নৈতিকতার উৎস এবং ধর্ম

কাগজটা দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল নিলয়ের,আবার এক শিশুকন্যা ধর্ষিতা হয়েছে। কাগজ খুললেই খালি খুন, জখম, ধর্ষণের খবর। মানুষ কি দিন দিন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে! এসবই ভাবছিল নিলয়, তখন ঘরে ঢুকল ওর রুমমেট পলাশ। পলাশ, নিলয় দুজন ছোটবেলার বন্ধু। অনেক কিছু নিয়ে মাঝে মধ্যেই তাদের গরম গরম বিতর্ক হয় কিন্তু তা কখনো ওদের বন্ধুত্বে চিড় ধরাতে পারেনি ।পলাশ খবরটা পড়েই বলল এসব হচ্ছে কারন মানুষ ধর্ম থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। এরপরই শুরু হয়ে গেল তাদের বিতর্ক –
পলাশ: একজন ধার্মিক কখনো ধর্ষন করবে না। কারন সে জানে এটা পাপ । তার ধর্ম তাকে এই পাপ কাজ করতে বাধা দেবে। কিন্তু ধর্ম থেকে দূরে থাকা ব্যক্তির পাপ বোধ নেই। তাই সে যদি ধর্ষন করতে উদ্যত হয় তাকে বাধা দেওয়ার কিছু নেই।
নিলয়: আজব কথা বলছ তুমি। যে ধর্ম মানে না সেও তো জানে ধর্ষন খারাপ, সে যদি সেই খারাপ কাজ করে তার জন্য তার চরিত্র দায়ী তার ধর্মবোধ নয়।
পলাশ: ধর্ষন যে খারাপ সেই বোধটাই তো ধর্ম দিয়েছে। ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল।
নিলয়: তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এখনো অনেক জাতি আছে যাদের মধ্যে তথাকথিত সভ্যতার আলো পৌছাইনি। এমনি এক জাতি হল আন্দামানের জারোয়ারা। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে দ্বীনের আলোও পৌছাইনি। ধর্মই যদি ঠিক ভুল বোধের উত্‍স হতো তাহলে তাদের সমাজ টিকে আছে কিভাবে? তোমার কথা অনুসারে তাদের মধ্যে তো কোন ন্যায় অন্যায় বোধ থাকবে না। তাদের তো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, মারামারি, খুন, ধর্ষন করে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা তো হচ্ছে না।
(পলাশ বুঝতে পারছিল নিলয়ের যুক্তি, কিন্তু তার আজন্ম বিশ্বাস যে ধর্মই সকল নৈতিকতার উত্‍স, বাধা দিচ্ছিল সেটা মেনে নিতে।)
পলাশ: কিন্তু তাদের মধ্যে এই নীতি বোধ এল কোথা থেকে?
নিলয়: প্রয়োজন। বেঁচে থাকার প্রয়োজনই মানুষের সমস্ত নৈতিকতার উত্‍স-ধর্ম নয়। কল্পনা কর এক নতুন মানব সভ্যতা। যাদের কাছে কোনো ধর্ম জ্ঞান নেই। গুহায় বাস করে। শিকার করা পশুর কাঁচা মাংস খায়। এরকমই কোনো এক গুহায়, এক গুহামানব, তার নাম দিলাম আলী, মাথা গরম করে বসে ছিল। আলী আজ ভাল শিকার পেয়েছিল। গুহায় শিকারটা রেখে সে একটু বেরিয়েছিল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। কিন্তু ফিরে এসে দেখে তার শিকার নেই। কেউ নিয়ে পালিয়েছে। খিদেই পেট জ্বলে যাচ্ছে অথচ কিছু করার নেই। তখন আলীর মনে পড়ল আবুর কথা। আবু ও ভাল শিকার পেয়েছে আজ। সে গেল আবুর গুহার দিকে। কিন্তু আবু নিজের শিকার আলী কে দেবে কেন? বেধে গেল তাদের মধ্যে মারামারি। আলী বরাবরই শক্তিশালী, আবুকে মেরে ফেলতে তার বিশেষ কষ্ট করতে হল না।
কিন্তু এই মারামারি আলী কে ভীষণ উত্তেজিত করে তুলেছিল। সে ভাবল পাশের গুহার ফাতেমার সাথে সঙ্গম করলে তার ভাল লাগবে। ফাতেমাকে আলীর খুবই ভাল লাগে। ফাতেমাও আলীকে পছন্দ করে। আলীর সাথে সঙ্গম করেই বেশি ভাল লাগে ওর।
রেগে গেল। কোথায় ছিলে আলী?দুদিন ধরে আসনি। আজ আমার এত সেক্স করতে ইচ্ছে করছিল, কাউকে না পেয়ে ওই ওমর এর সাথে করলাম। আজ ওমর করেছেও খুব ভাল।
আলীর তখন মোটেই ওমর এর প্র্শংসা শোনার ইচ্ছে নেই। সে বলল যাও ফাতেমা একটু স্নান করে এস, এখন আমি সেক্স করব তোমার সাথে। কিন্তু ফাতেমা তখন খুবই ক্লান্ত। সে চাইছিল জাস্ট ঘুমিয়ে পড়তে। তাই সে আলী কে বারন করে দিল। কিন্তু আলী তা শুনবে কেন। সে ভাবল জোর করেই করবে ফাতেমার সাথে। পৃথিবীর প্রথম ধর্ষন আলী করল ফাতেমাকে। ফাতেমা রাজি হতে চায়নি, আলী জোর করে করতে গিয়ে ফাতেমাকে মারধর করেছে।
এভাবেই চলছিল আলী, ফাতেমা, ওমরদের জীবন।সকলেই ছিল অসুখি।কে কার শিকার নিয়ে যায়,কে কর সাথে কখন সেক্স করে, কোন কিছুরই ঠিক নেই।এসব নিয়ে মারামারি করতে গিয়ে সবাই আহত হয়, কেউ কেউ মারাও যায়। মেয়েদের অবস্থা তো আরো খারাপ। ছেলেরা এসে কোনো কথা শুনতে চায় না। সেক্স করতে না চাইলে জোর করে, মারধর করে।
শেষে একদিন সবাই একসাথে বসল। কি করা যেতে পারে যাতে এসব না হয়। অনেক তর্ক বিতর্ক আলোচনার পর তারা কিছু সিদ্ধান্ত নিল। সেগুলো কিছুটা এরকম
1। কেউ অন্যের শিকার না বলে নেবে না। না বলে বা জোর করে নিলে সেটাকে চুরি বলা হবে। কেউ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লে তাকে মেরে ফেলা হবে।
2। কোনো মেয়ে সেক্স করতে রাজি না হলে জোর করা যাবে না।কেউ যদি জোর জোরে সেক্স করে সেটাকে ধর্ষন বলা হবে।ধর্ষন এর শাস্তি হবে মৃত্যু।
এই নিয়ম গুলো একটা বইতে লেখা হল যার নাম দেওয়া হল নীতিমালা। ওরা ঠিক করল তারা প্রত্যেক পূর্ণ চন্দ্রের রাতে এভাবে বসবে আর এই নীতিমালাকে আরো বাড়াবে যাতে ওরা শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
এই অব্দি বলে নিলয় একটু থামল তারপর আবার শুরু করল, দেখ পলাশ তাহলে বুঝতেই পারছো নিয়ম নীতি মানুষকে বেঁচে থাকার স্বার্থে বানাতে হয়েছে, ধর্ম এর উত্‍স নয়।
পলাশ এর কাছে উত্তর আর কিছু ছিল না। সে শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল, আমি খুব ক্লান্ত ভাই ঘুমবো এখন। নিলয় ওকে হাত ধরে তাকে তুলে ফেলল। যাও ভাই ঘুমলে হবেনা, তোমার নামায এর সময় হয়েছে।

লেখকঃ Mani Ruzzaman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *