‘ড. মেঘনাদ সাহার নবনীতি’ সমালোচনার উত্তরে

সমালোচনার উত্তর 

অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা ডি. এস সি, এফ. আর. এস

এই সংখ্যার ভারতবর্ষে প্রকাশিত “ডাক্তার মেঘনাদ সাহার নবনীতি” শীর্ষক শ্রীমোহিনীমোহন দত্তের সমালোচনা সম্বন্ধে দুই চারিটী কথা বলিব। উক্ত সমালোচকের সমালোচনার উত্তর দেওয়ার কোন প্রয়োজন আছে মনে হয় না। কারণ যে ব্যক্তি বাস্তবিকই নিদ্রিত তাহাকে জাগান সহজ ব্যাপার, কিন্তু যে লোক ঘুমাইবার ভান করিয়া বাস্তবিক পক্ষে জাগ্ৰত আছে তাহাকে ঠেলিয়া তোলবার চেষ্টা করা বিড়ম্বনা মাত্র। সমালোচক সেই শ্রেণীর লোক। তিনি জাগিয়া থাকিয়া ঘুমাইবার ভান করিয়াছেন। তিনি আমার প্রবন্ধের যে সমস্ত তর্ক উত্থাপন করিয়াছেন তাহার উত্তর আমার প্রবন্ধেই দেওয়া আছে, একটু ধৈৰ্য্যসহকারে পাঠ করিলেই উহা পাইবেন। কোন মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া দেবতাকে ডাকিলে সিদ্ধিলাভ হয়— আমার এ বিশ্বাস কদাপি ছিল না, এখনও নাই ; আমার মতে উহা একটি মধ্যযুগীয় কুসংস্কার মাত্র। এখন জিজ্ঞাস্য, যদি “বেদমন্ত্র উচ্চারণ করিলে বহু দেবদেবী বা যাগযজ্ঞ করিলে দেবতা ও ভগবান প্রসন্ন হন, তবে গত দুই শত বৎসর ধরিয়া হিন্দুজাতি বেদ-পুরাণ-হিন্দুর দেবতা প্রভৃতিতে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী, সর্ববিধ ভক্ষ্য-অভক্ষ্য আহারকারী মুষ্টিমেয় বৈদেশিকের দ্বারা নিগৃহীত, পদদলিত ও অশেষ প্রকারে লাঞ্ছিত হইয়া আসিতেছে কেন? ইহার সদুত্তর সমালোচক দিতে পারেন কি ?

দুঃখের বিষয়, willam Archer প্রণীত ‘India and the Future’ এবং শ্রীঅরবিন্দ প্রণীত ‘Defence of Indian Culture’,এই দুইখানি গ্রন্থের কোনখানাই আমি এ পর্যন্ত পড়ি নাই, তবে ঐ দুইখানি গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত অংশ কিছু কিছু এ প্রসঙ্গে পড়িয়াছি। শ্রীঅরবিন্দ তাহার উক্ত গ্রন্থে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা যে সমসাময়িক অন্যান্য সভ্যতা হইতে ন্যূন ছিল না—তাহা প্রতিপন্ন করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। কিন্তু এই তর্ক এখানে উঠে কেন? ভারতের প্রাচীন সভ্যতা তাৎকালীন পৃথিবীর অন্য সভ্যতার তুলনায় যতই শ্রেষ্ঠ হউক না কেন, তাহা যে মধ্যযুগ ও বর্তমান যুগের উপযোগী নয়, তাহা যাহাদের বিগত ৮০০ বৎসরের ভারতেতিহাসের সামান্য জ্ঞান আছে তাহাদিগকে বিশদ করিয়া বুঝাইবার প্রয়োজন হয় না। সমালোচকের ঐ ধরণের যুক্তি দেখিয়া এক শ্রেণীর কুযুক্তির কথা মনে পড়িয়া গেল।

আমাদের দেশের জনসাধারণ অত্যন্ত দরিদ্র এবং বর্তমান ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট এই দারিদ্র্য দূর করিতে পারেন নাই বলিয়া এদেশে ও বিদেশে তাহাদিগকে অনেক অনুযোগ শুনিতে হয়। তজ্জন্য কয়েকজন উর্বরমস্তিষ্ক “সিভিলিয়ন” ভাবিয়া চিন্তিয়া একটি অদ্ভুত যুক্তি বাহির করিয়াছেন। তাহারা হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন যে হিন্দু ও মোঘল রাজত্বকালে ভারতবাসীর গড়পড়তা আয় বর্তমান ভারতবাসীর আয় অপেক্ষা বেশী ছিল না। সুতরাং এই সমস্ত সিভিলিয়ানের মতে বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনকারিগণ যে বলেন ‘বৃটন ভারতকে শোষণ করিতেছে তাহা সর্বৈব মিথ্যা। একটু তলাইয়া দেখিলে বোঝা শক্ত নয় ইহা অতি কুযুক্তি। কারণ, বর্তমানে প্রত্যেক দেশের গভর্ণমেন্টের প্রধান কর্তব্য—দেশকে পৃথিবীর অপরাপর সভ্য দেশের তুল্য সমৃদ্ধিশালী করিয়া তোলা ; তাহা না হইলে আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের শিল্প-বাণিজ্য লোপ পাইবে, জন-বিপ্লব আসিবে এবং দেশ বিদেশীর পদানত হইবে। যদি বিলাতের কোন গভর্ণমেন্ট তাহাদের দেশের অধিবাসিগণের আয় মধ্যযুগের আয়ের সমতুল্য রাখিতে প্রয়াস পাইতেন তাহা হইলে তাহারা একদিনও টিকিতে পারিতেন না। সুতরাং মধ্যযুগের অবস্থার সহিত বর্তমান যুগের অবস্থার পরস্পর তুলনা করা কুতর্ক বই কিছুই নয়, কিন্তু ভারতবর্ষে গায়ের জোরে সবই চলে, তজ্জন্ত এই সিভিলিয়ানী যুক্তিও চলিয়া যাইতেছে।

সমালোচক অনিলবরণ রায়ের ও মোহিনীমোহন দত্তের সমালোচনাও এই সিভিলিয়ানী কুযুক্তির পর্যায়ভুক্ত। যেহেতু প্রাচীন ভারতীয় (অর্থাৎ, ২২০০ খৃষ্টাব্দের পূর্ববর্তী) সভ্যতা সমসাময়িক অন্য দেশীয় সভ্যতায় সমতুল্য বা শ্রেষ্ঠ ছিল, সুতরাং বর্তমান ভারতীয় সভ্যতা সমসাময়িক পশ্চিম ইউরোপীয় সভ্যতার সমতুল্য বা শ্রেষ্ঠ। ইহা অতি কুযুক্তি। অরবিন্দ কি বলিয়াছেন যে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা বর্তমান সময়ের *** ? যদি বলিয়া থাকেন তবে কোথায়—তাহা জানাইলে সুখী হইব। লেখক অধ্যাত্ম দৃষ্টি কথাটি পুনঃ পুনঃ ব্যবহার করিয়াছেন। বাস্তবিক পক্ষে প্রকৃত অধ্যাত্মবাদী আমাদের দেশে আছে কিনা সন্দেহ ; এই কথাটি, এদেশে অধিকাংশ স্থলে কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও ভণ্ডামির ছদ্মবেশ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। সেদিন খবরের কাগজে পড়িয়াছিলাম যে এদেশীয় পঞ্জিকাকারগণ একসায় মিলিত হইয়া প্রস্তাব  পাশ করিয়াছেন যে হিন্দু জ্যোতিষিক গণনা আধ্যাত্ম জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত, সুতরাং তাহারা পাশ্চাত্য জ্যোতিষ গ্রহন করিতে পারেন না এবং তজ্জন্য পুরাতন ঋষিপ্রোক্ত নিয়মানুসারেই পঞ্জিকা রচনা করিতে থাকিবেন। দুঃখের বা সুখের বিষয় এই যে, জ্যোতিষশাস্ত্রে গোঁজামিল দিবার সুবিধা নাই, কারণ উহাতে “সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ” ইত্যাদির কালগণনা করিয়া এক বৎসর পূর্বেই লিপিবদ্ধ করিতে হয়। কিন্তু ঋষিগণ লিখিত প্রণালীতে ‘গ্রহণ’ গণনা করিলে সময়ের অনেকটা বৈষম্য হয়। তজ্জন্ত এতদ্দেশীয় পঞ্জিকাকারগণ বেমালুম তুলিয়া দিয়া পাশ্চাত্য “নাবিক পঞ্জিকা” (Nautical Almanac) হইতে ‘গ্রহণ কাল “ঋষি প্রোক্ত” বলিয়া চালাইয়া দেন। পঞ্জিকাকারগণ বলেন-৩১শে চৈত্র মহাবিষুব সংক্রান্তি হয়, কিন্তু বাস্তবিক এই ঘটনা ঘটে ৭ই চৈত্র। সমস্ত হিন্দু পঞ্জিকা এইরূপ অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ এবং ইহা গাণিতিক ও প্রত্যক্ষের বিষয়ীভূত ব্যাপার বলিয়া এই সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি প্রদর্শন করা কঠিন নয়। তাহা সত্ত্বেও এই সব কুসংস্কার-ব্যবসায়িগণ”, অধ্যাত্মবিদ্যার দোহাই দিয়া অন্ধবিশ্বাসী হিন্দু জনসমাজে ব্যবসায়টি বেশ চালাইতেছেন।  পক্ষান্তরে “জন্মান্তরবাদ”, “অবতারবাদ” ইত্যাদি গণিতের বা প্রত্যক্ষ দর্শনের ব্যাপার নয়, “বাদ” মাত্র ; মানুষের বিশ্বাসের উপরই মূলত প্রতিষ্ঠিত। প্রায়ই দেখা যায় যে পৌত্র অধিকাংশ স্থলে পিতামহের প্রকৃতি পায়, সুতরাং এরূপ ধারণা হওয়া অসম্ভব নয় যে লোকে বিশ্বাস করিবে যে পিতামহ পুনরায় পৌত্ররূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছে। এক বংশে একই প্রকৃতিসম্পন্ন লোকের বারংবার জন্ম হয়, সম্ভবতঃ পৰ্যবেক্ষণজনিত জ্ঞান হইতেই জন্মান্তরবাদের উৎপত্তি হইয়াছিল। আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রেও বহু স্থলে ইহার উল্লেখ আছে। কিন্তু ইহার জন্য এরূপ কষ্ট কল্পনা করিবার প্রয়োজন নাই যে, একই লোকের আত্মা নানা যোনিতে ঘুরিতেছে। Mendelism তত্ত্ব দিয়া এইরূপ পৰ্যবেক্ষণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়।  অবতারবাদের মাহাত্ম্য বা কাৰ্যকারিতা আমি কখনও বুঝিতে পারি নাই। অবতারবাদে অনেক রকম অসামঞ্জস্য আছে। দুই একটী দৃষ্টান্ত দিতেছি।

অবতারবাদ মতে * কুঠারধারী রাম (পরশুরাম) ও দাশরথি রাম যথাক্রমে বিষ্ণুর ষষ্ঠ ও সপ্তম অবতার। ভীষণ সংহারমূর্তি, অতি ক্রোধপরায়ণ, প্রাণঘাতী জামদগ্ন্য রাম, তিনি হইলেন হিন্দুর অবতার (নৃশংসতার অবতার?)! কিন্তু, রামায়ণে বর্ণিত আছে যে এই দুই অবতার পরস্পত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। একই দেবতার দুই অবতার কি করিয়া যুগপৎ এ-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতে পারেন তাহা সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধির অগম্য। বলরাম অষ্টম অবতার। ইহার শক্তিমত্তার পরিচয় এই যে, তিনি হলের মুখে যমুনাকে আকর্ষণ করিয়াছিলেন এবং অষ্টপ্রহর মদ খাইয়া এবং বালে একটা মামুলী অসুর মারিয়া অবতার শ্রেণীতে আসন পাইয়াছিলেন, তদ্ভিন্ন তাহার অপর কোন কৃতিত্ব শাস্ত্র লিপিবদ্ধ করে নাই।  “জন্মান্তরবাদ” অনুসারে পাপীলোকে নীচ যোনিতে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু (কলিকালে !) পৃথিবীর শতকরা ৯৯ জন লোকই পাপী ; সুতরাং, এই জন্মান্তরবাদ সত্য হইলে পৃথিবী এতদিন নিকৃষ্ট প্রাণী পৰ্যায়ভূক্ত কীট-পক্ষী-পশু-পতঙ্গে পরিপূর্ণ হইয়া যাইত ও মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাইত। কিন্তু ইতিহাস আলোচনায় দেখা গিয়াছে যে পৃথিবীর লোকসংখ্যা গত ১০ বৎসরে চারিগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং অনেক জাতীয় পশু-পক্ষী প্রায় বিলুপ্ত হইতে বসিয়াছে। অতএব, প্রমাণিত হয় যে সমালোচকের অধ্যাত্মদৃষ্টি তাহার মানসিক জড়তার পরিচায়ক মাত্র। লেখক ‘মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কারের কথা তুলিয়া নিজের অজ্ঞতার আর একটি প্রমাণ দিয়াছেন। মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কারের মূলতথ্য বুঝিবার যদি তাঁহার সামর্থ্য থাকিত, তাহা হইলে তাহাকে এইরূপ ভাবে লেখনী-কণ্ডূয়নের বৃথা প্ৰয়াস করিতে হইত না। মহেঞ্জোদারোর লিপি পড়া যায় নাই সত্য, কিন্তু ধ্বংসাবশেষ হইতে তত্ৰত্য নাগরিক জীবনের উন্নত অবস্থা সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণা করিয়া লওয়া কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। “শিবঠাকুরের নাম না পড়িতে পারিলেও তিনি মূর্ত হইয়া “যোগাসনে” আত্মপ্রকাশ করিয়াছেন। মহেঞ্জোদারোর মূর্তি কয়টিতে যোগশাস্ত্র বর্ণিত নাসা বন্ধদৃষ্টি সুস্পষ্ট প্রতীয়মান শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ তাহা দেখাইয়াছেন। বৃক্ষ-দেবতার পূজাপ্রথা তখন প্রচলিত ছিল ইহা কয়েকটি মুদ্রা’ (“শীল”) হইতে প্রমাণিত হয়। ইরাদেশে “কিস” নামক প্রাচীন নগরের খননে কতিপয় স্তরে মহেঞ্জোদারোর “শীল” পাওয়া গিয়াছে এবং তাহা হইতে পণ্ডিতগণ স্পষ্ট প্রমাণ করিয়াছেন যে মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা খৃষ্টের ২৫০০ বৎসর পুর্বের। তখন মধ্য ও পূর্ব পঞ্জাব পৰ্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল এবং “বৈদিক ইন্দ্র-অগ্নিসূৰ্য্য-উপাসক” মানব উত্তর-পশ্চিম পঞ্জাব ও আফগানিস্থানে সভ্যতার নিম্ন-পৰ্যায়ে থাকিয়া জীবন-যাপন করিত। কারণ, ১৪৫০ পূঃ খৃষ্টাব্দে ইরা দেশের উত্তরে মিটানী-প্রদেশস্থ “বৈদিক-দেবতা-পূজক” রাজগণ বাবিলোনিয়া ও মিশরীয় সভ্যতাকে যেরূপ সম্ভ্রমে উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন তাহাতে মনে হয় না যে তাহার নিজস্ব “বৈদিক সভ্যতাকে ব্যাবিলোনিয় ও মিশরীয় সভ্যতার সমতুল্য বিবেচনা করিতেন।

“পুরুষ সুক্তের তাৎপর্য ও প্রকৃত অর্থ।“

এ বিষয়ে আমার মত ইতঃপূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, এজন্য তাহার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। উক্ত মতের কোন পরিবর্তনের কারণ দেখি না। তবে আমার মতের সামর্থনের জন্য প্রসিদ্ধ মনীষী রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয়ের মন্তব্য উদ্ধৃত করিতেছি।

“ঋগবেদ রচনাকালের অনেক পর এই অংশ রচিত হইয়া ঋগ্বেদের ভিতর প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। ঋগ্বেদের অন্য কোথাও ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র এই চারি জাতির উল্লেখ নাই এবং এই শব্দগুলি কোনও স্থানে শ্রেণী বিশেষ বুঝাইবার জন্য ব্যবহৃত হয় নাই। ব্যাকরণবিদ পণ্ডিতগণ প্রমাণ করিয়াছেন যে এই ঋকের ভাষাও বৈদিক ভাষা নহে, অপেক্ষাকৃত আধুনিক সংস্কৃত। জাতিবিভাগ প্রথা ঋগ্বেদের সময় প্রচলিত ছিল না; বেদে এই কুপ্রথার একটি প্রমাণ সৃষ্টি করিবার জন্য এই অংশ প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে।”

অর্থাৎ স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্তের মত বিখ্যাত মনীষীর মতে ঋগ্বেদের ১ম মণ্ডলের ৯০ সুক্তের দ্বাদশ শ্লোক—যাহাকে বর্ণাশ্রমীগণ জাতিবিভাগের মূল স্তস্বরূপ মনে করেন—তাহা কোন প্রাচীন ঋষি-প্রোক্ত নয়। পরবর্তীকালের কোনও অর্বাচীন বর্ণাশ্রমীর রচিত একটি “জাল দলীল” মাত্র। সুতরাং, এই জাল দলীল ভিত্তি করিয়া জাতিভেদ সমর্থক এবং তথাকথিত বর্ণসঙ্কর জাতির উৎপত্তি শীর্ষক যত কিছু আখ্যান পরবর্তীকালে রচিত হইয়াছে, তৎসমুদায়ই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত, সন্দেহ নাই।

“চৈততে বিশ্বাসবান্ বৈজ্ঞানিক”

 সমালোচক মোহিনীমোহন দত্ত চৈতন্যে বিশ্বাসবান বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে Sir Arthur Eddington ও sir James Jeans এর নাম এবং মতামত উল্লেখ করিয়াছেন। সুখের বিষয়, উভয় বৈজ্ঞানিকই বর্তমান লেখকের সহিত নিবিড় ভাবে পরিচিত এবং লেখকের ও উক্ত বৈজ্ঞানিকদ্বয়ের কর্মক্ষেত্র কতকটা এক হওয়ায় লেখক তাঁহাদের রচনার সহিত যতটা পরিচিত ভারতের অতি অল্প-লোকই ততটা পরিচয়ের দাবী করিতে পারেন।

অনেকেই বোধ হয় জানেন না যে Sir Arthur Eddington কোয়েকার (Quaker) সম্প্রদায়ভুক্ত এবং খৃষ্টের বাণীতে প্রকৃত বিশ্বাসী। বিগত যুদ্ধে তিনি ‘conscientious objector’ ছিলেন বলিয়া প্রায় জেলে যাইতে বসিয়াছিলেন, কোনও উচ্চপদস্থ বন্ধুর চেষ্টায় নিষ্কৃতি পান। তাঁহার ‘Idea of Universal Mind or Logos’ তাঁহার কোয়েকার-হৃদয়ের “বিশ্বাসের কথা, বৈজ্ঞানিকের “যুক্তি উহাতে অল্পই আছে।

লেখক sir James Jeans এর মন্তব্যে কি বুঝাইতে চান তাহ বোধগম্য হইল না। ** প্রাকৃবিজ্ঞানের সুবিখ্যাত জার্মান অধ্যাপক Heisenberg এর Theory of indeterminism এর কথা তুলিয়াছেন, ইহাতে ভগবান বা চৈতন্যের কোন কথা নাই। Derisp  এর বাক্যতেও ঐ তত্বের পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে। লেখকের প্রাকৃত বিজ্ঞানের সহিত পরিচয় না থাকায় তিনি এই উদ্ধৃত অংশ কিছুমাত্র বুঝিতে পারেন নাই।

Eddington ও jeans প্রমুখাৎ পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ “বিশ্বজগতের পশ্চাতে চৈতন্যে বিশ্বাসবান হইলেও সেই চৈতন্যকে আমাদের দেশের অপদার্শনিকদের দৃষ্টিতে দেখেন না। এতদ্দেশের দার্শনিক ও ধৰ্ম্মবাদিগণ ঐ চৈতন্য বা শক্তিকে প্রসন্ন করিবার জন্য, অথবা কোন কাল্পনিক বিভূতি’ বা ‘সিদ্ধি লাভের প্রত্যাশায় যোগাসনে ধ্যানে বসিয়া যান, অন্ততঃ লোকের কাছে এইরূপ ভাণ করেন যে তাহারা উক্ত “চৈতন্যের” সাক্ষাৎকার লাভ করিয়াছেন অথবা কোন লোকাতীত শক্তির অধিকারী হইয়াছেন এবং পরে একটা ধর্মের বা দার্শনিকতার ব্যবসায় ফাদিয়া সাধারণ লোককে প্রতারিত করিতে আরম্ভ করেন। দৃষ্টান্ত দেওয়ার প্রয়োজন নাই, কারণ দৈনিক খবরের কাগজ খুলিলে প্রত্যহই অনেক ধর্মের ব্যবসায়ীর নাম দৃষ্টিগোচর হইবে। কিন্তু Jeans বা Eddington প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত এইরূপ “ভণ্ডামি”র ধার দিয়াও যান না। তাহারা প্রাকৃবিজ্ঞানের নিয়মাবলী (laws of physics) এবং গণিতশাস্ত্র প্রয়োগ করিয়া এই পরিদৃশ্যমান জগৎ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াইবার চেষ্টা করেন। তজ্জন্য তাহাদিগকে বিতণ্ডা করিতে হয়, অপরাপর পণ্ডিতবর্গের আপত্তি ও তর্কের সমুচিত উত্তর দিতে হয় এবং সর্বোপরি প্রত্যক্ষের সহিত লব্ধ ফলকে মিলাইয়া দেখিতে হয়। যখন প্রত্যক্ষের সহিত না মিলে তখন উপপত্তি-গুলিকে বর্জন করিতে হয়; সুতরাং বিশ্বজগতের পশ্চাতে “চৈতন্য” আছে এইরূপ বিশ্বাস বা অবিশ্বাস তাঁহাদের কার্যক্রমের অণুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটায় না। আমাদের দেশের অধ্যাত্মবাদ-ব্যবসায়িগণ কি উদ্দেশ্যে তাহাদিগকে ‘মহাত্মা শ্রেণীভুক্ত করিতেন তাহার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা কিছু শক্ত নয়।

সমালোচক দুই-একজন পরলোকে বিশ্বাসবান বৈজ্ঞানিকের নাম করিয়াছেন, যেমন Sir William Crookes ও Sir oliver Lodge ক্রুকস এককালে Psychical Societyর সদস্য ও সভাপতি  ছিলেন। তিনি psychical experience সম্বন্ধে নানাবিধ গবেষণা করিতেন এবং বলা বাহুল্য, এই সব গবেষণামূলক বৃত্তান্ত সম্পূর্ণ লিখিয়া রাখিতেন। তিনি একজন কৃতী বৈজ্ঞানিক এবং বিশ্ববিখ্যাত Royal Societyর সভাপতি পৰ্য্যন্ত হইয়াছিলেন। সুতরাং ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় নয় যে, অধ্যাত্মবাদিগণ দাবী করিবেন যে তাহারা খুব একটি বড় কাৎলাকে বঁড়শীতে গাঁথিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। কিন্তু Crookes কে যে সমস্ত অধ্যাত্মবাদী নিজেদের দলভুক্ত বলিয়া প্রচার করেন তাঁহারা খুব সততার পরিচয় দেন না, কারণ তাহারা Crookes এর অধ্যাত্মবিদ্যা চর্চার ইতিহাস পরবর্তীকালে জানাইতে ভুলিয়া যান। Crookes একদিন অধ্যাত্মবিদ্যা বিষয়ক তাহার যাবতীয় গবেষণা ও অভিজ্ঞতার কাগজপত্র অগ্নিসাৎ করেন এবং যতদিন বাঁচিয়াছিলেন ততদিন এই সম্বন্ধে কোন কথাই মুখে আনিতেন না। লোকে কল্পনা-জল্পনা করে-

“He was the victim of some confidence trick.”

 বিলাতের ওয়াকীব মহলে জনশ্রুতি এই যে, sir Oliver Lodge ‘ভুতুড়ে'(spiritualist) হওয়ার পর তিনি খাঁটি বৈজ্ঞানিক মহলে অনেকটা প্রতিপত্তি হারাইয়াছেন। তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বে কিছু গবেষণা করিয়াছিলেন, কিন্তু তৎপরে তিনি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে কিছু দান করে নাই, “ভুতুড়ে বিজ্ঞানে কি দান করিয়াছেন, তাহা আমার জানা নাই।

শেষ কথা

ভারতবর্ষে আমার প্রবন্ধ দুইটি প্রকাশিত হইবার পর মৌমাছির চাকে ঢিল মারিলে যেরূপ হয় সেইরূপ অনেক প্রকার সমালোচনা, কদালোচনা, গালাগালি নানাস্থানে প্রকাশিত হইয়াছে। এই সবের উত্তর দেওয়া আমি সমীচীন মনে করি না—এবং আমার প্রবৃত্তিও নাই, অবকাশও নাই। নিছক যুক্তিহীন গালাগালির কোন সদুত্তর আছে কি না জানি না, গালাগালি করিতে পারিলে বোধ হয় ঠিক জবাব হয়। কিন্তু তাহাতে অভীষ্ট-সিদ্ধি হয় না, তজ্জন্য ঐ সমবেত গালাগালির পাল্টা জবাব দিতে আমি অসমর্থ। মাত্র একজন লেখক আমার বেদসম্বন্ধে মন্তব্যের জন্য আমাকে ও (আমার প্রবন্ধ প্রকাশ করার জন্য) ভারতবর্ষ-পত্রিকার সম্পাদক মহাশয়কে “নরকে” পাঠাইবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। ভারতবর্ষের সম্পাদক হয়ত শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করিয়া নরকের “টিকিট” নষ্ট করিয়া ফেলিবার ব্যবস্থা করিলেও করিতে পারেন, কিন্তু আমার নরকের টিকিট গ্রহণ করিতে কিছুমাত্র আপত্তি নাই। উপসংহারে, এই সম্বন্ধে একটি গল্প আপনাদের শুনাইবার লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না। গল্পটি এই

“দুই বন্ধু-প্রাচীনপন্থী ও নবীনপন্থী। প্রাচীনপন্থী, বেদ, উপনিষদ, পুরাণের কপা জনিত, পঞ্জিকায় যত রকম উপবাসের বিধিব্যবস্থা আছে তৎসমুদয় পালন করিত, প্রত্যহ গঙ্গাস্নান করিত এবং হাচি টিকটিকি পাঁজি মানিয়া চলিত, কোনওরূপ অভক্ষ্য ভক্ষণ করিত না, স্বপাক ভিন্ন আহার করিত না। নবীনপন্থী ছিল বস্তুতান্ত্রিক, কোনকিছু শাস্ত্র-বিধি মানিত না, অক্ষ্য ভক্ষণ করিত। যথাসময়ে মৃত্যুর পরে প্রাচীন-পন্থী গেল ‘হিন্দুর স্বর্গে, নবীনপন্থী গেল ‘বৈজ্ঞানিকের নরকে। কিছুদিন যায়। নবীনপন্থীর অনুরোধে প্রাচীনপন্থী একদিন রিটার্ণটিকিট কাটিয়া নরকদর্শনে বাহির হইল। কিন্তু সেই যে গেল আর স্বর্গে ফিরিয়া আসিল না। ব্যাপার কি ? না-ফেরা সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন হইয়া প্রাচীনপন্থীর স্বর্গবাসী জনৈক বন্ধু তাহাকে চিঠি লিখিয়াছিল ; প্রত্যুত্তরে বন্ধুকে প্রাচীনপন্থী যে চিঠি দিয়াছিল তাহা হইতে কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করিতেছি। প্রাচীনপন্থী লিখিয়াছে

“…বৈজ্ঞানিকের নরকের সীমানায় উপস্থিত হইলে প্রথমতঃ  ভীষণ উত্তাপ ও তৃষ্ণা অনুভব করিলাম, ভাবিলাম যাত্রা করিয়া কি ঝকমারিই করিয়াছি, এখন উপায়? কিন্তু সীমানার ভিতর প্রবেশ করিবামাত্র স্বর্গের গাড়ী বদলাইয়া নুতন গাড়ীতে উঠিতে হইল ; ঐখানে একটা বড় জংসন দেখিতে পাইলাম। জংসনের বর্ণনা করিবার আমার শক্তি নাই, নুতন গাড়ীতে প্রবেশ করিবামাত্র দেখিলাম আশ্চর্য্য!… আর উত্তাপ নাই, খাসা ঠাণ্ডা এবং মৃদুমন্দ হাওয়া বহিতেছে। ব্যাপার কি? শুনিলাম, এখানকার সমস্ত গাড়ীই air-conditioned । গন্তব্য ষ্টেশনে গাড়ি থামিলে নামিয়া বন্ধুর আবাসে উপস্থিত হইলাম। তার বিধি-ব্যবস্থা দেখিয়া চমৎকৃত হইলাম। স্বর্গে যেমন আমাদের পরিশ্রম করিতে হইত না, কেবল ইন্দ্রের সভায় হাজির থাকিয়া অপ্সরার মামুলী নাচ দেখিতে হইত এবং নারদ-ঋষির ভাঙ্গাগলায় পৃথিবীর ‘গেজেট’ শুনিতে হইত, পানীয়ের মধ্যে একঘেয়ে ভাঙ্গ ও ধেনো মদ—অর্থাৎ পৃথিবীতে আমি যে-সব যত্নের সহিত বর্জন করিয়াছিলাম স্বর্গে তাহার ক্ষতিপুরণস্বরূপ আমাকে ঐ সমস্ত জিনিস ভোগ করিতে দেওয়া হইত তেমনি বৈজ্ঞানিকের নরকে উহার সবই উল্টা, অথচ কি চমৎকার ব্যবস্থা ! যদিও নরক দেশটি অত্যন্ত গরম, কিন্তু বৈজ্ঞানিকেরা সেখানে যন্ত্রবলে উত্তাপকে কাধে পরিণত করিয়া সমস্ত ঘরবাড়ী air-conditioned করিয়া রাখিয়াছে, সুতরাং উত্তাপ মোটেই অনুভূত হয় না। তৃষ্ণা পাইলে Ice-cream সরবত, খাবার টেবিলে সর্বদেশজাত টাটকা ফলমূলের প্রাচুর্য এবং নুতন প্রণালীতে উদ্ভাবিত অপরাপর আহার্যের বাহার, পারিপাট্য ও সুগন্ধ স্বতঃই ক্ষুধার উদ্রেক করে। স্বর্গে বেড়ান ঝকমারি, ঘোড়াগুলা বুড়া হইয়া গিয়াছে প্রায়ই গাড়ী উলটায়,  কিন্তু নরকে airconditioned হাওয়া-গাড়ী, দিব্যি খেয়ে-দেয়ে-ঘুরেরে-ফিরে আরামে আছি। রেডিওর সুইচ টিপিলে বহির্জগতের সব খবর শুনিতে পাই, বিখ্যাত গায়ক-গায়িকার কলা-কুশলী সঙ্গীত, অভিনেতা-অভিনেত্রীর বক্তৃতা, আর্ট, নৃত্য-কলা প্রভৃতি দেখিয়া শুনিয়া মন আপনা হইতেই মুগ্ধ ও বিভোর হইতে থাকে। বহির্জগতের কোন ব্যাপার অনুসন্ধান করিতে যখন ইচ্ছা হয় museumএ যাই এবং Planetariumএ প্রদত্ত বক্তৃতা শুনি। স্বর্গের এক ঘেয়ে জীবন যাত্রায় কি সুখ আছে জানিনা, কিন্তু আমার কাছে বৈজ্ঞানিকের নরকের জীবনযাত্রা বড়ই আরামপ্রদ ও লোভ-জনক মনে হইয়াছে। সুতরাং আমি আমার স্বর্গবাস’ Cancel করিয়া ভবিষ্ণুতে নরকবাসে’র বন্দোবস্ত কায়েমী করিয়া লইয়াছি।”

বর্তমান লেখককে যাহারা, প্রাচীন পন্থীর মত নরকে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিয়াছেন তাহাদের প্রস্তাব আমি সানন্দে গ্রহণ করিলাম।

[ ডাউনলোড লিংক ]

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *