আমাদের নীতি-নৈতিকতার উৎস ধর্ম নয়

Print Friendly, PDF & Email

প্রাককথন

সত্যজিৎ রায়ের একটি গল্প আছে, গল্পটির নাম ‘অসমঞ্জ বাবুর কুকুর’। লাজপত রায় পোস্ট অফিসে রেজিস্ট্রি বিভাগে কাজ করেন তিনি। তিনি একদিন একটি ভুটানি ভদ্রলোকের কাছে সাড়ে সাতটায় একটি কুকুর কেনেন। সেই কুকুরটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যে সে হাসতে পারতো।

এই দেখে অসমঞ্জ বাবুর বিষম দ্বন্দ্বে পড়লেন। কুকুর হাসবে কি করে! কি করবেন তা ঠিক করতে না পেরে, তিনি এক অধ্যাপকের কাছে গিয়ে এই অদ্ভুত ঘটনা কথা জানালেন। এই অধ্যাপকের নাম রজনী চাটুজ্জে। রজনী চাটুজ্জের তার কথায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করলেন না। একবার ভাবলেন অসমঞ্জ বাবুর নেশা ভাং করেন। তারপর যখন সে রকম কোনো লক্ষণ দেখলেন না, তখন অসমঞ্জ বাবু কে বললেন, “আপনার একটি তথ্য বোধহয় জানা নেই; সেটা জেনে রাখুন! ঈশ্বরের সৃষ্ট যত প্রাণী আছে জগতে, তার মধ্যে মানুষ ছাড়া আর কেউ হাসে না, হাসতে জানে না, হাসতে পারে না। এটাই হচ্ছে মানুষ আর অন্য প্রাণীর মধ্যে প্রধান পার্থক্য।”

গল্পটি খুব সুন্দর। শেষ পর্যন্ত কি হল তা পড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু এইখানে একটি ভুল আছে। শুধু মানুষ কেন, অন্য প্রাণীরাও হাসতে পারে। সেই কথায় একটু পরে আসছি। আর আগে কয়েকটা কথা বলা দরকার।

অধ্যাপক রজনী বাবুর মত এমন অনেক মানুষই আছেন, যারা মনে করেন ঈশ্বরের সৃষ্ট সেরা জীব মানুষ। এবং তারা এটাও মনে করেন যে, এই মানুষ যা কিছু নীতি-নৈতিকতা শিখেছে, সেটা ধর্মের মাধ্যমে ঈশ্বরই তাদেরকে শিখিয়েছেন।

এটা ভাবতে মানুষ খুব ভালোবাসে যে তারাই এই পৃথিবীতে একমাত্র জীব যাদের মধ্যে অনুভূতি আছে, নীতি-নৈতিকতা (তথা morality) আছে, সংস্কৃতি ও সভ্যতা আছে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, যত আমরা অন্যান্য প্রাণীদের কে নিয়ে, পশুপাখিদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি ততই আমাদের এই ভ্রান্ত ধারণা নিরসন হতে শুরু করেছে। বহু বিজ্ঞানী এখন এটা মনে করেন যে, সেই সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলি যা একসময়ের শুধুমাত্র মানুষের মধ্যেই আছে বলে মনে করা হতো, অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও বিদ্যমান।

আর সেটা হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক নয় কি? মানুষ তো আর আকাশ থেকে পড়ে নি! বিবর্তন তত্ত্ব থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই পৃথিবীতে যত জীব আছে, তারা একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং মানুষ কোন গ্রহান্তরের জীব নয়।

বিবর্তন তত্ত্বের সাথে ধর্মের সংঘাত

মানুষ একসময় এই কথা বলে বড়াই করতো যে, ঈশ্বর তাকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বর তার মধ্যে নীতি-নৈতিকতা (তথা morality) দিয়েছেন, ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন, বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়েছেন; যা এই পৃথিবীর আর অন্য কোন প্রাণীর মধ্যে তিনি দেননি। কিন্তু ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদ তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে দেখালেন যে, মানুষ সেরকম বিশেষ কোনো প্রাণী নয়। এই পৃথিবীতে আর পাঁচটা প্রাণীর মতোই আরেকটি মানুষ প্রজাতি। আর মানুষ যদি বিশেষ একটি প্রজাতি ধরেই নিতে হয়, তাহলে সংজ্ঞা অনুযায়ী এই পৃথিবীতে যত পশু পাখি গাছপালা যত প্রকারের জীব আছে তাদের প্রত্যেকটি কিছু না কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এবং সেই অনুযায়ী তারাও ‘special’ কিছু বলে গণ্য হয়ে ওঠার দাবী রাখে। বিবর্তন তত্ত্ব মানুষকে সেই বাস্তবতা তাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। স্পষ্ট বোঝা গেল যে, তারা সৃষ্টির সেরা জীব কখনোই নয়; তারা বিশেষভাবে তৈরি হয়নি। বিভিন্ন তথ্য প্রমান থেকে জানা গেল মানুষের উদ্ভব এই ape জাতীয় কিছু পশুদের মধ্যে থেকেই। আর ধর্মের সেই প্রাচীন ধারণা ভেঙে গুঁড়িয়ে নস্যাৎ হয়ে যাবার জোগাড় হল।

সকল ধর্মের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, যেকোনো ধর্মের ধর্মগ্রন্থ ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে একটি চমৎকার বর্ণনা। আর সেই বর্ণনা হোল, মানুষ কিভাবে সৃষ্টি হল তার বিশদ বিবরন। সেখানে রীতিমত বড়াই করা হয় এই নিয়ে যে, মানুষকে ঈশ্বর কিভাবে বিশেষভাবে সৃষ্টি করলেন, কিভাবে সমস্ত কিছু বানানোর পরে রীতিমত সময় নিয়ে ঈশ্বর মানুষকে বিশেষভাবে গড়ে তুললেন; তার মধ্যে দিলেন বিদ্যে বুদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। সে এক বিশাল গল্প। কিন্তু বিবর্তনবাদ সেই ধারণাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। মানুষ যে ইশ্বরের favorite সেই ধারণা আর ধোপে টিকল না।

আর সেখানেই বাঁধল ধর্মের সাথে সংঘাত। ধর্ম নিজের গুরুত্ব বজায় রাখার জন্য সব সময় প্রচার করে এসেছে যে, মানুষের মধ্যে যে নীতি-নৈতিকতা (তথা morality) ও মূল্যবোধ তা ঈশ্বর মানুষের মধ্যে প্রদান করেছেন ধর্মের মাধ্যমে। কারণ ঈশ্বর মানুষকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছেন, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু ডারউইন প্রথমেই ধারণার বিরুদ্ধে কথা বললেন। “The Descent of Man” [1] বইতে তিনি লিখলেন,

…there is no fundamental difference between man and the higher mammals in their mental faculties.

তিনি আরও বললেন মানুষ এবং অন্যান্য উচ্চতর প্রাণীদের মধ্যে আপাত দৃষ্টিতে এই যে পার্থক্য তা, “certainly one of degree and not of kind.” ধর্মের ধ্বজাধারীরা প্রমাদ গুনলেন। এই ভদ্রলোক বলে কি? উঠে পড়ে লাগলেন বিবর্তন তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করার জন্য।

যে কোন ধর্মই ঈশ্বরের দ্বারা মানুষ সৃষ্টির কথা ফলাও করে প্রচার করে।বিবর্তনবাদ তত্ত্ব সেই ধারনায় জল ঢেলে দিল। এই যে কথাটা, ‘মানুষ এই পৃথিবীতে আর অন্যান্য প্রজাতির মতোই আর একটি প্রজাতি’, তা মানুষকে বোঝালো যে মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতই প্রাকৃতিক নিয়মে আবদ্ধ। মানুষ ভাবল, এই বিবর্তনবাদ হয়তো মানবসমাজের মানবিকতা, নীতি-নৈতিকতা, বিচার-বিবেচনা এই সমস্ত কিছু অধঃপতনে নিয়ে যাবে নিয়ে যাবে। কারণ ধর্ম এতদিন আমাদের শিখিয়ে এসেছে যে, মহান ঈশ্বর এই ধর্মের মাধ্যমেই আমাদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা, বিচার বিবেচনা ভরে দিয়েছেন। ধর্ম ছাড়া তাই মানব সমাজ অচল। কিন্তু বিবর্তন তত্ত্ব ধর্মের এক মুল ভিত্তিকে ভুল প্রমান করল। আর সেটা করে যেন ধর্মকেই এক রকম ভুল প্রমান করল।

কিন্তু মানুষ একবারও ভাবল না যে, মানুষ যদি সত্যিই সৃষ্টির সেরা জীব হবে, তাকে আবার আলাদা করে ধর্মের মাধ্যমে নীতি- নৈতিকতা শেখাতে হবে কেন? তাঁর মধ্যে তো এই গুণ সহজাত হবারই কথা।

এখন প্রশ্ন হোল, মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা, ভালো মন্দের বিচার বিবেচনা এলো কথা থেকে? এই প্রবৃত্তি কি মানুষের সহজাত? সেই উত্তরেই যাবো, কিন্তু তাঁর আগে দেখে নেওয়া যাক মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীদের, বিশেষ করে আমাদের নিকটাত্মীয় ‘Great Apes’-দের মধ্যে কি কি সাদৃশ্যআছে।

মানুষের সাথে অন্যান্য পশুপাখির সাদৃশ্য

ষোলশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে Rene Descartes লিখে ছিলেন,

animals are mere machines but man stands alone.

তাঁর এই ধারণা যে সত্য নয়, তা বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের সামনে উঠে এসেছে।

শিম্পাঞ্জি হাসতে পারে

The Expression of the Emotions in Man and Animals” বইটিতে ডারউইন লিখেছিলেন,

If a young chimpanzee be tickled—and the armpits are particularly sensitive to tickling, as in the case of our children,—a more decided chuckling or laughing sound is uttered; though the laughter is sometimes noiseless. The corners of the mouth are then drawn backwards; and this sometimes causes the lower eyelids to be slightly wrinkled. But this wrinkling, which is so characteristic of our own laughter, is more plainly seen in some other monkeys. The teeth in the upper jaw in the chimpanzee are not exposed when they utter their laughing noise, in which respect they differ from us.

একটা শিশু শিম্পাঞ্জিকে যদি কাতুকুতু দেওয়া, হয় তাহলে মানব শিশুর মতোই সে আচরণ করে। যদিও অনেক সময় হাসির মতো শব্দ হয় তো আসে না। তার মুখের কোনা পেছনের দিকে টানটান হয়ে যায়, নিচের চোখের পাতা সংকুচিত হয়ে যায়। তিনি আরো লক্ষ্য করলেন এই অভিব্যক্তির সাথে মানুষের অভিব্যক্তির খুব বেশি পার্থক্য নেই।

শুধু কি শিম্পাঞ্জির মধ্যেই? না। তিনি আরও লক্ষ্য করলেন,

Young Orangs, when tickled, likewise grin and make a chuckling sound; and Mr. Martin says that their eyes grow brighter. As soon as their laughter ceases, an expression may be detected passing over their faces, which, as Mr. Wallace remarked to me, may be called a smile.

২০১৫ সালে PLoS One পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া একটি গবেষণায় বলা হয়, মানুষ হাসার সময় যে মাংসপেশি ব্যবহার করে, শিম্পাঞ্জীরাও সেই একই পেশীর ব্যবহার করে।[2]

পশুপাখিদের মধ্যেও সময়ের হিসাব আছে

আমরা সময়ের হিসাব রাখি কিভাবে? উত্তর খুব সহজ। ঘড়ির সাহায্যে। কিন্তু পশুপাখিরা? তারাও কি সময়ের হিসাব রাখতে পারে? উত্তর যদি না জানা থাকে তাহলে Pavlov-এর সেই বিখ্যাত পরীক্ষার কথা তো সবার মনে আছে।

Animal Cognition and Behavior[3] শীর্ষক বইটিতে Seth Roberts (University of California, Berkeley) তাঁর লেখা “Properties and Function of an Internal Clock” নামের একটি প্রবন্ধে বলছেন,

A figure in Skinner (1956) showed three cumulative records with fixed-interval scallops, one record from a rat, one from a pigeon, and one from a monkey. The three records were similar, and Skinner stated, “Pigeon, rat, monkey, which is which? It doesn’t matter” (Skinner, 1956, p. 40). He was right–the ability to discriminate time is possessed by a wide range of vertebrates, and the accuracy of discrimination does not vary substantially. Not only dogs, pigeons, rats, and monkeys, but also mice (Sprott and Symons, 1974) , opossums (Cone and Cone, 1970), rabbits (Rubin and Brown, 1969), racoons (King, Schaeffer and Pierson, 1974) , bats (Schumake and Caudill, 1974), crows (Powell, 1973), and goldfish (Rozin, 1965) have discriminated time, usually with a fixed-interval schedule.

এখানে তিনি পশুপাখিদের মধ্যে circadian rhythm-এর কথা বলছেন। Circadian Rhythm হোল একটি সহজাত প্রাকৃতিক সময় নির্ধারক ব্যাবস্থা, যা পশুপাখিদের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সাথে সময়ের হিসাব রাখতে সাহায্য করে। আর এই article-এ এইকথাই উল্লেখ করা হচ্ছে যে পায়রা, বানর বা ইঁদুরের মধ্যে এই ব্যবস্থাটির কার্যকারিতার মধ্যে বিশেষ কোন তফাত নেই। এই circadian rhythm পশুপাখিদের মধ্যে তো আছেই, [4],[5],[6] এমনকি অন্ত্রে অবস্থিত সূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক ব্যাকটেরিয়াও এই circadian rhythm-এর দ্বারা পরিচালিত হয়।[7]

এর অর্থ খুব পরিষ্কার যে মানুষের মধ্যে যে circadian rhythm পরিলক্ষিত হয়, তা কোন ভিন গ্রহ থেকে আসে নি, বরং তা বিবর্তনের ধারায় পূর্বসূরি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত।[8]

মনুষ্যেতর প্রজাতিরও ভাবাবেগ আছে

মনুষ্যেতর জীবের মধ্যেও যে অনুভূতি আছে তা আলাদা করে বলার দরকার হয় না। যাদের বাড়িত কুকুর বিড়াল বা অন্য কোন জীবজন্তু আছে তারাই এই বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারেন। যদিও একসময় মনে করা হতো মানুষের যেমন ভাবাবেগ কাছে অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে তা নেই।

Jane Goodall ষাটের দশক বুনো শিম্পাঞ্জি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের পূর্ব পুরুষদের আচার-আচরণ কেমন ছিল সেই বিষয়ে খানিক আলকপাত করা। তাঁর লেখা বই “The Chimpanzees of Gombe: PATTERNS OF BEHAVIOR“-তে তিনি তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন। মানুষের সাথে এই বুনো শিম্পাঞ্জিদের আচার-আচরণ এবং ব্যবহারের মধ্যে আশ্চর্যজনক সাদৃশ্য লক্ষ্য করেন। তিনি এতই আশ্চর্য হয়েছিলেন এই সাদৃশ্য দেখে যে তিনি তাদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করেন। তিনি তিনি অবাক বিষয় লক্ষ্য করেন এই বুনো শিম্পাঞ্জিরা তাদের দৈনন্দিন কাজের সুবিধার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে।

পরবর্তী গবেষণাগুলি থেকে আরও নতুন তথ্য উঠে আসে। বোঝা যায় মানুষের মতো শিম্পাঞ্জিদের ভাবাবেগ আছে। মানুষের মতো তারাও তাদের ভাবাবেগ এবং মনের অনুভূতি, মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারে। হয়তো এই অভিব্যক্তি মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়, কিন্তু বেশ কিছুদিন এই শিম্পাঞ্জিদেরকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে এই অভিব্যক্তি শনাক্ত করা কঠিন নয়। মানুষের মতোই শিম্পাঞ্জিরাও একে অপরের অভিব্যক্তি খুব সহজেই বুঝতে পারে এবং তারা এই বিষয়ে খুবই পারদর্শী।[9]

শিম্পাঞ্জির নীতি-নৈতিকতা বোধ

Morality বলতে আমরা যদি নিরপেক্ষতা, ন্যায় পরায়ণতা, স্বার্থপর হীনতা এবং সহানুভূতি বুঝি,তাহলে এই বৈশিষ্ট্যগুলি শুধু মানুষের মধ্যে নয়, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও দেখা যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ এটাই মনে করে এসেছে নীতি-নৈতিকতা, সহানুভূতি, বিবেচনা বুদ্ধি শুধুমাত্র মানুষেরই বৈশিষ্ট্য এবং তা এক এমন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা মানুষকে পশুদের থেকে আলাদা করে। আর এই ধারণাই ‘humanity’ বলতে আমরা যা বুঝি সেই ধারণার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মানব শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের মধ্যে খুব ছোট বয়স থেকেই নিরপেক্ষতা, সততা ও সুবিচারের বোধ থাকে। তারা খুব ছোট বয়স থেকেই সহমর্মী, পরহিতৈষী এবং পরোপকারী। অনেক সময় তারা অপরকে সাহায্য করে, কোন লাভের আশা ছাড়াই। এর জন্য তাদের কোনো ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হয়না [10]

sense of morality in bonobo
আমরাও বুঝি ভালোবাসার মর্ম

এই স্বভাব নিরপেক্ষতা, সততা ও ন্যায্যতার বোধ মনুষ্যেতর প্রাণী মধ্যেও দেখা যায়। কতগুলি বাঁদরকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, একই কাজের জন্য যখন তারা সমান পুরস্কার পায়, তখন সবকটি বাঁদর খুশি থাকে। কিন্তু একজনকে কোন ভালো কিছু বা বেশি কিছু দিলে, তখন অন্যরা আর আগের মত সেই পুরস্কারটি গ্রহণ করতে চায় না।[11]

তার মানে বোঝা গেল শিম্পাঞ্জিরা নিজের ভালোটা বোঝে। কিন্তু শুধু কি তাই? তারা কি শুধুই স্বার্থপর? ২০১৩ সালে প্রকাশিত আরেকটি স্টাডিতে দেখা গেল তারা একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। যদি কোন শিম্পাঞ্জি দেখে তাদের গোষ্ঠীর কোন সদস্যের খাবারের অভাব আছে, তাহলে তারা নিজেদের খাবার ভাগ করে নেয়। তাদের এই আচরণ ঠিক মানুষেরই মত। [12]

২০০৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেল, ঠিক মানব শিশুর মতো শিম্পাঞ্জিরাও একে অপরকে সাহায্য করতে করে এবং এটি তাদের একটি সহজাত প্রবৃত্তি।[13] অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেল শিম্পাঞ্জিরা তাদের গোষ্ঠীর কোন এক সদস্যকে একটি দরজা খুলে খাবারের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং সেই কাজ করতে গিয়ে তারা কোন রকম লাভ-ক্ষতির তোয়াক্কা করে না। [14] কিছু গবেষণায় দেখা গেল শুধুমাত্র শিম্পাঞ্জি নয়, ইঁদুরের মধ্যেও গোষ্ঠীর অন্য সদস্যের প্রতি একই রকম সহানুভূতি এবং সহমর্মিতা প্রকাশ পায় [15]

মনুষ্যেতর প্রাণী এর সভ্যতা সংস্কৃতি

আমরা সেইভাবে পর্যবেক্ষণ করি না বটে, কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা থেকে এই ধারণা পাওয়া যায় যে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও সভ্যতা-সংস্কৃতির অস্তিত্ব আছে এবং তার বহু উদাহরণ বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে আমাদের সামনে এসেছে।[16] বিভিন্ন অঞ্চলের শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে রীতিনীতি, আচার আচরনের প্রভেদ লক্ষ্য করা যায়। গোষ্ঠীভেদে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার দেখা যায়, তারা বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করে, তাদের প্রেম নিবেদনের কায়দায় আলাদা, তাদের রীতিনীতি আলাদা। অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে সভ্যতা-সংস্কৃতির উদাহরন দেখা গেলেও, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে গোষ্ঠী ভেদে সংস্কৃতির এই যে ভিন্নতা তা কেবল মানব সমাজেই লক্ষ্য করা যায়।[17] একটি গবেষণায় দেখা গেল শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে আপেল শব্দটি বোঝানোর ক্ষেত্রেও ভিন্নতা আছে, ঠিক যেমন ভিন্নতা আছে বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ভাষায় [18]

উপসংহার

তাহলে দেখা গেল শুধু মানুষই না, বিভিন্ন মনুষ্যেতর প্রাণীও একটি জটিল সামাজিক গঠনের মধ্যে বাস করে, যেখানে তারা একে অপরের সাহায্যে উপরে নির্ভর করে। মানুষ একদিন মনে করত তাদের মধ্যে যে বিচার-বিবেচনা, নীতি-নৈতিকতা, বিচার, বুদ্ধি-বিবেচনার জ্ঞান আছে তা এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, এবং সেই বৈশিষ্ট্যই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনা-নীতি-নৈতিকতার মত বৈশিষ্ট্য গুলি আকাশ থেকে পড়ে নি। এগুলো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি সহজাত। এই যে সহানুভূতি, সহমর্মিতা, পরস্পরকে সাহায্য করার প্রবৃত্তি, এই বৈশিষ্ট্য গুলি পশুপাখির রাজ্যে আকছার দেখা যায়।[15] তাহলে এর থেকে বোঝা যায় সহযোগিতা, সহমর্মিতা, ন্যায় পরায়ণতার মত বৈশিষ্ট্যগুলি জীবজগতে খুবই দরকারী বৈশিষ্ট্য এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রাণীকূলকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। আর মানুষ সেই প্রবৃত্তিগুলি বিবর্তনের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। বিবর্তনের ধারায় সেই প্রাণী বা জীবকুল প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পেরেছে, যারা স্বপ্রজাতির অন্যান্য সদস্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, এবং যারা খুঁজে নিয়েছে এই প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানে বেঁচে থাকার পথ।

Frans de Waal (primatologist) তাঁর লেখা “The Bonobo and the Atheist” বইটিতে বলছেন যে, নীতিবোধ আমাদের মধ্যে সহজাত। এটি একটি সহজাত প্রবৃত্তি। নীতিবোধ আকাশ থেকে ধর্মের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছ থেকে মানুষের মধ্যে এসে পৌঁছয় নি। বরং এই নৈতিকতার জন্ম হয়েছে আমাদের অনুভূতি, আমাদের সমাজে টিকে থাকার তাগিদ থেকে। এবং এটি বিবর্তিত হয়েছে মনুষ্যেতর প্রাণী সামাজিক গঠন থেকে। তিনি আরও বলছেন,

“It wasn’t God who introduced us to morality; rather, it was the other way around. God was put into place to help us live the way we felt we ought to.” (এই ধারণা ভুল যে, ঈশ্বর ধর্মের মাধ্যমে মনুষ্যসমাজকে নীতি নৈতিকতা তথা morality-র সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। বরং উল্টোটাই সত্য। মানুষ, তার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে যে রকম জীবনযাপন করা উচিত মনে করেছে, সেই ধারণা প্রবর্তন করে সেই স্থানে ইশ্বরকে বসিয়েছে। )

অর্থাৎ এই যে ভাল-মন্দ বিচারের ক্ষমতা, পরস্পরের প্রতি এই যে সহমর্মিতা, এই যে সহানুভুতি, এই সকল বৈশিষ্ট্যগুলি ধর্ম শেখায় নি। ‘সদা সত্য কথা বলিবে’, ‘সদা সৎপথে চলিবে’ অথবা ‘Love thy neighbor’ -এই ধরনের নীতিশিক্ষা সকল ধর্মের মধ্যেই আছে। আর এই সমস্ত কথাগুলি আমাদের স্বাভাবিক সাধারণ বিচারবুদ্ধি বিবেচনার সাথে খাপ খায়। তাই আমাদের মনে হয়, ধর্ম কি ভালো কথাই না বলে। কিন্তু যদি অন্যথা হত, যদি ধর্মে বলা হয় একে অপরের ক্ষতি করতে অথবা পরের দ্রব্য সুযোগ পেলেই চুরি করতে, আমরা আমাদের সাধারণ জ্ঞান থেকেই বুঝতে পারতাম যে এই কথাগুলি ভুল। আর তাই আমরা যখন কোন ধর্মে এই বিরুদ্ধ বক্তব্য পেলেই, যারপরনাই চেষ্টা করি সেই কথাগুলি কোন না কোন ভাবে আমাদের সহজাত বিচার বিবেচনার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে, কোন না কোন যুক্তি সাজিয়ে “defend” করতে, অথবা ‘ধর্মে নেই’ এই কথা বলে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিতে।

যে প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা প্রায়শই হয়ে থাকি, “ধর্ম না থাকলে morality শেখাবে কে?”, তার উত্তর খুব সহজ। ধর্ম আমাদের morality বা ethics শেখায় না। আমরা আমাদের বিচার বুদ্ধি দিয়ে যে সকল নিয়ম কানুন, আচার আচরন সঠিক বলে মনে করেছি তাই ধর্মের নাম দিয়ে চালিয়েছি। তাই ধর্ম না থাকলে মানুষ নিজেই যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেচনা দিয়ে, তথ্য ও প্রমানের উপর ভিত্তি করে কোনটা সঠিক কোনটা ভুল তার ধারণা পেতে পারে। এর জন্য ধর্মের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন যেটা সেটা হোল শিক্ষা।

তথ্যসূত্রঃ
  1. http://darwin-online.org.uk/converted/published/1871_Descent_F937/1871_Descent_F937.1.html[]
  2. Davila-Ross M, Jesus G, Osborne J, Bard KA. Chimpanzees (Pan troglodytes) Produce the Same Types of ‘Laugh Faces’ when They Emit Laughter and when They Are Silent. PLoS One. 2015 Jun 10;10(6):e0127337. doi: 10.1371/journal.pone.0127337. PMID: 26061420; PMCID: PMC4465483.[]
  3. Mellgren, Roger L, Animal Cognition and Behavior, North Holland Publishing company, 1983, Page 347[]
  4. Bloch, Guy et al. “Animal activity around the clock with no overt circadian rhythms: patterns, mechanisms and adaptive value.” Proceedings. Biological sciences vol. 280,1765 20130019. 3 Jul. 2013, doi:10.1098/rspb.2013.0019[]
  5. Patke, A., Young, M.W. & Axelrod, S. Molecular mechanisms and physiological importance of circadian rhythms. Nat Rev Mol Cell Biol 21, 67–84 (2020). https://doi.org/10.1038/s41580-019-0179-2[]
  6. Jürgen Aschoff, Temporal orientation: circadian clocks in animals and humans, Animal Behaviour, Volume 37, Part 6, 1989, Pages 881-896, ISSN 0003-3472, https://doi.org/10.1016/0003-3472(89)90132-2.[]
  7. Voigt RM, Forsyth CB, Green SJ, Engen PA, Keshavarzian A. Circadian Rhythm and the Gut Microbiome. Int Rev Neurobiol. 2016;131:193-205. doi: 10.1016/bs.irn.2016.07.002. Epub 2016 Sep 6. PMID: 27793218.[]
  8. Jindrich Katia, Roper Kathrein E., Lemon Sussan, Degnan Bernard M., Reitzel Adam M., Degnan Sandie M. Origin of the Animal Circadian Clock: Diurnal and Light-Entrained Gene Expression in the Sponge Amphimedon queenslandica, Frontiers in Marine Science, VOLUME 4, 2017, 327, https://www.frontiersin.org/article/10.3389/fmars.2017.00327, DOI=10.3389/fmars.2017.00327,ISSN=2296-7745[]
  9. Lisa A. Parr, Bridget M. Waller, Understanding chimpanzee facial expression: insights into the evolution of communication, Social Cognitive and Affective Neuroscience, Volume 1, Issue 3, December 2006, Pages 221–228https://doi.org/10.1093/scan/nsl031[]
  10. Moore, Chris. “Fairness in Children’s Resource Allocation Depends on the Recipient.” Psychological Science, vol. 20, no. 8, Aug. 2009, pp. 944–948, doi:10.1111/j.1467-9280.2009.02378.x.[]
  11. Brosnan, S., de Waal, F. Monkeys reject unequal pay. Nature 425, 297–299 (2003). https://doi.org/10.1038/nature01963[]
  12. Darby Proctor, Rebecca A. Williamson, Frans B. M. de Waal, Sarah F. Brosnan, Chimpanzees play the ultimatum game, Proceedings of the National Academy of Sciences Feb 2013, 110 (6) 2070-2075; DOI:10.1073/pnas.1220806110[]
  13. Warneken F, Tomasello M. Altruistic helping in human infants and young chimpanzees. Science. 2006 Mar 3;311(5765):1301-3. doi: 10.1126/science.1121448. PMID: 16513986.[]
  14. Warneken F, Hare B, Melis AP, Hanus D, Tomasello M. Spontaneous altruism by chimpanzees and young children. PLoS Biol. 2007 Jul;5(7):e184. doi: 10.1371/journal.pbio.0050184. Epub 2007 Jun 26. PMID: 17594177; PMCID: PMC1896184.[]
  15. Sato, N., Tan, L., Tate, K. et al. Rats demonstrate helping behavior toward a soaked conspecific. Anim Cogn 18, 1039–1047 (2015). https://doi.org/10.1007/s10071-015-0872-2[][]
  16. Whiten A. The scope of culture in chimpanzees, humans and ancestral apes. Philos Trans R Soc Lond B Biol Sci. 2011 Apr 12;366(1567):997-1007. doi: 10.1098/rstb.2010.0334. PMID: 21357222; PMCID: PMC3049095.[]
  17. Whiten, A., Goodall, J., McGrew, W. et al. Cultures in chimpanzees. Nature 399, 682–685 (1999). https://doi.org/10.1038/21415[]
  18. Watson SK, Townsend SW, Schel AM, Wilke C, Wallace EK, Cheng L, West V, Slocombe KE. Vocal learning in the functionally referential food grunts of chimpanzees. Curr Biol. 2015 Feb 16;25(4):495-9. doi: 10.1016/j.cub.2014.12.032. Epub 2015 Feb 5. PMID: 25660548.[]

4 thoughts on “আমাদের নীতি-নৈতিকতার উৎস ধর্ম নয়

  • February 25, 2021 at 7:26 AM
    Permalink

    morality can’t be absolute. absolute morality destroys morality.

    Reply
  • February 26, 2021 at 8:52 AM
    Permalink

    Abstract
    There is a widespread cross-cultural stereotype suggesting that atheists are untrustworthy and lack a moral compass. Is there any truth to this notion? Building on theory about the cultural, (de)motivational, and cognitive antecedents of disbelief, the present research investigated whether there are reliable similarities as well as differences between believers and disbelievers in the moral values and principles they endorse. Four studies examined how religious disbelief (vs. belief) relates to endorsement of various moral values and principles in a predominately religious (vs. irreligious) country (the U.S. vs. Sweden). Two U.S. M-Turk studies (Studies 1A and 1B, N = 429) and two large cross-national studies (Studies 2–3, N = 4,193), consistently show that disbelievers (vs. believers) are less inclined to endorse moral values that serve group cohesion (the binding moral foundations). By contrast, only minor differences between believers and disbelievers were found in endorsement of other moral values (individualizing moral foundations, epistemic rationality). It is also demonstrated that presumed cultural and demotivational antecedents of disbelief (limited exposure to credibility-enhancing displays, low existential threat) are associated with disbelief. Furthermore, these factors are associated with weaker endorsement of the binding moral foundations in both countries (Study 2). Most of these findings were replicated in Study 3, and results also show that disbelievers (vs. believers) have a more consequentialist view of morality in both countries. A consequentialist view of morality was also associated with another presumed antecedent of disbelief—analytic cognitive style.
    full paper-https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0246593

    Reply
  • February 26, 2021 at 12:26 PM
    Permalink

    science to the rescue again(https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0246593)
    -Abstract
    There is a widespread cross-cultural stereotype suggesting that atheists are untrustworthy and lack a moral compass. Is there any truth to this notion? Building on theory about the cultural, (de)motivational, and cognitive antecedents of disbelief, the present research investigated whether there are reliable similarities as well as differences between believers and disbelievers in the moral values and principles they endorse. Four studies examined how religious disbelief (vs. belief) relates to endorsement of various moral values and principles in a predominately religious (vs. irreligious) country (the U.S. vs. Sweden). Two U.S. M-Turk studies (Studies 1A and 1B, N = 429) and two large cross-national studies (Studies 2–3, N = 4,193), consistently show that disbelievers (vs. believers) are less inclined to endorse moral values that serve group cohesion (the binding moral foundations). By contrast, only minor differences between believers and disbelievers were found in endorsement of other moral values (individualizing moral foundations, epistemic rationality). It is also demonstrated that presumed cultural and demotivational antecedents of disbelief (limited exposure to credibility-enhancing displays, low existential threat) are associated with disbelief. Furthermore, these factors are associated with weaker endorsement of the binding moral foundations in both countries (Study 2). Most of these findings were replicated in Study 3, and results also show that disbelievers (vs. believers) have a more consequentialist view of morality in both countries. A consequentialist view of morality was also associated with another presumed antecedent of disbelief—analytic cognitive style.

    Reply
    • March 15, 2021 at 2:20 PM
      Permalink

      Thank you so much for your valuable comment… really appreciate this article… Thanks a ton…

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *