লজিক বা যুক্তিবিদ্যা (Logic): অবিন্যস্ত পৃথিবীতে বিন্যাসের খোঁজ
Table of Contents
- 1 ভূমিকা: মহাজাগতিক একাকীত্ব এবং আমাদের মস্তিষ্ক
- 2 লজিক বা যুক্তিবিদ্যা: সংজ্ঞা ও স্বরূপ
- 3 লজিকের প্রকারভেদ: আকারগত ও অনাকারগত
- 4 লজিকের ইতিহাস: অ্যারিস্টটল থেকে রাসেল
- 5 আর্গুমেন্ট: যুক্তির শরীরব্যাবচ্ছেদ
- 6 ডিডাকশন, ইন্ডাকশন ও অ্যাবডাকশন: সত্যে পৌঁছানোর তিন রাস্তা
- 7 ফ্যালাসি: মস্তিষ্কের প্রতারণার ফাঁদ
- 7.1 ১. অ্যাড হোমনেম: ব্যক্তিগত আক্রমণ
- 7.2 ২. স্ট্র-ম্যান ফ্যালাসি: কাকতাড়ুয়া যুক্তি
- 7.3 ৩. আপিল টু অথরিটি: কর্তৃপক্ষের দোহাই
- 7.4 ৪. স্লিপারি স্লোপ: পিচ্ছিল ঢাল
- 7.5 ৫. সার্কুলার রিজনিং: চক্রাকার যুক্তি
- 7.6 ৬. ফলস ডাইলেমা: মিথ্যা উভয়সংকট
- 7.7 ৭. পোস্ট হক ফ্যালাসি: কাকতালীয় দোষ
- 7.8 ৮. বার্ডেন অফ প্রুফ: প্রমাণের দায়ভার
- 7.9 ৯. নো ট্রু স্কটসম্যান: খাঁটি স্কটিশের দোহাই
- 7.10 ১০. তু কোক: তুমিও তো তাই
- 8 কগনিটিভ বায়াস: লজিকের শত্রু যখন নিজের মন
- 8.1 কনফার্মেশন বায়াস: নিজের আয়নায় দেখা
- 8.2 ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট: অজ্ঞতার অহংকার
- 8.3 সাঙ্ক কস্ট ফ্যালাসি: লোকসানের মায়া
- 8.4 অ্যাঙ্করিং বায়াস: প্রথম তথ্যের ফাঁদ
- 8.5 সার্ভাইভারশিপ বায়াস: বিজয়ীদের ইতিহাস
- 8.6 এভেইলেবিলিটি হিউরিস্টিক: সহজলভ্যতার বিভ্রান্তি
- 8.7 নেগেটিভিটি বায়াস: খারাপের প্রতি আসক্তি
- 8.8 ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট: হুজুগে মাতাল
- 8.9 হ্যালো ইফেক্ট: প্রথম দর্শনের মোহ
- 8.10 ফ্রেমিং ইফেক্ট: উপস্থাপনের জাদু
- 9 প্রপোজিশনাল লজিক ও সিম্বলিক লজিক: যুক্তির গণিত
- 10 প্যারাডক্স: যখন লজিক নিজেই লুপে আটকে যায়
- 10.1 মিথ্যাবাদীর প্যারাডক্স: সত্যের অনন্ত লুপ
- 10.2 নাপিতের প্যারাডক্স: সেটের সমস্যা
- 10.3 থিসিউসের জাহাজ: আমি কে?
- 10.4 সর্বশক্তিমানের প্যারাডক্স: অসীমের সীমাবদ্ধতা
- 10.5 সরাইটিস প্যারাডক্স: বালুর স্তূপের ধাঁধা
- 10.6 জেনোর প্যারাডক্স: গতির কি অস্তিত্ব আছে?
- 10.7 গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স: সময়ের গোলমাল
- 10.8 সারপ্রাইজ হ্যাংগিং প্যারাডক্স: অপ্রত্যাশিত ফাঁসি
- 11 লজিক এবং বিজ্ঞান: সংশয়বাদের হাতিয়ার
- 12 লজিক ও নৈতিকতা: ভালো-মন্দের হিসাব
- 13 যুক্তির স্থপতিরা: লজিকের বিবর্তনের তাত্ত্বিক রূপরেখা
- 13.1 অ্যারিস্টটল: যুক্তির প্রথম বিধায়ক
- 13.2 ক্রিসিপাস ও স্টোয়িক লজিক: বাক্যের গণিত
- 13.3 ফ্রান্সিস বেকন: প্রকৃতির লজিক ও আরোহ পদ্ধতি
- 13.4 গটফ্রিড লাইবনিজ: সর্বজনীন ভাষার স্বপ্নদ্রষ্টা
- 13.5 জর্জ বুলি ও গটলোব ফ্রেগে: লজিকের গাণিতিকরণ
- 13.6 বার্ট্রান্ড রাসেল ও লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন: ভাষার সীমানা
- 13.7 কুর্ট গ্যোদেল ও অ্যালান টুরিং: লজিকের অসম্পূর্ণতা ও কম্পিউটেশন
- 13.8 ডব্লিউ. ভি. ও. কাইন ও সল ক্রিপকে: আধুনিক লজিকের দিগন্ত
- 14 উপসংহার: মশাল হাতে একা
- 15 তথ্যসূত্র
ভূমিকা: মহাজাগতিক একাকীত্ব এবং আমাদের মস্তিষ্ক
মানুষ প্রজাতিটি বড়ই বিচিত্র। এই দ্বিপদ প্রাণীটি নিজেকে ‘র্যাশনাল’ বা যুক্তিবাদী দাবি করতে পছন্দ করে, অথচ তার সারাটা জীবন কাটে অদ্ভুত সব অযৌক্তিক আবেগের ঘোরে। মহাবিশ্বের এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে আমরা আসলে খুব ক্ষুদ্র দর্শক। আমাদের মাথার ওপর অসীম আকাশ, পায়ের নিচে ঘূর্ণায়মান পৃথিবী। চারিদিকে লক্ষ কোটি নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, আর ব্ল্যাকহোল। এই যে বিপুল এবং বিশাল মহাজাগতিক কর্মকাণ্ড, এর মধ্যে কোনো দয়া-মায়া নেই, কোনো ঐশ্বরিক পরিকল্পনা নেই, আছে কেবল অন্ধ পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম। এই নিয়মগুলো নিষ্ঠুর এবং নৈর্ব্যক্তিক। একটা বিশাল উল্কাপিণ্ড এসে পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিলে মহাবিশ্বের কিচ্ছু আসবে যাবে না। সে তার নিজের গতিতে প্রসারিত হতে থাকবে। এই অসীম শূন্যতা এবং নীরবতার মধ্যে মানুষ বড় একা।
কিন্তু মানুষ এই নৈর্ব্যক্তিক বিশৃঙ্খলা বা ক্যাওসের (Chaos) মধ্যে স্বস্তি পায় না। তার মস্তিষ্ক এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে, সে সবকিছুর মধ্যে প্যাটার্ন খোঁজে। সে চায় সবকিছুর একটা অর্থ দাঁড় করাতে। সে চায় কার্যকারণ সম্পর্ক (Cause and effect) খুঁজে বের করতে। আদিম গুহায় বসে থাকা মানুষটি যখন দেখল আগুনের তাপে মাংস নরম হয়, তখন তার মস্তিষ্কে একটা নিউরনের খেলা চলল। সে বুঝল, ‘তাপ’ এবং ‘মাংসের পরিবর্তন’-এর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। এই যে সম্পর্ক খোঁজার প্রক্রিয়া, এই যে এক বা একাধিক জানা তথ্য থেকে একটা অজানা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা – এটাই লজিক বা যুক্তিবিদ্যা (Logic)।
আমরা যখন বলি, “লোকটা খুব লজিক্যাল,” তখন আমরা আসলে কী বোঝাই? আমরা বোঝাই, লোকটা আবেগের বশবর্তী হয়ে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। সে তথ্য যাচাই করে, প্রমাণের দিকে তাকায়, তারপর কথা বলে। কিন্তু লজিক কি কেবলই প্রমাণের খেলা? না। লজিক হলো চিন্তার বিশুদ্ধতা রক্ষার বিজ্ঞান। এটি এমন এক টুলবক্স (Toolbox), যা আমাদের মস্তিষ্কের অপরিচ্ছন্ন চিন্তাগুলোকে ছেঁটে ফেলে একটা ঝকঝকে রূপ দেয়। বার্ট্রান্ড রাসেল একবার বলেছিলেন, গণিত হলো লজিকেরই এক পরিণত রূপ (Russell, 1919)। অর্থাৎ, আমরা যা কিছু ভাবি, তার মূলে যদি সঠিক যুক্তি থাকে, তবে পৃথিবীটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
এই আর্টিকেলে আমরা লজিকের সেই গোলকধাঁধায় প্রবেশ করব। আমরা দেখব কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের বোকা বানায়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করতে হয়। কোনো অলৌকিক শক্তিতে আমরা বিশ্বাস করব না, কারণ লজিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, বিশ্বাসের ওপর নয়। অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে বেড়ানোর নাম জীবন হতে পারে, কিন্তু সেই অন্ধকারে টর্চলাইট ফেলার নামই হলো লজিক। আসুন, সেই টর্চলাইটটা একটু জ্বালিয়ে দেখি।
লজিক বা যুক্তিবিদ্যা: সংজ্ঞা ও স্বরূপ
মানুষের মস্তিষ্কের কারবার বড়ই অদ্ভুত। সে সারাক্ষণ কথা বলে, নিজের সাথে কিংবা অন্যের সাথে। এই যে অবিরাম চিন্তার স্রোত, এর বেশির ভাগই এলোমেলো, অসংলগ্ন এবং আবেগের বর্জ্যে ঠাসা। আমরা যখন বলি আমরা চিন্তা করছি, তখন আসলে আমরা স্মৃতির জাবর কাটি অথবা ভবিষ্যতের অলীক কল্পনা করি। কিন্তু লজিক বা যুক্তিবিদ্যা এই অসংলগ্ন স্রোতে বাঁধ দিতে চায়। লজিক (Logic) শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘লোগোস’ (Logos) থেকে, যার অর্থ কেবল শব্দ বা বাক্য নয়, এর গভীর অর্থ হলো চিন্তা, নীতি বা মহাজাগতিক বিন্যাস। গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস (Heraclitus) মনে করতেন, এই মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা লোগোস (Logos) দ্বারা চালিত হয়। লজিক হলো সেই নিয়মেরই ভাষ্য। খুব সহজ ভাষায় এবং কেতাবি ঢঙে বললে, লজিক হলো ‘সঠিক চিন্তার নিয়মাবলী’। দর্শনের ভাষায় একে বলা হয় ‘সায়েন্স অফ রিজনিং’ (Science of Reasoning) বা বিচারবুদ্ধির বিজ্ঞান। আমরা সারাদিন অজস্র কথা বলি, অজস্র দাবি করি, চায়ের কাপে ঝড় তুলি। লজিকের কাজ হলো সেই দাবিগুলোর কঙ্কাল বের করে আনা এবং একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতো পরীক্ষা করে দেখা যে, সেই কঙ্কালের কোথাও কোনো হাড় ভাঙা আছে কি না, নাকি কাঠামোটা ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে আছে।
লজিক আসলে কী করে, সেটা বোঝার জন্য একটা সাধারণ উদাহরণের ব্যবচ্ছেদ করা যাক। ধরুন আপনি বললেন – “আজকে খুব গরম, তাই বাইরে যাব না।” আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বাক্য মনে হলেও, লজিকের চোখে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আর্গুমেন্ট। লক্ষ করুন, এখানে দুটো অংশ আছে। প্রথম অংশটি হলো: “আজকে খুব গরম” – লজিকের ভাষায় একে বলে আশ্রয়বাক্য বা হেতুবাক্য (Premise)। দ্বিতীয় অংশটি হলো: “তাই বাইরে যাব না” – একে বলে সিদ্ধান্ত (Conclusion)। লজিকের কাজ হলো দেখা, এই যে আপনি ‘গরম’ থাকার কারণে ‘বাইরে না যাওয়ার’ সিদ্ধান্ত নিলেন, এই প্রসেসটা বা প্রক্রিয়াটা ঠিক আছে কি না (Copi et al., 2014)। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে যা সাধারণ মানুষ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলে। লজিক কিন্তু এটা দেখতে যাবে না যে, আজকে সত্যি সত্যি বাইরে গরম কি না। জানালার বাইরে তাকিয়ে তাপমাত্রা মাপা লজিকের কাজ নয়, ওটা আবহাওয়াবিদ বা আপনার ত্বকের কাজ। লজিকের কাজ হলো স্ট্রাকচার বা কাঠামো দেখা। লজিক কেবল দেখবে, আপনার দেওয়া তথ্যের (গরম) ভিত্তিতে আপনার নেওয়া সিদ্ধান্ত (বাইরে না যাওয়া) যৌক্তিকভাবে আসে কি না। অর্থাৎ লজিক তথ্যের সত্যতা (Truth) এবং যুক্তির বৈধতা (Validity) নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে কাজ করে। এই পার্থক্যটি না বুঝলে লজিকের রাজ্যে প্রবেশ করা অসম্ভব।
সত্যতা বনাম বৈধতা: যুক্তির কষ্টিপাথর
লজিকের দুনিয়ায় ‘সত্যতা’ (Truth) এবং ‘বৈধতা’ (Validity) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা। একটি আর্গুমেন্ট বা যুক্তি তখনই ‘ভ্যালিড’ (Valid) বা বৈধ হয়, যখন তার আশ্রয়বাক্যগুলো সত্য হলে সিদ্ধান্তটি মিথ্যা হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ধরুন আমি বললাম, “সকল মানুষ ডানাযুক্ত। সক্রেটিস একজন মানুষ। সুতরাং, সক্রেটিসের ডানা আছে।” লজিকের বিচারে এটি একটি ১০০% বৈধ বা ভ্যালিড যুক্তি। আপনি হয়তো অবাক হয়ে বলবেন, “মানুষের ডানা থাকে কীভাবে? এটা তো মিথ্যা!” ঠিক তাই, এখানে আশ্রয়বাক্যটি (সকল মানুষ ডানাযুক্ত) বাস্তবে মিথ্যা, কিন্তু যুক্তির গঠনটি নিখুঁত। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই মানুষ ডানাযুক্ত, তবে সক্রেটিসের ডানা থাকতেই হবে। এখানে লজিক তার নিয়ম মেনেছে। অন্যদিকে, একটি যুক্তি বাস্তবে সত্য হতে পারে কিন্তু লজিক্যালি অবৈধ বা ‘ইনভ্যালিড’ (Invalid) হতে পারে। যেমন: “রফিক মাছ খেতে পছন্দ করে। রফিক একজন বাঙালি। সুতরাং, সকল বাঙালি মাছ খেতে পছন্দ করে।” এখানে হয়তো সিদ্ধান্তটি বাস্তবে সত্য (বেশিরভাগ বাঙালি মাছ পছন্দ করে), কিন্তু যুক্তিটি অবৈধ। কারণ মাত্র একজন রফিকের পছন্দ দিয়ে আপনি কোটি কোটি বাঙালির পছন্দ বিচার করতে পারেন না। একে বলা হয় ‘ফ্যালাসি’ (Fallacy) বা অনুপপত্তি। সুতরাং, লজিক শেখার প্রথম পাঠ হলো বিষয়বস্তু (Content) এবং আকার (Form)-এর মধ্যে পার্থক্য করতে শেখা। লজিক হলো চিন্তার গ্রামার বা ব্যাকরণ। ব্যাকরণ যেমন বলে না আপনি কী লিখবেন, কেবল বলে কীভাবে লিখলে বাক্যটি শুদ্ধ হবে; লজিকও তেমনি বলে না আপনি কী ভাববেন, কেবল বলে কীভাবে ভাবলে সিদ্ধান্তটি নির্ভুল হবে।
লজিকের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন এক জায়গায় পৌঁছানো যাকে বলা হয় ‘সাউন্ড আর্গুমেন্ট’ (Sound Argument)। একটি যুক্তিকে তখনই সাউন্ড বা যথার্থ বলা হবে যখন এর দুটি গুণ থাকবে: এক, যুক্তিটি গঠনগতভাবে বৈধ বা ভ্যালিড হবে; এবং দুই, এর আশ্রয়বাক্যগুলো বাস্তবে সত্য হবে। যেমন: “সকল স্তন্যপায়ী প্রাণী মেরুদণ্ডী। মানুষ একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। সুতরাং, মানুষ মেরুদণ্ডী।” এটি একটি সাউন্ড আর্গুমেন্ট। এখানে লজিক এবং বাস্তব পৃথিবী হাত ধরাধরি করে চলেছে। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, রাজনীতিতে, টকশোতে আমরা যেসব যুক্তি দেখি, তার অধিকাংশই আনসাউন্ড। হয় তাদের তথ্যে ভুল থাকে, নয়তো তাদের যুক্তির গঠনে প্যাঁচ থাকে। লজিক আমাদের শেখায় কীভাবে এই জঞ্জাল সরিয়ে বিশুদ্ধ সত্যের কাছে পৌঁছানো যায়। বিখ্যাত দার্শনিক গটলোব ফ্রেগে (Gottlob Frege) লজিককে মনোবিজ্ঞান বা সাইকোলজি থেকে আলাদা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষ কীভাবে চিন্তা করে সেটা মনোবিজ্ঞানের বিষয়, কিন্তু মানুষের কীভাবে চিন্তা করা উচিত – সেটাই লজিকের বিষয়। আমাদের মস্তিষ্ক বিবর্তনের মাধ্যমে টিকে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে, সত্য খোঁজার জন্য নয়। তাই আমাদের ন্যাচারাল বা স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনায় প্রচুর খাদ থাকে। লজিক সেই খাদ বের করে চিন্তাকে পিওর গোল্ড বা খাঁটি সোনায় পরিণত করার চেষ্টা করে।
বচন বা প্রপোজিশন: যুক্তির একক
লজিকে আমরা যে বাক্যগুলো ব্যবহার করি, সেগুলোকে বলা হয় বচন বা প্রপোজিশন (Proposition)। সব বাক্য প্রপোজিশন নয়। যে বাক্যের কোনো সত্য বা মিথ্যা মান (Truth value) নেই, তা লজিকের অংশ হতে পারে না। আপনি যদি বলেন, “উফ! কী সুন্দর দৃশ্য!” – এটি লজিকের বাক্য নয়, কারণ এটি আপনার মনের আবেগ। এর কোনো সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যায় না। আপনি যদি কাউকে আদেশ দেন, “দরজাটা বন্ধ করো” – এটিও প্রপোজিশন নয়। কিন্তু আপনি যদি বলেন, “দৃশ্যটিতে লাল রং আছে” – এটি একটি প্রপোজিশন, কারণ একে যাচাই করা সম্ভব; হয় দৃশ্যটিতে লাল রং আছে (সত্য), নয়তো নেই (মিথ্যা)। লজিকের দুনিয়াটা বাইনারি (Binary) – এখানে ধূসর এলাকার কোনো স্থান নেই। একে বলা হয় ‘ল অফ বাইভ্যালেন্স’ (Law of Bivalence) বা দ্বিমূল নীতি। একটি প্রপোজিশন হয় সত্য হবে, নয়তো মিথ্যা হবে। এর মাঝামাঝি কিছু নেই। ব্যাপারটা অনেকটা কম্পিউটারের জিরো আর ওয়ানের মতো। এই জিরো আর ওয়ানের ওপর ভিত্তি করেই যেমন আজকের ডিজিটাল বিপ্লব, তেমনি সত্য আর মিথ্যার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বিশাল যুক্তিবিদ্যার ইমারত।
দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) তাঁর বিখ্যাত বই ক্রিটিক অফ পিওর রিজন-এ প্রপোজিশন বা বচনকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন (Kant, 1781)। এই ভাগটি বুঝলে লজিকের স্বরূপ বোঝা সহজ হয়। প্রথমত, ‘বিশ্লেষণাত্মক বচন’ (Analytic Proposition)। এই ধরণের বচনে বিধেয় (Predicate) উদ্দেশ্য (Subject)-এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। যেমন: “সব অবিবাহিত পুরুষই ব্যাচেলর।” এই বাক্যটি সত্য কি না তা জানার জন্য আপনাকে জরিপ চালাতে হবে না বা কারোর বৈবাহিক অবস্থা জানতে হবে না। ‘ব্যাচেলর’ শব্দের অর্থ জানলেই বোঝা যায় বাক্যটি সত্য। এটি সংজ্ঞাগতভাবেই সত্য। দ্বিতীয়ত, ‘সংশ্লেষণাত্মক বচন’ (Synthetic Proposition)। এখানে নতুন তথ্য যুক্ত হয় যা কেবল বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় না। যেমন: “টেবিলের ওপর একটি বিড়াল বসে আছে।” এই বাক্যটি সত্য না মিথ্যা তা জানার জন্য আপনাকে বাস্তবে টেবিলটির দিকে তাকাতে হবে। লজিক মূলত এই দুই ধরণের বচনের বিন্যাস নিয়েই খেলে। পিওর লজিক বা গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা সাধারণত অ্যানালিটিক বা বিশ্লেষণাত্মক সত্য নিয়ে কাজ করে, যেখানে বাইরের জগতের তথ্যের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সঙ্গতি বা কনসিস্টেন্সি বেশি জরুরি।
চিন্তার মৌলিক সূত্রসমূহ
যুক্তিবিদ্যার বিশাল প্রাসাদটি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি মৌলিক স্তম্ভ বা সূত্রের ওপর। এগুলোকে বলা হয় ‘লজ অফ থট’ (Laws of Thought)। এই সূত্রগুলো এতই মৌলিক যে, এগুলোকে প্রমাণ করা যায় না, বরং এগুলো সত্য বলে ধরে নিয়েই সব প্রমাণ করতে হয়। অ্যারিস্টটল এই সূত্রগুলোকে চিন্তার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। প্রথমটি হলো ‘অভেদ বা আইডেন্টিটির সূত্র’ (The Law of Identity)। সহজ কথায়, যা যা-ই, তা তা-ই (A is A)। একটি আপেল একটি আপেলই। তর্কের মাঝখানে আপনি শব্দের অর্থ বদলাতে পারেন না। যদি তর্কের শুরুতে ‘ব্যাংক’ বলতে আপনি নদীর তীর বোঝান, তবে শেষে এসে ‘টাকা রাখার ব্যাংক’ বলতে পারবেন না। শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, পৃথিবীর অধিকাংশ বিতর্ক বা ভুল বোঝাবুঝির মূল কারণ হলো এই আইডেন্টিটির সংকট। আমরা একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করি এবং ভাবি আমরা লজিক্যাল কথা বলছি।
দ্বিতীয় সূত্রটি হলো ‘বিরোধহীনতার সূত্র’ (The Law of Non-Contradiction)। একই সময়ে, একই অর্থে কোনো কিছু সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না। আপনি বলতে পারেন না, “আমি এখন ঘরে আছি এবং আমি এখন ঘরে নেই।” দুটোর একটা সত্য হবে, অন্যটা মিথ্যা। এই মহাবিশ্বে কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতার কোনো অস্তিত্ব নেই। আপনি যদি কোথাও স্ববিরোধিতা দেখেন, তবে বুঝবেন আপনার দেখায় ভুল আছে অথবা আপনার তথ্যে ভুল আছে। লজিকের কাজ হলো এই স্ববিরোধিতা খুঁজে বের করা এবং তা নির্মূল করা। তৃতীয় সূত্রটি হলো ‘মধ্যম রহিত সূত্র’ (The Law of Excluded Middle)। যেকোনো বিবৃতি হয় সত্য হবে, না হয় মিথ্যা হবে। এর মাঝামাঝি তৃতীয় কোনো অবস্থা নেই। হয় আজ বৃষ্টি হবে, নয়তো হবে না। “একটু একটু বৃষ্টি হতেও পারে” – এটা লজিকের ভাষায় অস্পষ্টতা বা ভেগনেস, কিন্তু দিনশেষে ঘটনাটা ঘটবে অথবা ঘটবে না। কোয়ান্টাম ফিজিক্সে এই সূত্রটি নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও, আমাদের ম্যাক্রোস্কোপিক বা দৃশ্যমান জগতে এবং ক্লাসিক্যাল লজিকে এটি অমোঘ সত্য। এই তিনটি সূত্র না মানলে কোনো অর্থপূর্ণ আলোচনা বা চিন্তা করা সম্ভব নয়। এরা হলো যুক্তিবাদী মনের রক্ষ কবচ।
লজিকের প্রকারভেদ: আকারগত ও অনাকারগত
লজিক বা যুক্তিবিদ্যাকে প্রধানত দুটি বড় ভাগে ভাগ করা যায় – ‘আকারগত যুক্তিবিদ্যা’ (Formal Logic) এবং ‘অনাকারগত যুক্তিবিদ্যা’ (Informal Logic)। ফরমাল লজিক হলো গণিতের মতো। এখানে ভাষা বা শব্দের আবেগের কোনো স্থান নেই। এখানে সব কিছুকে চিহ্নে বা সিম্বলে রূপান্তর করে ফেলা হয়। যেমন, “যদি বৃষ্টি হয়, তবে মাটি ভিজবে” বাক্যটিকে ফরমাল লজিকে লেখা হয় p → q। এখানে p হলো বৃষ্টি হওয়া আর q হলো মাটি ভেজা। এই ধরণের লজিকে আমরা যুক্তির কঙ্কাল বা স্ট্রাকচার নিয়ে কাজ করি। স্ট্রাকচার ঠিক থাকলে যুক্তি বৈধ। আধুনিক কম্পিউটার সায়েন্স, প্রোগ্রামিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) সম্পূর্ণভাবে এই ফরমাল লজিকের ওপর নির্ভরশীল। এখানে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, ইনফরমাল লজিক কাজ করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ও তর্ক নিয়ে। আমরা যখন খবরের কাগজ পড়ি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিই বা আদালতে উকিলরা যখন সওয়াল জবাব করেন, তখন তারা ইনফরমাল লজিক ব্যবহার করেন। এখানে কেবল যুক্তির আকার দেখলেই হয় না, প্রসঙ্গ বা কন্টেক্সট, শব্দের অর্থ এবং শ্রোতার মনস্তত্ত্বও বিচার করতে হয়। ইনফরমাল লজিকেই আমরা ফ্যালাসি বা অনুপপত্তিগুলো বেশি দেখতে পাই। যেমন, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা (Ad Hominem) বা আবেগের দোহাই দেওয়া। ফরমাল লজিক আমাদের শেখায় কীভাবে নিখুঁত হতে হয়, আর ইনফরমাল লজিক আমাদের শেখায় কীভাবে বাস্তব জীবনের বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে হয়। লজিকের এই স্বরূপ বা প্রকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যদিও আবেগী প্রাণী, আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে একটি যুক্তিবাদী সত্তা বাস করে, যে সব সময় বিশৃঙ্খলার মধ্যে শৃঙ্খলা খুঁজতে চায়। এই শৃঙ্খলা খোঁজার নামই বিজ্ঞান, এই শৃঙ্খলা খোঁজার নামই দর্শন, এবং এই শৃঙ্খলার ব্যাকরণই হলো লজিক।
চিন্তার মৌলিক সূত্রসমূহ: লজ অফ থট
যুক্তিবিদ্যার বিশাল এবং সুউচ্চ প্রাসাদটি শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত শক্তিশালী, স্বতঃসিদ্ধ এবং অপরিবর্তনীয় তিনটি মৌলিক স্তম্ভ বা সূত্রের ওপর। এই সূত্রগুলোকে বলা হয় ‘লজ অফ থট’ (Laws of Thought) বা চিন্তার মৌলিক নিয়ম। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (Aristotle) বহু শতাব্দী আগে এই নিয়মগুলোকে সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে গেছেন এবং তিনি এগুলোকে নাম দিয়েছিলেন “ফার্স্ট প্রিন্সিপালস” বা প্রথম নীতি। এই সূত্রগুলো এতটাই মৌলিক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, এগুলোকে আলাদা করে প্রমাণ করা যায় না, বরং অন্য যেকোনো কিছুকে প্রমাণ করতে গেলে এই সূত্রগুলোকে সত্য বলে ধরে নিতে হয়। আপনি যদি এই সূত্রগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবে সেই প্রশ্নটি করার জন্যও আপনাকে এই সূত্রগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হবে – এটাই হলো লজিকের প্যারাডক্স বা কূট। মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তনের ধারায় এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, সে বিশৃঙ্খল তথ্যের মধ্যে শৃঙ্খলা খুঁজতে চায়, আর এই সূত্রগুলোই হলো সেই শৃঙ্খলার ভিত্তিপ্রস্তর। কোনো আলোচনা, বিতর্ক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা গাণিতিক সমীকরণ – কোনোটিই এই তিনটি সূত্রকে লঙ্ঘন করে এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারে না। লজিক বা যুক্তিবিদ্যা মূলত এই তিনটি নিয়মের ওপর ভিত্তি করে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য গড়ে তোলে এবং আমাদের চিন্তার জগতকে পাগলামি বা ক্যাওস থেকে রক্ষা করে। একটু আগেই এই তিনটির ব্যাপারে বললাম। এবার চলুন, এই তিনটি সূত্রের গভীরে প্রবেশ করে দেখা যাক এরা কীভাবে আমাদের চিন্তার জগতকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
অভেদ বা আইডেন্টিটির সূত্র
প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি হলো অভেদ বা আইডেন্টিটির সূত্র (The Law of Identity)। খুব সহজ এবং গাণিতিক ভাষায় বলতে গেলে, যা যা-ই, তা তা-ই; অর্থাৎ A = A। শুনতে খুব বোকা বোকা বা সাধারণ মনে হতে পারে, মনে হতে পারে এটি তো জানা কথাই যে একটি আপেল একটি আপেলই, এটি কমলালেবু নয়। কিন্তু লজিকের গভীরে এর তাৎপর্য অসীম। এই সূত্রটি দাবি করে যে, একটি নির্দিষ্ট আলোচনার বা যুক্তির প্রেক্ষাপটে কোনো একটি বস্তু বা ধারণার অর্থ অপরিবর্তিত থাকতে হবে। আপনি তর্কের শুরুতে একটি শব্দের যে অর্থ ব্যবহার করবেন, তর্কের শেষেও সেই একই অর্থ বজায় রাখতে হবে। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি লজিকের ভাষায় ‘ইকুইভোকেশন’ (Equivocation) বা দ্ব্যর্থকতার দোষে দুষ্ট হবেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি তর্কের শুরুতে ‘ব্যাংক’ বলতে নদীর তীর বোঝান এবং কিছুক্ষণ পর সেই একই শব্দ ব্যবহার করে ‘টাকা রাখার ব্যাংক’ বোঝান, তবে আপনার পুরো যুক্তিটি ধসে পড়বে। বাস্তব জগত প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, নদীর জল গড়িয়ে যায়, মানুষের বয়স বাড়ে, পাহাড় ক্ষয় হয় – দার্শনিক হেরাক্লিটাস (Heraclitus) যেমন বলেছিলেন, “একই নদীতে দুবার পা দেওয়া যায় না” (Heraclitus, c. 500 BCE)। কিন্তু লজিকের জগত স্থির। লজিক দাবি করে, যখন আমরা কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছি বা কথা বলছি, অন্তত সেই মুহূর্তটুকুতে ওই বিষয়টির একটি সুনির্দিষ্ট এবং স্থির পরিচয় বা আইডেন্টিটি থাকতে হবে। যদি প্রতিটি শব্দের অর্থ প্রতি মুহূর্তে বদলে যেত, তবে মানুষের পক্ষে কোনো বাক্য গঠন করা বা যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না।
জার্মান গণিতবিদ ও দার্শনিক গটফ্রিড লাইবনিজ (Gottfried Wilhelm Leibniz) এই সূত্রটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছিলেন তার ‘আইডেন্টিটি অফ ইনডিসার্নিবলস’ (Identity of Indiscernibles) তত্ত্বে (Leibniz, 1714)। তিনি বলেছিলেন, যদি দুটি জিনিসের সব গুণাগুণ হুবহু এক হয়, তবে তারা আসলে দুটি ভিন্ন জিনিস নয়, তারা একই জিনিস। আইডেন্টিটির সূত্র আমাদের শেখায় যে সত্য পিচ্ছিল মাছের মতো নয় যা হাত থেকে ফসকে যাবে; সত্যকে হতে হবে সুনির্দিষ্ট। আমরা যখন বলি “মানুষ মরণশীল”, তখন ‘মানুষ’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা বাউন্ডারি আছে। এই বাউন্ডারি বা সীমানা নির্ধারণ করাই হলো আইডেন্টিটির কাজ। আধুনিক যুগে আমাদের সমাজে যে এত ভুল বোঝাবুঝি, তার অন্যতম কারণ হলো আমরা এই সূত্রটি মানি না। আমরা ‘গণতন্ত্র’, ‘স্বাধীনতা’, ‘অধিকার’ – এই শব্দগুলো ব্যবহার করি, কিন্তু একেকজন এর একেক অর্থ করি। ফলে আমাদের যুক্তিগুলো একে অপরের পাশ দিয়ে চলে যায়, কখনো মুখোমুখি হয় না। আইডেন্টিটির সূত্র আমাদের বাধ্য করে প্রথমে সংজ্ঞা ঠিক করতে: “আমরা কী নিয়ে কথা বলছি?” – এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সামনে আগানো লজিকের দৃষ্টিতে অপরাধ। সুতরাং, A মানে A-ই; কোনো ‘কিন্তু’ বা ‘হয়তো’ দিয়ে এর স্বরূপ বদলানো যাবে না। এটিই হলো সত্যের স্থিতিশীলতা।
বিরোধহীনতার সূত্র
দ্বিতীয় এবং যুক্তিবিদ্যার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভটি হলো বিরোধহীনতার সূত্র (The Law of Non-Contradiction)। এই সূত্রটি বলে: একই সময়ে, একই অর্থে, একই সম্পর্কের প্রেক্ষিতে কোনো কিছু সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না। গাণিতিক ভাষায়, কোনো কিছুই একই সাথে A এবং Not-A হতে পারে না। আপনি বলতে পারেন না, “আমি এখন ঘরে আছি এবং আমি এখন ঘরে নেই।” এই দুটি বাক্য পরস্পরকে বাতিল করে দেয়। যদি আপনি ঘরে থাকেন, তবে ‘ঘরে নেই’ বাক্যটি মিথ্যা। আর যদি ঘরে না থাকেন, তবে ‘ঘরে আছি’ বাক্যটি মিথ্যা। দুটোর একটা সত্য হবেই, এবং অন্যটা মিথ্যা হবেই। মধ্যযুগীয় মুসলিম দার্শনিক ইবনে সিনা (Avicenna) এই সূত্রটির ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যারা বিরোধহীনতার সূত্র মানে না, তাদের ততক্ষণ প্রহার করা উচিত যতক্ষণ না তারা স্বীকার করে যে “প্রহার করা” এবং “প্রহার না করা” এক জিনিস নয় (Avicenna, 1027)। যদিও এটি একটি চরমপন্থা, কিন্তু এর মূল কথাটি হলো – বাস্তবতা স্ববিরোধী নয়। এই মহাবিশ্বে কন্ট্রাডিকশন (Contradiction) বা স্ববিরোধিতার কোনো অস্তিত্ব নেই। একটি ইলেকট্রন একই সময়ে স্পিন-আপ এবং স্পিন-ডাউন হতে পারে না (কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সুপারপজিশন ভিন্ন বিষয়, সেখানেও গাণিতিক বিরোধহীনতা বজায় থাকে)।
আমরা যখন কারো কথায় অসঙ্গতি ধরি, তখন আমরা আসলে এই সূত্রটিই প্রয়োগ করি। ধরুন একজন রাজনীতিবিদ সকালে বললেন, “আমরা কর বাড়াব না,” এবং বিকেলে বললেন, “উন্নয়নের জন্য কর বাড়ানো জরুরি।” লজিক্যালি তিনি স্ববিরোধী কথা বলছেন, এবং তার দুটি কথার অন্তত একটি মিথ্যা। মানুষের মনস্তত্ত্বে এই স্ববিরোধিতা একটি অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’ (Cognitive Dissonance) বা জ্ঞানীয় অসংগতি। মানুষ সাধারণত নিজের মধ্যে এই স্ববিরোধিতা লালন করতে পারে না, তাই সে নানা অজুহাত দিয়ে নিজেকে বোঝাতে চায় যে তার কথায় কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু লজিক কোনো অজুহাত মানে না। লজিক নির্দয়ভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোথায় আপনি নিজের কথার সাথে নিজেই যুদ্ধ করছেন। অ্যারিস্টটল (Aristotle) তাঁর মেটাফিজিক্স বইতে লিখেছিলেন, এই সূত্রটি হলো সমস্ত তথ্যের ভিত্তি; যদি কেউ এটি অস্বীকার করে, তবে তার পক্ষে কোনো কিছুই জানা বা বলা সম্ভব নয়, কারণ তখন ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না (Aristotle, 350 BCE)। আধুনিক ডায়ালিথিজম (Dialetheism) নামক দর্শনে কিছু দার্শনিক যেমন গ্রাহাম প্রিস্ট (Graham Priest) দাবি করেন যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্য স্ববিরোধী হতে পারে (Priest, 1987), কিন্তু সেটি অত্যন্ত উচ্চমার্গীয় এবং জটিল গাণিতিক আলোচনার বিষয়। আমাদের সাধারণ জগত, বিজ্ঞান এবং প্রতিদিনের জীবন পরিচালনার জন্য বিরোধহীনতার সূত্রটি পরম সত্য। এটি আমাদের মিথ্যা শনাক্ত করার প্রধান হাতিয়ার – যেখানেই বিরোধ, সেখানেই মিথ্যার বসবাস।
মধ্যম রহিত সূত্র
তৃতীয় সূত্রটি হলো মধ্যম রহিত সূত্র (The Law of Excluded Middle)। এই সূত্রটি বলে: যেকোনো বিবৃতি বা প্রপোজিশন হয় সত্য হবে, না হয় মিথ্যা হবে; এর মাঝামাঝি তৃতীয় কোনো অবস্থা নেই। অর্থাৎ, হয় A সত্য, অথবা Not-A সত্য। সোজা কথায়, হয় আজ বৃষ্টি হবে, নয়তো হবে না। “একটু একটু বৃষ্টি হতেও পারে” বা “হতেও পারে আবার নাও হতে পারে” – এগুলো লজিকের ভাষায় কোনো সুনির্দিষ্ট সত্য মান বা ট্রুথ ভ্যালু (Truth Value) বহন করে না। দিনশেষে ঘটনাটা বাস্তবে ঘটবে অথবা ঘটবে না। এই সূত্রটি আমাদের জগতকে বাইনারি (Binary) বা দ্বিমূলিক করে তোলে। কম্পিউটারের পুরো জগতটি এই সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে – সেখানে সবকিছুই হয় ০ (মিথ্যা/অফ), নয়তো ১ (সত্য/অন)। কম্পিউটারের সার্কিট ‘হয়তো’ বোঝে না। এই সূত্রটি দাবি করে যে, প্রতিটি প্রশ্নের একটিই সঠিক উত্তর আছে – হ্যাঁ অথবা না। বাস্তব জীবনে আমরা অনেক সময় ধূসর এলাকা বা গ্রে এরিয়া দেখতে পাই, কিন্তু লজিক বলে, সেই অস্পষ্টতা আমাদের জ্ঞানের অভাব বা ভাষার সীমাবদ্ধতা থেকে আসে, বাস্তবতার অভাব থেকে নয়। একটি গ্লাস অর্ধেক ভরা না অর্ধেক খালি – এটি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু গ্লাসে ঠিক কতটা জল আছে, তা একটি সুনির্দিষ্ট সত্য।
তবে এই সূত্রটি নিয়ে দর্শনের ইতিহাসে অনেক বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে ভবিষ্যতের ঘটনা বা ‘ফিউচার কন্টিনজেন্ট’ (Future Contingents) নিয়ে। অ্যারিস্টটল নিজেই তার বিখ্যাত ‘সি ব্যাটেল’ বা নৌযুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে এই সমস্যাটি তুলে ধরেছিলেন। ধরুন বলা হলো, “আগামীকাল একটি নৌযুদ্ধ হবে।” আজ এই বাক্যটি কি সত্য না মিথ্যা? যদি বলি সত্য, তবে আগামীকাল যুদ্ধ হওয়াটা নির্ধারিত বা ডিটারমিনিস্টিক (Deterministic) হয়ে যায়, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার বিরোধী। আবার যদি বলি মিথ্যা, তবে আগামীকাল যুদ্ধ হলে আজকের বাক্যটি ভুল প্রমাণিত হবে। এই জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে আধুনিক যুগে লুকাসিয়েউইচ (Jan Łukasiewicz)-এর মতো গণিতবিদরা ‘বহুমূলীয় যুক্তিবিদ্যা’ (Many-valued Logic) বা ‘ফাজি লজিক’ (Fuzzy Logic)-এর অবতারণা করেছেন (Łukasiewicz, 1920)। ফাজি লজিকে সত্য এবং মিথ্যার মাঝখানে অনেকগুলো ধাপ থাকতে পারে (যেমন: ৭০% সত্য, ৩০% মিথ্যা)। কিন্তু ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল লজিক (Classical Logic)-এ মধ্যম রহিত সূত্র এখনো অটুট। আমরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমাদের একটি পক্ষ বেছে নিতেই হয়। আপনি ‘কাজটি করবেন’ অথবা ‘করবেন না’ – মাঝখানের কোনো রাস্তায় আপনি অনন্তকাল বসে থাকতে পারেন না। এই সূত্রটি আমাদের সিদ্ধান্তহীনতা বা প্যারালাইসিস অফ অ্যানালাইসিস থেকে মুক্তি দেয় এবং আমাদের কাজের জগতে সক্রিয় করে তোলে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট রূপ নেবেই, এবং আমাদের সেই অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে হবে।
লজিকের ইতিহাস: অ্যারিস্টটল থেকে রাসেল
লজিক বা যুক্তিবিদ্যা একদিনে আকাশ থেকে পড়েনি; এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং রোমাঞ্চকর যাত্রার ফসল। মানুষ যখন গুহা থেকে বেরিয়ে সমাজবদ্ধ হতে শুরু করল, তখন থেকেই সে বুঝতে পারছিল যে কেবল গায়ের জোর দিয়ে সবকিছু সমাধান করা যায় না, মাঝে মাঝে মস্তিষ্কের জোরও খাটাতে হয়। কিন্তু সেই মস্তিষ্কের জোর বা চিন্তাকে কীভাবে শান দেওয়া যায়, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম তখন ছিল না। যুক্তির এই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রাচীন গ্রিসে, যেখানে দার্শনিকরা বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে তর্কে লিপ্ত হতেন। সেই তর্কের খাতিরেই প্রয়োজন হলো এমন এক মানদণ্ডের, যা দিয়ে মাপা যাবে কার কথা সত্য আর কার কথা কেবলই কথার কথা। এই মানদণ্ড তৈরির কারিগর হিসেবে যার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তিনি হলেন অ্যারিস্টটল (Aristotle)। তাঁকে নিঃসন্দেহে লজিকের জনক বলা যায়। তিনি লজিককে দর্শনের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে দেখেননি, বরং তিনি মনে করতেন লজিক হলো সব ধরণের জ্ঞান অর্জনের প্রধান হাতিয়ার বা ‘অর্গান’ (Organ)।
অ্যারিস্টটল প্রথম নিয়ম করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে দুটি সাধারণ বাক্য থেকে তৃতীয় একটি সত্য সিদ্ধান্ত বের করা যায়। তাঁর এই পদ্ধতিকে বলা হয় সিলোজিজম (Syllogism) বা ন্যায়ানুমান। যেমন – “সকল মানুষ মরণশীল; সক্রেটিস একজন মানুষ; সুতরাং, সক্রেটিস মরণশীল।” এই যে তিনটি বাক্যের একটি নিটোল কাঠামো, এটি ছিল মানুষের চিন্তার জগতে এক বিশাল বিপ্লব। এর আগে মানুষ ভাবত সত্য বুঝি দৈববাণী বা আবেগের বিষয়, কিন্তু অ্যারিস্টটল দেখালেন সত্য হলো একটি গাণিতিক কাঠামোর মতো। তিনি তাঁর লজিক বিষয়ক চিন্তাভাবনাগুলো লিখে রেখেছিলেন অর্গানন (Organon) নামক সংকলনে, যা পরবর্তী প্রায় দুই হাজার বছর ধরে যুক্তিবিদ্যার বাইবেল হিসেবে টিকে ছিল (Aristotle, 350 BCE)। অ্যারিস্টটলের লজিকের মূল শক্তি ছিল শ্রেণীকরণ বা ক্যাটাগরাইজেশন (Categorization)। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের সবকিছুকে নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরিতে ভাগ করা সম্ভব এবং সঠিক চিন্তা করার পদ্ধতি জানলে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বাঁচবে। তাঁর প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, মধ্যযুগের বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, অ্যারিস্টটলের পর লজিকের আর এক পা-ও এগোনোর প্রয়োজন হয়নি, কারণ অ্যারিস্টটল নিজেই লজিককে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে গেছেন। যদিও কান্টের এই ধারণা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তবু অ্যারিস্টটলের ভিত্তি আজও অটুট।
মধ্যযুগ: মশাল হাতে অন্ধকারের যাত্রী
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপ যখন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত, জ্ঞান-বিজ্ঞান যখন সেখানে ডাইনির জাদুমন্ত্র বলে গণ্য হচ্ছে, তখন লজিকের মশালটা হাতবদল হয়ে চলে গিয়েছিল আরবে। মুসলিম দার্শনিকরা সেই মশালটা কেবল ধরে রাখেননি, সেটাকে আরও উজ্জ্বল করেছিলেন। তাঁরা গ্রিক দর্শনকে আরবিতে অনুবাদ করে নিজেদের মতো করে চর্চা শুরু করেন। এই সময়ের দুজন প্রধান ব্যক্তিত্ব হলেন আল-ফারাবি (Al-Farabi) এবং ইবনে সিনা (Avicenna)। আল-ফারাবিকে বলা হতো ‘দ্বিতীয় শিক্ষক’ (প্রথম শিক্ষক অ্যারিস্টটল)। তিনি লজিককে ব্যাকরণ এবং ভাষার সাথে মিলিয়ে এক নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে লজিক কেবল গণিত নয়, এটি ভাষার মারপ্যাঁচ খোলারও চাবি। অন্যদিকে, ইবনে সিনা লজিককে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। তিনি অ্যারিস্টটলের অন্ধ অনুকরণ করেননি। তিনি সময়ের ধারণা বা টেম্পোরাল লজিক (Temporal Logic) এবং মোডাল লজিক নিয়ে কাজ করেছিলেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য বুক অফ হিলিং (The Book of Healing)-এ লজিকের এমন কিছু নিয়মকানুন আলোচনা করেছিলেন যা তৎকালীন ইউরোপীয় চিন্তাধারার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল (Avicenna, 1027)।
ইবনে সিনা প্রমাণ করতে চাইতেন যে কার্যকারণ সম্পর্ক এবং লজিকের মাধ্যমে মহাবিশ্বের পরম সত্তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যদিও আধুনিক লজিক ঈশ্বর বা পরম সত্তাকে সমীকরণের বাইরে রাখে, কিন্তু মধ্যযুগে লজিক ছিল ধর্মতত্ত্বের দাসী। মুসলিম দার্শনিকদের হাত ধরে এই জ্ঞান আবার ইউরোপে ফিরে আসে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। তখন ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কলাস্টিসিজম (Scholasticism) বা পাণ্ডিত্যবাদের জন্ম হয়। টমাস অ্যাকুইনাস এবং উইলিয়াম অফ অকাম-এর মতো দার্শনিকরা অ্যারিস্টটল এবং মুসলিম দার্শনিকদের লজিক ব্যবহার করে খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে উইলিয়াম অফ অকাম (William of Ockham)-এর নাম লজিকের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে তার ‘অকামস রেজার’ (Occam’s Razor) নীতির জন্য। এই নীতি বলে, কোনো কিছু ব্যাখ্যা করার জন্য সবচেয়ে সহজ এবং কম অনুমাননির্ভর পথটাই বেছে নেওয়া উচিত। অকাম লজিককে মেটাফিজিক্স বা অতিপ্রাকৃত জগত থেকে আলাদা করে ভাষার বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা আধুনিক লজিকের পূর্বলক্ষণ ছিল।
রেনেসাঁ ও লাইবনিজের স্বপ্ন
ইউরোপে যখন রেনেসাঁ বা নবজাগরণ এল, তখন মানুষের চিন্তা করার ধরণ আবার পাল্টাতে শুরু করল। মানুষ আর ধর্মগ্রন্থের পাতায় সত্য খুঁজতে রাজি ছিল না, তারা তাকাচ্ছিল প্রকৃতির দিকে, গণিতের দিকে। এই সময়ের এক ক্ষণজন্মা প্রতিভার নাম গটফ্রিড লাইবনিজ (Gottfried Wilhelm Leibniz)। তিনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ, দার্শনিক, এবং যুক্তিবিদ। লাইবনিজ স্বপ্ন দেখতেন এমন এক সার্বজনীন লজিক্যাল ভাষার, যাকে তিনি বলতেন ‘ক্যারেক্টারিস্টিকা ইউনিভার্সালিস’ (Characteristica Universalis)। তিনি মনে করতেন, মানুষের মুখের ভাষা অস্পষ্ট এবং বিভ্রান্তিকর। তাই তিনি চেয়েছিলেন চিন্তাকে গণিতের চিহ্নে রূপান্তর করতে। লাইবনিজ বলতেন, ভবিষ্যতে মানুষ আর তর্ক করবে না। যখনই দুজন দার্শনিকের মধ্যে কোনো মতবিরোধ হবে, তারা খাতা-কলম বা স্লেট নিয়ে বসবেন এবং একে অপরকে বলবেন, “এসো, হিসাব করে দেখি (Calculemus) কে ঠিক।”
লাইবনিজ বিশ্বাস করতেন যে, সব ধরণের চিন্তাকেই যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগের মতো হিসাবের আওতায় আনা সম্ভব। তিনি বাইনারি নাম্বার সিস্টেম নিয়েও কাজ করেছিলেন, যা আজকের কম্পিউটারের ভিত্তি। তাঁর লেখা ডি আর্টে কম্বিনেটোরিয়া (De Arte Combinatoria)-তে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে অল্প কিছু মৌলিক ধারণা থেকে অসীম সংখ্যক জটিল ধারণা তৈরি করা যায় (Leibniz, 1666)। দুর্ভাগ্যবশত, লাইবনিজের লজিক বিষয়ক অনেক কাজ তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে কয়েকশ বছর এগিয়ে ছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন এক ক্যালকুলাস রেশিওসিনেটর (Calculus Ratiocinator) বা যুক্তির ক্যালকুলাস তৈরি করা, যা যন্ত্রের মতো নির্ভুলভাবে সত্য-মিথ্যা বিচার করতে পারবে। লাইবনিজ যা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নিতে সময় লেগেছিল আরও প্রায় দুইশো বছর, কিন্তু তিনি লজিকের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন – লজিককে তিনি শব্দের জগত থেকে বের করে চিহ্নের জগতে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন।
গণিতের বিপ্লব: বুলি ও ফ্রেগে
উনিশ এবং বিশ শতকে লজিক সম্পূর্ণ বদলে গেল। এটি আর দর্শনের আরামকেদারায় বসে থাকার বিষয় রইল না, এটি ঢুকে পড়ল গণিতের খটমটে জগতে। এই পরিবর্তনের মূল কারিগর ছিলেন জর্জ বুলি (George Boole)। ১৮৫৪ সালে তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর যুগান্তকারী বই দ্য লজ অফ থট (The Laws of Thought)। বুলি দেখালেন যে, লজিককে সাধারণ বীজগণিতের মতো করেই সমাধান করা যায়। তিনি সত্যকে ১ এবং মিথ্যাকে ০ ধরে এক নতুন অ্যালজেবরা তৈরি করলেন, যা আজ বুলিয়ান অ্যালজেবরা (Boolean Algebra) নামে পরিচিত (Boole, 1854)। আজকের দিনে যে ডিজিটাল বিপ্লব, যে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, আর এআই (AI) নিয়ে আমরা লাফালাফি করছি, তার মূলে আছে এই বুলিয়ান লজিক। বুলি প্রমাণ করলেন যে, “সব মানুষ মরণশীল” এই বাক্যটিকে x(1−y) = 0 এর মতো সমীকরণে ফেলা সম্ভব। লজিক তার হাজার বছরের পুরনো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল।
বুলির পর লজিকের জগতে এলেন আরেক দৈত্য, গটলোব ফ্রেগে (Gottlob Frege)। অনেকে ফ্রেগেকে আধুনিক লজিকের প্রকৃত জনক মনে করেন। অ্যারিস্টটলের লজিক ছিল মূলত শ্রেণীকরণ বা সাবজেক্ট-প্রেডিকেট ভিত্তিক। কিন্তু ফ্রেগে নিয়ে এলেন প্রেডিকেট লজিক (Predicate Logic) এবং কোয়ান্টিফায়ার (Quantifier)-এর ধারণা। তিনি তাঁর বই বেগ্রিফশ্রিফ্ট (Begriffsschrift) বা কনসেপ্ট স্ক্রিপ্টে এমন এক লজিক্যাল ভাষা তৈরি করলেন যা দিয়ে গণিতের যেকোনো প্রমাণকে নিখুঁতভাবে লেখা সম্ভব (Frege, 1879)। ফ্রেগে চাইলেন পাটিগণিতকে সম্পূর্ণভাবে লজিকের ওপর দাঁড় করাতে। একে বলা হয় লজিসিজম (Logicism)। তিনি দেখাতে চাইলেন যে গণিত আসলে লজিকেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ। ফ্রেগের কাজ ছিল অত্যন্ত জটিল এবং দুর্বোধ্য, কিন্তু এটি ছিল লজিকের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন। তিনি ভাষার অস্পষ্টতা দূর করে চিন্তাকে এক কঠিন গাণিতিক শৃঙ্খলায় বাঁধলেন।
রাসেল এবং আধুনিক লজিকের ক্রান্তিকাল
ফ্রেগে যখন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ শেষ করে এনেছেন এবং ভাবছেন যে তিনি গণিতের ভিত্তি লজিকের ওপর শক্তভাবে গেঁথে দিয়েছেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হলেন ব্রিটিশ দার্শনিক ও গণিতবিদ বারট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell)। রাসেল ফ্রেগের সিস্টেমে একটি মারাত্মক ত্রুটি বা প্যারাডক্স খুঁজে পেলেন, যা আজ রাসেলস প্যারাডক্স (Russell’s Paradox) নামে পরিচিত। রাসেল প্রশ্ন তুললেন: “যে সেটগুলোর নিজেরা নিজেদের সদস্য নয়, তাদের নিয়ে গঠিত সেটটি কি নিজের সদস্য?” এই আপাত নিরীহ প্রশ্নটি ফ্রেগের পুরো জীবনের কাজকে ধসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করল। কিন্তু রাসেল কেবল সমস্যা তুলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এর সমাধানও করতে চাইলেন। তিনি এবং তাঁর শিক্ষক আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড মিলে লিখলেন তিন খণ্ড বিশাল এক গ্রন্থ – প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা (Principia Mathematica)।
এই বইটিতে রাসেল এবং হোয়াইটহেড চেষ্টা করলেন মহাবিশ্বের সমস্ত গাণিতিক সত্যকে লজিকের কয়েকটি মৌলিক সূত্র থেকে প্রমাণ করতে। তাঁদের এই প্রচেষ্টা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প। এই বইয়ের কয়েকশ পৃষ্ঠা খরচ করা হয়েছিল কেবল এটা প্রমাণ করার জন্য যে 1+1 = 2। রাসেল লজিককে দর্শন থেকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলেননি, বরং তিনি দর্শনের সমস্যাগুলোকে লজিক দিয়ে সমাধান করার এক নতুন ধারা চালু করলেন, যাকে বলা হয় অ্যানালিটিক ফিলোসফি (Analytic Philosophy) বা বিশ্লেষণী দর্শন (Russell & Whitehead, 1910)। রাসেলের কাজ লজিককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল, যেখানে ভাষা, গণিত এবং বাস্তবতা এক বিন্দুতে এসে মিলিত হলো। যদিও পরবর্তীতে অস্ট্রিয়ান গণিতবিদ কুর্ট গ্যোদেল (Kurt Gödel) তাঁর অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে রাসেলের স্বপ্ন পুরোপুরি সফল হওয়া সম্ভব নয়, অর্থাৎ এমন কোনো লজিক্যাল সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব নয় যা গণিতের সব সত্যকে প্রমাণ করতে পারে; তবুও রাসেলের এই যাত্রা লজিককে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। অ্যারিস্টটলের সিলোজিজম থেকে শুরু করে রাসেলের টাইপ থিওরি পর্যন্ত – এই দীর্ঘ পথচলাই আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে বিশৃঙ্খল আবেগের জগত থেকে সুশৃঙ্খল যুক্তির জগতে প্রবেশ করতে হয়।
আর্গুমেন্ট: যুক্তির শরীরব্যাবচ্ছেদ
লজিক নিয়ে যেকোনো আলোচনার একেবারে কেন্দ্রে, হৃদপিণ্ডের মতো ধুকপুক করতে থাকা ধারণাটি হলো আর্গুমেন্ট (Argument) বা যুক্তি। সাধারণ কথাবার্তায় বা চায়ের দোকানের আড্ডায় আমরা যখন ‘আর্গুমেন্ট’ শব্দটি ব্যবহার করি, তখন আমাদের চোখে ভাসে দুজন মানুষের উত্তেজিত কথোপকথন, চেঁচামেচি, বা ঝগড়া। কিন্তু লজিক বা যুক্তিবিদ্যার শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং গাণিতিক জগতে আর্গুমেন্টের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে আর্গুমেন্ট মানে কোনো আবেগি লড়াই নয়, বরং একগুচ্ছ বাক্যের একটি সুবিন্যস্ত কাঠামো। লজিকের ভাষায়, আর্গুমেন্ট হলো এমন কতগুলো বচন বা প্রপোজিশনের সমষ্টি, যেখানে এক বা একাধিক বাক্য (যাদের বলা হয় আশ্রয়বাক্য বা Premises) অন্য একটি বাক্যকে (যাকে বলা হয় সিদ্ধান্ত বা Conclusion) সমর্থন করে, প্রমাণ করে, অথবা তার সত্যতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সহজ কথায়, আর্গুমেন্ট হলো সত্যে পৌঁছানোর একটি বাহন। আপনি যখন কোনো দাবি করেন, তখন লজিক আপনাকে প্রশ্ন করে, “কেন?” এই “কেন”-এর উত্তর হিসেবে আপনি যা যা পেশ করেন, সেগুলোই হলো আপনার আর্গুমেন্টের আশ্রয়বাক্য। আর সেই আশ্রয়বাক্যগুলোর ওপর ভর করে আপনি যে শেষ কথাটি বলেন, সেটিই সিদ্ধান্ত। লজিক মূলত এই আশ্রয়বাক্য এবং সিদ্ধান্তের মাঝখানের সেতুটি পরীক্ষা করে। সেতুটি যদি নড়বড়ে হয়, তবে আপনার সিদ্ধান্ত যতই সত্য হোক না কেন, লজিকের বিচারে তা মূল্যহীন।
একটি আর্গুমেন্টকে ব্যবচ্ছেদ করলে আমরা এর প্রধানত দুটি অংশ পাই। প্রথম অংশটি হলো ইনফারেন্স (Inference) বা অনুমান প্রক্রিয়া। এটি সেই মানসিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আমরা জানা সত্য থেকে অজানা সত্যে পৌঁছাই। যেমন, আপনি দেখলেন আকাশ মেঘলা (জানা সত্য), এবং ভাবলেন বৃষ্টি হবে (অজানা সত্য) – এই ভাবনার প্রক্রিয়াটিই ইনফারেন্স। দ্বিতীয় অংশটি হলো এই ইনফারেন্সের ভাষাগত রূপ, যা আমরা লিখে বা বলে প্রকাশ করি। আর্গুমেন্ট চেনার সহজ উপায় হলো কিছু নির্দেশক শব্দ বা ইন্ডিকেটর ওয়ার্ডস (Indicator Words) খোঁজা। যেমন – ‘অতএব’, ‘সুতরাং’, ‘তাই’, ‘কারণ’, ‘যেহেতু’ ইত্যাদি। ‘অতএব’ বা ‘সুতরাং’-এর পরে সাধারণত সিদ্ধান্ত থাকে, আর ‘কারণ’ বা ‘যেহেতু’-এর পরে থাকে আশ্রয়বাক্য। তবে সব সময় এই শব্দগুলো নাও থাকতে পারে, তখন আমাদের বাক্যের অর্থ বুঝে নিতে হয়। যেমন, “সাবধানে চলো, রাস্তা পিচ্ছিল।” এখানে “রাস্তা পিচ্ছিল” হলো আশ্রয়বাক্য (কারণ), আর “সাবধানে চলো” হলো সিদ্ধান্ত। লজিশিয়ানরা বা যুক্তিবিদরা ডাক্তারদের মতো আর্গুমেন্টের এই শরীরব্যাবচ্ছেদ করে দেখেন এর ভেতরে কোনো রোগ বা ফ্যালাসি (Fallacy) আছে কি না।
ভ্যালিড বনাম ইনভ্যালিড: যুক্তির বৈধতা বিচার
লজিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গোলমেলে জায়গাটি হলো যুক্তির বৈধতা বা ভ্যালিডিটি (Validity) বিচার করা। একটি আর্গুমেন্টকে তখনই ভ্যালিড আর্গুমেন্ট (Valid Argument) বলা হয়, যখন এর আশ্রয়বাক্যগুলো সত্য হলে সিদ্ধান্তটি মিথ্যা হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, আশ্রয়বাক্য এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে এমন এক অনিবার্য সম্পর্ক থাকবে যে, আপনি যদি আশ্রয়বাক্য মেনে নেন, তবে সিদ্ধান্ত মানতে আপনি বাধ্য। এখানে একটা ক্লাসিক উদাহরণ দেওয়া যাক, যেটা হাজার বছর ধরে পাঠ্যবইয়ে আছে এবং অ্যারিস্টটলের সিলোজিজমের সেরা উদাহরণ:
১. সকল মানুষ মরণশীল (Premise 1)।
২. সক্রেটিস একজন মানুষ (Premise 2)।
৩. সুতরাং, সক্রেটিস মরণশীল (Conclusion)।
এটি একটি নিখুঁত ভ্যালিড আর্গুমেন্ট। কেন? কারণ যদি আপনি মেনে নেন যে সব মানুষ মরণশীল এবং সক্রেটিস মানুষ, তবে সক্রেটিস মরণশীল – এই সত্যটি অস্বীকার করার কোনো উপায় আপনার হাতে নেই। এখানে লজিক একটা বদ্ধ ঘরের মতো, যেখান থেকে পালানোর পথ নেই। এই যে অনিবার্যভাবে সত্যে পৌঁছানো, এটাই লজিকের সৌন্দর্য। একে বলা হয় ডিডাক্টিভ ভ্যালিডিটি (Deductive Validity)। এখানে লজিক তথ্যের সত্যতা যাচাই করে না, সে কেবল দেখে যুক্তির গঠন বা স্ট্রাকচার ঠিক আছে কি না। যদি আমি বলতাম: ১. সকল মানুষ নীল রঙের। ২. সক্রেটিস একজন মানুষ। ৩. সুতরাং, সক্রেটিস নীল রঙের। – এটিও একটি ভ্যালিড আর্গুমেন্ট! কারণ লজিকের নিয়ম অনুযায়ী গঠন ঠিক আছে। যদিও বাস্তবে মানুষ নীল রঙের নয়, কিন্তু লজিকের মেশিনে ইনপুট দিলে আউটপুট সঠিকভাবেই বেরোচ্ছে।
এবার মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখা যাক। একটি ইনভ্যালিড আর্গুমেন্ট (Invalid Argument) বা অবৈধ যুক্তি কেমন হয়?
১. সকল চোর মানুষ।
২. আপনি একজন মানুষ।
৩. সুতরাং, আপনি একজন চোর।
এই আর্গুমেন্টটি শুনে আপনার রাগ হতে পারে, কিন্তু লজিক রাগ করে না, লজিক হাসে। কারণ এটি একটি ইনভ্যালিড আর্গুমেন্ট। লক্ষ করুন, এখানে দুটি আশ্রয়বাক্যই বাস্তবে সত্য (চোররা তো মানুষই, এলিয়েন নয়; এবং আপনিও মানুষ)। কিন্তু সিদ্ধান্তটি ভুল হতে পারে (আশা করি আপনি চোর নন!)। কেন এমন হলো? কারণ ‘মানুষ’ ক্যাটাগরিটা ‘চোর’ ক্যাটাগরির চেয়ে অনেক বড়। সব মানুষ চোর নয়, কিন্তু সব চোর মানুষ। আপনি ‘মানুষ’ ক্যাটাগরিতে পড়েন মানেই এই নয় যে আপনি ‘চোর’ সাব-ক্যাটাগরিতেও পড়বেন। লজিকের ভাষায় এই ভুলটিকে বলা হয় ‘আনডিস্ট্রিবিউটেড মিডেল’ (Undistributed Middle) নামক ফ্যালাসি। আবার অনেকে একে ‘অ্যাফার্মিং দ্য কনসিকুয়েন্ট’ (Affirming the Consequent)-এর সাথে গুলিয়ে ফেলেন, যদিও দুটোর গঠন ভিন্ন কিন্তু মূল সমস্যা একই – সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে আসে না। লজিক আমাদের শেখায় যে, সত্য আশ্রয়বাক্য থেকে মিথ্যা সিদ্ধান্ত আসতে পারে যদি যুক্তির গঠন ভুল হয়। এই সূক্ষ্ম ভুলগুলো ধরাটাই লজিকের কাজ।
সাউন্ডনেস: সত্য এবং বৈধতার মিলন
আমরা দেখলাম যে একটি যুক্তি ভ্যালিড হয়েও বাস্তবে মিথ্যা হতে পারে (যেমন নীল রঙের মানুষের উদাহরণ)। তাহলে লজিক দিয়ে আমাদের লাভ কী যদি তা আমাদের বাস্তব সত্য না দেয়? এখানেই আসে সাউন্ডনেস (Soundness)-এর ধারণা। লজিকের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল ভ্যালিড হওয়া নয়, বরং সাউন্ড হওয়া। একটি আর্গুমেন্টকে তখনই সাউন্ড আর্গুমেন্ট (Sound Argument) বলা হবে, যখন এর দুটি গুণ থাকবে:
১. যুক্তিটি ভ্যালিড বা বৈধ হবে।
২. এর আশ্রয়বাক্যগুলো বাস্তবে সত্য হবে।
সক্রেটিসের উদাহরণটি একটি সাউন্ড আর্গুমেন্ট, কারণ এটি ভ্যালিড এবং এর আশ্রয়বাক্যগুলো (মানুষ মরণশীল, সক্রেটিস মানুষ) বাস্তবে সত্য। কিন্তু “সকল মানুষ নীল রঙের” উদাহরণটি ভ্যালিড হলেও আনসাউন্ড (Unsound), কারণ এর প্রথম আশ্রয়বাক্যটি মিথ্যা। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, রাজনীতিতে, বিজ্ঞানে সবসময় সাউন্ড আর্গুমেন্ট খুঁজি। কিন্তু চালাক লোকেরা বা সোফিস্ট (Sophist)-রা প্রায়ই ভ্যালিড কিন্তু আনসাউন্ড যুক্তি দিয়ে আমাদের ধোঁকা দেয়। তারা এমন সব আশ্রয়বাক্য ব্যবহার করে যা শুনতে সত্য মনে হয়, কিন্তু আসলে মিথ্যা বা অর্ধসত্য। লজিক শেখার মানে হলো এই সাউন্ডনেস চেক করতে শেখা। কেউ কোনো দাবি করলে প্রথমে দেখবেন তার যুক্তির গঠন ঠিক আছে কি না (ভ্যালিডিটি), তারপর দেখবেন তার দেওয়া তথ্যগুলো সঠিক কি না (ট্রুথ)। যদি দুটোই ঠিক থাকে, তবেই আপনি তার কথা মানবেন।
আধুনিক যুক্তিবিদ স্টিফেন টুলমিন (Stephen Toulmin) তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ইউজেস অফ আর্গুমেন্ট-এ দেখিয়েছেন যে বাস্তব জীবনের আর্গুমেন্টগুলো সবসময় অ্যারিস্টটলের সিলোজিজমের মতো সরলরেখায় চলে না (Toulmin, 1958)। তিনি আর্গুমেন্টের একটি নতুন মডেল দাঁড় করিয়েছেন যা টুলমিন মডেল (Toulmin Model) নামে পরিচিত। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে একটি আর্গুমেন্টে কেবল আশ্রয়বাক্য আর সিদ্ধান্ত থাকে না, সেখানে থাকে ‘ওয়ারেন্ট’ (Warrant) বা নিশ্চয়তা, ‘ব্যাকিং’ (Backing) বা সমর্থন, এবং ‘রিবাটাল’ (Rebuttal) বা খণ্ডন। ওয়ারেন্ট হলো সেই লজিক্যাল সেতু যা ডাটা এবং কনক্লুশনকে যুক্ত করে। রিবাটাল হলো সেই সব ব্যতিক্রম অবস্থা যেখানে সিদ্ধান্তটি খাটবে না। যেমন: “হ্যারি একজন ব্রিটিশ নাগরিক (ডাটা), তাই হ্যারি সম্ভবত ইংরেজি জানে (সিদ্ধান্ত)।” এখানে ওয়ারেন্ট হলো “অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইংরেজি জানে।” আর রিবাটাল হলো “যদি না হ্যারি বোবা হয় বা সে মাত্র নাগরিকত্ব পেয়ে থাকে কিন্তু ভাষা না জানে।” এই জটিল মডেল আমাদের দেখায় যে আর্গুমেন্ট হলো একটি জীবন্ত এবং পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, যা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
ডিডাকশন বনাম ইন্ডাকশন: আর্গুমেন্টের দুই ধারা
লজিকের আর্গুমেন্টগুলোকে প্রধানত দুটি বড় ভাগে ভাগ করা যায় – ডিডাক্টিভ (Deductive) এবং ইন্ডাক্টিভ (Inductive)। আমরা এতক্ষণ যে উদাহরণগুলো দিলাম (সক্রেটিস, চোর), সেগুলো সব ডিডাক্টিভ আর্গুমেন্ট। ডিডাক্টিভ আর্গুমেন্টের বৈশিষ্ট্য হলো এর সিদ্ধান্ত আশ্রয়বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, নতুন কোনো তথ্য দেয় না, কেবল অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করে। এবং এর সিদ্ধান্ত ১০০% নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তব জগত সবসময় এত নিশ্চিত নয়। তাই আমাদের প্রয়োজন হয় ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্টের।
ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্টে আশ্রয়বাক্যগুলো সিদ্ধান্তকে প্রমাণ করে না, কেবল সমর্থন করে বা সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়ায়।
উদাহরণ:
১. গত ১০ বছর ধরে জানুয়ারি মাসে শীত পড়েছে।
২. এখন জানুয়ারি মাস।
৩. সুতরাং, সম্ভবত এখন শীত পড়বে।
এটি একটি শক্তিশালী ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্ট, কিন্তু এটি ডিডাক্টিভলি ভ্যালিড নয়। কারণ এমনও হতে পারে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার জানুয়ারিতে গরম পড়ল। ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্টে আমরা ‘ভ্যালিড’ বা ‘ইনভ্যালিড’ শব্দ ব্যবহার করি না, আমরা বলি ‘স্ট্রং’ (Strong) বা ‘উইক’ (Weak)। বিজ্ঞান মূলত এই ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্টের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার পরীক্ষা করে বলেন, “ধূমপান ক্যান্সারের কারণ।” এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্ট, কিন্তু এটি গাণিতিকভাবে নিশ্চিত নয় যে ধূমপান করলেই আপনার ক্যান্সার হবে (Hurley, 2011)। একজন ধূমপায়ী ১০০ বছর বেঁচেও থাকতে পারেন। কিন্তু লজিক বলে, ব্যতিক্রম নিয়মকে বাতিল করে না, বরং ব্যতিক্রমের উপস্থিতি ইন্ডাকশনের দুর্বলতা ও সৌন্দর্য – উভয়ই প্রকাশ করে। আর্গুমেন্টের এই ব্যবচ্ছেদ আমাদের শেখায় যে সত্য সবসময় কালো বা সাদা হয় না, মাঝেমধ্যে তা সম্ভাবনার ধূসর রঙেও সাজে।
ডিডাকশন, ইন্ডাকশন ও অ্যাবডাকশন: সত্যে পৌঁছানোর তিন রাস্তা
আমরা যখন চিন্তা করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক মূলত একটি গোয়েন্দার মতো কাজ করে। সে চারপাশের বিশৃঙ্খল তথ্যগুলো থেকে একটা অর্থপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়। লজিক বা যুক্তিবিদ্যা আমাদের বলে যে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বা ইনফারেন্স করার রাস্তা মূলত তিনটি। এই রাস্তাগুলোর নাম হলো – ডিডাকশন (Deduction), ইন্ডাকশন (Induction), এবং অ্যাবডাকশন (Abduction)। এই তিনটি পদ্ধতিই সত্য খোঁজার কাজ করে, কিন্তু এদের পথচলা, গন্তব্য এবং নিশ্চয়তার মাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। অনেকটা পাহাড়ে ওঠার মতো; কেউ সোজা খাড়া পথ বেয়ে ওঠে, কেউ ঘুরপথে ধীরে ধীরে ওঠে, আবার কেউ হেলিকপ্টারে করে নামার চেষ্টা করে। আমেরিকান দার্শনিক চার্লস স্যান্ডার্স পার্স (Charles Sanders Peirce)-কে এই আধুনিক শ্রেণীকরণের জনক বলা হয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে বিজ্ঞান এবং সাধারণ বুদ্ধি এই তিনটি পদ্ধতির এক জটিল মিশ্রণ ব্যবহার করে এগিয়ে চলে (Peirce, 1903)। চলুন, এই তিন রাস্তার মানচিত্র একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক।
ডিডাক্টিভ লজিক: নিশ্চিত সত্যের সরণি
ডিডাক্টিভ লজিক (Deductive Logic) বা অবরোহ যুক্তি হলো লজিকের রাজপথ। এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে আমরা সার্বিক বা সাধারণ (General) সত্য থেকে বিশেষ (Specific) সত্যে উপনীত হই। এখানে তথ্যের প্রবাহ ওপর থেকে নিচের দিকে নামে। ডিডাকশনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নিশ্চয়তা (Certainty)। যদি আপনার শুরুর কথাগুলো বা আশ্রয়বাক্যগুলো সত্য হয় এবং আপনার যুক্তির গঠন সঠিক থাকে, তবে সিদ্ধান্তটি সত্য হতে বাধ্য। এখানে কোনো ‘হয়তো’, ‘সম্ভবত’ বা ‘মনে হয়’-এর স্থান নেই। এটি গণিতের মতো নির্ভুল। বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস নিজেকে ‘ডিডাকশনের মাস্টার’ বলে দাবি করতেন, যদিও তিনি আসলে অ্যাবডাকশন বেশি ব্যবহার করতেন, কিন্তু তাঁর পদ্ধতি ছিল ডিডাকশনের মতোই সুশৃঙ্খল।
ডিডাকশনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি আমাদের নতুন কোনো তথ্য দেয় না। এটি কেবল সেই তথ্যগুলোকেই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে যা আগে থেকেই আশ্রয়বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। অনেকটা কমলার রস বের করার মতো; রসটা কমলার ভেতরেই ছিল, আপনি শুধু চিপে বের করলেন। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক:
- আশ্রয়বাক্য ১: সকল মানুষ মরণশীল। (এটি একটি সার্বিক সত্য)
- আশ্রয়বাক্য ২: সক্রেটিস একজন মানুষ। (এটি একটি বিশেষ তথ্য)
- সিদ্ধান্ত: সুতরাং, সক্রেটিস মরণশীল। (এটি একটি অনিবার্য সত্য)
এখানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য ১ এবং ২-এর ভেতরেই সুপ্ত অবস্থায় ছিল। আমরা কেবল লজিকের আলো ফেলে সেটাকে দৃশ্যমান করলাম। গণিত এবং জ্যামিতি পুরোটাই এই ডিডাক্টিভ লজিকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যখন আমরা বলি 2+2 = 4, তখন এটি কোনো সম্ভাবনার কথা নয়, এটি একটি পরম সত্য। ইউক্লিডীয় জ্যামিতির উপপাদ্যগুলো ডিডাকশনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সেখানে কিছু স্বতঃসিদ্ধ বা অ্যাক্সিওম (Axiom) ধরে নেওয়া হয় এবং তারপর ধাপে ধাপে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা হয় যে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ১৮০ ডিগ্রি। ডিডাক্টিভ লজিক আমাদের চিন্তার স্বচ্ছতা দেয় এবং আমাদের প্যারাডক্স বা স্ববিরোধিতা থেকে বাঁচায়। কিন্তু সমস্যা হলো, বাস্তব জগতে এমন সার্বিক সত্য (Universal Truth) পাওয়া খুব কঠিন যা সব সময় এবং সব ক্ষেত্রে খাটবে। তাই বিজ্ঞানে ডিডাকশনের চেয়ে ইন্ডাকশনের ব্যবহার বেশি।
ইন্ডাক্টিভ লজিক: সম্ভাবনার জগত
বাস্তব জীবনে, বিজ্ঞানে, এবং আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা ডিডাকশনের চেয়ে ইন্ডাক্টিভ লজিক (Inductive Logic) বা আরোহ যুক্তি বেশি ব্যবহার করি। এটি ডিডাকশনের ঠিক উল্টো। এখানে আমরা বিশেষ বিশেষ কিছু ঘটনা (Particulars) পর্যবেক্ষণ করে একটি সাধারণ বা সার্বিক সিদ্ধান্তে (General Conclusion) পৌঁছাই। এখানে তথ্যের প্রবাহ নিচ থেকে ওপরের দিকে ওঠে। ইন্ডাকশনের সিদ্ধান্তে আমরা কখনোই ১০০% নিশ্চয়তা পাই না, আমরা পাই উচ্চমাত্রার সম্ভাবনা (High Probability)। আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎবাণী করি।
উদাহরণ:
- পর্যবেক্ষণ ১: আমি দেখেছি কাক ১ কালো।
- পর্যবেক্ষণ ২: আমি দেখেছি কাক ২ কালো।
- পর্যবেক্ষণ ৩: বাংলাদেশের সব কাক কালো।
- সিদ্ধান্ত: সুতরাং, পৃথিবীর সব কাক সম্ভবত কালো।
লক্ষ করুন, এখানে ‘সম্ভবত’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আপনি পৃথিবীর সব কাক দেখেননি এবং দেখা সম্ভবও নয়। কাল যদি আন্টার্কটিকায় একটা সাদা কাক পাওয়া যায়, তবে আপনার এই সুন্দর সিদ্ধান্তটি ভুল প্রমাণিত হবে। একে বলা হয় ‘প্রবলেম অফ ইন্ডাকশন’ (Problem of Induction) বা আরোহের সমস্যা। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম (David Hume) এটি নিয়ে তাঁর অ্যান এনকুয়ারি কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং বইয়ে চমৎকার এবং বিধ্বংসী আলোচনা করেছেন (Hume, 1748)। তিনি দেখিয়েছিলেন যে আমরা বিশ্বাস করি প্রকৃতি সব সময় একই নিয়ম মেনে চলবে (Uniformity of Nature), অর্থাৎ গতকাল যা হয়েছে, আগামীকালও তা হবে। সূর্য আজ পর্যন্ত পুব দিকে উঠেছে, তাই আমরা ধরে নিই কালও উঠবে। কিন্তু হিউম প্রশ্ন তুলেছিলেন: “সূর্য যে কাল উঠবে, তার কি কোনো লজিক্যাল গ্যারান্টি আছে?” উত্তর হলো, না। আমরা কেবল অভ্যাসের বশে এটি ধরে নিই। লজিক্যালি এমন কোনো নিয়ম নেই যা বলে ভবিষ্যৎ অতীতের মতোই হবে।
আধুনিক যুগে এই সমস্যাটি নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছেন নাসিম নিকোলাস তালেব (Nassim Nicholas Taleb)। তিনি তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ব্ল্যাক সোয়ান-এ ‘ব্ল্যাক সোয়ান থিওরি’ (Black Swan Theory)-র অবতারণা করেছেন (Taleb, 2007)। ইউরোপীয়রা হাজার বছর ধরে বিশ্বাস করত সব রাজহাঁস সাদা, কারণ তারা কেবল সাদাই দেখেছে। তাদের কাছে “সব রাজহাঁস সাদা” ছিল একটি অকাট্য সত্য। কিন্তু ১৬৯৭ সালে যখন অস্ট্রেলিয়ায় কালো রাজহাঁস আবিষ্কৃত হলো, তখন এক লহমায় তাদের হাজার বছরের বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তালেব বলেন, একটি মাত্র ব্যতিক্রম বা ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ আমাদের সমস্ত জ্ঞান এবং পূর্বাভাসকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে। তাই ইন্ডাকশন আমাদের জ্ঞান দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই জ্ঞান ভঙ্গুর। বিজ্ঞান মূলত এই ভঙ্গুরতার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা হাজারটা পরীক্ষার মাধ্যমে একটি তত্ত্ব দাঁড় করান, কিন্তু তারা জানেন যে ভবিষ্যতে একটি মাত্র পরীক্ষা সেই তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করতে পারে। কার্ল পপার (Karl Popper) একেই বিজ্ঞানের শক্তি বলেছিলেন – বিজ্ঞান নিজেকে ভুল প্রমাণ করার সাহস রাখে, যা ধর্ম বা কুসংস্কার রাখে না।
অ্যাবডাক্টিভ লজিক: গোয়েন্দার অনুমান
ডিডাকশন এবং ইন্ডাকশনের বাইরেও চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা আছে, যার নাম অ্যাবডাক্টিভ লজিক (Abductive Logic)। শার্লক হোমস বইয়ে বা সিনেমায় যা করেন, তা আসলে ডিডাকশন নয়, তা হলো অ্যাবডাকশন। একে বলা হয় ‘ইনফারেন্স টু দ্য বেস্ট এক্সপ্লানেশন’ (Inference to the Best Explanation)। যখন আমাদের কাছে অসম্পূর্ণ তথ্য থাকে, কিছু বিক্ষিপ্ত সূত্র বা ক্লু থাকে, তখন আমরা সেই সূত্রগুলোকে জোড়া লাগিয়ে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত বা বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। এটি ডিডাকশনের মতো নিশ্চিত নয়, আবার ইন্ডাকশনের মতো কেবল পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি অনেকটা কল্পনাশক্তির লজিক্যাল ব্যবহার।
ধরুন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার বাড়ির সামনের রাস্তা ভিজে আছে। এখন আপনি ভাবতে শুরু করলেন কেন রাস্তা ভেজা?
- কারণ ১: গত রাতে বৃষ্টি হয়েছে।
- কারণ ২: মিউনিসিপালিটির গাড়ি রাস্তা ধুয়ে দিয়েছে।
- কারণ ৩: পাশের বাড়ির জলের ট্যাংক ফেটে বন্যা হয়ে গেছে।
- কারণ ৪: কোনো সিনেমার শুটিং হয়েছে এবং কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরি করা হয়েছে।
এখন আপনি অ্যাবডাকশন ব্যবহার করবেন। আপনি আকাশের দিকে তাকালেন, দেখলেন মেঘলা। আপনি অন্য বাড়ির ছাদ দেখলেন, সেগুলোও ভেজা। আপনি রাস্তার ড্রেনে জলের প্রবাহ দেখলেন। এই সব তথ্য মিলিয়ে আপনি সিদ্ধান্তে এলেন: “সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা হলো, বৃষ্টি হয়েছে।” কারণ মিউনিসিপালিটির গাড়ি ছাদ ভেজাতে পারে না, ট্যাংক ফাটলে সব বাড়ির ছাদ ভিজত না। তাই ‘বৃষ্টি’ হলো সেরা ব্যাখ্যা। এটি ১০০% নিশ্চিত নয় (হয়তো হেলিকপ্টার থেকে জল ফেলা হয়েছে!), কিন্তু এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডাক্তাররা রোগ নির্ণয়ের সময় বা ডায়াগনসিস (Diagnosis)-এ এই অ্যাবডাক্টিভ লজিক ব্যবহার করেন। একজন রোগীর জ্বর, কাশি, এবং শ্বাসকষ্ট আছে। ডাক্তার ভাবেন – এটি কি ফ্লু? নাকি নিউমোনিয়া? নাকি কোভিড? তিনি বিভিন্ন টেস্ট করেন এবং লক্ষণগুলো মিলিয়ে দেখেন কোন রোগটি সব লক্ষণের সেরা ব্যাখ্যা দেয়। ঐতিহাসিকরা যখন ইতিহাস লেখেন, প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন মাটি খুঁড়ে পুরনো সভ্যতা আবিষ্কার করেন, কিংবা জুরি বোর্ড যখন আদালতে রায় দেয় – সবাই আসলে এই অ্যাবডাকশনের ওপর নির্ভর করে। অ্যাবডাকশন আমাদের শেখায় যে সত্য সবসময় সরলরেখায় আসে না, মাঝেমধ্যে তাকে অনেকগুলো সম্ভাবনার মধ্য থেকে বেছে নিতে হয়। এটি আমাদের সৃজনশীলতা এবং লজিকের এক অপূর্ব মিলন। পার্স বলতেন, অ্যাবডাকশন হলো একমাত্র লজিক্যাল প্রক্রিয়া যা নতুন আইডিয়া বা হাইপোথিসিস তৈরি করতে পারে; ডিডাকশন কেবল সেই হাইপোথিসিসের ফলাফল বের করে, আর ইন্ডাকশন সেই হাইপোথিসিসকে পরীক্ষা করে। সুতরাং, মানুষের জ্ঞানের অগ্রগতি মূলত এই তিন রাস্তার এক সম্মিলিত যাত্রা।
ফ্যালাসি: মস্তিষ্কের প্রতারণার ফাঁদ
মানুষ হিসেবে আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় শর্টকাট খোঁজে। বিবর্তনের ধারায় আমরা টিকে আছি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার কারণে, নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে নয়। বনে যখন ঝোপ নড়ত, তখন আদিম মানুষ এটা লজিক দিয়ে বিচার করত না যে – “ঝোপটি বাতাসের কারণে নড়ছে নাকি বাঘের কারণে?” সে ভাবত “বাঘ!” এবং দৌড় দিত। এই তাড়াহুড়ো বা হিউরিস্টিকস (Heuristics) ব্যবহার করতে গিয়ে আমাদের মস্তিষ্কে কিছু যৌক্তিক ত্রুটি বা বাগ (Bug) তৈরি হয়েছে। লজিকের ভাষায় এদের বলা হয় ফ্যালাসি (Fallacy) বা অনুপপত্তি। ফ্যালাসি হলো এমন যুক্তি যা শুনতে ঠিক মনে হয়, কিন্তু আসলে তা ভুল বা বিভ্রান্তিকর। এগুলো অনেকটা জাদুকরের বিভ্রমের মতো – চোখের সামনে ঘটছে কিন্তু আপনি ধরতে পারছেন না। ফ্যালাসিগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ফরমাল ফ্যালাসি (Formal Fallacy) এবং ইনফরমাল ফ্যালাসি (Informal Fallacy)। ফরমাল ফ্যালাসি ঘটে যুক্তির গঠনে ভুল থাকলে, আর ইনফরমাল ফ্যালাসি ঘটে ভাষার মারপ্যাঁচে বা প্রসঙ্গের বিভ্রান্তিতে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত এই ইনফরমাল ফ্যালাসিগুলোর শিকার হই। রাজনীতিবিদদের ভাষণ, বিজ্ঞাপনের চটকদার কথা, এমনকি বন্ধুদের আড্ডায় – সবখানেই ফ্যালাসির ছড়াছড়ি। কিছু জনপ্রিয় এবং মারাত্মক ফ্যালাসি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। এগুলো জানলে আপনি বুঝতে পারবেন, চারপাশের মানুষ কীভাবে আপনাকে ভুল যুক্তি গিলিয়ে দিচ্ছে।
১. অ্যাড হোমনেম: ব্যক্তিগত আক্রমণ
অ্যাড হোমনেম (Ad Hominem) একটি ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ “মানুষের দিকে” বা “ব্যক্তির বিরুদ্ধে”। এটি তর্কের জগতে সবচেয়ে নোংরা এবং নিচু মানের কৌশল। এখানে যুক্তি খণ্ডন না করে, যে যুক্তি দিচ্ছে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়। উদ্দেশ্য হলো যুক্তির সত্যতা বিচার না করে ব্যক্তিটিকে অপমানিত করে শ্রোতাদের মনোযোগ ঘোরানো।
উদাহরণ:
- যুক্তিদাতা: “বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানের একটি প্রমাণিত তত্ত্ব এবং এর পক্ষে প্রচুর ফসিল রেকর্ড আছে।”
- প্রতিপক্ষ: “তোমার কথা শোনার দরকার নেই, কারণ তুমি তো ব্যক্তিগত জীবনে চরিত্রহীন এবং মদ্যপ।”
বিশ্লেষণ: এখানে প্রতিপক্ষ বিবর্তনবাদের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খণ্ডন করেননি। তিনি যুক্তিদাতার চরিত্রের ওপর আক্রমণ করেছেন। কিন্তু লজিক বলে, একজন মদ্যপ বা চরিত্রহীন মানুষও সত্য কথা বলতে পারেন। ২+২ = ৪, এই সত্যটি কোনো সাধু বললেও সত্য, কোনো চোর বললেও সত্য। ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে তার যুক্তির সত্যতার কোনো লজিক্যাল সম্পর্ক নেই। এই ফ্যালাসি ব্যবহার করে মানুষকে সহজেই মূল আলোচনা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়।
২. স্ট্র-ম্যান ফ্যালাসি: কাকতাড়ুয়া যুক্তি
স্ট্র-ম্যান ফ্যালাসি (Strawman Fallacy) বা কাকতাড়ুয়া যুক্তি হলো প্রতিপক্ষের যুক্তিকে বিকৃত করে দুর্বলভাবে উপস্থাপন করা, যাতে সহজেই সেটাকে আক্রমণ করা যায়। অনেকটা খড়কুটোর মানুষ (কাকতাড়ুয়া) বানিয়ে তাকে তলোয়ার দিয়ে কাটার মতো বীরত্ব দেখানো। আসল মানুষটিকে হারানো কঠিন, তাই তার একটি নকল এবং দুর্বল প্রতিকৃতি বানিয়ে সেটাকে হারানো হয়।
উদাহরণ:
- ব্যক্তি ক: “আমাদের উচিত সামরিক বাজেট কিছুটা কমিয়ে সেই টাকা শিক্ষায় এবং স্বাস্থ্যখাতে খরচ করা।”
- ব্যক্তি খ: “ও, তার মানে আপনি চাচ্ছেন আমাদের দেশ অরক্ষিত থাকুক এবং শত্রুরা এসে আমাদের মেরে ফেলুক? আপনি তো দেশের শত্রু!”
বিশ্লেষণ: লক্ষ করুন, ব্যক্তি ‘ক’ কখনোই বলেননি যে দেশ অরক্ষিত থাকুক বা সব সামরিক বাজেট বন্ধ করে দেওয়া হোক। কিন্তু ব্যক্তি ‘খ’ তার কথাকে অতিরঞ্জিত ও বিকৃত করে এমন একটা রূপ দিলেন (স্ট্র-ম্যান), যা সহজেই বাতিল করা যায় এবং যা শুনলে সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণার জন্ম হয়। রাজনীতিতে এই ফ্যালাসি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
৩. আপিল টু অথরিটি: কর্তৃপক্ষের দোহাই
আপিল টু অথরিটি (Appeal to Authority) বা অ্যাড ভেরেকুন্ডিয়াম (Ad Verecundiam) হলো কোনো প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র কোনো বিখ্যাত বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি বলেছেন বলেই সেটাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া। এটি আমাদের মানসিক দাসত্বের একটি রূপ। আমরা মনে করি, বড় মানুষরা ভুল করতে পারেন না।
উদাহরণ: “আইনস্টাইন ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন (যদিও এটি বিতর্কিত), তাই ঈশ্বর আছেন।”
বিশ্লেষণ: আইনস্টাইন নিঃসন্দেহে পদার্থবিজ্ঞানে জিনিয়াস, কিন্তু তিনি ধর্মতত্ত্ব বা দর্শনের বিশেষজ্ঞ নন। আর যদি বিশেষজ্ঞও হন, লজিক কোনো ব্যক্তির মুখের কথার ওপর নির্ভর করে না। লজিক চায় প্রমাণ। নিউটন আলকেমি বা লোহাকে সোনা বানানোর বিদ্যায় বিশ্বাস করতেন, তার মানে এই নয় যে আলকেমি সত্য। বিজ্ঞানে কোনো অথরিটি নেই, আছে কেবল তথ্য-উপাত্ত। এই ফ্যালাসি আমাদের স্বাধীন চিন্তা করতে বাধা দেয়।
৪. স্লিপারি স্লোপ: পিচ্ছিল ঢাল
স্লিপারি স্লোপ (Slippery Slope) ফ্যালাসিটি ভীতি প্রদর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে দাবি করা হয় যে, ছোট একটা ঘটনা ঘটলে, তার ধারাবাহিকতায় বিশাল কোনো ভয়ানক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে, যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয় না। একে অনেকটা ডোমিনো ইফেক্ট-এর ভুল প্রয়োগ বলা যেতে পারে।
উদাহরণ: “আজ যদি আমরা সমকামীদের বিয়ের অধিকার দিই, কাল মানুষ পশুপাখিকে বিয়ে করা শুরু করবে এবং সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।”
বিশ্লেষণ: দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিয়ের সাথে মানুষের পশুপাখিকে বিয়ে করার কোনো লজিক্যাল বা কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। দুটোর নৈতিক এবং আইনি ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু এখানে একটি কাল্পনিক ভয়ের চিত্র তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষ প্রথম ধাপটি নিতে ভয় পায়। এটি রক্ষণশীলদের একটি প্রিয় অস্ত্র।
৫. সার্কুলার রিজনিং: চক্রাকার যুক্তি
সার্কুলার রিজনিং (Circular Reasoning) বা বেগিং দ্য কোয়েশ্চেন (Begging the Question) হলো এমন এক ধরণের যুক্তি যেখানে সিদ্ধান্তের মধ্যেই প্রমাণ লুকিয়ে থাকে। অর্থাৎ যা প্রমাণ করতে হবে, তাকেই সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। এটি কোনো নতুন তথ্য দেয় না, কেবল একই কথা ঘুরিয়ে বলে।
উদাহরণ: “ধর্মগ্রন্থটি সত্য। কারণ ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে এটি সত্য। আর ধর্মগ্রন্থ কখনো মিথ্যা বলে না কারণ এটি ঈশ্বরের বাণী। আর ঈশ্বর সত্য কারণ ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে।”
বিশ্লেষণ: এটি একটি বদ্ধ লুপ। আপনি ধর্মগ্রন্থের সত্যতা প্রমাণ করতে ধর্মগ্রন্থকেই সাক্ষী মানছেন। এটি লজিক্যালি অগ্রহণযোগ্য। প্রমাণের উৎস অবশ্যই দাবির বাইরের কোনো নিরপেক্ষ জায়গা থেকে আসতে হবে।
৬. ফলস ডাইলেমা: মিথ্যা উভয়সংকট
ফলস ডাইলেমা (False Dilemma) বা ফলস ডাইকোটমি (False Dichotomy) হলো পরিস্থিতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যেন কেবল দুটি অপশন আছে, অথচ বাস্তবে আরো অনেক অপশন থাকতে পারে। একে ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ চিন্তাভাবনাও বলা হয়।
উদাহরণ: “হয় তুমি আমাদের দলে, না হয় তুমি দেশের শত্রু।”
বিশ্লেষণ: এই যুক্তিতে ধরে নেওয়া হয়েছে যে পৃথিবীতে মাত্র দুটো দল আছে – আপনার দল এবং দেশের শত্রু। কিন্তু একজন মানুষ আপনার দলের নাও হতে পারে, আবার দেশের শত্রুও নাও হতে পারে। সে নিরপেক্ষ হতে পারে, বা তৃতীয় কোনো দলের সমর্থক হতে পারে। এই ফ্যালাসি ব্যবহার করে মানুষকে কোণঠাসা করে জোরপূর্বক সমর্থন আদায় করা হয়।
৭. পোস্ট হক ফ্যালাসি: কাকতালীয় দোষ
পোস্ট হক ফ্যালাসি (Post Hoc Ergo Propter Hoc)-এর পুরো ল্যাটিন নামটির অর্থ হলো “এর পরে, তাই এর কারণে”। অর্থাৎ, ‘ক’ ঘটার পর ‘খ’ ঘটেছে, তাই আমরা ধরে নিই ‘ক’-ই ‘খ’-এর কারণ। এটি কুসংস্কারের মূল ভিত্তি।
উদাহরণ: “কালো বিড়াল রাস্তা পার হওয়ার পরেই আমার এক্সিডেন্ট হয়েছে। তাই কালো বিড়ালটিই অশুভ এবং আমার এক্সিডেন্টের কারণ।”
বিশ্লেষণ: বিড়াল রাস্তা পার হওয়া এবং এক্সিডেন্টের মধ্যে সময়ের ক্রম (Sequence) আছে, কিন্তু কোনো কার্যকারণ (Causality) সম্পর্ক নেই। এক্সিডেন্টটি অসাবধানতা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হতে পারে। দুটি ঘটনা পরপর ঘটলেই তারা সম্পর্কিত হয় না। একে কোরিলেশন ডাজ নট ইমপ্লাই কজেশন (Correlation does not imply causation)-ও বলা হয়।
৮. বার্ডেন অফ প্রুফ: প্রমাণের দায়ভার
বার্ডেন অফ প্রুফ (Burden of Proof) বা আপিল টু ইগনোরেন্স (Appeal to Ignorance) হলো নাস্তিকতা ও আস্তিকতার বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লজিকের নিয়ম হলো – যে দাবি করবে, প্রমাণ করার দায় তার।
উদাহরণ:
- দাবিকারী: “মহাকাশে একটা অদৃশ্য ড্রাগন আছে।”
- যুক্তিবিদ: “প্রমাণ দাও।”
- দাবিকারী: “ড্রাগন নেই, সেটা প্রমাণ করো।”
বিশ্লেষণ: এটি একটি ফ্যালাসি। আমি যদি ড্রাগন না থাকার প্রমাণ দিতে না পারি, তার মানে এই নয় যে ড্রাগন আছে। বারট্রান্ড রাসেল তাঁর বিখ্যাত ‘রাসেলস টিপট’ (Russell’s Teapot) উদাহরণ দিয়ে এটি বুঝিয়েছিলেন (Russell, 1952)। যদি কেউ দাবি করে পৃথিবী ও মঙ্গলের মাঝখানে একটা চায়ের কেতলি ঘুরছে যা টেলিস্কোপে দেখা যায় না, তবে সেটা অপ্রমাণ করা অসম্ভব। কিন্তু তাই বলে সেটাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া পাগলামি। নেতিবাচক দাবি (Negative Claim) প্রমাণ করা যায় না, ইতিবাচক দাবি (Positive Claim)-র প্রমাণ দিতে হয়।
৯. নো ট্রু স্কটসম্যান: খাঁটি স্কটিশের দোহাই
নো ট্রু স্কটসম্যান (No True Scotsman) হলো এমন এক ফ্যালাসি যেখানে নিজের দাবির কোনো ব্যতিক্রম বা কাউন্টার-এক্সাম্পল পাওয়া গেলে তাকে ‘আসল’ বা ‘খাঁটি’ নয় বলে বাদ দেওয়া হয়। এটি নিজের ভুল স্বীকার না করার একটি চতুর কৌশল।
উদাহরণ:
- ব্যক্তি ক: “কোনো স্কটিশ লোক ভাতের সাথে চিনি খায় না।”
- ব্যক্তি খ: “কিন্তু আমার আংকল তো স্কটিশ, তিনি ভাতের সাথে চিনি খান।”
- ব্যক্তি ক: “ওহ, তাহলে তিনি ‘প্রকৃত’ স্কটিশ নন।”
বিশ্লেষণ: এখানে স্কটিশের সংজ্ঞাকে সুবিধামতো বদলে ফেলা হচ্ছে। একইভাবে, যখন কোনো ধার্মিক ব্যক্তি সন্ত্রাস করে, তখন বলা হয় “সে প্রকৃত ধার্মিক নয়”। এটি একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি কারণ সংজ্ঞার এই পরিবর্তনটি স্বেচ্ছাচারী (Arbitrary)।
১০. তু কোক: তুমিও তো তাই
তু কোক (Tu Quoque) একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ “তুমিও”। এটি নিজের ভুল ঢাকার জন্য অন্যের ভুলের দিকে আঙুল তোলার কৌশল। একে হিপোক্রিসি বা ভণ্ডামির অভিযোগও বলা হয়।
উদাহরণ:
- বাবা: “ধূমপান করো না, এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।”
- ছেলে: “কিন্তু তুমিও তো ধূমপান করো!”
বিশ্লেষণ: বাবা ধূমপান করেন কি না, তার সাথে ধূমপানের ক্ষতিকর হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বাবার উপদেশটি সঠিক, যদিও তিনি নিজে সেটা মানেন না। অন্য কেউ ভুল করেছে বলে আমার ভুলটা সঠিক হয়ে যায় না। লজিকে দুটো ভুল মিলে একটা শুদ্ধ হয় না (Two wrongs don’t make a right)।
ফ্যালাসিগুলো আমাদের চিন্তার ভাইরাস। এগুলো আমাদের যুক্তিকে অসুস্থ করে তোলে। একজন যুক্তিবাদী মানুষের কাজ হলো নিজের এবং অন্যের কথার মধ্যে এই ভাইরাসগুলোকে শনাক্ত করা এবং সেগুলোকে ছেঁটে ফেলা। যখনই কেউ আবেগী কথা বলবে, ভয় দেখাবে, বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করবে – বুঝবেন সেখানে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। লজিকের আলোয় সেই কালো দাগগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়।
কগনিটিভ বায়াস: লজিকের শত্রু যখন নিজের মন
এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি ফ্যালাসি নিয়ে, যা হলো যুক্তির গঠন বা প্রয়োগের ভুল। কিন্তু লজিকের পথে এর চেয়েও বড় এবং অদৃশ্য এক শত্রু আছে, যা বাইরে থেকে আসে না, বরং আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরেই বসে থাকে। এর নাম কগনিটিভ বায়াস (Cognitive Bias) বা জ্ঞানীয় পক্ষপাত। ফ্যালাসি যদি হয় সফটওয়্যারের বাগ, তবে কগনিটিভ বায়াস হলো হার্ডওয়্যারের সীমাবদ্ধতা। আমাদের মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের ফসল। আদিম যুগে টিকে থাকার জন্য মস্তিষ্ককে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো – ঝোপ নড়লে ভাবার সময় ছিল না সেটা বাঘ নাকি বাতাস, দৌড় দেওয়াই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। এই দ্রুত চিন্তা বা হিউরিস্টিকস (Heuristics)-এর কারণে আমাদের মস্তিষ্কে কিছু শর্টকাট তৈরি হয়েছে। আধুনিক জটিল জগতে এই শর্টকাটগুলোই আমাদের ভুল পথে চালিত করে। নোবেল বিজয়ী মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেমান (Daniel Kahneman) এবং তাঁর সহযোগী আমোস ভারস্কি (Amos Tversky) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মানুষ আসলে র্যাশনাল বা যুক্তিবাদী প্রাণী নয়, বরং সে গভীরভাবে বায়াসড বা পক্ষপাতদুষ্ট। কাহনেমান তাঁর যুগান্তকারী বই থিংকিং, ফাস্ট অ্যান্ড স্লো-তে আমাদের চিন্তার দুটি সিস্টেমের কথা বলেছেন: সিস্টেম ১ (দ্রুত, আবেগি, অবচেতন) এবং সিস্টেম ২ (ধীর, যৌক্তিক, সচেতন)। কগনিটিভ বায়াসগুলো মূলত এই সিস্টেম ১-এর কারসাজি (Kahneman, 2011)। চলুন, আমাদের মস্তিষ্কের কিছু জনপ্রিয় এবং বিপজ্জনক বায়াস নিয়ে আলোচনা করা যাক।
কনফার্মেশন বায়াস: নিজের আয়নায় দেখা
কনফার্মেশন বায়াস (Confirmation Bias) বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত হলো মানুষের সবচেয়ে বড়, সর্বব্যাপী এবং সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক মনস্তাত্ত্বিক রোগ। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি হলো নিজের বিশ্বাসের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা। আমরা সবাই নিজেদের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পছন্দ করি, কারণ সেটাই আমাদের নিরাপদ বোধ করায়। এই বায়াসের কারণে আমরা অবচেতনভাবে আমাদের চারপাশের জগত থেকে কেবল সেই তথ্যগুলোই খুঁজি, বিশ্বাস করি বা মনে রাখি যা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণা বা বিশ্বাসকে সমর্থন করে। উল্টো দিকের হাজারটা প্রমাণ বা যুক্তি থাকলেও আমরা সেগুলোকে অবজ্ঞা করি, ভুলে যাই বা তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিই। আমাদের মস্তিষ্ক এখানে এক ধরণের ছাঁকনি বা ফিল্টারের মতো কাজ করে – যা কিছু আমার পছন্দের, তা ভেতরে আসুক; যা কিছু অপছন্দের, তা বাইরে থাক।
উদাহরণস্বরূপ, একজন গভীরভাবে ধার্মিক ব্যক্তি যখন খবরে দেখেন যে কোনো একজন মানুষ বিমান দুর্ঘটনা বা ভূমিকম্প থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন, তিনি সাথে সাথে ভাবেন – “ইনি নিশ্চয়ই প্রার্থনা করেছিলেন, তাই ঈশ্বর তাঁকে বাঁচিয়েছেন।” এটি তার বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে। কিন্তু একই দুর্ঘটনায় যে আরও শত শত মানুষ মারা গেল, যারা হয়তো আরও বেশি ভক্তিভরে প্রার্থনা করেছিল, সেই তথ্যটি তার মস্তিষ্ক খুব সুবিধাজনকভাবে ফিল্টার করে ফেলে দেয় বা এড়িয়ে যায়। তিনি হয়তো বলবেন, “ওটা ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল,” কিন্তু বেঁচে যাওয়ার ক্রেডিটটা প্রার্থনার বলেই গণ্য করবেন। এটি এক ধরণের সিলেক্টিভ থিংকিং। একইভাবে, রাজনৈতিক বিতর্কে এই বায়াস প্রকট আকার ধারণ করে। আমরা কেবল আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের ভালো কাজগুলো বা সাফল্যের খবরগুলো শেয়ার করি এবং বিপক্ষ দলের সব কাজকে খারাপ বা ষড়যন্ত্র মনে করি। বিপক্ষ দলের ভালো কাজগুলো আমাদের চোখে পড়লেও আমরা বলি, “এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে।”
বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media) বা ফেসবুকের অ্যালগরিদম এই বায়াসকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ‘ইকো চেম্বার’ (Echo Chamber)-এ আটকে রাখে। অ্যালগরিদম জানে আপনি কী পছন্দ করেন, তাই সে আপনাকে কেবল আপনার মতের সাথে মিলে যায় এমন পোস্ট, ভিডিও বা খবরই দেখায়। আপনি যদি বিবর্তনবাদ বিরোধী হন, তবে আপনার নিউজফিড ভরে যাবে বিবর্তনবাদ বিরোধী ভিডিও দিয়ে। এর ফলে আপনার মনে হবে – “পৃথিবীর সবাই তো আমার মতোই ভাবে! আমার বিশ্বাসই ধ্রুব সত্য।” এটি সমাজে মেরুকরণ বা পোলারাইজেশন (Polarization) সৃষ্টি করে। লজিক বা যুক্তিবিদ্যা বলে, সত্য জানতে হলে নিজের মতের বিপক্ষের যুক্তিগুলো সবচেয়ে মন দিয়ে শোনা উচিত এবং সেগুলোকে খণ্ডন করার চেষ্টা করা উচিত। কার্ল পপার একে বলেছিলেন ফলসিফিকেশন (Falsification) – নিজেকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করা। কিন্তু কনফার্মেশন বায়াস আমাদের কানে তুলা এবং চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখে, যাতে আমরা আমাদের আরামদায়ক বিশ্বাসের জগত থেকে বের হতে না পারি।
ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট: অজ্ঞতার অহংকার
ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট (Dunning-Kruger Effect) হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতার এক করুণ কিন্তু হাস্যকর চিত্র। এটি এমন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যেখানে কম জানা বা অদক্ষ লোকেরা নিজেদের অনেক বেশি জ্ঞানী বা দক্ষ মনে করে। ১৯৯৯ সালে কর্নেল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ডেভিড ডানিং (David Dunning) এবং জাস্টিন ক্রুগার (Justin Kruger) একটি গবেষণাপত্রে এই বিষয়টি তুলে ধরেন (Dunning & Kruger, 1999)। তাঁরা দেখেন, অদক্ষ বা মূর্খ মানুষদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের নিজেদের ভুল বা সীমাবদ্ধতা বোঝার ক্ষমতাটুকুও থাকে না। একে বলা হয় মেটা-কগনিশন (Metacognition) বা নিজের চিন্তা সম্পর্কে চিন্তা করার ক্ষমতার অভাব। ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস থাকে তুঙ্গে। তারা মনে করে তারা পৃথিবীর সবকিছু বুঝে ফেলেছে।
অন্যদিকে, যারা প্রকৃত বিশেষজ্ঞ বা জ্ঞানী, তারা জানেন জ্ঞানের পরিধি কত বিশাল এবং তারা তার তুলনায় কত কম জানেন। তাই তারা বিনয়ী হন, কথা বলতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন এবং সব সময় মনে করেন, “হয়তো আমি ভুল হতে পারি।” একে বলা হয় ইম্পোস্টার সিনড্রোম (Imposter Syndrome)-এর বিপরীত। ফেসবুকে বা চায়ের দোকানে দেখবেন, ভ্যাক্সিন, অর্থনীতি, বা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে এমন সব লোক জোর গলায় এবং চরম আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলছে যাদের এ বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান বা পড়াশোনা নেই। তারা বিজ্ঞানীদের ভুল ধরছে, অর্থনীতিবিদদের জ্ঞান দিচ্ছে। বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “এই বিশ্বের সমস্যা হলো, বোকারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী আর বুদ্ধিমানরা সংশয়ে পূর্ণ।” লজিক চর্চার অন্যতম লক্ষ্য হলো এই বায়াস কাটিয়ে নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করতে শেখা। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস (Socrates) বলেছিলেন, “আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না” – এটাই হলো প্রকৃত জ্ঞানের শুরু। যখন আপনি জানবেন যে আপনি জানেন না, তখনই শেখার দরজা খুলবে। ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট আমাদের শেখায় যে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অনেক সময় জ্ঞানের লক্ষণ নয়, বরং গভীর অজ্ঞতার লক্ষণ।
সাঙ্ক কস্ট ফ্যালাসি: লোকসানের মায়া
সাঙ্ক কস্ট ফ্যালাসি (Sunk Cost Fallacy) বা সাঙ্ক কস্ট বায়াস (Sunk Cost Bias) হলো অতীতের বিনিয়োগের মায়ায় পড়ে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত ভুল নেওয়া। মানুষের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী, আমরা লাভ করার চেয়ে লোকসান এড়াতে বেশি পছন্দ করি – একে বলা হয় লস এভারশন (Loss Aversion)। “অনেক দূর এসেছি, এখন আর ফেরা যাবে না” – এই ভুল এবং অযৌক্তিক চিন্তা আমাদের ধ্বংস করে। আমরা মনে করি, যেহেতু আমরা কোনো কিছুর পেছনে অনেক টাকা, সময় বা শ্রম খরচ করে ফেলেছি, তাই এখন হাল ছাড়া মানে সেই সব খরচ জলে যাওয়া। কিন্তু লজিক বা অর্থনীতির ভাষায়, যা খরচ হয়েছে তা তো গেছেই (Sunk), সেটা আর কোনোভাবেই ফিরবে না। এখন দেখার বিষয় হলো, সামনে এগিয়ে গেলে লাভ হবে নাকি আরও লস হবে।
বাস্তব জীবনের কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন আপনি একটা সিনেমা দেখতে হলে গেছেন এবং টিকিটের দাম ৫০০ টাকা। সিনেমা শুরু হওয়ার ১৫-২০ মিনিট পর আপনি বুঝলেন সিনেমাটা জঘন্য, কাহিনীতে কোনো আগামাথা নেই। এখন আপনি কী করবেন? লজিক বলে হল থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ ৫০০ টাকা তো গেছেই, সেটা আর ফেরত পাবেন না। এখন হলে বসে থাকলে আরও ২ ঘণ্টা সময় নষ্ট হবে এবং বিরক্তি বাড়বে। অর্থাৎ লসের সাথে আরও লস যোগ হবে। কিন্তু সাঙ্ক কস্ট বায়াসের কারণে অধিকাংশ মানুষ ভাবে, “টাকা দিয়েছি যখন, পুরোটা না দেখে যাব না!” তারা নিজেদের ২ ঘণ্টা সময় নষ্ট করে কেবল টাকার মায়ায়।
একইভাবে, মানুষ বছরের পর বছর ভুল চাকরিতে, ভুল ব্যবসায় বা টক্সিক রিলেশনশিপ (Toxic Relationship)-এ আটকে থাকে কেবল এই ভেবে যে, “এই সম্পর্কের পেছনে আমি জীবনের ১০টা বছর দিয়েছি, এখন ছাড়ি কী করে?” তারা ভাবে ছেড়ে দিলে এই ১০ বছর ‘লস’ হয়ে যাবে। কিন্তু লজিক বলে, আগামী আরও ২০ বছর যদি আপনি এই অসুখী সম্পর্কে থাকেন, তবে লসটা আরও বড় হবে। জুয়াড়িরা এই বায়াসের কারণেই সর্বস্বান্ত হয়; তারা আগের লস রিকভার করার আশায় আরও লস করতে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রেও সেনাপতিরা অনেক সময় এই ভুলের শিকার হন – অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে আরও সৈন্য পাঠান কারণ তাদের মনে হয় “আমাদের এত সৈন্য মারা গেছে, এখন পিছু হটলে তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে।” লজিক শেখায় নিষ্ঠুর হতে – অতীতের দিকে না তাকিয়ে কেবল ভবিষ্যতের লাভ-ক্ষতি হিসাব করতে।
অ্যাঙ্করিং বায়াস: প্রথম তথ্যের ফাঁদ
আমাদের মস্তিষ্ক কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বা কোনো কিছুর মূল্য নির্ধারণ করার সময় প্রথম পাওয়া তথ্যের ওপর খুব বেশি নির্ভর করে। এই প্রথম তথ্যটি একটি ‘অ্যাঙ্কর’ বা নোঙরের মতো কাজ করে, যার চারপাশে আমাদের পরবর্তী চিন্তাগুলো ঘুরপাক খায়। একে বলা হয় অ্যাঙ্করিং বায়াস (Anchoring Bias)। আমরা যখন কোনো অজানা বিষয়ে অনুমান করি, তখন আমরা শূন্য থেকে শুরু করি না, বরং হাতের কাছে পাওয়া প্রথম সংখ্যাটিকেই বেসলাইন বা ভিত্তি হিসেবে ধরি।
বিপণন বা মার্কেটিং-এ এই বায়াসটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। আপনি যখন কোনো শপিং মলে যান, দোকানদার যখন আপনাকে বলে, “এই শার্টের দাম ৫০০০ টাকা”, তখন আপনার মস্তিষ্কে ৫০০০ সংখ্যাটি গেঁথে যায় (অ্যাঙ্কর)। এরপর সে দাম কমিয়ে ৩০০০ বললে আপনার মনে হয়, “বাহ! অনেক সস্তায় পেলাম, ২০০০ টাকা লাভ হলো!” অথচ শার্টটির আসল দাম হয়তো ১০০০ টাকা এবং দোকানদার এখনো ২০০% লাভে বিক্রি করছে। আপনি আসলে ঠকেছেন, কিন্তু অ্যাঙ্করিং বায়াসের কারণে আপনার মনে হচ্ছে আপনি জিতেছেন বা ‘গুড ডিল’ পেয়েছেন। ডিসকাউন্টের সময় যে লেখা থাকে “পূর্বের দাম ১০০০, বর্তমান দাম ৫০০” – এটাও অ্যাঙ্করিং। ১০০০ সংখ্যাটি আপনাকে বোঝায় যে ৫০০ টাকা খুব সস্তা।
বেতনের নেগোসিয়েশন বা স্যালারি নেগোসিয়েশন (Salary Negotiation)-এর সময়ও এটা ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে পক্ষ আগে সংখ্যাটি বা বেতনের অংকটি বলে, সে আলোচনার গতিপথ ঠিক করে দেয়। যদি আপনি প্রথমেই বলেন “আমার প্রত্যাশা ১ লাখ টাকা”, তখন নিয়োগকারী হয়তো ৮০-৯০ হাজারের আশেপাশে ভাববেন। কিন্তু আপনি যদি প্রথমেই বলেন “৫০ হাজার”, তবে তারা ৪০-৪৫ হাজারের বেশি ভাববেন না। কারণ আপনি নিজেই তাদের মস্তিষ্কে একটি নিচু অ্যাঙ্কর বা নোঙর গেঁথে দিয়েছেন। লজিক্যাল হতে হলে আমাদের এই প্রথম তথ্যের প্রভাব মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে বিচার করতে শিখতে হবে। আমাদের প্রশ্ন করা উচিত – “এই জিনিসটির প্রকৃত মূল্য কত?” অন্য কেউ কী দাম বলল বা ট্যাগ-এ কী লেখা আছে, তা দিয়ে প্রভাবিত না হয়ে নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা উচিত।
সার্ভাইভারশিপ বায়াস: বিজয়ীদের ইতিহাস
আমরা কেবল তাদেরই দেখি যারা সফল হয়েছে, টিকে আছে বা বিজয়ী হয়েছে; যারা ব্যর্থ হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, তাদের আমরা দেখি না কারণ তারা দৃশ্যমান নয়। এর ফলে আমাদের তথ্যে বিশাল এক শূন্যতা বা গ্যাপ তৈরি হয় এবং আমরা ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। একে বলা হয় সার্ভাইভারশিপ বায়াস (Survivorship Bias)। ইতিহাস সব সময় বিজয়ীরাই লেখে, তাই সেখানে বিজিতের বা মৃতের কোনো স্থান থাকে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিল যুদ্ধফেরত বিমানের যে অংশগুলোতে বেশি গুলি লেগেছে, সেই অংশগুলোতে আরও শক্তিশালী বর্ম বা আর্মার প্লেট লাগাবে যাতে বিমানগুলো নিরাপদ হয়। তারা দেখল ফিরে আসা বিমানগুলোর ডানা ও লেজে প্রচুর গুলি লেগেছে, কিন্তু ইঞ্জিনে বা ককপিটে তেমন গুলি নেই। তাই তারা ডানা ও লেজ শক্ত করার পরিকল্পনা করল। কিন্তু পরিসংখ্যানবিদ আব্রাহাম ওয়াল্ড (Abraham Wald) বললেন, “না! আপনারা ভুল করছেন। আপনাদের উচিত ইঞ্জিনে ও ককপিটে বর্ম লাগানো, যেখানে গুলি লাগেনি।” কেন? কারণ, যে বিমানগুলোর ইঞ্জিনে বা ককপিটে গুলি লেগেছে, সেগুলো তো ফিরেই আসেনি, ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা কেবল ফিরে আসা (সার্ভাইভার) বিমানগুলোর গায়ের গুলি দেখছি, যারা ডানা বা লেজে গুলি নিয়েও ফিরতে পেরেছে। অর্থাৎ ইঞ্জিনে গুলি লাগলে ফেরা যায় না – এটাই আসল তথ্য, যা মিসিং ছিল।
একইভাবে আমরা বিল গেটস, স্টিভ জবস বা মার্ক জাকারবার্গের উদাহরণ দিয়ে বলি, “লেখাপড়া ছেড়ে দিলেই (ড্রপআউট হলেই) সফল হওয়া যায়।” আমরা সেই হাজার হাজার ঝরে পড়া বা ড্রপআউট হওয়া ছাত্রদের দেখি না যারা জীবনে ব্যর্থ হয়েছে এবং কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তারা খবরের শিরোনাম হয় না। মোটিভেশনাল স্পিকার (Motivational Speaker)-রা এই বায়াস ব্যবহার করে আমাদের বোকা বানায়। তারা বলে “চেষ্টা করলেই সফল হবে”, কিন্তু পরিসংখ্যান বলে চেষ্টার সাথে ভাগ্য ও সুযোগেরও ভূমিকা আছে। লজিক আমাদের শেখায় কেবল সফলদের দিকে না তাকিয়ে ব্যর্থদের ডাটাও বিশ্লেষণ করতে, তবেই আমরা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাব।
এভেইলেবিলিটি হিউরিস্টিক: সহজলভ্যতার বিভ্রান্তি
আমাদের মস্তিষ্ক খুব অলস এবং সে সব সময় জটিল চিন্তা এড়াতে চায়। তাই কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে পরিসংখ্যানের খটমটে রাস্তায় না গিয়ে স্মৃতির সহজ রাস্তায় হাঁটে। আমাদের মস্তিষ্ক মনে করে, যে ঘটনাটি বা তথ্যটি মনে করা সহজ (Available), সেটিই বাস্তবে বেশি ঘটে বা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একে বলা হয় এভেইলেবিলিটি হিউরিস্টিক (Availability Heuristic) বা সহজলভ্যতার বিভ্রান্তি। ড্যানিয়েল কাহনেমান এবং আমোস ভারস্কি তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষ কোনো ঘটনার সম্ভাবনা বিচার করার সময় সেই ঘটনার ফ্রিকোয়েন্সি বা সংখ্যা দিয়ে বিচার করে না, বরং বিচার করে সেই ঘটনাটি তার মস্তিষ্কে কতটা সহজে ভেসে উঠছে তার ওপর ভিত্তি করে (Tversky & Kahneman, 1973)।
যেহেতু বিমান দুর্ঘটনার খবর টিভিতে খুব ফলাও করে প্রচার করা হয়, দিনের পর দিন ব্রেকিং নিউজ চলে, এবং ধ্বংসাবশেষের ছবি আমাদের মনে গেঁথে থাকে, তাই আমরা অবচেতনভাবে ধরে নিই বিমান ভ্রমণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা ভাবি, বিমানে উঠলেই বুঝি মৃত্যু। অথচ বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান বা লজিক বলে, সড়ক পথের চেয়ে বিমান ভ্রমণ হাজার গুণ বেশি নিরাপদ। প্রতিদিন সারা বিশ্বে হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, কিন্তু সেগুলো টিভিতে ওভাবে দেখানো হয় না বলে আমাদের মনে অতটা দাগ কাটে না বা ‘এভেলেবল’ থাকে না। ফলে আমরা গাড়ি বা বাসে উঠতে ভয় পাই না, কিন্তু বিমানে উঠতে ভয় পাই। এখানে লজিক পরাজিত হয় স্মৃতির তীব্রতার কাছে।
একইভাবে, আমরা মনে করি লটারি জিতলে জীবন বদলে যাবে এবং লটারি জেতা খুব সহজ। কারণ মিডিয়াতে কেবল বিজয়ীদেরই হাসিমুখ দেখানো হয়। আমরা দেখি একজন রিকশাচালক কোটিপতি হয়ে গেছে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ যে লটারি কিনে সর্বস্বান্ত হয়েছে এবং কিছুই জিততে পারেনি, তাদের খবর কোথাও আসে না। তাদের কান্না ‘এভেলেবল’ নয়। এই বায়াসের কারণে আমরা ভুল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (Risk Assessment) করি। আমরা ধূমপান করি (যা নিশ্চিত মৃত্যু আনে) কিন্তু হাঙরের আক্রমণে মারা যাওয়ার অযৌক্তিক ভয়ে সমুদ্রে নামতে ভয় পাই (যা খুবই বিরল ঘটনা)। সন্ত্রাসবাদের ভয়, অপহরণের ভয় – এগুলো সব এভেলেবিলিটি হিউরিস্টিকের দান। লজিক্যাল হতে হলে আমাদের সংবাদের শিরোনামের দিকে না তাকিয়ে পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে।
নেগেটিভিটি বায়াস: খারাপের প্রতি আসক্তি
মানুষের মস্তিষ্ক ইতিবাচক ঘটনার চেয়ে নেতিবাচক ঘটনাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, বেশি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে এবং বেশি দিন মনে রাখে। একে বলা হয় নেগেটিভিটি বায়াস (Negativity Bias)। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রভাব ইতিবাচক অভিজ্ঞতার চেয়ে অন্তত তিন গুণ বেশি শক্তিশালী। বিবর্তনের ধারায় এটি আমাদের সতর্ক থাকতে সাহায্য করেছে। আদিম মানুষের কাছে সুন্দর ফুলের চেয়ে বিষাক্ত সাপ বা বাঘের ভয় মনে রাখাটা বেশি জরুরি ছিল, কারণ তাতে জীবন বাঁচত। আনন্দ ভুলে গেলে ক্ষতি নেই, কিন্তু বিপদ ভুলে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই আমাদের মস্তিষ্ক ‘খারাপ’ বা ‘বিপদ’-এর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে বিবর্তিত হয়েছে।
কিন্তু আধুনিক জীবনে, যেখানে বাঘের ভয় নেই, সেখানে এই বায়াসটি আমাদের অসুখী এবং উদ্বিগ্ন করে তোলে। আপনি হয়তো সারা দিন অফিসে দশটি ভালো কাজ করেছেন, সবাই আপনার প্রশংসা করেছে। কিন্তু বিকেলে বস আপনাকে একটি ছোট ভুলের জন্য বকা দিয়েছেন। রাতে ঘুমানোর সময় আপনার মনে বসের ওই বকাটাই ঘুরপাক খাবে, বাকি দশটি প্রশংসার কথা মনেই আসবে না। আপনার মনে হবে দিনটাই খারাপ গেল। মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যম এই বায়াসকে কাজে লাগিয়ে তাদের টিআরপি বাড়ায়। সাংবাদিকতায় একটি প্রবাদ আছে: “ইফ ইট ব্লিডস, ইট লিডস” (If it bleeds, it leads) – অর্থাৎ রক্তপাত বা খারাপ খবরই প্রধান খবর হয়। তাই তারা কেবল হত্যা, ধর্ষণ, যুদ্ধ, আর কেলেঙ্কারির খবর প্রচার করে। আমরাও সেগুলোই বেশি দেখি। এর ফলে আমাদের মনে হয় পৃথিবীটা বুঝি রসাতলে যাচ্ছে। লজিক আমাদের শেখায় আবেগের কালো চশমা খুলে পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে। স্টিভেন পিঙ্কার তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন যে, মানব ইতিহাসে আমরা এখনই সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ সময়ে বাস করছি, কিন্তু নেগেটিভিটি বায়াসের কারণে আমরা তা বিশ্বাস করতে পারি না (Pinker, 2011)।
ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট: হুজুগে মাতাল
মানুষ সামাজিক প্রাণী, সে একা থাকতে ভয় পায়। সে দলের অংশ হতে চায়, কারণ দল তাকে নিরাপত্তা দেয়। তাই যখন আমরা দেখি সবাই কোনো কাজ করছে বা কোনো কিছু বিশ্বাস করছে, আমরাও অবচেতনভাবে সেটাই করতে চাই। একে বলা হয় ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট (Bandwagon Effect) বা হুজুগ। এটি আমাদের নিজস্ব চিন্তা বা লজিককে অবশ করে দেয়। আমরা ভাবি, “এত মানুষ তো আর ভুল হতে পারে না।” অথচ ইতিহাস সাক্ষী, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষও ভুল হতে পারে। একসময় সবাই বিশ্বাস করত পৃথিবী সমতল বা সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। সবার বিশ্বাস সত্যকে বদলে দেয় না।
বিপণন বা মার্কেটিং-এ এই বায়াসটি প্রচুর ব্যবহৃত হয়। “সবাই আইফোন কিনছে”, “সবাই এই ব্র্যান্ডের জামা পরছে” – এই কথাগুলো আমাদের প্রভাবিত করে। এখানে লজিকের কোনো বালাই নেই যে আইফোনটি আমার আসলেই দরকার কি না, আছে কেবল দলে থাকার তাড়না বা ফিয়ার অফ মিসিং আউট (FOMO)। শেয়ার বাজারে ধস নামলে সবাই শেয়ার বেচতে শুরু করে কারণ সবাই বেচছে, আবার দাম বাড়লে সবাই কিনতে শুরু করে – এটাই ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট, যা বাজারের অস্থিরতা তৈরি করে। রাজনীতিতে, যে প্রার্থী জনমত জরিপে এগিয়ে থাকে, দোদুল্যমান ভোটাররা তাকেই ভোট দেয়, কারণ তারা ‘জেতা দলের’ সাথে থাকতে চায়। লজিক্যাল মানুষ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে জানে। সে ভিড়ের অংশ না হয়ে নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে।
হ্যালো ইফেক্ট: প্রথম দর্শনের মোহ
আমরা মানুষকে বিচার করার সময় খুব অলসতা করি। কারো একটি ভালো গুণ বা বৈশিষ্ট্য দেখে আমরা ধরে নিই তার বাকি সব গুণও ভালো। একে বলা হয় হ্যালো ইফেক্ট (Halo Effect)। ‘হ্যালো’ হলো সেই আলোর বলয় যা দেবতূতের মাথার পেছনে থাকে। আমরা মানুষকে দেবদূতের মতো নিখুঁত ভাবতে পছন্দ করি। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ দেখতে যদি সুন্দর, লম্বা বা স্মার্ট হয়, তবে আমরা অবচেতনভাবে ধরে নিই সে বুদ্ধিমান, দয়ালু, সৎ এবং দক্ষ। অথচ তার চেহারার সাথে তার চরিত্র বা দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। একজন সিরিয়াল কিলারও দেখতে খুব সুদর্শন হতে পারে (যেমন টেড বান্ডি), আবার একজন মহৎ মানুষও দেখতে কুৎসিত হতে পারে (যেমন সক্রেটিস)।
কর্মক্ষেত্রে বা ইন্টারভিউ বোর্ডে এই বায়াস মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সুদর্শন প্রার্থীরা তাদের যোগ্যতার চেয়ে বেশি সুবিধা পান। শিক্ষকরা সুন্দর হাতের লেখার ছাত্রকে বেশি নম্বর দেন, যদিও হয়তো তার উত্তরের মান সাধারণ। রাজনীতিতে, লম্বা এবং সুঠাম দেহের প্রার্থীরা বেশি ভোট পান। উল্টোটাও ঘটে, যাকে বলা হয় হর্ন ইফেক্ট (Horn Effect) – কারো একটি খারাপ দিক দেখে আমরা ধরে নিই সে সব দিক দিয়েই খারাপ। লজিক আমাদের শেখায় মানুষকে সামগ্রিকভাবে বা হোলিস্টিকালি (Holistically) বিচার করতে, কেবল একটি গুণের ওপর ভিত্তি করে জেনারালাইজ না করতে। চেহারা দেখে ফলের স্বাদ বা বইয়ের মলাট দেখে বই বিচার করা বোকামি।
ফ্রেমিং ইফেক্ট: উপস্থাপনের জাদু
একই তথ্য কীভাবে উপস্থাপন বা ‘ফ্রেম’ করা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। একে বলা হয় ফ্রেমিং ইফেক্ট (Framing Effect)। মানুষ লাভের চেয়ে ক্ষতিকে বেশি ভয় পায়, তাই তথ্যকে যদি ক্ষতির আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়, তবে প্রতিক্রিয়া এক রকম হয়; আর লাভের আঙ্গিকে উপস্থাপন করলে প্রতিক্রিয়া হয় অন্য রকম।
ধরুন আপনি অসুস্থ এবং ডাক্তার আপনাকে অপারেশনের কথা বললেন।
- ডাক্তার ১ বললেন: “এই অপারেশনে বাঁচার সম্ভাবনা ৯০%।”
- ডাক্তার ২ বললেন: “এই অপারেশনে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ১০%।”
গাণিতিকভাবে বা লজিক্যালি দুটো বাক্য হুবহু এক (১০০ – ৯০ = ১০)। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম ডাক্তারের কথা শুনে অধিকাংশ রোগী অপারেশনে রাজি হবেন, কারণ সেখানে ‘বাঁচার’ (লাভ) কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় ডাক্তারের কথা শুনে অধিকাংশ রোগী ভয় পাবেন এবং রাজি হতে চাইবেন না, কারণ সেখানে ‘মারা যাওয়ার’ (ক্ষতি) কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞাপনদাতারা এবং রাজনীতিবিদরা শব্দের এই খেলা খেলে আমাদের ম্যানিপুলেট করে। তারা বলে “৯৫% ফ্যাট ফ্রি” (শুনতে ভালো লাগে), তারা বলে না “৫% ফ্যাট আছে”। লজিক আমাদের শেখায় মোড়ক বা ফ্রেম দেখে বিভ্রান্ত না হতে। লজিক্যাল মানুষ তথ্যের ভেতরের সংখ্যা বা ফ্যাক্টস বিচার করে, উপস্থাপনের ভঙ্গি নয়।
আমাদের মস্তিষ্ক নিখুঁত নয়, এটি বায়াসে ভরা। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের বন্য পরিবেশে বাঁচিয়ে রেখেছিল, কিন্তু আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটি আমাদের বিভ্রান্ত করছে। লজিক চর্চার মানে কেবল বইয়ের পাতা মুখস্থ করা নয়, এর মানে হলো এই বায়াসগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা। যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন, নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আমি কি লজিক দিয়ে ভাবছি, নাকি আমার মস্তিষ্ক কোনো শর্টকাট নিচ্ছে? আমি কি হুজুগে মাতছি? আমি কি কেবল নিজের পছন্দের তথ্যই দেখছি?” এই আত্ম-জিজ্ঞাসাই হলো মুক্তচিন্তার প্রথম পদক্ষেপ। নিজের মনের ওপর গোয়েন্দাগিরি করাই হলো প্রকৃত লজিশিয়ানের কাজ।
প্রপোজিশনাল লজিক ও সিম্বলিক লজিক: যুক্তির গণিত
মানুষের মুখের ভাষা বা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ (Natural Language) বড়ই অদ্ভুত, সুন্দর, এবং একই সাথে বিপজ্জনকভাবে অস্পষ্ট। আমরা যখন কবিতা লিখি বা প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে কথা বলি, তখন ভাষার এই অস্পষ্টতা বা অ্যাম্বিগুইটি (Ambiguity) আমাদের সাহায্য করে, কিন্তু যখন আমরা সুনির্দিষ্ট সত্য বা লজিক খুঁজি, তখন এই ভাষাই আমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। ‘ভালোবাসা’, ‘গণতন্ত্র’, ‘স্বাধীনতা’, ‘ভালো’ – এই শব্দগুলোর অর্থ একেক জনের কাছে একেক রকম। “ব্যাংক” বলতে কি নদীর পাড় বোঝাচ্ছে নাকি টাকা রাখার জায়গা? “আমি তাকে খেতে দেখলাম” – এখানে কে খাচ্ছে? আমি, নাকি সে? এই ধরনের ভাষাগত বিভ্রান্তি লজিকের পথে বড় বাধা। তাই লজিককে যখন আমরা সাধারণ ভাষার অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত করতে চাই, তখন আমরা চিহ্নের আশ্রয় নিই, ঠিক যেমন গণিতবিদরা সংখ্যার বদলে x, y, z ব্যবহার করেন। লজিকের এই শাখাকে বলা হয় সিম্বলিক লজিক (Symbolic Logic) বা প্রতীকী যুক্তিবিদ্যা। এখানে আবেগের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল কাঠখোট্টা নিয়ম এবং চিহ্ন।
সিম্বলিক লজিকের প্রধান লক্ষ্য হলো যুক্তির গঠন বা ফর্ম (Form)-কে বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট (Content) থেকে আলাদা করা। “যদি বৃষ্টি হয়, তবে মাটি ভিজবে” – এই বাক্যে ‘বৃষ্টি’ বা ‘মাটি’ নিয়ে লজিকের কোনো মাথাব্যথা নেই। লজিক এটাকে দেখে p → q হিসেবে। এখানে p এবং q হলো ভেরিয়েবল, যা যেকোনো কিছু হতে পারে। এর অর্থ হলো: “যদি প্রথমটি সত্য হয়, তবে দ্বিতীয়টি সত্য হবে।” এই যে বিমূর্তকরণ বা অ্যাবস্ট্রাকশন (Abstraction), এটিই সিম্বলিক লজিকের শক্তি। এর মাধ্যমে বিশাল বিশাল জটিল বাক্যকে ছোট ছোট সমীকরণে নামিয়ে আনা যায় এবং গাণিতিক নির্ভুলতায় সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যায়। আধুনিক সিম্বলিক লজিকের যাত্রা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকে, যখন গণিতবিদরা লজিককে দর্শনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গণিতের অংশ বানাতে চাইলেন। এই বিপ্লবের পুরোধা ছিলেন গটফ্রিড লাইবনিজ, জর্জ বুলি, এবং গটলোব ফ্রেগে। তাঁদের হাত ধরেই লজিক হয়ে উঠল ‘যুক্তির গণিত’।
বুলিয়ান অ্যালজেবরা ও কম্পিউটারের ভাষা
আধুনিক লজিকের ইতিহাসে জর্জ বুলি (George Boole) এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৮৫৪ সালে তিনি তাঁর দ্য লজ অফ থট বইয়ে দেখালেন যে, মানুষের চিন্তার নিয়মগুলোকে বীজগণিতের সমীকরণের মতো করে লেখা সম্ভব (Boole, 1854)। তিনি সত্যকে ১ এবং মিথ্যাকে ০ দিয়ে প্রকাশ করলেন। এই পদ্ধতিটি আজ বুলিয়ান অ্যালজেবরা (Boolean Algebra) নামে পরিচিত। বুলির সময়ে কেউ ভাবতেও পারেনি যে তাঁর এই তাত্ত্বিক কাজটি একদিন পৃথিবী বদলে দেবে। প্রায় একশ বছর পর, ক্লড শ্যানন (Claude Shannon) দেখালেন যে বুলিয়ান লজিক ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক সার্কিট তৈরি করা সম্ভব, যা ‘চিন্তা’ করতে পারে বা লজিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আজকের কম্পিউটার, স্মার্টফোন, এবং ইন্টারনেটের প্রতিটি কণার পেছনে কাজ করছে এই বুলিয়ান লজিক। কম্পিউটার মানুষের ভাষা বোঝে না, সে বোঝে কেবল বিদ্যুতের উপস্থিতি (১) এবং অনুপস্থিতি (০)। এই অন-অফ সুইচগুলোকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয়েছে কোটি কোটি লজিক গেট (Logic Gate) (যেমন AND, OR, NOT), যা প্রসেসরের ভেতরে থাকে। আপনি যখন ফেসবুকে লগইন করেন, তখন কম্পিউটার চেক করে: (ইউজারনেম সঠিক) AND (পাসওয়ার্ড সঠিক)। যদি দুটোই ১ (সত্য) হয়, তবে ফলাফল ১, এবং আপনি লগইন করতে পারেন। যদি একটাও ০ (মিথ্যা) হয়, তবে ফলাফল ০, এবং লগইন হয় না। অর্থাৎ, আমাদের আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতা আসলে সিম্বলিক লজিকেরই এক বিশাল এবং জটিল প্রয়োগ।
প্রপোজিশনাল লজিকের অপারেটরসমূহ
প্রপোজিশনাল লজিক (Propositional Logic) হলো সিম্বলিক লজিকের সবচেয়ে মৌলিক শাখা। এখানে আমরা পূর্ণাঙ্গ বাক্য বা প্রপোজিশন নিয়ে কাজ করি এবং সেগুলোকে বিভিন্ন যোজক বা কানেক্টিভ (Connective) দিয়ে যুক্ত করি। এই কানেক্টিভ বা অপারেটরগুলো লজিকের ব্যাকরণের মতো। এগুলো চিনলে আপনি যেকোনো জটিল যুক্তিকে ভেঙে সহজ করতে পারবেন। চলুন প্রধান পাঁচটি অপারেটরের সাথে পরিচিত হই।
১. নেগেশন (Negation / ¬ বা ~): ‘না’ বোধক
এটি সবচেয়ে সহজ অপারেটর। এটি একটি বাক্যের সত্য মানকে উল্টে দেয়। যদি p সত্য হয়, তবে ¬p (Not p) মিথ্যা হবে। আবার p মিথ্যা হলে ¬p সত্য হবে।
উদাহরণ:
- p: “ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী।” (সত্য)
- ¬p: “ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী নয়।” (মিথ্যা)
২. কনজাংশন (Conjunction / ∧ বা &): এবং (AND)
এটি দুটি বাক্যকে যুক্ত করে। একে বলা হয় যৌক্তিক গুণ। p ∧ q (p AND q) তখনই সত্য হবে যখন p এবং q উভয়ই সত্য হবে। যদি দুটোর মধ্যে একটাও মিথ্যা হয়, তবে পুরো বাক্যটি মিথ্যা হয়ে যাবে।
উদাহরণ: “আমি ভাত খাব (p) এবং আমি ঘুমাব (q)।”
যদি আপনি ভাত খেলেন কিন্তু ঘুমালেন না, তবে আপনার পুরো কথাটা মিথ্যা হয়ে গেল। কম্পিউটার প্রগ্রামিং-এ এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ডিসজাংশন (Disjunction / ∨): অথবা (OR)
একে বলা হয় যৌক্তিক যোগ। p ∨ q (p OR q) সত্য হবে যদি p অথবা q-এর মধ্যে অন্তত যেকোনো একটি সত্য হয়। দুটোই সত্য হলেও এটি সত্য। এটি মিথ্যা হবে কেবল তখনই যখন দুটোই মিথ্যা হবে।
উদাহরণ: “আমি চা খাব (p) অথবা কফি খাব (q)।”
আপনি যদি চা খান, সত্য। কফি খান, সত্য। দুটোই খান, তবুও সত্য (লজিক্যাল অর্থে)। কিন্তু যদি কিছুই না খান, তবেই কেবল মিথ্যা। উল্লেখ্য, লজিকে এই ‘অথবা’ ইনক্লুসিভ (Inclusive), এক্সক্লুসিভ নয়।
৪. ইমপ্লিকেশন (Implication / → বা ⊃): যদি… তবে (If… Then)
এটি লজিকের সবচেয়ে ট্রিকি বা গোলমেলে অপারেটর। একে বলা হয় শর্তমূলক বচন বা কন্ডিশনাল (Conditional)। p → q এর অর্থ হলো “যদি p সত্য হয়, তবে q অবশ্যই সত্য হবে।” এখানে p-কে বলা হয় পূর্বগ বা অ্যান্টিসিডেন্ট (Antecedent) এবং q-কে বলা হয় অনুগ বা কনসিকুয়েন্ট (Consequent)।
উদাহরণ: “যদি বৃষ্টি হয় (p), তবে মাটি ভিজবে (q)।”
মজার ব্যাপার হলো, এই বাক্যটি কেবল তখনই মিথ্যা হবে যখন p সত্য কিন্তু q মিথ্যা (অর্থাৎ বৃষ্টি হলো কিন্তু মাটি ভিজল না)। অন্য সব ক্ষেত্রে এটি সত্য। এমনকি যদি বৃষ্টি না হয় (p মিথ্যা), তবুও লজিক্যালি এই বাক্যটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় (একে বলা হয় ভ্যাকুয়াস ট্রুথ)। এটি বুঝতে অনেকের সময় লাগে।
৫. বাই-কন্ডিশনাল (Bi-conditional / ↔ বা ≡): যদি এবং কেবল যদি (If and only if)
এটি ইমপ্লিকেশনের চেয়েও শক্তিশালী। p ↔ q সত্য হবে যদি p এবং q-এর সত্য মান একই হয়। অর্থাৎ হয় দুটোই সত্য, অথবা দুটোই মিথ্যা।
উদাহরণ: “আমি শ্বাস নেব যদি এবং কেবল যদি আমি বেঁচে থাকি।”
বেঁচে থাকলে শ্বাস নেব, শ্বাস নিলে বেঁচে থাকব। একটার সাথে আরেকটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ট্রুথ টেবিল: সত্যের মানচিত্র
এই অপারেটরগুলো ব্যবহার করে আমরা বিশাল সব জটিল বাক্যকে গাণিতিক সমীকরণে ফেলি। কিন্তু সেই সমীকরণ সত্য না মিথ্যা, তা বুঝব কীভাবে? এর জন্য আছে ট্রুথ টেবিল (Truth Table) বা সত্য সারণী। ট্রুথ টেবিল হলো এমন এক ছক, যা দিয়ে বলে দেওয়া যায় একটা জটিল যুক্তি কোন কোন অবস্থায় সত্য হবে। এটি আবিষ্কার বা জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (Ludwig Wittgenstein) এবং এমিল পোস্ট (Emil Post)-কে।
ট্রুথ টেবিলের বাম পাশে থাকে ইনপুট (যেমন p, q) এবং ডান পাশে থাকে আউটপুট। ধরুন আমরা p ∧ q-এর ট্রুথ টেবিল বানাব।
- যদি p সত্য (T) এবং q সত্য (T) হয়, তবে p ∧ q সত্য (T)।
- যদি p সত্য (T) এবং q মিথ্যা (F) হয়, তবে p ∧ q মিথ্যা (F)।
- যদি p মিথ্যা (F) এবং q সত্য (T) হয়, তবে p ∧ q মিথ্যা (F)।
- যদি p মিথ্যা (F) এবং q মিথ্যা (F) হয়, তবে p ∧ q মিথ্যা (F)।
এভাবে আমরা যেকোনো যুক্তির বৈধতা যাচাই করতে পারি। যদি ট্রুথ টেবিলের সব সারিতে চূড়ান্ত ফলাফল ‘সত্য’ (T) আসে, তবে সেই যুক্তিটিকে বলা হয় টটোলজি (Tautology) বা স্বতঃসত্য। যেমন p ∨ ¬p (হয় বৃষ্টি হবে, অথবা বৃষ্টি হবে না) – এটি সব সময়ই সত্য, এর কোনো মিথ্যা হওয়ার সুযোগ নেই। আবার যদি সব ফলাফল ‘মিথ্যা’ (F) আসে, তবে তাকে বলা হয় সেলফ-কন্ট্রাডিকশন (Self-Contradiction)। যেমন p ∧ ¬p (বৃষ্টি হচ্ছে এবং বৃষ্টি হচ্ছে না) – এটি সব সময়ই মিথ্যা।
প্রেডিকেট লজিক: আরও গভীরে যাওয়া
প্রপোজিশনাল লজিকের একটা সীমাবদ্ধতা হলো, এটি বাক্যের ভেতরে ঢুকতে পারে না। “সকল মানুষ মরণশীল” – এই বাক্যটিকে প্রপোজিশনাল লজিকে শুধু p দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এখান থেকে “সক্রেটিস মরণশীল” বের করা যায় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য গটলোব ফ্রেগে (Gottlob Frege) নিয়ে এলেন প্রেডিকেট লজিক (Predicate Logic) বা ফার্স্ট অর্ডার লজিক। এখানে তিনি বাক্যের ভেতরের উদ্দেশ্য (Subject) এবং বিধেয় (Predicate)-কে আলাদা করলেন এবং কোয়ান্টিফায়ার (Quantifier) ব্যবহার করলেন।
দুটি প্রধান কোয়ান্টিফায়ার হলো:
১. ইউনিভার্সাল কোয়ান্টিফায়ার (∀): “সকল” বা “সব”। ∀x মানে “সকল x এর জন্য”।
২. এক্সিস্টেনশিয়াল কোয়ান্টিফায়ার (∃): “কিছু” বা “অন্তত একজন”। ∃x মানে “এমন অন্তত একটি x আছে যে”।
উদাহরণস্বরূপ, “সকল মানুষ মরণশীল” বাক্যটিকে প্রেডিকেট লজিকে লেখা হয়: ∀x (Mx → Dx)। এর অর্থ: “সকল x-এর জন্য, যদি x মানুষ হয়, তবে x মরণশীল।” এই লজিক ব্যবহার করেই গণিতের জটিল সব উপপাদ্য প্রমাণ করা হয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডাটাবেস তৈরি করা হয়। সিম্বলিক লজিক আমাদের চিন্তাকে এমন এক স্বচ্ছতা এবং নির্ভুলতা দেয় যা সাধারণ ভাষায় কল্পনাও করা যায় না। এটি আমাদের শেখায় যে, আবেগ সরিয়ে রাখলে পৃথিবীর সব সমস্যাকেই আসলে p আর q-এর খেলায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
প্যারাডক্স: যখন লজিক নিজেই লুপে আটকে যায়
লজিক বা যুক্তিবিদ্যা হলো চিন্তার সুশৃঙ্খল ব্যাকরণ। এটি আমাদের আশ্বাস দেয় যে, যদি আমরা সঠিক নিয়ম মেনে চলি, তবে আমরা অকাট্য সত্যে পৌঁছাব। কিন্তু মাঝেমধ্যে লজিক এমন এক গোলকধাঁধা বা লুপে আটকে যায় যেখানে সাধারণ বুদ্ধি তো বটেই, এমনকি গাণিতিক যুক্তিও খেই হারিয়ে ফেলে। এই অদ্ভুত, বিভ্রান্তিকর, এবং আপাতদৃষ্টিতে সমাধানহীন অবস্থাগুলোকে বলা হয় প্যারাডক্স (Paradox)। প্যারাডক্স হলো লজিকের ব্ল্যাকহোল – এখানে আলোর মতো যুক্তিও হারিয়ে যায়। এগুলো কেবল ধাঁধা নয়, এগুলো আমাদের চিন্তার জগতের ফাটলগুলো দেখিয়ে দেয়। এগুলো প্রমাণ করে যে আমাদের ভাষা, গণিত এবং বাস্তবতার ধারণা এখনো নিখুঁত নয়। প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু করে আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্স পর্যন্ত, প্যারাডক্স মানুষের ঘুম হারাম করে এসেছে। দার্শনিকরা একে বলেন ‘বুদ্ধির কাঁটা’। চলুন, লজিকের এই কাঁটাগুলোর কয়েকটির সাথে পরিচিত হই।
মিথ্যাবাদীর প্যারাডক্স: সত্যের অনন্ত লুপ
লজিকের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন এবং বিখ্যাত প্যারাডক্সটি হলো মিথ্যাবাদীর প্যারাডক্স (The Liar Paradox)। এটি যিশুর জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগে গ্রিক দার্শনিক এপিমেনাইডিস প্রথম তুলে ধরেছিলেন। ধরুন, আমি একটি সাদা কাগজে কেবল একটি বাক্য লিখলাম: “এই বাক্যটি মিথ্যা।”
এখন লজিক দিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবুন বাক্যটি আসলে কী? সত্য না মিথ্যা?
- যদি আমরা ধরে নিই বাক্যটি সত্য (True), তবে বাক্যটির নিজের দাবি অনুযায়ী এটি মিথ্যা (কারণ এটি বলছে “আমি মিথ্যা”)। অর্থাৎ, সত্য হতে হলে একে মিথ্যা হতে হবে। এটি স্ববিরোধী।
- আবার যদি আমরা ধরে নিই বাক্যটি মিথ্যা (False), তবে এর দাবিটি (যে এটি মিথ্যা) সঠিক। আর দাবি সঠিক হওয়া মানে বাক্যটি সত্য। অর্থাৎ, মিথ্যা হতে হলে একে সত্য হতে হবে।
তাহলে বাক্যটি আসলে কী? এটি একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না (লজিকের বিরোধহীনতার সূত্র অনুযায়ী), আবার সত্য বা মিথ্যার বাইরে কিছুও হতে পারে না (মধ্যম রহিত সূত্র অনুযায়ী)। হাজার বছর ধরে দার্শনিকরা এই লুপে আটকে আছেন। আধুনিক গণিতবিদ আলফ্রেড টারস্কি (Alfred Tarski) এর সমাধান হিসেবে মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ (Meta-language) বা ভাষার স্তরবিন্যাসের ধারণা দিয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ লজিকে এর কোনো সহজ সমাধান নেই। এটি আমাদের দেখায় যে ভাষা নিজেই নিজের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে।
নাপিতের প্যারাডক্স: সেটের সমস্যা
বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক এবং গণিতবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell) ১৯০১ সালে এই প্যারাডক্সটি আবিষ্কার করেন, যা গণিতের জগতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল (Russell, 1903)। এটি রাসেলস প্যারাডক্স (Russell’s Paradox) নামে পরিচিত, তবে সহজ করে বোঝানোর জন্য তিনি একে নাপিতের গল্পে রূপ দিয়েছিলেন। গল্পটি এরকম:
একটি গ্রামে একজন নাপিত আছেন। তিনি একটি অদ্ভুত নিয়ম বা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেন: “আমি গ্রামের কেবল সেই সব পুরুষদের দাড়ি কামাই, যারা নিজের দাড়ি নিজে কামায় না।”
এখন প্রশ্ন হলো: নাপিত কি নিজের দাড়ি নিজে কামাবেন?
- যদি নাপিত নিজের দাড়ি নিজে কামান, তবে তিনি নিয়ম ভাঙছেন। কারণ তিনি কেবল তাদেরই দাড়ি কামানোর কথা যারা নিজেরটা কামায় না। অর্থাৎ তিনি নিজেরটা কামাতে পারেন না।
- যদি নাপিত নিজের দাড়ি নিজে না কামান, তবে তিনি সেই দলের অন্তর্ভুক্ত যারা নিজের দাড়ি নিজে কামায় না। আর নিয়ম অনুযায়ী, যারা নিজেরটা কামায় না, নাপিতের (অর্থাৎ তাঁর নিজের) দায়িত্ব তাদের দাড়ি কামিয়ে দেওয়া। সুতরাং, তাঁর নিজের দাড়ি কামানো উচিত।
মহা মুশকিল! তিনি কামালেও নিয়ম ভঙ্গ হয়, না কামালেও নিয়ম ভঙ্গ হয়। এই প্যারাডক্সটি আসলে সেট থিওরি (Set Theory)-র একটি গভীর সমস্যাকে নির্দেশ করে। রাসেল দেখিয়েছিলেন যে, “সকল সেটের সেট” বা এমন সেট যা নিজের সদস্য – এই ধারণাটি লজিক্যালি ত্রুটিপূর্ণ। এই প্যারাডক্সের কারণেই গণিতবিদরা সেট থিওরি নতুন করে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন।
থিসিউসের জাহাজ: আমি কে?
এটি আইডেন্টিটি (Identity) বা সত্তা বিষয়ক একটি ক্লাসিক প্যারাডক্স, যা গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুটার্ক লিপিবদ্ধ করেছিলেন। গ্রিক মিথলজির বীর থিসিউস (Theseus)-এর একটি জাহাজ ছিল। জাহাজটি এথেন্সের বন্দরে স্মৃতি হিসেবে রাখা ছিল। কিন্তু কাঠের তৈরি জাহাজ তো চিরস্থায়ী নয়, পচে যায়। তাই এথেন্সবাসীরা প্রতি বছর জাহাজের পচা তক্তাগুলো খুলে ফেলে সেখানে নতুন এবং শক্ত তক্তা লাগিয়ে দিত। এভাবে করতে করতে এক সময় জাহাজের প্রতিটি পুরনো অংশ, প্রতিটি কাঠ, প্রতিটি পেরেক বদলে ফেলা হলো। ১০০ বছর পর জাহাজের কোনো আদি অংশই আর অবশিষ্ট রইল না।
এখন প্রশ্ন হলো: বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা এই নতুন জাহাজটি কি সেই একই ‘থিসিউসের জাহাজ’?
- যদি বলেন ‘হ্যাঁ, এটি একই জাহাজ’, তবে প্রশ্ন – এর তো কোনো অংশই আর আগের নেই। বস্তুর উপাদান বদলে গেলে কি বস্তু এক থাকে?
- যদি বলেন ‘না, এটি নতুন জাহাজ’, তবে প্রশ্ন – ঠিক কোন তক্তাটি বদলানোর মুহূর্তে জাহাজটি আর থিসিউসের জাহাজ রইল না? ৫১তম তক্তা? নাকি শেষ পেরেকটি?
দার্শনিক টমাস হবস (Thomas Hobbes) এর সাথে আরও একটি প্যাঁচ লাগিয়েছিলেন। তিনি বললেন, ধরুন ওই পুরনো পচা তক্তাগুলো কেউ ফেলে দেয়নি, বরং জমা করে রেখেছিল। এবং পরে সেগুলো জোড়া দিয়ে হুবহু আগের মতো একটি জাহাজ বানাল। এখন আসল থিসিউসের জাহাজ কোনটি? বন্দরের চকচকে নতুন কাঠের জাহাজটি, নাকি পুরনো কাঠের তৈরি জাহাজটি? এই প্যারাডক্সটি আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমাদের শরীরের কোষগুলোও তো প্রতি ৭-১০ বছরে বদলে যায়। ছোটবেলার আমি আর এখনকার আমি কি একই ব্যক্তি? লজিক এখানে আইডেন্টিটির সংজ্ঞায় খেই হারিয়ে ফেলে।
সর্বশক্তিমানের প্যারাডক্স: অসীমের সীমাবদ্ধতা
এটি ধর্মতত্ত্ব এবং লজিকের এক চমকপ্রদ সংঘাত। বিশেষ করে নাস্তিকরা ঈশ্বরের ধারণা খণ্ডন করতে এই প্যারাডক্স ব্যবহার করেন। একে অমনিপোটেন্স প্যারাডক্স (Omnipotence Paradox) বলা হয়। প্রশ্ন হলো: “সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কি এমন কোনো ভারী পাথর তৈরি করতে পারেন যা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না?”
- যদি তিনি এমন পাথর তৈরি করতে পারেন, তবে তিনি পাথরটি তুলতে পারছেন না। অর্থাৎ এমন একটি কাজ আছে যা তিনি করতে পারেন না (পাথর তোলা)। সুতরাং, তিনি সর্বশক্তিমান নন।
- যদি তিনি এমন পাথর তৈরি করতে না পারেন, তবে তিনি পাথরটি তৈরি করতে পারছেন না। অর্থাৎ এমন একটি কাজ আছে যা তিনি করতে পারেন না (পাথর বানানো)। সুতরাং, তিনি সর্বশক্তিমান নন।
যেই উত্তরই দিন না কেন, ‘সর্বশক্তিমান’ ধারণাটি টেকে না। এটি লজিক্যালি ইনকনসিস্টেন্ট (Inconsistent)। ধর্মতাত্ত্বিকরা এর উত্তরে বলেন, লজিকের নিয়ম ঈশ্বরের ওপর খাটে না, অথবা ‘সর্বশক্তিমান’ মানে হলো যা কিছু লজিক্যালি সম্ভব তা করার ক্ষমতা। কিন্তু বিশুদ্ধ লজিকের দৃষ্টিতে এটি একটি অমীমাংসিত প্যারাডক্স।
সরাইটিস প্যারাডক্স: বালুর স্তূপের ধাঁধা
এটি গ্রিক মেগারিয়ান দার্শনিক ইউবুলিডিস আবিষ্কার করেছিলেন। সরাইটিস (Sorites) শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘সোরোস’ থেকে এসেছে যার অর্থ স্তূপ। ধরুন আপনার সামনে এক দানা বালু আছে। এটা কি স্তূপ? না। দুই দানা? না। তিন দানা? না।
এখন প্রশ্ন হলো: ঠিক কততম দানাটি যোগ করলে সেটি ‘স্তূপ’ বা ‘হিপ’ হয়ে যাবে? ৯৯টি দানা কি স্তূপ নয়, কিন্তু ১০০টি দানা স্তূপ? এক দানা বালু কি আসলেই কোনো পার্থক্য তৈরি করতে পারে?
একইভাবে উল্টো করে ভাবুন। একটি বালুর স্তূপ থেকে যদি আমি একটা একটা করে দানা সরাতে থাকি, ঠিক কোন মুহূর্তে সেটি আর স্তূপ থাকবে না? এই প্যারাডক্সটি আমাদের ভাষার অস্পষ্টতা (Vagueness) নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ‘স্তূপ’, ‘লম্বা’, ‘টাক’, ‘ধনী’ – এই শব্দগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। লজিক সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা চায়, কিন্তু আমাদের ভাষা অস্পষ্ট। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই আধুনিক যুগে ফাজি লজিক (Fuzzy Logic)-এর জন্ম হয়েছে, যেখানে সত্য বা মিথ্যা কেবল ০ বা ১ নয়, বরং এর মাঝখানের যেকোনো ভগ্নাংশ হতে পারে।
জেনোর প্যারাডক্স: গতির কি অস্তিত্ব আছে?
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর গ্রিক দার্শনিক জেনো (Zeno of Elea) গতির বিরুদ্ধে কিছু অদ্ভুত প্যারাডক্স দিয়েছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো একিলিস এবং কচ্ছপের দৌড় (Achilles and the Tortoise)।
ধরুন, দ্রুতগামী বীর একিলিস একটি কচ্ছপের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামলেন। যেহেতু কচ্ছপ ধীরগতির, তাই একিলিস তাকে ১০০ মিটার এগিয়ে থাকার সুযোগ দিলেন। জেনো বললেন, একিলিস কখনোই কচ্ছপটিকে ধরতে পারবেন না। কেন?
কারণ, একিলিস যখন ওই ১০০ মিটার পার হয়ে কচ্ছপটির শুরুর জায়গায় পৌঁছাবেন, ততক্ষণে কচ্ছপটি আরও একটু (ধরুন ১০ মিটার) এগিয়ে যাবে। একিলিস যখন ওই ১০ মিটার পার হবেন, কচ্ছপটি আরও একটু (১ মিটার) এগিয়ে যাবে। একিলিস যখন ওই ১ মিটার পার হবেন, কচ্ছপটি আরও একটু এগিয়ে যাবে। এভাবে অসীম কাল ধরে এটি চলতে থাকবে। ব্যবধান কমবে, কিন্তু কখনোই শূন্য হবে না।
বাস্তবে আমরা জানি একিলিস কচ্ছপকে সহজেই হারিয়ে দেবেন। কিন্তু জেনোর লজিক কোথায় ভুল? প্রায় দুই হাজার বছর পর ক্যালকুলাস আবিষ্কারের মাধ্যমে গণিতবিদরা এর সমাধান করেন। তাঁরা দেখান যে অসীম সংখ্যক দূরত্বের যোগফলও একটি সসীম সংখ্যা হতে পারে। একে বলা হয় কনভার্জেন্ট সিরিজ (Convergent Series)। জেনোর প্যারাডক্স আমাদের শিখিয়েছে যে সাধারণ বুদ্ধি এবং গাণিতিক লজিক সব সময় এক পথে চলে না।
গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স: সময়ের গোলমাল
এটি টাইম ট্রাভেল বা সময় ভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত একটি আধুনিক প্যারাডক্স। ধরুন, আপনি টাইম মেশিন আবিষ্কার করলেন এবং অতীতে গিয়ে আপনার গ্র্যান্ডপাকে শিশু অবস্থায় মেরে ফেললেন (বিয়ে করার আগেই)।
এখন লজিক কী বলে? গ্র্যান্ডপা মারা গেলে আপনার বাবার জন্ম হবে না। বাবার জন্ম না হলে আপনারও জন্ম হবে না। আপনার জন্ম না হলে আপনি টাইম মেশিনও বানাতে পারবেন না এবং অতীতে গিয়ে দাদাকে মারতেও পারবেন না।
তাহলে গ্র্যান্ডপা বেঁচে থাকবেন। গ্র্যান্ডপা বেঁচে থাকলে আপনার জন্ম হবে, আপনি টাইম মেশিন বানাবেন এবং অতীতে গিয়ে গ্র্যান্ডপাকে মেরে ফেলবেন।
এটি একটি অসীম লুপ। এই প্যারাডক্সটি দেখায় যে অতীতে গিয়ে পরিবর্তন করা লজিক্যালি অসম্ভব হতে পারে। পদার্থবিদরা এর সমাধানে প্যারালাল ইউনিভার্স (Parallel Universe) বা মাল্টিভার্সের কথা বলেন।
সারপ্রাইজ হ্যাংগিং প্যারাডক্স: অপ্রত্যাশিত ফাঁসি
একজন বিচারক বন্দিকে রায় দিলেন: “আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন (রবি থেকে শনি) তোমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে, কিন্তু ফাঁসির দিনটি তোমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত (Surprise) হবে। যেদিন ফাঁসি হবে, সেদিন সকাল পর্যন্ত তুমি জানবে না যে আজই ফাঁসি।”
বন্দি তখন লজিক খাটাতে শুরু করল:
- ১. ফাঁসি শনিবার হতে পারে না। কারণ শুক্রবারেও যদি ফাঁসি না হয়, তবে আমি বুঝে যাব যে শনিবারে ফাঁসি হবেই (কারণ ওটাই শেষ দিন)। তখন আর সেটা ‘সারপ্রাইজ’ থাকবে না। তাই শনিবার বাদ।
- ২. শনিবার বাদ হলে, ফাঁসি শুক্রবারও হতে পারে না। কারণ বৃহস্পতিবারের মধ্যে ফাঁসি না হলে এবং শনিবার বাদ থাকায়, আমি বুঝে যাব শুক্রবারে ফাঁসি হবে। তখন সেটাও সারপ্রাইজ থাকবে না।
- ৩. এভাবে একে একে বৃহস্পতিবার, বুধবার, সব দিনই বাদ হয়ে যায়।
বন্দি খুশি হলো যে তাকে ফাঁসি দেওয়া লজিক্যালি অসম্ভব। কিন্তু বুধবার সকালে জল্লাদ এসে তাকে ফাঁসি দিল এবং সে সত্যিই অবাক (Surprise) হলো! বিচারকের কথাই সত্য হলো। বন্দির লজিক কোথায় ভুল ছিল? এই প্যারাডক্সটি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং পূর্বাভাসের সমস্যা নিয়ে আমাদের ভাবায়।
প্যারাডক্সগুলো আসলে লজিকের ব্যর্থতা নয়, বরং লজিকের গভীরতা। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জগতটা বাইনারি (০ আর ১) নয়, এটি আরও অনেক জটিল। প্যারাডক্স সমাধানের চেষ্টা থেকেই মানুষ নতুন গণিত, নতুন বিজ্ঞান এবং নতুন দর্শন আবিষ্কার করেছে। এগুলো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়ের শিক্ষা দেয় – আমরা যা জানি, তা হয়তো আসল সত্যের কেবল একটি ভগ্নাংশ মাত্র।
লজিক এবং বিজ্ঞান: সংশয়বাদের হাতিয়ার
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা আছে যে বিজ্ঞান মানেই হলো ধ্রুব এবং অপরিবর্তনীয় সত্য। আমরা প্রায়ই বলি, “এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত,” যেন এটিই শেষ কথা এবং এর ওপরে আর কোনো কথা হতে পারে না। কিন্তু লজিক বা যুক্তিবিদ্যা আমাদের শেখায় যে, বিজ্ঞানের আসল শক্তি তার ধ্রুবতায় নয়, বরং তার সংশয়বাদিতায় বা স্কেপটিসিজম (Skepticism)-এ। বিজ্ঞান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যেখানে লেখা প্রতিটি শব্দকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে হবে। বরং বিজ্ঞান হলো সত্য অনুসন্ধানের একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত নিজেকে সংশোধন করে। লজিকের দৃষ্টিতে, বিজ্ঞান হলো ‘যা এখন পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু ভবিষ্যতে হতেও পারে’ – এমন সব তথ্যের সমষ্টি। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা দার্শনিক কার্ল পপার (Karl Popper) বিজ্ঞানের দর্শনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একটি তত্ত্ব বা থিওরিকে তখনই বৈজ্ঞানিক বলা যাবে, যখন সেটিকে ভুল প্রমাণ করার সুযোগ বা ফলসিফায়েবিলিটি (Falsifiability) থাকবে (Popper, 1959)।
পপারের এই তত্ত্বটি বুঝতে হলে আমাদের বিজ্ঞান ও অবিজ্ঞানের পার্থক্য বুঝতে হবে। ধরুন আপনি বললেন, “ঈশ্বর আছেন এবং তিনি সব সময় আমাদের দেখছেন।” এটি অনেকের কাছে পরম সত্য হতে পারে, কিন্তু লজিক বা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কোনো বৈজ্ঞানিক বিবৃতি নয়। কেন? কারণ এই দাবিটিকে কোনো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। আপনি এমন কোনো এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করতে পারবেন না যা দিয়ে প্রমাণ করা যাবে যে ঈশ্বর নেই। যেহেতু একে ভুল প্রমাণ করার কোনো রাস্তা নেই, তাই এটি বিজ্ঞানের আওতার বাইরে। এটি বিশ্বাসের বিষয়। অন্যদিকে, আপনি যদি বলেন, “জল ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফোটে,” এটি একটি বৈজ্ঞানিক বিবৃতি। কারণ আপনি চাইলেই থার্মোমিটার এবং জল নিয়ে এটি পরীক্ষা করতে পারেন। যদি কোনো দিন দেখা যায় জল ২০০ ডিগ্রিতেও ফুটছে না, তবে আপনার তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হবে। এই যে ‘ভুল হওয়ার ঝুঁকি’ নেওয়া, এটাই বিজ্ঞানকে অনন্য করে তোলে। বিজ্ঞান কখনোই পরম সত্য (Absolute Truth) দাবি করে না, বিজ্ঞান দাবি করে পরীক্ষাযোগ্যতা এবং প্রমাণযোগ্যতা। নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব তিনশো বছর ধরে রাজত্ব করার পর আইনস্টাইন এসে প্রমাণ করলেন যে সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বিজ্ঞান হাসিমুখে সেই নতুন সত্যকে বরণ করে নিল। এটিই বিজ্ঞানের লজিক।
নাল হাইপোথিসিস: অবিশ্বাসের দেয়াল
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় লজিক প্রয়োগের একটি চমৎকার পদ্ধতি হলো নাল হাইপোথিসিস (Null Hypothesis)। এটি হলো ডিফল্ট পজিশন বা শুরুর অবস্থান। যখনই কোনো গবেষক নতুন কোনো দাবি করেন, বিজ্ঞান শুরুতে ধরে নেয় যে দাবিটি মিথ্যা বা ওই দাবির পক্ষে বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটছে না। একে সাধারণত H0 দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ধরুন, আপনি দাবি করলেন, “টেলিপ্যাথি বা মনের মাধ্যমে যোগাযোগ সম্ভব।” বিজ্ঞান শুরুতেই ধরে নেবে, “না, টেলিপ্যাথি সম্ভব নয় বা এর কোনো অস্তিত্ব নেই।” এটিই নাল হাইপোথিসিস। এখন আপনার দায়িত্ব হলো তথ্য-উপাত্ত বা ডাটা দিয়ে এই ‘না’-বোধক দেয়ালটি ভাঙা। আপনাকে পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে টেলিপ্যাথি ঘটার সম্ভাবনা কাকতালীয় ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি। যতক্ষণ না আপনি শক্ত প্রমাণ দিচ্ছেন, ততক্ষণ ‘না’-টাই সত্য হিসেবে টিকে থাকবে।
লজিকের এই পদ্ধতিটি আমাদের রক্ষা করে ভুয়া দাবি বা সিউডো-সায়েন্স (Pseudoscience) থেকে। সমাজে অনেকেই দাবি করেন তাদের কাছে অলৌকিক ওষুধ আছে বা তারা গ্রহরত্ন দিয়ে ভাগ্য বদলাতে পারেন। নাল হাইপোথিসিস আমাদের শেখায় যে, প্রমাণের দায়ভার বা বার্ডেন অফ প্রুফ (Burden of Proof) সব সময় দাবিদারের কাঁধে। আপনি দাবি করেছেন, আপনিই প্রমাণ করুন। আমি আপনার দাবি বিশ্বাস করতে বাধ্য নই যতক্ষণ না আপনি প্রমাণ দিচ্ছেন। আদালতে যেমন “দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ” নীতি মানা হয়, বিজ্ঞানেও তেমনি “প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অস্তিত্বহীন” নীতি মানা হয়। এটি নিষ্ঠুর মনে হতে পারে, কিন্তু সত্যকে আবর্জনা থেকে আলাদা করার জন্য এই ছাঁকনিটি অপরিহার্য।
বালনি ডিটেকশন কিট: কুসংস্কারের ভ্যাকসিন
প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানলিপ্সু কার্ল সেগান (Carl Sagan) তাঁর কালজয়ী বই দ্য ডেমন-হন্টেড ওয়ার্ল্ড: সায়েন্স অ্যাজ আ ক্যান্ডেল ইন দ্য ডার্ক-এ সাধারণ মানুষের জন্য একটি চমৎকার লজিক্যাল টুলবক্স উপহার দিয়েছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘বালনি ডিটেকশন কিট’ (Baloney Detection Kit) (Sagan, 1996)। ‘বালনি’ মানে হলো বাজে কথা বা ধাপ্পাবাজি। সেগান চেয়েছিলেন মানুষ যেন বিজ্ঞানের কঠিন ভাষা না জেনেও ধাপ্পাবাজি ধরতে পারে। এই কিটে তিনি কিছু লজিক্যাল এবং স্কেপটিকাল টুলের কথা বলেছেন যা আমাদের কুসংস্কার এবং মিথ্যা দাবি থেকে বাঁচায়। চলুন কিটটি খুলে দেখা যাক।
১. স্বাধীনভাবে সত্য যাচাই করা (Independent Confirmation):
কেউ কিছু দাবি করলেই সেটা মেনে নেবেন না। সেই দাবিটি অন্য কোনো নিরপেক্ষ সূত্র বা গবেষক দ্বারা যাচাই করা হয়েছে কি না, তা দেখুন। ওষুধ কোম্পানির গবেষণায় বলা হলো তাদের ওষুধ সেরা – এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু যদি কোনো নিরপেক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করে একই কথা বলে, তবে তা বিশ্বাসযোগ্য। তথ্যের ক্রস-চেকিং লজিকের অন্যতম শর্ত।
২. বিতর্কের চর্চা (Substantive Debate):
প্রমাণিত সত্য সব সময় বিতর্কের আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়। বিজ্ঞানে কোনো গুরু নেই যার কথা শেষ কথা। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি, কিন্তু প্রমাণের ক্ষেত্রে কোনো দয়া দেখানো যাবে না। যুক্তিতর্ক বা আর্গুমেন্টেশন হলো সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ। যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, বুঝতে হবে তাদের দাবিতে গলদ আছে।
৩. অথরিটির কথায় বিশ্বাস না করা (No Argument from Authority):
“বড় হুজুর বলেছেন” বা “নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী বলেছেন” তাই এটি সত্য – এই যুক্তি বিজ্ঞানে অচল। লজিক বলে, কে বলেছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কী বলেছে এবং তার প্রমাণ কী – সেটাই আসল। অতীতে অ্যারিস্টটলের মতো মহাজ্ঞানীও বলেছিলেন যে নারীদের দাঁতের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে কম (যা ভুল ছিল), এবং মানুষ সেটা হাজার বছর বিশ্বাস করেছে কেবল তাঁর অথরিটির কারণে। বিজ্ঞান এই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়।
৪. একাধিক হাইপোথিসিস বা অনুকল্প তৈরি করা (Multiple Hypotheses):
কোনো একটি ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য কেবল একটি কারণের ওপর আটকে থাকবেন না। একাধিক সম্ভাব্য কারণ বা হাইপোথিসিস দাঁড় করান এবং একে একে সেগুলোকে বাতিল করুন। যেটা টিকবে, সেটাই সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেমন, আকাশে অদ্ভুত আলো দেখা গেছে। এটি কি এলিয়েন? নাকি ড্রোন? নাকি কোনো স্যাটেলাইট? নাকি চোখের ভুল? সব অপশন খোলা রাখুন এবং যাচাই করুন।
৫. অকামস রেজার ব্যবহার করা (Occam’s Razor):
এটি লজিকের অন্যতম ধারালো অস্ত্র। চতুর্দশ শতাব্দীর ইংরেজ যুক্তিবিদ উইলিয়াম অফ অকাম (William of Ockham)-এর নামানুসারে এই নীতিটি পরিচিত। নীতিটি খুব সহজ: “যদি কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য একাধিক তত্ত্ব থাকে, তবে যেটি সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে কম অনুমান (Assumption)-এর ওপর নির্ভরশীল, সেটিই সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”
উদাহরণস্বরূপ, আপনি রাতে আপনার ঘরে ফিসফিস শব্দ শুনতে পেলেন।
- ব্যাখ্যা ১: জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস আসছে এবং শব্দ হচ্ছে। (এটি একটি সহজ ব্যাখ্যা, কারণ বাতাস এবং জানালার অস্তিত্ব প্রমাণিত)।
- ব্যাখ্যা ২: একটি অদৃশ্য ভূত আপনার ঘরে ঢুকেছে এবং কথা বলছে। (এটি একটি জটিল ব্যাখ্যা, কারণ এখানে আপনাকে ভূতের অস্তিত্ব, ভূতের কথা বলার ক্ষমতা, এবং কেন তাকে দেখা যাচ্ছে না – এই সব কিছু ধরে নিতে হচ্ছে)।
অকামস রেজার বলে, দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি বাতিল করে প্রথমটি গ্রহণ করো। কারণ এটি লজিক্যালি বেশি সাশ্রয়ী। বিজ্ঞান সব সময় সরলতাকে পছন্দ করে। জটিল এবং অলৌকিক ব্যাখ্যা তখনই আনা উচিত যখন সরল ব্যাখ্যাটি ব্যর্থ হয়।
সংশয়বাদ ও মুক্ত চিন্তা
লজিক এবং বিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন আমাদের যে জিনিসটি শেখায়, তা হলো স্কেপটিসিজম (Skepticism) বা সংশয়বাদ। সংশয়বাদ মানে সব কিছু অবিশ্বাস করা নয়, বরং প্রমাণের অনুপাতে বিশ্বাস করা। প্রমাণের অভাব থাকলে বিশ্বাস স্থগিত রাখা (Suspension of Judgment)। এটি একটি মানসিক শৃঙ্খলা। একজন লজিক্যাল মানুষ জানে যে তার নিজের ইন্দ্রিয়ও তাকে ধোঁকা দিতে পারে, তার মস্তিষ্ক বায়াসড হতে পারে। তাই সে সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করে: “আমি যা বিশ্বাস করছি, তা কি সত্যি? নাকি আমি বিশ্বাস করতে চাই বলে বিশ্বাস করছি?”
রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন, “প্রথম নীতি হলো নিজেকে বোকা না বানানো, আর আপনিই হলেন সেই ব্যক্তি যাকে সবচেয়ে সহজে বোকা বানানো যায়।” লজিক আমাদের এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে রক্ষা করে। এটি আমাদের শেখায় যে সত্য সবসময় আরামদায়ক হয় না। অনেক সময় সত্য আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। গ্যালিলিও যখন টেলিস্কোপ দিয়ে দেখালেন যে পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্রের নক্ষত্র, তখন মানুষের ধর্মবিশ্বাস এবং অহংকারে আঘাত লেগেছিল। কিন্তু বিজ্ঞান সেই আঘাতের পরোয়া করেনি। কারণ বিজ্ঞানের আনুগত্য কেবল সত্যের প্রতি, মানুষের আবেগের প্রতি নয়।
আমাদের সমাজে কুসংস্কার, অপবিজ্ঞান এবং ভুয়া খবরের যে মহামারী চলছে, তার একমাত্র প্রতিষেধক হলো এই বৈজ্ঞানিক লজিক। আমরা যদি ছোটবেলা থেকে শিশুদের বালনি ডিটেকশন কিট ব্যবহার করা শেখাতে পারি, যদি তাদের শেখাতে পারি যে প্রশ্ন করা দোষের নয় বরং গুণের, তবেই আমরা একটি যুক্তিবাদী সমাজ গড়তে পারব। লজিক কেবল বইয়ের পাতায় থাকা কোনো থিওরি নয়, এটি জীবনযাপনের পদ্ধতি। এটি আমাদের শেখায় অন্ধকারের মধ্যে কীভাবে নিজের বুদ্ধির মশাল জ্বালিয়ে পথ চলতে হয়। মহাবিশ্বের এই বিশাল অজানার সামনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান আমাদের বলে না যে সে সব জানে, বরং সে বিনীতভাবে বলে: “এসো, আমরা একসাথে খুঁজি।” এই খোঁজার নামই জীবন, আর এই খোঁজার রাস্তার নামই লজিক।
লজিক ও নৈতিকতা: ভালো-মন্দের হিসাব
নৈতিকতা বা মোরালিটি কি কেবলই ধর্মের দান? কোনো ঐশ্বরিক শক্তির ভয় বা পরকালের লোভ ছাড়া কি মানুষ ভালো হতে পারে না? যুগ যুগ ধরে ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবি করে এসেছেন যে, ঈশ্বরের আদেশ ছাড়া ভালো-মন্দের কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু যুক্তিবিদ্যা বা লজিক এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। লজিক বলে, নৈতিকতা কোনো আকাশ থেকে পড়া দৈববাণী নয়, বরং এটি একটি গাণিতিক ও সামাজিক সমীকরণ যা মানুষের টিকে থাকার প্রয়োজনে বিবর্তিত হয়েছে। আমরা যখন লজিক ও নৈতিকতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমরা আসলে আবেগের কুয়াশা সরিয়ে যুক্তির আলোয় মানুষের আচরণকে বিচার করার চেষ্টা করি। নৈতিকতা হলো এমন এক কোড অফ কন্ডাক্ট বা আচরণবিধি, যা সমাজকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে। লজিক এখানে বিচারকের ভূমিকা পালন করে। এটি আমাদের শেখায় যে, ভালো কাজ করা কেবল ‘পুণ্য’ নয়, এটি একটি ‘বুদ্ধিমান’ সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে, খারাপ কাজ বা অপরাধ হলো আদতে একটি ‘লজিক্যাল এরর’ বা বা যুক্তির ত্রুটি, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে দর্শন, বিবর্তন এবং গেম থিওরি ব্যবহার করে লজিক আমাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য শেখায় এবং কেন একজন নাস্তিক বা ধর্মবিশ্বাসী নির্বিশেষে সবার জন্যই নৈতিকতা একটি যৌক্তিক অপরিহার্যতা।
হিউমের গিলোটিন: ‘হয়’ থেকে ‘উচিত’-এর দূরত্ব
লজিক ও নৈতিকতার আলোচনায় সবার আগে যে দার্শনিক প্রাচীরটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো ডেভিড হিউম (David Hume)-এর বিখ্যাত ইজ-অট প্রবলেম (Is-Ought Problem)। অষ্টাদশ শতাব্দীর এই স্কটিশ দার্শনিক তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ A Treatise of Human Nature-এ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আমরা প্রকৃতিতে যা দেখি (যা ‘হয়’ বা Is), তা থেকে সরাসরি নৈতিক সিদ্ধান্তে (যা ‘উচিত’ বা Ought) পৌঁছাতে পারি না (Hume, 1739)। একে দর্শনের ভাষায় হিউমের গিলোটিন (Hume’s Guillotine) বলা হয়। বিষয়টি একটু ভেঙে বলা যাক। প্রকৃতিতে আমরা দেখি শক্তিশালী প্রাণী দুর্বল প্রাণীকে ভক্ষণ করছে। এটি একটি ফ্যাক্ট বা ঘটনা (Is)। কিন্তু এই ঘটনা থেকে আমরা কি এই লজিক্যাল সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, মানুষের সমাজে সবলদের উচিত দুর্বলদের অত্যাচার করা? লজিক বলে, না। প্রকৃতিতে যা ঘটে, তা হলো পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের নিয়ম, সেখানে দয়া-মায়ার কোনো স্থান নেই। কিন্তু মানব সমাজ টিকে আছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও এম্প্যাথির ওপর। তাই প্রকৃতিতে ‘যা হয়’, তাকেই নৈতিকভাবে ‘সঠিক’ মনে করাটা হলো একটি মারাত্মক লজিক্যাল ফ্যালাসি, যার নাম ন্যাচারালিস্টিক ফ্যালাসি (Naturalistic Fallacy)। বিবর্তন আমাদের আগ্রাসী বানাতে পারে, কিন্তু লজিক আমাদের বলে সেই আগ্রাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে। হিউম দেখান যে, নৈতিকতা বিশুদ্ধ লজিক বা ফ্যাক্ট থেকে আসে না, বরং এটি আসে আমাদের সেন্টিমেন্ট বা অনুভূতি এবং সামাজিক উপযোগিতা থেকে। তবে লজিক আমাদের সেই অনুভূতিগুলোকে সঠিক পথে চালিত করতে সাহায্য করে। যেমন, লজিক আমাদের বলে, “যেহেতু আমি ব্যথা পেলে কষ্ট পাই এবং আমি চাই না কেউ আমাকে আঘাত করুক, তাই লজিক্যালি আমিও অন্যকে আঘাত করতে পারি না, কারণ সেও আমার মতোই অনুভব করে।” এখানে লজিক আমাদের এম্প্যাথি বা সহমর্মিতাকে একটি সর্বজনীন নিয়মে রূপান্তর করে।
উপযোগবাদ: সুখের গাণিতিক হিসাব
লজিক ব্যবহার করে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী পদ্ধতি হলো উপযোগবাদ (Utilitarianism)। এই মতবাদের মূল প্রবক্তা ছিলেন জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham) এবং জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill)। বেন্থাম নৈতিকতাকে একটি পাটিগণিতের অংকে নামিয়ে এনেছিলেন, যাকে তিনি বলতেন ফেলিসিফিক ক্যালকুলাস (Felicific Calculus) বা সুখের পরিমাপক (Bentham, 1789)। উপযোগবাদের মূল মন্ত্র হলো: “সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করা” (The greatest happiness for the greatest number)। এটি একটি বিশুদ্ধ লজিক্যাল এপ্রোচ। এখানে কোনো কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা হয় সেই কাজের ফলাফল বা কনসিকোয়েন্স (Consequence) দিয়ে। একে বলা হয় পরিণামবাদ (Consequentialism)। ধরুন, আপনি একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। একটি ট্রলি বা ট্রেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছুটে আসছে এবং সামনে ট্র্যাকে পাঁচজন মানুষ বাঁধা আছে। আপনার হাতে একটি লিভার আছে, যা টানলে ট্রেনটি অন্য ট্র্যাকে চলে যাবে, কিন্তু সেখানে একজন মানুষ বাঁধা আছে। আপনি কী করবেন? আবেগ হয়তো আপনাকে লিভার টানতে বাধা দেবে কারণ আপনি নিজের হাতে একজনকে মারতে চান না। কিন্তু উপযোগবাদ (Utilitarianism)-এর লজিক বলে, পাঁচজন মানুষের জীবন একজন মানুষের জীবনের চেয়ে গাণিতিকভাবে বেশি মূল্যবান। তাই লিভার টানা এবং একজনকে বলি দিয়ে পাঁচজনকে বাঁচানোই হলো নৈতিক কাজ। এখানে লজিক আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সংখ্যার বিচার করে। তবে এই লজিকের বিপদও আছে। যদি একজন সুস্থ মানুষকে হত্যা করে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে পাঁচজন মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানো যায়, তবে কি সেটা নৈতিক হবে? লজিক্যালি এখানেও ১ জনের বিনিময়ে ৫ জন বাঁচছে। কিন্তু আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বা কমন সেন্স বলে এটা ভুল। জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) এই সমস্যার সমাধানে বলেছিলেন যে, সুখের কেবল পরিমাণ (Quantity) দেখলেই হবে না, গুণগত মান (Quality) এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও দেখতে হবে (Mill, 1863)। একজন নিরপরাধকে হত্যা করলে সমাজে যে ভয় ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হবে, তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের সামগ্রিক সুখ কমিয়ে দেবে। তাই লজিক কেবল তাৎক্ষণিক লাভ দেখে না, সুদূরপ্রসারী ফলাফলের হিসাবও কষে।
কান্টের শর্তহীন আদেশ: কর্তব্যের লজিক
উপযোগবাদের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant)। তিনি ফলাফলের দিকে তাকিয়ে নৈতিকতা বিচার করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। কান্টের মতে, লজিক আমাদের কিছু পরম কর্তব্যের নির্দেশ দেয়, যা ফলাফল যা-ই হোক না কেন, পালন করতে হবে। তাঁর নৈতিক দর্শনের ভিত্তি হলো ডিউন্টোলজি (Deontology) বা কর্তব্যবাদ। কান্ট তাঁর Groundwork of the Metaphysics of Morals বইয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী লজিক্যাল কনসেপ্ট দেন, যার নাম ক্যাটাগরিকাল ইম্পারেটিভ (Categorical Imperative) বা শর্তহীন আদেশ (Kant, 1785)। এটি হলো নৈতিকতার সর্বোচ্চ লজিক্যাল টেস্ট। কান্ট বলেন, “এমন কাজই করো, যা তুমি চাও যে সেটা একটা সার্বজনীন আইন (Universal Law) হয়ে যাক।” অর্থাৎ, কোনো কাজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন: “যদি পৃথিবীর সবাই এই একই কাজ করে, তবে কি পৃথিবীটা টিকে থাকবে?” ধরুন, আপনি ভাবছেন, “আজকে আমি একটা মিথ্যা কথা বলব।” এখন লজিক দিয়ে ভাবুন, যদি পৃথিবীর সবাই সব সময় মিথ্যা কথা বলে, তবে কী হবে? তখন ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’র কোনো অর্থই থাকবে না, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করবে না। অর্থাৎ, মিথ্যা বলা বিষয়টি লজিক্যালি সেলফ-ডিফিটিং বা স্ববিরোধী। যেহেতু আপনি চান না যে সবাই আপনার সাথে মিথ্যা বলুক, তাই লজিক্যালি আপনার নিজেরও মিথ্যা বলার কোনো অধিকার নেই। কান্টের এই লজিক আবেগের ধার ধারে না। তাঁর মতে, নৈতিকতা কোনো অনুভূতির বিষয় নয়, এটি বিশুদ্ধ যুক্তির বিষয়। আপনি যদি আবেগবশত কাউকে সাহায্য করেন, তবে কান্টের মতে সেটা নৈতিক কাজ নয়, সেটা কেবলই ভালো লাগা। নৈতিক কাজ তখনই হবে যখন আপনি সেটাকে ডিউটি বা কর্তব্য মনে করে করবেন। কান্টের লজিক অত্যন্ত কঠোর। ধরুন, একজন খুনি আপনার বন্ধুকে মারার জন্য খুঁজছে এবং বন্ধুটি আপনার ঘরে লুকিয়ে আছে। খুনি এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বন্ধু কি ঘরে আছে?” উপযোগবাদ বলবে মিথ্যা বলে বন্ধুকে বাঁচানো উচিত। কিন্তু কান্টের ক্যাটাগরিকাল ইম্পারেটিভ (Categorical Imperative) অনুযায়ী, মিথ্যা বলা সর্বাবস্থায় অনৈতিক। তাই লজিক্যালি আপনাকে সত্য বলতে হবে, যদিও ফলাফল ভয়ানক হতে পারে। এই জায়গাটিতে কান্টের লজিক আমাদের মানবিক আবেগের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু এটি আমাদের শেখায় যে নৈতিকতার ভিত্তি হতে হবে অপরিবর্তনীয় নীতি, সুবিধাবাদ নয়।
গেম থিওরি ও রেসিপ্রোকাল আল্ট্রুইজম: স্বার্থপরতার লজিক
বিবর্তন ও জীববিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, নৈতিকতা বা পরোপকারিতা আসলে টিকে থাকার জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর লজিক্যাল স্ট্র্যাটেজি। একে ব্যাখ্যা করা হয় গেম থিওরি (Game Theory) এবং রেসিপ্রোকাল আল্ট্রুইজম (Reciprocal Altruism) বা পারস্পরিক পরোপকার দিয়ে। জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রাইভার্স (Robert Trivers) দেখিয়েছেন যে, প্রকৃতিতে প্রাণীরা একে অপরকে সাহায্য করে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের স্বার্থেই (Trivers, 1971)। ধরুন, আপনি আদিম যুগে বাস করেন। আপনি যদি একা শিকার করেন এবং অসুস্থ হন, তবে আপনি মারা যাবেন। কিন্তু আপনি যদি আপনার সঙ্গীকে সাহায্য করেন এবং বিনিময়ে সেও আপনাকে সাহায্য করে, তবে দুজনেই টিকে থাকবেন। এটি একটি লজিক্যাল ইনভেস্টমেন্ট। গেম থিওরি-র বিখ্যাত উদাহরণ প্রিজনার্স ডাইলেমা (Prisoner’s Dilemma) আমাদের দেখায় যে, যদিও বিশ্বাসঘাতকতা করলে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী খেলায় (Iterated Game) সহযোগিতা বা কোঅপারেশনই হলো সেরা লজিক্যাল স্ট্র্যাটেজি। রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins) তাঁর The Selfish Gene বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন যে, আমাদের জিনগুলো স্বার্থপর, তারা কেবল নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে চায় (Dawkins, 1976)। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই স্বার্থপর জিনগুলোই আমাদের ‘নিঃস্বার্থ’ আচরণ করতে শেখায়, কারণ দলবদ্ধভাবে বসবাস করলে জিনের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আমি যদি আজ আপনার পিঠ চুলকে দিই (সাহায্য করি), তবে ভবিষ্যতে আমার পিঠ চুলকানোর দরকার হলে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। এই যে “দাও এবং নাও” নীতি, এটাই মানব নৈতিকতার ভিত্তি। আমরা চুরি করি না, খুন করি না – কারণ আমরা জানি সমাজ যদি অস্থিতিশীল হয়, তবে আমার নিজের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে। অর্থাৎ, নৈতিকতা হলো একটি সামাজিক চুক্তি বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট। এখানে ধর্মের ভয় বা পরকালের লোভের প্রয়োজন নেই। একজন যুক্তিবাদী মানুষ বোঝেন যে, অনৈতিক কাজ করা মানে নিজের পায়ের নিচের মাটি নিজেই সরিয়ে ফেলা। সমাজ টিকে আছে এই পারস্পরিক আস্থার লজিকের ওপর।
নৈতিক আপেক্ষিকতা বনাম অবজেক্টিভ মোরালিটি
লজিক কি আমাদের কোনো ধ্রুব বা অবজেক্টিভ নৈতিক সত্য দিতে পারে? নাকি নৈতিকতা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আপেক্ষিক (Relative)? নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Moral Relativism) বলে যে, কোনো কিছুই চূড়ান্তভাবে ভালো বা মন্দ নয়; যা এক সমাজে ভালো, তা অন্য সমাজে খারাপ হতে পারে। কিন্তু লজিক এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। আধুনিক দার্শনিক ও স্নায়ুবিজ্ঞানী স্যাম হ্যারিস (Sam Harris) তাঁর The Moral Landscape বইয়ে দাবি করেছেন যে, বিজ্ঞান এবং লজিক ব্যবহার করে আমরা মানুষের ভালো-মন্দ নির্ধারণ করতে পারি (Harris, 2010)। হ্যারিস বলেন, নৈতিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো সচেতন প্রাণীর ‘ওয়েল-বিইং’ (Well-being) বা কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় দুঃখকষ্ট কমানো। যদি আমরা মেনে নিই যে ‘সুখ ভালো’ এবং ‘দুঃখ খারাপ’, তবে লজিক্যালি আমরা বলতে পারি যে যেই কাজগুলো দুঃখ বাড়ায় (যেমন দাসপ্রথা, বিনা কারণে হত্যা), সেগুলো অবজেক্টিভলি বা বস্তুগতভাবে খারাপ। ঠিক যেমন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আমরা লজিক দিয়ে বলি যে বিষ খাওয়া শরীরের জন্য খারাপ, তেমনি নৈতিকতার ক্ষেত্রেও আমরা লজিক দিয়ে বলতে পারি যে সমাজে ঘৃণা ছড়ানো বা বৈষম্য করা ‘সামাজিক স্বাস্থ্যের’ জন্য ক্ষতিকর। এখানে লজিক আমাদের একটি গাআইডলাইন দেয়। হ্যারিস যুক্তি দেন যে, সব সংস্কৃতি বা মতামতের মূল্য সমান নয়। যেই সংস্কৃতি বা মতবাদ মানুষের বিকাশে বাধা দেয় এবং কষ্ট বাড়ায়, লজিকের বিচারে তা ভুল। সুতরাং, লজিক নৈতিকতাকে কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে দেখে না, বরং একে মানুষের সমৃদ্ধির একটি বিজ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, লজিক ও নৈতিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য। ধর্ম আমাদের নৈতিকতার আদেশ দেয়, কিন্তু লজিক আমাদের নৈতিকতার কারণ ব্যাখ্যা করে। আমরা যখন লজিক দিয়ে ভালো-মন্দের বিচার করি, তখন আমাদের নৈতিকতা হয় আরও মজবুত এবং টেকসই। কারণ অন্ধ বিশ্বাস যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু যুক্তির ভিত্তি সহজে টলে না। লজিক আমাদের শেখায় যে, অপরকে ভালোবাসা, সত্য বলা, এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা – এগুলো কোনো রোমান্টিক বা আধ্যাত্মিক বিলাসিতা নয়; এগুলো হলো মানব প্রজাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকার এবং এগিয়ে যাওয়ার অপরিহার্য শর্ত। একজন লজিক্যাল মানুষ ভালো কাজ করেন না কারণ তিনি স্বর্গের লোভ করেন, তিনি ভালো কাজ করেন কারণ তিনি বোঝেন যে এটিই সঠিক, এটিই যৌক্তিক এবং এটিই সবার জন্য মঙ্গলজনক। মহাবিশ্বের এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে আমাদের কোনো অভিভাবক নেই, তাই আমাদের নিজেদের ভালো-মন্দের দায়িত্ব আমাদের নিজেদের কাঁধেই নিতে হবে, আর সেই যাত্রায় লজিকই হলো আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কম্পাস।
যুক্তির স্থপতিরা: লজিকের বিবর্তনের তাত্ত্বিক রূপরেখা
লজিক বা যুক্তিবিদ্যা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক শাখা, যা আমাদের চিন্তার বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় রূপান্তর করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এমন কিছু ক্ষণজন্মা তাত্ত্বিক ও দার্শনিক এসেছেন, যাঁরা কেবল চিন্তার নিয়মকানুন আবিষ্কারই করেননি, বরং চিন্তার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন। তাঁরা লজিককে দর্শন থেকে গণিতে, এবং গণিত থেকে কম্পিউটেশনের ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। এই তাত্ত্বিকদের কাজগুলো একে অপরের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি করেছে এক বিশাল যুক্তির মিনার। তাঁদের অবদান ছাড়া আজকের ডিজিটাল সভ্যতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কোনো অস্তিত্বই থাকত না। প্রাচীন গ্রিসের অলিগলি থেকে আধুনিক যুগের সিলিকন ভ্যালি পর্যন্ত – লজিকের এই অভিযাত্রায় আমরা সেই মহান তাত্ত্বিকদের মনোজগত বিশ্লেষণ করব, যাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ‘সঠিকভাবে’ চিন্তা করতে হয়। এই আলোচনা কেবল তাঁদের জীবনী নয়, বরং তাঁদের আবিষ্কৃত লজিক্যাল সিস্টেম (Logical Systems) এবং মেটা-লজিক্যাল (Meta-logical) ধারণাগুলোর এক গভীর তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ।
অ্যারিস্টটল: যুক্তির প্রথম বিধায়ক
লজিকের ইতিহাসে যার নাম সবার আগে এবং সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (Aristotle)। তাঁকে নিঃসন্দেহে ‘লজিকের জনক’ বলা হয়। তাঁর আগে যুক্তি বা তর্কের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ ছিল না; মানুষ তর্ক করত, কিন্তু সেই তর্কের বৈধতা মাপার কোনো মানদণ্ড ছিল না। অ্যারিস্টটলই প্রথম লজিককে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান বা সায়েন্স অফ রিজনিং (Science of Reasoning) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লজিক বিষয়ক ছয়টি গ্রন্থ, যা একত্রে Organon নামে পরিচিত, পরবর্তী দুই হাজার বছর ধরে পশ্চিমা এবং ইসলামি দর্শনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল (Aristotle, 350 BCE)। অ্যারিস্টটলের লজিকের মূল ভিত্তি ছিল সিলোজিজম (Syllogism) বা ন্যায়ানুমান। এটি এমন এক ধরণের অবরোহী যুক্তি (Deductive Logic) যেখানে দুটি আশ্রয়বাক্য বা প্রেমিস থেকে একটি অনিবার্য সিদ্ধান্ত বা কনক্লুশন বেরিয়ে আসে। যেমন: “সকল মানুষ মরণশীল; সক্রেটিস একজন মানুষ; সুতরাং, সক্রেটিস মরণশীল।” এই কাঠামোর মধ্যে তিনি লজিকের ফর্ম (Form) এবং কনটেন্ট (Content)-এর পার্থক্যটি স্পষ্ট করেন। অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতেন যে, যুক্তির সত্যতা কেবল তথ্যের ওপর নির্ভর করে না, বরং যুক্তির আকারের ওপর নির্ভর করে। তিনি লজ অফ আইডেন্টিটি (Law of Identity), লজ অফ নন-কন্ট্রাডিকশন (Law of Non-Contradiction) এবং লজ অফ এক্সক্লুডেড মিডেল (Law of Excluded Middle) – এই তিনটি মৌলিক সূত্র প্রবর্তন করেন যা আজও ক্লাসিক্যাল লজিকের ভিত্তি। তাঁর তত্ত্বে ক্যাটাগরিকাল প্রপোজিশন (Categorical Proposition) বা শর্তহীন বচনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি বিধেয় বা প্রেডিকেট এবং উদ্দেশ্যের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছিলেন। যদিও আধুনিক লজিক অ্যারিস্টটলের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, তবুও তাঁর তৈরি করা ভিত্তিটি এতটাই মজবুত ছিল যে দার্শনিক কান্ট বলেছিলেন, লজিক অ্যারিস্টটলের হাত ধরে পূর্ণতা পেয়েছে এবং এরপর আর এক পা-ও এগোনোর প্রয়োজন নেই। যদিও কান্টের এই ধারণা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তবু অ্যারিস্টটলের লজিক্যাল কাঠামো আজও আমাদের চিন্তার প্রাথমিক পাঠ।
ক্রিসিপাস ও স্টোয়িক লজিক: বাক্যের গণিত
অ্যারিস্টটলের লজিক যখন বস্তুর শ্রেণীবিভাগ বা টার্ম লজিক (Term Logic) নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন প্রাচীন গ্রিসে আরেক দল দার্শনিক লজিকের এক ভিন্ন ধারা তৈরি করছিলেন, যা দীর্ঘকাল উপেক্ষিত থাকার পর আধুনিক যুগে নতুন করে মূল্যায়িত হয়েছে। এঁরা হলেন স্টোয়িক (Stoic) দার্শনিকরা, এবং তাঁদের মধ্যে প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন ক্রিসিপাস (Chrysippus)। ক্রিসিপাসকে বলা হয় প্রপোজিশনাল লজিক (Propositional Logic)-এর অন্যতম আদি প্রবক্তা। অ্যারিস্টটল যেখানে দেখতেন “সকল মানুষ মরণশীল” (টার্মের সম্পর্ক), ক্রিসিপাস সেখানে দেখতেন পুরো বাক্যের সম্পর্ক। তাঁর লজিকের মূল একক ছিল প্রপোজিশন (Proposition) বা বচন। তিনি “যদি… তবে…” (If… then…), “এবং” (And), “অথবা” (Or) – এই যোজক বা কানেক্টিভগুলোর লজিক্যাল ব্যবহার নিয়ে কাজ করেছিলেন। ক্রিসিপাস পাঁচটি মৌলিক যুক্তির ধরণ বা ইন্ডেমোনস্ট্রেবলস (Indemonstrables) শনাক্ত করেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো মডাস পোনেন্স (Modus Ponens): “যদি প্রথমটি সত্য হয়, তবে দ্বিতীয়টি সত্য; প্রথমটি সত্য; সুতরাং দ্বিতীয়টি সত্য।” উদাহরণস্বরূপ: “যদি দিন হয়, তবে আলো আছে; এখন দিন; সুতরাং আলো আছে।” স্টোয়িক লজিক আধুনিক কম্পিউটার সায়েন্সের বুলিয়ান লজিকের পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করেছে। ক্রিসিপাস বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্ব একটি বিশাল লজিক্যাল বা যুক্তিবাদী সত্তা (Logos) দ্বারা পরিচালিত হয় এবং মানুষের লজিক সেই মহাজাগতিক লজিকেরই একটি অংশ। দুঃখজনকভাবে, ক্রিসিপাসের লেখা ৭০০-এর বেশি বইয়ের প্রায় সবকটিই হারিয়ে গেছে, কেবল অন্য দার্শনিকদের উদ্ধৃতিতে তাঁর কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক সিম্বলিক লজিক স্টোয়িকদের কাছে অনেকাংশে ঋণী।
ফ্রান্সিস বেকন: প্রকৃতির লজিক ও আরোহ পদ্ধতি
মধ্যযুগের অন্ধকূপ থেকে বিজ্ঞান ও লজিককে মুক্ত করার ক্ষেত্রে যার অবদান অনস্বীকার্য, তিনি হলেন ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন (Francis Bacon)। তিনি অ্যারিস্টটলের ডিডাক্টিভ লজিকের কঠোর সমালোচনা করেন। বেকন বলেন, অ্যারিস্টটলের লজিক কেবল জানা সত্যকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকাশ করতে পারে (যেমন সিলোজিজম), কিন্তু এটি নতুন কোনো সত্য আবিষ্কার করতে পারে না। নতুন জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের প্রয়োজন ভিন্ন এক লজিক, যার নাম ইন্ডাক্টিভ লজিক (Inductive Logic) বা আরোহ যুক্তি। ১৬২০ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ Novum Organum (যার অর্থ ‘নতুন অর্গানন’ বা অ্যারিস্টটলের লজিকের উত্তর) বইতে তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেন (Bacon, 1620)। বেকনের তত্ত্ব অনুযায়ী, সত্য কোনো বইয়ের পাতায় বা নিছক তর্কে পাওয়া যায় না, সত্য লুকিয়ে আছে প্রকৃতির পর্যবেক্ষণে। তিনি আইডল থিওরি (Idol Theory) বা মূর্তির তত্ত্বে মানুষের মস্তিষ্কের চারটি লজিক্যাল বায়াস বা কুসংস্কারের কথা বলেন – আইডলস অফ দ্য ট্রাইব (Idols of the Tribe) (মানুষের স্বভাবজাত ভুল), আইডলস অফ দ্য কেভ (Idols of the Cave) (ব্যক্তিগত ভুল), আইডলস অফ দ্য মার্কেটপ্লেস (Idols of the Marketplace) (ভাষাগত ভুল), এবং আইডলস অফ দ্য থিয়েটার (Idols of the Theater) (ভুল মতবাদ)। বেকন বলেন, এই বায়াসগুলো দূর করে ধাপে ধাপে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই হলো লজিকের কাজ। তাঁর এই অভিজ্ঞতাবাদী বা এম্পিরিসিস্ট (Empiricist) দৃষ্টিভঙ্গি লজিককে দর্শনের বিমূর্ত জগত থেকে নামিয়ে এনে পরীক্ষাগারের টেবিলে বসিয়েছিল। বেকনের লজিকই পরবর্তীকালে নিউটন, গ্যালিলিও এবং আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রার পথ প্রশস্ত করে।
গটফ্রিড লাইবনিজ: সর্বজনীন ভাষার স্বপ্নদ্রষ্টা
লজিককে গণিতের ভাষায় রূপান্তর করার প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন জার্মান পলিম্যাথ গটফ্রিড ভিলহেল্ম লাইবনিজ (Gottfried Wilhelm Leibniz)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের সব বিবাদ, সব ভুল বোঝাবুঝির মূলে আছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ভাষা। তাই তিনি এমন এক কৃত্রিম এবং নিখুঁত লজিক্যাল ভাষা তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ক্যারেক্টারিস্টিকা ইউনিভার্সালিস (Characteristica Universalis)। লাইবনিজের স্বপ্ন ছিল, ভবিষ্যতে মানুষ আর তর্ক করবে না; যখনই কোনো সমস্যা দেখা দেবে, তারা বলবে, “এসো, আমরা হিসাব করি” (Calculemus)। তিনি লজিককে ক্যালকুলাস রেশিওসিনেটর (Calculus Ratiocinator) নামক এক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফেলতে চেয়েছিলেন। যদিও তিনি তাঁর জীবদ্দশায় এই কাজটি শেষ করে যেতে পারেননি, কিন্তু তিনি বাইনারি নাম্বার সিস্টেম (০ এবং ১) নিয়ে যে কাজ করেছিলেন, তা ছিল লজিকের ইতিহাসে এক বিশাল উল্লম্ফন (Leibniz, 1666)। লাইবনিজ লজ অফ সাফিশিয়েন্ট রিজন (Principle of Sufficient Reason) বা পর্যাপ্ত যুক্তির নীতি প্রবর্তন করেন, যা বলে – “কোনো কিছুই কারণ ছাড়া ঘটে না।” তাঁর মোনাডলজি তত্ত্বে তিনি দেখান যে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা বা মোনাড (Monad) লজিক্যাল নিয়মে একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ (Leibniz, 1714)। লাইবনিজকে আধুনিক সিম্বলিক লজিক এবং কম্পিউটার লজিকের পিতামহ বলা হয়, কারণ তিনি লজিককে কেবল চিন্তার বিষয় নয়, বরং গণনার বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন।
জর্জ বুলি ও গটলোব ফ্রেগে: লজিকের গাণিতিকরণ
উনিশ শতকে লজিক সম্পূর্ণ নতুন রূপ পায় জর্জ বুলি (George Boole) এবং গটলোব ফ্রেগে (Gottlob Frege)-র হাত ধরে। জর্জ বুলি তাঁর The Laws of Thought বইয়ে প্রমাণ করেন যে লজিকের সূত্রগুলো আসলে বীজগণিতের সূত্র দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব (Boole, 1854)। তিনি ‘সত্য’ এবং ‘মিথ্যা’-কে ১ এবং ০ দিয়ে প্রকাশ করেন এবং তৈরি করেন বুলিয়ান অ্যালজেবরা (Boolean Algebra)। তাঁর লজিক ছিল বাইনারি বা দ্বিমূলিক। অন্যদিকে, গটলোব ফ্রেগে লজিককে নিয়ে যান আরও গভীরে। তিনি অ্যারিস্টটলের সাবজেক্ট-প্রেডিকেট লজিককে বাতিল করে প্রবর্তন করেন কোয়ান্টিফায়ার (Quantifier) এবং ফাংশন (Function)-এর ধারণা। তাঁর গ্রন্থ Begriffsschrift বা কনসেপ্ট স্ক্রিপ্ট-এ তিনি এমন এক লজিক্যাল নোটেশন তৈরি করেন যা গণিতের যেকোনো প্রমাণকে নিখুঁতভাবে প্রকাশ করতে পারে (Frege, 1879)। ফ্রেগেকে অ্যানালিটিক ফিলোসফি (Analytic Philosophy) এবং আধুনিক লজিকের প্রকৃত স্থপতি বলা হয়। তিনি দেখান যে পাটিগণিত আসলে লজিকেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ, যা লজিসিজম (Logicism) নামে পরিচিত। ফ্রেগের কাজ লজিককে ভাষার অস্পষ্টতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে এক বিশুদ্ধ গাণিতিক শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করেছিল।
বার্ট্রান্ড রাসেল ও লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন: ভাষার সীমানা
বিংশ শতাব্দীর লজিকের জগতকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell) এবং তাঁর ছাত্র লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (Ludwig Wittgenstein)। রাসেল ফ্রেগের লজিকের ওপর ভিত্তি করে গণিতের সমস্ত সত্যকে প্রমাণ করার এক বিশাল প্রকল্প হাতে নেন, যার ফসল হলো Principia Mathematica (Russell & Whitehead, 1910)। কিন্তু রাসেল নিজেই লজিকের এক মারাত্মক ত্রুটি খুঁজে পান, যা রাসেলস প্যারাডক্স (Russell’s Paradox) নামে পরিচিত। তিনি দেখান যে সেট থিওরি বা লজিকের কিছু স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নিজেই স্ববিরোধী হতে পারে। রাসেলের ছাত্র ভিটগেনস্টাইন লজিককে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যান। তাঁর প্রথম বই Tractatus Logico-Philosophicus-এ তিনি দাবি করেন যে, আমাদের ভাষার লজিক্যাল কাঠামোই আমাদের জগতকে সংজ্ঞায়িত করে (Wittgenstein, 1921)। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “আমার ভাষার সীমাই আমার জগতের সীমা।” ভিটগেনস্টাইনের পিকচার থিওরি অফ মিনিং (Picture Theory of Meaning) অনুযায়ী, লজিক্যাল প্রপোজিশনগুলো বাস্তবতার ছবি বা মডেল হিসেবে কাজ করে। তবে জীবনের শেষ দিকে তিনি তাঁর নিজের মতবাদ থেকেই সরে আসেন এবং ল্যাঙ্গুয়েজ গেমস (Language Games)-এর ধারণা দেন, যেখানে তিনি বলেন লজিক কোনো স্থির পাথর নয়, বরং এটি ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল এক পরিবর্তনশীল খেলা (Wittgenstein, 1953)।
কুর্ট গ্যোদেল ও অ্যালান টুরিং: লজিকের অসম্পূর্ণতা ও কম্পিউটেশন
লজিকের চূড়ান্ত ক্ষমতা নিয়ে মানুষের যে অহংকার ছিল, তা চূর্ণ করে দেন অস্ট্রিয়ান গণিতবিদ কুর্ট গ্যোদেল (Kurt Gödel)। ১৯৩১ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম (Incompleteness Theorems) প্রকাশ করেন (Gödel, 1931)। গ্যোদেল গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন যে, যেকোনো জটিল লজিক্যাল সিস্টেমে এমন কিছু সত্য থাকবে যা সেই সিস্টেমের নিয়ম ব্যবহার করে প্রমাণও করা যাবে না, আবার অপ্রমাণও করা যাবে না। অর্থাৎ, লজিক নিজেই অসম্পূর্ণ। এটি ছিল লজিকের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ঠিক এই সময়েই ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং (Alan Turing) লজিককে তাত্ত্বিক জগত থেকে বের করে মেশিনের জগতে নিয়ে আসেন। তিনি ১৯৩৬ সালে তাঁর প্রবন্ধে ইউনিভার্সাল টুরিং মেশিন (Universal Turing Machine)-এর ধারণা দেন (Turing, 1936)। টুরিং দেখান যে, লজিকের কাজগুলো ধাপে ধাপে কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব। তাঁর এই কাজই হলো আধুনিক কম্পিউটারের ব্লুপ্রিন্ট। টুরিং প্রমাণ করেন যে সব লজিক্যাল সমস্যার সমাধানযোগ্যতা বা ডিসিডিবিলিটি (Decidability) নেই। অর্থাৎ, এমন কিছু সমস্যা আছে যা কোনো কম্পিউটার বা লজিকই সমাধান করতে পারবে না। টুরিং এবং গ্যোদেল মিলে লজিকের সীমানা এবং অসীম ক্ষমতা – উভয়ই আমাদের সামনে উন্মোচন করেন।
ডব্লিউ. ভি. ও. কাইন ও সল ক্রিপকে: আধুনিক লজিকের দিগন্ত
বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে লজিক ও ভাষার দর্শনে বিপ্লব ঘটাতে আসেন আমেরিকান দার্শনিক ডব্লিউ. ভি. ও. কাইন (W.V.O. Quine) এবং সল ক্রিপকে (Saul Kripke)। কাইন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Two Dogmas of Empiricism”-এ লজিক্যাল সত্য (বিশ্লেষণাত্মক) এবং বাস্তবিক সত্য (সংশ্লেষণাত্মক)-এর চিরাচরিত পার্থক্যকে চ্যালেঞ্জ করেন (Quine, 1951)। তিনি দেখান যে লজিক কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক জ্ঞানের জালের (Web of Belief) একটি অংশ। অন্যদিকে, সল ক্রিপকে মোডাল লজিক (Modal Logic) বা সম্ভাবনার লজিককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি পসিবল ওয়ার্ল্ডস সেমান্টিকস (Possible Worlds Semantics) বা সম্ভাব্য বিশ্বের ধারণার মাধ্যমে দেখান কীভাবে ‘অপরিহার্যতা’ (Necessity) এবং ‘সম্ভাবনা’ (Possibility)-কে লজিক্যালি ব্যাখ্যা করা যায় (Kripke, 1980)। ক্রিপকে প্রমাণ করেন যে কিছু কিছু সত্য আছে যা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানা গেলেও তা অপরিহার্য সত্য হতে পারে (যেমন “জল হলো H2O”)। তাঁদের কাজগুলো লজিককে মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যার সাথে নতুন করে যুক্ত করেছে।
এই তাত্ত্বিকরা প্রত্যেকেই লজিকের বিশাল প্রাসাদে একেকটি করে ইট গেঁথেছেন। অ্যারিস্টটল যে ভিত গড়েছিলেন, বেকন তাতে জানালা কেটেছেন, লাইবনিজ ও বুলি তাতে নকশা করেছেন, ফ্রেগে ও রাসেল তাকে মজবুত করেছেন, আর গ্যোদেল ও টুরিং দেখিয়েছেন সেই প্রাসাদের ছাদ কোথায় গিয়ে আকাশের সাথে মিশেছে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লজিক আজ কেবল দর্শনের বিষয় নয়, বরং এটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উপসংহার: মশাল হাতে একা
লেখাটি শেষ করার আগে একটু গভীরে যাওয়া যাক। লজিক কি মানুষকে সুখী করে? সম্ভবত না। লজিক বা যুক্তি অনেক সময় আমাদের নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর সত্য সবসময় আরামদায়ক হয় না। মিথ্যার মধ্যে এক ধরণের মাদকতা আছে, এক ধরণের মোহ আছে। “সব ঠিক হয়ে যাবে”, “অলৌকিক কেউ আমাকে বাঁচাবে”, “মৃত্যুর পর অনন্ত সুখ অপেক্ষা করছে” – এসব ভাবতে ভালো লাগে। এগুলো মস্তিষ্কের পেইনকিলারের মতো। ব্যথা কমায়, কিন্তু রোগ সারে না।
তবে লজিকের একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আছে। যখন আপনি বুঝতে পারেন যে বজ্রপাত কোনো দেবতার ক্রোধ নয়, বরং ইলেকট্রনের প্রবাহ, তখন আপনার আদিম ভয় কেটে যায়। যখন আপনি বোঝেন রোগবালাই কোনো পাপের ফল নয়, বরং অণুজীবের সংক্রমণ, তখন আপনি ঝাড়ফুঁক বাদ দিয়ে চিকিৎসার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। লজিক আমাদের ভয় থেকে মুক্তি দেয়। অন্ধকার ঘরকে আমরা ভয় পাই কারণ আমরা জানি না সেখানে কী আছে। লজিক সেই ঘরে আলো ফেলে। সেই আলোতে হয়তো কোনো ভূত দেখা যায় না, দেখা যায় শুধুই ধুলোবালি আর পুরনো আসবাব, কিন্তু অন্তত ভয়টা তো কাটে। অজানা আতঙ্ক দূর হয়।
আমরা হয়তো এই মহাবিশ্বের সব রহস্য কখনো ভেদ করতে পারব না। গণিতের সব সত্যও হয়তো আমরা প্রমাণ করতে পারব না। কিন্তু যতটুকু পথ আমরা হাঁটব, ততটুকু যেন নিজের পায়ে হাঁটি। অন্যের কাঁধে চড়ে বা অন্ধবিশ্বাসের লাঠিতে ভর দিয়ে নয়।
মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোকে অলস বসিয়ে রাখার জন্য বিবর্তন আমাদের এত দূর নিয়ে আসেনি। চিন্তা করুন। প্রশ্ন করুন। প্রতিটি তথ্যের ব্যবচ্ছেদ করুন। পৃথিবীটা একটা গোলকধাঁধা হতে পারে, কিন্তু আপনার হাতে যুক্তির মশাল আছে। সেই মশালটা নিভতে দেবেন না। কারণ, দিনশেষে, এই বিশাল, নীরব, এবং হিমশীতল মহাবিশ্বে আমাদের চিন্তাশক্তিটুকুই আমাদের একমাত্র পরিচয়, একমাত্র অহংকার। আমরাই মহাবিশ্বের সেই অংশ যারা নিজেদের দিকে তাকিয়ে নিজেদের বুঝতে পারি। এই বোঝার ক্ষমতাটুকুই আমাদের একমাত্র প্রাপ্তি।
তথ্যসূত্র
- Aristotle. (350 BCE). Metaphysics (Trans. W. D. Ross). Clarendon Press.
- Aristotle. (350 BCE). Nicomachean Ethics. (Trans. W. D. Ross). Clarendon Press.
- Aristotle. (350 BCE). Organon. (Trans. E. M. Edghill). Not published conventionally.
- Avicenna. (1027). The Book of Healing (Trans. M. E. Marmura). Brigham Young University Press.
- Bacon, F. (1620). Novum Organum. (Ed. T. Fowler). Clarendon Press.
- Bentham, J. (1789). An Introduction to the Principles of Morals and Legislation. T. Payne.
- Boole, G. (1854). An Investigation of the Laws of Thought. Macmillan.
- Copi, I. M., Cohen, C., & McMahon, K. (2014). Introduction to Logic (14th ed.). Pearson.
- Dawkins, R. (1976). The Selfish Gene. Oxford University Press.
- Dunning, D., & Kruger, J. (1999). Unskilled and Unaware of It: How Difficulties in Recognizing One’s Own Incompetence Lead to Inflated Self-Assessments. Journal of Personality and Social Psychology.
- Foot, P. (1978). Virtues and Vices: And Other Essays in Moral Philosophy. Blackwell.
- Frege, G. (1879). Begriffsschrift. Louis Nebert.
- Gödel, K. (1931). On Formally Undecidable Propositions of Principia Mathematica and Related Systems. Monatshefte für Mathematik und Physik.
- Harris, S. (2010). The Moral Landscape: How Science Can Determine Human Values. Free Press.
- Heraclitus. (c. 500 BCE). Fragments. (Trans. T. M. Robinson). University of Toronto Press.
- Hume, D. (1739). A Treatise of Human Nature. John Noon.
- Hume, D. (1748). An Enquiry Concerning Human Understanding. A. Millar.
- Hurley, P. J. (2011). A Concise Introduction to Logic (11th ed.). Cengage Learning.
- Kahneman, D. (2011). Thinking, Fast and Slow. Farrar, Straus and Giroux.
- Kant, I. (1781). Critique of Pure Reason (Trans. N. Kemp Smith). Macmillan.
- Kant, I. (1785). Groundwork of the Metaphysics of Morals. (Trans. M. Gregor). Cambridge University Press.
- Kant, I. (1788). Critique of Practical Reason. (Trans. T. K. Abbott). Longmans, Green, and Co.
- Kripke, S. A. (1980). Naming and Necessity. Harvard University Press.
- Leibniz, G. W. (1666). De Arte Combinatoria. Not published conventionally.
- Leibniz, G. W. (1714). Monadology. (Trans. R. Latta). Clarendon Press.
- Łukasiewicz, J. (1920). On Three-Valued Logic. Ruch Filozoficzny.
- Mill, J. S. (1863). Utilitarianism. Parker, Son, and Bourn.
- Moore, G. E. (1903). Principia Ethica. Cambridge University Press.
- Peirce, C. S. (1903). Pragmatism as a Principle and Method of Right Thinking. (Ed. P. A. Turrisi). State University of New York Press.
- Pinker, S. (2011). The Better Angels of Our Nature: Why Violence Has Declined. Viking.
- Popper, K. (1959). The Logic of Scientific Discovery. Hutchinson & Co.
- Priest, G. (1987). In Contradiction. Martinus Nijhoff.
- Quine, W. V. O. (1951). Two Dogmas of Empiricism. The Philosophical Review.
- Rawls, J. (1971). A Theory of Justice. Belknap Press of Harvard University Press.
- Russell, B. (1903). The Principles of Mathematics. Cambridge University Press.
- Russell, B. (1919). Introduction to Mathematical Philosophy. George Allen & Unwin.
- Russell, B. (1952). Is There a God?. Illustrated Magazine.
- Russell, B., & Whitehead, A. N. (1910). Principia Mathematica (Vol. 1). Cambridge University Press.
- Sagan, C. (1996). The Demon-Haunted World: Science as a Candle in the Dark. Random House.
- Singer, P. (1975). Animal Liberation. HarperCollins.
- Singer, P. (1979). Practical Ethics. Cambridge University Press.
- Taleb, N. N. (2007). The Black Swan: The Impact of the Highly Improbable. Random House.
- Thomson, J. J. (1971). A Defense of Abortion. Philosophy & Public Affairs.
- Toulmin, S. E. (1958). The Uses of Argument. Cambridge University Press.
- Turing, A. M. (1936). On Computable Numbers, with an Application to the Entscheidungsproblem. Proceedings of the London Mathematical Society.
- Trivers, R. L. (1971). The Evolution of Reciprocal Altruism. The Quarterly Review of Biology.
- Tversky, A., & Kahneman, D. (1973). Availability: A Heuristic for Judging Frequency and Probability. Cognitive Psychology.
- Wittgenstein, L. (1921). Tractatus Logico-Philosophicus. (Trans. D. F. Pears & B. F. McGuinness). Routledge & Kegan Paul.
- Wittgenstein, L. (1953). Philosophical Investigations. (Trans. G. E. M. Anscombe). Blackwell.

