পরিবার (Family) ও “পরিবার বিদ্যা” (“Family Studies”): চেনা ঘরের অচেনা জগত ও একটি স্বীকৃতিহীন অথচ সর্বজনীন বিদ্যার খোঁজে
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 বিবর্তনবাদ ও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টি: টিকে থাকার লড়াই
- 2.1 প্যারেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট থিওরি: ত্যাগের অসম হিসাব
- 2.2 যৌন নির্বাচন এবং সঙ্গীর পছন্দ-অপছন্দ: মনের গহীনে জিনের খেলা
- 2.3 কিন সিলেকশন এবং স্বার্থপর জিন
- 2.4 পিতামাতা ও সন্তানের দ্বন্দ্ব: জৈবিক সংঘাত
- 2.5 প্যাটারনিটি আনসার্টেনিটি এবং ঈর্ষার সমীকরণ
- 2.6 গ্র্যান্ডমাদার হাইপোথিসিস: বার্ধক্যের উপযোগিতা
- 2.7 মস্তিষ্কের রসায়ন: ভালোবাসার হরমোন
- 3 নৃবিজ্ঞানের উঠোন: আত্মীয়তার জ্যামিতি
- 3.1 আত্মীয়তার জ্যামিতি ও লুইস হেনরি মর্গান
- 3.2 ইনসেস্ট ট্যাবু এবং জোট তত্ত্ব: লেভি-স্ট্রসের সমীকরণ
- 3.3 ট্রবরিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জ ও মামার ক্ষমতা: ম্যালিনোস্কির চ্যালেঞ্জ
- 3.4 বহু স্বামী ও বহু স্ত্রী: বৈচিত্র্যের বিস্ময়
- 3.5 সামাজিক বাবা বনাম জৈবিক বাবা: নুয়েরদের ভূত বিবাহ
- 3.6 রক্ত নাকি সম্পর্ক: ডেভিড স্নাইডারের বিশ্লেষণ
- 3.7 আধুনিক আত্মীয়তা এবং প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
- 3.8 ফাংশনালিজম বা ক্রিয়াবাদ: র্যাডক্লিফ-ব্রাউনের শৃঙ্খলা
- 4 ইতিহাসের পাতা: শৈশবের জন্ম ও প্রেমের বিয়ে
- 5 সমাজবিজ্ঞানের চশমা: কাঠামো ও দ্বন্দ্ব
- 6 মনোবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি: আবেগের সুতো
- 7 লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভ: সময়ের খেলা
- 7.1 গ্লেন এল্ডার ও মহামন্দার শিশুরা
- 7.2 টাইমিং: সময়ের সঠিক ব্যবহার
- 7.3 লিংকড লাইভস: অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা জীবন
- 7.4 ঐতিহাসিক সময় ও স্থান: আমরা ইতিহাসের সন্তান
- 7.5 হিউম্যান এজেন্সি: স্রোতের বিপরীতে সাঁতার
- 7.6 ট্রানজিশন ও ট্র্যাজেক্টরি: জীবনের পথচলা
- 7.7 কিউমুলেটিভ অ্যাডভান্টেজ ও ডিজঅ্যাডভান্টেজ: চক্রবৃদ্ধি হারে লাভ-ক্ষতি
- 8 অর্থনীতির খাতা: লাভ-ক্ষতির হিসাব
- 8.1 গ্যারি বেকার ও র্যাশনাল চয়েস থিওরি
- 8.2 সন্তান: ভালোবাসার ফসল নাকি বিনিয়োগ?
- 8.3 হাউজহোল্ড প্রোডাকশন: অদৃশ্য অর্থনীতি
- 8.4 অপরচুনিটি কস্ট ও ডিভোর্সের অর্থনীতি
- 8.5 বারগেইনিং মডেল: সংসারের ভেতরে ক্ষমতার লড়াই
- 8.6 শ্রমের জেন্ডার গ্যাপ ও মাদারহুড পেনাল্টি
- 8.7 ইন্টারজেনারেশনাল ওয়েলথ ট্রান্সফার: অসমতার বংশপরম্পরা
- 8.8 ম্যারেজ মার্কেট: বিয়ের বাজার
- 9 ডেমোগ্রাফি বা জনমিতি: সংখ্যার গল্প
- 10 যোগাযোগ বিদ্যা: নীরবতা ও কোলাহল
- 10.1 জেন্ডারলেক্ট: নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভাষা
- 10.2 ফ্যামিলি কমিউনিকেশন প্যাটার্নস থিওরি: খোলামেলা নাকি চাপা?
- 10.3 রিলেশনাল ডায়ালেক্টিকস: কাছে আসার ও দূরে যাওয়ার দ্বন্দ্ব
- 10.4 ফোর হর্সমেন অফ দ্য অ্যাপোক্যালিপ্স: বিচ্ছেদের চার অশ্বারোহী
- 10.5 ডাবল বাইন্ড: পাগল করা যোগাযোগ
- 10.6 সাইলেন্স বা নীরবতা: শক্তিশালী হাতিয়ার
- 10.7 ডিজিটাল যুগের যোগাযোগ: কানেক্টেড কিন্তু একা
- 10.8 ন্যারেটিভ থিওরি: পরিবারের গল্প বলা
- 11 নারীবাদ ও জেন্ডার স্টাডিজ: দ্বিতীয় শিফট
- 11.1 দ্য সেকেন্ড শিফট: কর্মজীবী নারীর দ্বিগুণ বোঝা
- 11.2 ইমোশনাল লেবার: হাসিমুখের চড়া দাম
- 11.3 জুডিথ বাটলার ও পারফর্মিটিভিটি: জেন্ডার যখন অভিনয়
- 11.4 পিতৃতন্ত্র ও প্রাইভেট প্যাট্রিয়ার্কি
- 11.5 মাতৃত্ব বা মাদারহুড: মিথ বনাম বাস্তবতা
- 11.6 জেন্ডার সোশ্যালাইজেশন: গোলাপি বনাম নীল
- 11.7 দ্য মেন্টাল লোড: অদৃশ্য চিন্তার বোঝা
- 11.8 ইন্টারসেকশনালিটি: সব নারীর গল্প এক নয়
- 12 পরিবার ও আইডেন্টিটি: আমি কে?
- 12.1 সিম্বলিক ইন্টারঅ্যাকশনালিজম: আয়নায় নিজেকে দেখা
- 12.2 পারিবারিক আখ্যান: গল্পের সুতোয় বোনা পরিচয়
- 12.3 বংশ ও লিনিয়েজ: রক্তের অহংকার
- 12.4 নামকরণের রাজনীতি: নামের ভেতর পরিচয়
- 12.5 জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়: শেকড়ের টান
- 12.6 ভাই-বোনের ভিন্নতা (Sibling Deidentification)
- 12.7 ফ্যামিলি সিক্রেটস ও পরিচয়ের ছায়া
- 12.8 কুইয়ার আইডেন্টিটি ও পরিবার: কামিং আউট
- 13 আইন ও বিচার: রাষ্ট্র যখন অভিভাবক
- 14 পরিবার, ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব: পার্থিব ও অপার্থিবের সেতু
- 14.1 পবিত্র ছাদ: পিটার বার্জার ও ধর্মের কাজ
- 14.2 ধর্মীয় সামাজিকীকরণ: বিশ্বাসের প্রথম পাঠ
- 14.3 খ্রিস্টধর্ম ও বিবাহের ধর্মানুষ্ঠান
- 14.4 ইসলাম: মওয়াদ্বাহ, রাহমাহ এবং পারিবারিক অধিকার
- 14.5 হিন্দুধর্ম: আশ্রম ব্যবস্থা ও পূর্বপুরুষের ঋণ
- 14.6 লাইফ সাইকেল রিচুয়ালস: দোলনা থেকে কবর
- 14.7 সেক্যুলারাইজেশন থিওরি: ধর্মের কি পতন ঘটছে?
- 14.8 মৌলবাদ এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবারের প্রত্যাবর্তন
- 14.9 ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সামাজিক পুঁজি: পরিবারের বর্ধিত হাত
- 14.10 নারীবাদী ধর্মতত্ত্ব: শৃঙ্খল নাকি মুক্তি?
- 14.11 ধর্ম এবং জেন্ডার ভূমিকা: ঈশ্বর যখন পুরুষ
- 14.12 আন্তঃধর্মীয় বিবাহ: নতুন চ্যালেঞ্জ
- 14.13 ধর্মীয় সংঘাত ও পারিবারিক ভাঙন: বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব
- 14.14 স্পিরিচুয়ালিটি এবং পারিবারিক সুস্থতা
- 15 পরিবার ও রাষ্ট্রচিন্তা: ব্যক্তিগত যখন রাজনৈতিক
- 15.1 এরিস্টটল বনাম প্লেটো: পরিবারের আদি বিতর্ক
- 15.2 লিবালিজম ও পাবলিক-প্রাইভেট বিভাজন
- 15.3 সুসান ওকিন ও পরিবারের ন্যায়বিচার
- 15.4 আলথুসার ও ভাবাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র
- 15.5 বায়োপলিটিক্স: শোবার ঘরে রাষ্ট্র
- 15.6 রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ: ভোটের বাক্স ও ডিনার টেবিল
- 15.7 নাগরিকত্ব ও মাতৃত্ব: নারীবাদী রাজনীতি
- 15.8 একনায়কতন্ত্র ও পরিবার: টোটালিটারিয়ান ভীতি
- 15.9 রক্ষণশীলতা বনাম উদারতাবাদ: পারিবারিক মূল্যবোধের রাজনীতি
- 16 সোশ্যাল ওয়ার্ক ও পলিসি: যখন ঝড় আসে
- 16.1 আলফ্রেড ক্যাডুশিন ও চাইল্ড ওয়েলফেয়ার: শিশুর অধিকার
- 16.2 চাইল্ড প্রোটেকশন ও অ্যাবিউজ: ঘরের ভেতরের শত্রু
- 16.3 ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স: নীরব মহামারী
- 16.4 দারিদ্র্য ও ফ্যামিলি পলিসি: রাষ্ট্রের ভূমিকা
- 16.5 ফস্টার কেয়ার ও অ্যাডপশন: নতুন ঠিকানার খোঁজে
- 16.6 বার্ধক্য ও সোশ্যাল ওয়ার্ক: জীবনের শেষ প্রান্তে
- 16.7 রেজিলিয়েন্স ও স্ট্রেংথ-বেসড অ্যাপ্রোচ
- 17 ভূগোল ও স্থানিক বিদ্যা: দূরত্ব ও নৈকট্য
- 18 জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: জিন ও জীবাণু
- 18.1 জেনেটিক্স ও ফ্যামিলি হিস্ট্রি: রক্তের উত্তরাধিকার
- 18.2 বায়োসাইকোসোশ্যাল মডেল: শরীর, মন ও সমাজ
- 18.3 স্বাস্থ্য আচরণ ও সামাজিকীকরণ: অভ্যাসের দাস
- 18.4 ইনফ্যান্ট মর্টালিটি ও মায়ের স্বাস্থ্য
- 18.5 কেয়ারগিভিং বা সেবাদান: বোঝা নাকি ভালোবাসা?
- 18.6 মেন্টাল হেলথ ও পরিবার: পাগল করার কল
- 18.7 সংক্রামক ব্যাধি ও পারিবারিক ক্লাস্টার
- 19 শিক্ষা ও প্যারেন্টিং: মানুষ গড়ার কারিগর
- 19.1 ডায়ানা বাউমরিন্ড ও প্যারেন্টিং স্টাইল: শাসনের জ্যামিতি
- 19.2 হোম-স্কুল লিংকেজ: সেতুবন্ধন
- 19.3 কালচারাল ক্যাপিটাল ও লারেউ-এর গবেষণা
- 19.4 হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং বনাম ফ্রি-রেঞ্জ কিডস
- 19.5 ফ্যামিলি লিটারেসি ও পড়ার অভ্যাস
- 19.6 ডিজিটাল প্যারেন্টিং: স্ক্রিনের লড়াই
- 19.7 প্যারেন্টাল বার্নআউট: ক্লান্ত বাবা-মা
- 20 বার্ধক্যবিদ্যা বা জেরোন্টোলজি: শেষ বেলার আশ্রয়
- 20.1 স্যান্ডউইচ জেনারেশন: দুই পাহাড়ের মাঝখানে
- 20.2 ইন্টারজেনারেশনাল সলিডারিটি: বন্ধনের ভিত্তি
- 20.3 বার্ধক্যের বোঝা বনাম সম্পদ: এক্সচেঞ্জ থিওরি
- 20.4 এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম: খালি বাসার হাহাকার
- 20.5 এল্ডার অ্যাবিউজ: ঘরের ভেতরের অন্ধকার
- 20.6 ফিলিওল পাইটি ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব
- 20.7 উইডোহুড বা বৈধব্য: একা পথ চলা
- 20.8 সাকসেসফুল এজিং: সফল বার্ধক্যের চাবিকাঠি
- 21 কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের ভারসাম্য: দড়ি টানাটানি
- 22 অবসর ও বিনোদন বিদ্যা: আনন্দের খোঁজ
- 23 প্রযুক্তি ও ডিজিটাল জগত: স্ক্রিনের দেয়াল
- 23.1 শার্লি টার্কল ও একা থাকার নতুন ধরণ
- 23.2 ডিজিটাল অভিবাসী বনাম ডিজিটাল নেটিভ
- 23.3 শ্যারেন্টিং: সন্তানের প্রাইভেসি কোথায়?
- 23.4 ফাবিং: উপেক্ষার নতুন নাম
- 23.5 ডিজিটাল ন্যানি: স্ক্রিন যখন আয়া
- 23.6 ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যামিলি ও ভার্চুয়াল ইনটিমেসি
- 23.7 সাইবার বুলিং ও অনলাইন ঝুঁকি
- 23.8 প্রযুক্তি: ভিলেন নাকি হিরো?
- 24 ভবিষ্যৎ পরিবার: এআই এবং অটোমেশনের যুগে
- 25 হোম ইকোনমিক্স: রান্নাঘরের বিজ্ঞান নাকি বিজ্ঞানের রান্নাঘর?
- 25.1 এলিন রিচার্ডস ও লেক প্লাসিড সম্মেলন
- 25.2 ডমেস্টিসিটি বা গার্হস্থ্যবাদ: বিজ্ঞানের মোড়কে পুরানো প্রথা
- 25.3 জেন্ডার স্টিরিওটাইপ ও সেগ্রিগেশন
- 25.4 কনজিউমারিজম বা ভোগবাদ: কেনাকাটার বিজ্ঞান
- 25.5 একাডেমিক অবহেলা: ‘মিসেস ডিগ্রি’
- 25.6 বিবর্তন ও নাম পরিবর্তন: ফ্যামিলি স্টাডিজের জন্ম
- 25.7 টেকনোক্র্যাটিক বা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা
- 25.8 গ্লোবাল সাউথ ও উন্নয়ন: ভিন্ন প্রেক্ষিত
- 26 কেন নেই একটি মাত্র ডিসিপ্লিন?
- 26.1 বিষয়বস্তুর বিশালতা: সবজান্তা নাকি কোনো জান্তাই নয়?
- 26.2 প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও জেন্ডার বায়াস: অন্দরমহলের বিজ্ঞান
- 26.3 কমন সেন্স সিনড্রোম: জানা জিনিসের অজানা রহস্য
- 26.4 একাডেমিক টার্ফ ওয়ার: কে খাবে এই কেক?
- 26.5 সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তি: কোনটি আসল পরিবার?
- 26.6 মেথডোলজিক্যাল চ্যালেঞ্জ: অন্ধকারের গবেষণা
- 26.7 তাত্ত্বিক একীকরণ বা ইন্টিগ্রেশনের অভাব
- 27 পারিবারিক চিন্তার স্থপতিরা: তাত্ত্বিক ও তাদের মানসজগত
- 27.1 কাঠামোর কারিগর: সমাজতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি
- 27.2 নৃবিজ্ঞানের পথিকৃৎ: আত্মীয়তার জট খোলা
- 27.3 দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার তাত্ত্বিক: মার্ক্সবাদ ও নারীবাদ
- 27.4 মনের গহীনে: মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ
- 27.5 ইতিহাস ও পরিবর্তনের সাক্ষী: ইতিহাসবিদ ও ডেমোগ্রাফার
- 27.6 অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ: গ্যারি বেকার
- 27.7 আধুনিক কণ্ঠস্বর: প্রযুক্তি ও যোগাযোগ
- 28 উপসংহার
- 29 তথ্যসূত্র
ভূমিকা
পৃথিবীতে কিছু কিছু জিনিস আছে যা আমরা খুব সহজ, স্বাভাবিক আর ‘প্রাকৃতিক’ মনে করি। যেমন – শ্বাস নেওয়া। আমরা কি কখনো এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, কীভাবে আমাদের ফুসফুস বাতাস টেনে নিচ্ছে, বা কীভাবে প্রতি সেকেন্ডে অলক্ষ্যে রক্তে অক্সিজেন মিশছে? ভাবি না, কারণ এটা আপনা-আপনিই ঘটে। ঠিক তেমনি একটি সর্বব্যাপী কিন্তু উপেক্ষিত ব্যাপার হলো ‘পরিবার’। জন্মের পর চোখ মেলে আমরা যে জগতটা দেখি, যে হাতটা আমাদের প্রথম স্পর্শ করে, সেটাই আমাদের পরিবার। আমরা অবচেতনভাবেই ধরে নেই, পরিবার মানেই বাবা-মায়ের আদর, ভাই-বোনের খুনসুটি, আর দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে এক ছাদের নিচে ফেরা। ব্যাপারটাকে আমরা এতটাই ‘ন্যাচারাল’ বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেই যে, এর পেছনের জটিল কলকব্জাগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। মনে হয় যেন গাছপালা বা নদীর মতো পরিবারও প্রকৃতিরই একটা অংশ। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে, একটু অন্য লেন্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, পরিবার মোটেও কোনো সহজ-সরল সমীকরণ নয়। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন, অথচ সবচেয়ে রহস্যময় এক প্রতিষ্ঠান।
বাইরে থেকে যাকে কেবল মায়া আর ভালোবাসার এক পবিত্র বন্ধন মনে হয়, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে টিকে থাকার এক নির্মম ও আদিম লড়াই। এখানে জীববিজ্ঞানের কঠোর নিয়ম খাটে, যেখানে জিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। এখানে অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির সূক্ষ্ম হিসাব কষা হয়, যেখানে শ্রম আর সম্পদের বিনিময় ঘটে। আবার রাজনীতির মতো ক্ষমতার চর্চাও চলে এই চারদেয়ালের ভেতরেই – কে সিদ্ধান্ত নেবে, আর কে মানবে। পরিবার একই সাথে আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে আমরা ঝড়ের রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাই; আবার কখনো কখনো এটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় মানসিক সংকটের কারণ, যেখানে ব্যক্তিত্বের সংঘাত আর প্রত্যাশার চাপে মানুষ পিষ্ট হয়।
সময়ের সাথে সাথে এই প্রতিষ্ঠানটি বারবার তার খোলস বদলেছে। গুহার যুগের সেই দলবদ্ধ হয়ে থাকা পরিবার আর আজকের হাই-রাইজ ফ্ল্যাটের বিচ্ছিন্ন পরিবার এক নয়। তবুও, হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেই সভ্যতা গড়ে তুলেছে, সমাজ টিকিয়ে রেখেছে। এই লেখায় আমরা আমাদের সেই অতি চেনা ঘরটাকেই একটু অচেনা চোখে দেখার চেষ্টা করব। আমরা দেখব, রক্ত, অর্থ, আইন এবং আবেগের অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা এই অদ্ভুত প্রতিষ্ঠানটি আসলে কীভাবে কাজ করে। কেন শত ভাঙা-গড়া আর পরিবর্তনের পরেও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পরিবার নামক এই দুর্গটি আজও অপরিহার্য, সেটিই আমাদের অনুসন্ধানের বিষয়।
পৃথিবীতে আশ্চর্যের কোনো শেষ নেই। মানুষের কৌতুহলেরও কোনো সীমা নেই। আমরা অণু-পরমাণুর ভেতরের খবর জানি, মহাকাশের ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করি, সমুদ্রের অতলে কী আছে তা নিয়ে হাজার কোটি ডলার খরচ করে গবেষণা করি। জ্ঞানের রাজ্যের প্রতিটি ধূলিকণা নিয়ে আলাদা আলাদা ডিসিপ্লিন বা বিদ্যাশাখা আছে। মাটির তলার পাথর নিয়ে জিওলজি আছে, আকাশের নক্ষত্র নিয়ে অ্যাস্ট্রোনমি আছে, এমনকি পুরোনো দিনের ভাঙা হাড়ি-পাতিল নিয়ে আর্কিওলজি আছে। কিন্তু মানুষের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে প্রতিষ্ঠানটি ছায়ার মতো লেগে থাকে, যার পেটের ভেতর আমাদের জন্ম এবং যার কোলে মাথা রেখে আমাদের মৃত্যু – সেই ‘পরিবার’ নিয়ে কোনো একক, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সর্বজনস্বীকৃত ডিসিপ্লিন নেই। ব্যাপারটা নিয়ে একটু গভীরভাবে ভাবলে কি খুব অদ্ভুত লাগে না? মনে হয় না যে, আমরা দূরের নক্ষত্র চিনতে গিয়ে কাছের মানুষগুলোকে চেনার প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনটাই করতে ভুলে গেছি?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে এই সংকটটা আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়। করিডোর দিয়ে হাঁটলে দেখবেন সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি, আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান – সবাই পরিবার নিয়ে কিছু না কিছু কথা বলছে। সমাজবিজ্ঞানী বলছেন পরিবার হলো সমাজের একক, মনোবিজ্ঞানী বলছেন ওটা আবেগের কারখানা, অর্থনীতিবিদ বলছেন ওটা উৎপাদনের জায়গা। সবাই পরিবারের শরীর থেকে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে নিয়ে নিজের মতো করে রান্না করে খাচ্ছে। কিন্তু ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ (Family Studies) বা ‘পরিবার বিদ্যা’ নামের কোনো বিশাল মহীরুহ নেই, যার ছায়ায় পরিবারের সবকটি দিক একসাথে আশ্রয় পেতে পারে। পরিবার নামক এই জটিল ও বিশাল প্রতিষ্ঠানটি যেন একাডেমিয়ার জগতে এক এতিম বা সৎ ছেলে হয়ে বেঁচে আছে। একেকজন একেক দিক থেকে একে দেখছে, কিন্তু কেউই একে অখণ্ড বা সামগ্রিকভাবে দেখার চেষ্টা করছে না। ফলে পরিবার সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান হয়ে আছে বিক্ষিপ্ত এবং খণ্ড খণ্ড।
আজকের এই লেখায় আমরা সেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জ্ঞানগুলোকে এক সুতোয় গাঁথব। আমরা দেখব, মানববিদ্যার প্রতিটি শাখা – নৃবিজ্ঞান থেকে শুরু করে স্নায়ুবিজ্ঞান পর্যন্ত – পরিবার নিয়ে ঠিক কী কী কাজ করেছে। কেন এদের সবাইকে এক করে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ ডিসিপ্লিন গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি, সেটি বোঝার চেষ্টা করব। এই যাত্রাটি কেবল একাডেমিক কোনো আলোচনা নয়, বরং এটি আমাদের নিজেদের শেকড় সন্ধানেরই একটি প্রচেষ্টা। কারণ, পরিবারকে বাদ দিয়ে মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা আর জল ছাড়া মাছের বেঁচে থাকার কল্পনা করা একই কথা।
বিবর্তনবাদ ও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টি: টিকে থাকার লড়াই
গল্পের শুরুটা করা যাক একদম গোড়া থেকে। আমরা যখন পরিবারের কথা বলি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়া, মমতা, ভালোবাসা আর ত্যাগের এক অপূর্ব দৃশ্যপট। কিন্তু বিজ্ঞানের চশমা চোখে দিয়ে যদি এই দৃশ্যপটের দিকে তাকানো যায়, তবে রোমান্টিকতার সেই পর্দায় কিছুটা চিড় ধরতে বাধ্য। জীববিজ্ঞানী এবং বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা (Evolutionary Psychologists) বলেন, পরিবারের মূল ভিত্তি কোনো স্বর্গীয় ভালোবাসা নয়, বরং এর পেছনে কাজ করছে অত্যন্ত কঠোর এবং স্বার্থপর এক জৈবিক তাড়না – সেটি হলো নিজের জিনকে (Gene) রক্ষা করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। মানুষ যখন গুহায় বা অরণ্যে থাকত, তখন কি আজকের মতো স্বামী-স্ত্রী-সন্তানের গোছানো সংসার ছিল? নাকি ছিল কেবল টিকে থাকার এক আদিম লড়াই? জীববিজ্ঞান আমাদের বলে, পরিবার হলো প্রকৃতির ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া এমন এক স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল, যার মাধ্যমে মানুষ তার ডিএনএ (DNA) বা বংশগতিকে অমর করে রাখতে চায়। শুনতে খুব যান্ত্রিক বা রূঢ় মনে হলেও, এই জৈবিক সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) যখন প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection) তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তখন তিনি দেখিয়েছিলেন যে, প্রকৃতিতে সেই প্রজাতিই টিকে থাকে যারা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করতে পারে। পরিবারের উদ্ভবও সেই খাপ খাইয়ে নেওয়ারই অংশ। আদিম যুগে যারা দলবেঁধে বা পরিবার গঠন করে থাকেনি, তারা হিংস্র প্রাণীর পেটে গেছে অথবা তাদের সন্তানরা বাঁচতে পারেনি। ফলে তাদের জিন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর যারা পরিবার নামক দুর্গের ভেতর নিজেদের আটকে রেখেছিল, তাদের জিন আজ আমাদের শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে।
প্যারেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট থিওরি: ত্যাগের অসম হিসাব
পরিবারের ভেতরে নারী ও পুরুষের ভূমিকা কেন আলাদা? কেন মায়েরা সচরাচর সন্তানদের প্রতি বেশি যত্নশীল হন আর বাবারা বাইরে থেকে রসদ জোগাড় করেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রিভারস (Robert Trivers) নিয়ে এলেন এক যুগান্তকারী তত্ত্ব, যার নাম প্যারেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট থিওরি (Parental Investment Theory)। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তার গবেষণায় তিনি দেখালেন যে, সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের বিনিয়োগের পরিমাণ মোটেও সমান নয় (Trivers, 1972)। জীববিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘গ্যামেট’ বা জননকোষের অসমতা। পুরুষের শুক্রাণু বা স্পার্ম তৈরি করতে শরীরের খুব একটা শক্তি খরচ হয় না, এবং একজন পুরুষ কোটি কোটি শুক্রাণু উৎপাদন করতে পারে। অন্যদিকে, নারীর ডিম্বাণু বা ওভাম অত্যন্ত মূল্যবান এবং সীমিত। একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করা, নয় মাস ধরে নিজের শরীরের পুষ্টি দিয়ে তাকে বড় করা এবং জন্মের পর বুকের দুধ পান করানো – এই পুরো প্রক্রিয়ায় একজন নারীকে যে পরিমাণ ‘মেটাবলিক এনার্জি’ বা বিপাকীয় শক্তি খরচ করতে হয়, তা পুরুষের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
রবার্ট ট্রিভারস (Robert Trivers) যুক্তি দেখালেন, যেহেতু সন্তান উৎপাদনে নারীর বিনিয়োগ বা ‘ইনভেস্টমেন্ট’ অনেক বেশি, তাই সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীরা অনেক বেশি খুঁতখুঁতে বা ‘চুজি’ (Choosy) হয়। তারা এমন পুরুষকেই স্বামী বা সঙ্গী হিসেবে চায়, যার কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ আছে, যে শক্তিশালী এবং যে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের সাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে, পুরুষের বিনিয়োগ যেহেতু জৈবিকভাবে কম, তাই বিবর্তনের ধারায় পুরুষদের মধ্যে অধিক সংখ্যক নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের বা ‘ম্যাটিং’ করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু মানব শিশু এতটাই অসহায় হয়ে জন্মায় যে, তাকে বড় করার জন্য কেবল মায়ের যত্ন যথেষ্ট নয়, বাবার সুরক্ষাও দরকার হয়। এই প্রয়োজন থেকেই মানবসমাজে দীর্ঘমেয়াদী জুটির বা ‘পেয়ার বন্ডিং’ (Pair Bonding) ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে, যাকে আমরা বিয়ে বা সংসার বলি। অর্থাৎ, নারী চায় ‘কোয়ালিটি’ বা গুণগত মান, যাতে তার মহামূল্যবান বিনিয়োগটি নষ্ট না হয়; আর পুরুষ চায় ‘কোয়ান্টিটি’ বা সংখ্যা, যাতে তার জিন বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এই দুই ভিন্নমুখী চাহিদার এক ধরণের সমঝোতাই হলো আজকের পরিবার।
যৌন নির্বাচন এবং সঙ্গীর পছন্দ-অপছন্দ: মনের গহীনে জিনের খেলা
আমরা যখন প্রেমে পড়ি বা বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী খুঁজি, তখন আমরা ভাবি – এটা বুঝি আমার একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাস (David Buss) আমাদের এই ভুল ধারণাটি ভেঙে দিয়েছেন। তিনি তার বিখ্যাত বই The Evolution of Desire-এ দেখিয়েছেন যে, আমাদের পছন্দ-অপছন্দগুলো আসলে লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফসল (Buss, 1994)। ডেভিড বাস (David Buss) বিশ্বজুড়ে বিশাল এক গবেষণা চালিয়ে দেখালেন, সংস্কৃতিভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস বা পোশাক আলাদা হতে পারে, কিন্তু সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পছন্দগুলো আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম। একে তিনি ব্যাখ্যা করলেন সেক্সুয়াল স্ট্র্যাটেজিস থিওরি (Sexual Strategies Theory) দিয়ে।
গবেষণায় দেখা গেল, পুরুষরা অবচেতনভাবেই এমন নারীকে স্ত্রী হিসেবে খোঁজে যার মধ্যে ‘উর্বরতা’ বা সন্তান জন্মদানের সক্ষমতার লক্ষণ আছে। যেমন – তারুণ্য, মসৃণ ত্বক, সুঠাম দেহ বা বিশেষ দৈহিক অনুপাত। কারণ আদিম যুগে এই লক্ষণগুলো যার মধ্যে ছিল, সে সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পেরেছিল। অন্যদিকে, নারীরা খোঁজে এমন পুরুষকে যার ‘রিসোর্স অ্যাকুইজিশন পটেনশিয়াল’ বা সম্পদ আহরণের ক্ষমতা আছে। আদিম সমাজে এর মানে ছিল ভালো শিকারি হওয়া বা গোত্রপতির মর্যাদা থাকা; আধুনিক সমাজে এর মানে হলো ভালো চাকরি, ব্যাংক ব্যালেন্স বা সামাজিক প্রতিপত্তি। ডেভিড বাস (David Buss) খুব পরিষ্কারভাবে বললেন, এটা কোনো নৈতিক বা অনৈতিক বিষয় নয়, এটা নিছকই টিকে থাকার কৌশল। নারীরা যদি এমন পুরুষকে বিয়ে করত যার কোনো সম্পদ বা ক্ষমতা নেই, তবে তার সন্তানদের না খেয়ে মরার ঝুঁকি থাকত। আর পুরুষ যদি বয়স্ক বা রুগ্ন নারীকে বিয়ে করত, তবে তার বংশধর রেখে যাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যেত। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে যে, আমরা সেই সব বৈশিষ্ট্যকেই ‘সুন্দর’ বা ‘আকর্ষণীয়’ মনে করি, যা আমাদের জিনকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এই আকর্ষণবোধই পরিবার গঠনের প্রাথমিক সিমেন্ট হিসেবে কাজ করে।
কিন সিলেকশন এবং স্বার্থপর জিন
পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমাদের যে টান, বা ভাই-বোনের জন্য আমরা যে বড় ত্যাগ স্বীকার করি – সেটা কি শুধুই আবেগ? বিবর্তনবাদীরা বলেন, এখানেও লুকিয়ে আছে গণিতের হিসাব। ১৯৬৪ সালে জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম হ্যামিল্টন (William Hamilton) একটি গাণিতিক সূত্র দিলেন, যা জীববিজ্ঞানের জগতকে নাড়িয়ে দিল। এর নাম কিন সিলেকশন (Kin Selection) বা জ্ঞাতি নির্বাচন। তিনি বললেন, একজন প্রাণী তার নিজের সন্তানের চেয়েও তার ভাই বা বোনের জন্য বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, যদি সেই ত্যাগের মাধ্যমে তার জিনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একে বলা হয় ইনক্লুসিভ ফিটনেস (Inclusive Fitness)। হ্যামিল্টনের সূত্রটি খুব মজার, একে বলা হয় হ্যামিল্টনের রুল (Hamilton’s Rule)। সূত্রটি হলো: rB > C। এখানে r হলো জিনের সম্পর্কের গভীরতা (যেমন ভাই-বোনের সাথে আমাদের ৫০% জিন মিল থাকে, কাজিনদের সাথে ১২.৫%), B হলো উপকারভোগীর লাভ, আর C হলো সাহায্যকারীর ক্ষতি (Hamilton, 1964)।
সহজ কথায়, একজন মানুষ তার নিজের জীবন দিয়েও যদি দুইজন ভাই বা আটজন কাজিনকে বাঁচাতে পারে, তবে বিবর্তনের দৃষ্টিতে সেটা লাভজনক। কারণ পরিসংখ্যানগতভাবে তার নিজের জিনের ১০০% কপি বেঁচে থাকছে আত্মীয়দের শরীরের ভেতর দিয়ে। পরে বিখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins) তার The Selfish Gene বইতে এই ধারণাটিকে আরও জনপ্রিয় করলেন। তিনি বললেন, আমরা মানুষেরা হলাম আসলে ‘সারভাইভাল মেশিন’ বা জিনের বাহন মাত্র (Dawkins, 1976)। জিন চায় অমর হতে, আর তাই সে আমাদের দিয়ে পরিবার তৈরি করায়, যাতে আমরা আমাদের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়দের রক্ষা করি। পরিবারের প্রতি আমাদের এই যে অন্ধ ভালোবাসা, যাকে আমরা ‘রক্তের টান’ বলি, তা আসলে আমাদের জিনেরই স্বার্থপরতার এক অদ্ভুত বহিঃপ্রকাশ। এই কারণেই সৎ বাবা-মা বা ‘স্টেপ প্যারেন্টস’-এর সাথে সন্তানদের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ হয় না। মার্টিন ডালি (Martin Daly) এবং মার্গো উইলসন (Margo Wilson) একে বলেছেন সিন্ডারেলা এফেক্ট (Cinderella Effect)। পরিসংখ্যান দিয়ে তারা দেখিয়েছেন যে, নিজের সন্তানের তুলনায় সৎ সন্তানের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের হার জৈবিকভাবেই বেশি, কারণ সৎ সন্তানের মধ্যে অভিভাবকের কোনো জিন থাকে না (Daly & Wilson, 1988)।
পিতামাতা ও সন্তানের দ্বন্দ্ব: জৈবিক সংঘাত
পরিবার মানেই যে সবসময় সুখের স্বর্গ, তা কিন্তু নয়। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বাবা-মা এবং সন্তানের মধ্যেও এক ধরণের অদৃশ্য যুদ্ধ চলে। রবার্ট ট্রিভারস (Robert Trivers) একে সংজ্ঞায়িত করেছেন প্যারেন্ট-অফস্প্রিং কনফ্লিক্ট (Parent-Offspring Conflict) হিসেবে। বিষয়টি একটু খোলসা করা যাক। মায়ের পেটে যখন শিশু থাকে, তখন থেকেই এই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ভ্রূণ চায় মায়ের শরীর থেকে সর্বোচ্চ পুষ্টি শুষে নিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করতে। অন্যদিকে মায়ের শরীর চায় নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে, যাতে ভবিষ্যতে তিনি আরও সন্তান নিতে পারেন। এই টানাটানিতেই অনেক সময় মায়ের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা দেখা দেয়। জন্মের পরেও এই যুদ্ধ থামে না। সন্তান চায় মায়ের সবটুকু মনোযোগ এবং বুকের দুধ কেবল সেই পাবে। কিন্তু মা চান নির্দিষ্ট সময় পর সন্তানকে দুধ ছাড়াতে (Weaning), যাতে তিনি পরবর্তী সন্তানের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন অথবা নিজের শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন।
ভাই-বোনদের ঝগড়া বা ‘সিবলিং রাইভালরি’ (Sibling Rivalry) নিয়ে আমরা প্রায়ই বিরক্ত হই। কিন্তু বিবর্তনবাদ বলে, এটাও খুব স্বাভাবিক। প্রতিটি সন্তান চায় বাবা-মায়ের সম্পদের (খাবার, নিরাপত্তা, মনোযোগ) ১০০ ভাগ নিজের দিকে টেনে নিতে। কিন্তু বাবা-মায়ের কাছে সব সন্তানই সমান (কারণ সবার সাথেই তাদের ৫০% জিনের মিল)। ফলে সম্পদের বণ্টন নিয়ে পরিবারের ভেতরে এই দ্বন্দ্ব বা সংঘাত অনিবার্য। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান (Evolutionary Psychology) আমাদের শেখায় যে, কিশোর বয়সে সন্তানদের যে বিদ্রোহ দেখা দেয়, সেটাও আসলে এক ধরণের জৈবিক সংকেত – যে এখন সময় হয়েছে নিজের আলাদা জগত তৈরি করার এবং প্রজননের জন্য প্রস্তুত হওয়ার। পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি এই জৈবিক সংঘাতগুলো ম্যানেজ করার বা সামাল দেওয়ার একটি সামাজিক কাঠামো মাত্র।
প্যাটারনিটি আনসার্টেনিটি এবং ঈর্ষার সমীকরণ
পরিবারের স্থায়িত্বের পেছনে ‘বিশ্বাস’ খুব বড় শব্দ। কিন্তু জীববিজ্ঞানের ভাষায় বিশ্বাসের চেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘নিশ্চয়তা’। একজন মা সবসময় জানেন যে সন্তানটি তার নিজের, কারণ তিনি তাকে গর্ভে ধারণ করেছেন। কিন্তু ডিএনএ টেস্ট আবিষ্কারের আগে হাজার বছর ধরে একজন বাবার পক্ষে ১০০% নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব ছিল যে সন্তানটি আসলেই তার কি না। একে বলা হয় প্যাটারনিটি আনসার্টেনিটি (Paternity Uncertainty)। এই অনিশ্চয়তা থেকেই পুরুষদের মধ্যে এক তীব্র যৌন ঈর্ষা (Sexual Jealousy) তৈরি হয়েছে। বিবর্তনবাদীরা বলেন, পুরুষের ঈর্ষার মূল কারণ হলো ভয় – পাছে সে অন্য কোনো পুরুষের সন্তানকে নিজের মনে করে লালন-পালন করে এবং নিজের সম্পদ নষ্ট করে। একে বলা হয় ‘কাকোল্ড্রি’ (Cuckoldry) হওয়ার ভয়।
অন্যদিকে নারীদের ঈর্ষা একটু ভিন্ন ধরণের। নারীরা যৌন সম্পর্কের চেয়ে বেশি ভয় পায় যদি তার পুরুষ সঙ্গী অন্য কোনো নারীর সাথে মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় ইমোশনাল জেলাসি (Emotional Jealousy)। কারণ, পুরুষ যদি অন্য নারীর প্রেমে পড়ে, তবে সে তার সম্পদ এবং সময় বর্তমান পরিবার থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে, যা সন্তানের টিকে থাকার জন্য হুমকি। ডেভিড বাস (David Buss) দেখিয়েছেন, এই দুই ধরণের ঈর্ষা পরিবারকে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, যাকে বলা হয় মেট গার্ডিং (Mate Guarding) বা সঙ্গীকে পাহারায় রাখার কৌশল। শুনতে খারাপ লাগলেও, সন্দেহ বা পজেসিভনেস আসলে পরিবার টিকিয়ে রাখার এক আদিম হাতিয়ার।
গ্র্যান্ডমাদার হাইপোথিসিস: বার্ধক্যের উপযোগিতা
মানুষ ছাড়া খুব কম প্রাণীই আছে যারা প্রজনন ক্ষমতা হারানোর পরও বহুদিন বেঁচে থাকে। নারীদের মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তির পর আরও ৩০-৪০ বছর বেঁচে থাকার জৈবিক কারণ কী? সাধারণত বিবর্তনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রজনন ক্ষমতা শেষ হলে প্রাণীর মারা যাওয়ার কথা। এখানেই আসে গ্র্যান্ডমাদার হাইপোথিসিস (Grandmother Hypothesis)। নৃতত্ত্ববিদ ক্রিস্টেন হকেস (Kristen Hawkes) এবং তার সহকর্মীরা এই চমৎকার তত্ত্বটি সামনে আনেন। তারা বলেন, বয়স্ক নারীরা যদি বেশি বয়সে নিজেরা সন্তান নিতে যেতেন, তবে মা ও শিশু উভয়েরই মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। তার চেয়ে বরং তারা যদি নিজের মেয়েদের বা নাতনিদের সন্তান লালন-পালনে সাহায্য করেন, তবে তাদের জিন টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ঠাকুরমা-দিদিমা বা নানি-দাদিরা যখন শিশুদের যত্ন নেন, তখন মায়েরা দ্রুত আবার সন্তান নিতে পারেন এবং শিশুদের বেঁচে থাকার হার বেড়ে যায়। মানব পরিবারে বয়স্ক সদস্যদের, বিশেষ করে ঠাকুরমা-দিদিমাদের যে বিশেষ ভূমিকা ও সম্মান দেখা যায়, তার পেছনে এই শক্তিশালী বিবর্তনীয় কারণ রয়েছে (Hawkes et al., 1998)। পরিবারে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণাটি তাই জৈবিক দিক থেকে অত্যন্ত অপ্রাকৃতিক এবং ক্ষতিকর।
মস্তিষ্কের রসায়ন: ভালোবাসার হরমোন
সবশেষে আসা যাক রসায়নে। পরিবার বা ভালোবাসা কি শুধুই জিনের হিসাব-নিকাশ? জীববিজ্ঞানী হেলেন ফিশার (Helen Fisher) মস্তিষ্কের স্ক্যান করে দেখিয়েছেন যে, রোমান্টিক প্রেম এবং দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক বন্ধন মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়া। যখন আমরা প্রেমে পড়ি, তখন কাজ করে ডোপামিন (Dopamine) – যা আমাদের উন্মাদ করে তোলে। কিন্তু পরিবার টিকিয়ে রাখার জন্য যেটা দরকার, তা হলো অক্সিটোসিন (Oxytocin) এবং ভ্যাসোপ্রেসিন (Vasopressin)। সন্তান জন্মদান এবং স্তন্যপানের সময় মায়ের মস্তিষ্কে প্রচুর অক্সিটোসিন ক্ষরিত হয়, যা সন্তানের প্রতি গভীর মায়া তৈরি করে। একইভাবে, স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিনের স্পর্শ এবং সহবাসের ফলে এই হরমোনগুলো নির্গত হয়, যা তাদের মধ্যে ‘অ্যাটাচমেন্ট’ বা গভীর বন্ধন তৈরি করে (Fisher, 2004)। এই হরমোনগুলোই আমাদের পরিবারের কাছে বারবার ফিরিয়ে আনে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান (Neuroscience) তাই বলছে, পরিবার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, এটি আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং হরমোনের এক জটিল খেলার ফলাফল।
পরিবারকে কেবল সামাজিক প্রথা হিসেবে দেখলে আমরা এর গভীরের জৈবিক শিকড়গুলোকে উপেক্ষা করব। কেন সৎ মায়ের আচরণ রূপকথার গল্পের মতো হয়, কেন ডিভোর্স রেট বাড়ে, কেন আমরা আপনজনের জন্য জীবন দেই – এই সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের আদিম অতীতে, আমাদের জিনের বিন্যাসে।
নৃবিজ্ঞানের উঠোন: আত্মীয়তার জ্যামিতি
নৃবিজ্ঞানের জগতটা বড়ই বিচিত্র। আমরা সাধারণ মানুষরা ‘পরিবার’ বলতে যা বুঝি – বাবা, মা আর তাদের ছেলেমেয়ে – নৃবিজ্ঞানীরা সেই ধারণাটিকে ধরে এমন এক ঝাঁকুনি দেন যে আমাদের বহুদিনের লালিত বিশ্বাসগুলো নড়বড়ে হয়ে যায়। নৃবিজ্ঞানের (Anthropology) উঠোনে দাঁড়িয়ে পরিবারকে দেখলে মনে হয় এটি কোনো স্থির নক্ষত্র নয়, বরং এটি একটি বহুরূপী ধারণা যা সংস্কৃতিভেদে পাল্টায়। নৃবিজ্ঞানীরা আমাদের শেখান, পরিবার এবং আত্মীয়তা বা কিনশিপ (Kinship) কোনো প্রাকৃতিক বা জৈবিক বিষয় নয়, এটি নিতান্তই একটি সাংস্কৃতিক নির্মিতি (Cultural Construct)। জীববিজ্ঞান আমাদের রক্ত দেয়, কিন্তু সমাজ ঠিক করে দেয় সেই রক্তের মানে কী। কার সাথে কার বিয়ে হবে, কে কার আপন, কে কার পর – এই সবকিছুর উত্তর রক্তের গ্রুপে লেখা থাকে না, লেখা থাকে সমাজের অলিখিত নিয়মের খাতায়। নৃবিজ্ঞানীরা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছেন, আমাজনের গহীন জঙ্গল থেকে শুরু করে হিমালয়ের বরফাবৃত গ্রাম পর্যন্ত, কেবল এটা বোঝার জন্য যে মানুষ কীভাবে দলবদ্ধ হয়ে থাকে। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে এমন সব তথ্য যা আমাদের তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজের পারিবারিক সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে।
আত্মীয়তার জ্যামিতি ও লুইস হেনরি মর্গান
পরিবার নিয়ে নৃবিজ্ঞানের আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন লুইস হেনরি মর্গান (Lewis Henry Morgan)। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই মার্কিন নৃবিজ্ঞানী উত্তর আমেরিকার ‘ইরোকোয়া’ (Iroquois) আদিবাসীদের মধ্যে এমন এক অদ্ভুত আত্মীয়তার ধরণ লক্ষ্য করলেন যা ইউরোপীয়দের কাছে ছিল অকল্পনীয়। তিনি দেখলেন, সেখানে একজন শিশু তার নিজের বাবাকে যেমন ‘বাবা’ ডাকে, ঠিক তেমনি বাবার ভাইকেও (কাকা বা চাচা) ‘বাবা’ বলেই ডাকে। আবার মায়ের বোনকে (মাসি বা খালা) ‘মা’ ডাকে। এটি কোনো সম্মানের ডাক নয়, এটিই তাদের নিয়ম। মর্গান একে বললেন শ্রেণিমূলক আত্মীয়তা (Classificatory Kinship)। অন্যদিকে আমাদের আধুনিক সমাজে আমরা বাবা এবং কাকাকে আলাদা শব্দে ডাকি, একে তিনি বললেন বর্ণনামূলক আত্মীয়তা (Descriptive Kinship)। ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত তার যুগান্তকারী বই Ancient Society-তে মর্গান দেখালেন যে, পরিবার আজকের এই অবস্থায় একদিনে আসেনি (Morgan, 1877)। তিনি দাবি করলেন, মানুষের আদিমতম অবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট বিবাহ প্রথা ছিল না, ছিল অবাধ মেলামেশা বা প্রমিসকুইটি (Promiscuity)। সেখান থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে গোষ্ঠী বিবাহ বা গ্রুপ ম্যারেজ (Group Marriage), এবং আরও অনেক ধাপ পেরিয়ে আজকের এই একগামী পরিবার বা মনোগ্যামি (Monogamy)। যদিও মর্গানের সব তত্ত্ব আজকের দিনে পুরোপুরি গৃহীত নয়, কিন্তু তিনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন এই বলে যে, পরিবার কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত অপরিবর্তনীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বিবর্তনের ফসল।
ইনসেস্ট ট্যাবু এবং জোট তত্ত্ব: লেভি-স্ট্রসের সমীকরণ
পরিবার কেন তৈরি হলো? এই প্রশ্নের উত্তরে ফরাসি নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss) এক অসাধারণ তত্ত্ব নিয়ে এলেন, যার নাম জোট তত্ত্ব (Alliance Theory)। তার বিখ্যাত বই The Elementary Structures of Kinship-এ তিনি বললেন, পরিবারের ভিত্তি রক্ত নয়, পরিবারের ভিত্তি হলো আদান-প্রদান। তিনি যুক্তি দিলেন, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ইনসেস্ট ট্যাবু (Incest Taboo) বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা। এই নিষেধাজ্ঞা কেন? কোনো নৈতিক কারণে নয়। লেভি-স্ট্রস বললেন, এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই মানুষ বাধ্য হয়েছে নিজের পরিবারের বাইরে গিয়ে সঙ্গী খুঁজতে। এর ফলে এক পরিবারের সাথে অন্য পরিবারের, এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের মৈত্রী বা জোট তৈরি হয়েছে। তিনি একে বললেন এক্সোগ্যামি (Exogamy) বা বহিগোত্র বিবাহ। তার মতে, আদিম সমাজে নারীরা ছিল এক ধরণের ‘উপহার’ বা যোগাযোগের মাধ্যম, যাদের এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর কাছে বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করত (Lévi-Strauss, 1969)। এই তত্ত্বটি নারীবাদীদের দ্বারা সমালোচিত হলেও, নৃবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক। এটি বোঝায় যে, পরিবার আসলে সমাজ গঠনের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল। আমরা যে শ্বশুরবাড়ি বা আত্মীয়-স্বজন পাই, তা আসলে এই সামাজিক বিনিময়েরই ফলাফল।
ট্রবরিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জ ও মামার ক্ষমতা: ম্যালিনোস্কির চ্যালেঞ্জ
বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছিলেন, সব ছেলের মনেই বাবার প্রতি এক অবচেতন হিংসা থাকে, যাকে তিনি বলেছিলেন ইডিপাস কমপ্লেক্স (Oedipus Complex)। কিন্তু এই তত্ত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন পোলিশ-ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ব্রনিস্লাভ ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski)। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের ট্রবরিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটালেন এবং দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। সেখানে পরিবার ব্যবস্থা মাতৃসূত্রীয় (Matrilineal)। অর্থাৎ, বংশ পরিচয় মায়ের দিক থেকে যায়। সেখানে বাবার ভূমিকা খুবই গৌণ। বাবা হলেন সন্তানের খেলার সাথী বা বন্ধু। সন্তানের ওপর বাবার কোনো আইনি অধিকার বা শাসন করার ক্ষমতা নেই। তবে ক্ষমতা কার? ক্ষমতা মায়ের ভাইয়ের, অর্থাৎ মামার। একে নৃবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যাভাঙ্কুলেট (Avunculate)। মামাই সেখানে আসল অভিভাবক, সম্পত্তি এবং ক্ষমতার মালিক। ম্যালিনোস্কি তার ক্লাসিক বই Argonauts of the Western Pacific এবং অন্যান্য গবেষণায় দেখালেন যে, ট্রবরিয়ান্ড বালকদের মনে বাবার প্রতি কোনো হিংসা নেই, বরং তারা মামাকে ভয় পায় এবং সম্মান করে (Malinowski, 1922)। এই গবেষণা প্রমাণ করল যে, বাবার কর্তৃত্ব বা পিতৃতন্ত্র কোনো সর্বজনীন বিষয় নয়। পরিবারের কাঠামো পাল্টালে আবেগের সমীকরণও পাল্টে যায়। পরিবার যে কেবল জৈবিক প্রজননের জায়গা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান – ম্যালিনোস্কি তা হাতে-কলমে দেখিয়ে দিলেন।
বহু স্বামী ও বহু স্ত্রী: বৈচিত্র্যের বিস্ময়
আমরা সাধারণত মনে করি বিয়ে মানেই একজন নারী এবং একজন পুরুষের বন্ধন। কিন্তু নৃবিজ্ঞানীরা আমাদের এমন সব সমাজের গল্প শোনান যেখানে এই ধারণা খাটবে না। যেমন, হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলের কিছু সমাজে (যেমন: তিব্বত এবং নেপালের কিছু অংশ) দেখা যায় ভ্রাতৃভিত্তিক বহুস্বামী বিবাহ (Fraternal Polyandry)। সেখানে এক পরিবারের সব ভাই মিলে একজন নারীকে বিয়ে করে। কেন? এর পেছনে আছে কঠিন অর্থনৈতিক যুক্তি। পাহাড়ে চাষযোগ্য জমি খুব কম। ভাইরা যদি আলাদা আলাদা বিয়ে করত, তবে পৈতৃক জমি ভাগ হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেত এবং কেউ খেয়ে বাঁচতে পারত না। তাই সব ভাই মিলে এক বউ এবং এক সংসার বজায় রাখে, যাতে জমি অখণ্ড থাকে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এখানে পরিবার প্রেমের চেয়ে বেশি টিকে থাকার কৌশল। আবার আফ্রিকার অনেক সমাজে দেখা যায় বহুস্ত্রী বিবাহ (Polygyny)। সেখানে একজন পুরুষের যত বেশি স্ত্রী এবং সন্তান থাকে, তার সামাজিক মর্যাদা তত বেশি। কারণ কৃষিভিত্তিক সমাজে বেশি মানুষ মানে বেশি শ্রমশক্তি। এই উদাহরণগুলো আমাদের শেখায় যে, পরিবারের রূপ কেমন হবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই অঞ্চলের ভূগোল এবং অর্থনীতির ওপর।
সামাজিক বাবা বনাম জৈবিক বাবা: নুয়েরদের ভূত বিবাহ
সুদানের ‘নুয়ের’ (Nuer) জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা করে বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ই. ই. ইভান্স-প্রিচার্ড (E. E. Evans-Pritchard) আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন ভূত বিবাহ (Ghost Marriage)-এর সাথে। নুয়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো পুরুষ যদি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায়, তবে তার আত্মা অতৃপ্ত থাকে এবং তার বংশরক্ষা হয় না। তাই মৃত ব্যক্তির ভাই বা নিকটাত্মীয় মৃত ব্যক্তির নামে একটি নারীকে বিয়ে করেন। সেই নারীর গর্ভে যে সন্তান জন্মায়, জৈবিকভাবে তার বাবা হলেন জীবিত ভাইটি, কিন্তু সামাজিকভাবে এবং আইনগতভাবে সেই সন্তানের বাবা হলেন মৃত ব্যক্তিটি! নৃবিজ্ঞানে এই পার্থক্যটিকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়: একজন হলেন জেনিটর (Genitor) বা জৈবিক পিতা, আর অন্যজন হলেন প্যাটার (Pater) বা সামাজিক পিতা (Evans-Pritchard, 1951)। পরিবারে রক্ত বা ডিএনএ-র চেয়ে যে সামাজিক স্বীকৃতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট। এমনকি নুয়ের সমাজে নারীতে-নারীতে বিবাহ (Woman-to-Woman Marriage)-এর চলও ছিল। যদি কোনো নারী বন্ধ্যা হতেন এবং খুব সম্পদশালী হতেন, তবে তিনি নিজেকে ‘সামাজিক পুরুষ’ বা স্বামী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে অন্য একজন নারীকে বিয়ে করতে পারতেন। সেই ‘স্ত্রী’ অন্য পুরুষের সাথে মিলিত হয়ে সন্তান জন্ম দিতেন, কিন্তু সেই সন্তানের ‘বাবা’ বা অভিভাবক হতেন ওই বন্ধ্যা নারীটি। এখানে জেন্ডার বা লিঙ্গ পরিচয় শরীরের ওপর নয়, বরং সামাজিক ভূমিকার ওপর নির্ভর করে।
রক্ত নাকি সম্পর্ক: ডেভিড স্নাইডারের বিশ্লেষণ
মার্কিন নৃবিজ্ঞানী ডেভিড স্নাইডার (David Schneider) তার American Kinship: A Cultural Account বইতে দেখালেন যে, আমরা আমেরিকান বা পশ্চিমারা মনে করি আত্মীয়তা মানেই ‘রক্ত’ (Blood) বা ‘জীব-জিনতাত্ত্বিক উপাদান’ (Biogenetic Substance)। আমাদের ধারণা, রক্তই আমাদের জুড়ে রাখে। কিন্তু স্নাইডার প্রশ্ন তুললেন, এটা কি সত্যিই প্রাকৃতিক, নাকি এটাও আমাদের সংস্কৃতির শেখানো বুলি? তিনি দেখালেন, অনেক সংস্কৃতিতে রক্ত নয়, বরং ‘একসাথে খাওয়া-দাওয়া’ বা কমেনসালিটি (Commensality) আত্মীয়তা তৈরি করে। যারা এক হাড়ির ভাত খায়, তারাই আত্মীয়। আবার অনেক জায়গায় দুধ পান করার মাধ্যমে আত্মীয়তা তৈরি হয়, যেমন একে ইসলাম ধর্মে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ‘দুধ-ভাই’ বা ‘দুধ-বোন’ হিসেবে (Schneider, 1968)। স্নাইডারের কাজ আমাদের বুঝতে সাহায্য করল যে, পরিবার কোনো পাথরে খোদাই করা বিষয় নয়। আমরা কাকে আপন ভাবব, তা নির্ভর করে আমরা কোন সাংস্কৃতিক চশমা দিয়ে জগতকে দেখছি তার ওপর।
আধুনিক আত্মীয়তা এবং প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
একুশ শতকে এসে নৃবিজ্ঞানীরা নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। টেস্ট টিউব বেবি, সারোগেসি, বা স্পার্ম ডোনেশনের যুগে ‘বাবা’ বা ‘মা’ কে? জ্যানেট কার্স্টেন (Janet Carsten) একে ব্যাখ্যা করার জন্য নিয়ে এলেন রিলেটেডনেস (Relatedness) বা সম্পৃক্ততার ধারণা। তিনি বললেন, প্রথাগত কিনশিপ বা আত্মীয়তা শব্দটি এখন আর যথেষ্ট নয়। মানুষ এখন নতুন নতুন উপায়ে আত্মীয়তা তৈরি করছে। একজন গে (Gay) বা লেসবিয়ান (Lesbian) দম্পতি যখন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে তাদের ‘চোজেন ফ্যামিলি’ (Chosen Family) বা নির্বাচিত পরিবার গড়ে তোলে, তখন সেখানে রক্তের কোনো সম্পর্ক থাকে না, কিন্তু থাকে গভীর আবেগীয় বন্ধন। কার্স্টেন মালয়েশিয়ার ল্যাংকাউই দ্বীপে গবেষণা করে দেখালেন যে, সেখানে বিশ্বাস করা হয় – একই বাড়িতে বসবাস করা এবং একই খাবার খাওয়া মানুষের শরীর ও রক্তকে এক করে দেয়। অর্থাৎ, আত্মীয়তা জন্মগত নয়, এটি অর্জিত। একে তিনি বললেন প্রসেস অফ বিকামিং কিন (Process of Becoming Kin) বা আত্মীয় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া (Carsten, 1997)। আধুনিক রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি বা প্রজনন প্রযুক্তি আমাদের সেই আদি প্রশ্নের সামনে আবার দাঁড় করিয়েছে – পরিবার কি প্রকৃতি, নাকি সংস্কৃতি? একজন সারোগেট মা, যিনি শিশুটিকে পেটে ধরলেন, তিনি কি মা? নাকি যিনি ডিম্বাণু দিলেন তিনি মা? নাকি যিনি লালন-পালন করছেন তিনি মা? নৃবিজ্ঞান এই জটিল জট খোলার চেষ্টা করছে।
ফাংশনালিজম বা ক্রিয়াবাদ: র্যাডক্লিফ-ব্রাউনের শৃঙ্খলা
ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী এ. আর. র্যাডক্লিফ-ব্রাউন (A. R. Radcliffe-Brown) পরিবারকে দেখলেন সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে। তিনি ছিলেন স্ট্রাকচারাল ফাংশনালিজম (Structural Functionalism) বা গাঠনিক ক্রিয়াবাদের প্রবক্তা। তিনি বললেন, পরিবারের কাজ হলো সমাজের ভারসাম্য বজায় রাখা। তিনি আত্মীয়তার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত আচরণের কথা বললেন, যেমন জোকিং রিলেশনশিপ (Joking Relationship) বা ঠাট্টার সম্পর্ক এবং অ্যাভয়ডেন্স রিলেশনশিপ (Avoidance Relationship) বা পরিহারের সম্পর্ক। কেন আমরা শালী বা দেবরের সাথে ঠাট্টা করি, কিন্তু শাশুড়ি বা ভাশুরকে এড়িয়ে চলি? র্যাডক্লিফ-ব্রাউন বললেন, এর পেছনে গভীর সামাজিক কারণ আছে। ঠাট্টার সম্পর্কগুলো সম্ভাব্য উত্তেজনা প্রশমন করে, আর পরিহারের সম্পর্কগুলো শ্রদ্ধার দূরত্ব বজায় রেখে সংঘাত এড়ায় (Radcliffe-Brown, 1952)। পরিবারের প্রতিটি সম্পর্কের পেছনে এমন সুনির্দিষ্ট সামাজিক ফাংশন বা কাজ রয়েছে যা সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
নৃবিজ্ঞানের এই বিশাল উঠোনে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি, পরিবার কোনো একরৈখিক গল্প নয়। এটি হাজারো রঙের এক ক্যানভাস। কোথাও মামা প্রধান, কোথাও বাবা। কোথাও এক স্বামী, কোথাও বহু। কোথাও রক্ত প্রধান, কোথাও খাবার। এই যে বৈচিত্র্য, এই যে ভিন্নতা – এটাই মানুষের টিকে থাকার শক্তি। ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ যদি একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে নৃবিজ্ঞানের এই জ্ঞানভাণ্ডার সেখানে এক বিশাল ভূমিকা রাখবে। কারণ, নিজের ঘরের জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখা আর পৃথিবী ঘুরে এসে নিজের ঘরকে চেনার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। নৃবিজ্ঞান আমাদের সেই দ্বিতীয় চোখটি দেয়, যা দিয়ে আমরা পরিবারকে তার সমস্ত বৈচিত্র্য ও জটিলতা সমেত দেখতে পাই।
ইতিহাসের পাতা: শৈশবের জন্ম ও প্রেমের বিয়ে
আমরা বর্তমানে যে পরিবার দেখি, যেখানে বাবা-মা তাদের সন্তানদের চোখের মণি করে রাখেন, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের হাত ধরে সূর্যাস্ত দেখেন এবং ‘সুখে-দুখে’ একসাথে থাকার শপথ নেন – এই ছবিটা আমাদের কাছে খুব শাশ্বত মনে হয়। আমরা ভাবি, মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই বুঝি পরিবারগুলো এমনই ছিল। বাবা বুঝি সবসময়ই অফিস থেকে ফেরার পথে সন্তানের জন্য চকোলেট আনতেন, আর মা বুঝি সবসময়ই সন্তানের মঙ্গলের জন্য উপোস থাকতেন। কিন্তু ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতা উল্টালে আমাদের এই রোমান্টিক ধারণাগুলো কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ইতিহাসবিদরা আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান – আজকের এই আবেগঘন পরিবার বা ‘সেন্টিমেন্টাল ফ্যামিলি’ আসলে খুব সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার। মাত্র কয়েকশ বছর আগেও পরিবারের চেহারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন পরিবারের ভিত্তি ভালোবাসা ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার প্রয়োজন। তখন শিশুদের কোনো ‘শৈশব’ ছিল না, ছিল কেবল শ্রম। আর বিয়ে? বিয়ে ছিল প্রেম বা রোমান্সের কোনো জায়গা নয়, বরং জমি বা সম্পত্তি বাড়ানোর এক নির্লজ্জ ব্যবসায়িক চুক্তি। পরিবার নিয়ে আমাদের আধুনিক ধ্যান-ধারণাগুলো আসলে ইতিহাসের এক বিরাট বিবর্তনের ফসল, যা মূলত গত তিন-চারশ বছরে ইউরোপে গড়ে উঠেছে এবং পরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।
শৈশবের আবিষ্কার: মিনি অ্যাডাল্ট থেকে আদরের দুলাল
আজকের দিনে আমরা শিশুকে মনে করি এক নিষ্পাপ দেবদূত, যাকে পৃথিবীর সব নোংরামি থেকে আড়াল করে রাখতে হবে। কিন্তু ফরাসি ইতিহাসবিদ ফিলিপ এরিয়েস (Philippe Ariès) ১৯৬০ সালে প্রকাশিত তার যুগান্তকারী বই Centuries of Childhood-এ এক বোমা ফাটালেন। তিনি মধ্যযুগের চিত্রকলা, ডায়েরি এবং চিঠি বিশ্লেষণ করে দেখালেন যে, সপ্তদশ শতাব্দীর আগে ইউরোপে ‘শৈশব’ (Childhood) বলে আলাদা কোনো ধারণাই ছিল না (Ariès, 1960)। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও সত্যি যে, মধ্যযুগে সাত বা আট বছর বয়স পার হলেই শিশুদের আর ‘শিশু’ ভাবা হতো না। তাদের দেখা হতো ক্ষুদ্রাকার প্রাপ্তবয়স্ক (Miniature Adults) বা ‘মিনি অ্যাডাল্ট’ হিসেবে। তাদের পোশাক-আশাকও ছিল বড়দের মতো। কোনো বিশেষ শিশুদের পোশাক ছিল না। যেই মুহূর্তে একটি শিশু নিজের পায়ে হাঁটতে শিখত এবং কথা বলতে পারত, সেই মুহূর্ত থেকেই তাকে সমাজের একজন পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে গণ্য করা হতো। তাদের দিয়ে ভারী কাজ করানো হতো, তারা বড়দের সাথে আড্ডায় বসত, এমনকি বড়দের অশ্লীল জোকস বা জুয়া খেলাতেও তাদের প্রবেশে কোনো বাধা ছিল না।
এরিয়েস (Ariès) দেখালেন, সেই সময়ে মৃত্যুহার বা ইনফ্যান্ট মর্টালিটি (Infant Mortality) এত বেশি ছিল যে, বাবা-মায়েরা শিশুদের প্রতি খুব বেশি আবেগীয় টান অনুভব করতে ভয় পেতেন। কারণ, যেকোনো সময় শিশুটি মারা যেতে পারে। তাই এক ধরণের মানসিক দূরত্ব বজায় রাখা হতো। সন্তান মারা গেলে তারা খুব দ্রুত সেটা কাটিয়ে উঠতেন এবং আরেকটি সন্তান নিতেন। আজকের দিনে সন্তানের মৃত্যুতে বাবা-মায়ের যে আকাশ ভেঙে পড়া হাহাকার দেখা যায়, মধ্যযুগে তা ছিল বিলাসিতা। শৈশবের আধুনিক ধারণা (Modern Concept of Childhood) তৈরি হতে শুরু করে মূলত সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, যখন গির্জা এবং সমাজসংস্কারকরা বলতে শুরু করলেন যে, শিশুরা হলো ঈশ্বরের পবিত্র আমানত এবং তাদের নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য বিশেষ শিক্ষা ও যত্নের প্রয়োজন। তখন থেকেই শিশুদের জন্য আলাদা পোশাক, আলাদা খেলনা এবং বিশেষ করে স্কুল ব্যবস্থার প্রবর্তন হলো। স্কুলই মূলত শিশুকে সমাজ থেকে আলাদা করে একটি ‘সংরক্ষিত এলাকা’ বা ‘কোয়ারেন্টাইন’-এ নিয়ে গেল, যেখানে সে বড় হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ, আমাদের অতি আদরের ‘শৈশব’ কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক আবিষ্কার।
প্রেমের বিয়ে: এক আধুনিক পাগলামি
এখনকার দিনে প্রেম করে বিয়ে বা ‘লাভ ম্যারেজ’ (Love Marriage) খুব স্বাভাবিক মনে হলেও, ইতিহাসের বিচারে এটি এক বৈপ্লবিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা। বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্টেফানি কুনজ (Stephanie Coontz) তার বই Marriage, a History: From Obedience to Intimacy, or How Love Conquered Marriage-এ দেখিয়েছেন যে, মানব ইতিহাসের ৯৯ শতাংশ সময় ধরে বিয়ে ছিল মূলত দুই পরিবারের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মৈত্রী (Coontz, 2005)। বিয়ে ঠিক করত বাবা-মা বা সমাজের মুরুব্বিরা। সেখানে পাত্র-পাত্রীর পছন্দ-অপছন্দের কোনো মূল্য ছিল না। রাজার সাথে রাজার বিয়ে হতো রাজ্য বাড়ানোর জন্য, কৃষকের সাথে কৃষকের বিয়ে হতো জমি বা হালের বলদ বাড়ানোর জন্য। স্টেফানি কুনজ (Stephanie Coontz) খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রাচীন এবং মধ্যযুগে প্রেমকে বিয়ের ভিত্তি হিসেবে দেখাটা ছিল এক ধরণের পাগলামি বা অসুস্থতা। তখন মনে করা হতো, আবেগের ওপর ভিত্তি করে জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামি। কারণ আবেগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জমি বা সম্পত্তি চিরস্থায়ী।
এমনকি প্রাচীন গ্রিস বা রোমেও ‘ভালোবাসা’ ছিল, কিন্তু তা বিয়ের বাইরে। স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে আশা করত সন্তান এবং বিশ্বস্ততা, আর মানসিক বা রোমান্টিক শান্তি খুঁজত রক্ষিতা বা অন্য সম্পর্কের মধ্যে। খ্রিষ্টধর্মেও দীর্ঘকাল ধরে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা বলতে বোঝাত ‘আনুগত্য’ বা ‘ভক্তি’, আজকের দিনের মতো চোখে চোখ রেখে গান গাওয়া প্রেম নয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে, বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লব এবং আমেরিকার স্বাধীনতার পর থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা ইন্ডিভিজুয়ালিজম (Individualism) মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মানুষ দাবি করতে শুরু করে, ‘আমার জীবন, আমার পছন্দ’। এর সাথে যুক্ত হলো রোমান্টিক আন্দোলনের জোয়ার। তখন থেকেই ধীরে ধীরে ‘ভালোবাসা’ বিয়ের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়াল। কুনজ (Coontz) একে বলেছেন লাভ রেভোলিউশন (Love Revolution)। কিন্তু এর একটা বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। যখন বিয়ের ভিত্তি হলো প্রেম, তখন সেই প্রেম ফুরিয়ে গেলেই বিয়ে ভেঙে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ল। আগে বিয়ে ছিল দায়িত্বের বন্ধন, তাই সহজে ভাঙত না। এখন বিয়ে হলো আবেগের বন্ধন, তাই আবেগ কমলেই ডিভোর্স। আধুনিক ডিভোর্স রেট বাড়ার পেছনে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দায় অনেকখানি।
পরিবার: পাবলিক থেকে প্রাইভেট
আজ আমরা মনে করি পরিবার হলো আমাদের একান্তই ব্যক্তিগত বা ‘প্রাইভেট’ জগত। বাইরের পৃথিবীর কোলাহল থেকে বাঁচার জন্য আমরা ঘরে ফিরি। একে বলা হয় হেভেন ইন আ হার্টলেস ওয়ার্ল্ড (Haven in a Heartless World) বা হৃদয়হীন পৃথিবীতে এক টুকরো স্বর্গ। এই শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেছিলেন ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার ল্যাস (Christopher Lasch) (Lasch, 1977)। কিন্তু ইতিহাস বলছে, পরিবার সবসময় এমন প্রাইভেট ছিল না। প্রাক-শিল্প যুগে পরিবার ছিল একটি পাবলিক ইনস্টিটিউশন (Public Institution)। তখন মানুষের ঘর ছিল সবার জন্য খোলা। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি পথচলতি মুসাফিরও যখন-তখন ঘরে ঢুকে পড়ত। ঘরের ভেতর আর বাইরের মধ্যে তেমন কোনো দেয়াল ছিল না। পরিবার ছিল মূলত উৎপাদনের জায়গা বা ইউনিট অফ প্রোডাকশন (Unit of Production)। বাবা, মা, সন্তান – সবাই মিলে জমিতে বা তাতে কাজ করত। সেখানে ভালোবাসার চেয়ে কাজের সম্পর্কই ছিল প্রধান।
কিন্তু শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) সবকিছু বদলে দিল। কাজ চলে গেল ঘরের বাইরে – ফ্যাক্টরিতে বা অফিসে। আর ঘর হয়ে গেল কেবল বিশ্রামের জায়গা বা ইউনিট অফ কনজাম্পশন (Unit of Consumption)। পুরুষরা চলে গেল বাইরের জগতে বা ‘পাবলিক স্ফিয়ারে’ টাকা ইনকাম করতে, আর নারীদের ওপর দায়িত্ব পড়ল ঘর বা ‘প্রাইভেট স্ফিয়ার’ সামলানোর। একে ঐতিহাসিকরা বলেন ডক্ট্রিন অফ সেপারেট স্ফিয়ারস (Doctrine of Separate Spheres) বা পৃথক জগতের মতবাদ। এই পরিবর্তনের ফলে পরিবার হয়ে উঠল অত্যন্ত গোপনীয় এবং আবেগঘন একটি জায়গা। আগে মানুষ মিশত পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে, এখন মানুষ মিশতে শুরু করল কেবল নিজের স্ত্রী ও সন্তানের সাথে। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের ওপর একে অপরের প্রতি আবেগীয় নির্ভরতা বা ইমোশনাল ডিপেন্ডেন্সি (Emotional Dependency) বহুগুণ বেড়ে গেল। লরেন্স স্টোন (Lawrence Stone) তার The Family, Sex and Marriage in England 1500-1800 বইতে একে বর্ণনা করেছেন এফেক্টিভ ইনডিভিজুয়ালিজম (Affective Individualism) বা আবেগীয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের উত্থান হিসেবে (Stone, 1977)। তিনি দেখালেন, কীভাবে পরিবার ধাপে ধাপে বংশ বা গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আজকের এই ছোট বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি (Nuclear Family)-তে পরিণত হলো।
নারীর ভূমিকা ও গার্হস্থ্য দেবী
ইতিহাসের এই পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীর ভূমিকাও নাটকীয়ভাবে বদলে গেল। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা ছিল কঠোর পরিশ্রমী কর্মী। তারা ফসল বুনত, পশু পালন করত। কিন্তু ভিক্টোরিয়ান যুগে (ঊনবিংশ শতাব্দী) মধ্যবিত্ত সমাজে নারীর এক নতুন ইমেজ তৈরি করা হলো – দ্য অ্যাঞ্জেল ইন দ্য হাউস (The Angel in the House) বা গৃহলক্ষ্মী। মনে করা হতে লাগল, নারীরা জন্মগতভাবেই কোমল, পবিত্র এবং নৈতিকভাবে পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাই তাদের কাজ হলো নোংরা বাইরের জগত থেকে দূরে থাকা এবং ঘরকে স্বর্গের মতো সাজিয়ে রাখা। এই আদর্শটি নারীকে অর্থনৈতিক জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলল এবং তাকে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল করে তুলল। ইতিহাসবিদ লিওনোর ডেভিডফ (Leonore Davidoff) এবং ক্যাথরিন হল (Catherine Hall) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই ‘গৃহলক্ষ্মী’ ধারণাটি আসলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিজের আভিজাত্য দেখানোর একটি উপায় ছিল (Davidoff & Hall, 1987)। কারণ গরিব বা শ্রমিক শ্রেণীর নারীদের সেই বিলাসিতা ছিল না; তাদের তখনও ফ্যাক্টরিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো। ইতিহাসের এই পাঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যাকে ‘আদর্শ মা’ বা ‘আদর্শ স্ত্রী’র শাশ্বত রূপ বলি, তা আসলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের এবং নির্দিষ্ট শ্রেণীর তৈরি করা সামাজিক প্রথা মাত্র।
বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতা
আমরা প্রায়ই হাহাকার করি যে, আজকালকার দিনে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, আগেকার দিনে মানুষ কত সুখে ছিল! কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত ভিন্ন কথা বলে। আগেকার দিনে ডিভোর্স কম ছিল ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে দাম্পত্য জীবন খুব সুখের ছিল। তখন মানুষ অসুখী বিয়েতেই জীবন পার করে দিত কারণ তাদের সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না। তাছাড়া, আগেকার দিনে মৃত্যুর কারণে পরিবার ভাঙত অনেক বেশি। পিটার লাসলেট (Peter Laslett) কেমব্রিজ গ্রুপের ঐতিহাসিক জনমিতি বা হিস্টোরিক্যাল ডেমোগ্রাফি (Historical Demography) নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলেন, সপ্তদশ শতাব্দীতে অনেক শিশুই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বাবা অথবা মাকে হারাত (Laslett, 1972)। অর্থাৎ, ‘সিঙ্গেল প্যারেন্ট ফ্যামিলি’ বা একক অভিভাবকের পরিবার আগেও ছিল, তবে তা ডিভোর্সের কারণে নয়, মৃত্যুর কারণে। আবার সৎ মা বা সৎ বাবার উপস্থিতিও ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। লাসলেট প্রমাণ করলেন যে, আমরা যে বিশাল যৌথ পরিবারের বা এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি (Extended Family)-র সোনালী অতীতের স্বপ্ন দেখি, তা আসলে একটি মিথ বা ভুল ধারণা। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বেশিরভাগ সময়ই পরিবার ছিল ছোট বা নিউক্লিয়ার। শিল্প বিপ্লবের ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে – এই বহুল প্রচলিত তত্ত্বটিকে তিনি চ্যালেঞ্জ জানালেন। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্বে পরিবার সবসময়ই তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল।
যৌনতা ও নৈতিকতার পরিবর্তন
ইতিহাসের পাতায় যৌনতার ধারণাও বারবার পাল্টেছে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তার The History of Sexuality বইতে দেখিয়েছেন, ভিক্টোরিয়ান যুগে যৌনতাকে কীভাবে দমন করা হতো এবং একে কেবল প্রজননের মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো। শিশুদের যৌনতা থেকে দূরে রাখার এক বাতিক তৈরি হয়েছিল, যা আগে ছিল না (Foucault, 1976)। আবার বিংশ শতাব্দীতে জন্মনিয়ন্ত্রণ বা কন্ট্রাসেপশন (Contraception) আবিষ্কারের পর যৌনতা এবং প্রজনন আলাদা হয়ে গেল। এর ফলে পরিবারের সংজ্ঞাই বদলে গেল। সন্তান না নিয়েও যে পরিবার হতে পারে বা বিয়ের বাইরেও যে যৌনতা সম্ভব – এই ধারণাগুলো আধুনিক পরিবারের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করল। এডওয়ার্ড শর্টার (Edward Shorter) তার The Making of the Modern Family বইতে যুক্তি দিয়েছেন যে, আধুনিক পরিবার মূলত রোমান্টিক এবং যৌন স্বাধীনতার ফসল। তিনি একে বলেছেন সার্জ অফ সেন্টিমেন্ট (Surge of Sentiment) বা অনুভূতির জোয়ার (Shorter, 1975)।
ইতিহাসের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ আমাদের শেখায় যে, পরিবার কোনো স্থির পুকুর নয়, বরং একটি প্রবহমান নদী। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবার তার রূপ বদলেছে। আজকের দিনে আমরা যে পরিবার দেখি, তা কোনো চূড়ান্ত রূপ নয়। ভবিষ্যতে হয়তো পরিবারের এমন সব ধরণ আসবে যা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। ইতিহাস আমাদের বলে, “পেছনে তাকাও, তবেই তুমি সামনের পথ দেখতে পাবে।” পরিবারের অতীত না জানলে তার বর্তমানকে বোঝা অসম্ভব।
সমাজবিজ্ঞানের চশমা: কাঠামো ও দ্বন্দ্ব
সমাজবিজ্ঞানীরা যখন পরিবারের দিকে তাকান, তখন তারা কোনো রোমান্টিক প্রেমের গল্প বা ব্যক্তিগত আবেগের হিসেব কষেন না। তারা দেখেন একটি বিশাল দালান বা কাঠামোর নকশা। সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে সমাজটা হলো মানুষের শরীরের মতো একটা বিশাল জীবন্ত সত্তা, আর পরিবার হলো সেই শরীরের একটা অপরিহার্য অঙ্গ – যেমন হৃৎপিণ্ড বা যকৃৎ। শরীরের অঙ্গগুলো ঠিকমতো কাজ না করলে যেমন শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে, তেমনি পরিবার যদি তার কাজ ঠিকমতো না করে, তবে সমাজও অচল হয়ে পড়বে। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে, সমাজবিজ্ঞানীদের আরেকটা দল আছেন যারা পরিবারকে দেখেন একটা রণক্ষেত্র হিসেবে। তাদের মতে, পরিবার হলো সেই জায়গা যেখানে সমাজের অসমতা, বৈষম্য এবং ক্ষমতার লড়াইটা প্রথম শুরু হয়। এই যে দুই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি – একটি হলো সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবারের ভূমিকা দেখা, আর অন্যটি হলো পরিবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে টেনে বের করা – এটাই সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মূল সুর। এই অধ্যায়ে আমরা ক্রিয়াবাদ (Functionalism), মার্ক্সবাদ (Marxism), এবং নারীবাদ (Feminism)-এর লেন্স দিয়ে পরিবারকে ব্যবচ্ছেদ করব এবং সবশেষে দেখব কীভাবে সংস্কৃতি ও পুঁজির খেলা পরিবারের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
ক্রিয়াবাদ: সমাজের ভারসাম্য ও ওয়ার্ম বাথ থিওরি
সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী শাখা হলো ক্রিয়াবাদ (Functionalism)। এই মতবাদের মূল কথা হলো, সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই কিছু নির্দিষ্ট কাজ বা ‘ফাংশন’ আছে যা সমাজের স্থায়িত্ব বজায় রাখে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম (Émile Durkheim) বিশ্বাস করতেন যে, পরিবার হলো সমাজের নৈতিক শিক্ষার প্রাথমিক স্কুল। সমাজকে বিশৃঙ্খলা বা অ্যানোমি (Anomie) থেকে রক্ষা করার জন্য পরিবার মানুষকে নিয়ম-কানুন শেখায়। তবে ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে সবচেয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী জর্জ পিটার মারডক (George Peter Murdock)। তিনি প্রায় ২৫০টি সমাজের ওপর গবেষণা চালিয়ে দাবি করলেন যে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা একক পরিবার হলো একটি সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান। তিনি পরিবারের চারটি অপরিহার্য কাজের কথা বললেন: ১. যৌন চাহিদা পূরণ (সামাজিকভাবে স্বীকৃত উপায়ে), ২. প্রজনন (সমাজের সদস্য সংখ্যা বজায় রাখা), ৩. অর্থনৈতিক সহযোগিতা (খাবার ও আশ্রয়), এবং ৪. শিক্ষা বা সামাজিকীকরণ (Murdock, 1949)। মারডকের মতে, এই চারটি কাজ ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না, আর পরিবারই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা এই কাজগুলো একসাথে করতে পারে।
তবে ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের মুকুটমণি হলেন ট্যালকট পার্সন্স (Talcott Parsons)। তিনি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকান সমাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, শিল্পায়ন বা আধুনিকায়নের ফলে পরিবারের আকার এবং কাজে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। আগে পরিবার ছিল বিশাল এক যৌথ কারবার, কিন্তু আধুনিক শিল্প সমাজ ছোট এবং গতিশীল পরিবার চায়, যাতে কাজের প্রয়োজনে মানুষ সহজেই এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে পারে। একে তিনি বললেন স্ট্রাকচারাল ডিফারেন্সিয়েশন (Structural Differentiation) বা কাঠামোগত পৃথকীকরণ। পার্সন্স বললেন, আধুনিক সমাজে পরিবার তার অনেক কাজ হারিয়েছে (যেমন শিক্ষা এখন স্কুল দেয়, চিকিৎসা দেয় হাসপাতাল), কিন্তু এর ফলে পরিবারের দুটি ‘মৌলিক এবং অপরিবর্তনীয়’ (Basic and Irreducible) কাজ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমটি হলো শিশুদের প্রাথমিক সামাজিকীকরণ (Primary Socialization)। শিশুরা হলো মাটির তালের মতো, পরিবার তাদের ‘মানুষ’ বানায় এবং সমাজের মূল্যবোধ বা ভ্যালু কনসেনশাস (Value Consensus) তাদের মনে গেঁথে দেয়।
দ্বিতীয় কাজটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। ট্যালকট পার্সন্স (Talcott Parsons) এর নাম দিলেন অ্যাডাল্ট পার্সোনালিটি স্টেবিলাইজেশন (Stabilization of Adult Personalities)। তিনি একে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি রূপক ব্যবহার করলেন – ওয়ার্ম বাথ থিওরি (Warm Bath Theory)। বাইরের জগতটা খুব কঠিন, সেখানে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা আর টেনশন। একজন পুরুষ যখন সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফেরে, তখন পরিবার তাকে উষ্ণ স্নানের মতো আরাম দেয়। স্ত্রীর ভালোবাসা আর সন্তানের হাসি তার মানসিক চাপ ধুয়ে মুছে দেয়, যাতে পরদিন সকালে সে আবার নবোদ্যমে কাজে যেতে পারে (Parsons & Bales, 1955)। পার্সন্স আরও বললেন, এই কাজগুলো ঠিকঠাক করার জন্য পরিবারে নারী ও পুরুষের ভূমিকা হতে হবে আলাদা। পুরুষের ভূমিকা হবে ইন্সট্রুমেন্টাল (Instrumental Role) বা রসদ যোগানদাতা এবং নেতা হিসেবে; আর নারীর ভূমিকা হবে এক্সপ্রেসিভ (Expressive Role) বা আবেগীয় যত্নকারী হিসেবে। পার্সন্সের মতে, এই শ্রমবিভাজন প্রাকৃতিক এবং এটিই পরিবারের ভারসাম্য রক্ষা করে। যদিও আজকের দিনে এই তত্ত্বটি অনেক বেশি সমালোচিত, তবুও সমাজ কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য এটি একটি বড় ভিত্তি।
মার্ক্সবাদ: পরিবার যখন পুঁজিবাদের সেবাদাস
পার্সন্স যেখানে পরিবারকে দেখছেন সুখের আধার হিসেবে, মার্ক্সবাদীরা (Marxists) সেখানে জ্বলে উঠলেন। তারা বললেন, পরিবার সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করে না, পরিবার কাজ করে পুঁজিবাদ (Capitalism)-কে টিকিয়ে রাখার জন্য। তাদের মতে, পরিবার হলো এমন এক প্রতিষ্ঠান যা শ্রমিক তৈরি করে এবং সেই শ্রমিকদের শান্ত রাখে যাতে মালিকশ্রেণী বা বুর্জোয়ারা নির্বিঘ্নে তাদের শোষণ করতে পারে। এই ধারার আদি গুরু ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) তার কালজয়ী বই The Origin of the Family, Private Property and the State-এ এক বিস্ফোরক তথ্য দিলেন। তিনি বললেন, আদিম সমাজে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, তখন একগামী পরিবারও ছিল না। কিন্তু যখন পুরুষরা উদ্বৃত্ত সম্পদ বা সম্পত্তির মালিক হলো, তখন তারা চাইল এই সম্পত্তি যেন কেবল তাদের ‘নিজস্ব’ সন্তানের হাতেই যায়। এই নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্যই তারা নারীদের একগামী বিবাহের শিকলে বাঁধল এবং তাদের যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করল। এঙ্গেলসের মতে, আধুনিক একগামী পরিবার হলো নারীদের জন্য এক ধরণের পরাজয়, যেখানে তারা পুরুষের সম্পত্তির পাহারাদার এবং উত্তরাধিকারী জন্ম দেওয়ার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে (Engels, 1884)।
আধুনিক মার্ক্সবাদীরা এই আলোচনাকে আরও এগিয়ে নিলেন। এলি জারেটস্কি (Eli Zaretsky) বললেন, পরিবার পুঁজিবাদকে একটি মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা দেয়। তিনি পার্সন্সের ‘ওয়ার্ম বাথ’ থিওরিকেই উল্টে দিলেন। জারেটস্কি বললেন, হ্যাঁ, পরিবার শ্রমিককে আরাম দেয়, কিন্তু সেটা পুঁজিবাদের স্বার্থেই। পরিবার যদি শ্রমিকের রাগ আর হতাশা শুষে না নিত (Cushioning Effect), তবে শ্রমিকরা হয়তো বিপ্লব করে বসত। পরিবার শ্রমিককে এমন এক ভ্রান্ত সান্ত্বনা দেয় যে, “বাইরে আমি শোষিত হলেও ঘরে আমি রাজা।” এই মিথ্যে রাজত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্যই শ্রমিকরা দিনের পর দিন মালিকের শোষণ মেনে নেয় (Zaretsky, 1976)। এছাড়া পরিবার হলো পুঁজিবাদের পণ্যের সবচেয়ে বড় খদ্দের। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে শিশুদের মাধ্যমে বাবা-মাকে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হয়, একে বলা হয় পেস্টার পাওয়ার (Pester Power)। মার্ক্সবাদীরা বলেন, আমরা যাকে ‘সুখী পরিবার’ বলি, তা আসলে পুঁজিবাদের পণ্য বিক্রি করার এবং অনুগত শ্রমিক তৈরি করার একটি সুনিপুণ ফাঁদ।
নারীবাদ: পিতৃতন্ত্রের দুর্গ
সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা নারীবাদী (Feminist), তারা বললেন, মার্ক্সবাদীরা পুঁজিবাদের দোষ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারা আসল সমস্যাটা এড়িয়ে যাচ্ছে – সেটা হলো পিতৃতন্ত্র (Patriarchy)। পরিবার হলো সেই জায়গা যেখানে নারীরা প্রথম বৈষম্যের শিকার হয়। উদারপন্থী নারীবাদীরা (Liberal Feminists) মনে করেন, আইনের পরিবর্তন এবং শিক্ষার মাধ্যমে পরিবারের ভেতরে সমতা আনা সম্ভব। কিন্তু র্যাডিক্যাল নারীবাদীরা (Radical Feminists) মনে করেন, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিই মূল সমস্যা। তারা বলেন, পরিবারে পুরুষরা নারীদের শ্রম এবং শরীর – উভয়ই শোষণ করে।
ফরাসি নারীবাদী ক্রিস্টিন ডেলফি (Christine Delphy) এবং ডায়ানা লেনার্ড (Diana Leonard) তাদের গবেষণায় দেখালেন যে, পরিবার একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে পুরুষরা নারীদের বিনাপয়সার শ্রমে লাভবান হয়। নারীরা রান্না করে, ঘর পরিষ্কার করে, বাচ্চার দেখাশোনা করে – কিন্তু এর বিনিময়ে তারা কোনো বেতন পায় না। অথচ এই কাজগুলো যদি বাজার থেকে কিনতে হতো, তবে বিশাল খরচ হতো। পুরুষরা বাইরে কাজ করে যে টাকা আনে, তার ওপর তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে, আর নারীদের শ্রমকে দেখা হয় ‘ভালোবাসার কাজ’ হিসেবে। ডেলফি ও লেনার্ড একে বললেন ডোমেস্টিক লেবার এক্সপ্লয়টেশন (Domestic Labor Exploitation) (Delphy & Leonard, 1992)।
বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অ্যান ওকলি (Ann Oakley) দেখালেন যে, ‘গৃহিণী’ বা হাউজওয়াইফ এর ভূমিকাটি কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়, এটি শিল্পায়নের ফলে তৈরি হওয়া একটি সামাজিক নির্মাণ। তিনি বললেন, সমাজ মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই পুতুল খেলা আর ঘরকন্নার মাধ্যমে এমনভাবে মগজধোলাই বা ক্যানালাইজেশন (Canalization) করে যে, তারা মনে করে মা ও স্ত্রী হওয়াটাই তাদের জীবনের একমাত্র সার্থকতা (Oakley, 1974)। নারীবাদীরা আরও মনে করিয়ে দেন যে, পরিবারের একটি অন্ধকার দিক বা ডার্ক সাইড অফ ফ্যামিলি (Dark Side of Family) আছে। পারিবারিক সহিংসতা বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, নারীর জন্য নিজের ঘর অনেক সময় বাইরের জগতের চেয়েও বেশি অনিরাপদ। পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয় ভাবার যে প্রচলিত ক্রিয়াবাদী ধারণা, নারীবাদীরা তাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
ক্রিটিক্যাল থিওরি ও পোস্ট-মডার্ন ভাবনা: ব্যক্তিগত জীবনের রূপান্তর
আধুনিক যুগে সমাজবিজ্ঞানীরা পরিবারকে আরও জটিল লেন্স দিয়ে দেখছেন। অ্যান্থনি গিডেন্স (Anthony Giddens) বললেন, আধুনিক পরিবার এখন আর প্রথা বা অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে টিকে নেই, এটি টিকে আছে ‘ভালোবাসা’র ওপর। তিনি একে বললেন কনফ্লুয়েন্ট লাভ (Confluent Love)। আগে বিয়ে ছিল আমৃত্যু বন্ধন, এখন সম্পর্ক টিকে থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ উভয় পক্ষ সেখান থেকে মানসিক তৃপ্তি পায়। একে তিনি বললেন পিওর রিলেশনশিপ (Pure Relationship)। শুনতে ভালো লাগলেও, এর ফলে পরিবার খুব ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। তৃপ্তি ফুরালেই সম্পর্ক শেষ, তাই ডিভোর্স বাড়ছে (Giddens, 1992)। আবার জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেক (Ulrich Beck) আমাদের সময়কে বললেন রিস্ক সোসাইটি (Risk Society)। তিনি বললেন, এখন আর কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। প্রতিটি মানুষকে তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। বিয়ে করব কি করব না, বাচ্চা নেব কি নেব না – সবই এখন আলোচনার বিষয়। একে তিনি বললেন নেগোশিয়েটেড ফ্যামিলি (Negotiated Family)। এই স্বাধীনতা যেমন সুযোগ এনেছে, তেমনি এনেছে অনিশ্চয়তা (Beck, 1992)।
পিয়ের বুরদিউ: সাংস্কৃতিক পুঁজি ও অসমতার খেলা
পরিবার নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার এক অপরিহার্য নাম ফরাসি তাত্ত্বিক পিয়ের বুরদিউ (Pierre Bourdieu)। তিনি পরিবারকে দেখলেন শ্রেণী বৈষম্য টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু মার্ক্সবাদীদের মতো তিনি কেবল অর্থনৈতিক পুঁজি বা টাকা-পয়সার কথা বললেন না। তিনি নিয়ে এলেন এক যুগান্তকারী ধারণা – কালচারাল ক্যাপিটাল (Cultural Capital) বা সাংস্কৃতিক পুঁজি। বুরদিউ বললেন, বড়লোক বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা কেবল বাবার সম্পত্তি পায় না, তারা পরিবার থেকে এমন কিছু অদৃশ্য সম্পদ পায় যা তাদের জীবনে এগিয়ে দেয়। যেমন – শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা, ধ্রুপদী গান শোনা, ভালো বই পড়া, বা আর্ট গ্যালারিতে যাওয়ার অভ্যাস। এই অভ্যাসগুলোকে তিনি বললেন হ্যাবিটাস (Habitus)।
বুরদিউর মতে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যে, তা এই উচ্চবিত্তের সংস্কৃতিকেই ‘মূল্যবান’ বা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ মনে করে। ফলে একজন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান যখন স্কুলে যায়, তখন সে সেখানকার পরিবেশের সাথে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে, কারণ তার পরিবার তাকে আগেই সেই ‘সাংস্কৃতিক কোড’গুলো শিখিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, একজন গরিব বা শ্রমিক পরিবারের সন্তানের মেধা থাকলেও তার এই ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ নেই। তার ভাষা, তার রুচি স্কুলের মানদণ্ডের সাথে মেলে না। ফলে সে পিছিয়ে পড়ে। শিক্ষক হয়তো ভাবেন ছেলেটি কম মেধাবী, কিন্তু আসলে সে ভিন্ন এক ‘হ্যাবিটাস’ থেকে এসেছে। বুরদিউ দেখালেন, পরিবার কেবল জিন বা টাকা হস্তান্তর করে না, পরিবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অসমতা হস্তান্তর করে। একে তিনি বললেন সোশ্যাল রিপ্রোডাকশন (Social Reproduction) (Bourdieu, 1986)। বুরদিউর এই তত্ত্ব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মেধা বা যোগ্যতার যে গল্প আমরা শুনি, তা অনেকাংশেই এক বিভ্রম; আসল খেলাটা খেলে পরিবার এবং তার দেওয়া সাংস্কৃতিক পুঁজি।
মিথষ্ক্রিয়াবাদ: পরিবারের ভেতরের গল্প
বড় বড় কাঠামোর বাইরে গিয়ে কিছু সমাজবিজ্ঞানী পরিবারের ভেতরের ছোট ছোট ঘটনার দিকে নজর দিলেন। একে বলা হয় মিথষ্ক্রিয়াবাদ (Interactionism) বা অ্যাকশন থিওরি (Action Theory)। ডেভিড মর্গান (David Morgan) বললেন, পরিবার কোনো স্থির বস্তু বা ‘Noun’ নয়, পরিবার হলো একটি কাজ বা ‘Verb’। আমরা যা করি, সেটাই পরিবার। তিনি একে বললেন ডুয়িং ফ্যামিলি (Doing Family)। একসাথে খেতে বসা, টিভি দেখা, বা ঝগড়া করা – এই দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমেই আমরা প্রতিনিয়ত পরিবার তৈরি করি। রক্তের সম্পর্ক থাকলেই পরিবার হয় না, যদি না তাদের মধ্যে এই মিথষ্ক্রিয়া থাকে (Morgan, 1996)।
সমাজবিজ্ঞানের এই বিশাল ক্যানভাসে পরিবারকে দেখা হয় বহুমাত্রিক এক সত্তা হিসেবে। ক্রিয়াবাদীরা যেখানে দেখেন শৃঙ্খলা, মার্ক্সবাদীরা দেখেন শোষণ, নারীবাদীরা দেখেন পিতৃতন্ত্র, আর বুরদিউ দেখেন অদৃশ্য পুঁজির খেলা। সমাজবিজ্ঞানের এই লেন্সগুলো আমাদের শেখায় যে, পরিবারের কোনো একক সত্য নেই। পরিবার একই সাথে আশ্রয় এবং কারাগার, ভালোবাসা এবং রাজনীতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এই জটিলতাটুকু বুঝতে পারলেই আমরা সমাজকে সত্যিকার অর্থে চিনতে পারব।
মনোবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি: আবেগের সুতো
সমাজবিজ্ঞানীরা যখন পরিবারের বাইরের কাঠামো বা দালানকোঠা নিয়ে ব্যস্ত, মনোবিজ্ঞানীরা তখন উঁকি দেন সেই দালানের ভেতরের অন্ধকার কুঠুরিতে। পরিবারের দেয়ালের ভেতর যে নাটক চলে, যে আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য রচিত হয়, তা বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। পরিবার তো কেবল কতগুলো মানুষের সমষ্টি নয়, এটি হলো আবেগের এক বিশাল জটপাকানো সুতো। এই সুতোর এক প্রান্ত টানলে অন্য প্রান্তে কার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। মনোবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে পরিবারকে ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, আমাদের ব্যক্তিত্ব, আমাদের সুখ, এমনকি আমাদের মানসিক রোগগুলোর বীজতলা হলো এই পরিবার। এখানে ভালোবাসা যেমন আছে, তেমনি আছে ঘৃণা, ঈর্ষা আর নিরাপত্তাহীনতা। সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud) অনেক আগেই বলেছিলেন, শিশু তার জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে যা দেখে বা অনুভব করে, সেটাই তার বাকি জীবনের ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা তৈরি করে দেয়। যদিও ফ্রয়েডের সব কথা এখন আর বেদবাক্য হিসেবে মানা হয় না, কিন্তু পরিবারের শৈশবকালীন অভিজ্ঞতাই যে মানুষের মনোজগৎ তৈরি করে – এই সত্যটি আধুনিক মনোবিজ্ঞান বারবার প্রমাণ করেছে।
জন বোলবি ও অ্যাটাচমেন্ট থিওরি: মায়ার বাঁধন নাকি শেকল?
পিতামাতা ও সন্তানের সম্পর্কের রসায়ন বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই যার কাছে যেতে হবে, তিনি হলেন ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী জন বোলবি (John Bowlby)। তিনি নিয়ে এলেন অ্যাটাচমেন্ট থিওরি (Attachment Theory) বা সংযুক্তি তত্ত্ব, যা শিশু মনস্তত্ত্বের জগতকে চিরতরে বদলে দিল। একটা সময় মনে করা হতো, শিশুরা মায়ের কাছে যায় শুধু খাবারের জন্য। মা দুধ দেয়, তাই শিশু মাকে ভালোবাসে – ব্যাপারটা অনেকটা পাভলভের কুকুরের মতো। কিন্তু জন বোলবি (John Bowlby) বললেন, না, বিষয়টা এত সরল নয়। তিনি বললেন, শিশুর কাছে মা বা প্রধান যত্নকারী (Primary Caregiver) কেবল খাবারের উৎস নন, তিনি হলেন ‘নিরাপদ আশ্রয়’ বা সিকিউর বেস (Secure Base)। আদিম যুগে বন্য প্রাণীর হাত থেকে বাঁচার জন্য মানব শিশুর এই এটাচমেন্ট বা লেগে থাকাটা ছিল বিবর্তনের এক অপরিহার্য কৌশল। বোলবি দেখালেন, শৈশবে মায়ের সাথে শিশুর যে বন্ধন তৈরি হয়, তার ওপর ভিত্তি করেই শিশুটি তার নিজের সম্পর্কে এবং জগত সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে, যাকে তিনি বললেন ইন্টারনাল ওয়ার্কিং মডেল (Internal Working Model) (Bowlby, 1969)। যদি শিশু দেখে যে কান্না করলেই মা ছুটে আসছেন, তবে সে শেখে – “আমি গুরুত্বপূর্ণ এবং জগতটা নিরাপদ।” আর যদি দেখে মা সাড়া দিচ্ছেন না, তবে সে শেখে – “আমি ভালোবাসার যোগ্য নই এবং জগতটা অনিরাপদ।”
বোলবির এই কাজকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিলেন তার সহকর্মী মেরি এইনসওয়ার্থ (Mary Ainsworth)। তিনি ল্যাবরেটরিতে এক অদ্ভুত পরীক্ষার আয়োজন করলেন, যার নাম স্ট্রেঞ্জ সিচুয়েশন প্রসিডিউর (Strange Situation Procedure)। এই পরীক্ষায় মা ও শিশুকে একটি অপরিচিত রুমে রাখা হয়, তারপর মা কিছুক্ষণ বাইরে যান এবং আবার ফিরে আসেন। মায়ের ফিরে আসার পর শিশুর প্রতিক্রিয়া দেখে এইনসওয়ার্থ শিশুদের এটাচমেন্টকে তিনটি ভাগে ভাগ করলেন।
- প্রথমত, সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট (Secure Attachment): মা ফিরে এলে শিশু খুশি হয় এবং শান্ত হয়। এদের মায়েরা সাধারণত শিশুর প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেন।
- দ্বিতীয়ত, অ্যাংশাস-অ্যাম্বিভ্যালেন্ট (Anxious-Ambivalent): মা ফিরে এলেও শিশু কান্না থামায় না, সে মায়ের প্রতি রাগ দেখায় আবার মাকেই আঁকড়ে ধরে। এদের মায়েরা কখনো খুব আদর করেন, আবার কখনো একদম পাত্তা দেন না, ফলে শিশু বিভ্রান্ত থাকে।
- তৃতীয়ত, অ্যাভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট (Avoidant Attachment): মা ফিরে এলেও শিশু কোনো ভাব দেখায় না, যেন তার কিছু যায় আসে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে প্রচণ্ড স্ট্রেসে থাকে। এদের মায়েরা সাধারণত শিশুর আবেগীয় চাহিদাকে উপেক্ষা করেন (Ainsworth et al., 1978)।
মজার এবং ভয়ের ব্যাপার হলো, শৈশবের এই প্যাটার্ন আমরা বড়বেলায় আমাদের রোমান্টিক সম্পর্কে বয়ে নিয়ে যাই। যে শিশুটি ‘সিকিউর’ ছিল, সে তার প্রেমিক বা প্রেমিকার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে। আর যে ‘অ্যাভয়ডেন্ট’ ছিল, সে বড় হয়ে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, সম্পর্কের গভীরে যেতে ভয় পায়। অর্থাৎ, আমাদের দাম্পত্য কলহের শিকড় হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের শৈশবের দোলনায়।
ফ্যামিলি সিস্টেমস থিওরি: পরিবার যখন একটি মেশিন
পরিবারকে বোঝার জন্য আরেকজন জাদুকরের আবির্ভাব ঘটল, তার নাম মারে বোয়েন (Murray Bowen)। তিনি বললেন, পরিবারের কোনো একজন সদস্যকে আলাদা করে বিচার করা বোকামি। কোনো সন্তান যদি মাদকাসক্ত হয়, বা কোনো বাবা যদি খুব রাগী হন – তবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, ওটা পুরো পরিবারের সমস্যা। মারে বোয়েন (Murray Bowen) নিয়ে এলেন ফ্যামিলি সিস্টেমস থিওরি (Family Systems Theory)। তিনি পরিবারকে তুলনা করলেন একটি ঝুলন্ত মোবাইল (Mobile) বা বাচ্চার দোলনার খেলনার সাথে। যদি আপনি মোবাইলের একটি অংশ নাড়া দেন, তবে পুরো খেলনাটিই নড়ে উঠবে। পরিবারের সবাই একে অপরের সাথে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। বোয়েন বললেন, পরিবার হলো একটি ইমোশনাল ইউনিট (Emotional Unit) বা আবেগীয় একক (Bowen, 1978)। এখানে একজনের উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি (Anxiety) ভাইরাসের মতো সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বাবার অফিসের টেনশন মায়ের মেজাজ খারাপ করে দেয়, আর মায়ের সেই মেজাজ গিয়ে পড়ে সন্তানের ওপর – এভাবেই সিস্টেমটি কাজ করে।
বোয়েন পরিবারের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য কিছু অসাধারণ ধারণা বা কনসেপ্ট দিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিফারেন্সিয়েশন অফ সেলফ (Differentiation of Self) বা স্ব-বিভেদন। এটি হলো একজন মানুষের সেই ক্ষমতা, যার মাধ্যমে সে পরিবারের আবেগের স্রোতে ভেসে না গিয়েও নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারে। যেসব পরিবারের সদস্যদের ‘ডিফারেন্সিয়েশন’ কম, তারা একে অপরের আবেগের সাথে খুব বেশি জড়িয়ে থাকে, যাকে বলা হয় ফিউশন (Fusion)। এমন পরিবারে কেউ একজন কষ্ট পেলে সবাই ভেঙে পড়ে, আবার কেউ একজন রেগে গেলে সবাই রেগে যায়। এখানে কারো ব্যক্তিগত স্পেস বা সীমানা থাকে না। অন্যদিকে, যাদের ‘ডিফারেন্সিয়েশন’ বেশি, তারা পরিবারের সাথে যুক্ত থেকেও নিজের মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বোয়েন দেখালেন, সুস্থ পরিবারের লক্ষণ হলো – সদস্যরা ‘আমরা’ এবং ‘আমি’-র মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
ট্রায়াঙ্গেলেশন: দুজনার সমস্যা, তৃতীয়র ঘাড়ে
বোয়েনের তত্ত্বের আরেকটি চমকপ্রদ এবং বহুল ব্যবহৃত ধারণা হলো ট্রায়াঙ্গেলেশন (Triangulation)। তিনি বললেন, দুজনের সম্পর্ক সবসময়ই অস্থির বা আনস্টেবল। যখনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বা টেনশন বাড়ে, তখনই তারা সেই টেনশন কমানোর জন্য তৃতীয় কাউকে টেনে আনে। এই তৃতীয় ব্যক্তিটি সাধারণত হয় তাদের সন্তান। ধরুন, বাবার ওপর মায়ের খুব রাগ, কিন্তু তিনি সরাসরি বাবাকে কিছু বলছেন না। তিনি গিয়ে ছেলেকে বলছেন, “তোর বাবা না একদম অপদার্থ, সংসারের কোনো খোঁজ রাখে না।” ছেলে তখন মায়ের দলে ভিড়ল এবং বাবার ওপর রাগ করল। এখানে মা তার নিজের অ্যাংজাইটি ছেলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে হালকা হলেন। একেই বলে ট্রায়াঙ্গেলেশন। এটি কেবল বাবা-মা-সন্তানের মধ্যে হয় না; শাশুড়ি-বউমা-ছেলে বা দুই বন্ধু ও প্রেমিকার মধ্যেও হতে পারে। বোয়েন বললেন, ট্রায়াঙ্গেলেশন সাময়িকভাবে শান্তি দেয় বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সমস্যার সমাধান করে না, বরং সমস্যাকে জিইয়ে রাখে এবং তৃতীয় ব্যক্তিটিকে (যে প্রায়শই শিশু) মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। পরিবারের ভেতর এই ত্রিভুজ প্রেমের চেয়ে ত্রিভুজ দ্বন্দ্বের খেলাই বেশি চলে।
স্ট্রাকচারাল ফ্যামিলি থেরাপি: সীমানা ও শাসন
পরিবারের ভেতরের কাঠামো নিয়ে কাজ করেছেন আরেক কিংবদন্তি থেরাপিস্ট সালভাদর মিনুচিন (Salvador Minuchin)। তিনি দিলেন স্ট্রাকচারাল ফ্যামিলি থেরাপি (Structural Family Therapy)। মিনুচিন পরিবারের দিকে তাকিয়ে দেখতেন সেখানে ক্ষমতার বিন্যাস বা হায়ারার্কি (Hierarchy) ঠিক আছে কি না। তিনি বললেন, একটি সুস্থ পরিবারে বাবা-মায়ের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। যদি দেখা যায় বাচ্চারা যা ইচ্ছা তাই করছে এবং বাবা-মা অসহায় হয়ে বসে আছে, তবে সেই পরিবারের কাঠামো ভেঙে পড়েছে। মিনুচিন পরিবারের সীমানা বা বাউন্ডারি (Boundaries) নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি দুই ধরণের অসুস্থ পরিবারের কথা উল্লেখ করেছেন। এক হলো এনমেশড ফ্যামিলি (Enmeshed Family) – যেখানে সীমানা এতই অস্পষ্ট যে কারো কোনো প্রাইভেসি নেই। মা সবসময় সন্তানের ডায়েরি পড়ছেন, বাথরুমের দরজা খোলা রাখছেন – অতি মাখামাখি অবস্থা। এতে সন্তানের শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম হয়। অন্যটি হলো ডিজএনগেজড ফ্যামিলি (Disengaged Family) – যেখানে সীমানা এতই কড়া যে কেউ কারো খবর রাখে না। বাবা তার ঘরে, ছেলে তার ঘরে; কারো সাথে কারো আবেগের সংযোগ নেই (Minuchin, 1974)। মিনুচিন বললেন, সুস্থ পরিবারে থাকে ‘ক্লিয়ার বাউন্ডারি’ – যেখানে ভালোবাসা আছে, আবার দূরত্বও আছে।
মিনুচিন আরেকটি মারাত্মক সমস্যার কথা বললেন, যার নাম প্যারেন্টিফিকেশন (Parentification)। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা-মায়ের অবহেলার কারণে বা কলহের কারণে পরিবারের ছোট শিশুটি বড়দের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। হয়তো আট বছরের মেয়েটি তার ছোট ভাইকে খাওয়াচ্ছে, বা মায়ের কান্নার সঙ্গী হচ্ছে। শিশুটি তার শৈশব হারিয়ে হয়ে ওঠে ‘ছোট বাবা’ বা ‘ছোট মা’। এটি শিশুটির মানসিক বিকাশের জন্য এক বড় বিপর্যয়। মনোবিজ্ঞান আমাদের দেখায়, পরিবারের এই উল্টো রথযাত্রায় শিশুটি কীভাবে পিষ্ট হয়।
ভার্জিনিয়া সাটির ও যোগাযোগের বরফ
পারিবারিক চিকিৎসা বা ফ্যামিলি থেরাপির মা বলা হয় ভার্জিনিয়া সাটির (Virginia Satir)-কে। তিনি পরিবারের সদস্যদের মনের খবর বের করার জন্য যোগাযোগের ওপর জোর দিলেন। তিনি বললেন, মানুষ যা বলে আর যা অনুভব করে – তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তিনি একে তুলনা করলেন আইসবার্গ মেটাফোর (Iceberg Metaphor)-এর সাথে। আমরা জলের ওপর যা দেখি তা হলো মানুষের আচরণ, কিন্তু জলের নিচে লুকিয়ে থাকে তার অনুভূতি, তার ভয়, তার আশা। সাটির দেখালেন, পরিবারে যখন সমস্যা হয়, তখন মানুষ চার ধরণের ভুল যোগাযোগের আশ্রয় নেয়। কেউ হয় প্লেকেটার (Placater) – যে সবসময় অন্যের মন জুগিয়ে চলে, নিজের কোনো মতামত দেয় না পাছে ঝগড়া লাগে। কেউ হয় ব্লেমার (Blamer) – যে নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপায়, সবসময় আক্রমণাত্মক। কেউ হয় কম্পিউটার (Computer) – যে কোনো আবেগ দেখায় না, শুধু যুক্তি দিয়ে কথা বলে, যেন সে একটা রোবট। আর কেউ হয় ডিস্ট্র্যাক্টর (Distractor) – যে মূল সমস্যা থেকে সবার মনোযোগ সরানোর জন্য অপ্রাসঙ্গিক কাজ করে। সাটির বললেন, সুস্থ যোগাযোগ হলো লেভেলিং (Leveling) – যেখানে মানুষ যা ভাবে, সেটাই সততার সাথে প্রকাশ করে (Satir, 1972)। সাটির আরও বললেন, পরিবার হলো এমন এক কারখানা যেখানে মানুষের সেলফ-এস্টিম (Self-Esteem) বা আত্মমর্যাদা তৈরি হয়। যে পরিবারে যোগাযোগ যত স্বচ্ছ, সেই পরিবারের সন্তানদের আত্মবিশ্বাস তত বেশি।
প্যারেন্টিং স্টাইল: কঠোর নাকি বন্ধু?
বাবা-মা কেমন আচরণ করলে সন্তান মানুষের মতো মানুষ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজিস্ট ডায়ানা বাউমরিন্ড (Diana Baumrind) প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালনের ধরণকে প্রধানত তিনটি (পরে চারটি) ভাগে ভাগ করলেন। প্রথমত, অথরিটারিয়ান (Authoritarian) বা স্বৈরাচারী: এখানে বাবা-মায়ের কথাই শেষ কথা। “আমি বলেছি তাই করবে” – এটাই নিয়ম। এই ধরণের প্যারেন্টিং-এ সন্তানরা বাধ্য হয় ঠিকই, কিন্তু তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তারা মনে মনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, পারমিসিভ (Permissive) বা অতি-অনুমোদনকারী: এখানে বাবা-মা সন্তানের বন্ধু হতে চান। কোনো নিয়মকানুন নেই, সন্তান যা চায় তাই পায়। এর ফলে সন্তানরা বখে যায় এবং তাদের মধ্যে আত্মসংযমের অভাব দেখা দেয়। তৃতীয়ত, অথরিটেটিভ (Authoritative) বা দায়িত্বশীল: এটিই সেরা পদ্ধতি। এখানে বাবা-মা নিয়ম কানুন বজায় রাখেন, কিন্তু সন্তানের কথাও শোনেন। তারা শাসন করেন, কিন্তু বুঝিয়ে। এই পরিবেশে বড় হওয়া সন্তানরা সবচেয়ে বেশি সফল এবং মানসিকভাবে সুস্থ হয়। পরবর্তীতে আরেকটি ধরণ যুক্ত হয়েছে – নেগলেক্টফুল (Neglectful) বা অবহেলাকারী, যেখানে বাবা-মা সন্তানের কোনো খোঁজই রাখেন না, যা সন্তানের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।
মনোবিজ্ঞানের এই লেন্স দিয়ে পরিবারকে দেখলে আমরা বুঝি, পরিবার কোনো শান্ত নদী নয়, বরং চোরাবালিতে ভরা এক সমুদ্র। এখানে অ্যাটাচমেন্টের অভাব, বাউন্ডারির গণ্ডগোল, বা ভুল যোগাযোগের কারণে প্রতিনিয়ত মানুষের মন ভাঙছে।
লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভ: সময়ের খেলা
আমরা প্রায়শই মানুষের জীবনকে একটি স্থির ছবি বা স্ন্যাপশট হিসেবে কল্পনা করি। ভাবি, আজ যে পরিবারটি সুখী, কালও তারা তেমনই থাকবে; বা আজ যে পরিবারটি বিপদে আছে, তাদের বিপদটা বুঝি শুধুই আজকের। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা আমাদের শেখায় যে, মানুষের জীবন আসলে স্থির ছবি নয়, এটি একটি দীর্ঘ এবং জটিল চলচ্চিত্র। আর এই চলচ্চিত্রটি বোঝার জন্য যে চশমাটি আমাদের দরকার, তার নাম লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভ (Life Course Perspective) বা জীবন প্রবাহের দৃষ্টিভঙ্গি। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো – মানুষের জীবন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা, যা ইতিহাসের বড় বড় ঘটনা এবং সমাজের পরিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময় জন্ম নেওয়া একটি শিশুর পারিবারিক অভিজ্ঞতা আর ২০০০ সালে স্মার্টফোনের যুগে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর অভিজ্ঞতা কখনোই এক হবে না। সময়, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে একে অপরের সাথে মিলেমিশে পরিবারের ভাগ্য নির্ধারণ করে, সেটাই এই অধ্যায়ের আলোচনার বিষয়।
গ্লেন এল্ডার ও মহামন্দার শিশুরা
লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভকে একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে দাঁড় করানোর কৃতিত্ব যার, তিনি হলেন প্রখ্যাত আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী গ্লেন এল্ডার (Glen Elder)। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ Children of the Great Depression-এ তিনি দেখালেন এক অভাবনীয় চিত্র। এল্ডার ১৯২০-এর দশকে জন্ম নেওয়া শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা চালিয়েছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, আমেরিকার মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন (১৯২৯-১৯৩৯) কীভাবে এই শিশুদের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। তিনি দেখলেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে অনেক বাবার চাকরি চলে গিয়েছিল এবং পরিবারের আয় কমে গিয়েছিল। এর ফলে পরিবারের ভেতরে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গিয়েছিল। বাবারা তাদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং মায়েরা বা বড় সন্তানরা পরিবারের হাল ধরেছিল। এল্ডার লক্ষ্য করলেন, যেসব পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ বেশি ছিল, সেখানে বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া বেড়েছে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিশুদের ওপর। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই প্রভাব সবার ওপর সমান ছিল না। যারা বয়সে একটু বড় ছিল, তারা কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পেরেছিল এবং এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে যারা খুব ছোট ছিল, তারা কেবল নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। এল্ডার (Elder) এই গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে, ইতিহাসের বড় কোনো ঘটনা (যেমন যুদ্ধ, মহামড়ী, মন্দা) ব্যক্তির জীবনের গতিপথ বা ট্র্যাজেক্টরি (Trajectory) চিরতরে বদলে দিতে পারে (Elder, 1974)। ইতিহাস এবং জীবনী যে একে অপরের পরিপূরক, তা তিনি হাতে-কলমে দেখিয়ে দিলেন।
টাইমিং: সময়ের সঠিক ব্যবহার
লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো টাইমিং (Timing) বা সময়জ্ঞান। জীবনের কোনো ঘটনা কখন ঘটছে, তা সেই ঘটনার ফলাফলের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। একে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন সোশ্যাল ক্লক (Social Clock) বা সামাজিক ঘড়ি। প্রতিটা সমাজেই একটা অলিখিত নিয়ম আছে – কখন পড়াশোনা শেষ করতে হবে, কখন বিয়ে করতে হবে, কখন বাচ্চা নিতে হবে এবং কখন অবসরে যেতে হবে। যখন কেউ এই ‘অন টাইম’ বা সঠিক সময়ে কাজগুলো করে, তখন সে সমাজ এবং পরিবারের কাছ থেকে সমর্থন পায়। কিন্তু যখন কেউ ‘অফ টাইম’ বা বেসময়ে কিছু করে, তখন তার জীবনে সংকট তৈরি হয়। যেমন, একজন নারী যদি ২৫ বছর বয়সে মা হন, তবে সেটা তার জন্য আনন্দের এবং পরিবার তাকে সাহায্য করে। কিন্তু সেই একই নারী যদি ১৫ বছর বয়সে মা হন (টিনএজ প্রেগন্যান্সি), তবে সেটা তার জীবনের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে – তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। আবার যদি ৪৫ বছর বয়সে কেউ প্রথম বাবা হন, তবে সেটাও তার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। গ্লেন এল্ডার (Glen Elder) এবং তার অনুসারীরা দেখিয়েছেন যে, ঘটনার চেয়ে ঘটনার সময়কাল বা টাইমিং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সুখ-দুঃখের বড় নির্ধারক। আধুনিক যুগে এই সোশ্যাল ক্লক কিছুটা শিথিল হলেও, এর প্রভাব এখনো প্রবল।
লিংকড লাইভস: অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা জীবন
আমরা ভাবি আমাদের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো বুঝি আমাদের একান্তই নিজস্ব। কিন্তু লাইফ কোর্স থিওরি একটি চমৎকার ধারণা দিয়েছে যার নাম লিংকড লাইভস (Linked Lives) বা সংযুক্ত জীবন। এর মানে হলো, পরিবারের একজন সদস্যের জীবনের ঘটনা অন্য সদস্যদের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। একে ইন্টারডিপেন্ডেন্সি (Interdependency) বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও বলা যায়। ধরুন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধের সময় কোনো পরিবারের বাবা শহীদ হলেন। এই একটি ঘটনা কেবল বাবার মৃত্যু নয়, এটি ওই পরিবারের মায়ের জীবনকে বদলে দিল (তিনি বিধবা হলেন এবং সংসারের হাল ধরলেন), বড় ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করে কাজে নামতে হলো, আর ছোট মেয়েটি বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হলো। অর্থাৎ, বাবার জীবনের ট্র্যাজেক্টরি পরিবারের বাকি সবার ট্র্যাজেক্টরিকে বাঁকিয়ে দিল। আবার বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ভাবুন – একজন বাবা যদি হঠাৎ চাকরি হারান, তবে তার প্রভাব পড়ে সন্তানের স্কুলের বেতন, স্ত্রীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর। এল্ডার (Elder) বলেছেন, মানুষ তার নিজের ইতিহাস নিজেই লেখে ঠিকই, কিন্তু সে তা একা লেখে না; সে তা লেখে অন্যদের সাথে মিলেমিশে। এই ‘লিংকড লাইভস’ ধারণাটি পরিবারের সংহতি এবং ভঙ্গুরতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার।
ঐতিহাসিক সময় ও স্থান: আমরা ইতিহাসের সন্তান
লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভের আরেকটি স্তম্ভ হলো হিস্টোরিক্যাল টাইম এন্ড প্লেস (Historical Time and Place)। আমরা যে সময়ে এবং যে স্থানে বাস করি, তা আমাদের সুযোগ এবং সীমাবদ্ধতাগুলোকে ঠিক করে দেয়। একে বলা হয় কোহর্ট এফেক্ট (Cohort Effect)। ‘কোহর্ট’ মানে হলো একই সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষের দল। যেমন, যারা ‘বেবি বুমার’ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জন্ম নেওয়া প্রজন্ম), তাদের পারিবারিক মূল্যবোধ আর আজকের ‘জেন-জি’ (Gen-Z) বা মিলেনিয়ালদের মূল্যবোধ এক নয়। বেবি বুমাররা যখন যৌবনে পা দিয়েছিল, তখন অর্থনীতি ছিল চাঙ্গা, তাই তারা অল্প বয়সে বিয়ে করে বাড়ি-গাড়ি করতে পেরেছিল। কিন্তু আজকের মিলেনিয়ালরা অর্থনৈতিক মন্দা, ছাত্রঋণ এবং অস্থিতিশীল চাকরির বাজারে প্রবেশ করেছে। ফলে তারা দেরিতে বিয়ে করছে, সন্তান নিতে ভয় পাচ্ছে বা মা-বাবার সাথেই থাকছে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলছেন বুমেরাং কিডস (Boomerang Kids) – যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও অর্থনৈতিক কারণে আবার বাবার বাড়িতে ফিরে আসছে। এই যে দুই প্রজন্মের আচরণের পার্থক্য, তা তাদের ব্যক্তিগত দোষ বা গুণ নয়, বরং তা হলো তারা ইতিহাসের কোন সময়ে বাস করছে তার ফল। রাইলি (Riley) এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এজ স্ট্র্যাটিফিকেশন থিওরি (Age Stratification Theory) দিয়ে, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন সমাজ কীভাবে বয়সের ভিত্তিতে মানুষের ভূমিকা ভাগ করে দেয় এবং ইতিহাসের পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই ভূমিকাগুলোও বদলে যায় (Riley, 1987)।
হিউম্যান এজেন্সি: স্রোতের বিপরীতে সাঁতার
এতক্ষণ ধরে আমরা দেখলাম ইতিহাস আর সমাজ কীভাবে আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাহলে কি মানুষের নিজের কোনো ক্ষমতা নেই? লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভ কিন্তু মানুষকে পুতুল মনে করে না। এই তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হিউম্যান এজেন্সি (Human Agency) বা মানবীয় কর্তাসত্তা। এর মানে হলো, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। গ্লেন এল্ডার (Glen Elder) দেখিয়েছেন, মহামন্দার সময় অনেক শিশু কষ্টে বড় হলেও, তারা তাদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে বা সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়) নিজেদের জীবনকে নতুন করে সাজিয়েছিল। একে তিনি বলেছেন টার্নিং পয়েন্ট (Turning Point)। জীবনের রাস্তায় চলতে চলতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে – যেমন একটি ভালো চাকরি পাওয়া, একজন ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়া, বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া – যা মানুষের আগের সব খারাপ অভিজ্ঞতাকে মুছে দিয়ে নতুন পথে নিয়ে যায়। জন লব (John Laub) এবং রবার্ট স্যাম্পসন (Robert Sampson) অপরাধী কিশোরদের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, ছোটবেলায় যারা অপরাধী ছিল, তাদের অনেকেই ভালো বিয়ে বা স্থিতিশীল চাকরির কারণে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে সৎ পথে ফিরে এসেছে (Laub & Sampson, 1993)। অর্থাৎ, মানুষ কেবল ইতিহাসের শিকার নয়, মানুষ ইতিহাসের নির্মাতাও বটে। পরিবারের সাপোর্ট এবং ব্যক্তিগত চেষ্টার মাধ্যমে মানুষ ‘বিধিলিপি’ খণ্ডাতে পারে।
ট্রানজিশন ও ট্র্যাজেক্টরি: জীবনের পথচলা
লাইফ কোর্স থিওরিতে জীবনকে দেখা হয় কতগুলো ট্রানজিশন (Transition) বা পরিবর্তনের সমষ্টি হিসেবে। স্কুল শেষ করা, প্রথম চাকরি, বিয়ে, প্রথম সন্তান, সন্তানের বিয়ে, অবসর, এবং সবশেষে সঙ্গীর মৃত্যু – এগুলো সবই একেকটি ট্রানজিশন। এই ট্রানজিশনগুলো যখন একটার পর একটা সাজানো হয়, তখন তৈরি হয় জীবনের ট্র্যাজেক্টরি (Trajectory) বা গতিপথ। ট্রানজিশনগুলো সবসময় মসৃণ হয় না। অনেক সময় এগুলো হয় আকস্মিক এবং বেদনাদায়ক, যেমন অকাল মৃত্যু বা ডিভোর্স। আবার অনেক সময় এগুলো হয় প্রত্যাশিত। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখেন, এই ট্রানজিশনগুলোর সময় পরিবার কীভাবে খাপ খাইয়ে নেয় বা অ্যাডাপ্টেশন (Adaptation) করে। যেমন, যখন প্রথম সন্তান জন্ম নেয়, তখন স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায় বিশাল পরিবর্তন আসে। তারা আর কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা থাকে না, তারা হয়ে যায় বাবা-মা। এই পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে না পারলে অনেক সময় বিয়ে ভেঙে যায়। আবার যখন সন্তানরা বড় হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তখন তৈরি হয় এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম (Empty Nest Syndrome)। বাবা-মা তখন আবার একা হয়ে যান এবং তাদের সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভ আমাদের শেখায় যে, পরিবারের সুখ বা দুঃখ কোনো স্থির অবস্থা নয়, এটি এই ট্রানজিশনগুলো সফলভাবে পার করার ওপর নির্ভর করে।
কিউমুলেটিভ অ্যাডভান্টেজ ও ডিজঅ্যাডভান্টেজ: চক্রবৃদ্ধি হারে লাভ-ক্ষতি
সবশেষে, লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো কিউমুলেটিভ অ্যাডভান্টেজ/ডিজঅ্যাডভান্টেজ (Cumulative Advantage/Disadvantage)। সহজ কথায়, “টাকায় টাকা আনে, আর বিপদ বিপদ বাড়ায়।” ছোটবেলায় যদি কোনো শিশু পুষ্টিকর খাবার, ভালো স্কুল এবং পারিবারিক সাপোর্ট পায়, তবে সে ভালো চাকরি পায়, ভালো বিয়ে করে এবং সুস্থ বার্ধক্য কাটায়। তার সুবিধাগুলো চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। একে বলা হয় ম্যাথিউ এফেক্ট (Matthew Effect)। উল্টোদিকে, যে শিশুটি ছোটবেলায় অপুষ্টিতে ভোগে বা পারিবারিক কলহ দেখে, সে স্কুলে খারাপ করে, কম বেতনের চাকরি পায় এবং অসুস্থতায় ভোগে। তার অসুবিধাগুলোও চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। ড্যানিফার (Dannefer) দেখিয়েছেন, জীবনের শুরুতে যে ছোট ব্যবধান থাকে, বয়সের সাথে সাথে তা বিশাল আকার ধারণ করে (Dannefer, 2003)। এই তত্ত্বটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কেন কিছু পরিবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধনী থাকে আর কিছু পরিবার গরিবই থেকে যায়। এটি কেবল ভাগ্যের দোষ নয়, এটি হলো জীবন প্রবাহের এক নির্মম গাণিতিক হিসাব।
লাইফ কোর্স পারসপেক্টিভ আমাদের পরিবারকে দেখার এক নতুন চোখ দেয়। আমরা বুঝতে পারি, পরিবার কোনো স্থির দ্বীপ নয়, এটি সময়ের নদীতে ভাসমান এক ভেলা। এই ভেলার যাত্রাপথে কখনো ঝড় আসে (ঐতিহাসিক সংকট), কখনো নতুন যাত্রী ওঠে (জন্ম/বিয়ে), আবার কখনো কেউ নেমে যায় (মৃত্যু)। এই সবকিছুর যোগফলই হলো আমাদের জীবন। ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ ডিসিপ্লিনটি যদি এই সময়ের খেলা বা ‘টেম্পোরাল ডাইমেনশন’কে বিবেচনায় না নেয়, তবে পরিবারের আসল গল্পটা কখনোই পুরোপুরি বলা হবে না।
অর্থনীতির খাতা: লাভ-ক্ষতির হিসাব
আমরা সাধারণত পরিবারকে দেখি ভালোবাসার এক পবিত্র মন্দির হিসেবে, যেখানে স্বার্থের কোনো জায়গা নেই। মা সন্তানের জন্য না খেয়ে থাকেন, বাবা সন্তানের জন্য ঘাম ঝরান – এগুলোকে আমরা বলি নিঃশর্ত ত্যাগ। কিন্তু অর্থনীতির খাতা বা লেজার বুক হাতে নিলে এই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। অর্থনীতিবিদরা যখন পরিবারের দিকে তাকান, তখন তারা কোনো আবেগ দেখেন না, তারা দেখেন লাভ-ক্ষতির এক জটিল অঙ্ক। তাদের কাছে পরিবার হলো একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা ‘ফার্ম’, যেখানে প্রতিনিয়ত উৎপাদন, বণ্টন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আমরা যাকে ‘ভালোবাসা’ বলি, অর্থনীতিবিদরা তাকে বলেন ‘ইউটিলিটি’ বা উপযোগিতা। আমরা যাকে ‘বিয়ে’ বলি, তারা তাকে বলেন ‘চুক্তি’। শুনতে খুব রূঢ় মনে হলেও, আধুনিক বিশ্বের পারিবারিক সংকটগুলো বুঝতে হলে এই অর্থনৈতিক চশমাটি পরা খুব জরুরি। কারণ, দিনশেষে পেট না চললে প্রেম জানালা দিয়ে পালায়। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে অর্থনীতির সূত্রগুলো আমাদের বেডরুম থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
গ্যারি বেকার ও র্যাশনাল চয়েস থিওরি
পরিবার নিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের জনক বলা হয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার (Gary Becker)-কে। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তার যুগান্তকারী বই A Treatise on the Family-তে তিনি এমন সব কথা বললেন যা সমাজবিজ্ঞানীদের ভুরু কুঁচকে দিল। বেকার বললেন, মানুষ যখন বিয়ে করে, সন্তান নেয়, বা ডিভোর্স দেয় – তখন তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় লাভ-ক্ষতির হিসাব করেই এই কাজগুলো করে। একে তিনি বললেন র্যাশনাল চয়েস থিওরি (Rational Choice Theory) বা যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব (Becker, 1981)। তার মতে, মানুষ তখনই বিয়ে করে যখন সে দেখে যে একা থাকার চেয়ে বিয়ে করলে তার ‘ইউটিলিটি’ বা সামগ্রিক সুখ বাড়বে। এই ইউটিলিটি হতে পারে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নিয়মিত যৌনতা, বা সন্তান লাভের সুযোগ। বেকারের ভাষায়, বিয়ে হলো এক ধরণের ট্রেডিং পার্টনারশিপ (Trading Partnership)। প্রথাগতভাবে পুরুষরা পরিবারে নিয়ে আসে ‘মার্কেট গুডস’ বা টাকা-পয়সা, আর নারীরা নিয়ে আসে ‘হাউজহোল্ড গুডস’ বা গৃহস্থালি সেবা এবং সন্তান লালন-পালন। এই শ্রম বিভাজনের ফলে উভয় পক্ষেরই লাভ হয়, একে তিনি বললেন গেইনস ফ্রম ট্রেড (Gains from Trade)। অর্থাৎ, প্রেমের কারণেই যে মানুষ বিয়ে করে তা নয়, বরং অর্থনৈতিক সুবিধা বা ‘কম্প্যারেটিভ অ্যাডভান্টেজ’ আছে বলেই মানুষ যুগ যুগ ধরে বিয়ে করে আসছে।
সন্তান: ভালোবাসার ফসল নাকি বিনিয়োগ?
গ্যারি বেকার সন্তান নেওয়াকে তুলনা করেছেন গাড়ি বা বাড়ি কেনার সাথে। শুনতে খারাপ লাগলেও, অর্থনীতির দৃষ্টিতে সন্তান হলো এক ধরণের ডিউরেবল গুড (Durable Good) বা দীর্ঘস্থায়ী পণ্য। বাবা-মা সন্তান নেওয়ার আগে অবচেতনভাবেই একটি কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস (Cost-Benefit Analysis) করেন। ‘কস্ট’ বা খরচ হলো – বাচ্চাকে খাওয়ানো, পড়ানো, এবং সবচেয়ে বড় হলো মায়ের সময় বা ‘টাইম কস্ট’। আর ‘বেনিফিট’ বা লাভ হলো – ভবিষ্যতে সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক সাহায্য (বৃদ্ধ বয়সের লাঠি) এবং মানসিক তৃপ্তি। বেকার দেখালেন, কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষ বেশি সন্তান নিত কারণ সেখানে সন্তান ছিল উৎপাদনের হাতিয়ার বা ‘প্রোডাকশন গুড’। ক্ষেতে কাজ করার জন্য বেশি হাত দরকার ছিল, আর খরচও ছিল কম। কিন্তু আধুনিক শিল্প সমাজে সন্তান হয়ে গেছে ‘কনজাম্পশন গুড’ বা ভোগের পণ্য। এখন সন্তান কোনো ইনকাম করে দেয় না, উল্টো তাদের পেছনে বিশাল খরচ করতে হয়। তাই মানুষ এখন ‘কোয়ান্টিটি’ বা সংখ্যার চেয়ে ‘কোয়ালিটি’ বা গুণগত মানের দিকে ঝুঁকছে। তারা কম সন্তান নিচ্ছে কিন্তু তাদের পেছনে বেশি বিনিয়োগ করছে (ভালো স্কুল, ভালো খাবার), যাতে ভবিষ্যতে তারা ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানব সম্পদে পরিণত হতে পারে। জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনের আসল কারণ কোনো সরকারি প্রচার-প্রচারণা নয়, বরং এই অর্থনৈতিক সমীকরণ।
হাউজহোল্ড প্রোডাকশন: অদৃশ্য অর্থনীতি
অর্থনীতির বইতে সাধারণত জিডিপি (GDP) বা জাতীয় আয়ের হিসাব থাকে, যেখানে কলকারখানার উৎপাদন বা অফিসের কাজকে মূল্য দেওয়া হয়। কিন্তু ঘরের ভেতরে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে, তার কোনো হিসাব থাকে না। একে বলা হয় হাউজহোল্ড প্রোডাকশন (Household Production)। মা যে রান্না করছেন, বাচ্চার ডায়পার পাল্টাচ্ছেন, ঘর পরিষ্কার করছেন, বা বৃদ্ধ শ্বশুরের সেবা করছেন – এগুলোর কোনো বাজারমূল্য দেওয়া হয় না। অর্থনীতিবিদ মার্গারেট রিড (Margaret Reid) ১৯৩৪ সালেই এই বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি বললেন, এই কাজগুলো যদি পরিবার না করত, তবে বাজার থেকে কিনতে হতো (যেমন – বাবুর্চি, নার্স বা ধোপা রাখা), যার জন্য বিশাল অংকের টাকা লাগত (Reid, 1934)। গ্যারি বেকার এই তত্ত্বটিকে আরও জোরালো করলেন। তিনি বললেন, পরিবার হলো একটি ছোট ফ্যাক্টরি। বাজার থেকে কেনা কাঁচামাল (যেমন – চাল, ডাল) এবং পরিবারের সদস্যদের শ্রম (রান্না করা) মিশিয়ে তৈরি হয় ‘ফাইনাল গুড’ বা চূড়ান্ত পণ্য (যেমন – এক প্লেট ভাত), যা পরিবারের সদস্যদের ক্ষুধা এবং তৃপ্তি মেটায়। এই ‘ছায়া অর্থনীতি’ বা শ্যাডো ইকোনমি (Shadow Economy) যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের মূল অর্থনীতি ধসে পড়তে বাধ্য। নারীবাদী অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, জিডিপিতে এই গৃহশ্রমের মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যাতে নারীদের কাজের স্বীকৃতি মেলে।
অপরচুনিটি কস্ট ও ডিভোর্সের অর্থনীতি
কেন আধুনিক সমাজে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে? সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বলবেন, কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলেন অপরচুনিটি কস্ট (Opportunity Cost)-এর কথা। অপরচুনিটি কস্ট হলো কোনো একটি কাজ করার জন্য অন্য যে সেরা সুযোগটি আমরা হাতছাড়া করি, তার মূল্য। আগেকার দিনে নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করার সুযোগ ছিল কম। তাই একজন নারী যদি ডিভোর্স দিতেন, তবে তাকে না খেয়ে মরতে হতো। অর্থাৎ, তার ডিভোর্স দেওয়ার ‘কস্ট’ ছিল অনেক বেশি। তাই তিনি স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেও সংসার করতেন। কিন্তু এখন নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে, চাকরি করছে। তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বেড়েছে। এখন একজন নারী যদি ডিভোর্স দেন, তবে তিনি নিজেই চলতে পারেন। অর্থাৎ, অসুখী বিয়েতে টিকে থাকার ‘অপরচুনিটি কস্ট’ এখন অনেক বেশি (কারণ তিনি একা থাকলে হয়তো আরও ভালো থাকতেন)। গ্যারি বেকার (Gary Becker) একে ব্যাখ্যা করেছেন ইন্ডিপেনডেন্স এফেক্ট (Independence Effect) হিসেবে। তিনি বললেন, নারীদের আয় বাড়লে বিয়ের অর্থনৈতিক উপযোগিতা বা ‘গেইনস ফ্রম ম্যারেজ’ কমে যায়, কারণ তারা এখন আর স্বামীর টাকার ওপর নির্ভরশীল নন। ফলে সম্পর্কের গুণগত মান বা ভালোবাসা যদি না থাকে, তবে কেবল টাকার জন্য বিয়ে টিকে থাকার দিন শেষ। আধুনিক ডিভোর্স রেট আসলে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেরই একটি বাই-প্রোডাক্ট।
বারগেইনিং মডেল: সংসারের ভেতরে ক্ষমতার লড়াই
গ্যারি বেকারের তত্ত্বের একটি বড় সমালোচনা হলো, তিনি পরিবারকে একটি ‘একক সত্তা’ হিসেবে দেখেছেন, যেন পরিবারের সবার স্বার্থ এক। তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, পরিবারের কর্তা (সাধারণত পুরুষ) সবার ভালোর জন্য সিদ্ধান্ত নেন, যাকে তিনি বললেন অলট্রুইস্টিক হেড (Altruistic Head)। কিন্তু পরবর্তী অর্থনীতিবিদরা, বিশেষ করে নারীবাদী অর্থনীতিবিদরা বললেন, এটা ভুল। পরিবারের ভেতরেও প্রতিনিয়ত ক্ষমতার লড়াই চলে। অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) এবং মার্থা চেন (Martha Chen) নিয়ে এলেন কোঅপারেটিভ কনফ্লিক্ট (Cooperative Conflict) বা সহযোগিতামূলক দ্বন্দ্বের ধারণা। তারা বললেন, পরিবারের সদস্যরা একসাথে থাকে কারণ তাতে তাদের লাভ হয় (সহযোগিতা), কিন্তু কার লাভ কতটুকু হবে বা সীমিত সম্পদ কে কতটুকু পাবে – তা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকে।
এই দ্বন্দ্ব বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদরা ব্যবহার করেন বারগেইনিং মডেল (Bargaining Model)। এই মডেল অনুযায়ী, পরিবারের ভেতরে কার কথা চলবে, তা নির্ভর করে কার ‘থ্রেট পয়েন্ট’ (Threat Point) বা ‘ফলব্যাক পজিশন’ (Fallback Position) কত শক্তিশালী তার ওপর। থ্রেট পয়েন্ট হলো – যদি সংসার ভেঙে যায়, তবে কে কত ভালো অবস্থায় থাকবে। যার আয় বেশি, যার সম্পত্তি আছে বা যার সামাজিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, তার থ্রেট পয়েন্ট উঁচুতে। ফলে সংসারের যেকোনো সিদ্ধান্তে (যেমন – টিভি কেনা হবে নাকি ফ্রিজ, বাচ্চার স্কুল কোনটা হবে) তার মতামতের গুরুত্ব বেশি থাকে। অন্যদিকে যার কোনো আয় নেই, তার বারগেইনিং পাওয়ার বা দর কষাকষির ক্ষমতা শূন্যের কোঠায়। শেলি লান্ডবার্গ (Shelly Lundberg) এবং রবার্ট পোলক (Robert Pollak) দেখিয়েছেন যে, যখন সরকারের দেওয়া চাইল্ড বেনিফিট বা ভাতার টাকা বাবার বদলে মায়ের হাতে দেওয়া হয়, তখন বাচ্চার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় এবং সংসারের খরচের প্যাটার্ন বদলে যায় (Lundberg & Pollak, 1993)। এটি প্রমাণ করে যে, টাকা কার পকেটে ঢুকছে তার ওপর নির্ভর করে পরিবারের কল্যাণ। অর্থাৎ, পরিবার কোনো সাম্যবাদী স্বর্গরাজ্য নয়, এটিও একটি ছোটখাটো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দাবার বোর্ড।
শ্রমের জেন্ডার গ্যাপ ও মাদারহুড পেনাল্টি
অর্থনীতি আমাদের আরেকটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে, যার নাম মাদারহুড পেনাল্টি (Motherhood Penalty) বা মাতৃত্বের জরিমানা। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান হওয়ার পর পুরুষদের আয় অনেক সময় বেড়ে যায় (যাকে বলা হয় ফাদারহুড বোনাস), কারণ সমাজ মনে করে তারা এখন আরও দায়িত্বশীল। কিন্তু সন্তান হওয়ার পর নারীদের আয় এবং ক্যারিয়ারের গ্রাফ নিচের দিকে নামতে থাকে। সন্তান লালন-পালনের জন্য নারীদের ক্যারিয়ারে বিরতি নিতে হয় বা কম সময়ের চাকরি (পার্ট-টাইম) নিতে হয়। এই বিরতির কারণে তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি ছোট হয়ে যায় এবং তারা প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন (Claudia Goldin) (যিনি ২০২৩ সালে নোবেল পেয়েছেন) দেখিয়েছেন যে, নারী ও পুরুষের আয়ের বৈষম্য বা জেন্ডার ওয়েজ গ্যাপ (Gender Wage Gap)-এর একটি বড় কারণ হলো এই ‘গ্রিডি ওয়ার্ক’ (Greedy Work) বা লোভী কাজ – যে কাজগুলো কর্মীদের কাছ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় দাবি করে। যেহেতু নারীদের ওপর সংসারের দায়িত্ব বা ‘কেয়ার ওয়ার্ক’ থাকে, তাই তারা এই লোভী কাজগুলো করতে পারে না এবং পিছিয়ে পড়ে (Goldin, 2014)। পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য নারীরা যে অর্থনৈতিক বলিদান বা স্যাক্রিফাইস দেয়, তা অর্থনীতির এক বড় আলোচনার বিষয়।
ইন্টারজেনারেশনাল ওয়েলথ ট্রান্সফার: অসমতার বংশপরম্পরা
পরিবার কেবল ভালোবাসা হস্তান্তর করে না, পরিবার সম্পত্তিও হস্তান্তর করে। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন ইন্টারজেনারেশনাল ওয়েলথ ট্রান্সফার (Intergenerational Wealth Transfer)। টমাস পিকেটি (Thomas Piketty) তার বিখ্যাত বই Capital in the Twenty-First Century-তে দেখিয়েছেন যে, বর্তমানে নিজের আয়ের চেয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বা ‘ইনহেরিটেন্স’ (Inheritance) ধনী হওয়ার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে (Piketty, 2014)। পরিবার হলো সেই মাধ্যম যা দিয়ে এই সম্পত্তি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে যায়। এর ফলে সমাজে ধনী আরও ধনী হয় এবং গরিব আরও গরিব হয়। একজন ধনী পরিবারের সন্তান যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (সেফটি নেট) এবং স্টার্ট-আপ ক্যাপিটাল পায়, তা একজন গরিব মেধাবী সন্তানের নেই। অর্থাৎ, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি অর্থনীতির বৃহত্তর অসমতাকে বা ইনইকুয়ালিটি (Inequality)-কে জিইয়ে রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এস্টেট ট্যাক্স বা উত্তরাধিকার কর নিয়ে যে বিতর্ক, তা আসলে পরিবারের এই অর্থনৈতিক ভূমিকার সাথেই জড়িত।
ম্যারেজ মার্কেট: বিয়ের বাজার
সবশেষে, অর্থনীতিবিদরা বিয়ের জগতটাকে দেখেন একটি বাজার বা ম্যারেজ মার্কেট (Marriage Market) হিসেবে। এখানে নারী এবং পুরুষ হলো ক্রেতা এবং বিক্রেতা। তারা একে অপরের গুণাবলী (সৌন্দর্য, শিক্ষা, আয়, বয়স) যাচাই-বাছাই করে ‘ম্যাচ’ করার চেষ্টা করে। এই বাজারেও ‘সাপ্লাই’ (যোগান) এবং ‘ডিমান্ড’ (চাহিদা)-এর সূত্র খাটে। যেমন, কোনো সমাজে যদি নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে কম হয় (সেক্স রেশিও ইমব্যালেন্স), তবে নারীদের বারগেইনিং পাওয়ার বেড়ে যায়। আবার যেখানে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা শিক্ষিত পুরুষের চেয়ে বেশি, সেখানে নারীদের জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় ম্যারেজ স্কুইজ (Marriage Squeeze)। আধুনিক ডেটিং অ্যাপগুলো এই ম্যারেজ মার্কেটকে আরও দক্ষ বা ‘এফিশিয়েন্ট’ করেছে, যেখানে অ্যালগরিদম ঠিক করে দিচ্ছে কার সাথে কার ‘ইউটিলিটি’ মিলবে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, আমরা যাকে ‘সোলমেট’ খোঁজা বলি, তা আসলে ‘সার্চ কস্ট’ (খোঁজার খরচ) কমিয়ে সেরা ‘ম্যাচ’টি খুঁজে বের করার অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
অর্থনীতির এই বিশ্লেষণগুলো আমাদের অনেক সময় অস্বস্তিতে ফেলে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই না যে আমাদের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন সিদ্ধান্তগুলো আসলে টাকার অঙ্কে মাপা যায়। কিন্তু সত্য হলো, অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল ভালোবাসা যথেষ্ট নয়, দরকার শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি। লাভ-ক্ষতির এই নির্মম হিসাবগুলো না বুঝলে আমরা পরিবারের আসল সংকট – যেমন দারিদ্র্য, ডিভোর্স, বা লিঙ্গ বৈষম্য – কখনোই সমাধান করতে পারব না। অর্থনীতি আমাদের শেখায়, পরিবার প্রেমের কবিতা হতে পারে, কিন্তু সেই কবিতার ছন্দ ও তাল ঠিক করে দেয় পকেটের টাকা।
ডেমোগ্রাফি বা জনমিতি: সংখ্যার গল্প
ডেমোগ্রাফার বা জনমিতিবিদরা যখন পরিবারের দিকে তাকান, তখন তারা কোনো একক স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বা মা-ছেলের মান-অভিমানের দিকে নজর দেন না। তারা অনেকটা পাখির চোখে (Bird’s Eye View) পুরো সমাজটাকে দেখেন। তারা দেখেন লাখ লাখ মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে আর ডিভোর্সের বিশাল সব ডেটা বা উপাত্ত। ডেমোগ্রাফারদের (Demographers) কাছে পরিবার হলো সংখ্যার খেলা, গ্রাফের ওঠানামা এবং পরিসংখ্যানের এক জটিল ধাঁধা। তারা পরিবারের ভেতরের গল্পে যান না, তারা দেখেন ট্রেন্ড (Trend) বা ঝোঁক। তাদের কাজ হলো সমাজের নাড়ি (Pulse) চেক করা। সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে? মানুষ কি এখন বেশি বিয়ে করছে নাকি কম? বাচ্চারা কি তাড়াতাড়ি হচ্ছে নাকি দেরিতে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য তারা ব্যবহার করেন আদমশুমারি বা সার্ভের মতো বিশাল সব হাতিয়ার। ডেমোগ্রাফি আমাদের শেখায় যে, ব্যক্তিগতভাবে আমরা যা-ই করি না কেন, সমষ্টিগতভাবে আমরা একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ছক মেনে চলি। এবং সেই ছকের পরিবর্তনগুলোই বলে দেয় আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন হবে। এখন আমরা দেখব, কীভাবে সংখ্যার লেন্স দিয়ে আধুনিক পরিবারের আমূল পরিবর্তন বা বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা হয়।
সেকেন্ড ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন: এক নীরব বিপ্লব
ডেমোগ্রাফির জগতে গত একশ বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন (Demographic Transition) বা জনমিতিক পরিবর্তন। প্রথম ধাপে মানুষ বেশি বাচ্চা নিত কারণ তখন মৃত্যুহার বেশি ছিল। এরপর যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতিতে মৃত্যুহার কমল, তখন মানুষ জন্মহারও কমিয়ে দিল। কিন্তু ১৯৮০-র দশকে ইউরোপের ডেমোগ্রাফাররা লক্ষ্য করলেন, জন্মহার কমার পরেও পরিবর্তন থামেনি। বরং এক নতুন ধরণের পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বেলজিয়ান ডেমোগ্রাফার রন লেসথায়েগ (Ron Lesthaeghe) এবং ডার্ক ভ্যান ডি কা (Dirk van de Kaa) একে নাম দিলেন সেকেন্ড ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন (Second Demographic Transition) বা এসডিটি (SDT)। তারা বললেন, প্রথম ট্রানজিশন ছিল মূলত শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা এবং পরিবারের আকার ছোট করার জন্য। কিন্তু এই দ্বিতীয় ট্রানজিশনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি ঘটছে মানুষের মূল্যবোধ বা ভ্যালু চেঞ্জ (Value Change)-এর কারণে। মানুষ এখন ‘বেঁচে থাকার’ চেয়ে ‘ভালো থাকা’ বা সেলফ-অ্যাকচুয়ালাইজেশন (Self-Actualization)-কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে তারা প্রথাগত বিয়ের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, দেরিতে বিয়ে করছে, বিয়ে না করে লিভ-ইন বা কোহাবিটেশন (Cohabitation) করছে, এবং সন্তান নেওয়াকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করছে না (Lesthaeghe, 2010)।
লেসথায়েগ দেখালেন, এই পরিবর্তনের মূলে আছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা ইন্ডিভিজুয়ালিজম (Individualism)-এর উত্থান। আগে মানুষ বিয়ে করত সমাজের বা ধর্মের চাপে। এখন মানুষ বিয়ে করে যদি সেটা তার ব্যক্তিগত জীবনে সুখ আনে। এই মানসিকতার পরিবর্তনের কারণে ডিভোর্স রেট বেড়েছে এবং বিয়ের হার কমেছে। মানুষ এখন ‘কিং সাইজ’ জীবন চায়, ‘চাইল্ড সাইজ’ দায়িত্ব নয়। এই এসডিটি বা সেকেন্ড ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন এখন কেবল ইউরোপ বা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। জাপানের মতো দেশে তো এখন তরুণরা প্রেম বা যৌনতাতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, যাকে বলা হচ্ছে হার্বিভোর মেন (Herbivore Men) বা তৃণভোজী পুরুষ। ডেমোগ্রাফি আমাদের সতর্ক করছে যে, এই ট্রেন্ড চলতে থাকলে মানব সমাজের মূল কাঠামোই ভবিষ্যতে ধসে পড়তে পারে।
ফার্টিলিটি রেট: শূন্যের দিকে যাত্রা?
পরিবার নিয়ে ডেমোগ্রাফারদের সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো ফার্টিলিটি রেট (Fertility Rate) বা প্রজনন হার। একটি জনসংখ্যাকে স্থির রাখতে হলে প্রতি দম্পতিকে গড়ে অন্তত ২.১ টি সন্তান নিতে হয়, একে বলা হয় রিপ্লেসমেন্ট লেভেল (Replacement Level)। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে (এবং বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশেও) ফার্টিলিটি রেট এই ২.১-এর নিচে নেমে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি ০.৭-এর কাছাকাছি চলে এসেছে, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। কেন মানুষ সন্তান নিচ্ছে না? ডেমোগ্রাফাররা একে ব্যাখ্যা করছেন অপরচুনিটি কস্ট (Opportunity Cost) এবং চাইল্ড কোয়ালিটি-কোয়ান্টিটি ট্রেড-অফ (Child Quality-Quantity Trade-off) দিয়ে। নারীরা এখন উচ্চশিক্ষিত এবং ক্যারিয়ার সচেতন। সন্তান নেওয়া মানে তাদের ক্যারিয়ারে বড় বিরতি বা ক্ষতি। তাছাড়া সন্তান লালন-পালনের খরচ এখন আকাশছোঁয়া।
আমেরিকান ডেমোগ্রাফার স্যামুয়েল প্রেস্টন (Samuel Preston) দেখিয়েছেন যে, আধুনিক সমাজে সন্তান না নেওয়া বা চাইল্ডলেসনেস (Childlessness) এখন আর কোনো অভিশাপ নয়, এটি একটি স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বা ‘চয়েস’। একে বলা হয় ভলানটারি চাইল্ডলেসনেস (Voluntary Childlessness) বা চাইল্ডফ্রি (Childfree) জীবনযাপন। এর ফলে পরিবারের সংজ্ঞা পাল্টাচ্ছে। আগে পরিবার মানেই ছিল ‘বাবা-মা-সন্তান’। এখন ‘স্বামী-স্ত্রী’ (DINK – Double Income, No Kids) মিলেও একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবার। ফার্টিলিটি কমে যাওয়ার এই ট্রেন্ড যদি চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন পৃথিবীতে তরুণের চেয়ে বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি হবে, যা অর্থনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একে বলা হচ্ছে ডেমোগ্রাফিক উইন্টার (Demographic Winter) বা জনমিতিক শীতকাল।
কোহাবিটেশন: বিয়ের বিকল্প নাকি বিয়ের প্রস্তুতি?
ডেমোগ্রাফারদের ডেটায় আরেকটি বিশাল পরিবর্তন চোখে পড়ছে, তা হলো কোহাবিটেশন (Cohabitation) বা বিয়ে না করে একত্রে বসবাস। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে (যেমন সুইডেন, নরওয়ে) এখন প্রায় অর্ধেক শিশু জন্মায় অবিবাহিত বাবা-মায়ের ঘরে। সেখানে বিয়ে এবং কোহাবিটেশনের মধ্যে আইনি বা সামাজিকভাবে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু আমেরিকা বা এশিয়ার দেশগুলোতে কোহাবিটেশন এখনো বিতর্কের বিষয়। ডেমোগ্রাফাররা কোহাবিটেশনকে দুটি ভিন্ন লেন্স দিয়ে দেখেন। কেউ কেউ বলেন, এটি হলো ট্রায়াল ম্যারেজ (Trial Marriage) বা বিয়ের মহড়া। মানুষ এখন ডিভোর্সকে ভয় পায়, তাই বিয়ের মতো বড় কমিটমেন্টে যাওয়ার আগে তারা একসাথে থেকে দেখে নিতে চায় বনিবনা হয় কি না। একে বলা হয় টেস্টিং দ্য ওয়াটারস (Testing the Waters)।
আবার কেউ কেউ, যেমন সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু চেরলিন (Andrew Cherlin) বলেন, কোহাবিটেশন এখন নিজেই একটি স্বতন্ত্র পারিবারিক ব্যবস্থা হয়ে উঠছে। গরিব বা নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে যারা বিয়ের খরচ বা ডিভোর্সের আইনি ঝামেলা পোহাতে চায় না, তাদের জন্য এটি একটি সহজ বিকল্প। চেরলিন একে বলেছেন দ্য ডি-ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অফ ম্যারেজ (The Deinstitutionalization of Marriage)। অর্থাৎ, বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি তার আগের কঠোর নিয়মকানুন বা সামাজিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। মানুষ এখন নিজের মতো করে সম্পর্কের নিয়ম তৈরি করছে। এর ফলে সমাজে ফ্যামিলি ফ্লুইডিটি (Family Fluidity) বা পারিবারিক অস্থিরতা বাড়ছে। বাচ্চারা দেখছে তাদের বাবা-মা আলাদা হচ্ছে, আবার নতুন সঙ্গীর সাথে থাকছে – এই ঘন ঘন পরিবর্তন বা ফ্যামিলি ইনস্ট্যাবিলিটি (Family Instability) শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে ডেমোগ্রাফাররা প্রচুর গবেষণা করছেন (Cherlin, 2004)।
ডিভোর্স বিপ্লব এবং গ্রে ডিভোর্স
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ডিভোর্স ছিল একটি বিরল এবং কলঙ্কজনক ঘটনা। কিন্তু ১৯৬০-এর দশক থেকে পশ্চিমা বিশ্বে ডিভোর্স রেট রকেটের গতিতে বাড়তে শুরু করে। একে বলা হয় ডিভোর্স রেভোলিউশন (Divorce Revolution)। এর পেছনে বড় কারণ ছিল আইনের পরিবর্তন, বিশেষ করে ‘নো-ফল্ট ডিভোর্স’ (No-fault divorce) আইন চালু হওয়া, যার ফলে ডিভোর্স পেতে আর কারো দোষ প্রমাণ করার দরকার হতো না। ডেমোগ্রাফাররা দেখালেন, ডিভোর্স বাড়ার সাথে সাথে সমাজে সিঙ্গেল প্যারেন্ট ফ্যামিলি (Single-parent Family) বা একক অভিভাবকের পরিবারের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। বর্তমানে আমেরিকায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু শুধু মায়ের কাছে বড় হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন এবং অদ্ভুত ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় গ্রে ডিভোর্স (Gray Divorce)। ডেমোগ্রাফাররা দেখছেন, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের দম্পতিদের মধ্যে ডিভোর্সের হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে মনে করা হতো, যারা ২৫-৩০ বছর সংসার করেছে, তারা আর আলাদা হবে না। কিন্তু এখন মানুষ দীর্ঘজীবী হচ্ছে। ৬০ বছর বয়সে এসেও মানুষ ভাবছে, “আমার হাতে আরও ২০-৩০ বছর সময় আছে, আমি কেন এই অসুখী বিয়েতে পচে মরব?” এই ‘গ্রে ডিভোর্স’ বা ধূসর বিচ্ছেদ পরিবারের কাঠামোকে নতুন করে নাড়া দিচ্ছে। বৃদ্ধ বয়সে একা হয়ে যাওয়া নারী বা পুরুষের জন্য নতুন করে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে (Brown & Lin, 2012)।
বার্ধক্যের ঢেউ: কেয়ার ক্রাইসিস
জনসংখ্যার বয়সের কাঠামো বা এজ স্ট্রাকচার (Age Structure) পরিবর্তন পরিবারের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। মানুষ এখন অনেক বেশি দিন বাঁচছে। একে বলা হয় লঞ্জিভিটি রেভোলিউশন (Longevity Revolution)। এর ফলে পরিবারে ‘চার জেনারেশন’ বা এমনকি ‘পাঁচ জেনারেশন’ একসাথে বেঁচে থাকছে, যাকে ডেমোগ্রাফাররা বলছেন বিনপোল ফ্যামিলি (Beanpole Family)। এই পরিবারগুলো শিমের লতার মতো লম্বা কিন্তু সরু (কারণ ভাই-বোন বা কাজিন কম, কিন্তু গ্র্যান্ডমা-গ্র্যান্ডপা বেশি)। এই দীর্ঘায়ু পাওয়ার একটা বড় মূল্য দিতে হচ্ছে পরিবারকে। বয়স্ক বাবা-মায়ের সেবা যত্ন বা এল্ডার কেয়ার (Elder Care) এখন এক বড় সমস্যা। আগে পরিবারে অনেক সন্তান থাকত, তারা ভাগ করে বাবা-মায়ের যত্ন নিত। এখন সন্তান হয়তো একজন বা দুজন, এবং তারাও চাকরির জন্য দূরে থাকে। ফলে তৈরি হচ্ছে কেয়ার ডেফিসিট (Care Deficit) বা যত্নের ঘাটতি।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে মধ্যবয়সী নারীরা। তারা একদিকে নিজের ছোট বাচ্চাদের দেখছে, আবার অন্যদিকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা করছে। ডেমোগ্রাফাররা এই প্রজন্মকে নাম দিয়েছেন স্যান্ডউইচ জেনারেশন (Sandwich Generation)। দুই দিকের চাপে তারা স্যান্ডউইচের মতো পিষ্ট হচ্ছে। চীনের মতো দেশে যেখানে ‘এক সন্তান নীতি’ (One Child Policy) ছিল, সেখানে সমস্যাটি আরও ভয়াবহ। একে বলা হয় ৪-২-১ প্রবলেম (4-2-1 Problem) যেখানে একজন সন্তানকে ভবিষ্যতে তার দুই বাবা-মা এবং চারজন গ্র্যান্ডপা-গ্র্যান্ডমার দায়িত্ব নিতে হবে। এটি গাণিতিকভাবে অসম্ভব। ডেমোগ্রাফাররা সতর্ক করছেন যে, রাষ্ট্র যদি এগিয়ে না আসে, তবে পরিবার নামক এই ‘সেফটি নেট’ বা সুরক্ষা বলয়টি বয়স্কদের ভারে ভেঙে পড়তে পারে।
মাইগ্রেশন এবং ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যামিলি
ডেমোগ্রাফির আরেকটি বড় বিষয় হলো মাইগ্রেশন (Migration) বা অভিবাসন। কাজের খোঁজে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ধরণের পরিবার, যাকে বলা হয় ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যামিলি (Transnational Family)। বাবা হয়তো সৌদি আরবে, মা বাংলাদেশে, আর সন্তানরা গ্রামের বাড়িতে গ্র্যান্ডমার কাছে। তারা শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমে মানসিকভাবে যুক্ত। ডেমোগ্রাফাররা দেখছেন, রেমিটেন্সের টাকা পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ বা ফ্যামিলি সেপারেশন (Family Separation) সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, দীর্ঘদিন পর বাবা যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন সন্তানরা তাকে আর চিনতে পারে না বা সহজভাবে নিতে পারে না। একে বলা হয় সোশ্যাল কস্ট অফ মাইগ্রেশন (Social Cost of Migration)।
আবার উন্নত দেশগুলোতে অভিবাসীদের আগমনের ফলে সেখানকার জনমিতিক চিত্র বদলে যাচ্ছে। যেমন, ইউরোপের অনেক দেশে স্থানীয়দের জন্মহার কম হলেও, অভিবাসী মুসলিম বা এশিয়ান পরিবারগুলোর জন্মহার বেশি। এর ফলে ভবিষ্যতে ওইসব দেশের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে বলে অনেক ডেমোগ্রাফার ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। একে বলা হয় রিপ্লেসমেন্ট মাইগ্রেশন (Replacement Migration)। এই অভিবাসন প্রক্রিয়া পরিবারের সংজ্ঞা এবং জাতীয় পরিচয় – দুটোকেই নতুন করে চ্যালেঞ্জ করছে।
বিয়ের বাজার ও ম্যারেজ স্কুইজ
ডেমোগ্রাফাররা বিয়ের জগতটাকে দেখেন নারী ও পুরুষের সংখ্যার অনুপাত হিসেবে, যাকে বলা হয় সেক্স রেশিও (Sex Ratio)। চীন বা ভারতের মতো দেশে যেখানে পুত্র সন্তানের আশায় কন্যা ভ্রুণ হত্যা বা ফিমেল ফিটিসাইড (Female Foeticide) হয়েছে, সেখানে এখন বিয়ের বয়সে এসে দেখা যাচ্ছে মেয়েদের দারুণ সংকট। লক্ষ লক্ষ যুবক বিয়ের জন্য পাত্রী পাচ্ছে না। এদের বলা হচ্ছে বেয়ার ব্রাঞ্চেস (Bare Branches) বা ফলহীন ডালপালা। এই ম্যারেজ স্কুইজ (Marriage Squeeze) বা বিয়ের চাপ সমাজে এক অস্থিরতা তৈরি করছে। পাত্রী জোগাড়ের জন্য মানব পাচার বা ব্রাইড ট্রাফিকিং (Bride Trafficking) বাড়ছে। আবার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে অনেক উন্নত দেশে বা শিক্ষিত সমাজে, যেখানে উচ্চশিক্ষিত নারীরা তাদের সমকক্ষ পাত্র পাচ্ছে না, কারণ পুরুষরা তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষিত হয়ে পড়ছে। এই ‘মিসম্যাচ’ বা অমিলের কারণেও অনেকে অবিবাহিত থেকে যাচ্ছে। ডেমোগ্রাফি আমাদের দেখায় যে, লিঙ্গ অনুপাতের সামান্য একটু হেরফের কীভাবে লক্ষ লক্ষ পরিবারের স্বপ্নকে চুরমার করে দিতে পারে।
ডেমোগ্রাফির এই সংখ্যার গল্পগুলো আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, পরিবার কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এটি জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সমাজের বিশাল এক সমুদ্রের ওপর ভাসমান। আমরা চাই বা না চাই, ফার্টিলিটি রেট, মৃত্যুহার বা মাইগ্রেশনের মতো বড় বড় স্রোতগুলো আমাদের ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সংখ্যার পেছনের এই সত্যগুলোই আমাদের বলে দেয়, আগামী দিনের পরিবার কেমন হবে এবং আমরা তার জন্য কতটা প্রস্তুত।
যোগাযোগ বিদ্যা: নীরবতা ও কোলাহল
পরিবারকে যদি একটি শরীরের সাথে তুলনা করা হয়, তবে ‘যোগাযোগ’ বা কমিউনিকেশন হলো সেই শরীরের রক্তপ্রবাহ। রক্ত চলাচল বন্ধ হলে যেমন শরীর মরে যায়, তেমনি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কথাবার্তা বা ভাবের আদান-প্রদান বন্ধ হলে সম্পর্ক মরে যায়। আমরা প্রায়ই ভাবি, কথা বলাই তো যোগাযোগ। কিন্তু যোগাযোগ বিদ্যার গবেষকরা (Communication Scholars) বলেন, কথা বলাটা যোগাযোগের মাত্র একটা ছোট অংশ। আসল যোগাযোগ লুকিয়ে থাকে কথার সুরে (Tone), চোখের ভাষায়, শরীরের ভঙ্গিতে, এমনকি নীরবতায়। পরিবারের চার দেয়ালের ভেতর প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য বেতার তরঙ্গের খেলা চলে। কে কাকে ধমক দিল, কে কার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিল, কে অভিমান করে চুপ করে রইল – এগুলোর ওপর নির্ভর করে পরিবারের শান্তি বা অশান্তি। যোগাযোগ বিদ্যা আমাদের শেখায় যে, একটি সুখী পরিবারের মূল চাবিকাঠি কোনো দামী আসবাবপত্র নয়, বরং তাদের ‘কমিউনিকেশন প্যাটার্ন’ বা কথা বলার ধরণ। এখন আমরা দেখব, কীভাবে সামান্য একটি ভুল শব্দ বা ভুল বোঝাবুঝি তিলে তিলে গড়া একটি সংসারকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিতে পারে।
জেন্ডারলেক্ট: নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভাষা
পরিবারে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয় স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে। কেন? কারণ তারা যেন দুটি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা, যারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। বিখ্যাত ভাষাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডেবোরা ট্যানেন (Deborah Tannen) তার বেস্ট সেলার বই You Just Don’t Understand-এ এই সমস্যার মূলে আঘাত করেছেন। তিনি বললেন, নারী ও পুরুষের কথা বলার ধরণ বা ‘ডায়ালেক্ট’ এতটাই আলাদা যে একে বলা যায় জেন্ডারলেক্ট (Genderlect)। ট্যানেন দেখালেন, পুরুষরা কথা বলে মূলত তথ্য আদান-প্রদান বা সমস্যার সমাধান করার জন্য, একে তিনি বললেন রিপোর্ট টক (Report Talk)। আর নারীরা কথা বলে সম্পর্ক তৈরি বা সংযোগ স্থাপনের জন্য, একে তিনি বললেন র্যাপোর্ট টক (Rapport Talk) (Tannen, 1990)।
একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করুন। স্ত্রী অফিস থেকে ফিরে স্বামীকে বললেন, “আজ বস আমাকে সবার সামনে বকা দিয়েছে, আমার খুব খারাপ লাগছে।” স্ত্রী এখানে চাইছেন স্বামী তার কথায় সায় দিক, বলুক “ইশ! তাই তো, খুব খারাপ হয়েছে।” অর্থাৎ স্ত্রী চাইছেন ইমোশনাল সাপোর্ট (Emotional Support) বা সহমর্মিতা। কিন্তু স্বামী শোনামাত্রই সমাধান দিতে শুরু করলেন, “তুমি এক কাজ করো, কাল গিয়ে বসের সাথে কথা বলো বা চাকরিটা ছেড়ে দাও।” স্ত্রী তখন রেগে গিয়ে বলেন, “তুমি আমার কথা শুনছই না!” আর স্বামী অবাক হয়ে ভাবেন, “আমি তো সমাধানই দিলাম, সমস্যা কী?” ট্যানেন বলেন, এখানে কেউ ভুল নয়। স্বামী ভাবছেন তিনি স্ত্রীকে সাহায্য করছেন (ইনস্ট্রুমেন্টাল বা যান্ত্রিক সাহায্য), আর স্ত্রী ভাবছেন স্বামী তাকে বুঝতে পারছেন না (আবেগীয় সাহায্য)। এই ‘ক্রস-কালচারাল’ যোগাযোগের অভাবই আধুনিক দাম্পত্য কলহের অন্যতম প্রধান কারণ। ট্যানেন পরামর্শ দেন, সুখী সংসারের জন্য আমাদের এই দুই ধরণের ভাষাই বা ‘কোড’ বুঝতে শিখতে হবে।
ফ্যামিলি কমিউনিকেশন প্যাটার্নস থিওরি: খোলামেলা নাকি চাপা?
সব পরিবারের কথা বলার ধরণ এক নয়। কোনো পরিবারে বাচ্চারা বাবার মুখের ওপর তর্ক করতে পারে, আবার কোনো পরিবারে বাবার সামনে কেউ টু শব্দটিও করে না। যোগাযোগ বিজ্ঞানী জ্যাক ম্যাকলিওড (Jack McLeod) এবং স্টিভেন চ্যাফি (Steven Chaffee) এই ভিন্নতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য দিলেন ফ্যামিলি কমিউনিকেশন প্যাটার্নস থিওরি (Family Communication Patterns Theory) বা এফসিপিটি (FCPT)। তারা পরিবারগুলোকে প্রধানত দুটি মাত্রায় বা ‘ডাইমেনশন’-এ ভাগ করলেন। প্রথমটি হলো কনভারসেশন ওরিয়েন্টেশন (Conversation Orientation)। এই ধরণের পরিবারে সব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। এখানে সবাই সবার মতামত দিতে পারে, কোনো টপিকই নিষিদ্ধ বা ‘ট্যাবু’ নয়। দ্বিতীয়টি হলো কনফর্মিটি ওরিয়েন্টেশন (Conformity Orientation)। এই পরিবারে মিলমিশ বা ঐকমত্যের ওপর জোর দেওয়া হয়। এখানে বড়দের কথার ওপর কথা বলা বেয়াদবি। ভিন্নমত বা বিতর্ককে এখানে পরিবারের জন্য হুমকি মনে করা হয় (McLeod & Chaffee, 1972)।
এই দুটি মাত্রার ওপর ভিত্তি করে চার ধরণের পরিবার পাওয়া যায়।
- ১. কনসেনসুয়াল (Consensual): এখানে কথা বলার সুযোগ আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই মানতে হয়।
- ২. প্লুরালিস্টিক (Pluralistic): এখানে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, সন্তানরা চাইলে বাবা-মায়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারে এবং সেটাকে স্বাগত জানানো হয়।
- ৩. প্রোটেক্টিভ (Protective): এখানে কথা কম, মান্য করা বেশি। “আমি বলেছি তাই করবে” – এটাই নিয়ম।
- ৪. লেসে-ফেয়ার (Laissez-Faire): এখানে কারো সাথে কারো তেমন কোনো যোগাযোগই নেই, সবাই যার যার মতো চলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘প্লুরালিস্টিক’ পরিবারের সন্তানরা সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং দক্ষ যোগাযোগকারী হিসেবে গড়ে ওঠে। আর ‘প্রোটেক্টিভ’ পরিবারের সন্তানরা বাইরের জগতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খায়, কারণ তাদের কখনো কথা বলার প্র্যাকটিস করানো হয়নি।
রিলেশনাল ডায়ালেক্টিকস: কাছে আসার ও দূরে যাওয়ার দ্বন্দ্ব
পরিবারে আমরা সবসময় এক ধরণের টানাপড়েনের মধ্যে থাকি। আমরা চাই প্রিয়জনের খুব কাছে থাকতে, আবার একই সাথে চাই নিজের একটু আলাদা জগত বা স্পেস। যোগাযোগ তাত্ত্বিক লেসলি ব্যাক্সটার (Leslie Baxter) এবং বারবারা মন্টগোমারি (Barbara Montgomery) একে বলেছেন রিলেশনাল ডায়ালেক্টিকস (Relational Dialectics)। তারা বললেন, সম্পর্ক কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি বিপরীতমুখী শক্তির এক চিরস্থায়ী সংগ্রাম। পরিবারে প্রধানত তিনটি দ্বন্দ্ব কাজ করে।
- প্রথমত, অটোনমি বনাম কানেকশন (Autonomy vs. Connection): “আমি তোমার সাথে থাকতে চাই, কিন্তু আবার আমি স্বাধীনও হতে চাই।” স্বামী হয়তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে চান (স্বাধীনতা), কিন্তু স্ত্রী চান তিনি বাসায় সময় দিন (সংযোগ)।
- দ্বিতীয়ত, ওপেননেস বনাম ক্লোজডনেস (Openness vs. Closedness): “আমি তোমাকে সব বলতে চাই, কিন্তু কিছু কথা গোপনও রাখতে চাই।” সব কথা বলে দিলে প্রাইভেসি থাকে না, আবার না বললে দূরত্ব বাড়ে।
- তৃতীয়ত, প্রেডিক্টেবিলিটি বনাম নোবেলটি (Predictability vs. Novelty): আমরা চাই সংসারটা রুটিনমাফিক চলুক (নিরাপত্তা), আবার একই রুটিনে চলতে চলতে একঘেয়েমি বা বোরিং লাগে, তখন নতুন কিছু (রোমাঞ্চ) চাই।
ব্যাক্সটার বলেন, সুখী পরিবারগুলো এই দ্বন্দ্বগুলো মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করে না, বরং এগুলোকে ‘ম্যানেজ’ বা পরিচালনা করতে শেখে। যেমন – সপ্তাহে একদিন ‘ডেট নাইট’ বা বিশেষ আয়োজন করে একঘেয়েমি দূর করা (Baxter & Montgomery, 1996)।
ফোর হর্সমেন অফ দ্য অ্যাপোক্যালিপ্স: বিচ্ছেদের চার অশ্বারোহী
জনপ্রিয় মনোবিজ্ঞানী এবং সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন গটম্যান (John Gottman) তার ‘লাভ ল্যাব’-এ হাজার হাজার দম্পতির ঝগড়া পর্যবেক্ষণ করে এক চমকপ্রদ তথ্য দিলেন। তিনি বললেন, দম্পতিরা কী নিয়ে ঝগড়া করছে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো তারা ‘কীভাবে’ ঝগড়া করছে। তিনি ডিভোর্সের চারটি প্রধান লক্ষণ চিহ্নিত করলেন এবং বাইবেলের রূপক ব্যবহার করে এদের নাম দিলেন দ্য ফোর হর্সমেন অফ দ্য অ্যাপোক্যালিপ্স (The Four Horsemen of the Apocalypse)।
- প্রথম অশ্বারোহী হলো ক্রিটিসিজম (Criticism): সঙ্গীর কাজকে দোষ না দিয়ে তার চরিত্রকে আক্রমণ করা। যেমন – “তুমি ঘর নোংরা করেছ” না বলে বলা “তুমি একটা অলস ও নোংরা লোক।”
- দ্বিতীয়টি হলো কনটেম্পট (Contempt) বা অবজ্ঞা: এটি সবচেয়ে মারাত্মক। সঙ্গীকে ব্যঙ্গ করা, চোখের মণি ঘোরানো (Eye-rolling), বা নিচু করে কথা বলা। গটম্যান বলেন, অবজ্ঞা হলো সম্পর্কের এসিড, এটি ভালোবাসাকে পুড়িয়ে দেয়।
- তৃতীয়টি হলো ডিফেন্সিভনেস (Defensiveness) বা আত্মপক্ষ সমর্থন: নিজের ভুল স্বীকার না করে পাল্টা আক্রমণ করা। “আমি তো এটা করিনি, তুমিই তো সেদিন ওটা করলে!”
- চতুর্থটি হলো স্টোনওয়ালিং (Stonewalling) বা পাথরের দেয়াল তোলা: ঝগড়ার মাঝখানে কোনো কথা না বলে চুপ করে যাওয়া বা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া। পুরুষরা এটি বেশি করে। এতে অপরপক্ষ আরও বেশি রেগে যায় (Gottman, 1994)।
গটম্যান দাবি করেন, এই চারটি লক্ষণ দেখে তিনি ৯৪% নিশ্চয়তার সাথে বলে দিতে পারেন কোন দম্পতির ডিভোর্স হবে।
ডাবল বাইন্ড: পাগল করা যোগাযোগ
পরিবারের যোগাযোগ অনেক সময় এতটাই গোলমেলে হয় যে তা মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিতে পারে। নৃবিজ্ঞানী ও সাইবারনেটিশিয়ান গ্রেগরি বেটসন (Gregory Bateson) সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের পরিবার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন ডাবল বাইন্ড (Double Bind) বা দ্বিমুখী বাঁধন তত্ত্ব। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে একজন মানুষ দুটি পরস্পরবিরোধী বার্তা বা মেসেজ পায়। ধরুন, একজন মা তার ছেলেকে মুখে বলছেন, “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, কাছে এসো।” কিন্তু ছেলেটি যখন কাছে যাচ্ছে, তখন মা শরীর শক্ত করে ফেলছেন বা বিরক্তিকর ভঙ্গি করছেন (নন-ভারবাল মেসেজ)। ছেলেটি তখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে যদি মায়ের কথার ওপর ভিত্তি করে কাছে যায়, তবে মায়ের শরীরী ভাষায় প্রত্যাখ্যাত হয়। আর যদি শরীরী ভাষা বুঝে দূরে থাকে, তবে মা বলেন, “তুমি আমাকে ভালোবাসো না কেন?” অর্থাৎ, ছেলেটি যাই করুক না কেন, সে ভুল প্রমাণিত হবে। বেটসন দাবি করলেন, দীর্ঘ দিন ধরে এমন ডাবল বাইন্ড পরিস্থিতিতে থাকলে শিশুর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং সে সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হতে পারে (Bateson et al., 1956)। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান সিজোফ্রেনিয়ার জন্য জিনকেও দায়ী করে, তবে পারিবারিক যোগাযোগের এই বিষাক্ত ধরণ বা টক্সিক কমিউনিকেশন (Toxic Communication) যে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা প্রমাণিত।
সাইলেন্স বা নীরবতা: শক্তিশালী হাতিয়ার
যোগাযোগ বিদ্যায় নীরবতা বা সাইলেন্স (Silence) নিয়েও বিস্তর গবেষণা আছে। পরিবারে নীরবতা সবসময় শান্তির লক্ষণ নয়, অনেক সময় এটি যুদ্ধের কৌশল। একে বলা হয় সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট (Silent Treatment)। স্বামী বা স্ত্রী যখন রাগের মাথায় কথা বলা বন্ধ করে দেন, তখন সেটি অপরজনের জন্য শারীরিক আঘাতের চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে। মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা গেছে, সামাজিকভাবে বর্জিত বা ইগনোরড হওয়ার কষ্ট মস্তিষ্কের সেই অংশকেই সক্রিয় করে যা শারীরিক ব্যথার সময় সক্রিয় হয়। আবার অনেক সময় পরিবারে কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ থাকে, একে বলা হয় ফ্যামিলি সিক্রেটস (Family Secrets)। যেমন – বাবার মদ্যপানের সমস্যা, বা আংকলের আত্মহত্যার ঘটনা। সবাই জানে, কিন্তু কেউ বলে না। এই ‘চাপা দেওয়া’ সত্যগুলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি এবং দূরত্ব তৈরি করে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সেলফ-ডিসক্লোজার (Self-Disclosure) বা নিজেকে প্রকাশ করা হলো ঘনিষ্ঠতার চাবিকাঠি। যে পরিবারে সিক্রেট কম এবং শেয়ারিং বেশি, সেই পরিবার তত বেশি সুস্থ।
ডিজিটাল যুগের যোগাযোগ: কানেক্টেড কিন্তু একা
আধুনিক যুগে পরিবারের যোগাযোগে নতুন এক দেওয়াল তুলেছে প্রযুক্তি। এমআইটির অধ্যাপক শার্লি টার্কল (Sherry Turkle) তার Alone Together বইতে দেখিয়েছেন যে, আমরা এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে সবার সাথে যুক্ত বা ‘কানেক্টেড’ থাকছি, কিন্তু সত্যিকারের ‘কনভারসেশন’ বা কথোপকথন হারিয়ে ফেলছি। ডিনার টেবিলে বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে – সবাই আছে, কিন্তু সবাই নিজের নিজের স্মার্টফোনে ব্যস্ত। একে বলা হচ্ছে ফাবিং (Phubbing) (Phone + Snubbing) – ফোনের দিকে তাকিয়ে সামনের মানুষটাকে উপেক্ষা করা। টার্কল বলেন, আমরা টেক্সট মেসেজে ইমোজি দিয়ে ভাব প্রকাশ করছি, কিন্তু তাতে গলার স্বর বা চোখের ভাষা নেই। এর ফলে আমাদের এমপ্যাথি (Empathy) বা সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। বাচ্চারা এখন ঝগড়া মিটমাট করতে বা ক্ষমা চাইতে শিখছে না, কারণ তারা অপ্রিয় পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য স্ক্রিনের আড়ালে লুকাচ্ছে (Turkle, 2011)। ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ‘ফেস-টু-ফেস’ সময় কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে। একে বলা হচ্ছে দ্য প্রেজেন্ট অ্যাবসেন্স (The Present Absence) – শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকা।
ন্যারেটিভ থিওরি: পরিবারের গল্প বলা
সবশেষে, যোগাযোগ বিদ্যার একটি চমৎকার দিক হলো ন্যারেটিভ থিওরি (Narrative Theory) বা গল্প তত্ত্ব। ওয়াল্টার ফিশার (Walter Fisher) বললেন, মানুষ হলো গল্প বলা প্রাণী বা হোমো ন্যারানস (Homo Narrans)। প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব কিছু গল্প থাকে – যেমন বাবা-মায়ের প্রেমের গল্প, বা গ্র্যান্ডপা কীভাবে শূন্য হাতে শহরে এসে বাড়ি করেছিলেন সেই সংগ্রামের গল্প। এই গল্পগুলো বারবার বলার মাধ্যমে পরিবার তার সদস্যদের মধ্যে একটি কালেক্টিভ আইডেন্টিটি (Collective Identity) বা যৌথ পরিচয় তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু তাদের পরিবারের ইতিহাস বা গল্পগুলো জানে, তাদের আত্মবিশ্বাস বা রেজিলিয়েন্স (Resilience) বেশি থাকে। তারা জানে তারা কোথা থেকে এসেছে এবং তাদের শিকড় কতটা শক্ত। ‘ফ্যামিলি স্টোরিটেলিং’ তাই কেবল বিনোদন নয়, এটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখার এক শক্তিশালী সিমেন্ট।
যোগাযোগ বিদ্যার এই আলোচনা আমাদের শেখায় যে, পরিবার কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের কথা এবং কাজের মাধ্যমে পরিবারকে নতুন করে তৈরি করি। ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ ডিসিপ্লিনে যোগাযোগের এই পাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি পরিবার ধ্বংস করার জন্য বড় কোনো ঝড়ের দরকার নেই; দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল সুরের একটি কথাই যথেষ্ট।
নারীবাদ ও জেন্ডার স্টাডিজ: দ্বিতীয় শিফট
পরিবার নিয়ে আমাদের মনে একটা খুব সুন্দর, রঙিন ছবি আঁকা থাকে। আমরা ভাবি পরিবার হলো শান্তির নীড়, ভালোবাসার খনি। কিন্তু নারীবাদী (Feminist) এবং জেন্ডার স্টাডিজ (Gender Studies)-এর গবেষকরা যখন এই রঙিন কাঁচটা সরিয়ে পরিবারের দিকে তাকান, তখন তারা দেখতে পান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। তারা দেখেন, পরিবার হলো ক্ষমতার অসম বণ্টন, শ্রমের শোষণ এবং লিঙ্গ বৈষম্য তৈরির কারখানা। নারীবাদীরা বলেন, পরিবারকে আমরা যতটা ‘প্রাইভেট’ বা ব্যক্তিগত ভাবি, তা আসলে ততটা নয়; বরং পরিবার হলো গভীরভাবে রাজনৈতিক। কারণ এখানেই সমাজ ঠিক করে দেয় কে প্রভু হবে আর কে দাস, কার কাজ হবে টাকা কামানো আর কার কাজ হবে পা টিপে দেওয়া। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে নারীবাদী আন্দোলন পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ভেতরের এই বৈষম্যগুলোকে টেনে বের করে এনেছে। তারা দেখিয়েছেন, সমাজ যাকে ‘ভালোবাসা’ বা ‘কর্তব্য’ বলে চালিয়ে দেয়, তা আসলে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ধরণের অদৃশ্য দাসত্ব। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে নারীবাদ এবং জেন্ডার স্টাডিজ পরিবারের এই অন্ধকার দিকগুলোর ওপর আলো ফেলেছে।
দ্য সেকেন্ড শিফট: কর্মজীবী নারীর দ্বিগুণ বোঝা
নারীবাদী সমাজবিজ্ঞানে সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী ধারণাগুলোর একটি হলো দ্য সেকেন্ড শিফট (The Second Shift)। এই তত্ত্বটির জনক হলেন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী আর্লি রাসেল হোকশিল্ড (Arlie Russell Hochschild)। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত তার বই The Second Shift-এ তিনি আধুনিক কর্মজীবী নারীদের জীবনের এক করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরলেন। হোকশিল্ড দেখালেন, নারীরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, তারা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চাকরি করছেন, টাকা ইনকাম করছেন। সমাজ একে নারীর ক্ষমতায়ন বলে বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু আসল সমস্যা হলো, নারীরা বাইরের জগত বা ‘পেইড ওয়ার্ক’ (Paid Work)-এ প্রবেশ করলেও, পুরুষরা কিন্তু সেভাবে ঘরের জগত বা ‘আনপেইড ওয়ার্ক’ (Unpaid Work)-এ প্রবেশ করেনি। ফলে একজন নারী যখন অফিস শেষ করে (ফার্স্ট শিফট) ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন, তখন তাকে বিশ্রাম নেওয়ার বদলে শুরু করতে হয় সংসারের কাজ – রান্না করা, ঘর মোছা, বাচ্চার হোমওয়ার্ক করানো, বা অসুস্থ শাশুড়ির ওষুধ দেওয়া। এই দ্বিতীয় দফার কাজকে হোকশিল্ড বললেন সেকেন্ড শিফট (Second Shift) (Hochschild & Machung, 1989)।
হোকশিল্ড তার গবেষণায় দেখালেন যে, একজন কর্মজীবী নারী তার স্বামীর চেয়ে বছরে গড়ে প্রায় এক মাস বেশি সময় কাজ করেন (যদি ঘণ্টার হিসাব যোগ করা হয়)। এই অতিরিক্ত কাজের বোঝা নারীর শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। হোকশিল্ড একে বললেন স্টলড রেভোলিউশন (Stalled Revolution) বা থমকে যাওয়া বিপ্লব। কারণ নারীরা বদলেছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্র এবং পরিবারের পুরুষরা সেই অনুপাতে বদলায়নি। পুরুষরা হয়তো মাঝে মাঝে বাজার করে বা বাচ্চাকে পার্কে নিয়ে যায়, কিন্তু দৈনন্দিন একঘেয়ে কাজগুলো – যেমন টয়লেট পরিষ্কার বা কাপড় কাচা – এখনো নারীর ঘাড়েই রয়ে গেছে। হোকশিল্ডের মতে, পরিবার অনেক নারীর জন্য ‘ওয়ার্ম বাথ’ বা আরামের জায়গা নয়, বরং এটি আরেকটি কর্মক্ষেত্র, যেখানে কোনো বেতন নেই, কোনো ছুটি নেই এবং কোনো ধন্যবাদও নেই।
ইমোশনাল লেবার: হাসিমুখের চড়া দাম
আর্লি হোকশিল্ডের আরেকটি যুগান্তকারী অবদান হলো ইমোশনাল লেবার (Emotional Labour) বা আবেগীয় শ্রমের ধারণা। তিনি তার বই The Managed Heart-এ প্রথমে বিমানবালাদের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়েছিলেন, পরে তা পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন। পরিবারে নারীরা কেবল শারীরিক শ্রম দেন না, তারা দেন আবেগীয় শ্রম। যেমন – স্বামীর মেজাজ খারাপ থাকলে তাকে শান্ত করা, বাচ্চার কান্না থামানো, শাশুড়ির মান ভাঙানো, বা পরিবারের সবার জন্মদিন মনে রাখা। এই কাজগুলো করতে গিয়ে নারীকে নিজের প্রকৃত অনুভূতি দমন করতে হয় এবং মুখে কৃত্রিম হাসি বা মমতা ফুটিয়ে তুলতে হয়। হোকশিল্ড বললেন, এই আবেগীয় কাজগুলো অত্যন্ত ক্লান্তিকর এবং এটি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। সমাজ ধরে নেয় নারীরা ‘প্রাকৃতিকভাবেই’ মমতাময়ী, তাই তাদের এই কাজের জন্য কোনো স্বীকৃতির দরকার নেই। কিন্তু নারীবাদীরা বলেন, এটি প্রাকৃতিক নয়, এটি সামাজিকীকরণ। মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় সবার মন জুগিয়ে চলতে, যা তাদের শোষণের পথ প্রশস্ত করে। পরিবারের সুখ ও শান্তি বজায় রাখার সম্পূর্ণ দায়ভার বা ইমোশনাল বার্ডেন (Emotional Burden) একা নারীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা এক ধরণের কাঠামোগত অবিচার।
জুডিথ বাটলার ও পারফর্মিটিভিটি: জেন্ডার যখন অভিনয়
আমরা সাধারণত ভাবি, মানুষ জন্মগতভাবেই পুরুষ বা নারী। কিন্তু বিখ্যাত দার্শনিক ও জেন্ডার তাত্ত্বিক জুডিথ বাটলার (Judith Butler) এই ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করলেন। তার বিখ্যাত বই Gender Trouble-এ তিনি বললেন, জেন্ডার কোনো স্থির সত্তা নয়, জেন্ডার হলো এক ধরণের কাজ বা অভিনয়, যাকে তিনি বললেন পারফর্মিটিভিটি (Performativity)। বাটলারের মতে, পরিবার হলো সেই মঞ্চ যেখানে এই অভিনয়ের মহড়া চলে। একটি শিশু যখন জন্মায়, তখন ডাক্তার ঘোষণা করেন “এটি ছেলে” বা “এটি মেয়ে”। তারপর থেকেই পরিবার সেই শিশুটিকে নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়তে শুরু করে। মেয়ে হলে তাকে দেওয়া হয় পুতুল, শেখানো হয় নরম করে কথা বলতে। ছেলে হলে দেওয়া হয় বন্দুক, শেখানো হয় কান্না না করতে। বোভোয়ার বললেন, আমরা ‘নারী হয়ে’ জন্মাই না, আমরা ‘নারী হয়ে’ উঠি। বাটলাএতাকে পরিবার আমাদের বারবার নির্দিষ্ট কিছু আচরণ করতে বাধ্য করে – যেমন মেয়েদের শাড়ি পরা বা রান্না শেখা – যাতে আমরা সমাজের চোখে ‘স্বাভাবিক’ নারী বা পুরুষ হিসেবে গণ্য হই (Butler, 1990)।
বাটলারের এই তত্ত্ব পরিবারকে দেখার দৃষ্টিই বদলে দিল। এতদিন ভাবা হতো নারী-পুরুষের ভূমিকা প্রাকৃতিক। বাটলার দেখালেন এটি সাংস্কৃতিক এবং পরিবর্তনযোগ্য। তিনি বললেন, পরিবার হলো হেটারোনরমেটিভিটি (Heteronormativity) বা বিষমকামী স্বাভাবিকতার প্রধান উৎপাদক। পরিবার আমাদের শেখায় যে, একজন নারী কেবল একজন পুরুষের সাথেই সংসার করবে এবং মা হবে – এটাই একমাত্র সত্য। কিন্তু বাটলার প্রশ্ন তুললেন, কেন? কেন দুজন নারী বা দুজন পুরুষ বা একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষ পরিবার গঠন করতে পারবে না? আধুনিক কুইয়ার থিওরি (Queer Theory) এবং এলজিবিটি (LGBT) আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি অনেকটাই বাটলারের এই কাজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পরিবার যে কেবল ভালোবাসার জায়গা নয়, বরং এটি যে জেন্ডার পরিচয় নির্মাণের এক কঠোর কারখানা – বাটলার তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
পিতৃতন্ত্র ও প্রাইভেট প্যাট্রিয়ার্কি
র্যাডিক্যাল নারীবাদীরা (Radical Feminists) পরিবারের সমালোচনায় সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। তারা বলেন, পরিবার হলো পিতৃতন্ত্র (Patriarchy)-র প্রধান দুর্গ। সমাজবিজ্ঞানী সিলভিয়া ওয়ালবি (Sylvia Walby) পিতৃতন্ত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন: পাবলিক প্যাট্রিয়ার্কি (Public Patriarchy) (অফিস বা রাষ্ট্র) এবং প্রাইভেট প্যাট্রিয়ার্কি (Private Patriarchy) (ঘর বা পরিবার)। ওয়ালবি বলেন, আগে নারীরা ঘরের ভেতর বাবা বা স্বামীর শাসনে থাকত (প্রাইভেট), এখন তারা বাইরে এসে বসের বা রাষ্ট্রের শাসনে থাকে (পাবলিক)। কিন্তু পরিবারের ভেতরে নারীর শোষণ আজও থামেনি। পরিবারের প্রধান কর্তা হিসেবে পুরুষকে মেনে নেওয়া, সম্পত্তির মালিকানা পুরুষের হাতে থাকা, এবং নারীর যৌনতা ও প্রজনন ক্ষমতার ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ – এগুলো সবই পিতৃতন্ত্রের কৌশল। নারীবাদীরা বলেন, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি পিতৃতন্ত্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায়। পরিবারকে ‘পবিত্র’ বলে প্রচার করার কারণে এর ভেতরের এই সহিংসতাগুলো আড়ালে থেকে যায়। কেট মিললেট (Kate Millett) তার Sexual Politics বইতে সরাসরি বলেছেন, পরিবার হলো পিতৃতন্ত্রের রাজনৈতিক ইউনিট, যেখানে পুরুষরা নারীদের শাসন করতে শেখে (Millett, 1970)।
মাতৃত্ব বা মাদারহুড: মিথ বনাম বাস্তবতা
নারীবাদী গবেষকরা ‘মাতৃত্ব’ বা মাদারহুড নিয়েও অনেক কাজ করেছেন। সমাজ আমাদের শেখায় যে, মাতৃত্বই নারীর জীবনের পূর্ণতা এবং সব নারীই মা হতে চায়। একে বলা হয় মাদারহুড ম্যান্ডেট (Motherhood Mandate)। কিন্তু নারীবাদী কবি ও প্রাবন্ধিক অ্যাড্রিয়েন রিচ (Adrienne Rich) তার বই Of Woman Born-এ মাতৃত্বকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন: ১. এক্সপেরিয়েন্স (Experience) বা অভিজ্ঞতা হিসেবে মাতৃত্ব (যা আনন্দের হতে পারে), এবং ২. ইনস্টিটিউশন (Institution) বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাতৃত্ব (যা শোষণের)। রিচ বললেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাতৃত্ব নারীর ওপর অসম্ভব সব দাবি চাপিয়ে দেয়। একজন ‘ভালো মা’ হতে হলে তাকে নিজের ক্যারিয়ার, শখ, এমনকি ঘুম বিসর্জন দিতে হবে। সমাজ একজন বাবাকে কখনোই জিজ্ঞেস করে না সে কীভাবে চাকরি এবং সন্তান সামলাচ্ছে, কিন্তু একজন মাকে সবসময় এই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। রিচ বললেন, মাতৃত্বকে মহান বা ‘স্যাক্রেড’ (Sacred) বানিয়ে সমাজ আসলে নারীদের ঘরে বন্দি করে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে (Rich, 1976)। আধুনিক নারীবাদীরা তাই দাবি করছেন, সন্তান পালন কেবল মায়ের কাজ নয়, এটি বাবা এবং সমাজের যৌথ দায়িত্ব বা কালেক্টিভ প্যারেন্টিং (Collective Parenting) হওয়া উচিত।
জেন্ডার সোশ্যালাইজেশন: গোলাপি বনাম নীল
পরিবার কীভাবে লিঙ্গ বৈষম্য তৈরি করে তা বোঝার জন্য সমাজবিজ্ঞানীরা জেন্ডার সোশ্যালাইজেশন (Gender Socialization) বা লিঙ্গভিত্তিক সামাজিকীকরণের দিকে নজর দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞানী অ্যান ওকলি (Ann Oakley) দেখিয়েছেন, পরিবার চারটি উপায়ে শিশুদের জেন্ডার রোল শেখায়। ১. ম্যানিপুলেশন (Manipulation): মা ছেলের সাজপোশাকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু মেয়ের চুল আঁচড়ে দেন বা ফ্রক পরান। ২. ক্যানালাইজেশন (Canalization): খেলনার মাধ্যমে ছেলে ও মেয়েকে ভিন্ন দিকে চালিত করা (পুতুল বনাম গাড়ি)। ৩. ভারবাল অ্যাপেলেশন (Verbal Appellation): ডাকনাম বা বিশেষণে ভিন্নতা (ছেলেকে ‘বাঘের বাচ্চা’ আর মেয়েকে ‘লক্ষ্মী’ বলা)। ৪. ডিফারেন্ট অ্যাক্টিভিটিস (Different Activities): মেয়েকে মায়ের সাথে রান্নাঘরে পাঠানো আর ছেলেকে বাবার সাথে বাজারে পাঠানো। ওকলি বললেন, এই ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমেই পরিবার শিশুদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয় যে নারী ও পুরুষের জগত আলাদা। এর ফলে মেয়েরা বড় হয়ে ‘কেয়ারিং’ বা যত্নশীল পেশায় (নার্স, শিক্ষক) যায় এবং ছেলেরা ‘টেকনিক্যাল’ বা চ্যালেঞ্জিং পেশায় (ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট) যায় (Oakley, 1974)। অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রে নারীর পিছিয়ে পড়ার বীজ বপন করা হয় পরিবারের ড্রয়িংরুমে।
দ্য মেন্টাল লোড: অদৃশ্য চিন্তার বোঝা
আধুনিক যুগে নারীরা হয়তো স্বামীর সাথে ঘরের কাজ ভাগ করে নিচ্ছেন। স্বামী হয়তো থালাবাসন মাজছেন। কিন্তু কার্টুনিস্ট ও নারীবাদী লেখক এমা (Emma) তার The Mental Load কমিক স্ট্রিপের মাধ্যমে একটি নতুন ধারণাকে জনপ্রিয় করেছেন। তিনি বললেন, স্বামীরা কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু তারা অপেক্ষা করছেন স্ত্রীর নির্দেশের জন্য। “কখন কী করতে হবে” – এই পরিকল্পনা বা ম্যানেজমেন্টের পুরো দায়িত্বটা স্ত্রীর মাথাতেই থাকে। যেমন – ফ্রিজে দুধ আছে কি না, বাচ্চার টিকা দেওয়ার ডেট কবে, বা কাল টিফিনে কী দেওয়া হবে – এই সব ছোট ছোট বিষয় মনে রাখার মানসিক চাপ বা মেন্টাল লোড (Mental Load) বা কগনিটিভ লেবার (Cognitive Labor) নারীকেই নিতে হয়। স্বামী কেবল ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ হিসেবে কাজ করেন, ম্যানেজার হিসেবে নয়। এমা বললেন, যতক্ষণ না পুরুষরা এই মানসিক দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন, ততক্ষণ আসল সমতা আসবে না। “আমাকে একটু বললেই তো হতো আমি করে দিতাম” – স্বামীদের এই কথাটিই প্রমাণ করে যে সংসারের মূল দায়িত্ব তারা এখনো নিজেদের মনে করেন না।
ইন্টারসেকশনালিটি: সব নারীর গল্প এক নয়
নারীবাদী আলোচনার শুরুতে শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত নারীদের অভিজ্ঞতাই প্রধান ছিল। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী কিম্বার্লি ক্রেনশ (Kimberlé Crenshaw) নিয়ে এলেন ইন্টারসেকশনালিটি (Intersectionality) বা আন্তঃছেদ তত্ত্ব। তিনি বললেন, সব নারীর বঞ্চনা এক নয়। একজন গরিব কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পারিবারিক অভিজ্ঞতা আর একজন ধনী শ্বেতাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতা আকাশ-পাতাল তফাৎ। একজন গরিব নারীকে হয়তো তার স্বামীর সাথে মিলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, সেখানে পরিবার তার জন্য শোষণের জায়গা নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ বা সাইট অফ রেজিস্ট্যান্স (Site of Resistance)। বেল হুকস (bell hooks) দেখিয়েছেন যে, কৃষ্ণাঙ্গ বা প্রান্তিক নারীদের কাছে পরিবার অনেক সময় একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে তারা সমাজের বর্ণবাদী বা শ্রেণীবৈষম্যমূলক আচরণের হাত থেকে বাঁচে। তাই পরিবারকে কেবল ‘শোষণের যন্ত্র’ বললে ভুল হবে। ইন্টারসেকশনালিটি আমাদের শেখায় যে, জেন্ডারের সাথে যখন ক্লাস (শ্রেণী) এবং রেস (বর্ণ) যুক্ত হয়, তখন পরিবারের সমীকরণ অনেক জটিল হয়ে যায় (Crenshaw, 1989)।
নারীবাদ ও জেন্ডার স্টাডিজের এই বিশাল ক্যানভাস আমাদের দেখায় যে, পরিবার কোনো নিরীহ প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাজনীতির একটি অংশ। ফ্যামিলি স্টাডিজ ডিসিপ্লিনটি যদি নারীবাদী চশমা দিয়ে পরিবারকে না দেখে, তবে তা হবে একচোখা। কারণ, সমাজের অর্ধেক জনসংখ্যা (নারী) পরিবারের ভেতরে কেমন আছে, তার ওপরই নির্ভর করছে পুরো সমাজের স্বাস্থ্য। নারীবাদ আমাদের শিখিয়েছে, “দ্য পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল” (ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক) – এবং পরিবারের চেয়ে ব্যক্তিগত আর কিছুই নেই।
পরিবার ও আইডেন্টিটি: আমি কে?
আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমরা কী দেখি? কেবল কি একটি রক্ত-মাংসের শরীর? না, আমরা দেখি একটি নাম, একটি বংশপরিচয়, আর একরাশ স্মৃতি। “আমি কে?” – এই দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর মানুষ খুঁজে ফেরে সারাজীবন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এই উত্তরটা আসলে আমাদের নিজেদের তৈরি করা নয়, এটি আমাদের পরিবারের দেওয়া উপহার। পরিবার হলো আমাদের পরিচয়ের বা আইডেন্টিটি (Identity)-র প্রথম কারখানা। জন্মের পর আমাদের যে নাম রাখা হয়, যে পদবী বা সারনেম জুড়ে দেওয়া হয়, তা আমাদের অজান্তেই ঠিক করে দেয় সমাজে আমাদের অবস্থান কী হবে। আমরা চৌধুরী না খান, ব্রাহ্মণ না শূদ্র, শিয়া না সুন্নি – এই পরিচয়গুলো আমাদের গায়ে সেঁটে দেয় আমাদের পরিবার। কেবল নাম নয়, আমাদের বিশ্বাস, আমাদের রুচি, এমনকি আমরা কীভাবে হাসি বা কথা বলি – সবকিছুতেই মিশে আছে পরিবারের অদৃশ্য ডিএনএ। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে পরিবার এবং আইডেন্টিটির এই সম্পর্ক নিয়ে গভীর গবেষণা হচ্ছে। গবেষকরা দেখছেন, পরিবার কেবল পরিচয় ‘দেয়’ না, পরিবার পরিচয় ‘তৈরি’ও করে। একে বলা হয় আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন (Identity Construction)। আবার কখনো কখনো পরিবার আমাদের এমন পরিচয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয় যা আমরা চাই না, তখন শুরু হয় আইডেন্টিটি ক্রাইসিস (Identity Crisis) বা পরিচয়ের সংকট। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে পরিবার নামক এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের ‘আমি’ হয়ে ওঠার গল্প লেখে এবং সেই গল্পে আমরা কতটা নায়ক আর কতটা পুতুল।
সিম্বলিক ইন্টারঅ্যাকশনালিজম: আয়নায় নিজেকে দেখা
পরিবার কীভাবে আমাদের পরিচয় তৈরি করে, তা বোঝার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী লেন্স হলো সিম্বলিক ইন্টারঅ্যাকশনালিজম (Symbolic Interactionism) বা প্রতীকী মিথষ্ক্রিয়াবাদ। এই ধারার অন্যতম পুরোধা সমাজবিজ্ঞানী চার্লস হর্টন কুলি (Charles Horton Cooley) একটি চমৎকার ধারণা দিয়েছিলেন, যার নাম লুকিং-গ্লাস সেলফ (Looking-Glass Self) বা আয়না-আত্মা। কুলি বললেন, আমরা নিজেদের সরাসরি দেখতে পাই না। আমরা নিজেদের দেখি অন্যের চোখের আয়নায়। পরিবারের সদস্যরা – মা, বাবা, ভাইবোন – আমাদের সম্পর্কে যা বলে বা আমাদের দিকে যেভাবে তাকায়, আমরা ভাবি আমরা তেমনই। মা যদি ছোটবেলায় বলেন, “তুমি খুব স্মার্ট”, তবে শিশুটি নিজেকে স্মার্ট ভাবতে শুরু করে। আর যদি বলেন, “তুমি একটা গাধা”, তবে সে নিজেকে গাধা হিসেবেই চিনে নেয়। কুলি বললেন, “আমি যা ভাবি আমি তা নই, তুমি যা ভাবো আমি তা নই; আমি তা-ই, যা আমি ভাবি যে তুমি আমাকে ভাবো।” পরিবারের প্রাথমিক আয়নাতেই আমাদের আত্ম-পরিচয়ের প্রথম প্রতিবিম্ব তৈরি হয় (Cooley, 1902)।
এই তত্ত্বকে আরও এগিয়ে নিলেন জর্জ হার্বার্ট মিড (George Herbert Mead)। তিনি বললেন, শিশু যখন বড় হয়, সে তার পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা বা রোল টেকিং (Role Taking)-এর মাধ্যমে নিজেকে চিনতে শেখে। প্রথমে সে বাবা-মায়ের নকল করে (প্লে স্টেজ), তারপর সে সমাজের নিয়ম বোঝে (গেম স্টেজ)। মিড বললেন, পরিবারের সদস্যরা হলো শিশুর জীবনের সিগনিফিক্যান্ট আদার্স (Significant Others) বা গুরুত্বপূর্ণ অন্যজন। এদের মাধ্যমেই শিশু শেখে সে কে। পরিবারের ভেতরে এই মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন যদি ইতিবাচক হয়, তবে শিশুর পরিচয় হয় শক্তিশালী। আর যদি নেতিবাচক হয়, তবে সে হীনম্মন্যতায় ভোগে।
পারিবারিক আখ্যান: গল্পের সুতোয় বোনা পরিচয়
প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব কিছু গল্প থাকে। বাবা কীভাবে শূন্য হাতে শহরে এসেছিলেন, গ্র্যান্ডপা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, বা মা কীভাবে কঠিন অসুখ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। এই গল্পগুলোকে বলা হয় ফ্যামিলি ন্যারেটিভস (Family Narratives) বা পারিবারিক আখ্যান। মনোবিজ্ঞানী রবিন ফাইভুশ (Robyn Fivush) এবং মার্শাল ডিউক (Marshall Duke) দেখিয়েছেন যে, এই গল্পগুলো কেবল বিনোদন নয়, এগুলো শিশুর পরিচয় গঠনের মেরুদণ্ড। তারা গবেষণা করে দেখলেন, যেসব শিশু তাদের পারিবারিক ইতিহাস বা ‘ফ্যামিলি স্টোরি’ জানে, তাদের আত্মবিশ্বাস বা সেলফ-এস্টিম (Self-Esteem) বেশি এবং তারা মানসিকভাবে বেশি শক্ত বা রেজিলিয়েন্স (Resilience) সম্পন্ন হয়। কেন? কারণ এই গল্পগুলো তাদের বলে যে তারা একা নয়, তারা একটি বড় ইতিহাসের অংশ। একে বলা হয় ইন্টারজেনারেশনাল সেলফ (Intergenerational Self)।
ফাইভুশ তিন ধরণের পারিবারিক আখ্যানের কথা বলেছেন। ১. অ্যাসন্ডিং ন্যারেটিভ (Ascending Narrative): “আমাদের পরিবার শুরু করেছিল নিচ থেকে, এখন আমরা ওপরে উঠেছি।” এটি শিশুকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে। ২. ডিসন্ডিং ন্যারেটিভ (Descending Narrative): “আমরা একসময় ধনী ছিলাম, এখন সব হারিয়েছি।” এটি শিশুকে হতাশ করতে পারে। ৩. অসিলেটিং ন্যারেটিভ (Oscillating Narrative): “আমাদের জীবনে চড়াই-উৎরাই ছিল, কিন্তু আমরা টিকে আছি।” এটিই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর আখ্যান, যা শিশুকে শেখায় যে বিপদ আসবেই, কিন্তু পরিবার একসাথে থাকলে তা পার করা সম্ভব (Fivush et al., 2008)। আমরা নিজেদের জীবনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব, তা নির্ভর করে আমাদের পরিবার আমাদের কী গল্প শুনিয়েছে তার ওপর।
বংশ ও লিনিয়েজ: রক্তের অহংকার
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের পরিচয়ের একটি বড় অংশ হলো তার বংশ বা লিনিয়েজ (Lineage)। “তুমি কার ছেলে?” – এই প্রশ্নটি অনেক সমাজে “তুমি কে?” প্রশ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, পরিবার আমাদের দেয় একটি অ্যাসক্রাইবড স্ট্যাটাস (Ascribed Status) বা অর্পিত মর্যাদা। আমি জন্মগতভাবেই সৈয়দ, চৌধুরী বা রাজপরিবারের সদস্য। এই পরিচয়টি অর্জন করতে হয় না, এটি রক্তের সাথে মিশে থাকে। পিয়ের বুরদিউ একে বলেছিলেন সোশ্যাল ক্যাপিটাল (Social Capital)-এর একটি রূপ। একটি নামী বংশের সদস্য হওয়া মানেই সমাজে বাড়তি সুবিধা পাওয়া।
তবে আধুনিক যুগে এই বংশপরিচয় নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দত্তক নেওয়া শিশু বা ডোনার কনসিভড (Donor Conceived) শিশুদের ক্ষেত্রে। তারা যখন জানতে পারে যে তাদের ‘বায়োলজিক্যাল’ বা জৈবিক বাবা-মা আর তাদের ‘সোশ্যাল’ বা সামাজিক বাবা-মা এক নন, তখন তাদের মধ্যে তীব্র জেনেটিক বিউইল্ডারমেন্ট (Genetic Bewilderment) বা জিনগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তারা ভাবে, “আমার আসল পরিচয় কী? আমার রক্তে কার ইতিহাস বইছে?” এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য এখন অনেকেই ডিএনএ টেস্ট করাচ্ছেন। আধুনিক ফ্যামিলি স্টাডিজ তাই এখন বায়োজেনেটিক আইডেন্টিটি (Biogenetic Identity) বনাম সোশ্যাল আইডেন্টিটি (Social Identity)-র দ্বন্দ্ব নিয়ে গভীর গবেষণা করছে।
নামকরণের রাজনীতি: নামের ভেতর পরিচয়
একটি শিশুর জন্মের পর পরিবারের প্রথম কাজ হলো তার একটি নাম রাখা। নাম কি শুধুই ডাকার জন্য? সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, নাম হলো পরিচয়ের প্রথম সাইনবোর্ড। নামের মাধ্যমেই পরিবার ঠিক করে দেয় শিশুটি কোন ধর্মের, কোন লিঙ্গের এবং কোন সংস্কৃতির অংশ হবে। সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান (Erving Goffman)-এর তত্ত্বে দেখা যায়, নাম হলো আমাদের সোশ্যাল ফেস (Social Face) বা সামাজিক মুখোশ। পরিবারের দেওয়া নামটি যদি খুব সুন্দর বা অর্থবহ হয়, তবে শিশুটি গর্ববোধ করে। আর যদি নামটি হাস্যকর বা অদ্ভুত হয়, তবে তা তার জন্য লজ্জার কারণ বা স্টিগমা (Stigma) হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নারীবাদী গবেষকরা নামের রাজনীতি নিয়ে খুব সোচ্চার। বিশেষ করে বিয়ের পর নারীর পদবী পরিবর্তন বা সারনেম চেঞ্জ (Surname Change) নিয়ে। পশ্চিমা বিশ্বে এবং আমাদের দেশেও বিয়ের পর মেয়েদের বাবার পদবী ফেলে স্বামীর পদবী নিতে হয় (যেমন – মিসেস আহমেদ)। নারীবাদীরা বলেন, এটি হলো নারীর নিজস্ব পরিচয় মুছে ফেলার একটি পিতৃতান্ত্রিক কৌশল। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে নারীটি বাবার সম্পত্তি থেকে স্বামীর সম্পত্তিতে পরিণত হলো। একে বলা হয় লস অফ আইডেন্টিটি (Loss of Identity)। আধুনিক নারীরা এখন অনেকেই বিয়ের পর নিজের নাম বদলাতে চান না, বা হাইফেনেটেড নেম (বাবার নাম ও স্বামীর নাম একসাথে) ব্যবহার করেন। এটি প্রমাণ করে যে, পরিবার এবং পরিচয়ের সমীকরণ এখন পাল্টাচ্ছে।
জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়: শেকড়ের টান
পরিবার হলো আমাদের সংস্কৃতির বাহক। আমরা বাঙালি না ইংরেজ, কৃষ্ণাঙ্গ না শ্বেতাঙ্গ – এই জাতিগত পরিচয় বা এথনিক আইডেন্টিটি (Ethnic Identity) আমরা পরিবার থেকেই পাই। অভিবাসী পরিবারগুলোতে বা ইমিগ্র্যান্ট ফ্যামিলি (Immigrant Family)-তে এই বিষয়টি খুব জটিল আকার ধারণ করে। ধরুন, বাংলাদেশি বাবা-মায়ের সন্তান আমেরিকায় বড় হচ্ছে। বাড়িতে সে বাংলা বলে, ভাত খায় (হেরিটেজ কালচার), কিন্তু স্কুলে সে ইংরেজি বলে, বার্গার খায় (হোস্ট কালচার)। এই দুই সংস্কৃতির টানাটানিতে তার মধ্যে তৈরি হয় কালচারাল আইডেন্টিটি কনফ্লিক্ট (Cultural Identity Conflict)। সে ভাবে, “আমি কি আমেরিকান, নাকি বাংলাদেশি?”
গবেষক জন বেরি (John Berry) অভিবাসীদের এই অবস্থার চারটি কৌশলের কথা বলেছেন। ১. অ্যাসিমিলেশন (Assimilation): নিজের সংস্কৃতি ভুলে নতুন সংস্কৃতি গ্রহণ করা। ২. সেপারেশন (Separation): নতুন সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করে কেবল নিজেরটা আঁকড়ে ধরা। ৩. মার্জিনালাইজেশন (Marginalization): দুটোর কোনোটিই না মানা। ৪. ইন্টিগ্রেশন (Integration): দুটো সংস্কৃতিকেই মিলিয়ে নেওয়া। বেরি দেখালেন, যেসব পরিবার ‘ইন্টিগ্রেশন’ বা সমন্বয়ের পথ বেছে নেয়, তাদের সন্তানরাই সবচেয়ে সুখী হয়। তারা নিজেদের বাই-কালচারাল (Bicultural) বা দ্বি-সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গর্ববোধ করে (Berry, 1997)। পরিবার এখানে একটি নিরাপদ আশ্রয় বা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে সন্তান তার শেকড়কে খুঁজে পায়।
ভাই-বোনের ভিন্নতা (Sibling Deidentification)
একই পরিবারে, একই বাবা-মায়ের কাছে বড় হয়েও দুই ভাই বা বোন কি একরকম হয়? না। অনেক সময় দেখা যায়, বড় ভাই খুব শান্ত আর ছোট ভাই খুব দুরন্ত। কেন এমন হয়? মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন সিবলিং ডি-আইডেন্টিফিকেশন (Sibling Deidentification)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভাই-বোনেরা অবচেতনভাবেই একে অপরের চেয়ে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে, যাতে তারা বাবা-মায়ের মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা না করে এবং নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বা ‘নিশ’ (Niche) তৈরি করতে পারে। বড় ভাই যদি পড়াশোনায় ভালো হয়, তবে ছোট ভাই হয়তো খেলাধুলায় ভালো হওয়ার চেষ্টা করে। গবেষক ফ্রান্সেস শু-হাইম (Frances Schachter) এই তত্ত্বটি জনপ্রিয় করেন। তিনি দেখান যে, পরিবারে নিজের আলাদা অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য এই ভিন্নতা তৈরি করা জরুরি (Schachter et al., 1976)। পরিবার যেমন আমাদের মিল বা সাদৃশ্য তৈরি করে, তেমনি আমাদের অমিল বা বৈচিত্র্যও তৈরি করে।
ফ্যামিলি সিক্রেটস ও পরিচয়ের ছায়া
সব পরিবারের আলমারিতেই কিছু কঙ্কাল বা ফ্যামিলি সিক্রেটস (Family Secrets) থাকে। হয়তো কোনো আংকলের মানসিক রোগ ছিল, বা গ্র্যান্ডপা আত্মহত্যা করেছিলেন, বা কেউ দত্তক নেওয়া সন্তান। এই গোপন তথ্যগুলো পরিবারের পরিচয়ের ওপর এক বিশাল ছায়া ফেলে। যখন এই গোপন কথাগুলো ফাঁস হয়, তখন পরিবারের সদস্যদের পরিচয় সংকটে পড়তে হয়। তারা ভাবে, “আমরা যা জানতাম, তা কি সব মিথ্যা?” গবেষক ইভান ইম্পার-ব্ল্যাক (Evan Imber-Black) তার The Secret Life of Families বইতে দেখিয়েছেন যে, গোপনীয়তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাস নষ্ট করে এবং তাদের আত্ম-পরিচয়কে ভঙ্গুর করে দেয়। অন্যদিকে, সত্য প্রকাশ করলে সাময়িক কষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা পরিচয়কে স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী করে (Imber-Black, 1998)।
কুইয়ার আইডেন্টিটি ও পরিবার: কামিং আউট
পরিবার ও পরিচয়ের সবচেয়ে বড় সংঘাত দেখা যায় এলজিবিটি (LGBT) বা কুইয়ার সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে। যখন কোনো সন্তান বুঝতে পারে যে তার যৌন পরিচয় বা সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি (Sexual Identity) পরিবারের প্রত্যাশার (বিষমকামী) সাথে মিলছে না, তখন সে এক গভীর সংকটে পড়ে। পরিবারকে সত্য বলা বা কামিং আউট (Coming Out) তাদের জন্য এক বড় পরীক্ষা। অনেক সময় পরিবার তাদের মেনে নেয় না, ত্যাজ্য করে দেয়। তখন তারা পরিবারের দেওয়া পরিচয় হারিয়ে নতুন পরিচয় খোঁজে। তারা বন্ধু-বান্ধব বা কমিউনিটি নিয়ে গড়ে তোলে ফ্যামিলিজ অফ চয়েস (Families of Choice) বা পছন্দের পরিবার। সমাজবিজ্ঞানী ক্যাথ ওয়েস্টন (Kath Weston) দেখিয়েছেন যে, রক্তের সম্পর্কের বাইরেও ভালোবাসা এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিবার গড়ে উঠতে পারে। এই ‘চোজেন ফ্যামিলি’ তাদের সত্যিকারের ‘আমি’ হয়ে ওঠার স্বীকৃতি দেয় (Weston, 1991)।
পরিবার ও আইডেন্টিটির এই সম্পর্ক বড়ই বিচিত্র। পরিবার আমাদের যেমন পরিচয় দেয়, তেমনি কখনো কখনো আমাদের পরিচয় কেড়েও নেয়। আমরা সারাজীবন পরিবারের দেওয়া লেবেলগুলো (ভালো ছেলে, লক্ষ্মী মেয়ে) বয়ে বেড়াই, আবার কখনো সেগুলো ছিঁড়ে ফেলে নিজের নতুন পরিচয় গড়তে চাই। এই পরিচয়ের রাজনীতি বোঝা খুব জরুরি, কারণ আমরা কে, তা জানার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমরা কাদের সাথে থাকি, তার ওপর।
আইন ও বিচার: রাষ্ট্র যখন অভিভাবক
আমরা সাধারণত ভাবি, আমার বেডরুমে বা ড্রয়িংরুমে যা ঘটছে, তা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি কাকে বিয়ে করব, কার সাথে সংসার করব, বা কখন ডিভোর্স দেব – এখানে বাইরের কারো নাক গলানোর অধিকার নেই। কিন্তু আইনের চশমা পরলে দেখা যায়, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি আসলে চারদেয়ালের ভেতরে বন্দি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। রাষ্ট্র বা স্টেট হলো পরিবারের এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত ক্ষমতাধর অভিভাবক। আপনি যখন বিয়ে করেন, তখন আপনি কেবল একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন না, আপনি রাষ্ট্রের সাথেও একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন। কাকে বিয়ে করা বৈধ, কাকে নয়; ডিভোর্সের পর বাচ্চার দায়িত্ব কে পাবে; স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী কতটুকু সম্পত্তি পাবে – এসব কিছুই ঠিক করে দেয় ফ্যামিলি ল (Family Law) বা পারিবারিক আইন। আইনবিদ্যার দৃষ্টিতে পরিবার কোনো প্রাকৃতিক বা ঐশ্বরিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি হলো একটি আইনি সত্তা বা লিগ্যাল এন্টিটি (Legal Entity)। রাষ্ট্র পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করে, কারণ পরিবার ঠিক থাকলে রাষ্ট্র ঠিক থাকে। আবার উল্টোভাবে, রাষ্ট্র পরিবারকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য – যেমন জনসংখ্যা বাড়ানো বা কমানো, অথবা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখন আমরা দেখব, কীভাবে আইন এবং বিচার ব্যবস্থা পরিবারের ভাগ্যলিপি লিখে দেয়।
মার্থা ফিনম্যান ও বিয়ের বিলুপ্তি
পারিবারিক আইনের জগতে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী তাত্ত্বিকদের একজন হলেন মার্থা ফিনম্যান (Martha Fineman)। তিনি কলম্বিয়া ল স্কুলের অধ্যাপক এবং নারীবাদী আইনজ্ঞ। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তার বই The Neutered Mother, the Sexual Family, and Other Twentieth Century Tragedies-এ তিনি এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, রাষ্ট্রের উচিত ‘বিয়ে’ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে আর কোনো বিশেষ সুবিধা বা আইনি স্বীকৃতি না দেওয়া। সহজ কথায়, তিনি চাইলেন আইনি বিয়ের বিলুপ্তি (Abolition of Legal Marriage)। ফিনম্যানের যুক্তি হলো, রাষ্ট্র কেন বিয়েকে এত গুরুত্ব দেয়? কারণ রাষ্ট্র চায় নারী-পুরুষের একটি যৌন সম্পর্ক (Sexual Family) তৈরি হোক, যা সন্তান উৎপাদন করবে এবং একে অপরের দায়িত্ব নেবে। এর ফলে রাষ্ট্রকে আর শিশু বা বয়স্কদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয় না। একে তিনি বললেন প্রাইভেটাইজেশন অফ ডিপেন্ডেন্সি (Privatization of Dependency)। অর্থাৎ, রাষ্ট্র মানুষের নির্ভরশীলতার দায়ভার সুকৌশলে পরিবারের কাঁধে চাপিয়ে দেয় (Fineman, 1995)।
ফিনম্যান বললেন, বিয়ের ওপর এই অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে সমাজে যারা অবিবাহিত মা, বা যারা বিয়ে না করে অন্যভাবে পরিবার গড়েছে, তারা আইনি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি প্রস্তাব দিলেন, রাষ্ট্রের উচিত ‘যৌন সম্পর্ক’ বা সেক্সুয়াল রিলেশনশিপকে সাপোর্ট না দিয়ে কেয়ারগিভিং রিলেশনশিপ (Caregiving Relationship) বা যত্নকারী সম্পর্ককে সাপোর্ট দেওয়া। এই সম্পর্ক হতে পারে মা ও শিশুর মধ্যে, অথবা বয়স্ক বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের মধ্যে, অথবা দুই বন্ধুর মধ্যে যারা একে অপরকে দেখভাল করে। ফিনম্যানের মতে, সমাজের আসল ভিত্তি যৌনতা নয়, আসল ভিত্তি হলো ‘কেয়ার’ বা যত্ন। তাই আইনি সুরক্ষা এবং সাবসিডি কেবল তাদেরই পাওয়া উচিত যারা সমাজে এই ‘কেয়ারটাকিং’ বা যত্নের কাজটা করছে, তারা বিবাহিত হোক বা না হোক। ফিনম্যানের এই তত্ত্ব ফ্যামিলি ল-এর চিরাচরিত ধারণাকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছে।
পারিবারিক আইন: ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক?
আইনবিদ্যার একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো – রাষ্ট্র কি মানুষের বেডরুমে প্রবেশ করতে পারে? এর উত্তরে দুটি ভিন্ন মতবাদ আছে। একদল বলেন, পরিবার হলো প্রাইভেট স্ফিয়ার (Private Sphere), এখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যতটা সম্ভব কম হওয়া উচিত। একে বলা হয় ফ্যামিলি প্রাইভেসি ডকট্রিন (Family Privacy Doctrine)। এই মতবাদ অনুযায়ী, বাবা-মা কীভাবে সন্তানকে মানুষ করবেন বা স্বামী-স্ত্রী কীভাবে থাকবেন, সেটা তাদের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু অন্যদল, বিশেষ করে নারীবাদী আইনজ্ঞরা বলেন, এই ‘প্রাইভেসি’ বা গোপনীয়তার দোহাই দিয়েই পরিবারের ভেতরে নারীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ক্যাথারিন ম্যাককিনন (Catharine MacKinnon) যুক্তি দিয়েছেন যে, আইনের চোখে ‘প্রাইভেসি’ মানে হলো পুরুষদের জন্য নারীকে শাসন করার অবাধ লাইসেন্স। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক সহিংসতা যখন ঘটে, তখন পুলিশ অনেক সময় বলে “এটা তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়, আমরা কিছু করব না” – এটি আসলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আধুনিক ফ্যামিলি ল তাই এখন ‘প্রাইভেসি’র দেওয়াল ভেঙে ভিক্টিম বা নির্যাতিতের সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাষ্ট্র এখন বলছে, “তোমার ঘর তোমার দুর্গ হতে পারে, কিন্তু সেই দুর্গে কাউকে পিটিয়ে মারার অধিকার তোমার নেই।”
বিবাহ ও ডিভোর্স: চুক্তির বিবর্তন
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আইন বিয়ের সংজ্ঞাকে বারবার বদলেছে। একসময় বিয়ে ছিল সম্পত্তির হস্তান্তর। নারী ছিল বাবার সম্পত্তি, বিয়ের পর সে হতো স্বামীর সম্পত্তি। একে বলা হতো কোভারচার (Coverture) আইন, যেখানে বিয়ের পর নারীর কোনো আইনি সত্তা থাকত না, স্বামী ও স্ত্রী মিলে ‘একজন’ ব্যক্তি হতো এবং সেই ব্যক্তিটি ছিল স্বামী। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে ম্যারিড উইমেনস প্রপার্টি অ্যাক্ট (Married Women’s Property Act) পাস হওয়ার পর নারীরা সম্পত্তির অধিকার পেল। আর বিংশ শতাব্দীতে এল নো-ফল্ট ডিভোর্স (No-Fault Divorce) বিপ্লব। আগে ডিভোর্স পেতে হলে প্রমাণ করতে হতো যে সঙ্গী কোনো ‘দোষ’ করেছে (যেমন পরকীয়া বা নির্যাতন)। এর ফলে আদালতে নোংরা কাদা ছোড়াছুড়ি হতো এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া লাগত। কিন্তু ১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রথম এবং পরে সারা বিশ্বে ‘নো-ফল্ট’ আইন চালু হলো, যেখানে বলা হলো – “আমাদের আর বনিবনা হচ্ছে না” (Irreconcilable Differences) – এইটুকু বলাই ডিভোর্সের জন্য যথেষ্ট। আইনবিদ হার্বার্ট জ্যাকব (Herbert Jacob) তার Silent Revolution বইতে দেখিয়েছেন যে, এই একটি আইনি পরিবর্তন কীভাবে ডিভোর্সকে সহজলভ্য করেছে এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে (Jacob, 1988)।
কাস্টডি এবং চাইল্ড সাপোর্ট: সন্তানের অধিকার
পরিবার ভেঙে গেলে সবচেয়ে বড় আইনি যুদ্ধ শুরু হয় সন্তানকে নিয়ে। একে বলা হয় কাস্টডি ব্যাটল (Custody Battle)। আগে আইন মেনে চলত টেন্ডার ইয়ারস ডকট্রিন (Tender Years Doctrine) – অর্থাৎ, ছোট বাচ্চার জন্য মায়ের কোলই সেরা, তাই কাস্টডি মা পাবে। কিন্তু আধুনিক জেন্ডার নিউট্রাল আইনে বলা হচ্ছে বেস্ট ইন্টারেস্ট অফ দ্য চাইল্ড (Best Interest of the Child) – অর্থাৎ, বাচ্চার মঙ্গলের জন্য যার কাছে থাকা ভালো, সে-ই কাস্টডি পাবে, সে বাবা বা মা যেই হোক। এর ফলে এখন অনেক বাবাও কাস্টডি পাচ্ছেন। আবার জয়েন্ট কাস্টডি (Joint Custody)-র ধারণাও জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে বাচ্চা বাবা ও মা উভয়ের কাছেই ভাগ করে থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাইল্ড সাপোর্ট (Child Support) বা সন্তানের ভরণপোষণ। আইন বলে, ডিভোর্স হলেও বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হয় না। নন-কাস্টোডিয়াল প্যারেন্ট (যার কাছে বাচ্চা থাকে না) তাকে অবশ্যই বাচ্চার খরচের জন্য টাকা দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বাবা এই টাকা দিতে চান না। রাষ্ট্র তখন কঠোর হয়, বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া বা পাসপোর্ট আটকে দেওয়ার মতো শাস্তি দেয়। এই আইনি কড়াকড়ির উদ্দেশ্য হলো, রাষ্ট্র চায় না বাচ্চারা গরিব হয়ে যাক এবং রাষ্ট্রের ওপর বোঝা হোক। অর্থাৎ, ফ্যামিলি ল-এর পেছনে সবসময়ই একটি অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে।
সমকামী বিবাহ ও পরিবারের নতুন সংজ্ঞা
একুশ শতকে ফ্যামিলি ল-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সমকামী বিবাহ বা সেম-সেক্স ম্যারেজ (Same-Sex Marriage)-এর স্বীকৃতি। ২০১৫ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ওবারগেফেল বনাম হজেস (Obergefell v. Hodges) মামলায় রায় দিল যে, বিয়ে করা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সমকামীরাও এই অধিকার পাবে। এই রায়টি কেবল আমেরিকার জন্য নয়, সারা বিশ্বের পারিবারিক আইনের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র স্বীকার করে নিল যে, বিয়ের উদ্দেশ্য কেবল প্রজনন নয়, বিয়ের উদ্দেশ্য হলো ভালোবাসা এবং সাহচর্য। তবে এই পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। যেমন – দুজন লেসবিয়ান মা যদি স্পার্ম ডোনারের মাধ্যমে বাচ্চা নেন, তবে বাচ্চার বার্থ সার্টিফিকেটে কার নাম থাকবে? যিনি স্পার্ম দিয়েছেন (বায়োলজিক্যাল বাবা) তার কি কোনো অধিকার থাকবে? আদালতকে এখন এই অভূতপূর্ব প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হচ্ছে। একে বলা হচ্ছে লিগ্যাল প্যারেন্টহুড (Legal Parenthood)-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ। আইন এখন আর রক্তের সম্পর্ক খুঁজছে না, খুঁজছে ইনটেনশন টু প্যারেন্ট (Intention to Parent) বা বাবা-মা হওয়ার ইচ্ছা।
রাষ্ট্র কেন বিয়ে চায়?
মার্থা ফিনম্যানের মতো সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্র কেন বিয়েকে এত সব সুবিধা (ট্যাক্স ছাড়, গ্রিন কার্ড, ইনস্যুরেন্স) দেয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশ্যাল কন্ট্রোল (Social Control) বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। রাষ্ট্র মনে করে, বিবাহিত মানুষ বেশি স্থিতিশীল হয়, তারা অপরাধ কম করে এবং তারা বেশি কাজ করে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) একে বলেছেন বায়োপলিটিক্স (Biopolitics)। রাষ্ট্র তার জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পরিবারকে ব্যবহার করে। যেমন, চীন যখন ‘এক সন্তান নীতি’ চালু করেছিল, তখন রাষ্ট্র সরাসরি ঠিক করে দিয়েছিল দম্পতিরা কয়টি বাচ্চা নেবে। আবার অনেক দেশ এখন জন্মহার বাড়ানোর জন্য বোনাস দিচ্ছে। অর্থাৎ, পরিবার হলো রাষ্ট্রের পরীক্ষাগার। আইন ও নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে নিজের জাতীয় স্বার্থে বাঁকিয়ে দেয়।
আইন ও বিচারের এই দৃষ্টিকোণ আমাদের দেখায় যে, পরিবার মোটেও কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এটি একটি রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন বিয়ে করি বা সন্তান নেই, তখন আমরা আসলে রাষ্ট্রের বানানো একটি স্ক্রিপ্টে অভিনয় করি। পরিবারকে বুঝতে আইনের এই পাঠ অত্যন্ত জরুরি, কারণ একটি ছোট আইনি পরিবর্তন (যেমন – নো-ফল্ট ডিভোর্স বা সমকামী বিবাহ) লক্ষ লক্ষ পরিবারের ভাগ্য এবং সমাজের চেহারা চিরতরে বদলে দিতে পারে।
পরিবার, ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব: পার্থিব ও অপার্থিবের সেতু
মানুষের তৈরি সমাজ এবং পরিবারের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আইন বা রাষ্ট্র আসার বহু আগে থেকেই পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে আরেকটি মহাশক্তি, আর তা হলো ধর্ম। আদিকাল থেকেই মানুষের জন্ম, বিবাহ এবং মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিচিত্র সব ধর্মীয় আচার বা রিচুয়াল (Ritual)। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, পরিবার এবং ধর্ম হলো সমাজের দুটি ‘মৌলিক প্রতিষ্ঠান’ যা একে অপরের পরিপূরক। ধর্ম পরিবারকে দেয় পবিত্রতা বা স্যাক্রেডনেস (Sacredness), আর পরিবার ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিশ্বাস হস্তান্তরের মাধ্যমে। ধর্মতত্ত্ববিদ বা থিওলজিস্টরা পরিবারকে দেখেন ঈশ্বরের বা সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ পরিকল্পনা হিসেবে। তাদের মতে, বিবাহ কেবল দুটি মানুষের চুক্তি নয়, এটি একটি স্বর্গীয় বন্ধন বা কোভেন্যান্ট (Covenant)। অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানীরা ধর্মকে দেখেন একটি ‘সামাজিক সিমেন্ট’ হিসেবে, যা পরিবারের সদস্যদের একীভূত রাখে। আধুনিক সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ যুগে ধর্মের প্রভাব কিছুটা কমলেও, পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং প্রথাগুলোর শেকড় আজও ধর্মের গভীরে প্রোথিত। এখন আমরা দেখব, পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলো এবং ধর্মতাত্ত্বিকরা পরিবারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে ধর্মের ভূমিকা বা রিলিজিয়াস সোশিওলাইজেশন (Religious Socialization) কীভাবে পরিবারের স্থায়িত্ব রক্ষা করছে বা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
পবিত্র ছাদ: পিটার বার্জার ও ধর্মের কাজ
ধর্ম কেন পরিবারের জন্য জরুরি? এই প্রশ্নের সমাজতাত্ত্বিক উত্তর দিয়েছেন বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী পিটার বার্জার (Peter Berger)। তিনি তার কালজয়ী বই The Sacred Canopy-এ দেখালেন যে, মানুষ বিশৃঙ্খলা বা ক্যাওস (Chaos) ভয় পায়। সে চায় তার জীবন এবং জগত একটি সুশৃঙ্খল নিয়মে চলুক। ধর্ম মানুষকে সেই শৃঙ্খলার বোধ দেয়, যাকে বার্জার বলেছেন নোমস (Nomos)। পরিবার হলো এই ‘নোমস’ বা শৃঙ্খলার সবচেয়ে ক্ষুদ্র সংস্করণ। বার্জার বললেন, ধর্ম পরিবারকে একটি ‘পবিত্র ছাদ’ বা স্যাক্রেড ক্যানোপি (Sacred Canopy)-র নিচে আশ্রয় দেয়। যখন আমরা বিয়েকে ‘পবিত্র বন্ধন’ বলি বা সন্তানকে ‘ঈশ্বরের দান’ বলি, তখন আমরা আসলে আমাদের নশ্বর এবং ভঙ্গুর সম্পর্কগুলোকে একটি অবিনশ্বর এবং মহাজাগতিক অর্থ দিই। এর ফলে পারিবারিক বন্ধনগুলো আরও শক্তিশালী হয়। বার্জার দেখালেন, ধর্মের কাজ হলো পারিবারিক জীবনের দৈনন্দিন ঘটনাগুলোকে (যেমন – জন্ম, বিয়ে, মৃত্যু) একটি মহৎ আখ্যানের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা, যাতে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পায় (Berger, 1967)। পরিবার যদি কেবলই বায়োলজিক্যাল বা অর্থনৈতিক ইউনিট হতো, তবে তা এত দীর্ঘস্থায়ী হতো না; ধর্মের দেওয়া এই ‘অতীন্দ্রিয় বৈধতা’ বা ট্রান্সসেন্ডেন্টাল লেজিটিমেশন (Transcendental Legitimation) পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে।
ধর্মীয় সামাজিকীকরণ: বিশ্বাসের প্রথম পাঠ
পরিবারকে বলা হয় ধর্মের আঁতুড়ঘর। শিশু তার ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাস কোথা থেকে পায়? কোনো ধর্মগ্রন্থ পড়ে নয়, বরং সে পায় তার বাবা-মায়ের আচরণ দেখে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন রিলিজিয়াস সোশিওলাইজেশন (Religious Socialization) বা ধর্মীয় সামাজিকীকরণ। গবেষক ক্রিস্টিয়ান স্মিথ (Christian Smith) তার বিশাল গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, টিনএজারদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচরণের সবচেয়ে বড় প্রভাবক বা ‘প্রেডিক্টর’ হলো তাদের বাবা-মায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস। তিনি একে বলেছেন ইন্টারজেনারেশনাল ট্রান্সমিশন অফ ফেইথ (Intergenerational Transmission of Faith)। স্মিথ দেখালেন, বাবা-মা যদি নিয়মিত উপাসনা করেন এবং ধর্ম নিয়ে সন্তানের সাথে খোলামেলা আলোচনা করেন, তবে সন্তানও সেই বিশ্বাস ধরে রাখে। কিন্তু বাবা-মা যদি কেবল মুখে ধর্মের কথা বলেন কিন্তু নিজেরা পালন না করেন, তবে সন্তানরা ধর্ম থেকে দূরে সরে যায়। পরিবার হলো সেই ফিল্টার, যার মধ্য দিয়ে ধর্মের বিমূর্ত ধারণাগুলো মূর্ত হয়ে শিশুর মনে প্রবেশ করে। আধুনিক যুগে এই ট্রান্সমিশন প্রক্রিয়াটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, কারণ মিডিয়া এবং পিয়ার গ্রুপ (বন্ধুবান্ধব) এখন শিশুর বিশ্বাস গঠনে পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে (Smith & Denton, 2005)।
তবে এই ধর্মীয় সামাজিকীকরণের একটি অন্ধকার দিকও আছে। বিখ্যাত দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell) তার Marriage and Morals বইতে যুক্তি দিয়েছেন যে, ধর্ম শিশুদের মনে যৌনতা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সম্পর্কে এক গভীর অপরাধবোধ বা গিল্ট (Guilt) ঢুকিয়ে দেয়। ছোটবেলা থেকেই ‘পাপ’ আর ‘নরকের’ ভয় দেখিয়ে শিশুদের বড় করা হলে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা সারা জীবন এক ধরণের হীনম্মন্যতায় ভোগে (Russell, 1929)। বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins) একে আরও কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ধর্মবিশ্বাসকে এক ধরণের মানসিক নির্যাতন (Mental Abuse) বলে অভিহিত করেছেন। ডকিন্সের মতে, শিশুদের কোনো নিজস্ব ধর্ম থাকে না; তাদের ‘মুসলিম শিশু’ বা ‘হিন্দু শিশু’ বলে ট্যাগ দেওয়া অনুচিত। তাদের বড় হয়ে নিজেদের বিশ্বাস বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া উচিত (Dawkins, 2006)।
খ্রিস্টধর্ম ও বিবাহের ধর্মানুষ্ঠান
পশ্চিমা বিশ্বের পারিবারিক কাঠামো এবং মূল্যবোধের অনেকটাই গড়ে উঠেছে খ্রিস্টধর্মের ভিত্তির ওপর। মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চ বিয়েকে ঘোষণা করেছিল একটি স্যাক্রামেন্ট (Sacrament) বা ধর্মানুষ্ঠান হিসেবে। এর মানে হলো, বিয়ে কোনো সাধারণ চুক্তি নয়, এটি ঈশ্বরের কৃপা লাভের একটি মাধ্যম এবং এটি অবিচ্ছেদ্য। সেন্ট অগাস্টিন (Saint Augustine) বিয়ের তিনটি মঙ্গলের কথা বলেছিলেন: সন্তান (Procreation), বিশ্বস্ততা (Fidelity), এবং ধর্মানুষ্ঠান (Sacrament)। এই ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই শত শত বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথার (Martin Luther) এবং প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের সময় এই ধারণায় বড় পরিবর্তন আসে। লুথার বললেন, বিয়ে কোনো ‘স্যাক্রামেন্ট’ নয়, এটি একটি ‘পার্থিব বিষয়’ (Worldly Thing), তবে এটি ঈশ্বরের দ্বারা আদিষ্ট। প্রোটেস্ট্যান্টরা বিয়েকে দেখল সাহচর্য এবং পারস্পরিক সমর্থনের জায়গা হিসেবে। সমাজতাত্ত্বিকরা বলেন, এই ধর্মীয় পরিবর্তনই আধুনিক কম্প্যানিয়নেট ম্যারেজ (Companionate Marriage) বা সাহচর্যমূলক বিবাহের পথ তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধুত্ব এবং প্রেমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব বা ক্রিশ্চিয়ান থিওলজি (Christian Theology) পরিবারকে দেখে ‘ছোট গির্জা’ বা ডোমেস্টিক চার্চ (Domestic Church) হিসেবে, যেখানে বাবা-মা হলেন সন্তানের প্রথম ধর্মগুরু।
ইসলাম: মওয়াদ্বাহ, রাহমাহ এবং পারিবারিক অধিকার
ইসলাম ধর্মে পরিবারকে সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামি সমাজতত্ত্বে বিয়ে বা নিকাহ (Nikah) হলো একটি দেওয়ানি চুক্তি বা সিভিল কন্ট্রাক্ট (Civil Contract), যা ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে পবিত্রতা পায়। কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে বর্ণনা করা হয়েছে মওয়াদ্বাহ (Mawaddah) বা গভীর ভালোবাসা এবং রাহমাহ (Rahmah) বা করুণার সম্পর্ক হিসেবে। ইসলামি চিন্তাবিদ ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman) দেখিয়েছেন যে, ইসলাম প্রাক-ইসলামি আরবের বিশৃঙ্খল পারিবারিক ব্যবস্থাকে সংস্কার করে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো দিয়েছে, যেখানে নারীর অধিকার, মোহরানা এবং উত্তরাধিকার সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। ইসলামে পরিবার কেবল স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আত্মীয়-স্বজন এবং গোত্র বা উম্মাহ (Ummah)-র সাথেও যুক্ত। ইসলামি পারিবারিক আইনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে অধিকার এবং কর্তব্যের সুস্পষ্ট বন্টন বা কমপ্লিমেন্টারিটি (Complementarity) রয়েছে। পুরুষের দায়িত্ব হলো পরিবারের ভরণপোষণ বা কাওয়াম (Qawwam) হওয়া, আর নারীর দায়িত্ব হলো পরিবারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা। ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি হলো ভারসাম্য রক্ষার কৌশল। অবশ্য আধুনিক নারীবাদীরা এই শ্রম বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইসলামি স্কলাররা বলেন, পরিবার হলো তারবিয়াহ (Tarbiyah) বা নৈতিক প্রশিক্ষণের কেন্দ্র, যেখানে সন্তানকে একজন ভালো মানুষ এবং ভালো মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
হিন্দুধর্ম: আশ্রম ব্যবস্থা ও পূর্বপুরুষের ঋণ
ভারতীয় উপমহাদেশে পরিবারের ধারণা হিন্দুধর্মের দর্শনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এখানে জীবনকে চারটি আশ্রমে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো গার্হস্থ্য আশ্রম (Grihastha Ashrama) বা সংসার জীবন। হিন্দু ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, বিয়ে এবং সন্তান উৎপাদন (বিশেষ করে পুত্র সন্তান) কেবল সুখের জন্য নয়, এটি একটি ধর্মীয় কর্তব্য বা ধর্ম (Dharma)। প্রতিটি মানুষ জন্মায় তিনটি ঋণ নিয়ে, যার একটি হলো পিতৃঋণ বা পূর্বপুরুষের ঋণ। সন্তান জন্ম দিয়ে এবং তাদের মানুষ করে এই ঋণ শোধ করতে হয়। সমাজবিজ্ঞানী টি. এন. মাদান (T. N. Madan) দেখিয়েছেন যে, হিন্দু যৌথ পরিবার বা জয়েন্ট ফ্যামিলি (Joint Family) ব্যবস্থা টিকে আছে এই ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর। এখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চেয়ে ‘কুল’ বা বংশের মর্যাদা এবং ধারাবাহিকতা রক্ষা করা বেশি জরুরি। শ্রাদ্ধ বা পিণ্ডদানের মতো ধর্মীয় আচারগুলো মৃত পূর্বপুরুষদের সাথে জীবিতদের সম্পর্ক বজায় রাখে এবং পারিবারিক সংহতি বা ফ্যামিলি সলিডারিটি (Family Solidarity) অটুট রাখে। মাদান বলেন, হিন্দু পরিবারে ‘পবিত্রতা’ এবং ‘অপবিত্রতা’ (Purity and Pollution)-এর ধারণাও খুব প্রবল, যা জন্ম, মৃত্যু এবং মাসিকের সময় পরিবারের সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে (Madan, 1987)।
লাইফ সাইকেল রিচুয়ালস: দোলনা থেকে কবর
পৃথিবীর সব ধর্মেই মানুষের জীবনের প্রধান প্রধান ধাপগুলো বা লাইফ সাইকেল ইভেন্টস (Life Cycle Events) – জন্ম, বয়ঃসন্ধি, বিবাহ এবং মৃত্যু – পারিবারিক আবহে পালন করার নির্দেশ রয়েছে। এই অনুষ্ঠানগুলোকে নৃবিজ্ঞানীরা বলেন রাইটস অফ প্যাসেজ (Rites of Passage)। যেমন – শিশুর জন্মের পর আকিকা বা নামকরণ, বা হিন্দুদের অন্নপ্রাশন। এই রিচুয়ালগুলোর কাজ কেবল ধর্মীয় নয়, এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও পারিবারিক কাজ করে। নৃবিজ্ঞানী আর্নল্ড ভ্যান জেনপ (Arnold van Gennep) দেখিয়েছিলেন যে, এই রিচুয়ালগুলো ব্যক্তিকে এক স্ট্যাটাস থেকে অন্য স্ট্যাটাসে নিয়ে যায় (যেমন – অবিবাহিত থেকে বিবাহিত)। আর এই পরিবর্তনের সময় পরিবার তাকে সাপোর্ট দেয়। ধর্মীয় আচারগুলো পরিবারের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং তাদের মধ্যে আবেগের বন্ধন দৃঢ় করে। আধুনিক যুগে যখন মানুষ অনেক ব্যস্ত, তখন কেবল ঈদ, পূজা বা বড়দিনের মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোতেই পুরো পরিবার এক হওয়ার সুযোগ পায়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ধর্ম যদি নাও থাকে, তবুও পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই রিচুয়ালগুলোর প্রয়োজন ফুরোবে না।
সেক্যুলারাইজেশন থিওরি: ধর্মের কি পতন ঘটছে?
আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের একটি বড় বিতর্ক হলো সেক্যুলারাইজেশন থিওরি (Secularization Theory)। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber), এমিল ডুরখেইম এবং পরবর্তীকালের তাত্ত্বিকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, বিজ্ঞান ও আধুনিকতার প্রসারের সাথে সাথে সমাজ এবং পরিবার থেকে ধর্মের প্রভাব কমে যাবে। তারা বলেছিলেন, পরিবার এখন আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি হয়ে গেছে একটি আবেগীয় এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিয়ের আগে লিভ-ইন করা, ডিভোর্স বেড়ে যাওয়া, এবং সমকামী বিয়ের স্বীকৃতি – এগুলো সবই সেক্যুলারাইজেশনের লক্ষণ। সমাজবিজ্ঞানী ব্রায়ান উইলসন (Bryan Wilson) দেখিয়েছেন যে, ধর্ম এখন আর ‘পাবলিক’ বা জনজীবনের বিষয় নয়, এটি হয়ে গেছে একান্তই ‘প্রাইভেট’ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। এর ফলে পরিবারের ওপর চার্চ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে। এখন মানুষ ধর্মের নিয়ম মেনে নয়, নিজেদের সুবিধা এবং পছন্দ অনুযায়ী পরিবারের নিয়ম তৈরি করছে। একে বলা হচ্ছে ডি-ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অফ ম্যারেজ (Deinstitutionalization of Marriage) – বিয়ে এখন আর কোনো অমোঘ প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি ঐচ্ছিক জীবনযাপন পদ্ধতি।
ধর্মপন্থীরা দাবি করেন, ধর্ম ছাড়া পরিবারের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়বে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী ফিল জাকারম্যান (Phil Zuckerman) এই দাবিকে ভুল প্রমাণ করেছেন। তিনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো ধর্মনিরপেক্ষ সমাজগুলোর ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, সেখানে ধর্মের প্রভাব কম হলেও পরিবারের বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। জাকারম্যান একে বলেছেন সেক্যুলার ফ্যামিলি ভ্যালুজ (Secular Family Values)। তিনি দেখান, সেক্যুলার পরিবারগুলোতে নৈতিকতা শেখানো হয় সহমর্মিতা এবং যুক্তির ওপর ভিত্তি করে, কোনো ঐশ্বরিক শাস্তির ভয়ে নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মহীন পরিবারে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের হার অনেক ধার্মিক সমাজের চেয়ে কম এবং সেখানে নারী-পুরুষের সমতা বেশি বজায় থাকে (Zuckerman, 2008)। অর্থাৎ, একটি সুখী ও নৈতিক পরিবার গঠনের জন্য ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই।
মৌলবাদ এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবারের প্রত্যাবর্তন
সেক্যুলারাইজেশনের উল্টো স্রোতও কিন্তু প্রবল। গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদ বা ফান্ডামেন্টালিজম (Fundamentalism)-এর উত্থান ঘটেছে। খ্রিস্টান ইভানজেলিকাল, কট্টর ইসলামি গোষ্ঠী বা হিন্দুত্ববাদী দলগুলো আবার সেই ‘ঐতিহ্যবাহী পরিবার’ বা ট্রেডিশনাল ফ্যামিলি (Traditional Family)-র মডেলে ফিরে যাওয়ার ডাক দিচ্ছে। আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ডব্লিউ ব্র্যাডফোর্ড উইলকক্স (W. Bradford Wilcox) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয়ভাবে সক্রিয় বা ধর্মপ্রাণ পরিবারগুলোতে ডিভোর্সের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং বাবারা সন্তানের সাথে বেশি সময় কাটান। উইলকক্স একে বলেছেন সফট প্যাট্রিয়ার্কি (Soft Patriarchy)। অর্থাৎ, এই ধর্মপ্রাণ পুরুষরা পরিবারের কর্তা বা ‘হেড’ হিসেবে সম্মান পান, কিন্তু তারা স্বৈরাচারী নন; বরং ধর্মের নির্দেশেই তারা স্ত্রীর প্রতি যত্নবান এবং সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হন। উইলকক্স যুক্তি দেন যে, আধুনিক ভঙ্গুর সমাজের প্রেক্ষাপটে ধর্ম পরিবারকে একটি শক্ত কাঠামো বা ‘মোরাল কম্পাস’ দিচ্ছে, যা অনেক মানুষের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে (Wilcox, 2004)।
ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সামাজিক পুঁজি: পরিবারের বর্ধিত হাত
পরিবার কি একা টিকে থাকতে পারে? সমাজবিজ্ঞানী জেমস কোলম্যান (James Coleman)-এর সোশ্যাল ক্যাপিটাল (Social Capital) বা সামাজিক পুঁজি তত্ত্বটি ধর্মের ক্ষেত্রে খুব খাটে। ধর্মপ্রাণ পরিবারগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায় বা চার্চ/মসজিদ/মন্দির ভিত্তিক কমিউনিটির সাথে যুক্ত থাকে। এই কমিউনিটি পরিবারকে এক বিশাল সাপোর্ট নেটওয়ার্ক দেয়। বাচ্চার জন্য ভালো স্কুল খোঁজা, বিপদে আর্থিক সাহায্য পাওয়া, বা টিনএজার সন্তানকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করা – এই সব ক্ষেত্রে ধর্মীয় সম্প্রদায় পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। গবেষকরা একে বলেন ক্লোজার অফ সোশ্যাল নেটওয়ার্কস (Closure of Social Networks)। যখন বাবা-মা এবং সন্তানের বন্ধুরা একই ধর্মীয় মণ্ডলীর অংশ হয়, তখন তাদের মূল্যবোধের মধ্যে একতা থাকে এবং সন্তানকে মানুষ করা সহজ হয়। আধুনিক বিচ্ছিন্নতাপূর্ণ শহুরে জীবনে এই ধর্মীয় কমিউনিটিগুলোই অনেক পরিবারের জন্য ‘এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি’ বা যৌথ পরিবারের অভাব পূরণ করে। লিসা পিয়ার্স (Lisa Pearce) এবং মেলিন্ডা লুন্ডকুইস্ট ডেন্টন (Melinda Lundquist Denton) দেখিয়েছেন, ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, এটি একটি সামাজিক সম্পদ যা পরিবারের স্থায়িত্ব বাড়ায় (Pearce & Denton, 2011)।
নারীবাদী ধর্মতত্ত্ব: শৃঙ্খল নাকি মুক্তি?
ধর্ম এবং পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমালোচনা এসেছে নারীবাদী ধর্মতত্ত্ববিদ বা ফেমিনিস্ট থিওলজিস্টদের কাছ থেকে। মেরি ডালি (Mary Daly) তার বৈপ্লবিক বই Beyond God the Father-এ বললেন, প্রধান প্রধান ধর্মগুলো মূলত পিতৃতান্ত্রিক। তারা ঈশ্বরকে ‘বাবা’ বা পুরুষ হিসেবে চিত্রিত করে, যা মর্ত্যের পরিবারে পুরুষের আধিপত্যকে বৈধতা দেয়। ডালি যুক্তি দিলেন, “If God is male, then the male is God” (ঈশ্বর যদি পুরুষ হন, তবে পুরুষই ঈশ্বর)। এই দর্শনের কারণে পরিবারে নারীকে সবসময় পুরুষের অধীনস্থ বা ‘সেকেন্ড সেক্স’ হিসেবে রাখা হয়েছে। অনেক ধর্মেই স্ত্রীকে স্বামীর ‘অনুগত’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারীবাদী তাত্ত্বিকরা বলেন, ধর্মের এই পবিত্রতার দোহাই দিয়েই পরিবারের ভেতরে নারীর ওপর নির্যাতন এবং বৈষম্য চালানো হয়। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। অনেক নারীবাদী এখন ধর্মের ভেতরের সমতার বাণীগুলো নতুন করে ব্যাখ্যা করছেন। যেমন – ইসলামি নারীবাদীরা (Islamic Feminists) কুরআনের আয়াতগুলোর নতুন ব্যাখ্যা বা হারমেনিউটিক্স (Hermeneutics) দাঁড় করাচ্ছেন, যেখানে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে। তারা বলছেন, ধর্ম নারীকে শৃঙ্খল পরায়নি, পরিয়েছে পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যা। সাবা মাহমুদ (Saba Mahmood) মিশরের ধর্মপ্রাণ নারীদের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা লিবারেল চশমা দিয়ে দেখলে মনে হবে তারা পরাধীন, কিন্তু তাদের কাছে ধর্ম পালন এবং পর্দা করা হলো আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক শক্তি অর্জনের একটি উপায় বা এজেন্সি (Agency) (Mahmood, 2005)।
ধর্ম এবং জেন্ডার ভূমিকা: ঈশ্বর যখন পুরুষ
প্রায় সব প্রধান ধর্মেরই পারিবারিক কাঠামোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো জেন্ডার বা লিঙ্গ ভিত্তিক শ্রম বিভাজন। ধর্মতাত্ত্বিকরা একে বলেন ডিভাইন অর্ডার (Divine Order) বা ঐশ্বরিক বিন্যাস। তারা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তা নারী ও পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতি দিয়ে তৈরি করেছেন এবং পরিবারের মঙ্গলের জন্য তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করা উচিত। সমাজবিজ্ঞানী জন পি. বার্টকোস্কি (John P. Bartkowski) ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান পরিবারগুলোর ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, সেখানে পুরুষকে পরিবারের ‘হেড’ বা মস্তক এবং নারীকে ‘হেল্পমেট’ বা সাহায্যকারী হিসেবে দেখা হয়। একে বলা হয় কমপ্লিমেন্টারিয়ানইজম (Complementarianism)। এই মতবাদ অনুযায়ী, নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী হলেও তাদের কাজ আলাদা। পুরুষ নেতৃত্ব দেবে এবং নারী তাকে সমর্থন করবে। রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারগুলোতে এই বিশ্বাস অত্যন্ত প্রবল। তবে বার্টকোস্কি আরও দেখিয়েছেন যে, বাস্তবে অনেক ধর্মপ্রাণ দম্পতি এই কঠোর নিয়ম পুরোপুরি মানেন না, বরং তারা নিজেদের প্রয়োজনে একে নমনীয় করে নেন, যাকে তিনি বলেছেন প্র্যাগমেটিক ইগালিটারিয়ানইজম (Pragmatic Egalitarianism)। অর্থাৎ, তত্ত্বে পুরুষ কর্তা হলেও বাস্তবে স্বামী-স্ত্রী মিলেমিশেই সিদ্ধান্ত নেন (Bartkowski, 2001)।
আন্তঃধর্মীয় বিবাহ: নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্বায়নের যুগে পরিবার এবং ধর্মের সমীকরণে নতুন এক জটিলতা যোগ হয়েছে – তা হলো আন্তঃধর্মীয় বিবাহ বা ইন্টারফেইথ ম্যারেজ (Interfaith Marriage)। যখন ভিন্ন ধর্মের দুজন মানুষ বিয়ে করেন, তখন তারা কেবল দুটি জীবন নয়, দুটি ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি বা ওয়ার্ল্ডভিউ (Worldview)-কে এক করেন। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখছেন, এই পরিবারগুলোতে ধর্ম পালন এবং সন্তানকে কোন ধর্মে বড় করা হবে – তা নিয়ে নতুন ধরণের ‘নেগোসিয়েশন’ বা সমঝোতা চলছে। কেউ কেউ নিজের ধর্ম ত্যাগ করেন, আবার কেউ কেউ দুটি ধর্মকেই পরিবারে স্থান দেন, যাকে বলা হয় ডুয়্যাল-ফেইথ ফ্যামিলি (Dual-faith Family)। গবেষক নাওমি শ্যাফার রাইলি (Naomi Schaefer Riley) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আন্তঃধর্মীয় বিয়েতে ডিভোর্সের ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে, কারণ সেখানে মূলল্যবোধের সংঘাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (Riley, 2013)। তবে এই পরিবারগুলো ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বা রিলিজিয়াস টলারেন্স (Religious Tolerance)-এর নতুন মডেলও তৈরি করছে। আধুনিক যুগে অনেকেই এখন ‘রিলিজিয়াস’ (ধর্মপ্রাণ) না হয়ে ‘স্পিরিচুয়াল’ (আধ্যাত্মিক) হতে পছন্দ করেন, যা পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে নতুন রূপ দিচ্ছে।
ধর্মীয় সংঘাত ও পারিবারিক ভাঙন: বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব
ধর্ম সবসময় পরিবারকে জোড়া লাগায় না, কখনো কখনো এটি পরিবার ভাঙার কারণও হতে পারে। বিশেষ করে যখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের তীব্র পার্থক্য দেখা দেয়। একে বলা হয় ইন্টারফ্যামিলিয়াল রিলিজিয়াস কনফ্লিক্ট (Interfamilial Religious Conflict)। ধরুন, বাবা খুব রক্ষণশীল কিন্তু মেয়ে খুব আধুনিক বা সেক্যুলার জীবনযাপন করতে চায়। অথবা স্বামী এক পীরের মুরিদ আর স্ত্রী আরেক পীরের। এই মতপার্থক্য পারিবারিক অশান্তির বড় কারণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানী কেনেথ পারগামেন্ট (Kenneth Pargament) দেখিয়েছেন যে, নেতিবাচক ধর্মীয় মোকাবেলা বা নেগেটিভ রিলিজিয়াস কোপিং (Negative Religious Coping) (যেমন – “ঈশ্বর আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন” বা “শয়তান আমার পরিবারের ক্ষতি করছে”) পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে পরিবারের সদস্যদের (বিশেষ করে এলজিবিটি বা সমকামী সন্তানদের) ত্যাজ্য করা বা পরিবার থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এখানে ধর্ম ভালোবাসার বদলে ঘৃণা বা বিভাজনের উৎস হয়ে ওঠে। পারগামেন্ট একে বলেছেন স্পিরিচুয়াল স্ট্রাগল (Spiritual Struggle), যা পরিবারের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয় (Pargament et al., 1998)।
ধর্মীয় সংঘাত কেবল মানসিক দূরত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, অনেক সময় তা ভয়াবহ সহিংসতার রূপ নেয়। ‘অনার কিলিং’ বা পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে হত্যার মতো জঘন্য ঘটনাগুলোর পেছনে প্রায়শই ধর্মীয় গোঁড়ামি কাজ করে। যখন কোনো মেয়ে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে করতে চায় বা পরিবারের ধর্মীয় অনুশাসন মানতে অস্বীকার করে, তখন ধর্ম তাকে ‘পাপী’ বা ‘বিপথগামী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই তকমাটিই পরিবারের অন্য সদস্যদের (বাবা বা ভাই) তার ওপর নির্যাতন বা হত্যা করার নৈতিক বৈধতা দেয়। সমালোচকরা বলেন, ধর্ম এখানে ভালোবাসার বদলে ঘৃণার উৎস হয়ে ওঠে এবং পরিবারের ‘পবিত্রতা’ রক্ষার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। ধর্ম যখন পরিবারের সদস্যদের চেয়ে ধর্মীয় নিয়মকানুনকে বড় করে দেখে, তখন পরিবার তার মূল উদ্দেশ্য – নিরাপত্তা ও আশ্রয় – প্রদানে ব্যর্থ হয়।
স্পিরিচুয়ালিটি এবং পারিবারিক সুস্থতা
চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতা পারিবারিক স্বাস্থ্যের বা ফ্যামিলি ওয়েল-বিইং (Family Well-being)-এর জন্য ইতিবাচক হতে পারে। অ্যানেট মাহোনি (Annette Mahoney) একে বলেছেন স্যাংটিফিকেশন অফ ফ্যামিলি (Sanctification of Family)। যখন পরিবারের সদস্যরা তাদের সম্পর্কগুলোকে (যেমন – বিয়ে বা প্যারেন্টিং) পবিত্র বা ঐশ্বরিক বলে মনে করেন, তখন তারা সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন এবং সংকটের সময় ধৈর্য ধরেন। প্রার্থনার মতো যৌথ ধর্মীয় কাজগুলো বা ফ্যামিলি প্রেয়ার (Family Prayer) পরিবারের মানসিক চাপ কমায় এবং একাত্মবোধ বাড়ায়। তবে মাহোনি সতর্ক করেছেন যে, ধর্ম যদি খুব কঠোর বা শাস্তিমূলক হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে এবং পারিবারিক কলহ বাড়াতে পারে (Mahoney et al., 2003)।
ধর্ম এবং ধর্মতত্ত্বের এই লেন্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, পরিবার কেবল মানুষের তৈরি কোনো সামাজিক ক্লাব নয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ পরিবারের মধ্যে খুঁজেছে এক অপার্থিব অর্থ। সেক্যুলারাইজেশন বা আধুনিকতা যতই আসুক, বেশিরভাগ মানুষের কাছে মৃত্যু বা জন্মের মতো মৌলিক ঘটনাগুলোর জন্য ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই ধর্মচর্চার কেন্দ্রবিন্দু আজও পরিবারই। পরিবারকে বুঝতে ধর্মের এই পাঠ অপরিহার্য, কারণ বিশ্বাস বা বিশ্বাসহীনতা – উভয়ই পরিবারের ডিএনএ-তে মিশে আছে।
পরিবার ও রাষ্ট্রচিন্তা: ব্যক্তিগত যখন রাজনৈতিক
আমরা সচরাচর ভাবি, রাজনীতি হলো রাজপথের বিষয়, আর পরিবার হলো অন্দরমহলের বিষয়। রাজনীতির কাজ হলো রাষ্ট্র চালানো, আর পরিবারের কাজ হলো সন্তান পালন করা। এই দুটি জগতকে আমরা একটি লোহার পর্দা দিয়ে আলাদা করে রাখি। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা (Political Theorists) বলেন, এই বিভাজনটি একটি ভ্রম। পরিবার মোটেও রাজনীতিমুক্ত কোনো দ্বীপ নয়; বরং পরিবার হলো রাজনীতির একদম আণবিক একক। এরিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক নারীবাদীরা পর্যন্ত সবাই স্বীকার করেছেন যে, রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হবে তা নির্ভর করে পরিবারের চরিত্র কেমন তার ওপর। পরিবার হলো সেই কারখানা যেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের তৈরি করা হয়। আবার উল্টোভাবে, রাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থে পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করে – কখনো আইন দিয়ে, কখনো প্রণোদনা দিয়ে, আবার কখনো বা আদর্শ দিয়ে। রাজনীতি আর পরিবারের এই সম্পর্কটি অত্যন্ত জটিল এবং দ্বান্দ্বিক। কখনো রাষ্ট্র পরিবারের বন্ধু, আবার কখনো বা সে পরিবারের ওপর চেপে বসা এক বড় ভাই বা ‘বিগ ব্রাদার’। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে পরিবারকে কীভাবে দেখা হয়েছে এবং কেন নারীবাদীরা স্লোগান তুলেছিলেন – “ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক” (The Personal is Political)।
এরিস্টটল বনাম প্লেটো: পরিবারের আদি বিতর্ক
পরিবার ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের শুরুটা হয়েছিল গ্রিক দর্শনের স্বর্ণযুগে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল (Aristotle) তার Politics গ্রন্থে পরিবারকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রাণী (Zoon Politikon), কিন্তু সে একা রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। প্রথমে তৈরি হয় পরিবার বা ওইকস (Oikos), এরপর কয়েকটি পরিবার মিলে গ্রাম, এবং গ্রাম মিলে তৈরি হয় নগর-রাষ্ট্র বা পোলিস (Polis)। এরিস্টটলের মতে, পরিবার হলো একটি ‘প্রাকৃতিক’ প্রতিষ্ঠান। এখানে কর্তৃত্ব বা অথরিটি (Authority) থাকে পিতার হাতে, যা অনেকটা রাজার মতো। তিনি মনে করতেন, পরিবারে যে নৈতিক শিক্ষা ও আনুগত্য শেখা হয়, সেটাই একজন মানুষকে ভালো নাগরিক হতে সাহায্য করে (Aristotle, trans. 1984)।
কিন্তু এরিস্টটলের গুরু প্লেটো (Plato) সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বললেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Republic-এ তিনি এক কাল্পনিক আদর্শ রাষ্ট্রের নকশা আঁকলেন। প্লেটো বললেন, রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী বা গার্ডিয়ানস (Guardians)-দের জন্য পরিবার থাকা উচিত নয়। কেন? কারণ পরিবার মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। একজন শাসক যদি তার নিজের সন্তান বা স্ত্রীর কথা ভাবেন, তবে তিনি রাষ্ট্রের মঙ্গলের কথা ভাববেন না। প্লেটো প্রস্তাব দিলেন কমিউনাল চাইল্ড রিয়ারিং (Communal Child Rearing) বা যৌথ সন্তান লালন-পালনের। অর্থাৎ, সন্তান কার – তা কেউ জানবে না, সব শিশুই হবে রাষ্ট্রের সন্তান। প্লেটোর এই ‘পরিবার বিলুপ্তি’র প্রস্তাব প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রচিন্তার শুরু থেকেই পরিবারকে রাষ্ট্রের প্রতিযোগী বা হুমকি হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা ছিল।
লিবালিজম ও পাবলিক-প্রাইভেট বিভাজন
আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো উদারতাবাদ বা লিবারেলিজম (Liberalism)। জন লক (John Locke) এবং জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill)-এর মতো তাত্ত্বিকরা সমাজকে দুটি ভাগে ভাগ করলেন: পাবলিক স্ফিয়ার (Public Sphere) বা জনপরিসর (যেখানে রাজনীতি ও ব্যবসা চলে) এবং প্রাইভেট স্ফিয়ার (Private Sphere) বা ব্যক্তিগত পরিসর (যেখানে পরিবার থাকে)। লিবালিজমের মূল কথা হলো – রাষ্ট্র পাবলিক স্ফিয়ার নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু প্রাইভেট স্ফিয়ারে বা বেডরুমে উঁকি দেবে না। পরিবার হলো মানুষের স্বাধীনতার শেষ দুর্গ, যেখানে সে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজের মতো থাকতে পারে। একে বলা হয় নন-ইন্টারভেনশন (Non-intervention) নীতি।
কিন্তু এই সুন্দর তত্ত্বটির একটি বড় সমস্যা ছিল। রাষ্ট্র যখন পরিবারের ভেতরে নাক না গলানোর সিদ্ধান্ত নিল, তখন পরিবারের ভেতরে যে অন্যায়গুলো হতো (যেমন – স্বামীর দ্বারা স্ত্রী নির্যাতন), সেগুলোও ‘ব্যক্তিগত’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হলো। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ক্যারল পেটম্যান (Carole Pateman) তার যুগান্তকারী বই The Sexual Contract-এ এই ভণ্ডামিটা ধরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, আমরা যে ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (Social Contract)-এর কথা বলি, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ‘যৌন চুক্তি’। এই চুক্তির মাধ্যমে নারীদের পাবলিক স্ফিয়ার বা রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে প্রাইভেট স্ফিয়ারে বা ঘরে বন্দি করা হয়েছে এবং পুরুষের অধীনস্থ করা হয়েছে। পেটম্যান দেখালেন, লিবারেলিজমের এই পাবলিক-প্রাইভেট বিভাজন আসলে পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল (Pateman, 1988)।
সুসান ওকিন ও পরিবারের ন্যায়বিচার
পরিবার নিয়ে রাজনৈতিক দর্শনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্নটি তুলেছেন সুসান মোলার ওকিন (Susan Moller Okin)। তার বই Justice, Gender, and the Family-তে তিনি প্রশ্ন করলেন – “একটি রাষ্ট্র কি ন্যায়পরায়ণ (Just) হতে পারে, যদি তার ভিত্তি অর্থাৎ পরিবার নিজেই অন্যায্য হয়?” ওকিন বললেন, আমরা শিশুদের শেখাই গণতন্ত্র, সাম্য এবং ন্যায়ের কথা। কিন্তু তারা বাড়িতে দেখে একনায়কতন্ত্র – যেখানে বাবার কথাই শেষ কথা এবং মা সেখানে সেবাদাসী। এই দ্বিমুখী আচরণের ফলে শিশুরা কখনোই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না। ওকিন যুক্তি দিলেন, পরিবার হলো স্কুল অফ জাস্টিস (School of Justice)। পরিবারের ভেতরে যদি নারী-পুরুষের সমতা না থাকে, তবে রাষ্ট্র বা সমাজেও সমতা আসবে না। তিনি বললেন, “যতক্ষণ না পরিবারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ রাজনীতিতেও ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।” ওকিনের এই তত্ত্ব পরিবারকে ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা থেকে টেনে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এল (Okin, 1989)।
আলথুসার ও ভাবাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র
মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকরা পরিবারকে দেখেছেন রাষ্ট্রের হাতিয়ার হিসেবে। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার (Louis Althusser) বললেন, রাষ্ট্র কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী (Repressive State Apparatus) দিয়ে মানুষকে শাসন করে না, রাষ্ট্র মানুষকে মগজধোলাই করেও শাসন করে। আর এই মগজধোলাই করার যন্ত্রগুলোকে তিনি বললেন আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস (Ideological State Apparatus) বা ভাবাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র। পরিবার হলো এমন একটি অন্যতম যন্ত্র। আলথুসার দেখালেন, রাষ্ট্র চায় অনুগত এবং বাধ্যগত প্রজা। পরিবার ছোটবেলা থেকেই শিশুকে শেখায় – “বাবার কথা শোনো, বড়দের মুখে তর্ক করো না।” এই যে কর্তৃপক্ষের বা অথরিটি (Authority)-র প্রতি অন্ধ আনুগত্যের শিক্ষা, এটিই শিশুকে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের বা বসের শোষণ মেনে নিতে প্রস্তুত করে। পরিবারের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভাবাদর্শ বা আইডিওলজি (Ideology)-কে মানুষের অবচেতন মনে ঢুকিয়ে দেয়, যাতে মানুষ মনে করে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাই সেরা এবং একে প্রশ্ন করা যাবে না (Althusser, 1971)।
বায়োপলিটিক্স: শোবার ঘরে রাষ্ট্র
মিশেল ফুকো (Michel Foucault)-এর বায়োপলিটিক্স (Biopolitics) ধারণাটি পরিবার ও রাজনীতির সম্পর্ক বোঝার জন্য অপরিহার্য। ফুকো বললেন, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল মানুষের মনের ওপর নয়, মানুষের শরীরের বা ‘বায়োলজিক্যাল লাইফ’-এর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। রাষ্ট্র জনসংখ্যাকে তার সম্পদ মনে করে। তাই রাষ্ট্র ঠিক করে দেয় মানুষ কখন বিয়ে করবে, কয়টি সন্তান নেবে এবং কীভাবে তাদের লালন-পালন করবে। ফুকোর অনুসারী জ্যাক ডনজেলট (Jacques Donzelot) তার The Policing of Families বইতে দেখালেন যে, রাষ্ট্র সরাসরি পুলিশ দিয়ে নয়, বরং ডাক্তার, সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং শিক্ষকদের মাধ্যমে পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন – টিকা দেওয়া, স্কুলে পাঠানো বা স্বাস্থ্যবিধি মানা – এগুলো আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও, এগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিবারের গভীরে ঢুকে পড়ে। একে বলা হয় গভর্নমেন্টালিটি (Governmentality) বা পরিচালনার রাজনীতি। রাষ্ট্র পরিবারকে ব্যবহার করে একটি সুস্থ, সবল এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যা তৈরি করার জন্য, যা রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির জন্য দরকার (Donzelot, 1979)। চীনের ‘এক সন্তান নীতি’ বা হিটলারের সময় জার্মান নারীদের বেশি সন্তান নেওয়ার পুরস্কার – এগুলো সবই বায়োপলিটিক্সের চরম উদাহরণ।
রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ: ভোটের বাক্স ও ডিনার টেবিল
আমরা কোন দলকে ভোট দেব বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হব – এটা কি আমরা নিজেরা ঠিক করি? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, এর অনেকটাই ঠিক হয়ে যায় আমাদের ডিনার টেবিলে। একে বলা হয় পলিটিক্যাল সোশ্যালাইজেশন (Political Socialization)। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ সেই দলকেই সমর্থন করে, যে দলকে তাদের বাবা-মা সমর্থন করতেন। পরিবার হলো রাজনৈতিক শিক্ষার প্রথম স্কুল। এখানেই শিশু শেখে জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, বা বিপ্লবের পাঠ। এম. কেন্ট জেনিংস (M. Kent Jennings) এবং রিচার্ড নিমি (Richard Niemi) তাদের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বাবা-মায়ের রাজনৈতিক বিশ্বাস সন্তানের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তবে আধুনিক যুগে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেট এই পারিবারিক প্রভাবকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করছে। তবুও, প্রাথমিক রাজনৈতিক মূল্যবোধ বা কোর ভ্যালুজ (Core Values) পরিবার থেকেই আসে। পরিবার যদি রক্ষণশীল হয়, সন্তানও রক্ষণশীল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি; আর পরিবার উদারপন্থী হলে সন্তানও তাই হয় (Jennings & Niemi, 1974)।
নাগরিকত্ব ও মাতৃত্ব: নারীবাদী রাজনীতি
রাজনীতিতে নাগরিক বা সিটিজেন (Citizen) বলতে সাধারণত পুরুষকে বোঝানো হতো – যে যুদ্ধ করতে পারে এবং কর দিতে পারে। নারীদের ভূমিকা ছিল কেবল ‘ভবিষ্যৎ নাগরিক’ অর্থাৎ সৈন্যদের জন্ম দেওয়া। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক জিন বেথকে এলশটেইন (Jean Bethke Elshtain) দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র কীভাবে মাতৃত্বকে রাজনীতিকরণ করেছে। যুদ্ধের সময় মায়েদের বলা হয় ‘দেশপ্রেমিক মা’ যারা তাদের সন্তানদের দেশের জন্য উৎসর্গ করেন। একে বলা হয় রিপাবলিকান মাদারহুড (Republican Motherhood)। কিন্তু নারীবাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্র মায়েদের ত্যাগের প্রশংসা করে ঠিকই, কিন্তু তাদের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতায় বসতে দেয় না। পরিবারে নারীর সেবাকে রাষ্ট্র ‘ফ্রি’ বা মাগনা হিসেবে গ্রহণ করে। বর্তমানে কেয়ার পলিটিক্স (Care Politics) নামে একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে, শিশু ও বৃদ্ধদের সেবা করা বা ‘কেয়ারগিভিং’ হলো একটি রাজনৈতিক কাজ এবং রাষ্ট্রের উচিত একে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বেতন বা ভাতার ব্যবস্থা করা।
একনায়কতন্ত্র ও পরিবার: টোটালিটারিয়ান ভীতি
ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, একনায়কতান্ত্রিক বা টোটালিটারিয়ান (Totalitarian) রাষ্ট্রগুলো সবসময় পরিবারকে ভয় পেয়েছে এবং ধ্বংস করতে চেয়েছে। হিটলারের নাৎসি জার্মানি বা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্র চেয়েছিল মানুষের সবটুকু আনুগত্য যেন কেবল নেতার প্রতি থাকে, পরিবারের প্রতি নয়। হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তার The Origins of Totalitarianism-এ দেখিয়েছেন, টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্রগুলো শিশুদের গুপ্তচর হিসেবে ব্যবহার করত। শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কাছে নালিশ করত। জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসেও আমরা দেখি সন্তানরা কীভাবে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে ‘থট পুলিশ’-এর কাছে রিপোর্ট করছে। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু ভেঙে দেওয়া। আরেন্ট দেখালেন, পরিবার ধ্বংস হলে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তখন তাকে শাসন করা সহজ হয়। পরিবার হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের শেষ দুর্গ, কারণ এখানেই মানুষ রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডার বাইরে নিজেদের মতো করে সত্যকে জিইয়ে রাখে (Arendt, 1951)।
রক্ষণশীলতা বনাম উদারতাবাদ: পারিবারিক মূল্যবোধের রাজনীতি
বর্তমান রাজনীতির মাঠে ‘পরিবার’ একটি বড় ইস্যু। রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভ (Conservative) রাজনীতিবিদরা ‘পারিবারিক মূল্যবোধ’ বা ফ্যামিলি ভ্যালুজ (Family Values)-এর কথা বলেন। তাদের কাছে পরিবার মানে হলো ঐতিহ্যবাহী বাবা-মা ও সন্তানের সংসার। তারা গর্ভপাত, সমকামী বিবাহ বা ডিভোর্সের বিরোধিতা করেন, কারণ তারা মনে করেন এতে সমাজ নষ্ট হয়ে যাবে। দার্শনিক এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke) বিশ্বাস করতেন, পরিবার হলো সেই ছোট প্লাটুন (Little Platoon) যা আমাদের সমাজের প্রতি ভালোবাসা শেখায়। পরিবার ভেঙে গেলে রাষ্ট্রও ভেঙে পড়বে।
অন্যদিকে, উদারপন্থী বা লিবারেল (Liberal) এবং বামপন্থী রাজনীতিবিদরা পরিবারের বৈচিত্র্যকে সমর্থন করেন। তারা বলেন, রাষ্ট্রকে একক মা, সমকামী দম্পতি বা লিভ-ইন পার্টনারদেরও সমান অধিকার দিতে হবে। তাদের কাছে রাজনীতি হলো পরিবারের ওপর থেকে প্রথাগত বা ধর্মীয় বোঝা সরিয়ে তাকে মুক্ত করা। এই যে ‘পরিবার’ কী হবে – তা নিয়ে রাজনীতিতে যে দড়ি টানাটানি, তাকে বলা হয় কালচার ওয়ার (Culture War)। রাষ্ট্র তার আইন ও পলিসির মাধ্যমে ঠিক করে দিতে চায় কোন ধরণের পরিবার ‘বৈধ’ আর কোনটি ‘অবৈধ’।
রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতির এই আলোচনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরিবার কোনো নিরীহ বা অরাজনৈতিক স্থান নয়। এটি ক্ষমতার এক রণক্ষেত্র। রাষ্ট্র চায় পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাতে সুনাগরিক পাওয়া যায়, আর মানুষ চায় পরিবারকে আঁকড়ে ধরে রাষ্ট্রের চাপ থেকে বাঁচতে। পরিবারকে বুঝতে তাই রাজনীতির এই পাঠ অত্যন্ত জরুরি, কারণ আমাদের ড্রয়িংরুমের সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টের আইনের দ্বারাই প্রভাবিত হয়, আবার পার্লামেন্টের আইনগুলো তৈরি হয় আমাদের ড্রয়িংরুমের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই।
সোশ্যাল ওয়ার্ক ও পলিসি: যখন ঝড় আসে
লিও টলস্টয় তার বিখ্যাত উপন্যাস আন্না কারেনিনা-র শুরুতে লিখেছিলেন, “সব সুখী পরিবার একে অপরের মতো; কিন্তু প্রতিটি অসুখী পরিবার অসুখী তার নিজের মতো করে।” সমাজবিজ্ঞানীরা বা অর্থনীতিবিদরা সাধারণত ‘সুখী’ বা ‘স্বাভাবিক’ পরিবার কীভাবে চলে তার সাধারণ সূত্র খোঁজেন। কিন্তু সোশ্যাল ওয়ার্ক (Social Work) বা সমাজকর্ম ডিসিপ্লিন কাজ করে সেইসব পরিবারকে নিয়ে, যেখানে ঝড় এসেছে। সব পরিবার তো আর রূপকথার গল্পের মতো হয় না। কোথাও বাবা মদ খেয়ে মাকে পেটায়, কোথাও মা নেশা করে বাচ্চাকে রাস্তায় ফেলে রাখে, আবার কোথাও চরম দারিদ্র্যের কারণে বাবা-মা সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এই পরিবারগুলোকে বলা হয় ডিসফাংশনাল ফ্যামিলি (Dysfunctional Family) বা অকার্যকর পরিবার। সমাজকর্মীরা হলেন সেই ঝড়ের মাঝখানের নাবিক, যারা ডুবন্ত পরিবারগুলোকে তীরে তোলার চেষ্টা করেন। তারা কাজ করেন সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে – ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, চাইল্ড অ্যাবিউজ, মাদকাসক্তি এবং মানসিক অসুস্থতা। সমাজকর্ম এবং সোশ্যাল পলিসি (Social Policy) আমাদের দেখায়, যখন একটি পরিবার তার নিজের সদস্যদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্র এবং সমাজ কীভাবে ‘সেফটি নেট’ বা সুরক্ষা জাল বিছিয়ে তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসে।
আলফ্রেড ক্যাডুশিন ও চাইল্ড ওয়েলফেয়ার: শিশুর অধিকার
সমাজকর্মে পরিবার নিয়ে আলোচনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো চাইল্ড ওয়েলফেয়ার (Child Welfare) বা শিশু কল্যাণ। এই ক্ষেত্রের কিংবদন্তি তাত্ত্বিক হলেন আলফ্রেড ক্যাডুশিন (Alfred Kadushin)। তিনি তার ক্লাসিক বই Child Welfare Services-এ দেখালেন যে, শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো তার নিজের পরিবার। কিন্তু সব পরিবার শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। ক্যাডুশিন চাইল্ড ওয়েলফেয়ার সার্ভিসকে তিনটি স্তরে ভাগ করলেন, যা আজও সমাজকর্মের বাইবেল হিসেবে মানা হয়।
- প্রথমত, সাপোর্টিভ সার্ভিসেস (Supportive Services): যখন পরিবারে কোনো সমস্যা দেখা দেয় কিন্তু পরিবারটি এখনো ভেঙে পড়েনি, তখন সমাজকর্মী বা রাষ্ট্র তাদের সাহায্য করে। যেমন – পারিবারিক কাউন্সেলিং বা ফ্যামিলি থেরাপি দেওয়া, যাতে বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভালো হয় এবং শিশুটি তার নিজের ঘরেই থাকতে পারে।
- দ্বিতীয়ত, সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিসেস (Supplementary Services): যখন বাবা-মা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারছেন না, তখন রাষ্ট্র বা এনজিও আংশিক দায়িত্ব নেয়। যেমন – দরিদ্র মায়ের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা বা আর্থিক সাহায্য (Allowance) দেওয়া।
- তৃতীয়ত, সাবস্টিটিউট সার্ভিসেস (Substitute Services): এটি হলো শেষ উপায় বা লাস্ট রিসোর্ট। যখন শিশুর নিজের পরিবার তার জন্য এতটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে (যেমন – শারীরিক বা যৌন নির্যাতন), তখন শিশুকে ওই পরিবার থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও রাখা হয়। এটি হতে পারে ফস্টার কেয়ার (Foster Care) (অন্য কোনো পরিবারের কাছে রাখা) বা এতিমখানা (Institutional Care)।
ক্যাডুশিন ও তার সহলেখক জুডিথ মার্টিন (Judith Martin) দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য সবসময় হওয়া উচিত ফ্যামিলি প্রিজারভেশন (Family Preservation) বা পরিবারকে টিকিয়ে রাখা, কিন্তু শিশুর জীবনের বিনিময়ে নয় (Kadushin & Martin, 1988)।
চাইল্ড প্রোটেকশন ও অ্যাবিউজ: ঘরের ভেতরের শত্রু
সমাজকর্মীরা প্রতিদিন এমন সব ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। এর নাম চাইল্ড অ্যাবিউজ (Child Abuse) বা শিশু নির্যাতন। এটি চার ধরণের হতে পারে: শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, আবেগীয় নির্যাতন (যেমন – সবসময় বকাঝকা করা), এবং অবহেলা বা নেগলেক্ট (Neglect)। পরিসংখ্যান বলে, শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় তাদের নিজেদের ঘরে এবং পরিচিত মানুষের দ্বারা। আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে চাইল্ড প্রোটেকশন সার্ভিস (CPS) নামে শক্তিশালী সরকারি সংস্থা আছে। যদি কোনো প্রতিবেশী বা স্কুলের শিক্ষক সন্দেহ করেন যে কোনো শিশুকে নির্যাতন করা হচ্ছে, তবে তারা সিপিএস-কে জানাতে বাধ্য (Mandatory Reporting)। সমাজকর্মীরা তখন তদন্তে নামেন। একে বলা হয় রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (Risk Assessment)। তারা দেখেন শিশুটি কতটা ঝুঁকিতে আছে। যদি ঝুঁকি বেশি হয়, তবে আদালতের আদেশে শিশুকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এটি একটি অত্যন্ত কঠিন এবং বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত। কারণ, বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিশুর জন্য এক গভীর ট্রমা। সমাজকর্মীরা এখানে এক নৈতিক দোটানায় পড়েন: শিশুকে রক্ষা করা জরুরি, নাকি পরিবারের অখণ্ডতা রক্ষা করা জরুরি? আধুনিক সমাজকর্ম এখন ট্রমা-ইনফর্মড কেয়ার (Trauma-Informed Care)-এর ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে নির্যাতিত শিশুরা মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স: নীরব মহামারী
পরিবারের আরেকটি বড় অভিশাপ হলো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স (Domestic Violence) বা পারিবারিক সহিংসতা, যাকে এখন ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স (Intimate Partner Violence) বা আইপিভি (IPV) বলা হয়। সমাজকর্মীরা ভিক্টিমদের (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু) উদ্ধার করে শেল্টার হোম (Shelter Home)-এ নিয়ে যান। সেখানে তাদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং স্বাবলম্বী হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। লেনোর ওয়াকার (Lenore Walker) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, পারিবারিক সহিংসতা একটি চক্রের মতো চলে, একে তিনি বলেছেন সাইকেল অফ ভায়োলেন্স (Cycle of Violence)। প্রথমে উত্তেজনা বা টেনশন বাড়ে (Tension Building), তারপর মারধরের ঘটনা ঘটে (Acute Explosion), এবং শেষে নির্যাতনকারী ক্ষমা চায় এবং খুব ভালো ব্যবহার করে (Honeymoon Phase)। ভিক্টিম তখন ভাবে, “সে বুঝি বদলে গেছে” এবং আবার ফিরে আসে। কিন্তু কিছুদিন পর চক্রটি আবার শুরু হয় (Walker, 1979)। সমাজকর্মীদের কাজ হলো ভিক্টিমকে এই চক্র বা মায়াজাল বুঝতে সাহায্য করা এবং তাকে সেখান থেকে বের করে আনা। সমাজকর্মীরা এখন কেবল ভিক্টিমদের নিয়েই কাজ করেন না, তারা নির্যাতনকারীদের জন্যও ব্যাটারার ইন্টারভেনশন প্রোগ্রাম (Batterer Intervention Program) চালান, যাতে তারা নিজেদের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
দারিদ্র্য ও ফ্যামিলি পলিসি: রাষ্ট্রের ভূমিকা
পরিবার কেন ভাঙে বা কেন অসুস্থ হয়? সমাজকর্মীরা এর মূলে দেখতে পান দারিদ্র্যকে। যখন ঘরে খাবার থাকে না, তখন ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়। তাই সোশ্যাল পলিসি বা সামাজিক নীতি পরিবারের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের দেশগুলোতে, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে (যেমন – সুইডেন, নরওয়ে) রাষ্ট্র পরিবারের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ায়। একে বলা হয় ওয়েলফেয়ার স্টেট (Welfare State) বা কল্যাণ রাষ্ট্র। সেখানে বাবা এবং মা উভয়কেই দীর্ঘদিনের বেতনসহ ছুটি (Parental Leave) দেওয়া হয়, যাতে তারা সন্তানের যত্ন নিতে পারেন। এছাড়া রাষ্ট্র প্রতিটি শিশুর জন্য মাসিক ভাতা বা চাইল্ড বেনিফিট (Child Benefit) দেয়। সমাজবিজ্ঞানী গোস্টা এস্পিং-অ্যান্ডারসন (Gøsta Esping-Andersen) তার The Three Worlds of Welfare Capitalism বইতে দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের এই নীতিগুলো কীভাবে পরিবারের ধরণ এবং নারীদের কর্মসংস্থানকে প্রভাবিত করে (Esping-Andersen, 1990)। যে দেশে রাষ্ট্রের সাপোর্ট বেশি, সেখানে সিঙ্গেল মাদার বা একক মায়েরা দারিদ্র্যের মধ্যে না পড়েও সন্তান মানুষ করতে পারেন। আর আমেরিকার মতো দেশে যেখানে রাষ্ট্রের সাপোর্ট কম, সেখানে পরিবারগুলো বেশি অর্থনৈতিক চাপে থাকে এবং ভেঙে যায়। সমাজকর্মীরা তাই নীতিনির্ধারকদের কাছে অ্যাডভোকেসি করেন যাতে এমন আইন পাস হয় যা পরিবারকে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেয়।
ফস্টার কেয়ার ও অ্যাডপশন: নতুন ঠিকানার খোঁজে
যখন কোনো শিশুর নিজের পরিবার তাকে রাখতে পারে না বা চায় না, তখন সমাজকর্মীরা তার জন্য নতুন ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা করেন। এর প্রথম ধাপ হলো ফস্টার কেয়ার (Foster Care)। এখানে রাষ্ট্র কিছু স্বেচ্ছাসেবী পরিবারকে লাইসেন্স দেয় এবং টাকা দেয়, যাতে তারা ওই শিশুটিকে সাময়িকভাবে নিজেদের কাছে রাখে। উদ্দেশ্য হলো, ইতিমধ্যে শিশুটির নিজের বাবা-মায়ের সমস্যার সমাধান হলে (যেমন – নেশামুক্তি বা চাকরি পাওয়া) তাকে আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। একে বলা হয় রিইউনিফিকেশন (Reunification)। কিন্তু যদি সেটা সম্ভব না হয়, তবে সমাজকর্মীরা অ্যাডপশন (Adoption) বা দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। দত্তক মানে হলো শিশুটি চিরতরে আইনিভাবে নতুন পরিবারের সদস্য হয়ে গেল। সমাজকর্মে এখন একটি বড় বিতর্ক হলো ট্রান্সরেশিয়াল অ্যাডপশন (Transracial Adoption) – অর্থাৎ এক বর্ণের শিশুকে অন্য বর্ণের পরিবারে দেওয়া (যেমন – কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে শ্বেতাঙ্গ পরিবারে)। সমাজকর্মীরা দেখেন, এতে শিশুটি ভালোবাসা পেলেও তার নিজের সংস্কৃতি এবং পরিচয় হারিয়ে ফেলে কি না। তাই এখন চেষ্টা করা হয় শিশুর নিজের আত্মীয়-স্বজন বা কিনশিপ কেয়ার (Kinship Care)-এর ব্যবস্থা করতে, যাতে সে তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।
বার্ধক্য ও সোশ্যাল ওয়ার্ক: জীবনের শেষ প্রান্তে
পরিবার কেবল শিশুদের জন্য নয়, পরিবার বৃদ্ধদের জন্যও আশ্রয়। কিন্তু আধুনিক নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বয়স্কদের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। সোশ্যাল ওয়ার্কের একটি বিশেষ শাখা হলো জেরন্টোলজিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক (Gerontological Social Work)। এখানে সমাজকর্মীরা কাজ করেন একাকী, অসুস্থ বা অবহেলিত বয়স্কদের নিয়ে। অনেক সময় সন্তানরা বয়স্ক বাবা-মাকে দেখে না, বা তাদের সম্পত্তি লিখে নেওয়ার জন্য নির্যাতন করে। একে বলা হয় এল্ডার অ্যাবিউজ (Elder Abuse)। সমাজকর্মীরা তখন হস্তক্ষেপ করেন। তারা বয়স্কদের জন্য অ্যাসিস্টেড লিভিং (Assisted Living) বা ওল্ড হোম-এর ব্যবস্থা করেন, অথবা বাড়িতে গিয়ে সেবা দেওয়ার হোম কেয়ার (Home Care) সার্ভিসের আয়োজন করেন। রাষ্ট্রের পলিসি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন – সোশ্যাল সিকিউরিটি বা পেনশন স্কিম যদি ভালো থাকে, তবে বৃদ্ধরা পরিবারের ওপর বোঝা হন না এবং সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন। সমাজকর্মীরা প্রমাণ করেছেন যে, পরিবার বা রাষ্ট্র যদি বয়স্কদের সাপোর্ট দেয়, তবে তা পুরো সমাজের জন্যই লাভজনক।
রেজিলিয়েন্স ও স্ট্রেংথ-বেসড অ্যাপ্রোচ
একটা সময় সমাজকর্মীরা পরিবারকে দেখতেন কেবল সমস্যার খনি হিসেবে। তারা খুঁজতেন কোথায় কী সমস্যা আছে (Deficit Model)। কিন্তু এখন সমাজকর্মে এক বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা ফলো করেন স্ট্রেংথ-বেসড অ্যাপ্রোচ (Strengths-Based Approach)। তারা পরিবারকে জিজ্ঞেস করেন না, “তোমাদের সমস্যা কী?” বরং জিজ্ঞেস করেন, “তোমাদের শক্তি কী?” তারা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি পরিবারের ভেতরেই, তা যত গরিব বা ভাঙাচোরাই হোক না কেন, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বা রেজিলিয়েন্স (Resilience) আছে। সমাজবিজ্ঞানী ও থেরাপিস্ট ফ্রোমা ওয়ালশ (Froma Walsh) তার Strengthening Family Resilience বইতে দেখিয়েছেন, সংকটের সময় কিছু পরিবার কীভাবে ভেঙে না পড়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি বললেন, যেসব পরিবারে বিশ্বাসের ব্যবস্থা (Belief System) শক্ত, যারা খোলামেলা যোগাযোগ করে এবং যারা একে অপরকে সাপোর্ট দেয়, তারা যেকোনো ঝড় মোকাবেলা করতে পারে (Walsh, 2006)। সমাজকর্মীদের কাজ হলো বাইরে থেকে সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে, পরিবারের ভেতরের এই সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা।
সোশ্যাল ওয়ার্ক ও পলিসির এই জগতটা আমাদের শেখায় যে, পরিবার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি রক্ত-মাংসের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। যখন পরিবারের দেয়ালগুলো ধসে পড়ে, তখন সমাজকর্মী এবং রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে সেই অদৃশ্য সিমেন্ট, যা আবার সেই দেয়াল গড়তে সাহায্য করে। পরিবারকে বুঝতে এই প্র্যাকটিক্যাল বা প্রায়োগিক দিকটা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তত্ত্ব দিয়ে পেট ভরে না বা মারের দাগ মোছে না; তার জন্য দরকার কার্যকরী নীতি এবং মানবিক সহায়তা।
ভূগোল ও স্থানিক বিদ্যা: দূরত্ব ও নৈকট্য
আমরা যখন পরিবারের কথা ভাবি, তখন আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে একটি নির্দিষ্ট বাড়ি, একটি ছাদ, যার নিচে সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকছে। কিন্তু ভূগোলবিদরা (Geographers) যখন পরিবারের দিকে তাকান, তখন তারা এই ‘এক ছাদের নিচে’ থাকার ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করেন। তারা দেখেন স্পেস (Space) বা স্থান এবং প্লেস (Place) বা জায়গার ধারণা। ভূগোলবিদদের মতে, পরিবার কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়, পরিবার হলো একটি ভৌগোলিক বিন্যাস বা স্পেশিয়াল অ্যারেঞ্জমেন্ট (Spatial Arrangement)। মানুষ কোথায় থাকছে, কত দূরে থাকছে এবং সেই দূরত্বের মধ্যে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছে – এসবই আধুনিক পরিবারের চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। বিশেষ করে বিশ্বায়নের (Globalization) এই যুগে, যখন মানুষ কাজের জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটে বেড়াচ্ছে, তখন পরিবারের ভৌগোলিক সীমানা আর আগের মতো নেই। এখন পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানচিত্রের বিভিন্ন প্রান্তে। ভূগোল এবং স্থানিক বিদ্যা (Spatial Studies) আমাদের শেখায়, দূরত্ব এবং নৈকট্য কীভাবে পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতা এবং ধরণকে প্রভাবিত করে। এছাড়াও, ঘরের ভেতরের নকশা বা ‘আর্কিটেকচার’ কীভাবে পরিবারের সদস্যদের মেলামেশা নিয়ন্ত্রণ করে, তাও এই বিদ্যার এক চমকপ্রদ আলোচনার বিষয়।
ডরিন ম্যাসি ও গ্লোবাল সেন্স অফ প্লেস
আধুনিক ভূগোলের অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক ডরিন ম্যাসি (Doreen Massey) আমাদের ‘জায়গা’ বা প্লেস সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ A Global Sense of Place-এ তিনি বললেন, আগে মানুষ ভাবত ‘বাড়ি’ বা ‘হোম’ হলো একটি স্থির এবং নিরাপদ জায়গা, যার চারপাশে দেওয়াল তোলা আছে। কিন্তু আধুনিক যুগে এই দেওয়াল ভেঙে গেছে। এখন ‘বাড়ি’ বা পরিবার কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি নেটওয়ার্কের মতো ছড়িয়ে আছে। ম্যাসি একে বললেন টাইম-স্পেস কমপ্রেশন (Time-Space Compression) বা সময় ও স্থানের সংকোচন। প্রযুক্তির কারণে দূরত্ব কমে গেছে, ফলে মানুষ শারীরিকভাবে দূরে থেকেও মানসিকভাবে কাছে থাকতে পারছে। ম্যাসি দেখালেন, পরিবারের সদস্যরা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, তারা এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। তিনি যুক্তি দিলেন যে, স্থান বা জায়গাকে কোনো বাউন্ডারি বা সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না; স্থান হলো আসলে সোশ্যাল রিলেশনস (Social Relations) বা সামাজিক সম্পর্কের ছেদবিন্দু (Massey, 1994)। অর্থাৎ, দুবাইয়ের কোনো শ্রমিক যখন ঢাকায় তার স্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেন, তখন ওই টেলিফোন কলটিই একটি ‘স্পেস’ বা স্থান তৈরি করে, যেখানে তাদের দাম্পত্য জীবন টিকে থাকে।
ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যামিলি: সীমানা পেরোনো সংসার
ভূগোলবিদরা বর্তমান সময়ের পরিবারকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করছেন – ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যামিলি (Transnational Family) বা আন্তঃদেশীয় পরিবার। এর মানে হলো, পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে বসবাস করে, কিন্তু তারা একে অপরের প্রতি দায়িত্ব পালন করে এবং একটি ‘পরিবার’ হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেয়। যেমন – বাবা হয়তো মালয়েশিয়ায় শ্রমিকের কাজ করছেন, মা বাংলাদেশে গ্রামের বাড়িতে সন্তানদের বড় করছেন, আর বড় ভাই লন্ডনে পড়াশোনা করছে। তারা শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু অর্থনৈতিক এবং মানসিকভাবে সংযুক্ত। এই পরিবারগুলো টিকে থাকে রেমিটেন্স (Remittance) এবং প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে। ভূগোলবিদরা একে বলছেন গ্লোবাল কেয়ার চেইন (Global Care Chain)। মায়েরা যখন উন্নত বিশ্বে গিয়ে ন্যানি বা আয়ার কাজ করেন এবং নিজের সন্তানকে দেশে রেখে যান, তখন তৈরি হয় এক অদ্ভুত শূন্যতা।
গবেষক রোবা সালহা (Rhacel Parreñas) ফিলিপাইনের অভিবাসী নারীদের ওপর কাজ করে দেখিয়েছেন যে, এই মায়েরা স্কাইপ বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে হাজার মাইল দূর থেকেও ‘মাদারিং’ বা মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন। একে তিনি বলেছেন ট্রান্সন্যাশনাল মাদারিং (Transnational Mothering)। মায়েরা ভিডিও কলে বাচ্চার হোমওয়ার্ক চেক করেন, শাসন করেন, এমনকি বাচ্চার কান্না থামানোর চেষ্টা করেন। ভূগোলবিদরা একে দেখছেন ভার্চুয়াল ইনটিমেসি (Virtual Intimacy) বা ভার্চুয়াল ঘনিষ্ঠতা হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্ক্রিনের ওপর ভেসে ওঠা ভালোবাসা কি সত্যিকারের স্পর্শের অভাব পূরণ করতে পারে? গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রান্সন্যাশনাল পরিবারে বাচ্চারা অনেক সময় বাবাকে ‘টাকা পাঠানোর মেশিন’ (ATM Father) হিসেবে দেখে এবং বাবার সাথে তাদের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। এই ভৌগোলিক বিচ্ছেদ পরিবারের সংজ্ঞাকে নতুন করে লিখছে।
ডোমেস্টিক স্পেস: ঘরের রাজনীতি
ভূগোলবিদরা কেবল আন্তর্জাতিক সীমানা নিয়েই ভাবেন না, তারা ভাবেন ঘরের ভেতরের সীমানা নিয়েও। একে বলা হয় মাইক্রো-জিওগ্রাফি অফ হোম (Micro-geography of Home)। আমাদের ঘরের নকশা বা ফ্লোর প্ল্যান আমাদের পারিবারিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন – ভিক্টোরিয়ান যুগের বাড়িগুলোতে ড্রয়িংরুম বা বৈঠকখানা থাকত একদম সামনে, যেখানে অতিথিরা আসত। আর রান্নাঘর থাকত বাড়ির পেছনের দিকে, লোকচক্ষুর আড়ালে। কেন? কারণ তৎকালীন সমাজ মনে করত, রান্না করা বা ধোয়ামোছা হলো ‘নোংরা’ কাজ যা নারীরা করবে এবং তা লুকিয়ে রাখা উচিত। ভূগোলবিদ ড্যাফনি স্পেন (Daphne Spain) তার Gendered Spaces বইতে দেখিয়েছেন যে, আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য কীভাবে লিঙ্গ বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে। তিনি যুক্তি দিলেন, যেসব বাড়িতে নারীদের জন্য আলাদা এবং গোপন জায়গা (যেমন – জেনানা মহল বা অন্দরমহল) রাখা হয়, সেসব সমাজে নারীদের সামাজিক ক্ষমতা বা স্ট্যাটাস কম থাকে। কারণ গোপনীয়তা বা সেগ্রিগেশন (Segregation) মানেই হলো জ্ঞান এবং তথ্য থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা (Spain, 1992)।
আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারে আবার অন্য চিত্র দেখা যায়। এখানে ‘ওপেন কিচেন’ বা খোলা রান্নাঘরের ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। এর ফলে মা যখন রান্না করেন, তখন তিনি ড্রয়িংরুমে বসে থাকা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে কথা বলতে পারেন। এই ভৌগোলিক পরিবর্তন বা স্পেশিয়াল চেঞ্জ (Spatial Change) পরিবারের যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করছে। আবার টিনএজারদের জন্য আলাদা বেডরুমের ধারণা বা ‘প্রাইভেট স্পেস’ পরিবারের মধ্যে এক ধরণের দূরত্ব বা ইনডিভিজুয়ালাইজেশন (Individualization) তৈরি করছে। আগে সবাই এক ঘরে বা এক বিছানায় ঘুমাত, এখন সবাই আলাদা ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে। ভূগোলবিদরা বলেন, দেয়াল এবং দরজা কেবল ইট-কাঠের বিষয় নয়, এগুলো সম্পর্কেরও দেয়াল। ঘরের ভেতরের এই স্পেস বা স্থানের ব্যবহার বলে দেয় ওই পরিবারে কার ক্ষমতা কতটুকু। যার ঘর সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর, সেই সাধারণত পরিবারের কর্তা।
জেন্ট্রিফিকেশন ও স্থানচ্যুতি: পরিবার যখন উদ্বাস্তু
শহুরে ভূগোলের (Urban Geography) একটি বড় বিষয় হলো জেন্ট্রিফিকেশন (Gentrification)। এর মানে হলো, শহরের পুরনো বা গরিব এলাকাগুলো ভেঙে সেখানে ধনীদের জন্য দালানকোঠা বা শপিং মল তৈরি করা। এর ফলে সেখানে বসবাসরত নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো উচ্ছেদ হয় এবং তাদের শহরের প্রান্তে বা বস্তিতে চলে যেতে হয়। একে বলা হয় ডিসপ্লেসমেন্ট (Displacement) বা স্থানচ্যুতি। ভূগোলবিদরা দেখিয়েছেন, এই স্থানচ্যুতি পরিবারের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একটি পরিবার যখন তার পুরনো পাড়া ছেড়ে নতুন জায়গায় যায়, তখন তারা কেবল ঘর হারায় না, তারা হারায় তাদের সামাজিক নেটওয়ার্ক। পাড়ার প্রতিবেশী, যারা বিপদে-আপদে সাহায্য করত, বা বাচ্চার দেখাশোনা করত, তারা আর থাকে না। এর ফলে পরিবারটি একা এবং অসহায় হয়ে পড়ে।
গবেষক লরেটা লিস (Loretta Lees) জেন্ট্রিফিকেশনের সামাজিক মূল্যের ওপর কাজ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, শহরের উন্নয়নের নামে গরিব পরিবারগুলোকে বারবার বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে, যা তাদের পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে। নতুন জায়গায় গিয়ে কাজের অভাব, যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে পরিবারগুলোতে কলহ এবং বিচ্ছেদ বাড়ছে। ভূগোল আমাদের শেখায়, পরিবার টিকে থাকার জন্য শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়, দরকার একটি স্থিতিশীল মাটি বা ‘গ্রাউন্ড’, যেখানে তারা শেকড় গাড়তে পারে। আবাসন সংকট বা হাউজিং ক্রাইসিস (Housing Crisis) তাই আধুনিক পরিবারের অন্যতম বড় শত্রু।
রুরাল বনাম আরবান: গ্রাম ও শহরের পরিবার
ভূগোলবিদরা গ্রাম (Rural) এবং শহর (Urban) ভেদে পরিবারের পার্থক্য নিয়েও কাজ করেন। গ্রামের পরিবারগুলো সাধারণত হয় এক্সটেন্ডেড (Extended) বা যৌথ, কারণ কৃষি কাজের জন্য বেশি মানুষের দরকার হয় এবং জমির মালিকানা পরিবারকে একসাথে ধরে রাখে। সেখানে বাড়িগুলো এমনভাবে তৈরি হয় যাতে সবাই উঠোনে বা বারান্দায় একসাথে বসতে পারে। একে বলা হয় কমিউনাল স্পেস (Communal Space)। অন্যদিকে, শহরের পরিবারগুলো হয় নিউক্লিয়ার (Nuclear) বা একক। শহরের ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে জায়গার অভাব বা স্পেস ক্রঞ্চ (Space Crunch) থাকায় মানুষ চাইলেও যৌথ পরিবারে থাকতে পারে না।
ভূগোলবিদরা দেখিয়েছেন, শহরের জনাকীর্ণ বা ঘিঞ্জি পরিবেশ (Crowding) পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। যখন একটি ছোট ঘরে ৫-৬ জন মানুষ থাকে, তখন তাদের কোনো প্রাইভেসি থাকে না, যার ফলে খিটখিটে মেজাজ এবং ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বাড়ে। একে বলা হয় এনভায়রনমেন্টাল স্ট্রেস (Environmental Stress)। আবার শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ন বা আরবান স্প্রল (Urban Sprawl)-এর ফলে বাবা-মাকে কাজের জন্য দীর্ঘ সময় জ্যামে বা যাতায়াতে কাটাতে হয়। এই কমিউটিং টাইম (Commuting Time) পরিবারের কোয়ালিটি টাইম কেড়ে নেয়। রবার্ট পাটনাম (Robert Putnam) তার Bowling Alone বইতে দেখিয়েছেন, মানুষ যাতায়াতে যত বেশি সময় ব্যয় করে, তার সামাজিক এবং পারিবারিক জীবন তত বেশি সংকুচিত হয় (Putnam, 2000)। অর্থাৎ, শহরের ভূগোল আমাদের পারিবারিক সময়কে চুরি করে নিচ্ছে।
ইমোশনাল জিওগ্রাফি: অনুভূতির মানচিত্র
ভূগোলের একটি নতুন এবং আকর্ষণীয় শাখা হলো ইমোশনাল জিওগ্রাফি (Emotional Geography)। এটি দেখে, স্থান বা জায়গার সাথে আমাদের আবেগ কীভাবে জড়িয়ে আছে। আমাদের ছোটবেলার বাড়ি, মামাবাড়ি, বা প্রথম প্রেমিকার সাথে দেখা করার পার্ক – এই জায়গাগুলো আমাদের কাছে কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়, এগুলো হলো অনুভূতির আধার। ভূগোলবিদরা একে বলেন সেন্স অফ প্লেস (Sense of Place)। মানুষ যখন ডিভোর্স দেয় বা বাড়ি বিক্রি করে চলে যায়, তখন তারা এক ধরণের শোক অনুভব করে, যাকে বলা হয় টপোসিলিয়া (Topophilia) বা স্থানের প্রতি ভালোবাসা হারানোর বেদনা। ইমোশনাল জিওগ্রাফাররা দেখান, পরিবার হলো এমন একটি জায়গা যেখানে আমরা ‘নিরাপদ’ বোধ করি। কিন্তু যাদের পরিবারে নির্যাতন আছে, তাদের কাছে ‘বাড়ি’ হলো ভয়ের জায়গা। অর্থাৎ, একই ভৌগোলিক স্থান কারো জন্য স্বর্গ, কারো জন্য নরক। নারী ও শিশুদের জন্য রাতের শহর বা নির্জন রাস্তা যেমন ভয়ের ভূগোল তৈরি করে, তেমনি পারিবারিক নির্যাতন ঘরের ভেতর ভয়ের ভূগোল তৈরি করে। এই ‘ভয়ের ভূগোল’ বা জিওগ্রাফি অফ ফিয়ার (Geography of Fear) পরিবারের সদস্যদের চলাফেরা এবং মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ডিজিটাল স্পেস: নতুন উঠোন
আগে পরিবারের সদস্যরা বিকেলে উঠোনে বসে আড্ডা দিত। এখন সেই উঠোন উঠে গেছে, তার জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল স্পেস (Digital Space) বা সাইবার জগত। ফেসবুকের গ্রুপ চ্যাট বা হোয়াটসঅ্যাপের ফ্যামিলি গ্রুপই এখন নতুন ‘ভার্চুয়াল লিভিং রুম’। ভূগোলবিদরা দেখছেন, এই ডিজিটাল স্পেস পরিবারের সীমানাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন একজন টিনএজার নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকলেও সে আসলে একা নয়, সে হয়তো ইন্টারনেটে তার বন্ধুদের সাথে বা গেমিং কমিউনিটির সাথে যুক্ত। একে বলা হচ্ছে প্রাইভেটাইজেশন অফ স্পেস (Privatization of Space)। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে এক ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা ডিজিটাল গ্রহে বা ‘বাবল’-এ বসবাস করছে। এই ডিজিটাল দূরত্বের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়া কমে যাচ্ছে, যা পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিতে পারে। ভূগোলবিদরা একে বলছেন দ্য ডেথ অফ ডিসটেন্স বাট দ্য বার্থ অফ আইসোলেশন (The Death of Distance but the Birth of Isolation) – দূরত্ব মরে গেছে ঠিকই, কিন্তু একাকীত্বের জন্ম হয়েছে।
ভূগোল ও স্থানিক বিদ্যার এই আলোচনা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, পরিবার কোনো শূন্যে ভাসমান ধারণা নয়। পরিবার মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান, যা স্থান, কাল এবং দূরত্বের নিয়মে চলে। মাইগ্রেশন, নগরায়ন, এবং ঘরের নকশা – এই ভৌগোলিক উপাদানগুলো আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের ধরণকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। পরিবারকে বুঝতে তাই ভূগোলের এই জ্ঞান অপরিহার্য, কারণ আমরা কোথায় থাকি এবং কীভাবে থাকি, তা ঠিক করে দেয় আমরা একে অপরের সাথে কেমন সম্পর্ক রাখি।
জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: জিন ও জীবাণু
আমরা যখন অসুস্থ হই, তখন ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার আমাদের ওষুধ দেন, আমরা সুস্থ হই। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান (Medical Science) এবং জনস্বাস্থ্য (Public Health) বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের রোগবালাইয়ের মূল উৎস কোনো হাসপাতাল বা ফার্মেসি নয়, বরং আমাদের নিজের পরিবার। পরিবার হলো আমাদের স্বাস্থ্যের আঁতুড়ঘর। এখানেই আমরা প্রথম শ্বাস নিই, প্রথম খাবার খাই এবং প্রথম অভ্যাসগুলো গড়ে তুলি। আমাদের শরীর এবং মনের ভালো-মন্দের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের জিনে (Gene) এবং আমাদের জীবনাচরণে (Lifestyle), যার দুটোই আমরা পাই আমাদের পরিবার থেকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার হলো হেলথ ইউনিট (Health Unit) বা স্বাস্থ্য একক। একজন ব্যক্তির উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা মানসিক অবসাদ – এগুলো কেবল তার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এগুলো হলো তার পারিবারিক ইতিহাস এবং পারিবারিক পরিবেশের ফসল। আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্র তাই এখন রোগীকে একা না দেখে, তাকে তার পরিবারের প্রেক্ষাপটে বা ফ্যামিলি কনটেক্সট (Family Context)-এ দেখার ওপর জোর দিচ্ছে। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে জিন এবং জীবাণুর পাশাপাশি পরিবারের অভ্যাস, বিশ্বাস এবং সাপোর্ট আমাদের আয়ু এবং আরোগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।
জেনেটিক্স ও ফ্যামিলি হিস্ট্রি: রক্তের উত্তরাধিকার
চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি কথা খুব প্রচলিত – “জিন বন্দুকের গুলি লোড করে, আর পরিবেশ ট্রিগার চাপে।” অর্থাৎ, আমরা আমাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে ডিএনএ (DNA)-র মাধ্যমে কিছু রোগের ঝুঁকি উত্তরাধিকার সূত্রে পাই। একে বলা হয় জেনেটিক প্রিডিসপোজিশন (Genetic Predisposition)। থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, বা সিস্টিক ফিব্রোসিসের মতো রোগগুলো সরাসরি জিনের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হয়। একে বলা হয় মেন্ডেলিয়ান ইনহেরিটেন্স (Mendelian Inheritance)। ডাক্তাররা যখন কোনো রোগীর চিকিৎসা শুরু করেন, তখন প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, “আপনার পরিবারে কি এই রোগ আগে কারো ছিল?” একে বলা হয় ফ্যামিলি মেডিকেল হিস্ট্রি (Family Medical History)।
আধুনিক জিনোমিক্স (Genomics) গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল বিরল রোগ নয়, হৃৎরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, এমনকি স্তন ক্যান্সার বা কোলন ক্যান্সারের মতো জটিল রোগগুলোর পেছনেও পারিবারিক জিনের বড় ভূমিকা আছে। যেমন – বিখ্যাত অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি তার স্তন কেটে ফেলেছিলেন (Mastectomy) কারণ তার শরীরে BRCA1 জিনের মিউটেশন ছিল, যা তিনি তার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন এবং যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিবার তাই কেবল সম্পত্তি বা পদবী হস্তান্তর করে না, পরিবার আমাদের মৃত্যুঝুঁকিও হস্তান্তর করে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান এও বলে যে, জিন মানেই ভাগ্য নয়। সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে জিনের এই কুপ্রভাব বা ‘এক্সপ্রেশন’ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যাকে বলা হয় এপিজেনেটিক্স (Epigenetics)। অর্থাৎ, পরিবার আমাদের যেমন ঝুঁকিতে ফেলে, তেমনি বাঁচার উপায়ও বাতলে দিতে পারে।
বায়োসাইকোসোশ্যাল মডেল: শরীর, মন ও সমাজ
একটা সময় চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষকে দেখত কেবল হাড়-মাংসের যন্ত্র হিসেবে। একে বলা হতো বায়োমেডিক্যাল মডেল (Biomedical Model)। কিন্তু ১৯৭৭ সালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জর্জ অ্যাঞ্জেল (George Engel) এক বৈপ্লবিক ধারণা নিয়ে এলেন, যার নাম বায়োসাইকোসোশ্যাল মডেল (Biopsychosocial Model)। তিনি বললেন, কোনো মানুষকে সুস্থ করতে হলে কেবল তার জীববিদ্যা বা বায়োলজি (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া) জানলে হবে না, জানতে হবে তার মনস্তত্ত্ব (সাইকোলজি) এবং তার সামাজিক পরিবেশ (সোশ্যাল)। আর এই সামাজিক পরিবেশের কেন্দ্রবিন্দু হলো পরিবার। অ্যাঞ্জেল দেখালেন, একজন হার্ট অ্যাটাকের রোগী কতটা দ্রুত সুস্থ হবে, তা নির্ভর করে সে হাসপাতালে কতটা দামী ওষুধ পাচ্ছে তার ওপর নয়, বরং বাড়ি ফিরে সে পরিবারের কাছ থেকে কতটা মানসিক সাপোর্ট বা সেবা পাচ্ছে তার ওপর (Engel, 1977)।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগীর পরিবার তাদের পাশে থাকে, ওষুধ খাইয়ে দেয় এবং সাহস যোগায়, তাদের মৃত্যুহার বা মরটালিটি রেট (Mortality Rate) একা থাকা রোগীদের চেয়ে অনেক কম। আবার উল্টোটাও সত্য। পরিবারের কলহ বা স্ট্রেস অনেক রোগের কারণ হতে পারে। যেমন – দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ বা ম্যারিটাল কনফ্লিক্ট (Marital Conflict) শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম (Immune System)-কে দুর্বল করে দেয় এবং ক্ষত শুকাতে দেরি করায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় সাইকোনিউরোইমিউনোলজি (Psychoneuroimmunology)। অর্থাৎ, পরিবারের ঝগড়া কেবল মন খারাপ করায় না, তা শরীরকেও অসুস্থ করে। তাই আধুনিক ডাক্তাররা এখন কেবল রোগীকে প্রেসক্রিপশন দেন না, তারা রোগীর পরিবারের সদস্যদেরও কাউন্সিলিং করেন, যাতে তারা রোগীর জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য আচরণ ও সামাজিকীকরণ: অভ্যাসের দাস
জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্য হলো অভ্যাসের সমষ্টি। আমরা কী খাই, কতটা ঘুমাই, ব্যায়াম করি কি না – এসবই ঠিক করে দেয় আমরা কতটা সুস্থ থাকব। আর এই অভ্যাসগুলো আমরা শিখি পরিবার থেকে। একে বলা হয় হেলথ সোশ্যালাইজেশন (Health Socialization)। বাবা-মা যদি ফাস্টফুড বা চিনিযুক্ত পানীয় বেশি খান, তবে সন্তানরাও সেই খাদ্যাভ্যাস রপ্ত করবে এবং ছোটবেলাতেই ওবেসিটি বা স্থূলতার শিকার হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) শিশু ওবেসিটিকে একুশ শতকের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যার মূল কারণ হলো পরিবারের অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল।
আবার বাবা-মা যদি ধুমপায়ী হন, তবে সন্তানরা কেবল ধুমপানে উৎসাহিত হয় না, তারা নিজেরাও প্যাসিভ স্মোকিং (Passive Smoking) বা পরোক্ষ ধুমপানের শিকার হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধুমপায়ী বাবার সন্তানদের হাঁপানি, ব্রংকাইটিস এবং নিউমোনিয়ার ঝুঁকি অধুমপায়ী বাবার সন্তানদের চেয়ে অনেক বেশি। একইভাবে, মদ্যপান বা মাদকাসক্তিও একটি ‘পারিবারিক রোগ’। অ্যালকোহলিক বা মদ্যপ বাবার সন্তানরা জিনগতভাবে এবং পরিবেশগতভাবে ভবিষ্যতে মদ্যপ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে বলেন ইন্টারজেনারেশনাল ট্রান্সমিশন অফ হেলথ বিহেভিয়ার (Intergenerational Transmission of Health Behavior)। পরিবার হলো সেই স্কুল যেখানে আমরা সুস্থ থাকা বা অসুস্থ হওয়ার পাঠ গ্রহণ করি। তাই জনস্বাস্থ্যের যেকোনো ক্যাম্পেইন (যেমন – হাত ধোয়া বা টিকা দেওয়া) সফল করতে হলে পরিবারকে টার্গেট করতে হয়।
ইনফ্যান্ট মর্টালিটি ও মায়ের স্বাস্থ্য
জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সূচক হলো ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট (Infant Mortality Rate) বা শিশু মৃত্যুহার। একটি দেশে প্রতি হাজার জন্মে কতটি শিশু এক বছর বয়সের আগে মারা যায়, তা দিয়ে বোঝা যায় ওই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং পরিবারের অবস্থা কেমন। গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের শিক্ষা এবং পরিবারের আয় শিশু মৃত্যুর সাথে সরাসরি জড়িত। শিক্ষিত মায়েরা জানেন কখন শিশুকে টিকা দিতে হবে, কখন ডাক্তারের কাছে নিতে হবে এবং কী খাওয়াতে হবে। একে বলা হয় ম্যাটারনাল হেলথ লিটারেসি (Maternal Health Literacy)। পরিবারে নারীর ক্ষমতা বা উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট (Women’s Empowerment) ও শিশুর স্বাস্থ্যের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। যেসব পরিবারে নারীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন (যেমন – টাকা খরচ করা বা ডাক্তারের কাছে যাওয়া), সেসব পরিবারে শিশুর পুষ্টির অবস্থা ভালো থাকে।
আবার বার্থ স্পেসিং (Birth Spacing) বা দুই সন্তানের মধ্যে বয়সের ব্যবধানও খুব জরুরি। পরিবার পরিকল্পনার অভাবে যদি ঘন ঘন সন্তান নেওয়া হয়, তবে মা এবং শিশু উভয়েরই স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। জনস্বাস্থ্য বিদ্যা আমাদের শেখায় যে, পরিবার পরিকল্পনা বা কন্ট্রাসেপশন কেবল জনসংখ্যা কমানোর জন্য নয়, এটি মা ও শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য। ডেভিড বার্কার (David Barker) তার বিখ্যাত ফিটাল অরিজিনস হাইপোথিসিস (Fetal Origins Hypothesis)-এ দেখিয়েছেন যে, মায়ের পেটে থাকার সময় ভ্রূণ যদি ঠিকমতো পুষ্টি না পায় (মায়ের দারিদ্র্য বা অপুষ্টির কারণে), তবে ওই শিশুটি বড় হয়ে ডায়াবেটিস বা হৃৎরোগে আক্রান্ত হতে পারে (Barker, 1990)। অর্থাৎ, আমাদের স্বাস্থ্যের ভাগ্যলিপি লেখা শুরু হয় জন্মের আগেই, মায়ের গর্ভে এবং পরিবারের হাড়িতে।
কেয়ারগিভিং বা সেবাদান: বোঝা নাকি ভালোবাসা?
পরিবারের একটি প্রধান কাজ হলো অসুস্থ ও বয়স্ক সদস্যদের সেবা করা। একে বলা হয় ইনফরমাল কেয়ারগিভিং (Informal Caregiving)। হাসপাতাল বা নার্সিং হোম হলো ফরমাল কেয়ার, কিন্তু পৃথিবীর ৮০-৯০ শতাংশ সেবা দেওয়া হয় পরিবারের সদস্যদের দ্বারা, বিশেষ করে নারীদের দ্বারা। আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বয়স্ক বাবা-মায়ের সেবা করা বা অটিস্টিক শিশুর যত্ন নেওয়া – এটি একটি ২৪ ঘণ্টার ডিউটি। এই সেবা দিতে গিয়ে কেয়ারগিভার বা সেবাদানকারীরা নিজেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একে বলা হয় কেয়ারগিভার বার্নআউট (Caregiver Burnout) বা কেয়ারগিভার স্ট্রেস সিনড্রোম (Caregiver Stress Syndrome)।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী কেয়ারগিভারদের মধ্যে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং উচ্চ রক্তচাপের হার সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘লুক্কায়িত স্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্র যদি এই কেয়ারগিভারদের সাপোর্ট না দেয় (যেমন – রিসপাইট কেয়ার বা সাময়িক ছুটির ব্যবস্থা), তবে পরিবার নামক এই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়তে পারে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে পরিবারগুলো আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনে থেকে একে অপরের সেবা করেছে। হাসপাতাল যখন ফেল করেছে, তখন পরিবারই হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। এটি প্রমাণ করে যে, পরিবার হলো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রথম এবং শেষ প্রতিরক্ষা ব্যূহ।
মেন্টাল হেলথ ও পরিবার: পাগল করার কল
মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে পরিবারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং জটিল। একদিকে পরিবার মানসিক প্রশান্তি দেয়, অন্যদিকে পরিবারই মানসিক রোগের কারণ হতে পারে। স্কটিশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আর. ডি. লেইং (R. D. Laing) তার অ্যান্টি-সাইকায়াট্রি মুভমেন্টের সময় বলেছিলেন, পরিবার হলো এক ধরণের ‘গ্যাস চেম্বার’, যেখানে শিশুদের স্বকীয়তা মেরে ফেলা হয় এবং তাদের পাগল বানানো হয়। বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগের ক্ষেত্রে পরিবারের যোগাযোগ ব্যবস্থা বা কমিউনিকেশন প্যাটার্ন-এর ভূমিকা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এক্সপ্রেসড ইমোশন (Expressed Emotion) বা ইই (EE) হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। গবেষকরা দেখেছেন, সিজোফ্রেনিয়া থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীরা যদি এমন পরিবারে থাকে যেখানে ইমোশনাল টেম্পারেচার খুব হাই (খুব বেশি সমালোচনা বা খুব বেশি তদারকি), তবে তাদের রোগ আবার ফিরে আসার বা রিল্যাপ্স (Relapse) হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় (Brown et al., 1972)। তাই মানসিক রোগের চিকিৎসায় এখন কেবল রোগীকে ওষুধ দেওয়া হয় না, পুরো পরিবারকে ফ্যামিলি সাইকো-এডুকেশন (Family Psycho-education) দেওয়া হয়, যাতে তারা রোগীর সাথে ঠিকমতো মিশতে পারে।
সংক্রামক ব্যাধি ও পারিবারিক ক্লাস্টার
কোভিড-১৯ বা যক্ষ্মার মতো সংক্রামক ব্যাধিগুলো পরিবারের মাধ্যমেই সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়। একে বলা হয় হাউজহোল্ড ট্রান্সমিশন (Household Transmission)। একই ছাদের নিচে থাকা, একই বাথরুম বা তোয়ালে ব্যবহার করা – এসবের কারণে পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে বাকিদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১০০%। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে বলেন ক্লাস্টারিং (Clustering)। মহামারী নিয়ন্ত্রণে তাই ‘লকডাউন’ বা ‘হোম কোয়ারেন্টিন’-এর নীতি নেওয়া হয়, যা মূলত পরিবারকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে বা বস্তিতে যেখানে এক ঘরে ৫-৭ জন থাকে, সেখানে এই নীতি কাজ করে না। উল্টো পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। জনস্বাস্থ্য এবং হাউজিং বা আবাসন ব্যবস্থার এই সংযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাস্থ্যকর পরিবার গড়তে হলে স্বাস্থ্যকর বাসস্থান অপরিহার্য।
জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই আলোচনা আমাদের দেখায় যে, পরিবার কেবল সমাজ বা অর্থনীতির একক নয়, এটি একটি জীবতাত্ত্বিক এককও বটে। আমাদের জিন, আমাদের জীবাণু এবং আমাদের জীবনযাত্রার অভ্যাস – সবই পরিবারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। পরিবার নিয়ে আলোচনায় এই বায়ো-মেডিক্যাল দিকটি খুব জরুরি, কারণ একটি সুস্থ পরিবার ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন করা অসম্ভব। জনস্বাস্থ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের যত্ন নেওয়া মানেই জাতির স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া।
শিক্ষা ও প্যারেন্টিং: মানুষ গড়ার কারিগর
একটি প্রবাদ আছে – “একটি শিশুকে বড় করতে পুরো গ্রামের দরকার হয়।” কিন্তু আধুনিক যুগে সেই ‘গ্রাম’ হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে কেবল পরিবার এবং স্কুল। শিশুর শিক্ষার ভিত্তি কোথায় রচিত হয়? ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে নাকি বাড়ির ডিনার টেবিলে? শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা (Educational Psychologists) এবং গবেষকরা একমত যে, স্কুল যতই ভালো হোক না কেন, পরিবারের পরিবেশ যদি শিক্ষার অনুকূল না হয়, তবে শিশুর মেধার পূর্ণ বিকাশ অসম্ভব। পরিবার হলো শিশুর প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী পাঠশালা। আর বাবা-মা হলেন সেই পাঠশালার প্রধান শিক্ষক। তারা শিশুকে কেবল অ-আ-ক-খ শেখান না, তারা শেখান কীভাবে শিখতে হয়, কীভাবে কৌতূহলী হতে হয় এবং কীভাবে ব্যর্থতাকে মেনে নিতে হয়। প্যারেন্টিং (Parenting) বা সন্তান লালন-পালন কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি একটি শিল্প এবং বিজ্ঞান। বাবা-মা কীভাবে সন্তানের সাথে কথা বলেন, কতটা সময় দেন, কতটা শাসন করেন – এই সবকিছুর ওপর নির্ভর করে সন্তান ভবিষ্যতে একজন সফল মানুষ হবে, নাকি হারিয়ে যাবে। এখন আমরা দেখব, প্যারেন্টিং স্টাইল এবং বাড়ির পরিবেশ কীভাবে সন্তানের শিক্ষাজীবনের ভাগ্যলিপি লিখে দেয়।
ডায়ানা বাউমরিন্ড ও প্যারেন্টিং স্টাইল: শাসনের জ্যামিতি
প্যারেন্টিং নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেছেন আমেরিকান ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজিস্ট ডায়ানা বাউমরিন্ড (Diana Baumrind)। ১৯৬০-এর দশকে তিনি শিশুদের আচরণ এবং তাদের বাবা-মায়ের ব্যবহারের ওপর এক বিশাল গবেষণা চালান। তিনি লক্ষ্য করলেন, বাবা-মায়ের আচরণের দুটি প্রধান দিক বা ‘ডাইমেনশন’ আছে: ১. ডিমান্ডিংনেস (Demandingness) বা দাবি (বাবা-মা সন্তানের কাছ থেকে কতটা নিয়মশৃঙ্খলা আশা করেন) এবং ২. রেসপন্সিভনেস (Responsiveness) বা সাড়া দেওয়া (বাবা-মা সন্তানের আবেগের প্রতি কতটা যত্নশীল)। এই দুটির কম-বেশির ওপর ভিত্তি করে তিনি প্যারেন্টিং স্টাইলকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করলেন (পরে ম্যাকোবি ও মার্টিন চতুর্থটি যোগ করেন) (Baumrind, 1967)।
- প্রথমত, অথরিটারিয়ান (Authoritarian) বা স্বৈরাচারী প্যারেন্টিং। এখানে বাবা-মায়ের নীতি হলো – “আমি বলেছি তাই করবে” (Because I said so)। এখানে ডিমান্ডিংনেস খুব বেশি, কিন্তু রেসপন্সিভনেস খুব কম। নিয়ম খুব কড়া, ভুল করলে শাস্তি অবধারিত, কিন্তু কেন এই নিয়ম তা বুঝিয়ে বলা হয় না। এই পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা সাধারণত বাধ্যগত হয় এবং স্কুলে ভালো রেজাল্ট করে, কিন্তু তাদের আত্মবিশ্বাস বা সেলফ-এস্টিম (Self-Esteem) কম থাকে। তারা খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় এবং বড় হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়।
- দ্বিতীয়ত, পারমিসিভ (Permissive) বা অনুমোদনকারী প্যারেন্টিং। এখানে বাবা-মা সন্তানের বন্ধু হতে চান। ডিমান্ডিংনেস খুব কম, কিন্তু রেসপন্সিভনেস খুব বেশি। কোনো নিয়মকানুন নেই, সন্তান যা চায় তাই পায়। এই স্টাইলের শিশুরা খুব আদুরে হয়, কিন্তু তাদের আত্মসংযম বা সেলফ-কন্ট্রোল (Self-Control)-এর অভাব থাকে। স্কুলে তারা অমনোযোগী হয় এবং নিয়ম মানতে চায় না।
- তৃতীয়ত, অথরিটেটিভ (Authoritative) বা দায়িত্বশীল প্যারেন্টিং। এটি হলো গোল্ডিলক্স জোন বা ‘সেরা উপায়’। এখানে ডিমান্ডিংনেস এবং রেসপন্সিভনেস – দুটোই বেশি। বাবা-মা নিয়ম কানুন বজায় রাখেন, কিন্তু সন্তানের কথাও শোনেন। শাসন করেন, কিন্তু বুঝিয়ে। বাউমরিন্ড দেখলেন, এই স্টাইলের সন্তানরাই সবদিক দিয়ে সেরা হয়। তারা স্কুলে ভালো রেজাল্ট করে, মানসিকভাবে সুস্থ থাকে এবং সামাজিকভাবে দক্ষ হয়।
- চতুর্থ স্টাইলটি হলো নেগলেক্টফুল (Neglectful) বা অবহেলাকারী, যেখানে বাবা-মা সন্তানের কোনো খোঁজই রাখেন না। এটি সন্তানের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর, যা তাদের অপরাধপ্রবণ বা অসামাজিক করে তোলে।
হোম-স্কুল লিংকেজ: সেতুবন্ধন
শিশুর শিক্ষার জন্য পরিবার এবং স্কুলের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত? শিক্ষা গবেষকরা একে বলেন হোম-স্কুল লিংকেজ (Home-School Linkage)। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মা যখন স্কুলের কার্যক্রমে জড়িত থাকেন (Parental Involvement), তখন সন্তানের রেজাল্ট ভালো হয়। এই জড়িত থাকা মানে কেবল রিপোর্ট কার্ডে সই করা নয়। এর মানে হলো – টিচারের সাথে কথা বলা, স্কুলের মিটিংয়ে যাওয়া, এবং বাড়িতে বসে বাচ্চার পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া। সমাজবিজ্ঞানী জেমস কোলম্যান (James Coleman) তার বিখ্যাত সোশ্যাল ক্যাপিটাল (Social Capital) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, পরিবার এবং স্কুলের মধ্যে যদি ভালো সম্পর্ক থাকে, তবে তা শিশুর জন্য এক ধরণের সামাজিক পুঁজি হিসেবে কাজ করে। কোলম্যান দেখলেন, ক্যাথলিক স্কুলগুলোর রেজাল্ট সরকারি স্কুলের চেয়ে ভালো, কারণ সেখানে বাবা-মা, শিক্ষক এবং চার্চের মধ্যে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি বা নেটওয়ার্ক কাজ করে। সবাই সবাইকে চেনে এবং শিশুর ওপর নজর রাখে। একে তিনি বললেন ফাংশনাল কমিউনিটি (Functional Community) (Coleman, 1988)। অর্থাৎ, শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় থাকে না, এটি থাকে সম্পর্কের জালে।
কালচারাল ক্যাপিটাল ও লারেউ-এর গবেষণা
সব শিশু কি সমান সুযোগ পায়? সমাজবিজ্ঞানী অ্যানেট লারেউ (Annette Lareau) তার Unequal Childhoods বইতে দেখালেন, মধ্যবিত্ত এবং শ্রমিক শ্রেণীর বাবা-মায়ের প্যারেন্টিং স্টাইল সম্পূর্ণ আলাদা, যা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেয়। মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা অনুসরণ করেন কনসার্টেড কাল্টিভেশন (Concerted Cultivation) বা সুপরিকল্পিত পরিচর্যা। তারা সন্তানকে গান শেখান, নাচে ভর্তি করেন, মিউজিয়ামে নিয়ে যান এবং সবসময় তাদের সাথে যুক্তি দিয়ে কথা বলেন। এর ফলে এই শিশুরা সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট (Sense of Entitlement) বা অধিকারবোধ নিয়ে বড় হয়। তারা বড়দের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে এবং যেকোনো পরিস্থিতি নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারে।
অন্যদিকে, শ্রমিক শ্রেণীর বা গরিব বাবা-মায়েরা অনুসরণ করেন অ্যাকম্প্লিশমেন্ট অফ ন্যাচারাল গ্রোথ (Accomplishment of Natural Growth) বা স্বাভাবিক বৃদ্ধি। তারা মনে করেন, শিশুকে খাবার ও নিরাপত্তা দেওয়াই যথেষ্ট, বাকিটা সে নিজে শিখে নেবে। এই শিশুরা অনেক বেশি স্বাধীনভাবে খেলে, কিন্তু তারা বড়দের সাথে কথা বলতে লজ্জা পায় বা ভয় পায়। লারেউ বললেন, স্কুলের পরিবেশটা মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির সাথে মিলে যায়। তাই ‘কনসার্টেড কাল্টিভেশন’ পাওয়া শিশুরা স্কুলে ভালো করে, কারণ তাদের কাছে কালচারাল ক্যাপিটাল (Cultural Capital) বা সাংস্কৃতিক পুঁজি আছে। আর গরিব শিশুরা মেধাবী হলেও স্কুলের সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না এবং ঝরে পড়ে (Lareau, 2003)। অর্থাৎ, প্যারেন্টিং স্টাইল কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, এটি শ্রেণী বৈষম্য টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার।
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং বনাম ফ্রি-রেঞ্জ কিডস
আধুনিক যুগে প্যারেন্টিং-এর একটি নতুন এবং বিতর্কিত ট্রেন্ড হলো হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং (Helicopter Parenting)। এই বাবা-মায়েরা সন্তানের মাথার ওপর সবসময় হেলিকপ্টারের মতো ঘুরতে থাকেন। তারা সন্তানের সব কাজ করে দেন – জুতার ফিতা বাঁধা থেকে শুরু করে অ্যাসাইনমেন্ট লেখা পর্যন্ত। তারা সন্তানকে কোনো কষ্ট বা ব্যর্থতা পেতে দেন না। এর ফলে সন্তানরা শারীরিকভাবে নিরাপদ থাকে ঠিকই, কিন্তু মানসিকভাবে তারা খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা নিজেরা কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারে না। কলেজে উঠে বা চাকরিতে ঢুকে যখন তারা প্রথম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়, তখন তারা ভেঙে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ফেইলিয়র টু লঞ্চ (Failure to Launch)।
এর ঠিক উল্টোটা হলো ফ্রি-রেঞ্জ প্যারেন্টিং (Free-Range Parenting)। এই মতবাদের অনুসারীরা (যেমন – লেনোর স্কেনাজি) বিশ্বাস করেন, শিশুকে স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। তাদের একা পার্কে যেতে দেওয়া, বাসে চড়তে দেওয়া এবং ছোটখাটো ঝুঁকি নিতে দেওয়া উচিত। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং তারা ‘স্ট্রিট স্মার্ট’ হয়। শিক্ষা এবং প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞরা এখন এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, শিশুকে ‘নিরাপদ’ রাখার চেয়ে ‘শক্ত’ বা রেজিলিয়েন্ট (Resilient) করে গড়ে তোলা বেশি জরুরি।
ফ্যামিলি লিটারেসি ও পড়ার অভ্যাস
শিশুরা পড়তে শেখে কোথায়? স্কুলেই কি প্রথম? গবেষকরা বলছেন, না। পড়ার অভ্যাস তৈরি হয় অনেক আগে, মায়ের কোলে বসে। একে বলা হয় ফ্যামিলি লিটারেসি (Family Literacy)। যেসব পরিবারে বাবা-মা সন্তানকে ছোটবেলা থেকে গল্প পড়ে শোনান (Bedtime Stories), বই উপহার দেন এবং নিজেরাও বই পড়েন, সেসব শিশুর শব্দভাণ্ডার বা ভোকাবুলারি (Vocabulary) অন্যদের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হয়। হার্ট এবং রিসলি (Hart & Risley) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, তিন বছর বয়সের মধ্যেই উচ্চবিত্ত এবং কল্যাণভাতা (Welfare) পাওয়া পরিবারের শিশুদের মধ্যে শব্দ শোনার ব্যবধান প্রায় ৩০ মিলিয়ন! একে বলা হয় ৩০ মিলিয়ন ওয়ার্ড গ্যাপ (30 Million Word Gap) (Hart & Risley, 1995)। এই গ্যাপটিই পরে স্কুলে গিয়ে বিশাল ব্যবধান তৈরি করে। তাই শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বাবা-মাকে পরামর্শ দেন – বাচ্চার সাথে কথা বলুন, তাকে প্রশ্ন করুন এবং বই পড়ে শোনান। কারণ, মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য ‘ভাষা’ হলো সবচেয়ে বড় খাদ্য।
ডিজিটাল প্যারেন্টিং: স্ক্রিনের লড়াই
একুশ শতকের বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্ক্রিন। বাচ্চার হাতে কখন ফোন দেবেন? কতক্ষণ দেখতে দেবেন? এই নতুন জমানার প্যারেন্টিংকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল প্যারেন্টিং (Digital Parenting)। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP) সুপারিশ করেছে যে, ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুদের কোনো স্ক্রিন দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে তা মানা কঠিন। গবেষকরা দেখছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মনোযোগ বা অ্যাটেনশন স্প্যান (Attention Span) কমিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করছে। আবার সাইবার বুলিং বা ইন্টারনেটের খারাপ কন্টেন্ট থেকে সন্তানকে রক্ষা করাও এক বড় যুদ্ধ। বাবা-মাকে এখন কেবল বাস্তব জগত নয়, ভার্চুয়াল জগতেও সন্তানের অভিভাবক হতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে সেরা প্যারেন্টিং হলো কো-ভিউইং (Co-viewing) বা বাচ্চার সাথে বসে একসাথে দেখা এবং সেটা নিয়ে আলোচনা করা, যাতে স্ক্রিনটা বিচ্ছিন্নতার দেয়াল না হয়ে যোগাযোগের মাধ্যম হয়।
প্যারেন্টাল বার্নআউট: ক্লান্ত বাবা-মা
সন্তানকে ‘পারফেক্ট’ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এই ইঁদুর দৌড়ে বাবা-মায়েরা নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। একে বলা হচ্ছে প্যারেন্টাল বার্নআউট (Parental Burnout)। সমাজের প্রত্যাশা বা ইনটেন্সিভ মাদারিং (Intensive Mothering)-এর চাপে মায়েরা সবসময় গিল্ট বা অপরাধবোধে ভোগেন – “আমি বুঝি যথেষ্ট ভালো মা নই।” এই স্ট্রেস বা চাপ সন্তানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ বাবা-মা যদি অসুখী বা ডিপ্রেশনে থাকেন, তবে তারা সন্তানের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারেন না। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা তাই এখন বলছেন, “সন্তানের ভালোর জন্য আগে নিজের যত্ন নিন।” গুড এনাফ প্যারেন্টিং (Good Enough Parenting) ধারণাটি এখন জনপ্রিয় হচ্ছে। এর মানে হলো, আপনাকে নিখুঁত হতে হবে না, মোটামুটি ভালো হলেই চলবে। ডোনাল্ড উইনিকট (Donald Winnicott) এই ধারণাটি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শিশু শেখে তার বাবা-মায়ের ছোটখাটো ভুল বা ব্যর্থতা থেকেও। তাই ‘সুপারমম’ বা ‘সুপারড্যাড’ হওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে একজন স্বাভাবিক, প্রেমময় মানুষ হওয়াই সন্তানের জন্য সেরা উপহার।
শিক্ষা ও প্যারেন্টিং-এর এই জগত আমাদের শেখায় যে, পরিবার হলো মানুষ গড়ার এক জটিল কারখানা। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই, কিন্তু আছে কিছু ধ্রুব সত্য। ভালোবাসা, সময়, এবং সঠিক দিকনির্দেশনা – এই তিনটি উপাদান যদি ঠিক থাকে, তবে যেকোনো শিশু তার সম্ভাবনার আকাশ ছুঁতে পারে। পরিবার নিয়ে আলোচনায় এই প্যারেন্টিং এবং শিক্ষার আন্তঃসম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ গড়বে। আর সেই শিশুটি কেমন হবে, তা ঠিক হয় তার শোবার ঘরে আর খাবার টেবিলে।
বার্ধক্যবিদ্যা বা জেরোন্টোলজি: শেষ বেলার আশ্রয়
মানুষের জীবনের গল্পটা অনেকটা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মতো। শিশুকাল যদি হয় সকালের সোনালী রোদ, তবে বার্ধক্য হলো গোধূলির ম্লান আলো। আর এই গোধূলি বেলাতেই মানুষের পরিবার নামক আশ্রয়টির প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি। সমাজবিজ্ঞানের যে শাখাটি মানুষের বার্ধক্য এবং পরিবারের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে, তাকে বলা হয় জেরোন্টোলজি (Gerontology) বা বার্ধক্যবিদ্যা। জেরোন্টোলজিস্টরা (Gerontologists) দেখেন, যখন মানুষের চুল পাকে, চামড়া কুঁচকে যায় এবং শরীর দুর্বল হয়, তখন তার সামাজিক অবস্থান এবং পারিবারিক ভূমিকায় কী পরিবর্তন আসে। একসময় যে বাবা বা মা পরিবারের বটগাছ ছিলেন, ছায়া দিতেন, বার্ধক্যে এসে তারাই হয়ে পড়েন পরগাছার মতো অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এই পরিবর্তনটি মেনে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়া পরিবারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। আধুনিক যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, যাকে বলা হচ্ছে লঞ্জিভিটি রেভোলিউশন (Longevity Revolution)। এর ফলে পরিবারগুলোতে এখন বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, পরিবারগুলোর আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার গতি বাড়ছে। এই বিপরীতমুখী স্রোতে বৃদ্ধরা কোথায় দাঁড়াবেন? তারা কি পরিবারের ‘বোঝা’, নাকি অভিজ্ঞতার ‘সম্পদ’? এই জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে জেরোন্টোলজি। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, বার্ধক্য কীভাবে পরিবারের সমীকরণ বদলে দেয় এবং কেন শেষ বয়সে মানুষের একমাত্র চাওয়া হয় একটু ভালোবাসা আর সঙ্গ।
স্যান্ডউইচ জেনারেশন: দুই পাহাড়ের মাঝখানে
বার্ধক্য এবং পরিবার নিয়ে আলোচনায় যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো স্যান্ডউইচ জেনারেশন (Sandwich Generation)। ১৯৮১ সালে সমাজবিজ্ঞানী ইলাইন ব্রডি (Elaine Brody) এই চমৎকার রূপকটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি মধ্যবয়সী নারীদের (এবং পুরুষদের) অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, তারা যেন স্যান্ডউইচের দুটি স্লাইসের মাঝখানে থাকা মাংস বা পুরের মতো পিষ্ট হচ্ছেন। একদিকে তাদের নিজেদের ছোট সন্তান বা টিনএজার ছেলেমেয়ে, যাদের পড়াশোনা ও আবদার মেটাতে হয়; অন্যদিকে তাদের বৃদ্ধ এবং অসুস্থ বাবা-মা, যাদের ওষুধ খাওয়ানো বা ডাক্তারের কাছে নেওয়া দরকার। এই দুই প্রজন্মের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মধ্যবয়সী মানুষটি নিজের জন্য কোনো সময় পান না। ব্রডি দেখালেন, ঐতিহ্যগতভাবে এই সেবার দায়িত্ব বা ‘কেয়ারগিভিং’ (Caregiving) মূলত নারীদের কাঁধেই পড়ে। তিনি একে বললেন উইমেন ইন দ্য মিডেল (Women in the Middle) (Brody, 1981)।
আধুনিক ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যাটি আরও প্রকট হয়েছে। মানুষ দেরিতে বিয়ে করছে এবং দেরিতে সন্তান নিচ্ছে। ফলে যখন তাদের বাচ্চারা ছোট, তখনই তাদের বাবা-মায়েরা খুব বৃদ্ধ হয়ে পড়ছেন। আগে বাচ্চারা বড় হয়ে যাওয়ার পর বাবা-মা বৃদ্ধ হতেন, ফলে দায়িত্ব পালনের জন্য সময় পাওয়া যেত। এখন দুটো দায়িত্ব বা ‘ডাবল ডিউটি’ একসাথে ঘাড়ে এসে পড়ছে। এর ফলে এই স্যান্ডউইচ জেনারেশনের মানুষেরা চরম মানসিক চাপ বা বার্নআউট (Burnout)-এ ভুগছেন। তাদের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নিজেদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে এবং দাম্পত্য কলহ বাড়ছে। জেরোন্টোলজিস্টরা বলছেন, এই প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্র এবং করপোরেট জগতকে এগিয়ে আসতে হবে – ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক আওয়ার বা অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করতে হবে।
ইন্টারজেনারেশনাল সলিডারিটি: বন্ধনের ভিত্তি
পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে? জেরোন্টোলজিস্ট ভার্ন বেংস্টন (Vern Bengtson) এবং রবার্ট রবার্টস (Robert Roberts) এই সম্পর্ক পরিমাপ করার জন্য একটি মডেল দাঁড় করালেন, যার নাম ইন্টারজেনারেশনাল সলিডারিটি মডেল (Intergenerational Solidarity Model)। তারা বললেন, বাবা-মা এবং সন্তানের মধ্যকার বন্ধন ছয়টি উপাদানের ওপর নির্ভর করে। ১. অ্যাসোসিয়েশনাল (Associational): তারা কত ঘন ঘন দেখা করে বা কথা বলে। ২. এফেকচুয়াল (Affectual): তাদের মধ্যে ভালোবাসার গভীরতা কতটুকু। ৩. কনসেনসুয়াল (Consensual): তাদের মূল্যবোধ বা মতামতের মিল কতটা। ৪. ফাংশনাল (Functional): তারা একে অপরকে কতটা সাহায্য করে (টাকা বা সেবা দিয়ে)। ৫. নরমেটিভ (Normative): তারা পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে কতটা সচেতন। ৬. স্ট্রাকচারাল (Structural): তারা ভৌগোলিকভাবে কত দূরে থাকে (Bengtson & Roberts, 1991)।
বেংস্টন দেখালেন, আধুনিক যুগে যদিও ভৌগোলিক দূরত্ব বেড়েছে (স্ট্রাকচারাল সলিডারিটি কমেছে), তবুও মানসিক বা আবেগীয় বন্ধন (এফেকচুয়াল সলিডারিটি) এখনো অটুট আছে। তিনি একে বললেন লং ডিসটেন্স ইনটিমেসি (Long Distance Intimacy)। সন্তানরা দূরে থাকলেও তারা ফোনে বা ভিডিও কলে বাবা-মায়ের খোঁজ রাখে। তবে তিনি সতর্ক করলেন যে, সলিডারিটি মানেই সবসময় সুখ নয়। অনেক সময় অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বা দায়িত্ববোধ সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা অ্যাম্বিভ্যালেন্স (Ambivalence) তৈরি করতে পারে। জেরোন্টোলজি আমাদের শেখায় যে, বার্ধক্যে সম্পর্কের কোয়ালিটি বা গুণগত মানটাই আসল, কোয়ান্টিটি বা সংখ্যা নয়।
বার্ধক্যের বোঝা বনাম সম্পদ: এক্সচেঞ্জ থিওরি
বৃদ্ধরা কি শুধুই পরিবারের বোঝা? সমাজতাত্ত্বিক এক্সচেঞ্জ থিওরি (Exchange Theory) বা বিনিময় তত্ত্ব দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ সম্পর্ক বজায় রাখে তখন, যখন সে দেখে যে সেখান থেকে সে কিছু লাভ করছে (তা হতে পারে টাকা, সম্মান বা ভালোবাসা)। বৃদ্ধ বয়সে মানুষের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বা ‘মার্কেট ভ্যালু’ কমে যায়। তখন তাদের বারগেইনিং পাওয়ার কমে যায়। যদি কোনো বৃদ্ধের হাতে টাকা বা সম্পত্তি থাকে, তবে পরিবার তাকে সম্মান করে এবং সেবা করে, কারণ তারা বিনিময়ে উত্তরাধিকার বা ইনহেরিটেন্স আশা করে। কিন্তু যার কিছুই নেই, তার অবস্থা হয় করুণ।
তবে জেরোন্টোলজিস্টরা বলেন, বৃদ্ধরা কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, তারা হলেন সোশ্যাল ক্যাপিটাল (Social Capital) বা সামাজিক পুঁজি। তারা নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করেন (চাইল্ড কেয়ার), যা কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য বিশাল সাশ্রয়। তারা পরিবারের ইতিহাস ও মূল্যবোধ ধরে রাখেন এবং সংকটকালে পরামর্শ দেন। আফ্রিকান প্রবাদে আছে, “একজন বৃদ্ধ মারা যাওয়া মানে একটি লাইব্রেরি পুড়ে যাওয়া।” আধুনিক পরিবার যদি বৃদ্ধদের এই ‘অদৃশ্য অবদান’ বা ইনভিজিবল কন্ট্রিবিউশন (Invisible Contribution)-কে মূল্য না দেয়, তবে তা হবে অকৃতজ্ঞতা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে গ্র্যান্ডপা-গ্র্যান্ডমা আছেন, সেসব পরিবারের শিশুরা মানসিকভাবে বেশি স্থিতিশীল হয়।
এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম: খালি বাসার হাহাকার
বার্ধক্যের শুরুর দিকে বাবা-মায়েরা এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থার মুখোমুখি হন, যাকে বলা হয় এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম (Empty Nest Syndrome) বা শূন্য নীড়ের বেদনা। যখন সব সন্তান পড়াশোনা বা চাকরির জন্য বা বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তখন হঠাৎ করে কোলাহলপূর্ণ বাড়িটা শান্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে মায়েরা, যারা সারা জীবন সন্তানদের ঘিরেই বেঁচে ছিলেন, তারা এক গভীর বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন (Depression)-এ ভোগেন। তারা অনুভব করেন যে তাদের জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই, তারা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছেন। তবে আধুনিক জেরোন্টোলজিস্টরা বলছেন, এটি সবসময় নেতিবাচক নয়। অনেক দম্পতির জন্য এটি সেকেন্ড হানিমুন (Second Honeymoon)-এর সুযোগ। সন্তানরা চলে যাওয়ার পর তারা আবার নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে পারেন, ঘুরতে যেতে পারেন বা নতুন শখ পূরণ করতে পারেন। একে বলা হয় পোস্ট-প্যারেন্টাল ফ্রিডম (Post-parental Freedom)। তবে যারা একাকী বা ডিভোর্সড, বা যাদের দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো নয়, তাদের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত কষ্টের। তখন একাকীত্ব বা লোনলিনেস (Loneliness) হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু।
এল্ডার অ্যাবিউজ: ঘরের ভেতরের অন্ধকার
বার্ধক্যবিদ্যার একটি অন্ধকার অধ্যায় হলো এল্ডার অ্যাবিউজ (Elder Abuse) বা প্রবীণ নির্যাতন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, প্রতি ৬ জন বয়স্ক মানুষের মধ্যে ১ জন কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন। এবং সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, এই নির্যাতনকারীরা বেশিরভাগই তাদের নিজের সন্তান বা আত্মীয়। নির্যাতন নানা ধরণের হতে পারে: শারীরিক মারধর, মানসিক অত্যাচার (গালিগালাজ বা অপমান), অর্থনৈতিক শোষণ (জোর করে সম্পত্তি লিখে নেওয়া বা পেনশনের টাকা কেড়ে নেওয়া), এবং অবহেলা বা নেগলেক্ট (Neglect) (খাবার বা ওষুধ না দেওয়া)। কেন সন্তানরা এমন করে? গবেষকরা বলেন, এর পেছনে আছে কেয়ারগিভার স্ট্রেস (Caregiver Stress), মাদকাসক্তি, বা ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাতে মার খাওয়ার প্রতিশোধ স্পৃহা (Cycle of Violence)। অনেক সময় বয়স্করা লজ্জায় বা ভয়ে এই নির্যাতনের কথা কাউকে বলেন না। সমাজকর্মীরা এবং জেরোন্টোলজিস্টরা এখন এই ‘লুক্কায়িত অপরাধ’ বা হিডেন ক্রাইম (Hidden Crime)-এর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছেন।
ফিলিওল পাইটি ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব
এশিয়ার দেশগুলোতে (যেমন চীন, জাপান, ভারত, বাংলাদেশ) বার্ধক্যের যত্নের ভিত্তি হলো ফিলিওল পাইটি (Filial Piety) বা পিতৃভক্তি। কনফুসিয়াসের দর্শন বা ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা করা সন্তানের পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু আধুনিকায়ন এবং নগরায়নের ফলে এই প্রথাগত মূল্যবোধে ফাটল ধরেছে। সন্তানরা কাজের জন্য শহরে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে। তারা চাইলেও দূরে থেকে বাবা-মায়ের সেবা করতে পারছে না। একে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন ইরোশন অফ ফিলিওল পাইটি (Erosion of Filial Piety)। এর ফলে বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রম বা ওল্ড এজ হোম (Old Age Home)-এর চাহিদা। আগে বৃদ্ধাশ্রমকে দেখা হতো কলঙ্ক হিসেবে, এখন একে দেখা হচ্ছে বাস্তবতা বা প্রয়োজন হিসেবে। তবে জেরোন্টোলজিস্টরা বলছেন, সেরা সমাধান হলো এজিং ইন প্লেস (Aging in Place) – অর্থাৎ বৃদ্ধরা যেন তাদের নিজেদের বাড়িতে, পরিচিত পরিবেশে শেষ সময়টুকু কাটাতে পারেন। এর জন্য দরকার কমিউনিটি সাপোর্ট বা হোম কেয়ার সার্ভিস।
উইডোহুড বা বৈধব্য: একা পথ চলা
বার্ধক্যের একটি অবধারিত সত্য হলো সঙ্গীর মৃত্যু। বিশেষ করে নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন, তাই বার্ধক্যে বিধবা হওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি। একে বলা হয় ফেমিনাইজেশন অফ এজিং (Feminization of Aging)। স্বামী মারা যাওয়ার পর একজন নারীর জীবন আমূল বদলে যায়। তিনি কেবল তার জীবনসঙ্গীকে হারান না, অনেক সময় তিনি তার সামাজিক পরিচয় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও হারান। সমাজ তাকে ‘অশুভ’ বা বোঝা মনে করে। পুরুষরা স্ত্রী হারালে বা উইডোয়ার (Widower) হলে সাধারণত দ্রুত আবার বিয়ে করেন বা সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকেন। কিন্তু নারীদের জন্য সমাজ অনেক বেশি রক্ষণশীল। জেরোন্টোলজিস্টরা দেখছেন, বিধবা নারীরা কীভাবে বন্ধু বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর মাধ্যমে নতুন করে তাদের সাপোর্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এটি তাদের টিকে থাকার বা রেজিলিয়েন্স (Resilience)-এর প্রমাণ।
সাকসেসফুল এজিং: সফল বার্ধক্যের চাবিকাঠি
সবাই কি বার্ধক্যে ধুঁকে ধুঁকে মরে? না। জেরোন্টোলজিস্ট জন রো (John Rowe) এবং রবার্ট কান (Robert Kahn) নিয়ে এলেন সাকসেসফুল এজিং (Successful Aging)-এর ধারণা। তারা বললেন, সফল বার্ধক্যের তিনটি শর্ত আছে: ১. রোগ ও অক্ষমতা থেকে মুক্ত থাকা, ২. উচ্চ শারীরিক ও মানসিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখা, এবং ৩. জীবনের সাথে বা সমাজের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকা (Active Engagement with Life) (Rowe & Kahn, 1997)। অর্থাৎ, বুড়ো হওয়া মানেই বিছানায় পড়ে থাকা নয়। যারা শেষ বয়সেও বাগান করেন, নাতি-নাতনিদের সাথে খেলেন, বা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন, তারাই আসলে সফলভাবে বুড়ো হচ্ছেন। পরিবার এখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। যে পরিবার বৃদ্ধ সদস্যকে উৎসাহ দেয় এবং কাজে লাগায়, সেই পরিবারের বৃদ্ধরা সুস্থ থাকেন। আর যে পরিবার তাদের বসিয়ে রেখে ‘বাতিল’ ঘোষণা করে, তারা দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান।
বার্ধক্যবিদ্যার এই আলোচনা আমাদের শেখায় যে, বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু এটি অপ্রয়োজনীয় অধ্যায় নয়। এটি অভিজ্ঞতার, প্রজ্ঞার এবং স্মৃতির অধ্যায়। পরিবার হলো সেই শেকড়, যা এই বুড়ো গাছগুলোকে ঝড়ের মধ্যেও শক্ত করে ধরে রাখে। পরিবার নিয়ে আলোচনায় জেরোন্টোলজির এই পাঠ অত্যন্ত জরুরি, কারণ আমরা সবাই একদিন এই পথে হাঁটব। আজকের বৃদ্ধদের আমরা যেভাবে রাখব, আগামী দিনে আমাদের সন্তানরা আমাদের সেভাবেই রাখবে। এটিই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।
কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের ভারসাম্য: দড়ি টানাটানি
আধুনিক মানুষের জীবন যেন একটি টানটান দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা। এক হাতে অফিসের ল্যাপটপ, অন্য হাতে বাচ্চার ফিডার। একটু এদিক-ওদিক হলেই পড়ে যাওয়ার ভয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় দৌড় – বাচ্চাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে ছুটতে হয়, আবার অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে রান্নাঘরে ঢুকতে হয়। এই যে কাজ (Work) এবং পরিবার (Family) নামক দুটি ভিন্ন জগতের মধ্যে প্রতিনিয়ত ভারসাম্য বজায় রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা, একে সমাজবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ওয়ার্ক-লাইফ ইন্টারফেস (Work-Life Interface)। আগেকার দিনে ব্যাপারটা সহজ ছিল – পুরুষরা কাজ করত বাইরে, নারীরা ঘরে। দুটি জগত ছিল আলাদা। কিন্তু এখন নারী-পুরুষ উভয়েই চাকরি করছেন, আবার উভয়েই সংসার সামলাচ্ছেন। ফলে এই দুই জগতের সীমানা বা বাউন্ডারি (Boundary) অস্পষ্ট হয়ে গেছে। অফিসের টেনশন এখন শোবার ঘরে ঢুকছে, আর সংসারের চিন্তা কনফারেন্স রুমে। এই দড়ি টানাটানির খেলায় মানুষ কীভাবে টিকে থাকে, এবং এর ফলে পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়ে – তা নিয়ে কাজ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজি (I/O Psychology)। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, ক্যারিয়ার এবং সংসারের এই দ্বন্দ্বে কে জেতে আর কে হারে।
ওয়ার্ক-ফ্যামিলি কনফ্লিক্ট: যখন দুই জগত মুখোমুখি
এই ক্ষেত্রের সবচেয়ে মৌলিক এবং বহুল আলোচিত ধারণাটি হলো ওয়ার্ক-ফ্যামিলি কনফ্লিক্ট (Work-Family Conflict)। ১৯৮৫ সালে গবেষক জেফরি গ্রিনহাউস (Jeffrey Greenhaus) এবং নিকোলাস বিউটেল (Nicholas Beutell) এই কনফ্লিক্ট বা দ্বন্দ্বের একটি ধ্রুপদী সংজ্ঞা দিলেন। তারা বললেন, যখন কাজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে (বা উল্টোটা হয়), তখনই তৈরি হয় এই কনফ্লিক্ট। তারা এই দ্বন্দ্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করলেন। ১. টাইম-বেসড কনফ্লিক্ট (Time-based Conflict): সময় তো সীমিত (২৪ ঘণ্টা)। অফিসে বেশি সময় দিলে পরিবারে সময় কম দিতে হয়। যেমন – বাবার অফিস শেষ করতে দেরি হলো বলে বাচ্চার জন্মদিনের পার্টি মিস হয়ে গেল। ২. স্ট্রেন-বেসড কনফ্লিক্ট (Strain-based Conflict): এক জায়গার মানসিক চাপ অন্য জায়গায় প্রভাব ফেলে। যেমন – অফিসে বসের বকা খেয়ে এসে স্বামী বাড়িতে স্ত্রীর সাথে খিটখিট করলেন (একে বলা হয় স্পিলওভার)। ৩. বিহেভিয়ার-বেসড কনফ্লিক্ট (Behavior-based Conflict): দুই জায়গায় দুই ধরণের আচরণের দরকার হয়। অফিসে হয়তো আপনাকে কঠোর এবং যুক্তিপূর্ণ হতে হয়, কিন্তু সেই আচরণ যদি আপনি বাড়িতে বাচ্চার সাথে করেন, তবে সমস্যা হবে (Greenhaus & Beutell, 1985)।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই কনফ্লিক্ট বা দ্বন্দ্ব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে দেয়। এর ফলে স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, এবং বার্নআউট বাড়ে। এমনকি এটি শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে – উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। পারিবারিক জীবনে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাড়ে, ডিভোর্সের সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং বাচ্চারা অবহেলিত বোধ করে। গ্রিনহাউস দেখালেন, এই কনফ্লিক্ট দ্বিমুখী। যখন কাজ পরিবারের ক্ষতি করে, তাকে বলে ওয়ার্ক-টু-ফ্যামিলি কনফ্লিক্ট (WFC)। আর যখন পরিবার কাজের ক্ষতি করে (যেমন – অসুস্থ বাচ্চার জন্য অফিসে যেতে না পারা), তাকে বলে ফ্যামিলি-টু-ওয়ার্ক কনফ্লিক্ট (FWC)। সাধারণত পুরুষদের ক্ষেত্রে WFC বেশি হয়, আর নারীদের ক্ষেত্রে FWC বেশি হয়, কারণ সংসারের মূল দায়ভার এখনো নারীর কাঁধেই।
ওয়ার্ক-ফ্যামিলি এনরিচমেন্ট: মুদ্রার উল্টো পিঠ
সবসময় কি কাজ আর পরিবার একে অপরের শত্রু? গবেষকরা বললেন, না। অনেক সময় একটি ভূমিকা অন্য ভূমিকাকে সমৃদ্ধ করে। একে বলা হয় ওয়ার্ক-ফ্যামিলি এনরিচমেন্ট (Work-Family Enrichment) বা ফ্যাসিলিটেশন (Facilitation)। গ্রিনহাউস এবং পাওয়েল (Powell) ২০০৬ সালে এই তত্ত্বটি সামনে আনলেন। তারা বললেন, কাজ থেকে মানুষ টাকা পায়, আত্মবিশ্বাস পায়, এবং নতুন দক্ষতা শেখে (যেমন – মাল্টিটাস্কিং বা ধৈর্য), যা তাকে ভালো বাবা বা মা হতে সাহায্য করে। একজন সফল কর্মজীবী নারী তার সন্তানের জন্য রোল মডেল হতে পারেন। আবার উল্টোভাবে, পরিবার মানুষকে মানসিক শান্তি এবং ভালোবাসার আধার দেয়, যা তাকে অফিসে আরও বেশি মনোযোগী এবং প্রোডাক্টিভ হতে সাহায্য করে। সুখী পরিবারের মানুষ সাধারণত ভালো কর্মী হন। এনরিচমেন্ট থিওরি আমাদের শেখায় যে, আমরা যদি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকাই, তবে দেখব কাজ এবং পরিবার একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
বাউন্ডারি থিওরি ও ডিজিটাল লিশ
আমরা কীভাবে আমাদের কাজ এবং পরিবারের জগতকে আলাদা রাখি? বাউন্ডারি থিওরি (Boundary Theory) অনুযায়ী, মানুষ দুই ধরণের হয়। একদল হলেন সেগমেন্টর (Segmentors) – যারা দুই জগতকে পুরোপুরি আলাদা রাখতে পছন্দ করেন। এরা অফিস থেকে বের হয়ে আর অফিসের ফোন ধরেন না, বা অফিসের কথা বাসায় বলেন না। এরা কাজের সময় কাজ, আর পরিবারের সময় পরিবার – এই নীতিতে বিশ্বাসী। অন্যদল হলেন ইন্টিগ্রেটর (Integrators) – যারা দুই জগতকে মিশিয়ে ফেলেন। এরা অফিসের ডেস্কে বসে বাচ্চার হোমওয়ার্ক চেক করেন, আবার বাচ্চার খেলার মাঠে বসে অফিসের ইমেইল রিপ্লাই দেন। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে, বিশেষ করে স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপের কারণে, আমরা সবাই কমবেশি ‘ইন্টিগ্রেটর’ হতে বাধ্য হচ্ছি। গবেষকরা একে বলছেন ইলেকট্রনিক লিশ (Electronic Leash) বা ডিজিটাল শেকল। বস এখন যেকোনো সময়, এমনকি ছুটির দিনেও আমাদের রিচ করতে পারেন। এর ফলে তৈরি হচ্ছে অলওয়েজ-অন কালচার (Always-on Culture)। বাউন্ডারি থিওরি বলছে, যারা সেগমেন্টর, তারা সাধারণত কম কনফ্লিক্টে ভোগেন। কিন্তু যারা ইন্টিগ্রেটর, তাদের বাউন্ডারি ব্লার বা ঝাপসা হয়ে যায় (Boundary Blurring), যার ফলে তারা কখনোই পুরোপুরি রিলাক্স হতে পারেন না। কোভিড-১৯ এর সময় ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ (Work From Home) এই বাউন্ডারিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে, যেখানে ডাইনিং টেবিলই হয়ে গেছে অফিস ডেস্ক।
জেন্ডার রুলস এবং গ্লাস সিলিং
কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের দ্বন্দ্বে নারী ও পুরুষের অভিজ্ঞতা কি সমান? মোটেও না। সমাজ নারীদের ওপর ডাবল বার্ডেন (Double Burden) চাপিয়ে দেয়। নারীদের বলা হয়, “তুমি বাইরে কাজ করো ঠিক আছে, কিন্তু সংসারের কোনো ক্ষতি যেন না হয়।” একে বলা হয় সুপারওম্যান সিনড্রোম (Superwoman Syndrome) – নারীকে একইসাথে পারফেক্ট কর্মী এবং পারফেক্ট মা হতে হবে। কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো চাপ নেই। পুরুষ যদি অফিস শেষে দেরি করে বাড়ি ফেরে, তবে বলা হয় “সে হার্ড ওয়ার্কিং”। আর নারী দেরি করলে বলা হয় “সে অবহেলাকারী মা”। এই বৈষম্য কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। একে বলা হয় ম্যাটারনাল ওয়াল (Maternal Wall)। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান হওয়ার পর নারীদের প্রমোশন পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, কারণ বসরা মনে করেন “তার এখন সংসারে মন বেশি”। আবার অনেক নারী নিজেই পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য প্রমোশন বা চ্যালেঞ্জিং প্রজেক্ট নিতে চান না। একে বলা হয় গ্লাস সিলিং (Glass Ceiling)-এর মতোই অদৃশ্য বাধা।
ফ্লেক্সিবিলিটি স্টিগমা ও ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি পলিসি
এই সমস্যা সমাধানের উপায় কী? অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি পলিসি (Family-Friendly Policy) চালু করছে। যেমন – ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক আওয়ার (Flexible Work Hours), টেলিকমিউটিং (Telecommuting) বা বাড়ি থেকে কাজ, পিতৃত্বকালীন ছুটি (Paternity Leave), এবং অন-সাইট ডে-কেয়ার সেন্টার। উদ্দেশ্য হলো কর্মীদের স্ট্রেস কমানো এবং রিটেনশন (Retention) বাড়ানো। কিন্তু গবেষক জোন উইলিয়ামস (Joan Williams) এক অদ্ভুত সমস্যার কথা বললেন, যার নাম ফ্লেক্সিবিলিটি স্টিগমা (Flexibility Stigma)। তিনি দেখলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে এই সুবিধাগুলো আছে, সেখানেও কর্মীরা (বিশেষ করে পুরুষরা) এগুলো নিতে ভয় পান। কারণ যারা ফ্লেক্স টাইম বা প্যারেন্টাল লিভ নেন, তাদের মনে করা হয় “কম সিরিয়াস” বা “কম ডেডিকেটেড”। এর ফলে তাদের ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে (Williams, 2000)। তাই কেবল পলিসি থাকলেই হবে না, দরকার কালচারাল শিফট বা সংস্কৃতিগত পরিবর্তন। বসদের বুঝতে হবে যে, পরিবারকে সময় দেওয়া মানে কাজকে ফাঁকি দেওয়া নয়।
স্পিলওভার ও ক্রসওভার এফেক্ট
মনোবিজ্ঞানীরা পরিবারের ওপর কাজের প্রভাবকে দুটি মডেলে ভাগ করেছেন। ১. স্পিলওভার মডেল (Spillover Model): এটি ব্যক্তির নিজের ভেতরে ঘটে। যেমন – আমার অফিসের মেজাজ আমার বাড়ির মেজাজকে খারাপ করল। এটি পজিটিভ বা নেগেটিভ দুইই হতে পারে। ২. ক্রসওভার মডেল (Crossover Model): এটি এক ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমিত হয়। যেমন – স্বামীর অফিসের স্ট্রেস স্ত্রীর ওপর প্রভাব ফেলল, বা স্ত্রীর ডিপ্রেশন স্বামীকে প্রভাবিত করল। গবেষক মিনা ওয়েস্টম্যান (Mina Westman) দেখিয়েছেন যে, স্ট্রেস হলো ছোঁয়াচে রোগের মতো। একজন দগ্ধ বা ‘বার্নড আউট’ কর্মী যখন বাড়ি ফেরেন, তখন তিনি তার সঙ্গীকেও ধীরে ধীরে দগ্ধ করেন (Westman, 2001)। অর্থাৎ, অফিসের সমস্যা কখনোই অফিসের গেটে আটকে থাকে না, তা ভাইরাসের মতো বেডরুম পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ব্যালেন্স নাকি হারমোনি?
সবশেষে প্রশ্ন হলো, ‘ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য কি আদৌ সম্ভব? অনেক বিশেষজ্ঞ এখন ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ শব্দটির বদলে ওয়ার্ক-লাইফ হারমোনি (Work-Life Harmony) বা ইন্টিগ্রেশন (Integration) শব্দটি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। জেফ বেজোস (Jeff Bezos)-এর মতো সিইওরা বলেন, ব্যালেন্স মানে হলো ট্রেড-অফ (একটার বিনিময়ে আরেকটা), কিন্তু হারমোনি মানে হলো দুটোই একসাথে উপভোগ করা। আপনি যখন অফিসে থাকবেন তখন কাজের মধ্যে আনন্দ পাবেন, আবার যখন বাড়িতে থাকবেন তখন পরিবারের মধ্যে শান্তি পাবেন – এটাই হলো হারমোনি। তবে সমালোচকরা বলেন, এটি ধনীদের বিলাসিতা। একজন সাধারণ শ্রমিক বা নিম্নবিত্ত কর্মীর জন্য, যাকে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা খাটতে হয়, তার জন্য হারমোনি এক অলীক স্বপ্ন। তাদের জন্য এটি নিছকই টিকে থাকার লড়াই।
কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের এই দড়ি টানাটানি আমাদের আধুনিক জীবনের এক বড় ট্র্যাজেডি। আমরা কাজের জন্য পরিবারকে স্যাক্রিফাইস করছি, আবার পরিবারের জন্য কাজকে। পরিবার নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে আমাদের এমন একটি ইকোনমি বা অর্থনীতি দরকার যা পরিবারকে সাপোর্ট করে, পরিবারকে ধ্বংস করে নয়। কাজ তো জীবনের জন্য, জীবন তো কাজের জন্য নয়।
অবসর ও বিনোদন বিদ্যা: আনন্দের খোঁজ
পরিবার মানেই কি কেবল বাজার করা, বাচ্চার স্কুল ফি দেওয়া আর অসুখে-বিসুখে সেবা করা? পরিবার কি শুধুই দায়িত্বের বোঝা আর টিকে থাকার সংগ্রাম? না। পরিবারের আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রায়শই অবহেলিত দিক আছে – তা হলো আনন্দ। একসাথে হাসা, খেলা, ঘুরতে যাওয়া আর অলস সময় কাটানো। সমাজবিজ্ঞানের যে শাখাটি এই দিকটা নিয়ে কাজ করে, তার নাম লিজার স্টাডিজ (Leisure Studies) বা অবসর ও বিনোদন বিদ্যা। গবেষকরা বলছেন, যে পরিবার একসাথে খেলে, সেই পরিবার একসাথে টিকে থাকে (The family that plays together, stays together)। ফ্যামিলি লিজার (Family Leisure) বা পারিবারিক বিনোদন কেবল সময় কাটানো নয়, এটি পরিবারের বন্ডিং বা বাঁধন শক্ত করার এক শক্তিশালী আঠা। যখন বাবা-মা এবং সন্তানরা অফিসের ফাইল আর স্কুলের বই সরিয়ে রেখে একসাথে লুডো খেলে বা পার্কে হাঁটতে যায়, তখন তাদের মধ্যে যে মানসিক সংযোগ তৈরি হয়, তা হাজার ঘণ্টার শাসনেও হয় না। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে অবসর যাপন এবং উৎসবগুলো পরিবারের ‘আইডেন্টিটি’ বা পরিচয় তৈরি করে এবং কঠিন সময়ে পরিবারকে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
রবার্ট রাপোপোর্ট ও ফ্যামিলি লিজার: কোর বনাম ব্যালেন্স
পারিবারিক বিনোদন নিয়ে গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ হলেন রবার্ট রাপোপোর্ট (Robert Rapoport) এবং তার স্ত্রী রোনা রাপোপোর্ট (Rhona Rapoport)। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত তাদের বই Leisure and the Family Life Cycle-এ তারা দেখালেন যে, মানুষের জীবনের বিভিন্ন ধাপে (যেমন – নবদম্পতি, ছোট বাচ্চার বাবা-মা, বা বৃদ্ধ দম্পতি) বিনোদনের ধরণ এবং প্রয়োজন বদলে যায়। কিন্তু সব ধাপেই বিনোদন পরিবারের সংহতির জন্য অপরিহার্য। তারা বললেন, বিনোদন পরিবারের সদস্যদের স্ট্রেস কমায় এবং একে অপরকে নতুন করে চেনার সুযোগ করে দেয় (Rapoport & Rapoport, 1975)।
পরবর্তী গবেষকরা ফ্যামিলি লিজারকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন: ১. কোর লিজার (Core Leisure): এটি হলো প্রতিদিনকার ছোটখাটো বিনোদন, যার জন্য খুব বেশি টাকা বা পরিকল্পনার দরকার হয় না। যেমন – একসাথে টিভি দেখা, ডিনারের পর গল্প করা, বা লুডো খেলা। এটি পরিবারের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। ২. ব্যালেন্স লিজার (Balance Leisure): এটি হলো মাঝেমধ্যে করা বড় আয়োজন। যেমন – দূরে কোথাও পিকনিকে যাওয়া, চিড়িয়াখানায় যাওয়া বা ভেকেশনে যাওয়া। এটি পরিবারে নতুনত্ব এবং উত্তেজনা নিয়ে আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুখী পরিবারের জন্য এই দুটিরই দরকার আছে। ‘কোর’ লিজার দেয় নিরাপত্তা আর ‘ব্যালেন্স’ লিজার দেয় অ্যাডভেঞ্চার। তবে মজার ব্যাপার হলো, সম্পর্কের গভীরতা তৈরিতে দামী ভেকেশনের চেয়ে প্রতিদিনের ছোটখাটো আড্ডার ভূমিকা অনেক বেশি।
ফ্যামিলি রিচুয়ালস ও ট্র্যাডিশন: স্মৃতির অ্যালবাম
পরিবারের কি নিজস্ব কোনো সংস্কৃতি আছে? অবশ্যই আছে। আর সেই সংস্কৃতি তৈরি হয় ফ্যামিলি রিচুয়ালস (Family Rituals) বা পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এটি হতে পারে প্রতি শুক্রবার রাতে একসাথে বিরিয়ানি খাওয়া, বাচ্চার জন্মদিনে উচ্চতা মাপা, বা ঈদের দিন সবাই মিলে ছবি তোলা। গবেষক বারবারা ফিজ (Barbara Fiese) দেখিয়েছেন যে, এই রিচুয়ালগুলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটি ‘আমরা’ বোধ বা উই-নেস (We-ness) তৈরি করে। রিচুয়ালগুলো পরিবারের ইতিহাস এবং মূল্যবোধকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দেয়। বাচ্চারা যখন বড় হয়, তখন এই স্মৃতিগুলোই তাদের শেকড় হিসেবে কাজ করে। ফিজ একে বলেছেন সিম্বলিক মিনিং (Symbolic Meaning)। রিচুয়ালগুলো কেবল কাজ নয়, এগুলোর প্রতীকী অর্থ আছে – “আমরা একে অপরের জন্য আছি।” গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে নিয়মিত রিচুয়াল পালন করা হয় (যেমন – একসাথে ডিনার করা), সেসব পরিবারের সন্তানরা মানসিকভাবে বেশি সুস্থ থাকে এবং তাদের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে (Fiese et al., 2002)। ডিভোর্সের পর বা পুনর্বিবাহের (Remarriage) পর নতুন পরিবার গঠনেও এই রিচুয়ালগুলো জাদুকরী ভূমিকা রাখে।
লিজার এবং জেন্ডার: আনন্দের বৈষম্য
বিনোদন কি সবার জন্য সমান আনন্দের? নারীবাদী গবেষকরা এখানে এক ভিন্ন চিত্র দেখতে পান। তারা বলেন, পারিবারিক বিনোদন বা ভেকেশন পুরুষদের জন্য বিশ্রাম হতে পারে, কিন্তু নারীদের জন্য তা প্রায়শই ওয়ার্ক (Work) বা কাজ। ভাবুন তো, একটি পিকনিকের কথা। বাবা হয়তো বাচ্চাদের সাথে বল খেলছেন বা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু মা? তিনি খাবার বাড়ছেন, বাচ্চার নোংরা জামা পাল্টাচ্ছেন, বা সবার খেয়াল রাখছেন। সমাজবিজ্ঞানী রোজমেরি ডেম (Rosemary Deem) একে বলেছেন ফ্র্যাগমেন্টেড লিজার (Fragmented Leisure)। নারীদের অবসর সময়গুলো টুকরো টুকরো এবং সবসময় অন্যের সেবার সাথে মিশে থাকে। নারীরা যখন বিনোদন করেন, তখনও তাদের মাথায় থাকে ‘এথিক্স অফ কেয়ার’ বা যত্নের নৈতিকতা। তাই লিজার স্টাডিজ আমাদের শেখায় যে, পারিবারিক বিনোদনকে সত্যিকারের আনন্দদায়ক করতে হলে ঘরের কাজের (বিশেষ করে ছুটির দিনে) সুষম বণ্টন জরুরি। নতুবা ‘ফ্যামিলি টাইম’ মায়ের জন্য হয়ে ওঠে ‘স্ট্রেস টাইম’।
পারপাসিভ লিজার: সন্তান গড়ার প্রজেক্ট
আধুনিক মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বিনোদন এখন আর কেবল ‘নিছক আনন্দ’ নয়, এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্তানকে দক্ষ করে তোলার একটি মাধ্যম। একে বলা হয় পারপাসিভ লিজার (Purposive Leisure)। বাবা-মায়েরা বাচ্চাকে এমন সব ক্লাসে ভর্তি করান বা এমন সব খেলনা কিনে দেন, যা তাদের মেধা বাড়াবে। যেমন – সাতার শেখা, পিয়ানো বাজানো, বা কোডিং শেখা। বিনোদন এখানে হয়ে গেছে এক ধরণের বিনিয়োগ। সমাজবিজ্ঞানী অ্যানেট লারেউ (Annette Lareau) একে বলেছেন কনসার্টেড কাল্টিভেশন (Concerted Cultivation)। কিন্তু এর একটা খারাপ দিকও আছে। বাচ্চাদের হাতে এখন আর ‘ফ্রি প্লে’ বা অখণ্ড অবসর নেই। তাদের ক্যালেন্ডার ঠাসাঠাসি। এর ফলে শিশুদের মধ্যে লিজার বোরডম (Leisure Boredom) বা সৃজনশীলতার অভাব দেখা দিচ্ছে। তারা নিজেরা কীভাবে খেলতে হয় তা ভুলে যাচ্ছে, সবসময় বড়দের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে। লিজার স্টাডিজ সতর্ক করছে যে, বিনোদনকে যেন আমরা পারফরম্যান্সের পাল্লায় না মাপি।
ডিজিটাল লিজার: এক ঘরে, তবু আলাদা
প্রযুক্তি আমাদের বিনোদনের ধরণ বদলে দিয়েছে। আগে পরিবার মানেই ছিল একসাথে বসে লুডো খেলা বা গল্প করা। এখন পরিবার মানে হলো – বাবা টিভিতে খবর দেখছেন, মা আইপ্যাডে রেসিপি দেখছেন, আর সন্তান ফোনে গেম খেলছে। সবাই এক ঘরে, কিন্তু কেউ কারো সাথে নেই। একে বলা হচ্ছে লিভিং টুগেদার সেপারেটলি (Living Together Separately)। গবেষকরা একে দেখছেন প্রাইভেটাইজেশন অফ লিজার (Privatization of Leisure) হিসেবে। ডিজিটাল বিনোদন আমাদের ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী কাস্টমাইজড হয়ে গেছে (আমার নেটফ্লিক্স প্রোফাইল আপনার চেয়ে আলাদা)। এর ফলে ‘শেয়ারড এক্সপেরিয়েন্স’ বা যৌথ অভিজ্ঞতা কমে যাচ্ছে। তবে এর উল্টো দিকও আছে। ভিডিও গেম বা অনলাইন মুভি নাইট অনেক পরিবারের (বিশেষ করে দূরে থাকা সদস্যদের) যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই প্রযুক্তি বিনোদনকে ভাঙছে নাকি গড়ছে, তা নির্ভর করে আমরা কীভাবে তা ব্যবহার করছি তার ওপর।
অবসর ও বিনোদন বিদ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের স্বাস্থ্য কেবল অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বা সামাজিক সম্মানের ওপর নির্ভর করে না। একটি পরিবার কতটা সুখী, তা মাপা যায় তাদের হাসির শব্দ দিয়ে। জীবনের কঠিন লড়াইয়ের মাঝে এই ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তগুলোই আমাদের অক্সিজেন জোগায়। পরিবার নিয়ে আলোচনায় তাই লিজারের পাঠ অত্যন্ত জরুরি – কারণ দিনশেষে আমরা বাঁচার জন্যই কাজ করি, কাজের জন্য বাঁচি না।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল জগত: স্ক্রিনের দেয়াল
আমাদের পারিবারিক অ্যালবামের দিকে তাকালে এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। দশ বছর আগেও ছবিতে দেখা যেত সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে বা গল্প করছে। আর আজকের ছবিতে? সবাই আছে, কিন্তু সবার চোখ হাতের মুঠোয় থাকা ওই উজ্জ্বল চারকোণা স্ক্রিনটির দিকে। প্রযুক্তি, বিশেষ করে স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া, আমাদের পারিবারিক জীবনে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই বিপ্লবের দুটো পিঠ আছে। একদিকে এটি আমাদের হাজার মাইল দূরের আত্মীয়ের সাথে মুহূর্তেই ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু অন্যদিকে, এটি আমাদের ঠিক পাশের মানুষটির সাথে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে দিয়েছে। আমরা এখন একই ছাদের নিচে থেকেও যেন ভিন্ন ভিন্ন গ্রহে বাস করছি। সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা এই নতুন বাস্তবতাকে গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা বলছেন, ডিজিটাল জগত আমাদের পরিবারের সংজ্ঞা, যোগাযোগ এবং আবেগের ব্যাকরণকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এখন আমরা দেখব, কীভাবে প্রযুক্তি আমাদের ‘কানেক্টেড’ রাখছে, আবার একই সাথে আমাদের ‘বিচ্ছিন্ন’ করছে।
শার্লি টার্কল ও একা থাকার নতুন ধরণ
ডিজিটাল যুগের পারিবারিক সংকট নিয়ে সবচেয়ে গভীর এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ কাজ করেছেন এমআইটি (MIT)-র অধ্যাপক এবং মনোবিজ্ঞানী শার্লি টার্কল (Sherry Turkle)। ২০১১ সালে প্রকাশিত তার বেস্ট সেলার বই Alone Together: Why We Expect More from Technology and Less from Each Other-এ তিনি আমাদের সময়ের এক নির্মম সত্য তুলে ধরলেন। টার্কল দেখালেন, আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে সবার সাথে যুক্ত বা ‘হাইপার-কানেক্টেড’ থাকছি ঠিকই, কিন্তু আমরা আসলে আগের চেয়ে অনেক বেশি একা হয়ে পড়ছি। তিনি এর নাম দিলেন অ্যালোন টুগেদার (Alone Together)। পরিবারের সবাই ড্রয়িংরুমে বসে আছে, কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। বাবা অফিসের ইমেইল চেক করছেন, মা ফেসবুকে লাইক গুনছেন, আর টিনএজার সন্তান স্ন্যাপচ্যাটে বন্ধুদের সাথে ছবি আদান-প্রদান করছে। টার্কল এই অবস্থাকে বললেন দ্য প্রেজেন্ট অ্যাবসেন্স (The Present Absence)। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে আপনি সেখানে উপস্থিত আছেন (Present), কিন্তু মানসিকভাবে আপনি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (Absent) (Turkle, 2011)।
টার্কল যুক্তি দিলেন যে, ডিজিটাল যোগাযোগ আমাদের ‘কনভারসেশন’ বা কথোপকথনের গভীরতা কেড়ে নিচ্ছে। টেক্সট মেসেজ বা ইমেইলে আমরা যা লিখি, তা আমরা এডিট করতে পারি, ডিলিট করতে পারি। অর্থাৎ, আমরা আমাদের ‘সেরা রূপটি’ উপস্থাপন করতে পারি। কিন্তু মুখোমুখি বা ‘ফেস-টু-ফেস’ কথোপকথনে সেই সুযোগ নেই। সেখানে ভুল হয়, তোতলামি হয়, আর সেটাই হলো মানবিক। পরিবারের ভেতরে এই অপরিশোধিত বা ‘র’ (Raw) আবেগের আদান-প্রদান কমে যাওয়ার ফলে আমাদের এমপ্যাথি (Empathy) বা সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। বাচ্চারা এখন বাবা-মায়ের গলার স্বর বা চোখের ভাষা পড়তে শিখছে না, কারণ তাদের দৃষ্টি সবসময় স্ক্রিনে। টার্কল সতর্ক করলেন যে, আমরা যদি স্ক্রিনের চেয়ে মানুষের মুখের দিকে বেশি না তাকাই, তবে আমরা রোবটের মতো অনুভূতিহীন হয়ে পড়ব।
ডিজিটাল অভিবাসী বনাম ডিজিটাল নেটিভ
পরিবারের ভেতরে প্রযুক্তি নিয়ে যে দ্বন্দ্ব বা ‘জেনারেশন গ্যাপ’ তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার জন্য মার্ক প্রেয়নস্কি (Marc Prensky)-র দেওয়া দুটি ধারণা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বললেন, আজকের বাবা-মায়েরা হলেন ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্টস (Digital Immigrants) বা ডিজিটাল অভিবাসী। তারা বড় হয়েছেন অ্যানালগ যুগে (চিঠি, ল্যান্ডফোন), আর বড় বয়সে এসে প্রযুক্তি শিখেছেন। তাদের কাছে প্রযুক্তির ভাষাটা যেন একটা বিদেশি ভাষা, যা তারা একটু তোতলে তোতলে বলেন। অন্যদিকে, তাদের সন্তানরা হলো ডিজিটাল নেটিভস (Digital Natives) বা ডিজিটাল স্থানীয়। তারা স্মার্টফোন হাতে নিয়েই জন্মেছে। তাদের কাছে প্রযুক্তি হলো মাতৃভাষার মতো সহজ এবং স্বতঃস্ফূর্ত (Prensky, 2001)।
এই পার্থক্যের ফলে পরিবারের ভেতরে এক বিশাল বোঝাপড়ার সংকট তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়েরা সন্তানের অনলাইন জগতকে ভয় পান বা সন্দেহ করেন। তারা ভাবেন সন্তান বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সন্তানরা ভাবে বাবা-মা কিছুই বোঝে না, তারা ‘ব্যাকডেটেড’। এই দ্বন্দ্বের নাম টেকনোফারেন্স (Technoference) – প্রযুক্তির কারণে পারিবারিক সম্পর্কে ব্যাঘাত ঘটা। গবেষক ব্র্যান্ডন ম্যাকড্যানিয়েল (Brandon McDaniel) দেখিয়েছেন যে, টেকনোফারেন্স যত বাড়ে, বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের উষ্ণতা তত কমে এবং সন্তানের আচরণগত সমস্যা (Behavioral Issues) বাড়ে (McDaniel & Radesky, 2018)।
শ্যারেন্টিং: সন্তানের প্রাইভেসি কোথায়?
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই দেখা যায় বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানের ছবি পোস্ট করছেন – বাচ্চা প্রথম হাঁটছে, বাচ্চার পটি ট্রেনিং, বা বাচ্চার স্নানের ছবি। এই যে সন্তানের ছবি বা তথ্য অনলাইনে শেয়ার করার প্রবণতা, একে বলা হয় শ্যারেন্টিং (Sharenting) (Share + Parenting)। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সাধারণ মনে হলেও, এর আইনি এবং নৈতিক দিক নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। গবেষকরা বলছেন, বাবা-মায়েরা তাদের অজান্তেই সন্তানের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট (Digital Footprint) তৈরি করে দিচ্ছেন, যা শিশুটি বড় হওয়ার আগেই তার অনলাইনে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। শিশুটি হয়তো বড় হয়ে চাইবে না তার ছোটবেলার বিব্রতকর ছবি সবাই দেখুক, কিন্তু ততদিনে সেটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞ স্টেসি স্টেইনবার্গ (Stacey Steinberg) সতর্ক করেছেন যে, শ্যারেন্টিং শিশুদের প্রাইভেসির অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে এবং তাদের ভবিষ্যতে সাইবার বুলিং বা আইডেন্টিটি থেফটের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তিনি একে বলছেন প্রাইভেসি প্যারাডক্স (Privacy Paradox) – বাবা-মায়েরা সন্তানের নিরাপত্তার জন্য খুব চিন্তিত, কিন্তু তারাই আবার সন্তানের সব তথ্য পাবলিক করে দিচ্ছেন। অনেক টিনএজার এখন তাদের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, তাদের অনুমতি না নিয়ে কেন ছবি পোস্ট করা হলো। এটি পরিবারের ভেতরে এক নতুন ধরণের বিশ্বাসভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ফাবিং: উপেক্ষার নতুন নাম
আপনি কি কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন যে আপনি কারো সাথে কথা বলছেন, কিন্তু সে আপনার দিকে না তাকিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে? এই অভদ্র আচরণের একটি নাম আছে – ফাবিং (Phubbing)। শব্দটি এসেছে ‘ফোন’ (Phone) এবং ‘স্নাবিং’ (Snubbing) বা নাকচ করা থেকে। গবেষকরা বলছেন, ফাবিং এখন দাম্পত্য কলহের অন্যতম বড় কারণ। যখন স্বামী বা স্ত্রী কথা বলার সময় পার্টনারের দিকে না তাকিয়ে ফোনে স্ক্রল করেন, তখন অপরজন নিজেকে অপমানিত এবং গুরুত্বহীন মনে করেন। একে বলা হয় পার্টনার ফাবিং (Partner Phubbing)। গবেষণায় দেখা গেছে, ফাবিং দাম্পত্য সন্তুষ্টি বা ম্যারিটাল স্যাটিসফ্যাকশন (Marital Satisfaction) কমিয়ে দেয় এবং ডিপ্রেশন বাড়ায়। কারণ, পার্টনারের এই আচরণটি এক ধরণের প্রত্যাখ্যান বা সোশ্যাল এক্সক্লুশন (Social Exclusion)-এর মতো কাজ করে, যা মস্তিষ্কে ব্যথার অনুভূতি তৈরি করে। কেবল দম্পতি নয়, বাবা-মায়ের ফাবিং বাচ্চার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাচ্চারা যখন দেখে বাবা-মা ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন তারা মনোযোগ পাওয়ার জন্য দুষ্টুমি বা জেদ শুরু করে।
ডিজিটাল ন্যানি: স্ক্রিন যখন আয়া
আজকাল বাবা-মায়েরা বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য বা খাওয়ানোর জন্য তাদের হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ধরিয়ে দেন। একে বলা হয় ডিজিটাল ন্যানি (Digital Nanny) বা ডিজিটাল আয়া। এটি বাবা-মায়ের জন্য সাময়িক স্বস্তি বা ‘কুইক ফিক্স’ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুর বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP) বলছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের ভাষার বিকাশ বা ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট (Language Development) দেরি করিয়ে দেয় এবং তাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। শিশুরা যখন স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা বাস্তব জগতের খেলাধুলো বা মানুষের সাথে মেশার সুযোগ হারায়। একে বলা হচ্ছে ডিসপ্লেসমেন্ট হাইপোথিসিস (Displacement Hypothesis) – স্ক্রিন টাইম বাচ্চার প্রোডাক্টিভ টাইমকে সরিয়ে দিচ্ছে। তবে কিছু গবেষক বলছেন, সব স্ক্রিন টাইম খারাপ নয়। বাবা-মা যদি বাচ্চার সাথে বসে শিক্ষামূলক কোনো অনুষ্ঠান দেখেন এবং সেটা নিয়ে কথা বলেন, তবে সেটা বাচ্চার জন্য ভালো হতে পারে। একে বলা হয় কো-ভিউইং (Co-viewing)।
ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যামিলি ও ভার্চুয়াল ইনটিমেসি
প্রযুক্তির একটি ইতিবাচক দিক হলো এটি পরিবারকে ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। বাবা দুবাইতে, মা ঢাকায়, আর ছেলে লন্ডনে – সবাই মিলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চ্যাট করছে বা স্কাইপে কথা বলছে। একে বলা হয় ভার্চুয়াল ইনটিমেসি (Virtual Intimacy)। ভূগোলবিদ এবং মিডিয়া স্কলাররা বলছেন, প্রযুক্তি এখন অ্যাম্বিয়েন্ট কো-প্রেজেন্স (Ambient Co-presence) তৈরি করছে। এর মানে হলো, আমরা সব সময় একে অপরের সাথে যুক্ত আছি, যেন আমরা একই ঘরে আছি। প্রবাসী শ্রমিকরা ভিডিও কলের মাধ্যমে বাচ্চার হোমওয়ার্ক দেখছেন বা স্ত্রীর সাথে সংসার নিয়ে কথা বলছেন। একে বলা হচ্ছে ট্রান্সন্যাশনাল কেয়ারগিভিং (Transnational Caregiving)। যদিও স্ক্রিনের স্পর্শ আসল স্পর্শের মতো নয়, তবুও এটি একাকীত্ব কমাতে এবং পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে জাদুকরী ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক অভিবাসী বা ‘ডায়াসপোরা’ পরিবারের টিকে থাকা অসম্ভব ছিল।
সাইবার বুলিং ও অনলাইন ঝুঁকি
পরিবার এখন কেবল বাইরের জগত থেকে নিরাপদ থাকলেই চলে না, ভার্চুয়াল জগত থেকেও নিরাপদ থাকতে হয়। শিশুরা ঘরে বসে থেকেও অনলাইনে বুলিং বা হেনস্তার শিকার হতে পারে, একে বলা হয় সাইবার বুলিং (Cyberbullying)। ট্র্যাডিশনাল বুলিং স্কুলে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সাইবার বুলিং ২৪ ঘণ্টাই চলতে থাকে এবং এটি অনেক বেশি মানসিক চাপ তৈরি করে। এছাড়াও আছে অনলাইন গ্রুমিং (Online Grooming) বা প্রিডেটরদের ভয়, যারা শিশুদের ফাঁদে ফেলে। বাবা-মায়ের জন্য এখন এক নতুন দায়িত্ব হলো ডিজিটাল প্যারেন্টিং (Digital Parenting) – সন্তান অনলাইনে কী করছে তার ওপর নজর রাখা। কিন্তু এখানেও এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য দরকার। নজরদারি বা সার্ভেইল্যান্স (Surveillance) যদি বেশি হয়ে যায়, তবে সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গবেষকরা পরামর্শ দেন ‘মনিটরিং’ বা গোয়েন্দাগিরি না করে ‘মেন্টরিং’ বা পথপ্রদর্শন করতে।
প্রযুক্তি: ভিলেন নাকি হিরো?
শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি কি পরিবারের শত্রু না বন্ধু? উত্তরটা নির্ভর করে আমরা কীভাবে তা ব্যবহার করছি তার ওপর। গবেষক প্যাট্রিসিয়া ভলকেনবার্গ (Patti Valkenburg) এবং জোচেন পিটার (Jochen Peter) ইন্টারনেটের প্রভাব নিয়ে দুটি হাইপোথিসিস দিয়েছেন। ১. ডিসপ্লেসমেন্ট হাইপোথিসিস (Displacement Hypothesis): অনলাইন সময় আমাদের অফলাইন সম্পর্কের ক্ষতি করে। ২. স্টিমুলেশন হাইপোথিসিস (Stimulation Hypothesis): অনলাইন যোগাযোগ আমাদের অফলাইন সম্পর্ককে আরও মজবুত করে (Valkenburg & Peter, 2007)। দেখা গেছে, যারা অপরিচিতদের সাথে চ্যাট করে সময় কাটায়, তাদের পারিবারিক সম্পর্ক খারাপ হয়। কিন্তু যারা পরিচিত বা পরিবারের সদস্যদের সাথেই অনলাইনে কথা বলে, তাদের সম্পর্ক আরও ভালো হয়। অর্থাৎ, প্রযুক্তি যদি যোগাযোগের মাধ্যম হয়, তবে তা ভালো; আর যদি তা পালানোর পথ বা এস্কেপিজম (Escapism) হয়, তবে তা খারাপ।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল জগতের এই আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবার কোনো স্থির প্রতিষ্ঠান নয়। এটি সময়ের সাথে সাথে বদলায়। স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ এগুলো এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের যেটা দরকার তা হলো ডিজিটাল ডায়েট (Digital Diet) – কখন এবং কতটা প্রযুক্তি ব্যবহার করব তার একটা পারিবারিক নিয়ম। ডিনার টেবিলে ফোন নিষিদ্ধ করা বা সপ্তাহে একদিন ‘স্ক্রিন-ফ্রি ডে’ পালন করা – এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই পারে আমাদের আবার ‘অ্যালোন টুগেদার’ থেকে ‘টুগেদার’ বা একসাথে থাকার আনন্দে ফিরিয়ে নিতে।
ভবিষ্যৎ পরিবার: এআই এবং অটোমেশনের যুগে
আমরা বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (Fourth Industrial Revolution) দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence), রোবোটিক্স, জিন এডিটিং এবং ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কেবল সায়েন্স ফিকশন সিনেমার বিষয় নয়, এগুলো আমাদের বসার ঘরে এবং শোবার ঘরে ঢুকে পড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টারা (Futurists) আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে প্রযুক্তির এই সুনামি পরিবারের সংজ্ঞাকেই বদলে দেবে। এতদিন আমরা ভেবেছি পরিবার মানেই মানুষে-মানুষে সম্পর্ক। কিন্তু যখন আমাদের ঘরের কাজ করবে রোবট, বাচ্চার দেখাশোনা করবে এআই ন্যানি, আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গী হবে সোশ্যাল রোবট – তখন পরিবারের চেহারাটা কেমন হবে? প্রযুক্তি কি আমাদের সম্পর্কগুলোকে আরও যান্ত্রিক করে তুলবে, নাকি আমাদের একঘেয়ে কাজ থেকে মুক্তি দিয়ে একে অপরের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেবে? এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, এআই এবং অটোমেশনের যুগে আমাদের পরিবারগুলো কোন দিকে যাচ্ছে এবং সেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পারিবারিক জীবন কতটা ‘মানবিক’ থাকবে।
এআই সঙ্গী ও রোবোটিক সম্পর্ক: মানুষ নাকি মেশিন?
ভবিষ্যৎ পরিবারের সবচেয়ে বড় চমক হতে যাচ্ছে হিউম্যান-রোবট ইন্টারঅ্যাকশন (Human-Robot Interaction)। আমরা ইতিমধ্যেই সিরি (Siri) বা অ্যালেক্সা (Alexa)-র সাথে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু ভবিষ্যতে আসবে ইমোশনাল এআই বা এফেক্টিভ কম্পিউটিং (Affective Computing), যা মানুষের আবেগ বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাবে। গবেষকরা ধারণা করছেন, নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য তৈরি হবে এআই কম্প্যানিয়ন (AI Companion) বা রোবোটিক সঙ্গী। জাপানে ইতিমধ্যেই ‘গেটবক্স’ (Gatebox) নামে এমন ভার্চুয়াল স্ত্রী বা সঙ্গী পাওয়া যাচ্ছে, যা একাকী পুরুষদের স্বাগত জানায়। এর ফলে ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ বিয়ের বদলে রোবটের সাথে সংসার করাকেই বেছে নেবে। একে বলা হচ্ছে ডিজিসেপ্সুয়ালিটি (Digisexuality)। ডেভিড লেভি (David Levy) তার বই Love and Sex with Robots-এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষ এবং রোবটের মধ্যে বিয়ে আইনি স্বীকৃতি পেতে পারে (Levy, 2007)।
এই প্রবণতা পরিবারের ওপর কী প্রভাব ফেলবে? একদিকে এটি একাকীত্ব বা সোশ্যাল আইসোলেশন (Social Isolation) কমাবে, বিশেষ করে বয়স্ক বা সামাজিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য। কিন্তু অন্যদিকে, এটি মানুষের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্কের প্রয়োজন কমিয়ে দেবে। যদি একটি রোবট সবসময় আপনার কথা শোনে, কখনো ঝগড়া না করে এবং আপনার সব চাহিদা মেটায়, তবে কেন আপনি একজন রক্ত-মাংসের মানুষের সাথে সংসার করতে চাইবেন যার নিজস্ব মতামত এবং মেজাজ আছে? এটি পরিবারের মূল ভিত্তি – ত্যাগ, সমঝোতা এবং ধৈর্যের – মৃত্যুঘণ্টা বাজাতে পারে। সমাজবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে মানব সমাজের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স (Emotional Intelligence) কমে যাবে এবং আমরা আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ব।
অ্যালগরিদমিক প্যারেন্টিং: ডেটা যখন অভিভাবক
সন্তান লালন-পালন বা প্যারেন্টিং-এর জগতেও এআই এক বিশাল বিপ্লব আনতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে বাবা-মায়েরা আর কেবল নিজেদের বুদ্ধিতে বা মুরুব্বিদের পরামর্শে সন্তান মানুষ করবেন না, তারা নির্ভর করবেন ডেটা বা তথ্যের ওপর। একে বলা হচ্ছে ডেটাফাইড প্যারেন্টিং (Datafied Parenting)। স্মার্ট ডায়াপার বাচ্চার স্বাস্থ্যের খবর দেবে, স্মার্ট ক্র্যাডল বা দোলনা বাচ্চাকে ঘুম পাড়াবে, আর এআই টিউটর বাচ্চার মেধা অনুযায়ী তাকে শেখাবে। গবেষক লুপটন এবং উইলিয়ামসন (Lupton & Williamson) একে বলেছেন দ্য কোয়ান্টিফায়েড চাইল্ড (The Quantified Child)। অর্থাৎ, শিশুর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কান্না এবং প্রতিটি হাসি ডেটায় রূপান্তরিত হবে এবং অ্যালগরিদম ঠিক করে দেবে তার জন্য কী ভালো (Lupton & Williamson, 2017)।
এর সুবিধা হলো, বাবা-মায়েরা অনেক বেশি নিশ্চিত মনে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং শিশুর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমবে। কিন্তু এর বিপদও ভয়াবহ। বাবা-মায়ের সহজাত প্রবৃত্তি বা প্যারেন্টাল ইন্সটিংকট (Parental Instinct) নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তারা মেশিনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন যে, মেশিন ছাড়া বাচ্চার কান্না থামানো বা তাকে খাওয়ানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হবে। এছাড়া, এআই ন্যানি বা রোবট বেবিসিটার যদি বাচ্চার দেখাশোনা করে, তবে শিশুর আবেগীয় বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, একটি মেশিন যতই উন্নত হোক, মায়ের স্পর্শ বা বাবার গায়ের গন্ধ সে দিতে পারে না। মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, এই টেকনো-প্যারেন্টিং (Techno-parenting) শিশুদের মধ্যে অ্যাটাচমেন্ট ডিজঅর্ডার তৈরি করতে পারে।
রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি ও ডিজাইনার বেবি
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা ক্রিসপার (CRISPR) প্রযুক্তির ব্যবহার। এর মাধ্যমে বাবা-মায়েরা তাদের অনাগত সন্তানের জিন এডিট করতে পারবেন। তারা ঠিক করতে পারবেন সন্তানের চোখের রঙ কী হবে, উচ্চতা কত হবে, বা সে কতটা মেধাবী হবে। একে বলা হয় ডিজাইনার বেবি (Designer Baby)। এতদিন সন্তান ছিল ‘ঈশ্বরের দান’ বা প্রকৃতির উপহার, ভবিষ্যতে সন্তান হবে ‘কাস্টমাইজড প্রোডাক্ট’। এই প্রযুক্তি পরিবারের ধারণাকে আমূল বদলে দেবে। পরিবার তখন হয়ে উঠবে এক ধরণের বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরি।
নীতিবিদ বা বায়োএথিসিস্টরা (Bioethicists) প্রশ্ন তুলছেন, যদি ধনী পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের জিন এডিট করে সুপার-হিউম্যান বানায়, আর গরিবরা তা না পারে, তবে সমাজে এক নতুন ধরণের বৈষম্য তৈরি হবে – জেনেটিক ইনইকুয়ালিটি (Genetic Inequality)। তখন পরিবার কেবল সামাজিক শ্রেণী নয়, জৈবিক শ্রেণীও তৈরি করবে। এছাড়া, সন্তানকে যখন বাবা-মা নিজেদের পছন্দমতো ডিজাইন করবেন, তখন সেই সন্তানের ওপর বাবা-মায়ের প্রত্যাশার চাপ অনেক বেড়ে যাবে। সন্তান যদি সেই ডিজাইনের মতো পারফর্ম না করে, তবে পারিবারিক কলহ এবং হতাশা দেখা দেবে। জুলিয়ান সাভুলেস্কু (Julian Savulescu) অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন যে, সন্তানের মঙ্গলের জন্য জিনগত রোগ দূর করা বা প্রোক্রিয়েটিভ বেনিফিসেন্স (Procreative Beneficence) বাবা-মায়ের নৈতিক দায়িত্ব (Savulescu, 2001)। এই বিতর্ক ভবিষ্যতে পরিবারের সংজ্ঞাকে নতুন করে লিখবে।
অটোমেশন ও গৃহশ্রমের ভবিষ্যৎ
নারীবাদীরা এতদিন অভিযোগ করে এসেছেন যে, গৃহশ্রম বা ডোমেস্টিক ওয়ার্কের বোঝা নারীর কাঁধেই বেশি। এআই এবং রোবোটিক্স হয়তো এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। স্মার্ট হোম, রোবট ক্লিনার এবং অটোমেটেড কিচেন ভবিষ্যতে ঘরের কাজকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনবে। এর ফলে পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে নারীরা, ‘সেকেন্ড শিফট’ বা দ্বিতীয় দফার কাজের চাপ থেকে মুক্তি পাবেন। একে বলা হচ্ছে পোস্ট-ওয়ার্ক ফ্যামিলি (Post-work Family)। যখন রান্নাবান্না বা ঘর মোছার কাজ থাকবে না, তখন পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটানোর বা লিজার (Leisure)-এর সুযোগ বেশি পাবেন।
তবে অর্থনীতিবিদরা মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখছেন। অটোমেশনের কারণে যদি বাইরে মানুষের চাকরি চলে যায়, তবে ঘরে বসে থাকা বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়বে। তখন এই অতিরিক্ত অবসর সময় বা ফোর্সড লিজার (Forced Leisure) পারিবারিক অশান্তির কারণ হতে পারে। ইতিহাসে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক মন্দার সময় ডিভোর্স এবং ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বাড়ে। তাই প্রযুক্তি যদি কাজ কমায় কিন্তু আয় না বাড়ায়, তবে তা পরিবারের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হতে পারে। এছাড়া, স্মার্ট হোম প্রযুক্তি আমাদের ঘরের ভেতরের প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা নষ্ট করে দিচ্ছে। গুগল বা অ্যামাজন সব সময় শুনছে আমরা ঘরে কী কথা বলছি। একে বলা হচ্ছে সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম (Surveillance Capitalism) বা নজরদারি পুঁজিবাদ, যা পরিবারের অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলোকেও পণ্যে পরিণত করছে (Zuboff, 2019)।
ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ও ডিজিটাল আফটারলাইফ
ভবিষ্যৎ পরিবারের আরেকটি অদ্ভুত দিক হতে পারে ডিজিটাল আফটারলাইফ (Digital Afterlife)। মানুষ মারা যাওয়ার পরও তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ডেটা ব্যবহার করে এআই তার একটি ভার্চুয়াল অবতার তৈরি করতে পারবে, যা পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলবে। কোরিয়ান একটি ডকুমেন্টারিতে দেখা গেছে, এক মা ভিআর (VR) প্রযুক্তির মাধ্যমে তার মৃত মেয়ের সাথে দেখা করছেন এবং কথা বলছেন। ভবিষ্যতে হয়তো মৃত বাবা বা দাদুর সাথে নাতি-নাতনিরা গল্প করতে পারবে। এটি শোক বা গ্রিফ (Grief) কাটানোর নতুন উপায় হতে পারে।
কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলছেন, এতে কি মানুষ সত্যিই শোক কাটিয়ে উঠতে পারবে, নাকি তারা অতীতের ভূত বা ডিজিটাল ঘোস্ট (Digital Ghost)-এর সাথে আটকে থাকবে? পরিবারের মৃত সদস্যদের ধরে রাখার এই প্রবণতা মানুষকে বর্তমানের সম্পর্কগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এছাড়া, ‘মেটাভার্স’ (Metaverse) বা ভার্চুয়াল জগতে মানুষ যদি বেশি সময় কাটায়, তবে বাস্তব পরিবারের গুরুত্ব কমে যাবে। মানুষ হয়তো বাস্তব সংসারের ঝামেলা এড়াতে ভার্চুয়াল সংসারে সুখ খুঁজবে। গবেষকরা একে দেখছেন এসকেপিজম (Escapism)-এর চরম রূপ হিসেবে। পরিবার তখন বাস্তব এবং অবাস্তবের এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে পারে।
এজিং সোসাইটি ও রোবট কেয়ারগিভার
বার্ধক্য বা এজিং সোসাইটির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এআই এবং রোবট বড় ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে হয়তো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবার জন্য মানুষের বদলে কেয়ারবট (Carebot) বা সেবা-রোবট ব্যবহার করা হবে। এই রোবটরা বৃদ্ধদের ওষুধ দেবে, ধরে ধরে হাঁটাবে, এমনকি গল্পও করবে। এটি ‘স্যান্ডউইচ জেনারেশন’-এর ওপর থেকে কাজের চাপ কমাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি রোবট কি সন্তানের ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে?
গবেষক শ্যানন ভ্যালর (Shannon Vallor) সতর্ক করেছেন যে, রোবট দিয়ে সেবা দেওয়াটা হয়তো দক্ষ বা এফিশিয়েন্ট হবে, কিন্তু তা হবে নৈতিকভাবে দেউলিয়া। তিনি একে বলেছেন মোরাল ডেস্কিলিং (Moral Deskilling)। অর্থাৎ, আমরা যত্ন নেওয়া বা সেবা করার মতো মানবিক গুণগুলো হারিয়ে ফেলব কারণ আমরা সেই দায়িত্ব মেশিনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছি (Vallor, 2015)। বৃদ্ধরা হয়তো শারীরিকভাবে ভালো থাকবেন, কিন্তু মানসিকভাবে তারা আরও বেশি একাকীত্বে ভুগবেন, কারণ তারা বুঝবেন যে তাদের পাশে যা আছে তা কেবলই একটি মেশিন, কোনো মানুষ নয়। পরিবারের মূলে যে ‘যত্ন’ বা কেয়ারগিভিং-এর দর্শন আছে, প্রযুক্তি তাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এআই এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির এই জগত আমাদের সামনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে। পরিবার কি টিকে থাকবে, নাকি প্রযুক্তির স্রোতে হারিয়ে যাবে? উত্তরটা নির্ভর করে আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করছি তার ওপর। যদি আমরা প্রযুক্তিকে পরিবারের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করি, তবে তা আমাদের বন্ধন দৃঢ় করতে পারে। আর যদি আমরা প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তবে আমরা হয়তো এমন এক সমাজ গড়ব যেখানে ‘স্মার্ট হোম’ থাকবে, কিন্তু ‘স্মার্ট হার্ট’ বা হৃদয়বান মানুষ থাকবে না। ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ ডিসিপ্লিনকে তাই এখন কেবল বর্তমান নয়, এই আসন্ন ভবিষ্যতের এথিক্স বা নৈতিকতা নিয়েও ভাবতে হবে।
হোম ইকোনমিক্স: রান্নাঘরের বিজ্ঞান নাকি বিজ্ঞানের রান্নাঘর?
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন শিল্প বিপ্লব তুঙ্গে, তখন আমেরিকার শিক্ষাবিদদের মাথায় এক নতুন চিন্তা এল। কলকারখানা চালানোর জন্য যেমন ইঞ্জিনিয়ার দরকার, তেমনি ঘর বা সংসার চালানোর জন্যও তো দক্ষ মানুষের দরকার। ঘর চালানো তো কোনো ছেলেখেলা নয়, এটিও একটি বিজ্ঞান। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল হোম ইকোনমিক্স (Home Economics) বা গার্হস্থ্য অর্থনীতি। এর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন এলিন সোয়ালো রিচার্ডস (Ellen Swallow Richards), যিনি ছিলেন এমআইটি (MIT)-র প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট এবং রসায়নবিদ। তিনি চেয়েছিলেন বিজ্ঞানকে ল্যাবরেটরি থেকে বের করে এনে রান্নাঘরে এবং শোবার ঘরে প্রয়োগ করতে। পুষ্টিবিজ্ঞান, হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি, টেক্সটাইল, এবং শিশু বিকাশ – এই সবগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে তিনি একটি নতুন ডিসিপ্লিন দাঁড় করালেন। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ – নারীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা এবং পরিবারকে আরও দক্ষ ও স্বাস্থ্যসম্মত করা। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাসে, এই হোম ইকোনমিক্সই পরে নারীদের জন্য এক সোনার খাঁচা হয়ে দাঁড়াল। সমাজ মনে করল, মেয়েদের কাজ কেবল ঘরকন্না করা, আর হোম ইকোনমিক্স হলো তাদের সেই ঘরকন্নার ‘ডিগ্রি’। আধুনিক ফ্যামিলি স্টাডিজ বা পরিবার বিদ্যার শিকড় এই হোম ইকোনমিক্সের গভীরে প্রোথিত থাকলেও, এর গায়ে লেগে থাকা ‘মেয়েলি’ বা ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ তকমাটি আজও পুরোপুরি মোছেনি। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে হোম ইকোনমিক্স পরিবারকে বিজ্ঞানের আলোয় এনেছিল এবং কেন পরবর্তীতে এটি নিজেই এক বড় বিতর্কের জন্ম দিল।
এলিন রিচার্ডস ও লেক প্লাসিড সম্মেলন
হোম ইকোনমিক্সের জন্ম হয়েছিল ১৮৯৯ সালে নিউইয়র্কের লেক প্লাসিডে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে। এলিন সোয়ালো রিচার্ডস (Ellen Swallow Richards) এবং তার সমমনা শিক্ষাবিদরা সেখানে মিলিত হয়ে একটি নতুন বিদ্যার রূপরেখা তৈরি করেন, যার নাম তারা প্রথমে দিতে চেয়েছিলেন ‘ওইকোলজি’ (Oekology) – অর্থাৎ ঘর বা বাসস্থানের বিজ্ঞান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ‘হোম ইকোনমিক্স’ নামটি বেছে নেন, কারণ তারা চেয়েছিলেন একে অর্থনীতির মতো একটি ‘সিরিয়াস’ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। রিচার্ডস বিশ্বাস করতেন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অপুষ্টির কারণেই মানুষ অসুস্থ হয় এবং সমাজ পিছিয়ে পড়ে। তাই তিনি চাইলেন নারীরা যেন ব্যাকটেরিয়া, স্যানিটেশন এবং পুষ্টির রাসায়নিক উপাদানগুলো বোঝেন। তার স্লোগান ছিল – “Science in the Home” বা গৃহের ভেতর বিজ্ঞান। রিচার্ডস চেয়েছিলেন হোম ইকোনমিক্স হবে এমন এক বিদ্যা যা কেবল নারীদের জন্য নয়, বরং নারী-পুরুষ সবার জন্য জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। তিনি এটিকে দেখেছিলেন একটি অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স (Applied Science) বা ফলিত বিজ্ঞান হিসেবে, যা পদার্থ বা রসায়নের মতোই গুরুত্বপূর্ণ (Stage, 1997)।
ডমেস্টিসিটি বা গার্হস্থ্যবাদ: বিজ্ঞানের মোড়কে পুরানো প্রথা
শুরুতে হোম ইকোনমিক্সের লক্ষ্য ছিল নারীদের ক্ষমতায়ন। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি এক ভিন্ন রূপ নিল। সমাজ এবং রাষ্ট্র চাইল নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করা থেকে বিরত রাখতে। তখন হোম ইকোনমিক্সকে ব্যবহার করা হলো কাল্ট অফ ডমেস্টিসিটি (Cult of Domesticity) বা গার্হস্থ্যবাদের প্রচারক হিসেবে। বলা হলো, ঘর চালানো একটি পূর্ণকালীন এবং পেশাদার কাজ বা প্রফেশনাল হোমমেকিং (Professional Homemaking)। একজন নারীকে কেবল রাঁধলে হবে না, তাকে রাঁধতে হবে বৈজ্ঞানিকভাবে; তাকে কেবল ঘর মুছলে হবে না, মুছতে হবে জীবাণুমুক্তভাবে। এর ফলে নারীদের ওপর ঘরের কাজের চাপ বা মানদণ্ড অনেক বেড়ে গেল। ইতিহাসবিদ রুথ শোয়ার্টজ কোওয়ান (Ruth Schwartz Cowan) তার বই More Work for Mother-এ দেখিয়েছেন যে, হোম ইকোনমিক্স এবং আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন – ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার) আসলে নারীদের কাজ কমায়নি, বরং বাড়িয়েছে। কারণ আগে সপ্তাহে একবার কাপড় ধোয়া হতো, এখন মেশিনের কারণে প্রতিদিন ধোয়া হয়। হোম ইকোনমিক্স নারীদের শেখাল যে, ঘরের প্রতিটি কোণা ঝকঝকে রাখা এবং পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করা তাদের পবিত্র দায়িত্ব, এবং এতে ব্যর্থ হওয়া মানে মাতৃত্বের ব্যর্থতা (Cowan, 1983)।
জেন্ডার স্টিরিওটাইপ ও সেগ্রিগেশন
হোম ইকোনমিক্সের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এটি জেন্ডার বা লিঙ্গ বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। স্কুল-কলেজগুলোতে ছেলেদের জন্য রাখা হলো ‘শপ ক্লাস’ বা কাঠের কাজ, আর মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হলো হোম ইকোনমিক্স। এর মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হলো যে তাদের আসল জগত হলো রান্নাঘর। এই সেক্স-সেগ্রিগেশন (Sex Segregation) বা লিঙ্গভিত্তিক পৃথকীকরণ নারীদের বিজ্ঞান, গণিত বা প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো থেকে দূরে সরিয়ে দিল। সমাজবিজ্ঞানী জেসি বার্নার্ড (Jessie Bernard) দেখিয়েছেন যে, হোম ইকোনমিক্স আসলে নারীদের ‘সেবাদাসী’ হিসেবে তৈরি করার এক সুকৌশল পাঠ্যক্রম ছিল। এখানে শেখানো হতো কীভাবে স্বামীকে খুশি রাখতে হয়, কীভাবে কম খরচে সংসার চালাতে হয়, এবং কীভাবে নিজেকে ত্যাগ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো যায়। বার্নার্ড একে বলেছেন দ্য ফিমেল ওয়ার্ল্ড (The Female World) – একটি আলাদা জগত, যা মূলধারার অর্থনীতি বা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন (Bernard, 1981)।
কনজিউমারিজম বা ভোগবাদ: কেনাকাটার বিজ্ঞান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হোম ইকোনমিক্সের ফোকাস কিছুটা বদলে গেল। তখন অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য দরকার ছিল প্রচুর ক্রেতা। হোম ইকোনমিক্স তখন নারীদের শেখাতে শুরু করল কীভাবে ‘স্মার্ট শপার’ বা দক্ষ ক্রেতা হতে হয়। কোন সাবান ভালো, কোন ফ্রিজ টিকবে, কোন কাপড়ের মান ভালো – এগুলো শেখানোই হলো হোম ইকোনমিক্সের কাজ। সমাজবিজ্ঞানী মার্জোরি ডিভল্ট (Marjorie DeVault) দেখিয়েছেন যে, হোম ইকোনমিক্স নারীদের চিফ পারচেজিং অফিসার (Chief Purchasing Officer) বা পরিবারের প্রধান ক্রয় কর্মকর্তা বানিয়ে দিল। এর ফলে পরিবার হয়ে উঠল পণ্য ভোগের কেন্দ্র বা ইউনিট অফ কনজাম্পশন (Unit of Consumption)। হোম ইকোনমিস্টরা বড় বড় ফুড কোম্পানি এবং অ্যাপ্লায়েন্স কোম্পানিগুলোর সাথে মিলে কাজ করতে শুরু করলেন। তারা নতুন নতুন রেসিপি তৈরি করলেন যাতে কোম্পানির পণ্য বিক্রি বাড়ে। সমালোচকরা বলেন, হোম ইকোনমিক্স তখন বিজ্ঞানের বদলে পুঁজিবাদের বা ক্যাপিটালিজম (Capitalism)-এর দালালি শুরু করল। এটি নারীদের শেখাল যে, পরিবারের সুখ নির্ভর করে দামী পণ্য কেনা এবং ভালো খাবার খাওয়ার ওপর, মানবিক সম্পর্কের ওপর নয় (DeVault, 1991)।
একাডেমিক অবহেলা: ‘মিসেস ডিগ্রি’
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হোম ইকোনমিক্স বিভাগগুলো সবসময়ই অবহেলার শিকার হয়েছে। একে বলা হতো এম.আর.এস ডিগ্রি (M.R.S Degree) বা ‘মিসেস ডিগ্রি’ – অর্থাৎ মেয়েরা এখানে পড়তে আসে কেবল একটি ভালো বর পাওয়ার জন্য এবং ভালো স্ত্রী হওয়ার জন্য। পদার্থবিজ্ঞান বা অর্থনীতির মতো ‘হার্ড সায়েন্স’-এর অধ্যাপকরা হোম ইকোনমিক্সকে ব্যঙ্গ করে বলতেন ‘পুডিং বানানোর ক্লাস’। এই একাডেমিক স্নবিজম বা আভিজাত্যবোধের কারণে হোম ইকোনমিক্সে যে সিরিয়াস গবেষণা হতো (যেমন – পুষ্টির মান, টেক্সটাইল কেমিস্ট্রি, বা শিশু মনস্তত্ত্ব), তা মূলধারার স্বীকৃতি পেত না। নারীবাদী ইতিহাসবিদ মার্গারেট রসিটার (Margaret Rossiter) দেখিয়েছেন যে, অনেক মেধাবী নারী বিজ্ঞানী (যেমন – রসায়নবিদ বা জীববিজ্ঞানী) কেবল নারী হওয়ার কারণে মূলধারার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে চাকরি পাননি; তাদের বাধ্য হয়ে হোম ইকোনমিক্স বিভাগে যোগ দিতে হয়েছে। একে তিনি বলেছেন হাইয়ারার্কিক্যাল সেগ্রিগেশন (Hierarchical Segregation)। হোম ইকোনমিক্স ছিল নারী বিজ্ঞানীদের জন্য এক ধরণের ‘ঘেটো’ বা বন্দিশিবির, যেখানে তারা কাজ করতে পারতেন কিন্তু ক্ষমতা বা সম্মান পেতেন না (Rossiter, 1982)।
বিবর্তন ও নাম পরিবর্তন: ফ্যামিলি স্টাডিজের জন্ম
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে যখন দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদ বা সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজম (Second Wave Feminism) শুরু হলো, তখন হোম ইকোনমিক্স তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ল। নারীবাদীরা বললেন, এই ডিসিপ্লিনটি নারীদের পরাধীনতার প্রতীক। তারা দাবি করলেন, হোম ইকোনমিক্স বন্ধ করে দেওয়া হোক। এই চাপের মুখে এবং নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার জন্য হোম ইকোনমিক্স নিজেকে বদলে ফেলল। ১৯৯৪ সালে আমেরিকায় ‘স্কটসডেল সম্মেলন’-এ হোম ইকোনমিক্স নাম বদলে রাখা হলো ফ্যামিলি অ্যান্ড কনজিউমার সায়েন্সেস (Family and Consumer Sciences) বা এফসিএস (FCS)। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এর নাম দিল হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এন্ড ফ্যামিলি স্টাডিজ (Human Development and Family Studies) বা এইচডিএফএস (HDFS)। এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা বোঝাতে চাইলেন যে, তারা এখন আর কেবল রান্না বা সেলাই শেখান না; তারা শেখান পরিবারের মনস্তত্ত্ব, অর্থনীতি, এবং মানব বিকাশের বিজ্ঞান। তারা গবেষণার ওপর জোর দিলেন এবং জেন্ডার নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা করলেন।
টেকনোক্র্যাটিক বা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা
হোম ইকোনমিক্সের একটি বড় দার্শনিক সমস্যা ছিল এর টেকনোক্র্যাটিক (Technocratic) দৃষ্টিভঙ্গি। এটি মনে করত, পরিবারের সব সমস্যার সমাধান বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব। যদি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়, তবে হয়তো তাদের বাজেট ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে; যদি বাচ্চা অবাধ্য হয়, তবে হয়তো তাকে সঠিক পুষ্টি দিতে হবে। অর্থাৎ, তারা সব সমস্যাকে ‘প্রযুক্তিগত’ বা ‘ব্যবস্থাপনাগত’ সমস্যা হিসেবে দেখত। কিন্তু জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবেরমাস (Jürgen Habermas)-এর তত্ত্ব ব্যবহার করে সমালোচকরা বললেন, পরিবারের সমস্যাগুলো আসলে ‘কমিউনিকেটিভ’ বা যোগাযোগমূলক এবং ‘মোরাল’ বা নৈতিক। এগুলোকে কোনো ফর্মুলা বা রেসিপি দিয়ে সমাধান করা যায় না। হোম ইকোনমিক্স পরিবারের ভেতরের আবেগ, ক্ষমতা বা রাজনীতির জটিলতাকে উপেক্ষা করে কেবল ‘এফিশিয়েন্সি’ বা দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছিল। এটি মানুষকে শেখাতে চেয়েছিল কীভাবে ‘পারফেক্ট’ হতে হয়, কিন্তু মানুষ যে আসলে ‘ইমপারফেক্ট’ বা অসম্পূর্ণ – এই সত্যটি তারা ভুলে গিয়েছিল। মার্জোরি ব্রাউন (Marjorie Brown) এবং বিয়াট্রিস পোলুচি (Beatrice Paolucci) হোম ইকোনমিক্সের এই যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে একে একটি ক্রিটিক্যাল সায়েন্স (Critical Science) হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যেখানে পরিবারের নৈতিক লক্ষ্যগুলো নিয়ে আলোচনা হবে (Brown & Paolucci, 1979)।
গ্লোবাল সাউথ ও উন্নয়ন: ভিন্ন প্রেক্ষিত
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বা গ্লোবাল সাউথ (Global South)-এ হোম ইকোনমিক্সের ভূমিকা ছিল কিছুটা ভিন্ন। এখানে এটি এসেছে ঔপনিবেশিক বা কলোনিয়াল প্রজেক্ট হিসেবে। ব্রিটিশ বা আমেরিকান মিশনারিরা এশীয় ও আফ্রিকান নারীদের ‘সভ্য’ করার জন্য হোম ইকোনমিক্স শেখাতেন। তারা মনে করতেন, স্থানীয় নারীরা নোংরা এবং তারা বাচ্চা পালতে জানে না। তাই তাদের পশ্চিমা কায়দায় ঘরকন্নার ট্রেনিং দেওয়া হতো। কিন্তু পরবর্তীতে, এই ডিসিপ্লিনটি গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য বিমোচন এবং পুষ্টি উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে বা ভারতে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজগুলো নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে এবং তাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে। তবে সমালোচকরা বলেন, এখানেও সেই একই সমস্যা – নারীদের কেবল কুটির শিল্প বা সেলাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, তাদের বড় উদ্যোক্তা বা নীতিনির্ধারক হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়নি। একে বলা হয় ডোমেস্টিকেশন অফ উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট (Domestication of Women in Development)।
হোম ইকোনমিক্সের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, কোনো বিদ্যা বা ডিসিপ্লিনই রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। এলিন রিচার্ডস চেয়েছিলেন নারীদের বিজ্ঞানী বানাতে, কিন্তু সমাজ তাদের বানাল ‘বৈজ্ঞানিক গৃহিণী’। তবুও, হোম ইকোনমিক্সের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এটিই প্রথম পরিবারকে একটি অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছিল। আজকের ফ্যামিলি স্টাডিজ যে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি বা বহুবিভাগীয় রূপ পেয়েছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল এই হোম ইকোনমিক্সই। এর সীমাবদ্ধতাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং এর জেন্ডার বায়াস ঝেড়ে ফেলে ফ্যামিলি স্টাডিজ আজ একটি আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিজ্ঞান হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে।
কেন নেই একটি মাত্র ডিসিপ্লিন?
আমরা এতক্ষণ ধরে জ্ঞানের এক বিশাল মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটলাম। আমরা দেখলাম, নৃবিজ্ঞান থেকে শুরু করে প্রযুক্তিবিদ্যা, আইন থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য – অন্তত ১৮ থেকে ২০টি ভিন্ন ভিন্ন ডিসিপ্লিন পরিবার নিয়ে গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ কাজ করেছে। প্রত্যেকের হাতে সত্যের একেকটি টুকরো আছে। অনেকটা সেই অন্ধের হাতি দেখার গল্পের মতো অবস্থা। কেউ হাতির পা ধরে বলছে হাতি থামের মতো (সমাজবিজ্ঞান), কেউ কান ধরে বলছে হাতি কুলোর মতো (আইন), আবার কেউ লেজ ধরে বলছে হাতি দড়ির মতো (মনোবিজ্ঞান)। সবার কথাই সত্য, কিন্তু আংশিক সত্য। সমস্যা হলো, এই টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ হাতিটিকে দেখার বা দেখানোর কেউ নেই। প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক – কেন ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ (Family Studies) বা ‘পারিবার বিদ্যা’ এখনো একটি মূলধারার শক্তিশালী, একক এবং দাপুটে ডিসিপ্লিন হিসেবে গড়ে উঠতে পারল না? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ বিভাগটি পদার্থবিজ্ঞান বা অর্থনীতির মতো গ্ল্যামারাস নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একাডেমিক রাজনীতির অলিগলি এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক অবহেলা, বিষয়বস্তুর বিশালতা এবং আমাদের তথাকথিত ‘কমন সেন্স’-এর অহংকার।
বিষয়বস্তুর বিশালতা: সবজান্তা নাকি কোনো জান্তাই নয়?
একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন গড়ে ওঠার জন্য বিষয়বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা বাউন্ডারি (Boundary) থাকা প্রয়োজন। যেমন – উদ্ভিদবিজ্ঞান কাজ করে গাছপালা নিয়ে, আর প্রাণীবিজ্ঞান কাজ করে প্রাণী নিয়ে। সীমানা খুব স্পষ্ট। কিন্তু পরিবারের সীমানা কোথায়? পরিবার মানুষের জীবনের সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে যে একে কোনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা প্রায় অসম্ভব। পরিবার একই সাথে একটি অর্থনৈতিক ইউনিট (টাকা আয় ও ব্যয়), একটি রাজনৈতিক ইউনিট (ক্ষমতার চর্চা), একটি মনস্তাত্ত্বিক ইউনিট (আবেগ ও প্রেম), এবং একটি আইনি ইউনিট (বিয়ে ও ডিভোর্স)। এখন আপনি যদি ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ নামে একটি ডিসিপ্লিন খুলতে চান, তবে আপনাকে অর্থনীতি, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, আইন, সমাজবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান – সবকিছুই পড়াতে হবে। সমালোচকরা বলেন, যে বিষয় ‘সবকিছু’ নিয়ে কথা বলে, সে আসলে ‘কিছুই’ গভীরভাবে বলতে পারে না। একে বলা হয় রিডাকশনিজম (Reductionism) বা লঘুকরণের সমস্যা। যখনই আমরা পরিবারকে একটি মাত্র ডিসিপ্লিনের অধীনে আনার চেষ্টা করি, তখনই এর কোনো না কোনো ডানা ছেঁটে ফেলতে হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা পরিবারকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান না, আবার মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তির মন থেকে পরিবারকে আলাদা করতে চান না। এই আন্তঃসম্পর্কিত জটিলতাই একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে ফ্যামিলি স্টাডিজের মাথা তুলে দাঁড়ানোর পথে অন্যতম বড় বাধা।
প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও জেন্ডার বায়াস: অন্দরমহলের বিজ্ঞান
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞানচর্চার জগতটাও দীর্ঘকাল ধরে পিতৃতান্ত্রিক ছিল। উনিশ ও বিশ শতকে যখন বড় বড় ডিসিপ্লিনগুলো (যেমন – অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান) গড়ে উঠছিল, তখন সেগুলোর ফোকাস ছিল ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা বাইরের জগত নিয়ে – যেখানে পুরুষরা কাজ করে, যুদ্ধ করে, রাজনীতি করে। আর পরিবার? পরিবারকে মনে করা হতো ‘প্রাইভেট স্ফিয়ার’ বা অন্দরমহলের বিষয়, যা নারীদের জগত। সেই সময়ের একাডেমিক মোড়লরা মনে করতেন, বাইরের জগত নিয়ে পড়াশোনা করাটা যতটা পৌরুষদীপ্ত এবং জরুরি, ঘরের ভেতরের কান্না-হাসি নিয়ে পড়াশোনা করাটা ততটা ‘সিরিয়াস’ বিজ্ঞান নয়। এর ফলে পরিবার নিয়ে পড়াশোনাটা চলে গেল হোম ইকোনমিক্স (Home Economics) বা গার্হস্থ্য অর্থনীতির আওতায়। বহুদিন ধরে একে দেখা হয়েছে কেবল মেয়েদের জন্য রান্না, সেলাই আর বাচ্চা পালনের ট্রেনিং হিসেবে। একে বলা হতো ‘সফট সায়েন্স’ বা নরম বিজ্ঞান।
আমেরিকান একাডেমিশিয়ান ওয়েসলি বার (Wesley Burr) এবং তার সহকর্মীরা এই ইতিহাসের দিকে আঙুল তুলেছেন। তারা দেখিয়েছেন, কীভাবে একাডেমিক স্নবিজম বা আভিজাত্যবোধের কারণে ‘ফ্যামিলি সায়েন্স’ বা ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’কে দীর্ঘকাল মূলধারার বাইরে রাখা হয়েছে। তারা একে বলেছেন মার্জিনালাইজেশন অফ দ্য ফ্যামিলি (Marginalization of the Family)। যদিও বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ‘হোম ইকোনমিক্স’ নাম বদলে ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এন্ড ফ্যামিলি সায়েন্স’ (HDFS) রেখেছে, কিন্তু সেই ঐতিহাসিক অবহেলার রেশ এখনো কাটেনি। এখনো অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন, পরিবার নিয়ে যা বলার তা সমাজবিজ্ঞান বা মনোবিজ্ঞানই ভালো বলতে পারে, আলাদা কোনো বিভাগের দরকার নেই (Burr et al., 1993)।
কমন সেন্স সিনড্রোম: জানা জিনিসের অজানা রহস্য
কেন আমরা অ্যাস্ট্রোনমি বা কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে আলাদা ডিসিপ্লিন বানাই? কারণ ওগুলো আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে ধরে না, ওগুলো জানার জন্য বিশেষ গবেষণার দরকার হয়। কিন্তু পরিবারের ক্ষেত্রে আমাদের সবারই একটা ধারণা আছে – “আরে, পরিবার তো আমি জানিই! আমার বাবা আছে, মা আছে, আমি তো পরিবারেই বড় হয়েছি।” এই যে ‘সব জানি’ ভাব, একে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন ফ্যামিলিয়ারিটি ব্রিডস কনটেম্পট (Familiarity Breeds Contempt) – অতি পরিচয়ে অবজ্ঞা। আমরা অবচেতনভাবে মনে করি, পরিবার একটি ‘প্রাকৃতিক’ (Natural) বিষয়। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। শ্বাস নেওয়া নিয়ে কি কেউ আলাদা করে ভাবে? তেমনি পরিবার নিয়েও আলাদা করে পড়ার বা গবেষণা করার গুরুত্ব আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেভাবে দিতে পারিনি।
বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্স (Anthony Giddens) এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন প্র্যাকটিক্যাল কনশাসনেস (Practical Consciousness) দিয়ে। আমরা প্রতিদিন পরিবার চর্চা করি, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে একে বিশ্লেষণ করি না। যখনই কোনো গবেষক বলেন – “আসুন আমরা পরিবার নিয়ে গবেষণা করি” – তখন সাধারণ মানুষ এবং অনেক নীতিনির্ধারকও মনে করেন, “এ আর নতুন কী? এখানে রকেট সায়েন্সের তো কিছু নেই।” এই মানসিকতা বা বায়াস (Bias)-এর কারণে ফ্যামিলি স্টাডিজের জন্য ফান্ডিং বা গবেষণার অর্থ জোগাড় করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ আমরা এই আর্টিকেলের আগের অংশগুলোতে দেখেছি, পরিবারের ভেতরের জগতটা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের চেয়ে কম জটিল নয়। সেখানেও ব্ল্যাকহোল আছে, সেখানেও মহাকর্ষীয় টান আছে, সেখানেও বিস্ফোরণ ঘটে।
একাডেমিক টার্ফ ওয়ার: কে খাবে এই কেক?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো জ্ঞানের এক একটি দুর্গ। আর প্রতিটি ডিসিপ্লিন সেই দুর্গের এক একটি প্রহরী। সমাজবিজ্ঞানীরা দাবি করেন, “পরিবার হলো সমাজের মৌলিক একক, তাই এটি আমাদের বিষয়।” মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, “পরিবার হলো সম্পর্কের জাল, তাই এটি আমাদের বিষয়।” নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, “আত্মীয়তা ছাড়া পরিবার বোঝা অসম্ভব, তাই এটি আমাদের।” অর্থনীতিবিদরা বলেন, “পরিবার হলো উৎপাদনের ইউনিট, তাই এটি আমাদের।” একে বলা হয় একাডেমিক টার্ফ ওয়ার (Academic Turf War) বা এলাকা দখলের লড়াই। প্রতিটি ডিসিপ্লিন পরিবার নামক এই সুস্বাদু কেকটির ভাগ চায়। যদি ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ নামে একটি শক্তিশালী এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন ডিসিপ্লিন গড়ে ওঠে, তবে এই প্রথাগত বিভাগগুলো তাদের একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র হারাবে।
এই কারণে, ফ্যামিলি স্টাডিজকে প্রায়শই একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি (Interdisciplinary) বা আন্তঃবিভাগীয় বিষয় হিসেবে রাখা হয়। এর মানে হলো, এটি সবার কাছ থেকে একটু একটু ধার করে চলে, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। এটি অনেকটা সেই অতিথির মতো, যে সবার বাড়িতেই দাওয়াতে যায়, কিন্তু যার নিজের কোনো বাড়ি নেই। যদিও ন্যাশনাল কাউন্সিল অন ফ্যামিলি রিলেশনস (NCFR)-এর মতো সংস্থাগুলো ‘ফ্যামিলি সায়েন্স’কে একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দশকের পর দশক ধরে লড়াই করে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ডিসিপ্লিনগুলোর দাপটের কাছে তা এখনো পুরোপুরি পেরে ওঠেনি।
সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তি: কোনটি আসল পরিবার?
একটি ডিসিপ্লিন বা বিদ্যাশাখা দাঁড় করাতে হলে তার মূল বিষয়বস্তুর একটি সর্বজনীন সংজ্ঞা থাকা দরকার। উদ্ভিদবিদ্যার জন্য ‘উদ্ভিদ’ কী তা সংজ্ঞায়িত করা সহজ। কিন্তু ‘পরিবার’ কী? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বর্তমান সময়ে সবচেয়ে কঠিন কাজ। আগে বলা হতো – বাবা, মা আর বাচ্চা – এই হলো পরিবার। কিন্তু এখন? সিঙ্গেল মাদার ফ্যামিলি, চাইল্ডলেস কাপল, লিভ-ইন পার্টনার, সমকামী দম্পতি, এমনকি বন্ধুরা মিলে থাকা ‘চোজেন ফ্যামিলি’ – এদের সবাইকে কি পরিবার বলা হবে? সমাজবিজ্ঞানী ক্যারল স্মার্ট (Carol Smart) এই বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য ‘পরিবার’ শব্দটির বদলে পার্সোনাল লাইফ (Personal Life) বা ব্যক্তিগত জীবন শব্দটি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, ‘পরিবার’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মাথায় একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ বা মডেল ভেসে ওঠে, যা আধুনিক বৈচিত্র্যময় সম্পর্কগুলোকে ধারণ করতে পারে না (Smart, 2007)।
যখন গবেষকরাই একমত হতে পারেন না যে তারা আসলে কী নিয়ে গবেষণা করছেন, তখন একটি সুসংহত ডিসিপ্লিন গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। যদি আপনি পরিবারকে খুব সংকীর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করেন, তবে সমাজের বিশাল এক অংশ বাদ পড়ে যাবে। আর যদি খুব ব্যাপকভাবে সংজ্ঞায়িত করেন (যেমন – যে কেউ একে অপরকে ভালোবাসলেই পরিবার), তবে ডিসিপ্লিনটি তার বৈজ্ঞানিক ধার হারাবে। এই ডেফিনিশনাল ক্রাইসিস (Definitional Crisis) বা সংজ্ঞার সংকট ফ্যামিলি স্টাডিজকে একটি শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে দিচ্ছে না।
মেথডোলজিক্যাল চ্যালেঞ্জ: অন্ধকারের গবেষণা
পরিবার নিয়ে গবেষণা করা আর ল্যাবরেটরিতে কেমিক্যাল নিয়ে গবেষণা করা এক জিনিস নয়। পরিবারের আসল ঘটনাগুলো ঘটে চার দেওয়ালের ভেতর, লোকচক্ষুর আড়ালে। একে সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান (Erving Goffman) বলেছেন ব্যাকস্টেজ (Backstage) বা নেপথ্য। আমরা বাইরের জগতকে যা দেখাই তা হলো ফ্রন্টস্টেজ (Frontstage) বা মঞ্চ। পরিবার নিয়ে যখনই কেউ সার্ভে বা ইন্টারভিউ করতে যায়, তখন মানুষ তাদের ‘ফ্রন্টস্টেজ’ বা ভালো দিকটাই দেখাতে চায়। কেউ সহজে বলতে চায় না যে গত রাতে তাদের মারামারি হয়েছে। একে বলা হয় সোশ্যাল ডিজায়ারেবিলিটি বায়াস (Social Desirability Bias)। গবেষকদের জন্য পরিবারের এই ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা কালো বাক্সটি খোলা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য দরকার অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা পদ্ধতি, যা ব্যয়সাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ। নৃবিজ্ঞানীরা হয়তো বছরের পর বছর কোনো পরিবারের সাথে থেকে (Participant Observation) সত্য বের করতে পারেন, কিন্তু বড় পরিসরে বা ‘ম্যাক্রো লেভেলে’ পরিবারের ভেতরের সঠিক তথ্য পাওয়া খুব কঠিন। তথ্যের এই নির্ভরযোগ্যতার অভাব বা মেথডোলজিক্যাল চ্যালেঞ্জ (Methodological Challenge) ফ্যামিলি স্টাডিজকে একটি ‘হার্ড সায়েন্স’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়।
তাত্ত্বিক একীকরণ বা ইন্টিগ্রেশনের অভাব
ফ্যামিলি স্টাডিজের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো একটি কেন্দ্রীয় তত্ত্ব বা গ্র্যান্ড থিওরি (Grand Theory)-র অভাব। পদার্থবিজ্ঞানে যেমন রিলেটিভিটি থিওরি আছে, বা জীববিজ্ঞানে যেমন বিবর্তনবাদ আছে – যা দিয়ে ওই বিষয়ের প্রায় সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায় – ফ্যামিলি স্টাডিজে এমন কিছু নেই। এখানে আছে টুকরো টুকরো তত্ত্বের সমাহার। এক্সচেঞ্জ থিওরি দিয়ে অর্থনীতির দিকটা বোঝা যায়, অ্যাটাচমেন্ট থিওরি দিয়ে আবেগের দিকটা বোঝা যায়, আবার ফেমিনিজম দিয়ে ক্ষমতার দিকটা বোঝা যায়। কিন্তু এমন কোনো একটি তত্ত্ব নেই যা দিয়ে পরিবারের অর্থনীতি, আবেগ, ক্ষমতা এবং ইতিহাস – সব একসাথে ব্যাখ্যা করা যায়। গবেষক জেটসে স্প্রে (Jetse Sprey) বলেছেন, ফ্যামিলি স্টাডিজ হলো থিওরেটিক্যাল প্লুরালিজম (Theoretical Pluralism)-এর ক্ষেত্র। এই বহুত্ববাদ ভালো, কারণ এটি বৈচিত্র্য আনে। কিন্তু এটি খারাপ, কারণ এটি বিষয়টিকে অগোছালো করে রাখে (Sprey, 1979)। যতক্ষণ না কোনো নিউটন বা ডারউইনের মতো তাত্ত্বিক এসে এই সবগুলোকে এক সুতোয় গাঁথছেন, ততক্ষণ ফ্যামিলি স্টাডিজ একটি ‘ডিসিপ্লিন’ না হয়ে কেবল একটি ‘গবেষণার বিষয়’ (Field of Study) হয়েই থেকে যাবে।
এতসব বাধা বা চ্যালেঞ্জ থাকার পরেও আশার কথা হলো, পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পারিবারিক সমস্যা – যেমন ডিভোর্স, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, এবং বয়স্কদের যত্ন – এতটাই প্রকট হয়ে উঠছে যে, নীতিনির্ধারকরা এখন পরিবার বিশেষজ্ঞদের খুঁজছেন। তারা বুঝতে পারছেন, কেবল অর্থনীতিবিদ দিয়ে পরিবারের সমস্যা সমাধান হবে না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা দেখব, এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জ্ঞানগুলো এক হয়ে একটি শক্তিশালী ‘ফ্যামিলি সায়েন্স’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা আমাদের মানববিদ্যা চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে।
পারিবারিক চিন্তার স্থপতিরা: তাত্ত্বিক ও তাদের মানসজগত
আমরা যখন পরিবারের কথা বলি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেনা মানুষের মুখ, ডিনার টেবিলের খুনসুটি কিংবা পুরোনো অ্যালবামের ধুলোমাখা ছবি। কিন্তু এই চেনা জগতটাকে অচেনা লেন্স দিয়ে দেখার জন্য, এর ভেতরের জটিল কলকব্জাগুলোকে খুলে দেখার জন্য ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষ এসেছেন, যাদের আমরা তাত্ত্বিক বা থিওরিস্ট বলি। তারা কেউ সমাজকে দেখেছেন পাখির চোখে, কেউ মানুষের মনকে দেখেছেন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে, আবার কেউ ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বের করেছেন পরিবারের বিবর্তনের ধারা। এই তাত্ত্বিকরা কেবল বইয়ের পাতার নাম নন; তারা হলেন সেই সব চিন্তাবিদ যারা আমাদের শিখিয়েছেন যে পরিবার কোনো স্থির পাথর নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। আজকের এই অধ্যায়ে আমরা সেই মহান স্থপতিদের মানসজগত ঘুরে দেখব, যারা পরিবার নিয়ে একাডেমিক স্টাডিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। তাদের চিন্তা, বিতর্ক এবং দর্শন কীভাবে আমাদের পারিবারিক জীবনকে ব্যাখ্যা করেছে, তা বোঝার জন্য আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। এই যাত্রাটি হবে সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং নৃবিজ্ঞানের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ, যেখানে প্রতিটি তাত্ত্বিক একেকজন জাদুকরের মতো আমাদের সামনে নতুন নতুন সত্য উন্মোচন করবেন।
কাঠামোর কারিগর: সমাজতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি
পরিবারকে সমাজের একটি অপরিহার্য অঙ্গ বা কাঠামো হিসেবে দাঁড় করানোর পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম (Émile Durkheim)। যদিও তিনি সরাসরি পরিবার নিয়ে খুব বেশি লেখেননি, কিন্তু তার ফাংশনালিজম (Functionalism) বা ক্রিয়াবাদী চিন্তাধারা পরবর্তীকালের পরিবার বিষয়ক গবেষণার মূল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। ডুরখেইম বিশ্বাস করতেন, সমাজ হলো মানবদেহের মতো, আর পরিবার হলো তার একটি অঙ্গ। তিনি তার Suicide গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে, যেসব মানুষের পারিবারিক বন্ধন বা সোশ্যাল ইন্টিগ্রেশন (Social Integration) শক্তিশালী, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কম। ডুরখেইম মনে করতেন, আধুনিক সমাজে পরিবার সংকুচিত হয়ে আসছে। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন কনজুগাল ফ্যামিলি (Conjugal Family) বা দাম্পত্য পরিবার। তার মতে, আগে পরিবার ছিল রক্ত আর সম্পত্তির বন্ধন, কিন্তু আধুনিক যুগে পরিবার হয়ে উঠেছে আবেগ আর নৈতিকতার বন্ধন। ডুরখেইমের এই ভাবনা আমাদের শেখায় যে, পরিবার কেবল ব্যক্তিগত সুখের জায়গা নয়, এটি সমাজকে বিশৃঙ্খলা বা অ্যানোমি (Anomie) থেকে রক্ষা করার রক্ষাকবচ।
তবে সমাজবিজ্ঞানের জগতে পরিবার নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত তাত্ত্বিক হলেন ট্যালকট পার্সন্স (Talcott Parsons)। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এক বিশাল তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করালেন। পার্সন্স ছিলেন স্ট্রাকচারাল ফাংশনালিজম (Structural Functionalism)-এর প্রধান প্রবক্তা। তিনি বললেন, শিল্পায়ন বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন (Industrialization)-এর ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি (Nuclear Family) তৈরি হওয়াটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি সমাজের প্রয়োজনে ঘটা একটি ‘ফাংশনাল’ বা কার্যকরী পরিবর্তন। পার্সন্স যুক্তি দিলেন, আধুনিক অর্থনীতিতে মানুষকে কাজের জন্য এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটতে হয়, যা বড় যৌথ পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়; তাই ছোট এবং গতিশীল পরিবারই এই সমাজের জন্য উপযুক্ত। পার্সন্স পরিবারের ভেতরে নারী ও পুরুষের ভূমিকা নিয়েও খুব স্পষ্ট বিভাজন টেনেছিলেন। তিনি বললেন, পুরুষের ভূমিকা হবে ইন্সট্রুমেন্টাল (Instrumental) – অর্থাৎ সে বাইরের জগতের সাথে লড়াই করে পরিবারের জন্য রসদ বা অর্থ জোগাড় করবে। আর নারীর ভূমিকা হবে এক্সপ্রেসিভ (Expressive) – সে ঘরের ভেতরে আবেগ, মায়া এবং যত্ন দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মানসিক চাপ কমাবে। তার বিখ্যাত ‘ওয়ার্ম বাথ থিওরি’ (Warm Bath Theory) অনুযায়ী, পরিবার হলো সেই উষ্ণ স্নানাগার, যেখানে বাইরের জগত থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরা পুরুষটি মানসিক শান্তি খুঁজে পায়। পার্সন্সের এই তত্ত্ব পঞ্চাশের দশকের আমেরিকায় খুব জনপ্রিয় হলেও, পরবর্তীতে নারীবাদীরা এর তীব্র সমালোচনা করেন। তারা বলেন, পার্সন্স নারীকে ঘরের চারদেয়ালে বন্দি করার জন্য একটি ‘বৈজ্ঞানিক’ যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তবুও, পরিবারের গঠন এবং কাজ বোঝার জন্য পার্সন্সের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
সমাজবিজ্ঞানের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক হলেন জর্জ পিটার মারডক (George Peter Murdock)। তিনি ১৯৪৯ সালে প্রায় ২৫০টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ওপর গবেষণা চালিয়ে দাবি করলেন যে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি (Nuclear Family) হলো একটি বিশ্বজনীন বা ইউনিভার্সাল (Universal) প্রতিষ্ঠান। মারডক বললেন, পৃথিবীর এমন কোনো সমাজ নেই যেখানে পরিবার নেই। তিনি পরিবারের চারটি মৌলিক কাজের কথা বললেন: যৌন নিয়ন্ত্রণ, প্রজনন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষা বা সামাজিকীকরণ। মারডকের মতে, এই চারটি কাজ ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না, আর পরিবারই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা এই কাজগুলো সুচারুভাবে করতে পারে (Murdock, 1949)। যদিও আধুনিক নৃবিজ্ঞানীরা মারডকের এই ‘ইউনিভার্সালিটি’ বা সর্বজনীনতার দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন – বিশেষ করে নায়ার সমাজ বা সমকামী পরিবারের উদাহরণ দিয়ে – কিন্তু মারডক আমাদের শিখিয়েছেন যে পরিবারের কিছু মৌলিক দায়িত্ব আছে যা সংস্কৃতিভেদেও অপরিবর্তিত থাকে।
নৃবিজ্ঞানের পথিকৃৎ: আত্মীয়তার জট খোলা
পরিবারকে বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে নৃবিজ্ঞানীদের দিকে, যারা দেখিয়েছেন পরিবার কোনো স্থির বিষয় নয়। এই ধারার আদিপুরুষ বলা যায় লুইস হেনরি মর্গান (Lewis Henry Morgan)-কে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ‘ইরোকোয়া’ আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে আত্মীয়তার অদ্ভুত সব নিয়ম আবিষ্কার করেন। তিনি দেখলেন, সেখানে বাবা এবং চাচাকে একই নামে ডাকা হয়। মর্গান তার Ancient Society বইতে মানব সমাজের বিবর্তনের একটি রূপরেখা দিলেন। তিনি বললেন, মানুষ বর্বর দশা বা স্যাভেজেরি (Savagery) থেকে সভ্যতার দিকে এগিয়েছে, আর এই যাত্রাপথে পরিবারের রূপও বদলেছে। শুরুতে ছিল অবাধ মেলামেশা, তারপর গোষ্ঠী বিবাহ বা গ্রুপ ম্যারেজ (Group Marriage), এবং সবশেষে এসেছে আজকের এই একগামী পরিবার বা মনোগ্যামি (Monogamy)। মর্গানের এই বিবর্তনবাদী তত্ত্ব কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। মর্গান আমাদের শিখিয়েছেন যে, আমরা যাকে ‘রক্তের সম্পর্ক’ বলি, তা আসলে অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের তৈরি করা নিয়ম বা কিনশিপ সিস্টেম (Kinship System)।
নৃবিজ্ঞানের আরেক নক্ষত্র হলেন ব্রনিস্লাভ ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski)। তিনি ট্রবরিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের ওপর গবেষণা করে দেখালেন যে, পরিবারে বাবার ভূমিকা সবসময় প্রধান নয়। ওই সমাজে মামাই ছিলেন আসল ক্ষমতার অধিকারী, আর বাবা ছিলেন কেবল খেলার সাথী। ম্যালিনোস্কি ছিলেন ফাংশনালিজম (Functionalism)-এর অনুসারী, কিন্তু তার ফোকাস ছিল ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনের ওপর। তিনি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ইডিপাস কমপ্লেক্স (Oedipus Complex)-এর সর্বজনীনতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ফ্রয়েড বলেছিলেন, সব ছেলেই অবচেতনভাবে বাবাকে ঘৃণা করে এবং মাকে কামনা করে। কিন্তু ম্যালিনোস্কি বললেন, ট্রবরিয়ান্ড সমাজে ছেলেরা বাবাকে ঘৃণা করে না, কারণ বাবার হাতে কোনো ক্ষমতা নেই; বরং তারা মামার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, কারণ মামাই তাদের শাসন করেন। ম্যালিনোস্কির এই কাজ প্রমাণ করল যে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা আবেগ কোনো জৈবিক বিষয় নয়, এটি পরিবারের কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
ফরাসি নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss) আত্মীয়তা বা কিনশিপ অধ্যয়নকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি ছিলেন স্ট্রাকচারালিজম (Structuralism) বা কাঠামোবাদের জনক। লেভি-স্ট্রস বললেন, সমাজ টিকে আছে বিনিময়ের ওপর। আর পরিবারের উদ্ভব হয়েছে ইনসেস্ট ট্যাবু (Incest Taboo) বা নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে। তিনি যুক্তি দিলেন, যেহেতু মানুষ নিজের বোন বা মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না, তাই তাকে বাধ্য হয়ে অন্য গোত্রের পুরুষের সঙ্গে তাদের বিয়ে দিতে হয়। এই যে নারীদের বিনিময়, এর মাধ্যমেই পুরুষদের মধ্যে জোট বা অ্যালায়েন্স (Alliance) তৈরি হয়। তার জোট তত্ত্ব (Alliance Theory) অনুযায়ী, বিয়ে কেবল দুটি মানুষের মিলন নয়, এটি দুটি ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক মৈত্রী স্থাপনের কৌশল। নারীবাদীরা লেভি-স্ট্রসের সমালোচনা করে বলেছেন যে, তিনি নারীদের কেবল বিনিময়ের বস্তু বা ‘উপহার’ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু লেভি-স্ট্রস আমাদের শিখিয়েছেন যে, পরিবারের মূলে রয়েছে সমাজের গভীরে প্রোথিত কিছু গাণিতিক এবং কাঠামোগত নিয়ম।
দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার তাত্ত্বিক: মার্ক্সবাদ ও নারীবাদ
সমাজ যখন পরিবারকে শান্তির নীড় বলছে, তখন কিছু তাত্ত্বিক সেই নীড়ের ভেতরের আগুনকে সামনে আনলেন। এদের মধ্যে প্রথমেই নাম করতে হয় ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels)-এর। কার্ল মার্ক্সের বন্ধু এবং সহযোদ্ধা এঙ্গেলস ১৮৮৪ সালে লিখলেন তার কালজয়ী বই The Origin of the Family, Private Property and the State। মর্গানের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এঙ্গেলস বললেন, আদিম সাম্যবাদী সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না। কিন্তু যখন মানুষ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রাইভেট প্রপার্টি (Private Property)-র মালিক হলো, তখন থেকেই নারীর পরাধীনতা শুরু হলো। পুরুষ চাইল তার সম্পত্তি যেন তার নিজের সন্তানের কাছেই যায়। এই নিশ্চিতকরণ বা প্যাটারনিটি এনশিওর করার জন্যই পুরুষ নারীকে একগামী বিবাহের শৃঙ্খলে বন্দি করল। এঙ্গেলস বললেন, আধুনিক একগামী পরিবার হলো নারীর ঐতিহাসিক পরাজয়ের দলিল। তার মতে, পরিবারের ভেতরে স্বামী হলেন ‘বুর্জোয়া’ বা মালিক, আর স্ত্রী হলেন ‘প্রলেতারিয়েত’ বা শ্রমিক। এঙ্গেলসের এই বিশ্লেষণ পরিবারকে দেখার রাজনৈতিক চশমাটাই বদলে দিল।
এঙ্গেলসের এই চিন্তাকে আধুনিক যুগে এগিয়ে নিলেন সমাজবিজ্ঞানী এলি জারেটস্কি (Eli Zaretsky)। তিনি বললেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিবারের একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক কাজ আছে। পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজম (Capitalism) শ্রমিকদের শোষণ করে তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। কিন্তু পরিবার সেই শ্রমিককে সান্ত্বনা দেয়, তাকে পরের দিন আবার কাজে যাওয়ার শক্তি জোগায়। জারেটস্কি বললেন, পরিবার হলো পুঁজিবাদের ‘সেফটি ভালভ’। পরিবার যদি শ্রমিকের ক্ষোভ প্রশমিত না করত, তবে সমাজ বিপ্লবের দিকে যেত। এছাড়াও, জারেটস্কি দেখালেন যে পরিবার এখন পুঁজিবাদের পণ্যের প্রধান ভোক্তায় পরিণত হয়েছে।
নারীবাদী তাত্ত্বিকদের মধ্যে আর্লি রাসেল হোকশিল্ড (Arlie Russell Hochschild)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি পরিবারের ভেতরের শ্রম এবং আবেগের রাজনীতি নিয়ে কাজ করেছেন। তার বিখ্যাত ‘দ্য সেকেন্ড শিফট’ (The Second Shift) তত্ত্ব দেখিয়েছে, কর্মজীবী নারীরা কীভাবে অফিসের কাজের পর বাড়িতে ফিরে দ্বিতীয় দফা কাজ বা ‘শিফট’ করেন। হোকশিল্ড কেবল শারীরিক শ্রমের কথা বলেননি, তিনি বলেছেন ইমোশনাল লেবার (Emotional Labour) বা আবেগীয় শ্রমের কথা। পরিবারের সদস্যদের খুশি রাখা, তাদের মান ভাঙানো – এই অদৃশ্য কাজগুলো নারীদেরই করতে হয়, যার কোনো অর্থনৈতিক মূল্য সমাজ দেয় না। হোকশিল্ডের কাজ আমাদের বুঝিয়েছে যে, আধুনিক পরিবারে জেন্ডার সমতার গল্পটি অনেকাংশেই মিথ বা অলিক কল্পনা।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী তাত্ত্বিক হলেন অ্যান ওকলি (Ann Oakley)। তিনি গৃহশ্রম বা হাউজওয়ার্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। ওকলি দেখালেন, ‘মাতৃত্ব’ বা ‘গৃহিণী’ হওয়ার বিষয়টি প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত নয়, এটি সামাজিকভাবে নির্মিত বা সোশ্যাল কনস্ট্রাকশন (Social Construction)। সমাজ মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই পুতুল খেলা আর ঘরকন্নার মাধ্যমে এমনভাবে তৈরি করে বা জেন্ডার সোশ্যালাইজেশন (Gender Socialization) করে, যাতে তারা মনে করে এটিই তাদের একমাত্র কাজ। ওকলি যুক্তি দিলেন, গৃহশ্রমকে ‘কাজের’ মর্যাদা না দেওয়া পর্যন্ত নারীদের মুক্তি সম্ভব নয়।
জুডিথ বাটলার (Judith Butler)-এর তত্ত্ব যদিও সরাসরি পরিবার নিয়ে নয়, কিন্তু তার পারফর্মিটিভিটি (Performativity) তত্ত্ব জেন্ডার এবং পরিবারের ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বাটলার বললেন, জেন্ডার কোনো স্থির পরিচয় নয়, এটি আমরা যা করি বা ‘পারফর্ম’ করি তা-ই। পরিবার হলো সেই মঞ্চ যেখানে আমাদের শেখানো হয় কীভাবে ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’ হয়ে উঠতে হয়। বাটলারের তত্ত্ব আধুনিক কুইয়ার থিওরি (Queer Theory) এবং ভিন্নধারার পরিবারের (যেমন সমকামী পরিবার) স্বীকৃতির পথ প্রশস্ত করেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পরিবার কেন কেবল নারী-পুরুষের মিলনেই হতে হবে? ভালোবাসা এবং যত্নের ভিত্তিতে যেকোনো সম্পর্কই কি পরিবার হতে পারে না?
মনের গহীনে: মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ
পরিবার তো কেবল সমাজ বা অর্থনীতির একক নয়, এটি আবেগের এক জটিল ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী হলেন জন বোলবি (John Bowlby)। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনাথ শিশুদের ওপর কাজ করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন অ্যাটাচমেন্ট থিওরি (Attachment Theory)। বোলবি বললেন, শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের (বা প্রধান যত্নকারীর) সাথে একটি নিরাপদ এবং উষ্ণ সম্পর্ক অপরিহার্য। তিনি দেখালেন, মানুষ জন্মগতভাবেই সম্পর্কের কাঙাল। মায়ের সাথে এই প্রাথমিক বন্ধন বা বন্ডিং (Bonding) যদি ঠিকমতো না হয়, তবে শিশু সারাজীবন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বোলবির কাজ আমাদের শিখিয়েছে যে, পরিবার কেবল খাবার জোগানোর জায়গা নয়, এটি হলো ‘সিকিউর বেস’ বা নিরাপদ আশ্রয়, যেখান থেকে শিশু পৃথিবী জয় করতে বের হয়।
বোলবির কাজকে আরও এগিয়ে নিলেন মেরি এইনসওয়ার্থ (Mary Ainsworth)। তিনি তার বিখ্যাত ‘স্ট্রেঞ্জ সিচুয়েশন’ পরীক্ষার মাধ্যমে দেখালেন যে, বাবা-মায়ের আচরণের ওপর ভিত্তি করে শিশুদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হয় – যেমন সিকিউর (Secure), অ্যাংশাস (Anxious), বা অ্যাভয়ডেন্ট (Avoidant)। এইনসওয়ার্থের তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন কেউ কেউ সম্পর্কে খুব সহজেই বিশ্বাস করতে পারে, আবার কেউ কেউ সবসময় সন্দেহে ভোগে। আমাদের দাম্পত্য জীবনের কলহ বা সুখের শিকড় যে শৈশবের পারিবারিক ইতিহাসে লুকিয়ে আছে, তা এই মনোবিজ্ঞানীরাই প্রমাণ করেছেন।
পারিবারিক থেরাপি বা ফ্যামিলি থেরাপির জগতে মারে বোয়েন (Murray Bowen) এক কিংবদন্তি। তিনি নিয়ে এলেন ফ্যামিলি সিস্টেমস থিওরি (Family Systems Theory)। বোয়েন বললেন, পরিবারের কোনো সদস্যকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করা যাবে না। পরিবার হলো একটি অখণ্ড আবেগীয় ইউনিট বা ইমোশনাল ইউনিট (Emotional Unit)। তিনি বললেন, পরিবারের সদস্যরা একে অপরের আবেগের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে, একজনের উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি পুরো পরিবারকে সংক্রমিত করে। বোয়েনের একটি বিখ্যাত ধারণা হলো ট্রায়াঙ্গেলেশন (Triangulation)। তিনি বললেন, যখনই দুজন মানুষের (যেমন স্বামী-স্ত্রী) মধ্যে টেনশন বাড়ে, তারা তৃতীয় কাউকে (সাধারণত সন্তানকে) টেনে এনে সেই টেনশন কমানোর চেষ্টা করে। বোয়েন আমাদের শিখিয়েছেন যে, সুস্থ পরিবারের লক্ষণ হলো সদস্যরা আবেগের স্রোতে ভেসে না গিয়েও নিজেদের স্বকীয়তা বা ডিফারেন্সিয়েশন অফ সেলফ (Differentiation of Self) বজায় রাখতে পারে।
প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছেন ডায়ানা বাউমরিন্ড (Diana Baumrind)। তিনি বাবা-মায়ের আচরণের ওপর ভিত্তি করে তিনটি প্রধান প্যারেন্টিং স্টাইল চিহ্নিত করেন: অথরিটারিয়ান (Authoritarian) বা স্বৈরাচারী, পারমিসিভ (Permissive) বা অনুমোদনকারী, এবং অথরিটেটিভ (Authoritative) বা দায়িত্বশীল। বাউমরিন্ড দেখালেন, অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা অতিরিক্ত ছাড় – কোনোটাই শিশুর জন্য ভালো নয়। বরং যারা ভালোবাসা এবং নিয়মের ভারসাম্য বজায় রাখেন (অথরিটেটিভ), তাদের সন্তানরাই সবচেয়ে সফল এবং সুখী হয়। বাউমরিন্ডের এই গবেষণা আজও সারা বিশ্বের বাবা-মায়েদের জন্য গাইডলাইন হিসেবে কাজ করছে।
ইতিহাস ও পরিবর্তনের সাক্ষী: ইতিহাসবিদ ও ডেমোগ্রাফার
পরিবার যে চিরকাল এক ছিল না, এই সত্যটি আমাদের সামনে এনেছেন ইতিহাসবিদরা। ফরাসি ইতিহাসবিদ ফিলিপ এরিয়েস (Philippe Ariès) তার Centuries of Childhood বইতে দেখালেন যে, মধ্যযুগে ‘শৈশব’ বা চাইল্ডহুড (Childhood) বলে আলাদা কোনো ধারণাই ছিল না। শিশুরা ছিল ‘ছোট আকারের বয়স্ক মানুষ’। সাত বছর বয়স হলেই তাদের বড়দের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতো। এরিয়েস বললেন, আধুনিক যুগে আমরা শিশুকে যেভাবে আগলে রাখি, তা আসলে খুব সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার। তার এই তত্ত্ব আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করেছে।
আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্টেফানি কুনজ (Stephanie Coontz) তার Marriage, a History এবং The Way We Never Were বইতে পরিবারের অনেক মিথ বা ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি দেখালেন, আমরা যে ১৯৫০-এর দশকের ‘আদর্শ পরিবার’ (বাবা কাজ করে, মা রাঁধে)-এর নস্টালজিয়ায় ভুগি, তা আসলে ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী এবং ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় ছিল। কুনজ দেখালেন, হাজার বছর ধরে বিয়ে ছিল মূলত সম্পত্তির চুক্তি, প্রেমের মিলন নয়। তিনি বললেন, যখন থেকে বিয়েতে ‘প্রেম’ বা লাভ ম্যারেজ (Love Marriage)-এর প্রবেশ ঘটল, তখন থেকেই বিয়ে বিষয়টি অস্থিতিশীল হয়ে গেল। কারণ প্রেম ফুরোলেই বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলো। কুনজের কাজ আমাদের শেখায়, পরিবারের অতীত নিয়ে অহেতুক হাহাকার করার কিছু নেই, কারণ প্রতিটি যুগেই পরিবারের নিজস্ব সংকট ছিল।
ডেমোগ্রাফার বা জনমিতিবিদ রন লেসথায়েগ (Ron Lesthaeghe) আধুনিক পরিবারের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্য নিয়ে এলেন সেকেন্ড ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন (Second Demographic Transition) তত্ত্ব। তিনি বললেন, মানুষ এখন কেবল বেঁচে থাকার জন্য পরিবার গঠন করে না, তারা চায় আত্মতৃপ্তি বা সেলফ-অ্যাকচুয়ালাইজেশন (Self-Actualization)। এই মূল্যবোধের পরিবর্তনের কারণেই মানুষ দেরিতে বিয়ে করছে, কম সন্তান নিচ্ছে, বা বিয়ে না করে লিভ-ইন করছে। লেসথায়েগের তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কেন উন্নত বিশ্বে জন্মহার কমছে এবং কেন পরিবারের প্রথাগত কাঠামো ভেঙে নতুন নতুন রূপ নিচ্ছে।
অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ: গ্যারি বেকার
পরিবার নিয়ে কথা হবে আর অর্থনীতির প্রসঙ্গ আসবে না, তা কি হয়? এই ক্ষেত্রে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার (Gary Becker)-এর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি তার A Treatise on the Family বইতে দেখালেন যে, মানুষ যখন বিয়ে করে বা সন্তান নেয়, তখন তার পেছনে কাজ করে র্যাশনাল চয়েস (Rational Choice) বা যৌক্তিক পছন্দ। বেকার বললেন, মানুষ তখনই বিয়ে করে যখন সে দেখে যে একা থাকার চেয়ে বিয়ে করলে তার লাভ বা ইউটিলিটি (Utility) বেশি হবে। তিনি সন্তান লালন-পালনকে দেখলেন এক ধরণের বিনিয়োগ হিসেবে। বেকারের তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক নারীরা যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে, তাই তাদের বিয়ে করার ‘অর্থনৈতিক প্রয়োজন’ কমে যাচ্ছে, যার ফলে ডিভোর্স বাড়ছে। বেকারের এই ‘কোল্ড ক্যালকুলেশন’ বা ঠান্ডা মাথার হিসাব অনেকে পছন্দ না করলেও, পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার।
আধুনিক কণ্ঠস্বর: প্রযুক্তি ও যোগাযোগ
একুশ শতকে এসে পরিবার নিয়ে ভাবনার জগতে নতুন সংযোজন করেছেন শার্লি টার্কল (Sherry Turkle)। তিনি প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। তার Alone Together বইতে তিনি দেখিয়েছেন, স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে আমাদের শারীরিকভাবে কাছে রাখলেও মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি একে বলেছেন দ্য প্রেজেন্ট অ্যাবসেন্স (The Present Absence)। টার্কল সতর্ক করেছেন যে, ডিজিটাল যোগাযোগ আমাদের পরিবারের ভেতরের গভীর কথোপকথন বা এমপ্যাথি (Empathy) নষ্ট করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডেবোরা ট্যানেন (Deborah Tannen) দেখিয়েছেন, পরিবারের ভেতরে নারী ও পুরুষের কথা বলার ধরণ আলাদা, যাকে তিনি বলেছেন জেন্ডারলেক্ট (Genderlect)। এই ভাষাগত পার্থক্যের কারণেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এত ভুল বোঝাবুঝি হয়। ট্যানেনের কাজ আমাদের শেখায়, সুখী পরিবারের জন্য কেবল ভালোবাসা নয়, সঠিক যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন স্কিল (Communication Skill)-ও সমান জরুরি।
এই তাত্ত্বিকরা – মর্গান থেকে টার্কল, এঙ্গেলস থেকে বাউমরিন্ড – সবাই মিলে পরিবারের যে বিশাল ক্যানভাস তৈরি করেছেন, তা এক কথায় বিস্ময়কর। তারা আমাদের দেখিয়েছেন, পরিবার কোনো একরৈখা গল্প নয়। এটি জিন, ইতিহাস, অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব এবং রাজনীতির এক জটিল বুনন। তাদের তত্ত্বগুলো কখনো একে অপরের পরিপূরক, আবার কখনো সাংঘর্ষিক। কিন্তু এই বিতর্ক আর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই আমরা পরিবার নামক এই রহস্যময় প্রতিষ্ঠানটিকে একটু একটু করে চিনতে পারছি। ফ্যামিলি স্টাডিজ বা পরিবার বিদ্যা যদি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিসিপ্লিন হিসেবে দাঁড়াতে চায়, তবে এই সব স্থপতির চিন্তাকে এক ছাদের নিচে আনা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
উপসংহার
এতক্ষণ আমরা পরিবারের অলিগলি ঘুরে, এর পেছনের জগতটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। ব্যাপারটা কি অদ্ভুত, তাই না? যাকে আমরা সারাজীবন নিছক মায়া-মমতার বাঁধন ভেবে এসেছি, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে জিনের স্বার্থপরতা, টাকার নির্মম হিসাব-নিকাশ, আর ক্ষমতার জটিল রাজনীতি। আমরা দেখলাম, পরিবার কোনো স্থির পুকুর নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান নদী। সময়ের প্রয়োজনে সে দিক বদলায়। কখনো সে জীববিজ্ঞানের কঠোর নিয়মে চলে, কখনো সে অর্থনীতির চাপে বাঁক নেয়, আবার কখনো সে আইনের শাসনে বন্দি হয়। একজন মানুষ যখন পরিবারের ভেতরে থাকে, তখন সে কেবল একজন বাবা, মা, সন্তান বা ভাই নয়; সে আসলে একটি বিশাল সামাজিক, ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখগুলো যে আসলে বড় বড় কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা পরিবারের এই গভীর বিশ্লেষণ ছাড়া বোঝা অসম্ভব।
দিনশেষে পরিবারই সেই জায়গা, যেখানে আমাদের সব গল্পের শুরু হয় এবং যেখানে এসেই পৃথিবীর সব গল্পের শেষ হয়। এটি আমাদের প্রথম পাঠশালা, যেখানে আমরা সমাজকে চিনতে শিখি; আমাদের প্রথম হাসপাতাল, যেখানে আমরা সেবা পাই; এবং আমাদের প্রথম ব্যাংক, যেখানে আমরা বিপদে ভরসা পাই। আধুনিক জীবনের হাজারো ব্যস্ততা, প্রযুক্তির আসক্তি আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ভিড়ে পরিবারের রূপ হয়তো পাল্টাচ্ছে, কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা একবিন্দুও ফুরিয়ে যায়নি। বরং এই অস্থির, প্রতিযোগিতামূলক সময়ে মানুষের একটু মানসিক শান্তির জন্য, দিনশেষে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য পরিবারের কোনো বিকল্প নেই।
পরিবার আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয় এবং কীভাবে একে অপরের হাত ধরে ঝড়ের মোকাবিলা করতে হয়। সমাজ বা রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক না কেন, মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল তার আপনজনদের গড়া এই ছোট বৃত্তটিই। তাই পরিবারকে জানা মানে আসলে মানুষকেই জানা, আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের শেকড়কেই চিনে নেওয়া। আমাদের এই অতি চেনা ঘরটিকে নতুন করে আবিষ্কার করার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের ভালো থাকার আসল চাবিকাঠি।
আমরা এতক্ষণ ধরে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার অলিগলি ঘুরে পরিবারকে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমরা যদি পরিবারকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে চাই, তবে আমাদের এই খণ্ডিত দৃষ্টি বাদ দিতে হবে। মানুষের জীবন তো আর ডিপার্টমেন্ট ভাগ করা সিলেবাস নয় যে, আজ শুধু অর্থনীতির ক্লাস করব, কাল মনোবিজ্ঞানের, আর পরশু আইনের। জীবন সবকিছুর এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি। এখানে সুখের সাথে টাকা, টাকার সাথে আইন, আর আইনের সাথে আবেগ জড়িয়ে থাকে। একটি উদাহরণের কথা ভাবুন – একজন মানুষ যখন ডিভোর্স দেয় বা পরিবার ভেঙে যায়, তখন তার জীবনে কী ঘটে? তখন তার কেবল মন ভাঙ্গে না (মনোবিজ্ঞান), তার অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়ে যায় (অর্থনীতি), সমাজে তার অবস্থান ও পরিচিতি বদলায় (সমাজবিজ্ঞান), সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়তে হয় (আইন), এমনকি তার শারীরিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটে (চিকিৎসাশাস্ত্র)।
এই সবগুলো ঘটনা একই সময়ে, একই মানুষের জীবনে ঘটে। অথচ আমাদের পড়াশোনার জগতটা এমনভাবে সাজানো যে, আমরা এই সমস্যাগুলোকে আলাদা আলাদা লেন্স দিয়ে দেখি। একজন অর্থনীতিবিদ কেবল টাকার অংক কষেন, একজন মনোবিজ্ঞানী কেবল বিষণ্ণতা মাপেন। কিন্তু এই সবগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে দেখার মতো কোনো বিশেষজ্ঞ বা ডিসিপ্লিন সচরাচর আমাদের চোখে পড়ে না। একটি স্বীকৃত এবং মূলধারার ‘ফ্যামিলি স্টাডিজ’ ডিসিপ্লিন না থাকা মানে হলো আমরা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবহেলা করছি। আমরা ধরে নিয়েছি পরিবার একটি ‘প্রাকৃতিক’ বিষয়, এটি এমনিতেই চলে, একে নিয়ে আলাদা করে পড়ার বা গবেষণা করার কিছু নেই। এই ধারণাটি যে কত বড় ভুল, তা আধুনিক সমাজের ভঙ্গুর পারিবারিক সম্পর্কের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
মানুষের ভালো থাকা বা মন্দ থাকা নির্ভর করে তার পরিবারের ওপর। আর পরিবারের ভালো থাকা নির্ভর করে আমরা পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিকে কতটা গভীরভাবে বুঝতে পারছি তার ওপর। যতক্ষণ না এই সবকটি ধারা – জীববিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান – এক মোহনায় মিশছে, ততক্ষণ আমরা সেই অন্ধের হাতি দেখার মতোই পরিবারকে কেবল আংশিক জানব। আর আংশিক সত্য অনেক সময় মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে। সময় এসেছে এই অনাথ বিদ্যাটিকে জাতে তোলার। একে অন্য কোনো বিভাগের লেজুড়বৃত্তি না করিয়ে, স্বমহিমায় একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানের মর্যাদা দেওয়ার। কারণ, দিনশেষে পরিবারই সেই জায়গা, যেখান থেকে আমাদের সব গল্পের শুরু হয় এবং যেখানে এসেই পৃথিবীর সব গল্পের শেষ হয়। এই গল্পটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে এবং সামগ্রিকভাবে পাঠ করা আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই জরুরি।
তথ্যসূত্র
- Ainsworth, M. D. S., Blehar, M. C., Waters, E., & Wall, S. (1978). Patterns of Attachment: A Psychological Study of the Strange Situation. Erlbaum.
- Althusser, L. (1971). Ideology and Ideological State Apparatuses. Monthly Review Press.
- Arendt, H. (1951). The Origins of Totalitarianism. Schocken Books.
- Ariès, P. (1960). Centuries of Childhood: A Social History of Family Life. Knopf.
- Aristotle. (1984). The Politics (C. Lord, Trans.). University of Chicago Press.
- Barker, D. J. P. (1990). The fetal and infant origins of adult disease. BMJ, 301(6761), 1111.
- Bartkowski, J. P. (2001). Remaking the Godly Marriage: Gender Negotiation in Evangelical Families. Rutgers University Press.
- Bateson, G., Jackson, D. D., Haley, J., & Weakland, J. (1956). Toward a theory of schizophrenia. Behavioral Science, 1(4), 251–264.
- Baumrind, D. (1967). Child care practices anteceding three patterns of preschool behavior. Genetic Psychology Monographs, 75(1), 43–88.
- Baxter, L. A., & Montgomery, B. M. (1996). Relating: Dialogues and Dialectics. Guilford Press.
- Beck, U. (1992). Risk Society: Towards a New Modernity. Sage.
- Becker, G. S. (1981). A Treatise on the Family. Harvard University Press.
- Bengtson, V. L., & Roberts, R. E. (1991). Intergenerational Solidarity in Aging Families: An Example of Formal Theory Construction. Journal of Marriage and Family, 53(4), 856–870.
- Berger, P. L. (1967). The Sacred Canopy: Elements of a Sociological Theory of Religion. Doubleday.
- Bernard, J. (1981). The Female World. Free Press.
- Berry, J. W. (1997). Immigration, Acculturation, and Adaptation. Applied Psychology, 46(1), 5–34.
- Bourdieu, P. (1986). The Forms of Capital. In J. Richardson (Ed.), Handbook of Theory and Research for the Sociology of Education (pp. 241–258). Greenwood.
- Bowen, M. (1978). Family Therapy in Clinical Practice. Jason Aronson.
- Bowlby, J. (1969). Attachment and Loss: Vol. 1. Attachment. Basic Books.
- Brody, E. M. (1981). “Women in the Middle” and Family Help to Older People. The Gerontologist, 21(5), 471–480.
- Brown, G. W., Birley, J. L., & Wing, J. K. (1972). Influence of family life on the course of schizophrenic disorders: A replication. British Journal of Psychiatry, 121(562), 241–258.
- Brown, M. M., & Paolucci, B. (1979). Home Economics: A Definition. American Home Economics Association.
- Brown, S. L., & Lin, I. F. (2012). The Gray Divorce Revolution: Rising Divorce Among Middle-Aged and Older Adults, 1990–2010. The Journals of Gerontology: Series B, 67(6), 731–741.
- Burr, W. R., Leigh, G. K., Day, R. D., & Constantine, J. (1993). Symbolic Interaction and the Family. In P. G. Boss et al. (Eds.), Sourcebook of Family Theories and Methods: A Contextual Approach (pp. 291–310). Plenum Press.
- Buss, D. M. (1994). The Evolution of Desire: Strategies of Human Mating. Basic Books.
- Butler, J. (1990). Gender Trouble: Feminism and the Subversion of Identity. Routledge.
- Carsten, J. (1997). The Heat of the Hearth: The Process of Kinship in a Malay Fishing Community. Oxford University Press.
- Cherlin, A. J. (2004). The Deinstitutionalization of American Marriage. Journal of Marriage and Family, 66(4), 848–861.
- Coleman, J. S. (1988). Social Capital in the Creation of Human Capital. American Journal of Sociology, 94, S95–S120.
- Cooley, C. H. (1902). Human Nature and the Social Order. Scribner’s.
- Coontz, S. (1992). The Way We Never Were: American Families and the Nostalgia Trap. Basic Books.
- Coontz, S. (2005). Marriage, a History: From Obedience to Intimacy, or How Love Conquered Marriage. Viking.
- Cowan, R. S. (1983). More Work for Mother: The Ironies of Household Technology from the Open Hearth to the Microwave. Basic Books.
- Crenshaw, K. (1989). Demarginalizing the Intersection of Race and Sex: A Black Feminist Critique of Antidiscrimination Doctrine, Feminist Theory and Antiracist Politics. University of Chicago Legal Forum, 1989(1), 139–167.
- Daly, M. (1973). Beyond God the Father: Toward a Philosophy of Women’s Liberation. Beacon Press.
- Daly, M., & Wilson, M. (1988). Homicide. Aldine de Gruyter.
- Dannefer, D. (2003). Cumulative Advantage/Disadvantage and the Life Course: Cross-Fertilizing Age and Social Science Theory. Journals of Gerontology: Series B, 58(6), S327–S337.
- Davidoff, L., & Hall, C. (1987). Family Fortunes: Men and Women of the English Middle Class, 1780-1850. University of Chicago Press.
- Dawkins, R. (1976). The Selfish Gene. Oxford University Press.
- Dawkins, R. (2006). The God Delusion. Bantam Books.
- Delphy, C., & Leonard, D. (1992). Familiar Exploitation: A New Analysis of Marriage in Contemporary Western Societies. Polity Press.
- DeVault, M. L. (1991). Feeding the Family: The Social Organization of Caring as Gendered Work. University of Chicago Press.
- Donzelot, J. (1979). The Policing of Families. Pantheon Books.
- Durkheim, É. (1897). Suicide: A Study in Sociology. Free Press.
- Elder, G. H. (1974). Children of the Great Depression: Social Change in Life Experience. University of Chicago Press.
- Engel, G. L. (1977). The need for a new medical model: a challenge for biomedicine. Science, 196(4286), 129-136.
- Engels, F. (1884). The Origin of the Family, Private Property and the State. Hottingen-Zurich.
- Esping-Andersen, G. (1990). The Three Worlds of Welfare Capitalism. Princeton University Press.
- Evans-Pritchard, E. E. (1951). Kinship and Marriage among the Nuer. Clarendon Press.
- Fiese, B. H., Tomcho, T. J., Douglas, M., Josephs, K., Poltrock, S., & Baker, T. (2002). A review of 50 years of research on naturally occurring family routines and rituals: Cause for celebration? Journal of Family Psychology, 16(4), 381–390.
- Fineman, M. A. (1995). The Neutered Mother, the Sexual Family, and Other Twentieth Century Tragedies. Routledge.
- Fisher, H. (2004). Why We Love: The Nature and Chemistry of Romantic Love. Henry Holt and Company.
- Fivush, R., Bohanek, J. G., & Duke, M. P. (2008). The intergenerational self: Subjective perspective and family history. In F. Sani (Ed.), Self-Continuity: Individual and Collective Perspectives (pp. 131–143). Psychology Press.
- Foucault, M. (1976). The History of Sexuality: Vol. 1. The Will to Knowledge. Pantheon.
- Giddens, A. (1992). The Transformation of Intimacy: Sexuality, Love and Eroticism in Modern Societies. Stanford University Press.
- Goldin, C. (2014). A Grand Gender Convergence: Its Last Chapter. American Economic Review, 104(4), 1091–1119.
- Gottman, J. M. (1994). What Predicts Divorce? The Relationship Between Marital Processes and Marital Outcomes. Lawrence Erlbaum Associates.
- Greenhaus, J. H., & Beutell, N. J. (1985). Sources of conflict between work and family roles. Academy of Management Review, 10(1), 76-88.
- Greenhaus, J. H., & Powell, G. N. (2006). When work and family are allies: A theory of work-family enrichment. Academy of Management Review, 31(1), 72–92.
- Hamilton, W. D. (1964). The genetical evolution of social behaviour. I & II. Journal of Theoretical Biology, 7(1), 1–52.
- Hart, B., & Risley, T. R. (1995). Meaningful Differences in the Everyday Experience of Young American Children. Paul H. Brookes Publishing.
- Hawkes, K., O’Connell, J. F., Blurton Jones, N. G., Alvarez, H., & Charnov, E. L. (1998). Grandmothering, menopause, and the evolution of human life histories. Proceedings of the National Academy of Sciences, 95(3), 1336–1339.
- Hochschild, A., & Machung, A. (1989). The Second Shift: Working Parents and the Revolution at Home. Viking.
- Imber-Black, E. (1998). The Secret Life of Families: Truth-Telling, Privacy, and Reconciliation in a Telling Era. Bantam Books.
- Jacob, H. (1988). Silent Revolution: The Transformation of Divorce Law in the United States. University of Chicago Press.
- Jennings, M. K., & Niemi, R. G. (1974). The Political Character of Adolescence: The Influence of Families and Schools. Princeton University Press.
- Kadushin, A., & Martin, J. A. (1988). Child Welfare Services. Macmillan.
- Lareau, A. (2003). Unequal Childhoods: Class, Race, and Family Life. University of California Press.
- Lasch, C. (1977). Haven in a Heartless World: The Family Besieged. Basic Books.
- Laslett, P. (1972). Household and Family in Past Time. Cambridge University Press.
- Laub, J. H., & Sampson, R. J. (1993). Turning Points in the Life Course: Why Change Matters to the Study of Crime. Criminology, 31(3), 301–325.
- Lesthaeghe, R. (2010). The Unfolding Story of the Second Demographic Transition. Population and Development Review, 36(2), 211–251.
- Levy, D. (2007). Love and Sex with Robots: The Evolution of Human-Robot Relationships. HarperCollins.
- Lévi-Strauss, C. (1969). The Elementary Structures of Kinship. Beacon Press.
- Lundberg, S., & Pollak, R. A. (1993). Separate Spheres Bargaining and the Marriage Market. Journal of Political Economy, 101(6), 988–1010.
- Lupton, D., & Williamson, B. (2017). The datafied child: The dataveillance of children and implications for their rights. New Media & Society, 19(5), 780–794.
- Madan, T. N. (1987). Non-renunciation: Themes and Interpretations of Hindu Culture. Oxford University Press.
- Mahmood, S. (2005). Politics of Piety: The Islamic Revival and the Feminist Subject. Princeton University Press.
- Mahoney, A., Pargament, K. I., Murray-Swank, A., & Murray-Swank, N. (2003). Religion and the sanctification of family relationships. Review of Religious Research, 44(3), 220–236.
- Malinowski, B. (1922). Argonauts of the Western Pacific. Routledge.
- Massey, D. (1994). Space, Place, and Gender. University of Minnesota Press.
- McDaniel, B. T., & Radesky, J. S. (2018). Technoference: Parent distraction with technology and associations with child behavior problems. Child Development, 89(1), 100–109.
- McLeod, J. M., & Chaffee, S. R. (1972). The construction of social reality. In J. T. Tedeschi (Ed.), The Social Influence Processes (pp. 50–99). Aldine-Atherton.
- Millett, K. (1970). Sexual Politics. Doubleday.
- Minuchin, S. (1974). Families and Family Therapy. Harvard University Press.
- Morgan, D. H. J. (1996). Family Connections: An Introduction to Family Studies. Polity Press.
- Morgan, L. H. (1877). Ancient Society. Henry Holt and Company.
- Murdock, G. P. (1949). Social Structure. Macmillan.
- Oakley, A. (1974). The Sociology of Housework. Martin Robertson.
- Okin, S. M. (1989). Justice, Gender, and the Family. Basic Books.
- Pargament, K. I., Smith, B. W., Koenig, H. G., & Perez, L. (1998). Patterns of positive and negative religious coping with major life stressors. Journal for the Scientific Study of Religion, 37(4), 710–724.
- Parreñas, R. S. (2001). Servants of Globalization: Women, Migration, and Domestic Work. Stanford University Press.
- Parsons, T., & Bales, R. F. (1955). Family, Socialization and Interaction Process. Free Press.
- Pateman, C. (1988). The Sexual Contract. Stanford University Press.
- Pearce, L. D., & Denton, M. L. (2011). A Faith of Their Own: Stability and Change in the Religiosity of America’s Adolescents. Oxford University Press.
- Piketty, T. (2014). Capital in the Twenty-First Century. Harvard University Press.
- Plato. (1991). The Republic (A. Bloom, Trans.). Basic Books.
- Prensky, M. (2001). Digital Natives, Digital Immigrants Part 1. On the Horizon, 9(5), 1–6.
- Putnam, R. D. (2000). Bowling Alone: The Collapse and Revival of American Community. Simon & Schuster.
- Radcliffe-Brown, A. R. (1952). Structure and Function in Primitive Society. Free Press.
- Rahman, F. (1982). Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition. University of Chicago Press.
- Rapoport, R., & Rapoport, R. N. (1975). Leisure and the Family Life Cycle. Routledge.
- Reid, M. G. (1934). Economics of Household Production. Wiley.
- Rich, A. (1976). Of Woman Born: Motherhood as Experience and Institution. Norton.
- Riley, M. W. (1987). On the Significance of Age in Sociology. American Sociological Review, 52(1), 1–14.
- Riley, N. S. (2013). ‘Til Faith Do Us Part: How Interfaith Marriage is Transforming America. Oxford University Press.
- Rossiter, M. W. (1982). Women Scientists in America: Struggles and Strategies to 1940. Johns Hopkins University Press.
- Rowe, J. W., & Kahn, R. L. (1997). Successful Aging. The Gerontologist, 37(4), 433–440.
- Russell, B. (1929). Marriage and Morals. George Allen & Unwin.
- Satir, V. (1972). Peoplemaking. Science and Behavior Books.
- Savulescu, J. (2001). Procreative Beneficence: Why We Should Select the Best Children. Bioethics, 15(5-6), 413–426.
- Schachter, F. F., Shore, E., Feldman-Rotman, S., Marquis, R. E., & Miller, S. (1976). Sibling deidentification. Developmental Psychology, 12(5), 418–427.
- Schneider, D. M. (1968). American Kinship: A Cultural Account. Prentice-Hall.
- Shorter, E. (1975). The Making of the Modern Family. Basic Books.
- Smart, C. (2007). Personal Life: New Directions in Sociological Thinking. Polity.
- Smith, C., & Denton, M. L. (2005). Soul Searching: The Religious and Spiritual Lives of American Teenagers. Oxford University Press.
- Spain, D. (1992). Gendered Spaces. University of North Carolina Press.
- Sprey, J. (1979). Conflict Theory and the Study of Marriage and the Family. In W. R. Burr et al. (Eds.), Contemporary Theories About the Family (Vol. 2, pp. 130–159). Free Press.
- Stage, S. (1997). Rethinking Home Economics: Women and the History of a Profession. Cornell University Press.
- Stone, L. (1977). The Family, Sex and Marriage in England 1500-1800. Harper & Row.
- Tannen, D. (1990). You Just Don’t Understand: Women and Men in Conversation. Ballantine Books.
- Trivers, R. L. (1972). Parental investment and sexual selection. In B. Campbell (Ed.), Sexual Selection and the Descent of Man (pp. 136–179). Aldine.
- Turkle, S. (2011). Alone Together: Why We Expect More from Technology and Less from Each Other. Basic Books.
- Vallor, S. (2015). Moral Deskilling and Upskilling in a New Machine Age: Reflections on the Ambiguous Future of Character. Philosophy & Technology, 28(1), 107–124.
- Valkenburg, P. M., & Peter, J. (2007). Preadolescents’ and adolescents’ online communication and their closeness to friends. Developmental Psychology, 43(2), 267–277.
- van Gennep, A. (1960). The Rites of Passage. University of Chicago Press.
- Walker, L. E. (1979). The Battered Woman. Harper & Row.
- Walsh, F. (2006). Strengthening Family Resilience. Guilford Press.
- Westman, M. (2001). Stress and Strain Crossover. Human Relations, 54(6), 717–751.
- Weston, K. (1991). Families We Choose: Lesbians, Gays, Kinship. Columbia University Press.
- Wilcox, W. B. (2004). Soft Patriarchs, New Men: How Christianity Shapes Fathers and Husbands. University of Chicago Press.
- Williams, J. C. (2000). Unbending Gender: Why Family and Work Conflict and What to Do About It. Oxford University Press.
- Zaretsky, E. (1976). Capitalism, the Family, and Personal Life. Harper & Row.
- Zuboff, S. (2019). The Age of Surveillance Capitalism: The Fight for a Human Future at the New Frontier of Power. PublicAffairs.
- Zuckerman, P. (2008). Society without God: What the Least Religious Nations Can Tell Us About Contentment. NYU Press.

