করোনা ভাইরাস, ইসলামিজম ও সংক্রমণের ইতিকথা

Table Of Contents
hide
.gutentoc-toc-wrap ul li a, .gutentoc-toc-title-wrap .text_open{ color: undefined}}

ভুমিকা

ইসলামিজমের প্রভাবে মাথায় বাঁধাকপির মত বিচিত্র হিজাব পরিহিতা “হিজাবি লেডী” আর হাটে মাঠে ময়দানে ওয়াযি হুজুর আর তৌহিদী জনতার দৌরাত্ব দেখে বাংলাদেশের অনেকেই একটি সহি ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিতে শোকর গুজরান করে থাকেন। তবে সত্তর দশকের অসাম্প্রদায়িক, সহনশীল বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইসলামীকরনের জন্য আমি অন্তত আর জামাতি-হেফাজতি-ওয়াহাবিদের এককভাবে দায়ী করি না। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা নেত্রিরা ইতোমধ্যে হজ্জ-ওমরা করার বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছেন। দেশের প্রধান নেত্রী যখন বলেন যে উনি দেশ পরিচালনা করবেন মদিনা সনদ অনুযায়ি তখন উনার নারায়ণগঞ্জের এমপি তো বুক ফুলিয়ে বলতেই পারেন যে নাস্তিক মুরতাদের কল্লা ফেলে দিতে উনি সাধের এমপিগিরি ছেড়ে দিতে রাজি আছেন। যেই এমপি মনোনয়ন পেতে চাঁদা দিতে হয় প্রায় কোটি টাকা, ইসলামের খেদমতে এক নিমিষে তা ত্যাগ করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। আর জনাব জাকির নায়েক বর্তুল আকৃতির পৃথিবীর কোরানিক প্রমানের জন্য সেই যে দাহাহা মানে উট পাখির ডিম আবিস্কার করলেন এর পর থেকে “কোরানিক বিজ্ঞান” নামে ইসলামের এক ষষ্ঠ স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

ইমান,নামাজ, রোজা, হজ্জ, জাকাত ইত্যাদি পাঁচ স্তম্ভের পর এখন সকল মুমিন মুসলমান কায়মনে বিশ্বাস করে যে, এ যাবত বিজ্ঞান যা কিছু আবিস্কার করেছে বা ভবিষ্যতে করবে সবই ১৪০০ বছর আগে কোরানে লেখা আছে আর ইহুদী – নাসারারা সেখান থেকেই সব চুরি করে তাবৎ কিছু মুসলমানদের আগেই আবিস্কার করে ফেলেছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শকে ওজুর সাথে মিলিয়ে আমাদের ওয়াযি হুজুরদের বগল বাজানো আপনারা হয়ত ইতোমধ্যে দেখেছেন। জানিনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে হ্যান্ডশেকের বদলে নমস্কারের জয়লাভে আমাদের হিন্দু দাদারা জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে আসর গরম করে তুলেছেন কিনা। “তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবিউ ওয়াতাব্বা – আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে” আমি মনে মনে ভেবে রেখেছি, “সুরা লাহাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার না করার জন্য আল্লাহ্‌ আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস করার কথা ১৪০০ বছর আগেই বলে গিয়েছেন এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের উপায় বাৎলে দিয়েছেন” এই মর্মে একটা তাফসীর বাজারে চালু করে “কোরানিক বিজ্ঞানীর” খ্যাতি লাভ করা যায় কিনা। ইসলামকে এভাবে বুলন্দ হতে দেখে আমিও ভেবেছিলাম যে আমাদের বঙ্গ মুসলিমরা হয়ত একেকজন জ্ঞানে বিজ্ঞানে সত্যি ইবনে সিনা, আল-রাযী হয়ে উঠেছেন। (প্রকৃতপক্ষে ইবনে সিনা, আল-রাযী এরা ছিলেন আজকালকার ওয়াযিদের ভাষায় “টাটকা নাস্তিক”, আগ্রহি পাঠকগন উল্লেখিত রেফারেন্সটি দেখুন, প্রখ্যাত সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ সৌদি সালাফি স্কলার শায়িখ সালিহ আল ফাওযান ও শেইখ ইবন উথায়মিন বলেছেন ইবনে সিনার নামে হাসপাতাল বা স্কুল করা জায়েজ নাই, জামাতি ভাইদের সম্ভবত এই তথ্যটি জানা নেই, থাকলে এতদিনে ইবনে সিনা হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে মুফতি কাজী ইব্রাহিম হাসপাতাল নামকরন করে ফেলতেন )[১]। বঙ্গ মুসলিমরদের এই ইসলামি বিজ্ঞানমনস্কতার ধারনা মুখ থুবড়ে পড়ল যখন এক বেরসিক করোনা ভাইরাস বিশ্বমহামারী নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর রোগের সংক্রমণের এক বিখ্যাত হাদিসকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিল। সার্কাসে দেখেছি, খেলোয়াড় পা বাঁকিয়ে ঘাড়ের পাশ দিয়ে নিয়ে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে নাক চুলকাতে পারে, তবে রোগের সংক্রমনের হাদিস নিয়ে যেই জিমনাস্টিক দেখলাম তাতে ঐ সার্কাসওয়ালা লজ্জা পেয়ে যাবেন।

করোনা ভাইরাস নিয়ে আলেম সমাজ ও ওয়াজি হুজুরদের প্রতিক্রিয়া

রোজার মাস আসলে আমাদের ব্যাবসায়ীদের পোয়াবারো তারা তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন অধিক মুনাফার জন্য। করোনা ভাইরাস বিশ্বমহামারীতে যখন হাজারে হাজার মানুষ প্রান হারাচ্ছেন তখন দেখলাম আমাদের এই হুজুররা যেন একধরনের বিকৃত আনন্দের ধর্ষকামে মেতে উঠেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যত না চিকিৎসা বিজ্ঞানী বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য দেখবেন তারচেয়ে বেশি পাবেন হরেক কিসিমের মোল্লা মাশায়েখদের করোনা ভাইরাস নিয়ে ময়দান কাঁপানো নানা চ্যালেঞ্জ আর নসিয়ত। আমাদের দেশের তথাকথিত এলিট শ্রেণি বা নীতি নির্ধারকগন এদের নিতান্তই মহিলাদের “হায়েয-নেফাজের হুজুর” ভেবে উন্নাসিকতা দেখাতে পারেন, তবে, উনারা জানেন না যে, এইসব ওয়াযিদের কথা শোনে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ, আর তাদের স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান সহ তাবৎ ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবনের নির্দেশনার উৎস এইসব “হায়েয-নেফাজের হুজুররাই”। কাজেই করোনা ভাইরাস নিয়ে সরকার যতই সমাবেশ না করার বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপদেশ দিন না কেন আমজনতার “ইসলামি অপবিজ্ঞান “ মানসিকতার কোনই পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমাদের ওলামায় কেরামদের ওয়াযের সারমর্ম নিম্নরুপঃ

১। চীনের উইঘুরে আয়েশা নামের এক তরুণীকে তিনজন চীনা সেনা কর্তৃক গন ধর্ষণের ফলেই আল্লাহ্‌ সুবহানওয়াতালা মানবজাতির প্রতি গজব হিসাবে উনার সৈনিক হিসাবে করোনা ভাইরাস প্রেরন করেছেন। (সহি ইসলামি রাষ্ট্র সৌদি আরব কর্তৃক মধ্যপ্রাচের সবচেয়ে দরিদ্র আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্র ইয়েমেনের উপর হামলার জন্য এ পর্যন্ত মারাগেছে ১০০,০০০ মানুষ, যুদ্ধের ফলে দুর্ভিক্ষ, কলেরা ইত্যাদিতে মারা গেছে ৮৫,০০, [২ ]এখানে আল্লাহ্‌ সুবহানওয়াতালা কেন গজব দিলেন না সেটা নিয়ে কাউকে ওয়ায করতে শুনি নাই।)

২। এটি অমুসলিম কাফেরদের জন্য গজব, তবে মুমিনদের জন্য রহমত স্বরূপ কারন এই মহামারীতে মারা গেলে মুসলিম শহীদের মর্যাদা পাবে।

৩। করোনা মুসলিমদের আক্রমন করে না, শুধু অমুসলিম কাফেরদের আক্রমন করে। মুসলিমদের চেহারায় এক ধরনের নূর বের হয় যা দেখে করোনা পালিয়ে যায় (মুফতি কাজী ইব্রাহীম) (এই ধারনাটি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় সকল মুমিনদের ভিতরেই ছিল, ইতালি ফেরত এক যুবক এই বিশ্বাসেই বিমানবন্দর হাজি ক্যাম্পে কোয়ারেন্টীন থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য টি ভি ক্যামেরার সামনে তারস্বরে বলছিলেন যে “মুসলিমদের করোনা হয়না কারন ওরা মদ, শূকর খান না, এই তথ্য বাংলাদেশ জানেনা ইত্যাদি”। বর্তমানে পাকিস্তান,তুরুস্ক, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া সহ সকল মুসলিম দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ায় এই নির্লজ্জরা আর এই কথাটি জোর গলায় বলে না, ইরানের উদাহরন দিলাম না কারন ইনারা শিয়া ইরানকে সহি মুসলিম দেশই মনে করেন না।

৪। করোনা ভাইরাস মুসলিমদের আক্রমন করলে কোরান মিথ্যা হয়ে যাবে (আমির হামযা)

৫। ইসলামে রোগের কোন সংক্রমন নেই। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ আল্লাহর হুকুমে হয়, করোনা ভাইরাস দেহে প্রবেশ করলেও আল্লহর হুকুম ছাড়া সে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, কাজেই এটি তকদীরের বিষয়। বেশি বেশি নামাজ, তওবা ও তাওয়াককুল করাই এর প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। (ইতোমধ্যে এই আকিদার ভিত্তিতে সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিল্লি মারকাজের তাবলীগ জামাত সমাবেশ করায় করোনা আক্রান্ত দশজন শহীদি মৃত্যু বরন করেছেন এবং শত শত মুসল্লি দেশব্যাপী আল্লাহর করোনা সৈনিক ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে সেই দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন। কোয়ারেন্টীনে নেওয়া অনেক মুসুল্লির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ডাক্তার-নার্সদের গায়ে থুতু নিক্ষেপ করার আর রাস্তা ঘাটে ইচ্ছাকৃতভাবে থুতু কফ ফেলে মুশরিকদের দেশে করোনা জিহাদ করার )[৩]

করোনা ভাইরাস


মুফতি কাজী ইব্রাহীমের স্বপ্নযোগে করোনা ভাইরাসের ইন্টারভিউ নামক ভণ্ডামি এখানে উল্লেখ করলাম না, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটার ভিউ হয়েছে লাখ লাখ, তার চেয়ে বড়কথা এর কমেন্ট পড়েছে হাজারে হাজার এবং প্রায় সকলেই হুজুরেরে বক্তব্যকে আলহামদুলীল্লাহ, সোবহানআল্লাহ বলে সমর্থন করেছেন আর এনারাই আমাদের আপামর জনসাধারণ। এইসব অন্ধকারাছন্ন, কূপমণ্ডূক, কুশিক্ষিত, ধর্মভিত্তিক ধান্দাবাজ মোল্লাতন্ত্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষক রাজনীতিবিদদের নিয়ে লিখতে একধরনের অস্বস্তিবোধ হয়। ইতিহাসের পরিক্রমায় কোনো নির্দিষ্ট সময়কালে এইসব মোল্লা পুরুত আর ধর্মগুরুদের প্রবল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ও মানবজাতির ক্ষতিসাধন করার ইতিহাস থাকলেও ,এই গোত্রটির কেউ কোন সময় একক নাম ধরে উল্লেখ করার মত গুরুত্ব লাভ করতে পারেনি। “ভগবান বুকে পদ চিহ্ন এঁকে” দেওয়া কবি নজরুল বা বেগম রোকেয়ার বিরুদ্ধে ফাতওয়া দেওয়া হাজার মোল্লা-মাশায়েখদের নাম কয়জন মনে রেখেছে? গ্যালিলিওকে অত্যাচার করা আর বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সেই সময়ের মহাপ্রতাপশালী চার্চ, পোপ, পাদ্রীরা ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। এতকিছু জানার পরেও এই করোনা ভাইরাস বিশ্বমহামারীতে আমাদের সমাজে এইসব মোল্লা-মাশায়েখরা যে সব জ্ঞানগর্ভ নসিয়ত করে গেছেন, শুধু ভবিষ্যৎ রেফারেন্স এর জন্য দুই একটি নাম উল্লেখ করলাম। “মুসলমানদের জন্য সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও মাস্ক পরার প্রয়োজন নাই” (মুফতি নজরুল ইসলাম কাসেমি, একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তারেক মনোয়ার ও আমির হামযা নামের দুই জন জামাতি ওয়াযি ), “এয়ারপোর্ট আটকে দিয়ে করোনা আটকানো যাবে না, গজব আসবে আসমান দিয়ে” (গোলাম সারওয়ার সাইদি ), “করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে নাই এবং whole world এ করোনা ভাইরাস মহামারী নয়” (মুফতি হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী)। এক গবেষণাপত্র যাতে আশঙ্কা করা হয়েছে ৫ লাখের বেশী মানুষ বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে, এই গবেষণার পদ্ধতিগত দুর্বলতা বা অন্য সমালোচনা করাই যেতে পারে, তবে খবরে পড়লাম এই গবেষণা পত্রের বাংলাদেশী সহ-লেখককে হয়রানি করা হয়েছে [৪] ,তবে লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে দিয়ে জন স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টিকারী, সকল সরকারী স্বাস্থ্য নির্দেশনা ও আইন ভঙ্গকারী মোল্লা-মাশায়েখদের কেশাগ্রও কেউ স্পর্শ করতে পেরেছে এমনটি আজ অবধি শুনিনি।

করোনাক্রান্ত আল-হাদিস

ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাবহার, প্রোপাগান্ডা ও সর্বস্তরে অনুপ্রবেশকে ইসলামিজম বলা হয়। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ পালন বা ব্যাক্তিগত ধর্মপালনের সাথে ইসলামিজমের কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই। একই ভাবে হিন্দুত্ববাদ যেমন হিন্দু ধর্মপালনের থেকে আলাদা। ইসলামিজম মানে শুধুমাত্র ইসলামি রাজনীতি নয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সকল ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী এক ব্যবস্থার নাম ইসলামিজম। এর প্রভাবে যে কোনো পতিতার দালাল, খুনি অথবা ধর্ষক, ইসলাম বা নবীর বিরুদ্ধে কটূক্তির বানোয়াট খবর বানিয়ে তৌহিদী জনতা বনে রাতারাতি খাঁটি মুমিনের মর্যাদা লাভ করতে পারেন। ইসলামিজমের প্রভাবে সেই কবে প্রথম আমাদের বিটিভি তে আযান দেওয়া শুরু হয় অর্থাৎ সুন্নতে খৎনা করানো হয়, এখন তো সকল প্রচার মাধ্যমে ইসলামি জিজ্ঞাসা,জলসা আর নসিয়তের মচ্ছব শুরু হয়ে গেছে। বিটিভিতে দু চারটি হাদিসের বানী শুনে ছোটবেলায় প্রথম হাদিস জানতে পারি, তারমধ্যে যেগুলো মনে পড়ে তার অন্যতম হল, “জ্ঞান অর্জনের জন্য চীন পর্যন্ত যাও” “বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চাইতেও পবিত্র”। পরে জানলাম এগুলো ডাহা জাল হাদিস, ভাগ্য ভাল দ্বিতীয় জাল হাদিসের খবর আই এস এখনো জানেনা, জানলে ট্রাক ভর্তি বোমা মেরে বিটিভি ভবন উড়িয়ে দিত। কিন্তু, করোনা মহামারী এসে আমাদের পবিত্র হাদিস সম্ভারেও সংক্রমণ চালিয়ে আমাদের ঈমান ধরে ঝাঁকি দেওয়া শুরু করেছে। নিম্নে তার খতিয়ান দেওয়া হলঃ

রোগের সংক্রমণ অস্বীকারকারী হাদিস সমূহ

করোনা ভাইরাস
মুফতি হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী

“রোগের কোন সংক্রমন নেই অথবা ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই” এই বক্তব্য সম্বলিত বেশ অনেকগুলি সহি হাদিস রয়েছে একাধিক হাদিস গ্রন্থে, শুধুমাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হলঃ

গ্রন্থ:সহীহ বুখারী (ইফাঃ) / হাদিস নাম্বার: 5308
৫৩০৮। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের কোন সংক্রমন নেই, সফরের কোন কুলক্ষণ নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন কুলক্ষণ নেই। তখন জনৈক বেদুঈন বলল ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা হয় কেন? সে যখন চারণ ভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগা উট এসে সেগুলোর মধ্যে ঢ়ুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগাক্রান্ত করে ফেলে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?
যুহরী হাদীসটি আবূ সালামা ও সিনান ইবনু আবূ সিনান (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থ:সহীহ বুখারী (ইফাঃ) / হাদিস নাম্বার: 5342
৫৩৪২। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে ও শুভ-অশুভ বলতে কিছু নেই। অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে – নারী ঘর ও জানোয়ার।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনানে ইবনে মাজাহ
৩১। চিকিৎসা
৩৫৩৭
আনাস (রাঃ), থেকে বর্ণিতঃ
নাবি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ রোগ সংক্রমন ও কুলক্ষণ বলে কিছু নেই। তবে আমি (অদৃশ্য থেকে শ্রুত ) উত্তম কথা পছন্দ করি।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।

***উপরে বর্ণিত সুনানে ইবনে মাজাহর হাদিসটি অন্যত্র একটি সংযজন সহ বর্ণনা করা হয়েছে যেমনটি নীচে দেওয়া আছে। “তিনি বলেনঃ এটাই তোমাদের তাকদীর। আচ্ছা প্রথম উটটিকে কে সংক্রামিত করেছিল?” অন্য কথায় সংক্রমন আল্লাহর হুকুমে হয়”, এই বাক্যটি অসৎ উপায়ে ঢুকানো হয়েছে। দারুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত একই হাদিসের পাদটীকায় মুহাদ্দিসগন একই কথা বলেছেন, কারন অন্য বর্ণনায় এই সংযজনটি পাওয়া যায় না। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানী যথাযথই এই সংযজন বর্জন করেছেন।

সুনানে ইবনে মাজাহ
তাকদীর (রাঃ) ভাগ্যলিপির বর্ণনা । (আবদুল্লাহ) বিন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ছোঁয়াচে বলতে কোন রোগ নেই, অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই এবং হামাহ (পেঁচার ডাক) বলতে কিছুই নেই। তখন তার সামনে এক বেদুঈন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনার কী মত যে, চর্মরোগে আক্রান্ত একটি উট সুস্থ উটের সংস্পর্শে এসে সকল উটকে আক্রান্ত করে? তিনি বলেন, এটাই তোমাদের তাকদীর। আচ্ছা প্রথম উটটিকে কে সংক্রামিত করেছিল? [৮৪]
তাহকীকঃ এটাই তোমাদের তাকদীর এ ব্যতীত সহীহ।
[৮৪] আহমাদ ৪৭৬১, ৬৩৬৯। তাহক্বীক্ব আলবানী: এটাই তোমাদের তাকদীর এ কথা ব্যতীত সহীহ। তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৭৮২, যঈফাহ ৪৮০৮। উক্ত হাদিসের রাবী ইয়াহইয়া বিন আবু হাইইয়াহ আবু জানাবীল কালবী সম্পর্কে ইয়াযিদ বিন হারুন বলেন, তিনি সত্যবাদী কিন্তু হাদিস বর্ণনায় তাদলীস করেন। আহমাদ বিন হাম্বল ও ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, তার মাঝে কোন সমস্যা নেই কিন্তু হাদিস বর্ণনায় তাদলীস করেন। ইবনু মাঈন অন্যত্র বলেন, তিনি দুর্বল।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

করোনা ভাইরাস
করোনা ভাইরাস

(সুনান ইবনে মাজাহ, ইংরাজি অনুবাদ, দারুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত)
সহিহ হাদিস অনুযায়ী সংক্রামক অথবা ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করার আগে “কুফরি ইয়াহুদি-নাসারাদের” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৯৬ সালের রিপোর্ট দেখা যাক, যেখানে বলা হয়েছে প্রতিদিন সংক্রামক রোগে এই বিশ্বে মারা যায় ৫০,০০০ মানুষ [৫] । কলেরা মহামারীতে কয়েক দশক আগেও গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। যাই হোক, সংক্রমনের এই হাদিস বিশ্লেষণের পূর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা জেনে নেওয়া যাক।

কিছু প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা

মহামারী (Epidemic) বলতে বোঝায়, কোন একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠীতে কোন একটি রোগের প্রকোপ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া যা প্রত্যাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণ ডেঙ্গু মহামারী। যদিও মহামারী শব্দটি জীবাণু বাহিত বা সংক্রামক রোগের (Infectious diseases) ক্ষেত্রে বেশী ব্যাবহার করা হয়, অসংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস বা আর্সেনিকোসিসের ক্ষেত্রেও মহামারী শব্দটি ব্যাবহার করা যেতে পারে।

মহামারী যখন কয়েকটি দেশে বা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ও বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করে তখন তাকে বিশ্ব মহামারী (Pandemic) বা প্যানডেমিক বলা হয়।

যে কোন জীবাণু বা অণুজীব যেমন, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস, প্রটোজোয়া দ্বারা সংক্রমিত রোগকে সংক্রামক রোগ (Infectious diseases) বলা হয়। ছোঁয়াচে রোগ (Contagious diseases) বলতে সেই সব রোগকে বোঝায় যা রোগীর সরাসরি সংস্পর্শ , নৈকট্য বা রোগীর কফ, কাশি, থুথু ইত্যাদি থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। সকল ছোঁয়াচে রোগই সংক্রামক রোগ কিন্তু সকল সংক্রামক রোগ ছোঁয়াচে নয়। করোনা ভাইরাস জনিত রোগ একই সঙ্গে ছোঁয়াচে ও সংক্রামক আবার ডেঙ্গু জ্বর ভাইরাস দ্বারা সংক্রামক রোগ হলেও ছোঁয়াচে নয় অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগীর সংস্পর্শে আপনার ডেঙ্গু হবে না যদি না এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি আপনার দেহে প্রবেশ না করে।

যদিও আরবি “আদওয়া” শব্দটির বাংলা অনুবাদে ছোঁয়াচে ও সংক্রমণ দুটোই একই অর্থে ব্যাবহার করা হয়েছে, ছোঁয়াচে শব্দটি বেশী উপযুক্ত হবে। দারুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত সুনান ইবনে মাজাহ প্রথম খণ্ডের ৮৬ নম্বর হাদিসে তে “আদওয়া” শব্দটির ইংরাজি অনুবাদ সঠিক ভাবে Contagion বা ছোঁয়াচে করা হয়েছে। Germ theory বা জীবাণু দ্বারা রোগ সংক্রমণের ধারনা ১৮০০ সালের মধ্যভাগে প্রসার লাভ করে, ১৪০০ বছর আগের আরব সমাজ তথা নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর এই সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিল না একই কারনে কোরান মজিদেও এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে কিছুই বলা নেই।

“ছোঁয়াচে বলতে কোন রোগ নেই” – হাদিসের ব্যাখ্যায় মডার্ন ইসলামি আলেমদের বিভাজন

বাংলাদেশে বা অন্য কোন মুসলিম দেশে যারা মনে করেন যে ইসলামপন্থিরা শুধুমাত্র ধর্ম পালনের নানা মাসালা-মাসায়েল আর বিবি তালাকের ফাতওয়ার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবে, তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। কাজেই করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার ইসলামি তরীকা যে আমাদের ইসলামী পণ্ডিতরা যে কোনো চিকিৎসক বা করোনা বিশেষজ্ঞের চেয়ে আরও জোর গলায় সর্বজ্ঞানীর মত বলবে এটাই স্বাভাবিক। তবে গোল বেঁধে গেল যখন প্রান বাঁচাতে মুসলিম, কাফের নির্বিশেষে এই সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য নবীর হাদিসের উপর ভরসা না করে কুফরি ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখানো পথে হাঁটা শুরু করল। সেই থেকে নবীর ছোঁয়াচে রোগের হাদিসটিকে ভিন্ন অর্থ দেওয়ার জন্য আমাদের মডার্ন ইসলামি আলেমরা রীতিমতো জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
প্রয়াত শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের ছেলে মাওলানা মামুনুল হক নিজেও শায়খুল হাদিস ও মঞ্চ কাঁপানো হেফাজতী নেতা “করোনা ভাইরাস কি আসলেই ছোঁয়াচে রোগ এ ব্যাপারে কি বলে ইসলাম” শীর্ষক এক ভিডিও বার্তায় এই হাদিসের যে ব্যাখ্যা দিলেন তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম হবার জোগাড়। এই ভিডিওর ২ঃ৪০ মিনিটে উনি “লা আদওয়া” বা নেই কোন ছোঁয়াচে এর অর্থ করেছেন এই ভাবে যে, এর মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে “তোমরা কেও যেন অন্য কারো নিকট রোগের সংক্রমণ না ঘটাও” [৬] দেশের প্রখ্যাত আহলে হাদিস আলেম মওলানা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইয়ুসুফ ও উনার পুত্র আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক এই ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকারকারী হাদিসটি কোনরূপ তা’উইল বা ভিন্ন অর্থ না করে প্রকৃত অর্থে বর্ণনা করেছেন।[৭] দেশে আলেম-ওলামা-মোল্লা -মাশায়েখদের সংখ্যা আর তাদের ওয়ায-নসিয়তের যে সুনামি শুরু হয়েছে তাতে এই হাদিস নিয়ে উনাদের সকলের তাফসীর পেশ করতে গেলে সাত খণ্ড রামায়ন হয়ে যাবে বরং বর্তমানের মডার্ন মুমিন ভাইরা এই ছোঁয়াচে রোগের হাদিসটি আম জনতার কাছে যেই মোড়কে পরিবেশন করছেন, সেটা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করব।

মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার সাহেব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন ইসলামী এপলজিস্ট এবং ইসলামে ছোঁয়াচে রোগের বিষয়ে লিখেছেন ও আলোচনা করেছেন। “নাস্তিক ব্লগার Asif Mohiuddin এবং Modon Kumar Hasan এর ২৫ মার্চের লাইভের পর্যালোচনা- মুশফিক মিনার” [৮] এই শিরোনামে মিনার সাহেবের একটি ভিডিও রয়েছে। উনার বক্তব্যের গতানুগতিক খণ্ডন করা আমার উদ্দেশ্য নয় বরং এই হাদিস নিয়ে যে তাকদির বা ভাগ্য নিয়ে যে আলোচনা উঠে এসেছে এবং করোনা ভাইরাস বিশ্বমহামারী আমাদের ইসলামী মনস্তত্ত্বে যে প্রভাব ফেলেছে সেই বিষয়টি এই আলোচনায় উঠে আসবে। আলোচ্য হাদিসটি আলোচনার সুবিধার্থে পুনরায় উল্লেখ করলাম।
“আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের কোন সংক্রমন নেই, সফরের কোন কুলক্ষণ নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন কুলক্ষণ নেই। তখন জনৈক বেদুঈন বলল ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা হয় কেন? সে যখন চারণ ভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগা উট এসে সেগুলোর মধ্যে ঢ়ুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগাক্রান্ত করে ফেলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?”

বিভিন্ন ইসলামী পণ্ডিতগন উপরের হাদিসটিকে কি ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সে আলোচনায় যাবার আগে বোঝা উচিৎ উপরের বক্তব্যের যিনি বক্তা সেই নবী মোহাম্মাদ (দঃ) নিজে উপরের বাক্যে কি বুঝিয়েছেন। লক্ষ্য করুন নবী মোহাম্মাদ (দঃ) পরিস্কারভাবে বলেছেন “রোগের কোন সংক্রমন নেই” উনি কিন্তু এর প্রমানে বা ডিফেন্সে এ কথা ধুনাক্ষরেও বলেননি যে “রোগের সংক্রমন আছে, এবং তা আল্লাহ্‌র হুকুমে হয়”। মডার্ন মুমিন বলেন বা ইবনে হাজার আশকালানির কথা বলেন, ইনারা এই হাদিসের ব্যাখ্যায়, নবী নিজ মুখে যা বলেন নি তা উনার মনের কথা বলে বলে চালিয়ে দেন। রোগের যে সংক্রমন নেই – এই কথার পক্ষে নবী নিজেই তাঁর “অকাট্য যুক্তি” উপস্থাপন করেছেন – “তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?” এই কথার মধ্য দিয়ে নবী এটাই বুঝিয়েছেন যে, যেহেতু প্রথম উটটি অন্য কোন উটের সংস্পর্শ ছাড়াই আক্রান্ত হয়েছে কাজেই অন্যান্য উটগুলিও সংক্রমন ছাড়াই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ নবী পরিস্কার ভাবে বলেছেন যে “রোগের কোন সংক্রমন নেই”। এখন যদি দাবী করা হয় যে, নবী মনে মনে এর মাধ্যমে একথাই বুঝিয়েছেন যে, রোগটি আল্লাহ্‌র হুকুমে প্রথম উটটিতে ও পরে সংক্রমণের মাধ্যমে প্রথম উট থেকে অন্য উটগুলোতে হয়েছে – উপরের হাদিস থেকে এ কথা মোটেও প্রতীয়মান হয় না। তবে আল্লাহ সংক্রমন ছাড়াই সকল উটকে রোগাক্রান্ত করেছেন – বরং এ কথা বেশী যুক্তিসঙ্গত, যদিও নবী নিজ মুখে তা বলেন নি। কোন সহিহ হাদিসে নবীর কথায় “আল্লাহর ইচ্ছায় উটের রোগ হয়েছে বা তকদীরে লেখা ছিল তাই রোগ হয়েছে” এরূপ বর্ণনা না থাকায়, এ কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে নবী অত্যন্ত নিশ্চয়তার সাথে এই দাবী করেছেন যে “রোগের কোন সংক্রমন নেই”। মডার্ন মুমিন বা ইসলামি পণ্ডিতগণ নানা কথা নবীর মুখে জুড়ে দিতে পারেন, তবে সেটা হবে হাদিসের মতনের বরখেলাপ ও অসততা। (বিজ্ঞান সম্পর্কে অল্প-বিস্তর নানা জ্ঞানের পাঠকরা লেখাটি পড়বেন, অণুজীব বিজ্ঞান সম্পর্কে কম ধারনা সম্পন্ন কারো মনে হতে পারে যে প্রথম উটটির চর্মরোগ হয়ত আল্লাহ, ভগবান বা জিন পরীর মাধ্যমে হয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যে যৎসামান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য উল্লেখ করলাম। প্রথম উটের চর্মরোগ কোন ছত্রাক দ্বারা হলে, এটির উৎস আল্লাহ-ভগবান নয়, এই ছত্রাক মাটি থেকে এমনকি সেই উটের লোম বা চামড়ায় পরজীবী হয়ে থাকা ছত্রাক থেকে আসতে পারে, কোন কারনে চামড়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বা কোন ক্ষতের মাধ্যমে এই ছত্রাকটি উটের চামড়ায় সংক্রমণের মাধ্যমে চর্মরোগ ঘটাতে পারে। মানুষের রানের চিপায় যে ছত্রাক জনিত দাদ রোগ আপনারা দেখে থাকেন সেটাও কারো শরীর থেকে সংক্রামিত হওয়া ছাড়াও, ঘামে ভেজা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ত্বকে অবস্থিত ছত্রাকের বংশ বিস্তারের মাধ্যমে নিজে নিজেই আপনার ত্বকে দাদ জাতীয় চর্মরোগ করতে পারে। এতে কোন মারেফতি বিষয় নেই, এটি একটি নির্জলা বৈজ্ঞানিক সত্য)।

নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর ওহি বা হাদিস সাধারনত আদেশ, নির্দেশ বা সরাসরি বক্তব্য হিসাবে উপস্থাপিত ,সংক্রমণের হাদিসটির মত যুক্তি নবী খুব কমই প্রয়োগ করেছেন। নবীর যুক্তি প্রদানের অন্য উদাহরণটি হল উনি নারীদের বুদ্ধি ও ইবাদতকে ত্রুতিপুরন প্রমান করতে এই যুক্তি দিয়েছেন যে, যেহেতু একজন মহিলার সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক কাজেই তাদের বুদ্ধিও ত্রুতিপুরন, একই ভাবে হায়েয অবস্থায় নারীরা সালাত ও সিয়াম পালন না করতে পারার কারনে তাদের ইবাদত বা দ্বীন অসম্পূর্ণ। এই মোক্ষম যুক্তির ক্ষেত্রেও নবী ঘুণাক্ষরেও বলেননি যে নারীদের হায়েয আল্লাহর হুকুমেই হয় এবং আল্লাহই নারিদের বুদ্ধি ও দ্বীন কমিয়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ নবী নিজেই তার যুক্তির অকাট্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন তাই এ ক্ষেত্রে আল্লাহর দোহাই আর প্রয়োজন হয় নি। হাদিসটি নিম্নে রেফারেন্স সহ উল্লেখ করা হল।

পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন / গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ) / অধ্যায়ঃ ৬/ হায়য (كتاب الحيض)
হাদিস নম্বরঃ ২৯৮ | 298 | ۲۹۸
পরিচ্ছেদঃ ২০৮। হায়য অবস্থায় সওম ছেড়ে দেওয়া
২৯৮। সা’ঈদ ইবনু আবূ মারয়াম (রহঃ) … আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একবার ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিতরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমরা সা’দকা করতে থাক। কারন আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা আরয করলেনঃ কী কারনে, ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমাণে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর না-শোকরী করে থাক। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যাক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চাইতে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি।
তাঁরা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষের অর্ধেক নয়? তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়য অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম থেকে বিরত থাকে না? তাঁরা বললেন, ‘হাঁ’। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ আছে” – এর সপক্ষে পেশ করা হাদিস সমুহ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ সংক্রামক রোগ বলতে কিছু নেই। কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই, সফর মাসকেও অশুভ মনে করা যাবে না এবং পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত রয়েছে তাও অবান্তর। তখন এক বেদুঈন বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উটের পাল অনেক সময় মরুভূমির চারন ভূমিতে থাকে, মনে হয় যেন নাদুস-নুদুস জংলী হরিণ। অতঃপর সেখানে কোন একটি চর্মরোগ আক্রান্ত উট এসে আমার সুস্থ উটগুলোর সাথে থেকে এদেরকেও চর্মরোগী বানিয়ে দেয়। তিনি বললেনঃ প্রথম উটটির রোগ সৃষ্টি করলো কে? মা’মার (রহঃ) বলেন, যুহরী (রহঃ) বলেছেন, অতঃপর এক ব্যক্তি আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেনঃ রোগাক্রান্ত উটকে যেন সুস্থ উটের সাথে একত্রে পানি পানের জায়গায় না আনা হয়।” আবূ হুরায়রার (রাঃ) এ হাদীস শুনে এক ব্যক্তি বললো, আপনি কি এ হাদীস বর্ণনা করেননি যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই, সফর মাসকে অশুভ মনে করবে না এবং পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত আছে তা অবান্তর?” তখন আবূ হুরায়রা বলেন, না, আমি তোমাদের নিকট এরূপ হাদীস বলিনি। যুহরী বলেন, আবূ সালামাহ (রাঃ) বলেছেন, তিনি অবশ্যই এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, তবে আমি আবূ হুরায়রা্কে এ হাদীস ছাড়া কখনো কোন হাদীস ভুলে যেতে শুনিনি। (সুনান আবু দাউদ ৩৯১১)

“…কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো।” (সহীহ বুখারী ৫৭০৭)


সাহাবি জাবের (রা.) বলেন, সাকিফের প্রতিনিধিদলের মধ্যে একজন কুষ্ঠ রোগী ছিলেন। তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে বায়াত হতে এসেছিলেন। রাসুল (সা.) তখন লোকমারফত তাকে বলে পাঠান, ‘তুমি ফিরে যাও। আমি তোমার বায়াত গ্রহণ করে নিয়ে নিয়েছি।’ (আস-সুনানুস সগির, খণ্ড : ৩, হাদিস : ২৫১৫)

ইবনু আবি মুলায়কা (র) থেকে বর্ণিতঃবায়তুল্লাহর তাওয়াফরত কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত এক মহিলার নিকট দিয়ে উমার ইবনু খাত্তাব (রা) যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর দাসী, অন্য মানুষকে কষ্ট দিও না। হায়, তুমি যদি তোমার বাড়িতেই বসে থাকতে। পরে উক্ত মেয়েলোকটি নিজের বাড়িতেই বসে থাকত। একদিন একটি লোক তাকে বললঃ যিনি তোমাকে বাড়ির বাহিরে যেতে নিষেধ করেছেন, তিনি ইন্তিকাল করেছেন। এখন তুমি বের হয়ে আসতে পার। মেয়েটি বলল, জীবদ্দশায় তাঁকে মানব, আর মৃত্যুর পর অবাধ্য হব, আমি এমন স্ত্রীলোক নই; হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) একক ভাবে বর্ণনা করেছেন (মুয়াত্তা ইমাম মালিক হজ্জ ৯৪৫)

“যখন তোমরা কোন্ অঞ্চলে প্লেগের বিস্তারের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।” (সহীহ বুখারী ৫৭২৮)

উপরের হাদিসগুলো থেকে এই দাবী করা হয় যে, যেহেতু কিছু রোগী বা রোগাক্রান্ত এলাকা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে নবী পরোক্ষভাবে রোগের সংক্রমণ স্বীকার করে নিয়েছেন। এই দাবীর ও প্রতিটি হাদিসের বিশ্লেষণের পূর্বে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত সুনান আবু দাউদ ৩৯১১ নং হাদিসটির দিকে লক্ষ্য করা যাক। যদিও হাদিসটিকে সহিহ বলা হয়েছে, এখানে দেখা যাচ্ছে যে আবু হুরাইরাহ হাদিসটি অস্বীকার করছেন, অন্যদিকে কোন সামঞ্জস্য ছাড়াই “রোগাক্রান্ত উটকে যেন সুস্থ উটের সাথে একত্রে পানি পানের জায়গায় না আনা হয়” – এই কথাটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আবূ হুরাইরাহ ছাড়াও আরও অনেক রাবী “রোগের কোন সংক্রমন নেই” এই ব্যাপারে অভিন্ন বর্ণনা দিলেও, রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সাথে একত্রে পানি পানের কথাটি বলেন নি। তবুও, এটি নবী বলেছেন, ধরে নিলেও এর মাধ্যমে নবী উটের সংক্রমণের কথা বলেছেন তা প্রমান হয় না। এর প্রমান নিম্নে বর্ণিত মুয়াত্তা মালিকের এই সংক্রান্ত হাদিসে।

পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
গ্রন্থঃ মুয়াত্তা মালিক
অধ্যায়ঃ ৫০. বদনজর সংক্রান্ত অধ্যায় (كتاب العين)
হাদিস নাম্বার: 1762
“রেওয়ায়ত ১৮. ইবন আতিয়া (রহঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, রোগের ছোঁয়াচ বা সংক্রমণ বলিয়া কিছুই নাই। পেঁচা অশুভ পাখি এবং সফর মাসে অমঙ্গলজনক কিছুই নাই। তবে রোগা উটকে সুস্থ উটের সহিত রাখিও না (বা বাধিও না)। অবশ্য সুস্থ উটকে যেখানে ইচ্ছা রাখিতে পার। অতঃপর সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই রকম কেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, রোগ একটি কষ্ট বিশেষ।[1]
[1] আরবে, বিশেষত অন্ধকার যুগে সাধারণ মানুষ বিশেষ বস্তু দেখিলে উহাকে অশুভ বলিয়া বিশ্বাস করিত। যেমন পেঁচা দেখিয়া তাহারা ধারণা করিত যে, আজ অমঙ্গলজনক কিছু ঘটিবে। পেঁচা ঘরের ছাদে বসিলে মনে করিত যে, এই ঘর বিরান হইয়া যাইবে অথবা এই ঘরে অচিরেই কেহ মারা যাইবে। এইগুলিকে এতদ্ব্যতীত অন্ধকার যুগের আরবরা সফর চাঁদকেও মনহুম বা অমঙ্গলজনক বলিয়া ধারণা পোষণ করিত, অথচ শরীয়তে এই সবের কোনই আমল নাই। আরবের কাফিরদের বিশ্বাস ছিল, রোগের মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে যে, সে ইচ্ছা করিলে যে কোন মানুষের দেহে প্রবেশ করিয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিতে পারে। অথচ ইহাও ভুল। আমাদের দেশেও এই জাতীয় অনেক রকমের কুধারণা সাধারণ মানুষের অন্তরে বিরাজ করিতেছে। শরীয়তে এই সমস্তের কোনই অস্তিত্ব নাই, বরং এইগুলিকে খারাপ আকীদা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, যেমন উক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে। অবশ্য এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগা উটকে সুস্থ উটের সাথে বাঁধিতে এইজন্য নিষেধ করিয়াছেন যে, একটির রোগ অপরটির জন্য কষ্টের কারণ হয় কিংবা দেখিতে বিশ্রী দেখায় বলিয়া ঘৃণার উদ্রেক হয়। যেমন যখমে পচন ধরিলে দুৰ্গন্ধ বাহির হয়। ফলে সুস্থ উটের জন্য ইহা কষ্টের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উদ্দেশ্যে বলেন নাই যে, একটির রোগ আর একটির মধ্যে প্রবেশ করিবে।“
(সুত্রঃ মুহাম্মদ রিজাউল করীম ইসলামবাদী অনুদিত মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রাঃ) দ্বিতীয় খণ্ড, তৃতীয় সংস্করন, ইফাঃ, ২০০১, পৃষ্ঠা ৬৬৬)

উপরের বর্ণনায় এটা অতি পরিস্কার যে নবী মোটেও সংক্রমনের আশঙ্কায় সুস্থ উটগুলোকে রোগাক্রান্ত উটের সাথে একত্রে পানি পানের জায়গায় আনতে বারন করেন নি। বর্তমান জামানায় যাতে মানুষ রোগের সংক্রমণ আছে এই জাহিলি আকিদায় বিশ্বাস না করে, এই ব্যাপারে মুহাদ্দিসে কেরাম অতি সচেতন, উপরের হাদিস ব্যাখ্যায় তা স্পষ্ট।
উপরন্তু, নবী নিজে বিবি খাদেজার সাথে বিবাহের পূর্বে দরিদ্র অবস্থায় উট, দুম্বা চড়িয়েছেন এবং হয়ত এই বেদুঈনের মত পর্যবেক্ষণ থেকে অন্তত এটা দেখেছিলেন যে, একটি চর্মরোগ আক্রান্ত উট থেকে সুস্থ উটগুলোর মধ্যে চর্মরোগ ছড়িয়ে পরে। কিন্তু নবী হওয়ার পর হয়ত নব্য ক্ষমতাবলে “জাহিলি” যুগের সকল ধারনার বিপরীতে নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য উনার “রোগের কোন সংক্রমন নেই” মতবাদটি চাপিয়ে দিয়েছেন। তবে, নবুয়তের ক্ষমতাবলে নবীর সকল হাইপোথিসিস যে সফল হয়েছিল সেটি বলা যায় না, বেশ কিছু পাণ্ডিত্য নবীর জন্য লজ্জাজনকও হয়েছিল বটে, উদাহরন দেখুনঃ

তালহাহ বিন উবায়দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে একটি খেজুর বাগান অতিক্রম করছিলাম। তিনি লোকদেরকে দেখলেন যে, তারা নর খেজুর গাছের কেশর মাদী খেজুর গাছের কেশরের সাথে সংযোজন করছে। তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ এরা কী করছে? তালহা (রাঃ) বলেন, তারা নর গাছের কেশর নিয়ে মাদী গাছের কেশরের সাথে সংযোজন করছে। তিনি বলেনঃ এটা কোন উপকারে আসবে বলে মনে হয় না। লোকজন তাঁর মন্তব্য অবহিত হয়ে উক্ত প্রক্রিয়া ত্যাগ করলো। ফলে খেজুরের উৎপাদন হ্রাস পেলো। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষয়টি অবহিত হয়ে বলেনঃ এটা তো ছিল একটা ধারণা মাত্র। ঐ প্রক্রিয়ায় কোন উপকার হলে তোমরা তা করো। আমি (এ বিষয়ে) তোমাদের মতই একজন মানুষ। ধারণা কখনো ভুলও হয়, কখনো ঠিকও হয়। কিন্তু আমি তোমাদের এভাবে যা বলি “আল্লাহ বলেছেন”, সেক্ষেত্রে আমি কখনো আল্লাহ্‌র উপর মিথ্যা আরোপ করবো না। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৪৭০, মুসলিম ২৩৬১, আহমাদ ১৩৯৮। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ

অন্য বর্ণনায়ঃ

আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু শোরগোল শুনতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, এটা কিসের শোরগোল? সাহাবীগণ বলেন, লোকজন নর খেজুর গাছের কেশর মাদী খেজুর গাছের কেশরের সাথে সংযোগ করছে। তিনি বলেনঃ তারা এরূপ না করলেই ঠিক হতো। অতএব তারা সে বছর উক্ত প্রক্রিয়া ত্যাগ করলো। এতে খেজুরের ফলন হ্রাস পেলো। তারা বিষয়টি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জানালে তিনি বলেনঃ তোমাদের একান্তই পার্থিব কোন বিষয় হলে সেটা তোমাদের নিজস্ব ব্যাপার এবং তোমাদের দ্বীনের কোন বিষয় হলে তা আমার কাছে রুজু করবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ ২৪৭১]

উপরের বর্ণনায় এটি স্পষ্ট বুঝা যায় যে নবী মোহাম্মাদ (দঃ) রোগের সংক্রমণের ব্যাপারে যতটা অজ্ঞ ছিলেন ঠিক ততটাই অজ্ঞ ছিলেন খেজুর গাছের পরাগায়নের মাধ্যমে ফল হওয়ার বিজ্ঞানের ব্যাপারে। অযথাই নবুয়তের পণ্ডিতি ফলাতে গিয়ে কিছু গরীব লোকের ফসলের বারোটা বাজালেন। “তোমাদের একান্তই পার্থিব কোন বিষয় হলে সেটা তোমাদের নিজস্ব ব্যাপার এবং তোমাদের দ্বীনের কোন বিষয় হলে তা আমার কাছে রুজু করবে।“ এই কথা নবী মোটেও রাখেন নি, নামাজের মাসালা-মাসায়েলের চাইতে বরং সকল পার্থিব বিষয়ে নবীর হাদিস রয়েছে, মলত্যাগ থেকে শুরু করে সঙ্গম কোনটাই বাদ পড়ে নি।

এবার আসা যাক কুষ্ঠ রোগী ও প্লেগ-মহামারী থেকে থেকে দূরে থাকার নির্দেশের মাধ্যমে নবী রোগের সংক্রমণকে স্বীকার করে নিয়েছেন কিনা এই প্রসঙ্গে। বাস্তবতা হল, কুষ্ঠ রোগ ও প্লেগ-মহামারীর ইতিহাস মানব সভ্যতার খুব আগে থেকেই প্রচলিত। বাইবেল ও ওল্ড টেস্টামেন্টে এই বিষয়ে প্রচুর উল্লেখ রয়েছে। কুষ্ঠ ও প্লেগ সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য পরে উল্লেখ করব, তবে এখানে এটা বলে রাখা প্রয়োজন যে যদিও প্লেগ একটি একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত একটি রোগ, জুডেও- খ্রিষ্টান ও ইসলামী ধর্ম গ্রন্থে, যে কোন প্রাণঘাতী মহামারী যা ব্যাপক প্রানহানি ঘটিয়েছে ও ঈশ্বরের ক্রোধ বা আযাব হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে তাকেই প্লেগ (আরবিতে তাউন) হিসাবে বলা হয়েছে। তৎকালীন আরব সমাজ তথা নবী মোহাম্মাদ (দঃ) কুষ্ঠ ও প্লেগ সম্পর্কে আহলে কিতাব ও অন্যান্য সুত্রে ভাল ভাবেই অবগত ছিলেন। কি ভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ে সেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া না জানলেও মানুষ সাধারন পর্যবেক্ষণ থেকে জানত যে কুষ্ঠ রোগ একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে ও এই রোগে অঙ্গহানি ও বীভৎসতা দেখে কুষ্ঠ রোগীদের এড়িয়ে চলত ও এইসব রোগীরা কোন পাপের সাজা ভোগ করছে এই ধারনায় তাদের সামাজিকভাবে নিগৃহীত করত। কোন মহামারী এলাকায় গেলে যে অন্যরাও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় – এটিও ছিল সাধারন পর্যবেক্ষণ যা মানুষ জানত খৃষ্ট পূর্ব আমল থেকেই। এর কোনটাই নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর আবিষ্কৃত নয়। কাজেই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে নবী মোহাম্মাদ (দঃ) তৎকালীন সমাজের প্রচলিত ধারনা বা মত অনুযায়ী কুষ্ঠ রোগী ও প্লেগ-মহামারী থেকে থেকে দূরে থাকার নির্দেশে দিয়েছেন। এই সকল হাদিসের বর্ণনার কোনখানেই নবী এ কথা বলেননি যে কুষ্ঠ বা প্লেগ সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়ায়।

নবী হিসাবে নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর জন্য এটাই বেশি উপযুক্ত হত যদি অন্যান্য আম জনতার মত কুষ্ঠ রোগীকে দূর দূর না করে তাদের চিকিৎসা বা অন্তত সামাজে সন্মানজনক অবস্থানের জন্য চেষ্টা করতেন। যিশু বা ঈসা নবী মোজেজার মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগী সারিয়ে তুলেছিলেন। নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর সেই ক্ষমতা ছিলনা তাই তিনি কুষ্ঠ রোগী দেখলে বাঘ বা সিংহ দেখলে যে ভাবে মানুষ পালায় সে ভাবে পালাতে বলেছেন। নীলফামারী, সিলেট ও মহাখালীতে তিনটি বিশেষায়িত কুষ্ঠ রোগ চিকিৎসা কেন্দ্র সহ সারা দেশে পাঁচটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং এর সাফল্যে বাংলাদেশে এই রোগ প্রায় নির্মূলের পথে।[৯] নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর কুষ্ঠ রোগের হাদিসকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বাংলাদেশ বরং মানবতার সেবা করে যাচ্ছে। নবী যে কুষ্ঠ রোগীদের থেকে দূরে থাকতেন তার আরও উদাহরন পাওয়া যায় তার বিবাহের ইতিহাসে। বানু আমির গোত্রের আমরা বিনতে ইয়াযিদকে বিবাহের পর নবী উনার শরীরে শ্বেতী রোগ বা কুষ্ঠ রোগের চিহ্ন দেখতে পান এবং সেই কারনে যৌন মিলনের পূর্বেই তাকে তালাক প্রদান করেন। (The History of al-Tabari, Vol 39, p 188 Biographies of the Prophet’s Companions and Their Successors/ Translated and annotated by Ella Landau-Tasseron)

অনেকে নিচে বর্ণিত নবীর সাথে কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত এক ব্যক্তির একত্রে আহারের দুর্বল হাদিস দেখিয়ে উনার মানবতার প্রমান দিতে চান। বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানী যথার্থই হাদিসটি বাতিল করে দিয়েছেন। যে নবী একমুখে কুষ্ঠ রোগী দেখলে কাছা খুলে দৌড় দিতে বলেছেন, ভয়ে কুষ্ঠ রোগীর হাত ধরে বায়াত গ্রহন করেন নি, ৩০ জন পুরুষের সমান যৌন ক্ষমতার অধিকারি হয়েও কুষ্ঠ সন্দেহে নব-পরিনিতা বিবিকে স্পর্শ করেননি তিনি হঠাৎ করে বলা নেই কওয়া নেই এক নাম না জানা কুষ্ঠ রোগীর হাত উনার খাওয়ার পাত্রে ডুবিয়ে দেবেন ভাবতে পারেন? যেই গর্ধব এই হাদিসটা জাল করেছে সে কি আগের কোন হাদিসের হদিস রাখে নি?

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ), থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত এক ব্যক্তির হাত ধরে তা নিজের আহারের পাত্রের মধ্যে রেখে বলেনঃ আল্লাহর উপর আস্থা রেখে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে খাও। [সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৫৪২] তাহকীক আলবানীঃ দুর্বল।[৩৫৪২] তিরমিযী ১৮১৭, আবূ দাউদ ৩৯২৫। মিশকাত ৪৫৮৫, দঈফাহ ১১৪৪ ।হাদিসের মানঃ দুর্বল হাদিস

কুষ্ঠ রোগ নিয়ে তো অনেক কথা হল, এখন দেখা যাক প্লেগ এর কারন নবীজি সংক্রমণ বলেছেন কিনা। নিম্নে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী প্লেগের কারন জ্বিনের খোঁচা!

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আমার উম্মতের ধ্বংস রয়েছে যুদ্ধ ও প্লেগ রোগে।” বলা হল, ‘হে আল্লাহর রসূল! যুদ্ধ তো চিনলাম, কিন্তু প্লেগ কী?’ তিনি বললেন, “তা হল জ্বিন জাতির তোমাদের দুশমনদের খোঁচা। আর উভয়ের মধ্যেই রয়েছে শহীদের মর্যাদা।” (আহমাদ ১৯৫২৮, ত্বাবারানী ১৬০৭নং) হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

প্লেগ রোগের বিজ্ঞান ও ইতিহাস

প্লেগ শব্দের ল্যাটিন উৎস অনুযায়ী এর অর্থ আঘাত। জুডেও- খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রন্থে, যে কোন প্রাণঘাতী মহামারী বা দুর্যোগ যা ব্যাপক প্রানহানি ঘটিয়েছে ও ঈশ্বরের ক্রোধ বা আযাব হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে তাকেই প্লেগ হিসাবে বলা হয়েছে, যেমন নবী মুসার সময় ঈশ্বর ফেরাউনের মিশরে ১০টি প্লেগ বা আসমানি বালা প্রেরন করেন, রোগব্যাধি ছাড়াও পঙ্গপালের আক্রমণও সেই অর্থে প্লেগ নামে পরিচিত ছিল। রোমান সম্রাজের গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন (১২৯-২১৬ খ্রিস্তাব্দ) বিশেষ মহামারী রোগের ক্ষেত্রে প্লেগ শব্দটি প্রচলিত করেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্লেগ Yersinia pestis (Y. pestis was discovered in 1894 by Alexandre Yersin, a Swiss/French physician and bacteriologist from the Pasteur Institute) নামক একটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রামিত একটি রোগকে বুঝানো হয়। এই জীবাণুটি ইঁদুরের দেহ থেকে ফ্লি (Flea, Xenopsylla cheopis)নামক ছারপোকার মত একটি পরজীবীর কামড়ের মাধ্যমে মানব দেহে সংক্রমিত হয়। প্রাচীনকালে রোগ সংক্রমণের এক সপ্তাহের মধ্যে শতকরা আশি ভাগ রোগীর মৃত্যু ঘটতো, কোন কোন ক্ষেত্রে এত দ্রুত মৃত্যু হত যে ঐতিহাসিক Black death এর সময় বলা হত যে একজন দুপুরের আহার তার পরিবারের সাথে করার পর তার রাতের খাবারটি গ্রহন করতে পরকালে তার প্রয়াত সজ্বনদের সাথে মিলিত হত। ফ্লি ছারপোকাটি ইঁদুরের রক্ত গ্রহন করে Yersinia pestis ব্যাকটেরিয়া দিয়ে নিজে সংক্রমিত হয়ে পড়ে, ব্যাকটেরিয়াটি ফ্লির উদরে বংশ বিস্তার করে তার খাদ্যনালী বন্ধ করে দেয়, ফলে বারবার কামড় দিয়েও সে তার উদরপূর্তি করতে পারে না এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় আশেপাশের সকল প্রানি তথা মানুষকে কামড়াতে থাকে এবং Yersinia pestis ব্যাকটেরিয়া মানব দেহে প্রবেশ করে প্লেগ রোগ তৈরি করে। জীবাণুটি র প্রথমে লসিকা গ্রন্থিতে (Lymph nodes) সংখ্যা বৃদ্ধি করে কুচকি, বগল বা গলার লসিকা গ্রন্থিগুলোকে ডিমের মত ফুলিয়ে দেয় যাকে বলা হয় Bubo, সেই থেকে এই ধরনের প্লেগকে Bubonic plague বলা হয়। (Three types of plagues are bubonic plague, septicemic plague and pneumonic plague). পরে দ্রুত জীবাণুটি সারা শরীর ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত রোগীর মৃত্যু ঘটায়। স্ফীত লসিকা গ্রন্থিগুলো ফেটে পুঁজ রক্ত বের হয়ে যেতে পারে, শরীরেরে বিভিন্ন অংশ রক্তক্ষরণে কাল বর্ণ ধারন করায় মধ্য যুগে এটি Black death নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রাচীন কাল থেকেই প্লেগ রোগের ইতিহাস পাওয়া যায়[১০], যেমন ঃ

Plague of Athens (429-426 BCE) (death toll: 75,000-100,000), Antonine Plague (165 – c. 180/190 CE) (death toll: 5 million), Plague of Cyprian (250-266 CE) (death toll 500,000 to 190,000; 5000 per day), Plague of Justinian (541-542 CE & onwards) (death toll: 50 million), Roman Plague (590 CE), The plagues of the Near East, Plague of Sheroe (627-628 CE) which killed the Sassanian monarch Kavad II (r. 628 CE) whose birth name was Sheroe, claimed 200,000 lives in Basra in three days. Black Death (1347-1352 CE) (death toll estimated at 30 million people), Columbian Exchange (1492-1550 CE), Bombay plague epidemic 1896.

যেমনটি পূর্বে উল্লেখিত প্রাচীন ইতিহাসে ও ধর্মগ্রন্থে যে কোন প্রাণঘাতী মহামারী বা দুর্যোগকে প্লেগ বলা হয়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ভাবে, উপরে উল্লেখিত মহামারী গুলোর মধ্যে জাস্টিনিয়ান প্লেগ (৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দ ও এর ধারাবাহিকতায় কয়েকটি মহামারী), ব্ল্যাক ডেথ (১৩৪৭-১৩৫২ খ্রিস্টাব্দ) ও বোম্বে প্লেগ (১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ) Yersinia pestis জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত প্লেগ রোগ হিসাবে প্রমানিত হয়েছে। অন্য মহামারী গুলোর কারন হিসাবে Yersinia pestis দ্বারা প্লেগ ছাড়াও small pox, measles, influenza, typhus ইত্যাদি নানা কারন হতে পারে বলে বর্ণনা করা আছে, যেমনটি ইসলামের সুরা ফীলে বর্ণিত আবাবিল পাখি কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত ইয়েমেন শাসক আবরারের বাহিনী গুটি বসন্ত বা small pox মহামারীর কবলে পড়েছিল বলে কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়।

Yersinia pestis জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত প্লেগ রোগ বহন করা ইঁদুরের আদি উৎপত্তি চীনের ইউনান প্রদেশে। আদি বাণিজ্য পথ যেমন সিল্ক রুট বা নৌ পথে জাহাজের মাধ্যমে খাদ্য শস্যের সাথে প্লেগ রোগ বহন করা ইঁদুর মিশর, সিরিয়া, পারস্য সহ ইউরোপীয় শহরগুলো যেমন ইতালি, তৎকালীন বাইজেনটিন কন্সতান্তিনপল বা ইস্তামবুল দিয়ে সমস্ত ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। যে সকল পরিবেশ ইঁদুরের বংশ বিস্তারের জন্য অনুকুল যেমন খাদ্য গুদাম ও ঘন মানব বসতি ইত্যাদি বিভিন্ন জনপদে প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে।

প্লেগ,মহামারী, ধর্ম ও সমাজ

প্লেগ ও অন্যান্য মহামারী প্রাচীন ও মধ্যযুগে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যার আলোচনা এই পরিসরে করা সম্ভব নয়। পরস্পর নিরন্তর যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ তৎকালীন রোমান ও পারস্য সম্রাজ্য প্লেগের আক্রমনে দুর্বল হয়ে পড়ে ও বিপুল পরিমান সৈন্য ও লোকবল হারায় এবং তাদের সীমান্ত এলাকাগুলো বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে প্রতিহত করার ক্ষমতা হারাতে থাকে। মরুময় আরব অঞ্চল গুলো ইঁদুরের মাধ্যমে প্লেগ ছড়ানোর জন্য সে ভাবে সহায়ক নয়। এই বিষয়গুলো পরবর্তীতে মরুচারী ইসলামি আরব বাহিনীর মিসর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও পারস্য বিজয়ে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

যে কোনো রোগ, মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে ঈশ্বর -আল্লাহ-দেব- দেবীর রোষ বা গজবের ফল এই ধারনা মোটেও আজকের নয়, যে আদিকাল থেকে মানব সমাজে শক্তিমান ঈশ্বর -আল্লাহ-দেব- দেবীর ধারনা তৈরি হয়েছে , সেই সময় থেকেই মানুষ এই গজবের ধারনা বহন করে আসছে। বর্তমান করোনা ভাইরাসের মহামারীতে আমাদের মোল্লা – পুরুতরা এমনকি শিক্ষিত মানুষরাও জেনেটিক ভাবে সেই ধারণাই বহন করে আসছে। এই দুর্যোগের কারন হিসাবে মানুষের পাপ, অশ্লীলতা ইত্যাদিকে যে দায়ি করে, এটাও প্রাচীন আমল থেকেই প্রতিষ্ঠিত ধারণা, বাইবেল – তাওরাতে সুস্পষ্ট ভাবে এটি উল্লেখিত। এমনিকি ইয়াহুদিদের দাউদ নবি আদমশুমারি করলে ঈশ্বর ক্ষেপে গিয়ে প্লেগ পাঠিয়ে ৭০,০০০ মানুষকে পরপারে পাঠিয়ে দেন[১১]। আদি কাল থেকেই মানুষ ঈশ্বর -আল্লাহ-দেব- দেবীর মন গলাতে নানা উপাসনা, কোরবানি,নরবলি, জিকির-আসগর, তওবা, ইস্তেগফার করে আসছে। ব্ল্যাক ডেথ (১৩৪৭-১৩৫২ খ্রিস্টাব্দ) সময়কালের প্লেগ যা তৎকালীন ইউরোপের ৩০-৫০% জনসংখ্যার মৃত্যু ঘটায়, এর ইতিহাস ও পরবর্তী প্রভাবের ঐতিহাসিক দলিল ভাল ভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এখানে অতি সংক্ষেপে শুধু প্লেগের সময়ে ধর্মীয় প্রভাবটি উল্লেখ করব। তৎকালীন মধ্যযুগীয় ইউরোপ ছিল অতি ধর্মপরায়ণ একটি ক্যাথলিক চার্চ প্রভাবিত ও শাসিত সমাজ। প্লেগের কারন হিসাবে পোপ, পাদ্রি ও চার্চ মানুষের পাপাচার, অশ্লীলতা, যাদুবিদ্যা ও ডাকিনী বা ডাইনী বিদ্যাকে দায়ী করেন। প্লেগের প্রতিকার হিসাবে চার্চ, গনপ্রার্থনা, প্রার্থনা মিছিল, রোজা পালন ইত্যাদি ব্যাবস্থা গ্রহন করেন। এই সকল গন জমায়েতের ফলে প্লেগের আর বিস্তার ও ব্যাপক প্রানহানি ঘটতে থাকে। এ ছাড়াও যারা রোগীর চিকিৎসা ও শুশ্রসা করতেন তারা সকলেই আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করতে থাকেন। এমনকি ব্যাপক হারে পাদ্রি ও ধর্মগুরু মরতে থাকায় শেষকৃত্য করার মত প্রশিক্ষিত পাদ্রি পাওয়া দুস্কর হয়ে পরে। তৎকালীন খ্রিস্টীয় সমাজ এই রোগের জন্য সংখ্যালঘু ইয়াহুদিদের দায়ি করে পুড়িয়ে মারা শুরু করে। ঈশ্বরের রোষ থেকে বাঁচার জন্য পাপ মোচনের উপায় হিসাবে একটি খ্রিস্টীয় দলের উদ্ভব হয়, বিশেষত জার্মানিতে , যারা সাদা পোশাক পরে নিজের পিঠে চাবুক মেরে ঈশ্বরের ক্ষমা প্রার্থনা করত, এদের বলা হত Flagellants। (ড্যান ব্রাউনের নভেল অবলম্বনে দ্যা ভিঞ্চি কোড মুভিতে শ্বেতী রোগাক্রান্ত খ্রিস্ট ভক্ত সাইলাস Opus Dei নামক একটি খ্রিস্টীয় দলের সদস্য যে এইরূপ স্বেচ্ছা নির্যাতনের মাধ্যমে পাপমোচনের প্রথা অনুসরণ করে)

করোনা ভাইরাস
প্লেগ মহামারী থেকে রক্ষা পেতে ঈশ্বরের অনুগ্রহ চেয়ে নিজের পিঠে চাবুক মারছে ধর্মপ্রাণ খৃস্টীয় ভক্তকুল

তবে এতে ঈশ্বরের মন গলে নি। সেই সময়কার রোগ ছড়ানোর ধারনা ছিল গালেনিও মাইয়াসমা (miasma) বা দূষিত বায়ু তত্ত্ব, তৎকালীন মুসলিম সমাজও এই তত্ত্ব গ্রহন করেছিল। এতে মনে করা হত মাটিতে পচনশীল জৈব পদার্থ থেকে নির্গত দুষিত বায়ুর মাধ্যমে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে মৃতের দ্রুত গভীর কবরে দাফন সহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিশেষ কোন ফল হয়নি। একই বিশ্বাসে মানুষ দূষিত বায়ু প্রতিরোধে নাকে সুগন্ধি মাস্ক ও প্লেগ চিকিৎসকগন পাখির ঠোঁটের মত মাস্ক ব্যবহার করত যার ভেতর সুগন্ধি দ্রব্য ভরা থাকত।

করোনা ভাইরাস
সুগন্ধি মাস্ক ও পিপিই পরিহিত প্লেগ চিকিৎসক

ব্ল্যাক ডেথের ব্যাপক মৃত্যুতে ও চার্চের কোন প্রার্থনায় কোন কাজ না হওয়ায় ক্যাথলিক চার্চ, পাদ্রি ও ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি মানুষ আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সুদুর প্রসারী প্রভাব হিসাবে প্রটেস্টান্ট ধর্মের পথ সুগম করলেও, ইউরোপে মুক্তচিন্তা ও রেনেসাঁর দ্বার উন্মুক্ত হয়ে পরে। রাষ্ট্রীয় নীতিতে ও বিজ্ঞান বিষয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম আজ পর্যন্ত তার সেই পুরানো কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা আর ফিরে পায় নি। বর্তমান দুনিয়ার মুসলিম সমাজে সর্ববিষয়ে আধিপত্য করে ইসলাম ও ইসলামিসম। প্রথমদিকে কাফির, শিয়া, নাসারা দেশে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর সংবাদে আমাদের ইসলামি মোল্লা – মাশায়েখগন যেভাবে খুশিতে বগল বাজাচ্ছিলেন তারা আশা করি ব্ল্যাক ডেথের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবেন, কারন, এতক্ষণে জেনে গেছেন যে সংক্রামক রোগ কোন ধর্মের বাছ বিচার করে না, আর যখন মানুষ দেখবে আপনাদের পড়া পানি,ওয়ায আর দুয়া দরূদ দিয়ে মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না তখন তাদের ঈমানেও বড় ধরনের ঝাঁকি লাগবে।

ইসলামে প্লেগ-মহামারী-গজব-রহমত

হাদিস ও অন্যান্য আদি ইসলামি লেখনীতে প্লেগ ও মহামারী বলতে তাউন ও ওয়াবা শব্দ দুটো ব্যবহার করা হয়েছে, বলা হয়ে থাকে যে, সাধারন সকল মহামারী বলতে ওয়াবা ও বিশেষ ভাবে প্লেগ বুঝাতে তাউন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ৮৪০ সালের পর প্লেগ শব্দটি হাদিসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মোদ্দা কথা হল মক্কা মদিনার প্রাক ইসলামিক ও নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর সমসাময়িক আরবরা এই প্লেগ মহামারী সম্পর্কে ধারনা পেয়েছিল ইয়াহুদিদের তাওরাত থেকে এবং সেই সাথে তৎকালীন বাইজেনটিন সিরিয়া মিশর থেকে। এর প্রমান আপনারা পাবেন যখন হাদিসে দেখবেন নবী প্লেগকে ইয়াহুদি জাতির প্রতি গজব হিসাবে বর্ণনা করেছেন। নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর সমসাময়িক আরবরা এইটুকু বুঝত যে প্লেগ একটি ভয়াবহ মহামারী এবং প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে যেই যাবে সেই মারা পরবে আর ইয়াহুদি-খ্রিস্তান পাদ্রি-পুরুত কেউই এই রোগ থেকে বাঁচতে পারে নি। এই সত্যটি ইসলামি হাদিস – ফিকাহতে কিভাবে এসেছে সেটা কিছুটা আলোচনায় আসবে। এ কথা সত্য, নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর এই রোগের সংক্রমণ কিভাবে হয় সে সম্পর্কে বিন্দু মাত্র ধারনা ছিলনা। বহু প্রাচীন আমল থেকেই মানুষ ছোঁয়াচে রোগাক্রান্ত অন্য অঞ্চলের ব্যাক্তিদের নিজ শহরে ঢুকতে দিত না, এটাও ছিল একটি প্রচলিত সত্য। যারা “যখন তোমরা কোন্ অঞ্চলে প্লেগের বিস্তারের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।”- সহি বুখারীর এই হাদিস নিয়ে নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর চিকিৎসা বিজ্ঞানে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য প্রাচীন কোয়ারেনটিনের রেফারেন্স পরে উল্লেখ করবো, তবে এখানে উল্লেখ্য যে এই ধারনাটি আগে থেকেই প্রচলিত। আজকের বাংলাদেশের এক শ্রেণির মোল্লা-মাশায়েখ যেমন বলে থাকেন যে করোনা মহামারী মুমিন মুসলমানদের হয় না, তাদের হতাশ করে বলতে হচ্ছে ইতিহাসে বহু মহামারী মুমিন মুসলমানদের বেশুমার প্রাণহানি ঘটিয়েছে।

ইসলামে সবচেয়ে আলোচিত প্লেগটির নাম আমওয়াসের প্লেগ[১২] (৬৩৮-৬৩৯), ফিলিস্তিনের আমওয়াস শহরের নাম অনুযায়ী এই প্লেগের নামকরন করা হয়েছে, মৃত্যু সংখ্যা ২৫,০০০-৩০,০০০। সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, ইরাকে ছড়িয়ে পড়া এই প্লেগটি জাস্টিনিয়ান প্লেগের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি। সিরিয়ায় বাইজেনটিন বা রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদা ইবনে জারাহ ও তৎকালীন ইসলামের খলিফা উমরকে কেন্দ্র এই প্রসঙ্গে যে ইতিহাসটি বর্ণনা করা হয়, রোগের সংক্রমণ, মহামারী ও তাকদীর সংক্রান্ত হাদিসের সমন্বয় নিয়ে মুহাদ্দিসদের বিতর্কে তা একটি বহুল আলোচিত বিষয়। অতি সংক্ষেপে, খলিফা উমর সিরিয়ায় অবস্থানরত বিশাল মুসলিম সেনাদলের সেনাপতির পদ থেকে খালেদ বিন ওয়ালিদকে বরখাস্ত করে এই পদে আরেক বিখ্যাত সাহাবি আবু উবাইদা ইবনে জারাহকে বসান। প্রসঙ্গত, বলে রাখি নবী যেই দশজন সাহাবিকে আগাম জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছিলেন ইবনে জারাহ তাদের একজন। ১৭ হিজরি বা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ওমর সিরিয়ার মুসলিম সেনাদলকে সাহায্য বা পরিদর্শন করতে মদিনা থেকে সিরিয়ার পথে বের হন কিন্তু এই সময় সিরিয়াতে প্লেগ রোগের খবরে তাবুকের ‘সারগ’ নামক এলাকার কাছে যাত্রা থামিয়ে সেনাপতি আবু উবাদাহ ও অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। এইক্ষেত্রে খলিফা উমর তার নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী প্লেগ আক্রান্ত সিরিয়ায় মুসলিম সেনা বাহিনীর সাথে যোগ দেবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন এই নিয়ে মদিনার আনসার ও মুহাজিরদের মতামত চান। উভয় দলই এই বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত মত দেন। অবশেষে, মক্কার সিনিয়র কুরায়িশগন যারা কিছুদিন পূর্বেও কাফির ছিলেন ও মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের ছায়াতলে আসেন, তারা বলেন “আপনি মদিনায় ফিরে যান কারন এটি এমন একটি রোগ যা আমাদের ধ্বংস ডেকে আনবে” উমর এই মতটি গ্রহন করলেন ও তার বাহিনীকে জানিয়ে দিলেন যে তারা মদিনায় ফিরে যাবেন। স্বভাবতই, মনঃক্ষুণ্ণ আবু উবাইদা ইবনে জারাহ উমরকে প্রশ্ন করেন “ আপনি কি আল্লাহর পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন?” খলিফা উমর এই উত্তরে বলেন “ হে আবু উবাদাহ, এমন কথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ বলত!’ মূলত ওমর (রা.) তাঁর মতভিন্নতাকে অপছন্দ করেছেন।“ওমর (রা.) আবু উবায়দার প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদীর থেকে অন্য তাকদীরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছি। যেমন মনে করো, তোমার অনেক উট আছে। তা নিয়ে তুমি এক উপত্যকায় এসেছ। উপত্যকার দুটি প্রান্ত আছে। এক প্রান্ত উর্বর। আরেক প্রান্ত শুষ্ক। তুমি উর্বর প্রান্তে উট চরালে কি আল্লাহর তাকদীরের ওপর নির্ভর করবে না? এবং শুষ্ক প্রান্তে চরালেও কি আল্লাহর তাকদীরের ওপর নির্ভর করবে না?’কিছুক্ষণ পর আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এলেন। কোনো এক প্রয়োজনে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, এ বিষয় সম্পর্কে আমার জ্ঞান আছে। আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে শুনেছি, ‘তোমরা কোনো অঞ্চলে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা শুনলে তাতে প্রবেশ করবে না। তবে সেখানে থাকাবস্থায় প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়লে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না।’ এ কথা শুনে ওমর (রা.) আলহামদুলিল্লাহ বললেন। পরে দলবল নিয়ে মদিনায় ফিরে যান। মদিনায় খলিফার কাছে সিরিয়া, মিশর ও ইরাক থেকে প্লেগে মৃত্যুর খবর আসতে থাকলে উনি আবু উবাইদা ইবনে জারাহকে এক পত্রে পরামর্শ করার ছুতায় মদিনায় চলে আসতে বলেন। নিজের অধীনে থাকা বিশাল সেনাদের ফেলে পালিয়ে যাওয়া আবু উবাইদা শ্রেয় মনে করেন নি বিধায় উনি উমরের আমন্ত্রন ফিরিয়ে দেন। এই খবরে উমর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, এতে তার সঙ্গিরা জিজ্ঞাস করেন “আবু উবাইদা কি মারা গেছেন?” উত্তরে উমর বলেন “মারা যায় নি, তবে মারা যাওয়ার পথে”। একটি বর্ণনায় আছে উমর আবু উবাইদাকে তার সেনাদল নিয়ে উচ্চভুমিতে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন, অন্য বর্ণনায়, আবু উবাইদা সহ অন্যান্য নেতার মৃত্যুর পর,আমর ইবনুল আস এই বলে সেনাদের নিয়ে উচ্চভুমিতে পালিয়ে যান যে, “রোগ আগুনের লেলিহান শিখার মত ছড়িয়ে পড়ছে”। তখন আবু ওয়ায়িল হুযালী প্রতিবাদ করে বলেন “ আল্লাহর কসম আপনি ঠিক বলেন নি। আপনি আল্লাহর রসুলের সাহচর্য পেয়েছেন বটে, কিন্তু আপনি আমার এই গাধার চেয়েও নিকৃষ্ট”।( সম্ভবত, আবু ওয়ায়িল হুযালী নবীর, ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই, এই হাদিসে বিশ্বাসী ছিলেন) আমর ইবনুল আসের পদক্ষেপ খলিফা উমর অপছন্দ করেন নি। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসীর আল- দামেশকী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭, ইফাঃ ২০০৫)। আবু উবাইদা, তার পরের সেনাপতি মুয়াদ ইবনে জাবাল তার দুই পুত্রসহ প্লেগে মারা যান। এই মহামারীতে নবীর প্রথম শ্রেণির সাহাবা, তাবেইন সহ প্রায় ২৫০০০ ইসলামের সৈনিক প্রান হারান। মুয়াদ ইবনে জাবাল তার শেষ ভাষণে মুসলিম সেনাদের চাঙ্গা করতে এই মহামারীকে তাদের প্রতি আল্লাহর রহমত হিসাবে বয়ান করে যান। ৪০০০ এর মত মুসলিম সেনা সিরিয়ার জাবিয়া নামক গোলান উচ্চভুমির নিকটবর্তী স্থানে পালিয়ে প্রান রক্ষা পান।

উপরের ঘটনা “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” হাদিসকে কিভাবে প্রভাবিত করবে তার ফিকহী বিশ্লেষণ পরে আসবে, তবে, সাধারন জ্ঞান বা কমনসেন্স দিয়ে উপরের ঘটনার ব্যাবচ্ছেদ করা যাক। খলিফা উমর নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর যত বড় সাহাবী হন না কেন, উনি প্লেগ মহামারীর ব্যাপকতা দেখে নবীর “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” – এটা যে চরম মূর্খতা সেটা ভালই বুঝেছিলেন। উমরের বিভিন্ন জনের সাথে পরামর্শের যে বর্ণনাই থাক না কেন, উনি যে, পালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মতামত আশা করছিলেন, সেটা বর্ণনায় স্পষ্ট। মক্কার সিনিয়র কুরায়িশগন যারা কিছুদিন পূর্বেও কাফির ছিল, তারা অন্তত, অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিল যে, এই মহামারীতে পা দেওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু আর নবীর ছোঁয়াচে হাদিস এদের ছুঁতে পারেনি কারন ইসলামি ভাইরাস তখনও সম্ভবত এই সিনিয়র কুরায়িশদের কমনসেন্স নষ্ট করতে পারেনি। দ্বিতীয় বিষয়টি হল, এই ইতিহাস বর্ণনার সময়, ইস্লামিস্টগন উমরকে নানা ভাবে মহিমান্বিত করে থাকেন। উনি আল্লাহ্‌র উপর ভরসা না করে, প্লেগের ভয়ে মুসলিম সেনাদল ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। “আমরা আল্লাহর এক তাকদীর থেকে অন্য তাকদীরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছি” – উমরের এই কথায় অনেকে বিশাল মারেফত খুঁজে পান, তবে সত্যটা হল, আপনি আপনার পছন্দমত কিছু একটা করে দোষটা আল্লাহর উপরে চাপিয়ে দেবেন আর বলবেন “সবই আল্লাহর তকদীর”। এটা ছাড়াও, প্রায় অর্ধ লক্ষ মুসলিম সেনাদের প্লেগের হাতে ফেলে দিয়ে উমর শুধু পদমর্যাদার ভিত্তিতে আবু উবাইদাকে মদিনায় পালিয়ে আসতে চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি কিভাবে সকল মুসলিম উম্মার আমিরুল মুমেনিন হতে পারেন?

তবে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালানোর ঘটনা উমরের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম নয়। হুনায়িনের যুদ্ধে পলায়ন করে উমর এটাকেও আল্লাহর হুকুম বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। নবীর মক্কা বিজয়ের পর আশেপাশের সকল গোত্রকে ইসলামি শাসনের আওতায় আনার জন্য হাওয়াজিন ও সাকীফ গোত্রকে ১২,০০০ সৈন্য নিয়ে নবী মোহাম্মাদ (দঃ) আক্রমন করেন হুনায়িনের যুদ্ধে। মুসলিমদের বিপুল সংখ্যাধিক্যের কারনে অবশেষে জয়লাভ করলেও, যুদ্ধের শুরুতে প্রতিপক্ষের নিখুঁত তীর নিক্ষেপে মুসলিম সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকে। নবী তার সাদা রঙের দুলদুল খচ্চররের উপর অসহায় হয়ে উপবিষ্ট ছিলেন, তার ঘনিষ্ঠ কিছু বানু হাশিম গোত্রের অনুচর ছাড়া সকলেই পালাতে থাকেন। নবী বারবার তারস্বরে বলতে থাকেন ঃ

“আমি অবশ্যই নবী, এ কথা মিথ্যা নয়। আমি ইবনু আবদুল মুত্তালিব”।

(সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী) / হাদিস নাম্বার: ৪৫০৭)

পলায়নপর সাহাবীদের মধ্যে উমরও ছিলেন। আবু কাতাদা বর্ণিত সহি বুখারির হাদিসে এসেছে “পলায়নরত মুসলিমদের মধ্যে উমর বিন খাত্তাবকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এদের কি সমস্যা হয়েছে? উমর উত্তর দিল “এটি আল্লাহর হুকুম”।[১৩] প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চল থেকে নবীর হাদিস অমান্য করে পালানোর ঘটনা এটাই একমাত্র না,নবীর বিখ্যাত সাহাবী আল মুগিরা বিন শুবা উমরের শাসন আমলে কুফার শাসক ছিলেন (উম্মে জামিল নামের নারীর সাথে জেনা করে হাতেনাতে ধরা পড়েও রজম থেকে বেঁচে যান উমরের বিচারে), প্লেগ শুরু হলে আল মুগিরা পালিয়ে যান তবে শেষ পর্যন্ত প্লেগেই মারা যান।

“ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” হাদিস বিতর্কে ইবনে হাজার আল আসকালানীর বিশ্লেষণ

ইবনে হাজার আল আসকালানী (১৩৭২-১৪৪৯) একজন বিখ্যাত হাদীস বিশারদ, শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহ এবং মুসলিম ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত ফতহুল বারী বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধতম ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর অন্যতম। মুসলিম বিশ্বে প্লেগের মহামারীর প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা ও নিজের দুই কন্যাকে প্লেগে হারানো এই প্রখ্যাত মুহাদ্দিস একদিকে “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” আবার অপর দিকে সংক্রমণের আশঙ্কায় “কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো”, এই পরস্পর বিরোধী হাদিস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তার বিখ্যাত ফতহুল বারী গ্রন্থের দশম খণ্ডে। সেই আলোচনা অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল। (সুত্রঃ Written and Researched by (Mufti) Abdul Waheed, Answer Attested by Shaykh Mufti Saiful Islam. Thu 17 Rajab 1441AH 12-3-2020AD JKN Fatawa Department। )

উপরে বর্ণিত সংক্রমণ বিষয়ক পরস্পর বিরোধী হাদিস নিয়ে ইসলামিক আলেম ও স্কলারগন ভীষণ ভাবে দ্বিধাবিভক্ত। কেউ একটি হাদিসকে গুরুত্ব দিয়ে অপরটিকে বাতিল বা মানসুখ করে দিয়েছেন, কেউ বা একটিকে অপরটির চাইতে শ্রেয় (preference) মনে করেছেন আবার কেউ কেউ পরস্পর বিরোধী হাদিস দুটোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার প্রয়াশ পেয়েছেন।

১। এক দল কুষ্ঠ রোগী থেকে পালানোর হুকুমকে বাতিল করেছেন এবং কুষ্ঠ রোগীর সংস্পর্শে আসা ও একত্রে খাওয়া জায়েজ বলে মত দিয়েছেন।
২। এক দল বলছেন কুষ্ঠ রোগী থেকে পালানোর হুকুমকে বাতিল হয়নি, তবে রোগী থেকে পালানো শ্রেয় এবং একত্রে খাওয়াও অনুমোদন যোগ্য।
৩। আরেক দল বলছেন যে এই দুই হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব নয়, এই দলটি দুই ভাগে বিভক্ত,

৩(ক) একটি উপদলের মতে “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” এটিই সহিহ মত। অন্য কথায় কুষ্ঠ রোগী থেকে পালানোর বা সাবধান হওয়া কোনটিরই প্রয়োজন নাই। এনারা এর পক্ষে বিবি আয়েশা বর্ণিত একটি হাদিস উদ্ধৃত করেন যেখানে বলা আছে যে আয়েশার ঘরে এক কুষ্ঠ রোগ আক্রান্ত দাস আসত ও খেত যা নবী নিষেধ করেন নি।

৩(খ) আরেকটি উপদল কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং উপরে আয়েশা বর্ণিত হাদিসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যেমন ইমাম তিরমিযি (রাঃ)।

উপরের সকল ইসলামি আলেমদের মতামত পর্যালোচনা করে ইবনে হাজার আল আসকালানী পরস্পর বিরোধী হাদিস দুটোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার পক্ষে মত দিয়েছেন এই কারনে যে দুটো হাদিসই সহিহ। এর ব্যাখ্যা হিসাবে উনি নিম্নক্ত মত প্রদান করেছেন।

১। ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই এটা মেনে কুষ্ঠ রোগী থেকে পালানোর আদেশ এই কারনে দেওয়া হয়েছে কারন একজন সুস্থ ব্যাক্তি একজন কুষ্ঠ রোগীর কাছে আসলে তার প্রতি ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকানোর সম্ভবনা আছে এবং এর ফলে কুষ্ঠ রোগীর মনে কষ্টের উদ্রেক হতে পারে। এই মনঃকষ্ট হওয়ার সম্ভবনা দূর করার জন্যই কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২। আবু বকর বাকিলানি (রাঃ) এর মতে কুষ্ঠ রোগ একটি ব্যাতিক্রম যা সংক্রমিত হতে পারে কাজেই শুধু এই ক্ষেত্রে “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” – এই হাদিসটি বাতিল হবে।
৩। রোগের সংক্রমনের পক্ষে ও বিপক্ষের হাদিস দুটি দুই ভিন্ন পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” এটি নবী মুজবুত ঈমানের লোকদের জন্য দিয়েছেন, তারা আল্লাহর হুকুম ছাড়া রোগের সংক্রমণ হয় না এই বিশ্বাসের উপর শক্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত, কাজেই কারো সংস্পর্শে এদের রোগ হলেও, এই মুজবুত ঈমানের লোকরা এটিকে আল্লহর হুকুমে হয়েছে এই তকদীরে বিশ্বাস করবে এবং রোগটি আল্লাহই দিয়েছেন সংক্রমনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায় নি এই বিশ্বাসের উপর স্থির থাকবে। অপরদিকে, দুর্বল ঈমানের ব্যক্তির জন্য কুষ্ঠ রোগী থেকে পালানোর হুকুমটিই শ্রেয় কারন সে রোগাক্রান্ত হলে ভাববে যে সংক্রমণের মাধ্যমেই তার রোগ হয়েছে, এতে তার ঈমান আরও নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা।

ইবনে হাজার আল আসকালানীর সময় জীবাণুর মাধ্যমে রোগের সংক্রমণের বিজ্ঞান আবিষ্কৃত হয়নি, যার পরিপ্রেক্ষিতে হাদিস স্কলারগন উপরে বর্ণিত ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। বর্তমান মডার্ন ডিজিটাল আলেমগন রোগ জীবাণুর অস্তিত্ব সম্পর্কে ভালভাবেই ওয়াকিবহাল এবং নিজেরা রোগাক্রান্ত হলে নবীর কালজিরার চিকিৎসা বাদ দিয়ে কাফির-মুশরিকদের আবিষ্কৃত চিকিৎসা গ্রহন করে থাকেন এবং জীবাণুর সংক্রমণের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের শরণাপন্ন হন। রোগের সংক্রমণের মডার্ন ব্যাখ্যা যেটি সবচেয়ে বহুলভাবে প্রচারিত সেটি হল ঃ

“জাহিলি যুগে কাফির-মুশরিকদের এই ধারনা ছিল যে আল্লাহর হুকুম ছাড়াই রোগ নিজে নিজেই একজন হতে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। জাহিলি এই ধারনা বাতিল করার জন্যই নবী বলেছেন “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই”। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুমেই রোগ বিস্তার লাভ করে।“

ছোঁয়াচে রোগের হাদিস ব্যাখ্যার নিধার্মিক বিশ্লেষণ

আল্লাহ, ভগবান, দেব-দেবী বা জীন –পরীর মাধ্যমে রোগ ব্যাধি, মহামারী, ভুমিকম্প হয় এটি নিজ নিজ ধর্মীয় মত অনুযায়ী বিশ্বাসের বিষয় এবং যে কেউ তার পছন্দমত বিশ্বাস করতেই পারে এর সাথে বৈজ্ঞানিক প্রমান বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সত্যের কোন সম্পর্ক নেই। হিন্দু লৌকিক দেবী ওলাইচণ্ডীকে মুসলমানরা বলে ওলা বিবি যা কিনা এই কিছুদিন আগেও গ্রাম বাংলার মানুষ কলেরা রোগের কারন হিসাবে মনে করত। ওলা বিবির আগমনে কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত, এমন অনেক মানুষ পাওয়া যেত সেই সময় যারা ওলা বিবিকে আসতে ও মহামারী শেষ হয়ে গেলে অন্য গ্রামে চলে যেতে দেখেছে। শুনতে খারাপ শুনালেও আল্লাহর হুকুমে রোগের সংক্রমণ হয় আর ওলা বিবির মাধ্যমে কলেরা মহামারী হয় এই দুই বিশ্বাসের মধ্যে কোন গুনগত পার্থক্য নাই, বরং ওলা বিবির অনুরূপ মহামারীর দেবীর কথা স্বয়ং নবীই বলেছেন। সহি হাদিসটি নিম্নে উল্লেখ করা হল।


আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি মাদীনাহ সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্বপ্নের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন। তিনি বলেছেনঃ আমি দেখেছি এলোমেলো চুল ওয়ালা একজন কালো মহিলা মাদীনাহ থেকে বের হয়েছে। অবশেষে মাহইয়ায়া নামক জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম যে, মদীনার মহামারী মাহইয়া‘আহ তথা জুহ্‌ফা নামক জায়গায় স্থানান্তরিত হল।( সহি বুখারি, হাদিস নং ৭০৩৯,আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৬২) হাদিসের

মানঃ সহিহ হাদিস

“জাহিলি” বা মূর্খতার যুগে কাফির-মুশরিকদের ধারনা যে আল্লাহর হুকুম ছাড়াই রোগ নিজে নিজেই একজন হতে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে – এই ধারনাই বরং বিজ্ঞানের বেশি কাছাকাছি , আল্লাহ নিজে বা ফেরেস্তা পাঠিয়ে রোগ ছড়াচ্ছেন এই দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

“আল্লাহর হুকুমে রোগ হয় আর আল্লাহর হুকুমে রোগ সারে” এই নিয়তিবাদী ধারনা যে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অনুসন্ধিৎসা ও আবিস্কারের পথে বিশাল অন্তরায়। “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই” আর যা হয় সবই আল্লাহর ইচ্ছা – এই চিন্তা করে রোগের কারন, প্রতিকার ও প্রতিরোধের চেষ্টা ও গবেষণা না করলে এতো দিনে “আল্লাহর হুকুমে” নানা রোগ ব্যাধিতে মানব সভ্যতা উজাড় হয়ে যেত। আপনারা অবগত আছেন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কয়েকটি ধাপে কোন একটি সিদ্ধান্তে পৌছায়। প্রথমে পর্যবেক্ষণ, পরের ধাপে পর্যবেক্ষণটির ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন, এরপর হাইপোথিসিস বা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দাড়া করানো, অতঃপর পরীক্ষার মাধ্যমে হাইপোথিসিস বা সম্ভাব্য ব্যাখ্যাকে যাচাই করন, পরবর্তিতে পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে সঠিক কারন নির্ণয় অথবা হাইপোথিসিস ভুল প্রমানিত হলে পুনরায় আগের ধাপ গুলো থেকে কাজ শুরু করা। লক্ষ্য করুন কোন বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন বা অনুসন্ধান না করলে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রথম স্তরই পার হওয়া যায় না। বলা বাহুল্য নিয়তিবাদীতা আর “আল্লাহর হুকুম ছাড়া একটি গাছের পাতাও নড়ে না” – এই বিশ্বাস, জাতি হিসাবে মুসলিমদের তেরশত সালের পর থেকে সবচেয়ে পশ্ছাদপদ জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। আল্লা- খোদা – ভগবান – ঈশ্বরের সর্বময় ক্ষমতা প্রচার করতেই পারেন তবে এই বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতাটিও মাথায় রাখবেন। তাকদীরের উপর সব ছেড়ে দিতে বলে মডার্ন মুমিন ও ডিজিটাল মোল্লা – পুরুতরা মুসলিম জাতির নিজের মগজটিকে কাজে লাগানোর সব পথ বন্ধ করে রেখেছেন।

রোগের সংক্রমণে তাকদীর বা ভাগ্য প্রসঙ্গে

করোনা ভাইরাস বিশ্বমহামারীর পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব আর এর প্রাণঘাতী ফলাফল কেউই অস্বীকার করতে পারছেন না, আমাদের সমাজের মোল্লা – মাশায়েখগনও এর বাইরে নন। কাজেই এই ভাইরাসের অস্তিত্ব মেনেই উনারা বিভিন্নভাবে এর সংক্রমণ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ ওয়ায নসিয়ত করে চলেছেন। সকল তত্ত্বের মধ্যে করোনা ভাইরাস নিয়ে যে ইসলামিক বিশ্লেষণটি সবচেয়ে বেশি মার্কেট পেয়েছে তা হল ঃ “করোনা ভাইরাস দেহে প্রবেশ করলেও আল্লাহর হুকুম ছাড়া রোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।“ এই তত্ত্বটি ইতোমধ্যে ফলাফল দিতে শুরু করেছে এবং সরকারি আদেশ অমান্য করে আমাদের হাজার হাজার মুসুল্লিগন গনদোয়া, জানাজায় শরিক হয়ে করোনা ভাইরাসকে ইসলামী বুড়োআঙুল দেখাতে শুরু করেছেন। করোনা ভাইরাসের মত যে কোনো প্রাণঘাতী মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষ কোন অতিপ্রাকৃত শক্তিমান সত্তার আশ্রয় খোঁজে , এটি যে কোনো ধর্মের অনুসারিরদের জন্য প্রযোজ্য। মানুষের সাথে এই ঈশ্বর – আল্লাহর সম্পর্ক অতি অদ্ভুত ও প্রাচীন। কোন সরকার কাজে ব্যার্থ হলে আমরা সমালোচনা করি, রোগী মারা গেলে লোকজন ডাক্তারের দোষারোপ করে, সেই দিক থেকে ঈশ্বর – আল্লাহর এক অনন্য অবস্থানে, কোন মহামারী, সুনামি, ভুমিকম্পে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ, শিশু, পশু, পাখী মারা গেলে আমরা ঈশ্বর – আল্লাহর সমালোচনা করি না বরং যারা বেঁচে গেছে তারা শোকর করে ও ঈশ্বর – আল্লাহকে ধন্যবাদ দেয়। প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম সমুহ থেকে শুরু করে আধুনা আব্রাহামিক ধর্মের ঈশ্বর সমুহ সকলেই সর্বকালে বোধগম্য বা অবোধ্য কোন কারনে, কোন ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিসমুহের বা জাতির কথিত “পাপের” কারনে যুগে যুগে অসংখ্য গজব – মহামারী নাযিল করেছেন এতে নির্বিচারে মারা গেছে বহুজন, বহু জনপদ, বহু জাতি এমনকি নবজাতক শিশুও বাদ যায় নি। সকল ধর্মে ঈশ্বরের এই কাজের দায়মুক্তি দেওয়া আছে আর কেউ কখনো কৈফিয়ত দাবী করে নি, অনেকে বলেন এতে আল্লাহর হেকমত আছে যা মানুষের জ্ঞানে বোধগম্য নয় আবার অনেকে উদাহরন দেন যে, “আপনাকে একটি পিঁপড়া কামড়ালে আপনি পুরো পিঁপড়ার কলোনিটি ধ্বংস করে দেন, আল্লাহ ঐ একি কাজটিই করেন, একজনের পাপে গোটা দেশ বা জাতিকে ধ্বংস করে দেন।“ একজন বিচারক এক খুনির ফাঁসির সাথে যদি তার নিরাপরাধ গোটা পরিবাবের ফাঁসি দিয়ে দেন, জানি না আপনারা ঐ পিঁপড়ার উদাহরন দিয়ে বিচারকের ভুল বিচারের পক্ষে রায় দেবেন কিনা। ঈশ্বর – আল্লাহর খামখেয়ালীপনা, অবিচার, নির্বিচার সবই আমাদের কাছে এক লীলাখেলা, ঈশ্বর – আল্লাহর সব কাজের কৈফিয়ত আমরা নিজেরাই দিয়ে দেই। ঈশ্বর – আল্লাহ একজন অতিমানব আমরা কল্পনায় তার উপর কল্পনাতীত ক্ষমতা আর গুণাবলী আরোপ করি আর দিয়ে দেই অফুরান দায়মুক্তি।(তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। সুরা আম্বিয়াঃ আয়াত ২৩) (ঈশ্বর – আল্লাহ কেন্দ্রিক এই ধর্ম বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের একটি ভিডিও লেকচারের লিঙ্ক দেওয়া হল[১৪], এতে জ্ঞানীদের জন্য চিন্তার খোরাক রয়েছে।)

অতিপ্রাকৃত, সর্ব শক্তিমান এই ঈশ্বর – আল্লাহর কাছে আমজনতার অসহায় আত্মসমর্পণের সুযোগ গ্রহন করে আমাদের মোল্লা – পুরুত আর ধর্মগুরুরা আর এই কারনেই যতই হাদিসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তাহাকীক-তর্জমা করুন অথবা করোনা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক তথ্য দিন, সবশেষে উপসংহার – “সবই আল্লাহর হুকুম”। এই পজিশনটি সবার জন্যই সুবিধাজনক, মোল্লা-পুরুতদের কথা বাদ দিলাম সরকার, প্রশাসন, মন্ত্রী, আমলা সবাই এই ঈশ্বর – আল্লাহর হুকুমের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যান।


কোরানে বলা আছে হেদায়েত তথা ঈমান সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন সে-ই সঠিক পথ লাভ করে। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন তার জন্য তুমি কোনো অলি (পৃষ্ঠপোষক-অভিভাবক) কিংবা মুরশিদ (পথপ্রদর্শক) পাবে না।’ (কাহফ : ১৭, ইসরা : ৯৭, আরাফ : ১৭৮)। ‘আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে আর সঠিক পথে পরিচালিত করেন না। আর এ ধরনের লোকদের (সঠিক পথ পেতে) কেউই সাহায্য করতে পারে না।’ (নাহল : ৩৭।) আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০(পঞ্চাশ) হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ্ তা’আলা সৃষ্টজীবের ভাগ্য সমূহ লিখে রেখেছেন। [সহি মুসলিম ইফাঃ-৬৫০৭] কোরান-হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষের সবকিছুই পূর্ব নির্ধারিত অর্থাৎ তাকদীর বা ভাগ্যলিখন – এর পক্ষেই সব দলিল থাকায়, ইসলামের ইতিহাসে বিশেষত আব্বাসীয় খিলাফতের সময়, মানুষ তার কর্মে স্বাধীন কিনা? সবই যদি আল্লাহর হুকুমে হয় তাহলে পাপের দায় মানুষ নেবে কেন? আল্লাহর কাজ কি অনৈতিক হতে পারে? ইত্যাদি নানা দার্শনিক প্রশ্নে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সম্বলিত নানা মতের উদ্ভব হয়, যার বর্ণনা এই লেখার পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে, দুইটি মতধারা উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রথমত, যুক্তিবাদী মুতাযিলাপন্থী যারা, মানুষ কাজ কর্মে ও ইচ্ছায় স্বাধীন ও ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ মুক্ত ও নিজের কর্মের জন্য দায়বদ্ধ – এর মতের অনুসারী। দ্বিতীয়ত, আশারী মতবাদ, যেটিকে এক বাক্যে প্রকাশ করা কঠিন তবে আশারী মতবাদ অনুসারে মানুষ তার ইচ্ছায় স্বাধীন কিন্তু তার ইচ্ছা অনুযায়ী কর্ম করার ক্ষমতাটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। অন্য কথায়, কেউ খুন করার জন্য কারো গলায় ছুরি চালালে, এই খুন করার ইচ্ছার জন্য সে স্বাধীন, কাজেই অপরাধী, কিন্তু খুনের কর্মটির ক্ষমতা আল্লাহর হাতে, এবং আল্লাহ চাইলে ছুরি চালালেও ভিকটিমের গলা নাও কাটতে পারে, অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম ছাড়া ছুরির ধারে গলা কাটবে না। বিখ্যাত আশারী স্কলার ইমাম গাজ্জালির তুলা ও আগুনের উদাহরণটি দিলে ব্যাপারটি পরিস্কার হয়ে যাবে। তুলা আগুনের সংস্পর্শে আসলে পুড়ে যায়, কিন্তু আগুনের পোড়ানোর বা তুলার পুড়ে যাবার নিজের ক্ষমতা নাই, তারা পরস্পরের সংস্পর্শে আসার পর আল্লাহর হুকুমে পুড়ে যায় এবং আল্লাহ চাইলে সংস্পর্শে আসার পরও তুলা পুড়বে না। মুলত যুক্তিবাদী মুতাযিলা মতের ফলে বহুলাংশে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা খর্ব হওয়া ছাড়াও যুক্তিকে ঐশী বানীর উপরে স্থান দেওয়া ও তাকদীরের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার বিপরীতে নিয়তিবাদী আশারী মতবাদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সুন্নি মুসলিম উম্মাহ কালাম বা দর্শনের দিক দিয়ে মুলত আশারীপন্থী ও নিয়তিবাদী। তবে সালাফিপন্থিরা কালাম বা যে কোন যুক্তিবাদের চর্চাকে কুফরি মনে করে ও আশারী মতবাদকে সঠিক আকিদা বলে মনে করে না আর অনেক সালাফিপন্থিরা এই আকিদাকে সম্পূর্ণ বিদাতি ও কুফরি আকিদা বলে মনে করে। (এই বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত তথ্য সম্বলিত ভিডিও লিঙ্ক আগ্রহী পাঠকদের জন্য দেওয়া হল [১৫])

“করোনা ভাইরাস দেহে প্রবেশ করলেও আল্লাহর হুকুম ছাড়া রোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।“ – এই অমোঘ বানীটি নানা মাপের, নানা জ্ঞানের মোল্লা – মাশায়েখ, ডিজিটাল আলেম যত্রতত্র বলে বেড়ালেও এর দার্শনিক উৎপত্তি উপরে বর্ণিত আশারী মতবাদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর হুকুমে সবকিছু হয় এই বিশ্বাসের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ভাগ্যে বা তাকদীরে বিশ্বাস। আল্লাহর একত্ব ও নবী মোহাম্মাদ (দঃ) কে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল হিসবে বিশ্বাস করা যেমন মুসলমান হওয়ার মূলনীতি ভাগ্যে বা তাকদীরে বিশ্বাসও একটি মূলনীতি, যা বিশ্বাস না করলে একজন ছরাছর কাফের হয়ে যাবে। “হে বৎস আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ” যে ব্যক্তি [তাকদীরের উপর] বিশ্বাস ব্যতীত মৃত্যুবরণ করল, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সুনান আবী দাউদ, হাদীস নং ৪৭০০)”

মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার সাহেবের ইসলামে ছোঁয়াচে রোগের বিষয়ে লেখা ও ভিডিওর ব্যাপারে ফিরে আসি। রোগের কোন সংক্রমন নেই অথবা ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই – এই হাদিসের বিপরীতে মিনার সাহেবও এই আশারীপন্থী মত প্রকাশ করেছেন ও এর সমর্থনে রেফারেন্সে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মোদ্দাকথা করোনা ভাইরাস উসিলা মাত্র, আল্লাহ না চাইলে করোনা ভাইরাস দিয়ে গোসল করলেও কেও আক্রান্ত হবে না। এই দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও শতাব্দি ধরে প্রচলিত আল্লাহর হুকুমের উপর বিশ্বাস নিয়ে তো আর কোন যুক্তি প্রমান চলে না, এটি যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার। তবে আমাদের “গর্জনশীল চল্লিশা” মোল্লা – মাশায়েখ ও ইসলামিক করোনা ভাইরাস বিশেষজ্ঞগন অতি সহজে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে সব ‘ইসলাম- বিদ্বেষীদের” দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিয়ে দিতে পারেন। এই ক্ষেত্রে একটি Case control study করা যেতে পারে। অর্থাৎ এক গ্রুপে ১০০ জন ইসলামের সৈনিক করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের পরিচর্যা করল (মাস্ক, পিপিই ছাড়া) অন্য গ্রুপে ১০০ জন নিজ বাসায় অবস্থান করল। ১৪ দিন পর দুই গ্রুপের লোকদের সকলের করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করা হল। এখন ইসলামী দাবী অনুযায়ী, এই দুই গ্রুপের করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার মধ্যে কোন বেশ কম পাওয়া যাবে না। কিন্তু, যদি দেখা যায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা গ্রুপে অনেক বেশী করোনা টেস্ট পজিটিভ পাওয়া যায়, তবে আল্লাহর হুকুম ছাড়া করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসলেও রোগের সংক্রমণ হবে না এই দাবিটি মিথ্যা প্রমানিত হয়ে যাবে, কারন আল্লাহই যদি করোনা রোগ কারো শরীরে ঢুকিয়ে রোগ সৃষ্টি করেন, সেই ক্ষেত্রে নিজ বাসায় লক ডাউনে থাকা ১০০ জনের মধ্যেও সমান হারে করোনা রোগ পজিটিভ হওয়ার কথা। তবে, আমার সন্দেহ আছে, হাদিসের প্রতি এই ঈমানী জোর কয়জন মুমিনের মধ্যে পাওয়া যাবে সেটাই দেখার বিষয়। ইতোমধ্যে খবরে পড়লাম নাস্তিকদের বহু দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়া ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বইয়ের ইসলামিস্ট লেখক নবীর হাদিসের উপর ভরসা করতে না পেরে চিকিৎসকের দায়িত্ব ফেলে চম্পট দিয়েছেন। (করোনা আতঙ্কে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি পালিয়ে গেছেন গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. আমিরুজ্জামান মোহাম্মদ সামসুল আরেফিন। ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, আপডেট: ২০২০-০৩-২৯ ১১:৫৯:৩১ এএম)

আল্লাহর হুকুম ছাড়া ভাইরাসের রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা নাই, এই ইসলামী মতের আর কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন, একজন ডায়বেটিস রোগীকে বলেতে পারেন যে উনি চাইলে এক কেজি রসগোল্লা খেয়ে ফেলতে পারেন, রক্তে সুগার বাড়বে না যদি না আল্লাহ না চান। রোগ ব্যাধি বা বিজ্ঞানের বিষয়ে উপদেশ পরামর্শ খুবই নির্দিষ্ট (specific) এবং এতে কোন দুই অর্থবোধক বা ভুল বোঝার কোন অবকাশ নাই। অর্থাৎ, করোনা রোগ এড়াতে যে সব স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হয়, সেখানে একথা বলার অবকাশ নাই যে আপনি চাইলে হাত ধুতেও পারেন আবার নাও পারেন, একি ভাবে কোন চিকিৎসক বলবেন না যে আপনি ধূমপান করেন বা না করেন আল্লাহ না চাইলে আপনার হৃদরোগ বা ফুসফুসের রোগ হবে না। আমি জানি না, ছোঁয়াচে রোগের সব হাদিস বিশ্লেষণ করে ইসলামি হকুমত অনুযায়ী এই রোগ প্রতিরোধে আমাদের মোল্লা – মাশায়েখ বা মিনার সাহেবরা কি উপদেশ দেবেন। মিনার সাহেবের পুরো ভিডিও দেখে যেই ইসলামী মেসেজ বা পরামর্শ পেলাম,সেটিকে একটি উদাহরন দিয়ে বুঝানো যায়। আপনি আপনার বাচ্চাকে আগুন সম্পর্কে সাবধান করছেন, সাধারনভাবে আপনি তাকে বলবেন সে যেন আগুনে হাত না দেয়। কিন্তু, ইসলামী মতটি হবে, “বাবা আগুনে হাত দিতেও পার নাও দিতে পার, হাত পুড়বে কিনা নির্ভর করবে আল্লাহর হুকুমের উপর।

“ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই- এই হাদিসের উপর আমল করে মুমিন মুসলমানের জন্য মাস্ক পরা ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ মুলক ব্যাবস্থা গ্রহন নবীর এই হাদিসের পরিপন্থী কিনা এর বিপরীতে সুরা বাকারাহঃ ১৯৫ নং আয়াতটি মিনার সাহেবের মত অনেক মডার্ন ইসলামিস্ট দলিল হিসাবে দিয়ে থাকেন, আয়াতটিতে বলা হয়েছে “ তোমরা আল্লাহর পথে ব্যায় কর এবং নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করিও না”। এখানে “নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করিও না” এই বাক্যটিকে রোগ প্রতিরোধে মাস্ক পরা, হ্যান্ড সানিটাইজার ব্যাবহারের পক্ষে কোরানের নির্দেশ বলে বলা হয়ে থাকে। এই ব্যাখ্যাটি সালাফের বুঝ ও আদি তাফসীরের পরিপন্থী এবং অপ্রাসঙ্গিক ভাবে গোঁজামিলের উদ্দেশ্যে বলা হয়। এখানে জিহাদ ছেড়ে দিয়ে ছেলে মেয়ে,পরিবার ও ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়াকে ধ্বংসের শামিল বলা হয়েছে, এখানে রোগ প্রতিরোধের কোন বিষয়ই নেই। অনেকে এটিকে জিহাদে আত্মঘাতী হামলার বিপরীতে পেশ করতে চান সেটিও এখানে বলা হয় নি (বিস্তারিত বর্ণনার জন্য, তাফসীর ইবনে কাসীর,অষ্টম সংস্করণ ২০০৮, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড , পৃষ্ঠা ৫৪০, অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর পাবলিকেশন কমিটি)

মিনার সাহেবের লাইভে একজন ইসলামিস্ট চিকিৎসক রোগ সংক্রমণের “Theological explanation” নামের এক অভিনব তত্ত্বের কথা জানালেন, ভিডিওর ৩১:৩৭ মিনিটে উনাদের হোস্টেলে জলবসন্ত (Chicken pox) রোগের সংক্রমণের এক গল্প শুনে আক্কেল গুড়ুম হওয়ার যোগাড়। গল্পটি এরকম, এক রুমে চারজন মেডিকেল ছাত্র ছিল তাদের একজনের জলবসন্ত হয়, একজন ছাত্রের আগেই জলবসন্ত হওয়ার সে জলবসন্ত ভাইরাসে ইমিউন, বাকি দুই ছাত্রের মধ্যে একজন জলবসন্ত হওয়ার ভয়ে রুমের কোনায় অবস্থান করা শুরু করল আর অপরজন জলবসন্ত আক্রান্ত বন্ধুর সেবা করল। এক সপ্তাহ পরে তাজ্জব ঘটনা, যে বন্ধু রুমের কোনায় অবস্থান নিয়ে ছিল তার জলবসন্ত হল আর যে বন্ধু আক্রান্ত বন্ধুর সেবা করল তার জলবসন্ত হল না, লাইভে চিকিৎসক সাহেব জানালেন যে, এই বন্ধুর আগে কখনো জলবসন্ত হয়নি, অর্থাৎ এই রোগের বিরুদ্ধে তার দেহে আগে থেকেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে ছিল না। মুলত, এই ইসলামিস্ট চিকিৎসক এই গল্পের মাধ্যমে রোগ সংক্রমণের “Theological explanation” অর্থাৎ ভাইরাস রোগীর সংস্পর্শে আসা বন্ধুর দেহে প্রবেশ করলেও আল্লাহর হুকুমে জলবসন্ত রোগের সংক্রমণ ঘটাতে পারল না অপর দিকে রোগী থেকে রুমের ভিতর দূরে থাকা বন্ধুর দেহে ভাইরাস আল্লাহর হুকুমে জলবসন্ত রোগের সংক্রমণ ঘটাল- সুবহানাল্লাহ! ইসলামিস্ট চিকিৎসক সাহেবের গল্প সত্য মিথ্যা কিনা জানি না তবে এই ঘটনার বর্ণনায় চিকিৎসক সাহেব বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ভুল করেছেন, জলবসন্ত রোগের সংক্রমণের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান না থাকার কারনে। প্রথমত, যে বন্ধু জলবসন্ত হওয়ার ভয়ে রুমের কোনায় অবস্থান করছিল তার জলবসন্ত হওয়ার সম্ভবনা মোটেও কম নয় কারন জলবসন্ত সংক্রমিত হওয়ার জন্য সরাসরি রোগীর সাথে স্পর্শ জরুরী নয়, করোনা ভাইরাসের মতই জলবসন্ত নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে (droplet infection), দ্বিতীয়ত জলবসন্ত রোগের লক্ষণ অর্থাৎ ত্বকে জলবসন্ত রোগের ফোস্কা প্রকাশ পাওয়ার এক থেকে দুই দিন আগে থেকেই রোগী এই রোগ ছড়াতে থাকে[১৬], কাজেই, দূরে থাকা বন্ধু এই সময় ভাইরাস বহনকারী বন্ধুর সংস্পর্শে আসতে পারে। এবার আসা যাক, রোগীর সংস্পর্শে আসা বন্ধুর কেন জলবসন্ত হল না। এর পেছনে যে সব কারন থাকতে পারে তা হল ঐ বন্ধু আগে জলবসন্ত রোগের ভাক্সিন নিয়ে ছিল অথবা তার ছোটবেলায় জলবসন্ত হয়েছিল যা ছিল mild অথবা ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেও রোগের প্রকাশ না ঘটিয়েই (subclinical infection)[১৭] তার দেহে জলবসন্ত রোগের ইমুনিটি তৈরি করেছিল। ইসলামিস্ট চিকিৎসক সাহেব আরেকটি বৈজ্ঞানিক ভুল করেছেন, তা হল রোগীর সংস্পর্শে আসার এর সপ্তাহের মধ্যে রোগাক্রান্ত হওয়া, কারন জলবসন্ত রোগ রোগীর সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ২১ দিন পর প্রকাশ পায় (Incubation period), তবে এটি চিকিৎসক সাহেব খুব বড় কোন ভুল করেন নি। রোগ সংক্রমণের কারন নির্ণয়ে চিকিৎসক সাহেবের উচিৎ ছিল চিকিৎসক হিসাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত্তিতেই রোগাক্রান্ত হওয়া বা না হওয়ার কারন নির্ণয় করার চেষ্টা করা। চিকিৎসা বিজ্ঞান কোন মারেফতি বিদ্যা নয় কাজেই চিকিৎসক হিসাবে “Theological explanation” নয় Medical explanation খোঁজাই উনার জন্য যথাযথ হত, আর ইসলামি ওয়ায নসিয়ত করতে আসলে সেটা ভিন্ন কথা, তবে তা করতে হবে চিকিৎসক পরিচয়ের অপব্যবহার করে নয়। দুঃখজনক যে ইসলামিজমের প্রভাবে আমাদের দেশে ইসলামিস্ট চিকিৎসক শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা রোগীর প্রেসক্রিপশনে ঔষধের পাশাপাশি কয়বার সুরা ফালাক আর নাস পড়তে হবে লিখে দেন, সার্জন অপারেশনের রোগী টেবিলে রেখে সালাত আদায় করতে চলে যান কেউ বা ছুটি না নিয়ে কর্মক্ষেত্র ফাঁকি দিয়ে চিল্লায় চলে যান। সাধারন মানুষরা এই সব ইসলামিস্ট চিকিৎসকদের দেখে আরও বিভ্রান্ত হন। কাজেই বিজ্ঞানের ব্যাপারে এইসব “Theological explanation” আমদানিকারকগন এমনিতেই অশিক্ষিত-কুশিক্ষিত জাতির আরও বারোটা বাজান। মিনার ভাই আরেকটি ভুল করেছেন সেটি হল কুষ্ঠ রোগকে সাংঘাতিক ভাবে ছোঁয়াচে (highly contagious) বলেছেন এটি সত্য নয় এর সংক্রমণের মাত্রা জলবসন্ত, হাম, প্লেগ বা করোনা ভাইরাসের চেয়ে অনেক কম। তাই কুষ্ঠ রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্য কর্মীদের সাধারনত আক্রান্ত হতে দেখবেন না আর কুষ্ঠ রোগীদের সাথে মাদার তেরেসার অন্তরঙ্গতার ছবি আপনারা হরহামেশাই দেখেছেন। কাজেই “কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো” নবীর এই হাদিস শুধু অমানবিকই নয় অবৈজ্ঞানিকও বটে। মিনার ভাই এ ব্যাপারে যে পুস্তকের তথ্য দেখিয়েছেন সেটা সম্ভবত অনেক পুরানো এডিশন এবং পুস্তকের ভুল, এ ব্যাপারে যে কেউ সংক্রামক রোগের হালনাগাদ বই অথবা কুষ্ঠ রোগ বা সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে পারেন, রেফারেন্সে CDC র লিঙ্ক দেওয়া হল।[১৮]

মডার্ন তাফসীর কারকগণের ছোঁয়াচে রোগের হাদিসের উসুল না হয় শোনা গেল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনাদের অনেক বড় গলা কিন্তু এর বিপরীতে বহু আলেম ওলামারা এই ছোঁয়াচে রোগের, প্লেগ মহামারীর হদিস যে ভাবে বলা হয়েছে ঠিক সে ভাবেই বুঝেছেন, উদাহরণ হিসাবে একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীনের লেখা তুলে ধরলামঃ
“এ হাদীসে মহামারি কবলিত স্থানে কেউ থাকলে তাকে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে এ ঈমানী বিশ্বাসের ভিত্তিতেই যে, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। অধিকন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো, এমতাবস্থায় যাতে সেখান থেকে চলে আসার দ্বারা তার মনে এ বিশ্বাস স্থান না পায় যে, সে সেখানে থাকলে সেই রোগে আক্রান্ত হবে।অপরদিকে উক্ত হাদীসে মহামারি কবলিত স্থানে কাউকে যেতে নিষেধ করা হয়েছে এ জন্য যে, যাতে সেখানে গিয়ে আল্লাহর হুকুমে সেই রোগে আক্রান্ত হলে, সে তার সেই ঈমানী পরীক্ষায় ফেল না করে এবং তার ঈমানকে নষ্ট না করে ফেলে এ কথা ভেবে যে, সেখানে যাওয়ার কারণেই তার এ রোগ হয়েছে। কেননা, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। বরং সবার সব রোগই মহান আল্লাহর হুকুমে নতুনভাবে হয়।মোট কথা, মহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো সেই রোগ হতে পারে না। সেই ভিত্তিতে প্রথম জনের যেভাবে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ হয়েছে, তেমনি অন্যজনেরও আল্লাহর হুকুম হলে নতুনভাবে সেই রোগ হবে। আর আল্লাহর হুকুম না হলে কিছুতেই তার সেই রোগ হবে না। এ বিশ্বাসই সকল মুমিনের অন্তরে পোষণ করতে হবে।সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে এভাবে সর্বাবস্থায় ঈমান রক্ষা করে বেশী বেশী ইস্তিগফার করা আমাদের কর্তব্য। আর মহান আল্লাহর নিকট দু‘আ-প্রার্থনা ও ইবাদত-জিকিরে মশগুল থাকা উচিত। (ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত আকিদা : করোনা ভাইরাস যেন আমাদের ঈমানকে নষ্ট না করে, মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী , মাসিক আদর্শ নারী পত্রিকায় March 18, 2020 তে প্রকাশিত)। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামিয়াত নাম সহ এক ইসলামি সাইটে ছোঁয়াচে রোগের সব হাদিসের বিশ্লেষণ করে ভিন্ন কোন আলেম নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত দিয়েছেনঃ
“স্মরনীয় যে, চিকিৎসা শাস্ত্রে পাঠ্য সূচীতে ইসলামি জ্ঞান না থাকার কারনে কোন কোন চিকিৎসকগন কিছু কিছু রোগ সম্পর্কে যেমন- চর্মরোগ, খুজলী পাঁচড়া, কুষ্ঠ, কলেরা- বসন্ত ইত্যাদি রোগকে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক বলে থাকে। যেটা শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ !! কাজেই এমন শরীয়ত বিরোধী কুফরী আক্বীদা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ ও ওয়াজিব !!” (noorejulfikar / 29/04/2014)

ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত সকল হাদিস, সকল মুহাদ্দিস, শায়েখ, ডিজিটাল মডার্ন আলেম, মুকাল্লিদ, গায়রে-মুকাল্লিদ আলেমদের সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এ পর্যন্ত যা আলোচনা করা হল এর পরিপ্রেক্ষিতে যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়,

“কইন চেন দেহি ইসলামে কি ছোঁয়াচে রোগ আছে নাকি নাই?”

আমি হলফ করে বলতে পারি বেশির ভাগের কাছে সহজ উত্তর হবে “কিছুই বুঝলাম না” অথবা কেউ বলবে আছে, কেউ বলবে নাই, অর্থাৎ বিষয়টি পরিস্কার হল না। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কিন্তু বেশ ভয়াবহ। এই হাদিসটি কিন্তু কোন রাম, শ্যাম, যদু, মদু বলেন নি, এটি বলেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব যার প্রতিটি কথা, নির্দেশ মুসলমানদের জন্য কিয়ামত অবধি অবশ্য পালনীয়। আরও চিন্তার বিষয় উনি শেষ নবী, কোন হাদিস না বুঝলে যে পরের নবীকে জিজ্ঞাসা করবেন সেই সুযোগটিও নেই। এর চেয়েও বড় ব্যাপার হল, নবী তার উম্মতের জন্য যা বলেন সেটার নির্দেশ আসে সরাসরি সেই সাত আসমানের উপরে আরসে আসীন মহান আল্লাহ তালার কাছ থেকে, আর উনিও নিশ্চয়ই চেয়েছেন উনার পেয়ারে নবীর মাধ্যমে ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত সঠিক ধারনাটি এই মুসলিম উম্মাহ যাতে লাভ করেন। কথা হল, এই হাদিসটির নির্দেশনা, আসল অর্থ আমরা কেউই বুঝলাম না, তার উপর এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে আলেমদের রীতিমত গলদঘর্ম হবার জোগাড়, এই ব্যার্থতাটি কার? নবীর নাকি আল্লাহর?

করোনা ভাইরাস নিয়ে ইসলামি দাবী সমুহঃ প্রশ্ন – উত্তর পর্ব

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে দেশের আম জনতার স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান সহ তাবৎ ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবনের নির্দেশনার উৎস আমাদের ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখ- ওলামায়ে কেরামগন। শুধু ওয়ায ব্যক্তিতার মঞ্চ নয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইনাদের ইউটিউব চ্যানেলই আছে শতাধিক। আমরা যারা লেখালিখি করি তারা অনেক সময় “সুশীল সমাজের” পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লিখে থাকি। আমি করোনা ভাইরাস নিয়ে আমাদের আমজনতার মনোভাব দেখার পর তথাকথিত “সুশীল সমাজের” চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। কারণটি খুব সোজা, আমাদের ওয়াযিদের গাঁজাখুরি তারস্বরের ওয়ায শোনার চাইতে এর দর্শকরা কি মন্তব্য লিখেছেন সেগুলো পড়ার পর আমার ধারনা বদলে গেছে।

ওয়াযি মোল্লা ও ধর্মগুরুদের বিজ্ঞান ও মানবতাবিরোধী গাঁজাখুরি বক্তব্যের পর “কথা ঠিক কিনা বলেন” এর বিপরীতে সারা বাংলাদেশে একজন ব্যক্তিরও সেই বুকের পাটা দেখিনি যে বলতে পারবে “না হুজুর ঠিক বলেন নাই ”।

করোনা ভাইরাস নিয়ে ওয়াযে একটি মন্তব্য যার লাইক ছিল কয়েক হাজার, আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, মন্তব্যটি এরকম “ তোদের বিজ্ঞান কি …টা ছিঁড়তে পেরেছে?” প্রথমে ভেবেছিলাম মন্তব্যটি সল্প শিক্ষিত কারো, পরে দেখলাম যদিও ভদ্রতা করে কিছু ছিঁড়তে চান নি কিন্তু একই ধরনের মত প্রকাশ করে যাচ্ছেন যাদের আমরা সচরাচর “সুশীল সমাজ” বলে থাকি। এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স, ইসলামের গন্ধ থাকলে কেন জানি সবাই বিজ্ঞানের সাথে ইসলাম দিয়ে পাঞ্জা লড়তে চলে আসেন, উনাদের মুল বক্তব্য দুইটি। প্রথমত, “দেখেছেন আগেই বলেছিলাম জ্ঞান বিজ্ঞান ইসলামের আল্লা খোদার কাছে কিছুই না”, আর দ্বিতীয়টি অতি সুপরিচিত দাবী “ইসলাম সব কিছুই ১৪০০ বছর আগেই বলে গেছে”। বাঙ্গালীর স্বভাব যে পাত্রে খায় সেটা ফুঁটা করা আর তার সাথে যোগ হয়েছে ধর্মীয় ভাইরাস, কাজেই বিজ্ঞানের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এরই বদনাম করবে এটাই স্বাভাবিক। এদের কথা মাথায় রেখেই, কিছু হাস্যকর ইসলামি দাবীর উত্তর দিলাম এই “কথা ঠিক কিনা বলেন” এর বিপরীতে একটা জবাব হলেও মানুষকে জানাতে।


১ নং দাবী ঃ ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই অযুর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের উপায় বলে গেছে, বিজ্ঞান এত দিন পর সেটা আবিস্কার করেছে?

উত্তরঃ করোনা ভাইরাসের বলতে গেলে প্রাণস্বরূপ RNA লিপিড বা স্নেহ জাতীয় পর্দা বা এনভেলপের অভ্যন্তরে থাকে, সাবান বা ৭০% অ্যালকোহল এই লিপিড বা স্নেহ জাতীয় পর্দা গলিয়ে দিয়ে করোনা ভাইরাসেকে ধ্বংস করে। কেউ সাবান অথবা ৭০% অ্যালকোহল দিয়ে অযু করেন না। কাজেই অযুর পানি দিয়ে করোনা ভাইরাসের কিছুই হয় না, উপরন্তু, অযুর সময় যে নাকে মুখে পানি দেওয়া হয় তার মাধ্যমে সাবান দিয়ে না ধোয়া হাত থেকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আরও ভালভাবে হবে।


২ নং দাবীঃ করোনা ভাইরাস ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে যে পরিস্কার পরিচ্ছনতার কথা বলা হয়েছে, ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই তা বলে গেছে।

উত্তরঃ তৃতীয় বিশ্ব সহ সকল অনুন্নত দেশে ডাইরিয়া জনিত মৃত্যু রোধে সবচেয়ে জরুরী স্যানিটারি পায়খানা ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ। হাদিস কোরানে অনেকে বিগ ব্যাং, স্ট্রিং থিওরি ইত্যাদি খুঁজে পান, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ স্যানিটারি পায়খানা ও বিশুদ্ধ পানির কথা বলা নাই। হাদিস থেকে দেখা যাক।

৭১৪। আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। তিনি পায়খানা থেকে এলেন। খানা হাযির করা হল। তাকে বলা হল আপনি কি উযূ (ওজু/অজু/অযু) করবেন না? তিনি বললেনঃ কেন আমি কি সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছি যে উযূ করব? (সহি মুসলিম ইফাঃ হাদিস নং ৭১৪) হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

৪২। আহমদ ইবনু সুলায়মান (রহঃ) … আসওয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন (পায়খানার জন্য) ঢালু জমিতে আসেন এবং আমাকে তিনটি পাথর (ঢেলা) আনার জন্য হুকুম করেন। আমি দু’টি পাথর পেলাম। তৃতীয়টি খোঁজ করলাম। কিন্তু পেলাম না। কাজেই আমি একটি গোবরের টুকরা নিলাম এবং এগুলো নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলাম। তিনি পাথর দু’টি নিলেন ও গোবর ফেলে দিলেন এবং বললেন, ইহা ‘রিকস’। আবূ আবদুর রহমান বলেনঃ ‘রিকস’ হল জ্বীনের খাদ্য। সূনান নাসাঈ (ইফাঃ) হাদিস নং ৪২ সহীহ, বুখারী হাঃ ১৫৬, তিরমিযী হাঃ ১৭। সহীহ, বুখারী হাঃ ১৫৬, তিরমিযী হাঃ সহীহ, বুখারী হাঃ ১৫৬, তিরমিযী হাঃ ১৭। সহীহ, বুখারী হাঃ ১৫৬, তিরমিযী হাঃ ১৭।

উপরের বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে নবী পায়খানা করে এসে খেতে বসেছেন, এই ক্ষেত্রে বরং অযুর মত হাত ধোয়ার কথা থাকলে তা হত স্বাস্থ্যসম্মত। দ্বিতীয় হাদিসে দেখা যাচ্ছে উনি পাথর দিয়ে মল পরিস্কার করেন, এতে হাতে মল লেগে থাকার সমুহ সম্ভবনা। নবীর প্রতিটি হাদিস কেয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিনের জন্য পালন করা সুন্নত, অথচ এই ক্ষেত্রে একটি বারও পায়খানা পরিস্কার করে হাত ধোয়ার কথা বলা হল না। হযরত উম্মে আয়মান কর্তৃক নবীর প্রসাব পানের দলিল তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হল।১৯ প্রসাবের মাধ্যমে টাইফয়েড, সিসটসমিয়াসিসের জীবাণু ছড়িয়ে যেতে পারে। এখনেও নবী তার প্রসাব পান করতে বারন না করে উল্টো বলেছেন যে তার প্রসাব পানের ফলে হযরত উম্মে আয়মানের কোন দিন পেটের পীড়া হবে না।

জীবনের অপরনাম যে পানি, তার বিশুদ্ধতা নিয়ে যে হাদিসটি আছে তা রীতিমত বিবমিষাকর, হাদিসে বর্ণিত ঐ কুপের পানি পান করলে বা তা দিয়ে অযু করলে যে কি হবে, পাঠকরা হাদিসটি পড়ে অনুধাবন করুন।

৩২৭। হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি বুযাআ নামক কূপের পানিতে উযু করব? তা এমন একটি কূপ যাতে কুকুরের গোশত, হায়যের ন্যাকড়া ও আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয়। তিনি বললেনঃ পানি পবিত্র, তাকে কোন বস্তুই নাপাক করে না। সূনান নাসাঈ (ইফাঃ) হাদিস নাম্বার: ৩২৭ হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ আরেকটি হাদিস যা বহুল আলোচিত।

৬৩/ চিকিৎসা (كتاب الطب) / ২৩২৯. কোন পাত্রে যখন মাছি পড়ে
৫৩৬৬। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারও কোন খাবার পাত্রে মাছি পড়ে, তখন তাকে সম্পূর্নভাবে ডুবিয়ে দিবে, তারপরে ফেলে দিবে। কারন, তার এক ডানায় থাকে শিফা, আর অন্য ডানায় থাকে রোগ জীবানু। গ্রন্থ:সহীহ বুখারী (ইফাঃ) / হাদিস নাম্বার: ৫৩৬৬। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কলেরা বা অন্য ডাইরিয়ায় আক্রান্তের পায়খানায় বসা মাছি আপনার খাবারে পড়ার পর সেই মাছি আরও চুবিয়ে দিয়ে সেই খাদ্য গ্রহন করে যে কোন মুমিন ইসলামি তরিকায় রোগ প্রতিরোধ ও পরিস্কার পরিচ্ছনতার পরীক্ষা দিয়ে দেখতে পারেন।

সহি বুখারি শরীফের হাদীস

পরিচ্ছদঃ ৫/১২. একাধিকবার বা একাধিক স্ত্রীর সাথে সঙ্গত হবার পর একবার গোসল করা।

২৬৮. আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীগণের নিকট দিনের বা রাতের কোন এক সময়ে পর্যায়ক্রমে মিলিত হতেন। তাঁরা ছিলেন এগারজন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি আনাস (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কি এত শক্তি রাখতেন? তিনি বললেন, আমরা পরস্পর বলাবলি করতাম যে, তাঁকে ত্রিশজনের শক্তি দেয়া হয়েছে। সা‘ঈদ (রহ.) ক্বাতাদাহ (রহ.) হতে বর্ণনা করেন, আনাস (রাযি.) তাঁদের নিকট হাদীস বর্ণনা প্রসঙ্গে (এগারজনের স্থলে) নয়জন স্ত্রীর কথা বলেছেন। (২৮৪, ৫০৬৮, ৫২১৫ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৬৬)

উপরে বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে একাধিক বিবির সাথে সঙ্গমের ক্ষেত্রে যে সহি ইসলামি তরীকা একজন মুমিন মুসলমান ও তার মুমিনা বিবিগন এস্তেমাল করবেন সেখানে পরিস্কার পরিছন্নতার বিষয়টি ভীষণ ভাবে উপেক্ষিত। এই হাদিসের ভিত্তিতে মাজহাবী ও লা – মাজহাবী উভয়ের ফাতওয়া হল, এক বিবির সাথে সঙ্গম করে দ্বিতীয় বিবি বা পালাক্রমে একাধিক বিবির সাথে সঙ্গম করতে হলে গোসল করার প্রয়োজন নাই শুধু লিঙ্গ ধৌত করে মুমিন ব্যক্তি দ্বিতীয় বিবির সাথে সঙ্গম করতে পারবে, তবে আমার জানা মতে হানাফি মাজহাবে একই শয্যায় একাধিক বিবিকে নিয়ে সম্ভোগ করা জায়েজ নাই। যৌনবাহিত রোগের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু গোসল না করে এক বিবির থেকে দ্বিতীয় বিবির সাথে মিলিত হলে প্রথম  বিবি থেকে চর্মরোগ,স্কাবিস ইত্যাদি দ্বিতীয় বিবির শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। এ ছাড়াও একজন মুমিনা নারীর কাছে তার স্বামীর শরীরে সদ্য উপগত হওয়া পূর্ববর্তী বিবির চুল, শরীরের গন্ধ অত্যন্ত অস্বস্তির কারন হতে পারে। এই ক্ষেত্রে ইসলাম পুরুষের যৌন তাড়না পুরনের সুবিধা দিলেও, মুমিনা বিবিগনের দিকটি বিবেচনা করে নাই। তবে নামাজের পূর্বে এই ক্ষেত্রে একাধিক বিবির সাথে সঙ্গম করার পর একবার গোসল করলেই চলবে।

৩ নং দাবীঃ জাহেলি যুগের আবররা পাখির ডাককে কুলক্ষণ মনে করত ইত্যাদি কুসংস্কার ইসলামে নেই অর্থাৎ ইসলাম একটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধর্ম ?

উত্তরঃ ইসলাম জীন, যাদু টোনা, বদ নজর, বান মারা এই সবকিছুতেই বিশ্বাস করে। প্রাচীন ইসলাম পূর্ব আরবে তৎকালীন মানুষ মরুভুমি, পাহাড় ইত্যাদিতে বসবাসরত অশরীরী জীনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত, নবী মোহাম্মাদ (দঃ) নিজেও এই বিশ্বাসের বাইরে ছিলেন না তাই জীনের অস্তিত্ব ইসলামে বহাল রেখেছেন। সুরা নাস ও ফালাকে যাদু টোনার বিষয়টি পরিস্কার। সুরা ফালাকের ৪ নং আয়াতে যেমন বলা আছে “গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে” এখানে যাদু টোনার কথাই বলা আছে। নিম্নে বর্ণিত হাদিসে লক্ষ করুন যে নবী নিজেই যাদু টোনার শিকার হয়ে মতিভ্রমে ভুগতে থাকেন এবং বিবিদের সাথে সঙ্গম না করেই মনে করতেন যে উনি সঙ্গম করেছেন। এই হাদিসটিতে একটি আশংকা তৈরি হয় যে মাথা খারাপ অবস্থায় প্রাপ্ত ওহী গুলি সত্যই আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত কিনা? তবে ইসলামিস্টগন দ্রুত এই আশংকা এই বলে আশ্বস্ত করেন যে মতিভ্রমটি শুধু দুনিয়াভি বিষয়ে হয়েছিল, ওহীর ডাউনলোড লিঙ্ক এতে বাঁধাগ্রস্ত হয় নি। যাদু টোনা যে ইসলামে পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা হয়, তার প্রমান হাদিসের পরে বর্ণিত রেফারেন্সে যেখানে বলা হয়েছে যাদু করার একমাত্র ইসলামি শাস্তি গর্দান উড়িয়ে দেয়া। ইসলাম যদি যাদু টোনা ইত্যাদির অস্তিত্ব ও ক্ষমতায় বিশ্বাস না করত তাহলে অবশ্যই এর শাস্তি হিসাবে কল্লা ফেলে দেওয়ার বিধান দিত না। কাজেই জাহিলি আরবদের কুসংস্কার নিয়ে নসিয়ত করার আগে নিজের রেকর্ডটি দেখে নেয়া জরুরি।

পরিচ্ছদঃ ৭৬/৪৯. যাদুর চিকিৎসা করা যাবে কি না?
৫৭৬৫. ‘আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর একবার যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে, তাঁর মনে হতো তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন, অথচ তিনি আদৌ তাঁদের কাছে আসেননি। সুফ্ইয়ান বলেনঃ এ অবস্থা যাদুর চরম প্রতিক্রিয়া। বর্ণনাকারী বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! তুমি জেনে নাও যে, আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি আমাকে তা বলে দিয়েছেন। স্বপ্নে দেখি আমার নিকট দু’জন লোক এলেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং আরেকজন আমার পায়ের নিকট বসলেন। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কী অবস্থা? দ্বিতীয় লোকটি বললেনঃ একে যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন বললেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বললেনঃ লাবীদ ইবনু আ‘সাম। এ ইয়াহূদীদের মিত্র যুরায়ক্ব গোত্রের একজন, সে ছিল মুনাফিক। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে? দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তর দিলেনঃ চিরুনী ও চিরুনী করার সময় উঠে যাওয়া চুলের মধ্যে। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কোথায়? উত্তরে দ্বিতীয়জন বললেনঃ পুং খেজুর গাছের জুবের মধ্যে রেখে ‘যারওয়ান’ কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কূপের নিকট এসে সেগুলো বের করেন এবং বলেনঃ এইটিই সে কূপ, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। এর পানি মেহদী মিশ্রিত পানির তলানীর মত, আর এ কূপের পার্শ্ববর্তী খেজুর গাছের মাথাগুলো দেখতে শয়তানের মাথার ন্যায়। বর্ণনাকারী বলেনঃ সেগুলো তিনি সেখান থেকে বের করেন। ‘আয়িশাহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেছেন; আর আমি মানুষকে এমন বিষয়ে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে। [৩১৭৫; মুসলিম ৩৯/১৭, হাঃ ২১৮৯, আহমাদ ২৪৩৫৪] আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৪৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৪০)

জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে, “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া(মৃত্যুদণ্ড)”।((জামে’ তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৬)। সহীহ বুখারিতে বাজালা বিন আবাদাহ থেকে বর্ণিত আছে, ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম গভর্ণরদের কাছে পাঠানো নির্দেশ নামায় লিখেছিলেন, “তোমরা প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ এবং যাদুকর নারীকে হত্যা কর”। বাজালা বলেন, ‘এ নির্দেশের পর আমরা তিনজন যাদুকরকে হত্যা করেছি’। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৫৬, সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৩০৪৩, মুসনাদ আহমাদ, ১/১৯০,১৯১)। হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে আছে, ‘তিনি তাঁর অধীনস্থ একজন ক্রীতদাসীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে দাসী তাঁকে যাদু করেছিল। অতঃপর উক্ত নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’ (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদীস নং৪৬)। যে কোন প্রকার যাদু হোক না কেন যাদুকরকে হত্যা করতে হবে এবং বাস্তবতা হচ্ছে যাদুকরের শাস্তি এবং মুরতাদের শাস্তি একই কেননা যাদুতে শিরক থাকেই। ফলে যে ব্যক্তি শিরক করল সে মুরতাদ হয়ে গেল এবং তার জানমাল বৈধ হয়ে গেল (হত্যাযোগ্য হয়ে গেল)। (উৎসঃ কিতাবুত তাওহীদ ও এর ব্যাখ্যা – অধ্যায় ২৩। মুহাম্মদ বিন সুলায়মান আত-তামীমী(রাহিমাহুমুল্লাহ) ব্যাখ্যাকারঃ শায়খ সালেহ বিন আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম আলে শায়েখ, ভাষান্তরঃ মুহাম্মদ আবদুর বর আফফান, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)

৪ নং দাবীঃ “যখন তোমরা কোন্ অঞ্চলে প্লেগের বিস্তারের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।“ এর মাধ্যমে কোয়ারেনটিনের কথা আর কুষ্ঠ রোগী থেকে দুরে থাকার কথা বলে ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই সামাজিক দূরত্বের বিধান দিয়ে গেছে।

উত্তরঃ কোয়ারেনটিনের যে মূলনীতি অর্থাৎ ঘরে বা নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থাকা উপরের হাদিসে সেটা বলা হয় নি। অর্থাৎ আপনার শহর বা অঞ্চলে মহামারী বা প্লেগ দেখা দিলে বলা হচ্ছে যে ঐ শহর ছেড়ে না যেতে, কিন্তু ঐ শহরের ভেতর চলাফেরায় কোন নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয় নি। কাজেই একে কোয়ারেনটিন বলা যাবে না এবং নিজের শহরের ভেতর চলাফেরা করে বরং রোগ ছড়িয়ে পড়বে। এই ইসলামি কোয়ারেনটিনের ভিত্তিতেই আমাদের মোল্লা – মাশায়েখগন লক্ষ্মীপুরে করোনা প্রতিরোধে জনসমাবেশ করে আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়েছেন আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে এক ইসলামি নেতার জানাজায় লক্ষ মুমিনের সমাবেশ করে উপরের হাদিসের ইসলামি প্রয়োগ হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। “তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না” নবীর এই বানী যে তার সাহাবীরাই মানেনি, আমওয়াসের প্লেগে মুসলিম বাহিনীর সিরিয়ার জাবিয়া নামক গোলান উচ্চভুমির নিকটবর্তী স্থানে পালিয়ে প্রান রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা তারই প্রমান, এই ইতিহাস ইতোমধ্যে বর্ণনা করেছি।

কোয়ারেনটিনের আবিস্করতাও ইসলাম এই দাবির উত্তরে বলতে হয়, কুষ্ঠ রোগীকে মুল জনপদ থেকে পৃথক স্থানে রেখে সেবা করার কথা খ্রিস্টপূর্ব আমল থেকে প্রচলিত। বুক অফ লেটিভিকাস এর ১৩ নং অধ্যায় যা ইয়াহুদি তৌরাতের তৃতীয় গ্রন্থ বা খ্রিস্টীয় ওল্ড টেস্টামেন্টের তৃতীয় গ্রন্থ, সেখানে কুষ্ঠ রোগীকে আলাদা করা ও তার রোগ নিয়মিত ধর্মযাজক দ্বারা পরীক্ষা করার বিস্তারিত বিবরন রয়েছে এবং রোগ হতে পবিত্রতা অর্জনের পর তাকে সমাজে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান দেওয়া আছে।[২০] লেটিভিকাস এর রচনা কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮-৩৩২ সালের মধ্যে। বাইবেলে কুষ্ঠ রোগের কথা আছে ৬৮ বার। এখানে ইসলামের সাথে মুল পার্থক্য হল কুষ্ঠ রোগীকে দেখে বাঘ দেখার মত পালিয়ে যেতে বলা হয় নি বরং আলাদা করে চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। কোয়ারেনটিন শব্দটি এসেছে ইতালিয়ান কোয়ারেনটিনো থেকে এখানে কোয়ারানটা মানে ৪০ অর্থাৎ ৪০ দিন isolation এর কথা বলা হয়েছে । ১৪ শতকের প্লেগ বা ব্লাক ডেথ এর সময় বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার রাগুসা (বর্তমান নাম ডুবরভনিক) সমুদ্র বন্দরে প্লেগ আক্রান্ত দেশ থেকে জাহাজকে ৩০ দিনের isolation এর বিধান দেওয়া হত যাকে বলা হত ট্রেনটিনো পরবর্তীতে এই সময়কাল বাড়িয়ে ৪০ দিনের কোয়ারেনটিনের বিধান আসে।[২১]

যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করেছি, কোন মহামারী এলাকায় গেলে যে অন্যরাও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় – এটিও ছিল সাধারন পর্যবেক্ষণ যা মানুষ জানত খৃষ্ট পূর্ব আমল থেকেই। এই কোনটাই নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর আবিষ্কৃত নয়। ৫৪৯ সালে জাস্টিনিয়ান প্লেগের সময় সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আগত লোকদের আলাদা করে রাখার বিধান করেছিলেন।[২২] মিশরীয় ফারাওদের বিধান ছিল তারা নীল নদের উপকূলবর্তী বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতেন। খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪৮ সালে ফারাও আখেনেটান প্লেগ মহামারীর সময় এইসব উপকূলবর্তী বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে যোগ না দিয়ে দূরবর্তী প্রাসাদে নিজেকে পৃথক করে রাখতেন। পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় যে প্লেগ যে ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায় তা প্রথমে অনেক সময় নদী বা সমুদ্র বন্দরে প্লেগ আক্রান্ত দেশ থেকে জাহাজে আসা ইঁদুরের মাধ্যমে উপকূলবর্তী শহরে আক্রমন করে। খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগে যে আনাতলিয়ার হিটটাইট সম্রাজ ছিল তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় মিশর থেকে আগত যুদ্ধবন্দীদের মাধ্যমে প্লেগ রোগের মহামারী সংক্রমণের ব্যাপারে তারা জানত। শিলালিপিতে সংরক্ষিত হিটটাইট সম্রাট দ্বিতীয় মুরসিলির দেবতাদের প্রতি “প্লেগ প্রার্থনা” থেকে রোগ মহামারীতে মানব সভ্যতার আদি ধর্মবিশ্বাস ও ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়। আগ্রহী পাঠকদের জন্য এই তথ্যটি শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না। সম্রাট দ্বিতীয় মুরসিলির রাজত্ব কাল খৃষ্ট পূর্ব ১৩২১ থেকে ১২৯৫ পর্যন্ত, খৃষ্ট পূর্ব ১৩২২ সালে মিশর থেকে আগত যুদ্ধবন্দীদের মাধ্যমে তার রাজ্যে ভয়াবহ প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। দেবতার প্রতি তাঁর প্রার্থনায় যে বিষয়গুলো প্রতীয়মান হয় যে এই মহামারী কোন ঈশ্বরের রোষের ফলে তার তার রাজ্যে এসেছে, এর কারন পূর্বে কৃত পাপ সমুহ যা ঈশ্বরদের রাগিয়ে তুলেছে। সম্রাট দ্বিতীয় মুরসিলি তার পূর্বসূরি সম্রাট তার পিতার পাপের জন্য ক্ষমা চান। তার প্রার্থনার অনেক ভাষা খুবই আবেগঘন, উল্লেখ্য প্লেগে তার পিতা, ভাই ও স্ত্রী মৃত্যুবরণ করে। সম্রাট দ্বিতীয় মুরসিলি তার প্রার্থনায় বলছেন পাখি যেভাবে তার বাসায় আশ্রয় পায় ঈশ্বর যেন তার বান্দাকে সেই ভাবে আশ্রয় দান করেন, একজন দাস অপরাধ করলে সে কি ক্ষমা প্রার্থনার পর তার মালিক ক্ষমা করে না? ঈশ্বর তার বাঁদি সম্রাটের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গেছেন, তার বিনিময়ে ঈশ্বরের জন্য পশু কোরবানি তৈরি আছে। ঈশ্বরকে খুশি করার জন্য তার প্রার্থনায় ঈশ্বরের উপাসনালয় মেরামতের অঙ্গীকার রয়েছে।২৩ এই প্রার্থনা এত বিস্তারিত বলার কারন মৌলিক ধর্মচিন্তায় রোগ মহামারী সবই যে আল্লাহর গজব এই ধারনা মানব সভ্যতার শুরু থেকেই। আর একটা ব্যাপার পরিস্কার যে ঈশ্বরদের আমরা মানুষের মতই আচরণকারী কখনো দয়ালু আবার কখনো ক্রোধ উন্মক্ত অতিমানব হিসাবে দেখে আসছি। আমাদের ধর্মগুরুরাও করোনা ভাইরাসকে আল্লাহর গজব বলে মত দিয়েছেন এবং কারন হিসাবে অশ্লিলতা, বেপর্দা ইত্যাদি পাপকে দায়ি করেছেন আর এর থেকে মুক্তি পেতে আল্লহর কাছে বেশি বেশি তাওবা করতে বলেছেন।
এতো ইতিহাস বর্ণনার কারন আমাদের ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখ আর মডার্ন ইসলামিস্টদের “সব কিছু ইসলাম ১৪০০ বছর আগে বলে গেছে” এই বক্তব্যকে কষে চপেটাঘাত করা। খৃষ্ট পূর্ব ১৫০০ বছর আগের প্যাপিরাসে প্লেগ রোগের বিবরণ পাওয়া যায় অথচ এই ১৪০০ বছর আগের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের হাদিসে অশিক্ষা,কুশিক্ষা, গনিমতের মালের ভাগ বাটোয়ারা, কাফের-মুরতাদের কল্লা ফেলা, হাত কাটা, পাথর মারার বিধান পাবেন,কোন জ্ঞান বিজ্ঞানের লেশ মাত্র পাবেন না।

“যখন তোমরা কোন্ অঞ্চলে প্লেগের বিস্তারের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।এই হাদিসটি যে মোটেও হোম কোয়ারেনটিন নির্দেশ করে না সেটা শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এই হাদিসের “আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না” অংশটি বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বাস্তবিক নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অমানবিক ও আত্মহত্যার সামিল। হাদিসের এই নির্দেশনা যে স্বয়ং নবীর অনেক সাহাবী, তাবে-তাবেইনরা মানে নি, তার ইতিহাস আগেই বলেছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থাকা বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সরকারেরা কারন তারা করোনায় আক্রান্ত প্রবাসীদের দায়িত্ব নিতে চান না। কয়েক সপ্তাহে দেশে ফিরবে ২৮,৮৯৬ জন মুলত মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি (প্রথম আলো ৬ই মে ২০২০)। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কি উপরের হাদিসটি জানে না? একথা সত্য যে আন্তর্জাতিক চলাচলে রোগের বিস্তার ঘটতে পারে, তবে তার জন্য কোন দেশই তার নিজের নাগরিকদের ফেরত নিতে অস্বীকার করে নি। কাজেই উপরের হাদিসের আলোকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে না দিয়ে, নিজ দেশে উপযুক্ত কোয়ারেনটিন নিশ্চিত করাটাই বাস্তবসম্মত। অর্থাৎ হাদিসের দ্বিতীয় ধারাটি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অবাস্তব।

৫ নং দাবীঃ করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাস্কের ব্যবহার পর্দা প্রথার মাধ্যমে ১৪০০ বছর আগেই ইসলামে বলা আছে।
উত্তরঃ রোগ প্রতিরোধের জন্য পর্দা প্রথার বিধান দেওয়া হয় নাই। মাস্ককে পর্দা হিসাবে মেনে নিলে পুরুষদের মাস্ক ব্যবহার হারাম কারন ইসলামে পুরুষদের মহিলাদের মত পোশাক পরা হারাম।

দাবিসমুহর উত্তরের পর সাধারন প্রশ্ন – উত্তর পর্ব

ক) ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখরা যে বলেছেন মুসলিমদের করোনা হয় না আর হলে কুরআন মিথ্যা হয়ে যাবে অথবা স্বপ্নে করোনা ভাইরাস বলেছে যে বাংলাদেশে তাদের আক্রমণের প্ল্যান নাই, কিন্তু দেখা যাচ্ছে সকল মুসলিম দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে আর অনেক ইমাম, তাবলীগ জামাতের খাটি মুমিন বান্দাও রেহাই পাচ্ছে না। কিন্তু এতো বড় মিথ্যা বলার পরেও কোনও ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখ কোন লজ্জা প্রকাশ করেনি বরং আরও জোর গলায় ওয়ায নসিয়ত করে যাচ্ছেন। উনাদের কি লজ্জা শরম নাই? সম্পুরক প্রশ্ন করোনা আক্রমনে মানুষের মৃত্যুতে উনারা এত উল্লসিত কেন?

করোনা ভাইরাস


উত্তরঃ জ্বী উনাদের লজ্জা শরম নাই। এর কারণ ইসলামিজম, অর্থাৎ ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাবহার। এই কারণে যাকে বা যেই গোষ্ঠীর কার্যক্রমকে আমরা ইসলামের পক্ষে মনে করি তাদের কথা বা কর্মকাণ্ড যতই গাঁজাখুরি বা ক্ষতিকারক হোক না কেন, তাকে প্রশ্ন ব্যাতীত শর্তহীন সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। এটা করতে হবে ইসলামের স্বার্থেই, না হলে “ইসলাম বিরোধী শক্তিরা” অগ্রবর্তী হয়ে যাবে। কাজেই ঠিক কিনা বললে ঠিক ঠিক বলে যেতে হবে। এই একটি ব্যাপারে জামাতি – হেফাজতি – সালাফি-ওয়াহাবি-আন্সারুল্লাহ-জেএমবিরা একমত।

আগে যেমন উল্লেখ করেছি, যেকোনো মহামারী, দুর্ভিক্ষ বা মানবিক বিপর্যয়ে মানুষের মন দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্র, তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলো যেখানে সরকার মানুষের চাহিদা মেটাতে অক্ষম বা অত্যাচারী ও অবিচারী সে দেশে জনগন নিয়তিবাদী ও অধিক ধার্মিক হয়ে পড়ে ও অতিপ্রাকৃত শক্তির কাছে নিজেদের সঁপে দেয়। উন্নতবিশ্বে এই চিত্র ভিন্ন, এই ক্ষেত্রে জনগন এইসব দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ আসা করে ও সরকারও এই দায়বদ্ধতা অনুভব করে, চার্চ-সিনাগগে কেউ উত্তর খোঁজে না। গরীব দেশের নিয়তিবাদী ধার্মিক মানুষদের এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় এই সব ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখরা, এদের গুরুত্বও এই সব বিপদে বেড়ে যায়, আর নিজেদের আখের গোছানোর পাশাপাশি ওয়াযের বক্তব্যেও হয়ে ওঠে বেপরওয়া। কেউ বা স্বপ্নে করোনা ভাইরাসের সাক্ষাৎকার প্রচার করেন, কেউ বা বিজ্ঞানকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন আবার কেউ নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেন। আগেই যেমনটা উল্লেখ করেছি যেহেতু এর সাথে ইসলামি অনুভুতির যোগ রয়েছে আর আছে ইসলামিজমের প্রভাব, যার কারনে এই সব মোল্লা পুরুতদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা কোন রাজনৈতিক সরকারের নেই। সংক্ষেপে, করোনা বিপর্যয়ে নিজেদের গুরুত্ব আর ওয়াযের বাণিজ্য চাঙ্গা হওয়ার কারনেই এরসব ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখরা উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন, মানুষের মৃত্যু উনাদের কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে না।


খ) আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, একবার বর্ষণ মুখর দিনে ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবাহ দিচ্ছিলেন। এদিকে মুয়াজ্জিন আযান দিতে গিয়ে যখন —– -এ পোঁছল, তখন তিনি তাকে এ ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিলেন যে, ‘লোকেরা যেন আবাসে সালাত আদায় করে নেয়।’ এতে লোকেরা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। তখন ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, তাঁর চেয়ে যিনি অধিক উত্তম ছিলেন (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনিই এরূপ করেছেন। অবশ্য জুমু’আর সালাত ওয়াজিব। (তবে ওযরের কারণে নিজ আবাসস্থলে সালাত আদায় করার অনুমতি আছে)। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬১৬)
উপরের হাদিস আনুযায়ি কারোনা ভাইরাসে সংক্রমণ ঠেকাতে বাসায় সালাত আদায় করার ফাতওয়া কি ইসলাম সম্মত?


উত্তরঃ “উল্লেখ্য যে, একটি হাদিসে অতিবৃষ্টির সময় ঘরে নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে। এটার সাথে করোনা ভাইরাসকে তুলনা করা যাবে না। কারণ, বৃষ্টি একটি নিশ্চিত বিষয়, আর কারোনা ভাইরাসে সংক্রমণ অনিশ্চিত ও সন্দেহযুক্ত বিষয়। বেশি মানুষ একত্রিত হলেই যে ভাইরাস সকলকে আক্রান্ত করবে, এটা আবশ্যক নয়। বরং আল্লাহ তা‘আলার হুকুম হলেই ভাইরাসাক্রান্ত হবে।
মনে রাখতে হবে যে, করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তিলাভ করার জন্য আসল পন্থা হলো, আল্লাহ পাকের দরবারে তাওবা করা এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
অর্থাৎ, আপনি (রাসূল) যতদিন তাদের মাঝে অবস্থান করবেন, ততদিন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে শাস্তি দেবেন না। অনুরূপভাবে তারা যতদিন ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে ততদিন আল্লাহ তাদের উপর আজাব নাযিল করবেন না। (সুরা আনফাল আয়াত ৩৩)
মোহাম্মদ আবদুল হালীম বোখারী
মহা-পরিচালক, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম। “ ( ৩১ মার্চ, ২০২০ তে প্রকাশিত, বর্তমানে ওয়েব সাইটটিতে কোন কারনে প্রবেশ বন্ধ আছে)

উপরে মুফতি সাহেব তার উত্তর দিয়েছেন। নবী কখনো কোন অসুখের কারনে মসজিদে জামাত বন্ধ করেন নি, বরং যারা জামাতে আসবে না তাদের ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! আমার ইচ্ছে হয়, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করতে আদেশ দেই, অতঃপর সলাত কায়েমের নির্দেশ দেই, অতঃপর সলাতের আযান দেয়া হোক, অতঃপর এক ব্যক্তিকে লোকদের ইমামত করার নির্দেশ দেই। অতঃপর আমি লোকদের নিকট যাই এবং (যারা সলাতে শামিল হয় নাই) তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেই। যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! যদি তাদের কেউ জানত যে, একটি গোশ্‌তহীন মোটা হাড় বা ছাগলের ভালো দু’টি পা পাবে তাহলে অবশ্যই সে ‘ইশা সলাতের জামা’আতেও উপস্থিত হতো। (বুখারী পর্ব ১০ : /২৯ হাঃ ৬৪৪, মুসলিম ৫/৪২, হাঃ ৬৫১) হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

আযান (كتاب الأذان) / ৪৩১। কি পরিমাণ রোগ থাকা সত্ত্বেও জামা’আতে শামিল হওয়া উচিত। (গ্রন্থ:সহীহ বুখারী (ইফাঃ) / হাদিস নাম্বার: 631) এই হাদিসটিতে লক্ষ করবেন যে নবী অন্তিম রোগের সময়, জ্বরগ্রস্থ অবস্থায় হযরত আলি ও অপর আরেকজনের কাঁধে ভর দিয়ে সালাত আদায় করতে আসেন। বর্তমানে উদ্ভূত করোনা মহামারীতে আমাদের ডিজিটাল ইসলামিস্টগন ইসলামকে অতি বিজ্ঞানসম্মত ও যুগোপযোগী প্রমান করতে এই গোঁজামিলের আশ্রয় নিয়েছেন। এখানে বৃষ্টির সাথে সংক্রামক রোগকে কিয়াস করার মাধ্যমে যে ফাতওয়া দেওয়া হয়েছে তা ইসলাম সম্মত নয় বরং মনগড়া। এরফলে যদি ভবিষ্যতে মুসুল্লিগণ শীতকালে শীতের দোহাই আর গরমকালে গরমের দোহাই দিয়ে যদি জামাতে না আসেন সেটা কি ইসলাম সম্মত হবে? উপরন্তু, নবী জ্বরগ্রস্থ অবস্থায় নিজেই কোয়ারেনটিন মানেন নি। নবী মোহাম্মাদ (দঃ) যে রোগে মারা যান তার লক্ষণ বিবেচনা করে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন উনি ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস রোগে মারা গিয়েছিলেন। ব্রেনের আবরন বা মেনিনজেসের মেনিনগোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমণের ফলে এই রোগ হয়ে থাকে। জ্বর ও তীব্র মাথাব্যাথার উপসর্গ নিয়ে এই রোগ উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা দ্রুত চিকিৎসা না করলে রোগী মৃত্যুবরন করে। হাদিসে যেভাবে বর্ণনা করা আছে যে নবী বিবি আয়েশাকে বলছেন যে তীব্র ব্যাথার উনার মনে হচ্ছিল যে উনার গলার প্রধান রক্তনালী ছিঁড়ে যাচ্ছে, মেনিনজাইটিস রোগের সাথে লক্ষণ গুলো মিলে যায়। সেই সময় কোন বেদনানাশক ঔষধের অভাবে নবী বাস্তবিকই খুবই কষ্টকর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সৌদি আরব ও সাব -সাহারান আফ্রিকার এই রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশী থাকায় হজ্জের পূর্বশর্ত হিসাবে এই মেনিনগোকক্কাল ভাক্সিন নেওয়া বাধ্যতামূলক। বড়ই পরিতাপের বিষয় এই যে “রোগের কোন সংক্রমন নেই” এই হাদিসের যিনি প্রবক্তা তার জন্মভুমি খোদ মক্কাতে ইসলামের একটি প্রধান স্তম্ভ হজ্জ পালন করতে এখন রোগের সংক্রমন ঠেকাতে ভাক্সিন নেওয়া বাধ্যতামূলক।


গ) “ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই। কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে রোগ হয়ে যাবে এটা কুফরি চেতনা” মুফতি হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী। মুফতির এই কথা কি ইসলামের আলোকে সঠিক ?

উত্তরঃ জ্বী সঠিক। তাওহীদে রুবুবিয়্যাহর মূলনীতি অনুসারে ভাইরাস দ্বারা অথবা কোন রোগীর সংস্পর্শে রোগ ছড়ায় এই কথা বলাতে ভাইরাসকে আল্লাহর ক্ষমতার সাথে অংশীবাদী সাব্যস্ত করা হয়, কাজেই “কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে রোগ হয়ে যাবে এটা কুফরি চেতনা” ইসলামের দৃষ্টিতে মুফতি সাহেব সঠিক ফাতওয়া দিয়েছেন। তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ ইসলামের প্রধান নীতিমালা। ওয়াহাবি-সালাফি নীতিমালায় তাওহীদ তিন প্রকার (তাওহীদুর রুবুবিইয়াহ্‌ বা প্রভূত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ, তাওহীদুল উলুহিইয়াহ্‌  বা ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ ও তাওহীদুল আসমা ওয়াসসিফাত  অথবা নাম এবং গুণসমূহে একত্ব), এখানে শুধু তাওহিদে রুবুবিয়্যাহ উল্লেখ করা হল। তাওহিদে রুবুবিয়্যাহর অর্থ আল্লাহর যাবতীয় কর্মে বা প্রভূত্বের ক্ষেত্রে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। যেমন- সৃষ্টি করা, মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ করা, রিযিক দেয়া, জীবন দেয়া, মৃত্যু দেয়া, বৃষ্টিপাত করা ইত্যাদি। কাজেই ভাইরাস দিয়ে রোগ হয়েছে না বলে, ইসলাম অনুযায়ি কাফির হওয়া থেকে বাঁচতে হলে বলতে হবে “আল্লাহ রোগ দিয়েছেন “। একই ভাবে “মহাশক্তিশালী সুপার সাইক্লোন আম্পান থেকে দেশকে রক্ষা করল সুন্দরবন” এ কথা বলাও কুফরি মূলক কারন এতে তাওহিদে রুবুবিয়্যাহ বা আল্লাহর যাবতীয় প্রভূত্বের স্থলে সুন্দরবনের ক্ষমতার স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে সুন্দরবনকে আল্লহর একক ক্ষমতার অংশীবাদি বানিয়ে ফেলা হয়। পাকিস্তানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক এই কুফরি থেকে জাতিকে বাঁচানোর জন্য সকল বিজ্ঞানের বই গুলোকে ইস্লামিকরন করিয়েছিলেন। উদাহরন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় পানির অনু তৈরি হয় এই কুফরি বক্তব্যটিকে ইসলামি আলোকে বলতে হবে “হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় আল্লাহর হুকুমে পানির অনু তৈরি হয় – সুবহানাল্লাহ” ।

ঘ) খৃষ্ট পূর্ব পেগাণ ধর্ম, খৃস্ট ধর্ম ও ইসলাম ধর্মে রোগ মহামারীর ব্যাপারে ধর্মতত্ত্বগত ( theological) ভাবে মিল ও অমিল কি ও কেন?

উত্তরঃ এই তিন ধর্মেই রোগ মহামারীকে ঈশ্বরের বা দেবতাদের গজব হিসাবে দেখা হয়েছে এবং কারণ হিসাবে মানুষের পাপকে দায়ী করা হয়েছে। খৃষ্ট পূর্ব পেগাণ ধর্মে প্লেগ- মহামারীতে ঈশ্বরকে খুশী করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষদের শায়েস্তা করা হয়েছে এই বলে যে এদের কারণেই ঈশ্বর নাখোশ হয়ে গজব দিয়েছেন। ঈশ্বরের পক্ষ থেকে কোন সান্ত্বনা বানী পেগাণ ধর্মে নাই, কাজেই রোগে দিশেহারা মানুষদের কোন ধর্মভিত্তিক সমাধান পেগাণ ধর্ম দিতে পারেনি। সেই সময়কার নব্য খ্রিষ্টানরা যদিও কোন চিকিৎসা দিতে পারেনি, তবে খ্রিস্টীয় রীতি অনুযায়ী অসুস্থদের ফেলে না দিয়ে সেবা করার চেষ্টা করেছে। এই ব্যাপারটা রোমান সম্রাজে পেগাণ ধর্মের বিপরীতে খ্রিস্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছে। ব্লাক ডেথ প্লেগের সময় বিপুল প্রতাপশালী খ্রিস্টীয় চার্চ, প্রার্থনা কিছুই কাজে না আসায় আর জাত-বর্ণ, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবার ভয়াবহ মৃত্যু দেখে ধর্মের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায় যা ইউরোপে পরবর্তীতে রেনেসাঁ, সেকুলার ভাবধারা বিস্তারে সহায়ক হয়েছিল। চার্চ ও ধর্মের প্রতি আগের বিশ্বাস এখনো ইউরোপ ফিরে পায় নাই।

অপরপক্ষে রোগ মহামারীর ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান বেশ ধূর্ততাপূর্ণ। অর্থাৎ ইসলামে রোগ মহামারী সব কাফেরদের জন্য গজব কিন্তু মুমিনদের জন্য এটি আল্লাহর রহমত। আপনারা জানেন যে ইসলামে জিহাদে মারা যাওয়াকে শহীদি মর্যাদা বা সর্বোচ্চ সন্মান দেওয়া হয়েছে । কোরানে সরাসরি জিহাদ করার আয়াতের সংখ্যা ১৬৪ অনেকের মতে আরও অধিক। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ পানিতে ডুবে, কলেরায়, প্লেগে এবং ভূমিধসে বা চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তিরা শহীদ। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭২০)। জিহাদ করা সবচেয়ে সন্মানের, কারন এর মাধ্যমেই নবী ইসলাম তথা নিজেকে নবী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আর সাহাবী ও নিজের জন্য মালে গনিমতের ভোগ নিশ্চিত করেছেন, শুধু পরকালে হুরের লোভ দেখিয়ে যে সবাইকে জিহাদে সামিল করা যায় না সেটা নবী ভাল ভাবেই জানতেন। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে জিহাদের কথা বুঝলাম কিন্তু ডাইরিয়া বা প্লেগে মারা গেলে ইসলাম তাকে জিহাদে মৃত্যুর সমান মর্যাদা দেবে কোন স্বার্থে? এর উত্তরের সাথে জড়িয়ে আছে নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর নবুয়তের দাবি। অন্দর মহলে ডজনখানি বিবি আর দাসি সামলানর পর যে বিষয়টি নবীর জন্য সবচেয়ে বেশী চ্যালেঞ্জিং ছিল তা হল নবুয়তের পক্ষে মানুষকে বিশ্বাস করাতে জনতার দাবী অনুযায়ি মোজেজা দেখানো। ঈসা নবীর কুষ্ঠ রোগী সারিয়ে তোলা বা মৃতকে জীবিত করা অথবা নিদেন পক্ষে মুসা নবীর মত লাঠিকে সাপ বানানোর মত কোন মোজেজাই নবী মোহাম্মাদ (দঃ) দেখাতে পারেন নি।

করোনা ভাইরাস
মোজেজার মাধ্যমে দশজন কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করছেন ঈসা নবী বা যীশু খ্রিস্ট

উনার বোরাক পরিবহনে চেপে আল্লাহর সাথে চা – বিস্কুট খাওয়ার কাহিনী শুনে অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করেছিল, এমনকি আবু বকর ছাড়া অন্য সাহাবীরাও এই কাহিনী সে ভাবে বিশ্বাস করে নি। আর আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদ দুই টুকরা করে পাহাড়ের দুই পাশে ফেলে দেওয়ার কাহিনীর অবস্থাও তথৈবচ। খাইবার আক্রমনের সময় থুথু দিয়ে নবী হযরত আলির চোখের ব্যারাম সারিয়ে দেন, এর বাইরে নবীর কোন বড় মোজেজার পরিচয় জানা যায় না। এমতাবস্থায় এক জলজ্যান্ত নবী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ডাইরিয়া বা পেটের পীড়ায় উম্মতরা মারা যাবে আর আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নবী কিছুই করতে পারবে না এটা মেনে নেওয়া উম্মতের জন্য সত্যই দুরুহ। নবী এই ‌‌ব্যার্থতা ঢাকার জন্যই রোগ মহামারীর মৃত্যুকে শহীদি মর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন।তবে এই আধুনিক কালে একাত্তরে খুন ধর্ষণ করে ফাঁসিতে মরলে তাকে শহীদ বলা হয় অথচ কলেরা ডাইরিয়ায় মরা কাউকে এই হাদিস মেনে শহীদ বলেতে শুনিনি, বোধ করি ইসলামিজমের প্রভাবে। জাস্টিনিয়ান প্লেগের বিস্তার নবীর জীবনকালের ঘটনা, বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারনে তৎকালীন আরবরা বাইজেনটিন মিশর ও সিরিয়ার ভয়াবহ প্লেগের কথা জানতেন, এও জানতেন যে প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে গেলে সেও আক্রান্ত হবে আর ঐ অঞ্চলের লোকদের অন্য শহরে জায়গা দিলে সেই জনপদও আক্রান্ত হবে। নবীর প্লেগ নিয়ে হাদিসে এই কথাই প্রতিফলিত। নবী ও আরবরা এও বুঝত যে প্লেগ মহামারী উট মুত্র পান বা কালিজিরা খেয়ে ঠেকানো যাবে না। তাই নবীর প্লেগ মহামারী নিয়ে অবস্থানটি খুবই সুবিধাজনক, “এটি বনী ইসরাইল বা ইয়াহুদিদের, কাফিরদের জন্য আযাব আর মুমিনদের জন্য রহমত” – সরাসরি জান্নাতের টিকেট, শরাব আর হুর নিয়ে মাস্তি। বর্তমানের কোন ঘিরিঙ্গি রাজনৈতিক নেতাও এরকম ওয়াটার টাইট ফর্মুলা দিতে পারবে কিনা সন্দেহ। সাপও মরল অর্থাৎ কাফির গজবে মরল আবার লাঠিও ভাঙ্গল না অর্থাৎ মুমিনও খুশী মহামারীতে মরলেই জান্নাত আর নবী রোগ বালাই নিয়ে দায়মুক্ত – সরকারের মত করোনা ভাইরাসের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া বা মাস্ক- হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরন করা, কোনটাই নবীর করা লাগবে না, যা হবে সবই আল্লাহর হুকুমে হবে, আপনার কাজ বিনা বাক্যব্যায়ে সব মেনে নেওয়া।


ঘ) ইসমাইল (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফিরিশতা প্রহরায় নিয়োজিত থাকবে। তাই প্লেগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ কতে পারবে না। (সহিহ বুখারি, ইফাঃ হাদিস নং ১৭৫৯)

উত্তরঃ ২৬শে এপ্রিল ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তর সংখ্যা সৌদি সরকারি হিসাবে ১৬,২৯৯। মদিনাতে কয়জন সেই হিসাব দেওয়া নাই তবে মক্কায় ওমরা বাতিলের পাশাপাশি মদিনায় নবীর রাওজা মোবারক দর্শনও বন্ধ। মদিনাতে এই আগেও বহু রোগ ব্যাধি, মহামারী এসেছে। ২০১২ সালে সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়ে আরেকটি করোনা ভাইরাস দ্বারা সংঘটিত রোগ যা MERS নামে পরিচিত, যা মক্কা, মদিনা সহ অন্যান্য সকল শহরে ছড়িয়ে পড়ে, এর মৃত্যুহার (case fatality) ছিল ৩৫% যা বর্তমান COVID19 থেকে বহুগুন বেশি। মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফিরিশতাগন সম্ভবত কাজে ফাঁকি দিয়েছেন। আগেই উল্লেখ করেছি, প্রাচীন কালে যে কোন ভয়াবহ মহামারীকেই প্লেগ বলা হত। Yersinia pestis দ্বারা যে প্লেগ বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় সেই সম্পর্কে নবী ও তৎকালীন আরব তো দুরেরে কথা মধ্যযুগের ইউরোপও জানত না। কাজেই ইসলামিস্টদের দাবি যে নবী প্লেগ বলতে Yersinia pestis দ্বারা সংক্রমিত রোগ বুঝিয়েছে, সেই দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া, আরবি তাউন, ওয়াবা ইত্যাদি শব্দ নিয়ে যে খেলা উনারা করেন সেটা জাকির নায়েকের উট পাখির ডিম দাহাহার অনুরূপ। দাজ্জালের কথা তো বলতে পারবনা, তবে যেসব সৌদি রাজবর্গ দরিদ্র ইয়ামেনের সাধারন মানুষদের উপর, বাচ্চাদের স্কুলে প্রতিদিন বোমা বর্ষণ করে যাচ্ছেন, সেই সব দাজ্জালদের মদিনায় হর হামেশাই দেখা যায়।

বিস্তারিত উত্তর (অগ্রসর পাঠকের জন্য)

করোনা ভাইরাস বিশ্বমহামারী নবীর হাদিস অনুযায়ী মদিনায় প্রবেশ করবে না এই ধারণা যখন সৌদি তথা মদিনায় করোনা সংক্রমণের কাছে ধূলিসাৎ হয়ে গেল, তখন এই হাদিস নিয়ে শুরু হল আরেক লম্ফযম্প। এই হাদিস নিয়ে এখন যেটা বলা হচ্ছে যে, এই হাদিসে মদিনায় মহামারী হবে না সেটা বলা হয় নাই বরং তাউন শব্দ দিয়ে শুধুমাত্র আধুনা চিকিৎসা শাস্ত্রে বর্ণিত Yersinia pestis জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত প্লেগ রোগ মদিনাতে হবে না সেটা বুঝানো হয়েছে। উপরের প্রশ্নের উত্তরে, আদি আরবি ভাষায় ও হাদিসে, মহামারী, প্লেগ ইত্যাদি বুঝাতে যে দুটো শব্দ ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ ওয়াবা ও তাউন নিয়ে কিছু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। বলে রাখি, এই আলোচনাটি সাধারন পাঠকের জন্য উপযোগী নয়। যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, প্লেগের মত বিশাল মহামারী বিশেষত ইউরোপের সামাজিক- রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রচুর গবেষণা আছে। আমওয়াসের প্লেগ ও পরবর্তী মহামারীগুলোতে তৎকালীন মুসলিম সম্রাজ ভীষণভাবে আক্রান্ত হওয়ায় পাশ্চাত্যের প্লেগ গবেষকদের লেখায় এ নিয়ে বেশ কিছু তথ্যপূর্ণ গবেষণাপত্র রয়েছে, এই রেফেরেন্সগুলো সাধারন পাঠকদের কিছুটা কঠিন বিধায় তথ্যসূত্রের “Further reading” অংশে উল্লেখ করা হল।    পুনরায় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে বর্তমানে প্লেগ Yersinia pestis নামক একটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রামিত একটি  বিশেষ রোগকে বুঝানো হয় যার জীবাণুটি ১৮৯৪ সালে আবিষ্কৃত। জুডেও- খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রন্থে বা হাদিসে প্লেগ বলতে মোটেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্লেগ রোগ বুঝানো হয়নি। (হিব্রু বাইবেলে নবী মুসার সময় ফেরাউনের মিশরে ১০টি প্লেগের বর্ণনা দ্রষ্টব্য) । রোগব্যাধি ছাড়াও পঙ্গপালের আক্রমণ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেই অর্থে প্লেগ নামে পরিচিত এমনকি ইংরাজি ভাষায় রোগ ব্যাধি ছাড়াও সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে প্লেগ শব্দটির ব্যবহার রয়েছে, যেমন “Corruption continues to plague our country”.   

তাউন শব্দটিকে বিশেষ ভাবে Bubonic plague রোগের লক্ষণযুক্ত মহামারী বুঝাতে হাদিসে বর্ণনা প্রথম শুরু করা হয় ৮৪০ সালের পর বিশেষত, আমওয়াসের প্লেগের পর Bubonic plague এর লক্ষণ মুসলিম চিকিৎসক ও ঐতিহাসিকগণ লিপিবদ্ধ করার পর। মুসলিম ঐতিহাসিক যেমন আল মাদাইনি (২২৫-৮৪০), ইবন কুতাইবা (২৭৬-৮৮৯), ইবন আবি হাজালাহ (৭৬৪-১৩৬২), বাহাআদ্দিন আস সুবকি (৭৬৫-১৩৫৫), ইবন আল ওয়ারদি (৭৪৯-১৩৪৯) সকলেই ইসলামি রাজ্যে প্লেগ মহামারীর ইতিহাস ও রোগের লক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন। ইবনে সিনা,  আল-রাযী উভয়েই এই রোগ বর্ণনা করেছেন। এই সব বর্ণনা ও প্লেগের প্রত্যক্ষদ্রষ্টা হিসাবে বিখ্যাত হাদীস বিশারদ ইবনে হাজার আল আসকালানী (১৩৭২-১৪৪৯)  প্লেগকে একটি বিশেষ রোগ হিসাবে হাদিসে বর্ণনা করেছেন। পূর্বের হাদিস ও ইসলামি দালিল সমুহে তাউন বলতে প্লেগ ছাড়াও  বিভিন্ন রোগ যেমন কলেরা মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা বা দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি হিসাবে বর্ণনার ফলে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে সেটা নিয়ে উনি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। প্লেগ সংক্রান্ত পুস্তক রচনাকালে তাঁর নিজের দুই কন্যা প্লেগ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আল নাওয়ায়ি (১২৩৩-১২৭৭) দামেস্কের প্রখ্যাত শাফেয়ী স্কলার, হাদিস বিশারদ, রিয়াজুস সালেহিন গ্রন্থের রচয়িতা, ২০১৫ সালে আল কায়েদা সংযুক্ত সালাফি জিহাদি দল আল নুসরা ফ্রন্ট উনার কবরটি ওয়াহাবি – সালাফি মানহাজ মোতাবেক ধ্বংস করেন। আল নাওয়ায়ি ভাল ভাবেই প্লেগ রোগ সম্বন্ধে ধারনা রাখতেন এবং প্রাচীন আরবিতে সমার্থক শব্দ ওয়াবা ও তাউনকে পৃথক ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। উনি সকল মহামারীকে ওয়াবা এবং তাউনকে ওয়াবার অন্তর্ভুক্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্লেগ রোগ হিসাবে অভিহিত করেন। উনার মতে “সকল তাউনই ওয়াবা কিন্তু সকল ওয়াবাই তাউন নয়”। আল নাওয়ায়ির এই আধুনিক সংজ্ঞাটি ইস্লামিস্টগন বহুল্ভাবে ব্যবহার করে থাকেন, কারন এর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মহামারীর মদিনায় প্রবেশকে নবীর হাদিসের বিপরীত নয় বলে দাবি করা যায় যেহেতু করোনা ভাইরাস মহামারী কিন্তু Yersinia pestis  দ্বারা সংক্রামিত প্লেগ নয়, অন্য কথায় আল নাওয়ায়ির সংজ্ঞা অনুযায়ী  দাবী করা হচ্ছে করোনা ভাইরাস মহামারী ওয়াবার অন্তর্ভুক্ত কিন্তু হাদিসে বর্ণিত তাউন নয়।

উপরে সংক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কিভাবে তাউন শব্দটিকে শুধুমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্লেগ রোগ বুঝাতে হাদিসে ৮৪০ সালের পর থেকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  তৌরাত, ইঞ্জিল , নবী মোহাম্মাদ (দঃ), সাহাবায়ে কেরাম বা তাবে তাবাইন কারো বর্ণনায় তাউন বা প্লেগ বলতে “চিকিৎসা বিজ্ঞানের Yersinia pestis  দ্বারা সংক্রামিত প্লেগ” রোগ বুঝানো হয় নাই।  সবচেয়ে প্রাচীন আরব ভাষার ডিকশনারি রচনা করেন আল খালিলি ইবন আহমাদ আল ফারাহিদি (৭১৮-৭৮৬), উনার কিতাব আল আইন গ্রন্থে তাউন ও ওয়াবা কে একই অর্থবোধক শব্দ হিসাবে বর্ণনা করে মহামারী বা রোগের বিস্তার বুঝানো  হয়েছে (Conrad, Lawrence I,1982)। যেমনটি রোগ বা ব্যাধি বলতে আমরা একই কথা বুঝি। ইবন মানজুর (মৃত্যু ১৩১১ বা ১৩১২) লিসান আল আরব গ্রন্থে তাউন ও ওয়াবাকে সমার্থক বলেছেন। আধুনিক কালে গুরুত্বপূর্ণ সৌদি সালাফি স্কলার শেইখ ইবন উথায়মিন কলেরাসহ যে কোন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মহামারীকে তাউনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন

উপরের ব্যাখ্যামুলক পরস্পর বিরোধী তথ্যের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নবী মোহাম্মাদ (দঃ) তার তাউন বা ওয়াবা সংক্রান্ত হাদিসে কি বুঝিয়েছেন বা নিজে কি বুঝেছেন; বর্তমান বিজ্ঞান কি বলে সেটা নয় বরং নবীর হাদিসই একজন মুমিনের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নবী মোহাম্মাদ (দঃ) এর সময়কালের বহু আগে থেকে শুরু করে আঠারো শতকে জীবাণু তত্বের আবিস্কারের আগ পর্যন্ত রোগ বিস্তারের কারন হিসাবে গালেনিও মাইয়াসমা (miasma) বা দূষিত বায়ু তত্ত্ব খ্রিস্টীয় ও মুসলিম সমাজে ছিল বহুল প্রচলিত ধারনা। নবী মোহাম্মাদ (দঃ)ও এর বাইরে নন, নীচে বর্ণিত হাদিসটি লক্ষ্য করুন, এই হাদিসটি বেশ অনেকগুলো মতনে বর্ণনা করা আছে। নীচে উল্লেখিত হাদিসটি সবচেয়ে সহি। করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে সবচেয়ে সহি ইসলামি দল আই এস পর্যন্ত তার জিহাদি যোদ্ধাদের নীচের হাদিসটি মেনে চলার নির্দেশ জারি করেছে।

Jabir b. ‘Abdullah reported Allah’s Messenger ﷺ as saying: Cover the vessels and tie the waterskin, for there is a night in a year when pestilence descends, and it does not pass an uncovered vessel or an untied waterskin but some of that pestilence descending into it. Sahih Muslim, 2014a (From SUNNAH.COM)

৫১৫০-(৯৯/২০১৪) আমর আন নাকিদ (রহঃ) ….. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা বাসনগুলো আবৃত রাখবে এবং মশকসমূহের মুখ বেঁধে রাখবে। কারণ বছরে একটি এমন রাত আছে, যে রাতে মহামারী অবতীর্ণ হয়। যে কোন খোলা পাত্র এবং বন্ধনহীন মশকের উপর দিয়ে তা অতিবাহিত হয়, তাতেই সে মহামারী নেমে আসে।

(সহি মুসলিম হাদিস একাডেমী, হাদিস নং ৫১৫০)

উপরে হাদিসে বর্ণিত Pestilence বা মহামারী বলতে আরবি ওয়াবা বুঝানো হয়েছে, আপনারা Google translator দিয়ে Pestilence কে আরবি করলে ওয়াবা পাবেন। এখানে রাতে যে মহামারী অবতীর্ণ হয় বলা হচ্ছে সেটা বলতে প্রকৃত অর্থে গালেনিও মাইয়াসমা (miasma) বা দূষিত বায়ু বুঝানো হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা ধোঁয়াটে বাতাস দেখলে রোগ বিস্তারের আশঙ্কায় ভিত হয়ে পড়তেন (আল ওয়াবা ওয়াল মারাদ)। “খারাপ বাতাস” লেগে বাচ্চার রোগ হয়েছে এই ধারনা আজও গ্রাম বাংলায় পাওয়া যায়।

এর পরেও প্রশ্ন থাকে, যেহেতু ওয়াবা ও তাউন দুটো সমার্থক শব্দ রয়েছে, নবী নিজে তাউন কি বিশেষ ভাবে কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন? এর উত্তর হল, নবী তাউন (আধুনিক অনুবাদে প্লেগ) বলতে তৌরাতে বর্ণিত বনি ইস্রাইলদের প্রতি আযাবকে বুঝিয়েছেন, সেই আযাব যেমন রোগ ব্যাধিও মহামারী হতে পারে তেমনি হতে পারে ভুমিকম্প বা যে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এই তাউন আল্লাহ্‌ যে কারো উপরে পাঠাতে পারেন। তাউন নিয়ে নবীর এই ধারনা আহালে কিতাবদের গ্রন্থে বর্ণিত প্লেগের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ, মডার্ন ইস্লামিস্টগন যেভাবে তাউনকে নির্দিষ্ট জীবাণুর সংক্রমণে ঘটিত প্লেগ রোগ হিসাবে বুঝাতে চান সেটা নবীর বুঝ নয়। নবী আরও বলেছেন এটি কাফেরদের জন্য গজব কিন্তু মুমিনদের জন্য এই একই আযাবে মারা গেলে সে পাবে শহীদের সাওয়াব।

মুহাম্মদ ইবনু হাতিম (রহঃ) … আমির ইবনু সা’দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। এক ব্যাক্তি সা’দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) বললেন, আমি সে বিষয়ে তোমাকে অভিত করছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তা একটি আযাব কিংবা একটি শাস্তি যা আল্লাহ্‌ পাক বনী ইসরাইলের একটি উপদল কিংবা তোমদের পূর্ববর্তী কোন একদল লোকের উপরে পাঠিয়েছিলেন। সুতরাং কোন এলাকায় তাঁর কথা শুনলে সেখানে তাঁর উপরে (প্লেগকে পরোয়া না করে) তোমরা প্রবেশ কর না, আর কোন এলাকায় তোমাদের উপরে তা এসে পড়লে সেখান থেকে পলায়নের উদ্দেশ্যে বের হয়ো না।

(সহীহ মুসলিম ইফাঃ, হাদিস নং ৫৫৮৩) হাদিসের মানঃ সহিহ)

ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল হানযালী (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেনঃ এটা হচ্ছে আল্লাহর এক আযাব। আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা তার ওপরই প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাআলা এটা মুসলমানের জন্য রহমাতে পরিণত করেছেন। প্লেগাক্রান্ত শহরে কোন বান্দা যদি ধৈর্যধারণ করে এ বিশ্বাস নিয়ে সেখানেই অবস্থান করে, তা থেকে বের না হয়। আল্লাহ তাআলা তার জন্য যা ভাগ্যে লিখেছেন তা ব্যতীত কিছুই তাকে স্পর্শ করবে না, তাহলে সে শহীদের সাওয়াব লাভ করবে।

(সহি বুখারি ইফাঃ হাদিস নং ৬১৬৬, হাদিসের মানঃ সহিহ)

নবী তাউন বা প্লেগ হিসাবে যখন কোন বিশেষ রোগ বুঝাতে চাইতেন তখন উনি “জিনের খোঁচা” দ্বারা সংঘটিত রোগকে বুঝিয়েছেন, যেমনটি উল্লেখিত হাদিসে বলা আছে।

“হে আল্লাহর রসূল! যুদ্ধ তো চিনলাম, কিন্তু প্লেগ কী?’ তিনি বললেন, “তা হল জ্বিন জাতির তোমাদের দুশমনদের খোঁচা। আর উভয়ের মধ্যেই রয়েছে শহীদের মর্যাদা।” ”

(আহমাদ ১৯৫২৮, ত্বাবারানী ১৬০৭নং) হাদিসের মান ঃ সহিহ

মুসাদ্দাদ (রহঃ) …… জাবির ইবন আবদিল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ তোমাদের ইশার সময়, রাবী মুসাদ্দাদ (রহঃ)-এর বর্ণসা অনুযায়ী, সন্ধ্যার সময় তোমাদের বাচ্চাদেরকে হিফাযত করবে। কেননা, জিনরা এ সময় ছড়িয়ে পড়ে এবং ছোট বাচ্চাদের খোঁচা দেয়।

(সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ) হাদিস নং ৩৬৯১ হাদিসের মান ঃ সহিহ )

আল খালিলি ইবন আহমাদ আল ফারাহিদির (৭১৮-৭৮৬), কিতাব আল আইন গ্রন্থের ওয়াবা ও তাউন শব্দের অর্থ,  নবী যে ভাবে বুঝিয়েছেন তার সাথে সবচেয়ে মিল পূর্ণ, এর কারণটি অতি সহজ, কারন এই গ্রন্থটি নবীর সময়কালের সবচেয়ে নিকটবর্তী। এখানে ওয়াবা ও তাউনকে সমার্থক বলার পর দুটো শব্দের ব্যাপ্তি বর্ণনা করা হয়েছে। ওয়াবাকে দূষিত বায়ু বা পরিবেশ দ্বারা সৃষ্ট রোগ মহামারীকে বুঝানো হয়েছে, আর তাউন বলতে  জ্বিন জাতির খোঁচা দ্বারা সৃষ্ট যন্ত্রণাপূর্ণ রোগ বুঝানো হয়েছে। বুৎপত্তিগত ভাবেও তাউন শব্দের অর্থ ছিদ্র করে দেওয়া। উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে নবীর হাদিসে তাউন,ওয়াবা, প্লেগ, মহামারী এগুলো বলতে কোন একটি বিশেষ রোগ বা নির্দিষ্ট এক প্রকার বালা মুসিবতের কথা বলা হয় নাই। মডার্ন ইস্লামিস্টগন যেভাবে তাউন শব্দটি নিয়ে দাহাহার মত প্রতিষ্ঠা করতে চান ব্যাপারটি মোটেও অতটা সহজ নয়।

কাফের-ইয়াহুদি-নাসারদের উদ্ভাবন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সকল শাখায় সর্বধরনের ইস্লামিস্টদের ব্যাপক বিচরন। জামাতি-হেফাজতি থেকে শুরু করে আই এস, আন্সারুল্লাহ কেউ পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ সকল ইসলামী দেশে ইসলাম নিয়ে যে কোন সমালোচনার জন্য কল্লা ফেলে দেওয়ার সুবন্দবস্ত আছে, ইসলামিজমের কল্যাণে এই সকল দেশের সরকার ও সকল রাজনৈতিক দল এই একটি ব্যাপারে ঐকমত। তবে, কাফেরদের দেশে এই সুবিধাটি নেই। মুসলিম সমাজে যেমন কাতারে কাতারে মানুষ ইসলামিজমের ছায়াতলে আসছে এর বিপরীতে বিশেষ করে তরুণদের ভেতর ইসলাম ত্যাগ করে নাস্তিক-মুরতাদ হওয়ার সংখ্যাটিও কিন্তু ব্যাপক। এই সব নাস্তিক-মুরতাদদের নানা ইসলাম বিরোধী লেখা আর চিন্তা চেতনার জবাব দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ইসলামি এপলজিস্ট ওয়েব সাইট। আমদের দেশে কল্লা ফেলে দেওয়ার পাশাপাশি এই   ধরনের ইসলামি ওয়েব সাইট গুলো মুলত অতি নিম্নমানের অবৈজ্ঞানিক কুযুক্তি ও নির্জলা মিথ্যা বলে থাকে  বলে শিক্ষিত সমাজে এগুলো তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায় নি। তবে পশ্চিমা দেশে শিক্ষার মান উন্নত হওয়ার কারনে অবৈজ্ঞানিক গাঁজাখুরি নিম্নমানের উপাদান দিয়ে অন লাইনে টিকে থাকা দুস্কর। এইসব মাথায় রেখে সেখানকার অনেক মডার্ন  ইস্লামিস্টগন ইসলামের সাথে বিজ্ঞানের এক জগা খিচুড়ি বানিয়ে এক অদ্ভুত সঙ্কর প্রজাতির ইসলামের জন্ম দিয়েছে। যেমন, অন লাইনে সুপরিচিত শেইখ ইয়াসির কাদি একদিকে ইয়াজুজ মাজুজের বৈজ্ঞানিক প্রমান দিতে হলিউড  ফিকশনের জম্বির গল্প ফাদেন আর কেও বা কোরান অনুযায়ী বুকের ভিতরের থেকে বীর্য প্রবাহিত করার জন্য বিজ্ঞানের ঘাড় মোটকে অণ্ডকোষ থেকে বীচি প্রায় কাঁধে তুলে ফেলেছেন। এই সকল বে – জ্ঞানী ইস্লামিস্টগন চারআনা পরিমান করোনা ভাইরাস আর প্লেগের বিজ্ঞানের সাথে চারআনা পরিমান পছন্দমত হাদিস আর আটআনা পরিমান স্বরচিত ও স্বব্যাখ্যায়িত তাফসীর করে থাকেন। এদের দু একটি বিষয় উল্লেখ করলাম।

করোনা মহামারীতে “ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই” এই হাদিস ছাড়াও যেসব বিষয়ে ইনারা তাফসীর করে যাচ্ছেন তার অন্যতম হল মদিনায় করোনা আক্রমনে নবীর হাদিস  “প্লেগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না” ভুল প্রমানিত হল কিনা? করোনা  ভাইরাসে মরলে শহীদি মর্যাদা পাওয়া যাবে কি? ইত্যাদি। এমনি একটি ইসলামি এপলজিস্ট ওয়েব সাইট ইয়াকিন ইন্সিটিউট এর এই নিয়ে লেখা পড়লাম, যেখানে গতানুগতিক দাবি করা হয়েছে যে এই হাদিসের ক্ষেত্রে তাউন মানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্লেগ বুঝতে হবে সাধারন মহামারী নয়। করোনা ভাইরাস মহামারী যে নবীর তাউন বা প্লেগের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে সেই আলোচনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। ১৮৬৫ সালে হজ্জে যে ভয়াবহ কলেরা মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তাতে মারা যায় ১৫,০০০ হাজী আর মদিনাও রক্ষা পায়নি, হাজীদের নিয়ে ফিরতি জাহাজের ভেতর মারা যাওয়া শত শত মৃতদেহ লোহিত সাগরে নিক্ষেপ করা হয়, কলেরা ছড়িয়ে পড়ে নিউইয়র্ক পর্যন্ত, শুধুমাত্র প্রধান শহরগুলোতে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০০,০০০ এর অধিক (Low, Michael Christopher, 2007)। কাজেই মদিনায় তাউন প্রবেশ করবে না এই হাদিস ইতোমধ্যেই ভুল প্রমানিত হয়ে গেছে। সৌদি সালাফি স্কলার শেইখ ইবন উথায়মিন কলেরাসহ যে কোন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মহামারীকে তাউনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন সে কথা পূর্বে উল্লেখ করেছি, তথ্যসূত্রে বিস্তারিত দেখুন।

মদিনায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে বর্ণিত প্লেগ রোগ প্রবেশে বাধা দিতে ফেরেস্তা পাহারাদার থাকলেও  আল্লাহর ঘর মক্কার ভাগ্যে সেটা জোটে নাই। আর তাইতো মক্কায় হজ্জে গিয়ে ক্রেন ভেঙ্গে বা শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে পদদলিত হয়ে হাজার হাজার হাজী মারা যান। সেই কবে আবাবিল পাখি পাঠিয়ে আল্লাহ কাবা ঘর রক্ষা করেছিলেন এর পর কতবার মুসলমানদের হাতেই কাবাঘর আক্রান্ত হল আবাবিল পাখি তো দুরের কথা একটা মশাও হুল ফুটাতে আসলো না। উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদ ও তারপর আব্দুল মালেকের সেনাপতি আল হাজ্জাজ বিন ইয়ুসুফ, আব্দুল্লাহ ইবন আল জুবায়েরের সাথে যুদ্ধে পাথর নিক্ষেপ করে কাবা ধ্বংস করে দেন ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে, কারমাতি নেতা আবু তাহের সুলাইমান আল জান্নাবি ৯৩০ সালে কাবা আক্রমন করেন, বহু হাজীদের হত্যা করে হজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর লুট করে নিয়ে যান। উনারা হজ্জকে পৌত্তলিক রীতি বলে মনে করতেন। কোরায়েশ বংশোদ্ভূত সালাফি নেতা জুহাইমান আল-ওতোয়বী কাবা আক্রমন করে দখল করেন ১৯৭৯ সালে। মক্কায় প্লেগের আক্রমনে হজ্জ বাতিল হয় ৯৬৭ সালে আর ভয়াবহ কলেরার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। দুষ্ট লোকেরা বলে থাকে নবী মোহাম্মদ (দঃ) নাকি আল্লাহর চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাই বোধ হয় মক্কা নয় মদিনায় ফেরেস্তা পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

সবই বুঝলাম, কিন্তু তারপরও চিকিৎসা বিজ্ঞানে বর্ণিত প্লেগ রোগ কি মদিনায় প্রবেশ করেছিল?

এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য আছে। অষ্টম শতকের পর থেকে মদিনায় তাউন বা প্লেগ হওয়াকে জোরেশোরে অস্বীকার করা হয়। অষ্টম শতকের পর থেকে হাদিস সঙ্কলন সমুহে আল আস্মাই ও আল মাদাইনির করা তাউন বা প্লেগের তালিকা বাদ দেওয়া হয়।

সৌদি শিলালিপি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মাদ আল মাগথাওয়ি  ৭৬৯ সালে মদিনায় হওয়া এক মহামারীর তথ্যসম্বলিত বেশ কিছু শিলা লিপির ছবি প্রকাশ করেছে। এর একটিতে লেখা আছে ঃ

করোনা ভাইরাস
হে আল্লাহ মদিনার মানুষদের উপর থেকে প্লেগ ও কষ্ট তুলে নাও

The second inscription says, “O God, lift the plague and hardship from the people of Medina. Written in Jumada 152 [A.H., May-June 769 A.D.].”

অর্থাৎ ঃ হে আল্লাহ মদিনার মানুষদের উপর থেকে প্লেগ ও কষ্ট তুলে নাও।

মদিনায় ফেরেস্তাদের পাহারা ফাঁকি দিয়ে প্লেগ প্রবেশ করেছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে বিপুল পরিমানে কাফের, নাস্তিক, মুরতাদ থাকা এই বাংলাদেশে Yersinia pestis  দ্বারা সংক্রামিত প্লেগ হওয়ার কোন ইতিহাস নাই, বাংলাদেশ কি মদিনার চেয়ে পবিত্র শহর ?

করোনা ভাইরাসে মরলে শহীদি মর্যাদা পাওয়া যাবে কি?

সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি প্লেগ বা তাউন রোগে মারা যায়-সে শহীদ; যে ব্যক্তি (নদী ইত্যাদিতে) ডুবে মরেছে-সে শহীদ, (আল্লাহর রাস্তায়) অভিযানে মৃত ব্যক্তি শহীদ; পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ; আর যে মহিলা নেফাসকালীন সময়ে মৃত্যু বরণ করে-সেও শহীদ।

(সুনান আদ দারেমি, হাদিস নং ২৪৫২ হাদিসের মান ঃ হাসান)

করোনা ভাইরাসে মরলে শহীদ হবে কিনা এই নিয়ে আলেমরা একমত নয়। কারন হিসাবে অনেকে করোনা মহামারীকে তাউন বা প্লেগের আওতায় ফেলছেন না তার কারন এটিকে প্লেগ স্বীকার করে নিলে নবীর মদিনা নিয়ে হাদিস মিথ্যা হয়ে যাবে। একই যুক্তিতে ইয়াকিন ইন্সিটিউট তাউনকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্লেগ রোগ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে করোনা ভাইরাসকে প্লেগ মহামারীর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, কিন্তু এর মাধ্যমে করোনায় মৃতরা উপরের হাদিস অনুযায়ী শহীদি মর্যাদা থেকে বাদ পড়ে যায়। করোনা ভাইরাস যদি তাউন না হয় আর করোনা ভাইরাস তো কোনভাবেই পেটের পীড়া নয় – এই হিসাবে হাদিস অনুসারে করোনায় মৃতরা শহীদি মৃত্যুর দাবী করতে পারে না। চতুর এই মডার্ন ইস্লামিস্ট ওয়েব সাইট উদ্ভট স্বব্যাখ্যায়িত ফাতওয়া দিয়ে তাদের শহীদি মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে, তারা কি বুঝেছে সেটা উনারাই ভাল বলতে পারবেন,উনাদের যুক্তিগুলো একেবারেই সারবস্তুহীন বিধায় উল্লেখ করার মত কিছু নেই।  

মোদ্দা কথাটি অতি পরিস্কার, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী একই হাদিস একবার বাতিল করতে হবে আবার প্রয়োজনে ফিরিয়ে আনতে হবে, এটা করতে হাদিসের যে কোন শব্দের বা অর্থের পরিবর্তন করা কোন লজ্জার বিষয় নয়। ইসলামকে একবিংশ শতকের যুগোপযোগী প্রমান করতে আর কত গোঁজামিল ইনারা ভবিষ্যতে দিয়ে যাবেন সেটাই দেখার বিষয়।


ঙ) “ছোঁয়াচে বলতে কোন রোগ নেই” এর বিপরীতে বলার মত কোন মুসলিম চিন্তাবিদ বা চিকিৎসক কি ইসলামের ইতিহাসে কি নাই? থাকলে তার পরিনতি কি হয়েছিল?

উত্তরঃ আন্দালুস বা ইসলামিক স্পেনের গ্রানাডায় জন্মগ্রহন করা লিসান আদ দিন ইবন আল খাতিব (১৩১৩-১৩৭৪) ছিলেন একাধারে কবি, চিকিৎসক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, লেখক ও রাজনীতিবিদ। প্লেগের উপর তার লেখায় উনি স্পষ্ট ভাবে এই রোগে সংক্রমণের পক্ষে উনার প্রমান তুলে ধরেন। উনি এও লেখেন যে প্রাপ্ত প্রমানের ভিত্তিতে হাদিসের পরিবর্তন করা উচিৎ। উনার বিরুদ্ধে ফাতওয়া জারি হয় এবং উনাকে মুরতাদ, নাস্তিক ও জিন্দিক হিসাবে অভিহিত করা হয়। উনাকে কারারুদ্ধ করে পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়, তবে এতে উনার বিরোধীরা সন্তুষ্ট না হয়ে কবর থেকে উনার দেহ তুলে পুড়িয়ে দেন। তবে মুরতাদের অভিযোগ ছাড়াও অনেকে উনার মৃত্যুকে রাজনৈতিক কারনে বলে মনে করেছেন।[২৪]

উপসংহার

কভিড১৯ এর প্রভাবে বিশ্ব মানবতা এক বিশাল ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। লক্ষ মানুষের জীবনহানি ছাড়াও এই মহামারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফলাফল অনিশ্চিত। বহু চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সেবা দিতে গিয়ে আক্রন্ত হয়েছেন আর অনেকেই জীবন দিয়েছেন। অনেকেই কর্মহীন মানুষদের এমনকি পশুপাখিদের খাদ্য সরবরাহ করতে এগিয়ে এসেছেন। আমাদের বাংলাদেশে কিছু কিছু মানবিক উদ্যোগ দেখা গেলেও সার্বিক চিত্রটি হতাশাবাঞ্জক। সরকারী পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা, পি,পি,ই না দিয়ে দেশের চিকিৎসকদের ঢালাও দোষারোপ এইসব বিষয় বাদ দিয়েও যদি এই দুর্যোগে আমাদের সামাজিক আচরণ বিচার করি কেউ বিশ্বাস করবে না যে একাত্তরে এই জাতি পাকবাহিনী আর রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচাতে একে অন্যকে আশ্রয় দিয়েছিল। এই একবিংশ শতকের করোনা মহামারীতে খবর আসে যে বাড়িওয়ালা, ডাক্তার ভাড়াটেকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না, সাধারন রোগী হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে মারা যাচ্ছে, এর মধ্যেও ত্রানের চাল চুরি করার লোকের অভাব নেই। দেশ হাঁটছে ইসলামিজমের পিঠে সাওয়ার হয়ে। সারা দেশে কোটি কোটি মসজিদ হয়েছে, রেডিও-টেলিভিসনও পাঁচ ওয়াক্ত আযান দেয়, রাস্তা ঘাটে, অফিস আদালতে এতো হিজাবি নারী আগে কেউ কোন দিন দেখে নি, কেউ ইনশাআল্লাহ, সুবহানাল্লাহ ছাড়া কথা বলেন না, খোদা হাফেয ও ইস্লামিকরন থেকে বাদ যায়নি, খোদাকে ঝেটিয়ে এখন সহি ভাবে আল্লাহ হাফেজ এসেছেন। আর মাঠে-ময়দানে,টিভি – রেডিওতে,ফেসবুক – ইউ টিউবে সবচেয়ে বেশী যার বিস্তার ঘটেছে সেটা হল ওয়াযি মোল্লা-মাশায়েখদের। উনারা ঢিলা – কুলুখের ব্যবহার থেকে শুরু করে অ তে অজগর হবে না অযু হবে সেই পাঠক্রমও ঠিক করে দিচ্ছেন, করোনা ভাইরাসের বেলায় উনারা শীর্ষ ভাইরাস বিশেষজ্ঞের চাইতেও বড় বিশেষজ্ঞ। দেশ ও জাতির এতো ইস্লামিকরন করার পরেও এই জাতি হয়েছে আরও অমানবিক, নির্দয়, দুর্নীতিবাজ, নিয়তিবাদী, বিজ্ঞানবিমুখ এক জাতি। করোনা ভাইরাস প্রকান্তরে, সব কিছু সামনে এনে দিয়েছে। কোন এক ইসলামিস্টের “তোদের বিজ্ঞান কি …টা ছিঁড়তে পেরেছে?” মন্তব্য দেখে মনে হয়েছে যে, এদের দায় – দায়িত্ব এখন থেকে গাজাহারি-মাজাহারি-এনটারকটিক–বেল্গ্রেদ হুজুরদের হাতে সমর্পণ করার সময় এসেছে, স্বপ্নযোগে আসবে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা, ডাক্তার – নার্স কোন কিছুরই প্রয়োজন নাই, কালজিরা আর মধু দিয়ে সর্ব রোগের চিকিৎসা চলবে, সামনে আগানোর আর প্রয়োজন নাই, সব সমস্যার সমাধান ১৪০০ বছর আগেই দেওয়া আছে। করোনা ভাইরাস হয়ত অচিরেই দূর হবে, তার চেয়ে ভয়াবহ যে ভাইরাস আমাদের চিন্তা – চেতনাকে পঙ্গু বানিয়ে রেখেছে তার অবসান কবে হবে?

তথ্যসূত্র

(বিঃদ্রঃ বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারী ও এর ধর্মীয় – সামাজিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে লিখিত আর্টিকেলটিতে রোগের মহামারী সংক্রান্ত প্রাচীন ইতিহাস ও প্রচুর চিকিৎসা বিজ্ঞানের রেফারেন্সে ব্যবহার করা হয়েছে। লেখকের পক্ষ থেকে এই অনুরোধ জানানো হচ্ছে যে লেখার কোন অংশ ব্যাবহারের ক্ষেত্রে সংশয় ডট কমের ওয়েব সাইটের লিঙ্কটি ও “সংশয় ডট কম থেকে সংগৃহীত” এই কথাটি উল্লেখ করবেন)

লেখায় উল্লেখিত সকল ওয়াযিদের বক্তব্যের ইউ টিউব লিঙ্ক দেওয়া আছে, পাঠকরা সব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে নেবেন। আধুনা ইস্লামিস্টদের অসততার কারনে উনারা পরিস্থিতি অনুযায়ী  উনাদের ভিডিও সমুহ ডিলিট করে দেন ও পরবর্তীতে বেমালুম অস্বীকার করেন, এই ক্ষেত্রে উনারা নিজ মহলে যে ব্যাখ্যাটি দিয়ে থাকেন সেটি হল, ইসলামকে বাঁচাতে বা শক্তিশালী করতে মিথ্যা বলা ও প্রতারনার আশ্রয় নেওয়া ইসলামে জায়েজ। বর্তমানে কোরানের তাফসীর সমুহের নতুন সংস্করনে ইস্লামিস্টগন কোরানের আয়াতের শব্দ পর্যন্ত পরিবর্তন করেছেন ও অনেক ক্ষেত্রে নতুন বাক্য সংযোজন করেছেন! তরবারির আয়াত খ্যাত সুরা তাওবার ৫ নং আয়াতের অনুবাদে “যুদ্ধ” শব্দটি নতুন ভাবে সংযোজন করা হয়েছে এই আয়াতটিকে যুদ্ধকালীন আয়াত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, সংযোজন করা হয়েছে “যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল” – এই বাক্যটি, যা সুরা তাওবার ৫ নং আয়াতের মধ্যেই নেই । “একটি তরবারির আয়াতের (The sword verse) পর্যালোচনা, প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য” লেখাটির “প্রিন্ট মিডিয়ায় তরবাবির আয়াত ও অন্যান্য তাফসির বিকৃতি” শীর্ষক অংশটি পড়ে মিলিয়ে নিন।

১। ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) ও আল রাযী (৮৪৫-৯২৫) ইসলামের স্বর্ণযুগ বলে পরিচিত সময়কালের বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী যাদের পুস্তক প্রায় আঠারো শত সাল পর্যন্ত ইউরোপে পাঠ্যপুস্তক ছিল। জাতিতে পারসিক এই দুই চিন্তাবিদের চিকিৎসা বিজ্ঞান ছাড়াও দর্শন, গনিত, রসায়নবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা সহ জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা শাখায় ইনাদের আছে অসংখ্য অবদান। ইবনে সিনা চিকিৎসা শাস্ত্রের বিশ্বকোষ আল-কানুন ফিত-তিব রচনা করেন যা ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠ্য ছিল। শিশুরোগবিদ্যার জনক হিসাবে কোন কোন লেখায় উল্লেখ করা আল রাযী চক্ষুরোগ ও ধাত্রীবিদ্যায় সেই সময়ে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। ইসলামিজমের প্রভাবে এই দুই বিজ্ঞানী সহ নানা মনিষীকে মডার্ন ইস্লামিস্টগন মহা ধার্মিক মুমিন মুসলমান হিসাবে দাবি করে থাকেন। ইসলামি প্রোপাগান্ডার সুনামিতে এ কথা কেউ জানেনা যে বিশ্ব সৃষ্টি, ঈশ্বর বিশ্বাস, নুবুয়ত ও ধর্ম নিয়ে উনাদের চিন্তা ও লেখা পর্যালোচনা করলে এই যুগে নাস্তিকতা আর ধর্মীয় অনুভুতি আহত করার দায়ে আমাদের তৌহিদী জনতা এতদিনে তাদের কল্লা ফেলে দেওয়ার জন্য আন্দোলনে নেমে যেতেন। নিম্নে এই ব্যাপারে অতি সামান্য তথ্য দেওয়া হল।

Claims about Ibn Sina being an atheist or Kafir
Fatwa No: 87783 Fatwa Date:20-5-2004 – Rabee’ Al-Aakhir 1, 1425
Ibn Sinna (Avicenna) was accused of being a Kafir and an atheist because of his statements about the antiquity of the world, his rejection of the Hereafter, and other atheist theories, in addition to his inner legendary ideology.
Other scholars stated that Ibn Sinna was an atheist before Sheikh Al-Huwaini did; amongst them is: Al-Ghazali, Ibn Taymiyah, Ibn Al-Qayim, and Al-Dhahabi.
(পৃথিবীর সৃষ্টির ব্যাপারে ও পরকালকে অস্বীকার করার কারনে ইবনে সিনা কাফির ও নাস্তিক। শাইখ আল হুওানির পূর্বে যারা এইমত প্রকাশ করেছেন তারা হলেন ঃ আল গাজ্জালি, ইবন তাইমিয়া, ইবন আল কাইয়িম এবং আল দাহাবি)

উল্লেখিত লিঙ্কটিতে বিভিন্ন ইসলামি স্কলারদের রেফারেন্স দিয়ে ইবনে সিনা যে কাফির, নাস্তিক – মুরতাদ ছিল তার সন্দেহাতিত প্রমান উপস্থাপন করা হয়েছে।
Shaykh al-Islaam Ibn Taymiyyah on Ibn Sina
Aboo ‘Alee Al-Husayn ibn ‘Abdillaah ibn al-Hasan ibn ‘Alee ibn Sina (d.428) was born to a severely deviant Ismaa’eelee (Shiite) family, known for their severe blasphemy and hypocrisy, as mentioned by Shaykh al-Islaam Ibn Taymiyyah.[1] In fact, as Ibn Taymiyyah said:
وأحسن ما يُظهرون دين الرفض وهم في الباطن يُبطنون الكفر المحض
“The best thing they showed openly was ar-Rafdh (being Raafhidah Shiites), while they concealed pure, absolute disbelief inwardly.”
Additionally, Shaykh Saalih al-Fowzaan, Shaykh Ibn ‘Uthaymeen, and others mentioned that it is not permissible to name schools, hospitals, or health clinics after him (in his honor).
Muslims who have mistakenly praised this severely deviant disbelieving philosopher, Ibn Sina, are urged to hasten to repent to Allah and free themselves of this serious error, lest they be counted alongside of Ibn Sina as a disbeliever in this life and the Next, and refuge with Allaah is sought.
And Allaah knows best.

On ReligionAl-Razi wrote three books dealing with religion: (1) The Prophet’s Fraudulent Tricks, (2) The Stratagems of Those Who Claim to Be Prophets (Arabic حيل المتنبيين), and (3) On the Refutation of Revealed Religions (Arabic مخارق الانبياء). He offered harsh criticism concerning religions, in particular those religions that claim to have been revealed by prophetic experiences.
The prophets—these billy goats with long beard—cannot claim any intellectual or spiritual superiority. These billy goats pretend to come with a message from God, all the while exhausting themselves in spouting their lies, and imposing on the masses blind obedience to the “words of the master.” The miracles of the prophets are impostures, based on trickery, or the stories regarding them are lies.

অতি সংক্ষেপে আল রাযী নবীকুলকে লম্বা দাঁড়িয়ালা রামছাগলের সাথে তুলনা করেছেন, যারা কোনভাবেই বোধশক্তি ও আধ্যাত্মিকতায় উৎকর্ষের দাবীদার হতে পারেন না। এরা ভান করে আল্লাহর থেকে ওহী নিয়ে আসার আর সবার কাছে অন্ধ অনুসরন দাবী করে। বাস্তবিকে এরা মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড, তাদের মোজেজার কাহিনীগুলো মিথ্যা।
২। Yemeni Civil War (2015–present)

৩। দিল্লির তাবলিগ জামায়েত থেকে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা নিয়ে ভারতে তোলপাড়

“Spit Attacks On Doctors”: Police Deployed In LNJPN Hospital To Control Jamaatis

৪। Bangladesh: End Wave of COVID-19 ‘Rumor’ Arrests
৫। Infectious diseases kill over 17 million people a year: WHO warns of global crisis
৬। করোনা ভাইরাস কি আসলেই ছোঁয়াচে রোগ এ ব্যাপারে কি বলে ইসলাম?। । corona virus।। mayar badhon
৭। করোনা ভাইরাস স্কুল কলেজ বন্ধ মুখ খুললেন আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ | করোনা ভাইরাস আবার কি
ছোঁয়াচে রোগ সংক্রমণ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে ।।আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
৮। নাস্তিক ব্লগার Asif Mohiuddin এবং Modon Kumar Hasan এর ২৫ মার্চের লাইভের পর্যালোচনা- মুশফিক মিনার

ইসলাম কি ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে?_মুশফিক মিনার | ডা. রাফান আহমেদ |২৯.০৩.২০
৯। Leprosy and Infectous Diseases Hospitals
১০। Plague in the Ancient & Medieval World
১১। প্লেগ নিয়ে বাইবেলের কিছু আয়াতঃ
• God sent ten plagues upon the Egyptians before the Israelites left Egypt. These plagues include the plague of blood, the plague of frogs, the plague of lice (gnats), the plague of flies, the plague of livestock, the plague of boils, the plague of hail, the plague of locusts, the plague of darkness, and the death of the firstborn (Exodus 7:14–12:36).
• God promised judgment if the people of Israel turned against the Lord. Part of God’s judgment included plagues (Leviticus 26:25).
• God sent a three-day plague to wipe out 70,000 men after King David sinned by numbering the people of Israel (2 Samuel 24:10–17).
• Amos prophesied that God would send several judgments against the nation of Israel, including plagues similar to what Egypt endured (Amos 4:10).
• God sent several judgments against the nation of Judah, including a plague, when he sent King Nebuchadnezzar to sack Jerusalem (Jeremiah 21:7, 24:10, 29:17).
• The plagues described in the Book of Revelation including those sent by the two witnesses (Revelation 11:6) and the seven final plagues sent by God (Revelation 15:1).
১২। Plague of Amwas
১৩।
Narrated Abu Qatada:
When it was the day of (the battle of) Hunain, I saw a Muslim man fighting with one of the pagans and another pagan was hiding himself behind the Muslim in order to kill him. So I hurried towards the pagan who was hiding behind the Muslim to kill him, and he raised his hand to hit me but I hit his hand and cut it off. That man got hold of me and pressed me so hard that I was afraid (that I would die), then he knelt down and his grip became loose and I pushed him and killed him. The Muslims (excepting the Prophet and some of his companions) started fleeing and I too, fled with them. Suddenly I met ‘Umar bin Al-Khattab amongst the people and I asked him, “What is wrong with the people?” He said, “It is the order of Allah”
Classification
Sahih (Authentic)
References
• Sahih al-Bukhari, 4322
• Sahih al-Bukhari, Vol. 5, Book of Military Expeditions led by the Prophet ﷺ (Maghaazi), Hadith 611
• Sahih al-Bukhari, Book of Military Expeditions led by the Prophet ﷺ (Maghaazi), Hadith 611
১৪। Jalaluddin Rumee & Shubochon Nirbashone |Analysis of religion from different point of view P-1। মনোবিজ্ঞান,সমাজবিজ্ঞান,নৃবিদ্যা, স্নায়ু বিজ্ঞান ও বিবর্তনের আলোকে ধর্ম চেতনা।
১৫। মুরজিয়াহ বিতর্ক আর সুন্নি ইসলামে বিভাজন
১৬। The average incubation period for varicella is 14 to 16 days after exposure to a varicella or a herpes zoster rash, with a range of 10 to 21 days.

Varicella is highly contagious. The virus can be spread from person to person by direct contact, inhalation of aerosols from vesicular fluid of skin lesions of acute varicella or zoster, and possibly through infected respiratory secretions that also may be aerosolized. A person with varicella is contagious beginning 1 to 2 days before rash onset until all the chickenpox lesions have crusted.

১৭। Lowe GL, Salmon RL, Thomas DR, et al Declining incidence of chickenpox in the absence of universal childhood immunisation Archives of Disease in Childhood 2004;89:966-969.
Conclusion: General practitioner consultation rates for chickenpox are declining in Wales except in pre-school children. These findings are unlikely to be a reporting artefact but may be explained either by an overall decline in transmission or increased social mixing in those under 5 years old, through formal child care and earlier school entry, and associated increasing rates of mild or subclinical infection in this age group. Further investigation, particularly by serological surveillance, is necessary before universal varicella immunisation can be considered in the UK.

১৮। Hansen’s Disease (Leprosy)
Leprosy was once feared as a highly contagious and devastating disease, but now we know it doesn’t spread easily and treatment is very effective.
Prolonged, close contact with someone with untreated leprosy over many months is needed to catch the disease.

You cannot get leprosy from a casual contact with a person who has Hansen’s disease like:
• Shaking hands or hugging
• Sitting next to each other on the bus
• Sitting together at a meal
১৯। নবীজির পবিত্র পস্রাব, পায়খানা ও রক্ত মুবারকঃ
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পস্রাব, পায়খানা ও রক্ত মুবারক পাক পবিত্র ছিল আর এটা এমন এক বৈশিষ্ট্য যা শুধু নবীজিকেই দান করা হয়েছে।
আল্লামা কাসতুলানী (রঃ) তদীয় ‘মাওয়াহেবুল লাদুনিয়া’ তে একখানা হাদীস উল্লেখ করেন-
عَنْ اُمِّ اَيْمَنْ قَالَتْ قَامَ رَسُوْلُ الله صَلَّي اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ مِنَ اللَّيْلِ اِلَي فَخَّارَةِ فِي جَانِبِ الْبَيْتِ فَبَالَ فِيْهَا فَقُمْتُ مِنَ اللَّيْلِ وَاَنَا عَطْشَانَةُ فَشَرِبْتُ مَا فِيْهَا وَاَنَا لَا اَشْعُرُ فَلَمَّا اَصْبَحَ النَّبِيِّ صَلَّي اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ قَالَ يَا اُمِّ اَيْمَنْ قَوْمِي فَاَهْرِيْقِيْ مَا فِي تِلْكَ الْفَخَّارَةِ فَقُلْتُ قَدْ وَاللهِ شَرِبْتُ مَا فِيْهَا قَالَتْ فَضَحِكَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّي اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ حَتَّي بَدَتْ ثُمَّ قَالَ اَمَا وَاللهِ لَا يُصِيْبُ بَطْنُكِ اَبَدًا
অর্থাৎ- “হযরত উম্মে আয়মান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক রাত্রিতে ঘুম থেকে উঠে ঘরের পার্শে একটি মাটির পাত্রে প্রস্রাব মুবারক করলেন। আমি রাত্রে ঘুম থেকে উঠে খুব তৃষ্ণার্তবোধ করলাম। অতৎপর মাটির পাত্রে যা ছিল তা পান করে নিলাম। পাত্রে কী ছিল তা আমি মোটেই অবগত নই। তারপর সকালে নবী করি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সম্বোধন করে বললেন হে উম্মে আয়মান! ঘুম থেকে উঠো আর মাটির পাত্রে যা আছে তা ফেলে দাও। অতঃপর আমি বললাম নিশ্চয় আল্লাহর কসম মাটির পাত্রে যা কিছু ছিল তা আমি পান করে ফেলেছি। তিনি বললেন (উম্মে আয়মান) তৎক্ষনাৎ আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন এমনকি তাঁর প্রান্তসীমার দাঁত মুবারক প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহর হাবীব বললেন- আল্লাহর কসম তোমার পেটে কখনও পীড়া হবে না।”

কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, “এক ব্যক্তি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেশাব মুবারক পান করেছিলেন। এর ফলে তার সমস্ত শরীর থেকে সারা জীবন সুঘ্রাণ ছড়াতে থাকতো। এমন কি তার বংশধরদের ভিতরেও কয়েক পুরুষ পর্যন্ত উক্ত সুঘ্রাণ পাওয়া যেতো।” (মাদারেজুন নবুওয়াত)

মোদ্দাকথা হল,উম্মে আয়মন (রা.) সহ যাঁরা আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার পেশাব মোবারক পান করেছেন এবং সফিনা (রা.) রক্ত মোবারক পান করেছেন, অপরদিকে হযরত জুবাইর (রা.) ও রক্ত মোবারক পান করেছেন,এ সংক্রান্ত হাদিস
শরীফসমূহ সহীহ বা বিশুদ্ধ। অথচ নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহা পান করতে নিষেধ করেন নাই বরং আনন্দিত হয়েছেন।এ সকল দলিলের উপর ভিত্তি করে দ্বীনের মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাাইহি ওয়া সাল্লামার পেশাব মোবারক,রক্ত মোবারক এবং পায়খানা মোবারকসহ সকল ফুজলাত মোবারক উম্মতের বেলায় পাক ও পবিত্র বলে অভিমত পেশ করেছেন। ইহাই সঠিক আক্বিদা।

অর্থ : হযরত হাকীমা বিনতে আমীমা বিনতে দাক্বীক্বা মাতা থেকে বর্ননা করেছেন।নিশ্চয়ই তিঁনি বলেছেন, একদা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি পাত্রে নূরুশ শেফা মুবারক করলেন এবং তা খাট মুবারকের নিচে রেখে দিলেন।এরপর তার একটি ব্যবস্থা করার ইচ্ছা করলে এসে দেখলেন পাত্রের মধ্যে কিছু নেই। তখন তিঁনি বারাকা নামের এক মহিলা,যিনি হাবশা হতে উম্মু হাবীবা আলাইহাস সালাম উঁনার খাদিমা হিসাবে এসেছিলেন,তাঁকে বললেন,পাত্রের মধ্যে যে নূরুশ শেফা মুবারক ছিলো তা কোথায় গেল ? উত্তরে তিনি বললেন,আমি উহা পান করে ফেলেছি। তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,অবশ্যই তুমি তোমার নিজেকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ রাখলে।” সুবহানাল্লাহ্ !!

*****দলিল******
*(ক.) ত্বাবরানী ফিল মু”জামিল কবীর, ২৪ তম খন্ড,১৮৯ পৃষ্ঠা/২৫ তম খন্ড, ৮৯ পৃষ্ঠা
*(খ.) আল মুসতাদরেক লিল হাকিম: ১ম খন্ড,২৭২ পৃষ্ঠা,হাদিস নং-৫৯৩/
৪র্থ খন্ড,৭১পৃষ্ঠা,হাদিস নং ৬৯১২
*(গ.) ইবনু হিব্বান,হাদিস নং ১৪১৩
*(ঘ.) দালাইলুন নবুওয়াত,২য় খন্ড, ৬৫৪ পৃষ্ঠা
*(ঙ.) খাছায়েছুল কুবরা,১ম খন্ড,১২২ পৃষ্ঠা
*(চ.) মাদারেজুন নবুওয়াত,১ম অধ্যায়
*(ছ.) মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক
*(জ.) আদদারু কুতনী
*(ঝ.) আবু ইয়ালা
২০। The Law Concerning Leprosy, Leviticus 13 New King James Version (NKJV)
২১। Philip A. Mackowiak, Paul S. Sehdev. Clinical Infectious Diseases 2002; 35:1071–2
২২। A Short History of Quarantine by Peter TysonTuesday, October 12, 2004
২৩। Norrie, Philip. (2016). How Disease Affected the End of the Bronze Age. 10.1007/978-3-319-28937-3_5.
রেফারেন্সটি একটি ডক্টরেট থিসিস। লেখায় উল্লেখিত “প্লেগ প্রার্থনা” ও মিসরীয় ফারাও আখেনেটান সম্পর্কিত অংশের পৃষ্ঠা নম্বর দেওয়া হল।
“প্লেগ প্রার্থনা” পৃষ্ঠা ৮১
Akhenaten in c1348 BCE. It was the usual practice of pharaohs to visit towns and
travel from religious festival to religious festival along the Nile but Akhenaten did not
travel and stayed only within the boundaries of his new city – was it to isolate himself from the plague?(page 88)
২৪। https://infogalactic.com/info/Ibn_al-Khatib

Further reading:

Dols, Michael W. “Plague in Early Islamic History.” Journal of the American Oriental Society, vol. 94, no. 3, 1974, pp. 371–383. JSTOR, . Accessed 28 Apr. 2020.

Buzzard, Chloe, “Sin, Salvation and the Medieval Physician: Religious Influences on Fourteenth Century Medicine” (2017). Student
Theses, Papers and Projects (History). 66.

Conrad, Lawrence I. “Tāʿūn and Wabāʾ Conceptions of Plague and Pestilence in Early Islam.” Journal of the Economic and Social History of the Orient, vol. 25, no. 3, 1982, pp. 268–307. JSTOR, www.jstor.org/stable/3632188. Accessed 9 May 2020.

 Abdul Nasser Kaadan MD, PhD*, Mahmud Angrini MD Was the Plague Disease a Motivating or an Inhibiting Factor in the Early Muslim Community.

Justin Stearns. New Directions in the Study of Religious Responses to the Black Death. History Compass 7 (2009): 1–13,10.1111/j.1478-0542.2009.00634.

Low, Michael Christopher, “Empire of the Hajj: Pilgrims, Plagues, and Pan-Islam under British Surveillance,1865-1926.” Thesis,Georgia State University, 2007.

Shaykh Ibn ‘Uthaymeen said in Sharh Riyadh as-Saaliheen (6/569):

Ruling on travelling from a country where the Ebola virus is widespread (IslamQA, publication: 21-02-2016, Question 225592)

The plague is a lethal epidemic – we seek refuge with Allah. Some of the scholars said that it is a particular type of epidemic, and it refers to sores and boils on the body of the afflicted person… And it was said that taa‘oon (plague) is a word that applies to any kind of epidemic that spreads rapidly, such as cholera and the like. This is more likely to be correct, because even if that is not included in the wording of the hadith, it is included in the meaning. In the event of any epidemic that spreads rapidly, it is not permissible for anyone to travel to the land where this epidemic has broken out, and if it breaks out when you are in that land, then do not leave, fleeing from it. As for a person leaving that land, not to flee from it, but because he came to that land for a reason and has finished what he went there to do, and wants to return to his own land, there is nothing wrong with him doing so. End quote. 

shubochon

A free thinking human being and humanist

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *