fbpx

ইবনে সিনা কী মুসলিম ছিলেন?

ভূমিকা

প্রায় প্রতিদিনই আমরা অনেকের মুখে কিছু কথাবার্তা শুনতে পাই যে, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সূচনা নাকি মুসলিমদের থেকেই হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে ইসলামের প্রচারকগণ প্রায়শই কয়েকজন প্রখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞানী কিংবা সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করেন। সেই সব উল্লিখিত নামের মধ্যে ইবনে সিনার নাম খুবই জোরেসোরে শোনা যায়। মুসলিমগণ এই নিয়ে খুবই গর্ববোধ করেন যে, একজন মুসলিম বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক সারা পৃথিবীতে এত বেশি বিখ্যাত এবং মানব সভ্যতার জ্ঞান বিজ্ঞানের এক অন্যতম নক্ষত্র স্বরূপ। মুসলিমদের এই গর্বের ফলাফল হিসেবে নানা দেশে প্রচুর সংখ্যক হাসপাতাল, গবেষনাগার এমনকি সড়কের নামও রয়েছে ইবনে সিনার নামে। মুমিন মুসলমানগণ এই মুসলিম নাম দেখেই ভক্তি সহকারে এই হাসপাত্যালে হালাল চিকিৎসা নিতে যান। তখন যাচাই করে দেখা প্রয়োজন হয়ে যায় যে, ইবনে সিনা আসলে কে ছিলেন? কেমন মুসলমান ছিলেন? ইসলামের মূল ইমান আকিদারে প্রতি তার কতটুকু বিশ্বাস ছিল?

আমরা যখন আইনস্টাইনের কথা বলি, তখন কখনই তার ধর্মবিশ্বাস কী তা নিযে আলোচনা শুরু করি না। বা ধরুন নিউটন/ডারউইন একজন বৃটিশ বিজ্ঞানী, নীটশে/মার্ক্স জার্মান দার্শনিক, রবীন্দ্রনাথ বাঙালি সাহিত্যিক-শেক্সপিয়র ইংরেজ সাহিত্যিক। আমি কখনও কাউকে দাবী করতে শুনিনি, আইনস্টাইন একজন ইহুদী বিজ্ঞানী, নিউটন-ডারউইন খ্রিষ্টান বিজ্ঞানী, শেক্সপিয়র খ্রিষ্টান সাহিত্যিক ছিলেন। কারণ এই সকল বিখ্যাত মানুষেরা আসলে ক্ষুদ্র ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। উনারা পুরো মানব সমাজের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু একটি বিশেষ ধরণের হিপোক্রেসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভেতরে প্রায়শই দেখা যায়। যেটা হচ্ছে, তারা কোন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিকের নাম বলার সময় আরব দার্শনিক বা পারশ্যের বিজ্ঞানী না বলে তাদেরকে ‘মুসলিম’ দার্শনিক বা বিজ্ঞানী বানিয়ে ফেলেন! তাদের ধর্ম পরিচয়টা কিভাবে যেন শুধু মুসলিমদের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে! পৃথিবীর সকল কিছু ভাগাভাগির পরে জ্ঞান বিজ্ঞানকেও উনারা ভাগ করতে চান ধর্মের ভিত্তিতে। তাহলে কী, আপেক্ষিক তত্ত্ব একটি ইহুদী বিজ্ঞান? অভিকর্ষ তত্ত্ব একটি খ্রিস্টান বিজ্ঞান? শুণ্যের আবিষ্কার কী হিন্দু বিজ্ঞান? এরকম কেউ সাধারণত দাবী করে না। শুধুমাত্র কোন মুসলমান বিজ্ঞানী কিছু আবিষ্কার করলেই, বর্তমান সময়ে জ্ঞান বিজ্ঞানে তেমন কোন অবদান না রাখা মুসলিমরা ইসলামী বিজ্ঞানী কিংবা মুসলমানদের জ্ঞানবিজ্ঞান ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার শুরু করে দেয়। মূলত আপন হীনমন্যতা ঢাকার জন্যেই একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় সবসময় ধর্মটিকে সামনে নিয়ে আসে। আমাদের আজকের আলোচনা হচ্ছে, এই যে ইবনে সিনার মত প্রখ্যাত একজন বুদ্ধিজীবী, উনি কী আসলেই মুসলিম ছিলেন? নাকি ছিলেন কাফের? এই বিষয়ে ইসলামের প্রখ্যাত সব আলেমগণের অভিমত কী?

ইবনে সিনা কে?

ইবনে সিনা কথাটির অর্থ হচ্ছে সিনার পুত্র। আসলে, সিনা ছিলেন উনার কোন এক পূর্বপুরুষের নাম। ইবনে সিনার মূল নাম হোসাইন। পিতার নাম আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। আবু আলী ইবনে সিনা নামেই তিনি অধিক পরিচিত। ৩৭০ হিজরি বা ৯৮০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে বুখারার (বর্তমান উজবেকিস্তান) অন্তর্গত খার্মাতায়েন জেলার আফসানা নামক স্থানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আবু আলী হোসাইন ইবনে সিনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক নয়, সারা পৃথিবীতেই তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী মানুষ বলে পরিচিত। তাঁকে একই সাথে ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান এবং রাশিয়ার বিজ্ঞজনেরা তাদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে ঘোষনা করেছে। মধ্যযুগীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত রচনায় তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন, এবং ইউরোপেও উনাকে অত্যন্ত সম্মান করা হয় উনার জ্ঞানের কারণে। মূলত তিনি এরিষ্টটল, প্লেটো এবং অন্যান্য দর্শনের উপর ব্যপক জ্ঞানার্জন করেন এবং একই সাথে প্রাচ্যের মনিষীদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কাঠামো সম্পর্কেও ব্যপক ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ইবনে সিনার মূল অবদান ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রে। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বিশ্বকোষ আল-কানুন ফিত-তিব রচনা করেন যা ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠ্য ছিল। পাঁচ খণ্ডের এই বইটিকে বলা হয় মেডিক্যাল শাস্ত্রের বাইবেল। তার বই এত বেশি প্রভাবশালী ছিল যে, এখন পর্যন্ত তার বইগুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইবন সিনাকে আল-শায়খ আল-রাঈস তথা জ্ঞানীকুল শিরোমণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইউরোপে তিনি আভিসিনা (Avicenna) নামে পরিচিত; হিব্রু ভাষায় উনাকে বলা হয় Aven Sina। ইউরোপ আমেরিকাতেই এই বর্তমান সময়েও এই প্রখ্যাত পন্ডিতকে অসম্ভব সম্মানের চোখে দেখা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভাষ্কর্য এখনো লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দেয়।

ইবনে সিনা

ইবনে সিনার ঈশ্বর বিশ্বাস

ঈশ্বর বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম সম্পর্কে ইবনে সিনার ধারণা খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। তিনি আস্তিক ছিলেন নাকি নাস্তিক, তা নিয়ে হতে পারে অনেক বিতর্ক। তবে এইটুকু বোঝা যায়, তিনি মনে করতেন, মানুষ সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। তিনি ইসলামের অন্যতম মূল বিশ্বাস তাকদীরে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, আল্লাহ মানুষের সাথে সরাসরি কোন যোগাযোগ রাখেন না এবং বিশ্বটাকে নিয়ন্ত্রণ করেন না। ইবনে সিনার সাথে এরিষ্টটলের ইশ্বরের ধারণার মিল যেমন আছে, পার্থক্যও আছে। তিনি যুক্তি দিযে ইসলামের মূল বিশ্বাসগুলোকে যাচাই করে দেখতেন, এবং যেটি উনার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হতো তিনি তার পক্ষেই অবস্থান নিতেন। কিন্তু ইসলামের মূল আকিদার সাথে এই নিয়েই তার সংঘাতের শুরু হয়। কারণ ইসলামের মূল আকিদা হচ্ছে, যুক্তিকে নয়, কোরআন হাদিসকেই প্রাধান্য দিতে হবে। আর ইবনে সিনা প্রাধান্য দিতেন যুক্তিকে। ইসলামে তাকদীর সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে পারেন এখান [1] থেকে।

ইবনে সিনার ধর্মীয় মাযহাব নিয়ে একাধিক মতামত প্রচলিত রয়েছে। মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক জহির আল দ্বীন আল বায়হাক্বি ইবনে সিনাকে ইখওয়ান আল সাফার অনুসারী বলে মনে করেন। অপরদিকে দিমিত্রি গুস্তা, আইশা খান এবং জুলস জে জেনসেন ইবনে সিনাকে সুন্নি হানাফি মাযহাবের অনুসারী হিসেবে দেখিয়েছেন। ইবনে সিনা হানাফি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আলি ইবনে মানুনের আদালতে হানাফি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইবনে সিনা জানিয়েছিলেন যে, অল্প বয়সে ইসমাইলিয়দের দ্বারা তিনি প্রভাবিত হননি। যদিও, ইরানী দার্শনিক সৈয়দ হোসেন নসরের মতে ১৪শতকে শিয়া বিজ্ঞ নুরুল্লাহ শুশতারি অনুসারে ইবনে সিনা শিয়া অনুসারী ছিলেন [2]। শারাফ খোরসানি এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করে সুন্নি গভর্নর সুলতান মাহমুদ গজনবির একটি আমন্ত্রের প্রত্যাখ্যান পত্রকে নথি হিসেবে দেখিয়ে ইবনে সিনাকে ইসমাইলী অনুসারী বলেন। একই ধরেন দ্বিমত ইবনে সিনার পারিবারিক পটভূমির ভিত্তিতে পাওয়া যায়। বেশিরভাগ লেখকেরা সুন্নি মতবাদী বলে মনে করলেও সাম্প্রতিককালে ইবনে সিনার পরিবারকে শিয়া অনুসারী বলে দাবী করা হয়।

তাকদীরে অবিশ্বাসের ফলাফল

অনেক মুসলিমানই ইসলামে তাকদীর বিষয়ে যা বলা আছে, তা মানেন না বা তাকদীর সম্পর্কে নিজের মনগড়া কথাবার্তা বলেন। অথচ, ইসলামের অত্যন্ত মৌলিক এই বিষয়ে ইসলামে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই বিশ্বাস না করলে সে সরাসরি কুফরিই করে। [3] [4]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৫-[৩৭] ইবনু আদ্ দায়লামী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছে আমি তাকে বললাম, তাক্বদীর সম্পর্কে আমার মনে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কিছু হাদীস শুনান যাতে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমার মন থেকে (তাক্বদীর সম্পর্কে) এসব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাঁর সৃষ্টজীবের সকলের প্রতিই রহমত করেন, তবে তাঁর এ রহমত তাদের জন্য সকল ‘আমল হতে উত্তম হবে। সুতরাং তুমি যদি উহুদ পাহাড়সম স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান কর, তোমার থেকে তিনি তা গ্রহণ করবেন না, যে পর্যন্ত তুমি তাক্বদীরে বিশ্বাস না করবে এবং যা তোমার ভাগ্যে ঘটেছে তা তোমার কাছ থেকে কক্ষনো দূরে চলে যাবে না- এ কথাও তুমি বিশ্বাস না করবে, আর যা এড়িয়ে গেছে তা কক্ষনো তোমার নিকট আর আসবে না- এ বিশ্বাস স্থাপন করা ব্যতীত যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
ইবনু আদ্ দায়লামী বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর এ বর্ণনা শুনে আমি সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে এ কথাই প্রত্যুত্তর করলেন। তিনি বলেন, তারপর হুযায়ফাহ্ ইবনু ইয়ামান (রাঃ)-এর নিকট যেয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে একই প্রত্যুত্তর করলেন। এরপর যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর কাছে আসলাম। তিনি স্বয়ং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করেই আমাকে একই ধরনের কথা বললেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
[1] সহীহ : আহমাদ ২১১৪৪, আবূ দাঊদ ৪৬৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৭৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৬-[৩৮] নাফি‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর নিকট এসে বলল, অমুক লোক আপনাকে সালাম দিয়েছে। উত্তরে ইবনু ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি, সে নাকি দীনের মধ্যে নতুন মত তৈরি করেছে (অর্থাৎ- তাক্বদীরের প্রতি অবিশ্বাস করছে)। যদি প্রকৃতপক্ষে সে দীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করে থাকে, তাহলে আমার পক্ষ হতে তাকে কোন সালাম পৌঁছাবে না। কেননা আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমার উম্মাতের অথবা এ উম্মাতের মধ্যে জমিনে ধ্বসে যাওয়া, চেহারা বিকৃত রূপ ধারণ করা, শিলা পাথর বর্ষণের মতো আল্লাহর কঠিন ‘আযাব পতিত হবে, তাদের ওপর যারা তাক্বদীরের প্রতি অস্বীকারকারী হবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্; ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব)[1]
[1] হাসান : তিরমিযী ২১৫২, ইবনু মাজাহ্ ৪০৬১, আবূ দাঊদ ৪৬১৩।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

তাকদীর নিয়ে বিতর্ক বা অনুসন্ধান

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই তাকদীরের বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা তর্ক বিতর্ক করতে নবী নিষেধ করে গেছে। উনি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হতেন, যখন কেউ এই নিয়ে আলোচনা করতো। উনি চাইতেন, অন্ধভাবেই এগুলো তার উম্মতগণ বিশ্বাস করুক। ভয় দেখাবার জন্য বলেছেন, এই নিয়ে আলোচনা করলে ধ্বংস হয়ে যাবে [5]

গ্রন্থঃ সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ তাকদীর নিয়ে আলোচনায় মত্ত হওয়া সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী।
২১৩৬. আবদুল্লাহ ইবন মুআবিয়া জুমাহী (রহঃ) ……. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বের হয়ে এলেন। আমরা তখন তাকদীর বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করছিলামতিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। এমনকি তাঁর চেহারা লাল হয়ে উঠল, তাঁর দুই কপালে যেন ডালিম নিংড়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেনঃ এই বিষয়েই কি তোমরা নির্দেশিত হয়েছ? আর এই নিয়েই কি আমি তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি? তোমাদের পূর্ববর্তীরা যখন এ বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে তখনই তারা ধ্বংস হয়েছে। দৃঢ়ভাবে তোমাদের বলছি, তোমরা যেন এ বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত না হও। হাসান, মিশকাত ৯৮, ৯৯, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৩৩ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এ বিষয়ে উমার, আয়িশা ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটি গারীব। সালিহ মুররী-এর রিওয়ায়াত হিসাবে এ সূত্র ছাড়া এটি সম্পর্কে আমরা অবহিত নই, সালিহ মুররি বেশ কিছু গারীব রিওয়ায়াত রয়েছে। যেগুলির বিষয়ে তিনি একা।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

ইসলামের সাথে সংঘাত

মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে সিনা

ইবনে সিনা মনে করতেন, এই মহাবিশ্ব পরমশূন্য থেকে সৃষ্টি হয়নি। তিনি মনে করতেন, পদার্থের শুরু কিংবা শেষ নেই, পদার্থ চিরন্তন। কিন্তু ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ সবকিছুই শূণ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। সত্যিকার অর্থে সৃষ্টি শব্দটির অর্থই হচ্ছে অনস্তিত্ত্ব থেকে অস্তিত্ত্বে আসা। শূণ্য থেকে যদি সৃষ্টি না হয়, সেটিকে আর সৃষ্টি বলা যায় না। বরঞ্চ রূপান্তর বলা যায়।সহজভাষায় বললে, একটি গাছ কেটে যখন চেয়ার তৈরি হয়, সেটি চেয়ার সৃষ্টি নয়। চেয়ার তৈরি বা কাঠ থেকে চেয়ারের রূপান্তর। সৃষ্টি শব্দটি তখনই ব্যবহার করা যাবে, যখন প্রকৃতি থেকে কোন উপাদান না নিয়ে, কোন প্রভাবকের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে স্বতন্ত্র স্বাধীনভাবে কোন কিছু অনস্তিত্ত্ব থেকে অস্তিত্ত্বে আনা হয়। ইসলামের বিশ্বাস হচ্ছে, আল্লাহ সবকিছু অনস্তিত্ত্ব থেকে অস্তিত্ত্বে এনেছেন। ইবনে সিনা ইসলামের এই মৌলিক বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মনে করতেন, কিছুরই অস্তিত্ত্ব না থাকলে আল্লাহর অস্তিত্ত্ব কোথায় ছিল? বা কোন সময়ে ছিল?

তিনি আরো মনে করতেন, সৃষ্টিকর্তা সরাসরি তার সৃষ্টির সাথে কোন যোগাযোগ রাখেন না। আল্লাহ যতদিন ধরে আছে, এই জগতের অস্তিত্বও তত দিন। আল্লাহ এই মহাবিশ্বকে কোন এক বিশেষ সময়ে সৃষ্টি করেছেন, ইবনে সিনা এই কথাতে বিশ্বাস করতেন না। এই প্রশ্নগুলো দর্শনের অন্যতম মৌলিক সব প্রশ্ন। যার মধ্যে একটি হচ্ছে, ঈশ্বর কোন সময়ে সময় সৃষ্টি করেন? বা আরেকটি হচ্ছে, ঈশ্বর কোন স্থানে বসে স্থান সৃষ্টি করেন? ইবনে সিনা মনে করতেন, এ বিশ্ব পরম স্রষ্টা থেকে উদ্ভুত হয়ে অনন্তকাল ধরে বিরাজমান রয়েছে।

ইমাম গাজ্জালি ইবনে সিনার এই দার্শনিক অবস্থানকে চ্যালেন্জ্ঞ দিয়ে বলেন, আল্লাহ যদি একমাত্র স্বাধীন অমূখাপেক্ষী সত্ত্বা হন তবে এই মহাবিশ্ব, স্থান কাল তার পরেই সৃষ্ট হতে হবে। ইমাম গাজ্জালি ইবনে সিনার দর্শনকে কুফরী বলে আখ্যায়িত করেন এবং ইবনে সিনাকে কাফির ঘোষণা দেন। সেই সাথে, ইসলামের অসংখ্য আলেম ইবনে সিনাকে কাফের ঘোষনা দেয়ার সাথে একমত হয়েছেন। এই বিষয়ে সৌদি আরবের সরকারি ফতোয়া কাউন্সিল থেকে আলেমদের ইজমা বা সর্বসম্মত ঐক্যমত্য রয়েছে।

আল্লাহর স্বরুপ এবং তার সর্বজ্ঞান

ইবনে সিনার মনে করতেন, বিভিন্ন গুণাবলী দিয়ে আল্লাহর বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করার চেষ্টা হলো একত্ববাদের মৌলিক অবস্থানের লংঘন। ইবনে সিনার সাথে অনেক বিষয়ের মত এই বিষয়েও মুতাজিলা দার্শনিকদের সাথে তার মতের মিল ছিল। তাদের মতোই তিনি মনে করতেন, আল্লাহ একক সত্ত্বা হয়ে থাকলে তার আলাদা আলাদা গুনের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। সামগ্রিকভাবে তার অস্তিত্ত্ব থাকা এবং আলাদা আলাদা গুণ থাকা পরষ্পর বিরোধী। কিন্তু কোরআন সুন্নাহ অনুযায়ী আল্লাহ বিভিন্ন মানবিক গুনাবলীর অধিকারী এবং তার প্রায় শ’খানেক বৈশিষ্ট্যসূচক নাম আছে। যা একই সাথে ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। ইবনে সিনা বলেন, আল্লাহ মহাবিশ্বের স্রষ্টা হলে সে আল্লাহ এক পরম, বিশুদ্ধ, একক স্রষ্টা, একই সাথে আমাদের পার্থিক জগত সম্পর্কে উদাসীন এক সত্ত্বা। সমগ্র বিশ্ব সেই স্রষ্টার জ্ঞান প্রক্রিয়ার ফলাফল।

ইবনে সিনার মতে আল্লাহ সর্বজ্ঞানী নন বা অতীত ভবিষ্যত সব কিছু সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান রাখেন না। যেহেতু স্রষ্টার জ্ঞান প্রক্রিয়ার ফলাফল এই বিশ্ব, সুতরাং গ্রহ, নক্ষত্র, জীবকূল এইরকম বস্তু সম্পর্কে স্রষ্টা সচেতন এবং এগুলো তার সার্বিক জ্ঞানের অংশ। কিন্তু স্রষ্টা ‘মানুষ’ সম্বন্ধে জ্ঞান রাখলেও কলিমুদ্দিন এখন কী করছে, বা কলিমুদ্দিন কোন হাতে পানি পান করছে, পানি পান করার আগে বিসমিল্লাহ বলছে কিনা, স্ত্রী সহবাসের আগে সূরা পড়ছে কিনা, ইসলাম পালন করছে নাকি অন্য কোন ধর্ম, এসব বিষয়ে তিনি উদাসীন।

ইবনে সিনা বলেছেন,

God, the supreme being, is neither circumscribed by space, nor touched by time; he cannot be found in a particular direction, and his essence cannot change. The secret conversation is thus entirely spiritual; it is a direct encounter between God and the soul, abstracted from all material constraints.
[ As quoted in 366 Readings From Islam (2000), edited by Robert Van der Weyer ]

মৃত্যু পরবর্তী জীবন

ইবনে সিনার মনে করতেন, মানুষ হচ্ছে আত্মা এবং দেহের সমষ্টি। কোরআনে মৃত্যু পরবর্তি পুনুরুত্থান, জান্নাত জাহান্নাম, বিচারের ময়দান, এইসব যা বর্ণনা দেয়া আছে, খুব পরিষ্কারভাবে তিনি এসব অস্বীকার করেছেন। তিনি মনে করতেন, মৃত্যুর পরে আর পুনুরুত্থান সম্ভব নয়, মৃত্যুই পরিসমাপ্তি। তবে তিনি আত্মার অস্তিত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। তার মতে, মৃত্যুর পরে পুণ্যাত্মা ফিরে যাবে বুদ্ধির জগতে, অনেকটা বৌদ্ধ দর্শনের মত নির্বান প্রাপ্তির ধারণার সাথে তার ধারণার মিল ছিল।

নবীদের বা নবুয়্যাত সম্পর্কিত ধারণা

নবুয়্যাত প্রাপ্তি সম্পর্কে ইসলামের ধারণাকে তিনি প্রকারান্তরে স্বীকার করলেও অনেকটাই নিজের মত করে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে নবীরা ছিলেন সাধারণ মানুষ যারা সমাজের নানা সমস্যা পর্যবেক্ষণ করে সংস্কারের চেষ্টা করেছেন। সাধারণ মানুষেদের সুপথে আনার জন্য তাদের অনেকেই নিজেদের নবী বলে প্রচার করলেও, তারা আসলে ছিলেন সমাজের এক একজন অগ্রসর নেতা। সাধারন অশীক্ষিত মূর্খ মানুষেরা তাদেরকে সত্যিকারের আল্লাহর নবী ভাবে, কিন্তু জ্ঞানী মানুষেরা কখনও তা করে না। ধর্ম হচ্ছে সাধারণ মানুষকে নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার একটি কৌশল মাত্র।

মদ্যপান

ইবনে সিনা মনে করতেন, জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমানদের জন্য ইসলামের বিধানগুলো প্রযোজ্য নয়, ওগুলো সাধারণ মূর্খ মানুষের জন্য । যেমন, তিনি মনে করতেন, মদ বুদ্ধিমানদের জন্য হালাল।
তিনি নিজেই বলেছেন:

كنت أرجع بالليلي إلى داري فمهما غلبني النوم عدلت إلى شرب قدح من الشراب ريثما تعود إلى قوتي
অর্থাৎ, আমি রাতে বাড়িতে ফিরে আসতাম। যখন আমাকে ঘুম পর্যুদস্ত করত তখন আমি মদ পান করতাম। শক্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত তা পান করতাম।(লিসানুল মীযান ২/২৯২)


তার সম্পর্কে আরো কিছু গ্রন্থে বর্ণনা এসেছে,

أنه لما صار وزيراً لبعض السلاطين كانوا يشتغلون عليه فإذا فرغوا حضر المغنون وهيء مجلس الشراب
তিনি কিছু বাদশাহর মন্ত্রী হন। তারা তাকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখতেন। কাজ থেকে অব্যাহতি পেলে নর্তকীর আয়োজন হত ও মদের ব্যবস্থা করা হত। (সীয়ারু আ’লামিন নুবালা ১৭/৫৩৩)

ইবনে সিনা সম্পর্কে আলেমদের অভিমত

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ইবনে সিনা সম্পর্কে বলেন –

وابن سينا تكلم في أشياء من الإلهيات والنبوات والمعاد والشرائع لم يتكلم فيها سلفه ولا وصلت إليها عقولهم ولا بلغتها علومهم فإنه استفادها من المسلمين وإن كان إنما أخذ عن الملاحدة المنتسبين إلى المسلمين كالإسماعيلية وكان هو وأهل بيته وأتباعهم معروفين عند المسلمين بالإلحاد وأحسن ما يظهرون دين الرفض وهم في الباطن يبطنون الكفر المحض
ইবনে সীনা ইলাহ,নবুওয়াত, পরকাল ও শরী’আত সম্পর্কে এমন সব কথাবার্তা বলেছেন যা তার পূর্বের কোনো সালাফ বলেননি। তাঁদের বিবেক ও জ্ঞান সেদিকে যেতেই পারেনি। তিনি এসব শিখেন ইসমাইলিয়্যাহদের মত নামধারী নাস্তিকদের থেকে। তিনি,তার পরিবার ও তার অনুসারীরা মুসলিমদের নিকট নাস্তিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তারা বাহিরে রাফেজীর ভাব নিতেন আর ভিতরে কুফরী লালন করতেন।

তিনি আরো বলেন –

أن ابن سينا أخبر عن نفسه أن أهل بيته وأباه وأخاه كانوا من هؤلاء الملاحدة وأنه إنما اشتغل بالفلسفة بسبب ذلك
ইবনে সীনা নিজেই তার সম্পর্কে বলেছেন, তার পরিবার, তার পিতা ও তার ভাইয়েরা এসব নাস্তিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সে একারণে দর্শন শাস্ত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। (মাজমুঊল ফাতওয়া ৯/২৩২-২৩৫)

অন্যত্র বলেন –

وابن سينا أحدث فلسفة ركبها من كلام سلفه اليونان ومما أخذه من أهل الكلام المبتدعين الجهمية ونحوهم وسلك طريق الملاحدة الإسماعيلية في كثير من أمورهم العلمية والعملية ومزجه بشيء من كلام الصوفية وحقيقته تعود إلى كلام إخوانه الإسماعيلية القرامطة الباطنية فإن أهل بيته كانوا من الإسماعيلية أتباع الحاكم الذي كان بمصر وكانوا في زمنه ودينهم دين أصحاب “رسائل إخوان الصفا” وأمثالهم من أئمة منافقي الأمم الذين ليسوا مسلمين ولا يهود ولا نصارى
ইবনে সীনা জাহমিয়াদের মত বিদ’আতপন্থী আহলে কালামদের থেকে কিছু গ্রহণ করে ও তার পূর্ববর্তী ইউনানিদের থেকে কিছু নিয়ে সবকে জোড়া দিয়ে এক নতুন দর্শন আবিষ্কার করেন।তিনি ইলমী, আমলী অনেক ক্ষেত্রে নাস্তিক ইসমাইলিয়্যাহদের তরীকায় চলেন।তার সাথে আরো মিশ্রণ করেন সূফীদের কথাবার্তা। তিনি বাস্তবিকভাবে তার ইসমাইলিয়্যাহ কারামুতাহ বাতেনিয়্যাহ ভাইদের মতাদর্শে ছিলেন। তার পরিবার ছিলেন মিসরে অবস্থানকারী হাকেমের অনুসারী ইসমাইলিয়্যাহদের অন্তর্ভুক্ত। তারা তার যুগে ছিলেন। “রাসায়েল ইখওয়ানুস সফা”-র অনুসারী ও তাদের মত মুসলিম নয়, ইহুদী নয়, খ্রিষ্টান নয় বরং মুনাফিকদের ধর্ম ছিল তাদের ধর্ম। (মাজমুঊল ফাতওয়া ১১/৫৭১)

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ, ইবনে সিনা সম্পর্কে বলেন –

وكان ابن سينا كما أخبر عن نفسه قال: أنا وأبي من أهل دعوة الحاكم فكان من القرامطة الباطنية الذين لا يؤمنون بمبدأ ولا معاد ولا رب ولا رسول مبعوث جاء من عند الله تعالى
ইবনে সীনা তেমনটি ছিলেন যেমনটি তিনি তার সম্পর্কে বলেছেন: আমি ও আমার পিতা হাকেমের আন্দোলনের অনুসারী ছিলাম।তিনি কারামুতাহ বাতেনিয়্যাহর অন্তর্গত ছিলেন, যারা বিশ্বাস করেনা (সৃষ্টির) সূচনা, পরকাল, রব,প্রেরিত রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তা।(ইগাসাতুল লাহফান ২/১৯৫)
তিনি তাকে নাস্তিকদের নেতা বলে আখ্যায়িত করেছেন। (ইগাসাতুল লাহফান ২/১৯৬)

ইমাম শামসুদ্দিন আয যাহাবি

জারাহ ওয়া ত্বাদিলের ইমাম শামসুদ্দিন আয যাহাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন –

وله كتاب الشفاء وغيره وأشياء لاتحتمل ,وقد كفره الغزالي في كتاب [6] وكفر الفارابي )

তার “আশ-শিফা” সহ অন্যান্য কিতাব এবং এমন কিছু বিষয় রয়েছ যা সহ্য করার মত না।তাকে গাযালী “আল-মুনকিয মিলাজ জলাল” কিতাবে কাফের বলেছেন এবং ফারাবীকেও কাফের বলেছেন। (সীয়ারু আ’লামিন নুবালা ১৭/৫৩৫)

ইমাম ইবনু ইমাদ রাহিমাহুল্লাহ

ইমাম ইবনু ইমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন –

أكثر العلماء على كفره وزندقته حتى قال الإمام الغزالي في كتابه “المنقذ من الضلال” : لا شك في كفرهما أي الفارابي وابن سينا
অধিকাংশ উলামা তাকে কাফের ও নাস্তিক বলেছেন। এমনকি ইমাম গাযালী তার কিতাব ‘আল-মুনকিয মিনাজ জলাল’ কিতাবে বলেছেন, উভয়ের অর্থাৎ ফারাবী ও ইবনে সীনার কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ নেই।( সাযারাতুয যাহাব ২/৩৫৩)

ইমাম ইবনুস সালাহ

ইমাম ইবনুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন –

كان شيطاناً من شياطين الإنس
সে (ইবনে সিনা) ছিল মানুষদের মধ্যে একজন শয়তান!
ফাতাওয়ায়ে ইবনুস সালাহ – ১/২০৯

ইবনু হাজার আসকালানী

ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ,

ইবনে সিনাকে রদ্দ করে যাহাবীর উদ্ধৃতি দিয়ে অভিশাপ দিয়েছেন, যেন আল্লাহ তার প্রতি রাজী না থাকেন, তার রচিত “লিসানুল মীযান” কিতাবে।
لا رضـي اللـه عنه

আনওয়ার শাহ আল কাশ্মিরী

আনওয়ার শাহ আল কাশ্মিরী (রহ) তাকে মুরতাদ যিন্দিক, শিরকের দিকে আহবান কারী বলেছেন-

ابن سينا الملحد الزنديق القرمطي غدا مدى شرك الردى وشريطة الشيطان
(ফয়যুল বারী ১/১৬৬)

ইবনে কাসীর

ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

قد حصر الغزالي كلامه في “مقاصد الفلاسفة” ثم رد عليه في “تهافت الفلاسفة” في عشرين مجلساً له، كفره في ثلاث منها، هي: قوله بقدم العالم وعدم المعاد الجسماني وأن الله لا يعلم الجزئيات وبدَّعه في البواقي ويقال أنه تاب عند الموت والله أعلم

গাযালী তার মতবাদকে “মাকাসিদুল ফালাসাফাহ” গ্রন্থে একত্রিত করেছেন। তারপর তিনি ২০টি আলোচনায় “তাহাফুতুল ফালাসাফাহ”-তে তার জবাব দিয়েছেন। তিন কারণে তিনি তাকে কাফের বলেছেন। তা হল: তার মতে বিশ্বজগত সৃষ্টি নয়, শারীরিকভাবে পরকাল হবে না এবং আল্লাহ শাখাগত বিষয় সমূহ জানেন না। আর অন্যান্য কারণে তিনি তাকে বিদ’আতী বলেছেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি নাকি মরার সময় তাওবাহ করেছিলেন। আল্লাহ ভালো জানেন। [আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১২/৪৩]

উস্তাযুল আলেম আল্লামাহ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ, ফারাবী এবং ইবনু সীনাকে কঠোরভাবে রদ্দ করেছেন এবং তাদের নামে মুসলিমদের নাম না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন!
(ফাওয়ায়েদুল জালিয়্যাহ, যাহরানী পৃষ্ঠা ৩৭)

ইসলাম ওয়েব ডট নেট এর ফতোয়া

বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলাম বিষয়ক ওয়েবসাইট ইসলাম ওয়েব সাইটে এই বিষয়ে একটি ফতোয়া দেয়া হয়েছে, [7]

Claims about Ibn Sina being an atheist or Kafir
Fatwa No: 87783
Fatwa Date:20-5-2004 – Rabee’ Al-Aakhir 1, 1425
Question
I heard Sheik Al-Huwayni say, in one of his tapes, that Ibn Sinna (Avicenna) was an atheist or Kafir. Was he really?
Answer
Praise be to Allah, the Lord of the Worlds; and may His blessings and peace be upon our Prophet Muhammad and upon all his Family and Companions.
Ibn Sinna (Avicenna) was accused of being a Kafir and an atheist because of his statements about the antiquity of the world, his rejection of the Hereafter, and other atheist theories, in addition to his inner legendary ideology.
Other scholars stated that Ibn Sinna was an atheist before Sheikh Al-Huwaini did; amongst them is: Al-Ghazali, Ibn Taymiyah, Ibn Al-Qayim, and Al-Dhahabi.

Allah knows best.

শুধু যে ইবনে সিনাকে কাফের ফতোয়া দিয়েই উনারা থেমেছেন তাই নয়, উনার নামে স্কুল কলেজ হাসপাতাল বানানোও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে ইসলামিক আলেমদের দ্বারা। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ সালাফি আলেম সালেহ আল-ফাওজান এবং মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উথাইমীন দুইজনই এই ঘোষণা দিয়েছেন।

উপসংহার

হাদিসে বর্ণিত আছে, একজন আরেকজনকে কাফির বলে গালি দিলে, দুইজনার মধ্যে একজন অবশ্যই কাফির। সেই সূত্র অনুসারে, ইবনে সিনাকে যারা কাফের মানে না, তারা ইমাম গাজ্জালি সহ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার মত প্রসিদ্ধ আলেমকে কাফির মনে করবে।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৫/ আচার ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ ২৪৭৬. গালি ও অভিশাপ দেয়া নিষিদ্ধ
৫৬১৯। আবূ মা’মার (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন অপর জনকে ফাসিক বলে যেন গালি না দেয় এবং একজন আর একজনকে যেন কাফির বলে অপবাদ না দেয়। কেননা যদি সে তা না হয়ে থাকে তবে তা তার উপরই পতিত হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইসলামিক আলেমদের দ্বারা কাফের ফতোয়া প্রাপ্ত ইবনে সিনাকে নিয়ে অনেক সময়ই মুসলিমদের মধ্যে গর্ব করতে দেখা যায়। অথচ, ইবনে সিনা ছিলেন ইসলামের সর্বোচ্চ আলেমদের দ্বারা অসংখ্যবার কাফির খেতাব এবং ফতোয়া প্রাপ্ত। ধর্ম বিষয়ে উনার ধারণা একেবারেই ছিল ইসলামের মূল ইমান আকিদার পরিপন্থী. বরঞ্চ নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, সংশয়বাদীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা ভালভাবেই জানি, এরপরেও ইবনে সিনাকে নিয়ে যথারীতি মুসলিমগণ গর্ব করেই যাবে। সেই সাথে, মুসলিম সমাজে ইবনে সিনার মত কোন জ্ঞানী ব্যক্তি জন্ম নিলে, তাকে কাফের ফতোয়া দিয়ে জবাই করবে। ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের জন্য এই আত্মবিরোধীতা, স্ববিরোধীতাই আসলে স্বাভাবিক, কারণ তারা যুক্তি বোঝে না।

তথ্যসূত্রঃ
  1. ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে []
  2. Seyyed Hossein Nasr, An introduction to Islamic cosmological doctrines, Published by State University of New York press, p. 183 []
  3. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস নম্বর- ১১৫ []
  4. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস নম্বর- ১১৬ []
  5. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর- ২১৩৬ []
  6. المنقذ من الضلال []
  7. Claims about Ibn Sina being an atheist or Kafir []

2 thoughts on “ইবনে সিনা কী মুসলিম ছিলেন?

  • January 15, 2021 at 8:08 AM
    Permalink

    ইসলামের সাথে সংঘাত অংশে ইবনে সিনার ধারণা সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে তার রেফারেন্স দেয়া হয়নি, তথ্যসূত্র উল্লেখ করলে ভাল হয়। লেখাটি চমৎকার হয়েছে।

    Reply
  • January 20, 2021 at 10:47 AM
    Permalink

    অসাধারণ লিখেছেন ভাই। মানুষ কে সত্য জানানোর জন্য আপনার যে প্রচেষ্টা সেটা দেখে আমি মুগ্ধ হই। আমি চেষ্টা করব আপনার এই লেখা টি যেন সবাই পরে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *