বেদে কোনো বর্ণভেদ নেই

এটা ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক যে, যে বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায়ে বেদ হলো সমাজের মূল ভিত্তি, সেখানে আমরা ভুলেই গেছি বেদের মূল শিক্ষাগুলো এবং নিজেদেরকে নানা ভুল-ভ্রান্তিসমূহের ধারণায় জড়িয়ে ফেলেছি যেমন, জন্মগত caste system-সহ নানারকম বৈষম্য। এরকম বিপথগামী চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা আমাদের সমাজকে ভীষণ ক্ষতিসাধন করেছে এবং বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছে। Dalit নামক জাতিচ্যুত ব্যক্তিদের আমরা দূরে ঠেলে দিয়েছি এবং এর ফলে আমাদের উন্নতি ও প্রগতির বিকাশ স্থবির হচ্ছে। এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে হিন্দু সমাজের মূলে গিয়ে বেদকে জানা – যার ফলে আমরা আমাদের মধ্যে ভাঙা সম্পর্কগুলো পুনরায় স্থাপণ করতে পারব।

এই লেখায় আমরা চেষ্টা করব বেদ অনুযায়ী আমাদের caste system সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন করার এবং শূদ্রের আসল অর্থ খোঁজার।

১।
প্রথমত, কোনো প্রকার হিংসা বা বৈষম্যের স্থাণ নেই বেদে যেকোনো ব্যক্তি সম্পর্কে – সে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, বা শূদ্র কিনা।

২।
Caste system প্রায় নতুন। বেদে কোনো শব্দ নেই যার অর্থ বর্ণ/জাতি হতে পারে। আসলে, caste, জাতি আর বর্ণ এগুলো এক একটি এক এক অর্থ বহন করে।

Caste হলো একটি ইউরোপীয় নবধারা যার সাথে বৈদিক সংস্কৃতির কোনো সামঞ্জস্যতা নেই।

জাতি

‘জাতি’র অর্থ হচ্ছে এক শ্রেণীভুক্তকরণ যার উৎস হচ্ছে জন্মে। ন্যায় সূত্র বলেছে “সমানপ্রসাভাত্মিকা জাতিহ্‌” অথবা তারা যাদের একইপ্রকার জন্মসূত্র যা এদেরকে একটি জাতিতে সমষ্টিবদ্ধ করে।
একটি প্রাথমিক আরো বড় শ্রেণীভুক্তকরণ ঋষিদের দ্বারা করা হয়েছে চারভাবে: উদ্ভিজ (অর্থাৎ গাছপালা),  আন্ডাজ (অর্থাৎ ডিম থেকে যার উৎপত্তি যেমন পাখি এবং সরীসৃপ), পিন্ডজ (স্তন্যপায়ী), উষ্মজ (তাপমাত্রা বা পরিবেষ্টনকারী আবহাওয়ার জন্য যার জন্ম যেমন ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া ইত্যাদি)।
তেমনিভাবে নানাপ্রকার পশুসমূহ যেমন হাতি, সিংহ, খরগোশ ইত্যাদি তৈরি করে এক ভিন্ন ‘জাতি’। একইভাবে সমস্ত মানবকুল তৈরি করে একটি ‘জাতি’।
একটি নির্দিষ্ট জাতির থাকবে একই ধরনের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য যারা সেই জাতি থেকে আরেক জাতিতে পরিবর্তিত হতে পারবে না এবং ভিন্ন জাতির বাচ্চা প্রসব করতে পারবে না। অর্থাৎ, জাতি হচ্ছে ঈশ্বরের সৃষ্টি।
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রেরা কোনোভাবেই ভিন্ন জাতি নয় কারণ তাদের মধ্যে জন্ম সূত্রগত বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগত কোনো পার্থক্য নেই যা তাদেরকে ভিন্ন করবে।
পরবর্তীতে ‘জাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে যেকোনো প্রকার শ্রেণীভেদকরণের জন্য। তাই সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন ভিন্ন সমাজকেও ভিন্ন ভিন্ন ‘জাতি’ হিসেবে আখ্যা দেই। কিন্তু এ শুধু ব্যবহারের সুবিধার জন্য। আসলে আমরা মানবকুল এক জাতিরই অংশ।

বর্ণ

প্রকৃত যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র বোঝাতে তা হলো ‘বর্ণ’ (‘জাতি’ নয়)।
‘বর্ণ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এই চারকে বোঝাতেই নয়, বরং দস্যু ও আর্যদেরকেও।

‘বর্ণ’ অর্থ হচ্ছে তাহাই যাহা গ্রহণ করা হয় পছন্দের দ্বারা। তাই, যেখানে ‘জাতি’ ঈশ্বর দ্বারা প্রদত্ত, ‘বর্ণ’ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব পছন্দগত।

যারা আর্য হতে পছন্দ করে তাদের বলা হয় ‘আর্য বর্ণ’। তেমনি যারা দস্যু হতে পছন্দ করে, তারা হয় ‘দস্যু বর্ণ’। একইভাবে হয় ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র।

এই কারণেই বৈদিক ধর্মকে বলা হয় ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম’। বর্ণ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে এটির ভিত্তি হচ্ছে নিজ পছন্দকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া ও যোগ্যতা অনুসারে পরিচালিত ব্যবস্থাকে অনুমোদন দেয়া।

৩।
যারা বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত, তারা পছন্দ করেন ‘ব্রাহ্মণ বর্ণ’। যারা প্রতিরক্ষা, যুদ্ধ-বিগ্রহ পছন্দ করেন, তারা হন ‘ক্ষত্রিয় বর্ণ’। যারা অর্থনীতি ও পশুপালনাদি পছন্দ করেন তারা হন ‘বৈশ্য বর্ণ’ এবং যারা নিয়োজিত আছেন অন্যান্য সেবামূলক কাজ-কর্মে, তারা হন ‘শূদ্র বর্ণ’। এসব শুধু বোঝায় নানা ধরনের পছন্দ যেসব মানুষজন তাদের কর্মের জন্য নির্বাচন করেন এবং এর সাথে ‘জাতি’ বা জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই।

৪।
পুরুষ সুক্তের অন্যান্য মন্ত্রসমূহ উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, ব্রাহ্মণ এসেছে ঈশ্বরের মুখ থেকে, ক্ষত্রিয় হাত থেকে, বৈশ্য উরু থেকে এবং শূদ্র পা থেকে। সেইভাবে এইসব বর্ণসমূহ জন্মগত। কিন্তু কোনোকিছুই এর চেয়ে বেশী ভ্রান্তিজনক হতে পারে না। আসুন দেখি কেন:

(অ)
বেদ ঈশ্বরকে বর্ণনা করে আকারহীন ও অপরিবর্তনশীল হিসেবে। এমন ঈশ্বর কিভাবে বিশাল আকৃতির মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে যদি তিনি আকারহীনই হন? (যজুর্বেদ ৪০.৮)

ডঃ তুলসি রাম শর্মা হলেন সংস্কৃত পণ্ডিত যিনি পাণিনির সূত্রে সংস্কৃত থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ তার ভাবার্থসহ করেছেন। নিচে যজুর্বেদের ৪০.৮ এর স্ক্রিনশট দেওয়া হলোঃ

বেদ


(আ)
যদি ইহা সত্যিই হয়, তাহলে তাহা বেদের কর্মতত্ত্বের বিরোধীতা করবে। কারণ কর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির জন্মগত পরিবার পরিবর্তিত হতে পারে তার কর্ম অনুসারে। সুতরাং একজন ব্যক্তি যে শূদ্র পরিবারে জন্ম নেয়, পরের জন্মে এক রাজার পরিবারে জন্ম নিতে পারে। কিন্তু যদি শূদ্রেরা ঈশ্বরের পা থেকে এসে থাকে, তাহলে সেই একই শূদ্র ঈশ্বরের হাত থেকে কিভাবে জন্ম নেয়?

(ই)
আত্মা হলো সময়হীন এবং কখনো জন্ম নেয় না। সুতরাং আত্মার কখনোই কোনো বর্ণ হতে পারে না। এ শুধুমাত্র যখন আত্মা জন্ম নেয় মনুষ্য হিসেবে তখনই এর সুযোগ থাকে বর্ণ বেছে নেবার। তাহলে বর্ণ দ্বারা কি বোঝানো হয় যা ঈশ্বরের একাংশ হতে আসে? যদি আত্মা ঈশ্বরের দেহ থেকে জন্ম না নিয়ে থাকে, তাহলে কি এই বোঝায় যে আত্মার দেহ তৈরি হয়েছে ঈশ্বরের দেহের অংশ থেকে? কিন্তু বেদ অনুযায়ী, এমনকি প্রকৃতিও চিরন্তন। এবং এই একই অনু-পরমানু পুনর্ব্যবহৃত হচ্ছে নানা মনুষ্যের মধ্যে। তাই কৌশলগতভাবে ঈশ্বরের দেহ থেকে জন্ম নেয়া কারো পক্ষে অসম্ভব, এমনকি আমরা যদি ধরেও নেই ঈশ্বরের দেহ আছে।

(ঈ)
উপরে উল্লেখ করা পুরুষ সুক্ত রয়েছে যজুর্বেদের ৩১তম অধ্যায়ে (এবং ঋগবেদ ও অথর্ববেদ বাদে যেগুলোতে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। যজুর্বেদে এ হচ্ছে ৩১.১১)। প্রকৃতভাবে এর অর্থ কি তা বোঝার জন্য, আসুন দেখি এর আগের মন্ত্রের দিকে লক্ষ্য করি ৩১.১০।
এতে প্রশ্ন করা হয়েছে – কে মুখ? কে হাত? কে উরু আর কেই বা পা?

যজুর্বেদের ৩১তম অধ্যায়ে
এর পরের মন্ত্র এর উত্তর দিয়েছে – ব্রাহ্মণ হলো মুখ, ক্ষত্রিয় হলো হাত, বৈশ্য হলো উরু এবং শূদ্র হলো পা।
লক্ষ্য করুন, মন্ত্রটি কিন্তু বলছে না ব্রাহ্মণ “জন্ম নেয়” মুখ থেকে…এটি বলছে ব্রাহ্মণ “হলো” মুখ।
কারণ যদি মন্ত্রটির অর্থ হতো “জন্ম নেওয়া” তাহলে এটি উত্তর দিত না আগের মন্ত্রের প্রশ্নটির “কে মুখ?”
যেমন, যদি আমি প্রশ্ন করি “দশরথ কে?” উত্তরটি যদি হয় “রাম জন্ম নেন দশরথের ঘরে” তাহলে তা হবে অর্থহীন।কে মুখ

প্রকৃত অর্থ হচ্ছে:
সমাজে ব্রাহ্মণ বা বুদ্ধিজীবিরা তৈরি করে মস্তিষ্ক বা মাথা বা মুখ যা চিন্তা করে এবং বলে। ক্ষত্রিয় বা রক্ষণকর্মীরা তৈরি করে হাত যা রক্ষা করে। বৈশ্য বা উৎপাদনকারীরা এবং ব্যবসায়ীরা তৈরি করে উরু যা ভার বহন করে এবং যত্ন করে (লক্ষ্য করুন উরুর হাড় অথবা উর্বাস্থি তৈরি করে রক্ত এবং এ হচ্ছে দেহের সবচেয়ে শক্ত হাড়)। অথর্ববেদে উরুর বদলে “মধ্য” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ বোঝায় পাকস্থলী এবং দেহের মধ্যের অংশ।

শূদ্র বা শ্রমিকেরা তৈরি করে পা যা কাঠামোটিকে দাঁড় করায় এবং দেহকে চলতে সক্ষম করে।
পরবর্তী মন্ত্রগুলো আলোচনা করেছে অন্যান্য দেহের অংশ সম্পর্কে যেমন – মন, চোখ ইত্যাদি। পুরুষ সুক্ত বর্ণনা করেছে সৃষ্টির সূত্রপাত এবং তার স্থায়ী থাকা সম্পর্কে যার মধ্যে অন্তর্গত মানব সমাজ এবং বর্ণনা করেছে অর্থপূর্ণ সমাজের উপাদানসমূহকে।
তাই এ ভীষণ করুণ অবস্থা যে এমন সুন্দর সমাজ সম্পর্কে রূপক বর্ণনা এবং সৃষ্টি সম্পর্কিত বর্ণনা বিকৃত হয়েছে যা সম্পূর্ণভাবে বৈদিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে।
এমনকি ব্রহ্ম গ্রন্থগুলো, মনুস্মৃতি, মহাভারত, রামায়ণ এবং ভগবদগীতা বলে নাই কোনোকিছুই যার কাছাকাছি উপপ্রমেয় হতে পারে এমন অদ্ভূত যে ঈশ্বর তৈরি করেছেন ব্রাহ্মণদের তাঁর মুখ হতে মাংস ছিঁড়ে কিংবা ক্ষত্রিয়দের তাঁর হাতের মাংস থেকে বা অন্যান্যসমূহ।

৫।
তাই এটি স্বাভাবিক কেন ব্রাহ্মণরা বেদ অনুসারে সবচেয়ে বেশী সম্মান লাভ করেছে। এমনটিই হচ্ছে আজকের বর্তমান সমাজে। বুদ্ধিজীবিরা এবং অভিজ্ঞরা আমাদের সম্মান অর্জন করেন কারণ তারা তৈরি করেন দিক প্রদর্শনকারী সারা মানবতার জন্য। কিন্তু যেমনভাবে পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, বেদে শ্রমের মর্যাদা সমভাবে জোর দেওয়া হয়েছে এবং এই কারণেই কোনো প্রকার বৈষম্যের উপাদান নেই।

৬।
বৈদিক সংস্কৃতিতে সবাইকে ধরা হয় শূদ্র হিসেবে জন্ম। তারপর ব্যক্তির শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা সে পরিণত হয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যতে। এই শিক্ষা-দীক্ষার পূর্ণতাকে ধরা হয় দ্বিতীয় জন্ম। একারণেই এই তিন বর্ণকে বলা হয় “দ্বিজ” বা দু’জন্মা। কিন্তু যারা রয়ে যায় অশিক্ষিত (যেকোনো কারণেই হোক) তারা সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়। তারা চালিয়ে যায় শূদ্র হিসেবে এবং করে যায় সমাজের সেবামূলক কাজসমূহ।

৭।
এক ব্রাহ্মণের পুত্র, যদি সে তার শিক্ষা-দীক্ষা সম্পূর্ণ করতে অসমর্থ হয়, পরিণত হয় শূদ্রে। তেমনিভাবে শূদ্রের পুত্র অথবা এমনকি দস্যু, যদি সে তার শিক্ষা-দীক্ষা সম্পূর্ণ করে, তাহলে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় কিংবা বৈশ্য হতে পারে। এ হচ্ছে নির্ভেজাল যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থা। যেমনভাবে এখনকার সময়ে ডিগ্রী প্রদান করা হয়, যজ্ঞপবিত দেয়া হতো বৈদিক নিয়ম অনুসারে। তাছাড়া, আচরণবিধির সাথে অসম্মতি ঘটলে যজ্ঞপবিত নিয়ে নেয়া হতো বর্ণগুলোর।

৮।
বৈদিক ইতিহাসে অনেক উদাহরণ রয়েছে বর্ণ পরিবর্তনের –

(ক)
ঋষি ঐতরেয়া ছিলেন দাস বা অপরাধীর পুত্র কিন্তু তিনি পরিণত হন শীর্ষ ব্রাহ্মণদের মধ্যে একজন এবং লেখেন ঐতরেয়া ব্রহ্ম এবং ঐতরেয়াপোনিষদ। ঐতরেয়া ব্রহ্মকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয় ঋগবেদ বোঝার জন্য।

(খ)
ঋষি ঐলুশ জন্মেছিলেন দাসীর ঘরে যিনি ছিলেন জুয়াখোর এবং নিচু চরিত্রের লোক। কিন্তু এই ঋষি ঋগবেদের উপর গবেষণা করেন এবং কিছু বিষয় আবিষ্কার করেন। তিনি শুধুমাত্র ঋষিদের দ্বারা আমন্ত্রিতই হতেন না এমনকি আচার্য্য হিসেবেও অধিষ্ঠিত হন। (ঐতরেয়া ব্রহ্ম ২.১৯)

(গ)
সত্যকাম জাবাল ছিলেন এক পতিতার পুত্র যিনি পরে একজন ব্রাহ্মণ হন।

(ঘ)
প্রীষধ ছিলেন রাজা দক্ষের পুত্র যিনি পরে শূদ্র হন। পরবর্তীতে তিনি তপস্যা দ্বারা মোক্ষলাভ করেন প্রায়ঃশ্চিত্তের পরে। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৪)
যদি তপস্যা শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ হতো যেমনভাবে উত্তর রামায়ণের নকল গল্প বলে, তাহলে প্রীষধ কিভাবে তা করল?

(ঙ)
নবগ, রাজা নেদিস্থের পুত্র পরিণত হন বৈশ্যে। তার অনেক পুত্র হয়ে যান ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৩)

(চ)
ধৃষ্ট ছিলেন নবগের (বৈশ্য) পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং তার পুত্র হন ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.২.২)

(ছ)
তার পরবর্তী প্রজন্মে কেউ কেউ আবার ব্রাহ্মণ হন। (বিষ্ণু পুরাণ ৯.২.২৩)

(জ)
ভগবদ অনুসারে অগ্নিবেশ্য ব্রাহ্মণ হন যদিও তিনি জন্ম নেন এক রাজার ঘরে।

(ঝ)
রাথোটর জন্ম নেন ক্ষত্রিয় পরিবারে এবং পরে ব্রাহ্মণ হন বিষ্ণু পুরাণ ও ভগবদ অনুযায়ী।

(ঞ)
হরিৎ ব্রাহ্মণ হন ক্ষত্রিয়ের ঘরে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.৩.৫)

(ট)
শৌনক ব্রাহ্মণ হন যদিও ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্ম হয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.৮.১)
এমনকি বায়ু পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ ও হরিবংশ পুরাণ অনুযায়ী শৌনক ঋষির পুত্রেরা সকল বর্ণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
একই ধরনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় গ্রীতসমদ, বিতব্য ও বৃৎসমতির মধ্যে।

(ঠ)
মাতঙ্গ ছিলেন চন্ডালের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন।

(ড)
রাবণ জন্মেছিলেন ঋষি পুলৎস্যের ঘরে কিন্তু পরে রাক্ষস হন।

(ঢ)
প্রবৃদ্ধ ছিলেন রাজা রঘুর পুত্র কিন্তু পরে রাক্ষস হন।

(ণ)
ত্রিশঙ্কু ছিলেন একজন রাজা যিনি পরে চন্ডাল হন।

(ত)
বিশ্বামিত্রের পুত্রেরা শূদ্র হন। বিশ্বামিত্র নিজে ছিলেন ক্ষত্রিয় যিনি পরে ব্রাহ্মণ হন।

(থ)
বিদুর ছিলেন এক চাকরের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং হস্তিনাপুর রাজ্যের মন্ত্রী হন।

৯।
“শূদ্র” শব্দটি বেদে দেখা গেছে প্রায় ২০ বারের মতো। কোথাও এটি অবমাননাকরভাবে ব্যবহৃত হয়নি। কোথাও বলা হয়নি শূদ্রেরা হলো অস্পর্শযোগ্য, জন্মগতভাবে এই অবস্থাণে, বেদ শিক্ষা হতে অনুনোমোদিত, অন্যান্য বর্ণের তুলনায় নিম্ন অবস্থাণের, যজ্ঞে অনুনোমোদিত।

১০।
বেদে বলা হয়েছে শূদ্র বলতে বোঝায় কঠিন পরিশ্রমী ব্যক্তি। (তপসে শূদ্রম্‌ – যজুর্বেদ ৩০.৫)
একারণেই পুরুষ সুক্ত এদের বলে পুরো মানব সমাজের কাঠামো।

১১।
যেহেতু বেদ অনুযায়ী চার বর্ণসমূহ বলতে বোঝায় চার প্রকারের কর্মকান্ড যা পছন্দের উপর ভিত্তি করে, একই ব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে চার বর্ণের বৈশিষ্ট্য চার ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে। এইভাবে সকলেই চার বর্ণের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সারল্যতার জন্য, আমরা বলি প্রধান পেশাকে বর্ণের পরিচয় হিসেবে। এবং এই কারণে সকল মানুষের উচিত পূর্ণভাবে চার বর্ণ হবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা, যেমনভাবে বেদের জ্ঞান আমাদের বলে। এই হলো পুরুষ সুক্তের সারাংশ।

ঋষি বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, অঙ্গীরা, গৌতম, বামদেব ও কন্ব – এরা সকলেই চার বর্ণের বৈশিষ্ট্যের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তারা বৈদিক মন্ত্রের অর্থ উদ্ভাবন করেছেন, দস্যু দমন করেছেন, দৈহিক শ্রমের কর্ম করেছেন এবং নিজেদেরকে যুক্ত করেছেন সমাজ কল্যাণের জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায়।
আমাদেরও উচিত এমনটিই হওয়া।

অবশেষে আমরা দেখলাম বৈদিক সমাজ সকল মানুষকে একই জাতি বা গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করে, শ্রমের মর্যাদা বহাল রাখে, এবং সকল মানুষের জন্য সমান সুযোগ প্রদান করে যাতে তারা নিজ নিজ বর্ণ গ্রহণ করতে পারে।
বেদে কোনো প্রকার জন্মগত বৈষম্যের উল্লেখ নেই।
আমরা যেন সকলে একযুক্ত হয়ে একটি পরিবারের ন্যায় একতাবদ্ধ হতে পারি, প্রত্যাখান করতে পারি জন্মগত সকল বৈষম্যকে এবং একে অপরকে ভাই-বোন হিসেবে সদ্ব্যবহার করতে পারি।
আমরা যেন সকল পথভ্রষ্টকারীদের ভুল পথে এগুনো ব্যাহত করতে পারি যারা বেদে বর্ণভেদ সম্পর্কে ভিত্তিহীন দাবী করে এবং দমন করি সকল দস্যু, অসুর, রাক্ষসদের।
আমরা যেন সকলে আসতে পারি বেদের আশ্রয়ে এবং একত্রে কাজ করে মানবতার বন্ধনকে আরো দৃঢ় করতে পারি এক পরিবার হিসেবে।

সুতরাং বেদ অনুযায়ী কোনো বর্ণভেদ নেই।

Shulok Badhon

সত্যের সন্ধানে ও পথে নির্ভীক সৈনিক।

11 thoughts on “বেদে কোনো বর্ণভেদ নেই

  • April 14, 2018 at 12:20 AM
    Permalink

    জাতিভেদ প্রথা নিয়ে এযাবৎ কাল প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু হিন্দুরা কি জাতিভেদ বা বর্ণভেদ তা যাই বলেন না কেন এর থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে?এখন প্রশ্ন হলো জাতিভেদ প্রথা বিলুপ্ত করার দায়িত্ব কে নিবে। খ্রীষ্টানধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস এর মতো হিন্দুদের মধ‍্যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এমন কোন ধর্মীয় গুরু আছেন কি-যার কথা সবাই শুনবে।নিশ্চয়ই নেই-তো সমাধান কিভাবে হবে। তাছাড়া তথাকথিত বর্ণহিন্দুদের এমন কি দায় পড়েছে দলিতদের ভাই বলে বুকে টেনে নিবে। বর্ণহিন্দুরা কখনো কি এত উদার হতে পারবে -মনে হয়না।কাজেই চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় যতোদিন হিন্দুধর্ম থাকবে ততোদিন হিন্দুধর্মে বর্ণপ্রথাও থাকবে। এ অভিশাপ থেকে হিন্দুরা কখনোই বেরিয়ে আসতে পারবে না। বেদে বা অন্য ধর্মগ্রন্থ গুলোতে বর্ণভেদ প্রথা না থাকলে হাজার হাজার বছর ধরে এ কুপ্রথা কিভাবে হিন্দুদের মধ্যে টিকে আছে? হিন্দুদের মধ‍্যে এতো এতো মহাপুরুষের নাম শোনা যায় তারা তাহলে হিন্দু ধর্মের জন্য কি ভালো কাজটি করেছে? না পেরেছে হিন্দুর ধর্মান্তর ঠেকাতে না পেরেছে জাতিভেদ প্রথা বিলোপ করতে।

    Reply
    • April 14, 2018 at 6:18 AM
      Permalink

      আমাদের নতুন জেনারেশন হিন্দুরা এটা পারবে বলে আমার বিশ্বাস আছে। কারণ বাংলাদেশে হিন্দুদের কিছু সংস্থা ও আর্যসমাজীরা এইসব কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, এমনকি ভারতেও আর্যসমাজীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রসেস ধীরগতিতে হচ্ছে, এতো mass মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তন করা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। হিন্দুদের অন্য প্রথা গুলোও বিলুপ্ত হয়েছে, একদিন এটাও হবে। মহাপুরুষ দের মধ্যে উদাহরণ হিসাবে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায় কে ধরা যায়, যারা এই হিন্দু সমাজ থেকে সতীদাহ প্রথা দূর করা এবং হিন্দু বিধবা আইন পাশ করিয়েছেন। এইগুলা কুপ্রথা গুলো কিন্তু সমাজে ধর্ম রুপেই ছিলো,যদিও এইগুলা হিন্দুশাস্ত্র বিরুদ্ধ ছিলো। এই মহাপুরুষেরাই হিন্দুশাস্ত্র থেকে রেফারেন্স টেনে এইসব কুপ্রথা দূর করেছিলো। ধর্মান্তর ঢেকানোর অনেক চেষ্টা চালানো হচ্ছে, একদিনে তো হবে না, অজ্ঞ হিন্দুরাই ধর্মান্তর হচ্ছে। মোঘল সাম্রাজ্যবাদ থেকেই হিন্দু সংস্কৃতির পতন ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়েছিলো, রামকে হেয় করার জন্য বোকাছাগল থেকে রামছাগল শব্দ বানানো। Krishna কে লুচ্চা লম্পটশ্রেষ্ঠ বানানো ইত্যাদি এরকম অনেক আছে। আমি রাম ও krishna কে নিয়ে লিখবো যখন সময় হবে। এই অপপ্রচার গুলো রোধ করতে হবে।

      Reply
    • July 20, 2018 at 6:56 PM
      Permalink

      Your knowledge. Sri Krishna said biggest Dhar ma is yoga dharma. Dharma changes with youg. Human knowledge will abolish the barns automatically according to the nessacity of the time.

      Reply
  • April 14, 2018 at 1:44 PM
    Permalink

    ‘ অজ্ঞ হিন্দুরাই ধর্মান্তর হচ্ছে”-আমি আপনার এই মতের সাথে একমত হতে পারলাম না বলে দু:খিত। বাংলা/ভারতের লক্ষ লক্ষ নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়েছে অজ্ঞতার জন্যে এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ‍্য?তাই যদি হবে তাহলে ভীমরাও আম্বেদকর এর মত একজন সুশিক্ষিত ,ভারতের সংবিধান প্রণেতা কি কারণে তার দলবলসহ প্রকাশ‍্যে ঘোষণা দিয়ে হিন্দু ধর্ম ত‍্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন? অজ্ঞতার জন‍্য ? কই ভারতের কোন ধর্মগুরু, রাজনৈতিক নেতা তো হিন্দু শাস্ত্র ঘেটে তাকে দেখাতে পারেন নি যে হিন্দু ধর্মে জন্মগত বর্ণভেদ বলতে কিছু নেই।হিন্দু ধর্মের প্রকৃত বাস্তবতাটা যে কি এটা আমি আপনি খুব ভালো ভাবেই জানি।এই অমানবিক নিষ্ঠুর বর্ণপ্রথার জন‍্য দায়ী কে-কারা এটা টিকিয়ে রাখতে চায়?তথাকথিত নিম্নবর্ণ এর হিন্দুরা নিশ্চয়ই এটা চায়না-তাহলে কারা চায় -এর উত্তর দেয়ার প্রয়োজন আছে কি? ঈশ্বর চন্দ্র বিদ‍্যাসাগর এবং রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রোধ,বিধবা বিবাহের প্রচলন করেছেন এ সবই ঠিক আছে।কিন্তু হিন্দুধর্মের মূল সমস্যা জাতিভেদ প্রথা উচ্ছেদে তারা ব‍্যর্থ হয়েছেন এটাওতো নিরেট বাস্তবতা।আর জাতিভেদ প্রথা উচ্ছেদের ব‍্যর্থতার কারনেই কিনা জানিনা রাজা রামমোহন রায় হিন্দুধর্ম ছেড়ে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহন করেছিলেন।জানি শুনতে খারাপ লাগবে তবুও কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে এই যে বহু বর্ণে মতবাদে বিশ্বাসী হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা একবর্ণে নিয়ে আসা শুধু কঠিন নয় দূরুহও বটে।তারপরেও মানুষ গভীর অন্ধকারেও আশার আলো দেখতে চায়-আমরাও তাই চাই-পাবো কিনা ভবিষ‍্যতই বলতে পারবে।

    Reply
    • April 15, 2018 at 8:59 AM
      Permalink

      অজ্ঞ হিন্দু বলতে আমি হিন্দু ধর্মীয় সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় জ্ঞান নেই, তাদের বুঝিয়েছি। হিন্দুধর্ম এটা পরে ধর্ম রুপে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আসলে আপনি এটাকে হিন্দু সংস্কৃতি বলতে পারেন। ব্রাহ্মণধর্ম হিন্দু সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সেভাবে ক্ষত্রিয়ধর্ম, বৈশ্য, শূদ্র ধর্ম ও আছে সেগুলাও তাই। আপনি গীতা পড়লে বুঝতে পারবেন, একজন ব্রাহ্মণের ধর্ম কি, একজন ক্ষত্রিয়র ধর্ম কি। এই ব্রাহ্মণধর্ম, ক্ষত্রিয়ধর্ম এবং বাকিদের ধর্মকি সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে গীতায়। ধর্মের মানে মানুষ যা ধারণ করে। Religion/Faith এটার সাথে ধর্ম শব্দ যায় না। দুটো ভিন্ন। Dharma Speaks এইসব নিয়েও কাজ করে যাচ্ছে, এই ভিডিও দেখলে বুঝবেন সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছে https://www.youtube.com/watch?v=k7q_LtZUJZw । তাদের চ্যানেলের সব কয়টা ভিডিও অনেক ইনফোরমেটিভ এবং যৌত্তিকতা আছে। হিন্দুদের ঐক্যবোধ করা কঠিন তবে দুরূহ হয়। দেখা যাক এই হিন্দুত্ববাদ যেটা একটা living tradition আরো কতদিন ধরে টিকে থাকে এত আক্রমণের পরেও। হিন্দু সংস্কৃতিতে diversity কে সম্মান করে বলেই, এটা এতদিন ধরে টিকে আছে। এই বর্ণ বৈষম্য অন্য সমাজেও আছে। আমাদের বাংলাদেশেও একজন রিক্সাওয়ালা বা নিম্ন শ্রেণির মানুষদের সাথে যেরকম দুর্ব্যাবহার করা হয়, সেটা এই বর্ণপ্রথার মতই। সিনেমাতেও দেখা যায়, উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্তের সাথে বিয়ে দিতে চায় না, বলে এই কুলি, ড্রাইভার, চাকর ইত্যাদি দের সাথে তোমার বিয়ে কখনই দেবো না। এই বর্ণপ্রথা আসলে সমাজেরই একটা রোগ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এটা প্রায় সব সমাজেই আছে। একদিন এ প্রথার উচ্ছেদ হবেই সেটা আমরা আশা করতে পারি। আমি নিজেও একজন ক্ষত্রিয় পরিবারের তবে জন্মগতভাবে আমি শূদ্র ছিলাম। কারণ সবাই শূদ্র হয়েই জন্ম নেয় এটা গীতার ভাষ্য। আমি যদি আমার অবস্থান পরিবর্তন না করতাম, তাহলে হয়তো আমাকে নিম্নশ্রেণীর কাজ সর্বদা করতে হতো। এখন আমি চাকরিগত অবস্থায় আছি। পরে হয়তো এই অবস্থান পরিবর্তন করে আমি নিজের ব্যাবসাও চালু করতে পারি। শূদ্র থেকে বৈশ্য হতেও পারি। আমি আগেও বলেছি, এই প্রথা নতুন হিন্দু জেনারেশন উচ্ছেদ করতে পারবে। আমার জেনারেশন থেকে আমি শুরু করেছি , এবং আমার পরের জেনারেশনকেও আমি শিখিয়ে যাবো।

      Reply
      • September 15, 2018 at 3:52 PM
        Permalink

        Excellent writing

        Reply
    • July 20, 2018 at 7:02 PM
      Permalink

      I do not think Buddha is a pure dharma. It is a modification of sanatanism dharma based on Upanishads. In China, Japan Vietnam Buddha dharma mixed with Tao, Shinto etc cult and made some separate concepts in it which directly mismatch with Buddha ism. Acceptance of Buddhism didn’t mean leaving. Sanatanism but taking new though.

      Reply
  • April 22, 2018 at 10:56 AM
    Permalink

    অন‍্যান‍্য ধর্মে উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণী বৈষম্য সাময়িক-নিম্নবিত্তের আর্থিক উন্নতির সাথে এটা থাকেনা।কিন্তু হিন্দুদের বর্ণবৈষম‍্য জন্মগত-আর্থিক উন্নতি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা দ্বারা এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় কি?আপনার মতামত জানতে চাই।

    Reply
    • April 22, 2018 at 11:17 AM
      Permalink

      আমি বলবো যায়, শিক্ষা দ্বারাই এটা সম্ভব, এখন নতুন জেনারেশন এইসব বর্ণবৈষম্য মানে না। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু সংস্থা এবং সংগঠন এটাই প্রচার করে এখন “জাত-পাত দূর কর, হিন্দু হলেই বিয়ে করো”। এখানে দেখতে পারেন https://www.facebook.com/search/str/%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81+%E0%A6%B9%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%87+%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87+%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%8B+/keywords_search । সুশিক্ষিত হিন্দুরাই এটা প্রচার করছে, মানুষের এই চিন্তা পরিবর্তন করা কঠিন তবে অসম্ভব নয়। আমার বাবা ক্ষত্রিয় পরিবারের হয়েও আমার মাকে বিয়ে করে, যে কিনা শূদ্র পরিবারের ছিলো। আমার মা পড়ালেখা করে ডাক্তার হয় এবং সমাজে সম্মানিত স্থান পায়।

      Reply
  • April 22, 2018 at 1:15 PM
    Permalink

    বিয়ের মাধ্যমে নারীদের বর্ণ পরিবর্তন তো হতেই পারে।কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে কিভাবে সম্ভব? বাংলাদেশে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় বলতে কিছু আছে বলে জানতাম না।আপনার পিতা শূদ্র কণ‍্যাকে বিয়ে করেছেন-এ কথার মাধ্যমে প্রকারন্তরে হিন্দুদের জন্মগত বর্ণকেই স্বীকার করে নেয়া হয়। সে যাহোক আপনি হিন্দুদের বর্ণপ্রথার উচ্ছেদ চান,অমানবিক এপ্রথার সংস্কার চান-তা আপনার লেখা পড়ে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়। আমি আপনার এ মহৎ উদ্যোগ কে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। লিঙ্কগুলো দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।ভালো থাকবেন।

    Reply
  • June 16, 2019 at 6:43 AM
    Permalink

    আপনার লেখাটির কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। তার আগে প্রথমেই একটি বিষয় স্বীকার করছি, আর্যদের মধ্যে বর্ণ প্রথমদিকে অনেকটা শিথিল ছিল অর্থাৎ, ইচ্ছামতো বর্ণ পরিবর্তন করা যেত।

    এবার আমার মূল কথায় আসি। আপনার লেখার শিরোনাম বেদে বর্ণভেদ নেই। কিন্তু আপনি তাতে অনেক পুরাণের উল্লেখও করেছেন এবং সেইসব উদাহরণকে বৈদিক বর্ণ ব্যবস্থার উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছেন। আপনি কি নিশ্চিত পুরাণগুলোতে বর্ণভেদ (বৈষম্য অর্থে) নেই? আপনি অনেক পুরাণের উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে যথাযথ তথ্যসূত্র দেননি। আশাকরি সেগুলো আপনি যুক্ত করবেন। তথ্যসূত্র ছাড়া কথার সত্যতা কিছুতেই নির্ণয় করা যায় না। এছাড়া ব্রাহ্মণ থেকে রাক্ষস হওয়ার ঘটনাকে যে আপনি বর্ণ পরিবর্তন বলে ধরেছেন, এটা একটু অদ্ভুত মনে হল! রাক্ষস বর্ণ হল কবে থেকে?

    আপনি বলেছেন, ” বৈদিক সংস্কৃতিতে সবাইকে ধরা হয় শূদ্র হিসেবে জন্ম। তারপর ব্যক্তির শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা সে পরিণত হয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যতে। এই শিক্ষা-দীক্ষার পূর্ণতাকে ধরা হয় দ্বিতীয় জন্ম। একারণেই এই তিন বর্ণকে বলা হয় “দ্বিজ” বা দু’জন্মা। কিন্তু যারা রয়ে যায় অশিক্ষিত (যেকোনো কারণেই হোক) তারা সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়। তারা চালিয়ে যায় শূদ্র হিসেবে এবং করে যায় সমাজের সেবামূলক কাজসমূহ।” বৈদিক সংস্কৃতিতে সবার জন্ম যে শূদ্র হিসাবে হয় এর কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি আপনি। আশা করি করবেন। যদিও এটি কোনও শাস্ত্রে পড়েছিলাম বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু এখন মনে নেই।তবে সকল পাঠকদের সুবিধার্থে এটির তথ্যসূত্র দিলে ভালো হবে।

    আপনি উদাহরণ হিসাবে মাতঙ্গের কথা বলেছেন। সাথে কোনো তথ্যসূত্র দেননি। তবে আমি যতটা পড়েছি, সেই অনুসারে মাতঙ্গের উল্লেখ মহাভারতে রয়েছে। মাতঙ্গ বহু কঠোর তপস্যা করেও ব্রাহ্মণ হতে পারেননি। এর দ্বারা মহাভারতে বোঝানো হয়েছে চণ্ডাল চাইলে কখনোই এক জন্মে ব্রাহ্মণ হতে পারেনা। মাতঙ্গের কাহিনীর উল্লেখ করছি-

    অনুশাসন পর্বে যুধিষ্ঠির ভীষ্মকে জিজ্ঞেস বলেন, “ …ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র কোন কার্য দ্বারা ব্রাহ্মণত্ব লাভে সমর্থ হয়? তপস্যা, সৎকার্য, শাস্ত্রজ্ঞান এই কয়েকটির মধ্যে কোনটি ক্ষত্রিয়াদি বর্ণত্রয়ের ব্রাহ্মণত্ব লাভের উপযোগী , তাহা আপনি সবিস্তারে কীর্তন করুন।“ ভীষ্ম বলেন, “ ধর্মরাজ ক্ষত্রিয় প্রভৃতি বর্ণত্রয়ের ব্রাহ্মণত্ব লাভ করা নিতান্ত সুকঠিন। ব্রাহ্মণত্ব সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। জীব বারবার জন্মমৃত্যু লাভ ও বহুবিধ যোনিতে পরিভ্রমণ পূর্বক পরিশেষে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। “ এরপর ভীষ্ম চণ্ডাল মাতঙ্গের ব্রাহ্মণ হওয়ার প্রচেষ্টার কাহিনী বর্ণনা করেন।
    পূর্বকালে এক ব্রাহ্মণের স্ত্রীর গর্ভে শূদ্রের ঔরসে মাতঙ্গ নামে এক পুত্র হয়। ব্রাহ্মণ ঐ পুত্রকে নিজের পুত্র ভেবে তার জাতকর্ম ইত্যাদি সমাপন করেন। একদিন ব্রাহ্মণ মাতঙ্গকে যজ্ঞের দ্রব্যসমূহ আনার জন্য আদেশ দিলে মাতঙ্গ তার গর্দভযুক্ত রথে করে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু ওই গর্দভ যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে না গিয়ে তার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়। এই দেখে মাতঙ্গ সেই গর্দভকে আঘাত করেন। তখন সেই গর্দভের মা মাতঙ্গকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, “ বৎস, তুমি দুঃখিত হইও না। এক্ষণে এক চণ্ডাল তোমারে সঞ্চালিত করিতেছে। ব্রাহ্মণ কদাচ এইরূপ নিষ্ঠুর স্বভাব হন না। ব্রাহ্মণ জগতের মিত্র। তিনি সকল ভূতের আচার্য ও শাসনকর্তা, এই ব্যক্তি ব্রাহ্মণ হইলে কি তোমারে এইরূপ নির্দয়ভাবে প্রহার করিতে পারিত? এই দুরাত্মা অতিশয় পাপস্বভাব। শিশুর প্রতি ইহার কিছুমাত্র দয়ার উদ্রেক হইতেছে না। এই নির্দয় যেমন ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তদনুরূপ কার্যসাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। ইহার জাতিসুলভ অসৎভাব ইহারে তোমার প্রতি সদ্ভাব প্রদর্শনে একান্ত পরাঙ্মুখ করিতেছে।“
    গর্দভীর কাছ থেকে এমন কটু বাক্য শোনার পর মাতঙ্গ গর্দভীকে বলেন, “ কল্যাণী! আমার মা যেরূপে দূষিত হইয়াছেন, আমি যে নিমিত্ত চণ্ডাল হইয়াছি এবং যে কারণে আমার ব্রাহ্মণত্ব নষ্ট হইয়াছে তুমি তৎসমুদয় আমার নিকট অকপটে কীর্তন কর।“ তখন গর্দভী বললো, “ তুমি কামোন্মত্তা ব্রাহ্মণীর গর্ভে নাপিতের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। এই নিমিত্ত তোমার ব্রাহ্মণত্ব তিরোহিত হইয়াছে ও তুমি চণ্ডাল হইয়াছ।“
    মাতঙ্গ গর্দভীর মুখে একথা শোনা মাত্র যজ্ঞদ্রব্য আহরণ না করেই ঘরে ফিরে যায়। তখন তার ব্রাহ্মণ পিতা তাকে যজ্ঞের দ্রব্য না আনার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “ পিত! যে ব্যক্তি চণ্ডাল জাতি বা তদপেক্ষা নিকৃষ্ট জাতিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছে , তাহার আর মঙ্গল কি? যাহার জননী দুঃশীলা , সে কিরূপে কুশলী হইবে? এই গর্দভী কহিতেছে যে, তুমি ব্রাহ্মণীর গর্ভে শূদ্রের ঔরসে জন্ম পরিগ্রহ করিয়াছ। ইহার বাক্য কদাপি মিথ্যা হইবার নহে। অতএব আমি এক্ষণে ব্রাহ্মণত্ব লাভের নিমিত্ত অতি কঠোর তপোনুষ্ঠান করিব। “ এই বলে মাতঙ্গ তার পর থেকে ব্রাহ্মণত্ব লাভের জন্য কঠোর তপস্যা করতে থাকেন। মাতঙ্গের কঠোর তপস্যা দেখে দেবতারা ভয় পেয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে মাতঙ্গের কাছে প্রেরণ করেন। ইন্দ্র মাতঙ্গকে বর প্রদানে আগ্রহী হয়ে তার তপস্যার কারণ জানতে চান। মাতঙ্গ বলেন, “ ভগবন! আমি ব্রাহ্মণত্ব লাভের নিমিত্ত এই তপোনুষ্ঠান করিতেছি। ব্রাহ্মণত্ব ভিন্ন অন্য কোনো বরই প্রার্থনা করি না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ হইলেই আমি গৃহে প্রতিগমন করিব।“ তখন ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্র মাতঙ্গের সেই অসঙ্গত প্রার্থনা শ্রবণ করে বললেন, “ মাতঙ্গ তুমি যাহা লাভ করিতে ইচ্ছা করিতেছ, উহা নিতান্ত দুর্লভ। তুমি এই অসুলভ বিষয় লাভের চেষ্টা করিয়া নিশ্চয়ই বিনাশপ্রাপ্ত হইবে। ব্রাহ্মণত্ব সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; তপস্যা দ্বারা কোনোক্রমেই উহা অধিকার করা যাইতে পারে না। অতএব তুমি অবিলম্বে এই দুরাশা পরিত্যাগ কর। ত্রিলোকমধ্যে যাহা পরম পবিত্র বলিয়া সমাদৃত হইয়া থাকে , তুমি চণ্ডাল যোনিতে জন্ম গ্রহণ করিয়া কিরূপে তাহা প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হইবে?”
    ইন্দ্র এমন বললে মাতঙ্গ ইন্দ্রের কথা না শুনে একশত বছর এক পায়ে দাঁড়িয়ে কঠিন তপস্যা করলেন। তখন ইন্দ্র আবারো তার কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “ বৎস! ব্রাহ্মণ্য নিতান্ত দুর্লভ। তুমি উহা লাভ করিতে চেষ্টা করিয়া নিশ্চয় কালকবলে নিপতিত হইবে।তথাপি আমি তোমারে বারংবার নিষেধ করিতেছি। তুমি ব্রাহ্মণ্য লাভের বাসনা করিও না। তুমি সহস্র চেষ্টা করিলেও কোন ক্রমেই উহা লাভ করিতে পারিবে না। জীব তির্যকযোনি হইতে মনুষ্যত্ব লাভ করিয়া প্রথমত পুক্কস বা চণ্ডাল যোনিতে উৎপন্ন হইয়া সহস্র বছর সেই নিকৃষ্ট যোনিতে পরিভ্রমণ পূর্বক শূদ্রতা লাভ করে। তৎপরে ত্রিংশত সহস্র বৎসর অতীত হইলে তাহার বৈশ্যতা, বৈশ্যতা লাভের পর এক লক্ষ অশীতি সহস্র বৎসর অতীত হইলে ক্ষত্রিয়ত্ব ও ক্ষত্রিয়ত্ব লাভের পর এক লক্ষ অশীতি বৎসর অতীত হইলে পতিত ব্রাহ্মণত্ব লাভ হয়। তৎপরে সে সেই পতিত ব্রাহ্মণকুলে দ্বিশত ষোড়শ কোটি বৎসর পরিভ্রমণ করিয়া অস্ত্রজীবি ব্রাহ্মণের কুলে, তৎপরে চতুঃষষ্টি সহস্র অষ্ট শত কোটি বৎসর অতীত হইলে গায়ত্রী সেবি ব্রাহ্মণ বংশে, এবং পরিশেষে ঐ বংশে দুইশত উনষষ্টি লক্ষ বিংশতি সহস্র কোটি বৎসর পরিভ্রমণ করিয়া শ্রোত্রিয় গৃহে জন্মপরিগ্রহ করে।… হে মাতঙ্গ এক্ষণে আমি তোমার নিকট যেকথা কীর্তন করিলাম , ইহা বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম করিয়া অন্য অভিষ্ট বর প্রার্থনা কর। ব্রাহ্মণ্যলাভের লোভ করা তোমার পক্ষে নিতান্ত কঠিন।“
    ইন্দ্রের এ কথা শুনেও মাতঙ্গ থামলেন না। এক পায়ে দাঁড়িয়ে আরো একশ বছর ধ্যানে মগ্ন রইলেন। এর পর ইন্দ্র সেখানে উপস্থিত হয়ে মাতঙ্গকে আগের কথা বলে তপস্যা করতে নিষেধ করলেন।
    তখন মাতঙ্গ জিজ্ঞেস করলেন, হে পুরন্দর আমি ব্রহ্মচারী হইয়া সমাহিত চিত্তে সহস্র বৎসর এক পদে দণ্ডায়মান রহিয়াছি; তথাপি কি নিমিত্ত আমার ব্রাহ্মণ্য লাভ হইতেছে না।
    দেবরাজ কহিলেন, বৎস! তুমি চণ্ডাল যোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছ; অতএব কোনোরূপেই ব্রাহ্মণ্য লাভে সমর্থ হইবে না। এক্ষণে আর তোমার বৃথা পরিশ্রম করিবার প্রয়োজন নাই। তুমি অন্য অভিলাষিত বর প্রার্থনা কর। তখন মাতঙ্গ ইন্দ্র বাক্য শ্রবণে একান্ত শোকার্ত হইয়া গয়া তীর্থে গমন পূর্বক এক বৎসর অঙ্গুষ্ঠের উপর নির্ভর করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। ঐরূপ কঠোর তপোনুষ্ঠান করাতে তাহার শরীর অস্থিচর্মাবশিষ্ট ও শিরা সমুদায়ে পরিব্যপ্ত হইল। অনন্তর একদা তিনি সেই ঘোরতর নিয়মানুষ্ঠান করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন সাথে সাথে ইন্দ্র মাতঙ্গের সামনে উপস্থিত হইলেন। ইন্দ্র বললেন, “ বৎস! ব্রাহ্মণত্ব লাভ তোমার পক্ষে নিতান্ত বিরুদ্ধ বলিয়া মনে হইতেছে। ফলত ব্রাহ্মণ্য লাভ নিতান্ত সুকঠিন, উহার লাভ চেষ্টা করিলে অশেষ বিঘ্ন উপস্থিত হয়। এই ভূমন্ডলে ব্রাহ্মণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। ব্রাহ্মণকে পূজা না করিলে অশেষ দুঃখ এবং পূজা করিলে বিবিধ সুখ লাভ হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণ সমুদায় প্রাণীর মঙ্গলদাতা। ব্রাহ্মণ হইতেই দেবতা ও পিতৃগণ পরিতৃপ্ত হয়। ব্রাহ্মণগণ যখন যাহা বাসনা করেন তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিতে পারেন। জীব পর্যায়ক্রমে বহুতর যোনি পরিভ্রমণ করিয়া পরিশেষে ব্রাহ্মণ্য লাভ করে। অতএব তুমি সেই দুর্লভ ব্রাহ্মণ্য লাভের বাসনা পরিত্যাগ করিয়া অন্যবর প্রার্থনা কর। কখনোই তদ্বিষয়ে কৃতকার্য হইবে না।“
    মাতঙ্গ বললেন, “ দেবেন্দ্র আপনি আর কি নিমিত্ত আমারে তিরস্কার করিয়া পীড়িতপীড়ন ও মৃত ব্যক্তির উপর প্রহার করিতেছেন? আমি তপোবলে ব্রাহ্মণ্য লাভের উপযুক্ত হইলেও আপনি কি নিমিত্ত আমারে উহা প্রদান করিতেছেন না? অনেকে ক্ষত্রিয়াদি বর্ণত্রয়ের পক্ষে নিতান্ত দুর্লভ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়াও নিয়মিত তাহা প্রতিপালন করিতেছে না। যাহারা দুর্লভ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়া তাহা প্রতিপালন না করে, তাহারা নিতান্ত পাপাত্মা ব্যক্তিগণ অপেক্ষাও অধম। কিন্তু জনসমাজে তাদৃশ ব্যক্তিগণ তো ব্রাহ্মণ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। অতএব যখন অনেকে অহিংসা, শম দমাদি ধর্মের অনুষ্ঠান না করিয়াও ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিগণিত হইতেছে , তখন আমি আত্মারাম নির্দ্বন্দ্ব নিষ্পরিগ্রহ অহিংসাদি ধর্মাবলম্বী হইয়াও কি নিমিত্ত ব্রাহ্মণ্য লাভে বঞ্চিত হইব। হায়! আমার কি দুরদৃষ্ট, আমি ধর্মজ্ঞ হইয়াও কেবল একমাত্র মাতৃদোষে এতাদৃশ দুরবস্থা প্রাপ্ত হইলাম। যখন আমি এতাদৃশ যত্নবান হইয়াও, ব্রাহ্মণত্ব লাভে অসমর্থ হইলাম, তখন নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে পুরুষকারপ্রভাবে দৈবকে অতিক্রম করা নিতান্ত সুকঠিন। যাহা হউক, অতঃপর অগত্যা আমারে ব্রাহ্মণত্ব লাভের আশা পরিত্যাগ করিতে হইল।“ তারপর মাতঙ্গ ইন্দ্রের কাছে অন্য বর প্রার্থনা করেন। [ কালিপ্রসন্নের মহাভার/ অনুশাসন পর্ব/ সপ্তবিংশতিতম অধ্যায়- একোনত্রিংশত্তম অধ্যায়]

    আপনি বলেছেন, “বিদুর ছিলেন এক চাকরের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং হস্তিনাপুর রাজ্যের মন্ত্রী হন।”

    বিদুর শুধুমাত্র দাসীপুত্র ছিল না। ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের জন্য ব্যাসদেবকে ডাকা হলে ব্যাসদেব অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুকে উৎপাদন করেন। মহাভারত অনুসারে ব্যাসদেব কুদর্শন ছিলেন। তাকে দেখে অম্বিকা ও অম্বালিকা ভয়ে পেয়েছিলেন। তাই ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ও পান্ডুর গায়ের রঙ পাণ্ডু বর্ণ হয়েছিল। তাই ব্যাসদেবকে দ্বারা আরেকটু সুলক্ষণযুক্ত পুত্র উৎপাদনের জন্য অম্বিকাকে বলা হয়। অম্বিকা ভয়ে ব্যাসদেবের কাছে যান না, এক সুন্দরী দাসীকে ব্যাসদেবের কাছে পাঠান। সেই দাসী বিদুরকে জন্ম দেন। সুতরাং ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর সকলেই ব্যাসদেবের সন্তান। এমনকি মহাভারতে, বিদুরকেও রাজা বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রজ পুত্র বলা হয়েছে-

    ” এইরূপে দ্বৈপায়ণের ঔরসে ও বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম হয়। ” [কালিপ্রসন্নের মহাভারত/ আদি পর্ব/ ১০৬ অধ্যায়]

    বিদূরকে স্বয়ং ধর্মের অবতার বলা হয়েছে মহাভারতে। তবে ধর্মের বিদূর রূপে জন্মগ্রহণ করার একটি পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। কাহিনীটি এমন-
    মান্ডব্য নামে এক ঋষি ছিলেন। তিনি যখন মৌনব্রত পালন করছিলেন তখন নগরপালদের ভয়ে তার আশ্রমে কিছু দস্যু আত্মগোপন করে। দস্যুদের খুঁজতে খুঁজতে নগরপালেরা সেখানে উপস্থিত হয়ে মৌনব্রত অবলম্বনকারী মান্ডব্যকে দেখতে পান। তারা ঋষির কাছে দস্যুদের সম্বন্ধে জানতে চান। ঋষি যেহেতু মৌনব্রত অবলম্বন করছিলেন, তাই তিনি ভালো-খারাপ কিছুই বললেন না। তারা সন্দেহের বশে দস্যুদের সাথে ঋষি মান্ডব্যকেও ধরে নিয়ে যান রাজার কাছে। রাজা তাদের শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি দেন। শূলে চড়ানোর পরেও মান্ডব্য দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন। মান্ডব্যকে এমন অবস্থায়ও বেঁচে থাকতে দেখে রাজা তার ভুল বুঝতে পারেন এবং মান্ডব্যকে শূল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শূল কোনোমতেই বের করতে সক্ষম হন না। শেষমেষ শূলের মূলচ্ছেদ করে দেন। এভাবে শূল বহন করেই মান্ডব্য দীর্ঘকাল কাটান । একবার মান্ডব্য যমালয়ে গমন করেন। সেখানে তিনি ধর্মরাজের দেখা পান। কোন পাপের ফলে মান্ডব্য এমন শাস্তি ভোগ করছেন তা তিনি ধর্মের কাছে জানতে চান। ধর্ম বলেন, মান্ডব্য এক পতঙ্গের পুচ্ছদেশে তৃণ প্রবেশ করিয়েছিলেন, তার ফলেই তিনি এমন শাস্তি পেলেন। এ কথা শোনার পর মান্ডব্য ধর্মকে মানুষ রূপে শূদ্রযোনিতে জন্ম নেওয়ার অভিশাপ দেন। [আদি পর্ব/ সপ্তাধিক শততম অধ্যায় – অষ্টাধিকশততম অধ্যায়]

    সুতরাং দেখা যায় মহাভারত অনুসারে ধর্ম দেবতা অভিশাপের ফলেই শূদ্রযোনিতে জন্মগ্রহণ করেন। শূদ্রের জীবন যে অভিশপ্ত তার ইঙ্গিতই এই কাহিনী বহন করে।

    পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, বিদুরকেও বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রজ পুত্র বলা হয়েছে মহাভারতে। বিদূরের হীন জাতিতে জন্মের কারণে তাকে সিংহাসন থেকেও বঞ্চিত করা হয়।
    মহাভারতে বলা হয়েছে, “বিদূরের ন্যায় ধার্মিক ত্রিভুবনমধ্যে দৃষ্টিগোচর হইত না…… ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ ছিলেন, বিদূর পারসব, সুতরাং পাণ্ডুই সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন।“ [ মহাভারত/ আদিপর্ব/ ১০৯ অধ্যায়]

    বিদূর নিজেও ক্ষণে ক্ষণে হীনমন্যতায় ভুগতেন তার নীচু জাতিতে জন্মের কারণে-
    বিদূর কহিলেন, “ মহারাজ, আমি শূদ্রযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছি এই নিমিত্ত আপনার নিকট সেই বিষয়ের উল্লেখ করিতে অসমর্থ হইতেছি। কিন্তু কুমার সনৎসুজাতের জ্ঞানই শ্বাশ্বত জ্ঞান । যিনি ব্রাহ্মণকুলে জন্মপরিগ্রহ করিয়া অতি গোপনীয় বিষয় সমুদয় কীর্তন করেন , তিনি দেবগণের নিকট কদাচ নিন্দাভাজন হয়েন না, অতএব আমি সনৎসুজাতের নিকট এই বিষয় শ্রবণ করিতে আপনাকে অনুরোধ করিতেছি।“ [উদ্যোগ পর্ব/ চত্বারিংশত্তম অধ্যায়]

    ‘বেদে বর্ণভেদ নেই’ লেখাতে যদি পুরাণের উদাহরণও গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে নিচের তথ্যগুলোও বিবেচনা করবেন বলেই আশা করি।

    https://www.shongshoy.com/archives/9347

    https://www.shongshoy.com/archives/9291

    https://www.shongshoy.com/archives/13592

    এছাড়া ব্রাহ্মণ স্বাভাবিক ভাবেই অধিক সম্মান পেতে পারে বলে আপনি বলেছেন। ব্রাহ্মণ সম্মান পেত অন্যদের কাছ থেকে নাকি নিজেরা ধড়িবাজ ছিল এখান থেকে দেখুন-

    https://www.shongshoy.com/archives/9381

    https://www.shongshoy.com/archives/13536

    আপনি যেসব পুরাণের উদাহরণ টানছেন, সেইসব পুরাণ , ধর্মশাস্ত্র , মহাভারত ইত্যাদি জাতপাতে ভরপুর। সেসব নিয়ে ধীরে ধীরে লেখা হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *