পৃথিবী আগে সৃষ্টি নাকি মহাকাশ?

Print Friendly, PDF & Email

ভূমিকা

কোরআন, হাদিস এবং ইসলামের ক্লাসিক্যাল তাফসীরসমূহ অনুসারে, জমিন বা পৃথিবীর সৃষ্টি এবং মহাকাশের অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহ নক্ষত্র ইত্যাদি, এদের মধ্যে কোনটি পূর্বে বা আগে সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন ইসলামিস্ট বিভিন্ন সময়ে নানারকম মিথ্যাচার করেন। ইসলামিক মিথলজি অনুসারে, আল্লাহ পাক পৃথিবী এবং মহাকাশ একই সাথে সৃষ্টি করেন, কিন্তু মহাকাশ শুরুতে ছিল ধোঁয়ার আকার, অর্থাৎ গ্রহ উপগ্রহ নক্ষত্র তখনো তৈরি হয় নি। সেই সময়ে আল্লাহ পৃথিবীকে তৈরি, সেখানে গাছপালা ও প্রাণিকুল সৃষ্টিতে মন দেন। সর্বশেষে আদমকে সৃষ্টির পরেই তিনি মহাকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং আসমানকে সাত আসমানে পরিণত করে প্রদীপ অর্থাৎ সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্র স্থাপন করেন। এই লেখাটিতে এই বিষয়ে রেফারেন্সগুলো একত্র করা হলো, পরবর্তীতে তাদের উত্তরগুলো একসাথে দেয়ার জন্য। আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণা এবং ইসলামের ধারণার মিল অমিলগুলো আপনারা নিজেরাই বুঝতে পারবেন।

পৃথিবী নামক গ্রহটির সৃষ্টি ও বয়স

পৃথিবী সূর্য থেকে দূরত্ব অনুযায়ী তৃতীয়, সর্বাপেক্ষা অধিক ঘনত্বযুক্ত এবং সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ। এটি সৌরজগতের চারটি কঠিন গ্রহের অন্যতম। পৃথিবীর অপর নাম “বিশ্ব” বা “নীলগ্রহ”। আজ থেকে প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর আগে পৃথিবী গঠিত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, পৃথিবীর থেকে বহু পুরনো এবং বয়ষ্ক গ্রহ বিজ্ঞানের জগতে খুবই সাধারণ বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ট্রাপিস্ট-১ (ইংরেজি: TRAPIST-1) এর গ্রহগুলোর কথা।

পৃথিবী 2

TRAPIST-1 একটি অতি-শীতল বামন তারকা, যা 2MASS J23062928-0502285, হিসেবেও পরিচিত।  তারকাটি পৃথিবী থেকে ৩৯ আলোকবর্ষ (১২ পার্সেক; ৩৭০ পেটামিটার)দূরে কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটি  ২০১৫ সালে চিলির লা সিলা মানমন্দিরে মাইকেল গিলনের নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল ‘ট্রানজিট ফটোমেট্রি’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে TRAPPIST (Transiting Planets and Planetesimals Small Telescope)নামক দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে বামন তারকাটির চারপাশে প্রদক্ষিণরত পৃথিবীর সমান আকারের তিনটি গ্রহ আবিষ্কার করে । ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর চারপাশে আরো চারটি বহির্গ্রহ আবিষ্কারের ঘোষণা দেয় ।TRAPPIST ছাড়াও প্যারানালে অবস্থিত Very Large Telescope এবং নাসার Spitzer Space Telescope ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন যে , আবিষ্কৃত সাতটি গ্রহের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি অথবা সবগুলোই বামন তারকাটির প্রাণমণ্ডলে অবস্থিত ।

আরো পড়ুনঃ The TRAPPIST-1 Planets Are Older Than Earth

এবারে জেনে নিন, মহাবিশ্বে যতটুকু মানুষ জানতে পেরেছে, তার মধ্যে প্রাচীনতম গ্রহটি সম্পর্কে। প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর আগের এই গ্রহটির সম্পর্কে পড়ুন এখান থেকেঃ  Oldest Known Planet Identified

আসমান বা মহাকাশ বা মহাবিশ্ব সৃষ্টি

পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ , সূর্য ও অন্যান্য তারা ও নক্ষত্র, জ্যোতির্বলয়স্থ স্থান ও এদের অন্তর্বর্তীস্থ গুপ্ত পদার্থ , ল্যামডা-সিডিএম নকশা , তমোশক্তি ও শূণ্যস্থান (মহাকাশ) – যেগুলো এখনও তাত্ত্বিকভাবে অভিজ্ঞাত কিন্তু সরাসরি পর্যবেক্ষিত নয় – এমন সব পদার্থ ও শক্তি মিলে যে জগৎ তাকেই বলা হচ্ছে মহাবিশ্ব বা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড। বর্তমান বিশ্বতত্ত্বের মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বর্তমান বয়েস ১৩.৭৫ বিলিয়ন বা ১,৩৭৫ কোটি বছর। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরে ৯২১ কোটি বছর পৃথিবী বলে কোন গ্রহের অস্তিত্ব ছিল না। এই সময়ে মহাবিশ্বে অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্রের উদ্ভব এবং ধ্বংস ঘটেছে, যখন পৃথিবীর জন্মও হয় নি।

শুরুতেই জেনে নিই, এই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর উদ্ভব সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলছে।

আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টি একই দিনে?

কোরআনে পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসমান বা মহাকাশে আমরা যা দেখি সেসব এবং জমিন, অর্থাৎ পৃথিবীকে একই দিনে বা একই সময়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, এগুলোর বয়স হচ্ছে একই, বা এদের বয়সে কোন পার্থক্য নেই। বিষয়টি পরিষ্কারভাবে একটি মস্তবড় বৈজ্ঞানিক ভুল। কারণ আমরা আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার থেকে জানি, মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রায় নয় বিলিয়ন বছর পরে পৃথিবী নামক গ্রহটির উদ্ভব ঘটে। এর পূর্বে পৃহিবী নামক কোন কিছুর কোন অস্তিত্ব ছিল না। নিচে এই বিষয়ে কোরআনের আয়াত এবং প্রাসঙ্গিক তাফসীর দেয়া হচ্ছে। [1]

আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাস গণনায় বারটি। এর মধ্যে বিশেষ রূপে চারটি মাস হচ্ছে সম্মানিত। এটাই হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। অতএব তোমরা এ মাসগুলিতে (ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে) নিজেদের ক্ষতি সাধন করনা, আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখ যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টির দিন থেকেই [১] আল্লাহ্‌র বিধানে [২] আল্লাহ্‌র কাছে গণনায় মাস বারটি [৩], তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস [৪], এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন [৫]। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Indeed, the number of months with Allah is twelve [lunar] months in the register of Allah [from] the day He created the heavens and the earth; of these, four are sacred.1 That is the correct religion [i.e., way], so do not wrong yourselves during them.2 And fight against the disbelievers collectively as they fight against you collectively. And know that Allah is with the righteous [who fear Him].
— Saheeh International

তাফসীর গ্রন্থগুলোতেও এই বিষয়গুলো খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, স্বয়ং নবী এবং নবীর সাহাবীগণ অনেকেই একই বক্তব্য দিয়েছেন। [2]

পৃথিবী 4
পৃথিবী 6
পৃথিবী 8
পৃথিবী 10

ঠিক একই বিষয় এসেছে অনেকগুলো হাদিসেও। আসুন হাদিসগুলো দেখি, [3] [4]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ২৩৯৮. আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গননায়, মাস বারোটি। তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান (৯ঃ ৩৬) القيم শব্দটি قائم (প্রতিষ্ঠিত) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৩০৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৬৬১ – ৪৬৬২
২৩৯৭. অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণীঃ সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে দাগিয়ে দেয়া হবে তাদের কপাল, তাদের পাঁজর এবং তাদের পৃষ্ঠদেশ, বলা হবেঃ এগুলো হল তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং যা তোমরা জমা করে রাখতে তার সাদ গ্রহণ কর। (৯: ৩৫)
আহমাদ ইবন শু’আয়ব ইবন সা’ঈদ (রহঃ) … খালিদ ইবনু আসলাম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে বের হলাম। তখন তিনি বললেন, এ আয়াতটি যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের। এরপর যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হলে আল্লাহ তা সম্পদের পরিশুদ্ধকারী রূপে নির্ধারণ করেন।
৪৩০৫ আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল ওয়াহাব (রহঃ) … আবূ বকর (রাঃ) কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহর যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করে সেদিন যেভাবে কাল (যামানা) ছিল তা আজও অনুরূপভাবে বিদ্যমান। বারোমাসে এক বছর, তন্মধ্যে চার মাস পবিত্র। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকাদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররম আর মুযার গোত্রের রজব যা জামিদিউস সানী ও সাবান মাসদ্বয়ের মধ্যবর্তী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬। হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৮২. মক্কার হারামে হওয়া, হারামের অভ্যন্তরে ও উপকণ্ঠে শিকার কার্য চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ, এখানকার গাছপালা উপড়ানো ও ঘাস কাটা নিষেধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩১৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৫৩
৩১৯৩-(৪৪৫/১৩৫৩) ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল হানযালী (রহঃ) ….. ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাহ (মক্কা) বিজয়ের দিন বলেছেনঃ হিজরাতের আর প্রয়োজন নেই, কিন্তু জিহাদ ও নিয়্যাত অব্যাহত থাকবে। তোমাদেরকে যখন জিহাদের আহবান জানানো হয় তখন জিহাদে যোগদান কর। মক্কাহ (মক্কা) বিজয়ের দিন তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তা’আলা এ শহরকে সম্মানিত করেছেন- যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকে। অতএব কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা এ শহরের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখবেন। তিনি এ শহরে আমার পূর্বে আর কারও জন্য যুদ্ধ বৈধ করেননি। আমার জন্য মাত্র এক দিনের কিছু সময় তিনি এখানে যুদ্ধ বৈধ করেছিলেন। অতএব তথায় যুদ্ধ বিগ্রহ করা হারাম। আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার কারণে এখানকার কোন কাঁটাযুক্ত গাছ উপড়ানো যাবে না, এখানকার শিকারের পশ্চাদ্ধাবণ করা যাবে না, এখানকার পতিত জিনিস তোলা যাবে না। তখন “আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কিন্তু ইযখির (লম্বা ঘাস) সম্পর্কে (অনুমতি দিন)। কারণ তা স্বর্ণকার ও তাদের ঘরের কাজে লাগে। তিনি বললেন, কিন্তু ইযখির (তোলার অনুমতি দেয়া হল)। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩১৬৮, ইসলামীক সেন্টার ৩১৬৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

কোরআনে পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টি

এবারে আসুন, এই সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতগুলো দেখে নিই।

তোমাদের জন্য তিনি ভূ-মন্ডলের যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করিয়াছেন, অতঃপর নভোমন্ডলের যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করিয়াছেন, অতঃপর নভোমন্ডলের প্রতি দৃষ্টি দিয়া ইহাকে সাত স্তরে বিভক্ত করিয়াছেন, তিনিই সকল বস্তু সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।
কুরআন ২ঃ২৯

বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু’দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
কুরআন ৪১ঃ৯-১২

বিভিন্ন অনুবাদে পৃথিবী ও মহাকাশ

ইসলামের দাবী অনুসারে, আসমান বা মহাকাশের যাবতীয় বস্তু ও পৃথিবী একই সময়ে সৃষ্টি হলেও, পৃথিবীকে আল্লাহপাক আগে সজ্জিত করেন। সেই সময়টুকুতে আসমান ছিল একটি ধুম্রকুঞ্জ। পৃথিবী সজ্জিত করার পরে আল্লাহ আসমানের দিকে মন দেন এবং আসমানকে সজ্জিত করেন। এরপরে তিনি নিকটবর্তী আসমানে প্রদীপ বা সূর্যের মত নক্ষত্র, তারা ইত্যাদি তৈরি করেন। আসুন, বিষয়গুলো কোরআনের কয়েকটি অনুবাদ থেকে দেখে নিই।

পৃথিবী 12
পৃথিবী 14
পৃথিবী 16
পৃথিবী 18
পৃথিবী 20
পৃথিবী 22
পৃথিবী 24
পৃথিবী 26

হাদিসে পৃথিবী ও মহাকাশ সৃষ্টি

এবারে আসুন দেখা যাক, সহিহ হাদিস কী বলে। উল্লেখ্য, অনেকেই দাবী করেন যে, ছয় দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয়দিন বলতে নাকি ছয় যুগ বা ছয় কাল বোঝানো হয়েছে। অথচ সহিহ হাদিসে একদম শনি রবি সোম বার উল্লেখ করেই দিনের হিসেব করা হয়েছে। যা থেকে নিঃসন্দেহে বোঝা যায়, ঐ ছয় দিন আসলে পৃথিবীরই দিন। তাই এই বিষয়ে মিথ্যাচার করার আর কোন উপায় নেই।

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
হাদিস নম্বরঃ (6947) অধ্যায়ঃ ৫২। কিয়ামাত, জান্নাত ও জান্নামের বর্ণনা
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ১. সৃষ্টির সূচনা এবং আদাম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৯৪৭-(২৭/২৭৮৯) সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারূন ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তা’আলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন এবং এতে পর্বত সৃষ্টি করেন রবিবার দিন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি বিপদাপদ সৃষ্টি করেন। তিনি নূর সৃষ্টি করেন বুধবার দিন। তিনি বৃহস্পতিবার দিন পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর জুমুআর দিনের শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ আসর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে সর্বশেষ মাখলুক আদাম (আঃ) কে সৃষ্টি করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৯৭,ইসলামিক সেন্টার ৬৮৫১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
হাদিস নম্বরঃ (6797) পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২. সৃষ্টির সূচনা এবং আদম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৭৯৭। সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তাআলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন। রোববার দিন তিনি এতে পর্বত সৃষ্টি করেন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি আপদ বিপদ সৃষ্টি করেন। বুধবার দিন তিনি নূর সৃষ্টি করেন। বৃহস্পতিবার দিন তিনি পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ জুমুআর দিনের সময়সমূহের শেষ মুহূর্তে (মাখলূক) আসর থেকে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

পৃথিবী 28
পৃথিবী 30

তাফসীরে পৃথিবী ও মহাকাশ সৃষ্টি

এবারে, সর্বাধিক প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 32
পৃথিবী 34
পৃথিবী 36
পৃথিবী 38
পৃথিবী 40
পৃথিবী 42

এবারে, প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবন আব্বাসে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 44
পৃথিবী 46

এবারে, প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে জালালাইনে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 48

এবারে,  মা’আরেফুল কোরআনে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 50
পৃথিবী 52
পৃথিবী 54

এবারে, সর্বাধিক প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুরা ফুসসিলাতের ৯-১২ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 56
পৃথিবী 58
পৃথিবী 60
পৃথিবী 62
পৃথিবী 64
পৃথিবী 66
পৃথিবী 68
পৃথিবী 70

সূর্যের আগেই গাছপালা সৃষ্টি?

নিচের আয়াতগুলো মন দিয়ে পড়ুন। এখানে বলা হচ্ছে, আল্লাহ পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন, এরপরে পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করলেন। অর্থাৎ গাছপালা পশুপাখী তৈরি করলে। সেই সময়ে আকাশ ছিল ধুম্রকুঞ্জ। এরপরে তিনি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা অর্থাৎ সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করলেন। অর্থাৎ, ইসলাম অনুসারে সূর্যের সৃষ্টি পৃথিবীর গাছপালা সৃষ্টির পরে। কিন্তু সূর্য না থাকলে সালোক সংশ্লেষণ ও গাছপালা কীভাবে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, তা পাঠকের বোধবুদ্ধির ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।

বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু’দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
কুরআন ৪১ঃ৯-১২

পৃথিবী 24
পৃথিবী 26

উপসংহার

উপরের কোরআন, হাদিস, তাফসীর এবং ইসলামী স্কলারদের বক্তব্য অনুসারে, পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে ইসলামের দাবীগুলো যে বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক, তা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। কোরআন ও হাদিস অনুসারে, পৃথিবী ও মহাবিশ্ব একই সময়ে সৃষ্টি, যা একটি ভুল কথা। পৃথিবী নামক গ্রহটির উৎপত্তি মহাবিশ্বের উৎপত্তির কমপক্ষে ৯ বিলিয়ন বছর পরে। সেইসাথে, পৃথিবীর উপরিভাগ গঠনের পরে, পাহাড় পর্বত ও পৃথিবীতে খাদ্য অর্থাৎ গাছপালা তৈরির পরে আল্লাহ আসমানের দিকে নজর দেন, এবং সেই সময়ে আসমান ছিল ধুম্রকুঞ্জ। সেখান থেকে তিনি প্রদীপমালা অর্থাৎ নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেন। এটিও ভুল কথা। কারণ পৃথিবীর থেকে বহু প্রাচীন নক্ষত্র এবং গ্রহ পাওয়া গেছে। পৃথিবী মোটেও মহাবিশ্বের প্রাচীনতম গ্রহ নয়।

পাঠকের কাছে অনুরোধ থাকবে, প্রতিটি রেফারেন্স নিজেরাই যাচাই করে দেখুন, এবং সিদ্ধান্ত নিন। যুক্তি এবং বুদ্ধি দিয়ে, অন্ধবিশ্বাস দিয়ে কগনিটিভ বায়াসের দ্বারা নয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. কোরআন সূরা তওবাঃ ৩৬ []
  2. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৮৩- ৫৮৬ []
  3. সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নম্বরঃ ৪৩০৫ []
  4. সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), হাদিস নাম্বারঃ ৩১৯৩ []
আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

5 thoughts on “পৃথিবী আগে সৃষ্টি নাকি মহাকাশ?

  • জুন 23, 2019 at 9:39 পূর্বাহ্ন
    Permalink

    ভাই অসাধারণ ব্যবচ্ছেদ

    Reply
    • অক্টোবর 11, 2020 at 3:34 অপরাহ্ন
      Permalink

      লেখাটা ভালো হয়েছে। তবে ওখানে ধুম্র কুঞ্জ নামে কী বোঝানো হয়েছে বুঝতে পারছি না!

      Reply
  • জুলাই 25, 2019 at 2:47 পূর্বাহ্ন
    Permalink

    অাদমকে যদি সৃষ্টি করে থাকেন তবে তাকে বেহেশতে সৃষ্টি করেছেনে । পৃথিবীর দিন রাত্রির সময় হিসেবে কেন বর্ণনা থাকবে? সেখানে কোন সুর্যের অালোর বর্ণনা করা হচ্ছে ?

    Reply
  • জুন 5, 2021 at 2:58 অপরাহ্ন
    Permalink

    মুমিন বিজ্ঞানীরা তো একেবারে শহীদ হয়ে যাবে। তারা না পারবে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে না পারবে কোরআনকে। না পারবে বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারবে কোরআনকে।

    Reply
  • সেপ্টেম্বর 16, 2021 at 8:52 অপরাহ্ন
    Permalink

    আহা । দারুন । তাফসির দিয়ে মুমিনদের ফাটিয়ে দিয়েছেন । থুম্মা নিয়ে অনেক ত্যানাবাজি করে । এবার চুপ হয়ে যাবে ।

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: