জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুতে ইসলামের ভূমিকা

Print Friendly, PDF & Email

ভূমিকা

কয়েকবছর আগে বাঙলাদেশে মিয়ানমার থেকে বেশ কয়েকলাখ রোহিঙ্গা শরনার্থী প্রবেশ করেছে। আমরা অবশ্যই নির্যাতিত মানুষের পক্ষে, এবং শরনার্থীদের আশ্রয় দেয়া অবশ্যই একটি মানবিক কাজ। কিন্তু বাঙলাদেশে রোহিঙ্গারা প্রবেশের পরে তাদের অনেকগুলো ক্যাম্পে আমার বেশ কয়েকজন বন্ধু ও সহযোদ্ধা তাদের সাথে মিশেছেন, তাদের সাথে কথা বলেছেন। একটি অদ্ভুত ব্যাপার তাদের মধ্যে দেখা গেছে যে, সেই ক্যাম্পগুলোর অধিকাংশ নারী গর্ভবতী, এবং তারা প্রচুর পরিমানে সন্তান উৎপাদন করে। নিয়ম করে প্রতিটি বছরই তাদের একটি, কখনো দুই তিনটি বাচ্চা একসাথে হবেই হবে। যুদ্ধে ভয়াবহ অত্যাচারের শিকার হওয়ার পরেও তারা এত বিপুল পরিমানে সন্তান উৎপাদন কীভাবে করছে, তা এক বিষ্ময়। বেশিরভাগ নারীই তাদের পেট কখনো খালি রাখে না। একটি শিশু জন্ম দেয়ার সাথে সাথেই তারা আবারো গর্ভবতী হয়। আমার বন্ধুদের অনেকেই তাদের মধ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শেখাবার কাজে সেসব ক্যাম্পে গিয়েছেন, কিন্তু তারা কনডোম এবং এই ধরণের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো রীতিমত ঘৃনা করেন। কনডোমগুলো দুরে ফেলে দেন। এরপর তারা আবারো গর্ভবতী হন, একের পর এক। কোন বিরতি দেন না। রোহিঙ্গাদের এই অধিক সন্তান জন্ম দেয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও অনেকবার পত্রিকাতে এসেছে। কীভাবে এত অত্যাচারের শিকার একটি জনগোষ্ঠীর মনে এত প্রেম, এত ভালবাসা, যে তারা একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যাচ্ছে, তা রীতিমত গবেষনার বিষয়। এর পেছনে নিশ্চয়ই অনেক কারণ আছে, তবে সেসব কারণের মধ্যে একটি গুরুত্বপুর্ণ কারণ যে ধর্মান্ধতা, সেটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ, সেইসব জায়গাতে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়, নানা ধরনের ওয়াজ মাহফিল হয়, সেসব ওয়াজে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হয়। একইসাথে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে কীভাবে ভূমি দখল করতে হয়, সরকার ও জাতিসংঘ থেকে শরনার্থী ভাতা এবং সাহায্য আদায় করতে হয়, সেসবের শিক্ষাও খুব জোরেসোরেই তারা করে থাকেন। সেগুলো নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা নয়। আজকের আলোচনা হচ্ছে, এই ঘটনায় ইসলামের কোন ভূমিকা রয়েছে কিনা, তা যাচাই করে দেখা। বলে নেয়া জরুরি, অন্যান্য ধর্ম, অশিক্ষা কুশিক্ষা কুসংস্কারও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রভাব রাখে, যেমনটি ইসলাম রাখে। আজকে আমাদের আলোচনা শুধুমাত্র ইসলাম বিষয়ে। আশাকরি আগ্রহী পাঠক লেখার তথ্যগুলো যাচাই করে দেখবেন এবং লেখাটি তাদের মনে কিছু চিন্তার খোরাক যোগাবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ইসলামের ভূমিকা

অর্থনৈতিক কারণে বা সন্তান জন্ম দিলে তার খাওয়া পড়া বা জীবিকা নির্বাহের খরচের কথা চিন্তা করে সন্তান জন্ম দেয়া থেকে কোন অপ্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বিরত থাকা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। তবে শারীরিক অসুস্থতা বা এরকম কোন বিষয় থাকলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ রয়েছে, তবে তা যদি খাওয়াতে পারবে না এরকম আশঙ্কায় হয়, তবে তা ইসলামে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ কোরআনে বারবার এই বিষয়ে হুশিয়ারি করা আছে,

পৃথিবীর প্রত্যেক জীবের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই
(সূরা হূদ ১১:৬)

তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না দারিদ্রের কারণে, আমিই তোমাদের রিযিক দান করি এবং তাদেরও আমিই রিযিক দান করব
(সূরা আন‘আম ৬:১৫১)

অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিয্ক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।
(সূরা ইসরা ১৭:৩১)

ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য ও সুখ-শান্তির উপাদান ও বাহন
(সূরা কাহাফ ১৮:৪৬)

প্রশ্ন আসতে পারে, কোরআনের এই আয়াতগুলোতে তো সন্তান হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে পুরুষের বীর্য যদি প্রবেশ নাই করে, তাহলে তো সন্তানও হলো না, আর সেই সন্তান হত্যাও হলো না। এরকম করা কী ইসলাম অনুসারে ঠিক হবে? নিচে তা বর্ণনা করা হচ্ছে।

ইসলামে আজলের বিধান

আজল হচ্ছে প্রাচীনকালের এক ধরণের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। সঙ্গমের সময় শেষ মূহুর্তে লিঙ্গ বের করে বাইরে বীর্য ফেলাকে আজল বলা হয়। ইসলামে স্ত্রীর সাথে আজল করাকে গোপন হত্যার সাথে নবী মুহাম্মদ তুলনা করেছেন। নিচের হাদিসটি পড়ুন। এই হাদিসটিতে স্ত্রীর সাথে আজল করাকে গোপন হত্যার মত গর্হিত কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২৪. ‘গীলাহ’ অর্থাৎ স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সাথে সঙ্গমের বৈধতা এবং ‘আযল মাকরূহ হওয়া প্রসঙ্গে
৩৪৫৭-(১৪১/…) উবায়দুল্লাহ্ ইবনু সাঈদ ও মুহাম্মাদ ইবনু আবূ উমর (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. উকাশার ভগ্নি জুদামাহ্ বিনতু ওয়াহব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদিন কিছু সংখ্যক লোকের সাথে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হাযির হলাম। তিনি তখন বলছিলেন, আমি স্তন্যদায়িনী মহিলার সাথে সঙ্গম করা নিষেধ করার ইচ্ছা করলাম, এমতাবস্থায় আমি রোম ও পারস্যবাসী লোকদের অবস্থার কথা বিবেচনা করে অবগত হলাম যে, তারা তাদের স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে থাকে, কিন্তু তা তাদের সন্তান-সন্ততির কোনরূপ ক্ষতি করে না। অতঃপর লোকেরা তাকে ‘আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তা হল গোপন হত্যা। রাবী উবায়দুল্লাহ তার বর্ণনায় আল মুকরী সূত্রে আয়াতটুকুও উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ “যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে” (সূরা আত্ তাকভীর ৮১ঃ ৮-৯)। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৩০, ইসলামীক সেন্টার ৩৪২৯ )
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুদামা বিনত ওয়াহব আসাদিয়া (রাঃ)

তবে, ক্রীতদাসী বা যুদ্ধবন্দী নারীরা যদি দ্রুত গর্ভবতী হয়ে যায়, তাহলে তাদের আর দাস বাজারে নিয়ে বিক্রি করা যায় না। তাদের অনেকদিন আর ধর্ষণ করাও সম্ভব হয় না। এই কারণে নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ যুদ্ধবন্দী ক্রীতদাসীদের সাথে আজল করতো। সেই হাদিসগুলো পরে দেয়া হবে, আগে আজল কাকে বলে তা জেনে নিই সহিহ বুখারী হাদিস গ্রন্থ থেকে [1]

জনসংখ্যা

এবারে আসুন দেখি, দাসী বা যুদ্ধবন্দী ক্রীতদাসীদের সাথে আজলকে নবী কীভাবে বৈধতা দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দী নারীগণ যেন দ্রুত গর্ভবতী না হয়ে যায়, সেই দিকে মুহাম্মদের জিহাদী সৈন্যদের ছিল খুব সজাগ দৃষ্টি। নিচের হাদিসটি পড়ুন [2]

গ্রন্থের নামঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
হাদিস নম্বরঃ (7409)
অধ্যায়ঃ ৯৭/ তাওহীদ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৯৭/১৮. আল্লাহর বাণীঃ তিনিই আল্লাহ্ সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, আকৃতিদাতা। (সূরাহ আল-হাশর ৫৯/২৪)
৭৪০৯. আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বানী মুসতালিক যুদ্ধ বিষয়ে বর্ণনা করেন যে, মুসলিমগণ যুদ্ধে কতকগুলো বন্দিনী লাভ করলেন। এরপর তাঁরা এদেরকে ভোগ করতে চাইলেন। আবার তারা যেন গর্ভবতী হয়ে না পড়ে সে ইচ্ছাও তারা করছিলেন। তাই তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আযল বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এতে তোমাদের কোন লাভ নেই। কারণ আল্লাহ্ ক্বিয়ামাত পর্যন্ত যত জীবন সৃষ্টি করবেন, তা সবই লিখে রেখেছেন। মুজাহিদ (রহ.) কাযআ (রহ.)-এর মাধ্যমে আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যত জীবন সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, আল্লাহ্ তা‘আলা অবশ্যই তা সৃষ্টি করবেনই। (২২২৯) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯০৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অনেকগুলো হাদিসেই যুদ্ধবন্দী নারী বা দাসীদের সাথে আজলের কথা বলা আছে, আমরা শুধু কিছু দেখাচ্ছি। নিচের হাদিসটির বই থেকে তোলা ছবি [3]

বনী মুসতালিক যুদ্ধ
যুদ্ধবন্দী গর্ভবতী

এবারে আসুন, সহজ নসরুল বারী গ্রন্থে থেকে এই সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যা পড়ে নিই [4]

জনসংখ্যা
জনসংখ্যা

মাতৃমৃত্যুতে ইসলামের ভূমিকা

মাতৃমৃত্যু বা মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও/WHO) এর সংজ্ঞা হলো “গর্ভবতী অবস্থায় একজন মহিলার মৃত্যু বা মাতৃত্বকালীন মৃত্যু হয়, বা গর্ভাবস্থার অবসানের জন্য ৪২ দিনের মধ্যে যদি গর্ভধারণ বা তার ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা সম্পর্কিত কারণে মৃত্যু হয়, তাকে মাতৃমৃত্যু বলা হয়”। ইউনাইটেড নেশনস জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ২০১৭-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি দুই মিনিটে একজন মহিলার এই কারণে মৃত্যু হয় এবং যারা মারা যায় তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুর পেছনে ২০ বা ৩০ টি কারণ থাকে, যা গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় সম্মুখীন করে। এই মৃত্যুর অধিকাংশই এবং সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য। মাতৃমৃত্যু কমানো খুব কঠিন কাজ নয়, প্রয়োজন শুধু সচেতনতা এবং শিক্ষা। মাতৃমৃত্যু এড়াতে পারে যায় উপযুক্ত যৌন শিক্ষা দান এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে। গর্ভাবস্থায় প্রসবকালীন যত্নের উন্নতি, শিশুর জন্মের সময় যত্ন, এবং সন্তানের জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যত্ন ও সহায়তা মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পারে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই দেখা যায়, সঠিক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে অনেক মায়ের মৃত্যু ঘটে।

মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া। যার ফলে শরীর সন্তান জন্মদানের মত যথেষ্ট পরিপক্ক হওয়ার আগেই তারা সন্তান জন্ম দিতে শুরু করে, এবং পুষ্ঠিহীনতা এবং প্রসব বেদনার কারণে বহু সংখ্যক নারী মৃত্যুবরণ করে। ইসলামে অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়াকে বৈধতা এবং উৎসাহ দেয়া হয়েছে, যা এই লেখাটিতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে [5]

একইসাথে মাতৃমৃত্যুর আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ কারণ হচ্ছে অধিক সন্তান জন্ম দেয়া। অধিক সন্তান জন্ম দিতে দিতে নারীরা তাদের টিকে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নানা ধরনের রোগব্যাধীতে আক্রান্ত হতে শুরু করে, এবং শরীরে পুষ্ঠিহীনতা দেখা দেয়। সেই সাথে থাকে ইসলামে অধিক সন্তান জন্ম দেয়াকে বহু জায়গাতেই উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আসুন প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার মুফতি ইব্রাহীমের একটি বক্তব্য শুনে নিই। উল্লেখ্য, আমি নিজেও ব্যবসার জন্য অতিমাত্রায় সিজারিয়ানের পক্ষে নই, তবে সেটি একজন হুজুরের চাইতে ডাক্তারই ভাল বুঝবেন বলেই আমি মনে করি।

এবারে আসুন দেখি নবী কী বলেছেন। নবী মুহাম্মদ বন্ধ্যা নারীকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন, কারণ তিনি অধিক সন্তান জন্ম দেয়াকেই সমর্থন করতেন। তিনি মুসলিমদের বেশি বেশি সন্তান জন্ম দেয়াকে উৎসাহিত করেছেন, কেয়ামতের দিন সংখ্যায় বেশি হয়ে গর্ব করার জন্য। এর থেকে বোঝা যায়, বেশি বেশি বাচ্চা জন্ম দেয়াকেই ইসলাম উৎসাহিত করে।

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ (বিবাহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. বন্ধ্যা নারীকে বিবাহ করা অনুচিত
৩২৩০. আব্দুর রহমান ইবন খালিদ (রহঃ) … মা’কাল ইবন ইয়াসার (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে আরয করলোঃ আমি এমন এক মহিলার সন্ধান পেয়েছি, যে বংশ গৌরবের অধিকারিণী ও মর্যাদাবান, কিন্তু সে বন্ধ্যা, আমি কি তাকে বিবাহ করবো? তিনি তাকে নিষেধ করলেন। দ্বিতীয় দিন তাঁর নিকট আসলে তিনি নিষেধ করলেন। এরপর তৃতীয় দিন তাঁর খেদমতে আসলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন এবং বললেনঃ তোমরা অধিক সন্তান প্রসবা নারীকে বিবাহ করবে, যে তোমাদেরকে ভালবাসবে। কেননা, আমি তোমাদের দ্বারা সংখ্যাধিক্য লাভ করবো।
তাহক্বীকঃ হাসান। ইরওয়া ১৭৮৪, আদাবুয যিফাফ ১৬, সহীহ আবু দাউদ ১৭৮৯।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৪. যে মহিলা সন্তান দিতে অক্ষম তাকে বিয়ে করা নিষেধ সম্পর্কে
২০৫০। মা‘কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করে যে, প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো।[1]
হাসান সহীহ।
[1]. নাসায়ী।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ)

সবচাইতে ভয়াবহ বিষয়টি হচ্ছে, গর্ভাবস্থায় মৃত্যু হলে সেই নারীকে নবী শহীদের মর্যাদায় জান্নাতী বলে ঘোষণা করে গেছেন। এর ফলে গর্ভাবস্থায় অনেক মুসলিম পরিবারই গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নেবেন না, চিকিৎসা দেয়ার ব্যাপারে হেলাফেলা করবেন, সিজারের প্রয়োজন হলে সিজার করাবেন না! এর ফলে ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে। যেসব পুরুষের অনেকগুলো স্ত্রী, তারা প্রায়শই গর্ভবতী স্ত্রীদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারে সচেতন থাকেন না। নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নেন না। এর ওপর যদি সে মনে করে যে, গর্ভাবস্থায় মৃত্যু হলে স্ত্রী জান্নাতী, তাহলে তার খুব ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো বা অর্থ খরচ করার ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলা দেখা যেতে পারে।

সুনান ইবনু মাজাহ
১৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৮/১৭. যার জন্য শহীদের মর্যাদা আশা করা যায় (শহীদের শ্রেণীবিভাগ)
১/২৮০৩। জাবির ইবনে আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। জাবির (রাঃ) এর পরিবারের কেউ বললো, আমরা আশা করতাম যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাহলে আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা তো খুব কম হয়ে যাবে। আল্লাহর পথে নিহত হলে শহীদ, মহামারীতে নিহত হলে শহীদ, যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদ এবং পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে ও ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।
নাসায়ী ১৮৪৬, ৩১৯৪, আবূ দাউদ ৩১১১, আহমাদ ২৩২৪১, মুয়াত্তা মালেক ৫৫২, আল-আহকাম ৩৯-৪০ নং পৃষ্ঠা, আত-তালীকুর রাগীব ২/২০২।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আতীক (রাঃ)

নবজাতকের মৃত্যুতে ইসলামের ভূমিকা

বেশি বেশি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যদি কয়েকটি শিশু মারা যায়, সেটিও আসলে ইসলাম নানাভাবে উৎসাহিত করেছে। নবী মুহাম্মদ বলেছেন, কোন মুসলিম পিতামাতার তিনটি নাবালেগ সন্তানের মৃত্যু হলে পিতামাতা জান্নাতে প্রবেশ করবে। এরকম গ্যারান্টি দেয়া থাকলে, মুসলিম পিতামাতার জন্য সন্তানের মৃত্যু একটি আনন্দের ব্যাপার বলেই মনে হবে। কারণ এতে তাদের জান্নাত প্রাপ্তির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। তারা আরো বেশি বেশী সন্তান জন্ম দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে সন্তান অপুষ্টির শিকার হলে, অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিলে, গর্ভাবস্থায় কোন বড় সমস্যা দেখা দিলে, ভিটামিনের অভাব দেখা দিলে, পিতামাতা আর স্বাস্থ্য সেবাও নিতে যাবে না। কারণ সন্তান জন্ম হলে তো ভাল, মারা গেলেও সেটি তাদের জন্য জান্নাত প্রাপ্তির সুসংবাদ নিয়ে আসবে। এরকম উৎসাহ প্রদান এবং এরকম ধর্মীয় বিশ্বাস বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বদ্ধমূল থাকলে, স্বাভাবিকভাবেই সেই অঞ্চলে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। আসুন হাদিসগুলো পড়ে দেখা যাক,

সুনান ইবনু মাজাহ
৬/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৬/৫৭. সন্তানের মৃত্যুতে পিতা-মাতার সওয়াব।
৩/১৬০৫। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন মুসলিম পিতা-মাতার তিনটি নাবালেগ সন্তান মারা গেলে, আল্লাহ্ তার বিশেষ অনুগ্রহে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
সহীহুল বুখারী ১২৪৮, ১৩৮১; তিরমিযী ১০০৩; নাসায়ী ১৮৭২; ১৮৭৩; আহমাদ ১২১২৬
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সুনান ইবনু মাজাহ
৬/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৬/৫৭. সন্তানের মৃত্যুতে পিতা-মাতার সওয়াব।
২/১৬০৪। উতবা ইবনু আবদুস সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ কোন মুসলিম ব্যক্তির তিনটি নাবালেগ সন্তান মারা গেলে, সে জান্নাতের আটটি দরজার যেটি দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করতে পারবে।
তা’লীকুর রগীব ৩/৮৯।
তাহকীক আলবানীঃ হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

সুনান ইবনু মাজাহ
৬/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৬/৫৭. সন্তানের মৃত্যুতে পিতা-মাতার সওয়াব।
১/১৬০৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন ব্যক্তির তিনটি সন্তান মারা গেলে সে জাহান্নাম পার হয়ে যাবে, তবে শপথ পূর্ণ না করার জন্য (শাস্তি পাবে)।
সহীহুল বুখারী ১০২, মুসলিম ২৬৩২, ২৬৩৪, তিরমিযী ১০৬০ নাসায়ী ১৮৭৫, ১৮৭৬, আহমাদ ৭২২৪, ৭৬৬৪, ৯৭৭০, ৯৮৫৩, ১০৫৪০, মুয়াত্তা মালেক ৫৫৪
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এমনকি, গর্ভপাত হলেও সেটি নারীর জন্য ভাল বিষয়। সন্তান জন্ম দেয়াকে ইসলাম এতটাই উৎসাহিত করে যে, নারীর স্বাস্থ্য, শরীর পরিণত না হলেও সন্তান জন্ম দেয়ার চেষ্টা একজন নারী চালাতে পারে, কারণ এতে তার জান্নাত প্রাপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে। এমনকি গর্ভপাত হলেও তার লাভ। এরকম প্রতিশ্রুতি মেয়েদের আরো বেশি সন্তান জন্ম দিতে উৎসাহ দেবে, ফলশ্রুতিতে শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাবে।

সুনান ইবনু মাজাহ
৬/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৬/৫৮. কোন মহিলার গর্ভপাত হলে।
৩/১৬০৯। মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! গর্ভপাত হওয়া সন্তানের মাতা তাতে সওয়াব আশা করলে ঐ সন্তান তার নাভিরজ্জু দ্বারা তাকে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে।
আহমাদ ২১৫৮৫ মিশকাত ১৭৫৪।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ)

উপসংহার

উপরের আলোচনা থেকে এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, ইসলাম অল্পবয়সে মেয়েদের বিবাহ সমর্থন করে, অধিক সন্তান জন্মদান সমর্থন করে, অধিক সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নারীদের মৃত্যু হলে সেই মৃত্যুকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে সেই মৃত্যুর সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করে, গর্ভপাতকেও আশীর্বাদ হিসেবে উপস্থাপন করে, শিশুদের জন্মের পরে শিশুদের মৃত্যুকেও বিশেষ মর্যাদা দান করে, এইসবের মাধ্যমে আসলে সামগ্রিকভাবে এই অন্ধবিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, মুমিনা নারীদের শারীরিক সামর্থ্য না থাকলেও, বয়স না হলেও, পরিপক্ক না হলেও, শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকলেও মেয়েদের বেশি বেশি সন্তান ধারণ করা উচিত। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মা এবং সেই সন্তান যদি মারা যায়, তাহলে সেটি মুসলিমদের জন্য খুবই মর্যাদার, খুবই মহামান্বিত বিষয়। এই কারণে নারীর গর্ভাবস্থায় তাদের প্রতি অবহেলা, স্বাস্থ্য সেবা না নেয়া, পুষ্টিহীনতা সহ নানা সমস্যার উদ্ভব ঘটতে পারে। এই ধরণের কুসংস্কার এবং বাজে ধারণা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সেটি গোটা সমাজের জন্যেই ক্ষতিকর।

তথ্যসূত্রঃ
  1. সহিহ বুখারী । ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সপ্তম খণ্ড। পৃষ্ঠা ৬৯। হাদিস নম্বর ৩৮৩২ []
  2. সহীহ বুখারী (তাওহীদ), হাদিস নম্বর- ৭৪০৯ []
  3. বুখারী শরীফ । ইসলামিক ফাউন্ডেশন। দশম খণ্ড । পৃষ্ঠা ৫৪৯। হাদিস নম্বর ৬৯০৫ []
  4. সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ১১ তম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৭, ৫০৮ []
  5. আয়িশা কি নয়বছর বয়সে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছেছিলেন? []

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *