ইসলামইসলামে নারীস্টিকি

ইসলামি শরিয়তঃ ধর্ম ও সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বা অনারকিলিং

Table of Contents

ভূমিকা

সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বা ‘অনার কিলিং’ (Honor Killing) হলো একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক অপরাধমূলক প্রপঞ্চ, যেখানে পরিবার বা গোত্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে পরিবারেরই কোনো সদস্যকে—যিনি মূলত নারী—হত্যা করা হয়। সহজ কথায়, কোনো ব্যক্তির আচরণের মাধ্যমে বংশের মর্যাদা ও ধর্মীয় পবিত্রতা বিনষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হলে, সেই হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের কথিত ‘প্রতিকার’ হিসেবে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই প্রথা প্রচলিত থাকলেও পাকিস্তান, জর্ডান, লেবানন, মরক্কো ও সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এর হার সর্বাধিক; এমনকি অভিবাসনের ফলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোতেও বর্তমানে অনার কিলিংয়ের খবর পাওয়া যায়। যদিও অনার কিলিংয়ের পেছনে কেবল নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম এককভাবে দায়ী নয় এবং হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এটি পরিলক্ষিত হয়, তবুও কিছু ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ ও আইনতাত্ত্বিক কাঠামোতে (Jurisprudence) এই বিষয়টিকে পরোক্ষভাবে সমর্থন বা লঘু করে দেখার নজির রয়েছে। বিশেষত ইসলামি আইনশাস্ত্রে ‘গয়রাত’ বা আত্মমর্যাদাবোধের ধারণা এবং কিসাস ও রক্তপণ সংক্রান্ত বিধানে কিছু পদ্ধতিগত ফাঁকফোকর থাকার অভিযোগ রয়েছে, যা এই ধরনের অপরাধকে সামাজিক ও আইনি বৈধতা পেতে সহায়তা করে। আমাদের বর্তমান আলোচনার উদ্দেশ্য হলো ইসলামি দলিলাদি ও শরীয়াহ বিধানের আলোকে যাচাই করা যে, এই প্রথাটিকে ইসলামে জাস্টিফাই করার মতো কোনো উপাদান বিদ্যমান কি না।


লিঙ্গ নির্ভর সম্মানের ধারণা

নারীর সতীত্ব এবং জৈবিক অঙ্গকেন্দ্রিক সম্মানের ধারণাটি সমাজতাত্ত্বিক বিচারে প্রাগৈতিহাসিক এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। রক্ষণশীল ও ধর্মকেন্দ্রিক সমাজগুলোতে আজও এই আদিম ধারণা লালন করা হয়, যেখানে নারীর শরীরের ওপর বংশ, পরিবার বা গোত্রের ‘সামাজিক পবিত্রতা’ আরোপ করা হয়। এই মনস্তত্ত্বে নারীর শরীর কেবল তার নিজস্ব সত্তা নয়, বরং তা পরিবারের মান-সম্মানের একটি প্রতীকে পরিণত হয়। এই তথাকথিত সম্মান রক্ষার তাগিদ এতটাই উগ্র হয়ে ওঠে যে, প্রয়োজনে আপনজনকে হত্যা করাও তখন খুনিদের কাছে একটি ‘পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে গণ্য হয়। এই লিঙ্গ নির্ভর সম্মানের ধারণা নারীকে সর্বদা এই ভয়ের মধ্যে রাখে যে—তার পোশাক, সামান্যতম ব্যক্তিগত পছন্দ, প্রেম বা পরিবারের অমতে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত পুরো বংশের মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।

এই মনস্তত্ত্বকে যখন ধর্মীয়ভাবে ‘গয়রাত’ (Ghayrah) বা পবিত্র আত্মমর্যাদাবোধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন তা এক প্রকার অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক পবিত্রতা অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ, সাহাবী সাদ ইবন উবাদাহ (রা) যখন বলেছিলেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে কোনো পরপুরুষকে দেখলে তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করবেন, তখন নবী মুহাম্মদ এই চরমপন্থাকে নিন্দা না করে বরং সাদের এই আত্মমর্যাদাবোধ বা গয়রাতের প্রশংসা করেছিলেন (পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা হবে)। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোতে নারীকে প্রায়শই একটি ‘সেক্স অবজেক্ট’ বা বংশের শুদ্ধতা রক্ষার আধার হিসেবে দেখা হয়। ফলে নারীর নগ্নতা বা স্বাধীন যৌনাচারকে কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং বংশীয় অপবিত্রতা হিসেবে বিচার করা হয়। যখন এই পুরুষতান্ত্রিক ধারণাগুলোকে ধর্ম ‘সার্টিফাই’ বা অনুমোদন করে, তখন ‘ঈশ্বরের সন্তুষ্টি’ কিংবা ‘পারিবারিক গৌরব’ পুনরুদ্ধারের নামে হত্যাকাণ্ড ঘটানো সহজ হয়ে যায় এবং খুনিরা এর জন্য কোনো অনুশোচনা বোধ করে না।


সম্মান রক্ষার্থে হত্যার সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় কারণ

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘সম্মান রক্ষার্থে হত্যা’ বা অনার কিলিংয়ের হার উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইয়ের বিবৃতি অনুসারে (২০১০), প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫,০০০ অনার কিলিং সংঘটিত হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার নারী অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা কমপক্ষে চারগুণ বেশি, অর্থাৎ ২০,০০০-এরও অধিক হতে পারে [1]। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কঠোর সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর কারণে এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত দুরুহ হলেও প্রাপ্ত উপাত্তসমূহ শিউরে ওঠার মতো। আসুন দেখি,

জাতিসংঘ (Navi Pillay, OHCHR)
২০১০
৫,০০০
“reported to take place” — সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত ফিগার, কিন্তু স্বীকার করা হয়েছে যে আসল সংখ্যা অনেক বেশি (underreporting)
Robert Fisk / মধ্যপ্রাচ্যের নারী অধিকার সংগঠন
২০১০
২০,০০০+
UN-এর ফিগারের “at least four times” — সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উচ্চ অনুমান
UNODC (Global Study on Homicide)
২০২০
~৪৭,০০০
পরিবার বা সঙ্গী দ্বারা নারী/বালিকা হত্যা (intimate partner/family femicide) — অনার কিলিং-এর একটা বড় অংশ এর মধ্যে পড়ে
UN Women (সাম্প্রতিক আপডেট)
২০২৪
~৫০,০০০
একই ধরনের পরিবারিক/সঙ্গী-সংক্রান্ত ফেমিসাইড — অনার কিলিং আলাদাভাবে গণনা করা হয় না
Britannica / UNFPA (পুরনো অনুমান)
২০০০-বর্তমান
~৫,০০০
“as many as 5,000” — সবচেয়ে কমন সাইটেশন, কিন্তু underreported বলে স্বীকৃত

মূলত নিম্নলিখিত কারণগুলোকে ‘সম্মানহানি’ হিসেবে গণ্য করে এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয় –

  • অভিভাবকের (Wali) অনুমতি ব্যতিরেকে স্বাধীনভাবে বিবাহ করা [2]
  • সামাজিকভাবে নিম্নবর্ণ বা নিম্ন মর্যাদার কারো সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা
  • বিবাহ-পূর্ব শারীরিক বা প্রণয়ঘটিত সম্পর্ক
  • বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া
  • কেবল অনুমানের ভিত্তিতে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ পোষণ করা
  • ধর্মীয় অনুশাসন বা পোশাক-পরিচ্ছদ সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ অমান্য করা
  • সামাজিক প্রথা বা গোত্রীয় শৃঙ্খলার অবজ্ঞা করা, যা ধর্মীয় বয়ানে প্রায়শই ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়

অনার কিলিংয়ের শিকার কতিপয় ভিকটিম: কেস স্টাডি

অনার কিলিং কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি ব্যবস্থার প্রতিফলন। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো যা এই অপরাধের ধরণ ও ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে:

১. সামিয়া শহীদ (পাকিস্তান/ব্রিটেন)

ব্রিটিশ-পাকিস্তানি নাগরিক সামিয়া শহীদকে ২০১৬ সালে পাকিস্তান ভ্রমণে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পাঞ্জাব প্রদেশে তাঁর নিজ বাড়িতেই হত্যা করা হয়। পরিবারের ভাষ্যমতে এটি ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হলেও ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধ করে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়। সামিয়ার অপরাধ ছিল তিনি তাঁর প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে নিজের পছন্দমতো এক ব্রিটিশ যুবককে বিয়ে করেছিলেন, যা তাঁর পরিবার ‘বংশের অমর্যাদা’ হিসেবে গণ্য করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, সামিয়ার বাবা এবং তাঁর প্রাক্তন স্বামী শাকিল যৌথভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে [3]। উল্লেখ্য যে, এই ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময় ‘রক্তপণ’ বা ‘দিয়াত’ আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে খুনিরা রেহাই পেয়ে যায়।

সম্মান
সামিয়া শহীদ

২. কান্দিল বেলুচ (পাকিস্তান)

পাকিস্তানের প্রখ্যাত সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রেটি ও মডেল কান্দিল বেলুচ ২০১৬ সালে তাঁর আপন ভাই ওয়াসিমের হাতে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। গ্রেফতারের পর ওয়াসিম অত্যন্ত গর্বের সাথে গণমাধ্যমে স্বীকারোক্তি দেন যে, কান্দিল ইন্টারনেটে ‘অশালীন’ ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে ‘বেলুচ’ বংশের নাম কলঙ্কিত করছিলেন, তাই তাঁকে হত্যা করা তাঁর জন্য ‘আবশ্যক’ হয়ে পড়েছিল। কান্দিল হত্যার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, কারণ এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে কীভাবে নারীর স্বাধীন আত্মপ্রকাশকে ‘গয়রাত’ বা সম্মানের পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয় [4]

কান্দিল বেলুচ

৩. রোমেনা আশরাফী ও রায়হানে আমেরী (ইরান)

২০২০ সালে ইরানে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি অনার কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে। ১৪ বছর বয়সী রোমেনা আশরাফীকে তাঁর বাবা ঘুমের মধ্যে কাস্তে দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন, কারণ সে একজন যুবকের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। রোমেনার বাবা হত্যার আগে একজন আইনজীবীর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ইরানের ইসলামি দণ্ডবিধি (আইন নম্বর ২২০) অনুযায়ী বাবা হিসেবে সন্তানকে হত্যার জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড হবে না। ঠিক একইভাবে ২২ বছর বয়সী রায়হানে আমেরীকে তাঁর বাবা লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন কেবল বাড়িতে দেরি করে ফেরার অপরাধে [5]। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, যখন আইন পিতাকে সন্তানের ‘মালিক’ হিসেবে বিবেচনা করে এবং কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ) থেকে অব্যাহতি দেয়, তখন অনার কিলিং আইনি সুরক্ষা পায়।

সম্মান 2

৪. শাফিলিয়া আহমেদ (যুক্তরাজ্য)

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ১৭ বছরের কিশোরী শাফিলিয়া আহমেদ ছিল একজন মেধাবী ছাত্রী। সে পশ্চিমা জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হতে চেয়েছিল—জিন্স পরা, চুলে রঙ করা এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু তাঁর রক্ষণশীল বাবা-মা ইফতিখার ও ফারজানা আহমেদ একে ‘ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের’ অবমাননা হিসেবে দেখেন। শাফিলিয়াকে পাকিস্তানে নিয়ে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলে, ২০০৩ সালে তাঁর ভাই-বোনের সামনেই প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ ৯ বছর পর তাঁর বোন আলেশার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাঁর বাবা-মায়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় [6]

সম্মান রক্ষার্থে হত্যা

ইসলামি শরীয়তের বিধান ও আইনি কাঠামো

মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে অনার কিলিংয়ের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি হওয়া সত্ত্বেও, সমসাময়িক অধিকাংশ ইসলামি স্কলার এই প্রথার সাথে ইসলামের সরাসরি সম্পর্ক অস্বীকার করেন। তবে এই প্রপঞ্চটির শেকড় সন্ধানে কেবল আধুনিক প্রথাই নয়, বরং কোরআন, হাদিস এবং ধ্রুপদী ফিকহ শাস্ত্রের (Islamic Jurisprudence) দলিলগুলো বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। অনার কিলিং মূলত ‘পাপ প্রতিরোধ’ বা ‘বংশের শুদ্ধতা’ রক্ষার একটি চরমপন্থী রূপ। ইসলামি টেক্সটগুলোতে এমন কিছু দৃষ্টান্ত ও আইনি বিধান রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে কিংবা খুনিকে কঠোর শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে। আসুন আমরা এই সংক্রান্ত প্রাথমিক উৎসগুলো পর্যালোচনা করি।


কোরআনে নিষ্পাপ বালককে ‘প্রতিরোধমূলক হত্যা’ (Preventive Killing)

কোরআনের সূরা কাহফে বর্ণিত খিজির এবং হযরত মূসা-এর সফরনামায় একটি অদ্ভুত হত্যাকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে। সেখানে খিজির একজন আপাত নিষ্পাপ বালককে হত্যা করেন এই আশঙ্কায় যে, সে ভবিষ্যতে তার ঈমানদার পিতা-মাতাকে অবাধ্যতা ও কুফরিতে লিপ্ত করবে। এই ঘটনাটি অনার কিলিংয়ের সমর্থকদের জন্য একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক দলিল হিসেবে কাজ করে, যেখানে ‘ভবিষ্যৎ লজ্জা বা পাপ’ থেকে পরিবারকে বাঁচাতে ‘আগাম হত্যা’ (Pre-emptive killing) করার মনস্তত্ত্বকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কোরআনের আয়াত এবং হাদিসগুলো পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এখানে সরাসরি ‘আগাম হত্যা’ (pre-emptive killing) এর তাত্ত্বিক মডেল প্রদান করা হচ্ছে, যা অনার কিলিংয়ের সমর্থকরা ‘ভবিষ্যৎ লজ্জা প্রতিরোধ’-এর জন্য ব্যবহার করেন। কোনো প্রমাণ নেই যে এই ঘটনা শুধুমাত্র ‘খিজিরের বিশেষ অবস্থা’—বরং এটি কোরআনের অংশ হিসেবে সকলের জন্য নৈতিক দৃষ্টান্ত [7] [8]

তারপর তারা চলতে লাগল। চলতে চলতে এক বালককে তারা দেখতে পেল। তখন সে তাকে হত্যা করে ফেলল। মূসা বলল, ‘আপনি কি এক নিরাপরাধ জীবনকে কোন প্রকার হত্যার অপরাধ ছাড়াই হত্যা করে দিলেন? আপনি তো গুরুতর এক অন্যায় কাজ করে ফেললেন!’
— Taisirul Quran
অতঃপর তারা চলতে লাগল, চলতে চলতে তাদের সাথে এক বালকের সাক্ষাৎ হলে সে তাকে হত্যা করল; তখন মূসা বললঃ আপনি এক নিস্পাপ জীবন নাশ করলেন হত্যার অপরাধ ছাড়াই! আপনিতো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতঃপর তারা চলতে লাগল। অবশেষে যখন তারা এক বালকের সাক্ষাৎ পেল, তখন সে তাকে হত্যা করল। সে বলল, ‘আপনি নিষ্পাপ ব্যক্তিকে হত্যা করলেন, যে কাউকে হত্যা করেনি? আপনি তো খুবই মন্দ কাজ করলেন’।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর উভয়ে চলতে লাগল, অবশেষে তাদের সাথে এক বালকের সাক্ষাত হলে সে তাকে হত্যা করল। তখন মূসা বললেন, ‘আপনি কি এক নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন, হত্যার অপরাধ ছাড়াই? আপনি তো এক গুরুত্বর অন্যায় কাজ করলেন [১]!
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আর বালকটির ব্যাপার হল- তার মাতা-পিতা ছিল মু’মিন। আমরা শঙ্কা করলাম যে, সে তার বিদ্রোহমূলক আচরণ ও (আল্লাহর প্রতি) কুফুরী দ্বারা তাদেরকে কষ্ট দেবে।
— Taisirul Quran
আর কিশোরটি, তার মাতাপিতা ছিল মু’মিন – আমি আশংকা করলাম যে, সে বিদ্রোহাচরণ ও কুফরীর দ্বারা তাদের বিব্রত করবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘আর বালকটির বিষয় হল, তার পিতা-মাতা ছিল মুমিন। অতঃপর আমি আশংকা* করলাম যে, সে সীমালংঘন ও কুফরী দ্বারা তাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলবে’। * তাঁর আশংকা নিছক ধারণা ভিত্তিক ছিল না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি নিশ্চিত জানতে পেরেছিলেন।
— Rawai Al-bayan
‘আর কিশোরটি—তার পিতামাতা ছিল মুমিন। অতঃপর আমরা আশংকা করলাম যে, সে সীমালঙ্ঘন ও কুফরীর দ্বারা তাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলবে [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই বিষয়টি সহিহ হাদিসেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে [9]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৭। তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রত্যেক শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মানোর মর্মার্থ এবং কাফির ও মুসলিমদের মৃত শিশুর বিধান
৬৬৫৯-(২৯/২৬৬১) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ ইবনু কা’নাব (রহঃ) ….. উবাই ইবনু কা’ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই যে ছেলেটিকে খাযির (আঃ) (আল্লাহর আদেশে) হত্যা করেছিলেন তাকে কফিরের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদি সে জীবিত থাকত তাহলে সে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফুরী করতে বাধ্য করত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫২৫, ইসলামিক সেন্টার ৬৫৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)


গয়রাত (Ghayrah) এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রশংসা

ইসলামি পরিভাষায় ‘গয়রাত’ বলতে ধর্মীয় ও নৈতিক আত্মমর্যাদাবোধকে বোঝায়। সাহাবী সাদ ইবন উবাদাহ-এর একটি উক্তি এবং তার প্রতি নবী মুহাম্মদের সমর্থন অনার কিলিংয়ের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে। সেখানে দেখা যায়, আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে পরপুরুষের সাথে স্ত্রীকে দেখা মাত্র হত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করাকে নবী কেবল সমর্থনই করেননি, বরং একে একটি প্রশংসনীয় গুণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি আধুনিক অনেক মুসলিম দেশের দণ্ডবিধিতে (যেমন জর্ডানের পেনাল কোড ৩৪০) ‘প্ররোচনা’ বা Provocation-এর অজুহাতে সাজা কমানোর আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে [10] [11] [12]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২০। লি’আন
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৬৫৫-(১৬/…) আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ সা’দ ইবনু উবাদাহ্ (রাযিঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোন পুরুষকে দেখতে পাই তবে চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করা পর্যন্ত আমি কি তাকে ধরব না? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ, পারবে না। তিনি (সা’দ) বললেনঃ এমনটি কিছুতেই হতে পারে না, সে মহান সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আবশ্য আমি তার (চারজন সাক্ষী উপস্থিত করার) আগেই কাল বিলম্ব না করে তার প্রতি তলোয়ার হানব। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা শোন, তোমাদের নেতা কী বলছেন। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় আত্মমর্যাদার অধিকারী। আর আমি তার চাইতেও অধিকতর আত্মমর্যাদাশীল এবং আল্লাহ আমার চাইতেও অধিক মর্যাদাবান। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৬২১, ইসলামিক সেন্টার ৩৬২১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২০। লি’আন
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৬৫৬-(১৭/১৪৯৯) উবাইদুল্লাহ ইবনু উমার কাওয়ারীরী ও আবূ কামিল ফুযায়ল ইবনু হুসায়ন জাহদারী (রহঃ) ….. মুগীরাহ শুবাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ সা’দ ইবনু উবাদাহ্ (রাযিঃ) বললেনঃ আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে অন্য কোন পুরুষকে দেখতে পাই তবে নিশ্চয়ই আমি তাকে আমার তরবারীর ধারালো দিক দিয়ে তার উপর আঘাত হানব- পার্শ্ব দিয়ে নয়।এ কথা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌছল। তিনি বললেনঃ তোমরা কি সাদের আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে আশ্চর্য হয়েছ? আল্লাহর কসম! আমি তার চাইতে অধিকতর আত্মমর্যাদাবান। আর আল্লাহ আমার তুলনায় অধিকতর মর্যাদাবান। আল্লাহ তাঁর আত্মমর্যাদার কারণে প্রকাশ্য ও গোপন যাবতীয় অশ্লীল কর্ম হারাম করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর তুলনায় অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কেউ নেই এবং আল্লাহর চাইতে অধিকতর ওযর (স্থাপন) পছন্দকারী কেউ নেই।* এ কারণেই আল্লাহ তার নাবী-রসূলদের সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর চাইতে অধিকতর প্রশংসা পছন্দকারী কেউ নেই। এ কারণে তিনি জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ৩৬২২, ইসলামিক সেন্টার ৩৬২২)
* আল্লাহর চেয়ে ওযর পছন্দকারী কেউ নেই। এখানে ‘ওযর’ ক্ষমা করা ও সতর্ক করা অর্থে এসেছে। শাস্তির জন্য পাকড়াও করার পূর্বে আল্লাহ তা’আলা রসূলদেরকে সতর্ক করার জন্য প্রেরণ করেছেন। (তাহকীক। সহীহ মুসলিম, ফুআদ আবদুল বাকী’, ২য় খণ্ড, ৫৭৪ পৃঃ)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ শু’বা (রহঃ)

উপরের হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, পরপুরুষের সাথে পরিবারের কোন নারী সদস্যকে একসাথে দেখলে, কেউ যদি আত্মমর্যাদা, বংশের সম্মান এবং গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য সেই নারীকে কোন বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সাথে সাথে হত্যা করে, তা নবী মুহাম্মদের কাছে প্রশংসনীয় ছিল। অথচ, সেই পুরুষ যদি এরকম কিছু দেখে থাকে, খুব সহজেই সেই নারীকে তালাক দিতে পারে। কিন্তু সেটি না করে তাকে হত্যা করে ফেলা, এবং নবী নিজে সেই হত্যার ইচ্ছাকে প্রশংসা করা, খুবই মর্মান্তিক ব্যাপার।


কিসাস ও রক্তপণের মারপ্যাঁচ: সন্তানদের ওপর পিতামাতার কর্তৃত্ব

অনার কিলিংয়ে খুনি সাধারণত পরিবারের সদস্য হয়। ইসলামি শরীয়তে কিসাসের (প্রাণের বদলে প্রাণ) বিধানে পিতামাতার জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। শাফিঈ মাযহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘উমদাত আল-সালিক’-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোনো পিতা যদি তার সন্তানকে হত্যা করে, তবে তার ওপর কিসাস বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না [13]। এই বিধানটি খুনিদের জন্য একটি আইনি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। আসুন হাদিসটি পড়ি – [14]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৪/ দিয়াত বা রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ৯. বাবা ছেলেকে খুন করলে তার কিসাস হবে কি না
১৪০০উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ ছেলেকে খুনের অপরাধে বাবাকে হত্যা করা যাবে না।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

বিষয়টি আমরা ইসলামী আইনশাস্ত্র থেকেও দেখে নিই, [15]

বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন. পৃষ্ঠা ২৫৪
(খ) পিতা-মাতা, দাদা-দাদী ও নানা-নানী পর্যায়ক্রমে পুত্রকে বা নাতিকে হত্যা করিলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হইবে না, কিন্তু দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে।
বিশ্লেষণ
কিসাস সম্পর্কিত আয়াতের নির্দেশ সাধারণভাবে যে কোন হত্যাকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই কেহ নিজ পিতা বা মাতা, দাদা বা দাদী এবং নানা বা নানীকে (যত ঊর্ধ্বগামী হউক) হত্যা করিলে হত্যাকারী পুত্র, পৌত্র বা দৌহিত্রের মৃত্যুদণ্ড হইবে।” কিন্তু পিতা বা মাতা পুত্রকে, দাদা বা দাদী পৌত্রকে এবং নানা বা নানী দৌহিত্রকে হত্যা করিলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হইবে না। মহানবী (সা) উপরোক্ত ব্যক্তিগণকে কিসাসের সাধারণ নির্দেশ-বহির্ভূত রাখিয়াছেন।
عَنْ سُرَاقَةَ بْنِ مَالِكَ قَالَ حَضَرْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقِيدُ الْأَبِ مِنْ ابْنِهِ وَلَا يُقِيدُ الْإِبْنَ مِنْ أَبِيهِ .
“সুরাকা ইবন মালিক (রা) বলেন, আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) পিতৃহত্যার অপরাধে পুত্রের উপর কিসাস কার্যকর করিয়াছেন এবং পুত্রহত্যার অপরাধে পিতার উপর কিসাস কার্যকর করেন নাই।””
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَا يُقَادُ الْوَالِدُ بِالْوَلَدِ .
“উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলিতে শুনিয়াছি। পুত্র হত্যার অপরাধে পিতার উপর কিসাস কার্যকর হইবে না।”
عَنِ ابْنِ عَبَّاس عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَلَا يُقْتَلُ الْوَالِدُ بِالْوَلَد
“ইবন ‘আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (সা) বলেন: পুত্রহত্যার অপরাধে পিতার মৃত্যুদণ্ড হইবে না।””
এই ক্ষেত্রে দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক হইবে পুত্র, পৌত্র ও দৌহিত্রগণও (যত নিম্নগামী হউক) পুত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং দাদা-দাদী ও নানা-নানী (যত ঊর্ধ্বগামী হউক) পিতা-মাতার অন্তর্ভুক্ত

সন্তান হত্যার বিধান

আসুন এই বিষয়ে কিছু ফতোয়া পড়ে নেয়া যাক [16]

لا يقتل الوالد بولده
17409
56745
الأربعاء 2 ربيع الآخر 1423 هـ – 12-6-2002 م
556
السؤال
عند الترمذي في باب ما جاء في الرجل يقتل ابنه أيقاد أم لا؟ يذكر متن الحديث: “حضرت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقيد الأب من ابنه ولا يقيد الابن من أبيه”. ويضعف إسناده ثم يقول: “والعمل على هذا عند أهل العلم: أن الأب إذا قتل ابنه لا يقاد”. فهل يعني بقوله: “العمل على هذا” أي مثل نص الحديث فكلامه يقتضي خلافه حينئذ أم يعني العمل على خلاف الحديث؟ حتى ظننت أنه خطأ مطبعي وليس عندي نسخ خطية لاتأكد من ذلك، إلا أن النووي في شرحه عليه لا يشير إلى هذا والله أعلم . بينوا لنا الصواب فيما ترون مأجورين؟.
الإجابــة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فأحاديث لا يقتل الوالد أو لا يقاد الوالد بولده، أحاديث قد حكم أهل العلم بالحديث بإعلالها وبأن طرقها منقطعة، لكن أهل العلم على العمل بما دلت عليه.
يقول الإمام الشافعي: حفظت عن عدد من أهل العلم لقيتهم أن لا يقتل الوالد بالولد، وبذا أقول. انتهى.
ويقول ابن العربي: وعمر قضى بالدية في قاتل ابنه، ولم ينكر أحد من الصحابة عليه، فأخذ سائر الفقهاء المسألة مسجلة، وقالوا: لا يقتل الولد بولده. انتهى.
وفي هذا السياق تفهم قول الإمام الترمذي: وهذا الحديث فيه اضطراب، والعمل على هذا عند أهل العلم أن الأب إذا قتل ابنه لا يقتل به، وإذا قذفه لا يحد. انتهى. فهذا تصريح منه -رحمه الله- بمراده.
وجماهير الفقهاء الذين يرون أن الوالد لا يقتل بولده، يستدلون بهذه الأحاديث وغيرها كحديث: “أنت ومالك لأبيك” ، فإذا لم تثبت حقيقة الملكية بهذه الإضافة بقيت الإضافة شبهة في درء القصاص لأنه يدرأ بالشبهات، ولأن الأب سبب إيجاد الولد فلا ينبغي أن يتسبب بإعدامه. انظر المفصل لعبد الكريم زيدان 5/348.
والله أعلم.
مواد ذات صلة

ফতোয়ার বাংলা অনুবাদঃ

ফতোয়া শিরোনাম: সন্তান হত্যার দায়ে পিতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না
ফতোয়া নম্বর: ১৭৪০৯ / ৫৬৭৪৫
তারিখ: ১২ জুন, ২০০২
প্রশ্ন:
সুনানে তিরমিযীর একটি পরিচ্ছেদে ‘পিতা তার সন্তানকে হত্যা করলে কিসাস (মৃত্যুদণ্ড) হবে কি না’ শিরোনামে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে: “রাসূলুল্লাহ (সা) পিতার বদলে সন্তানকে হত্যা করার (কিসাস) নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু সন্তানের বদলে পিতাকে হত্যা করার নির্দেশ দেননি।” ইমাম তিরমিযী এই হাদিসটির সনদকে দুর্বল (যঈফ) বলেছেন, কিন্তু পরক্ষণেই মন্তব্য করেছেন: “বিদ্বানগণের নিকট এই হাদিসের ওপরই আমল জারি রয়েছে যে, পিতা যদি তার সন্তানকে হত্যা করে তবে তার কিসাস হবে না।” আমার প্রশ্ন হলো, ইমাম তিরমিযী যখন বলছেন ‘আমল এর ওপরই’, তার মানে কি তিনি দুর্বল হাদিসটিকেই আমলযোগ্য বলছেন? নাকি হাদিসের বিপরীত কোনো বিষয়ের কথা বোঝাচ্ছেন? আমার মনে হচ্ছে এটি হয়তো কোনো মুদ্রণজনিত ভুল (Typo), কারণ ইমাম নববী তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে এ নিয়ে কিছু বলেননি। দয়া করে সঠিক বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
১. হাদিসের মান: ‘সন্তান হত্যার দায়ে পিতাকে হত্যা করা যাবে না’—এই মর্মে যে হাদিসগুলো বর্ণিত হয়েছে, হাদিস বিশারদগণের মতে সেগুলোর সনদ ত্রুটিযুক্ত এবং বর্ণনা পরম্পরা বিচ্ছিন্ন (Incomplete chain)।
২. বিদ্বানদের অবস্থান: যদিও হাদিসগুলোর সনদ দুর্বল, তবুও মুসলিম উম্মাহর আলেমগণ এই হাদিসগুলো যে বিধান নির্দেশ করে, তার ওপর ভিত্তি করেই আমল করে থাকেন।
৩. ইমাম শাফিঈর বক্তব্য: ইমাম শাফিঈ বলেছেন: “আমি যেসব বিজ্ঞ আলেমদের সান্নিধ্য পেয়েছি, তাদের অনেকের কাছ থেকেই এটি সংরক্ষিত রয়েছে যে—সন্তান হত্যার দায়ে পিতাকে হত্যা করা যাবে না। আমিও একমত যে এটিই বিধান” [ ইমাম শাফিঈ, কিতাবুল উম্ম ]।
৪. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ইবনুল আরাবী উল্লেখ করেছেন যে, খলিফা উমর (রা) একবার এমন এক ব্যক্তির বিচার করেছিলেন যে তার ছেলেকে হত্যা করেছিল। উমর (রা) তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে কেবল ‘দিয়াত’ বা রক্তপণ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। উপস্থিত সাহাবীদের কেউ উমরের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। ফলে পরবর্তী ফকীহগণ (আইনবিদ) এটিকে একটি সর্বসম্মত মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেন যে—সন্তান হত্যার কারণে পিতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না [ ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ]।
৫. ইমাম তিরমিযীর ব্যাখ্যা: ইমাম তিরমিযী স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, যদিও হাদিসটি বর্ণনায় সমস্যা (اضطراب) আছে, তবুও আলেমদের মধ্যে আমল এটিই যে—পিতা তার সন্তানকে হত্যা করলে তাকে হত্যা করা যাবে না, এমনকি পিতা যদি সন্তানকে অপবাদ (Qadhf) দেয়, তবে শরীয়তের নির্ধারিত দোররা বা হদ (حد) তার ওপর প্রয়োগ করা হবে না [ সুনানে তিরমিযী, হাদিস নম্বর: ১৪০০ এর ব্যাখ্যা ]।
৬. আইনি ও যৌক্তিক কারণ: অধিকাংশ ফকীহ (আইনবিদ) যারা পিতাকে কিসাস থেকে অব্যাহতি দেন, তারা এই হাদিস ছাড়াও আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন: “তুমি এবং তোমার সম্পদ—উভয়ই তোমার পিতার মালিকানাধীন” [ সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯১ ]। এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে দুটি প্রধান যুক্তি দেওয়া হয়:
সন্দেহের সুবিধা (Shubha): যেহেতু সন্তানকে এক অর্থে পিতার ‘মালিকানাভুক্ত’ হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাই এখানে একটি আইনি ‘সন্দেহ’ (Shubha) তৈরি হয়। ইসলামি আইন অনুযায়ী, যেখানেই কোনো আইনি সন্দেহ থাকে, সেখানে কিসাস বা মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হয়ে যায়।
অস্তিত্বের কারণ: পিতা যেহেতু সন্তানের পৃথিবীতে আসার বা অস্তিত্ব লাভের ‘কারণ’ (Cause), তাই সন্তান পিতার ধ্বংস বা মৃত্যুদণ্ডের ‘কারণ’ হতে পারে না [ আবদুল করীম যাইদান, আল-মুফাসসাল, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪৮ ]।
আল্লাহই ভালো জানেন।

এবারে আসুন আরও একটি ফতোয়া পড়ে নিই [17]

ما يترتب على قتل الأب لابنه من أحكام
30793
210530
الخميس 15 صفر 1424 هـ – 17-4-2003 م
837
السؤال
السلام عليكم
ما هو الحكم الشرعي في قاتل ابنه أو أبنائه؟ مع توضيح الدليل إن أمكن.
بارك الله فيكم ووفقكم الله.
الإجابــة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فيحرم على الأب قتل ابنه ولو لقصد التأديب، لقول الله تعالى: وَلا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ [الأنعام:151].
ولقول الله تعالى: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِناً مُتَعَمِّداً فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِداً فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَاباً عَظِيماً [النساء:93].
ولحديث البخاري: لن يزال المؤمن في فسحة من دينه ما لم يصب دما حراماً.
وإذا قتل الأب الابن فإنه تترتب على ذلك أحكام من أهمها:
أنه لا يقتل الأب بابنه؛ لما في الحديث: لا يقتل الوالد بالولد. رواه الترمذي وابن ماجه وصححه الألباني.
وفي رواية: لا يقاد الوالد بالولد. رواه أحمد والترمذي، وصححه ابن الجارود والبيهقي والألباني.
ومنها: أنه تلزمه الدية؛ لما في الموطأ وابن ماجه: أن أبا قتادة رجل من بني مدلج قتل ابنه، فأخذ منه عمر مائة من الإبل. صححه الألباني.
ومنها: أنه لا يرث من مال ابنه القتيل ولا من ديته كما قال عمر وعلي، قال ابن عبد البر في التمهيد: وأجمع العلماء على أن القاتل عمداً لا يرث شيئاً من مال المقتول ولا من ديته، روي عن عمر وعلي ولا مخالف لهما من الصحابة، ويدل له قول النبي صلى الله عليه وسلم: ليس للقاتل من الميراث شيء. رواه الدارقطني والبيهقي وصححه الألباني.
والله أعلم.

এবারে এটিও আসুন বাংলায় পড়ি,

ফতোয়া শিরোনাম: সন্তান হত্যার দায়ে পিতার ওপর প্রযোজ্য শরয়ী বিধানসমূহ
ফতোয়া নম্বর: ৩০৭৯৩ / ২১০৫৩০
তারিখ: ১৭ এপ্রিল, ২০০৩
প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম। নিজের সন্তান বা সন্তানদের হত্যাকারীর বিষয়ে ইসলামি শরীয়তের বিধান কী? সম্ভব হলে দলীলসহ বিষয়টি স্পষ্ট করবেন। আল্লাহ আপনাদের কল্যাণ করুন।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
প্রাথমিক বিধান: শাসন বা শৃঙ্খলার (Discipline) দোহাই দিয়েও কোনো পিতার জন্য তার সন্তানকে হত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “আল্লাহ যার হত্যা হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। তিনি তোমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা বুঝতে পারো।” [ কোরআন, সূরা আন-আম, আয়াত: ১৫১ ]।
অন্যত্র বলা হয়েছে: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হলো জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে। আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হয়েছেন, তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য বিশাল শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।” [ কোরআন, সূরা নিসা, আয়াত: ৯৩ ]।
সহীহ বুখারীর একটি হাদিসে বলা হয়েছে: “একজন মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশস্ততার মধ্যে থাকে (অর্থাৎ ক্ষমার আশা থাকে), যতক্ষণ না সে কোনো হারাম রক্তপাত ঘটায়।” আইনি ফলাফল (পিতা যদি তার সন্তানকে হত্যা করে ফেলে): যদি কোনো পিতা তার সন্তানকে হত্যা করে, তবে ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী মূলত তিনটি প্রধান বিধান কার্যকর হয়:
১. কিসাস বা মৃত্যুদণ্ড মওকুফ: পিতাকে তার সন্তান হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড (কিসাস) দেওয়া যাবে না। এর সপক্ষে তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে: “সন্তানের অপরাধে পিতাকে হত্যা করা যাবে না।” ইমাম আলবানী এই হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ ও তিরমিযীর অপর বর্ণনায় এসেছে: “সন্তানের কারণে পিতার ওপর কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ) কার্যকর হবে না।”
২. রক্তপণ বা দিয়াত (Blood Money): যদিও মৃত্যুদণ্ড হবে না, তবে সেই পিতাকে অবশ্যই ‘দিয়াত’ বা রক্তপণ পরিশোধ করতে হবে। ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’ ও ‘ইবনে মাজাহ’-তে বর্ণিত হয়েছে যে—বনু মুদলিজ গোত্রের আবু কাতাদা নামক এক ব্যক্তি তার ছেলেকে হত্যা করেছিল। খলিফা উমর (রা) সেই ব্যক্তির কাছ থেকে রক্তপণ হিসেবে ১০০টি উট আদায় করেছিলেন [ সহীহ আলবানী ]।
৩. উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া: হত্যাকারী পিতা তার নিহত সন্তানের রেখে যাওয়া কোনো সম্পদ কিংবা সেই সন্তানের জন্য সংগৃহীত রক্তপণের (দিয়াত) কোনো অংশ উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে না। ইমাম ইবনে আব্দুল বার বলেছেন: “ওলামাগণ এ বিষয়ে একমত (ইজমা) যে—ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী ব্যক্তি নিহত ব্যক্তির সম্পদ বা দিয়াতের কিছুই পাবে না।” খলিফা উমর এবং আলী (রা) থেকেও এই ফয়সালা বর্ণিত হয়েছে এবং কোনো সাহাবী এর বিরোধিতা করেননি। নবী (সা) বলেছেন: “হত্যাকারীর জন্য মিরাসের (উত্তরাধিকার) কোনো অংশ নেই।” [ সুনানে দারাকুতনী ও বায়হাকী ]।
আল্লাহই ভালো জানেন।


পিতার অসম্মতিতে বিবাহঃ নারীর নিজ-পছন্দে বিবাহ হচ্ছে যিনা

ইসলামি বিধান অনুসারে কোন নারী যদি ওয়ালি বা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করে, তার বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হবে না, এবং সেই স্বামীর সাথে সহবাসকে ইসলাম যিনা বলে গণ্য করবে। আর যিনার শাস্তি কী তা নিশ্চয়ই আপনারা অবগত আছেন। এই বিষয়ে এই সহিহ হাদিসটি পড়ে নেয়া জরুরি। হাদিসটি পাবেন [18] [19] [20]

গ্রন্থঃ সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ৯/ বিবাহ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৯/১৫. অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না।
৪/১৮৮২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকে বিবাহ দিবে না এবং কোন মহিলা নিজেকেও বিবাহ দিবে না। কেননা যে নারী স্বউদ্যোগে বিবাহ করে সে যেনাকারিণী।
It was narrated from Abu Hurairah that: the Messenger of Allah said: “No woman should arrange the marriage of another woman, and no woman should arrange her own marriage. The adulteress is the one who arranges her own marriage.”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনানে ইবনে মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/১৫. অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না।
১/১৮৭৯। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক।
তিরমিযী ১১০২, আবূ দাউদ ২০৮৩, আহমাদ ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী ২১৮৪, ইরওয়াহ ১৮৪০, মিশকাত ১৩৩১, সহীহ আবী দাউদ ১৮১৭।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ। উক্ত হাদিসের রাবী সুলায়মান বিন মুসা সম্পর্কে আবু আহমাদ বিন আদী আল-জুরজানী বলেন, তিনি আমার নিকট সত্যবাদী। আবু হাতিম বিন হিব্বান বলেন, তিনি একজন ফকিহ। আহমাদ বিন শু’আয়ব আন-নাসায়ী বলেন, তিনি ফকিহদের একজন তবে হাদিস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য নয়। আল-মিযযী বলেন, তিনি তার যুগে শামের একজন ফকিহ ছিলেন। আতা বিন আবু রাবাহ বলেন, তিনি শামের যুবকদের নেতা ছিলেন। মুহাম্মাদ বিন সা’দ বলেন, তিনি সিকাহ। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ২৫৭১, ১২/৯২ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না
নিজে বিয়ে করা মেয়ে যিনাকারী

অপরাধের নৈতিকীকরণ এবং অনুশোচনাহীন মনস্তত্ত্ব

অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) ভাষায় সবচাইতে বিপজ্জনক অপরাধী সে-ই নয় যে আইন ভাঙে, বরং সে—যে বিশ্বাস করে সে আইন ভেঙে কোনো ‘মহৎ’ বা ‘পবিত্র’ কাজ করছে। অনার কিলিং বা সম্মান রক্ষার্থে হত্যার ক্ষেত্রে এই মনস্তত্ত্বটিই সবচাইতে প্রবল। সাধারণ হত্যাকাণ্ডে অপরাধী সাধারণত আইনের ভয় বা নৈতিক দংশনে ভোগে, কিন্তু যখন কোনো হত্যাকাণ্ডকে ধর্মের বয়ান কিংবা বংশীয় গৌরবের আবরণে ‘নৈতিকীকরণ’ (Moralization of Crime) করা হয়, তখন অপরাধীর ভেতর থেকে অনুশোচনার সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর মূলে কাজ করে সমাজ ও ধর্মের দেওয়া এক প্রকার ‘ছদ্ম-বীরত্ব’। যখন কোনো বাবা তার সন্তানকে কিংবা কোনো ভাই তার বোনকে হত্যা করে, সে নিজেকে খুনি হিসেবে নয়, বরং বংশের কলঙ্ক মোচনকারী একজন ‘ত্রাতা’ হিসেবে কল্পনা করে। যেহেতু তার এই চরমপন্থাকে নবী মুহাম্মদের ‘গয়রাত’ বা আত্মমর্যাদাবোধের প্রশংসার সাথে তুলনা করা হয় [21], সেহেতু সে মনে করে তার এই রক্তক্ষয়ী কাজটি সরাসরি ঈশ্বরের কাছে প্রশংসনীয়।

এই ধরণের অপরাধের ভয়াবহতা এখানেই যে, এখানে খুনিকে তার ভুল বোঝানো প্রায় অসম্ভব। কারণ, সে কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নয়, বরং একটি ‘বৃহত্তর আদর্শ’ রক্ষার্থে এই কাজ করেছে বলে বিশ্বাস করে। কোনো অপরাধ যখন ‘পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে গণ্য হয়, তখন খুনি কেবল অনুশোচনাহীনই থাকে না, বরং সে নিজের পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে এক প্রকার মৌন বা প্রকাশ্য স্বীকৃতি লাভ করে। এই সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাকরণই খুনিকে মানসিক শান্তি দেয় যে, সে তার পূর্বপুরুষদের ‘সম্মান’ রক্ষা করতে পেরেছে। ফলে বিচারব্যবস্থা তাকে শাস্তি দিলেও, তার মনস্তাত্ত্বিক জগতে সে সর্বদা একজন ‘ন্যায়নিষ্ঠ’ ব্যক্তি হিসেবেই থেকে যায়, যা এই ধরণের নৃশংস অপরাধকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়।


উপসংহার

উপরোক্ত আলোচনা এবং ইসলামি শরীয়তের প্রাথমিক উৎস—কোরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্য দলিলসমূহ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ‘অনার কিলিং’ বা সম্মান রক্ষার্থে হত্যার বিষয়টি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন কুসংস্কার নয়। বরং এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে ধ্রুপদী ইসলামি আইনতত্ত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর গভীরে। একদিকে যেমন কোরআন ও হাদিসে ‘ভবিষ্যৎ ফিতনা’ বা ‘কুফরি’ থেকে বাঁচতে আগাম নিষ্পাপ শিশুকে হত্যার (Preventive Killing) উদাহরণ খিজিরের গল্পের মাধ্যমে মহিমান্বিত করা হয়েছে [22], অন্যদিকে নবী মুহাম্মদ নিজে সাহাবী সা’দ ইবন উবাদাহ-র চরমপন্থী আত্মমর্যাদাবোধ বা ‘গয়রাত’-কে সরাসরি ‘প্রশংসনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন [21]

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ইসলামি কিসাস ও দিয়াত (রক্তপণ) আইনগুলো খুনিকে এক ধরণের ‘ইনস্টিটিউশনাল প্রোটেকশন’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা প্রদান করে। যখন স্বয়ং নবি মুহাম্মদ বলেন যে, সন্তান হত্যার দায়ে পিতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না [23], তখন তা সমাজ ও বিচারব্যবস্থায় এক ভয়ংকর বার্তা দেয়। এই আইনি শিথিলতা এবং অভিভাবকের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের ধারণাটিই মূলত পারিবারিক সম্মানহানির অজুহাতে নারী হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করে।

আজও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মাদরাসা ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই দলিলগুলোই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পঠিত ও পড়ানো হয়। যখন কোনো অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি সরাসরি ঐশ্বরিক বা পবিত্র বয়ানের মাধ্যমে নির্মিত হয়, তখন খুনিরা কোনো অপরাধবোধে ভোগে না; বরং তারা নিজেদের বংশের ‘পবিত্রতা রক্ষাকারী’ হিসেবে গণ্য করে।

পরিশেষে, আমাদের সামনে এখন বড় প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে—একটি বিমূর্ত ‘সম্মান’ রক্ষার নামে একজন রক্ত-মাংসের মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া কি আদৌ ন্যায়বিচার? ইসলামি দলিলাদি এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে যে নৈতিক ও আইনি বৈধতা দান করে, তা কি আধুনিক মানবাধিকার এবং যুক্তিবাদী সমাজব্যবস্থার সাথে কোনোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তথ্য এবং দলিলগুলো আপনার সামনে উপস্থাপিত হলো। এখন যুক্তি, বিবেক এবং মানবিকতা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আপনার। ইসলামে অনার কিলিং আদৌ কি কেবলই একটি ভুল ধারণা, নাকি এটি সুসংগঠিত ধর্মীয় আইনি কাঠামোরই এক অনিবার্য পরিণতি?


তথ্যসূত্রঃ
  1. “Robert Fisk: The crimewave that shames the world”, The Independent, ২০১০-০৯-০৭ ↩︎
  2. মাজমু আল-ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়াহ, খণ্ড ৩৪, পৃষ্ঠা ১৭৭ ↩︎
  3. Rethinking the term ‘honor killing’ ↩︎
  4. Qandeel Baloch: The woman who was killed for her selfies ↩︎
  5. Iran’s police confirmed the fourth case of honor killing in less than a month ↩︎
  6. Shafilea Ahmed: The girl who died for a ‘Western’ lifestyle ↩︎
  7. কোরআন, সূরা কাহফ, আয়াত ৭৪ ↩︎
  8. কোরআন, সূরা কাহফ, আয়াত ৮০ ↩︎
  9. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৬৬৫৯ ↩︎
  10. আল-মুদাওয়ানা, ইমাম মালেক, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪০৫ ↩︎
  11. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৬৫৫ ↩︎
  12. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৬৫৬ ↩︎
  13. উমদাত আল-সালিক, আইন নম্বর: o1.2.4 ↩︎
  14. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৪০০ ↩︎
  15. বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৪, ২৫৫ ↩︎
  16. لا يقتل الوالد بولده ↩︎
  17. ما يترتب على قتل الأب لابنه من أحكام ↩︎
  18. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ১৮৮২ ↩︎
  19. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ১৮৭৯ ↩︎
  20. সুনান ইবনে মা’জাহ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে ↩︎
  21. সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৬৫৬ 1 2
  22. কোরআন, ১৮:৮০ ↩︎
  23. তিরমিযী, হাদিস: ১৪০০ ↩︎

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

2 thoughts on

Leave a comment

Your email will not be published.