আর্মেনীয় গণহত্যা (Armenian Genocide): ইতিহাস, সহিংসতা ও উত্তরাধিকার
ভূমিকা
বিংশ শতাব্দীর মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ও সুদূরপ্রসারী অধ্যায় হলো অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক বিনাশ। এটি কেবল কোনো যুদ্ধকালীন বিচ্ছিন্ন সংঘাত ছিল না, বরং আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত জনসংখ্যাগত রূপান্তর (demographic engineering) এবং জাতিগত নিধনযজ্ঞ (systematic annihilation)-এর একটি সুসংগঠিত দৃষ্টান্ত। উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিশ শতকের সূচনালগ্নে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাঙনের মুখে উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের যে উত্থান ঘটেছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯১৫ সালের এই মর্মান্তিক ঘটনা। ধর্মীয় পরিচয়কে যখন আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের ওপর চূড়ান্ত হুমকি তৈরি করে, আর্মেনীয় সংকট তার এক বাস্তব ঐতিহাসিক প্রমাণ। অটোমান প্রশাসনিক কাঠামোয় প্রচলিত মিল্লাত ব্যবস্থা (millet system) কোনো ধর্মনিরপেক্ষ সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা ছিল না; বরং তা ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক স্তরভিত্তিক ক্ষমতার কাঠামো, যেখানে অমুসলিম জনগোষ্ঠী কাঠামোগতভাবে অধস্তন অবস্থানে বাধ্য ছিল। সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ব্যর্থতা, বহিঃশক্তির ভূরাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং বলকান অঞ্চলের ভূখণ্ড হারানোর পর উদ্ভূত আতঙ্ক শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এক চরমপন্থী মনোভাব তৈরি করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বৈশ্বিক সংঘাতকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস (Committee of Union and Progress – CUP) আনাতোলিয়াকে একটি একক নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বলয়ে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধকালীন নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত তুলে সমগ্র আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্বের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তার ভিত্তিতে চালু করা হয় নির্বাসন ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ আইন (Tehcir Law)। আধুনিক আমলাতন্ত্র, টেলিগ্রাফ যোগাযোগ এবং রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মতো কাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে এই ধ্বংসযজ্ঞ সম্পন্ন করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত দাঙ্গা ছিল না বরং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত এক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস (state-sponsored terror)। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছিল রাষ্ট্রের নিজস্ব প্যারা-মিলিটারি বাহিনী বা স্পেশাল অর্গানাইজেশন (Special Organization – Teşkilât-ı Mahsusa), যা সরাসরি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশনায় হত্যা ও নিধনযজ্ঞ কার্যকর করত। শুধু শারীরিক নিধনই নয়, বরং বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, শিশুদের জোরপূর্বক আত্তীকরণ এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শনসমূহের নিশ্চিহ্নকরণের মাধ্যমে একটি প্রাচীন সমাজকে তার মূল থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনবিদ রাফায়েল লেমকিন (Raphael Lemkin) আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর এই করুণ অভিজ্ঞতা এবং হলোকস্টের নথিপত্র বিশ্লেষণ করেই আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা (genocide) শব্দটির তাত্ত্বিক ও আইনি ভিত্তি রচনা করেন। ফলে, আর্মেনীয় গণহত্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংকট নয়, বরং আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বিকাশ, ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ এবং আদর্শিক চরমপন্থার ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা অনুধাবনের এক অপরিহার্য দলিল।
অটোমান সাম্রাজ্য ও আর্মেনীয় প্রশ্ন (Ottoman Empire and the Armenian Question): সহাবস্থান, জাতীয়তাবাদ ও সংকট
আর্মেনীয় গণহত্যার পরিচয় (Introduction to the Armenian Genocide): ধারণা, পরিধি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
গণহত্যার ধারণাগত ভিত্তি ও লেমকিনের তাত্ত্বিক কাঠামো (Conceptual Foundations of Genocide and Lemkin’s Theoretical Framework)
মানুষের সমষ্টিগত বিনাশের ইতিহাস নতুন কিছু নয়, তবে সেই ধ্বংসযজ্ঞকে আইনের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করার কাজটি বিংশ শতাব্দীর আগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। পোলিশ-ইহুদি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক আইনবিদ রাফায়েল লেমকিন (Raphael Lemkin) প্রথম এই শূন্যতা লক্ষ্য করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর পরিকল্পিত উচ্ছেদ ও হত্যাকাণ্ড তার কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন, কোনো এক ব্যক্তি যদি অন্য একজন ব্যক্তিকে হত্যা করে, তবে রাষ্ট্র তাকে খুনি হিসেবে বিচার করে; অথচ একটি রাষ্ট্র যদি নিজেই নিজের সীমানার ভেতরের লাখ লাখ নাগরিককে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তবে আন্তর্জাতিক আইনে সেই রাষ্ট্রনেতাদের শাস্তি দেওয়ার স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। এই আইনি সীমাবদ্ধতা তাকে নতুন একটি ধারণার অনুসন্ধানে তাড়িত করে (Lemkin, 1944)। তিনি গ্রিক শব্দ ‘জেনোস’ (যার অর্থ জাতি বা গোষ্ঠী) এবং লাতিন শব্দ ‘সাইড’ (যার অর্থ হত্যা) যুক্ত করে তৈরি করেন গণহত্যা (genocide) পরিভাষাটি।
১৯৪৪ সালে প্রকাশিত তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ অ্যাক্সিস রুল ইন অকুপায়েড ইউরোপ (Axis Rule in Occupied Europe)-এ তিনি এই ধারণার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তুলে ধরেন। লেমকিনের মতে, গণহত্যা মানেই কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর তাৎক্ষণিক বা প্রত্যক্ষ শারীরিক বিনাশ নয়। বরং এটা হলো বিভিন্ন সুসংগঠিত পদক্ষেপের একটি পরিকল্পিত নীলনকশা, যার উদ্দেশ্য কোনো জাতীয়, জাতিগত, ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর জীবনের অপরিহার্য ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া (Moses, 2010)। এর ভেতরে যেমন রয়েছে ভাষা ও সংস্কৃতির বিনাশ, তেমনই রয়েছে অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া এবং পরিশেষে তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি উপড়ে ফেলা। লেমকিন স্পষ্ট ভাষায় দেখান যে, আর্মেনীয়দের ওপর অটোমান প্রশাসনের পরিচালিত অভিযান ছিল এই আধুনিক অপরাধের অন্যতম বড় একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি। ১৯১৫ সালের সেই রক্তাক্ত ঘটনাগুলোই তাকে পরবর্তীকালে জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন (Genocide Convention) প্রণয়নে নেতৃত্ব দিতে প্রেরণা যুগিয়েছিল (Weiss-Wendt, 2008)।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, জাতিসংঘের সংজ্ঞায় কোনো গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য (specific intent) বা ডলুস স্পেশালিস (dolus specialis) থাকাটা গণহত্যার অপরিহার্য শর্ত (Schabas, 2009)। অটোমান সাম্রাজ্যের তৎকালীন নথিপত্র এবং প্রশাসনিক নির্দেশাবলি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, সরকার আর্মেনীয়দের কেবল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাতে চায়নি, বরং আনাতোলিয়ার মাটি থেকে তাদের ভৌগোলিক ও জাতিগত চিহ্ন স্থায়ীভাবে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। ফলে এটা কোনো আকস্মিক দাঙ্গার ফল ছিল না, ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে রবার্ট মেলসন (Robert Melson) বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর বিকাশ এবং জাতিগত বিশুদ্ধতার ধারণার সঙ্গে গণহত্যার এই আইনি রূপরেখা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত (Melson, 1992)। লেমকিন যে আইনি ভিত তৈরি করেছিলেন, তা শুধু একটি অপরাধের নাম দেয়নি, বরং আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে, সেই পথটি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উন্মোচিত করেছিল।
আনাতোলিয়ার ভূরাজনীতি ও ওসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্যের সংকট (Geopolitics of Anatolia and the Crisis of the Ottoman Empire)
উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে অটোমান সাম্রাজ্য এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। ইউরোপীয় কূটনীতিতে এই পরিস্থিতিকে বলা হতো প্রাচ্য প্রশ্ন (Eastern Question)। বলকান অঞ্চলে একের পর এক ভূখণ্ড হারানোর ফলে সাম্রাজ্যের আয়তন যেমন কমছিল, তেমনই ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর নজর গিয়ে পড়েছিল আনাতোলিয়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের ওপর (Anderson, 1966)। সাম্রাজ্য যখন সংকুচিত হয়ে আসছিল, তখন শাসকগোষ্ঠীর কাছে আনাতোলিয়াই হয়ে ওঠে তুর্কি জাতির শেষ আশ্রয়স্থল। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কেন্দ্রস্থলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছিল আর্মেনীয়রা। তারা ছিল ওই মাটির প্রাচীনতম অধিবাসী। কিন্তু সাম্রাজ্যের পতনের মুখে বহুত্ববাদী ধারণার অবক্ষয় ঘটে এবং সেখানে জায়গা করে নেয় এক উগ্র জাতিগত সুরক্ষাবাদ।
১৮৭৭-১৮৭৮ সালের রুশ-তুর্কি যুদ্ধের পর স্বাক্ষরিত সান স্তেফানো চুক্তি (Treaty of San Stefano) এবং পরবর্তী বার্লিন চুক্তি (Treaty of Berlin)-এর মাধ্যমে আর্মেনীয়দের সুরক্ষার বিষয়টি প্রথম আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে প্রবেশ করে (Dadrian, 1995)। এই চুক্তিগুলোতে আর্মেনীয় অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ এই আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করেন। সংস্কার বাস্তবায়নের বদলে তিনি রাষ্ট্রযন্ত্র ও স্থানীয় উপজাতীয় শক্তিকে ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের নীতি গ্রহণ করেন। এর ফলে ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে ঘটে যায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, যা ইতিহাসে হামিদীয় হত্যাকাণ্ড (Hamidian massacres) নামে পরিচিত (Suny, 2015)। এই সংকটকালে আনাতোলিয়ার ভূরাজনীতি আর কেবল অভ্যন্তরীণ শাসনের অংশ থাকেনি, তা আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের জটিল জালে জড়িয়ে পড়ে।
বিশ শতকের শুরুতে ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসে তরুণ তুর্কিদের সংগঠন কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস (Committee of Union and Progress) বা সিইউপি। তারা শুরুতে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সমতার কথা বললেও, ১৯১২-১৯১৩ সালের বলকান যুদ্ধ (Balkan Wars) তাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনে (Üngör, 2011)। বলকান অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো সহিংসতা এবং বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আনাতোলিয়ায় আগমন তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেয়। রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা এই রূপান্তরকে বহুজাতিভিত্তিক সাম্রাজ্য থেকে একক জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রে উত্তরণের এক রক্তাক্ত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন (Bloxham, 2005)। আনাতোলিয়াকে আর বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের ভূমি হিসেবে দেখা হচ্ছিল না, বরং একে দেখা হচ্ছিল তুর্কি জাতির একচেটিয়া দুর্গ হিসেবে। ঠিক সেই সময়ে সেখানে বসবাসকারী অমুসলিম ও বিশেষ করে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীকে দেখা হতে থাকে সম্ভাব্য পঞ্চম বাহিনী হিসেবে, যারা যে কোনো সময় বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে পারে। এই ভিত্তিহীন ভীতি ও ভৌগোলিক সুরক্ষার উন্মাদনা পরবর্তীতে বড় ধরনের নিধনের পটভূমি তৈরি করে।
মিল্লাত ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য (The Millet System and Institutionalized Discrimination)
অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনকাঠামোর ভিত্তি ছিল মিল্লাত ব্যবস্থা (millet system)। আধুনিক গবেষকদের একাংশ অনেক সময় এই ব্যবস্থাকে ধর্মীয় সহনশীলতার চমৎকার উদাহরণ হিসেবে প্রচার করতে চান, কিন্তু নির্মোহ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে (Barkey, 2008)। এই ব্যবস্থার অধীনে সাম্রাজ্যের প্রজাদের নাগরিক হিসেবে নয়, বরং তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্বশাসিত গোষ্ঠীতে ভাগ করা হতো। মুসলমানরা ছিল শাসক বা প্রথম শ্রেণির প্রজা, আর আর্মেনীয়, গ্রিক ও ইহুদিদের মতো অমুসলিমরা পরিচিত ছিল জিম্মি (dhimmi) হিসেবে। তাদের নিজস্ব পারিবারিক আইন ও উপাসনালয় পরিচালনার স্বাধীনতা দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর তাদের কোনো অধিকার ছিল না। আদালত থেকে শুরু করে করকাঠামো – সব জায়গাতেই এই অসম অবস্থান ছিল স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
আইনি ক্ষেত্রে অমুসলিমদের অবস্থান ছিল মুসলমানদের চেয়ে নিচে। ইসলামী শরিয়াহ আদালতে একজন মুসলিমের সাক্ষ্যের বিপরীতে অমুসলিমদের সাক্ষ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতো না (Braude & Lewis, 1982)। এছাড়া অমুসলিমদের ওপর জিজিয়া কর (jizya) ও বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ চাপিয়ে দেওয়া হতো। তাদের জন্য অস্ত্র বহন করা নিষিদ্ধ ছিল এবং তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব ছিল পুরোপুরি রাষ্ট্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য সামাজিক ক্ষেত্রে এক স্থায়ী বিভাজনরেখা তৈরি করেছিল। সমাজবিজ্ঞানী ফাতিমা মুগে গোচেক (Fatma Müge Göçek) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মিল্লাত ব্যবস্থা আদতে কোনো সমতাভিত্তিক নাগরিক সমাজ তৈরি করেনি, বরং তা একটি আধিপত্যকামী স্তরবিন্যাসকে আইনি ও সামাজিক বৈধতা দিয়েছিল (Göçek, 2015)। যখন রাষ্ট্র কোনো সংকট বা যুদ্ধের মুখোমুখি হতো, তখন এই অধীনস্থ জনগোষ্ঠীকে সহজেই সন্দেহ ও বলির পাঁঠা বানানো সম্ভব হতো।
উনিশ শতকে এসে যখন তানজিমাত সংস্কার (Tanzimat reforms) এবং ১৮৫৬ সালের হাতি হুমায়ুন (Hatt-ı Hümayun) সনদের মাধ্যমে সকল প্রজার সমান অধিকারের ঘোষণা দেওয়া হলো, তখন তা অটোমান সমাজের রক্ষণশীল অংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে (Davison, 1963)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে আধিপত্য তারা ভোগ করে এসেছে, তা হঠাৎ আইনগতভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া তারা মেনে নিতে পারেনি। অন্যদিকে, আর্মেনীয়রা যখন এই প্রতিশ্রুত সমতা ও সম্পত্তির অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করতে শুরু করল, তখন তাদের এই ন্যায্য নাগরিক দাবিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে চিত্রিত করা হলো। মিল্লাত ব্যবস্থার মাধ্যমে যে মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা নাগরিক সমতার ধারণাকে সফল হতে দেয়নি। ফলে আধুনিক আইনের আবরণ তৈরি হলেও রাষ্ট্রের ভেতরের পুরনো বৈষম্যমূলক কাঠামোটি অটুট রয়ে যায়, যা পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালিত দমননীতির পথকে সুগম করে।
সহিংসতার ভৌগোলিক বিস্তার ও শিকারের পরিধি (Geographical Scope of Violence and the Scale of Victims)
১৯১৫ সালের বসন্তে শুরু হওয়া ধ্বংসযজ্ঞের ভৌগোলিক পরিধি ছিল বিশাল। আনাতোলিয়ার পূর্ব প্রান্তের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক শহরগুলো পর্যন্ত এই অভিযানের শিকার হয়েছিল। এই নিধনের ভৌগোলিক বিন্যাসকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার মূলত ছয়টি পূর্ব প্রদেশ বা ভিলিয়াতে সিত্তা (Six Vilayets) (যেখানে আর্মেনীয়দের ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি) সেখান থেকেই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করে (Kévorkian, 2011)। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে এই অভিযান পশ্চিম আনাতোলিয়া, সিলিসিয়া এবং ইউরোপীয় অংশের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জোর করে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো সিরিয়ার মরুভূমির দিকে। এই পথচলা কোনো সাধারণ স্থানান্তর ছিল না; এগুলো ছিল মূলত উদ্দেশ্যমূলক মৃত্যুমিছিল (death marches)।
মরুভূমির তীব্র রোদ, অনাহার ও তৃষ্ণায় ক্লান্ত মানুষদের ওপর দিয়ে বয়ে যেত অন্তহীন দুর্ভোগ। তাদের কোনো খাবার বা পানীয় জল সরবরাহ করা হতো না। পথে পাহাড়ি উপজাতি এবং অপরাধী চক্রের আক্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা, যা মূলত রাষ্ট্রের সহায়তায়ই ঘটত (Akçam, 2012)। নির্বাসনের প্রধান গন্তব্য ছিল দের জোর (Deir ez-Zor) এবং রাস আল-আইনের মতো মরু এলাকা। এগুলো কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্র ছিল না, বরং ছিল মুক্ত আকাশের নিচে গড়ে ওঠা একেকটি মৃত্যুশিবির (concentration camps)। সেখানে পৌঁছানোর আগেই অর্ধেকের বেশি মানুষ মারা যেত, আর যারা পৌঁছাত, তাদেরও পরবর্তী ধাপে অনাহারে বা সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হতো। শুধু আর্মেনীয় নয়, এই ভৌগোলিক বলয়ের ভেতরে থাকা আশেরীয় (Assyrian) এবং পন্টিক গ্রিক জনগোষ্ঠীও একই ধরনের জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছিল, যা প্রমাণ করে এই সহিংসতার শিকারের পরিধি ছিল বহুমাত্রিক (Morris & Ze’evi, 2019)।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও, আন্তর্জাতিক একাডেমিক মহলে একটি সাধারণ ঐকমত্য রয়েছে। উচ্ছেদ ও সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে আনুমানিক ৮ লাখ থেকে ১৫ লাখ আর্মেনীয় তাদের জীবন হারিয়েছিল (Hovannisian, 1986)। যুদ্ধের আগের অটোমান আদমশুমারি এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক, যেমন জার্মান ও মার্কিন কূটনীতিকদের নথিপত্র পর্যালোচনা করে এই সংখ্যার সত্যতা পাওয়া যায়। ধ্বংসের মাত্রা কেবল প্রাণহানির সংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আনাতোলিয়ার হাজার বছরের পুরনো গির্জা, পাঠশালা, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং শতাব্দী প্রাচীন পাড়া-মহল্লাগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল বিশেষ আইন, যার মাধ্যমে তাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হাতে তুলে দেওয়া হয় (Üngör & Polatel, 2011)। এর মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীর শারীরিক মৃত্যুর পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্তিত্বের শেকড় উপড়ে ফেলা হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও বিশেষ সংগঠনের ভূমিকা (State Bureaucracy and the Role of the Special Organization)
আর্মেনীয় নিধন কোনো অরাজক জনতার উগ্র বিশৃঙ্খলার ফল ছিল না, বরং এটা পরিচালিত হয়েছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন তিন পাশার শাসন – বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা (Talaat Pasha), যুদ্ধমন্ত্রী এনভার পাশা (Enver Pasha) এবং নৌমন্ত্রী জামাল পাশা (Djemal Pasha)। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রদেশগুলোর গভর্নর ও জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো অসংখ্য গোপন টেলিগ্রাফের মাধ্যমে এই অভিযান তদারকি করা হতো (Akçam, 2018)। সরকারি নির্দেশনায় সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো কোনো সৎ জেলা প্রশাসক যখন নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করতে বা দেশান্তরি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে পদচ্যুত বা হত্যা করা হয়েছিল। এটি স্পষ্ট করে যে, এই নিধন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক সম্মতি ও নির্দেশ ছিল সুস্পষ্ট।
এই কর্মকাণ্ড মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয়েছিল, যার নাম ছিল তেশকিলাত-ই মাহসুসা (Teşkilât-ı Mahsusa) বা বিশেষ সংগঠন (Dadrian, 1995)। এই সংগঠনের সদস্যদের বড় একটি অংশকে সংগ্রহ করা হয়েছিল কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া দাগি অপরাধী ও দস্যুদের মধ্য থেকে। তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল বেসামরিক কাফেলার ওপর হামলা চালানো, হত্যা করা এবং সম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য। সরকারিভাবে নির্বাসনের আদেশ জারি করে নাগরিকদের বলা হতো সামরিক সুরক্ষায় নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিন্তু কাফেলাগুলো শহর ছাড়ার পরপরই এই বিশেষ সংগঠনের হাতে তুলে দেওয়া হতো (Kaiser, 2010)। নিয়মিত সেনাবাহিনী যেখানে সম্মুখ সমরে ব্যস্ত ছিল, এই প্যারা-মিলিটারি বাহিনী তখন দেশের ভেতরেই নিজ নাগরিকদের বিনাশে নিয়োজিত ছিল।
আমলাতান্ত্রিক দক্ষতার আরেকটি দিক ছিল যোগাযোগ ও পরিবহন প্রযুক্তির ব্যবহার। আনাতোলিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলের মধ্যে দ্রুত নির্দেশ আদান-প্রদানের জন্য টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতো অত্যন্ত গোপনীয় কোড বা সাংকেতিক ভাষায় (Akçam, 2006)। এছাড়া বাগদাদ রেলপথ (Baghdad Railway) ব্যবহার করে বহু মানুষকে গবাদি পশুর মতো ওয়াগনে ভরে মরুভূমির দিকে পাঠানো হয়েছিল। ইতিহাসবিদ হিলমার কাইজার (Hilmar Kaiser) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, রেলওয়ের জার্মান প্রকৌশলীদের অনেকেই এই মর্মান্তিক পরিবহন প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তাদের নথিতে এই আমলাতান্ত্রিক বর্বরতার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে (Kaiser, 2010)। রাষ্ট্রের লজিস্টিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে এভাবে মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের ঘটনা আধুনিক কালের প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার এক প্রাথমিক নিদর্শন হয়ে আছে।
ইতিহাসতাত্ত্বিক বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির রাজনীতি (Historiographical Debates and the Politics of International Recognition)
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও আর্মেনীয় গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইতিহাসের অঙ্গনে বিতর্ক থেমে থাকেনি। আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের অফিশিয়াল অবস্থান দীর্ঘকাল ধরেই এই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। তাদের রাষ্ট্রীয় বয়ানে দাবি করা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এটি ছিল একটি দুঃখজনক যুদ্ধকালীন দুর্ঘটনা, যেখানে উভয় পক্ষের মানুষই মারা গিয়েছিল, এবং আর্মেনীয়দের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল মূলত রুশ বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার কারণে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে (Erickson, 2001)। তবে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ ও গবেষক সমাজ এই দাবিকে পদ্ধতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, কোনো জনগোষ্ঠীর একাংশের রাজনৈতিক বিদ্রোহকে অজুহাত বানিয়ে সমগ্র জনগোষ্ঠীর নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিশ্চিহ্ন করা কোনো যুদ্ধকালীন সাধারণ ঘটনা হতে পারে না (Suny et al., 2011)।
ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে বিপুল অগ্রগতি হয়েছে। তুর্কি বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ তানার আকচাম (Taner Akçam) অটোমান সামরিক আদালত ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, নির্বাসনের আদেশের পেছনে গণহত্যার স্পষ্ট উদ্দেশ্য লিখিত ছিল (Akçam, 2012)। তার বই আ শেমফুল অ্যাক্ট (A Shameful Act) এবং পরবর্তী গবেষণাসমূহ আন্তর্জাতিক একাডেমিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ সমিতি (IAGS) বহু আগেই একে সর্বসম্মতভাবে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম স্পষ্ট গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের সংসদ – যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়া – আইনগতভাবে এই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে (Adalian, 2010)।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বীকৃতির এই বিষয়টি কেবল ইতিহাসের সত্য উদ্ঘাটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ভূরাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। ন্যাটো জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তুরস্কের কৌশলগত অবস্থানের কারণে বহু রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে নীরবতা পালন করেছে। তবে সময়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশ এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে বিশ্বজনমতের পরিবর্তনের ফলে স্মৃতির রাজনীতি এখন এক শক্তিশালী রূপ ধারণ করেছে (Bloxham, 2005)। আর্মেনীয়দের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ডায়াস্পোরা গোষ্ঠীগুলো তাদের পূর্বপুরুষের এই ট্র্যাজেডির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সক্রিয় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো ঐতিহাসিক অপরাধের রাষ্ট্রীয় অস্বীকৃতি কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত তৈরি করে, আর্মেনীয় গণহত্যার পরবর্তী রাজনীতি তারই এক স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয় সমাজ (Armenians in the Ottoman Empire): জনবসতি, মিল্লাত ব্যবস্থা ও সামাজিক অবস্থান
ঐতিহাসিক জনবসতি ও ভৌগোলিক বিন্যাস (Historical Settlement and Demographic Distribution)
আনাতোলিয়া ও সংলগ্ন উচ্চভূমি অঞ্চলে আর্মেনীয় সমাজের উপস্থিতি কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনার ফল ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা এই ভূখণ্ডের প্রাচীন পাহাড়ি উপত্যকা ও নদী অববাহিকায় বসবাস করে আসছিল। এই অঞ্চলের ভূগোল ও আর্মেনীয় সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল বেশ নিবিড়। পূর্ব আনাতোলিয়ার পাহাড়ি এলাকা, যা ঐতিহাসিকভাবে আর্মেনীয় মালভূমি নামে পরিচিত, সেখানেই তাদের মূল বসতি গড়ে উঠেছিল (Bournoutian, 2002)। ভ্যান হ্রদের চারপাশ, সাসুন ও মুশের উর্বর উপত্যকা, এরজুরুমের পার্বত্য অঞ্চল এবং দিয়ারবেকিরের সমতল ভূমিতে আর্মেনীয় কৃষিজীবী ও কারিগর সমাজের বহু প্রজন্মের পদচিহ্ন ছিল। এছাড়া সিলিসিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলেও তাদের শক্তিশালী ঐতিহাসিক উপস্থিতি ছিল, যেখানে মধ্যযুগে একসময় আর্মেনীয় রাজ্য গড়ে উঠেছিল।
ষোড়শ শতকে অটোমান সাম্রাজ্য যখন পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়, তখন এই প্রাচীন জনপদগুলো সরাসরি ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে চলে আসে। তবে তাদের ভৌগোলিক বিস্তার কেবল পূর্ব প্রদেশগুলোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অটোমান বাণিজ্যিক ব্যবস্থার প্রসারের সাথে সাথে বহু আর্মেনীয় পরিবার রাজধানী ইস্তাম্বুল, ইজমির, বুরসা, এদির্নে এবং ট্রাবজোনের মতো প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে (Karpat, 1985)। বিশেষ করে রাজধানীতে তাদের একটি প্রভাবশালী নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠে। ফলে আর্মেনীয় সমাজ ভৌগোলিকভাবে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একভাগে ছিল পূর্ব আনাতোলিয়ার বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, আর অন্যভাগে ছিল সাম্রাজ্যের পশ্চিমের বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে থাকা বাণিজ্য ও প্রশাসনের সাথে যুক্ত শহুরে সমাজ।
জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে অটোমান আমলের বিভিন্ন নথিতে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। উনিশ শতকের শেষার্ধে অটোমান সরকারি আদমশুমারি এবং আর্মেনীয় প্যাট্রিয়ার্কেটের নথির মধ্যে সংখ্যার স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে। ইতিহাসবিদ কেমাল কারপাত (Kemal Karpat) অটোমান নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে আর্মেনীয়দের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখের কাছাকাছি (Karpat, 1985)। অন্যদিকে আর্মেনীয় চার্চের রেকর্ডে এই সংখ্যা বিশ লাখেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সংখ্যার এই অমিল সত্ত্বেও ভৌগোলিক বাস্তবতায় কোনো সন্দেহ ছিল না। পূর্ব আনাতোলিয়ার ছয়টি প্রধান প্রদেশ – যেগুলোকে অটোমান প্রশাসনিক ভাষায় বলা হতো ভিলিয়াতে সিত্তা (Six Vilayets) – সেখানে তারা মুসলিম তুর্কি ও কুর্দি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি প্রধান একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে জীবনযাপন করত। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গিরিপথ পর্যন্ত তাদের ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলোই ছিল এই মিশ্র জনসংখ্যার বাস্তব চিত্র।
মিল্লাত ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো (Administrative and Legal Structure of the Millet System)
অটোমান শাসনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিটি কোনো ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক সমতার ওপর দাঁড়ানো ছিল না। পুরো সমাজকে পরিচালনা করা হতো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে, যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল মিল্লাত ব্যবস্থা (millet system)। ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ অমুসলিম প্রজাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এই কাঠামোগত ব্যবস্থাটি চালু করেন। এর আওতায় ১৪৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্মেনীয় প্যাট্রিয়ার্কেট (Armenian Patriarchate of Constantinople) (Artinian, 1980)। একজন ধর্মীয় নেতার হাতে কেবল আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব নয়, বরং তার পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর প্রশাসনিক, দেওয়ানি ও বিচারিক ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছিল। প্যাট্রিয়ার্ক স্বয়ং সুলতানের কাছ থেকে দায়িত্ব পেতেন এবং তিনিই ছিলেন সরকারের কাছে নিজ জনগোষ্ঠীর প্রধান প্রতিনিধি ও জবাবদিহিকারী ব্যক্তি।
এই প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে সাম্রাজ্যের ভেতরে আর্মেনীয়রা একটি পৃথক আইনি সত্তা বা স্বশাসিত ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হতো। তাদের নিজস্ব পারিবারিক বিষয়, যেমন বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার এবং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির ভার ছিল চার্চের আদালতের ওপর (Inalcik, 1994)। কিন্তু এই স্বায়ত্তশাসনের একটি বড় রাজনৈতিক দিক ছিল। রাষ্ট্র সরাসরি প্রতিটি নাগরিকের কাছে না পৌঁছে এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর আদায় করত এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখত। ফলে সাধারণ আর্মেনীয় জনগণের ওপর চার্চের অভিজাত যাজকদের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের মাঝখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি এক ধরনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করত, যা কার্যত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার একটি কার্যকর কৌশল ছিল।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবস্থা কোনো সমতার নিশ্চয়তা দিত না। অমুসলিম হিসেবে আর্মেনীয়রা ইসলামী আইনের অধীনে সুরক্ষার বিনিময়ে নির্ধারিত কর বা জিজিয়া (jizya) দিতে বাধ্য থাকত। আদালত ব্যবস্থায় মুসলিম ও অমুসলিম বিরোধে সাক্ষ্যপ্রমাণের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের অংশ। ইতিহাসবিদ হালিল ইনালসিক (Halil Inalcik) তার ধ্রুপদী গবেষণায় দেখিয়েছেন, মিল্লাত ব্যবস্থা সাম্রাজ্যকে এক ধরনের আপেক্ষিক সামাজিক স্থিতিশীলতা দিলেও তা ধর্মীয় আধিপত্যের কাঠামোর ভেতরেই কাজ করত (Inalcik, 1994)। সাধারণ আর্মেনীয় নাগরিক কখনোই রাজনৈতিকভাবে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেত না। তারা ছিল এমন এক ব্যবস্থার অধীন, যেখানে ধর্মীয় আনুগত্যই নাগরিকের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করত এবং সামাজিক স্তরে তাদের অবস্থানকে অধস্তন করে রাখত।
অর্থনৈতিক ভূমিকা: আমিরা শ্রেণি, এসনাফ ও বাণিজ্য নেটওয়ার্ক (Economic Roles: The Amira Class, Esnafs and Trade Networks)
অটোমান সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে আর্মেনীয় সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুমুখী। উনিশ শতকে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে সাম্রাজ্যের অর্থব্যবস্থা সচল রাখতে যারা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, তারা ছিলেন আর্মেনীয় ব্যাংকার বা সারাফ (sarraf) গোষ্ঠী। এই অর্থনৈতিক অভিজাতদের পরিচিতি ছিল আমিরা (amira) নামে (Barsoumian, 1982)। এই আমিরালারা অটোমান রাজদরবার, উচ্চপদস্থ পাশা এবং প্রাদেশিক গভর্নরদের বিপুল পরিমাণ ঋণ সরবরাহ করতেন। ট্যাক্স ফার্মিং বা রাজস্ব ইজারা দেওয়ার যে ব্যবস্থা চালু ছিল, সেখানেও সারাফরা ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। প্রাদেশিক কর আদায়ের অধিকার কেনার জন্য মুসলিম পাশাদের প্রয়োজনীয় জামানত ও অর্থের যোগান দিতেন এই ধনী আর্মেনীয়রা।
আমিরা শ্রেণি কেবল অর্থলগ্নিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা সাম্রাজ্যের নির্মাণ ও শিল্পোৎপাদনের সাথেও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। রাজকীয় টাকশাল বা দারপহানে (Darphane)-র পরিচালকের দায়িত্ব বহু বছর ধরে এই পরিবারের সদস্যদের হাতেই ছিল। একই সাথে তারা রাজকীয় গানপাউডার কারখানা ও নৌবাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থার প্রধান ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বিখ্যাত বালিয়ান পরিবার (Balyan family) ছিল অগ্রগণ্য (Artinian, 1980)। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে ইস্তাম্বুলের বহু বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ, মসজিদ ও প্রশাসনিক ভবন (যার মধ্যে দোলমাবাহচে প্রাসাদও রয়েছে) তাদের নকশায় তৈরি হয়েছিল। এই অভিজাত শ্রেণিটি তাদের বিপুল সম্পদ দিয়ে আর্মেনীয় চার্চ, বিদ্যালয় ও হাসপাতাল পরিচালনা করত, যার ফলে মিল্লাত প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তাদের একক আধিপত্য বজায় থাকত।
শহরের সাধারণ আর্মেনীয়দের অর্থনৈতিক জীবন অবশ্য এই ধনকুবেরদের মতো ছিল না। তারা মূলত যুক্ত ছিল কারিগর ও ব্যবসায়ী গিল্ড বা এসনাফ (esnaf) সংগঠনের সাথে (Pamuk, 2000)। স্বর্ণকার, রৌপ্যকার, দর্জি, কাঠমিস্ত্রি, জুতা প্রস্তুতকারক এবং সিল্ক উৎপাদনের মতো পেশাগুলোতে আর্মেনীয় কারিগররা তাদের দক্ষতার পরিচয় দেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তারা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। ইতিহাসবিদ সেবুহ আসলানিয়ান (Sebouh Aslanian) তার প্রভাবশালী গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে আর্মেনীয় বণিকরা নিউ জুলফা থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর, ভেনিস, আমস্টারডাম এবং অটোমান বন্দরগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করেছিল (Aslanian, 2011)। তাদের এই বাণিজ্য নেটওয়ার্ক সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের সাথে সংযুক্ত রাখতে বিশেষ সহায়তা করেছিল।
গ্রামীণ আনাতোলিয়ার জীবন ও কৃষক সমাজের সংকট (Rural Anatolian Life and the Crisis of the Peasantry)
রাজধানী ইস্তাম্বুল বা বড় বাণিজ্যিক শহরগুলোর সমৃদ্ধি দেখে গোটা আর্মেনীয় সমাজের বাস্তব রূপ বোঝা সম্ভব ছিল না। অধিকাংশ আর্মেনীয়ই বাস করত পূর্ব আনাতোলিয়ার পাহাড়ি গ্রামে, যেখানে জীবন ছিল কঠোর, একঘেয়ে এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভরা। এই গ্রামীণ কৃষকদের বলা হতো মশাগ (mshag) বা ক্ষেতমজুর ও সাধারণ চাষি। তারা গম, বার্লি উৎপাদন করত এবং পশুপালনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করত। মাটির তৈরি ছোট ছোট ঘরে তাদের বাস ছিল, যার অর্ধেকটা জুড়ে থাকত শীতকালে গবাদিপশু রাখার জায়গা। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘ শীতকালের কারণে তাদের জীবন ছিল পুরোপুরি প্রকৃতি ও মাটির সাথে বাঁধা (Walker, 1990)।
গ্রামীণ সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল দ্বৈত শোষণ ও আইনি সুরক্ষার অভাব। কেন্দ্রীয় অটোমান প্রশাসনের কর ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের স্থানীয় কুর্দি গোত্রপতি বা দেরেবেই (derebey)-দের অন্যায় দাবি মেটাতে হতো (Faroqhi, 2004)। স্থানীয় উপজাতি প্রধানরা এই কৃষকদের কাছ থেকে এক ধরনের বাধ্যতামূলক সুরক্ষা কর বা হাফির (hafir) আদায় করত। যদি কোনো কৃষক এই অতিরিক্ত কর দিতে ব্যর্থ হতো, তবে তার ফসল পুড়িয়ে দেওয়া হতো বা গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যাওয়া হতো। অস্ত্র বহন করার কোনো আইনি অধিকার গ্রামীণ খ্রিস্টান কৃষকদের ছিল না। ফলে তারা স্থানীয় সশস্ত্র উপজাতিদের সামনে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হতো। জমি দখল ছিল এই অঞ্চলের এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে এই গ্রামীণ সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করে। কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতি কৃষকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড কোয়াটার্ট (Donald Quataert) দেখিয়েছেন যে, ভূমি রাজস্বের অনিশ্চয়তা এবং সামন্ততান্ত্রিক শোষণ বহু গ্রামীণ কৃষককে ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে শ্রমিকের কাজ খুঁজতে বাধ্য করেছিল (Quataert, 2005)। কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের নামে লিখে নিত, আর স্থানীয় আদালতগুলোতে আর্মেনীয়দের সাক্ষ্য মুসলিম বাদীর বিপরীতে গ্রাহ্য হতো না। এই কাঠামোগত অবিচার ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা গ্রামীণ সমাজের ভেতরে এক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দেয়, যা তাদের অস্তিত্বকে প্রতিদিনের সংগ্রামের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।
সামাজিক স্তরবিন্যাস, সাংস্কৃতিক জাগরণ ও শিক্ষাব্যবস্থা (Social Stratification, Cultural Renaissance and Education)
অটোমান আর্মেনীয় সমাজ কোনো একক বা সমজাতীয় গোষ্ঠী ছিল না, বরং তা ছিল নানামুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তরে বিভক্ত। সমাজের শীর্ষে ছিল আমিরা শ্রেণি এবং উচ্চপদস্থ যাজক সম্প্রদায়, যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকত এবং স্থবির ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা পছন্দ করত। মাঝখানে ছিল উদীয়মান মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী শ্রেণি, যাদের বিকাশ ঘটেছিল মূলত উনিশ শতকে। আর সবার নিচে ছিল শহরগুলোর সাধারণ শ্রমজীবী এসনাফ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল কৃষক সমাজ। এই অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের কারণে সমাজের ভেতরে প্রায়ই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিত, যা পরবর্তীতে আধুনিক সামাজিক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করেছিল (Panossian, 2006)।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আর্মেনীয় সমাজে এক বড় ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন আসে, যাকে বলা হয় জারতঙ্ক (Zartonk) বা আর্মেনীয় সাংস্কৃতিক নবজাগরণ। এই রূপান্তরের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ইউরোপে বিশেষ করে ভেনিস ও ভিয়েনায় সক্রিয় থাকা ক্যাথলিক আর্মেনীয় পণ্ডিত বা মেখিতারিস্ট (Mekhitarist) সংঘের (Somakian, 1995)। তারা প্রাচীন আর্মেনীয় পাণ্ডুলিপি উদ্ধার, ব্যাকরণ রচনা এবং আধুনিক চিন্তাধারার বইপত্র অনুবাদ করতে শুরু করেন। একই সাথে ইস্তাম্বুল ও প্যারিসে পড়াশোনা করতে যাওয়া তরুণ আর্মেনীয় ছাত্ররা ইউরোপীয় জ্ঞানালোকের ধারণা নিয়ে ফিরে আসে। তারা দাবি তোলে যে, শিক্ষাকে চার্চের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় আধুনিক সাহিত্য রচনা করতে হবে। এর ফলে ধ্রুপদী ভাষার বদলে আধুনিক পশ্চিম আর্মেনীয় ভাষা (Western Armenian) সাহিত্যের বাহন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংবাদপত্রের বিস্তার। শত শত নতুন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, যেখানে বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস ও আধুনিক ভাষা শেখানো হতো। নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই সময় বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটে। ১৮৬০-এর দশকে ইস্তাম্বুল থেকে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে সাহিত্য পত্রিকা ও দৈনিক সংবাদপত্র, যেমন মাসিস (Masis) এবং হায়রেনিক (Hayrenik) (Nalbandian, 1963)। এই পত্রিকাগুলোতে সামাজিক অসাম্য, নারীদের অধিকার এবং গ্রামীণ কৃষকদের দুর্দশার চিত্র খোলাখুলি তুলে ধরা হতো। এই নতুন শিক্ষিত ও ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি প্রাচীন প্যাট্রিয়ার্কেটের একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালের আর্মেনীয় জাতীয় সংবিধান (Armenian National Constitution) প্রণয়নের পথ তৈরি করে।
তানজিমাত পূর্ববর্তী রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়া ও ‘সাদিক মিল্লাত’ বয়ান (Pre-Tanzimat Political Dynamics and the ‘Loyal Millet’ Narrative)
অটোমান রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আর্মেনীয়দের রাজদরবারে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হতো। তাদের সরকারিভাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল সাদিক মিল্লাত (millet-i sadıka) বা “বিশ্বস্ত সম্প্রদায়” (Libaridian, 2004)। এই নামকরণের পেছনে ঐতিহাসিক কিছু রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছিল। গ্রিক ও সার্বদের মতো অন্যান্য খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী যখন উনিশ শতকের শুরুতে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অটোমানদের বিরুদ্ধে একের পর এক সশস্ত্র বিদ্রোহ করছিল এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করছিল, আর্মেনীয়রা তখনো সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছিল। তাদের কোনো নিজস্ব পৃথক রাষ্ট্রের দাবি ছিল না এবং ভৌগোলিকভাবে তারা সাম্রাজ্যের একেবারে কেন্দ্রস্থলে ছড়িয়ে ছিল।
গ্রিকদের স্বাধীনতা যুদ্ধের (১৮২১-১৮২৯) পর অটোমান প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদগুলো থেকে গ্রিকদের সরিয়ে সেখানে আর্মেনীয়দের নিয়োগ দিতে শুরু করে। সাম্রাজ্যের অনুবাদ ব্যুরো, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য আর্মেনীয়দের এগিয়ে দেওয়া হয় (Der Matossian, 2014)। রাজদরবারের দৃষ্টিতে তারা ছিল এমন এক প্রজা গোষ্ঠী, যাদের কাছ থেকে কোনো আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী হুমকির ভয় ছিল না। সুলতানরা প্রায়ই আমিরদের প্রশংসা করতেন এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। এই ঘনিষ্ঠতার কারণে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসনে তাদের এক ধরনের প্রভাব তৈরি হয়েছিল, যা আপাতদৃষ্টিতে এক স্থিতিশীল সম্পর্কের ছবি তুলে ধরত।
তবে এই “বিশ্বস্ত প্রজা” পরিচয়ের আড়ালে সম্পর্কের ভিত্তিটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। এই আনুগত্য কোনো স্থায়ী আইনি চুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, বরং তা টিকে ছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ প্রজা তার অধস্তন অবস্থান মেনে নিয়ে রাজকোষে সম্পদ যোগান দিয়ে যেত। ইতিহাসবিদ জেরার্ড লিবারিডিয়ান (Gerard Libaridian) উল্লেখ করেছেন যে, এই বিশ্বস্ততার বয়ানটি ছিল মূলত সাম্রাজ্যিক শাসনের একটি কৌশলগত সুরক্ষাবলয় (Libaridian, 2004)। যখনই গ্রামীণ দুর্দশার অবসানে সংস্কার চাওয়া হলো এবং আন্তর্জাতিক শক্তির চাপ বাড়ল, তখনই পুরনো এই আপাত সুসম্পর্কের মুখোশ খসে পড়ল। রাষ্ট্র আর্মেনীয়দের ন্যায্য আইনি সংস্কারের দাবিকে হঠাৎ করেই সাম্রাজ্যের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা ও রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করল। এর ফলে কয়েক শতাব্দীর তথাকথিত বিশ্বস্ততার আখ্যান অত্যন্ত দ্রুত এক তীব্র সন্দেহের রাজনীতিতে রূপ নিল, যা পরবর্তীতে পুরো জাতির ভাগ্যকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
উনিশ শতকে আর্মেনীয় প্রশ্নের উত্থান (Rise of the Armenian Question): তানজিমাত, জাতীয় চেতনা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি
তানজিমাত সংস্কার ও অটোমান সমতার বিভ্রান্তি (Tanzimat Reforms and the Illusion of Ottoman Equality)
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অটোমান সাম্রাজ্য এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে। ইউরোপের সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে তাল মেলাতে না পেরে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আধুনিকায়নের এক নতুন পথ বেছে নেয়। এই সংস্কার আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছিল তানজিমাত (Tanzimat), যার অর্থ পুনর্গঠন বা বিন্যাস (Berkes, 1964)। ১৮৩৯ সালে সুলতান প্রথম আব্দুলমেজিদ জারি করেন ঐতিহাসিক গুলহানে ঘোষণা (Edict of Gülhane)। এই রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের সকল প্রজার – ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে – জীবন, সম্মান ও সম্পত্তির নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল প্রথাগত মিল্লাত ব্যবস্থার ধর্মীয় স্তরবিন্যাস ভেঙে একটি সর্বজনীন নাগরিক পরিচয় গড়ে তোলা, যা ইতিহাসে অটোমানবাদ (Ottomanism) নামে পরিচিত।
কিন্তু কাগজের কলমের সংস্কার বাস্তব সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। ১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর চাপে জারি করা হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সনদ, যার নাম হাতি হুমায়ুন (Hatt-ı Hümayun) (Findley, 1980)। এতে অমুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার, সরকারি চাকরিতে প্রবেশাধিকার, সামরিক বাহিনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং নিজস্ব কর ব্যবস্থার সংস্কারের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। ঐতিহাসিক নিয়াজি বেরকেস (Niyazi Berkes) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই ঘোষণাগুলো সাম্রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছিল (Berkes, 1964)। শতাব্দীর পর দশক ধরে যে আধিপত্যকে তারা স্বাভাবিক সামাজিক নিয়ম বলে মনে করত, আইনের চোখে অমুসলিমদের সেই সমান আসনে বসানোকে তারা মেনে নিতে পারেনি। ফলে সমাজের ভেতরে এক ধরনের মানসিক প্রতিরোধ ও ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।
প্রাদেশিক প্রশাসনে তানজিমাত সংস্কারের রূপ ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অকার্যকর। ইস্তাম্বুলের আমলারা যখন সমতার আইন প্রণয়ন করছিলেন, পূর্ব আনাতোলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখন স্থানীয় গভর্নর ও সামন্ত প্রভুরা সেই আইনগুলোকে প্রকাশ্যেই উপেক্ষা করতেন (Shaw & Shaw, 1977)। আর্মেনীয় কৃষকদের কাছ থেকে অন্যায় কর আদায়, জমি দখল এবং বিচারহীনতার পরিবেশ আগের মতোই বহাল ছিল। আইন পাস হলেও তা কার্যকর করার জন্য যে আধুনিক ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার দরকার ছিল, তা তৈরি করা হয়নি। ইতিহাসবিদ স্ট্যানফোর্ড শ (Stanford Shaw) উল্লেখ করেছেন যে, তানজিমাত ব্যবস্থা অমুসলিমদের মনে সমতার এক বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তা গভীর হতাশা ও রাজনৈতিক ক্ষোভের জন্ম দেয় (Shaw & Shaw, 1977)। এই অসঙ্গতিই পরবর্তীতে সাম্রাজ্যের ভেতরের সামাজিক সম্পর্কে বড় ধরনের সংঘাতের বীজ রোপণ করে।
১৮৬৩ সালের আর্মেনীয় জাতীয় সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ রূপান্তর (The Armenian National Constitution of 1863 and Secular Transformation)
তানজিমাত যুগের সংস্কারের একটি অপ্রত্যাশিত ও উল্লেখযোগ্য ফল ছিল আর্মেনীয় সমাজের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কাঠামোর রূপান্তর। শত শত বছর ধরে আর্মেনীয় মিল্লাতের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল ইস্তাম্বুলের ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং ধনী আমিরা (amira) শ্রেণি। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে উঠতি মধ্যবিত্ত পেশাজীবী ও কারিগরদের শাসনকাজে কোনো মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ১৮৫০-এর দশকে ইউরোপফেরত তরুণ আর্মেনীয় বুদ্ধিজীবীরা এই রক্ষণশীল অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান (Sarkissian, 1938)। তারা চার্চের কর্তৃত্বকে আধ্যাত্মিক সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ রেখে সম্প্রদায়ের নাগরিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার দাবি জানান।
এই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৮৬৩ সালে অটোমান সরকার কর্তৃক অনুমোদিত আর্মেনীয় জাতীয় সংবিধান (Armenian National Constitution), যার স্থানীয় নাম ছিল ‘সাহমানাদ্রুতিউন’ (Kirakossian, 1992)। মোট ১৫০টি ধারা সম্বলিত এই দলিলটি কোনো রাষ্ট্র গঠনের সংবিধান ছিল না, বরং তা ছিল অটোমান কাঠামোর ভেতরে আর্মেনীয় মিল্লাতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনার একটি আধুনিক রূপরেখা। এর মাধ্যমে গঠিত হয় জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদ (National Representative Assembly), যার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হতেন সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে। ধর্মযাজকদের ক্ষমতা খর্ব করে শিক্ষা, বিচার, স্বাস্থ্য ও অর্থ ব্যবস্থার তদারকি ছেড়ে দেওয়া হয় ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন কাউন্সিলের হাতে।
ইতিহাসবিদ আরশাক সারকিসিয়ান (Arshak Sarkissian) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, এই সংবিধান আর্মেনীয় সমাজের আধুনিকায়নের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছিল (Sarkissian, 1938)। সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো নিজস্ব ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা লাভ করে। এর ফলে রাজনীতি কেবল চার্চ ও রাজদরবারের গোপন যোগাযোগের বিষয় না থেকে এক ধরনের উন্মুক্ত বিতর্কের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন আর্মেনীয়দের একটি সচেতন রাজনৈতিক সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তবে একই সাথে এই সংবিধান গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের সমস্যার কোনো বাস্তব সমাধান দিতে পারেনি, কারণ এর মূল কেন্দ্র ছিল ইস্তাম্বুলভিত্তিক শহুরে বুদ্ধিজীবী সমাজ (Kirakossian, 1992)। ফলে প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিক হলেও প্রদেশগুলোর বাস্তব সংকট অমীমাংসিতই থেকে যায়।
জাতীয় চেতনার উন্মেষ, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ (Awakening of National Consciousness, Literature and Intellectual Renaissance)
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আর্মেনীয় সমাজে যে বুদ্ধিবৃত্তিক জোয়ার তৈরি হয়, তা তাদের জাতীয় পরিচয়ের ধারণাকে বদলে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে আর্মেনীয়দের পরিচয় ছিল নিছক একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় বা মিল্লাত হিসেবে। কিন্তু আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ, মাতৃভাষার সংস্কার এবং ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে এই ধর্মীয় পরিচিতি ধীরে ধীরে আধুনিক জাতিগত চেতনায় রূপান্তরিত হতে থাকে (Ter-Minassian, 1984)। এই রূপান্তরের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল ইউরোপীয় জ্ঞানালোক ও রোমান্টিক জাতীয়তাবাদের প্রভাব। আর্মেনীয় তরুণরা বুঝতে শুরু করে যে, তাদের অস্তিত্ব কেবল মধ্যযুগীয় ধর্মীয় আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক অধিকারের এক সমৃদ্ধ অতীত।
সাহিত্য এই নবজাগরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রাফফি (Raffi) তার কালজয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেন (Lewis, 1961)। তার রচিত খােন্ত (The Fool) এবং জালালেদ্দিন (Jalaleddin) গ্রন্থে পূর্ব আনাতোলিয়ার সাধারণ কৃষকদের নিপীড়নের জীবন্ত চিত্র এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে কবি ও শিক্ষাবিদ খাচাতুর আবোভিয়ান (Khachatur Abovian) তার উপন্যাসে প্রাচীন ধ্রুপদী ভাষার বদলে সাধারণ মানুষের মুখের কথ্য ভাষায় সাহিত্য রচনা করে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই সাহিত্যিক আন্দোলন মানুষকে তার পারিপার্শ্বিক অন্যায় ও শোষণ সম্পর্কে সচেতন করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
একই সময়ে জাতীয় চেতনার উন্মেষে নেতৃত্ব দেন এমন কিছু চরিত্র, যারা ধর্মীয় পোশাকে থেকেও সামাজিক সংস্কারের কথা বলেছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভ্যানের আর্চবিশপ এবং পরবর্তীতে প্যাট্রিয়ার্ক হওয়া এমকরতিচ খরিমিয়ান (Mkrtich Khrimian), যাকে সাধারণ মানুষ ভালোবেসে ডাকত ‘খরিমিয়ান হাইরিক’ বা পিতা খরিমিয়ান নামে (Ter-Minassian, 1984)। তিনি তার নিজ হাতে ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং সাময়িকী প্রকাশ করে গ্রামীণ জীবনের দুরবস্থা তুলে ধরেন। তিনি বারবার বলেছিলেন যে, চোখ বন্ধ করে অদৃষ্টের ওপর ভরসা রাখলে মানুষের মুক্তি মিলবে না; প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষা, কৃষি সংস্কার এবং আত্মমর্যাদাবোধ। ইতিহাসবিদ বার্নার্ড লুইস (Bernard Lewis) দেখিয়েছেন যে, উনিশ শতকে এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ পুরো সাম্রাজ্যের অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বে এক গভীর পরিবর্তন এনেছিল, যা তাদের চিরাচরিত নীরব অনুগত্যের অচলায়তন ভেঙে ফেলতে প্ররোচিত করে (Lewis, 1961)।
১৮৭৭-১৮৭৮ সালের রুশ-তুর্কি যুদ্ধ ও সান স্তেফানো চুক্তি (The Russo-Turkish War of 1877–1878 and the Treaty of San Stefano)
১৮৭৭ সালে শুরু হওয়া রুশ-তুর্কি যুদ্ধ আর্মেনীয় সমাজের রাজনৈতিক গতিপথকে পুরোপুরি বদলে দেয়। বলকান অঞ্চলে অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক বড় আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। ককেশাস ফ্রন্টে রুশ সেনাবাহিনী যখন পূর্ব আনাতোলিয়ায় প্রবেশ করে এবং কার্স, আরদাহান ও এরজুরুমের মতো শহরগুলো দখল করে নেয়, তখন সেখানকার স্থানীয় আর্মেনীয়রা রুশ বাহিনীকে এক ধরনের স্বস্তির প্রতীক হিসেবে স্বাগত জানায় (Hanioğlu, 2008)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়ন ও উপজাতীয় আক্রমণের মুখে তারা আশা করেছিল যে, একটি বড় শক্তি তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের অবসান ঘটাতে পারে।
যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে ১৮৭৮ সালের মার্চ মাসে স্বাক্ষরিত সান স্তেফানো চুক্তি (Treaty of San Stefano)-এর মাধ্যমে। এই চুক্তির ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদটি ছিল আর্মেনীয় ইতিহাসের একটি বড় মাইলফলক (Zürcher, 2004)। এই অনুচ্ছেদে অটোমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয় যে, আর্মেনীয় অধ্যুষিত পূর্ব প্রদেশগুলোতে অবিলম্বে প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে এবং কুর্দি ও সার্কাশীয় উপজাতিদের হাত থেকে আর্মেনীয়দের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, এই সংস্কার বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে শর্ত যুক্ত করা হয়।
ইতিহাসবিদ এরিখ ইয়ান জুরখার (Erik-Jan Zürcher) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সান স্তেফানো চুক্তির মাধ্যমেই তথাকথিত আর্মেনীয় প্রশ্ন (Armenian Question) প্রথম আন্তর্জাতিক কূটনীতির আনুষ্ঠানিক টেবিলে নথিভুক্ত হয় (Zürcher, 2004)। এটি আর কোনো অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিরোধ বা মিল্লাতের নিজস্ব সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ রইল না। চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হয়ে দাঁড়াল। তবে এর একটি মারাত্মক রাজনৈতিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তৈরি হলো। সুলতানের সরকার আর্মেনীয়দের আর কেবল অসন্তুষ্ট প্রজা হিসেবে দেখল না, তাদের চিহ্নিত করা হলো পরাশক্তি রাশিয়ার চর ও সাম্রাজ্য বিভাজনের বিপজ্জনক হাতিয়ার হিসেবে। ইতিহাসবিদ শুকরু হানিওগ্লু (Şükrü Hanioğlu) উল্লেখ করেছেন যে, এই যুদ্ধের পর থেকে অটোমান রাজদরবারে আর্মেনীয়দের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিগুলোকে সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করার এক স্থায়ী প্রবণতা শুরু হয় (Hanioğlu, 2008)।
বার্লিন কংগ্রেস, আর্টিক্যাল ৬১ ও ‘কাগজের চামচ’ রূপক (The Congress of Berlin, Article 61 and the ‘Paper Ladle’ Metaphor)
সান স্তেফানো চুক্তিতে রাশিয়ার বিপুল আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সহ অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিগুলো মেনে নিতে পারেনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলি (Benjamin Disraeli) আশঙ্কা করেছিলেন যে, পূর্ব আনাতোলিয়ায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ সুয়েজ খাল ও ভারতের দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্য পথের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠবে। ফলে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার জন্য ১৮৭৮ সালের গ্রীষ্মে জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক (Otto von Bismarck)-এর মধ্যস্থতায় আয়োজিত হয় ঐতিহাসিক বার্লিন কংগ্রেস (Congress of Berlin) (Clark, 2006)। আর্মেনীয় সমাজের পক্ষ থেকে খরিমিয়ান হাইরিকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইউরোপের নেতাদের কাছে তাদের দুর্দশা ও সংস্কারের দাবি তুলে ধরতে বার্লিনে উপস্থিত হন।
বার্লিন কংগ্রেসের পরিণতি কিন্তু আর্মেনীয়দের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক হয়েছিল। মূল চুক্তির ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদটি বদলে গিয়ে বার্লিন চুক্তির ৬১ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 61)-এ রূপ নেয় (Rodogno, 2012)। এতে পূর্ব প্রদেশের সংস্কারের কথা আগের মতোই বলা হয়েছিল, কিন্তু রুশ সেনা প্রত্যাহারের সাথে সংস্কার বাস্তবায়নের শর্তটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়। এর বদলে সংস্কার পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউরোপের ছয়টি পরাশক্তির যৌথ তদারকির ওপর। বাস্তবে কোনো পরাশক্তিই অটোমানদের ওপর সরাসরি সামরিক চাপ সৃষ্টি করে সেই সংস্কার বাস্তবায়নে আগ্রহী ছিল না। ইতিহাসবিদ দাভিদে রদোগনো (Davide Rodogno) তার বিশদ গবেষণায় দেখিয়েছেন, ইউরোপীয় শক্তিগুলোর এই তথাকথিত মানবিক কূটনীতি মূলত তাদের নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্যের রাজনীতিরই একটি অংশ ছিল (Rodogno, 2012)।
বার্লিন থেকে শূন্য হাতে ফিরে এসে খরিমিয়ান হাইরিক ইস্তাম্বুলের গির্জায় এক বিখ্যাত ভাষণ দেন, যা ইতিহাসে ‘কাগজের চামচ’ (Paper Ladle) রূপক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে (Sonyel, 1987)। তিনি সমবেত জনতাকে বলেন, বার্লিনে ক্ষমতার টেবিলে রাখা হয়েছিল এক বড় পাত্রভর্তি খাবার, যা ছিল স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার। সার্ব, বুলগেরিয়ান ও মন্টিনিগ্রিনরা তাদের হাতের লোহার চামচ – অর্থাৎ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও অস্ত্রের শক্তি – দিয়ে সেই পাত্র থেকে নিজেদের অংশ তুলে নিয়ে গেছে। আর তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এক টুকরো কাগজের আবেদন নিয়ে, যা সেই ফুটন্ত পাত্রে দেওয়া মাত্র ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “যেখানে লোহার চামচ নেই, সেখানে কাগজের আবেদন দিয়ে কোনোদিন অধিকার পাওয়া যায় না”। এই রূপকটি পুরো প্রজন্মের চিন্তায় এক বিরাট ধাক্কা দেয় এবং তাদের সশস্ত্র রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
সাম্রাজ্যিক প্রতিক্রিয়া, হামিদিয়ান ভাবাদর্শ ও ইসলামি সংহতি (Imperial Reaction, Hamidian Ideology and Islamic Solidarity)
বার্লিন কংগ্রেসের পর অটোমান সিংহাসনে নিজের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেন সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (Abdul Hamid II)। তিনি দেখলেন যে, তানজিমাত আমলের ধর্মনিরপেক্ষ অটোমানবাদ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে; বলকান অঞ্চলের একের পর এক খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। তাই তিনি এক সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শিক অবস্থান গ্রহণ করেন, যা পরিচিত প্যান-ইসলামিজম (Pan-Islamism) বা ইসলামি সংহতি আন্দোলন নামে (Deringil, 1998)। সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট মুসলিম জনগোষ্ঠী – তুর্কি, কুর্দি, আরব ও ককেশীয় শরণার্থীদের – একক ধর্মীয় আনুগত্যের পতাকাতলে একত্রিত করাই হয়ে ওঠে তার শাসনের প্রধান ভিত্তি। এই নতুন সাম্রাজ্যিক ভাবাদর্শে অমুসলিমদের জন্য স্থান ছিল কেবল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ও আনুগত্যশীল প্রজা হিসেবে।
সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ বার্লিন চুক্তির ৬১ নম্বর অনুচ্ছেদকে সাম্রাজ্য ভেঙে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসেবে মনে করতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, পূর্ব আনাতোলিয়ায় সামান্যতম ছাড় দেওয়া হলে তা আরেকটি নতুন খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের পথ খুলে দেবে, ঠিক যেভাবে বুলগেরিয়া স্বাধীন হয়েছিল। তাই তিনি সংস্কার কার্যকর করার প্রতিটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে কূটনীতির মারপ্যাঁচে ঝুলিয়ে রাখতেন (Kasaba, 1988)। একই সাথে তিনি প্রদেশগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণ অভূতপূর্ব মাত্রায় বাড়িয়ে দেন। সামান্যতম রাজনৈতিক অসন্তোষ বা অধিকারের দাবিকে তিনি কঠোর হাতে দমন করার নির্দেশ দেন।
এই নীতির অংশ হিসেবে ১৮৯১ সালে সুলতান এক বিশেষ আধাসামরিক অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করেন, যার নাম দেওয়া হয় হামিদিয়া অশ্বারোহী রেজিমেন্ট (Hamidiye cavalry) (Deringil, 1998)। স্থানীয় সুন্নি কুর্দি উপজাতিদের মধ্য থেকে এই বাহিনীর সদস্যদের বাছাই করা হয়েছিল। তাদের রাষ্ট্রীয় অস্ত্র, ঘোড়া ও বিশেষ সামরিক পদমর্যাদা দেওয়া হয় এবং স্থানীয় বেসামরিক আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। ইতিহাসবিদ সেলিম দেরিংগিল (Selim Deringil) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, হামিদিয়া রেজিমেন্ট গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল পূর্ব আনাতোলিয়ায় কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর যে কোনো ধরনের সংগঠিত তৎপরতাকে ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার মাধ্যমে দাবিয়ে রাখা (Deringil, 1998)। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে গোষ্ঠীগত উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই এক বিশাল সামাজিক সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এই নীতি উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে বড় ধরনের রক্তপাতের পথ উন্মুক্ত করে দেয়।
আর্মেনীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাম্রাজ্যিক প্রতিক্রিয়া (Armenian Political Movements and Imperial Response): সংগঠন, সংস্কার ও সংঘাত
প্রাথমিক আত্মরক্ষা উদ্যোগ ও আর্মেনাকান দলের আত্মপ্রকাশ (Early Self-Defense Initiatives and the Emergence of the Armenakan Party)
বার্লিন চুক্তির পর পূর্ব আনাতোলিয়ার বাস্তব পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো যখন একের পর এক ভেস্তে যাচ্ছিল, তখন গ্রামীণ সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাইরের শক্তির কূটনৈতিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। স্থানীয় কুর্দি গোত্রপতিদের নিয়মিত আক্রমণ, বেআইনি কর আদায় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা গ্রামীণ যুবসমাজকে নিজেদের নিরাপত্তার উপায় খুঁজতে বাধ্য করে। ১৮৭০-এর দশকের শেষ দিকে ভ্যান, এরজুরুম ও মুশের মতো অঞ্চলগুলোতে গোপনে গড়ে উঠতে থাকে ছোট ছোট আত্মরক্ষা সমিতি। এদের মধ্যে ‘ইউনিয়ন অব স্যালভেশন’ এবং ‘ব্ল্যাক ক্রস সোসাইটি’ ছিল অন্যতম, যাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্থানীয় কৃষকদের অস্ত্র চালনা শেখানো এবং বিপদের সময় পারস্পরিক সহায়তা প্রদান করা (Dasnabedian, 1990)।
এই প্রাথমিক উদ্যোগগুলোর মধ্য থেকেই প্রথম সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। ১৮৮৫ সালে ভ্যান শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্মেনাকান পার্টি (Armenakan Party) (Chalabian, 1988)। এই দলটির মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মকরতিচ তেরলেমেজিয়ান (Mkrtich Terlemezian), যিনি স্থানীয়ভাবে মেকরতিচ পোরতুগালিয়ানের শিক্ষাদর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পোরতুগালিয়ান নির্বাসনে গিয়ে ফ্রান্সের মার্সেই থেকে আর্মেনিয়া (Armenia) নামের একটি দেশপ্রেমিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন, যা গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ত। আর্মেনাকানদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ও বাস্তবমুখী। তারা তাৎক্ষণিক কোনো বড় আকারের সশস্ত্র বিপ্লব বা সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ডাক দেয়নি। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলা, রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং একটি সুশৃঙ্খল আঞ্চলিক প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
আর্মেনাকানরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম চালাত। তারা ছোট ছোট সেলে বিভক্ত হয়ে যুবকদের শারীরিক ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিত এবং বাইরে থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ এনে মজুত করত। ইতিহাসবিদ হ্রাচ দাসনাবেন্দিয়ান (Hrach Dasnabedian) উল্লেখ করেছেন যে, আর্মেনাকান দলের শক্তি ছিল তাদের স্থানীয় শিকড়ে (Dasnabedian, 1990)। তারা জানত গ্রামীণ কৃষকদের প্রকৃত সমস্যা কী। তবে তাদের প্রভাব মূলত ভ্যান প্রদেশ ও এর আশেপাশের অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা তাদের ছিল না। তা সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের মনে আত্মরক্ষার যে চেতনা আর্মেনাকানরা জাগিয়ে তুলেছিল, তা পরবর্তীকালে আরও বড় রাজনৈতিক দল গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।
হুঞ্চাক পার্টি: মার্ক্সবাদ, জাতীয় মুক্তি ও জনবিক্ষোভ (The Hunchakian Party: Marxism, National Liberation and Public Protests)
আর্মেনীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের দ্বিতীয় ও আরও বৈপ্লবিক ধারাটির সূচনা হয় সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে। ১৮৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একদল তরুণ আর্মেনীয় ছাত্র প্রতিষ্ঠা করে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক হুঞ্চাকিয়ান পার্টি (Social Democratic Hunchakian Party) (Atamian, 1955)। এই দলের প্রধান নেতাদের মধ্যে ছিলেন আভেতিস নাজারবেকিয়ান (Avetis Nazarbekian) এবং মরিয়ম ভারদানিয়ান (Mariam Vardanian)। তারা তৎকালীন ইউরোপের বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা এবং রুশ পপুলিস্ট আন্দোলনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। দলের মুখপত্রের নাম ছিল হুঞ্চাক (Hunchak), যার অর্থ ‘ঘণ্টাধ্বনি’। এই নামের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল নিপীড়িত জনতাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেওয়া।
হুঞ্চাকদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল দ্বিমুখী। তারা একদিকে সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বের আলোকে সর্বজনীন সামাজিক মুক্তি ও সাম্যের কথা বলত, অন্যদিকে অটোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে থাকা পশ্চিম আর্মেনিয়াকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল (Chaliand & Ternon, 1983)। আর্মেনাকানদের মতো তারা কেবল আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায়নি। তাদের কৌশল ছিল প্রকাশ্য গণবিক্ষোভ, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং কখনো কখনো সরাসরি সংঘাতের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তারা বিশ্বাস করত যে, সাম্রাজ্যের ভেতরে একটি বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারলে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ১৮৭৮ সালের বার্লিন চুক্তির ৬১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুলতানের সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করবে।
এই কৌশলের অংশ হিসেবে হুঞ্চাকরা বেশ কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে। ১৮৯০ সালের জুলাই মাসে ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রস্থলে তারা আয়োজন করে ঐতিহাসিক কুম কাপু বিক্ষোভ (Kum Kapu demonstration) (Atamian, 1955)। আর্মেনীয় প্যাট্রিয়ার্কেটের সামনে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদ জানায় এবং সুলতানের প্রাসাদের দিকে পদযাত্রা করার চেষ্টা করে। এটি ছিল অটোমান রাজধানী শহরে অমুসলিমদের প্রথম কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিবাদ মিছিল। এরপর ১৮৯৪ সালে সাসুন অঞ্চলে অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে কৃষকদের নিয়ে তারা এক বড় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা সাসুন বিদ্রোহ (Sasun resistance) নামে পরিচিত। কিন্তু গবেষক জেরার্ড শালিয়ঁ (Gérard Chaliand) এবং ইভ তেরনন (Yves Ternon) তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, হুঞ্চাকদের এই আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের কৌশল বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে (Chaliand & Ternon, 1983)। তাদের গণবিক্ষোভ ইউরোপের সামরিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং তা অটোমান প্রশাসনের হাতে সাধারণ নিরপরাধ মানুষের ওপর পাইকারি হারে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা চালানোর এক অজুহাত তুলে দিয়েছিল।
আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন বা দশনাৎসুতীয়ুন (Armenian Revolutionary Federation or Dashnaktsutyun)
হুঞ্চাক পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বিভিন্ন বিপ্লবী উপদলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব যখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, তখন একটি একক ও শক্তিশালী জাতীয় মোর্চা গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮৯০ সালে তিবলিসি (তৎকালীন তিফলিস) শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন (Armenian Revolutionary Federation), যা সংক্ষেপে ‘দশনাৎসুতীয়ুন’ (Dashnaktsutyun) বা এআরএফ নামে পরিচিত (Hovannisian, 1997)। এই দলটির মূল রূপকার ছিলেন তিন দূরদর্শী নেতা – ক্রিস্তাপোর মিকায়েলিয়ান (Christapor Mikaelian), স্তেপান জোরিয়ান (Stepan Zorian) যিনি রস্তম নামে পরিচিত ছিলেন, এবং সিমন জাভারিয়ান (Simon Zavarian)। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলকে একটি সাধারণ ফেডারেশনের ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
দশনাৎসুতীয়ুনের মতাদর্শ ছিল সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের এক বাস্তববাদী মিশ্রণ। তারা হুঞ্চাকদের মতো সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিকে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ না করে, অটোমান সাম্রাজ্যের কাঠামোর ভেতরেই পূর্ব প্রদেশগুলোর ব্যাপক প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয় (Miller & Miller, 1993)। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং বিকেন্দ্রীভূত। কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি স্থানীয় কমিটিগুলোকে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এই নমনীয় কাঠামোর কারণে দলটি খুব দ্রুত ককেশাস থেকে শুরু করে আনাতোলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আর্মেনীয় সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড হোভানিসিয়ান (Richard Hovannisian) তার সম্পাদিত আকর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দশনাৎসুতীয়ুন নিছক একটি রাজনৈতিক দল ছিল না, এটি পরিণত হয়েছিল একটি বিস্তৃত সামাজিক প্রতিষ্ঠানে (Hovannisian, 1997)। তারা স্কুল পরিচালনা করত, স্থানীয় বিবাদ মীমাংসার জন্য বিকল্প আদালত বসাত এবং সাধারণ কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় তহবিল গঠন করত। একই সাথে তারা গড়ে তোলে একটি শক্তিশালী গোপন মিলিশিয়া বাহিনী। দশনাৎসুতীয়ুন বিশ্বাস করত যে, রাজনৈতিক কূটনীতি তখনই কাজ করবে যখন তার পেছনে থাকবে নিজস্ব সশস্ত্র শক্তি। এই দলটির উত্থান অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যের ভাগ্য ও আর্মেনীয় সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল।
ফেদায়ী আন্দোলন ও গ্রামীণ গেরিলা প্রতিরোধ (The Fedayi Movement and Rural Guerrilla Resistance)
রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক কাঠামোর সমান্তরালে পূর্ব আনাতোলিয়ার পাহাড়-পর্বতে জন্ম নেয় এক অনন্য সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন, যা ফেদায়ী আন্দোলন (Fedayi movement) নামে পরিচিত। আরবি শব্দ ‘ফিদা’ থেকে আসা ‘ফেদায়ী’ শব্দের অর্থ যারা আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত (Boyajian, 1972)। এই যোদ্ধারা ছিলেন মূলত সাধারণ কৃষক পরিবারের তরুণ, যারা স্থানীয় সামন্ত প্রভুদের অত্যাচার, জমি দখল এবং সরকারি বাহিনীর নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে পাহাড়ে গিয়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তারা আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের কৌশলে পারদর্শী ছিলেন এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিকে নিজেদের আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন।
ফেদায়ীদের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠোর ও বিপজ্জনক। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে চলাফেরা করতেন এবং দিনের বেলা বনে বা গুহায় লুকিয়ে থেকে রাতের অন্ধকারে অভিযান চালাতেন। তাদের মূল কাজ ছিল কোনো গ্রামে কুর্দি অশ্বারোহী বা ডাকাত দল আক্রমণ করলে সেখানে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অত্যাচারী সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া (Duguid, 1973)। সাধারণ গ্রামীণ মানুষের কাছে এই যোদ্ধারা ছিলেন বীরের প্রতীক। লোকগাথা, গান এবং কবিতার মাধ্যমে তাদের বীরত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরে ঘরে। ফেদায়ী নেতাদের মধ্যে সেরোব পাশা (Serob Pasha), কেভর্ক চাভুশ (Kevork Chavush), আরাবো (Arabo) এবং পরবর্তীকালে জাতীয় কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া আন্দ্রানিক ওজানিয়ান (Andranik Ozanian) ছিলেন অগ্রগণ্য।
ইতিহাসবিদ স্টিফেন ডুগুইড (Stephen Duguid) তার গবেষণায় ফেদায়ী আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক দিকটি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Duguid, 1973)। ফেদায়ীদের এই প্রতিরোধ সাধারণ কৃষকদের মনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ভীতি ও হীনম্মন্যতা দূর করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু একই সাথে এই গেরিলা যুদ্ধের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দিকও ছিল। পাহাড়ি এলাকায় ফেদায়ীদের কোনো একটি অতর্কিত হামলার পর সরকারি বাহিনী বা উপজাতীয় মিলিশিয়ারা ফেদায়ীদের ধরতে না পেরে নিকটবর্তী নিরস্ত্র গ্রামগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। ফলে অল্প কয়েকজন সশস্ত্র বিপ্লবীর তৎপরতার খেসারত দিতে হতো শত শত নিরীহ নারী ও শিশুকে। গেরিলা প্রতিরোধ ও গ্রামীণ সুরক্ষার এই ভারসাম্যহীনতা ফেদায়ী আন্দোলনকে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
অটোমান ব্যাংক দখল ও প্রত্যক্ষ আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ব্যর্থ প্রয়াস (The Seizure of the Ottoman Bank and the Failed Bid for Direct Intervention)
১৮৯৪-১৮৯৫ সালের হামিদীয় হত্যাকাণ্ডের পর যখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো আবারও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলো, তখন আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন একটি দুঃসাহসিক ও চরম পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের খাস দরবারে সরাসরি এক প্রবল ধাক্কা দেওয়া, যাতে তারা আর সাম্রাজ্যের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করতে না পারে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৮৯৬ সালের ২৬ আগস্ট দুপুরে পাপকেন সিউনি (Papken Siuni) এবং আর্মেন গারো (Armen Garo)-র নেতৃত্বে আঠাশ জন সশস্ত্র দশনাক সদস্য ইস্তাম্বুলের গ্যালাটায় অবস্থিত ইম্পেরিয়াল অটোমান ব্যাংক (Imperial Ottoman Bank) দখল করে নেয় (Zeidner, 2005)।
ব্যাংকটি ছিল মূলত ব্রিটিশ ও ফরাসি যৌথ পুঁজিতে পরিচালিত এবং এটি ছিল তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের আর্থিক হৃৎপিণ্ড। ব্যাংকের ভেতরে থাকা ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জিম্মি করে বিপ্লবীরা হুমকি দেয় যে, তাদের রাজনৈতিক দাবি মেনে না নেওয়া হলে এবং পূর্ব প্রদেশে অবিলম্বে ইউরোপীয় তদারকিতে সংস্কার কার্যকর না করা হলে তারা পুরো ব্যাংক ভবনটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেবে। প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টা ধরে চলা এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর রাশিয়ান দূতাবাসের প্রধান ড্রাগোম্যান বা দোভাষী ম্যাক্সিমভের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা হয় (Salt, 1993)। ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রতিনিধিদের আশ্বাসে বিপ্লবীরা বন্দিদের কোনো ক্ষতি না করে একটি ফরাসি জাহাজে করে নিরাপদ আশ্রয়ে শহর ত্যাগ করার সুযোগ পায়।
ইতিহাসবিদ জেরেমি সল্ট (Jeremy Salt) তার বইতে দেখিয়েছেন, এই ব্যাংক দখলের কৌশলগত উদ্দেশ্য পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল (Salt, 1993)। ইউরোপীয় শক্তিগুলো ক্ষণিকের জন্য নড়েচড়ে বসলেও অটোমান সরকারের ওপর কোনো কার্যকর সামরিক বা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। উল্টো এই ঘটনার তাৎক্ষণিক ও মারাত্মক পরিণতি নেমে আসে ইস্তাম্বুলের সাধারণ আর্মেনীয় নাগরিকদের ওপর। ব্যাংক দখলের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সরকারি মদদপুষ্ট সশস্ত্র জনতা শহরের রাস্তায় নেমে আসে। পরের তিন দিনে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের চোখের সামনে কেবল ইস্তাম্বুল শহরেই প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার নিরীহ আর্মেনীয়কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই ট্র্যাজেডি দেখিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া রাজনৈতিক হঠকারিতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনকেই চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
সাম্রাজ্যিক দমননীতি ও যৌথ শাস্তির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Imperial Repression and the Institutionalization of Collective Punishment)
রাজনৈতিক দল ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর উত্থানকে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সরকার সাম্রাজ্যের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে গ্রহণ করে। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর, সর্বব্যাপী এবং পদ্ধতিগত। অটোমান প্রশাসন প্রতিটি আর্মেনীয় নাগরিককে সম্ভাব্য বিদ্রোহী হিসেবে সন্দেহ করতে শুরু করে। সাম্রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সামান্যতম রাজনৈতিক কার্যকলাপের আভাস পেলেই কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। সংবাদপত্রগুলোর ওপর জারি করা হয় নজিরবিহীন সেন্সরশিপ; এমনকি আর্মেনিয়া শব্দটি মুদ্রণ করাও রাষ্ট্রীয় আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় (Gidney, 1967)।
এই দমননীতির সবচেয়ে বিধ্বংসী দিক ছিল যৌথ শাস্তি (collective punishment)-র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সরকার কোনো নির্দিষ্ট অপরাধীকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার চিরাচরিত পদ্ধতির বদলে সমগ্র গ্রাম বা সম্প্রদায়কে শাস্তি দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে (Pamboukian, 2003)। কোনো একটি পাহাড়ি অঞ্চলে ফেদায়ীদের সাথে সরকারি বাহিনীর সামান্য সংঘর্ষ হলেই আশেপাশের দশটি নিরস্ত্র গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। খ্রিষ্টান প্রজাদের ঘরবাড়ি তল্লাশি করে যেকোনো ধরনের ছুরি বা লোহার সরঞ্জাম পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করা হতো, অথচ একই সাথে মুসলিম উপজাতিদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা অব্যাহত ছিল। এর মাধ্যমে পুরো একটি সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্রীকরণ করে তাদের আত্মরক্ষার শেষ সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়।
ইতিহাসবিদ জেমস গিডনি (James Gidney) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, উনিশ শতকের শেষ ভাগে সাম্রাজ্যিক এই দমননীতি সমাজের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিটি পুরোপুরি নষ্ট করে দেয় (Gidney, 1967)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে প্রতিবেশীরা পাশাপাশি বাস করে আসছিল, তাদের মধ্যে কৃত্রিমভাবে গভীর অবিশ্বাস ও শত্রুতার দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, আর্মেনীয়রা বিদেশি শক্তির সহায়তায় মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করতে চায়। এই রাষ্ট্রীয় ভীতি প্রদর্শন ও যৌথ শাস্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি বিশ শতকের শুরুতে ঘটে যাওয়া আরও বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের আদর্শিক ও মানসিক ভিত্তি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে দিয়েছিল।
হামিদীয় ও আদানা হত্যাকাণ্ড (Hamidian and Adana Massacres): গণসহিংসতার পূর্বসূত্র
১৮৯৪ সালের সাসুন প্রতিরোধ ও প্রাথমিক সংঘাত (The Sasun Resistance of 1894 and Initial Clashes)
পূর্ব আনাতোলিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল সাসুনে সহিংসতার যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পাহাড়ি জনপদের আর্মেনীয় কৃষকদের নিজস্ব নিয়মে বেঁচে থাকার ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে তারা এক অসহনীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়ে। একদিকে সরকারের নিয়মিত করের দাবি, অন্যদিকে স্থানীয় কুর্দি গোত্রপতিদের জোরপূর্বক তোলা আদায় – এই দ্বৈত কর ব্যবস্থার চাপে কৃষকদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। ১৮৯৩ সালে যখন নতুন করে কর পরিশোধে অস্বীকৃতি জানানো হয়, তখন বিষয়টি আর কেবল অর্থনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা দ্রুত রূপ নেয় এক রাজনৈতিক সংঘাতে (Astourian, 2011)।
এই প্রতিবাদের নেতৃত্বে ছিলেন হুঞ্চাক নেতা হাম্পারৎসুম বোয়াডজিয়ান (Hampartsoum Boyadjian), যিনি মুরাদ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি স্থানীয় গ্রামবাসীদের সংগঠিত করেন এবং ঘোষণা দেন যে, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো বেআইনি কর দেওয়া হবে না। সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সরকার এই অবাধ্যতাকে সরাসরি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যা দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো হয় চতুর্থ আর্মি কোরের প্রধান জেকি পাশা (Zeki Pasha)-কে। নিয়মিত সেনাবহিনীর পাশাপাশি সদ্য গঠিত হামিদিয়া অশ্বারোহী বাহিনীকে পুরো সাসুন অঞ্চল ঘিরে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় (Bliss, 1896)। ১৮৯৪ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয় বড় ধরনের সামরিক অভিযান।
পাহাড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিরোধ চললেও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর সামনে গ্রামবাসী বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি। শেনিক, সেমাল এবং গেলিয়েগুজান গ্রামগুলো একের পর এক দখল করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সেনাসদস্যরা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালায়। ইতিহাসবিদ এডউইন ব্লিস (Edwin Bliss) তার সমকালীন নথিতে উল্লেখ করেছেন যে, সাসুনের এই অভিযানে প্রায় তিন থেকে চার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল (Bliss, 1896)। জেকি পাশাকে পরবর্তীতে সুলতানের পক্ষ থেকে বিশেষ সামরিক পদকে ভূষিত করা হয়, যা স্পষ্টভাবে দেখায় যে এই রক্তপাত সরকারের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের পূর্ণ অনুমোদনেই ঘটেছিল। জার্মান প্রাচ্যবিদ ইয়োহানেস লেপসিউস (Johannes Lepsius) তার বিশদ প্রতিবেদনে তুলে ধরেন যে, সাসুনের এই সহিংসতাই ছিল পরবর্তী দেশব্যাপী বড় ধরনের নিধনযজ্ঞের পরীক্ষামূলক সূচনা (Lepsius, 1897)।
১৮৯৫-১৮৯৬ সালের দেশব্যাপী হামিদীয় গণহত্যা (The Nationwide Hamidian Massacres of 1895–1896)
সাসুনের ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো – বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া – সুলতান সরকারের ওপর তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। ১৮৯৫ সালের মে মাসে তারা একটি বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাব পেশ করে। সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ কালক্ষেপণ করে অবশেষে ১৮৯৫ সালের অক্টোবরে নামমাত্র এই সংস্কার প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু কাগজে সই করার সাথে সাথেই এক উল্টো প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ইস্তাম্বুল থেকে শুরু করে আনাতোলিয়ার শহরগুলোতে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, ইউরোপীয়দের চাপে খ্রিস্টানদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং এর ফলে মুসলিম আধিপত্য চিরতরে শেষ হয়ে যাবে (Georgeon, 2003)। এই পরিকল্পিত ভীতি তৈরি করার পর শুরু হয় এক নজিরবিহীন দেশব্যাপী সহিংসতা।
১৮৯৫ সালের অক্টোবর থেকে ১৮৯৬ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত আনাতোলিয়ার প্রায় প্রতিটি বড় শহরে একই ধাঁচের হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ট্রাবজোন, এরজুরুম, দিয়ারবেকির, হারপুত, বিটলিস, মারাশ এবং সিভাসে শুক্রবারের জুমার নামাজের পর স্থানীয় জনতা ও হামিদিয়া মিলিশিয়ারা আর্মেনীয় পাড়াগুলোতে হামলা চালাত। এসব হামলায় একটি নিখুঁত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট ছিল; ঘণ্টা বাজিয়ে বা শিঙা ফুঁকে আক্রমণ শুরু হতো এবং নির্দিষ্ট সময় পর সরকারি হুইসেলের মাধ্যমে আবার তা থামিয়ে দেওয়া হতো (Greene, 1896)। এই নিধনযজ্ঞের অন্যতম ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায় উরফা শহরে। ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় তিন হাজার আর্মেনীয় যখন নিরাপত্তার জন্য ঐতিহাসিক উরফা ক্যাথেড্রাল (Urfa Cathedral)-এ আশ্রয় নিয়েছিল, তখন সরকারি মদদপুষ্ট জনতা গির্জার দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। গির্জার ভেতরে থাকা হাজার হাজার মানুষ জীবন্ত পুড়ে মারা যায়।
ইতিহাসবিদ ফ্রঁসোয়া জর্জোঁ (François Georgeon) সুলতান আব্দুল হামিদের শাসনকাল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো আঞ্চলিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি ছিল না, বরং তা ছিল কেন্দ্র থেকে পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা (Georgeon, 2003)। উদ্দেশ্য ছিল আর্মেনীয়দের জনসংখ্যাগতভাবে দুর্বল করে দেওয়া এবং তাদের রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিকে চিরতরে স্তব্ধ করা। জেমস রেনডেল হ্যারিস এবং হেলেন হ্যারিসের প্রত্যক্ষ বিবরণী থেকে জানা যায়, এই দুই বছরে প্রায় এক থেকে তিন লাখ আর্মেনীয়কে হত্যা করা হয় এবং লক্ষাধিক মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখারিতে পরিণত হয় (Harris & Harris, 1897)। এই নিধনযজ্ঞ ইতিহাসে হামিদীয় হত্যাকাণ্ড (Hamidian massacres) নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শী দলিল, পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া ও ‘রেড সুলতান’ বয়ান (Eyewitness Accounts, Western Reactions and the ‘Red Sultan’ Narrative)
১৮৯৫-১৮৯৬ সালের নিধনযজ্ঞের খবর কিন্তু চাপা থাকেনি। আনাতোলিয়ায় কর্মরত পশ্চিমা কূটনীতিক, ত্রাণকর্মী এবং আমেরিকান মিশনারিদের মাধ্যমে রক্তপাতের বিস্তারিত তথ্য দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শহরে নিযুক্ত কনসালরা তাদের সরকারের কাছে নিয়মিত গোপন ও প্রকাশ্য বার্তা পাঠাতে থাকেন। ব্রিটিশ কূটনীতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ব্রাইস (James Bryce) ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এবং জনসমক্ষে অটোমান সরকারের এই দমননীতির কঠোর সমালোচনা করেন (Bryce, 1896)। তিনি তার প্রকাশিত নথিপত্রে তুলে ধরেন যে, রাষ্ট্র নিজেই কীভাবে তার বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধে লিপ্ত হয়েছে। মিশনারি বিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলো তখন হাজার হাজার আহত ও অনাথ শিশুর আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। ফরাসি ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ আলবার্ট ভ্যান্ডাল তাকে প্রথম ‘লে সুলতান রুজ’ বা ‘রেড সুলতান’ (The Red Sultan) নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ রক্তপিপাসু সুলতান (Balakian, 2003)। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোন (William Gladstone) অবসরে থেকেও এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে জনসভায় ভাষণ দেন এবং সুলতানকে ‘গ্রেট অ্যাসাসিন’ (The Great Assassin) বা মহা-হত্যাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলোতে আনাতোলিয়ার মানুষের সহায়তার জন্য তহবিল গঠনের ডাক দেওয়া হয় এবং আমেরিকান রেড ক্রস প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক মানবিক মিশনে অংশ নিয়ে আনাতোলিয়ায় ত্রাণ পাঠায়।
তবে প্রবল জনমত সত্ত্বেও ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর সরকার কোনো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের মধ্যকার সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এবং ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতি সুলতানকে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে দেয়নি (Hepworth, 1898)। অটোমান সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক ভাঙন শুরু হলে কার ভাগে কী পড়বে – এই ভূরাজনৈতিক সন্দেহের কারণে ব্রিটেন, রাশিয়া বা জার্মানি কেউ একতরফা হস্তক্ষেপ করতে রাজি হয়নি। আমেরিকান পরিদর্শক জর্জ হেপওয়ার্থ (George Hepworth) সে সময় আনাতোলিয়া ভ্রমণ করে লক্ষ্য করেছিলেন যে, পশ্চিমা শক্তির এই নিষ্ক্রিয়তা সুলতান সরকারকে কার্যত এক ধরনের রাজনৈতিক দায়মুক্তি দিয়েছিল (Hepworth, 1898)। আন্তর্জাতিক মহলের এই নীরবতা ও পদক্ষেপহীনতা অটোমান শাসকগোষ্ঠীকে এই বার্তা দেয় যে, অভ্যন্তরীণ দমননীতি চালালেও বহির্বিশ্ব শেষ পর্যন্ত বড় কোনো সামরিক বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, নারীর ওপর সহিংসতা ও সামাজিক ক্ষত (Forced Conversions, Violence Against Women and Social Scars)
হামিদীয় হত্যাকাণ্ডের একটি বড় ও সুদূরপ্রসারী দিক ছিল জনসংখ্যার ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক ও ধর্মীয় রূপান্তর। কেবল সরাসরি হত্যা করেই অভিযান শেষ হয়নি; বরং বহু অঞ্চলে বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ধর্ম পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা। দিয়ারবেকির, ভ্যান এবং ট্রাবজোনের শত শত গ্রামে পুরো সম্প্রদায়কে সমবেত করে তাদের পূর্বপুরুষের বিশ্বাস ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল (Gaunt, 2006)। যারা প্রকাশ্যে অস্বীকৃতি জানাত, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করা হতো। এর ফলে বহু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে লোকদেখানো ধর্মান্তরিত হয়েছিল, যাদের পরবর্তীতে সমাজে পরিচিতি দেওয়া হতো গোপন বা ক্রিপ্টো-খ্রিস্টান হিসেবে।
নারীদের ওপর চালানো সহিংসতা ছিল এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে অন্ধকার দিক। হাজার হাজার নারীকে অপহরণ করে স্থানীয় গোত্রপতি ও সাধারণ মানুষের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াটি কোনো সাধারণ ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি সামাজিক গোষ্ঠীর ধারাবাহিকতা ধ্বংস করার সুপরিকল্পিত অস্ত্র (Kieser, 2018)। বহু কমবয়সী মেয়ে ও শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে মুসলিম পরিবারগুলোতে জোরপূর্বক আত্তীকরণ করা হয়। এর ফলে একটি প্রজন্মের হাজার হাজার শিশুর পারিবারিক পরিচয় চিরতরে হারিয়ে যায়। পরিবারগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে এবং গ্রামীণ সমাজের চিরাচরিত রক্তের বন্ধনটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
ইতিহাসবিদ ডেভিড গান্ট (David Gaunt) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই সামাজিক রূপান্তরের ক্ষত পরবর্তী কয়েক দশকেও শুকায়নি (Gaunt, 2006)। হত্যাকাণ্ডের পর যখন কিছু মিশনারি ও চার্চ সংগঠন অপহৃত নারীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়, তখন দেখা যায় বহু নারী সামাজিক লজ্জা এবং পারিবারিক অনমনীয়তার কারণে আর ফিরতে পারেননি। আবার অনেকে নতুন পরিবারের ভেতর নিজেদের পরিচয় পুরোপুরি গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। শত শত চার্চ ও মঠকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছিল অথবা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এই সহিংসতা কেবল মানুষের শরীরেই আঘাত করেনি, তা পুরো একটি প্রাচীন সমাজের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তিকেও গভীরভাবে আহত করেছিল।
১৯০৯ সালের আদানা হত্যাকাণ্ড ও সাংবিধানিক বিভ্রমের অবসান (The 1909 Adana Massacre and the Shattering of Constitutional Illusions)
১৯০৮ সালে তরুণ তুর্কিদের নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লব পুরো সাম্রাজ্যে এক অভূতপূর্ব আনন্দের পরিবেশ তৈরি করেছিল। সুলতান আব্দুল হামিদের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে যখন ১৮৭৬ সালের সংবিধান পুনর্বহাল করা হলো, তখন স্লোগান উঠেছিল – “স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচার”। আর্মেনীয় ও তুর্কিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রাজপথে উৎসব করেছিল। আর্মেনীয় রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্বাস করেছিল যে, এবার হয়তো একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক অটোমান রাষ্ট্রের ভেতরে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু এই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। ঠিক নয় মাসের মাথায়, ১৯০৯ সালের এপ্রিলে, সিলিসিয়ার প্রবেশদ্বার আদানা শহরে নেমে আসে এক চরম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় (Bayraktar, 2010)।
আদানার হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করছিল অর্থনৈতিক ঈর্ষা ও রাজনৈতিক জটিলতার এক বিষাক্ত সংমিশ্রণ। তুলা চাষ ও বাণিজ্যের কারণে সিলিসিয়া অঞ্চলটি ছিল অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ, যেখানে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও বাণিজ্যে আর্মেনীয় মধ্যবিত্তরা এগিয়ে ছিল (Eby, 1979)। সংবিধান পুনর্বহালের পর আর্মেনীয়রা যখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অধিকার চর্চা শুরু করল এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে গেল, তখন স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও মুসলিম ভূস্বামীরা একে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক আধিপত্যের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখল। ১৯০৯ সালের এপ্রিলে ইস্তাম্বুলে সুলতানের সমর্থকদের এক ব্যর্থ পাল্টা অভ্যুত্থানের সুযোগে আদানায় গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, আর্মেনীয়রা একটি পৃথক রাজ্য গঠনের জন্য সশস্ত্র বিদ্রোহ করতে যাচ্ছে।
১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই তাণ্ডব দুই দফায় চলেছিল। প্রথম দফায় স্থানীয় জনতা আর্মেনীয়দের ওপর হামলা চালায়, আর দ্বিতীয় দফায় পরিস্থিতি শান্ত করতে ইস্তাম্বুল ও মেসিডোনিয়া থেকে আসা সরকারি সেনারাই সরাসরি এই নিধনযজ্ঞে যোগ দেয় (Bayraktar, 2010)। পুরো আদানা শহরকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল; পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল শত শত দোকান, গির্জা এবং আবাসিক এলাকা। কেবল আদানা ও এর আশেপাশের তারসুস ও মারসিন শহরেই মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার নিরপরাধ আর্মেনীয়কে হত্যা করা হয়। ইতিহাসবিদ বব এবারহার্ট এবি (Bob Eberhardt Eby) উল্লেখ করেছেন যে, আদানার ঘটনা আর্মেনীয় সমাজের সব সাংবিধানিক বিভ্রম এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল (Eby, 1979)। এটা দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ইস্তাম্বুলের ক্ষমতার মসনদে যেই বসুক না কেন – রক্ষণশীল সুলতান হোক বা আধুনিক তরুণ তুর্কি – প্রাদেশিক স্তরে কাঠামোগত জাতিগত সহিংসতার ছকটি একই রয়ে গেছে।
১৯১৫ সালের মহাবিপর্যয়ের কাঠামোগত মহড়া (A Structural Rehearsal for the Catastrophe of 1915)
হামিদীয় হত্যাকাণ্ড এবং আদানার এই রক্তপাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল না। এগুলো ছিল মূলত ১৯১৫ সালের পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসযজ্ঞের এক ধারাবাহিক প্রস্তুতিমূলক রূপরেখা। এই প্রাথমিক গণহত্যাগুলোর মধ্য দিয়েই অটোমান রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজ প্রথমবারের মতো বড় আকারের জনসংখ্যাগত প্রকৌশলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেছিল (Astourian, 2011)। ১৮৯৪ থেকে ১৯০৯ সালের ঘটনাবলী প্রমাণ করেছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকারের সামান্য মদদ ও প্ররোচনায় সমাজের একটি বড় অংশকে তাদেরই প্রতিবেশী অন্য একটি অংশের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে গণসহিংসতা চালালে তার কোনো আইনি বা রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো শক্তি দেশের ভেতরে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনুপস্থিত।
আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই দুটি ঘটনা ভবিষ্যতের এক বিপজ্জনক পথ তৈরি করে দিয়েছিল। আর্মেনীয়দের হত্যা করার পর তাদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি, চাষের জমি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো শাস্তির মুখোমুখি না হয়েই দখল করে নিয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এক নতুন সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, যাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই ছিল এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি (Arnold Toynbee) প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন তার প্রামাণ্য নথিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, হামিদীয় আমলের অসমাপ্ত কাজকেই তরুণ তুর্কিরা আরও বৈজ্ঞানিক ও আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ১৯১৫ সালে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছিল (Toynbee, 1915)।
সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা তাই ১৮৯৪-১৮৯৬ এবং ১৯০৯ সালের ঘটনাগুলোকে ১৯১৫ সালের মহাবিপর্যয়ের কাঠামোগত মহড়া (structural rehearsal) হিসেবে চিহ্নিত করেন। হামিদীয় যুগে নিধনের কৌশলটি ছিল শৃঙ্খলা রক্ষার নামে পরিচালিত সামন্ততান্ত্রিক সহিংসতা, আর আদানার সময় তাতে যুক্ত হয়েছিল জাতীয়তাবাদী ও অর্থনৈতিক ঈর্ষা। এই দুই অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকারের আড়ালে পুরো একটি জাতিকে ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চরম পরিকল্পনাটি কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল। অতীতের বিচারহীনতাই ভবিষ্যতের আরও বড় অপরাধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়েছিল।
ইয়াং তুর্ক বা তরুণ তুর্কি শাসন ও গণহত্যার পথে (Young Turk Rule and the Road to Genocide): যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও জনসংখ্যাগত রাজনীতি
ইয়াং তুর্ক বিপ্লব ও কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস (Young Turk Revolution and the CUP): সাংবিধানিকতা থেকে কর্তৃত্ববাদ
১৯০৮ সালের বিপ্লব ও সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পুনর্জাগরণ (The Revolution of 1908 and Revival of Constitutional Monarchy)
১৯০৮ সালের জুলাই মাসে মেসিডোনিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে অটোমান সেনাবাহিনীর একদল তরুণ অফিসারের বিদ্রোহ পুরো সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্রকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। এদের নেতৃত্বে ছিলেন আহমেদ নিয়াজি (Ahmed Niyazi) এবং ইসমাইল এনোভার (Ismail Enver)। তারা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের তিন দশকের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। মেসিডোনিয়ার বিভিন্ন শহরে সেনা ইউনিটগুলো সংবিধান পুনর্বহালের দাবিতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সুলতানের পক্ষে এই সামরিক বিদ্রোহ দমন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ তার নিজস্ব অনুগত বাহিনীও বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়েছিল। ফলে ২৪ জুলাই ১৯০৮ সালে সুলতান বাধ্য হয়ে ১৮৭৬ সালের স্থগিত থাকা অটোমান সংবিধান (Kanun-ı Esasî) পুনর্বহাল করেন (Ahmad, 1969)।
সংবিধান পুনর্বহালের ঘোষণার সাথে সাথে সাম্রাজ্যের রাজপথে নেমে আসে উৎসবের বন্যা। ইস্তাম্বুল, থেসালোনিকি, স্মার্না এবং ভ্যানের রাস্তায় তুর্কি, আর্মেনীয়, গ্রিক, ইহুদি ও আরব নাগরিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিল বের করে। স্লোগান উঠেছিল ফরাসি বিপ্লবের আদলে – ‘হুররিয়েত, মুসাভাত, আদালেত, উহুভভেত’ বা “স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্ব”। যে আর্মেনীয় বিপ্লবী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বা প্রবাসে থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে আসছিল, তারাও এই বিপ্লবকে স্বাগত জানায়। বিশেষ করে আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন (Armenian Revolutionary Federation) তরুণ তুর্কিদের মূল রাজনৈতিক সংগঠন কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস (Committee of Union and Progress – CUP)-এর সাথে সরাসরি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছায় (Kansu, 1997)। তারা বিশ্বাস করেছিল যে, একটি আধুনিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভেতরেই অমুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার এবং স্বশাসনের দাবি সুরক্ষিত হবে।
ইতিহাসবিদ আইকুত কানসু (Aykut Kansu) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, এই বিপ্লব ছিল সাম্রাজ্যের পুরনো সামন্ততান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক অভিজাতদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে একটি নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে ন্যস্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ (Kansu, 1997)। এর মাধ্যমে দীর্ঘকাল পর অনুষ্ঠিত হয় বহুদলীয় সাধারণ নির্বাচন। অটোমান পার্লামেন্টে আর্মেনীয় প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসেন এবং তারা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে শুরু করেন। সংবাদপত্রের ওপর থেকে সেন্সরশিপ তুলে নেওয়া হয় এবং জনপরিসরে রাজনৈতিক বিতর্ক এক নতুন মাত্রা পায়। তবে এই উন্মাদনার আড়ালে একটি গভীর দ্বন্দ্ব লুকিয়ে ছিল। সিইউপি নেতৃত্ব চেয়েছিল সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পুনর্গঠন, আর অমুসলিম দলগুলো চেয়েছিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও নাগরিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এই মতাদর্শিক সংঘাত খুব দ্রুত বিপ্লবের প্রাথমিক স্বপ্নকে ফিকে করে তুলতে শুরু করে।
কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেসের আদর্শিক বিবর্তন ও সামাজিক ডারউইনবাদ (Ideological Evolution of the CUP and Social Darwinism)
সিইউপি বা তরুণ তুর্কি দলটির জন্ম হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ দিকে ইস্তাম্বুলের মিলিটারি মেডিকেল স্কুলের একদল তরুণের হাত ধরে। তাদের এই রাজনৈতিক দলটির আদর্শ কোনো একক উৎসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক ইউরোপীয় দর্শন ও স্থানীয় সংকটের এক জটিল সংমিশ্রণ। সংগঠনের শুরুর দিকের তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন আহমেদ রেজা (Ahmed Rıza), যিনি অগাস্ট কোঁতের পজিটিভিজম বা প্রত্যক্ষবাদ বা দৃষ্টিবাদ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন (Hanioğlu, 2001)। তাদের মূল স্লোগান ছিল ‘শৃঙ্খলাই প্রগতি’। তারা সমাজকে দেখতেন একটি জৈবিক দেহের মতো, যেখানে রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল সর্বোচ্চ লক্ষ্য। ব্যক্তি অধিকার বা ধর্মীয় অনুভূতির চেয়ে তাদের কাছে রাষ্ট্রের আধুনিকীকরণ ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল।
সংগঠনটির চিন্তাধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে যখন তাদের ওপর সামাজিক ডারউইনবাদ (Social Darwinism) এবং ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ ল্য বঁ-র মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের প্রভাব পড়ে (Hanioğlu, 2001)। তরুণ তুর্কি বুদ্ধিজীবীরা বিশ্ব ইতিহাসকে দেখতেন বিভিন্ন জাতির মধ্যকার এক নিরন্তর অস্তিত্বের সংগ্রাম হিসেবে। তাদের দৃষ্টিতে জাতিগুলো ছিল পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী জীবসত্তা; যার মধ্যে কেবল সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংগঠিত জাতিই টিকে থাকবে, আর দুর্বল জাতিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ইতিহাসবিদ শুকরু হানিওগ্লু (M. Şükrü Hanioğlu) সিইউপি-র গোপন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এই নেতৃত্ব নিজেদেরকে তুর্কি জাতির অস্তিত্বের রক্ষক হিসেবে ভাবত (Hanioğlu, 2001)। তারা বিশ্বাস করত, অটোমান সাম্রাজ্য যদি টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও পরজীবী উপাদান থেকে মুক্ত হতে হবে।
দলের ভেতরে মতাদর্শিক দিক থেকে দুটি ভিন্ন ধারা কাজ করছিল। একপক্ষে ছিলেন প্রিন্স সাবাহাদ্দিন (Prince Sabahaddin)-এর অনুসারীরা, যারা বিকেন্দ্রীকরণ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পক্ষে ছিলেন। অন্যপক্ষে ছিল সিইউপি-র মূল কেন্দ্রীয় কমিটি, যারা কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কাঠামোর পক্ষপাতী ছিল। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকামী দলটিই জয়ী হয়। তারা ধর্মীয় পরিচয়কে আধ্যাত্মিক বিশ্বাস হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক সংহতি তৈরির একটি কার্যকর সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করত। এই বস্তুবাদী ও কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা সাম্রাজ্যের বহুত্ববাদী চরিত্রকে এক ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা বলে মনে করতে শুরু করে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, বৈচিত্র্য নয়, বরং জাতীয় সমসত্ত্বতাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে পারে।
১৯০৯ সালের প্রতি-বিপ্লব ও রাজনৈতিক আধিপত্য সংহতকরণ (The Counter-Coup of 1909 and Consolidation of Political Hegemony)
বিপ্লবের মাধ্যমে সাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু হলেও তা সমাজের রক্ষণশীল ও সুবিধাভোগী অংশ সহজে মেনে নেয়নি। ১৯০৯ সালের ১৩ এপ্রিল (তৎকালীন রুমি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩১ মার্চ) ইস্তাম্বুলে এক বিশাল সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যা ইতিহাসে ৩১ মার্চের ঘটনা (31 March Incident) নামে পরিচিত (Ahmad, 1993)। প্রথম আর্মি কোরের সাধারণ সৈনিকরা তাদের তরুণ অফিসারদের বন্দি করে এবং শরিয়াহ আইন পুনর্বহাল ও সংবিধান বাতিলের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। তাদের সাথে যোগ দেয় রক্ষণশীল আলেম সমাজ এবং পদচ্যুত আমলাতন্ত্রের একাংশ। তারা সংসদ ভবন ঘেরাও করে এবং সিইউপি-র বহু সদস্যকে হত্যা করে। পরিস্থিতি এতই নাজুক হয়ে পড়েছিল যে তরুণ তুর্কি নেতৃত্বকে সাময়িকভাবে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।
এই প্রতি-বিপ্লবের জবাবে থেসালোনিকি থেকে দ্রুত গঠিত হয় এক বিশেষ সামরিক বাহিনী, যার নাম দেওয়া হয়েছিল অ্যাকশন আর্মি (Action Army – Hareket Ordusu) (Sohrabi, 2011)। মাহমুদ শেভকেত পাশা (Mahmud Shevket Pasha)-র নেতৃত্বে এই বাহিনী ইস্তাম্বুলের দিকে অগ্রসর হয় এবং তীব্র লড়াইয়ের পর বিদ্রোহ দমন করে রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়। এই সামরিক সাফল্যের পর সিইউপি নেতৃত্ব আর কোনো দ্বিধা রাখেনি। ২৭ এপ্রিল ১৯০৯ সালে জাতীয় সংসদ এক বিশেষ অধিবেশনে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদকে সিংহাসনচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার জায়গায় নামমাত্র ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে সিংহাসনে বসানো হয় তার দুর্বল ভাই পঞ্চম মেহমেদ রশাদ (Mehmed V Reshad)-কে, যার ফলে সাম্রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় তরুণ তুর্কি দলের প্রভাবশালী নেতৃত্বের হাতে।
ইতিহাসবিদ নাদের সোহরাবি (Nader Sohrabi) তার তুলনামূলক বিপ্লব বিষয়ক গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ১৯০৯ সালের এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাটি সিইউপি-কে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের পথ থেকে একনায়কতান্ত্রিক আধিপত্যের দিকে ঠেলে দেয় (Sohrabi, 2011)। সরকার ইস্তাম্বুল জুড়ে জরুরি অবস্থা ও সামরিক আইন জারি করে। বিরোধী সংবাদপত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকলাপ কঠোরভাবে সীমিত করা হয় এবং ধর্মঘট ও শ্রমিক ইউনিয়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়। প্রতি-বিপ্লবের এই অভিজ্ঞতার পর সিইউপি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, আপস বা উদারনৈতিক গণতন্ত্র দিয়ে এই বিশৃঙ্খল সাম্রাজ্য পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে তারা রাষ্ট্রের পুলিশি ও গোয়েন্দা কাঠামোকে নিজেদের দলীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে এককেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে।
অটোমানবাদ থেকে তুর্কি জাতীয়তাবাদের দিকে রূপান্তর (Transition from Ottomanism to Turkish Nationalism)
সাংবিধানিক শাসনের প্রাথমিক দিনগুলোতে সিইউপি যে সর্বজনীন অটোমানবাদ (Ottomanism)-এর কথা বলেছিল, তা ছিল মূলত সব জাতিকে একসাথে ধরে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু একের পর এক সাম্রাজ্যিক সংকট এই কৌশলের অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট করে তোলে। অমুসলিম জাতিগুলো – যেমন আলবেনিয়ান, গ্রিক ও আরবদের রাজনৈতিক তৎপরতা – সিইউপি নেতাদের এই বার্তা দেয় যে, কেবল নাগরিক সমতার কথা বলে এই বিশাল ভূখণ্ডের বিভাজন ঠেকানো যাবে না। ফলে দলের নীতিনির্ধারকরা এক নতুন মতাদর্শের সন্ধানে নামেন, যার নাম ছিল তুর্কি জাতীয়তাবাদ (Turkish Nationalism) বা তুর্কিবাদ (Gökalp, 1959)।
এই নতুন মতাদর্শের প্রধান সমাজতাত্ত্বিক রূপকার ছিলেন জিয়া গোকাল্প (Ziya Gökalp)। তিনি ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের তত্ত্বের আলোকে তুর্কি সমাজের পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা তৈরি করেন (Gökalp, 1959)। গোকাল্প যুক্তি দেন যে, একটি টেকসই রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক ঐক্য। তিনি ভাষা, ইতিহাস এবং লোকজ সংস্কৃতির তুর্কিকরণের ডাক দেন। এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘তুর্ক ওজাগি’ (Türk Ocağı) বা তুর্কি কেন্দ্র এবং প্রকাশ পেতে থাকে তুর্ক ইউরদু (Türk Yurdu)-র মতো প্রভাবশালী সাময়িকী। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে আনাতোলিয়াকে একটি একক তুর্কি ভূখণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে।
ইতিহাসবিদ হাসান কায়ালি (Hasan Kayalı) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই রূপান্তরটি কোনো রাতারাতি ঘটা পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল সাম্রাজ্যের ভাঙনের মুখে এক চরম প্রতিক্রিয়া (Kayalı, 1997)। অমুসলিম জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা আর্মেনীয়দের আর সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছিল না। তাদের বিবেচনা করা হতে থাকে তুর্কি জাতির বিকাশের পথে এক বড় প্রতিবন্ধক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে অ-আত্মীকরণযোগ্য উপাদান হিসেবে। এর ফলে সিইউপি-র রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রকাশ্যেই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি জায়গা করে নেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তুর্কি ভাষা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং স্থানীয় প্রশাসনে অমুসলিমদের প্রভাব কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই ভাবাদর্শিক পরিবর্তনই পরবর্তীতে আনাতোলিয়াকে জোরপূর্বক সমজাতীয় জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তরের তাত্ত্বিক বৈধতা তৈরি করেছিল।
১৯১৩ সালের বাব-ই আলী অভ্যুত্থান ও ত্রয়ী একনায়কতন্ত্র (The 1913 Raid on the Sublime Porte and the Triumvirate Dictatorship)
১৯১২ সালের বলকান যুদ্ধে অটোমান সেনাবাহিনীর বিপর্যয় সিইউপি-র ভেতরের উগ্রপন্থী অংশকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেয়। তখন ক্ষমতায় ছিল সিইউপি বিরোধী উদারপন্থী জোট লিবারেল ইউনিয়ন (Liberal Union)। গ্র্যান্ড উজির কামিল পাশার মন্ত্রিসভা যখন বলকান মিত্রদের কাছে ঐতিহাসিক এদির্নে শহর ছেড়ে দিয়ে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন তরুণ তুর্কিদের চরমপন্থী অংশ এই সুযোগটি লুফে নেয়। ২৩ জানুয়ারি ১৯১৩ সালে এনোভার বের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র অফিসার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা বাব-ই আলী (Sublime Porte)-তে এক রক্তক্ষয়ী আক্রমণ চালায় (Turfan, 2000)।
এই আকস্মিক অভিযানে তৎকালীন যুদ্ধমন্ত্রী নাজিম পাশা (Nazım Pasha)-কে রাজপ্রাসাদের করিডোরেই সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়। এনোভার পাশা স্বয়ং পিস্তল উঁচিয়ে গ্র্যান্ড উজির কামিল পাশাকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করেন (Akmeşe, 2005)। এই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যের সাংবিধানিক ও সংসদীয় রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি চলে যায় একটি গোপন দলীয় ক্যাবালের হাতে। আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভা থাকলেও সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলে যায় তিনজন ব্যক্তির হাতে, যারা ইতিহাসে পরিচিত হন ‘তিন পাশা’ (Three Pashas) বা ত্রয়ী একনায়কতন্ত্র হিসেবে।
এই ত্রয়ী ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেহমেদ তালাত পাশা (Mehmed Talaat Pasha), যুদ্ধমন্ত্রী ইসমাইল এনোভার পাশা (Ismail Enver Pasha) এবং নৌমন্ত্রী ও সিরিয়ার সামরিক গভর্নর আহমেদ জামাল পাশা (Ahmed Djemal Pasha) (Turfan, 2000)। এদের মধ্যে তালাত পাশা ছিলেন দলের মূল রাজনৈতিক মস্তিষ্ক ও প্রশাসনিক চালিকাশক্তি, আর এনোভার পাশা ছিলেন সামরিক বাহিনীর সর্বময় কর্তা। ইতিহাসবিদ হেন্দা আকমেসে (Handan Nezir Akmeşe) দেখিয়েছেন যে, বাব-ই আলী অভ্যুত্থানের পর অটোমান শাসনব্যবস্থা কার্যত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদী ধাঁচের সামরিক একনায়কতন্ত্রে রূপ নিয়েছিল (Akmeşe, 2005)। আইনসভা বা আদালতের কোনো ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না। সিইউপি কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পুরো রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে, যা পরবর্তীকালের সব ধরনের চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজ ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে।
সাম্রাজ্যের সীমান্তসংকট ও জাতীয় নিরাপত্তার নামে কর্তৃত্ববাদ (Imperial Border Crises and Authoritarianism in the Name of National Security)
১৯১১ সালে লিবিয়ায় ইতালি কর্তৃক আক্রমণ এবং ১৯১২-১৯১৩ সালের বলকান যুদ্ধ সাম্রাজ্যের সীমানাকে নাটকীয়ভাবে সংকুচিত করে এনেছিল। বিশেষ করে ইউরোপের প্রায় সব ভূখণ্ড হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর ইস্তাম্বুল খোদ ফ্রন্টলাইনের শহরে পরিণত হয়েছিল। এই ভূরাজনৈতিক পরাজয় সিইউপি নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও স্থায়ী অবরুদ্ধ মানসিকতা তৈরি করে (Reynolds, 2011)। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অটোমান সাম্রাজ্যকে পুরোপুরি মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে চায় এবং দেশের ভেতরের অমুসলিম সংখ্যালঘুরা এই চক্রান্তের সহযোগী। ফলে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ হয়ে ওঠে সব ধরনের দমনমূলক কর্মকাণ্ডের প্রধান ঢাল।
এই ভীতিকর পরিস্থিতির মুখে রাষ্ট্রযন্ত্র সমাজের প্রতিটি স্তরে সামরিকীকরণ শুরু করে। যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় বিশেষ প্যারা-মিলিটারি স্কাউট সংগঠন এবং সমাজের ভেতরে সার্বিক নজরদারি বৃদ্ধি করা হয় (Beşikçi, 2012)। সিইউপি নেতৃত্ব পূর্ব আনাতোলিয়ার আর্মেনীয় প্রশ্নকে আর কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে রাজি ছিল না। ১৯১৪ সালের শুরুতে যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যস্থতায় পূর্ব প্রদেশের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্কার চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, তখন তালাত ও এনোভারের দল একে সাম্রাজ্যের শেষ দুর্গ আনাতোলিয়াকে টুকরো করার ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করল (Reynolds, 2011)।
ইতিহাসবিদ মাইকেল রেনল্ডস (Michael Reynolds) তার গভীর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সিইউপি-র কর্তৃত্ববাদ কেবল ক্ষমতার লোভ থেকে জন্ম নেয়নি, তা ছিল সাম্রাজ্যের পতন ঠেকানোর এক উগ্র ও মরিয়া প্রয়াস (Reynolds, 2011)। এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অজুহাতে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বলি দেওয়াকে তারা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে অটোমান সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে ছিল এমন এক বিন্দুতে, যেখানে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল একদল চরমপন্থী মতাদর্শীর হাতে, যাদের কাছে মানবজীবনের কোনো মূল্য ছিল না। এই কর্তৃত্ববাদী ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক মানসিকতাই পরবর্তী বছরগুলোতে আনাতোলিয়ার বুকে নেমে আসা চূড়ান্ত দুর্যোগের পটভূমি রচনা করেছিল।
বলকান যুদ্ধ, মুসলিম শরণার্থী ও জাতীয়তাবাদের র্যাডিক্যালাইজেশন (Balkan Wars, Muslim Refugees and Radicalization): সাম্রাজ্যিক সংকট ও জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন
বলকান যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক বিপর্যয় (The Balkan Wars and Imperial Territorial Catastrophe)
১৯১২ সালের অক্টোবর থেকে ১৯১৩ সালের মে মাসের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে বদলে দেয়। সার্বিয়া, গ্রিস, বুলগেরিয়া এবং মন্টিনিগ্রোর সমন্বয়ে গঠিত বলকান লিগ একযোগে অটোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা ইতিহাসে প্রথম বলকান যুদ্ধ (First Balkan War) নামে পরিচিত (Hall, 2000)। কয়েক শতাব্দীর পুরনো অটোমান সামরিক কাঠামো আধুনিক বলকান জোটের তীব্র আক্রমণের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। একে একে থেসালোনিকি, স্কোপিয়ে, মোনাস্তির, ইয়ানিনা এবং শকোদরার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শহরগুলো অটোমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। খোদ রাজধানী ইস্তাম্বুলের মাত্র কয়েক মাইল দূরে চালতালজা পর্যন্ত শত্রুসেনারা পৌঁছে গিয়েছিল।
এই পরাজয়ের অভিঘাত ছিল বহুমুখী এবং অত্যন্ত গভীর। রোমেলিয়া বা ইউরোপীয় অটোমান ভূখণ্ড কেবল কোনো সাধারণ উপনিবেশ ছিল না, বরং তা ছিল সাম্রাজ্যের মূল প্রাণকেন্দ্র এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের আঁতুড়ঘর। তরুণ তুর্কি আন্দোলনের অধিকাংশ নেতাই এসেছিলেন মেসিডোনিয়া ও থ্রেসের এই অঞ্চলগুলো থেকে। যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্য তার ইউরোপীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৮৩ শতাংশ এবং সেখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৬৯ শতাংশ হারিয়ে ফেলে (Glenny, 2000)। দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধে অটোমানরা ঐতিহাসিক এদির্নে শহরটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, ইউরোপের মানচিত্র থেকে তাদের শতবর্ষের উপস্থিতি প্রায় সম্পূর্ণ মুছে যায়।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড হল (Richard Hall) তার আকর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বলকান যুদ্ধের এই পরাজয় অটোমান সমাজের মনস্তত্ত্বে এক গভীর আঘাত হানে (Hall, 2000)। এতদিন ধরে যে সাম্রাজ্যিক আত্মবিশ্বাস এবং বহুত্ববাদী সহাবস্থানের কথা বলা হচ্ছিল, তা এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা এই সময়টিকে চিহ্নিত করেন অটোমান অভিজাতদের আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত সংকটকাল হিসেবে। তারা বুঝতে পারেন যে, ইউরোপের মাটি থেকে তাদের বিতাড়ন কেবল সীমানা পরিবর্তনের বিষয় ছিল না, তা ছিল একটি জাতিগত ও ধর্মীয় আধিপত্যের পতন। ফলে আনাতোলিয়াই হয়ে দাঁড়ায় তাদের অস্তিত্বের শেষ ভরসা, যা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার এক মরিয়া মানসিকতা তৈরি করে।
‘মুহাজির’ সংকট ও মানবিক বিপর্যয় (The ‘Muhacir’ Crisis and Humanitarian Catastrophe)
বলকান অঞ্চলের ভূখণ্ড হারানোর সাথে সাথে শুরু হয় এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়। বিজয়ী বলকান রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে বাঁচতে লাখ লাখ মুসলিম পরিবার তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে ইস্তাম্বুল ও আনাতোলিয়ার দিকে পালাতে শুরু করে। এই বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের সরকারিভাবে বলা হতো ‘মুহাজির’ (muhacir) (McCarthy, 1995)। তীব্র শীত, কলেরা মহামারি এবং খাদ্যাভাবের মধ্য দিয়ে গরুর গাড়ি ও পায়ে হেঁটে তারা রাজধানীতে প্রবেশ করতে থাকে। তৎকালীন ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর প্রাঙ্গণ, মাদ্রাসা এবং খোলা মাঠগুলো পরিণত হয়েছিল হাজার হাজার অনাহারক্লিষ্ট মানুষের অস্থায়ী শিবিরে।
এই মানবিক সংকটের আন্তর্জাতিক তদন্ত করে কার্নেগি আন্তর্জাতিক শান্তি সংস্থা। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে বলকান অঞ্চলে মুসলিম ও অন্যান্য বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত ব্যাপক নৃশংসতার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয় (Carnegie Endowment, 1914)। সেই নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯১২ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে প্রায় চার লাখেরও বেশি মুসলিম শরণার্থী অটোমান ভূখণ্ডে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। পথিমধ্যে ক্ষুধা, রোগবালাই ও চরম ঠান্ডার কারণে মারা যায় আরও হাজার হাজার মানুষ। ইস্তাম্বুলের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না এবং মহামারির দৃশ্য স্থানীয় জনগণের মনে ইউরোপীয় খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
ইতিহাসবিদ মার্ক মাজোয়ার (Mark Mazower) বলকান অঞ্চলের এই রূপান্তরকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় জনসংখ্যাগত উচ্ছেদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Mazower, 2000)। এই বিপুল পরিমাণ নিঃস্ব মানুষের আগমন অটোমান সাম্রাজ্যের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। তাদের পুনর্বাসন, খাদ্য সরবরাহ এবং কর্মসংস্থানের কোনো সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো সরকারের ছিল না। প্রতিদিন রাজধানীতে উপস্থিত হওয়া এই ছিন্নমূল মানুষগুলো কেবল অর্থনৈতিক সংকটই বাড়ায়নি, তারা সাথে করে নিয়ে এসেছিল নিজ ভূমিতে সহিংসতার শিকার হওয়ার এক তীব্র মানসিক ট্রমা। এই সম্মিলিত ক্ষোভ ও শোক পরবর্তীতে সমাজের রাজনৈতিক মেরুকরণকে চরম রূপ দিতে সবচেয়ে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।
জাতিগত নির্মূলের চক্র ও সামাজিক বৈরিতা (Cycles of Ethnic Cleansing and Social Antagonism)
বলকান যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মুহাজিরদের আগমন আনাতোলিয়ার চিরাচরিত আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ভারসাম্যকে ধ্বংস করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল মান (Michael Mann) তার বিখ্যাত গ্রন্থে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বিকাশের সাথে জাতিগত নিধনের যে সম্পর্ক দেখিয়েছেন, বলকান পরিস্থিতি ছিল তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ (Mann, 2005)। বিজয়ী দেশগুলো তাদের নবগঠিত জাতিরাষ্ট্রকে একক নৃতাত্ত্বিক রূপ দিতে গিয়ে মুসলিমদের উচ্ছেদ করেছিল। আর সেই উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুব্ধ মানুষগুলো যখন আনাতোলিয়ায় এসে পৌঁছায়, তখন তারা তাদের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু বানায় স্থানীয় খ্রিস্টান – বিশেষ করে আর্মেনীয় ও গ্রিক – জনগোষ্ঠীকে।
আনাতোলিয়ার স্থানীয় সমাজে তখন ছড়িয়ে পড়ে এক গভীর প্রতিশোধমূলক মনোভাব। বলকানের শরণার্থীরা নিজ চোখে তাদের পরিবারকে খুন হতে এবং তাদের সম্পত্তি হাতছাড়া হতে দেখেছিল। ফলে তারা যখন দেখত যে আনাতোলিয়ার আর্মেনীয় ও গ্রিকরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি পরিচালনা করছে, তখন তাদের মনে তীব্র সামাজিক ঈর্ষা ও শত্রুতা তৈরি হতো। স্থানীয় মুসলিম নেতারা এবং সিইউপি-র তৃণমূল কর্মীরা এই অনুভূতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে (Biondich, 2011)। প্রচার করা হতো যে, আনাতোলিয়ার খ্রিস্টানরা সুযোগ পেলেই বলকান খ্রিষ্টানদের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং অটোমানদের এই শেষ আশ্রয়স্থল থেকেও তাড়িয়ে দেবে।
ইতিহাসবিদ মার্ক বায়োন্ডিচ (Mark Biondich) উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রক্রিয়াটি ছিল একটি ধারাবাহিক জাতিগত নির্মূলের চক্র (cycle of ethnic cleansing) (Biondich, 2011)। এক অঞ্চলের শিকার অন্য অঞ্চলে গিয়ে পরিণত হচ্ছিল আক্রমণকারীতে। শতাব্দী ধরে যে প্রতিবেশীরা শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করত, তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়ে। গ্রামীণ হাটবাজার ও শহরের জনপরিসরে খ্রিস্টানদের দেখা হতে থাকে সম্ভাব্য বিদেশি চর ও শত্রু হিসেবে। এই বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশ স্থানীয় মুসলিম সমাজকে ধীরে ধীরে যে কোনো চরম পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।
জনসংখ্যাগত প্রকৌশল ও আনাতোলিয়ার হোমল্যান্ড রূপান্তর (Demographic Engineering and Anatolia as the Homogenized Homeland)
বলকান সংকটের পর সিইউপি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে আনাতোলিয়াকে জোরপূর্বক একটি সমজাতীয় তুর্কি-মুসলিম ভূখণ্ডে রূপান্তর করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গ্রহণ করা হয় এক আধুনিক ও আমলাতান্ত্রিক জনসংখ্যাগত প্রকৌশল (demographic engineering) নীতি। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় উপজাতি ও অভিবাসী পুনর্বাসন অধিদপ্তর (İskân-ı Aşâyir ve Muhâcirîn Müdîriyeti – İAMM) (Dündar, 2008)। এই প্রশাসনিক সংস্থাটির মূল কাজ ছিল সাম্রাজ্যের ভেতরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভৌগোলিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং আনাতোলিয়ার বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চলে মুসলিম শরণার্থীদের পরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপন করানো।
ইতিহাসবিদ ফুয়াত দুন্দার (Fuat Dündar) অটোমান আর্কাইভের নথিপত্র উন্মোচন করে দেখিয়েছেন যে, সরকার এই পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট গাণিতিক কোটা বা অনুপাত নির্ধারণ করেছিল (Dündar, 2008)। নিয়ম করা হয়েছিল যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অমুসলিম বা অ-তুর্কি জনগোষ্ঠীর অনুপাত মোট জনসংখ্যার ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হতে দেওয়া যাবে না। যেখানেই স্থানীয় খ্রিস্টানদের সংখ্যা বেশি ছিল, সেখানেই ইচ্ছাকৃতভাবে বলকান থেকে আসা মুহাজিরদের বসতি গড়ে দেওয়া হতো, যাতে স্থানীয় জনমিতির চরিত্র বদলে দেওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় বহু প্রাচীন আর্মেনীয় ও গ্রিক গ্রামকে চারপাশ থেকে নতুন নতুন মুসলিম শরণার্থী শিবির দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়।
গবেষক রায়ান জিঞ্জেরাস (Ryan Gingeras) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই নীতি আনাতোলিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলকে চিরতরে পরিবর্তন করে দিয়েছিল (Gingeras, 2009)। আনাতোলিয়াকে আর কেবল একটি সাধারণ ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে দেখা হচ্ছিল না, বরং একে কল্পনা করা হচ্ছিল তুর্কি জাতির এক ও অবিভাজ্য ‘হোমল্যান্ড’ (homeland) হিসেবে। এই হোমল্যান্ড ধারণার ভেতরে অমুসলিমদের কোনো স্থায়ী বা সমমর্যাদার স্থান ছিল না। রাষ্ট্রযন্ত্র অত্যন্ত সচেতনভাবে আনাতোলিয়ার বুক থেকে অ-তুর্কি উপাদানগুলোকে প্রান্তিক করার এক প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাসনের পথকে মসৃণ করেছিল।
অর্থনৈতিক বয়কট ও জাতীয় অর্থনীতি আন্দোলন (Economic Boycott and the National Economy Movement)
জনসংখ্যাগত রূপান্তরের পাশাপাশি সিইউপি এক নতুন অর্থনৈতিক ভাবাদর্শের সূচনা করে, যার নাম ছিল জাতীয় অর্থনীতি (Milli İktisat) আন্দোলন (Toprak, 1982)। এতদিন ধরে সাম্রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশ ছিল আর্মেনীয় ও গ্রিক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। মুসলিমরা প্রধানত কৃষক, সৈনিক বা সরকারি আমলা হিসেবে কাজ করত। সিইউপি নেতৃত্ব মনে করত যে, অর্থনৈতিক পরাভবের কারণেই অটোমান সাম্রাজ্য রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অনুগত তুর্কি-মুসলিম বুর্জোয়া শ্রেণি গড়ে তোলাকেই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১৯১৩ ও ১৯১৪ সালে দেশব্যাপী শুরু হয় অমুসলিমদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত অর্থনৈতিক বয়কট (economic boycott) (Köroğlu, 2007)। সিইউপি-র স্থানীয় শাখাগুলো এবং পত্রিকাগুলো মুসলিম নাগরিকদের প্রতি প্রকাশ্য আহ্বান জানায় যাতে তারা কোনো খ্রিস্টান দোকান থেকে পণ্য না কেনে, খ্রিস্টান মালিকানাধীন জাহাজে না চড়ে এবং কোনো আর্মেনীয় চিকিৎসকের সেবা গ্রহণ না করে। তরুণদের রাস্তায় নামানো হতো পাহারা দেওয়ার জন্য; কোনো মুসলিম ক্রেতা যদি ভুলক্রমে কোনো অমুসলিম দোকানে যেত, তবে তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হতো এবং তার কেনা পণ্য রাস্তায় ফেলে নষ্ট করা হতো।
সমাজবিজ্ঞানী জাফের তোপরাক (Zafer Toprak) তার যুগান্তকারী গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, এই বয়কট আন্দোলন কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ছিল না, বরং তা ছিল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করার রাষ্ট্রীয় কৌশল (Toprak, 1982)। অনেক ক্ষেত্রে আর্মেনীয় ও গ্রিক ব্যবসায়ীদের জোরপূর্বক তাদের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো এবং সেই দোকানগুলো বলকান থেকে আসা মুহাজিরদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। এর ফলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শতাব্দী প্রাচীন বাণিজ্যিক আধিপত্য রাতারাতি ধসে পড়তে শুরু করে। এই অর্থনৈতিক আগ্রাসন বহু মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে জাতিগত বিদ্বেষকে আরও উসকে দেয়।
এজিয়ান উপকূলীয় গ্রিক উচ্ছেদ: ১৯১৪ সালের টেস্ট ক্যাস (The Ethnic Cleansing of Aegean Greeks: The 1914 Test Case)
১৯১৪ সালের বসন্তে এজিয়ান সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে যা ঘটেছিল, তা ছিল মূলত ১৯১৫ সালের আর্মেনীয় ধ্বংসযজ্ঞের এক প্রত্যক্ষ মহড়া বা টেস্ট কেস (test case)। বলকান যুদ্ধের পর পশ্চিম আনাতোলিয়ার উপকূলবর্তী শহর ও গ্রামগুলোতে – যেমন স্মার্না (ইজমির), আইভালিক এবং থ্রেসের সংলগ্ন অঞ্চলে – বসবাসকারী প্রাচীন অটোমান গ্রিকদের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সিইউপি নেতৃত্ব আশঙ্কা করেছিল যে, গ্রিসের সাথে আরেকটি যুদ্ধ বাধলে এই উপকূলীয় গ্রিকরা গ্রিক নৌবাহিনীকে সহায়তা করবে (Kennan, 1993)। ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ছাড়াই তাদের উচ্ছেদ করার এক গোপন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
এই অপারেশনটি পরিচালনা করেছিল সিইউপি-র গোপন আধাসামরিক শাখা এবং সদ্য সক্রিয় হওয়া গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক (Stoddard, 1963)। কোনো প্রকাশ্য সরকারি আদেশ জারি না করে এক ধরনের মানসিক সন্ত্রাস ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। রাতে গ্রিক গ্রামগুলোতে গুলি চালানো হতো, তাদের কৃষিজমি ও জলপাইয়ের বাগান নষ্ট করে দেওয়া হতো এবং দরজায় হুমকি দিয়ে চিরকুট সেঁটে দেওয়া হতো। দিনের পর দিন এই ভীতি প্রদর্শনের মুখে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ উপকূলীয় গ্রিক তাদের সর্বস্ব ফেলে নৌকায় করে গ্রিসের দ্বীপগুলোর দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তাদের ফেলে যাওয়া খালি ঘরবাড়িগুলোতে সাথে সাথে বলকান থেকে আসা মুসলিম মুহাজিরদের পুনর্বাসন করা হয়।
ইতিহাসবিদ জর্জ কেনান (George Kennan) এবং ফিলিপ স্টডার্ডের গবেষণা থেকে দেখা যায়, ১৯১৪ সালের এই গ্রিক উচ্ছেদ অভিযান সিইউপি নেতৃত্বকে এক অভাবনীয় আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছিল (Kennan, 1993; Stoddard, 1963)। তারা প্রমাণ পেয়েছিল যে, অত্যন্ত গোপনে প্যারা-মিলিটারি বাহিনী ব্যবহার করে, কোনো আনুষ্ঠানিক দায়ভার নিজের কাঁধে না নিয়ে, পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এবং এর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলোও শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। জনসংখ্যাগত প্রকৌশলের এই সফল পরীক্ষাটিই কয়েক মাস পর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের ভেতর, আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে অনেক বড় পরিসরে ও চরমতম নিষ্ঠুরতায় প্রয়োগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সিইউপি নেতাদের প্ররোচিত করেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আর্মেনীয়দের নিরাপত্তা-হুমকি হিসেবে নির্মাণ (World War I and the Construction of the Armenian Threat): যুদ্ধ, সারিকামিশ ও বিশ্বাসঘাতকতার বয়ান
বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রবেশ ও জার্মান মৈত্রী (Ottoman Entry into WWI and the German Alliance)
১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপ যখন মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, অটোমান সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব তখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বিপজ্জনক খেলায় মেতে ওঠে। সাম্রাজ্যের প্রধান নীতিনির্ধারকরা জানতেন যে কোনো বড় শক্তির মিত্রতা ছাড়া একা টিকে থাকা সম্ভব নয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে প্রাথমিক কূটনৈতিক আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা বার্লিনের দিকে হাত বাড়ায়। ২ আগস্ট ১৯১৪ সালে অত্যন্ত গোপনে স্বাক্ষরিত হয় অটোমান-জার্মান মৈত্রী চুক্তি (Ottoman-German Alliance) (Trumpener, 1968)। এই গোপন সামরিক চুক্তির পেছনে তৎকালীন যুদ্ধমন্ত্রী ইসমাইল এনোভার পাশা (Ismail Enver Pasha) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাজ করছিল। তারা ভেবেছিলেন জার্মানির আধুনিক সমরাস্ত্র ও শিল্পশক্তির সহায়তায় ককেশাস এবং বলকান অঞ্চলের হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখল করা সম্ভব হবে।
অটোমানদের যুদ্ধে প্রবেশের ঘটনাটিও ঘটেছিল এক আকস্মিক নাটকের মধ্য দিয়ে। ভূমধ্যসাগরে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর তাড়া খেয়ে দুটি জার্মান যুদ্ধজাহাজ – ‘গোয়েবেন’ এবং ‘ব্রেসলাউ’ – দার্দানেলিস প্রণালী অতিক্রম করে ইস্তাম্বুলে এসে আশ্রয় নেয়। সরকার জাহাজ দুটি জার্মানির কাছ থেকে কিনে নেওয়ার নাটক করে সেগুলোর নাম বদলে রাখে ‘ইয়াভুজ সুলতান সেলিম’ এবং ‘মিদিল্লি’। এরপর অক্টোবরের শেষ ভাগে এই জাহাজ দুটি জার্মান অ্যাডমিরাল সুশনের কমান্ডে ব্ল্যাক সাগরে গিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই রাশিয়ার ওদেসা ও সেভাস্তোপোল বন্দরে গোলাবর্ষণ করে (Aksakal, 2008)। এই আক্রমণ রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যকে সরাসরি বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে টেনে নামায়।
ইতিহাসবিদ মুস্তফা আকসাকাল (Mustafa Aksakal) তার গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যে, এই যুদ্ধে প্রবেশ কোনো আকস্মিক সামরিক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল সিইউপি নেতৃত্বের এক দীর্ঘমেয়াদী আদর্শিক সিদ্ধান্তের ফল (Aksakal, 2008)। যুদ্ধের মাধ্যমে তারা একাধারে প্যান-তুর্কিবাদ বা তুর্কি ঐক্যের স্বপ্ন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংহতি অর্জনের সুযোগ দেখেছিল। সাম্রাজ্যের সুলতান আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ধর্মীয় যুদ্ধের ঘোষণা দিলেও, সিইউপি-র তরুণ অফিসারদের কাছে এটা ছিল আধুনিক ভূরাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের লড়াই। কিন্তু এই যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। বিশাল সামরিক ফ্রন্ট সামলানোর মতো রসদ, রেলপথ বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা অটোমান সাম্রাজ্যের ছিল না, যা শুরুতেই পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
সারিকামিশ বিপর্যয় ও সামরিক ব্যর্থতার মনস্তত্ত্ব (The Sarıkamış Catastrophe and the Psychology of Military Failure)
১৯১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ককেশাস ফ্রন্টে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানটি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বড় বিপর্যয়। এনোভার পাশা ব্যক্তিগতভাবে তৃতীয় সেনাবাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এক অতি-উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তৈরি করেন। তার লক্ষ্য ছিল তীব্র শীতের মধ্যে ককেশাস পর্বতমালা অতিক্রম করে রাশিয়ার কার্স ও তিবলিসি দখল করা এবং সেখান থেকে মধ্য এশিয়ার দিকে তুর্কি বলয় তৈরি করা (Allen & Muratoff, 1953)। তিনি ভেবেছিলেন জার্মান ব্লিৎসক্রিগ ধাঁচের দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে রুশদের চমকে দেবেন। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন শীতকালীন পার্বত্য যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ, গরম কাপড় এবং খাদ্য সরবরাহের বাস্তবতাকে।
ডিসেম্বরের শেষে আল্লাহুআকবার পর্বতের দুর্গম গিরিপথে নেমে আসে নজিরবিহীন তুষারঝড়। তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। অটোমান সৈন্যদের গায়ে ছিল সাধারণ গ্রীষ্মকালীন পোশাক এবং পায়ে ছিল ছেঁড়া বুট। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর গুলির চেয়ে ঠান্ডায় জমে মারা যায় কয়েকগুণ বেশি সৈন্য। ১৯১৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সারিকামিশের যুদ্ধ (Battle of Sarıkamış) অটোমান বাহিনীর সম্পূর্ণ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় (Rogan, 2015)। প্রায় এক লাখ সেনার বিশাল বাহিনীর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সৈন্য কেবল অনাহারে, ঠান্ডায় ও টাইফাসে ভুগে বরফের নিচে চিরতরে হারিয়ে যায়। এনোভার পাশা কোনোমতে তার জীবন নিয়ে পালিয়ে ইস্তাম্বুলে ফিরে আসেন।
ইতিহাসবিদ ইউজিন রোগান (Eugene Rogan) তার গ্রন্থে সারিকামিশের এই ট্র্যাজেডিকে অটোমান সামরিক আত্মবিশ্বাসের ওপর এক মরণাঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Rogan, 2015)। এই পরাজয় পূর্ব ফ্রন্টকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে ফেলে এবং রুশ বাহিনীকে আনাতোলিয়ার কেন্দ্রস্থলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। ইস্তাম্বুলে ফিরে এনোভার পাশা তার ব্যক্তিগত অদক্ষতা ও রণকৌশলের ভুল ঢাকার জন্য এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার পথ বেছে নেন। সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করার বদলে এই বিপর্যয়ের পুরো দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে, যা পরবর্তীতে আনাতোলিয়ার নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর এক বিশাল দুর্যোগ ডেকে আনে।
বলির পাঁঠা তত্ত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতার বয়ান নির্মাণ (Scapegoat Theory and the Construction of the Betrayal Narrative)
সারিকামিশের সামরিক ব্যর্থতার পর সিইউপি প্রপাগান্ডা মেশিন অত্যন্ত দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজেদের সামরিক নেতৃত্বের খামখেয়ালি ঢাকতে তারা বেছে নেয় চিরাচরিত বলির পাঁঠা তত্ত্ব (scapegoat theory) (Fromkin, 1989)। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ও প্রেসের মাধ্যমে প্রচার করা শুরু হয় যে, ককেশাস ফ্রন্টে অটোমান সেনাবাহিনীর এই হারের কারণ কোনো সামরিক দুর্বলতা নয়, বরং তা ছিল দেশের ভেতরে থাকা আর্মেনীয়দের পরিকল্পিত ‘পেছন থেকে ছুরি মারা’ (stab in the back) বা বিশ্বাসঘাতকতা। সীমান্ত অঞ্চলের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া ককেশীয় আর্মেনীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকাকে বাড়িয়ে ফাঁপিয়ে পুরো অটোমান আর্মেনীয় সমাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ হিসেবে দাঁড় করানো হয়।
প্রকৃতপক্ষে, ককেশাস ফ্রন্টে হাজার হাজার অটোমান আর্মেনীয় নাগরিক নিয়মিত অটোমান সেনাবাহিনীর পোশাকে বিশ্বস্ততার সাথেই লড়াই করছিল। স্বয়ং এনোভার পাশা সারিকামিশের যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে কোনো কোনো আর্মেনীয় অফিসারের সাহসিকতার প্রশংসা করে আর্মেনীয় প্যাট্রিয়ার্ককে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার পর সেই বাস্তবতা রাতারাতি উল্টে দেওয়া হয় (McMeekin, 2015)। সরকারি বয়ানে প্রতিটি আর্মেনীয়কে দেখা হতে থাকে রুশ আগ্রাসনের সম্ভাব্য সাহায্যকারী হিসেবে। স্থানীয় স্তরে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, আর্মেনীয়রা শহরগুলোতে অস্ত্র মজুত করছে, তারা টেলিগ্রাফের তার কেটে দিচ্ছে এবং মুসলিম জনবসতি ধ্বংসের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইতিহাসবিদ ডেভিড ফ্রমকিন (David Fromkin) দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র একটি কাল্পনিক শত্রুর অবয়ব তৈরি করে নিজের সমাজকে বিষাক্ত করে তুলেছিল (Fromkin, 1989)। কোনো ধরনের প্রমাণ বা বিচার ছাড়াই পুরো একটি জাতিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই বিশ্বাসঘাতকতার বয়ানটি কেবল সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা স্থানীয় মুসলিম জনসাধারণের মধ্যেও এক তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে মানুষের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল যে, আর্মেনীয়দের ধ্বংস না করলে নিজেদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।
আর্মেনীয় সৈন্যদের নিরস্ত্রীকরণ ও লেবার ব্যাটালিয়ন (Disarmament of Armenian Soldiers and the Labor Battalions)`
বিশ্বাসঘাতকতার বয়ান তৈরির পর সরকারের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক আঘাতটি আসে সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা আর্মেনীয় সদস্যদের ওপর। ১৯১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধমন্ত্রী এনোভার পাশা ‘নির্দেশনা নং ৮৬৭’ জারি করেন (Emin, 1930)। এই গোপন সামরিক আদেশের মাধ্যমে অটোমান সেনাবাহিনীর সকল নন-মুসলিম, বিশেষ করে আর্মেনীয় অফিসার ও সৈনিকদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদের সরাসরি যুদ্ধ ফ্রন্ট বা কমব্যাট ইউনিট থেকে সরিয়ে পৃথক করা হয় এবং সংগঠিত করা হয় নিরস্ত্র শ্রম ব্যাটালিয়ন (Labor Battalions – Amele Taburları)-এ।
এই শ্রম ব্যাটালিয়নগুলোতে আর্মেনীয় সৈনিকদের জীবন হয়ে ওঠে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার। তাদের দিয়ে করানো হতো রেললাইন তৈরি, দুর্গম পাহাড়ে রাস্তা খনন এবং সামরিক রসদ পিঠে বহন করানোর মতো অমানুষিক শারীরিক পরিশ্রম। তাদের ঠিকমতো খাবার বা কোনো চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হতো না। সামান্য ক্লান্তির লক্ষণ দেখা দিলে প্রহার করা হতো। মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মর্গেনথাউ (Henry Morgenthau) তার কূটনৈতিক নথিপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, এই শ্রম ব্যাটালিয়নগুলো আসলে ছিল এক ধরনের পরোক্ষ মৃত্যুদণ্ড কেন্দ্র (Morgenthau, 1918)। সৈন্যদের এমন জায়গায় কাজ করতে বাধ্য করা হতো যেখানে ক্ষুধা ও রোগেই তাদের অর্ধেক শেষ হয়ে যেত।
পরবর্তী ধাপে এই নিরস্ত্র সৈনিকদের ওপর নেমে আসে চূড়ান্ত সহিংসতা। রাস্তা তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে বা কোনো রসদ পরিবহন শেষ হলে তাদের নির্জন পাহাড়ি উপত্যকা বা গিরিপথে নিয়ে গিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ করে গুলি করে হত্যা করা হতো (Emin, 1930)। এই কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো স্থানীয় মিলিশিয়া ও বিশেষ সংগঠনের সদস্যদের। এর ফলে আর্মেনীয় সমাজের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও সক্ষম পুরুষ অংশটি – যারা সম্ভাব্য কোনো গণহত্যা প্রতিরোধে অস্ত্র তুলে নিতে পারত – তারা কোনো প্রকার আত্মরক্ষার সুযোগ ছাড়াই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকদের উচ্ছেদের আগেই সমাজকে প্রতিরক্ষাহীন করার এক নিখুঁত সামরিক নীলনকশা কার্যকর করা হয়েছিল।
ভ্যান প্রতিরোধ: আত্মরক্ষা বনাম ‘বিদ্রোহের’ সরকারি ফ্রেম (The Defense of Van: Self-Defense versus the Official Narrative of ‘Rebellion’)
১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব আনাতোলিয়ার ভ্যান শহরে যা ঘটেছিল, তা অটোমান গণহত্যার ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ভ্যানের তৎকালীন সামরিক গভর্নর ছিলেন এনোভার পাশার ভগ্নিপতি জেভদেত বে (Jevdet Bey)। তিনি শহরের আশেপাশে থাকা আর্মেনীয় গ্রামগুলোতে চরম সহিংসতা শুরু করেন এবং হাজার হাজার গ্রামবাসীকে হত্যা করেন। এরপর তিনি শহরের আর্মেনীয় নেতাদের ডেকে চার হাজার তরুণকে অবিলম্বে সামরিক সেবার নামে তার হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্থানীয় মানুষ তখন ভালোভাবেই জানত যে এই তরুণদের শ্রম ব্যাটালিয়নে নিয়ে যাওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু (Badem, 2010)।
নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে ভ্যান শহরের আর্মেনীয়রা তাদের আবাসিক এলাকা ‘আইগেস্তান’ (Aygestan)-এ ব্যারিকেড গড়ে তোলে এবং এক মরিয়া আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ শুরু করে। নারী, পুরুষ এমনকি কিশোররা পর্যন্ত হাতে তৈরি সাধারণ অস্ত্র ও সীমিত গোলাবারুদ নিয়ে সরকারি বাহিনী এবং উপজাতীয় আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালায় (Wegner, 1919)। তারা পুরো এক মাস ধরে শহরটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়, যতক্ষণ না মে মাসের শুরুতে রুশ সেনাবাহিনী এবং ককেশীয় আর্মেনীয় অগ্রবর্তী দল সেখানে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে।
ইতিহাসবিদ জান্দার বাদেমে (Candar Badem) দেখিয়েছেন কীভাবে অটোমান রাষ্ট্রযন্ত্র এই আত্মরক্ষার ঘটনাটিকে এক ভিন্ন রূপ দিয়েছিল (Badem, 2010)। ইস্তাম্বুলের সরকার ভ্যানের এই আত্মরক্ষা অভিযানকে দেশব্যাপী এক সুসংগঠিত ‘সশস্ত্র বিদ্রোহ’ হিসেবে প্রচার করে। সিইউপি নেতৃত্ব দাবি করে যে, আর্মেনীয়রা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু করেছে এবং তারা পেছনের ফ্রন্ট ভেঙে দিচ্ছে। ভ্যানের এই প্রতিরক্ষাকে অজুহাত বানিয়েই সরকার পুরো সাম্রাজ্যের সকল আর্মেনীয়কে দেশান্তরি করার ও নিশ্চিহ্ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। যে ঘটনাটি ছিল নিছক জীবনের দায়ে আত্মরক্ষার লড়াই, তাকেই রাষ্ট্রযন্ত্র রূপান্তর করে পুরো একটি জাতিকে ধ্বংস করার প্রধান যুক্তি হিসেবে।
নিরাপত্তায়ন প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত উচ্ছেদের ক্ষেত্র প্রস্তুত (The Securitization Process and Paving the Ground for Total Deportation)
সমাজবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আধুনিক তত্ত্বে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়কে চরম রাষ্ট্রীয় সংকটে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিরাপত্তায়ন (securitization) (Buzan et al., 1998)। কোপেনহেগেন স্কুলের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ব্যারি বুজান (Barry Buzan) এবং ওলে ওয়েভার দেখিয়েছেন কীভাবে শাসকগোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে রাষ্ট্রের জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ আইনকানুন স্থগিত করে যেকোনো চরম পদক্ষেপকে বৈধ করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ঠিক এই তাত্ত্বিক মডেলটিই বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
সিইউপি নেতৃত্ব যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থাকে ব্যবহার করে বিচারব্যবস্থা, সংবিধান এবং নাগরিক সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন করে ফেলে। তারা আর্মেনীয়দের আর কোনো রাজনৈতিক দল বা সাধারণ প্রজা হিসেবে দেখেনি; তাদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এক ‘অস্তিত্বের সংকট’ বা এমন এক অভ্যন্তরীণ ক্যান্সার হিসেবে, যা কেটে বাদ না দিলে রাষ্ট্র বাঁচবে না (Strachan, 2001)। এই চরম বয়ানটি রাষ্ট্রের সকল স্তর – আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের মনস্তত্ত্বে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে যেকোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা নির্বাসনকে সাধারণ মানুষ কোনো অপরাধ হিসেবে না দেখে নিজেদের সুরক্ষার অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
ইতিহাসবিদ হিউ স্ট্রাকান (Hew Strachan) তার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক যুদ্ধের চরম জাতীয়তাবাদী রূপটিই এই ধরনের নিরাপত্তার যুক্তিকে দানবীয় আকার ধারণ করতে সাহায্য করেছিল (Strachan, 2001)। আর্মেনীয়দের নিরাপত্তাহীনতার এই প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হওয়ার পরই ১৯১৫ সালের মে মাসে সরকার প্রণয়ন করে কুখ্যাত তেহসির আইন বা নির্বাসন আইন। একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে তাদের হাজার বছরের পৈতৃক ভূমি থেকে উপড়ে ফেলার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক ক্ষেত্র এভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছিল। যুদ্ধকে ব্যবহার করা হয়েছিল এক নিখুঁত পর্দা হিসেবে, যার আড়ালে একটি আধুনিক রাষ্ট্র তার নিজস্ব নাগরিকদের বিরুদ্ধে চরমতম ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করার চূড়ান্ত ছাড়পত্র পেয়ে যায়।
আর্মেনীয় গণহত্যা, ১৯১৫–১৯১৭ (The Armenian Genocide, 1915–1917): নির্বাসন, হত্যা ও সামাজিক ধ্বংস
২৪ এপ্রিল ১৯১৫, তেহসির আইন ও গণহত্যার সূচনা (24 April, Tehcir Law and the Beginning of the Genocide): নেতৃত্বের দমন ও নির্বাসনের কাঠামো
২৪ এপ্রিল ১৯১৫: বুদ্ধিজীবী নিধন ও নেতৃত্বের শিরচ্ছেদ (24 April 1915: Intellectual Purge and Leadership Decapitation)
১৯১৫ সালের ২৪ এপ্রিলের বসন্তের রাতটি ছিল পুরো আর্মেনীয় সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডির সূচনা। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই তৎকালীন অটোমান রাজধানী ইস্তাম্বুলে শুরু হয়েছিল এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় পুলিশি অভিযান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশার বিশেষ দপ্তরের প্রস্তুত করা একটি গোপন তালিকা হাতে নিয়ে পুলিশের দল শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যরাতে আর্মেনীয় সমাজের শীর্ষ বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, সংসদ সদস্য, লেখক, কবি, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের দরজায় কড়া নাড়া হয়। বিছানা থেকে তুলে নিয়ে কোনো কারণ না জানিয়েই তাদের সেন্ট্রাল পুলিশ স্টেশনে জড়ো করা হতে থাকে (Payaslian, 2007)। সেই রাতে এবং তার পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় আড়াইশো থেকে ছয়শো প্রভাবশালী নাগরিককে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বন্দি করা হয়।
আটককৃত এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অটোমান সমাজের প্রথম সারির গুণী মানুষেরা। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও অটোমান পার্লামেন্টের সদস্য গ্রিগর জোহরাব (Krikor Zohrab), যিনি একসময় স্বয়ং তালাত পাশার ঘনিষ্ঠ আইনি পরামর্শক ছিলেন। তালিকায় আরও ছিলেন সমাজসচেতন কবি দানিয়েল ভারুজান (Daniel Varoujan), প্রতীকবাদী কবি সিয়ামান্তো (Siamanto), বিশিষ্ট চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদ নাজারেত দাগাভারিয়ান (Nazaret Daghavarian) এবং খ্যাতনামা প্রাবন্ধিক রুপেন জারদারিয়ান (Ruben Zartarian)। মধ্যরাতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বসফরাস তীরের হায়দারপাশা রেলস্টেশনে। সেখান থেকে বিশেষ সামরিক ট্রেনে করে তাদের পাঠানো হয় আঙ্কারার নিকটবর্তী আয়াস এবং চানকিরির দুর্গম বন্দিশিবিরে (Balakian, 2010)। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই চিন্তাবিদদের অধিকাংশকেই কোনো প্রকার বিচার ছাড়াই পাহাড়ি গিরিপথে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
সমাজতত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় এই ধরনের সুপরিকল্পিত অভিযানকে বলা হয় নেতৃত্বের শিরচ্ছেদ (leadership decapitation) (Barton, 1998)। একটি সুসংগঠিত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার আগে তাদের চিন্তাশীল ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো নেতৃত্বকে শুরুতেই সরিয়ে দেওয়া হয়। ইতিহাসবিদ সাইমন পায়াসলিয়ান (Simon Payaslian) দেখিয়েছেন যে, ইস্তাম্বুলের এই বুদ্ধিজীবী নিধন কোনো বিচ্ছিন্ন পুলিশি পদক্ষেপ ছিল না (Payaslian, 2007)। এর আসল লক্ষ্য ছিল পুরো আর্মেনীয় সমাজকে অভিভাবকহীন, দিশাহীন এবং সম্পূর্ণ কণ্ঠহীন করে তোলা। সাধারণ মানুষ যেন সংগঠিত হয়ে কোনো আত্মরক্ষা করতে না পারে, আন্তর্জাতিক মহলে কোনো আবেদন পাঠাতে না পারে কিংবা আইনি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে – সেই উদ্দেশ্যেই সমাজের মস্তিষ্কস্বরূপ এই অংশটিকে শুরুতেই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল।
পরবর্তীকালে এই ২৪ এপ্রিলের তারিখটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আর্মেনীয় ডায়াস্পোরার কাছে জাতীয় শোক ও প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়। তারা এই দিনটিকে অভিহিত করে ‘লাল রবিবার’ (Red Sunday) নামে। রাজধানী শহরের এই নেতৃত্ব নিধনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল পুরো আনাতোলিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ। নেতৃত্বের এই শূন্যতা সাধারণ গ্রামীণ ও শহুরে মানুষকে এতটাই স্তব্ধ ও বিভ্রান্ত করে দিয়েছিল যে, কয়েক সপ্তাহ পর যখন পুরো সম্প্রদায়কে ঘরবাড়ি ছাড়ার সরকারি নির্দেশ দেওয়া হলো, তখন তাদের পক্ষে কোনো সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
কোমিতাস ও সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি (Komitas and the Irreparable Loss of Cultural Heritage)
২৪ এপ্রিলের সেই বন্দিদের তালিকায় থাকা সবচেয়ে বেদনাদায়ক চরিত্রটি ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও নৃতাত্ত্বিক সঘোমোন সঘোমোনিয়ান (Soghomon Soghomonian), যিনি সঙ্গীতজগতে কোমিতাস ভার্দাপেত (Komitas Vardapet) নামে পরিচিত ছিলেন। কোমিতাস ছিলেন একজন অনন্য প্রতিভাবান সুরকার ও সংগীত গবেষক, যিনি আধুনিক প্রাচ্য সঙ্গীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আনাতোলিয়ার পাহাড়ি গ্রামগুলোতে ঘুরে ঘুরে কৃষকদের মুখ থেকে হাজার হাজার প্রাচীন আর্মেনীয়, কুর্দি এবং তুর্কি লোকগান সংগ্রহ করেছিলেন এবং সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্বরলিপিবদ্ধ করেছিলেন (Bardakjian, 1985)। প্রাচ্যের সুর ও লোকজ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
সেই কালো রাতে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের মতো কোমিতাসকেও তার বাসা থেকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে চানকিরির বন্দিশিবিরে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে নির্বাসনযাত্রার সময় তিনি নিজ চোখে সহযাত্রী কবি ও লেখকদের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় বর্বরতা এবং রক্তপাত প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীতে কিছু প্রভাবশালী বন্ধু ও পশ্চিমা ব্যক্তিত্বের মধ্যস্থতায় – যার মধ্যে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত এবং অটোমান রাজপরিবারের কিছু ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন – কোমিতাসকে রাজধানী ইস্তাম্বুলে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল (Shirinian, 2017)। কিন্তু শারীরিক মুক্তি মিললেও তার মানসিক জগৎ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই ভয়াবহ ধ্বংসের স্মৃতি তিনি মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি।
ইস্তাম্বুলে ফিরে আসার পর কোমিতাস সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং গভীর মানসিক ট্রমার শিকার হন। তিনি তার সঙ্গীত সৃষ্টি পুরোপুরি বন্ধ করে দেন এবং মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করেন। জীবনের শেষ কুড়িটি বছর তিনি প্যারিসের একটি মনোরোগ চিকিৎসালয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটিয়েছিলেন, এক চিরন্তন নীরবতার ভেতর। ইতিহাসবিদ কেভর্ক বারদাকজিয়ান (Kevork Bardakjian) উল্লেখ করেছেন যে, কোমিতাসের এই মানসিক মৃত্যু ছিল একটি জাতির সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ওপর নেমে আসা এক অপূরণীয় আঘাত (Bardakjian, 1985)। তিনি ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে থাকলেও তার ভেতরের মহান শিল্পীসত্তাটি ১৯১৫ সালের সেই মরুযাত্রাতেই চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল।
মানুষের শারীরিক বিনাশের সাথে সাথে কীভাবে একটি জাতির শতাব্দী প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মুছে দেওয়া হয়েছিল, কোমিতাসের জীবন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নির্বাসন অভিযানের সমান্তরালে আনাতোলিয়া জুড়ে থাকা প্রাচীন মঠ, গির্জা, প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং সঙ্গীতশালাগুলো পদ্ধতিগতভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল (Moumdjian, 2012)। পশ্চিম আর্মেনীয় ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ এই হত্যাকাণ্ডের ফলে এক আকস্মিক মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। প্রাচীন সুর, লোকগাথা এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে এভাবে ধ্বংস করে দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মিক ভিত্তিটিকেই চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মে ১৯১৫-এর তেহসির আইন: নির্বাসনের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক (The Tehcir Law of May 1915: The Legal Framework of Deportation)
বুদ্ধিজীবী নিধনের মধ্য দিয়ে প্রাথমিক পর্ব শেষ করার পর অটোমান সরকার পুরো জনসংখ্যাকে উচ্ছেদ করার জন্য একটি আইনি কাঠামোর আশ্রয় নেয়। ২৭ মে ১৯১৫ সালে অটোমান মন্ত্রিসভা একটি জরুরি অধ্যাদেশ জারি করে, যা প্রশাসনিক ভাষায় পরিচিত হয় অস্থায়ী নির্বাসন আইন (Provisional Law of Deportation) বা ‘তেহসির কানুনু’ (Tehcir Law) নামে (Ternon, 1981)। ১ জুন ১৯১৫ সালে এটি অটোমান সরকারের অফিশিয়াল গেজেট তাকভিম-ই ভেকায়ে (Takvim-i Vekâyi)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই সংক্ষিপ্ত আইনের মাধ্যমে সামরিক কমান্ডার ও প্রাদেশিক গভর্নরদের যে কোনো ব্যক্তি বা পুরো জনপদকে জোরপূর্বক অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আইনটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকার অত্যন্ত ধূর্ত প্রশাসনিক চাতুর্যের পরিচয় দিয়েছিল। পুরো চার ধারার আইনের কোথাও ‘আর্মেনীয়’ বা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করা হয়নি (Dyer, 1973)। এতে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও সাধারণ ভাষা ব্যবহার করে বলা হয়েছিল যে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যদি কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায়, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে কিংবা বিদেশি শক্তির সাথে সম্পৃক্ততার সন্দেহের সৃষ্টি করে, তবে তাদের যেকোনো স্থানে উচ্ছেদ করা যাবে। বাস্তবে এই নিরপেক্ষ ভাষার আড়ালে তৈরি করা হয়েছিল পুরো আর্মেনীয় জাতিকে তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে উপড়ে ফেলার এক সর্বজনীন আইনি হাতিয়ার।
ইতিহাসবিদ ইভ তেরনন (Yves Ternon) তার গবেষণায় বিশ্লেষণ করেছেন যে, তেহসির আইন ছিল আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ (Ternon, 1981)। এই আইনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিগত অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই লাখ লাখ নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে সামষ্টিক অপরাধী হিসেবে গণ্য করার পথ তৈরি করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আইনটির উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে, রাষ্ট্র কোনো বেআইনি সহিংসতা করছে না, বরং নিছক যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক এলাকার বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নিচ্ছে। ইতিহাসবিদ গুইন ডায়ার (Gwynne Dyer) দেখিয়েছেন যে, আইনের এই আনুষ্ঠানিক আবরণটি প্রাদেশিক আমলাদের যেকোনো ধরনের নৈতিক সংশয় থেকে মুক্তি দিয়েছিল এবং তাদের যেকোনো চরম পদক্ষেপকে আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছিল (Dyer, 1973)।
আইনটির প্রয়োগের ক্ষেত্রটি বিশ্লেষণ করলে এর প্রকৃত ধ্বংসাত্মক চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনটিকে বলা হয়েছিল সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থে জারি করা ব্যবস্থা, অথচ বাস্তবে এই আইন কার্যকর করা হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শত শত মাইল দূরে থাকা শান্ত ও নিরস্ত্র শহরগুলোতেও। পশ্চিম আনাতোলিয়ার ইজমির, বুরসা, আঙ্কারা এবং থ্রেসের মতো অঞ্চলগুলো, যেখানে কোনো সামরিক ফ্রন্ট ছিল না, সেখানকার সাধারণ অধিবাসীদেরও এই আইনের আওতায় এনে মরুভূমির দিকে হাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছিল (Marashlian, 1991)। ফলে এটি সামরিক প্রয়োজনের কোনো সাধারণ স্থানান্তর ছিল না, ছিল আইনের মোড়কে ঢাকা এক সর্বাত্মক জাতিগত নির্মূলের প্রশাসনিক পরিকাঠামো।
অস্থায়ী সম্পত্তি আইন ও অর্থনৈতিক বাজেয়াপ্তকরণ (The Abandoned Property Laws and Economic Dispossession)
মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়ার সমান্তরালে চলেছিল তাদের শতাব্দী প্রাচীন সঞ্চিত সম্পদ কেড়ে নেওয়ার আরেক সুপরিকল্পিত আইনি চক্রান্ত। ১০ জুন এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ সালে অটোমান সরকার দুটি সম্পূরক আইন জারি করে, যা ইতিহাসে পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন (Law on Abandoned Property – Emvâl-i Metrûke Kanunu) নামে পরিচিত (Sarafian, 2004)। এই আইনের মূল দাবি ছিল, যাদের সাময়িকভাবে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে, তাদের ফেলে যাওয়া যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্র নিজের জিম্মায় রাখবে এবং তারা ফিরে এলে তা বুঝিয়ে দেবে। এই কাজের জন্য প্রতিটি প্রদেশে গঠন করা হয়েছিল বিশেষ লিকুইডেশন কমিশন (Tasfiye Komisyonu)।
বাস্তবে এই কমিশনগুলোর একমাত্র কাজ ছিল আর্মেনীয়দের বিপুল ধনসম্পদ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দখল করা এবং তা নিজেদের অনুগত গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া। নির্বাসিত পরিবারগুলোকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হতো এবং তারা সাথে কেবল সেইটুকু জিনিসই নিতে পারত যা নিজের হাতে বহন করা সম্ভব। তাদের ফেলে যাওয়া বিশাল অট্টালিকা, উর্বর কৃষিজমি, ফলের বাগান, দোকানপাট, কলকারখানা এবং গুদামভর্তি পণ্যসামগ্রী সিলগালা করে দিত স্থানীয় প্রশাসন (Kevorkian & Paboudjian, 1992)। এরপর সেই সম্পত্তিগুলোকে নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে বলকান থেকে আসা মুসলিম শরণার্থী, স্থানীয় সিইউপি নেতা এবং প্রভাবশালী মুসলিম ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।
ইতিহাসবিদ আরা সারাফিয়ান (Ara Sarafian) অটোমান নথিপত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন যে, এই বাজেয়াপ্তকরণ ছিল মূলত একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ (Sarafian, 2004)। এর মাধ্যমে আনাতোলিয়ায় একটি নতুন জাতীয় বুর্জোয়া (milli burjuvazi) শ্রেণি তৈরি করার পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল। আর্মেনীয়দের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো জব্দ করা হয় এবং তাদের ব্যাংকে গচ্ছিত সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রা সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজকোষে জমা করে নেওয়া হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওনা প্রিমিয়ামের অর্থও রাষ্ট্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একটি সমাজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল।
সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক গারো মউমদজিয়ান (Garo Moumdjian) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই সম্পত্তি হরণের প্রক্রিয়াটি নির্বাসিতদের বেঁচে ফেরার সব রাস্তা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছিল (Moumdjian, 2012)। যদি কোনো মানুষ মরুভূমির নরক থেকেও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরত, তার জন্য ফিরে আসার মতো কোনো বাড়ি, জমি বা জীবিকার সংস্থান আনাতোলিয়ায় অবশিষ্ট রাখা হয়নি। স্থানীয় মুসলিম সুবিধাভোগীদের একটি বিশাল শ্রেণি এই লুণ্ঠিত সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিল, যার কারণে তারা পরবর্তীকালে আর্মেনীয়দের ফিরে আসার যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে এই অর্থনৈতিক দখলদারি কেবল সম্পত্তি হস্তান্তরের ঘটনাই ছিল না, তা ছিল নিধনযজ্ঞের ফলাফলকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার এক অমোচনীয় সামাজিক চুক্তি।
নির্বাসনের আমলাতান্ত্রিক নকশা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা (The Bureaucratic Blueprint and Logistics of Deportation)
তেহসির আইন প্রণয়নের পর নির্বাসনের পুরো অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল রাজধানী ইস্তাম্বুল থেকে নিয়ন্ত্রিত এক নিখুঁত ও আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পাবলিক সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট (Emniyet-i Umumiye) এবং বিশেষ সাইফার ব্যুরো (Şifre Kalemi) ছিল এই কার্যক্রমের মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (Hull, 2005)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশার টেবিল থেকে প্রতিদিন শত শত এনক্রিপ্ট করা বা সাংকেতিক টেলিগ্রাফ পাঠানো হতো আনাতোলিয়ার প্রতিটি প্রদেশের গভর্নর (ভালি) এবং জেলা প্রশাসকদের (মুতাশারিফ) কাছে। এই বার্তাগুলোতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকত কোন শহর থেকে কতজন মানুষকে কখন বের করতে হবে এবং কোন পাহাড়ি পথ দিয়ে তাদের হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রযন্ত্র এক দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রেখেছিল। সরকারি গেজেট ও আন্তর্জাতিক মহলের জন্য পাঠানো চিঠিপত্রে নিয়মিত নির্দেশ দেওয়া হতো যে নির্বাসিতদের খাদ্য ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে; কিন্তু একই সাথে সাইফার ব্যুরো থেকে পাঠানো অত্যন্ত গোপন কোডেড টেলিগ্রাফে আসত সম্পূর্ণ বিপরীত আদেশ (Marashlian, 1991)। গোপন বার্তাগুলোতে স্পষ্ট নির্দেশ থাকত যে নির্বাসিত কাফেলাগুলোর কোনো সদস্য যেন তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে জীবিত পৌঁছাতে না পারে। জেলা পর্যায়ের আমলারা জানতেন কোন আদেশটি লোকদেখানো আর কোন আদেশটি আসলে পালনীয়। যে সকল সৎ কর্মকর্তা – যেমন আঙ্কারার গভর্নর মাজহার বে বা কাস্তামনুর গভর্নর রশীদ পাশা – এই অমানবিক গোপন আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের রহস্যজনকভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
লজিস্টিক ক্ষেত্রে তৎকালীন আধুনিক পরিবহন পরিকাঠামোকে এই নিধনযজ্ঞের কাজে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। পশ্চিম আনাতোলিয়া ও কিলিকিয়া অঞ্চলের মানুষকে পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল বাগদাদ রেলপথ (Baghdad Railway) (Ternon, 1981)। একেকটি ছোট ও বাতাসহীন মালগাড়ির ওয়াগনে আশি থেকে নব্বই জন মানুষকে পশুর মতো গাদাগাদি করে তোলা হতো। তীব্র গরমে কোনো জল বা খাবার ছাড়া দিনের পর দিন ট্রেনগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত। ট্রেনের ভেতরের দমবন্ধ করা পরিবেশেই শিশু ও বৃদ্ধরা মারা যেত। অন্যদিকে পাহাড়ি পূর্ব প্রদেশগুলোতে যেখানে রেলপথ ছিল না, সেখানে হাজার হাজার মানুষকে শত শত মাইল পায়ে হেঁটে মরুভূমির দিকে যাত্রা করতে বাধ্য করা হতো।
ইতিহাসবিদ ইসাবেল হাল (Isabel Hull) তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় আধুনিক আমলাতন্ত্রের ‘অব্যক্তিগত দক্ষতা’ এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল (Hull, 2005)। আমলারা সাধারণ মানুষকে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে কেবল দাপ্তরিক ফাইলের সংখ্যা এবং জনসংখ্যার গাণিতিক হিসাব হিসেবে দেখেছিল। প্রতিটি কাফেলার জন্য জেন্ডারমে বা পুলিশের দল ঠিক করে দেওয়া হতো, যাদের কাজ ছিল কাফেলাগুলোকে কোনো সুপেয় জলের উৎস বা জনবসতিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে দুর্গম মরুভূমির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমলাতান্ত্রিক এই ঠান্ডা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে যে, এই নিধনযজ্ঞ কোনো স্থানীয় বিশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা ছিল না, বরং তা ছিল একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত আধুনিক রাষ্ট্রীয় অভিযান।
‘স্থানান্তর’ বনাম বিনাশ: প্রত্যক্ষদর্শীদের দলিল ও বাস্তব পরিণতি (‘Relocation’ versus Annihilation: Eyewitness Evidence and Real Consequences)
অটোমান সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় এই পুরো অভিযানকে বর্ণনা করা হয়েছিল একটি নিরাপদ ও মানবিক ‘স্থানান্তর’ (relocation) বা যুদ্ধকালীন সাময়িক পুনর্বাসন হিসেবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সংরক্ষিত হাজার হাজার নথি প্রমাণ করে যে এই তথাকথিত স্থানান্তর আদতে ছিল একটি সুপরিকল্পিত মৃত্যুর ফাঁদ (Naimark, 2001)। নির্বাসনের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়ার ধূসর মরুভূমি – বিশেষ করে দের জোর (Deir ez-Zor), রাস আল-আইন এবং মেসকেন এলাকা। এই অঞ্চলগুলো ছিল সম্পূর্ণ অনাবাদী, যেখানে স্বাভাবিকভাবে মানুষের বেঁচে থাকার মতো কোনো খাদ্য বা সুপেয় জলের উৎস ছিল না।
সেই সময় আনাতোলিয়ায় অবস্থানরত নিরপেক্ষ বিদেশি কূটনীতিক, আমেরিকান মিশনারি এবং অটোমানদের মিত্র জার্মান সেনা কর্মকর্তাদের নথিতে এই ট্র্যাজেডির জীবন্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস বার্টন তার সংকলিত নথিতে উল্লেখ করেছেন যে, এই নির্বাসন কোনো স্থানান্তর ছিল না, এটি ছিল মূলত অনাহার ও নির্যাতনের মাধ্যমে একটি জাতিকে ধীরে ধীরে শেষ করে দেওয়ার এক নির্মম পদ্ধতি (Barton, 1998)। কাফেলাগুলো যখন মরুভূমির দিকে এগিয়ে যেত, তখন পথে পুলিশ ও স্থানীয় ডাকাত দলের সহায়তায় পুরুষদের কাফেলা থেকে আলাদা করে গুলি করে বা কুপিয়ে হত্যা করা হতো। বাকি নারী ও শিশুদের দিনের পর দিন কোনো খাদ্য ও জল ছাড়া তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো।
গণহত্যা গবেষক নরম্যান নাইমার্ক (Norman Naimark) এবং মার্ক লেভেন (Mark Levene) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মরুভূমির চরম প্রতিকূল পরিবেশকে রাষ্ট্র এখানে একটি জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল (Naimark, 2001; Levene, 2005)। কোনো গোলাবারুদ খরচ না করেই কেবল ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ডায়রিয়া ও ক্লান্তির মুখে ঠেলে দিয়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছিল। যারা সমস্ত বাধা অতিক্রম করে মরুভূমির অন্তিম শিবিরে পৌঁছাতে পেরেছিল, তাদেরও পরবর্তীতে নতুন করে হত্যা করার নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের তোলা ছবি – যা গোপনে তুলে এনেছিলেন জার্মান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরমিন টি. ভেগনার – আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এই সত্যকে সন্দেহাতীতভাবে তুলে ধরেছিল যে, ‘স্থানান্তর’ শব্দটি ছিল নিছক একটি পরিভাষা, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আনাতোলিয়ার বুক থেকে পুরো একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
গণহত্যার সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্রীয় সংগঠন (Decision-Making and Organization of the Genocide): কেন্দ্র, স্থানীয় প্রশাসন ও স্পেশাল অর্গানাইজেশন
সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু: সিইউপি কেন্দ্রীয় কমিটি ও গোপন বৈঠক (The Decision-Making Core: The CUP Central Committee and Secret Meetings)
১৯১৪ সালের শীতকাল থেকে ১৯১৫ সালের বসন্তের মধ্যবর্তী সময়ে অটোমান রাজধানী ইস্তাম্বুলের দৃশ্যপট ছিল অত্যন্ত থমথমে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস বা সিইউপি-র নীতিনির্ধারকরা এক রুদ্ধদ্বার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। কোনো প্রকাশ্য সংসদীয় বিতর্ক বা সরকারি মন্ত্রিসভার সাধারণ বৈঠকে বড় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছিল না। প্রকৃত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি (Merkez-i Umumî)-র হাতে (Semelin, 2007)। নুরুওসমানিয়েতে অবস্থিত দলের প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত গোপন বৈঠক বসত। এই বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থাকতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা, যুদ্ধমন্ত্রী এনোভার পাশা, দলের সাধারণ সম্পাদক মিধাত শকরু ব্লেদা (Midhat Şükrü Bleda) এবং দুই প্রভাবশালী আদর্শিক চিকিৎসক।
এই গোপন শলা-পরামর্শে তৎকালীন বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি এবং সারিকামিশের পরাজয় পরবর্তী সীমান্ত সংকট নিয়ে বিশদ আলোচনা হতো। দলের ভেতরের চরমপন্থী অংশটি যুক্তি দেখায় যে, বহু বছর ধরে চলে আসা সংস্কারের চাপ এবং তথাকথিত আর্মেনীয় প্রশ্নকে আর কোনো আইনি বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে মেটানো সম্ভব নয়। তাদের মতে, আনাতোলিয়াকে নিরাপদ করতে হলে এবং তুর্কি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে এই জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী জ্যাক সেমেলিন (Jacques Semelin) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে চরম সংকটের মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক ধরনের ‘সর্বাত্মক সমাধান’-এর মানসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে (Semelin, 2007)। সিইউপি কেন্দ্রীয় কমিটিও সিদ্ধান্ত নেয় যে, আংশিক দমন নয়, বরং পুরো আনাতোলিয়া থেকে এই সমাজকে শারীরিকভাবে মুছে ফেলাই হবে একমাত্র পথ।
জার্মান দূতাবাসের গোপন নথিপত্র এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত প্রামাণ্য দলিলে এই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। জার্মান গবেষক ভল্ফগ্যাং গুস্ট (Wolfgang Gust) সংকলিত কূটনৈতিক নথিতে দেখা যায় যে, ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছিল (Gust, 2014)। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র এবং তাদের নিজস্ব দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে এক সমান্তরাল নেটওয়ার্কে যুক্ত করে। রাষ্ট্রীয় বাজেট, সামরিক অস্ত্রাগার এবং সরকারি যোগাযোগ পরিকাঠামোকে এই গোপন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অধীনে নিয়ে আসা হয়। কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি দলিল ছাড়াই মৌখিক নির্দেশ ও সাংকেতিক চিঠির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রদেশের শীর্ষ নেতাদের কাছে।
ডক্টর নাযিম, বাহাত্তিন শাকির ও চরমপন্থী মতাদর্শী চক্র (Dr. Nazım, Bahaeddin Şakir and the Extremist Ideological Circle)
সিইউপি কেন্দ্রীয় কমিটির এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনে যে দুজন ব্যক্তি সবচেয়ে প্রভাবশালী মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করেছিলেন, তারা উভয়েই ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। এদের একজন ছিলেন ডক্টর সেলিম নাযিম (Dr. Selim Nazım) এবং অন্যজন ডক্টর বাহাত্তিন শাকির (Dr. Bahaeddin Şakir)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও তারা বিজ্ঞান ও জীববিদ্যার ধারণাকে বিকৃতভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। তারা সমাজকে দেখতেন একটি জৈবিক শরীর হিসেবে এবং আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীকে সংজ্ঞায়িত করতেন সেই শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধা এক ‘মারাত্মক রোগজীবাণু’ বা টিউমার হিসেবে (Fein, 1979)। তাদের ধারণা ছিল, শরীরকে বাঁচাতে হলে যেমন বিষাক্ত অঙ্গ কেটে ফেলে দিতে হয়, তেমনই সাম্রাজ্যকে বাঁচাতে হলে এই পুরো জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানী হেলেন ফাইন (Helen Fein) তার প্রভাবশালী গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যে, কীভাবে চরমপন্থী মতাদর্শীরা অন্য মানুষকে মানবিক বিবেচনার বাইরে ঠেলে দেয় (Fein, 1979)। ডক্টর নাযিম কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন বৈঠকগুলোতে প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন যে, যদি একজন আর্মেনীয়ও আনাতোলিয়ায় বেঁচে থাকে, তবে ভবিষ্যতে তারা আবার স্বাধিকারের দাবি তুলবে এবং সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনবে। ফলে তাদের নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দয়া, মানবিকতা বা বয়স-লিঙ্গের পার্থক্য রাখা চলবে না। এই চিকিৎসকরা নিজেদের কোনো অপরাধী ভাবতেন না; বরং তারা বিশ্বাস করতেন তারা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এক ঐতিহাসিক ও অপরিহার্য শল্যচিকিৎসা পরিচালনা করছেন।
ডক্টর বাহাত্তিন শাকির কেবল তত্ত্ব দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি ছিলেন এই নিধনযজ্ঞের মাঠপর্যায়ের প্রধান রূপকার। তিনি সিইউপি-র রাজনৈতিক ব্যুরোর দায়িত্ব নিয়ে সরাসরি পূর্ব ফ্রন্টে চলে যান এবং এরজুরুমে নিজের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন (Alvarez, 2001)। সেখান থেকে তিনি স্থানীয় কুর্দি গোত্রপ্রধান, ডাকাত দল এবং উগ্র দলীয় ক্যাডারদের একত্রিত করে নিধনকারী বাহিনী গঠন করেন। অপরাধবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার আলভারেজ (Alex Alvarez) উল্লেখ করেছেন যে, বাহাত্তিন শাকিরের এই সরাসরি মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি প্রমাণ করে এই নিধনযজ্ঞ কোনো স্থানীয় ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ ছিল না, বরং তা ছিল শীর্ষ মতাদর্শীদের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত এক নিখুঁত অপারেশন (Alvarez, 2001)। তার পাঠানো সাংকেতিক চিঠিগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কোনো কাফেলা যেন মরুভূমির গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারে।
তেশকিলাত-ই মাহসুসা: প্যারা-মিলিটারি নিধনযন্ত্রের গঠন ও কার্যক্রম (Teşkilât-ı Mahsusa: Structure and Operations of the Paramilitary Death Machine)
আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছিল একটি গোপন আধাসামরিক বাহিনী, যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল তেশকিলাত-ই মাহসুসা (Teşkilât-ı Mahsusa) বা স্পেশাল অর্গানাইজেশন। যুদ্ধের শুরুতে এই বাহিনীটিকে গঠন করা হয়েছিল শত্রুসীমানার ভেতরে গিয়ে গেরিলা যুদ্ধ ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য। কিন্তু ১৯১৫ সালের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের যৌথ নির্দেশনায় এই সংগঠনের সম্পূর্ণ চরিত্র ও লক্ষ্য বদলে ফেলা হয় (Safarian, 2016)। এর একমাত্র প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় আনাতোলিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া নিরস্ত্র বেসামরিক কাফেলাগুলোকে আক্রমণ করা এবং তাদের হত্যা করা।
এই বাহিনীর সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও অভিনব। তৎকালীন বিচার মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাজার হাজার দাগি অপরাধী, খুনি ও দুধর্ষ ডাকাতদের শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয় (Gerwarth & Horne, 2012)। তাদের এই বিশেষ শর্তে ক্ষমা করা হয়েছিল যে তারা স্পেশাল অর্গানাইজেশনের অধীনে গঠিত বিশেষ সশস্ত্র দল বা ‘চেতে’ (çete)-তে যোগ দেবে এবং রাষ্ট্রের দেওয়া গোপন দায়িত্ব পালন করবে। এই অপরাধীদের অস্ত্র ও ঘোড়া সরবরাহ করত স্বয়ং যুদ্ধ মন্ত্রণালয়। তাদের নেতৃত্ব দিতেন সেনাবাহিনীর কট্টরপন্থী তরুণ অফিসার অথবা সিইউপি-র বিশ্বস্ত দলীয় নেতারা।
ইতিহাসবিদ রবার্ট গেরওয়ার্থ (Robert Gerwarth) এবং জন হর্ন তাদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র অপরাধী চক্রগুলোকে নিজের ধ্বংসাত্মক কাজে বৈধতা দিয়ে যুক্ত করেছিল (Gerwarth & Horne, 2012)। এই চেতে দলগুলোকে পূর্ব আনাতোলিয়ার কৌশলগত পাহাড়ি গিরিপথ এবং নদীর বাঁকগুলোতে আগে থেকেই মোতায়েন করে রাখা হতো। এর মধ্যে এরজিঞ্জানের নিকটবর্তী বিখ্যাত কেমাখ গিরিখাত (Kemakh Gorge), হারপুতের পাহাড়ি উপত্যকা এবং দিয়ারবেকিরের সংলগ্ন অঞ্চলগুলো ছিল অন্যতম। নিয়মিত পুলিশ যখন বেসামরিক মানুষদের কাফেলা নিয়ে এই নির্জন এলাকাগুলোতে পৌঁছাত, তখন তারা কাফেলাগুলোকে এই চেতেদের হাতে তুলে দিত। কোনো প্রকার গোলাবারুদ নষ্ট না করে তারা ধারালো অস্ত্র ও পাথর ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে কুপিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিত। তেশকিলাত-ই মাহসুসা ছিল আধুনিক রাষ্ট্রের এমন এক প্যারা-মিলিটারি নিধনযন্ত্র, যা রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে এই গণহত্যা সম্পন্ন করেছিল।
দ্বৈত শাসন ও প্রাদেশিক প্রশাসনের সমান্তরাল চেইন অব কমান্ড (Dual Authority and the Parallel Chain of Command in Provincial Administration)
গণহত্যার পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অটোমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক অদ্ভুত দ্বৈত শাসন চালু করা হয়েছিল। একপক্ষে ছিল ব্রিটিশ বা ফরাসি কাঠামোর আদলে গড়ে ওঠা চিরাচরিত আমলাতন্ত্র – যেমন প্রাদেশিক গভর্নর (ভালি), জেলা প্রশাসক (মুতাশারিফ) এবং স্থানীয় জেন্ডারমে পুলিশ। অন্যপক্ষে ছিল সিইউপি দলের নিজস্ব প্যারালাল বা সমান্তরাল নেটওয়ার্ক, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিটি প্রদেশে নিযুক্ত দলীয় প্রতিনিধি বা মুরাহহাস (murahhas) এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক (Midlarsky, 2005)। এই দলীয় প্রতিনিধিরা সরাসরি ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং স্থানীয় যে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর তাদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা ছিল।
এই সমান্তরাল কাঠামোর কারণে স্থানীয় পর্যায়ে আইনের শাসন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত একজন জেলা প্রশাসক কোনো কাফেলাকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সাথে সাথে সিইউপি-র স্থানীয় পার্টি সেক্রেটারি বা তেশকিলাত-ই মাহসুসার কমান্ডার এসে সেই নির্দেশ বাতিল করে দিচ্ছে। রাজনীতিবিজ্ঞানী ম্যানুস মিডলারস্কি (Manus Midlarsky) তার তাত্ত্বিক গবেষণায় এই দ্বৈত শাসনকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের এক বড় হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Midlarsky, 2005)। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার আনুষ্ঠানিক আইনকানুনকে বজায় রাখার ভান করত, অথচ তলে তলে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে চরম নৃশংসতা কার্যকর করাত।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে উগ্র প্রকাশ দেখা গিয়েছিল দিয়ারবেকির প্রদেশে। সেখানে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কুখ্যাত ডক্টর মেহমেদ রশীদ (Dr. Mehmed Reşid)-কে। তিনি ছিলেন সিইউপি-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি দায়িত্ব নিয়েই পুরো স্থানীয় প্রশাসনকে দলীয় নিধনযন্ত্রে রূপান্তর করেন। আমেরিকান মিশনারি হেনরি রিগস (Henry Riggs) হারপুত থেকে পাঠানো তার সমকালীন বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন যে, স্থানীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় আইনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কেবল চরমপন্থী দলীয় নির্দেশনাই ছিল শেষ কথা (Riggs, 1997)। ডক্টর রশীদের মতো কট্টরপন্থীরা সাধারণ জেন্ডারমে বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব সশস্ত্র মিলিশিয়া তৈরি করেছিলেন, যারা কাঠ দিয়ে তৈরি বিশেষ ভেলায় করে হাজার হাজার মানুষকে তায়গ্রিস নদীতে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে মারত।
অবাধ্য কর্মকর্তাদের অপসারণ ও প্রশাসনিক প্রতিরোধ দমন (Purging Dissenting Officials and Crushing Administrative Resistance)
অটোমান প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা কিন্তু সিইউপি-র এই অমানবিক রক্তপাতের নির্দেশ মুখ বুজে মেনে নেননি। আনাতোলিয়ার বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, যারা নিজেদের বিবেক ও পেশাগত সততা বজায় রাখতে গিয়ে এই নিধনযজ্ঞের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। এদের মধ্যে আলেপ্পো ও পরবর্তীতে কোনিয়ার গভর্নর মেহমেদ জালাল বে (Mehmed Celal Bey), আঙ্কারার গভর্নর হাসান মাজহার বে (Hasan Mazhar Bey) এবং বাসরার গভর্নর সুলেমান নাজিম অন্যতম ছিলেন (Kunzler, 1921)। এই কর্মকর্তারা স্পষ্ট ভাষায় কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়েছিলেন যে তারা নিরীহ বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নির্বাসনে পাঠানোর নামে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারবেন না।
কিন্তু সিইউপি নেতৃত্ব যে কোনো ধরনের প্রশাসনিক ভিন্নমত বা প্রতিরোধকে অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমন করে। যে সকল কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় আদেশ অমান্য করেছিলেন, তাদের চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশে পদচ্যুত করা হয়। হাসান মাজহার বে যখন আঙ্কারার আর্মেনীয়দের গ্রেফতার করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করে সেখানে কট্টরপন্থী আতিফ বের মতো অনুগত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন। সুইস চিকিৎসক জ্যাকব কুনজলার (Jakob Kunzler) উরফা থেকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে লিখেছেন যে, যারা রাষ্ট্রীয় নির্দেশ পালনে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তাদের চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল (Kunzler, 1921)।
এই প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযানের সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার হয়েছিলেন লিসের জেলা প্রশাসক হুসেইন নেসিমি বে (Hüseyin Nesimi Bey)। তিনি তার এলাকার আর্মেনীয়দের হত্যা করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং দিয়ারবেকিরের গভর্নর ডক্টর রশীদের আদেশ মানতে অস্বীকার করেছিলেন। এর শাস্তি হিসেবে ডক্টর রশীদের পাঠানো বিশেষ চেতে দল হুসেইন নেসিমিকে পথিমধ্যে আক্রমণ করে হত্যা করে এবং তার মরদেহ একটি খাদে ফেলে দেয়। একই পরিণতি হয়েছিল দারিয়েলের কায়মাকাম জালাল বের। জার্মান শিক্ষক মার্টিন নিপাগে (Martin Niepage) আলেপ্পো থেকে পাঠানো তার নথিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, এই ধরনের একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো আমলাতন্ত্রকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে সামান্যতম মানবিকতা বা করুণা দেখালে নিজের প্রাণ হারাতে হবে (Niepage, 1917)। ফলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ভয়ে ও আতঙ্কে এক অখণ্ড আজ্ঞাবহ নিধনযন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
আমলাতান্ত্রিক যৌক্তিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার সমাজতত্ত্ব (Bureaucratic Rationality and the Sociology of Institutionalized Genocide)
সমাজতাত্ত্বিক ও তুলনামূলক গণহত্যা গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞ কোনো মধ্যযুগীয় বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক আমলাতান্ত্রিক যুক্তিবাদ ও চরম জাতীয়তাবাদের এক যৌথ পরিণতি। সমাজবিজ্ঞানী হেলেন ফাইন প্রণীত বাধ্যবাধকতার বলয় (universe of obligation) তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে তার মানবিক সুরক্ষা ও আইনি সীমানার বাইরে ঘোষণা করে, তখন তাদের ধ্বংস করাকে সমাজ আর কোনো পাপ বা অপরাধ মনে করে না (Fein, 1979)। সিইউপি নেতৃত্ব এই সীমানাটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করেছিল।
গণহত্যা গবেষক ফ্র্যাঙ্ক চক (Frank Chalk) এবং কার্ট জোনাসন তাদের ধ্রুপদী গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীর প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যাগুলো সম্পন্ন করতে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের সহযোগিতার প্রয়োজন হয় (Chalk & Jonassohn, 1990)। আনাতোলিয়াতেও ঠিক তাই ঘটেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে স্থানীয় কাস্টমস কর্মকর্তা, রেলওয়ের ক্লার্ক এবং টেলিগ্রাফ অপারেটর – প্রত্যেকেই নিজ নিজ দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়েই এই বিশাল অপরাধের অংশীদারে পরিণত হয়েছিল। মনোবিজ্ঞানী এরভিন স্টব (Ervin Staub) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ মানুষ কোনো দানব হয়ে জন্মায় না; কিন্তু ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, ভীতি এবং আনুগত্যের সংস্কৃতির কারণে তারা ধীরে ধীরে চরম অমানবিক কাজকে স্বাভাবিক দাপ্তরিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে (Staub, 1989)।
তাত্ত্বিক রুডলফ রামেল (R. J. Rummel) এই ধরনের রাষ্ট্রীয় অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ডেমোসাইড (democide) হিসেবে, যেখানে রাষ্ট্র তার নিজস্ব নাগরিকদের বিরুদ্ধে চরমতম প্রাণঘাতী ক্ষমতা প্রয়োগ করে (Rummel, 1994)। কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যন্ত একটি জটিল সাংগঠনিক চেইন তৈরি করা হয়েছিল, যার প্রতিটি খাঁজ ছিল অন্যটির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখাটি প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় গণহত্যা কোনো সাময়িক নিয়ন্ত্রণহীন দাঙ্গার ফল ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিকল্পনা, সমান্তরাল আধাসামরিক নেটওয়ার্ক এবং আমলাতান্ত্রিক আনুগত্যের এক সুসমন্বিত ও পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ।
নির্বাসন, মৃত্যুমিছিল ও হত্যাকাণ্ড (Deportations, Death Marches and Mass Killing): আনাতোলিয়া থেকে সিরীয় মরুভূমি
নির্বাসন কাফেলার সূচনা ও গ্রামীণ সমাজ ধ্বংস (Initiation of Deportation Convoys and the Destruction of Rural Society)
১৯১৫ সালের মে মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া দিনগুলো আনাতোলিয়ার শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাচীন জনপদগুলোর জন্য এক অন্ধকার অধ্যায় বয়ে নিয়ে আসে। পূর্ব ও মধ্য আনাতোলিয়ার শহর ও গ্রামগুলোতে একযোগে জারি করা হয় সরকারি উচ্ছেদের আদেশ। স্থানীয় টাউন স্কয়ার, গির্জার ফটক এবং বাজারগুলোতে ঢোল পিটিয়ে ও নোটিশ ঝুলিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সমস্ত আর্মেনীয় অধিবাসীকে মাত্র চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তাদের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে হবে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছিল যে, সামরিক ফ্রন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সাময়িকভাবে নিরাপদ কোনো দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশে পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু মানুষকে কেবল সেই পরিমাণ জিনিস সাথে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যা নিজের হাতে বহন করা সম্ভব। কোনো ভারি আসবাবপত্র, বাণিজ্য সামগ্রী বা পরিবারের সঞ্চিত সম্পদ সাথে নেওয়ার অধিকার কারো ছিল না (Davis, 1994)।
কাফেলাগুলো শহর বা গ্রাম ছাড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কার্যকর করা হতো প্রথম ও সবচেয়ে বিধ্বংসী কৌশলটি। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা পুরো জনগোষ্ঠীর সক্ষম পুরুষদের – পনেরো বছরের কিশোর থেকে শুরু করে সত্তর বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত – আলাদা করে ফেলত। পুরুষদের আশ্বাস দেওয়া হতো যে তাদের আলাদা সামরিক দল গঠন করে নিরাপদ সড়ক দিয়ে পথ দেখানোর জন্য আগে পাঠানো হচ্ছে, অথবা কোনো সরকারি নথিপত্রে সই করানোর জন্য জেলা সদরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শহরের সীমানা পার হয়ে মাত্র কয়েক মাইল নির্জন পাহাড়ি পথে পৌঁছানোর পরই তাদের হাত ও ঘাড় শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হতো (Atkinson, 2000)। এরপর সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা সশস্ত্র জেন্ডারমে পুলিশ বা স্থানীয় মিলিশিয়া দলগুলো কোনো প্রকার বিচার ছাড়াই তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করত কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করত।
হারপুতের আমেরিকান হাসপাতালের চিকিৎসক তেডকিন অ্যাটকিনসন (Taddeneus Atkinson) তার সমকালীন ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে, পুরুষদের এই তাৎক্ষণিক নিধনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষাহীন করে ফেলা (Atkinson, 2000)। কাফেলাগুলোতে অবশিষ্ট থাকত কেবল আতঙ্কিত নারী, স্তন্যপায়ী শিশু এবং চলাচলে অক্ষম জরাজীর্ণ বৃদ্ধরা। এই অবশিষ্ট মানুষগুলোর আত্মরক্ষা করার মতো কোনো শারীরিক সক্ষমতা ছিল না। গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজের সুদৃঢ় পারিবারিক কাঠামোটি কাফেলা শুরুর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ঘরবাড়িগুলোতে পড়ে থাকে রান্না করা খাবার, উঠানে বেঁধে রাখা গৃহপালিত গবাদিপশু এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন, যা মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় সুযোগসন্ধানী চক্রের লুণ্ঠনের বস্তুতে পরিণত হয়।
অসহায় নারী ও শিশুদের নিয়ে গঠিত এই কাফেলাগুলোকে এরপর রাস্তায় নামানো হতো। কোনো ধরনের প্রস্তুতি বা বিশ্রামের সুযোগ ছাড়াই তাদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটার নির্দেশ দেওয়া হতো। পেছনে থাকত রাইফেলধারী পুলিশের দল, যারা সামান্য ধীরগতির কারণে মানুষদের রাইফেলের বাঁট বা চাবুক দিয়ে আঘাত করত। এভাবে শুরু হয়েছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক এক মৃত্যুযাত্রা, যার প্রতিটি মাইল আনাতোলিয়ার বুক থেকে একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর পদচিহ্ন মুছে দেওয়ার সুপরিকল্পিত ছক অনুযায়ী সাজানো হয়েছিল।
ভৌগোলিক করিডোর ও পাহাড়ি গিরিপথের কসাইখানা (Geographical Corridors and the Slaughterhouses of Mountain Gorges)
আনাতোলিয়া থেকে সিরিয়ার মরুভূমির দিকে যাওয়ার পথগুলো কোনো মসৃণ বা সমতল সড়ক ছিল না। কাফেলাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবেই নিয়ে যাওয়া হতো তোরোস ও অ্যান্টি-তোরোস পর্বতমালার দুর্গম ও বিপজ্জনক পাহাড়ি গিরিপথগুলোর ভেতর দিয়ে। এই ভৌগোলিক ফাঁদগুলোকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছিল পরিকল্পিত কসাইখানা হিসেবে। বিশেষ করে এরজিঞ্জানের নিকটবর্তী কেমাখ গিরিখাত (Kemakh Gorge), সিভাস ও মালাতিয়ার সংযোগস্থলের গভীর পাহাড়ি খাদ এবং হারপুতের নিকটবর্তী লেক গোলচুক (Lake Gölcük) এলাকা হয়ে উঠেছিল হাজার হাজার নিরীহ মানুষের গণকবর (Davis, 1994)।
এই পাহাড়ি করিডোরগুলোতে পৌঁছামাত্র কাফেলাগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত স্পেশাল অর্গানাইজেশনের সশস্ত্র চেতে দল এবং স্থানীয় পাহাড়ি ডাকাত চক্র। তারা কাফেলার গতি থামিয়ে দিয়ে চারপাশ থেকে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসত। কাফেলা পাহারার দায়িত্বে থাকা পুলিশরা এই আক্রমণকারীদের বাধা দেওয়ার বদলে তাদের সাথে মিলে লুণ্ঠন ও নির্যাতনে অংশ নিত। মানুষের গায়ের শেষ জামাকাপড় ও জুতো পর্যন্ত খুলে নেওয়া হতো। এরপর খাড়া পাহাড়ের কিনারে দাঁড় করিয়ে মানুষকে একের পর এক গভীর খাদে ফেলে দেওয়া হতো। প্রত্যক্ষদর্শী আমেরিকান মিশনারি গ্রেস ন্যাপ (Grace Knapp) বিটলিস থেকে পাঠানো তার প্রামাণ্য নথিতে লিখেছিলেন যে, পাহাড়ি গিরিপথগুলো মানুষের রক্তাক্ত মরদেহে সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছিল এবং নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইউফ্রেটিস নদীর জল রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল (Knapp, 1919)।
ইউফ্রেটিস ও তায়গ্রিস নদী দুটি এই নিধনযজ্ঞে এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক ভাগাড়ে রূপ নিয়েছিল। শত শত মাইল জুড়ে নদীর বাঁকগুলোতে ও চড়ায় প্রতিদিন অগণিত মরদেহ আটকে থাকত। আমেরিকান চিকিৎসক ক্ল্যারেন্স উশার (Clarence Ussher) ভ্যান থেকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জানিয়েছিলেন যে, নদীর স্রোতে ভেসে আসা মরদেহের কারণে ভাটির গ্রামগুলোতে জল ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল (Ussher, 1917)। কোনো গোলাবারুদ খরচ না করে কেবল নদীর তীব্র স্রোতে ডুবিয়ে বা পাহাড়ি খাদে ফেলে দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নিঃশেষ করার এই ভৌগোলিক কৌশলটি অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী জন ইয়েরভান্ট (John Yervant) তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন যে, পাহাড়ি করিডোরগুলোতে কোনো মানুষের পক্ষে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না (Yervant, 1988)। একদিকে ছিল দুর্লঙ্ঘ পাথুরে খাড়া দেওয়াল, অন্যদিকে ছিল উন্মত্ত পাহাড়ি নদী বা অতল খাদ। কাফেলাগুলো যখন একটি গিরিপথ পার হতো, তখন তাদের অর্ধেকের বেশি মানুষ সেখানে প্রাণ হারাত। যে অল্প কয়েকজন কোনোমতে বেঁচে থাকত, তাদের সম্পূর্ণ নগ্ন ও রক্তাক্ত অবস্থায় পরবর্তী উপত্যকার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এভাবে আনাতোলিয়ার পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিকে ব্যবহার করে পুরো একটি জাতিকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করার পথ সুগম করা হয়েছিল।
মরুযাত্রার শারীরিক বিন্যাস: ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও মহামারি (Physicality of the Desert Marches: Starvation, Thirst and Epidemics)
পাহাড়ের রক্তক্ষয়ী পথ পেরিয়ে যে কাফেলাগুলো দক্ষিণ আনাতোলিয়ার সমতল ভূমি অতিক্রম করে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হতো, তাদের সামনে নেমে আসত আরও এক ধীরগতির যন্ত্রণাদায়ক নিধনের পর্যায়। এটি ছিল মরুভূমির মৃত্যুমিছিল (death marches in the desert)। সিরিয়ার তপ্ত বালির ওপর দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নগ্ন পায়ে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। দিনের বেলা মরুভূমির তাপমাত্রা পৌঁছাত চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আর রাতের বেলা নেমে আসত হাড় কাঁপানো তীব্র ঠান্ডা। মানুষের শরীরের চামড়া রোদে পুড়ে ফোস্কা পড়ে যেত এবং পা কেটে রক্তে ভেসে যেত।
এই মৃত্যুমিছিলের সবচেয়ে অমানবিক দিক ছিল পানীয় জলের অভাব। কাফেলা পাহারার দায়িত্বে থাকা জেন্ডারমেদের ওপর নির্দেশ ছিল যেন কাফেলাগুলোকে কোনো নদী, ঝরনা বা কুয়োর কাছে থামতে না দেওয়া হয়। তৃষ্ণার্ত মানুষ যখন জলের জন্য নদীর দিকে ছুটে যেত, তখন পুলিশরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাত। বাধ্য হয়ে মানুষ নিজের ঘাম চুষে কিংবা চরম তৃষ্ণায় কাদামাটি খেয়ে বাঁচতে চেষ্টা করত (Bedoukian, 1978)। খাবারের কোনো সরবরাহ ছিল না; মায়েরা তাদের সন্তানদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য রাস্তার ধারের শুকনো ঘাস ও গাছের ছাল চিবিয়ে দিতেন। শরীর যখন দীর্ঘদিনের অনাহারে শুকিয়ে কঙ্কালে পরিণত হতো, তখন মানুষ এক পা ফেলার শক্তিও হারিয়ে ফেলত।
হারপুতের আমেরিকান অনাথ আশ্রমের ড্যানিশ মিশনারি মারিয়া জ্যাকবসেন (Maria Jacobsen) তার প্রকাশিত ঐতিহাসিক ডায়েরিতে লিখেছেন যে, এই মৃত্যুমিছিল ছিল মূলত মানুষের শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতাকে ভেঙে দেওয়ার এক আধুনিক জৈবিক পদ্ধতি (Jacobsen, 2001)। কোনো মানুষ ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে কাফেলা থামানো হতো না; তাকে পেছনের রোদ ও বালির মধ্যে ফেলে রেখেই সামনের দল এগিয়ে যেত। পেছনের পাহারাদাররা নিশ্চিত করত যাতে পড়ে থাকা মানুষটি আর কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে না পারে।
বেঁচে যাওয়া কিশোর কেরাপ বেদোকিয়ান (Kerop Bedoukian) তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, অপুষ্টি ও ক্লান্তির সাথে সাথে শুরু হয়েছিল টাইফাস, কলেরা এবং ডিসেন্ট্রির মতো মারাত্মক মহামারি (Bedoukian, 1978)। কাফেলার ভেতর রোগাক্রান্ত মানুষদের আলাদা করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ত এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যেত। রাস্তার দুই পাশে মাইলকে মাইল জুড়ে ছড়িয়ে থাকত মানুষের শুকিয়ে যাওয়া হাড় ও খুলি, যা দেখে পেছনের কাফেলাগুলো বুঝতে পারত তারা সঠিক মৃত্যুর পথেই এগিয়ে চলেছে।
ট্রানজিট পয়েন্ট ও সিরীয় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নেটওয়ার্ক (Transit Points and the Network of Syrian Concentration Camps)
আনাতোলিয়া অতিক্রম করার পর যে ভগ্ন কাফেলাগুলো সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করত, তাদের জন্য কোনো মুক্ত জীবন অপেক্ষা করছিল না। আলেপ্পো শহরের চারপাশের অঞ্চল এবং ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এক সুসংগঠিত ট্রানজিট ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নেটওয়ার্ক। এই ক্যাম্পগুলোর প্রধান অবস্থান ছিল কাটমা, আজাজ, আল-বাব, লালে, মেসকেন, ডিপসি, আবুহারা, হামাম, সেবকা এবং রাস আল-আইন (Carzou, 1975)। সরকারি নথিপত্রে এগুলোকে ‘পুনর্বাসন ও ট্রানজিট কেন্দ্র’ বলা হলেও, বাস্তবে এগুলো ছিল খোলা আকাশের নিচে কাঁটাতার ছাড়া তৈরি একেকটি মৃত্যু উপত্যকা।
ক্যাম্পগুলোতে কোনো তাঁবু, ছাদ বা আশ্রয়ের ন্যূনতম কাঠামো ছিল না। হাজার হাজার মানুষ ধুলাবালি ও রোদের হাত থেকে বাঁচতে মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে কিংবা কাপড়ের টুকরো লাঠিতে ঝুলিয়ে কোনোমতে মাথা গোঁজার চেষ্টা করত। এই ক্যাম্পগুলোর সার্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য ইস্তাম্বুলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করত নির্বাসন সাব-ডিরেক্টরেট (Sevkiyat Müdiriyeti)। এই দপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিদিন ক্যাম্পগুলোতে উপস্থিত হতো কেবল মানুষের সংখ্যা গণনা করতে এবং সেখান থেকে কতজন মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে তার হিসাব নথিভুক্ত করতে। ক্যাম্পের ভেতরে কোনো খাদ্য, সুপেয় জল বা চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
আলেপ্পোর চার্চের যাজক ইফরেম জেরনাজিয়ান (Ephraim Jernazian) তার প্রত্যক্ষ বিবরণীতে রাস আল-আইন এবং মেসকেনের ক্যাম্পগুলোর অবর্ণনীয় চিত্র তুলে ধরেছেন (Jernazian, 1990)। মানুষ ক্ষুধা মেটানোর জন্য পশুর পচা নাড়িভুঁড়ি এবং বর্জ্যের মধ্য থেকে খাবারের দানা খুঁজত। প্রতিদিন সকালে ক্যাম্পের ভেতর থেকে শত শত মরদেহ তুলে নেওয়ার জন্য সরকারি মালগাড়ি আসত। সেই মরদেহগুলোকে শহরের বাইরে মরুভূমিতে আগে থেকে খুঁড়ে রাখা বিশাল গর্তে গণকবর দেওয়া হতো। ইতিহাসবিদ জঁ-মারি কারজু (Jean-Marie Carzou) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, এই ট্রানজিট ক্যাম্পগুলো ছিল একটি সুপরিকল্পিত ফিল্টারিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে অবশিষ্ট মানুষদের শারীরিক শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে তাদের চূড়ান্ত নিধনের জন্য প্রস্তুত করা হতো (Carzou, 1975)।
ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা সামরিক কমান্ডাররা প্রায়ই ক্যাম্পগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করত। আন্তর্জাতিক কোনো সাহায্য সংস্থা যাতে এই বন্দিদের কাছে খাদ্য বা ওষুধ নিয়ে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য ক্যাম্পগুলোর চারপাশে পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছিল। যদি কোনো স্থানীয় আরব বা বেদুইন গোপনে কোনো শিশুকে এক টুকরো রুটি দেওয়ার চেষ্টা করত, তবে তাকেও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোর নেটওয়ার্ক ছিল আধুনিক আমলাতন্ত্রের এক নির্মম সৃষ্টি, যা মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার কাজে কোনো ত্রুটি রাখেনি।
দের জোরের চূড়ান্ত নিধনযজ্ঞ: ১৯১৬ সালের দ্বিতীয় পর্যায় (The Final Annihilation of Deir ez-Zor: The Second Phase of 1916)
১৯১৫ সালের পুরো বছর জুড়ে চলা ধ্বংসযজ্ঞ এবং মরুযাত্রার পরও প্রায় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ মানুষ কোনোমতে সিরিয়ার মরুভূমির বিভিন্ন প্রান্তে এবং ক্যাম্পে বেঁচে ছিল। তারা ভেবেছিল হয়তো নির্বাসনের ঝড় থেমে গেছে এবং তারা এই মরুভূমিতে কোনোভাবে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নেবে। কিন্তু ১৯১৬ সালের বসন্তে সিইউপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই অবশিষ্ট জীবিত মানুষদের সম্পূর্ণ মুছে ফেলার এক নতুন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা ইতিহাসবিদদের কাছে পরিচিত ‘গণহত্যার দ্বিতীয় পর্যায়’ (Second Phase of the Genocide) নামে (Hartunian, 1968)। এই চূড়ান্ত অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সিরীয় মরুভূমির একেবারে গভীরে অবস্থিত দের জোর (Deir ez-Zor) অঞ্চল।
দের জোরের তৎকালীন প্রাদেশিক গভর্নর ছিলেন তুলনামূলকভাবে মানবতাবাদী আলী সুয়াদ বে (Ali Suad Bey)। তিনি নির্বাসিতদের দুর্দশা দেখে তাদের কিছু মাটির কুঁড়েঘর তৈরি করার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং অনাথ শিশুদের জন্য রুটির ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু ইস্তাম্বুলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে আলী সুয়াদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। তার জায়গায় ১৯১৬ সালের জুলাই মাসে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এক কুখ্যাত ও চরমপন্থী আমলা সালিহ জেকি বে (Salih Zeki Bey)-কে (Ward, 1923)। সালিহ জেকি দের জোরে পৌঁছেই ঘোষণা করেছিলেন যে তার দায়িত্ব কোনো মানুষকে বাঁচানো নয়, বরং এই মরুভূমিকে যে কোনো মূল্যে আর্মেনীয়মুক্ত করা।
১৯১৬ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে সালিহ জেকির প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পরিচালিত হয় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ পরিকল্পিত গণহত্যা। দের জোরের আশেপাশের ক্যাম্পগুলো থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হতো মারাত, সুওয়ার এবং মারগাদার মরুভূমির গভীর গুহাগুলোর দিকে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে সরাসরি মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করা হতো। বহু ক্ষেত্রে হাজার হাজার মানুষকে মরুভূমির প্রাকৃতিক গুহাগুলোতে ঢুকিয়ে গুহামুখে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো, যাতে বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে সবাই মারা যায় (Hartunian, 1968)।
আমেরিকান চিকিৎসক ও ত্রাণকর্মী মার্ক ওয়ার্ড (Mark Ward) তার কূটনৈতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন যে, মাত্র চার মাসের ব্যবধানে দের জোর ও এর সংলগ্ন মরু অঞ্চলে প্রায় দুই লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল (Ward, 1923)। যাদের সরাসরি গুলি করা হয়নি, তাদের খাবার ও জল ছাড়া গভীর মরুভূমির বালুর চড়ায় তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তারা তীব্র রোদে পুড়ে মারা যায়। মারগাদার মরু উপত্যকাটি পরিণত হয়েছিল মানুষের কঙ্কাল ও মাটির এক সম্মিলিত পাহাড়ে। এই দ্বিতীয় পর্যায়ের নিধনযজ্ঞের মধ্য দিয়ে সিরিয়ার মরুভূমিতে একটি জাতির শেষ বেঁচে থাকা অংশটিকেও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও গণকবরের মানচিত্র (Eyewitness Accounts and Mapping the Mass Graves)
আনাতোলিয়ার সবুজ পাহাড়ি উপত্যকা থেকে শুরু করে মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়ার ধূসর মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত এই ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস কেবল কোনো অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তৎকালীন সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যে অবস্থানরত নিরপেক্ষ কূটনীতিক, চিকিৎসক, মিশনারি এবং অটোমানদের মিত্র জার্মানির সেনা কর্মকর্তাদের নথিপত্রে এই নিধনযজ্ঞের প্রতিটি পদক্ষেপের বিশদ ও নিখুঁত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী লিও কুপার (Leo Kuper) তার তুলনামূলক গণহত্যা তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞের প্রমাণসমূহ এতোটাই বিস্তৃত ও অকাট্য যে তা আধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধের অন্যতম স্পষ্টতম ভিত্তি তৈরি করে (Kuper, 1981)।
হারপুতে নিযুক্ত আমেরিকান কনসাল লেসলি ডেভিস (Leslie Davis) নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে তার কনস্যুলার এলাকার আশেপাশের শত শত মাইল ঘুরে দেখেছিলেন। তিনি তার বিখ্যাত কূটনৈতিক প্রতিবেদন দ্য স্লটারহাউস প্রভিন্স (The Slaughterhouse Province)-এ উল্লেখ করেছিলেন কীভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে শহরের বাইরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হতো (Davis, 1994)। তিনি হারপুতের লেক গোলচুকের চারপাশের উপত্যকাগুলোতে প্রায় দশ হাজার মানুষের মরদেহ ব্যক্তিগতভাবে গণনা করেছিলেন এবং একটি বিস্তারিত ভৌগোলিক মানচিত্র প্রস্তুত করেছিলেন, যেখানে প্রতিটি গণকবর ও বধ্যভূমির অবস্থান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল।
একই সময়ে জার্মান ফিল্ড মেডিকেল কোরের কর্মকর্তা আরমিন টি. ভেগনার তার ব্যক্তিগত ক্যামেরা দিয়ে নির্বাসিত কাফেলা ও দের জোরের ক্যাম্পগুলোর শত শত প্রামাণ্য আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন। অটোমান সেন্সরশিপের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি সেই ছবিগুলো নেগেটিভ বেল্টের ভেতরে লুকিয়ে জার্মানিতে নিয়ে যান, যা আজও সেই অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের চাক্ষুষ দলিল হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
ইউফ্রেটিস নদী এবং খাবুর নদীর অববাহিকা জুড়ে আজও মাটি সামান্য খুঁড়লেই শত শত মানুষের হাড়, মাথার খুলি এবং মাটির পাত্রের টুকরো বেরিয়ে আসে। এই ভৌগোলিক চিহ্নগুলো প্রমাণ করে যে, ১৯১৫ এবং ১৯১৬ সালের এই অভিযান কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা স্থানান্তর ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, আধুনিক লজিস্টিক এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে পরিচালিত একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর পদ্ধতিগত বিনাশ। আনাতোলিয়ার পাহাড়ি উপত্যকা থেকে শুরু করে দের জোরের গভীর মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথটি ছিল মূলত এক নিরবচ্ছিন্ন গণকবরের মানচিত্র, যার বুক থেকে একটি সুপ্রাচীন সমাজকে তার হাজার বছরের ভিটেমাটি সহ চিরতরে মুছে ফেলা হয়েছিল।
নারী, শিশু ও পরিবার (Women, Children and Families): যৌন সহিংসতা, অপহরণ, ধর্মান্তর ও জোরপূর্বক আত্মীকরণ
জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণ (Gender-Based Violence and Rape as a Weapon of War)
১৯১৫ সালের ধ্বংসযজ্ঞে নারী ও কিশোরীদের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তা কেবল সাধারণ যুদ্ধকালীন অপরাধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি পুরো সমাজকে ধ্বংস করার জন্য সুপরিকল্পিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (gender-based violence)। কাফেলাগুলো যখন শহর ও গ্রাম ছেড়ে জনমানবহীন প্রান্তরে প্রবেশ করত, তখন থেকেই নারীদের ওপর শুরু হতো শারীরিক ও যৌন অত্যাচার। পাহারাদার জেন্ডারমে, তেশকিলাত-ই মাহসুসার সদস্য এবং স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলো নিয়মিত রাতের বেলা ক্যাম্পগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে যুবতী ও কিশোরীদের তুলে নিয়ে যেত (Derderian, 2005)। কাফেলার পথগুলোতে নারীদের জন্য কোনো ধরনের মানবিক বা শারীরিক নিরাপত্তা অবশিষ্ট ছিল না।
গণহত্যা গবেষক ক্যাথরিন ডারদেরিয়ান (Katharine Derderian) তার তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় যৌন সহিংসতাকে নিছক লালসা মেটানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি, বরং একে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাস্ত্র (weapon of war) হিসেবে (Derderian, 2005)। নারীদের জনসমক্ষে নগ্ন করে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া, তাদের পারিবারিক মর্যাদাকে চূর্ণ করা এবং তাদের ওপর ধারাবাহিক গণধর্ষণ চালানোর মাধ্যমে পুরো জাতির মানসিক প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারে রীতিমতো প্রকাশ্য নিলাম বসিয়ে দশ থেকে বিশ বছর বয়সী মেয়েদের বিক্রি করা হতো। এই বাজারগুলোকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘দাসীদের হাট’।
এই নারকীয় অভিজ্ঞতার অন্যতম বড় চাক্ষুষ দলিল রেখে গেছেন বেঁচে ফেরা তরুণী অরোরা মারদিগানিয়ান (Aurora Mardiganian)। তিনি তার বিশ্ববিখ্যাত স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রেভিস্ট আর্মেনিয়া (Ravished Armenia)-তে বর্ণনা করেছেন কীভাবে তার চোখের সামনে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল এবং তাকে বারবার বিভিন্ন হাতবদল করে যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হয়েছিল (Mardiganian, 1918)। তিনি পাহাড় ও নদী অতিক্রম করে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়ে আমেরিকায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। তার এই আত্মজীবনী আন্তর্জাতিক মহলে তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে নারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় মদদে চলা প্রাতিষ্ঠানিক যৌন সহিংসতার চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল।
নারীদের ওপর চালানো এই শারীরিক অত্যাচার কেবল ব্যক্তি মানুষের শরীরেই আঘাত করেনি, তা একটি প্রাচীন সমাজের পারিবারিক শৃঙ্খলার ভিত্তিকেই ধসিয়ে দিয়েছিল। বহু তরুণী নিজেদের আত্মসম্মান রক্ষা করতে এবং ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে পাহাড়ি গিরিপথ থেকে গভীর খাদে বা উত্তাল ইউফ্রেটিস নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিতেন। যে সমাজ নারীর সামাজিক মর্যাদা ও পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো, সেই সমাজের নারীদের এভাবে চরম অসহায়ত্ব ও লাঞ্ছনার মুখে ঠেলে দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের জাতিগত ধারাবাহিকতার পথটিকেই সম্পূর্ণ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল।
বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ ও ধর্মীয় আত্তীকরণ (Forced Conversions and Religious Assimilation)
শারীরিক নিধনের সমান্তরালে অটোমান রাষ্ট্রযন্ত্র আরেকটি সূক্ষ্ম ও দূরপ্রসারী নীতি কার্যকর করেছিল, যা হলো বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ (forced conversion) ও ধর্মীয় আত্তীকরণ। মরুযাত্রার পথগুলোতে বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত হিসেবে নারীদের সামনে চাপিয়ে দেওয়া হতো ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বাধ্যবাধকতা। কোনো কোনো অঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসন ও গোত্রপতিরা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিত যে, যারা তাদের পূর্বপুরুষের বিশ্বাস ত্যাগ করে মুসলিম নাম গ্রহণ করবে এবং স্থানীয় কোনো মুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে, কেবল তাদেরই কাফেলা থেকে রেহাই দেওয়া হবে (Bjørnlund, 2008)।
ইতিহাসবিদ ম্যাথিয়াস বজরনলুন্ড (Matthias Bjørnlund) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই ধর্মান্তরকরণ কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল একটি কার্যকর জনসংখ্যাগত হাতিয়ার (Bjørnlund, 2008)। সরকার খুব ভালোভাবেই জানত যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা করার পর যদি নারী ও শিশুদের নিজেদের সমাজকাঠামোর ভেতরে টেনে নেওয়া যায়, তবে একটি পৃথক জাতিগত সত্তা হিসেবে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিভিন্ন নির্দেশনায় স্থানীয় কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল আর্মেনীয় যুবতীদের মুসলিম পরিবারগুলোতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে কিংবা গৃহকর্মী হিসেবে স্থান দিতে, যাতে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম পুরোপুরি তুর্কি বা মুসলিম পরিচয়ে বড় হয়ে ওঠে।
এই প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার নারীর পারিবারিক পরিচয় ও জন্মসূত্রে পাওয়া নাম সরকারি খাতা থেকে মুছে দেওয়া হয়। তাদের নতুন মুসলিম নাম দেওয়া হতো, যেমন ফাতিমা, আয়েশা বা খাদিজা। সরকারি আদমশুমারি ও রেজিস্ট্রেশন নথিতে তাদের জাতিগত পরিচয়ের কলামে ‘তুর্কি’ বা ‘মুসলিম’ লিখে দেওয়া হতো (Melkonian, 2010)। ইতিহাসবিদ এডুয়ার্ড মেলকোনিয়ান (Eduard Melkonian) উল্লেখ করেছেন যে, এই নীতিটি ছিল মূলত এক ধরনের জৈবিক আত্তীকরণ (biological assimilation) (Melkonian, 2010)। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সংখ্যায় শূন্যে নামিয়ে আনা হচ্ছিল, অন্যদিকে বিজয়ী সমাজের গৃহস্থালি ও কৃষিকাজে সস্তা শ্রমিকের সংস্থান করা হচ্ছিল।
এই রূপান্তরের শিকার হওয়া নারীদের জীবন ছিল চরম মানসিক দাসত্বে ঘেরা। তারা যে পরিবারগুলোতে আশ্রয় পেয়েছিলেন, সেখানে তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হতো যাতে তারা তাদের পুরনো ভাষা বা সংস্কৃতির কোনো চর্চা করতে না পারে। বহু নারী তাদের সন্তানদের কাছেও নিজেদের আসল পরিচয় প্রকাশ করার সাহস পেতেন না। বাহ্যিকভাবে নতুন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে বাধ্য হলেও, ভেতরে ভেতরে তারা এক আজীবন মানসিক নির্বাসনের শিকার হয়ে বেঁচে ছিলেন।
অনাথ সংকট ও রাষ্ট্রীয় তুর্কিকরণ নীতি (The Orphan Crisis and State-Sponsored Turkification)
নির্বাসন ও হত্যাকাণ্ডের ফলে আনাতোলিয়া ও সিরিয়ার পথগুলোতে জন্ম নিয়েছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শিশু সংকট। লক্ষাধিক শিশু তাদের মা-বাবা ও স্বজনদের হারিয়ে পথে পথে দিশাহীনভাবে ঘুরছিল। এই পরিস্থিতির মুখে অটোমান সরকার একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত তুর্কিকরণ নীতি (Turkification policy) হাতে নেয়। স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে গড়ে তোলা হয় বিশেষ রাষ্ট্রীয় অনাথ আশ্রমের নেটওয়ার্ক, যার প্রশাসনিক নাম ছিল ‘দারুলআইতাম’ (Darüleytam) (Ekmekçioğlu, 2016)।
ইতিহাসবিদ লেরনা একমেকচিওগ্লু (Lerna Ekmekçioğlu) তার যুগান্তকারী গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, এই অনাথ আশ্রমগুলো কোনো সাধারণ দাতব্য প্রতিষ্ঠান ছিল না (Ekmekçioğlu, 2016)। এগুলো পরিচালিত হতো একটি চরম জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের অংশ হিসেবে, যার উদ্দেশ্য ছিল আর্মেনীয় ও কুর্দি অনাথ শিশুদের স্মৃতি মুছে দিয়ে তাদের কট্টর তুর্কি জাতীয়তাবাদী হিসেবে গড়ে তোলা। এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল লেবাননের বৈরুতের নিকটবর্তী আইনতুরা অনাথ আশ্রম (Aintoura Orphanage)। এই আশ্রমটি সরাসরি পরিচালনা করতেন তৎকালীন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সিইউপি সমর্থক হালিদে এদিব (Halide Edib) এবং নৌমন্ত্রী জামাল পাশা।
আইনতুরায় আশ্রয় পাওয়া শত শত শিশুর ওপর এক কঠোর ডিসিপ্লিনারি ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি শিশুর মুখের প্রাচীন ভাষা নিষিদ্ধ করা হয়; এমনকি কেউ ভুল করে নিজের মাতৃভাষায় কোনো শব্দ উচ্চারণ করলে তাকে তীব্র শারীরিক শাস্তি দেওয়া হতো (Watenpaugh, 2010)। শিশুদের আর্মেনীয় নাম বদলে নতুন তুর্কি নাম রাখা হতো এবং তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ ও ইসলামি অনুশাসন শেখানো হতো। ইতিহাসবিদ কিথ ওয়াতেনপফ (Keith Watenpaugh) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, আইনতুরার এই প্রকল্প ছিল আধুনিক রাষ্ট্র দ্বারা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় ধ্বংস করার এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ (Watenpaugh, 2010)।
এই আশ্রমগুলোতে শিশুদের এমনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হতো যেন তারা নিজেদের বংশপরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে যায় এবং বড় হয়ে অটোমান রাষ্ট্রের অনুগত পদাতিক বাহিনীতে পরিণত হয়। অপুষ্টি, কঠোর শারীরিক নির্যাতন ও মহামারির কারণে আইনতুরা ও অন্যান্য সরকারি আশ্রমেই হাজার হাজার শিশু প্রাণ হারায়। যে শিশুরা কোনোমতে বেঁচে ছিল, তাদের ভেতরের আত্মপরিচয়টি এমনভাবে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল যে তারা নিজেদের জাতির ধ্বংসের ইতিহাসকেই নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখতে শিখত।
শিশু অপহরণ, বেদুইন ট্যাটু ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা (Child Abduction, Bedouin Tattoos and Cultural Alienation)
সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার ট্রানজিট ক্যাম্পগুলোর আশেপাশে গড়ে উঠেছিল শিশু বিক্রির এক ভয়ংকর চোরাবাজার। চরম অনাহারে থাকা মায়েরা যখন দেখতেন যে তাদের সন্তান চোখের সামনে না খেয়ে মারা যাচ্ছে, তখন অনেক মা বাধ্য হয়ে স্থানীয় যাযাবর বেদুইন, আরব বা কুর্দি গ্রামবাসীদের হাতে সন্তান তুলে দিতেন এই আশায় যে অন্তত শিশুটির প্রাণ বাঁচবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুদের কাফেলা থেকে জোরপূর্বক ছিনতাই বা অপহরণ করা হতো (Tachjian, 2009)।
এই প্রক্রিয়ায় অপহৃত শিশুদের বড় একটি অংশ চলে যায় যাযাবর বেদুইন গোত্রগুলোর অধীনে। বেদুইন পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করার একটি স্থায়ী সামাজিক নিদর্শন হিসেবে এই শিশুদের শরীরে – বিশেষ করে কপালে, গালে, থুতনিতে এবং হাতে – গাঢ় নীল কালির বিশেষ উপজাতীয় চিহ্ন বা ট্যাটু (Bedouin tribal tattoos – daqq) এঁকে দেওয়া হতো (Shemmassian, 2003)। এই ট্যাটুগুলো ছিল একটি স্থায়ী দাগ, যার মাধ্যমে একটি শিশুকে তার পূর্বের সব সামাজিক ও জাতিগত শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেই নির্দিষ্ট গোত্রের সম্পত্তি বা সদস্য হিসেবে সিলমোহর মেরে দেওয়া হতো।
ইতিহাসবিদ ভাহে তাচজিয়ান (Vahé Tachjian) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই ট্যাটুর দাগগুলো ছিল এক ধরনের অপনোদনযোগ্য সাংস্কৃতিক চুরি (Tachjian, 2009)। শিশুরা বড় হয়ে যখন বুঝতে পারত যে তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা, তখন মুখের এই স্থায়ী দাগ তাদের জন্য এক চিরন্তন লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াত। ইতিহাসবিদ দিকরান শেম্মাসিয়ান (Dikran Shemmassian) দেখিয়েছেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন রেড ক্রস এবং আর্মেনীয় উদ্ধারকারী দলগুলো মরুভূমির বিভিন্ন প্রত্যন্ত উপত্যকা থেকে অপহৃত শিশুদের উদ্ধার করার অভিযান শুরু করে, তখন এই মুখের ট্যাটুই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের চিহ্নিত করার একমাত্র উপায় (Shemmassian, 2003)।
হাজার হাজার শিশু এভাবে তার মাতৃভাষা, পারিবারিক নাম এবং জন্মভূমির স্মৃতি সম্পূর্ণ হারিয়ে যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। উদ্ধার কাজের সময় অনেক শিশু তাদের উদ্ধারকারীদের দেখে ভয়ে পালিয়ে যেত, কারণ তাদের মনে বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে খ্রিষ্টানরা তাদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে। শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও, এই শিশুরা তাদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দিক থেকে এমন এক শূন্যতার ভেতর নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, যার কোনো প্রতিকার পরবর্তী জীবনে আর সম্ভব হয়নি।
পোস্ট-ট্রমা, মাতৃত্বের সংকট ও সামাজিক ক্ষত (Post-Trauma, Crises of Motherhood and Social Scars)
যুদ্ধের পর যে সকল নারী অলৌকিকভাবে বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপ ও বন্দিদশা থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন, তাদের সামনে শুরু হয়েছিল আরেক দীর্ঘ মানসিক ও সামাজিক লড়াই। এই পর্বটি ছিল পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস (post-traumatic stress) এবং মাতৃত্বের এক গভীর সংকটের অধ্যায়। মরুযাত্রার সময় যেসব মাকে বাধ্য হয়ে নিজের চোখের সামনে এক সন্তানকে ফেলে অন্য সন্তানকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছিল, সেই অপরাধবোধ তাদের জীবনকে চিরতরে বিষাক্ত করে তুলেছিল (Derderian, 2005)।
যুদ্ধের পর গঠিত বিভিন্ন অনাথ আশ্রম ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া নারীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। গবেষক সুসান বালিয়ান (Susan Balian) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বহু নারী বছরের পর বছর সম্পূর্ণ নির্বাক অবস্থায় কাটিয়ে দিয়েছিলেন (Balian, 2014)। তারা কারো সাথে কথা বলতেন না, এমনকি নিজেদের সন্তানদের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পেতেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল সেই সকল নারীদের ট্র্যাজেডি, যারা অপহরণ ও ধারাবাহিক ধর্ষণের শিকার হয়ে আক্রমণকারীদের সন্তানদের জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই যুদ্ধকালীন শিশুদের নিয়ে সমাজে এক জটিল নৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন আর্মেনীয় জাতীয় সমাজ ও চার্চ এই নারীদের ফিরিয়ে নিতে চাইলেও, তাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া মুসলিম পিতাদের সন্তানদের সমাজে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এক গভীর দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয় (Ekmekçioğlu, 2016)। বহু নারীকে বাধ্য করা হয়েছিল তাদের সদ্যোজাত সন্তানদের সরকারি আশ্রমে বা রাস্তায় ফেলে রেখে আসতে, যাতে তারা নিজেরা সমাজে পুনর্বাসিত হতে পারেন। একজন মায়ের কাছে নিজের সন্তানকে ফেলে আসার এই দ্বিতীয় ট্র্যাজেডি ছিল তাদের জীবনের আরেক অপূরণীয় ক্ষতি।
পারিবারিক কাঠামোর এই সামগ্রিক ভাঙন পুরো সমাজকে এমন এক মানসিক ক্ষতের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত হয়েছে। পরিবার ছিল আর্মেনীয় সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক। কিন্তু গণহত্যা সেই পরিবারের মূল স্তম্ভ নারীদের মানসিক ভারসাম্য ও মাতৃত্বের ধারণাকে এত গভীরভাবে আহত করেছিল যে, সমাজ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় এই ট্রমা এক স্থায়ী ছায়া ফেলে রেখে যায়।
‘লুক্কায়িত আর্মেনীয়’ ও আন্তঃপ্রজন্মীয় আত্মপরিচয় (The ‘Hidden Armenians’ and Intergenerational Identity)
১৯১৫ সালের সেই ধ্বংসযজ্ঞের শতবর্ষ পরেও আধুনিক তুরস্কে এর একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী উত্তরাধিকার টিকে রয়েছে, যা সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় পরিচিত ‘লুক্কায়িত আর্মেনীয়’ (Hidden Armenians) বা ইসলামাইজড আর্মেনীয় হিসেবে (Altınay & Çetin, 2014)। লক্ষাধিক নারী ও শিশুকে যে জোরপূর্বক তুর্কি ও কুর্দি পরিবারগুলোতে আত্তীকরণ করা হয়েছিল, তাদের উত্তরসূরিরা আজও পূর্ব আনাতোলিয়া ও তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছেন। তারা বাইরে পুরোপুরি মুসলিম ও তুর্কি বা কুর্দি পরিচয়ে জীবনযাপন করলেও, পারিবারিক স্তরে একটি গোপন সত্য বয়ে নিয়ে চলেছেন।
তুরস্কের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টি ছিল একটি চরম রাজনৈতিক ট্যাবু। কিন্তু ২০০৪ সালে তুর্কি আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ফেথিয়ে চেতিন (Fethiye Çetin) যখন তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ মাই গ্র্যান্ডমাদার (My Grandmother) প্রকাশ করেন, তখন পুরো তুর্কি সমাজে এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক আলোড়ন সৃষ্টি হয় (Altınay & Çetin, 2014)। তিনি সেই বইতে প্রকাশ করেন যে, তার আজীবন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে পরিচিত গ্র্যান্ডমা মূলত ছিলেন একজন আর্মেনীয় খ্রিস্টান নারী, যার আসল নাম ছিল হেরানুশ গাদ্যারিয়ান। ১৯১৫ সালে কাফেলা থেকে এক তুর্কি ক্যাপ্টেন তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের পরিবারে বড় করেছিলেন এবং তার আসল অতীত গোপন রেখেছিলেন।
সমাজবিজ্ঞানী আয়শে গুল আলতিনায় (Ayşe Gül Altınay) এবং ফেথিয়ে চেতিন তাদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক তুরস্কে লক্ষ লক্ষ মানুষ রয়েছে যাদের গ্র্যান্ডমা বা কোনো এক পূর্বপুরুষ ছিলেন এই জোরপূর্বক আত্তীকরণের শিকার হওয়া নারী ও শিশু (Altınay & Çetin, 2014)। এই ‘লুক্কায়িত’ বংশধরেরা প্রায়ই এক গভীর দ্বৈত পরিচয়ের সংকটে ভোগেন। বর্তমান সময়ে এসে তাদের অনেকেই নিজেদের শিকড়ের সন্ধান করছেন, চার্চের রেজিস্ট্রি খুঁজছেন এবং হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছেন।
এই আন্তঃপ্রজন্মীয় বাস্তবতাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র ১৯১৫ সালে যে বলপূর্বক আত্তীকরণ ও রক্তমিশ্রণের নীতি গ্রহণ করেছিল, তা কোনো অতীত বিষয় নয়। শত বছর পরেও তা মানুষের পারিবারিক স্মৃতি, পরিচয় সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্বের গভীরে এক জীবন্ত ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। নারী ও শিশুদের ওপর চালানো এই আক্রমণ একটি জনগোষ্ঠীকে শারীরিকভাবে শেষ করার পাশাপাশি তাদের আত্মপরিচয়ের মানচিত্রকে চিরতরে বিকৃত করে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ ও জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন (Property Confiscation and Demographic Transformation): অর্থনৈতিক ধ্বংস ও সম্পদ স্থানান্তর
জাতীয় পুঁজি গঠন ও তুর্কি বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ (Formation of National Capital and Rise of the Turkish Bourgeoisie)
আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞের পেছনে নিছক কোনো উগ্র রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ কাজ করেনি, বরং এর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল অটোমান অর্থনীতির খোলনলচে বদলে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক মতাদর্শ। কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস বা সিইউপি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই অনুভব করছিল যে, সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, ব্যাংকিং, আমদানি-রপ্তানি এবং কুটির শিল্পের বড় অংশটি নিয়ন্ত্রণ করত খ্রিস্টান অমুসলিমরা। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে তারা তুর্কি-মুসলিম জাতির রাজনৈতিক বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে ১৯১৫ সালের অভিযানটিকে তারা আনাতোলিয়ার বুকে একটি সম্পূর্ণ অনুগত এবং সমজাতীয় জাতীয় বুর্জোয়া (national bourgeoisie) গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে (Keyder, 1987)।
সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ চাগলার কেইদের (Çağlar Keyder) তার ধ্রুপদী গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক পেশিশক্তি ব্যবহার করে বাজারের স্বাভাবিক গতিপথকে বিকৃত করেছিল (Keyder, 1987)। সিইউপি-র ঘোষিত ‘জাতীয় অর্থনীতি’ নীতির মূল উদ্দেশ্যই ছিল অমুসলিম ব্যবসায়ীদের ধ্বংস করে তাদের বাজার একচেটিয়াভাবে মুসলিম উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া। এই উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুল ও প্রধান শহরগুলোতে রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া কোম্পানি, যেমন ‘মিল্লি একমেকচি’ (Milli Ekmekçi) বা জাতীয় রুটি প্রস্তুতকারী সংস্থা এবং ‘মিল্লি মাহসুলাত’ (Milli Mahsulat) বা জাতীয় কৃষি বিপণন সংস্থা। এই নতুন কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে বসানো হয়েছিল সিইউপি-র শীর্ষ নেতা, প্রভাবশালী পাশা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের।
অর্থনীতিবিদ আয়শে বুগরা (Ayşe Buğra) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক তুরস্কের বাণিজ্যিক পুঁজির আদি সঞ্চয়ন কোনো মুক্ত অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি (Buğra, 1994)। এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত এক বিধ্বংসী সম্পদ স্থানান্তর (capital transfer)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে আর্মেনীয় পরিবারগুলো ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছিল, তাদের শারীরিক উপস্থিতির অবসানের সাথে সাথে সেই পুঁজিকাঠামো রাতারাতি নতুন শাসকগোষ্ঠীর মালিকানায় চলে যায়। এই অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন নিশ্চিত করেছিল যে, স্থানীয় মুসলিম এলিট ও ভূস্বামীরা সিইউপি-র গণহত্যামূলক নীতির অন্ধ সমর্থকে পরিণত হবে, কারণ তাদের নতুন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সরাসরি টিকে ছিল এই দখলদারির ওপর।
পরিত্যক্ত সম্পত্তি কমিশন ও সম্পদ চুরির আইনি যন্ত্র (The Abandoned Property Commissions and Legal Apparatus of Plunder)
লুণ্ঠনের এই সর্বাত্মক প্রক্রিয়াটিকে একটি সভ্য ও আইনি রূপ দেওয়ার জন্য অটোমান সরকার তৈরি করেছিল এক জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জারি করা পরিপূরক ডিক্রি অনুযায়ী প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হয় লিকুইডেশন কমিশন (Tasfiye Komisyonları) বা পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিষ্পত্তিকরণ কমিশন (Toriguian, 1988)। এই কমিশনগুলোর নেতৃত্ব দিতেন একজন স্থানীয় বিচারক, একজন অর্থ কর্মকর্তা এবং সিইউপি-র মনোনীত একজন প্রশাসনিক প্রতিনিধি। তাদের দাপ্তরিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছিল যে নির্বাসিত ব্যক্তিদের যাবতীয় সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করা হবে এবং তা নিরাপদে নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ তাদের ব্যক্তিগত আমানত অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হবে।
বাস্তব ক্ষেত্রে এই কমিশনগুলো কাজ করেছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ চুরির যন্ত্র হিসেবে। গবেষক শার্স তরিগুয়ান (Sarkis Toriguian) তার আইনি বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে আইনকে ব্যবহার করে একটি জনগোষ্ঠীর সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল (Toriguian, 1988)। শহরের আর্মেনীয় মহল্লাগুলোতে যখন বাড়িঘর সিলগালা করা হতো, তখন কমিশন সদস্যরা সেখানে প্রবেশ করে আসবাবপত্র, প্রাচীন তৈজসপত্র, গালিচা, রৌপ্য ও স্বর্ণালঙ্কার এবং গুদামজাত পণ্যের এক নামমাত্র মূল্যায়ন করত। এরপর সেই বহুমূল্য সম্পদগুলোকে স্থানীয় টাউন হলে এনে সাজানো নিলামের মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে সিইউপি কর্মকর্তা ও তাদের অনুগত ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হতো।
ইতিহাসবিদ কেভর্ক বাগদজিয়ান (Kevork Baghdjian) এই সম্পত্তি কমিশনগুলোর অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও স্থাবর সম্পত্তির কোনো অর্থই কোনোদিন মূল মালিকদের কাছে পৌঁছায়নি (Baghdjian, 1987)। সরকারি খাতায় যে ‘আমানত অ্যাকাউন্ট’-এর কথা বলা হয়েছিল, তা ছিল নিছক একটি কাগুজে প্রতারণা। বিক্রির অর্থ সরাসরি জমা হতো সিইউপি-র যুদ্ধকালীন বিশেষ তহবিলে কিংবা স্থানীয় কমিটির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত পকেটে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় একটি সমৃদ্ধ সমাজের সমগ্র ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদকে নিজেদের সম্পত্তিতে রূপান্তর করে নিয়েছিল।
ব্যাংক, বীমা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক পুঁজি লুণ্ঠন (Looting of Banks, Insurance and International Financial Assets)
লুণ্ঠনের পরিধি কেবল গৃহস্থালি জিনিসপত্র বা দোকানের মালামালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা আঘাত হেনেছিল আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার গভীরে। তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে পরিচালিত বিভিন্ন বহুজাতিক ব্যাংক – যেমন ইম্পেরিয়াল অটোমান ব্যাংক (Imperial Ottoman Bank), ডয়েচে ব্যাংক, ভিয়েনার ব্যাংকভেরিন এবং ক্রেদি লিওঁনে – আর্মেনীয় পরিবারগুলোর কোটি কোটি টাকার নগদ আমানত ও স্বর্ণ জমা ছিল। নির্বাসন শুরুর পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক গোপন সার্কুলারের মাধ্যমে এই ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় যে সমস্ত আর্মেনীয় অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত করতে হবে এবং তাদের গচ্ছিত অর্থ রাষ্ট্রীয় রাজকোষে হস্তান্তর করতে হবে (Moranian, 1994)।
ইতিহাসবিদ সুজান মোরানিয়ান (Suzanne Moranian) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এই আর্থিক চক্রান্তের এক রোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরেছেন (Moranian, 1994)। অনেক সচেতন আর্মেনীয় নাগরিক নিজেদের পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য আমেরিকান ও ইউরোপীয় বীমা কোম্পানিগুলোতে – যেমন নিউ ইয়র্ক লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং ইকুইটেবল লাইফ – জীবন বীমা করিয়ে রেখেছিলেন। ১৯১৫ সালের নিধনযজ্ঞের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা স্বয়ং তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মর্গেনথাউকে ডেকে এক অবিশ্বাস্য দাবি জানান। তালাত পাশা দাবি করেন যে, যেহেতু মৃত আর্মেনীয়দের কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী এখন আর দেশে বেঁচে নেই, তাই তাদের জীবন বীমার সমস্ত প্রিমিয়াম ও ক্ষতিপূরণের অর্থ সরাসরি অটোমান সরকারের প্রাপ্য।
আইনবিদ জিন কোহান (Jean Cohan) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই আর্থিক লুণ্ঠন ছিল আধুনিক বীমা ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং আইনের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ডাকাতি (Cohan, 2005)। বিদেশি কোম্পানিগুলো শুরুতে এই দাবির বিরোধিতা করলেও, অটোমান সরকারের যুদ্ধের ডামাডোলে বহু আন্তর্জাতিক আর্থিক সম্পদ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই বিলীন হয়ে যায়। ব্যাংক লকারগুলোতে রক্ষিত বংশপরম্পরায় চলে আসা পারিবারিক হীরা, মুক্তা ও মূল্যবান দলিলপত্র বাজেয়াপ্ত করে বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে রাজধানী ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রীয় কোষাগারে নিয়ে আসা হয়। এর ফলে একটি জাতির প্রাতিষ্ঠানিক সঞ্চয় ও বৈশ্বিক পুঁজির সমস্ত চিহ্ন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
কৃষিজমি, কারখানা ও পরিকাঠামো হস্তান্তর (Transfer of Farmland, Factories and Infrastructure)
আনাতোলিয়া ও সিলিসিয়ার কৃষি ও শিল্প পরিকাঠামো ছিল আর্মেনীয়দের কঠোর পরিশ্রমের ফসল। আদানা ও তারসুসের উর্বর সমতল ভূমির আধুনিক তুলা চাষ, মারদিনের জলপাই বাগান, বিটলিসের তামাকের জমি এবং হারপুতের সমৃদ্ধ রেশম কারখানাগুলো ছিল অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান (Krikorian, 1977)। সিলিসিয়া অঞ্চলে আধুনিক বাষ্পচালিত ট্রাক্টর ও সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন আর্মেনীয় কৃষি উদ্যোক্তারা। কিন্তু ১৯১৫ সালের মে থেকে আগস্টের মধ্যে এই সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোটির হাতবদল ঘটে যায়।
ইতিহাসবিদ মেসরোব ক্রিকোরিয়ান (Mesrob Krikorian) অটোমান প্রাদেশিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন কীভাবে সিলিসিয়ার হাজার হাজার একর উর্বর কৃষিজমি এবং আধুনিক তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো স্থানীয় মুসলিম ভূস্বামী বা ‘আগা’ এবং সিইউপি নেতাদের মধ্যে বিনামূল্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল (Krikorian, 1977)। সিল্ক ও টেক্সটাইল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বুরসা শহরের যে বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল, তা রাতারাতি ধ্বংস হয়ে যায় কারণ এই শিল্পের সাথে যুক্ত দক্ষ তাঁতি, রঞ্জক ও কারিগরদের সবাইকে নির্বাসনে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের ফেলে যাওয়া রেশম কারখানাগুলো নামমাত্র মূল্যে কিনে নেয় সিইউপি-র আশীর্বাদপুষ্ট নতুন মালিকরা।
এই পরিকাঠামো হস্তান্তরের ফলে আনাতোলিয়ার প্রদেশগুলোতে এক নতুন ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠীর জন্ম হয়, যাদের পরিচিতি ছিল ‘আশরাফ’ (eşraf) বা স্থানীয় প্রভাবশালী মুসলিম এলিট নামে (Keyder, 1987)। এই স্থানীয় প্রভাবশালীরা হঠাৎ করেই বিশাল ভূসম্পত্তি, খামারবাড়ি, আটার মিল এবং তামার কারখানার একক মালিক বনে যায়। এই বিশাল অর্থনৈতিক লাভ তাদের রাজনৈতিকভাবে এতটাই শক্তিশালী করে তুলেছিল যে, তারা পরবর্তীতে যেকোনো যুদ্ধোত্তর তদন্ত বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগকে নিজেদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করেছিল। ফলে আনাতোলিয়ার গ্রামীণ ও শিল্প অর্থনীতির এই কাঠামো রূপান্তর নিধনযজ্ঞের ফলাফলকে চিরস্থায়ী করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
জনসংখ্যাগত প্রকৌশল ও আনাতোলিয়ার স্থানিক রূপান্তর (Demographic Engineering and Spatial Transformation of Anatolia)
অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞের সমান্তরালে চলেছিল আনাতোলিয়ার ভূগোল ও মানচিত্র থেকে একটি সুপ্রাচীন জাতির স্মৃতি মুছে ফেলার এক সর্বাত্মক স্থানিক রূপান্তর (spatial transformation)। খালি হয়ে যাওয়া আর্মেনীয় গ্রাম, শহর ও মহল্লাগুলোকে দ্রুত পুনর্বাসিত করা হয়েছিল বলকান, ককেশাস এবং ক্রিমিয়া থেকে আসা শত শত মুসলিম শরণার্থী বা মুহাজির (muhacir) দ্বারা (Chorbajian, 1999)। এই শরণার্থীদের সরাসরি সেই সব বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানকার রান্নাঘরের চুলার ছাই তখনো হয়তো পুরোপুরি নিভেনি।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী দিকটি ছিল স্থাননামের পরিবর্তন বা টপোনোমিক রূপান্তর (toponymic erasure)। ১৯১৬ সালের জানুয়ারি মাসে যুদ্ধমন্ত্রী এনোভার পাশা এক বিশেষ সামরিক ফরমান জারি করেন, যার মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয় যে সাম্রাজ্যের যে সকল শহর, গ্রাম, পাহাড়, নদী বা উপত্যকার নাম আর্মেনীয়, গ্রিক বা বুলগেরিয়ান ভাষায় রয়েছে, সেগুলোকে অবিলম্বে বদলে নতুন তুর্কি নাম রাখতে হবে (Minassian, 2006)। ফলে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক নামগুলো এক নিমিষে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, শতাব্দী প্রাচীন আর্মেনীয় জনপদগুলোর নাম বদলে এমন সব তুর্কি শব্দ বসানো হয়, যাতে মনে হয় এই অঞ্চলগুলোতে কোনোদিন তুর্কি ছাড়া অন্য কোনো জাতির পদচিহ্ন ছিল না।
ইতিহাসবিদ লেভন চোর্বাজিয়ান (Levon Chorbajian) এবং ওশিন মিনাসিয়ান তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই স্থানিক রূপান্তর ছিল মূলত একটি জাতির স্মৃতি ও ইতিহাসকে চিরতরে সমাহিত করার কৌশল (Chorbajian, 1999; Minassian, 2006)। গির্জাগুলোকে রূপান্তর করা হয়েছিল মসজিদে, শস্যের গুদামে কিংবা আস্তাবলে। প্রাচীন কবরস্থানগুলোর মার্বেল পাথর তুলে নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল নতুন সরকারি ভবন ও রাস্তা তৈরির কাজে। এর মাধ্যমে আনাতোলিয়ার দৃশ্যমান ভৌগোলিক পরিচয়টিকে এমনভাবে পাল্টে দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোনোদিন বুঝতেই না পারে যে এই মাটির নিচে অন্য একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার কঙ্কাল চাপা পড়ে আছে।
অর্থনৈতিক শূন্যতা, মুদ্রাস্ফীতি ও সাম্রাজ্যের আর্থিক বিপর্যয় (Economic Vacuum, Inflation and Imperial Financial Collapse)
সিইউপি নেতৃত্ব ভেবেছিল যে অমুসলিমদের সম্পত্তি দখল করে তারা সাম্রাজ্যকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করবে, কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি পরিচালিত হয় নিজস্ব নিয়মে। একটি দেশের উৎপাদনশীল, দক্ষ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশকে রাতারাতি হত্যা ও উচ্ছেদ করার ফলে সাম্রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেমে আসে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়। দক্ষ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, ব্যাংকার, কারিগর এবং আধুনিক কৃষকদের হারিয়ে পুরো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে (Ökçün, 1970)।
অর্থনীতিবিদ গুন্দুজ ওকচুন (Gündüz Ökçün) অটোমান যুদ্ধকালীন অর্থনীতির পরিসংখ্যানে দেখিয়েছেন যে, ১৯১৬ এবং ১৯১৭ সালের মধ্যে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল (Ökçün, 1970)। নতুন যে মুসলিম শরণার্থীদের আর্মেনীয়দের জমিতে বসানো হয়েছিল, তাদের অধিকাংশেরই সেই অঞ্চলের কৃষিপ্রযুক্তি বা বিশেষ ফসলের চাষাবাদ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছিল না। আধুনিক রেশম ও তুলা কারখানাগুলো পরিচালনার মতো দক্ষ প্রকৌশলী না থাকায় একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয় তীব্র খাদ্য সংকট, পরিবহন সংকট এবং অনিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি।
ইতিহাসবিদ আয়শে বুগরা তার বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন যে, এই অর্থনৈতিক শূন্যতার সুযোগে সমাজে এক সুবিধাবাদী কালোবাজারি চক্রের জন্ম হয়, যাদের সমকালীন তুর্কি ভাষায় বলা হতো ‘হার্প জেনগিনলেরি’ (harp zenginleri) বা যুদ্ধের ধনীক শ্রেণি (Buğra, 1994)। সাধারণ মুসলিম জনগণ যখন আটার অভাবে অনাহারে দিন কাটাচ্ছিল এবং রুটির জন্য রাজপথে হাহাকার করছিল, তখন সিইউপি-র মদদপুষ্ট কিছু অসাধু ব্যবসায়ী লুণ্ঠিত সম্পদ ও কালোবাজারির মাধ্যমে বিপুল মুনাফা লুটছিল। সুতরাং, আর্মেনীয়দের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তথাকথিত জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অটোমান সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবং সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আর্মেনীয় প্রতিরোধ, স্থানীয় আচরণ ও বেঁচে থাকা (Armenian Resistance, Local Responses and Survival): প্রতিরোধ, সহযোগিতা, উদ্ধার ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
মুসা দাগের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক উদ্ধার (The Historic Resistance of Musa Dagh and International Rescue)
১৯১৫ সালের গ্রীষ্মকালে যখন পুরো আনাতোলিয়া জুড়ে উচ্ছেদ ও নিধনের সরকারি ফরমান কার্যকর করা হচ্ছিল, তখন ভূমধ্যসাগরের উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত আন্তিওক অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। মুসা দাগ বা মূসা পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ছয়টি প্রাচীন আর্মেনীয় গ্রাম – হাজি হাবিবেলি, কেবুসিয়ে, ভাকিফ, খেদের বেগ, ইয়োঘুনোলুক এবং বীতিয়াস – এর অধিবাসীদের ওপর জুলাই মাসের শেষ দিকে নির্বাসনের নোটিশ জারি করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে সমস্ত গ্রামবাসীকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে কাফেলায় যোগ দিতে হবে। কিন্তু পূর্বের শহরগুলো থেকে পালিয়ে আসা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তারা আগেই জেনে গিয়েছিলেন যে এই কাফেলাগুলোর আসল গন্তব্য কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্র নয়, বরং তা নিশ্চিত মৃত্যুর ফাঁদ। ফলে প্রবীণ ও তরুণ নেতারা এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়ে আত্মসমর্পণের বদলে পর্বতের চূড়ায় উঠে আত্মরক্ষার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেন (Gabrielian, 1918)।
তরুণ সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মোভসেস দের কালৌস্তিয়ান (Movses Der Kaloustian)-এর নেতৃত্বে প্রায় চার হাজার দুইশো গ্রামবাসী তাদের গৃহপালিত গবাদিপশু, খাদ্যশস্য, চাষের যন্ত্রপাতি এবং যা কিছু পুরনো শিকারের বন্দুক ও হাতবোমা ছিল, তা নিয়ে মুসা দাগের দুর্গম চূড়ায় অবস্থান নেন। তারা পাহাড়ের প্রতিটি সংকীর্ণ গিরিপথ ও প্রবেশমুখে বড় বড় পাথর কেটে ব্যারিকেড গড়ে তোলেন। পর্বতের চূড়ায় একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল; সেখানে নারীরা খাদ্য প্রস্তুত ও আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব নেন, কিশোররা বার্তা বাহক হিসেবে কাজ করে এবং সক্ষম পুরুষরা পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করে। আগস্ট মাসের শুরু থেকে অটোমান নিয়মিত সেনাবাহিনী ও স্থানীয় উপজাতীয় মিলিশিয়ারা ভারী কামান নিয়ে পাহাড়ের ওপর একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে। কিন্তু প্রতিকূল পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয়দের নিখুঁত গেরিলা কৌশলের কারণে টানা তিপ্পান্ন দিন ধরে সমস্ত আক্রমণ ব্যর্থ করে দেওয়া হয় (Werfel, 1933)।
লড়াই দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে পাহাড়ে খাদ্য, পানীয় জল এবং বিশেষ করে গোলাবারুদের তীব্র সংকট দেখা দেয়। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ যোদ্ধারা একটি দুঃসাহসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তারা সমুদ্রমুখী খাড়া পাথুরে ঢালে সাদা কাপড়ের ওপর লাল রঙের দুটি সুবিশাল ব্যানার তৈরি করে ঝুলিয়ে দেন। একটি ব্যানারে আঁকা ছিল একটি বড় লাল ক্রুশ চিহ্ন এবং অন্যটিতে ইংরেজিতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল “বিপদাপন্ন খ্রিস্টান: আমাদের উদ্ধার করুন”। একই সাথে তারা রাতের বেলা পাহাড়ের চূড়ায় বিশাল আগুন জ্বালিয়ে সাগরে টহলরত জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালান। ১৯১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরে টহলরত ফরাসি যুদ্ধজাহাজ ‘গিশেন’-এর নজরে এই সংকেতটি পড়ে। ফরাসি কমান্ডার জঁ-জোসেফ ব্রিসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান।
ফরাসি নৌবহরের ভাইস-এডমিরাল লুই দার্তিজ দ্যু ফুরনে (Louis Dartige du Fournet) খবর পেয়ে কালবিলম্ব না করে তার অধীনে থাকা পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মুসা দাগের উপকূলে পৌঁছান। তারা সমুদ্র থেকে কামানের গোলাবর্ষণ করে অটোমান বাহিনীকে দূরে সরিয়ে রাখেন এবং জাহাজের ছোট ছোট লাইফবোট ব্যবহার করে টানা তিন দিন ধরে পাহাড়ের চূড়া থেকে নারী, শিশু ও যোদ্ধা সহ মোট চার হাজার চুয়ান্ন জন মানুষকে নিরাপদে জাহাজে তুলে নেন। উদ্ধারকৃত এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সমুদ্রপথে মিশরের পোর্ট সাইদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাদের জন্য শরণার্থী শিবির স্থাপন করা হয়। অস্ট্রিয়ান বিখ্যাত লেখক ফ্রাঞ্জ ভেরফেল (Franz Werfel) পরবর্তীতে এই অবিস্মরণীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচনা করেন তার কালজয়ী উপন্যাস দ্য ফর্টি ডেজ অব মুসা দাগ (The Forty Days of Musa Dagh) (Werfel, 1933)। এই গ্রন্থটি নাৎসি জার্মানিতে পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কারণ এটি মানুষকে যেকোনো রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রেরণা যুগিয়েছিল।
উরফা, শাপিন-কারাহিসার ও সাসুনের আত্মরক্ষা দুর্গ (The Self-Defense Strongholds of Urfa, Shabin-Karahisar and Sasun)
মুসা দাগ ছাড়াও আনাতোলিয়ার বেশ কিছু নগর ও পাহাড়ি জনপদে নিশ্চিত বিনাশের মুখে মানুষ নিজেদের সীমিত শক্তি নিয়ে আত্মরক্ষার দুর্গ গড়ে তুলেছিল। মেসোপটেমিয়ার ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার উরফা শহরের ঘটনাটি ছিল এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ। ১৯১৫ সালের শরৎকালে যখন আনাতোলিয়ার উত্তর দিক থেকে আসা রক্তক্ষয়ী ও কঙ্কালসার কাফেলাগুলো উরফা অতিক্রম করছিল, তখন শহরের স্থানীয় অধিবাসীরা বুঝতে পারেন যে তাদের ভাগ্যও একই সুতোয় গাঁথা। সেপ্টেম্বর মাসে যখন উরফার আর্মেনীয় নেতাদের গ্রেফতার ও হত্যার খবর আসে, তখন যুবনেতা মেগেরদিচ ইয়োতনেঘপারিয়ান (Megerdich Yotneghparian)-এর নেতৃত্বে পুরো আর্মেনীয় মহল্লা একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করে (Sahakian, 1966)।
উরফার সাধারণ মানুষ তাদের প্রাচীন পাথুরে বাড়িঘরগুলোকে একেকটি সামরিক বাঙ্কারে পরিণত করে। তারা মহল্লার প্রবেশপথগুলোতে পাথর ও মাটির বস্তা দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে এবং ছাদ থেকে ছাদে যাওয়ার জন্য দেয়াল কেটে গোপন সুড়ঙ্গ নির্মাণ করে। স্থানীয় জেন্ডারমে ও পুলিশ কয়েক সপ্তাহ চেষ্টা করেও এই অবরুদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইস্তাম্বুল থেকে সরাসরি পাঠানো হয় অভিজ্ঞ সেনা কমান্ডার ফাহরেদ্দিন পাশা (Fahreddin Pasha)-কে, যিনি সাথে নিয়ে এসেছিলেন ভারী ফিল্ড আর্টিলারি ও পদাতিক রেজিমেন্ট। শহরের আবাসিক এলাকার ওপর টানা কয়েক দিন ধরে অবিরাম কামানের গোলাবর্ষণ করা হয়। বাড়িঘরগুলো যখন মাটির সাথে মিশে যায় এবং সমস্ত গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়, তখন মেগেরদিচ সহ শীর্ষ যোদ্ধারা শত্রুর হাতে ধরা না দিয়ে নিজেদের পিস্তলের শেষ গুলিতে আত্মাহুতি দেন (Sahakian, 1966)।
একই ধরনের তীব্র লড়াই সংঘটিত হয়েছিল কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের পাহাড়ি শহর শাপিন-কারাহিসার (Shabin-Karahisar)-এ। সেখানে স্থানীয় নেতা ঘুকাস দেভেজিয়ান (Ghukas Devejian)-এর নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রাচীন রোমান দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন (Tashjian, 1965)। দুর্গের উঁচু পাথুরে প্রাচীর তাদের সাময়িক সুরক্ষা দিলেও সেখানে কোনো সুপেয় জলের স্থায়ী উৎস ছিল না। দুর্গের অধিবাসীরা বৃষ্টির জল এবং প্রাচীন তামার পাত্র গলিয়ে তৈরি করা বুলেট দিয়ে টানা আঠারো দিন ধরে নিয়মিত অটোমান সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত পানীয় জলের অভাবে যখন শিশুরা মারা যেতে শুরু করে, তখন দুর্গের পতন ঘটে এবং ভেতরে থাকা প্রায় সকল মানুষকে হত্যা করা হয়।
পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল সাসুনেও স্থানীয় ফেদায়ী যোদ্ধারা হাজার হাজার নিরীহ কৃষককে নিয়ে পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ জেমস তাশজিয়ান (James Tashjian) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রতিরোধগুলো কোনো পূর্বপরিকল্পিত বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল চরম বিপদে পড়া মানুষের আত্মরক্ষার এক স্বাভাবিক জৈবিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া (Tashjian, 1965)। যেখানেই সামান্যতম ভৌগোলিক সুবিধা বা অস্ত্রের সংস্থান ছিল, সেখানেই মানুষ নিছক নীরবে মৃত্যুর মুখে হেঁটে যাওয়ার বদলে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়েছিল।
স্থানীয় মুসলিম সমাজের আচরণ: সহযোগিতা বনাম উদ্ধার (Behavior of Local Muslim Societies: Collaboration versus Rescue)
১৯১৫ সালের ধ্বংসযজ্ঞ চলাকালে আনাতোলিয়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের স্থানীয় মুসলিম সমাজের – তুর্কি, কুর্দি, আরব ও সার্কাশীয় – আচরণ কোনো সরলরেখায় চলেনি। এটি ছিল এক অত্যন্ত জটিল, পরস্পরবিরোধী এবং বহুমাত্রিক সামাজিক প্রতিক্রিয়া। রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, যুদ্ধকালীন আতঙ্ক এবং ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে সমাজের একটি বড় অংশ এই নিধনযজ্ঞে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল। অনেকে প্রতিবেশীর ফেলে যাওয়া ধনসম্পদ, কৃষিজমি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করার লোভ সংবরণ করতে পারেনি। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে বহু সাধারণ মানুষ রাতারাতি অপরাধী চক্র ও লুণ্ঠনকারীদের সাথে হাত মিলিয়েছিল (Totten, 2008)।
কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেও সমাজের আরেকটি অংশ চরম নৈতিক সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও গণহত্যা গবেষক স্যামুয়েল টটেন (Samuel Totten) তার সম্পাদিত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আনাতোলিয়ার শত শত সাধারণ মুসলিম নাগরিক নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের প্রতিবেশীদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন (Totten, 2008)। তৎকালীন অটোমান সামরিক আইনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো আর্মেনীয়কে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তবে তার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে সেই বাড়ির আঙিনায় প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। এই চরম পরিণতির ভয়কে তুচ্ছ করে বহু তুর্কি কৃষক, কুর্দি গোত্রপ্রধান এবং সুফি দরবেশ বিপন্ন মানুষদের নিজেদের ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
ইতিহাসবিদ হারোতুয়ুন বয়াদজিয়ান (Haroutune Boyadjian) তার গবেষণায় এই মানবিক উদ্ধার কাজের বহু প্রামাণ্য বিবরণ তুলে ধরেছেন (Boyadjian, 1975)। বহু মুসলিম পরিবার আর্মেনীয় শিশুদের নিজেদের পরিবারে দত্তক নিয়ে নিজেদের সন্তান হিসেবে বড় করেছিলেন এবং তাদের নতুন নাম দিয়ে পুলিশি তল্লাশির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। সিরিয়ার মরুভূমিতে বহু বেদুইন শেখ কাফেলা থেকে পালিয়ে আসা অনাহারক্লিষ্ট নারীদের নিজেদের তাঁবুতে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং পাহারাদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের খাদ্য ও পানীয় জল সরবরাহ করেছিলেন। আলেপ্পো ও দামেস্কের বেশ কিছু মুসলিম ব্যবসায়ী গোপনে তহবিল গঠন করে অনাথদের জন্য রুটির ব্যবস্থা করেছিলেন।
এই উদ্ধারকারীদের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না; তাদের চালিকাশক্তি ছিল বিশুদ্ধ মানবতাবোধ এবং প্রতিবেশীর প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্রীয় নিধনযন্ত্র যখন পুরো সমাজকে অপরাধের অংশীদার বানাতে চেয়েছিল, তখন এই বিবেকবান মানুষগুলো প্রমাণ করেছিলেন যে চরম রাষ্ট্রীয় ভয়ের মধ্যেও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। তাদের এই নীরব প্রতিরোধ হাজার হাজার মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
দেরসিমের আলেভি সমাজ ও ককেশাস করিডোর (The Alevi Society of Dersim and the Caucasus Corridor)
পূর্ব আনাতোলিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল দেরসিম (বর্তমান তুনজেলি প্রদেশ) ছিল এই পুরো ট্র্যাজেডির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ব্যতিক্রমী এক ভৌগোলিক আশ্রয়স্থল। দেরসিমের বাসিন্দারা ছিলেন মূলত ভিন্ন সংস্কৃতির আলেভি (Alevi) কুর্দি ও জাজা জনগোষ্ঠীর মানুষ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা ইস্তাম্বুলের সুন্নি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বাইরে নিজেদের এক ধরনের প্রথাগত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে চলেছিলেন। ফলে সিইউপি সরকারের কোনো বৈষম্যমূলক নীতির প্রতি তাদের কোনো আস্থা বা আনুগত্য ছিল না। ১৯১৫ সালে যখন কেন্দ্রীয় সরকার দেরসিমের উপজাতীয় নেতাদের নির্দেশ দেয় তাদের এলাকায় থাকা সমস্ত আর্মেনীয়দের ধরে সরকারি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে, তখন দেরসিমের প্রভাবশালী নেতারা সেই আদেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন (Minassian, 2007)।
দেরসিমের প্রধান আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা সায়িদ রেজা (Seyid Riza) এবং কাঙ্গোজাদে শাহ হুসেইন বের নেতৃত্বে স্থানীয় গোত্রগুলো এক অনন্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা সিভাস, হারপুত, এরজিঞ্জান এবং মালাতিয়া থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার বিপন্ন মানুষকে নিজেদের পাহাড়ি উপত্যকায় সাদরে আশ্রয় দেন। ইতিহাসবিদ অনায়েদ তের মিনাসিয়ান (Anaide Ter Minassian) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দেরসিমের দুর্গম পাহাড়গুলো তখন পরিণত হয়েছিল এক মুক্তাঞ্চলে, যেখানে প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার আর্মেনীয় শরণার্থী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল (Minassian, 2007)। স্থানীয় আলেভি পরিবারগুলো তাদের নিজেদের খাদ্য ও ছাগলের দুধ এই অনাহারক্লিষ্ট শরণার্থীদের সাথে ভাগ করে নিয়েছিল।
দেরসিমের গোত্রগুলো কেবল আশ্রয় দিয়েই থেমে থাকেনি, তারা এই শরণার্থীদের নিরাপদ ভূখণ্ডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গড়ে তুলেছিল এক অত্যন্ত সুসংগঠিত ককেশাস করিডোর (Caucasus corridor)। মুঞ্জুর পর্বতমালার বরফাবৃত বিপদসংকুল গিরিপথ দিয়ে দেরসিমের অভিজ্ঞ গাইডরা শরণার্থীদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতেন ককেশাস ফ্রন্টে রুশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলে। ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু চেলেবিয়ান (Andrew Chelebian) তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য গাইডরা সামান্য পারিশ্রমিক নিলেও, পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালিত হয়েছিল এক গভীর মানবিক সংহতির ভিত্তিতে (Chelebian, 1989)।
অটোমান সামরিক বাহিনী দেরসিমে আক্রমণ করার হুমকি দিলেও পাহাড়ি যোদ্ধাদের প্রবল বাধার মুখে তারা এই অঞ্চলে বড় আকারের অভিযান চালাতে সাহস করেনি। ফলে ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত দেরসিম ছিল হাজার হাজার মানুষের জন্য এক জীবন্ত দুর্গ। এই ঐতিহাসিক সহায়তা দেখায় কীভাবে একটি ঐতিহ্যগতভাবে নিপীড়িত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অন্য একটি নিগৃহীত জাতির সুরক্ষায় নিজেদের সর্বস্ব বাজি রেখে দাঁড়িয়েছিল।
বেঁচে থাকার কৌশল: ছদ্মবেশ, গোপন নেটওয়ার্ক ও মরুভূমির আশ্রয় (Survival Strategies: Disguises, Underground Networks and Desert Sanctuary)
গণহত্যার নারকীয় বাস্তবতায় যারা কোনোমতে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল টিকে থাকার এক জটিল ও মরিয়া লড়াই। এটি দাবি করত তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা, মানসিক দৃঢ়তা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার অবিশ্বাস্য সক্ষমতা। নির্বাসনের কাফেলাগুলো থেকে রাতের অন্ধকারে যারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হতেন, তারা আনাতোলিয়া ও মেসোপটেমিয়ার পথে পথে নিজেদের শারীরিক ও সামাজিক পরিচয় সম্পূর্ণ বদলে ফেলতেন (Missakian, 1950)। পুরুষরা তাদের মাথার টুপি ও পোশাক বদলে স্থানীয় কুর্দি বা বেদুইনদের মতো পোশাক পরতেন এবং নারীরা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী চাদরে নিজেদের ঢেকে নিতেন।
ভাষা এই বেঁচে থাকার কৌশলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যারা শুদ্ধ তুর্কি, কুর্দি বা আরবি ভাষায় কথা বলতে পারতেন, তারা নিজেদের আসল পরিচয় গোপন করে সরকারি চেকপোস্টগুলো পার হতে পারতেন। ইতিহাসবিদ জিরার মিসাকিয়ান (Jirair Missakian) তার নথিতে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক মানুষ নিজেদের বধির বা বোবা সাজিয়ে রাখতেন যাতে তাদের মুখের আঞ্চলিক টান বা ভাষার ত্রুটি ধরা না পড়ে (Missakian, 1950)। এছাড়া ধনী পরিবারগুলো কাফেলায় নামার আগেই তাদের স্বর্ণমুদ্রা ও রত্ন কাপড়ের সেলাইয়ের ভেতর বা জুতার তলায় লুকিয়ে রেখেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে পাহারাদার ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে জীবন বাঁচানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
শহরাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক। ইস্তাম্বুল, আলেপ্পো এবং স্মার্নার মতো বড় শহরগুলোতে বিদেশি কনস্যুলেটের কর্মী, আমেরিকান মিশনারি এবং স্থানীয় প্রগতিশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় গোপনে ভুয়া পরিচয়পত্র ও ভ্রমণ সনদ বা ‘ইয়োল কাগিদি’ (yol kâğıdı) প্রস্তুত করা হতো (Torossian, 1947)। স্মৃতিকথা লেখক জেমস তোরোসিয়ান (James Torossian) উল্লেখ করেছেন যে, শত শত মানুষ মাসের পর মাস বড় বড় গুদামঘরের মাটির নিচের কুঠুরিতে বা কয়লার খনির ভেতরে সম্পূর্ণ অন্ধকারে লুকিয়ে থেকে দিন কাটিয়েছিলেন (Torossian, 1947)।
সিরিয়ার মরুভূমির গভীরে বেঁচে থাকার আরেকটি পথ ছিল যাযাবর বেদুইনদের সমাজে মিশে যাওয়া। হাজার হাজার তরুণ ও কিশোর বেদুইনদের উটের রাখাল বা সাধারণ মেষপালক হিসেবে মরুভূমিতে কাজ নিয়েছিল। তারা বেদুইনদের কঠিন জীবনযাত্রাকে মেনে নিয়েছিলেন কেবল নিজের শারীরিক অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য। প্রতিটি বেঁচে থাকার গল্পের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অসীম মানসিক যন্ত্রণা, যেখানে নিজের ধর্ম, ভাষা, পরিবার এবং অতীতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রতিদিন এক নতুন ছদ্মবেশে বাঁচতে হতো।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক গতিশীলতা (Regional Variations and Local Political Dynamics)
আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞের তীব্রতা ও মাত্রা সাম্রাজ্যের সব অঞ্চলে হুবহু একই রকম ছিল না। এতে অত্যন্ত স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈচিত্র্য (regional variations) দেখা গিয়েছিল, যা মূলত নির্ধারিত হতো স্থানীয় গভর্নরের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে (Peterson, 2002)। পূর্ব আনাতোলিয়ার যে ছয়টি প্রদেশে স্পেশাল অর্গানাইজেশনের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেখানে প্রায় শতভাগ মানুষকে নির্মূল করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম আনাতোলিয়ার কিছু উপকূলীয় বাণিজ্য নগরীতে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল।
এই আঞ্চলিক পার্থক্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল এজিয়ান সাগরের প্রধান বন্দর শহর স্মার্না (বর্তমান ইজমির)। ইজমিরের প্রাদেশিক গভর্নর ছিলেন রহমি বে (Rahmi Bey), যিনি ছিলেন তুলনামূলকভাবে দূরদর্শী ও স্বাধীনচেতা আমলা। তিনি খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে স্মার্নার সমৃদ্ধ বাণিজ্য ব্যবস্থা অমুসলিম আর্মেনীয় ও গ্রিক ব্যবসায়ীদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং এই শহরটি বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশার দফতর থেকে যখনই উচ্ছেদের নির্দেশ আসত, রহমি বে তা নানা অজুহাতে আটকে রাখতেন বা অত্যন্ত ধীরগতিতে কার্যকর করার ভান করতেন (Peterson, 2002)। তিনি প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন যে এই নাগরিকদের উচ্ছেদ করলে শহরের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধসে পড়বে। তার এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে ইজমিরের মূল শহরের বিপুল সংখ্যক আর্মেনীয় ও গ্রিক নাগরিক নির্বাসনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
একইভাবে রাজধানী ইস্তাম্বুলেও সাধারণ নাগরিকদের সবাইকে মরুভূমিতে পাঠানো সম্ভব হয়নি। যদিও ২৪ এপ্রিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, কিন্তু শহরের লক্ষাধিক সাধারণ বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে সিইউপি নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক মহলের চরম নিন্দার মুখে পড়ার ভয় পাচ্ছিল। কারণ ইস্তাম্বুলে তখন নিরপেক্ষ মার্কিন দূতাবাস, অস্ট্রিয়ান ও জার্মান সামরিক মিশন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ইতিহাসবিদ মিকায়েল ভারান্দিয়ান (Mikael Varandian) তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার এই ভয়টি রাজধানীতে এক ধরনের অঘোষিত সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছিল (Varandian, 1926)।
একইভাবে কুথাহিয়ার গভর্নর আলী ফাইক বের মতো সৎ কর্মকর্তারা নিজেদের প্রশাসনিক এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং স্থানীয় আর্মেনীয়দের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন। এই আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং কিছু সাহসী গভর্নরের ভূমিকা প্রমাণ করে যে, এই নিধনযজ্ঞ কোনো অবধারিত প্রক্রিয়া ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্ধ প্রয়োগের ফসল, যেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক প্রতিরোধ হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী দলিল ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান (Eyewitness Evidence and Demographic Losses): কূটনৈতিক নথি, সাক্ষ্য ও সংখ্যাগত বিতর্ক
কূটনৈতিক নথিপত্র: জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় মিত্রদের দলিল (Diplomatic Archives: Evidence from German and Austro-Hungarian Allies)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে সংঘটিত নিধনযজ্ঞের সবচেয়ে অকাট্য ও নিরপেক্ষ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় স্বয়ং অটোমানদের প্রধান সামরিক মিত্র জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির কূটনৈতিক নথিপত্র। এই দলিলগুলো কোনো শত্রু রাষ্ট্রের প্রচারণা ছিল না, বরং তা ছিল মিত্র দেশের অভ্যন্তরীণ গোপন দাপ্তরিক বার্তা। যুদ্ধের শুরু থেকেই কনস্টান্টিনোপলে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত হ্যান্স ফন ওয়াঙ্গেনহাইম এবং তার পরবর্তী উত্তরসূরি কাউন্ট পল উলফ-মেটারনিখ বার্লিনের চ্যান্সেলর কার্যালয়ে নিয়মিত গোপন ডেসপ্যাচ পাঠাতেন (Stuermer, 1917)। ১৯১৫ সালের জুলাই মাসেই উলফ-মেটারনিখ স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন যে, অটোমান সরকার যে চরম পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করছে, তা কোনো সামরিক ফ্রন্টের নিরাপত্তার প্রয়োজনে নয়; বরং আনাতোলিয়া থেকে সমগ্র আর্মেনীয় সমাজকে চিরতরে মুছে ফেলার এক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
জার্মান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কনস্যুলার নেটওয়ার্ক থেকে আসা বার্তাগুলো ছিল আরও বেশি বিস্তারিত ও মর্মান্তিক। আলেপ্পোতে নিযুক্ত জার্মান কনসাল ওয়াল্টার রসলার, এরজুরুমের কনসাল ম্যাক্স এরউইন ফন শ্যুবনার-রিখটার এবং আদানার কনসাল ডক্টর বুগে নিয়মিত নিজেদের চোখে দেখা ধ্বংসের চিত্র কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নথিভুক্ত করতেন। রসলার তার বার্তায় উল্লেখ করেছিলেন যে, শত শত মাইল হেঁটে আসা কঙ্কালসার কাফেলাগুলোকে কীভাবে চোখের সামনে শেষ করে দেওয়া হচ্ছিল এবং স্থানীয় প্রশাসনের কোনো অংশই এই মানুষদের বাঁচানোর সামান্যতম চেষ্টা করছিল না। এই কনসালরা সরাসরি বার্লিনকে অনুরোধ করেছিলেন যেন কাইজার সরকার অটোমান নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই রক্তপাত বন্ধ করায়। কিন্তু তৎকালীন সামরিক বাস্তবতায় জার্মানির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা তাদের যুদ্ধকালীন মিত্রকে বিরক্ত করতে চাননি, যদিও তাদের নথিপত্রে প্রতিটি অপরাধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সংরক্ষিত রয়ে যায়।
একইভাবে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির রাষ্ট্রদূত জোহান ফন পালাভিচিনি এবং ট্রাবজোনের ভাইস-কনসাল অগাস্ট শভেগেল (August Schwegel) তাদের সরকারের কাছে পাঠানো গোপন প্রতিবেদনে এই নিধনযজ্ঞের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেন (Schwegel, 1915)। অস্ট্রিয়ান কূটনীতিকরা লক্ষ্য করেছিলেন কীভাবে প্রাদেশিক গভর্নররা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোপন নির্দেশনায় নিয়মিত কাফেলাগুলোকে পাহাড়ি গিরিপথে নিয়ে গিয়ে তেশকিলাত-ই মাহসুসার অপরাধীদের হাতে তুলে দিচ্ছিল। শভেগেল তার বার্তায় লিখেছিলেন যে কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে নৌকায় তুলে সাগরের গভীরে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে মারা হচ্ছিল। স্যামসুনের অস্ট্রিয়ান কনসাল আর্নস্ট ফন কিয়াতকোভস্কিও একই ধরনের বর্বরতার দলিল তৈরি করেছিলেন।
জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নথিপত্রের ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম, কারণ এই কূটনীতিকদের কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না অটোমান সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করার। বরং যুদ্ধের ময়দানে অটোমান সাম্রাজ্যের সামরিক সংহতি রক্ষা করাই ছিল তাদের প্রধান কূটনৈতিক দায়িত্ব। তা সত্ত্বেও নিজেদের সরকারি গোপন ডেসপ্যাচে তারা এই উচ্ছেদকে কোনো সামরিক পদক্ষেপ না বলে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই গোপন কূটনৈতিক নথিসমূহ যুদ্ধপরবর্তী আন্তর্জাতিক গবেষণায় অটোমানদের সরকারি অস্বীকারের বয়ানকে পুরোপুরি খণ্ডন করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উৎসে পরিণত হয়।
নিরপেক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শী পশ্চিমা সাক্ষ্য (Neutral and Eyewitness Western Testimonies)
যুদ্ধ চলাকালে অটোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে উপস্থিত বিভিন্ন নিরপেক্ষ দেশের কূটনীতিক, স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সাহায্যকারী সংস্থার কর্মী এবং সাংবাদিকদের লিখিত সাক্ষ্য এই ট্র্যাজেডির এক বিশাল প্রামাণ্য ভিত্তি তৈরি করেছে। আমেরিকান স্পেশাল এনভয় লুইস আইনস্টাইন (Lewis Einstein) ১৯১৫ সালে রাজধানী ইস্তাম্বুল ও সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি তার সমকালীন ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে, প্রতিদিন শত শত নিরীহ নাগরিককে কোনো আনুষ্ঠানিক পরোয়ানা ছাড়াই রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো এবং শহরের জনপরিসরে এক থমথমে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল (Einstein, 1917)। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন কীভাবে রাজধানী শহরের শতাব্দী প্রাচীন বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রগুলোকে রাতারাতি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছিল।
একই সময়ে জার্মান দৈনিক পত্রিকা কোলনিশে জাইতুং (Kölnische Zeitung)-এর ইস্তাম্বুল প্রতিনিধি হ্যারি স্টুয়ার্মার (Harry Stuermer) নিজ চোখে সামরিক বাহিনীর এই চরম বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেন (Stuermer, 1917)। তিনি পরবর্তীতে নিজের পেশাগত দায়িত্ব ও বিবেকের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং নিরপেক্ষ সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নেন। ১৯১৭ সালে তিনি প্রকাশ করেন তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই টু ওয়ার ইয়ার্স ইন কনস্টান্টিনোপল (Two War Years in Constantinople)। স্টুয়ার্মার সেই গ্রন্থে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছিলেন যে, সিইউপি নেতৃত্ব আনাতোলিয়ার বুকে এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পরিচালনা করেছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
স্মার্নায় দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করা আমেরিকান কনসাল জেনারেল জর্জ হর্টন (George Horton) এবং মার্কিন ঐতিহাসিক হারবার্ট অ্যাডামস গিবন্স (Herbert Adams Gibbons) এই সহিংসতার ধারাবাহিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন (Horton, 1926; Gibbons, 1916)। গিবন্স ১৯১৬ সালে প্রকাশিত তার তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ দ্য ব্ল্যাকেস্ট পেজ অব মডার্ন হিস্ট্রি (The Blackest Page of Modern History)-এ আনাতোলিয়ার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সংগৃহীত প্রত্যক্ষদর্শীদের শত শত বয়ান সংকলন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে এই উচ্ছেদ কোনো স্থানীয় দাঙ্গা ছিল না, বরং তা ছিল নিখুঁত আমলাতান্ত্রিক ছকে পরিচালিত এক সামগ্রিক ধ্বংসযজ্ঞ।
নিরপেক্ষ এই পর্যবেক্ষকদের দলিলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভৌগোলিক অভিন্নতা। আনাতোলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাক্ষ্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একে অপরের সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন শহরের প্রত্যক্ষদর্শীরা হুবহু একই ধরনের প্রশাসনিক ও সামরিক পদ্ধতির বিবরণ দিয়েছেন। কীভাবে পুরুষদের আলাদা করা হতো, কীভাবে কাফেলাগুলোকে জল ও খাদ্যহীন অবস্থায় মরুভূমির দিকে হাঁটিয়ে নেওয়া হতো এবং কীভাবে পথে মিলিশিয়ারা আক্রমণ চালাত – এই সব বিবরণী আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেছিল যে অপরাধটি ছিল কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।
অটোমান সামরিক কর্মকর্তার জবানবন্দি: রাফায়েল দে নোগালেস মেনদেস (Testimony of an Ottoman Military Officer: Rafael de Nogales Méndez)
আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও চমকপ্রদ চরিত্রটি ছিলেন ভেনিজুয়েলার অভিযাত্রী ও সামরিক কর্মকর্তা রাফায়েল দে নোগালেস মেনদেস (Rafael de Nogales Méndez)। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভাগ্যের সন্ধানে ইউরোপে আসেন এবং পরবর্তীতে অটোমান সেনাবাহিনীতে একজন বেতনভুক্ত নিয়মিত অফিসার হিসেবে মেজর পদমর্যাদায় কমিশন লাভ করেন। ১৯১৫ সালের বসন্তে তিনি পূর্ব ফ্রন্টে থার্ড আর্মির অধীনে সরাসরি সামরিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ভ্যান শহরের অবরোধে অটোমান সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ ইউনিটের অন্যতম কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছিলেন (Nogales, 1926)।
নোগালেস ছিলেন একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা এবং তৎকালীন ভ্যানের গভর্নর জেভদেত বের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছিলেন কীভাবে নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং তেশকিলাত-ই মাহসুসার সশস্ত্র চেতে দলগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা সাধারণ নিরস্ত্র গ্রামীণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত স্মৃতিকথা ফোর ইয়ার্স বিনিথ দ্য ক্রিসেন্ট (Four Years Beneath the Crescent)-এ তিনি এই নিধনযজ্ঞের নিখুঁত সামরিক ও প্রশাসনিক বিবরণ তুলে ধরেন (Nogales, 1926)। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং গভর্নরদের দফতর থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন কোনো আর্মেনীয় বেসামরিক নাগরিককে জীবিত ছেড়ে দেওয়া না হয়।
নোগালেস তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি যখন সামরিক দায়িত্বে বিটলিস, সিয়ের্ত ও দিয়ারবেকির অঞ্চল অতিক্রম করছিলেন, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই রক্তপাতের তীব্র বিরোধিতা করার চেষ্টা করেছিলেন এবং স্থানীয় কমান্ডারদের সাথে তার বিরোধ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সিইউপি ক্যাডার ও চরমপন্থী আমলাদের অনমনীয় মনোভাবের কারণে তাকে এক চরম অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে নিজের সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।
একজন বিদেশি কর্মকর্তার এই জবানবন্দি ঐতিহাসিক গবেষণায় অত্যন্ত অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এটি কোনো শিকারের বা বাইরের কোনো পর্যবেক্ষকের বয়ান নয়; এটি হলো স্বয়ং অটোমান সামরিক পোশাক পরিহিত একজন প্রত্যক্ষদর্শীর স্বীকারোক্তি। নোগালেসের বর্ণনা প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয়দের প্রতিরোধ কোনো পূর্বপরিকল্পিত রাষ্ট্রদ্রোহ ছিল না, বরং তা ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার এক শেষ মরিয়া চেষ্টা। তার এই বিশদ বিবরণী গণহত্যার সামরিক ও প্রশাসনিক রূপরেখাকে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিল।
প্রাক-যুদ্ধ জনসংখ্যা ও পরিসংখ্যানগত ভিত্তি (Pre-War Demography and Statistical Baselines)
গণহত্যার সঠিক মাত্রা এবং নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক প্রাক্কালে অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা কত ছিল তা নির্ভুলভাবে নিরূপণ করা। এই জনমিতিক ভিত্তিকে কেন্দ্র করে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের গবেষণা ও বিতর্ক চলেছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে ফরাসি ভূগোলবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ ভিতাল কুইনে (Vital Cuinet) তার বিখ্যাত ভৌগোলিক জরিপগ্রন্থ লা তুর্কি দাজি (La Turquie d’Asie)-তে উল্লেখ করেছিলেন যে, এশীয় তুরস্কের ভূখণ্ডে প্রায় পনেরো লাখেরও বেশি আর্মেনীয় বসবাস করত (Cuinet, 1892)।
ব্রিটিশ ভূগোলবিদ ও গবেষক এইচ. এফ. বি. লিঞ্চ (H. F. B. Lynch) ১৯০১ সালে প্রকাশিত তার দুই খণ্ডের ঐতিহাসিক গ্রন্থ আর্মেনিয়া: ট্রাভেলস অ্যান্ড স্টাডিজ (Armenia: Travels and Studies)-এ পূর্ব আনাতোলিয়ার প্রতিটি প্রদেশের বিস্তারিত জনমিতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন (Lynch, 1901)। লিঞ্চ তৎকালীন অটোমান সরকারি আদমশুমারির নানা ধরনের অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক বিকৃতি বিশদভাবে উন্মোচন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে সরকার কর ফাঁকি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সংস্কার এড়ানোর উদ্দেশ্যে খ্রিস্টান জনসংখ্যার হিসাব সবসময় অনেক কম করে নথিবদ্ধ করত। তিনি স্বাধীন মাঠপর্যায়ের হিসাবের ভিত্তিতে দাবি করেছিলেন যে সাম্রাজ্যের ভেতরে আর্মেনীয়দের প্রকৃত সংখ্যা ছিল প্রায় ষোলো থেকে আঠারো লাখের কাছাকাছি।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয় কনস্টান্টিনোপলের আর্মেনীয় প্যাট্রিয়ার্কেট কর্তৃক ১৯১১-১৯১২ সালে পরিচালিত চার্চ আদমশুমারিকে। তৎকালীন প্যাট্রিয়ার্ক মালাচিয়া ওরম্যানিয়ান (Malachia Ormanian) তার গবেষণাধর্মী নথিতে দেখিয়েছেন যে, সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ডায়োসিস ও প্যারিশের রেজিস্ট্রি অনুযায়ী নিবন্ধিত আর্মেনীয় নাগরিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ২১ লাখ (Ormanian, 1911)। এই শুমারিতে প্রতিটি গির্জার আওতাধীন পরিবারের সংখ্যা, বাপ্তিস্মের রেকর্ড, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং করদাতাদের নিখুঁত তালিকা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফলে আধুনিক আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ সমাজের একটি বড় অংশ একমত যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে অটোমান সাম্রাজ্যের সীমানায় আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা ছিল প্রায় উনিশ থেকে একুশ লাখের মধ্যবর্তী। সরকারি তুর্কি আদমশুমারির যে নথিতে এই সংখ্যা অনেক কম দেখানো হয়েছিল, তা ছিল মূলত কর ফাঁকি দেওয়া এবং জনসংখ্যার অনুপাতকে কৃত্রিমভাবে বদলে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক কৌশল। এই প্রাক-যুদ্ধ পরিসংখ্যানগত ভিত্তিটিই পরবর্তীকালের মোট ধ্বংসের পরিমাণ সঠিকভাবে পরিমাপ করার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও সংখ্যাগত বিতর্ক (Death Toll Statistics and Numerical Debates)
১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত এই নিধনযজ্ঞে মোট কতজন মানুষ তাদের জীবন হারিয়েছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তারিত সংখ্যাগত বিশ্লেষণ রয়েছে। আর্মেনীয় সাংবাদিক ও গবেষক আরাম আন্দোনিয়ান (Aram Andonian) যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আলেপ্পো, দামেস্ক ও মেসোপটেমিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংকলন করেছিলেন (Andonian, 1920)। তৎকালীন আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা, আমেরিকান রেড ক্রস এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের যুদ্ধোত্তর হিসাব অনুযায়ী নিহতের এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় আট লাখ থেকে পনেরো লাখের মধ্যে।
ফরাসি যুদ্ধ সাংবাদিক হেনরি বার্বি (Henry Barby) ১৯১৭ সালে ককেশাস ফ্রন্ট পরিদর্শন করে তার প্রকাশিত গ্রন্থ ও পেই দে লোপুভান্ত: লারমেনি মার্তির (Au pays de l’épouvante: L’Arménie martyre)-তে লিখেছিলেন যে, কেবল পূর্বের ছয়টি প্রদেশ থেকেই দশ লাখেরও বেশি মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল (Barby, 1917)। মৃত্যুর এই বিশাল পরিসংখ্যানের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল: প্রথমত, সক্ষম পুরুষ ও সৈন্যদের শ্রম ব্যাটালিয়নে নিয়ে সরাসরি গুলি ও ধারালো অস্ত্রে হত্যা; দ্বিতীয়ত, মরুযাত্রার দীর্ঘ পথে তীব্র ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও শারীরিক ক্লান্তিতে অনাহারে মৃত্যু; এবং তৃতীয়ত, দের জোর ও রাস আল-আইনের ট্রানজিট ক্যাম্পগুলোতে ছড়িয়ে পড়া মহামারি এবং পরবর্তী পরিকল্পিত গণহত্যা।
আধুনিক ডেমোগ্রাফিক মেথডোলজি বা জনমিতিক বিয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকরা এই সংখ্যার সত্যতা নিরূপণ করেছেন। প্রাক-যুদ্ধ জনসংখ্যার মোট হিসাব (প্রায় বিশ লাখ) থেকে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সোভিয়েত আর্মেনিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আমেরিকায় আশ্রয় নেওয়া মোট জীবিত শরণার্থীর সংখ্যা বাদ দিলে এই নিহতের সংখ্যাটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক একাডেমিক গবেষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো যে, এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রায় দশ লাখ থেকে পনেরো লাখ আর্মেনীয় প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এর মানে দাঁড়ায় যে, তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে বসবাসকারী মোট আর্মেনীয় জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা সত্তর শতাংশেরও বেশি মানুষকে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে শারীরিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধকালীন ক্ষতি ছিল না; এটি ছিল পুরো একটি প্রাচীন জাতির সমগ্র জনমিতিক উপস্থিতিকে এক অভাবনীয় গতিতে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ঘটনা।
পরিসংখ্যানের রাজনীতি ও ঐতিহাসিক সংশোধনবাদ (The Politics of Demography and Historical Revisionism)
মৃত্যুর এই বিশাল পরিসংখ্যান কেবল একটি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবেই থাকেনি, বরং তা আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের এক প্রধান রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আধুনিক তুরস্কের অফিশিয়াল রাষ্ট্রীয় বয়ানে প্রাক-যুদ্ধ আর্মেনীয় জনসংখ্যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে মাত্র এগারো থেকে বারো লাখ বলে দাবি করা হয় এবং নিহতের সংখ্যাকে দুই থেকে তিন লাখের মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয় (Einstein, 1917)। এই রাষ্ট্রীয় সংশোধনবাদের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি পরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞকে নিছক যুদ্ধকালীন সাধারণ অস্থিরতা ও পারস্পরিক সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা।
তুর্কি অফিশিয়াল ইতিহাসে প্রায়ই একটি ‘পারস্পরিক সংঘাত’ বা উভয় পক্ষের সমান ক্ষয়ক্ষতির রাজনৈতিক বয়ান প্রচার করা হয়। সেখানে দাবি করা হয় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রোগবালাই ও গৃহযুদ্ধের কারণে মুসলিম ও অমুসলিম উভয়েই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এই কৃত্রিম সমতাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে গণ্য করে। কারণ রাষ্ট্রের সমগ্র প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, আধুনিক সেনাবাহিনী, প্যারা-মিলিটারি নেটওয়ার্ক এবং লজিস্টিক পরিকাঠামো ছিল ক্ষমতাসীনদের হাতে, আর অন্যপক্ষে শিকার হয়েছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, প্রান্তিক এবং প্রতিরক্ষাহীন সাধারণ বেসামরিক মানুষ।
ইতিহাসবিদ আরাম আন্দোনিয়ান এবং পরবর্তী গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, পরিসংখ্যানের এই রাজনৈতিক বিকৃতি মূলত গণহত্যার চূড়ান্ত পর্যায়েরই একটি অংশ (Andonian, 1920)। একটি জাতির শারীরিক অস্তিত্ব ধ্বংস করার পর তাদের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে মুছে ফেলার জন্যই এই সংখ্যাগত অস্বীকৃতির জন্ম দেওয়া হয়। বিশ্বের খ্যাতনামা ঐতিহাসিকদের ঐকমত্য এবং হাজার হাজার পৃষ্ঠার কূটনৈতিক দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য প্রমাণ করে যে, ১৯১৫ সালের এই ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম সুপরিকল্পিত আমলাতান্ত্রিক জাতিগত নিধনযজ্ঞ, যার প্রতিটি পরিসংখ্যান রক্তের অক্ষরে ইতিহাসের পাতায় চিরতরে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
সাম্রাজ্যের পতন, বিচার ও ডায়াস্পোরা (Collapse, Justice and Diaspora): যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক রূপান্তর
যুদ্ধোত্তর বিচার ও দায়বদ্ধতার প্রচেষ্টা (Postwar Trials and Accountability): অটোমান সামরিক আদালত ও অপরাধের বিচার
মুদরোস অস্ত্রবিরতি ও যুদ্ধোত্তর বিচারপ্রক্রিয়ার পটভূমি (The Armistice of Mudros and Context of Postwar Justice)
১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর এজিয়ান সাগরের লেমনস দ্বীপে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘আগামেমনন’-এর ডেকে স্বাক্ষরিত হয় মুদরোস অস্ত্রবিরতি চুক্তি (Armistice of Mudros) (Bass, 2000)। এর মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ পরাজয় আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটার সাথে সাথে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা কাঠামোর ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। সিইউপি সরকারের যে তিন শীর্ষ নেতা পুরো যুদ্ধের গতিপথ এবং নিধনযজ্ঞের প্রধান রূপকার ছিলেন – তালাত পাশা, এনোভার পাশা এবং জামাল পাশা – তারা পরাজয়ের নিশ্চিত পরিণতি বুঝতে পেরে ১৯১৮ সালের ২ নভেম্বর রাতের আঁধারে একটি জার্মান টর্পেডো বোটে করে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিয়ে জার্মানির বার্লিনে পালিয়ে যান।
রাজধানী ইস্তাম্বুল খুব দ্রুত ব্রিটিশ, ফরাসি এবং ইতালীয় যৌথ মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সিংহাসনে তখন আসীন ছিলেন নতুন সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদ ওয়াহিদেদ্দিন (Mehmed VI Vahideddin)। তার নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী বা গ্র্যান্ড উজির দামাত ফেরিদ পাশা (Damat Ferid Pasha) এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে এবং আসন্ন প্যারিস শান্তি সম্মেলনে মিত্রশক্তির সম্ভাব্য কঠোর শর্ত শিথিল করার উদ্দেশ্যে সুলতান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহলকে এই বার্তা দেওয়া যে, বিশ্বযুদ্ধকালীন নিধনযজ্ঞের সমস্ত দায় তৎকালীন সিইউপি দলের একটি বিশেষ চক্রের, এবং অটোমান রাষ্ট্র ও রাজবংশ এই অপরাধের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল না (Robertson, 2014)।
আন্তর্জাতিক আইনবিদ জিওফ্রে রবার্টসন (Geoffrey Robertson) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই বিচারপ্রক্রিয়াটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক অনন্য পরীক্ষা (Robertson, 2014)। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিচার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে যুদ্ধকালীন দলিলপত্র সংগ্রহের জন্য বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করে। প্রদেশগুলো থেকে উদ্ধার করা হয় শত শত গোপন সরকারি আদেশ, টেলিগ্রাম এবং আর্থিক নথিপত্র। ১৬ ডিসেম্বর ১৯১৮ সালে জারি করা রাজকীয় ফরমানে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে, যুদ্ধকালীন সময়ে যারা সাম্রাজ্যের নিরীহ প্রজাদের হত্যা, লুণ্ঠন ও দেশান্তরি করার সাথে যুক্ত ছিল, তাদের বিশেষ সামরিক আদালতে বিচারের আওতায় আনা হবে। এর ফলে অটোমান সাম্রাজ্যের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামোর ভেতরেই শুরু হয় প্রথম পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার প্রয়াস।
ইস্তাম্বুল সামরিক আদালত: গঠন, বিচার ও রায় (The Istanbul Military Tribunals: Structure, Trials and Verdicts)
১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ইস্তাম্বুল সামরিক আদালত (Istanbul Military Tribunals – Dîvân-ı Harb-i Örfî) (Segesser & Gessler, 2005)। এই বিশেষ আদালতের প্রধান বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল জেনারেল মুস্তফা নাযিম পাশা (Mustafa Nazım Pasha)-কে, এবং পরবর্তীতে দায়িত্ব পান জেনারেল মুস্তফা পাশা, যিনি তার অনমনীয় ও কঠোর অবস্থানের কারণে পরিচিত ছিলেন ‘নেমরুদ মুস্তফা’ (Nemrud Mustafa) নামে। আদালতের বিচারকার্য কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; কেন্দ্রীয় সিইউপি নেতৃত্বের বিচারের পাশাপাশি ট্রাবজোন, ইয়োজগাত এবং বায়বুর্টের মতো আঞ্চলিক হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্য পৃথক পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল।
সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছিল সিইউপি কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মূল বিচারপ্রক্রিয়া। পলাতক তালাত পাশা, এনোভার পাশা, জামাল পাশা এবং ডক্টর নাযিমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সংবিধান লঙ্ঘন এবং আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর পরিকল্পিত বিনাশের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। আদালতের সামনে সাক্ষ্য দেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা, প্রাদেশিক গভর্নর এবং বেঁচে ফেরা নাগরিকরা। ১৯১৯ সালের ৫ জুলাই সামরিক আদালত তার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। রায়ে পলাতক তিন পাশা এবং ডক্টর নাযিমকে গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড বা ‘ইন অ্যাবসেন্টসিয়া’ (in absentia) প্রদান করা হয় (Willis, 1982)।
ইতিহাসবিদ জেমস উইলিস (James Willis) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আদালত কেবল পলাতকদেরই সাজা দেয়নি, বরং হেফাজতে থাকা বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও সরাসরি শাস্তির আওতায় নিয়ে আসে (Willis, 1982)। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইয়োজগাতের বোগাজলিয়ানের জেলা প্রশাসক মেহমেদ কামাল বে (Mehmed Kemal Bey)-এর ফাঁসি। হাজার হাজার মানুষকে পাহাড়ি গিরিপথে হত্যা করার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়ার পর ১৯১৯ সালের এপ্রিলে ইস্তাম্বুলের বায়েজিদ স্কয়ারে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। এছাড়া ট্রাবজোনের গভর্নর জামাল আজমি এবং তেশকিলাত-ই মাহসুসার কেন্দ্রীয় পরিচালক বাহাত্তিন শাকিরকেও দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এই রায়গুলো প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিল যে রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতার আড়ালে গণসহিংসতা চালালেও তাকে ব্যক্তিগত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা সম্ভব।
আইনি নথিপত্র, সরকারি গেজেট ও গোপন নির্দেশের প্রমাণ (Legal Documentation, the Official Gazette and Proof of Clandestine Orders)
ইস্তাম্বুল সামরিক আদালতের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান ছিল এই নিধনযজ্ঞের সপক্ষে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ সরকারি নথিপত্র ও প্রত্যক্ষ প্রমাণাদি। বিচার চলাকালে উপস্থাপিত সমস্ত অভিযোগপত্র, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং মূল টেলিগ্রামের কপিগুলো অটোমান সরকারের সরকারি গেজেট তাকভিম-ই ভেকায়ে (Takvim-i Vekâyi)-এর বিশেষ সম্পূরক সংখ্যাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল (Heller, 2011)। এর ফলে এই বিচারপ্রক্রিয়ার সমস্ত আইনি নথিপত্র রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে চিরতরে সংরক্ষিত হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে কোনো সরকারের পক্ষেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আদালতের শুনানিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইফার ব্যুরো থেকে উদ্ধার করা মূল এনক্রিপ্ট করা টেলিগ্রামগুলো ডিকোড করে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই গোপন বার্তাগুলো পরীক্ষা করে বিচারকরা দেখতে পান যে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে একটি সমান্তরাল যোগাযোগ ব্যবস্থা কাজ করত (Sunga, 1992)। প্রকাশ্য নথিপত্রে যে কাফেলাগুলোকে কেবল স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেই একই কাফেলা সম্পর্কে গোপনে পাঠানো কোডেড বার্তায় প্রদেশগুলোর পুলিশ ও মিলিশিয়া বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তাদের কাউকেই জীবিত মরুভূমিতে পৌঁছাতে না দেওয়া হয়।
আইনবিজ্ঞানী কেভিন হেলার (Kevin Heller) তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, এই বিচার নথিপত্রগুলোই প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেছিল যে আর্মেনীয় নিধনযজ্ঞ কোনো স্থানীয় বিশৃঙ্খলা ছিল না (Heller, 2011)। এটি ছিল একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, যার প্রতিটি ধাপে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যুদ্ধ মন্ত্রণালয় এবং তেশকিলাত-ই মাহসুসার প্রত্যক্ষ সমন্বয় কাজ করেছিল। সরকারি কর্মকর্তারা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছিলেন কীভাবে মৌখিক আদেশ ও গোপন তারবার্তার মাধ্যমে এই রক্তপাত কার্যকর করা হয়েছিল। আইনি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই দলিলগুলো বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক অপরাধবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দালিলিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মাল্টা বন্দি সংকট ও ব্রিটিশ ভূরাজনীতি (The Malta Detainees Crisis and British Geopolitics)
ইস্তাম্বুলের স্থানীয় আদালতগুলোতে বিচার চলার সমান্তরালে মিত্রশক্তি বিশেষ করে গ্রেট ব্রিটেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করে। ব্রিটিশ সামরিক কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করেছিল যে ইস্তাম্বুলের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে কট্টরপন্থী বন্দিরা কারাগার ভেঙে পালিয়ে যেতে পারে অথবা স্থানীয় সরকার তাদের ছেড়ে দিতে পারে। ফলে ১৯১৯ সালের মে থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনী প্রায় একশো পঁয়তাল্লিশ জন শীর্ষ অটোমান মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সেনা জেনারেল এবং গভর্নরকে গ্রেফতার করে ভূমধ্যসাগরের মাল্টা দ্বীপে নির্বাসনে নিয়ে যায়, যারা ইতিহাসে ‘মাল্টা বন্দি’ (Malta Detainees) নামে পরিচিত হন (Simpson, 2007)।
ব্রিটিশ সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল এদের বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করা, যা পরবর্তীকালের নুরেমবার্গ ট্রায়ালের একটি প্রাথমিক রূপ হতে পারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আইনি প্রমাণের অপ্রতুলতার কারণে ব্রিটিশ আইন মন্ত্রণালয় এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে। তখনকার আন্তর্জাতিক আইনে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে চালানো অপরাধের জন্য অন্য কোনো বিদেশি আদালতে শাস্তি দেওয়ার স্পষ্ট কোনো বৈশ্বিক সনদ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো ছিল না (Kochavi, 1998)।
ইতিহাসবিদ আরিহ কোচাভি (Arieh Kochavi) দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের এই শূন্যতার সাথে যুক্ত হয়েছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি (Kochavi, 1998)। আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরে যখন মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে এক নতুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, তখন তুর্কি জাতীয়তাবাদী বাহিনী বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তাকে (যার মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রলিনসন) যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করে। মোস্তফা কামাল স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে মাল্টার সমস্ত বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে এই ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করা হবে। ফলে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের চাপে পড়ে ব্রিটিশ সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক বিচার ছাড়াই ১৯২১ সালের শেষ নাগাদ মাল্টার সমস্ত যুদ্ধাপরাধী বন্দিকে তুর্কি বন্দিদের সাথে বিনিময় করে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রথম বড় উদ্যোগটি রাজনৈতিক দরকষাকষির মুখে মুখ থুবড়ে পড়ে।
জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া ও বিচারপ্রক্রিয়ার পতন (The Nationalist Backlash and the Collapse of Judicial Accountability)
১৯১৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে আনাতোলিয়ার মাটিতে যে জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা ইস্তাম্বুলের এই সামরিক আদালতগুলোকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। আঙ্কারায় প্রতিষ্ঠিত গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (TBMM) এবং মোস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় আন্দোলন ইস্তাম্বুল সরকারকে বিদেশি দখলদারদের হাতের পুতুল হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা ঘোষণা করে যে মিত্রশক্তির চাপে পরিচালিত এই সামরিক আদালতগুলো তুর্কি জাতির মর্যাদা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর এক সরাসরি আঘাত (Bass, 2000)।
এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে আদালতের ফাঁসি হওয়া অপরাধীদের দ্রুত জাতীয়তাবাদী প্রতীকে রূপান্তর করা শুরু হয়। ইয়োজগাতের যে কামাল বেকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, আঙ্কারার সংসদ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় শহীদ’ (National Martyr) ঘোষণা করে এবং তার পরিবারের জন্য আজীবন রাষ্ট্রীয় ভাতার ব্যবস্থা করে (Scharf, 1997)। যে বিচারকরা এই মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন – বিশেষ করে নেমরুদ মুস্তফা পাশা – তাদের জাতীয় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ১৯২০ সালের আগস্টের পর থেকে ইস্তাম্বুলের সামরিক আদালতগুলোর কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং অনেক বন্দিকে গোপনে মুক্তি দিয়ে আঙ্কারার জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আইনবিদ মাইকেল শ্যাফ (Michael Scharf) উল্লেখ করেছেন যে, জাতীয়তাবাদী এই প্রতিক্রিয়ার কারণে অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া একটি চরম সামাজিক বৈপরীত্যের মুখে পড়ে (Scharf, 1997)। যে ব্যক্তিরা কয়েক মাস আগেও গণহত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন, রাতারাতি তারাই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জাতীয় বীর হিসেবে সমাদৃত হতে থাকেন। ১৯২২ সালের শেষ দিকে যখন মোস্তফা কামালের বাহিনী ইস্তাম্বুল দখল করে এবং সালতানাতের অবসান ঘটে, তখন এই সামরিক আদালতগুলোকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বাজেয়াপ্ত হওয়া আর্মেনীয় সম্পত্তির সিংহভাগ এই পুনর্বাসিত কর্মকর্তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে যুদ্ধোত্তর দায়বদ্ধতার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার (International Criminal Law and the Legacy of Accountability)
যদিও ইস্তাম্বুলের সামরিক আদালত এবং মাল্টার বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক কারণে অকালে থমকে গিয়েছিল, তবুও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে এর তাত্বিক ও আইনি গুরুত্ব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯১৫ সালের ২৪ মে যখন ব্রিটিশ, ফরাসি এবং রুশ সরকার এক যৌথ কূটনৈতিক ঘোষণাপত্র জারি করে অটোমানদের এই নিধনযজ্ঞকে প্রথমবারের মতো ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ (crimes against humanity) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিল, তখন থেকেই আন্তর্জাতিক আইনের এক নতুন যুগের সূচনা হয় (Meron, 1998)।
আইনবিজ্ঞানী থিওডোর মেরন (Theodor Meron) তার ধ্রুপদী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, অটোমান সামরিক আদালতগুলো ছিল বিশ্বের প্রথম বিচারিক নজির, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব আদালত সেই রাষ্ট্রেরই শীর্ষ মন্ত্রীদের নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিল (Meron, 1998)। এই বিচার নথিপত্র এবং এর আইনি সীমাবদ্ধতাগুলোই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনবিদ রাফায়েল লেমকিনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। লেমকিন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা প্রায়শই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়, ফলে এমন একটি স্থায়ী বৈশ্বিক আইনি পরিকাঠামো প্রয়োজন যা রাষ্ট্রীয় সীমানার ঊর্ধ্বে কাজ করবে (Sands, 2016)।
ইতিহাসবিদ ফিলিপ স্যান্ডস (Philippe Sands) এবং লেইলা সাদাত তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, ইস্তাম্বুল আদালতের এই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালের নুরেমবার্গ ট্রায়াল, টোকিও ট্রায়াল এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court – ICC) গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে (Sands, 2016; Sadat, 2002)। যুদ্ধোত্তর বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যর্থতা এবং পরবর্তীকালে দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা বিশ্ববাসীকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার যদি রাজনৈতিক সমঝোতার বলি হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধের পথ উন্মুক্ত করে। সুতরাং, এই অটোমান সামরিক আদালতগুলো ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অসম্পূর্ণ কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক।
সেভ্র থেকে লুজান (From Sèvres to Lausanne): আর্মেনীয় রাষ্ট্রের প্রশ্ন, তুর্কি জাতীয় আন্দোলন ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা
সেভ্রে চুক্তি ও ‘উইলসনীয় আর্মেনিয়া’র স্বপ্ন (The Treaty of Sèvres and the Dream of ‘Wilsonian Armenia’)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি যখন মধ্যপ্রাচ্য ও আনাতোলিয়ার নতুন রাজনৈতিক ভূগোল পুনর্গঠনের জন্য প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে একত্রিত হয়, তখন এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা আর্মেনীয় প্রশ্নের এক ঐতিহাসিক আইনি সমাধান দৃশ্যমান হয়েছিল। ১৯২০ সালের এপ্রিল মাসে ইতালির সান রেমো সম্মেলনে দীর্ঘ আলোচনার পর ১০ আগস্ট ১৯২০ সালে প্যারিসের বিখ্যাত পোর্সেলিন কারখানার হলে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক সেভ্রে চুক্তি (Treaty of Sèvres) (Helmreich, 1974)। এই চুক্তির ৮৮ থেকে ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদে অটোমান সাম্রাজ্যের ইস্তাম্বুল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম আর্মেনীয় রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নতুন এই রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের ভার ন্যস্ত করা হয়েছিল তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson)-এর ব্যক্তিগত সালিশি কর্তৃত্বের ওপর।
উইলসন তার ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতির ওপর ভিত্তি করে পূর্ব আনাতোলিয়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের এক বিশদ সীমানা মানচিত্র প্রস্তুত করেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘উইলসনীয় আর্মেনিয়া’ (Wilsonian Armenia) নামে পরিচিত (Hurewitz, 1979)। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী সাবেক অটোমান সাম্রাজ্যের চারটি প্রধান প্রদেশ – এরজুরুম, ট্রাবজোন, ভ্যান এবং বিটলিস – সদ্য গঠিত প্রথম আর্মেনীয় প্রজাতন্ত্রের সাথে সংযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল কৃষ্ণসাগরের উপকূলে ট্রাবজোন বন্দরকে আর্মেনিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে নতুন এই স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রটি একটি স্বাধীন সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ লাভ করতে পারে। প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত জাতীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান বোগোস নুবার পাশা (Boghos Nubar Pasha) এবং প্রথম আর্মেনীয় প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধি আভেতিসাহারোনিয়ান এই চুক্তিকে তাদের প্রজন্মের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
ইতিহাসবিদ পল হেলমরাইখ (Paul Helmreich) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সেভ্রে চুক্তির ভেতরের এই বিশাল স্বপ্নটি শুরু থেকেই এক চরম কাঠামোগত দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল (Helmreich, 1974)। মিত্রশক্তি কাগজে কলমে এই সীমানা মেনে নিলেও আনাতোলিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সৈন্য পাঠিয়ে সেই সীমানা কার্যকর করার কোনো সরাসরি সামরিক দায়িত্ব ব্রিটেন বা ফ্রান্স গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে মার্কিন সিনেট ১৯২০ সালের জুন মাসেই আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট বা আর্মেনিয়ার সুরক্ষার অভিভাবকত্ব নেওয়ার প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজেদের চিরাচরিত আইসোলেশনিস্ট নীতিতে ফিরে যায়। ইতিহাসবিদ এ. ই. মন্টগোমারি (A. E. Montgomery) উল্লেখ করেছেন যে, কোনো বড় আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তির উপস্থিতি ছাড়া একটি কাল্পনিক সীমানা ঘোষণা করার এই সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চলের মানুষকে এক নতুন ভূরাজনৈতিক ফাঁদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল (Montgomery, 1972)।
মোস্তফা কামাল ও তুর্কি জাতীয় আন্দোলনের উত্থান (Mustafa Kemal and the Rise of the Turkish National Movement)
সেভ্রে চুক্তির শর্তাবলী যখন ইস্তাম্বুলের সালতানাত সরকার মেনে নিচ্ছিল, তখন আনাতোলিয়ার পাহাড়ি জনপদে জন্ম নিচ্ছিল এক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও অপ্রতিরোধ্য জাতীয়তাবাদী সামরিক শক্তি। ১৯১৯ সালের ১৯ মে অটোমান সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ জেনারেল মোস্তফা কামাল (Mustafa Kemal) কৃষ্ণসাগরের সামসুন বন্দরে অবতরণ করেন এবং সেখান থেকেই সূচনা হয় তুর্কি জাতীয় আন্দোলন বা স্বাধীনতা যুদ্ধ। তিনি আনাতোলিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে একত্রিত করে হাভজা, আমাসিয়া, এরজুরুম এবং সিভাসে ধারাবাহিক জাতীয় কংগ্রেস আহ্বান করেন। এই কংগ্রেসগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রচিত হয় ঐতিহাসিক জাতীয় চুক্তি (National Pact – Misak-ı Millî) (Mango, 2000)।
জাতীয় চুক্তির মূল ঘোষণা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও আপসহীন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় যে সীমানা পর্যন্ত অটোমান সামরিক নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং যেখানে তুর্কি-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেই ভূখণ্ডের কোনো অংশ বিদেশি শক্তির কাছে বা কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রের দাবির মুখে ছেড়ে দেওয়া হবে না। মোস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন ইস্তাম্বুলের দুর্বল সরকারকে বিদেশি শক্তির হাতের পুতুল হিসেবে অভিযুক্ত করে এবং ২৩ এপ্রিল ১৯২০ সালে আঙ্কারায় প্রতিষ্ঠা করে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (TBMM)। আঙ্কারার এই নতুন সংসদ সেভ্রে চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর চরম কুঠারাঘাত হিসেবে ঘোষণা করে এবং এর প্রতিটি অনুচ্ছেদকে সামরিক শক্তিতে চূর্ণ করার সর্বসম্মত শপথ গ্রহণ করে।
ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু ম্যাঙ্গো (Andrew Mango) তার আকর গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে মোস্তফা কামাল আনাতোলিয়ার সাধারণ মানুষকে একটি সর্বাত্মক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন (Mango, 2000)। পশ্চিমা শক্তির বিভাজন নীতি এবং গ্রিক সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের মুখে সাধারণ তুর্কি জনমানসে এক গভীর প্রতিরোধ চেতনার জন্ম হয়েছিল। ইতিহাসবিদ লর্ড কিনরোস (Lord Kinross) দেখিয়েছেন যে, আঙ্কারা সরকারের কাছে সেভ্রে চুক্তির ‘উইলসনীয় আর্মেনিয়া’ ছিল তাদের জাতীয় ভূখণ্ডের বুক চিরে আরেকটি রাষ্ট্র তৈরি করার এক সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা (Kinross, 1964)। ফলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে পূর্ব ফ্রন্টে আর্মেনীয় রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে সমূলে উৎপাটন করাই হয়ে দাঁড়ায় আঙ্কারার প্রধান সামরিক অগ্রাধিকার।
তুর্কি-আর্মেনীয় যুদ্ধ ও প্রথম প্রজাতন্ত্রের পতন (The Turkish-Armenian War and Collapse of the First Republic)
সেভ্রে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে, ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আঙ্কারার সরকারের নির্দেশে পূর্ব ফ্রন্টে শুরু হয় এক সর্বাত্মক সামরিক অভিযান। জেনারেল কাজিম কারাবেকির (Kâzım Karabekir)-এর নেতৃত্বে তুর্কি পঞ্চদশ আর্মি কোর সীমান্ত অতিক্রম করে অগ্রসর হয় এবং শুরু হয় রক্তক্ষয়ী তুর্কি-আর্মেনীয় যুদ্ধ (Turkish-Armenian War) (Howard, 1931)। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম আর্মেনীয় প্রজাতন্ত্র তখন এক চরম অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিল। পূর্ববর্তী গণহত্যার শিকার হয়ে বেঁচে ফেরা লাখ লাখ অনাহারক্লিষ্ট শরণার্থীর ভিড়, টাইফাস মহামারি এবং চতুর্মুখী অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে থাকা একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের পক্ষে আধুনিক ভারী অস্ত্রে সজ্জিত তুর্কি নিয়মিত বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
কারাবেকিরের বাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়ে সীমান্ত শহর সারিকামিশ, আরদাহান এবং অক্টোবরের শেষে দুর্ভেদ্য সামরিক দুর্গ নগরী কার্স দখল করে নেয়। এরপর তারা বর্তমান আর্মেনিয়ার মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ঐতিহাসিক আলেক্সান্দ্রোপোল (বর্তমান গ্যুমরি) শহরটি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তুর্কি অগ্রবর্তী দল যখন রাজধানী ইয়েরেভানের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়, তখন পুরো আর্মেনীয় জাতির সামনে নেমে আসে সম্পূর্ণ ধ্বংসের চরম পদধ্বনি। ২-৩ ডিসেম্বর ১৯২০ সালের মধ্যরাতে আর্মেনীয় প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধি আলেকজান্ডার খাতিসিয়ান স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন চরম অবমাননাকর আলেক্সান্দ্রোপোল চুক্তি (Treaty of Alexandropol) (Macfie, 1998)। এই চুক্তির মাধ্যমে আর্মেনিয়া সেভ্রে চুক্তির সমস্ত ভৌগোলিক দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয় এবং কার্স ও সুরমালু সহ পশ্চিমের সুবিশাল ভূখণ্ডের ওপর তুরস্কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়।
ইতিহাসবিদ হ্যারি হাওয়ার্ড (Harry Howard) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, সামরিক পরাজয়ের এই চরম মুহূর্তে আর্মেনিয়া দাঁড়িয়েছিল এক গভীর ঐতিহাসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখে (Howard, 1931)। হয় তুর্কি বাহিনীর হাতে সমগ্র ভূখণ্ডের বিনাশ মেনে নেওয়া, অথবা বলশেভিক রাশিয়ার সুরক্ষাবলয়ে আশ্রয় নেওয়া। আর্মেনীয় নেতৃত্ব নিজেদের শারীরিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। আলেক্সান্দ্রোপোল চুক্তি স্বাক্ষরের সমান্তরালেই রুশ একাদশ রেড আর্মি ইয়েরেভানে প্রবেশ করে এবং সেখানে সোভিয়েত শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসবিদ এ. এল. ম্যাকফি (A. L. Macfie) দেখিয়েছেন যে, এই সোভিয়েতকরণের মাধ্যমে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক আর্মেনীয় রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন অকালে ধূলিসাৎ হয়ে গেলেও, তা অন্তত দক্ষিণ ককেশাসের ক্ষুদ্র একটি ভূখণ্ডে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ শারীরিক বিলুপ্তির হাত থেকে শেষ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল (Macfie, 1998)।
মহান শক্তির ভূরাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ও কিলিফিয়া সংকট (Shifting Geopolitics of Great Powers and the Cilicia Crisis)
তুর্কি জাতীয় আন্দোলনের চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের পেছনে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর স্বার্থপর ভূরাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এক বড় ভূমিকা রেখেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে সকল শক্তি আর্মেনীয়দের সুরক্ষার জন্য বড় বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা খুব দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ ও নতুন বাণিজ্য চুক্তির লোভে নিজেদের পূর্বের সমস্ত অঙ্গীকার থেকে সরে আসতে শুরু করে। এর সবচেয়ে ট্র্যাজিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী সিলিসিয়া অঞ্চলে, যা তখন ফরাসি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল (Walder, 1969)।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক আশ্বাসের ওপর ভরসা করে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি বেঁচে ফেরা আর্মেনীয় শরণার্থী তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি কিলিকিয়া, আদানা, মারাশ এবং আইনতাবে ফিরে এসেছিল। কিন্তু আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরে মোস্তফা কামালের জাতীয়তাবাদী বাহিনীর প্রবল গেরিলা আক্রমণের মুখে এবং যুদ্ধক্লান্ত ফরাসি সমাজের অর্থনৈতিক চাপের মুখে প্যারিস সরকার আঙ্কারার সাথে গোপন সমঝোতায় পৌঁছায়। ২০ অক্টোবর ১৯২১ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক আঙ্কারা চুক্তি (Treaty of Ankara) বা ফ্রাঙ্কলিন-বুইলন চুক্তি (Walder, 1969)। এই চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সিলিসিয়া অঞ্চলটি মোস্তফা কামালের সরকারের হাতে তুলে দিয়ে তাদের সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। ফরাসি সেনাবাহিনী যখন তাদের ঘাঁটিগুলো খালি করছিল, তখন আসন্ন প্রতিশোধের ভয়ে চরম আতঙ্কিত লক্ষাধিক আর্মেনীয় শরণার্থী নিজেদের নতুন করে সাজানো বাড়িঘর আবার ফেলে ফরাসি জাহাজে করে সিরিয়া, লেবানন ও গ্রিসের দিকে পালিয়ে যায়।
একই সময়ে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ঘটে যায় আরেক বড় আন্তর্জাতিক সমীকরণ। সোভিয়েত বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin) ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে মোস্তফা কামালের আঙ্কারা সরকারকে তাদের অন্যতম প্রধান মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেন (Kuniholm, 2014)। ১৬ মার্চ ১৯২১ সালে স্বাক্ষরিত মস্কো চুক্তি (Treaty of Moscow)-র মাধ্যমে সোভিয়েত রাশিয়া আঙ্কারা সরকারকে তুরস্কের একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। সোভিয়েতরা এই চুক্তির অধীনে আঙ্কারা সরকারকে লাখ লাখ রুবল খাঁটি স্বর্ণমুদ্রা, আধুনিক রাইফেল, কামান এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সরবরাহ করে। ইতিহাসবিদ ব্রুস কুনিহোম (Bruce Kuniholm) দেখিয়েছেন যে, মস্কোর দেওয়া এই আর্থিক ও সামরিক সহায়তাই মূলত মোস্তফা কামালকে পশ্চিমা শক্তির কূটনৈতিক অবরোধ ভেঙে পরবর্তীতে গ্রিক সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার মূল জ্বালানি সরবরাহ করেছিল।
১৯২৩ সালের লুজান চুক্তি ও আর্মেনীয় প্রশ্নের নীরব সমাধি (The 1923 Treaty of Lausanne and the Silent Burial of the Armenian Question)
১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রিক বাহিনীকে পরাজিত করে ইজমির পুনর্দখল এবং ব্রিটিশদের সাথে চাকান সংকটের পর আঙ্কারার সরকার মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পুরনো সেভ্রে চুক্তিকে সম্পূর্ণ বাতিল করে এক নতুন শান্তি চুক্তি প্রণয়নের জন্য সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে শুরু হয় দীর্ঘ কূটনৈতিক সম্মেলন। ২০ নভেম্বর ১৯২২ থেকে ২৪ জুলাই ১৯২৩ পর্যন্ত চলা এই শান্তি সম্মেলনে তুরস্কের পক্ষে নেতৃত্ব দেন জেনারেল ইসমত ইনোনু (İsmet İnönü) এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে নেতৃত্ব দেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড কার্জন (Lord Curzon) (Montgomery, 1972)।
লুজান সম্মেলনের আলোচনার টেবিলে ইসমত ইনোনু এক অত্যন্ত অনমনীয় ও আক্রমণাত্মক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তুরস্ক কোনো অবস্থাতেই তার সার্বভৌম ভূখণ্ডের ভেতরে কোনো অমুসলিম ‘জাতীয় হোমল্যান্ড’ বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের দাবি মেনে নেবে না। নির্বাসিত আর্মেনীয়দের প্রতিনিধি দল লুজানে উপস্থিত হয়ে অন্তত একটি ক্ষুদ্র স্বশাসিত আশ্রয়স্থলের জন্য বারবার আবেদন জানায়, কিন্তু পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই আবেদনকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে। ব্রিটিশরা মসুলে তাদের তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং তুর্কি প্রণালী দিয়ে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার বিনিময়ে তুরস্কের এই অভ্যন্তরীণ সমজাতীয়করণের দাবি মেনে নেয় (Psomiades, 2000)।
২৪ জুলাই ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক লুজান চুক্তি (Treaty of Lausanne)। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, পুরো চুক্তির কোনো অনুচ্ছেদে কোথাও ‘আর্মেনিয়া’ বা ‘আর্মেনীয়’ শব্দটির কোনো উল্লেখ পর্যন্ত রাখা হয়নি (Montgomery, 1972)। জাতীয় ও রাজনৈতিক অধিকারের সমস্ত দাবিকে মুছে দিয়ে ৩৭ থেকে ৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদে অত্যন্ত নামমাত্র ও সাধারণভাবে কেবল ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’দের ধর্মীয় ও নাগরিক সুরক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়। ইতিহাসবিদ এ. ই. পসোমিয়াদেস (A. E. Psomiades) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, লুজান চুক্তি ছিল মূলত আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে আর্মেনীয় প্রশ্নের এক নীরব, প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী সমাধি। এই চুক্তির মাধ্যমেই আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র তার বর্তমান ভৌগোলিক সীমানায় আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণ বৈধতা লাভ করে।
নতুন জাতিরাষ্ট্র ও নিধনের চূড়ান্ত ভূরাজনৈতিক স্বীকৃতি (The New Nation-State and Final Geopolitical Validation of Extermination)
সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সেভ্রে থেকে লুজানের এই পুরো ঐতিহাসিক পরিক্রমাটি ছিল বহুজাতিভিত্তিক সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে একটি সমসত্ত্ব আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে উত্তরণের এক চরম নিদর্শন। লুজান চুক্তি কোনো সাধারণ শান্তি চুক্তি ছিল না, এটি ছিল মূলত আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত জাতিগত নিধন, সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং জনসংখ্যাগত রূপান্তরের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক চূড়ান্ত ভূরাজনৈতিক স্বীকৃতি (Smith, 1998)। যে ভূখণ্ড থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক মুছে ফেলা হয়েছিল, সেই খালি ভূমির ওপরই কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা ছাড়া একটি একক জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো।
সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্টনি স্মিথ (Anthony D. Smith) তার আধুনিক জাতীয়তাবাদ বিষয়ক তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রকল্প প্রায়শই তার পূর্বতন বহুত্ববাদী সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় (Smith, 1998)। ২৯ অক্টোবর ১৯২৩ সালে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের জন্ম ঘোষণা করা হলো, তখন তার অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক ভিত্তিটি দাঁড়িয়ে ছিল এই অপসারিত অমুসলিমদের ফেলে যাওয়া সম্পদের ওপর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নতুন প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক পুঁজি হিসেবে আইনি স্থায়ী রূপ লাভ করে।
সেভ্রে চুক্তি যেখানে একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পর আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও ভৌগোলিক পুনর্বাসনের এক ক্ষণস্থায়ী আশা জাগিয়েছিল, লুজান চুক্তি সেখানে বাস্তব রাজনীতির কাছে সেই নৈতিকতাকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে নতুন স্থিতাবস্থাকেই সিলমোহর মেরে দেয়। এই রূপান্তরটি বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছিল। এটি দেখায় যে, যদি কোনো রাষ্ট্র চরম সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নিজ সীমানা থেকে একটি প্রাচীন জাতিকে মুছে দিতে পারে এবং যুদ্ধপরবর্তী কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত সমস্ত মানবিক অপরাধকে ভুলে গিয়ে বিজয়ী রাষ্ট্রের শর্তেই শান্তি স্থাপন করতে বাধ্য হয়।
অপারেশন নেমেসিস, শরণার্থী ও আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা (Operation Nemesis, Refugees and the Armenian Diaspora): প্রতিশোধ, বাস্তুচ্যুতি ও নতুন পরিচয়
অপারেশন নেমেসিস: গোপন পরিকল্পনা ও বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধ (Operation Nemesis: Clandestine Planning and Extrajudicial Retribution)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ইস্তাম্বুলের সামরিক আদালতগুলো অকেজো হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে মাল্টার যুদ্ধাপরাধী বন্দিদের একে একে মুক্তি দেয়, তখন আর্মেনীয় সমাজে এক গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর ব্যর্থতা দেখে প্রবাসে থাকা আর্মেনীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পারে যে আইনি পথে ন্যায়বিচার পাওয়ার সমস্ত পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। এই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় এক অতি গোপন ও সুপরিকল্পিত প্রতিশোধমূলক অভিযান, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল অপারেশন নেমেসিস (Operation Nemesis) (Bogosian, 2015)। গ্রিক পুরাণের প্রতিশোধ ও শোধের দেবী ‘নেমেসিস’-এর নামানুসারে এই অভিযানের নামকরণ করা হয়েছিল।
১৯১৯ সালের শরৎকালে প্রথম আর্মেনীয় প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন (ARF – Dashnaktsutyun)-এর নবম সাধারণ কংগ্রেসে অত্যন্ত গোপনে এই অভিযানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই গোপন অপারেশনের প্রধান রূপকার ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ শাহান নাতালি (Shahan Natalie) এবং প্যারিস শান্তি সম্মেলনের অন্যতম কূটনীতিক আর্মেন গারো (Armen Garo)। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কোনো সাধারণ প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং যে সকল প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব ১৯১৫ সালের নিধনযজ্ঞের সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন, তাদের খুঁজে বের করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা।
ইতিহাসবিদ জ্যাক ডেরোগি (Jacques Derogy) তার আকর গ্রন্থে এই অভিযানের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক রূপরেখা উন্মোচন করেছেন (Derogy, 1990)। দলটি একটি বিশেষ ‘কালো তালিকা’ তৈরি করে, যাতে সিইউপি-র শীর্ষ নেতা, প্রাদেশিক গভর্নর এবং আজারবাইজানের বাকু হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই অপারেশনটি পরিচালিত হয়েছিল এক আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মতো; বোস্টনে স্থাপন করা হয়েছিল এর প্রধান অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সেল এবং সেখান থেকে সুইজারল্যান্ড, বার্লিন, রোম ও তিবলিসিতে পাঠানো হয়েছিল প্রশিক্ষিত তরুণ এজেন্টদের। এই গোপন অভিযানটি ছিল মূলত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে এক বেসরকারি বৈশ্বিক ট্রাইব্যুনাল।
সঘোমোন তেহলিরিয়ান, বার্লিন হত্যাকাণ্ড ও ঐতিহাসিক আদালত (Soghomon Tehlirian, the Berlin Assassination and the Historical Trial)
অপারেশন নেমেসিসের সবচেয়ে নাটকীয় ও ঐতিহাসিক পর্বটি রচিত হয়েছিল জার্মানির রাজধানী বার্লিনে। নিধনযজ্ঞের মূল হোতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা তখন নাম বদলে ‘আলী সালেহ বে’ পরিচয়ে বার্লিনের শার্লটেনবার্গ এলাকার এক অভিজাত ভবনে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছিলেন। এই গোপন আস্তানা খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয় এক চব্বিশ বছর বয়সী তরুণ সঘোমোন তেহলিরিয়ান (Soghomon Tehlirian)-কে, যার পুরো পরিবার ১৯১৫ সালের কাফেলায় চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল (Tehlirian, 1953)।
১৯২১ সালের ১৫ মার্চ সকালে বার্লিনের হার্ডেনবার্গ স্ট্রিটের ফুটপাতে যখন তালাত পাশা প্রাতঃভ্রমণে বের হন, তখন তেহলিরিয়ান তার ঠিক পেছনে গিয়ে নিজের পিস্তল থেকে মাত্র এক ফুট দূর থেকে তালাত পাশার মাথায় গুলি করেন। তালাত পাশা ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যান। তেহলিরিয়ান কোনো পালানোর চেষ্টা করেননি; তিনি শান্তভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং পথচারীরা তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ হেফাজতে তিনি জার্মান ভাষায় কেবল একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন: “আমি মানুষ হত্যা করেছি, কিন্তু আমি কোনো খুনি নই” (Bogosian, 2015)।
১৯২১ সালের জুন মাসের শুরুতে বার্লিনের জেলা আদালতে শুরু হয় তেহলিরিয়ানের ঐতিহাসিক বিচারকার্য। এই বিচার আদালতকক্ষ ছাড়িয়ে পুরো আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তেহলিরিয়ানের আইনজীবী দল বিচারকে নিছক একটি হত্যা মামলা হিসেবে না রেখে এটিকে ১৯১৫ সালের অটোমান অপরাধের এক প্রকাশ্য তদন্তে রূপান্তর করেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষদর্শী জার্মান প্রাচ্যবিদ ডক্টর ইয়োহানেস লেপসিউস এবং জার্মান সেনা কর্মকর্তারা তৎকালীন ধ্বংসযজ্ঞের শত শত সরকারি গোপন নথি আদালতের সামনে উন্মুক্ত করেন। মাত্র দুই দিনের শুনানির পর জার্মান জুরি বোর্ড এক নজিরবিহীন রায় ঘোষণা করে। জুরিরা রায় দেন যে, পরিবারের চরম ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করার ফলে তেহলিরিয়ান সাময়িক মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার ছিলেন এবং তাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। এই রায়ের মাধ্যমে প্রকারান্তরে স্বয়ং তালাত পাশা এবং অটোমান রাষ্ট্রযন্ত্রকেই আন্তর্জাতিক নৈতিকতার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
অন্যান্য শীর্ষ নেতার বিনাশ ও অভিযানের সমাপ্তি (Elimination of Other Top Leaders and Conclusion of the Campaign)
বার্লিনের এই সাফল্যের পর অপারেশন নেমেসিসের স্কোয়াডগুলো তাদের তালিকার অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুর দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রস্থলে আজারবাইজানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেহবুদ খান জাবানশির (Behbud Khan Javanshir)-কে গুলি করে হত্যা করেন তরুণ বিপ্লবী মিসাক তরলাকিয়ান। এরপর ১৮ ডিসেম্বর ১৯২১ সালে ইতালির রোম শহরে অটোমান সাম্রাজ্যের সাবেক গ্র্যান্ড উজির সায়িদ হালিম পাশা (Said Halim Pasha)-কে তার গাড়ির ভেতরে হত্যা করেন আরেক নেমেসিস এজেন্ট আরশাভির শিরাগিয়ান (Arshavir Shiragian) (Shiragian, 1976)। সায়িদ হালিম পাশা ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি ১৯১৫ সালের মে মাসে ঐতিহাসিক তেহসির আইনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিলেন।
অভিযানের পরবর্তী বড় আঘাতটি আসে ১৯২২ সালের ১৭ এপ্রিল বার্লিনে। আরশাভির শিরাগিয়ান এবং আরাম ইয়েরগানিয়ান এক যৌথ অভিযানে তেশকিলাত-ই মাহসুসার কেন্দ্রীয় পরিচালক ডক্টর বাহাত্তিন শাকির (Dr. Bahaeddin Şakir) এবং ট্রাবজোনের সাবেক গভর্নর জামাল আজমি (Cemal Azmi)-কে একসাথে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করেন (Derogy, 1990)। জামাল আজমি ছিলেন কৃষ্ণসাগরে হাজার হাজার মানুষকে ডুবিয়ে মারার জন্য কুখ্যাত। এর মাত্র কয়েক মাস পর, ২১ জুলাই ১৯২২ সালে ককেশাস অঞ্চলের তিবলিসি (তিফলিস) শহরের কেন্দ্রস্থলে নিহত হন নৌমন্ত্রী এবং সিরিয়ার সাবেক সামরিক গভর্নর আহমেদ জামাল পাশা (Ahmed Djemal Pasha)। পেট্রোস তের-পোগোসিয়ান এবং আর্তাশেস গেভোরগিয়ানের গুলিতে জামাল পাশা তার দুই দেহরক্ষী সহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
ত্রয়ী একনায়কতন্ত্রের শেষ সদস্য এনোভার পাশা অবশ্য কোনো নেমেসিস এজেন্টের হাতে নিহত হননি; তিনি ১৯২২ সালের আগস্টে মধ্য এশিয়ার তাজিকিস্তানে সোভিয়েত রেড আর্মির বিরুদ্ধে প্যান-তুর্কি মিলিশিয়া বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার সময় যুদ্ধে নিহত হন। ইতিহাসবিদ আর্শাভির শিরাগিয়ান তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, এই লক্ষ্যবস্তুগুলোর অবসানের সাথে সাথে অপারেশন নেমেসিস তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় (Shiragian, 1976)। এই অভিযান প্রমাণ করেছিল যে, ভূরাজনৈতিক কূটনীতি যখন রাষ্ট্র পরিচালিত অপরাধের বিচার করতে ব্যর্থ হয়, তখন ভুক্তভোগী সমাজের গোপন প্রতিরোধই ন্যায়বিচারের শেষ বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়।
শরণার্থী সংকট, নানসেন পাসপোর্ট ও আন্তর্জাতিক পুনর্বাসন (The Refugee Crisis, the Nansen Passport and International Resettlement)
সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে বাস্তব জীবনে সবচেয়ে বড় সংকটটি ছিল লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন। ১৯২৩ সালের লুজান চুক্তির পর শত শত বছর ধরে নিজেদের পৈতৃক ভূমিতে বসবাস করা বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো রাতারাতি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। আনাতোলিয়া ও সিলিসিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রায় তিন থেকে চার লাখ শরণার্থী সিরিয়া, লেবানন, গ্রিস, সাইপ্রাস, ফ্রান্স, লাতিন আমেরিকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কোনো পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব বা আইনগত পরিচয়পত্র ছিল না (Skran, 1995)।
এই বিশাল মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থা লিগ অব নেশনস এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। লিগ অব নেশনসের শরণার্থী বিষয়ক প্রথম হাই কমিশনার এবং নরওয়ের বিখ্যাত মেরু অভিযাত্রী ফ্রিদতিয়ফ নানসেন (Fridtjof Nansen) এক বিশেষ আন্তর্জাতিক সনদের প্রস্তাব করেন (Nansen, 1928)। তার নামানুসারে তৈরি হয় ঐতিহাসিক ‘নানসেন পাসপোর্ট’ (Nansen passport)। এই বিশেষ নথিটি রাষ্ট্রহীন আর্মেনীয় ও রুশ শরণার্থীদের একটি আইনি পরিচয় এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবাধে যাতায়াতের ও কাজের আইনি অধিকার প্রদান করে। ইতিহাসবিদ ক্লডিনা স্ক্রান (Claudena Skran) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের ভিত্তি মূলত রচিত হয়েছিল এই নানসেন সনদের মাধ্যমে (Skran, 1995)।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই ছিন্নমূল মানুষগুলো নিজেদের বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম শুরু করে। বৈরুতের সমুদ্রতীরে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক শরণার্থী শিবির বুর্জ হাম্মুদ (Bourj Hammoud) এবং সিরিয়ার আলেপ্পোয় গড়ে ওঠে ‘নর মারাশ’ ও ‘নর হাদজিন’ নামের নতুন নতুন পাড়া। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ ও দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেও এই উদ্বাস্তুরা কাঠ ও টিনের ছাপড়া ঘরে নিজেদের স্কুল, কারিগরি কর্মশালা এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং আমেরিকান নিয়ার ইস্ট রিলিফ সংস্থা এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা যুগিয়েছিল, যা হাজার হাজার অনাথ শিশুকে এক নতুন জীবনের পথ দেখায়।
ডায়াস্পোরার তাত্ত্বিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার (Theoretical Framework of Diaspora and Institutional Spread)
গণহত্যার সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী সমাজতাত্ত্বিক পরিণতি ছিল একটি বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত আধুনিক আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা (Armenian Diaspora)-র জন্ম। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম সাফরান (William Safran) ডায়াস্পোরার যে ধ্রুপদী তাত্ত্বিক কাঠামো প্রণয়ন করেছেন, আর্মেনীয় অভিজ্ঞতা হলো তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাস্তব রূপরেখা (Safran, 1991)। সাফরানের মতে, একটি জনগোষ্ঠীর নিজ ঐতিহাসিক মাতৃভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ, তাদের ভেতর পৈতৃক ভূমির এক যৌথ স্মৃতি ও ট্রমা লালন করা এবং প্রবাসে থেকেও নিজেদের পৃথক জাতিগত অস্তিত্ব বজায় রাখার নিরন্তর লড়াই – এই সব বৈশিষ্ট্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিশ শতকের আর্মেনীয় সমাজ।
সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক খাচিগ তোলোলিয়ান (Khachig Tölölyan) দেখিয়েছেন যে, আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা প্রবাসের বুকে নিজেদের বিলীন হয়ে যাওয়া ঠেকাতে একটি সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ত্রিমুখী কাঠামো গড়ে তুলেছিল (Tölölyan, 1996)। এই কাঠামোর প্রথম স্তম্ভ ছিল আর্মেনীয় চার্চ (Armenian Apostolic Church), যা কোনো আধ্যাত্মিক উপাসনালয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের সামাজিক মিলনমেলা হিসেবে কাজ করত। দ্বিতীয় স্তম্ভটি ছিল রাজনৈতিক দলসমূহ – বিশেষ করে এআরএফ দশনাৎসুতীয়ুন, রামগাভার এবং হুঞ্চাক দল – যারা প্রবাসের রাজনীতি ও যুবসমাজকে সংগঠিত রাখত। আর তৃতীয় স্তম্ভটি ছিল শক্তিশালী বিশ্বজনীন দাতব্য সংস্থা, যেমন আর্মেনীয় জেনারেল বেনিভোলেন্ট ইউনিয়ন (AGBU)।
সমাজবিজ্ঞানী রবিন কোহেন (Robin Cohen) তার তুলনামূলক অভিবাসন গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, ডায়াস্পোরা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবাসের প্রতিটি বড় শহরে নিজস্ব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিল (Cohen, 2008)। এই স্কুলগুলোতে শিশুদের মাতৃভাষা, জাতীয় সাহিত্য এবং ইতিহাস শিক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ও ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্রান্সের প্যারিস ও মার্সেই কিংবা আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মও নিজেদেরকে সেই সুদূর আনাতোলিয়ার মাটির সাথে মানসিকভাবে যুক্ত রাখতে পেরেছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিই একটি বাস্তুচ্যুত জাতিকে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড ছাড়াও এক শতাব্দী ধরে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
বাস্তুচ্যুতি থেকে নতুন পরিচয়: হাই তাহত ও রাজনৈতিক সংহতি (From Displacement to New Identity: Hai Tahd and Political Mobilization)
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রবাসে বড় হয়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের আর্মেনীয়দের আত্মপরিচয়ের ধারণায় এক গভীর রূপান্তর ঘটে। সমাজবিজ্ঞানী অ্যানি বাকালিয়ান (Anny Bakalian) তার বিখ্যাত গ্রন্থে এই রূপান্তরকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে একটি প্রজন্মগত উত্তরণ ঘটেছিল (Bakalian, 1993)। প্রথম প্রজন্ম যারা মরুভূমির ধ্বংসযজ্ঞ নিজ চোখে দেখে বেঁচে এসেছিল, তাদের কাছে আর্মেনীয় থাকাটা ছিল নিছক বেঁচে থাকার প্রতিদিনের প্রাত্যহিক সংগ্রাম বা ‘বিয়িং আর্মেনিয়ান’। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের কাছে, যারা আমেরিকায় বা ইউরোপে আধুনিক পরিবেশে বড় হয়েছে, আর্মেনীয় পরিচয়টি হয়ে দাঁড়ায় এক সচেতন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব বা ‘ফিলিং আর্মেনিয়ান’।
এই নতুন আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ‘হাই তাহত’ (Hai Tahd – The Armenian Cause) বা আর্মেনীয় জাতীয় অধিকারের রাজনৈতিক সংগ্রাম (Pattie, 1997)। নতুন প্রজন্মের যুবসমাজ কেবল অতীত শোক পালনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায়নি; তারা পুরো বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এই গণহত্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য এক শক্তিশালী লবিং ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়োসি শাইন (Yossi Shain) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ডায়াস্পোরা গোষ্ঠীগুলো কীভাবে পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ (Shain, 2007)।
১৯৬৫ সালে গণহত্যার পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে বৈরুত, প্যারিস এবং ইয়েরেভানের রাজপথে লাখ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বিশ্ববাসীকে এই বার্তা দেয় যে, আনাতোলিয়া থেকে একটি জাতিকে মুছে ফেলা সম্ভব হলেও তাদের সম্মিলিত স্মৃতি ও দাবিকে কোনোদিন সমাহিত করা যায়নি। ট্রমা ও বাস্তুচ্যুতির এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা অবশেষে রূপ নিয়েছিল এক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলনের শক্তিতে। ফলে অপারেশন নেমেসিসের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী ডায়াস্পোরার এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার প্রমাণ করে যে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম গণহত্যার শিকার হওয়া একটি জাতি কীভাবে নিজের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই পুনর্জন্ম লাভ করে এক নতুন বৈশ্বিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
ইতিহাসচর্চা, অস্বীকার ও উত্তরাধিকার (Historiography, Denial and Legacy): স্মৃতি, স্বীকৃতি ও গণহত্যা-গবেষণা
রাফায়েল লেমকিন, গণহত্যার ধারণা ও আর্মেনীয় অভিজ্ঞতা (Raphael Lemkin, Genocide and the Armenian Experience): ধারণাগত ও আইনি উত্তরাধিকার
রাফায়েল লেমকিনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও প্রাথমিক কৌতূহল (Raphael Lemkin’s Intellectual Development and Early Curiosity)
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন পোলিশ-ইহুদি বংশোদ্ভূত আইনজ্ঞ রাফায়েল লেমকিন (Raphael Lemkin)। উনিশ শতকের শেষ ভাগে পোল্যান্ডের ভোলকোভিস্কের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া লেমকিন ছোটবেলা থেকেই মানব ইতিহাসের বিভিন্ন জাতিগত নিধনযজ্ঞের বিবরণে গভীরভাবে আলোড়িত হতেন। তিনি যখন লভভ (তৎকালীন লম্বার্গ) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব ও আইনের তরুণ ছাত্র, তখন ১৯২১ সালে বার্লিনের রাজপথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তার চিন্তার জগতকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রধান অপরাধী তালাত পাশাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেন আর্মেনীয় তরুণ সঘোমোন তেহলিরিয়ান এবং বার্লিনের আদালত তেহলিরিয়ানের মানসিক ট্রমার বিষয়টি বিবেচনা করে তাকে খালাস দেয় (Power, 2002)।
এই বিচারপ্রক্রিয়াটি তরুণ লেমকিনের মনে এক গভীর দার্শনিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক জুলিউস মাকারেভিচ (Juliusz Makarewicz)-কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো একক ব্যক্তিকে হত্যা করে, তবে রাষ্ট্র তাকে খুনি হিসেবে ফাঁসি দেয়; কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন নিজের সার্বভৌম ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের সীমানার ভেতরের লাখ লাখ নিরীহ নাগরিককে ঠান্ডা মাথায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তখন আন্তর্জাতিক আইনে কেন সেই রাষ্ট্রপ্রধানদের শাস্তি দেওয়ার কোনো বিধান নেই? অধ্যাপক মাকারেভিচ তখন তাকে আন্তর্জাতিক আইনের তৎকালীন প্রচলিত ডকট্রিন বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব (state sovereignty)-এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ প্রজাদের সাথে কী আচরণ করবে তা তার সম্পূর্ণ নিজস্ব এখতিয়ার, ঠিক যেমন একজন কৃষক তার খামারের মুরগির সাথে কী করবে তা বাইরের প্রতিবেশীর দেখার বিষয় নয় (Cooper, 2008)।
আইনবিদ সামান্থা পাওয়ার (Samantha Power) তার বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অধ্যাপকের এই যান্ত্রিক উত্তর তরুণ লেমকিন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি (Power, 2002)। তিনি অনুভব করেছিলেন যে আন্তর্জাতিক আইনের এই শূন্যতা আদতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাইকারি হত্যাকাণ্ড চালানোর এক ধরনের স্থায়ী লাইসেন্স প্রদান করেছে। এই আইনি বৈপরীত্য দূর করার জন্য লেমকিন তার জীবনের বাকি সময়টি উৎসর্গ করার সংকল্প গ্রহণ করেন। অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর এই সম্পূর্ণ ধ্বংসের অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত লেমকিনের মনে একটি সর্বজনীন আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে উঠেছিল, যা পরবর্তীকালে তাকে নতুন এক অপরাধের ধারণা সংজ্ঞায়িত করতে চালিত করে।
১৯৩৩ সালের মাদ্রিদ প্রস্তাব: বর্বরতা ও ধ্বংসের অপরাধ (The 1933 Madrid Proposals: Crimes of Barbarity and Vandalism)
আইনের ছাত্রত্ব শেষ করে লেমকিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার নতুন ধারণাগুলো তুলে ধরার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ১৯৩৩ সালের অক্টোবর মাসে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক দণ্ডবিধি একীকরণ বিষয়ক পঞ্চম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। লেমকিন সেই সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী আইনি গবেষণাপত্র পাঠান (Elder, 2005)। ইউরোপে তখন অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানির উত্থান ঘটছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। লেমকিন বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমানদের মতো একই ধরনের রাষ্ট্র পরিচালিত অপরাধ ইউরোপের বুকেও পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে।
মাদ্রিদ সম্মেলনে লেমকিন দুটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রস্তাব পেশ করেন। প্রথমটি ছিল বর্বরতার অপরাধ (crime of barbarity), যার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত, ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যদের সমষ্টিগত শারীরিক নিধনকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। দ্বিতীয়টি ছিল ধ্বংসপ্রবণতার অপরাধ (crime of vandalism), যার উদ্দেশ্য ছিল কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য, উপাসনালয়, ঐতিহাসিক সৌধ, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করার কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা (Frieze, 2013)। লেমকিন যুক্তি দেন যে, কোনো গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব মুছে দেওয়া আদতে তাদের শারীরিক মৃত্যুরই এক পূর্ববর্তী পর্যায়।
ইতিহাসবিদ তানিয়া ফ্রিয়েজ (Donna-Lee Frieze) তার সম্পাদিত নথিপত্রে তুলে ধরেছেন যে, ১৯৩৩ সালে মাদ্রিদের রক্ষণশীল আইনবিদ সমাজ লেমকিনের এই দূরদর্শী প্রস্তাবকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল (Frieze, 2013)। তৎকালীন ইউরোপীয় কূটনীতিকরা মনে করেছিলেন যে সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ ধরনের আইন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। ফলে লেমকিনের প্রস্তাবটি তখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পারেনি। কিন্তু মাদ্রিদের এই খসড়াটিই প্রমাণ করে যে আর্মেনীয় ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রাচীন রোমান ও হেলেনীয় নিধনের ঐতিহাসিক পাঠ থেকেই লেমকিন তার ভবিষ্যতের সার্বিক গণহত্যা তত্ত্বের মূল দার্শনিক কাঠামোটি প্রস্তুত করেছিলেন।
১৯৪৪ সালের নতুন শব্দায়ন: ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার সংজ্ঞা (The 1944 Neologism: Coining the Definition of ‘Genocide’)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নাৎসি জার্মানি যখন পুরো ইউরোপ জুড়ে হলোকস্টের গ্যাস চেম্বার ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মাধ্যমে ইহুদি নিধন শুরু করে, তখন লেমকিন কোনোমতে নিজের জীবন বাঁচিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। কিন্তু তার পরিবারের প্রায় উনপঞ্চাশ জন সদস্য নাৎসিদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান। আমেরিকায় পৌঁছে লেমকিন এক নজিরবিহীন আইনি ও ঐতিহাসিক গবেষণায় হাত দেন। ১৯৪৪ সালে ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট থেকে প্রকাশিত হয় তার কালজয়ী গ্রন্থ অ্যাক্সিস রুল ইন অকুপায়েড ইউরোপ (Axis Rule in Occupied Europe) (Irvin-Erickson, 2016)। এই বইয়ের নবম অধ্যায়ে লেমকিন প্রথম বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেন তার উদ্ভাবিত নতুন শব্দ গণহত্যা (genocide)।
লেমকিন গ্রিক শব্দ ‘জেনোস’ (যার অর্থ জাতি বা গোষ্ঠী) এবং লাতিন শব্দ ‘সাইড’ (যার অর্থ হত্যা করা) যুক্ত করে এই ঐতিহাসিক শব্দটি তৈরি করেন। তবে লেমকিনের দেওয়া সংজ্ঞাটি কেবল তাত্ক্ষণিক বা প্রত্যক্ষ গণকাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংজ্ঞায়িত করেছিলেন যে, গণহত্যা হলো বিভিন্ন সুসংগঠিত পদক্ষেপের একটি পরিকল্পিত নীলনকশা, যার উদ্দেশ্য কোনো জাতীয় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর জীবনের অপরিহার্য ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া (Shaw, 2007)। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ধ্বংস করা, রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া, জোরপূর্বক জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের সন্তানদের অন্য সমাজে জোর করে আত্তীকরণ করা।
সমাজবিজ্ঞানী মার্টিন শ (Martin Shaw) তার তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, লেমকিনের এই ধারণাটি ছিল এক বহুমাত্রিক সমাজতাত্ত্বিক কাঠামো (Shaw, 2007)। লেমকিন স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছিলেন যে ১৯১৫ সালে অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয়দের যেভাবে মরুভূমিতে হাঁটিয়ে মারা হয়েছিল এবং ১৯৪১ সালে নাৎসিরা যেভাবে ইহুদি ও রোমাদের নিশ্চিহ্ন করছিল – উভয় ঘটনাই মূলত একই অপরাধের দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ। এই নতুন পরিভাষাটি আন্তর্জাতিক আইনের শব্দভাণ্ডারে এক স্থায়ী জায়গা করে নেয় এবং বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অপরাধকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি পরিচয় দান করে।
১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন ও আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা (The 1948 UN Convention and Limitations of the Legal Framework)
শব্দটি উদ্ভাবন করেই লেমকিন থেমে থাকেননি; তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে নিছক একটি পরিভাষা যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক আইনে বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, ততক্ষণ অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি সদ্য গঠিত জাতিসংঘে একাকী এক নিরবচ্ছিন্ন আইনি লড়াই শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন লেক সাকসেস ও প্যারিসের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের করিডোরে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিদের কাছে ধরনা দিতেন। অবশেষে তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতভাবে পাস হয় গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশন (Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide) বা রেজোলিউশন ২৬০ এ (III) (Korey, 2001)।
কনভেনশনের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত অপরাধ হিসেবে। কিন্তু এই চূড়ান্ত সনদে পৌঁছাতে গিয়ে লেমকিনকে বেশ কিছু বড় আইনি ও রাজনৈতিক ছাড় দিতে হয়েছিল। বিশেষ করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রবল আপত্তির কারণে ‘রাজনৈতিক গোষ্ঠী’ বা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের এই সুরক্ষার বাইরে রাখা হয় (LeBlanc, 1991)। এছাড়া পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর নিজেদের ঔপনিবেশিক অপরাধের ভয়ে লেমকিনের প্রস্তাবিত ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র ধারাটিকে মূল কনভেনশন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
আইনবিজ্ঞানী লরেন্স লেব্লাঙ্ক (Lawrence LeBlanc) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, কনভেনশনের সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জ ছিল সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য (specific intent – dolus specialis) প্রমাণ করার বাধ্যবাধকতা (LeBlanc, 1991)। কোনো সরকার যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করেছে, তা আদালতের কাঠগড়ায় প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন এক শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও, ১৯৪৮ সালের এই কনভেনশনটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে প্রথম কোনো সার্বজনীন মানবাধিকার চুক্তি, যা রাষ্ট্রকে নিজের সীমানার ভেতরে পরিচালিত অনাচারের জন্য বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিল।
তুলনামূলক ইতিহাসচর্চা ও সামাজিক বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক বিকাশ (Comparative Historiography and Theoretical Advances in Social Sciences)
লেমকিনের এই আইনি উত্তরাধিকার পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর সমাজবিজ্ঞান ও তুলনামূলক ইতিহাসচর্চায় এক সম্পূর্ণ নতুন একাডেমিক শাখার জন্ম দেয়, যা পরিচিত গণহত্যা গবেষণা (Genocide Studies) নামে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে, গণহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন বা অপ্রকৃতিস্থ ঘটনা নয়, বরং তা আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং চরম নিরাপত্তা সংকটের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংমিশ্রণ (Straus, 2007)।
গণহত্যা গবেষক স্কট স্ট্রস (Scott Straus) তার তুলনামূলক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কোনো রাষ্ট্রে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট কাঠামোগত পর্যায় কাজ করে (Straus, 2007)। প্রথম ধাপে চলে কোনো গোষ্ঠীকে অমানবিক বা ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিতকরণ, দ্বিতীয় ধাপে চলে তাদের নাগরিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হরণ এবং শেষ ধাপে আধুনিক আমলাতন্ত্র ও প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের শারীরিক বিনাশ। ইতিহাসবিদ ডেভিড নার্সেসিয়ান (David Nersessian) আর্মেনীয় গণহত্যা ও হলোকস্টের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ১৯১৫ সালের ঘটনাটি বিংশ শতাব্দীর পরবর্তী সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার জন্য এক কাঠামোগত ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করেছিল (Nersessian, 2010)।
এই একাডেমিক অগ্রগতির ফলে গবেষকরা সাধারণ যুদ্ধাপরাধ, সামরিক সংঘাত এবং গণহত্যার মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো স্পষ্টভাবে নিরূপণ করতে সক্ষম হন। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখান যে, যুদ্ধ হলো দুটি সশস্ত্র পক্ষের মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই, কিন্তু গণহত্যা হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের সমগ্র ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও প্রতিরক্ষাহীন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব চিরতরে মুছে ফেলার একতরফা প্রক্রিয়া। লেমকিন যে তাত্ত্বিক ভিত স্থাপন করেছিলেন, তার ওপর দাঁড়িয়েই আধুনিক সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্র পরিচালিত চরম সহিংসতার সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শেকড়গুলো উন্মোচন করতে পেরেছে।
সার্বভৌমত্বের অহমিকা বনাম সর্বজনীন বিচারব্যবস্থা (Arrogance of Sovereignty versus Universal Jurisdiction)
লেমকিনের আজীবন সংগ্রামের মূল সুরটি ছিল ওয়েস্টফেলিয়ান সার্বভৌমত্বের অহমিকা ভেঙে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের একটি সর্বজনীন ভিত্তি তৈরি করা। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি চুক্তির পর থেকে আন্তর্জাতিক আইন এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে অন্য কোনো শক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কিন্তু লেমকিন প্রমাণ করেছিলেন যে, যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের জীবন ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তখন সেই তথাকথিত সার্বভৌমত্ব তার বৈধতা হারিয়ে ফেলে (Quigley, 2006)।
দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ আইখম্যান ইন জেরুজালেম (Eichmann in Jerusalem)-এ আমলাতান্ত্রিক মন্দের যে ‘স্বাভাবিকতা’র কথা বলেছিলেন, লেমকিন সেই ধারণাকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিধানে রূপ দিতে চেয়েছিলেন (Arendt, 1963)। আরেন্ট দেখিয়েছিলেন কীভাবে সাধারণ আমলারা নিছক নির্দেশ পালনের দোহাই দিয়ে এক বিশাল জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। লেমকিনের কনভেনশন নিশ্চিত করেছিল যে কোনো আমলা বা সেনা কর্মকর্তা আর ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ’ পালন করার অজুহাত দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় এড়াতে পারবে না।
আইনবিদ জন কুইগলি (John Quigley) তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, লেমকিনের চিন্তাধারা থেকেই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে জন্ম নিয়েছে সর্বজনীন এখতিয়ার (universal jurisdiction) এবং সুরক্ষার দায়িত্ব (Responsibility to Protect – R2P)-এর মতো শক্তিশালী আইনি নীতি (Quigley, 2006)। এই নীতিগুলোর মূল কথা হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যার ক্ষেত্রে কোনো অপরাধীই রাষ্ট্রীয় সীমানা বা দায়মুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারবে না; পৃথিবীর যেকোনো আদালত সেই অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার রাখবে। সুতরাং, রাফায়েল লেমকিন কেবল একটি নতুন আইনের রূপকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন আধুনিক মানবিক চেতনার এক অগ্রদূত, যিনি আর্মেনীয়দের সেই মরুভূমির দীর্ঘ ট্র্যাজেডিকে বিশ্বমানবতার সুরক্ষার এক চিরন্তন প্রাতিষ্ঠানিক ঢালে রূপান্তরিত করেছিলেন।
আর্মেনীয় গণহত্যার ইতিহাসচর্চা ও বিতর্ক (Historiography and Debates on the Armenian Genocide): উৎস, উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যার প্রশ্ন
ইনটেনশনালিজম বনাম ফাংশনালিজম: উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়ার বিতর্ক (Intentionalism versus Functionalism: The Debate on Intent and Process)
হলোকস্ট এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যান্য বৃহৎ জাতিগত নিধনযজ্ঞের ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে যে দুটি প্রধান তাত্ত্বিক ধারা বিতর্ক তৈরি করেছে, আর্মেনীয় গণহত্যার বিশ্লেষণেও সেই ধারা দুটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। এর একটি হলো ইনটেনশনালিজম (intentionalism) বা পূর্বপরিকল্পনাবাদ এবং অন্যটি ফাংশনালিজম (functionalism) বা প্রক্রিয়াবাদ (Ihrig, 2016)। ইনটেনশনালিস্ট ইতিহাসবিদরা যুক্তি দেখান যে, ১৯১৫ সালের এই ধ্বংসযজ্ঞ কোনো আকস্মিক যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের ফল ছিল না। তাদের মতে, কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস বা সিইউপি নেতৃত্ব ক্ষমতা দখলের শুরু থেকেই – বিশেষ করে ১৯১০ বা ১৯১১ সালের থেসালোনিকি কংগ্রেস থেকেই – আনাতোলিয়াকে একটি একক তুর্কি জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য অমুসলিমদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার একটি দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছিল। এই চিন্তাধারার গবেষকরা দাবি করেন যে, যুদ্ধ ছিল কেবল একটি উপযুক্ত সুযোগ বা পর্দা, যার আড়ালে আগে থেকে ঠিক করে রাখা নিধনযজ্ঞ কার্যকর করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ফাংশনালিস্ট বা কাঠামোগত ঐতিহাসিকরা বিষয়টিকে একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের ক্রমবর্ধমান চরমপন্থা বা ক্রমপুঞ্জিত র্যাডিক্যালাইজেশন (cumulative radicalization) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন (Cheterian, 2015)। ইতিহাসবিদ ভিগেন চেতেরিয়ান (Vicken Cheterian) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, বলকান যুদ্ধের বিপর্যয়, শত শত মুসলিম শরণার্থীর আগমন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সারিকামিশ ফ্রন্টে সামরিক বিপর্যয়ের ফলে সিইউপি নেতৃত্ব চরম অবরুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এই ধারার গবেষকদের মতে, সরকার শুরুতে হয়তো সীমিত পরিসরে সীমান্ত অঞ্চলের জনসংখ্যা স্থানান্তরের চিন্তা করেছিল, কিন্তু যুদ্ধকালীন প্রতিকূল পরিস্থিতি, স্থানীয় সুযোগসন্ধানী আমলাদের উগ্রতা এবং পরিকাঠামোগত ব্যর্থতার কারণে সেই নীতি ধাপে ধাপে একটি সামগ্রিক ও সর্বাত্মক জাতিগত নিধনের রূপ নেয়। অর্থাৎ কোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্লুপ্রিন্ট নয়, বরং সংকটের গতিশীলতাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে চরমতম নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
আধুনিক আন্তর্জাতিক ইতিহাসচর্চায় অবশ্য এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির এক সমন্বিত রূপ বা সিন্থেসিস প্রাধান্য পাচ্ছে। ইতিহাসবিদ স্টেফান ইহরিগ (Stefan Ihrig) তার গবেষণাগ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ইনটেনশনালিজম এবং ফাংশনালিজম পরস্পরবিরোধী নয়, বরং এরা একই প্রক্রিয়ার দুটি পরিপূরক মাত্রা (Ihrig, 2016)। দলের চরমপন্থী মতাদর্শ একটি আদর্শিক ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছিল, আর বিশ্বযুদ্ধের জরুরি অবস্থা সেই পরিকল্পনাকে মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি কার্যকর আমলাতান্ত্রিক ধ্বংসযজ্ঞে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। ফলে এই গণহত্যা কোনো অন্ধ বিশৃঙ্খলা ছিল না, আবার তা নিছক একটি কাগুজে নির্দেশের যান্ত্রিক বাস্তবায়নও ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদী জাতিগত বিদ্বেষ এবং তাৎক্ষণিক যুদ্ধকালীন সংকটের এক চরম ও বিপজ্জনক সংমিশ্রণ।
ইতিহাসের মেথডোলজির দিক থেকে এই বিতর্কটি প্রমাণ করে যে, গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য কোনো একক আনুষ্ঠানিক লিখিত সনদের প্রয়োজন হয় না। বরং রাষ্ট্রীয় আচরণ, সমান্তরাল আমলাতন্ত্রের ব্যবহার এবং ধারাবাহিক উচ্ছেদের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেই একটি রাষ্ট্রের ধ্বংসাত্মক ইচ্ছাশক্তিকে স্পষ্টরূপে চিহ্নিত করা সম্ভব। ফলে আধুনিক ইতিহাসবিদ সমাজ এই কৃত্রিম বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো প্রশাসনিক ও আদর্শিক কাঠামোর সামগ্রিক কার্যপদ্ধতি উন্মোচনের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
অটোমান আর্কাইভ বনাম বিদেশি নথিপত্র: উৎসের রাজনীতি (Ottoman Archives versus Foreign Documents: The Politics of Sources)
আর্মেনীয় গণহত্যার ইতিহাস পুনর্গঠনে সবচেয়ে বড় মেথডোলজিক্যাল বা পদ্ধতিগত বিতর্কটি আবর্তিত হয়েছে ঐতিহাসিক উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রবেশাধিকারকে কেন্দ্র করে। তুর্কি সরকারের অধীনে থাকা ইস্তাম্বুলের প্রধান ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা বা প্রধানমন্ত্রীর অটোমান আর্কাইভ (Başbakanlık Osmanlı Arşivi – BOA) দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে (Suciyan, 2015)। ইতিহাসবিদ তালিন সুসিয়ান (Talin Suciyan) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, তুর্কি অফিশিয়াল গবেষকরা দাবি করেন যে কেবল অটোমান আর্কাইভের দলিলপত্রই হলো একমাত্র প্রামাণ্য উৎস। কিন্তু স্বাধীন গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ১৯১৮ এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সংবেদনশীল বহু ফাইল, গোপন টেলিগ্রাফ এবং স্পেশাল অর্গানাইজেশনের নথিপত্র রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পদ্ধতিগতভাবে নষ্ট বা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
এই সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ সমাজ তাদের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে পশ্চিমা ও নিরপেক্ষ কূটনৈতিক নথিপত্রকে অগ্রাধিকার দেয়। বিশেষ করে জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তরের পলিটিক্যাল আর্কাইভ, অস্ট্রিয়ান স্টেট আর্কাইভ, ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভসে সংরক্ষিত হাজার হাজার কূটনৈতিক ডেসপ্যাচ, কনস্যুলার রিপোর্ট এবং সামরিক উপদেষ্টাদের দিনলিপি এই নিধনযজ্ঞের এক অবিচ্ছেদ্য দলিল হিসেবে কাজ করে (Mouradian, 2021)। ইতিহাসবিদ খাচিক মুরাদিয়ান (Khatchig Mouradian) উল্লেখ করেছেন যে, নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের এই কূটনৈতিক উৎসগুলো অটোমান আর্কাইভের শূন্যতা পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, কারণ এই দলিলের লেখকদের মূল দায়িত্বই ছিল কোনো পক্ষপাত ছাড়াই তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতি নিজ নিজ রাজধানীতে জানানো। যুদ্ধের মিত্র জার্মানি বা অস্ট্রিয়ার কর্মকর্তাদের নিজেদের ডেসপ্যাচে মিথ্যা বলার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না।
এছাড়া আর্মেনীয় প্যাট্রিয়ার্কেটের আর্কাইভ, প্যারিস ও বোস্টনে সংরক্ষিত ডায়াস্পোরার নথি এবং বেঁচে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ জবানবন্দি এই ইতিহাসচর্চায় আরেকটি বড় মাত্রা যোগ করেছে। অনেক সংশোধক ইতিহাসবিদ এই প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে খারিজ করতে চাইলেও, আধুনিক ইতিহাসতত্ত্ব প্রমাণ করেছে যে মৌখিক ইতিহাস বা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ছাড়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা বোঝা অসম্ভব। বিভিন্ন ভাষা ও অঞ্চল থেকে আসা এই বহুস্তরীয় উৎসের তুলনামূলক বিশ্লেষণই মূলত বিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের এক অখণ্ড ও নির্মোহ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
সুতরাং, উৎসের রাজনীতি কেবল কোনো সাধারণ একাডেমিক বিতর্ক নয়, এটি হলো সত্যকে উন্মোচন বা আড়াল করার এক দীর্ঘমেয়াদী লড়াই। যখন গবেষকরা একাধারে অটোমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইফার টেলিগ্রাম, জার্মান কূটনীতিকদের ডেসপ্যাচ এবং সাধারণ মানুষের ডায়েরি পাশাপাশি রেখে পাঠ করেন, তখন সমস্ত বিভ্রান্তি দূর হয়ে যায় এবং একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের অকাট্য প্রমাণ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
কলোনিয়াল ও সাম্রাজ্যিক প্রেক্ষাপট: তুলনা ও ধারাবাহিকতা (Colonial and Imperial Context: Comparison and Continuity)
সমকালীন গণহত্যা গবেষণার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো আর্মেনীয় ট্র্যাজেডিকে কোনো বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে না দেখে একে উনিশ ও বিশ শতকের বৈশ্বিক ঔপনিবেশিক সহিংসতা ও সাম্রাজ্যিক পতনের ধারাবাহিকতায় পাঠ করা। ইতিহাসবিদ জোয়েল লেকক (Joelle Laycock) তার তুলনামূলক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন কলোনিতে যে ধরনের সামরিক দমননীতি ও জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন চালিয়েছিল, অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ দশকের নীতিগুলোর সাথে তার গভীর আদর্শিক ও প্রযুক্তিগত মিল রয়েছে (Laycock, 2009)। বিশেষ করে ১৯০৪-১৯০৮ সালে জার্মান দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় (বর্তমান নামিবিয়া) সংঘটিত হেরেরো ও নামা গণহত্যা (Herero and Namaqua genocide)-র সাথে অটোমানদের নিধন কৌশলের এক গভীর কাঠামোগত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
ইতিহাসবিদ ফিলিপ মারশাঁ (Philippe Marchand) এবং বেরনার পেরিয়ে তাদের যৌথ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং বর্ণবাদী মতাদর্শ প্রাচ্যের শেষ সাম্রাজ্যগুলোর ভেতরে সংক্রামিত হয়েছিল (Marchand & Perrier, 2015)। সিইউপি নেতৃত্ব আনাতোলিয়াকে দেখত তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের এক অভ্যন্তরীণ ‘উপনিবেশ’ হিসেবে, যেখানকার আদিবাসী অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে তারা সাম্রাজ্যের সুরক্ষার পথে প্রধান শত্রু বলে মনে করত। ফলে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো যেভাবে বহিরাগতদের উচ্ছেদ করে নিজেদের বসতি স্থাপন করত, সিইউপি নেতৃত্বও ঠিক একইভাবে বলকান ও ককেশাস থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীদের দিয়ে আনাতোলিয়ার পাহাড়ি জনপদগুলোতে এক অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক বসতি গড়ে তুলেছিল।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটটি গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করেছে যে, আর্মেনীয় গণহত্যা কোনো মধ্যযুগীয় অন্ধ ধর্মীয় অন্ধত্বের প্রকাশ ছিল না। এটি ছিল আধুনিক ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ডারউইনবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী ভৌগোলিক প্রকৌশলের এক নিখুঁত স্থানীয় রূপান্তর। সাম্রাজ্যের সীমানা সংকুচিত হয়ে আসার সাথে সাথে যে অবরুদ্ধ মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছিল, তা থেকেই জন্ম নিয়েছিল পুরো আনাতোলিয়াকে একটি একক নৃতাত্ত্বিক জাতিতে পরিণত করার চরম প্রয়াস।
ফলে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সংঘটিত বিভিন্ন জাতিগত সহিংসতার ইতিহাসকে যখন একটি অখণ্ড ক্যানভাসে দেখা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আর্মেনীয় ধ্বংসযজ্ঞ ছিল সাম্রাজ্যিক বহুত্ববাদ ভেঙে আধুনিক চরমপন্থী জাতিরাষ্ট্র গঠনের এক আন্তর্জাতিক ট্র্যাজেডি। আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে সীমানা রক্ষার নামে নিজ ভূখণ্ডের প্রাচীন জনগোষ্ঠীকে একটি অভ্যন্তরীণ বিপদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, তা অনুধাবনের ক্ষেত্রে এই ঔপনিবেশিক ও তুলনামূলক পাঠ এক অপরিহার্য দিক উন্মোচন করে।
অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চা ও মূলধন রূপান্তরের নতুন ধারা (Economic Historiography and the New Paradigm of Capital Transfer)
বিগত দুই দশকে আর্মেনীয় গণহত্যার ইতিহাসচর্চায় সবচেয়ে বড় প্যারাডাইম শিফট বা ধারণাগত পরিবর্তনটি এসেছে অর্থনৈতিক ইতিহাস ও সামাজিক রূপান্তরের গবেষণার মধ্য দিয়ে। এতদিন ধরে এই ট্র্যাজেডিকে কেবল রাজনৈতিক সংঘাত বা সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে এই নিধনযজ্ঞের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল একটি পুরো দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির জোরপূর্বক হাতবদল (Maksudyan, 2005)।
সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ নাজান মাকসুদিয়ান (Nazan Maksudyan) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে অটোমান সাম্রাজ্যের অমুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছিল (Maksudyan, 2005)। পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে আর্মেনীয়দের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক আমানত, কৃষিজমি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান দখল করার ঘটনাটি কোনো যুদ্ধকালীন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক তুরস্কের অর্থনৈতিক ভিত্তি বা তুর্কি জাতীয় বুর্জোয়া (Turkish national bourgeoisie) গঠনের এক সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। ইতিহাসবিদ সৈয়দ তানভীর ওয়াস্তি (Syed Tanvir Wasti) অটোমান আর্থিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছেন যে, এই সম্পদ দখলদারি স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীদের নতুন শাসনব্যবস্থার অন্ধ সমর্থকে পরিণত করতে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল (Wasti, 1996)।
এই অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চা প্রমাণ করেছে যে, ১৯১৫ সালের নিধনযজ্ঞ কোনো সাময়িক ঘটনা ছিল না, যার সমাপ্তি যুদ্ধ শেষেই ঘটেছিল। বরং লুণ্ঠিত এই পুঁজির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আধুনিক প্রজাতন্ত্রের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং শিল্পায়ন গড়ে উঠেছিল। জমি, কারখানা ও পারিবারিক সম্পদের এই জোরপূর্বক হস্তান্তরের ফলে সমাজের ভেতরে এমন এক স্থায়ী সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়েছিল, যারা প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তী রাজনীতিতে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করেছিল।
ফলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের ইতিহাস কেবল অতীতের কোনো আর্থিক ক্ষতির হিসাব নয়, এটি হলো কীভাবে একটি আধুনিক রাষ্ট্র নিজের আদি অর্থনৈতিক পুঁজি সঞ্চয়ের জন্য অন্য একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও সামাজিক উপস্থিতিকে মুছে ফেলেছিল, সেই গভীর কাঠামোগত সত্য উন্মোচনের এক অপরিহার্য ক্ষেত্র। এই নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসচর্চাকে নিছক রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে নিয়ে এসে বস্তুনিষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানের শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জাতিরাষ্ট্রের নির্মাণ ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসতত্ত্ব (Nation-State Building and Nationalist Historiography)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ভিত্তি যখন রচিত হচ্ছিল, তখন নতুন এই জাতিরাষ্ট্রের বৈধতা রক্ষার জন্য ইতিহাসচর্চাকে একটি বড় মতাদর্শিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৩১ সালে মোস্তফা কামালের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত হয় তুর্কি ইতিহাস সমিতি (Türk Tarih Kurumu – TTK) (Auron, 2000)। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় এমন একটি নতুন জাতীয়তাবাদী বয়ান নির্মাণ করা, যা আনাতোলিয়ার বুকে তুর্কি জাতির হাজার বছরের একচেটিয়া উপস্থিতিকে তুলে ধরবে এবং সেখানে থাকা সমস্ত প্রাচীন অমুসলিম সমাজের ইতিহাস ও অবদানকে সম্পূর্ণ অস্বীকার বা প্রান্তিক করবে।
ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক ইয়ার ওরন (Yair Auron) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চাকে অস্বীকারনীতির প্রধান যন্ত্রে রূপান্তর করা হয়েছিল (Auron, 2000)। এই সরকারি বয়ানে একটি কৃত্রিম ঐতিহাসিক তত্ত্ব প্রচার করা হয়, যাতে দাবি করা হয় যে আর্মেনীয়রাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং মুসলিম জনসমাজকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল, ফলে সরকার কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থে কিছু মানুষকে সাময়িকভাবে স্থানান্তরিত করেছিল। এই আখ্যানটিকে জাতীয় স্কুল পাঠ্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় প্রকাশনাগুলোর মাধ্যমে এক অপরিবর্তনীয় সরকারি ডগমায় পরিণত করা হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মেলতেম মুফতিউলার-বাচ (Meltem Müftüler-Baç) উল্লেখ করেছেন যে, কোনো রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী মনস্তত্ত্বে অতীত অপরাধকে স্বীকার করাকে জাতীয় গৌরবের জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয় (Baç, 2005)। এর ফলে তুরস্কের মূলধারার ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই বিষয়ে কোনো উন্মুক্ত ও নির্মোহ গবেষণার সুযোগ ছিল না। যে কোনো ভিন্নমতাবলম্বী গবেষককে রাষ্ট্রীয় আইনে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। রাষ্ট্রীয় এই প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয়তাবাদী ইতিহাসতত্ত্ব ইতিহাসচর্চাকে সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যম না রেখে মূলত জাতীয় আত্মপক্ষ সমর্থনের এক রাজনৈতিক ঢালে পরিণত করেছিল।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চা সমাজের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এমন এক যৌথ বিস্মৃতির জন্ম দিয়েছিল, যেখানে অতীতের রক্তক্ষয়ী রূপান্তরকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে কেবল একটি গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের আখ্যানকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ইতিহাসচর্চায় নথিনির্ভর পদ্ধতির বিজয়ের ফলে রাষ্ট্রীয় এই কৃত্রিম ইতিহাসতত্ত্ব ধীরে ধীরে তার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
আধুনিক ইতিহাসচর্চায় রূপান্তর: তুর্কি-আর্মেনীয় যৌথ গবেষণা উদ্যোগ (Modern Historiographical Paradigm Shifts: Joint Research Initiatives)
একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে এসে আর্মেনীয় গণহত্যার ইতিহাসচর্চায় এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক রূপান্তর ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তুর্কি রাষ্ট্রীয় বয়ানের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দিয়ে একদল স্বাধীনচেতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তুর্কি ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক এই ঐতিহাসিক সত্যকে সরাসরি উন্মোচন করতে এগিয়ে আসেন (Marutyan, 2009)। এই নতুন প্রজন্মের গবেষকরা কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার না হয়ে সরাসরি মূল নথিপত্র, আদালতের রায় এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের ভিত্তিতে গবেষণা শুরু করেন।
এই রূপান্তরের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক ছিল ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়ার্কশপ ফর আর্মেনিয়ান/তুর্কি স্কলারশিপ (WATS) (Cheterian, 2015)। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে থাকা শীর্ষ আর্মেনীয় ও তুর্কি গবেষকরা প্রথমবারের মতো একই টেবিলে বসে খোলামেলা ও বস্তুনিষ্ঠ একাডেমিক বিতর্কে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এই যৌথ উদ্যোগের ফলে ইতিহাসচর্চা আর কোনো রাজনৈতিক দোষারোপের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা রূপ নেয় এক গভীর ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে। গবেষকরা এখন কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় পর্যায়ের মাইক্রো-হিস্ট্রি বা ক্ষুদ্র ইতিহাস, নারীদের স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক নিধনের মতো আধুনিক বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ কাজ করছেন।
নৃতাত্ত্বিক ও স্মৃতি গবেষক হারুটিউন মারুতিয়ান (Harutyun Marutyan) তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক এই একাডেমিক মেলবন্ধন পুরো আন্তর্জাতিক মহলে এই ঐতিহাসিক সত্যের গ্রহণযোগ্যতাকে এক চূড়ান্ত ভিত্তি দান করেছে (Marutyan, 2009)। যখন খোদ তুর্কি সমাজের ভেতর থেকেই বিবেকবান গবেষকরা নিজস্ব আর্কাইভ ও সমাজ পর্যালোচনা করে এই নিধনযজ্ঞের প্রমাণ তুলে ধরছেন, তখন কোনো রাষ্ট্রীয় অস্বীকৃতির পক্ষেই আর এই বাস্তবতাকে আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে আধুনিক ইতিহাসচর্চা আজ কোনো অন্ধ জাতীয়তাবাদী সংঘাতের হাতিয়ার নয়, বরং তা দাঁড়িয়েছে এক নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত্তির ওপর। অতীতের অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে স্বীকার করে নিয়ে কীভাবে একটি সুস্থ ও মানবিক ঐতিহাসিক চেতনা গড়ে তোলা যায়, বর্তমান গবেষকরা সেই পথেই অগ্রসর হচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহাসিক সত্যের এক অবিনশ্বর দলিল হয়ে থাকবে।
অস্বীকার, স্মৃতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (Denial, Memory and International Recognition): রাষ্ট্রীয় বয়ান, ডায়াস্পোরা ও স্মৃতির রাজনীতি
রাষ্ট্রীয় অস্বীকারনীতির রূপরেখা ও মেকানিজম (Framework and Mechanisms of State Denialism)
একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যার শেষ ধাপটি কেবল মানুষের শারীরিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় না; এর চূড়ান্ত পর্যায়টি সম্পন্ন হয় অপরাধের স্মৃতিকে মুছে ফেলা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তা অস্বীকার করার মাধ্যমে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন (Stanley Cohen)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ স্টেটস অব ডিনায়াল (States of Denial)-এ তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র তিনটি স্তরে অস্বীকারের মেকানিজম বা কৌশল তৈরি করে: আক্ষরিক অস্বীকার (দাবি করা যে এমন কিছু ঘটেইনি), ব্যাখ্যামূলক অস্বীকার (ঘটনাকে স্বীকার করলেও তার নাম ও চরিত্র বিকৃত করা) এবং তাৎপর্যগত অস্বীকার (দাবি করা যে যা ঘটেছে তা পরিস্থিতি অনুযায়ী অনিবার্য ছিল) (Cohen, 2001)।
তুর্কি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় অস্বীকৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কোহেনের এই তিনটি স্তরেরই স্পষ্ট প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে একটি আন্তর্জাতিক অস্বীকারের পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। ওয়াশিংটন, লন্ডন এবং প্যারিসের মতো বড় বড় রাজধানীতে প্রভাবশালী লবিং ফার্ম ভাড়া করা, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ তহবিল দিয়ে অটোমান চেয়ার প্রতিষ্ঠা করা এবং তুর্কি রাষ্ট্রীয় বয়ানের অনুকূলে থাকা গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এই অস্বীকারনীতির নিয়মিত অংশ হয়ে ওঠে (Dixon, 2010)। ইতিহাসবিদ জেনিফার ডিক্সন (Jennifer Dixon) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মহলে অতীত অপরাধের স্বীকৃতি আটকে দেওয়ার জন্য নিরন্তর চাপ প্রয়োগ করে।
এই রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের অন্যতম বড় কৌশল ছিল তথাকথিত ‘ইতিহাসবিদদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার’ ভান করা। তুর্কি সরকার প্রায়ই আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি করে যে একটি যৌথ ইতিহাস কমিশন গঠন করে বিষয়টি পরীক্ষা করা উচিত। কিন্তু যে ক্ষেত্রে হাজার হাজার পৃষ্ঠা নিরপেক্ষ কূটনৈতিক দলিল এবং সমকালীন আদালতের রায় ইতিমধ্যে বিদ্যমান, সেখানে নতুন করে ‘বিতর্কের’ ধোঁয়া তোলা মূলত বিচার ও স্বীকৃতিকে অনন্তকাল ঝুলিয়ে রাখার এক ধূর্ত রাজনৈতিক চাল। রাষ্ট্র পরিচালিত এই প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকারনীতি কেবল সত্যকে গোপন করার চেষ্টা করেনি, বরং তা ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মানসিক ক্ষতের ওপর এক স্থায়ী আঘাত হয়ে রয়ে গেছে।
আর্টিক্যাল ৩০১ ও তুরস্কে বাকস্বাধীনতার অবদমন (Article 301 and the Suppression of Free Speech in Turkey)
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্বীকারের পাশাপাশি তুরস্কের অভ্যন্তরীণ সমাজেও যে কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক আলোচনার ওপর রাষ্ট্র এক কঠোর আইনি ও বিচারিক সেন্সরশিপ বজায় রেখে চলেছে। তুর্কি দণ্ডবিধির কুখ্যাত আর্টিক্যাল ৩০১ (Article 301) – যাতে বলা হয়েছে ‘তুর্কি জাতি বা রাষ্ট্রের অবমাননা’ একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ – এই দমননীতির প্রধান আইনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে (Zarakolu, 2011)। কোনো সাংবাদিক, লেখক বা গবেষক যদি ১৯১৫ সালের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করতেন, তবে এই আইনের অধীনে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হতো। নোবেলজয়ী লেখক ওরহান পামুক এবং ঔপন্যাসিক এলিফ শাফাক সহ বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীকে এই আইনের আওতায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল।
এই আইনি নিপীড়নের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও অন্ধকার অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০০৭ সালে। ইস্তাম্বুল থেকে প্রকাশিত দ্বিভাষিক পত্রিকা আগোস (Agos)-এর প্রধান সম্পাদক এবং বিশিষ্ট তুর্কি-আর্মেনীয় সাংবাদিক হ্রান্ট দিঙ্ক (Hrant Dink) দীর্ঘদিন ধরে তুর্কি ও আর্মেনীয় সমাজের মধ্যে সংলাপ ও সত্য উন্মোচনের পক্ষে কাজ করছিলেন (Dink, 2008)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তুর্কি সমাজকে তার অতীত মুখোমুখি করাতে হবে কোনো বিদেশি চাপের মাধ্যমে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম ও কট্টর জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ১৯ জানুয়ারি ২০০৭ সালে ইস্তাম্বুলের তার নিজস্ব অফিসের সামনে এক কিশোর উগ্র জাতীয়তাবাদী তাকে দিনে-দুপুরে গুলি করে হত্যা করে।
হ্রান্ট দিঙ্কের এই হত্যাকাণ্ডের পর তুরস্কের বিবেকবান নাগরিক সমাজ এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধে ফেটে পড়ে। তার জানাজায় লাখ লাখ তুর্কি ও কুর্দি নাগরিক রাজপথে নেমে আসেন এবং তাদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল ঐতিহাসিক স্লোগান: “আমরা সবাই হ্রান্ট দিঙ্ক, আমরা সবাই আর্মেনীয়”। মানবাধিকার কর্মী ও প্রকাশক রাগিপ জারাকোলু (Ragıp Zarakolu) উল্লেখ করেছেন যে, হ্রান্ট দিঙ্কের আত্মত্যাগ তুর্কি সমাজের ভেতরে একটি স্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল (Zarakolu, 2011)। এর ফলে রাষ্ট্র পরিচালিত ঐতিহাসিক ট্যাবুটি প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের বিবেকের সামনে এক বড় ধাক্কা খায় এবং ভেতরের বহু মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।
স্মৃতির রাজনীতি ও স্মৃতিস্তম্ভের লড়াই (The Politics of Memory and the Battle of Monuments)
গণহত্যার পরবর্তী সময়ে স্মৃতি কেবল কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় থাকেনি, তা রূপ নিয়েছিল এক বৃহৎ রাজনৈতিক ও স্থানিক দ্বন্দ্বে বা স্মৃতির রাজনীতি (politics of memory)-তে। ১৯৬৫ সালে গণহত্যার পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে তৎকালীন সোভিয়েত আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানের রাজপথে ঘটে যায় এক বিশাল নাগরিক জাগরণ। মস্কোর কঠোর কমিউনিস্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে এসে একটি জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৬৭ সালে ইয়েরেভানের পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত হয় ঐতিহাসিক জিজেরনাকাবার্দ স্মৃতিসৌধ (Dzidzernagapert Memorial Complex) (Gürsel, 2018)। স্মৃতিসৌধের অনন্ত শিখা এবং ৪৪ মিটার উঁচু বিভক্ত স্তম্ভটি হয়ে ওঠে বৈশ্বিক আর্মেনীয় আত্মপরিচয় ও শোকের চিরন্তন প্রতীক।
এই স্মৃতির উত্থানের জবাবে তুর্কি রাষ্ট্রযন্ত্র এক পালটা স্মৃতি নির্মাণের কৌশল গ্রহণ করে। ১৯৯৯ সালে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইগদিরে রাষ্ট্র নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করে সুবিশাল ‘ইগদির গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ ও জাদুঘর’। সেখানে এক সম্পূর্ণ উল্টো বয়ান দাঁড় করিয়ে দাবি করা হয় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর্মেনীয়রাই তুর্কিদের হত্যা করেছিল এবং তুর্কিরা ছিল শিকার (Galip, 2020)। সমাজবিজ্ঞানী ওজলেম গুরসেল (Özlem Gürsel) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে দুটি রাষ্ট্র তাদের সীমান্তজুড়ে স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে এক অদৃশ্য মতাদর্শিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাসবিদ ওজান খলিল গালিপ (Özlem Belçim Galip) উল্লেখ করেছেন যে, এই স্মৃতির লড়াইয়ে সবচেয়ে নীরব শিকার হয়েছে আনাতোলিয়ার বাস্তব ভূগোল (Galip, 2020)। হাজার বছরের পুরনো গির্জাগুলোর গায়ের খোদাই করা লিপি ঘষে মুছে ফেলা, প্রাচীন শহরগুলোর নাম বদলে দেওয়া এবং ঐতিহাসিক কবরস্থানগুলোকে পার্ক বা রাস্তায় রূপান্তর করা – এই সব স্থানিক রূপান্তর চালানো হয়েছে যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন দেখে অতীতকে মনে করতে না পারে। কিন্তু স্মৃতির এই স্থানিক বিনাশ সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে থাকা ডায়াস্পোরার সম্মিলিত স্মৃতি এই অতীতকে প্রতিদিন জীবন্ত রেখেছে।
ডায়াস্পোরা লবিং ও বৈশ্বিক স্বীকৃতির আন্দোলন (Diaspora Lobbying and the Global Recognition Movement)
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা নিজেদের টিকে থাকার লড়াইকে রূপান্তর করেছিল এক সুসংগঠিত রাজনৈতিক স্বীকৃতি আন্দোলনে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন শক্তিশালী নাগরিক সংগঠন – যেমন আর্মেনিয়ান ন্যাশনাল কমিটি অব আমেরিকা (ANCA) এবং আর্মেনিয়ান অ্যাসেম্বলি অব আমেরিকা (AAA) – তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে লবিংয়ের এক নতুন মডেল তৈরি করে (Paul, 2000)। এই সংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংসদ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ১৯১৫ সালের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
এই আন্দোলনের প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্যটি এসেছিল ১৯৬৫ সালে, যখন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আর্মেনীয় গণহত্যাকে আইনি স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর থেকে শুরু হয় এক দীর্ঘ ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পরিক্রমা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রেজিদা বিলালি (Rezarta Bilali) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে ডায়াস্পোরা গোষ্ঠীগুলো ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ, মানবাধিকারের ভাষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে এনে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল (Bilali, 2013)। ২০০১ সালে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট একটি বিশেষ আইনের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি দেয়, এবং ২০১৬ সালে জার্মানির বুন্ডেস্ট্যাগ এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করে স্বীকার করে যে তৎকালীন জার্মান সাম্রাজ্যও এই নিধনযজ্ঞ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে পরোক্ষ দায় বহন করেছিল।
সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক সাফল্যটি আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘ কয়েক দশকের তুর্কি কূটনৈতিক বাধা ও সামরিক ব্ল্যাকমেইল অতিক্রম করে ২০১৯ সালে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে – হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেট – বিপুল ভোটে আর্মেনীয় গণহত্যার স্বীকৃতি বিল পাস হয়। এরপর ২৪ এপ্রিল ২০২১ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন (Joe Biden) তার বার্ষিক স্মারক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ (Genocide) শব্দটি উচ্চারণ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রেচেল পল (Rachel Paul) উল্লেখ করেছেন যে, ডায়াস্পোরার এই নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, একটি ঐক্যবদ্ধ জনসমাজের দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি ও নৈতিক লড়াই শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে সত্যের পক্ষে দাঁড় করাতে বাধ্য করে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও জাতীয় স্বার্থের দ্বৈরথ (International Geopolitics and the Clash of National Interests)
আর্মেনীয় গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথটি কিন্তু কোনো সহজ নৈতিক পথ ছিল না; এটি ছিল মূলত স্নায়ুযুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতির এক অন্যতম বড় বলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ন্যাটো জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আঙ্কারায় অবস্থিত ইনজিরলিক বিমানঘাঁটি, সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে রাখার ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন এবং বসফরাস প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ তুরস্ককে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছিল (Ohandjanian, 1988)।
ইতিহাসবিদ আর্তেম ওহানজানিয়ান (Artem Ohandjanian) তার কূটনৈতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কীভাবে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের নীতিনির্ধারকরা ব্যক্তিগতভাবে এই গণহত্যার সত্যতা স্বীকার করলেও প্রকাশ্য রাজনীতিতে তুরস্ককে চটাতে ভয় পেতেন (Ohandjanian, 1988)। যখনই কোনো দেশের সংসদে এই স্বীকৃতির প্রস্তাব উঠত, তখনই আঙ্কারা সরকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার, সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়ার কিংবা অর্থনৈতিক চুক্তি বাতিলের প্রকাশ্য হুমকি দিত। ইসরায়েলও দীর্ঘদিন ধরে তুরস্ক ও আজারবাইজানের সাথে তাদের কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্কের কারণে নেসেটে এই সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আটকে রেখেছিল।
সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক এলাজার বারকান (Elazar Barkan) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গিল্ট অব নেশনস (The Guilt of Nations)-এ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা এবং বাস্তব রাজনীতির বা রিয়েলপলিটিকের মধ্যে এক নিরন্তর সংঘাত চলে (Barkan, 2000)। পরাশক্তিগুলো বহু দশক ধরে মানবাধিকারের সার্বজনীন নীতিকে নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে বন্ধক রেখেছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি যখন বহুমুখী রূপ নিতে শুরু করে এবং তুরস্কের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশলগত দূরত্ব তৈরি হয়, তখন ভূরাজনীতির সেই পুরনো বাধাগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ঐতিহাসিক সত্যের স্বীকৃতি কেবল প্রমাণের ওপর নির্ভর করে না, তা বহুলাংশে নির্ধারিত হয় ক্ষমতার বৈশ্বিক সমীকরণের ওপর।
অস্বীকারের মনোস্তত্ত্ব ও পুনর্মিলনের প্রতিবন্ধকতা (The Psychology of Denial and Obstacles to Reconciliation)
মনস্তাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রীয় অস্বীকারনীতি মূলত একটি সমাজের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার এক চরম জটিল রূপ। গণহত্যা গবেষক কলিন ট্যাটজ (Colin Tatz) দেখিয়েছেন যে, কোনো জাতির জাতীয়তাবাদী অহমিকা যখন তার প্রতিষ্ঠাতাদের চরম অপরাধের সাথে যুক্ত থাকে, তখন সেই সমাজ অপরাধ স্বীকার করাকে নিজের আত্মপরিচয়ের ওপর এক অস্তিত্বের হুমকি বলে মনে করে (Tatz, 2003)। তুর্কি জাতীয়তাবাদের পুরো কাঠামোটি দাঁড় করানো হয়েছিল এই বিশ্বাসের ওপর যে তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন কেবল বীর ও সাম্রাজ্যের ত্রাণকর্তা; ফলে তাদের পক্ষে এটি মেনে নেওয়া মানসিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে যে সেই একই নেতৃত্ব ছিল লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্তের জন্য দায়ী।
সমাজবিজ্ঞানী ফাতমা বেশপিনার (Fatma Umut Beşpınar) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ পুরো সমাজকে এক গভীর যৌথ অপরাধবোধ ও ট্রমার মধ্যে আটকে রাখে (Beşpınar, 2010)। অস্বীকার কেবল ভুক্তভোগীদের স্মৃতিকেই অসম্মান করে না, তা অপরাধী সমাজের ভেতরের গণতান্ত্রিক বিকাশ এবং নৈতিক রূপান্তরকেও স্থবির করে দেয়। যে সমাজ নিজের অতীতের অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে স্বীকার করতে পারে না, সেই সমাজে বহুত্ববাদ, সংখ্যালঘুর অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত বিকাশ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং, আর্মেনীয় ও তুর্কি সমাজের মধ্যকার প্রকৃত পুনর্মিলন কোনো রাজনৈতিক চুক্তি বা সীমান্ত খুলে দেওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে না। এর একমাত্র পূর্বশর্ত হলো অতীতের ঐতিহাসিক সত্যের নিঃশর্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। অস্বীকারের এই শতাব্দী প্রাচীন দেয়াল ভেঙে যখন একটি সমাজ তার পূর্বপুরুষের ভুলকে স্বীকার করে নেওয়ার নৈতিক সাহস অর্জন করবে, কেবল তখনই দুই প্রতিবেশী জাতির মধ্যে প্রকৃত মানবিক ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব হবে।
আর্মেনীয় গণহত্যার উত্তরাধিকার (Legacy of the Armenian Genocide): আন্তঃপ্রজন্মীয় স্মৃতি, পুনর্মিলন ও বৈশ্বিক গণহত্যা-চিন্তা
আন্তঃপ্রজন্মীয় ট্রমা ও পোস্ট-মেমোরির ধারণা (Intergenerational Trauma and the Concept of Postmemory)
একটি সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ কেবল সেই প্রত্যক্ষ প্রজন্মের শারীরিক ধ্বংসের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায় না যারা সরাসরি তরবারি বা মরুযাত্রার শিকার হয়েছিল। এর ধ্বংসাত্মক মানসিক প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মগুলোর অবচেতন মনোজগতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক অদৃশ্য ক্ষত হিসেবে প্রবাহিত হতে থাকে। এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটিকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রখ্যাত স্মৃতি গবেষক ও সাহিত্যতাত্ত্বিক মারিয়ান হিরশ (Marianne Hirsch) প্রণয়ন করেছেন পোস্ট-মেমোরি (postmemory)-র ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক কাঠামো (Hirsch, 2012)। পোস্ট-মেমোরি হলো এমন এক ধরনের যৌথ স্মৃতি যা পরবর্তী প্রজন্ম প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করে না, বরং পূর্বপুরুষদের মুখে শোনা অসম্পূর্ণ গল্প, পারিবারিক অ্যালবামে সংরক্ষিত বিবর্ণ আলোকচিত্রের খণ্ডাংশ, ফেলে আসা ভিটেমাটির স্মৃতি এবং ঘরে বিরাজমান এক গভীর ট্রমাটিক নীরবতার মধ্য দিয়ে নিজেদের মনের ভেতরে আত্মস্থ করে নেয়।
আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা সমাজের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের মানসিক গঠনে এই পোস্ট-মেমোরির ভূমিকা অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। যে তরুণরা প্যারিস, বৈরুত, লস অ্যাঞ্জেলেস, সিডনি বা বুয়েনস আইরেসে জন্ম নিয়েছেন এবং যাদের শৈশব কেটেছে সম্পূর্ণ আধুনিক পশ্চিমা বা মধ্যপ্রাচ্যের নাগরিক পরিবেশে, তারা কোনোদিন স্বচক্ষে আনাতোলিয়ার পাহাড়ি গ্রাম বা সিরিয়ার মরুভূমি দেখেননি। কিন্তু শৈশব থেকেই পরিবারের বয়োবৃদ্ধদের কাছে স্বজন হারানোর আহাজারি শুনে এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা মানসিক শূন্যতা প্রত্যক্ষ করে তারা নিজেদের অস্তিত্বকেই সেই ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত উত্তরাধিকার হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেন। মনোসমীক্ষক ভামিক ভোলকান (Vamık Volkan) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কোনো জাতি যখন চরম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার পায় না, তখন সেই জাতি নিজের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে এক ধরনের নির্বাচিত ট্রমা (chosen trauma)-কে তাদের যৌথ আত্মপরিচয়ের মূল স্তম্ভে রূপান্তর করে ফেলে (Volkan, 2001)।
আধুনিক চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, এই আন্তঃপ্রজন্মীয় ট্রমা কেবল স্মৃতির জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা জৈবিক ও আচরণগত স্তরেও বংশপরম্পরায় সংক্রামিত হতে পারে। গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা পরিবারগুলোতে এক ধরনের স্থায়ী মানসিক নিরাপত্তাহীনতা, রাষ্ট্রের প্রতি গভীর ভীতি এবং সামাজিক অবিশ্বাসের পরিবেশ বজায় থাকে। মায়েরা প্রায়ই অবচেতনভাবেই সন্তানদের মধ্যে এই ভয় ঢুকিয়ে দেন যে পারিপার্শ্বিক পৃথিবী যে কোনো মুহূর্তে শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। মারিয়ান হিরশ দেখিয়েছেন যে, পোস্ট-মেমোরির এই শক্তিশালী প্রভাবের কারণেই শতবর্ষ পরেও ১৯১৫ সালের নিধনযজ্ঞ কোনো দূরবর্তী বইয়ের ইতিহাস হয়ে যায়নি, বরং তা প্রতিটি নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের নিজস্ব সত্তার এক অবিচ্ছেদ্য এবং জীবন্ত আবেগীয় বাস্তবতা হিসেবে টিকে রয়েছে।
সাংস্কৃতিক ট্রমা ও সমষ্টিগত আত্মপরিচয় (Cultural Trauma and Collective Identity)
সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বে কোনো বৃহৎ ঐতিহাসিক বিপর্যয় যখন একটি সমাজের সমগ্র বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়, তখন তাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় সাংস্কৃতিক ট্রমা (cultural trauma) হিসেবে (Alexander, 2004)। সমাজবিজ্ঞানী জেফরি সি. আলেকজান্ডার (Jeffrey C. Alexander) তার বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক মডেলে দেখিয়েছেন যে, সাংস্কৃতিক ট্রমা কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি হলো এক সুপরিকল্পিত সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো একটি নির্দিষ্ট ট্র্যাজেডিকে একটি জাতির যৌথ অস্তিত্বের প্রধান আখ্যান বা ‘মাস্টার ন্যারেটিভ’-এ রূপান্তর করা হয়, যা ছাড়া সেই জাতির কোনো সদস্য নিজের পৃথক সত্তা কল্পনা করতে পারে না।
জার্মান স্মৃতি গবেষক আলাইদা আসমান (Aleida Assmann) তার কালজয়ী গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে মানুষের ক্ষণস্থায়ী ‘যোগাযোগমূলক স্মৃতি’ বা প্রাত্যহিক কথাবার্তা সময়ের ব্যবধানে এক স্থায়ী ‘সাংস্কৃতিক স্মৃতি’-তে রূপ নেয় (Assmann, 2011)। বেঁচে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের শারীরিক মৃত্যুর সাথে সাথে আর্মেনীয় সমাজ তাদের অতীত ধ্বংসযজ্ঞকে সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ধ্রুপদী সঙ্গীত এবং জাতীয় শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে রূপ দান করেছে। প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত শোক পালন করেন, কালো পোশাক পরে পদযাত্রা করেন এবং মোমবাতি জ্বালান – এটি নিছক কোনো ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করা নয়; এটি হলো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মুখে একটি প্রাচীন জাতির টিকে থাকার সামষ্টিক অঙ্গীকারকে বিশ্বমঞ্চে পুনর্ব্যক্ত করা।
এই সাংস্কৃতিক ট্রমা প্রবাসের বুকে ছড়িয়ে থাকা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বৃহত্তর সমাজের ভেতরে বিলীন বা আত্তীকৃত হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্বের যে প্রান্তেই আর্মেনীয়রা বসবাস করুক না কেন, তাদের দৈনন্দিন ভাষা বা জীবনযাত্রার ভিন্নতা সত্ত্বেও ১৯১৫ সালের সেই সম্মিলিত শোক তাদের সবাইকে একটি একক মানসিক ভূখণ্ডে একত্রিত করে রাখে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা এটাও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই ট্রমা যখন একমাত্র জাতীয় পরিচয়ের সম্বল হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা সমাজকে এক চিরন্তন দুঃখ ও শোকের বন্দিশালায় আটকে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের চিন্তাবিদরা এই স্মৃতিকে কেবল অতীতের কান্নায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে সাংস্কৃতিক নবজাগরণ, সাহিত্য সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক মানবাধিকারের এক ইতিবাচক হাতিয়ারে রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছেন।
বহুমাত্রিক স্মৃতি ও তুলনামূলক ট্র্যাজেডি (Multidirectional Memory and Comparative Tragedy)
বিগত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক স্মৃতিচর্চার অঙ্গনে একটি মারাত্মক সংকীর্ণ প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, যাকে বলা হয় প্রতিযোগিতামূলক স্মৃতি বা ‘কম্পেটিটিভ মেমোরি’। বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী প্রায়ই দাবি করত যে তাদের পূর্বপুরুষদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয় ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং অনন্য এক ঘটনা, যার সাথে অন্য কোনো অপরাধের তুলনা চলে না। কিন্তু বিশিষ্ট সংস্কৃতি তাত্ত্বিক মাইকেল রথবার্গ (Michael Rothberg) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ মাল্টিডিরেকশনাল মেমোরি (Multidirectional Memory)-তে এই জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতাকে পদ্ধতিগতভাবে খণ্ডন করেছেন (Rothberg, 2009)। রথবার্গ তুলে ধরেন বহুমাত্রিক স্মৃতি (multidirectional memory)-র এক নতুন দর্শন, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে বিভিন্ন জাতির ঐতিহাসিক ট্রমাগুলো একে অপরের সাথে কোনো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় না, বরং তারা পরস্পরের স্মৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বেশি উন্মুক্ত ও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।
আর্মেনীয় গণহত্যার ইতিহাস এই বহুমাত্রিক স্মৃতির এক শ্রেষ্ঠ বাস্তব উদাহরণ। ১৯১৫ সালের এই ধ্বংসযজ্ঞটি পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর অন্যান্য বৃহৎ জাতিগত নিধনযজ্ঞ – যেমন নাৎসি জার্মানির হলোকস্ট, রুয়ান্ডার গণহত্যাএবং কম্বোডিয়ার গণহত্যামূলক শাসন – বোঝার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য তুলনামূলক সেতু তৈরি করেছে। ইতিহাসবিদ ওমের বার্তভ (Omer Bartov) তার তুলনামূলক গণহত্যা গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র বিজ্ঞান, আমলাতন্ত্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নেয় (Bartov, 2000)। বার্তভ দেখান যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আনাতোলিয়ার বুকে যে জনমিতিক উচ্ছেদ ও নিধনের প্রযুক্তি প্রথম পরীক্ষা করা হয়েছিল, ঠিক সেই একই আমলাতান্ত্রিক যৌক্তিকতা আরও নিখুঁতভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাস চেম্বারগুলোতে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
এই তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসচর্চাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধ ক্ষোভের বাইরে নিয়ে এসে এক সার্বজনীন মানবিক শিক্ষার স্তরে উন্নীত করেছে। আর্মেনীয় সমাজের দীর্ঘ লড়াই আজ আর কেবল তাদের একার অতীত পুনরুদ্ধারের বিষয় নয়; এটি যুক্ত হয়েছে ঔপনিবেশিক সহিংসতার শিকার হওয়া আফ্রিকান জনগোষ্ঠী, আমেরিকার আদিবাসী সমাজ এবং হলোকস্টের শিকার হওয়া কোটি কোটি মানুষের সার্বিক মুক্তির আন্দোলনের সাথে। অন্য মানুষের যন্ত্রণার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া এবং নিজের ইতিহাসকে মানবজাতির সামগ্রিক অবিচারের অংশ হিসেবে দেখতে শেখাই হলো আধুনিক স্মৃতি-দর্শনের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বিজয়।
ক্ষতিপূরণ, পুনরুদ্ধার ও ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার (Reparations, Restitution and Historical Justice)
গণহত্যার ক্ষত নিরাময়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে জটিল ও অমীমাংসিত প্রশ্নটি হলো ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার (historical justice) এবং বাস্তব ক্ষতিপূরণের দাবি। ট্রানজিশনাল জাস্টিস বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানী জন টর্পে (John Torpey) তার প্রভাবশালী গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, কোনো বৃহৎ অপরাধের পর অপরাধী বা উত্তরসূরি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিছক মৌখিক দুঃখ প্রকাশ বা সাধারণ স্বীকৃতি দেওয়া যথেষ্ট নয়; এর সাথে বস্তুগত ও আইনি পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিপূরণ (restitution and reparations)-এর প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত (Torpey, 2006)।
আর্মেনীয় ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের এই দাবিটি প্রধানত দুটি স্তরে বিভক্ত: বস্তুগত সম্পদ ফেরত পাওয়া এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন’-এর নামে যে লাখ লাখ একর উর্বর কৃষিজমি, হাজার হাজার পারিবারিক বাড়িঘর, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কারখানা এবং ব্যাংক আমানত বেআইনিভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, সেগুলোর আইনি মালিকানার নিষ্পত্তি আজও হয়নি। আন্তর্জাতিক আইনবিদ আর্নেস্তো ভার্দেহা (Ernesto Verdeja) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্র কর্তৃক অতীতের অপরাধের দায় স্বীকার করার সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রমাণ হলো সেই লুণ্ঠিত সম্পদের উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া অথবা তাদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার আইনি পথ তৈরি করা (Verdeja, 2009)।
বস্তুগত সম্পদের পাশাপাশি আরেকটি বড় লড়াই চলছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার নিয়ে। আনাতোলিয়ার মাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রাচীন চার্চ, মঠ, দুর্গ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ চরম ধ্বংস ও অবহেলার মুখে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভ্যান হ্রদের আঘথামার চার্চ বা দিয়ারবেকিরের সেন্ট গিরাগোস চার্চের মতো কিছু স্থাপত্যের প্রতীকী সংস্কার করা হলেও, সিংহভাগ ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নকে হয় মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে অথবা মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গবেষকরা স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শেকড় মুছে দেওয়া শারীরিক নিধনেরই এক প্রলম্বিত রূপ। ফলে এই ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, সেগুলোর আদি পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া এবং আদি সম্প্রদায়ের কাছে তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার হস্তান্তর করাই হলো দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি।
ক্ষমার রাজনীতি, নাগরিক উদ্যোগ ও পুনর্মিলনের রূপরেখা (Politics of Forgiveness, Civil Society and Frameworks of Reconciliation)
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন চরম কূটনৈতিক অস্বীকারনীতি এবং সামরিক সীমান্ত বিরোধ বিরাজ করে, তখন দুটি ঐতিহাসিক বৈরী সমাজের মধ্যে কীভাবে আস্থা ও পুনর্মিলন গড়ে তোলা সম্ভব? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনবিদ ও চিন্তাবিদ মার্থা মিনো (Martha Minow) তার বিখ্যাত গ্রন্থ বিটুইন ভেঞ্জেন্স অ্যান্ড ফরগিভনেস (Between Vengeance and Forgiveness)-এ দেখিয়েছেন যে, কোনো বৃহৎ জাতিগত সহিংসতার পর সমাজ সাধারণত দুটি চরম ভুলের মুখে পড়ে – একদিকে ধ্বংসাত্মক অন্ধ প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে অন্যায়ভাবে সবকিছু ভুলে গিয়ে অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়া (Minow, 1998)। মিনো এই দুই ধ্বংসাত্মক প্রান্তের বিকল্প হিসেবে প্রস্তাব করেছেন ‘পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার’ বা রেস্টোরেটিভ জাস্টিসের রূপরেখা, যার ভিত্তি হলো সত্যকে উন্মোচন করা, অপরাধীর দায় স্বীকার এবং নাগরিক পর্যায়ে সরাসরি মানবিক সংলাপ গড়ে তোলা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ পরবর্তী রূপান্তরের অন্যতম রূপকার ও নোবেলজয়ী আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু (Desmond Tutu) তার অবিস্মরণীয় দর্শনে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, সত্যকে আড়াল করে বা অস্বীকার করে কোনোদিন সমাজে প্রকৃত ক্ষমা বা পুনর্মিলন আসতে পারে না (Tutu, 1999)। আর্মেনীয় ও তুর্কি সমাজের মধ্যকার ঐতিহাসিক দূরত্বের ক্ষেত্রেও ঠিক এই নীতিটি সর্বাগ্রে প্রযোজ্য। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তুরস্কের একদল প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক নাগরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা পরিচিত ‘আমি ক্ষমা চাই’ (Özür Diliyorum) ক্যাম্পেইন নামে। এই অনলাইন আবেদনে হাজার হাজার সাধারণ তুর্কি নাগরিক স্বাক্ষর করে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেন যে, ১৯১৫ সালে অটোমান আর্মেনীয়দের ওপর নেমে আসা চরম মহাবিপর্যয়ের জন্য তারা ব্যক্তিগতভাবে লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী এবং রাষ্ট্র কর্তৃক সত্য ধামাচাপা দেওয়ার এই অনৈতিক নীতিকে তারা প্রত্যাখ্যান করছেন।
যদিও এই নাগরিক উদ্যোগটি তৎকালীন তুর্কি জাতীয়তাবাদী সরকার ও চরমপন্থী মহলের তীব্র ক্রোধ ও মামলার মুখে পড়েছিল, তবুও এটি প্রমাণ করেছিল যে সমাজের তৃণমূল স্তরে মানুষ অতীতের সত্যকে গ্রহণ করতে আগ্রহী। মার্থা মিনো দেখিয়েছেন যে, পুনর্মিলন কোনো উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক চুক্তি বা কাগুজে প্রটোকলের মধ্য দিয়ে রাতারাতি অর্জিত হয় না; এটি গড়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বিনিময়, সাধারণ মানুষের পারস্পরিক ভ্রমণ এবং সত্যকে স্বীকার করার মানসিক সাহসের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র যখন নিজের অতীত অপরাধের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছাবে, কেবল তখনই দুটি প্রতিবেশী জাতি তাদের শতবর্ষের শত্রুতা ভুলে একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
বৈশ্বিক গণহত্যা-চিন্তা ও আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের রূপান্তর (Global Genocide Studies and Transformation of Modern Political Philosophy)
আর্মেনীয় গণহত্যার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক দর্শনের চিন্তার জগতে এক গভীর ও মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। বিশিষ্ট গণহত্যা গবেষক ড্যানিয়েল ফেয়ারস্টাইন (Daniel Feierstein) তার ধ্রুপদী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, গণহত্যা কোনো বিশৃঙ্খল জনতার ক্ষোভের প্রকাশ নয়, এটি হলো আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক অনুশীলন (genocide as a social practice) (Feierstein, 2014)। ফেয়ারস্টাইনের মতে, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের সমাজকে জোরপূর্বক একটি একক জাতিগত বা আদর্শিক ছাঁচে পুনর্গঠন করার জন্য অন্য সমস্ত বৈচিত্র্যময় ও ভিন্নমতাবলম্বী অংশকে নির্মূল করার এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ভ্যালেন্টিনো (Benjamin Valentino) তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, কোনো বড় গণসহিংসতা পুরো সমাজের সামগ্রিক ইচ্ছায় ঘটে না; এটি ঘটে যখন রাষ্ট্রের ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একটি ছোট মতাদর্শিক চক্র নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে নিধনযজ্ঞকে একটি কার্যকর নীতি বা হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে (Valentino, 2004)। আর্মেনীয় ট্র্যাজেডি আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনকে এই চরম শিক্ষা দিয়েছে যে, যখন কোনো রাষ্ট্রে আইনসভা, আদালত এবং মুক্ত গণমাধ্যমকে অকেজো করে সমস্ত ক্ষমতা একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, তখন সেই আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র যে কোনো মুহূর্তে একটি দানবীয় নিধনযন্ত্রে রূপ নিতে পারে।
ফলে আর্মেনীয় গণহত্যার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার আজ আর কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব মানবতার কাছে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও দার্শনিক সতর্কবার্তা। রাফায়েল লেমকিনের প্রথম চিন্তা থেকে শুরু করে জাতিসংঘের কনভেনশন, ইস্তাম্বুলের বিচারপ্রক্রিয়া এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত পর্যন্ত যে দীর্ঘ পথ মানবজাতি অতিক্রম করেছে, তার মূল সুরটিই হলো রাষ্ট্রের অনিয়ন্ত্রিত সার্বভৌম ক্ষমতার মুখে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও বৈচিত্র্যকে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা। অতীতের অন্ধকার ইতিহাসের এই নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠ আমাদের এই চূড়ান্ত শিক্ষাই দেয় যে, ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং তা হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও চরমপন্থার হাত থেকে রক্ষা করার এক চিরন্তন নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গীকার।
সম্পর্কিত কিছু ছবি

উৎস: Armenian Genocide Museum-Institute.



উপসংহার
আর্মেনীয় গণহত্যার তাৎপর্য কেবল ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের ভৌগোলিক ও শারীরিক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির দ্বন্দ্বে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই নিধনযজ্ঞের মাধ্যমে আনাতোলিয়ার হাজার বছরের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায় এবং সেখানে জোরপূর্বক একটি সমজাতীয় জাতীয়তাবাদী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। হত্যা ও বলপ্রয়োগের পাশাপাশি আর্মেনীয়দের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল, তা আধুনিক তুরস্কের অর্থনৈতিক ভিত্তি বা জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি (national bourgeoisie) গঠনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল। ফলে এটি শুধু রক্তপাতের ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও পুঁজি স্থানান্তর (economic dispossession and capital transfer)-এর ঘটনা। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ইস্তাম্বুল সামরিক আদালত (Istanbul Military Tribunals) দোষীদের বিচারের আওতায় আনার প্রাথমিক উদ্যোগ নিলেও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পটপরিবর্তন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানের মুখে সেই বিচারপ্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, সুবিচারের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় অস্বীকৃতি আন্তর্জাতিক অপরাধের ইতিহাসে এক স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে।
বর্তমান বিশ্বে আর্মেনীয় গণহত্যা একটি গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সংঘাত চলছে রাষ্ট্রীয় বয়ান ও অস্বীকারনীতি (state-sponsored denialism) এবং ঐতিহাসিক নথিনির্ভর বাস্তবতার মধ্যে। আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক ও গবেষক সমাজের ব্যাপক ঐকমত্য সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে বহু রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আর্মেনীয় ডায়াস্পোরা (Armenian diaspora)-র নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা এই ইতিহাসকে বৈশ্বিক স্মৃতিতে জীবন্ত রেখেছে এবং একে স্মৃতির রাজনীতি (politics of memory)-র এক অন্যতম প্রভাবশালী উপাদানে পরিণত করেছে। সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের অতীত অপরাধকে স্বীকার ও মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা ভবিষ্যৎ আগ্রাসন ও সহিংসতার পথকে সুগম করে। ধর্মীয় ও জাতিগত আধিপত্যবাদ কীভাবে আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করতে পারে, আর্মেনীয় ট্র্যাজেডি তার এক সতর্কবার্তা। তাই আর্মেনীয় গণহত্যার নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়ন কেবল অতীতকে জানার জন্য নয়, বরং আধুনিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা (authoritarian regime), জাতিগত অসহিষ্ণুতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।
তথ্যসূত্র
- Adalian, R. P. (2010). Historical dictionary of Armenia. Scarecrow Press.
- Ahmad, F. (1969). The Young Turks: The Committee of Union and Progress in Turkish politics, 1908–1914. Oxford University Press.
- Ahmad, F. (1993). The making of modern Turkey. Routledge.
- Akçam, T. (2006). A shameful act: The Armenian genocide and the question of Turkish responsibility. Metropolitan Books.
- Akçam, T. (2012). The Young Turks’ crime against humanity: The Armenian genocide and ethnic cleansing in the Ottoman Empire. Princeton University Press.
- Akçam, T. (2018). Killing orders: Talat Pasha’s telegrams and the Armenian genocide. Palgrave Macmillan.
- Akmeşe, H. N. (2005). The birth of modern Turkey: The Ottoman military and the march to WWI. I.B. Tauris.
- Aksakal, M. (2008). The Ottoman road to war in 1914: The Ottoman Empire and the First World War. Cambridge University Press.
- Alexander, J. C. (2004). Toward a theory of cultural trauma. In J. C. Alexander, R. Eyerman, B. Giesen, N. J. Smelser, & P. Sztompka (Eds.), Cultural trauma and collective identity (pp. 1–30). University of California Press.
- Allen, W. E. D., & Muratoff, P. (1953). Caucasian battlefields: A history of the wars on the Turco-Caucasian border 1828–1921. Cambridge University Press.
- Altınay, A. G., & Çetin, F. (2014). The grandchildren: The hidden legacy of “lost” Armenians in Turkey (M. Freely, Trans.). Transaction Publishers.
- Alvarez, A. (2001). Governments, citizens, and genocide: A comparative and interdisciplinary approach. Indiana University Press.
- Anderson, M. S. (1966). The Eastern question, 1774–1923: A study in international relations. Macmillan.
- Andonian, A. (1920). The memoirs of Naim Bey: Turkish official documents relating to the deportations and massacres of Armenians. Hodder and Stoughton.
- Arendt, H. (1963). Eichmann in Jerusalem: A report on the banality of evil. Viking Press.
- Artinian, V. (1980). The Armenian constitutional system in the Ottoman Empire, 1839–1863: A study of its historical development. The Isis Press.
- Aslanian, S. D. (2011). From the Indian Ocean to the Mediterranean: The global trade networks of Armenian merchants from New Julfa. University of California Press.
- Assmann, A. (2011). Cultural memory and Western civilization: Functions, media, archives. Cambridge University Press.
- Astourian, S. H. (2011). The silence of the land: Agrarian relations, ethnicity, and power in the Ottoman Empire. In R. G. Suny, F. M. Göçek, & N. M. Naimark (Eds.), A question of genocide: Armenians and Turks at the end of the Ottoman Empire (pp. 55–81). Oxford University Press.
- Atamian, S. (1955). The Armenian community: The welfare of a people in search of a state. Philosophical Library.
- Atkinson, T. B. (2000). “Statement” in The German, the Turk and the devil made a triple alliance: Harpoot diaries, 1908–1917. Gomidas Institute.
- Auron, Y. (2000). The banality of indifference: Zionism and the Armenian genocide. Transaction Publishers.
- Baç, M. M. (2005). Turkey’s political reforms and the European Union. West European Politics, 28(1), 16–31.
- Baghdjian, K. (1987). The confiscation of Armenian properties by the Turkish government said to be abandoned. Printing Press of the Catholicossate of Cilicia.
- Bakalian, A. (1993). Armenian-Americans: From being to feeling Armenian. Transaction Publishers.
- Balakian, G. (2010). Armenian Golgotha: A memoir of the Armenian genocide, 1915–1918 (P. Balakian & A. Sevag, Trans.). Vintage Books.
- Balakian, P. (2003). The burning Tigris: The Armenian genocide and America’s response. HarperCollins.
- Balian, S. (2014). Women and children of the Armenian genocide: The gendered dimension of collective violence. Genocide Studies International, 8(2), 167–185.
- Barby, H. (1917). Au pays de l’épouvante: L’Arménie martyre. Albin Michel.
- Bardakjian, K. B. (1985). Hitler and the Armenian genocide. The Zoryan Institute.
- Barkan, E. (2000). The guilt of nations: Restitution and negotiating historical injustices. W. W. Norton & Company.
- Barkey, K. (2008). Empire of difference: The Ottomans in comparative perspective. Cambridge University Press.
- Barsoumian, H. (1982). The dual role of the Armenian Amira class within the Ottoman government and the Armenian Millet (1750–1850). In B. Braude & B. Lewis (Eds.), Christians and Jews in the Ottoman Empire (Vol. 1, pp. 171–184). Holmes & Meier Publishers.
- Bartov, O. (2000). Mirrors of destruction: War, genocide, and modern identity. Oxford University Press.
- Barton, J. L. (1998). “Turkish atrocities”: Statements of American missionaries on the destruction of Christian communities in Ottoman Turkey, 1915–1917. Gomidas Institute.
- Bass, G. J. (2000). Stay the hand of vengeance: The politics of war crimes tribunals. Princeton University Press.
- Bayraktar, S. (2010). The massacres of Adana in 1909: The role of state-society relations in provincial politics. Journal of Ottoman Studies, 36(1), 115–142.
- Bedoukian, K. (1978). Some of us survived: The story of an Armenian boy. Farrar, Straus and Giroux.
- Berkes, N. (1964). The development of secularism in Turkey. McGill University Press.
- Beşikçi, M. (2012). The Ottoman mobilization of manpower in the First World War: Between voluntarism and coercion. Brill.
- Beşpınar, F. U. (2010). Questioning the collective memory: The Armenian issue in Turkish public sphere. Journal of Historical Sociology, 23(3), 442–463.
- Bilali, R. (2013). National narratives and intergroup relations: The case of the Armenian genocide. Political Psychology, 34(6), 803–823.
- Biondich, M. (2011). The Balkans: Revolution, war, and political violence since 1878. Oxford University Press.
- Bjørnlund, M. (2008). ‘A fate worse than dying’: Sexual violence during the Armenian genocide. In D. Herzog (Ed.), Brutality and desire: War and sexuality in Europe’s twentieth century (pp. 16–58). Palgrave Macmillan.
- Bliss, E. M. (1896). Turkey and the Armenian atrocities. Edgewood Publishing Company.
- Bloxham, D. (2005). The great game of genocide: Imperialism, nationalism, and the destruction of the Ottoman Armenians. Oxford University Press.
- Bogosian, E. (2015). Operation Nemesis: The assassination plot that avenged the Armenian genocide. Little, Brown and Company.
- Bournoutian, G. A. (2002). A concise history of the Armenian people: From ancient times to the present. Mazda Publishers.
- Boyajian, D. H. (1972). Armenia: The case for a forgotten genocide. Educational Book Crafters.
- Boyadjian, H. (1975). Joy and sorrow: A personal narrative of the Armenian massacres. Vantage Press.
- Braude, B., & Lewis, B. (Eds.). (1982). Christians and Jews in the Ottoman Empire: The functioning of a plural society. Holmes & Meier Publishers.
- Bryce, J. (1896). Transcaucasia and Ararat: Being notes of a vacation tour in the autumn of 1876 (4th ed.). Macmillan and Co.
- Buğra, A. (1994). State and business in modern Turkey: A comparative study. State University of New York Press.
- Buzan, B., Wæver, O., & de Wilde, J. (1998). Security: A new framework for analysis. Lynne Rienner Publishers.
- Carnegie Endowment for International Peace. (1914). Report of the International Commission to inquire into the causes and conduct of the Balkan Wars. Carnegie Endowment for International Peace.
- Carzou, J. M. (1975). Un génocide exemplaire: Arménie 1915. Flammarion.
- Chalabian, A. (1988). General Andranik and the Armenian revolutionary movement. Antranig Chalabian.
- Chaliand, G., & Ternon, Y. (1983). The Armenians: From genocide to resistance. Zed Books.
- Chalk, F., & Jonassohn, K. (1990). The history and sociology of genocide: Analyses and case studies. Yale University Press.
- Chelebian, A. (1989). General Andranik and the Armenian revolutionary movement (2nd ed.). Antranig Chelebian.
- Cheterian, V. (2015). Open wounds: Armenians, Turks and a century of genocide. Hurst & Company.
- Chorbajian, L. (Ed.). (1999). The making of Nagorno-Karabagh: From genocide to statehood. Palgrave Macmillan.
- Clark, C. (2006). Iron kingdom: The rise and downfall of Prussia, 1600–1947. Harvard University Press.
- Cohan, J. A. (2005). Environmental catastrophe: The genocide and insurance claims of the Ottoman Armenians. International Journal of Human Rights, 9(2), 221–254.
- Cohen, R. (2008). Global diasporas: An introduction (2nd ed.). Routledge.
- Cohen, S. (2001). States of denial: Knowing about atrocities and suffering. Polity Press.
- Cooper, J. (2008). Raphael Lemkin and the struggle for the Genocide Convention. Palgrave Macmillan.
- Cuinet, V. (1892). La Turquie d’Asie: Géographie administrative, statistique, descriptive et raisonnée de chaque province de l’Asie-Mineure (Vol. 1). Ernest Leroux.
- Dadrian, V. N. (1995). The history of the Armenian genocide: Ethnic conflict from the Balkans to Anatolia to the Caucasus. Berghahn Books.
- Dasnabedian, H. (1990). History of the Armenian Revolutionary Federation, Dashnaktsutiun, 1890–1924. Oemme Edizioni.
- Davis, L. A. (1994). The slaughterhouse province: An American diplomat’s report on the Armenian genocide, 1915–1917 (S. E. Blair, Ed.). Aristide D. Caratzas.
- Davison, R. H. (1963). Reform in the Ottoman Empire, 1856–1876. Princeton University Press.
- Derderian, K. (2005). Common fate, different experience: Gender-specific aspects of the Armenian genocide, 1915–1917. Holocaust and Genocide Studies, 19(1), 1–25.
- Deringil, S. (1998). The well-protected domains: Ideology and the legitimation of power in the Ottoman Empire 1876–1909. I.B. Tauris.
- Der Matossian, B. (2014). Shattered dreams of revolution: From liberty to violence in the late Ottoman Empire. Stanford University Press.
- Derogy, J. (1990). Resistance and revenge: The Armenian assassination of the Turkish leaders responsible for the 1915 massacres and deportations (A. M. Berrett, Trans.). Transaction Publishers.
- Dink, H. (2008). Two close peoples, two distant neighbours (K. M. Göçek, Trans.). International Hrant Dink Foundation Publications.
- Dixon, J. M. (2010). Defending the nation? Maintaining Turkey’s narrative of the Armenian genocide. South European Society and Politics, 15(3), 467–485.
- Duguid, S. (1973). The politics of unity: Hamidian policy in Eastern Anatolia. Middle Eastern Studies, 9(2), 139–155.
- Dündar, F. (2008). Modern Türkiye’nin şifresi: İttihat ve Terakki’nin etnisite mühendisliği (1913–1918). İletişim Yayınları.
- Dyer, G. (1973). Turkish ‘falsifiers’ and Armenian ‘deceivers’: Historiography and the Armenian massacres. Middle Eastern Studies, 9(1), 99–107.
- Eby, B. F. (1979). The Adana massacres of 1909: A study in collective violence. University of Michigan Press.
- Einstein, L. (1917). Inside Constantinople: A diplomatist’s diary during the Dardanelles Expedition, April–September, 1915. E.P. Dutton & Company.
- Ekmekçioğlu, L. (2016). Recovering Armenia: The limits of belonging in post-genocide Turkey. Stanford University Press.
- Elder, T. (2005). What you see before your eyes: Upheaval and partiality in Raphael Lemkin’s formulation of the concept of genocide. Journal of Genocide Research, 7(4), 469–499.
- Emin, A. (1930). Turkey in the World War. Yale University Press.
- Erickson, E. J. (2001). Ordered to die: A history of the Ottoman army in the First World War. Greenwood Press.
- Faroqhi, S. (2004). The Ottoman Empire and the world around it. I.B. Tauris.
- Feierstein, D. (2014). Genocide as social practice: Reorganizing society under the Nazis and Argentina’s military juntas (D. Foster, Trans.). Rutgers University Press.
- Fein, H. (1979). Accounting for genocide: National tolerances and systemic mass murders. Free Press.
- Findley, C. V. (1980). Bureaucratic reform in the Ottoman Empire: The Sublime Porte, 1789–1922. Princeton University Press.
- Frieze, D. L. (Ed.). (2013). Totally unofficial: The autobiography of Raphael Lemkin. Yale University Press.
- Fromkin, D. (1989). A peace to end all peace: The fall of the Ottoman Empire and the creation of the modern Middle East. Henry Holt and Company.
- Gabrielian, M. C. (1918). Armenia: A martyr nation. Fleming H. Revell Company.
- Galip, Ö. B. (2020). New social movements and the Armenian question in Turkey: Civil society vs. the state. Palgrave Macmillan.
- Gaunt, D. (2006). Massacres, resistance, protectors: Muslim-Christian relations in Eastern Anatolia during World War I. Gorgias Press.
- Georgeon, F. (2003). Abdülhamid II: Le sultan calife (1876–1909). Fayard.
- Gerwarth, R., & Horne, J. (Eds.). (2012). War in peace: Paramilitary violence in Europe after the Great War, 1917–1923. Oxford University Press.
- Gibbons, H. A. (1916). The blackest page of modern history: Events in Armenia in 1915, the facts and the responsibilities. G.P. Putnam’s Sons.
- Gidney, J. B. (1967). A mandate for Armenia. The Kent State University Press.
- Gingeras, R. (2009). Sorrowful shores: Violence, ethnicity, and the end of the Ottoman Empire 1912–1923. Oxford University Press.
- Glenny, M. (2000). The Balkans: Nationalism, war, and the Great Powers, 1804–1999. Viking.
- Göçek, F. M. (2015). Denial of violence: Ottoman past, Turkish present, and collective violence against the Armenians, 1789–2009. Oxford University Press.
- Gökalp, Z. (1959). Turkish nationalism and Western civilization: Selected essays of Ziya Gökalp (N. Berkes, Trans. & Ed.). Columbia University Press.
- Greene, F. D. (1896). The Armenian crisis in Turkey: The historic catastrophe of 1894–1896. G.P. Putnam’s Sons.
- Gürsel, Ö. (2018). Landscape of memory: The politics of commemoration in Armenia and Turkey. Memory Studies, 11(4), 489–505.
- Gust, W. (Ed.). (2014). The Armenian genocide: Evidence from the German Foreign Office archives, 1915–1916. Berghahn Books.
- Hall, R. C. (2000). The Balkan Wars, 1912–1913: Prelude to the First World War. Routledge.
- Hanioğlu, M. Ş. (2001). Preparation for a revolution: The Young Turks, 1902–1908. Oxford University Press.
- Hanioğlu, M. Ş. (2008). A brief history of the late Ottoman Empire. Princeton University Press.
- Harris, J. R., & Harris, H. B. (1897). Letters from the scenes of the recent massacres in Armenia. James Nisbet & Co.
- Hartunian, A. H. (1968). Neither to laugh nor to weep: A memoir of the Armenian genocide (V. Hartunian, Trans.). Beacon Press.
- Heller, K. J. (2011). The Nuremberg Military Tribunals and the origins of international criminal law. Oxford University Press.
- Helmreich, P. C. (1974). From Paris to Sèvres: The partition of the Ottoman Empire at the Peace Conference of 1919–1920. Ohio State University Press.
- Hepworth, G. H. (1898). Through Armenia on horseback. E.P. Dutton & Company.
- Hirsch, M. (2012). The generation of postmemory: Writing and visual culture after the Holocaust. Columbia University Press.
- Horton, G. (1926). The blight of Asia: An account of the systematic extermination of Christian populations by Mohammedans and of the culpability of certain great powers. Bobbs-Merrill Company.
- Hovannisian, R. G. (1986). The Armenian genocide in perspective. Transaction Publishers.
- Hovannisian, R. G. (Ed.). (1997). The Armenian people from ancient to modern times: Volume II: Foreign dominion to statehood: The fifteenth century to the twentieth century. St. Martin’s Press.
- Howard, H. N. (1931). The partition of Turkey: A diplomatic history, 1913–1923. University of Oklahoma Press.
- Hull, I. V. (2005). Absolute destruction: Military culture and the practices of war in Imperial Germany. Cornell University Press.
- Hurewitz, J. C. (Ed.). (1979). The Middle East and North Africa in world politics: A documentary record (Vol. 2). Yale University Press.
- Ihrig, S. (2016). Justifying genocide: Germany and the Armenians from Bismarck to Hitler. Harvard University Press.
- Inalcik, H. (1994). An economic and social history of the Ottoman Empire, 1300–1914. Cambridge University Press.
- Irvin-Erickson, D. (2016). Raphael Lemkin and the concept of genocide. University of Pennsylvania Press.
- Jacobsen, M. (2001). Diaries of a Danish missionary: Harpoot, 1907–1919 (K. Vardanyan, Trans.). Gomidas Institute.
- Jernazian, E. K. (1990). Judgment unto truth: Witnessing the Armenian genocide (A. Haigazian, Trans.). Transaction Publishers.
- Kaiser, H. (2010). The extermination of Armenians in the Diarbekir region. Libra Books.
- Kansu, A. (1997). The revolution of 1908 in Turkey. Brill.
- Karpat, K. H. (1985). Ottoman population, 1830–1914: Demographic and social characteristics. University of Wisconsin Press.
- Kasaba, R. (1988). The Ottoman Empire and the world economy: The nineteenth century. State University of New York Press.
- Kayalı, H. (1997). Arabs and Young Turks: Ottomanism, Arabism, and Islamism in the Ottoman Empire, 1908–1918. University of California Press.
- Kennan, G. F. (1993). The other Balkan Wars: A 1913 Carnegie Endowment inquiry in retrospect. Carnegie Endowment for International Peace.
- Kevorkian, R. H., & Paboudjian, P. B. (1992). Les Arméniens dans l’Empire Ottoman à la veille du génocide. Editions d’Art et d’Histoire.
- Kévorkian, R. (2011). The Armenian genocide: A complete history. I.B. Tauris.
- Keyder, Ç. (1987). State and class in Turkey: A study in capitalist development. Verso.
- Kieser, H. L. (2018). Talaat Pasha: Father of modern Turkey, architect of genocide. Princeton University Press.
- Kinross, L. (1964). Atatürk: A biography of Mustafa Kemal, father of modern Turkey. William Morrow and Company.
- Kirakossian, A. J. (1992). The British diplomacy and the Armenian question: From the 1830s to 1905. Gomidas Institute.
- Knapp, G. H. (1919). The tragedy of Bitlis. Fleming H. Revell Company.
- Kochavi, A. J. (1998). Prelude to Nuremberg: Allied war crimes policy and the question of punishment. The University of North Carolina Press.
- Korey, W. (2001). An epitaph for Raphael Lemkin. Jacob Blaustein Institute for the Advancement of Human Rights.
- Köroğlu, E. (2007). Ottoman propaganda and Turkish identity: Literature in Turkey during the First World War. I.B. Tauris.
- Krikorian, M. K. (1977). Armenians in the service of the Ottoman Empire, 1860–1908. Routledge & Kegan Paul.
- Kuniholm, B. R. (2014). The origins of the Cold War in the Near East: Great power conflict and diplomacy in Iran, Turkey, and Greece. Princeton University Press.
- Kunzler, J. (1921). Im Lande des Blutes und der Tränen: Erlebnisse in Mesopotamien während des Weltkrieges. Tempel-Verlag.
- Kuper, L. (1981). Genocide: Its political use in the twentieth century. Yale University Press.
- Laycock, J. (2009). Imagining Armenia: Orientalism, ambiguity and intervention, 1879–1925. Manchester University Press.
- LeBlanc, L. J. (1991). The Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide: Fifty years of legal and political action. Kluwer Academic Publishers.
- Lemkin, R. (1944). Axis rule in occupied Europe: Laws of occupation, analysis of government, proposals for redress. Carnegie Endowment for International Peace.
- Lepsius, J. (1897). Armenia and Europe: An indictment. Hodder and Stoughton.
- Levene, M. (2005). Genocide in the age of the nation state: Volume II: The rise of the West and the coming of genocide. I.B. Tauris.
- Lewis, B. (1961). The emergence of modern Turkey. Oxford University Press.
- Libaridian, G. J. (2004). Modern Armenia: People, nation, state. Transaction Publishers.
- Lynch, H. F. B. (1901). Armenia: Travels and studies (Vols. 1–2). Longmans, Green, and Co.
- Macfie, A. L. (1998). The end of the Ottoman Empire, 1908–1923. Longman.
- Maksudyan, N. (2005). Orphans and destitute children in the late Ottoman Empire. Syracuse University Press.
- Mango, A. (2000). Atatürk: The biography of the founder of modern Turkey. Overlook Press.
- Mann, M. (2005). The dark side of democracy: Explaining ethnic cleansing. Cambridge University Press.
- Marashlian, L. (1991). Politics and demography: Armenians, Turks, and Kurds in the Ottoman Empire. Zoryan Institute.
- Marchand, P., & Perrier, B. (2015). Comprendre le génocide des Arméniens: 1915–2015. Éditions du Seuil.
- Mardiganian, A. (1918). Ravished Armenia: The story of Aurora Mardiganian, the Christian girl, who survived the great massacres. Kingfield Press.
- Marutyan, H. (2009). Iconography of Armenian identity: The memory of genocide and the Karabagh movement. Center for the Study of Religion and Society.
- Mazower, M. (2000). The Balkans: A short history. Modern Library.
- McCarthy, J. (1995). Death and exile: The ethnic cleansing of Ottoman Muslims, 1821–1922. Darwin Press.
- McMeekin, S. (2015). The Ottoman endgame: War, revolution, and the making of the modern Middle East, 1908–1923. Penguin Books.
- Melkonian, E. (2010). The demographic consequences of the Armenian genocide. Armenian Review, 52(1), 27–49.
- Melson, R. (1992). Revolution and genocide: On the origins of the Armenian genocide and the Holocaust. University of Chicago Press.
- Meron, T. (1998). War crimes law comes of age: Essays. Oxford University Press.
- Midlarsky, M. I. (2005). The killing trap: Genocide in the twentieth century. Cambridge University Press.
- Miller, D. E., & Miller, L. T. (1993). Survivors: An oral history of the Armenian genocide. University of California Press.
- Minassian, A. T. (2007). Histoires croisées: Diaspora, Arménie, Transcaucasie, 1880–1990. Éditions Parenthèses.
- Minassian, O. (2006). Spatial politics and memory: The erasure of Armenian heritage in Anatolia. Journal of Historical Geography, 32(4), 412–435.
- Minow, M. (1998). Between vengeance and forgiveness: Facing history after genocide and mass violence. Beacon Press.
- Missakian, J. (1950). A searchlight on the Armenian Question (1878–1950). Hairenik Press.
- Montgomery, A. E. (1972). The making of the Treaty of Sèvres of 10 August 1920. The Historical Journal, 15(4), 775–787.
- Moranian, S. E. (1994). The American financial connection and the Armenian genocide: The role of life insurance policies. Armenian Review, 47(1), 35–62.
- Morgenthau, H. (1918). Ambassador Morgenthau’s story. Doubleday, Page & Company.
- Morris, B., & Ze’evi, D. (2019). The thirty-year genocide: Turkey’s destruction of its Christian minorities, 1894–1924. Harvard University Press.
- Moses, A. D. (2010). Raphael Lemkin, culture, and the concept of genocide. In D. Bloxham & A. D. Moses (Eds.), The Oxford handbook of genocide studies (pp. 19–41). Oxford University Press.
- Moumdjian, G. E. (2012). Building a modern state on the ashes of empire: Young Turk demographic engineering. Journal of the Society for Armenian Studies, 21, 143–168.
- Mouradian, K. (2021). The resistance network: The Armenian genocide and humanitarianism in Ottoman Syria, 1915–1918. Michigan State University Press.
- Naimark, N. M. (2001). Fires of hatred: Ethnic cleansing in twentieth-century Europe. Harvard University Press.
- Nalbandian, L. (1963). The Armenian revolutionary movement: The development of Armenian political parties through the nineteenth century. University of California Press.
- Nansen, F. (1928). Armenia and the Near East. Duffield & Company.
- Nersessian, D. L. (2010). Continuity and change in the international law of genocide: 1948 and beyond. Cambridge University Press.
- Niepage, M. (1917). The horrors of Aleppo: Seen by a German eyewitness. T. Fisher Unwin.
- Nogales, R. de. (1926). Four years beneath the crescent (M. Lee, Trans.). Charles Scribner’s Sons.
- Ökçün, A. G. (1970). 1909–1930 yılları arasında Türkiye’de anonim şirketler. Sevinç Matbaası.
- Ohandjanian, A. (1988). Österreich-Armenien 1872–1936: Faksimilesammlung diplomatischer Aktenstücke. Ohandjanian Verlag.
- Ormanian, M. (1911). The Church of Armenia: Her history, doctrine, rule, discipline, liturgy, literature, and existing condition (G. M. Gregory, Trans.). A. R. Mowbray & Co.
- Pamboukian, Y. (2003). The Armenian Question and the Armenian Revolutionary Federation documents. Armenian Cultural Association.
- Pamuk, Ş. (2000). A monetary history of the Ottoman Empire. Cambridge University Press.
- Panossian, R. (2006). The Armenians: From kings and priests to merchants and commissars. Columbia University Press.
- Pattie, S. R. (1997). Faith in history: Armenians rebuilding community. Smithsonian Institution Press.
- Paul, R. A. (2000). Grassroots mobilization and diaspora politics: The case of the Armenian-American community. Ethnic and Racial Studies, 23(1), 112–134.
- Payaslian, S. (2007). The history of Armenia: From the origins to the present. Palgrave Macmillan.
- Peterson, M. B. (2002). The limits of absolute destruction: Regional variation and provincial dynamics in the Ottoman Empire during World War I. Journal of Historical Sociology, 15(3), 321–348.
- Power, S. (2002). “A problem from hell”: America and the age of genocide. Basic Books.
- Psomiades, A. E. (2000). The Eastern Question: The last phase: A study in Greek-Turkish diplomacy. Pella Publishing Company.
- Quataert, D. (2005). The Ottoman Empire, 1700–1922 (2nd ed.). Cambridge University Press.
- Quigley, J. (2006). The Genocide Convention: An international law analysis. Ashgate Publishing.
- Reynolds, M. A. (2011). Shattering empires: The clash and collapse of the Ottoman and Russian Empires 1908–1918. Cambridge University Press.
- Riggs, H. H. (1997). Days of tragedy in Armenia: Personal experiences in Harpoot, 1915–1917. Gomidas Institute.
- Robertson, G. (2014). An inconvenient genocide: Who now remembers the Armenians? Biteback Publishing.
- Rodogno, D. (2012). Against massacre: Humanitarian interventions in the Ottoman Empire, 1815–1914. Princeton University Press.
- Rogan, E. (2015). The fall of the Ottomans: The Great War in the Middle East. Basic Books.
- Rothberg, M. (2009). Multidirectional memory: Remembering the Holocaust in the age of decolonization. Stanford University Press.
- Rummel, R. J. (1994). Death by government: Genocide and mass murder since 1900. Transaction Publishers.
- Sadat, L. N. (2002). The International Criminal Court and the transformation of international law: Global justice and the challenge of state sovereignty. Transnational Publishers.
- Safarian, A. (2016). The Special Organization (Teşkilat-ı Mahsusa) and its role in the Armenian Genocide. Diaspora Studies, 9(2), 112–128.
- Safran, W. (1991). Diasporas in modern societies: Myths of homeland and return. Diaspora: A Journal of Transnational Studies, 1(1), 83–99.
- Sahakian, A. (1966). The heroic defense of Urfa: Documents and testimonies. Armenian Cultural Association.
- Salt, J. (1993). Imperialism, evangelism and the Ottoman Armenians, 1878–1896. Frank Cass.
- Sands, P. (2016). East West Street: On the origins of “genocide” and “crimes against humanity”. Alfred A. Knopf.
- Sarafian, A. (2004). The Ottoman archives and the Armenian genocide: The issue of the abandoned property. Haigazian Armenological Review, 24, 233–244.
- Sarkissian, A. O. (1938). History of the Armenian question to 1885. University of Illinois Press.
- Schabas, W. A. (2009). Genocide in international law: The crime of crimes. Cambridge University Press.
- Scharf, M. P. (1997). Balkan justice: The story behind the first international war crimes trial since Nuremberg. Rowman & Littlefield.
- Schwegel, A. (1915). Austro-Hungarian consular reports on the Armenian massacres. Austrian State Archives.
- Segesser, D. M., & Gessler, M. (2005). Raphael Lemkin and the international debate on the punishment of war crimes (1872–1948). Journal of Genocide Research, 7(4), 453–468.
- Semelin, J. (2007). Purify and destroy: The political uses of massacre and genocide (C. Schoch, Trans.). Columbia University Press.
- Shain, Y. (2007). Kinship and diasporas in international politics. University of Michigan Press.
- Shaw, M. (2007). What is genocide? Polity Press.
- Shaw, S. J., & Shaw, E. K. (1977). History of the Ottoman Empire and modern Turkey: Volume 2, Reform, revolution, and republic: The rise of modern Turkey 1808–1975. Cambridge University Press.
- Shemmassian, D. (2003). The League of Nations and the reclamation of Armenian women and children, 1920–1927. In R. G. Hovannisian (Ed.), Looking backward, moving forward: Confronting the Armenian genocide (pp. 81–112). Transaction Publishers.
- Shiragian, A. (1976). The legacy: Memoirs of an Armenian patriot (S. Shiragian, Trans.). Hairenik Press.
- Shirinian, G. N. (Ed.). (2017). Genocide in the Ottoman Empire: Armenians, Assyrians, and Greeks, 1913–1923. Berghahn Books.
- Simpson, G. (2007). Law, war and crime: War crimes, trials and the reinvention of international law. Polity Press.
- Skran, C. M. (1995). Refugees in inter-war Europe: The emergence of a regime. Oxford University Press.
- Smith, A. D. (1998). Nationalism and modernism: A critical survey of recent theories of nations and nationalism. Routledge.
- Sohrabi, N. (2011). Revolution and constitutionalism in the Ottoman Empire and Iran. Cambridge University Press.
- Somakian, M. J. (1995). Empires in conflict: Armenia and the great powers, 1895–1920. I.B. Tauris.
- Sonyel, S. R. (1987). The Ottoman Armenians: Victims of great power diplomacy. K. Rustem & Brother.
- Staub, E. (1989). The roots of evil: The origins of genocide and other group violence. Cambridge University Press.
- Stoddard, P. H. (1963). The Ottoman government and the Arabs, 1911 to 1918: A preliminary study of the Teşkilât-ı Mahsusa. Princeton University Press.
- Strachan, H. (2001). The First World War: Volume I: To arms. Oxford University Press.
- Straus, S. (2007). Second-generation comparative research on genocide. World Politics, 59(3), 476–501.
- Stuermer, H. (1917). Two war years in Constantinople: Sketches of German and Young Turkish ethics and politics (E. Allen & H. Stuermer, Trans.). George H. Doran Company.
- Suciyan, T. (2015). The Armenians in modern Turkey: Post-genocide society, politics and history. I.B. Tauris.
- Sunga, L. S. (1992). Individual responsibility in international law for serious human rights violations. Martinus Nijhoff Publishers.
- Suny, R. G. (2015). “They can live in the desert but nowhere else”: A history of the Armenian genocide. Princeton University Press.
- Suny, R. G., Göçek, F. M., & Naimark, N. M. (Eds.). (2011). A question of genocide: Armenians and Turks at the end of the Ottoman Empire. Oxford University Press.
- Tachjian, V. (2009). Gender, nationalism, embodiment: The Turkish state and Armenian children, 1915–1923. In S. R. Pattie (Ed.), Armenian women in a changing world (pp. 45–68). Armenian Institute.
- Tashjian, J. H. (1965). The Armenian American in World War II. Hairenik Association.
- Tatz, C. (2003). With intent to destroy: Reflecting on genocide. Verso.
- Tehlirian, S. (1953). Recollections: The trial of Talaat Pasha (V. Yeghiayan, Ed.). Gomidas Institute.
- Ter-Minassian, A. (1984). Nationalism and socialism in the Armenian revolutionary movement (1887–1912). The Zoryan Institute.
- Ternon, Y. (1981). Les Arméniens: Histoire d’un génocide. Éditions du Seuil.
- Tölölyan, K. (1996). Rethinking diaspora(s): Stateless power in the transnational moment. Diaspora: A Journal of Transnational Studies, 5(1), 3–36.
- Toprak, Z. (1982). Türkiye’de “Milli İktisat” (1908–1918). Yurt Yayınları.
- Toriguian, S. (1988). The Armenian Question and international law (2nd ed.). UCHR.
- Torossian, J. (1947). From the ashes of Cilicia: An eyewitness account of the massacres. Columbia University Press.
- Totten, S. (Ed.). (2008). The prevention and intervention of genocide: An annotated bibliography. Transaction Publishers.
- Toynbee, A. J. (1915). Armenian atrocities: The murder of a nation. Hodder and Stoughton.
- Trumpener, U. (1968). Germany and the Ottoman Empire, 1914–1918. Princeton University Press.
- Turfan, M. N. (2000). Rise of the Young Turks: Politics, the military and Ottoman collapse. I.B. Tauris.
- Tutu, D. (1999). No future without forgiveness. Doubleday.
- Üngör, U. Ü. (2011). The making of modern Turkey: Nation and state in Eastern Anatolia, 1913–1950. Oxford University Press.
- Üngör, U. Ü., & Polatel, M. (2011). Confiscation and destruction: The Young Turk seizure of Armenian property. Continuum.
- Ussher, C. D. (1917). An American physician in Turkey: A narrative of adventures in peace and in war. Houghton Mifflin Company.
- Valentino, B. A. (2004). Final solutions: Mass killing and genocide in the twentieth century. Cornell University Press.
- Varandian, M. (1926). History of the Dashnaktsutiun. Hairenik Press.
- Verdeja, E. (2009). Unchopping a tree: Reconciliation in the aftermath of evil. Temple University Press.
- Volkan, V. D. (2001). Transgenerational transmissions and chosen traumas: An aspect of large-group identity. Group Analysis, 34(1), 79–97.
- Walder, D. (1969). The Chanak affair. Macmillan.
- Walker, C. J. (1990). Armenia: The survival of a nation (2nd ed.). St. Martin’s Press.
- Ward, M. H. (1923). The deportations in Asia Minor, 1921–1922: A personal narrative. Anglo-Hellenic League.
- Wasti, S. T. (1996). The last chroniclers of the Mabeyn. Middle Eastern Studies, 32(2), 261–273.
- Watenpaugh, K. D. (2010). The League of Nations’ rescue of Armenian genocide survivors and the making of modern humanitarianism, 1920–1927. The American Historical Review, 115(5), 1315–1339.
- Wegner, A. T. (1919). Der Weg ohne Heimkehr: Ein Martyrium in Briefen. Der Neue Geist-Verlag.
- Weiss-Wendt, A. (2008). The Soviet Union and the gutting of the UN Genocide Convention. Journal of Genocide Research, 10(2), 253–277.
- Werfel, F. (1933). Die vierzig Tage des Musa Dagh. Paul Zsolnay Verlag.
- Willis, J. F. (1982). Prologue to Nuremberg: The politics and diplomacy of punishing First World War criminal acts. Greenwood Press.
- Yervant, J. M. (1988). Needle, thread and shovel: The diary of an Armenian boy who survived the genocide. Gomidas Institute.
- Zarakolu, R. (2011). Freedom of expression in Turkey and the Armenian Question. Belge Publishing.
- Zeidner, R. F. (2005). The tricolor over the Taurus: The French in Cilicia and vicinity, 1918–1922. Türk Tarih Kurumu.
- Zürcher, E. J. (2004). Turkey: A modern history (3rd ed.). I.B. Tauris.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

