ইসলামযুক্তিবাদসম্পাদকীয়

ইসলামের ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দাবি: শরীয়তের বৈষম্য ও পরকালের অবিচার

সারসংক্ষেপ

ইসলামের অন্যতম প্রচলিত দাবি হলো, ইসলাম ইহকাল ও পরকালে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। অসংখ্য মুসলিমের ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এই ধারণা: পৃথিবীতে অন্যায় ও অবিচারের শিকার হলেও পরকালে আল্লাহ তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। এই প্রবন্ধে দাবিটি পরীক্ষা করা হবে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস—কোরআন, হাদিস এবং শরীয়তের বিধান দিয়ে। সেই যাচাই হবে কঠোর ও যুক্তিনির্ভর। কারণ শুরু থেকেই ইসলামকে নির্ভুল এবং আল্লাহকে ন্যায়পরায়ণ ধরে নিলে অনুসন্ধানের আগেই তার ফল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তখন যাচাইয়ের নামে চলে পূর্ববিশ্বাসের পক্ষে সাফাই। এখানে ইসলামকে অন্য ধর্মগুলোর মতোই একটি অন্ধবিশ্বাস হিসেবে যাচাইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে। এর কোনো দাবি শুধু ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে বলে সত্য, কিংবা কোনো বিধান আল্লাহর নামে দেওয়া হয়েছে বলে ন্যায়সংগত গণ্য হবে না। প্রতিটি দাবিকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, প্রতিটি বিধানকে ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। ভক্তি ও বিশ্বাসের চশমা খুলে আসুন, শুধুমাত্র যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখি—ইসলাম আসলেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে কি না। পুরো প্রবন্ধের একটি সামগ্রিক ম্যাপ এখানে পাঠকের সুবিধার জন্য দেয়া হচ্ছেঃ

মূল বিষয়আলোচিত প্রশ্ন ও বিধান
ইনসাফের মানদণ্ডন্যায়বিচারের অর্থ; ক্ষমতা ও ন্যায়ের পার্থক্য; বিচারকের নিজের জবাবদিহি।
জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাপারিবারিকভাবে পাওয়া ধর্ম; ইচ্ছামতো বিশ্বাস তৈরি বা পরিবর্তনের সীমা; ধর্ম যাচাইয়ের অসম সুযোগ।
নবী নির্বাচন ও বিশেষ সুবিধানবী হওয়ার যোগ্যতা; নবীর স্বজনপ্রীতি; বদরের যোদ্ধাদের বিশেষ ছাড় ও হাতিবের ঘটনা।
তাকদীর ও কাজের দায়পাপ-পুণ্যের কাজ কে করায়; মানুষের ইচ্ছার ওপর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ; পথভ্রষ্ট করার পরে শাস্তি দেওয়ার ন্যায্যতা।
অপরাধ ছাড়াই শাস্তি ও অন্যের কাজের দায়জন্মগত কুফর; খুন হওয়া শিশুর পরিণতি; অন্যের কান্নার কারণে মৃতের শাস্তি; মুসলিমের মুক্তির বিনিময়ে ইহুদি-খ্রিষ্টানকে জাহান্নামে পাঠানো।
বিশ্বাস, অপরাধ ও ক্ষমাধর্ষক ও খুনির জান্নাতপ্রাপ্তি; একশ হত্যাকারীর ক্ষমা; গুনাহকারীদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা; অমুসলিমের সৎকাজের মূল্য; সুপারিশনির্ভর মুক্তি।
চিরস্থায়ী শাস্তি ও নির্যাতনসীমিত জীবনের অপরাধে অনন্ত শাস্তি; পোড়া চামড়া বদলে নির্যাতন অব্যাহত রাখা।
সাক্ষ্য ও বিচার পাওয়ার অধিকারঅমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হওয়া; ধর্ষণের ক্ষেত্রে চার সাক্ষীর শর্ত; ঋণের সাক্ষ্যে একজন পুরুষের পরিবর্তে দুই নারী।
ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী জীবনের মূল্যঅমুসলিম হত্যায় কিসাসের বিধান; মুসলিম ও অমুসলিমের রক্তপণের পার্থক্য।
অর্থ ও পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বৈষম্যরক্তপণ ও ক্ষমার অধিকার; নিজ সন্তানকে হত্যায় পিতার বিশেষ ছাড়; পুত্র-কন্যার উত্তরাধিকারের পার্থক্য।
দাসত্ব ও জন্মগত অধীনতাদাসদাসী ও স্বাধীন মানুষের জীবনের অসম মূল্য; দাসীর সন্তানের জন্মগত দাসত্ব।
ধর্ম পালন ও ধর্মত্যাগের শাস্তিনামাজ ত্যাগকারীর শাস্তি; ইসলাম ত্যাগের মৃত্যুদণ্ড; শিরককারীর বিরুদ্ধে হত্যার বিধান।
শারীরিক শাস্তি ও নির্যাতিতের অধিকারচুরির জন্য হাত কাটা; যৌন নিপীড়িত পশুকেও হত্যা; অমুসলিম নারীকে বিবস্ত্র করার হুমকি।
ভুল বিচারের প্রতিকারবিচারকের ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা; ভুল রায়ে হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদের ক্ষতিপূরণ; অর্থ দিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি মেরামতের সীমা।

ভূমিকা

একজন মানুষ কোন পরিবারে জন্মাবে, তার পিতা-মাতা কারা হবেন, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সে কতটা সম্পদ, নিরাপত্তা এবং সুযোগ পাবে—এসবের কোনো কিছুই সে নিজে নির্ধারণ করে না। অথচ এই অনির্বাচিত ঘটনাগুলোই তার জীবনের একটি বড় অংশ নির্ধারণ করে দেয়। একজন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান জন্মসূত্রে এমন সব সুযোগ পেতে পারে, যেগুলোর নাগাল পেতে একজন সাধারণ মানুষকে সারা জীবন পরিশ্রম করতে হয়। আমরা মুকেশ আম্বানী বা বিল গেটসের সন্তান হিসেবে জন্মালে হয়তো দামি গাড়ি চালাতাম, ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠানে পড়তাম এবং জীবিকার চিন্তা ছাড়াই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতাম। কিন্তু আমাদের অনেকের জীবন কাটে সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং আগামী মাসের ভাড়া কীভাবে জোগাড় হবে, সেই দুশ্চিন্তায়। এই পার্থক্যের সূচনা হয় ব্যক্তির যোগ্যতা, পরিশ্রম কিংবা নৈতিক চরিত্র যাচাই হওয়ার অনেক আগেই।

আমরা যে একটি ধনী পরিবারে জন্ম নিইনি, এটি তো আমাদের অপরাধ নয়। আবার কোনো ধনকুবেরের সন্তান নিজ যোগ্যতায় সেই পরিবারে জন্ম নেয়নি। এই ঘটনাগুলোর পেছনে তাদের বা আমাদের কারোরই কোনো হাত ছিল না। অথচ একজন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যবহার করে আরও সম্পদ অর্জনের সুযোগ পায়, আরেকজন নিজের মেধা বিকাশের সুযোগ পাওয়ার আগেই জীবিকার চাপে পড়ে যায়। যে শিশুকে বিদ্যালয় ছেড়ে কাজ করতে হয়, তার সঙ্গে যে শিশু সব ধরনের সহায়তা নিয়ে পড়াশোনা করে, তাদের পরবর্তী সাফল্য বা ব্যর্থতাকে কেবল ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ফল বলে বিচার করা যায় না। জন্মের সুবিধাকে ব্যক্তির অর্জন এবং জন্মের বঞ্চনাকে ব্যক্তির ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য করলে বিচার শুরু হওয়ার আগেই বঞ্চিত মানুষটির ওপর বাড়তি দায় চাপানো হয়।

মানুষ নিজের জন্মপরিবারের মতো জন্মস্থান, শৈশবের ধর্মীয় পরিবেশ কিংবা সমাজে প্রথম পরিচয়টিও বেছে নেয় না। একটি শিশু যে বিশ্বাসকে ঘিরে বড় হয়, তার প্রথম শিক্ষা, ভয়, আশা এবং কর্তব্যবোধও সেই পরিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠে। এখন এই অনির্বাচিত পরিচয়গুলো যদি তার অধিকার, নিরাপত্তা কিংবা শাস্তি পাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জন্মের ঘটনাটিই বিচারব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধা বা অসুবিধা তৈরি করে। কেউ শুধু নির্দিষ্ট পরিবারে জন্মেছে বলে বাড়তি মর্যাদা পাবে, আর কেউ অন্য পরিবারে জন্মেছে বলে কম অধিকার পাবে—এমন ব্যবস্থায় মানুষের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে তার নিজের কাজের আগেই। তখন ব্যক্তির নৈতিক দায় এবং তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

মানুষের তৈরি ব্যবস্থায় এই ধরনের অবিচার দেখলে আমরা তার কারণ খুঁজি। কোথাও পরিবারতন্ত্র, কোথাও সম্পদের কেন্দ্রীভবন, কোথাও বৈষম্যমূলক আইন, আবার কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষের সুযোগ সংকুচিত করে। এসব ব্যবস্থাকে বদলানোর দাবি ওঠে, কারণ সেগুলোর সিদ্ধান্ত ও ফল মানুষের জীবনে বাস্তব ক্ষতি তৈরি করে। কিন্তু পৃথিবীর এই অসম পরিস্থিতিকে যদি একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার পরিকল্পনার অংশ বলা হয়, তাহলে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। যে সত্তা জন্মপরিস্থিতি নির্ধারণ করেন, সুযোগের পার্থক্য সৃষ্টি করেন এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের কাজের বিচারও করেন, তার বিচারনীতিতে এই পার্থক্যের হিসাব কোথায়? আর যে ব্যক্তি বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার বঞ্চনার কারণ ও প্রভাব হিসাব থেকে বাদ দিয়ে শুধু তার পরবর্তী আচরণ বিচার করলে সেই বিচারে মূল সমস্যাটিই অদৃশ্য থেকে যায়।

পরকালের বিচার নিয়ে প্রশ্ন করার সময়ও এই সম্পর্কটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভবিষ্যতে কাউকে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার বর্তমান বঞ্চনার ন্যায়সংগততা প্রমাণ করা যায় না। ক্ষতি করার কারণ এবং পরে সেই ক্ষতির প্রতিকার—দুটিরই ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিশেষত যিনি পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, তিনিই যদি সেই পরিস্থিতির মধ্যে জন্মানো মানুষের সিদ্ধান্তের বিচার করেন, তাহলে দেখতে হবে মানুষের কাজের কতখানি তার নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং কতখানি তার ওপর আরোপিত অবস্থার ফল। জন্মের সময় থেকেই কারও জন্য পথ অনুকূল, কারও জন্য প্রতিকূল করে দিয়ে পরে তাদের প্রাপ্তি ও শাস্তিকে নিছক ব্যক্তিগত যোগ্যতার ফল বলা হলে জন্মগত বৈষম্য বিচারের মধ্যেও বহাল থাকে। মানুষের দুঃখের একটি সান্ত্বনামূলক ব্যাখ্যা দেওয়া যায় সহজেই; সেই দুঃখ, তার কারণ এবং তার ওপর দাঁড়ানো বিচারকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করা অনেক কঠিন। ইনসাফের প্রশ্নটি সেখানেই।


ইনসাফের অর্থ ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড

ইনসাফ অর্থ কী?

ইনসাফ শব্দের অর্থ হচ্ছে ন্যায়বিচার। অথবা বলা যেতে পারে, অধিকার, সুযোগ এবং দায়ের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য রক্ষা করা। যেমন ধরুন, দুই বা একাধিক পক্ষ কোনো একটি বিচার বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার একই রকম সুযোগ পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। সকলের সমান অধিকার এবং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র বা বিচারক কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন না করে পুরো প্রক্রিয়া সম্পাদন করলে, তবেই সেটিকে সুবিচার বলা যেতে পারে। কাউকে তার পরিচয়, বংশ, ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা ক্ষমতার কারণে একটু বেশি সুবিধা আর অন্যকে একটু অসুবিধা দিয়ে যদি কোনো বিচার করা হয়, সেটি কোনোভাবেই সুবিচার বলে গণ্য হতে পারে না। বিচারিক প্রক্রিয়ায় যদি একজন অযৌক্তিকভাবে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায়, আর অন্যজন আত্মপক্ষ সমর্থনের কম সুযোগ পায়, তাহলে সেই বিচার নিরপেক্ষ থাকে না। একইভাবে, কারও কাজে জবরদস্তি, ভয়ভীতি, অজ্ঞতা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবক কাজ করে থাকলে, সেই প্রভাব বিবেচনা না করে তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করা ব্যক্তির সমান দায়ী করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বিচার করতে হলে কাজটির পাশাপাশি কাজটি করার পরিস্থিতি, ব্যক্তির জ্ঞান এবং তার বাস্তব স্বাধীনতাও যাচাই করতে হবে।

যেমন ধরুন, একজন আসামি যদি ক্ষমতাবান হয়, কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়, তার জন্য যদি এক নিয়ম আর ক্ষমতাহীন ব্যক্তির জন্য যদি আরেক নিয়ম হয়, তাহলে সেটিকে আমরা ইনসাফ বলতে পারি না। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যদি শুধুমাত্র মুজিব পরিবারে জন্মাবার জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বা বিচারিক সুবিধা পান, আর অন্য একজন নাগরিক যদি সেই সুবিধাটুকু না পান, তাহলে ধরে নিতে হবে, সেখানে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়নি। একই কথা প্রযোজ্য সকলের জন্য। হোক সে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, কিংবা হোক সে একজন মুদি দোকানদার। স্বাভাবিকভাবেই, একজন পিতা তার সন্তানকে বেশি ভালোবাসবেন। কিন্তু সেই পিতা যদি কোনো পদের অধিকারী হন, এবং সেই পদ যদি জনগণের ভাগ্য বা উপকার-অপকারের ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে সেই পদে থাকা অবস্থায় তাকে নিজের সন্তানকেও অন্য আরেকজন নাগরিকের মতোই দেখতে হবে। বিচারক পিতা যদি তার সন্তানকে শুধুমাত্র নিজের সন্তান হওয়ার কারণে কিছু সুবিধা দেন, তাহলে সেটি হবে তার পদের অবমাননা। বুঝতে হবে, তিনি পদের অপব্যবহার করছেন, স্বজনপ্রীতি করছেন। যা ইনসাফের অন্তরায়। ব্যক্তিগত ভালোবাসা বিচারিক পক্ষপাতের অনুমতিপত্র হতে পারে না।

এবার একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি ধরুন। একজন মানুষকে খুন করেছে কলিমুদ্দিন নামের ব্যক্তি। কিন্তু কলিমুদ্দিনকে এই কাজ করতে বাধ্য করেছে শামীম ওসমান নামের এক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। কলিমুদ্দিনের পরিবারকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে সে কাজটি করিয়ে নিয়েছে। এখানে কলিমুদ্দিন অবশ্যই খুনটি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এখানে ভয়ভীতি ও জবরদস্তির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সেই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। তাই শুধু কলিমুদ্দিনের হাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলেই বিচার শেষ হয়ে যেতে পারে না। যে ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডটি করিয়েছে, হুমকি দিয়েছে এবং অন্যের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করেছে, তার দায়ও বিচার করতে হবে। কলিমুদ্দিন নিজেও জবরদস্তির শিকার। তার সামনে হুমকি এড়ানোর কী সুযোগ ছিল, হুমকিটি কতটা বাস্তব ছিল এবং সে কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল, এগুলো না জেনে তার দায় নির্ধারণ করা যাবে না। যে প্রভাবশালী ব্যক্তি কাজটি করিয়েছে, তাকে আড়ালে রেখে শুধু তার ব্যবহৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দিলে অপরাধের কারণ ও দায়ের একটি মৌলিক অংশ বিচার থেকেই বাদ পড়ে যায়।

আবার ধরুন, একটি ছেলে একটি ধনী পরিবারে জন্মেছে, আরেকটি ছেলে জন্মেছে একটি দরিদ্র পরিবারে। ধনী এবং দরিদ্র পরিবারের দুই ছেলেই একটি দোকান থেকে রুটি চুরির দায়ে ধরা পড়ল। এবার ঘটনাটি এমন যে, দরিদ্র ছেলেটি কয়েক দিন না খেয়ে ক্ষুধার তাড়নায় রুটিটি নিয়েছে, আর ধনী পরিবারের ছেলেটি রুটির মালিকের ক্ষতি করার জন্য চুরিটি করেছে। হয়তো সে সেই রুটিটি খাবেও না, ফেলে দেবে। এখানে দুজনের কাজ বাইরে থেকে একই রকম মনে হলেও তাদের উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি এক নয়। তাই বিচারটিও একই রকম হতে পারে না। বিচারককে অবশ্যই সেই উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি যাচাই করতে হবে; কেবল ধনী বা দরিদ্র পরিচয় দেখেই তা ধরে নেওয়া যাবে না। ন্যায়বিচার মানে প্রতিটি মানুষকে যান্ত্রিকভাবে একই শাস্তি দেওয়া নয়। ন্যায়বিচার মানে প্রাসঙ্গিক পার্থক্য বিবেচনা করা এবং অপ্রাসঙ্গিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য না করা। ক্ষুধা, জবরদস্তি বা মানসিক সক্ষমতা অপরাধের দায় নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক; বিচারকের পছন্দের ধর্মে জন্মানো কিংবা তার প্রিয় ব্যক্তির সন্তান হওয়া অপরাধের দায় কমানোর যুক্তি হতে পারে না।

এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমার ধারণা, ইনসাফের বিষয়টি আপনারা আরও ভালোভাবে চিন্তা করলেই উপলব্ধি করতে পারবেন। তাই আর বেশি উদাহরণে যাচ্ছি না। এই আলোচনায় বিচার যাচাইয়ের মানদণ্ড হবে মানুষের অধিকার, প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি বিবেচনা এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির সামঞ্জস্য। যে কাজটি করার কোনো বাস্তব স্বাধীনতা কারও ছিল না, তার জন্য তাকে দায়ী করা যায় কি না; যে সিদ্ধান্তের ক্ষতি সীমিত, তার জন্য সীমাহীন শাস্তি ন্যায়সংগত কি না; এবং যে পরিচয় মানুষ নিজে বেছে নেয়নি, সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তার অধিকার কমানো যায় কি না—এসব প্রশ্নও একই মানদণ্ডে পরীক্ষা করতে হবে। ধর্মীয় বিধানের ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড বদলে ফেললে যাচাইয়ের অর্থই থাকে না। কোনো বিধানকে আগে থেকেই ন্যায়সংগত ধরে নিয়ে পরে তার পক্ষে ব্যাখ্যা খোঁজা ন্যায়বিচার যাচাই করার পদ্ধতি হতে পারে না।

এবারে আসুন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস পড়ে নিই। এখানে বলা হচ্ছে, আল্লাহ সমস্ত আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসীকে শাস্তি দিলেও তাকে যালিম বলে গণ্য করা হবে না। মানুষের ক্ষেত্রে আমরা শাস্তির যথার্থতা যাচাই করি অপরাধ, দায় এবং পরিস্থিতি পরীক্ষা করে। এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর শাস্তিকেও কি সেইভাবে যাচাই করা হবে, নাকি শাস্তিদাতা আল্লাহ বলেই তাকে শুরু থেকে ন্যায়সংগত ধরে নিতে হবে? বিচারকের পরিচয় যদি তার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়, তাহলে বিচারটি আসলেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করছে কি না, সেই পরীক্ষার সুযোগ কোথায়? প্রথমে হাদিসটির সম্পূর্ণ বর্ণনা পড়ুন [1]—

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৫-(৩৭) ইবনু আদ্ দায়লামী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছে আমি তাকে বললাম, তাক্বদীর সম্পর্কে আমার মনে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কিছু হাদীস শুনান যাতে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমার মন থেকে (তাক্বদীর সম্পর্কে) এসব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাঁর সৃষ্টজীবের সকলের প্রতিই রহমত করেন, তবে তাঁর এ রহমত তাদের জন্য সকল ‘আমল হতে উত্তম হবে। সুতরাং তুমি যদি উহুদ পাহাড়সম স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান কর, তোমার থেকে তিনি তা গ্রহণ করবেন না, যে পর্যন্ত তুমি তাক্বদীরে বিশ্বাস না করবে এবং যা তোমার ভাগ্যে ঘটেছে তা তোমার কাছ থেকে কক্ষনো দূরে চলে যাবে না- এ কথাও তুমি বিশ্বাস না করবে, আর যা এড়িয়ে গেছে তা কক্ষনো তোমার নিকট আর আসবে না- এ বিশ্বাস স্থাপন করা ব্যতীত যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
ইবনু আদ্ দায়লামী বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর এ বর্ণনা শুনে আমি সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে এ কথাই প্রত্যুত্তর করলেন। তিনি বলেন, তারপর হুযায়ফাহ্ ইবনু ইয়ামান (রাঃ)-এর নিকট যেয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে একই প্রত্যুত্তর করলেন। এরপর যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর কাছে আসলাম। তিনি স্বয়ং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করেই আমাকে একই ধরনের কথা বললেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)(1)
(1) সহীহ : আহমাদ ২১১৪৪, আবূ দাঊদ ৪৬৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৭৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


ক্ষমতা থাকলেই ন্যায় হয় না

কারও কোনো কাজ করার ক্ষমতা আছে এবং সেই কাজটি ন্যায়সংগত—এই দুটি আলাদা দাবি। একজন শাসকের ক্ষমতা থাকতে পারে নিরপরাধ মানুষকে কারাগারে পাঠানোর, কারও সম্পদ কেড়ে নেওয়ার কিংবা নিজের সন্তানের জন্য আলাদা সুবিধা তৈরি করার। সেই ক্ষমতার অস্তিত্ব কাজগুলোর নৈতিক বৈধতা প্রমাণ করে না। একইভাবে, কোনো সত্তা যদি মানুষ সৃষ্টি করতে পারে, মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তবুও শুধু এই ক্ষমতার বিবরণ থেকে প্রমাণিত হয় না যে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত। ক্ষমতা দিয়ে বোঝানো যায় কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে। সিদ্ধান্তটি কেন ন্যায়সংগত, তার জন্য প্রয়োজন পৃথক যুক্তি। আল্লাহকে সর্বশক্তিমান বলা তাই তার শাস্তির ন্যায়সংগততা প্রমাণ করার বিকল্প হতে পারে না। শাস্তিটি কার ওপর দেওয়া হচ্ছে, কেন দেওয়া হচ্ছে, তার দায় কতখানি এবং শাস্তির মাত্রা কী—এসব প্রশ্ন থেকেই যায়।

উপরের হাদিসটির ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী আল-কারীর ‘মিরকাতুল মাফাতীহ’-এ মালিকানাকেই আল্লাহর শাস্তি ন্যায়সংগত হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসীর মধ্যে নিকটবর্তী ফেরেশতা এবং নবী-রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত করে, তাদের শাস্তি দেওয়ার অনুমিত পরিস্থিতিটিও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ পড়ুন [2]—

মিরকাতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাসাবীহ
ঈমান অধ্যায়: তাকদীরের প্রতি ঈমান
হাদিস: ১১৫-এর সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:

‘যদি’ অর্থ হচ্ছে, এমনটি ধরে নেওয়া হয়। ‘আল্লাহ তাঁর আকাশবাসীদের শাস্তি দিতেন’—অর্থাৎ নিকটবর্তী ফেরেশতাদের; ‘এবং তাঁর পৃথিবীবাসীদের’—অর্থাৎ নবী ও রাসুলদের; ‘তিনি তাদের শাস্তি দিতেন’—এখানে একটি জটিলতা রয়েছে। এর সমাধান হচ্ছে, শর্তযুক্ত বক্তব্যের বাস্তবে সংঘটিত হওয়া আবশ্যক নয়। ‘অথচ তিনি তাদের প্রতি অন্যায়কারী নন’—এখানে ‘ওয়াও’ অবস্থাবাচক। কারণ তিনি নিজের মালিকানা ও রাজত্বের মধ্যে কাজ করেন। সুতরাং তাঁর শাস্তি হচ্ছে ন্যায় এবং তাঁর পুরস্কার হচ্ছে অনুগ্রহ।

এখানে যে যুক্তিটি দেওয়া হলো, তার ভিত্তি হচ্ছে মালিকানা। কিন্তু কোনো সচেতন, অনুভূতিসম্পন্ন সত্তার ওপর মালিকানার দাবি তার প্রতি যেকোনো আচরণকে ন্যায়সংগত করে দিতে পারে কীভাবে? একটি মানুষকে সৃষ্টি করার অর্থ কি তার কষ্ট, অধিকার এবং স্বাধীনতার কোনো নৈতিক গুরুত্ব থাকবে না? একজন পিতা-মাতা সন্তানের জন্মের কারণ। সেই কারণে তারা সন্তানকে নির্যাতন করার অধিকার পেয়ে যান না। একজন শাসক কোনো রাষ্ট্র গড়ে তুললেও সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। একইভাবে, স্রষ্টা হওয়ার দাবির সঙ্গে নিজের সৃষ্টিকে শাস্তি দেওয়ার নৈতিক অধিকারকে যুক্ত করতে হলে দেখাতে হবে, সেই শাস্তি প্রাপ্য কেন। ‘তিনি সৃষ্টি করেছেন’ দিয়ে সৃষ্টির উৎসের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়; ‘তাই তিনি যা করবেন, তা-ই ন্যায়’ সিদ্ধান্তটি প্রতিষ্ঠা করতে আরও যুক্তি প্রয়োজন। সৃষ্টির ওপর ক্ষমতা থাকাকে সৃষ্টির প্রতি সীমাহীন নৈতিক অনুমতি হিসেবে গণ্য করা হলে অধিকার বলে স্বাধীন কোনো বিষয় অবশিষ্ট থাকে না। তখন অধিকারও দাঁড়ায় ক্ষমতাবানের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল একটি সুবিধায়।

বিষয়টির আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, এভাবে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করলে অবিচার শনাক্ত করার পথই বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ কোনো কাজ করেছেন বলে কাজটি ন্যায়, আর আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ বলে তার সব কাজ ন্যায়—এভাবে একই দাবিকে ঘুরিয়ে নিজের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে কোনো স্বাধীন যাচাই নেই। একজন শাসক যদি ঘোষণা করেন, ‘আমার সিদ্ধান্তই ন্যায়, কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতা আমার’, তাহলে তার দাবিটি পরীক্ষা করতে আমরা অবশ্যই সিদ্ধান্তের ফল, সংশ্লিষ্ট মানুষের অধিকার এবং শাস্তির কারণ দেখব। আল্লাহর ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষা বাদ দিলে ‘আল্লাহ ইনসাফ করেন’ কথাটির অর্থ দাঁড়ায় শুধু ‘আল্লাহ নিজের ইচ্ছামতো কাজ করেন’। কিন্তু নিজের ইচ্ছামতো কাজ করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা একই বিষয় নয়। ন্যায়বিচারের দাবি অর্থপূর্ণ হতে হলে অন্তত এমন কিছু আচরণ চিহ্নিত করার সুযোগ থাকতে হবে, যেগুলো অন্যায় এবং যেগুলো ঘটলে দাবিটি ভুল প্রমাণিত হবে। সব সম্ভাব্য আচরণকেই আগাম ন্যায় বলে ঘোষণা করা হলে ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ পাওয়া যায় না; দাবিটিকে খণ্ডনের অযোগ্য করে রাখা হয়।

আমাদের তাই সরাসরি বিধান এবং তার ফল পরীক্ষা করতে হবে। একই অপরাধে দুই ব্যক্তির ধর্মের কারণে শাস্তি বদলে যাচ্ছে কি না, একজনের ওপর আরেকজনের কাজের দায় চাপানো হচ্ছে কি না, মানুষ যে পরিস্থিতি বেছে নেয়নি তার জন্য শাস্তি পাচ্ছে কি না, এবং শাস্তি অপরাধের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ক্ষমতার বিবরণ দিয়ে পাওয়া যায় না। ‘এই বিধান আল্লাহর’ বললেও বিধানটির ন্যায়সংগততা যাচাই করার প্রয়োজন শেষ হয় না। বরং সর্বোচ্চ ন্যায়বিচারের দাবি করা হলে সেই দাবির পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিই প্রত্যাশিত। মানুষের বিচারব্যবস্থায় আমরা যে বৈষম্যকে অবিচার বলি, একই বৈষম্য ধর্মীয় অনুমোদন পেয়েছে বলেই ন্যায় হয়ে যেতে পারে না। নৈতিক মূল্যায়নের সময় বিচারকের নাম বদলাতে পারে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট এবং তার অধিকার হারানোর বাস্তবতা বদলায় না।


বিচারকের নিজের জবাবদিহি কোথায়?

ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কেবল অভিযুক্তের জবাবদিহির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিচারক যে নিয়মে বিচার করছেন, সেই নিয়ম ন্যায়সংগত কি না, প্রমাণ যথেষ্ট কি না এবং তার সিদ্ধান্তে পক্ষপাত কাজ করছে কি না—এসবও পরীক্ষা করতে হয়। বিচারক নিজেই যদি অভিযোগকারী হন, বিচারযোগ্য কাজের নিয়ম নির্ধারণ করেন, শাস্তি ঠিক করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তির সুযোগও নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে তার ন্যায়পরায়ণতা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একজন মানুষকে তার কাজের কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করা হবে, অথচ তাকে যে বিচারক শাস্তি দিচ্ছেন সেই বিচারকের সিদ্ধান্তের যথার্থতা পরীক্ষা করা যাবে না—এমন ব্যবস্থায় জবাবদিহি একমুখী হয়ে যায়। ক্ষমতাহীন ব্যক্তির ওপর সব দায় বর্তায়, আর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী নিজের সিদ্ধান্তের নৈতিকতা ব্যাখ্যা করার দায় থেকে মুক্ত থাকেন।

সূরা আল-আম্বিয়ার ২৩ নম্বর আয়াতের সঙ্গে তাফসিরে তাবারির মূল ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণ অনুবাদ করে পড়ুন [3]—

তাফসিরে তাবারি: জামিউল বায়ান
সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৩
আয়াত ও মূল ব্যাখ্যার পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:

‘তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হবে না; অথচ তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।’
আল্লাহ বলছেন: আরশের রব তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে যা করেন, অর্থাৎ নিজের ইচ্ছামতো তাদের জীবন, মৃত্যু, সম্মান, অপমান এবং তাদের সম্পর্কে অন্যান্য সিদ্ধান্ত পরিচালনা করেন, তা নিয়ে কোনো প্রশ্নকারী তাঁকে প্রশ্ন করবে না। কারণ তারা তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর বান্দা; তারা সবাই তাঁর মালিকানা ও কর্তৃত্বের অধীন। বিধান তাঁরই বিধান এবং ফয়সালা তাঁরই ফয়সালা। তাঁর ওপরে এমন কেউ নেই যে তাঁর কাজ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করে বলবে: আপনি কেন এটি করলেন? কেন এটি করলেন না? ‘অথচ তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে’—অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীতে তাঁর যত বান্দা রয়েছে, তাদের সবাইকে নিজেদের কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে এবং তাদের কাজের হিসাব নেওয়া হবে। তিনিই তাদের সে সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন এবং তাদের হিসাব নেবেন। কারণ তিনি তাদের ঊর্ধ্বে ও তাদের মালিক, আর তারা তাঁর কর্তৃত্বের অধীন।

কাউকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করার মতো উচ্চতর ক্ষমতা নেই—এটি কর্তৃত্বের অবস্থান সম্পর্কে একটি বক্তব্য। কিন্তু তার সিদ্ধান্তের নৈতিক মূল্যায়ন করা যায় না—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। একজন স্বৈরশাসকের ওপর কার্যকর কোনো আদালত না-ও থাকতে পারে। তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কারও না-ও থাকতে পারে। তাতে তার নির্যাতন ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। অন্যায়কারীকে বিচারের মুখোমুখি করতে না পারা এবং তার কাজকে অন্যায় বলে শনাক্ত করতে না পারার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একইভাবে, আল্লাহকে কোনো উচ্চতর আদালতে হাজির করার ক্ষমতা মানুষের নেই—এটি মেনে নিলেও তার নামে প্রচারিত বিধানগুলোর ন্যায়সংগততা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন করার অধিকার বিলুপ্ত হয় না। নৈতিক বিচারের জন্য বিচারককে বন্দি করার ক্ষমতা প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন তার সিদ্ধান্ত মূল্যায়নের মানদণ্ড ও সংশ্লিষ্ট তথ্য।

ইসলামকিউএর নিচের ব্যাখ্যাটি পড়ুন [4]—

ইসলামকিউএ, উত্তর: ২৯০০০৯
উত্তরের চতুর্থ অংশের পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:

চতুর্থত: তোমাকে জানতে হবে যে আল্লাহই সেই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় রব, যিনি যা করেন সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় না। তাই রবকে বলা হয় না: আপনি অমুককে দিলেন, অথচ অমুককে দিলেন না কেন? রবকে এ কথাও বলা হয় না: আপনি একে সুন্দর এবং অন্যকে কুৎসিত করে সৃষ্টি করলেন কেন? রবকেও যদি জিজ্ঞাসা করা হতো, তাহলে রব ও বান্দার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না! তবে আল্লাহর প্রজ্ঞা নিয়ে চিন্তা করো। তিনি কাউকে সৌন্দর্য ও সম্পদ দিতে পারেন, ফলে সেই বান্দা সীমালঙ্ঘন করে এবং তার পরিণতি হয় জাহান্নাম। তিনি সৌন্দর্য ও সম্পদ দিতে পারেন, অথচ বান্দা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না; ফলে সেটি তার বিপদ ও দুর্ভাগ্যের কারণ হয়। তিনি সৌন্দর্য কেড়ে নিতে পারেন, কিন্তু হিদায়াত দেন এবং অন্তরে সন্তুষ্টি সৃষ্টি করেন; ফলে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সুখী মানুষদের একজন হয়! তিনি তাঁর বান্দার জন্য সৌন্দর্য, হিদায়াত ও সুখ একত্রও করতে পারেন। এটি তাঁর অনুগ্রহ; তিনি যাকে ইচ্ছা তা দেন। ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রিজিক প্রশস্ত করে দিলে তারা পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করত; কিন্তু তিনি নিজের ইচ্ছামতো পরিমাণে তা নাজিল করেন। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত ও সর্বদ্রষ্টা।’—সূরা আশ-শূরা: ২৭।

ক্ষমতার পার্থক্য থাকলেই অধিক ক্ষমতাবানের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন অযৌক্তিক হয়ে যায় না। সম্ভাব্য কোনো ভালো ফলের কথা বললেও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণিত হয় না। কারও সম্পদ তাকে বিপথে নিতে পারে, আবার তার চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারে। কারও বঞ্চনার সঙ্গে মানসিক সন্তুষ্টি থাকতে পারে, আবার সেই বঞ্চনা তার জীবন ধ্বংসও করতে পারে। একটি সিদ্ধান্তের পক্ষে ভালো পরিণতি কল্পনা করতে পারা এবং বাস্তবে সিদ্ধান্তটি ন্যায়সংগত প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। বিশেষত সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যদি পুরস্কার ও শাস্তি যুক্ত থাকে, তাহলে কে কী সুযোগ পেয়েছিল, সেই সুযোগের পার্থক্য তার কাজকে কতটা প্রভাবিত করেছে এবং তার দায় কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, এসবের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। প্রশ্নের অধিকার সরিয়ে দিয়ে সেই ব্যাখ্যার অভাব পূরণ করা যায় না।

‘আল্লাহ কখনো অন্যায় করেন না’ কথাটিকেও এই প্রবন্ধে একটি যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে। যে বিধানের ন্যায়সংগততা পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেই বিধানের উৎস নিজের ন্যায়পরায়ণতার ঘোষণা দিলেই পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়ে যায় না। কোনো শাসক নিজের ঘোষণায় ন্যায়পরায়ণ হয়ে যান না; তার আচরণ দিয়ে দাবিটি বিচার করতে হয়। একইভাবে, কোনো ধর্মের সর্বোচ্চ বিচারককে ন্যায়পরায়ণ বলা হলে দেখতে হবে তার নামে প্রচারিত বিচারনীতিতে নিরপরাধকে দায়ী করা হচ্ছে কি না, সমান নৈতিক মর্যাদার মানুষের অধিকার পরিচয়ের কারণে বদলে যাচ্ছে কি না, কিংবা শাস্তির সঙ্গে দায়ের সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে কি না। প্রশ্ন করা এখানে অবাধ্যতার প্রমাণ নয়; ন্যায়বিচারের দাবি পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয় শর্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী যত ক্ষমতাবানই হোন, তার সিদ্ধান্তকে যুক্তির সামনে হাজির করতে না পারলে তার ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

এই মানদণ্ড নিয়েই পরবর্তী আলোচনায় ইসলামের বিধান, তাকদীর, মানুষের জন্মপরিস্থিতি এবং ইহকাল ও পরকালের বিচার পরীক্ষা করা হবে। কোথাও বিচারকের ক্ষমতাকে ন্যায়ের প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে না, কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একই ধরনের বৈষম্যের মূল্যায়ন বদলানো হবে না, এবং কোথাও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকেই অপরাধী বানানোকে যুক্তি হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। ইনসাফের দাবি থাকলে সেই দাবিকে যাচাইয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। মানুষের ক্ষেত্রে যে আচরণকে অবিচার বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, ধর্মীয় অনুমোদনের কারণে সেই কারণ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না।


জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা

পারিবারিকসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম

আমরা প্রায় সব মানুষই কোনো একটি পরিবার ও সমাজে জন্ম নিই। স্বাভাবিকভাবেই, সেই পরিবারের ভাষা, আচার-আচরণ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচিত হয়েই বড় হয়ে উঠি। বাবা-মা যদি আমাদের শেখান যে, আল্লাহই একমাত্র ঈশ্বর এবং কোরআনই একমাত্র সত্য ধর্মগ্রন্থ, তাহলে শৈশবে সেই কথাগুলোই আমাদের কাছে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাবা-মা হিন্দু হলে তাঁদের কাছ থেকে দেবদেবী, পূজা ও ধর্মীয় কাহিনির শিক্ষা পাই। খ্রিস্টান পরিবারে বড় হলে যিশু ও বাইবেলের কথা শুনি। একটি শিশু এসব বিশ্বাস গ্রহণ করার আগে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের দাবি পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা করে না। সে তখন নিজের খাবার, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসার জন্য যাদের ওপর নির্ভর করে, তাদের কথাকেই বিশ্বাস করতে শেখে। ঈশ্বর কেমন, তাঁর কোনো দৃশ্যমান রূপ আছে কি না, তিনি একজন নাকি একাধিকজন, কোন কাজ পুণ্য আর কোন কাজ পাপ—এসব বিষয়ে তার প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয় পরিবারের শেখানো কথার ভিত্তিতে।

এরপর এলাকার বন্ধুরা, আত্মীয়স্বজন, নানা-নানি, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি এবং মামা-মামি সেই শিক্ষার সঙ্গে আরও গল্প ও অভিজ্ঞতা যুক্ত করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ধর্মীয় ব্যক্তিদের জীবনকাহিনি শোনান। কেউ ভালো ফল করলে বলা হয়, ঈশ্বর তাকে সাহায্য করেছেন; বিপদ থেকে বাঁচলে বলা হয়, প্রার্থনার ফল পাওয়া গেছে; বিপদ ঘটলে বলা হয়, এটি পরীক্ষা কিংবা পাপের পরিণতি। এভাবে শিশুটি শুধু একটি ধর্মের নাম শেখে না, জীবনের ঘটনাগুলো সেই ধর্মের ভাষায় ব্যাখ্যা করতেও শেখে। বাংলাদেশের কোনো মুসলিম পরিবার ও মুসলিমপ্রধান পরিবেশে বড় হলে সে সাধারণত ইসলামের পক্ষে ব্যাখ্যাই বেশি শোনে। ভারতের কোনো হিন্দু পরিবার ও হিন্দুপ্রধান পরিবেশে বড় হলে হিন্দু ধর্মের কাহিনি ও আচারই তার কাছে বেশি পরিচিত হয়। অন্য ধর্মীয় পরিবেশেও একই প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে। নিজের ধর্মের পক্ষে অনুকূল গল্প আর অন্য ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ বর্ণনা শুনতে শুনতে শিশুর মনে একটি অসম পরিচিতি তৈরি হয়: নিজের ধর্মকে সে ভেতর থেকে চেনে, অন্য ধর্মকে চেনে নিজের ধর্মের অনুসারীদের দেওয়া বিবরণ থেকে।

এই শিক্ষা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, নাটক, চলচ্চিত্র এবং এখন মুঠোফোনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও পরিচিত ধর্মীয় ধারণা বারবার সামনে আসে। কোথাও রমজান, ঈদ ও ইসলামি কাহিনি বেশি প্রচারিত হয়; কোথাও রামায়ণ, মহাভারত ও পূজার অনুষ্ঠান বেশি দেখা যায়; কোথাও বড়দিন বা অন্য ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে সামাজিক জীবন সাজানো থাকে। একটি শিশু চারপাশে একই ধারণার পুনরাবৃত্তি দেখতে দেখতে সেটিকে স্বাভাবিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। সে মনে করে, সবাই তো এই কথাই বলছে, তাহলে এটি নিশ্চয়ই সত্য। কিন্তু আশপাশের সবাই একই শিক্ষা পেয়েছে বলে একই কথা বললে, সেটি বহু মানুষের স্বাধীন অনুসন্ধানের ফল হয় না। একই বিশ্বাস বিভিন্ন মানুষের মুখ দিয়ে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। একটি দাবি সত্য কি না, তা নির্ধারণ করতে তার প্রমাণ দেখতে হয়; কত পরিচিত মানুষ দাবিটি উচ্চারণ করছে, সেটি যথেষ্ট নয়।

আশপাশের মানুষ যদি ছোটবেলা থেকে আমাদের দেবদেবীর ছবি, মূর্তি এবং পূজার সঙ্গে পরিচিত করেন, তাহলে সেই উপাসনার ধরন আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। এমন পরিবেশে বড় হওয়া একটি শিশু শুনে অবাক হতে পারে যে, অন্য ধর্মের ঈশ্বরকে দেখা যায় না, অথচ তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হয়। আবার মুসলিম পরিবারে বড় হওয়া একটি শিশু দেবদেবীর একাধিক হাত, মাথা কিংবা বিভিন্ন আকৃতির ছবি দেখে হাসতে পারে। সে ভাবতে পারে, এ আবার কেমন ঈশ্বর! কিন্তু তার বিস্ময় বা হাসির পেছনে কাজ করছে আগে থেকে শেখা একটি ধারণা: ঈশ্বরকে তার নিজের পরিবার যেভাবে বর্ণনা করেছে, সেই রকমই হতে হবে। সে অন্য পরিবারে বড় হলে একই ছবি ও আচার তার কাছে পরিচিত এবং সম্মানযোগ্য মনে হতে পারত। একটি ধর্মীয় রূপকে অস্বাভাবিক মনে হওয়া এবং সেই ধর্মের দাবি যুক্তিতে ভুল প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। পরিচিতির কারণে কোনো ধারণা সহজে গ্রহণ করতে পারা তার সত্যতার প্রমাণ নয়।

ভাষা ও সংস্কৃতির উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। আমি একটি বাঙালি পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে বাংলা ভাষা আমার কাছে স্বাভাবিক এবং সহজ। কিন্তু জার্মান ভাষা শিখতে গিয়ে তার শব্দ, উচ্চারণ ও বাক্যের গঠন প্রথমে অদ্ভুত মনে হতে পারে। একজন জার্মানও বাংলা শিখতে গিয়ে একই ধরনের অসুবিধায় পড়তে পারেন। আবার আমাদের সংস্কৃতিতে ঈদের দিন পাঞ্জাবি পরে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া পরিচিত ব্যাপার। অন্য কোনো সংস্কৃতিতে উৎসবের দিনে মানুষ রাস্তায় নেমে নাচগান করে, বিশেষ পোশাক পরে কিংবা অন্যভাবে আনন্দ প্রকাশ করে। তাদের আচরণ আমাদের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে, আমাদের আচরণও তাদের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। এই পরিচিতি ও অপরিচিতির পার্থক্য তৈরি হয় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে। ধর্মের ক্ষেত্রেও মানুষ প্রায়ই ছোটবেলা থেকে শেখা ধারণাকে এত স্বাভাবিক মনে করে যে, সেটি শেখা একটি বিশ্বাস—এই কথাটিই ভুলে যায়।

পিতা-মাতার মাধ্যমে শিশুর ধর্মীয় পরিচয় গড়ে ওঠার কথা হাদিসেও সরাসরি রয়েছে। সহিহ মুসলিমের সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি পড়ুন [5]—

সহিহ মুসলিম
তাকদীর অধ্যায়
সংশ্লিষ্ট পূর্ণ বর্ণনার বাংলা অনুবাদ:

হাজিব ইবনুল ওয়ালিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনু হারব তাঁকে বর্ণনা করেছেন, যুবাইদি থেকে, তিনি যুহরি থেকে। যুহরি বলেছেন: সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব আমাকে আবু হুরাইরা থেকে জানিয়েছেন যে, তিনি বলতেন: মুহাম্মদ বলেছেন, প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়। যেমন একটি পশু পূর্ণাঙ্গ অঙ্গপ্রত্যঙ্গবিশিষ্ট বাচ্চা জন্ম দেয়; তোমরা কি তার মধ্যে কোনো অঙ্গচ্ছেদ দেখতে পাও? এরপর আবু হুরাইরা বলতেন: তোমরা চাইলে পড়তে পারো, ‘আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই’—এই আয়াত।

এখানে শিশুর পরবর্তী ধর্মীয় পরিচয় তৈরিতে পিতা-মাতার ভূমিকা স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিশু কোন পরিবারে জন্মাবে তা নিজে বেছে নেয়নি, সেই পরিবারের শেখানো বিশ্বাস বহন করার জন্য তার দায় কতখানি? একজন মুসলিম পরিবারের শিশুকে জন্ম থেকেই ইসলামের কথা শেখানো হবে, আর একজন অমুসলিম পরিবারের শিশুকে নিজের পরিবারের ধর্মের কথা শেখানো হবে। পরে শুধু তাদের বিশ্বাসের নাম দেখে একজনকে সঠিক পথের অনুসারী আর অন্যজনকে অপরাধী হিসেবে বিচার করলে সেই বিশ্বাস তৈরির ইতিহাসটি বাদ পড়ে যায়। নিজের পরিবারকে বিশ্বাস করার আচরণ দুজনের ক্ষেত্রেই একই; কিন্তু তারা যে শিক্ষা পেয়েছে, তা আলাদা। একটি ন্যায়সংগত বিচারকে এই পার্থক্যের হিসাব দিতে হবে।

গাজালির সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের শুরুর দুই অনুচ্ছেদের পূর্ণ অনুবাদ পড়ুন [6]—

ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন
বিশ্বাসের মূলনীতি বিষয়ক গ্রন্থ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের শুরুর দুই অনুচ্ছেদের পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:

জেনে রাখো, আকিদার বিবরণে আমরা যা উল্লেখ করেছি, তা শিশুর বেড়ে ওঠার শুরুতেই তার সামনে উপস্থাপন করা উচিত, যাতে সে তা মুখস্থ করে। এরপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থ তার কাছে একটু একটু করে উন্মোচিত হতে থাকবে। শুরুতে মুখস্থ করা, তারপর বোঝা, তারপর বিশ্বাস, নিশ্চয়তা ও সত্য বলে গ্রহণ করা। শিশুর মধ্যে এগুলো প্রমাণ ছাড়াই ঘটে। মানুষের অন্তরের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ হচ্ছে, বেড়ে ওঠার শুরুতেই তিনি যুক্তি ও প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই তার অন্তরকে ঈমানের জন্য উন্মুক্ত করেন। এটি অস্বীকার করা যায় কীভাবে, যখন সাধারণ মানুষের সমস্ত বিশ্বাসের সূচনা হয় নিছক শেখানো এবং সম্পূর্ণ অনুকরণের মাধ্যমে? তবে শুধু অনুকরণ থেকে অর্জিত বিশ্বাস শুরুতে কিছু দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকে না; অর্থাৎ তার বিপরীত ধারণা সামনে আনা হলে সেটি অপসারিত হতে পারে। তাই শিশু ও সাধারণ মানুষের মনে সেই বিশ্বাসকে শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যাতে তা গভীরভাবে স্থায়ী হয় এবং নড়ে না যায়।

এখানে আগে শেখানো বিশ্বাসটিকে পরে স্থায়ী করে তোলার কথা বলা হচ্ছে। একই পদ্ধতিতে অন্য ধর্মের পরিবারও নিজের ধর্মের বিশ্বাস শিশুর মনে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকে কোনো বিশ্বাস গভীরভাবে ধারণ করা, সেটির পক্ষে আবেগ অনুভব করা কিংবা সেটি ত্যাগ করতে কষ্ট হওয়া—কোনোটিই সেই বিশ্বাসের সত্যতার স্বতন্ত্র প্রমাণ নয়। বরং এগুলো দেখায়, শিশুর অজান্তে গড়ে ওঠা একটি ধারণা পরে তার পরিচয়, সম্পর্ক ও আত্মবোধের সঙ্গে কত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।

এর মধ্যেও কিছু মানুষ বড় হয়ে নিজের ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করে, অন্য ধর্ম গ্রহণ করে কিংবা নাস্তিক হয়ে যায়। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কী শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, তথ্য এবং চিন্তার সুযোগ কাজ করেছে, সেটিও দেখতে হবে। কেউ নিজের পরিবারের বিশ্বাস বদলাতে পেরেছে বলেই প্রত্যেক মানুষের সামনে সেই পরিবর্তনের সমান সুযোগ ছিল, এমন সিদ্ধান্ত আসে না। একজন প্রশ্ন করতে গিয়ে উৎসাহ পেতে পারে, আরেকজন অপমান, ভয় কিংবা সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কার মুখোমুখি হতে পারে। যে পরিবারে জন্ম, যে শিক্ষা পাওয়া এবং যে পরিবেশে বেড়ে ওঠা—এসব ব্যক্তির নিজের নির্বাচিত কাজ নয়। সেই অনির্বাচিত পরিচয়কে তার নৈতিক মর্যাদা নির্ধারণের ভিত্তি বানানোর প্রশ্নটি তাই গুরুতর। শিশুদের পরিণতি সম্পর্কে আপনারা এবার নিচের হাদিসটি পড়ুন [7]—

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১১-(৩৩) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মু’মিনদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের (জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত ব্যাপারে) কী হুকুম? তিনি উত্তরে বললেন, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আমি বললাম, কোন (নেক) ‘আমল ছাড়াই? তিনি বললেন, আল্লাহ অনেক ভালো জানেন, তারা জীবিত থাকলে কী ‘আমল করতো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা মুশরিকদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের কী হুকুম? তিনি বললেন, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। (অবাক দৃষ্টিতে) আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন (বদ) ‘আমল ছাড়াই? উত্তরে তিনি বললেন, সে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকলে কী ‘আমল করত, আল্লাহ খুব ভালো জানেন। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৮৯। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন : হাদীসটি দু’টি সানাদে বর্ণিত যার একটি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

হাদিসটির প্রশ্নই হচ্ছে, কোনো কাজ না করা শিশুদের অবস্থান কী হবে। উত্তরে তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে এবং তারা বেঁচে থাকলে কী কাজ করত, সেই জ্ঞানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু জন্মপরিবার শিশুর নিজস্ব নৈতিক অর্জন নয়, আর বেঁচে থাকলে সে কী করত—সেটিও তার ইতিমধ্যে সম্পাদিত কাজ নয়। ভবিষ্যতের কোনো কাজ সম্পর্কে জানার দাবি এবং সেই কাজ বাস্তবে সংঘটিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি শিশুর পরিণতি নিয়ে বিচার করতে হলে তার নিজের অপরাধ কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। পিতা-মাতার পরিচয় কিংবা সম্পাদিত হয়নি এমন কাজের বিবরণ দিয়ে সেই প্রশ্নের সমাধান হয় না। জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মকে বিচারযোগ্য দায়ে পরিণত করার সমস্যা এই জায়গাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


বিশ্বাস কি ইচ্ছামতো তৈরি করা যায়?

আমরা ইচ্ছা করলে একটি কথা মুখে বলতে পারি। ইচ্ছা করলে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারি, কোনো পোশাক পরতে পারি কিংবা অন্যের সামনে নির্দিষ্ট আচরণ করতে পারি। কিন্তু কোনো কথাকে মনে সত্য বলে বিশ্বাস করা একই ধরনের কাজ নয়। ধরুন, আপনাকে বলা হলো, আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিশ্বাস করতে হবে যে দুই আর দুই যোগ করলে পাঁচ হয়। কথাটি উচ্চারণ করা আপনার পক্ষে সম্ভব। চাপের মুখে কাগজে লিখেও দিতে পারেন। কিন্তু শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে আপনার কাছে হিসাবটি সত্য হয়ে যাবে না। আবার কাউকে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলা হলো, তার সামনে থাকা খালি বাক্সে সোনা আছে বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে। সে পুরস্কারের জন্য বিশ্বাসের ঘোষণা দিতে পারে, কিন্তু বাক্সটিকে খালি বলে বোঝার পর শুধু পুরস্কারের লোভে নিজের বোঝাপড়াটি বদলে ফেলতে পারবে না। সত্য বলে গ্রহণ করার জন্য তার কাছে কোনো কারণ, তথ্য কিংবা অভিজ্ঞতা বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। একজন মানুষের কাছে যদি কোনো ধর্মের দাবি সত্য বলে মনে না হয়, তাহলে তাকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে সেই দাবিকে সত্য করে দেওয়া যায় না। ভয় তাকে চুপ করাতে পারে, ধর্মীয় আচার পালন করাতে পারে, এমনকি প্রকাশ্যে বিশ্বাসী পরিচয় গ্রহণ করাতেও পারে। কিন্তু তার মনে জন্মানো সংশয় দূর করতে হলে সংশয়ের কারণটির উত্তর দিতে হবে। একটি ওষুধ কাজ করে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে রোগীকে ভয় দেখিয়ে ওষুধটির কার্যকারিতা প্রমাণ করা হয় না। একইভাবে, কোনো ধর্ম সত্য কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর ‘বিশ্বাস না করলে শাস্তি পাবে’ হতে পারে না। শাস্তির হুমকি সেই ধর্মীয় দাবিরই একটি অংশ; দাবিটির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে তার হুমকিকে সত্যের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

আমরা কোন বই পড়ব, কার বক্তব্য শুনব, কোনো তথ্য আবার যাচাই করব কি না এবং নিজের ধারণার বিপরীত যুক্তি বিবেচনা করব কি না—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। সেই সিদ্ধান্তগুলো পরে আমাদের বিশ্বাস বদলাতেও সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত এবং অনুসন্ধানের ফল এক জিনিস নয়। একজন মানুষ আন্তরিকভাবে কোনো ধর্ম পরীক্ষা করার পরও সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হতে পারেন। তাঁর কাছে উপস্থাপিত যুক্তি দুর্বল মনে হতে পারে, তথ্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে অথবা কোনো দাবির যথেষ্ট প্রমাণ না-ও পাওয়া যেতে পারে। এখানে শুধু বিশ্বাস না হওয়ার ঘটনাটি দেখে তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বলা ভুল। দেখতে হবে, তিনি কী জেনেছেন, কেন সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি এবং তাঁর আপত্তির উত্তর আদৌ দেওয়া হয়েছে কি না। বিশ্বাসের অনুপস্থিতিকে অসততার সঙ্গে এক করে দিলে প্রকৃত অনুসন্ধানকারীর সংশয়ও অপরাধে পরিণত হয়।

নিজের পরিচিত ধর্মের বাইরে দাঁড়িয়ে বিষয়টি ভাবলে এই পার্থক্য আরও পরিষ্কার হয়। একজন মুসলিমকে কোনো হিন্দু বা খ্রিস্টান যদি বলেন, ‘আমাদের ধর্ম সত্য, এখনই তা বিশ্বাস করুন’, তাহলে শুধু এই নির্দেশে তাঁর বিশ্বাস বদলে যাবে না। তিনি যুক্তি চাইবেন, প্রমাণ চাইবেন, নিজের আপত্তির উত্তর চাইবেন। ঠিক একইভাবে, একজন হিন্দু বা খ্রিস্টানের কাছে ইসলামের দাবি উপস্থাপন করলেই তাঁর মনে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বাস জন্মাতে হবে, এমন দাবি অযৌক্তিক। তাঁরও আগে থেকে শেখা ধারণা আছে, পরিচিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা আছে এবং কোন তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন, তার একটি ইতিহাস আছে। মুসলিম ব্যক্তি নিজের বিশ্বাস বদলাতে যে যুক্তি ও সময় প্রত্যাশা করেন, অন্য ব্যক্তির বিশ্বাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সেই প্রয়োজনের নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। নিজে যে দাবিকে কেবল আদেশে বিশ্বাস করতে পারেন না, অন্যের কাছে সেই ধরনের বিশ্বাস দাবি করে তাকে দোষী করা যায় না।

জাহান্নামের ভয় এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে। যে ব্যক্তি ভয়ে বিশ্বাসীর আচরণ করছে অথচ মনে নিশ্চিত নয়, তার ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে আনুগত্যের প্রকাশ। আর যে ব্যক্তি নিজের সংশয় গোপন না করে সত্য কথা বলছে, সে প্রকাশ্য অবিশ্বাসী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। তখন সত্য বলার কারণে দ্বিতীয় ব্যক্তি বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। একটি বিচারব্যবস্থা যদি আন্তরিক বিশ্বাস দাবি করে, তাহলে তাকে বিশ্বাসের এই স্বভাবের হিসাব দিতে হবে। যে সংশয় যুক্তি ও তথ্যের কারণে তৈরি হয়েছে, তাকে শুধু অবাধ্যতা বলে শাস্তি দেওয়া যায় না। মানুষকে নিজের বোঝাপড়ার বিপরীত ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হলে সেটি বিশ্বাসের স্বাধীনতা ধ্বংস করে এবং অসততার জন্য প্রণোদনা তৈরি করে। ভয় দিয়ে মুখের স্বীকারোক্তি আদায় করা যায়; কোনো দাবি সত্য কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আদায় করা যায় না।


ধর্ম যাচাইয়ের অসম সুযোগ

মাঝে মাঝে আমাদের মনে ধর্ম বিষয়ে নানা প্রশ্ন জাগে। আমরা নিজের ধর্মের কোনো ধর্মগুরু, বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা পরিবারের গুরুজনদের কাছে সেই প্রশ্ন নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে প্রশ্নটি প্রায়ই এমন একজনের সামনে রাখা হচ্ছে, যিনি আগে থেকেই সেই ধর্মকে সত্য বলে গ্রহণ করেছেন এবং আমাদেরও একই বিশ্বাসে ধরে রাখতে চান। সেখানে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার বদলে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া, অযৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা প্রশ্ন করাটিকেই খারাপ বলে দাগিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। শিশুর পক্ষে তখন বোঝা কঠিন হয়, উত্তরটি আসলেই প্রশ্নের সমাধান করেছে, নাকি শুধু প্রশ্ন করা বন্ধ করেছে। যে ব্যক্তির কাছ থেকে সে ধর্ম শিখেছে, তাঁর কর্তৃত্বের কারণে একটি দুর্বল উত্তরও গ্রহণ করতে পারে। নিজের সংশয় প্রকাশ করলে গুরুজন কষ্ট পাবেন, রাগ করবেন কিংবা তাকে খারাপ মানুষ ভাববেন—এই ভয়ও প্রশ্ন থামিয়ে দিতে পারে।

যেমন ধরুন, একটি হিন্দু পরিবারের শিশু নিয়মিত মন্দিরে যায় এবং দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে শেখে। পরে কোনো মন্দির বা মূর্তি আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে: যাঁর কাছে নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করা হয়, তিনি নিজের উপাসনালয় রক্ষা করলেন না কেন? আবার মুসলিম পরিবারের কোনো শিশু মসজিদ আক্রান্ত হওয়ার, কোরআন পোড়ানোর কিংবা কাবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা শুনে প্রশ্ন করতে পারে: আল্লাহ চাইলে এগুলো ঠেকাতে পারতেন না? খ্রিস্টান শিশুরও গির্জা বা নিজের ধর্মের অনুসারীদের বিপদ নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে। এরপর ধর্মগুরু যদি প্রতিটি ঘটনাকে পরীক্ষা, অজ্ঞাত উদ্দেশ্য কিংবা মানুষের অপরাধ বলে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে সেই ব্যাখ্যাটিকেও যাচাই করতে হবে। কোনো প্রশ্নের পর একটি ধর্মীয় বাক্য উচ্চারণ করা এবং প্রশ্নটির যুক্তিসংগত উত্তর দেওয়া এক বিষয় নয়। যা-ই ঘটুক, সেটিকেই বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হলে বিশ্বাসটি ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাব্য লক্ষণ আর অবশিষ্ট থাকে না।

ধর্ম যাচাই করার সুযোগ বলতে তাই শুধু নিজের ধর্মের প্রশংসা শোনার সুযোগ বোঝায় না। প্রয়োজন নিজের ধর্মের মূল বক্তব্য পড়া, তার সমালোচনা জানা, অন্য ধর্মের দাবি তাদের নিজস্ব উৎস থেকে বোঝা এবং বিভিন্ন ব্যাখ্যা তুলনা করার স্বাধীনতা। একজন মানুষ যদি শুধু ইসলামের পক্ষে লেখা বই পড়েন এবং ইসলামের অনুসারীদের কাছ থেকেই অন্য ধর্মের পরিচয় জানেন, তাহলে তাঁর সামনে তুলনার উপকরণ অসম থাকে। একই সমস্যা তৈরি হয় যখন কোনো হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মের অনুসারী শুধু নিজের ধর্মের অনুকূল ব্যাখ্যা পান। নিজের পক্ষের সবচেয়ে সুন্দর বক্তব্যের সঙ্গে অন্য পক্ষের সবচেয়ে দুর্বল বা বিকৃত বর্ণনা তুলনা করে নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া নির্ভরযোগ্য যাচাই নয়। যে দাবির সমালোচনা শোনাই নিষিদ্ধ, সেই দাবি অনুসন্ধানের সুবিধা পাচ্ছে; যে দাবির পক্ষে বক্তব্যই শোনা যাচ্ছে না, সেটি শুরু থেকেই অসুবিধায় পড়ছে।

ইসলামকিউএতে প্রকাশিত ইবনু বাযের ফতোয়ার শেষ দুই অনুচ্ছেদের পূর্ণ অনুবাদ পড়ুন [8]—

ইঞ্জিল ও তাওরাত পড়ার বিধান
ইসলামকিউএ, উত্তর: ১২৮৮৫০
উদ্ধৃত ফতোয়ার শেষ দুই অনুচ্ছেদের পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:

জ্ঞানসম্পন্ন ও বিচক্ষণ আলেমের জন্য ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ইসলামের বিরোধীদের জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব গ্রন্থ দেখা অনুমোদিত হতে পারে। যেমন, ইহুদিরা পাথর নিক্ষেপের বিধান অস্বীকার করলে নবী তাওরাত আনতে বলেছিলেন, যাতে তিনি সেটি দেখেন; এরপর তারা স্বীকার করেছিল। উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুহাম্মদের শরিয়ত সম্পর্কে জ্ঞানী আলেমদের কোনো ইসলামি উদ্দেশ্যে তাওরাত, ইঞ্জিল কিংবা যাবুর দেখার প্রয়োজন হতে পারে; যেমন আল্লাহর শত্রুদের জবাব দেওয়া এবং কোরআনের শ্রেষ্ঠত্ব ও তাতে থাকা সত্য ও হিদায়াত তুলে ধরা। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও তাদের মতো লোকদের জন্য এর কোনো অনুমতি নেই। বরং তাদের কাছে তাওরাত, ইঞ্জিল কিংবা যাবুরের কোনো কিছু পাওয়া গেলে তা পরিচ্ছন্ন স্থানে পুঁতে ফেলা অথবা পুড়িয়ে দেওয়া আবশ্যক, যাতে এর মাধ্যমে কেউ পথভ্রষ্ট না হয়।

এখানে অনুমোদিত পাঠের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মের পক্ষে জবাব তৈরি করা। সাধারণ পাঠকের জন্য পড়ার দরজাটিও বন্ধ। ফলে একজন মানুষ নিজের ধর্ম সম্পর্কে অনুকূল শিক্ষা পাবেন, কিন্তু অন্য ধর্মের বক্তব্য নিজের হাতে পরীক্ষা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। তারপর তাঁর জন্মসূত্রে পাওয়া বিশ্বাসে স্থির থাকাকে স্বাধীন যাচাইয়ের ফল বলা হলে সেটি ভুল। তথ্যের একটি অংশ সরিয়ে রেখে যে সিদ্ধান্ত তৈরি করা হয়, তাকে পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। যাচাই করতে হলে কোনো বিশ্বাস ভুলও প্রমাণিত হতে পারে—এই সম্ভাবনা খোলা রাখতে হয়। ফল আগেই স্থির করে কেবল তার পক্ষে উপকরণ সংগ্রহ করলে অনুসন্ধানের বদলে বিশ্বাস রক্ষার কাজ হয়।

তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি ব্যবহারের বাস্তব সামর্থ্য সবার সমান থাকে না। একজন পাঠক মূল ভাষা জানেন, বিভিন্ন অনুবাদ পড়তে পারেন, বই কেনার সামর্থ্য আছে এবং প্রশ্ন করার জন্য সময় পান। আরেকজন সীমিত শিক্ষার কারণে অন্যের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করেন, জীবিকার চাপে পড়াশোনার সময় পান না কিংবা নিজের পরিবারে প্রশ্ন করার নিরাপত্তা পান না। আবার একই ধর্মের ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এলে কোনটি গ্রহণ করবেন, সেটি বোঝার জন্যও তাঁর প্রয়োজনীয় জ্ঞান না-ও থাকতে পারে। ‘সব তথ্য তো পাওয়া যায়’ বললেই এই পার্থক্য মুছে যায় না। তথ্য কোথাও থাকা, সেটি খুঁজে পাওয়া, ভাষা বোঝা, বক্তব্য মূল্যায়ন করা এবং সিদ্ধান্তটি নিরাপদে প্রকাশ করতে পারা—এগুলো পৃথক বিষয়। ন্যায়বিচারের দাবি করতে হলে মানুষের বাস্তব সুযোগ দেখতে হবে; কেবল কল্পিত সুযোগের তালিকা যথেষ্ট নয়।

কোনো মানুষ নিজের ধর্ম ছাড়তে পেরেছেন—এই উদাহরণ দিয়েও সবার সুযোগ সমান প্রমাণ করা যায় না। একজন পরিবারের সমর্থন নিয়ে নিজের বিশ্বাস বদলাতে পারেন, আরেকজনের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্তের অর্থ হতে পারে সম্পর্ক হারানো, আর্থিক নিরাপত্তা হারানো কিংবা সামাজিক আক্রমণের মুখোমুখি হওয়া। এই দুটি পরিস্থিতিতে বিশ্বাস প্রকাশের স্বাধীনতা এক নয়। তবু যদি বিচার করা হয় শুধু কে কোন ধর্মের পরিচয় বহন করছে, তাহলে সেই পরিচয়ের পেছনে থাকা শিক্ষা, চাপ, ভয় ও তথ্যের সীমাবদ্ধতা হিসাবের বাইরে থেকে যায়। জন্মের সময় পাওয়া অসম সুযোগ তখন বিশ্বাসের বিচারেও ফিরে আসে। ইসলামের ক্ষেত্রে অন্য ধর্ম পড়া, সংশয় প্রকাশ করা এবং পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের বাইরে অনুসন্ধানের সুযোগ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে ‘ইসলামের সাথে দর্শনশাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যার সংঘাত: ইসলাম কি যাচাই করার সুযোগ দেয়?’ প্রবন্ধে।

সুতরাং বিশ্বাসের বিচার করতে হলে শুধু শেষ অবস্থানটির নাম জানা যথেষ্ট নয়। মানুষটি কোন পরিবেশে বড় হয়েছেন, কী তথ্য পেয়েছেন, কোন প্রশ্নের কী উত্তর পেয়েছেন, তাঁর কাছে কোন দাবি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে এবং ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তব স্বাধীনতা কতখানি ছিল—এসবও দেখতে হবে। যে ধর্ম শিশুর কাছে জন্মের সঙ্গে পাওয়া একটি শিক্ষা, সেই ধর্মকেই পরে তার সম্পূর্ণ স্বাধীন নির্বাচনের ফল ধরে নেওয়া যায় না। আবার একই ধরনের পারিবারিক শিক্ষায় বড় হওয়া দুই ব্যক্তির মধ্যে একজনকে জন্মপরিচয়ের কারণে সুবিধা দেওয়া এবং অন্যজনকে সেই পরিচয়ের কারণে শাস্তিযোগ্য করা ব্যক্তির নিজের কাজের ভিত্তিতে বিচার নয়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষের বিশ্বাস গড়ে ওঠার ইতিহাস এবং তার বাস্তব স্বাধীনতাকে হিসাবের মধ্যে আনতেই হবে।


নবী নির্বাচন, পারিবারিক মর্যাদা ও বিশেষ ছাড়

মানুষের ধর্মীয় পরিচয় যেমন জন্মপরিস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তেমনি ধর্মের ভেতরে কারা বিশেষ মর্যাদা পাবেন, কারা নেতৃত্ব দেবেন এবং কারা আগাম মুক্তির নিশ্চয়তা পাবেন—সেসব প্রশ্নও ইনসাফের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের জন্য যে পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেই পরীক্ষায় নবী ও তার ঘনিষ্ঠদের অবস্থান কেমন? কেউ যদি আগে থেকেই মনোনীত হন, শৈশবেই বিশেষ সহায়তা পান, কিংবা ভবিষ্যতের কাজের আগেই সর্বোচ্চ মর্যাদা ও ক্ষমার ঘোষণা পেয়ে যান, তাহলে তাদের সঙ্গে অন্য মানুষের নৈতিক মূল্যায়নের সম্পর্কটি যাচাই করতে হয়। কারণ যে ব্যবস্থা মানুষের নিজের কাজের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তি দেওয়ার দাবি করে, সেই ব্যবস্থায় ব্যক্তির কাজ, প্রাপ্ত সুযোগ এবং বিশেষ সুবিধার হিসাব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

এই আলোচনায় ইসলামের গ্রন্থগুলোকে ইসলামের নিজস্ব দাবি ও বিচারনীতি যাচাই করার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো বর্ণনাকে ইসলামের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে ‘সহিহ’ বললেই সেখানে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনা বাস্তবে ঘটেছে বলে নিরপেক্ষভাবে প্রমাণিত হয় না। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব বর্ণনা ও ব্যাখ্যাকে এই ধর্মে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেগুলোর মধ্যে মানুষের সুযোগ, দায়িত্ব, মর্যাদা এবং পরিণতির যে সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে, তা ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে কতটা সংগত?


নবী হওয়ার যোগ্যতা কী?

আমরা পৃথিবীতে বড় বড় পদে অনেক মানুষকে দেখি। এই যেমন ধরুন, জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এমন দায়িত্বের জন্য শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের কাজের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। আবার ধরুন, কোনো দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়া, গুগলের প্রধান নির্বাহী হওয়া, কিংবা অ্যাপল কোম্পানির বড় কোনো পদে কাজ করা—এসব ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কাজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কে কী জানেন, কী কাজ করেছেন, কেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল কী হয়েছে, তা অন্তত আলোচনার সামনে আনা সম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, নবী হওয়ার জন্য কী যোগ্যতা লাগে? এই পদটি কি ব্যক্তির অর্জিত যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, নাকি আল্লাহ আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখেন যে অমুক ব্যক্তিকেই নবী করা হবে? আর সেই নির্বাচনের কারণ সাধারণ মানুষ কীভাবে যাচাই করবে?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, মুহাম্মদ কি নিজ কর্মগুণে নবী হয়েছিলেন, নাকি তার নবী হওয়া তার জন্মের অনেক আগেই নির্ধারিত ছিল? প্রাচীন গ্রিসের সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল কিংবা পরবর্তী সময়ের হাইপেশিয়ার কথা বিবেচনা করুন। তাদের চিন্তা, যুক্তি, শিক্ষা এবং কাজের পরিচয় দিয়েই তাদের অবদান বিচার করা হয়। তাদের কোনো বক্তব্য ভুল হলে সেই ভুল নিয়েও আলোচনা করা যায়; কোনো অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলে তার গুরুত্বের কারণ ব্যাখ্যা করা যায়। নবী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির এমন কোন অর্জনকে ভিত্তি করা হয়েছে? জন্মের আগেই যদি নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে তখনও সংঘটিত হয়নি এমন কাজের কৃতিত্ব দেখানোর অর্থ কী? ভবিষ্যতের কাজ, সেই কাজের সুযোগ এবং সেই কাজ করার জন্য বিশেষ সহায়তা—সবই যদি নির্বাচনের পরে নির্ধারিত হয়, তাহলে নির্বাচিত ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যাচাইয়ে সেই সহায়তার হিসাবও আনতে হবে।

ইবন তাইমিয়ার ব্যাখ্যায় মুহাম্মদের নবুওয়াত নির্ধারিত হওয়ার সময়টি উল্লেখ করা হয়েছে: আদমের দেহ সৃষ্টির পরে, কিন্তু তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চারের আগেই আল্লাহ মুহাম্মদের নবুওয়াত লিখে রেখেছেন। এই ব্যাখ্যা অনুসারে মুহাম্মদের জন্ম, শিক্ষা, ব্যক্তিগত চেষ্টা এবং মানুষের কল্যাণে তার কোনো কাজ সম্পাদনের বহু আগেই মনোনয়ন স্থির হয়েছে। নিচে একই আলোচনার বর্ণনা ও ব্যাখ্যার দুটি পূর্ণ অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো। [9]

ইবন তাইমিয়া, জামি আল-মাসায়িল
নবুওয়াত নির্ধারণের সময়সংক্রান্ত আলোচনা
প্রাসঙ্গিক পূর্ণ অনুচ্ছেদগুলোর বাংলা অনুবাদ
আল-ইরবাদ ইবন সারিয়ার বর্ণনায় নবী বলেছেন: “আদম তখনও নিজের মাটির মধ্যে পড়ে থাকা অবস্থায় আমি আল্লাহর কাছে শেষ নবী হিসেবে লিখিত ছিলাম। এর সূচনার কথা তোমাদের জানাব: আমার পিতা ইবরাহিমের দোয়া, ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। আমাকে জন্ম দেওয়ার সময় তিনি দেখেছিলেন, তার কাছ থেকে এমন আলো বের হয়েছে, যা শামের প্রাসাদগুলো আলোকিত করেছে।”
এই সহিহ হাদিসে নবী স্পষ্ট করেছেন যে দেহ সৃষ্টি হওয়ার পরে এবং প্রাণ সঞ্চারের আগে বান্দার রিজিক, আয়ু, কাজ এবং সে দুর্ভাগা হবে না সৌভাগ্যবান হবে, তা লিখে দেওয়া হয়। আদম মানবজাতির পিতা, আর মুহাম্মদ আদমসন্তানদের নেতা। তাই আদমকে সৃষ্টি করার পরে এবং তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চারের আগে আল্লাহ মুহাম্মদের নবুওয়াত লিখে রেখেছেন।

এই পূর্বনির্বাচনের সঙ্গে শৈশবের বিশেষ সহায়তার বর্ণনাটিও মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। সহিহ মুসলিমে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ যখন অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন, তখন জিব্রাইল এসে তার বুক চিরে হৃদপিণ্ড বের করেন, সেখান থেকে শয়তানের অংশ বলে চিহ্নিত একটি রক্তপিণ্ড সরিয়ে দেন এবং যমযমের পানি দিয়ে হৃদপিণ্ড ধুয়ে আবার যথাস্থানে বসিয়ে দেন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের পাপপ্রবণতা ও নৈতিক সংগ্রামের আলোচনায় যে শয়তানের প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, মনোনীত নবীর ক্ষেত্রে সেই প্রভাব দূর করার জন্য শৈশবেই সরাসরি হস্তক্ষেপের বর্ণনা রয়েছে। [10] [11]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
৩১০। শায়বান ইবনু ফাররুখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এলেন, তখন তিনি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিণ্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। তখন ঐ শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, মুহাম্মাদ -কে হত্যা করা হয়েছে। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বক্ষে সে সেলাই-এর চিহ্ন দেখেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ভেবে দেখুন, একজন সাধারণ মানুষকে যদি শৈশব থেকেই এমন বিশেষ সহায়তা দেওয়া হতো, তার নৈতিক জীবন কি একই রকম থাকত? যে বাধা দূর করে দেওয়া হয়েছে এবং যে বাধা অন্যদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, দুটিকে এক করে দেখলে ব্যক্তিগত চেষ্টার হিসাব বিকৃত হয়। একটি পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থীকে আগে থেকেই অতিরিক্ত প্রস্তুতি, সরাসরি সহায়তা এবং ভুলের প্রধান উৎস থেকে সুরক্ষা দেওয়া হলো, অন্য পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হলো সংগ্রামের সাধারণ নির্দেশ। তারপর প্রথম ব্যক্তির সাফল্যকে সবার ওপর তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হলো। এমন বিচারে ফলাফলের সঙ্গে ফল অর্জনের শর্তও বিচার করতে হবে। মুহাম্মদের বক্ষবিদারণের বর্ণনায় যে বিশেষ ব্যবস্থা পাওয়া যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের পাপের দায় নির্ধারণের সময় তার অনুপস্থিতির হিসাব কোথায়?

একজন শিক্ষক যদি পরীক্ষার আগে নিজের পছন্দের ছাত্রকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করেন, তার দুর্বলতা দূর করে দেন এবং পরীক্ষার সময়ও অন্যদের তুলনায় বাড়তি সহায়তা দেন, তাহলে সেই ছাত্রের ভালো ফলাফল দিয়ে শিক্ষকের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা যায় না। বরং প্রশ্ন ওঠে, বাকিদের জন্য সেই সহায়তা কেন ছিল না? পরীক্ষার আয়োজকের হাতে যদি সবার প্রস্তুতি উন্নত করার ক্ষমতা থাকে, তাহলে শুধু একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। ইসলামের বর্ণনায় আল্লাহর ক্ষমতা সীমাহীন। সুতরাং মুহাম্মদের জন্য যে বিশেষ প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা হয়েছে, অন্য মানুষের জন্য সেই ব্যবস্থা করার পথে আল্লাহর কোনো সামর্থ্যগত বাধা ছিল না। পার্থক্যটি তৈরি হয়েছে তার নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই নির্বাচনের ন্যায়সংগত কারণ কোথায়?

নবী হওয়ার মনোনয়ন, নবী হওয়ার প্রস্তুতি এবং নবীকে দেওয়া বিশেষ সহায়তা—তিনটিই যখন আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তখন “শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলেই নবী” কথাটি দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। সেই শ্রেষ্ঠত্বের কতখানি ব্যক্তির নিজের চেষ্টা এবং কতখানি আগে থেকেই দেওয়া সুবিধার ফল, তা দেখাতে হবে। আবু লাহাবের পূর্বনির্ধারিত পরিণতি নিয়ে প্রশ্নটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। মুহাম্মদের জন্য যে পূর্বনির্বাচন ও বিশেষ প্রস্তুতির বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে, আবু লাহাব কিংবা অন্য মানুষের জন্য সেই সুযোগ কোথায়? একই স্রষ্টা কাউকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করবেন, অন্যকে ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে রাখবেন, আবার সবার নৈতিক অবস্থানের বিচারও করবেন—এই ব্যবস্থার ন্যায়সংগততা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুযোগের পার্থক্যকে হিসাবের মধ্যে আনতেই হবে। আল্লাহ কাকে বেছে নিয়েছেন, তা দিয়ে তার পছন্দ বোঝানো যায়; সেই পছন্দ কেন ন্যায়সংগত, তার জন্য পৃথক যুক্তি প্রয়োজন।

লাহাব
লাহাব

নবীর স্বজনপ্রীতি ও ইনসাফ

নবী মুহাম্মদ তার পরিবারের একাধিক সদস্যকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। শুধু জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদই নয়, তাদের মধ্যে কাউকে জান্নাতের নারীদের এবং কাউকে যুবকদের সর্দার হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। এখানেই ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং পারিবারিক পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পৃথিবীর সব নারী ও সব যুবকের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা নির্ধারণ করা হলে সেই মর্যাদার মানদণ্ড কী? কোন কাজ, কোন ত্যাগ, কোন নৈতিক গুণ এবং মানুষের জন্য কোন অবদানের ভিত্তিতে এই স্থান নির্ধারিত হচ্ছে? নবীর কন্যা ফাতিমাকে নারীদের সর্দার বলা হয়েছে। মেরি কুরি, মাদার তেরেসা, হাইপেশিয়া কিংবা বেগম রোকেয়ার কাজের কথা আমরা আলোচনা করতে পারি, তাদের অবদান ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করতে পারি। ফাতিমার সর্বোচ্চ মর্যাদার দাবিটিও তখন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়: অন্য নারীদের সঙ্গে তার কাজ ও গুণের তুলনামূলক মূল্যায়ন কোথায়? নবীর পরিবারের সদস্য বলেই যদি ঘোষণাটি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তাহলে মর্যাদা নির্ধারণে পারিবারিক পরিচয়ই বিশেষ অধিকার পেয়ে বসে।

পৃথিবীর সামাজিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে বহু মানুষের জীবনযাত্রা ও পেশার সুযোগ পারিবারিক অবস্থার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। একজন কৃষকের সন্তান কিংবা রিকশাচালকের সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সংসারের আয়, শিক্ষার ব্যয় এবং অনিশ্চিত জীবিকার চাপ সামলাতে হতে পারে। অভিজাত ও ক্ষমতাশালী পরিবারের সন্তান একই বয়সে ভালো স্কুলে পড়ার, নিরাপদ পরিবেশে বড় হওয়ার, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার এবং প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান সেই একই অবস্থানে পৌঁছাতে চাইলে তাকে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়; পরিশ্রম করলেও সাফল্যের নিশ্চয়তা থাকে না। এই পার্থক্য শিক্ষা ও পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সম্পদ, পরিচিতি এবং সামাজিক মর্যাদা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে যায়। ফলে জন্মসূত্রে পাওয়া সুবিধাকে ব্যক্তির নিজের অর্জন হিসেবে দেখালে অন্য মানুষের বঞ্চনা আড়াল হয়ে যায়।

রাজনীতির পরিবারতন্ত্র নিয়েও আমরা একই প্রশ্ন তুলি। শেখ হাসিনার ছেলে জয় কিংবা খালেদা জিয়ার ছেলে তারেককে শুধু পিতা-মাতার পরিচয়ের কারণে কোনো রাজনৈতিক পদ, বাড়তি ক্ষমতা বা বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হলে তার ন্যায়সংগততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন? কারণ সেই পরিচয় তাদের নিজের সৃষ্টি নয়, এবং একই সুযোগ অন্য যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত নয়। একজন শ্রমজীবী, কৃষক কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানকে রাজনৈতিক জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়; ক্ষমতাবান পরিবারের সন্তান যে যোগাযোগ ও প্রবেশাধিকার জন্মসূত্রে পায়, তা সে সহজে পায় না। জমিদারি ও রাজতন্ত্রেও বংশপরিচয় ক্ষমতার উত্তরাধিকার নির্ধারণ করত। এসব ব্যবস্থায় আমাদের আপত্তির মূল জায়গা হচ্ছে, ব্যক্তির মূল্যায়নের বদলে তার পরিবারকে অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তি করে তোলা। ধর্মীয় মর্যাদা বণ্টনের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। আসুন, নবীর পরিবার সম্পর্কে উদ্ধৃত বর্ণনাগুলো পড়ি। [12]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০৯১. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট আত্মীয়দের মর্যাদা এবং ফাতিমা (রাঃ) বিনতে নবী (সাঃ) এর মর্যাদা। নবী (সাঃ) বলেছেন, ফাতিমা (রাঃ) জান্নাতবাসী মহিলাগণের সরদার
৩৪৪৭। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) … আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মাদসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারবর্গের প্রতি তোমরা অধিক সম্মান দেখাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)

এখানে পরিচ্ছেদের শিরোনামে ফাতিমার মর্যাদার ঘোষণা রয়েছে, আর মূল বর্ণনাটি আবু বকরের বক্তব্য: মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি বিশেষ সম্মান দেখানোর নির্দেশ। ফাতিমাকে নারীদের সর্দার বলার সরাসরি বর্ণনাও বুখারিতে আছে। নিচে তার সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো। [13]

সহিহ বুখারি
নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহ
হাদিস ৩৬২৩–৩৬২৪; পূর্ণ বর্ণনার বাংলা অনুবাদ
আবু নুআইম আমাদের বর্ণনা করেছেন; জাকারিয়া ফিরাস থেকে, তিনি আমির থেকে, তিনি মাসরুক থেকে, তিনি আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন। আয়িশা বলেন: ফাতিমা হেঁটে এলেন; তার হাঁটা নবীর হাঁটার মতো ছিল। নবী বললেন, “আমার কন্যাকে স্বাগতম।” তাকে ডানে অথবা বামে বসিয়ে গোপনে কিছু বললেন। তিনি কাঁদলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কাঁদছ কেন?” আবার গোপনে কিছু বললে তিনি হাসলেন। আমি বললাম, “আজকের মতো দুঃখের এত কাছে আনন্দ দেখিনি।” কী বলেছেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, “রাসুলের গোপন কথা প্রকাশ করব না।” নবীর মৃত্যুর পরে জিজ্ঞেস করলে বললেন: “তিনি আমাকে গোপনে বলেছেন, জিব্রাইল প্রতি বছর একবার আমার সঙ্গে কোরআন মিলিয়ে নিতেন, এ বছর দুবার মিলিয়েছেন। আমার মনে হচ্ছে মৃত্যুর সময় উপস্থিত; আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার কাছে আসবে। তাই কেঁদেছিলাম। তারপর তিনি বললেন, তুমি কি জান্নাতবাসী নারীদের সর্দার অথবা মুমিন নারীদের সর্দার হতে সন্তুষ্ট নও? তাই হেসেছিলাম।”

নবীর দুই নাতি হাসান ও হোসেইন সম্পর্কেও জান্নাতের যুবকদের সর্দার হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। অর্থাৎ একই পরিবারের মধ্যে কন্যার জন্য নারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং দুই নাতির জন্য যুবকদের নেতৃত্বের ঘোষণা পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো তাদের পদমর্যাদা জানাচ্ছে; সেই পদমর্যাদা নির্ধারণের জন্য অন্য মানুষের সঙ্গে তুলনা করার প্রকাশ্য মানদণ্ড কী, প্রশ্নটি সেখানেই। [14] [15]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৩১. আল-হাসান ইবনু ‘আলী এবং আল-হুসাইন ইবনু ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাযিঃ)-এর মর্যাদা
৩৭৬৮। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল-হাসান ও আল-হুসাইন (রাযিঃ) প্রত্যেকেই জান্নাতী যুবকদের সরদার।
সহীহঃ সহীহাহ (৭৯৬)
সুফইয়ান ইবনু ওয়াকী’-জারীর ও মুহাম্মাদ ইবনু ফুযাইল হতে, তিনি ইয়াযীদ (রাহঃ) হতে এই সনদে একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু আবী নুম হলেন আবদুর রহমান ইবনু আবী নুম আল-বাজালী, কুফার অধিবাসী। তার উপনাম আবূল হাকাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সুনানে ইবনে মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ১৪. ‘আলী বিন আবী ত্বলিব (রাঃ)-এর সম্মান
৫/১১৮। ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা এবং তাদের পিতা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৯৭৯। উক্ত হাদিসের রাবী মুআল্লা বিন আব্দুর রহমান সম্পর্কে আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, তার হাদিস দুর্বল এবং তার ব্যাপারে হাদিস বানিয়ে বর্ণনার অভিযোগ রয়েছে। ইবনু আদী বলেন, আশা করি তেমন কোন সমস্যা নেই। আবু হাতীম আর-রাযী বলেন, তার হাদিস দুর্বল। ইমাম দারাকুতনী বলেন, তিনি দুর্বল ও মিথ্যুক। উক্ত হাদিস শাহিদ এর ভিত্তিতে সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ)

এবার জন্মপরিস্থিতির প্রশ্নটি আবার বিবেচনা করুন। আবু লাহাব বা আবু জেহেল যদি ভিন্ন পরিবারে, ভিন্ন শিক্ষা ও ভিন্ন সহায়তার মধ্যে বড় হতেন, তাদের বিশ্বাস ও আচরণ কেমন হতো? আমি কিংবা আপনি যদি মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক পরিবেশে জন্মাতাম, শৈশব থেকেই তার শিক্ষা পেতাম এবং তার কাছ থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ মর্যাদার নিশ্চয়তা পেতাম, আমাদের ধর্মীয় জীবন কতটা বদলে যেত? জন্মের স্থান, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রাপ্ত সহায়তা মানুষের জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। সেই পার্থক্যকে পাশ কাটিয়ে কেবল বিশেষ ব্যক্তির মর্যাদা ঘোষণা করলে যোগ্যতা নির্ধারণের প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে। পরিবারের মানুষকে ভালোবাসা সহজে বোঝা যায়। কিন্তু সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা পরকালের নেতৃত্ব ঘোষণার ক্ষেত্রে সবার জন্য প্রযোজ্য নৈতিক মানদণ্ড দেখাতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতায় পারিবারিক পরিচয়কে বিশেষ অধিকার দেওয়ার সময় যে প্রশ্ন তুলি, ধর্মীয় মর্যাদার ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন বহাল থাকে: ঘোষণাকারীর ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যক্তির নিজের অর্জনের মধ্যে সীমারেখা কোথায়?

ধরা যাক, কোনো রাজনৈতিক নেতা নিজের কন্যাকে দেশের সব নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং নিজের দুই নাতিকে দেশের সব যুবকের নেতা ঘোষণা করলেন। তখন আমরা তার কাছে সেই শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্বের কারণ জানতে চাইব। শুধু “তারা আমার পরিবারের সদস্য” কিংবা “আমি জানি তারা যোগ্য” বললে সেই দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে না। অন্য মানুষের কাজ, যোগ্যতা এবং অবদানও একই বিচারে সামনে আনতে হবে। নবীর পরিবারের জন্য পরকালের সর্বোচ্চ মর্যাদা ঘোষণার ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কারণ নেই। বরং দাবির পরিসর যখন পৃথিবীর একটি দেশ ছাড়িয়ে সব যুগের মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তখন সেই ঘোষণার মানদণ্ড আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়ার ন্যায়সংগততা দেখাতে হলে পারিবারিক নৈকট্যের বাইরে তাদের স্বতন্ত্র যোগ্যতা এবং অন্যদের সঙ্গে তুলনার ভিত্তি তুলে ধরতে হবে।

এই আলোচনায় খাদিজার সন্তানদের নিয়ে বাংলা মিশকাতে থাকা একটি বর্ণনাও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, খাদিজার আগের সংসারের মৃত দুই সন্তান জাহান্নামে, অথচ মুহাম্মদের ঔরসে তার মৃত সন্তানরা জান্নাতে। নিচে বর্ণনাটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করা হলো। [16]

১১০। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার (পূর্ব-স্বামীর ঔরষজাত) দুইটি সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, যারা জাহিলিয়াতের যুগে মারা যায় (তারা জান্নাতী কি জাহান্নামী)। হুযুর জবাবে বললেন, তারা জাহান্নামে। হযরত আলী বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খাদিজার (বাচ্চাদের ব্যাপার শুনার পর) চেহারায় বিষন্ন ভাব দেখে বললেন, তুমি যদি তাদের অবস্থান দেখতে, তাহলে তুমি ওদের (বাচ্চাদের) থেকে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়তে। এরপর হযরত খাদিজা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ঔরসে আমার যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করে মারা গেছে (কাসেম ও আবদুল্লাহ, ওদের অবস্থা কি)? হুযুর বললেন, তারা জান্নাতে আছে। তারপর হুযুর বললেন, মু’মিন ও তাদের সন্তানরা জান্নাতে এবং মুশরিক ও তাদের সন্তানরা জাহান্নামে। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন (অনুবাদ): “যারা ঈমান এনেছে আর তাদের সন্তানরা তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকে (জান্নাতে) ওদের সাথে রাখবো” (সূরা তুর: ১২) (আহমাদ)।

ইসলামে ইনসাফ

এই বর্ণনার সনদ নিয়ে ইবন কাসীর আপত্তি উল্লেখ করেছেন; উদ্ধৃত আয়াতটিও সূরা তুরের ১২ নয়, ২১ নম্বর আয়াত। [17] এখানে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, উদ্ধৃত পাঠে শিশুদের পরিণতি নির্ধারণের জন্য যে নীতি উপস্থাপিত হয়েছে, তার নৈতিক অর্থ কী। কোনো শিশু নিজের জন্মপরিবার বা পিতা-মাতার ধর্ম নির্ধারণ করে না। জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয়কে তার মুক্তি কিংবা শাস্তির ভিত্তি করলে ব্যক্তিগত দায়ের প্রশ্নটি কোথায় থাকে? কেউ এই বক্তব্য গ্রহণ করলে তাকে ব্যাখ্যা করতে হবে, নিজের কোনো সিদ্ধান্তের আগেই একটি শিশুকে পিতা-মাতার পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে বিচার করা কীভাবে ইনসাফ হয়।

পরিবারের বিশেষ মর্যাদা নিয়ে মূল প্রশ্নটি ফাতিমা, হাসান ও হোসেইনের মর্যাদাসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর মধ্যেই উপস্থিত রয়েছে। ইনসাফের বিচার করতে হলে জানতে হবে, একজন সাধারণ মানুষের নৈতিক গুণ, ত্যাগ এবং মানবকল্যাণে অবদান কোন নিয়মে মূল্যায়িত হচ্ছে, আর বিশেষ পরিবারের সদস্যদের সর্বোচ্চ মর্যাদা কোন নিয়মে নির্ধারিত হচ্ছে। ঘোষিত শ্রেষ্ঠত্বকেই তার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে যুক্তি ঘুরে একই জায়গায় ফিরে আসে: তিনি শ্রেষ্ঠ, কারণ তাকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি ঘোষণাটি বিশ্বাস করেন না, তার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ দেখাতে হলে ঘোষণা ছাড়াও যাচাইযোগ্য মানদণ্ড প্রয়োজন। সেই মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য কি না, পারিবারিক নৈকট্য সেখানে কতটা ভূমিকা রাখছে এবং জন্মসূত্রে পাওয়া সুযোগের পার্থক্য কীভাবে বিবেচিত হচ্ছে—ইনসাফের দাবিকে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।


বদরের যোদ্ধাদের বিশেষ ছাড়: হাতিবের ঘটনা

বিশেষ মর্যাদার প্রশ্ন পরিবারের সীমা পেরিয়ে একটি নির্দিষ্ট দলের জন্য আগাম ক্ষমার ঘোষণাতেও দেখা যায়। বদরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে “তোমরা যা ইচ্ছা করো” এবং ক্ষমা কিংবা জান্নাতের নিশ্চয়তার বর্ণনা রয়েছে। হাতিব ইবন আবি বালতার ঘটনাটি এই প্রশ্নে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মক্কার মুশরিকদের কাছে এমন চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যাতে মুহাম্মদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য ছিল। চিঠি উদ্ধার হওয়ার পরে মুহাম্মদ তার কাছে কারণ জানতে চান। হাতিব বলেন, নিজের পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য মক্কাবাসীদের কাছে উপকারের সম্পর্ক তৈরি করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। মুহাম্মদ তার ব্যাখ্যা সত্য বলে গ্রহণ করেন। কিন্তু উমর যখন তাকে হত্যার অনুমতি চান, তখন জবাবে তার বদরে অংশ নেওয়ার পরিচয় এবং বদরের যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ ঘোষণাও সামনে আনা হয়। পুরো বর্ণনাটি পড়লে উদ্দেশ্যের মূল্যায়ন এবং পূর্বপরিচয়ের বিশেষ সুবিধা—দুটি বিষয়ই দেখা যায়। [18]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৯/ অনুমতি প্রার্থনা
পরিচ্ছেদঃ ৭৯/২৩. কারো এমন পত্রের বিষয়ে স্পষ্টরূপে জানার জন্য তদন্ত করে দেখা, যাতে মুসলিমদের জন্য শংকার কারণ আছে।
৬২৫৯. ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ও যুবায়র ইবনু আওয়াম এবং আবূ মারসাদ গানাভী (রাঃ)-কে অশ্ব বের করে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা রওয়ানা হয়ে যাও এবং ’রওযায়ে খাখে’ গিয়ে উপস্থিত হও। সেখানে একজন মুশরিক স্ত্রীলোক পাবে। তার কাছে হাতিব ইবনু আবূ বালতার দেয়া মুশরিকদের প্রতি প্রেরিত একখানি পত্র আছে। আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই তাকে পেয়ে গেলাম যেখানকার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন। ঐ স্ত্রী লোকটি তার এক উটের উপর সওয়ার ছিল। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তোমার কাছে যে পত্রখানি আছে তা কোথায়? সে বললঃ আমার সাথে কোন পত্র নেই। তখন আমরা তার উটসহ তাকে বসালাম এবং তার সাওয়ারীর আসবাবপত্রের তল্লাশি করলাম। কিন্তু আমরা কিছুই খুঁজে পেলাম না।
আমার দু’জন সাথী বললেনঃ পত্রখানা তো পাওয়া গেল না। আমি বললামঃ আমার জানা আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনর্থক কথা বলেননি।
তখন তিনি স্ত্রী লোকটিকে ধমক দিয়ে বললেনঃ তোমাকে অবশ্যই চিঠিটা বের করে দিতে হবে, নইলে আমি তোমাকে উলঙ্গ করে তল্লাশি চালাব। এরপর সে যখন আমার দৃঢ়তা লক্ষ্য করল, তখন সে বাধ্য হয়ে তার কোমরে পেঁচানো চাদরে হাত দিয়ে ঐ পত্রখানা বের করে দিল। তারপর আমরা তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছলাম।
তখন তিনি হাতিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে হাতিব! তুমি কেন এমন কাজ করলে? তিনি বললেনঃ আমার মনে এমন কোন খারাপ ইচ্ছে নেই যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। আমি আমার দৃঢ় মনোভাব পরিবর্তন করিনি এবং আমি দ্বীনও বদল করিনি। এই চিঠি দ্বারা আমার নিছক উদ্দেশ্য ছিল যে, এতে মক্কাবাসীদের উপর আমার দ্বারা এমন উপকার হোক, যার ফলে আল্লাহ তা’আলা আমার পরিবার ও সম্পদ নিরাপদে রাখবেন। আর সেখানে আপনার অন্যান্য সাহাবীদের এমন লোক আছেন যাঁদের দ্বারা আল্লাহ তা’আলা তাদের পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা দান করবেন।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাতিব ঠিক কথাই বলেছে। সুতরাং তোমরা তাকে ভাল ব্যতীত অন্য কিছুই বলো না। রাবী বলেনঃ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বললেন, তিনি নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অতএব আমাকে ছেড়ে দিন আমি তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেই। রাবী বলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’উমার! তোমার কি জানা নেই যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, তোমরা যা ইচ্ছে করতে পার। নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়ে আছে। রাবী বলেনঃ তখন ’উমার (রাঃ) এর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। [৩০০৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৮১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৭১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)

হাতিব কেন চিঠি পাঠিয়েছিলেন, সেটি তার কাজের উদ্দেশ্য বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। কোনো বিচারে উদ্দেশ্য, চাপ, পরিস্থিতি এবং কাজের পরিণতি যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু এই বর্ণনায় সেই যাচাইয়ের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে: তিনি বদরের যোদ্ধা। এই পরিচয়ের সঙ্গে “তোমরা যা ইচ্ছা করতে পার” এবং জান্নাত নির্ধারিত থাকার ঘোষণা যুক্ত করা হয়েছে। এখানেই সমান বিচারনীতির প্রশ্ন ওঠে। একই পরিস্থিতিতে অন্য কোনো ব্যক্তি একই কাজ করলে তার উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিচার হবে; হাতিবের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে আগে থেকেই থাকা একটি বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদাও যুক্ত হচ্ছে। অতীতের একটি কাজের পুরস্কার কত দূর পর্যন্ত ভবিষ্যতের দায়কে প্রভাবিত করবে? নির্দিষ্ট যুদ্ধে অংশ নেওয়া কি পরবর্তী সব কাজের চূড়ান্ত পরিণতি আগেই নির্ধারণ করে দেয়? আর এমন নিশ্চয়তা যাদের জন্য ঘোষণা করা হয়নি, তাদের সঙ্গে এই দলের বিচারের সম্পর্ক কী?

ধরা যাক, রাষ্ট্রের কোনো কর্মচারী শত্রুপক্ষের কাছে গোপন তথ্য পাঠিয়েছেন। তদন্তে জানা গেল, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে তিনি কাজটি করেছেন। তার উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি বিচারে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু বিচারক যদি এর সঙ্গে বলেন, “তিনি আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাই তার চূড়ান্ত মুক্তি আগেই নিশ্চিত”, তখন সিদ্ধান্তে একটি আলাদা সুবিধা ঢুকে পড়ে। অতীতের সেবা পুরস্কৃত করার প্রশ্ন এবং পরবর্তী অপরাধের দায় নির্ধারণের প্রশ্নকে পৃথকভাবে বিচার করতে হয়। একটি ভালো কাজের জন্য কাউকে পুরস্কার দেওয়ার অর্থ তার ভবিষ্যতের সব অন্যায়ের পরিণতি আগাম মিটিয়ে দেওয়া কেন হবে? বিশেষত ভবিষ্যতের কোনো কাজের দ্বারা অন্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবির মূল্য কোথায় থাকবে?

ইমাম নববী এই ঘোষণার ব্যাখ্যায় ক্ষমাকে পরকালের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার ব্যাখ্যায় পার্থিব শাস্তি এবং পরকালীন ক্ষমা পাশাপাশি রয়েছে। প্রশ্নটি তাই সরাসরি পরকালের বিচারেও পৌঁছায়: দুনিয়ায় কোনো কাজ শাস্তিযোগ্য হলেও সেই কাজের পরকালীন পরিণতির বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট দলের জন্য আগাম নিশ্চয়তা কেন? নিচে নববীর সংশ্লিষ্ট পূর্ণ ব্যাখ্যার বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো। [19] [20]

ইমাম নববী, আল-মিনহাজ শরহ সহিহ মুসলিম
খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ৫৬–৫৭
বদরের যোদ্ধাদের ক্ষমাসংক্রান্ত পূর্ণ ব্যাখ্যার বাংলা অনুবাদ
নবীর বক্তব্য: “হতে পারে, আল্লাহ বদরের যোদ্ধাদের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা করো; আমি তোমাদের ক্ষমা করেছি।” আলেমরা বলেছেন, এর অর্থ তাদের জন্য পরকালে ক্ষমা। তবে তাদের কারও ওপর কোনো নির্ধারিত শাস্তি বা অন্য শাস্তি প্রযোজ্য হলে দুনিয়ায় তা কার্যকর করা হবে। কাজি ইয়াদ তাদের ওপর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করার বিষয়ে সর্বসম্মত মত উল্লেখ করেছেন। উমর তাদের কয়েকজনের ওপর সেই শাস্তি কার্যকর করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, নবী মিসতাহকে নির্ধারিত শাস্তি দিয়েছেন, অথচ মিসতাহ বদরের যোদ্ধা ছিলেন।

ইসলামকিউএ-তে উদ্ধৃত ইবন তাইমিয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যাটিও পড়া যাক। [21]

ইসলামকিউএ, প্রশ্নোত্তর ১৫৯৫১৯
ইবন তাইমিয়ার মুখতাসার আল-ফাতাওয়া আল-মিসরিয়্যা থেকে উদ্ধৃত
হাতিব, বদরের যোদ্ধা এবং ভবিষ্যতের পাপের ক্ষমা বিষয়ে প্রাসঙ্গিক পূর্ণ অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ
এটি হাতিব ইবন আবি বালতার হাদিসের মতো, যেখানে নবী উমরকে বলেছেন: “তোমার কী জানা আছে, আল্লাহ বদরের যোদ্ধাদের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা করো; আমি তোমাদের ক্ষমা করেছি?” আরও এসেছে, হাতিবের দাস তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছিল, “আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসুল, হাতিব অবশ্যই জাহান্নামে যাবে!” তিনি বলেন, “তুমি মিথ্যা বলেছ; সে বদর ও হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল।” এসব হাদিসে বোঝানো হয়েছে, একজন মুমিন এমন নেক কাজ করতে পারেন, যার কারণে তার পরবর্তী পাপও ক্ষমা করা হয়, যদিও অন্য কারণেও ক্ষমা হতে পারে। এগুলো আরও বোঝায়, তিনি মুমিন অবস্থায় মারা যাবেন এবং জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তার কোনো পাপ হলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। যেমন বদরের কিছু যোদ্ধার তওবা কবুল হয়েছে। কুদামা ইবন আবদুল্লাহ ভুল ব্যাখ্যা করে মদ পান করলে উমর ও তার সঙ্গীরা তাকে তওবা করতে বলেন এবং বেত্রাঘাত করেন; নির্ধারিত শাস্তি ও তওবার মাধ্যমে তিনি শুদ্ধ হন। অথচ তিনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদের বলা হয়েছিল, “তোমরা যা ইচ্ছা করো।”

এই ব্যাখ্যায় প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়। একজন ব্যক্তি ভবিষ্যতে পাপ করলে তার জন্য তওবা ও ক্ষমার পথ নিশ্চিত থাকবে, আর শেষ পর্যন্ত তার জান্নাতলাভও নিশ্চিত—এমন ঘোষণা দেওয়া হলে তার পরীক্ষা এবং অন্য মানুষের পরীক্ষা একই অবস্থায় থাকে কীভাবে? সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে, বিশ্বাস, কাজ এবং মৃত্যুর সময়কার অবস্থার ওপর তার পরিণতি নির্ভর করবে। কিন্তু বিশেষ দলের ক্ষেত্রে সেই শেষ অবস্থাই আগাম নিশ্চিত বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। এখানে তওবা করাও সেই নিশ্চিত পরিণতির পথে একটি উপায় হয়ে যায়। তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য সেই উপায়, সেই সহায়তা এবং সেই নিশ্চয়তা একইভাবে কেন স্থির করা হয় না? ভবিষ্যতের তওবা ও ক্ষমার ব্যবস্থা নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নিশ্চিত করে দেওয়া হলে তার মুক্তির কতখানি ব্যক্তিগত অর্জন এবং কতখানি আগাম ব্যবস্থার ফল, সেই হিসাবও বিচারের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

কাউকে আগাম জান্নাতের নিশ্চয়তা দেওয়া এবং কাউকে নিজের শেষ পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রেখে পরীক্ষা করা—এই দুটি অবস্থার পার্থক্যও বিবেচনা করুন। একজন জানেন, তার পরবর্তী জীবন শেষ পর্যন্ত মুক্তির দিকে পৌঁছাবে। অন্যজনকে বলা হচ্ছে, যেকোনো ভুল, বিশ্বাসের পরিবর্তন কিংবা জীবনের শেষ অবস্থার কারণে তার পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে। প্রথম ব্যক্তির জন্য মুক্তির নিশ্চয়তা যদি তার ভবিষ্যতের আচরণ ও তওবার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থির করা সম্ভব হয়, তাহলে অন্যদের জন্য তা সম্ভব নয় কেন? সর্বশক্তিমান স্রষ্টা একজনের জন্য এমন পথ নির্ধারণ করতে পারলে সবার জন্য সেই পথ নির্ধারণে তার অক্ষমতার প্রশ্ন ওঠে না। তখন প্রশ্নটি তার বিচারনীতির: একই মানবজাতির মধ্যে কারও শেষ পরিণতি নিশ্চিতভাবে অনুকূল করে দেওয়ার কারণ কী, এবং সেই বিশেষ ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের প্রতি ইনসাফ কোথায়?

হাতিবের দাসের অভিযোগের ঘটনাটি সহিহ মুসলিমেও রয়েছে। দাসটি হাতিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তার জাহান্নামে যাওয়ার কথা বললে মুহাম্মদ বদর ও হুদাইবিয়ায় উপস্থিত থাকার কারণ দেখিয়ে বলেন, হাতিব সেখানে প্রবেশ করবে না। নিচে সম্পূর্ণ বর্ণনার বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো। [22]

সহিহ মুসলিম
সাহাবিদের মর্যাদা; বদরের যোদ্ধাদের মর্যাদা ও হাতিবের ঘটনা
হাদিস ২৪৯৫; পূর্ণ বর্ণনার বাংলা অনুবাদ
কুতাইবা ইবন সাঈদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; লাইস আমাদের বর্ণনা করেছেন। অন্য সনদে মুহাম্মদ ইবন রুমহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; লাইস আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি আবু যুবাইর থেকে, তিনি জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন: হাতিবের এক দাস আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে হাতিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, হাতিব অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” আল্লাহর রাসুল বললেন, “তুমি মিথ্যা বলেছ। সে সেখানে প্রবেশ করবে না; কারণ সে বদর ও হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল।”

এই বর্ণনায় মুহাম্মদের উত্তরে হাতিবের ভবিষ্যৎ পরিণতি নির্ধারণের কারণটি বলা হয়েছে: বদর ও হুদাইবিয়ায় উপস্থিত থাকা। অভিযোগের বিচার এবং এই বিশেষ পরিচয়ের সম্পর্ক এখানেই যাচাই করতে হয়। দাসটির অভিযোগের বিস্তারিত বিষয় উদ্ধৃত পাঠে নেই, কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চয়তা আছে। অভিযোগকারী যখন অধীনস্থ একজন দাস এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি আগাম মুক্তির ঘোষণাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, তখন অভিযোগকারীর অবস্থান থেকে প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে: তার অভিযোগের নৈতিক মূল্যায়নের জায়গাটি কোথায়? বিশেষ মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পাবেন—এই ঘোষণা দিয়ে অভিযোগকারীর সম্ভাব্য ক্ষতি, কষ্ট কিংবা ন্যায্য দাবির প্রশ্ন মিটে যায় কীভাবে?

অতীতের কোনো কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়ার একটি যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু সেই পুরস্কারকে ভবিষ্যতের পাপের ক্ষমা এবং চূড়ান্ত মুক্তির নিশ্চয়তা পর্যন্ত প্রসারিত করতে হলে তার সীমা ও কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। মানুষ পরে কী করবে, সেই কাজের দ্বারা কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচার কীভাবে হবে—এসব প্রশ্ন তখন সামনে আসে। কোনো দলের বিশেষ মর্যাদা যেন অন্য মানুষের অভিযোগের মূল্য কমিয়ে না দেয়, সেটি নিশ্চিত করাও ইনসাফের অংশ। বদরে অংশ নেওয়া ব্যক্তির নেক কাজের মূল্য থাকলে তার পরবর্তী কাজের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনেরও মূল্য আছে। প্রথমটির পুরস্কার নির্ধারণ করতে গিয়ে দ্বিতীয়টির দাবি আড়াল করা হলে বিচারব্যবস্থা ব্যক্তির কাজের বদলে তার বিশেষ পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।

নবী নির্বাচন, পরিবারের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং বদরের যোদ্ধাদের বিশেষ ক্ষমা—এই তিনটি প্রসঙ্গকে পাশাপাশি রাখলে মানুষের নৈতিক মূল্যায়নের একটি মৌলিক সমস্যা দেখা যায়। কারও জন্য জন্মের আগে মনোনয়ন, কারও জন্য শৈশবে বিশেষ সহায়তা, কারও জন্য পরিবারের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার ঘোষণা, আবার কারও জন্য ভবিষ্যতের পাপের পরেও শেষ পর্যন্ত মুক্তির নিশ্চয়তা। এসব ক্ষেত্রে ইনসাফের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাচনের কারণ, সুযোগের পার্থক্য, মর্যাদার মানদণ্ড এবং ভবিষ্যতের দায়—সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলকে পছন্দ করেছেন, কিংবা মুহাম্মদ তাদের বিশেষ মর্যাদার কথা বলেছেন—এগুলো সেই ধর্মীয় ঘোষণার পরিচয় দেয়। সেই ঘোষণাগুলো সবার জন্য ন্যায়সংগত বিচারব্যবস্থা তৈরি করছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রত্যেক মানুষের কাজ, সুযোগ ও দায়কে একই প্রকাশ্য মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।


তাকদীর, কাজের নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির দায়

ইনসাফের প্রশ্নে শুধু শাস্তির তালিকা দেখলেই চলে না; যে কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, সেই কাজটি কীভাবে ঘটল এবং তার ওপর কার কতখানি নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেটিও দেখতে হয়। একজন মানুষ নিজের সিদ্ধান্তে অপরাধ করলে তার দায় বিচার করা এক বিষয়; কিন্তু অন্য কোনো সত্তা যদি তার চূড়ান্ত পরিণতি আগেই নির্ধারণ করে, সেই পরিণতির উপযোগী কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নেয় এবং পরে সেই কাজের জন্য তাকেই শাস্তি দেয়, তাহলে বিচারের ভিত্তিটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইসলামের তাকদীরের বিশ্বাস এই দ্বিতীয় সমস্যাটি সামনে আনে। এখানে আল্লাহ কেবল বিচারক নন; মানুষের সৃষ্টি, তার ইচ্ছার কার্যকারিতা, তার কাজ এবং তার শেষ পরিণতির ওপরও আল্লাহর কর্তৃত্বের দাবি করা হয়েছে। ফলে মানুষের দায় নির্ধারণ করতে গিয়ে আল্লাহর ভূমিকা বাদ দেওয়ার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই।

তাকদীরের বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যাবে সংশয়ের ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে প্রবন্ধে এবং ইসলাম ও তাকদীর সম্পর্কিত বিভাগে। এখানে সেই আলোচনার যে দিকটি সরাসরি ইনসাফের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটিই পরীক্ষা করা হবে: পাপের পথ, পাপ করার ইচ্ছা এবং পাপের পরিণতি যদি আল্লাহর কার্যকর নির্ধারণের বাইরে যেতে না পারে, তাহলে সেই পাপের দায় কেবল মানুষের ঘাড়ে চাপানো ন্যায়সঙ্গত হয় কীভাবে?


পাপ পুণ্য কে করায়?

মানুষ কেন অন্যায় এবং অপরাধ করে, সেই অন্যায় ও অপরাধের পেছনে কোন কোন প্রভাবক কাজ করে—ইনসাফের বিচার করতে হলে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেমন ধরুন, ইসরাইলের সেনাবাহিনীর কোনো প্রধান প্যালেস্টাইনে নিরীহ মানুষের ওপর হামলার নির্দেশ দিলেন এবং সেনাসদস্যরা সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করলেন। হামলাটি অপরাধমূলক হলে শুধু যে সৈন্যরা হামলা চালিয়েছে, তাদের দিকে আঙুল তুলেই নির্দেশদাতার দায় শেষ করে দেওয়া যায় না। যিনি পরিকল্পনা করেছেন, নির্দেশ দিয়েছেন এবং অন্যদের দিয়ে অপরাধটি করিয়েছেন, তার ভূমিকাও বিচার করতে হবে। আবার নির্দেশ পালনকারী সৈন্যদের দায়ও তাদের সিদ্ধান্ত, পরিস্থিতি ও প্রত্যাখ্যান করার সামর্থ্য বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু একজন সেনাপ্রধানের নির্দেশ কোনো সৈন্য অগ্রাহ্য করতে পারে; সেই প্রধানের ক্ষমতা অসীম নয়। অন্যদিকে, আল্লাহ যদি নিজেই কোনো কাজ করিয়ে নেন এবং তার নির্ধারণ ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে সামান্য মানুষ সেই নির্ধারণ অগ্রাহ্য করবে কীভাবে? আসুন, হাদিসটি পড়ি— [23]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
৪৭০৩। মুসলিম ইবনু ইয়াসার আল-জুহানী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলোঃ ‘‘যখন তোমার রব আদম সন্তানের পিঠ থেকে তাদের সমস্ত সন্তানদেরকে বের করলেন…’’ (সূরা আল-আ‘রাফঃ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, আল-কা‘নবী এ আয়াত পড়েছিলেন। উমার (রাঃ) বলেন, আমি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রশ্ন করতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর স্বীয় ডান হাতে তাঁর পিঠ বুলিয়ে তা থেকে তাঁর একদল সন্তান বের করে বললেন, আমি এদেরকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং এরা জান্নাতবাসীর উপযোগী কাজই করবে।
অতঃপর আবার তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে একদল সন্তান বেরিয়ে এনে বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং জাহান্নামীদের উপযোগী কাজই করবে। একথা শুনে এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমলের কি মূল্য রইলো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তার দ্বারা জান্নাতবাসীদের কাজই করিয়ে নেন। শেষে সে জান্নাতীদের কাজ করেই মারা যায়। আর আল্লাহ এর বিনিময়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোনো বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন। অবশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করে মারা যায়। অতঃপর এজন্য তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।(1)
সহীহ, পিঠ বুলানো কথাটি বাদে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই বর্ণনায় ঘটনাগুলোর ক্রম খেয়াল করা প্রয়োজন। প্রথমে মানুষকে জান্নাত অথবা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। তারপর সেই পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যের উপযোগী কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শেষে সে সেই কাজের ওপর মারা যাচ্ছে এবং সেই কাজের বিনিময়ে তাকে নির্ধারিত গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে শুধু এমন দাবি করা হয়নি যে, মানুষ কী করবে তা আল্লাহ আগে থেকে জানতেন। দাবি করা হয়েছে, আল্লাহ গন্তব্য নির্ধারণ করেন, সেই গন্তব্যের উপযোগী কাজ করিয়ে নেন, তারপর নিজের করিয়ে নেওয়া কাজকেই পুরস্কার বা শাস্তির কারণ হিসেবে ব্যবহার করেন। এই ব্যবস্থায় শাস্তির কারণটি বিচারক নিজেই তৈরি করছেন। মানুষ কাজটি করেছে—এই কথাটি বললেই কাজটি করিয়ে নেওয়া সত্তার দায় মুছে যায় না। সংশয়ের ইসলামের ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় আল্লাহ মানুষকে জান্নাতী বা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন প্রবন্ধে এই কার্যকারণ ও বিচারের সম্পর্কটি আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

হাদিসের শ্রোতাও এই সমস্যাটি ধরতে পেরেছিলেন; তাই প্রশ্ন করেছিলেন, “তাহলে আমলের কি মূল্য রইলো?” উত্তরটি লক্ষণীয়: তাকে বলা হয়নি যে, আগে কোনো গন্তব্য নির্ধারিত নেই এবং মানুষের কাজের ভিত্তিতেই পরে তা ঠিক হবে। বরং আবারও বলা হয়েছে, যার জন্য যে গন্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে দিয়ে সেই গন্তব্যের কাজই করিয়ে নেওয়া হয়। ফলে আমল এখানে পূর্বনির্ধারিত পরিণতি বদলানোর স্বাধীন উপায় হিসেবে উপস্থিত নেই; সেটি সেই পরিণতি বাস্তবায়িত হওয়ার পথ। একটি নির্দিষ্ট ফল উৎপাদনের জন্য কাজ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই কাজের প্রয়োজনীয়তা থেকে কাজটির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে ছিল—এই সিদ্ধান্ত আসে না। এই প্রশ্নের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে আমলের কি আসলে কোন মূল্য আছে? প্রবন্ধে।

সেইসঙ্গে নবীর আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, মানুষের জন্মেরও আগে, পিতাদের ঔরসে থাকতেই জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য লোক সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তখন কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত নেয়নি, কোনো পাপ করেনি, কোনো নৈতিক পরীক্ষায়ও অংশ নেয়নি। তবু তার সম্পর্কে জান্নাত অথবা জাহান্নামের জন্য সৃষ্ট হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। নিচের বর্ণনাটিতে প্রসঙ্গটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি একজন নিষ্পাপ শিশুর জানাজাকে কেন্দ্র করে এসেছে— [24]

সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ১০. তাকদীর (রাঃ) ভাগ্যলিপির বর্ণনা
৭/৮২। উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আনসার সম্প্রদায়ের এক বালকের জানাযা পড়ার জন্য ডাকা হল। আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! তার জন্য সুসংবাদ, সে জান্নাতের চড়ুই পাখিদের মধ্যে এক চড়ুই যে পাপ কাজ করেনি এবং তা তাকে স্পর্শও করেনি। তিনি বলেনঃ হে আয়িশাহ! এর ব্যতিক্রমও কি হতে পারে? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা একদল লোককে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে অবচেতন থাকতেই তিনি তাদেরকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি জাহান্নামের জন্যও একদল সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে অবচেতন থাকতেই তিনি তাদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: মুসলিম ২৬৬২/১-২, নাসায়ী ১৯৪৭, আবূ দাঊদ ৪৭১৩, আহমাদ ২৩৬১২, ২৫২১৪।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

আয়িশার বক্তব্যের নৈতিক ভিত্তি খুব সহজ: শিশুটি পাপ করেনি, তাই তার জন্য শাস্তির কারণ নেই। কিন্তু উত্তরে সেই পাপহীনতার ভিত্তিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য যথেষ্ট হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি; সামনে আনা হয়েছে জন্মের আগে জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য মানুষ সৃষ্টি করার কথা। এই বর্ণনা নির্দিষ্ট শিশুটিকে জাহান্নামী ঘোষণা করছে না; কিন্তু ইনসাফের প্রশ্নে আরও মৌলিক একটি সমস্যা তুলছে—কোনো মানুষের কাজ করার আগেই তাকে একটি চূড়ান্ত পরিণতির জন্য সৃষ্টি করা হলে, তার পরবর্তী কাজের বিচার কতখানি উন্মুক্ত বিচার থাকে? ব্যক্তির নৈতিক জীবন শুরু হওয়ার আগেই যদি গন্তব্য নির্ধারিত থাকে, তাহলে তার জীবন সেই গন্তব্য যাচাইয়ের পরীক্ষা, নাকি আগে থেকে স্থির করা ফল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া?

পূর্বনির্ধারণের সময়সীমা সম্পর্কেও সহীহ মুসলিমে স্পষ্ট বক্তব্য আছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই সমগ্র সৃষ্টির ভাগ্যলিপি লেখা হয়েছে। ফলে এটি কোনো ব্যক্তির জীবন শেষ হওয়ার পরে তার কাজের হিসাব তৈরি করার দাবি নয়; তার জন্ম এবং কাজের বহু আগে ভাগ্যলিপি নির্ধারণের দাবি— [25]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪৮/ তাকদীর‏
পরিচ্ছদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৭। আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সারহ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ তাঁআলা সমগ্র সৃষ্টির ভাগ্যলিপি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, সে সময় আল্লাহর আরশ পানির উপরে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য জন্মের আগে মানুষ সৃষ্টি করার একই বক্তব্য সহীহ মুসলিমের হাদীস একাডেমী সংস্করণেও রয়েছে। এই পূর্ণ বর্ণনাটিও পড়া যাক— [26]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৭। তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রত্যেক শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মানোর মর্মার্থ এবং কাফির ও মুসলিমদের মৃত শিশুর বিধান
৬৬৬১-(৩১/…) আবু বকর ইবনু আবু শাইবাহ্ (রহঃ) ….. উম্মুল মুমিন ‘আয়িশাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আনসার নাবালক বাচ্চার জানাযায় উপস্থিত হওয়ার জন্য আমন্ত্রিত হলেন। এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ নাবালকটি তো সৌভাগ্যবান। সে তো জান্নাতে চড়ুই পাখিদের থেকে একটি চড়ুই পাখি। সে পাপকর্ম করেনি এবং পাপ তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি বললেন, এছাড়া আরো কিছু আছে, হে আয়িশাহ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা জান্নাতের জন্য উপযুক্ত অধিবাসী সৃষ্টি করেছেন তাদেরকে, যাদেরকে সে উদ্দেশেই সৃষ্টি করেছে, অথচ তখন তারা তাদের বাপ দাদাদের ঔরসে ছিল। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন যাদেরকে জাহান্নামের জন্য তাদের সে উদ্দেশেই পয়দা করেছেন আর তারা তখন তাদের বাপ দাদাদের ঔরসে ছিল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫২৭, ইসলামিক সেন্টার ৬৫৭৮)‏
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

এখানে আগে থেকে জানা এবং কাজের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের পার্থক্যটি পরিষ্কার রাখা জরুরি। একজন শিক্ষক কোনো ছাত্রের প্রস্তুতি দেখে অনুমান করতে পারেন যে সে পরীক্ষায় ব্যর্থ হবে। কিন্তু শিক্ষক যদি নিজেই ছাত্রকে ভুল উত্তর লিখিয়ে দেন, সঠিক উত্তর লেখার কার্যকর সুযোগ বন্ধ করে দেন এবং তারপর ভুল উত্তর দেওয়ার জন্য তাকে শাস্তি দেন, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রথম ক্ষেত্রে শিক্ষক ফলের পর্যবেক্ষক; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ফল তৈরির সক্রিয় অংশীদার। আলোচিত বর্ণনায় “কাজ করিয়ে নেন” কথাটি দ্বিতীয় প্রশ্নই সামনে আনে। শুধু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আর ভবিষ্যতের কাজ ও পরিণতি নির্ধারণ করে সেগুলো ঘটানো এক বিষয় নয়। এই দুই বিষয় এক করে ফেললে তাকদীরের সঙ্গে ইনসাফের প্রকৃত দ্বন্দ্বটি আড়াল হয়ে যায়।

ইসলাম প্রশ্নোত্তরের ২৬৪৩৫৪ নম্বর উত্তরে তাকদীরকে জ্ঞান, লিখন, ইচ্ছা এবং সৃষ্টি—এই চারটি দিক দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ কারও মুমিন অথবা কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ নির্ধারণ করে থাকলে সেই চূড়ান্ত নির্ধারণ বদলানো যায় না। ফেরেশতাদের কাছে থাকা লিখনে দোয়া বা অন্য কারণে পরিবর্তনের কথা বলা হলেও, সেটি আল্লাহর জ্ঞান ও লওহে মাহফুজের চূড়ান্ত নির্ধারণ বদলানো নয়। অর্থাৎ দোয়া এবং তার ফলও পূর্বনির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত। এই আলোচনায় ইবনে আব্বাসের নিচের হাদিসটি উদ্ধৃত হয়েছে— [27]

জামে তিরমিযী
হাদিস: ২৫১৬
ইবনে আব্বাসের বর্ণনা
ইসলাম প্রশ্নোত্তরে উদ্ধৃত হাদিসটির আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ:
আমি একদিন আল্লাহর রাসূলের পেছনে ছিলাম। তিনি বললেন: হে বালক, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাচ্ছি। আল্লাহর বিধান রক্ষা করো, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর বিধান রক্ষা করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছে চাইবে; যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে। জেনে রাখো, সমস্ত মানুষ যদি তোমার কোনো উপকার করতে একত্র হয়, তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না। আর তারা যদি তোমার কোনো ক্ষতি করতে একত্র হয়, তবে আল্লাহ তোমার বিরুদ্ধে যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।

কেউ নিজের নির্ধারিত ভাগ্য জানে না বলে তার ভাগ্য অনির্ধারিত হয়ে যায় না। অজ্ঞতা মানুষের অভিজ্ঞতা বদলাতে পারে, নির্ধারণের চরিত্র বদলায় না। একজন ব্যক্তি জানে না তার শেষ পরিণতি কী, তাই সে চেষ্টা করে, সিদ্ধান্ত নেয়, আশা করে এবং ভয় পায়। কিন্তু যদি তার প্রতিটি চেষ্টা ও সিদ্ধান্তসহ শেষ পরিণতিও এমনভাবে নির্ধারিত থাকে যা অন্যরকম হতে পারে না, তাহলে “সে জানত না” বলে তার ওপর চূড়ান্ত দায় চাপানোর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিচার করতে হবে সেই ব্যবস্থার প্রকৃতি দিয়ে, যার মধ্যে তার ইচ্ছা ও কাজ তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি থেকেই যায়: মানুষ যদি তার জন্য নির্ধারিত পরিণতি অতিক্রম করতে না পারে এবং সেই পরিণতির কাজ আল্লাহই তাকে দিয়ে করিয়ে নেন, তাহলে পাপ-পুণ্য ব্যক্তির স্বাধীন নৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি হয় কীভাবে?


আল্লাহ নিজেই পথভ্রষ্ট করেন, আবার জবাবদিহি চান

তাকদীরের সমস্যা শুধু হাদিসে আগে থেকে জান্নাত ও জাহান্নামের লোক নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনে মানুষের ইচ্ছা, হেদায়াত এবং পথভ্রষ্টতাকেও আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করা হয়েছে। প্রশ্নটি তাই আরও সরাসরি হয়ে ওঠে: সত্য গ্রহণ করার ক্ষমতা, সৎপথে পৌঁছানোর কার্যকর সুযোগ এবং নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়নের সামর্থ্য যদি আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তাহলে যাকে সেই সুযোগ দেওয়া হলো না, তার অবিশ্বাসের পূর্ণ দায় তার নিজের হয় কীভাবে? এখানে মানুষের সামনে ধর্মের কথা পৌঁছানো এবং তার পক্ষে সেই ধর্মে বিশ্বাস করা সম্ভব হওয়া এক জিনিস নয়। কোনো পথ দেখানো হয়েছে বলেই সেই পথে চলার কার্যকর সামর্থ্যও সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত আছে—এটি ধরে নেওয়া যায় না।

সূরা তাকভীরের শেষ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ইবন কাসির বিষয়টি সরাসরি বলেছেন। সেখানে মানুষের ইচ্ছা উল্লেখ করার পরই সেই ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা ও তার সঙ্গে উল্লেখ করা বর্ণনাটি পড়া যাক— [28]

তাফসিরুল কোরআনিল আজিম — ইবন কাসির
সূরা তাকভীর, আয়াত ২৭–২৯-এর ব্যাখ্যা
খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৪০
আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য, “এটি তো বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ ছাড়া আর কিছু নয়”—অর্থাৎ এই কোরআন সমস্ত মানুষের জন্য উপদেশ; তারা এর মাধ্যমে স্মরণ করবে এবং উপদেশ গ্রহণ করবে। “তোমাদের মধ্যে যে সোজা পথে চলতে চায়”—অর্থাৎ যে হেদায়াত চায়, সে যেন এই কোরআন গ্রহণ করে; কারণ এটি তার জন্য মুক্তি ও হেদায়াত, আর এটি ছাড়া হেদায়াত নেই। “আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যদি না বিশ্বজগতের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন”—অর্থাৎ ইচ্ছার বিষয়টি তোমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি যে, যে চাইবে হেদায়াত পাবে এবং যে চাইবে পথভ্রষ্ট হবে; বরং এই সবই বিশ্বজগতের রব আল্লাহর ইচ্ছার অনুসারী।
সুফিয়ান আস-সাওরি, সাঈদ ইবনে আবদুল আজিজের মাধ্যমে সুলায়মান ইবনে মুসা থেকে বর্ণনা করেন: যখন এই আয়াত নাজিল হলো—“তোমাদের মধ্যে যে সোজা পথে চলতে চায়”—তখন আবু জাহল বলল, বিষয়টি আমাদের হাতে; আমরা চাইলে সোজা পথে চলব, আর চাইলে চলব না। তখন আল্লাহ নাজিল করলেন—“আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যদি না বিশ্বজগতের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন।”

এই ব্যাখ্যায় মানুষের ইচ্ছা আছে বলেই সেই ইচ্ছা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে না। ইচ্ছাটি কার মধ্যে ঘটছে এবং সেই ইচ্ছার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—এই দুটি পৃথক প্রশ্ন। মানুষ নিজের মনে কোনো কাজের ইচ্ছা অনুভব করতে পারে; কিন্তু সেই ইচ্ছা গঠিত হওয়া ও কার্যকর হওয়া যদি আরেক সত্তার অপরিহার্য অনুমোদনের অধীন থাকে, তাহলে শুধু ইচ্ছার অনুভূতিকে দেখিয়ে চূড়ান্ত দায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। “আমি চাইছি” কথাটি থেকে “আমার চাওয়ার চূড়ান্ত নির্ধারকও আমি”—এই সিদ্ধান্ত আসে না। বিশেষত যখন ধর্মীয় ব্যাখ্যাই বলে দেয় যে, মানুষ চাইলেই হেদায়াত পেতে পারে না এবং পুরো বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার অনুসারী।

সূরা নাহলের ৯৩ নম্বর আয়াতে এই দ্বন্দ্বটি একই বাক্যের মধ্যে উপস্থিত। প্রথমে বলা হচ্ছে, আল্লাহ চাইলে সবাইকে এক সম্প্রদায় করতে পারতেন; এরপর বলা হচ্ছে, তিনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান পথ দেখান; তারপরই মানুষের কাজের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ইবন কাসিরের সংশ্লিষ্ট আয়াতের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাটি নিচে দেওয়া হলো— [29]

তাফসিরুল কোরআনিল আজিম — ইবন কাসির
সূরা নাহল, আয়াত ৯৩ ও তার ব্যাখ্যা
আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহ চাইলে তোমাদের এক সম্প্রদায় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ দেখান। আর তোমরা যা করতে, সে সম্পর্কে অবশ্যই তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।”
আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ চাইলে তোমাদের”—হে মানুষ—“এক সম্প্রদায় করতে পারতেন।” যেমন তিনি বলেছেন, “তোমার রব চাইলে পৃথিবীতে যারা আছে, তারা সবাই ঈমান আনত” [ইউনুস: ৯৯]। অর্থাৎ তিনি তোমাদের মধ্যে ঐক্য ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি করতেন; মতভেদ, পারস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা রাখতেন না। “তোমার রব চাইলে মানুষকে এক সম্প্রদায় করতে পারতেন। কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে, তাদের ছাড়া যাদের প্রতি তোমার রব দয়া করেছেন; আর এ জন্যই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন” [হুদ: ১১৮–১১৯]। এখানে একইভাবে তিনি বলেছেন, “কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ দেখান।” তারপর কিয়ামতের দিন তোমাদের সমস্ত কাজ সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসা করবেন এবং তার প্রতিদান দেবেন—খেজুরের আঁটির সূতা, ক্ষুদ্র বিন্দু ও পাতলা আবরণের সমান সামান্য বিষয় পর্যন্ত।

এখানে ইনসাফের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। যে সত্তা চাইলে সবাইকে পথ দেখাতে পারেন, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় কাউকে পথভ্রষ্ট করেন, তিনিই আবার সেই পথভ্রষ্ট মানুষের কাজের বিচার করবেন। একজন মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার আগে দেখতে হয়, অভিযোগের বিষয়বস্তু তৈরিতে বিচারকের নিজের কোনো ভূমিকা ছিল কি না। বিচারক নিজেই যদি অভিযুক্তের সৎপথে পৌঁছানোর কার্যকর সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তাহলে বিচারে সেই ভূমিকা উপেক্ষা করা পক্ষপাত। পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা নিজের হাতে রাখা এবং পথভ্রষ্টতার দায় পুরোপুরি অন্যের ওপর চাপানো—এই দুই দাবিকে পাশাপাশি ঘোষণা করলেই তাদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না।

মানুষের কর্মের সৃষ্টি এবং কাফেরের কুফর সম্পর্কে ধ্রুপদী সুন্নি ব্যাখ্যাও এই সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। ইবনে আবিল ইযের শারহুল আকিদা আত-তাহাবিয়ায় বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষের কাজের স্রষ্টা এবং কাফেরের কুফরও তার কার্যকর ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে ধর্মীয় পছন্দের সঙ্গে এই কার্যকর ইচ্ছার পার্থক্য করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আলোচনার শুরুতে ধারাবাহিকভাবে যা বলা হয়েছে, তা পড়া যাক— [30]

শারহুল আকিদা আত-তাহাবিয়া — ইবনে আবিল ইয আল-হানাফি
তাকদীর বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মত
আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ:
তাকদীর বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতবিরোধ সুপরিচিত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অবস্থান হলো: সবকিছু আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীর অনুযায়ী ঘটে এবং আল্লাহ মানুষের কাজের স্রষ্টা। আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি সবকিছু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি” [কামার: ৪৯]। তিনি আরও বলেছেন, “তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং যথাযথভাবে তার পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন” [ফুরকান: ২]। আল্লাহ কাফেরের কাছ থেকে কুফর ইচ্ছা করেন ও চান, কিন্তু তা পছন্দ করেন না এবং ভালোবাসেন না। তিনি তা সৃষ্টিগতভাবে চান, ধর্মীয়ভাবে পছন্দ করেন না।
কাদরিয়া ও মুতাজিলা এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা দাবি করেছে, আল্লাহ কাফেরের ঈমান চেয়েছেন, কিন্তু কাফের কুফর চেয়েছে। তারা এ অবস্থান নিয়েছে যাতে বলতে না হয় যে, আল্লাহ কাফেরের কুফর চেয়েছেন এবং তার জন্য তাকে শাস্তি দিয়েছেন! কিন্তু তারা যেন উত্তপ্ত বালু থেকে বাঁচতে আগুনে আশ্রয় নিয়েছে!
তারা এক বিষয় থেকে পালিয়ে তার চেয়েও খারাপ বিষয়ে পড়েছে! কারণ তাদের বক্তব্য থেকে আবশ্যক হয় যে, কাফেরের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য পেয়েছে। তাদের মতে, আল্লাহ তার ঈমান চেয়েছেন আর কাফের কুফর চেয়েছে; ফলে আল্লাহর ইচ্ছার পরিবর্তে কাফেরের ইচ্ছাই ঘটেছে! এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট বিশ্বাস; এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, বরং এটি প্রমাণের বিরোধী।

এই ব্যাখ্যায় “আল্লাহ কুফর পছন্দ করেন না” বলা হলেও কুফর ঘটার কার্যকর ইচ্ছা তার কাছেই রাখা হয়েছে। পছন্দ না করা এবং ঘটতে নির্ধারণ করা আলাদা বিষয়; প্রথমটি দিয়ে দ্বিতীয়টির নৈতিক দায় দূর হয় না। কেউ কোনো কাজকে মুখে অপছন্দ করলেন, অথচ সেই কাজ ঘটার ব্যবস্থা নিজেই নির্ধারণ করলেন এবং কাজটি তার নির্ধারণ ছাড়া ঘটতেই পারত না—তাহলে তার অপছন্দের ঘোষণা তাকে কার্যকারণ ও নৈতিক আলোচনার বাইরে রাখে না। এখানে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মানুষ আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার বাইরে যেতে পারবে—এমন অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে আল্লাহর ক্ষমতা রক্ষার জন্য। কিন্তু সেই ক্ষমতা রক্ষা করতে গিয়ে মানুষের পক্ষে ভিন্ন ফল ঘটানোর স্বাধীন সুযোগটিই সংকুচিত করা হচ্ছে। এরপরও মানুষকে সম্পূর্ণ দায়ী করার জন্য আলাদা যুক্তি প্রয়োজন; শুধু দায়ী ঘোষণা করা সেই যুক্তির বিকল্প নয়।

বিশ্বাস ও নৈতিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার অসাম্য আরও প্রকট। যে হেদায়াত পায়, তার সাফল্য আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের ফল; যে পথভ্রষ্ট হয়, তার ব্যর্থতার শাস্তি তার নিজের। অথচ আলোচিত উৎসগুলোয় হেদায়াত এবং পথভ্রষ্টতা—দুটির ওপরই আল্লাহর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে। আল্লাহর নির্ধারণে সাফল্য ঘটলে তার কৃতিত্ব স্বীকার করা হবে, কিন্তু একই নির্ধারণে ব্যর্থতা ঘটলে নির্ধারকের ভূমিকা আড়াল করে পুরো দায় সৃষ্টির ওপর চাপানো হবে—এটি ইনসাফের সমান মানদণ্ড নয়। মানুষের দায়ের প্রশ্ন উঠলে তার ইচ্ছার কথা বলা, আর আল্লাহর ক্ষমতার প্রশ্ন উঠলে সেই ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ অধীন বলে ঘোষণা করা—এই দুই বক্তব্যের মধ্যকার সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে। শুধু দুটিতে বিশ্বাস করতে বললে তাদের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।

কোরআন ও তাফসিরের সংশ্লিষ্ট আরও দলিল পাওয়া যাবে তাকদীর বিষয়ে কোরআন ও তাফসির কী বলে? প্রবন্ধে। মানুষের কাজের সৃষ্টি, পাপ-পুণ্যের নির্ধারণ এবং হেদায়াত-পথভ্রষ্টতার ওপর ঐশ্বরিক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে আকিদা-গ্রন্থগুলোর বক্তব্য একত্রে পড়তে ইসলামি ধ্রুপদী আকীদা গ্রন্থে তাকদীর: আল্লাহর ইচ্ছা, মানুষের কর্ম ও নৈতিক দায় প্রবন্ধটি দেখা যেতে পারে। এই উৎসগুলোকে ইনসাফের মানদণ্ডে বিচার করলে কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি একই থাকে: যে সত্তা পরিণতি নির্ধারণ করেন, সেই পরিণতির কাজ করিয়ে নেন এবং হেদায়াতের কার্যকর সুযোগও নিজের হাতে রাখেন, তিনি নিজের ভূমিকার কোনো বিচার ছাড়াই সৃষ্টিকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার পান কীভাবে? এমন ব্যবস্থাকে ন্যায়বিচার বলার জন্য ক্ষমতার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; শাস্তির ন্যায্য ভিত্তি দেখাতে হবে।


অপরাধ ছাড়াই শাস্তি ও অন্যের কাজের দায়

ইনসাফের একটি মৌলিক শর্ত হলো, যে ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তার নিজের কোনো দায়যোগ্য কাজ থাকতে হবে। জন্মের সময় পাওয়া পরিচয়, ভবিষ্যতে সে কী করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে, কিংবা তার মৃত্যুর পরে অন্য কেউ কী করছে—এসবকে তার নিজের সংঘটিত অপরাধের জায়গায় বসানো যায় না। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে অন্যের রক্তের সম্পর্ক বা ধর্মীয় পরিচয়ের সম্পর্ক থাকলেই অপরাধের দায় এক দেহ থেকে আরেক দেহে চলে যায় না। কিন্তু ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনায় এমন কয়েকটি পরিস্থিতি পাওয়া যায়, যেখানে শাস্তির সঙ্গে ব্যক্তির নিজের কাজের সম্পর্ক অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, কখনো সরাসরি প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই পরিচ্ছেদে জন্মগত কুফরের বর্ণনা, অপরাধ ঘটার আগেই বালক হত্যা, হত্যার শিকার কন্যার জাহান্নামে যাওয়ার ঘোষণা এবং অন্যের কাজের সঙ্গে শাস্তি যুক্ত করার বক্তব্যগুলো পরীক্ষা করা হবে।


জন্মগতভাবে কাফির?

কোরআনের মূসা ও খিজিরের কাহিনির সূত্র ধরে সহীহ মুসলিমে একটি বালককে হত্যার বর্ণনা রয়েছে। বালকটি অন্য বালকদের সঙ্গে খেলছিল; খিজির তাকে হত্যা করেন। মূসা তখন প্রশ্ন করেন, কোনো প্রাণের বিনিময় ছাড়াই একটি নিষ্পাপ প্রাণকে কেন হত্যা করা হলো। হত্যার ব্যাখ্যায় পরে বলা হয়, বালকটি জন্মগতভাবে কাফির ছিল এবং বেঁচে থাকলে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফরির দিকে নিয়ে যেত। অর্থাৎ এখানে হত্যার কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে এমন একটি ভবিষ্যৎ, যা তখনও ঘটেনি। বালকটি তখন তার পিতামাতাকে কুফরিতে বাধ্য করেনি; কিন্তু সেই অনঘটিত কাজের কারণেই তার জীবন শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। যে কাজ একজন মানুষ এখনও করেনি, সেই কাজের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে তার বর্তমান মৃত্যুর ন্যায্যতা বানানো ইনসাফ হয় কীভাবে? প্রথমে সংক্ষিপ্ত বর্ণনাটি পড়া যাক— [31]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৭। তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রত্যেক শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মানোর মর্মার্থ এবং কাফির ও মুসলিমদের মৃত শিশুর বিধান
৬৬৫৯-(২৯/২৬৬১) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ ইবনু কা’নাব (রহঃ) ….. উবাই ইবনু কা’ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই যে ছেলেটিকে খাযির (আঃ) (আল্লাহর আদেশে) হত্যা করেছিলেন তাকে কফিরের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদি সে জীবিত থাকত তাহলে সে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফুরী করতে বাধ্য করত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫২৫, ইসলামিক সেন্টার ৬৫৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)

এই বর্ণনার “কাফিরের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল” কথাটি ইনসাফের প্রশ্নে আরও গভীর সমস্যা তৈরি করে। কোনো মানুষের জন্মগত স্বভাব তার নিজের নির্বাচিত কাজ নয়। সে কোন মানসিক গঠন, কোন প্রবণতা এবং কোন পরিবেশ নিয়ে জন্মাবে, তার ওপর জন্মের আগে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ধর্মীয় বর্ণনায় যদি সেই স্বভাবের স্রষ্টা আল্লাহ হন, তাহলে জন্মগত কুফরকে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে সেই স্বভাব সৃষ্টি করার দায়টি বাদ দেওয়া যায় না। তার জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলারও আগে এখানে ঘটে যাওয়া হত্যাটির বিচার করতে হবে। বালকটিকে নিজের জীবন যাপন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আগেই মেরে ফেলা হয়েছে। তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ বর্ণনায় রাখা হয়নি; রাখা হয়েছে তাকে সরিয়ে অন্য সন্তান দেওয়ার কথা।

সহীহ মুসলিমের দীর্ঘ বর্ণনায় ঘটনাটি আরও বিস্তারিত এসেছে। সেখানে মূসার আপত্তি, খিজিরের কাজ এবং শেষে বালকটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেওয়া ব্যাখ্যা একসঙ্গে পাওয়া যায়। পুরো বর্ণনাটি পড়া যাক— [32]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৪২. খিযির (আঃ) এর ফযীলত
৫৯৪৯। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল আলা কায়সী (রহঃ) … সাঈদ ইবনু যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বলা হলো, নাওফ দাবি করে যে, মূসা (আলাইহিস সালাম) যিনি জ্ঞান অন্বেষণে বের হয়েছিলেন। তিনি বনী ইসরাঈলের মূসা নন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, হে সাঈদ, তূমি কি তাকে এটা বলতে শুনেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, নাওফ মিথ্যা বলেছে। কেননা উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মূসা (আলাইহিস সালাম) একদা তার জাতির সামনে আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত এবং তাঁর শাস্তি পরীক্ষাসমূহ স্মরণ করিয়ে নসীহত করছিলেন। (কথা প্রসঙ্গে কারো প্রশ্নের জবাবে) তিনি বলে ফেললেন, পৃথিবীতে আমার চেযে উত্তম এবং বেশি জ্ঞানী কোন ব্যক্তি আছে বলে আমরে জানা নেই।
রাবী বলেন। আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) এর প্রতি ওহী পাঠালেনঃ আমি জানি তার (মূসা) থেকে উত্তম কে বা কার কাছে কল্যাণ রয়েছে। অবশ্যই পৃথিবীতে আরো ব্যক্তি আছে যে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আয় রব্ব! আমাকে তার পথ বাতলিয়ে দিন। তাকে বলা হলো লবণাক্ত একটি মাছ সঙ্গে নিয়ে যাও। যেখানে এ মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই সে ব্যক্তি। মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর খাদিম রওনা হলেন, অবশেষে তাঁরা একটি বিশাল পাথরের কাছে পৌছলেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর সাথীকে রেখে অগোচরে চলে গেলেন। এরপর মাছটি নড়েছরে পানিতে চলে গেল এবং পানিও খোপের মত হয়ে গেল মাছের পথে মিলিত হল না।
মূসা (আলাইহিস সালাম) এর খাদিম বললেন, আচ্ছা আমি আল্লাহর নাবীর সাথে মিলিত হয়ে তাঁকে এ ঘটনা বলবো। পরে তিনি ভুলে গেলেন। যখন তারা আরো সামনে অগ্রসর হলেন, তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমার নাশতা দাও, এ সফরে তো আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যতক্ষন তারা এ স্থানটি অতিক্রম করেন নি, ততক্ষণ তাদের ক্লান্তি আসে নি।
রাবী বলেন, তাঁর সাথীর যখন স্মরণ হল, এবং সে বলল, আপনি কি জানেন যখন আমরা পাথরে আশ্রয় নিয়েছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গেছি। আর শয়তানই আমাকে আপনার কাছে বলার কখা ভুলিয়ে দিয়েছে এবং বিস্ময়করভাবে মাছটি সমুদ্রে তার পথ করে নিয়েছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ-ই তো ছিল আমাদের উদ্দীষ্ট। অতএব তাঁরা পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চললেন। তখন তার খাদিম মাছের স্থানটি তাকে দেখালো।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ স্থানের বিবরনই আমাকে দেওয়া হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) খুজতে লাগলেন, এমন সময় তিনি বস্ত্রাবৃত খিযির (আলাইহিস সালাম) কে গ্রীবার উপর চিৎ হয়ে শায়িত দেখতে পেলেন। অথবা (অন্য বর্ননায়) সোজাসুজি গ্রীবার উপর। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আসসালামু আলাইকুম। খিযির (আলাইহিস সালাম) মুখ খেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, ওয়া আলাইকুম সালাম, তুমি কে? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি মূসা। তিনি বললেন, কোন মূসা? মূসা (আলাইহিস সালাম) উত্তর দিলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, কোন মহান ব্যাপারই আপনাকে নিয়ে এসেছে? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি এসেছি যেন আপনাকে যে সৎজ্ঞান দান করা হয়েছে, তা থেকে কিছু আপনি আমায় শিক্ষা দেন।
খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমার সঙ্গে আপনি ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হবেন না। আর কেমন করে আপনি ধৈর্য ধারণ করবেন এমন বিষয়ে, যার জ্ঞান দেওয়া হয় নি। এমন বিষয় হতে পারে যা করতে আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, আপনি যখন তা দেখবেন, তখন আপনি সবর করতে পারবেন না। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আমি আপনার কোন নির্দেশ অমান্য করব না।
খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি যদি আমার অনুগামী হন তবে আমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না যতক্ষণ না আমি নিজেই এ বিযয়ে উল্লেখ করি। এরপর উভয়ই চললেন, অবশেষে তারা একটি নৌকায় চড়লেন। (খিযির (আলাইহিস সালাম) তখন( তা ছিদ্র করলেন অর্থাৎ তাতে (একটি তক্তায়) সজোরে চাপ দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি কি নৌকাটি ভেঙ্গে ফেলেছেন, আরোহীদের ডুবিয়ে দেয়ার জন্যে? আপনি তো বড় আপত্তিকর কাজ করেছেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হবেন না? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি ভুলে গিয়েছি, আমাকে আপনি দোষী করবেন না। আমার বিষয়টিকে আপনি কঠোরতাপূর্ণ করবেন না।
আবার দু’জন চলতে লাগলেন। এক জায়গায় তাঁরা বালকদের পেলেন যারা খেলা করছে খিযির (আলাইহিস সালাম) অবলীলাক্রমে একটি শিশুর কাছে গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। এতে মূসা (আলাইহিস সালাম) খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, আপনি প্রাণের বিনিময় ব্যতীত একটি নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করলেন? বড়ই গর্হিত কাজ আপনি করেছেন। এ স্থলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহর রহমত বর্ষণ করুন আমাদের ও মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর। তিনি যদি তাড়াহুড়া না করতেন তাহলে আরো বিস্ময়কর ঘটনা দেখতে পেতেন। কিন্তু তিনি সহযাত্রী (খিযির (আলাইহিস সালাম)) এর সামনে লজ্জিত হয়ে বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোন প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমায় সঙ্গে রাখবেন না। তখন আপনি আমার ব্যাপারে অবশ্যই চূড়ান্ত অভিযোগ করতে পারবেন (এবং দায়মুক্ত হবেন)।
যদি মূসা (আলাইহিস সালাম) ধৈর্য ধরতেন, তাহলে আরো বিস্ময়কর বিষয় দেখতে পেতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন নাবীর উল্লেখ করতেন, প্রথমে নিজকে দিয়ে শুরু করতেন, বলতেন, আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন এবং আমার অমুক ভাইয়ের উপরও। এভাবে নিজেদের উপর আল্লাহর রহমত কামনা করতেন।
তারপর উভয়ে চললেন এবং ইতর লোকের একটি জনপদে গিয়ে উঠলেন। তাঁরা লোকদের বিভিন্ন সমাবেশে ঘুরে তাদের কাছে খাবার চাইলেন। তারা তাঁদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। এরপর তাঁরা একটি পতনোন্মুখ দেয়াল পেলেন। তিনি (খিযির (আলাইহিস সালাম)) সেটি ঠিকঠাক করে দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি চাইলে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, এবার আমার আর আপনার মধ্যে বিচ্ছেদ (এর পালা)।
খিযির (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাপড় ধরে বললেন, আপনি যেসব বিষয়ের উপর অধৈর্য হয়ে পড়েছিলে সে সবের তাৎপর্য বলে দিচ্ছি।
‘নৌকাটি ছিল কতিপয় গরীব লোকের যারা সমুদ্রে কাজ করতো’– আয়াতের শেষ পর্যন্ত। তারপর যখন এটাকে দখলকারী লোক আসলো তখন ছিদ্রযুক্ত দেখে ছেড়ে দিল। এরপর তারা একটা কাঠ দিয়ে নৌকাটি ঠিক করে নিলো। আর বালকটি সৃষ্টিতেই ছিল জন্মগত কাফির। তার মা-বাবা তাকে বড়ই স্নেহ করতো। সে বড় হলে ওদের দুজনকেই অবাধ্যতা ও কুফরির দিকে নিয়ে যেতো। সুতরাং আমি ইচ্ছে করলাম, আল্লাহ যেন তাদেরকে এর বদলে আরো উত্তম, পবিত্র স্বভাবের ও অধিক দয়াপ্রবন ছেলে দান করেন। ‘আর দেয়ালটি ছিল শহরের দুটো ইয়াতীম বালকের’ আয়াতের শেষ পর্যন্ত (সূরা কাহফঃ ৬০-৮২)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)

এই কাহিনিতে মূসার আপত্তিটি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রশ্ন: নিহত ব্যক্তির এমন কী কাজ ছিল, যার জন্য তার প্রাণ নেওয়া হবে? উত্তরে তার সংঘটিত অপরাধের তালিকা দেওয়া হয়নি; দেওয়া হয়েছে সে বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে কী করত, সেই দাবি। কিন্তু কোনো ঘটনার পূর্বজ্ঞান থাকলেও সেই ঘটনাকে ইতিমধ্যে সংঘটিত অপরাধ বানানো যায় না। একজন ব্যক্তি ভবিষ্যতে অন্যায় করবে বলে তাকে আগেই হত্যা করা হলে, তাকে সংশোধিত হওয়ার, ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। আর যদি বলা হয় তার ভবিষ্যৎ কোনোভাবেই বদলাতে পারত না, তাহলে আগের পরিচ্ছেদের প্রশ্নটিই ফিরে আসে: যার ভবিষ্যৎ নিজে বদলানোর ক্ষমতা নেই, তাকে সেই নির্ধারিত ভবিষ্যতের জন্য দায়ী করা হয় কোন যুক্তিতে?

একই ঘটনার আরেকটি পূর্ণ বর্ণনায় হত্যার পদ্ধতিও উল্লেখ আছে। মূল আলোচনার সঙ্গে এই বর্ণনাটিও পড়া প্রয়োজন— [33]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৪২. খিযির (আঃ) এর ফযীলত
৫৯৪৮। আমর ইবনুু মুহাম্মাদ আন-নাকিদ, ইসহাক ইবনু ইবরাহীম হানযালী, উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ও মুহাম্মাদ ইবনু আবূ উমর মাক্কী (রহঃ) … সাঈদ ইবনু জুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, নাওফ বিকালী বলেন যে, বনী ইসরাঈলের নাবী মূসা খিযির (আলাইহিস সালাম) এর সাথী মূসা নন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। আমি উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) থেকে শুনেছি, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) বনী ইসরাঈলের মধ্যে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বড় আলিম? তিনি উত্তর দিলেন, আমি সবচেয়ে বড় আলিম। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। কারণ মূসা (আলাইহিস সালাম) জ্ঞানকে আল্লাহর প্রতি ন্যস্ত করেননি।
অতঃপর আল্লাহর তার ওহী পাঠালেন যে, দু’সাগরের সঙ্গম স্থলে আমার বান্দাদের মধ্যে এক বান্দা আছে, যে তোমার চেয়েও অধিক জ্ঞানী। মূসা (আলাইহিস সালাম) প্রশ্ন করলেন আয় রব্ব! আমি কী করে তাঁকে পাব? তাঁকে বলা হলো, থলের ভেতর একটি মাছ নাও। মাছটি যেখানে হারিয়ে যাবে, সেখানেই তাঁকে পাবে। তারপর তিনি রওনা হলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর খাদিম ইউশা ইবনু নূনও চললেন এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) একটি মাছ থলিতে নিয়ে নিলেন।
তিনি ও তাঁর খাদিম চলতে চলতে একটি বিশাল পাথরের কাছে উপস্থিত হলেন। এখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁবু সাথীও ঘুমিয়ে পড়ল। মাছটি নড়েচড়ে থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়লো। এদিকে আল্লাহ তা’আলা পানির গতিরোধ করে দিলেন। এমনকি তা একটি খোপের মত হয়ে গেল এবং মাছটির জন্য একটি সুড়ঙ্গের মতো হয়ে গেল। মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তার খাদিমের জন্য এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার হল।
এরপর তাঁরা আবার দিন-রাতভর চললেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাথী খবরটি দিতে ভুলে গেলো। যখন সকাল হলো, মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর খাদিমকে বললেন, আমাদের নাশতা বের কর। আমরা তো এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আদেশকৃত (নির্ধারিত) স্থান অতিক্রম না করা পর্যন্ত তাঁরা ক্লান্ত হন নি। খাদিম বলল, আপনি কি জানেন, যখনই আমরা পাথরের উপর আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছের কথাটি ভুলে যাই, আর শয়তানই আমাকে আপনাকে বলার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে মাছটি সমুদ্রে তার নিজের পথ করে চলে গেল।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ জায়গাটই তো আমরা খুজছি। অতঃপর উভয়েই নিজ নিজ পদচিহ্ন অনুসরণ করে পাথর পর্যন্ত পৌছলেন। সেখানে (পানির উপরে ভাসমান অবস্থায়) চাঁদরে আচ্ছাদিত একজন লোক দেখতে পেলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম দিলেন। খিযির বললেন, তোমার এ দেশে সালাম কোত্থেকে? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি মূসা। তিনি প্রশ্ন করলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। খিযির বললেন, আল্লাহ তার জ্ঞানের এমন এক ইলম আপনাকে দিয়েছেন যা আমি জানি না। আর আল্লাহ তাঁর জ্ঞানের এমন এক ইলম আমাকে দিয়েছেন যা আপনি জানেন না।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি আপনার সাথে থাকতে চাই যেন আপনাকে প্রদত্ত জ্ঞান আমাকে দান করেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। আর কী করে ধৈর্য ধারণ করবেন, ঐ বিষয়ের উপর যা সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত নন? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আপনার কোন নির্দেশ আমি অমান্য করব না। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আচ্ছা আপনি যদি আমার অনুসরণ করেন, তবে আমি নিজে কিছু উল্লেখ না করা পর্যন্ত কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আাচ্ছা।
খিযির এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) উভয়ে সমুদ্র তীর ধরে চলতে লাগলেন। সম্মুখ দিয়ে একটি নৌকা আসল। তারা নৌকাওয়ালাকে তাঁদের তুলে নিতে বললেন। তারা খিযির (আলাইহিস সালাম) কে চিনে ফেললো, তাই দু’জনকেই বিনা ভাড়ায় তুলে নিল। এরপর খিযির (আলাইহিস সালাম) নৌকার একটি তক্তার দিকে লক্ষ্য করলেন এবং তা উঠিয়ে ফেললেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এরা তো এমন লোক যে, আমাদের বিনা ভাড়ায় নিয়েছে আর আপনি তাদের নৌকাটি ছিদ্র করে দিলেন যাতে নৌকা ডুবে যায়? আপনি তো সাংঘাতিক কাজ করেছেন! খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি কি আপনাকে বলি নি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে সক্ষম হবেন না? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমার এ ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিবেন। আর আমাকে কঠিন অবস্থায় ফেলবেন না। তারপর নৌকার বাইরে এলেন এবং উভয়ে সমুদ্র তীর ধরে চলতে লাগলেন।
হঠাৎ একটি বালকের সম্মুখীন হলেন, যে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করছিল। খিযির (আলাইহিস সালাম) তার মাথাটি হাত দিয়ে ধরে ছিঁড়ে ফেলে হত্যা করলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি কোন প্রাণের বিনিময় ছাড়াই একটা নিষ্পাপ প্রাণকে শেষ করে দিলেন? আপনি তো বড়ই খারাপ কাজ করলেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি কি আপনাকে বলি নি যে, আমার সাথে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম হবেন না? রাবী বলেন, আর এ ভুল প্রথমটার চেয়ে আরো গুরুতর। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আচ্ছা, এরপর যদি আর কিছু সম্পর্কে প্রশ্ন করি, তাহলে আমাকে সাথে রাখবেন না। নিঃসন্দেহে আমার ব্যাপারে আপনার আপত্তি চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
এরপর উভয়েই চলতে লাগলেন এবং একটি গ্রামে পৌঁছে গ্রামবাসীর কাছে খাবার চাইলেন। তারা তাঁদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করলো। তারপর তাঁরা একটি দেয়াল পেলেন, যেটি ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে অর্থাৎ ঝুঁকে পড়েছে। খিজির (আলাইহিস সালাম) আপন হাতে সেটি ঠিক করে সোজা করে দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমরা এ সম্প্রদায়ের কাছে এলে তারা আমাদের মেহমানদারী করে নি এবং খেতে দেয় নি। আপনি চাইলে এদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারতেন? খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, এবার আমার ও আপনার মাঝে বিচ্ছেদের পালা।
এখন আমি আপনাকে এসবের তাৎপর্য বলছি, যে সবের উপর আপনি ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হন নি (সূরা কাহফঃ ৬০-৮২)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর রহম করুন, আমার আকাঙ্ক্ষা হয় যে, যদি তিনি ধৈর্যধারণ করতেন, তাহলে আমাদের কাছে তাঁদের আরো ঘটনাসমূহের বিবরণ দেওয়া হতো।
রাযী বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রথমটা মূসা (আলাইহিস সালাম) ভুলে যাওয়ার কারণে করেছিলেন। এও বলেছেন, একটি চড়ুই এসে নৌকার পার্শ্বে বসে সমুদ্রে চঞ্চু মারল। তখন খিযির (আলাইহিস সালাম) মূসাকে বলেন, আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় এতই কম, যতখানি সমূদ্রের পানি থেকে এ চড়ুইটি কমিয়েছে।
সাঈদ জ্যুায়র বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) পড়তেনঃوَكَانَ أَمَامَهُمْ مَلِكٌ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ صَالِحَةٍ غَصْبًا (এদের সম্মুখে একজন বাদশাহ ছিল, যে সমস্ত ভালো নৌকা কেড়ে নিতো) তিনি আরো পড়তেনঃوَأَمَّا الْغُلاَمُ فَكَانَ كَافِرًا (আর সে বালকটি ছিল কাফির)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)

পিতামাতার বিশ্বাস রক্ষার জন্য সন্তানকে হত্যা এবং তার বদলে “উত্তম” সন্তান দেওয়ার যুক্তিতে নিহত বালকটির নিজস্ব অধিকার কোথায়? একজন সন্তান আরেকজন সন্তানের বদলি বস্তু নয়। নতুন সন্তান পাওয়া আগের সন্তানের জীবন কেড়ে নেওয়ার অন্যায় মুছে দেয় না। এখানে পিতামাতার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অথচ যার জীবন শেষ করে দেওয়া হলো, তার বাঁচার অধিকার সেই কল্যাণের নিচে রাখা হচ্ছে। আরও প্রশ্ন হলো, সর্বশক্তিমান সত্তা যদি পিতামাতাকে রক্ষা করতে চান, তাহলে বালকটিকে হত্যা করানোর বদলে তার ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকাতে, তার স্বভাব সংশোধন করতে অথবা তাকে সৎপথ দেখাতে পারেন না কেন? নিজের সৃষ্টি করা সমস্যার সমাধান হিসেবে একটি প্রাণ ধ্বংস করাকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে হলে শুধু ঐশ্বরিক আদেশের দাবি যথেষ্ট নয়।

নববীর ব্যাখ্যায় এই ঘটনাকে আল্লাহর নির্ধারণ এবং মানুষের অন্তরের ওপর তার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ব্যাখ্যার একটি সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— [34]

শারহু সহীহ মুসলিম — ইমাম নববী
খিজিরের ফযীলত প্রসঙ্গে
মূল আরবি:
والحق الذي لا شك فيه أن الله تعالى يفعل ما يشاء من الخير والشر ، لا يسأل عما يفعل ، وهم يسألون وكما قال تعالى في الذر : ” هؤلاء للجنة ولا أبالي ، وهؤلاء للنار ، ولا أبالي ” فالذين قضى لهم بالنار طبع على قلوبهم ، وختم عليها ، وغشاها ، وأكنها ، وجعل من بين أيديها سدا ، ومن خلفها سدا وحجابا مستورا ، وجعل في آذانهم وقرا ، وفي قلوبهم مرضا لتتم سابقته فيهم ، وتمضي كلمته ، لا راد لحكمه ، ولا معقب لأمره وقضائه . وبالله التوفيق .
বাংলা অনুবাদ:
নিঃসন্দেহ সত্য হলো, আল্লাহ ভালো-মন্দ যা চান করেন; তাঁর কাজ সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় না, কিন্তু তাদের প্রশ্ন করা হয়। আদিম বংশধরদের বিষয়ে যেমন বলা হয়েছে: “এরা জান্নাতের জন্য, আমি পরোয়া করি না; এরা জাহান্নামের জন্য, আমি পরোয়া করি না।” যাদের জন্য তিনি জাহান্নাম নির্ধারণ করেছেন, তাদের অন্তরে মোহর দিয়েছেন, আবৃত ও আচ্ছাদিত করেছেন; সামনে-পেছনে বাধা ও আড়াল রেখেছেন। তাদের কানে বধিরতা ও অন্তরে রোগ রেখেছেন, যাতে পূর্বনির্ধারণ সম্পন্ন হয় এবং তাঁর কথা কার্যকর হয়। তাঁর ফয়সালা প্রতিরোধকারী বা তাঁর আদেশ ও নির্ধারণ পরিবর্তনকারী কেউ নেই। আল্লাহই তৌফিকদাতা।

এই ব্যাখ্যায় মানুষের অন্তরে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে পূর্বনির্ধারিত ফল সম্পন্ন করার জন্য; আবার সেই নিয়ন্ত্রকের কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকারও অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি ইনসাফের যুক্তি নয়, কর্তৃত্বের ঘোষণা। বিচারকের নিজের সৃষ্টি করা স্বভাব, আরোপ করা বাধা এবং বাস্তবায়িত করা নির্ধারণকে বিচার থেকে বাদ দিয়ে শুধু সৃষ্টির কাজকে বিচারের বিষয় বানালে দায় নির্ধারণ অসম্পূর্ণ থাকে। ক্ষমতাবান যা করেন, তা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না—এই নিয়ম ক্ষমতাবানের দায়মুক্তি প্রতিষ্ঠা করে; তার কাজের ন্যায়সঙ্গততা প্রতিষ্ঠা করে না।


খুন হওয়া শিশুরা কোথায় যাবে?

জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যার ক্ষেত্রে অপরাধী এবং ভুক্তভোগীর পার্থক্য আরও স্পষ্ট। যে হত্যা করেছে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে; যে নিহত হয়েছে, সে হত্যার শিকার। কিন্তু আবু দাউদের নিচের বর্ণনায় জীবন্ত কবরদাতা এবং জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যা—উভয়কেই জাহান্নামী বলা হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু হত্যাকারীর শাস্তি নিয়ে নয়; হত্যার শিকারকে একই পরিণতির অংশ করা নিয়ে। অসহায় অবস্থায় প্রাণ হারানো শিশুর নিজের পাপ-পুণ্যের হিসাব কোথায়? তার ওপর সংঘটিত অপরাধকে তার নিজের বিরুদ্ধে শাস্তির কারণ বানানো হচ্ছে কেন? বর্ণনাটি পড়ি— [35]

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে।
৪৬৪২. ইব্‌রাহীম ইবন মূসা (রহঃ) ….. আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জীবন্ত প্রথিত কন্যা এবং তার মা- উভয়ই জাহান্নামী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ শা‘বী (রহঃ)

এই বক্তব্যের নৈতিক সংকট বাংলা ব্যাখ্যাতেও দৃশ্যমান। সেখানে হত্যাকারীর জাহান্নামে যাওয়ার কারণ স্পষ্ট বলা হয়েছে, কিন্তু নিহত কন্যার জাহান্নামে যাওয়ার কারণ স্পষ্ট নয় বলে স্বীকার করা হয়েছে। এরপর যুক্তি দিয়ে সমস্যাটি সমাধান করার বদলে নীরব থাকার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ ব্যাখ্যাটি পড়া যাক— [36]

১০৫। হযরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: নিজের মেযে সন্তানকে যে নারী জীবিত কবর দেয় এবং যে মেয়েকে কবর দেয়া হয়, উভয়ই জাহান্নামী (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
ব্যাখ্যা: আরবে জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত পুতে ফেলার অমানবিক নিষ্ঠুর প্রথা জারী ছিলো। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ইসলামের আলো বিকশিত হবার পর এই জুলুম ও জিহালতের অন্ধকার দূর হয়ে যায়। এই হাদীসে এই নিষ্ঠুর আচরণের উপর এই শাস্তি দেবার কথা বলা হয়েছে। সাধারণত ভরণপোষণ ও অকুলীন পরিবারে বিয়ে দেবার ভয়ে মেয়েরাই অর্থাৎ মায়েরা একাজ করতো। এই হাদীসে তাই মেয়ে লোকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা কবর দিতো। তারা তো জাহান্নামে যাবার কারণ স্পষ্ট। কিন্তু যাদের কবর দেওয়া হতো অর্থাৎ কন্যারা তারা জাহান্নামে যাবে কেনো তা স্পষ্ট নয়। মুহাদ্দিসগণ এ ব্যাপারে খামুশ থাকাই ভালো মনে করেছেন।

ইসলামে ইনসাফ 1

“কেন” প্রশ্নের উত্তর নেই বলে চুপ থাকতে বলা কোনো নৈতিক ব্যাখ্যা নয়। ধর্মের কোনো বক্তব্যকে ইনসাফের উদাহরণ হিসেবে হাজির করলে তার ন্যায্যতা দেখানোর দায়ও নিতে হবে। নিহত শিশুর নিজের অপরাধ কী, সে কী বুঝত, কী সিদ্ধান্ত নিতে পারত এবং কোন কাজের দায় তার ওপর বর্তায়—এসব প্রশ্ন বাদ দিয়ে শুধু জাহান্নামের ঘোষণা মেনে নেওয়া ন্যায়বিচারের পরীক্ষা নয়। ভুক্তভোগীর শাস্তির কারণ অস্পষ্ট থাকা অবস্থায় প্রশ্ন নিষিদ্ধ করা সেই শাস্তিকে ন্যায়সঙ্গত করে না; অন্যায়ের কারণ অনুসন্ধান বন্ধ করে। কোনো ধর্মগ্রন্থ বা ব্যাখ্যাকারীর মর্যাদা এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর হয়ে যেতে পারে না।

এই বয়সের ব্যাখ্যা ইবন কায়্যিম প্রত্যাখ্যান করেছেন। সংশ্লিষ্ট সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদটি পড়া যাক— [37]

আহকামু আহলিয যিম্মাহ — ইবন কায়্যিম
জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যার বয়স প্রসঙ্গে
মূল আরবি:
قلت : وهذا الجواب في غاية الضعف ، ولا يجوز أن ينسب إلى رسول الله – صلى الله عليه وسلم – أنه سئل عن موءودة لم تبلغ الحنث ، فأجاب عمن بلغت الحنث ، بل إنما خرج جوابه – صلى الله عليه وسلم – لنفس ما سئل عنه ، فكيف ينسب إليه أنه ترك الجواب عما سئل عنه ، وأجاب عما لم يسأل عنه موهما أنه المسئول عنه ، ولم ينبه السائل ؟ ! هذا لا يظن برسول الله – صلى الله عليه وسلم – أصلا .
বাংলা অনুবাদ:
আমি বলি, এই উত্তর অত্যন্ত দুর্বল। আল্লাহর রাসূলের প্রতি এমন কথা আরোপ করা যায় না যে, তাঁকে পাপের বয়সে না-পৌঁছানো জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অথচ তিনি পাপের বয়সে পৌঁছানো কারও বিষয়ে উত্তর দিয়েছেন। বরং তাঁর উত্তর ছিল ঠিক সেই বিষয় সম্পর্কে, যা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। কীভাবে তাঁর প্রতি আরোপ করা হয় যে, তিনি জিজ্ঞাসিত বিষয়ের উত্তর না দিয়ে এমন বিষয়ের উত্তর দিলেন, যা জিজ্ঞাসা করা হয়নি; অথচ প্রশ্নকারীকে সতর্কও করলেন না এবং এমন ধারণা দিলেন যে এটাই প্রশ্নের উত্তর? আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে এমন ধারণা একেবারেই করা যায় না।

ইবন কায়্যিম বর্ণনাটিকে নির্দিষ্ট ঘটনাসংক্রান্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন, যদিও তার ব্যাখ্যা হাদিসের স্পষ্ট নসের সাথে মেলে না। তারপরেও যদি ধরে নিই, সেই নির্দিষ্ট ঘটনার ব্যাখ্যাতেও নৈতিক প্রশ্নটি দূর হয় না। সব শিশুকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না বলে একটি শিশুকে বিনা দায়ে শাস্তি দেওয়া ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। একজন ভুক্তভোগীকে কেন জাহান্নামী বলা হলো, সেই ব্যক্তির নিজের কোন কাজ তার শাস্তির ভিত্তি—এটিই প্রমাণ করতে হবে। অন্যায়ের পরিধি ছোট করা এবং অন্যায়কে ন্যায়সঙ্গত করা এক বিষয় নয়। এখানে হত্যাকারীর দায়ের পাশাপাশি নিহত ব্যক্তির নিজস্ব নির্দোষ অবস্থাও বিচারের কেন্দ্রে থাকতে হবে।


অন্যের কৃতকর্মের দায়

কেউ যদি অন্যের কোনো কাজের জন্য কাউকে শাস্তি দেয়, সেটি কীভাবে ইনসাফ হতে পারে? কলিমুদ্দীনের কোনো কাজের ভিত্তিতে তার আত্মীয় আক্কাসউদ্দীনকে শাস্তি দেওয়া হলে, আত্মীয়তার সম্পর্ক সেই শাস্তিকে ন্যায্য করে না। আক্কাসউদ্দীন ওই কাজের নির্দেশদাতা, প্ররোচনাকারী অথবা অংশীদার হলে তার নিজের ভূমিকার জন্য দায় থাকতে পারে। কিন্তু অন্যের কাজের সঙ্গে তার কোনো দায়যোগ্য সম্পর্ক না থাকলে শুধু সম্পর্কের কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া অন্যায়। মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট, কারণ মৃত্যুর পরে জীবিত আত্মীয়রা কী করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার নেই। নিচের বর্ণনাটি পড়ি— [38]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৩/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ২৩/৩২. নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণীঃ পরিবার-পরিজনের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হয়, যদি বিলাপ করা তার অভ্যাস হয়ে থাকে।
১২৮৬. ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ্ ইবনু আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা্য় উসমান (রাঃ)-এর জনৈকা কন্যার মৃত্যু হল। আমরা সেখানে (জানাযায়) অংশগ্রহণ করার জন্য গেলাম। ইবনু ‘উমার এবং ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-ও সেখানে উপস্থিত হলেন। আমি তাঁদের দু’জনের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলাম, অথবা তিনি বলেছেন, আমি তাঁদের একজনের পার্শ্বে গিয়ে উপবেশন করলাম, পরে অন্যজন আগমন করে আমার পার্শ্বে উপবেশন করলেন। (ক্রন্দনের শব্দ শুনে) ইবনু ‘উমার (রাঃ) ‘আমর ইবনু ‘উসমানকে বললেন, তুমি কেন ক্রন্দন করতে নিষেধ করছ না? কেননা, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘মৃত ব্যক্তিকে তার পরিজনদের কান্নার কারণে ‘আযাব দেয়া হয়।’ (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২১১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবন আবূ মুলায়কা (রহঃ)

এই উদ্ধৃতির পরিচ্ছেদ-শিরোনামে “যদি বিলাপ করা তার অভ্যাস হয়ে থাকে” শর্তটি আছে। এটি খেয়াল করা প্রয়োজন, কারণ মৃত ব্যক্তির নিজের কোনো ভূমিকার সঙ্গে শাস্তি যুক্ত করা এবং অন্যের স্বাধীন কাজের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া এক কথা নয়। কিন্তু উদ্ধৃত মূল বক্তব্যে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তিকে তার পরিজনদের কান্নার কারণে আজাব দেওয়া হয়। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, শাস্তির ভিত্তি মৃত ব্যক্তির নিজের কাজ, নাকি মৃত্যুর পরে অন্যের কাজ? শুধু পরিবারের আচরণ জানা থেকে মৃত ব্যক্তির দায় প্রমাণিত হয় না। তিনি সেই আচরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, তাতে অংশ নিয়েছিলেন কি না, অথবা তা প্রতিরোধ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সচেতনভাবে অনুমোদন করেছিলেন কি না—এসব আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কারণ হিসেবে অন্যের কাজের উল্লেখ থাকলেই সেই কাজের জন্য মৃত ব্যক্তির নৈতিক দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না।

এই সমস্যা হাদিসের ভেতরেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আয়িশার একটি বর্ণনায় ইবনে উমরের বক্তব্যকে ভুল বা বিস্মৃতিজনিত বলা হয়েছে। সেখানে কারও কান্নার কারণে মৃতের শাস্তি হওয়ার বদলে দুটি ঘটনা পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে: লোকেরা একজন ইহুদি নারীর জন্য কাঁদছে, আর সেই নারী কবরে শাস্তি পাচ্ছে। সম্পূর্ণ বর্ণনাটি পড়া যাক— [39]

সহীহ মুসলিম — জানাযা অধ্যায়
আয়িশার বর্ণনা; আস-সিরাজুল ওয়াহহাজে উদ্ধৃত
মূল আরবি:
عن عبد الله بن أبي بكر، عن أبيه، عن عمرة بنت عبد الرحمن أنها أخبرته أنها سمعت عائشة، وذكر لها أن عبد الله بن عمر يقول: إن الميت ليعذب ببكاء الحي، فقالت عائشة: يغفر الله لأبي عبد الرحمن، أما إنه لم يكذب، ولكنه نسي أو أخطأ، إنما مر رسول الله صلى الله عليه وسلم على يهودية يبكى عليها، فقال: إنهم ليبكون عليها، وإنها لتعذب في قبرها.
বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর তার পিতা থেকে এবং তিনি আমরা বিনতে আবদুর রহমান থেকে বর্ণনা করেন। আমরা তাকে জানান, তিনি আয়িশাকে বলতে শুনেছেন। আয়িশার কাছে উল্লেখ করা হলো যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, জীবিত ব্যক্তির কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয়। আয়িশা বললেন, আল্লাহ আবু আবদুর রহমানকে ক্ষমা করুন। তিনি মিথ্যা বলেননি; কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন অথবা ভুল করেছেন। আল্লাহর রাসূল একটি ইহুদি নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার জন্য কান্না করা হচ্ছিল। তখন তিনি বলেছিলেন: তারা তার জন্য কাঁদছে, আর সে তার কবরে শাস্তি পাচ্ছে।

দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটছে—এটি বলা এবং একটি ঘটনা অন্যটির শাস্তির কারণ—এটি বলা সম্পূর্ণ আলাদা। কেউ কাঁদছে, একই সময়ে অন্য কেউ শাস্তি পাচ্ছে—এ থেকে কান্নাই শাস্তির কারণ, সেই সিদ্ধান্ত আসে না। আয়িশার আপত্তি এই পার্থক্যটিকেই সামনে আনে। ফলে এখানে শুধু পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের তৈরি সমস্যা নেই; বর্ণনা পৌঁছানোর পর্যায়েই শাস্তির কারণ সম্পর্কে আপত্তি আছে। ইনসাফ যাচাই করতে হলে সেই আপত্তিকে বাদ দেওয়া যাবে না। যে পাঠই গ্রহণ করা হোক, নৈতিক মানদণ্ড একই: মৃত ব্যক্তির নিজের দায়যোগ্য ভূমিকা ছাড়া জীবিতদের কাজের জন্য তার শাস্তি অন্যায়।


মুসলিমের মুক্তির বিনিময়ে ইহুদি-খ্রিষ্টানকে জাহান্নামে পাঠানো

অন্যের কাজের দায়ের প্রশ্নটি সহীহ মুসলিমের আরেকগুচ্ছ বর্ণনায় আরও সরাসরি এসেছে। সেখানে একজন মুসলিমের জাহান্নাম থেকে মুক্তির সঙ্গে একজন ইহুদি অথবা খ্রিষ্টানকে যুক্ত করা হয়েছে। এক বর্ণনায় তাকে মুসলিমের মুক্তিপণ বলা হচ্ছে; আরেকটিতে মুসলিমের জায়গায় তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর কথা বলা হচ্ছে; তৃতীয়টিতে মুসলিমদের পাহাড়সম পাপ ক্ষমা করে সেগুলো ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ওপর রাখার ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। একই আলোচনার এই তিনটি পূর্ণ বর্ণনা একসঙ্গে পড়া যাক— [40] [41] [42]

সহীহ মুসলিম — তওবা অধ্যায়
হাদিস: ২৭৬৭; একই বিষয়ের তিনটি বর্ণনা
প্রথম বর্ণনার মূল আরবি:
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ طَلْحَةَ بْنِ يَحْيَى، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ دَفَعَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا فَيَقُولُ هَذَا فَكَاكُكَ مِنَ النَّارِ “.
বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর ইবনে আবি শাইবা, আবু উসামা, তালহা ইবনে ইয়াহইয়া, আবু বুরদা হয়ে আবু মূসা থেকে বর্ণনা করেন। আবু মূসা বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন: কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের কাছে একজন ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান দেবেন এবং বলবেন, এই তোমার জাহান্নাম থেকে মুক্তিপণ।
দ্বিতীয় বর্ণনার মূল আরবি:
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ بْنُ مُسْلِمٍ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، حَدَّثَنَا قَتَادَةُ، أَنَّ عَوْنًا وَسَعِيدَ بْنَ أَبِي بُرْدَةَ حَدَّثَاهُ أَنَّهُمَا شَهِدَا أَبَا بُرْدَةَ يُحَدِّثُ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ عَنْ أَبِيهِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ يَمُوتُ رَجُلٌ مُسْلِمٌ إِلاَّ أَدْخَلَ اللَّهُ مَكَانَهُ النَّارَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا “. قَالَ فَاسْتَحْلَفَهُ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ بِاللَّهِ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ أَنَّ أَبَاهُ حَدَّثَهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَحَلَفَ لَهُ – قَالَ – فَلَمْ يُحَدِّثْنِي سَعِيدٌ أَنَّهُ اسْتَحْلَفَهُ وَلَمْ يُنْكِرْ عَلَى عَوْنٍ قَوْلَهُ.
বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর ইবনে আবি শাইবা, আফফান ইবনে মুসলিম, হাম্মাম হয়ে কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন। আওন ও সাঈদ ইবনে আবু বুরদা তাকে জানান, তারা উপস্থিত ছিলেন যখন আবু বুরদা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে তার পিতার সূত্রে নবীর এই বক্তব্য বর্ণনা করছিলেন: কোনো মুসলিম মারা যায় না, যার জায়গায় আল্লাহ একজন ইহুদি অথবা খ্রিষ্টানকে জাহান্নামে প্রবেশ করান না। উমর ইবনে আবদুল আজিজ সেই আল্লাহর নামে, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাকে তিনবার শপথ করান যে, তার পিতা আল্লাহর রাসূল থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি তার কাছে শপথ করেন। বর্ণনাকারী বলেন, সাঈদ আমাকে শপথ করানোর বিষয়টি বলেননি, তবে আওনের বক্তব্য অস্বীকারও করেননি।
তৃতীয় বর্ণনার মূল আরবি:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَمْرِو بْنِ عَبَّادِ بْنِ جَبَلَةَ بْنِ أَبِي رَوَّادٍ، حَدَّثَنَا حَرَمِيُّ بْنُ عُمَارَةَ، حَدَّثَنَا شَدَّادٌ أَبُو طَلْحَةَ الرَّاسِبِيُّ، عَنْ غَيْلاَنَ بْنِ جَرِيرٍ، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَاسٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ بِذُنُوبٍ أَمْثَالِ الْجِبَالِ فَيَغْفِرُهَا اللَّهُ لَهُمْ وَيَضَعُهَا عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى “. فِيمَا أَحْسِبُ أَنَا. قَالَ أَبُو رَوْحٍ لاَ أَدْرِي مِمَّنِ الشَّكُّ. قَالَ أَبُو بُرْدَةَ فَحَدَّثْتُ بِهِ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَقَالَ أَبُوكَ حَدَّثَكَ هَذَا عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قُلْتُ نَعَمْ.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে আব্বাদ ইবনে জাবালা ইবনে আবি রাওয়াদ, হারামি ইবনে উমারা, শাদ্দাদ আবু তালহা আর-রাসিবি, গাইলান ইবনে জারির এবং আবু বুরদা হয়ে তার পিতার সূত্রে নবী থেকে বর্ণনা করেন: কিয়ামতের দিন কিছু মুসলিম পাহাড়সম পাপ নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাদের সেই পাপ ক্ষমা করবেন এবং সেগুলো ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর রাখবেন। বর্ণনায় রয়েছে, “আমার মনে হয়।” আবু রাওহ বলেন, সংশয়টি কার পক্ষ থেকে, আমি জানি না। আবু বুরদা বলেন, আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে এটি বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন, তোমার পিতা কি নবী থেকে এটি তোমাকে বলেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ।

মুক্তিপণ এবং “তার জায়গায়” প্রবেশ করানোর ভাষা ব্যক্তিগত বিচারের সঙ্গে একটি গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। একজন মানুষের বিরুদ্ধে শাস্তির কারণ তার নিজের কাজ থেকে আসার কথা। অন্য একজনের মুক্তির প্রয়োজন তাকে শাস্তি দেওয়ার কারণ হতে পারে না। ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান ব্যক্তির নিজের অপরাধ থাকলে সেই অপরাধের স্বতন্ত্র বিচার হবে; কিন্তু একজন মুসলিমের শাস্তির জায়গা পূরণ করার জন্য তাকে ব্যবহার করা ব্যক্তিগত দায়ের নীতি বদলে দেয়। অন্যের মুক্তির উপকরণ হিসেবে মানুষকে জাহান্নামে পাঠানো এবং তার নিজের অপরাধের ভিত্তিতে বিচার করা এক বিচারপদ্ধতি নয়। প্রথমটিতে একজনের পরিণতি আরেকজনের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে বিনিময়ের সম্পর্ক তৈরি করছে।

এই বক্তব্যকে নববী সরাসরি আক্ষরিক দায় স্থানান্তর হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি “তাদের ওপর রাখবেন” কথাটিকে রূপক বলেছেন এবং “কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না” নীতির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। ইসলাম প্রশ্নোত্তরের ৯৪৮৮ নম্বর উত্তরেও তার এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত হয়েছে। পাপের বর্ণনা সম্পর্কে নববীর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাটি পড়া যাক— [43] [44]

শারহু সহীহ মুসলিম — নববী
খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৮৫
মুসলিমদের পাপ সম্পর্কে বর্ণনার ব্যাখ্যা; আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ:
“কিয়ামতের দিন কিছু মুসলিম পাপ নিয়ে আসবে”—এই বর্ণনার অর্থ হলো, আল্লাহ মুসলিমদের সেই পাপ ক্ষমা করে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে দেবেন; আর ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের কুফর ও নিজেদের পাপের কারণে তাদের ওপর সেগুলোর অনুরূপ পাপ রাখবেন। ফলে তারা নিজেদের কাজের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, মুসলিমদের পাপের কারণে নয়। “কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না”—এই আয়াতের কারণে এই ব্যাখ্যা করা অপরিহার্য। “তাদের ওপর রাখবেন” কথাটি রূপক; উদ্দেশ্য হলো, তাদের নিজেদের পাপের কারণে তাদের ওপর অনুরূপ পাপ রাখা, যেমন বলা হয়েছে। আল্লাহ মুসলিমদের মন্দ কাজ সরিয়ে দিয়েছেন এবং কাফেরদের মন্দ কাজ রেখে দিয়েছেন বলে তারা যেন উভয় পক্ষের পাপ বহনকারীর মতো হয়েছে; কারণ অবশিষ্ট পাপ, অর্থাৎ নিজেদের পাপ, তারাই বহন করেছে। এ-ও হতে পারে যে, উদ্দেশ্য এমন পাপ, যার কারণ কাফেররা হয়েছিল, সেগুলোর প্রচলন ঘটিয়ে। আল্লাহর ক্ষমায় সেই পাপ মুসলিমদের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং প্রচলনকারীদের ওপর অনুরূপ পাপ রাখা হবে। যে মন্দ রীতি চালু করে, সেই রীতি অনুসরণকারীদের প্রত্যেকের পাপের অনুরূপ দায় তার ওপর থাকে।

এই ব্যাখ্যা দুটি বিষয় স্পষ্ট করে। প্রথমত, হাদিসের আক্ষরিক ভাষায় অন্যের পাপ বহনের সমস্যা আছে বলেই “রূপক” ব্যাখ্যার প্রয়োজন স্বীকার করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে আলোচনার বিষয় সরাসরি পাপ স্থানান্তর থেকে সরে গিয়ে ক্ষমা ও শাস্তির অসম প্রয়োগে পৌঁছায়। মুসলিমের পাহাড়সম পাপ সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর ইহুদি-খ্রিষ্টানের পাপ রেখে দেওয়া হচ্ছে। কেন একজনের ক্ষেত্রে ক্ষমা এবং অন্যজনের ক্ষেত্রে শাস্তি, তার সমান নৈতিক মানদণ্ড দেখাতে হবে। এখানে মুসলিমের পাপের পরিমাণ ছোট বলা হয়নি; বরং পাহাড়সম বলা হয়েছে। অপরাধের পরিমাণের বদলে ধর্মীয় পরিচয় যদি মুক্তি ও শাস্তির প্রধান বিভাজক হয়, তাহলে বিচার কাজের মূল্যায়ন থেকে সরে গিয়ে বিশ্বাসের আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত হয়।

অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া বা মন্দ রীতি চালু করার দায় ব্যক্তির নিজের কাজের দায়; সেটি অন্যের দায় নির্বিচারে স্থানান্তর নয়। কিন্তু ওই ব্যাখ্যা ব্যবহার করলেও নির্দিষ্ট ইহুদি বা খ্রিষ্টান ব্যক্তি কোন মুসলিমের কোন পাপের কারণ হয়েছিল, তা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন থাকে। শুধু তার ধর্মীয় পরিচয় থেকে সেই কার্যকারণ প্রমাণিত হয় না। আর তাকে মুসলিমের মুক্তিপণ বলা হলেও নিজের অপরাধের স্বাধীন বিচারের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। জন্মগত স্বভাবের জন্য জীবন কেড়ে নেওয়া, অনঘটিত ভবিষ্যতের জন্য হত্যা, নিহত শিশুর শাস্তি অথবা অন্যের মুক্তির সঙ্গে নিজের শাস্তি যুক্ত হওয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইনসাফের মানদণ্ড একই: শাস্তি যার, দায়ও তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কাজের হতে হবে। সম্পর্ক, পরিচয়, পূর্বনির্ধারণ অথবা অন্য কারও মুক্তির প্রয়োজন সেই দায়ের বিকল্প হতে পারে না।


বিশ্বাস, অপরাধ, ক্ষমা ও জান্নাতের যোগ্যতা

কোনো বিচারব্যবস্থা মানুষের কাজের মূল্যায়ন করে কি না, তা বোঝার একটি সহজ উপায় হলো দেখা: মানুষের উপকার করা এবং মানুষের ক্ষতি করার মধ্যে সেটি কী পার্থক্য করে। একজন মানুষ সারাজীবন অন্যের অধিকার রক্ষা করলেন, আরেকজন হত্যা, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে অসংখ্য জীবন ধ্বংস করলেন। তাদের বিচার করতে হলে কাজ, উদ্দেশ্য, ক্ষতির মাত্রা, দায় এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্নগুলো সামনে আসার কথা। কিন্তু সেই বিচারের চূড়ান্ত ফল যদি নির্ধারিত হয় কে বিচারকের অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বে বিশ্বাস করেছে, আর কে করেনি, তাহলে নৈতিক কাজের চেয়ে ধর্মীয় আনুগত্য বড় হয়ে যায়। ইসলামের জান্নাত-জাহান্নামের বিধান পরীক্ষা করতে গিয়ে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: মানুষের প্রতি আচরণ কি মানুষের চূড়ান্ত পরিণতির প্রধান মানদণ্ড, নাকি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস সেই আচরণের ওপর শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়?

ক্ষমা, অনুতাপ ও সংশোধনের সুযোগ একটি মানবিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ক্ষমা কার জন্য, কী শর্তে, কার ক্ষতির বিনিময়ে এবং একই সুযোগ অন্যদেরও দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব যাচাই করেই সেই ক্ষমার ন্যায়সংগততা নির্ধারিত হয়। একজন হত্যাকারী অনুতপ্ত হয়েছেন বলে তাঁর পরিবর্তনের মূল্য থাকতে পারে; সেই অনুতাপ নিহত মানুষের জীবন ফিরিয়ে আনে না। আবার একজন অবিশ্বাসী মানুষের কল্যাণ করেছেন বলে তাঁর কাজের মূল্য থাকে; ধর্মীয় বিশ্বাসের অভাব সেই কল্যাণকে অঘটিত করে দেয় না। এই পরিচ্ছেদে তাই অপরাধীর মুক্তির প্রতিশ্রুতি, শত হত্যাকারীর তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার গুরুত্ব, অমুসলিমের সৎকাজের পরিণতি এবং সুপারিশের মাধ্যমে মুক্তির বিধান পাশাপাশি রেখে বিচার করা হবে।


ধর্ষক এবং খুনিও জান্নাতি

ইসলামের প্রচলিত সুন্নি আকিদায় কোনো ব্যক্তি তাওহিদের ওপর মৃত্যুবরণ করলে তাঁর বড় অপরাধের কারণে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকার বিধান প্রযোজ্য হয় না। অপরাধের জন্য শাস্তি হতে পারে; আল্লাহ ক্ষমাও করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ বিশ্বাসের ভিত্তিতে বজায় থাকে। ফলে হত্যাকারী, চোর কিংবা যৌন সহিংসতায় অভিযুক্ত অপরাধীর ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাঁর অপরাধের পরিমাণে শেষ হয় না; তিনি ইসলামের বিচারে ঈমানের ওপর মারা গেছেন কি না, সেটি তাঁর চূড়ান্ত মুক্তির নির্ধারক হয়ে ওঠে। আবু যারের হাদিসে চুরি ও ব্যভিচারের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। সেখানে ধর্ষণ শব্দটি নেই; ব্যভিচার ও ধর্ষণকে এক করে পড়লে সহিংসতার বিশেষ দায় চাপা পড়ে। এখানে ধর্ষক ও খুনির প্রসঙ্গ আসছে বড় অপরাধ করেও ঈমানের কারণে চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে মুক্ত থাকার সাধারণ বিধান এবং হত্যাকারীর বিষয়ে সরাসরি বর্ণিত ব্যাখ্যা থেকে। [45] [46]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৬-(২৫) আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে পৌঁছলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি সাদা কাপড় পরিহিত অবস্থায় ঘুমিয়েছিলেন। আমি ফেরত চলে এলাম। অতঃপর পুনরায় তাঁর নিকট গেলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জেগে ছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (আমাকে দেখে) বললেন, যে ব্যক্তি (অন্তরের সাথে) ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে আর এ বিশ্বাসের উপর তার মৃত্যু হবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে চুরি ও ব্যভিচার (এর মতো বড় গুনাহ) করে থাকে তবুও? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে চুরি ও ব্যভিচার করলেও। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, চুরি ও ব্যভিচার করার পরও? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, চুরি ও ব্যভিচারের ন্যায় গুনাহ করলেও। আবূ যার-এর নাক ধূলায় মলিন হলেও। বর্ণনাকারী বলেন, যখনই আবূ যার (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন (গৌরবের সাথে) এ শেষ বাক্যটি ‘আবূ যার-এর নাক ধূলায় মলিন হলেও’ অবশ্যই বর্ণনা করতেন। (বুখারী, মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৫৮২৭, মুসলিম ৯৪, আহমাদ ২১৪৬৬, সহীহ আল জামি‘ ৫৭৩৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই হাদিসে আবু যার একই প্রশ্ন বারবার করছেন: চুরি ও ব্যভিচারের মতো বড় অপরাধ করার পরও কি জান্নাতে যাওয়া সম্ভব? প্রতিবারই উত্তর দেওয়া হচ্ছে, সম্ভব। অর্থাৎ অপরাধের অস্তিত্ব স্বীকার করেও মুক্তির প্রতিশ্রুতি বহাল রাখা হয়েছে। এখানে বিশ্বাস কোনো সাধারণ ব্যক্তিগত মতের জায়গায় থাকছে না; সেটি অপরাধীর চূড়ান্ত মুক্তির বিশেষ যোগ্যতায় পরিণত হচ্ছে। একজন চোর যে মানুষের সম্পদ কেড়ে নিয়েছে, সেই মানুষের ক্ষতি সত্য। একইভাবে হত্যাকারীর হাতে নিহত মানুষটির জীবনহানি সত্য। অপরাধীর বিশ্বাস এই ক্ষতি কমায় না। অথচ চূড়ান্ত পরিণতির বিচারে সেই বিশ্বাসের জন্য একটি সুবিধা থাকছে, যা অবিশ্বাসীর সবচেয়ে বড় মানবিক অবদানও নিশ্চিত করতে পারে না। ইনসাফের প্রশ্নটি হলো: অপরাধীর ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁর অপরাধের বাইরে এমন কী নৈতিক গুণ যোগ করে, যার কারণে চূড়ান্ত মুক্তির এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে?

হত্যাকারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা নববীর সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় সরাসরি পাওয়া যায়। তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যাকে বড় গুনাহ বলেও তাওহিদের ওপর মৃত হত্যাকারীর চিরস্থায়ী জাহান্নাম অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অংশের বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো। [47]

নববী, আল-মিনহাজ: শরহ সহীহ মুসলিম
খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ৮৩
পরিচ্ছেদ: হত্যাকারীর তওবা গ্রহণ, তার হত্যার সংখ্যা বেশি হলেও
প্রাসঙ্গিক বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ: যদি কেউ কোনো বৈধ কারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই অন্যায় হত্যাকে হালাল মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তবে সে কাফির ও ধর্মত্যাগী; সর্বসম্মতভাবে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। কিন্তু সে যদি হত্যাকে হালাল মনে না করে, বরং তা হারাম বলে বিশ্বাস করে, তাহলে সে পাপাচারী, অবাধ্য ও বড় গুনাহের অপরাধী। তার প্রাপ্য শাস্তি জাহান্নামে স্থায়ী অবস্থান; কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে জানানো হয়েছে যে, একত্ববাদের ওপর মৃত্যুবরণকারী সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে না। ফলে এই ব্যক্তিও চিরস্থায়ী থাকবে না। তাকে ক্ষমা করা হতে পারে, তখন সে আদৌ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আবার তাকে ক্ষমা না-ও করা হতে পারে; তখন অন্য পাপী একত্ববাদীদের মতো শাস্তি ভোগ করে তাদের সঙ্গে জান্নাতে বেরিয়ে আসবে এবং আগুনে চিরস্থায়ী থাকবে না। আয়াতের অর্থ সম্পর্কে এটাই সঠিক ব্যাখ্যা।

এখানে লক্ষ করার বিষয়, হত্যাকে হারাম বলে মানা এবং হত্যা থেকে বিরত থাকা এক জিনিস নয়। কেউ হত্যাকে অন্যায় বলেও হত্যা করতে পারে; তাঁর হাতে মানুষ মারা যায়, পরিবার ধ্বংস হয়, সন্তান অভিভাবক হারায়। উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় সেই হত্যাকারীকে বড় অপরাধী বলা হচ্ছে, কিন্তু তাঁর ঈমান থাকলে চিরস্থায়ী শাস্তির দরজা বন্ধ রাখা হচ্ছে। বিপরীতে, এমন একজন মানুষ যিনি কাউকে হত্যা করেননি, কারও সম্পদ লুট করেননি এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর চূড়ান্ত মুক্তি ধর্মীয় অবিশ্বাসের কারণে অস্বীকার করা হলে বিচারটির নৈতিক অগ্রাধিকার পরিষ্কার হয়ে যায়। মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের চেয়েও বিচারকের ধর্মীয় কর্তৃত্ব অস্বীকার করা অধিক অমার্জনীয় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে কেন্দ্র করে ইনসাফ বিচার করলে এই অগ্রাধিকার গ্রহণ করার কারণ কী?


একশ হত্যা করেও জান্নাতি

শত হত্যাকারীর কাহিনি এই সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। এখানে এক ব্যক্তি প্রথমে নিরানব্বই জনকে হত্যা করে। তওবার সুযোগ নেই বলা হলে সে সেই উত্তরদাতাকেও হত্যা করে সংখ্যা একশ পূর্ণ করে। পরে অন্য একজনের পরামর্শে সে সৎ লোকদের জনপদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় এবং পথেই মারা যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হয়। অর্থাৎ বর্ণনায় একশ মানুষের জীবন ধ্বংসের পরও অপরাধীর জন্য মুক্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তার অনুতাপের সঙ্গে পুরোনো পরিবেশ ছেড়ে যাওয়ার পদক্ষেপও আছে; কিন্তু নিহতদের অধিকার কীভাবে মেটানো হলো, সেটি এই কাহিনির আলোচনায় আসে না। মূল বিষয়টি সম্পূর্ণ বোঝার জন্য হাদিসের পুরো বর্ণনা পড়া প্রয়োজন। [48] [49]

রিয়াযুস স্বা-লিহীন
অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ
পরিচ্ছেদঃ ২: তওবার বিবরণ
৮/২১। আবূ সাঈদ সা‘দ ইবনু মালেক ইবনু সিনান খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের পূর্বে (বনী ইস্রাইলের যুগে) একটি লোক ছিল; যে ৯৯টি মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর লোকদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে একটি খ্রিষ্টান সন্নাসীর কথা বলা হল। সে তার কাছে এসে বলল, ‘সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবার কোন সুযোগ আছে?’ সে বলল, ‘না।’ সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকেও হত্যা করে একশত পূরণ করে দিল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবারও তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হল। সে তার নিকট এসে বলল যে, সে একশত মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তওবার কোন সুযোগ আছে? সে বলল, ‘হ্যাঁ আছে! তার ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশে চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।’
সুতরাং সে ব্যক্তি ঐ দেশ অভিমুখে যেতে আরম্ভ করল। যখন সে মধ্য রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আযাবের উভয় প্রকার ফিরিশ্তা উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হল। রহমতের ফিরিশ্তাগণ বললেন, ‘এই ব্যক্তি তওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।’ আর আযাবের ফিরিশ্তারা বললেন, ‘এ এখনো ভাল কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।’ এমতাবস্থায় একজন ফিরিশ্তা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাগণ তাঁকে সালিস মানলেন। তিনি ফায়সালা দিলেন যে, ‘তোমরা দু’ দেশের দূরত্ব মেপে দেখ। (অর্থাৎ এ যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশী নিকটবর্তী হবে, সে তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ অতএব তাঁরা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশী নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফিরিশতাগণ তার জান কবয করলেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
সহীহতে আর একটি বর্ণনায় এরূপ আছে যে, ‘‘পরিমাপে ঐ ব্যক্তিকে সৎশীল লোকদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পাওয়া গেল। সুতরাং তাকে ঐ সৎশীল ব্যক্তিদের দেশবাসী বলে গণ্য করা হল।’’
সহীহতে আরো একটি বর্ণনায় এইরূপ এসেছে যে, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ দেশকে (যেখান থেকে সে আসছিল তাকে) আদেশ করলেন যে, তুমি দূরে সরে যাও এবং এই সৎশীলদের দেশকে আদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও। অতঃপর বললেন, ‘তোমরা এ দু’য়ের দূরত্ব মাপ।’ সুতরাং তাকে সৎশীলদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পেলেন। যার ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল।’’
আরো একটি বর্ণনায় আছে, ‘‘সে ব্যক্তি নিজের বুকের উপর ভর করে ভালো দেশের দিকে একটু সরে গিয়েছিল।’’(1)
(1) সহীহুল বুখারী ৩৪৭০, মুসলিম ২৭৬৬, ইবনু মাজাহ ২৬২৬, আহমাদ ১০৭৭০, ১১২৯০
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ইসলামে ইনসাফ 3

সহীহ মুসলিমের ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণেও একই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেখানে শাস্তির ফেরেশতাদের যুক্তি ছিল, এই ব্যক্তি কোনো নেক কাজ করেনি; ক্ষমার ফেরেশতাদের যুক্তি ছিল, সে আন্তরিকভাবে তওবার উদ্দেশ্যে এগিয়ে এসেছে। তারপর বিচার করা হয়েছে দুই জনপদের সঙ্গে তার অবস্থানের দূরত্ব দিয়ে। নিচে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো সম্পূর্ণ দেয়া হলো [50] [51]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫২। মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক লোক ছিলো। সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করার পর জিজ্ঞাসা করল, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলিম ব্যক্তি কে? তাকে এক রাহিবের সন্ধান দেওয়া হয়। সে তার কাছে এসে বলল, যে, সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করেছো এমতাবস্থায় তার জন্য কি তাওবা আছে? রাহিব বলল, না। তখন সে রাহিবকেও হত্যা করে ফেলল। এবং এর (রাহিবের) হত্যা দ্বারা একশ পূর্ণ করল।
তারপর সে আবার প্রশ্ন করল এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলিম কে? তখন তাকে এক আলিম ব্যক্তির সন্ধান দেওয়া হল। সে আলিমকে সে বলল যে, সে একশ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, তার জন্য কি তাওবা আছে? আলিম ব্যক্তি বললেন, হ্যাঁ। এ তাওবার মধ্যে কে অন্তরায় হতে পারে? তুমি অমুক দেশে যাও। সেখানে কতিপয় লোক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদতে মশশুল হয়ে যাও। নিজের দেশে আর কখনো ফিরে যেয়ো না। কেননা এ দেশটি বড় মন্দ। তারপর সে চলতে লাগল। এমন কি যখন সে অর্ধ পথে পৌছে তখন তার মৃত্যু এল।
এরপর রহমতের ফিরিশতা ও আযাবের ফিরিশতার মধ্যে তার সম্পর্কে বিবাদ লেগে গেল। রহমতের ফিরিশতারা বললেন, সে অন্তরের আবেগ নিয়ে আল্লাহর দিকে তাওবার জন্য ধাবিত হয়ে এসেছে। আর আযাবের ফিরিশতারা বললেন, সে তো কখনো কোন নেক আমল করেনি। এ সময় মানুষের সুরতে এক ফিরিশতা এলেন। তারা তাকে তাদের মধ্যে মীমাংসাকারী নির্ধারণ করলেন।
তিনি তাদের বললেন, তোমরা দুই দেশের মধ্যবর্তী দূরত্ব মেপে নাও। দুই স্থানের মধ্যে যে স্থানের দিকে সে অধিক নিকটবর্তী হবে তাকে সে স্থানেরই গণ্য করা হবে। তারা মাপলেন। তখন তাঁরা তাকে উদ্দিষ্ট স্থানের অধিক নিকটবর্তী পেলেন। তখন রহমতের ফিরিশতা তাকে কবজ করে নিলেন। কাদাতা (রহঃ) বলেন, হাসান (রহঃ) বলেছেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন তার মৃত্যু এল, তখন সে বুকের উপর ভর দিয়ে (কিছু এগিয়ে) গেল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৩। উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয আনবারী (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে লাগল, তার কি তাওবা আছে? অবশেষে সে এক পাদ্রীর নিকট এসে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। পাদ্রী বলল, তোমার জন্য তাওবা নেই। তখন সে পাদ্রীকে হত্যা করল। এরপর সে আবারো লোকদের জিজ্ঞাসা করতে লাগল। তারপর সে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল যেখানে কিছু নেক লোকের বসবাস ছিলো। রাস্তার এক অংশে তাকে মৃত্যু পেয়ে বসল। তখন সে বুকের উপর ভর করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে। তারপর সে মারা গেল। তখন রহমতের ফিরিশতা ও আযাবের ফিরিশতা তার সম্পর্কে বিবাদে লিপ্ত হল। তখন দেখা গেল যে, সে নেক লোকদের জনপদের দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী রয়েছে। তাই তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

এই কাহিনি শুনে সাধারণত আলোচনা হয় আল্লাহ কত বড় ক্ষমাশীল, সেই বিষয়ে। কিন্তু ইনসাফ যাচাইয়ের জন্য কাহিনির অনুপস্থিত মানুষগুলোকেও সামনে আনতে হবে। একশটি হত্যার অর্থ একশটি জীবন, একশটি মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের শোক ও ক্ষতি। শেষ হত্যাটিও ঘটেছে তখন, যখন অপরাধী ইতোমধ্যে ক্ষমার পথ খুঁজছিল। তার অনুতাপ সম্পর্কে অস্বস্তিকর উত্তর পেলেই আরেকটি মানুষকে হত্যা করার এই আচরণ তার সহিংসতার গভীরতা দেখায়। পরে তার পরিবর্তনের চেষ্টা মূল্যবান হতে পারে; সেই পরিবর্তনের মূল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে একশ মানুষের অধিকারকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায় না। অপরাধীর উদ্ধার নিয়ে একটি কাহিনি যত আবেগপূর্ণই হোক, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সেটি আলাদা করে দেখাতে হবে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্যও শোনা যেতে পারে। তবে বক্তব্যে ক্ষমার মহিমা তুলে ধরা হলে তার পাশাপাশি নিহতদের অধিকার, অপরাধীর দায় এবং ক্ষমার শর্তগুলো একই গুরুত্বে বিচার করা প্রয়োজন।


অপরাধীর ক্ষমা, ভুক্তভোগীর অধিকার

অপরাধীর অনুতাপ, তার সংশোধন এবং ভুক্তভোগীর অধিকার—তিনটি সম্পর্কিত বিষয় হলেও একটির মাধ্যমে অন্যটির নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। যে মানুষটি খুন হয়েছেন, তিনি হত্যাকারীর পরবর্তী অনুতাপ দেখার সুযোগই পাননি। যে পরিবার অভিভাবক হারিয়েছে, তারা হত্যাকারীর উপাসনায় যোগ দেওয়ার কারণে নিজেদের ক্ষতি ফেরত পায় না। ন্যায়বিচারের আলোচনায় তাই জিজ্ঞাসা করতে হবে: কার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, তার প্রতিকার কী, এবং ক্ষমার সিদ্ধান্তে সেই অধিকার কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে? ইসলামী ফিকহের আলোচনাতেও হত্যার সঙ্গে আল্লাহ, নিহত ব্যক্তি এবং নিহতের অভিভাবকদের পৃথক অধিকার যুক্ত করা হয়েছে। ইসলামকিউএর ১৪৭০১৭ নম্বর উত্তরে ইবনুল কাইয়িমের এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত রয়েছে। [52]

ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি
পৃষ্ঠা: ১০২; ইসলামকিউএর ১৪৭০১৭ নম্বর উত্তরে উদ্ধৃত
আরবি মূল: والتحقيق في المسألة أن القتل يتعلق به ثلاثة حقوق: حق لله، وحق للمظلوم المقتول، وحق للولي، فإذا سلّم القاتل نفسه طوعا واختيارا إلى الولي، ندما على ما فعل، وخوفا من الله، وتوبة نصوحا: يسقط حق الله بالتوبة، وحق الولي بالاستيفاء أو الصلح، أو العفو، وبقي حق المقتول يعوضه الله عنه يوم القيامة عن عبده التائب المحسن ويصلح بينه وبينه، فلا يبطل حق هذا، ولا تبطل توبة هذا.
বাংলা অনুবাদ: বিষয়টির যথাযথ বিশ্লেষণ হলো, হত্যার সঙ্গে তিনটি অধিকার যুক্ত: আল্লাহর অধিকার, অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির অধিকার এবং অভিভাবকের অধিকার। হত্যাকারী কৃতকর্মের অনুতাপ, আল্লাহর ভয় ও আন্তরিক তওবা নিয়ে স্বেচ্ছায় অভিভাবকের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর অধিকার এবং প্রতিশোধ গ্রহণ, মীমাংসা অথবা ক্ষমার মাধ্যমে অভিভাবকের অধিকার নিষ্পত্তি হয়। নিহত ব্যক্তির অধিকার অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ তাঁর তওবাকারী সৎকর্মশীল বান্দার পক্ষ থেকে কিয়ামতের দিন নিহতকে ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং তাদের মধ্যে মীমাংসা করবেন। ফলে নিহতের অধিকারও বাতিল হবে না, হত্যাকারীর তওবাও বাতিল হবে না।

এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, অপরাধ গোপন রেখে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াকেই মানুষের অধিকার মেটানোর সমান বলা হচ্ছে না। কিন্তু শত হত্যাকারীর কাহিনিতে নিহতদের অভিভাবকদের কাছে আত্মসমর্পণ, ক্ষতিপূরণ কিংবা তাদের ক্ষমার কোনো বিবরণ নেই। সেখানে অপরাধীর জনপদ পরিবর্তনের যাত্রা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির ফল দেখানো হয়েছে। ফলে ফিকহে অধিকার মেটানোর যে শর্ত আলোচনা করা হচ্ছে, কাহিনিতে সেই শর্ত পূরণের প্রমাণ কোথায়—এই প্রশ্ন থেকে যায়। বিচার যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কাহিনির অনুপস্থিত ধাপগুলো নিজের বিশ্বাস দিয়ে পূরণ করে নেওয়া চলে না। যদি বলা হয়, নিহতদের পাওনা অন্যভাবে মেটানো হয়েছে, তাহলে সেটি এই বর্ণনার বাইরে যোগ করা একটি দাবি; বর্ণিত ঘটনার মধ্যে তার প্রতিষ্ঠা দেখাতে হবে।

ইবনুল কাইয়িমের ব্যাখ্যায় নিহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের ভার শেষ পর্যন্ত আল্লাহ গ্রহণ করছেন। এখানে আবার ক্ষমতা ও ইনসাফের পার্থক্য ফিরে আসে। সর্বশক্তিমান সত্তা ক্ষতিপূরণ দিতে পারবেন—এটি তাঁর সামর্থ্যের দাবি। কিন্তু কোন ক্ষতিপূরণ একটি কেড়ে নেওয়া জীবন ও তার সঙ্গে যুক্ত ক্ষতি ন্যায়সংগতভাবে মেটায়, ভুক্তভোগীর সম্মতি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একই সুবিধা কাদের জন্য প্রযোজ্য—এসব বিচারের মানদণ্ডের প্রশ্ন। অপরাধীর মুক্তির সুবিধা থাকলে তা তাঁর সংশোধন ও ক্ষতি পূরণের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে; শুধু বিচারকের প্রতি বিশ্বাসের সুবিধা হিসেবে সংরক্ষিত হলে বৈষম্যের প্রশ্ন থেকেই যায়। ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং অপরাধীকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিশেষ ছাড় দেওয়া—দুটিকে একই যুক্তিতে ন্যায়সংগত প্রমাণ করা যায় না।


শত হত্যাকারীকে বাঁচাতে দূরত্ব বদলে দেওয়া

শত হত্যাকারীর কাহিনির একটি বর্ণনায় বিষয়টি শুধু দুই জনপদের দূরত্ব মাপার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আল্লাহ এক ভূমিকে দূরে সরে যেতে এবং অন্য ভূমিকে কাছে আসতে নির্দেশ দেন। এরপর দূরত্ব মেপে অপরাধীকে সৎ লোকদের জনপদের কাছাকাছি পাওয়া যায় এবং তাকে ক্ষমা করা হয়। রিয়াযুস স্বা-লিহীনের উপরের পূর্ণ উদ্ধৃতিতেই এই বক্তব্য রয়েছে। সহীহ মুসলিমের ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি আলাদাভাবেও এসেছে। [53]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৪। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … কাতাদা (রহঃ) এর সূত্রে মু’আয ইবনু মূআযের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে এ হাদীসে আছে যে, তখন আল্লাহ এ ভূমির প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন যে, তুমি দূরবর্তী হয়ে যাও এবং ঐ ভূমির প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন যে তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ কাতাদাহ (রহঃ)

কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দূরত্বকে মানদণ্ড করা হলে সেই দূরত্ব সিদ্ধান্তের আগে বিদ্যমান একটি তথ্য হওয়ার কথা। এখানে ফল নির্ধারণকারী সত্তাই সেই তথ্য বদলে দিচ্ছেন। প্রথমে বলা হচ্ছে, যে জনপদ কাছাকাছি হবে, সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। তারপর একটি পক্ষের অনুকূলে জনপদের অবস্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে। মানবিক বিচারে এর সমতুল্য ঘটনা ভাবলে সমস্যাটি সহজে বোঝা যায়: বিচারক একটি পরিমাপের ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করলেন, তারপর নিজের পছন্দের ফল পাওয়ার জন্য মাপার বস্তুটির অবস্থান বদলে দিলেন। তখন পরিমাপের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও সিদ্ধান্তটি স্বাধীন তথ্যের মূল্যায়ন থেকে আসছে না; তথ্যকে কাঙ্ক্ষিত ফলের অনুকূলে সাজানো হচ্ছে। যিনি পরীক্ষার ফল নির্ধারণ করেন, তিনিই যদি বিশেষ কারও জন্য পরীক্ষার শর্ত বদলে দেন, সেই সুবিধাকে নিরপেক্ষ বিচার বলে প্রতিষ্ঠা করতে আলাদা যুক্তি প্রয়োজন।

এই ব্যক্তি আন্তরিকভাবে বদলাতে চেয়েছিলেন—বর্ণনায় তার পক্ষে এই যুক্তি রয়েছে। সেই আন্তরিকতা ক্ষমার ভিত্তি হলে সরাসরি তা দিয়েই সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু দূরত্বকে সিদ্ধান্তের মানদণ্ড করে সেই দূরত্বও পরিবর্তন করার ফলে বিশেষ অনুগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এখানে সব মানুষের বিচার সর্বত্র দূরত্ব দিয়ে হয় বলে দাবি করা হচ্ছে না; প্রশ্নটি এই নির্দিষ্ট ঘটনায় নির্ধারিত মানদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে। অন্য কোনো মানুষ একই অনুতাপ ও একই সংশোধনের চেষ্টা নিয়ে মারা গেলে তাঁর জন্যও কি একইভাবে তথ্য বদলানো হবে? সে সুযোগের সমান ও পূর্বনির্ধারিত নিয়ম কোথায়? শত মানুষ হত্যাকারীর জন্য এমন সহায়তা সম্ভব হলে, যুক্তিসংগত সংশয়ের কারণে বিশ্বাস করতে না-পারা অথচ মানুষের ক্ষতি না-করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই সহায়তা অস্বীকারের নৈতিক কারণ কী?


আল্লাহ গুনাহকারীদের ভালোবাসেন

অপরাধীর ক্ষমার আলোচনায় আরেকটি হাদিস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হচ্ছে, মানুষ গুনাহ না করলে আল্লাহ তাদের সরিয়ে এমন মানুষ আনতেন, যারা গুনাহ করে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে, এবং তিনি তাদের ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ পাপমুক্ত মানবসমাজকে চূড়ান্ত আদর্শ হিসেবে সামনে আনার বদলে পাপ, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ক্ষমার একটি সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই বক্তব্যে আল্লাহর সঙ্গে গুনাহকারীর সম্পর্ক কেন্দ্রস্থলে থাকে; অপরাধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা সেই ঘোষণায় আসে না। এখানে সরাসরি “আল্লাহ সব অপরাধ ভালোবাসেন” বলা হয়নি; কিন্তু গুনাহ না-করা মানুষকে সরিয়ে গুনাহ ও ক্ষমাপ্রার্থনাকারী মানুষ আনার ঘোষণার নৈতিক তাৎপর্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। [54]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০. আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ – ক্ষমা ও তাওবাহ্
২৩২৮-(৬) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি তোমরা গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে সরিয়ে এমন জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত ও আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চাইত। আর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন। (মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : মুসলিম ২৭৪৯, শু‘আবূল ঈমান ৬৭০০, সহীহাহ্ ১৯৫০, সহীহ আত্ তারগীব ৩১৪৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে প্রশ্নটি আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন কি না, সেটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, অন্যায় না-ঘটা সমাজের বদলে অন্যায় করে ক্ষমা চাওয়ার সমাজকে কেন এমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে প্রথম সমাজটিকেই সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হবে? মানুষ ভুল করলে সংশোধনের পথ থাকবে—এটি একটি কথা। মানুষ ভুল না করলে তাদের জায়গায় ভুলকারী মানুষ আনা হবে—এটি আরেকটি কথা। প্রথম বক্তব্যে ক্ষতির পরে প্রতিকার আছে; দ্বিতীয় বক্তব্যে ক্ষতি, ক্ষমাপ্রার্থনা ও ক্ষমার ধারাটিই মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে। সেই ধারায় অপরাধীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার সুযোগ থাকে, কিন্তু নির্যাতিত মানুষের জন্য নির্যাতন না-ঘটার যে অধিক মূল্যবান সম্ভাবনা ছিল, সেটি হারিয়ে যায়। ক্ষমা প্রদর্শনের প্রয়োজন কেন মানুষের অক্ষত জীবন ও নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে?

একটি নির্যাতনের ঘটনা কল্পনা করা যাক। একটি শিশু যৌন সহিংসতা ও হত্যার শিকার হলো। অপরাধী পরে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল। অপরাধীর অনুতাপ তার পরিবর্তনের একটি দিক হতে পারে, কিন্তু শিশুটির জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতা তাতে মুছে যায় না। যদি ঘটনাটি সম্পর্কে আলোচনা শুধু “অপরাধীকে আল্লাহ ক্ষমা করেন” পর্যন্ত পৌঁছে থেমে যায়, তাহলে সবচেয়ে অসহায় মানুষটির জায়গা থেকে বিচার করা হয় না। আর আগের পরিচ্ছেদে আলোচিত তাকদীরের দাবি—মানুষের কাজসহ সবই আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারণের অধীন—এর সঙ্গে এই ক্ষমার বক্তব্য একসঙ্গে রাখলে প্রশ্ন আরও কঠিন হয়। যিনি ঘটনাটি ঘটার আগেই তা ঠেকাতে পারতেন, তাঁর ক্ষমাশীলতার মহিমা দেখাতে শিশুটির ওপর এমন ক্ষতি ঘটার প্রয়োজন কেন থাকবে? অপরাধ ঘটার পরে অপরাধীকে ক্ষমা করার ক্ষমতার চেয়ে অপরাধ ঘটার আগেই নিরপরাধকে রক্ষা করার ক্ষমতা ইনসাফের বিচারে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রয়েছে। একটি ক্ষমতাবান সত্তার প্রশংসা, তাঁর কাছে মাথা নত করা এবং তাঁর ক্ষমার ওপর নির্ভরতা যদি বিচারব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মানুষের ক্ষতি সেই সম্পর্কের পটভূমিতে সরে যায়। অন্যায় ঘটল, অপরাধী ক্ষমা চাইল, বিচারক ক্ষমা করে মহিমান্বিত হলেন—এই বৃত্তে ভুক্তভোগীর অধিকার কোথায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা প্রতিবার আলাদাভাবে দেখাতে হবে। মিজানুর রহমান আজহারীর নিচের বক্তব্যে এই হাদিসের আলোচনা শোনা যেতে পারে। বক্তব্যের আবেগের পাশাপাশি এই নৈতিক প্রশ্নগুলোও বিচার করা প্রয়োজন।


অমুসলিম ভালো কাজ করলেও জাহান্নামি

বিশ্বাসী অপরাধীর শেষ পর্যন্ত মুক্তির বিধানের বিপরীতে ইসলামের প্রচলিত ব্যাখ্যায় কুফরের ওপর মৃত্যুবরণকারীর সৎকাজ পরকালের মুক্তি নিশ্চিত করে না। এখানে নৈতিক বৈষম্যটি আরও স্পষ্ট। একজন মানুষ দাসপ্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করলেন কিংবা ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিলেন। এসব কাজের ফলে অন্য মানুষের জীবনে যে বাস্তব কল্যাণ ঘটল, তা তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কমে যায় না। আব্রাহাম লিঙ্কন, নেলসন ম্যান্ডেলা, রাজা রামমোহন রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিদের মানবিক অবদানের প্রসঙ্গ তাই এই আলোচনায় আসে। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তির পরকাল সম্পর্কে আলাদা ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রয়োজন নেই; যাচাই করার বিষয় হলো, তাদের মতো একজন মানুষকে ইসলামের বিচারে কুফরের ওপর মৃত বলে গণ্য করা হলে তাঁর মানবকল্যাণমূলক কাজ চূড়ান্ত মুক্তির জন্য যথেষ্ট গণ্য হয় কি না। কোরআনের বক্তব্যটি পড়া যাক। [55]

আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইবে কক্ষনো তার সেই দ্বীন কবূল করা হবে না এবং আখেরাতে সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
Taisirul Quran
আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
Rawai Al-bayan
আর যে কেহ ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অন্বেষণ করে তা কখনই তার নিকট হতে গৃহীত হবেনা এবং পরলোকে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
Sheikh Mujibur Rahman
And whoever desires other than Islām as religion – never will it be accepted from him, and he, in the Hereafter, will be among the losers.
Saheeh International

এই নীতিতে ধর্মীয় পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় থাকছে না; তা সৎকাজ গ্রহণযোগ্য হওয়ার পূর্বশর্ত হয়ে যাচ্ছে। অথচ পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া ধর্মীয় বিশ্বাস, ভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানা এবং নিজের বিশ্বাস যাচাই করার সুযোগ মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত নয়। আফ্রিকার কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া একজন মানুষ এবং ধর্মীয় শিক্ষার সুবিধা পাওয়া অন্য একজন মানুষের বিশ্বাস গঠনের পরিস্থিতি এক নয়। সেই অসম সুযোগের পরেও মানুষের বাস্তব আচরণের ওপর বিশ্বাসের শর্ত বসালে জন্ম ও পরিবেশের সুবিধা চূড়ান্ত বিচারে প্রবেশ করে। শিশুদের পরিণতি নিয়ে পৃথক মতের আলোচনা আগের পরিচ্ছেদে এসেছে; এখানে আলোচ্য বিষয় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সৎকাজের মূল্য নির্ধারণে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রাধান্য।

হাদিসেও জান্নাতে প্রবেশের যোগ্যতা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নিচের বর্ণনায় মুসলিমদের জান্নাতবাসীদের একটি বড় অংশ হওয়ার সুসংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি বলা হচ্ছে, মুসলিম প্রাণ ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [56]

রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন)
বিবিধ
পরিচ্ছেদঃ ৫১: আল্লাহর দয়ার আশা রাখার গুরুত্ব
তাওহীদ পাবলিকেশন নাম্বারঃ ৪৩৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৩১
২০/৪৩৬। ইবনে মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমরা প্রায় চল্লিশ জন মানুষ রাসূলুললাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে একটি তাঁবুতে ছিলাম। একসময় তিনি বললেন, ‘‘তোমরা কি পছন্দ কর যে, তোমরা জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ হবে?’’ আমরা বললাম, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘‘তোমরা কি জান্নাতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ হতে পছন্দ কর?’’ আমরা বললাম, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘‘তাঁর শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ আছে, আমি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশী যে, জান্নাতবাসীদের অর্ধেক তোমরাই হবে। এটা এ জন্য যে, শুধুমাত্র মুসলিম প্রাণ ছাড়া অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর মুশরিকদের তুলনায় তোমরা এরূপ, যেরূপ কালো বলদের গায়ে (একটি) সাদা লোম অথবা লাল বলদের গায়ে (একটি) কালো লোম।’’ (বুখারী ও মুসলিম) [1]
[1] সহীহুল বুখারী ৬৫২৮, ৬৬৪২, মুসলিম ২০২১, তিরমিযী ২৫৪৭, ইবনু মাজাহ ৪২৮৩, আহমাদ ৩৬৪৩, ৪১৫৫, ৪২৩৯, ৪৩১৬
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

এখানে মুহাম্মদের অনুসারীদের জান্নাতবাসীদের অর্ধেক হওয়ার যে প্রত্যাশা বলা হয়েছে, বাকি অংশকে অমুসলিমদের জন্য উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা হিসেবে পড়া যায় না। একই বক্তব্যে মুসলিম প্রাণের শর্তটি দেওয়া আছে; ইসলামী ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী নবীদের প্রকৃত অনুসারীরাও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে আলোচনার মূল প্রশ্ন রয়ে যায়: একজন মানুষের সততা, করুণা ও মানবকল্যাণের কাজ কি নিজের গুণেই মুক্তির মূল্য বহন করে, নাকি সেগুলোর ওপর ধর্মীয় আনুগত্যের অনুমোদন লাগবে? এই প্রশ্নের সঙ্গে তুলনা করার জন্য আবু যারের হাদিসটি আবার সম্পূর্ণ পড়া প্রয়োজন। [45]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৬-(২৫) আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে পৌঁছলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি সাদা কাপড় পরিহিত অবস্থায় ঘুমিয়েছিলেন। আমি ফেরত চলে এলাম। অতঃপর পুনরায় তাঁর নিকট গেলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জেগে ছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (আমাকে দেখে) বললেন, যে ব্যক্তি (অন্তরের সাথে) ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে আর এ বিশ্বাসের উপর তার মৃত্যু হবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে চুরি ও ব্যভিচার (এর মতো বড় গুনাহ) করে থাকে তবুও? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে চুরি ও ব্যভিচার করলেও। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, চুরি ও ব্যভিচার করার পরও? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, চুরি ও ব্যভিচারের ন্যায় গুনাহ করলেও। আবূ যার-এর নাক ধূলায় মলিন হলেও। বর্ণনাকারী বলেন, যখনই আবূ যার (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন (গৌরবের সাথে) এ শেষ বাক্যটি ‘আবূ যার-এর নাক ধূলায় মলিন হলেও’ অবশ্যই বর্ণনা করতেন। (বুখারী, মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৫৮২৭, মুসলিম ৯৪, আহমাদ ২১৪৬৬, সহীহ আল জামি‘ ৫৭৩৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

একদিকে বিশ্বাসের ওপর মৃত অপরাধীর শেষ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশের প্রতিশ্রুতি রয়েছে; অন্যদিকে অবিশ্বাসের ওপর মৃত সৎ মানুষের জন্য সেই পথ বন্ধ রাখা হচ্ছে। এই পার্থক্য মানুষের ক্ষতি ও উপকারের পরিমাণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন হত্যাকারী মানুষ হত্যাকে হারাম বলেও হত্যা করেছে—তবু তার বিশ্বাস চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে মুক্তির ভিত্তি। আর একজন অবিশ্বাসী হত্যাকে অন্যায় জেনে তা থেকে বিরত থেকেছে, অন্যের জীবন রক্ষাও করেছে—তবু সেই কাজ বিশ্বাসের বিকল্প হয় না। ধর্মীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা কিংবা যৌন সহিংসতার অপরাধীর ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য হলে সমস্যাটি আরও তীব্র হয়: অপরাধের বিচার থাকা সত্ত্বেও ঈমানের শর্ত পূরণকারী অপরাধীর চূড়ান্ত মুক্তির সুযোগ আছে; কুফরের ওপর মৃত মানবহিতৈষীর নেই। মানুষের ওপর সংঘটিত অপরাধের চেয়ে ধর্মীয় আনুগত্যকে শেষ বিচারের বড় বিভাজক করা হলে সেই বিচার মানবিক ইনসাফের দাবি কীভাবে পূরণ করে?

ইবনু জুদআনের বিষয়ে আয়িশার প্রশ্নের উত্তরে মানুষের উপকার এবং পরকালের লাভের এই বিচ্ছেদ সরাসরি পাওয়া যায়। তিনি আত্মীয়দের অধিকার আদায় করতেন এবং দরিদ্রদের আহার দিতেন। প্রশ্ন ছিল, তাঁর এসব কাজ পরকালে উপকার করবে কি না। উত্তরে তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনার অভাব সামনে আনা হয়েছে। [57]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৮৫. যে ব্যাক্তি কুফরী অবস্থায় মারা যায়, তার কোন আমল তার উপকারে আসবে না
৪১১। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইবনু জুদআন জাহেলী যুগে আত্নীয়-স্বজনদের হক আদায় করত এবং দরিদ্রদের আহার দিত। আখিরাতে এসব কর্ম তার উপকারে আসবে কি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন উপকারে আসবে না। সে তো কোনদিন এ কথা বলেনি যে হে আমার রব! কিয়ামতের দিন আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

এই বর্ণনায় দরিদ্রদের খাওয়ানোর কাজটিকে মিথ্যা কিংবা ক্ষতিকর বলা হয়নি। উপকারের কাজ ঘটেছে, কিন্তু পরকালে সেই উপকার গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার শর্ত সামনে এসেছে। নববীও অমুসলিমের সৎকাজের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় একই নীতি আলোচনা করেছেন। ইসলামওয়েবের ৯৭১৬৫ নম্বর ফতোয়ায় উদ্ধৃত তাঁর সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো। [58]

নববী, শরহ সহীহ মুসলিম
ইসলামওয়েবের ৯৭১৬৫ নম্বর ফতোয়ায় উদ্ধৃত অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ
আলেমরা একমত যে, যে কাফির কুফরের ওপর মারা যায়, পরকালে তার কোনো সওয়াব নেই; দুনিয়ায় আল্লাহর নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজের প্রতিদানও সেখানে সে পাবে না। এই হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তার সৎকাজের কারণে তাকে দুনিয়ায় ভরণপোষণ দেওয়া হয়। এর অর্থ, আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য করা এমন কাজ, যার শুদ্ধতা নিয়তের ওপর নির্ভর করে না—যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দান, দাসমুক্তি, অতিথিসেবা এবং কল্যাণের পথ সহজ করা ইত্যাদি। মুমিনের সৎকাজ ও তার সওয়াব পরকালের জন্য সঞ্চিত থাকে; একই সঙ্গে দুনিয়াতেও সে প্রতিদান পায়। দুনিয়া ও পরকাল উভয় জায়গায় প্রতিদান পাওয়ায় কোনো বাধা নেই; শরিয়তে তা এসেছে, তাই বিশ্বাস করা আবশ্যক। “আল্লাহ মুমিনের কোনো সৎকাজে জুলুম করেন না”—এর অর্থ, তার কোনো সৎকাজের প্রতিদান দেওয়া বাদ দেন না। জুলুম শব্দটি কমিয়ে দেওয়ার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। প্রকৃত জুলুম আল্লাহর ক্ষেত্রে অসম্ভব, যেমন আগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। “পরকালে পৌঁছায়” অর্থ সেখানে উপনীত হয়।

এখানে সৎকাজের তালিকায় দাসমুক্তি, দান ও অতিথিসেবার মতো বাস্তব মানবিক কাজও রয়েছে। এসব কাজ দুনিয়ায় কিছু প্রতিদান দিতে পারে বলে বলা হচ্ছে, কিন্তু অনন্ত পরকালের মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। এই ব্যাখ্যায় দুনিয়ার সীমিত পুরস্কার ও অনন্ত শাস্তির মধ্যে আনুপাতিকতার সমস্যাও থাকে। কাউকে কিছু পার্থিব সুবিধা দেওয়া হলো, তারপর অনন্তকাল শাস্তি দেওয়া হলো—প্রথম সুবিধাটি দিয়ে দ্বিতীয় পরিণতির ন্যায়সংগততা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাছাড়া এই ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট সৎকর্মশীল অবিশ্বাসী তাঁর সৎকাজের জন্য বাস্তবে কত প্রতিদান পেয়েছেন, সেটির যাচাইযোগ্য হিসাবও দেখানো হচ্ছে না। “দুনিয়ায় প্রতিদান দেওয়া হয়েছে” বলা এবং ন্যায্য প্রতিদান দেওয়া হয়েছে বলে প্রমাণ করা এক নয়।

আরও গভীর সমস্যা হলো, “প্রকৃত জুলুম আল্লাহর ক্ষেত্রে অসম্ভব” কথাটিকে বিচার শুরুর আগেই সত্য ধরে নেওয়া। সেটি ধরে নিলে যেকোনো ফলকেই শেষ পর্যন্ত ন্যায় বলে মানতে হয়, কারণ ফলটি আল্লাহর সিদ্ধান্ত বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রবন্ধের প্রথম পরিচ্ছেদে নির্ধারিত মানদণ্ডে কাজ, দায়, ক্ষতি, সমতা ও শাস্তির আনুপাতিকতা দিয়ে সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করতে হবে। একজন অবিশ্বাসীর দান সত্যিই ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা মিটিয়েছে; সেই কাজের মূল্য তাঁর বিশ্বাসের সঙ্গে বদলে যায় না। একইভাবে একজন বিশ্বাসীর হত্যাকাণ্ড সত্যিই মানুষ মেরেছে; তাঁর ঈমান নিহত মানুষের ক্ষতি কমায় না। এই বাস্তবতা পাশ কাটিয়ে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে শেষ বিচারের প্রধান যোগ্যতা করা হলে ন্যায়ের দাবি আলাদা যুক্তি ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় না।


সুপারিশনির্ভর মুক্তি ও বিচারের নিরপেক্ষতা

বিশ্বাসের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মুক্তির সঙ্গে ইসলামে শাফাআত বা সুপারিশের বিধানও যুক্ত। সুপারিশের কথা শুনলে প্রশ্ন আসে, যে বিচারক প্রত্যেক ব্যক্তির কাজ, উদ্দেশ্য, অনুতাপ ও ক্ষতি সম্পূর্ণ জানেন, তাঁর বিচারে অন্য কারও আবেদন কী নতুন তথ্য যোগ করে? মানুষের আদালতে সাক্ষ্য বা বক্তব্য অজানা তথ্য সামনে আনতে পারে। কিন্তু সর্বজ্ঞ বিচারকের ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতির সেই যুক্তি প্রযোজ্য নয়। তবু মুহাম্মদের সুপারিশের জন্য বিশেষ সুবিধা সংরক্ষণের বর্ণনা রয়েছে, এবং বড় গুনাহে জড়িত অনুসারীদের সেই সুপারিশের প্রাপক বলা হয়েছে। নিচে দুটি সংশ্লিষ্ট হাদিসের সম্পূর্ণ বক্তব্য একসঙ্গে দেওয়া হলো। [59] [60]

সহীহ মুসলিম
ঈমান অধ্যায়, হাদিস: ১৯৯ক
আরবি মূল: لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا.
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, প্রত্যেক নবীর একটি কবুলযোগ্য দোয়া রয়েছে। প্রত্যেক নবী নিজের সেই দোয়া তাড়াতাড়ি করে ফেলেছেন। আমি আমার দোয়া কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশ হিসেবে সংরক্ষণ করেছি। আল্লাহ চাইলে আমার উম্মতের সেই ব্যক্তি এর সুবিধা পাবে, যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না-করে মৃত্যুবরণ করেছে।
জামে তিরমিযী
কিয়ামতের বিবরণ, হাদিস: ২৪৩৫
আরবি মূল: عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: شَفَاعَتِي لأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي. قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ. وَفِي الْبَابِ عَنْ جَابِرٍ.
বাংলা অনুবাদ: আনাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, আমার সুপারিশ আমার উম্মতের বড় গুনাহকারীদের জন্য। আবু ঈসা তিরমিযী বলেন, এই সূত্রে হাদিসটি হাসান, সহীহ ও গরিব। এই বিষয়ে জাবির থেকেও বর্ণনা রয়েছে।

এই সুপারিশ আল্লাহর ইচ্ছার অধীন; অর্থাৎ কোনো সুপারিশকারী আল্লাহকে বাধ্য করে সিদ্ধান্ত বদলাবেন, এমন কথা উদ্ধৃত বর্ণনায় নেই। কিন্তু তাতে বিচারের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন শেষ হয় না। নিয়মটি যদি বিচারক নিজেই অনুমোদন করে থাকেন, তবুও কারা সুবিধা পাচ্ছে এবং কেন পাচ্ছে, তা পরীক্ষা করতে হবে। এখানে সুবিধাপ্রাপ্তদের পরিচয় হিসেবে মুহাম্মদের উম্মত হওয়া এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক না-করা সামনে এসেছে; বড় গুনাহকারীরাও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং অপরাধের পরিমাণ ও মানুষের প্রতি আচরণের বাইরে ধর্মীয় সম্পর্ক একটি বিশেষ সুযোগের ভিত্তি হচ্ছে। যে ব্যক্তি সেই ধর্মীয় সম্পর্কের বাইরে থেকেও মানুষের উপকার করেছেন, তাঁর জন্য একই সুযোগ কোথায়? ধর্মীয় পরিচয় সুবিধার শর্ত হলে সুপারিশ বিচারকের অনুমোদিত হলেও তার বৈষম্যমূলক চরিত্র বদলায় না।

একজন অপরাধী সংশোধিত হয়েছেন বলে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য হলে তাঁর সংশোধন, অনুতাপ ও ক্ষতি মেটানোর কাজ দিয়েই তা নির্ধারিত হওয়া উচিত। আর তিনি ক্ষমার যোগ্য না হলে অন্য কারও বিশেষ মর্যাদা কীভাবে তাঁকে সেই যোগ্যতা দেবে? সর্বজ্ঞ বিচারক তাঁর যোগ্যতা আগেই জানেন। ফলে সুপারিশ যদি নতুন তথ্য যোগ না করে, তবে মুক্তির সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা বিশেষ অনুগ্রহ বা সম্পর্কের সুবিধা হিসেবে দাঁড়ায়। মানুষের আদালতে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কারও সুপারিশে অপরাধীর সুবিধা হলে আমরা নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলি। পরকালের বিচার নিয়ে একই প্রশ্ন তুলতে বাধা থাকার কারণ কী? বিচারকের অনুমোদন কোনো বিশেষ সুবিধার অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে; সেই সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে ন্যায়সংগত কি না, তা প্রমাণ করে না।

এই পরিচ্ছেদের বর্ণনাগুলো একসঙ্গে রাখলে একটি ধারাবাহিক অগ্রাধিকার দেখা যায়। বিশ্বাসী অপরাধীর জন্য চূড়ান্ত মুক্তির পথ থাকে; শত হত্যাকারীর জন্য ক্ষমা ও বিশেষ সহায়তার কাহিনি আছে; বড় গুনাহকারীর জন্য সুপারিশ সংরক্ষিত থাকে। বিপরীতে, কুফরের ওপর মৃত মানুষের সৎকাজ পরকালের মুক্তির ভিত্তি হয় না। এখানে ধর্মীয় আনুগত্য এমন একটি সুবিধা দিচ্ছে, যা মানুষের প্রতি সততা ও করুণার কাজ দিয়ে অর্জন করা যায় না। ফলে প্রশ্নটি আবার প্রথম মানদণ্ডে ফিরে আসে: বিচার কি মানুষের কাজ ও দায়ের সমান মূল্যায়ন, নাকি বিচারকের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার? যে ব্যবস্থায় বিশ্বাসী অপরাধীর শেষ পর্যন্ত মুক্তি থাকে, অথচ অবিশ্বাসী সৎ মানুষের জন্য সেই মুক্তির পথ বন্ধ থাকে, সেটিকে ইনসাফ বলতে হলে ধর্মীয় পরিচয়ের এই অগ্রাধিকারকে নৈতিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। আল্লাহ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এই দাবি সেই প্রমাণের বিকল্প নয়।


চিরস্থায়ী শাস্তি ও নির্যাতনের ন্যায্যতা

ইনসাফ বিচার করতে হলে শুধু কাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তা দেখলে চলবে না; কী ধরনের শাস্তি, কতদিনের জন্য এবং কোন উদ্দেশ্যে দেওয়া হচ্ছে, তাও পরীক্ষা করতে হবে। একই অপরাধের জন্য সতর্ক করা, সাময়িক স্বাধীনতা সীমিত করা, অঙ্গহানি করা কিংবা অনন্তকাল আগুনে পোড়ানো সমান সিদ্ধান্ত নয়। অপরাধ প্রমাণিত হলেই যেকোনো মাত্রার শাস্তি ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। শাস্তির সঙ্গে অপরাধের গুরুতরতা, দায়, ক্ষতি এবং প্রতিকারের সম্পর্ক দেখাতে হয়। কিন্তু ইসলামের প্রচলিত পরকালীন বিচারে কুফরের ওপর মৃত্যুবরণকারী মানুষের জন্য এমন একটি শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, যার শেষ নেই। সেখানে মানুষ শুধু দীর্ঘদিন কষ্ট পাবে না; মৃত্যু, মুক্তি এবং নির্যাতনের অবসানের পথও বন্ধ থাকবে। সীমিত জীবনের কাজের জন্য সীমাহীন যন্ত্রণা নির্ধারণ করা হলে শাস্তির আনুপাতিকতা কোথায় থাকে—ইনসাফের দাবি যাচাই করতে এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

আগের পরিচ্ছেদে দেখা হয়েছে, বিশ্বাসী বড় অপরাধীর চূড়ান্ত মুক্তি এবং অবিশ্বাসী মানুষের সৎকাজের পরিণতি কীভাবে আলাদা করা হচ্ছে। এখানে সেই শাস্তির প্রকৃতি পরীক্ষা করা হবে। একজন মানুষকে দোষী বলা এবং তাকে চিরকাল নির্যাতন করার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা পৃথক বিষয়। প্রথম দাবির পক্ষে কোনো যুক্তি থাকলেও দ্বিতীয় দাবির জন্য নিজস্ব নৈতিক যুক্তি প্রয়োজন। আল্লাহ শাস্তি দিতে সক্ষম, তিনি সেই শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন কিংবা তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা যাবে না—এসব বক্তব্য শাস্তির ন্যায়সংগততার প্রমাণ নয়। ক্ষমতা দিয়ে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায়; সিদ্ধান্তের নৈতিক যথার্থতা তার কারণ, সীমা ও উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করতে হয়।


সীমিত জীবনের অপরাধে অনন্ত শাস্তি

অনন্ত শাস্তির অর্থ বোঝার জন্য দীর্ঘ শাস্তি এবং শেষহীন শাস্তির পার্থক্য পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। দশ বছর, একশ বছর কিংবা এক লক্ষ বছর—প্রতিটিরই শেষ আছে। কিন্তু অনন্ত শাস্তির ক্ষেত্রে যত সময়ই পেরিয়ে যাক, মুক্তির কোনো দিন আসে না। কোটি বছর আগুনে পোড়ানোর পরও শাস্তি শেষ হওয়ার দিকে এক পা এগোয় না। শাস্তির মেয়াদ কখনো ফুরাবে না বলে অপরাধের দায়ও কখনো মেটানো সম্ভব হয় না। ফলে এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে যন্ত্রণার পরিমাণ বাড়তেই থাকে, অথচ অতীতে সংঘটিত কাজের সংখ্যা ও প্রকৃতি আর বাড়ে না। কোরআনে অবিশ্বাসীদের পরিণতির বর্ণনায় চিরস্থায়ী অবস্থান এবং সাহায্যহীনতার ঘোষণা এসেছে। [61]

কোরআন
সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬৪–৬৬
আরবি মূল: إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا ۝ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَا يَجِدُونَ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا ۝ يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا.
বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ অবিশ্বাসীদের অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত করেছেন। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে; কোনো অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী পাবে না। যেদিন আগুনে তাদের মুখমণ্ডল উলটেপালটে দেওয়া হবে, তারা বলবে, হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসুলের আনুগত্য করতাম!

এই বর্ণনায় শাস্তির সঙ্গে যে অপরাধের সম্পর্ক সামনে এসেছে, তা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য না-করা। কিন্তু আনুগত্যের অভাব নিজে থেকে সীমাহীন নির্যাতনের নৈতিক অধিকার তৈরি করে না। একজন ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় দাবিকে সত্য মনে করতে পারেননি, কিংবা সেই ধর্মের স্রষ্টা ও নবীর কর্তৃত্ব গ্রহণ করেননি—এতে তিনি কাকে কতখানি ক্ষতি করেছেন, সেটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁর সংশয়কে অপরাধ বলে ঘোষণা করলেও সেই অপরাধের জন্য অনন্ত আগুন কেন ন্যায্য, তার উত্তর আলাদা। বিচারকের আনুগত্যের দাবি এবং মানুষের অক্ষত থাকার অধিকার মুখোমুখি হলে প্রথম দাবিটিকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সীমাহীন গুরুত্ব দেওয়া যায় না। কোনো কর্তৃত্বকে স্বীকার না-করার কারণে একজন মানুষকে অনন্তকাল পোড়ানো ন্যায়বিচার নয়; এটি আনুগত্য আদায়ের জন্য সীমাহীন শাস্তির ব্যবস্থা।

শাস্তির আনুপাতিকতা কেবল অপরাধ সংঘটনের সময় দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড কয়েক মুহূর্তে ঘটলেও তার ক্ষতি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই দায়, উদ্দেশ্য, ক্ষতির মাত্রা এবং ভুক্তভোগীর অধিকার বিচার করতে হয়। কিন্তু এসব বিষয় বিবেচনা করার পরও সীমিত মানুষের দায়যোগ্য কাজকে সীমাহীন যন্ত্রণার যোগ্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে হয়; সেটি শুধু “অপরাধ গুরুতর” বলেই প্রমাণিত হয় না। অনন্ত শাস্তিতে এমন কোনো সীমা নেই, যার পরে বলা যাবে অপরাধের দায় অনুযায়ী শাস্তি সম্পন্ন হয়েছে। অতীতের একই কাজের জন্য যন্ত্রণা চলতে থাকবে, অথচ সেই অতীতের কাজটি আর নতুন করে ঘটছে না। বিচার যদি দায়ের উপযুক্ত নিষ্পত্তি হয়, তাহলে এমন শাস্তি দায় মেটানোর সুযোগই চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

মৃত্যুর মাধ্যমে যন্ত্রণা শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও হাদিসের বর্ণনায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সহীহ বুখারীতে মৃত্যুকে এনে জবাই করার এবং জান্নাত ও জাহান্নামের অধিবাসীদের আর মৃত্যু হবে না বলে ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। বর্ণনার শেষ অংশে বলা হচ্ছে, এই ঘোষণায় জাহান্নামবাসীর দুঃখ আরও বাড়বে। অর্থাৎ মুক্তির পথ বন্ধ হওয়ার মানসিক যন্ত্রণাও শাস্তির বর্ণনার অংশ। [62]

সহীহ বুখারী
রিকাক অধ্যায়, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
হাদিস: ৬৫৪৮; বর্ণনাকারী: ইবনু উমার
আরবি মূল: قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: إِذَا صَارَ أَهْلُ الْجَنَّةِ إِلَى الْجَنَّةِ، وَأَهْلُ النَّارِ إِلَى النَّارِ، جِيءَ بِالْمَوْتِ حَتَّى يُجْعَلَ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، ثُمَّ يُذْبَحُ، ثُمَّ يُنَادِي مُنَادٍ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ لاَ مَوْتَ، يَا أَهْلَ النَّارِ لاَ مَوْتَ، فَيَزْدَادُ أَهْلُ الْجَنَّةِ فَرَحًا إِلَى فَرَحِهِمْ، وَيَزْدَادُ أَهْلُ النَّارِ حُزْنًا إِلَى حُزْنِهِمْ.
বাংলা অনুবাদ: ইবনু উমার থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, জান্নাতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে পৌঁছালে মৃত্যুকে এনে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে রাখা হবে। তারপর তাকে জবাই করা হবে। এরপর একজন ঘোষণাকারী বলবে, হে জান্নাতবাসী, আর মৃত্যু নেই! হে জাহান্নামবাসী, আর মৃত্যু নেই! তখন জান্নাতবাসীদের আনন্দের সঙ্গে আরও আনন্দ যোগ হবে এবং জাহান্নামবাসীদের দুঃখের সঙ্গে আরও দুঃখ যোগ হবে।

কোরআনের অন্য বর্ণনায়ও বলা হচ্ছে, জাহান্নামে তাদের মৃত্যু ঘটানো হবে না এবং শাস্তি হালকা করা হবে না। তারা মুক্তি চেয়ে ভালো কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেবে, কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে। ফলে শাস্তির পর সংশোধিত জীবন শুরু করার সুযোগও এখানে দেখানো হচ্ছে না। পৃথিবীর জীবনকে যথেষ্ট সুযোগ বলা হচ্ছে; তারপর আর কোনো মুক্তির ব্যবস্থা থাকছে না। [63]

কোরআন
সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৬–৩৭
আরবি মূল: وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ ۝ وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ.
বাংলা অনুবাদ: যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের মৃত্যু ঘটানো হবে না যে তারা মরে যাবে, এবং তার শাস্তিও তাদের জন্য হালকা করা হবে না। এভাবেই আমরা প্রত্যেক অকৃতজ্ঞ অবিশ্বাসীকে প্রতিদান দিই। সেখানে তারা চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব, আমাদের বের করে দিন; আমরা আগে যা করতাম, তার পরিবর্তে সৎকাজ করব। তাদের বলা হবে, আমরা কি তোমাদের এতটা জীবন দিইনি, যার মধ্যে যে উপদেশ গ্রহণ করতে চায়, সে গ্রহণ করতে পারে? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং শাস্তি আস্বাদন করো; অন্যায়কারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।

এই ব্যবস্থা সংশোধনের সুযোগ দিয়ে মানুষকে সমাজে ফিরিয়ে আনার কোনো প্রক্রিয়া দেখায় না। নিরাপত্তার যুক্তিতেও অনন্ত নির্যাতনের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠিত হয় না। একজন বিপজ্জনক ব্যক্তিকে অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখা এবং তাঁকে অনন্তকাল আগুনে পোড়ানো পৃথক কাজ। সর্বশক্তিমান সত্তা যদি কাউকে নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে সেই নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁর শরীরে সীমাহীন যন্ত্রণা তৈরি করার প্রয়োজন কী? আর ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও অপরাধীকে অবিরাম পোড়ানো কীভাবে ক্ষতি মেটায়, তা দেখাতে হবে। কষ্ট উৎপাদন করতে পারা এবং কষ্ট উৎপাদনের নৈতিক প্রয়োজন থাকা এক বিষয় নয়।

অনন্ত শাস্তির পক্ষে ইসলামকিউএর ২৩৫০২৬ নম্বর উত্তরে একটি যুক্তি সামনে আনা হয়েছে: আল্লাহ জানেন, এসব ব্যক্তিকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠালেও তারা আবার নিষিদ্ধ কাজেই ফিরে যাবে। এই ব্যাখ্যায় বাস্তবে সংঘটিত কাজের সঙ্গে একটি না-ঘটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুক্ত করা হচ্ছে। এর ভিত্তি হিসেবে সূরা আল-আনআমের নিচের আয়াতগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। [64] [65] [66]

কোরআন
সূরা আল-আনআম, আয়াত: ২৭–২৮
আরবি মূল: وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَا لَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ۝ بَلْ بَدَا لَهُمْ مَا كَانُوا يُخْفُونَ مِنْ قَبْلُ وَلَوْ رُدُّوا لَعَادُوا لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ.
বাংলা অনুবাদ: তুমি যদি দেখতে, যখন তাদের আগুনের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, হায়, আমাদের যদি ফেরত পাঠানো হতো! আমরা আমাদের রবের আয়াতগুলোকে মিথ্যা বলতাম না এবং বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। বরং আগে তারা যা গোপন করত, তা তাদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের ফেরত পাঠানো হলেও তারা আবার সেই কাজেই ফিরে যেত, যা থেকে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।

এই যুক্তিতে দুটি আলাদা দাবি রয়েছে। প্রথম দাবি, তাদের ফেরত পাঠালে তারা আবার অপরাধ করত। দ্বিতীয় দাবি, সেই সম্ভাবনার কারণে এখনই তাদের অনন্তকাল শাস্তি দেওয়া ন্যায্য। প্রথম দাবি সত্য বলে ধরলেও দ্বিতীয়টি তার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। ভবিষ্যতে কোনো কাজ করতে পারে বলে কাউকে সেই কাজের অপরাধী গণ্য করলে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও সম্ভাব্য আচরণের পূর্বাভাস এক হয়ে যায়। আগের পরিচ্ছেদে খিজিরের হাতে বালক হত্যার ঘটনায় এই সমস্যাই দেখা হয়েছে। এখানে একই সমস্যার সঙ্গে অনন্ত শাস্তি যুক্ত হয়েছে। কোনো ব্যক্তি অন্য পরিস্থিতিতে কী করত বলে দাবি করা হচ্ছে, তা তার বাস্তবে সংঘটিত কাজের বাইরে অনন্ত শাস্তি যোগ করার নৈতিক অনুমতি নয়।

তাদের কখনো ফেরত পাঠানো হচ্ছে না; সেই সম্ভাব্য কাজও কখনো ঘটছে না। তা সত্ত্বেও না-ঘটা ভবিষ্যতের নামে নির্যাতন চলতে থাকবে। যদি বলা হয়, আল্লাহ তাদের পরিবর্তনের অক্ষমতা জানেন, তাহলে আবার প্রশ্ন আসে: যিনি তাদের সৃষ্টি, মানসিক গঠন ও জীবনের পরিস্থিতি নির্ধারণ করেছেন, তিনি সেই ব্যক্তিদের জন্য পরিবর্তনের পথ একেবারে অসম্ভব হওয়ার অবস্থাটি কেন বজায় রাখবেন? আর সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকানো যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে ক্ষতি করার সুযোগ বন্ধ রাখাই সেই উদ্দেশ্য পূরণ করে। সীমাহীন যন্ত্রণা যোগ করতে হলে তার পৃথক প্রয়োজন দেখাতে হবে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সর্বজ্ঞতার দাবি সেই প্রয়োজন প্রমাণ করে না।

একইভাবে শাস্তির আগাম ঘোষণা থাকাও শাস্তিটিকে ন্যায়সংগত করে না। কোনো শাসক যদি আগে থেকেই ঘোষণা করেন, তাঁর কর্তৃত্বে বিশ্বাস না-করলে মানুষকে অনন্তকাল নির্যাতন করা হবে, তাহলে সেই ঘোষণার অস্তিত্ব দিয়ে নির্যাতনের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। মানুষকে একটি দাবির পক্ষে সন্তোষজনক প্রমাণ দেখানো, সেই দাবি যাচাই করার বাস্তব সুযোগ দেওয়া এবং শাস্তির মাত্রা ন্যায়সংগত রাখা—এসব আলাদা শর্ত। কাউকে ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করা এবং যুক্তি দিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সমান প্রক্রিয়া নয়। অনন্ত শাস্তির হুমকি প্রমাণের দুর্বলতা পূরণ করতে পারে না; ভয় পাওয়া মানুষকে দাবি সত্য বলে বোঝানোর বিকল্পও হতে পারে না।


পোড়া চামড়া বদলে নির্যাতন অব্যাহত রাখা

অনন্ত শাস্তির সঙ্গে নির্যাতনের পদ্ধতিও বিচার করা প্রয়োজন। সূরা নিসায় বলা হয়েছে, অবিশ্বাসীদের চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া দেওয়া হবে, যাতে তারা শাস্তি আস্বাদন করতে থাকে। এখানে দেহ পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য আয়াতেই বলা আছে: যন্ত্রণা অনুভব বজায় রাখা। একই প্রসঙ্গে পরের আয়াতে বিশ্বাসীদের জন্য বাগান, পবিত্র সঙ্গী এবং ছায়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে। বিশ্বাসের ভিত্তিতে একদিকে অব্যাহত দহন, অন্যদিকে আরাম ও পুরস্কারের এই পার্থক্য পাশাপাশি পড়লে বর্ণনার নৈতিক অগ্রাধিকার পরিষ্কার হয়। [67]

কোরআন
সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৬–৫৭
আরবি মূল: إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا ۝ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا.
বাংলা অনুবাদ: যারা আমাদের আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছে, আমরা তাদের আগুনে প্রবেশ করাব। যখনই তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, আমরা তার বদলে অন্য চামড়া দেব, যাতে তারা শাস্তি আস্বাদন করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আর যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকাজ করেছে, আমরা তাদের এমন বাগানে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। তাদের জন্য সেখানে পবিত্র সঙ্গী থাকবে এবং আমরা তাদের গভীর ছায়ায় প্রবেশ করাব।

ইবনু কাসিরের তাফসিরেও এই বর্ণনাকে শাস্তি অব্যাহত রাখার বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি আগুনে দেহের সব অংশ পরিবেষ্টিত হওয়া এবং পোড়া চামড়া বদলে দেওয়ার প্রসঙ্গ একসঙ্গে এনেছেন। নিচে সংশ্লিষ্ট সূচনানুচ্ছেদটি আরবি ও বাংলা অনুবাদসহ সম্পূর্ণ দেওয়া হলো। [68]

ইবনু কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম
সম্পাদক: সামি ইবনু মুহাম্মদ সালামাহ; প্রকাশক: দারু তাইবা
খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৩৭; সূরা নিসা ৪:৫৬-এর ব্যাখ্যার সূচনানুচ্ছেদ
আরবি মূল: يخبر تعالى عما يعاقب به في نار جهنم من كفر بآياته وصد عن رسله، فقال: ﴿إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا﴾ الآية، أي ندخلهم نارا دخولا يحيط بجميع أجرامهم، وأجزائهم. ثم أخبر عن دوام عقوبتهم ونكالهم، فقال: ﴿كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ﴾ قال الأعمش، عن ابن عمر: إذا أحرقت جلودهم بدلوا جلودًا بيضا أمثال القراطيس. رواه ابن أبي حاتم.
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর আয়াত অস্বীকারকারী এবং তাঁর রাসুলদের থেকে মানুষকে বাধা দেওয়া ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে কীভাবে শাস্তি দেবেন, তা জানাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, “যারা আমাদের আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছে, আমরা তাদের আগুনে প্রবেশ করাব।” অর্থাৎ এমনভাবে আগুনে প্রবেশ করাব, যা তাদের সমগ্র দেহ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঘিরে ফেলবে। এরপর তিনি তাদের শাস্তি ও দণ্ড অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন: “যখনই তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, আমরা তার বদলে অন্য চামড়া দেব, যাতে তারা শাস্তি আস্বাদন করে।” আল-আমাশ ইবনু উমার থেকে বর্ণনা করেছেন, তাদের চামড়া পুড়ে গেলে তার বদলে কাগজের মতো সাদা চামড়া দেওয়া হবে। ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।

বাগবীর তাফসিরে নতুন চামড়ার পরিচয় সম্পর্কে উত্থাপিত প্রশ্নের একটি সম্পূর্ণ উত্তরও রয়েছে। [69]

বাগবী, মাআলিমুত তানজিল
খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৩৭–২৩৮; সূরা নিসা ৪:৫৬-এর ব্যাখ্যা
আরবি মূল: فإن قيل: كيف تعذب جلود لم تكن في الدنيا ولم تعصه؟ قيل يعاد الجلد الأول في كل مرة. وإنما قال: ﴿جلودا غيرها﴾ لتبدل صفتها، كما تقول: صنعت من خاتمي خاتما غيره، فالخاتم الثاني هو الأول إلا أن الصناعة والصفة تبدلت، وكمن يترك أخاه صحيحا ثم بعد، مرة يراه مريضا دنفا فيقول: أنا غير الذي عهدت، وهو عين الأول، إلا أن صفته تغيرت.
বাংলা অনুবাদ: যদি প্রশ্ন করা হয়, দুনিয়ায় যে চামড়া ছিল না এবং যা আল্লাহর অবাধ্যতাও করেনি, তাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া হবে? উত্তর হলো, প্রতিবার আগের চামড়াই ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তার বৈশিষ্ট্য বদলায় বলে “অন্য চামড়া” বলা হয়েছে। যেমন বলা হয়, আমার আংটি দিয়ে আরেকটি আংটি তৈরি করেছি। দ্বিতীয় আংটি প্রথমটিই; শুধু নির্মাণ ও বৈশিষ্ট্য বদলেছে। কিংবা কেউ ভাইকে সুস্থ রেখে যাওয়ার পরে তাকে অসুস্থ ও দুর্বল দেখে; ভাই বলে, তুমি আগে যেমন দেখেছিলে, এখন আমি তেমন নেই। সে একই ব্যক্তি, শুধু তার অবস্থা বদলেছে।

দেহের ধারাবাহিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই ব্যক্তির ওপর অব্যাহত নির্যাতনের নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা পৃথক প্রশ্ন। একই ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলেই যেকোনো মাত্রার শাস্তি ন্যায্য হয় না। চামড়া বদলে দেওয়া হচ্ছে যন্ত্রণার অবসান ঘটানোর জন্য নয়; পুনরায় যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। কোনো নির্যাতনকারী যদি একজন মানুষকে পোড়ানোর পরে তাঁর দেহ পুনর্গঠন করে আবার পোড়ানোর ব্যবস্থা করে, সেই পুনর্গঠন আগের নির্যাতনকে ন্যায়সংগত করে না। বরং তা নির্যাতনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। ক্ষমতাবান সত্তা একই কাজ করলে নৈতিক প্রশ্নটিও একই থাকে: কেন মানুষটির কষ্ট থামানো হচ্ছে না, কেন তাঁর দেহ বারবার নির্যাতনের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে, এবং এই অতিরিক্ত যন্ত্রণার সঙ্গে তাঁর দায়ের সম্পর্ক কী? পোড়া দেহ পুনর্গঠন করে বারবার যন্ত্রণা দেওয়ার সামর্থ্য দেখানো যায়; সেই যন্ত্রণা ন্যায্য বলে প্রমাণ করতে তার নৈতিক প্রয়োজন দেখাতে হবে।

এখানে দেহ পুনর্গঠনের ক্ষমতা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। যিনি দেহ পুনর্গঠন করতে পারেন, তিনি সেই ক্ষমতা দিয়ে ক্ষত সারিয়ে নিরাপদ জীবনও দিতে পারেন বলে সর্বশক্তিমানতার দাবি করা হয়। কিন্তু বর্ণিত ব্যবস্থায় ক্ষমতাটি প্রয়োগ হচ্ছে কষ্টের পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করতে। শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর কী শিখবে, কীভাবে বদলাবে কিংবা কোন শর্ত পূরণ করলে মুক্তি পাবে—চিরস্থায়ী নির্যাতনের বর্ণনায় তার কোনো শেষ ধাপ নেই। ফলে এখানে যন্ত্রণা একটি সাময়িক উপায় হয়ে কোনো সংশোধনমূলক ফলের দিকে যাচ্ছে না; যন্ত্রণাই অবিরাম ফল হয়ে থাকছে। এই ফলকে প্রজ্ঞা বলার আগে মানুষের প্রতি এমন আচরণের নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আয়াতের শেষে আল্লাহকে পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় বলা হয়েছে। পরাক্রমের বক্তব্য দিয়ে বোঝানো যায়, তিনি শাস্তি কার্যকর করতে সক্ষম। কিন্তু প্রজ্ঞার বিশেষণ দিয়ে শাস্তির প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয় না। কোনো সিদ্ধান্তকে প্রজ্ঞাময় বলার জন্য তার উদ্দেশ্য ও নৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। যে শাস্তিতে ক্ষতি মেটানোর নির্দিষ্ট সীমা নেই, সংশোধনের পরে মুক্তির সুযোগ নেই এবং যন্ত্রণা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই, সেখানে “প্রজ্ঞাময়” শব্দটি বিচার যাচাইয়ের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রশংসাসূচক বিশেষণ যুক্ত করলেই সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।

এই অনন্ত যন্ত্রণা অবধারিত প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবেও বর্ণিত হচ্ছে না। আগুনে প্রবেশ করানো, মৃত্যু হতে না-দেওয়া, শাস্তি হালকা না-করা এবং নতুন চামড়া দেওয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের কথা রয়েছে। ফলে নির্যাতন বজায় রাখার দায়ও সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। একজন মানুষ একবার আগুনে পড়ে গেল এবং তাকে উদ্ধার করার ক্ষমতা কারও নেই—এমন পরিস্থিতির সঙ্গে এই বর্ণনার তুলনা চলে না। এখানে উদ্ধার করার ক্ষমতা আছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অথচ অবিশ্বাসের ওপর মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কষ্ট থামানোর পথ বন্ধ রাখা হচ্ছে। যে যন্ত্রণা থামানোর ক্ষমতা আছে, সেটিকে সচেতনভাবে অনন্তকাল বজায় রাখা একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত; সেই সিদ্ধান্তের দায় ক্ষমতার আড়ালে লুকানো যায় না।

চিরস্থায়ী শাস্তি ও বারবার দেহ পুনর্গঠন করে নির্যাতনের এই ব্যবস্থা তাই ইনসাফের একাধিক মৌলিক শর্ত ভাঙে। অপরাধের সঙ্গে শাস্তির যুক্তিসংগত সীমা পাওয়া যায় না; যন্ত্রণা শেষ করে দায় মেটানোর সুযোগ থাকে না; সংশোধনের পর মুক্তির পথ দেখানো হয় না; আর কষ্ট অব্যাহত রাখার পৃথক প্রয়োজনও প্রতিষ্ঠিত হয় না। ধর্মীয় কর্তৃত্ব অস্বীকারকে অনন্ত দহনের যোগ্য বলা হলে মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতাও সীমাহীন শাস্তির হুমকির অধীন হয়। ইনসাফের অর্থ যদি কাজ ও দায় অনুযায়ী ন্যায়সংগত বিচার হয়, তাহলে সীমিত জীবনের জন্য অনন্ত নির্যাতন এবং সেই নির্যাতন চালিয়ে যেতে বারবার পোড়া চামড়া বদলে দেওয়া ইনসাফের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আল্লাহর ক্ষমতা বা ঘোষণাকে এই অসংগতির উত্তর হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।


সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও বিচার পাওয়ার অধিকার

কোনো বিচারব্যবস্থার ন্যায়পরায়ণতা শুধু তার শাস্তির তালিকা দিয়ে বোঝা যায় না। অপরাধের শিকার মানুষ কীভাবে অভিযোগ জানাবে, তার কথা কীভাবে পরীক্ষা করা হবে এবং কোন প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে—এসবও ইনসাফের অপরিহার্য অংশ। কঠোর শাস্তি ঘোষণা করলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণের পথ বন্ধ থাকলে সেই শাস্তি তার অধিকার রক্ষায় কতটা কাজে আসে? আবার একই ঘটনা দেখার পর একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা এবং অন্যজনের সাক্ষ্য ধর্ম বা লিঙ্গের কারণে বাদ দেওয়ার মধ্যে কী ন্যায় রয়েছে? বিচারের দরজায় পৌঁছানোর সুযোগ এবং সেখানে নিজের দেখা ঘটনা বলার অধিকার অসমান হলে, শাস্তির কঠোরতা দিয়ে সেই বৈষম্য দূর করা যায় না।

সাক্ষী সত্য বলছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য তার বক্তব্যের সামঞ্জস্য, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি, দেখার সুযোগ, স্মৃতি, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একজন মুসলিম, অমুসলিম, পুরুষ কিংবা নারী—প্রত্যেকেই সত্য বলতে পারে, ভুল করতে পারে এবং মিথ্যাও বলতে পারে। তাই নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষা ব্যক্তির বক্তব্য ও আচরণের ওপর হওয়া উচিত। অথচ শরীয়তের সাক্ষ্যবিধানে ধর্মীয় পরিচয় এবং নারী-পুরুষের পরিচয়কে এমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে বহু ক্ষেত্রে সাক্ষী কী দেখেছে, সেই প্রশ্নে যাওয়ার আগেই তার সাক্ষ্য বাতিল কিংবা কম মূল্যবান হয়ে যায়।


অমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য

ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে মুসলিমের বিরুদ্ধে অমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। এর বাস্তব অর্থ একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি একটি অমুসলিম পরিবারের বাড়িতে ঢুকে তাদের কয়েকজনকে হত্যা করে এবং সেই পরিবারের জীবিত সদস্যরা ঘটনাটি নিজের চোখে দেখে, তাহলে এই বিধান অনুযায়ী মুসলিম অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তাদের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। তারা ঘটনাস্থলে ছিল কি না, হত্যাকারীকে চিনত কি না কিংবা একই বিবরণ দিচ্ছে কি না—এসব পরীক্ষা করে সাক্ষ্য গ্রহণের পরিবর্তে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ই সাক্ষ্য বাতিলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্য কোনো প্রমাণের সম্ভাবনা থাকলেও, নিজেদের দেখা অপরাধ সম্পর্কে আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য দেওয়ার এই অধিকারহীনতা দূর হয় না। [70]—

দশম পরিচ্ছেদ: অমুসলিমদের সাক্ষ্য প্রসংগ
১. মাসআলা: মুসলিমের বিরুদ্ধে কাফিরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় (আল-মুহীত: আস-সারাখসী)।
২. মাসআলা: যিম্মিগণ (মুসলিম দেশের অমুসলিম নাগরিক) যদি পরস্পরে একে অন্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তা গৃহীত হবে, যদিও তারা আলাদা আলাদা ধর্মের অনুসারী হয়। অবশ্য নির্ভরযোগ্য হওয়া সর্বাবস্থায়ই শর্ত (আল-বাদাঈ)।
৩. মাসআলাঃ কোন যিম্মি যদি মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত বিদেশী অমুসলিমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তবে তা জাইয হবে। পক্ষান্তরে যিম্মির বিরুদ্ধে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। এরূপ নিরাপত্তাপ্রাপ্তগণ যদি একই দেশের নাগরিক হয়, তবে তাদের একের বিরুদ্ধে অন্যের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। যদি পৃথক দেশের নাগরিক হয়, যেমন- রোমান ও (প্রাচীন) তুর্কী, তবে গৃহীত হবে না (আজ-জহীরিয়‍্যা)।
৪. মাসআলা: মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগী) নর-নারীর সাক্ষ্য সম্পর্কে মতভেদ আছে। কতক ফুকাহায়ে কিরাম বলেন, কাফিরদের বিরুদ্ধে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। কারও মতে তাদের সাক্ষ্য কেবল তাদের মত মুরতাদের বিরুদ্ধেই গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু বিশুদ্ধতম রায় হচ্ছে যে, তাদের সাক্ষ্য কোনও অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয় (আল-মুহীত)।

ইসলামে ইনসাফ 5

এই উদ্ধৃতিতে শুধু মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যকার পার্থক্য নেই; অমুসলিমদের মধ্যেও মর্যাদার কয়েকটি স্তর তৈরি করা হয়েছে। যিম্মি, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত বিদেশি এবং ইসলামত্যাগী মানুষের সাক্ষ্যের জন্য আলাদা নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে। এমনকি বিদেশিদের দেশের পরিচয়ও সাক্ষ্য গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। একই মানুষ একই ঘটনা সম্পর্কে একই সত্য বললেও, কার বিরুদ্ধে বলছে এবং কোন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক শ্রেণির সদস্য হিসেবে বলছে, তার ভিত্তিতে বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা বদলে যেতে পারে। সত্যের মূল্য সাক্ষীর পরিচয় এবং অভিযুক্তের পরিচয়ের সঙ্গে বদলে গেলে, আদালত সত্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় মর্যাদার পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামওয়েবের সংশ্লিষ্ট ফতোয়াগুলোতেও সাক্ষ্য গ্রহণের শর্ত হিসেবে ইসলামকে উল্লেখ করা হয়েছে। সফরে মৃত্যুর সময় মুসলিমের অসিয়তের সাক্ষ্য হিসেবে অমুসলিমকে গ্রহণ করার বিষয়ে ব্যতিক্রম ও মতভেদ আলোচিত হয়েছে। অপরাধসংক্রান্ত আরেকটি ফতোয়ায় শক্তিশালী সহায়ক প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল অমুসলিমের দেওয়া তথ্য বিবেচনার কথাও আছে; সেখানে ঘটনার ধারণকৃত ছবি গ্রহণ এবং অমুসলিমের নিজের বক্তব্যকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি অমুসলিম মানুষ অপরাধের দৃশ্য ধারণ করলে দৃশ্যটি কাজে লাগতে পারে, অথচ সেই মানুষটির প্রত্যক্ষ বিবরণ ধর্মের কারণে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যের মর্যাদা পায় না। [71] [72]

এখানে সমস্যাটি পরিষ্কার। কোনো ব্যক্তি অন্য ধর্ম মানে বলেই তার দেখা ঘটনা অসত্য হয়ে যায় না। একজন অমুসলিম চিকিৎসক, প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মী যদি অপরাধের নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শী হয়, তাহলে তার বক্তব্য যাচাই করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার ধর্মকে বক্তব্য বাতিলের কারণ করলে মুসলিম অভিযুক্ত এমন একটি সুবিধা পায়, যার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, তার কোনো সম্পর্ক নেই। বিচারপ্রার্থী অমুসলিমকে কার্যত বলা হচ্ছে, তোমার চোখে দেখা সত্য আদালতে গ্রহণ করতে তোমার ধর্মীয় পরিচয় যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখার পরও সাধারণ নিয়মটির বৈষম্য থেকে যায়: সত্য বলার যোগ্যতা বিচার করা হচ্ছে মানুষের বিশ্বাস দিয়ে।


ধর্ষণ প্রমাণে চার সাক্ষী

ধর্ষণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যবিধানের সমস্যা আরও গুরুতর। ইসলামকিউএ অস্ত্রের হুমকি ছাড়া ধর্ষণের শাস্তিকে যিনার হদ্দের কাঠামোয় আলোচনা করে এবং সাক্ষ্য দিয়ে সেই হদ্দ প্রতিষ্ঠার জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষীর শর্ত উল্লেখ করে। সাক্ষীদের কেবল জবরদস্তি, বিবস্ত্র অবস্থায় থাকা কিংবা যৌন আক্রমণের দৃশ্য দেখলেই চলে না; যোনির মধ্যে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করতে দেখার শর্তও আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি স্বীকারোক্তি এবং হদ্দ প্রতিষ্ঠিত না হলে সহায়ক প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারকের নির্ধারিত শাস্তি বা তাযিরের কথাও আছে। অস্ত্রের হুমকিতে ধর্ষণকে ওই ফতোয়ায় হিরাবার অধীনে রাখা হয়েছে। এই আলোচনায় প্রশ্নটি হচ্ছে, সাক্ষ্যের মাধ্যমে ধর্ষকের ওপর যিনার নির্ধারিত শাস্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এমন শর্ত কেন থাকবে, যা পূরণ করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন? [73] [74]

ইবন কুদামার আল-মুগনিতে যিনার সাক্ষ্যের আলোচনায় চারজন ন্যায়পরায়ণ, স্বাধীন মুসলিম পুরুষের শর্ত এসেছে। পরের অংশে অধিকাংশ ফকিহের অবস্থান হিসেবে নারী ও দাসের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যানের কথাও বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ পড়া যাক। [75] [76]

আল-মুগনি
লেখক: ইবন কুদামা
দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩০; যিনার সাক্ষী প্রসঙ্গ
আরবি মূল: وَقَدْ رُوِيَ عَنْ النَّبِيِّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – أَنَّهُ قَالَ: «أَرْبَعَةٌ، وَإِلَّا حَدٌّ فِي ظَهْرِك» فِي أَخْبَارٍ سِوَى هَذَا. وَأَجْمَعُوا عَلَى أَنَّهُ يُشْتَرَطُ كَوْنُهُمْ مُسْلِمِينَ، عُدُولًا، ظَاهِرًا وَبَاطِنًا، وَسَوَاءٌ كَانَ الْمَشْهُودُ عَلَيْهِ مُسْلِمًا أَوْ ذِمِّيًّا. وَجُمْهُورُ الْعُلَمَاءِ عَلَى أَنَّهُ يُشْتَرَطُ أَنْ يَكُونُوا رِجَالًا أَحْرَارًا، فَلَا تُقْبَلُ شَهَادَةُ النِّسَاءِ وَلَا الْعَبِيدِ. وَبِهِ يَقُولُ مَالِكٌ، وَالشَّافِعِيُّ، وَأَصْحَابُ الرَّأْيِ.
বাংলা অনুবাদ: এ ছাড়া অন্য বর্ণনাগুলোতেও নবী—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন: চারজন সাক্ষী, অন্যথায় তোমার পিঠে হদ্দ। তাঁরা একমত হয়েছেন যে সাক্ষীদের মুসলিম এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে ন্যায়পরায়ণ হওয়া শর্ত; যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে, সে মুসলিম কিংবা যিম্মি হোক। অধিকাংশ আলেমের মতে সাক্ষীদের স্বাধীন পুরুষ হওয়াও শর্ত; তাই নারী এবং দাসের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। মালিক, শাফেয়ি এবং আহলুর রায়ের ফকিহরাও এই মত পোষণ করেন।

একই আলোচনায় আতা ও হাম্মাদের নামে তিন পুরুষ ও দুই নারীর সাক্ষ্য গ্রহণের ভিন্ন মতও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উদ্ধৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে নারীকে চার সাক্ষীর একজন হিসেবেও গ্রহণ করা হচ্ছে না। ধর্ষণের শিকার নারী নিজে পুরো ঘটনাটি জানে, তার সঙ্গে থাকা আরেকজন নারী আক্রমণটি দেখে থাকতে পারে, কিংবা কয়েকজন নারী মিলে তাকে উদ্ধার করে থাকতে পারে। এই মানুষগুলো কী দেখেছে, তার মান যাচাইয়ের আগেই সাক্ষ্য দিয়ে যিনার হদ্দ প্রতিষ্ঠার নির্দিষ্ট কাঠামো থেকে তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। নারীর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার বিচারে নারীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকেই নির্ধারিত সাক্ষীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলে, সেই বিধানের ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

অভিযোগের সত্যতা পরীক্ষা করা এবং নির্দোষ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন থেকে চারজন পুরুষকে একই অপরাধের সময় উপস্থিত থেকে যৌনাঙ্গের প্রবেশ প্রত্যক্ষ করতে হবে—এই সিদ্ধান্ত কীভাবে আসে? ধর্ষণকারী সাধারণত সাক্ষীদের সামনে অপরাধ করার আয়োজন করে না। নির্জন জায়গা, বন্দিত্ব, ভয় দেখানো কিংবা আকস্মিক আক্রমণের পরিস্থিতিতে এমন সাক্ষী পাওয়া ভুক্তভোগীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আঘাত, চিকিৎসা পরীক্ষার ফল, ঘটনাস্থলের আলামত, অভিযুক্তের আচরণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য একসঙ্গে বিচার করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট শাস্তির জন্য একটি প্রায় অসম্ভব দৃশ্যদর্শনের শর্ত রাখা হলে তার অসুবিধা পড়ে অপরাধের শিকার মানুষের ওপর। তাযিরের পথ থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নটি থাকে: ধর্ষণের মতো সহিংস অপরাধের নির্ধারিত শাস্তি প্রতিষ্ঠার সাক্ষ্যবিধান কেন সম্মতিতে সংঘটিত নিষিদ্ধ যৌন সম্পর্কের একই ছাঁচ অনুসরণ করবে?

ধর্ষণের শিকার নারীর দায় নিয়েও সংশ্লিষ্ট ফিকহি বক্তব্যটি দেখা প্রয়োজন। ইসলামকিউএ ইবন আবদুল বাররের আল-ইস্তিযকার থেকে যে মূল বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে, সেখানে জবরদস্তি প্রমাণিত হলে নারীর শাস্তি নেই এবং ধর্ষকের ক্ষেত্রে হদ্দের প্রমাণ না থাকলেও শাস্তির কথা আছে। নিচে তাঁর সেই বক্তব্যের সম্পূর্ণ মূল অংশ ও অনুবাদ দেওয়া হলো। [77]

আল-ইস্তিযকার
লেখক: ইবন আবদুল বারর
সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৬; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত মূল বক্তব্য
আরবি মূল: وَقَدْ أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى أَنَّ عَلَى الْمُسْتَكْرِهِ الْمُغْتَصِبِ الْحَدَّ إِنْ شَهِدَتِ الْبَيِّنَةُ عَلَيْهِ بِمَا يُوجِبُ الْحَدَّ، أَوْ أَقَرَّ بِذَلِكَ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَعَلَيْهِ الْعُقُوبَةُ، وَلَا عُقُوبَةَ عَلَيْهَا إِذَا صَحَّ أَنَّهُ اسْتَكْرَهَهَا وَغَلَبَهَا عَلَى نَفْسِهَا، وَذَلِكَ يُعْلَمُ بِصُرَاخِهَا وَاسْتِغَاثَتِهَا وَصِيَاحِهَا.
বাংলা অনুবাদ: আলেমরা একমত হয়েছেন যে জবরদস্তি করে ধর্ষণকারী ব্যক্তির ওপর হদ্দ প্রযোজ্য হবে, যদি তার বিরুদ্ধে এমন সাক্ষ্যপ্রমাণ দেওয়া হয় যা হদ্দ আবশ্যক করে, অথবা সে তা স্বীকার করে। এমনটি না হলে তার ওপর শাস্তি প্রযোজ্য হবে। নারীর ওপর কোনো শাস্তি নেই, যখন প্রতিষ্ঠিত হয় যে সে নারীকে জবরদস্তি করেছে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে পরাস্ত করেছে। নারীর চিৎকার, সাহায্যের আবেদন এবং আর্তনাদ থেকে তা জানা যায়।

এই বক্তব্যে ভুক্তভোগীর শাস্তিমুক্তি জবরদস্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত। এখানেই বাস্তব বিচারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। যে নারী ভয়ে চিৎকার করতে পারেনি, যাকে মুখ চেপে ধরা হয়েছিল, যে অচেতন ছিল কিংবা প্রাণের হুমকিতে প্রতিরোধ করতে পারেনি, তার জবরদস্তির অভিজ্ঞতা কীভাবে যাচাই করা হবে? সাহায্য চাওয়া বা প্রতিরোধের দৃশ্য অনুপস্থিত থাকলে সম্মতি ধরে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। আবার অপরাধীর বিরুদ্ধে চার সাক্ষী হাজির করতে না পারাও ভুক্তভোগী মিথ্যা বলছে বা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছে—এর প্রমাণ নয়। ইনসাফের পরীক্ষায় তাই শুধু শাস্তিমুক্তির ঘোষণা যথেষ্ট নয়; ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক আলামতকে কীভাবে মূল্য দেওয়া হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।

ধর্ষণের অভিযোগ, যিনার হদ্দের সাক্ষ্য এবং অপবাদসংক্রান্ত শাস্তির সম্পর্ক নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা আলাদা প্রবন্ধে রয়েছে। আগ্রহী পাঠক ইসলামি শরিয়তে ধর্ষণের শাস্তি: চার সাক্ষীর বিপজ্জনক বিধান প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারেন। এখানে বিচার্য বিষয় হলো, অভিযোগ যাচাইয়ের পদ্ধতি অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণের মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না এবং ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক সাক্ষ্যবিধান ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার সুযোগকে কতটা সংকুচিত করে।


ঋণের সাক্ষ্যে একজন পুরুষের পরিবর্তে দুই নারী

ঋণের দলিল ও সাক্ষ্য সম্পর্কে সূরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতে প্রথমে দুইজন পুরুষ সাক্ষী নিতে বলা হয়েছে। দুইজন পুরুষ না হলে একজন পুরুষ এবং দুইজন নারী সাক্ষীর কথা এসেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, একজন নারী ভুল করলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। অর্থাৎ এখানে একজন পুরুষের জায়গায় একজন নারীকে যথেষ্ট ধরা হয়নি; দুইজন নারী চাওয়া হয়েছে। ঋণসংক্রান্ত এই নির্দিষ্ট বিধানেই প্রশ্নটি স্পষ্ট: সাক্ষীর জ্ঞান, স্মৃতি এবং ঘটনার সঙ্গে পরিচয়ের পৃথক পরীক্ষা ছাড়া, শুধু নারী হওয়ার কারণে কেন অতিরিক্ত সাক্ষীর প্রয়োজন হবে? আয়াতটি সম্পূর্ণ পড়া যাক। [78] [79] [80]

কোরআন
সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮২
আরবি মূল: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ ۚ وَلْيَكْتُب بَّيْنَكُمْ كَاتِبٌ بِالْعَدْلِ ۚ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَن يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللَّهُ ۚ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا يَبْخَسْ مِنْهُ شَيْئًا ۚ فَإِن كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ ۚ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ أَن تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَىٰ ۚ وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاءُ إِذَا مَا دُعُوا ۚ وَلَا تَسْأَمُوا أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَوْ كَبِيرًا إِلَىٰ أَجَلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ وَأَقْوَمُ لِلشَّهَادَةِ وَأَدْنَىٰ أَلَّا تَرْتَابُوا ۖ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا ۗ وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ ۚ وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ ۚ وَإِن تَفْعَلُوا فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ ۗ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ.
বাংলা অনুবাদ: হে বিশ্বাসীরা! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো। তোমাদের মধ্যে একজন লেখক ন্যায়সংগতভাবে তা লিখবে। আল্লাহ তাকে যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবে লিখতে কোনো লেখক যেন অস্বীকার না করে। সে লিখবে এবং যার ওপর ঋণের দায় রয়েছে, সে লেখার বিষয় বলে দেবে। সে যেন তার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং ঋণ থেকে কিছুই কমিয়ে না বলে। ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ, দুর্বল অথবা নিজে বলে দেওয়ার অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক ন্যায়সংগতভাবে বলে দেবে। তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে দুইজন সাক্ষী রাখো। দুইজন পুরুষ না হলে তোমাদের পছন্দের সাক্ষীদের মধ্যে থেকে একজন পুরুষ ও দুইজন নারী রাখো, যাতে একজন নারী ভুল করলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। সাক্ষীদের যখন ডাকা হয়, তারা যেন অস্বীকার না করে। ঋণ ছোট কিংবা বড় হোক, মেয়াদসহ তা লিখতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। আল্লাহর কাছে এটি অধিক ন্যায়সংগত, সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠার জন্য অধিক শক্তিশালী এবং তোমাদের সন্দেহ না হওয়ার অধিক কাছাকাছি। তবে তোমাদের মধ্যে হাতে হাতে সম্পন্ন হওয়া উপস্থিত ব্যবসা হলে তা না লেখায় তোমাদের দোষ নেই। তোমরা যখন বেচাকেনা করো, সাক্ষী রাখো। লেখক কিংবা সাক্ষীকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয়। তোমরা এমন করলে তা হবে তোমাদের পাপাচার। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞানী।

একজন সাক্ষীর ভুল আরেকজন সাক্ষীর সাহায্যে সংশোধনের ধারণা যুক্তিসংগত হতে পারে। কিন্তু ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি শুধু নারীর কেন হবে? পুরুষও ভুলে যেতে পারে, হিসাব না বুঝতে পারে কিংবা লেনদেনের শর্ত গুলিয়ে ফেলতে পারে। একজন নারী যদি নিয়মিত হিসাব রাখে এবং লেনদেনটি নিজে পরিচালনা করে, আর একজন পুরুষ যদি আর্থিক বিষয়ে অনভিজ্ঞ হয়, তাহলে নারীটির সাক্ষ্যের পাশে আরেকজন নারীকে বাধ্যতামূলক করার কারণ কী? উল্টোভাবে, পুরুষটির সম্ভাব্য ভুল সংশোধনের জন্য একই নিয়ম কেন প্রযোজ্য হবে না? স্মৃতির সীমাবদ্ধতা মানুষের বৈশিষ্ট্য; সেটিকে শুধু নারীর সাক্ষ্যের মূল্য কমানোর কারণ করলে নিয়মটি ব্যক্তির যোগ্যতা যাচাই না করে লিঙ্গের ওপর রায় দেয়।

সহিহ বুখারীর সাক্ষ্য অধ্যায়ে এই পার্থক্যকে নারীর বুদ্ধির ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট হাদিসে নারীর সাক্ষ্য পুরুষের অর্ধেক কি না, তা জিজ্ঞাসা করার পর সেই ব্যবধানকেই বুদ্ধির ঘাটতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হাদিসটির সম্পূর্ণ বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো। [81]

সহিহ বুখারী
কিতাবুশ শাহাদাত; অধ্যায়: নারীদের সাক্ষ্য
হাদিস: ২৬৫৮; গ্রন্থের অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: ৫২তম বই, ২২তম হাদিস
আরবি মূল: حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ، أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي زَيْدٌ، عَنْ عِيَاضِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «أَلَيْسَ شَهَادَةُ الْمَرْأَةِ مِثْلَ نِصْفِ شَهَادَةِ الرَّجُلِ». قُلْنَا بَلَى. قَالَ: «فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ عَقْلِهَا».
বাংলা অনুবাদ: ইবন আবু মারইয়াম আমাদের বর্ণনা করেছেন; মুহাম্মদ ইবন জাফর তাঁকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যায়দ আমাকে জানিয়েছেন; তিনি ইয়াদ ইবন আবদুল্লাহ থেকে এবং তিনি আবু সাঈদ খুদরী—রাদিয়াল্লাহু আনহু—থেকে বর্ণনা করেন। নবী—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—বলেছেন: নারীর সাক্ষ্য কি পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেকের মতো নয়? আমরা বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: এটিই তার বুদ্ধির ঘাটতির অন্তর্ভুক্ত।

এই যুক্তিতে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। প্রথমে বিধানে নারীর সাক্ষ্যের জন্য দুইজনের শর্ত নির্ধারণ করা হচ্ছে; তারপর সেই বিধানের পার্থক্যকেই নারীর বুদ্ধির ঘাটতির পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ কোনো আইন একজন মানুষের বক্তব্যকে কম মূল্য দিলেই তার বুদ্ধি কম—এটি প্রমাণিত হয় না। বুদ্ধি, স্মৃতি এবং নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যক্তির বাস্তব সক্ষমতা পরীক্ষা করতে হয়। নারী হওয়ার কারণে সাক্ষ্যের মূল্য কমিয়ে দিয়ে, কমিয়ে দেওয়া সেই মূল্যকে আবার নারীর ঘাটতির প্রমাণ বানালে বিধানের যথার্থতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয় না। তখন বিধানটি নিজের সিদ্ধান্তকেই নিজের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে।

ঋণের ক্ষেত্রে এই সাক্ষ্যসমন্বয়কে ন্যায়সংগত বলতে হলে দেখাতে হবে, কেন দুইজন যোগ্য নারী দুইজন যোগ্য পুরুষের মতো সাক্ষী হতে পারবে না, অথবা কেন একজন যোগ্য নারীর জায়গায় দুইজন প্রয়োজন হবে। কোনো সমাজে নারীদের আর্থিক কাজের সুযোগ কম থাকলে সেই পরিস্থিতি থেকে কিছু মানুষের অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু সুযোগ কম থাকার ফলকে নারী পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে স্থায়ী বিধান বানানোর যুক্তি পাওয়া যায় না। শিক্ষা, কাজ এবং অভিজ্ঞতা বদলালে ব্যক্তির দক্ষতাও বদলায়। একটি ন্যায়ভিত্তিক সাক্ষ্যবিধান সেই বাস্তব দক্ষতা এবং বক্তব্যের মান পরীক্ষা করবে। ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে কারও সাক্ষ্য বাতিল করা, নারী হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সাক্ষ্য থেকে বাদ দেওয়া এবং একজন পুরুষের জায়গায় দুইজন নারী চাওয়ার মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে, ইনসাফের দাবি যাচাই করতে সেটিরই জবাব প্রয়োজন।


ধর্মীয় পরিচয় অনুসারে মানুষের জীবনের মূল্য

মানুষের জীবনের মূল্য কি তার ধর্ম বদলালে বদলে যায়? একইভাবে হত্যা করা দুইজন মানুষের একজন মুসলিম এবং অন্যজন অমুসলিম হলে, হত্যাকারীর অপরাধের দায় কেন আলাদা হবে? একজনের পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, অন্যজনের পরিবারও একই ক্ষতি ভোগ করেছে। অথচ শরীয়তের কিসাস ও রক্তপণের বিভিন্ন বিধানে নিহতের ধর্মীয় পরিচয়কে শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের মানদণ্ড করা হয়েছে। ধর্মের কারণে একই হত্যাকাণ্ডের প্রতিকার বদলে গেলে, আইনের চোখে মানুষের জীবন সমান থাকে না।


অমুসলিমের জীবনের মূল্য কম

কিসাস হলো ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে হত্যাকারীর ওপর প্রতিশোধমূলক মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের বিধান। নিচের হাদিসগুলোর ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহের অবস্থান হচ্ছে, অমুসলিমকে হত্যার কারণে মুসলিম হত্যাকারীর ওপর কিসাস প্রয়োগ করা যাবে না। অথচ অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিমকে হত্যা করলে এই ধর্মীয় পরিচয় তাকে একই অব্যাহতি দেয় না। এখানে অপরাধের পার্থক্য দিয়ে শাস্তির পার্থক্য তৈরি হচ্ছে না; হত্যাকারী ও নিহতের ধর্মের পার্থক্যই কিসাসের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো পড়া যাক। [82] [83]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮৭/ রক্তপণ
পরিচ্ছদঃ ৮৭/৩১. কাফেরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।
৬৯১৫. আবূ জুহাইফাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কাছে এমন কিছু আছে কি যা কুরআনে নেই? তিনি বললেন, দিয়াতের বিধান, বন্দী-মুক্তির বিধান এবং (এ বিধান যে) কাফেরের বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। (১১১) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৪৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনানে ইবনে মাজাহ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
‏অধ্যায়ঃ ১৫/ রক্তপণ
পরিচ্ছদঃ ১৫/২১. কাফের ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না
১/২৬৫৮। আবূ জুহাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী ইবনে আবূ তালিব (রাঃ) কে বললাম, আপনাদের নিকট এমন কোন জ্ঞান আছে কি যা অন্যদের অজ্ঞাত? তিনি বলেন, না, আল্লাহর শপথ! লোকেদের নিকট যে জ্ঞান আছে তা ব্যতীত বিশেষ কোন জ্ঞান আমাদের নিকট নাই। তবে আল্লাহ যদি কাউকে কুরআন বুঝবার জ্ঞান দান করেন এবং এই সহীফার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দিয়াত ইত্যাদি প্রসঙ্গে যা আছে (তাহলে স্বতন্ত্র কথা)। এই সহীফার মধ্যে আরো আছেঃ কোন কাফেরকে হত্যার অপরাধে কোন মুসলমানকে হত্যা করা যাবে না।
সহীহুল বুখারী ১১১, ১৮৭০, ৩০৪৭, ৩০৩৪, ৩১৭২, ৩১৮০, ৬৭৫৫, ৬৯০৩, ৬৯১৫, ৭৩০০, মুসলিম ১৩৭০, তিরমিযী ১৪১২, ২১২৭, নাসায়ী ৪৭৩৪, ৪৭৩৫, ৪৭৪৪, ৪৭৪৫, ৪৭৪৬, ৪৫৩০, আহমাদ ৬০০, ৬১৬, ৪৮৪, ৯৬২, ৯৯৪, ১০৪০, দারেমী ২৩৫৬, ইরওয়া ২২০৯। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আবু দাউদের বর্ণনায় প্রথমে মুসলিমদের রক্তকে সমমানের বলা হয়েছে। তারপরই অমুসলিম হত্যার জন্য মুসলিমকে হত্যা না করার বিধান এসেছে। অর্থাৎ সমতার ঘোষণা মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ; মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে একই সমতা বহাল থাকছে না। চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা নিষিদ্ধ হওয়ার কথাও একই বর্ণনায় আছে। হত্যাকে নিষিদ্ধ বলা এবং নিহতের জন্য সমান কিসাসের অধিকার রাখা দুইটি পৃথক বিষয়। [84] [85]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ১১. কাফির হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে কি না?
৪৫৩০। কাইস ইবনু আব্বাদ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ও আল-আশতার আলী (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বলি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনাকে বিশেষ কোনো উপদেশ দিয়েছেন যা সাধারণভাবে মানুষকে দেননি? তিনি বললেন, না; তবে শুধু এতটুকু যা আমার এ চিঠিতে আছে। অতঃপর তিনি তার তরবারির খাপ থেকে একখানা পত্র বের করলেন। তাতে লেখা ছিলোঃ সকল মুসলিমের জীবন সমমানের। অন্যদের বিরুদ্ধে তারা একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি।
তাদের একজন সাধারণ ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তাই সকলের জন্য পালনীয়। সাবধান! কোনো মু‘মিনকে কোনো কাফির হত্যার অপরাধে হত্যা করা যাবে না। চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককেও চুক্তি বলবৎ থাকাকালে হত্যা করা যাবে না। কেউ বিদ‘আত চালু করলে তার দায় তার উপর বর্তাবে। কোনো ব্যক্তি বিদ‘আত চালু করলে বা বিদ‘আতিকে মুক্তি দিলে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ এবং ফিরিশতা ও মানবকূলের অভিশাপ।(1)
সহীহ।
(1). নাসায়ী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ কায়স ইবনু ‘উবাদ (রহঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ১১. কাফির হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে কি না?
৪৫৩১। আমর ইবনু শু‘আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অতঃপর আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীদের অনুরূপ। তবে এতে রয়েছেঃ তাদের দূরবর্তীরাও তাদের পক্ষে নিরাপত্তা দিতে পারবে, উত্তম ও দুর্বল পশুর মালিকরা এবং পিছনে অবস্থানরত ও সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ সৈন্যগণও গানীমাতে সমান অংশ লাভ করবে।(1)
হাসান সহীহ।
(1). এটি গত হয়েছে হা/ ২৭৫১।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)

ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় এই বিধান সরাসরি অনুমোদন করা হয়েছে। সেখানে হানাফিদের যিম্মি হত্যায় মুসলিমের কিসাস প্রয়োগের মত উল্লেখ করে, কিসাস না হওয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকেই সঠিক বলা হয়েছে। সম্পূর্ণ ফতোয়াটি এবং তার বাংলা অনুবাদ একসঙ্গে দেওয়া হলো। [86]

All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad is His slave and Messenger. We ask Allaah to exalt his mention as well as that of his family and all his companions.
First of all, you should know that a Muslim should not be killed for killing a belligerent non-Muslim according to the consensus of the scholars may Allaah have mercy upon them. According to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them a Muslim should not be killed against a free non-Muslim under the Muslim rule. The evidence about this is the saying of the Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ): “A Muslim should not be killed for killing a non-Muslim.” (At-Tirmithi)
Moreover, according to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them the title (and rulings) “disbeliever” is applicable to a free non-Muslim under the Muslim rule. However, Abu Haneefah, and the scholars of his School of jurisprudence may Allaah have mercy upon them are of the view that a Muslim should be killed for killing a free non-Muslim under Muslim rule; their evidence is the two verses which the questioner mentioned. Nonetheless, the correct opinion is that of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them that is based on the above Prophetic narration, which is a direct proof related to the case of dispute.
Allaah Knows best.
বাংলা অনুবাদ: সমস্ত পরিপূর্ণ প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর দাস ও রাসূল। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁর এবং তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবির মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
প্রথমে তোমার জানা উচিত, আলেমদের ঐকমত্য অনুসারে যুদ্ধরত অমুসলিমকে হত্যার কারণে মুসলিমকে হত্যা করা হবে না। আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন। অধিকাংশ আলেমের মতে, মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা স্বাধীন অমুসলিমের বদলেও মুসলিমকে হত্যা করা হবে না। এর দলিল নবী—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর বক্তব্য: অমুসলিমকে হত্যার কারণে মুসলিমকে হত্যা করা হবে না। তিরমিযী।
এ ছাড়া অধিকাংশ আলেমের মতে, মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা স্বাধীন অমুসলিমের ক্ষেত্রেও অবিশ্বাসী পরিচয় ও তার বিধান প্রযোজ্য। তবে আবু হানিফা এবং তাঁর মাযহাবের আলেমদের মতে, মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা স্বাধীন অমুসলিমকে হত্যার কারণে মুসলিমকে হত্যা করা হবে; তাঁদের দলিল প্রশ্নকারী উল্লেখিত দুইটি আয়াত। তা সত্ত্বেও সঠিক মত হচ্ছে অধিকাংশ আলেমের মত, যা উপরোক্ত নবীর বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মতভেদের বিষয়টিতে সেটি সরাসরি দলিল।
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

সমকক্ষতা অস্বীকারের চিন্তাটি আল-মুগনির ভাষায় আরও প্রকাশ্য। ইবন কুদামা আহমদের এমন বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে অগ্নিউপাসক, ইহুদি ও খ্রিষ্টানের রক্তপণ মুসলিমের সমান হওয়ার মতকেই আপত্তিকর বলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বক্তব্যটি পড়লে বোঝা যায়, বিতর্কের কেন্দ্রে মানুষের সমান মর্যাদা স্বীকার করার প্রশ্নই রয়েছে। [87]

আল-মুগনি
লেখক: ইবন কুদামা
অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩; মুসলিমকে অমুসলিমের বদলে হত্যা করার প্রসঙ্গ
আরবি মূল: قَالَ أَحْمَدُ: الشَّعْبِيُّ وَالنَّخَعِيُّ قَالَا: دِيَةُ الْمَجُوسِيِّ وَالْيَهُودِيِّ وَالنَّصْرَانِيِّ، مِثْلُ دِيَةِ الْمُسْلِمِ، وَإِنْ قَتَلَهُ يُقْتَلُ بِهِ. هَذَا عَجَبٌ، يَصِيرُ الْمَجُوسِيُّ مِثْلَ الْمُسْلِمِ، سُبْحَانَ اللَّهِ، مَا هَذَا الْقَوْلُ، وَاسْتَبْشَعَهُ. وَقَالَ: النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – يَقُولُ: «لَا يُقْتَلُ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ». وَهُوَ يَقُولُ: يُقْتَلُ بِكَافِرٍ. فَأَيُّ شَيْءٍ أَشَدُّ مِنْ هَذَا.
বাংলা অনুবাদ: আহমদ বলেছেন: শাবি ও নাখায়ি বলেছেন, অগ্নিউপাসক, ইহুদি ও খ্রিষ্টানের রক্তপণ মুসলিমের রক্তপণের সমান; আর মুসলিম তাকে হত্যা করলে, তার বদলে মুসলিমকে হত্যা করা হবে। এ তো বিস্ময়কর! অগ্নিউপাসক মুসলিমের সমান হয়ে যায়! সুবহানাল্লাহ! এ কেমন কথা! তিনি এই মতকে আপত্তিকর মনে করেছেন। তিনি বলেছেন: নবী—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—বলছেন, অমুসলিমের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা হবে না। আর সে বলছে, অমুসলিমের বদলে তাকে হত্যা করা হবে। এর চেয়ে গুরুতর আর কী হতে পারে?

এখানে সমতার বিরুদ্ধে আপত্তির ভাষাটিই গুরুত্বপূর্ণ: অগ্নিউপাসক মুসলিমের সমান হয়ে যায়! কিন্তু একজন মানুষ মুসলিমের সমান আইনগত মর্যাদা পেলে তাতে অন্যায়টি কোথায়? তার জীবন, মৃত্যু এবং পরিবারের ক্ষতি কি কম বাস্তব? অন্য ধর্মের মানুষকে সমান মর্যাদা দেওয়া আপত্তিকর মনে হলে, সেখানে ইনসাফের মানদণ্ড মানুষের অধিকার নয়; নিজের ধর্মের মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব।

উদ্ধৃত দরসে তাওহীদ ও কিতাল গ্রন্থেও নিহত ও হত্যাকারীর ধর্মীয় সমকক্ষতাকে কিসাসের শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্মের পাশাপাশি স্বাধীনতা, লিঙ্গ ও সংখ্যার বিষয়ও একই আলোচনায় রয়েছে। সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিটি রাখা হলো। [88]—

চতুর্থ শর্ত: নিহত ব্যক্তি খুনী ব্যক্তির সমকক্ষ হতে হবে। আর এই সমকক্ষতা চারটি বিবেচনায় হয়। যদিও এই চার বিবেচ্য বিষয়ে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। তথাপি আমরা চারোটি বিষয় উল্লেখ করে এর মধ্যে থেকে অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়টিও উল্লেখ করবো।
প্রথম বিবেচ্য, ধর্মের ক্ষেত্রে সমকক্ষতা: সুতরাং কোন মুসলিমকে কোন কাফিরের
বদলায় হত্যা করা যাবেনা। কারণ মুসলিম এবং কাফির ধর্মের ক্ষেত্রে সমকক্ষ নয়। অতএব কোন মুসলিমকে কোন যিম্মী বা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফিরের বদলায় হত্যা করা যাবেনা। যেহেতু হারবী কাফিরের মৌলিকভাবেই কোন দিয়্যত (রক্তপণ) এবং কিসাস নেই। বরং তাকে হত্যা করা মুস্তাহাব কিংবা ওয়াজিব অথবা মুবাহ (বৈধ)। এটিই জুমহুর শাফেয়ী, হাম্বলী এবং কতিপয় মালেকী ও যাহেরী ফকীহদের মত।
দলীল: হযরত আবু জুহাইফা সূত্রে বর্ণিত মারফু হাদীস। তিনি বলেন, আমি আলী রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কাছে কি এমন কিছু আছে যা কুরআনে নেই? তখন তিনি বললেন, ঐ সত্বার কসম! যিনি দানা বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন- আমার কাছে কুরআনে যা আছে এর বাইরে কিছুই নেই। আর আছে ওই বুঝশক্তি যা কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর কিতাব কুরআনের ব্যাপারে দান করা হয় এবং এই পুস্তিকায় যা আছে তাই। আমি বললাম, কী আছে পুস্তিকায়? তিনি বললেন, দিয়্যত (রক্তপণ), বন্দীমুক্তি বিষয়ক বিধানাবলী এবং এই নীতি- মুসলিম ব্যক্তিকে কোন কাফেরের বদলায় হত্যা করা হবেনা।
অতএব, কোন মুসলিমকে কোন কাফেরের বদলায় হত্যা করা যাবেনা। কিন্তু এ ব্যাপারে হানাফী ফকীহগণ কী বলেন? ইমাম আবু হানীফা রহ. একটি যঈফ হাদীস দিয়ে প্রমাণ পেশ করে বলেন, যিম্মী কাফেরের বদলায় মুসলিমকে হত্যা করা হবে। ইমাম মালিক রহ. বলেন, মুসলিমকে কাফেরের বদলায় হত্যা করা যাবেনা। তবে কেবলমাত্র একটি অবস্থায় তা করা যাবে। তা হল, যদি সে তাকে “গীলা” করে হত্যা করে।
“গীলা’ মানে কী? ইবনে রুশদ রহ. এ ব্যাপারে ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ’ কিতাবে লিখেন,
গীলা হত্যা হল- (কোন যিম্মী অথবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফেরকে) কাত করে শুইয়ে যবাই করে হত্যা করে তার ধন-সম্পদ লুটে নেয়া। ইমাম মালেক রহ. এর মাযহাব হল, এক্ষেত্রে ওই হত্যাকারী মুসলিমকে এই যিম্মী কাফেরের বদলায় হত্যা করা হবে। তবে এটা খুবসম্ভব তা’যীর ইত্যাদি হবে। আল্লাহই ভাল জানেন। কিন্তু অনুসরণের জন্য সহীহ হাদীসই এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারযোগ্য। সহীহ হাদীসে আছে, কোন মুসলিমকে কাফেরের বদলায় হত্যা করা হবেনা।
এটি হল প্রথম বিবেচ্য বিষয়। ধর্মের ক্ষেত্রে সমকক্ষ হওয়া।
দ্বিতীয় বিবেচ্য: স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সমকক্ষতা, অতএব গোলামের বিনিময়ে স্বাধীন
ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবেনা। চাই নিহত ব্যক্তি তার নিজের গোলাম হোক বা অন্যের। এ অভিমতই ব্যক্ত করেছেন শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণ। কিন্তু মালেক রহ. এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, এ প্রকারের হত্যা যদি “গীলা” করে হয়ে থাকে তবে গোলামের বিনিময়ে স্বাধীন হত্যাকারীকে হত্যা করা হবে। যেমনটা তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও বলেছেন।
তৃতীয় বিবেচ্য: লিঙ্গের ক্ষেত্রে সমকক্ষতা, কোন পুরুষকে কি কোন নারীর বদলায় হত্যা
করা যাবে? হ্যাঁ, পুরুষকে নারীর বদলায় হত্যা করা যাবে। এ অভিমতই ব্যক্ত করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হাম্বলী ফকীহগণ। এবং এ মতটিই অগ্রাধিকারযোগ্য।
চতুর্থ বিবেচ্য: সংখ্যায় সমকক্ষতা, অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তি যেমন দুই, তিন অথবা পাঁচ
কিংবা দশজন লোক যদি এক ব্যক্তিকে হত্যার জন্য একমত হয়, কিংবা তারা সকলে এক ব্যক্তির হত্যায় শরীক হয় তাহলে কি ওই এক ব্যক্তির বদলায় এদের সকলকে হত্যা করা হবে? হ্যাঁ, তাদের সকলকেই তার বদলায় হত্যা করা হবে। এ মতই পোষণ করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ফুকাহায়ে কেরাম তথা হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী এবং হাম্বলী ফুকাহায়ে কেরাম। এ মতের উপরই সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের ইজমা (ঐক্যমত্য) প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যেমনটি ঘটেছিল ওমর ইবনে খাত্তাব রা. এর যামানায়। সেটি প্রায় অনেকটা ইজমায়ী (ঐক্যমত্যপূর্ণ) মাসআলার রূপ নিয়েছিল। আল্লাহই ভাল জানেন।

ইসলামে ইনসাফ 7
ইসলামে ইনসাফ 9

এই উদ্ধৃতিতে ধর্মীয় সমকক্ষতার অভাব বলতে নিহতের অপরাধ বোঝানো হয়নি। যিম্মি কিংবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অমুসলিমও মুসলিমের সমকক্ষ নয় বলে কিসাসের বাইরে রাখা হচ্ছে। ধোঁকা দিয়ে হত্যার বিশেষ পরিস্থিতিতে মালিকের ভিন্ন বিধান উল্লেখ করা হলেও সাধারণ ধর্মীয় পার্থক্যটি বহাল রয়েছে। অর্থাৎ সুরক্ষা পাওয়া অমুসলিম নাগরিকের হত্যার বিচারেও মুসলিম পরিচয় হত্যাকারীর জন্য একটি বিশেষ সুবিধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

উসমানের শাসনামলের আলোচনায় এই পার্থক্যের প্রয়োগ পাওয়া যায়। ফিকহে ওসমান গ্রন্থে উবাইদুল্লাহ ইবন উমরের একাধিক হত্যাকাণ্ড, কিসাসের বিষয়ে পরামর্শ এবং রক্তপণ প্রদানের সিদ্ধান্ত বর্ণিত হয়েছে। সেখানে জুফাইনাহর খ্রিষ্টান পরিচয়কে তার হত্যার জন্য মুসলিম হত্যাকারীর কিসাস না হওয়ার কারণ হিসেবে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রন্থটির সম্পূর্ণ উদ্ধৃত অংশ পড়া যাক। [89]—

(ঘ) উত্তেজিত অবস্থায় কোনো অপরাধ করে বসলে। এ ব্যাপারে হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত হচ্ছে-উত্তেজিত অবস্থায় কেউ কোনো অপরাধ করে বসলে তার হুকুম জিনাইয়াতুল খাতা বা ভুলে কৃত অপরাধের মত। এ ক্ষেত্রে কিসাসের পরিবর্তে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা অপরিহার্য হবে। যেমন-আবদুর রহমান ইবনু আবু বকর (রা) বর্ণনা করেছেন-যখন হযরত ওমর (রা)-কে শহীদ করা হলো, তখন আমি হরমুজান, জুফাইনাহ এবং আবু লুলুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারা মদীনার একটি মহল্লায় বসবাস করতো। আমাকে দেখেই তারা পালাতে শুরু করলো। আমিও তাদের পিছু নিলাম। দৌড়ানোর এক পর্যায়ে তাদের হাত থেকে একটি খঞ্জর (বড়ো আকারের ছুরি) পড়ে গেলো, যা দুদিকেই ধারালো ছিলো। আমি দেখেই (আমার সাথীদেরকে) বললাম- দেখো, এটি সেই খঞ্জর যা দিয়ে ওমর (রা)-কে শহীদ করা হয়েছে। লোকজন গিয়ে খঞ্জর দেখে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। যখন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) সেই খঞ্জর দেখলেন, তখন তরবারী নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এবং হরমুজান, জুফাইনাহকে হত্যা করলেন, আর আবু লুলুর কিশোরী কন্যাকে পেয়ে তাকেও হত্যা করে ফেললেন। তারপর তলোয়ার উচিয়ে বলতে লাগলেন- আল্লাহর কসম! আজ মদীনার কোনো গোলাম বা বাঁদী আমার তরবারী থেকে রেহাই পাবে না। এদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককেও হত্যা করতে হবে। আরো কিছু লোক বলতে তিনি কতিপয় মুহাজির সাহাবার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। লোকজন তাকে তলোয়ার ফেলে দেয়ার জন্য চাপ দিলেন। তারা কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এমন সময় সেখানে হযরত আমর ইবনুল আস (রা) এলেন। তিনি খুব নরম ও স্নেহের স্বরে বললেন-‘ভাতিজা। তরবারীটি আমার কাছে দিয়ে দাও।’ তিনি তরবারী দিয়ে দিলেন।
হযরত ওসমান (রা) মজলিসে শূরার অধিবেশন আহ্বান করে তাদেরকে বললেন-আপনারা উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-এর ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দিন। মতামত দিতে গিয়ে শূরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলো। কতিপয় মুহাজির সাহাবা পরামর্শ দিলেন-তাকে কিসাস স্বরূপ হত্যা করা হোক। অন্যেরা বললেন-কী আশ্চর্য! কাল তার পিতাকে শহীদ করা হয়েছে আর আজ তাকে হত্যা করা হবে। আল্লাহ হরমুজান ও জুফাইনাহকে ধ্বংস করুন। হযরত ওসমান (রা) চিন্তার গভীরে হারিয়ে গেলেন। পরে সিদ্ধান্তে পৌছুলেন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) এমন অবস্থায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যখন সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো না। সে এমন কথা বলছে এবং এমন কাজ করছে তা স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ করতে পারে না। তার মানসিক অবস্থা এমন ছিলো, যা কিসাস মুলতবী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সন্দেহের কারণে হদ এর মত কিসাসও মূলতবী হয়ে যায়।
হরমুজান এবং আবু লুলুর কন্যার কোনো উত্তরাধিকারী ছিলো না। এমতাবস্থায় রাষ্ট্র তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছিলো। অন্য কথায় হযরত ওসমান (রা) তাদের অভিভাবক ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন কিভাবে এ সমস্যার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান করা যায়। তাই যারা উৰাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন-আপনারা বলনুতো হরমুজানের অভিভাবক কে? ‘আমীরুল মুমিনীন! তার অভিভাবক তো এখন আপনি।’- তারা উত্তর দিলেন। এ জবাব শুনে তিনি বললেন-‘যদি তাই হয় তাহলে আমি উবাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মাফ করে দিলাম। ‘৬ যখন নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে মাফ করে দেন তখন কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত (রক্তপণ) ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই হযরত ওসমান (রা) বাইতুলমাল থেকে দিয়াত আদায় করে দেবার নির্দেশ দেন। রইলো জুফাইনার ব্যাপারটি। সে খৃষ্টান ছিলো। কোনো অমুসলিম কোনো মুসলমানের হাতে নিহত হলে সেজন্য মুসলমানকে হত্যা করা যায় না। তাই তিনি উবাইদুল্লাহর পক্ষ থেকে তার দিয়াতও আদায় করে দেন।
[খ] কোনো মানুষের ওপর অপরাধ সংঘটিত করা: যদি কোনো মানুষকে হত্যা করা হয়
কিংবা দৈহিক কোনো ক্ষতিসাধন করা হয়, তাহলে দেখতে হবে সেটি ইচ্ছেকৃত করা হয়েছে, না কি তুলে। ইচ্ছেকৃত হলে কিসাস ওয়াজিব হবে। সেই অপরাধ হত্যাজনিত হোক কিংবা কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হানি করে হোক। শর্ত হচ্ছে যদি ফিসাস গ্রহণের ব্যাপারে অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে। কিসাস গ্রহণ করা যদি কোনো অবস্থায়ই সম্ভব না হয় অথবা এমন কিছু কারণ থাকে যে জন্য কিসাসের নির্দেশ রহিত হয়ে যায়। তাহলে দিয়াত (রক্তপণ) প্রদান করা অপরিহার্য।
আর যদি ভুলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে দিয়াত প্রদান ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক)।
[খ.১] মুসলিম কর্তৃক কোনো অমুসলিমের ক্ষতি সাধন: কোনো মুসলমানের হাতে যদি
কোনো অমুসলিম (সে যিম্মি হোক কিংবা না হোক) নিহত হয়, সে জন্য মুসলিম থেকে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করতে হবে। এজন্য হযরত ওসমান (রা) কোনো মুশরিককে হত্যা করার কারণে কোনো মুসলমান থেকে কিসাস গ্রহণ করতেন না। তার সময়ে একজন মুসলমান এক যিম্মীকে ইচ্ছে করে হত্যা করেন। সে জন্য তিনি কিসাস গ্রহণ করেননি বরং দিয়াতু মুগাল্লাযা (অর্থাৎ পুরো দিয়াত) প্রদানের নির্দেশ দেন। ৯ যদি কোনো মুসলমান অমুসলিমকে হত্যা না করে হত্যার চেয়ে কম ক্ষতি সাধন করেন, সে ক্ষেত্রে কিভাবে কিসাস গ্রহণ করা যাবে? এ সম্পর্কে আমরা হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত সংক্রান্ত কোনো বর্ণনা পাইনি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে হযরত ওমর (রা) কিসাস গ্রহণ করতেন না, তবে দিয়াতের পরিমাণ

ইসলামে ইনসাফ 11
ইসলামে ইনসাফ 13
ইসলামে ইনসাফ 15

উদ্ধৃত গ্রন্থে হরমুজান ও আবু লুলুর কন্যার হত্যার বিষয়ে হত্যাকারীর মানসিক অবস্থা এবং রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের যুক্তি দেওয়া হয়েছে; জুফাইনাহর ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের যুক্তি। এই পৃথক কারণগুলো লক্ষ্য করা প্রয়োজন। জুফাইনাহকে হত্যার দায়ে কিসাস না হওয়ার কারণ হিসেবে সে খ্রিষ্টান ছিল—এই কথাটিই ধর্মভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্ট করে। হত্যাকারীর ব্যক্তিগত উত্তেজনা, রাজনৈতিক অবস্থান বা নিহতের ধর্মের কারণে প্রতিকার বদলে গেলে, নিহত মানুষের জীবনের সমান মূল্য কোথায় থাকে?

চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ না পাওয়ার হুমকিও হাদিসে রয়েছে। সেই বর্ণনাটি সম্পূর্ণ দেখা যাক। [90]

সহিহ বুখারী
কিতাবুল জিযিয়া ওয়াল মুওয়াদাআ; হাদিস: ৩১৬৬
আরবি মূল: حَدَّثَنَا قَيْسُ بْنُ حَفْصٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ، حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَمْرٍو، حَدَّثَنَا مُجَاهِدٌ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو ـ رضى الله عنهما ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا تُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا».
বাংলা অনুবাদ: কায়স ইবন হাফস আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুল ওয়াহিদ তাঁকে বর্ণনা করেছেন; হাসান ইবন আমর তাঁকে বর্ণনা করেছেন; মুজাহিদ তাঁকে বর্ণনা করেছেন; তিনি আবদুল্লাহ ইবন আমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা—থেকে এবং তিনি নবী—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ মানুষকে হত্যা করে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না; অথচ তার সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।

পরকালের শাস্তির এই ঘোষণা নিহতের পরিবারের সমান বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। হত্যাকারী পরকালে কী শাস্তি পাবে, সেই দাবি এবং আদালতে নিহতের জন্য কী প্রতিকার থাকবে, তা পৃথক প্রশ্ন। অমুসলিমকে হত্যা করা নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও, সেই হত্যায় মুসলিম হত্যাকারীর কিসাস ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বন্ধ রাখলে বিচারিক বৈষম্য থেকেই যায়। হত্যাকে পাপ বলা আর নিহত মানুষের অধিকার মুসলিমের সমান করা এক কথা নয়।


অমুসলিম হত্যার রক্তপণ

কিসাসের পরে আসে দিয়াত বা রক্তপণের প্রশ্ন। এটি হত্যার কারণে নিহতের পরিবারকে দেওয়ার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ। নিচের বর্ণনাগুলোতে আহলে কিতাবের রক্তপণ মুসলিমের রক্তপণের অর্ধেক বলা হয়েছে। একইভাবে জীবন হারানো মানুষের ক্ষতিপূরণ শুধু ধর্মের কারণে কমিয়ে দেওয়া হলে, আইন নিজেই নিহতদের অসম মর্যাদা নির্ধারণ করে। সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো সম্পূর্ণ দেওয়া হলো [91] [92]

সুনানে ইবনে মাজাহ
১৫/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ১৫/১৩. কাফের-এর দিয়াত
১/২৬৪৪। ‘আমর ইবনে শু‘আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফয়সালা দেন যে, দু’ আহলে কিতাব সম্প্রদায় অর্থাৎ ইহূদী ও নাসারাদের দিয়াত হবে মুসলমানদের দিয়াতের অর্ধেক।
তিরমিযী ১৪১৩, নাসায়ী ৪৮০৬, ৪৮০৭, ইরওয়া ২২৫১।
তাহকীক আলবানীঃ হাসান। উক্ত হাদিসের রাবী আব্দুর রহমান বিন আয়্যাশ সম্পর্কে ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি মাকবুল। ইমাম যাহাবী তাকে সিকাহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৪/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ২১. যিম্মীর দিয়াত সম্পর্কে।
৪৫১৪. ইয়াযীদ ইবন খালিদ (রহঃ) …. আমর ইবন শুআয়ব (রহঃ) তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যিম্মীর দিয়াত হলো স্বাধীন ব্যক্তির দিয়াতের অর্ধেক।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)

তিরমিযীর উদ্ধৃতিতে অর্ধেক রক্তপণের বর্ণনার পাশাপাশি বিভিন্ন ফকিহের ভিন্ন অঙ্কও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ধর্মভেদে রক্তপণ কমানোর বিধান এবং কোন মত কতটা কমাচ্ছে—দুইটি প্রশ্নই সরাসরি দেখা যায়। [93]

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ কাফেরের দিয়াত প্রসঙ্গে।
১৪১৭. ঈসা ইবনু আহমাদ (রহঃ) ….. আমর ইবনু শুআয়ব তাঁর পিতা তাঁর পিতামহ (আবদুল্লাহ ইবনু আমর রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমকে অমুসলিমের বদলে হত্যা করা যাবে না। – ইবনু মাজাহ ২৬৫৯, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৪১৩ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই সনদে আরো বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কাফিরের দিয়াতের পরিমাণ হল মুমিনের দিয়াতের অর্ধেক। – ইবনু মাজাহ ২৬৪৪
এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান। ইয়াহুদী ও খৃস্টানের দিয়াতের বিষয়ে আলিমগণের মতবিরোধ রয়েছে। কতক আলিমের মাযহাব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত এই হাদীস অনুসারে। উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) বলেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের দিয়াত মুসলিমের দিয়াতের অর্ধেক। আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) এ মত পোষণ করেন। উমর ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত তিনি বলেছেন, ইয়হুদী ও খৃস্টানদের দিয়াত হল চার হাজার দিরহাম। অগ্নি উপাসকের দিয়াত হল আটশত দিরহাম। এ হল ইমাম মালিক, শাফিঈ ও ইসহাক (রহঃ)-এর অভিমত। কোন কোন আলিম বলেছেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানের দিয়াত হল মুসলিমের দিয়াতের সমান। এ হল ইমাম সুফইয়ান ছাওরী ও কুফাবাসী আলিমগণের অভিমত।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)

মুয়াত্তা মালিকের আলোচনাতেও ইহুদি, খ্রিষ্টান ও অগ্নিউপাসকের জন্য রক্তপণের আলাদা অঙ্ক রয়েছে। কিসাসের বিধান, ধোঁকা দিয়ে হত্যার পরিস্থিতি এবং অঙ্গহানির ক্ষতিপূরণও একই আলোচনায় এসেছে। [94]

মুয়াত্তা মালিক
৪৩. দিয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১৫. কাফির যিম্মীর দিয়াত
মালিক (রহঃ) বলিয়াছেন, তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) বলতেন, ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের দিয়াত যখন তাহারা একে অন্যকে হত্যা করে, স্বাধীন মুসলমানের দিয়াতের অর্ধেক।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট বিধান এই যে, কোন মুসলমানকে কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা হইবে না। হ্যাঁ, যদি ধোঁকা দিয়া সে যিম্মীকে হত্যা করে তবে তাহাকে হত্যা করা হইবে।
সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) বলিতেন, অগ্নিউপাসকদের দিয়াত আট শত দিরহাম।
মালিক (রহঃ) বলেন, ইহাই আমাদের নিকট বিধান।
মালিক (রহঃ) বলেন, ইহুদী ও খ্রিস্টানদের ক্ষত করার দিয়াত মুসলমানদের ক্ষত করার দিয়াতের হিসাবে মুযিহার বিশ ভাগের একভাগ এবং মাসুমা ও জাইকায় তিন ভাগের একভাগ। ইহার উপর অন্যগুলির অনুমান করা যায়।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)

ইসলামওয়েবের ফতোয়া ২১২২৪-এ মালিকি ও হাম্বলি অবস্থান হিসেবে সংশ্লিষ্ট অমুসলিমের রক্তপণ মুসলিমের অর্ধেক, শাফেয়ি অবস্থান হিসেবে ইহুদি-খ্রিষ্টানের এক-তৃতীয়াংশ এবং অগ্নিউপাসকসহ অন্য সংশ্লিষ্ট শ্রেণির জন্য আরও কম অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফিদের সমান রক্তপণের মতও সেখানে রয়েছে। এই পার্থক্যগুলোতে যে অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশের বিধান দেওয়া হচ্ছে, তার কারণ নিহত মানুষের ক্ষতি কম হওয়া নয়; কারণ তার ধর্মীয় শ্রেণি। [95]

ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে কিসাস না দিয়ে রক্তপণ বাড়ানোর একটি বিধানও রয়েছে। ইসলামকিউএতে ভুলবশত যিম্মি হত্যার রক্তপণ অর্ধেক এবং ইচ্ছাকৃত হত্যায় তা বাড়িয়ে মুসলিমের সমান করার সিদ্ধান্ত আলোচিত হয়েছে। আল-মুগনিতে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে কিসাস বাদ যাওয়ার কথাই বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ অনুচ্ছেদ পড়া যাক। [96] [97]

আল-মুগনি
লেখক: ইবন কুদামা
অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০০; মাসআলা: ৬৮৩৩
আরবি মূল: مَسْأَلَةٌ: قَالَ: «فَإِنْ قَتَلُوهُ عَمْدًا، أُضْعِفَتْ الدِّيَةُ عَلَى قَاتِلِهِ الْمُسْلِمِ؛ لِإِزَالَةِ الْقَوَدِ». هَكَذَا حَكَمَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ -. هَذَا يُرْوَى عَنْ عُثْمَانَ رَوَاهُ أَحْمَدُ عَنْ عَبْدِ الرَّزَّاقِ عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَالِمٍ عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَجُلًا قَتَلَ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الذِّمَّةِ، فَرُفِعَ إلَى عُثْمَانَ، فَلَمْ يَقْتُلْهُ، وَغَلَّظَ عَلَيْهِ أَلْفَ دِينَارٍ. فَصَارَ إلَيْهِ أَحْمَدُ اتِّبَاعًا.
বাংলা অনুবাদ: মাসআলা: তিনি বলেছেন, তারা যদি তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তাহলে তার মুসলিম হত্যাকারীর ওপর দিয়াত দ্বিগুণ করা হবে; কারণ কিসাস বাদ গেছে। উসমান ইবন আফফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু—এভাবেই রায় দিয়েছেন। এটি উসমান থেকে বর্ণিত। আহমদ বর্ণনা করেছেন আবদুর রাজ্জাক থেকে, তিনি মামার থেকে, তিনি যুহরি থেকে, তিনি সালিম থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা থেকে: একজন ব্যক্তি আহলুয যিম্মার একজন মানুষকে হত্যা করল। বিষয়টি উসমানের কাছে আনা হলে তিনি হত্যাকারীকে হত্যা করেননি; বরং তার ওপর কঠোর করে এক হাজার দিনার ধার্য করেছেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে আহমদও একই মত গ্রহণ করেছেন।

এই বিধানে ইচ্ছাকৃত হত্যার রক্তপণ বাড়লেও কিসাসের ধর্মীয় বাধা বহাল থাকে। ফলে দ্বিগুণ রক্তপণকে সমান বিচার বলা যায় না: মুসলিম নিহত হলে যে কিসাস প্রযোজ্য হতে পারে, অমুসলিম নিহত হলে তা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাদ যাচ্ছে। অন্যদিকে ভুলবশত মৃত্যুতে অর্ধেক রক্তপণের নিয়মও পৃথক বৈষম্য তৈরি করছে। একই দুর্ঘটনায় দুইজন মানুষ মারা গেলে একজনের পরিবারকে পূর্ণ অঙ্ক এবং অন্যজনের পরিবারকে ধর্মের কারণে অর্ধেক অঙ্ক দেওয়ার মধ্যে কী ইনসাফ রয়েছে?

এখানে ক্ষতিপূরণ নিহতের আয়, পরিবারের নির্ভরশীলতা কিংবা বাস্তব আর্থিক ক্ষতির পৃথক মূল্যায়ন দিয়ে বদলানো হচ্ছে না। একজন দরিদ্র মুসলিম ও একজন সচ্ছল খ্রিষ্টানের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় শ্রেণি দিয়ে নির্ধারিত অনুপাত প্রযোজ্য হওয়ার কথা। একজন মানুষ ধর্মান্তরিত হলে তার শারীরিক জীবন বা তার পরিবারের ক্ষতি বদলে যায় না; অথচ ধর্মভিত্তিক এই বিধানে তার জন্য প্রযোজ্য কিসাস ও রক্তপণের অবস্থান বদলে যেতে পারে। মানুষের জীবন এক থাকলেও ধর্ম বদলানোর সঙ্গে আইনগত মূল্য বদলে গেলে, সেটি জীবনের সমান মর্যাদার নীতি নয়; ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য।


অর্থ, পারিবারিক সম্পর্ক ও অধিকারের বৈষম্য

ইনসাফের পরীক্ষা শুধু আদালতের ঘোষণায় শেষ হয় না। একই অপরাধের দায় থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ কার বেশি, একই হত্যাকাণ্ডে কোন আত্মীয় বিশেষ ছাড় পান, আর একই পিতা-মাতার সন্তানদের মধ্যে কার অধিকার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কমিয়ে দেওয়া হয়—এসবও বিচার করতে হবে। মানুষের সম্পদ, পরিবারের মধ্যে তার অবস্থান এবং নারী বা পুরুষ হিসেবে তার পরিচয় যদি বিচার ও অধিকারের ফলাফল নির্ধারণ করে, তাহলে সমতার দাবিটি সেখানে প্রশ্নের মুখে পড়ে। শরীয়তের রক্তপণ, সন্তান হত্যায় পিতার কিসাস থেকে অব্যাহতি এবং পুত্র-কন্যার উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান পাশাপাশি রাখলে এই প্রশ্নগুলো আরও স্পষ্ট হয়। আইন সবাইকে সমান চোখে দেখছে কি না, সেটি বোঝার জন্য দেখতে হবে—কার ক্ষতির মূল্য কত, কার অপরাধে কী ছাড়, এবং কার অধিকারে কী কাটছাঁট।


শরীয়তে রক্তপণের বিধান

ইসলামী শরীয়তে হত্যার ক্ষেত্রে কিসাস এবং দিয়াতের বিধান রয়েছে। কিসাস বলতে এখানে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড বোঝানো হচ্ছে; দিয়াত হচ্ছে নিহতের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য রক্তপণ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ। ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে নিহতের অধিকারী স্বজনরা কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত গ্রহণ করতে কিংবা ক্ষমা করতে পারেন। ফলে খুনি নিহতের পরিবারের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করে কিসাস এড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন। এই ব্যবস্থার বিচার করতে হলে একটি সরল প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: একই অপরাধ করা দুই ব্যক্তির মধ্যে যার অর্থ বেশি, তার কি নিজের জীবন রক্ষার জন্য দরকষাকষির সুযোগও বেশি হয়ে যাচ্ছে? অর্থ দিয়ে কিসাস এড়ানোর সুযোগটি আইনের অংশ হলে, ধনসম্পদ তখন শুধু ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের বিষয় থাকে না; অপরাধের পরিণতি বদলানোর উপায়ও হয়ে ওঠে।

ধরুন, করিম নামের একজনকে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল না। তার মৃত্যুর পরে যারা সম্পত্তি পাবেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো তার বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুতেই বেশি লাভ দেখছেন। হত্যাকারী এবার সেই স্বজনদের অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তারা রক্তপণ নিতে রাজি হলেন। এখানে নিহত করিমের নিজের ন্যায়বিচারের দাবি কোথায় গেল? জীবিত অবস্থায় যে মানুষগুলোর সঙ্গে তার বিরোধ ছিল, মৃত্যুর পরে তার হত্যার প্রতিকার নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের হাতে চলে গেল। সম্পত্তির পাশাপাশি আরও কিছু অর্থ পাওয়ার সুযোগ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। নিহতের স্বজনদের হাতে এই ক্ষমতা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই তাদের স্বার্থ এবং নিহত ব্যক্তির স্বার্থ এক কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। নিহতের পরিবার আর নিহত মানুষটি একই সত্তা নয়; পরিবারের আর্থিক লাভকে নিহতের প্রতি ইনসাফ বলে ধরে নেওয়া যায় না।

ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে ক্ষমা ও অর্থ প্রদানের সুযোগের ভিত্তি দেখতে সূরা বাকারার ১৭৮ নম্বর আয়াতটি পড়া প্রয়োজন। এখানে কিসাসের বিধানের সঙ্গে ক্ষমা, দাবি আদায় এবং অর্থ প্রদানের কথাও এসেছে। [98]—

কোরআন
সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৮
আরবি মূল:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَىٰ بِالْأُنْثَىٰ فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَٰلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَىٰ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ
বাংলা অর্থ:
হে বিশ্বাসীরা, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিসাস নির্ধারিত হয়েছে: স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস এবং নারীর বদলে নারী। তবে যার প্রতি তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষমা করা হয়, তার ক্ষেত্রে ন্যায়সংগতভাবে দাবি অনুসরণ করতে হবে এবং সুন্দরভাবে তাকে তা পরিশোধ করতে হবে। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে লাঘব ও দয়া। এরপর যে সীমা লঙ্ঘন করবে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

বহুতির শরহু মুনতাহাল ইরাদাত গ্রন্থে ক্ষমা, শাস্তি ও আর্থিক সমঝোতার হানবলি বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি পড়ুন। [99]—

শরহু মুনতাহাল ইরাদাত
মানসুর আল-বহুতি
কিতাবুল জিনায়াত, কিসাস ক্ষমার অধ্যায়
খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৭৮–২৭৯
আরবি মূল:
وَيَصِحُّ عَفْوٌ بِلَفْظِ الصَّدَقَةِ وَكُلِّ مَا أَدَّى مَعْنَاهُ؛ لِأَنَّهُ إِسْقَاطٌ. (ثُمَّ لَا تَعْزِيرَ عَلَى جَانٍ) بَعْدَ عَفْوٍ؛ لِأَنَّ عَلَيْهِ حَقًّا وَاحِدًا وَقَدْ سَقَطَ كَعَفْوٍ عَنْ دِيَةِ خَطَأٍ. (فَإِنِ اخْتَارَ الْوَلِيُّ الْقَوَدَ) فَلَهُ أَخْذُهَا، وَالصُّلْحُ عَلَى أَكْثَرَ مِنْهَا؛ لِأَنَّ الْقِصَاصَ أَعْلَى فَلَا يَمْتَنِعُ عَلَيْهِ الِانْتِقَالُ إِلَى الْأَدْنَى، وَتَكُونُ الدِّيَةُ بَدَلًا عَنِ الْقِصَاصِ.
বাংলা অর্থ:
সদকা শব্দ দিয়ে এবং একই অর্থ প্রকাশ করে এমন যেকোনো শব্দ দিয়ে ক্ষমা করা বৈধ; কারণ এতে অধিকার ছেড়ে দেওয়া হয়। ক্ষমা করার পরে অপরাধীর ওপর আর তাজির প্রয়োগ করা হবে না; কারণ তার ওপর একটি অধিকার ছিল, সেটি বিলুপ্ত হয়েছে—যেমন ভুলবশত হত্যার দিয়াত ক্ষমা করা হলে হয়। অধিকারী স্বজন যদি কিসাস বেছে নেন, তবুও তিনি দিয়াত গ্রহণ করতে এবং দিয়াতের চেয়ে বেশি অর্থে সমঝোতা করতে পারেন; কারণ কিসাস উচ্চতর, ফলে তা থেকে নিম্নতর প্রতিকারে যাওয়া নিষিদ্ধ হয় না। তখন দিয়াত কিসাসের বিকল্প হয়।

এখানে নিহতের পরিবারের ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন এবং হত্যার সামাজিক দায়—দুইটি আলাদা প্রশ্ন রয়েছে। পরিবার উপার্জনকারী মানুষ হারালে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। সেই প্রয়োজন পূরণ করা ন্যায়সংগত। কিন্তু ক্ষতিপূরণের সঙ্গে হত্যাকারীর কিসাস থেকে অব্যাহতি বেঁধে দিলে অর্থের লেনদেন অপরাধের পরিণতি নির্ধারণে ভূমিকা পায়। হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের আর্থিক ক্ষতি করে না; একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় এবং সমাজের নিরাপত্তাকেও আঘাত করে। অথচ উদ্ধৃত বিধানে স্বজনের ক্ষমার পরে তাজিরও বাদ যাচ্ছে। তখন প্রশ্ন ওঠে, নিহতের স্বজনদের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেলেই সমাজের প্রতি হত্যাকারীর দায়ও কীভাবে শেষ হয়ে যায়?

ধরুন, বিল গেইটসের মেয়ে এবং হতদরিদ্র আক্কাস আলীর ছেলে পৃথক দুইটি ঘটনায় একই ধরনের ইচ্ছাকৃত হত্যা করেছেন। দুই নিহতের পরিবারই অর্থের বিনিময়ে কিসাস ছেড়ে দিতে প্রস্তুত, কিন্তু এমন অর্থ চাইছেন যা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব। বিপুল সম্পদের অধিকারী পরিবার বড় অঙ্কের প্রস্তাব দিতে পারে, দীর্ঘদিন দরকষাকষি চালাতে পারে এবং নিহতের পরিবারের আর্থিক সংকটকে সমঝোতার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। আক্কাস আলীর ছেলের হাতে সেই সুযোগ থাকবে না। অপরাধ একই হলেও কিসাস এড়ানোর বাস্তব সুযোগ সমান থাকে না; ধনী পরিবারের অর্থ সেখানে বিচারিক পরিণতি বদলানোর শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। নিহতের পরিবার প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, সেটিও তাদের সিদ্ধান্ত; কিন্তু বড় অঙ্কের প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষমতা কার আছে, সেটি সম্পদের প্রশ্ন।

ভুলবশত মৃত্যু ঘটানোর বিধানটি আলাদাভাবে দেখা দরকার। ইচ্ছাকৃত হত্যা এবং অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুতে অপরাধের প্রকৃতি এক নয়। সূরা নিসার ৯২ নম্বর আয়াতটি বিশেষভাবে ভুলবশত হত্যার কথা বলছে; এতে রক্তপণ, বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং দাস মুক্ত করার সামর্থ্য না থাকলে একটানা দুই মাস রোজার বিধান এসেছে। এখানে দাসমুক্তি ও রোজার কাফফারা পড়ে ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী শুধু দাস মুক্ত করেই কিসাস এড়াতে পারেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আয়াতটি সম্পূর্ণ পড়লে এই পার্থক্য এবং নিহতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী প্রতিকারের পার্থক্যও বোঝা যায়। [100]—

কোন মুমিনকে হত্যা করা যেন মুমিনের কাজ নয় (১), তবে ভুলবশতঃ করলে সেটা স্বতন্ত্র; এবং কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক মুমিন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা কর্তব্য, যদি না তারা ক্ষমা করে। যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং মুমিন হয় তবে এক মুমিন দাস মুক্ত করা কর্তব্য। আর যদি সে এমন সম্প্রদায়ভুক্ত হয় যাদের সাথে তোমরা অংগীকারাবদ্ধ তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় এবং মুমিন দাস মুক্ত করা কর্তব্য। আর যে সঙ্গতিহীন সে একাদিক্রমে দু মাস সিয়াম পালন করবে (২)। তাওবাহ্‌র জন্য এগুলো আল্লাহর ব্যবস্থা এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোন মু’মিনকে হত্যা করা কোন মু’মিনের কাজ নয় তবে ভুলবশত হতে পারে, কেউ কোন মু’মিনকে ভুলক্রমে হত্যা করলে, একজন মু’মিন দাস মুক্ত করা বা তার পরিবারবর্গকে রক্তপণ দেয়া কর্তব্য, যদি না তারা ক্ষমা করে দেয়। যদি সে তোমাদের শত্রুপক্ষের লোক হয় এবং মু’মিন হয় তবে একজন মু’মিন গোলাম আযাদ করা কর্তব্য, আর যদি সে এমন গোত্রের লোক হয় যাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে তবে তার পরিবারকে রক্তপণ দেয়া এবং একজন মু’মিন গোলাম আযাদ করা কর্তব্য এবং যে ব্যক্তি সঙ্গতিহীন সে একাদিক্রমে দু’ মাস রোযা পালন করবে। এটাই হল আল্লাহর নিকট তাওবাহ করার ব্যবস্থা, আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সুবিজ্ঞ।
Taisirul Quran
আর কোন মুমিনের কাজ নয় অন্য মুমিনকে হত্যা করা, তবে ভুলবশত (হলে ভিন্ন কথা)। যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাহলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি সদাকা (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে দিতে হবে না)। আর সে যদি তোমাদের শত্রু কওমের হয় এবং সে মুমিন, তাহলে একজন মুমিন দাস মুক্ত করবে। আর যদি এমন কওমের হয় যাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সন্ধিচুক্তি রয়েছে তাহলে দিয়াত দিতে হবে, যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিবারের কাছে এবং একজন মুমিন দাস মুক্ত করতে হবে। তবে যদি না পায় তাহলে একাধারে দু’মাস সিয়াম পালন করবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
Rawai Al-bayan
কোন মু’মিনের উচিত নয় যে, ভ্রম ব্যতীত কোন মু’মিনকে হত্যা করে; যে কেহ ভ্রম বশতঃ কোন মু’মিনকে হত্যা করে তাহলে সে জনৈক মু’মিন দাসকে মুক্ত করে দিবে এবং তার আত্মীয় স্বজনকে হত্যার বিনিময় সমর্পণ করবে; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে দেয় এবং যদি সে তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ও মু’মিন হয় তাহলে জনৈক মু’মিন দাসকে মুক্তি দান করবে; এবং যদি সে তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে সন্ধিবদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয় তাহলে তার স্বজনদেরকে হত্যার বিনিময় অর্পণ করবে এবং জনৈক মু’মিন দাসকে মুক্ত করবে; কিন্তু যদি সে ওটায় অক্ষম হয় তাহলে আল্লাহর নিকট হতে ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য একাদিক্রমে দুই মাস সিয়াম পালন করবে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়।
Sheikh Mujibur Rahman
And never is it for a believer to kill a believer except by mistake. And whoever kills a believer by mistake – then the freeing of a believing slave and a compensation payment (diyah) presented to his (i.e., the deceased’s) family (is required), unless they give (up their right as) charity. But if he (i.e., the deceased) was from a people at war with you and he was a believer – then (only) the freeing of a believing slave; and if he was from a people with whom you have a treaty – then a compensation payment presented to his family and the freeing of a believing slave. And whoever does not find (one or cannot afford to buy one) – then (instead), a fast for two months consecutively,1 (seeking) acceptance of repentance from Allah.2 And Allah is ever Knowing and Wise.
Saheeh International

দিয়াতের পরিমাণ নিয়েও হাদিসে বিস্তারিত বিধান আছে। নিচের বর্ণনায় স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা ও গবাদিপশুর হিসাবে দিয়াত নির্ধারণের কথা রয়েছে। একই বর্ণনায় মুসলিম এবং আহলে-কিতাবের দিয়াতের পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ রক্তপণের ব্যবস্থার মধ্যে সম্পদের প্রশ্নের পাশাপাশি নিহতের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণে বৈষম্যের প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। [101]—

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৪/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দিয়াতের (হত্যার বিনিময়ের) পরিমাণ সম্পর্কে।
৪৪৭৬. ইয়াহইয়া ইবন হাকীম (রহঃ) ….. আমর ইবন শু’আয়ব (রহঃ) তার পিতা হতে এবং তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় দিয়াতের মূল্যমান ছিল-আট শত দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা আট হাযার দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা)-এর অনুরূপ। এ সময় আহলে-কিতাব (ইয়াহূদ-নাসারা)-দের জন্য দিয়াতের পরিমাণ ছিল মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত দিয়াতের অর্ধেক, যার প্রচলন উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের পূর্ব পর্যন্ত ছিল। তিনি খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে গিয়ে বলেনঃ এখন উটের দাম বেড়ে গেছে।
রাবী বলেনঃ এরপর উমার (রাঃ) দিয়াতের মূল্যমান আটশত দীনার হতে এক হাজার দীনারে এবং আট হাযার দিরহাম হতে বার হাযার দিরহাম নির্ধারিত করেন। আর তিনি গাভীর মালিকদের জন্য দুইশো গাভী এবং বকরীর মালিকদের জন্য দু’হাজার বকরী নির্ধারণ করেন। তিনি যিম্মীদের দিয়াত আগের মত বহাল রাখেন এবং তাতে কিছু বৃদ্ধি করেননি, যেমন তিনি মুসলমানদের দিয়াত বৃদ্ধি করেন।

হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)

এবার ধনী পরিবারের ছেলে করিম এবং দরিদ্র পরিবারের ছেলে রহিমের কথা ভাবুন। তারা পৃথক দুইটি ঘটনায় একই ধরনের হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। দুই নিহতের পরিবারই অর্থের শর্তে কিসাস ছেড়ে দিতে রাজি। করিমের পরিবার প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারল; রহিমের পরিবার পারল না। এই পরিস্থিতিতে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা সম্পন্ন করার পথ করিমের জন্য কার্যকর, রহিমের জন্য কার্যকর নয়। তাদের চরিত্র, অপরাধের ভয়াবহতা কিংবা অনুতাপের গভীরতা এই পার্থক্য তৈরি করেনি; পার্থক্য তৈরি করেছে পরিবারের অর্থ। যে বিচারব্যবস্থা এমন সুযোগকে স্বীকৃতি দেয়, তার ইনসাফ যাচাই করতে গিয়ে ধনী-দরিদ্রের এই অসম অবস্থান উপেক্ষা করা যায় না।

আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, নিহতের দরিদ্র পরিবার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কতটুকু সুযোগ পায়? একদিকে প্রিয়জন হারানোর ক্ষতি, অন্যদিকে জীবিকা, ঋণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং ক্ষমতাবান অপরাধীর চাপ—সব মিলিয়ে অর্থ গ্রহণে সম্মতি সব সময় সমান ক্ষমতার মানুষের স্বাধীন সমঝোতা হয় না। এই অবস্থায় পরিবারের অর্থের প্রয়োজন হত্যাকারীর জন্য মুক্তির দরজা হয়ে যেতে পারে। বিচারব্যবস্থার কাছে তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা করার দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি অপরাধের দায়কে ধনসম্পদের ওপর নির্ভরশীল হতে না দেওয়ার দায়িত্বও আছে। ক্ষতিপূরণ কত পাওয়া গেল এবং হত্যার দায়ে কী বিচার হলো—এই দুইটি প্রশ্নকে এক করে ফেললে নিহত মানুষের জীবনের অধিকার অর্থের দরকষাকষিতে হারিয়ে যেতে পারে।


নিজ সন্তানকে হত্যা করা

হত্যাকারী ও নিহতের পারিবারিক সম্পর্কও শরীয়তের কিসাসের বিধানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। পিতা সন্তানকে হত্যা করলে পিতার ওপর কিসাস কার্যকর না করার একটি বহুল গৃহীত ফিকহি অবস্থান রয়েছে। এখানে হত্যাকাণ্ডের দায়ের সঙ্গে পিতৃত্ব যুক্ত হয়ে বিশেষ ছাড় তৈরি করছে। সন্তানকে হত্যা করলে দিয়াতের দায় থাকতে পারে; কিন্তু অন্য কাউকে একইভাবে হত্যা করলে যে কিসাসের মুখোমুখি হতে হতো, নিজের সন্তানকে হত্যার ক্ষেত্রে তা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাচ্ছে। নিচের হাদিসে সেই ছাড়ের বক্তব্য সরাসরি আছে। [102]—

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৪/ দিয়াত বা রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ৯. বাবা ছেলেকে খুন করলে তার কিসাস হবে কি না
১৪০০। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ ছেলেকে খুনের অপরাধে বাবাকে হত্যা করা যাবে না।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

হাদিসটি সরাসরি বই থেকেও দেখা যাক। [103]—

ইনসাফ

সুনান ইবনু মাজাহতেও একই বিধান পাওয়া যাচ্ছে। হাদিসটির পরিচ্ছেদ এবং বক্তব্য দুইটিই সন্তান হত্যার জন্য পিতার ওপর কিসাস না হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে। [104]—

সুনান ইবনু মাজাহ
১৫/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ১৫/২২. সন্তানকে হত্যার অপরাধে পিতাকে হত্যা করা যাবে না
২/২৬৬২। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ সন্তান হত্যার অপরাধে পিতাকে হত্যা করা যাবে না।
তিরমিযি ১৪০০, ইরওয়া ২২১৪।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

মূল বইয়ের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাটিও দেখুন। [105]—

ইসলামে ইনসাফ 18

এই বিধান বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ইসলামী আইনের সংকলনেও রয়েছে। নিচে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন গ্রন্থের সংশ্লিষ্ট অংশ দেওয়া হলো। [106]—

সন্তান হত্যার বিধান

কেন পিতাকে এই বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে, তার ফিকহি ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। শামেলায় সংরক্ষিত ইবন কুদামার আল-মুগনি গ্রন্থে পিতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ককে মালিকানার সন্দেহ এবং জন্ম দেওয়ার যুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে কিসাস বাদ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর আগে গ্রন্থে “তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার পিতার” বক্তব্যটি উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যামূলক অনুচ্ছেদটি পড়ুন। [107]—

আল-মুগনি
ইবন কুদামা
মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ
খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৮৫, মাসআলা ৬৬২১
আরবি মূল:
وَقَضِيَّةُ هَذِهِ الْإِضَافَةِ تَمْلِيكُهُ إيَّاهُ، فَإِذَا لَمْ تَثْبُتْ حَقِيقَةُ الْمِلْكِيَّةِ، بَقِيَتْ الْإِضَافَةُ شُبْهَةً فِي دَرْءِ الْقِصَاصِ؛ لِأَنَّهُ يُدْرَأُ بِالشُّبُهَاتِ، وَلِأَنَّهُ سَبَبُ إيجَادِهِ، فَلَا يَنْبَغِي أَنْ يَتَسَلَّطَ بِسَبَبِهِ عَلَى إعْدَامِهِ.
বাংলা অর্থ:
এই সম্বন্ধ আরোপের তাৎপর্য তাকে পিতার মালিকানায় দেওয়া। প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলেও, এই সম্বন্ধ কিসাস দূর করার ক্ষেত্রে একটি সন্দেহ হিসেবে থেকে যায়; কারণ সন্দেহের কারণে কিসাস রদ করা হয়। তাছাড়া পিতা সন্তানের অস্তিত্বের কারণ; তাই সন্তানের কারণে পিতার অস্তিত্ব বিলোপ করার ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত নয়।

জন্ম দেওয়ার ঘটনাটি এখানে হত্যার দায় নির্ধারণে সুবিধা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একজন মানুষকে জন্ম দেওয়ার ফলে তার জীবনের ওপর কি জন্মদাতার বিশেষ অধিকার তৈরি হয়? সন্তান পিতার সম্পত্তি নয়; তার জীবন, শরীর এবং নিরাপত্তা তার নিজের। পিতৃত্বের সঙ্গে সন্তানের যত্ন ও সুরক্ষার দায়িত্ব যুক্ত হওয়ার কথা। সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষটি সন্তানকে হত্যা করলে দায়িত্বভঙ্গের প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়। অথচ উদ্ধৃত যুক্তিতে জন্মদাতার অবস্থানই হত্যার পর কিসাস এড়ানোর কারণ। যিনি সন্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব বহন করেন, তার হাতে সন্তান নিহত হলে সেই সম্পর্ককে হত্যাকারীর ছাড়ের কারণ বানানো ইনসাফের দাবি আরও কঠিন করে তোলে।

এই বিধান শুধু সাধারণ একটি বাক্য হিসেবে থাকেনি; ইচ্ছাকৃত সন্তান হত্যার ঘটনার বিবরণেও তা পাওয়া যাচ্ছে। মুসনাদে আহমাদের নিচের বর্ণনায় পিতা ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানকে হত্যা করেছেন বলে উল্লেখ আছে। উমার তার ওপর উটের হিসাবে দিয়াত ধার্য করেছেন এবং বলেছেন, পিতাকে সন্তান হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার বক্তব্যটি না শুনলে তিনি তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতেন। অর্থাৎ এখানে কিসাস বাদ দেওয়ার কারণ অপরাধের অনিচ্ছাকৃত প্রকৃতি নয়; পিতা-সন্তানের সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট ছাড়। [108]—

মুসনাদে আহমাদ
মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস)
পরিচ্ছেদঃ
৩৪৬। আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা থেকে এবং তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি তার ছেলেকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলো। উমার ইবনুল খাত্তাবের নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের হলো। তিনি হত্যাকারীর ওপর একশো উট জরিমানা ধার্য করলেন। তন্মধ্যে ত্রিশটি হিক্কা, ত্রিশটি জাযআ এবং চল্লিশটি ছানিয়া। তিনি বললেন, হত্যাকারী উত্তরাধিকার পায়না। আর আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ কথা বলতে না শুনতাম যে, পিতাকে সন্তান হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না, তাহলে আমি তোমাকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দিতাম।
(হাদীস নং-১৪৭ দ্রষ্টব্য)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

এখানে হত্যাকারী উত্তরাধিকার পাবেন না বলে উল্লেখ আছে এবং দিয়াতও ধার্য হয়েছে। ফলে বিচার্য প্রশ্নটি হচ্ছে কিসাসের সমতা। একই অপরাধে পরিবারের বাইরের হত্যাকারী এবং পিতা কেন একই অবস্থানে থাকবেন না? নিহত সন্তানকে হত্যাকারীর উত্তরাধিকার পাওয়ার উপায় বন্ধ করা এবং হত্যাকারী পিতাকে কিসাস থেকে বিশেষ অব্যাহতি দেওয়া—দুইটি পৃথক বিধান। প্রথমটি দ্বিতীয়টির বৈষম্য দূর করে না। সন্তানের জীবনকে স্বতন্ত্র অধিকার হিসেবে স্বীকার করলে, তার হত্যার বিচারেও পিতার পরিচয়ের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা দেখাতে হবে।

মুয়াত্তা মালিকের নিচের বর্ণনায় পিতার তলোয়ারের আঘাতে সন্তানের মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুর জন্য উটের হিসাবে রক্তপণ আদায়ের ঘটনা রয়েছে। এটি আগের ইচ্ছাকৃত হত্যার বর্ণনা থেকে আলাদা ঘটনা; দুইটির বিবরণই সম্পূর্ণ দেওয়া হলো। [109]—

মুয়াত্তা মালিক
৪৩. দিয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দিয়াত হইতে মীরাস দেওয়া এবং উহাতে কাঠিন্য করা
রেওয়ায়ত ১০. আমর ইবন শুআয়েব (রহঃ) বনী মদলজের এক ব্যক্তি, যাহার নাম ছিল কাতাদা, নিজের ছেলেকে তলোয়ারে আঘাত করিল, যাহাতে ঐ ছেলের পায়ে আঘাত লাগিল। ক্ষতস্থান হইতে রক্ত বন্ধ না হইয়া ছেলেটি মারা গেল। সুরাকা ইবন জাশাম উমর (রাঃ)-এর নিকট আসিয়া ঘটনা বর্ণনা করিল। উমর (রাঃ) তাহাকে বলিলেন, আমার কাদীদের কূপের নিকট আসা পর্যন্ত ১শত ২০টি উট যোগাড় করিয়া রাখ। যখন তিনি তথায় আসিলেন ঐ উটের ৩০ হক্কা, ২০টি জাযআ, ৪০টি গর্ভবতী উটনী লইলেন এবং বলিলেনঃ নিহত ব্যক্তির ভাই কোথায়? সে বলিল, আমি উপস্থিত আছি। তিনি বলিলেন, তুমি এই উট লইয়া যাও। হত্যাকারী মীরাস পায় না।
সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) ও সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, যদি কেহ হারাম মাসসমূহে কাহাকেও হত্যা করে তবে তাহার দিয়াতের ব্যাপারে কি কঠোরতা অবলম্বন করা হইবে? তিনি বলিলেন, না, বরং ঐ সকল মাস হারাম মাস হওয়ার দরুন দিয়াত বাড়াইয়া লওয়া হইবে। অতঃপর সাঈদের নিকট জিজ্ঞাসা করা হইল, যদি কেহ এই মাসে কাহাকেও ক্ষত করিয়া দেয়, তবু সেই হত্যার মতো উহার দিয়াতও বৃদ্ধি পাইবে? সাঈদ বললেনঃ হ্যাঁ।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমার মনে হয় বাড়াইয়া দেওয়ারও উহাই উদ্দেশ্য যেমন মদলজীর দিয়াত উমর (রাঃ) করিয়াছেন যখন সে তাহার ছেলেকে মারিয়াছিল।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ

পিতার ওপর কিসাস প্রয়োগ নিয়ে ফকিহদের মধ্যে ভিন্ন অবস্থানও রয়েছে। আল-মুগনির একই আলোচনায় ইবন নাফি, ইবন আবদিল হাকাম ও ইবনুল মুনজিরের কিসাসের পক্ষে অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে; মালিকের অবস্থান হিসেবে হত্যা করার উদ্দেশ্য দ্ব্যর্থহীন হলে কিসাসের কথা এসেছে। এই মতপার্থক্যের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি স্পষ্ট: পিতৃত্বের জন্য কিসাস বাদ দেওয়ার বিধান হাদিস ও ফিকহের স্বীকৃত অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, এবং উপরের ইচ্ছাকৃত হত্যার বর্ণনায় তার প্রয়োগও পাওয়া যাচ্ছে। তাই ইনসাফের দাবি যাচাই করতে এই ছাড়ের নৈতিক ভিত্তি সরাসরি পরীক্ষা করতে হবে। [110]

এই প্রশ্নটি পরিবার বা তথাকথিত সম্মান রক্ষার নামে হত্যার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। যে পরিবারের সদস্যরা কোনো সন্তানের আচরণকে পরিবারের সম্মানের বিরুদ্ধে মনে করেন, তারাই যদি হত্যার পরে ক্ষমা ও রক্তপণের সিদ্ধান্তের অধিকারী হন, তাহলে নিহতের স্বার্থ রক্ষার সমস্যা আরও গভীর হয়। তার সঙ্গে পিতার জন্য কিসাস থেকে বিশেষ অব্যাহতি যুক্ত হলে পরিবারের ভেতরে দুর্বল সদস্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে সংশয়ের বিস্তারিত প্রবন্ধ ইসলামি শরিয়ত: ধর্ম ও সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বা অনারকিলিং পড়া যেতে পারে। পরিবারের মর্যাদা বা পিতার সামাজিক অবস্থানের চেয়ে নিহত সন্তানের জীবনের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নই এখানে মুখ্য।


পুত্র-কন্যার উত্তরাধিকারে বৈষম্য

পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে অধিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে উত্তরাধিকার। একই পিতা-মাতার ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে উত্তরাধিকারী হলে কোরআনের বিধানে পুত্রের অংশ কন্যার দ্বিগুণ। এখানে আলোচ্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতিটি হচ্ছে পুত্র ও কন্যার একসঙ্গে উত্তরাধিকার পাওয়া। একই মৃত ব্যক্তির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রাপ্য অংশ আলাদা করার জন্য লিঙ্গকে মানদণ্ড করা হয়েছে। কন্যা পিতা-মাতার দেখাশোনা করেছেন কি না, পুত্র সংসারের দায়িত্ব নিয়েছেন কি না, কার আর্থিক প্রয়োজন বেশি—এসবের ভিত্তিতে এই অনুপাত নির্ধারিত হয় না। সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতটি সম্পূর্ণ পড়া যাক। [111]—

কোরআন
সূরা নিসা, আয়াত ১১
আরবি মূল:
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا
বাংলা অর্থ:
আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: একজন পুরুষের অংশ দুইজন নারীর অংশের সমান। তারা যদি শুধু নারী হয় এবং দুইজনের বেশি হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ তাদের জন্য। একজন হলে তার জন্য অর্ধেক। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য রেখে যাওয়া সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ। সন্তান না থাকলে এবং পিতা-মাতাই তার উত্তরাধিকারী হলে তার মায়ের জন্য এক-তৃতীয়াংশ। তার ভাইবোন থাকলে মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ; এসব বণ্টন হবে তার করা ওসিয়ত এবং ঋণের পরে। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী, তা তোমরা জানো না। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরে ঋণ, বৈধ ওসিয়ত ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের জন্য নয় লাখ টাকা রইল। তার উত্তরাধিকারী শুধু একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। এই বিধান অনুসারে ছেলে পাবেন ছয় লাখ এবং মেয়ে পাবেন তিন লাখ। একই পিতার সন্তান হিসেবে তাদের সম্পর্কের নৈকট্য সমান; অথচ সম্পত্তির ভাগ সমান নয়। মেয়েটি হয়তো দীর্ঘদিন পিতার চিকিৎসা, সেবা ও সংসারের খরচ বহন করেছেন, আর ছেলেটি হয়তো কোনো দায়িত্ব নেননি। মেয়েটি দরিদ্র এবং ছেলেটি ধনী হলেও এই দুই-এক অনুপাত বদলাবে না। এখানে বেশি পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত হচ্ছে দায়িত্ব পালন বা প্রয়োজন দিয়ে নয়, পুত্র হওয়ার পরিচয় দিয়ে।

এই বৈষম্যের প্রচলিত ব্যাখ্যা হচ্ছে, পুরুষের ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব আছে, তাই তার বেশি অংশ পাওয়া যুক্তিসংগত। এই ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা পরীক্ষা করতে হলে দেখতে হবে, বাস্তবে দায়িত্বটি কে পালন করছেন এবং দায়িত্ব না পালন করলে বেশি অংশ পাওয়ার সুবিধাটি বদলায় কি না। কোনো নারী যদি আয় করেন, নিজের খরচ চালান, পিতা-মাতার চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় বহন করেন, তাহলে তার শ্রম ও অর্থের দায়ও বাস্তব। অন্যদিকে কোনো পুরুষ দায়িত্ব পালন না করলে তার সম্ভাব্য দায়িত্বের কথা বলে বেশি সম্পত্তি দেওয়ার ন্যায্যতা কোথায়? দায়িত্বের যুক্তি ব্যবহার করলে অধিকার বণ্টনেও বাস্তব দায়িত্বের হিসাব প্রয়োজন। জন্মের পরিচয় দিয়ে অধিকার স্থির করে রেখে দায়িত্বের কথা বললে ব্যাখ্যা এবং বিধানের কার্যকারিতার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়।

এই প্রশ্নটি ইসলামকিউএর একটি ফতোয়াতেও সরাসরি এসেছে। সেখানে একজন কর্মজীবী নারী জানান, তিনি ও তার মা ভাড়া, খাবার ও পোশাকের খরচ বহন করেন; প্রাপ্তবয়স্ক ভাইরা দায়িত্ব নিতে চান না। তবুও কি ভাইরা উত্তরাধিকারে দ্বিগুণ পাবেন—এটাই তার প্রশ্ন। উত্তরে বলা হয়েছে, ব্যয়ের দায়িত্ব দিয়ে এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করা আলেমদের ব্যাখ্যা; তা বিধান কার্যকর হওয়ার শর্ত নয়। ছেলের দায়িত্বহীনতায় উত্তরাধিকারের অনুপাত বদলাবে না। ফতোয়াটি আরও জানায়, অর্থসম্পন্ন মেয়ের নিজের এবং দরিদ্র মায়ের ব্যয় বহনের দায়ও থাকতে পারে। [112]

এই উত্তরের ফলাফল হচ্ছে, ভরণপোষণের যুক্তিটি বাদ পড়লেও পুত্রের দ্বিগুণ অংশ বহাল থাকে। দায়িত্ব পালন করলে বেশি পাবেন, দায়িত্ব পালন না করলে অনুপাত বদলাবে—এমন ব্যবস্থা এখানে নেই। বাস্তবে যে মেয়েটি দায়িত্ব বহন করছেন, তার অবদানও একই অনুপাত বদলাতে পারে না। ফলে দায়িত্বের যুক্তিটি ন্যায় যাচাইয়ের কার্যকর মানদণ্ড হিসেবে কাজ করছে না। যে কারণ দেখিয়ে বৈষম্যকে ন্যায্য বলা হয়, সেই কারণ অনুপস্থিত থাকলেও বৈষম্য বহাল থাকলে, কারণটি বিধানের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে পারে না। ন্যায়সংগত বণ্টনের প্রশ্ন তখন আবার একই জায়গায় ফিরে আসে: একই সম্পর্কের দুই সন্তানের মধ্যে জন্মগত লিঙ্গ কেন সম্পত্তির অধিকার কম-বেশি করবে?

কেউ সম্পত্তির অধিকার পেলেই তার সঙ্গে সমান অবস্থানের অন্য মানুষের অধিকার সমান হয়ে যায় না। মেয়েকে উত্তরাধিকার দেওয়া হয়েছে—এই বক্তব্যের পরে এখনও প্রশ্ন থাকে, একই পরিবারের ছেলে ও মেয়ের অংশ কেন আলাদা হবে। কোনো বিধান ঐতিহাসিকভাবে কিছু মানুষের অবস্থার উন্নতি করেছিল কি না এবং বর্তমানেও সেটি সমতা প্রতিষ্ঠা করে কি না, এই দুই প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়। ইসলামের আগে নারীর সম্পত্তিতে কোনো অধিকারই ছিল না—এই প্রচলিত দাবির বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে সংশয়ের ইসলামের পূর্বে নারীর সম্পত্তিতে অধিকার ছিল না? প্রবন্ধে। সেই ঐতিহাসিক দাবি এবং বর্তমান বণ্টনের ন্যায্যতা—দুইটিকেই প্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হবে।

উত্তরাধিকারের আলোচনায় নির্ধারিত ভগ্নাংশগুলোর সমন্বয় এবং আউল পদ্ধতির প্রশ্নও রয়েছে। সেই পৃথক সমস্যার বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যাবে সংশয়ের আউল পদ্ধতি: কোরআনে উত্তরাধিকার আইনে ভুল প্রবন্ধে। এখানে আলোচিত পুত্র-কন্যার অংশের প্রশ্নটিতে হিসাব সরল হলেও ন্যায্যতার প্রশ্নটি সরল নয়: সমান সম্পর্কের দুই ব্যক্তির অধিকারকে লিঙ্গের ভিত্তিতে স্থায়ীভাবে অসম করে দেওয়ার কারণ কী? “আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন” বললে বিধানের উৎসের দাবি করা হয়; সেই উৎসের দাবিই বিধানটি ন্যায়সংগত—এমন প্রমাণ হয়ে যায় না।

এই পরিচ্ছেদের তিনটি আলোচনায় একই মৌলিক সমস্যা ফিরে এসেছে। রক্তপণের সমঝোতায় অর্থসম্পদ অপরাধের পরিণতি বদলানোর সুযোগ তৈরি করে; সন্তান হত্যার কিসাসে পিতৃত্ব বিশেষ ছাড়ের কারণ হয়; আর পুত্র-কন্যার উত্তরাধিকারে লিঙ্গের ভিত্তিতে অংশ নির্ধারিত হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ন্যায় যাচাইয়ের প্রশ্ন হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মানুষের অধিকার ও দায় সমান মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে কি না। কার পরিবার ধনী, কে নিহতের পিতা, কিংবা কে পুত্র আর কে কন্যা—এসব পরিচয় দিয়ে অধিকার ও প্রতিকার বদলে গেলে, ইনসাফের দাবি শুধু ঘোষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; সেই বৈষম্যের যৌক্তিক ও নৈতিক ভিত্তিও দেখাতে হয়।


দাসত্ব, জন্মগত অধীনতা ও জীবনের অসম মূল্য

মানুষের ওপর মানুষের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হলে ইনসাফের ভিত্তিতেই আঘাত আসে। একজন মানুষ নিজের জীবন, শ্রম, শরীর এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারান; অন্য একজন তার মালিক হয়ে সেই অধিকারগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। এই সম্পর্কের মধ্যে মালিকের ইচ্ছা এবং অধীন মানুষের স্বাধীনতা সমান অবস্থানে থাকে না। শরীয়তের দাসপ্রথায় এই অধীনতা শুধু শ্রমের ব্যবস্থায় সীমিত থাকেনি; হত্যার বিচার, ক্ষতিপূরণের হিসাব এবং পরবর্তী প্রজন্মের পরিচয় নির্ধারণেও প্রবেশ করেছে। দাস হত্যার ক্ষেত্রে স্বাধীন হত্যাকারীর জন্য কিসাস থেকে ছাড় এবং দাসীর গর্ভে জন্মানো শিশুর ওপর মালিকানা—এই দুইটি বিধান একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, দাসত্ব এখানে একটি মানুষের বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি তার সন্তানের ভবিষ্যৎও দখল করে। যে মানুষ জন্মের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই পাননি, তাকেও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের সম্পত্তি বানানো হলে, ইনসাফের দাবিটি শুরুতেই ব্যর্থ হয়।


দাসদাসীর জীবনের মূল্য কম

একজন স্বাধীন মানুষ এবং একজন দাস—দুইজনই মানুষ। তাদের ব্যথা, ভয়, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কিংবা প্রিয়জন হারানোর ক্ষতি দাসত্বের পরিচয়ের কারণে কম-বেশি হয়ে যায় না। অথচ হত্যার বিচারে স্বাধীনতা ও দাসত্বকে আলাদা মর্যাদার ভিত্তি বানানোর বিধান রয়েছে। কোরআনের সূরা বাকারার ১৭৮ নম্বর আয়াতে স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারীর কথা এসেছে। আয়াতের এই শ্রেণিবিভাগ ফিকহে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা পরবর্তী উদ্ধৃতিগুলোতে সরাসরি দেখা যাবে। [98]—

হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! নিহতদের সম্বন্ধে তোমাদের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারী। কিন্তু যদি কেহ তার ভাই কর্তৃক কোন বিষয়ে ক্ষমা প্রাপ্ত হয় তাহলে যেন ন্যায় সঙ্গতভাবে পাওনা সাব্যস্ত করা হয় এবং সদ্ভাবে তা পরিশোধ করে। এটা তোমাদের রবের পক্ষ হতে লঘু বিধান ও করুণা; অতঃপর যে কেহ সীমা লংঘন করবে তার জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।
— Sheikh Mujibur Rahman
হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর ‘কিসাস’ ফরয করা হয়েছে। স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারী। তবে যাকে কিছুটা ক্ষমা করা হবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে, তাহলে সততার অনুসরণ করবে এবং সুন্দরভাবে তাকে আদায় করে দেবে। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে হালকাকরণ ও রহমত। সুতরাং এরপর যে সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
— Rawai Al-bayan

মুয়াত্তা মালিকের নিচের আলোচনায় বিধানটি দ্ব্যর্থহীন: দাস ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করলে দাসকে হত্যা করা হবে; স্বাধীন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে দাসকে হত্যা করলে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে না। একই আলোচনায় পুরুষ ও নারীর মধ্যে পারস্পরিক কিসাসের কথা স্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু স্বাধীন ও দাসের ক্ষেত্রে সেই সমতা রাখা হয়নি। ফলে শুধু আয়াতের শব্দের অর্থ অনুমান করার প্রয়োজন নেই; মালিকের বক্তব্যেই স্বাধীনতা ও দাসত্বের ভিত্তিতে বিচারের পার্থক্য স্পষ্ট। সম্পূর্ণ বর্ণনাটি পড়ুন। [113]—

মুয়াত্তা মালিক
৪৩. দিয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২১. হত্যার কিসাস লওয়া
মালিক (রহঃ)-এর নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, মারওয়ান ইবন হাকাম (রহঃ) মুয়াবিয়া ইবন আবি সুফয়ান (রাঃ)-এর নিকট লিখিলেন, এক ব্যক্তি মাতাল অবস্থায় কাহাকেও হত্যা করিল। মুয়াবিয়া (রাঃ) তাহাকে লিখিলেন, তুমিও তাহাকে হত্যা কর।
মালিক (রহঃ) বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ
‏الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ
এই আয়াতের আমি উক্ত তফসীর যাহা শুনিয়াছি তাহা এই, এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেন, স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে, দাসের পরিবর্তে দাসকে, স্ত্রীলোকের পরিবর্তে স্ত্রীলোককে হত্যা কর। অতএব স্ত্রীদের মধ্যেও পুরুষদের মতো কিসাস লওয়া হইবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ
‏وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالأَنْفَ بِالأَنْفِ وَالأُذُنَ بِالأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ
অর্থাৎ প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ, চক্ষুর পরিবর্তে চক্ষু, নাকের পরিবর্তে নাক, কানের পরিবর্তে কান, দাঁতের পরিবর্তে দাঁত, ক্ষতের পরিবর্তে ক্ষত। অতএব, পুরুষের পরিবর্তে স্ত্রী এবং স্ত্রীর পরিবর্তে পুরুষ হত্যা করা হইবে। এইরূপ যখন একে অন্যকে যখম করে তখনও কিসাস লওয়া হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কেহ কাহাকেও ধরিয়া ফেলে আর দ্বিতীয় ব্যক্তি আসিয়া তাহাকে হত্যা করে আর যদি সাব্যস্ত হয় যে, ঐ ব্যক্তিও তাহাকে হত্যা করার জন্য ধরিয়াছিল, তবে তাহার পরিবর্তে উভয়কে হত্যা করিতে হইবে। যদি ঐ ব্যক্তি তাহাকে মারিয়া ফেলার জন্য না ধরিয়া থাকে, বরং তাহার ইচ্ছা ছিল দ্বিতীয় ব্যক্তি যাহাকে সে ধরিয়াছে তাহাকে সাধারণভাবে প্রহার করিবে, তবে এই অবস্থায় এই ব্যক্তি হত্যার পরিবর্তে কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হইবে। আর শাস্তির পর এক বৎসর বন্দী থাকিবে। আর হত্যাকারীকে হত্যা করা হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে ইচ্ছা করিয়া হত্যা করিল অথবা তাহার চক্ষু নষ্ট করিয়া ফেলিল। এখন হত্যাকারী হইতে কিসাস লওয়ার পূর্বেই তাহাকে অন্য এক ব্যক্তি হত্যা করিয়া বসিল বা তাহার চক্ষু নষ্ট করিয়া দিল; এই অবস্থায় তাহার উপর দিয়াত বা কিসাস কিছুই বর্তিবে না। কেননা যাহাকে হত্যা করা হইয়াছিল তাহার হক ছিল হত্যাকারীর প্রাণে বা চক্ষুতে। এখন হত্যাকারী ব্যক্তিও নাই, তাহার চক্ষুও নাই।
ইহার উপমা এইরূপ, যেমন যদি এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে ইচ্ছা করিয়া হত্যা করে আর হত্যাকারী নিজেই মরিয়া যায় এখন হত্যাকাণ্ডে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসদের কিছুই মিলিবে না। কেননা যখন হত্যাকারীই মরিয়া গেল এখন না কিসাস রহিল, না দিয়াত।
মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কোন দাস স্বেচ্ছায় স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করে সেই দাসকে হত্যা করা হইবে । যদি স্বাধীন ব্যক্তি কোন দাসকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে তবে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হইবে না।
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)

এই বিধানে অপরাধের প্রকৃতি বদলায়নি। দুই ক্ষেত্রেই ইচ্ছাকৃত হত্যা; বদলেছে হত্যাকারী ও নিহতের সামাজিক অবস্থান। দাস স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার জীবনের ওপর কিসাস কার্যকর হবে, কিন্তু স্বাধীন ব্যক্তি দাসকে হত্যা করলে একই প্রতিকার কার্যকর হবে না। এই পার্থক্যকে ইনসাফ বলতে হলে প্রমাণ করতে হবে, একজন মানুষকে দাস বানানোর ফলে তার জীবন রক্ষার অধিকার কেন কমে যাবে। দাসত্ব নিজেই মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অধীনতা; সেই অধীনতাকে আবার তার হত্যার বিচারে কম অধিকার পাওয়ার কারণ করা হচ্ছে। প্রথমে একজন মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, তারপর সেই স্বাধীনতাহীন অবস্থাকে তার জীবনের কম আইনি মর্যাদার কারণ বানানো—এটি একই মানুষের বিরুদ্ধে দুই স্তরের অন্যায়।

সূনান আবু দাউদেও এই বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। নিচের প্রথম বর্ণনায় হাসান বাসরীর বক্তব্য হিসেবে স্বাধীন ব্যক্তিকে দাসের পরিবর্তে হত্যা না করার কথা এসেছে। পরের বর্ণনায় একই বক্তব্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী বর্ণনা ভুলে যাওয়ার বিষয়টিও আছে। দুইটি বর্ণনাই সম্পূর্ণ দেওয়া হলো। [114] [115]—

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৪/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ৭. যে ব্যক্তি তার গোলামকে হত্যা করে, অথবা তার কোন অংগছেদ করে, তার থেকে কি কিসাস নেওয়া হয়ে?
৪৪৫৩. মুসলিম ইবন ইবরাহীম (রহঃ) …. হাসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কোন আযাদ ব্যক্তিকে গোলামের পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ হাসান বাসরী (রহঃ)

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৪/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ৭. যে ব্যক্তি তার গোলামকে হত্যা করে, অথবা তার কোন অংগছেদ করে, তার থেকে কি কিসাস নেওয়া হয়ে?
৪৪৫২. হাসান ইবন আলী (রহঃ) …. কাতাদা (রহঃ) শু’বা (রহঃ)-এর সনদে অনুরূপ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তবে এখানে এরূপ বর্ণিত হয়েতে যে, এরপর রাবী হাসান (রহঃ) এ হাদীছ ভুলে যান এবং বলেনঃ কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে গোলামের বিনিময়ে হত্যা করা যাবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ কাতাদাহ (রহঃ)

এই ছাড়ের ব্যাখ্যায় দাসের ওপর মালিকানাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েবের ৩১৬৪৮০ নম্বর ফতোয়ায় দাস হত্যার জন্য স্বাধীন হত্যাকারীর ওপর কিসাস না হওয়ার অবস্থানটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; হানাফিদের কিসাসের পক্ষে অবস্থানও সেখানে আছে। ফলে এই বৈষম্য ফিকহের স্বীকৃত ও বিস্তৃত একটি বিধান। এখানে বিচার্য প্রশ্নটি সরাসরি: যে বিধানে দাসত্বের জন্য নিহত মানুষকে স্বাধীন মানুষের সমমর্যাদার বলে গণ্য করা হচ্ছে না, সেই বিধান কীভাবে সমান ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে? [116]

আবু বকরের বিচারসংক্রান্ত বিধানের সংকলনেও এই বৈষম্য পাওয়া যাচ্ছে। ফিকহে আবু বকর গ্রন্থের নিচের অংশে দাসকে মর্যাদার দিক থেকে চতুষ্পদ জন্তুর সঙ্গে তুলনা করে কিসাস না হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। একই অংশে নিজের দাসকে হত্যা করলে চাবুক, কারাবাস ও দাসমুক্তির নির্দেশ এবং অন্যের দাসকে হত্যা করলে তার মূল্য মালিককে দেওয়ার কথা রয়েছে। [117] [118]—

৩. যার ওপর অপরাধ সংঘটিত হয়
[৩.১] ক্রীতদাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপরাধ: হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর রায় ছিল-ক্রীতদাস হত্যার বিনিময়ে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না। ৫ চাই সে দাস তার মালিকানাধীনে হোক কিংবা অন্যের মালিকানাধীন। কেননা দাস মর্যাদার দিক থেকে চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। কাজেই মানুষ ও পশুর মধ্যে কোনো কিসাস হতে পারে না।
যদি ক্রীতদাস মালিকের হাতে মারা যায় তবে ঘাতক মালিককে একশ’ চাবুক লাগানো হবে। এক বছর তাকে বন্দী করে রাখা হবে। এ সময়ের মধ্যে সে ফাই-এর কোনো অংশ পাবে না। এবং তাকে একজন ক্রীতদাস মুক্তির নির্দেশ দেয়া হবে। মুসান্নাফ-আবদুর রাজ্জাকে আছে-হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্রীতদাস হত্যার বিনিময়ে স্বাধীন কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করতেন না। বরং তাকে একশ’ চাবুক মেরে এক বছর বন্দী করে রাখতেন এবং এক বছরের জন্য ‘ফাই’য়ে তার অংশ মুলতবী রাখতেন, যদি এ হত্যাকাণ্ড ইচ্ছেকৃত হতো। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে যে বর্ণনা এসেছে তাতে একথাও আছে, তাকে একটি ক্রীতদাস মুক্তির নির্দেশ দেয়া হতো। ৬
যদি নিহত ক্রীতদাস হত্যাকারীর মালিকানাধীন না হয় তবে সকলের মতে তার মূল্য ক্রীতদাসের মালিককে প্রদান করতে হবে। ৭

ইসলামে ইনসাফ 21

উদ্ধৃত সংকলনে হত্যাকারীর অন্য শাস্তির কথা আছে; সেই শাস্তিগুলোর উপস্থিতি কিসাসে অসমতার প্রশ্ন দূর করে না। দাস স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করলে প্রাণদণ্ড, আর স্বাধীন ব্যক্তি দাসকে হত্যা করলে চাবুক ও কারাবাস—এই পার্থক্যই এখানে বিচার্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অন্যের দাসকে হত্যা করলে ক্ষতিপূরণ যাচ্ছে নিহতের মালিকের কাছে। নিহত মানুষটির জীবন তখন এমন একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার নষ্ট হওয়ার আর্থিক ক্ষতি মালিককে পুষিয়ে দিতে হবে। মানুষটি যে নিজের জীবন নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন এবং তার পরিবার যে একজন মানুষকে হারিয়েছে, তা মালিকের সম্পদ হারানোর হিসাবের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

এই সম্পত্তির ধারণা ইবন কুদামার আল-মুগনি গ্রন্থেও স্পষ্ট। দাসের দিয়াত আলোচনায় নিচের সম্পূর্ণ যুক্তিপ্রদর্শক অনুচ্ছেদে দাসকে অর্থমূল্যসম্পন্ন সম্পদ হিসেবে ধরে ক্ষতিপূরণের ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা এসেছে। [119]—

আল-মুগনি
ইবন কুদামা
মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ
খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৯৯, মাসআলা ৬৬৪৬
আরবি মূল:
وَلَنَا، أَنَّهُ مَالٌ مُتَقَوِّمٌ، فَيُضْمَنُ بِكَمَالِ قِيمَتِهِ بَالِغَةً مَا بَلَغَتْ، كَالْفَرَسِ، أَوْ مَضْمُونٌ بِقِيمَتِهِ، فَكَانَتْ جَمِيعَ الْقِيمَةِ، كَمَا لَوْ ضَمِنَهُ بِالْيَدِ، وَيُخَالِفُ الْحُرَّ، فَإِنَّهُ لَيْسَ بِمَضْمُونِ بِالْقِيمَةِ، وَإِنَّمَا ضَمِنَ بِمَا قَدَّرَهُ الشَّرْعُ، فَلَمْ يَتَجَاوَزْهُ، وَلِأَنَّ ضَمَانَ الْحُرِّ لَيْسَ بِضَمَانِ مَالٍ؛ وَلِذَلِكَ لَمْ يَخْتَلِفْ بِاخْتِلَافِ صِفَاتِهِ، وَهَذَا ضَمَانُ مَالٍ، يَزِيدُ بِزِيَادَةِ الْمَالِيَّةِ، وَيَنْقُصُ بِنُقْصَانِهَا، فَاخْتَلَفَا.
বাংলা অর্থ:
আমাদের যুক্তি হলো, সে আইনস্বীকৃত অর্থমূল্যসম্পন্ন সম্পদ। তাই তার সম্পূর্ণ মূল্য দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, সেই মূল্য যতই হোক—যেমন ঘোড়ার ক্ষেত্রে হয়। অথবা, যেহেতু তার মূল্যের হিসাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, তাই সম্পূর্ণ মূল্যই দিতে হবে; যেমন নিজের দখলে থাকার কারণে ক্ষতিপূরণের দায় হলে হয়। স্বাধীন ব্যক্তির বিষয়টি আলাদা: তার ক্ষতিপূরণ বাজারমূল্যের ভিত্তিতে হয় না, বরং শরীয়ত যে পরিমাণ নির্ধারণ করেছে, তার ভিত্তিতে হয়; সেই সীমা অতিক্রম করা যায় না। স্বাধীন ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ সম্পদের ক্ষতিপূরণ নয়; তাই তার বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যে তা বদলায় না। কিন্তু এটি সম্পদের ক্ষতিপূরণ; অর্থমূল্য বাড়লে তা বাড়ে এবং কমলে কমে। তাই দুইটির বিধান আলাদা।

এখানে বাজারমূল্য যতই হোক, মানুষের জীবনকে পণ্যের হিসাবে মাপার সমস্যাটি থেকেই যায়। কোনো দাসের দাম বেশি হলে মালিক বেশি ক্ষতিপূরণ পাবেন, দাম কম হলে কম পাবেন—এতে নিহতের সমান মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং বাজারে তার বিক্রয়যোগ্যতার ভিত্তিতে মালিকের ক্ষতির হিসাব নির্ধারিত হয়। হত্যার বিচারে একজন মানুষকে স্বাধীন ব্যক্তির সমান অধিকার না দেওয়া এবং তার ক্ষতিপূরণে তাকে ঘোড়ার মতো সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা একই দাসব্যবস্থার দুইটি দিক। বিষয়টির সংশ্লিষ্ট দলিল ও আলোচনা রয়েছে সংশয়ের দাসদাসীর জীবনের মূল্য কম এবং ইসলামে দাসদাসী গবাদি পশুর মত প্রবন্ধে।


দাসীর সন্তানও দাস হবে

দাসপ্রথার আরও ভয়াবহ দিক হচ্ছে, মালিকানার দাবি পরবর্তী প্রজন্মেও পৌঁছে যায়। দাসীর মালিক ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে তার বিবাহ হলে, সেই বিবাহের সন্তান সাধারণ বিধানে মায়ের মালিকের দাস হিসেবে গণ্য হয়। বাবার স্বাধীন পরিচয়ও এই সাধারণ বিধানে শিশুকে স্বাধীন করে না। অন্যদিকে দাসীর স্বাধীন মালিকের নিজের সন্তান স্বাধীন হয়; মুক্তির বিশেষ শর্ত বা আইনি অবস্থার কারণেও ফল আলাদা হতে পারে। এই ব্যবস্থায় শিশুর স্বাধীনতা তার মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার অধিকার থেকে আসে না; আসে বাবা-মায়ের সঙ্গে মালিকের সম্পর্ক এবং নির্দিষ্ট বিধানের ওপর নির্ভর করে। ফলে যে শিশুটি কারও বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ করেনি, কোনো যুদ্ধ করেনি, এমনকি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সেও পৌঁছায়নি, তার ওপরও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত ইবন তাইমিয়ার মাজমুউল ফাতাওয়া গ্রন্থে এই বিধান সরাসরি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রশ্নে একজন কুরাইশ পুরুষের দাসীকে বিয়ে করে সন্তান হওয়ার কথা আছে। উত্তরের শুরুতে সন্তান কার মালিকানায় যাবে এবং স্বাধীনতা বা দাসত্বে কাকে অনুসরণ করবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশ্ন এবং প্রথম সম্পূর্ণ বিধানব্যাখ্যাটি পড়ুন। [120]—

মাজমুউল ফাতাওয়া
ইবন তাইমিয়া
দাসমুক্তি অধ্যায়
খণ্ড ৩১, পৃষ্ঠা ৩৭৬
আরবি মূল:
وَسُئِلَ الشَّيْخُ رَحِمَهُ اللَّهُ عَنْ رَجُلٍ قُرَشِيٍّ: تَزَوَّجَ بِجَارِيَةٍ مَمْلُوكَةٍ، فَأَوْلَدَهَا وَلَدًا، هَلْ يَكُونُ الْوَلَدُ حُرًّا؟ أَمْ يَكُونُ عَبْدًا مَمْلُوكًا؟
فَأَجَابَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. إِذَا تَزَوَّجَ الرَّجُلُ الْمَرْأَةَ وَعَلِمَ أَنَّهَا مَمْلُوكَةٌ، فَإِنَّ وَلَدَهَا مِنْهُ مَمْلُوكٌ لِسَيِّدِهَا بِاتِّفَاقِ الْأَئِمَّةِ؛ فَإِنَّ الْوَلَدَ يَتْبَعُ أَبَاهُ فِي النَّسَبِ وَالْوَلَاءِ، وَيَتْبَعُ أُمَّهُ فِي الْحُرِّيَّةِ وَالرِّقِّ.
বাংলা অর্থ:
শায়খকে একজন কুরাইশ পুরুষ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: তিনি একজন মালিকানাধীন দাসীকে বিয়ে করেছেন এবং তার গর্ভে সন্তান জন্মেছে। সন্তান কি স্বাধীন হবে, নাকি মালিকানাধীন দাস হবে?
তিনি উত্তর দেন: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর। কোনো পুরুষ যদি একজন নারীকে বিয়ে করেন এবং জানেন যে তিনি মালিকানাধীন, তাহলে ইমামদের ঐকমত্য অনুসারে সেই নারীর গর্ভে তার সন্তান নারীর মালিকের সম্পত্তি হবে। কারণ সন্তান বংশপরিচয় ও ওয়ালার সম্পর্কে পিতাকে অনুসরণ করে, আর স্বাধীনতা ও দাসত্বের ক্ষেত্রে মাকে অনুসরণ করে।

এই বিধানের ফলাফল একটি সাধারণ পরিবারের উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। একজন পুরুষ এবং একজন নারী বিবাহ করেছেন; তাদের একটি সন্তান জন্মাল। সাধারণভাবে শিশুটির পরিচয় হওয়ার কথা তাদের সন্তান হিসেবে। কিন্তু মা দাসী হলে এই বিধানে তার সন্তানের ওপর মায়ের মালিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বাবা শিশুটির বাবা, মা শিশুটির মা—তবুও সন্তানটি তাদের স্বাধীন পরিবারের সদস্য হিসেবে জীবন শুরু করে না; অন্য একজনের দাস হিসেবে জীবন শুরু করে। মানুষের সন্তানকে মায়ের মালিকের সম্পত্তি বানানো মানে বাবা-মায়ের পারিবারিক সম্পর্কের ওপর একটি তৃতীয় ব্যক্তির মালিকানা চাপিয়ে দেওয়া। শিশুটির কোনো সম্মতি নেই, তার বাবা-মায়ের ভালোবাসা তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে না, আর জন্মের ঘটনা নিজেই তার অধীনতার কারণ হয়ে যায়।

মালিকের মৃত্যুর পরে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা বা মুদাব্বার অবস্থার ক্ষেত্রেও সন্তানের জন্মের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফিকহে ওসমান গ্রন্থে উদ্ধৃত ঘটনার বিবরণে মুদাব্বার ঘোষণার আগে জন্মানো সন্তান এবং পরে জন্মানো সন্তানের ভাগ্য আলাদা করা হয়েছে। মা মুক্ত হয়েছেন বলেই তার আগে জন্মানো সব সন্তান মুক্ত হয়ে যায়নি; ঘোষণার সময়ের ভিত্তিতে কারও দাসত্ব বহাল থেকেছে। এতে বোঝা যায়, পরিবারের সদস্যদের স্বাধীনতা এমন একটি অধিকার হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যা মালিকের ঘোষণা ও তার সময়ের ওপর নির্ভর করে। [121]—

২. দাসত্বের প্রকার
৪. উন্মু ওয়ালাদ।
দাসত্ব চার প্রকার-১. কিন্তু, ২. মুদাব্বার ৩. মুকাতাব,
[২.১] কিন্তু ঃ এমন গোলাম বা দাসদাসীকে কিন্তু বলা হয় যার মধ্যে দাসত্বের পুরো বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যে মুকাতাব, মুদাব্বার ও উন্মু ওয়ালাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। গোলাম বা বাঁদী শব্দটি এদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
[২.২] মুদাব্বারঃ এমন গোলাম বা বাঁদীকে মুদাব্বার বলা হয় যার মুক্তি মনিবের মৃত্যু পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়। যেমন, মনিব বললেন-‘আমার মৃত্যুর পর তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।’ এ ধরনের গোলাম বাঁদী মনিবের মৃত্যুর সাথে সাথে মুক্ত বলে গণ্য হয়।
যদি মুদাব্বার বিবাহিত বাঁদী হয় এবং তাকে মুদাব্বার ঘোষণার পূর্বে তার সন্তানাদি থাকে তারা মালিকের গোলাম বাঁদী হিসেবেই গণ্য হবে। তবে মুদাব্বার ঘোষণার পর যদি ঐ বাঁদীর সন্তানাদি হয় তারাও তার সাথে মুক্ত হয়ে যাবে। আবদুর রহমান ইবনু ইয়াকুব যিনি বানু যুহাইনা গোত্রের এক শাখা বানু হিরকার মুক্ত ক্রীতদাস ছিলেন-বর্ণনা করেন, আমার দাদীর মনিব তার এক গোলামের সাথে আমার দাদীকে বিয়ে দেন। অতপর তাকে মুদাব্বার ঘোষণা করেন। মুদাব্বার ঘোষণার পর তার গর্ভে এক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার কিছুদিন পর আমার দাদীর মনিব ইন্তিকাল করেন। যার ফলে তিনি মুক্ত হয়ে যান। তিনি মুক্ত হয়ে তার সন্তানকে মুক্ত ঘোষণা করার দাবীতে হযরত ওসমান (রা)-এর দরবারে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার রায়ে হযরত ওসমান (রা) ঘোষণা করেন-‘যে সন্তান তাকে মুদাব্বার ঘোষণা করার পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছে তারা গোলাম বাঁদী হিসেবেই পরিচিত হবে। আর মুদাব্বার ঘোষণার পর যে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে সে মায়ের সাথে সাথে মুক্ত হয়ে যাবে।’ ৫
[২.৩] মুকাতাব [ক] সংজ্ঞা-মুকাতাব বলতে বুঝায়, গোলাম কিংবা বাঁদী কোনো কিছুর বিনিময়ে (মালিক থেকে) নিজের মুক্তির পরওয়ানা অর্জন করা।
[খ] মুকাতাবের বিধান: মুকাতাব সম্পর্কে হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত হচ্ছে-যদি গোলাম বা বাঁদী তার মনিবের কাছে মুকাতাব হতে চায়, তাহলে তাদের এ আবদার মনিবের পুরা করা উচিত। অবশ্য এ ব্যাপারে মালিকের বুঝা উচিত, সে মুক্তি পাওয়ার পর কারো জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে কিনা। বর্ণিত আছে-হযরত ওসমান (রা)-এর এক গোলাম

ইসলামে ইনসাফ 23
ইসলামে ইনসাফ 25

এই বর্ণনায় একই মায়ের সন্তানদের মধ্যে একজন মুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যজনের দাসত্ব থেকে যাচ্ছে। পার্থক্যটি কোনো সন্তানের কাজ, অপরাধ বা যোগ্যতায় তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছে মালিকের ঘোষণার আগে না পরে জন্মেছেন, সেই সময়ের হিসাবে। একজন শিশুকে দাস হিসেবে ধরে নিয়ে পরে বিশেষ শর্তে মুক্তির ব্যবস্থা করা এবং তাকে শুরু থেকেই স্বাধীন মানুষ হিসেবে স্বীকার করা দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথম ব্যবস্থায় স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত মালিকের অধিকার থেকে আসে; দ্বিতীয় ব্যবস্থায় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার অধিকারই কারও থাকে না। ইনসাফের প্রশ্ন হচ্ছে, একটি মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা অন্যের ঘোষণা বা মৃত্যুর অপেক্ষায় ঝুলে থাকবে কেন?

আধুনিক ফতোয়াতেও জন্মসূত্রে দাসত্বের বিধান বহাল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ইসলামকিউএর ৩২৩৩৬২ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্নটি সরাসরি করা হয়েছে: দাসীর সন্তানকে দাস করা হয় কেন, নবজাতকের অপরাধ কী? উত্তরে মালিকের সন্তান স্বাধীন হওয়ার কথা এবং কিছু বিশেষ অবস্থার কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, দাসীকে বিয়ে করা অন্য পুরুষের সন্তান সাধারণ বিধানে মায়ের মালিকের দাস। শিশুর ওপর এই মালিকানাকে সেখানে অপরাধের শাস্তি হিসেবে গণ্য করা হয়নি; ঈশ্বরের নির্ধারিত ব্যবস্থা ও মানুষের অবস্থানের তারতম্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [122]

কিন্তু কোনো অন্যায়কে শাস্তি বলা হচ্ছে না—এতে সেটি ন্যায় হয়ে যায় না। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কারও ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা, তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং তার জীবন অন্যের অধীনে দেওয়া—এই কাজগুলোর ন্যায্যতা দেখাতে হবে। শিশুটি অপরাধী নয়, এই স্বীকারোক্তি বরং সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে: অপরাধ ছাড়াই কেন সে এমন অধীনতার মধ্যে জীবন শুরু করবে? “ঈশ্বর এমন ব্যবস্থা করেছেন” বললে ব্যবস্থাটির উৎস নিয়ে একটি দাবি করা হয়; তা দিয়ে শিশুটির ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার নৈতিক অধিকার প্রমাণিত হয় না। অপরাধ ছাড়াই অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রশ্নের উত্তর “এটি শাস্তি নয়” হতে পারে না; প্রশ্ন হচ্ছে, অধিকার কেড়ে নেওয়ার ন্যায্য কারণ কোথায়?

আরও একটি বৈষম্য স্পষ্ট: একই দাসী নারীর সন্তান মালিকের হলে স্বাধীন, অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহের সন্তান হলে সাধারণ বিধানে দাস। শিশুর মানবিক সত্তা দুই ক্ষেত্রেই একই, কিন্তু পিতার সঙ্গে মালিকানার সম্পর্ক বদলালে তার স্বাধীনতার ফল বদলে যাচ্ছে। যে শিশু মালিকের সন্তান নয়, তাকে কেন কম অধিকার নিয়ে জন্মাতে হবে? মালিকের সন্তানকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, অথচ অন্যের সন্তানকে তার সম্পত্তি করা হচ্ছে—এই পার্থক্যই দেখায়, ব্যবস্থাটি সব শিশুর সমান স্বাধীনতাকে ভিত্তি করেনি। জন্মসূত্রে দাসত্বের আরও দলিল, তাফসির এবং ফিকহি বিধান রয়েছে সংশয়ের ইসলামে জন্মসূত্রে দাসদাসী হওয়া ও বংশগত দাসত্বের শরীয়তি আইনি কাঠামো প্রবন্ধে।

দাসমুক্তির কিছু সুযোগ থাকলেও মানুষের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার এই মূল কাঠামো থেকে যায়। মুক্তি পাওয়ার পথ রাখা মানে এই নয় যে, দাস বানানোর অধিকার ন্যায়সংগত। কেউ মালিকের অনুগ্রহে মুক্তি পেলেন, কেউ চুক্তির অর্থ পরিশোধ করে মুক্ত হলেন, কেউ ঘোষণার শর্তে ভবিষ্যতে মুক্ত হবেন—এসবের প্রত্যেকটিতে প্রথমে মানুষটিকে পরাধীন সম্পদ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। যে শিশু জন্মের মুহূর্ত থেকেই সেই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে যায়, তাকে নিজের স্বাধীনতা ফিরে পেতে পরে অন্যের ইচ্ছা বা শর্তের মুখাপেক্ষী হতে হয়। ইনসাফের দাবি যাচাই করতে তাই শুধু কতজন মুক্ত হয়েছেন, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়; কতজনকে এবং কোন অধিকারে দাস বানিয়ে রাখা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও করতে হবে।

এই অধীনতা থেকে নিজে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টাতেও ধর্মীয় বাধা রয়েছে। দাসের পালিয়ে যাওয়াকে কুফরি বলা এবং ফিরে আসার সঙ্গে তা যুক্ত করার হাদিসগুলো নিয়ে সংশয়ের দাসদাসীর পালিয়ে যাওয়া কুফরী প্রবন্ধে আলোচনা আছে। দাসী নারীর শরীর ও যৌন সিদ্ধান্তের ওপর মালিকানার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত লেখা রয়েছে ইসলামে যুদ্ধবন্দি নারী বা দাসী ধর্ষণের বৈধতা প্রসঙ্গে: দাসীর সম্মতি কি জরুরি? প্রবন্ধে। এসব বিধান পাশাপাশি দেখলে দাসত্বের ব্যাপ্তি বোঝা যায়: শুধু কাজ আদায় নয়, মানুষের চলাফেরা, শরীর এবং পরিবারের ভবিষ্যৎও মালিকানার অধীনে যায়।

দাসপ্রথার ক্ষেত্রে ইনসাফের সংকট তাই মৌলিক। একজন মানুষের হত্যার প্রতিকার তার স্বাধীন বা দাস পরিচয় অনুযায়ী বদলাচ্ছে; তার জীবনের ক্ষতিপূরণ মালিকের সম্পদের মূল্য হিসেবে হিসাব হচ্ছে; আর তার সন্তানের জন্মও মালিকের জন্য নতুন দাস পাওয়ার কারণ হতে পারে। এই প্রতিটি জায়গায় মানুষের নিজস্ব অধিকারকে মালিকানার নিচে রাখা হয়েছে। যে ব্যবস্থা একজন মানুষকে অন্যের সম্পত্তি করে, তার হত্যার বিচারে অসম মর্যাদা দেয় এবং তার সন্তানকেও জন্মসূত্রে পরাধীন করে, সেই ব্যবস্থার ইনসাফের দাবি তার নিজের বিধানেই খণ্ডিত হয়।


ধর্ম পালন ও ধর্মত্যাগের ওপর শাস্তির বাধ্যবাধকতা

ধর্মীয় স্বাধীনতার পরীক্ষা শুধু একটি ধর্ম গ্রহণের সুযোগ দিয়ে হয় না। সেই ধর্ম পালন না করার, তার দাবিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং যাচাইয়ের পরে তা ত্যাগ করার অধিকারও থাকতে হয়। কাউকে বলা হলো, সে নিজের বিবেক অনুসরণ করতে পারে; কিন্তু বিবেক অনুসরণ করে ইসলাম ত্যাগ করলে তাকে হত্যা করা হবে—এই দুই বক্তব্য একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। আগের পরিচ্ছেদগুলোতে জন্মসূত্রে পাওয়া বিশ্বাস এবং ধর্ম যাচাইয়ের অসম সুযোগ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, এখানে তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শাস্তির ভয়। জন্মের সময় ধর্ম বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই, পরে সেই ধর্ম থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তও প্রাণহানির কারণ হয়। ইনসাফের দাবি যাচাই করতে এই বাধ্যবাধকতাকে সরাসরি পরীক্ষা করতে হবে।


বেনামাজিকে হত্যার ইসলামিক বিধান

ইসলামের প্রচারে প্রায়ই বলা হয়, ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। কিন্তু নামাজ ত্যাগকারীর বিরুদ্ধে শরীয়তের শাস্তির আলোচনা সামনে আনলেই বোঝা যায়, ধর্মীয় আচরণ পালন এখানে কেবল ব্যক্তির বিশ্বাস বা আগ্রহের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। নামাজ ফরজ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা এবং ফরজ বলে মেনেও নামাজ না পড়ার ক্ষেত্রে ফকীহদের আলোচনা আলাদা। দ্বিতীয় ক্ষেত্রেও মালিক ও শাফেঈর মত অনুযায়ী তওবার আহ্বানে না ফিরলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে; আবু হানীফার মত অনুযায়ী শাস্তি ও কারাবাসের মাধ্যমে নামাজ পড়তে বাধ্য করার বিধান আছে। পার্থক্যটি শাস্তির ধরনে; নামাজ না পড়েও শাস্তি ছাড়া নিজের জীবন যাপনের অধিকার এই আলোচনায় স্বীকৃত হয়নি।

নওবী তাঁর সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় নামাজ ফরজ বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও তা ত্যাগকারীর বিধান নিয়ে বিভিন্ন মত পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। ইসলামওয়েবের ১৩০৮৫৩ নম্বর ফতোয়াতেও এই ব্যাখ্যাটি উদ্ধৃত আছে। নামাজ ত্যাগকারীকে কাফের না বলেও যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে, এই অংশটি তা স্পষ্ট করে [123] [124]—

وإن كان تركه تكاسلا مع اعتقاده وجوبها كما هو حال كثير من الناس فقد اختلف العلماء فيه فذهب مالك والشافعي رحمهما الله والجماهير من السلف والخلف إلى أنه لا يكفر بل يفسق ويستتاب فإن تاب وإلا قتلناه حدا كالزانى المحصن ولكنه يقتل بالسيف، وذهب جماعة من السلف إلى أنه يكفر وهو مروي عن علي بن أبى طالب كرم الله وجهه وهو إحدى الروايتين عن أحمد بن حنبل رحمه الله وبه قال عبد الله بن المبارك وإسحاق بن راهويه وهو وجه لبعض أصحاب الشافعى رضوان الله عليه، وذهب أبو حنيفة وجماعة من أهل الكوفة والمزني صاحب الشافعي رحمهما الله إلى أنه لا يكفر ولا يقتل بل يعزر ويحبس حتى يصلي.

বাংলা অনুবাদ: আর যদি সে নামাজের আবশ্যকতা বিশ্বাস করেও অলসতাবশত তা ত্যাগ করে, যেমন অনেক মানুষের অবস্থা, তাহলে তার ব্যাপারে আলেমরা মতভেদ করেছেন। মালিক, শাফেঈ এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধিকাংশ আলেমের মত হলো, সে কাফের হয় না; বরং ফাসিক হয় এবং তাকে তওবা করতে বলা হয়। সে তওবা করলে ভালো; অন্যথায় বিবাহিত ব্যভিচারীর মতো নির্ধারিত শাস্তি হিসেবে তাকে হত্যা করা হবে, তবে তাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা হবে। পূর্ববর্তী আলেমদের একদল বলেছেন, সে কাফের হয়। এই মত আলী ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণিত; আহমদ ইবনে হাম্বলের দুটি বর্ণনার একটি এটিই। আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ও ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহও এই মত দিয়েছেন, এবং শাফেঈর কিছু অনুসারীরও এটি একটি মত। আবু হানীফা, কুফার একদল আলেম এবং শাফেঈর অনুসারী মুযানীর মত হলো, সে কাফের হয় না এবং তাকে হত্যা করা হবে না; বরং তাকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং নামাজ না পড়া পর্যন্ত কারাবন্দি রাখা হবে।

তথ্যসূত্র: নওবী, আল-মিনহাজ শরহে সহিহ মুসলিম, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭০।

এখানে অপরাধ হিসেবে কারও সম্পদ চুরি, কাউকে আক্রমণ বা অন্যের অধিকার নষ্ট করার কথা বলা হচ্ছে না। একজন মানুষ নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচরণ পালন করছেন না, সেই কারণেই তাঁর শরীর ও স্বাধীনতার ওপর শাস্তি প্রয়োগের কথা হচ্ছে। মৃত্যুদণ্ডকে ধর্মীয় দণ্ড বলা অথবা কারাবাসকে সংশোধনের ব্যবস্থা বলা এই মৌলিক বিষয় বদলায় না। নামাজ পড়া পর্যন্ত কাউকে বন্দি রাখা মানে তাঁর মুক্তির শর্ত হিসেবে ধর্মীয় আচরণ চাপিয়ে দেওয়া। নামাজ শুরু করলে মুক্তি, না করলে বন্দিত্ব বা মৃত্যু—এটি কীভাবে বিশ্বাসের স্বাধীনতা হয়?

আরও একটি সমস্যা আছে। ভয় দেখিয়ে মানুষের মাথা নোয়ানো যায়, মুখ দিয়ে নির্দিষ্ট কথা বলানো যায়, নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড় করিয়ে নামাজ পড়ানো যায়। কিন্তু এসবের কোনোটিই প্রমাণ করে না যে তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মেছে। শাস্তি এড়ানোর জন্য নামাজ পড়া এবং বিশ্বাস থেকে নামাজ পড়া এক বিষয় নয়। ফলে এই ব্যবস্থা একদিকে ধর্ম পালন বাধ্যতামূলক করে, অন্যদিকে বাধ্য হয়ে করা আচরণকে বিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের আলেম শাইখ ড. মুযাফফর বিন মুহসিনের নামাজ ত্যাগকারীর বিধানসংক্রান্ত বক্তব্যও দেখা যাক—

ধর্মে জোরজবরদস্তি না থাকার দাবির সঙ্গে এসব বিধানের সম্পর্ক নিয়ে সংশয়ের লা ইকরাহা ফিদ-দীন: ইসলামে কি আসলেই কোনো জবরদস্তি নেই? প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা আছে। ইনসাফের প্রশ্নটি সরল: অন্যের অধিকার নষ্ট না করে একজন মানুষ নামাজ পড়বেন কি পড়বেন না, সেই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর প্রাণ বা স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ন্যায্যতা কোথায়?


ইসলাম ত্যাগের শাস্তি

বিশ্বাসের স্বাধীনতা বলতে বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতাও বোঝায়। একজন মানুষ কোনো ধর্মের দাবিকে সত্য বলে মনে করতে পারেন; পরে নতুন তথ্য, অভিজ্ঞতা বা যুক্তির ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। ইসলাম ত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান সেই পরিবর্তনের অধিকার কেড়ে নেয়। মুসলিম পরিবারে জন্মানো মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও তীব্র: তিনি জন্মের সময় ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেননি, অথচ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে সেই বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করলে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মত্যাগের অভিযোগ উঠতে পারে। নিজে বেছে না নেওয়া একটি ধর্মীয় পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রাণ দিতে হওয়া ইনসাফের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

সূনান আবু দাউদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদে আলীর মুরতাদদের পুড়িয়ে হত্যা করা এবং ইবনে আব্বাসের আপত্তির বিবরণ আছে। পুরো বর্ণনাটি পড়লে বোঝা যায়, আপত্তি হত্যার পদ্ধতি নিয়ে; ধর্মত্যাগীদের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে নয় [125]—

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান‏
৪৩০০. আহমদ ইব্‌ন মুহাম্মদ (রহঃ) — ইকরাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌছলে, তিনি বলেনঃ যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোময়া আল্লাহ্‌ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য আমি তাদেরকে আল্লাহ্‌র রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করতাম। কেননা, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ দীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে। আলী (রাঃ) ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে বলেনঃ ওয়াহ্‌! ওয়াহ্‌! ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) সত্য বলেহছেন। আর ইহাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

পরের বর্ণনায় হত্যা, বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার এবং ধর্মত্যাগকে একই মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় রাখা হয়েছে [126]—

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান‏
৪৩০১. আমর ইব্‌ন আওন (রহঃ) —- আবদুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ মুসলমানের রক্ত হালাল নয়, যে এরূপ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহ্‌র রাসূল”। তবে তিনটি কারণের কোন মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত করা হালালঃ (১) যদি কোন বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করে; (২) যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তবে এর বিনিময়ে হত্যা এবং (৩) যে ব্যক্তি দীন ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলমানের জামায়াত থেকে বেরিয়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

প্রথম বর্ণনায় ইবনে আব্বাস বলেন, তিনি আগুনে পোড়াতেন না, কিন্তু হত্যা করতেন। দ্বিতীয় বর্ণনায় ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিমদের জামায়াত থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে হত্যার কারণ বলা হচ্ছে। মানুষের বিবেকের সিদ্ধান্তকে এখানে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কারণ করা হয়েছে। একই বিষয় সহিহ বুখারীর বাংলা সংস্করণেও পাওয়া যায় [127] [128]—

ইসলামে ইনসাফ 27

ইসলামে ইনসাফ 29

ইমাম মালিকের মুয়াত্তায় ধর্ম পরিবর্তনের এই বিধান কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তার ব্যাখ্যাও রয়েছে। সেখানে ইহুদি থেকে খ্রিস্টান হওয়াকে এই হাদিসের আওতায় রাখা হয়নি; ইসলাম ত্যাগ করার ক্ষেত্রে হত্যার বিধান প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে [129]—

রেওয়ায়ত ১৫
যায়দ ইব্‌ন আসলাম (র) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি নিজ দীন (ধর্ম)-কে পরিবর্তন করে তাহার গর্দান উড়াইয়া দাও। মালিক (র) বলেন যে, আমার নিকট রাসূলুল্লাহ্-এর কথা-যে দীন পরিবর্তন করিয়া ফেলে তাহার গর্দান উড়াইয়া দাও”- এর অর্থ এই যে, কোন মুসলমান ইসলাম ধর্ম ছাড়িয়া দেয় ও ধর্মত্যাগী (যিনদীক) বা এই ধরনের কিছু হইয়া যায় তবে তাহাদের উপর মুসলমানগণ বিজয়ী হইলে তাহাদিগকে কতল করিয়া দেওয়ার হুকুম। তাহাদিগকে তওবা করারও সময় দেওয়া হইবে না কারণ তাহাদের তওবার কোন মূল্য নাই। যেহেতু তাহাদের অন্তরে কুফরী অংকিত হইয়া গিয়াছে, ফলে তাহারা প্রকাশ্যে ইসলাম প্রকাশ করিবে এবং অন্তরে কুফরী করিতে থাকিবে। আর যে ব্যক্তি কোন কারণে ইসলাম হইতে বাহির হইয়া যায় তবে তাহাকে তওবা করাইবে। আর যদি ‘তওবা করিতে
অস্বীকার করে তবে হত্যা করিয়া দিবে। আর যদি কোন কাফের অন্য কোন কুফরী ধর্ম গ্রহণ করে যেমন ইহুদী হইতে নাসারা হইয়া গেল তৰে সে তাহার দীন পরিবর্তন করিয়াছে বলিয়া এই হাদীস বোঝা যায় না।
এই হাদীস দ্বারা একমাত্র ইসলাম হইতে বহিষ্কার হওয়ার হুকুম প্রকাশ পায়।

ইসলামে ইনসাফ 31
ইসলামে ইনসাফ 33

এই ব্যাখ্যা ধর্ম পরিবর্তনের অধিকারকে সবার জন্য সমান রাখে না। ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডের কারণ, কিন্তু ইহুদি থেকে খ্রিস্টান হওয়ার ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য নয়। আবার যিনদীক হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তির তওবা গ্রহণ না করার যুক্তি হিসেবে তাঁর অন্তরের অবিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বিশ্বাসে ফিরে আসার ঘোষণাও তাঁর জীবন রক্ষা নাও করতে পারে। এখানে বিচারক মানুষের অন্তরের অবস্থার দাবি করে তাঁর প্রাণ কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন।

মুরতাদকে কেউ বিচার ছাড়াই হত্যা করলে হত্যাকারীর শাস্তি কী হবে, বিধিবদ্ধ ইসলামী আইনেও তার আলোচনা আছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রথম খণ্ডে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তাযীরের আওতায় শাস্তির কথা বলা হয়েছে [130]—

ধারা-৭২
মুরতাদকে হত্যা করিলে
কোন ব্যক্তি মুরতাদকে হত্যা করিলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হইবে না, তবে সে তাযীরের আওতায় দণ্ডযোগ্য হইবে।
ব্যাখ্যা
কোন মুসলিম ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করিলে তাহাকে ‘মুরতাদ’ (ধর্মত্যাগী) বলে।
বিশ্লেষণ
যে কোন ধরনের অপরাধীর উপর শাস্তি কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। কোন ব্যক্তিকে বিচারের সম্মুখীন না করিয়া শাস্তি দেওয়া বৈধ নহে। মুরতাদ যদিও ইসলাম ত্যাগ করিয়া মৃত্যুদণ্ডের অপরাধী হইয়াছে এবং নিজের জীবনের নিরাপত্তা হারাইয়া ফেলিয়াছে, তবুও বিনা বিচারে তাহাকে হত্যা করা যাইবে না। অতএব যে ব্যক্তি মুরতাদকে হত্যা করিল সে সরকারের কর্তৃত্বের অবমাননা করিল। এইজন্য সে তাযীরের আওতায় দণ্ডযোগ্য হইবে। এই বিষয়ে ফকীহগণ একমত।”

ইসলামে ইনসাফ 35

উদ্ধৃতিতে ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি কার্যকর করার বিরুদ্ধে নিষেধ আছে, কিন্তু তার যুক্তিটি লক্ষ করা জরুরি। হত্যাকারী সরকারের কর্তৃত্বের অবমাননা করেছেন—এ কারণে তাঁর শাস্তি হবে। নিহত ব্যক্তির ধর্মত্যাগের কারণে তিনি আগেই জীবনের নিরাপত্তা হারিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। হত্যাকে নিষিদ্ধ বলেও হত্যাকারীর বিরুদ্ধে সমান হত্যার প্রতিকার বাদ দেওয়া হলে ধর্মত্যাগীর জীবন অন্য মানুষের জীবনের সমান আইনি সুরক্ষা পায় না। বিচার ছাড়া হত্যার নিষেধ আর নিহত মানুষের জীবনের সমমূল্য প্রতিষ্ঠা এক কথা নয়।

ধর্মত্যাগের প্রভাব উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির বিধানেও প্রবেশ করেছে। একই গ্রন্থে মুরতাদের মুসলিম আত্মীয়ের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং তাঁর সম্পদের উত্তরাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা বলা আছে [131]—

ধারা-৪৪৪
মুরতাদের (ইসলাম ধর্মত্যাগীর) মীরাস
(ক) মুরতাদ তাহার মুসলিম আত্মীয়দের ওয়ারিশ হইতে পারে না।
(খ) মুরতাদ মুসলমান অবস্থায় যে সম্পদ উপার্জন করিয়াছে উহা তাহার মুসলিম ওয়ারিশগণ পাইবে এবং ধর্মত্যাগের পরে অর্জিত মাল “বাইতুল মাল”-এ
জমা হইবে; কিন্তু
(গ) মুরতাদ নারীর সমস্ত সম্পত্তি তাহার মুসলিম ওয়ারিশগণ লাভ করিবে।
বিশ্লেষণ
কোন মুসলমান দীন ইসলাম ত্যাগ করিলে তাহাকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলে।
পবিত্র ত্র কুরআনে বলা হইয়াছে: L
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُونَ .
“তোমাদের মধ্যে যে কেহ স্বীয় দীন হইতে ফিরিয়া যায় এবং কাফিররূপে মৃত্যুমুখে পতিত হয় দুনিয়া ও আখিরাতে তাহাদের কর্ম নিষ্ফল হইয়া যায়। ইহারাই দোযখবাসী, সেথায় তাহারা স্থায়ী হইবে” (সূরা বাকারা: ২১৭)।
ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে মুরতাদের পূর্বাপর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হইবে তাহার মুসলিম ওয়ারিশগণ।”

ইসলামে ইনসাফ 37

এই ধারা সম্পত্তির মীরাস বা উত্তরাধিকার নিয়ে। এতে ধর্মত্যাগের আগের ও পরের অর্জিত সম্পদ, নারী ও পুরুষ এবং বিভিন্ন ফকীহের মত অনুযায়ী ভিন্ন বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় সম্পদের অধিকার নির্ধারণের একটি কারণ হয়েছে। একজন মানুষ তাঁর আত্মীয়ের উত্তরাধিকার পাবেন কি না, তাঁর সম্পদ কার কাছে যাবে—এসব প্রশ্নের সঙ্গে তাঁর বিশ্বাস পরিবর্তনকে যুক্ত করা হয়েছে। প্রাণহানির শাস্তির পাশাপাশি পারিবারিক ও আর্থিক অধিকারেও ধর্মত্যাগের প্রভাব পড়ছে।

ফয়যুল হাদী শরহে তিরমিযী গ্রন্থে ধর্মত্যাগের সংজ্ঞা এবং শাস্তির আলোচনা আরও স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে [132]—

রজম ওয়াজিব হওয়ার বিধান
বিবাহিত নারী ও পুরুষ যিনা করলে তাদের উপর ‘রজম’ ওয়াজিব। এ ব্যাপারে সকল ইমাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। খারেজীদের একটি উপদল যারা সাহাবায়ে কিরামকে ও কাফের বলতে কুণ্ঠিত হয় না, তারা ব্যতীত গোটা মুসলিম উম্মাহ এ মাসআলার ব্যাপারেও একমত। যথা হিদায়া গ্রন্থকার বলেন-
وَإِذَا وَجَبَ الْحَد وَكَانَ الزَّانِي مُحْصَنَا رُحِمَهُ بِالْحِجَارَةِ حَتَّى يَمُوتَ لِأَنَّهُ عَلَيْهِ السَّلَامُ رَجَمَ مَا عِزَّ أَوْ قَدْ أَحْصَنَ وَقَالَ فِي الْحَدِيثِ الْمَعْرُوفِ وَرْنَا بَعْدَ الإِحْصَان وعَلَى هَذَا إِجْمَاعُ الصَّحَابَةِ .
“হদ্দ যখন ওয়াজিব হয়, আর যিনা কারী ‘মুহছান’ হয় তবে তার উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করবে, যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। কেননা নবী কারীম হজযরত মাইযকে রজম করেছিলেন। আর তিনি ‘মুহছান’ ছিলেন। তাছাড়া প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে ‘যদি মুহছান অবস্থায় যিনা করে, (তাহলে তার খুন হালাল হবে।)’ এর উপর সকল সাহাবার ইজমা রয়েছে।”
মুরতাদের শাস্তিঃ
‘ইরতিদাদ’ অর্থ কোনো মুসলমান ইসলাম ধর্ম থেকে বের হয়ে যাওয়া। ইসলাম ধর্ম যে ত্যাগ করে তাকে মুরতাদ’ বলে। আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেন:
“ইসলামের পরিভাষায় ইরতিদাদ অর্থ হলো, ইসলাম ধর্মের স্থানে অন্য ধর্ম, ইসলামী আকীদার স্থানে অন্য আকীদা গ্রহণ করা। রাসুলুল্লাহ যে শিক্ষা নিয়ে আগমন করেছিলেন, যা কিছু نص قطعی তথা অকাট্য সত্যরূপে বর্ণনা পরম্পরায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং যা কিছু ইসলামে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত তাকে অস্বীকার করা’। যেমন ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম কিংবা কাদিয়ানী মতবাদ গ্রহণ করা অথবা নামায-রোজা, হজ্ব ইসলামের দণ্ডবিধি ইত্যাদিকে অস্বীকার করা। কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে যোষিত হয়েছে-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
মুরতাদের শাস্তি:
ইমাম কুদুরী বলেন:
إِذَا ارْتَدَّ الْمُسْلِمُ عَنِ الْإِسْلَامِ عُرِضَ عَلَيْهِ الْإِسْلَامُ فَإِن كَانَتْ لَهُ شُبَهَةٌ كَيْفَ لَهُ وَمُحْبَسَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فإن أسلم والإقتل .
অর্থাৎ মুসলমান যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে তার সামনে ইসলাম পেশ করা হবে। যদি তার মনে সন্দেহ থাকে তাহলে তার সন্দেহ দূর করা হবে। তাকে তিন দিন আটকে রাখা হবে। যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তো ভালো, অন্যাথায় তাকে হত্যা করা হবে।
মুরতাদ পুরুষ হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এটা সকল ইমামের অভিমত। আর যদি মুরতাদ মহিলা হয় তাহলে এ ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ আছে। ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, মুরতাদ নারীকে ও হত্যা করতে হবে। কারণ, ইরতিদাদ afte عَن ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ الله الله مَن بَدِّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوه – 1 19 2019 ধর্ম ত্যাগ করেছে, তাকে হত্যা কর।’ এত নারী পুরুষের প্রার্থক্য করা হয়নি। পক্ষান্তরে আহনাফের অভিমত হলো কোন মহিলাকে ধর্ম ত্যাগের অপরাধে হত্যা করা বৈধ নয়। কারণ হাদীসে এসেছে- نهى عن قتل النساء রাসূলুল্লাহ নারীদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে, “যদি কোনো নারী ধর্ম ত্যাগ করে তবে তাকে ইসলামের দিকে আহবান করাবে। যদি সে ফিরে আসে তবে তাকে গ্রহণ করবে। যদি অস্বীকার করে তাকে বন্দী করে রাখবে।

ইসলামে ইনসাফ 39

ইযাহুল মুসলিমে তওবার সময়, নারী ও পুরুষের শাস্তি এবং বিভিন্ন মাযহাবের মত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। এখানে নারী মুরতাদকে হত্যা করার পরিবর্তে বন্দি রাখার মতটিও ব্যক্তির স্বাধীনতা স্বীকার করে না; উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় বারবার শাস্তি দিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে [133]—

মুরতাদের হুকুম
মুরতাদের হুকুম হলো তাকে হত্যা করা। চার ইমাম এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায় তাকে হত্যা করা ওয়াজিব এবং তার রক্ত মূল্যহীন হয়ে যায়। মুরতাদকে হত্যা করার ব্যাপারে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যথা:
. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ مَرْفُوعًا مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
“যে ব্যক্তি দ্বীন-ইসলামকে ত্যাগ করলো তাকে হত্যা করো।”
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ حَيْدَةَ : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ .
আবূ হুরাইরা (রা.) ইসমা (রা.) প্রমুখ সাহাবা থেকে এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে।
مَنْ غَيَّرَ دِينَهُ فَاضْرِبُوا عُنَقَهُ . :
(۳) عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِءٍ مُّسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَانِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ ، الطَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ وَالْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ . بخاري ومسلم
“হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন,
মুসলমান যে কালিমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেয় তাকে তিন কারণের কোন এক কারণ ছাড়া হত্যা করা জায়িয নেই। যথা: (১) বিবাহিত ব্যভিচারী, (২)
অন্যায়ভাবে হত্যাকারী এবং (৩) দ্বীন পরিত্যাগকারী (মুরতাদ)।
(٤) عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفِ بْنِ عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ أشرف يومَ الدَّارَ فَقَالَ انْشُدُكُمْ بِاللهِ ، أَتَعْلَمُونَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى تَلْتَ زِنَا
بَعْدَ احْصَانٍ أَوْ كُفْرٍ بَعْدَ إِسْلامِ أَوْ قَتْلِ نَفْسٍ بِغَيْرِ حَةٍ فَيُقْتَلُ بِهِ فَوَاللَّهِ مَا زَنَيْتُ فِي جَاهِلِيَّةٍ وَلَا فِي إِسْلامِ وَلَا ارْتَدَّدْتُ مُنْذُ بَايَعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلا قَتَلْتُ النَّفْتَنَ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ.
ترمذی، نسائی، ابوداود
আবু উমামা থেকে বর্ণিত, হযরত ওসমান (রা.) কে যে সময় অবরোধ করে রাখা হয় সে সময় একদিন তিনি মাথা উঁচু করে বিদ্রোহীদের প্রতি সম্বোধন করে বলেন, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তোমরা কি জানো না যে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, তিন কারণ ছাড়া মুসলমানকে হত্যা করা জায়িয নেই? কারণ তিনটি হলো, বিবাহিত হয়ে ব্যভিচার করা, ইসলাম গ্রহণ করার পর কুফরী করা এবং অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। আল্লাহর কসম! আমি জাহেলী যুগেও ব্যভিচার করিনি, ইসলাম গ্রহণ করেও নয়। আমি মুরতাদ হয়ে যাইনি এবং কাউকে হত্যাও করিনি। -তিরমিযী, নাসায়ী, আবূ দাউদ
(٥) عَنْ جَرِيرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : إِذَا أَبَقَ الْعَبْدُ إِلَى الشِّرْكِ فَقَدْ حَلَّ دَمُهُ . ابوداود
“যে ব্যক্তি শিরকে লিপ্ত হয় তার রক্ত হালাল হয়ে যায়।”
(٦) عَنْ عِكْرَمَةَ قَالَ : أَنِي عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ بِزَنَادِقَةٍ فَأَحَرَّفَهُمْ، فَبَلَغَ ذَلِكَ ابْنَ عَبَّاسٍ فَقَالَ : لَوْ كُنْتُ أَنَا لَمْ أَحْرِقْهُمْ لِنَهْي رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : قَالَ : لَا تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ وَلَقَتَلْتُهُمْ لِقَوْلِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ – (بخاری ، ترمذی، ابوداؤد وغير ذلك من الاحاديث الكثيرة .
ইকরামা (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.)-এর কাছে কয়েকজন যিন্দীককে গ্রেফতার করে আনা হলে তিনি সবাইকে পুড়িয়ে মারেন। ইবনে আব্বাসের কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেন, “আমি হলে পুড়িয়ে মারতাম না। কেননা রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা আল্লাহর শাস্তি দিয়ে কাউকে শাস্তি দিও না।”
বরং আমি তাদের হত্যা করতাম। কেননা রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দ্বীন (ইসলাম) পরিত্যাগ করে তাকে হত্যা করো।”
মুরতাদের তওবা গ্রহণ করা
১। ইমাম আবু হানীফার (রহ.) মতে মুরতাদকে কিছুটা অবকাশ দেয়া উচিত যাতে এ সময়ে পুনরায় তার কাছে ইসলাম পেশ করা যায়। কাজী ইচ্ছা করলে তিন দিন জেলখানায় আবদ্ধ রাখবে। এ সময় সে ইসলাম কবুল করলে ভালো অন্যথায় তাকে হত্যা করতে হবে। এই অবকাশ দেয়াটা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। কেননা তার কাছে তো ইসলামের দাওয়াত আগেই পৌঁছেছে। আর যার কাছে আগে থেকেই দাওয়াত পৌঁছেছে তাকে নতুন করে দাওয়াত দেয়া ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব। কুরআনের আয়াত فاقتلوا المشركين এবং হাদীস من بدل دینه فاقتلوه-এ অবকাশ দেয়ার কথা উল্লেখ নেই। তাছাড়া মুরতাদ হলো হরবী কাফিরের মত যাকে অবকাশ দেয়া জরুরী নয়। আর সে যিম্মিত নয় কেননা তার থেকে জিযিয়া (কর) আদায় করা হয় না। সুতরাং অবকাশ না দিয়েই তাকে হত্যা করা যাবে।
-আল ফিকহু আলা মাযাহিবিল আরবা’আ খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪২৪
২। ইমাম শাফেঈর (রহ.) মতে তিনদিন পর্যন্ত অবকাশ দেয়া ওয়াজিব। তিনি বলেন, মুসলমান কোন সন্দেহের কারণেই মুরতাদ হয়ে থাকে। সুতরাং এতটুকু সময় দেয়া উচিত যাতে করে সে সন্দেহ দূর করতে পারে। আর এই সময়ের পরিমাণ তিনদিন। তিনদিন সময়ের একটি বৈশিষ্ট্য আছে। মূসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে-
وَلَمَّا كَانَتِ الثَّالِثَةُ قَالَ لَهُ قَدْ بَلَغْتُ مِن لَّدُنِي عُدْرًا . এটি মালেকী মাযহাব এবং আহমদ (রহ.)-এর একমত এরূপ।
মহিলা মুরতাদের হুকুম
১। ইমাম শাফেঈ, আহমদ ও মালেকের মতে মহিলা মুরতাদকেও পুরুষের মত হত্যা করা হবে। কেননা উভয়ের অপরাধ সমান। তাঁরা বলেন, মহিলা মুরতাদের হুকুম পুরুষ মুরতাদের মতো। সুতরাং কতল করার আগে তাকেও তিনদিন অবকাশ দিতে হবে।
عَنْ جَابِرٍ : أَنَّ امْرَأَةً يُقَالُ أَمْ رُومَانَ ارْتَدَّتْ فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُعْرَضَ عَلَيْهَا الْإِسْلامُ فَإِنْ تَابَتْ وَإِلَّا قُتِلَتْ – دار قطني
“উম্মে রূমান নামী এক মহিলা মুরতাদ হয়ে গেলে রাসূল (সা.) তাকে তিনদিনের অবকাশ দেয়ার নির্দেশ দেন। এ সময়ে ইসলাম কবুল না করলে হত্যা করার আদেশ দেন। এমনিভাবে من بدل دینه فاقتلوه হাদীসে ব্যাপকভাবে নারী-পুরুষ সকল মুরতাদকে হত্যা করতে বলা হয়েছে।
২। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর মতে মহিলা মুরতাদকে হত্যা করা যাবে না। বরং বন্দী করে রেখে ইসলাম পেশ করতে হবে। প্রত্যেক দিন ৩৯টি দোররা লাগাতে হবে। এভাবে হয় ইসলাম কবুল করবে না হয় জেলখানাতেই মারা যাবে। হ্যাঁ, কোন ব্যক্তি যদি হত্যা করেই ফেলে তাহলে তার জন্য তাকে কেসাস বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।
কতল না করার স্বপক্ষে দলীলসমূহ:
(1) عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ امْرَأَةٌ وُجِدَتْ فِي بَعْضٍ مَغَازِي النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقْتُولَةً فَأَنْكَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَتْلَ النِّسَاءِ وَالصَّبْيَانِ .
রাসূল (সা.)-এর যুগে কোন এক যুদ্ধে একজন মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। এতে রাসূল (সা.) অসন্তুষ্ট হন এবং মহিলা ও শিশু বাচ্চা হত্যা করতে বারণ করেন।
(۲) رُوِيَ عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَهُ حِيْنَ بَعَثَ إِلَى الْيَمَنِ : أَنَّمَا رَجُلٍ ارْتَدَّ عَنِ الْإِسْلَامِ فَادْعُهُ فَإِنْ تَابَ فَاقْبَلْ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَتُبْ فَاضْرِبْ عُنُقَهُ، وَأَنَّمَا امْرَأَةٍ ارْتَدَّتْ عَنِ الإِسْلامِ فَادْعُهَا فَإِنْ تَابَتْ فَاقْبَلَ مِنْهَا وَإِنْ أَبَتْ فَاسْتَتِبْهَا الخ .
মু’আয ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেনে প্রেরণ করার সময় রাসূল (সা.)
নসীহত করেন-যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করবে তাকে পুনরায় দাওয়াত দাও,
যদি সে তওবা করে তাহলে ভালো আর তওবা না করলে গর্দান উড়িয়ে দাও। আর যে মহিলা মুরতাদ হয়ে যায় তাকে দ্বীনের দিকে আহবান কর। যদি তওবা করে তাহলে তা কবুল করে নাও। অস্বীকৃতি জানালে বারবার তওবা করার আহবান জানাও।
(۳) روى أَبُو يُوسُفَ عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ عَنْ عَاصِمِ بْنِ أَبِي النُّجُودِ عَنْ أَبِي رُزَيْنِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : لَا تُقْتَلُ النِّسَاءُ إِذَا هُنَّ ارْتَدْنَ عَنِ الْإِسْلَامِ وَلَكِنْ يُحْبَسَنَ وَيُدْعَيْنَ إِلَى الْإِسْلَامِ وَيُجْبَرْنَ عَلَيْهِ . رو
“ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, মহিলা মুরতাদ হয়ে গেলে তাকে হত্যা করা যাবে না বরং বন্দী করে রাখতে হবে এবং ইসলামের প্রতি বারবার আহবান করতে হবে।”
) عَنْ مُحَمَّدٍ قَالَ بَلَغَنَا عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ قَالَ : إِذَا ارْتَدَّتِ الْمَوَاةُ عَنِ الْإِسْلَامِ حُبِسَتْ ، وَمِثْلُ هَذَا لَا يُقَالُ عَنِ اجْتِهَادٍ .
হমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আমাদের কাছে এই রেওয়ায়াত এসেছে, যে মহিলা মুরতাদ হয়ে যাবে তাকে আটকে রাখতে হবে। আর এ ধরনের ফতওয়া কেউ ইজতেহাদ করে দেয় না।”
(٥) عَنْ عَلِيِّ قَالَ : الْمُرْتَدَّةٌ تُسْتَبَانُ وَلَا تُقْتَلُ – دارقطني
“আলী (রা.) বলেন, মুরতাদ মহিলাকে হত্যা করা যাবে না, তাওবা করতে সারা হবে।” দারা কুতনী
৬। মহিলার বুদ্ধি কম হওয়ায় তার অপরাধ কম বলে বিবেচিত হবে।
৭। মহিলার যুদ্ধাংদেহী মনোভাব কম হয়ে থাকে। এ কারণে রাসূল (সা.)
মহিলাদেরকে কতল করতে নিষেধ করেছেন এবং এর কারণ স্বরূপ বলেছেন, এরা যুদ্ধ করে না।
ইমামগণের দলীলের জওয়াব
ইমামগণ উম্মে রূমান নামী মহিলার ঘটনা দ্বারা যে দলীল পেশ করেছেন এর জওয়াব হলো, তাকে শুধু মুরতাদ হওয়ার কারণেই হত্যা করা হয়নি বরং সে ছিল একাধারে যাদুকারিণী এবং কবি। সে রাসূল (সা.)-এর শানে অপমানজনক

ইসলামে ইনসাফ 41
ইসলামে ইনসাফ 43
ইসলামে ইনসাফ 45
ইসলামে ইনসাফ 47
ইসলামে ইনসাফ 49

এই উদ্ধৃতির একটি অনুবাদগত অসংগতি আলাদা করে লক্ষ করা প্রয়োজন। সেখানে আবু দাউদের বর্ণনার বাংলা অর্থ দেওয়া হয়েছে, “যে ব্যক্তি শিরকে লিপ্ত হয় তার রক্ত হালাল হয়ে যায়।” কিন্তু পাশে দেওয়া আরবিতে إِذَا أَبَقَ الْعَبْدُ إِلَى الشِّرْكِ আছে—অর্থাৎ দাসের পালিয়ে শিরকের দিকে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। “দাস” ও “পালিয়ে যাওয়া” বাদ দিলে একটি নির্দিষ্ট অবস্থার বর্ণনা সব শিরককারীর বিরুদ্ধে সাধারণ হত্যার বক্তব্যে পরিণত হয়। সুনানে আবু দাউদ ৪৩৬০-এর মূল পাঠে এই শব্দগুলো রয়েছে [134]। ধর্মীয় বিধানের সমালোচনায় এই পার্থক্যটি জরুরি, কারণ কোন বক্তব্য কোন মানুষ ও কোন অবস্থাকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, তা বাদ দিয়ে ইনসাফের প্রশ্ন যাচাই করা যায় না।

তওবার জন্য তিন দিন সময় দেওয়া হলেও বিশ্বাসের স্বাধীনতা ফিরে আসে না। বন্দিত্ব বা মৃত্যুর হুমকির মুখে একজন মানুষকে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আগের বিশ্বাসে ফিরে আসতে হবে। সন্দেহ দূর হওয়া সময় বেঁধে আদায় করার বিষয় নয়। একজন মানুষ সত্যিই কোনো দাবিতে বিশ্বাস হারালে তাঁকে সময়সীমা দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করতে বলা যায় না। ফলে এই অবকাশের শেষে পরীক্ষাটি দাঁড়ায়, তিনি ধর্মে ফিরে আসার ঘোষণা দিলেন কি না; তাঁর বিবেক স্বাধীন থাকল কি না, সেই প্রশ্নের কোনো স্থান থাকে না।

ধর্মত্যাগের মৃত্যুদণ্ড শুধু সশস্ত্র বিদ্রোহীর জন্য—এমন দাবিও প্রচার করা হয়। কিন্তু মুফতি তাকী উসমানীর দরসে তিরমিযীর ব্যাখ্যায় এই দাবিটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সেখানে “জামায়াত থেকে পৃথক হওয়া” কথাটিকে বিদ্রোহের আলাদা শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি [135]—

মুরতাদের সাজা মৃত্যুদণ্ড
বর্তমান যুগে অনেক আধুনিক লোক মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডকে অস্বীকার করেছে। বলেছে যে, মুরতাদকে কতল করার আদেশ শরিয়তে নেই। তাঁরা কোরআনে কারিমের নিম্নেযুক্ত আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করে- لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ )সূরা বাকারা, আয়াত-২৫৬(
‘দীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই।’
সুতরাং যদি কেউ মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে তাকে কতল করা হবে না। তারা এ অনুচ্ছেদের হাদিস দ্বারাও দলিল পেশ করতে গিয়ে বলে যে, এই হাদিসে শব্দটি রয় الثَّارِكٌ এর কয়েদ। হাদিসের অর্থ শুধু মুরতাদ হয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডের কারণ না, যতোক্ষণ পর্যন্ত এর সঙ্গে جماعة বা দল হতে বিচ্ছেদ তথা বিদ্রোহ না পাওয়া যাবে। সুতরাং যখন কেউ মুরতাদ হয়ে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়, তখন সেটা মৃত্যুদণ্ডের কারণ হবে। শুধু মুরতাদ হওয়া মৃত্যুদণ্ডের কারণ না।
كتاب الديات، باب قول الله تعالى – كتاب القسامة والمحاربين والقصاص، باب ما يباح به دم المسام – cafe النفس بالنفس والعين بالعين
তাহলে এই দলিল সঠিক না। কেনোনা, অন্যান্য বর্ণনায় ব্যাপক আকারে বলা হয়েছে-مَنْ بَنَّلُ ذِينَهُ فَاقْلُو তথা যে তার দীন পরিবর্তন করবে তাকে কতল করো। তাছাড়া প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগের অনেক ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে যেগুলোতে বিদ্রোহ না হওয়া সত্ত্বেও মুরতাদকে কতল করা হয়েছে। বস্তুত التَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ এ বিশদ বিবরণ দাতা, স্বতন্ত্র কয়েদ না। সুতরাং এ হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা ঠিক না।

ইসলামে ইনসাফ 51

সমসাময়িক ফতোয়াতেও এই বিধান রয়েছে। ইসলাম প্রশ্নোত্তরের ২০৩২৭ নম্বর উত্তরে বিশ্বাস, বক্তব্য, কাজ এবং ধর্মীয় আচরণ পুরোপুরি ত্যাগ—এই চারভাবে ধর্মত্যাগের আলোচনা করা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বেচ্ছায় ধর্মত্যাগকারীকে শাসক বা তাঁর প্রতিনিধি হত্যা করবেন বলে সেখানে বলা হয়। শাস্তির কারণ হিসেবে কেবল সশস্ত্র আক্রমণ উল্লেখ করা হয়নি। বরং মানুষ সহজে ধর্ম ছেড়ে চলে যেতে পারলে অন্যের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেই প্রশ্ন তুলে মৃত্যুদণ্ডের সমর্থন করা হয়েছে [136]।

এই যুক্তির ভিত্তিতেই ইনসাফের সমস্যা প্রকাশ পায়। একজন মানুষ ইসলাম ত্যাগ করলে অন্যরা ধর্মটি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন—এটি তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ন্যায্য কারণ হতে পারে না। মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমণ নয়। ধর্মত্যাগকে প্রশ্ন ছড়ানোর উৎস হিসেবে দমন করা মানে বিশ্বাসের দাবিকে যুক্তির পরীক্ষায় টিকিয়ে রাখার বদলে প্রশ্নকারীর জীবনকে শাস্তির অধীন করা। এই বিধান এবং ধর্মীয় প্রচারের সম্পর্ক বোঝার জন্য আলেমদের কয়েকটি বক্তব্যও দেখা যাক—

ধর্মত্যাগের শাস্তির সঙ্গে ধর্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুক্তি কীভাবে যুক্ত করা হয়, সেই বিষয়েও একটি বক্তব্য দেখা যাক—

কোনো ধর্মের অনুসারীরা মৃত্যুভয়ে সেটি ছাড়তে না পারলে তাঁদের সংখ্যাকে সেই ধর্মের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না। যে ব্যক্তিকে বলা হয়েছে, বিশ্বাস ত্যাগ প্রকাশ করলে তাঁর প্রাণ যাবে, তাঁর প্রকাশ্য ধর্মীয় পরিচয় থেকে অন্তরের বিশ্বাস নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষের জীবন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দাবি করা হলে সেটি ইনসাফের পক্ষে যুক্তি হয় না; বরং ব্যক্তির বিবেককে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের নিচে রাখার ঘোষণা হয়। এই বিষয়ে সংশয়ের ইসলামে মুরতাদ কতল: ধর্মত্যাগের বর্বর শাস্তি এবং ইসলামের সঙ্গে দর্শনশাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যার সংঘাত: ইসলাম কি যাচাই করার সুযোগ দেয়? প্রবন্ধে আরও বিস্তারিত আলোচনা আছে।


শিরককারী হত্যাযোগ্য

ধর্মত্যাগের বিধানের পরে আরও একটি প্রশ্ন আসে: অন্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে কীভাবে এমন অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার জন্য মানুষের রক্ত হালাল বলার ভাষা ব্যবহৃত হতে পারে? বাংলাদেশের আলেম ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত মো. আব্দুল কাদেরের বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা গ্রন্থে শিরককারীদের সম্পর্কে সরাসরি এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে [137]—

যারা শির্ক চর্চা করে, তাদের রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল, হত্যাযোগ্য। আল্লাহর ভাষায়-
فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ ﴾ [التوبة: ٥]
“অতঃপর শির্ককারীদের যেখানে পাবে তাদেরকে হত্যা কর, তাদেরকে পাকড়াও কর ও অবরুদ্ধ কর। আর তাদের ঘাটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎপেতে বসে থাকো।”10
শির্ক একটি বড় গুনাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
عن أبي هريرة رضى الله عنه إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: اجتنبوا الموبقات …. الإشراك بالله….

ইসলামে ইনসাফ 53

“শিরক চর্চা করে” এমন মানুষের রক্ত হালাল—এই বক্তব্যে অন্যের ওপর আক্রমণ, হত্যা বা সম্পদ লুণ্ঠনের শর্ত উল্লেখ নেই। অপরাধ হিসেবে সামনে এসেছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার পরিচয়। একজন মানুষ একাধিক দেবতায় বিশ্বাস করেন বা মূর্তির সামনে উপাসনা করেন—এই কাজ কোনো মুসলিমের কাছে ধর্মীয়ভাবে ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই আপত্তি মানুষটির জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। কোনো বিশ্বাসকে নিজের ধর্মের বিচারে পাপ বলা এবং সেই বিশ্বাসের অনুসারীকে হত্যাযোগ্য বলা সম্পূর্ণ আলাদা দাবি। দ্বিতীয় দাবিটির জন্য মানুষের ওপর সংঘটিত অপরাধের প্রমাণ প্রয়োজন; ধর্মীয় অমিল সেই প্রমাণের বিকল্প নয়।

গ্রন্থটি সূরা তওবার পঞ্চম আয়াতের একটি অংশ দিয়ে বক্তব্যটি সমর্থন করেছে। অথচ একই জায়গায় চুক্তি রক্ষাকারী মুশরিকদের সঙ্গে চুক্তি পূর্ণ করা এবং আশ্রয়প্রার্থী মুশরিককে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কথাও রয়েছে। ফলে শিরক পরিচয় দেখেই যেকোনো মানুষকে হত্যাযোগ্য বলার সাধারণীকরণ এই আয়াতগুলোর সব বক্তব্য ধারণ করে না। চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতের পূর্ণ পাঠ পাশাপাশি দেখা যাক [138] [139] [140]—

সূরা তওবা, আয়াত ৪
إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنْقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
বাংলা অনুবাদ: তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তোমরা চুক্তি করেছ, তারপর তারা তোমাদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে চুক্তির ঘাটতি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তাদের সঙ্গে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সংযমীদের ভালোবাসেন।

সূরা তওবা, আয়াত ৫
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ ۚ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
বাংলা অনুবাদ: অতঃপর নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হলে মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো, তাদের ধরো, অবরোধ করো এবং তাদের জন্য প্রত্যেক ওত পেতে থাকার স্থানে বসে থাকো। তবে তারা তওবা করলে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করলে এবং যাকাত দিলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

সূরা তওবা, আয়াত ৬
وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَعْلَمُونَ
বাংলা অনুবাদ: আর মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কথা শুনতে পারে; তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও। তা এ জন্য যে তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা জানে না।

তথ্যসূত্র: কোরআন, সূরা তওবা ৯:৪–৬; বাংলা অনুবাদ আরবি পাঠ থেকে।

এই পাঠ থেকে দুটি প্রশ্ন আলাদা করে আসে। প্রথমত, “সব শিরককারীর রক্ত হালাল”—এমন সীমাহীন বক্তব্য চুক্তি ও আশ্রয়ের বিধান বাদ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পঞ্চম আয়াতে পথ ছেড়ে দেওয়ার শর্তের মধ্যে তওবা, নামাজ ও যাকাত এসেছে। যুদ্ধ, চুক্তি ও আশ্রয়ের অবস্থাগুলো নির্দিষ্ট করে আলোচনা করলেও ধর্মীয় আনুগত্যকে নিরাপত্তার শর্তে পরিণত করার নৈতিক প্রশ্নটি থেকে যায়। অন্যের ওপর আক্রমণ বন্ধ করার সঙ্গে কারও ধর্মীয় বিশ্বাস বদলানো এক বিষয় নয়। যে মানুষ শান্তিতে অন্য বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চান, তাঁর নিরাপত্তার জন্য নিজের বিশ্বাস ত্যাগের শর্ত কেন থাকবে?

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষের জীবনের আইনি মূল্য বদলে যাওয়ার আরও কিছু বিধান নিয়ে সংশয়ের ইসলামী শরীয়তে কাফের হত্যা করলে মুসলিমের কোনো মৃত্যুদণ্ড নেই প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা আছে। এখানে প্রশ্নের কেন্দ্র মানুষের নিজের জীবন ও বিবেকের অধিকার। নামাজ পড়তে বাধ্য করা, ধর্মত্যাগের জন্য হত্যা বা বন্দিত্ব এবং অন্য বিশ্বাসের অনুসারীর রক্ত হালাল বলার ভাষা—এসব জায়গায় ধর্মীয় কর্তৃত্বকে মানুষের স্বাধীনতার ওপরে রাখা হয়েছে। যে ব্যবস্থায় বিশ্বাস ধরে রাখার শর্তে জীবন ও স্বাধীনতার নিরাপত্তা পাওয়া যায়, সেখানে বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকে না। আর মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে ধর্মীয় আনুগত্যের পুরস্কার বানিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা যায় না।


শারীরিক শাস্তি, নির্যাতিতের অধিকার ও ভুল বিচারের প্রতিকার

কোনো বিচারব্যবস্থা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে কি না, তা বুঝতে শুধু অপরাধের তালিকা দেখা যথেষ্ট নয়। শাস্তি অপরাধের তুলনায় কতটা যুক্তিসঙ্গত, নির্যাতিত ব্যক্তি কী সুরক্ষা পান, প্রমাণ সংগ্রহের সময় অভিযুক্তের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয় এবং বিচার ভুল হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কীভাবে প্রতিকার পান—এসব প্রশ্নও করতে হয়। কাউকে অপরাধী প্রমাণ করা এবং তাঁর শরীর স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার অধিকার পাওয়া এক বিষয় নয়। আবার অন্যের অপরাধের শিকার হওয়াকে শাস্তির কারণ করা হলে অপরাধীর দায় ও ভুক্তভোগীর অবস্থার মধ্যকার পার্থক্যই মুছে যায়। এই পরিচ্ছেদে হাত কাটার শাস্তি, যৌন নিপীড়িত পশুকে হত্যার বিধান, একজন নারীকে বিবস্ত্র করার হুমকি এবং ভুল বিচারের অপূরণীয় ক্ষতি—এই বিষয়গুলো পাশাপাশি পরীক্ষা করা হবে।


চুরির শাস্তি হাত কেটে দেওয়া

চুরি মানুষের সম্পদের ওপর আক্রমণ। চুরি বন্ধ করা, চুরি হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয় কাজ। কিন্তু এই প্রয়োজন থেকে চোরের হাত কেটে ফেলার ন্যায্যতা নিজে থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি সম্পদের ক্ষতির প্রতিকারে একজন মানুষের শরীর স্থায়ীভাবে অঙ্গহীন করে দেওয়া হচ্ছে। চুরি হওয়া বস্তু ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরে সম্পদের ক্ষতি কিছুটা মেরামত করা যায়; কাটা হাতের ক্ষতি সেভাবে মেরামত করা যায় না। অপরাধের শাস্তি আছে বলেই সেই শাস্তির যেকোনো ধরন ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।

কোরআনে পুরুষ ও নারী চোরের হাত কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে শাস্তিটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বলা হচ্ছে [141]—

সূরা মায়িদা, আয়াত ৩৮
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: আর পুরুষ চোর ও নারী চোর—তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে তাদের হাত কেটে দাও। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

তথ্যসূত্র: কোরআন, সূরা মায়িদা ৫:৩৮; বাংলা অনুবাদ আরবি পাঠ থেকে।

হাত কাটার জন্য ফিকহে নির্দিষ্ট শর্তের আলোচনা আছে। ইসলাম প্রশ্নোত্তরের ১০১৭৮১ নম্বর ফতোয়ায় গোপনে সম্পদ নেওয়া, অপরাধীর প্রাপ্তবয়স্কতা ও সুস্থবুদ্ধি, সম্পদের ন্যূনতম মূল্য, সংরক্ষিত স্থান থেকে নেওয়া, মালিকানা নিয়ে সংশয়ের অনুপস্থিতি এবং সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আদালতে চুরি প্রমাণিত হওয়া—এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে [142]। ফলে প্রতিটি সম্পদ নেওয়ার ঘটনাকে একইভাবে এই শাস্তির আওতায় বলা ঠিক হবে না। কিন্তু শর্ত পূরণ হলে হাত কাটার বিধানটি বহাল থাকে। প্রমাণ গ্রহণের শর্ত এবং শাস্তির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আলাদা প্রশ্ন; কঠোর শর্ত দিয়ে কোনো শাস্তি প্রয়োগ সীমিত করলেও অঙ্গচ্ছেদের ন্যায্যতা প্রমাণিত হয় না।

হাদিসে শুধু একবার হাত কাটার ঘটনাই নেই। সূনান আবু দাউদের নিচের বর্ণনায় একই ব্যক্তির বারবার চুরির জন্য পর্যায়ক্রমে হাত ও পা কেটে ফেলা এবং শেষে তাঁকে হত্যা করার বিবরণ রয়েছে। বর্ণনার শুরু থেকেই হত্যার নির্দেশ আসে; উপস্থিত লোকেরা প্রতিবারই বলেন, তিনি তো শুধু চুরি করেছেন [143]—

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছদঃ ২০. যে বার বার চুরি করে, তার শাস্তি সস্পর্কে।
৪৩৫৮. মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ্ (রহঃ) ……. জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ জনৈক চোরকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে হাযির করা হলে, তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। তখন সাহাবীগণ বলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসুল! এ লোক তো কেবল চুরি করেছে! তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তবে তার হাত কেটে দাও। তখন সে ব্যক্তির ডান হাত কেটে দেওয়া হয়। এরপর সে দ্বিতীয়বার চুরি করলে, তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত করা হয় এবং তিনি তার হত্যার নির্দেশ দেন। তখনও সাহাবীগণ বলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসুল! সে তো কেবল চুরি করেছে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তার পা কেটে দাও। তখন তার বাম-পা কেটে ফেলা হয়। এরপর সে ব্যক্তিকে তৃতীয় বার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে পেশ করা হলে, তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। তখন সাহাবীগণ বলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসুল! সে তো চুরি করেছে। এরপর তিনি কাটার নির্দেশ দিলে, সে ব্যক্তির বাম-হাত কাটা হয়। পরে সে ব্যক্তিকে চতুর্থবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে পেশ করা হলে, তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। তখনও সাহাবীগণ বলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসুল! এ ব্যক্তি তো চুরি করেছে। তখন তিনি কাটার নির্দেশ দিলে তার ডান-পা কেটে ফেলা হয়। এরপর সে ব্যক্তিকে পঞ্চমবারের অপরাধের কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে হাযির করা হলে, তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। জাবির (রাঃ) বলেনঃ এরপর আমরা তাকে প্রান্তরে নিয়ে হত্যা করি এবং তার লাশ টেনে কূপের কাছে নিয়ে তাতে নিক্ষেপ করি। পরে তার মৃত দেহের উপর পাথর নিক্ষেপ করি।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

এই বর্ণনায় শাস্তির ভয় চুরি বন্ধ করতে পেরেছে—এমন ফল দেখা যায় না। বরং শরীরের একের পর এক অঙ্গ হারানোর পরেও চুরির অভিযোগ অব্যাহত থাকে, এবং শেষে হত্যা করা হয়। এখানে প্রশ্ন শুধু কতবার অপরাধ হয়েছে, তা নয়; কেন অপরাধ হচ্ছে, আগের শাস্তি কেন কাজ করেনি এবং মানুষের শরীর ধ্বংস করার পরিবর্তে কার্যকর প্রতিকার কী হতে পারে—সেই প্রশ্নগুলোও জরুরি। অঙ্গচ্ছেদে একজন মানুষ কাজ করার ক্ষমতা হারালে তাঁর নিজের জীবিকা ও পরিবারের ওপরও ক্ষতি পড়ে। তাঁকে সংশোধন করা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যের সঙ্গে এই স্থায়ী অক্ষমতার সম্পর্ক কী?

এই জায়গায় ক্লেপটোম্যানিয়ার প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। এটি চুরি করার তাড়না নিয়ন্ত্রণের একটি মানসিক সমস্যা; প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ জিনিস নেওয়ার তাড়না অনুভব করেন। রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যক্তির উপসর্গ, আচরণের ইতিহাস এবং মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন প্রয়োজন; চিকিৎসাও রয়েছে [144]। শুধু বারবার চুরির বিবরণ থেকে ঐ ব্যক্তির ক্লেপটোম্যানিয়া ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তাই কারণ অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের প্রয়োজনকে সামনে আনে। অপরাধের পুনরাবৃত্তি দেখে শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়ানো মানুষের দায়, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং আচরণের কারণ যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না।

চুরির জন্য অঙ্গচ্ছেদের আরও বর্ণনা সহিহ মুসলিমে পাওয়া যায়। তিন দিরহাম মূল্যের একটি ঢাল চুরির জন্য হাত কাটার বিবরণটি দেখা যাক [145]—

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩০/ অপরাধের শাস্তি
৪২৫৯। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঢাল চুরির অপরাধে এক চোরের হাত কর্তন করেন। ঢালটির মূল্য ছিল তিন দিরহাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আয়িশার বর্ণনায় এক দীনারের এক-চতুর্থাংশ বা তার বেশি মূল্যের সম্পদ চুরির জন্য হাত কাটার কথা আছে [146]—

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩০/ অপরাধের শাস্তি
৪২৫১। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ও ইবনু আবূ উমার (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক দ্বীনারের এক চতুর্থাংশ এবং এর অধিক পরিমাণ মূল্যের মাল চুরির অপরাধে চোরের হাত কর্তন করতেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ডিম ও দড়ি চুরির উল্লেখসহ বর্ণনাগুলোও পড়া যাক [147] [148]—

সুনানে ইবনে মাজাহ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ১৪/ হদ্দ (দন্ড)
১/২৫৮৩। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ চোরের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত, ডিম চুরি করার অপরাধে যার হাত কাটা যায় এবং রশি চুরি করার অপরাধে যার হাত কাটা যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩০/ অপরাধের শাস্তি
৪২৬১। আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেন সে চোরের ওপর, যে একটি ডিম (বা ডিমের মূল্যের পরিমাণ বস্তু) চুরি করল। এতে তার হাত কাটা যাবে। আর যে ব্যক্তি একটি দড়ি (কিংবা দড়ির সমম্যূল্যর পরিমাণ বস্তু) চুরি করল, তারও হাত কাটা যাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই বর্ণনায় “ডিম” অনূদিত আরবি শব্দটি “বাইদা”; বুখারীর সংশ্লিষ্ট পাঠের অনুবাদে ডিম বা শিরস্ত্রাণ—দুই অর্থের উল্লেখ আছে [149]। আগের বর্ণনায় ন্যূনতম মূল্যের বিধানও রয়েছে। তাই এই অনুবাদের ওপর দাঁড়িয়ে যেকোনো সামান্য মূল্যের ডিম বা দড়ি চুরিতেই অবশ্যই হাত কাটা হবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। ইনসাফের মূল প্রশ্নটি বস্তুটির নামের ওপর নির্ভর করছে না: নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে সম্পদের অপরাধের শাস্তি হিসেবে মানুষের হাত স্থায়ীভাবে কেটে ফেলা কতটা ন্যায়সংগত?

শাস্তির দৃষ্টান্তমূলক ভয় সৃষ্টি করা একটি লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু ভয় সৃষ্টি করাই শাস্তির ন্যায্যতার একমাত্র মানদণ্ড হলে আরও নিষ্ঠুর শাস্তিকেও একই যুক্তিতে সমর্থন করা সম্ভব। একজন অপরাধীর মানবিক মর্যাদা অপরাধের কারণে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না। ক্ষতিগ্রস্তের ক্ষতিপূরণ, অপরাধীর দায়, পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং সংশোধনের প্রয়োজন—এসব বিচার করেই শাস্তির যৌক্তিকতা যাচাই করতে হয়। এই বিধান ও সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো নিয়ে সংশয়ের ইসলামে চুরির অমানবিক শাস্তি: কবজি থেকে হাত কেটে ফেলার আল্লাহর নির্দেশ প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা আছে।


ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতের শাস্তি

এখানে আলোচ্য বর্ণনাটি মানুষের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার একটি পশুকে নিয়ে। যে ব্যক্তি পশুটির সঙ্গে যৌনকর্ম করেছে, তার সঙ্গে পশুটিকেও হত্যা করার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। পশুটি মানুষের মতো ধর্মীয় আইন বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়নি, কোনো অপরাধের পরিকল্পনা করেনি এবং নিজের ওপর সংঘটিত কাজটির জন্য মানুষের মতো নৈতিক দায়ও বহন করে না। অথচ হত্যার নির্দেশে অপরাধী মানুষের সঙ্গে নিপীড়িত প্রাণীটিকেও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সরাসরি প্রশ্ন ওঠে: অন্যের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া প্রাণীটির মৃত্যুর কারণ হবে কেন?

সূনান আবু দাউদের বর্ণনায় এই প্রশ্নটি ইবনে আব্বাসকেও করা হয়েছে। তাঁর উত্তর হত্যার কারণ হিসেবে পশুটির কোনো অপরাধ দেখায় না; তার গোশত খাওয়া অপছন্দ করার একটি অনুমান সামনে আনে [150]—

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছদঃ ২৮. পশুর সাথে সংগম করলে তার শাস্তি সস্পর্কে।
৪৪০৫. আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) ………. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ কোন পশুর সাথে সঙ্গম করে, তবে তাকে হত্যা করবে এবং সে পশুকেও তার সাথে হত্যা করবে। রাবী বলেন, আমি ইবন আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিঃ পশুর অপরাধ কি? তিনি বলেনঃ আমার মনে হয়, তিনি সে পশুর গোশত খাওয়া ভাল মনে করেননি, যার সাথে কেউ এরূপ কুকর্ম করে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

এই বিষয়ে ফকীহদের সব মত এক নয়। ইসলামওয়েবের ১২৬৩৮৬ নম্বর ফতোয়ায় অপরাধীর তাযীর, যিনার শাস্তি এবং মানুষ ও পশু উভয়কে হত্যার বিভিন্ন মত উল্লেখ করা হয়েছে [151]। সেই পার্থক্য ঠিক রেখেই পশু হত্যার বিধানের ন্যায্যতা পরীক্ষা করতে হবে। যে মত প্রাণীটিকে হত্যা করতে বলে, সেটি নিপীড়িত প্রাণীর ওপর দ্বিতীয়বার ক্ষতি চাপায়। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন প্রাণীটিকে হত্যা করার নৈতিক অনুমতি তৈরি করে না।

ইবনে কুদামার আল-মুগনিতে পশু হত্যার পক্ষে বিভিন্ন কারণ দেওয়া হয়েছে। শামেলায় মূল গ্রন্থের নবম খণ্ডে এই আলোচনা পাওয়া যায়; ইসলামওয়েবের উল্লিখিত ফতোয়াতেও কারণগুলোর এই অংশ উদ্ধৃত হয়েছে [152]—

وَاخْتُلِفَ فِي عِلَّةِ قَتْلِهَا، فَقِيلَ: إنَّمَا قُتِلَتْ لِئَلَّا يُعَيَّرَ فَاعِلُهَا، وَيُذَكَّرَ بِرُؤْيَتِهَا. وَقَدْ رَوَى ابْنُ بَطَّةَ، بِإِسْنَادِهِ عَنْ النَّبِيِّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – أَنَّهُ قَالَ: «مَنْ وَجَدْتُمُوهُ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ، وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا بَالُ الْبَهِيمَةِ؟ قَالَ: لَا يُقَالُ هَذِهِ وَهَذِهِ» . وَقِيلَ: لِئَلَّا تَلِدَ خَلْقًا مُشَوَّهًا. وَقِيلَ: لِئَلَّا تُؤْكَلَ. وَإِلَيْهَا أَشَارَ ابْنُ عَبَّاسٍ فِي تَعْلِيلِهِ.
বাংলা অনুবাদ: পশুটিকে হত্যার কারণ নিয়ে মতভেদ হয়েছে। বলা হয়েছে, তাকে হত্যা করা হয়, যাতে কাজটি করা ব্যক্তিকে পশুটি দেখে তিরস্কার করা না হয় এবং ঘটনাটি মনে করিয়ে দেওয়া না হয়। ইবনে বাত্তা তাঁর বর্ণনাসূত্রে নবী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: তোমরা যাকে পশুর সঙ্গে এমন কাজে পাও, তাকে হত্যা করো এবং পশুটিকেও হত্যা করো। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, পশুটির কী হয়েছে? তিনি বললেন: যেন বলা না হয়, এইটিই সেই পশু। আরও বলা হয়েছে, যাতে পশুটি বিকৃত আকৃতির সন্তান জন্ম না দেয়। আবার বলা হয়েছে, যাতে তাকে খাওয়া না হয়। ইবনে আব্বাস তাঁর কারণ ব্যাখ্যায় এই শেষ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
তথ্যসূত্র: ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩; পশু হত্যার কারণসংক্রান্ত আলোচনা।

এই কারণগুলোর মধ্যেও প্রাণীটির অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অপরাধী মানুষকে তিরস্কার থেকে রক্ষা করা বা ঘটনাটি মনে না পড়ার জন্য প্রাণীটিকে হত্যা করার যুক্তি দিলে অপরাধীর অস্বস্তির মূল্য দাঁড়ায় নিপীড়িত প্রাণীর জীবন। গোশত না খাওয়ার প্রয়োজন থাকলে খাওয়া বন্ধ করাই যথেষ্ট; সেখান থেকে হত্যার প্রয়োজনীয়তা আসে না। বিকৃত সন্তান জন্মানোর আশঙ্কার দাবিটিও নিজে থেকে প্রাণীটিকে অপরাধী করে না। এই ব্যাখ্যাগুলো প্রাণীটির সুরক্ষা ও যত্নকে আলোচনার কেন্দ্র করেনি; বরং মানুষের দ্বারা তার ওপর সংঘটিত কাজকেই তার মৃত্যুর কারণ করেছে। এই বিষয়ে সংশয়ের ইসলামী শরীয়তে পশু ধর্ষণের শাস্তি হয় পশুটির প্রবন্ধে আরও বিস্তারিত আলোচনা আছে।

ইনসাফের ন্যূনতম শর্ত হলো, যে ক্ষতির জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তার দায় শাস্তিপ্রাপ্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এই বর্ণনায় পশুটি ঘটনার শিকার; দায়ী মানুষটি অন্য। তাই দুজনকে একই হত্যার নির্দেশে যুক্ত করা দায়ের এই পার্থক্যকে অস্বীকার করে। নিপীড়িতের শরীরকে অপরাধের চিহ্ন হিসেবে মুছে ফেললে তার ওপর হওয়া নিপীড়নের প্রতিকার হয় না; তার জীবনও মুছে ফেলা হয়।


অমুসলিম নারীকে উলঙ্গ করার হুমকি

নবী মুহাম্মদ আলী ও তাঁর সঙ্গীদের একটি চিঠি উদ্ধারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটি হাতিবের লেখা এবং মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল। একজন নারী সেটি বহন করছিলেন। তিনি চিঠির কথা অস্বীকার করলে এবং তাঁর সওয়ারীর জিনিসপত্র তল্লাশি করেও চিঠি না পাওয়া গেলে আলী তাঁকে বিবস্ত্র করে তল্লাশি করার হুমকি দেন। এই হুমকির পরে নারীটি চিঠি বের করে দেন। প্রশ্ন হলো, চিঠি উদ্ধার প্রয়োজনীয় হলেও সেই উদ্দেশ্যে একজন নারীর শরীর ও মর্যাদাকে ভয় দেখানোর অস্ত্র বানানোর অধিকার কোথা থেকে আসে?

সহিহ বুখারীর বর্ণনাটি পুরো পড়া যাক। এখানে নারীকে দেওয়া হুমকি এবং পরে চিঠির প্রেরক হাতিবের প্রতি আচরণ—দুটিই একই বর্ণনায় আছে [153]—

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৯/ অনুমতি প্রার্থনা
পরিচ্ছেদঃ ৭৯/২৩. কারো এমন পত্রের বিষয়ে স্পষ্টরূপে জানার জন্য তদন্ত করে দেখা, যাতে মুসলিমদের জন্য শংকার কারণ আছে।
৬২৫৯. ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ও যুবায়র ইবনু আওয়াম এবং আবূ মারসাদ গানাভী (রাঃ)-কে অশ্ব বের করে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা রওয়ানা হয়ে যাও এবং ’রওযায়ে খাখে’ গিয়ে উপস্থিত হও। সেখানে একজন মুশরিক স্ত্রীলোক পাবে। তার কাছে হাতিব ইবনু আবূ বালতার দেয়া মুশরিকদের প্রতি প্রেরিত একখানি পত্র আছে। আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই তাকে পেয়ে গেলাম যেখানকার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন। ঐ স্ত্রী লোকটি তার এক উটের উপর সওয়ার ছিল। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তোমার কাছে যে পত্রখানি আছে তা কোথায়? সে বললঃ আমার সাথে কোন পত্র নেই। তখন আমরা তার উটসহ তাকে বসালাম এবং তার সাওয়ারীর আসবাবপত্রের তল্লাশি করলাম। কিন্তু আমরা কিছুই খুঁজে পেলাম না।
আমার দু’জন সাথী বললেনঃ পত্রখানা তো পাওয়া গেল না। আমি বললামঃ আমার জানা আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনর্থক কথা বলেননি।
তখন তিনি স্ত্রী লোকটিকে ধমক দিয়ে বললেনঃ তোমাকে অবশ্যই চিঠিটা বের করে দিতে হবে, নইলে আমি তোমাকে উলঙ্গ করে তল্লাশি চালাব। এরপর সে যখন আমার দৃঢ়তা লক্ষ্য করল, তখন সে বাধ্য হয়ে তার কোমরে পেঁচানো চাদরে হাত দিয়ে ঐ পত্রখানা বের করে দিল। তারপর আমরা তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছলাম।
তখন তিনি হাতিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে হাতিব! তুমি কেন এমন কাজ করলে? তিনি বললেনঃ আমার মনে এমন কোন খারাপ ইচ্ছে নেই যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। আমি আমার দৃঢ় মনোভাব পরিবর্তন করিনি এবং আমি দ্বীনও বদল করিনি। এই চিঠি দ্বারা আমার নিছক উদ্দেশ্য ছিল যে, এতে মক্কাবাসীদের উপর আমার দ্বারা এমন উপকার হোক, যার ফলে আল্লাহ তা’আলা আমার পরিবার ও সম্পদ নিরাপদে রাখবেন। আর সেখানে আপনার অন্যান্য সাহাবীদের এমন লোক আছেন যাঁদের দ্বারা আল্লাহ তা’আলা তাদের পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা দান করবেন।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাতিব ঠিক কথাই বলেছে। সুতরাং তোমরা তাকে ভাল ব্যতীত অন্য কিছুই বলো না। রাবী বলেনঃ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বললেন, তিনি নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অতএব আমাকে ছেড়ে দিন আমি তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেই। রাবী বলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’উমার! তোমার কি জানা নেই যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, তোমরা যা ইচ্ছে করতে পার। নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়ে আছে। রাবী বলেনঃ তখন ’উমার (রাঃ) এর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। [৩০০৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৮১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৭১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)

চিঠিটি নারীর কাছে পাওয়া গেছে—এই ফল থেকে আগের হুমকি ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। অনুসন্ধানে কী পাওয়া গেল এবং অনুসন্ধান কীভাবে চালানো হলো, দুটি আলাদা প্রশ্ন। কাউকে অপমান, নির্যাতন বা বিবস্ত্র করার ভয় দেখিয়ে তথ্য আদায় করা গেলে শুধু তথ্য পাওয়া গেছে বলে সেই পদ্ধতিকে গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। নইলে যে পদ্ধতিতে ফল পাওয়া যায়, সেই পদ্ধতিরই নৈতিক ছাড় তৈরি হবে। তখন ক্ষমতাবান পক্ষ নিজের প্রয়োজন দেখিয়ে দুর্বল মানুষের শরীর ও মর্যাদার ওপর যেকোনো চাপ প্রয়োগের যুক্তি পাবে।

একজন নারীকে পুরুষের সামনে বিবস্ত্র করে তল্লাশির হুমকি দেওয়া তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শারীরিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। তল্লাশির প্রয়োজন হলে তার পদ্ধতিও মানুষের মর্যাদা রক্ষার শর্ত মানতে হবে। নারী কর্মীর মাধ্যমে, প্রয়োজনের সীমার মধ্যে এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে তল্লাশি করার ব্যবস্থা সেই উদ্দেশ্যেই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বোরখা পরা মুসলিম নারীকে একজন পুরুষ নিরাপত্তাকর্মী একই হুমকি দিলে তাঁর মর্যাদা রক্ষার দাবি আমরা কীভাবে বিচার করব? একই নীতি অমুসলিম নারীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। যে মর্যাদা নিজের ধর্মের নারীর জন্য দাবি করা হয়, অন্য ধর্মের নারীর জন্যও সেটি স্বীকার না করলে ইনসাফের মানদণ্ড এক থাকে না।

এই একই ঘটনায় চিঠির প্রেরক হাতিব নিজের পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তার যুক্তি পেশ করার সুযোগ পান। তাঁর বক্তব্য সত্য বলে গ্রহণ করা হয়, তাঁকে ভালো ছাড়া অন্য কিছু বলতে নিষেধ করা হয় এবং বদরে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গও সামনে আসে। বিপরীতে চিঠিবাহক নারীটি সশস্ত্র পুরুষদের মুখে বিবস্ত্র করার হুমকির সম্মুখীন হন। দুই ব্যক্তির ভূমিকা এক নয়, কিন্তু ভূমিকার পার্থক্য নারীটির মানবিক মর্যাদা বাতিল করার কারণ হতে পারে না। বিশেষ মর্যাদার ব্যক্তির ব্যাখ্যা মনোযোগ দিয়ে শোনা আর দুর্বল ব্যক্তির শরীরকে ভয় দেখানোর উপায় করা—এই পার্থক্য ইনসাফের প্রশ্নকে আরও তীব্র করে।

এই ঘটনার নৈতিক প্রশ্নটি বিবস্ত্র করার হুমকিকে ঘিরে। বর্ণনা অনুযায়ী, হুমকির পরে নারীটি চিঠি দিয়েছেন। অপমানজনক আচরণের হুমকিও আচরণের অংশ, এবং তার মাধ্যমেই এখানে চিঠি আদায় করা হয়েছে। মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন শুধু হুমকিটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হলো কি না, সেখানে সীমিত থাকে না। এই ঘটনা নিয়ে সংশয়ের আলীর অমুসলিম নারীকে উলঙ্গ করার হুমকি প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা আছে।


শাস্তিতে বিচারিক ভুলের প্রতিকার

যেকোনো বিচারব্যবস্থায় একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকে: আদালত ভুল করলে কী হবে? সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারেন, ঘটনার স্মৃতি ভুল হতে পারে, তথ্য অসম্পূর্ণ থাকতে পারে অথবা বিচারক বক্তব্যের প্রভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো আইনকে আল্লাহর বিধান বলা হলে সেই আইন প্রয়োগকারী মানুষের জ্ঞান, সততা ও সিদ্ধান্তও অভ্রান্ত হয়ে যায় না। অতএব শাস্তির ন্যায্যতা যাচাই করার সময় বিচারিক ভুলের সম্ভাবনা এবং সেই ভুলের ক্ষতি সংশোধন করার ক্ষমতা পরীক্ষা করা অপরিহার্য।

সহিহ বুখারীর একটি বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজেই বিচার তাঁর কাছে উপস্থাপিত বক্তব্যের ওপর নির্ভর করার কথা বলেন। কারও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতার কারণে অন্যের অধিকার তাঁর পক্ষে দেওয়া হতে পারে—এই সম্ভাবনাও বর্ণনায় রয়েছে [154]—

সহিহ বুখারী, হাদিস ২৬৮০
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ زَيْنَبَ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ ـ رضى الله عنها ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ إِنَّكُمْ تَخْتَصِمُونَ إِلَىَّ، وَلَعَلَّ بَعْضَكُمْ أَلْحَنُ بِحُجَّتِهِ مِنْ بَعْضٍ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ أَخِيهِ شَيْئًا بِقَوْلِهِ، فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ فَلاَ يَأْخُذْهَا ‏”‏‏.‏
বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা আমাদের বর্ণনা করেছেন, মালিক থেকে, তিনি হিশাম ইবনে উরওয়া থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি যয়নব থেকে, তিনি উম্মে সালামা থেকে: আল্লাহর রাসূল বলেছেন, তোমরা আমার কাছে বিবাদ নিয়ে আসো। তোমাদের কেউ কেউ অন্যের চেয়ে নিজের যুক্তি উপস্থাপনে বেশি দক্ষ হতে পারে। তাই কারও বক্তব্যের ভিত্তিতে আমি যদি তাকে তার ভাইয়ের অধিকারের কোনো অংশ দিয়ে দিই, তাহলে তাকে আগুনের একটি অংশই দিচ্ছি। সুতরাং সে যেন তা গ্রহণ না করে।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারী ২৬৮০; আরবি পাঠ থেকে বাংলা অনুবাদ।

এই বর্ণনায় আদালতের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব অধিকার এক হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ভুল রায়ের সুবিধাভোগীকে সেই সুবিধা গ্রহণ না করতে বলা হয়েছে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরিয়ে আসছে না। যদি সম্পদের মামলায় বক্তব্যের প্রভাবে ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে, তাহলে মানুষের সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তিনির্ভর দণ্ডবিচারকে ভুলের ঊর্ধ্বে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বিচারকের ধর্মীয় মর্যাদা প্রমাণের ঘাটতি পূরণ করে না, আর রায় ঘোষণাও মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে দেয় না।

ফিকহের গ্রন্থে ভুল বিচারের কারণে ক্ষতিপূরণের আলোচনাও আছে। তুহফাতুল মুহতাজের সঙ্গে শিরওয়ানীর টীকায় সাক্ষ্যদাতাদের সাক্ষ্য গ্রহণের অযোগ্যতা পরে প্রকাশ পেলে রায়ের ফল ও ক্ষতিপূরণের দায় নিয়ে বলা হয়েছে। এখানে ধর্ম, দাসপরিচয় বা নৈতিক অবস্থার কারণে সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তও রয়েছে; এটি সব ধরনের বিচারিক ভুলের একক বিধান নয় [155] [156]—

وإذا حكم القاضي بشاهدين فبانا مردودين في شهادتهما بكفر أو رق أو فسق أو غيرها فقد سبق أن حكمه يتبين بطلانه فتعود المطلقة بشهادتهم زوجة والمعتقة بها أمة فإن استوفي بها قتل أو قطع فعلى عاقلة القاضي الضمان ولو حدا لله تعالى وإن كان المحكوم به مالا تالفا ضمنه المحكوم له فلو كان معسرا أو غائبا غرم القاضي للمحكوم عليه ورجع به على المحكوم له إذا أيسر أو حضر ولا غرم على الشهود ؛ لأنهم ثابتون على شهادتهم ولا على المزكين لأن الحكم غير مبني على شهادتهم مع أنهم تابعون للشهود مغني وروض مع شرحه وأقره سم .
বাংলা অনুবাদ: বিচারক যদি দুই সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় দেন, পরে প্রকাশ পায় যে কুফর, দাসত্ব, ফিসক বা অন্য কোনো কারণে তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, তাঁর রায় বাতিল বলে প্রকাশ পাবে। তাঁদের সাক্ষ্যে তালাকপ্রাপ্ত নারী আবার স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবে এবং সেই সাক্ষ্যে মুক্ত করা নারী আবার দাসী হিসেবে গণ্য হবে। সেই সাক্ষ্যের মাধ্যমে হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদ কার্যকর হয়ে থাকলে বিচারকের আকিলার ওপর ক্ষতিপূরণের দায় থাকবে, যদিও তা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত দণ্ড হয়ে থাকে। আর রায়ের বিষয় যদি এমন সম্পদ হয় যা নষ্ট হয়ে গেছে, তাহলে যার পক্ষে রায় দেওয়া হয়েছিল সে ক্ষতিপূরণ দেবে। সে নিঃস্ব বা অনুপস্থিত হলে বিচারক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেবেন; পরে সে সচ্ছল হলে বা উপস্থিত হলে তার কাছ থেকে ফেরত নেবেন। সাক্ষীদের ওপর ক্ষতিপূরণ নেই, কারণ তাঁরা তাঁদের সাক্ষ্যের ওপর অটল আছেন। সাক্ষীদের গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যয়নকারীদের ওপরও নেই, কারণ রায় তাঁদের সাক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এবং তাঁরা মূল সাক্ষীদের অনুসারী। মুগনি ও রওদ এবং তার ব্যাখ্যায় এটি আছে; ইবনে কাসিমও তা অনুমোদন করেছেন।
তথ্যসূত্র: তুহফাতুল মুহতাজের সঙ্গে শিরওয়ানীর টীকা, দশম খণ্ড, সাক্ষ্য প্রত্যাহারের পরিচ্ছেদ। আকিলা বলতে এখানে ক্ষতিপূরণের দায় বহনকারী আত্মীয়গোষ্ঠী বোঝানো হচ্ছে।

এই আলোচনা থেকে বোঝা যায়, হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার পরেও বিচারিক ভিত্তির ত্রুটি ধরা পড়ার পরিস্থিতি ফিকহে বিবেচিত হয়েছে। অর্থের ক্ষতিপূরণ এবং শরীরের পুনরুদ্ধার এক জিনিস নয়। ভুল করে কারও হাত কেটে দেওয়ার পরে টাকা দিলে তাঁর হাত ফিরে আসে না। তাঁর কাজ করার সুযোগ, দৈনন্দিন চলাফেরা, অন্যের সাহায্য ছাড়া নিজের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা এবং জীবনের পরবর্তী অভিজ্ঞতার ক্ষতি শুধু নির্ধারিত অর্থের হিসাবে শেষ হয় না। আর ভুল করে হত্যা করা হলে নিহত ব্যক্তিকে কোনো ক্ষতিপূরণই ফিরিয়ে আনে না।

শুধু ভুলের পরে কে অর্থ দেবে, সেই প্রশ্নে ইনসাফের পরীক্ষা শেষ করা যায় না। রায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ, নতুন প্রমাণ এলে সিদ্ধান্ত বদলানো, মিথ্যা সাক্ষ্যের অনুসন্ধান এবং নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি যতটা সম্ভব মেরামত করা—এসবের সঙ্গে শাস্তির প্রকৃতি যুক্ত। কিছু শাস্তির ভুল ফল আংশিক সংশোধন করা যায়; অঙ্গচ্ছেদ বা মৃত্যুদণ্ডের ফল সেই অর্থে ফেরানো যায় না। তাই বিচারক ভুল করতে পারেন জেনেও অপূরণীয় শাস্তিকে চূড়ান্ত করা হলে ভুলের সবচেয়ে বড় বোঝাটি নিরপরাধ মানুষের শরীর ও জীবনকেই বহন করতে হয়।

অঙ্গচ্ছেদে অপরাধীর শরীর স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা, নিপীড়িত পশুকেও হত্যার বিধান, তথ্য উদ্ধারে নারীর মর্যাদাকে হুমকির উপায় করা এবং ভুল বিচারের পরে অপূরণীয় ক্ষতি—এই বিষয়গুলো বিচারব্যবস্থার ক্ষমতার সীমা নিয়ে একই প্রশ্ন তোলে। শাস্তি দেওয়ার কর্তৃত্ব নিজে থেকে শাস্তির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। ইনসাফ যাচাইয়ের শেষ মানদণ্ড হতে হবে মানুষের ও নির্যাতিতের সুরক্ষা, দায়ের সঠিক নির্ধারণ এবং ক্ষমতার ভুল প্রয়োগের প্রতিকার; বিধানদাতার মর্যাদা দিয়ে সেই পরীক্ষার ফল আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া যায় না।


উপসংহার

কোরআন, হাদিস ও শরীয়তের আলোচিত বিধানগুলো ইসলামের ইনসাফের দাবির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। যে বিচারব্যবস্থায় মানুষের ধর্মীয় পরিচয় অনুসারে তার সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও জীবনের মূল্য বদলে যায়, স্বাধীন মানুষ ও দাসের হত্যার জন্য পৃথক বিধান থাকে, সন্তানহত্যায় পিতা বিশেষ ছাড় পায় এবং বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান থাকে, সেখানে মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। এসব বৈষম্যকে আল্লাহ ও তাঁর নবীর অনুমোদিত বিধান বলে পবিত্রতা দিলেও বৈষম্যের চরিত্র বদলায় না। শাস্তি দেওয়ার অধিকার কার হাতে আছে, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি শাস্তি কেন ন্যায়সংগত, কাকে কোন কারণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং কার অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোরও উত্তর দিতে হয়।

সমস্যাটি আরও গভীর হয় যখন নির্দিষ্ট বিধানকে আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশ হিসেবে মানুষের নৈতিক মূল্যায়ন ও সংশোধনের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। কোনো বিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা থাকা আর সেই বিধান অন্যায় প্রমাণিত হলে তা প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা থাকা এক বিষয় নয়। হাত কাটার শর্ত নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু অঙ্গচ্ছেদকেই অমানবিক মনে করে বাতিল করতে চাইলে ধর্মীয় আদেশের কর্তৃত্ব সামনে আসে। ধর্মত্যাগের শাস্তি প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে; কিন্তু বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়—এই নীতি গ্রহণ করতে গেলে শাস্তির মূল বিধানটির সঙ্গেই বিরোধ তৈরি হয়। যে ন্যায়বোধ অন্যায় শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু পবিত্রতার দাবি ওঠামাত্র সেই অন্যায় সংশোধনের অধিকার হারায়, তাকে স্বাধীন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বলা যায় না।

পরকালের বিচারের ক্ষেত্রেও সমস্যাটি আরও মৌলিক। আল্লাহ যদি মানুষের তাকদীর এবং জান্নাত-জাহান্নামের পরিণতি আগেই নির্ধারণ করে রাখেন, তারপর মানুষকে দিয়ে সেই পরিণতির উপযোগী কাজ করিয়ে নেন, তাহলে শাস্তির দায় মানুষের ওপর চাপানোর যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। এখানে যিনি মানুষের পরিণতি নির্ধারণ করছেন, কাজ করাচ্ছেন এবং শাস্তি দিচ্ছেন, তিনি একই সত্তা। অপরাধ সংঘটনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে তার দায় সৃষ্টির ওপর চাপানো স্পষ্ট অবিচার। জন্মসূত্রে পাওয়া বিশ্বাস, ধর্ম যাচাইয়ের অসম সুযোগ এবং বিশ্বাস তৈরি বা বদলানোর ওপর মানুষের সীমিত নিয়ন্ত্রণ বিবেচনা না করে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য চিরস্থায়ী শাস্তি দেওয়ার দাবিও এই অবিচারকে আরও তীব্র করে।

একইভাবে, মানুষের কল্যাণে করা কাজ অবিশ্বাসের কারণে নিষ্ফল করে দেওয়া এবং বিশ্বাসের কারণে অপরাধীর মুক্তির সুযোগ রাখা নৈতিকতার চেয়ে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়। এতে কে মানুষের উপকার করেছেন এবং কে অন্যের ক্ষতি করেছেন, সেই প্রশ্নের চেয়ে কে সঠিক কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করেছেন, সেটিই বড় হয়ে ওঠে। অথচ ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্যাতিতের অধিকার, অপরাধীর ব্যক্তিগত দায় এবং ক্ষতির প্রতিকারকে গুরুত্ব দিতে হয়। নিপীড়িত পশুকে হত্যা করা, একজন নারীকে বিবস্ত্র করার হুমকি দেওয়া কিংবা ভুল বিচারে নিরপরাধ মানুষের অঙ্গ কেটে ফেলার পরে অর্থ দিয়ে দায় মেটানোর আলোচনা—কোনোটিই শুধু ধর্মীয় অনুমোদনের কারণে ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।

আল্লাহ যা করেন, তা সংজ্ঞানুসারেই ইনসাফ—এই ধারণা গ্রহণ করলে ন্যায় ও অন্যায় যাচাই করার কোনো স্বাধীন মানদণ্ড অবশিষ্ট থাকে না। তখন ইনসাফ শব্দটি ক্ষমতাবানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের সিলমোহরে পরিণত হয়। কিন্তু যুক্তির পরীক্ষায় বিধানদাতার পরিচয় বিধানের ন্যায্যতার প্রমাণ নয়। মানুষের সমান মর্যাদা, নিজের কাজের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ, অপরাধের সঙ্গে শাস্তির সামঞ্জস্য এবং নির্যাতিতের অধিকার—এই মানদণ্ডে বিচার করলে আলোচিত ইসলামী বিধানগুলো ইনসাফের দাবি পূরণ করে না।


তথ্যসূত্রঃ
  1. মিশকাতুল মাসাবীহ, ঈমান অধ্যায়, তাকদীরের প্রতি ঈমান, হাদিস: ১১৫; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ ↩︎
  2. মোল্লা আলী আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাসাবীহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৯, হাদিস: ১১৫-এর ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
  3. আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনু জারির আত-তাবারি, জামিউল বায়ান আন তাওয়িলি আয়িল কোরআন, খণ্ড: ১৮, পৃষ্ঠা: ৪২৫, সূরা আল-আম্বিয়া: ২৩-এর মূল ব্যাখ্যা; আল-মাকতাবাতুশ শামেলা ↩︎
  4. ইসলামকিউএ, উত্তর: ২৯০০০৯; প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ↩︎
  5. সহিহ মুসলিম, তাকদীর অধ্যায়, ‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মায়’ সংক্রান্ত হাদিস; ইসলামওয়েবে শারহুন নববির সঙ্গে সংরক্ষিত পাঠ ↩︎
  6. আবু হামিদ আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৯৪, কিতাবু কাওয়াইদিল আকায়িদ, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ; আল-মাকতাবাতুশ শামেলা ↩︎
  7. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস: ১১১; সুনান আবু দাউদ, প্রচলিত নম্বর: ৪৭১২ ↩︎
  8. ইসলামকিউএ, উত্তর: ১২৮৮৫০; ইবনু বায, ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৯–১০ ↩︎
  9. ইবন তাইমিয়া, জামি আল-মাসায়িল, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০৬–৩০৭; নবুওয়াত নির্ধারণের সময়সংক্রান্ত আলোচনা; ইসলামওয়েব ↩︎
  10. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩১০ ↩︎
  11. সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৯৮–১৯৯ ↩︎
  12. সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৪৪৭ ↩︎
  13. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬২৩–৩৬২৪; ইসলামে নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহ পরিচ্ছেদ ↩︎
  14. সুনান আত-তিরমিজি, তাহকিককৃত, হাদিস ৩৭৬৮ ↩︎
  15. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১১৮ ↩︎
  16. মিশকাতুল মাসাবিহ, আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৪; উদ্ধৃত সংস্করণের হাদিস ১১০ ↩︎
  17. ইবন কাসীর, তাফসির আল-কোরআন আল-আযিম, সূরা ইসরা ১৭:১৫-এর আলোচনা, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৯–৬০; বর্ণনাটির সনদমূল্যায়ন; ইসলামওয়েব ↩︎
  18. সহিহ বুখারি, তাওহিদ পাবলিকেশন, হাদিস ৬২৫৯; অন্য নম্বরক্রমে হাদিস ৩০০৭ ↩︎
  19. নববী, আল-মিনহাজ শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ৫৬ ↩︎
  20. একই ব্যাখ্যার পরবর্তী অংশ, পৃষ্ঠা ৫৭; মাকতাবা শামেলা ↩︎
  21. ইসলামকিউএ, প্রশ্নোত্তর ১৫৯৫১৯; ইবন তাইমিয়ার মুখতাসার আল-ফাতাওয়া আল-মিসরিয়্যা, পৃষ্ঠা ৩২২–৩২৪ থেকে উদ্ধৃত আলোচনা ↩︎
  22. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৯৫; বদরের যোদ্ধাদের মর্যাদা ও হাতিব ইবন আবি বালতার ঘটনা ↩︎
  23. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, অধ্যায়: সুন্নাহ, হাদিস: ৪৭০৩ ↩︎
  24. সুনানে ইবনে মাজাহ, ভূমিকা পর্ব, তাকদীরের বর্ণনা, হাদিস: ৭/৮২; সহীহ মুসলিম: ২৬৬২ ↩︎
  25. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অধ্যায়: তাকদীর, হাদিস: ৬৫০৭; প্রচলিত আরবি নম্বর: ২৬৫৩ ↩︎
  26. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, অধ্যায়: তাকদীর, হাদিস: ৬৬৬১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ৬৫২৭; ইসলামিক সেন্টার: ৬৫৭৮ ↩︎
  27. ইসলাম প্রশ্নোত্তর, প্রশ্ন: ২৬৪৩৫৪, তাকদীর পরিবর্তন ও মানুষের নির্বাচন প্রসঙ্গে; উদ্ধৃত হাদিস: জামে তিরমিযী, ২৫১৬ ↩︎
  28. ইবন কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম, সম্পাদনা: সামি ইবনে মুহাম্মদ আস-সালামা, দারু তাইবা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি., খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৪০; সূরা তাকভীর: ২৭–২৯; মাকতাবা শামেলা ↩︎
  29. ইবন কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম, সূরা নাহল: ৯৩-এর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা; কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরআন ও তাফসির সংকলন ↩︎
  30. ইবনে আবিল ইয আল-হানাফি, শারহুল আকিদা আত-তাহাবিয়া, তাকদীর বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মত; ইসলামওয়েব গ্রন্থাগার, বই: ১০৬, পরিচ্ছেদ: ১৬১ ↩︎
  31. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, অধ্যায়: তাকদীর, হাদিস: ৬৬৫৯; আরবি নম্বর: ২৬৬১ ↩︎
  32. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অধ্যায়: ফযীলত, খিযিরের ফযীলত, হাদিস: ৫৯৪৯ ↩︎
  33. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অধ্যায়: ফযীলত, খিযিরের ফযীলত, হাদিস: ৫৯৪৮ ↩︎
  34. নববী, আল-মিনহাজ শারহু সহীহ মুসলিম, খিজিরের ফযীলত অধ্যায়; ইসলামওয়েব গ্রন্থাগার, খণ্ড ১৫-এর সংশ্লিষ্ট আলোচনা ↩︎
  35. সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অধ্যায়: সুন্নাহ, মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে, হাদিস: ৪৬৪২ ↩︎
  36. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, হাদিস: ১০৫, পৃষ্ঠা ১২০–১২১; নিচে মূল পাতার ছবি সংযুক্ত ↩︎
  37. ইবন কায়্যিম, আহকামু আহলিয যিম্মাহ, অমুসলিমদের শিশুদের পরিণতি প্রসঙ্গে, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১২০; ইসলামওয়েব গ্রন্থাগার ↩︎
  38. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, জানাযা অধ্যায়, হাদিস: ১২৮৬ ↩︎
  39. সহীহ মুসলিম, জানাযা অধ্যায়, হাদিস: ৯২৯; সিদ্দিক হাসান খানের আস-সিরাজুল ওয়াহহাজ, মৃত ব্যক্তি ও জীবিতের কান্না প্রসঙ্গে, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩১০; ইসলামওয়েব গ্রন্থাগার ↩︎
  40. সহীহ মুসলিম, তওবা অধ্যায়, হাদিস: ২৭৬৭-এর প্রথম বর্ণনা ↩︎
  41. সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৬৭-এর দ্বিতীয় বর্ণনা ↩︎
  42. সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৬৭-এর পাহাড়সম পাপের বর্ণনা ↩︎
  43. নববী, আল-মিনহাজ শারহু সহীহ মুসলিম, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৯২ হি., খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৮৫; হাদিস: ২৭৬৭-এর ব্যাখ্যা; মাকতাবা শামেলা ↩︎
  44. ইসলাম প্রশ্নোত্তর, প্রশ্ন: ৯৪৮৮, মুসলিমদের পাপ অমুসলিমদের ওপর রাখার হাদিসের ব্যাখ্যা ↩︎
  45. মিশকাতুল মাসাবীহ, ঈমান অধ্যায়, হাদিস: ২৬; সহীহ বুখারী: ৫৮২৭; সহীহ মুসলিম: ৯৪ 1 2
  46. নববী, আল-মিনহাজ: শরহ সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ৮৩; হত্যাকারীর তওবা ও একত্ববাদীর চূড়ান্ত পরিণতির ব্যাখ্যা ↩︎
  47. নববী, আল-মিনহাজ: শরহ সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ৮৩; সূরা নিসা ৪:৯৩ ও সহীহ মুসলিম ২৭৬৬-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  48. রিয়াযুস স্বা-লিহীন, তওবার বিবরণ, হাদিস: ৮/২১; সহীহ বুখারী: ৩৪৭০; সহীহ মুসলিম: ২৭৬৬ ↩︎
  49. সুনান আবু দাউদ, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪২৯ ↩︎
  50. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তওবা অধ্যায়, হাদিস: ৬৭৫২ ↩︎
  51. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তওবা অধ্যায়, হাদিস: ৬৭৫৩ ↩︎
  52. ইসলামকিউএ, উত্তর: ১৪৭০১৭, “হত্যাকারী নিহতের অভিভাবকদের কাছে আত্মসমর্পণ না করলে তার তওবা কি যথেষ্ট?”; উদ্ধৃত গ্রন্থ: ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি, পৃষ্ঠা: ১০২ ↩︎
  53. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তওবা অধ্যায়, হাদিস: ৬৭৫৪; দুই ভূমির দূরত্ব পরিবর্তনের বর্ণনা ↩︎
  54. মিশকাতুল মাসাবীহ, ক্ষমা ও তওবা পরিচ্ছেদ, হাদিস: ২৩২৮; সহীহ মুসলিম: ২৭৪৯ ↩︎
  55. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫ ↩︎
  56. রিয়াযুস স্বা-লিহীন, আল্লাহর দয়ার আশা রাখার গুরুত্ব, তাওহীদ পাবলিকেশন নম্বর: ৪৩৬, আন্তর্জাতিক নম্বর: ৪৩১ ↩︎
  57. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঈমান অধ্যায়, হাদিস: ৪১১; আন্তর্জাতিক নম্বর: ২১৪ ↩︎
  58. ইসলামওয়েব, ফতোয়া: ৯৭১৬৫, “পরকালে কাফিরের কোনো অংশ নেই”; উদ্ধৃত ব্যাখ্যা: নববী, শরহ সহীহ মুসলিম, অমুসলিমের সৎকাজের পার্থিব প্রতিদান ↩︎
  59. সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, হাদিস: ১৯৯ক; উম্মতের সুপারিশের জন্য দোয়া সংরক্ষণ ↩︎
  60. জামে তিরমিযী, কিয়ামতের বিবরণ, হাদিস: ২৪৩৫; বড় গুনাহকারীদের জন্য সুপারিশ ↩︎
  61. সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬৪–৬৬; চিরস্থায়ী আগুন, সাহায্যহীনতা ও মুখমণ্ডল পোড়ানোর বর্ণনা ↩︎
  62. সহীহ বুখারী, রিকাক অধ্যায়, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ, হাদিস: ৬৫৪৮; মৃত্যুর অবসান ও জাহান্নামবাসীর দুঃখ বৃদ্ধির পূর্ণ বর্ণনা ↩︎
  63. সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৬–৩৭; মৃত্যু না-ঘটা, শাস্তি হালকা না-করা এবং মুক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান ↩︎
  64. ইসলামকিউএ, উত্তর: ২৩৫০২৬, “আল্লাহকে অস্বীকারকারী জাহান্নামের আগুনে চিরকাল থাকবে”; প্রথম অংশে সম্ভাব্য পুনরাবৃত্তির যুক্তি ↩︎
  65. সূরা আল-আনআম, আয়াত: ২৭ ↩︎
  66. সূরা আল-আনআম, আয়াত: ২৮ ↩︎
  67. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৬–৫৭; পোড়া চামড়া বদলে শাস্তি অব্যাহত রাখা এবং বিশ্বাসীদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ↩︎
  68. ইবনু কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম, সামি ইবনু মুহাম্মদ সালামাহ সম্পাদিত সংস্করণ, দারু তাইবা, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৩৭; সূরা নিসা ৪:৫৬-এর ব্যাখ্যার পূর্ণ সূচনানুচ্ছেদ ↩︎
  69. বাগবী, মাআলিমুত তানজিল, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৩৭–২৩৮; সূরা নিসা ৪:৫৬-এর ব্যাখ্যা; নতুন চামড়ার পরিচয় সম্পর্কে প্রথম পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ↩︎
  70. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭০ ↩︎
  71. ইসলামওয়েব, ফতোয়া: ৩৭৬৯৩; মুসলিম ও অমুসলিমের বিরুদ্ধে অমুসলিমের সাক্ষ্য এবং সফরে অসিয়তের ব্যতিক্রম ↩︎
  72. ইসলামওয়েব, ফতোয়া: ৩৪৪৫৩৩; অপরাধের ক্ষেত্রে অমুসলিমের সাক্ষ্য, সহায়ক প্রমাণ এবং ধারণকৃত দৃশ্যের পার্থক্য ↩︎
  73. ইসলামকিউএ, ফতোয়া: ১২৮৪৪৮; ধর্ষণ, যিনার হদ্দ, চার পুরুষ সাক্ষী, প্রত্যক্ষ প্রবেশদর্শন এবং তাযির ↩︎
  74. ইসলামকিউএ, ফতোয়া: ৭২৩৩৮; ধর্ষণের শাস্তি, জবরদস্তির শিকার নারীর দায় এবং অস্ত্রের হুমকিতে হিরাবা ↩︎
  75. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৯, মাসআলা: ৮৩৩১; যিনার সাক্ষীর শর্ত ↩︎
  76. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩০; যিনার সাক্ষ্যে মুসলিম, পুরুষ ও স্বাধীন হওয়ার শর্ত ↩︎
  77. ইবন আবদুল বারর, আল-ইস্তিযকার, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৬; ইসলামকিউএ, ফতোয়া: ৭২৩৩৮-এ উদ্ধৃত ধর্ষক ও জবরদস্তির শিকার নারীর বিধান ↩︎
  78. কোরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮২; ঋণের দলিল, সাক্ষী এবং একজন পুরুষের পরিবর্তে দুই নারী ↩︎
  79. কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরআনভাণ্ডার; সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮২-এর সম্পূর্ণ আরবি পাঠ ↩︎
  80. তাফসিরে কুরতুবি; সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮২ এবং সাক্ষ্য স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ব্যাখ্যা ↩︎
  81. সহিহ বুখারী, কিতাবুশ শাহাদাত, নারীদের সাক্ষ্য অধ্যায়, হাদিস: ২৬৫৮; সাক্ষ্যের পার্থক্য এবং নারীর বুদ্ধির ঘাটতি ↩︎
  82. সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস: ৬৯১৫; অমুসলিম হত্যার কারণে মুসলিমের কিসাস না হওয়া ↩︎
  83. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস: ২৬৫৮; আলীর সহীফায় কিসাসের বিধান ↩︎
  84. সুনান আবু দাউদ, তাহকিককৃত, হাদিস: ৪৫৩০; মুসলিমদের রক্তের সমতা, অমুসলিম হত্যায় কিসাস এবং চুক্তিবদ্ধ মানুষের নিরাপত্তা ↩︎
  85. সুনান আবু দাউদ, তাহকিককৃত, হাদিস: ৪৫৩১; একই বিধানের পরবর্তী বর্ণনা ↩︎
  86. ইসলামওয়েব, ফতোয়া: ৯২২৬১; অমুসলিম হত্যার কারণে মুসলিমকে শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা ↩︎
  87. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩, মাসআলা: ৬৫৯২; মুসলিম ও অমুসলিমের কিসাস এবং আহমদের বক্তব্য ↩︎
  88. দরসে তাওহীদ ও কিতাল, চতুর্থ দরস: যে সকল কারণে কারো রক্তপাত হালাল হয়ে যায়; মূল: হারেস বিন গাযী আন নাযারী; অনুবাদ: আব্দুল্লাহ সিরাজী; আল-আবতাল মিডিয়া প্রকাশনী; পৃষ্ঠা ৭–৮ ↩︎
  89. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু; মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী; ভাষান্তর ও সম্পাদনা: মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন; আধুনিক প্রকাশনী; পৃষ্ঠা ১৫২–১৫৪ ↩︎
  90. সহিহ বুখারী, হাদিস: ৩১৬৬; চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিকে হত্যার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ না পাওয়ার ঘোষণা ↩︎
  91. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৬৪৪; ইহুদি ও খ্রিষ্টানের দিয়াত মুসলিমের অর্ধেক ↩︎
  92. সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৪৫১৪; যিম্মির দিয়াত ↩︎
  93. সুনান তিরমিযী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ১৪১৭; অন্য সংস্করণে ১৪১৩; অমুসলিমের দিয়াত ও ফকিহদের মত ↩︎
  94. মুয়াত্তা মালিক, দিয়াত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১৫; অমুসলিমের রক্তপণ, কিসাস এবং অঙ্গহানির ক্ষতিপূরণ ↩︎
  95. ইসলামওয়েব, ফতোয়া: ২১২২৪; অমুসলিমের দিয়াত সম্পর্কে মাযহাবগুলোর অবস্থান ↩︎
  96. ইসলামকিউএ, ফতোয়া: ২৪৩৩৪৫; যিম্মি হত্যায় মুসলিমের শাস্তি, কিসাস না হওয়া এবং ইচ্ছাকৃত হত্যায় রক্তপণ বৃদ্ধি ↩︎
  97. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০০, মাসআলা: ৬৮৩৩; কিসাস বাদ যাওয়ার কারণে ইচ্ছাকৃত হত্যায় দিয়াত দ্বিগুণ করা ↩︎
  98. কোরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৮ 1 2
  99. মানসুর আল-বহুতি, শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, কিতাবুল জিনায়াত, কিসাস ক্ষমার অধ্যায়, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৭৮–২৭৯ ↩︎
  100. কোরআন, সূরা নিসা, আয়াত ৯২; বিভিন্ন অনুবাদ ↩︎
  101. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, রক্তপণ অধ্যায়, হাদিস ৪৪৭৬ ↩︎
  102. সূনান আত তিরমিজী, তাহকীককৃত, দিয়াত অধ্যায়, হাদিস ১৪০০; সহীহ আত-তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৭৯ ↩︎
  103. সহীহ আত-তিরমিযী, তাহকীক: নাসিরুদ্দীন আলবানী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৭৯ ↩︎
  104. সুনান ইবনু মাজাহ, রক্তপণ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ১৫/২২, হাদিস ২৬৬২ ↩︎
  105. তাহকীককৃত সুনান ইবনু মাজাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯৬ ↩︎
  106. বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৪–২৫৫ ↩︎
  107. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৮৫, মাসআলা ৬৬২১ ↩︎
  108. মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব, হাদিস ৩৪৬ ↩︎
  109. মুয়াত্তা মালিক, দিয়াত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ১৭, রেওয়ায়ত ১০ ↩︎
  110. আল-মুগনি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৮৫, পিতার ওপর কিসাসের বিধান ও ভিন্নমতের আলোচনা ↩︎
  111. কোরআন, সূরা নিসা, আয়াত ১১ ↩︎
  112. ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর, ফতোয়া ৫৪৪৮৯১: পুরুষেরা ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন না করলে উত্তরাধিকার বণ্টন কি বদলাবে? প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ↩︎
  113. মুয়াত্তা মালিক, দিয়াত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ২১: হত্যার কিসাস নেওয়া ↩︎
  114. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, রক্তপণ অধ্যায়, হাদিস ৪৪৫৩ ↩︎
  115. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, রক্তপণ অধ্যায়, হাদিস ৪৪৫২ ↩︎
  116. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩১৬৪৮০: স্বাধীন ব্যক্তি দাসকে হত্যা করলে ফকিহদের বিধান; প্রকাশ: ৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ↩︎
  117. ফিকহে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১০২–১০৩ ↩︎
  118. দরসে তাওহীদ ও কিতাল, চতুর্থ দরস: যে সকল কারণে কারো রক্তপাত হালাল হয়ে যায়; মূল: মুজাহিদ হারেস বিন গাযী আন নাযারী; অনুবাদ: আব্দুল্লাহ সিরাজী; আল-আবতাল মিডিয়া প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৭–৮ ↩︎
  119. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৯৯, মাসআলা ৬৬৪৬: দাসের দিয়াত ↩︎
  120. ইবন তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, দাসমুক্তি অধ্যায়, খণ্ড ৩১, পৃষ্ঠা ৩৭৬: কুরাইশ পুরুষ দাসীকে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিলে সন্তান স্বাধীন হবে কি না ↩︎
  121. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনা: মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৯ ↩︎
  122. ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর, ফতোয়া ৩২৩৩৬২: দাসীর সন্তান কখন স্বাধীন এবং কখন মায়ের মালিকের দাস হবে? প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২০ ↩︎
  123. নওবী, আল-মিনহাজ শরহে সহিহ মুসলিম, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭০; শামেলা ↩︎
  124. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৩০৮৫৩; নামাজ ত্যাগকারীর বিধান নিয়ে নওবীর ব্যাখ্যা ↩︎
  125. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৩০০ ↩︎
  126. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৩০১ ↩︎
  127. সহিহ বুখারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৬ ↩︎
  128. সহিহ বুখারী, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬১ ↩︎
  129. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৬–৪০৭ ↩︎
  130. বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭, ধারা ৭২ ↩︎
  131. বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬, ধারা ৪৪৪ ↩︎
  132. ফয়যুল হাদী শরহে তিরমিযী (ছানী), প্রথম খণ্ড, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪১৫ ↩︎
  133. ইযাহুল মুসলিম, মুসলিম জিলদে সানীর অদ্বিতীয় বাংলা শরাহ, দারুল উলুম লাইব্রেরি, পৃষ্ঠা ৪০৩–৪০৭ ↩︎
  134. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৬০; আরবি মূল পাঠ ↩︎
  135. মুফতি তাকী উসমানী, দরসে তিরমিযী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৬ ↩︎
  136. ইসলাম প্রশ্নোত্তর, ফতোয়া ২০৩২৭; ইসলাম ত্যাগকারীকে কেন হত্যা করা হয় ↩︎
  137. বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা; শির্কের পরিণতি ↩︎
  138. কোরআন, সূরা তওবা, আয়াত ৪; আরবি মূল পাঠ ↩︎
  139. কোরআন, সূরা তওবা, আয়াত ৫; আরবি মূল পাঠ ↩︎
  140. কোরআন, সূরা তওবা, আয়াত ৬; আরবি মূল পাঠ ↩︎
  141. কোরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩৮; আরবি মূল পাঠ ↩︎
  142. ইসলাম প্রশ্নোত্তর, ফতোয়া ১০১৭৮১; চুরির জন্য হাত কাটার শর্ত ↩︎
  143. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৩৫৮; বারবার চুরির শাস্তি ↩︎
  144. মায়ো ক্লিনিক, ক্লেপটোম্যানিয়া: রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ↩︎
  145. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪২৫৯ ↩︎
  146. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪২৫১ ↩︎
  147. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ২৫৮৩ ↩︎
  148. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪২৬১ ↩︎
  149. সহিহ বুখারী, হাদিস ৬৭৯৯; ডিম বা শিরস্ত্রাণ এবং দড়ি চুরির বর্ণনা ↩︎
  150. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৪০৫; পশুর সঙ্গে যৌনকর্মের শাস্তি ↩︎
  151. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১২৬৩৮৬; পশুর সঙ্গে যৌনকর্ম এবং পশু হত্যার বিধান ↩︎
  152. ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, মাকতাবাতুল কাহিরা সংস্করণ, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩; পশু হত্যার কারণের আলোচনা ↩︎
  153. সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৬২৫৯; হাতিবের চিঠি উদ্ধার এবং নারীকে বিবস্ত্র করার হুমকি ↩︎
  154. সহিহ বুখারী, হাদিস ২৬৮০; বক্তব্যের প্রভাবে অন্যের অধিকার নিয়ে বিচার হওয়ার সম্ভাবনা ↩︎
  155. তুহফাতুল মুহতাজ, দশম খণ্ড, সাক্ষ্য প্রত্যাহারের পরিচ্ছেদ; শিরওয়ানীর টীকা, ইসলামওয়েব ↩︎
  156. একই পরিচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট পাঠ ও টীকা, ইসলামওয়েব ↩︎

About This Article

Genre: Source-Based Critical Analysis of Islamic Justice, Predestination, Legal Inequality, and Moral Accountability

Epistemic Position: Secular Humanist Ethics, Legal-Moral Philosophy, Human Rights Reasoning, Anti-Discrimination Analysis, and Source-Internal Islamic Critique

This article examines the Islamic claim that Allah, Sharia, and the afterlife establish perfect justice in this world and the next.

Its scope is moral, theological, and legal. The article evaluates Islamic sources on divine predestination, inherited religion, prophetic privilege, family-based status, punishment before action, collective or transferred liability, rape evidence, apostasy, blasphemy, slavery, non-Muslim legal status, and unequal blood-money rules.

The central claim is that Islamic justice cannot be assessed merely by declaring Allah just by definition. A system must be judged by whether it gives equal opportunity, fair accountability, proportional punishment, due process, bodily autonomy, equal legal standing, and protection from inherited or coerced disadvantage.

The article does not attack ordinary Muslims as individuals. Its criticism is directed at doctrines, hadith-based rulings, classical fiqh, theological claims, and apologetic defenses that normalize unequal treatment, inherited liability, religious hierarchy, coercive punishment, or divine favoritism as “justice.”

This article should be evaluated through source accuracy, moral consistency, legal reasoning, proportionality, due-process standards, equality before law, child protection, women's dignity, anti-slavery ethics, and human-rights reasoning—not through religious sensitivity, apologetic expectation, inherited reverence, fear of blasphemy, or the demand that divine command be accepted as justice without ethical examination.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

One thought on

  1. প্রিয় আসিফভাই, লেখাটি পড়লাম। যুক্তিসমৃদ্ধ বিশ্লেষণী লেখা। মান অবশ্যই উৎকৃষ্ট। কিন্তু (অনিচ্ছাকৃত) বেশ কিছু বানানভুল বা সমোচ্চারিত শব্দের ভুল প্রয়োগ ঘটেছে। কিছু মনে না করলে আমি সংশোধনী পাঠাতে পারি(অন্য লেখারও)। তাহলে এত উচ্চমানের লেখা নিখুঁত হতে পারে। আপনার মতামতের অপেক্ষা করব। সদা মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী।
    শ্রীজীব বিশ্বাস

Leave a comment

Your email will not be published.