নবি মুহাম্মদের ২৩ বছর – আলি দস্তি

Print Friendly, PDF & Email

সূচিপত্র

প্রস্তাবনা

ইসলাম, নবি মুহাম্মদ এবং…

বিশ্ব-ইতিহাসে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ধর্ম। ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নবি মুহাম্মদ ইতিহাসের একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। অন্যান্য ধর্মের প্রচারকদের সাথে নবি মুহাম্মদের অন্যতম তফাৎ হচ্ছে তিনি কেবল একাধারে সফল ধর্মপ্রচারকই নন, তিনি ছিলেন একইসাথে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ এবং দক্ষ প্রশাসক। দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে বহু বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে প্রচণ্ড পরিশ্রম, ত্যাগ আর লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল বিশ্বের বুকে ইসলামের বিস্তারই ঘটাননি, একই সাথে একটি রাষ্ট্রের গোড়পত্তন ঘটিয়েছেন, আরব-জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে বহু গোত্রে বিভক্ত মরুবাসী বেদুইনদের একত্রিত করেছেন। জীবদ্দশাতেই তিনি স্থির লক্ষে পৌছাতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রায় সাড়ে তেরশ বছর পার হয়ে গেছে। আজ শুধু মরুবাসী আরব-ই নয়, বিশ্বের বহু দেশের, বহু জাতির লক্ষ-কোটি অনারব মুসলমান এই পতাকাতলে সমবেত। ফলে এদিক দিয়ে দেখলে নবি মুহাম্মদ অতুলনীয়। তিনি নিঃসন্দেহে সফল।

ইসলামের ইতিহাস, নবি মুহাম্মদের জীবনী নিয়ে প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্রচুর সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়। এই বইগুলির বেশিরভাগই হয় স্তুতিভিত্তিক-অলৌকিকতার ধূম্রজালে আবদ্ধ আবার কোনোটা হয় অযথাই নিন্দা আর সমালোচনাকে ভিত্তি করে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণে খুবই কমসংখ্যক বই প্রকাশিত হয়েছে। এটা স্বীকার করতে হবে ইসলাম আজও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য, নবি মুহাম্মদের জীবনী আজও কোটি মানুষের চর্চার বিষয়। অনেকের কাছে এটিই একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান।

অন্য আরও সকল ধর্মের মতোই সুদূর অতীতকাল থেকে ইসলাম নিয়েও লৌকিক ভিত্তি ত্যাগ করে অলৌকিক-গায়েবি সংস্কারে নিমজ্জিত প্রচুর মানুষ। ধর্ম নিয়ে যৌক্তিক-বিশ্লেষণী আলোচনা আমাদের এই সমাজে এমনিতে বিরল। ভাববাদী-আধ্যাত্মবাদী বহু দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলাম আলোচিত হয়েছে বহুজনের লেখনীতে। কিন্তু ইসলামের উত্থান-বিকাশ এবং নবি মুহাম্মদের অসাধ্য সাধন নিয়ে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইসলামকে জানার ও বোঝার চেষ্টা দুর্লভ বটে। সে-হিসেবে ইরানের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী আলি দস্তি রচিত নবি মুহাম্মদের ২৩ বছর গ্রন্থটি ঐতিহাসিক এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

আলি দস্তির মতে, অলৌকিকতা কোনো ঐশী নির্দেশ নয়। অলৌকিকতা কেবল দুর্বলচিত্তের জনগণের কাছে ধোঁয়াশার জালে আবদ্ধ সংস্কার নয়। কিংবা নয় কোনো ধরনের বিভ্রম। অলৌকিকতা একটি অর্থবহ বিষয়। একজন ব্যক্তি যখন তার দক্ষতা, কৌশল, বুদ্ধিমত্তা আর পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটিয়ে আপাত অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম হন, তখন সেই কাজকে অলৌকিক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। নবি মুহাম্মদও এই অর্থে অসাধ্য সাধন করেছেন। প্রায় একা একজন মানুষ অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর কৌশল অবলম্বন করে নিজ জাতির বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে প্রচণ্ড লড়াই করে নিজস্ব ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেছেন। অসংখ্য মানুষের পূর্বতন ধর্মমতের বিলোপ ঘটিয়েছেন। নবি মুহাম্মদের এই ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিশাল কর্মযজ্ঞ কোনো অর্থেই অলৌকিকতার মহিমা থেকে খাটো নয়। আলি দস্তি তাঁর বইয়ে ইসলাম এবং নবি মুহাম্মদের জীবন নিয়ে সকল রহস্যময় ও আলঙ্কারিক মিথ্যে ভাষণের ঢালি সরিয়ে নির্মোহভাবে বস্তুবাদী ইতিহাস রচনা করেছেন। যার জন্য এই বইও ইতিহাসে ধ্রুপদী গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে।

আজকের এই একুশ শতকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া, আফ্রিকার মুসলিম-প্রধান দেশগুলিতে একদিকে পরাক্রমশালী রাষ্ট্রগুলোর অযাচিত হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে সেখানকার স্বৈরতান্ত্রিক শাষকগোষ্ঠীর ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অত্যাচার-নিপীড়ণে অতিষ্ঠ জনতা আবার আল কায়েদা, আইএস, বোকো হারাম, তালেবান ইত্যাদি জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর নৃশংস কর্মকাণ্ডে বিশ্বের বুকে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। এই অবস্থায় ইসলামকে খাটাে বা হেয় করে নয়, নবি মুহামদকে নিন্দা বা অবহেলা করে নয়, যাবতীয় আধ্যাতিক ও গায়েবি দৃষ্টিভঙ্গি সরিয়ে প্রাকৃতিক জগতের নিয়মের লঙ্ঘন না ঘটিয়ে মানব মুহাম্মদের বিশাল কীর্তি ও ইসলামের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের পুনর্পাঠ অতি জরুরি। আর এই বিষয়টিই আলি দস্তির শক্তিশালী লেখনী থেকে ফুটে উঠেছে দ্বিধাহীনভাবে।

আলি দস্তি ও তাঁর বই

আশির দশকের কথিত ইসলামি বিপ্লবের আগে আলি দস্তি ছিলেন ইরানের হাতে গোণা কয়েকজন প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী, রাজনীতিমনস্ক বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় সাংবাদিক, লেখক, সমাজ-চিন্তক সেইসাথে ছিল তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। গেল শতাব্দীতে শুধু ইরান নয়, গোটা আরব দেশগুলোর মধ্যে অল্প যে কয়েকজন প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, সমাজ-ধর্ম বিশ্লেষক ও সংস্কারবাদী ভূমিকা রেখেছেন আলি দস্তি তাঁদের অন্যতম। যদি ইউরোপের রেনেসাঁসের মত কখনো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর যুক্তিবাদের আলোকায়নের তুলনা করা হয়, তবে সেই তালিকায় বিংশ শতাব্দীতে আলি দস্তি অবস্থান করবেন শীর্যে। অথচ ধর্মতান্ত্রিক মতাদর্শে আবদ্ধ আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বাধীন ইরানে আলি দস্তি আজ ব্রাত্যজন।

আলি দস্তির জন্ম ১৮৯৬ সালে পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত বুশেহর রাজ্যের দাস্তেস্তান জেলার একটি গ্রামে। তাঁর পিতার নাম শেখ আব্দুল হোসেন দাস্তেস্তানি। লেখাপড়ার হাতেখড়ি স্থানীয় মাদ্রাসায়। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য তরুণ বয়সে আলি দস্তি উসমানীয় শাসনাধীন ইরাকের কারবালা শহরে আসেন।

ইরাকের কারবালা ইতিহাসে প্রসিদ্ধ একটি শহর। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে নবি মুহাম্মদের দৌহিত্র হোসেন বিন আলি শহীদ হয়েছেন এই প্রান্তরে; এবং এখান থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে নাজাফ শহরে নবি মুহামদের চাচাতো ভাই এবং জামাতা আলি বিন আবু তালিব (মৃত্যু ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে) শায়িত আছেন।

সময়টা তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিক, আলি দস্তি কারবালা শহরের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কারবালা ও নাজাফ উভয় শহরেই লেখাপড়া করেন। সেখানে তিনি ইসলামি ধর্মবিদ্যা, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, ধ্রুপদী সাহিত্য এবং আরবি ও ফার্সি ব্যাকরণ শিক্ষা লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক আলোড়ন তীব্র হয়। একদিকে পতনোন্মুখ তুর্কি উসমানীয় ধর্মীয় শাসন-ব্যবস্থা, অন্যদিকে পরাক্রমশালী ব্রিটেনসহ ইউরোপের একাধিক দেশের উপনিবেশিক শাসন আর

সৃষ্টি করে। প্রবাস জীবনে দস্তির মধ্যে প্রবল দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। একই সাথে তিনি মার্কসীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা আলোড়িত হন। তাঁর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা জন্ম নেয়। ১৯১৮ সালের দিকে ইরাক থেকে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে এসে বসবাস করেন ফার্স রাজ্যের শিরাজ শহরে। পেশা হিসেবে তখন বেছে নেন সাংবাদিকতা। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি থিতু হন ইরানের রাজধানী তেহরানে।

১৯২২ সালের পহেলা মার্চ আলি দস্তির সম্পাদনায় তেহরানে চালু হয় শাফাক-ই সরকা (লালের উদয়) নামের বামপন্থী পত্রিকা। পত্রিকাটি ১৯৩৫ সালের ১৮ই মার্চ পর্যন্ত চালু থাকলেও আলি দস্তি এই পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে ছিলেন প্রায় নয় বছরের মত। ১৯৩১ সালের পহেলা মার্চে তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে দেন নতুন সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন মায়েল তুয়েসারকানি। সাংবাদিকতা পেশায় আসার পর থেকে আলি দস্তি তাঁর বস্তুনিষ্ঠ, নির্মোহ লেখনীর কারণে ক্ষমতাসীন শাসকদের বিরাগভাজনে পরিণত হন। ১৯১৯ সালে তাঁকে কারাগারে যেতে হয় ইঙ্গো-ইরানীয় চুক্তির বিরোধিতা করে কলাম লেখার কারণে। পরবর্তী দুই বছর তাঁকে একাধিকবার কারাগারে প্রেরণ করা হয় উপনিবেশিক শাসন-ব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর আগ্রাসী নীতির বিরোধিতা করায়। জেল থেকে বের হয়ে আলি দস্তি জেলখানার দিনলিপি (আওয়ামী মাহবাস) নামে একটি বই প্রকাশ করেন। দস্তির প্রগতিশীল, কুসংস্কারমুক্ত বিপ্লবী চিন্তাধারা, সুগভীর পর্যবেক্ষণ-সমৃদ্ধ এবং কিছুটা রাজনৈতিক ব্যঙ্গার্থকধর্মী লেখনীর কারণে বইটি দ্রুতই বিশাল সংখ্যক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে গোটা ইরানে। অসংখ্যবার বইটির সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। অলপ বয়সে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জনের ফলে দস্তির শাফাক-ই সরক’ পত্রিকাটিও দ্রুত পারস্যের শোষিত জনগণের মুখপত্র হয়ে দাঁড়ায়। এই পত্রিকায় রাশিদ ইয়াসমেনি, সাইদ নাফিসি, আব্বাস ইকবাল, মুহাম্মদ মুহিত তাবাতাবাইয়ের মত ইরানের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবী-ইতিহাসবিদরা কলাম লিখে নিজেদের গোড়পত্তন ঘটিয়েছেন।

এই সময়কালে আলি দস্তি ফরাসি, ইংরেজি, রুশভাষা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। বিশেষ করে আধুনিক ফরাসি এবং রুশ সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রশিল্প তাঁর শৈলিপক মনে দারুন ছাপ ফেলে। তৎকালীন পারস্যে আলি দস্তি হচ্ছেন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে একজন, যিনি আধুনিক আরবি সাহিত্য(বিশেষ করে মিশরীয় সাহিত্য) ও ইসলামি গ্রন্থগুলোকে বস্তুবাদী বীক্ষণে আত্মস্থ করেছেন। যে-সময়কালে পারস্যের কবি-সাহিত্যিকরা রূপক শব্দের মেলবন্ধন ঘটিয়ে জটিল বাক্য তৈরি করে একের পর এক দুর্বোধ্য আধ্যাত্মিক সাহিত্য-চৰ্চায় নিমগ্ন, সে-সময় আলি দস্তি সাহিত্য জগতে ছোটছোট বাক্য দিয়ে সাধাসিধে ভাষায় কিন্তু সুতীক্ষনির্মোহভাষায় লেখনীর নতুন ধারা তৈরি করেন, যা পাঠক-সমাজে ব্যাপক আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। ১৯২৭ সালে রুশ বিপ্লবের দশম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তিনি আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে রাশিয়া ভ্রমণ করেন। এ-সময় ফ্রান্সসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ পরিভ্রমণের সুযোগ হয় তাঁর।

উল্লেখ্য ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর থেকে ইরান হয়ে ওঠে যুদ্ধের এক বিরাট ময়দান। ব্রিটেনের সমাজতন্ত্র-বিরোধী শাসকগোষ্ঠী একাধিকবার ইরানকে ব্যবহার করে রাশিয়ায় প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা করে। কিন্তু তা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। বিশ্বজুড়ে স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর পূর্বে ইরানকে নিজের কজায় রাখার জন্য ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে এক-ধরনের পরোক্ষ স্নায়ুযুদ্ধ বাধে তখন থেকেই। ফলে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলির ভূমি দখলের তৎপরতায় ইরানের শাসকগোষ্ঠী আদতে ক্রীড়ানড়কে পরিণত হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ইরান সোভিয়েত ব্লকে যোগদান করে। ১৯২৮ সালের দিকে দস্তি রাশিয়া ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে এলে বুশেহর আসন থেকে মজলিসের(পার্লামেন্ট) নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন(ইরানে তখন রেজা শাহ পাহলভি সরকার) এবং পরের টানা দুই মজলিশেও তিনি নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি হিসেবে জায়গা করে নেন। সাহিত্য-সাংবাদিকতার জগতে দস্তি সাহেব যেমন দক্ষ লেখনীশক্তির কারণে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন, তেমনি মজলিসে এসে সুদক্ষ বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু ১৯৩৫ সালের দিকে ইরানের নবম মজলিস ভেঙে গেলে তাঁকে চৌদ্দ মাসের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ১৯৩৯ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন তেহরানের নিকটবর্তী দামাবন্দ আসন থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে (১৯৪১ সালে) ইঙ্গো-রাশিয়ীয় উপনিবেশিক বাহিনী বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভিকে (১৮৭৮-১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ) ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের পর আলি দস্তি একই আসন (১৯৪১ ও ১৯৪৩ সালে) থেকে নির্বাচিত হন। ইরানের প্রগতিশীল ও সমাজ-সংস্কারবাদী রাজনৈতিক দল আদালত পার্টির নেতৃস্থানীয় ছিলেন তিনি। ১৯৪৬ সালের শুরুর দিকে ইরানে সোভিয়েত প্রভাবিত তুদেহ পার্টি ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আহমদ কাভাম সালতানাহ (১৮৭৬-১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ইরানে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ইরানের তেল সম্পদের মালিকানা এবং খনি থেকে তেল উত্তোলনের জন্য চুক্তি করতে প্রবল আগ্রহী সোভিয়েত ইউনিয়ন। আলি দস্তি তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং দেশাত্মবোধের কারণে এই চুক্তির কতিপয় ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন মজলিসে, যা তুদেহ পার্টিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলে পুনরায় একই বছরের এপ্রিল মাসে জেলে প্রেরণ করা হয়। ছয় মাস জেল খেটে বের হবার পর তাঁকে নিরাপত্তার জন্য ফ্রান্সে আশ্রয় নিতে হয়। বছর দুয়েক সেখানে থেকে ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে তিনি পুনরায় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে মিশর ও লেবাননের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি সময়ে হোসেন আলা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে (মুহামদ মুসাদ্দেকের ক্ষমতা গ্রহণের আগে) সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আলি দস্তি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি ইরানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সিনেটর নিযুক্ত হন। ইরানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে অর্ধেক সংখ্যক সিনেটর জনতার ভোটে নির্বাচিত হতেন আর বাকি অর্ধেক শাহ সরকার কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীরা নিযুক্ত হতেন। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লবে ইরানের শাহানশাহ মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের আগ পর্যন্ত পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সিনেটর ছিলেন আলি দস্তি।

রাজনৈতিক জীবনের মত দস্তির সাহিত্যিক জীবনও এরূপভাবে মুখরিত। ১৯৪৬ সালে ‘সায়া’ নামে প্রকাশিত প্রবন্ধ-গ্রন্থে ইরানের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ সংস্কার ঘটিয়ে আধুনিক সমাজ বিনির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন জোরালোভাবে। ১৯৩৬ সালের আগ পর্যন্ত ইরানে পর্দা-প্রথার প্রচলন তেমন ছিল না। ওই বছরে স্থাপিত তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়ে একত্রে লেখাপড়া করতো। ১৯৬৩ সালে ইরানে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মেয়েদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ব্যবস্থা করা হয় এবং পার্লামেন্টে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়। পারিবারিক নিরাপত্তা আইন সংশোধনের মাধ্যমে নারীদের তালাক প্রদানের অধিকার দেয়া হয়, সন্তানকে মায়ের জিমায় দেয়ার আইনি নির্দেশ দেয়া হয়। মেয়েদের বিয়ের নূ্যনতম বয়স ১৩ থেকে ১৮ নির্ধারণ করা হয় এবং ছেলেদের দ্বিতীয় বিয়ের জন্য আদালতের অনুমতির নির্দেশ বাধ্যতামূলক করা হয়। ইসলামি বিপ্লবের প্রাক্কালে ইরানের পার্লামেন্টে ২২জন নারী সাংসদ ছিলেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে ৩৩৩ জন নারী কাউন্সিলর দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী ছিলেন নারী। সরকারি বেসামরিক পদে প্রায় ১ লক্ষ ৪৬ হাজার নারী চাকুরিজীবী কর্মরত ছিলেন। কিন্তু খোমেনির বিপ্লবের পর ইরানের অবস্থা পাল্টে যায়। সরকারি সকল পদ থেকে নারীদের অপসারণ করা হয়। স্কুল-মাদ্রাসার একদম প্রথম শ্রেণি থেকে মেয়েদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। ইরানের পরিবারিক আইন সংশোধন করে নারী-অধিকার বিঘ্নিত করা হয়। পুরুষদের সুবিধা মত তালাকের সুযোগ করে দেয়া হয় এবং সন্তানকে পুরুষের জিমায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সমাজে বহুগামিতার যে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল সেটা তুলে দেয়া হয়। এমন কী, মেয়েদের বিয়ের নূ্যনতম বয়স ১৮ করা হয়েছিল সেটাকে কেটে ইসলামি শাস্ত্র মেনে ৯ বছর করা হয়। ১৯৮১ সালে ইরানের মোল্লাতান্ত্রিক সরকার পার্লামেন্টে একটি বিল পাস করেন, যেখানে বলা হয়েছে, ইসলামি ড্রেস কোড কেউ ভঙ্গ করলে ব্যভিচারের শামিল বলে গণ্য করা হবে এবং এ-জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। আলি দস্তি তাঁর ফিৎনা (১৯৪৩ ও ১৯৪৯), জাদু’(১৯৫১) এবং ‘হেন্দু (১৯৫৫) উপন্যাসগুলিতে পারস্যের সমাজের নারীর প্রতি বৈষম্য, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ, নিপীড়ণের বর্ণনা দিয়েছেন চমৎকার ভঙ্গিমায়।

এরপর আলি দস্তি ইসলাম বিষয়ে লেখনীতে মনোনিবেশ করেন। শৈশবকালের মাদ্রাসা-শিক্ষা, আধুনিক মিশরীয় ও ইউরোপের রেনেসাঁসের প্রভাবে সমুজ্জ্বল বিশ্লেষণধর্মী যুক্তিবাদী রচনাগুলো তাঁকে প্রেরণা দান করে। ইসলামি সুফিবাদের উপর লেখা পর্দাইয়ে পিঞ্জর (১৯৭৪), ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা ও নিয়তিবাদীর মধ্যেকার কথোপকথন নিয়ে রচিত জিবর ইয়া এখতিয়ার (প্রকাশনার সঠিক তারিখ জানা যায় না। সম্ভবত ১৯৭১ সালে এটি প্রকাশিত হয়), ধর্মীয় চিন্তাবিদ মুহাম্মদ আল-গাজ্জালির বক্তব্যের যৌক্তিক সমালোচনা করে লিখিত আকলা বার খেলাফ-ই আকল’(প্রথম প্রকাশ ১৯৭৫ এবং এরপরে আরও দুইবার পুনঃপ্রকাশিত হয়) এবং পর্দা-ইয়ে পিঞ্জর গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড ‘দার দিয়ারে সুফিয়ান’(১৯৭৫) গ্রন্থগুলি আলি দস্তিকে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা দান করে। তবে আলি দস্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে বিশত ও সেহ সাল’। বিষয়বস্তুর কারণে এই বইটি প্রকাশের সঠিক তারিখ ও স্থান কখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হয় এবং আলি দস্তির নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৭৪ সালের আগে লেবাননের বৈরুত থেকে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। নবি মুহাম্মদের নবুওতির বস্তুবাদী ইতিহাস নিয়ে ফার্সি ভাষায় রচিত এই বইটি শুধু ইরানে নয় গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

বিশত ও সেহ সাল বইটি ইরানের ধর্মীয় চিন্তাবিদদের ব্যাপক ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গোটা ইরান জুড়ে ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে মার্কসবাদী ও ইসলামপন্থীদের মধ্যেকার সংঘর্ষ যখন তীব্র হয়ে ওঠে তখন রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ আরোপের বিধিবিধান কার্যকর হতে থাকে একের পর এক। আলি দস্তির বইটি বিদেশে (বৈরুতে) প্রকাশিত হলেও ইরান সরকার কোনো ধরনের নামপ্রকাশ ব্যতিরেকে বইটি বাজেয়াপ্ত করে।

কথিত ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইরানের খোমেনি সরকার আশি উর্ধ্ব আলি দস্তিকে গ্রেফতার করে গোপন কারাগারে নিয়ে যায়। তাঁর প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, তাঁর লেখনী বিশেষ করে বিশত ও সেহ সাল’বইটি প্রকাশের জন্য ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে রিমান্ডে নিয়ে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়। প্রহারের ফলে দস্তির উরুর হাড় ভেঙে যায়। এরপর গণমাধ্যমে আলি দস্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। লোকমুখে শোনা যায় তাঁকে একসময় গোপনে ছেড়ে দেয়া হয়। বয়স বিবেচনায় হোক অথবা অসুস্থতার কারণেই হোক ঠিক কিভাবে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন তা পরিষ্কার নয়। তবে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও তাঁকে নিজ বাড়িতে ফিরতে দেয়া হয়নি। তেহরানের উত্তরে জারগান্ধে উপশহরে একখণ্ড বাগান নিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট একটি কুটির। এরপর অনেকটা আকস্মিকভাবে ইরানের পাক্ষিক পত্রিকা ‘আয়ান্দা (সংখ্যা ২২ ডিসেম্বর ১৯৮১-২০ জানুয়ারি ১৯৮২) ছোট করে আলি দস্তির মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে। ব্যাস এতটুকুই। ইরানের সরকারের কাছ থেকে এরপর আলি দস্তি সম্পর্কে আর কোনো তথ্য কখনো প্রকাশিত হয়নি।

‘বিশত ও সেহ সাল’ থেকে ‘টুয়েন্টি থ্রি ইয়ার্স’

আলি দস্তির সাথে ইংরেজ অনুবাদক এফ. আর. সি. ব্যাগলির (F. R. C. Bagley) প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৭৫ সালের বসন্তে তেহরানে এক বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা দেবার সময়। দস্তির প্রাণোবন্ত চেহারা আর ভরাট কণ্ঠস্বর সহজেই নজর কাড়ে অনুবাদকের। গল্প, চুটকি আর ঠাট্টার মাধ্যমে পরিচয়। আলি দস্তি এফ. আর. সি. ব্যাগলিকে বিশত ও সেহ সাল’বইটি উপহার দেন এবং অনুরোধ করেন সম্ভব হলে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য। তবে তাঁর মৃত্যুর আগে যেন অনুবাদটি প্রকাশিত না হয়। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুনরায় সাক্ষাৎ হলে আলি দস্তি তাঁর পূর্বের অনুরোধের কথা সারণ করিয়ে দেন। পরের বছরে জুন মাসে আলি দস্তির প্যারিস ও লন্ডনে একটি সংক্ষিপ্ত সফরের সময় অনুবাদ নিয়ে ফোনালাপ ও চিঠি চালাচালি হয়েছে দুজনের।

আলি দস্তির মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হওয়ার পরই বই প্রকাশে উদ্যোগী হন অনুবাদক এফ. আর. সি. ব্যাগলি। ১৯৮৫ সালে লন্ডন থেকে টুয়েন্টি থ্রি ইয়ার্স অ্যা স্টাডি অব দ্যা প্রফেটিক ক্যারিয়ার অব মুহাম্মদ শিরোনামে বইটি হার্ডকাভারে প্রথম ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। এরপর বইটি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার মাজদা পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। মাজদা পাবলিশার্স থেকে বইটির ১৯৮৫ ও ১৯৯৪ সালে দুইটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। হার্ডকভার ও পেপারব্যাক মুদ্রণে বইটি বাজারে পাওয়া যায়।

‘টুয়েন্টি থ্রি ইয়ার্স’ থেকে ‘নবি মুহাম্মদের ২৩ বছর’

আলি দস্তির বইটি বাংলায় অনুবাদের জন্য আমরা এফ. আর. সি. ব্যাগলি অনুদিত মাজদা পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত (১৯৯৪ সালের সংস্করণ) বইটির সাহায্য নিয়েছি। পূবেই উল্লেখ করা হয়েছে সমাজ-সচেতন ও নির্মোহ হয়ে ইসলামের ইতিহাস পাঠের জন্য আলি দস্তির বই একটি অনন্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থ মূলভাব বজায় রেখে বাংলায় সহজবোধ্য ভাষায় অনুবাদের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। আলি দস্তি তাঁর বইয়ে আয়াত উদ্ধৃতির জন্য মূল আরবি কোরান ব্যবহার করেছেন। আমরা কোরানের আয়াত বাংলায় ব্যবহার করার জন্য একাধিক বাংলায় অনূদিত কোরান অনুসরণ করেছি। মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রয়াত সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ, মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান অনুদিত তফসীর মারেফুল কোরআন এবং হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদের অনূদিত কোরআন শরীফ-এর সহায়তা নিয়েছি। ইংরেজি বইটির মূলভাব বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কিছু জায়গায় তৃতীয় বন্ধনী ব্যবহার করে অনুবাদকের নিজস্ব মন্তব্য ও ভাবনা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুবাদকের মন্তব্যে কিছু জায়গায় তথ্যসূত্র হিসেবে হাদিস নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকার সাউথদান ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর মুসলিম-জিউস এনগেজমেন্ট- এর উদ্যোগে পরিচালিত কোরান ও হাদিসের অনলাইন আর্কাইভ রয়েছে। হাদিসের জন্য এই সাইটের অনলাইন ঠিকানা ।

এখানে বুখারির হাদিস ছাড়াও রয়েছে মুসলিম শরিফ, দাউদ শরিফের বিশাল অনলাইন সংগ্রহ। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী, লেখক, পাঠক, ধর্মীয়গবেষক এই সাইট ব্যবহার করে থাকেন সহজবোধ্য ইংরেজি ও সহজে ব্যবহার-উপযোগী বলে। অনুবাদের সময় হাদিসের সূত্র ব্যবহারে আমরা এই সাইটে ব্যবহৃত ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেছি। এছাড়া অনেক জায়গায় বাংলায় হাদিস অনুবাদের জন্য বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত অনুবাদ গ্রন্থ বুখারী শরীফ এর সহায়তা নেয়া হয়েছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, আলি দস্তির ব্যবহৃত কোরানের আয়াতের নম্বরের সাথে বর্তমানে প্রচলিত কোরানের আয়াত নম্বর পুরোপুরি মিলে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আয়াতের নম্বরে দুয়েকটি সংখ্যার উপর-নিচ হতে দেখা যায়। এই ক্ষেত্রে আমরা আলি দস্তির লিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করিনি। দস্তির বইয়ে উদ্ধৃত কোরানের আয়াতের সাথে বর্তমানে প্রচলিত কোরানের আয়াত মিলিয়ে নিয়ে সেই নাম্বারটি ব্যবহার করেছি। আশা করি এর ফলে মূল বিষয়ের কোনো ব্যতয় ঘটেনি।

সবশেষে বলতে চাই, আমাদের এই অনুবাদটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশের জন্য একাধিক তরুণ অপরিসীম সহায়তা করেছেন। পাণ্ডুলিপির প্রফ দেখা, সংশোধন, সম্পাদনা ইত্যাদি পরিশ্রমী কাজে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের নিরলস শ্রমের বিনিময়ে পুস্তকারে প্রকাশে আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে, এজন্য তাঁদেরকে অশেষ ধন্যবাদ।

আবুল কাশেম ও সৈকত চৌধুরী
১০ জানুয়ারি, ২০১৫

জন্ম পরিচিতি

প্রথম অধ্যায় । নবি মুহাম্মদ । জন্ম পরিচিতি

‘পথ খুঁজি আমি, কিন্তু কাবা-মসজিদের পথ নয়। জানি ঐ কাবায় আছে একদল পৌত্তলিক আর এর মসজিদে একদল পূজারী।’ – জালালুদ্দিন রুমি।

মক্কায় ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আমিনা বিনতে ওহাব এক শিশুর জন্ম দেন। শিশুর চোখ খোলার আগে তাঁর পিতা আবদুল্লাহ মারা যান। আর শিশুর বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তাঁর মা আমিনা মারা যান। এরপর শিশুটির দেখাশোনার ভার বর্তায় তাঁর প্রভাবশালী ও উদার পিতামহ আব্দুল মোতালেবের উপর। কয়েক বছর পর শিশুর পিতামহও মারা যান। ঐ শিশুর অনেক বিত্তবান চাচা থাকা সত্ত্বেও লালন-পালনের দায়িত্ব নেন তাঁর সবচেয়ে দরিদ্র চাচা আবু তালিব। দরিদ্র অথচ সাহসী আবু তালিবের যত্নেলালিত এই শিশুই পরে বিকাশিত হন বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং একজন অনন্যসাধারণ মহাপুরুষ রূপে। সম্ভবত ইতিহাসে এই লব্ধপ্রতিষ্ঠিত মহামানবের দৃষ্টান্ত আর কখনো দেখা যায়নি বা যাবেও না।

এই অসাধারণ ব্যক্তির জীবন নিয়ে সহস্র পুস্তক রচিত হয়েছে। বিশেষত তাঁর জীবনের শেষ তেইশ বছরের ঘটনাপ্রবাহ, এবং সমস্ত কিছু যা তিনি বলেছেন এবং করেছেন তা নিয়ে প্রচুর লেখা রয়েছে। বিদগ্ধজন এবং গবেষকেরা এই মহাপুরুষের জীবনের উপর যত কাজ করেছেন তা আর কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির উপর হয়নি। এতদসত্ত্বেও আজ পর্যন্ত তাঁর উপর যুক্তিসিদ্ধ এবং বস্তুনিষ্ঠ কোনো পুস্তক, যার মধ্যে কোনো অতিরঞ্জিত উগ্র যুক্তিহীন এবং কাল্পনিক ব্যাপার নেই-এরকম বই বোধহয় রচিত হয়নি।

দেখা যায় যে মুসলিম এবং অন্যান্যরা যাঁরা মুহাম্মদের জীবন নিয়ে ব্যগ্র, তাঁরা ঐতিহাসিক সত্য অগ্রাহ্য করেন। তাঁরা সর্বদা মুহাম্মদকে এক কাল্পনিক অতিমানব বা কাপড়ে ঢাকা দ্বিতীয় ঈশ্বর হিসেবে পরিচিত করতে সচেষ্ট। এটা করতে গিয়ে তারা মানুষ মুহাম্মদকে বারেবারে উপেক্ষা করে গেছেন। এর ফলে তারা প্রকৃতিতে কার্যকারণের যে অমোঘ নিয়ম বিদ্যমান তা এড়িয়ে গেছেন। তাই তাঁদের বর্ণনায় শুধু দেখা যায় কাল্পনিক এবং অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ।

মুহাম্মদের জীবনের প্রথম চল্লিশ বছর, অর্থাৎ ৬১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, তেমন কিছু জানা যায় না। নবির জীবনীতে অথবা লোকপ্রবাদেও এই সময়ের কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে তৃতীয় হিজরি বা নবম শতাব্দীতে বিশিষ্ট ঐতিহাসিক এবং কোরানের তফসিরকারক আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জরির আল-তাবারি সুরা বাকারার ২৩ নম্বর আয়াতের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে মুহাম্মদের জন্ম নিয়ে এক ভিত্তিহীন দাবি করেন। এ থেকে বোঝা যায় সেই সময় সাধারণ মানুষ নবির জীবন-কাহিনী নিয়ে প্রচুর কাল্পনিক বক্তব্যে বিশ্বাস করতো। এমন কী কাল্পনিক লোককথার প্রভাব থেকে তাবারির মতো ঐতিহাসিকও মুক্ত ছিলেন না। সুরা বাকারা’র ঐ আয়াতে বলা হয়েছে : ‘আমি আমার দাসের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কোনো সুরা আনো। আর তোমরা যদি সত্য বল, আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সব সাক্ষীকে ডাকো।’ (২:২৩)। তাবারি এই আয়াতের তফসির করতে গিয়ে নিজস্ব মন্তব্য যোগ করেছেন : ‘নবুওত প্রাপ্তির পূর্বে মক্কায় একবার লোকমুখে কথা রটলো যে, আল্লাহ মুহাম্মদ নামে এক ব্যক্তিকে তাঁর প্রেরিত পুরুষ (রসুল) হিসেবে পাঠাবেন এবং পূর্ব ও পশ্চিমে যা কিছু আছে তার সবই ঐ ব্যক্তির আয়ত্তে আসবে। সে-সময় মক্কার চল্লিশজন নারী গর্ভবতী ছিল। গর্ভবতী প্রত্যেক মাতা চাচ্ছিলেন তার শিশু সেই প্রেরিত পুরুষ হোক। তাই শিশুর জন্মের সাথে সাথে প্রত্যেক মাতা তার পুত্রের নাম মুহাম্মদ রাখলেন।’

উপরের উক্তি যে বাস্তবতাবর্জিত তা বলা নিম্প্রয়োজন। সে সময় মক্কায় কেউ এই ধরনের গুজব শুনেনি অথবা কেউই মুহাম্মদ নামে আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ সমন্ধে অবহিত ছিল না। মুহাম্মদের অভিভাবক আবু তালিব এ-ব্যাপারে কিছু না জেনেই অথবা কিছু না শুনেই এবং ইসলামে দীক্ষিত না হয়েই মারা যান। নবুওতের স্বীকৃতি পাবার পূর্বে মুহাম্মদ কোনোদিনও ভাবতে পারেননি যে তিনি নবি হতে যাচ্ছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সুরা ইউনুসের ১৬ আয়াতে : ‘বলো, আল্লাহর তেমন ইচ্ছা থাকলে আমি তোমাদের কাছে এটি পড়তাম না, আর তিনি তোমাদেরকে এ-বিষয়ে জানাতেন না। আমি তো এর আগে তোমাদের মধ্যে দীর্ঘকাল কাটিয়ে দিলাম, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?”(১০:১৬)। মক্কার ইতিহাসে কখনো জানা যায় না যে,৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চল্লিশজন নারী সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন এবং প্রত্যেকেই তার শিশুর নাম রাখেন মুহামদ। এটা কী বিশ্বাসযোগ্য যে, সেসময় মুহামদ তাঁর সমবয়সী ও একই নামধারী চল্লিশজন খেলার সাখী পেয়েছিলেন?

ঐতিহাসিক ওয়াকেদিনবির জন্ম সম্পর্কে তাবরি থেকে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। ওয়াকেদি লিখেছেন ; মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়েই মুহাম্মদ উচ্চারণ করেন- আল্লাহ সবার উর্ধ্বে। এক মাস বয়সে মুহাম্মদ হামাগুড়ি দিতে থাকেন, দুই মাসে দাঁড়িয়ে যান, তিন মাসে হাঁটতে শুরু করেন, চার মাসে দৌড়াতে পারেন এবং নয় মাস বয়সে তীর ছুড়তে থাকেন। উল্লেখ্য মির্জা জানি কাশানি (মৃত্যু ১২৬৮ হিজরি বা ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর নাকাত আল-কাফ” বইয়েও বাহাই মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আলি মুহাম্মদ সিরাজি সম্পর্কে একই ধরনের বক্তব্য লিখেছেন। যদিও বাহাই সম্প্রদায় পরে এই ধরনের প্রচারণাকে চাপা দেবার প্রয়াস চালায়। মির্জা কাশানির বক্তব্য অনুযায়ী সাইয়েদ আলি জন্মের সাথে সাথে নাকি উচ্চারণ করেছিলেন : ‘আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যা-হোক ওয়াকেদি যেমনটা বলেছেন মক্কায় এধরনের অলৌকিক কিছু হয়ে থাকলে তখনকার পৌত্তলিক মক্কাবাসীরা নিশ্চয়ই জানতেন এবং মুহাম্মদের কাছে শুরুতেই মাথা নত করতেন।’

উপরে উল্লেখিত উদাহরণ থেকে সে-সময়কার মুসলমানদের মধ্যে অবাস্তব এবং ইতিহাসের নামে কাল্পনিক কাহিনী রচনার প্রবণতা দেখা যায়। আবার অনেক পাশ্চাত্য খ্রিস্টান লেখক কোনো যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ছাড়াই মুহাম্মদকে মিথ্যাবাদী, ভণ্ড, যোদ্ধা, ক্ষমতালোভী এবং লম্পট বলে প্রচার করে থাকেন। আদতে এই দুই দলের কেউই হজরত মুহাম্মদ সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে বাস্তব এবং প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেননি। এর কারণ হতে পারে ভাবাদর্শের প্রতি গভীর আসক্তি। রাজনৈতিক, ধর্মীয় অথবা গোত্রীয় হোক, সে পুরুষ অথবা নারীই হোক অন্ধভাবাদর্শে বিভোর একজন ব্যক্তি তার পরিষ্কার বিশ্লেষণী চিন্তা করতে অক্ষম। ভাল-মন্দ সম্পর্কে তার পূর্বধারণা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। হৃদয়ে প্রোথিত ব্যক্তিপ্রেম কিংবা ব্যক্তি-ঘৃণা এবং উগ্র মৌলবাদী চিন্তা ও সংস্কার তাকে ঘিরে রাখে সবসময়। এর ফলাফল হয় কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি কুয়াশাচ্ছন্ন এবং অবাস্তব কল্পনায় বিভোর থাকেন।

নিঃসন্দেহে হজরত মুহাম্মদ একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। যেসব গুণের জন্য মুহামদকে অন্যদের থেকে পৃথক করা যেতে পারে সেগুলো হচ্ছে-তাঁর তীক্ষ্ণবুদ্ধি, চিন্তার গভীরতা এবং তৎকালীন সর্বপ্রকার কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আপোষহীন মনোভাব। তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি এবং কর্মশক্তি যা দিয়ে তিনি একাই পাপকার্যের বিরদ্ধে লড়ে গেছেন। প্রতারণা এবং অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তিনি সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন। অন্যায়, অসত্য, স্বার্থপরায়ণতাকে তিনি প্রবলভাবে তিরস্কার করেছেন। বঞ্চিত, নিপীড়িত এবং হতদরিদ্রের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন আজীবন। স্বদেশবাসীকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মূর্তিপূজার জন্য ভর্ৎসনা করেছেন। স্বাভাবিকভাবে মক্কাবাসী যারা তখন সম্মানিত এবং ক্ষমতাশালী ছিল তারা নবির কথায় কর্ণপাত করেননি। নবির আহ্বানে সাড়া দেয়ার অর্থ ছিল, তাদের শত বছরের লালিত সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা এবং ধর্মবিশ্বাস পরিহার করা। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ধর্মীয় বিশ্বাস তাদের কাছেও ছিল একমাত্র সত্য এবং এই বিশ্বাসের বাইরে ভিন্ন কিছু তারা চিন্তা করতে পারতেন না।

তবে মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে সবচেয়ে যে বিষয়টি অসন্তুষ্টির কারণ ছিল তা হলো মুহাম্মদ তাঁদের শতাধিক বছরের সনাতন সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিতে চাচ্ছিলেন। অথচ মুহাম্মদের সামাজিক পদমর্যাদা ছিল তাদের চেয়ে নিচুতে। মুহাম্মদ কুরাইশ গোত্রের হলেও তাঁর সামাজিক পদমর্যাদা তাদের পর্যায়ে ছিল না। এর কারণ হচ্ছে ছোটবেলা থেকেই মুহাম্মদ ছিলেন এতিম এবং লালিত-পালিত হয়েছিলেন তাঁর এক চাচার অনুগ্রহে। মুহাম্মদের শৈশব কেটেছে চাচা এবং প্রতিবেশীদের উটের রাখাল হিসেবে। জীবিকার তাগিদে অলপ বয়সে খাদিজা নামের এক বিত্তবান মহিলার কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন তিনি। তখন মুহাম্মদের কিছুটা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তথাপি মুহাম্মদ কুরাইশ নেতাদের কাছে একজন সাধারণ ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এই অপাংক্তেয়া ব্যক্তি সহসা নিজেকে আল্লাহর এক নবি বলে ঘোষণা করে কুরাইশদের উপর কর্তৃত্ব দাবি করে তাদেরকে নতুন ধর্মীয় শিক্ষা দিতে চাইলেস্বাভাবিকভাবেই কুরাইশরা তা মানতে রাজি ছিলেন না।

ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে কুরাইশ নেতাদের মনোভাব বোঝা যায় ওয়ালিদ বিন আল-মুগিরার একটি দাম্ভিক উক্তিতে। মুহাম্মদের নবুওতির প্রারম্ভে ওয়ালিদ বিন আল-মুগিরা ছিলেন কুরাইশদের মাখজুম গোত্রের প্রভাবশালী নেতা। তিনি মারা যান ৬১৫ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময়ে। ওয়ালিদ বিন আল-মুগিরা একবার মন্তব্য করেছিলেন : যখন কুরাইশরা আমার মতো নেতা পেয়েছে এবং বানু তামিমের নেতা হচ্ছে ওরওয়া বিন মাসুদ, তখন মুহামদ কেমন করে নিজেকে নবি দাবি করেন?”কোরানের সুরা জুখরুফে মুগিরার বক্তব্য উঠে এসেছে এভাবে ; আর এরা বলে কোরান কেন অবতীর্ণ হল না দুই জনপদের (মক্কা ও তায়েফের) কোনো বড়লোকের ওপর? এরা কি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বণ্টন করে? আমি তাদের পার্থিব জীবনে তাদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করি, আর এককে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি যাতে তারা একে অপরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারে। আর তারা যা জমা করে তার চেয়ে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ অনেক ভালো। (৪৩: ৩১-৩২)।

ঐ সময়ে মাখজুম গোত্র মক্কায় বেশ সুবিধাজনক পর্যায়ে ছিল। কুরাইশদের মধ্যে আবদে মনাফ বংশ একাধিক কয়েকটি ছোট দলে বিভাজিত হয়ে গিয়েছিল তাঁর পুত্রদের বিভাজনের ফলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হাশেম বংশ এবং ধনাঢ্য আবদে শামস বংশ ও তাঁর পুত্র উমাইয়া বংশ। মুহাম্মদ জন্মেছিলেন হাশেম বংশে। আবু জেহেল তখন মাখজুম গোত্রের পরবর্তী প্রধান হবেন ঠিক হয়েছিলেন। মুহাম্মদের নবুওতি নিয়ে আবু জেহেল আরেকটি বংশের নেতা আকনাস বিন শারিককে বলেন,”প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষেত্রে আমরা আবদে মনাফের প্রধান প্রতিদ্বন্দী। সর্ববিষয়েই আমরা প্রায় তাঁদের সমকক্ষ হয়ে এসেছি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে তাঁদের একজন নবুওতির দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে। বানু মনাফ এইভাবেই পুনরায় আমাদের উপর তাঁদের প্রভুত্ব টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। ”

এই বক্তব্যগুলি থেকে মুহাম্মদের নবুওতি নিয়ে আমরা কুরাইশ নেতাদের মনোভাব বুঝতে পারি। বোঝাই যায় তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল নেতিবাচক। তারা কোনোভাবে একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন না। আবার তাদের মধ্য থেকেই একজন ব্যক্তি ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদেরকে ধর্ম শিক্ষা দিতে আসছেন-এটা তারা কোনোভাবে মানতে পারছিলেন না। কোরানের বিভিন্ন আয়াতে তাদের এই প্রতিবাদ-আপত্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন সুরা আনআম ; আয়াত ৮; সুরা হুদ ; আয়াত ১৩-১৪; সুরা ফুরকান ; আয়াত ৭-৮। কুরাইশরা বললেন, আল্লাহ যদি সত্যি পরিচালিত করতে চাইতেন তবে কোনোভাবেই তাদের মধ্য থেকে একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ করতেন না। তিনি কোনো ফেরেশতা বা দেবদূত পাঠিয়ে দিতেন। তাদের এই বক্তব্যের উত্তরে আকাশ থেকে এক ফেরেশতাকেই ওদের কাছে রসুল করে পাঠাতাম।” (সুরা বনি-ইসরাইল ; আয়াত ৯৫)।

আসল কথা হচ্ছে মক্কার নেতারা মুহাম্মদের ভিন্নধরনের চিন্তাভাবনা এবং ভাবধারা প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা করতে চাইলেন না। তারা আগ্রহী হয়ে মুহাম্মদের কোনো কথা শুনতে রাজি ছিলেন না। মুহাম্মদের চিন্তাভাবনায় তাদের সমাজের উন্নতি হতে পারে এই মনোভাব তাদের মধ্যে কখনো ছিল না। তারা যুক্তি এবং সুসংগতভাবে মুহাম্মদের মতামতের সত্যতা যাচাইয়ে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। তবে যে কোনো সমাজ যতই খারাপ হোক না কেন, ঐ সমাজে সবসময়ই কোনো না কোনো সৎ মানুষ পাওয়া যায় যারা নির্মোহ এবং নির্মল চিন্তার মাধ্যমে সত্য উপলব্ধি করতে পারেন, সেই সত্য যে কেউ বলুক না কেন। মক্কাবাসীর মধ্যে হজরত আবু বকরকে ধরা যেতে পারে প্রথম ব্যক্তি, যিনি মুহাম্মদের বাণীর সত্যতা উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। আবু বকরের উদাহরণ দেখে আরও কয়েকজন কুরাইশ ব্যক্তি, যেমন আব্দুর রহমান বিন আউফ, উসমান বিন আফফান, জুবায়ের বিন আল-আওয়াম, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ এবং সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস ইসলাম গ্রহণ করেন। আবার প্রত্যেক সমাজেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতদরিদ্র লোক থাকেন যারা সমাজের ধনী ব্যক্তির সম্পদের কোনো কিছুই পান না। ফলে এরা প্রচলিত সমাজধারার প্রতি থাকেন বিক্ষুব্ধ এবং অসন্তুষ্ট। মক্কার এই দুই দল মুহাম্মদের মতবাদের প্রশংসা করে তাঁর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এই পরিস্থিতিতে সংঘাত ছিল অনিবার্য। মক্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ছিল বিত্তবানদের সমর্থক এবং বিত্তবানরাও তাদের সম্পদ ও অর্থের জন্য ছিল গর্বিত। যে মুষ্টিমেয় সংখ্যালঘু জনতা মুহাম্মদের সমর্থক ছিলেন তারা ভাবলেন মুহাম্মদের নতুন মতবাদের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে। ফলে সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সবরকম ত্যাগ এবং লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। নবি জীবিত থাকালীন সময়ে এই অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিমিত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এই আন্দোলন ক্রমশ গতিশীল হতে থাকে। ফলে জনসাধারণের মাঝে মুহাম্মদ হয়ে পড়েন একজন অতিমানব এবং তারা তাঁকে ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হতে যে-সব গুণের দরকার সেই গুণাবলী দ্বারা আবৃত করে ফেলেন। এদিকে ঈশ্বর বা আল্লাহ হলেন সৃষ্টিকর্তা এবং পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক।

নবি মুহাম্মদ সম্পর্কে এ-ধরনের অলীক কল্পনা কেমন করে দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল তার একটা উজ্জ্বল উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। উদাহরণটি অত্যন্ত পরিষ্কার এবং অখণ্ডনীয়। মুসলমানরা মনে করেন কোরানই হচ্ছে একমাত্র চূড়ান্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ। কোরানের মক্কি সুরা বনি-ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে এক রাতে নবি স্বর্গে ভ্রমণ করেছেন। আয়াতটি খুব সরল এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যাখ্যাসাধ্য। আয়াতে বলা হয়েছে : ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর দাসকে তাঁর নিদর্শন দেখাবার জন্য রাত্রে সফর করিয়েছিলেন মসজিদ-উল-হারাম থেকে মসজিদ-উল-আকসায়, যেখানে পরিবেশ তাঁরই আশীবাদপূত। তিনি তো সব শোনেন, সব দেখেন।’(১৭:১)। আয়াতটিতে যা বলা হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে আধ্যাতিক ভ্রমণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। এধরনের আধ্যাত্মিক ভ্রমণ আরও অনেক ভাবতান্ত্রিক ব্যক্তিরও হয়েছে বলে শোনা যায়।

কিন্তু মুসলমানরা এই অতি সাধারণ ভ্রমণকে বিস্ময়কর, অযৌক্তিক এবং অবাস্তব বক্তব্য দ্বারা সজ্জিত করেছেন। এই আয়াত সম্পর্কে আমি তফসির আল-জালালাইনের অপেক্ষাকৃত কিছুটা সংযত ব্যাখ্যার উদ্ধৃতি দিব। তফসির আল-জালালাইন হচ্ছে কোরানের বিশ্বস্ত তফসির-বইগুলোর মধ্যে অন্যতম। কোরানের সুন্নি তফসিরগুলোর মধ্যে একে ধ্রুপদী মর্যাদা দেয়া হয়। মিশরের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ জালালউদ্দিন আল-মাহালি এই তফসির লেখা শুরু করেন ১৪৫৯ সালে এবং তাঁর ছাত্র জালালউদ্দিন আল-সুয়ুতি লেখাটি শেষ করেন তাঁর মৃত্যুর আগে ১৫০৫ সালে। আল-মাহালি এবং আল-সুয়তি দুজনের নামই জালাল, তাই তাঁদের নামানুসারে এই তফসিরের নামকরণ হয় তফসির আল-জালালাইন’, যার অর্থ হচ্ছে, দুইজন জালালের তফসির।

ধারণা করা হয় তাঁরা দুজনেই ধর্মকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সমস্ত দলীয়-উপদলীয় কোন্দলের উর্ধ্বে ছিলেন। তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কোরানের আয়াতের ব্যাখ্যা দেয়া এবং এর প্রসঙ্গ জানানো। তথাপি তাঁরা তফসিরে সুরা বনি-ইসরাইলের প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অপ্রমাণিত বক্তব্য নবি মুহাম্মদের মুখের উপর বসিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কি উদ্দেশ্য ছিল-ব্যাখ্যাও প্রসঙ্গ জানানো নাকি তৎকালীন সময়ে মুসলমানদের মধ্যে যেসব কাহিনী প্রচলিত ছিল সেগুলোর সংক্ষিপ্তসার দেয়া? যাহোক নবির যেসব উদ্ধৃতি তাঁরা দিয়েছেন তফসিরে, সেগুলোর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। হাদিস সংকলনকারীরাও নবির উপর অর্পিত কথাবার্তার ব্যাপারে প্রচলিত সংবাদের প্রমাণের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। এই চেষ্টার পরও এটা প্রমাণ করে না যে, নবি আদৌ একথাগুলো বলেছিলেন। তাই হাদিস-সংকলনকারীদের তথ্যও নির্ভরযোগ্য নয়। তফসির আল-জালালাইনের লেখকদ্বয় তাঁদের ব্যাখ্যার কোনো সূত্রও দিতে পারেননি। ফলে বোঝা যায় খুব সম্ভবত তাঁরাও হয়তো নিজেরা এই কাহিনী বিশ্বাস করতেন না।

তফসির আল-জালালাইন’-এ রয়েছে নবি বলেছেন : ‘ঐ রাতে জিব্রাইল আসলেন। জিব্রাইলের সাথে ছিল একটা চতুষ্পদী জন্তু যা দেখতে গাধার চেয়ে বড় আবার খচ্চরের চেয়ে ছোট। এই জন্তুর পায়ের খুর ছিল বহির্মুখী। আমি এই জন্তুর উপরে বসলাম এবং পবিত্র মসজিদের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। সেখানে পৌছালে আমি বোরাকটির (সেই জন্তু) লাগাম বেঁধে দিলাম সেই আংটার সাথে যাতে নবিরা তাঁদের বাহন পশুকে বেঁধে দিতেন। সেই দূরের মসজিদে গিয়ে আমি তিনবার ভূমিতে মাথা নত করে প্রার্থনা করলাম। যখন বাইরে এলাম তখন জিব্রাইল আমাকে দুটি পাত্র দিলেন। একটি পাত্র ছিল দুধভর্তি আর আরেকটি পাত্র ভর্তি ছিল সুরায় আমি যখন দুধ-ভর্তি পাত্র গ্রহণ করলাম তখন জিব্রাইল তা সমর্থন করলেন। তারপরে আমরা উড়ে গেলাম প্রথম স্বর্গে। আমরা প্রথম স্বর্গের ফটকে পৌছালে একজন রক্ষী চিৎকার করে আওয়াজ দিলেন : “এখানে কে? জিব্রাইল উত্তর দিলেন : এখানে আছে জিব্রাইল। ফটকরক্ষী জিজ্ঞাসা করল : আপনার সাথে কে? জিব্রাইল উত্তর দিলেন : মুহাম্মদ। রক্ষী আবারও জিজ্ঞাসা করলেন : “তাঁকে কী ডাকা হয়েছে?’ জিব্রাইল উত্তর দিলেন: “হ্যাঁ। এরপর রক্ষী স্বর্গের ফটক খুলে দিলেন। হজরত আদম আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন এবং বললেন : ‘আপনাকে স্বাগতম। (এভাবে নবি মুহাম্মদ সপ্তস্বর্গ ভ্রমণ করলেন এবং প্রত্যেকটি স্বর্গেই একজন নবি তাঁকে স্বাগতম জানালেন।) সপ্তম স্বর্গে পৌছে আমি দেখলাম হজরত ইব্রাহিম সেই জনপ্রিয় স্থানে হেলান দিয়ে বসে আছেন। এ-স্থানেই প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন কিন্তু কেউ বাইরে আসেন না। এরপরে জিব্রাইল আমাকে নিয়ে যান সর্বশেষ লোট গাছের কাছে। এই গাছের এক একটি পাতা ছিল হাতির কানের মতো বড়। এরপর আমি এক দৈববাণী পেলাম যাতে আমাকে আদেশ করা হলো প্রতিদিন এবং রাতে পঞ্চাশবার নামাজ পড়ার। আমি যখন ফিরে আসছিলাম তখন নবি মুসা আমাকে বললেন : “পঞ্চাশবার নামাজ পড়া বেশি হয়ে যাবে। আপনি আল্লাহকে অনুরোধ করুন নামাজের সংখ্যা কমানোর জন্য। আল্লাহ নামাজের সংখ্যা কমিয়ে চল্লিশ করে দিলেন। এরপর নবি মুসা বললেন : ‘আমি আমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করেছি এই ব্যাপারে। তারা এক দিন এবং এক রাতে চল্লিশবার নামাজ পড়তে সক্ষম নয়। আমি আবার আল্লাহর কাছে গেলাম…। (সংক্ষিপ্তভাবে বলতে হয় মুহাম্মদ আল্লাহর কাছে অনুরোধ করতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ নামাজের সংখ্যা পাঁচে নামিয়ে আনেন।)

নবির রাত্রি-ভ্রমণ নিয়ে তফসির আল-জালালাইন-এ যা লেখা হয়েছে তা ইরানের বিশিষ্ট এবং প্রভাবশালী সুন্নি চিন্তাবিদ আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জরির আল-তাবারির (৮৩৯-৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) বিখ্যাত তফসির অথবা তফসিরকারক আবু বকর আতিক নিশাপুরির রচনার তুলনায় নিতান্ত নগণ্য। মুহামদের রাত্রি-ভ্রমণ ঘিরে মুসলিমদের মধ্যে যে ধরনের কাহিনী প্রচারিত হয়েছে তা দুঃসাহসিক অভিযানের মতোই শোনায়। মিশরীয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং একসময়ের শিক্ষামন্ত্রী মুহাম্মদ হোসেন হায়কলং আধুনিককালের অত্যন্ত যুক্তিবাদী লেখক। তিনি নবি মুহাম্মদের জীবনী লিখেছেন ১৯৩৩ সালে। তাঁর বইয়ে সশরীরে নবির রাত্রি ভ্রমণকে অস্বীকার করলেও একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন কিছুটা পরিবর্তিত রূপে। এই বর্ণনা তিনি পেয়েছেন ফরাসি লেখক এমিলি ভারমেনগেমের মুহাম্মদের জীবনীভিত্তিক লেখা বই থেকে।

যারা কোরানের সাথে পরিচিত তারা জানেন যে, কোরান হচ্ছে মুহাম্মদের নবি-জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং অভিজ্ঞতার প্রতিফলক। কোরান থেকেই বোঝা যায় নবি কখনো এই ধরনের বর্ণনা দেননি। এ-ধরনের উপকথা সাধারণ জনগণের কালপনিক আবিষ্কার। গভীরভাবে বিশ্বাসী সাধারণ জনগণ মনেমনে ভাবতেন যাঁরা ওহি পেয়ে থাকেন তাঁরা শাসকদের মতো ক্ষমতাশালী এবং প্রভাবশালী। সুরা বনি-ইসরাইলের প্রথম তিনটি আয়াতে আধ্যাত্মিক ব্যাপার বলা হয়েছে। এই সুরার ৯৩ নম্বর আয়াতে নবিকে বলা হয়েছে . . . . বলো, আমার প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা! আমি একজন মানুষ, সুসংবাদদাতা রসুল ছাড়া আর কী?” (১৭৯৩)। সূরা আশ-শুরার ৫১ আয়াতে বলা হয়েছে : এ কোনো দেহধারী মানুষের জন্য নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন কোনো প্রত্যাদেশ ছাড়া, পর্দার অন্তরাল ছাড়া, বা আল্লাহর ইচ্ছা প্রকাশ করবে তাঁর অনুমতি নিয়ে এমন কোনো ফেরেশতা প্রেরণ না করে। তিনি তো সর্বোচ্চ জ্ঞানী। (৪২:৫১)। আল্লাহ যেখানে নিজেই নবিকে প্রত্যাদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন সেখানে নবির ভূলোক থেকে উর্ধ্বলোকে ভ্রমণের কোনো প্রয়োজন ছিল না। যদিও ধরে নেয়া যায় ঐ ভ্রমণের প্রয়োজন ছিল তাহলেও ডানাবিশিষ্ট চতুষ্পদ পশুর পিঠে চড়ে আকাশে উড্ডীয়মান হওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? যাকে বলা হয়ে থাকে দূরের মসজিদ সেটা কী স্বর্গে পাড়ি দেবার পথে ছিল কি? আল্লাহ যদি সর্বত্র বিদ্যমান তবে আল্লাহর কী মানুষের প্রার্থনার প্রয়োজন আছে? এবং নবি যখন স্বর্গে পৌছালেন তখন কেন ফটকরক্ষীদের নবির আগমনবার্তা আগে জানানো হয়নি?

সরল বিশ্বাসী মানুষ কার্যকারণ বিষয়ে বাস্তববাদী নন। তারা মনে করেন নবি বহু দূরের ভ্রমণে যাবেন, এজন্য তাঁর এক বাহন দরকার। এক ডানাবাহী পশু এই কাজে সক্ষম হবে, যা পায়রার মতো উড়ে যেতে পারবে, তাই তারা ধারণা করতেন। সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন তাঁর রাজকীয় দ্যুতি দিয়ে নবির চোখ ধাঁধিয়ে দিবেন। তাই স্রষ্টা জিব্রাইলকে আদেশ দিলেন নবিকে স্বর্গের বিস্ময় দেখাতে এবং জিব্রাইলের ডানার সংখ্যা ৬০০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বুখারি শরীফের হাদিসে, যা জিব্রাইলকে অতি দ্রুতগামী বলে ধারণা দেয়, ভলিউম ৬, বুক ৬০ নম্বর ৩৮০) । একজন প্রতাপশালী রাজা রাজ্যের খরচ মেটানোর জন্য তাঁর কর্মচারীকে কর আদায়ের আদেশ দেন। রাজার অর্থমন্ত্রী রাজাকে সাবধান করে দেন যেন উন্নয়নের জন্যে প্রজাদের উপর অধিক কর চাপানো না হয়। এমনিভাবে আমাদের স্রষ্টা বান্দাদের কাছ থেকে তাঁর প্রার্থনা দাবি করেন। তখন নবি আজি করলেন দিন-রাতে পঞ্চাশবার নামাজ আদায় করা অতিরিক্ত হয়ে যাবে।

মুহাম্মদের মহানুভবতা প্রশ্নাতীত। ইতিহাসে যেসব মহামানবের উল্লেখ আমরা পাই তার মধ্যে মুহাম্মদ অতুলনীয়। তাঁর সমসায়িক সমাজ বিবেচনা করলে বোঝা যায় তিনি যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনয়ন করেছেন তা অনন্যসাধারণ। আলেকজান্ডার, সিজার, নেপোলিয়ন, হিটলার, সাইরাস, চেঙ্গিস খান অথবা তৈমুর লং এদের সাথে নবি মুহাম্মদের কোনো তুলনা হয় না। এই নেতাদের পেছনে ছিল সামরিক বাহিনী এবং গণসমর্থন। কিন্তু মুহাম্মদ যা আয়ত্ত করেছেন তা সবই এক বৈরী সমাজের বিরুদ্ধে একা রিক্তহস্তে লড়াই করে।

বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা সম্ভবত ভুদিমির ইলিচ লেনিন। মুহাম্মদের সাথে হয়তো লেনিনের তুলনা করা যেতে পারে। বিশ বছর ধরে (১৯০৪-১৯২৪) লেনিন অবিশ্রান্ত কর্মশক্তি, দক্ষতা, প্রতাপ এবং একাগ্রতার সাথে তাঁর অবিচল নীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন, নিরলসভাবে লিখে গেছেন এবং বহুদূর থেকে নিজ দেশে বিপ্লবী কার্যক্রম সজীব রেখেছিলেন। রাশিয়ার সমাজ তখন তাঁর প্রতি ছিল অতিশয় বিরূপ। তথাপি সত্যিকারের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গঠন না করা পর্যন্ত লেনিন বিশ্রাম নেননি। এটা নিশ্চিত যে সাফল্য অর্জন করতে লেনিনকে অনেক অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। অপরপক্ষে বলা যায় লেনিনের পূর্বেই রাশিয়ায় এক বিপ্লবী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। শতসহস্র বিপ্লবী এবং প্রচুর বিক্ষুব্ধ জনতা লেনিনকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত ছিল। মুহাম্মদের সাথে লেনিনের একটি পার্থক্য হচ্ছে যে মুহাম্মদ সারা জীবন কাটিয়েছেন দারিদ্রতায়, অথবা স্বেচ্ছায় অনাড়ম্বর জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

স্বাভাবিকভাবে মহাপুরুষদের প্রস্থানের পর তাঁদের ঘিরে ভক্তবৃন্দ দ্বারা অনেক লোককাহিনী রচিত হয়। সময়ের সাথে সাথে তাঁদের দুর্বল দিকগুলিও চাপা পড়ে যায়। শুধু ভালো দিকগুলি প্রচার করা হয়। অনেক চিন্তাবিদ এবং শিল্পীদের নৈতিক জীবন নিখুঁত ছিল বলা যায় না। তা সত্ত্বেও তাঁদের কীর্তি বেঁচে থাকে এবং প্রশংসিত হয়। ইরানের বিশিষ্ট মুসলিম মনীষী নাসির উদ্দিন তুসি” (১২০১১২৭৪ খ্রিস্টাব্দ) কেমন করে মঙ্গোলীয় শাসক হালাকু খানের মন্ত্রী হলেন তা আমরা জানি না। নাসির উদ্দিন তুসির ব্যক্তিগত জীবনে নীতি-বহির্ভূত কার্য সত্ত্বেও দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও স্থাপত্যবিদ্যার উপর তাঁর প্রচুর রচনার জন্যে পারস্যের একজন ঐতিহাসিক সমানিত ব্যক্তি হয়ে আছেন। আশ্চর্য হবার কিছু নেই একজন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক নেতার মৃত্যুর পর তাঁকে প্রচুর কাল্পনিক সদগুণ এবং যোগ্যতা দিয়ে আবৃত করা হয়। সমস্যা হচ্ছে এই প্রক্রিয়া পরিমিত বোধের মধ্যে না থেকে বেশিরভাগ সময়ই অমার্জিত, বাণিজ্যিক এবং অযৌক্তিক হয়ে পড়ে।

লক্ষ লক্ষ শিশুর মতো নবি মুহাম্মদেরও জন্ম ছিল স্বাভাবিক। তাঁর জন্মের সাথে কোনো কিছু অস্বাভাবিক ছিল না। কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নবির এই জন্ম নিয়ে অযথাই অলৌকিক ব্যাখ্যা, উপাখ্যান দাঁড় করানো হয় এবং প্রচুর লোক তা বিশ্বাসও করে। যেমন বলা হয়ে থাকে নবির জন্মের সাথে সাথে ইরাকের প্রাচীন শহর তাসিবনের ধনুকাকৃতির খিলানে ফাটল ধরেছিল এবং পারস্যের ফার্সে রাজ্যে অবস্থিত খাজেরুন অগ্নিমন্দিরের আগুনও নিভে যায়। এ-ধরনের ঘটনা যদি ঘটেও থাকে তবে তার সাথে নবির জন্মের কী সম্পর্ক? আর এগুলি কেমন করে মহান সৃষ্টিকর্তার সতর্কবার্তা হতে পারে?

যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং গণিত অনুযায়ী যে কোনো ঘটনার পিছনে কারণ থাকে। বিশ্বের সমস্ত ঘটনা তা নৈসর্গিক, সামাজিক অথবা রাজনৈতিক হোক না কেন, সবকিছুর পিছনে কার্যকারণ অবশ্যই আছে। অনেক সময় এই কারণ প্রতীয়মান হয় দ্রুত। যেমন সূর্যালোক দেয় উষ্ণতা এবং আলো, অনিয়ন্ত্রিত আগুন দগ্ধ করে, পাম্প দিয়ে উত্তোলন না করলে পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। আবার দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর জানা না গেলে অনেক সময় এই নিয়ম প্রতীয়মান হয় না আমাদের কাছে। যেমন কোনো ব্যাধির উপশম কিংবা আপাত রহস্যময় অন্যকিছু।

মক্কায় এক শিশুর জন্মের সাথে পারস্যের ফার্সের অগ্নিমন্দিরের আগুন নিভে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। তাসিবনের ধনুকাকৃতির খিলানে কোনো ফাটল ধরলে তা হয়তো ভূমিধ্বসের জন্য হতে পারে। পরবর্তীকালে ভক্তবৃন্দ যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ছাড়াই এই ঘটনাগুলিকে স্রষ্টার সাবধানবাণী হিসেবে প্রচার করতে থাকেন। এই গুজব প্রচারের উদ্দেশ্য হতে পারে যে ইরাকের তাসিবনের অধিবাসীদেরকে এবং বিশেষ করে ইরানের রাজাকে জানিয়ে দেয়া যে, স্রষ্টা তাদের উপর এক মহাদুর্যোগ প্রেরণ করতে যাচ্ছেন। আর ফার্সের অগ্নিমন্দিরের রক্ষকদের এক শিশুর জন্ম সংবাদ জানিয়ে দেয়া যে, এই শিশু তাদের অগ্নিপূজা বন্ধ করে দিবেন। কিন্তু এটা কেমন করে সম্ভব যে, ইরানের রাজা কিংবা জরথুস্ত্রের পুরোহিতরা বহু দূরের মক্কার এক শিশুর জন্মের সাথে তাসিবনের খিলানের ফাটল ও অগ্নিমন্দিরের আগুন নিভে যাওয়ার সাথে সমিলন ঘটাবে? যেখানে নবি মুহামদই তাঁর ধর্মীয় প্রচারণা শুরু করেন জন্মের চল্লিশ বছর পর। মুহামদের বয়স যখন চল্লিশ বছর তখন আল্লাহ তাঁকে নতুন ধর্ম প্রচারে নিয়োজিত করেন। সর্বজ্ঞানী এবং অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন স্রষ্টা কেন ইসলাম আগমনের চল্লিশ বছর আগেই তাদের জানিয়ে দিবেন? কোরানে রয়েছে আল্লাহ যে মুহাম্মদকে ধর্মপ্রচারক হিসেবে নিয়োগ দিবেন এ-ব্যাপারে মুহাম্মদের কাছে কোনো পূর্বাভাষ ছিল না। প্রাক-ইসলামি আরবের অবস্থা থেকে কোরানের এই দাবির সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহ যদি মুহাম্মদের জন্মের অসাধারণ গুরুত্ব সবাইকে জানাতে চাইতেন তবে কেন তিনি খোদ মক্কাবাসীদেরকেই ইশারা দিলেন না? সর্বশক্তিমান আল্লাহ চাইলে কাবা ঘরের মূর্তিগুলোকে ভেঙে দিতে পারতেন এবং ছাদকে ধ্বসিয়ে দিতে পারতেন নিমিষে। দূরদেশের অগ্নিমন্দিরের আগুন নেভানোর চাইতে কাবার এই ঘটনা হতো কুরাইশদের জন্য এক শক্তিশালী সতর্কবাণী। এছাড়া প্রশ্ন থেকে যায় নবি হবার সাথে সাথে কেন আল্লাহ তাঁর নবিকে দিয়ে কোনো ব্যতিক্রমী কাজ দেখালেন না? এমনটা হলেই কুরাইশরা নবি সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে যেতেন, এবং আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষকে তেরো বছর ধরে শক্রতা ও শত উৎপীড়ন সহ্য করতে হতো না। সত্য ধর্ম ইসলামের প্রভাবে কেন পারস্যের জরথুস্ত্র ধর্মাবলম্বী বাদশাহ খসরু পারভেজের (৫৭০-৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) অন্তর প্রভাবিত হলো না? তাহলে তো তিনি ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে নবির লেখা চিঠি পড়ে রাগে ছুড়ে ফেলে দিতেন না, মুহাম্মদের বার্তাবাহক আব্দুল্লাহ ইবনে হুদহাফা আস-সামিকে অপমান করে তাড়িয়ে দিতেন না; এবং ইরানিরা তাদের সম্রাটের উদাহরণ অনুসরণ করে সবাই ইসলাম গ্রহণ করে ফেলতেন। ফলে তাদেরকে আর আরব মুসলমানদের সাথে কাদেসিয়া ও নেহাবন্দের ভয়ানক লড়াইয়ে পরাজয়ের গ্লানি বহন করতে হতো না?

অনেকদিন পূর্বে আমি ফরাসি দার্শনিক জোসেফ আর্নেস্ট রেনানের (১৮২৩-১৮৯২) লেখা Vie de Jesus (যিশুর জীবনী, ১৮৬৩) বইটি পড়ি। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যিশুর জীবনকাহিনীকে বাস্তবানুগ এবং প্রাণবন্তভাবে প্রকাশ করেছেন। এর কিছুদিন পরে আমি জার্মানির বিশিষ্ট ইতিহাস-গবেষক এমিল লুদভিগের(১৮৮১-১৯৪৮) লেখা ‘The Son of Man: The Story of Jesus ( ১৯২৮) বইটা পড়ি। লুদভিগের মতে যিশুর জীবনকাহিনী নিয়ে অন্য রেফারেন্স বইয়ে যতটুকু বাস্তবসমত বলে মনে হয়েছে ততটুকুই তিনি লিখেছেন। কারণ তাঁর মতে এই বিষয়ে বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক দলিল দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্লভ। আমার এই ক্ষুদ্র বইয়ে আমি নবি মুহাম্মদের ৬৩ বছরের জীবনের মধ্যে ২৩ বছরের সুদীর্ঘ বিবরণ দিতে পারব না। আমি স্বীকার করে নিতে চাই আর্নেস্ট রেনানের মতো মেধা ও সংবেদনশীলতা আমার নেই। এমন কী আমার নেই এমিল লুদভিগের মতো গবেষণা করার দক্ষতা। যে নবির আধ্যাত্মিক এবং বিশাল নৈতিক শক্তি মানব-ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, তাঁর চরিত্র পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণনার জন্য একজন লেখকের এই ধরনের গুণাবলী অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। আমার এই নাতিদীর্ঘ লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে নবির জীবন সম্বন্ধে একটা সীমিত রূপরেখা দেখানো এবং তাঁকে ঘিরে অযথাই যেসব অলীক কাহিনী এবং মিথ প্রচলিত রয়েছে দীর্ঘদিন তার অবসান ঘটানো। এই বই লেখার অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছি কোরান অধ্যয়ন করে এবং ইসলামের জন্ম ও বিকাশ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে।

আরও সত্যি করে বললে বলতে হয় আমার লেখার তাগিদ এসেছে এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং পর্যবেক্ষণ থেকে। আমার পর্যবেক্ষণ এই যে, গোঁড়া, অন্ধবিশ্বাস একজন মানুষের কাণ্ডজ্ঞান বা বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনাকে ভোঁতা করে দিতে পারে। আমরা সবাই জানি শিশুকালে সামাজিকীকরণের সময় আমাদের মনে যেসব ধারণা প্রবিষ্ট করানো হয় তা পরবর্তীতে সবসময় আমাদের চিন্তার পটভূমিতে থাকে। ফলে যেকোনো অযৌক্তিক ভাবনাও যদি আমাদের মনে আসে তবে আমাদের শিশুকালে লব্ধ ভাবধারণার সাথে মিলিয়ে তার বৈধতা দিতে চাই। স্বল্প কিছু বিরল ব্যক্তি ছাড়া অনেক বিদ্বান ব্যক্তিও এই প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। অযৌক্তিকতা অথবা কালপনিক ভাবনাকে বাস্তব বলে গ্রহণের জন্য প্রায়শ তাঁরা সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করেন না অথবা করলেও তখনই করেন যখন তা তাঁদের মনে প্রোথিত ধারণার সাথে খাপ খেয়ে যায়। মানবজাতি পর্যবেক্ষণ এবং ন্যায্য বিচারবিবেচনার অধিকারী। মানুষ তার এই জ্ঞানের জন্য নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু যখন ধর্ম ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী সামনে আসে তখন মানুষ তার বিচার-বুদ্ধি, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং যৌক্তিকতাকে পদদলিত করে ফেলে।

নবির বাল্যকাল

প্রথম অধ্যায় । নবি মুহাম্মদ । নবির বাল্যকাল

মুহাম্মদের বাল্যকাল সম্পর্কে তথ্য অত্যন্ত অপ্রতুল। একজন পিতৃমাতৃহীন শিশু হিসাবে তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের গৃহে লালিতপালিত হন। আবু তালিব ছিলেন হৃদয়বান কিন্তু বিষয়সম্পত্তিহীন। জীবিকার তাগিদে মুহাম্মদ তাঁর চাচা এবং প্রতিবেশীদের উট চরানোর কাজ করতেন। তাই মুহাম্মদের দিন কাটতো রুক্ষ মরুভূমিতে একাকী।
মুহাম্মদ ছিলেন স্পর্শকাতর ও বুদ্ধিমান। মুহাম্মদের কয়েক বছরের মরুভূমির অভিজ্ঞতা পারস্যের ভাষায় এক তেতো গাছের ডাল চিবানোর সাথেই তুলনীয়। স্বাভাবিকভাবে তিনি চিন্তা করতে শুরু করলেন কেন এই পৃথিবীতে এসেছেন এক পিতৃহীন শিশু হিসেবে; আর তিনি যখন তাঁর মায়ের কাছে স্নেহ-ভালবাসা চেয়েছিলেন তখনই কেন তাঁর তরুণী মাতা মারা গেলেন। মুহাম্মদ আরও চিন্তা করলেন কেন নিষ্ঠুর ভাগ্য তাঁর প্রভাবশালী ও উদার পিতামহকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল এবং তাঁকে দরিদ্র চাচার গৃহে ফেলে দিল। মুহামদের চাচা আবু তালিব ছিলেন উদার এবং উপকারী। কিন্তু আবু তালিবের ছিল বিশাল পরিবার। তাই মুহাম্মদ তাঁর চাচাতো ভাই-বোনদের মতো স্নেহ-মমতা পাননি। মুহামদের অন্যান্য চাচা যেমন আব্বাস ও আব্দুল ওজা (আবু লাহাব নামে পরবর্তীতে পরিচিত হন) আরাম-আয়েশে বসবাস করলেও তাঁরা মুহাম্মদকে লালন-পালনে উপেক্ষা করলেন। দীর্ঘ দুঃখকষ্টের দিনগুলিতে মুহাম্মদের মনে নিশ্চয় এইসব ঘটনা বাজতে থাকতো।

বৈচিত্র্যহীন, শুষ্ক মরুভূমিতে উটের দল তাদের গ্রীবা ঘষিয়ে চলে একগুচ্ছ তৃণলতা বা এক কঙ্কটপূর্ণ ডালপালার খোঁজে। এহেন পরিবেশে এলোমেলো চিন্তা করা ছাড়া আর কী-ই থাকতে পারে? দুর্ভাগ্য মানুষের মনকে তিক্ততায় ভরে দেয়। যখন কোনো উপায় থাকে না তখন সে দুঃখ-বেদনার প্রতি সচেতন হয়ে পড়ে। নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে বাল্যকালের এই পরিবেশ থেকে মুহাম্মদ চিন্তা করতে শুরু করলেন তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থা সম্পর্কে এবং বুঝতে পারলেন যে, তাঁর জীবনের দুঃখ-কষ্টের প্রধান কারণ হচ্ছে তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থা। মুহাম্মদের সমবয়সী অন্যান্য বালকের পিতারা কাবা ঘরের পরিচর্যায় নিয়োজিত ছিল। তাদের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল। তাই ঐ বালকেরা সুখে দিনযাপন করতো। তাদের পিতারা কাবায় যে বাৎসরিক তীর্থযাত্রীরা আগমন করতো তাদেরকে পানি, রুটি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবারহ করতেন। সিরিয়া থেকে নিয়ে আসা পণ্যসামগ্রী তারা অতি উচ্চদামে বিক্রি করতো তীর্থযাত্রীদের কাছে। আর তীর্থযাত্রীদের আনা সামগ্রী তারা অতি নিম্নমূল্যে ক্রয় করতো। এইভাবে অর্জন করতো প্রচুর মুনাফা। এই বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ছিল তাদের ছেলে-মেয়েদের সুখের কারণ।

প্রশ্ন হতে পারে অনেকগুলো গোত্র কেন কাবায় আসতো এবং কুরাইশদের ক্ষমতা ও প্রভাবকে সহ্য করতো? এর উত্তর হচ্ছে কাবা ঘরে তখন ছিল অনেক দেবদেবীর প্রতিমা। আর ছিল একটি কৃষ্ণ পাথর যাকে আরবেরা পবিত্র বলে গণ্য করতেন। তারা মনে করতেন ঐ পাথরের চতুর্দিকে ঘুরে আসলে সুখ এবং মুক্তি পাওয়া যায়। সাফা ও মারওয়া পাহড়ের মাথায় ছিল আরও দুই মূর্তি। তাই তারা এই দুই পাহাড়ের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, এমন করলে তাদের প্রার্থনা ফলপ্রসু হবে। প্রত্যেক দলই তাদের মূর্তির কাছে এসে চিৎকার করে অনুনয়-বিনয় করতেন, কাবাকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরতে এবং সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত দৌড়দৌড়ি করতেন। তীক্ষ্ণবুদ্ধির অধিকারী মুহাম্মদের বয়স যখন এগারো কি বারো তখনই তিনি চিন্তা করলেন, কৃষ্ণপাথরের কি সত্যিই কোনো গুপ্তশক্তি আছে? আরও চিন্তা করলেন, নিম্প্রাণ মূর্তিগুলো কি কোনো কাজ করতে পারে? তাঁর এই সন্দেহের উৎপত্তি হয় ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা থেকে। এটা হয়তো বলা যাবে না যে, দুঃখ ও আধ্যাতিক সংশয়ে মুহ্যমান মুহামদ কখনো কাবার মূর্তিগুলোর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেননি; এবং তাঁর সাহায্য-প্রার্থনা যে, পরবর্তীতে নিস্ফল হয়েছিল তাও বলাবাহুল্য। এই ধারণার প্রমাণ পাওয়া যায় কোরানের দুটি আয়াত থেকে। এই দুটি আয়াত মুহাম্মদের মুখে শোনা যায় ত্রিশ বছর পরে। প্রথম আয়াতটি হচ্ছে সুরা মুদ্দাসসির এর ৫ নম্বর আয়াত : ‘আর অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো। (৭৪:৫)। দ্বিতীয় আয়াতটি উল্লেখ আছে সুরা দোহা’য় ; তিনি কি তোমাকে পিতৃহীন অবস্থায় পাননি, আর তোমাকে আশ্রয় দেননি?”(৯৩:৬)।

কুরাইশ নেতাদের এ-ব্যাপারে অজানা থাকার কথা নয়। তারা কাবার উপাসনালয়ের কাছাকাছি থাকতেন এবং জানতেন পাথরের তৈরি মূর্তিগুলো না-পারে নড়াচড়া করতে, না-পারে কোনো অনুগ্রহ বা কৃপা প্রদর্শন করতে। এ-সম্পর্কে নীরবতা পালন ও লাত, মানাত এবং ওজা দেবীদের পূজো করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের অর্থনৈতিক লাভ। পারস্যের একটি জনপ্রিয় প্রবাদ হচ্ছে একজন ঋষির পুণ্যতা নির্ভর করে তার সমাধির তত্ত্বাবধায়কের উপর। কুরাইশরা ভালো করেই জানতেন যে, তারা যদি কাবার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব হারিয়ে ফেলেন তাহলে তাদের বিশাল আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। আর সিরিয়ার সাথে তাদের যে বর্ধিত বাণিজ্য চলছিল তাও কমে যাবে। কারণ কোনো বেদুইন তীর্থযাত্রীরা আর কাবায় আসবে না এবং কুরাইশরাও তাদের পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে পারবেন না এবং তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকেও পণ্যসামগ্রী অতি অল্পমূল্যে ক্রয় করতে পারবেন না।

সূর্যস্নাত রুক্ষ মরুভূমিতে একাকী দুঃসহ অবস্থায় মুহাম্মদ দেখেছেন কত কষ্ট করে উটগুলি তাদের সামান্য খাদ্য সংগ্রহ করে। এই অবস্থা জাগিয়ে তোলে মুহাম্মদের কল্পনাবিহারী মনকে। সূর্য ডোবার সাথে মুহাম্মদ যখন উটেরপাল হাঁকিয়ে শহরে নিয়ে আসতেন তখন আবার বাস্তবে ফিরে যেতেন। উটগুলিকে বারেবারে হাঁক দিয়ে তাদেরকে সঠিকভাবে চালিত করতে হতো যাতে তারা হারিয়ে না যায়। এভাবে উটগুলিকে নিশ্চিতভাবে তাদের মালিকদের খোঁয়াড়ে দিয়ে আসতেন রাতের বেলায়। রাতে মুহামদ চিন্তায় মগ্ন থাকতেন এবং তাঁর সামনে ভেসে উঠতো অনেক মানসচিত্র। প্রত্যুষে সূর্যের আলোকের পুনরাবৃত্তি ঘটলে আবার সেই বৈচিত্র্যহীন মরুভূমিতে চলে যেতেন। ধীরে ধীরে এসব বিভিন্নমুখী চিন্তাভাবনা তাঁর মানসকোঠরে দানা বাঁধতে শুরু করল।
একজন অন্তর্মুখী ব্যক্তি ভাবুক এবং স্বপ্নবিলাসী হয়ে থাকে। বাইরের কোনো শোরগোল বা স্বাভাবিক কোনো আনন্দ তাদের বিচলিত করে না, বরং সময়ের সাথে তারা আরও অন্তর্মুখী হয়ে যায়। তাই বলা যায় দীর্ঘদিন ধরে মরুভূমিতে একাকী সময় কাটানোর জন্য মুহাম্মদও একসময় অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন। ফলে আকস্মিকভাবে অনেক সময় তাঁর ভূত দেখার অথবা সাগরের ঢেউয়ের শব্দ শোনার বিভ্রম হতো।

এভাবেই গতানুগতিক কয়েক বছর চলে গেল। মরুভূমির অভিজ্ঞতা মুহাম্মদের মনে গভীর রেখাপাত করে। এগারো বছর বয়সে মুহাম্মদ তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে বাণিজ্য-ভ্রমণে সিরিয়া গমণ করেন। সিরিয়াতে মুহামদ অন্য এক বিশ্বের সাথে পরিচিত হন। এই বিশ্ব ছিল উজ্জ্বল, অজ্ঞানতাবিহীন এবং কুসংস্কারমুক্ত। মক্কার আরবেরা ছিল অতিশয় রূঢ় এবং অমার্জিত। সিরিয়ার জীবনযাত্রা ভিন্ন।

সিরিয়ার যেখানেই মুহাম্মদ কারো দেখা পেলেন সেই-ই তাঁর সাথে ভদ্রতা রক্ষা করল। সিরিয়ার সমাজে বিরাজমান ছিল খুশির আমেজ এবং তাদের সামাজিক রীতিনীতি ছিল অনেক উঁচুমানের। সিরিয়া-ভ্রমণ মুহাম্মদের অন্তর আলোড়িত করে। এ-অভিজ্ঞতার দ্বারাই হয়তো তিনি উপলদ্ধি করলেন তাঁর নিজের লোকেরা আদিম, অমার্জিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তখন তাঁর মনে ভাবনা আসে তাঁর সমাজও উন্নতির পথে আসুক, সমাজে শৃঙ্খলা থাকুক, কুসংস্কারমুক্ত হোক। মক্কার সমাজ যেন আরও মানবিক হোক। তবে এটা পরিষ্কার নয় যে, এই ভ্রমণে মুহাম্মদ প্রথমবারের মতো কোনো একেশ্বরবাদীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না। তখন মুহাম্মদের এ-বিষয়গুলি বুঝার জন্য খুব অল্পবয়স্ক ছিলেন। তাই এধরনের কোনো সংস্রব হলেও তাতে তাঁর চিন্তাধারায় রেখাপাত হওয়ার কথা নয়। তা সত্ত্বেও এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা মুহাম্মদের সংবেদনশীল ও চঞ্চল মনে ছাপ ফেলেছিল। হয়তো এজন্যই মুহাম্মদ দ্বিতীয়বার ভ্রমণে আগ্রহী হন। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় ভ্রমণের সময় মুহামদ অল্পবয়স্ক ছিলেন না। তখন তিনি মনোযোগ দিয়ে ধর্মের কথা শুনলেন।

মুহাম্মদের বাল্যকাল এবং তরুণ বয়স সম্পর্কে এত অপ্রতুল তথ্যের কী কারণ তা কেউ জানেন না। হয়তো বলা যেতে পারে, এক অনাথ বালক যে তার চাচার গৃহে লালিত-পালিত হয়েছে তার জীবন কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে বাল্যকালে এবং যৌবনে মুহাম্মদ কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি। কেউ মুহাম্মদের স্মৃতিও মনে রাখেননি। এখানে যা লেখা হচ্ছে তার বেশির ভাগই অনুমানভিত্তিক। বলা হয় যে মরুভূমির একাকীত্ব এবং এক ঘেয়েমিপূর্ণ জীবন বালক-মুহামদকে কল্পনাবিলাসী, অন্তৰীক্ষণিক এবং দর্শনশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে।

কোরানের প্রারম্ভিক আয়াতগুলো পড়লে মনে করা যেতে পারে এই আয়াতগুলো আসছে এক যুবক মুহাম্মদের নিদারুণ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মন থেকে। এই আয়াতগুলিতে প্রকৃতি ও নৈসর্গিক বিষয়ে অনেক চিন্তাভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। এখানে সুরা গাশিয়ার কয়েকটি আয়াত উদাহরণ হিসেবে দেয়া যেতে পারে ; তবে কি ওরা লক্ষ করে না, উট কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে? কীভাবে আকাশ উর্ধ্বে রাখা হয়েছে? পৰ্বতমালাকে কীভাবে শক্ত করে দাঁড় করানো হয়েছে, আর পৃথিবীকে কীভাবে সমান করা হয়েছে? ( ৮৮:১৭-২০)।

কোরানের মক্কি সুরাতে দেখা যায় একজন ভাবুক মানুষের মানসচরিত্র। মনে হবে যেন এই ব্যক্তি নিজেকে সংসারের আকর্ষণ থেকে দূরে রেখে প্রকৃতির আশীৰ্বাদ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন আর নিজেকে সমর্পণ করেছেন প্রকৃতির কাছে। এই সুরাগুলিতে দাম্ভিক এবং অহঙ্কার ব্যক্তিদের প্রতি রোষ দেখানো হয়েছে। সে-সময়ে এধরনের ব্যক্তিরা হলেন আবু লাহাব’ এবং আবুল আসাদ ১৩।

পরে মুহাম্মদ যখন ধর্ম প্রচারে সফল হলেন এবং সামাজিক সমান ও মর্যাদা বিশাল পরিমাণে বৃদ্ধি পেল, তখন তাঁর অনুগ্রাহীরা নিজস্ব কল্পনা-ভাবনা দিয়ে নবির জীবন নিয়ে অনেক কাহিনী তৈরি করেন। এই অতিমানবীয় কাহিনীগুলো লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে তাবারি এবং ওয়াকেদির লেখনীতেও একসময় স্থান পেয়ে যায়।

আরেকটি বিষয়ে এখানে স্বল্পপরিসরে আলোচনা করা দরকার। মুসলিম লেখকেরা হয়তো ইচ্ছে করে নবির ধর্মপ্রচারণার পূর্বের সময়ের হেজাজ (মক্কা ও মদিনা শহরকে একত্রে হেজাজ নামে অভিহিত করা হয়), বিশেষ করে মক্কাকে এক অন্ধকার যুগের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তব তেমন ছিল না। অনেক মুসলিম লেখকের তথ্য মতে তৎকালীন মক্কার আরবেরা বর্বরতা এবং পৌত্তলিকতার অন্ধকারে চরমভাবে নিমজ্জিত ছিল। তাদের মাঝে না ছিল কোনো উচ্চ চিন্তাভাবনা, না ছিল কোনো ধর্মের পরিচর্যা। ধারণা করা যায় এই ধরনের অতিরঞ্জিত বর্ণনা দেয়া হয় মূলত নবি মুহাম্মদের উত্থান ও তাঁর শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেয়ার জন্য। অবশ্য আধুনিক যুগের একাধিক আরব চিন্তাবিদ যেমন আলি জায়াদ, আবদুল্লাহ সামান, তাহা হোসেন’, মুহাম্মদ হোসেন হায়কল, মুহাম্মদ ইজ্জাত দারওয়াজা, অধ্যাপক হাঁদাদ প্রমুখ মতামত দেন যে, ষষ্ঠ শতাব্দীর হেজাজে কিছুটা সভ্যতা বিরাজমান ছিল এবং প্রাথমিক পর্যায়ের ধর্মবিশ্বাস ও আস্তিকতাও প্রচলিত ছিল সেখানে যা কোনোমতেই খাটো করে দেখা উচিৎ নয়। এছাড়া এই আধুনিক আরব চিন্তাবিদদের গবেষণা এবং আরও প্রাচীন সূত্র থেকে জানা যায় পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হেজাজে একটা আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

প্রথমদিকে হেজাজে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয় তার বিকাশ ঘটে কিছুটা ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রভাবে। ইহুদিরা ইয়াসরিবে (পরবর্তীতে মুসলমান জয়ের পর এই শহরের নাম হয় মদিনা) খুব প্রভাবশালী ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিল। আর খ্রিস্টানরা সিরিয়া থেকে হেজাজে এসে বসতি স্থাপন করে। এছাড়াও হেজাজে ধর্মতান্ত্রিক তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক একটি দল ছিল যারা ‘হানিফ নামে পরিচিত। মক্কায় হানিফেরা পৌত্তলিকতা এবং বহুঈশ্বরবাদের প্রতি প্রার্থনার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছিল। এ
ওজ্জাকে পূজা করার জন্য তায়েফের এক পাম-বাগানে সমবেত হন। ওজা ছিলেন বানু সাকিফদের প্রধান দেবী। এসময় চারজন ব্যক্তি পূজারী ও ভক্তদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি শুরু করেন, মক্কার লোকেরা ভুল পথে আছে। তারা আমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের ধর্ম হারিয়ে ফেলেছে। এরপর এই চারজন অন্যান্য পূজারীদের প্রতি চিৎকার করে বলেন, ‘একি হলো, তোমরা অন্য-ধর্ম পালন করছ! একটি পাথর, যা না পারে দেখতে, না পারে শুনতে, আর যা তোমাদের সাহায্যও করে না এবং অনিষ্টও করে না, তোমরা কেন তাকে বৃত্ত করে ঘুরে বেড়াও?’ এই চারজন ব্যক্তি হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাস, উসমান বিন আল-হুয়ারিস এবং জায়েদ বিন ওমর। এই ঘটনার পর থেকে এই চারজন নিজেদেরকে হানিফ মতাবলম্বী হিসেবে পরিচিতি প্রদান করেন এবং তাঁরা ইব্রাহিমের ধর্মের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। তাঁদের মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তি (জায়েদ বিন ওমর) নিজস্ব রীতিতে প্রার্থনার সময় উচ্চারণ করতেন : ‘এখানে আমি সত্যে আছি, সত্যে আছি উপাসনায় এবং বিনম্রতায়। ইব্রাহিম যেখানে আশ্রিত ছিলেন আমিও সেই আশ্রয়ে। আমি আপনার থেকে উদাসীন ছিলাম। আমার ভাগ্যে যা ঘটবে তা আমারই প্রাপ্য। এরপর জায়েদ নতজানু হতেন এবং মাটিতে তাঁর মাথা ঠেকিয়ে দিতেন।”
সন্দেহ নাই যে, আরবে তখন অজ্ঞানতা এবং কুসংস্কার বিরাজমান ছিল। সংখাগরিষ্ঠ আরবেরা মূর্তিপূজারী ছিলেন। তবু একেশ্বরবাদ তাদের কাছে কোনো অভিনব বিষয় ছিল না। হেজাজ, বিশেষত মদিনা এবং হেজাজের উত্তরাঞ্চলে যেখানে ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা বসবাস করতেন, সেখানে একেশ্বরবাদ অনেক আগে থেকে প্রচলিত ছিল। মুহাম্মদের পূর্বেও অনেকে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। যাদের সম্পর্কে কোরানে কিছু কিছু উল্লেখ আছে। যেমন আদ সম্প্রদায়ের হুদ নবি, সামুদ সম্প্রদায়ের সালেহ নবি, মিদিয়ান (উত্তর-পশ্চিম আরব-উপসাগরীয় অঞ্চল) সম্প্রদায়ের শুয়েব নবি। আবার আরবইতিহাসে একাধিক ধর্মপ্রচারক ব্যক্তির কথা জানা যায়, যেমন হানজালা বিন সাফওয়ান, খালেদ বিন সিনান, আমির বিন জারিব আল-আদওয়ানি এবং আবদুল্লাহ বিন আল-কোদাই। এছাড়া সুন্দর বাচনভঙ্গির অধিকারী এবং সুবক্তা কাসা বিন সায়িদা আল-ইয়াদি নামের একজন কবির নাম জানা যায়। ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কার পূর্বে নাখালা উপত্যকার পাশে বাণিজ্য নগরী ‘ওকাজ’- এ বিশাল পরিসরে বার্ষিক মেলা হতো যাকে সারা আরবে ওকাজের মেলা বলতো। এই মেলার সবচেয়ে আকষণীয় দিক ছিল বার্ষিক কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান। সারা আরব থেকে খ্যাতিমান কবিরা এসে এখানে নিজস্ব কবিতা আবৃত্তি করতেন। জিলকদ মাসের সাতদিনব্যাপী (ভিন্নমতে বিশদিন) ওকাজে মেলার আয়োজন করা হতো। এই সময় আরববাসীর মধ্যে হত্যা-মারামারিহানাহানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। ওকাজের মেলা সম্পর্কে প্রচলিত প্রবাদ ছিল এরকম : ওকাজ আজকে যা বলে, সারা আরবে আগামীকাল তার পুনরাবৃত্তি হয়। ওকাজের মেলা ছিল আরবের বিভিন্ন সম্প্রদায়-গোত্র ও বহু ধর্মের মানুষের সমন্বয়শীল মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিলন মেলা। মুক্ত আলোচনা, বিতর্ক, জনপ্রিয় কবিদের কাসিদা ( গীতিকবিতা) প্রতিযোগিতা ছিল মেলা বা সাহিত্য সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। স্বাভাবিকভাবে এই সাহিত্য সমেলনের ফলাফল সারা আরব জাহানে মধ্যে ছড়িয়ে পড়তো। এখানে এসে কবিতা পাঠ করা কবিদের কাছে অত্যন্ত সমানের ও জীবনের আরাধ্য একটি বিষয় ছিল। কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে বিজয়ী কবিতাকে পুরস্কারস্বরূপ স্বর্ণীক্ষরে পর্দার কাপড়ে লিখে কাবা ঘরসহ দেব-দেবীর মন্দিরের দেয়ালে টানিয়ে দেয়ার রেওয়াজ ছিল। তখন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ইমরুল কায়েসসহ আমর ইবনে কুলসুম, তারাফা, অন্তরা, নাবিঘা, জুহাইর, আশা প্রমুখ শ্রেষ্ঠ কবিদের স্বর্ণীক্ষরে লিখিত মোয়াল্লাকাত বা ঝুলন্ত কবিতায় কাবা ঘরের দেয়াল অলংকৃত হতো।-অনুবাদক)।

ওকাজের কবিতা সম্মেলনে কবি কাসা বিন সায়িদা প্রকাশ্যেই কবিতা এবং ধর্মোপদেশ দ্বারা লোকজনকে মূর্তি পূজা পরিহার করার আহ্বান জানাতেন। তায়েফের সাকিফ গোত্রের ওমায়া বিন আবু-সালাত মুহাম্মদের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি সে-সময়ের বিখ্যাত হানিফ এবং একশ্বরবাদের প্রবক্তা ছিলেন। ওমায়া বিন আবু-সালাত প্রায়ই সিরিয়ায় যেতেন এবং সেখানকার খ্রিস্টান সন্ন্যাসী ও ইহুদি পণ্ডিতদের সাথে সংলাপে বসতেন। একদা সিরিয়াতে অবস্থানকালে তিনি মুহাম্মদের উত্থানের সংবাদ শুনতে পান। অনেকে বলেন ওমায়া এবং মুহাম্মদের মধ্যে সাক্ষাত হয়েছিল। কিন্তু ওমায়া ইসলাম গ্রহণ করেননি, মুসলিম হননি। জানা যায় যে তায়েফ প্রত্যাবর্তনের পর ওমায়া তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন : অন্যান্য ধর্ম এবং প্রথার উপর আমার জ্ঞান মুহাম্মদের চাইতে অনেক বেশি। আমি আরমেনীয় এবং হিব্রুভাষাও জানি। কাজেই নবি হবার দাবি আমার অধিকতর।’ বুখারির মতে, পরবর্তীতে মুহামদ একথা শুনে বলেছিলেন ; ওমায়া বিন আবু-সালাত মুসলমান হবার কাছাকাছি এসেছিলেন।

তৎকালীন তরুণ কবিদের লেখা কবিতায় এক জাতির সচেতনতা এবং সামাজিক রীতিনীতি প্রাণবন্তভাবে প্রকাশিত হয়। প্রাকইসলামি যুগের কিছু আরবি কবিতা আছে। তখনকার একটি কবিতা খুব সম্ভবত কবি জোহাইর’ এর লেখা হতে পারে। এই কবিতা এখানে দেয়া হলো :

তোমার আত্মায় যা আছে তা আল্লাহর কাছে গোপন করবে না,
কেন-না তুমি যেমনভাবেই তা ঢাকার চেষ্টা কর না কেন আল্লাহ তা জেনে যাবেন।
হয়তো বা স্থগিত থাকবে, অথবা এক বইতে লিখিত হবে এবং জমা হবে
হিসাবের দিন, অথবা শীঘ্রই তা পরিশোধ করা হবে।’

অথবা আবদুল্লাহ বিন আল-আবরাসের লেখা এই কবিতা :

জনতা চায় তারই উপাসনা করতে
কারণ ঈশ্বর-সন্ধানীরা হতাশ হবে না।
ঈশ্বরের মাধ্যমে সকল আশীৰ্বাদ নাগাল পাওয়া যায়,
যে কিছুর উল্লেখ করলেই বিজয় প্ররোচতে হয়ে যায়।
ঈশ্বরের কোনো অংশীদার নাই
এবং হৃদয়ে যা গোপন আছে তা তিনি অবগত।

শোনা যায় একদা নবি মুহামদ কবি লাবিদের এই কবিতা উদ্ধৃত করেছিলেন :

আল্লাহ ছাড়া সব কিছুই প্রথা
সমস্ত সাফল্য একদিন অবসান পাবে।

লক্ষণীয় যে লাবিদসহ প্রাক-ইসলামি যুগের কবিরা স্রষ্টা বা ঈশ্বরকে ‘আল্লাহ বলেই সম্বোধন করতেন। মুহাম্মদের পিতাসহ অনেক পৌত্তলিক কুরাইশদের নাম রাখা হতো আবদুল্লাহ-যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর দাস। মুহাম্মদের অনেক পূর্বকাল থেকে মক্কাবাসীদের কাছে আল্লাহ নামটি পরিচিত ছিল, তারা মনে করতেন তাদের দেবদেবী হচ্ছেন আল্লাহর সান্নিধ্য পাবার মাধ্যম। তাদের এই ধারণা কোরানের সুরা ইউনুসে বর্ণিত হয়েছে : ‘ওরা আল্লাহ ছাড়া যার উপাসনা করে তা তাদের ক্ষতি করে না, উপকারও করে না। ওরা বলে, এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। বলো, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশ ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না? তিনি পবিত্র, মহান। আর তারা যাকে শরিক করে তিনি তার উর্ধ্বে।’ ( ১০:১৮)। আমর বিন ফজল নামের আরেকজন প্রাক-ইসলামি যুগের আরব কবি মূর্তিপূজাকে সরাসরি প্রত্যাখান করেছেন। তিনি লিখেছেন:

আমি তো লাত এবং ওজ্জাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেছি,
যে কোনো বলিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এই রকমই করবে।
আমি কোনোমতেই ওজ্জা এবং তার দুই বোনকে দেখতে যাব না
অথবা বানু ঘনমের দুটি মূর্তিকে।
আর আমি তো হুবালকেও বার বার দর্শন দিব না,
ভাগ প্রতিকুল হতে পারে, আমার ধৈর্য সামান্য।

কাজেই মক্কাবাসীর কাছে পৌত্তলিকতা ছেড়ে এক ঈশ্বরের উপাসনা করার আহ্বান নতুন কিছু ছিল না। যেটা অভিনব সেটা হলো এই উপাসনাকে আশু করার জন্য পীড়াপীড়ি করা। মুহাম্মদের অসামান্য কাজ ছিল, তিনি দৃঢ়ভাবেই সমস্ত অপমান, হয়রানি এবং প্রতিরোধের মোকাবেলা করে গেছেন। আরব-উপদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত মুহাম্মদ ক্ষান্ত হননি; এবং আরবের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একই পতাকাতলে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আরবের বিভিন্ন গোত্রের জীবনযাপন ছিল খুব সেকেলে। তারা ছিলেন অনেকাংশে বস্তুবাদী এবং একমাত্র বাস্তব ও দৃশ্যমান বস্তু নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। আধ্যাতিক ব্যাপারে তারা ছিলেন উদাসীন। তাৎক্ষণিক মুনাফার প্রতি তাদের ছিল তীব্র আকর্ষণ। অন্যের বিষয়-সম্পত্তি জব্দ করতে তারা কুষ্ঠাবোধ করতেন না। ক্ষমতা লাভের জন্য তারা যা খুশি তাই করতেন। তাদের এই মানসিকতার পরিচয় পূর্বেই আকনাস বিন শারিকের কাছে আৰু জেহেলের উক্তিতে ফুটে উঠেছে। আবু জেহেলের দৃষ্টিতে মুহাম্মদ নবুওতির ভান করছিলেন আবদে মনাফ বংশের প্রাধান্যতা প্রতিষ্ঠা করতে। উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার (৬০ হিজরি বা ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ-৬৪ হিজরি বা ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দ) মন্তব্যে একই ধারণার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। মুহাম্মদ যেভাবে তাঁর বিরোধীপক্ষকে বদর যুদ্ধে (২ হিজরি বা ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) পরাজিত করেছিলেন ঠিক একইভাবে উমাইয়া বংশের সৈন্যরা বানু হাশেমি গোত্রকে পরাজিত করে এবং কারবালার যুদ্ধে (৬১ হিজরি বা ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) হোসেন বিন আলিকে হত্যা করেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই ঘটনার পর ইয়াজিদ এক পঙক্তি কবিতাও লিখে ফেলেছিলেন :

‘হাশেমিরা ক্ষমতার জুয়া খেলে, কিন্তু কোনো শব্দ আসলো না, কোনো দৈববাণীও নামলো না।’

পরিচ্ছেদটি শেষ করার পূর্বে এখানে না বললেই নয় যে, আধুনিক যুগের কোনো কোনো আরব পণ্ডিত প্রাক-ইসলামি যুগের কবিতা সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেন। যাহোক, প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবে পৌত্তলিকতার উপর মোহমুক্ত হয়ে একাধিক ব্যক্তির হাত ধরে একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে ওঠে।

নবুওতির সমস্যা

প্রথম অধ্যায় । নবি মুহাম্মদ । নবুওতির সমস্যা

ইদানীং প্রচুর বিদগ্ধজন ইসলামের উত্থান ও প্রসার নিয়ে সবিস্তারে অনুসন্ধান করেছেন। সেই-সাথে কোরানের আয়াতের অর্থ, বিন্যাস, প্রসঙ্গ এবং হাদিসের উদ্ভব নিয়েও হচ্ছে অনেক গবেষণা। পাশ্চাত্য পণ্ডিত যেমন জার্মান বংশোদ্ভূত প্রাচ্য-বিশেষজ্ঞ থিওদর নোলদেক(১৮৩৬-১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ), হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত ইজহাক গোল্ডজিহার (১৮৫০-১৯২১ খ্রিস্টাব্দ), অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত অধ্যাপক আলফ্রেড ভন ক্রেমার (১৮২৮-১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ), জার্মান বংশোদ্ভূত আরবি সাহিত্য বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম মেজ (১৮৬৯-১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ), ফরাসি বংশোদ্ভূত প্রাচ্য-বিশেষজ্ঞ এবং কোরানের ফরাসি অনুবাদক রেগিস ব্লাশের (১৯০০-১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ) প্রমুখ এ-ব্যাপারে তাঁদের গবেষণালব্দ কর্ম দিয়ে মূল্যবান অবদান রেখেছেন। অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখার মতো তাঁরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করেছেন ইসলাম, কোরান, হাদিস, আরব-ইতিহাসসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়াবলী। পর্যবেক্ষণ করেছেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা তাঁদের মধ্যে লক্ষ করা যায় না। বরং তাঁদের গবেষণার ভিত্তি হচ্ছে প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য ইসলামি-নথিপত্র।

অবশ্য কোনো কোনো ইউরোপীয় লেখক নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গবেষণার কাজকে স্থিমিত করে ফেলেছেন। তারা মুহামদকে একজন স্রেফ অভিযাত্রিক ও ভণ্ড হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে কোরান হচ্ছে ক্ষমতালাভের একটি হাতিয়ার। অবশ্য কোরানের এই পশ্চিমা-সমালোচকেরা মুসা এবং যিশুকেও যদি সমালোচনা করতেন তবে হয়তো তাদের বক্তব্য কিছুটা বিবেচনাযোগ্য হতো (যদিও বিষয়টি এই বইয়ের আলোচনার বাইরে)। কিন্তু তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, মুসা এবং যিশুকে ঈশ্বর স্বয়ং নিয়োজিত করেছিলেন, কিন্তু মুহামদকে নয়। তাঁদের এই বক্তব্যের সমর্থনে যৌক্তিকভাবে স্বীকৃত কোনো প্রমাণ নাই। এরকম ধারণা যারা পোষণ করেন তাঁদেরকে শুরুতেই নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার। নীতিগতভাবে তাঁদেরকে প্রথমেই নবুওতির বিষয়টি মেনে নিতে হবে। কারণ তারা একটি ক্ষেত্রে নবুওতির তত্ত্ব মানবেন, কিন্তু অন্যক্ষেত্রে মানবেন না, এটা যৌক্তিক আচরণ নয়।

আরবের প্রসিদ্ধ চিন্তাবিদ মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া’ এবং সিরিয়ীয় অন্ধকবি আবু আল আলা আল-মারিং নবুওতির দাবিকে স্বীকার করতেন না। তাঁদের মতে ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নবুওতি বা পয়গম্বরের দাবি অযৌক্তিক ও অবিশ্বাস্য। ধর্মবিশ্বাসীরা বলেন স্রষ্টা অনুগ্রহপূর্বক কোনো ব্যক্তিকে নিয়োজিত করেন মানুষকে বিপথ এবং পাপ থেকে বিরত রাখার জন্য। যুক্তিবাদীরা বলেন স্রষ্টা যদি সৎকর্ম এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক নিয়ে এতই চিন্তিত থাকেন তবে তিনি সবাইকে নিষ্পাপ এবং উত্তম করেই তৈরি করতেন। মানুষকে ঈশ্বরের মনমতো করে সৃষ্টি করলে কোনো পয়গম্বর বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি পাঠানোর দরকার থাকত না। ধর্মবিশ্বাসীরা উত্তর দেন ভাল ও মন্দ ঈশ্বরের সৃষ্ট নয়। ঈশ্বর নিজে থেকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হলেও ভাল এবং মন্দ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এ-থেকেও স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন তুলেন যুক্তিবাদীরা – একজন ব্যক্তি কি ঈশ্বরের সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছার বাইরে গিয়ে ভালো বা খারাপ গুণের অধিকারী হতে পারেন?

একজন মানুষ তার বৈশিষ্ট্য লাভ করে পিতা-মাতা থেকে, গর্ভধারণের ক্ষণে। প্রত্যেক নবজাত শিশুই জন্মগ্রহণ করে কিছু শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এই বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে শিশুটির শারীরিক গঠনের উপর। কেউ ইচ্ছে করলেই যেমন পছন্দ করে নিতে পারে না তার চোখের রঙ, নাকের গঠন, হৃৎপিণ্ডের রক্তচাপ, দৈহিক উচ্চতা অথবা চোখের দৃষ্টিশক্তি, তেমনি কেউ ইচ্ছে করে তার মস্তিষ্কের ক্ষমতা, স্নায়ুশক্তি এবং সহজাত প্রবৃত্তিকে বেছে নিতে পারে না। কেউ কেউ শান্ত এবং পরিমিত মেজাজের, আবার অনেকে উচ্ছঙ্খল, জেদি এবং চরমপন্থী। যারা সন্তোষজনক ভারসাম্যপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী তারা অন্য কারো স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করে না। যারা আগ্রাসী তারা প্রায় হিংসাত্মক কর্মে লিপ্ত হন।

বলা হয় যে, নবিদের পাঠানো হয় মানুষের চরিত্রের পরিবর্তনের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে একজন ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে কী পুরোপুরি সন্তোষজনক ভারসাম্যের ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করা যেতে পারে? মানবীয় আচরণের যে গুণাবলী বংশগত, সেগুলি কি অন্য ব্যক্তির সদুপদেশ দ্বারা পরিবর্তিত করা সম্ভব? আর তাই যদি সম্ভব হতো তবে মানব-ইতিহাসে ধর্মের আগমনের পরও কেন এতো হিংসা, নিষ্ঠুরতা, অপরাধপ্রবণতা বিরাজ করেছে এবং বিস্তার লাভ করেছে? ফলে আমরা বলতে বাধ্য হই যে, ঈশ্বর তাঁর প্রেরিত নবিদের দ্বারা মানবজাতির সকল নারী-পুরুষকে ভালো এবং সুখী বানাতে পারেননি। একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণকারী হিসেবে এই বিষয়ে মন্তব্য করা যেতে পারে যে, এর চাইতে সঠিক, সহজ এবং নিরাপদ ব্যবস্থা হতো যদি ঈশ্বর প্রথমেই সকল নারী-পুরুষকে ভালো বানাতেন।
ধর্মবিদদের কাছে এই সমালোচনার উত্তর প্রস্তুত আছে। তারা বলেন পার্থিব জীবন হচ্ছে একটা পরীক্ষা। ভালো ও মন্দ কর্তৃত্বপূর্ণভাবে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। একজন নবি পাঠিয়ে ঈশ্বর চূড়ান্তভাবে ভালো কর্মের লোক, যারা ঈশ্বরের আদেশ পালন করবে, তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, ভবিষ্যতে তাদের জন্য রয়েছে স্বর্গের পুরস্কার। আর যারা ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করবেন ভবিষ্যতে তাদের জন্য রয়েছে নরকের কঠোর শাস্তি।
নবুওতির অস্বীকারকারীরা বলেন ইহজীবন যে একটা পরীক্ষা এই যুক্তি অসার এবং অসমর্থনযোগ্য। যদি স্রষ্টা বা ঈশ্বর বলে কেউ থাকেন তবে তার বান্দাদের মনে যেসব গোপন চিন্তা আছে তা তো ঈশ্বর ঐ ব্যক্তির চাইতেও ভালো করে জানেন বা জানার কথা। তথাপি ঈশ্বর সবকিছু জেনেশুনে কেন তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা নিবেন? তিনি কি আগে থেকেই জানেন না যে কে এই পরীক্ষায় কৃতকার্য হবে আর কে অকৃতকার্য হবে? ঈশ্বরের সবকিছুই কি পরিকল্পিত কিংবা এই মহাবিশ্বে ঈশ্বরের পরিকল্পনার বাইরে বা
কখনো নিজেদের কাজকে পাপ বলে মনে করবে না। ওরা যা করে তা ওদের মেজাজের বৈশিষ্ট্য এবং চরিত্রের সাথে খাপ খায়। সবার যদি একই ধরনের সহজাত প্রবৃত্তি হতো তাহলে কেউ কেউ ঈশ্বরের আদেশ পালন করেন আর কেউ করেন না এর ব্যাখ্যা করা যায় না। সোজা ভাষায় বলা যায়, সবার মাঝে যদি ভাল মন্দ করার প্রবণতা সমানভাবে থাকতো তাহলে হয় সবাই ঈশ্বরের আদেশ পালন করবে, নয়তো সবাই ঈশ্বরের আদেশ পালন করবে না। সাধারণ এই বিবেচনার সাথে মুসলিম চিন্তাবিদদের এটাও মনে রাখা দরকার যে কোরানের একাধিক স্থানে বলা হয়েছে, মানুষের ভ্রান্তি এবং সাধুতা নির্ভর করে আল্লাহর ইচ্ছার উপর। যেমন : ‘কাউকে প্রিয় মনে করলেই তুমি তাকে সৎপথে আনতে পারবে না; তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন,

আর তিনিই ভালো জানেন কারা সৎপথ অনুসরণ করে। (সুরা কাসাস ; আয়াত ৫৬)। আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতাম। (সুরা সিজদা ; আয়াত ১৩)। . . . আল্লাহ যাকে ইচ্ছা (উত্তম বাণীসংবলিত কিতাব) দিয়ে পথপ্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই। (সুরা জুমার ; আয়াত ২৩)।

কোরানে এই ধরনের আয়াত এত অধিক যে এখানে সব উদ্ধৃত করা অসম্ভব। এই আয়াতগুলো এবং মানবকুলে মৌলিক পরিবর্তনে নবিদের অক্ষমতা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ধৰ্মজ্ঞানীদের বক্তব্য অনুযায়ী নবির প্রয়োজনীয়তার দাবি আসলে অর্থহীন।
ধর্মীয় পণ্ডিতদের অসার বক্তব্যগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ঈশ্বরের সৃষ্টি নিয়ে। তাঁদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হচ্ছে যে, সৃষ্টিকর্তা এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তা নবি এবং অবতার পাঠিয়ে থাকেন। এছাড়া ধর্মীয় পণ্ডিতরা মনে করেন, সৃষ্টিকর্তা দ্বারা সৃষ্টির আগে মহাবিশ্বের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তিনি শূন্য হতে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এই ধরনের দাবি যাচাই-অযোগ্য। আমরা কেমন করে জানতে পারবো যখন ঈশ্বর অস্তিত্বশীল ছিলেন, অথচ মহাবিশ্ব, মহাকাশ কোনো কিছুই ছিল না। এটা সত্য যে, আজকের সৌরমণ্ডল ও তারকা, এবং নীহারিকার সর্বদা অবস্থিতি ছিল না। কিন্তু এগুলোর কোনো উপাদান মহাবিশ্বে বর্তমান ছিল না বরং হঠাৎ করে ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে এই মতবাদ যৌক্তিক নয়। ঈশ্বর মহাবিশ্বের সৃষ্টির উপাদানগুলো কোথা হতে কোন উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করলেন? তারচেয়ে বরং পূর্ব থেকেই পরমাণুর অস্তিত্ব ছিল মেনে নেয়া যেতে পারে। পরমাণুর সংমিশ্রণে সূর্যের উৎপত্তি ঘটে। কিন্তু এখনো আমরা পরিষ্কারভাবে জানি না, কেমন করে পরমাণুর সংমিশ্রণ ঘটে এবং বস্তুর উদ্ভব হয়। তবে এই অনুকল্পের প্রমাণ দেখা যায় মহাকাশে অবিরামভাবে তারকাদের উদ্ভবে এবং তাদের মৃত্যুতে।

তাই বলা যেতে পারে যে সৃষ্টির সূচনা পদার্থ থেকে নয় বরং এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে রূপান্তর। এই পরিস্থিতে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি দেখানো খুব কঠিন। আবার আমরা যদি ধরে নেই যে, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্টির পূর্বে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ছিল না তাহলে সমস্যা দেখা দিবে। সেই সমস্যা হচ্ছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির কারণ কী? আমরা চেষ্টা করেও দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না। প্রশ্ন দুটি হচ্ছে ; বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আগে থেকে কেন ছিল না? আর ঈশ্বর কেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলেন? প্রশ্নগুলোর কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর নেই ধর্মবিদদের কাছে। ফলে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষেও কোনো যুতসই প্রমাণ দেখানো যাবে না।

এই রকম বিভ্রান্তির মাঝে আমাদের পার্থিব মনে একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায়। আমরা মানুষেরা পৃথিবীর অন্যান্য জীবের সাথে একই শ্রেণিতে বিন্যস্ত হতে রাজি নই। মানুষ চিন্তাশীল প্রাণি এবং বহু পূর্ব থেকে মানুষ বিশ্বাস করে আসছে এই বিশ্বমহাবিশ্বের সবকিছু কেউ না কেউ একজন শুরু করেছেন এবং তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন সকল শুভ এবং অশুভ প্রভাব। এই ধারণা যুক্তি দিয়ে হোক বা গর্ব অনুভবের জন্য অন্য প্রাণি থেকে মানুষকে পৃথক করে দেখার মানসিকতাই হোক, ধর্মগুলির উদ্ভব ঘটিয়েছে। আদিম অথবা প্রগতিশীল, সব সমাজে আমরা দেখি ধর্মের শক্তিশালী প্রভাব বিরাজমান। আদিম সমাজে আছে কুসংস্কার এবং মোহ। আধুনিক প্রগতিশীল সমাজে চিন্তাশীল ব্যক্তির প্রভাবে সভ্য এবং ন্যায়সঙ্গত সমাজব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। চিন্তাবিদরা আবির্ভূত হয়েছেন আইন প্রণয়নকারী, সমাজ সংস্কারক, অথবা দার্শনিকরূপে। যেমন হামুরাবি, কনফুসিয়াস, বুদ্ধ, সক্রেটিস এবং প্লেটোসহ বিভিন্নজনের নাম উল্লেখ করা যায়। সেমিটিকদের মধ্যে সর্বদা এই ধরনের ব্যক্তিরা আবির্ভূত হয়েছেন নবি বা রসুল হিসেবে। অর্থাৎ তাঁরা স্বঘোষিতভাবে ঈশ্বরের প্রতিনিধি দাবি করেছিলেন।
মুসা সিনাই পর্বতে আরোহণ করে নিয়ে আসলেন লিপিফলক, যার ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করলেন ইসরাইলিদের সমাজব্যবস্থা সংস্কারের জন্য। যিশু দেখলেন ইহুদিরা অহংকার এবং মিথ্যা ধর্মানুরাগে নিমজ্জিত। তাই তিনি তাদেরকে উত্তম নৈতিকতা শিক্ষা দিতে উপস্থিত হলেন। তিনি ঈশ্বরকে তাঁর দয়াময় পিতা বলে প্রচার করলেন। তাই যিশু নিজস্ব বক্তব্যকে পিতা-পুত্রের বাণী হিসেবে প্রচার করলেন। অথবা যিশু এ-রকমটি না করে থাকলেও তাঁর ভক্তরা অলৌকিকতার প্রচার চালিয়ে যিশুর মহিমা প্রচার করলেন। ফলে এটা হতে পারে যে, নতুন বাইবেলের চারটি গসপেল যিশুর জন্মবৃত্তান্তকে বিকৃত করেছে অথবা তাঁর সম্বন্ধে অতিরঞ্জিত গল্প সাজিয়েছে।

ষষ্ঠ শতাব্দীতে মুহাম্মদের উত্থান ঘটে আরবের হেজাজে। তিনি সমাজ-সংস্কারের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানালেন। কিন্তু তিনি মুসা এবং যিশুর সাথে কীভাবে পার্থক্য সূচনা করলেন? সরলমনা ধর্মবিশ্বাসীরা অলৌকিক ঘটনার ভিত্তিতে নবুওতি বিশ্বাস করেন। এজন্য ইসলামি লেখকেরা শতাধিক অলৌকিক কাহিনী মুহাম্মদের ওপর আরোপ করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে হাদাদ নামে একজন খ্রিস্টীয় আরব পণ্ডিতের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রচুর গবেষণা করে তিনি দ্যা কোরান অ্যান্ড দ্যা বাইবেল”নামে একটি বই রচনা করেছেন। কোরান থেকে প্রচুর উদাহরণ সংগ্রহ করে তিনি দেখিয়েছেন নবি মুহাম্মদ আসলে কোনো অলৌকিক কাজ করেননি। এরপর তিনি অর্বাচীনের মতো দাবি করেন যেহেতু অলৌকিক ঘটনা দিয়ে নবিদের মূল্যায়ন করা হয় তাই যিশু ও মুসার নবুওতি প্রমাণিত। আদতে সমস্ত অলৌকিক ঘটনাই অপ্রতিপাদনযোগ্য কল্পকাহিনী অথবা দৃষ্টিভ্রম। যিশু যদি সত্যি সত্যি কোনো মৃতব্যক্তিকে জীবিত করে ফেলতেন তবে ইহুদিদের মধ্যে একজনও থাকতো না যে যিশুর নবুওতিতে অবিশ্বাস করতো বা যিশুর প্রতি মাথা নত করতে দ্বিমত পোষণ করতো। ঈশ্বর যদি চাইতেন তাঁর প্রেরিত একজন রসুলের প্রতি সবাই বিশ্বাস আনুক এবং তাঁর শিক্ষা থেকে সবাই সুফল গ্রহণ করুক তবে ঈশ্বরের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক হচ্ছে সবাইকে ভালো এবং বিশ্বাসী বানিয়ে দেয়া। অথবা ঈশ্বর এটাও করতে পারেন যে, ঐ নবিকে মানুষের মনের উপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়ে দিতে পারতেন। এই প্রক্রিয়া একজন মৃতব্যক্তিকে পুনঃজীবিত করার ক্ষমতার চাইতে অনেক সহজতর। তখন সে নবির প্রয়োজন পড়তো না কোনো নদীর প্রবাহ বন্ধ করা বা আগুনকে প্রজ্জ্বলিত হতে বাধা দেয়া ইত্যাদি করতে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে নবুওতির সমস্যাকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করতে হবে। নবিকে দেখতে হবে একজন ব্যক্তি হিসেবে যাঁর রয়েছে অসাধারণ মানসিক এবং আধ্যাতিক প্রতিভা যা সচরাচর একজন সাধারণ ব্যক্তির মধ্যে নেই। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক নেতাদের মধ্যে আছেন সাইরাস, আলেকজান্ডার, সিজার, নাদির এবং নেপোলিয়ন। যুদ্ধ-পরিকল্পনায় এবং যুদ্ধে জয়ী হবার পদ্ধতিতে তাঁরা ছিলেন অসাধারণ কুশলী। কিন্তু জনসাধারণকে শিক্ষা দেবার মতো তাঁদের কিছুই ছিল না। শিল্পকলা এবং বিজ্ঞানে আছেন অ্যারিস্টটল, ইবনে সিনা, নাসির উদ্দিন তুসি, টমাস অ্যাডিসন, আইনস্টাইন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, বিটোফেন, হোমার, ফেরদৌস, অন্ধকবি আবু আল আলা আল-মারি, হাফিজ, এবং আরও শতজন। তাঁদের আবিষ্কার, উদ্ভাবন, রচনা, এবং সেরা শিল্পকর্ম বিশ্বসভ্যতাকে প্রজ্জ্বলিত করেছে। ফলে আধ্যাত্মিক জগতেও এই ধরনের ব্যক্তিত্ব থাকবেন না কেন? কোনো ব্যক্তি যদি গভীর ধ্যান বা চিন্তাশক্তি দ্বারা কোনো অসীম ক্ষমতাধরের ধারণা আবিষ্কার করেন এবং জনতাকে পথ-প্রদর্শনের জন্য সে ধারণা ধীরে ধীরে প্রেরিত বাণী বলে প্রচার করেন তবে তাঁর সেই ধারণা সহজে কোনো যুক্তি দিয়ে নাকচ করা যায় না।
বাল্যকালে মুহামদের মনেও একই ধরনের চিন্তা স্থান পায়। এজন্য সিরিয়া ভ্রমণকালে বাণিজ্যের কাজে ব্যস্ত না থেকে তিনি চট করে খ্রিস্টান সন্ন্যাসী এবং পাদ্রিদের সাথে আলাপে বসেন। ফেরার পথে মিদিয়ান, আদ এবং সামুদ সম্প্রদায়ের অনেক গল্প শোনেন। মক্কাতেও মুহামদ প্রায়ই ধর্মীয় ও আধ্যাতিক নেতা, সন্ন্যাসীদের সাথে আলাপ করতেন। তিনি মারওয়া পাহাড়ের নিকটে জাবর নামে এক ব্যক্তির দোকানে প্রচুর সময় কাটাতেন। সে-সময় খাদিজার চাচাতো ভাই হানিফ মতাবলম্বী ওয়ারাকা বিন নওফল নতুন বাইবেলের অংশবিশেষ আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন। মুহাম্মদ ওয়ারাকার সাথেও প্রচুর সময় নিয়ে মতবিনিময় করতেন। এই আলোচনা-অভিজ্ঞতাগুলি মুহাম্মদের মনে দীর্ঘদিনের যে সুপ্ত চিন্তাভাবনা ছিল তা ঘূর্ণির মতো জেগে ওঠে।

জাবরের সাথে মুহাম্মদের ঘনঘন এবং দীর্ঘ আলোচনার কথা কোরানে উল্লেখ আছে। জাবর ছিলেন ভিনদেশি। তাই কুরাইশরা বলতেন, মুহাম্মদ কোরানের আয়াত পেয়েছেন এক বিদেশির কাছে। কোরানের সুরা নাহলে এ-বিষয়ে বলা হয়েছে : ‘আমি অবশ্যই জানি যে ওরা বলে, তাকে (মুহাম্মদকে) শিক্ষা দেয় এক মানুষ। ওরা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তার ভাষা তো আরবি নয়, কিন্তু এ কোরান তো পরিষ্কার আরবি ভাষা।’ ( ১৬:১০৩)। মুহাম্মদের জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি ধর্মপ্রচার শুরু করার আগে অনেক ধর্মবিদ, সন্ন্যাসী-ঋষি এবং জ্ঞানী ব্যক্তির সাথে ভাবের আদান-প্রদান করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য হচ্ছেন : হুয়ারিব গোত্রের সন্ন্যাসী আয়েশ, পারস্যের সালমান আল-ফার্সি এবং আবিসিনিয়ার (বর্তমান নাম ইথিওপিয়া) অধিবাসী বেলাল। এছাড়া আবু বকরও অনেক সময় মুহাম্মদের সাথে আলোচনা করে ধর্মীয় বিষয়ে একমত হন।

মুহাম্মদের জীবনী, হাদিস এবং কোরানের বেশকিছু আয়াতের ভিত্তিতে যে-কোনো অনুসন্ধানী ব্যক্তি প্রকৃত ঘটনা বের করে নিতে পারবেন। এই আলামতগুলো থেকে প্রমাণিত হয় মুহাম্মদের ভাবুক মনের দুর্নিবার যাতনার ফলস্বরূপ তিনি এক অশরীর আত্মা বা দেবদূতের সাক্ষাৎ পান। কোরানের সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতে রয়েছে :
আরক্তি করে তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে।

আবৃত্তি করো, তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন,
শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না

মুহাম্মদের নবুওতি প্রাপ্তির প্রথম সূরা।

তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। উচ্চতায় তিনি মাঝারি, শ্বেত বর্ণের ত্বক অনেক সময় লালাভ হয়ে যেত, কৃষ্ণকায় চুল ও চোখ। মুহাম্মদ কদাচিত কৌতুক করতেন বা হাসতেন। কখনো হাসলেও হাত দিয়ে হাসি চেপে রাখতেন। তিনি দৃঢ় পদক্ষেপে স্বাচ্ছন্দে হাটতেন এবং হাঁটার সময় এদিক-ওদিক তাকাতেন না। কিছু লোকভাষ্য থেকে জানা যায় মুহাম্মদ কয়েকটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কখনো কুরাইশ যুবকদের সাথে আমোদ-ফুর্তি বা লঘু কথাবার্তায় যোগদান করেননি। তিনি যৌবনে সততার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন, এমন-কী তাঁর শত্রুপক্ষ থেকেও। খাদিজাকে বিয়ের পর মুহাম্মদের আর্থিক চিন্তা দূরীভূত হয়। তখন তিনি আধ্যাত্মিক বিষয়ে অনেক সময় ব্যয় করতেন। বেশিরভাগ হানিফ মতাদশীর মতো তিনিও নবি ইব্রাহিমকে নিখুঁতভাবে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত মনে করতেন। আর এটা বলার অবকাশ থাকে না যে, তিনি তাঁর বংশের লোকদের পৌত্তলিকতাকে ঘৃণার চোখে দেখতেন।

আধুনিক যুগের আরবের খ্যাতিমান পণ্ডিত তাহা হোসেনের মতে তখন বেশিরভাগ কুরাইশ নেতাও কাবার মূর্তিগুলোর উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা সম্মান দেখানোর বাহানা করতেন, কেননা বেদুইনদের মাঝে তখনও পৌত্তলিকতা শক্তভাবে বিদ্যমান ছিল। বেদুইনদের এই ধর্মীয় বিশ্বাস আর প্রথা পালন মক্কার কুরাইশদের জন্য নিয়ে আসতো আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা।

শব্দচয়নে মুহামদ ছিলেন সবসময় সুচিন্তিত এবং হুশিয়ার। একটি লোকভাষ্য অনুযায়ী মুহাম্মদ একসময় একজন কুমারী তরুণীর মতো লাজুক ছিলেন। তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল সুন্দর এবং তিনি কথা বলার সময় সর্বদা অর্থহীন পুনরাবৃত্তি এবং দীর্ঘ বক্তৃতা থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর মাথার কেশ ছিল লম্বা এবং তা কানদ্বয়কে ঢেকে রাখত। মাথায় সচরাচর তিনি সাদা পাগড়ি পরতেন। মাথা এবং দাড়িতে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন নিয়মিত। তিনি ছিলেন বিনয়ী এবং দয়ালু। করমর্দন করলে কখনোই তিনি নিজের হাত আগে ছাড়িয়ে নিতেন না। নিজেই নিজের পোশাক এবং জুতা মেরামত করতেন। তাঁর অধঃস্থ ব্যক্তিদের সাথে তিনি মেলামেশা করতে পারতেন অনায়াসে। একবার তিনি এক ক্রীতদাসের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং ক্রীতদাসের সাথে মাটিতে বসে খেজুর আহার করেন। ধর্মপ্রচারের সময় তিনি অনেকবার কণ্ঠ জোরালো করতেন বিশেষ করে যখন কোনো কাজের নিন্দা করতেন। এই সময় তাঁর চোখ দুটি এবং মুখমণ্ডল রক্তিম হয়ে যেত।
মুহাম্মদের চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর প্রচণ্ড সাহস। একবার এক যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি একটি ধনুকে হেলান দিয়ে মুসলমানদেরকে যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করেন। যুদ্ধের সময় যখন মুসলমান যোদ্ধারা ভীত থাকতেন তখন মুহাম্মদ সমুখে হেঁটে শক্রর একেবারে কাছাকাছি চলে যেতেন, যা অন্য কেউ করতে পারতেন না। মুহাম্মদ মাত্র একজন ব্যক্তিকে স্বহস্তে হত্যা করেছিলেন। তাও হয়েছিল যখন সেই ব্যক্তি অসিযুদ্ধে মুহামদকে মারাত্মক আঘাত হানে। নবি মুহাম্মদের প্রচারিত কিছু বাণী হচ্ছে :

১. ‘কেউ যদি এক ব্যক্তিকে মন্দ জেনেও তার সাথে মেলামেশা করে এবং সে জানে যে ঐ ব্যক্তি মন্দ, তবে সে মুসলমান নয়।”
২. ‘পাশের ব্যক্তিটি ক্ষুধার্ত জেনেও যে ব্যক্তি একাকী আহার করেন তিনি মুসলমান নন।’
৩. ‘উত্তম নীতিমালা হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক।’
8. ‘সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হচ্ছে একজন অনৈতিক ব্যক্তিকে সত্য জানিয়ে দেয়া।’
৫. ‘যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করেন সেই-ই অধিক শক্তিশালী।’

মুহাম্মদের নবি হয়ে ওঠা

প্রথম অধ্যায় । নবি মুহাম্মদ । মুহাম্মদের নবি হয়ে ওঠা

মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত হেরা পর্বত। শুষ্ক এক শিলাময় স্থান। এই পর্বতের ঢাল বেয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু পর্বতের গুহার ভেতর তৎকালীন অনেক হানিফ নিয়মিত যেতেন নির্জন আশ্রয় ও একাকী ধ্যান করার জন্য। মুহাম্মদও বেশ কিছু দিনের জন্য তাই করছিলেন। বাস্তব জীবনের কোলাহল থেকে মুক্তি পেয়ে একাকী কিছু সময় অতিবাহিত করার স্পৃহা মুহামদকে অনেক বার এই স্থানে নিয়ে আসতো। কখনো কখনো মুহামদ সাথে করে আহার সামগ্ৰী নিয়ে যেতেন এবং গুহা থেকে বের হতেন না আহার ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত। কখনো কখনো আবার খুব ভোরে তিনি চলে যেতেন আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আসতেন।

৬১০ খ্রিস্টাব্দে একদিন মুহাম্মদ ঘরে ফিরলেন না। কথা ছিল সেদিন সন্ধ্যায় তিনি ঘরে আসবেন। উৎকণ্ঠিত খাদিজা লোক পাঠালেন মুহাম্মদের খোঁজে। অবশ্য অল্পসময় পরে মুহাম্মদ দুয়ারে উপস্থিত হয়ে গেলেন। তাঁকে বিবর্ণ দেখাচ্ছিল এবং শরীর কপিছিল। তিনি বললেন ; আমাকে আবৃত করো তখন তাঁকে চাদর দিয়ে আবৃত করা হলো। কিছু সময় পর যখন মুহাম্মদ স্বাভাবিক হলেন এবং সংবিৎ ফিরে আসলে তিনি খাদিজাকে ঘটনা বর্ণনা করেন।

নির্ভরযোগ্য হাদিস সংগ্রাহক বুখারি, মুসলিম বিন আল হাজ্জাজ, আবু দাউদ আল তায়ালিসি, ইবনে আব্দুল আল-বার, নুয়ারি এবং ইবনে সাইয়েদ আন-নাস প্রণীত হাদিস গ্রন্থে এবং বিখ্যাত ধর্মবিশারদ ইমাম আহমদ বিন হানবলের (১৬৪ হিজরি বা ৭৮০ খ্রিস্টাব্দ-২৪১ হিজরি/৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ) মুসনাদে বর্ণিত : হজরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ-এর প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহি আসে, তা ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়ে এবং তিনি হেরা-গুহায় নির্জনে থাকতেন। আপন পরিবারের কাছে ফিরে আসা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া, এভাবে সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন।

তারপর খাদিজা (রা)-র কাছে ফিরে এসে আবার অনুরূপ সময়ের জন্য কিছু খাদ্যসামগ্ৰী নিয়ে যেতেন। এমনিভাবে হেরা-গুহায় অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে ওহি এলো। তাঁর কাছে ফেরেশতা এসে বললেন, ‘পড়ুন। রসূলুল্লাহ (সা) বলেন ; আমি বললাম, আমি পড়ি না”। (বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড, হাদিস নম্বর ৩, পৃ. ৫ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।-অনুবাদক)

হাদিস অনুযায়ী মুহাম্মদ তাঁর অভিজ্ঞতা খাদিজাকে জানালেন এভাবে ; তারপর তিনি (ফেরেশতা) আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হলো। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘পড়ুন। আমি বললাম আমি তো পড়ি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে আমার অত্যন্ত কষ্ট হলো। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন : পড়ুন। আমি জবাব দিলাম, আমি তো পড়ি না। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তারপর তৃতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ুন, আর আপনার রব মহামহিমাম্বিত। (৯৬:১-৩)। এরপর ফেরেশতা উধাও হয়ে গেলেন। আমি সজাগ হলাম এবং ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। হাদিসের অনুবাদটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বুখারী শরীফ থেকে সংগৃহীতঅনুবাদক)। পরে মুহাম্মদ খাদিজাকে জানালেন যে তিনি তাঁর জীবনের জন্য ভীত ছিলেন। এ-সবের কী ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে? কেন তিনি এত ভীত হলেন? মুহাম্মদ কী ভেবেছিলেন তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন, কোনো জাদুর প্রভাবে পড়েছেন, অথবা কোনো নিরাময়-অযোগ্য রোগ তাঁকে কাবু করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা কিছুটা পাই খাদিজা যখন মুহাম্মদকে সান্তুনা দিয়ে উত্তর দিলেন: আপনি একজন অতিশয় সৎ ব্যক্তি। আপনি দরিদ্রদের প্রতি অত্যন্ত সদয়, আপনি অতিথি-বৎসল, আপনি আপনার পরিবারের প্রতি এত স্নেহশীল, পীড়িতদের প্রতি আপনি অত্যন্ত উপকারী। তাই বিধাতা কখনোই আপনাকে তাঁর যত্ন থেকে বঞ্চিত করবেন না।”

খাদিজার সাথে কথোপকথনের পর মুহাম্মদ স্বাভাবিক হলেন। তখন খাদিজা তাড়াতাড়ি গৃহ থেকে বের হলেন এ ঘটনা তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফলকে জানানোর জন্য। হানিফ মতাবলম্বী ওয়ারাক মক্কাবাসীর পৌত্তলিকতাকে ঘৃণা করতেন। তাই ওয়ারাকা একদা মুহামদকে উপদেশ দিয়েছিলেন কুরাইশদের এড়িয়ে চলতে। তিনি মুহামদকে ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক কর্মে অনুরক্ত হতেও উপদেশ দিয়েছিলেন। খাদিজার মুখে ঘটনাবলী শুনে ওয়ারাকা বললেন: “খুব সম্ভবত এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে আল্লাহ তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক করছেন এবং মানবতাকে পথ দেখানোর জন্য তাঁকে নির্দিষ্ট করেছেন।”

আয়েশার এই বক্তব্য থেকে অতিপ্রাকৃত কিছুই পাওয়া যায় না। তাঁর সকল বর্ণনা মনোবিজ্ঞানের সাধারণ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে। মনের মধ্যে প্রবল ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা থাকলে কল্পনার জগতে মানুষ তার বাস্তবায়ন ঘটায় নানাকিছু ভাবনা-চিন্তা করে, নানা কাহিনীর জাল বুনে। কল্পনার জগতে বিরাজ করতে করতে মানুষ অনেক সময় কল্পনার জগত আর বাস্তব জগতের মধ্যে তফাৎ করতে পারে না। তার মধ্যে ভ্রম সৃষ্টি হতে পারে। তার মনে হয় দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা যেন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। মুহাম্মদ ত্রিশ বছর ধরে চিন্তা-ভাবনায় মশগুল ছিলেন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের সন্ন্যাসী-ঋষির সাথে সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। একেশ্বরবাদের প্রতি গভীরভাবে একনিষ্ঠ হয়েছেন। এরপর হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানরত হন এবং সেখানে অনেক কঠোর তাপসদের সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের পৌত্তলিকতা বিরোধিতা এবং একেশ্বরবাদের ভাষ্য তাঁকে আলোড়িত করে। সব মিলিয়ে স্রষ্টা-সৃষ্টি-ধর্ম সম্পর্কিত প্রশ্নে মুহাম্মদের মন প্রচণ্ড উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। তাই একসময় হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে ধ্যান করতে করতে তাঁর ধারণা হলো, কোনো অশরীরী আত্মা তাঁর সামনে উপস্থিত হয়েছে। অথবা এটা এমনও হতে পারে যে, ধ্যানরত অবস্থায় তাঁর অবচেতন মন থেকে সাড়া আসলো এখন সময় এসেছে সক্রিয় হবার। সক্রিয় হবার ভীতি তাঁর মনে এতোই প্রভাব বিস্তার করল যে, তিনি প্রণত হলেন এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া নিজের জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পূর্বে দেবদূত (ফেরেশতা) তাঁকে কাবু করে ফেলার ঘটনার আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবসমত ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। এখানে দেবদূতের আবির্ভাব তাঁর মনে দীর্ঘ লালিত সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন মনে করা যেতে পারে।

এই বিশ্লেষণ পুরোটা অনুমানিক হলেও এর সমর্থন পাওয়া যায় অন্য এক ভাষ্য থেকে। এই ভাষ্য অনুযায়ী মুহাম্মদ একবার খাদিজাকে বলেছিলেন : ‘আমি যখন ঘুমাচ্ছিলাম তখন তিনি (ফেরেশতা) একটা সুদৃশ্য কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা বই নিয়ে আসলেন। ফেরেশতা বললেন, ‘পড়ুন! আমি জেগে উঠলাম এবং মনে হলো যেন আমার হৃদপিণ্ডে একটা বই স্থাপিত হয়েছে। এই ভাষ্য থেকে মনে করা যায়, প্রগাঢ় ধ্যানের শ্রান্তি মুহামদকে ক্রমেই মোহগ্ৰস্ত করে ফেলে। তিনি ঘুমের সময়ও তাঁর তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পান স্বপ্নে। এই স্বপ্নদর্শন তাঁর চেতনার জগতকে সন্ত্রস্ত করে দেয়। হজরত আয়েশার আরেকটি বর্ণনা আছে : ‘আল্লাহর নবির তখন শরীর কাঁপছিল। তিনি খাদিজাকে বললেন, “আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও!”খাদিজা তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তাঁর কাঁপুনি দূর হলো। ( আয়েশা বর্ণিত হাদিসটির বাংলা অনুবাদের সূত্র উপরে উল্লিখিতঅনুবাদক)। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে মুহাম্মদের শরীরে কাঁপুনি সৃষ্ট হয়েছিল তার নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা থেকে। ধারণা করা যায়, এই ধরনের অবস্থা হয় সেই ব্যক্তির, যে দ্বৈত জীবনযাপন করে-একদিকে সাধারণ জীবন, অন্যদিকে স্বপ্নময় অলীক অভ্যন্তর জীবন। এই দুই জীবনের মধ্যেকার তফাৎ তৈরি করতে অক্ষম সেই ব্যক্তি। এই ঘটনার পর মুহাম্মদ আরও দুইবার হেরা পর্বতের ঐ নির্জন গুহায় যান। কিন্তু এবার আর কোনো কিছু দেখলেন না; কোনো ফেরেশতা আসলেন না, বা কারো কণ্ঠস্বরও শুনতে পেলেন না। মুহামদকে লেখাপড়া না-জানা একজন মানুষ হিসাবে চিত্রিত করা হয়। তাহলে কেন মহান আল্লাহ তাকে ইকুরা অর্থাৎ “পড় এই আদেশ দিয়ে সুরা নাজিল করবেন?)

মুহাম্মদের এই পুরো অভিজ্ঞতাটি স্বপ্ন বা অলীক বিশ্বাস ছাড়া কি বেশি কিছু ছিল? এটা কী নবুওতি প্রদানের কোনো আলামত ছিল কিংবা ওয়ারাকা বিন নওফলের কোনো ভবিষ্যদ্বাণী ছিল? এরপর থেকে ক্ষয়িষ্ণু সন্দেহে মুহামদের মন জর্জরিত হতে থাকে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছায় যে, কয়েকবার তিনি উচু পাহাড়ের উপর থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার কথা চিন্তা করলেন। কিন্তু খাদিজা ও ওয়ারাকা সর্বদা মুহামদকে শান্ত করতেন এবং আশার বাণী শোনাতেন।

ইসলামের ঐতিহাসিক ভাষ্যমতে মুহাম্মদের কাছে প্রত্যাদেশ বন্ধ থাকার সময়কাল বিভিন্ন রকম। অনেকের মতে এই ফাঁকা সময় ছিল তিনদিন, কেউ বলেন তিন মাস, আবার কারো কারো মতে তিন বছর। আবার কেউ কেউ বলেন এই অবস্থা বিরাজমান থাকে যতক্ষণ না সুরা মুদ্দাসসির নাজিল হয়। এরপরে আবার প্রত্যাদেশ আসা বন্ধ হয়ে যায়।
কী কারণে প্রত্যাদেশ আসা বিঘ্নিত হয় তা বোঝা কঠিন নয়। প্রথমবার স্বপ্নবিভোর হয়ে দেবদূত দেখার পর মুহাম্মদের মনে যে দীর্ঘদিনের জ্বলন্ত জিজ্ঞাসা ছিল তা প্রশমিত হয়ে যায়। ঐ দৈবদর্শনে সুদীর্ঘ সময় ধরে লালিত মনের গভীরে সঞ্চিত প্রশ্নসমূহের উত্তরের আগ্রহমিটে যায়। স্বভাবিকভাবেই এরপর আসে সন্দেহ এবং নৈরাশ্য। মনের ভেতর গচ্ছিত আকাঙ্ক্ষাকে পুনর্বার প্রজ্জ্বলিত করার জন্য প্রয়োজন আরও একনিষ্ঠ ধ্যান এবং গভীর একাগ্রতা; যা মস্তিষ্ককে আলোড়িত করবে, এবং একসময় আবারও বাস্তব ও কল্পনাএই দুই জগতের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেবে। ফলে অন্তর্মুখী মুহাম্মদের মানস সরোবরে যা লুকিয়ে আছে তা আবার ভেসে উঠবে এবং তাঁকে তাড়িত করবে।

উপরে হজরত আয়েশার দেয়া বিবরণ আমরা পড়েছি। মুহাম্মদের মৃত্যুর এক শতাব্দী পূরণের আগেই একেবারে ভিন্ন বক্তব্য আসতে থাকে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জীবন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাহিনী সত্য বক্তব্যের ভেতরে ঢুকে পড়ে। যতই দিন যেতে থাকে ততই কাল্পনিক ও অলৌকিক ঘটনার সমারোহ বৃদ্ধি পায়। এ ব্যাপারে ইবনে ইসহাকের লেখা নবির জীবনী যা ইবনে হিশামের পাণ্ডুলিপিতে এখনো পাওয়া যায়, তার কিছু কিছু উল্লেখ রয়েছে। ইবনে ইসহাক হিজরি ১৫০ (৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ) সালে মারা যান এবং মৃত্যুর কিছু আগে তাঁর লেখা শেষ করেন। এখানে তাঁর বই থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া হলো: নবি হবার আগে যখন মুহাম্মদ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে মক্কার বসতবাড়ির বাইরে যেতেন এবং যখন বসতবাড়ি একটি বাঁকের পেছনে দৃষ্টিসীমার বাইরে যেত, তখন প্রত্যেক পাথরের শীলাখণ্ড যার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন, এরা বলে উঠতো ; হে আল্লাহর প্রতিনিধি! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! কিন্তু এদিক-সেদিক তাকালে মুহাম্মদ কাউকে দেখতে পেতেন না। তাঁর চারিদিকে শুধু দেখতেন গাছপালা এবং পাথরখণ্ড।’

একখণ্ড পাথর নিম্প্রাণ বস্তু। আর গাছগাছালির শব্দ সৃষ্টির জন্য কণ্ঠনালী নেই, যা দ্বারা তারা তাদের চিন্তা বা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। যুক্তির বিচারে এই গল্প এতোই অনুপযুক্ত যে, পরবর্তীতে নবির অনেক জীবনীকারক এই গল্প সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেতে পারেননি। তাঁরা বলেন, যে কণ্ঠস্বর শোনা যেত তা হবে ফেরেশতার কণ্ঠস্বর। নবির জীবনীকারকদের ভাবনায় এই বিষয়টি আসেনি যে, মুহাম্মদ যদি এরকম ডাক কখনো শুনেও থাকেন সেটা হতে পারে নিজেরই অন্তরের ডাক। গায়েবি কিছু নয়। অনেক বছরের একাগ্র ধ্যান ও একই চিন্তায় নিমগ্নতার ফলে সে চিন্তাভাবনা বাস্তব মনে হতে পারে এবং তা অনেক সময়। যাহোক, ধর্মবিশারদের উদ্বিগ্ন হলেও ইবনে হিশামের বক্তব্য নিয়ে বিরোধিতা করতে চান না। তাই তাঁরা এই রহস্যপূর্ণ কণ্ঠস্বরকে কোনো দেবদূত বা ফেরেশতার কণ্ঠস্বর বলে চালিয়ে দিতে চান। কিন্তু এর ফলে কী অনুসিদ্ধান্ত দাঁড়ায় তা বুঝতে তাঁরা ব্যর্থ। ফেরেশতা যদি মুহামদকে সত্যিই সম্ভাষণ করতেন, নিশ্চয়ই তাঁরা তা করতেন প্রকাশ্যে, সবার সামনে। আড়ালে বা লুকিয়ে সম্ভাষণ করার কোনো প্রয়োজনীয় দিক বা উপযোগিতা নেই। প্রকাশ্যে করলে মক্কাবাসী সকলে একবাক্যে মুহাম্মদের কথায় বিশ্বাস করতেন, এবং আল্লাহর যে আসল অভিপ্রায় ছিল সমস্ত আরবজাতিকে ইসলামে দীক্ষিত করার, তাও পূর্ণ হয়ে যেত তাড়াতাড়ি কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই। এসব ধর্মবিশারদদের নজরে আসেনি যে তথাকথিত গায়েবি আওয়াজ নবির নিজস্ব কাল্পনিক ভাবনা থেকে উৎপন্ন হতে পারে। অথবা অন্য বিষয়েও কিছু চিন্তা করা যেত। নবি শহরের বাইরে শুধুমাত্র একা গেলেই যদি সেই কণ্ঠস্বর শুনতেন তবে অন্যরা কিভাবে তা জানতে পারলেন? নবি কোনোদিন এই বিষয়ে কিছু বলেননি। এমন-কী কোনো প্রামাণিক হাদিসেও এই ঘটনার বিবরণ নেই। সুতরাং এটা পরিষ্কারভাবে এক কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে ইবনে ইসহাক যে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা সংবাদ দিয়েছেন তাও বলা যায় না। তিনি নিশ্চয়ই কারো কাছ থেকে এই বক্তব্য শুনেছেন এবং কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তা গ্রহণ করেছেন। কেননা এই বক্তব্য তাঁর নিজের অলৌকিকতার প্রতি বিশ্বাসের সাথে খাপ খায়। সম্ভবত ইবনে ইসহাক নিজেকে বা সংবাদদাতাকে জিজ্ঞাসা করেননি যে, অন্য কেউ কী শুনেছে পাথরের টুকরো অথবা গাছপালা নবিকে সম্ভাষণ জানিয়েছে। তাছাড়া নবি নিজে এই ঘটনা ব্যক্ত করেছেন এই ধরনের কোনো আলামত সংবাদদাতার কাছে ছিল কী না। আল্লাহ যে মুহাম্মদকে নিজের মনোনীত দূত বানিয়েছেন তার একমাত্র দাবি হচ্ছে মুহাম্মদের স্ত্রী আয়েশার বিবৃতি, যা আগেই আমরা দেখেছি।

বেশিরভাগ মানুষই তার অর্জিত বিশ্বাসের মধ্যে বন্দী এবং শারীরিক ও সহজাত প্রবৃত্তির প্রতি অনুগত। আর এতে মানুষের যৌক্তিক ক্ষমতা হ্রাস পায়। পরিষ্কারভাবে চিন্তা-বিশ্লেষণ তারা করতে পারে না। তখন তারা আসল ঘটনাকে উপেক্ষা করে যা তাদের বিশ্বাসের সাথে সংঘাত সৃষ্টি করে। তারা যা কিছুর মধ্যে তাদের ধারণা ও বিশ্বাসের আলামত পায় তাকেই আঁকড়ে ধরে। মানুষের এই আচরণ ও মানসিকতাই হচ্ছে কুসংস্কার এবং বিভ্রম বিস্তারের কারণ।

নবুওতি অর্জনের পর

প্রথম অধ্যায় । নবি মুহাম্মদ । নবুওতি অর্জনের পর

মুহাম্মদের বয়স যখন চল্লিশ, তখন এক প্রত্যাদেশ দ্বারা আল্লাহ মুহামদকে প্রেরিত পুরুষ হিসেবে নিয়োজিত করেন। প্রত্যাদেশের এই বাণী সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতে বর্ণিত আছে। কিন্তু ইসলামের প্রচার কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, কারণ ওহি নাজিল হওয়াতে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিঘ্ন ঘটেছে একাধিকবার। প্রথম দিকে ইসলামের প্রচার হয়েছে গোপনে এবং সামান্য কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সুরা আলাকের পরে আরও সাতটি কিংবা দশটি সুরা প্রকাশ পায়। এ-থেকে প্রতীয়মান হয় যে শুরুতে ইসলামের প্রচার মক্কাবাসীর কাছে উপহাস্যবলে পরিগণিত হয় এবং প্রত্যাখাত হয়। মুহামদ তখন বিমর্ষ হয়ে যান, তার মধ্যে দ্বিধাবোধ তৈরি হয়। ইসলামের জন্য এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, কোরান সম্পাদিত হয়েছে অগোছালোভাবে। কোরানের বিষয়বস্তুকে নিতান্ত এলোমেলোভাবে সাজানো হয়েছে। যারা কোরান অধ্যয়ন করবেন তারা বিসিত হবেন যে, কোরানের সংকলকেরা কেন সুরা বা আয়াতের আগমনের ধারা অনুযায়ী কোরানের সুরা ও আয়াতগুলোকে বিন্যস্ত করেননি। মুহাম্মদের চাচাতো ভাই হজরত আলি বিন আবু তালিব সময়ের ক্রমানুযায়ী একটি কোরান সংকলন করেছিলেন; যদিও তা পরবর্তীতে হারিয়ে যায়। সময়কাল অনুযায়ী কোরান সংকলন হলে কোরানের বিষয়বস্তু অনেক অর্থবহ ও বাস্তবসম্মত হত, এবং এর ফলে ভবিষ্যত প্রজন্ম ইসলামের উত্থান এবং এর প্রতিষ্ঠাতার অনুপ্রেরণা ও চিন্তাভাবনার সাথে সহজে পরিচিত হতে পারতো।

কোরান সংকলনের প্রথম পদক্ষেপ নেন হজরত ওমর। আবু বকর খলিফা হবার পর ওমর তাঁর সাথে দেখা করে কোরান সংকলনের পক্ষে যুক্তি দেখান। হজরত ওমর বলেন, নবির মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই কোরানের বিষয়বস্তু ও শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে মুসলমিদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ কোরানের বাণী যেসব সাহাবি মুখস্ত রাখতেন তাদের কেউ কেউ ইয়ামামার যুদ্ধে মারা গেছেন। এছাড়া তাল গাছের পাতায় লিখিত কোরানের বাণী খেয়ে ফেলেছে পশুরা। ওমরের বক্তব্যে হজরত আবু বকর আপত্তি জানালেন। তিনি বললেন : কোরানের সংকলন যদি আবশ্যিকই হতো তাহলে নবি তাঁর জীবিত থাকাকালেই এ-বিষয়ে পদক্ষেপ নিতেন। এরপরও ওমরের দীর্ঘ অনুরোধের জন্য শেষমেশ মদিনার খাজরাজ গোত্রে জন্মগ্রহণকারী সাহাবি জায়েদ বিন সাবিতকে ডাকা হয়। জায়েদ ছিলেন মুহাম্মদের সর্বশেষ কোরান লেখক। খলিফা আবু বকর জায়েদকে কোরান সংকলনের ভার অর্পণ করেন। আবু বকরের পর ওমর খলিফা হলে কোরান সংকলনের ভার গিয়ে পৌছায় হজরত উসমানের উপর। উসমান তাঁর সহকর্মীদের আদেশ দিলেন কোরানের সুরার দৈর্ঘ্য অনুযায়ী কোরানের সংকলনের জন্য। এতে করে মক্কার অনেক আয়াত মদিনার সুরাতে এবং মদিনার আয়াত মক্কার অনেক সুরাতে ঢুকে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ও ইউরোপের গবেষক বিশেষ করে থিওদর নোলদেক কোরানের বিষয়বস্তুর অবিচ্ছন্নতা, ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ও ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে সুরাগুলির মানে ও মোটামুটি তারিখ অনুযায়ী কোরান বিন্যস্ত করেছেন”। যা-হোক, প্রারম্ভিক মক্কার সুরাগুলিতে ইসলামের প্রথম কয়েক বছরের প্রচুর সংগ্রামের বিবরণ পাওয়া যায়। সুরা দোহার প্রথম দুই আয়াতের পরই আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন :

‘তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়ে যাননি ও তোমার ওপর তিনি অসন্তুষ্টও নন।
তোমার জন্য পরকাল ইহকালের চেয়ে ভালো।
তোমার প্রতিপালক তো তোমাকে অনুগ্রহ করবেনই আর তুমিও সন্তুষ্ট হবে।
তিনি কি তোমাকে ভুল পথে পেয়ে পথের হদিস দেননি?
তিনি কি তোমাকে অভাব দেখে অভাবমুক্ত করেননি? ( সুরা দোহা আয়াত ৩-৮)।

মুহাম্মদের কী হয়েছিল যে আল্লাহ তাঁকে সান্তনা দিবেন এবং উৎসাহিত করবেন? সুরা দোহার তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ বলছেন : ‘তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়ে যাননি ও তোমার ওপর তিনি অসন্তুষ্টও নন -এই আয়াতটা কী প্রত্যাদেশ প্রেরণের যে বিরতিটুকু চলছিলতা শেষ হবার পর নাজিল হয়েছিল! প্রত্যাদেশ প্রেরণের মধ্যবর্তী বিরতিতে মুহাম্মদ কি বা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন এই ভেবে যেতাঁর রব তাঁকে হয়ত ত্যাগ করেছেন? পরে তিনি নিজেকে যা দিয়ে প্রবোধ দেন সেটাই হয়ে দাঁড়ায় সুরা দোহা। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এ সুরা নিজের সাথে নিজের কথা বলা মাত্র। যদি কোরান অবতরণের উদ্দেশ্য থাকে মানব জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনা করা তবে সেক্ষেত্রে এই সুরার কোনো উপযোগিতাই নেই, একই কথা অন্যান্য অনেক সুরা ও আয়াতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। তফসির আল-জালালাইনে এভাবেই লেখা হয়েছে। এই ধারণা যদি সঠিক হয় তবে কালানুক্রম অনুযায়ী সুরা দোহা কোরানের দ্বিতীয় সুরা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ধারাবাহিকতার ক্রম হিসেবে ১১তম সুরা ধরা হয় এবং বর্তমান কোরানের সংকলনে এটির অবস্থান ৯৩তম। সুরা দোহা পাঠ করলে বোঝা যায় এই সুরায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মুহামদকে আল্লাহ সান্তনা এবং উৎসাহ দিচ্ছেন। এই ধারণা করা যায় যখন আমরা সুরা দোহার পরবর্তী ৯৪তম সুরা ইনশিরাহ এর প্রথম দুটি আয়াত পাঠ করি।

কালানুক্রমিকভাবে ইনশিরাহকে ১২তম বলে ধরা হয়। এই সুরার আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ মুহাম্মদকে বলছেন : ‘আমি কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করিনি? আমি হালকা করেছি তোমার ভার (৯৪:১-২)। এই দুই আয়াত ও অন্য আয়াতগুলি এবং এর পূর্বের সুরা দোহার বিষয়বস্তু প্রায় একই। তাই বলা যায়, এই দুই সুরায় আল্লাহ মুহাম্মদের দুশ্চিন্তা লাঘব করে তাঁর দৃঢ়সংকল্পকে শক্তিশালী করেছেন। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে বলা যায়, আসলে এই দুইটি সুরা মুহাম্মদের মনের ভেতরে লুকায়িত ইচ্ছা ও আশার প্রতিফলন মাত্র।

ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে মুহামদ গোপনে অল্পসংখ্যক ব্যক্তিদের মধ্যেই তাঁর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেন। পরে সুরা শোআরার ২১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নতুন এক আদেশ দিলেন : “তুমি তোমার আতীয়স্বজনকে সতর্ক করে দাও।”(২৬:২১৪)। এই আয়াত প্রাপ্ত হয়ে মুহাম্মদ (৬১৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে) কুরাইশ নেতাদের সাফা পর্বতে এক সভায় ডাকলেন। তারা সমবেত হলে মুহাম্মদ তাঁদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আবেদন জানান। নেতাদের মধ্যে থেকে মুহাম্মদের চাচা আবু লাহাব উঠে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে ও ক্রুদ্ধস্বরে বললেন : মুহাম্মদ, তুমি ধ্বংস হও! তুমি কী এ-জন্য আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছ? আবু লাহাবের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের জবাব আসলো ১১১তম সুরা লাহাব বা আল-মাসাদের মধ্য দিয়ে। এই সুরার প্রথম আয়াতে আবু লাহাবের উচ্চারিত শব্দ অর্থাৎ ধ্বংস হও ব্যবহৃত হয়েছে : “ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত! আর সে নিজে। (১১১:১) আবু লাহাব তার সম্পদ এবং সন্তানদের জন্য গর্বিত ছিল। তাই আল্লাহ জানিয়ে দিলেন :

তার ধনসম্পদ ও উপজিন তার কোনো কাজে আসবে না।
সে ভুলবে অগ্নিশিখায় ( ১১১: ২-৩)

মুহাম্মদ যে পথ দিয়ে হাটতেন সে পথে আবু লাহাবের স্ত্রী উমে জামিল কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। তিনিও আল্লাহর শাস্তি থেকে নিস্তার পেলেন না। নাজিল হলো পরবর্তী আয়াত :

‘আর তার জ্বালানিভারাক্রান্ত স্ত্রীও, যার গলায় থাকবে কড়া আঁশের দড়ি।’ (১১১:৪-৫)।

নবি হবার পর তেরো বছরের ঘটনাসমূহ এবং সর্বোপরি মক্কায় নামানো সুরাগুলি পাঠ করলে মনে হয় এ-যেন একজন ব্যক্তির উপাখ্যান যিনি একা তাঁর গোত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এবং তাদেরকে বোঝানোর জন্য ও তাদের বিরোধিতা অতিক্রম করার জন্য কোনো পদ্ধতিই বাদ দেননি। এমন-কী সাহায্যের জন্য আবিসিনিয়ার সম্রাট নিগাসের নিকট তিনি তাঁর কয়েকজন অনুগতকে পাঠালেন। উপহাস ও বিরোধিতার মুখে মুহাম্মদ কখনো পিছপা হননি। যখন মুহাম্মদের পুত্র কাসেম মারা যায় তখন আলাস বিন ওয়ায়েল মুহাম্মদকে উপহাস করেন উত্তরাধিকারহীন বলে। এজন্য সুরা কাউসারে বলা হলো : যে তোমার দুশমন, সে-ই তো নির্বংশ।’ (১০৮:৩)। হজের সময় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি তীর্থযাত্রী হতেন। যখন মুহামদ প্রভাবশালী লোকদের ইসলামে দীক্ষিত হবার আমন্ত্রণ জানাতেন তখন তাঁর চাচা আবু লাহাব তাঁকে অনুসরণ করতেন এবং তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলতেন । আমার এই ভ্রাতুষ্পপুত্র এক পাগল। সে কী বলে তার প্রতি আপনারা কর্ণপাত করবেন না। সুরা তুর কোরানের জীবন্ত এবং সুরেলা সুরাগুলোর মধ্যে অন্যতম মক্কি সুরা। মুহাম্মদের সাথে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও স্বদেশবাসীর বচসার বর্ণনা এই সুরায় পাওয়া যায়। এখানে এই সুরার ২৯-৩১ এবং ৩৩-৩৪ আয়াতের উদ্ধৃতি দেয়া হলো :
অতএব তুমি উপদেশ দিতে থাকো তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহে তুমি ভবিষ্যদ্বক্তা বা পাগল নও।

ওরা কি বলে সে এক কবি আমরা তার অনিশ্চিত দেবের (মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছি
বলো তোমরা প্রতীক্ষা করে আমিও তোমাদের সঙ্গে প্রতীক্ষা করছি। ”
ওরা কি বলে এ (কোরান) তার নিজের রচনা না তারা বিশ্বাস করে না।
তারা যদি সত্যবাদ হয় এর মতো কোনো রচনা নিয়ে আসুক-না/’ (৫২:২৯-৩১, ৩৩-৩৪)

মুহাম্মদের সাথে তাঁর স্বদেশবাসীদের বাদানুবাদের আরও উদাহরণ পাওয়া যাবে মক্কি সুরা তাহায় (২০)। মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছিল তার বর্ণনা পাওয়া যায় সুরা ফুরকানে : অবিশ্বাসীরা বলে, “এ মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়। সে (মুহাম্মদ) এ বানিয়েছে ও অন্য সম্প্রদায়ের লোক তাকে এ-ব্যাপারে সাহায্য করেছে। ওরা তো সীমালঙ্ঘন করে ও মিথ্যা বলে। ওরা বলে, “এগুলো তো সেকালের উপকথা যা সে লিখিয়ে নিয়েছে। এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তাকে শেখানো হয়। ’ বলো, “এ তিনিই অবতীর্ণ করেছেন, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সব রহস্য জানেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ওরা বলে, “এ কেমন রসুল যে খাবার খায় ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করে! তার কাছে কেন ফেরেশতা পাঠানো হয় না যে তার সঙ্গে থাকবে ও ভয় দেখাবে, বা তাকে ধনভাণ্ডার দেওয়া হয় না কেন, বা তার একটাও বাগানও নেই কেন যেখান থেকে সে তার খাবার যোগাড় করতে পারবে? সীমালঙ্ঘনকারীরা আরও বলে, “তোমরা তো এক জাদুগ্রস্ত লোকের অনুসরণ করছ!’ (সুরা ফুরকান ; আয়াত 8:৮)

মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিবরণ একাধিক মক্কি সুরাতে রয়েছে। মক্কাবাসীরা তাঁকে বলতো, উন্মাদ, জিনের প্রভাবে আক্রান্ত, একজন জাদুকর, কবি এবং শয়তানের দোসর। কোরানের আয়াতগুলোকে বলা হলো জাদুমন্ত্র। কখনো বলা হলো যে,
মুহাম্মদের মুখনিঃসৃত বাক্য যা নিশ্চিতভাবে অন্যের দ্বারা লিখিত, কেননা তিনি লেখাপড়া জানতেন না। যারা তাঁর সমালোচনায় অপেক্ষাকৃত নরম ছিলেন তারা বলতেন মুহাম্মদ আসলে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, তিনি অলীক স্বপ্নে আচ্ছন্ন অথবা একজন কবি যিনি তাঁর কল্পনা প্রকাশ করছেন ছন্দযুক্ত গদ্যের মধ্য দিয়ে।

মক্কি সুরাতে অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো সুরার প্রধান বাদানুবাদ থেকে বিচ্যুত। এ-থেকে বোঝা যায় মুহাম্মদ প্রবল বিরোধিতার মুখে কখনো নিরাশ হয়ে যেতেন এবং তাঁর সংকল্প দুর্বল হয়ে যেত। ফলে তাঁর মধ্যে অপোষ করার ভাবনা তৈরি হয়। তিনি মনে করলেন এই আপোষের বিনিময়ে তাঁর বিপক্ষের লোকের থেকে শক্রতা মুক্ত হয়ে বন্ধুত্ব পেতে পারবেন। তিনি পৌত্তলিকদের সাথে সমঝোতায় আসার কথা বিবেচনা করলেন। এই বিষয়ে সুরা বনি-ইসরাইলে বর্ণিত হয়েছে : ‘আমি তোমার কাছে যে প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি তার থেকে তোমার বিচ্যুতি ঘটানোর জন্য ওরা চেষ্টা করবে যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু মিথ্যা কথা বানাও, তা হলে, ওরা অবশ্যই বন্ধু হিসেবে তোমাকে গ্রহণ করবে। আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখলে তুমি ওদের দিকে কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে। তুমি ঝুঁকে পড়লে অবশ্যই আমি তোমাকে ইহজীবন ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতাম, তখন আমার বিপক্ষে তোমাকে কেউ সাহায্য করত না।’ ( ১৭:৭৩-৭৫)।

উক্ত তিনটি আয়াতের বিশ্লেষণ প্রয়োজন রয়েছে। সত্যি কী একটা সময় ছিল যখন কুরাইশদের প্রবল বিরোধিতার মুখে মুহাম্মদ ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং আপোষ অথবা নিদেনপক্ষে কিছু সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন? হয়তোবা এ-বিষয়টি সত্য হতে পারে। মানব-চরিত্র এমনই যে, সে সমস্যায় পড়লে অথবা যখন জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে যায় তখন এই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এছাড়াও কোরানের অনেক তফসিরকারক বলেছেন, এই আয়াতগুলোর পরিপ্রেক্ষিত ছিল একটা ঘটনা যাকে সারসের ঘাড় বাঁকানোর ঘটনাবলা হয়ে থাকে। এই ঘটনার বিবরণ মুহাম্মদের অনেক জীবনীকারক বর্ণনা করেছেন।

এই বর্ণনানুযায়ী একদা কাবার নিকটবর্তী এক স্থানে নবি কয়েকজন কুরাইশের কাছে সুরা নজম আবৃত্তি করে শোনান। ছন্দোবদ্ধ এই সুরায় যেমন আছে আধ্যাত্মিক অনুভূতি, তেমনি মন কেড়ে নেবার শক্তি। নবি যখন তাঁর ধর্মের সত্যতা ব্যাখ্যা করছিলেন তখনই ফেরেশতা নিয়ে আসলেন এক নতুন অনুপ্রেরণা। ফলে নবি উচ্চারণ করলেন সেই প্রসিদ্ধ আয়াতদ্বয় ; তোমারা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওজা সম্বন্ধে, আর তৃতীয়টি মানাত সম্বন্ধে? (৫৩:১৯-২০)। আয়াত দুটি উচ্চারণের সময় নবির গলার স্বর ছিল প্রায় ঘৃণাপূর্ণ, অর্থাৎ নবি বোঝাতে চেয়েছিলেন এইসব মূর্তিগুলো আসলে অসার। কিন্তু এরপর নেমে আসলো আরও দুটি আয়াত, যা পরবর্তীতে কোরান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, আয়াত দুটি নাকি শয়তান নবির মুখে দিয়েছিল, যার জন্য নবি পরে আক্ষেপ করেছেন। আয়াতদ্বয় ছিল : ‘এরা হচ্ছে সেই উড়ন্ত সারস। তাই এদের মধ্যস্ততা আশা করা যেতে পারে। এ-কথা বলে নবি নতজানু হলেন। তা দেখে তাঁর সাথে কুরাইশরাও নতজানু হলেন তিন দেবীকে সম্মান দেখানোর জন্য। তারা ভাবলো এতদিন পরে মুহাম্মদ তিন দেবীর মধ্যস্থতার ক্ষমতা স্বীকার করে নিয়েছেন।

যারা মনে করেন নবি মুহাম্মদ ছিলেন ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে তাঁরা আসলে অস্বীকার করবেন যে, মুহামদ কোনোদিনই এমন কথা বলেননি যা তাঁর নীতির সাথে সামঞ্জস্যহীন। তাই তাঁরা ঐ কাহিনীকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। এমনকি কোরান থেকে দুটি আয়াত মুছে ফেলতেও দ্বিধা করেননি। এরপরও অনেক প্রামাণ্য দলিল এবং কোরানের তফসিরকারকদের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় আসলেই এ-ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।

কোরানের বিখ্যাত তফসিরগ্রন্থ তফসির আল-জালালাইনে লেখা হয়েছে ঐ দুই আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয় আরও একটি আয়াত। সুরা হজের আয়াত ৫১। ধারণা করা হয় সুরা নজমের দুটি আয়াত উচ্চারণের জন্য নবির মনে তীব্র অনুশোচনা সৃষ্টি হয় তা থেকে নিবৃত্তির জন্য এবং নবিকে সান্তনা দেবার জন্য সুরা হজের এই বিশেষ আয়াত নাজিল হয়। নবিকে এই বলে আশ্বস্ত করা হয় ; আমি তোমার পূর্বে যেসব নবি ও রসুল পাঠিয়েছিলাম তারা যখনই কিছু আবৃত্তি করত তখনই শয়তান তাদের আবৃত্তিতে বাইরে থেকে কিছু ছুড়ে ফেলত। কিন্তু শয়তান যা বাইরে থেকে ছুড়ে ফেলে আল্লাহ তা দূর করে দেন। তারপর আল্লাহ তাঁর আয়াতগুলোকে সুসংবদ্ধ করেন। আর আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী। (সুরা হজ, ২২:আয়াত (৫২) |

কোরানের অন্যত্র এই ধরনের আয়াত আরও আছে। এই (শয়তান-সংশ্লিষ্ট) আয়াতগুলি ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ থেকে এটা পরিষ্কার যে, নবি আসলে ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে ছিলেন না। ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনেক পণ্ডিতেরাও এরকম মনে করেন-নবি শুধুমাত্র তাঁর নবুওতির নীতির ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে ছিলেন। এখন যদি স্বীকার করে নেয়া হয় যে, নবি মুহামদ আসলে ব্যক্তিগত ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে ছিলেন না, তাহলে উপরে বর্ণিত ঘটনার যৌক্তিক এবং সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যায়। প্রবল বিরোধিতার মুখে মুহাম্মদ যখন পর্যুদস্ত, তখন কিছু সহনশীলতা ও বন্ধুত্ব দেখানোর প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেন। তাই কুরাইশদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য কৌশলী হয়ে মিষ্টি বাক্য বললেন। এতে কুরাইশরা খুশি হলেন এবং মুহাম্মদসহ তাঁরা একসাথে নতজানু হলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন এই উপাখ্যান শেষ হলো এবং সবাই ঘরে ফিরে গেল, নবি মুহাম্মদের মনের ভেতরে শুরু হলো প্রবল তোলপাড়। তিনি অনুভব করলেন কেউ যেন তাঁকে এই ধরনের সমঝোতা না করার জন্য সতর্ক করে দিচ্ছে। কারণ ত্রিশটি বছর ধরে মুহামদ যে আদর্শ ধারণ করে এসেছেন, একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী হয়ে কুরাইশদের পৌত্তলিকতাকে বিরোধিতা করে গিয়েছেন এর সাথে সাংঘর্ষিক। আজকের এই সমঝোতা তাঁর সারা জীবনের বিশ্বাস, আদর্শ, চিন্তা, দর্শন সবকিছুকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেবে। এরপরে সুরা বনি-ইসরাইলের ৭৩-৭৫ আয়াতগুলি তৈরি হয়। উপরে যে যৌক্তিক বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে তা থেকে এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা প্রমাণিত হয়। আর শুধুমাত্র অন্য একটি ব্যাখ্যা হতে পারে যে, এই কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা। অর্থাৎ মুহাম্মদ নিজেই চেয়েছেন কুরাইশদের সাথে সমঝোতা ও বন্ধুত্ব করতে তথাপি আল্লাহ তাঁকে নিষেধ করে দেন। কিন্তু যেহেতু নবি তাঁর সততা এবং সত্যবাদিতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন তাই এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

ধর্মীয় কাঠামো

দ্বিতীয় অধ্যায় । ইসলাম ধর্ম । ধর্মীয় কাঠামো

ধর্ম কখনো আরব বেদুইনদের মধ্যে পরিপূর্ণ অর্থে বিস্তার লাভ করেনি। এখনো আরব বেদুইনরা বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক, অধিবিদ্যাগত বিষয়ের প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ বোধ করেন না। দুর্গম ও প্রতিকূল অঞ্চলে বসবাসের কারণে তাদের মধ্যে রীতিনীতি, প্রথা বা বিধিনিষেধ ব্যতীত তেমন কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে বেদুইনরা একদিকে যেমন স্বভাবে নমনীয় আবার অন্যদিকে মেজাজে উদ্বায়ী। কোনো কবিতার সাধারণ কোনো একটি পঙক্তিতেই তারা ক্ষুব্ধ হতে পারে অথবা অতি-আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যেতে পারে। বেদুইনদের মধ্যে অনেকে আত্মকেন্দ্রিক ও দাম্ভিক প্রকৃতির। সর্বদা নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বড়াই করার মানসিকতা তাদের মধ্যে রয়েছে। নিজেদের দুর্বল দিকগুলো, এমনকি অপরাধ ও পৈশাচিকতা নিয়েও তাদের অহঙ্কার দীর্ঘদিনের। অতীতকাল থেকে সহজে তারা বিভিন্ন কুসংস্কার ও অন্যান্য বিভ্রমের শিকার হতো। মরুভূমিতে প্রতিটি গাছ বা পাথরের নিচে কোনো না কোনো দানব লুকিয়ে আছে বলে বিশ্বাস করত। ভূমির রুক্ষতার কারণে তারা মানবসভ্যতার অন্যতম ভিত্তি কৃষিকাজ থেকে দূরে ছিল।

বেদুইনদের দৃষ্টিতে গরুর লেজ হচ্ছে অমর্যাদার প্রতীক আর ঘোড়ার মাথা হচ্ছে মর্যাদার প্রতীক। তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজেদের তাৎক্ষণিক শারীরিক চাহিদা পূরণ, দেবতার প্রতি প্রার্থনার একমাত্র উদ্দেশ্যও ছিল ওই লক্ষ্য অর্জন করা। প্রতিপক্ষ অস্ত্রধারী না হলেও কিংবা আত্মরক্ষা করার মতো প্রস্তুতি না থাকলেওতাদেরআক্রমণ করা এবং আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন বেদুইনদের ক্ষেত্রে সবসময় স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। সহিংস কোনো ঘটনা প্রায়-সময়ই অত্যধিক প্রশংসিত হতো এবং তা-নিয়ে বীরোচিত কবিতাও রচনা করা হতো। অন্য ব্যক্তির স্ত্রীকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেয়ার ক্ষেত্রে বেদুইন-কবিরা ‘অসভ্যতা’র পরিচয় দিতেন। হামলার শিকার হওয়া মহিলার গোপনীয়তা প্রকাশ, তার শারীরিক নিগ্রহ বা বিড়ম্বনার বর্ণনা দিতে বেদুইন-কবিরা নূ্যনতম বিবেকবোধের পরিচয় দিতেন না।

বেদুইনরা ঈশ্বরকে এক কৃত্রিম এবং গতানুগতিক সত্তা বলেই মনে করতেন। তারা স্বাধীন ও নৈর্ব্যক্তিক কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। মজার বিষয় হচ্ছে, বেদুইনরা অন্য কোনো গোষ্ঠীর সাথে প্রতিযোগিতার সময় প্রতিদ্বন্দী গোষ্ঠীর কোনো বিখ্যাত দেবতার আদলে নিজেরাও একটি দেবতা তৈরি করে উপাসনা শুরু করে দিত। ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কার কাবা ঘরটি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিতে ভর্তি এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় ছিল। বেদুইনরা এই পবিত্র স্থানে নিয়মিত আসত এবং গভীরভাবে সমান প্রদর্শন করত। কুরাইশদের সাথে বিরোধের জের ধরে একবার জোহায়না গোষ্ঠীর নেতা আব্দুদার বিন হুদায় তার জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাওরা নামক স্থানে কাবার মতো আরেকটি উপাসনালয় বানানোর জন্য, যাতে বেদুইনদেরকে কাবার পরিবর্তে এই উপাসনালয়ে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু জোহায়না গোষ্ঠীর লোকজন এ কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে নেতার নির্দেশ উপেক্ষা করেছিল। এজন্য হিশাম বিন মুহাম্মদ আল-কালবি (হিজরি ১২০ বা ৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ-হিজরি ২০৪/২০৬ বা ৮১৯/৮২১খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘তানকিস আল আসনাম’ গ্রন্থে(২৩) ব্যঙ্গধর্মী কবিতায় জোহায়না গোষ্ঠীর জনগণকে নিয়ে উপহাস করা হয়েছে। উল্লেখ্য হিশামের এই বইটি পৌত্তলিক আরবের ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। ইসলাম-পূর্ব আরব পৌত্তলিকদের মানসিকতা বোঝার জন্য এই বই থেকে কিছু উক্তি তুলে দেয়া যেতে পারে : ‘আব্রাহা (ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আবিসিনিয়া বিজয়ের পরে ইয়েমেনের একজন খ্রিস্টান শাসক) যখন সানায় অত্যন্ত মূল্যবান পাথর ও দামি গাছের গুড়ি দিয়ে কেলিস নামের গির্জা নির্মাণ করে শপথ নিয়েছিলেন তিনি তার হাতের মুঠি ততদিন পর্যন্ত আলগা করবেন না, যতদিন না আরবরা কাবাকে পরিত্যাগ করে এই গির্জায় আসা শুরু করে। এ সংবাদ শুনে আরবের একজন নেতা এক রাত্রে কিছু লোক পাঠালেন নোংরা আবর্জনা আর মলমূত্র দিয়ে গির্জাটি নষ্ট করতে।’ এক ছেলে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করে। এজন্য প্রথমে সে জুল-খালাসা নামের এক দেবতার মূর্তির কাছে যায়। রীতি অনুযায়ী ছেলেটি তীরের ফলক নিক্ষেপ করে জানতে চায় তার পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করে বদলা নেয়া উচিত হবে কিনা। জুল-খালাসার অমত হয় তাতে। আরব ছেলেটি তখন ক্ষুব্ধ হয়ে জুল-খালাসা দেবতাকে নিজের পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন করে বলে, ‘আমার মতো আপনার পিতাও যদি খুন হতেন তবে আজ আপনি আমাকে না বলতে পারতেন না।’ প্রাক-ইসলামি যুগের এক কবির ভাষায়, ‘হে জুল-খালাসা আপনার সাথেও যদি এমন অনাচার হতো, আমার মতো আপনার পিতাও যদি আজ মাটির নিচে শায়িত থাকতেন, তবে শক্ৰদের হত্যা করতে আপনি আমাকে কখনোই বারণ করতেন না।’(২৪) বিশ্বজুড়ে সে-সময়ের মানুষেরা যেখানে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রের পূজা করে বেড়িয়েছে তখন আরব বেদুইনরা আবিষ্ট ছিল পাথরের মধ্যে। পাথরকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকে ঘোরা আর পাথর পূজা করা ছিল বেদুইনদের ধর্মীয় প্রথা। পাথরকে পূজা করার আরেকটি ব্যতিক্রমী রেওয়াজও ছিল তাদের মধ্যে। যেমন মরুভূমিতে যাত্রাপথের বিরতিতে বেদুইনদের প্রথম কাজ থাকত কোথাও থেকে চারটি পাথর খুঁজে বের করা। সবচেয়ে সুন্দর পাথরটাকে মাটিতে রেখে এর চারপাশে প্রদক্ষিণ করত তারা। অন্য তিনটি পাথরকে রান্নার পাত্র রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়া মেষ, ছাগল বা উট কোরবানি দেয়ার সময় কোনো পাথরের সামনে এমনভাবে কোরবানি দেয়া হতো যেন পশুর রক্তে পাথরটি লাল হয়ে যায়।

প্রাচীন আরব-বেদুইনরা উপাসনায় খুব একটা আন্তরিক ছিল না। তানকিস আল আসনাম বই থেকে আরেকটি ঘটনা তুলে ধরা যায় : এক আরব তার উটগুলোকে ‘সাদ নামের এক উপাস্য-পাথরের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে যায়। পশুর রক্তে রঞ্জিত লাল পাথরটি দেখে উটগুলো ভয়ে বারবার দূরে সরে যাচ্ছিল। এতে বিরক্ত হয়ে আরব ব্যক্তিটি ছোট পাথরের টুকরা নিয়ে সাদ নামের উপাস্য-পাথরটিকে ঢিল মেরে চেচিয়ে বলে, “তুমিও সাধারণ জনতার ভালবাসা-সম্মান থেকে বঞ্চিত হও! ইবনে ইসহাকের রচিত বইয়েও এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে(২৫) :

‘সাদের কাছে আমরা আমাদের সৌভাগ্যের জন্য এসেছিলাম /
কিন্তু এই সাদ যখন তার সবই উড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের তাই আর তার সাথে কোনো লেনদেন নাই।
আচ্ছা এই সাদ কি মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুধুই একটি পাথর নয়?
সে কোনোভাবেই আমাদের চলার পথের সঠিক বা ভুল নির্দেশ দিতে পারে না।’

মদিনার প্রথম দিকের বছরগুলোতে মুহাম্মদের জীবনেও এই বেদুইন-আচরণের দেখা পাওয়া যায়। যেমন হিজরতের পর নবি যখন জোরেশোরে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন তখনঅনেক বেদুইন অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে ভীত হয়ে কিংবা গনিমতের মাল লাভের আশায় মুসলমানদের দলে যোগদান করে। কিন্তু যখনই মুসলিমরা কোনোভাবে বিপাকে পড়েছিল যেমন ওহুদের যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তখনই তারা অন্য কোনো দলে ডিগবাজি দিয়ে চলে যায়, নয়তো ভয়ে নবি বা মুসলমানদের কাছ থেকে দূরে থাকত। মুহাম্মদ বেদুইনদের এই মানসিকতা খুব ভালোভাবে জানতেন। কোরানের বিভিন্ন আয়াতে এ-ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন সুরা তওবা। কালপঞ্জি অনুসারে এটি কোরানের সর্বশেষ সুরা এবং নবির বাণী হিসেবেও একে বিবেচনা করা হয়। এই সুরায় রয়েছে : অবিশ্বাস ও কপটতায় মরুবাসী আরব বেদুইনরা বড় বেশি পোক্ত। আর আল্লাহ তাঁর রসুলের ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার (ন্যায়নীতির) সীমারেখা না শেখার যোগ্যতা এদের বেশি।’ (৯:৯৭)। এ কারণেই তাদের আশা ছিল, যদি এ কোনো অনারব-এর ওপর অবতীর্ণ করা হতো (২৬:১৯৮)। আসলে আরবের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুসংস্কার খুব গভীরে ছিল। যেনতেন কোনো চাহিদা পূরণে তারা মূর্তি বা প্রতিমার কাছে গিয়ে প্রার্থনার আশ্রয় নিত।

তবে হেজাজের, বিশেষ করে মক্কা বা ইয়াসরিব (পরবর্তীতে নামকরণ হয় মদিনা) এলাকার চিত্র এমন ছিল না। এই দুই শহরের মধ্যে বিশেষ করে ইয়াসরিবের অধিবাসীরা ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ঈশ্বর শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে “আল্লাহ শব্দের ব্যবহারও তাদের মধ্যে ছিল। তারা নিজেদের ইব্রাহিমের বংশধর মনে করত। ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী অনুসরণে তারা নিজেদেরকে ইসরাইলের বংশধর বলে দাবি করত। আদম ও শয়তানের কাহিনী প্রায় সবারই জানা ছিল। তারা ফেরেশতা বিশ্বাস করত এবং তাঁদেরকে আল্লাহর কন্যা হিসেবে কল্পনা করত। তাঁদের এই ধারণা সম্পর্কে কোরানে বেশ কয়েকবার পরোক্ষভাবে বলা হয়েছে : তোমরা কি মনে কর তোমাদের জন্য পুত্রসন্তান আর আল্লাহর জন্য কন্যাসন্তান?” (সুরা নজম : আয়াত ২১)। যাহোক এই নগরবাসী বেশ কয়েকটি ইহুদি প্রথাও অনুসরণ করত। যেমন খৎনা, ওজু করা, ঋতুবতী নারীদের বর্জন করা এবং বিশ্রামের জন্য সপ্তাহের একটি দিন বরাদ্দ রাখা। এজন্য তারা পরবর্তীতে শনিবারের স্থলে শুক্রবারকে বিশ্রামের দিন হিসেবে গ্রহণ করে।

স্পষ্ট বোঝা যায় ইসলাম প্রচারের জন্য হেজাজের সামাজিক পরিবেশ একেবারে আনকোরা কিছু ছিল না। ওখানে শুধু যে পৌত্তলিকতা-বর্জনকারী কিছু আধুনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন তাই নয়, অনেক পৌত্তলিকও সেখানে আলোর রেখার দর্শন পেয়েছিলেন। কোরানে তাঁদের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সুরা জুখরুফ-এ বলা হয়েছে : “যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে ওদেরকে সৃষ্টি করেছে, ওরা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। (৪৩:৮৭)। আবার সুরা আনকাবুত-এ বলা হয়েছে ; যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন? ওরা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তাহলে ওরা কোথায় ঘুরাপাক খাচ্ছে?’ (২৯:৬১)। মক্কার কুরাইশ পৌত্তলিকরা তাদের মূর্তিগুলোকে শক্তির প্রতীক হিসেবে এবং এর মাধ্যমে ঈশ্বরের নিকটে যাওয়া যায় বলেও বিশ্বাস করত। কুরাইশদের এরকম ভাবনার কথা কোরানে রয়েছে : “যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, আমরা এদের পূজা এজন্যই করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌছে দেবে।’ (৩৯:৩)।

এরপরও মক্কায় ইসলাম তেমন বিকশিত হতে পারে নি। ১৩ বছর ধরে নবুওতি প্রচারের পরও, এমন কী মনোমুগ্ধকর মক্কি সুরাগুলো প্রকাশের পরও সেখানে ইসলাম-গ্রহণকারীর সংখ্যা একশ ছড়ায়নি। নবি মুহাম্মদ ১৩ বছর ধরে দিনরাত পরিশ্রম করেও কুরাইশদের দৃঢ় অবস্থান ভাঙতে পারেননি। এই সময় যে কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবু বকর, ওমর, উসমান, হামজা বিন আব্দুল মোতালেব, আব্দুর রহমান বিন আউফ এবং সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস। এছাড়া বাকিরা ছিলেন দরিদ্র পরিবারের অথবা নিচু শ্রেণির। মক্কার সমাজে তাদের কোনো প্রভাব ছিল না।

একেশ্বরবাদী হানিফ মতাবলম্বী ওয়ারাকা বিন-নওফল ইসলাম গ্রহণ না করলেও মুহামদকে সবসময় সমর্থন দিয়ে এসেছিলেন। আবু বকরকে ইসলামে নিয়ে আসার পরামর্শ তিনিই মুহাম্মদকে দিয়েছিলেন। কারণ আবু বকর মক্কার একজন প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য ও সমানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণ স্বাভাবিকভাবে অন্যদের প্রভাবিত করবে। এবং তেমনটিই ঘটে। আবু বকরের ইসলাম গ্রহণের পর একে একে উসমান বিন আফফান, আব্দুর রহমান বিন আউফ, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, জুবায়ের বিন আল-আওয়াম মুসলিম হয়েছিলেন।

ইসলামের প্রসারের পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে নবি মুহাম্মদের একনিষ্ঠতা এবং গভীর আত্মবিশ্বাস। যা তাঁকে অনেক সুদৃঢ় লক্ষ্য অর্জনে তাঁর আত্মবিশ্বাসকে ধরে রেখেছিল। অনেক ব্যক্তির প্ররোচনা, হুমকি-ধামকি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। একই সময় মুহাম্মদেরও যথেষ্ট সম্পদ ছিল, সেগুলোকে তিনি যথাসময়ে ব্যবহার করেছেন। ইসলাম প্রচারের পঞ্চম বছরে তিনি তাঁর এক অনুসারীকে আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা আসামা ইবনে আবজরের (নিগাস) কাছে দূত হিসেবে পাঠান, রাজা যেন তাঁর রাষ্ট্রে মক্কার পৌত্তলিকতা-বিরোধী কয়েকজন মুসলমানকে সহায়তা করেন। প্রাচীন আবিসিনিয়ার রাজাদের নিগাস নামে ডাকা হতো।-অনুবাদক)। এ-ঘটনায় মক্কার কুরাইশ-প্রধানদের টনক নড়ে। তাঁরাও নিগাসের কাছে কুরাইশ বংশের বানু শাহম গোত্রের আমর ইবনে আল-আস (৫৮৫-৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং আব্দুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াকে দূত হিসেবে পাঠান, যাতে সেখানকার শাসকদের বোঝানো হয় তারা যেন অভিবাসী মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে কুরাইশরা মুহাম্মদকে খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি। তারা তাঁকে পাগল, কবি, জ্যোতিষী, জিন বা শয়তানে ভর করা ব্যক্তি ইত্যাদি বলে সম্বোধন করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মুহাম্মদের মানসিক দৃঢ়তা এবং কতিপয় উল্লেখযোগ্য সাফল্য কুরাইশদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। স্বাভাবিকভাবে কুরাইশদের সাথে নবির শক্ৰতা বাড়তে থাকে। কুরাইশ-প্রধানরা বুঝতে পেরেছিলেন যদি মুহাম্মদের প্রচারণা সাফল্য পেতে শুরু করে তবে তাদের নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পথ ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে। প্রতি বছর হাজারো মানুষ একত্রিত হতো মক্কার কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে। এটা ছিল আরবের বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর প্রধান তীর্থস্থান। আরবের সকল কবি, সাহিত্যিক, বক্তৃতাকারীদের মিলনমেলা পরিচালিত হতো কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে। মক্কাবাসীদের রুটি-রুজি ও কুরাইশদের মানসম্মান সবই তীর্থযাত্রীদের আসা-যাওয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। বেদুইনরা মূর্তিসজ্জিত কাবা ঘর (উপাসনালয়) দর্শন করতে আসত। নতুন ধর্মমতে যদি এই মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়, তবে বেদুইনরা হয়ত আর কখনোই এখানে আসবে না।

পনের বছর পর ইসলামের বিজয় যখন সাধিত হয়, মক্কার মুসলিমরাও পূর্বের মতো ঠিক তেমনি তাদের জীবিকা নির্বাহ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে মক্কা শহর বিজয়ের পর নাজিল হওয়া আয়াতে পৌত্তলিকদের কাবাঘরে গমন নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিজেদের জীবিকা নিয়ে উদ্বিগ্নমক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদেরকে সুরা তওবার ২৮ নং আয়াতের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা দূর করা হয় ; হে বিশ্বাসীগণ অংশীবাদীরা তো অপবিত্র; তাই এ-বছরের পর তারা যেন মসজিদ-উল-হারামের কাছে না আসে। (৯:২৮)। অর্থাৎ ব্যবসায় লোকসানের ক্ষতিপূরণ তিনিই (আল্লাহ) প্রদান করবেন।

কুরাইশ-প্রধানরা যখন মুহাম্মদের ধৈর্য, ঐকান্তিকতার প্রতি লক্ষ করলো এবং নিজেদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারল তখন তারা তুলনামূলক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা মুহাম্মদের চাচা বৃদ্ধ আবু তালিবের শরণাপন্ন হয়ে অনুরোধ জানান তিনি যেন মুহাম্মদকে ইসলাম প্রচার থামাতে বলেন এবং বিনিময়ে তাঁকে কাবা ঘর রক্ষণাবেক্ষণের এক পদে চাকুরির প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। আবু তালিব অবশ্য ভাতিজাকে রাজি করাতে ব্যর্থ হলে প্রায় সব কুরাইশ-প্রধানই বানু হাশেমিকে সামাজিকভাবে একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বেশ কয়েকদিনের জন্য হাশেমি গোষ্ঠীর সদস্যদের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অবশ্য হাশেমি গোষ্ঠীর দুর্দশা দেখে এক সময় অন্য আরবরা এগিয়ে এলে তাদের দুঃসময়ের অবসান হয়।

এ ঘটনার পর এবং বিশেষ করে আবু তালিবের মৃত্যুর পর নবি মুহাম্মদকে থামানোর আর কোনো আশা বাকি থাকে না। কুরাইশপ্রধানরা এবার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনায় সম্ভাব্য তিনটি প্রস্তাব সামনে রাখা হয় নবি মুহামদকে উপযুক্ত হবে। শুধু একটা শর্ত থাকল যে, সকলের হাতই মুহাম্মদের রক্তে রঞ্জিত করা হবে যাতে করে ভবিষ্যতে কাউকে যেন হাশেমি গোত্রের প্রতিশোধের শিকার না হতে হয়। মুহাম্মদের নবুওতির ১২-১৩ বছরের মাথায় এই পরিকল্পনা করা হয়। যা তাঁর মক্কা থেকে মদিনায় অভিবাসিত হওয়াকে প্রভাবিত করে।

——————–
পাদটীকা
২৩. হিশাম বিন মুহাম্মদ আল-কালবি রচিত তানকিস আল আসনাম” বইটি ১৯১২ সালে আহমদ জাকির সম্পাদনায় কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ডব্লিউ. আতাউল্লাহ কর্তৃক সম্পাদনায় প্যারিস থেকে ফরাসি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে ইরানের তেহরান থেকে ফার্সি অনুবাদ করেছেন সাঈদ মোহাম্মদ রেজা জালিলি নাইনি। ‘The Book of idols’ শিরোনামে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন নাবিহ আমিন ফারিস। প্রকাশিত হয়েছে প্রিন্সটন থেকে ১৯৫২ সালে।
২৪. অনেকের মতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর এবং কবিতা রচয়িতা একই ব্যক্তি। তাঁর নাম ইমরুল কায়েস, যাকে প্রাক-ইসলামি কবিদের রাজকুমার হিসেবে অভিহিত করা হয়। দ্রষ্টব্য : R A Nicholson, A Literary History of the Arabs, London, 1907, reprint in Cambridge 1953, pp. 103-105 to Encyclopaedia of Islam, 2nd ed., articles Dhu’l-Khalasa and Imru’ al-Kays.
২৫ . ইবনে ইসহাক রচিত ‘Life of Mohammad’ ( অনুবাদ : A Guillaume), Oxford 1955, p.37-এ উদ্ধৃত রয়েছে।

অলৌকিকত্ব

দ্বিতীয় অধ্যায় । ইসলাম ধর্ম । অলৌকিকত্ব

অনেক ইরানি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, যে কোনো ইমামজাদা(২৬) প্রতি মুহুর্তেই কোনো না কোনো রকমের অলৌকিক কাজকারবার করতে পারেন। নবি মুহাম্মদ ও হজরত আলি ইবনে আবু তালিবের কোনো বংশধর কিংবা ইরানের স্থানীয় কোনো সন্ন্যাসীকে ইমামজাদাবলে সম্বোধন করা হয়। অবশ্য তাদের যদি কোরান পড়ার সাধ্য থাকত তবে সেখানে আদৌ অলৌকিক কিছু নেই দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যেত।

কোরানে বিশটিরও অধিক আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, সংশয়বাদীরা যখনই নবিকে কোনো অলৌকিক কাজ করে দেখাতে বলেছে, ততবারই তিনি হয় নীরব থেকেছেন, নয়তো বলেছেন তিনি আর দশজনের মতই সাধারণ মানুষ, শুধুমাত্র আল্লাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে সুসংবাদ ও সতর্কবাণী নিয়ে আসা ছাড়া তাঁর পক্ষে অন্য কিছু করা সম্ভব নয়। এই আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে ; আর ওরা বলে, ‘আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না তুমি মাটি ফাটিয়ে একটি ঝরনা ফোটাবে, বা তোমার খেজুরের বা আঙুরের বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র নদীনালা বইবে, বা তুমি যেমন বল, আকাশকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলবে আমাদের ওপর, বা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে নিয়ে আসবে আমাদের সামনে বা তোমার জন্য একটা সোনার বাড়ি হবে, বা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু তোমার আকাশে আরোহণ আমরা কখনও বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমাদের পড়ার জন্য তুমি আমাদের ওপর এক কিতাব অবতীর্ণ করবে। বলো, ‘আমার প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা! আমি একজন মানুষ, একজন সুসংবাদদাতা রসুল ছাড়া আর কী?’ (সুরা বনি-ইসরাইল ; আয়াত ৯০-৯৩)।

পরের দুই আয়াতে সংশয়বাদীদের বিস্ময় প্রকাশিত হয়েছে এভাবে : আল্লাহ কি মানুষকে রসুল করে পাঠিয়েছেন? ওদের এই কথাই লোকদেরকে বিশ্বাস করতে বাধা দেয় যখন ওদের কাছে আসে পথের নির্দেশ। বলো, ‘ফেরেশতারা যদি নিশ্চিন্ত হয়ে পৃথিবীতে ঘোরাফেরা করতে পারত তবে আমি আকাশ থেকে এক ফেরেশতাকেই ওদের কাছে রসুল করে পাঠাতাম। (১৭:৯৪-৯৫)। এই দুটি আয়াত অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও সহজবোধ্য। নবি হলেন সাধারণ লোকজনের মধ্যেকার এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যদের থেকে তুলনামূলক বেশি দূরদর্শী ও চিন্তাশীল, এবং তিনি প্রচলিত কুসংস্কারের অসারতা ও অযৌক্তিকতা সবাইকে দেখাতে পারেন। এমন কী, সমাজে প্রচলিত নিষ্ঠুর ও ক্ষতিকর প্রথা থেকে লোকজনকে দূরে রাখতে পারেন। মুহাম্মদের বক্তব্যের স্বচ্ছতা, সহজবোধ্যতা ও গভীরতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন উঠেনি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের উঠেপড়ে লাগার কারণও পরিষ্কার। বেশিরভাগ মানুষ ঐ ধরনের হিংসামূলক আচার-আচরণে অভ্যস্ত ছিল। শৈশবকাল থেকে তারা এগুলো অনুসরণ করত। আজকের এই আধুনিক বিংশ শতাব্দীতেও একই দৃশ্য দেখা যায়। তাই সহজে বোঝা যায় আরবের তখনকার মানুষেরা এমন কোনো লোকের কথা সহজে মেনে নেবে না যিনি তাদের পূর্বসূরিদের ঐতিহ্যের বিরোধিতা করবেন। মুহাম্মদ যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলার দাবি করলেন, তখন খুব স্বাভাবিকভাবে অন্যরা তার প্রমাণ দেখতে চাইল। মুহাম্মদ নিজেও পূর্বের বিভিন্ন নবির অলৌকিক কর্মকাণ্ডের কথা নানা সময় স্বীকার করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্মের নবি সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়েছেন। পারস্যে একটি কথা প্রচলিত আছে এরকম : যে অন্যের বেশি প্রশংসা করে পরোক্ষভাবে সে নিজের অক্ষমতাই প্রকাশ করে।” এই কথার প্রভাব তখনও পড়েছিল। কুরাইশরা ভেবেছিল সময় এলে মুহাম্মদ নিজেও দৃশ্যমান কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে দেখাবেন। তাই তারা অন্য কোনো বিকল্প মানতে রাজি ছিল না। এজন্য তারা জিজ্ঞাসা করেছিল এভাবে: ‘ওরা বলে, “এ কেমন রসুল যে খাবার খায় ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করে! তার কাছে কেন ফেরেশতা পাঠানো হয় না যে তার সঙ্গে থাকবে ও ভয় দেখাবে, বা তাকে ধনভাণ্ডার দেওয়া হয় না কেন, বা তার একটা বাগানও নেই কেন যেখান থেকে সে তার খাবার যোগাড় করতে পারবে?’ জালেমরা আরও বলে, তোমরা তো এক জাদুগ্রস্ত লোকের অনুসরণ করছ! ( সুরা ফুরকান : আয়াত ৭-৮)।

কুরাইশদের এ-ধরনের দাবি কিংবা তীব্র অসন্তোষমূলক সমালোচনারও কোনো উত্তর দেননি নবি। অলৌকিক কিছু ঘটানোর গণদাবির মুখেও তিনি নীরব থেকেছেন। আল্লাহর তরফ থেকে প্রত্যাদেশ এলে তিনি পরে বলেন : তোমার পূর্বে আমি যেসব রসুল পাঠিয়েছি, তারা সকলেই তো খাওয়া-দাওয়া করত ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করত। (২৫:২০)। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়: তারা বলে, ‘ওহে, যার ওপর এই উপদেশবাণী অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল! তুমি সত্যবাদী হলে আমাদের সামনে ফেরেশতাদের নিয়ে আসছ না কেন? (সুরা হিজর ; আয়াত ৬-৭)। আবার সুরা আম্বিয়াতে রয়েছে একই কথা : ‘সীমালঙ্ঘনকারীরা গোপনে পরার্শ করে, এ তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখেশুনে জাদুর খপ্পরে পড়বে?’. . . ‘ওরা বলল, “অলীক স্বপ্ন! না, সে এ বানিয়েছে। না, সে তো এক কবি। সুতরাং সে আমাদের কাছে এক নিদর্শন আনুক, যেমন নিদর্শন দিয়ে পূর্বসূরিদের পাঠানো হয়েছিল। (২১:৩, ৫)। একই সুরার পরবর্তী আয়াতে একটা উত্তর দেয়া হয়েছিল যেখানে আল্লাহ মুহাম্মদকে বলেন: “তোমার পূর্বে আমি প্রত্যাদেশ দিয়ে মানুষই পাঠিয়েছিলাম। পরবর্তী বাক্যে মুহাম্মদকে সংশয়বাদীদের উপদেশ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তোমরা যদি না জান, তবে উপদেশপ্রাপ্ত সম্প্রদায়দেরকে জিজ্ঞাসা করো। (২১:৭)। আবারও পূর্বের নবিদের প্রসঙ্গ উঠলে বলা হয় : আর আমি তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে তাদের খাবার খেতে হত না; তারা চিরস্থায়ীও ছিল না।’ (২১:৮)।

সব মিলিয়ে মক্কি সূরাগুলোর মধ্যে ২৫টিরও বেশি আয়াতে দেখা যায়মুহাম্মদকে অনুরোধ করা হচ্ছে তিনি যদি একজন নবি হয়ে থাকেন, তবে এমন কোনো অলৌকিক কাজ করে দেখাতে যা সাধারণ মানুষ পারে না। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে মুহাম্মদ ছিলেন হয় নীরব নয়তো নিজেকে অন্য সাধারণ মানুষের মতোই বলে স্বীকার করেছেন। যদিও তিনি স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে ওহি পেয়েছেন, তথাপি তিনি আর দশজনের মতোই মরণশীল ছিলেন। একটা কথা পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে সুরা ইউনুসে : ‘ওরা বলে, তার কাছে তার প্রতিপালকের কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? বলো, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই। অতএব তোমরা প্রতীক্ষা করো, আমি তোমাদের সঙ্গে প্রতীক্ষা করছি। 🙁 ১০:২০)। অন্যসব মানুষের মতো মুহামদেরও আল্লাহর গায়েবি উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সুরা রাদ-এ মুহাম্মদের নবুওতি ও অলৌকিক কিছু করার অক্ষমতা সম্পর্কে প্রশ্নগুলির উত্তর এভাবে দেয়া হয়েছে, তাঁর একমাত্র কাজ হল আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌছে দেয়া। যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, (মুহাম্মদের) প্রতিপালকের কাছ থেকে তার কাছে কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী, আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য তো পথপ্রদর্শক আছে।‘(২৭) (১৩:৭)। এ-বক্তব্য থেকে বোঝা যায় কোনো প্রকার অলৌকিক কিছু করা একজন নবির কাজের মধ্যে পড়ে না।

একই ধরনের বক্তব্য দেখা যায় আরও একটি আয়াতেযেখানেপৌত্তলিকদের করা প্রশ্নের জবাবে মুহাম্মদ বলেন, তিনি একজন সতর্ককারী মাত্র, অলৌকিকতা কেবল আল্লাহই দেখাতে পারেন আর কেউ না। যদিও বর্তমানকালে কোরান নাজিল হওয়াকে অনেকে অলৌকিক ঘটনা বলেই বিশ্বাস করেন। সুরা আনকাবুত-এ অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের উত্তর মুহাম্মদকে এভাবে দিতে দেখা যায়: ‘ওরা বলে, “তার প্রতিপালকের কাছ থেকে তার কাছে নিদর্শন পাঠানো হয় না কেন?” বলো, নিদর্শন আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, আর আমি তো একজন স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। ( ২৯:৫০)। আবার পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এ কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, যে-কিতাব তাদের কাছে আবৃত্তি করা হয় আমিই তা পাঠিয়েছি তোমার কাছে? এতে অবশ্যই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে। ( ২৯:৫১)। সুরা মুলক-এ পৌত্তলিকদের জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে: ‘ওরা বলে, “তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে বলো এ-প্রতিশ্রুতি কবে পালন করা হবে? পরের আয়াতে মুহাম্মদ জবাব দেন : এর জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে, আমি তো স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’ (৬৭:২৬-২৭)। সুরা নাজিআত-এ পুনরুত্থান দিবস ও নবুওতি জ্ঞানের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে অস্বীকার করতে দেখা যায় মুহামদকে : ‘ওরা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেয়ামত কখন ঘটবে? তোমাকে কী বলা আছে এ-ব্যাপারে? এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তো কেবল তোমার প্রতিপালকের কাছে। তুমি তো একজন সতর্ককারী-তার জন্য যে একে ভয় করে। (৭৯:৪২-৪৫)।

পৌত্তলিকদের জেদের মুখে এবং তাদের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী অলৌকিক কাজ দেখালেই তারা বিশ্বাস করে ফেলবে মুহাম্মদ ও আল্লাহকে এমনটা ভেবে মুসলমান, এবং এমন কী মুহামদের ভেতরেও আশা জন্মাতে থাকে যে আল্লাহ হয়তো সত্যিই একদিন তাঁকে দিয়ে অলৌকিক কিছু করে দেখাবেন, যাতে সব অবিশ্বাসীই বিশ্বাসী হয়ে যায়। সুরা আনআম-এ এই বিষয়টির সুরাহা হয় এভাবে ; আর তারা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করে বলে, তাদের কাছে যদি কোনো নিদর্শন আসত তবে অবশ্যই তারা বিশ্বাস করত। বলো, নিদর্শন তো আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। আর তাদের কাছে নিদর্শন এলেও তারা যে বিশ্বাস করবে না, এ কীভাবে তোমাদেরকে বোঝানো যাবে?’(৬:১০৯)। আল্লাহ এরপর নবিকে বলেন ; আর তারা যেমন প্রথমবারে ওতে বিশ্বাস করেনি তেমনি আমিও তাদের অন্তরে ও নয়নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করব আর অবাধ্যতায় তাদেরকে উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেব। তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠালেও এবং মৃত ব্যক্তিরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সব জিনিস তাদের সামনে হাজির করলেও তারা বিশ্বাস করবে না, যদি না আল্লাহ চান, কারণ তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। (৬:১১০-১১১)।

সুরা আনআম-এর এই ৩টি আয়াত নিয়ে মন্তব্য করা প্রয়োজন : (১) আরবের পৌত্তলিকরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মুহাম্মদ যদি কোনো ধরনের অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন তবে তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ মুহাম্মদকে জবাব দিতে বলেন যে, অলৌকিক ঘটনা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন, তিনি বা অন্য কেউ নন। একজন মানুষের (হতে পারেন তিনি নবি)

এই ধরনের পরিষ্কার স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতির নিয়ম অলঙ্ঘনীয়। কারো পক্ষেই প্রাকৃতিক কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো সম্ভব নয়। যেমন আগুন কখনো তার পোড়ানোর ক্ষমতা হারাতে পারে না। (২) নবি মুহামদ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো অলৌকিক ঘটনা হয় আর অন্যরা যদি এতে বিশ্বাস না করে, তবে তিনি তা কিভাবে জানতে পারবেন? এখানে একটি পাল্টা প্রশ্নের উদ্ভব হয়, এটা কী নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটলেই পৌত্তলিকরা তা বিশ্বাস করে ফেলবে? মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অস্বাভাবিক কিছু দেখলে মানুষ বিস্মিত হয় এবং যে ব্যক্তি এই কাজ করে অনেকেই তার অনুগত হয়ে পড়ে। কোরানের তফসিরকারকদের বর্ণনায় বুঝা যায়, স্বয়ং আল্লাহ তাঁর ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিক্ষমতার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো ধরনের অলৌকিক ঘটনা না-ঘটলে অবিশ্বাসীরা কখনোই মুহাম্মদ বা কোরানের বাণী স্বীকার করবে না। ৩) আল্লাহ সরাসরি জানিয়ে দেন, তাঁর পূর্বে পাঠানো নিদর্শন কে অবিশ্বাস করলে তিনি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টি ও হৃদয়কে ভুলপথে নিয়ে যাবেন। এখানে প্রশ্ন দেখা দেয়, সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজেই কী সাধারণ মানুষের সত্য নির্ধারণের ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছেন? যদি তাই হয়, তবে মানবজাতির কাছে কী আশা করা যেতে পারে আর, কিংবা তাহলে তাদের কাছে বারেবারে নবি পাঠানোর প্রয়োজনটা কী? আর এটা পরিষ্কার নয়, পূর্বে পাঠানো নিদর্শন বলতে কি বোঝানো হয়েছে? পূর্বের নবিদের কিছু ঘটনা আছে, তেমনি মুহাম্মদেরও কিছু ঘটনা রয়েছে, হয়তো এগুলোর কোনো কিছুই হতে পারে। অবশ্য পূর্বের নবিদের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে খুব কমই জানা যায়। কিন্তু কোরান অনুসারে, যখনই পৌত্তলিকরা মুহাম্মদের কাছে অলৌকিক কিছু করে দেখানোর দাবি জানিয়েছে, তখনই তিনি নিজেকে শুধু আল্লাহর তরফ থেকে একজন সুসংবাদদাতা ও সর্তককারী বলে দাবি করেছেন। হতে পারে, পূর্বে পাঠানো নিদর্শনের প্রতি অবিশ্বাস বলতে কোরানের অন্য আয়াতগুলোর কথা বোঝানো হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে তবে এটা কখনো উপযুক্ত জবাব নয়। কারণ পৌত্তলিকরা কোরানের অলৌকিক বাণীকে বিশ্বাস করতে চাইত না। মুহাম্মদের প্রতি তাদের দাবি ছিল – যিশু, মুসা, সালেহ বা অন্যান্য নবিদের যে রকম অলৌকিক ঘটনার কথা কোরানে বলা হয়েছে, সেরকম যেন মুহামদও কিছু করে দেখান। ৪) সুরা আনআম-এর ১১১নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্বয়ং জানিয়ে দিলেন, ফেরেশতা পাঠালেও অবিশ্বাসীরা (পৌত্তলিকরা) বিশ্বাস করবে না। এমনকি মৃত মানুষ জীবিত হয়ে উঠে এসে তাদের সাথে কথা বললেও নাকি তারা বিশ্বাস করবে না। তারা মুহামদকে বারবার বলতো বেহেশত থেকে কোনো ফেরেশতা এনে দেখাতে বা যিশুর মতো কোনো মৃতকে জীবিত করে দেখাতে। মুহাম্মদ নিজেও সবসময় এমন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটার আশায় ছিলেন। এরপর আল্লাহ নবিকে বলেন যে, তেমনটা ঘটলেও নাকি ওরা বিশ্বাস করবে না। ৫) এখন কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব পৌত্তলিক লোকের ভবিষ্যৎ-অবিশ্বাস ও অনমনীয় চিন্তাধারা যদি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে তাদেরকে সঠিক পথে আনতে নবি প্রেরণের কি দরকার? আল্লাহর মতো একজন সর্বজ্ঞানী, সবজান্তা এবং অব্যর্থ কেন এই ধরনের অর্থহীন কাজ করবেন? সনাতনপন্থীরা, ধর্মীয় ব্যাপারে যারা যুক্তি প্রয়োগ করতে রাজি নন, তারা এই বক্তব্যের একটা ব্যাখ্যা দিতে চান এভাবে : যেসব মানুষ অসৎ পথে চলে তাদেরকে মৃত্যুর পরের শাস্তি সম্পর্কে একটা চূড়ান্ত সতর্কবাণী দেয়ার জন্য এমনটা করা। কিন্তু সনাতনপন্থীদের এই ব্যাখ্যা এক্ষেত্রে খাটে না। কারণ ১১১ নম্বর আয়াতের পরের বাক্যে রয়েছে, যদি না আল্লাহ চান। বোঝা যায় এই পৌত্তলিক মানুষেরা কখনোই বিশ্বাস করতে পারবে না কারণ আল্লাহই চান না তারা বিশ্বাস করুক কোরানের বাণীতে। এই বক্তব্যে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় একই সুরার ১১০ নম্বর আয়াত থেকে : “তারা যেমন প্রথমবারে ওতে বিশ্বাস করেনি তেমনি আমিও তাদের অন্তরে ও নয়নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করব আর অবাধ্যতায় তাদেরকে উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেব। একই সুরার ১০৭নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : “যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তারা শরিক করত না।’(৬:১০৭)। অর্থাৎ আল্লাহই নিজে চান তারা পৌত্তলিক থেকে যাক। তাই স্বাভাবিকভাবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নগণ্য সৃষ্টি মানুষেরা তো আল্লাহর ইচ্ছাকে পরিবর্তন করতে পারে না। এমন কী মুহাম্মদও পৌত্তলিকদেরকে তাদের অবিশ্বাস থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না, যদি তাদের এই অবিশ্বাস আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ‘কোরানের প্রতি অবিশ্বাসে পৌত্তলিকদের কোনো দোষ দেয়া যায় না। তাদেরকে কেন মৃত্যুর পরের শাস্তির ভয় দেখানো হবে? একজনের ধর্মীয় বিশ্বাস যদি কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশেই হয়ে থাকে তবে যুক্তি আমাদের বলে যে, সেই ঐশ্বরিক নির্দেশ ওই ব্যক্তির নিয়তি, ভবিষ্যৎ সুখ-দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করবে। আর সেক্ষেত্রে কোনো নবি প্রেরণেরও প্রয়োজন থাকবে না, কোনো অলৌকিকতা দেখানোর দাবিও থাকবে না এবং অলৌকিকতা না দেখানোর কোনো অজুহাত খোঁজারও প্রয়োজন হবে না।

উপরের সব বিষয় বিবেচনা করে বোঝা যায় পৌত্তলিকদের অলৌকিকত্ব দেখানোর দাবি সম্পর্কে নবি মুহাম্মদ সবসময় নীরব থেকেছেন কিংবা পাশ কাটিয়ে গেছেন। মক্কি সুরাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কাব্যিক সুরা তাকভির-এ আমরা নবুওতি সম্পর্কে উজ্জ্বল বাগিতার প্রকাশ দেখতে পাই। সেখানে নবি মুহাম্মদ অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। আকারে ইঙ্গিতে আল্লাহর হয়ে কথা বলার দাবি জানিয়েছেন। সুরা তাকভির-এর প্রথম ১৮ আয়াত নাজিলকালে যেসব পৌত্তলিকঅবিশ্বাসীরা মুহাম্মদের নবুওতিকে মৃগীরোগীর বিভ্রম কিংবা জ্যোতিষীর কাজকারবার বলে উড়িয়ে দিয়েছে তাদের এভাবে জবাব দেয়া হয় : “সত্যই একথা এক সমানিত বার্তাবাহকের, যে শক্তিধর, আরশের অধিপতির নিকট মর্যাদাসম্পন্ন; যার আজ্ঞা সেখানে মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। আর (হে মক্কাবাসী!) তোমাদের সঙ্গী তো পাগল নয়। সে তো ওকে (ফেরেশতাকে) স্বচ্ছ দিগন্তে দেখেছে। সে অদৃশ্য প্রকাশ করতে কার্পণ্য করে না। আর এ তো অভিশপ্ত শয়তানের কথা নয়!( ৮১:১৯-২৫)।

মক্কার বেশিরভাগ অধিবাসীর চিন্তা ছিল মুহাম্মদ অলৌকিক কোনো কর্মকাণ্ড করে দেখালে তারা তখন ইসলাম গ্রহণ করার কথা ভাববে। সেখানে আল্লাহ জানিয়ে দেন, সাক্ষাৎ ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেও বা মরা-মানুষকে জীবিত করে তুললেও তারা বিশ্বাস করবে না। দশ-বারো বছর পর যখন নবির তরবারি ও অনুসারীরা অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠেন তখন তারা –দলে দলে আল্লাহর ধর্ম গ্রহণ করেন। (১১০:২)। নবির অন্যতম কট্টর প্রতিপক্ষ এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আবু সুফিয়ান পর্যন্ত ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম গ্রহণ করেন।

সুফিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এখন নিশ্চয় আপনি বুঝতে পারছেন এক সর্বশক্তিমান ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নাই? এবং তিনিই সর্বজ্ঞ। আবু সুফিয়ান জবাব দেন, হ্যাঁ, আমি সেই বিশ্বাসের দিকেই এগোচ্ছি, তবে এ নিয়ে আমাকে আরও ভাবতে হবে। আব্বাস তখন বলেন, আবু সুফিয়ান, তুমি এখনই মুসলমান হয়ে যাও, নয়তো নবিজি এই মুহুর্তে তোমার মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দিবেন। মুসলিম যোদ্ধা দ্বারা আবদ্ধ অবস্থায় আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। আব্বাস বিন আব্দুল মোতালেবের পরামর্শে নবি আবু সুফিয়ানকে এই আশ্বাস দেন, তার গৃহ কাবার মতই নিরাপদ থাকবে, তার ঘরে যেই প্রবেশ করবে সেই নিরাপদ থাকবে। একই বছরের শেষের দিকে মুসলমানরা যখন হাওয়াজেন গোত্রকে পরাজিত করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ লাভ করেন তখন আবু সুফিয়ানসহ অন্য কুরাইশ নেতাদের মুহাম্মদ এতো বেশি উপহার প্রদান করেন যে, আনসাররা (নবির মদিনাবাসী অনুসারীরা) অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল (আবিসিনিয়া থেকে আগত ক্রীতদাস) ওয়াশির ইসলাম গ্রহণ। ওয়াশি ৬২৫ সালের মার্চে ওহুদের যুদ্ধে হামজা বিন আব্দুল মোতালেবকে হত্যা করে তাঁর লাশ ছিড়ে টুকরো করে ফেলেন। এ-ঘটনায় নবি এতোই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি এর প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াশি বন্দী অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করলে মুহাম্মদ তা মেনে নেন।

বোঝা যায় এই ধর্মান্তরের পিছনের প্রধান কারণ ছিল ভয়। শত্রুভীত হলে নবি তাদেকে ক্ষমা করতেন। সুরা আনআমের আয়াত তিনটি (১০৯-১১১) নিছক কোনো অনুমান বা প্রকল্পিত ছিল না। এগুলো কোরানের অন্যান্য আয়াতের সারমর্ম। এখান থেকে দেখা যায়, যখন আল্লাহর কোনো সাহায্য নবির লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে আসছিল না তখন মুহাম্মদ ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। এটা স্পষ্ট হয় সুরা ইউনুসের এই আয়াতদ্বয় থেকে ; আমি তোমার কাছে যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি সন্দেহ হয় তবে তোমার আগের কিতাব যারা পড়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার কাছে সত্য এসেছে। তুমি কখনও সন্দিহানদের শামিল হয়ো না। আর যারা আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না হলে, তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবে।’ ( ১০:৯৪-৯৫)।

আয়াতগুলো ব্যাখ্যা করতে নাজিলের দৃশ্য কল্পনা করার কোনো প্রয়োজন হয় না। সংশয়বাদী এবং দ্বিধাচিত্তের মানুষদের বিশ্বাস করাতে গিয়ে নবি নিজেও সন্দেহের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। পরে আল্লাহই তা দূর করে দেন। আরও ব্যাখ্যা দেয়া যায় যে, যখন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটার আশা প্রায় শেষের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল তখন মুহাম্মদ মনে মনে নিজের সাথে কিভাবে কথা বলতেন তা এই আয়াতগুলোতে পাওয়া যায়।

মক্কার সুরাগুলোর অন্যান্য আয়াতে দেখা যায় মুহাম্মদ নিজেও কিছুটা আধ্যাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সুরা হুদ-এ নবির প্রতি আল্লাহর বাণীকে এভাবে দেখা যায়: ‘ওরা যখন বলে, তার কাছে ধনভাণ্ডার পাঠানো হয় না কেন, বা তার সাথে ফেরেশতারা আসে না কেন? তখন তুমি যেন তোমার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কিছু বর্জন না কর এবং এর জন্য তোমার হৃদয় যেন দমে না যায়। তুমি তো কেবল সতর্ককারী, আর আল্লাহ সকল বিষয়ের কর্মবিধায়ক। ( ১১:১২)। অর্থাৎ লোকে যাই বলুক না কেন, নবির একমাত্র কাজ ছিল ধর্ম প্রচার করা। সুরা আন’আমে মুহাম্মদ আরেকটি দাবি খণ্ডনের দায় ঘাড়ে নেন : তাদের (কাফেরদের) মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই যদি তোমার কাছে বড় মনে হয়, পারলে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বা আকাশে সিড়ি লাগিয়ে তাদের জন্য নিদর্শন নিয়ে এসো। আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় সকলকে একসঙ্গে সৎপথে আনতেন। সুতরাং তুমি মূর্খদের মতো হয়ো না।’(৬:৩৫)। সুরা নিসায় একই ঘটনা আবার দেখা যায়। সম্ভবত ইহুদিরাও মুহাম্মদের কাছে মোজেজার দাবি জানিয়েছিল। তাদের সন্তুষ্ট করতেই এই আয়াত নাজেল করা হয়; কিতাবিরা তোমাকে তাদের জন্য আকাশ থেকে কিতাব অবতীর্ণ করতে বলে, কিন্তু মুসার কাছে তারা এর চেয়েও বড় দাবি করেছিল। তারা বলেছিল, আমাদেরকে আল্লাহকে সাক্ষাৎ দেখাও। তাদের সীমালঙ্ঘনের জন্য তারা বজ্ৰাহত হয়েছিল। তারপর স্পষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে প্রকাশ হওয়ার পরও তারা গোবৎসকে উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করেছিল। আমি এও ক্ষমা করেছিলাম। আর আমি মুসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দান করেছিলাম।(৪:১৫৩)। সুরা বনি-ইসরাইলে অলৌকিকত্বের অনুপস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে : পূর্ববর্তীরা নিদর্শন অস্বীকার করার ফলে আমি নিদর্শন প্রেরণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখি। আমি স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে সামুদের কাছে এক মাদি উট পাঠিয়েছিলাম। তারা ওর ওপর জুলুম করেছিল। আমি ভয় প্রদর্শনের জন্য নিদর্শন প্রেরণ করি। ( ১৭:৫৯)। এই আয়াত হয়েছিল। তাদের মধ্যে বিশ্বাস আনার জন্য আল্লাহ সালেহর মাধ্যমে একটি অলৌকিক ঘটনা দেখান। একটা পাথরখণ্ড থেকে একটা মাদি উট সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সামুদরা উটটিকে মেরে নিজেদের অবিশ্বাসকেই আঁকড়ে রাখে। এতে আল্লাহ রেগে গিয়ে বজ্রপাতের মাধ্যমে তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেন। এখন আল্লাহ যদি মুহাম্মদের হয়েও কোনো অলৌকিক-বিসায়কর ঘটনা দেখাতেন আর সবাই যদি নিজেদের অবিশ্বাসকেই ধরে রাখত তবে তাদেরও ধবংস হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নবির লক্ষ্যের কথা বিবেচনা করে আল্লাহ তাদের ধ্বংসের আদেশ মুলতবি করে রাখেন।’

ঠিক পরের আয়াতটিও বেশ আকর্ষণীয় এবং চিন্তা-উদ্রেককর : ‘সারণ করো, আমি তোমাকে বলেছিলাম যে, তোমার প্রতিপালক মানুষকে ঘিরে রয়েছেন। আমি যে-দৃশ্য তোমাকে (মিরাজে) দেখিয়েছি তা এবং কোরানে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের জন্য। আমি তাদেরকে ভয় দেখাই, কিন্তু তা তাদের উগ্র অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে। (১৭৬০)। এর অর্থ হল যেহেতু আল্লাহ সকলকেই নিয়ন্ত্রণ করেন, নবির তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তিনি সতর্কবাণী প্রদান করে যাবেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের পরীক্ষা নেয়ার জন্য বলা হচ্ছে, কারণ তাঁরা মুহামদকে অবজ্ঞা করেছিল।

জাহান্নামের অভিশপ্ত জাক্কম বৃক্ষের কথা কোরানের তিন জায়গায় (৩৭:৬২, ৪৪:৪৩এবং ৫৬:৫৩) উল্লেখ করার মাধ্যমেও জনগণকে ভয় দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এটা তাদের কাছে আরও বেশি হাস্যকর মনে হয়। উপহাসের সুরে আরবরা তখন জিজ্ঞাসা করতে থাকে, জাহান্নামের আগুনের মধ্যে একটা গাছ কিভাবে জন্মাতে বা বেঁচে থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা প্রদর্শনের দায় থেকে সরে গিয়ে নবি সবাইকে কেয়ামত এবং জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করে বলেন: ‘এমন কোনো জনপদ নেই যা আমি কেয়ামতের দিনের পূর্বে ধ্বংস করব না বা যাকে কঠোর শাস্তি দেব না। এ তো কিতাবে লেখা আছে।’(১৭:৫৮)। এটা সত্যিই বিস্ময়কর যে, আল্লাহ যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়তিনি সুরা সিজদা-তে দাবি করেছেন, “আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতাম (৩২:১৩), তিনি আবার সবাইকে মৃত্যুর পরের গুরুতর শাস্তির হুমকি দিয়ে চলেছেন। এ-ধরনের বক্তব্য প্রদানের বদলে সামান্য মোজেজা প্রদর্শন করে দিলেই কি বেশি ভালো হতো না? বিপুল সংখ্যক মানুষ তখন সহজেই ইসলাম গ্রহণ করত এবং সেই সাথে প্রচুর যুদ্ধ আর রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হতো।

মোজেজার অনুপস্থিতির পৃথক একটি ব্যাখ্যা আমরা সুরা আনআম-এর ৩৭ নম্বর আয়াতে দেখতে পাই: “তারা বলে, তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার কাছে কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? বলো, নিদর্শন অবতারণ করতে নিশ্চয় আল্লাহ সক্ষম। কিন্তু তাদের অনেকেই (এ) জানে না। আয়াতটির শব্দগুলোর মধ্যে যুক্তির অভাব সহজেই দৃশ্যমান। অবিশ্বাসীরা অন্তত একটি অলৌকিক ঘটনা দেখার জন্য বারেবারে অনুরোধ করে যাচ্ছে অথচ তাদেরকে বারবার বলা হচ্ছে, আল্লাহ অলৌকিকবিস্ময়কর ব্যাপার দেখাতে পারেন কিন্তু দেখাচ্ছেন না। আল্লাহ সর্বশক্তিমান হলে অলৌকিকতা দেখানো খুব স্বাভাবিক একটা বিষয় কিন্তু তারপরও কোনো অলৌকিক কিছু ঘটেনি। আর ঘটলেও সুরা আনআমের এই আয়াত অনুসারে তাদের কেউই জানতে পারেনি। তাহলে সেটা কী ছিলযা তারা জানত না? তারা অবশ্যই বিশ্বাস করতযে আল্লাহ সর্বশক্তিমান, না-হলে তারা কখনোই অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনের দাবি তুলত না। হেজাজের জনতার এই দাবির জবাব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে তফসির আল-জালালাইনের বক্তব্য হচ্ছে, অলৌকিক ঘটনা দেখার বাসনাকারী বেশিরভাগই জানত না যে, বিস্ময়কর ঘটনা ঘটার পরও তারা অবিশ্বাস করলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এখান থেকে দুটি প্রশ্ন উঠে প্রথমত, অলৌকিক ঘটনা ঘটার পরও কেন তারা অবিশ্বাস করবে? দ্বিতীয়ত, নির্বোধ এবং একরোখা মানুষ যারা আলৌকিক ঘটনা ঘটার পরও অবিশ্বাস করে যাবে তাদেরকে ধ্বংস করাটা কতটা যৌক্তিক?

5 thoughts on “নবি মুহাম্মদের ২৩ বছর – আলি দস্তি

  • September 19, 2018 at 3:20 AM
    Permalink

    আল্লাহ ছিলেন কাবার মন্দিরের রক্তপিপাসু অপদেবতা ; মুহাম্মদ আল্লাহর মূর্তি ধ্বংস করিয়াছিলেন ; এবং আল্লাহর ভক্তরা কারবালা ময়দানে , মুহাম্মদের বংশ ধ্বংস করিয়াছিল ; সেই আল্লাহর নাম নিয়ে প্রত্যহ তাদের এখনো চেঁচামেচি ;

    Reply
    • October 7, 2018 at 10:42 PM
      Permalink

      Mr Asit, do you really think that only cursing hatred can bring ignorant believers in light ? We have to learn how to make self-criticism.
      2. Now let’s come to the point : and that’s much more effective than cursing . If we carefully notice Muhammad’s life in Mecca , what we learn actually ? He used soft and decent tactics . Again, no spiritual power benefited him or came in work . In 13 years of Mecca, only few influential persons were converted to Islam. Why they converted themselves, that’s a separate and dufferent debate. I can only say for now that those first Converted to Islam were very wise and had a vision of bright future. For them, it was a career. No angel, no miracle or spiritual power came to work in in use except tactics , psychological manipulation or game, I. e, using fear of punishment after life, greed, and helplessness of man . When Muhammad went to Madina, his status changed , became stronger financially by robbery of commerce groups (banijjo kafela), then his language of Quran changed. It was not decent any more.

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *