কোরবানির মাংসের ভাগ-বাটোয়ারাঃ দান করা কি বাধ্যতামূলক?

কোরবানির মাংস কি দান করা বাধ্যতামূলক? কোরবানির মাংস কি পুরোটাই নিজে খাওয়া যায়? বিক্রি করা যায়? সমান ৩ ভাগ করার কি কোন নিয়ম আছে? অনেকেই দাবী করেন দরিদ্র মানুষের কল্যাণার্থে এই প্রথা। আসলেই কি তাই?

কোরবানির নামে পশুহত্যাকে আজকাল অনেকেই খাদ্যশৃংখল, বাস্তুতন্ত্র ইত্যাদির মাধ্যমে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে থাকেন। দরিদ্র মানুষেরা যারা সারা বছর মাংস খেতে পায়না তাদের আমিষের চাহিদা পূরণ নাকি কুরবানি প্রথার অন্যতম উদ্দেশ্য। তাছাড়াও কুরবানির তাৎপর্য ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে অনেক ইসলামিক স্কলার দান খয়রাত, আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত করাকে উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। যারা এসব বলে তারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারন কোরবানির মাংস দান খয়রাত বা বিলি বন্টন করা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশ নেই। বরং, কোরবানির উদ্দেশ্য হল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে নিষ্পাপ প্রাণী হত্যা।

সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ২৮ঃ

‘যেন তারা নিজদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিয্ক দিয়েছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে খেতে দাও’।

তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ফাতহুল মাজীদে এই আয়াতের তাফসীরে লেখা আছেঃ

এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

(فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ)

“অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর‎ এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত‎কে ও বিনয়ের সাথে ভিক্ষাকারীকে।” এখান থেকে অনেকে দলীল গ্রহণ করেন যে, কুরবানীর গোশত তিনভাগ করতে হবে। একভাগ নিজের জন্য, দ্বিতীয়ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং তৃতীয়ভাগ ফকির-মিসকীনদের জন্য। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এরূপ কোন নির্দেশই জারী করে দেননি।

যেমন হাদীসে বলা হয়েছে:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমি তোমাদের তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি তোমরা খাও, প্রয়োজন মত জমা রাখ। অন্য বর্ণনায় এসেছেন খাও, সদাকা কর এবং জমা রাখ। অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছেন খাও, খাওয়াও ও সদকা কর। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫৬৯, সহীহ মুসলিম হা: ১৯৭১)

কোরবানি
[পাঠকদের সুবিধার জন্য হাদীসটি নিম্নরুপঃ

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৬। কুরবানী (كتاب الأضاحى)
হাদিস নম্বরঃ ৫০০৩
৫. ইসলামের সূচনালগ্নে তিনদিনের পরে কুরবানীর গোশত খাওয়া সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা অর্পিত হয়েছিল তার বর্ণনা এবং তা রহিত হওয়া ও যতদিন ইচ্ছা ততদিন পর্যন্ত খাওয়া বৈধ হওয়ার বর্ণনা
৫০০৩-(৩৪/১৯৭৪) ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) ….. সালামাহ্ ইবনু আকওয়া (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, সে যেন ঈদের তৃতীয় রাতের পর তার বাড়িতে কুরবানীর পশুর কোন কিছু সঞ্চিত না রাখে। আগামী বছর যখন আগত হলো, তখন লোকজনেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি গত বছরের মতো করবো? তিনি বললেন, না। সে বছর তো মানুষ খুব দুর্দশায় ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম যাতে সকলের কাছে কুরবানীর (গোশত) পৌছে যায়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৯৪৮, ইসলামিক সেন্টার ৪৯৫৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৩/ কুরবানী (كتاب الأضاحي)
হাদিস নম্বরঃ ৫৫৬৯
৭৩/১৬. কুরবানীর গোশ্ত থেকে কতটুকু খাওয়া যাবে, আর কতটুকু সঞ্চয় করে রাখা যাবে।
৫৫৬৯. সালামাহ ইবনু আকওয়া‘ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের যে লোক কুরবানী করেছে, সে যেন তৃতীয় দিনে এমন অবস্থায় সকাল অতিবাহিত না করে যে, তার ঘরে কুরবানীর গোশ্ত কিছু থেকে যায়। পরবর্তী বছর আসলে, সহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তেমন করব, যেমন গত বছর করেছিলাম? তখন তিনি বললেনঃ তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সঞ্চয় করে রাখ, কারণ গত বছর মানুষের মধ্যে ছিল অনটন। তাই আমি চেয়েছিলাম, তোমরা তাতে সহযোগিতা কর। [মুসলিম ৩৫/৫, হাঃ ১৯৭৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫১৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫০৫৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অর্থাৎ, দুর্দশা-অনটনের বছরে অভাবীদের ভেতর কোরবানির মাংস বিলানোর নির্দেশ থাকলেও, অন্যান্য বছরগুলোতে দান করার সুস্পষ্ট হুকুম দেননি নবী। কেউ যদি ইচ্ছা করে তবে দান করতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে কোন বাধ্যবাধকতা নেই।]

তাফসীর গ্রন্থ ফাতহুল মাজীদে আরো বলা হয়েছেঃ

সঠিক মত এই যে, কোন আয়াত বা সহীহ হাদীসে এরূপ ভাগাভাগি করতেই হবে এমনটি প্রমাণ পাওয়া যায় না, তাই কেউ যদি ভাগ নাও করে তাতে সে গুনাহগার হবে না। মূলত দেখা হবে তার অন্তরে কী ছিল। তাই আমাদেরকে প্রথমত আমাদের নিয়ত ঠিক করা একান্ত কর্তব্য, তা না হলে কোন আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না।

আবার ইবনে কাসিরের তাফসীর গ্রন্থে এসেছেঃ

কোন কোন লোকের ধারণা এই যে, কুরবানীর গোশতকে দু’ভাগ করতে হবে। একভাগ হলো কুরবানী দাতার এবং অপর ভাগ হলো ফকীর মিসকীনের। আর কেউ কেউ বলেন যে, তিন ভাগ করা উচিত। এক ভাগ হাদিয়ার জন্যে, এক ভাগ সাদকার জন্যে এবং এক ভাগ নিজের জন্যে।

কোরবানি

এই আয়াত ও তার তাফসীর থেকে এটা স্পষ্ট যে কুরবানীর মাংস কেউ যদি চায় ৩ ভাগ করতে পারে, কেউ চাইলে ২ ভাগ করতে পারে। কেউ চাইলে কোন ভাগ নাও করতে পারে। কোরবানির আসল উদ্দেশ্য হল বান্দার অন্তরের তাকওয়া পরীক্ষা করা। ফকির-মিসকিন খাওয়ানো নয়। কোরবানির মাংস থেকে অভাবীদের দান করতে বলা হলেও এর মূখ্য উদ্দেশ্য বান্দার মনের আল্লাহভীতি পরীক্ষা।

এই আয়াতটি থেকেই তা স্পষ্টঃ

আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশ্ত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবেই তিনি সে সবকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর তাকবীর পাঠ করতে পার, এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন; সুতরাং তুমি সৎকর্মশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।(২২ঃ৩৭)

এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসির লিখেছেনঃ

হযরত আমির শাবীকে (রঃ) কুরবানীর পশুর চামড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলার কাছে কুরবানীর পশুর রক্ত ও গোশত পৌঁছে না। সুতরাং তোমার ইচ্ছা হলে বেচে দাও, ইচ্ছা হলে নিজের কাছে রেখে দাও এবং ইচ্ছা হলে আল্লাহর পথে দান কর।”

কোরবানি

তাফসীর আবু বকর জাকারিয়ায় এই আয়াত বিষয়ে আছেঃ

এখানে একথা বলার উদ্দেশ্য যে, হাদঈ যবেহ করা বা কুরবানী করা একটি মহান ইবাদাত; কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে এর গোশত ও রক্ত পোঁছে না কারণ তিনি অমুখাপেক্ষী। আর হাদঈ ও কুরবানীর উদ্দেশ্যও এগুলো নয়; বরং আসল উদ্দেশ্য জন্তুর উপর আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করা এবং পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে পালনকর্তর আদেশ পালন করা। তাঁকে যথাযথভাবে স্মরণ করা। [ইবন কাসীর]

কোরবানি

এছাড়াও কোরানের অসংখ্য আয়াত দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে কুরবানি কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং তার সন্তুষ্টির জন্যই। মাংস দান খয়রাতের উদ্দেশ্যে কোরবানী প্রথা চালু হয়নি। যেমনঃ

আর তুমি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা কর, যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করল। অতঃপর তাদের একজন থেকে গ্রহণ করা হল, আর অপরজন থেকে গ্রহণ করা হল না। সে বলল, ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব’। অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন’।(৫ঃ২৭)

আর আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য ‘মানসাক’ এর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেসবের উপর তারা আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ, কাজেই তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর এবং সুসংবাদ দিন বিনীতদেরকে। (২২ঃ৩৪)

অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’; সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’।(৩৭ঃ১০২)

অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে* কাত করে শুইয়ে দিল*

ইসমাঈলকে(৩৭ঃ১০৩)

তখন আমি তাকে আহবান করে বললাম, ‘হে ইবরাহীম(৩৭ঃ১০৪)

‘তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয় আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি’।(৩৭ঃ১০৫)

‘নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা’।(৩৭ঃ১০৬)

অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর কর*।

*অর্থ কুরবানী কর।(১০৮ঃ২)

অর্থাৎ, একথা প্রমাণিত কুরবানির আসল উদ্দেশ্য বান্দার মনের আল্লাহভীতি পরীক্ষা করা। মাংস বন্টনের সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। এবং এর আসল উদ্দেশ্যও সেটা নয়। যদি এটাই মূখ্য উদ্দেশ্য হত তাহলে অবশ্যই নিয়ম নির্দিষ্ট থাকতো। কোরান বা হাদীসে কোথাও বন্টনের নিয়ম নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। বরং মাংস পুরোটা নিজের জন্য রেখে দিলে বা বিক্রি করে দিলেও গোনাহ নেই এরুপ ফতোয়াও আছে। কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করে সারা বছর খাওয়ায়ও কোন বাধা নেই। এ ব্যাপারে সহীহ হাদীসও রয়েছে। আর ইসলামিক মিথলজিতেও কোরবানির সূত্রপাত শুধুমাত্র আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশের উদ্দেশ্যেই। তাই উৎসব করে পশু হত্যাকে বিভিন্নভাবে ন্যায্যতা প্রদানের চেষ্টা বা আর্তমানবতার সেবামূলক কর্মকান্ড প্রতিপাদনের চেষ্টা একইসাথে দু:খজনক এবং হাস্যকর।

ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *