04.অন্য উপাস্যদের গালি দেয়া নিষেধ?

Print Friendly, PDF & Email

অনেক মুমিনই দাবী করে থাকেন যে, কোরআনে একটি আয়াতে [1] অন্য ধর্মের উপাস্যদের গালি দেয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এই মিথ্যাবাদী মুমিনেরা যে বিষয়টি লুকায় তা হচ্ছে, এই আয়াতটি নাজিলের প্রেক্ষাপট। মুহাম্মদই আগ বাড়িয়ে কাফেরদের দেবদেবীকে গালাগালি করতো, এর বিপরীতে মক্কার কাফেরগণও পাল্টা হুমকি দিয়েছিল যে, মুহাম্মদ এই কাজ করতে থাকলে তারাও মুহাম্মদের আল্লাহকে গালি দিবে। শুধুমাত্র নিজের আল্লাহকে গালির হাত থেকে রক্ষার জন্য মুহাম্মদ ভীত হয়ে এই আয়াতটি নাজিল করেছিল, যা তাফসীর গ্রন্থগুলোতে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা আছে। এই কাজটি মুহাম্মদ মোটেও স্বপ্রোনোদিতভাবে করেনি, পাল্টা হুমকি পাওয়ার পরে করেছিল। এমন নয় যে, মুহাম্মদ কাফেরদের ধর্মগুলো বা বিশ্বাস সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হয়ে নিজেই সেইসব ধর্মের উপাস্যদের গালি দেয়া থেকে বিরত থেকেছিল! শক্তিমত্তায় এবং জনবলে দুর্বল হওয়ার কারণে এই আয়াতটি ছিল মুহাম্মদের কল্পিত আল্লাহকে কাফেরদের গালাগাল থেকে রক্ষার জন্য। পরবর্তীতে ক্ষমতা পাওয়ার পরে মুহাম্মদ সেইসব উপাস্য দেবদেবীদের মূর্তি ও মন্দিরগুলোর কী করেছিল, তা পরে আলোচনা করছি। আপাতত আসুন সেই প্রেক্ষাপটটি জেনে নিই শায়খুল মুফাসসিরীন, ফক্বীহুল উম্মত আল্লামা ছানাউল্লাহ পানীপথীর তাফসীরে মাযহারী থেকে [2]

হজরত ইবনে আব্বাস থেকে বাগবী বর্ণনা করেছেন, যখন এই আয়াত “ইন্নাকুম ওয়ামা তা’বুদুনা মিন্দুনিল্লাহি হাসবু জাহান্নাম’ (নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের উপাসনা করো— সকলে জাহান্নামের ইন্ধন) অবতীর্ণ হলো, তখন মুশরিকেরা বললো, হে মোহাম্মদ! আমাদের প্রভু প্রতিমাগুলোর দোষ বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকো। নইলে আমরাও তোমার প্রভুর দোষ বর্ণনা করবো। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে এই আয়াতটি। আয়াতের প্রথমেই বলা হয়েছে—‘আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা, তারা সীমালংঘন করে অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহকেও গালি দিবে।’
আল্লামা সুদ্দী বর্ণনা করেছেন, মৃত্যুর প্রাক্কালে আবু তালেবের নিকট উপস্থিত হলো কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ। বললো, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের সঙ্গে বিবাদ করতে নিষেধ করে দিন। ভাবতে লজ্জা হয়, আপনার মৃত্যুর পর আমরা যদি মোহাম্মদকে হত্যা করি তবে লোকে বলবে তার চাচাই তাকে নিরাপদে রাখতো। এখন চাচা নেই বলে কাপুরুষেরা তাকে হত্যা করেছে। ওই নেতাদের দলে ছিলো আবু সুফিয়ান, আবু জেহেল, নজর বিন হারেস, উমাইয়া বিন খাল্‌ফ, উবাই বিন খাল্‌ফ, উকবা বিন আবী মুয়ীত, আমর ইবনে আস এবং আসওয়াদ বিন আবুল বুখতারী। তারা আরো বললো, আপনি আমাদের প্রিয় নেতা। কিন্তু মোহাম্মদ আমাদেরকে ও আমাদের পূজনীয় প্রতিমাগুলোকে কষ্ট দিচ্ছে। যদি আপনি পছন্দ করেন, তবে মোহাম্মদকে এ কাজ থেকে বিরত রাখুন। সে যেনো আমাদের দেবদেবীর বিরুদ্ধে কিছু না বলে। আমরাও তার আল্লাহ্ সম্পর্কে কিছু বলবো না ।
আবু তালেব রসুল স. কে ডেকে বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের ইচ্ছা— তুমি আমাদের ও আমাদের প্রভুদের সম্পর্কে আপত্তিকর কিছু বলবে না। আমরাও তোমার প্রভু সম্পর্কে কোনো অন্যায় মন্তব্য করবো না। আর এরা তো ন্যায্য কথাই বলছে। সুতরাং প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র আমার! তুমি এদের কথা মেনে নাও।
রসুল স. বললেন, তোমরা শুধু আমার একটি কথা মেনে নাও। মানলে তোমরা লাভ করবে সমগ্র আরবের কর্তৃত্ব। অনারবেরাও হয়ে যাবে তোমাদের নেতৃত্বের অধীন।। আবু জেহেল বললো, তোমার পিতার কসম! এরূপ একটি কথা কেনো দশটি কথা মানতে আমরা রাজী। রসুল স. বললেন, তোমরা কেবল বলো ‘লা
ইলাহা ইল্লাল্লহ্’। কিন্তু কুরায়েশ নেতারা এই পবিত্র কলেমা উচ্চারণ করতে অস্বীকৃত হলো এবং তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করলো সেখান থেকে। আবু তালেব বললেন, বৎস! তুমি এছাড়া অন্য কথা বলো— যা তারা মানতে পারে । রসুল স. বললেন, আমার এক হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি এ কথা বলা থেকে বিরত
তাফসীরে মাযহারী/২৭৯

থাকবো না। কুরায়েশ নেতারা নতুন করে প্রস্তাব দিলো, তুমি আমাদের প্রতিমাগুলোকে গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকো। না হলে আমরা তোমাকে ও তোমার নির্দেশদাতাকে গালি দিবো। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হলো— আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে, তাদেরকে তোমরা গালি দিও না, কেননা, তারা সীমালংঘন করে অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহকেও গালি দিবে।
এই আয়াতে প্রকাশ্যতঃ অংশীবাদীদের দেবদেবীদেরকে মন্দ বলতে নিষেধ করা হয়েছে। এ রকম নির্দেশ দেয়া হয়েছে কেবল আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলকে গালমন্দ থেকে রক্ষা করার জন্য। কারণ অজ্ঞ ও অবাধ্যরা এতে করে আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলকে গালাগাল করবে। আয়াতের বর্ণনাদৃষ্টে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, চূড়ান্ত পর্যায়ের অবাধ্যদেরকে পরিত্যাগ করা অত্যাবশ্যক। তাদেরকে কিছু না বলাই উত্তম। সত্য মিথ্যার ন্যূনতমবোধও তাদের নেই ।
তাফসীরে মাযহারী/২৮০

2

এবারে এই আয়াতের তাফসীর দেখে নিই ইবনে কাসীরের তাফসীর থেকে [3] । ইবনে কাসীরের তাফসির থেকেও যা জানা যায় তা হচ্ছে, মুসলিমরাই আগে পৌত্তলিকদের প্রতিমাগুলোকে গালাগালি শুরু করে। তখন বাধ্য হয়ে পৌত্তলিক কোরাইশরা মুহাম্মদের চাচা আবু তালিবের কাছে বিচার দেয়, এবং তাদের দেবদেবীকে গালি দিতে নিষেধ করে। সেই সাথে এটিও হুমকি দেয়, মুহাম্মদ তাদের দেবদেবীকে গালি দিলে তারাও মুহাম্মদের আল্লাহকে গালি দিবে। তখন নিতান্তই বাধ্য হয়ে, তাফসীরের ভাষ্য অনুসারে “উপকার থাকা সত্ত্বেও” কাফেরদের প্রতিমাগুলোকে গালি দেয়া থেকে বিরত থাকার আয়াত নাজিল হয়, যেহেতু সেই সময়ে মুসলিমরা সংখ্যালঘু ছিল!

4
6

তথ্যসূত্র

  1. সূরা আনআ’ম, আয়াত ১০৮ []
  2. তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৮, ২৭৯, ২৮০ []
  3. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৬৬, ৮৬৭[]
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন