ধর্মআর্কিওলজিইতিহাসে ধর্মমিথোলজি বা পুরাণ

সুমেরীয় ধর্ম ও পুরাণ (Sumerian Religion and Mythology): মানব সভ্যতার আদিমতম বিশ্বাসের রূপরেখা

Table of Contents

ভূমিকা

মেসোপটেমিয়ার ঊষর ভূখণ্ডের বুক চিরে বয়ে যাওয়া টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর পললভূমিতে মানব ইতিহাসের প্রথম সুসংগঠিত সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল। যাযাবর জীবন পেছনে ফেলে মানুষ থিতু হতে শিখলে কৃষিকাজ ও পশুপালনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির সূচনা হয়। এই স্থিতিশীলতা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেয়। ফলে তারা মহাবিশ্ব, প্রকৃতি এবং নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার অবকাশ পায়। চারপাশের বিশাল এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণহীন প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর সামনে সুমেরীয়রা নিজেদের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করতে শুরু করে। কেন নদী তার দুকূল ছাপিয়ে জনপদ ভাসিয়ে নেয়, কেন খরা এসে ফসলের মাঠ বিরান করে দেয়, অথবা কেনই বা দিনরাত্রির আবর্তন ঘটে – এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার তাগিদ থেকেই জন্ম নেয় এক আদিম অথচ জটিল বিশ্বাস ব্যবস্থা।

তারা প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের পেছনে এক বা একাধিক শক্তিশালী সত্তার কল্পনা করেছিল। এই সত্তারাই কালক্রমে দেবতা হিসেবে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত, মহাবিশ্বের যাবতীয় নিয়মকানুন এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলি সম্পূর্ণভাবে এই দেবতাদের ইচ্ছাধীন। ফলে দেবতাদের সন্তুষ্টি বিধান করাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্র এবং সমাজের মূল লক্ষ্য। ধর্ম কেবল তাদের আধ্যাত্মিক প্রয়াস ছিল না, সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার একটি অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করত। সুমেরীয় পলিথিজম বা বহুদেবতাবাদী বিশ্বাস ব্যবস্থায় প্রতিটি নগররাষ্ট্রের নিজস্ব একজন প্রধান দেবতা থাকতেন। সেই দেবতার মন্দির বা জিগুরাতকে কেন্দ্র করেই নগররাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অর্থনীতি, প্রশাসন এবং সামাজিক বিন্যাস আবর্তিত হতো। মানুষ ও দেবতাদের এই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, যেখানে মানুষের কর্তব্য ছিল কায়িক শ্রমের মাধ্যমে দেবতাদের জাগতিক প্রয়োজন মেটানো।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের ফলে প্রাপ্ত কাদামাটির ফলকগুলোতে উৎকীর্ণ কিউনিফর্ম লিপি থেকে আমরা এই প্রাচীন সভ্যতার ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক আখ্যান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি (Kramer, 1963)। এই লিপিগুলো কেবল শস্যাগারের হিসাবনিকাশ বা রাজকীয় ফরমান সংরক্ষণের মাধ্যম ছিল না, এগুলো ছিল মানবজাতির আদিমতম সাহিত্য এবং দর্শনের বাহন। ফলকগুলোর পাঠোদ্ধার করার পর আধুনিক জগৎ প্রথমবার জানতে পারে গিলগামেশের মতো বীরের কথা, মহাপ্লাবনের ভয়াবহতার কথা এবং পাতালপুরীর অন্ধকার জগতের কথা। পাশাপাশি তারা অনুধাবন করতে পারে কীভাবে অ্যানথ্রোপোমরফিজম বা দেবতায় মানবীয় বৈশিষ্ট্যের আরোপ ঘটিয়ে সুমেরীয়রা এক বিশাল দেবমণ্ডলী বা প্যান্থিয়ন তৈরি করেছিল।

তাদের এই পুরাণ এবং ধর্মীয় ব্যবস্থা পুরোপুরি আধুনিক যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে হয়তো উত্তীর্ণ হবে না। তবে এটি মানব সভ্যতার আদিপর্বে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বোঝার এবং ব্যাখ্যা করার এক অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। একটি প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তারা যে মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয় তৈরি করেছিল, তা পরবর্তীতে ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয় এবং সমগ্র প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের ধর্মীয় কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা সুমেরীয়দের সেই বিস্ময়কর ধর্মীয় বিশ্বাস, কসমোলজি বা বিশ্বতত্ত্ব, দেবমণ্ডলীর স্বরূপ এবং তাদের রেখে যাওয়া পৌরাণিক উপাখ্যানগুলোর বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা অনুধাবন করার চেষ্টা করব কীভাবে হাজার হাজার বছর আগের একটি সমাজ তাদের চারপাশের জগৎকে একটি সুশৃঙ্খল ঐশ্বরিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করিয়েছিল।

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Geographical and Historical Context)

মেসোপটেমিয়ার ভৌগোলিক রূপরেখা ও পরিবেশগত দ্বন্দ্ব (Geographical Outline of Mesopotamia and Environmental Conflict)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, যার শাব্দিক অর্থ হলো দুই নদীর মধ্যবর্তী দেশ, মূলত আধুনিক ইরাক এবং এর সংলগ্ন কিছু অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই ভৌগোলিক এলাকাটি মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী। এই দুটি নদী উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে এসে পারস্য উপসাগরে পতিত হতো। নদীর দুই ধারের পললভূমি ছিল প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত উর্বর, তবে এই উর্বরতার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল অনিশ্চয়তা। প্রাচীন মিশরের নীল নদের বন্যা ছিল অনেকটা নিয়মিত এবং পূর্বাভাসযোগ্য, যার ফলে কৃষিকাজ করা তুলনামূলক সহজ ছিল। বিপরীতে, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের জলস্ফীতি বা বন্যা ছিল চরম খামখেয়ালি এবং অনেক ক্ষেত্রেই ধ্বংসাত্মক। পাহাড়ে বরফ গলার ওপর নির্ভর করে হঠাৎ করেই নদীর জল বেড়ে যেত, ভাসিয়ে নিয়ে যেত লোকালয় ও ফসলের মাঠ। প্রকৃতির এই রুক্ষ এবং অননুমেয় আচরণ স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে এনভায়রনমেন্টাল ডিটারমিনিজম (Environmental Determinism) বা পরিবেশগত নির্ধারণবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়, যেখানে একটি অঞ্চলের বাহ্যিক পরিবেশ সরাসরি তার অধিবাসীদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকে রূপদান করে।

এই ভৌগোলিক কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর উন্মুক্ত প্রান্তর। মেসোপটেমিয়ার সমভূমির চারপাশে কোনো প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম সীমানা ছিল না। উত্তরে ছিল রুক্ষ পর্বতমালা আর পশ্চিমে সুবিশাল সিরীয় মরুভূমি, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত যাযাবর উপজাতিরা উর্বর সমভূমির দিকে ধেয়ে আসত। প্রাকৃতিকভাবে অরক্ষিত এই ভূখণ্ডে টিকে থাকার জন্য সুমেরীয়দের একটি সুসংগঠিত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প ছিল না। চারপাশের এই অরক্ষিত অবস্থার কারণে প্রাচীন নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায়, এই অবস্থাকে প্রাচীন যুগের জিওপলিটিক্স (Geopolitics) বা ভূ-রাজনীতির এক ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। মরুভূমি এবং পাহাড়ের রুক্ষতা থেকে বাঁচতে মানুষের কাছে এই নদীবিধৌত সমভূমিই ছিল একমাত্র আশ্রয়স্থল। ফলে সীমিত উর্বর জমি এবং পানযোগ্য জলের উৎসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাদের অস্তিত্বের সমার্থকে পরিণত হয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক সময় পুরো একটি জনপদ পরিত্যক্ত হয়ে যেত।

প্রতিকূল এই ভূগোলে বসবাস করতে গিয়ে সুমেরীয়রা বুঝতে পেরেছিল যে প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে থাকলে টিকে থাকা সম্ভব নয়। বিস্তীর্ণ সমভূমিতে খরা এবং বন্যার মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসলকে রক্ষা করার জন্য তারা সেচব্যবস্থা এবং খাল খননের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করে। এই খালগুলো কেবল কৃষিকাজের জন্যই ব্যবহৃত হতো না, বরং এগুলো ছিল এক নগররাষ্ট্র থেকে অন্য নগররাষ্ট্রে যাতায়াত এবং বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম (Kramer, 1963)। খাল খনন এবং বাঁধ নির্মাণের মতো কাজগুলো কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব ছিল না, এর জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল সংখ্যক মানুষের সম্মিলিত শ্রম এবং একটি কেন্দ্রীয় নির্দেশনা। ভূগোলের এই বাধ্যবাধকতার কারণেই মূলত সুমেরীয় সমাজে প্রথমবার একটি সুসংগঠিত শাসনকাঠামো এবং আমলাতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। অর্থাৎ, মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ পরিবেশই পরোক্ষভাবে মানব ইতিহাসের প্রথম প্রশাসনিক রূপরেখা তৈরি করতে বাধ্য করেছিল (Postgate, 1992)।

Mesopotamia - Students | Britannica Kids | Homework Help
মানচিত্রে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল এবং বৃহত্তর ‘ফার্টাইল ক্রিসেন্ট’ দেখানো হয়েছে, যেখানে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকা প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত; Source: Encyclopaedia Britannica

কৃষিনির্ভর অর্থনীতির উন্মেষ এবং নগররাষ্ট্রের উত্থান (Emergence of Agriculture-based Economy and the Rise of City-States)

যাযাবর শিকারি জীবন থেকে বের হয়ে মানুষ যখন স্থায়ীভাবে এক জায়গায় বসবাস করতে শুরু করে, তখন থেকেই মূলত সভ্যতার চাকা ঘুরতে শুরু করে। সুমেরীয় অঞ্চলে এই রূপান্তরটি ঘটেছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। নদী বিধৌত পলিমাটিতে তারা গম, যব এবং খেজুরের মতো ফসলের চাষ শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি ইতিহাসে অ্যাগ্রিকালচারাল রিভোলিউশন (Agricultural Revolution) বা কৃষি বিপ্লব নামে পরিচিত। উন্নত সেচব্যবস্থার কারণে কৃষিতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত তৈরি হতে থাকে। এই উদ্বৃত্ত ফসল সংরক্ষণের জন্য তৈরি হয় বিশাল শস্যাগার, এবং সেই শস্যাগারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রথম দিককার নগর বা শহরগুলো। উরুক, উর, এরিদু, নিপ্পুর এবং লাগাশের মতো নগররাষ্ট্রগুলো ছিল এই কৃষিনির্ভর অর্থনীতিরই চূড়ান্ত ফসল। কৃষিভিত্তিক এই উদ্বৃত্ত সম্পদের কারণেই সমাজের একটি অংশ কৃষিকাজ থেকে অব্যাহতি পেয়ে মৃৎশিল্প, ধাতববিদ্যা, এবং মন্দির নির্মাণের মতো বিশেষায়িত পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।

উরুক এবং উর-এর মতো নগররাষ্ট্রগুলো আয়তন এবং জনসংখ্যায় ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার অব্দের দিকে উরুক ছিল সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর, যেখানে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার মানুষের বাস ছিল। এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি নগররাষ্ট্র ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং স্বায়ত্তশাসিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব, বিশেষ করে রিয়েলিজম (Realism) বা বাস্তববাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই নগররাষ্ট্রগুলোর আচরণ খুব সহজে বিশ্লেষণ করা যায়। এখানে কোনো কেন্দ্রীয় বা সার্বভৌম শক্তি ছিল না, প্রতিটি নগররাষ্ট্র নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় এবং ক্ষমতার বিস্তারে ব্যস্ত থাকত। উর্বর কৃষিজমি, জলের অধিকার এবং বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘাত হতো। নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রতিটি শহর উঁচু ও মজবুত মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকত, যা তাদের নিরন্তর নিরাপত্তাহীনতারই প্রমাণ দেয়।

নগররাষ্ট্রগুলোর এই উত্থান মূলত প্রাচীনকালের আরবানাইজেশন (Urbanization) বা নগরায়ণের একটি নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে (Liverani, 2013)। শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকত প্রধান মন্দির বা জিগুরাত, আর তার চারপাশে ধাপে ধাপে গড়ে উঠত সাধারণ মানুষের বাসস্থান। সমাজকাঠামো ক্রমশ জটিল হতে শুরু করে। সমাজে তৈরি হয় স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস। চূড়ায় ছিলেন শাসক এবং পুরোহিত শ্রেণি, এরপর ব্যবসায়ী ও কারিগর, তারপর সাধারণ কৃষক এবং সবার নিচে ছিল দাস সম্প্রদায়। দাসরা মূলত ছিল যুদ্ধবন্দী বা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া সাধারণ মানুষ। উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্যের সুষম বণ্টন, সেচ খালের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে শহরকে রক্ষা করা – এই তিন মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলো তাদের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করত। এভাবেই একটি সাধারণ কৃষিজীবী সমাজ সময়ের আবর্তনে একটি জটিল ও সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় রূপ লাভ করে।

প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তা ও ধর্মীয় মনস্তত্ত্বের বিকাশ (Natural Uncertainty and the Development of Religious Psychology)

প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা সুমেরীয়দের মনস্তত্ত্বে এক গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত সেই প্রাচীন মানুষগুলো তাদের চারপাশের ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলোকে জাগতিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারত না। বিনা মেঘে বজ্রপাত, হঠাৎ ধেয়ে আসা প্রবল ঘূর্ণিঝড়, কিংবা দীর্ঘস্থায়ী খরা তাদের কাছে মনে হতো কোনো এক অদেখা অতিপ্রাকৃত শক্তির রোষানল। সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের ফাংশনালিজম (Functionalism) বা ক্রিয়াবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, এ ধরনের চরম অনিশ্চয়তার মুখে সমাজকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখতে এবং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো প্রদান করতে ধর্মের উদ্ভব ঘটে। সুমেরীয়রা প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের পেছনে এক বা একাধিক শক্তিশালী সত্তার অস্তিত্ব কল্পনা করে নিয়েছিল, যারা কালক্রমে তাদের উপাস্য দেবতায় পরিণত হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল, এই দেবতাদের সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই কেবল জাগতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের ফলে সুমেরীয় দেবতারা হয়ে ওঠেন পরম ক্ষমতাশালী এবং বেশ রাগী স্বভাবের। মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ পরিবেশের মতোই তাদের দেবতাদের আচরণ ছিল অনেক ক্ষেত্রে ক্ষ্যাপাটে এবং ধ্বংসাত্মক। যেমন, ঝড়ের দেবতা এনলিলকে তারা ভয় ও ভক্তি দুটোই করত, কারণ তার একটি মাত্র ইশারায় পুরো শহর বন্যায় তলিয়ে যেতে পারত (Jacobsen, 1976)। মানুষ নিজেদেরকে দেবতাদের আজ্ঞাবহ ভৃত্য হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ – তা সে কৃষিকাজ হোক বা খাল খনন – সবকিছুই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হতো। প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তারা দেবতাদের ওপর এক ধরনের মানসিক নির্ভরশীলতা তৈরি করেছিল। এই নির্ভরশীলতা তাদের সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছিল। কারণ, সবাই মিলে যখন একই দেবতার সন্তুষ্টির জন্য কাজ করত, তখন সামাজিক বিভেদ কিছুটা হলেও প্রশমিত হতো।

ধর্মীয় এই বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় তাদের স্থাপত্যে, বিশেষ করে জিগুরাতগুলোতে। এই বিশাল পিরামিড আকৃতির মন্দিরগুলো কেবল উপাসনার স্থান ছিল না, এগুলো ছিল মানবীয় অসহায়ত্বের বিপরীতে দেবতাদের নৈকট্য লাভের এক আপ্রাণ চেষ্টা। সুমেরীয়রা মনে করত, সমতল ভূমিতে দেবতারা বাস করেন না, তাই কৃত্রিম পাহাড় বানিয়ে তারা দেবতাদের পৃথিবীতে আমন্ত্রণ জানাত। তাদের আচার-অনুষ্ঠানগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর। বলিদান, স্তোত্র পাঠ এবং বিশেষ ধর্মীয় উৎসবের মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করত (Black & Green, 1992)। মূলত, তাদের ধর্ম কোনো আধ্যাত্মিক মোক্ষলাভের পথ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রুক্ষ পরিবেশে দৈনন্দিন টিকে থাকার এক মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। প্রকৃতির অসীম ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করেই তারা তাদের জগতকে অর্থবহ করার চেষ্টা করেছিল।

Ziggurat Architecture in Mesopotamia: A Journey Through Time
উরের জিগুরাতের স্থাপত্যিক পুনর্গঠনচিত্র, যেখানে ধাপযুক্ত কাঠামো ও উপরের মন্দির অংশ দেবতাদের নৈকট্য লাভের প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছে; Source: Encyclopaedia Britannica

ধর্ম, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক (Interrelationship of Religion, State, and Power)

সুমেরীয় সভ্যতার আদি পর্বে রাষ্ট্র এবং ধর্মের মধ্যে কোনো সীমারেখা ছিল না। সমাজ পরিচালনার মূল দায়িত্ব ছিল মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের হাতে, যাকে বলা হতো ‘এন’ (En)। এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় থিওক্রেসি (Theocracy) বা ধর্মতন্ত্র। প্রধান পুরোহিত কেবল ধর্মীয় আচারেরই নেতৃত্ব দিতেন না, শহরের সমস্ত কৃষিজমি এবং অর্থনীতির ওপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। সাধারণ কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ মন্দিরে জমা দিত, যা দেবতাদের নৈবেদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হতো। পরে সেই উদ্বৃত্ত শস্য মন্দিরের আমলাদের মাধ্যমে বিপদের সময় বা উৎসবের দিনে জনসাধারণের মধ্যে বণ্টন করা হতো। এই মন্দিরভিত্তিক অর্থনীতি বা টেম্পল ইকোনমি সুমেরীয় সমাজকাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করত। দেবতা ছিলেন শহরের প্রকৃত মালিক, আর পুরোহিত ছিলেন তার পার্থিব প্রতিনিধি।

তবে সময়ের সাথে সাথে নগররাষ্ট্রগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদের জন্য আন্তঃনগর সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। উরুকের সাথে লাগাশের, কিংবা নিপ্পুরের সাথে উরের প্রতিনিয়ত সীমানা এবং জলের অধিকার নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এই নিরন্তর যুদ্ধের ডামাডোলে মন্দিরের পুরোহিতদের পক্ষে সামরিক নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সমাজের ভেতর থেকে এক নতুন সামরিক নেতার উত্থান ঘটে, যাকে সুমেরীয় ভাষায় বলা হতো ‘লুগাল’ (Lugal) বা ‘বিগ ম্যান’। প্রথমে লুগালরা কেবল যুদ্ধের সময় অস্থায়ীভাবে সেনাপতির দায়িত্ব পেতেন। যুদ্ধ শেষ হলে তারা আবার সাধারণ জীবনে ফিরে যেতেন। কিন্তু যুদ্ধ যখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলো, তখন এই লুগালরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে স্থায়ী রাজায় পরিণত হন। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি প্রাচীনকালের পলিটিকাল ইভোলিউশন (Political Evolution) বা রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত, যেখানে ধর্মীয় নেতার হাত থেকে ক্ষমতা ধীরে ধীরে সামরিক নেতার হাতে চলে যায় (Yoffee, 2005)।

রাজতন্ত্রের এই উদ্ভব সত্ত্বেও ধর্মের প্রভাব কিন্তু সমাজ থেকে মুছে যায়নি। নতুন রাজারা খুব সচেতনভাবেই জানতেন যে, সাধারণ মানুষের আনুগত্য ধরে রাখতে হলে ধর্মীয় বৈধতার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে তারা নিজেদেরকে দেবতাদের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন। রাজারা বিশাল সব মন্দির নির্মাণ করতেন এবং প্রধান পুরোহিতদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বিনিময়ে পুরোহিতরা রাজাকে ঐশ্বরিক আশীর্বাদপুষ্ট বলে ঘোষণা করতেন। এটি ছিল মূলত এক ধরনের প্রাচীন গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি (Grand Strategy), যার মাধ্যমে রাজারা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেন এবং একই সাথে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতেন। রাষ্ট্র এবং ধর্মের এই পারস্পরিক সমঝোতা সুমেরীয় সভ্যতাকে দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্থিতিশীল কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।

The World's Oldest Writing - Warfare - Archaeology Magazine - May/June 2016
কিউনিফর্ম লিপিতে খোদাই করা মাটির ফলক, যার উপরের অংশে চিত্রধর্মী প্রতীক এবং নিচে লিখিত চিহ্ন একত্রে দেখা যায় – পিকটোগ্রাম থেকে ধ্বনিভিত্তিক লিপিতে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের নিদর্শন; Source: British Museum

চাকা, লিপি এবং সভ্যতার কাঠামোগত বিবর্তন (Wheel, Script, and the Structural Evolution of Civilization)

সভ্যতার কাঠামোগত বিবর্তনে সুমেরীয়দের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন। বিশাল মন্দির অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ, শস্যের মজুত এবং পশুসম্পদের হিসাব মানুষের স্মৃতিতে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠছিল। এই প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা থেকেই উদ্ভাবিত হয় কিউনিফর্ম (Cuneiform) লিপি। কাদা মাটির নরম ফলকে খাগড়ার কলম দিয়ে তীরের ফলার মতো দাগ কেটে এই লিপি লেখা হতো। শুরুতে এটি কেবল কিছু ছবি বা পিকটোগ্রামের সমষ্টি ছিল, যা ধীরে ধীরে জটিল ধ্বনিভিত্তিক লিপিতে রূপান্তরিত হয়। এই উদ্ভাবনটি ছিল প্রাচীনকালের ইনফরমেশন রেভোলিউশন (Information Revolution) বা তথ্য বিপ্লব। লিপির এই উদ্ভাবন সমাজকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয় – শিক্ষিত আমলা বা লিপিকার শ্রেণি এবং অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ। লিপিকাররা রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন, কারণ তারাই ছিলেন তথ্য এবং আইনের রক্ষক।

What's the World's Oldest Language? | Scientific American
কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা মাটির ফলক, যেখানে তীরের ফলার মতো দাগ ব্যবহার করে প্রশাসনিক হিসাব ও তথ্য সংরক্ষণ করা হতো – প্রাচীন তথ্য বিপ্লবের একটি প্রধান নিদর্শন; Source: British Museum

লিপির পাশাপাশি সুমেরীয়রা উদ্ভাবন করেছিল চাকা, যা তাদের অর্থনীতি এবং সামরিক বাহিনীকে আমূল বদলে দেয়। শুরুতে চাকা ব্যবহৃত হতো মৃৎশিল্পীদের কাজের সুবিধার জন্য, কিন্তু খুব দ্রুতই তারা এটিকে পরিবহনের কাজে লাগাতে শুরু করে। চাকাযুক্ত গরুর গাড়ি ভারী মালপত্র বহনের কাজ সহজ করে দেয়। একই সাথে সামরিক বাহিনীতে ঘোড়াচালিত রথের ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রার গতিশীলতা নিয়ে আসে। চাকার ব্যবহারের ফলে দূরপাল্লার বাণিজ্য ব্যাপক প্রসার লাভ করে। মেসোপটেমিয়ার সমভূমিতে পাথর, কাঠ বা ধাতব আকরিকের মতো কাঁচামালের তীব্র সংকট ছিল। ফলে তারা তাদের উদ্বৃত্ত শস্য এবং বস্ত্রের বিনিময়ে লেবানন থেকে সিডার কাঠ, আনাতোলিয়া থেকে তামা এবং আফগানিস্তান থেকে ল্যাপিস লাজুলি আমদানি করত। এই বাণিজ্য ব্যবস্থা তৎকালীন অঞ্চলের মধ্যে এক ধরনের ইকোনমিক ইন্টারডিপেনডেন্স (Economic Interdependence) বা অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরি করেছিল।

লিখন পদ্ধতি কেবল অর্থনীতির কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ধীরে ধীরে এটি সাহিত্য, আইন এবং পুরাণ সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে ওঠে। সুমেরীয়রা তাদের দেব-দেবীর স্তোত্র, রাজাদের বিজয়গাথা এবং প্রাচীন লোককথাগুলোকে মাটির ফলকে খোদাই করে রাখতে শুরু করে। The Epic of Gilgamesh-এর মতো বিশ্বসাহিত্যের আদি নিদর্শন এভাবেই কালের গর্ভ থেকে রক্ষা পেয়েছে (George, 2003)। এছাড়া, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লিখিত আইনের প্রচলন শুরু হয়। উর-নাম্মুর আইন সংহিতা এর একটি বড় প্রমাণ, যেখানে অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান লিখিত ছিল। এই প্রযুক্তিগত এবং কাঠামোগত উদ্ভাবনগুলো সুমেরীয় সমাজকে একটি সাধারণ কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠী থেকে এক জটিল এবং অগ্রসর সভ্যতায় উন্নীত করেছিল, যার প্রভাব পরবর্তী বহু সহস্রাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল।

সুমেরীয় সভ্যতার পতন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার (Decline of Sumerian Civilization and Cultural Legacy)

যেকোনো মহান সভ্যতার মতোই সুমেরীয় সভ্যতারও একদিন পতন ঘটেছিল, তবে এই পতন রাতারাতি হয়নি। এর পেছনে বাহ্যিক আক্রমণের পাশাপাশি পরিবেশগত কারণও সমানভাবে দায়ী ছিল। মেসোপটেমিয়ার কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম সেচের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খালের মাধ্যমে জল এনে জমিতে সেচ দেওয়ার ফলে মাটিতে লবণের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। উর্বর পলিমাটি ধীরে ধীরে তার উৎপাদন ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। গমের ফলন মারাত্মকভাবে কমে গেলে তারা যব চাষে বাধ্য হয়, কারণ যব কিছুটা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। কিন্তু একপর্যায়ে জমিও সম্পূর্ণ অনুর্বর হয়ে পড়ে। পরিবেশগত এই বিপর্যয়কে আধুনিক গবেষণায় ইকোলজিক্যাল কলাপ্স (Ecological Collapse) বা প্রতিবেশগত পতন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সুমেরীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।

অর্থনৈতিক এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষেরা। উত্তরে আক্কাদীয়রা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ অব্দের দিকে আক্কাদীয় সম্রাট সারগন সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলো একে একে দখল করে নেন এবং মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসে প্রথম সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। সুমেরীয়রা তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারায়। আক্কাদীয়দের পর ব্যাবিলনীয় এবং ইলামাইটদের ক্রমাগত আক্রমণে সুমেরীয়দের রাজনৈতিক অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্ত হয়। তবে বিজয়ীরা সুমেরীয়দের শুধু পরাজিতই করেনি, তাদের সংস্কৃতির অনেক কিছুই আত্মস্থ করেছিল। এই প্রক্রিয়াটি কালচারাল অ্যাসিমিলিয়েশন (Cultural Assimilation) বা সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। সারগনের মতো শাসকরা সুমেরীয় দেবতাদের সম্মান করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ভাষার পাশাপাশি সুমেরীয় লিপিও ব্যবহার করতেন।

রাজনৈতিকভাবে সুমেরীয়রা মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেলেও, তাদের সাংস্কৃতিক এবং কাঠামোগত উত্তরাধিকার টিকে ছিল বহু যুগ ধরে। তাদের উদ্ভাবিত চাকা, কিউনিফর্ম লিপি, আইনের ধারণা এবং গণিতের ষাট-ভিত্তিক গণনা পদ্ধতি পরবর্তী ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সভ্যতা গ্রহণ করেছিল (Pollock, 1999)। এমনকি তাদের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মহাপ্লাবনের পৌরাণিক আখ্যানগুলো পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যে এবং ধর্মে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। একটি শুষ্ক, রুক্ষ এবং বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে টিকে থাকার জন্য তারা যে প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকাঠামো তৈরি করেছিল, তা পরবর্তীতে পুরো নিকটপ্রাচ্যের সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। সুমেরীয়রা প্রমাণ করে গেছে যে, চরম প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশেও মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম কীভাবে একটি শূন্য প্রান্তরকে সভ্যতার সূতিকাগারে পরিণত করতে পারে।

মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব (Cosmology)

আদিম সমুদ্র ও সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান (The Primordial Sea and the Primary Elements of Creation)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের চিন্তাজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সুমেরীয় বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজির একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে একটি আদিম জলরাশির ধারণা। তাদের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সূচনায় কোনো নির্দিষ্ট আকার বা কাঠামো ছিল না। চারদিকে কেবল অনন্ত এবং সীমাহীন এক জলরাশি বিরাজ করত, যার নাম দেওয়া হয়েছিল নাম্মু (Nammu)। এই নাম্মু কোনো সাধারণ দেবতা ছিলেন না। তাকে মহাবিশ্বের আদিমতম সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সুমেরীয়রা এই আদিম সমুদ্রকেই সবকিছুর উৎপত্তিস্থল বলে মনে করত। তাদের কাছে জলের এই ধারণাটি খুবই বাস্তবসম্মত ছিল। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষ প্রতিনিয়ত জলের ধ্বংসাত্মক এবং সৃজনশীল উভয় রূপই প্রত্যক্ষ করত। জল একদিকে যেমন বন্যা ডেকে এনে সব ভাসিয়ে নিত, অন্যদিকে এই জলই আবার কৃষিকাজের মূল ভিত্তি ছিল। ফলে জীবন এবং সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান হিসেবে জলকে কল্পনা করা তাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতারই একটি দার্শনিক প্রতিফলন।

এই আদিম সমুদ্র নাম্মুর ভেতর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরবর্তী মহাজাগতিক উপাদানগুলোর জন্ম হয়। সুমেরীয় চিন্তাধারায় শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির কোনো অবকাশ ছিল না। প্রাচীন দর্শনের অন্টোলজি (Ontology) বা সত্তাতত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষ সাধারণত তার চারপাশের বস্তুগত জগত থেকে উপাদান নিয়েই বৃহত্তর জগতের কল্পনা করে। মেসোপটেমিয়ার মানুষ শূন্যতার ধারণাটি খুব একটা বুঝতে পারত না। তাদের মতে, সৃষ্টির জন্য আগে থেকেই কোনো না কোনো বস্তুগত উপাদান থাকা অপরিহার্য। নাম্মু ছিল সেই অনাদি এবং অনন্ত বস্তুগত উপাদান। এই জলরাশির কোনো নির্দিষ্ট স্রষ্টা ছিল না। সে নিজেই নিজের অস্তিত্বের কারণ ছিল। নাম্মুর গর্ভ থেকে একটি বিশাল মহাজাগতিক পর্বতের জন্ম হয়। এই পর্বতটি স্বর্গ এবং মর্ত্যের এক অবিচ্ছেদ্য মিশ্রণ ছিল। স্বর্গ ও পৃথিবীর এই আদিম অবিচ্ছেদ্য অবস্থাকে পৌরাণিক পরিভাষায় ওয়ার্ল্ড প্যারেন্টস মাইথলজি (World Parents Mythology) বলা হয়ে থাকে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই প্রাথমিক কাঠামোটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এবং জমাটবদ্ধ ছিল, যেখানে প্রাণের বিকাশের কোনো সুযোগ ছিল না।

আদিম এই বিশৃঙ্খলা থেকে ধীরে ধীরে শৃঙ্খলার দিকে যাত্রাই হলো সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের মূল কথা। দেবতারা এখানে জাদুকরের মতো শূন্য থেকে কিছু সৃষ্টি করেন না। তারা মূলত কারিগরের ভূমিকা পালন করেন। তারা বিদ্যমান উপাদানগুলোকে ভেঙে, কেটে এবং নতুন আকার দিয়ে একটি বাসযোগ্য বিশ্ব তৈরি করেন। নাম্মুর গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া মহাজাগতিক পর্বতটিতে স্বর্গকে আন (An) এবং পৃথিবীকে কি (Ki) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আন এবং কি পরস্পর গভীরভাবে আলিঙ্গনবদ্ধ ছিল। স্বর্গের দেবতা আন এবং পৃথিবীর দেবী কি-এর মিলনের ফলে জন্ম নেয় বায়ুর দেবতা এনলিল (Enlil)। এনলিলের জন্মের মাধ্যমেই মহাবিশ্বের কাঠামোতে প্রথম বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। জমাটবদ্ধ উপাদানগুলো ধীরে ধীরে আলাদা সত্তা লাভ করতে থাকে। সৃষ্টির এই প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো নৈতিকতা বা পাপ-পুণ্যের ধারণা ছিল না। এটি ছিল নিতান্তই একটি ভৌত এবং গাঠনিক প্রক্রিয়া, যেখানে এক উপাদান থেকে আরেক উপাদানের জন্ম হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি তৎকালীন মানুষের বিশ্বকে একটি যান্ত্রিক ও যৌক্তিক কাঠামোতে ফেলার আদিমতম বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা।

স্বর্গ ও মর্ত্যের বিভাজন এবং মহাজাগতিক স্থপতি (The Separation of Heaven and Earth and the Cosmic Architects)

মহাবিশ্বকে বাসযোগ্য করার জন্য সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপটি ছিল স্বর্গ এবং পৃথিবীর বিভাজন। সুমেরীয় পুরাণ অনুযায়ী, দেবতা এনলিল এই যুগান্তকারী কাজটি সম্পন্ন করেন। বায়ুর দেবতা হিসেবে এনলিলের শক্তি ছিল অপরিসীম। তিনি একটি বিশাল মহাজাগতিক কুঠার বা অস্ত্রের সাহায্যে তার পিতা আন এবং মাতা কি-কে আলাদা করে ফেলেন। আন চলে যান ওপরের দিকে এবং স্বর্গের সর্বোচ্চ সিংহাসন গ্রহণ করেন। আর দেবী কি নিচে অবস্থান নেন এবং চ্যাপ্টা পৃথিবীর রূপ ধারণ করেন। স্বর্গ এবং পৃথিবীর মাঝখানে যে বিশাল ফাঁকা জায়গাটি তৈরি হয়, এনলিল সেখানে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। এই শূন্যস্থানটি বাতাসে পূর্ণ হয়ে ওঠে এবং এখানেই পরবর্তীতে যাবতীয় প্রাণের সঞ্চার ঘটে। জ্যামিতিক এই বিভাজনটি প্রাচীন বিশ্বতত্ত্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি প্রমাণ করে যে, সুমেরীয়রা মহাবিশ্বকে একটি সুনির্দিষ্ট গাঠনিক বিন্যাসে কল্পনা করত। তাদের এই ধারণাকে প্রাথমিক যুগের ভৌত বলবিদ্যা (Physical Mechanics)-এর একটি রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে (Kramer, 1961)। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বস্তুর স্থানচ্যুতি ঘটানোর এই ধারণা তাদের দৈনন্দিন কায়িক শ্রমের অভিজ্ঞতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

স্বর্গ ও মর্ত্যের এই বিভাজন কেবল ভৌত শূন্যস্থানই তৈরি করেনি, এটি মহাবিশ্বের প্রশাসনিক কাঠামোও নির্ধারণ করে দেয়। আন, এনলিল এবং এনকি – এই ত্রিমূর্তি দেবতাদের হাতে মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণভার ন্যস্ত হয়। স্বর্গের নিরঙ্কুশ অধিপতি হিসেবে আন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতেন। কিন্তু মহাজাগতিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব ছিল এনলিলের। এনলিল ছিলেন পৃথিবীর বুকে বাতাস এবং ঝড়ের নিয়ন্ত্রক। মেঘমালাকে চালিত করা, বৃষ্টিপাত ঘটানো এবং ফসলের বৃদ্ধি নিশ্চিত করা – সবকিছুই তার নির্দেশে পরিচালিত হতো। অন্যদিকে, পৃথিবীর নিচের যে পাতালস্থ মিঠে জলের আধার ছিল, তার নিয়ন্ত্রণ নেন দেবতা এনকি। তাকে প্রজ্ঞা এবং কারিগরি জ্ঞানের দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। স্বর্গীয় এই প্রশাসনিক কাঠামোটি আসলে মেসোপটেমিয়ার নগররাষ্ট্রগুলোর আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি মহাজাগতিক প্রতিফলন। সমাজে যেমন রাজা, সেনাপতি এবং পুরোহিতদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করা থাকত, মহাবিশ্বের পরিচালন ব্যবস্থাও ঠিক তেমনি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

মহাজাগতিক স্থপতি হিসেবে দেবতাদের এই কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্ব তাদের কাছে একটি বিশাল স্থাপত্যকর্মের চেয়ে কম কিছু ছিল না। তারা বিশ্বাস করত, পৃথিবীর প্রতিটি পাহাড়, নদী এবং উপত্যকা দেবতাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফসল। উদাহরণস্বরূপ, ইউফ্রেটিস এবং টাইগ্রিস নদীর উৎপত্তির পেছনেও দেবতাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল বলে পুরাণগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। পৃথিবী নামক এই সমতল থালাটির ওপর প্রাণের বিকাশ ঘটানোর জন্য জলের সুষম বণ্টন জরুরি ছিল। দেবতারা খাল খনন করে এবং নদীর গতিপথ নির্ধারণ করে সেই কাজটি সম্পন্ন করেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে কসমিক ডিজাইনিং (Cosmic Designing) হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এখানে কোনো কিছুই কাকতালীয় নয়। প্রতিটি উপাদানের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং কার্যকারণ রয়েছে। সুমেরীয়রা তাদের কায়িক শ্রম দিয়ে জিগুরাত এবং নগর নির্মাণ করত। সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা মহাবিশ্বের সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করেছিল। তাদের চোখে দেবতারা ছিলেন মহাবিশ্বের প্রধান প্রকৌশলী, যারা নিরন্তর কাজ করে একটি বিশৃঙ্খল জলরাশিকে একটি বাসযোগ্য এবং সুশৃঙ্খল আবাসস্থলে পরিণত করেছিলেন।

Constructing Cosmotheism (Chapter 3) - From Ritual to God in the Ancient Near East
সুমেরীয় মহাবিশ্বতত্ত্বের স্তরভিত্তিক কাঠামোর চিত্র, যেখানে আকাশ (An), পৃথিবী (Ki), ভূগর্ভস্থ জলরাজ্য (Abzu) এবং পাতাললোক (Kur) সমন্বয়ে একটি প্রতীকী বিশ্বচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে; Source: Ancient Mesopotamian Cosmology Studies

মহাবিশ্বের জ্যামিতিক ও ভৌত কাঠামো (Geometric and Physical Structure of the Universe)

সুমেরীয়দের চোখে মহাবিশ্বের জ্যামিতিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য। তারা মনে করত যে পৃথিবী একটি বিশাল, সমতল এবং গোলাকার থালার মতো। এই থালাটি একটি অন্তহীন এবং গভীর আদিম সমুদ্রের ওপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। সমতল এই পৃথিবীর ওপরে আচ্ছাদন হিসেবে রয়েছে একটি কঠিন গম্বুজ। এই গম্বুজটিকে বলা হতো ফার্মামেন্ট। গম্বুজটি টিন বা এ জাতীয় কোনো কঠিন ধাতু দিয়ে তৈরি বলে তারা বিশ্বাস করত। এই কঠিন আচ্ছাদনের মূল কাজ ছিল ওপরের আদিম জলরাশিকে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়া থেকে ঠেকিয়ে রাখা। বৃষ্টিপাতকে তারা মনে করত এই গম্বুজের গায়ে থাকা ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে চুইয়ে পড়া স্বর্গীয় জল। এই পুরো ব্যবস্থাটি প্রাচীনকালের ফ্ল্যাট আর্থ মডেল (Flat Earth Model)-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ (Horowitz, 1998)। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে এটি অবৈজ্ঞানিক মনে হলেও, সেই সময়ের মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার সাপেক্ষে তারা কিভাবে এরকম সিদ্ধান্তে আসে তা অনুমান করা যায়। খোলা প্রান্তরে দাঁড়ালে দিগন্তকে সমতল এবং আকাশকে একটি উপুড় করা বাটির মতোই মনে হয়। তারা তাদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাকেই বিশ্বতত্ত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

এই মহাজাগতিক কাঠামোর ভেতরে একাধিক স্তর বিদ্যমান ছিল। স্বর্গ কেবল একটি একক স্থান ছিল না। দেবতাদের মর্যাদা এবং পদমর্যাদা অনুযায়ী স্বর্গেরও বিভিন্ন স্তর ছিল। সর্বোচ্চ স্তরে বাস করতেন প্রধান দেবতা আন। তার নিচের স্তরগুলোতে অন্যান্য দেবতারা অবস্থান করতেন। পৃথিবীর সমতল পৃষ্ঠে বাস করত মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী। আর পৃথিবীর ঠিক নিচে অবস্থান করত পাতালপুরী বা কুর্। এটি ছিল মৃত আত্মাদের আবাসস্থল। পাতালপুরী এবং সমতল পৃথিবীর মাঝখানে ছিল আবজু বা বিশাল মিঠা জলের আধার। দেবতা এনকি এই আবজুতে বাস করতেন। মেসোপটেমিয়ার শুষ্ক এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা মিঠা জল ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। কুয়ো খুঁড়লে যে জল পাওয়া যেত, সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত তা এই আবজু থেকেই আসে। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালপুরী এবং আবজু – এই চারটি প্রধান অংশ নিয়ে মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ জ্যামিতিক কাঠামোটি গঠিত হয়েছিল। মহাকাশীয় এই বিভাজনগুলো তাদের চিন্তার কাঠামোগত শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়। তারা মহাবিশ্বের কোনো অংশকেই অসংজ্ঞায়িত রাখতে চায়নি।

মহাবিশ্বের এই ত্রিমাত্রিক কাঠামোটি তাদের সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক জীবনে এক গভীর স্বস্তি এনে দিয়েছিল। অসীম এবং অনন্ত মহাকাশের ধারণা মানুষকে অনেক সময় দিশেহারা করে তোলে। সুমেরীয়রা একটি নির্দিষ্ট সীমানাযুক্ত মহাবিশ্বে বিশ্বাস করত। তাদের পৃথিবী গম্বুজ দিয়ে ঢাকা এবং নিচে জল দ্বারা বেষ্টিত। এটি অনেকটা একটি সুরক্ষিত দুর্গের মতো। এই বন্ধ এবং নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ধারণা তাদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছিল। তারা জানত যে দেবতারা এই গম্বুজ এবং পাতালপুরীর সীমানা পাহারা দিচ্ছেন। মহাজাগতিক এই দুর্গটি বাইরের বিশৃঙ্খল এবং আদিম জলরাশি থেকে তাদের রক্ষা করছে। জ্যামিতিক এই নিখুঁত পরিমাপগুলো পরবর্তী ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। তারা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং দূরত্ব মাপার জন্য যে ষাট-ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল, তার পেছনে এই জ্যামিতিক বিশ্বতত্ত্বের একটি বড় ভূমিকা ছিল।

মহাজাগতিক শৃঙ্খলা এবং অলঙ্ঘনীয় বিধান (Cosmic Order and the Inviolable Decrees)

ভৌত কাঠামো তৈরি হওয়ার পর মহাবিশ্বকে সচল রাখার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুনের প্রয়োজন ছিল। সুমেরীয় দর্শনে এই নিয়মকানুনগুলোকে বলা হতো মে (Me)। মে হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালনার এমন কিছু অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক বিধান, যা মহাবিশ্বের ভারসাম্য বজায় রাখে। গ্রহ-নক্ষত্রের নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরা, ঋতুর পরিবর্তন, নদীর জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে সমাজের রাজতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, এমনকি শিল্পকলা এবং যুদ্ধ – সবকিছুর পেছনেই এক বা একাধিক মে কাজ করে। এগুলো কোনো নৈতিক উপদেশ ছিল না। এগুলো ছিল প্রকৃতির কঠিন নিয়মের মতো, যা লঙ্ঘন করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি সর্বশক্তিমান দেবতারাও এই মে-গুলোর অধীন ছিলেন। তারা এই নিয়মগুলো তৈরি করেননি, তারা কেবল এগুলোকে সংরক্ষণ এবং প্রয়োগ করতেন। দর্শনের পরিভাষায় একে এক ধরনের মহাজাগতিক ডিটারমিনিজম (Determinism) বা নির্ধারণবাদ বলা যেতে পারে, যেখানে মহাবিশ্বের প্রতিটি উপাদান একটি পূর্বনির্ধারিত ছক অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য।

এই মে-গুলোর ধারণা প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা মহাবিশ্বকে একটি অন্ধ এবং বিশৃঙ্খল স্থান বলে মনে করত না। তাদের মতে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি কার্যকারণ সম্পর্ক বিদ্যমান। যদি কখনো অনাবৃষ্টি হয় বা অকালে বন্যা আসে, তবে তারা ধরে নিত যে মহাজাগতিক শৃঙ্খলায় কোনো ছেদ পড়েছে। মে-গুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলেই প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে। প্রজ্ঞার দেবতা এনকি ছিলেন এই মে-গুলোর প্রধান রক্ষক। পুরাণ অনুযায়ী, তিনি তার জলজ আবাসস্থল আবজুতে বসে এই নিয়মকানুনগুলো পরিচালনা করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের দেবতাদের কাছে সেগুলো হস্তান্তর করতেন। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন শহরের উত্থান এবং পতনকে এই মে-গুলোর হাতবদলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হতো। যখন কোনো শহর শক্তিশালী হয়ে উঠত, তখন ধরে নেওয়া হতো যে সেই শহরের দেবতা প্রচুর মে-এর অধিকারী হয়েছেন। মানব সমাজ এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার মধ্যে এই অবিচ্ছেদ্য সংযোগ সুমেরীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

বস্তুত, মে-এর ধারণাটির মাধ্যমে সুমেরীয়রা তাদের চারপাশের পরিবর্তনশীল জগতকে কিছু ধ্রুবক নিয়মের ফ্রেমে বাঁধার চেষ্টা করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে পৃথিবী একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলে। বীজ বপন করলে চারা গজায়, আবার সময়মতো জল না পেলে তা মরে যায়। কার্য এবং কারণের এই ধারাবাহিকতা তাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। মে হলো সেই ভাবনাগুলোরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। দেবতারা ইচ্ছামতো জগত চালাতে পারতেন না, তাদেরও একটি ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা মেনে চলতে হতো। মহাবিশ্বের এই নিয়মতান্ত্রিকতা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করত। তারা জানত, নিয়ম মেনে চললে এবং দেবতাদের সন্তুষ্ট রাখলে প্রকৃতির এই শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরে, ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাজকর্ম পর্যন্ত, সব জায়গায় কঠোর নিয়মতন্ত্র অনুসরণ করা হতো।

জ্যোতিষ্কবিদ্যা এবং মহাকাশীয় সত্তাদের ভূমিকা (Astronomy and the Role of Celestial Entities)

রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে সুমেরীয়রা কেবল কিছু উজ্জ্বল বিন্দুই দেখতে পেত না, তারা দেখত দেবতাদের সরাসরি উপস্থিতি। মহাবিশ্বের কাঠামোতে জ্যোতিষ্কগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদ, সূর্য এবং শুক্র গ্রহকে তারা অত্যন্ত সম্মানজনক দেবতা হিসেবে উপাসনা করত। চাঁদের দেবতা নান্না (Nanna) তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ এবং উত্তপ্ত আবহাওয়ায় দিনের বেলায় সূর্যের প্রখর তাপ অনেক সময় কষ্টদায়ক হতো। বিপরীতে রাতের স্নিগ্ধ আলো মানুষকে স্বস্তি দিত। একারণে সুমেরীয় প্যান্থিয়নে সূর্যের দেবতা উতু (Utu)-এর চেয়ে চাঁদের দেবতা নান্নার অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নান্না তার নৌকায় করে রাতের আকাশে ঘুরে বেড়াতেন এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করতেন। চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করেই সুমেরীয়রা তাদের ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল। কৃষিকাজ, ধর্মীয় উৎসব এবং কর আদায়ের সময়সূচি নির্ধারণের জন্য এই চন্দ্রপঞ্জিকা অপরিহার্য ছিল। আকাশ পর্যবেক্ষণের এই ধারাবাহিক এবং সুশৃঙ্খল চেষ্টার মাধ্যমেই মূলত প্রাচীন অ্যাস্ট্রোনমি (Astronomy) বা জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তি স্থাপিত হয়।

সূর্য দেবতা উতু ছিলেন ন্যায়বিচার এবং সত্যের প্রতীক। দিনে আলোকরশ্মি দিয়ে তিনি পুরো পৃথিবী আলোকিত করতেন। কোনো কিছুই তার দৃষ্টির আড়াল হওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে সমাজে কেউ কোনো অপরাধ করলে উতু তা দেখতে পান বলে বিশ্বাস করা হতো। উতুকে তাই একজন কঠোর বিচারক হিসেবে দেখা হতো, যিনি মহাজাগতিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি মানবিক শৃঙ্খলারও তদারকি করতেন। আর শুক্র গ্রহের দেবী ইনান্না (Inanna) ছিলেন প্রেম, উর্বরতা এবং যুদ্ধের দেবী। ভোরের তারা এবং সন্ধ্যার তারা হিসেবে আকাশে তার উপস্থিতি ছিল খুব স্পষ্ট। মহাকাশীয় এই সত্তারা কেবল আলো দেওয়ার জন্য আকাশে থাকতেন না, তারা মহাবিশ্বের একটি বিশাল ঘড়ির কাঁটার মতো কাজ করতেন। তাদের নিখুঁত এবং সময়ের কাঁটায় বাঁধা চলাফেরা সুমেরীয়দের মনে সময়ের একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করেছিল। তারা দিন এবং রাতকে সমান ভাগে ভাগ করতে শিখেছিল এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান মেপে দিক নির্ণয় করতে পারত।

আকাশের এই গ্রহ-নক্ষত্রগুলোকে তারা এক ধরনের ঐশ্বরিক লিপি হিসেবে বিবেচনা করত। তারা মনে করত যে দেবতারা আকাশের গায়ে নক্ষত্রমণ্ডলীর মাধ্যমে মানুষের ভবিষ্যৎ এবং পৃথিবীর ভাগ্য লিখে রেখেছেন। এই ধারণা থেকেই উৎপত্তি ঘটে অ্যাস্ট্রোলজি (Astrology) বা জ্যোতিষশাস্ত্রের (Rochberg, 2004)। পুরোহিত এবং লিপিকাররা রাতের পর রাত জেগে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লিপিবদ্ধ করতেন। যদি কোনো গ্রহ তার স্বাভাবিক পথ থেকে কিছুটা বিচ্যুত হতো বা কোনো গ্রহণ লাগত, তবে তারা একে আসন্ন বিপদের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করতেন। রাজারা কোনো যুদ্ধে যাওয়ার আগে বা নতুন মন্দির নির্মাণের আগে অবশ্যই এই মহাকাশীয় সংকেতগুলোর পাঠোদ্ধার করার নির্দেশ দিতেন। অর্থাৎ, সুমেরীয় বিশ্বতত্ত্বে মহাকাশ এবং পৃথিবীর মানুষের ভাগ্য একটি অদৃশ্য সুতোর মাধ্যমে বাঁধা ছিল। আকাশের সামান্যতম পরিবর্তনও পৃথিবীতে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে, এই বিশ্বাস তাদের মহাকাশ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী করে তুলেছিল।

The moon god Sin - SyriacPress
প্রাচীন মেসোপটেমীয় শিলালিপি বা রিলিফ, যেখানে দেবতা ও ধর্মীয় প্রতীকসমূহকে খোদাই করে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা তৎকালীন ধর্মবিশ্বাস, আচার এবং দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন বহন করে; Source: British Museum

শূন্য থেকে সৃষ্টির ধারণার অনুপস্থিতি এবং বস্তুগত রূপান্তর (Absence of Creation Ex Nihilo and Material Transformation)

সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে শূন্য থেকে সৃষ্টির ধারণার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। পরবর্তীতে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলামিক দর্শনে আমরা ক্রিয়েটিও এক্স নিহিলো (Creatio Ex Nihilo) বা সম্পূর্ণ শূন্য থেকে ঈশ্বরের আদেশে মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে ধারণা পাই, মেসোপটেমিয়ার চিন্তাজগতে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সুমেরীয়রা চরম বাস্তববাদী ছিল। তাদের মতে, কোনো কিছু তৈরি করতে হলে অবশ্যই কোনো না কোনো কাঁচামাল প্রয়োজন। একজন ছুতার যেমন কাঠ ছাড়া চেয়ার বানাতে পারে না, তেমনি দেবতারাও উপাদান ছাড়া জগত বানাতে পারেন না। মহাবিশ্বের সূচনায় আদিম জলরাশি উপস্থিত ছিল। দেবতারা কেবল সেই বিশৃঙ্খল জলরাশিকে কেটে, ছেঁটে এবং আকার দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল রূপ দিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি মূলত প্রাচীন কসমোগনি (Cosmogony) বা সৃষ্টিবিদ্যার একটি চমৎকার রূপরেখা, যেখানে সৃষ্টির অর্থ হলো নতুন কিছু বানানো নয়, বরং পুরোনো বস্তুকে নতুনভাবে সাজানো।

এই বস্তুগত রূপান্তরের ধারণাটি তাদের চারপাশের পরিবেশ এবং কায়িক শ্রমের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। তারা কাদা মাটি দিয়ে ইট বানাত, আর সেই ইট দিয়ে বিশাল সব মন্দির তৈরি করত। তাদের সৃষ্টিতত্ত্বেও দেবতারা ঠিক এই একই কাজ করেছেন। মানুষ সৃষ্টির মিথটিতে দেখা যায়, দেবতা এনকি কাদা মাটির সাথে দেবতাদের রক্ত মিশিয়ে প্রথম মানুষ তৈরি করেছিলেন। এখানেও কাদা মাটি এবং রক্ত আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। সৃষ্টির এই পদ্ধতিটি প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা মহাবিশ্বকে একটি জাদুকরী জায়গা হিসেবে ভাবত না। তাদের কাছে মহাবিশ্ব একটি বিশাল কর্মশালা, যেখানে দেবতারা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন। বস্তুর অবিনশ্বরতা নিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে যে সূত্র রয়েছে, সুমেরীয়দের এই দর্শনে তার একটি অবচেতন প্রতিধ্বনি শোনা যায়। উপাদানগুলো কখনো ধ্বংস হয় না, সেগুলো কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, সুমেরীয় কসমোলজি বা বিশ্বতত্ত্ব ছিল তাদের সমাজকাঠামো, অর্থনীতি এবং ভৌগোলিক বাধ্যবাধকতার একটি নিখুঁত মহাজাগতিক সংস্করণ। তারা মহাবিশ্বকে এমন একটি কাঠামো হিসেবে কল্পনা করেছিল যা তাদের নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচিত জগতের মতোই সুশৃঙ্খল। আদিম সমুদ্র থেকে শুরু করে সমতল পৃথিবী, কঠিন গম্বুজ এবং অলঙ্ঘনীয় মে – সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তৈরি হয়েছিল। এই বিশ্বতত্ত্ব কোনো অন্ধ বিশ্বাসের ফসল ছিল না; এটি ছিল শত শত বছরের পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা এবং একটি অনিশ্চিত পরিবেশে নিজেদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলার একটি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। তারা হয়তো মহাবিশ্বের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক কাঠামোটি উন্মোচন করতে পারেনি, তবে মহাবিশ্ব যে নিয়ম মেনে চলে এবং তার একটি সুনির্দিষ্ট বিন্যাস রয়েছে – এই যুগান্তকারী ধারণাটি তারাই প্রথমবারের মতো মানুষের চিন্তার ইতিহাসে যুক্ত করেছিল।

বহুদেবতাবাদ এবং অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Polytheism and Anthropomorphism)

সুমেরীয় সমাজে বহুদেবতাবাদের বিন্যাস ও নগররাষ্ট্রের সম্পর্ক (Structure of Polytheism and Relationship with City-States in Sumerian Society)

মেসোপটেমিয়ার শুকনো ধুলো ও পলিমাটির ওপর যখন প্রথম সভ্যতা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল, তখন মানুষের মনে জগৎকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা ছিল তীব্র। সুমেরীয়রা তাদের চারপাশের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে কেবল জড় পদার্থ হিসেবে দেখেনি। তারা মনে করত, প্রতিটি প্রাকৃতিক শক্তির পেছনে একজন করে পরিচালক কাজ করছেন। এই বিশাল বিশ্বাস ব্যবস্থাই হলো বহুদেবতাবাদ (Polytheism)। এই পলিথিজম কোনো এলোমেলো ধারণা ছিল না, বরং এটি ছিল তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে স্বর্গে ঠিক ততটাই বৈচিত্র্য আছে যতটা তাদের নিজেদের সমাজে। সেখানে ছোট-বড় হাজার হাজার দেবতা ছিলেন। কোনো দেবতা হয়তো কেবল একটি ঝোপের রক্ষক, আবার কেউ হয়তো পুরো ঝড়ের মালিক। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খাইম (Emile Durkheim) তার দ্যা এলিমেন্টারি ফর্মস অফ রিলিজিয়াস লাইফ (The Elementary Forms of Religious Life) গ্রন্থে ধর্মের যে সামাজিক সংহতির কথা বলেছেন, সুমেরীয় সমাজে তার বাস্তব রূপ দেখা যায়। সেখানে ধর্ম ছিল প্রতিটি নগররাষ্ট্রের পরিচয়ের মূল ভিত্তি।

সুমেরীয় প্রতিটি নগররাষ্ট্র ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বাধীন। আর এই স্বাধীনতার পেছনে কাজ করত তাদের নিজস্ব পৃষ্ঠপোষক দেবতা বা ‘প্যাট্রন গড’উরুক শহরের কথা ধরা যাক। সেই শহরের মানুষ বিশ্বাস করত তাদের অধিপতি হলেন আকাশ দেবতা আন। আবার এরিদু শহরের মানুষ মনে করত তাদের রক্ষাকর্তা হলেন প্রজ্ঞার দেবতা এনকি। এই নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক এবং দ্বন্দ্ব অনেক সময় তাদের দেবতাদের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করত। যখন একটি শহর অন্য শহরকে যুদ্ধে পরাজিত করত, তখন মনে করা হতো বিজয়ী শহরের দেবতা পরাজিত শহরের দেবতাকে হারিয়ে দিয়েছেন। নৃবিজ্ঞানী ব্রনিস্ল ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski)-র ফাংশনালিজম (Functionalism) বা ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, এই বহুদেবতাবাদ আসলে একটি বিভক্ত ভৌগোলিক অঞ্চলে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কৌশল ছিল। মানুষ যখন ভাবত তাদের শহরের মালিক একজন শক্তিশালী দেবতা, তখন তাদের মধ্যে কাজ করার এবং শহরকে রক্ষা করার স্পৃহা বেড়ে যেত।

সুমেরীয়দের এই দেবমণ্ডলী বা প্যান্থিয়ন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। সেখানে একটি নির্দিষ্ট হায়ারার্কি বা ক্রমবিন্যাস ছিল। একেবারে শীর্ষে ছিলেন সাতজন মহান দেবতা, যারা মহাবিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন। তাদের নিচে ছিলেন ‘অনুনাকি‘ নামক একদল দেবতা। ছোট ছোট দেবতাদের সংখ্যা ছিল অগুনতি। প্রতিটি পেশার জন্য আলাদা দেবতা ছিল। একজন লিপিকার বা কাস্তে তৈরির কারিগরের জন্য যেমন আলাদা দেবতা ছিল, তেমনি প্রতিটি পরিবারে ‘লামাস্সু‘ বা ব্যক্তিগত রক্ষাকারী সত্তার ধারণা ছিল। এই ব্যবস্থাটি আসলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার একটি মানসিকভাবে তৈরি করা রক্ষাকবচ। তারা মনে করত, পৃথিবীটা একা বাউন্ডুলে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা নয়। প্রতিটি ধূলিকণার জন্য কেউ না কেউ দায়ী। তবে এই দেবতাদের প্রতি আনুগত্য কেবল ভক্তি থেকে আসত না, এর পেছনে ছিল অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ। কারণ সুমেরীয়রা মনে করত, দেবতাদের খুশি না রাখলে তারা যেকোনো সময় রুষ্ট হয়ে ধ্বংসলীলা চালাতে পারেন। টাইগ্রিস বা ইউফ্রেটিসের হঠাৎ আসা বন্যাকে তারা দেবতাদের রাগ হিসেবেই দেখত।

এই পলিথিজম বা বহুদেবতাবাদের কাঠামোটি মেসোপটেমিয়ার মানুষের রাজনৈতিক জীবনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। মন্দিরের পুরোহিতরা রাজাদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী হতেন অনেক সময়, কারণ তারা ছিলেন দেবতাদের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। সুমেরীয়রা মনে করত তাদের শহরগুলো আসলে দেবতাদের জমি, আর তারা কেবল সেই জমির বর্গা চাষি। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)-এর থিওক্রেটিক অথরিটি (Theocratic Authority) বা ধর্মীয় কর্তৃত্বের যে ধারণা, সুমেরীয় শাসনব্যবস্থা ছিল তার এক নিখুঁত উদাহরণ। এখানে ধর্মের গুরুত্ব কোনো আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের জন্য ছিল না, বরং সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্পদ বণ্টনের একটি কেন্দ্রীয় পদ্ধতি হিসেবে এটি কাজ করত। দেবতাদের হাজার হাজার নামের তালিকা আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, সেই সময়ের মানুষ জগতের প্রতিটি পরিবর্তনকে একটি নির্দিষ্ট সত্তার সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করত। এর ফলে তাদের জগতটা অনেক বেশি জীবন্ত এবং অর্থবহ হয়ে উঠেছিল।

অ্যানথ্রোপোমরফিজম: মানবরূপী দেবতার মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা (Anthropomorphism: Psychological Profile of Human-like Deities)

সুমেরীয় ধর্মের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি হলো তাদের দেবতাদের চেহারা এবং স্বভাব। তারা দেবতাদের কোনো বিমূর্ত বা ভয়ংকর দানবীয় রূপে কল্পনা করেনি। তাদের দেবতারা ছিলেন পুরোপুরি মানুষের মতো। একেই বলা হয় অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism)। এই মানবরূপায়ণ কেবল চেহারার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেবতারা মানুষের মতোই পোশাক পরতেন, অলঙ্কার পছন্দ করতেন এবং তাদের পরিবার ছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাদের আবেগগুলো ছিল পুরোপুরি মানুষের মতো। দেবতারা হাসতেন, আনন্দ করতেন, আবার বিষণ্ণতায় ভুগতেন। তারা প্রেমে পড়তেন, ঈর্ষান্বিত হতেন এবং মাঝে মাঝে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করতেন। সুমেরীয় পুরাণগুলো পড়লে দেখা যায়, দেবতারা অনেক সময় তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছেন। ধর্মের ইতিহাসে এই মানবিক গুণাবলির আরোপ এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে দেবতারা অনেক বেশি কাছের এবং পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism)-কে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে মানুষের নিজের ছায়াকে মহাবিশ্বের ওপর প্রক্ষেপণ হিসেবে। সমাজবিজ্ঞানী লুডভিগ ফয়ারবাখ (Ludwig Feuerbach) তার দ্যা এসেন্স অফ রিলিজিয়ন (The Essence of Religion) বইয়ে যেমনটি বলেছেন, মানুষ আসলে নিজের সেরা বা সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণগুলোকেই দেবতা হিসেবে কল্পনা করে। সুমেরীয়রা যখন দেখত তাদের রাজারা শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী, তারা তাদের দেবতাদেরও সেই রাজকীয় ঢঙে কল্পনা করত। তবে এই মানবিক আচরণের একটি অন্ধকার দিকও ছিল। দেবতারা যেহেতু মানুষের মতো আবেগপ্রবণ ছিলেন, তাই তাদের আচরণ ছিল অনিশ্চিত। তারা কখনো দয়াময় হতেন, আবার কখনো ভয়াবহ রাগী। এনলিল যখন মানুষের কোলাহলে বিরক্ত হয়ে মহাপ্লাবন ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেখানে কোনো নৈতিক বিচারের চেয়ে তার ব্যক্তিগত বিরক্তিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। অর্থাৎ, সুমেরীয়দের কাছে দেবতারা কোনো পরম ন্যায়বিচারের মানদণ্ড ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আবেগপ্রবণ শাসক।

এই মানবরূপী দেবতাদের পার্থিব প্রয়োজনও ছিল মানুষের মতোই। তাদের খাবার লাগত, জল লাগত এবং ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক বিছানার প্রয়োজন হতো। মন্দিরে দেবতাদের মূর্তিকে প্রতিদিন দুবেলা রাজকীয় খাবার পরিবেশন করা হতো। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে মূর্তির ভেতরে দেবতার আসল আত্মা বিরাজ করছে। ‘মিস পি’ বা মাউথ ওপেনিং রিচুয়াল (Mouth Opening Ritual) নামক এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হতো যাতে সে কথা বলতে বা খেতে পারে। যদি কোনো কারণে মন্দিরে ভোগ দিতে দেরি হতো, তবে পুরোহিতরা ভয় পেতেন যে দেবতা হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে শহরে দুর্ভিক্ষ নামিয়ে দেবেন। এই পুরো ব্যবস্থাটি আসলে মানুষের এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তার অংশ ছিল। দেবতাকে যখন মানুষের মতো প্রয়োজনযুক্ত মনে করা হয়, তখন মানুষ তাকে নিয়ন্ত্রণ করার বা সন্তুষ্ট করার একটি সহজ পথ খুঁজে পায়। এটি ছিল মূলত প্রকৃতির বিশাল শক্তির সাথে মানুষের এক ধরনের মানসিক আপস।

দেবতাদের অমরত্ব এবং সাধারণ মানুষের নশ্বরতার মাঝে যে ফারাক, সেটিই ছিল সুমেরীয় ধর্মের মূল দ্বন্দ্ব। দেবতারা অমর ছিলেন কারণ তারা ‘মে’ নামক মহাজাগতিক বিধানের মালিক ছিলেন। মানুষের সাথে তাদের অমিল কেবল এই অমরত্ব এবং ক্ষমতার মাত্রায়। অন্যথায় তারা একেকজন সাধারণ মানুষের মতোই ভুল করতেন। গিলগামেশের মহাকাব্যে দেখা যায়, ইশতার দেবী গিলগামেশের প্রেমে পড়েন এবং প্রত্যাখ্যাত হয়ে সাধারণ কোনো ঈর্ষাতুর নারীর মতোই আচরণ করেন। এই যে দেবতাদের ভুল করা বা আবেগতাড়িত হওয়া, এটি প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে একটি সুশৃঙ্খল কিন্তু খামখেয়ালি রাজতন্ত্রের মতো দেখত। সেখানে কোনো অলঙ্ঘনীয় নৈতিক বিধান ছিল না, ছিল কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য। এই অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism) আসলে সেই সময়ের মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং জগতকে নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোয় চেনার এক সাহসিক প্রয়াস।

Who Were the Main Sumerian Gods? | History Hit
ইনান্না (Inanna)-কেন্দ্রিক সুমেরীয় সিলিন্ডার সিলের ধর্মীয় দৃশ্য, যেখানে ডানাওয়ালা মানবরূপী দেবী, পবিত্র প্রতীক, প্রাণীচিহ্ন এবং দেবতার মানবীয় বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে অ্যানথ্রোপোমরফিজমের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে; Source: Journal of Near Eastern Studies

ভৃত্য হিসেবে মানুষ: সেবা ও আচারের বৈষয়িক প্রেক্ষাপট (Humans as Servants: Material Context of Service and Rituals)

সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত করুণ কিন্তু স্পষ্ট। তারা বিশ্বাস করত, মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে দেবতাদের কাজ করে দেওয়ার জন্য। এর আগে দেবতারা নিজেরাই চাষবাস করতেন, খাল খনন করতেন এবং ঘরবাড়ি বানাতেন। কিন্তু একসময় তারা এই কায়িক পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ করেন। তখন প্রজ্ঞার দেবতা এনকি পরামর্শ দেন এমন এক সত্তা তৈরি করার, যে দেবতাদের সমস্ত ভার নিজের কাঁধে তুলে নেবে। এই বিশ্বাসটি সুমেরীয় সমাজের শ্রম বিভাজন এবং সোশ্যাল হায়ারার্কি (Social Hierarchy) বা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে ধর্মীয় বৈধতা দিয়েছিল। সাধারণ মানুষ নিজেকে দেবতাদের ভৃত্য বা দাস মনে করত। নৃবিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ (Clifford Geertz)-এর রিলিজিয়ন অ্যাজ আ কালচারাল সিস্টেম (Religion as a Cultural System) তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ধরনের প্রতীকী বিশ্বাস মানুষের যন্ত্রণাময় শ্রমকে একটি মহত্তর উদ্দেশ্য প্রদান করে। মানুষ যখন ভাবত যে তার করা প্রতিটি পরিশ্রম আসলে দেবতাকে খাওয়ানোর জন্য, তখন সেই কষ্টের কাজও তার কাছে পবিত্র হয়ে উঠত।

মন্দির ছিল এই সেবা কার্যের মূল কেন্দ্র। একে বলা হতো ‘ই’ (E) বা ঘর। এটি কেবল উপাসনার জায়গা ছিল না, এটি ছিল একটি বিশাল বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক দপ্তর। মন্দিরের অধীনে হাজার হাজার একর জমি থাকত যেখানে সাধারণ কৃষকরা কাজ করত। উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ মন্দিরের গুদামে জমা হতো। সেখান থেকে দেবতাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোগ আলাদা করে বাকিটা দুর্ভিক্ষের সময় বা অভাবীদের মাঝে বিতরণ করা হতো। এই ব্যবস্থাটিকে ঐতিহাসিকরা টেম্পল ইকোনমি (Temple Economy) বা মন্দির অর্থনীতি বলেন। অর্থাৎ, ধর্ম এখানে কেবল পরকালীন মুক্তির জন্য ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন সমাজের একটি অত্যন্ত কার্যকর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। মানুষ দেবতাদের সেবা করার মাধ্যমে আসলে নিজেদের সমাজের ভারসাম্যই রক্ষা করত। দেবতাকে খাওয়ানো মানে ছিল পরোক্ষভাবে সমাজের মজুত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা।

ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে সুমেরীয়রা ছিল অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক। তাদের কাছে ভক্তি বা ভালোবাসার চেয়ে ‘সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একজন পুরোহিতকে নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করে এবং নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে জল ঢেলে বা বলি দিয়ে দেবতার পূজা করতে হতো। সামান্যতম ভুল মানেই ছিল অমঙ্গল। একে বলা যেতে পারে এক ধরনের রিচুয়ালিস্টিক ফরমালিজম (Ritualistic Formalism)। দেবতার মূর্তিকে স্নান করানো, নতুন পোশাক পরানো এবং সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করা ছিল নিত্যদিনের কাজ। এমনকি বিশেষ দিনে দেবতাদের মূর্তিকে নৌকায় করে এক শহর থেকে অন্য শহরে ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হতো যাতে তারা অন্য দেবতাদের সাথে দেখা করতে পারেন। এই যে দেবতাদের পার্থিব আচারের সাথে যুক্ত করা, এটি আসলে সুমেরীয়দের জীবনের একঘেয়েমি দূর করার একটি শৈল্পিক উপায়ও ছিল। তাদের উৎসবগুলো ছিল বর্ণাঢ্য এবং প্রাণবন্ত।

মানুষ এবং দেবতাদের এই সম্পর্কের মধ্যে কোনো দয়াময় স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ ছিল না। এটি ছিল অনেকটা এক ধরনের কন্ট্রাকচুয়াল রিলেশনশিপ (Contractual Relationship) বা চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক। মানুষ সেবা দেবে, বিনিময়ে দেবতা শহরকে রক্ষা করবেন – এটুকুই ছিল মূল কথা। যদি কখনো কোনো শহর ধ্বংস হতো, তবে মানুষ মনে করত দেবতা তার শহর ছেড়ে চলে গেছেন অথবা দেবতাকে মানুষ যথেষ্ট সেবা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এই যুক্তিনির্ভর অথচ অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসটি মানুষের মনে এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি করত। তারা জানত যে অলস হয়ে বসে থাকলে কেবল পেট নয়, স্বর্গের কোপও পড়বে। ফলে মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ মাটিতে তারা যে অসাধ্য সাধন করেছিল, তার পেছনে এই ভৃত্যসুলভ ধর্মীয় মানসিকতা এক বিশাল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

plaque | British Museum
সুমেরীয় উপাসনা ও নৈবেদ্য নিবেদনের রিলিফ, যেখানে উপাসকগণ দেবমূর্তির সামনে ভোগ অর্পণ করছে এবং মন্দিরভিত্তিক সেবা, রিচুয়ালিস্টিক ফরমালিজম ও মানুষ – দেবতার কন্ট্রাকচুয়াল রিলেশনশিপের ধারণা দৃশ্যমানভাবে প্রকাশিত হয়েছে; Source: Iraq Journal

দেবতাদের সভা ও মহাজাগতিক হায়ারার্কি (Divine Assembly and Cosmic Hierarchy)

সুমেরীয় বিশ্বাসে দেবতারা একা সিদ্ধান্ত নিতেন না। তাদের একটি বিশাল সভা ছিল যাকে বলা হতো ‘অনুনাকি‘। এই সভার প্রধান ছিলেন আকাশ দেবতা আন। তবে বাস্তবে সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল এনলিলের হাতে। গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে দেবতারা একসাথে বসে আলোচনা করতেন। এই ব্যবস্থাটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার আদিম গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি প্রতিফলন। ইতিহাসবিদ থর্কিড ইয়াকবসেন (Thorkild Jacobsen) একে প্রিমিটিভ ডেমোক্রেসি (Primitive Democracy) বা আদিম গণতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মেসোপটেমিয়ার শহরগুলোতে রাজা বা ‘লুগাল’ আসার আগে একদল প্রবীণ মানুষ মিলে যেমন সিদ্ধান্ত নিতেন, স্বর্গের দেবতারাও ঠিক সেভাবেই কাজ করতেন। এই সভার সিদ্ধান্তই ছিল মহাবিশ্বের চূড়ান্ত নিয়তি। এই ব্যবস্থায় কোনো একক দেবতার স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ কম ছিল, যদিও এনলিল অনেক সময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন।

এই সভার কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলিত। সেখানে তর্ক-বিতর্ক হতো, এমনকি ভোটের মতো ব্যবস্থাও ছিল বলে কোনো কোনো পুরাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দেবতারা যখন কোনো নগররাষ্ট্রকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিতেন, তখন সেই শহরের রক্ষাকারী দেবতা সভার কাছে মিনতি করতেন তার শহরকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যদি ধ্বংসের পক্ষে থাকতেন, তবে রক্ষাকারী দেবতাকে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে হতো। এই ধারণাটি আসলে মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার একটি উপায়। মানুষ যখন দেখত তাদের সমৃদ্ধ শহর হঠাৎ ধুলোয় মিশে গেছে, তখন তারা এই ভেবে সান্ত্বনা পেত যে হয়তো দেবতাদের সভায় এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের নিজস্ব দেবতার সেখানে কিছু করার ছিল না। রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায় একে কালেকটিভ ডিসিশন মেকিং (Collective Decision Making)-এর একটি মিথলজিক্যাল সংস্করণ বলা যেতে পারে।

হায়ারার্কি বা স্তরায়ণ সুমেরীয় দেবমণ্ডলীর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। সেখানে দেবতাদের গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রদান করা হতো। যেমন আন-এর সংখ্যা ছিল ৬০, যা ছিল পূর্ণতার প্রতীক। এনলিলের ছিল ৫০ এবং এনকির ৪০। এই গাণিতিক বিন্যাস প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা তাদের জগতকে কতটা নিখুঁতভাবে মাপতে চাইত। ছোট দেবতারা অনেক সময় বড় দেবতাদের ভৃত্য হিসেবে কাজ করতেন। যেমন এনকির জন্য কাজ করতেন জাদুকর ও কারিগর দেবতারা। এই বিভাজনটি আসলে সুমেরীয় আমলাতন্ত্রেরই একটি প্রতিচ্ছবি। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন (Robert Merton)-এর ব্যুরোক্র্যাটিক স্ট্রাকচার (Bureaucratic Structure) বা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর যে ধারণা, সুমেরীয় দেবমণ্ডলী ছিল তার এক অতিপ্রাকৃত সংস্করণ। সেখানে প্রতিটি দেবতার জন্য একটি নির্দিষ্ট দপ্তর বা ‘মে’ বরাদ্দ ছিল।

এই মহাজাগতিক হায়ারার্কি কেবল স্বর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি পাতালপুরী বা ‘কুর্’ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পাতালপুরীর নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা ছিল যার প্রধান ছিলেন দেবী এরেসকিগাল। সেখানেও নিয়মকানুনের কোনো অভাব ছিল না। ইনান্না যখন পাতালপুরীতে প্রবেশ করতে চান, তখন তাকে সাতটি দরজায় তার সাতটি রাজকীয় পোশাক ও অলঙ্কার ত্যাগ করতে হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে দেবতাদের ক্ষমতাও সীমাহীন ছিল না, তারা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এবং আইনি সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। এই শৃঙ্খলার ধারণা সুমেরীয়দের মনে আইনের প্রতি এক ধরনের ভক্তি তৈরি করেছিল। তারা বিশ্বাস করত যে নিয়ম ভাঙলে দেবতারাও রেহাই পান না, সুতরাং মানুষের পক্ষে নিয়ম ভাঙা হবে আত্মঘাতী। এভাবেই সুমেরীয় প্যান্থিয়ন তাদের সমাজের নৈতিক ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করত।

দেবমূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও জাগতিক অস্তিত্বের স্বরূপ (Animation of Divine Statues and Nature of Earthly Existence)

সুমেরীয়দের কাছে দেবমূর্তি কেবল একটি প্রতীক ছিল না। তারা মনে করত মূর্তির ভেতরে দেবতার আসল উপস্থিতি রয়েছে। এই বিশ্বাসটি তাদের ধর্মের সবচেয়ে কায়িক এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দিক। মূর্তিকে প্রতিদিন স্নান করানো হতো, সবচেয়ে দামি কাপড় পরানো হতো এবং সুগন্ধি ধূপ জ্বালানো হতো। এই আচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেবতাকে তার পার্থিব বাসস্থানে স্বস্তিতে রাখা। ধর্মের ইতিহাসে এই ধরনের বিশ্বাসকে আইকনোগ্রাফিক রিয়ালিজম (Iconographic Realism) বা মূর্তিনির্ভর বাস্তবতা বলা যেতে পারে। মূর্তিগুলো সোনা, রুপো এবং ল্যাপিস লাজুলির মতো মূল্যবান পাথর দিয়ে খচিত থাকত। যখন কোনো শত্রু শহর দখল করত, তাদের প্রথম কাজ হতো প্রধান দেবতার মূর্তিকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া। মূর্তির এই অপহৃত হওয়া মানে ছিল দেবতার শহর ত্যাগ করা, যা সেই জনপদের জন্য ছিল চরম অপমানের এবং পতনের প্রতীক।

দেবমূর্তির সাথে মানুষের এই যে নিবিড় সম্পর্ক, তার পেছনে ছিল ‘মিস পি’ (Mis-pi) নামক এক বিশেষ অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বাস করা হতো যে মূর্তির মুখ এবং কান খুলে দেওয়া হয়েছে যাতে সে ভক্তদের কথা শুনতে পারে এবং খাবার গ্রহণ করতে পারে। এটি কোনো জাদুকরী ধারণা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া যেখানে জড় বস্তুকে ঐশ্বরিক সত্তায় রূপান্তর করা হতো। তাত্ত্বিক মির্চা এলিয়াদে (Mircea Eliade) তার দ্যা সেক্রেড অ্যান্ড দ্যা প্রোফেন (The Sacred and the Profane) গ্রন্থে যেমনটি বলেছেন, এই ধরনের আচার সাধারণ স্থান বা বস্তুকে ‘পবিত্র’ স্থানে রূপান্তরিত করে। জিগুরাতের চূড়ায় রাখা সেই মূর্তিটি ছিল পৃথিবীর এমন এক বিন্দু যেখানে স্বর্গ ও মর্ত্য মিলেমিশে এক হয়ে যেত। মানুষ যখন সেই মূর্তির সামনে দাঁড়াত, সে সরাসরি ভগবানের সান্নিধ্য অনুভব করত।

মূর্তিকে খাওয়ানোর প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। একে বলা হতো ‘ভোগ’। প্রতিদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় দেবতার সামনে থালায় করে সেরা মানের রুটি, মাংস, ফল এবং মদ সাজিয়ে দেওয়া হতো। কিছুক্ষণ পর পর্দার আড়ালে রাখা খাবারগুলো সরিয়ে নেওয়া হতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে দেবতা খাবারের সূক্ষ্ম অংশটি গ্রহণ করেছেন। অবশিষ্ট খাবারগুলো মন্দিরের পুরোহিত এবং কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। এই ব্যবস্থাটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, এটি ছিল একটি সুশৃঙ্খল রিসোর্স ডিস্ট্রিবিউশন (Resource Distribution) বা সম্পদ বণ্টন পদ্ধতি। এতে করে মন্দিরের বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ পেত এবং সমাজের উদ্বৃত্ত শস্যের একটি সদ্ব্যবহার হতো। মানুষ মনে করত তারা দেবতাকে খাওয়াচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তারা একটি সচল সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখছিল।

সুমেরীয়দের এই জাগতিক অস্তিত্বের স্বরূপ ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং অনিশ্চিত। তারা মনে করত দেবতারা যেকোনো সময় তাদের এই পার্থিব নিবাস ত্যাগ করতে পারেন। তাই তারা নিরন্তর জিগুরাত বা মন্দিরগুলো সংস্কার করত। যদি একটি ইঁটও খসে পড়ত, তবে সেটিকে অশুভ লক্ষণ মনে করা হতো। দেবতাকে তার ঘরে আটকে রাখার এই যে আপ্রাণ চেষ্টা, এটি আসলে মেসোপটেমিয়ার মানুষের নিরাপত্তাহীনতারই এক বহিঃপ্রকাশ। তারা তাদের সবচেয়ে প্রিয় এবং শক্তিশালী সত্তাটিকে চোখের সামনে দেখতে চাইত, তাকে স্পর্শ করতে চাইত এবং তার সেবা করতে চাইত। এই বস্তুনিষ্ঠ ধর্মীয় দর্শন প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা আকাশকুসুম কল্পনায় বিশ্বাসী ছিল না। তারা যা দেখত এবং যা অনুভব করত, তাকেই তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল। এভাবেই সুমেরীয় বহুদেবতাবাদ এবং অ্যানথ্রোপোমরফিজম একটি প্রাচীন সভ্যতার বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছিল।

Mīs pî o lavado de boca. El ritual mesopotámico de consagración de las imágenes – Post Mortem
সুমেরীয় বা মেসোপটেমীয় দেবমূর্তির এই প্রত্নভাস্কর্যে এক মানবাকৃতি দেবতার পূজ্য উপস্থিতি, রাজকীয় অলংকার, বৃহৎ দাড়ি, এবং মন্দিরভিত্তিক কাল্ট স্ট্যাচু (cult statue)-র ধারণা ফুটে উঠেছে, যা আইকনোগ্রাফিক রিয়ালিজম (Iconographic Realism), দেবতার পার্থিব উপস্থিতি, এবং ‘মিস পি’ (Mis-pi) আচার-পরবর্তী জীবন্ত দেবমূর্তির বিশ্বাসকে ব্যাখ্যা করে; Source: Journal of Near Eastern Studies

আন: স্বর্গের সর্বোচ্চ অধিপতি (An: Supreme Lord of Heaven)

স্বর্গের সর্বোচ্চ সিংহাসন এবং আন-এর পৌরাণিক উৎপত্তি (The Supreme Throne of Heaven and the Mythological Origin of An)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা মাথার ওপরের বিশাল এবং সীমাহীন নীল আকাশকে কেবল একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে বিবেচনা করত না। তাদের কাছে এই আকাশ ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন, নীরব এবং পরম ক্ষমতাবান সত্তা। সুমেরীয় ভাষায় ‘আন’ (An) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো আকাশ। অর্থাৎ, আন কেবল আকাশের দেবতা ছিলেন না, তিনি নিজেই ছিলেন সেই আকাশ। ধর্মতত্ত্ব এবং নৃবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের বিশ্বাসকে পার্সোনিফিকেশন (Personification) বা ব্যক্তিসত্তারোপ বলা হয়, যেখানে একটি জড় প্রাকৃতিক উপাদানকে জীবন্ত এবং সচেতন সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়। সৃষ্টির একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে মহাবিশ্ব বলতে বোঝানো হতো একটি বিশাল মহাজাগতিক পর্বতকে। এই পর্বতের ওপরের অংশটি ছিল পুরুষ সত্তা আন বা আকাশ, আর নিচের অংশটি ছিল নারী সত্তা কি (Ki) বা পৃথিবী। আদিম এই অবস্থায় স্বর্গ এবং পৃথিবী একে অপরের সাথে গভীরভাবে আলিঙ্গনবদ্ধ ছিল। তাদের এই অবিচ্ছেদ্য অবস্থার কারণে মহাবিশ্বে আলো বা বাতাস চলাচলের কোনো সুযোগ ছিল না। সব কিছু এক জমাটবদ্ধ অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। পরবর্তীতে তাদের সন্তান বায়ুর দেবতা এনলিল জন্ম নেওয়ার পর এক বিশাল মহাজাগতিক কুঠারের সাহায্যে পিতা আন এবং মাতা কি-কে আলাদা করে ফেলেন।

এনলিলের এই বলপ্রয়োগের ফলে পৃথিবী নিচে সমতল রূপ লাভ করে, আর আন চলে যান একেবারে ওপরের দিকে। স্বর্গের এই সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান নেওয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন মহাবিশ্বের চূড়ান্ত অধিপতি। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে আকাশ আসলে একটি কঠিন গম্বুজ, যা পৃথিবীকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। আন-এর সিংহাসন সেই গম্বুজের একেবারে সর্বোচ্চ বিন্দুতে স্থাপিত। সেখান থেকে তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর নজর রাখেন। আন-এর এই উৎপত্তি এবং অবস্থান সুমেরীয় বিশ্বতত্ত্বের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। প্রাচীন মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল উপাদানগুলোর – যেমন বাতাস বা জল – পেছনে একটি অপরিবর্তনীয় এবং স্থির আশ্রয় দরকার। আকাশের বিশালতা এবং স্থিরতা তাদের মনে সেই স্থায়িত্বের ধারণা দিয়েছিল। মেঘ আসে এবং যায়, ঝড় ওঠে আবার থেমে যায়, কিন্তু আকাশ সবসময় তার নিজের জায়গায় অবিচল থাকে। আন ঠিক সেই অবিচল স্থায়িত্বের প্রতীক ছিলেন। তিনি প্রতিদিনের তুচ্ছ ঘটনায় মাথা ঘামাতেন না, বরং পুরো মহাবিশ্বের ভারসাম্য ধরে রাখতেন।

দেবতাদের পিতা হিসেবে আন-এর সম্মান ছিল সবার ওপরে। সুমেরীয় প্যান্থিয়ন বা দেবমণ্ডলীর প্রায় সমস্ত প্রধান দেবতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আন-এর বংশধর ছিলেন। স্বর্গের দেবতাদের একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে বলা হতো ‘অনুনাকি’ (Anunnaki), যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘আন-এর সন্তানসন্ততি’। এই অনুনাকি দেবতারাই মহাবিশ্বের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করতেন। আন-এর কোনো নির্দিষ্ট জন্মবৃত্তান্ত পুরাণগুলোতে খুব একটা বিস্তারিত পাওয়া যায় না। তিনি যেন সবসময়ই ছিলেন। সৃষ্টির আদিম জলরাশি নাম্মু থেকে তার উদ্ভব হলেও, পরবর্তী পুরাণগুলোতে তাকেই সকল সৃষ্টির আদি কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। আন-এর এই পিতৃত্ব কেবল জন্ম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন ঐশ্বরিক নিয়মের প্রণেতা। সুমেরীয়রা মনে করত যে মহাবিশ্বের সমস্ত আইন, যাকে তারা ‘মে’ (Me) বলত, তার আদি উৎস হলেন আন। তিনি এই নিয়মগুলো তৈরি করে অন্যান্য দেবতাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, যাতে তারা জগত পরিচালনা করতে পারেন। একারণে আন-এর প্রতি অন্যান্য দেবতাদের ভক্তি এবং ভয় দুটোই ছিল।

What is the family tree of the Sumerian gods? - Mythology & Folklore Stack Exchange
সুমেরীয়-আক্কাদীয় দেবমণ্ডলীর বংশতালিকা ও অনুনাকিদের (Anunnaki) গ্র্যান্ড অ্যাসেম্বলির জিনিয়ালজিক্যাল চার্ট, যেখানে আপসু, তিয়ামত, আন (An), কি (Ki), এনলিল, এনকি, ইনান্না প্রমুখ দেবতার পারস্পরিক সম্পর্ক ও মহাজাগতিক প্রশাসনিক কাঠামো উপস্থাপিত হয়েছে; Source: Ancient Near Eastern Texts

নিষ্ক্রিয় ঈশ্বর এবং মহাজাগতিক কর্তৃত্বের প্রকৃতি (The Inactive God and the Nature of Cosmic Authority)

সুমেরীয় ধর্মতত্ত্বের একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো আন-এর নিষ্ক্রিয়তা। স্বর্গের সর্বোচ্চ অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি মহাবিশ্বের দৈনন্দিন পরিচালনায় খুব একটা অংশগ্রহণ করতেন না। ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এ ধরনের দেবতাকে দেউস ওটিওসাস (Deus Otiosus) বা নিষ্ক্রিয় ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আদিম বা সর্বোচ্চ স্রষ্টা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি করার পর বা মূল নিয়মকানুন বেঁধে দেওয়ার পর দৃশ্যপট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্ব তিনি তার অধস্তন দেবতাদের ওপর ছেড়ে দেন। আন-এর চরিত্রটি ঠিক এরকমই ছিল। তিনি বৃষ্টি ঝরাতেন না, ফসলের মাঠ রক্ষা করতেন না, এমনকি মানুষকে জাদুর বিদ্যাও শেখাতেন না। মানুষের প্রতিদিনের জীবনে যে সংকটগুলো আসত, সেগুলোর সমাধানের জন্য মানুষ এনলিল, এনকি বা ইনান্নার মতো সক্রিয় দেবতাদের দ্বারস্থ হতো। আন ছিলেন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে। তার কাছে সরাসরি কোনো কিছু প্রার্থনা করা সাধারণ মানুষের সাধ্যের অতীত বলে মনে করা হতো।

আন-এর এই নিষ্ক্রিয়তা কোনোভাবেই তার ক্ষমতার অভাব প্রমাণ করে না। বাস্তবে এটি ছিল তার চূড়ান্ত ক্ষমতারই এক ধরনের মহাজাগতিক প্রকাশ। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার শাসনকাঠামোর দিকে লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একজন সম্রাট বা সর্বাধিনায়ক নিজে গিয়ে খালের জল বণ্টন করেন না বা যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ সৈনিকের মতো তলোয়ার চালান না। তিনি কেবল রাজপ্রাসাদে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তার নির্দেশনামায় সিলমোহর দেন। আন-এর রাজত্বও ঠিক একইভাবে চলত। তিনি দেবতাদের সভায় সভাপতিত্ব করতেন। যেকোনো বড় সংকটে বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দেবতারা আন-এর কাছে পরামর্শ নিতে যেতেন। আন একবার কোনো কথা বলে দিলে তা আর পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারও ছিল না। সুমেরীয় পরিভাষায় একে বলা হতো ‘আন-এর বাক্য’। এই বাক্য ছিল অলঙ্ঘনীয় এবং চূড়ান্ত। অর্থাৎ, আন সরাসরি কাজ না করলেও তার সম্মতি ছাড়া মহাবিশ্বের একটি পাতাও নড়তে পারত না।

এই ধরনের দূরবর্তী এবং নিষ্ক্রিয় দেবতার ধারণার পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। মানুষ প্রতিনিয়ত দেখত যে প্রকৃতির শক্তিগুলো অনেক সময় তাদের প্রতি চরম বিরূপ আচরণ করছে। কখনো বন্যা এসে সব ভাসিয়ে নিচ্ছে, আবার কখনো মহামারীতে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সক্রিয় দেবতা যেমন এনলিল বা ইশতারকে তারা এই ধ্বংসলীলার জন্য দায়ী করত। তারা মনে করত এই দেবতারা বদমেজাজি এবং খামখেয়ালি। কিন্তু মানুষের মনের গহিনে এমন একজন দেবতার প্রয়োজন ছিল, যিনি এই সব সাময়িক রাগ বা ক্ষোভের ঊর্ধ্বে। আন ছিলেন সেই পরম এবং নিরাবেগ সত্তা। তিনি ধ্বংসের আনন্দে মাততেন না। যখন অন্যান্য দেবতারা মানুষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার করতেন, তখন মানুষ আশা করত যে আন অন্তত তার সুবিচার দিয়ে এই ভারসাম্যহীনতা দূর করবেন। সহজ করে বললে, আন ছিলেন মহাজাগতিক বিচারব্যবস্থার সুপ্রিম কোর্ট। তার কাছে শেষ আশ্রয় হিসেবে যাওয়া যেত। এই দূরবর্তী অবস্থান তাকে মানুষের দৈনন্দিন ক্ষোভ এবং হতাশার লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল এবং প্যান্থিয়নে তার পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল।

উরুক নগরীতে উপাসনা এবং ই-আন্না মন্দিরের ভূমিকা (Worship in Uruk and the Role of the E-anna Temple)

মেসোপটেমিয়ার বুকে প্রথম যে কয়েকটি নগররাষ্ট্র মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, তার মধ্যে উরুক ছিল অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই উরুক নগরীই ছিল আন-এর প্রধান উপাসনা কেন্দ্র। উরুকের কেন্দ্রস্থলে আন-এর উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল এক বিশাল মন্দির এলাকা, যার নাম ছিল ‘ই-আন্না’ (E-anna)। সুমেরীয় ভাষায় এই নামের অর্থ হলো ‘স্বর্গের গৃহ’। প্রাচীন যুগের স্থাপত্যকলার এক বিস্ময়কর নিদর্শন ছিল এই মন্দির। বিশাল সব ইটের গাঁথুনি, রঙিন মোজাইক করা দেয়াল এবং সুউচ্চ জিগুরাত নিয়ে গঠিত ই-আন্না কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় ছিল না। এটি ছিল সমগ্র উরুক শহরের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। হাজার হাজার একর কৃষিজমি এই মন্দিরের মালিকানায় ছিল। সাধারণ কৃষকরা এই জমিতে চাষাবাদ করে ফসলের একটি বড় অংশ আন-এর নামে মন্দিরে জমা দিত। সেই উদ্বৃত্ত ফসল দিয়ে মন্দিরের পুরোহিত, কারিগর এবং আমলাদের ভরণপোষণ চলত। ফলে ই-আন্না মন্দিরটি একাধারে ধর্মীয়, প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

তবে আন-এর উপাসনা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ভক্তি নিবেদনের মতো ছিল না। যেহেতু তিনি ছিলেন একজন দূরবর্তী দেবতা, তাই তার আচার-অনুষ্ঠানগুলো ছিল অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষ ই-আন্নার মূল গর্ভগৃহে প্রবেশ করার সুযোগ পেত না। কেবল উচ্চপদস্থ পুরোহিত এবং রাজারা নির্দিষ্ট কিছু দিনে অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে সেখানে প্রবেশ করতেন। আন-এর উদ্দেশ্যে যে নৈবেদ্য দেওয়া হতো, তা ছিল অন্যান্য দেবতাদের তুলনায় অনেক বেশি রাজকীয়। ইতিহাসবিদরা একে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার স্টেট রিলিজিয়ন (State Religion) বা রাষ্ট্রধর্মের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখেন। রাজারা আন-এর মন্দিরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করতেন এই প্রমাণ করার জন্য যে, স্বর্গের সর্বোচ্চ দেবতা তাদের শাসনকে সমর্থন করেন। বিশেষ করে নববর্ষের উৎসবের সময় আন-এর মন্দিরে বিশাল আয়োজন করা হতো। বিশ্বাস করা হতো যে এই উৎসবের সময় আন এবং অন্যান্য দেবতারা মিলে পুরো শহরের আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করেন।

আকর্ষণীয় একটি ব্যাপার হলো, সময়ের সাথে সাথে উরুক নগরীতে আন-এর প্রভাব কিছুটা কমতে শুরু করে এবং ই-আন্না মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইনান্নার হাতে চলে যায়। পুরাণে এই ক্ষমতা হস্তান্তরের বেশ কিছু রূপক গল্প রয়েছে। একটি গল্পে বলা হয় যে ইনান্না আন-এর কাছ থেকে কৌশল করে মন্দিরের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। আবার অন্য একটি মিথ অনুসারে, আন নিজেই ইনান্নার সাহসিকতা এবং শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে এই মন্দিরের কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তনটি তৎকালীন সমাজের একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে নির্দেশ করে। সমাজ যখন কেবল কৃষিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বাণিজ্য, যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকে ঝুঁকছিল, তখন তাদের আন-এর মতো একজন নিষ্ক্রিয় দেবতার চেয়ে ইনান্নার মতো একজন অত্যন্ত সক্রিয় এবং আক্রমণাত্মক দেবতার বেশি প্রয়োজন ছিল। এরপরও আন-কে উরুক থেকে পুরোপুরি নির্বাসন দেওয়া হয়নি। তিনি সবসময়ই সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে এসেছেন, যদিও উপাসনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে তখন ইনান্না জায়গা করে নিয়েছিলেন।

রাজতান্ত্রিক বৈধতা এবং প্যান্থিয়নে আন-এর ক্রমাবনতি (Monarchical Legitimacy and the Gradual Decline of An in the Pantheon)

সুমেরীয় রাজনৈতিক দর্শনে ক্ষমতার উৎস কোনো মানুষের নিজের বাহুবল বা বংশপরিচয় ছিল না। তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে রাজত্ব করার অধিকার সরাসরি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসে। আর স্বর্গের এই অধিকার বিতরণের একমাত্র মালিক ছিলেন আন। রাজা হওয়ার জন্য আন-এর অনুমোদন ছিল অপরিহার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ডিভাইন রাইট অফ কিংস (Divine Right of Kings) বা রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার বলা হয়। সুমেরীয় মিথলজিতে বলা হয়েছে যে রাজমুকুট, রাজদণ্ড এবং সিংহাসন – এই তিনটি জিনিস সৃষ্টির শুরু থেকেই স্বর্গে আন-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। আন যখন মনে করতেন যে পৃথিবীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো নির্দিষ্ট মানুষের হাতে ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন, তখন তিনি সেই মুকুট ও দণ্ড পৃথিবীতে পাঠাতেন। এই বিশ্বাসের কারণে রাজারা নিজেদের আন-এর সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করতেন। আন-এর নাম যুক্ত করে রাজারা নিজেদের শাসনকে বৈধতা দিতেন, যাতে সাধারণ মানুষ বা অন্য কোনো প্রতিযোগী সিংহাসন দাবি করার সাহস না পায়।

রাজতান্ত্রিক বৈধতার এই প্রধান উৎস হওয়া সত্ত্বেও, আন-এর নিজস্ব রাজনৈতিক এবং মহাজাগতিক ক্ষমতা সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পেতে থাকে। মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল। যখন নিপ্পুর নামের শহরটি ধর্মীয় এবং রাজনৈতিকভাবে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন নিপ্পুরের প্রধান দেবতা এনলিল স্বর্গের কার্যনির্বাহী প্রধানের পদ দখল করে নেন। এনলিল ছিলেন বায়ুর দেবতা, অত্যন্ত রাগী এবং সক্রিয়। সুমেরীয় প্যান্থিয়নে ক্ষমতার এই হাতবদল কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বরং এটি ছিল প্রাচীনকালের পলিটিকাল থিওলজি (Political Theology) বা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের একটি বিবর্তন। আন স্বেচ্ছায় তার কার্যকরী ক্ষমতা এনলিলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আন তখনও সম্মানজনক সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন, কিন্তু নির্দেশ বাস্তবায়নের সমস্ত চাবিকাঠি চলে গিয়েছিল এনলিলের হাতে। রাজারা আন-এর নাম নিতেন ঠিকই, কিন্তু তারা ভয় পেতেন এনলিলকে। কারণ এনলিল চাইলেই ঝড় পাঠিয়ে শহর ধ্বংস করে দিতে পারতেন, যা আন করতেন না।

আন-এর এই ক্রমাবনতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল দেবতাদের মানবিকীকরণ বা অ্যানথ্রোপোমরফিজমের চরম বিকাশ। মানুষ তার দেবতাদের নিজের মতোই আবেগপ্রবণ হিসেবে দেখতে ভালোবাসত। ইনান্না, এনকি বা এনলিল – এদের সবার অসংখ্য রোমাঞ্চকর মিথ বা গল্প ছিল। তারা ভালোবাসত, যুদ্ধ করত, চাতুরী করত এবং বিপদে পড়ত। সাধারণ মানুষ এসব গল্প শুনে দেবতাদের সাথে এক ধরনের মানসিক সংযোগ অনুভব করত। কিন্তু আন-এর চরিত্রটি ছিল একেবারেই নিরস এবং কাঠখোট্টা। তার কোনো নাটকীয় প্রেমের গল্প বা বীরত্বের আখ্যান ছিল না। তিনি কেবল সিংহাসনে বসে থাকতেন। সাহিত্যের বিচারে তার চরিত্রটি খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। ফলে কবি এবং চারণ গায়করা আন-কে নিয়ে খুব বেশি মহাকাব্য বা গান রচনা করেননি। মানুষের দৈনন্দিন আড্ডা এবং গল্প থেকে আন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করেন। তিনি কেবল রাষ্ট্রীয় চুক্তিনামা এবং প্রাচীন শপথবাক্যগুলোতেই বেঁচে ছিলেন। সাধারণ মানুষের মনোজগতে আন-এর জায়গা দখল করে নিয়েছিল আরও অনেক বেশি মানবিক এবং ত্রুটিপূর্ণ দেবতারা।

পৌরাণিক আখ্যান এবং অন্যান্য সংস্কৃতির ওপর আন-এর প্রভাব (Mythological Narratives and An’s Influence on Other Cultures)

আন-কে নিয়ে খুব বেশি নাটকীয় পৌরাণিক গল্প না থাকলেও, মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিথে তার উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো আদাপা (Adapa) নামের এক মানব পুরোহিতের গল্প। আদাপা ছিলেন দেবতা এনকির এক অত্যন্ত অনুগত সেবক। একদিন মাছ ধরার সময় দক্ষিণ দিকের বাতাস আদাপার নৌকা উল্টে দিলে সে রেগে গিয়ে বাতাসের ডানা ভেঙে দেয়। এই ঘটনার বিচার করার জন্য আদাপাকে স্বর্গে আন-এর দরবারে তলব করা হয়। আন প্রথমে খুব রেগে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরে আদাপার প্রজ্ঞা দেখে মুগ্ধ হন। আন আদাপাকে অমরত্বের খাবার এবং জল প্রস্তাব করেন। কিন্তু এনকির পূর্ব-সতর্কবার্তার কারণে আদাপা সেই খাবার খেতে অস্বীকার করে। ফলে মানুষের অমর হওয়ার শেষ সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়। এই মিথটিতে আন-কে একজন পরম বিচারক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। আন ইচ্ছা করলেই মানুষকে অমরত্ব দিতে পারতেন, কিন্তু মানুষের নিজের ভুলের কারণেই তা সম্ভব হয়নি। এটি প্রাচীনকালের মানুষের নশ্বরতাকে মেনে নেওয়ার একটি মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।

বিশ্বসাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন The Epic of Gilgamesh-এও আন-এর একটি ছোট কিন্তু ভয়ংকর ভূমিকা রয়েছে। উরুকের রাজা গিলগামেশ যখন দেবী ইনান্নার (ব্যাবিলনীয় ইশতার) প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, তখন দেবী চরম অপমানিত বোধ করেন। ইনান্না সোজা স্বর্গে পিতা আন-এর কাছে ছুটে যান এবং গিলগামেশকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ‘স্বর্গের ষাঁড়’ (Bull of Heaven) ধার চান। আন প্রথমে রাজি হননি, কারণ তিনি জানতেন এই ষাঁড় পৃথিবীতে গেলে সাত বছরের দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। কিন্তু ইনান্নার জেদ এবং হুমকির মুখে আন শেষ পর্যন্ত ষাঁড়টি পৃথিবীতে পাঠানোর অনুমতি দেন। এই ঘটনাটি আন-এর চরিত্রের একটি দুর্বল দিক উন্মোচন করে। তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান হলেও পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে আদরের মেয়ে ইনান্নার আবদারের কাছে অনেক সময় নতি স্বীকার করতেন। এই ষাঁড়টি ছিল ধ্বংস এবং খড়ার প্রতীক, যা আন-এর মহাজাগতিক নিয়ন্ত্রণের একটি ভয়ানক রূপ।

সুমেরীয় সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরও আন-এর ধারণা অন্যান্য সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। আক্কাদীয় এবং ব্যাবিলনীয়রা আন-কে ‘আনু‘ নাম দিয়ে তাদের প্যান্থিয়নে গ্রহণ করেছিল। তবে আন-এর সবচেয়ে চমকপ্রদ রূপান্তরটি দেখা যায় হুরিয়ান (Hurrian) এবং হিট্টিট (Hittite) পুরাণে। সেখানে আন-কে কুমারবি (Kumarbi) নামক এক দেবতা ক্ষমতাচ্যুত করেন। যুদ্ধে কুমারবি আন-এর যৌনাঙ্গ কামড়ে ছিঁড়ে নেন। এই হিংস্র মিথটি মূলত ক্ষমতার পালাবদলের একটি চরম রূপক। ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে, এই হুরিয়ান মিথটি পরবর্তীতে গ্রিক পুরাণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। গ্রিক পুরাণে আকাশ দেবতা ইউরেনাসকে (Ouranos) তার সন্তান ক্রোনাস (Kronos) ঠিক এভাবেই ক্যাসট্রেট বা খোজাকরণ করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। অর্থাৎ, আন-এর সেই প্রাচীন সুমেরীয় ধারণাটি কেবল মেসোপটেমিয়াতেই আবদ্ধ থাকেনি। ভূমধ্যসাগরের তীরে গড়ে ওঠা পরবর্তীকালের অনেক বড় বড় সভ্যতার সৃষ্টিতত্ত্ব এবং দেবমণ্ডলীর প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে দিয়েছিল সুমেরীয়দের এই নীরব আকাশ দেবতা।

প্রতীকী তাৎপর্য, সংখ্যাতত্ত্ব এবং মহাকাশীয় নিয়ন্ত্রণ (Symbolic Significance, Numerology, and Celestial Control)

প্রাচীন শিল্পকলা এবং সিলমোহরগুলোতে আন-কে সাধারণত মানুষের রূপে খুব একটা উপস্থাপন করা হতো না। তাকে বোঝানোর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতীক ব্যবহার করা হতো। আন-এর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীক ছিল শিংযুক্ত মুকুট। এই মুকুটের ওপরে ষাঁড়ের শিং বসানো থাকত। প্রাচীন কৃষিজীবী এবং পশুপালক সমাজে ষাঁড় ছিল প্রচণ্ড শক্তি, উর্বরতা এবং পুরুষত্বের সর্বোচ্চ প্রতীক। আন-কে স্বর্গের ষাঁড় বা মহাজাগতিক ষাঁড় হিসেবে কল্পনা করা হতো, যার গর্জনে পৃথিবী কেঁপে উঠত। এই শিংযুক্ত মুকুটটি পরবর্তীতে মেসোপটেমিয়ার সমস্ত প্রধান দেবতার ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়। একজন দেবতার মুকুটে যত বেশি শিং থাকত, প্যান্থিয়নে তার মর্যাদা তত বেশি বলে ধরা হতো। আন-এর মুকুটটি ছিল সব মুকুটের আদি রূপ। এছাড়া স্বর্গের সিংহাসন এবং রাজদণ্ডও ছিল আন-এর সরাসরি প্রতীক। যখন কোনো কাদামাটির ফলকে কেবল একটি মুকুট বা সিংহাসনের ছবি আঁকা থাকত, তখন বুঝতে হবে সেখানে আন-এর উপস্থিতি বোঝানো হচ্ছে। এই প্রতীকী উপস্থাপন প্রমাণ করে যে আন কোনো নির্দিষ্ট চেহারায় আবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক সার্বজনীন মহাজাগতিক ধারণার নাম।

সুমেরীয় চিন্তাধারায় গাণিতিক এবং সংখ্যাতাত্ত্বিক শৃঙ্খলার একটি বিশেষ স্থান ছিল। তারা প্রতিটি প্রধান দেবতার জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বরাদ্দ করেছিল। আন-এর সংখ্যা ছিল ৬০। মেসোপটেমিয়ার গণিতে এই ৬০ সংখ্যাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে ষাট-ভিত্তিক গণনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল, তাকে আধুনিক পরিভাষায় সেক্সাজেসিমাল সিস্টেম (Sexagesimal System) বলা হয়। এই পদ্ধতিতে ৬০ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ এবং নিখুঁত চক্রের প্রতীক। আমরা আজও যে এক ঘণ্টাকে ৬০ মিনিটে এবং বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করি, তার মূলে রয়েছে এই সুমেরীয় গাণিতিক ধারণা। আন-কে এই ৬০ সংখ্যাটি দেওয়ার অর্থ হলো, তিনি ছিলেন সমস্ত ক্ষমতার পূর্ণতা এবং মহাবিশ্বের চূড়ান্ত চক্র। ৬০ সংখ্যাটি যেমন অন্য অনেক সংখ্যা দিয়ে বিভাজ্য এবং গাণিতিক হিসাবের ভিত্তি, আন-ও তেমনি সমস্ত দেবতার অস্তিত্বের ভিত্তি ছিলেন। সংখ্যাতত্ত্বের এই ব্যবহার ধর্মকে কেবল আবেগের বিষয় না রেখে একটি যুক্তিনির্ভর এবং গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করিয়েছিল।

মহাকাশ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও আন-এর উপস্থিতি ছিল সর্বব্যাপী। সুমেরীয় এবং পরবর্তী ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশকে তিনটি প্রধান অংশে ভাগ করেছিলেন। আকাশের নিরক্ষীয় বা বিষুবীয় অঞ্চলকে তারা বলত ‘আন-এর পথ’ (The Way of Anu)। এই পথের উত্তরের অংশটি ছিল এনলিলের এবং দক্ষিণের অংশটি ছিল এনকির। আন-এর পথ ধরে যে নক্ষত্রগুলো অবস্থান করত, সেগুলোকে তারা আন-এর মহাজাগতিক সৈন্যবাহিনী মনে করত। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় এই গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর ভাগ্য নির্ণয় করার একটি বিশাল শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল, যাকে অ্যাস্ট্রাল থিওলজি (Astral Theology) বলা হয়। তারা বিশ্বাস করত, আন তার নক্ষত্রের মাধ্যমে পৃথিবীতে বার্তা পাঠান। যদি আন-এর পথে কোনো নক্ষত্রের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যেত, তবে রাজারা চিন্তিত হয়ে পড়তেন এবং আন-কে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশেষ আচার পালন করতেন। আন হয়তো সরাসরি পৃথিবীতে এসে বৃষ্টি দিতেন না, কিন্তু রাতের আকাশে তার এই নিঃশব্দ উপস্থিতি পুরো সমাজকে একটি মহাজাগতিক শৃঙ্খলার জালে আবদ্ধ করে রেখেছিল।

এনলিল: ঝড়ের নিয়ন্তা (Enlil: Controller of Storms)

এনলিল এবং বায়ুর মহাজাগতিক শক্তি (Enlil and the Cosmic Power of Air)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সমতল ভূমিতে দাঁড়িয়ে যখন কেউ দিগন্তের দিকে তাকাত, তখন তার মনে হতো পৃথিবী আর আকাশের মাঝখানে যে বিশাল শূন্যতা, সেখানে একজন প্রচণ্ড শক্তিশালী কেউ বাস করেন। সুমেরীয়দের কাছে এই বিশাল শূন্যতা বা বায়ুমণ্ডল ছিল দেবতা এনলিল (Enlil)-এর বিচরণক্ষেত্র। ‘এন’ মানে হলো প্রভু এবং ‘লিল’ মানে বাতাস বা ঝড়। অর্থাৎ এনলিল হলেন বাতাসের অধিপতি। আকাশ এবং পৃথিবী যখন একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গনাবদ্ধ ছিল, তখন এই এনলিলই তাদের মাঝখানে জায়গা করে নিয়ে প্রাণের জন্য অবকাশ তৈরি করেছিলেন। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে বায়ুর এই উপাদানটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বাতাস যেমন জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে (যদিও তারা তখন অক্সিজেনের কথা জানত না, তারা একে প্রাণের নিশ্বাস ভাবত), তেমনি এই বাতাসই আবার মরুভূমির ধুলোবালি উড়িয়ে এনে জনপদ অন্ধকার করে দিতে পারে। এই দ্বৈত সত্তাই ছিল এনলিলের চরিত্রের মূল ভিত্তি। তিনি একদিকে যেমন শস্যের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিয়ে আসতেন, অন্যদিকে প্রবল ঝড় বা টাইফুন তৈরি করে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতেন। নৃবিজ্ঞানী ব্রনিস্ল ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski) তার ফাংশনালিজম (Functionalism) বা ক্রিয়াবাদী তত্ত্বে যেমনটি বলেছেন, আদিম মানুষ প্রকৃতির এই অনিশ্চিত শক্তিকে বশ করার জন্যই দেবতার ধারণা তৈরি করেছিল।

এনলিলের জন্মকাহিনীটিও বেশ চমকপ্রদ। আকাশ দেবতা আন এবং পৃথিবী দেবী কি-এর মিলনের ফলে তার উদ্ভব ঘটে। জন্মের পর এনলিল অনুভব করেছিলেন যে তাকে একটি সংকীর্ণ জায়গার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। মহাবিশ্ব তখন ছিল একটি জমাটবদ্ধ পর্বতের মতো। এনলিল তার সহজাত শক্তি দিয়ে সেই পর্বতকে চিরে আকাশকে ওপরে এবং পৃথিবীকে নিচে ঠেলে দেন। এই মহাজাগতিক রূপান্তরকে আধুনিক বিজ্ঞানের অ্যাটমোস্ফিয়ারিক প্রেসার (Atmospheric Pressure) বা বায়ুমণ্ডলীয় চাপের একটি প্রাচীন রূপক হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। বাতাস সবসময়ই নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চায়, আর এনলিল ছিলেন সেই প্রসারণের প্রতীক। তিনি যে কেবল বাতাসের দেবতা ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন মহাজাগতিক শৃঙ্খলার প্রধান চালিকাশক্তি। এনলিলকে ছাড়া মহাবিশ্বের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দান করা সম্ভব ছিল না। আকাশ দেবতা আন পরিকল্পনা করতেন, কিন্তু সেই পরিকল্পনাকে ধুলো-মাটির পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করতেন এনলিল। তার এই ভূমিকা তাকে সুমেরীয় প্যান্থিয়ন বা দেবমণ্ডলীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেবতায় পরিণত করেছিল।

মেসোপটেমিয়ার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে বাতাসের গুরুত্ব অপরিসীম। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় হঠাৎ আসা ধূলিঝড় ছিল একটি নিয়মিত আপদ। কৃষকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত মেঘের আশায়, আর সেই মেঘ উড়িয়ে আনার দায়িত্ব ছিল এনলিলের। কিন্তু এনলিল ছিলেন বেশ খামখেয়ালি। তিনি কখনো দয়াময় হয়ে জল ঝরাতেন, আবার কখনো রাগে অন্ধ হয়ে মরুভূমির শুষ্ক লু হাওয়া বইয়ে দিতেন। এই অনিশ্চয়তা সুমেরীয়দের মনে এনলিল সম্পর্কে এক ধরনের ভীতিমিশ্রিত ভক্তি তৈরি করেছিল। তারা এনলিলকে কোনো দয়ালু পরমেশ্বর হিসেবে দেখত না, বরং দেখত একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং কিছুটা বদমেজাজি সম্রাট হিসেবে।  তিনি তার শক্তি দিয়ে অন্যদের শাসন করতেন এবং তার ইচ্ছাই ছিল অলঙ্ঘনীয় আইন। এনলিলের এই প্রবল প্রতাপ সুমেরীয় সমাজের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সামরিক শক্তি এবং কঠোর অনুশাসন (Jacobsen, 1976)।

নিপ্পুর এবং একুর: পৃথিবীর প্রশাসনিক কেন্দ্র (Nippur and Ekur: The Administrative Center of Earth)

সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিপ্পুর (Nippur) কোনোদিন সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে নিপ্পুর ছিল সমস্ত সুমেরীয়দের কাছে পবিত্রতম শহর। এর কারণ হলো, এখানেই ছিল এনলিলের প্রধান উপাসনালয় ‘একুর’ (Ekur)। সুমেরীয় ভাষায় ‘একুর’ মানে হলো ‘পর্বত সদৃশ গৃহ’। এই মন্দিরটি কেবল পূজার স্থান ছিল না, এটি ছিল পুরো মেসোপটেমিয়ার আধ্যাত্মিক রাজধানী। সুমেরীয়রা মনে করত, স্বর্গের দেবতারা যখন পৃথিবীতে নেমে আসেন, তখন তারা নিপ্পুরেই প্রথম পদার্পণ করেন। একুর মন্দিরে বসেই এনলিল দেবতাদের সভা পরিচালনা করতেন এবং পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করতেন। এই মন্দিরটি কেন্দ্র করে যে বিশাল ধর্মীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তাকে থিওক্রেসি (Theocracy) বা ধর্মতন্ত্রের আদিমতম রূপ বলা যেতে পারে। কোনো রাজাই নিজেকে সুমেরীয়দের বৈধ শাসক হিসেবে দাবি করতে পারতেন না, যতক্ষণ না নিপ্পুরের পুরোহিতরা এবং স্বয়ং এনলিল তাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। অর্থাৎ এনলিল ছিলেন রাজাদের রাজা বা ‘কিং-মেকার’।

একুর মন্দিরের কাঠামোটি ছিল স্থাপত্যবিদ্যার এক বিশাল বিস্ময়। এটি ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে যাওয়া একটি বিশাল জিগুরাত ছিল। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে, উঁচু স্থানে দেবতার বাস। যেহেতু নিপ্পুর সমতল ভূমিতে অবস্থিত ছিল, তাই তারা কৃত্রিম পর্বত তৈরি করে এনলিলকে সেখানে আমন্ত্রণ জানাত। মন্দিরের ভেতরে এনলিলের মূর্তিকে অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে রাখা হতো। সেখানে তাকে প্রতিদিন বহুমূল্য খাবার ও পানীয় নিবেদন করা হতো। নৃবিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ (Clifford Geertz) যেমনটি বলেছেন, ধর্মীয় আচারগুলো সমাজের গভীরতম মূল্যবোধগুলোকে প্রতিফলিত করে। এনলিলের সেবায় নিয়োজিত পুরোহিতরা ছিলেন সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা মন্দির সংলগ্ন বিশাল কৃষিজমি এবং শস্যভাণ্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। একুর মন্দিরটি একাধারে একটি ধর্মীয় কেন্দ্র এবং একটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল। এই মন্দিরকেন্দ্রিক অর্থনীতিই সুমেরীয় সভ্যতাকে হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছিল (Stone, 1995)।

নিপ্পুর শহরটি মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য শহরের তুলনায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে ছিল। লাগাশ এবং উম্মার মতো শহরগুলো যখন সীমানা নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো, নিপ্পুর তখন নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসেবে কাজ করত। এটি ছিল দেবতাদের শহর, তাই এখানে যুদ্ধ করা ছিল মহাপাপ। এই রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিপ্পুরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও পরিণত করেছিল। মানুষ বিশ্বাস করত যে এনলিল তার এই শহরকে রক্ষা করছেন। একুর মন্দিরে সংরক্ষিত মাটির ফলকগুলো থেকে জানা যায় যে, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসত মানত করতে এবং দেবতাদের আশীর্বাদ নিতে। এনলিলের এই কেন্দ্রীয় অবস্থান প্রমাণ করে যে, সুমেরীয়রা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত থাকলেও ধর্মীয়ভাবে একটি অভিন্ন সুতোয় গাঁথা ছিল। এনলিল ছিলেন সেই ঐক্যের প্রতীক। তিনি ঝড়ের দেবতা হতে পারেন, কিন্তু তার মন্দির ছিল শান্তির এক অটল স্তম্ভ। এই যে ঝড়ের দেবতার ঘরে শান্তির অন্বেষণ, এটিই ছিল সুমেরীয় ধর্মের এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য।

Enlil in the E-kur - World History Encyclopedia
নিপ্পুরে এনলিলের একুর (Ekur) মন্দির-কমপ্লেক্সের ধ্বংসাবশেষ, যেখানে ‘পর্বত সদৃশ গৃহ’ ধারণার প্রতিফলন হিসেবে কৃত্রিম উঁচু পবিত্র স্থাপত্যরীতি দেখা যায়; এটি সুমেরীয় ধর্মতন্ত্র, মন্দির-অর্থনীতি এবং এনলিলের ‘কিং-মেকার’ কর্তৃত্বের অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য; Source: Wikimedia Commons / archaeological remains of Nippur Ekur complex

মানুষের কোলাহল এবং মহাপ্লাবনের আখ্যান (Human Noise and the Narrative of the Great Flood)

সুমেরীয় পুরাণে এনলিলকে প্রায়শই একজন রাগী এবং মানুষের ওপর বিরক্ত দেবতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো মহাপ্লাবনের কাহিনী। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছিল দেবতাদের পরিশ্রম লাঘব করার জন্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে যায়। চারদিকে কেবল মানুষের কোলাহল আর শোরগোল। এনলিল ছিলেন নিরিবিলি প্রিয় দেবতা। মানুষের এই নিরন্তর হইহুল্লোড় আর চিৎকারে তার ঘুম আসত না। তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে দেবতাদের সভায় প্রস্তাব দিলেন যে, এই অবাধ্য এবং কোলাহলপূর্ণ মানবজাতিকে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। এনলিল মনে করেছিলেন যে মানুষ তাদের সীমা অতিক্রম করছে।

এনলিলের জেদের মুখে অন্যান্য দেবতারাও প্লাবন ঘটাতে রাজি হন। তিনি স্বর্গের দরজা খুলে দিলেন এবং প্রবল বর্ষণ শুরু হলো। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস দুকূল ছাপিয়ে জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। এটি কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না, এটি ছিল এনলিলের মহাজাগতিক ক্রোধ। তবে প্রজ্ঞার দেবতা এনকি এনলিলের এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হতে পারেননি। তিনি গোপনে জিউসুদ্রা (Ziusudra) নামের এক ধার্মিক রাজাকে এই প্লাবনের কথা জানিয়ে দেন এবং তাকে একটি বিশাল নৌকা তৈরি করার পরামর্শ দেন। জিউসুদ্রা সেই নৌকায় চড়ে বেঁচে যান। যখন বন্যা কমল এবং এনলিল দেখলেন যে কিছু মানুষ বেঁচে আছে, তখন তিনি প্রথমে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে কেউ তার আজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে। তবে পরবর্তীতে এনকি তাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, মানুষকে পুরোপুরি ধ্বংস করলে দেবতাদের সেবা করবে কে? এনলিল শেষ পর্যন্ত শান্ত হন এবং জিউসুদ্রাকে অমরত্ব দান করেন।

এই আখ্যানটি মানুষের অস্তিত্বের ভঙ্গুরতা এবং প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে তুলে ধরে। এনলিল এখানে কোনো নীতিমান বিচারক নন, বরং তিনি একজন ক্ষমতাশালী শাসক যার মেজাজ বোঝা কঠিন। মানুষের কোলাহলে তার ঘুম না হওয়াটা একটি প্রতীকী ব্যাপার। এটি নির্দেশ করে যে, মানুষ যখন প্রকৃতির শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে অত্যধিক শোরগোল বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তখন প্রকৃতি তার রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। প্লাবনের এই কাহিনীটি পরবর্তীকালে ব্যাবিলনীয় মহাকাব্য Enuma Elish এবং হিব্রু বাইবেলেও জায়গা করে নিয়েছে। তবে সুমেরীয় সংস্করণে এনলিল ছিলেন এই ধ্বংসযজ্ঞের মূল কারিগর। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে বাতাস এবং জল যখন তার নির্দেশে একসাথে কাজ করে, তখন মানুষের তৈরি দালানকোঠা খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। এই ভয়ংকর রূপটিই এনলিলকে সুমেরীয়দের মনে এক অমলিন ভীতির আসন তৈরি করে দিয়েছিল। মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে তাদের জীবন এনলিলের নিশ্বাসের ওপর ঝুলে আছে (Kramer, 1963)।

এনলিল এবং নিনলিল: নির্বাসন ও প্রেমের পুরাণ (Enlil and Ninlil: The Myth of Exile and Love)

এনলিলের ব্যক্তিগত জীবনও খুব একটা সহজ ছিল না। সুমেরীয় মিথ অনুযায়ী, তিনি নিনলিল (Ninlil) নামের এক তরুণীর প্রেমে পড়েন। কিন্তু এনলিল তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব না দিয়ে জোরপূর্বক (মতান্তরে মোহিত করে) তার সাথে মিলিত হন। দেবতাদের সভার কাছে এই খবর পৌঁছালে তারা এনলিলকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এনলিল যদিও ছিলেন দেবতাদের নির্বাহী প্রধান, কিন্তু সুমেরীয় সমাজে আইন ছিল সবার ঊর্ধ্বে। দেবতারা তাকে নিপ্পুর থেকে নির্বাসিত করেন এবং পাতালপুরী বা ‘কুর্’-এ পাঠিয়ে দেন। এই মিথটি সুমেরীয়দের সামাজিক ও নৈতিক শৃঙ্খলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। এমনকি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী দেবতাও যদি সামাজিক নিয়ম বা নৈতিকতা ভঙ্গ করেন, তাকেও শাস্তি পেতে হবে। একে রাজনৈতিক দর্শনের রুল অফ ল (Rule of Law) বা আইনের শাসনের এক আদিম দৈব সংস্করণ বলা যেতে পারে।

নিনলিল কিন্তু এনলিলকে ছেড়ে দেননি। তিনি এনলিলের খোঁজে পাতালপুরীর দিকে রওনা হন। এনলিল জানতেন যে তার সন্তান যদি পাতালপুরীতে জন্ম নেয়, তবে সে কোনোদিন পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে না। পাতালপুরী ছিল মৃতদের জায়গা, সেখানে প্রাণের কোনো স্থান ছিল না। এনলিল তখন বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে নিনলিলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিবারই নিনলিল তাকে চিনে ফেলেন। এই মিলনের ফলেই জন্ম নেন চন্দ্র দেবতা নান্না (Nanna)। এনলিল কৌশলে নান্নাকে পাতালপুরী থেকে ওপরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন, যাতে সে আকাশে আলো ছড়াতে পারে। এই আখ্যানটি নির্দেশ করে যে, অন্ধকার বা অশুভ শক্তির মাঝেও শুভ এবং জ্যোতির্ময় শক্তির জন্ম হতে পারে। এনলিল এখানে কেবল ঝড়ের দেবতা নন, তিনি একজন পিতা এবং স্বামী হিসেবেও আবির্ভূত হন, যিনি নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করছেন।

পরবর্তীতে এনলিল তার নির্বাসন কাটিয়ে আবার নিপ্পুরে ফিরে আসেন এবং নিনলিলকে তার রানীর মর্যাদা দেন। নিনলিল সুমেরীয় সমাজে একজন অত্যন্ত সম্মানীয় দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাকে বলা হতো ‘বাতাসের দেবী’। নিপ্পুরের একুর মন্দিরে এনলিলের পাশেই নিনলিলের উপাসনালয় ছিল। তাদের এই জুটি সুমেরীয়দের কাছে উর্বরতা এবং মহাজাগতিক ভারসাম্যের প্রতীক ছিল। এনলিলের এই নির্বাসনের গল্পটি মেসোপটেমিয়ার মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি করেছিল যে, ক্ষমতার দম্ভ সবসময় স্থায়ী হয় না। এমনকি সর্বশক্তিমান এনলিলকেও পাতালপুরীর অন্ধকার ধুলোবালি স্পর্শ করতে হয়েছে। এটি ছিল মূলত মানুষের জন্য একটি শিক্ষামূলক আখ্যান, যা শেখাত যে প্রতিটি কাজের জন্য উত্তরদায়ী হতে হয়। এনলিল এবং নিনলিলের এই প্রেম ও বিরহের উপাখ্যানটি সুমেরীয় সাহিত্যের এক অত্যন্ত রোমান্টিক এবং জটিল অধ্যায়।

ভাগ্যলিপি এবং রাজার ক্ষমতার উৎস (Decrees of Fate and the Source of Kingly Power)

সুমেরীয়দের কাছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে দামি জিনিসটি ছিল ‘ট্যাবলেট অফ ডেসটিনিজ’ বা ভাগ্যলিপি। বিশ্বাস করা হতো যে, এই লিপি যার কাছে থাকবে, সে-ই হবে মহাবিশ্বের প্রকৃত পরিচালক। শুরুতে এই লিপি আকাশ দেবতা আন-এর কাছে থাকলেও পরে তা এনলিলের অধিকারে আসে। এনলিল এই লিপিতে যা লিখতেন, তা-ই পৃথিবীতে বাস্তবরূপ পেত। তিনি প্রতি বছর নববর্ষের সময় দেবতাদের সভায় এই লিপিটি সামনে রাখতেন এবং আগামী এক বছরের জন্য প্রতিটি নগররাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন। এই প্রক্রিয়াটিকে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফাটালিজম (Fatalism) বা নিয়তিবাদ বলা যেতে পারে। মানুষ মনে করত যে তাদের চেষ্টা বা পরিশ্রমের চেয়েও এনলিলের কলমের খোঁচায় কী লেখা আছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাগ্যলিপির ওপর নিয়ন্ত্রণই এনলিলকে অন্যান্য দেবতাদের তুলনায় অনেক বেশি অপরাজেয় করে তুলেছিল।

পৃথিবীর রাজাদের জন্য এনলিল ছিলেন পরম বৈধতার উৎস। সুমেরীয় রাজারা নিজেদের লুগাল (Lugal) বা ‘মহা মানুষ’ বলতেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে এনলিল নিপ্পুরে বসে তাদের হাতে রাজদণ্ড তুলে দিয়েছেন। কোনো রাজবংশ যখন পতন ঘটত, তখন বলা হতো যে এনলিল তার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং ভাগ্যলিপিতে অন্য কারো নাম লিখেছেন। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার পালাবদলকে বৈধতা দেওয়ার একটি ধর্মীয় কৌশল। রাজারা এনলিলকে সন্তুষ্ট করার জন্য একুর মন্দিরে প্রচুর উপঢৌকন পাঠাতেন। তারা শিলালিপিতে খোদাই করে রাখতেন যে তারা এনলিলের আশীর্বাদপুষ্ট। সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিউ (Pierre Bourdieu)-এর সিম্বলিক ক্যাপিটাল (Symbolic Capital) বা প্রতীকী পুঁজির তত্ত্ব অনুযায়ী, এনলিলের নাম ব্যবহার করা ছিল রাজাদের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক সম্পদ। এর ফলে তারা সাধারণ মানুষের ওপর শাসন করার নৈতিক অধিকার লাভ করতেন।

এনলিলের এই ক্ষমতা কেবল আশীর্বাদ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি ছিলেন একজন কঠোর শাস্তিদাতা। যদি কোনো রাজা মন্দিরের অমর্যাদা করতেন বা খালের জল নিয়ে অন্যায় করতেন, তবে বিশ্বাস করা হতো যে এনলিল তার শহরে শত্রু বাহিনী পাঠিয়ে দেবেন। সুমেরীয়রা মনে করত যে যুদ্ধ বা বিগ্রহ আসলে এনলিলের একটি বিচার পদ্ধতি। শত্রু সেনারা যখন উর বা উরুক শহর ধ্বংস করত, তখন কবিরা বিলাপ করে লিখতেন যে এনলিল তার ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। এই যে পরাজয়কে দেবতাদের ইচ্ছার সাথে যুক্ত করা, এটি আসলে একটি পরাজিত জাতির জন্য মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি হিসেবে কাজ করত। তারা ভাবত যে তারা বীরত্বের অভাবে হারেনি, বরং স্বর্গের সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে ছিল। এনলিল এভাবেই সুমেরীয়দের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সামাজিক বিবর্তনের প্রধান নিয়ন্তা হয়ে উঠেছিলেন। তার প্রবল প্রতাপ মেসোপটেমিয়ার ধূলিকণায় আজও মিশে আছে।

এনকি: প্রজ্ঞা ও জলের রক্ষক (Enki: Guardian of Wisdom and Water)

এনকি এবং পাতালস্থ আবজুর মিঠা জলের আধিপত্য (Enki and the Dominion of the Subterranean Sweet Water Abzu)

মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা টিকে থাকার মূল ভিত্তি ছিল জল। শুষ্ক এবং প্রায় বৃষ্টিহীন একটি অঞ্চলে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছুই নদীর জলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সুমেরীয়রা জলের এই অপরিহার্য শক্তিকে দেবতা এনকি (Enki)-র মাঝে কল্পনা করেছিল। সুমেরীয় ভাষায় ‘এন’ শব্দের অর্থ প্রভু এবং ‘কি’ শব্দের অর্থ পৃথিবী। আক্ষরিক অর্থে তাকে পৃথিবীর প্রভু বলা হলেও, মূলত তিনি ছিলেন পৃথিবীর নিচে বহমান মিঠা জলের দেবতা। প্রাচীনকালের মানুষ বিশ্বাস করত যে সমতল পৃথিবীর ঠিক নিচে এক বিশাল এবং অসীম মিঠা জলের আধার রয়েছে, যার নাম আবজু (Abzu)। নদী, হ্রদ বা কুয়ো খুঁড়লে যে জল পাওয়া যায়, তা এই আবজু থেকেই উৎসারিত হয়। সমুদ্রের লবণাক্ত জলের সাথে এই মিঠা জলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। লবণাক্ত জলকে তারা ধ্বংসাত্মক মনে করত, অন্যদিকে আবজুর মিঠা জল ছিল জীবনদায়ী। এনকি এই আবজুতে তার বিশাল প্রাসাদে বাস করতেন এবং সেখান থেকেই পুরো পৃথিবীর জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতেন। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, সেচের জন্য খালের জলের সুষম বণ্টন – সবকিছুর পেছনেই এনকির অদৃশ্য হাত কাজ করত।

বাতাস ও ঝড়ের দেবতা এনলিল যেখানে ছিলেন ধ্বংসাত্মক এবং বদমেজাজি, এনকির চরিত্র ছিল ঠিক তার বিপরীত। এনলিল যদি হঠাৎ বয়ে যাওয়া প্রবল বন্যা বা টাইফুন হন, তবে এনকি হলেন খালের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা শান্ত এবং নিয়ন্ত্রিত জলের ধারা, যা ফসলের মাঠকে বাঁচিয়ে রাখে। এই শান্ত স্বভাবের কারণেই এনকিকে প্রজ্ঞার দেবতা হিসেবে মান্য করা হতো। জলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তা যেকোনো বাধা এড়িয়ে নিজের পথ খুঁজে নিতে পারে। জল কখনো কঠোরভাবে আঘাত করে না, বরং নীরবে সমস্ত কাঠিন্যকে ক্ষয় করে দেয়। সুমেরীয় চিন্তাবিদরা জলের এই ভৌত বৈশিষ্ট্যকে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির সাথে তুলনা করেছিলেন। তাদের চোখে প্রজ্ঞা হলো সেই মানসিক তরলতা, যা যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে সমাধান বের করতে সক্ষম। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে কসমোলজিক্যাল ডুয়ালিজম (Cosmological Dualism) বা মহাজাগতিক দ্বৈতবাদের একটি রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে এনলিলের কঠোর এবং পেশিশক্তির্ভর শাসনের বিপরীতে এনকির ধীরস্থির এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে।

আবজুতে অবস্থান করার কারণে এনকিকে পাতালপুরীর অনেক গভীর রহস্যের অধিকারক মনে করা হতো। তিনি কেবল জলের দেবতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ খনিজ সম্পদ এবং উর্বরতারও প্রতীক। নদীর পলিমাটি দিয়ে যে উর্বর কৃষিজমি তৈরি হতো, তার পেছনের কারিগর ছিলেন এনকি। সুমেরীয়দের কৃষিনির্ভর সমাজে উর্বরতার এই ধারণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। তারা মনে করত যে এনকি তার আবজু থেকে জল পাঠিয়ে মাটিকে সিক্ত করেন এবং বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটান। জলের সাথে প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টির এই নিবিড় সম্পর্ক মেসোপটেমিয়ার মানুষের জীবনদর্শনের একটি বড় অংশ দখল করে ছিল। তারা বিশ্বাস করত, বুদ্ধি ছাড়া যেমন কোনো সভ্যতা গড়া যায় না, জল ছাড়াও তেমনি কোনো সমাজ বাঁচতে পারে না। এনকি ছিলেন এই দুই অপরিহার্য উপাদানের এক মহাজাগতিক সমন্বয়। জ্যামিতিক বিশ্বতত্ত্বের যে সমতল পৃথিবীর ধারণা সুমেরীয়রা লালন করত, তার নিচে আবজুর এই অনন্ত জলরাশি মূলত একটি সংরক্ষিত সম্পদভাণ্ডার হিসেবে কাজ করত (Jacobsen, 1976)।

Enki and Ninhursag - Mesopotamian Gods & Kings
দেবতা এনকি বা ইয়া (Enki / Ea)-র একটি সিলিন্ডার সিল ইমপ্রেশন, যেখানে তাকে শিঙওয়ালা মুকুট ও স্তরযুক্ত পোশাকে দেখানো হয়েছে এবং তার দেহের পাশ বেয়ে প্রবাহিত জলের ধারা তার আবজু (Abzu), মিঠা জল, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশীল শক্তির ওপর আধিপত্যকে প্রতীকায়িত করেছে; Source: British Museum / Mesopotamian Cylinder Seal Depicting Ea (Enki)

মানবজাতির সৃষ্টি এবং কায়িক শ্রমের অবসান (Creation of Humanity and the End of Physical Labor)

সুমেরীয় পুরাণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলো মানব সৃষ্টির আখ্যান। এই আখ্যানে এনকির ভূমিকা কেবল একজন দেবতার নয়, বরং একজন নিপুণ স্থপতির। পুরাণ অনুসারে, সৃষ্টির আদি পর্বে কোনো মানুষ ছিল না। দেবতাদের নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য কায়িক পরিশ্রম করতে হতো। ছোট এবং মাঝারি স্তরের দেবতারা, যাদের ‘ইগিজি‘ বলা হতো, তারা দিনরাত কৃষিকাজ করতেন, খাল খনন করতেন এবং পাহাড় কাটতেন। দীর্ঘকাল এই অমানবিক পরিশ্রম করার পর তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তারা তাদের কাজ বন্ধ করে দেন এবং প্রধান দেবতা এনলিলের প্রাসাদের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। মহাজাগতিক এই ধর্মঘট স্বর্গে এক বিশাল সংকটের জন্ম দেয়। কাজ বন্ধ থাকায় দেবতাদের খাবারের টান পড়ে। এনলিল তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পেশিশক্তি প্রয়োগ করে এই বিদ্রোহ দমনের কথা ভাবলেও তা সম্ভব হয়নি। তখন সমস্ত দেবতা মিলে আবজুতে ঘুমন্ত প্রজ্ঞার দেবতা এনকির কাছে যান সমাধানের আশায়। এনকি বুঝতে পেরেছিলেন যে বলপ্রয়োগ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না, এর জন্য প্রয়োজন একটি নতুন কাঠামোগত উদ্ভাবন।

এনকি একটি যুগান্তকারী সমাধান বের করলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন এমন একটি নতুন প্রজাতি তৈরি করার, যারা দেবতাদের এই ভারবাহী কাজগুলো স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেবে। এনকির নির্দেশে দেবী নাম্মু এবং জন্মদাত্রী দেবী নিনমাহ কাদামাটি দিয়ে নতুন এই প্রজাতির অবয়ব তৈরি করেন। কিন্তু কেবল কাদা দিয়ে তো আর প্রাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই এনকির পরামর্শে একজন বিদ্রোহী দেবতাকে হত্যা করা হয় এবং তার রক্ত ও বুদ্ধিমত্তা সেই কাদামাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এই মিশ্রণ থেকেই জন্ম নেয় প্রথম মানুষ। এই আখ্যানটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সোশ্যাল স্ট্র্যাটিফিকেশন (Social Stratification) বা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে ধর্মীয় বৈধতা প্রদান করে। এই গল্পটি সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতো যে তাদের জন্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো দেবতাদের – এবং পরোক্ষভাবে দেবতাদের পার্থিব প্রতিনিধি পুরোহিত ও রাজাদের – সেবা করা। শ্রমজীবী মানুষ যখন এই গল্প শুনত, তখন তারা তাদের যন্ত্রণাময় জীবনকে একটি ঐশ্বরিক দায়িত্ব হিসেবে মেনে নিত।

এনকির এই সৃষ্টিপ্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে তিনি কেবল জাদুকর ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী চিন্তাবিদ। তিনি মানুষকে পুরোপুরি দেবতার সমকক্ষ করে তৈরি করেননি। মানুষকে দেওয়া হয়েছিল শ্রম করার ক্ষমতা, কিন্তু অমরত্ব থেকে তাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। কাদামাটি এবং দেবতার রক্তের এই মিশ্রণ মানুষের দ্বৈত সত্তাকে নির্দেশ করে। একদিকে মানুষ মাটির তৈরি বলে নশ্বর এবং জাগতিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ, অন্যদিকে তার ধমনীতে দেবতার রক্ত প্রবহমান থাকায় সে বুদ্ধিমান এবং সৃজনশীল। এনকি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেই তাদের একা ছেড়ে দেননি। তিনি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা সরবরাহ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি মানুষকে কৃষিকাজের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন, লাঙল তৈরি করতে শিখিয়েছিলেন এবং ইটের গাঁথুনি দিয়ে ঘর বানানোর বিদ্যা প্রদান করেছিলেন। এক অর্থে এনকি ছিলেন মানব সভ্যতার আদি শিক্ষক। মানুষের প্রতি তার এই পিতৃসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সুমেরীয় দেবমণ্ডলীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আপন দেবতায় পরিণত করেছিল।

প্রজ্ঞা, জাদুবিদ্যা এবং মে বা সভ্যতার নিয়মকানুনের রক্ষক (Guardian of Wisdom, Magic, and Me or the Rules of Civilization)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় জাদুবিদ্যা কোনো কুসংস্কার বা হাতসাফাই ছিল না। জাদুবিদ্যা ছিল তৎকালীন সমাজের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাশাস্ত্র। আর এই জাদুবিদ্যার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন দেবতা এনকি। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে অনেক সময় মানুষের শরীরে অপদেবতা বা অশুভ শক্তি প্রবেশ করে রোগের সৃষ্টি করে। এই অপদেবতাদের তাড়ানোর জন্য বিশেষ মন্ত্র বা ‘ইনক্যান্টেশন‘ পাঠ করতে হতো। এনকি ছিলেন এই সমস্ত মন্ত্র এবং নিরাময় বিদ্যার আদি রচয়িতা। যখন কোনো মানুষ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ত এবং সাধারণ ওষুধে কাজ হতো না, তখন পুরোহিতরা এনকির কাছে প্রার্থনা করতেন। এনকি তার পুত্র আসাল্লুহি-র মাধ্যমে পৃথিবীতে এই জাদুর বিদ্যা এবং রোগ নিরাময়ের কৌশল প্রেরণ করতেন। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে বলা যেতে পারে প্রাচীনকালের এসোটেরিক নলেজ (Esoteric Knowledge) বা গূঢ় বিদ্যা, যা কেবল বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুরোহিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এনকির এই জাদুকরী ক্ষমতা তাকে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার একজন অন্যতম রক্ষকে পরিণত করেছিল।

এনকির প্রজ্ঞার আরেকটি বড় দিক হলো তিনি ছিলেন ‘মে’ (Me)-এর রক্ষক। মে হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং সভ্যতা পরিচালনার অলঙ্ঘনীয় কিছু ঐশ্বরিক নিয়ম বা ডিক্রি। রাজতন্ত্র, সত্য, ন্যায়বিচার, অস্ত্রনির্মাণ, সঙ্গীত, এমনকি পতিতাবৃত্তির মতো সমাজের প্রতিটি অনুষঙ্গের জন্য আলাদা আলাদা মে ছিল। এই মে-গুলো এনকির আবজুতে সুরক্ষিত থাকত। এনকি তার বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের দেবতাদের কাছে এই মে-গুলো বণ্টন করতেন, যাতে তারা তাদের শহর সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন। মে-এর এই ধারণাটি প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা সভ্যতাকে একটি দৈবপ্রদত্ত প্যাকেজ হিসেবে দেখত, যা মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। এনকি ছিলেন এই প্যাকেজের লাইব্রেরিয়ান বা মহাজাগতিক তত্ত্বাবধায়ক। তিনি নিশ্চিত করতেন যে সভ্যতার নিয়মকানুনগুলো যেন ঠিকভাবে কাজ করে এবং কোনো দেবতা যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন (Black & Green, 1992)।

তবে এনকিকে মাঝে মাঝে এই মে-গুলোর নিয়ন্ত্রণ হারাতেও দেখা গেছে, যা তার চরিত্রের একটি কৌতুকপূর্ণ দিক তুলে ধরে। একটি বিখ্যাত মিথ অনুযায়ী, প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইনান্না একবার এরিদু শহরে এনকির প্রাসাদে বেড়াতে যান। এনকি তাকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানান এবং উভয়ে মদ্যপান করেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এনকি একে একে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ মে ইনান্নাকে উপহার দিয়ে বসেন। ইনান্না দ্রুত সেই মে-গুলো নিয়ে নিজের শহর উরুকের দিকে রওনা হন। এনকির নেশা কাটলে তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি ভয়ানক ভুল করেছেন। তিনি ইনান্নাকে আটকানোর জন্য দানব পাঠান, কিন্তু ইনান্না সফলভাবে মে-গুলো নিয়ে উরুকে পৌঁছান। এই মিথটি মূলত এক শহর থেকে অন্য শহরে ক্ষমতার স্থানান্তরের একটি রূপক কাহিনী। ইতিহাসবিদরা একে কালচারাল ডিফিউশন (Cultural Diffusion) বা সংস্কৃতির বিস্তারের আদিমতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন। এরিদু থেকে উরুকে সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু সরে যাওয়ার ঐতিহাসিক সত্যতাকেই এই গল্পের মাধ্যমে পৌরাণিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এনকি শেষ পর্যন্ত তার ভুল মেনে নেন এবং ইনান্নাকে আশীর্বাদ করেন, যা তার পরমতসহিষ্ণুতার প্রমাণ দেয়।

মহাপ্লাবন থেকে মানবজাতিকে রক্ষা এবং এনলিলের সাথে বৈপরীত্য (Saving Humanity from the Great Flood and the Contrast with Enlil)

সুমেরীয় পুরাণের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় হলো মহাপ্লাবনের কাহিনী, যেখানে এনকি এবং এনলিলের আদর্শগত সংঘাত খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। মানবজাতির কোলাহলে বিরক্ত হয়ে ঝড়ের দেবতা এনলিল যখন দেবতাদের সভায় প্রস্তাব আনেন যে পুরো মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে হবে, তখন এনকি এর তীব্র বিরোধিতা করেন। কিন্তু এনলিল তার রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং অন্যান্য দেবতাদের সমর্থন নিয়ে মহাপ্লাবনের প্রস্তাব পাস করিয়ে নেন। পাশাপাশি তিনি দেবতাদের দিয়ে একটি শপথ করান যে, কেউ যেন এই পরিকল্পনার কথা কোনো মানুষকে না জানায়। এনলিল চেয়েছিলেন পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ যেন বেঁচে না থাকে। এনলিলের এই সিদ্ধান্ত ছিল একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি, যা কোনো দূরদর্শী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তিনি কেবল তার তাৎক্ষণিক বিরক্তি দূর করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু এনকি ছিলেন প্রজ্ঞার দেবতা। তিনি জানতেন যে মানুষকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিলে দেবতাদের নিজেদের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। মানুষ না থাকলে দেবতাদের মন্দিরে ভোগ দেবে কে? এনকি সরাসরি দেবতাদের শপথ ভাঙতে পারতেন না। তাই তিনি একটি অভিনব চাতুর্যের আশ্রয় নিলেন। তিনি জিউসুদ্রা (Ziusudra) নামের এক অত্যন্ত ধার্মিক এবং অনুগত রাজার কুঁড়েঘরের কাছে গিয়ে সরাসরি রাজার সাথে কথা না বলে কুঁড়েঘরের খাগড়ার দেয়ালকে উদ্দেশ্য করে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “হে দেয়াল, শোনো! একটি প্রবল বন্যা আসতে চলেছে, যা সব প্রাণ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। একটি বিশাল নৌকা বানাও এবং তাতে সব প্রাণীর বীজ রক্ষা করো।” জিউসুদ্রা দেয়ালের আড়াল থেকে এই বার্তা শুনতে পান এবং এনকির নির্দেশ মতো একটি বিশাল নৌকা তৈরি করে নিজে এবং পরিবারকে রক্ষা করেন। এনকির এই কাজটি তার তীব্র বুদ্ধিমত্তা এবং নিয়ম ভাঙার শৈল্পিক রূপ তুলে ধরে। তিনি শপথও ভাঙলেন না, আবার মানবজাতিকেও রক্ষা করলেন।

বন্যা যখন শেষ হলো, এনলিল দেখলেন যে একটি নৌকায় কিছু মানুষ বেঁচে আছে। তিনি প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়লেন এবং জানতে চাইলেন কে তার নির্দেশ অমান্য করেছে। এনকি তখন শান্তভাবে এনলিলকে বোঝালেন যে, ঢালাওভাবে সবাইকে শাস্তি দেওয়া কোনো ন্যায়বিচার হতে পারে না। যে পাপ করেছে, কেবল তাকেই শাস্তি দেওয়া উচিত। তদুপরি, এনকি যুক্তি দিলেন যে মানুষ বেঁচে না থাকলে দেবতাদের উপোস করতে হবে। সমাজবিজ্ঞানের র‍্যাশনাল চয়েস থিওরি (Rational Choice Theory) বা যৌক্তিক নির্বাচনের তত্ত্ব অনুযায়ী, এনকির এই যুক্তি ছিল সম্পূর্ণ স্বার্থনির্ভর এবং বাস্তববাদী। এনলিল শেষ পর্যন্ত এনকির যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করেন এবং বুঝতে পারেন যে মানুষের ধ্বংস আসলে দেবতাদের নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে আনত। তিনি জিউসুদ্রাকে অমরত্ব দান করেন। এই আখ্যানটিতে এনকিকে মানুষের চূড়ান্ত ত্রাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে পেশিশক্তি বা ক্ষমতার দম্ভের চেয়ে সূক্ষ্ম বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

এরিদু নগরীর উপাসনা কেন্দ্র এবং স্থাপত্যের ঐশ্বরিক কারিগর (The Worship Center of Eridu and the Divine Architect of Structures)

সুমেরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী এরিদু (Eridu) ছিল পৃথিবীর বুকে স্থাপিত প্রথম নগরী। মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন রাজা-তালিকায় স্পষ্ট লেখা আছে যে, রাজত্ব যখন স্বর্গ থেকে প্রথম পৃথিবীতে নেমে আসে, তখন তা এরিদু শহরেই স্থাপিত হয়েছিল। এই পবিত্র নগরীটি ছিল এনকির নিজস্ব বাসস্থান। পারস্য উপসাগরের খুব কাছে, জলাভূমি এবং নলখাগড়ার বনের মাঝখানে গড়ে ওঠা এই শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান এনকির জলের দেবতা হওয়ার ধারণার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এরিদু শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল এনকির মূল উপাসনালয় ই-আবজু (E-abzu) বা ‘আবজুর গৃহ’। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে দেখা গেছে যে, এই মন্দিরটি হাজার হাজার বছর ধরে একই জায়গায় বারবার সংস্কার করে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে এই মন্দিরটি সরাসরি মাটির নিচের মিঠা জলের স্তরের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এটি কেবল একটি ইটের ইমারত ছিল না, এটি ছিল পাতালপুরীর আবজুর সাথে পৃথিবীর সরাসরি যোগাযোগের একটি প্রবেশদ্বার।

এনকিকে কেবল জলের দেবতা হিসেবেই নয়, বরং সমস্ত কারিগরি বিদ্যার আদি পিতা হিসেবেও মান্য করা হতো। একটি উন্নত শহর তৈরি করার জন্য যে ধরনের কারিগরি জ্ঞান প্রয়োজন – যেমন ইট তৈরি করা, খাল কাটা, ধাতু গলিয়ে অলঙ্কার বানানো, কাঠের কাজ করা – সবকিছুর পেছনে এনকির আশীর্বাদ ছিল। তিনি ছিলেন সমস্ত স্থপতি, সূত্রধর, স্বর্ণকার এবং কারিগরদের পৃষ্ঠপোষক দেবতা। মেসোপটেমিয়ার মতো একটি রুক্ষ পরিবেশে যেখানে পাথর বা কাঠের মতো কাঁচামালের তীব্র অভাব ছিল, সেখানে সামান্য কাদা আর নলখাগড়া দিয়ে এত বড় সভ্যতা দাঁড় করানো চাট্টিখানি কথা ছিল না। এই কারিগরি উৎকর্ষতাকে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে টেকনিক্যাল ডিটারমিনিজম (Technical Determinism) বা প্রযুক্তিগত নির্ধারণবাদের একটি প্রাচীন রূপ হিসেবে দেখা যায়। কারিগররা তাদের প্রতিটি কাজের শুরুতে এনকির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতেন। তারা মনে করত তাদের হাতের দক্ষতা তাদের নিজস্ব নয়, এটি এনকির দেওয়া এক ঐশ্বরিক উপহার (Bottero, 2001)।

সময়ের সাথে সাথে এরিদু শহরটি তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে এবং উরুক বা উরের মতো শহরগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা হারালেও এরিদু তার ধর্মীয় পবিত্রতা কখনো হারায়নি। মেসোপটেমিয়ার পরবর্তী রাজারাও এরিদু শহরে এসে এনকির মন্দিরে সংস্কার কাজ করতেন এবং নিজেদের এনকির সেবক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। কারণ এনকির আশীর্বাদ ছাড়া কোনো রাজার শাসনকেই সম্পূর্ণ বৈধ বলে মনে করা হতো না। এনকির উপাসনা কেবল এরিদুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মেসোপটেমিয়ার প্রতিটি বড় শহরে এনকির উদ্দেশ্যে ছোট ছোট মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। সুমেরীয় পুরাণ অনুসারে তিনি ছিলেন সেই মহাজাগতিক প্রকৌশলী, যিনি আদিম বিশৃঙ্খলা থেকে একটি সুশৃঙ্খল এবং বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করেছিলেন। তার এই গঠনমূলক ভূমিকা সুমেরীয় সভ্যতাকে টিকে থাকার এবং প্রতিনিয়ত নতুন কিছু উদ্ভাবন করার প্রেরণা যুগিয়েছিল।

এনকির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং মানবীয় ত্রুটির প্রতিফলন (Psychological Complexity of Enki and the Reflection of Human Flaws)

সুমেরীয় দেবমণ্ডলীর অন্যান্য দেবতাদের চেয়ে এনকির চরিত্রটি অনেক বেশি বর্ণিল এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল ছিল। তিনি যেমন পরম প্রজ্ঞাবান এবং দয়ালু ছিলেন, তেমনি তার চরিত্রে বেশ কিছু ত্রুটি এবং দুর্বলতাও ছিল। বিশ্ব পুরাণের আলোচনায় এনকিকে অনেক সময় ট্রিকস্টার আর্কিটাইপ (Trickster Archetype) বা চালাক এবং নিয়মভঙ্গকারী সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন না, বরং পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনার জন্য প্রতারণা, কূটবুদ্ধি এবং অনেক সময় অনৈতিক পথের আশ্রয় নিতেন। মহাপ্লাবনের সময় শপথ ভঙ্গ করে জিউসুদ্রাকে বাঁচানোর মতো কাজ তার ট্রিকস্টার চরিত্রের প্রমাণ দেয়। তবে তার এই প্রতারণাগুলো সাধারণত কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তিনি এই পথ বেছে নিতেন। তার চরিত্রটি প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা বুদ্ধিমত্তাকে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা মনে করত না, তারা উপস্থিত বুদ্ধি এবং চাতুর্যকেও প্রজ্ঞার অংশ বলে মানত।

এনকির ব্যক্তিগত জীবনের পৌরাণিক আখ্যানগুলোতেও এই মানবীয় দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। একটি বিখ্যাত মিথ হলো এনকি এবং দেবী নিনহুরসাগের (Ninhursag) গল্প। দিলমুন নামের এক পবিত্র স্বর্গে এনকি বসবাস করতেন, যেখানে কোনো রোগ বা মৃত্যু ছিল না। কিন্তু এনকি সেখানে বেশ কিছু যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তার স্ত্রী নিনহুরসাগের অবর্তমানে নিজের কন্যা, নাতনি এবং প্রপৌত্রীর সাথে মিলিত হন। এই অজাচারের ফলে বেশ কিছু নতুন দেব-দেবীর জন্ম হয়। একপর্যায়ে এনকি নিনহুরসাগের বারণ অমান্য করে কিছু নিষিদ্ধ উদ্ভিদের ফল খেয়ে ফেলেন। এর ফলে এনকির শরীরের আটটি অঙ্গে মারাত্মক রোগ দেখা দেয় এবং তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে একটি শিয়ালের মধ্যস্থতায় নিনহুরসাগ ফিরে আসেন এবং এনকিকে নিরাময় করার জন্য আটজন নতুন দেবী সৃষ্টি করেন। এই আটজন দেবীর মধ্যে একজন ছিলেন ‘নিনতি’ (Ninti), যার নামের অর্থ ‘পাঁজরের দেবী’ বা ‘প্রাণের দেবী’। উল্লেখ্য, এনকির পাঁজরের ব্যথা নিরাময়ের জন্যই নিনতির জন্ম হয়েছিল। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, হিব্রু বাইবেলে আদমের পাঁজর থেকে ইভের জন্মের গল্পের আদি উৎস সম্ভবত এই সুমেরীয় মিথটি (Dalley, 1989)।

এনকির এই ত্রুটিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে নৈতিকভাবে স্খলিত চরিত্রটি তাকে সাধারণ মানুষের অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। তিনি আন বা এনলিলের মতো দূরবর্তী এবং নিরাবেগ দেবতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন দেবতা, যিনি মানুষের মতোই লোভ, মোহ এবং কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে ভুল করতেন এবং আবার সেই ভুলের জন্য শাস্তিও ভোগ করতেন। এনকি মূলত মানুষের সৃজনশীল এবং একই সাথে বিশৃঙ্খল মনের একটি ঐশ্বরিক প্রতিফলন ছিলেন। মানবীয় বুদ্ধিমত্তা যেমন অসাধারণ সব আবিষ্কার করতে পারে, তেমনি ভুল পথে চালিত হলে তা ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। এনকির চরিত্রটি সেই জটিল মনস্তত্ত্বেরই রূপক। তিনি দেখিয়েছিলেন যে নিখুঁত না হয়েও মহৎ হওয়া যায় এবং ভুল করার পরও প্রজ্ঞা দিয়ে সেই ভুলের সংশোধন করা সম্ভব। এই মানবীয় গুণাবলিই এনকিকে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বাস্তবসম্মত দেবতায় পরিণত করেছিল।

ইনান্না: প্রেম ও সংঘাতের দেবী (Inanna: Goddess of Love and Conflict)

ইনান্নার দ্বৈত সত্তা এবং প্রেম ও উর্বরতার দেবী হিসেবে তার ভূমিকা (Inanna’s Dual Nature and Her Role as the Goddess of Love and Fertility)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দেবমণ্ডলী বা প্যান্থিয়নে অসংখ্য দেব-দেবীর বাস ছিল, যাদের প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ক্ষমতা ছিল। এই বিশাল ঐশ্বরিক কাঠামোর মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, গতিশীল এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন দেবী ইনান্না (Inanna)। সুমেরীয় বিশ্বাস ব্যবস্থায় তাকে একাধারে প্রেম, সৌন্দর্য, যৌনতা এবং যুদ্ধের দেবী হিসেবে মান্য করা হতো। একটি চরিত্রের ভেতর প্রেম এবং সংঘাতের মতো দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী উপাদানের এই সহাবস্থান আধুনিক পাঠকের কাছে বৈপরীত্য মনে হতে পারে। তবে প্রাচীন মানুষের জীবনদর্শনে এই দুটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক ছিল। প্রেমের ভেতর যেমন তীব্র আবেগ এবং অধিকার খাটানোর বাসনা থাকে, যুদ্ধের ভেতরও ঠিক একই রকম আগ্রাসন কাজ করে। সুমেরীয়রা ইনান্নার মাঝে প্রকৃতির এই তীব্র এবং অনিয়ন্ত্রিত শক্তিকে কল্পনা করেছিল। সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় এ ধরনের দেবীকে অনেক সময় প্রাইমর্ডিয়াল ফেমিনিন এনার্জি (Primordial Feminine Energy) বা আদিম নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যিনি প্রথাগত নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। ইনান্না আন বা এনলিলের মতো সিংহাসনে বসে নিরবে শাসন করার দেবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন চঞ্চল, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং প্রতিনিয়ত নিজের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশায় মত্ত একজন সত্তা।

উর্বরতার দেবী হিসেবে ইনান্নার ভূমিকা ছিল সুমেরীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলানো খুব সহজ কাজ ছিল না। জলের যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি প্রয়োজন ছিল মাটির উর্বরতা। ইনান্নাকে সেই উর্বরতার চাবিকাঠি মনে করা হতো। কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি বছর বসন্তকালে একটি বিশেষ ধর্মীয় আচারের আয়োজন করা হতো, যাকে ইতিহাসবিদরা সেক্রেড ম্যারেজ (Sacred Marriage) বা পবিত্র বিবাহ প্রথা বলে অভিহিত করেছেন। এই প্রথায় নগররাষ্ট্রের রাজা স্বয়ং দেবতা দুমুজির (Dumuzi) ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন এবং ইনান্নার মন্দিরের প্রধান পুরোহিতকে বিয়ে করতেন। বিশ্বাস করা হতো, এই পবিত্র মিলনের ফলেই পৃথিবীর মাটি উর্বর হবে এবং শস্যের বাম্পার ফলন হবে। দুমুজি ছিলেন মেষপালকদের দেবতা। ফলে এই আচারটি কেবল কৃষিকাজ নয়, বরং পশুসম্পদের বৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য ছিল। মানুষ মনে করত, দেবী খুশি থাকলে সমাজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে, আর তিনি রুষ্ট হলে দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে।

প্রেমের দেবী হলেও ইনান্নাকে প্রথাগত মাতৃরূপী দেবী হিসেবে খুব একটা দেখা যায়নি। তিনি বিবাহিত নারীদের রক্ষাকর্ত্রী বা শান্ত গৃহিণী ছিলেন না। তার প্রেম ছিল প্রবল এবং অনেক ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক। পুরাণগুলোতে তাকে একজন স্বাধীন নারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি নিজের পছন্দের পুরুষকে বেছে নেন এবং প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাকে পরিত্যাগ করেন। নৃবিজ্ঞানের ফেমিনিস্ট থিওলজি (Feminist Theology) বা নারীবাদী ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে ইনান্নাকে অনেক সময় প্রাচীনকালের স্বাধীন নারীসত্তার এক অসামান্য রূপক হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। তিনি পিতৃতান্ত্রিক দেবমণ্ডলীর ভেতরে থেকেও নিজের আলাদা এবং প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। তার এই স্বাধীনতা তৎকালীন সমাজের নারীদের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন নাকি কেবল একটি মহাজাগতিক রূপক, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। এরপরও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইনান্নার চারিত্রিক এই দৃঢ়তা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণ বাস্তব এবং কাছের একজন দেবীতে পরিণত করেছিল। মানুষ তাকে ভয় পেত, আবার একই সাথে তার সাহসিকতার প্রশংসাও করত।

Ereshkigal - World History Encyclopedia
ডানাযুক্ত দেবী ইনান্না (Inanna)-র সঙ্গে সম্পর্কিত বিখ্যাত বার্নি রিলিফ (Burney Relief) বা তথাকথিত “Queen of the Night” ফলক, যেখানে উর্বরতা, দৈবশক্তি, পাতালসংযোগ এবং সুমেরীয়-মেসোপটেমীয় নারী দেবত্বের জটিল প্রতীকী রূপ ফুটে উঠেছে; Source: British Museum

উরুক নগরীতে ই-আন্না মন্দির এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু (The E-anna Temple in Uruk City and the Center of Political Power)

সুমেরীয় সভ্যতার একেবারে আদি পর্বে যে নগররাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি লাভ করেছিল, তার মধ্যে উরুক (Uruk) অন্যতম। এই উরুক নগরীই ছিল দেবী ইনান্নার প্রধান উপাসনা কেন্দ্র। শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ছিল তার বিশাল মন্দির, যার নাম ই-আন্না (E-anna)। সুমেরীয় ভাষায় এই নামের অর্থ হলো ‘স্বর্গের গৃহ’। মজার ব্যাপার হলো, এই মন্দিরটি শুরুতে আকাশের দেবতা আন-এর জন্য নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু কালক্রমে ইনান্না আন-এর কাছ থেকে এই মন্দিরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। পুরাণে এই ক্ষমতা হস্তান্তরের সরাসরি কোনো সংঘাতের কথা উল্লেখ নেই। বরং বলা হয়েছে যে আন নিজেই ইনান্নার গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে এই মর্যাদা দিয়েছিলেন। তবে ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের লেন্স থেকে দেখলে এর একটি ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। উরুক যখন একটি ছোট কৃষিনির্ভর জনপদ থেকে একটি বিশাল এবং শক্তিশালী বাণিজ্য নগরীতে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তখন তাদের একজন নিষ্ক্রিয় দেবতার চেয়ে ইনান্নার মতো একজন গতিশীল এবং আগ্রাসী দেবতার বেশি প্রয়োজন ছিল। নগরায়ণ বা আরবানাইজেশন (Urbanization)-এর এই প্রক্রিয়ায় ইনান্না হয়ে ওঠেন সেই নতুন সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষার উপযুক্ত প্রতীক।

ই-আন্না মন্দির কেবল ধূপ জ্বালানো বা স্তোত্র পাঠের জায়গা ছিল না। এটি ছিল পুরো মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। মন্দিরের অধীনে হাজার হাজার একর আবাদি জমি ছিল, যেখানে অসংখ্য কৃষক কাজ করত। উৎপাদিত ফসলের হিসাব রাখার জন্যই মূলত কিউনিফর্ম লিপির উদ্ভব ঘটেছিল। ইনান্নার পুরোহিতরা এই বিশাল সম্পদের তদারকি করতেন। কারিগররা মন্দিরের ভেতরের কর্মশালায় কাজ করে মৃৎপাত্র, কাপড় এবং ধাতুর অলঙ্কার তৈরি করত। বাণিজ্যের সুবিধার জন্য এই মন্দির থেকে দূরের শহরগুলোতে বণিকদের পাঠানো হতো। অর্থাৎ, ইনান্নার মন্দিরটি ছিল তৎকালীন উরুকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং প্রশাসনিক সচিবালয়ের সম্মিলিত রূপ। প্রাচীনকালের টেম্পল ইকোনমি (Temple Economy) বা মন্দিরভিত্তিক অর্থনীতির সবচেয়ে সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে এই ই-আন্না মন্দিরকে ধরা হয়। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করত যে তাদের সমস্ত সম্পদের মূল মালিক হলেন ইনান্না। তারা কেবল তার জমিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। এই বিশ্বাসটি সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে সুসংগঠিত রাখতে সাহায্য করেছিল।

উরুকের প্রথম দিককার রাজারা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য ইনান্নার আশীর্বাদকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। এনমেরকার বা লুগালবান্দার মতো প্রাচীন রাজারা দাবি করতেন যে তারা ইনান্নার সরাসরি মনোনীত প্রতিনিধি। ইনান্নার সাথে এই রাজনৈতিক সংযোগ রাজাদের একটি আলাদা বৈধতা এনে দিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে পলিটিকাল লেজিটিমেসি (Political Legitimacy) বা রাজনৈতিক বৈধতা বলা হয়। রাজারা যখন যুদ্ধে যেতেন, তারা ইনান্নার নামে শপথ নিতেন। যেহেতু ইনান্না যুদ্ধেরও দেবী ছিলেন, তাই শত্রু শহর দখল করাকে ইনান্নার ইচ্ছার বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা হতো। ইনান্নার চরিত্রটি তাই উরুকের রাজনৈতিক এবং সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি আর কেবল প্রেমের দেবী ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সাম্রাজ্য রক্ষাকারী এবং পথপ্রদর্শক সত্তা, যার ইশারায় পুরো মেসোপটেমিয়ার ভাগ্য নির্ধারিত হতো।

এনকির কাছ থেকে মে বা সভ্যতার নিয়মকানুন ছিনিয়ে আনা (Snatching the Me or the Rules of Civilization from Enki)

ইনান্নার উচ্চাকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং নাটকীয় উদাহরণটি পাওয়া যায় দেবতা এনকির সাথে তার মুখোমুখি হওয়ার পুরাণে। প্রজ্ঞার দেবতা এনকির বাস ছিল এরিদু নগরীতে। তার কাছেই সংরক্ষিত ছিল ‘মে’ (Me) নামের মহাজাগতিক এবং সভ্যতার নিয়মকানুনগুলো। রাজত্ব, সত্য, যুদ্ধ, শান্তি, শিল্পকলা – সবকিছুর পেছনে এই মে কাজ করত। ইনান্না চাইলেন এই মে-গুলোকে যেকোনো মূল্যে উরুক নগরীতে নিয়ে আসতে। তিনি জানতেন, মে ছাড়া উরুক কখনোই মেসোপটেমিয়ার সেরা শহর হতে পারবে না। তাই তিনি এরিদু শহরের দিকে যাত্রা করলেন। এনকি তাকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানালেন এবং প্রচুর খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করলেন। মদ্যপানের এক পর্যায়ে এনকি কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়েন। এই সুযোগটিই ইনান্না কাজে লাগান। তিনি এনকির কাছ থেকে একে একে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ মে উপহার হিসেবে চেয়ে নেন। এনকি ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় তাকে সবই দিয়ে দেন। ইনান্নার এই কৌশল প্রয়োগ প্রমাণ করে যে তিনি কেবল পেশিশক্তিতে বিশ্বাস করতেন না, বরং লক্ষ্য অর্জনের জন্য বুদ্ধিমত্তা এবং চাতুর্যেরও আশ্রয় নিতেন।

মে-গুলো হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই ইনান্না ‘স্বর্গের নৌকা’-তে চড়ে উরুকের দিকে রওনা দেন। এদিকে এনকির নেশা কাটলে তিনি বুঝতে পারেন যে কী মারাত্মক ভুল তিনি করে বসেছেন। সভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলো এখন ইনান্নার হাতে। এনকি দ্রুত তার দানব এবং জলদস্যুদের পাঠান ইনান্নার নৌকা আটকানোর জন্য। কিন্তু ইনান্নাও প্রস্তুত ছিলেন। তার বিশ্বস্ত সেনাপতি এবং মন্ত্রী নিনশুবুরের (Ninshubur) সাহায্যে তিনি এনকির পাঠানো সব আক্রমণ প্রতিহত করেন। একের পর এক বাধা পেরিয়ে ইনান্না অবশেষে বিজয়িনীর বেশে উরুক নগরীতে এসে পৌঁছান। উরুকের মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। এই মে-গুলো পাওয়ার ফলেই উরুক একটি সাধারণ শহর থেকে মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে উন্নত এবং সভ্য নগরীতে পরিণত হয়। এই পুরো মিথটিকে ইতিহাসবিদরা কালচারাল ডিফিউশন (Cultural Diffusion) বা সংস্কৃতির বিস্তারের একটি চমৎকার রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এরিদু ছিল প্রাচীনতম শহর, কিন্তু ধীরে ধীরে তার জৌলুস কমতে থাকে এবং উরুক নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। সভ্যতার এই কেন্দ্র পরিবর্তনের ঐতিহাসিক বাস্তবতাই পৌরাণিক গল্পের মোড়কে এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

এই আখ্যানটিতে ইনান্নার চরিত্রটি ভীষণ পরোক্ষভাবে তৎকালীন সমাজের নারীদের ক্ষমতা কাঠামোর একটি চিত্রও তুলে ধরে। ইনান্না কোনো অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে মে জয় করেননি, তিনি এনকির দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিলেন। পিতৃতান্ত্রিক দেবমণ্ডলীতে একজন নারী দেবতা যখন এক শক্তিশালী পুরুষ দেবতাকে পরাস্ত করেন, তখন তা সাহিত্যের একটি শক্তিশালী বার্তা হয়ে দাঁড়ায়। এনকি পরবর্তীতে তার ভুল মেনে নিয়েছিলেন এবং ইনান্নাকে আশীর্বাদ করেছিলেন, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মে-গুলোর যোগ্য ব্যবহার করার মতো প্রাণশক্তি ইনান্নার ভেতরেই আছে। এই ঘটনার পর প্যান্থিয়নে ইনান্নার মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি আর কেবল একজন স্থানীয় দেবী থাকেননি, তিনি পুরো সুমেরীয় সংস্কৃতির একজন অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি পান। উরুকের মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন সভ্যতার আলো বহনকারী এক অবিসংবাদিত নেত্রী (Kramer, 1963)।

গিলগামেশের মহাকাব্য এবং প্রত্যাখ্যানের মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি (The Epic of Gilgamesh and the Psychological Consequences of Rejection)

বিশ্বসাহিত্যের আদি নিদর্শন The Epic of Gilgamesh-এ ইনান্নার চরিত্রের একটি অত্যন্ত রুদ্র এবং প্রতিশোধপরায়ণ রূপ দেখতে পাওয়া যায়। এই মহাকাব্যের ব্যাবিলনীয় সংস্করণে তাকে ইশতার (Ishtar) নামে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে মূল কাঠামোটি সুমেরীয় ইনান্নারই। উরুকের রাজা গিলগামেশ যখন তার বন্ধু এনকিডুকে সাথে নিয়ে সিডার বনের রাক্ষস হুমবাবাকে হত্যা করে বীরদর্পে শহরে ফেরেন, তখন ইনান্না গিলগামেশের রূপে এবং বীরত্বে মুগ্ধ হন। তিনি গিলগামেশকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং বিনিময়ে তাকে অগাধ সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু গিলগামেশ সেই প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি কেবল প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হননি, ইনান্নার অতীত প্রেমিকদের করুণ পরিণতির কথা একে একে স্মরণ করিয়ে দেন। গিলগামেশ জানান যে, ইনান্না যাকে ভালোবেসেছেন, তাকেই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করেছেন। যেমন মেষপালক দুমুজিকে তিনি পাতালপুরীতে পাঠিয়েছেন, মালিকে ব্যাঙে পরিণত করেছেন এবং ঘোড়াকে চাবুক পেটা করেছেন। গিলগামেশের এই কথাগুলো ছিল একজন ক্ষমতাবান দেবীর জন্য চরম অপমানজনক।

এই প্রত্যাখ্যানের ফলে ইনান্নার ভেতরের ভয়ংকর রূপটি বেরিয়ে আসে। তিনি কোনোভাবেই এই অপমান মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি সোজা স্বর্গে পিতা আন-এর কাছে চলে যান এবং গিলগামেশকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ‘স্বর্গের ষাঁড়’ (Bull of Heaven) ধার চান। আন প্রথমে এই ধ্বংসাত্মক প্রাণীটিকে পৃথিবীতে পাঠাতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু ইনান্না তখন হুমকি দেন যে, যদি তাকে ষাঁড়টি দেওয়া না হয়, তবে তিনি পাতালপুরীর দরজা ভেঙে মৃতদের পৃথিবীতে নিয়ে আসবেন এবং তারা জীবিতদের খেয়ে ফেলবে। রাগের বশবর্তী হয়ে মহাজাগতিক শৃঙ্খলা ধ্বংস করার এই যে মানসিকতা, তা মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় নার্সিসিস্টিক রেজ (Narcissistic Rage) বা আত্মপ্রেমজনিত ক্রোধের একটি প্রাচীন রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিজের ইগোতে আঘাত লাগলে মানুষ বা দেবতা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, ইনান্না তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বাধ্য হয়ে আন তাকে ষাঁড়টি দেন এবং সেটি উরুক নগরীতে নেমে এসে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাতে শুরু করে।

অবশ্য গিলগামেশ এবং এনকিডু মিলে শেষ পর্যন্ত সেই স্বর্গের ষাঁড়টিকেও হত্যা করে ফেলেন। ষাঁড়টি মারা যাওয়ার পর ইনান্না যখন উরুকের দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে শোক এবং ক্ষোভে চিৎকার করছিলেন, তখন এনকিডু ষাঁড়ের ডান ঊরুটি ছিঁড়ে ইনান্নার মুখের দিকে ছুঁড়ে মারেন। এটি ছিল দেবীর প্রতি একজন মরণশীল মানুষের চূড়ান্ত অবজ্ঞা। এই পুরো আখ্যানটি মূলত রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি প্রতিফলন। প্রাচীনকালে পুরোহিতরা রাজাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত। গিলগামেশ কর্তৃক ইনান্নার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান আসলে রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার স্বাবলম্বী হয়ে ওঠারই ইঙ্গিত দেয়। রাজা এখন আর মন্দিরের আজ্ঞাবহ নন, তিনি নিজের শক্তিতে বিশ্বাসী। তবে এই ঘটনার জেরে এনকিডুকে দেবতাদের অভিশাপে প্রাণ হারাতে হয়। ইনান্নার ক্রোধ হয়তো সরাসরি গিলগামেশকে মারতে পারেনি, কিন্তু তা গিলগামেশের জীবনে গভীরতম শোক ডেকে এনেছিল। এটি প্রমাণ করে যে ইনান্নাকে অমান্য করার পরিণাম কখনো সুখকর হতে পারে না (George, 2003)।

পাতালপুরীতে অবতরণ এবং মহাজাগতিক রূপান্তরের রূপক (Descent to the Underworld and the Metaphor of Cosmic Transformation)

ইনান্নাকে নিয়ে রচিত সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দার্শনিক দিক থেকে গভীরতম মিথটি হলো তার পাতালপুরীতে অবতরণের কাহিনী। সুমেরীয়রা পাতালপুরীকে বলত ‘কুর্’ (Kur), যার শাসক ছিলেন ইনান্নার বড় বোন দেবী এরেসকিগাল (Ereshkigal)। ইনান্না সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি স্বর্গের পাশাপাশি পাতালপুরীতেও নিজের ক্ষমতা বিস্তার করবেন। তিনি চমৎকার পোশাক ও অলঙ্কারে সেজে পাতালপুরীর দিকে রওনা হন। তবে তিনি জানতেন যে এই যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই তিনি তার মন্ত্রী নিনশুবুরকে বলে যান যে, যদি তিনি তিন দিনের মধ্যে ফিরে না আসেন, তবে যেন সে প্রধান দেবতাদের কাছে সাহায্য চায়। পাতালপুরীতে প্রবেশের সময় ইনান্নাকে সাতটি দরজা পার হতে হয়। প্রত্যেক দরজায় পাহারাদাররা তার শরীর থেকে একটি করে রাজকীয় পোশাক বা অলঙ্কার খুলে নেয়। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি এরেসকিগালের সিংহাসনের সামনে পৌঁছান, তখন তিনি সম্পূর্ণ নগ্ন এবং ক্ষমতাহীন। এরেসকিগাল এবং পাতালপুরীর বিচারকরা তার দিকে মৃত্যুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং ইনান্না একটি মৃতদেহে পরিণত হন। তার মৃতদেহটি একটি হুকের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

এই মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের আখ্যানটিকে মিথলজির পণ্ডিতরা মিথ অফ দ্য ডাইং গড (Myth of the Dying God) বা মৃত্যুবরণকারী দেবতার মিথ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কৃষিনির্ভর সমাজে ঋতুর পরিবর্তনের সাথে এই মিথটি গভীরভাবে যুক্ত। গ্রীষ্মের খরায় যখন ফসল শুকিয়ে যায়, তখন মনে করা হয় যে উর্বরতার দেবী মারা গেছেন বা পাতালপুরীতে বন্দী আছেন। তিন দিন পার হওয়ার পর নিনশুবুর যখন এনকির কাছে সাহায্য চান, তখন এনকি তার নখের ময়লা থেকে দুটি ছোট প্রাণী তৈরি করে তাদের পাতালপুরীতে পাঠান। তারা এরেসকিগালের মন গলিয়ে ইনান্নার মৃতদেহের ওপর জীবনদায়ী জল ও খাবার ছিটিয়ে তাকে জীবিত করে তোলে। ইনান্না পুনর্জীবন লাভ করেন ঠিকই, কিন্তু পাতালপুরীর নিয়ম অনুযায়ী কাউকে সেখান থেকে বের হতে হলে তার বদলে অন্য কাউকে সেখানে রেখে যেতে হয়। ইনান্না যখন পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তখন পাতালপুরীর রাক্ষসরা তার পিছু নেয় একজন বদলি খোঁজার জন্য।

ইনান্না তার বিশ্বস্ত মন্ত্রী নিনশুবুর বা অন্যান্য দেবতাদের এই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু যখন তিনি তার শহর উরুকে ফেরেন, তখন দেখেন তার স্বামী দুমুজি তার জন্য শোক করার বদলে রাজকীয় পোশাক পরে সিংহাসনে বসে আছেন। এই দৃশ্য দেখে ইনান্না প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তিনি রাক্ষসদের নির্দেশ দেন দুমুজিকে ধরে পাতালপুরীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। দুমুজি অনেক চেষ্টা করেও এই ভাগ্য থেকে পালাতে পারেন না। পরে দুমুজির বোন দেবী গেসতিনান্না প্রস্তাব দেন যে, বছরের অর্ধেক সময় তিনি পাতালপুরীতে থাকবেন এবং বাকি অর্ধেক সময় দুমুজি থাকবেন। এভাবেই ঋতুচক্রের একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়। ইনান্নার এই অবতরণ মিথটি কেবল ঋতু পরিবর্তন নয়, বরং মানুষের আত্মিক রূপান্তরেরও প্রতীক। এটি বোঝায় যে, প্রকৃত প্রজ্ঞা বা পুনর্জন্ম লাভের জন্য মানুষকে তার সমস্ত অহংকার এবং বাহ্যিক আবরণ ত্যাগ করে একবার মৃত্যুর অন্ধকারে প্রবেশ করতে হয় (Dalley, 1989)।

দেবী থেকে ইশতার: সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রভাব (From Goddess to Ishtar: Cultural Evolution and Historical Impact)

সুমেরীয় সভ্যতা যখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হতে শুরু করে এবং আক্কাদীয়দের উত্থান ঘটে, তখন ইনান্নার চরিত্রের সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটে। আক্কাদীয় সম্রাট সারগনের মেয়ে এনহেদুয়ানা (Enheduanna) ছিলেন উর শহরের প্রধান পুরোহিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এনহেদুয়ানাই হলেন পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লেখক, যার নাম আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারি। তিনি ইনান্নাকে নিয়ে বেশ কিছু অসাধারণ স্তোত্র রচনা করেছিলেন। এই স্তোত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি সুমেরীয় ইনান্না এবং আক্কাদীয়দের দেবী ইশতারকে (Ishtar) একই সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। ধর্মের সমাজতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে কালচারাল অ্যাসিমিলিয়েশন (Cultural Assimilation) বা সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ বলা হয়। এনহেদুয়ানার এই বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ফলে ইনান্না কেবল একটি নির্দিষ্ট শহরের দেবী থেকে পুরো মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সার্বজনীন দেবীতে পরিণত হন। ইশতার হিসেবে তার যুদ্ধের দিকটি আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে, যা আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের সামরিক প্রসারের সাথে পুরোপুরি মানানসই ছিল।

ইশতার নামে তিনি পরবর্তী ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যেও সমানভাবে পূজিত হতে থাকেন। অ্যাসিরীয় রাজারা যখন পাশ্ববর্তী দেশগুলো দখল করতে যেতেন, তারা ইশতারের নামে যুদ্ধযাত্রা করতেন। তাকে তারা ‘রণক্ষেত্রের রানি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তার এই ব্যাপক প্রভাব কেবল মেসোপটেমিয়াতেই আটকে থাকেনি। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে তার ধারণাটি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফিনিশীয়দের কাছে তিনি পরিচিত হন আসতার্তে (Astarte) নামে। অনেকেই মনে করেন যে, প্রাচীন গ্রিকদের প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির (Aphrodite) ধারণার পেছনেও এই ইনান্না বা ইশতারের বিশাল প্রভাব রয়েছে। যদিও আফ্রোদিতির চরিত্রে যুদ্ধের দিকটি প্রায় অনুপস্থিত, কিন্তু প্রেম, যৌনতা এবং উর্বরতার যে আদিম ধারণা ইনান্না তৈরি করেছিলেন, তা প্রাচীন বিশ্বের প্রায় সমস্ত সংস্কৃতিতেই কোনো না কোনোভাবে টিকে ছিল। একটি স্থানীয় কৃষিজীবী সমাজের দেবী কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্য এবং সংস্কৃতির মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, ইনান্না তার এক বিস্ময়কর উদাহরণ।

আধুনিক যুগে এসেও ইনান্নার আকর্ষণ খুব একটা কমেনি। প্রাচীন সাহিত্য এবং পুরাণ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের কাছে তিনি প্রতিনিয়ত গবেষণার নতুন খোরাক জুগিয়ে যাচ্ছেন। তার মিথগুলো যেমন প্রাচীন মানুষের ঋতুচক্র বা কৃষিকাজ বোঝার চেষ্টা তুলে ধরে, তেমনি তা মানুষের মনের অন্ধকার এবং জটিল দিকগুলোও উন্মোচন করে। তিনি ক্ষমতার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারতেন, আবার ভালোবাসার জন্য পাতালপুরীতে নেমে যেতেও দ্বিধা করতেন না। ভালো এবং মন্দের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখায় তাকে আটকে রাখা যায় না। তিনি ছিলেন স্রেফ এক অদম্য প্রাণশক্তি। সুমেরীয়রা তাদের চারপাশের ভয়ংকর সুন্দর প্রকৃতিকে ঠিক যেভাবে উপলব্ধি করেছিল, ইনান্নার চরিত্রটি ঠিক তারই এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সহস্রাব্দ পেরিয়ে আজ হয়তো ই-আন্না মন্দিরের কোনো অস্তিত্ব নেই, কিন্তু মানব ইতিহাসের প্রথম প্রেম ও যুদ্ধের দেবী হিসেবে তার আখ্যানগুলো আজও সাহিত্যের পাতায় অমলিন হয়ে আছে।

To Stand in the Presence of the Ancients! – Enheduanna, Part 1 by Janet Maika’i Rudolph – Feminism and Religion
সিংহের ওপর দণ্ডায়মান ডানাযুক্ত দেবী ইনান্না (Inanna) বা ইশতার (Ishtar)-এর প্রাচীন মেসোপটেমীয় প্রতিরূপ, যেখানে যুদ্ধ, রাজকীয় ক্ষমতা, উর্বরতা এবং নারী দৈবশক্তির সমন্বিত প্রতীকী রূপ প্রকাশিত হয়েছে; Source: Oriental Institute Museum Collections

মানবসৃষ্টির পেছনের মিথ (The Myth Behind the Creation of Human)

দেবতাদের কায়িক শ্রম ও মহাজাগতিক অস্থিরতা (Physical Labor of the Gods and Cosmic Instability)

সুমেরীয়দের জীবন দর্শনে মানুষের উপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। মহাবিশ্বের আদি লগ্নে যখন স্বর্গ ও মর্ত্য আলাদা হয়েছে মাত্র, তখন পৃথিবীতে কোনো মানুষ ছিল না। আধুনিক বিবর্তনবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আসার হাজার হাজার বছর আগে সুমেরীয়রা তাদের নিজস্ব ধরনে মানুষের অস্তিত্বের কারণ ব্যাখ্যা করেছিল। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই সুদূর অতীতে দেবতাদের নিজেদের জীবনধারণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিসের অববাহিকায় যে বিশাল সেচ নালা বা খালের জাল আমরা দেখি, সুমেরীয়রা মনে করত এগুলো প্রথম খনন করেছিলেন স্বয়ং দেবতারা। দেবতাদের এই গোষ্ঠীকে দুই ভাগে ভাগ করা হতো – উচ্চপদস্থ ‘অনুনাকি’ এবং নিম্নপদস্থ ‘ইগিজি’ (Igigi)। এই ইগিজি দেবতারা ছিলেন মূলত কায়িক শ্রমের দায়িত্বে। তাদের দিন কাটত মাটি কেটে খাল বানাতে, শস্য উৎপাদন করতে এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার ভৌত কাঠামো ধরে রাখতে। এই পরিস্থিতিটিকে সমাজবিজ্ঞানের সোশ্যাল হায়ারার্কি (Social Hierarchy) বা সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটি আদিরূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে (Kramer, 1963)।

দেবতারা অমর হতে পারেন, কিন্তু সুমেরীয় পুরাণে তাদের মানবিক গুণাবলি ও সীমাবদ্ধতা ছিল স্পষ্ট। তাদেরও খিদে পেত, ক্লান্তি আসত। তারা কেবল ধ্যানে মগ্ন থাকতেন না, বরং কৃষিকাজের মতো ঘাম ঝরানো শ্রমে যুক্ত ছিলেন। এই যে দেবতার শ্রম প্রদানের ধারণা, এটি নির্দেশ করে যে সুমেরীয়রা পৃথিবীকে একটি বিশাল কর্মশালা মনে করত। ইগিজি দেবতারা টানা আড়াই হাজার বছর ধরে এই পরিশ্রম করেছিলেন। কিন্তু এক সময় তাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। তারা অনুভব করেন যে এই অনন্ত শ্রমের কোনো শেষ নেই। কাদার ঝুড়ি মাথায় নিয়ে চলা আর খালের গভীরতা বাড়ানো তাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। এই পর্যায়টিকে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে থিওক্র্যাটিক ফাংশনালিজম (Theocratic Functionalism) হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সচল রাখার জন্য যে পরিমাণ শ্রমের প্রয়োজন ছিল, তা দেবতাদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিল।

শ্রমের এই আধিক্য দেবতাদের মধ্যে এক গভীর অসন্তোষের জন্ম দেয়। তারা তাদের কাস্তে ও ঝুড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেন। এনলিলের প্রাসাদের সামনে গিয়ে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। এই বিক্ষোভ কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না, এটি ছিল মহাজাগতিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, স্বয়ং এনলিল ভয়ে তার প্রাসাদের দরজা বন্ধ করে দেন। দেবতাদের এই অস্থিরতা প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা তাদের দেবতাদের কোনো নিখুঁত বা অভ্রান্ত সত্তা হিসেবে দেখেনি। দেবতারাও সংকটে পড়েন, তারাও ভুল করেন। এই মহাজাগতিক অস্থিরতাই শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত করে। তারা বুঝতে পারেন যে একটি বিকল্প শ্রমশক্তির প্রয়োজন, যারা দেবতাদের এই বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। এই ভাবনা থেকেই মানবসৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, যেখানে ধর্মীয় আখ্যানের আড়ালে মূলত শ্রম বিভাজনের একটি কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে ছিল (Dalley, 1989)।

ইগিজি দেবতাদের বিদ্রোহ এবং এনকির কৌশল (The Rebellion of the Igigi and Enki’s Strategy)

দেবতাদের বিদ্রোহ যখন চরমে পৌঁছালো, তখন মহাবিশ্বের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। এনলিল প্রচণ্ড রেগে গেলেন। তিনি চাইলেন বিদ্রোহীদের কঠোর শাস্তি দিতে। কিন্তু বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি, আর তাদের অভিযোগও ছিল যৌক্তিক। এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে প্রজ্ঞার দেবতা এনকি (Enki) এগিয়ে এলেন। এনকি জানতেন যে পেশিশক্তি দিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি কাঠামোগত সমাধান। তিনি দেবতাদের সভায় একটি প্রস্তাব দিলেন। এনকি বললেন যে দেবতাদের এই কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য একটি নতুন সত্তা তৈরি করা সম্ভব। দেবতারা তাদের শ্রম থেকে মুক্তি পাবেন, আবার একটি নতুন প্রজাতি তাদের আজীবন সেবা করবে। এনকির এই চাতুর্যপূর্ণ সমাধান দেবতাদের ক্ষোভ শান্ত করল।

এনকি কেবল প্রস্তাব দিয়ে ক্ষান্ত হননি, তিনি সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও পদ্ধতির কথা জানালেন। তিনি পাতালস্থ আবজুর মিঠা জল এবং পৃথিবীর মাটি ব্যবহার করে এক নতুন দেহ তৈরির পরিকল্পনা করলেন। সুমেরীয় পুরাণ Enki and Ninmah এবং Atrahasis-এ এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। এনকি এখানে একজন জাদুকরের চেয়েও বেশি একজন প্রকৌশলী বা স্থপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি জানতেন যে মাটির শরীরে প্রাণের সঞ্চার করতে হলে কেবল দৈহিক কাঠামো যথেষ্ট নয়, এর সাথে ঐশ্বরিক কোনো উপাদান প্রয়োজন। এনকির এই কৌশলটি ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি বিদ্রোহ প্রশমন করলেন এবং একই সাথে দেবতাদের জন্য একদল অনুগত ভৃত্য তৈরির পথ পরিষ্কার করলেন। এই যে সমস্যার সমাধান হিসেবে নতুন কোনো সত্তার উদ্ভাবন, এটি তৎকালীন সুমেরীয়দের উদ্ভাবনী মনস্তত্ত্বেরই প্রতিফলন।

এনকির এই কৌশলের পেছনে আরেকটি সূক্ষ্ম দিক ছিল। তিনি চাইলেন মানুষের রক্তে এমন কিছু মেশাতে যা তাদের বুদ্ধিমত্তা দেবে কিন্তু তারা যেন দেবতাদের সমকক্ষ হতে না পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ছিল এনকির মূল চ্যালেঞ্জ। বিদ্রোহীরা যখন এনকির পরিকল্পনা শুনল, তারা খুশি মনে কাজে ফেরার শর্ত দিল। এনকি দেবী নাম্মু (Nammu) এবং জন্মদাত্রী দেবী নিনমাহ (Ninmah)-কে সাথে নিয়ে সৃষ্টির কাজ শুরু করেন। সৃষ্টির এই আখ্যানটি মূলত এক ধরনের ইউটিলিটারিয়ানিজম বা উপযোগবাদকে সমর্থন করে। মানুষের সৃষ্টি এখানে কোনো ভালোলাগা বা ভালোবাসার ফসল ছিল না, এটি ছিল স্রেফ প্রয়োজনীয়তা মেটানোর একটি হাতিয়ার। সুমেরীয়দের এই বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ধর্মীয় দর্শনকে অন্য অনেক সভ্যতা থেকে আলাদা করে রাখে। সেখানে মানুষের জন্ম হয়েছে দেবতাদের ক্লান্তি দূর করার জন্য, কোনো স্বর্গীয় বাগান পাহারা দেওয়ার জন্য নয় (Lambert & Millard, 1969)।

La Creación del Universo y del Hombre – ReydeKish – Historias de la Antigüedad
এনকি (Enki) এবং নিনমাহ (Ninmah)-কে ঘিরে সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের প্রতীকী দৃশ্য, যেখানে দেবীয় হস্তক্ষেপ, উর্বরতা, এবং মানবসৃষ্টির আচারসংক্রান্ত মোটিফ একত্রে ফুটে উঠেছে; এ ধরনের সিলমোহর বা রিলিফে এনকি-নিনমাহ মিথের কেন্দ্রীয় ধারণা – কাদা, ঐশ্বরিক শক্তি, এবং দেবতাদের শ্রম লাঘবের জন্য মানুষের সৃষ্টিকে – চিত্ররূপে প্রকাশ করা হতো। Source: Oriental Institute Museum – Sumerian Relief Plaque (Enki and Ninmah Theme).

রক্ত ও মাটির রসায়ন: সৃষ্টির উপাদান (Chemistry of Blood and Clay: Elements of Creation)

মানুষ তৈরির জন্য এনকি যে উপাদানগুলো বেছে নিয়েছিলেন, তা সুমেরীয় বিশ্বতত্ত্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি চাইলেন পৃথিবীর মাটি এবং মৃত দেবতার রক্তের মিশ্রণে এক নতুন সত্তা তৈরি করতে। এর জন্য একজন দেবতাকে উৎসর্গ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। পুরাণ অনুযায়ী, এনলিলের নির্দেশে ‘ওয়ে-ইলু’ (We-ilu) নামের একজন বিদ্রোহী দেবতাকে হত্যা করা হয়। এই দেবতাকে বেছে নেওয়ার পেছনে একটি কারণ ছিল – ওয়ে-ইলু ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন। তার রক্তে ছিল প্রজ্ঞা এবং সাহসের ছোঁয়া। এনকি চাইলেন মানুষের মাঝে এই প্রজ্ঞা থাকুক যাতে তারা দেবতাদের আদেশ বুঝতে পারে এবং সুচারুভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু একই সাথে সেই রক্তে যেন দেবতাদের অমরত্ব না থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ম্যাটেরিয়ালিস্টিক কসমোগনি (Materialistic Cosmogony) হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে সৃষ্টির জন্য বস্তুগত উপাদানের পাশাপাশি একটি বিমূর্ত প্রাণের উৎস প্রয়োজন (Jacobsen, 1976)।

মাটি বা কাদা ছিল সুমেরীয়দের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কাদা দিয়ে ইট বানাত, বাড়ি তৈরি করত, এমনকি লিখতও কাদা মাটির ফলকে। তাই স্রষ্টা যখন মানুষ বানাচ্ছেন, তখন তিনি প্রিয় উপাদান কাদাকেই বেছে নিলেন। আবজুর মিঠা জলে ভেজা সেই মাটির সাথে যখন মৃত দেবতার রক্ত মেশানো হলো, তখন মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হলো একটি আত্মিক সত্তা বা ‘ইটেম্মু’ (Etemmu)। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে মানুষের যে বুদ্ধিবৃত্তি বা প্রজ্ঞা, তা আসলে সেই উৎসর্গকৃত দেবতার দান। কিন্তু সেই সাথে মানুষের শরীরে মাটির নশ্বরতাও মিশে আছে। এই দ্বৈত সত্তা – ঐশ্বরিক রক্ত এবং নশ্বর মাটি – মানুষের জীবনকে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। তারা দেবতাদের মতো ভাবতে পারে, কিন্তু দেবতাদের মতো চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে না। এটি মূলত মানুষের অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়ার একটি দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করে।

এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সেই সময়ে সম্ভব ছিল না ঠিকই, তবে উপাদানের এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক জেনেটিক্সের ভাষায় বললে, রক্ত যেমন বংশগতির বাহক, সুমেরীয়রা তেমনি রক্তকে ঐশ্বরিক গুণাবলির বাহক মনে করত। অন্যদিকে মাটি ছিল স্থায়িত্ব এবং ভৌত কাঠামোর প্রতীক। এনকি যখন কাদা মাটির অবয়বে রক্ত ঢালছিলেন, তখন তিনি আসলে একটি জৈবিক ও আধ্যাত্মিক সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করছিলেন। এই রসায়নটি সফল হওয়ার পর সাতজন পুরুষ এবং সাতজন নারী তৈরি করা হয়। তাদের মাধ্যমেই মানবজাতির বিস্তার ঘটে। সুমেরীয়দের এই সৃষ্টিতত্ত্বে কোনো ‘অরিজিনাল সিন’ (Original Sin) বা আদি পাপের ধারণা নেই। মানুষ জন্মগতভাবে পাপী নয়, বরং সে জন্মগতভাবে একজন ভৃত্য। তার অস্তিত্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু তৈরি হয়েছে দেবতাদের সেবার জন্য (Dalley, 1989)।

মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য ও মন্দির অর্থনীতি (The Purpose of Human Existence and Temple Economy)

সুমেরীয় সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার এবং এককেন্দ্রিক। তাদের কাজ ছিল দেবতাদের সেবা করা এবং মহাজাগতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। দেবতারা যখন মানুষকে তাদের কায়িক শ্রমের ভার বুঝিয়ে দিলেন, তখন থেকেই মানুষের হাতে উঠে এলো ‘শুপশিক্কু’ (Shupshikku) বা কাজের ঝুড়ি। এই ঝুড়িটি ছিল মানুষের নিয়তির প্রতীক। সুমেরীয়রা মনে করত, মানুষ পৃথিবীতে এসেছে দেবতাদের জন্য শস্য উৎপাদন করতে, দেবতাদের খাবার ও পানীয় সরবরাহ করতে এবং তাদের জন্য বিলাসবহুল বাসস্থান নির্মাণ করতে। এই বিশ্বাসটি সমাজকে অত্যন্ত শৃঙ্খলিত করে তুলেছিল। প্রতিটি মানুষ জানত যে তার কাজের সাথে সরাসরি স্বর্গের সন্তুষ্টি জড়িত। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটিই ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার টেম্পল ইকোনমি (Temple Economy) বা মন্দির অর্থনীতির মূল স্তম্ভ।

মন্দিরগুলো কেবল প্রার্থনার জায়গা ছিল না, সেগুলো ছিল বিশাল বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক দপ্তর। মন্দিরের অধীনে থাকা হাজার হাজার একর জমিতে সাধারণ মানুষ চাষাবাদ করত। এই উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ দেবতাদের নৈবেদ্য হিসেবে মন্দিরের গুদামে জমা হতো। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে এই শস্য আসলে দেবতাদের খাবার। পুরোহিতরা ছিলেন এই সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক। তারা দেবতাদের পক্ষ থেকে মানুষের শ্রম পরিচালনা করতেন। এই ব্যবস্থাটিকে তাত্ত্বিক লেন্স থেকে থিওক্র্যাটিক ডিরেক্টিভিজম (Theocratic Directivism) হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। অর্থাৎ, ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি বিশাল জন গোষ্ঠীর শ্রমকে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করা হতো। এর ফলে মেসোপটেমিয়ায় প্রথমবার একটি স্থিতিশীল এবং উদ্বৃত্ত সম্পদ ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।

মানুষের এই ভৃত্যসুলভ পরিচয় কিন্তু তাদের মর্যাদাহীন করেনি। বরং তারা নিজেদের দেবতাদের ‘গৃহকর্মী’ হিসেবে মনে করে এক ধরনের গর্ব অনুভব করত। জিগুরাতের বিশাল সিঁড়ি বেয়ে যখন তারা দেবতাদের জন্য ভোগ নিয়ে যেত, তখন তারা নিজেদের মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অংশ মনে করত। এই যে শ্রমকে পবিত্র করার ধারণা, এটিই সুমেরীয় সভ্যতাকে টিকে থাকার শক্তি যুগিয়েছিল। তারা খালের জল বণ্টন থেকে শুরু করে শস্য কাটা পর্যন্ত প্রতিটি কাজকে ধর্মীয় আচারের অংশ করে নিয়েছিল। অর্থাৎ, তাদের কাছে কাজের অভাব মানেই ছিল দেবতার প্রতি অবজ্ঞা। এই কঠোর কর্মতৎপরতা সুমেরীয়দেরকে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত কারিগরি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য এখানে কোনো বিমূর্ত মুক্তি লাভ নয়, বরং একটি সচল এবং উৎপাদনশীল সমাজ টিকিয়ে রাখা, যা পরোক্ষভাবে দেবতাদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে (Kramer, 1963)।

অপূর্ণ সৃষ্টি ও নৈতিকতার অভাব (Imperfect Creations and the Absence of Morality)

সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের একটি খুব চমকপ্রদ দিক হলো মানুষের ‘অপূর্ণতা’। দেবতারা যখন মানুষ বানাচ্ছিলেন, তখন সবকিছুই যে নিখুঁত ছিল তা নয়। এনকি এবং জন্মদাত্রী দেবী নিনমাহ সৃষ্টির সময় একটি খেলা বা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলেন। তারা মদ্যপান করে একে একে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটিপূর্ণ মানুষ তৈরি করতে শুরু করেন। কেউ ছিল অন্ধ, কেউ পঙ্গু, আবার কারো প্রজনন ক্ষমতা ছিল না। এনকি এই প্রতিটি ত্রুটিপূর্ণ মানুষের জন্য সমাজে একটি নির্দিষ্ট স্থান এবং জীবিকার ব্যবস্থা করে দেন। যেমন, অন্ধ মানুষটিকে তিনি একজন দক্ষ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিথটি প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কোনো অভিশাপ হিসেবে দেখত না। বরং তারা মনে করত এটি সৃষ্টিরই একটি অংশ। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে সোশ্যাল ইনক্লুশন (Social Inclusion) বা সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি আদিম রূপ বলা যেতে পারে।

সুমেরীয়দের মানুষের এই সৃষ্টিতত্ত্বে কোনো পরম নৈতিক বিধান বা ‘মোরাল কোড’-এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। মানুষকে ভালো বা মন্দ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তাদের তৈরি করা হয়েছিল কর্মক্ষম হিসেবে। আধুনিক আব্রাহামীয় ধর্মগুলোতে যেমন শয়তান বা মন্দ শক্তির প্রলোভনের কথা বলা হয়, সুমেরীয় পুরাণে তার কোনো প্রতিফলন নেই। মানুষের ভুলগুলো ছিল মূলত তার সীমাবদ্ধতার ফল। যদি কোনো মানুষ অন্যায় করত, তবে তার জন্য জাগতিক আইনের ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু পরকালীন কোনো নরকের আগুনের ভয় ছিল না। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে মৃত্যুর পর সবাইকে ধূসর এবং অন্ধকার পাতালপুরী ‘কুর্’-এ যেতে হবে। সেখানে কোনো পুরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি নির্দেশ করে যে তাদের ধর্ম ছিল অত্যন্ত ইহজাগতিক। তাদের কাছে জীবনের সার্থকতা ছিল দেবতাদের দেওয়া কাজগুলো পৃথিবীতে সঠিকভাবে সম্পন্ন করার মাঝে।

এই নৈতিকতাহীন সৃষ্টিতত্ত্ব মানুষকে এক ধরনের মানসিক মুক্তিও দিয়েছিল। তারা নিজেদেরকে পাপী ভাবত না, বরং ভাবত অসম্পূর্ণ। তারা জানত যে দেবতারাও ভুল করেন, সুতরাং মানুষের পক্ষে নিখুঁত হওয়া অসম্ভব। এনকি এবং নিনমাহ-র সেই প্রতিযোগিতার গল্পটি আসলে মানব বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়ার একটি শৈল্পিক প্রচেষ্টা। সৃষ্টির কারিগররা যখন নিজেরাই নেশাগ্রস্ত হয়ে সৃষ্টি করতে পারেন, তখন সৃষ্টির মধ্যে যে অসংগতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই অসংগতি বা ‘ইমপারফেকশন’কে সুমেরীয়রা জীবনের পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ফলে তাদের সমাজে ত্রুটিপূর্ণ মানুষদের অবহেলার বদলে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজের সুযোগ দেওয়া হতো। এটি সেই প্রাচীনকালের একটি অত্যন্ত অগ্রসর এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয় (Black & Green, 1992)।

অন্য সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ (Impact on Other Cultures and Comparative Analysis)

সুমেরীয়দের এই সৃষ্টিতত্ত্ব মেসোপটেমিয়ার পরবর্তী সভ্যতাগুলোতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে ব্যাবিলনীয়দের Enuma Elish মহাকাব্যে এই গল্পের একটি আরও যুদ্ধংদেহী সংস্করণ পাওয়া যায়। সেখানে দেবতা মারদুক রাক্ষসী তিয়ামাতকে হত্যা করে তার শরীরের অংশ দিয়ে জগত বানান এবং তিয়ামাতের সেনাপতি কিঙ্গুর রক্ত দিয়ে মানুষ তৈরি করেন। সুমেরীয়দের সেই শান্ত এনকির বদলে এখানে একজন বিজয়ী যোদ্ধার রূপ ফুটে ওঠে। কিন্তু মানুষের উদ্দেশ্য সেই একই থাকে – দেবতাদের সেবা করা। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই রূপান্তরকে কালচারাল অ্যাসিমিলিয়েশন (Cultural Assimilation) বা সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ বলা যায়, যেখানে পুরনো মিথকে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢেলে সাজানো হয়েছে।

আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, হিব্রু বাইবেলের Genesis বা আদিপুস্তকের সাথে সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের কিছু কাঠামোগত মিল থাকলেও মৌলিক পার্থক্য অনেক বেশি। বাইবেলে ঈশ্বর মানুষকে নিজের আদলে তৈরি করেন এবং তাকে পৃথিবীর আধিপত্য দেন। কিন্তু সুমেরীয় পুরাণে মানুষ কেবল একজন ভৃত্য। তবে মাটি বা কাদা দিয়ে শরীর বানানোর যে ধারণা, তার আদি উৎস কিন্তু এই সুমেরীয় পুরাণই। মানুষের নশ্বরতা এবং মাটির সাথে তার সম্পর্কের এই ধারণাটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি ধর্মীয় কাঠামোতে স্থায়ীভাবে আসন করে নিয়েছে। নৃবিজ্ঞানী মির্চা এলিয়াদে (Mircea Eliade) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে এই আদিম মিথগুলো পরবর্তীকালের বিশ্বধর্মের বুনিয়াদ তৈরি করে দিয়েছে। সুমেরীয়রা প্রথমবার মানুষকে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও উপাদানের ফ্রেমে বাঁধার চেষ্টা করেছিল।

পরিশেষে বলা যায়, সুমেরীয়দের মানবসৃষ্টির মিথটি ছিল তাদের চারপাশের রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার একটি উপায়। তারা বুঝতে পেরেছিল যে জীবন মানেই নিরন্তর পরিশ্রম। এই পরিশ্রমকে অর্থবহ করার জন্য তারা দেবতাদের শ্রম এবং মানুষের সৃষ্টির কাহিনী বুনেছিল। এটি কোনো আবেগপ্রবণ গল্প ছিল না, এটি ছিল একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং বৈষয়িক ব্যাখ্যা। মানুষ কেন পৃথিবীতে এলো, কেন তাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করতে হয় – এই চিরন্তন প্রশ্নগুলোর উত্তর তারা খুঁজে পেয়েছিল এনকির সেই বুদ্ধিমত্তার মাঝে। আজ আমরা হয়তো বিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে মানুষের উৎপত্তির ব্যাখ্যা করি, কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য নিয়ে যে গভীর জিজ্ঞাসা, তার প্রথম পদচিহ্নগুলো আমরা দেখতে পাই মেসোপটেমিয়ার সেই হাজার বছরের পুরনো ধুলোমলিন ফলকগুলোতে।

জিগুরাত: দেবতাদের পার্থিব আবাস (Ziggurat: Earthly Abode of the Gods)

জিগুরাতের স্থাপত্যশৈলী এবং মহাজাগতিক পর্বতের রূপক (Architectural Style of the Ziggurat and the Metaphor of the Cosmic Mountain)

মেসোপটেমিয়ার সমতল এবং দিগন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক কাঠামোর মাঝে দাঁড়িয়ে প্রাচীন মানুষ সবসময় উচ্চতার একটি মনস্তাত্ত্বিক অভাব অনুভব করত। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় প্রাকৃতিকভাবে কোনো পাহাড় বা পর্বত ছিল না, চারদিকে কেবল পলিমাটির বিশাল প্রান্তর। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে আমরা দেখেছি যে মহাবিশ্বের আদিম রূপ ছিল একটি বিশাল জমাটবদ্ধ পর্বত, যা স্বর্গ এবং মর্ত্যকে একসাথে যুক্ত করে রেখেছিল। প্রকৃতির এই পর্বতহীন সমভূমিতে বসবাস করতে গিয়ে সুমেরীয়রা তাদের দেবতাদের জন্য কৃত্রিম পাহাড় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই কৃত্রিম পাহাড়গুলোই ইতিহাসে জিগুরাত নামে পরিচিত। মাটি থেকে ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে যাওয়া এই বিশাল পিরামিড আকৃতির স্থাপত্যগুলো কেবল ইটের গাঁথুনি ছিল না, এগুলো ছিল তাদের বিশ্বতত্ত্বের এক চাক্ষুষ এবং বাস্তব প্রতিরূপ। সমতল ভূমিতে মানুষ অনুভব করত যে তারা দেবতাদের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তাই উঁচু একটি কাঠামো তৈরি করে তারা মূলত দেবতাদের আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল। তাত্ত্বিক মির্চা এলিয়াদে (Mircea Eliade) তার দর্শনে এই ধরনের পবিত্র উচ্চতাকে অ্যাক্সিস মুন্ডি (Axis Mundi) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই ধারণার মূল কথা হলো, প্রতিটি সভ্যতার এমন একটি কেন্দ্র থাকে যা স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালপুরীকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। জিগুরাত ছিল সুমেরীয় সমাজের সেই মহাজাগতিক কেন্দ্র বা অ্যাক্সিস মুন্ডি, যা পুরো শহরকে একটি আধ্যাত্মিক এবং ভৌত আশ্রয় প্রদান করত।

জিগুরাত নির্মাণের প্রযুক্তিগত দিকটি তৎকালীন মেসোপটেমিয়ার ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার একটি চমৎকার প্রমাণ দেয়। প্রাচীন মিশরে পিরামিড নির্মাণের জন্য প্রচুর পাথরের সরবরাহ ছিল, ফলে তাদের স্থাপত্যগুলো হাজার হাজার বছর ধরে টিকে রয়েছে। বিপরীতে মেসোপটেমিয়ায় পাথরের আকরিক প্রায় ছিলই না। তাদের মূল সম্পদ ছিল নদীর তীরের নরম কাদা মাটি এবং নলখাগড়া। সুমেরীয় স্থপতিরা এই সাধারণ কাদা মাটি ব্যবহার করেই স্থাপত্যকলার এক বিস্ময়কর নিদর্শন তৈরি করেন। তারা রোদে শুকানো ইট দিয়ে জিগুরাতের বিশাল মূল কাঠামোটি তৈরি করতেন। এরপর সেই কাঠামোকে জল এবং আবহাওয়ার ক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য বাইরে থেকে আগুনে পোড়ানো শক্ত ইটের একটি আবরণ দেওয়া হতো। ইটগুলোকে একে অপরের সাথে শক্তভাবে আটকে রাখার জন্য তারা অ্যাসফল্ট বা বিটুমিন নামক এক ধরনের প্রাকৃতিক আলকাতরা ব্যবহার করতেন (Crawford, 2004)। এই বিটুমিনগুলো মাটি খুঁড়ে বের করা হতো এবং এগুলো ইটের গাঁথুনিকে প্রায় জলরোধী করে তুলত। জিগুরাতের দেয়ালগুলো সোজা না তুলে কিছুটা হেলানোভাবে তৈরি করা হতো, যাতে বিশাল এই ইমারতটি তার নিজস্ব ওজনে ভেঙে না পড়ে। প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরে ওঠার জন্য বিশাল এবং প্রশস্ত সিঁড়ি থাকত, যা স্থাপত্যটিকে একটি রাজকীয় গাম্ভীর্য প্রদান করত।

এই বিশাল স্থাপত্যগুলো কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা ছিল না, সময়ের সাথে সাথে এগুলোর আকার এবং জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একেবারে আদিম যুগের জিগুরাতগুলো ছিল কেবল একটি উঁচু মঞ্চের ওপর বসানো ছোট একটি মন্দির। কিন্তু উর-নাম্মুর রাজত্বকালে উর নগরীতে যে জিগুরাতটি নির্মাণ করা হয়, তা ছিল মেসোপটেমিয়ার স্থাপত্যকলার এক স্বর্ণযুগ। উরের জিগুরাতটির ভিত্তিভূমি ছিল আয়তাকার এবং এর তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপ ছিল। সিঁড়িগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যে নিচ থেকে দেখলে মনে হতো এগুলো সোজা স্বর্গে গিয়ে মিশেছে। ওপরের দিকে ওঠার সাথে সাথে প্রতিটি ধাপের আয়তন কমে আসত, যা এর কাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করত। স্থপতিরা দেয়ালের বাইরের অংশে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর ছোট ছোট খাঁজ কেটে দিতেন। এই খাঁজগুলো কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই ছিল না, এগুলো কাঠামোর ওপর রোদের তাপ এবং ছায়ার এক অপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি করত। দূর থেকে দেখলে মনে হতো পুরো ইমারতটি যেন জীবন্ত এবং স্পন্দিত। জিগুরাতের এই স্থাপত্যশৈলী প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা কেবল ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসে মত্ত ছিল না, তারা গাণিতিক হিসাব এবং প্রকৌশল বিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী একটি জাতি ছিল। তাদের এই কৃত্রিম পর্বতগুলো তাদের কায়িক শ্রম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার এক অসামান্য দলিল।

Ziggurat of Ur located in Iraq showcasing ancient Mesopotamian architecture in sunlight
উরের জিগুরাতের পুনর্নির্মিত প্রধান সিঁড়ি ও ধাপভিত্তিক ইট-নির্মিত সম্মুখভাগ, যেখানে স্বর্গমুখী আরোহন, পবিত্র উচ্চতার ধারণা এবং সুমেরীয় স্থাপত্যের প্রকৌশলগত স্থিতি একসাথে ফুটে উঠেছে; এই সিঁড়িপথটি জিগুরাতকে দেবতাদের পার্থিব আবাস এবং মহাজাগতিক সংযোগস্থল হিসেবে বোঝার কেন্দ্রীয় প্রতীক; Source: UNESCO World Heritage / Ziggurat of Ur Archaeological Site
Love and the letter of the law | Resilience
উরের জিগুরাতের পুনর্গঠিত স্থাপত্য পরিকল্পনা, যেখানে ধাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, সামনের র‍্যাম্প, চূড়ার মন্দির এবং বহির্দেয়ালের বিন্যাস দেখানো হয়েছে; এটি সুমেরীয় জিগুরাতকে কৃত্রিম মহাজাগতিক পর্বত (Cosmic Mountain) এবং স্বর্গ – মর্ত্যের সংযোগস্থল হিসেবে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপত্যিক মডেল; Source: Ancient History Encyclopedia / реконструкtion based on archaeological studies of the Ziggurat of Ur

স্বর্গ ও মর্ত্যের সংযোগস্থল হিসেবে পবিত্র পরিসর (The Sacred Space as the Nexus Between Heaven and Earth)

সুমেরীয় ধর্মতত্ত্বে জিগুরাতের ভূমিকা একটি সাধারণ উপাসনালয়ের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং জটিল ছিল। তারা বিশ্বাস করত না যে দেবতারা চিরস্থায়ীভাবে পৃথিবীর বুকে এই মন্দিরগুলোতে বাস করেন। দেবতাদের মূল বাসস্থান ছিল স্বর্গে বা পাতালপুরীতে। জিগুরাত ছিল মূলত তাদের পৃথিবীতে নেমে আসার একটি ট্রানজিট পয়েন্ট বা সংযোগস্থল। স্বর্গের দেবতারা যখন পৃথিবীর বুকে মানুষের নিবেদন গ্রহণ করতে বা শহরের ভাগ্য নির্ধারণ করতে আসতেন, তখন তারা জিগুরাতের একেবারে চূড়ায় অবস্থিত ছোট মন্দিরটিতে প্রথম পদার্পণ করতেন (Jacobsen, 1976)। এই চূড়ার মন্দিরটিকে বলা হতো ‘ওয়েটিং রুম’ বা অপেক্ষার প্রহর। মানুষ বিশ্বাস করত যে, আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে যে বিশাল দূরত্ব, তা কেবল এই জিগুরাতের মাধ্যমেই ঘোচানো সম্ভব। এই পবিত্র পরিসরটি নির্মাণ করে সুমেরীয়রা মহাবিশ্বের দুই বিপরীত মেরুকে একত্রিত করার একটি আধ্যাত্মিক সেতু তৈরি করেছিল। তারা জানত যে দেবতারা সমতল ভূমির কোলাহল পছন্দ করেন না, তাই তাদের জন্য মেঘের কাছাকাছি একটি নির্জন এবং পবিত্র স্থান তৈরি করা হয়েছিল।

এই পবিত্র পরিসরের ধারণাটি সমাজের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি এবং শৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছিল। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খাইম মিরচিয়া এলিয়াদে ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেক্রেড অ্যান্ড প্রোফেন (Sacred and Profane) বা পবিত্র এবং অপবিত্র জগতের যে বিভাজন করেছেন, জিগুরাতের স্থানিক বিন্যাস তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, বাজার, কৃষিকাজ এবং কোলাহল ছিল প্রোফেন বা জাগতিক পরিসর। আর জিগুরাতের বিশাল দেয়ালের ভেতরের অংশটি ছিল সেক্রেড বা পবিত্র পরিসর। এই দুই জগতের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানা ছিল। জিগুরাতের সিঁড়ির নিচের ধাপে সাধারণ মানুষ এসে তাদের নৈবেদ্য জমা দিতে পারত, কিন্তু ওপরের দিকে ওঠার অধিকার সবার ছিল না। ধাপে ধাপে যত ওপরে ওঠা হতো, পবিত্রতার মাত্রা তত বৃদ্ধি পেত। একেবারে চূড়ার মন্দিরটিতে কেবল প্রধান পুরোহিত এবং রাজা প্রবেশ করতে পারতেন। এই স্থানিক বিভাজনটি সাধারণ মানুষের মনে দেবতাদের প্রতি গভীর ভক্তি এবং দূরত্বের এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি করত। তারা জানত দেবতা তাদের শহরেই আছেন, কিন্তু তাকে সরাসরি স্পর্শ করার বা দেখার ক্ষমতা তাদের নেই।

দেবতারা যাতে এই পবিত্র পরিসরে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তার জন্য জিগুরাতের ভেতরে অত্যন্ত বিলাসবহুল আয়োজন রাখা হতো। চূড়ার মন্দিরটিতে একটি বিশাল পালঙ্ক থাকত, যা মূল্যবান কাঠ এবং সোনা দিয়ে মোড়ানো হতো। এছাড়াও দেবতার মূর্তির সামনে প্রতিদিন টাটকা খাবার, সুগন্ধি মদ এবং সেরা মানের মাংস নিবেদন করা হতো। মানুষ মনে করত যে এই পবিত্র স্থানে দেবতারা তাদের নৈবেদ্যর সুবাস গ্রহণ করেন। বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে, যেমন নববর্ষের সময়, জিগুরাতের এই সংযোগস্থলের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যেত। বিশ্বাস করা হতো যে এই দিনে দেবতারা স্বর্গে বসে যে ভাগ্যলিপি তৈরি করেন, তা এই জিগুরাতের মাধ্যমেই পৃথিবীতে কার্যকর হয়। অর্থাৎ, জিগুরাত কোনো মৃত ইমারত ছিল না, এটি ছিল মহাজাগতিক শক্তি আদান-প্রদানের একটি জীবন্ত মাধ্যম। যদি কোনো কারণে জিগুরাত অপরিচ্ছন্ন থাকে বা আচার পালনে ত্রুটি হয়, তবে দেবতারা ক্ষুব্ধ হয়ে স্বর্গ থেকে সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবেন বলে মানুষ গভীরভাবে বিশ্বাস করত। এই পবিত্র পরিসরটি তাই শহরের টিকে থাকার প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হতো (Bahrani, 2017)।

জিগুরাত নির্মাণে সামাজিক সংহতি এবং শ্রমের রাজনৈতিক অর্থনীতি (Social Cohesion in Ziggurat Construction and the Political Economy of Labor)

একটি জিগুরাত নির্মাণ করা কোনো সাধারণ কাজ ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর একটি, যার জন্য প্রয়োজন হতো হাজার হাজার মানুষের একটানা শ্রম। মেসোপটেমিয়ার নগররাষ্ট্রগুলোতে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করার জন্য একটি সুসংগঠিত সমাজ কাঠামোর প্রয়োজন ছিল। রাজা এবং পুরোহিতরা যখন একটি নতুন জিগুরাত নির্মাণের ঘোষণা দিতেন, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এই কাজে অংশগ্রহণ করতে হতো। একে এক ধরনের পবিত্র কর বা ‘করভি লেবার’ হিসেবে গণ্য করা হতো। কৃষকরা তাদের ফসল কাটার মৌসুম শেষ হলে জিগুরাতের জন্য মাটি কাটতে এবং ইট বানাতে আসত। এই সম্মিলিত শ্রম কেবল ইমারত নির্মাণের কাজ করত না, এটি পুরো সমাজকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করত। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে সোশ্যাল কোহেশন (Social Cohesion) বা সামাজিক সংহতির একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক বলা যায়। মানুষ যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের শহরের দেবতার জন্য একটি কৃত্রিম পাহাড় তৈরি করত, তখন তাদের ভেতরের পারস্পরিক ভেদাভেদ অনেক কমে আসত এবং তারা নিজেদের একটি অখণ্ড জনপদ হিসেবে অনুভব করত।

এই বিশাল শ্রমশক্তির জন্য খাদ্যের যোগান দেওয়া ছিল জিগুরাত অর্থনীতির একটি বড় দিক। হাজার হাজার শ্রমিককে প্রতিদিন খাওয়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ উদ্বৃত্ত শস্যের প্রয়োজন হতো। জিগুরাত সংলগ্ন বিশাল গুদামঘরগুলোতে এই শস্য মজুত থাকত। সাধারণ কৃষকরা তাদের জমির উৎপাদিত ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ দেবতার নামে মন্দিরে কর হিসেবে জমা দিত। সেই করের শস্য দিয়েই জিগুরাতের নির্মাণ শ্রমিক, কারিগর এবং আমলাদের বেতন বা রেশন দেওয়া হতো। এই পুরো ব্যবস্থাটিকে প্রাচীনকালের রিডিস্ট্রিবিউটিভ ইকোনমি (Redistributive Economy) বা পুনর্বণ্টনমূলক অর্থনীতির একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখা হয় (Kramer, 1963)। অর্থাৎ, জিগুরাত কেবল একটি ধর্মীয় সৌধ ছিল না, এটি ছিল একটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা সম্পদের কেন্দ্রিকরণ এবং পুনরায় বণ্টনের মাধ্যমে সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করত। এই নির্মাণ প্রকল্পগুলোর কারণেই মেসোপটেমিয়ায় প্রথম দিককার আমলাতন্ত্র এবং হিসাবরক্ষক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যারা কিউনিফর্ম লিপিতে এই সম্পদের সূক্ষ্ম হিসাব লিখে রাখত।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জিগুরাত নির্মাণ ছিল রাজাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে মনুমেন্টাল আর্কিটেকচার (Monumental Architecture) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যেখানে বিশাল ইমারত তৈরি করে শাসক তার শক্তির বৈধতা এবং স্থায়িত্ব প্রমাণ করেন। একজন রাজা যত বড় এবং সুন্দর জিগুরাত তৈরি করতে পারতেন, মানুষের চোখে তিনি তত বেশি ক্ষমতাবান এবং দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট বলে গণ্য হতেন। রাজারা জিগুরাতের ভিত্তিপ্রস্তরের নিচে নিজেদের নাম খোদাই করা তামার পেরেক পুঁতে রাখতেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে যে এই বিশাল ইমারতটি কার নির্দেশে তৈরি হয়েছে। উর-নাম্মু বা শুলগির মতো শক্তিশালী রাজারা জিগুরাত নির্মাণের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধর্মীয় বৈধতার চাদরে মুড়িয়ে নিতেন। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতেন যে এই জিগুরাত নির্মাণ তাদের নিজস্ব কোনো স্বার্থ নয়, বরং এটি দেবতার নির্দেশ। এভাবেই মেসোপটেমিয়ায় ধর্ম এবং রাষ্ট্র একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছিল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই জিগুরাতগুলো।

উপাসনা, আচার এবং পুরোহিততন্ত্রের স্থানিক বিন্যাস (Spatial Layout of Worship, Rituals, and Priesthood)

জিগুরাতের ভেতরের উপাসনা পদ্ধতি এবং আচার-অনুষ্ঠানগুলো ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নাটুকে। এটি কোনো সাধারণ প্রার্থনা সভা ছিল না, বরং এখানে ধর্মীয় আচারগুলোকে একটি মহাজাগতিক নাটকের মতো উপস্থাপন করা হতো। উৎসবের দিনগুলোতে জিগুরাতের বিশাল সিঁড়ি বেয়ে একটি দীর্ঘ মিছিল ওপরের দিকে উঠে যেত। এই মিছিলে থাকতেন প্রধান পুরোহিত, রাজা, সঙ্গীতশিল্পী এবং বলিদানের জন্য আনা পশুরা। সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া এবং বাদ্যযন্ত্রের শব্দের মাঝে এই যাত্রাটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করত। জিগুরাতের ধাপে ধাপে ওঠা ছিল মূলত পার্থিব জগৎ থেকে স্বর্গের দিকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক উত্তরণের একটি প্রতীক। স্তোত্র পাঠ এবং নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে তারা দেবতাদের পৃথিবীতে আহ্বান জানাতেন। প্রতিটি আচার ছিল সময়ের কাঁটায় বাঁধা এবং কঠোর নিয়মের অধীন। সামান্যতম ভুল উচ্চারণ বা আচারের ব্যত্যয় পুরো শহরের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনতে পারে বলে পুরোহিতরা গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন (Bottero, 2001)।

এই বিশাল উপাসনা পদ্ধতি পরিচালনা করার জন্য একটি শক্তিশালী পুরোহিততন্ত্রের প্রয়োজন ছিল, যারা জিগুরাতের ভেতরেই বসবাস এবং কাজ করতেন। পুরোহিতরা কেবল ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, তারা ছিলেন তৎকালীন সমাজের সবচেয়ে শিক্ষিত এবং প্রজ্ঞাবান শ্রেণি। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে এই ব্যবস্থাকে সোশ্যাল স্ট্র্যাটিফিকেশন (Social Stratification) বা সামাজিক স্তরবিন্যাসের চূড়ান্ত রূপ বলা যেতে পারে, যেখানে জ্ঞানের ওপর একচেটিয়া অধিকার পুরোহিতদের সমাজে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছিল। জিগুরাতের নিচের দিকের কক্ষগুলোতে সাধারণ পুরোহিতরা কাজ করতেন, যারা শস্যের হিসাব রাখা, বলিদানের পশু নির্বাচন করা এবং মন্দির পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব পালন করতেন। অন্যদিকে প্রধান পুরোহিত বা অনেক ক্ষেত্রে প্রধান পুরোহিত্রী (যেমন উর শহরের এন-পুরোহিত্রী) জিগুরাতের ওপরের দিকের বিশেষ প্রকোষ্ঠে থাকতেন। তারা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দেবতাদের ইচ্ছা পাঠ করার চেষ্টা করতেন। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে তারা মাথা ঘামাতেন না, তাদের মূল কাজ ছিল রাষ্ট্রের ভাগ্য এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার দিকে নজর রাখা।

জিগুরাতের এই উচ্চতা কেবল উপাসনার জন্যই ব্যবহৃত হতো না, এটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের প্রথম মানমন্দির বা অবজারভেটরি। রাতের পরিষ্কার আকাশে তারা জিগুরাতের চূড়ায় বসে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। সমতল ভূমিতে দৃষ্টি সীমানা সীমিত থাকে, কিন্তু জিগুরাতের ওপর থেকে তারা দিগন্তের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত নক্ষত্রমণ্ডলীর নিখুঁত হিসাব রাখতে পারতেন। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই মূলত মেসোপটেমিয়ায় প্রথম দিককার অ্যাস্ট্রাল থিওলজি (Astral Theology) এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের উদ্ভব ঘটে। পুরোহিতরা বিশ্বাস করতেন যে আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তন মানেই হলো দেবতারা পৃথিবীতে কোনো বার্তা পাঠাচ্ছেন। তারা এই জ্যোতিষ্কগুলোর গতিবিধি লিখে রাখতেন এবং এর ভিত্তিতে রাজাকে যুদ্ধ বা শান্তির পরামর্শ দিতেন। জিগুরাতের এই স্থানিক বিন্যাস প্রমাণ করে যে এটি একই সাথে একটি ধর্মীয় উপাসনালয়, একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং একটি আদিম বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করত, যা সুমেরীয় সমাজকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করত (Frankfort, 1954)।

নগররাষ্ট্রের পরিচয় এবং প্রতিরক্ষায় জিগুরাতের প্রতীকী ভূমিকা (The Symbolic Role of the Ziggurat in the Identity and Defense of the City-State)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র ছিল অসংখ্য ছোট ছোট নগররাষ্ট্রে বিভক্ত। প্রতিটি শহরের একটি নিজস্ব পরিচিতি এবং স্বকীয়তা ছিল, আর এই পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল তাদের জিগুরাত। সুমেরীয়রা নিজেদের কোনো বৃহত্তর সাম্রাজ্যের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিত না, বরং তারা পরিচয় দিত তাদের শহরের দেবতার নামে। উর শহরের মানুষ গর্ব করত তাদের দেবতা নান্নার জিগুরাত ‘ই-তেমেন-নিগুর’ (E-temen-nigur) নিয়ে, আর নিপ্পুর শহরের মানুষের পরিচয়ের কেন্দ্র ছিল এনলিলের জিগুরাত ‘একুর’ (Ekur)। সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধারণাকে সিভিক আইডেন্টিটি (Civic Identity) বা নাগরিক পরিচিতি বলা হয়। দূর থেকে যখন কোনো ব্যবসায়ী বা পরিব্রাজক মরুভূমির বুকে একটি শহরের দিকে এগিয়ে আসতেন, তখন সবার আগে তাদের চোখে পড়ত সেই শহরের জিগুরাতের বিশাল চূড়া। এই চূড়াটি ঘোষণা করত যে এটি একটি সভ্য জনপদ এবং এখানে একজন ক্ষমতাবান দেবতা বাস করেন। জিগুরাতগুলো ছিল প্রাচীন যুগের এক ধরনের লোগো বা প্রতীক, যা প্রতিটি নগররাষ্ট্রকে অন্যের থেকে আলাদা করত।

জিগুরাত কেবল পরিচিতিই দিত না, এটি শহরের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করত। শহরকে রক্ষা করার জন্য চারদিকে বিশাল ইটের দেয়াল তোলা হতো ঠিকই, কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করত যে মূল সুরক্ষা আসে জিগুরাতে বসবাসকারী দেবতার কাছ থেকে। তারা মনে করত, যতক্ষণ জিগুরাতে দেবতার মূর্তির সামনে নিয়মিত বলিদান এবং ভোগ দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো শত্রু বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ শহর ধ্বংস করতে পারবে না। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল এক ধরনের মহাজাগতিক নিরাপত্তা বলয়। যদি কখনো প্রবল বন্যা বা মহামারী আসত, মানুষ মনে করত জিগুরাতের দেবতা তাদের ওপর রুষ্ট হয়েছেন। তখন তারা প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি করে জিগুরাতে নৈবেদ্য পাঠাত। এই বিশ্বাসটি শহরের ভেতরে একটি অদ্ভুত মানসিক শক্তি তৈরি করত। সৈন্যরা যখন শহরের দেয়াল রক্ষা করতে যেত, তারা জানত যে তারা কেবল ইট-পাথরের একটি শহর নয়, বরং তাদের দেবতার নিজস্ব বাসস্থান রক্ষা করতে যাচ্ছে (Roaf, 1990)।

এই প্রতীকী প্রতিরক্ষার ধারণাটি যুদ্ধের সময় চরম পরিণতি লাভ করত। যখন কোনো শত্রু বাহিনী একটি শহর দখল করত, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকত সেই শহরের জিগুরাতটি ধ্বংস করা বা অপবিত্র করা। শত্রু শহরের জিগুরাত ধ্বংস করার মানে ছিল সেই শহরের দেবতাকে পরাজিত করা এবং তার আশ্রয় কেড়ে নেওয়া। জিগুরাত পুড়িয়ে দেওয়া বা দেবতার মূর্তি চুরি করে নিয়ে যাওয়া ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে ভয়ানক মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। সুমেরীয় সাহিত্যে এমন অনেক বিলাপ বা ‘ল্যামেন্টেশন’ পাওয়া যায়, যেখানে কবিরা তাদের জিগুরাত ধ্বংস হওয়ার পর হাহাকার করে লিখছেন যে দেবতা তাদের শহর ছেড়ে চলে গেছেন এবং শহরটি এখন প্রতিরক্ষাহীন। এই আখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে জিগুরাতের অস্তিত্বের সাথে শহরের মানুষের ভাগ্য একই সুতোয় গাঁথা ছিল। একটি জিগুরাত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ ছিল শহরটি বেঁচে আছে, আর এর পতন মানেই ছিল একটি সভ্যতার চূড়ান্ত মৃত্যু।

জিগুরাতের পতন এবং সভ্যতার ইতিহাসে এর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার (The Fall of Ziggurats and Their Cultural Legacy in the History of Civilization)

হাজার হাজার বছর ধরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর একসময় এই বিশাল জিগুরাতগুলোর পতন শুরু হয়। এই পতনের পেছনে কেবল রাজনৈতিক সংঘাত বা যুদ্ধ দায়ী ছিল না, এর একটি বড় পরিবেশগত কারণও ছিল। মেসোপটেমিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত রুক্ষ। বছরের পর বছর প্রখর রোদ, হঠাৎ আসা প্রবল বৃষ্টি এবং টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের বন্যা জিগুরাতের বাইরের ইটের আবরণকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে থাকে। সুমেরীয়রা প্রতিনিয়ত এই ইমারতগুলো সংস্কার করত, কিন্তু যখন তাদের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নতুন সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে, তখন এই বিশাল সংস্কার কাজ আর সম্ভব হয়নি। তাছাড়া নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে অনেক সমৃদ্ধ শহর চিরতরে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। মানুষ যখন শহর ছেড়ে চলে যায়, তখন জিগুরাতগুলোও একা পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রোদে শুকানো ইটগুলো ধীরে ধীরে আবার তাদের আদিম রূপ অর্থাৎ কাদা মাটিতে পরিণত হতে শুরু করে। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন প্রথম এই ধ্বংসস্তূপগুলো আবিষ্কার করেন, তখন সেগুলো কেবল বিশাল মাটির ঢিবির মতো দেখাচ্ছিল।

ভৌত কাঠামোর এই পতন ঘটলেও জিগুরাতের সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার মানব সভ্যতার ইতিহাস থেকে কখনো মুছে যায়নি। সুমেরীয়দের পর ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যগুলো এই স্থাপত্যশৈলী গ্রহণ করেছিল এবং তারা নিজেদের দেবতাদের জন্য আরও বড় বড় জিগুরাত নির্মাণ করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল ব্যাবিলনের জিগুরাত, যার নাম ছিল ‘এতেমেনানকি’ (Etemenanki)। ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে হিব্রু বাইবেলে বা আদিপুস্তকে বর্ণিত টাওয়ার অফ বাবেল (Tower of Babel) বা বাবেল টাওয়ারের মিথটি মূলত এই ব্যাবিলনীয় জিগুরাত থেকেই অনুপ্রাণিত (Dalley, 1989)। বাইবেলের গল্পে মানুষ স্বর্গে পৌঁছানোর জন্য যে বিশাল টাওয়ার তৈরি করতে চেয়েছিল, তা আসলে মেসোপটেমিয়ার জিগুরাত নির্মাণের এই অহংকারী এবং গগনচুম্বী স্থাপত্যেরই একটি ধর্মতাত্ত্বিক সমালোচনা। অর্থাৎ, জিগুরাত তার নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য ধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলোতেও চিরস্থায়ী একটি স্থান করে নিয়েছিল।

আধুনিক যুগে এসেও জিগুরাতের এই উত্তরাধিকার নানাভাবে আমাদের স্থাপত্য এবং চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলে যাচ্ছে। বিশাল আকারের ইমারত তৈরি করে ক্ষমতা প্রদর্শন করা বা আকাশ ছোঁয়ার যে অদম্য আকাঙ্ক্ষা, তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই সুমেরীয় জিগুরাতগুলোর মাধ্যমেই। প্রাচীনকালের সেই স্তরে স্তরে সাজানো পিরামিডগুলোর ছায়া আজও আমরা দেখতে পাই আধুনিক যুগের অনেক মনুমেন্ট এবং গগনচুম্বী অট্টালিকার নকশায়। মানুষ আজও বিশ্বাস করে যে উচ্চতার সাথে ক্ষমতা এবং মহিমার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সুমেরীয়রা মাটির ইট দিয়ে স্বর্গের দেবতাদের পৃথিবীতে নামিয়ে আনার যে অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছিল, তা হয়তো তাদের মহাজাগতিক শূন্যতা পূরণের একটি প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার ফলেই তারা মানব ইতিহাসকে উপহার দিয়েছিল এমন এক স্থাপত্য দর্শন, যা আজও আমাদের বিস্ময়াভিভূত করে। সভ্যতার এই আদিমতম রূপকারদের হাতে গড়া মাটির পাহাড়গুলো তাই কেবল ধ্বংসস্তূপ নয়, এগুলো মানুষের অসীম উদ্ভাবনী ক্ষমতার এক চিরন্তন স্মারক।

পাতালপুরী বা কুর্ (The Underworld or Kur)

পাতালপুরীর ভৌগোলিক অবস্থান ও কুর্-এর মহাজাগতিক ধারণা (Geographical Location of the Underworld and the Cosmic Concept of Kur)

জীবনের শেষ গন্তব্য নিয়ে মানুষের ভাবনার কোনো শেষ নেই। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষেরাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে তাদের এই গন্তব্যের ছবিটি ছিল ঘোর অন্ধকারে ঢাকা। সুমেরীয়রা মৃত্যু পরবর্তী এই জগতকে ডাকত ‘কুর্’ (Kur) নামে। মহাজাগতিক কাঠামোর বর্ণনায় আমরা দেখেছি, তাদের পৃথিবী ছিল একটি সমতল থালার মতো। সেই পৃথিবীর ঠিক নিচে, প্রজ্ঞার দেবতা এনকির আবাসস্থল মিঠা জলের আধার আবজুরও অনেক গভীরে ছিল এই পাতালপুরীর অবস্থান। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত, এই জগতটি সম্পূর্ণভাবে আলোহীন এবং নিস্তব্ধ। সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, বাতাস বয় না। একটি বিশাল এবং অন্তহীন গহ্বর হিসেবে তারা কুর্-কে কল্পনা করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, সুমেরীয় ভাষায় কুর্ শব্দের আদি অর্থ ছিল পাহাড় বা পর্বত। মেসোপটেমিয়ার সমতল ভূমিতে বসবাসকারী মানুষের কাছে দূরের রুক্ষ এবং অনাবৃত পাহাড়গুলো সবসময়ই এক ভীতিকর এবং অপরিচিত জগত হিসেবে বিবেচিত হতো। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এই অজানা পাহাড়ের ধারণাই রূপান্তরিত হয় মাটির নিচের এক অন্ধকার জগতে। ভাষাতাত্ত্বিক এই পরিবর্তনটি প্রাচীন মানুষের মনস্তত্ত্বের একটি চমৎকার দিক উন্মোচন করে। তারা দূরের অচেনা বিপদকেই ধীরে ধীরে মৃত্যু পরবর্তী স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল।

কুর্-এ পৌঁছানোর পথটি মোটেও সহজ ছিল না। পৃথিবীর বুক থেকে পাতালপুরীতে যাওয়ার জন্য একটি দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিতে হতো। পুরাণ অনুযায়ী, মৃত আত্মাকে প্রথমে একটি বিশাল প্রান্তর পার হতে হতো এবং এরপর তাদের সামনে এসে হাজির হতো ‘হুবুর’ (Hubur) নামের একটি নদী। এই নদীটি ছিল জীবিত এবং মৃতদের জগতের মাঝখানের বিভাজন রেখা। হুবুর নদী পার হওয়ার জন্য একজন নির্দিষ্ট খেয়া পারাপারকারী ছিলেন, যাকে অনেক সময় উরশানাবি বা সিলুলু নামে ডাকা হতো। গ্রিক পুরাণের ক্যারন (Charon) এবং হিন্দু পুরাণের বৈতরণী নদীর ধারণার সাথে এর বিস্ময়কর মিল রয়েছে। আত্মারা এই খেয়া পার হয়ে একবার ওপারে চলে গেলে, পৃথিবীতে ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা থাকত না। ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় একে এসক্যাটলজি (Eschatology) বা পরকালবিদ্যা বলা হয়। সুমেরীয়দের এই পরকালবিদ্যা কোনো আধ্যাত্মিক মোক্ষলাভের কথা বলে না। বরং এটি নির্দেশ করে একটি ভৌত এবং চূড়ান্ত সীমারেখাকে। তারা মৃতদের জগতকে বাস্তব পৃথিবীর মতোই একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান হিসেবে বিবেচনা করত, তবে সেই স্থানে জীবনের কোনো স্পন্দন ছিল না।

এই অন্ধকার জগতের ধারণা প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা পরকাল নিয়ে কোনো রোমান্টিক কল্পনায় বিশ্বাসী ছিল না। তাদের কাছে মৃত্যু মানে অনন্ত শান্তির কোনো স্বর্গে যাওয়া নয়। তারা তৈরি করেছিল এক চরম বাস্তব এবং বিষণ্ণ পরকালের ছবি। এই জগতটি স্বর্গের ঠিক বিপরীত। স্বর্গে যেমন দেবতারা রাজকীয় জীবনযাপন করেন, পৃথিবীতে মানুষ যেমন কর্মচাঞ্চল্যের মাঝে থাকে, কুর্-এ তেমন কিছুই নেই। সেখানে কোনো সবুজ ঘাস নেই, কোনো বয়ে চলা নদীর মিষ্টি জল নেই। এটি ছিল একটি বিশাল ধুলোর রাজ্য। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থাকে মেটাফিজিক্যাল রিয়ালিজম (Metaphysical Realism) বা পরাবাস্তববাদের একটি অন্ধকার রূপ বলা যেতে পারে। সুমেরীয়রা জানত যে মাটির নিচে পুঁতে রাখা শরীর ধীরে ধীরে ধুলোয় মিশে যায়। তাদের পাতালপুরীর ধারণাটি মূলত সেই পচন এবং ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ারই একটি মহাজাগতিক রূপক। তারা মৃত্যুর ভয়াবহতাকে কোনো মধুর প্রলেপ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করেনি। কঠিন সত্যকে তার সবচেয়ে নগ্ন এবং ধুলোমলিন রূপেই তারা মেনে নিয়েছিল (Katz, 2003)।

মৃত্যু পরবর্তী জীবন: ধুলোমলিন অস্তিত্ব ও পালকযুক্ত আত্মা (Life After Death: Dusty Existence and Feathered Souls)

মৃত্যুর পর মানব সত্তার ঠিক কী অবস্থা হয়, তার একটি অত্যন্ত করুণ বিবরণ সুমেরীয় পুরাণগুলোতে পাওয়া যায়। তারা মনে করত, শরীর মাটির নিচে নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষের একটি বায়বীয় রূপ বা আত্মা বেঁচে থাকে। সুমেরীয় ভাষায় এই আত্মাকে বলা হতো ‘গিদিম’ (Gidim)। কুর্-এ প্রবেশের পর এই গিদিমগুলো তাদের পার্থিব রূপ হারিয়ে ফেলে। তারা আর মানুষের মতো পোশাক পরে না বা মানুষের মতো হাঁটে না। সুমেরীয় পুরাণ অনুযায়ী, পাতালপুরীর আত্মারা পাখির মতো পালক গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের ডানার মতো হাত থাকে, কিন্তু তারা মুক্ত আকাশে উড়তে পারে না। তারা সেই অন্ধকার গুহার ভেতর বাঁদুড়ের মতো ডানা ঝাপটায়। এই পালকযুক্ত আত্মার ধারণাটি একাধারে কাব্যিক এবং ভীতিপ্রদ। পাখিরা সাধারণত মুক্তির প্রতীক। কিন্তু পাতালপুরীর এই পাখিরা অনন্তকাল ধরে বন্দী। তাদের ডানা আছে, কিন্তু ওড়ার আকাশ নেই। মানুষের অসহায়ত্বের এর চেয়ে চমৎকার এবং বিষাদময় চিত্রকল্প প্রাচীন সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়।

পাতালপুরীতে এই আত্মাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল আরও মর্মান্তিক। পৃথিবীতে যারা প্রতিদিন রুটি, মাংস এবং বিয়ার খেত, কুর্-এ তাদের খাবার ছিল কেবল কাদা এবং ধুলো। তাদের পানের জন্য কোনো মিষ্টি জল ছিল না, তারা খেত তিক্ত এবং ময়লা জল। আলোহীন সেই পরিবেশে ধুলো খেয়ে বেঁচে থাকার এই যে বিবরণ, এটি আসলে মানুষের নশ্বরতার চূড়ান্ত প্রকাশ। সুমেরীয়দের মানবসৃষ্টির মিথ অনুযায়ী, প্রজ্ঞার দেবতা এনকি মানুষকে কাদা মাটি দিয়েই তৈরি করেছিলেন। মৃত্যুর পর সেই মানুষ আবার কাদাতেই ফিরে যাচ্ছে এবং কাদা খেয়েই তার অনন্তকাল পার করছে। এই খাদ্যাভ্যাস কোনো বিশেষ শাস্তির অংশ ছিল না। পাতালপুরীর প্রাকৃতিক নিয়মই ছিল এমন। সেখানে কোনো রান্নাঘর ছিল না, কোনো শস্যক্ষেত্র ছিল না। পৃথিবীতে মানুষ যেমন প্রচুর পরিশ্রমে ফসল ফলাত, পাতালপুরীতে শ্রমের কোনো সুযোগ না থাকায় উৎপাদনেরও কোনো সুযোগ ছিল না।

অস্তিত্বের এই ধুলোমলিন রূপ মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর শূন্যতাবোধ তৈরি করত। ইন্দ্রিয়ের সমস্ত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় সুমেরীয়দের সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত। পৃথিবীতে একজন মানুষ গান শুনতে পেত, সূর্যের আলো দেখতে পেত, প্রিয়জনের স্পর্শ পেত। কিন্তু পাতালপুরীতে তার এই পঞ্চইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যেত। সেখানে কেবল স্তব্ধতা আর অন্ধকার রাজত্ব করত। এই অবস্থাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় সেন্সরি ডিপ্রাইভেশন (Sensory Deprivation) বা ইন্দ্রিয়গত বঞ্চনার চরম পর্যায় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আত্মারা একে অপরকে দেখতে পেত না, তারা কেবল অন্ধকারের মাঝে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে, মানুষের জীবনের সমস্ত সার্থকতা তার শারীরিক এবং মানসিক অনুভূতিগুলোর মধ্যেই নিহিত। মৃত্যু সেই অনুভূতিগুলোকে কেড়ে নেয়। তাই পাতালপুরীর এই জীবনকে তারা কোনোভাবেই ‘জীবন’ বলত না, তারা একে বলত অস্তিত্বের এক নিষ্প্রাণ ছায়া, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে ঠিকই, কিন্তু জীবন বলে সেখানে কিছু থাকে না (Jacobsen, 1976)।

এরেসকিগালের রাজত্ব এবং পাতালপুরীর প্রশাসনিক কাঠামো (The Reign of Ereshkigal and the Administrative Structure of the Underworld)

স্বর্গে যেমন আন এবং এনলিলের রাজত্ব ছিল, পাতালপুরীতেও তেমনি একজন সুনির্দিষ্ট শাসকের অধীনে একটি প্রশাসন পরিচালিত হতো। এই অন্ধকার জগতের নিরঙ্কুশ অধিপতি ছিলেন দেবী এরেসকিগাল (Ereshkigal)। তিনি ছিলেন প্রেম ও সংঘাতের দেবী ইনান্নার বড় বোন। দুই বোনের এই অবস্থান সুমেরীয় চিন্তাধারার একটি চমৎকার দ্বৈতসত্তার পরিচয় দেয়। ছোট বোন ইনান্না হলেন আলো, উর্বরতা এবং জীবনের চাঞ্চল্যের প্রতীক। অন্যদিকে বড় বোন এরেসকিগাল হলেন অন্ধকার, মৃত্যু এবং স্থবিরতার প্রতীক। এরেসকিগাল পাতালপুরীর বিশাল প্রাসাদে তার সিংহাসনে বসে থাকতেন। তাকে পুরাণগুলোতে খুব বিষণ্ণ এবং রোদনরত এক দেবী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তিনি পৃথিবীর আলো দেখতে পেতেন না, তার রাজ্যে কোনো বসন্ত আসত না। তার এই বিষণ্ণতা মূলত মৃত্যুর শোকেরই এক মহাজাগতিক রূপ। এরেসকিগাল কোনো রাক্ষসী বা মন্দ দেবী ছিলেন না। তিনি কেবল মৃত্যুর নিয়মের একজন কঠোর বাস্তবায়নকারী ছিলেন। তার রাজত্বে প্রবেশ করার পর কেউ আর তার আদেশ অমান্য করতে পারত না।

পাতালপুরীর এই প্রশাসনিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। কুর্-এর মূল প্রাসাদে পৌঁছানোর আগে আত্মাদের সাতটি বিশাল দরজা পার হতে হতো। প্রতিটি দরজার পাহারায় থাকত সশস্ত্র রক্ষীরা। প্রধান দ্বাররক্ষীর নাম ছিল নেতি (Neti)। পৃথিবীতে মানুষের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই থাকুক না কেন, নেতির দরজা পার হওয়ার সময় সবাইকে সম্পূর্ণ নগ্ন এবং রিক্ত হতে হতো। দেবী ইনান্না যখন পাতালপুরীতে প্রবেশ করেছিলেন, তাকেও এই সাতটি দরজায় নিজের মুকুট, গহনা এবং রাজকীয় পোশাক খুলে রাখতে হয়েছিল। এই আচারটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। এটি নির্দেশ করে যে মৃত্যু মানুষের সমস্ত পার্থিব অহংকার, সম্পদ এবং ক্ষমতা কেড়ে নেয়। সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রক্রিয়াকে ডিকনস্ট্রাকশন অফ আইডেন্টিটি (Deconstruction of Identity) বা পরিচয়ের বিনির্মাণ বলা যেতে পারে। পাতালপুরীতে প্রবেশ করা মানে হলো জাগতিক সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলে একদম শূন্য অবস্থায় নতুন একটি শৃঙ্খলার অধীন হওয়া।

এরেসকিগালের সিংহাসনের সামনে বসে থাকত পাতালপুরীর বিচারকমণ্ডলী, যাদের বলা হতো ‘অনুনাকি’ (Anunnaki)। স্বর্গেও অনুনাকি দেবতারা থাকতেন, তবে পাতালপুরীর এই বিচারকদের কাজ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা মৃত আত্মাদের কোনো নৈতিক বিচার করতেন না। কে জীবনে কতগুলো ভালো কাজ করেছে বা কতগুলো মন্দির বানিয়েছে, তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তাদের একমাত্র কাজ ছিল মৃত আত্মার নাম পাতালপুরীর খাতায় নিবন্ধন করা এবং তাকে মৃত্যুর চূড়ান্ত সিলমোহর প্রদান করা। একবার এই বিচারকদের নজর কারো ওপর পড়লে, তার আর পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার কোনো আশা থাকত না। ইনান্নার দিকে তাকিয়ে তারা যে ‘মৃত্যুর দৃষ্টি’ নিক্ষেপ করেছিলেন, তা মূলত এই চূড়ান্ত নিয়তিরই প্রতীক। পাতালপুরীর এই আমলাতন্ত্র প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্তরেই একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করত। এরেসকিগাল এবং তার বিচারকরা মিলে সেই নিয়মগুলো কঠোরভাবে পালন করতেন, যাতে জীবিত এবং মৃতদের জগতের মধ্যে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয় (Dalley, 1989)।

সমতা ও পুরস্কারহীন জগত: সামাজিক স্তরবিন্যাসের অবসান (An Egalitarian and Rewardless World: The End of Social Stratification)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সমাজ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। সেখানে যেমন অসীম ক্ষমতার অধিকারী রাজা ছিলেন, তেমনি ছিলেন অধিকারহীন ক্রীতদাস। সমাজ বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত ছিল। কিন্তু পাতালপুরীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে এই সামাজিক স্তরবিন্যাসের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মৃত্যু ছিল সুমেরীয়দের কাছে চরম এক সমতাবিধানকারী শক্তি। উরুকের প্রতাপশালী রাজা গিলগামেশ থেকে শুরু করে সাধারণ একজন কৃষক – সবাই মৃত্যুর পর একই মর্যাদায় কুর্-এ প্রবেশ করত। সেখানে রাজাদের বসার জন্য কোনো আলাদা সোনার সিংহাসন ছিল না। দাসদেরও নতুন করে কারো দাসত্ব করতে হতো না। সবাই একসাথে সেই অন্ধকারে ঘুরে বেড়াত এবং ধুলো খেত। সমাজবিজ্ঞানী এবং ইতিহাসবিদরা মৃত্যুর এই ধারণাকে র‍্যাডিক্যাল ইগালিটারিয়ানিজম (Radical Egalitarianism) বা চরম সমতাবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেন। পৃথিবীতে যে সমতা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব ছিল, সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে মৃত্যু সেই সমতা নিখুঁতভাবে প্রতিষ্ঠা করে।

এই সমতার পাশাপাশি আরেকটি দিক ছিল কর্মফল বা নৈতিক বিচারের অনুপস্থিতি। পরবর্তীকালের প্রায় সব বড় ধর্মেই পরকালে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার বা স্বর্গের ধারণা এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সুমেরীয় ধর্মে এর কোনো বালাই ছিল না। পৃথিবীতে খুব সৎ এবং ধার্মিক জীবনযাপন করলেও মৃত্যুর পর তাকে সেই অন্ধকার কুর্-এই যেতে হতো। আবার একজন চরম অত্যাচারী শাসকেরও একই পরিণতি হতো। এই ধারণাকে তাত্ত্বিক পরিভাষায় মোরাল নিইলিজম (Moral Nihilism) বা নৈতিক শূন্যবাদের একটি প্রাচীন রূপ বলা যেতে পারে, যা পরকালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। সুমেরীয়রা মনে করত, নৈতিকতা এবং আইনের বিচার কেবল পৃথিবীর জন্য। দেবতারা পৃথিবীতে বসে মানুষের অপরাধের শাস্তি দেন বা ভালো কাজের জন্য শস্যের ফলন বাড়িয়ে দেন। কিন্তু একবার মানুষের শ্বাস ফুরিয়ে গেলে, এই সমস্ত হিসাব-নিকাশের খাতা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। পাতালপুরীতে কোনো পাপ-পুণ্যের খাতা নেই, আছে কেবল অনন্ত ধুলো।

পুরস্কার বা শাস্তির এই অনুপস্থিতি সুমেরীয়দের জীবনবোধকে একটি অত্যন্ত বাস্তববাদী রূপ দিয়েছিল। তারা পরকালের লোভ বা ভয়ে ভালো কাজ করত না। তাদের কাছে ভালো কাজ মানে ছিল সমাজের নিয়ম মেনে চলা এবং দেবতাদের পার্থিব মন্দিরগুলোকে রক্ষা করা। মিশরের ফারাওরা যেমন পরকালে অনন্ত রাজত্ব করার জন্য পিরামিড বানিয়ে প্রচুর সম্পদ সাথে নিয়ে যেতেন, সুমেরীয় রাজাদের সেই সুযোগ ছিল না। তারা জানত যে সোনা-দানা সাথে দিয়ে দিলেও পাতালপুরীর দরজায় তা কেড়ে নেওয়া হবে। উরের রাজকীয় সমাধিসৌধগুলোতে রাজাদের সাথে প্রচুর সম্পদ এবং ভৃত্যদের কবর দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলেও, তা মূলত পাতালপুরীর দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য ছিল, নিজেদের ভোগবিলাসের জন্য নয়। সামগ্রিকভাবে, কুর্-এর এই বৈষম্যহীন এবং পুরস্কারহীন কাঠামোটি মানুষের অহংকারকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিত। এটি প্রতিদিন তাদের মনে করিয়ে দিত যে জীবনের শেষে সবার গন্তব্য একটি অভিন্ন অন্ধকার, যেখানে রাজা আর ফকিরের মাঝে তফাৎ করার মতো কোনো আলো অবশিষ্ট থাকে না (Kramer, 1963)।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও মৃতদের প্রতি জীবিতদের দায়বদ্ধতা (Funerary Rites and the Responsibility of the Living Towards the Dead)

মৃত্যু পরবর্তী জীবন আনন্দদায়ক না হলেও, মৃতদের প্রতি জীবিতদের একটি বড় ধরনের সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়বদ্ধতা ছিল। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে, মৃত আত্মা বা গিদিম পাতালপুরীতে শান্তিতে থাকবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে পৃথিবীর জীবিত আত্মীয়দের ওপর। মৃত্যুর পর একটি যথাযথ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা ছিল অত্যন্ত জরুরি। মৃতদেহকে সম্মানজনকভাবে মাটির নিচে সমাহিত না করলে আত্মা কখনোই পাতালপুরীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এই নিয়মগুলোকে সমাজবিজ্ঞানে অ্যানসেস্টর ওয়ার্শিপ (Ancestor Worship) বা পূর্বপুরুষ পূজার একটি ধরন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুমেরীয়রা মৃতদের কবর সাধারণত তাদের বাড়ির মেঝের নিচে বা শহরের নির্দিষ্ট সমাধিক্ষেত্রে খনন করত। তারা মনে করত যে পরিবারের মৃত সদস্যরা শারীরিকভাবে চলে গেলেও আত্মিক চুক্তির মাধ্যমে তারা পরিবারের সাথেই যুক্ত থাকেন। এই চুক্তি রক্ষার দায়িত্ব ছিল মূলত পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রের।

পাতালপুরীতে যেহেতু আত্মাদের জন্য কোনো খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল না, তাই জীবিতদের কাজ ছিল তাদের জন্য খাবার পাঠানো। সুমেরীয়রা কবরের মাটির ভেতর দিয়ে একটি ছোট মাটির পাইপ বা নল ঢুকিয়ে দিত। বিশেষ দিনগুলোতে, যেমন অমাবস্যার রাতে, পরিবারের সদস্যরা এই নলের ভেতর দিয়ে পরিষ্কার জল এবং তরল খাবার ঢেলে দিত। এই আচারটিকে বলা হতো ‘কিসপু’ (Kispu)। তারা বিশ্বাস করত যে এই জলটুকু সরাসরি পাতালপুরীতে থাকা তাদের পূর্বপুরুষের তৃষ্ণা মেটাবে। যদি কোনো কারণে কিসপু দেওয়া বন্ধ হয়ে যেত, তবে পাতালপুরীতে সেই আত্মাকে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করতে হতো। তখন সে ধুলো আর ময়লা জলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। এই ব্যবস্থাটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার পরিবার কাঠামোকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছিল। মানুষ সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকত, কারণ তারা জানত যে মৃত্যুর পর কেউ যদি কিসপু দেওয়ার না থাকে, তবে পাতালপুরীর জীবন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। সন্তানহীনতা তাই তাদের কাছে একটি বড় সামাজিক এবং মহাজাগতিক অভিশাপ ছিল।

যদি কোনো মানুষের মৃতদেহ সমাহিত করা না হতো বা তার কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকত, তবে তার আত্মার পরিণতি হতো ভয়াবহ। এই ধরনের আত্মারা পাতালপুরীতে প্রবেশ করতে পারত না। তারা পৃথিবীতে ভূত বা প্রেতাত্মা হিসেবে ঘুরে বেড়াত। সুমেরীয়রা এই অতৃপ্ত আত্মাদের ভীষণ ভয় পেত। তারা মনে করত, এই আত্মারা ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত থাকে বলে তারা জীবিত মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে এবং সমাজে নানা ধরনের রোগবালাই ও মহামারীর সৃষ্টি করে। এই প্রেতাত্মাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য পুরোহিতরা বিশেষ জাদুমন্ত্র এবং তাবিজের ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, মৃতদের প্রতি অবহেলা কেবল মৃতদের জন্যই কষ্টের ছিল না, জীবিতদের জন্যও তা ভয়ানক বিপদের কারণ হতে পারত। জীবিত এবং মৃতদের এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা প্রমাণ করে যে, সুমেরীয়রা সমাজ বলতে কেবল বর্তমান প্রজন্মকে বুঝত না। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের একটি নিরবচ্ছিন্ন শৃঙ্খল দিয়ে তাদের পরিবার এবং সমাজ গঠিত ছিল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এই আচারগুলো সেই শৃঙ্খলকেই মজবুত করে রাখত (Barret, 2007)।

পার্থিব জীবনের প্রাধান্য এবং নশ্বরতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব (The Supremacy of Earthly Life and the Psychological Impact of Mortality)

কুর্ বা পাতালপুরীর এই নিরালোক এবং আনন্দহীন ধারণাটি সুমেরীয় সভ্যতার ওপর একটি যুগান্তকারী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। যেহেতু পরকাল নিয়ে আশা করার বা স্বপ্ন দেখার মতো কিছু ছিল না, তাই তারা তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ এবং শক্তি নিবদ্ধ করেছিল পার্থিব জীবনের ওপর। তারা জানত যে মৃত্যুর পর আর কোনো আনন্দ নেই, কোনো বিয়ারের আসর নেই, কোনো উৎসব নেই। তাই তারা চাইত যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ করতে। এই তীব্র জীবনবোধই সুমেরীয়দের এত উদ্যমী এবং পরিশ্রমী করে তুলেছিল। তারা বিশাল সব শহর বানিয়েছিল, খাল কেটেছিল, বাণিজ্য করেছিল এবং শিল্পের উৎকর্ষ সাধন করেছিল। তারা বুঝেছিল যে পৃথিবীতে তাদের যে সময়টুকু বরাদ্দ আছে, সেটি অমূল্য। এই সময়টুকু কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না। পরকালের অন্ধকার তাদের পার্থিব জীবনকে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতায় ভরিয়ে তুলেছিল।

এই পার্থিব জীবনের প্রতি মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে চমৎকার সাহিত্যিক দলিল হলো গিলগামেশের মহাকাব্য। বন্ধু এনকিডুর মৃত্যুর পর রাজা গিলগামেশ যখন প্রথমবার মৃত্যুর ভয়াবহতা এবং পাতালপুরীর অমোঘ সত্যটি উপলব্ধি করেন, তখন তিনি অমরত্বের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তিনি পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে বের হন। কিন্তু যাত্রাপথে মদের দেবী সিদুরি (Siduri) তাকে একটি অসামান্য উপদেশ দেন। সিদুরি বলেন, “গিলগামেশ, তুমি যা খুঁজছ তা কখনো পাবে না। দেবতারা যখন মানুষ বানিয়েছেন, তখন মৃত্যুকে তারা মানুষের জন্যই রেখে দিয়েছেন। তাই তুমি পেট ভরে খাও, দিনরাত আনন্দ করো, পরিষ্কার কাপড় পরো এবং তোমার হাত ধরে থাকা স্ত্রী ও সন্তানকে ভালোবাসো। এটাই মানুষের একমাত্র কাজ।” সিদুরির এই কথাগুলো আসলে সমগ্র সুমেরীয় সভ্যতারই জীবন দর্শন। এটি কোনো হতাশার বাণী নয়, এটি হলো নশ্বরতাকে মেনে নিয়ে বর্তমানকে উদ্‌যাপন করার এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। তারা জানত মৃত্যু আসবেই, কিন্তু মৃত্যু আসার আগে পর্যন্ত জীবনটা যেন পূর্ণতায় ভরা থাকে, সেদিকেই তাদের সব নজর ছিল।

পরিশেষে বলা যায়, সুমেরীয়দের পাতালপুরী বা কুর্-এর ধারণাটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অত্যন্ত বাস্তববাদী চিন্তার নিদর্শন। তারা মৃত্যু নিয়ে কোনো মিথ্যা সান্ত্বনার আশ্রয় নেয়নি। তারা মহাবিশ্বের একটি অন্ধকার এবং ধুলোমলিন গহ্বরকে তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে মেনে নিয়েছিল। এই মেনে নেওয়ার ভেতরে এক ধরনের বুকভরা সাহস ছিল। তারা দেবতাকে ভয় করত, কিন্তু মৃত্যুর সত্যকে তারা বীরের মতো গ্রহণ করেছিল। এই অন্ধকার গন্তব্যের কথা মাথায় রেখেই তারা পৃথিবীর বুকে আলোর বন্যা বইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল জিগুরাতের চূড়ায় আগুন জ্বেলে। পাতালপুরীর দেবীরা যখন মাটির নিচে তাদের শাসন চালাতেন, মাটির ওপরের মানুষরা তখন কাদা আর জল দিয়ে সভ্যতার নতুন ইতিহাস লিখত। সুমেরীয়দের কাছে জীবন মানে ছিল সেই অন্ধকার গহ্বরে পড়ে যাওয়ার আগে নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলা এবং দুকূল ছাপিয়ে ফসল ফলানো। এই অসাধারণ বৈষয়িক এবং জীবনমুখী দর্শন আজও আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে, পরকালের আশ্বাস ছাড়াই মানুষ কীভাবে এত সুন্দর একটি জগত নির্মাণ করতে পারে (George, 2003)।

গিলগামেশের মহাকাব্য (The Epic of Gilgamesh)

গিলগামেশের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ভিত্তি (Historical and Mythological Foundation of Gilgamesh)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সবার আগে যে নামটি উঠে আসে, তা হলো গিলগামেশ। উরুক শহরের এই প্রতাপশালী রাজাকে কেন্দ্র করে রচিত মহাকাব্যটি বিশ্বসাহিত্যের আদিমতম নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে পরিগণিত। গিলগামেশ বাস্তবে কোনো রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন নাকি নিছকই এক কাল্পনিক চরিত্র, তা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে তর্ক-বিতর্ক চলেছে। সুমেরীয় রাজাদের যে প্রাচীন তালিকা বা ‘সুমেরিয়ান কিং লিস্ট’ পাওয়া গেছে, সেখানে গিলগামেশের নাম জ্বলজ্বল করছে। এই তালিকা অনুযায়ী, তিনি উরুক নগরের প্রথম রাজবংশের পঞ্চম শাসক ছিলেন এবং ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব সাতাশ শতকের দিকে তিনি রাজত্ব করতেন। বাস্তব পৃথিবীতে উরুক শহরের চারপাশে যে বিশাল এবং সুদৃঢ় ইটের দেয়াল গড়ে উঠেছিল, ঐতিহাসিকরা মনে করেন তার নির্মাণের পেছনে গিলগামেশের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একেবারে শুরুর দিকের এই ইতিহাসকে ঘিরেই পরবর্তীতে লোকমুখে নানা কল্পকাহিনী ডালপালা মেলতে শুরু করে। একজন সাধারণ রক্তমাংসের রাজা সময়ের আবর্তনে মানুষের মুখে মুখে পরিণত হন এক অতিপ্রাকৃত বীরপুরুষে, যার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইতিহাস এবং পুরাণের এই যে মেলবন্ধন, তা প্রাচীন সাহিত্যকে এক ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেছে।

পুরাণের পাতায় গিলগামেশের জন্মবৃত্তান্ত বেশ চমকপ্রদ এবং কিছুটা হিসাব মেলানো কঠিন। মহাকাব্য অনুযায়ী, তার মাতা ছিলেন দেবী নিনসুন এবং পিতা ছিলেন উরুকের এক প্রাক্তন রাজা লুগালবান্দা। জিনতত্ত্বের সাধারণ হিসাবে একজন মানুষের অর্ধেক দেবতা এবং অর্ধেক মানুষ হওয়ার কথা। কিন্তু সুমেরীয় কবিরা গিলগামেশকে কল্পনা করেছিলেন দুই-তৃতীয়াংশ দেবতা এবং এক-তৃতীয়াংশ মানুষ হিসেবে। গাণিতিকভাবে এই হিসাবটি অবাস্তব মনে হলেও, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি বিশাল তাৎপর্য রয়েছে। এই আনুপাতিক বিভাজন মূলত গিলগামেশের চরিত্রের ভেতরের তীব্র দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে। তার ভেতরে দেবতার মতো অসীম শক্তি, সাহস এবং দম্ভ ছিল। একই সাথে সেই এক-তৃতীয়াংশ মানবীয় সত্তার কারণে তিনি ছিলেন নশ্বর। অর্থাৎ, তাকে একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় এই ধরনের চরিত্রকে অনেক সময় ডিভাইন কিংশিপ (Divine Kingship) বা ঐশ্বরিক রাজতন্ত্রের একটি রূপক হিসেবে দেখা হয়। রাজারা নিজেদের সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক ওপরে স্থান দিতেন এবং নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য দেবতাদের সাথে রক্তের সম্পর্ক দাবি করতেন। গিলগামেশের এই পৌরাণিক জন্মবৃত্তান্তটি মূলত উরুকের রাজসিংহাসনের সেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতারই একটি আখ্যান।

মহাকাব্যের শুরুতে আমরা গিলগামেশকে কোনো আদর্শ বা প্রজাদরদি শাসক হিসেবে দেখতে পাই না। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড স্বৈরাচারী। তার ক্ষমতার কোনো সীমারেখা ছিল না এবং তিনি শহরের মানুষের ওপর নির্মমভাবে ছড়ি ঘোরাতেন। উরুকের বিশাল দেয়াল নির্মাণের জন্য তিনি সাধারণ মানুষকে তাদের ইচ্ছা বা সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করতেন। তরুণদের তিনি জোর করে সৈন্যদলে ভর্তি করতেন এবং নারীদের সাথে যথেচ্ছ আচরণ করতেন। সমাজে প্রচলিত একটি নিয়ম ছিল যে, যেকোনো বিয়ের প্রথম রাতে বরের আগে রাজা কনের সাথে মিলিত হবেন। এই প্রথাটি শহরের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। গিলগামেশের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে কতটা বেপরোয়া করে তুলতে পারে। শহরের মানুষ তার এই অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্বর্গের দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করে। তারা চাইত এমন কেউ আসুক, যে রাজাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পরিস্থিতিটি প্রাচীনকালের সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরি (Social Contract Theory) বা সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের একটি আদিম লঙ্ঘন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। রাজার দায়িত্ব ছিল প্রজাদের রক্ষা করা, তাদের ওপর জুলুম করা নয়।

মানুষের কান্না এবং হাহাকার শেষ পর্যন্ত স্বর্গের দেবতাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায়। দেবতারা বুঝতে পারেন যে গিলগামেশের এই উন্মাদনা থামানো না গেলে উরুক শহর ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা গিলগামেশকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন না। এর বদলে তারা চাইলেন ক্ষমতার একটি ভারসাম্য তৈরি করতে। তারা জন্মদাত্রী দেবী আরুরুকে নির্দেশ দিলেন এমন কাউকে তৈরি করতে, যে গিলগামেশের সমান শক্তিশালী হবে এবং তার ঔদ্ধত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। দেবী আরুরু তখন বন্য প্রান্তরে মাটি দিয়ে এক বিশালদেহী মানুষের অবয়ব তৈরি করলেন, যার নাম দেওয়া হলো এনকিডু। এই এনকিডুর সৃষ্টির মাধ্যমেই মহাকাব্যের মূল পটভূমি তৈরি হয়। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে প্রতিটি শক্তির বিপরীতে একটি সমান এবং বিপরীতমুখী শক্তি থাকা প্রয়োজন। গিলগামেশ ছিলেন শহরের সভ্যতার অহংকার, আর এনকিডু হলেন বন্য প্রকৃতির শক্তি। এই দুই শক্তির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার মাধ্যমেই কবিরা মূলত মানবচরিত্রের দুটি ভিন্ন দিকের একটি দার্শনিক সংঘাতের সূচনা করেছিলেন (George, 2003)।

Gilgamesh and glory (Chapter 3) - Achilles beside Gilgamesh
গিলগামেশ-সংক্রান্ত ঐশ্বরিক রাজতন্ত্র (Divine Kingship)-এর প্রতীকী ধারণাকে প্রতিফলিত করা মেসোপটেমীয় সিলিন্ডার সিল ও তার ইমপ্রেশন, যেখানে রাজকীয় সত্তা, দেবীয় প্রতীক, এবং পৌরাণিক প্রাণীর মাধ্যমে শাসকের ক্ষমতার অতিমানবীয় বৈধতা চিত্রিত হয়েছে; Source: British Museum

এনকিডুর সৃষ্টি এবং সভ্যতা বনাম প্রকৃতির দ্বন্দ্ব (The Creation of Enkidu and the Conflict Between Civilization and Nature)

দেবী আরুরুর হাতে গড়া এনকিডু ছিলেন গিলগামেশের সম্পূর্ণ বিপরীত এক সত্তা। গিলগামেশ থাকতেন প্রাসাদের বিলাসবহুল পরিবেশে, আর এনকিডুর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা হয়েছিল লোকালয় থেকে অনেক দূরে, বন্য জন্তুদের সাথে। এনকিডুর সারা শরীর ছিল বড় বড় লোমে ঢাকা। তিনি মানুষের ভাষা জানতেন না, নদীর জল থেকে হরিণদের সাথে মুখ লাগিয়ে জল খেতেন এবং ঘাস লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকতেন। তার গায়ে ছিল অসীম জোর, কিন্তু মনে ছিল এক আদিম এবং বন্য সরলতা। তিনি বনের পশুদের নিজের ভাই মনে করতেন এবং শিকারিদের পাতা ফাঁদ ভেঙে দিয়ে পশুদের রক্ষা করতেন। এনকিডুর এই জীবনযাপন সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত পরিচিত বিতর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়, যাকে আমরা নেচার ভার্সাস নার্চার (Nature versus Nurture) বা প্রকৃতি বনাম লালনপালনের দ্বন্দ্ব বলে থাকি। এনকিডু ছিলেন সেই আদিম প্রকৃতির প্রতিনিধি, যেখানে কোনো আইন নেই, কোনো সামাজিক প্রথা নেই, আছে কেবল বেঁচে থাকার সহজ প্রবৃত্তি। শহরের মানুষ এই বন্য মানুষটিকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল, কারণ শিকারিরা জঙ্গলে গিয়ে কিছু শিকার করতে পারছিল না।

শিকারিদের অভিযোগের ভিত্তিতে গিলগামেশ একটি সুকৌশল পরিকল্পনা করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে বন্য শক্তিকে পরাস্ত করতে হলে অস্ত্রের চেয়ে বুদ্ধির প্রয়োগ বেশি প্রয়োজন। তিনি শামহাত নামের এক মন্দির-বারাঙ্গনাকে জঙ্গলে পাঠালেন। শামহাতের দায়িত্ব ছিল তার নারীত্ব এবং শারীরিক আকর্ষণের মাধ্যমে এনকিডুকে প্রলুব্ধ করা। জঙ্গলে গিয়ে শামহাত নিজের পোশাক খুলে ফেলেন এবং এনকিডুর সামনে নিজেকে উপস্থাপন করেন। এনকিডু, যিনি এর আগে কোনো নারী দেখেননি, তিনি শামহাতের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হন এবং টানা ছয় দিন ও সাত রাত তার সাথে মিলিত হন। এই শারীরিক মিলনের পর এনকিডুর জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। তিনি যখন তার পুরনো বন্ধু বন্য পশুদের কাছে ফিরে গেলেন, তখন পশুরা তাকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। এনকিডু আর তাদের মতো দ্রুত দৌড়াতে পারলেন না। তার বন্য শক্তি কমে গিয়েছিল, কিন্তু বিনিময়ে তার ভেতরে মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং চেতনা জাগ্রত হয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে তাত্ত্বিক পরিভাষায় সিভিলাইজেশন প্রসেস (Civilization Process) বা সভ্যকরণ প্রক্রিয়ার একটি শক্তিশালী রূপক হিসেবে ধরা হয়। বন্যতা থেকে সভ্যতায় উত্তরণের জন্য মানুষকে তার আদিম সরলতা বিসর্জন দিতে হয়।

শামহাত এরপর এনকিডুকে মানুষের মতো জীবনযাপন করতে শেখান। তিনি তাকে পোশাক পরান, রুটি খেতে শেখান এবং বিয়ার পান করতে শেখান। এনকিডু প্রথমবার বুঝতে পারেন যে লোকালয়ের জীবন জঙ্গলের চেয়ে অনেক আলাদা। তিনি মেষপালকদের রক্ষী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং নেকড়ে বা সিংহ তাড়িয়ে তাদের সাহায্য করতে থাকেন। শামহাতের কাছ থেকেই এনকিডু গিলগামেশের স্বৈরাচারের কথা জানতে পারেন। নববিবাহিত কনেদের ওপর গিলগামেশের এই জোর খাটানোর কথা শুনে এনকিডুর ভেতরে এক ধরনের মানবীয় ন্যায়বোধ জেগে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি উরুকে যাবেন এবং এই অহংকারী রাজাকে চ্যালেঞ্জ করবেন। মানুষের সংস্পর্শে এসে এনকিডু কেবল রুটি খেতে শেখেননি, তিনি ভালো-মন্দের পার্থক্য করতেও শিখেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে সভ্যতা কেবল পোশাক বা খাদ্যাভ্যাস নয়, এটি মূলত একটি নৈতিক কাঠামোর নাম, যা মানুষকে পশুর স্তর থেকে আলাদা করে (Mitchell, 2004)।

উরুক শহরে এনকিডুর প্রবেশ ছিল এক মহানাটকীয় ঘটনা। একটি বিয়ের আসরে যখন গিলগামেশ জোর করে কনের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখন এনকিডু দরজার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ান। দুই বিশালদেহী বীরের মধ্যে শুরু হয় এক ভয়াবহ কুস্তি। তারা একে অপরকে আছাড় মারেন, দেয়াল ভেঙে পড়ে, মাটি কেঁপে ওঠে। শহরের মানুষ অবাক হয়ে সেই লড়াই দেখে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারল না। গিলগামেশ এবং এনকিডু দুজনেই একে অপরের শক্তির গভীরতা বুঝতে পারলেন। তাদের এই লড়াই কোনো শত্রুতার জন্ম দিল না, বরং জন্ম দিল এক গভীর শ্রদ্ধাবোধের। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের শপথ নিলেন। এই মিলনটি ছিল আসলে কালচারাল অ্যাসিমিলেশন (Cultural Assimilation) বা সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের একটি প্রতীকী মুহূর্ত। গিলগামেশের অহংকার এবং এনকিডুর বন্যতা – দুটি মিলে এক নতুন এবং ভারসাম্যপূর্ণ শক্তির জন্ম দিল। তারা বুঝতে পারলেন যে একা চলার চেয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চললে অনেক বেশি অসাধ্য সাধন করা সম্ভব।

সিডার বনে অভিযান এবং ক্ষমতার আস্ফালন (Expedition to the Cedar Forest and the Assertion of Power)

এনকিডুর সাথে বন্ধুত্বের পর গিলগামেশের চরিত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এলেও তার ভেতরের অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা একটুও কমেনি। উরুক শহরে শান্তিতে বসে থাকতে তার ভালো লাগছিল না। তিনি জানতেন যে তিনি সম্পূর্ণ দেবতা নন, তাই একদিন তাকে মরতেই হবে। কিন্তু তিনি এমন কিছু করে যেতে চাইলেন, যার কারণে পৃথিবীর মানুষ তাকে চিরকাল মনে রাখবে। তার এই খ্যাতি এবং যশের তৃষ্ণা তাকে একটি বিপজ্জনক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি লেবাননের সিডার বা দেবদারু বনে অভিযান চালাবেন। সেই বিশাল বনটি ছিল দেবতাদের নিজস্ব সম্পত্তি এবং এনলিল স্বয়ং হামবাবা নামের এক ভয়াবহ রাক্ষসকে সেই বনের পাহারাদার নিযুক্ত করেছিলেন। এই অভিযানটি নিছক কোনো বীরত্ব দেখানোর সুযোগ ছিল না। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে এর একটি বড় অর্থনৈতিক কারণ ছিল। তাদের সমভূমিতে ইমারত বানানোর মতো ভালো কাঠের তীব্র অভাব ছিল। সিডার বনের গাছ কেটে আনা ছিল তাদের জন্য এক বিশাল সম্পদের হাতছানি। আধুনিক পরিভাষায় একে ইম্পেরিয়ালিজম (Imperialism) বা সাম্রাজ্যবাদের একটি আদিম এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আগ্রাসন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এনকিডু এই অভিযানের কথা শুনে বেশ ভয় পেয়ে যান। তিনি জঙ্গলের পরিবেশে বড় হয়েছেন এবং তিনি জানতেন হামবাবা কতটা ভয়ংকর। হামবাবার নিশ্বাস ছিল আগুনের মতো এবং তার কণ্ঠস্বর ছিল ঝড়ের মতো। এনকিডু গিলগামেশকে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বলেন। কিন্তু গিলগামেশ ছিলেন অনড়। তিনি সূর্য দেবতা শামাশের কাছে প্রার্থনা করলেন এবং শামাশ তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। গিলগামেশের এই জেদ প্রমাণ করে যে ক্ষমতাবান শাসকরা অনেক সময় নিজেদের শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়ে যান। তারা মনে করেন যে প্রকৃতি এবং দেবতা – সবাই তাদের ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার মাত্র। শহরের প্রবীণদের বারণ না শুনেই দুই বন্ধু বিশাল সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সিডার বনের দিকে রওনা হন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে গিলগামেশ বেশ কয়েকটি দুঃস্বপ্ন দেখেন, যা তার ভেতরের অবচেতন ভয়েরই প্রতিফলন ছিল। তবে প্রতিবারই এনকিডু সেই স্বপ্নগুলোর একটি ইতিবাচক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে বন্ধুকে সাহস যুগিয়েছেন।

সিডার বনে পৌঁছে তারা দেখতে পান সেই বিশাল এবং গগনচুম্বী গাছগুলো। কিন্তু তাদের উপস্থিতির কথা টের পেয়ে হামবাবা সেখানে এসে হাজির হয়। দুই বীরের সাথে সেই রাক্ষসের এক ভয়ঙ্কর লড়াই শুরু হয়। হামবাবার শক্তি ছিল অসীম, কিন্তু সূর্য দেবতা শামাশ হঠাৎ করে তেরোটি প্রবল বাতাস পাঠিয়ে হামবাবাকে চারদিক থেকে আটকে ফেলেন। হামবাবা চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না এবং নড়াচড়া করতে পারছিল না। তখন সে গিলগামেশের কাছে প্রাণভিক্ষা চায়। সে প্রতিশ্রুতি দেয় যে তাকে ছেড়ে দিলে সে গিলগামেশের দাস হয়ে থাকবে এবং বনের সব গাছ কেটে উরুকে পাঠিয়ে দেবে। গিলগামেশের মনে একটু দয়ার উদ্রেক হয়েছিল, কিন্তু এনকিডু তাকে বাধা দেন। এনকিডু বলেন যে এই রাক্ষসকে বাঁচিয়ে রাখলে তারা আর কোনোদিন উরুকে ফিরতে পারবে না। বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে এবং সুরক্ষার যুক্তিতে তারা শেষ পর্যন্ত হামবাবার গলা কেটে ফেলে। এই ঘটনাটিকে তাত্ত্বিকরা অনেক সময় প্রকৃতির ওপর মানুষের চূড়ান্ত বিজয় এবং একই সাথে ইকোলজিক্যাল এক্সপ্লয়টেশন (Ecological Exploitation) বা পরিবেশগত শোষণের একটি রূপক হিসেবে বর্ণনা করেন।

হামবাবাকে হত্যা করার পর তারা বনের সবচেয়ে বড় সিডার গাছগুলো কেটে ফেলেন। তারা সেই কাঠ দিয়ে একটি বিশাল দরজা তৈরি করেন এবং সেটি ভাসিয়ে নিপ্পুরে এনলিলের মন্দিরের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। তারা ভেবেছিলেন এই কাজের মাধ্যমে তারা দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে পারবেন এবং নিজেদের বীরত্ব প্রমাণ করবেন। উরুক শহরে তারা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন। শহরের মানুষ তাদের জয়ধ্বনি করে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেননি যে, দেবতাদের নিযুক্ত একজন পাহারাদারকে হত্যা করে তারা আসলে মহাজাগতিক শৃঙ্খলায় এক বিশাল ফাটল তৈরি করেছেন। প্রকৃতিকে জয় করার এই আস্ফালন তাদের সাময়িক খ্যাতি এনে দিলেও, এর পরিণাম যে কতটা ভয়ানক হতে পারে, তা তখনও তাদের ভাবনার বাইরে ছিল। ক্ষমতার এই দম্ভই তাদের পরবর্তী জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল (Dalley, 1989)।

দেবী ইশতারের প্রত্যাখ্যান এবং স্বর্গের ষাঁড়ের পতন (Rejection of Goddess Ishtar and the Fall of the Bull of Heaven)

সিডার বন থেকে ফিরে আসার পর গিলগামেশ যখন তার শরীর পরিষ্কার করে রাজকীয় পোশাক এবং মুকুট পরেন, তখন তাকে দেখতে অভাবনীয় সুন্দর লাগছিল। তার এই রূপে মুগ্ধ হন স্বয়ং প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইশতার (সুমেরীয় ভাষায় ইনান্না)। ইশতার সরাসরি গিলগামেশের কাছে এসে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে গিলগামেশ যদি তার স্বামী হন, তবে তিনি তাকে সোনার রথ, অঢেল সম্পদ এবং পৃথিবীর সমস্ত রাজাদের তার পদানত করে দেবেন। একজন সাধারণ মানুষের জন্য একজন দেবীর এই প্রস্তাব ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু গিলগামেশ এই প্রস্তাব অত্যন্ত রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ইশতারকে সরাসরি অপমান করেন এবং তার অতীত প্রেমিকদের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। গিলগামেশ বলেন যে, ইশতার যাকে ভালোবেসেছেন, তাকেই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করেছেন। তিনি মেষপালক দুমুজির কথা বলেন, যাকে পাতালে পাঠানো হয়েছিল; তিনি মালির কথা বলেন, যাকে ব্যাঙে পরিণত করা হয়েছিল। গিলগামেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি ইশতারের এই ধ্বংসাত্মক প্রেমের ফাঁদে পা দেবেন না।

গিলগামেশের এই প্রত্যাখ্যান কেবল একজন মানুষের অহংকার ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্বের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। একসময় রাজারা মন্দিরের পুরোহিত এবং দেব-দেবীদের আজ্ঞাবহ থাকতেন। কিন্তু গিলগামেশ প্রমাণ করলেন যে, একজন শক্তিশালী রাজা দেবতাদের হুমকিতেও ভয় পান না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে পলিটিকাল থিওলজি (Political Theology) বা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের একটি রূপান্তর হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। ইশতার এই অপমান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না। একজন মরণশীল মানুষের এই আস্পর্ধা তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তিনি সোজা স্বর্গে গিয়ে তার পিতা আন-এর কাছে বিচার দাবি করেন। তিনি আন-কে বাধ্য করেন ‘স্বর্গের ষাঁড়’ (Bull of Heaven) নামক এক ভয়াবহ জন্তুকে পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য, যাতে গিলগামেশকে ধ্বংস করা যায়। আন প্রথমে আপত্তি করলেও ইশতারের জেদের কাছে নতি স্বীকার করেন।

স্বর্গের ষাঁড় উরুক শহরে নেমে আসার সাথে সাথে এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসলীলা শুরু হয়। ষাঁড়টির নিশ্বাসের তাপে নদীর জল শুকিয়ে যায় এবং মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। ষাঁড়টি যখন মাটিতে জোরে পা ফেলে, তখন ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয় এবং শত শত মানুষ সেই ফাটলে তলিয়ে যায়। এটি মূলত প্রকৃতির খরা এবং মহামারীর একটি পৌরাণিক রূপ ছিল। গিলগামেশ এবং এনকিডু তখন শহরের মানুষকে বাঁচানোর জন্য সেই মহাজাগতিক ষাঁড়ের মুখোমুখি হন। দীর্ঘ এবং ভয়ানক এক লড়াইয়ের পর এনকিডু ষাঁড়টির শিং শক্ত করে ধরে রাখেন এবং গিলগামেশ তার তলোয়ার দিয়ে ষাঁড়ের ঘাড়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। তারা দেবতাদের পাঠানো এই বিশাল শক্তিকেও পরাস্ত করেন। এটি ছিল তাদের বীরত্বের চূড়ান্ত নিদর্শন। কিন্তু এনকিডু এই জয়ের আনন্দে এতই মাতোয়ারা ছিলেন যে, তিনি ষাঁড়ের একটি কাটা পা ইশতারের মুখের দিকে ছুঁড়ে মারেন এবং তাকে তাচ্ছিল্য করেন। এই কাজটির মাধ্যমে তারা সরাসরি দেবতাদের মর্যাদাকে ভুলুণ্ঠিত করেছিলেন।

স্বর্গের ষাঁড়কে হত্যা করা এবং ইশতারকে অপমান করার পর দেবতাদের সভায় এক জরুরি আলোচনা বসে। দেবতারা সিদ্ধান্ত নেন যে, গিলগামেশ এবং এনকিডু অনেক বেশি সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তারা হামবাবাকে মেরেছে, স্বর্গের গাছ কেটেছে এবং স্বর্গের ষাঁড়কে হত্যা করেছে। এর জন্য কাউকে না কাউকে শাস্তি পেতেই হবে। যেহেতু গিলগামেশ দুই-তৃতীয়াংশ দেবতা এবং উরুকের রাজা, তাই দেবতারা সিদ্ধান্ত নেন যে এই শাস্তির বোঝা এনকিডুর ঘাড়েই পড়বে। এনকিডু স্বপ্নে দেবতাদের এই সভার কথা জানতে পারেন এবং বুঝতে পারেন যে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। মানুষের ঔদ্ধত্যের কারণে দেবতাদের এই শাস্তির বিধান প্রাচীন সাহিত্যের একটি অত্যন্ত পরিচিত মোটিফ। একে হিউব্রিস (Hubris) বা অহংকারের পতন বলা হয়। তারা প্রমাণ করেছিল যে মানুষের শক্তি যতই অসীম হোক না কেন, মহাজাগতিক নিয়ম বা দেবতাদের ইচ্ছা লঙ্ঘন করলে তার চরম মূল্য চোকাতেই হয়। এনকিডুর এই আসন্ন মৃত্যুর মাধ্যমেই মহাকাব্যটি তার সবচেয়ে দার্শনিক এবং শোকাবহ পর্যায়ে প্রবেশ করে।

এনকিডুর মৃত্যু এবং শোকের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া (The Death of Enkidu and the Psychological Reaction to Grief)

দেবতাদের অভিশাপের পর এনকিডু হঠাৎ করেই এক অজানা এবং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। তার শরীরের সেই বিশাল বন্য শক্তি ধীরে ধীরে উবে যেতে শুরু করে। বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে এনকিডু প্রথমে নিজের নিয়তিকে অভিশাপ দেন। তিনি সেই শিকারিকে অভিশাপ দেন, যে প্রথম তাকে জঙ্গলে দেখেছিল। তিনি মন্দির-বারাঙ্গনা শামহাতকে অভিশাপ দেন, কারণ তার কারণেই এনকিডু জঙ্গল ছেড়ে মানুষের সমাজে এসেছিলেন। কিন্তু সূর্য দেবতা শামাশ তাকে মনে করিয়ে দেন যে, শামহাতের কারণেই তিনি গিলগামেশের মতো বন্ধু পেয়েছেন এবং রাজকীয় জীবন উপভোগ করেছেন। এই কথা শুনে এনকিডুর রাগ কিছুটা কমে এবং তিনি শামহাতকে আশীর্বাদ করেন। টানা বারো দিন ধরে এনকিডু মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েন। এই সময় তিনি বেশ কিছু ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেন, যেখানে তিনি দেখতে পান যে তাকে এক অন্ধকার এবং ধুলোমলিন জগতে (পাতালপুরী বা কুর্) টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে সবাই পাখির মতো পালক গায়ে দিয়ে ধুলো খাচ্ছে। মৃত্যুর এই ধীর এবং যন্ত্রণাদায়ক আগমন এনকিডুর মতো বীরের কাছেও প্রচণ্ড ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অবশেষে এনকিডু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার এই মৃত্যু কোনো বীরের মৃত্যু ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ারের আঘাতে না মরে, বিছানায় শুয়ে রোগে ভুগে মরার এই আক্ষেপ এনকিডুকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। গিলগামেশের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও বেশি মর্মান্তিক। তিনি তার প্রিয় বন্ধুর শরীরের পাশে বসে একটানা বিলাপ করতে থাকেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে এনকিডু আর নেই। তিনি শহরের সব মানুষকে নির্দেশ দেন শোক পালন করার জন্য। গিলগামেশ এনকিডুর শরীর মাটি চাপা দিতে দেননি। তিনি সাত দিন এবং সাত রাত সেই পচনশীল লাশের পাশে বসে ছিলেন। তার আশা ছিল হয়তো এনকিডু আবার চোখ খুলে তাকাবে। কিন্তু যখন এনকিডুর নাক থেকে একটি পোকা বের হয়ে আসে, তখন গিলগামেশের সামনে বাস্তবতার এক রুক্ষ এবং কঠিন চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে মৃত্যু মানে কেবল ঘুম নয়, এটি হলো শরীরের পচন এবং চূড়ান্ত অবলুপ্তি। এই দৃশ্যটি মানব সাহিত্যের ইতিহাসে শোক এবং মৃত্যুর শারীরিক বাস্তবতার এক অসামান্য দলিল।

গিলগামেশ তার রাজকীয় মুকুট এবং রেশমের পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি মাথার চুল উপড়ে ফেলেন এবং সিংহের ছাল গায়ে জড়িয়ে নেন। একজন সভ্য রাজা মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত অহংকার এবং মর্যাদা ত্যাগ করে বন্য মানুষের রূপ ধারণ করেন। তিনি উরুক শহর ছেড়ে বন্য প্রান্তরে দিকভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। গিলগামেশের এই আচরণকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এক গভীর এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস (Existential Crisis) বা অস্তিত্বের সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এনকিডুর মৃত্যু তার মনের ভেতর এমন এক শূন্যতার জন্ম দিয়েছিল, যা কোনো সম্পদ বা রাজ্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। তিনি কেবল তার বন্ধুকেই হারাননি, তিনি প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনিও মরণশীল। তার সেই এক-তৃতীয়াংশ মানবীয় সত্তা যে তাকে একদিন এই একই পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে, এই চিন্তা তাকে পাগল করে তুলেছিল। রাজা থেকে বন্য মানুষের এই রূপান্তর মূলত এনকিডুর জীবনের উল্টো যাত্রার একটি প্রতীকী রূপ।

শোকের এই তীব্রতা গিলগামেশকে একটি নতুন এবং মরিয়া লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি কোনোভাবেই এনকিডুর মতো মরবেন না। তিনি মৃত্যুকে জয় করবেন। তিনি শুনেছিলেন যে উটনাপিশটিম (Utnapishtim) নামের এক প্রাচীন মানুষ মহাপ্লাবনের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে দেবতাদের কাছ থেকে অমরত্বের বর পেয়েছিলেন। গিলগামেশ সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গিয়ে হলেও সেই উটনাপিশটিমকে খুঁজে বের করবেন এবং তার কাছ থেকে অমরত্বের রহস্য জেনে নেবেন। জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে মানুষ কতটা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে, গিলগামেশের এই যাত্রা তারই প্রমাণ। তিনি তার সিংহাসন, তার শহর, সবকিছু পেছনে ফেলে কেবল একটি প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে পথে নামেন – মানুষ কেন মরে? এই যাত্রা আর কোনো বীরত্ব দেখানোর জন্য ছিল না, এটি ছিল মানুষের সবচেয়ে আদিম এবং অজেয় শত্রু মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক একাকী লড়াই (Kramer, 1963)।

অমরত্বের সন্ধান এবং মানবজীবনের নশ্বরতার চূড়ান্ত পাঠ (The Quest for Immortality and the Final Lesson on Human Mortality)

অমরত্বের সন্ধানে গিলগামেশের যাত্রা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং দুর্গম অভিযান। তিনি সূর্য যেখান থেকে ওঠে, সেই মাশু পর্বতের কাছে পৌঁছান, যা ছিল বিছে-মানুষ বা স্করপিয়ন-ম্যানদের পাহারায়। তারা গিলগামেশকে সতর্ক করে দেয় যে এই পথ কোনো সাধারণ মানুষের জন্য নয়। কিন্তু গিলগামেশ পিছপা হলেন না। তিনি পর্বতের ভেতরের সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার সুড়ঙ্গ পাড়ি দেন, যেখান দিয়ে সূর্য রাতে ভ্রমণ করে। বারো ঘণ্টা এই দমবন্ধ করা অন্ধকারের পর তিনি এক অদ্ভুত এবং মায়াবী বাগানে এসে উপস্থিত হন, যেখানে গাছের ডালে ফলের বদলে দামি পাথর ঝুলে ছিল। সেখানে তার দেখা হয় সরাইখানার মালকিন দেবী সিদুরির সাথে। গিলগামেশের রুক্ষ এবং বন্য চেহারা দেখে সিদুরি প্রথমে ভয় পেয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। পরে গিলগামেশ তাকে তার উদ্দেশ্যের কথা জানান। সিদুরি তাকে অত্যন্ত বাস্তববাদী একটি উপদেশ দেন। তিনি বলেন, মানবজীবনের উদ্দেশ্য অমরত্ব খোঁজা নয়; বরং বর্তমান সময়টুকু পরিবার এবং পরিজনের সাথে আনন্দে কাটানোই হলো জীবনের আসল সার্থকতা।

কিন্তু গিলগামেশ সিদুরির এই কথায় সান্ত্বনা পেলেন না। তিনি মৃত্যুর খেয়া পারাপারকারী উরশানাবির সাহায্যে মৃত্যুর নদী পার হয়ে অবশেষে উটনাপিশটিমের দ্বীপে গিয়ে পৌঁছান। উটনাপিশটিম গিলগামেশকে মহাপ্লাবনের গল্প শোনান এবং বুঝিয়ে বলেন যে তাকে অমরত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে, মানবজাতিকে রক্ষা করার পুরস্কার হিসেবে। এটি এমন কোনো নিয়ম নয় যা সবার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। উটনাপিশটিম গিলগামেশকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে মৃত্যু হলো মহাজাগতিক শৃঙ্খলার একটি অংশ। গিলগামেশের সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করার জন্য উটনাপিশটিম তাকে একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন – যদি সে মৃত্যুকে জয় করতে চায়, তবে তাকে আগে ঘুমের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হবে। তিনি গিলগামেশকে টানা সাত দিন না ঘুমিয়ে জেগে থাকতে বলেন। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে গিলগামেশ বসার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এই ঘুম প্রমাণ করে যে, যে মানুষ সাধারণ ঘুমকে জয় করতে পারে না, সে কী করে অনন্ত ঘুম বা মৃত্যুকে জয় করবে? গিলগামেশ চরম হতাশায় ভেঙে পড়েন।

উটনাপিশটিমের স্ত্রী গিলগামেশের প্রতি কিছুটা সদয় হন। তিনি ফিরে যাওয়ার আগে গিলগামেশকে সমুদ্রের তলদেশে থাকা একটি বিশেষ কাঁটাযুক্ত গাছের কথা বলেন, যা খেলে হারানো যৌবন ফিরে পাওয়া যায়। এটি অমরত্ব দিতে পারে না, তবে বার্ধক্য থেকে দূরে রাখতে পারে। গিলগামেশ পায়ে ভারী পাথর বেঁধে সমুদ্রের নিচে ডুব দেন এবং অনেক কষ্টে সেই গাছটি তুলে আনেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নিজে সাথে সাথে এটি খাবেন না, বরং উরুকে ফিরে গিয়ে কোনো বৃদ্ধ মানুষের ওপর এটি পরীক্ষা করবেন। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে গিলগামেশ এখন আর সেই স্বার্থপর রাজা নেই, তার মধ্যে প্রজাদের প্রতি একটি দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছে। কিন্তু নিয়তির পরিহাস ছিল ভিন্ন। উরুকে ফেরার পথে গিলগামেশ যখন একটি পুকুরে স্নান করতে নামেন, তখন একটি সাপ সেই গাছের গন্ধ পেয়ে চুপিচুপি এসে তা খেয়ে ফেলে। সাপটি তখনই তার পুরনো খোলস পাল্টে নতুন রূপ ধারণ করে চলে যায়। গিলগামেশ শূন্য হাতে নদীর তীরে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তার এত দীর্ঘ যাত্রা, এত কষ্ট – সবকিছু এক নিমেষে অর্থহীন হয়ে যায়।

রিক্ত হাতে গিলগামেশ উরুক শহরের সামনে এসে দাঁড়ান। তার সাথে আর কোনো জাদুর গাছ নেই, কোনো অমরত্বের প্রতিশ্রুতি নেই। কিন্তু যখন তিনি শহরের সেই বিশাল ইটের দেয়ালগুলোর দিকে তাকান, তখন তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। তিনি উরশানাবিকে সেই দেয়ালের গাঁথুনি, এর বিশালত্ব এবং এর কারিগরির কথা গর্বের সাথে বর্ণনা করেন। গিলগামেশ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন যে, মানুষের শরীর নশ্বর ঠিকই, কিন্তু মানুষ তার কাজের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকতে পারে। তিনি যে শহরটি গড়েছেন, যে সভ্যতা তিনি তৈরি করেছেন, সেটিই তার প্রকৃত অমরত্ব। দর্শনের ভাষায় এটি হলো জীবনের প্রতি এক গভীর অ্যাকসেপটেন্স (Acceptance) বা মেনে নেওয়ার মানসিকতা। মৃত্যুর ভয়াবহতাকে পেছনে ফেলে তিনি তার শহরের দায়িত্ব নতুন করে কাঁধে তুলে নেন। গিলগামেশের এই মহাকাব্য কেবল একটি পৌরাণিক আখ্যান নয়, এটি হলো মানুষের অহংকার, শোক এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করার এক চিরন্তন দলিল, যা আজও আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় (Mitchell, 2004)।

মহাপ্লাবনের আখ্যান (The Narrative of the Great Flood)

ঐশ্বরিক বিরক্তি এবং মহাপ্লাবনের প্রেক্ষাপট (Divine Irritation and the Context of the Great Flood)

সুমেরীয় সভ্যতার ধূলিমলিন পাণ্ডুলিপিগুলোতে যে গল্পটি সবচেয়ে বেশি শিহরণ জাগায়, তা হলো এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যার কাহিনী। প্রকৃতির রুদ্ররূপ মেসোপটেমিয়ার মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল না। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষরা জানত নদী যেমন জীবন দেয়, নদী তেমনি কেড়েও নিতে পারে। তবে পুরাণে বর্ণিত এই প্লাবনটি ছিল জাগতিক যেকোনো বন্যার চেয়ে আলাদা। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের প্রধান চরিত্র ঝড়ের দেবতা এনলিল (Enlil) ছিলেন এই মহাজাগতিক ধ্বংসলীলার মূল কারিগর। পুরাণে বলা হয়েছে, মানুষ সৃষ্টির পর তাদের সংখ্যা পৃথিবীতে হু হু করে বাড়তে থাকে। মানুষ যত বাড়ে, তাদের কোলাহল ও শোরগোলও তত প্রকট হয়। এনলিল ছিলেন মূলত প্রশান্তিপ্রিয় এবং কিছুটা খামখেয়ালি সত্তা। মানুষের এই নিরন্তর হৈচৈ তার দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞানী টমাস ম্যালথাস (Thomas Malthus)-এর ম্যালথুসীয় জনসংখ্যা তত্ত্ব (Malthusian Theory of Population)-এর একটি আদিম এবং পৌরাণিক প্রতিচ্ছবি এখানে লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতি বা দৈব শক্তি যখন অনুভব করে যে কোনো একটি প্রজাতির ভার পৃথিবী আর সইতে পারছে না, তখন সে ভারসাম্য ফেরাতে কঠোর পথ বেছে নেয়।

এনলিলের এই বিরক্তি কেবল ব্যক্তিগত ঘুমের অভাব ছিল না; এটি ছিল মহাজাগতিক শৃঙ্খলার এক ধরনের সংকটের সংকেত। তিনি দেবতাদের সর্বোচ্চ সভায় প্রস্তাব দিলেন যে, অবাধ্য এবং কোলাহলপূর্ণ মানবজাতিকে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। দেবতারা তখন পৃথিবীর প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন এবং এনলিলের প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। সভায় যখন এই প্রস্তাব উঠল, অধিকাংশ দেবতাই এনলিলের পেশিশক্তি এবং প্যান্থিয়নে তার উচ্চমর্যাদার কারণে এর বিরোধিতা করার সাহস পেলেন না। এনলিল চাইলেন এক বিশাল জলোচ্ছ্বাসের মাধ্যমে পৃথিবীকে পরিষ্কার করতে। এই সিদ্ধান্তটি কোনো নৈতিক বিচারের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়নি, বরং এটি ছিল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এনলিল মনে করেছিলেন মানুষের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ এবং খরাপ্রবণ আবহাওয়ায় যেখানে জল ছিল সবচেয়ে দামি সম্পদ, সেখানে সেই জলকেই ধ্বংসের অস্ত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। নৃবিজ্ঞানী ব্রনিস্ল ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski)-এর ফাংশনালিজম (Functionalism) বা ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের লেন্স থেকে দেখলে বোঝা যায়, এই মিথটি মূলত মেসোপটেমিয়ার ভয়াবহ বন্যার বাস্তবতাকে একটি ঐশ্বরিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা ছিল।

মহাপ্লাবনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে এনলিলের যে চারিত্রিক দৃঢ়তা ও জেদ কাজ করেছিল, তা সুমেরীয় সমাজের রাজনৈতিক কাঠামোরই প্রতিফলন। সমাজ যখন অতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং সম্পদের সংকটে ভোগে, তখন শাসকরা অনেক সময় চরম কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দেবতারাও এখানে অনেকটা সেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের মতোই আচরণ করেছিলেন। তারা একটি পবিত্র শপথ নিলেন যে, এই ধ্বংসযজ্ঞের কথা কোনো মরণশীল মানুষের কানে পৌঁছাতে দেওয়া হবে না। মহাবিশ্বের এই ষড়যন্ত্র ছিল নিশ্ছিদ্র। মানুষ তাদের প্রতিদিনের মতো হালচাষ করছিল, ফসল বুনছিল, বিয়ের উৎসব করছিল – কেউ জানত না যে আকাশ থেকে ধেয়ে আসছে এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার। এই অনিশ্চয়তা এবং ভীতিই ছিল সুমেরীয় ধর্মের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রকৃতি যে কোনো সময় তার আশীর্বাদ ফিরিয়ে নিতে পারে, এই ধ্রুব সত্যটিকেই মহাপ্লাবনের প্রেক্ষাপট হিসেবে চয়ন করা হয়েছিল। দেবতাদের এই গোপনীয়তা প্রমাণ করে যে, তারা মানুষকে আর তাদের অংশীদার বা ভৃত্য হিসেবে নয়, বরং একটি বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন (Lambert & Millard, 1969)।

এনকির চাতুর্য এবং জিউসুদ্রার প্রতি সতর্কবার্তা (Enki’s Cunning and the Warning to Ziusudra)

দেবতাদের সভায় যখন মানবজাতিকে ধ্বংস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, তখন কেবল একজন দেবতা এই পরিকল্পনার সাথে একমত হতে পারেননি। তিনি হলেন প্রজ্ঞার দেবতা এনকি (Enki)। এনকি ছিলেন মানবজাতির নির্মাতা এবং তাদের পরম হিতৈষী। তিনি জানতেন যে মানুষকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিলে দেবতাদের নিজেদের অস্তিত্বও অর্থহীন হয়ে পড়বে। কারণ মানুষ না থাকলে দেবতাদের মন্দিরে ভোগ নিবেদন করার কেউ থাকবে না। কিন্তু এনকি সরাসরি এনলিলের বিরোধিতা করার মতো রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন না। তাছাড়া দেবতাদের সেই অলঙ্ঘনীয় শপথ ভাঙার সাহসও তার ছিল না। এখানে এনকির চরিত্রে আমরা ট্রিকস্টার আর্কিটাইপ (Trickster Archetype) বা চালাক ও প্রজ্ঞাবান সত্তার এক অসামান্য উদাহরণ দেখতে পাই। তিনি শপথ রক্ষা করেও কীভাবে মানুষকে বাঁচানো যায়, তার একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত পথ বের করলেন। তিনি চাইলেন এমন একজন মানুষকে সতর্ক করতে, যে যোগ্য এবং ধার্মিক। শুরূপ্পাক নগরীর রাজা জিউসুদ্রা (Ziusudra) ছিলেন ঠিক তেমন একজন মানুষ।

জিউসুদ্রা ছিলেন দেবতা এনকির একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি প্রতিদিন মন্দিরে গিয়ে ধ্যান করতেন এবং দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য প্রার্থনা করতেন। একদিন জিউসুদ্রা যখন তার নলখাগড়ার তৈরি কুঁড়েঘরে বসে ধ্যানমগ্ন ছিলেন, তখন এনকি সেই কুঁড়েঘরের দেয়ালের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন। এনকি সরাসরি জিউসুদ্রার সাথে কথা বললেন না, কারণ তাতে দেবতাদের শপথ ভঙ্গ হতো। তিনি কুঁড়েঘরের দেয়ালকে উদ্দেশ্য করে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “হে দেয়াল, শোনো! আমার কথা মন দিয়ে শোনো! সমস্ত নগররাষ্ট্রের ওপর দিয়ে এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় ও বন্যা বয়ে যেতে চলেছে। মানবজাতির বীজ রক্ষা করার জন্য এখনই একটি বিশাল নৌকা তৈরি করো।” জিউসুদ্রা দেয়ালের ওপার থেকে এই ঐশ্বরিক সংকেতটি শুনতে পান। প্রজ্ঞার এই চাতুর্যপূর্ণ সঞ্চার মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলের জয়গান গায়। এনকি প্রমাণ করেছিলেন যে পেশিশক্তি বা ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার চেয়ে সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা অনেক বেশি শক্তিশালী। জিউসুদ্রা বুঝতে পারলেন যে আকাশ থেকে কোনো সাধারণ বৃষ্টি নামবে না, এটি হবে জগতের শেষ প্রহর।

এনকির এই গোপন সতর্কতা কেবল একটি প্রাণ বাঁচানোর গল্প নয়, এটি মূলত মেসোপটেমিয়ার মানুষের টিকে থাকার কৌশলের একটি দার্শনিক রূপক। প্রকৃতির ধ্বংসলীলার মাঝখানেও যে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পথ বের করা সম্ভব, এনকি সেই শিক্ষাটিই জিউসুদ্রাকে দিয়েছিলেন। এনকি জিউসুদ্রাকে নির্দেশ দিলেন তার ঘর ভেঙে সেই কাঠ দিয়ে নৌকা বানাতে এবং তার সমস্ত ধনসম্পদ বিসর্জন দিতে। জীবনের এই চরম সংকটে পার্থিব সম্পদের চেয়ে প্রাণরক্ষা যে বেশি জরুরি, এই সত্যটি জিউসুদ্রা দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন। জিউসুদ্রার এই আনুগত্য এবং এনকির পরোক্ষ সাহায্য প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা দেব-মানুষের সম্পর্কের মাঝে একটি সহমর্মিতার স্থান খুঁজে পেয়েছিল। এনকি এখানে কোনো জাদুকর নন, বরং তিনি একজন দক্ষ পরামর্শদাতা। তিনি জানতেন যে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মাঝেও একটি ক্ষুদ্র বীজ রক্ষা করতে পারলে আবার নতুন করে প্রাণের সঞ্চার সম্ভব। এই যে বীজ রক্ষার ধারণা, এটিই সুমেরীয় বিশ্বতত্ত্বকে এক ধরনের আশাবাদী রূপ দান করে, যদিও তা ভয়াবহ ধ্বংসের চাদরে মোড়ানো (Kramer, 1963)।

নৌকার নির্মাণ এবং মহাজাগতিক প্রাণভাণ্ডার সংরক্ষণ (Construction of the Boat and Preservation of the Cosmic Seed)

এনকির নির্দেশ পাওয়ার পর জিউসুদ্রা এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি। তিনি জানতেন যে সময়ের কাঁটা তার প্রতিকূলে। নৌকার নকশাটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। এটি কোনো সাধারণ নৌযান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বিশাল ভাসমান শোরুম বা কক্ষবিশিষ্ট জাহাজ। জিউসুদ্রা তার সমস্ত কারিগর এবং শ্রমিকদের ডেকে পাঠালেন। তাদের বলা হলো যে তিনি দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য একটি বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করছেন। মেসোপটেমিয়ার মানুষের কাছে রাজকীয় কাজে অংশগ্রহণ করা ছিল একটি পবিত্র দায়িত্ব। তারা দিনরাত এক করে কাজ করতে শুরু করল। নৌকার বাইরে এবং ভেতরে অ্যাসফল্ট বা বিটুমিন দিয়ে জলরোধী করা হলো। স্থাপত্যবিদ্যার এই যে আদিম উৎকর্ষতা, তা প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা ভৌত প্রকৌশল বিদ্যায় কতটা পারদর্শী ছিল। নৌকার প্রতিটি তলা এবং কক্ষ এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছিল যাতে সেখানে বিপুল পরিমাণ ভার সহ্য করার ক্ষমতা থাকে। এটি ছিল মূলত এক ধরনের সিভিলাইজেশনাল টেকনোলজি (Civilizational Technology) বা সভ্যতা রক্ষার প্রযুক্তি।

নৌকা প্রস্তুত হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু হলো। এনকি নির্দেশ দিয়েছিলেন পৃথিবীর সমস্ত জীবের বীজ নৌকায় তুলে নিতে। এখানে ‘বীজ’ শব্দটি অত্যন্ত প্রতীকী। এটি কেবল আক্ষরিক অর্থেই শস্যের বীজ ছিল না, বরং এটি ছিল জীবনের সারবস্তু। জিউসুদ্রা তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, দক্ষ কারিগর এবং সমস্ত গৃহপালিত ও বন্য প্রাণীদের এক এক জোড়া করে নৌকায় তুলে নিলেন। এই প্রক্রিয়াটিকে নৃবিজ্ঞানের কালচারাল প্রিজারভেশন (Cultural Preservation) বা সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের একটি আদিম রূপ বলা যেতে পারে। জিউসুদ্রা জানতেন যে বন্যা শেষে পৃথিবী যখন আবার জেগে উঠবে, তখন নতুন করে সভ্যতা শুরু করার জন্য কারিগরি জ্ঞান এবং জৈবিক বৈচিত্র্য দুটোই প্রয়োজন হবে। তাই তিনি কেবল জীবন বাঁচাননি, তিনি বাঁচিয়েছিলেন মানব সভ্যতার অর্জিত জ্ঞান এবং প্রকৃতির ভারসাম্য। নৌকাটি একাধারে একটি আশ্রয়স্থল এবং একটি চলমান জাদুঘর হিসেবে কাজ করছিল।

নৌকায় আরোহণের দৃশ্যটি ছিল একাধারে করুণ এবং গম্ভীর। শহরের সাধারণ মানুষ তখনও জানত না যে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। তারা হয়তো অবাক হয়ে দেখছিল কেন তাদের রাজা এত সম্পদ এবং প্রাণী নিয়ে একটি বিশাল কাঠের খোলে আটকা পড়ছেন। জিউসুদ্রা যখন নৌকার দরজা বন্ধ করলেন, তখন চারদিকের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যেতে শুরু করল। বাতাসের গতি বেড়ে গেল এবং ধুলোয় আকাশ অন্ধকার হয়ে এল। এই মুহূর্তটি ছিল মানব ইতিহাসের এক বিশাল যবনিকা পাতের মতো। নৌকার ভেতরে ছিল জীবনের স্পন্দন, আর বাইরে ছিল আসন্ন মৃত্যুর হিমশীতল নীরবতা। জিউসুদ্রার এই ত্যাগ এবং পরিশ্রম প্রমাণ করে যে, সভ্যতা টিকে থাকার জন্য একজন স্বপ্নদর্শী নেতার প্রয়োজন হয়, যে বিপদের সংকেত বুঝতে পারে এবং আগাম প্রস্তুতি নিতে জানে। সুমেরীয়রা এই আখ্যানের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকে এই শিক্ষাই দিতে চেয়েছিল যে, প্রস্তুতিহীন জাতি প্রকৃতির রোষানলে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। জিউসুদ্রা ছিলেন সেই প্রস্তুতির এক উজ্জ্বল মহাজাগতিক প্রতীক (Lambert & Millard, 1969)।

সাত দিন সাত রাতের প্রলয় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (Seven Days and Nights of Cataclysm and Natural Disaster)

প্রলয়ের সূচনা হয়েছিল এক ভয়াবহ গর্জনের মাধ্যমে। সুমেরীয় পুরাণ অনুযায়ী, দক্ষিণ দিক থেকে এক বিশাল কালো মেঘ উড়ে এল এবং পুরো আকাশ ঢেকে দিল। বিদ্যুতের চমকানি আর বজ্রপাতে মনে হচ্ছিল আকাশ ভেঙে পড়ছে। এরপরই শুরু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। এটি কোনো সাধারণ বর্ষা ছিল না। একে বলা হয়েছে ‘আকাশের দরজা খুলে যাওয়া’। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদী তাদের সীমানা ছাড়িয়ে জনপদ ভাসিয়ে দিতে শুরু করল। মাটির নিচ থেকেও জল চুঁইয়ে উঠতে লাগল। সাত দিন এবং সাত রাত ধরে এই অবিরাম বর্ষণ ও ঝড় পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে নিল। চারদিকে কেবল জল আর জল। মেসোপটেমিয়ার সমতল ভূমিতে যেখানে দৃষ্টিসীমা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে, সেখানে এখন কেবল উত্তাল ঢেউয়ের রাজত্ব। এই ধ্বংসযজ্ঞকে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইকোলজিক্যাল কলাপ্স (Ecological Collapse) বা প্রতিবেশগত পতন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়, যেখানে প্রকৃতি তার সমস্ত শৃঙ্খলা হারিয়ে আবার আদিম বিশৃঙ্খলায় ফিরে গিয়েছিল।

এই সাত দিনের বিভীষিকা দেবতাদেরও আতঙ্কিত করে তুলেছিল। তারা যে ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন, তার ব্যাপকতা দেখে তারা নিজেরাই নিজেদের সিংহাসনে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন। প্রেমের দেবী ইনান্না মানুষের এই করুণ মৃত্যু দেখে বিলাপ করতে শুরু করলেন। তিনি আক্ষেপ করে বললেন যে, কেন তিনি দেবতাদের সভায় এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। দেবতারা বুঝতে পারলেন যে মানুষকে ধ্বংস করে তারা আসলে নিজেদের সেবকদেরই হারিয়েছেন। চারদিকে পচা লাশের গন্ধ আর ধ্বংসাবশেষ ভেসে বেড়াচ্ছিল। নৌকার ভেতরে জিউসুদ্রা এবং তার সঙ্গীরা সেই উত্তাল সমুদ্রের মাঝে দুলছিলেন। এটি ছিল চরম অনিশ্চয়তার একটি সময়। মানুষের তৈরি সমস্ত বাঁধ, জিগুরাত এবং অট্টালিকা জলের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। সুমেরীয় সাহিত্যের এই বর্ণনাগুলো অত্যন্ত দৃশ্যমান এবং হৃদয়স্পর্শী। তারা বৃষ্টির শব্দকে তুলনা করেছিল মহাজাগতিক রোদনের সাথে। এই প্লাবন ছিল মানুষের অহংকার এবং কোলাহলের বিপরীতে প্রকৃতির এক বিশাল এবং নিস্তব্ধ জবাব।

সপ্তম দিন শেষে হঠাৎ করেই ঝড় থেমে গেল। সূর্য আবার মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল। জিউসুদ্রা নৌকার একটি জানালা খুলে দিলেন এবং তার মুখে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ল। তিনি দেখলেন চারদিকে কেবল অনন্ত জলরাশি, কোথাও কোনো ডাঙার চিহ্ন নেই। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন। এই যে ঝড়ের পরের স্তব্ধতা, এটি ছিল এক নতুন পৃথিবীর জন্মমুহূর্ত। জিউসুদ্রা বুঝতে পারলেন যে তিনি এবং তার নৌকার আরোহীরাই এখন এই পৃথিবীর একমাত্র প্রতিনিধি। জিউসুদ্রা একে একে একটি পায়রা এবং একটি সোয়ালো পাখি উড়িয়ে দিলেন দেখার জন্য যে কোথাও ডাঙা পাওয়া যায় কি না। পাখিগুলো বারবার ফিরে এল, কারণ বসার মতো কোনো শুকনো জায়গা ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি কাককে উড়িয়ে দেওয়া হলো এবং সে আর ফিরে এল না। এর মানে ছিল কোথাও জল সরে গেছে এবং মাটি জেগে উঠেছে। এই পাখির মাধ্যমে খবর পাওয়ার যে মোটিফ, তা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের ক্ষমতারই একটি অংশ। তারা পাখির গতিবিধি দেখে দিক নির্ণয় করতে জানত। জিউসুদ্রার নৌকা অবশেষে নিসির (Nisir) নামক একটি পর্বতের চূড়ায় গিয়ে ভিড়ল (Dalley, 1989)।

প্লাবন পরবর্তী সময় এবং জিউসুদ্রার অমরত্ব লাভ (Post-Flood Era and the Immortality of Ziusudra)

নৌকা থেকে নেমে জিউসুদ্রার প্রথম কাজ ছিল দেবতাদের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তিনি একটি যজ্ঞের আয়োজন করলেন এবং সুগন্ধি নৈবেদ্য উৎসর্গ করলেন। প্লাবনের এই দীর্ঘ সময়ে দেবতারা কোনো খাবার পাননি, কারণ পৃথিবীতে মানুষ ছিল না। যজ্ঞের আগুনের ধোঁয়া আকাশে পৌঁছানো মাত্রই দেবতারা মাছিদের মতো সেই যজ্ঞের চারপাশে ভিড় করতে লাগলেন। এই দৃশ্যটি একাধারে অদ্ভুত এবং গভীর অর্থবহ। এটি নির্দেশ করে যে দেবতারা মানুষের ওপর কতটা নির্ভরশীল। দেবতারা বুঝতে পারলেন যে জিউসুদ্রাকে বাঁচিয়ে রেখে এনকি আসলে দেবতাদেরই বাঁচিয়েছেন। তবে ঝড়ের দেবতা এনলিল যখন দেখলেন যে কিছু মানুষ বেঁচে আছে, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি গর্জন করে উঠলেন – কে সেই দেবতা যে তার আদেশ অমান্য করেছে? এনকি তখন শান্তভাবে এগিয়ে এলেন এবং এনলিলকে প্রজ্ঞার সাথে বোঝালেন। এনকি বললেন, “বিচক্ষণ শাসক নিরপরাধকে শাস্তি দেন না। যে অন্যায় করেছে তাকে দণ্ড দাও, কিন্তু ঢালাওভাবে সবাইকে ধ্বংস করা কোনো ন্যায়বিচার নয়।”

এনলিল শেষ পর্যন্ত এনকির যুক্তির সারবত্তা বুঝতে পারলেন। তার রাগ প্রশমিত হলো। তিনি জিউসুদ্রা এবং তার স্ত্রীর হাত ধরে তাদের আশীর্বাদ করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে, জিউসুদ্রা আর সাধারণ মরণশীল মানুষ থাকবেন না। মানবজাতিকে রক্ষা করার এই অসাধারণ বীরত্ব এবং ধৈর্যের পুরস্কার হিসেবে তাকে দেবতাদের মতো অমরত্ব দান করা হলো। তাকে পাঠানো হলো দিলমুন (Dilmun) নামক এক পবিত্র উদ্যানে, যেখানে মৃত্যু বা বার্ধক্য নেই। জিউসুদ্রার এই রূপান্তর মূলত মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির বিজয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে অমরত্ব লাভ করার এই কাহিনী সুমেরীয় সাহিত্যের এক চিরন্তন প্রেরণা। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অমরত্ব দান আসলে একটি সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বীকৃতি। জিউসুদ্রা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি পুরনো সভ্যতার জ্ঞানকে নতুন পৃথিবীতে বহন করে এনেছেন। তাকে অমর করার অর্থ হলো সেই জ্ঞান এবং ঐতিহ্যকে চিরস্থায়ী করা।

জিউসুদ্রা অমরত্ব পেলেও সাধারণ মানুষের জন্য কিছু নতুন নিয়ম বেঁধে দেওয়া হলো। দেবতারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ভবিষ্যতে যেন মানুষের সংখ্যা আর অনিয়ন্ত্রিতভাবে না বাড়ে। তারা পৃথিবীতে বন্ধ্যাত্ব, শিশুমৃত্যু এবং প্রসবকালীন জটিলতার মতো কিছু প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করলেন। এটি ছিল এক ধরনের মহাজাগতিক রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (Resource Management)। তারা চাইলেন মানুষ থাকুক, কিন্তু তারা যেন আর কক্ষনো দেবতাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। এই প্লাবন পরবর্তী ব্যবস্থাগুলো প্রমাণ করে যে সুমেরীয়রা বিশ্বকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্থান হিসেবে দেখত। সেখানে যেমন আশীর্বাদ আছে, তেমনি আছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। জিউসুদ্রার গল্পটি সুমেরীয়দের প্রতিটি নববর্ষের উৎসবে পাঠ করা হতো। এটি তাদের মনে করিয়ে দিত যে জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং প্রকৃতির রোষানল থেকে বাঁচতে হলে দেবতাদের সন্তুষ্ট রাখা এবং প্রজ্ঞার পথ অনুসরণ করা অপরিহার্য। জিউসুদ্রা দিলমুনের সেই শান্ত বাগানে বসে নতুন পৃথিবীর বিকাশ পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন (George, 2003)।

তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা (Comparative Mythology and Historical Reality)

সুমেরীয় মহাপ্লাবনের এই আখ্যানটি কেবল মেসোপটেমিয়ার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিভ্রমণ সম্পন্ন করেছে। আক্কাদীয় পুরাণে জিউসুদ্রার নাম হয়ে যায় আত্রাহাসিস (Atrahasis), আর ব্যাবিলনীয়দের কাছে তিনি পরিচিত হন উটনাপিশটিম (Utnapishtim) নামে। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত রূপান্তরটি আমরা দেখতে পাই হিব্রু বাইবেলে নোয়াহ বা নূহের (Noah) কাহিনীর মাঝে। নূহের নৌকা, জোড়ায় জোড়ায় প্রাণী রক্ষা এবং পাখির মাধ্যমে ডাঙার খবর নেওয়া – এই প্রতিটি উপাদানই সুমেরীয় মূল গল্পের সাথে হুবহু মিলে যায়। এমনকি গ্রিক পুরাণে ডিউকালিয়ন (Deucalion) এবং হিন্দু পুরাণে মনুর (Manu) প্লাবন কাহিনীর মধ্যেও এই সুমেরীয় প্রভাবের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এই তুলনামূলক আলোচনাকে তাত্ত্বিক পরিভাষায় কালচারাল ডিফিউশন (Cultural Diffusion) বা সাংস্কৃতিক বিস্তার বলা হয়। একটি শক্তিশালী আখ্যান কীভাবে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিভিন্ন ধর্মের ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, মহাপ্লাবনের কাহিনী তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

তবে এই কাহিনীর পেছনে কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা আছে কি না, তা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক লিওনার্ড উলি (Leonard Woolley) যখন উর (Ur) নগরীতে খননকাজ চালাচ্ছিলেন, তখন তিনি মাটির অনেক গভীরে প্রায় আট ফুট পুরু এক স্তরের পলিমাটি খুঁজে পান। এই পলিমাটির স্তরের নিচে এবং ওপরে দুই ধরনের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ ছিল। উলি দাবি করেছিলেন যে তিনি মহাপ্লাবনের ভৌত প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। যদিও পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন সময়ে বন্যা হয়েছে এবং সবগুলো বন্যা একই সময়ের নয়। অর্থাৎ কোনো একটি বৈশ্বিক প্লাবনের চেয়ে অনেকগুলো বিশাল আঞ্চলিক বন্যার স্মৃতি মিলেমিশে এই মহাপ্লাবনের পুরাণের জন্ম দিয়েছে। একে ইতিহাসের হিস্টোরিক্যাল পার্টিকুলারিজম (Historical Particularism) হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে একটি বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতাকে ঘিরে একটি মহাজাগতিক মিথ গড়ে ওঠে। মেসোপটেমিয়ার মানুষ যেহেতু নদীবিধৌত সমতলে বাস করত, তাই তাদের কাছে বিশাল বন্যা ছিল পৃথিবীর ধ্বংসের সমার্থক।

পুরাণতত্ত্বের গবেষক মিরচিয়া এলিয়াদে (Mircea Eliade) মনে করেন যে মহাপ্লাবনের এই মিথটি মূলত এক ধরনের ‘মহাজাগতিক পুনর্গঠন’। পৃথিবী যখন পাপে বা বিশৃঙ্খলায় ভরে যায়, তখন তাকে জল দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করার প্রয়োজন পড়ে। জল এখানে কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি শুদ্ধিকরণেরও প্রতীক। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে প্লাবনের পর যে নতুন জগত সৃষ্টি হয়েছে, তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। এই মিথটি মানুষের মনে এক ধরনের আশার জন্ম দেয় যে, চরম ধ্বংসের পর আবার নতুন করে শুরু করা সম্ভব। জিউসুদ্রার সেই বিশাল নৌকাটি আসলে মানব সভ্যতার সংকল্পের প্রতীক। সেই নৌকায় বয়ে আনা জীবন এবং প্রজ্ঞার কাহিনী আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে প্রজ্ঞা এবং ধৈর্যই হলো মানুষের একমাত্র রক্ষাকবচ। সুমেরীয়দের এই মহাপ্লাবনের আখ্যান তাই কেবল একটি প্রাচীন গল্প নয়, এটি মানব অস্তিত্বের এক চিরন্তন সংগ্রাম ও উত্তরণের আখ্যান (Jacobsen, 1976)।

“Nuh Tufanı Efsanesi” Hakkında Bir İnceleme | by Diamond Tema | Medium
মহাপ্লাবনের আখ্যানবাহী চারটি কিউনিফর্ম ফলকের সমন্বিত আলোকচিত্র, যেখানে আক্কাদীয়-ব্যাবিলনীয় প্লাবনকাহিনীর বহু-কলামবিশিষ্ট লিপি, ফলকের ভাঙন, পুনর্গঠন, এবং প্রাচীন মেসোপটেমীয় লিপিকারদের নথিবদ্ধকরণ পদ্ধতির বস্তুগত বৈশিষ্ট্য একসাথে দেখা যায়; Source: The Schøyen Collection – The Atrahasis Epic / Old Babylonian cuneiform tablets

মে বা সভ্যতার নিয়মকানুন (Me or the Rules of Civilization)

মে-এর তাত্ত্বিক ও মহাজাগতিক ভিত্তি (Theoretical and Cosmic Foundation of Me)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষ তাদের চারপাশের সমাজ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে কোনো বিশৃঙ্খল বা আকস্মিক ঘটনার সমষ্টি হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিল না। তারা বিশ্বাস করত যে দৃশ্যমান এই জগতের প্রতিটি উপাদানের পেছনে একটি অদৃশ্য, সুনির্দিষ্ট এবং অলঙ্ঘনীয় নিয়ম কাজ করছে। সুমেরীয় চিন্তাধারায় এই নিয়ম বা ঐশ্বরিক ডিক্রিগুলোকে একত্রে ‘মে’ (Me) বলা হতো। সহজ বাংলায় একে সভ্যতার ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। মে কেবল কোনো রাজার জারি করা সাধারণ আইন ছিল না, এটি ছিল মহাজাগতিক শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি। সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় একে অনেক সময় কসমোলজিক্যাল ডিটারমিনিজম (Cosmological Determinism) বা মহাজাগতিক নিয়তিবাদের একটি প্রাচীন রূপ হিসেবে দেখা হয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি থেকে শুরু করে মাঠে কৃষকের লাঙল চালানো পর্যন্ত – সবকিছুই আগে থেকে নির্ধারিত এই মে-গুলোর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই নিয়মগুলোর কোনো জন্ম বা মৃত্যু নেই। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি লগ্নে যখন স্বর্গ ও মর্ত্য আলাদা হয়েছিল, তখন থেকেই এই মে-গুলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কাঠামোগত অখণ্ডতা ধরে রেখেছে। দেবতা আন এবং এনলিল এই নিয়মগুলোর রূপকার হলেও, তারা নিজেরাও এই নিয়মের অধীন ছিলেন। এমনকি সর্বশক্তিমান দেবতাদেরও সাধ্য ছিল না একটি মে-কে তার নির্দিষ্ট গতিপথ থেকে বিচ্যুত করার (Kramer, 1963)।

সুমেরীয়দের কাছে মে-এর ধারণাটি একই সাথে বিমূর্ত এবং বস্তুগত ছিল। আধুনিক যুগে আমরা যেমন ‘আইন’ বা ‘সভ্যতা’ বলতে কিছু বিমূর্ত ধারণাকে বুঝি, প্রাচীন মানুষের চিন্তার জগত ঠিক সেরকম ছিল না। তারা বিমূর্ত ধারণাকে একটি ভৌত আকার দিতে পছন্দ করত। পুরাণগুলোতে প্রায়শই দেখা যায় যে দেবতারা মে-গুলোকে হাতে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, নৌকায় তুলছেন বা নির্দিষ্ট কোনো বাক্সে বন্দী করে রাখছেন। মানুষের মনস্তত্ত্বে এই ধরনের চিন্তাধারাকে কগনিটিভ মেটেরিয়ালিজম (Cognitive Materialism) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বস্তুবাদ বলা যেতে পারে। মেসোপটেমিয়ার মানুষ বিশ্বাস করত যে রাজত্ব, সত্য বা সংগীতের মতো ধারণাগুলো কেবল মানুষের মনের ভাবনা নয়; স্বর্গে এগুলোর এক একটি বস্তুগত রূপ রয়েছে। এই বস্তুগত রূপগুলো দেবতাদের হেফাজতে থাকে। যখন কোনো নগররাষ্ট্রে নতুন রাজার অভিষেক হতো, তখন মানুষ মনে করত যে স্বর্গের সেই নির্দিষ্ট মে-টি সাময়িকভাবে রাজার ওপর ভর করেছে। এই মে ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রথা এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারে না। এটি ছিল মূলত এক ধরনের ঐশ্বরিক লাইসেন্স, যা সমাজ পরিচালনার প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিখুদ্র কাজের বৈধতা প্রদান করত (Jacobsen, 1976)।

এই নিয়মকানুনগুলোর কোনো নৈতিক বিভাজন ছিল না, যা আধুনিক চিন্তাধারার সাথে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে। আমরা সাধারণত সভ্যতার নিয়ম বলতে ভালো বা ইতিবাচক কিছুকেই বুঝে থাকি। কিন্তু সুমেরীয়দের মে-এর তালিকায় ভালো-মন্দের কোনো বাছবিচার ছিল না। সেখানে যেমন ন্যায়বিচার, শান্তি এবং বীরত্বের মে ছিল, তেমনি ভয়, ধ্বংস, মিথ্যাচার এবং পতিতাবৃত্তির জন্যও আলাদা মে বরাদ্দ ছিল। তারা অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছিল। তারা জানত যে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ কেবল ইতিবাচক উপাদান দিয়ে চলতে পারে না। ধ্বংস ছাড়া যেমন নতুন নির্মাণ সম্ভব নয়, তেমনি ভয় ছাড়া মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা তৈরি হয় না। দর্শনের পরিভাষায় একে হোলিস্টিক রিয়ালিজম (Holistic Realism) বা সামগ্রিক বাস্তববাদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই ত্রুটিপূর্ণ এবং দ্বান্দ্বিক রূপটিকে তারা অস্বীকার না করে, তাকে একটি ঐশ্বরিক শৃঙ্খলার আওতায় নিয়ে এসেছিল। তাদের চোখে, পৃথিবীর বুকে যা কিছুই টিকে আছে বা যার কোনো নির্দিষ্ট কার্যকারিতা আছে, তার সবকিছুর পেছনেই একটি করে মে কাজ করছে। এই নিখুঁত কাঠামোগত চিন্তা সুমেরীয়দের মহাজাগতিক দর্শনকে এক অন্য মাত্রায় উন্নীত করেছিল (Horowitz, 1998)।

দেবতা এনকি এবং আবজুতে মে-এর সংরক্ষণ (God Enki and the Preservation of Me in Abzu)

মহাবিশ্বের এতগুলো জটিল এবং সংবেদনশীল নিয়মকানুন সংরক্ষণের দায়িত্ব কোনো সাধারণ বা বদমেজাজি দেবতার হাতে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। ঝড়ের দেবতা এনলিল ছিলেন মহাবিশ্বের নির্বাহী প্রধান, কিন্তু তার স্বভাব ছিল ভীষণ খামখেয়ালি। অন্যদিকে আকাশের দেবতা আন ছিলেন মানুষের দৈনন্দিন জগৎ থেকে অনেক দূরের এক সত্তা। তাই মে-গুলোর সুরক্ষার জন্য সুমেরীয়রা প্রজ্ঞা ও জলের দেবতা এনকিকে (Enki) বেছে নিয়েছিল। এনকির বাসস্থান ছিল পৃথিবীর নিচে অবস্থিত মিঠা জলের এক অনন্ত আধার, যার নাম আবজু (Abzu)। এই আবজুকে মেসোপটেমিয়ার মানুষ সমস্ত জ্ঞান, জাদুবিদ্যা এবং কারিগরি বিদ্যার উৎপত্তিস্থল মনে করত। মে-গুলো এনকির এই পাতালস্থ প্রাসাদে অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষিত থাকত। এনকি এখানে কেবল একজন পাহারাদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই নিয়মকানুনের প্রধান সমন্বয়ক। জল যেমন সব জায়গায় সহজেই প্রবেশ করতে পারে এবং যেকোনো পাত্রের আকার ধারণ করতে পারে, এনকির প্রজ্ঞাও ঠিক তেমনি সভ্যতার প্রতিটি স্তরে মে-গুলোকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করত। জলের এই বহমানতার সাথে মে-এর গতিশীলতার এক চমৎকার সাযুজ্য রয়েছে (Dalley, 1989)।

এনকি মে-গুলোকে নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখতেন না। সভ্যতার বিকাশ ঘটানোর জন্য এই নিয়মগুলোর সঠিক ব্যবহার জরুরি ছিল। পুরাণ অনুযায়ী, এনকি তার বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের প্রধান দেবতাদের কাছে নির্দিষ্ট কিছু মে সাময়িকভাবে হস্তান্তর করতেন। উদাহরণস্বরূপ, লাগাশ শহরের দেবতা নিনগিরসুকে তিনি হয়তো কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার মে প্রদান করেছিলেন, আবার নিপ্পুর শহরকে দিয়েছিলেন ধর্মীয় আচারের মে। এই বণ্টন ব্যবস্থাটি আসলে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক তত্ত্বে একে ডিসেন্ট্রালাইজেশন অফ পাওয়ার (Decentralization of Power) বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এনকি বুঝতে পেরেছিলেন যে সমস্ত ক্ষমতা এক জায়গায় পুঞ্জীভূত থাকলে সভ্যতার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হবে। তাই তিনি প্রতিটি শহরকে তার প্রয়োজন এবং ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী আলাদা আলাদা ঐশ্বরিক ডিক্রি দিয়েছিলেন। এই কারণেই সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা কেবল পণ্যই বিনিময় করত না, বরং এক শহরের মে-এর প্রভাব অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ত। মেসোপটেমিয়ার অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা মূলত এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর দাঁড়িয়েই বিকশিত হয়েছিল (Bottero, 2001)।

তবে মে-এর রক্ষণাবেক্ষণ কোনো সহজ কাজ ছিল না। এই নিয়মকানুনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার কারণে অন্যান্য দেবতারা প্রায়শই এগুলো হস্তগত করার জন্য উদগ্রীব থাকতেন। এনকিকে সবসময় সতর্ক থাকতে হতো যাতে কোনো মে ভুল হাতে না পড়ে। যদি কোনো ধ্বংসাত্মক মে ভুল সময়ে পৃথিবীতে পাঠানো হতো, তবে পুরো সভ্যতায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে অনেক সময় এনকির অমতেই কিছু মে চুরি হয়ে যেত বা হারিয়ে যেত। সমাজে যখন হঠাৎ করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী খরা, মহামারী বা যুদ্ধ দেখা দিত, তখন সাধারণ মানুষ মনে করত যে এনকির আবজু থেকে কোনো অশুভ মে পৃথিবীতে চলে এসেছে। এই ধারণাটি তাদের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের ভীতিমিশ্রিত সতর্কতার জন্ম দিয়েছিল। তারা জানত যে সভ্যতা একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর কাঠামো, যা কেবল এনকির প্রজ্ঞার সুতোর ওপর ঝুলে আছে। জিগুরাত বা মন্দিরগুলোতে পুরোহিতরা প্রতিনিয়ত এনকির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতেন, যাতে তিনি মে-গুলোর ভারসাম্য ঠিক রাখেন। স্থাপত্য ও ধর্মের এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে, তারা তাদের বেঁচে থাকাকে সম্পূর্ণভাবে এই মহাজাগতিক নিয়মগুলোর সুষম বণ্টনের ওপর নির্ভরশীল মনে করত (Frankfort, 1954; Bahrani, 2017)।

দেবী ইনান্নার চাতুর্য ও উরুকে ক্ষমতার স্থানান্তর (Goddess Inanna’s Cunning and the Transfer of Power to Uruk)

মে-এর আখ্যানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সাহিত্যিক গুণসমৃদ্ধ গল্পটি হলো দেবী ইনান্না কর্তৃক এনকির কাছ থেকে মে হস্তগত করার মিথ। ইনান্না ছিলেন উরুক শহরের প্রধান দেবী, যিনি প্রেম, সৌন্দর্য এবং যুদ্ধের প্রতিনিধিত্ব করতেন। উরুক তখন ধীরে ধীরে একটি বড় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল, কিন্তু সভ্যতার সমস্ত প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ মে তখনও এরিদু শহরে এনকির কাছে সংরক্ষিত ছিল। ইনান্না চাইলেন তার শহর উরুককে মেসোপটেমিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজধানীতে পরিণত করতে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তিনি এক অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ পরিকল্পনা করেন। তিনি এরিদু শহরে এনকির আবজুতে বেড়াতে যান। এনকি তার প্রিয় নাতনির আগমনে ভীষণ আনন্দিত হন এবং তাকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানান। ভোজসভার এক পর্যায়ে এনকি প্রচুর মদ্যপান করে কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়েন। এই সুযোগটির অপেক্ষাতেই ছিলেন ইনান্না। তিনি এনকিকে প্রলুব্ধ করে একে একে প্রায় একশোর বেশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মে উপহার হিসেবে চেয়ে নেন। নেশাগ্রস্ত এনকি রাজত্ব, বীরত্ব, শিল্পকলা এবং আরও অসংখ্য নিয়মকানুন অবলীলায় ইনান্নাকে দিয়ে দেন (Postgate, 1992)।

ইনান্না একটুও সময় নষ্ট না করে সেই মে-গুলোকে নিজের ‘স্বর্গের নৌকা’-তে বোঝাই করে উরুকের দিকে রওনা দেন। এদিকে মদের ঘোর কাটার পর এনকি বুঝতে পারেন যে তিনি কী ভয়াবহ ভুল করে বসেছেন। সভ্যতার সমস্ত মূল্যবান সম্পদ এখন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী দেবীর হাতে। এনকি দ্রুত তার বিশ্বস্ত জলদস্যু এবং দানবদের পাঠান ইনান্নার নৌকা আটকে মে-গুলো ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু ইনান্না সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। তার বিশ্বস্ত সেনাপতি নিনশুবুর এই দানবদের প্রতিহত করেন এবং ইনান্না সফলভাবে মে-গুলো নিয়ে উরুকে পৌঁছান। উরুকের মানুষ তাদের দেবীকে উল্লাসের সাথে বরণ করে নেয়। সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের লেন্স থেকে এই গল্পটি মূলত কালচারাল ডিফিউশন (Cultural Diffusion) বা সাংস্কৃতিক বিস্তারের একটি অসামান্য রূপক। এরিদু ছিল সুমেরীয়দের সবচেয়ে প্রাচীন শহর, কিন্তু সময়ের আবর্তনে তার জৌলুস কমতে থাকে এবং উরুক নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। সভ্যতার এই কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সত্যতাকেই সুমেরীয় কবিরা ইনান্না ও এনকির এই পৌরাণিক আখ্যানের মোড়কে উপস্থাপন করেছিলেন। ইনান্নার এই চাতুর্য প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা কেবল পেশিশক্তি দিয়ে অর্জন করা যায় না, এর জন্য তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তারও প্রয়োজন হয় (Yoffee, 2005)।

এই মিথটি তৎকালীন সমাজে নারী এবং ক্ষমতার মধ্যকার একটি জটিল সম্পর্কও উন্মোচন করে। পিতৃতান্ত্রিক একটি দেবমণ্ডলীতে ইনান্না যেভাবে নিজের বুদ্ধিবলে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এক পুরুষ দেবতাকে বোকা বানিয়েছিলেন, তা তৎকালীন সাহিত্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা। ইনান্না কোনো অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে মে জয় করেননি, তিনি এনকির দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে সুমেরীয়রা সম্ভবত এটিই বোঝাতে চেয়েছিল যে, সভ্যতার নিয়মকানুন কোনো নির্দিষ্ট দেবতা বা শহরের চিরস্থায়ী সম্পত্তি নয়। যার মধ্যে এই নিয়মগুলো ধারণ করার এবং ব্যবহার করার মতো প্রাণশক্তি রয়েছে, মে শেষ পর্যন্ত তার কাছেই চলে যায়। এনকি পরবর্তীতে তার ভুল মেনে নিয়েছিলেন এবং ইনান্নাকে বাধা দেওয়া বন্ধ করেছিলেন। কারণ প্রজ্ঞার দেবতা হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি অগ্রসরমান শহরের বিকাশের জন্য এই মে-গুলোর প্রয়োজন ছিল। উরুকের এই উত্থান মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল, যেখানে কৃষিনির্ভরতার পাশাপাশি বাণিজ্য এবং সাম্রাজ্য বিস্তার সমান গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ইনান্না হয়ে ওঠেন সেই নতুন যুগের অবিসংবাদিত প্রতীক (Liverani, 2013; Pollock, 1999)।

মে-এর তালিকা এবং প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সমাজচিত্র (The List of Me and the Social Picture of Ancient Mesopotamia)

ইনান্না এবং এনকির মিথটিতে মে-এর যে বিস্তারিত তালিকা পাওয়া যায়, তা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সমাজ ও সংস্কৃতি বোঝার জন্য এক অমূল্য দলিল। এই তালিকায় প্রায় শতাধিক মে-এর নাম উল্লেখ রয়েছে, যা তৎকালীন মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরকে স্পর্শ করে। তালিকার একেবারে শুরুতেই রয়েছে রাজপদ, পুরোহিততন্ত্র, মুকুট এবং রাজদণ্ডের মতো বিষয়গুলো। এর দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় যে সুমেরীয় সমাজের প্রধান ভিত্তি ছিল তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বিশ্বাস করত যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের তৈরি নয়, বরং এগুলো সরাসরি স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন কারিগরি বিদ্যার কথা। কাঠমিস্ত্রি, ধাতব কর্মী, চর্মকার থেকে শুরু করে লিপিকার পর্যন্ত প্রতিটি পেশার জন্য আলাদা মে ছিল। এই পেশাগুলোর ঐশ্বরিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে সুমেরীয় অর্থনীতি কতটা বিকশিত এবং শ্রম বিভাজনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নৃবিজ্ঞানের ভাষায় একে অকুপেশনাল স্পেশালাইজেশন (Occupational Specialization) বা পেশাগত বিশেষায়নের চরম পর্যায় হিসেবে দেখা যায়। একজন কারিগর যখন কাজ করত, সে মনে করত সে একটি ঐশ্বরিক দায়িত্ব পালন করছে (Black & Green, 1992)।

এই তালিকার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি হলো এতে থাকা মানবিক আবেগ এবং নেতিবাচক দিকগুলো। মে-এর তালিকায় কেবল শান্তি বা ন্যায়বিচার ছিল না, সেখানে শত্রুতা, ভয়, বিদ্রোহ এবং শহরের পতনের মে-ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি পতিতাবৃত্তি এবং যৌনতার জন্যও সুনির্দিষ্ট মে ছিল। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগুলোকে সমাজের অবক্ষয় হিসেবে দেখা হলেও, সুমেরীয়রা একে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে দেখত। তাদের মতে, সমাজে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে, তার সবকিছুরই একটি সুনির্দিষ্ট কার্যকারণ বা উদ্দেশ্য রয়েছে। পতিতাবৃত্তি বা যুদ্ধকে তারা কোনো নৈতিক অবক্ষয় মনে করত না, বরং এগুলোকে মানব চরিত্রের সহজাত প্রবৃত্তি এবং সামাজিক ভারসাম্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করত। এই ধারণাকে তাত্ত্বিক আলোচনায় সোশিওলজিক্যাল ফাংশনালিজম (Sociological Functionalism) বা সমাজতাত্ত্বিক ক্রিয়াবাদ বলা যেতে পারে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের প্রতিটি উপাদান – তা ভালো হোক বা মন্দ – পুরো কাঠামোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করে। সুমেরীয়রা তাদের সমাজের কোনো অন্ধকার দিককে অস্বীকার করেনি, বরং সেগুলোকে ঐশ্বরিক নিয়মের কাঠামোর ভেতর জায়গা দিয়েছিল (George, 2003)।

মে-এর তালিকায় সংগীত, বাদ্যযন্ত্র এবং শিল্পের উপস্থিতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা বাঁশি, বীণা এবং ড্রামের মতো বাদ্যযন্ত্রের জন্য আলাদা মে বরাদ্দ করেছিল। ধর্মীয় আচারে এবং রাজকীয় ভোজসভায় সংগীতের একটি বিশাল ভূমিকা ছিল। এই শিল্পকলাগুলো সমাজের মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐক্য তৈরি করত। পাশাপাশি পাতালপুরীতে অবতরণ এবং সেখান থেকে ফিরে আসার মে-ও এই তালিকায় ছিল, যা তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন এবং পুনর্জন্মের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। সব মিলিয়ে, মে-এর এই তালিকাটি ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার একটি সম্পূর্ণ ক্যাটালগ। এটি পড়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি তারা কী কী বিষয়কে গুরুত্ব দিত, তাদের ভয় কীসে ছিল এবং তারা সমাজকে কীভাবে পরিচালনা করত। এই তালিকাটি কোনো এলোমেলো শব্দগুচ্ছ নয়; এটি একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং চিন্তাশীল জাতির বিশ্বকোষ, যারা তাদের চারপাশের প্রতিটি দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য উপাদানকে একটি যৌক্তিক ছকে বাঁধার চেষ্টা করেছিল। এই ছকবদ্ধ চিন্তাধারাই তাদের হাজার বছর ধরে একটি প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার শক্তি যুগিয়েছিল (Rochberg, 2004; Stone, 1995)।

মানব সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে মে-এর প্রয়োগ (Application of Me in Human Society and State Administration)

মে-এর ধারণাটি কেবল পুরাণ বা ধর্মগ্রন্থের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দৈনন্দিন সমাজ পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অত্যন্ত কার্যকর একটি হাতিয়ার ছিল। রাজারা তাদের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য প্রতিনিয়ত এই মে-এর দোহাই দিতেন। যখন কোনো রাজা সিংহাসনে বসতেন, তখন তিনি দাবি করতেন যে দেবতারা তাকে ‘রাজত্বের মে’ প্রদান করেছেন। এই দাবিটি তাকে সাধারণ মানুষের চোখে এক অনতিক্রম্য উচ্চতায় নিয়ে যেত। সাধারণ কৃষকরা বিশ্বাস করত যে রাজার বিরোধিতা করা মানে আসলে মহাজাগতিক নিয়মের বিরোধিতা করা। রাজনৈতিক দর্শনে একে পলিটিকাল লেজিটিমেসি (Political Legitimacy) বা রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের একটি ধ্রুপদী কৌশল বলা হয়। রাজারা নিজেদের শিলালিপি বা স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে গর্ব করে লিখতেন যে তারা তাদের শহরের মে-গুলোকে রক্ষা করেছেন এবং শত্রুদের কাছ থেকে হারানো মে ফিরিয়ে এনেছেন। অর্থাৎ, মে ছিল রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতীক। একটি শহরের মে যতদিন অক্ষত থাকত, মানুষ মনে করত তাদের শহরটিও ততদিন সুরক্ষিত থাকবে (Lambert & Millard, 1969)।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পাশাপাশি আইন ও বিচার ব্যবস্থায় মে-এর প্রয়োগ ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। সুমেরীয়রা প্রথম লিখিত আইন কানুন প্রবর্তন করেছিল, যেমন উর-নাম্মুর আইন সংহিতা। এই আইনগুলো কোনো রাজার নিজস্ব খেয়ালখুশি অনুযায়ী তৈরি হতো না। তারা বিশ্বাস করত যে সত্য এবং ন্যায়বিচারের মে আগে থেকেই স্বর্গে বিদ্যমান রয়েছে, রাজারা কেবল সেই মে-এর আলোকে পার্থিব আইনগুলো প্রণয়ন করছেন। এই ধারণাটি আধুনিক ন্যাচারাল ল থিওরি (Natural Law Theory) বা প্রাকৃতিক আইন তত্ত্বের সাথে বেশ মিলে যায়, যেখানে মনে করা হয় যে মানুষের তৈরি আইনের ঊর্ধ্বে একটি শাশ্বত এবং ঐশ্বরিক আইন রয়েছে। বিচারকরা যখন বিচার করতেন, তখন তারা মনে করতেন যে তারা এনকি বা আন-এর প্রতিনিধি হিসেবে মহাজাগতিক শৃঙ্খলারই বাস্তবায়ন করছেন। এই বিচার ব্যবস্থায় অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান ছিল অত্যন্ত কঠোর, কারণ মে-এর লঙ্ঘন মানেই ছিল পুরো সমাজের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনা। আইনকে ধর্মের এই শক্ত আবরণে মুড়িয়ে রাখার ফলেই সমাজে অপরাধের প্রবণতা নিয়ন্ত্রিত হতো এবং একটি স্থিতিশীল আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল (Crawford, 2004)।

সাধারণ মানুষের জীবনেও মে-এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। কৃষিকাজ, পশু পালন বা পরিবারের নিয়মকানুন – সবকিছুই মে-এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করা হতো। একজন সাধারণ কৃষক যখন জমিতে বীজ বপন করত, সে বিশ্বাস করত যে কৃষিকাজের মে তাকে ভালো ফলন দেবে। মন্দিরের পুরোহিতরা এই মে-গুলোকে জাগিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন। তারা জিগুরাতের চূড়ায় উঠে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলিদান করতেন এবং সুগন্ধি ধূপ জ্বালাতেন। এই আচারগুলো সমাজকে একটি মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা প্রদান করত। মানুষ জানত যে তাদের চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত অনিশ্চিত; যেকোনো সময় বন্যা বা খরা এসে সব ভাসিয়ে নিতে পারে। এই চরম অনিশ্চয়তার মুখে মে-এর ধারণাটি তাদের মনে একটি আশার আলো জ্বালিয়ে রাখত। তারা ভাবত, মহাবিশ্বে অন্তত কিছু নিয়ম আছে যা ধ্রুব এবং অপরিবর্তনীয়। এই বিশ্বাসটি তাদের হতাশা থেকে মুক্তি দিত এবং নতুন করে শহর গড়ার বা ফসল ফলানোর প্রেরণা যোগাত। মূলত, মে ছিল সেই অদৃশ্য সুতো, যা মেসোপটেমিয়ার খণ্ডিত নগররাষ্ট্রগুলোকে এবং এর ভেতরের প্রতিটি মানুষকে এক অভিন্ন অস্তিত্বের জালে বেঁধে রেখেছিল (Roaf, 1990; Katz, 2003)।

মে-এর দার্শনিক তাৎপর্য ও সভ্যতার বিবর্তন (Philosophical Significance of Me and the Evolution of Civilization)

সুমেরীয়দের মে-এর ধারণাটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে দার্শনিক চিন্তার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আধুনিক যুগে আমরা বিশ্বাস করি যে সভ্যতা মানুষের নিজস্ব মেধা, পরিশ্রম এবং ক্রমাগত উদ্ভাবনের ফসল। কিন্তু সুমেরীয়রা সভ্যতার এই বিবর্তনমূলক ধারণায় বিশ্বাসী ছিল না। তাদের মতে, সভ্যতা বা সমাজ ব্যবস্থা সময়ের সাথে সাথে উন্নত হয় না; বরং সৃষ্টির শুরুতেই দেবতারা এটিকে একটি নিখুঁত প্যাকেজ বা মে হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মানুষের একমাত্র কাজ হলো সেই নিখুঁত প্যাকেজটিকে কোনো পরিবর্তন ছাড়া সংরক্ষণ করা। দর্শনের পরিভাষায় এই চিন্তাধারাকে স্ট্যাটিক ওয়ার্ল্ডভিউ (Static Worldview) বা স্থিতিশীল বিশ্বদর্শন বলা যেতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, নতুন কিছু উদ্ভাবন করার চেয়ে পুরনো নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করা অনেক বেশি সম্মানের। তারা মনে করত যে অতীতের জ্ঞান বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি শুদ্ধ এবং পবিত্র। এই কারণেই মেসোপটেমিয়ার লিপিকাররা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরনো গ্রন্থগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নকল করে গেছেন, তাতে কোনো নতুন সংযোজন বা বিয়োজন না করেই (Barret, 2007; Mitchell, 2004)।

এই স্থিতিশীল বিশ্বদর্শন মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাকে একদিক থেকে যেমন দীর্ঘস্থায়ী করেছিল, অন্যদিকে তা তাদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর আবদ্ধও করে রেখেছিল। তারা মে-গুলোকে এতটাই চূড়ান্ত এবং অলঙ্ঘনীয় মনে করত যে, প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে কোনো নতুন সমাজ কাঠামো নিয়ে ভাবার সাহস তাদের ছিল না। যখন কোনো বিদেশী আক্রমণকারী এসে তাদের শহর দখল করত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের জিগুরাত ধ্বংস হতো, তখন তারা এর পেছনে কোনো জাগতিক কারণ খুঁজত না। তারা মনে করত যে তাদের মে-গুলো চুরি হয়ে গেছে বা দেবতারা তাদের কাছ থেকে মে ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই ধরনের নিয়তিবাদী চিন্তা মানুষকে অনেক সময় বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় করে তোলে। কিন্তু একই সাথে, এই ধারণাটি তাদের চরম বিপর্যয়ের পরও টিকে থাকার অদ্ভুত এক মানসিক শক্তি দিয়েছিল। তারা বিশ্বাস করত যে মে কখনো ধ্বংস হয় না। একবার যদি তা হারিয়েও যায়, তবে সঠিক উপাসনা এবং দেবতাদের সন্তুষ্টির মাধ্যমে তা আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব। এই বিশ্বাসের জোরেই মেসোপটেমিয়ার শহরগুলো বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল (Van De Mieroop, 2015)।

পরিশেষে বলা যায়, মে-এর ধারণাটি ছিল প্রাচীন মানুষের বিশ্বকে সুশৃঙ্খলভাবে বোঝার আদিমতম এবং সফল একটি প্রচেষ্টা। তারা তাদের চারপাশের পরিবর্তনশীল, অনেক সময় ধ্বংসাত্মক প্রকৃতিকে কিছু অপরিবর্তনীয় নিয়মের ফ্রেমে বাঁধার চেষ্টা করেছিল। মে কেবল কিছু আইনের তালিকা ছিল না; এটি ছিল একটি সভ্যতার আত্মপরিচয়। রাজতন্ত্রের অহংকার থেকে শুরু করে সাধারণ কারিগরের ঘাম – সবকিছুই এই মে-এর বিশাল ক্যানভাসে আঁকা ছিল। পরবর্তীকালে ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যগুলো সুমেরীয়দের এই মে-এর ধারণাকে কিছুটা পরিবর্তন করে তাদের নিজেদের ‘পার্সুতু’ বা ঐশ্বরিক বিধান হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এমনকি প্রাচীন গ্রিক দর্শনের ‘লোগোস’ বা বিশ্বজনীন যুক্তির ধারণার সাথেও এই মে-এর সূক্ষ্ম মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সুমেরীয়রা হয়তো বিজ্ঞানের কোনো গাণিতিক সূত্র দিয়ে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, কিন্তু তারা মানুষের সমাজ ও চিন্তার জগতকে এমন এক সুশৃঙ্খল এবং দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল, যার প্রভাব মানব ইতিহাস থেকে কোনোদিনই মুছে যাওয়ার নয়। এই মে-গুলোই ছিল সেই প্রাচীন কাদামাটির সভ্যতার আসল অমরত্ব (Gadd, 1971)।

পুরোহিততন্ত্র এবং মন্দিরকেন্দ্রিক অর্থনীতি (Priesthood and Temple-centric Economy)

ঐশ্বরিক ভূস্বামী এবং মন্দির অর্থনীতির ভিত্তি (The Divine Landlord and the Foundation of Temple Economy)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার নগররাষ্ট্রগুলোতে প্রবেশ করলে সবার আগে চোখে পড়ত বিশাল জিগুরাত বা প্রধান মন্দির। আধুনিক যুগে মন্দির বলতে আমরা কেবল উপাসনা বা প্রার্থনার একটি নিরিবিলি জায়গাকে বুঝে থাকি। বাস্তবে সুমেরীয় মন্দিরগুলোর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলো ছিল প্রচণ্ড কোলাহলপূর্ণ, ব্যস্ত এবং বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে, পুরো শহরটি এবং এর চারপাশের সমস্ত কৃষিজমি আসলে তাদের প্রধান দেবতার নিজস্ব সম্পত্তি। মানুষ নিজেদের এই জমির মালিক মনে করত না, তারা নিজেদের মনে করত দেবতার বর্গা চাষি বা ভাড়াটিয়া। তাত্ত্বিক আলোচনায় এই ব্যবস্থাকে টেম্পল ইকোনমি (Temple Economy) বা মন্দির অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই কাঠামোর মূল কথা হলো, দেবতা হলেন একজন অনুপস্থিত ভূস্বামী এবং পুরো সমাজ সেই ভূস্বামীর এস্টেট বা সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত। উরুক, উর বা নিপ্পুরের মতো শহরগুলোতে দেবতা কেবল আধ্যাত্মিক সান্ত্বনার উৎস ছিলেন না, তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পুঁজিপতি এবং জমির মালিক। সাধারণ কৃষকদের জীবনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই জমি থেকে ফসল ফলিয়ে দেবতার গুদামে তা জমা করা।

মন্দির প্রাঙ্গণটি কেবল একটি ইমারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর চারপাশে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল চত্বর, যেখানে শস্যাগার, কসাইখানা, বেকারি, এবং বিভিন্ন কারিগরদের কর্মশালা অবস্থিত ছিল। কৃষকরা তাদের জমিতে যে গম বা যব উৎপাদন করত, তার একটি বড় অংশ কর বা নৈবেদ্য হিসেবে সরাসরি এই মন্দিরের গুদামে চলে আসত। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতো। পুরোহিতরা দেবতার পার্থিব প্রতিনিধি হিসেবে এই সম্পদের হিসাব রাখতেন এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। মানুষ ধর্মীয় ভক্তি থেকেই তাদের কষ্টার্জিত ফসল হাসিমুখে মন্দিরে দিয়ে আসত। তারা মনে করত যে, দেবতাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলে আগামী বছর জমিতে আরও ভালো ফসল হবে এবং বন্যা বা খরা থেকে শহর রক্ষা পাবে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাসের এই আবরণটি মূলত একটি রাষ্ট্রীয় কর ব্যবস্থাকে অত্যন্ত মসৃণ এবং সংঘাতহীন করে তুলেছিল। মানুষ কর দিতে সাধারণত অনাগ্রহী থাকে, কিন্তু যখন সেই কর দেবতার নামে নেওয়া হয়, তখন তা এক ধরনের পবিত্র দায়িত্বে পরিণত হয়। সুমেরীয় পুরোহিতরা মানুষের এই মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত সফলভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন (Postgate, 1992)।

এই বিশাল সম্পদের ব্যবস্থাপনা কোনো সহজ কাজ ছিল না। মন্দিরের অধীনে জমিগুলোকে সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হতো। একটি অংশ সরাসরি দেবতার নিজস্ব জমি হিসেবে চিহ্নিত থাকত, যেখানে উৎপাদিত সমস্ত ফসল মন্দিরের সংরক্ষিত তহবিলে জমা হতো। দ্বিতীয় অংশটি মন্দিরের পুরোহিত, আমলা এবং কারিগরদের ভরণপোষণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। আর তৃতীয় অংশটি সাধারণ কৃষকদের লিজ বা ইজারা দেওয়া হতো, যার বিনিময়ে তারা ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ মন্দিরে প্রদান করত। কৃষিকাজের পাশাপাশি পশুপালনের ক্ষেত্রেও মন্দিরের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। হাজার হাজার ভেড়া এবং ছাগল মন্দিরের নিজস্ব চারণভূমিতে ঘুরে বেড়াত। এই পশুগুলো থেকে প্রাপ্ত উল এবং মাংস সুমেরীয় অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি তৈরি করেছিল। সহজ করে বললে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মন্দিরগুলো আধুনিক যুগের কোনো বিশাল কর্পোরেশনের মতো কাজ করত, যেখানে প্রচুর মানুষ চাকরি করত এবং তাদের জীবনজীবিকা সম্পূর্ণভাবে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল (Crawford, 2004)।

সম্পদের পুনর্বণ্টন এবং পুরোহিতদের প্রশাসনিক ক্ষমতা (Redistribution of Wealth and the Administrative Power of Priests)

মন্দিরে জমা হওয়া এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেবল মজুত করে রাখার জন্য ছিল না। সুমেরীয় অর্থনীতি টিকে থাকার মূল রহস্য ছিল এর সুষম বণ্টন ব্যবস্থা। কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ফসল, কারিগরদের তৈরি জিনিসপত্র এবং পশুপালকদের কাছ থেকে পাওয়া উল – সবকিছু প্রথমে একটি কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা হতো। এরপর সেই তহবিল থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী রেশন হিসেবে তা পুনরায় বিতরণ করা হতো। অর্থনীতি ও নৃবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে রিডিস্ট্রিবিউটিভ ইকোনমি (Redistributive Economy) বা পুনর্বণ্টনমূলক অর্থনীতি বলা হয়। মন্দিরের পুরোহিতরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই রেশনের হিসাব রাখতেন। প্রতিটি শ্রমিক, কারিগর বা আমলা তার পদমর্যাদা এবং কাজের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ যব, তেল এবং উল পেত। এমনকি সমাজে যারা অসহায়, যেমন বিধবা নারী বা এতিম শিশু, তাদেরও ভরণপোষণের দায়িত্ব মন্দির গ্রহণ করত। এই ব্যবস্থার ফলে মেসোপটেমিয়ার রুক্ষ পরিবেশে কেউ সাধারণত অনাহারে মারা যেত না। মন্দির একাধারে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং একটি প্রাচীন কল্যাণকামী রাষ্ট্র বা ওয়েলফেয়ার স্টেট হিসেবে কাজ করত।

সম্পদের ওপর এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ পুরোহিতদের সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শ্রেণিতে পরিণত করেছিল। যেহেতু মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের চাবিকাঠি পুরোহিতদের হাতে ছিল, ফলে সমাজের প্রতিটি মানুষ তাদের সমীহ করে চলত। প্রথম দিককার সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলোতে রাজা বলে কোনো আলাদা পদ ছিল না। প্রধান পুরোহিত, যাকে সুমেরীয় ভাষায় ‘এন’ (En) বলা হতো, তিনিই ছিলেন শহরের সর্বাধিনায়ক। তিনি একদিকে যেমন ধর্মীয় আচার পরিচালনা করতেন, অন্যদিকে খাল খনন, শস্য রোপণ এবং নগর পরিকল্পনার মতো প্রশাসনিক কাজগুলোও তদারকি করতেন। ক্ষমতার এই কাঠামোটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে থিওক্রেসি (Theocracy) বা ধর্মতন্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এখানে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিভাজন রেখা ছিল না। প্রধান পুরোহিত যা বলতেন, মানুষ তাকে সরাসরি দেবতার নির্দেশ বলে মেনে নিত। এই প্রশাসনিক ক্ষমতা পুরোহিতদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে তারা শহরের আইন প্রণয়ন এবং বিচারের দায়িত্বও নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন (Yoffee, 2005)।

পুরোহিতদের এই প্রশাসনিক দক্ষতা মূলত একটি অত্যন্ত প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশে টিকে থাকার তাগিদ থেকেই তৈরি হয়েছিল। মেসোপটেমিয়ায় কৃষিকাজ ছিল সম্পূর্ণভাবে সেচনির্ভর। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর জল খালের মাধ্যমে জমিতে নিয়ে আসা ছাড়া ফসল ফলানো অসম্ভব ছিল। এই খাল খনন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা কোনো একক কৃষকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল সংখ্যক মানুষের সম্মিলিত শ্রম এবং একটি কেন্দ্রীয় নির্দেশনা। পুরোহিতরা এই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পালন করতেন। তারা নির্দিষ্ট সময়ে কৃষকদের একত্রিত করে খাল খননের কাজে লাগাতেন এবং মন্দিরের মজুত শস্য থেকে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। খরার সময় যখন মাঠে ফসল থাকত না, তখন মন্দিরের এই শস্যভাণ্ডারই পুরো সমাজকে বাঁচিয়ে রাখত। অর্থাৎ, পুরোহিতদের এই ক্ষমতা কেবল ধর্মীয় ভীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এর পেছনে ছিল একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম ছিল (Charvát, 2002)।

আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বিকাশ এবং লিপিকার শ্রেণি (Development of Bureaucratic Structure and the Scribe Class)

অর্থনীতির আকার যখন বড় হতে শুরু করে, তখন মানুষের স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে সবকিছু পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মন্দিরের গুদামে কত বস্তা যব জমা হলো, কাকে কতটুকু রেশন দেওয়া হলো, কিংবা কতগুলো ভেড়া বসন্তকালে জন্ম নিল – এই অগণিত হিসাব রাখা পুরোহিতদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই নিখুঁত হিসাব রাখার প্রয়োজন থেকেই মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারটি ঘটে, তা হলো লিখন পদ্ধতি। সুমেরীয়রা নরম কাদা মাটির ফলকে খাগড়ার কলম দিয়ে দাগ কেটে যে লিপি উদ্ভাবন করেছিল, তাকে কিউনিফর্ম (Cuneiform) লিপি বলা হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই লিপির উদ্ভাবন কোনো কবিতা বা মহাকাব্য লেখার জন্য হয়নি; এটি উদ্ভূত হয়েছিল সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে। মন্দিরের এই হিসাবরক্ষকরা ধীরে ধীরে সমাজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী অংশ হিসেবে আবির্ভূত হন। এই হিসাবরক্ষকদের সুমেরীয় ভাষায় বলা হতো ‘দুব-সার’ (Dub-sar), যার অর্থ লিপিকার। এই লিপিকারদের হাত ধরেই প্রাচীন বিশ্বে প্রথম সুসংগঠিত ব্যুরোক্র্যাটিক ডমিনেন্স (Bureaucratic Dominance) বা আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের সূচনা হয়।

লিপিকার হওয়া মোটেও সহজ কাজ ছিল না। কিউনিফর্ম লিপিতে হাজার হাজার জটিল চিহ্ন ছিল, যা আয়ত্ত করার জন্য বছরের পর বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হতো। মন্দিরের সাথে যুক্ত বিশেষ বিদ্যালয়গুলোতে, যাকে ‘এদুব্বা’ (Edubba) বা ফলকের ঘর বলা হতো, সেখানে তরুণদের এই শিক্ষা দেওয়া হতো। সাধারণত সমাজের উচ্চবিত্ত বা পুরোহিত পরিবারের ছেলেরাই এই শিক্ষা লাভের সুযোগ পেত। পড়াশোনা শেষ করে তারা মন্দিরের আমলা হিসেবে কাজে যোগ দিত। এই লিপিকাররা ছিলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ডেটাবেস বা তথ্যভাণ্ডার। তারা প্রতিটি বস্তা শস্যের হিসাব রাখতেন, শ্রমিকদের হাজিরা খাতায় লিপিবদ্ধ করতেন এবং জমির পরিমাপ করতেন। তাদের এই নিখুঁত হিসাবরক্ষণের কারণেই মন্দিরের অর্থনীতি এত বড় আকার ধারণ করতে পেরেছিল। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, লিপিকাররা মূলত তথ্যের ওপর একচেটিয়া অধিকার বা মনোপলি অফ ইনফরমেশন (Monopoly of Information) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেহেতু সাধারণ মানুষ বা অনেক ক্ষেত্রে রাজারাও পড়তে বা লিখতে পারতেন না, তাই লিপিকাররা পর্দার আড়ালে থেকে সমাজের প্রকৃত চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন (Roaf, 1990)।

এই আমলাতান্ত্রিক কাঠামোটি অর্থনীতিকে একটি গাণিতিক শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসেছিল। লিপিকাররা ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারতেন। তারা হিসাব করে বের করতেন যে আগামী এক বছর শহরের মানুষদের খাওয়ানোর জন্য কতটুকু শস্য প্রয়োজন এবং কতটুকু শস্য বাণিজ্যের জন্য উদ্বৃত্ত রাখা যাবে। তারা খালের জল মাপার এবং জমির সীমানা নির্ধারণের জন্য জ্যামিতি এবং গণিতের উদ্ভাবন করেছিলেন। কোনো কারণে যদি কৃষকের ফসলের ক্ষতি হতো, তারা মন্দিরের রেকর্ড দেখে তার ঋণের হিসাব সমন্বয় করতে পারতেন। এই পেশাদার আমলাদের কাজের কারণে সুমেরীয় অর্থনীতি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ লাভ করেছিল। প্রতিদিনের ধুলোমলিন কৃষিকাজের সাথে এই অত্যন্ত গোছানো এবং শিক্ষিত আমলাতন্ত্রের মেলবন্ধন সুমেরীয় সমাজকে একটি অদম্য শক্তি প্রদান করেছিল। কাদামাটির ফলকে লেখা এই শুষ্ক হিসাব-নিকাশগুলোই আসলে সেই প্রাচীন সভ্যতার অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ, যা হাজার বছর পরেও মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে (Snell, 1997)।

সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং শ্রমের সুনির্দিষ্ট বিভাজন (Social Stratification and Specific Division of Labor)

মন্দিরকেন্দ্রিক এই বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিল। সবার উপরে ছিলেন প্রধান পুরোহিত এবং রাজপরিবারের সদস্যরা, যারা সমস্ত সম্পদ এবং নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতেন। তাদের ঠিক নিচেই ছিল লিপিকার, হিসাবরক্ষক এবং উচ্চপদস্থ আমলাদের অবস্থান। সমাজের এই মুষ্টিমেয় মানুষরা শারীরিক শ্রম করতেন না, কিন্তু সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশটি তারাই ভোগ করতেন। এর নিচে ছিল কারিগর এবং ব্যবসায়ীদের একটি বড় শ্রেণি। আর সমাজের একেবারে নিচতলায় ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং দাস সম্প্রদায়। সমাজবিজ্ঞানীরা এই ধরনের বিভাজনকে সোশ্যাল স্ট্র্যাটিফিকেশন (Social Stratification) বা সামাজিক স্তরবিন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করেন। মেসোপটেমিয়ার এই স্তরবিন্যাস কোনো লুকোচুরির বিষয় ছিল না। রেশনের তালিকায় স্পষ্ট লেখা থাকত কে তার পদমর্যাদা অনুযায়ী কতটুকু যব বা তেল পাবে। এই বৈষম্যকে তারা সমাজের একটি স্বাভাবিক এবং ঐশ্বরিক নিয়ম হিসেবেই মেনে নিয়েছিল, কারণ তারা বিশ্বাস করত যে দেবতারা এভাবেই সমাজকে সাজিয়েছেন।

শ্রমের এই সুনির্দিষ্ট বিভাজন সুমেরীয় অর্থনীতিকে অত্যন্ত উৎপাদনশীল করে তুলেছিল। যেহেতু মন্দিরের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে কারিগরদের নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা হতো, তাই তাদের আর নিজেদের খাবারের জন্য জমিতে কৃষিকাজ করতে হতো না। ফলে তারা তাদের সম্পূর্ণ সময় এবং মনোযোগ নিজ নিজ পেশায় ব্যয় করার সুযোগ পেত। এই কারণেই সুমেরীয় মৃৎশিল্প, ধাতববিদ্যা এবং অলঙ্কার তৈরির কৌশল এত বেশি উৎকর্ষ লাভ করেছিল। মন্দিরের ভেতরে বিশাল সব কর্মশালা ছিল, যেগুলোকে প্রাচীন যুগের কারখানা বলা যেতে পারে। বিশেষ করে বস্ত্র শিল্পে সুমেরীয়দের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। মন্দিরের এই বস্ত্র কারখানাগুলোতে হাজার হাজার নারী শ্রমিক কাজ করতেন, যাদের ‘গেমে’ (Geme) বলা হতো। তারা ভেড়ার উল পরিষ্কার করা, সুতো কাটা এবং কাপড় বোনার মতো অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ করতেন। এই উৎপাদিত কাপড় কেবল শহরের মানুষের পোশাকের চাহিদা মেটাত না, এটি ছিল বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পণ্য। নারী শ্রমিকদের এই বিপুল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে সুমেরীয় অর্থনীতি কেবল পুরুষনির্ভর ছিল না, এর পেছনে নারীদের এক বিশাল অবদান ছিল (Stone, 1995)।

সমাজের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো সাধারণত দাস এবং নির্ভর শ্রমিকদের (যাদের গুরুস বা Gurus বলা হতো) দিয়ে করানো হতো। যুদ্ধবন্দীদের অনেক সময় দাস হিসেবে মন্দিরের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতো। এছাড়াও কেউ যদি তার ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হতো, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মন্দিরের দাসত্ব মেনে নিতে হতো। এই দাসরা খাল খনন করা, বড় বড় পাথর বা ইটের বোঝা টানা এবং ফসল কাটার মতো অমানবিক পরিশ্রমে যুক্ত থাকত। তাদের জীবনের কোনো স্বাধীনতা ছিল না, তারা কেবল বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম রেশন পেত। সুমেরীয় অর্থনীতির এই অন্ধকার দিকটি নির্দেশ করে যে, এত বড় একটি সভ্যতা এবং জিগুরাতের মতো বিশাল স্থাপত্যগুলো কেবল ধর্মীয় ভক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এর পেছনে অসংখ্য সাধারণ মানুষ এবং দাসের রক্ত ও ঘাম মিশে ছিল। এই শোষণমূলক ব্যবস্থাটি অত্যন্ত কঠোর হলেও, এটি পুরো মেসোপটেমিয়ার অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। বস্তুত, প্রাচীন বিশ্বের কোনো বড় সভ্যতাই এই ধরনের স্তরবিন্যাস এবং শ্রমের শোষণ ছাড়া গড়ে উঠতে পারেনি (Bottero, 2001; Nemet-Nejat, 1998)।

ধর্মতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্র: ক্ষমতার রূপান্তর ও বোঝাপড়া (From Theocracy to Monarchy: Transformation and Understanding of Power)

সময়ের আবর্তনে মেসোপটেমিয়ার নগররাষ্ট্রগুলোর জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে উর্বর কৃষিজমি এবং নদীর জলের অধিকার নিয়ে এক শহরের সাথে অন্য শহরের বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। লাগাশ, উম্মা, উরুক এবং উরের মতো শহরগুলো প্রতিনিয়ত একে অপরের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতে শুরু করে। এই নিরন্তর সংঘাতের ডামাডোলে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বা ‘এন’-এর পক্ষে শহরকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুরোহিতরা ছিলেন মূলত প্রশাসক এবং ধর্মীয় নেতা; যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশল তাদের অজানা ছিল। শহরের অস্তিত্ব রক্ষার এই তাগিদ থেকেই সমাজের ভেতর থেকে এক নতুন ধরনের নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটে। যুদ্ধের সময় একজন দক্ষ এবং সাহসী যোদ্ধাকে অস্থায়ীভাবে সেনাপতির দায়িত্ব দেওয়া হতো, যাকে সুমেরীয় ভাষায় বলা হতো ‘লুগাল’ (Lugal) বা ‘মহা মানুষ’। প্রথমদিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে এই লুগালরা তাদের সাধারণ জীবনে ফিরে যেতেন। কিন্তু যুদ্ধ যখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলো, তখন এই সামরিক নেতারা তাদের ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান এবং নিজেদের স্থায়ী রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। ক্ষমতার এই পালাবদলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পলিটিকাল ইভোলিউশন (Political Evolution) বা রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব সামরিক শক্তির কাছে জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

রাজতন্ত্রের এই উদ্ভব সমাজ ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। শহরের কেন্দ্রে জিগুরাতের পাশাপাশি এখন একটি বিশাল রাজপ্রাসাদও গড়ে ওঠে। শুরু হয় মন্দির এবং প্রাসাদের মধ্যে ক্ষমতার এক সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব। কিন্তু সুমেরীয় রাজারা খুব বিচক্ষণ ছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে পেশিশক্তি দিয়ে হয়তো যুদ্ধ জেতা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের মন জয় করা যায় না। মানুষের মন তখনও জিগুরাতের পুরোহিত এবং দেবতাদের ভয়ে আচ্ছন্ন ছিল। তাই রাজারা মন্দিরকে ধ্বংস বা দুর্বল করার পরিবর্তে এর সাথে এক ধরনের আপস বা বোঝাপড়ায় আসেন। রাজারা নিজেদের দেবতাদের মনোনীত প্রতিনিধি বা পালক সন্তান হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন। তারা দাবি করেন যে, স্বয়ং এনলিল বা আন তাদের হাতে রাজদণ্ড তুলে দিয়েছেন। এই কৌশলটিকে পলিটিকাল লেজিটিমেসি (Political Legitimacy) বা রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের উপায় বলা হয়। রাজারা যদি মন্দিরের সমর্থন না পেতেন, তবে সাধারণ কৃষক এবং শ্রমিকরা কখনোই তাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রকাশ করত না। ফলে রাজারা সর্বদা পুরোহিতদের তুষ্ট রাখার চেষ্টা করতেন (Jacobsen, 1976)।

এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে একটি নতুন রূপ দান করে। রাজারা যখন যুদ্ধে গিয়ে অন্য শহর দখল করতেন, তখন তারা লুট করা সম্পদের একটি বিশাল অংশ শহরের প্রধান মন্দিরে দান করতেন। তারা পুরনো জিগুরাতগুলোকে সংস্কার করতেন এবং নতুন নতুন মন্দির নির্মাণ করে নিজেদের ধার্মিকতার প্রমাণ দিতেন। বিনিময়ে পুরোহিতরা বিভিন্ন উৎসব ও আচারে রাজাকে ঐশ্বরিক আশীর্বাদপুষ্ট বলে ঘোষণা করতেন। নববর্ষের মতো বড় উৎসবগুলোতে রাজা স্বয়ং প্রধান দেবতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। এভাবেই প্রাসাদ এবং মন্দির একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। রাজারা সামরিক নিরাপত্তা দিতেন, আর মন্দির দিত ধর্মীয় বৈধতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। প্রশাসন দুটি আলাদা কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হলেও, সাধারণ মানুষের চোখে রাষ্ট্র এবং ধর্ম এক সুতোয় গাঁথা ছিল। এই অটুট রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় জোটবদ্ধতাই মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাকে একের পর এক বহিরাক্রমণ এবং দুর্যোগের পরও হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছিল (Gadd, 1971; Bahrani, 2017)।

দূরপাল্লার বাণিজ্য এবং অর্থনীতির আন্তর্জাতিক রূপরেখা (Long-distance Trade and the International Outline of the Economy)

মেসোপটেমিয়ার সমভূমি কৃষিকাজের জন্য উর্বর হলেও এর একটি বড় ভৌগোলিক দুর্বলতা ছিল। তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে শস্য, খেজুর এবং উল ছিল, কিন্তু সভ্যতা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাঁচামাল তাদের ছিল না। জিগুরাত বা রাজপ্রাসাদ নির্মাণের জন্য পাথর, অস্ত্র ও গহনা তৈরির জন্য তামা ও সোনা, এবং নৌকা বানানোর জন্য ভালো মানের কাঠের তীব্র অভাব ছিল এই অঞ্চলে। এই অভাব পূরণের জন্য মন্দিরগুলোকে তাদের নিজ শহরের গণ্ডি পেরিয়ে দূরপাল্লার বাণিজ্যে মনোযোগ দিতে হয়। মন্দিরের বিশাল অর্থনীতি কেবল অভ্যন্তরীণ রেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি পরিণত হয়েছিল প্রাচীন বিশ্বের বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তিতে। পুরোহিতরা তাদের উদ্বৃত্ত শস্য এবং কারিগরদের তৈরি বস্ত্র দিয়ে বাণিজ্যের মূলধন তৈরি করতেন। এই কাজের জন্য তারা ‘দামগার’ (Damgar) নামক একদল পেশাদার বণিকের নিয়োগ দিতেন। এই বণিকরা মন্দিরের অর্থে এবং নিরাপত্তায় দূরের দেশগুলোতে বাণিজ্য যাত্রায় বের হতেন। অর্থনীতির এই বিস্তৃত রূপকে ইকোনমিক ইন্টারডিপেনডেন্স (Economic Interdependence) বা অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। মেসোপটেমিয়া বাইরের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল ছিল, আর বাইরের পৃথিবী নির্ভরশীল ছিল মেসোপটেমিয়ার শস্য এবং বস্ত্রের ওপর (Crawford, 2004)।

এই বাণিজ্য পথগুলো ছিল অত্যন্ত দুর্গম এবং বিস্তৃত। সুমেরীয় বণিকরা নৌকা করে পারস্য উপসাগর পাড়ি দিয়ে দিলমুন (বর্তমান বাহরাইন), মাগান (ওমান) এবং মেলুহা (সম্ভবত সিন্ধু উপত্যকা) পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন। উত্তর দিকে তারা নদীপথে বা গাধার কাফেলা নিয়ে আনাতোলিয়া এবং লেবাননের সিডার বন পর্যন্ত যাত্রা করতেন। তারা সেখান থেকে সিডার কাঠ, তামা, টিন, সোনা এবং ল্যাপিস লাজুলির মতো মূল্যবান পাথর নিয়ে আসতেন। এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য অত্যন্ত জটিল এক ধরনের লজিস্টিক বা সরবরাহ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। লিপিকাররা বাণিজ্যের চুক্তিপত্র তৈরি করতেন এবং পণ্যের গুণমান ও পরিমাপ নিশ্চিত করার জন্য আদর্শ ওজন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। রৌপ্যকে তারা বিনিময়ের একটি সাধারণ মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, যা প্রাচীন যুগের মুদ্রাব্যবস্থার একটি প্রাথমিক রূপ ছিল। বাণিজ্যের এই চুক্তিগুলোতে অনেক সময় দেবতাদের সাক্ষী হিসেবে রাখা হতো, যাতে কেউ চুক্তির বরখেলাপ করার সাহস না পায়। অর্থাৎ, বাণিজ্যের মতো একটি সম্পূর্ণ জাগতিক বিষয়েও ধর্মের গভীর প্রভাব ছিল (Snell, 1997)।

এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেসোপটেমিয়ার সমাজকে কেবল সম্পদশালীই করেনি, এটি তাদের মনন এবং সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছিল। দূর দেশের বণিকদের আনাগোনার ফলে উরুক বা উরের মতো শহরগুলো পরিণত হয়েছিল এক একটি কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন কেন্দ্রে। বিভিন্ন ভাষা, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটেছিল এই শহরগুলোতে। ধাতু গলানোর নতুন কৌশল বা নতুন ধরনের চাকার ব্যবহার এভাবেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। মন্দিরকেন্দ্রিক অর্থনীতি দিয়ে শুরু হওয়া একটি সমাজ এভাবেই ধীরে ধীরে নিজেকে প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পরিণত করেছিল। কৃষকের লাঙল থেকে শুরু করে জিগুরাতের চূড়ায় ব্যবহৃত ল্যাপিস লাজুলি পাথর – সবকিছুর পেছনেই কাজ করেছিল এই সুসংগঠিত বাণিজ্য ব্যবস্থা। সুমেরীয়রা প্রমাণ করেছিল যে, একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং সুশৃঙ্খল আমলাতন্ত্র থাকলে যেকোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে একটি বিশ্বমানের সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব। তাদের এই অর্থনৈতিক মডেল পরবর্তী হাজার হাজার বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সাম্রাজ্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে (Liverani, 2013)।

পরবর্তী সভ্যতাগুলোতে সুমেরীয় প্রভাব (Sumerian Influence on Subsequent Civilizations)

ভাষার বিলুপ্তি ও সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের মনস্তত্ত্ব (Extinction of Language and the Psychology of Cultural Assimilation)

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, কোনো সভ্যতাই চিরকাল তার পূর্ণ জৌলুস নিয়ে টিকে থাকে না। মেসোপটেমিয়ার প্রথম দিককার এই সুসংগঠিত সমাজটিও সময়ের আবর্তনে তার রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক আধিপত্য হারিয়ে ফেলে। ক্রমাগত সেচ ব্যবস্থার কারণে কৃষিজমিতে লবণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং পরিবেশগত বিপর্যয় এই পতনের একটি বড় কারণ ছিল। পাশাপাশি উত্তরের আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের উত্থান সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেয়। সম্রাট সারগনের অধীনে যখন পুরো মেসোপটেমিয়া একীভূত হয়, তখন সুমেরীয়রা রাজনৈতিকভাবে পরাধীন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক এই পটপরিবর্তন খুব স্বাভাবিকভাবেই সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলেছিল। বিজয়ী আক্কাদীয়রা নিজেদের ভাষা এবং প্রশাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। কালক্রমে সুমেরীয় ভাষা মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তা থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। একটি ভাষা যখন তার সাধারণ ব্যবহারকারীদের হারায়, তখন সেই ভাষার সাথে যুক্ত সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটার কথা। বাস্তবে কিন্তু এমনটি ঘটেনি। সুমেরীয় ভাষা সাধারণ মানুষের মুখ থেকে হারিয়ে গেলেও, তা জ্ঞানচর্চা এবং ধর্মীয় আচারের পবিত্র ভাষা হিসেবে সগৌরবে টিকে ছিল। ইউরোপের ইতিহাসে ল্যাটিন ভাষা যেমন একটি দীর্ঘ সময় ধরে চার্চ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ভাষা ছিল, সুমেরীয় ভাষাও প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় ঠিক সেই জায়গাতেই অবস্থান করছিল। সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রক্রিয়াকে কালচারাল অ্যাসিমিলিয়েশন (Cultural Assimilation) বা সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ বলা হয়। বিজয়ী আক্কাদীয়রা রাজনৈতিকভাবে জয়ী হলেও, সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে তারা পরাজিতদের কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিল।

আক্কাদীয়রা মূলত ছিল যাযাবর বা আধা-যাযাবর গোত্রের মানুষ, যারা পরে নগরকেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়। তাদের নিজস্ব কোনো সুসংগঠিত পুরাণ, মহাজাগতিক দর্শন বা লিখন পদ্ধতি ছিল না। সুমেরীয়দের তৈরি করা জিগুরাত, তাদের জটিল দেবমণ্ডলী এবং কৃষিকাজের নিখুঁত ব্যবস্থাপনা দেখে আক্কাদীয়রা অভিভূত হয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই ভূখণ্ডে শাসন করতে হলে এখানকার মানুষের হাজার বছরের পুরনো বিশ্বাসগুলোকে মুছে ফেলা যাবে না। বরং সেই বিশ্বাসগুলোকে নিজেদের বলে গ্রহণ করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। ফলে তারা সুমেরীয় পুরাণগুলোকে বর্জন করার বদলে নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করে। আক্কাদীয় লিপিকাররা সুমেরীয় সাহিত্যের প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে মাটির ফলকে খোদাই করে রাখতেন। এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করেছিল এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল প্র্যাগম্যাটিজম (Intellectual Pragmatism) বা বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তববাদ (Crawford, 2004)। তারা জানত, সুমেরীয়দের সৃষ্টিতত্ত্ব বা দেবতাদের ধারণাগুলো প্রকৃতির বাস্তবতার সাথে খুব ভালোভাবে খাপ খায়। খরার সময় নদীর জল শুকিয়ে যাওয়া বা হঠাৎ বন্যার কারণ হিসেবে সুমেরীয়রা যে ঐশ্বরিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল, তার চেয়ে ভালো কোনো ব্যাখ্যা আক্কাদীয়দের জানা ছিল না। ফলে ভাষা হারিয়ে গেলেও সুমেরীয়দের চিন্তার জগৎটি জয়ীদের মনস্তত্ত্বে স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে।

পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যগুলোও ঠিক একইভাবে সুমেরীয় উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে যায়। তারা সুমেরীয়দের কিউনিফর্ম লিখন পদ্ধতি ব্যবহার করে নিজেদের রাজকীয় ফরমান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবসায়ের হিসাব লিখে রাখত। মেসোপটেমিয়ার প্রতিটি বড় শহরে লিপিকার তৈরির যে স্কুলগুলো ছিল, সেখানে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে সুমেরীয় ভাষা শিখতে হতো। এই শিক্ষাব্যবস্থা পুরো অঞ্চলকে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল। সুমেরীয়রা যে সাহিত্যিক কাঠামো তৈরি করেছিল, তা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা পরবর্তী কয়েক হাজার বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সাহিত্যের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। মৃতদের প্রতি শোকগাথা রচনা, রাজাদের বন্দনা করে স্তোত্র লেখা অথবা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা – সবকিছুতেই সুমেরীয় ব্যাকরণ এবং শৈলী অনুসরণ করা হতো। একটি জাতির রাজনৈতিক পরিচয় মুছে যাওয়ার পরও তাদের চিন্তা এবং দর্শনের এই যে টিকে থাকার ক্ষমতা, তা প্রমাণ করে যে পেশিশক্তির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির স্থায়িত্ব অনেক বেশি। সুমেরীয়রা হয়তো তাদের স্বাধীন ভূমি হারিয়েছিল, কিন্তু তারা তাদের বিজেতাদের মনোজগৎ চিরতরে জয় করে নিয়েছিল।

প্যান্থিয়নের রূপান্তর এবং ব্যাবিলনীয় ও অ্যাসিরীয় আত্মীকরণ (Transformation of the Pantheon and Babylonian and Assyrian Assimilation)

সুমেরীয় প্রভাবের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং বিস্তৃত রূপটি লক্ষ্য করা যায় পরবর্তী সভ্যতাগুলোর ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেবমণ্ডলীতে। ব্যাবিলনীয় এবং আক্কাদীয়রা মেসোপটেমিয়ার শাসনভার গ্রহণ করার পর তারা নিজেদের সেমিটিক দেবতাদের সাথে সুমেরীয় দেবতাদের একীভূত করে নেয়। ধর্মের সমাজতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে সিনক্রেটিজম (Syncretism) বা ধর্মীয় সমন্বয়বাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির দেবতারা তাদের আলাদা পরিচয় হারিয়ে একটি একক সত্তায় পরিণত হন। উদাহরণস্বরূপ, সুমেরীয়দের স্বর্গের সর্বোচ্চ অধিপতি আন (An) আক্কাদীয় এবং ব্যাবিলনীয় ধর্মে এসে হয়ে গেলেন আনু (Anu)। নামের সামান্য পরিবর্তন হলেও তার মহাজাগতিক মর্যাদা এবং নিষ্ক্রিয় অথচ সর্বোচ্চ বিচারকের ভূমিকা ঠিক আগের মতোই থেকে যায়। একইভাবে, প্রজ্ঞা এবং জলের দেবতা এনকি (Enki) পরিচিতি লাভ করেন ইয়া (Ea) নামে। সুমেরীয় ধর্মে এনকির যে চরিত্র – যিনি মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং জাদুবিদ্যার প্রবর্তক ছিলেন – ব্যাবিলনীয় ধর্মে ইয়া ঠিক সেই একই বৈশিষ্ট্য নিয়ে পূজিত হতে থাকেন। এই দেবতারা নতুন সাম্রাজ্যেও সমান ভক্তি এবং সম্মানের সাথে তাদের আসন ধরে রেখেছিলেন।

এই রূপান্তরের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং প্রভাবশালী উদাহরণ হলেন দেবী ইনান্না (Inanna)। সুমেরীয়দের এই প্রেম ও সংঘাতের দেবী আক্কাদীয় এবং ব্যাবিলনীয় যুগে ইশতার (Ishtar) নাম ধারণ করেন। ইনান্নার মূল চরিত্রটি ছিল অত্যন্ত স্বাধীন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ইশতার হিসেবে তার সেই বৈশিষ্ট্যগুলো আরও বেশি প্রকট আকার ধারণ করে। ব্যাবিলনীয়রা ইশতারকে কেবল প্রেমের দেবী হিসেবেই নয়, বরং রণক্ষেত্রের এক ভয়ংকর শক্তি হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে। অ্যাসিরীয় রাজারা যখন পাশ্ববর্তী দেশগুলো দখল করতে যেতেন, তারা ইশতারের নামে যুদ্ধযাত্রা করতেন। তার এই ব্যাপক প্রভাব কেবল মেসোপটেমিয়াতেই আটকে থাকেনি। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে ইশতারের ধারণাটি ফিনিশীয়দের কাছে পৌঁছায় এবং সেখানে তিনি আসতার্তে (Astarte) নামে পরিচিতি পান। অনেক গবেষক মনে করেন, প্রাচীন গ্রিকদের প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির (Aphrodite) ধারণার পেছনেও এই সুমেরীয় ইনান্না বা ব্যাবিলনীয় ইশতারের বিশাল প্রভাব রয়েছে। একটি স্থানীয় কৃষিজীবী সমাজের দেবী কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্য এবং সংস্কৃতির মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, এটি তার এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত (Black & Green, 1992)।

দেবমণ্ডলীর এই আত্তীকরণের পেছনে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও কাজ করেছিল। সুমেরীয় যুগের প্রধান দেবতা এনলিল (Enlil) দীর্ঘকাল ধরে দেবতাদের সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু যখন ব্যাবিলন শহরটি পুরো মেসোপটেমিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠল, তখন ব্যাবিলনীয়রা চাইল তাদের নিজস্ব দেবতা মারদুক (Marduk) যেন প্যান্থিয়নের শীর্ষে অবস্থান করেন। একইভাবে, পরবর্তীতে অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য শক্তিশালী হয়ে উঠলে তারা তাদের রাষ্ট্রীয় দেবতা আশুরকে (Ashur) সর্বোচ্চ আসনে বসাতে চাইল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থাকে পলিটিকাল থিওলজি (Political Theology) বা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের একটি সুস্পষ্ট প্রয়োগ বলা যেতে পারে। পৃথিবীর বুকে যে শহরের রাজা সবচেয়ে শক্তিশালী, স্বর্গেও সেই শহরের দেবতা সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী হবেন – এটাই ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার বিশ্বাস। তবে মজার ব্যাপার হলো, মারদুক বা আশুরকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সুমেরীয় দেবতাদের সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়নি। বরং দেখানো হয়েছিল যে, আন বা এনলিলের মতো প্রাচীন দেবতারাই স্বেচ্ছায় মারদুকের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ, নতুন সাম্রাজ্যগুলো তাদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সেই প্রাচীন সুমেরীয় দেবতাদের আদেশের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।

সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তন এবং এনুমা এলিশ-এর মহাজাগতিক রাজনীতি (Evolution of Cosmology and the Cosmic Politics of Enuma Elish)

সুমেরীয়দের বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজি ছিল মূলত তাদের চারপাশের নদীমাতৃক এবং কৃষিনির্ভর পরিবেশের একটি মহাজাগতিক রূপক। তাদের মতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল একটি আদিম জলরাশি থেকে অত্যন্ত ধীর এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পরবর্তী ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় এই সৃষ্টিতত্ত্বের মূল কাঠামোটি বজায় থাকলেও, এর বর্ণনায় যুক্ত হয় এক তীব্র রাজনৈতিক এবং সামরিক আবহ। ব্যাবিলনীয়দের সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্য Enuma Elish-এ এই পরিবর্তিত সৃষ্টিতত্ত্বের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই মহাকাব্যে আদিম জলরাশিকে দুটি সত্তায় ভাগ করা হয় – মিঠা জলের দেবতা আপসু এবং লোনা জলের দেবী তিয়ামাতসুমেরীয়দের আদিম সমুদ্র নাম্মু এখানে রাক্ষসী তিয়ামাতের রূপ ধারণ করে, যে সম্পূর্ণ মহাবিশ্বকে একটি ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে চায়। তিয়ামাতের এই ধ্বংসাত্মক রূপ মূলত মেসোপটেমিয়ার বাইরের শত্রু এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি সম্মিলিত রূপক। ব্যাবিলনীয়রা যেহেতু প্রতিনিয়ত যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে যুক্ত ছিল, তাই তাদের সৃষ্টিতত্ত্বও হয়ে উঠেছিল অনেক বেশি সংঘাতময় এবং রক্তক্ষয়ী।

এই মহাকাব্যে দেবতাদের মধ্যে যখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তখন তরুণ দেবতা মারদুক এগিয়ে আসেন। তিনি তিয়ামাতকে পরাজিত করার শর্তে দেবতাদের কাছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দাবি করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিয়ামাতের বিশাল শরীরকে দ্বিখণ্ডিত করে মারদুক মহাবিশ্বের কাঠামো তৈরি করেন। তিনি তিয়ামাতের শরীরের এক ভাগ দিয়ে আকাশ এবং অন্য ভাগ দিয়ে পৃথিবী নির্মাণ করেন। তাত্ত্বিক বিচারে সৃষ্টির এই প্রক্রিয়াটিকে কমব্যাট মিথ (Combat Myth) বা সংঘাতমূলক সৃষ্টিতত্ত্ব বলা হয়। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে যেখানে দেবতারা কারিগরের মতো উপাদান সাজিয়ে বিশ্ব তৈরি করেছিলেন, ব্যাবিলনীয় সৃষ্টিতত্ত্বে সেখানে সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন হয়েছিল একটি ভয়ংকর যুদ্ধ এবং রক্তপাত। এটি প্রমাণ করে যে, ব্যাবিলনীয় সমাজ ব্যবস্থায় সামরিক শক্তি এবং পেশিবলের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। তবে এই ভিন্নতা সত্ত্বেও, সৃষ্টির মূল উপাদান হিসেবে জলের ব্যবহার এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে একটি সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক কাঠামোতে ফেলার যে প্রবণতা, তা সরাসরি সুমেরীয় দর্শন থেকেই ধার করা হয়েছিল। মারদুক তিয়ামাতকে মারলেও, তিনি সুমেরীয় দেবতা আন বা এনলিলের বেঁধে দেওয়া নিয়ম বা ‘মে’ (Me) অনুযায়ীই জগত পরিচালনা করতেন।

মানুষ সৃষ্টির কারণ এবং প্রক্রিয়াও এই মহাকাব্যে সুমেরীয় আদলেই বর্ণনা করা হয়েছে। সুমেরীয় পুরাণে যেমন দেবতা এনকি মাটি এবং একজন বিদ্রোহী দেবতার রক্ত মিশিয়ে মানুষ তৈরি করেছিলেন, Enuma Elish-এ ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। এখানে মারদুক তিয়ামাতের প্রধান সেনাপতি কিঙ্গুর (Kingu) রক্ত ব্যবহার করে মানুষ তৈরি করেন। মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যও ছিল সম্পূর্ণ অভিন্ন – দেবতাদের কাজ করে দেওয়া এবং তাদের জন্য মন্দির নির্মাণ করা। এই যে মানুষের অস্তিত্বকে দেবতাদের সেবার সাথে যুক্ত করা, এটি মেসোপটেমিয়ার সমাজকে হাজার হাজার বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় বেঁধে রেখেছিল। মানুষ জানত যে তাদের সৃষ্টির পেছনে কোনো প্রেম বা ভালোবাসা নেই, আছে কেবল দায়িত্ব। এই কঠোর এবং বাস্তববাদী দর্শনটি সুমেরীয়দের উদ্ভাবন হলেও, ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয়রা এটিকে তাদের সাম্রাজ্য পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারা সাধারণ মানুষকে এই সৃষ্টিতত্ত্বের গল্প শুনিয়ে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করত এবং রাজতান্ত্রিক শোষণকে একটি ঐশ্বরিক রূপ প্রদান করত।

মহাপ্লাবনের আখ্যানের স্থানান্তর এবং জিউসুদ্রা থেকে উটনাপিশটিম (Migration of the Flood Narrative and Ziusudra to Utnapishtim)

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মহাপ্লাবন বা প্রলয়ের একটি নির্দিষ্ট আখ্যান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মোড়কে আবির্ভূত হয়েছে। এই আখ্যানের আদি উৎপত্তিস্থল ছিল প্রাচীন সুমের। সুমেরীয় পুরাণে জিউসুদ্রা নামের এক ধার্মিক রাজা দেবতা এনকির সতর্কবার্তা পেয়ে একটি বিশাল নৌকা তৈরি করে মানবজাতির বীজ রক্ষা করেছিলেন। এই গল্পটি মেসোপটেমিয়ার পরবর্তী সভ্যতাগুলোতে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সময়ের সাথে সাথে এর চরিত্রগুলোর নাম পরিবর্তিত হতে থাকে। আক্কাদীয় পুরাণে জিউসুদ্রার নাম হয়ে যায় আত্রাহাসিস (Atrahasis), যার অর্থ ‘অত্যন্ত জ্ঞানী’। আত্রাহাসিসের মহাকাব্যেও মানুষের কোলাহলে বিরক্ত হয়ে দেবতাদের প্লাবন সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আর ব্যাবিলনীয়দের বিখ্যাত Epic of Gilgamesh-এ এসে এই একই চরিত্র উটনাপিশটিম (Utnapishtim) নাম ধারণ করেন। গিলগামেশ যখন অমরত্বের সন্ধানে বের হন, তখন এই উটনাপিশটিমের কাছেই তিনি গিয়ে পৌঁছান এবং তার মুখ থেকে মহাপ্লাবনের সেই আদিম গল্পটি শোনেন। তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব বা কম্প্যারেটিভ মাইথলজি (Comparative Mythology)-এর আলোচনায় এই আখ্যানের ধারাবাহিকতা এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

গল্পের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও, পরবর্তী সভ্যতাগুলো এতে নিজেদের মতো কিছু দার্শনিক উপাদান যুক্ত করেছিল। ব্যাবিলনীয় সংস্করণে দেবতাদের সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্লাবনের পর তাদের অনুশোচনা অনেক বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্লাবন শেষে দেবতারা যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় যজ্ঞের ধোঁয়ার কাছে মাছিদের মতো জড়ো হন, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে দেবতারাও মানুষের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার ধারণাটি সুমেরীয় যুগেও ছিল, তবে ব্যাবিলনীয় যুগে তা সাহিত্যিক দিক থেকে অনেক বেশি নাটকীয়তা লাভ করে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে ধীরে ধীরে একটি মহাজাগতিক শাস্তির রূপকথায় পরিণত হয়, প্লাবনের এই গল্প তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মেসোপটেমিয়ার নদীগুলো প্রায়ই দুকূল ছাপিয়ে বন্যা ডেকে আনত। এই জাগতিক ভীতিকেই তারা একটি ধর্মীয় আবরণে মুড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে রেখে গিয়েছিল। তারা বোঝাতে চেয়েছিল যে, প্রকৃতি এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সাথে বেইমানি করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে (George, 2003)।

এই আখ্যানের প্রভাব কেবল মেসোপটেমিয়ার গণ্ডিতেই আটকে থাকেনি, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। প্রাচীন হিব্রু সাহিত্যের আদিপুস্তক বা Genesis-এ নোয়াহ্‌র (Noah) যে কাহিনী পাওয়া যায়, তার সাথে সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয় প্লাবনের গল্পের কাঠামোগত মিল অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি নির্দিষ্ট নৌকা তৈরি করা, প্রাণীদের জোড়ায় জোড়ায় রক্ষা করা এবং বন্যা শেষে পাখির মাধ্যমে ডাঙার সন্ধান নেওয়া – এই প্রতিটি অনুষঙ্গই সরাসরি প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সাহিত্য থেকে প্রভাবিত। পার্থক্য কেবল এতটুকুই যে, সুমেরীয় পুরাণে প্লাবনের কারণ ছিল মানুষের কোলাহল, আর হিব্রু পুরাণে তা রূপান্তরিত হয়েছিল মানুষের নৈতিক স্খলন বা পাপে। একটি বহিরাগত আখ্যান কীভাবে একটি ভিন্ন ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এসে নতুন নৈতিক অর্থ লাভ করে, সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে কালচারাল রি-অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন (Cultural Re-appropriation) বলা যেতে পারে। সুমেরীয়রা যে গল্পটি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে তৈরি করেছিল, তা এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার পবিত্র গ্রন্থে অমর হয়ে রয়েছে।

জিগুরাত স্থাপত্যের প্রসার এবং নগরকেন্দ্রিক প্রশাসনের উত্তরাধিকার (Expansion of Ziggurat Architecture and the Legacy of City-centric Administration)

সুমেরীয়দের ধর্মীয় এবং সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জিগুরাত নামক বিশাল সব পিরামিড আকৃতির স্থাপত্য। সমতল ভূমিতে দেবতাদের পৃথিবীতে নামিয়ে আনার জন্য তারা এই কৃত্রিম পাহাড়গুলো নির্মাণ করেছিল। সুমেরীয় সভ্যতার পতনের সাথে সাথে এই স্থাপত্যশৈলীর মৃত্যু হয়নি, বরং পরবর্তী সাম্রাজ্যগুলো এই জিগুরাত নির্মাণের ধারাকে আরও বিশাল এবং জাঁকজমকপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ইমারত ছিল ‘এতেমেনানকি’ (Etemenanki), যার অর্থ ‘স্বর্গ ও মর্ত্যের ভিত্তিমূলের গৃহ’। এটি ছিল দেবতা মারদুকের প্রধান উপাসনালয়। ব্যাবিলনীয় রাজারা এই জিগুরাতটি এতটাই উঁচু করে বানিয়েছিলেন যে দূর থেকে দেখলে মনে হতো তা আকাশ ছুঁয়েছে। এই ধরনের বিশালাকৃতির ইমারত নির্মাণকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় মনুমেন্টাল আর্কিটেকচার (Monumental Architecture) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রাজারা জিগুরাত নির্মাণের মাধ্যমে কেবল দেবতাদের সন্তুষ্ট করতেন না, তারা নিজেদের রাজকীয় শক্তি এবং সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য সাধারণ মানুষের সামনে প্রদর্শন করতেন। জিগুরাতগুলো ছিল প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলোর মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় হাতিয়ার (Van De Mieroop, 2015)।

এই বিশাল স্থাপত্যগুলোর প্রভাব পার্শ্ববর্তী সংস্কৃতির মনস্তত্ত্বে এক গভীর ভীতি ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে যারা যাযাবর বা পশুপালক সমাজ থেকে এসেছিল, তাদের কাছে শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এত উঁচু ইটের ইমারত অকল্পনীয় মনে হতো। ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে, হিব্রু বাইবেলে বর্ণিত ‘বাবেল টাওয়ার’ বা টাওয়ার অফ বাবেল (Tower of Babel)-এর মিথটি মূলত এই ব্যাবিলনীয় জিগুরাতগুলো দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। বাইবেলের গল্পে বলা হয়েছে যে মানুষ অহংকারবশত স্বর্গে পৌঁছানোর জন্য একটি উঁচু টাওয়ার বানাচ্ছিল এবং ঈশ্বর তাদের ভাষা আলাদা করে দিয়ে সেই কাজ পণ্ড করে দেন। এটি ছিল মূলত গ্রামীণ বা পশুপালক সমাজের দিক থেকে শহুরে মেসোপটেমিয়ার জিগুরাত নির্মাণের অহংকারের একটি ধর্মতাত্ত্বিক সমালোচনা। এই গল্পটি প্রমাণ করে যে সুমেরীয়দের উদ্ভাবিত জিগুরাতের ধারণাটি কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক হিসেবেই নয়, বরং মানুষের ঔদ্ধত্য এবং সভ্যতার অহংকারের প্রতীক হিসেবেও অন্যান্য সংস্কৃতির সাহিত্যে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছিল।

স্থাপত্যের পাশাপাশি সুমেরীয়দের নগরকেন্দ্রিক প্রশাসনের যে মডেল, তা পরবর্তী সমস্ত মেসোপটেমীয় সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সুমেরীয় যুগে কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করা, মন্দিরের গুদামে শস্য জমা রাখা এবং লিপিকারদের মাধ্যমে তার নিখুঁত হিসাব রাখার যে টেম্পল ইকোনমি (Temple Economy) বা মন্দির অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, তা অত্যন্ত কার্যকর একটি ব্যবস্থা ছিল। আক্কাদীয় বা অ্যাসিরীয় রাজারা যখন বিশাল সাম্রাজ্য গঠন করলেন, তখন তারা এই সুমেরীয় প্রশাসনিক কাঠামোটিকেই নিজেদের সাম্রাজ্য পরিচালনার কাজে লাগালেন। কারণ একটি বিশাল জনপদকে খাওয়ানো এবং সেনাবাহিনীর রসদ জোগানোর জন্য এর চেয়ে আধুনিক কোনো ব্যবস্থা তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তারা সুমেরীয় লিপিকারদের বংশধরদেরই রাজপ্রাসাদের আমলা হিসেবে নিয়োগ দিতেন। ওজন মাপার পদ্ধতি, কর আদায়ের নিয়ম এবং বাণিজ্যের চুক্তিপত্র – সবকিছুতেই সেই প্রাচীন সুমেরীয় ছাপ অক্ষুণ্ণ ছিল। অর্থাৎ, মেসোপটেমিয়ার মাটি থেকে সুমেরীয়রা রাজনৈতিকভাবে মুছে গেলেও, তাদের তৈরি করা প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক চাকার ওপর ভর করেই পরবর্তী সাম্রাজ্যগুলো হাজার বছর ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।

আইনি সংহিতা ও লিখন পদ্ধতির আন্তর্জাতিকীকরণ (Codification of Law and the Internationalization of the Writing System)

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সুমেরীয়দের সম্ভবত সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী অবদান হলো লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন। কাদামাটির নরম ফলকে দাগ কেটে তারা যে কিউনিফর্ম (Cuneiform) বা কীলকাকার লিপি তৈরি করেছিল, তা খুব দ্রুতই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়। সুমেরীয় ভাষা যখন হারিয়ে গেল, তখনও আক্কাদীয়, হিট্টাইট, ইলামাইট এবং উরার্তীয়দের মতো বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ নিজেদের ভাষা লেখার জন্য এই সুমেরীয় লিপি ব্যবহার করতে শুরু করে। এটি ঠিক বর্তমান যুগের ইংরেজি হরফের মতো কাজ করেছিল, যা দিয়ে পৃথিবীর বহু ভাষা লেখা সম্ভব। প্রাচীন বিশ্বের কূটনীতি এবং বাণিজ্যের ভাষা হিসেবে এই কিউনিফর্ম লিপি একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছিল। মিশরীয় ফারাওদের সাথে অন্যান্য রাজ্যের যোগাযোগের যে ‘আমার্না লেটারস’ পাওয়া গেছে, সেগুলোও এই কিউনিফর্ম লিপিতেই লেখা ছিল। এই লিপিটি কেবল একটি প্রযুক্তি ছিল না, এটি ছিল একটি বিশাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (Information Network), যা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক অঞ্চলকে তথ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে একীভূত করেছিল (Snell, 1997)।

Linear Elamite Deciphered! - Biblical Archaeology Society
প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান লিখনপদ্ধতিগুলোর ভৌগোলিক বিস্তৃতির তুলনামূলক মানচিত্র, যেখানে কিউনিফর্ম, লুইয়ান হাইরোগ্লিফ, লিনিয়ার A/B, মিশরীয় হাইরোগ্লিফ, প্রোটো বা লিনিয়ার ইলামাইট এবং প্রাথমিক অ্যালফাবেটিক লিপির আঞ্চলিক প্রভাবক্ষেত্র দেখানো হয়েছে; Source: Biblical Archaeology Society – “Linear Elamite Deciphered!”

লিখন পদ্ধতির পাশাপাশি সমাজের আইন কানুনকে লিখিত রূপ দেওয়ার ধারণাটিও সুমেরীয়দের মস্তিষ্কপ্রসূত। প্রাচীনকালে উর-নাম্মু নামের এক সুমেরীয় রাজা প্রথম লিখিত আইন সংহিতা প্রণয়ন করেছিলেন। এই সংহিতায় সমাজে চুরি, হত্যা বা অন্যান্য অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান লেখা ছিল। পরবর্তীতে ব্যাবিলনীয় রাজা হাম্মুরাবি যখন তার বিখ্যাত আইন সংহিতা বা ‘কোড অফ হাম্মুরাবি’ সংকলন করেন, তখন তার মূল ভিত্তি ছিল ওই প্রাচীন সুমেরীয় আইনগুলো। তবে সুমেরীয় আইনে যেখানে অপরাধের জন্য সাধারণত জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিধান ছিল, হাম্মুরাবির আইনে তা কিছুটা কঠোর রূপ লাভ করে এবং ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির প্রয়োগ দেখা যায়। এই কঠোরতার ভিন্নতা থাকলেও, আইনকে একটি লিখিত এবং সর্বজনীন রূপ দেওয়ার ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে সুমেরীয় উত্তরাধিকার। এই লিখিত আইনগুলোর কারণে সমাজের সাধারণ মানুষ বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পেরেছিল এবং রাজাদের স্বৈরাচারী মনোভাব কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আইনগুলোকে রাজারা তাদের নিজস্ব ইচ্ছা বলে চালিয়ে দিতেন না। হাম্মুরাবির শিলালিপির একেবারে ওপরে খোদাই করা আছে যে, তিনি ন্যায়বিচারের দেবতা শামাশের (সুমেরীয় উতু) কাছ থেকে এই আইনগুলো গ্রহণ করছেন। অর্থাৎ, আইনের উৎস রাজা নিজে নন, স্বয়ং দেবতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় একে ডিভাইন রাইট অফ ল (Divine Right of Law) বা আইনের ঐশ্বরিক অধিকার বলা হয়। এই ধারণাটি সুমেরীয়দের ‘মে’ (Me) বা মহাজাগতিক নিয়মেরই একটি রাজনৈতিক সম্প্রসারণ। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে সভ্যতার সমস্ত নিয়ম দেবতারা বেঁধে দিয়েছেন। পরবর্তী রাজারাও সেই বিশ্বাসটিকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রণীত আইনগুলোকে ঐশ্বরিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। এর ফলে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা এবং ভীতি দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছিল। একটি সমাজকে কীভাবে সুশৃঙ্খল রাখতে হয় এবং আইনের মাধ্যমে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় – সেই পথ মেসোপটেমিয়ার কাদা মাটির ফলকেই প্রথম লেখা হয়েছিল। পরবর্তী সভ্যতাগুলো কেবল সেই আদিম পথ ধরেই হেঁটে গেছে এবং নিজেদের প্রয়োজন মতো তাকে কিছুটা চওড়া করেছে। এভাবেই সুমেরীয় প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব সভ্যতার মননে এবং শৃঙ্খলায় নীরবে কাজ করে গেছে।

La ignorancia de la ley no exime de su cumplimiento
হাম্মুরাবির আইনসংহিতার ব্যাসল্ট স্তম্ভ, যার শীর্ষে ব্যাবিলনের রাজা হাম্মুরাবিকে সূর্যদেব শামাশের কাছ থেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রতীক গ্রহণ করতে দেখা যায় এবং নিচের অংশজুড়ে পুরাতন ব্যাবিলনীয় কিউনিফর্ম লিপিতে আইন খোদাই করা রয়েছে; Source: Louvre Collections – Code de Hammurabi

উপসংহার

সুমেরীয় ধর্ম ও পুরাণকে কেবল কিছু প্রাচীন এবং কাল্পনিক উপাখ্যানের সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করলে এর ঐতিহাসিক ও দার্শনিক গুরুত্বকে অবমূল্যায়ন করা হয়। মূলত এটি ছিল একটি বিকাশমান মানবগোষ্ঠীর দ্বারা তাদের চারপাশের জটিল ও পরিবর্তনশীল বিশ্বকে ব্যাখ্যা করার প্রথম কাঠামোগত প্রয়াস। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা প্রকৃতির যে বিশাল এবং অনেক সময় ধ্বংসাত্মক শক্তির সম্মুখীন হতো, তার সামনে নিজেদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলার জন্য তারা এই দেবমণ্ডলী এবং পৌরাণিক আখ্যানগুলোর জন্ম দিয়েছিল। দেবতারা তাদের কাছে কেবল পূজনীয় সত্তাই ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন মহাজাগতিক শৃঙ্খলার ধারক এবং বাহক। জিগুরাত নামক গগনচুম্বী স্থাপত্যের ইটের গাঁথুনি থেকে শুরু করে কিউনিফর্ম লিপিতে অত্যন্ত সযত্নে খোদাই করা স্তোত্র ও মহাকাব্যগুলো – সবকিছুর মাঝেই নিহিত রয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার এক তীব্র এবং সুসংগঠিত আকাঙ্ক্ষা।

তারা আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো গাণিতিক সূত্র বা পরীক্ষামূলক প্রমাণের মাধ্যমে মহাবিশ্বকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায়নি। এরপরও তারা তাদের মতো করে সমগ্র পরিবেশ এবং জীবনচক্রকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করিয়েছিল। তাদের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মে (Me) বা সভ্যতার অলঙ্ঘনীয় নিয়মকানুনের ধারণা প্রমাণ করে যে, তারা বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বাস করত। সমাজ পরিচালনার প্রতিটি অনুষঙ্গকে তারা এই ঐশ্বরিক নিয়মের অধীনস্থ করেছিল। সুমেরীয় দেবতারা হয়তো আজ আর কোনো বেদিতে পূজিত হন না, এবং তাদের বিশাল মন্দিরগুলো সহস্রাব্দ ধরে মরুভূমির শুষ্ক বালুকাস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ যখন সেই বিস্মৃত কাদামাটির ফলকগুলোকে পুনরায় দিনের আলোতে নিয়ে আসে, তখন আধুনিক বিশ্ব প্রথমবারের মতো সভ্যতার এই আদিমতম রূপকারদের মননশীলতার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।

তাদের তৈরি করা এই ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা ইতিহাসের পাতায় একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুমেরীয় সভ্যতা রাজনৈতিক ও ভাষাগতভাবে বিলীন হয়ে গেলেও, তাদের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় উত্তরাধিকার পরবর্তী বহু সভ্যতার মাঝে টিকে ছিল। আক্কাদীয়, ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যগুলো সুমেরীয় প্যান্থিয়ন এবং পুরাণকে নিজেদের মতো করে আত্মস্থ করেছিল। গিলগামেশের মহাকাব্য বা মহাপ্লাবনের যে আখ্যান তারা রচনা করেছিল, তার সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি আমরা পরবর্তীকালের বিভিন্ন সংস্কৃতির মিথলজি এবং সাহিত্যকর্মে দেখতে পাই। সুমেরীয় পুরাণ কেবল একটি মৃত সভ্যতার দলিল নয়; এটি মানব চিন্তাধারার বিবর্তনের একটি জীবন্ত স্মারক, যা আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় কীভাবে মানুষ প্রথমবার তার জাগতিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে অমরত্বের ধারণা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিল।

পরিশেষে বলা যায়, সুমেরীয়দের এই দার্শনিক জিজ্ঞাসা এবং বিশ্বকে বোঝার চেষ্টা আজও আধুনিক মানুষকে ভাবনার খোরাক জোগায়। তারা মানবজীবনের নশ্বরতা, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং সমাজ পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেছিল, তা যুগ পেরিয়ে আজও বহুলাংশে প্রাসঙ্গিক। মন্দিরকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশ থেকে শুরু করে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের সূচনা – সবকিছুতেই তাদের ধর্মীয় দর্শনের একটি পরিষ্কার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। মানব ইতিহাসের এই উন্মেষলগ্নটি তাই সবসময় সমাজবিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক এবং সাধারণ পাঠকের কাছে এক গভীর মনোযোগের বিষয় হয়ে থাকবে। তাদের রেখে যাওয়া এই আদিম বৌদ্ধিক কাঠামো আমাদের অনুধাবন করতে সাহায্য করে যে, বাহ্যিক রূপান্তর ঘটলেও মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক জিজ্ঞাসা এবং অস্তিত্বের অর্থ খোঁজার নিরন্তর প্রচেষ্টা হাজার হাজার বছর ধরে মূলত একই রকম রয়ে গেছে।

আব্রাহামিক ধর্মসমূহে সুমেরীয় ধর্ম ও পুরাণের প্রভাব (Influence of Sumerian Religion and Mythology on Abrahamic Religions)

সৃষ্টিতত্ত্ব এবং আদিম জলরাশির রূপরেখা (Cosmology and the Outline of the Primordial Sea)

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা খুব সাধারণ সত্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোনো সভ্যতাই শূন্য থেকে গড়ে ওঠে না। একটা সভ্যতা যখন মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়, তখন তার রেখে যাওয়া জ্ঞান, দর্শন আর গল্পগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না। বরং পরবর্তী সভ্যতাগুলো সেই পুরনো জ্ঞানগুলোকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। সুমেরীয় সভ্যতা বিলীন হয়ে যাওয়ার পর তাদের অনেক বিশ্বাস, মিথ এবং মহাজাগতিক দর্শন ধীরে ধীরে আব্রাহামিক ধর্মগুলোর (ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম) পবিত্র গ্রন্থগুলোর বর্ণনায় প্রবেশ করে। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের একেবারে কেন্দ্রে ছিল একটি আদিম এবং অনন্ত জলরাশির ধারণা, যাকে তারা ‘নাম্মু’ বলত। সুমেরীয়দের বিশ্বাস ছিল যে, সৃষ্টির শুরুতে কোনো নির্দিষ্ট আকার বা কাঠামো ছিল না, চারদিকে কেবল অথৈ জল বিরাজ করত। এই জলরাশি থেকেই পরবর্তীতে স্বর্গ এবং পৃথিবীর জন্ম হয়। ব্যাবিলনীয় মহাকাব্য Enuma Elish-এ এই নাম্মু রূপান্তরিত হয় লোনা জলের দেবী তিয়ামাত (Tiamat) হিসেবে, যাকে পরাজিত করে দেবতা মারদুক পৃথিবী সৃষ্টি করেন। হিব্রু বাইবেলের আদিপুস্তক বা Genesis-এর একেবারে শুরুর দিকে তাকালে আমরা ঠিক একই রকম একটি মহাজাগতিক চিত্রের দেখা পাই। সেখানে বলা হয়েছে যে সৃষ্টির শুরুতে পৃথিবী ছিল আকারহীন ও শূন্য, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের ওপর ঘোরাফেরা করছিল। এই আদিম জলরাশিকে হিব্রু ভাষায় বলা হয়েছে ‘তেহোম’ (Tehom)। ভাষাতাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, ব্যাবিলনীয় ‘তিয়ামাত’ এবং হিব্রু ‘তেহোম’ শব্দ দুটির মূল উৎস একই (Smith, 2001)। এর মানে দাঁড়ায়, সৃষ্টির শুরুতে একটি বিশৃঙ্খল জলরাশির উপস্থিতি এবং সেই জলরাশি থেকে একটি সুশৃঙ্খল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরির ধারণাটি সরাসরি প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার চিন্তাধারা থেকে অনুপ্রাণিত।

জলরাশি থেকে সৃষ্টির এই কাঠামোগত মিল কেবল শুরুর বাক্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে আমরা দেখি, বায়ুর দেবতা এনলিল একটি মহাজাগতিক কুঠার দিয়ে স্বর্গ এবং পৃথিবীকে আলাদা করে ফেলেন। এর ফলে পৃথিবীর ওপর একটি কঠিন আচ্ছাদন বা গম্বুজ তৈরি হয়, যা ওপরের আদিম জলরাশিকে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া থেকে ঠেকিয়ে রাখে। হিব্রু সৃষ্টিতত্ত্বেও ঠিক একইভাবে দ্বিতীয় দিনে ঈশ্বর একটি ‘বিতান’ বা ‘ফার্মামেন্ট’ তৈরি করেন। এই ফার্মামেন্টের কাজ ছিল ওপরের জল থেকে নিচের জলকে আলাদা করা। প্রাচীনকালের মানুষেরা আকাশকে একটি কঠিন গম্বুজ হিসেবেই কল্পনা করত। তারা মনে করত যে আকাশের ওপারে বিশাল সমুদ্র রয়েছে এবং বৃষ্টির সময় সেই গম্বুজের দরজা খুলে যায়। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়টিকে কসমোলজিক্যাল কন্টিনিউটি (Cosmological Continuity) বা মহাজাগতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষ মহাবিশ্বের জ্যামিতিক কাঠামো নিয়ে যে আদিম বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি করেছিল, তা ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির মনস্তত্ত্বে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছিল। আব্রাহামিক ধর্মগুলো যখন তাদের নিজস্ব ধর্মতত্ত্ব বিকশিত করছিল, তখন তারা তাদের চারপাশের পরিচিত এই মহাজাগতিক মডেলটিকেই গ্রহণ করেছিল, তবে এর পেছনের পরিচালক হিসেবে বহু দেবতার বদলে একজন একক ঈশ্বরের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছিল (Gmirkin, 2006)।

সৃষ্টিতত্ত্বের এই মিলগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন বিশ্বের মানুষেরা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। ইসরায়েলীয়রা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করত না। তারা ব্যাবিলন এবং মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য শক্তিশালী সাম্রাজ্যের খুব কাছাকাছি ছিল। বিশেষ করে ইহুদিদের ব্যাবিলনে নির্বাসনের সময় (Babylonian Exile) তারা মেসোপটেমিয়ার সাহিত্য এবং পুরাণের খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়। অনেক গবেষক মনে করেন, ঠিক এই সময়েই ইহুদি পুরোহিতরা তাদের নিজস্ব পবিত্র গ্রন্থগুলো সংকলন করার সময় ব্যাবিলনীয় এবং সুমেরীয় মিথগুলোর সাথে পরিচিত হন। তারা মেসোপটেমিয়ার গল্পগুলোকে সরাসরি অনুকরণ করেননি। তারা এই গল্পগুলোর একটি নতুন এবং একেশ্বরবাদী রূপ দিয়েছিলেন। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে যেখানে দেবতারা নিজেদের মধ্যে মারামারি এবং ষড়যন্ত্র করে পৃথিবী তৈরি করেন, আব্রাহামিক ধর্মে সেখানে ঈশ্বর তাঁর অসীম ক্ষমতায় কেবল একটি নির্দেশের মাধ্যমে সৃষ্টি সম্পন্ন করেন। গল্পের এই রূপান্তর ঘটলেও এর মূল উপাদানের মাঝে – যেমন আদিম জল, অন্ধকার এবং আকাশ ও পৃথিবীর বিভাজন – সুমেরীয় দর্শনের সেই হাজার বছরের পুরনো ছাপটি স্পষ্ট রয়ে গেছে (Kramer, 1963)।

মহাপ্লাবনের আখ্যান এবং নূহের নৌকার উৎস (The Narrative of the Great Flood and the Origin of Noah’s Ark)

সুমেরীয় ধর্ম ও পুরাণ থেকে আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে সবচেয়ে সরাসরি এবং জোরালোভাবে যে গল্পটি প্রবেশ করেছে, তা হলো মহাপ্লাবনের কাহিনী। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সাহিত্যে এই প্রলয়ঙ্করী বন্যার আখ্যান অত্যন্ত বিশদভাবে লেখা রয়েছে। সুমেরীয় পুরাণে আমরা জিউসুদ্রা (Ziusudra) নামের এক ধার্মিক রাজার কথা জানতে পারি, যাকে দেবতা এনকি গোপনে বন্যার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে ব্যাবিলনীয় মহাকাব্য Epic of Gilgamesh-এ এসে এই একই চরিত্র উটনাপিশটিম (Utnapishtim) নাম ধারণ করেন। হিব্রু বাইবেল এবং ইসলামিক ঐতিহ্যে বর্ণিত নোয়াহ বা নূহের (Noah) কাহিনীর সাথে এই উটনাপিশটিমের কাহিনীর মিল এতটাই বেশি যে, তা যেকোনো পাঠককে বিস্মিত করতে বাধ্য। সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয় আখ্যানে দেবতারা মানুষের কোলাহলে বিরক্ত হয়ে পৃথিবীকে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে আব্রাহামিক ধর্মে প্লাবনের কারণ হিসেবে মানুষের নৈতিক স্খলন এবং পাপকে দায়ী করা হয়েছে। কারণের এই ভিন্নতা থাকলেও, বন্যার প্রস্তুতি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রায় হুবহু মিলে যায়। উভয় গল্পেই একজন বিশেষ ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া হয়, তাকে একটি নির্দিষ্ট মাপে বিশালাকার নৌকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কাঠকে জলরোধী করার জন্য অ্যাসফল্ট বা আলকাতরা ব্যবহারের কথা বলা হয় (Finkel, 2014)।

নৌকা তৈরির পর প্রাণী সংগ্রহের পদ্ধতিতেও অসাধারণ মিল লক্ষ্য করা যায়। উটনাপিশটিম তার নৌকায় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর বীজ এবং তার পরিবারকে তুলে নিয়েছিলেন। নূহ নবীও ঠিক একইভাবে সমস্ত প্রাণীকে জোড়ায় জোড়ায় তার নৌকায় আশ্রয় দেন। বন্যা শুরু হওয়ার পর উভয় গল্পেই এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বর্ণনা রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীকে জলের নিচে তলিয়ে রাখে। প্লাবন শেষে নৌকা একটি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ভেড়ে। ব্যাবিলনীয় গল্পে সেটি ছিল নিসির পর্বত, আর বাইবেলে বলা হয়েছে আরারাত পর্বতের কথা। এরপর ডাঙার খোঁজ নেওয়ার জন্য পাখি উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি দুটি গল্পেই বর্তমান। উটনাপিশটিম প্রথমে একটি পায়রা, তারপর একটি সোয়ালো এবং শেষে একটি কাক উড়িয়ে দিয়েছিলেন। নূহও জল কমেছে কি না তা দেখার জন্য প্রথমে একটি কাক এবং পরে একটি পায়রা উড়িয়েছিলেন। সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় এই ধরনের হুবহু মিলকে কালচারাল ডিফিউশন (Cultural Diffusion) বা সংস্কৃতির বিস্তারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার গল্প কীভাবে যাযাবর এবং বণিকদের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে প্রবেশ করে, এটি তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ (Dalley, 1989)।

প্লাবন পরবর্তী ঘটনাগুলোও তুলনামূলক পুরাণতত্ত্বের এক চমৎকার গবেষণার ক্ষেত্র। নৌকা থেকে নেমে উটনাপিশটিম দেবতাদের উদ্দেশ্যে একটি যজ্ঞ বা বলিদানের আয়োজন করেন। পুরাণে বলা হয়েছে যে যজ্ঞের সুগন্ধি ধোঁয়া পেয়ে দেবতারা মাছিদের মতো সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। হিব্রু বাইবেলেও দেখা যায়, নূহ নৌকা থেকে বের হয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে একটি বেদী নির্মাণ করেন এবং নৈবেদ্য উৎসর্গ করেন। ঈশ্বর সেই নৈবেদ্যের সুঘ্রাণ গ্রহণ করেন এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি আর কখনো জল দিয়ে পৃথিবীকে এভাবে ধ্বংস করবেন না। দুটি গল্পেই এই নৈবেদ্য উৎসর্গ করার বিষয়টি মানবজাতির নতুন করে শুরু করার একটি প্রতীকী চুক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সুমেরীয়রা তাদের দৈনন্দিন জীবনে বন্যাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিল বলে এই ভয়ানক ধ্বংসলীলাকে তারা একটি মহাজাগতিক রূপ দিয়েছিল। আব্রাহামিক ধর্মগুলো সেই প্রাচীন ভীতি এবং ধ্বংসের গল্পটিকে গ্রহণ করে তাকে একটি নৈতিক মোড়ক প্রদান করে। তারা প্রমাণ করে যে, ঈশ্বরের অবাধ্য হলে যেমন শাস্তি পেতে হয়, তেমনি অনুগত থাকলে চরম বিপদের মাঝেও ঈশ্বর রক্ষার ব্যবস্থা করেন। এভাবেই মেসোপটেমিয়ার কাদা-জলের একটি গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় (George, 2003)।

প্রথম মানব সৃষ্টি এবং ইডেন গার্ডেনের পৌরাণিক সংযোগ (Creation of the First Human and the Mythological Connection of the Garden of Eden)

মানুষের সৃষ্টির পেছনের আখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে সুমেরীয় এবং আব্রাহামিক ধর্মের মধ্যে বেশ কিছু কাঠামোগত সংযোগ চোখে পড়ে। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী, দেবতারা যখন কায়িক পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ করেন, তখন প্রজ্ঞার দেবতা এনকি কাদামাটি দিয়ে মানুষ তৈরির প্রস্তাব দেন। দেবী নিনমাহ এবং এনকি মিলে কাদামাটির সাথে একজন মৃত দেবতার রক্ত মিশিয়ে প্রথম মানবকাঠামো তৈরি করেন। এই মাটি বা কাদার ব্যবহারের ধারণাটি হিব্রু বাইবেল এবং কোরআন উভয় গ্রন্থেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থিত রয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মে ঈশ্বর প্রথম মানব আদমকে মাটি বা কাদা থেকেই সৃষ্টি করেছেন। পার্থক্য হলো, সুমেরীয় ধর্মে মাটির সাথে দেবতার রক্ত মেশানো হয়েছিল, আর আব্রাহামিক ধর্মে ঈশ্বর মাটির সেই অবয়বের ভেতর নিজের আত্মা বা জীবনদায়ী নিশ্বাস ফুঁকে দিয়েছিলেন। উপাদানের এই মিল প্রমাণ করে যে, প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ মাটির সাথে মানবদেহের নশ্বরতার একটি গভীর সম্পর্ক অনুভব করত। মৃত্যুর পর শরীর যে মাটিতেই মিশে যায়, এই সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকেই সম্ভবত মাটির তৈরি মানুষের ধারণাটি বিকশিত হয়েছিল। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে মিথোলজিক্যাল ট্রান্সফারেন্স (Mythological Transference) বা পৌরাণিক স্থানান্তর বলা যেতে পারে, যেখানে একটি আদিম রূপক ভিন্ন একটি ধর্মীয় কাঠামোতে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় (Smith, 2001)।

আব্রাহামিক ধর্মে বর্ণিত হাওয়া বা ইভ-এর সৃষ্টির গল্পটির সাথেও সুমেরীয় একটি মিথের অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক মিল রয়েছে। হিব্রু বাইবেলে বলা হয়েছে যে ঈশ্বর আদমের পাঁজরের হাড় থেকে ইভকে সৃষ্টি করেছিলেন। ইভকে বলা হয় ‘সমস্ত জীবিতদের মাতা’। এই পাঁজরের হাড়ের গল্পটি প্রাচীন সুমেরীয় পুরাণের দেবী নিনহুরসাগ এবং দেবতা এনকির মিথের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পুরাণে দেখা যায়, এনকি একবার কিছু নিষিদ্ধ উদ্ভিদের ফল খেয়ে ফেলেন, যার ফলে তার শরীরের আটটি অঙ্গে মারাত্মক রোগ দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি অঙ্গ ছিল তার পাঁজর। এনকিকে সারিয়ে তোলার জন্য দেবী নিনহুরসাগ আটজন নতুন দেবী সৃষ্টি করেন। এনকির পাঁজরের ব্যথা নিরাময়ের জন্য যে দেবীর জন্ম হয়, তার নাম ছিল ‘নিনতি’ (Ninti)। সুমেরীয় ভাষায় ‘তি’ (Ti) শব্দের দুটি অর্থ হয় – একটি হলো ‘পাঁজর’ এবং অন্যটি হলো ‘জীবন’। ফলে নিনতি নামের অর্থ একই সাথে ‘পাঁজরের দেবী’ এবং ‘প্রাণের দেবী’ দাঁড়ায়। ভাষাতাত্ত্বিকরা মনে করেন, সুমেরীয় সাহিত্যের এই চমৎকার শ্লেষ বা ওয়ার্ডপ্লে পরবর্তীতে হিব্রু সাহিত্যে অনুবাদ করার সময় পাঁজরের হাড় থেকে নারী সৃষ্টির আখ্যানে পরিণত হয়েছে (Kramer, 1963)।

ইডেন গার্ডেন বা স্বর্গোদ্যানের ধারণার শেকড়ও আমরা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় খুঁজে পাই। সুমেরীয়রা ‘দিলমুন’ (Dilmun) নামের এক পবিত্র এবং ঐশ্বরিক বাগানের কথা বিশ্বাস করত। পুরাণে দিলমুনকে এমন এক জায়গা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে কোনো রোগ নেই, মৃত্যু নেই, সিংহ কাউকে আক্রমণ করে না এবং নেকড়ে ভেড়াকে ছিঁড়ে খায় না। এটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তি এবং অমরত্বের একটি জায়গা, যা আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে বর্ণিত ইডেন বাগানের ঠিক অনুরূপ। ইডেনে যেমন জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়ার কারণে আদম ও ইভ বা হাওয়াকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল এবং তারা অমরত্ব হারিয়েছিলেন, সুমেরীয় মিথ আদাপা (Adapa)-র গল্পেও ঠিক এরকম একটি থিম রয়েছে। আদাপাকে স্বর্গে দেবতা আন অমরত্বের খাবার এবং জল প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কারণে আদাপা তা খেতে অস্বীকার করেন এবং মানবজাতির জন্য অমরত্ব লাভের সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যায়। এই আখ্যানগুলো মানুষের নশ্বরতা এবং স্বর্গীয় পবিত্রতা হারানোর এক আদিম শোকের প্রতিনিধিত্ব করে। মেসোপটেমিয়ার মানুষ তাদের শুষ্ক এবং রুক্ষ পরিবেশে একটি নিখুঁত সবুজ বাগানের স্বপ্ন দেখত। সেই স্বপ্নই কালক্রমে ইডেন গার্ডেনের পবিত্র আখ্যানে রূপ লাভ করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে (Gmirkin, 2006)।

ঐশ্বরিক আইন এবং দশ আজ্ঞার কাঠামোগত ভিত্তি (Divine Law and the Structural Foundation of the Ten Commandments)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া কেবল মিথ আর গল্পের জন্যই পরিচিত ছিল না; এটি ছিল মানব সভ্যতার প্রথম আইনি কাঠামোর জন্মস্থান। সমাজে কীভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, অপরাধের শাস্তি কী হবে এবং সম্পত্তির অধিকার কীভাবে বন্টিত হবে – সে বিষয়ে সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয় রাজারা সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছিলেন। উর-নাম্মুর আইন সংহিতা এবং পরবর্তীতে হাম্মুরাবির আইন সংহিতা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই আইনগুলোর একটি খুব সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এগুলোকে রাজাদের নিজস্ব উদ্ভাবন হিসেবে প্রচার করা হতো না। শিলালিপিতে সবসময় দেখানো হতো যে রাজারা ন্যায়বিচারের দেবতা শামাশ (সুমেরীয় উতু) বা অন্য কোনো প্রধান দেবতার কাছ থেকে এই আইনগুলো গ্রহণ করছেন। আব্রাহামিক ধর্মে, বিশেষ করে ইহুদি ধর্মে মোশির (Moses) কাছে ঈশ্বরের আইন বা দশ আজ্ঞা (Ten Commandments) অবতীর্ণ হওয়ার যে বর্ণনা রয়েছে, তার সাথে মেসোপটেমিয়ার এই ঐশ্বরিক আইনের ধারণার একটি সুস্পষ্ট কাঠামোগত মিল রয়েছে। মোশিও সিনাই পর্বতের চূড়ায় গিয়ে ঈশ্বরের কাছ থেকে সরাসরি পাথরের ফলকে লেখা আইনগুলো গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ডিভাইন রাইট অফ ল (Divine Right of Law) বা আইনের ঐশ্বরিক অধিকার বলা হয়। প্রাচীনকালে সাধারণ মানুষকে আইন মানতে বাধ্য করার জন্য এই ঐশ্বরিক বৈধতার প্রয়োজন ছিল (Dalley, 1989)।

আইন প্রদানের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আইনের ভেতরের কাঠামো এবং ধারাগুলোর মধ্যেও গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। হিব্রু বাইবেলের ‘বুক অফ কভেন্যান্ট’ (Book of the Covenant)-এ এমন অনেক আইন রয়েছে, যেগুলো সরাসরি হাম্মুরাবির আইন সংহিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে ‘চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত’ (Lex Talionis) – এই প্রতিশোধমূলক ন্যায়বিচারের নীতিটি মেসোপটেমিয়ার আইনি ব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কারো চোখ নষ্ট করে দেয়, তবে শাস্তি হিসেবে তারও চোখ নষ্ট করে দেওয়ার বিধান হাম্মুরাবির আইনে স্পষ্ট লেখা ছিল। হিব্রু আইনেও ঠিক একই ধরনের শর্তসাপেক্ষ বা ক্যাজুইস্টিক (Casuistic) আইনের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। যদি কেউ একটি নির্দিষ্ট অপরাধ করে, তবে তার শাস্তি কী হবে – এই ‘যদি-তবে’ কাঠামোটি মেসোপটেমিয়ার লিপিকাররাই প্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন। এই মিলগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং এটি নির্দেশ করে যে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের একটি সাধারণ আইনি সংস্কৃতি ছিল, যা বিভিন্ন সমাজ নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছিল (Finkel, 2014)।

তবে মেসোপটেমিয়ার আইনের সাথে আব্রাহামিক আইনের একটি বড় তফাৎও ছিল। মেসোপটেমিয়ায় আইনগুলো সাধারণত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করত। একজন অভিজাত মানুষ অপরাধ করলে তার যে শাস্তি হতো, একজন সাধারণ কৃষক বা দাস একই অপরাধ করলে তার শাস্তি হতো অনেক বেশি কঠোর। আব্রাহামিক ধর্মে, বিশেষ করে প্রাথমিক হিব্রু আইনে, ঈশ্বরের সামনে সমাজের সব মানুষকে অন্তত তাত্ত্বিকভাবে সমান হিসেবে দেখার একটি প্রচেষ্টা ছিল। ঈশ্বর এখানে কেবল একজন দূরে বসে থাকা রাজা নন, তিনি সমাজের নৈতিক কাঠামোর একজন সক্রিয় তদারককারী। মেসোপটেমিয়ায় আইন অমান্য করাকে মূলত সমাজের প্রতি অপরাধ হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু আব্রাহামিক ধর্মে তা সরাসরি ঈশ্বরের প্রতি পাপ হিসেবে গণ্য হয়। এই নৈতিক বিবর্তনটি ঘটলেও, আইনকে পাথরে খোদাই করে ঐশ্বরিক আজ্ঞা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রাথমিক নকশা, তা সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয় জিগুরাতগুলোর ছায়াতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল। তারা বুঝিয়েছিল যে, একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু অলঙ্ঘনীয় নিয়ম প্রয়োজন, যা মানুষের তৈরি যেকোনো প্রথার চেয়ে বেশি শক্তিশালী (Smith, 2001)।

জিগুরাত এবং বাবেল টাওয়ারের মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত (Ziggurat and the Psychological Conflict of the Tower of Babel)

সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয় শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে সবচেয়ে উঁচু যে স্থাপত্যটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকত, তাকে জিগুরাত বলা হতো। এগুলো ছিল ধাপে ধাপে ওপরে ওঠা বিশাল সব ইটের তৈরি ইমারত, যার একেবারে চূড়ায় দেবতাদের উপাসনালয় থাকত। মেসোপটেমিয়ার মানুষ বিশ্বাস করত যে দেবতারা এই জিগুরাতের মাধ্যমেই পৃথিবীতে নেমে আসেন। এটি ছিল স্বর্গ এবং পৃথিবীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। ব্যাবিলন শহরের প্রধান জিগুরাতটির নাম ছিল ‘এতেমেনানকি’ (Etemenanki), যার অর্থ ‘স্বর্গ ও মর্ত্যের ভিত্তিমূলের গৃহ’। হিব্রু বাইবেলে বর্ণিত বিখ্যাত ‘বাবেল টাওয়ার’ বা টাওয়ার অফ বাবেলের আখ্যানটি মূলত মেসোপটেমিয়ার এই জিগুরাত নির্মাণের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে। বাইবেলের গল্পে বলা হয়েছে যে, মানুষ অহংকারবশত এমন একটি শহর এবং উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করতে চেয়েছিল, যার চূড়া স্বর্গ পর্যন্ত পৌঁছাবে। ঈশ্বর মানুষের এই ঔদ্ধত্য দেখে রেগে যান এবং তাদের ভাষা গুলিয়ে দিয়ে তাদের পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে দেন, যাতে তারা আর কখনো এক হয়ে এমন কোনো স্থাপত্য তৈরি করতে না পারে। তাত্ত্বিক আলোচনায় একে মনুমেন্টাল আর্কিটেকচার (Monumental Architecture)-এর বিরুদ্ধে একটি ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে (George, 2003)।

এই আখ্যানটির গভীরে একটি বিশাল সমাজতাত্ত্বিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত লুকিয়ে আছে। প্রাচীন ইসরায়েলীয়রা মূলত ছিল পশুপালক এবং কৃষিজীবী সমাজ। তারা যাযাবর বা আধা-যাযাবর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। অন্যদিকে মেসোপটেমিয়া ছিল বিশাল সব নগররাষ্ট্র, জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ এবং আকাশছোঁয়া জিগুরাতের দেশ। ইসরায়েলীয়দের কাছে এই বিশালাকৃতির শহুরে স্থাপত্যগুলো মানুষের চরম অহংকার এবং ঈশ্বরের প্রতি অবজ্ঞার প্রতীক বলে মনে হয়েছিল। বাবেল টাওয়ারের গল্পটি আসলে গ্রামীণ বা পশুপালক সমাজের দিক থেকে শহুরে সভ্যতার একটি তীব্র সমালোচনা। সুমেরীয়রা জিগুরাত তৈরি করেছিল দেবতাদের কাছে পৌঁছানোর ভক্তি থেকে, কিন্তু বাইবেলের লেখকরা এটিকে দেখেছেন মানুষের স্বর্গে হানা দেওয়ার একটি স্পর্ধিত চেষ্টা হিসেবে। তারা মাটির ইট আর আলকাতরা দিয়ে তৈরি এই ইমারতগুলোকে ঈশ্বরের অনন্ত ক্ষমতার সামনে এক হাস্যকর এবং অহংকারী প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এই সংঘাতটি মূলত দুটি ভিন্ন জীবনধারার – শহর বনাম প্রকৃতির – এক পৌরাণিক প্রকাশ (Gmirkin, 2006)।

বাবেল টাওয়ারের মিথটিতে মানুষের ভাষার বৈচিত্র্য বা কনফিউশন অফ টাং (Confusion of Tongues)-এর যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটিও মেসোপটেমিয়ার সামাজিক বাস্তবতার একটি চমৎকার রূপক। ব্যাবিলন ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র। চারদিক থেকে বিভিন্ন ভাষাভাষী বণিক, কারিগর এবং শ্রমিকরা সেখানে এসে ভিড় করত। শহরের রাস্তায় হাঁটলে অসংখ্য অজানা ভাষা শোনা যেত, যা একজন সাধারণ বহিরাগতের কাছে চরম বিশৃঙ্খল এবং বিভ্রান্তিকর মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। ভাষার এই বহুত্ববাদকে হিব্রু লেখকরা ঈশ্বরের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তারা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মানুষ যখন ঐশ্বরিক সীমানা অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তখন তাদের মধ্যে বিভেদ এবং যোগাযোগের অভাব তৈরি হয়। জিগুরাতের সেই মাটির পাহাড়গুলো হয়তো সত্যি সত্যি স্বর্গ ছুঁতে পারেনি, কিন্তু তারা মানুষের মনে এমন এক অমলিন ভীতি এবং বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল, যা হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে মানুষের অহংকারের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে। মেসোপটেমিয়ার স্থাপত্যকলা এভাবেই অন্য একটি সংস্কৃতির ধর্মতত্ত্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতীকী অর্থ লাভ করেছিল (Black & Green, 1992)।

পরকালবিদ্যা এবং পাতালপুরীর রূপান্তরের ধারাবাহিকতা (Eschatology and the Continuity of the Underworld’s Transformation)

মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে মানুষের ভাবনার যে বিবর্তন, তাতেও সুমেরীয় দর্শনের একটি অস্পষ্ট কিন্তু শক্তিশালী ছায়া রয়েছে। সুমেরীয়রা পরকাল বলতে একটি অত্যন্ত অন্ধকার, ধুলোমলিন এবং বিষণ্ণ জায়গার কথা ভাবত, যাকে তারা ‘কুর্’ (Kur) বলত। সেখানে কোনো পুরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না। রাজা থেকে শুরু করে দাস – সবাইকে মৃত্যুর পর সেই একই অন্ধকার গহ্বরে যেতে হতো এবং ধুলো খেয়ে বেঁচে থাকতে হতো। প্রাথমিক দিকের হিব্রু ধর্মতত্ত্বে পরকালের এই ধারণাটি প্রায় হুবহু একই রকম ছিল। হিব্রু বাইবেলে মৃত্যু পরবর্তী জগতকে ‘শিওল’ (Sheol) নামে ডাকা হয়েছে। শিওল কোনো আধুনিক অর্থে স্বর্গ বা নরক ছিল না। এটি ছিল মূলত কবরের সমার্থক একটি অন্ধকার গহ্বর বা পিট, যেখানে ভালো-খারাপ নির্বিশেষে সমস্ত মৃত আত্মা অবস্থান করে। শিওলে ঈশ্বরের উপস্থিতি বা প্রশংসা করার কোনো সুযোগ ছিল না। এটি ছিল জীবনের চূড়ান্ত এবং নীরব পরিণতি। ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় মৃত্যু এবং পরকালের এই ধারণাকে এসক্যাটলজি (Eschatology) বা পরকালবিদ্যা বলা হয়। সুমেরীয় কুর্ এবং প্রাথমিক হিব্রু শিওলের এই সাদৃশ্য প্রমাণ করে যে, প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ মৃত্যুকে কোনো আনন্দদায়ক মুক্তি হিসেবে দেখত না, বরং অস্তিত্বের এক নিরালোক সমাপ্তি হিসেবেই বিবেচনা করত (Jacobsen, 1976)।

তবে সময়ের সাথে সাথে আব্রাহামিক ধর্মগুলোর পরকালবিদ্যা একটি বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। ইহুদি ধর্মের পরবর্তী যুগে এবং বিশেষ করে খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মে পরকালের ধারণাটি নৈতিক বিচারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পর মানুষের কর্মের হিসাব নেওয়া এবং তার ভিত্তিতে স্বর্গ বা নরকে পাঠানোর যে পরিষ্কার বিভাজন তৈরি হয়, তা সুমেরীয় যুগে ছিল না। সুমেরীয়দের কাছে মানুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে দেবতাদের সেবা করা; মৃত্যুর পর তাদের আর কোনো উপযোগিতা ছিল না। কিন্তু আব্রাহামিক ধর্মগুলো মানুষকে একটি নৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার কর্মের ফল মৃত্যুর পরও তাকে ভোগ করতে হয়। নরকের আগুনের ধারণা বা স্বর্গের চিরস্থায়ী বাগানের ধারণাগুলো ধীরে ধীরে বিকশিত হয়, যা মানুষের পার্থিব জীবনকে আরও বেশি নীতিবান করার জন্য কাজ করে। এই বিবর্তনটি ঘটলেও, মাটির নিচের সেই অন্ধকার কবরের যে আদিম ভীতি, তা কোনোদিনই মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি (Finkel, 2014)।

মৃতদেহের সৎকার এবং মাটির সাথে মানুষের সম্পর্ক নিয়েও এই ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। সুমেরীয়রা মৃতদের কবরে খাবার এবং জল দিত, কারণ তারা বিশ্বাস করত যে পাতালপুরীতে এই জিনিসগুলোর খুব অভাব। আব্রাহামিক ধর্মে এই ধরনের খাবার দেওয়ার প্রথা নিষিদ্ধ করা হলেও, মৃতদেহকে সসম্মানে মাটিতে সমাহিত করার রীতিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়। “তুমি মাটি থেকে এসেছ, আবার মাটিতেই ফিরে যাবে” – আব্রাহামিক ধর্মের এই বিখ্যাত উক্তিটি মূলত প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সেই জীবনবোধেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে মানুষকে কাদা মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। সুমেরীয়রা হয়তো তাদের পরকালকে কোনো সুন্দর মোড়কে সাজায়নি, কিন্তু তারা মানুষের নশ্বরতার যে নগ্ন সত্যটি তুলে ধরেছিল, তা পরবর্তী সমস্ত সভ্যতার ধর্মীয় কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। আব্রাহামিক ধর্মগুলো সেই অন্ধকার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একটি নৈতিক এবং আশাবাদী পরকালের ধারণা নির্মাণ করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই নির্মাণের নিচে মেসোপটেমিয়ার সেই আদিম এবং ধুলোমলিন কুর্-এর স্মৃতি আজও নীরবে ঘুমিয়ে আছে (Smith, 2001; Kramer, 1963)।

তথ্যসূত্র

  • Bahrani, Z. (2017). Mesopotamia: Ancient Art and Architecture. Thames & Hudson.
  • Barret, C. E. (2007). Was Dust Their Food and Clay Their Meat? Journal of Ancient Near Eastern Religions.
  • Black, J., & Green, A. (1992). Gods, Demons and Symbols of Ancient Mesopotamia: An Illustrated Dictionary. University of Texas Press.
  • Bottéro, J. (2001). Religion in Ancient Mesopotamia. University of Chicago Press.
  • Charvát, P. (2002). Mesopotamia Before History. Routledge.
  • Crawford, H. (2004). Sumer and the Sumerians. Cambridge University Press.
  • Dalley, S. (1989). Myths from Mesopotamia: Creation, the Flood, Gilgamesh, and Others. Oxford University Press.
  • Frankfort, H. (1954). The Art and Architecture of the Ancient Orient. Yale University Press.
  • Gadd, C. J. (1971). The Cities of Babylonia. Cambridge University Press.
  • George, A. R. (2003). The Babylonian Gilgamesh Epic: Introduction, Critical Edition and Cuneiform Texts. Oxford University Press.
  • Horowitz, W. (1998). Mesopotamian Cosmic Geography. Eisenbrauns.
  • Jacobsen, T. (1976). The Treasures of Darkness: A History of Mesopotamian Religion. Yale University Press.
  • Katz, D. (2003). The Image of the Netherworld in the Sumerian Sources. CDL Press.
  • Kramer, S. N. (1961). Sumerian Mythology: A Study of Spiritual and Literary Achievement in the Third Millennium B.C.. University of Pennsylvania Press.
  • Kramer, S. N. (1963). The Sumerians: Their History, Culture, and Character. University of Chicago Press.
  • Lambert, W. G., & Millard, A. R. (1969). Atra-hasis: The Babylonian Story of the Flood. Oxford University Press.
  • Liverani, M. (2013). The Ancient Near East: History, Society and Economy. Routledge.
  • Mitchell, S. (2004). Gilgamesh: A New English Version. Free Press.
  • Nemet-Nejat, K. R. (1998). Daily Life in Ancient Mesopotamia. Greenwood Press.
  • Pollock, S. (1999). Ancient Mesopotamia: The Eden that Never Was. Cambridge University Press.
  • Postgate, J. N. (1992). Early Mesopotamia: Society and Economy at the Dawn of History. Routledge.
  • Roaf, M. (1990). Cultural Atlas of Mesopotamia and the Ancient Near East. Facts on File.
  • Rochberg, F. (2004). The Heavenly Writing: Divination, Horoscopy, and Astronomy in Mesopotamian Culture. Cambridge University Press.
  • Snell, D. C. (1997). Life in the Ancient Near East. Yale University Press.
  • Stone, E. C. (1995). Nippur, Neighborhoods and Households in Ancient Mesopotamia. The University of Chicago Press.
  • Van De Mieroop, M. (2015). A History of the Ancient Near East, ca. 3000-323 BC. Wiley-Blackwell.
  • Yoffee, N. (2005). Myths of the Archaic State: Evolution of the Earliest Cities, States, and Civilizations. Cambridge University Press.

Leave a comment

Your email will not be published.