সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) – খণ্ড ১: ধারণা, মতাদর্শ, সংগঠন ও আচরণ
ভূমিকা
মানব সভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতার উপস্থিতি নতুন কিছু নয়, তবে সেই সহিংসতা যখন কোনো বৈধ সামরিক রণাঙ্গনের সীমানা পেরিয়ে ভীতি সঞ্চারের পরিকল্পিত হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা রূপ নেয় সন্ত্রাসবাদ (Terrorism)-এ। আধুনিক বিশ্বে এই প্রত্যয়টি প্রতিদিনের রাজনৈতিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক সংবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। অথচ একে বুঝতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেগী প্রতিক্রিয়া, পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা তাৎক্ষণিক আতঙ্কের ওপর নির্ভর করা হয়। সংঘাতের এই জটিল রূপকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হলে প্রয়োজন এর শিকড়ে প্রবেশ করা – যেখানে কাজ করে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতা (Political Violence), জটিল দার্শনিক যুক্তি এবং মানুষের মনের গহীনে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভ। কোনো মানুষ এক মুহূর্তে কিংবা কোনো পূর্বাপর প্রেক্ষাপট ছাড়া হঠাৎ নিজের শরীরে বিস্ফোরক বেঁধে জনবহুল বাজারে প্রবেশ করে না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত মতাদর্শিক দীক্ষা (Ideological Indoctrination) এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার এক নিবিড় কার্যকারণ সম্পর্ক।
সন্ত্রাসবাদকে কেবল কিছু বিপথগামী ব্যক্তির বেআইনি তৎপরতা হিসেবে দেখলে এর আসল চরিত্রটি আড়ালেই থেকে যায়। বাস্তবে এটি হলো দুর্বল পক্ষের দ্বারা ব্যবহৃত এক অত্যন্ত পরিকল্পিত অসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare)। যখন কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রচলিত সামরিক শক্তিতে সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাথে পেরে ওঠে না, তখন তারা ভয় ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাতকে অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। এই প্রক্রিয়ায় শারীরিক ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র; তাদের চূড়ান্ত নিশানা থাকে সমাজের মনস্তত্ত্ব, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং বিশ্ব জনমতের গতিপথ পরিবর্তন করা। ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল যুগের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর রূপ, ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক স্লোগান বদলেছে বটে, তবে সমাজকে স্তব্ধ করে নিজের উদ্দেশ্য আদায়ের মৌলিক সমীকরণটি সবসময় একই রয়ে গেছে।
এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাসবাদের সেই ভিত্তিমূলকে ব্যবচ্ছেদ করা, যার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে হিংস্রতার নানা বয়ান। অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্র জাতীয়তাবাদ কিংবা চরমপন্থী বিপ্লবী মতবাদ কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের ভেতরে অন্যকে শত্রু ভাবার বিষাক্ত বীজ বপন করে, সেই প্রক্রিয়াটি অনুধাবন করা জরুরি। এই রূপান্তরকে সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় র্যাডিক্যালাইজেশন (Radicalization)। চরমপন্থার এই পথে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তার জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয় এক কাল্পনিক ও আপসহীন মুক্তির স্বপ্ন।
একই সাথে সহিংস গোষ্ঠীগুলোর সাংগঠনিক গতিশীলতা (Organizational Dynamics) এবং তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব কাঠামোর বোঝাপড়া ছাড়া এই সংকটের গভীরতা স্পর্শ করা অসম্ভব। গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড সেল থেকে শুরু করে আধুনিক বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক – প্রতিটি কাঠামোর পেছনেই রয়েছে টিকে থাকা এবং আক্রমণ পরিচালনার নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। সন্ত্রাসবাদের জন্ম, মতাদর্শের বিকাশ, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি এবং সহিংসতার পেছনের মনস্তত্ত্বকে কোনো পূর্বধারণা বা ভাবাবেগ ছাড়া একটি বস্তুনিষ্ঠ, নির্মোহ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরীক্ষণ করাই এই পর্বের মূল অন্বেষণ।
সন্ত্রাসবাদের ধারণা ও বিবর্তন (Concepts and Evolution of Terrorism): সংজ্ঞা, ইতিহাস ও তাত্ত্বিক ভিত্তি
সন্ত্রাসবাদের পরিচয় (Introduction to Terrorism): ধারণা ও পরিধি
সন্ত্রাসবাদের আভিধানিক ও প্রায়োগিক অর্থ (Lexical and Practical Meaning of Terrorism)
মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে সংঘাতের নানাবিধ রূপ দেখা যায়। মানুষ তার স্বার্থ, ক্ষমতা কিংবা বিশ্বাসের জন্য যুগে যুগে অস্ত্রের ব্যবহার করেছে। তবে সব সংঘাত বা রক্তপাতকে এক কাতারে ফেলা যায় না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ভয় জাগিয়ে তোলার যে সুপরিকল্পিত কৌশল, তাকেই আমরা আজ সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) বলে জানি। শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন আলাপে এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে, এর পেছনের ঐতিহাসিক বিবর্তন আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না। ফরাসি শব্দ ‘তেররিসম’ (Terrorisme) থেকে এর উৎপত্তি। আঠারো শতকের শেষভাগে ফরাসি বিপ্লবের ঠিক পরের সময়টায় এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার শুরু হয়। তখন এর অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ওপর বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখত, সেই আইনি ও রাষ্ট্রীয় শাসনকেই বলা হতো সন্ত্রাস। ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত চলা ফরাসি বিপ্লবের সেই অস্থির সময়টি ইতিহাসে সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror) নামে পরিচিত।
সেই সময়ের ফরাসি সরকার রাষ্ট্রদ্রোহীদের দমন করার জন্য প্রকাশ্যে গিলোটিনে মাথা কেটে ফেলার যে উৎসব শুরু করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। বিখ্যাত আইরিশ চিন্তাবিদ ও রাজনীতিক এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke) ১৭৯৫ সালে তার একটি লেখায় ফরাসি বিপ্লবের এই সহিংস রূপকে বর্ণনা করতে গিয়ে এই শব্দটির প্রয়োগ করেছিলেন (Hoffman, 2006)। তিনি এই শাসনব্যবস্থাকে একটি স্বৈরাচারী রূপ হিসেবে দেখেছিলেন। আঠারো শতকে যা ছিল রাষ্ট্রের একটি শাসন প্রক্রিয়া, একুশ শতকে এসে তা পুরোপুরি উল্টে গেছে। আজকের দিনে আমরা রাষ্ট্র-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ডকেই এই পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করে থাকি। ভাষার এই বিবর্তন আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে সাথে শব্দের অর্থ কীভাবে তার খোলস পাল্টায়। রাষ্ট্র একসময় যাকে নিজের আইনি অধিকার বলে দাবি করত, আজ সেটিকেই সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে শব্দটির অর্থে বড় ধরনের বাঁকবদল ঘটে। ইতালিয়ান বিপ্লবী কার্লো পিসাকানে প্রথম তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান, যেখানে তিনি প্রচার করেন যে, কেবল লিফলেট বিলি করে বা বক্তৃতা দিয়ে বিপ্লব আনা সম্ভব নয়। তার মতে, একটি সহিংস কাজ হাজারটা শব্দের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই ধারণাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন কাজের মাধ্যমে প্রচার (Propaganda by Deed)। এই তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকেই পরবর্তীতে রাশিয়ার নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো জার সরকারের বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যার পথ বেছে নেয়। তারা নিজেদের অত্যন্ত গর্বের সাথে ‘সন্ত্রাসী’ বলে পরিচয় দিত। কারণ তাদের কাছে এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি মহৎ ভাষা। বর্তমান যুগে কোনো গোষ্ঠী নিজেদের এই নামে ডাকে না। তারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতাকামী কিংবা বিপ্লবী বলে দাবি করে। সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড র্যাপোফোর্ট (David Rapoport) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক সন্ত্রাসবাদের এই বিবর্তন কয়েকটি নির্দিষ্ট তরঙ্গের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, যা আমরা ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেই দেখতে পাই (Rapoport, 2004)।
ভয় ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের রাজনীতি (The Politics of Fear and Psychological Impact)
সহিংসতার যতগুলো ধরন পৃথিবীতে আছে, তার মধ্যে এই বিশেষ ধরনটি সবচেয়ে আলাদা তার মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। সাধারণ যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করাই প্রধান লক্ষ্য থাকে। এখানে ব্যাপারটি ভিন্ন। একটি বোমা বিস্ফোরণে হয়তো দশজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, কিন্তু এর আসল লক্ষ্য সেই দশজন মানুষ নয়। আসল লক্ষ্য হলো সেই কোটি কোটি মানুষ, যারা টেলিভিশনের পর্দায় বা খবরের কাগজে সেই ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখবে। বিখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রায়ান জেনকিন্স (Brian Jenkins) ১৯৭৫ সালে একটি খুব চমৎকার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “সন্ত্রাসীরা অনেক মানুষের মৃত্যু চায় না, তারা চায় অনেক মানুষ তাদের দেখুক” (Jenkins, 1975)। অর্থাৎ, এটি একধরনের চরম সহিংস নাটক, যার উদ্দেশ্য দর্শকদের মনে চিরস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করা।
ভয় মানুষের সবচেয়ে আদিম ও শক্তিশালী আবেগ। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এই আবেগকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তা খুব ভালো করেই জানে। একটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে যখন কোনো আত্মঘাতী হামলা হয়, তখন কেবল কয়েকটি ভবন বা মানুষেরই ক্ষতি হয় না; সেই শহরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যায়। মানুষ বাসে উঠতে ভয় পায়, বাজারে যেতে দ্বিধা করে, এমনকি নিজের ঘরের ভেতরও একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এই যে জনমনে একটা অস্থিতিশীলতা তৈরি হলো, এটিই হলো এই গোষ্ঠীগুলোর প্রাথমিক বিজয়। তারা প্রমাণ করতে চায় যে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare) সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন করে তোলে। মানুষ তখন নিজেদের সুরক্ষার জন্য সরকারের কাছে কঠিন ও অনেক সময় অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ দাবি করে বসে।
এই মনস্তাত্ত্বিক খেলার আরেকটি দিক হলো নিজেদের শক্তি সম্পর্কে একটি অতিকায় ধারণা তৈরি করা। একটি ছোট, দুর্বল গোষ্ঠী যখন বিশাল শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্রের ওপর আঘাত হানে, তখন তারা প্রচার করতে চায় যে তারা অজেয়। তারা চায় রাষ্ট্র যেন রাগের বশবর্তী হয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। সরকার যখন ভয় পেয়ে পুরো একটি এলাকার মানুষের ওপর ধরপাকড় শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ জন্ম নেয়। এই ক্ষোভকে পুঁজি করেই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের দলে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে। সমাজবিজ্ঞানে একে সহিংসতার থিয়েটার (Theater of Violence) বলা হয়ে থাকে। এখানে প্রতিটি রক্তপাত, প্রতিটি বিস্ফোরণ একেকটি বার্তা। সেই বার্তার ভাষা বুঝতে না পারলে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক মহামারির মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সন্ত্রাসবাদ বনাম স্বাধীনতা সংগ্রাম (Terrorism versus Freedom Struggle)
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল এবং অমীমাংসিত বিতর্কগুলোর একটি হলো একটি সহিংস কাজকে কখন সন্ত্রাস বলা হবে আর কখন স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা হবে। আমরা প্রায়ই একটি প্রবাদ শুনে থাকি, “একের কাছে যে সন্ত্রাসী, অন্যের কাছে সে-ই মুক্তিযোদ্ধা”। এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরম স্বার্থপরতা ও সংজ্ঞায়নের সংকট। জাতিসংঘ দশকের পর দশক ধরে চেষ্টা করেও সর্বজনীন একটি আইনি সংজ্ঞায় পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, যে রাষ্ট্রগুলো এই সংজ্ঞা তৈরি করবে, তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের নেতা ইয়াসির আরাফাত (Yasser Arafat) ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন যে, যে ব্যক্তি একটি ন্যায়সঙ্গত কারণের জন্য লড়াই করে এবং আক্রমণকারীদের হাত থেকে নিজের ভূমি মুক্ত করতে চায়, তাকে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী বলা যায় না।
ইতিহাসের দিকে তাকালে এই বিতর্কের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে যারা নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্ত হামলা চালাত, মিত্রবাহিনীর কাছে তারা ছিল সাহসী প্রতিরোধ যোদ্ধা। অন্যদিকে জার্মানির চোখে তারা ছিল ভয়ংকর সন্ত্রাসী। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে যে সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছিল, ব্রিটিশ সরকার তাকে সন্ত্রাসী তৎপরতা হিসেবেই নথিবদ্ধ করেছিল। সূর্য সেন বা ভগৎ সিংহের মতো বিপ্লবীদের ব্রিটিশ আইনে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। অথচ ভারত বা বাংলার ইতিহাসে তারা পরম পূজনীয় জাতীয় বীর। একটি রাষ্ট্র যখন তার নিজের সীমানার ভেতর কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়ন চালায়, তখন তারা সেই গোষ্ঠীকে উগ্রবাদী তকমা দেয়। আবার অন্য কোনো রাষ্ট্র হয়তো নিজেদের স্বার্থে সেই একই গোষ্ঠীকে লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে তাদের স্বাধীনতাকামী বলে স্বীকৃতি দেয়। এই দ্বিচারিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষাবিদ ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Inside Terrorism-এ এই ধারণাগত জটিলতার ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, কোনো গোষ্ঠী নিজেদের কখনোই নেতিবাচক শব্দ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে না। তারা নিজেদের দেশপ্রেমিক, মুক্তিদাতা বা ঈশ্বরের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দেয়। কারণ তাদের কাজের একটি নৈতিক বৈধতা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্র চায় তার বিরোধীদের সব ধরনের আইনি ও নৈতিক অধিকার কেড়ে নিতে। তাই রাষ্ট্র খুব সহজেই একটি অবমাননাকর লেবেল সেঁটে দেয়। একটি কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ভর করে কে সেই কাজের বিচার করছে তার ওপর। তবে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণ নিরপরাধ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা হয় না। উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক না কেন, নিরস্ত্র মানুষের ওপর সুপরিকল্পিত হামলাকে কোনো আইনি বা নৈতিক কাঠামোতেই বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রীয় বনাম অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস (State versus Non-State Terrorism)
সাধারণ আলোচনায় আমরা যখন এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু গোপন আস্তানা, অস্ত্রধারী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী অথবা ধর্মীয় চরমপন্থী সংগঠন। পত্রিকা বা টেলিভিশনের কল্যাণে আমরা এই চিত্রটিতেই সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু এর একটি বিশাল ও ভয়ংকর রূপ অনেক সময় আমাদের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো রাষ্ট্রের নিজস্ব সহিংসতা। একটি রাষ্ট্র যখন তার পুলিশ, সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে তার নাগরিকদের ওপর ভীতি প্রদর্শন করে, তখন তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ (State Terrorism) বলা হয়। তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রের হাতে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সেই আইনি সীমানা অতিক্রম করে রাজনৈতিক বিরোধীদের গুম করে, বিনা বিচারে হত্যা করে কিংবা গোপন কারাগারে নির্যাতন চালায়, তখন তা সাধারণ অপরাধী গোষ্ঠীর সহিংসতার চেয়ে কোনো অংশে কম হয় না।
বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) সবসময় এই বিষয়টি নিয়ে সরব থেকেছেন। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের সুবিধামতো একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছে, যেখানে কেবল অ-রাষ্ট্রীয় কুশীলবদের কাজকেই অপরাধ হিসেবে ধরা হয় (Chomsky, 2001)। বৃহৎ পরাশক্তিগুলো যখন অন্য দেশের সরকার পতনের জন্য প্রক্সি যুদ্ধ চালায়, ড্রোন হামলার মাধ্যমে বিয়ের অনুষ্ঠান বা স্কুলে বোমা ফেলে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ মারে, তখন সেগুলোকে ‘সম্পার্শ্বিক ক্ষতি’ বা কোল্যাটারাল ড্যামেজ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। চমস্কি প্রশ্ন তুলেছেন, একটি রাষ্ট্র যখন কাঠামোগতভাবে অন্য একটি ভূখণ্ডের মানুষের ওপর মাসের পর মাস অবরোধ দিয়ে রাখে, তাদের চিকিৎসা ও খাদ্য থেকে বঞ্চিত করে, সেটি কেন আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হিটলারের জার্মানি, স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা লাতিন আমেরিকার সামরিক জান্তা সরকারগুলো তাদের নিজস্ব নাগরিকদের ওপর যে মাত্রায় দমন-পীড়ন চালিয়েছে, তা যেকোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর ধ্বংসযজ্ঞকে হার মানায়।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর দিয়ে যখন এই ধরনের কাজ পরিচালিত হয়, তখন তার বিচার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র নিজেই আইন তৈরি করে এবং নিজেই বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক স্বৈরতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদ (Authoritarianism) ভিত্তিক রাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার ধোঁয়া তুলে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়। ভিন্নমত পোষণকারী সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার মিথ্যা মামলায় আটকে রাখা হয়। সমাজবিজ্ঞানী ও শান্তি গবেষকরা একে কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। সাধারণ একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী লুকোচুরি করে হামলা চালায়, তাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন তার পুরো আমলাতন্ত্র ও সামরিক শক্তি নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠী বা বিরোধী দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তার ধ্বংস ক্ষমতা হয় অসীম। তাই এই বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন করতে হলে অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর পাশাপাশি রাষ্ট্রের আচরণকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে।
পরিধি ও আধুনিক যুগে এর বিস্তৃতি (Global Sphere and the Expansion of Modern Terrorism)
আগেকার দিনে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকত। তাদের দাবিদাওয়া ছিল স্পষ্ট – হয় তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাইত, নয়তো নির্দিষ্ট কোনো নীতির পরিবর্তন দাবি করত। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা স্পেনের ইটিএ-এর মতো সংগঠনগুলোর দিকে তাকালে আমরা এমনটাই দেখতে পাই। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আর ঘটনা কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে আটকে নেই। প্রযুক্তি এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে এটি একটি বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। ঐতিহাসিক ওয়াল্টার লাকুর (Walter Laqueur) তার গবেষণা গ্রন্থ The New Terrorism: Fanaticism and the Arms of Mass Destruction-এ দেখিয়েছেন কীভাবে প্রথাগত সংগঠনের জায়গা দখল করেছে সীমানাবিহীন বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কগুলো (Laqueur, 1999)। এই নতুন রূপটিকে তাত্ত্বিকরা নব সন্ত্রাসবাদ (New Terrorism) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আধুনিক যুগে একটি বড় পরিবর্তনের জায়গা হলো প্রযুক্তির অভাবনীয় ব্যবহার। একসময় হামলার ছক কষতে গোপন বৈঠক করতে হতো, এখন ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েবে বসেই মহাদেশ পাড়ি দিয়ে অপারেশনের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছে সদস্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনে যোগ না দিয়েও, কেবল অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন সাধারণ মানুষ নিজের দেশে একাই বড় ধরনের হামলা করে বসতে পারে। এদেরকে ‘লোন উলফ’ বা একাকী নেকড়ে বলা হয়। এছাড়া আধুনিক যুগে সাইবার সন্ত্রাসবাদ (Cyber Terrorism) একটি বিশাল হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন আর কোনো দেশের ক্ষতি করার জন্য বোমা মারার প্রয়োজন নেই। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ বা হাসপাতালের নেটওয়ার্ক বিকল করে দিয়ে পুরো দেশকে অচল করে দেওয়া সম্ভব।
বিশ্বায়ন (Globalization) মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি ধ্বংসের পথকেও করেছে মসৃণ। অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখন আর কেবল ডাকাতি বা চাঁদাবাজির ওপর নির্ভর করতে হয় না। ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি টাকা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি রাসায়নিক বা জৈব অস্ত্র সাধারণ চরমপন্থীদের হাতে পড়ার একটা প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ল্যাবরেটরিতে তৈরি কোনো মারণ ভাইরাস যদি কোনো জনবহুল শহরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তার ফলাফল হবে প্রথাগত বোমার চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি ভয়াবহ। আধুনিক এই বিস্তৃতির ফলে প্রচলিত সামরিক বাহিনী বা পুলিশ দিয়ে এই ধরনের হুমকি মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিধি এতটা বিস্তৃত হয়েছে যে, এর শিকড় এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে, অর্থনীতিতে এবং সাইবার স্পেসে ছড়িয়ে আছে।
সন্ত্রাসবাদ অধ্যয়নের তাত্ত্বিক কাঠামো (Theoretical Framework of Terrorism Studies)
সমাজবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন কেন কিছু মানুষ স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে এমন একটি ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয়। এটি কি স্রেফ মানুষের সহজাত আগ্রাসন, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো যুক্তিবাদী হিসাব-নিকাশ কাজ করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তত্ত্বের সাহায্য নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি ধারণা হলো যুক্তিবাদী পছন্দ তত্ত্ব (Rational Choice Theory)। প্রখ্যাত গবেষক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) তার কাজগুলোতে দেখিয়েছেন যে, আমরা অনেক সময় চরমপন্থীদের পাগলাটে বা মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে উড়িয়ে দিই, যা আসলে সত্য নয় (Crenshaw, 1981)। তার মতে, রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো যখন দেখে যে বৈধ পথে বা শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের দাবি আদায় করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না, তখন তারা খুব হিসাব কষে, লাভ-ক্ষতির অঙ্ক মিলিয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেয়। এটি তাদের জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরেক দল তাত্ত্বিক বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন লেন্স দিয়ে দেখেন। তারা নির্মাণবাদ (Constructivism) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করেন যে কীভাবে মানুষের পরিচয় এবং বিশ্বাস তাকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। একটি সমাজে যখন দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য বিরাজ করে, যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ক্রমাগত প্রান্তিক করে রাখা হয়, তখন তাদের মধ্যে একটি তীব্র বঞ্চনাবোধ তৈরি হয়। তারা নিজেদেরকে একটি বৃহত্তর ‘আমরা বনাম তারা’ আখ্যানে আটকে ফেলে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম বা অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে এবং তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তারা যেকোনো মাত্রার সহিংসতাকে নিজেদের কাছে বৈধ বলে মনে করে। এখানে বস্তুগত লাভের চেয়ে আদর্শিক বা আত্মপরিচয়ের সংকট অনেক বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
এই তাত্ত্বিক কাঠামোগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কোনো মানুষ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ করে হাতে অস্ত্র তুলে নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, কাঠামোগত নিপীড়ন, মগজধোলাই এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের এক জটিল প্রক্রিয়া। মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদরা আবার এর জন্য বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও অর্থনৈতিক শোষণকে দায়ী করেন। তাদের মতে, সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলোর সাম্রাজ্যবাদী নীতিই দরিদ্র দেশগুলোতে ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে উগ্রবাদে রূপ নেয়। একটি নির্দিষ্ট লেন্স দিয়ে এই বিশাল সমস্যার পুরোটা দেখা সম্ভব নয়। এর রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক – সবগুলো দিক সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বহুমাত্রিক তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে কোনোভাবেই এর মোকাবেলায় কার্যকরী ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব নয়।
সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা ও ধারণাগত বিতর্ক (Definitions and Conceptual Challenges of Terrorism): ব্যাখ্যার জটিলতা
সংজ্ঞায়নের বৈশ্বিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক প্রভাব (The Global Vacuum of Definition and Political Influence)
খুন, ডাকাতি বা চুরির মতো অপরাধগুলোর একটি সর্বজনীন আইনি সংজ্ঞা রয়েছে, যা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সমানভাবে প্রযোজ্য। চুরি বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা নিয়ে আমেরিকার আদালতের সাথে জাপানের আদালতের খুব একটা মতবিরোধ নেই। রাজনৈতিক সহিংসতার বেলাতে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল ধাঁধাগুলোর একটি হলো এমন একটি সংজ্ঞা দাঁড় করানো, যা সব রাষ্ট্র বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবে। দশক পেরিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। এর প্রধান কারণ নিহিত আছে শব্দটির নিজস্ব রাজনৈতিক ওজনের মধ্যে। সাধারণ অপরাধীরা নিজেদের অপরাধী বলে স্বীকার করে নিলেও, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী কখনোই নিজেদের গায়ে এই ধ্বংসাত্মক তকমা মাখতে চায় না। তারা নিজেদের কাজের পেছনে নানা রকম আদর্শিক ও নৈতিক যুক্তি দাঁড় করায়, যা সংজ্ঞায়নের আইনি কাজটিকে অসম্ভব করে তোলে।
শব্দটির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির গায়ে একবার এই তকমা লাগিয়ে দিতে পারলে, তাদের দাবিদাওয়ার সমস্ত রাজনৈতিক বৈধতা মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। রাষ্ট্রগুলো খুব সুকৌশলে তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের দমন করার জন্য এই লেবেলটি ব্যবহার করে থাকে। একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার তার দেশের সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকেও এই শব্দের মোড়কে পেঁচিয়ে কঠোর হাতে দমন করতে পারে। প্রখ্যাত বিশ্লেষক ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তার কাজগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতার সমীকরণ শব্দটির অর্থ নির্ধারণ করে দেয় (Hoffman, 2006)। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী একই ঘটনাকে বিভিন্ন নামে ডাকে। মিত্র দেশের কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে তারা হয়তো স্বাধীনতাকামী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, আবার শত্রু দেশের ঠিক একই রকম বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে তারা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে।
এই চরম আপেক্ষিকতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকার কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আইনি সহযোগিতা ব্যাহত হয়। ধরা যাক, একটি দেশের নাগরিক রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটিয়ে অন্য একটি দেশে আশ্রয় নিল। দ্বিতীয় দেশটি যদি মনে করে যে সেই ব্যক্তির কাজগুলো কোনো অপরাধ নয় বরং ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সংগ্রাম, তবে তারা প্রথম দেশের কাছে সেই ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানাবে। সংজ্ঞার এই অস্পষ্টতা অপরাধীদের জন্য একধরনের আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করে দেয়। তাত্ত্বিকরা মনে করেন, একটি সর্বজনীন কাঠামোর অনুপস্থিতি আসলে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর জন্য লাভজনক। কারণ সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকলে তাদের নিজেদের অনেক সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতাও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হবে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই এই সংজ্ঞায়নের বিতর্কটিকে জিইয়ে রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের আইনি সংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক মতভেদ (Legal Struggles in the United Nations and International Dissent)
বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ফোরাম হিসেবে জাতিসংঘের ওপর একটি সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণের বিশাল দায় রয়েছে। আশির দশকের পর থেকে সাধারণ পরিষদে এই নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছিল ১৯৯৬ সালে, যখন ভারতের পক্ষ থেকে সার্বিক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সনদ (Comprehensive Convention on International Terrorism) বা সিসিআইটি-এর একটি খসড়া প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল সারা বিশ্বের জন্য একটি একক ও আইনিভাবে বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি করা। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল হয়তো এবার একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। আলোচনার টেবিলে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তীব্র মতভেদ প্রকাশ করতে শুরু করে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনা চললেও এই সনদটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।
মতভেদের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মূলত উন্নত পশ্চিমা বিশ্ব এবং উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি ছিল, যেকোনো পরিস্থিতিতে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো হামলাকে নিঃশর্তভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এখানে হামলাকারীর উদ্দেশ্য বা পেছনের কারণ বিবেচনার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসি-ভুক্ত দেশগুলো এবং গ্লোবাল সাউথের অনেক রাষ্ট্র এই ঢালাও সংজ্ঞার ঘোর বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল, ভিনদেশি শক্তির দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করা যেকোনো জাতির একটি বৈধ অধিকার। তারা জাতীয় মুক্তি আন্দোলন (National Liberation Movements) এবং সাধারণ উগ্রবাদী হামলার মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানার দাবি জানায়। এই দেশগুলোর মতে, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য যে সশস্ত্র সংগ্রাম, তাকে কোনোভাবেই অপরাধের কাতারে ফেলা উচিত নয়।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান (Kofi Annan) ২০০৫ সালে এই অচলাবস্থা ভাঙার একটি জোরালো চেষ্টা করেছিলেন। তিনি একটি উচ্চ-পর্যায়ের প্যানেল গঠন করে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, রাজনৈতিক বা আদর্শিক কারণ যা-ই থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটানো বা তাদের গুরুতর আহত করার উদ্দেশ্য নিয়ে করা যেকোনো কাজকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে (Annan, 2005)। তার এই প্রস্তাবটি ছিল কাজের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে একটি বস্তুনিষ্ঠ কাঠামোর রূপরেখা। এরপরও সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব এই প্রস্তাবটিকে সর্বসম্মতভাবে পাস হতে দেয়নি। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কৌশলগত মিত্রদের রক্ষা করতে এবং নিজেদের সামরিক অভিযানগুলোকে সংজ্ঞার বাইরে রাখতে এতটাই তৎপর যে, জাতিসংঘের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানও এই ধারণাগত গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার কোনো পরিষ্কার পথ আজ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি।
একাডেমিক পরিসরে সংজ্ঞার ব্যবচ্ছেদ (Dissecting the Definition in the Academic Sphere)
রাজনীতিবিদ এবং কূটনীতিকরা যখন সংজ্ঞার প্রশ্নে বিভক্ত, তখন সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের গবেষকরা বিষয়টিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নেন। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর পক্ষ না নিয়ে, বরং সহিংসতার ধরন ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে ডাচ পণ্ডিত অ্যালেক্স শ্মিড (Alex Schmid) এবং অ্যালবার্ট ইয়ংম্যান (Albert Jongman) একটি যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনা করেন (Schmid & Jongman, 1988)। তারা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সরকারি নথিপত্র থেকে ১০৯টি ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা সংগ্রহ করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এতগুলো সংজ্ঞার মধ্যে কোনো সাধারণ যোগসূত্র বা উপাদান আছে কি না, তা খুঁজে বের করা। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে তারা কয়েকটি নির্দিষ্ট উপাদানের সন্ধান পান, যা প্রায় প্রতিটি সংজ্ঞাতেই কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত ছিল।
তাদের গবেষণায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো সহিংসতার ব্যবহার অথবা সহিংসতা ব্যবহারের হুমকি। সংগৃহীত সংজ্ঞাগুলোর ৮৩ শতাংশের মধ্যেই এই উপাদানটি ছিল। এরপর ৬৫ শতাংশ সংজ্ঞায় ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা আর্থিক লাভের জন্য করা সহিংসতা এই হিসাবের বাইরে থাকবে। গবেষকরা আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কথা উল্লেখ করেন, যাকে তারা মনস্তাত্ত্বিক বাধ্যবাধকতা (Psychological Coercion) বলে আখ্যা দেন। এর মানে দাঁড়ায়, হামলার শিকার হওয়া ব্যক্তিটি এখানে আসল লক্ষ্য নয়; আসল লক্ষ্য হলো সেই ঘটনার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনে একটি স্থায়ী ভীতির জন্ম দেওয়া। সমাজবিজ্ঞানীরা একে একটি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও দেখেন, যেখানে বোমার শব্দ আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই গবেষণার মাধ্যমে একাডেমিক মহলে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে, উদ্দেশ্যবিহীন রক্তপাত আর সুপরিকল্পিত ভীতির রাজনীতির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
একাডেমিক পরিসরে আরেকটি বড় বিতর্কের জায়গা হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। অনেক গবেষক মনে করেন, সংজ্ঞাটি কেবল অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কারণ রাষ্ট্রকে যুক্ত করলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরো কাঠামোটিই নড়বড়ে হয়ে যাবে। ভিন্নমতাবলম্বী গবেষকদের একটি বড় অংশ এই ধারণার তীব্র সমালোচনা করেন। তাদের মতে, একটি রাষ্ট্র যখন নিজের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিতভাবে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শাসন টিকিয়ে রাখে, তখন তাকে সংজ্ঞার বাইরে রাখা চরম ভণ্ডামি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভেতরে রাষ্ট্রের হাতে থাকা পুলিশ বা আধা-সামরিক বাহিনী সাধারণ চরমপন্থীদের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একাডেমিক সংজ্ঞায় রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী – উভয়ের আচরণকেই অন্তর্ভুক্ত করার দাবিটি দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে, যা তাত্ত্বিক বিতর্ককে আরও এক ধাপ উসকে দিয়েছে।
গেরিলা যুদ্ধ বনাম সন্ত্রাসবাদ: সীমারেখার অস্পষ্টতা (Guerrilla Warfare vs Terrorism: The Blurring of Boundaries)
রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন রূপের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় ভূগোলের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ মাপার মতো সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে গেরিলা যুদ্ধ এবং গুপ্ত উগ্রবাদী হামলার মধ্যে সীমারেখা টানা অত্যন্ত কঠিন একটি তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। ঐতিহ্যগতভাবে গেরিলা যোদ্ধারা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। তারা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর মতো পোশাক পরে, প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করে এবং সাধারণত রাষ্ট্রের সামরিক বা পুলিশ বাহিনীকেই তাদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। চীনা বিপ্লবী নেতা মাও সে-তুং (Mao Zedong) গ্রামীণ গেরিলা যুদ্ধের যে ধ্রুপদী তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, সেখানে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। মাওয়ের মতে, সাধারণ মানুষ হলো জলের মতো, আর গেরিলারা হলো সেই জলে সাঁতার কাটা মাছ। তাই সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করা তাদের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।
অন্যদিকে, সাধারণ উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড থাকে না। তারা সমাজের সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকে এবং হঠাৎ করে জনবহুল কোনো স্থানে হামলা চালিয়ে আবার লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নয়, বরং নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিক। তবে বাস্তবে এই দুটি আলাদা ধারার মধ্যে অনেক সময় সংমিশ্রণ ঘটে যায়। ষাটের দশকে ব্রাজিলিয়ান তাত্ত্বিক কার্লোস মারিঘেলা (Carlos Marighella) তার বিখ্যাত রচনা Minimanual of the Urban Guerrilla-তে এমন এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, যা এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্যকে প্রায় মুছে দেয় (Marighella, 1969)। তিনি গ্রামীণ এলাকা ছেড়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে গুপ্ত হামলা, ব্যাংক ডাকাতি এবং সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার ডাক দেন। তার এই তত্ত্ব ল্যাটিন আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপের অনেক গোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
বাস্তব ময়দানে আমরা অনেক সংগঠনকে দেখি যারা একই সাথে এই দুই ধরনের কৌশলই অবলম্বন করে। উদাহরণ হিসেবে কলম্বিয়ার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর কথা বলা যায়। তারা জঙ্গলের গভীরে রীতিমতো সামরিক ক্যাম্প তৈরি করে প্রথাগত গেরিলা স্টাইলে সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছে। আবার সেই একই গোষ্ঠী শহরের ভেতরে গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, যা স্পষ্টতই চরমপন্থী আচরণের লক্ষণ। এ ধরনের দ্বিমুখী কৌশল ব্যবহার করার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ফ্রেমে আটকে ফেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। গবেষকরা যখন কোনো গোষ্ঠীর কার্যকলাপ মূল্যায়ন করতে যান, তখন এই কৌশলগত ওভারল্যাপ বা উপরিপাতন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ধারণাগত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি গোষ্ঠী সকালে গেরিলা এবং বিকেলে সন্ত্রাসী আচরণ করলে তাকে আইনি ও তাত্ত্বিক পরিভাষায় কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট উত্তর আজ অবধি পাওয়া যায়নি।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক সহিংসতার পার্থক্য (Distinguishing Criminal Activities and Political Violence)
একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বা মাফিয়া গ্রুপও তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য চরম সহিংসতার আশ্রয় নেয়, ভয় দেখায় এবং অনেক সময় রাষ্ট্রের আইনের তোয়াক্কা করে না। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি মাফিয়া গ্যাংয়ের কার্যকলাপ এবং একটি উগ্রবাদী সেলের কার্যকলাপের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাত্ত্বিকরা এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য স্বার্থের প্রকৃতি (Nature of Interest)-এর ওপর জোর দেন। অপরাধী চক্রগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে আর্থিক মুনাফা অর্জন। তারা মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি বা চোরাচালানের মাধ্যমে নিজেদের সাম্রাজ্য বড় করতে চায়। তাদের কোনো আদর্শিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, অপরাধীরা মনোযোগ এড়াতে চায়। তারা চায় রাষ্ট্র ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যেন তাদের দিকে নজর না দেয়।
এর বিপরীতে, আদর্শিক সহিংস গোষ্ঠীগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে সমাজের রাজনৈতিক বা কাঠামোগত পরিবর্তন। তারা চায় গোটা বিশ্বের মনোযোগ তাদের দিকে আকৃষ্ট হোক। তাদের প্রতিটি হামলার পেছনে কোনো না কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার লুকানো থাকে। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই সুস্পষ্ট পার্থক্যটি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। গবেষক তামারা মাকারেঙ্কো (Tamara Makarenko) তার তাত্ত্বিক মডেলে একটি নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছেন, যাকে তিনি অপরাধ-সন্ত্রাস কন্টিনুয়াম (Crime-Terror Continuum) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Makarenko, 2004)। তার মতে, বর্তমানে অপরাধী চক্র এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো দুটি আলাদা মেরুতে অবস্থান করছে না, বরং তারা একে অপরের কাছ থেকে শিখছে এবং অনেক ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করছে। একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী তাদের সংগঠনের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য যখন মাদক চোরাচালান বা অপহরণের মতো খাঁটি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মূল চরিত্রটি বদলাতে শুরু করে।
ল্যাটিন আমেরিকা বা পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে দেখা গেছে যে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো একসময় শুধু রাজনৈতিক আদর্শের জন্য লড়লেও, পরবর্তীতে তারা নিজেরাই বিশাল মাদক পাচারকারী চক্রে পরিণত হয়েছে। তাদের কাছে আদর্শের চেয়ে অর্থের জোগান দেওয়াটাই একসময় মুখ্য হয়ে ওঠে। আবার অনেক সময় প্রথাগত অপরাধী চক্রগুলো নিজেদের আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচাতে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ বা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে, যাতে রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী বিদ্রোহীদের দমনে ব্যস্ত থাকে এবং অপরাধীরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা চালাতে পারে। এই যে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সাধারণ অপরাধের মধ্যে একটি আন্তঃসংযুক্ত ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র তৈরি হয়েছে, তা আইনি সংজ্ঞায়নের সীমানাকে আরও বেশি ঘোলাটে করে তুলেছে। একটি গোষ্ঠীকে কখন রাজনৈতিক বিদ্রোহী বলা হবে আর কখন নিছক অপরাধী সিন্ডিকেট বলা হবে, তা নির্ধারণ করা আইনপ্রণেতাদের জন্য রীতিমতো এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বস্তুনিষ্ঠ শ্রেণিবিন্যাসের তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা (Theoretical Attempts at Objective Categorization)
এতসব রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক জটিলতার মধ্যে কিছু সমাজবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করেছেন। তারা মনে করেন, কে হামলা করছে বা কেন হামলা করছে – এই প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে, কেবল হামলার শিকার কারা হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে একটি সংজ্ঞা তৈরি করা উচিত। এই ধারণাটি অভিনেতা-নিরপেক্ষ সংজ্ঞা (Actor-Neutral Definition) নামে পরিচিত। এখানে রাষ্ট্র, স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী বা ধর্মীয় চরমপন্থী – সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। দার্শনিক ইগর প্রিমোরাজ (Igor Primoratz) এই ধারণার অন্যতম কট্টর সমর্থক। তিনি নৈতিকতার জায়গা থেকে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষের ওপর যে সহিংসতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা কোনো অবস্থাতেই নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে না (Primoratz, 1990)। তার এই তাত্ত্বিক অবস্থানটি “একের সন্ত্রাসী অন্যের মুক্তিযোদ্ধা” নামক বহুল প্রচলিত রাজনৈতিক প্রবাদটিকে সরাসরি বাতিল করে দেয়।
এই বস্তুনিষ্ঠ শ্রেণিবিন্যাসের আরেকটি বড় ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন বা জেনেভা কনভেনশন। যুদ্ধে লিপ্ত দুটি দেশের সেনাবাহিনী যখন একে অপরের সাথে লড়াই করে, তখন কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। কোনো দেশ চাইলেই অপর দেশের স্কুল, হাসপাতাল বা সাধারণ নাগরিকদের ওপর ইচ্ছেমতো বোমা ফেলতে পারে না। একে আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক তাত্ত্বিক প্রস্তাব করেছেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুপ্ত হামলাগুলোকে শান্তির সময়ের যুদ্ধাপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য (Equivalent to War Crimes) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, একটি গোষ্ঠী যত মহৎ আদর্শ নিয়েই লড়াই করুক না কেন, তারা যদি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তবে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই কাঠামোটি গ্রহণ করা হলে আদর্শ বা রাজনৈতিক এজেন্ডার ধোঁয়াশা কেটে যায়।
যদিও এই বস্তুনিষ্ঠ কাঠামোটি তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত নিখুঁত মনে হয়, বাস্তব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি প্রয়োগ করা সমানভাবে কঠিন। পরাশক্তিগুলো কখনোই এমন কোনো সংজ্ঞায় স্বাক্ষর করতে রাজি হবে না, যা ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের সামরিক বা গোয়েন্দা কার্যক্রমকে যুদ্ধাপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। ড্রোন হামলার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে হত্যা করতে গিয়ে যখন চারপাশের অনেক সাধারণ মানুষ মারা যায়, তখন রাষ্ট্র তাকে দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞার মানদণ্ডে বিচার করলে সেই রাষ্ট্রকেও আইনি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংজ্ঞায়নের এই ধারণাগত বিতর্কটি তাই কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি সরাসরি বৈশ্বিক ক্ষমতা, ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সাথে সম্পর্কিত। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলো তাদের সংকীর্ণ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যাখ্যার এই জটিল গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস (History of Terrorism): প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগ
প্রাচীন যুগের গুপ্তঘাতক: সিকারি ও জিলট (Ancient Assassins: Sicarii and Zealots)
রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনমনে ভীতি সঞ্চার করার কৌশল কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়। মানব ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, প্রাচীন সমাজেও সুসংগঠিত গোষ্ঠীগুলো নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য গুপ্তহত্যার আশ্রয় নিত। প্রথম শতাব্দীর রোমান সাম্রাজ্যের দিকে তাকালে আমরা এমন একটি গোষ্ঠীর সন্ধান পাই, যাদের অনেকেই আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতার আদি রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। রোমানরা যখন জুডিয়া বা বর্তমান ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন অঞ্চল দখল করে নেয়, তখন স্থানীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর চরম করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। রোমান সাম্রাজ্যের বিশাল সামরিক শক্তির সামনে সরাসরি যুদ্ধ করে জয়লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এই বাস্তবতায় জন্ম নেয় জিলট (Zealots) নামক একটি কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা রোমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দেয়। তাদেরই একটি চরমপন্থী শাখা ইতিহাসে সিকারি (Sicarii) নামে পরিচিতি লাভ করে।
সিকারি শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সিকা’ থেকে, যার অর্থ ছোট ছোরা বা গুপ্তঘাতকের খঞ্জর। রোমান ঐতিহাসিক ফ্লেভিয়াস জোসেফাস (Flavius Josephus) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Jewish War-এ এই গোষ্ঠীর কার্যপ্রণালীর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন (Josephus, 1981)। তারা কোনো প্রথাগত সেনাবাহিনী ছিল না। তারা লোকালয়ে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকত এবং উৎসবের দিনগুলোতে যখন জেরুজালেমের রাস্তায় প্রবল ভিড় জমতো, তখন তারা তাদের পোশাকের নিচে লুকিয়ে রাখা খঞ্জর দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে হত্যা করত। হত্যার পরপরই তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে গলা মিলিয়ে চিৎকার শুরু করত, যাতে কেউ তাদের সন্দেহ করতে না পারে। তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু কেবল রোমান সেনাপতিরাই ছিল না, বরং যেসব ইহুদি অভিজাত শ্রেণি রোমানদের সাথে আঁতাত করে চলত, তাদেরও তারা নির্মমভাবে হত্যা করত।
জোসেফাসের বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, সিকারিদের এই কৌশলটি ছিল পুরোপুরি একটি অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare)-এর ধরণ। বিশাল রোমান লিজিয়নের সাথে সম্মুখ সমরে না গিয়ে তারা রোমান প্রশাসন ও তাদের সহযোগীদের মনে একটি চিরস্থায়ী আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিল। তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে রোমানরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের সুরক্ষিত শহরের ভেতরেও কেউ নিরাপদ নয়। রোমান সাম্রাজ্যের মতো একটি প্রতাপশালী শক্তির বিরুদ্ধে এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বেশ কয়েক বছর সফলভাবেই পরিচালিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ৭৩ খ্রিস্টাব্দে মাসাদা নামক দুর্গে রোমান বাহিনীর দীর্ঘ অবরোধের পর সিকারি বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ না করে গণ-আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার লাকুর (Walter Laqueur) তার লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, সিকারিদের এই প্রতিরোধ সংগ্রাম প্রাচীনকালের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ, যেখানে দুর্বল প্রতিপক্ষ ভীতির রাজনীতিকে নিজেদের টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল (Laqueur, 2001)।
মধ্যযুগের হাশাশিন ও গোপন সম্প্রদায় (The Hashashins and Secret Societies of the Middle Ages)
প্রাচীন যুগের গণ্ডি পেরিয়ে মধ্যযুগে প্রবেশ করলে আমরা রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার আরেকটি সুসংগঠিত ও ভয়ংকর রূপ দেখতে পাই। একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে পারস্য ও সিরিয়া অঞ্চলে এমন একটি গোপন সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটে, যাদের নাম শুনলে তৎকালীন পরাক্রমশালী শাসকরাও শিউরে উঠতেন। এরা ইতিহাসে হাশাশিন (Hashashins) নামে পরিচিত। ইংরেজিতে রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা বোঝাতে যে ‘অ্যাসাসিনেশন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তা এই হাশাশিন শব্দ থেকেই এসেছে। এই গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হাসান-ই-সাবাহ, যিনি ১০৯০ সালে পারস্যের আলবুরজ পর্বতমালার একটি দুর্গম পাহাড় চূড়ায় আলামুত দুর্গ দখল করেন। তিনি ছিলেন শিয়া ইসলামের ইসমাইলি সম্প্রদায়ের একটি নির্দিষ্ট উপশাখা, যাদের নিজারি ইসমাইলি (Nizari Ismaili) বলা হতো, তার অবিসংবাদিত নেতা। সেলজুক সাম্রাজ্যের বিশাল সুন্নি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তিনি একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী যুদ্ধকৌশল আবিষ্কার করেন।
প্রখ্যাত মধ্যপ্রাচ্য বিশারদ বার্নার্ড লুইস (Bernard Lewis) তার সাড়া জাগানো গবেষণা The Assassins: A Radical Sect in Islam-এ দেখিয়েছেন কীভাবে হাসান-ই-সাবাহ তার অনুসারীদের একটি অপ্রতিরোধ্য গুপ্তঘাতক বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন (Lewis, 1967)। হাশাশিনদের কোনো বড় সেনাবাহিনী ছিল না, তাদের কোনো সাম্রাজ্য বিস্তারেরও ইচ্ছা ছিল ইচ্ছা ছিল না। তাদের কৌশল ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী, সেনাপতি এবং পরবর্তীতে ক্রুসেডার নেতাদের বেছে বেছে হত্যা করা। তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিজয় ছিল ১০৯২ সালে সেলজুক সাম্রাজ্যের ক্ষমতাধর উজির নিজাম আল-মুলককে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা। এই একটি হত্যাকাণ্ড পুরো সেলজুক প্রশাসনে যে পরিমাণ বিশৃঙ্খলা ও ভীতি তৈরি করেছিল, তা হাজার হাজার সৈন্যের মুখোমুখি যুদ্ধেও সম্ভব হতো না। তারা তাদের লক্ষ্যবস্তুকে এমনভাবে হত্যা করত যেন তা সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেয়।
হাশাশিনদের কার্যপ্রণালীতে মনস্তাত্ত্বিক বাধ্যবাধকতা (Psychological Coercion) একটি বড় ভূমিকা পালন করত। তারা অনেক সময় তাদের শত্রুদের সরাসরি হত্যা করত না, বরং রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রাসাদে ঢুকে শাসকের বালিশের পাশে একটি খঞ্জর বা হুমকি লেখা চিরকুট রেখে আসত। সকালে ঘুম থেকে উঠে শাসক যখন বুঝতে পারতেন যে মৃত্যু তার শয়নকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন এবং হাশাশিনদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হতেন। যারা এই গুপ্তহত্যার মিশনগুলো পরিচালনা করত, তাদের বলা হতো ‘ফিদাই‘ বা আত্মোৎসর্গকারী। তারা জানত যে মিশন সফল করার পর তাদের নিজেদের বেঁচে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবুও তারা হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিত। ১২৫৬ সালে মোঙ্গল বাহিনীর হাতে আলামুত দুর্গ ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ বছর ধরে হাশাশিনরা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের এই রাজনৈতিক ভীতির রাজত্ব কায়েম রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
ফরাসি বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের রূপান্তর (The French Revolution and the Transformation of State Terror)
ইতিহাসের টাইমলাইন ধরে আঠারো শতকের ইউরোপে পৌঁছালে শব্দটির অর্থের একটি বড় ধরনের পালাবদল দেখতে পাওয়া যায়। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে যে যুগান্তকারী ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার একটি নতুন সমাজ গড়ে তোলা। বিপ্লবের কয়েক বছর পরই ফ্রান্স এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। চারদিক থেকে বিদেশি শক্তির আক্রমণ এবং দেশের ভেতরে প্রতিবিপ্লবীদের ষড়যন্ত্র ফরাসি প্রজাতন্ত্রকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেয়। এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ১৭৯৩ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে জ্যাকোবিন (Jacobin) নামক একটি কট্টর রাজনৈতিক গোষ্ঠী। তাদের নেতা ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবোস্পিয়ার (Maximilien Robespierre) প্রজাতন্ত্র রক্ষার নামে এমন এক শাসনব্যবস্থা চালু করেন, যা ইতিহাসে সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror) নামে কুখ্যাতি অর্জন করে।
ইতিহাসবিদ ডেভিড আন্ড্রেস (David Andress) তার The Terror: The Merciless War for Freedom in Revolutionary France বইতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে বিপ্লবের নামে রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই একটি ভয়ংকর ঘাতক বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল (Andress, 2006)। রোবোস্পিয়ারের মতে, প্রজাতন্ত্রের শত্রুদের দমন করার জন্য ভীতির ব্যবহার কেবল বৈধই নয়, বরং অত্যাবশ্যক। তিনি জননিরাপত্তা কমিটি বা ‘কমিটি অফ পাবলিক সেফটি’ গঠন করেন, যার কাজ ছিল সন্দেহভাজন যে কাউকে বিনা বিচারে বা নামমাত্র বিচারে গিলোটিনে পাঠিয়ে দেওয়া। গিলোটিন নামক শিরশ্ছেদ করার যন্ত্রটি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের পরম ক্ষমতার প্রতীক। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এমনকি বিপ্লবের একসময়ের নায়কদেরও প্রকাশ্যে গিলোটিনে মাথা কেটে ফেলা হয়।
এই সময়টিতেই আধুনিক বিশ্বে প্রথম বারের মতো ‘টেররিসম’ শব্দটির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার শুরু হয়। তবে আজকের দিনের মতো এটি তখন কোনো গোপন বিরোধী গোষ্ঠীর কাজ ছিল না। এটি ছিল পুরোপুরি আইনি কাঠামোর ভেতরে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ (State Terrorism)। ফরাসি সরকার অত্যন্ত গর্বের সাথে এই শব্দটি ব্যবহার করত তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা বোঝানোর জন্য। এক বছরের কিছু বেশি সময় ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে যখন রোবোস্পিয়ার নিজেই গিলোটিনের শিকার হন, তখন এই ভীতির রাজত্বের অবসান ঘটে। এরপর থেকেই শব্দটি তার আগের ইতিবাচক বা আইনি অর্থ হারিয়ে ফেলে এবং একটি নেতিবাচক রূপ ধারণ করে। ফরাসি বিপ্লবের এই অধ্যায়টি আমাদের শেখায় যে, একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য লাগামহীন বলপ্রয়োগ করে, তখন তার ধ্বংস ক্ষমতা যেকোনো গোপন উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চেয়ে বহুগুণ বেশি হয়।
উনিশ শতকের নৈরাজ্যবাদ ও গুপ্তহত্যার রাজনীতি (Nineteenth-Century Anarchism and the Politics of Assassination)
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপ ও রাশিয়ায় শিল্প বিপ্লবের ফলে সমাজকাঠামোতে এক বিশাল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। একদিকে পুঁজিবাদের অভাবনীয় বিকাশ, অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণির চরম বঞ্চনা – এই দুইয়ের সংঘাতে এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়, যাকে নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) বলা হয়। রাশিয়ান চিন্তাবিদ মিখাইল বাকুনিন (Mikhail Bakunin) ছিলেন এই দর্শনের অন্যতম রূপকার। তিনি বিশ্বাস করতেন যে রাষ্ট্র, ধর্ম এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি – এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই মানুষকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল বিনাশ ছাড়া মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করতেন। নৈরাজ্যবাদীরা বুঝতে পেরেছিল যে কেবল বই লিখে বা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে এই বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরাসরি আঘাত।
এই চিন্তাধারা থেকেই জন্ম নেয় কাজের মাধ্যমে প্রচার (Propaganda by Deed) নামক একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক কৌশল। নৈরাজ্যবাদীরা মনে করত, একজন অত্যাচারী রাজা বা রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করলে তা সাধারণ মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার করবে এবং একটি বিশাল গণ-অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করবে। ১৮৭৮ সালে রাশিয়ায় গড়ে ওঠে নারোদনায়া ভোলিয়া (Narodnaya Volya) বা ‘জনগণের ইচ্ছা’ নামক একটি গোপন বিপ্লবী সংগঠন। ব্রিটিশ বিশ্লেষক পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) তারPolitical Terrorism গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে এই গোষ্ঠীটি আধুনিক গুপ্তহত্যার রূপরেখা তৈরি করেছিল (Wilkinson, 1974)। তাদের সবচেয়ে বড় টার্গেট ছিলেন স্বয়ং রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার। কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর ১৮৮১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায় বোমা ছুঁড়ে জারকে হত্যা করতে তারা সক্ষম হয়।
এই সময়টাতে বিজ্ঞানের একটি নতুন আবিষ্কার রাজনৈতিক সহিংসতার হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি পাল্টে দেয়। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেন, যা খুব সহজেই বহনযোগ্য বোমায় রূপান্তর করা যেত। আগে কাউকে হত্যা করতে হলে গুপ্তঘাতককে খুব কাছে যেতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ডিনামাইট হাতে আসার পর নৈরাজ্যবাদীরা দূর থেকে জনবহুল স্থানে বা কোনো সরকারি ভবনে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হয়। ১৮৯০-এর দশক থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকায় নৈরাজ্যবাদীরা অসংখ্য রাষ্ট্রপ্রধান, রাজা এবং রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করে। তারা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করত না, বরং রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাদের এই গুপ্তহত্যার রাজনীতি কোনো গণ-অভ্যুত্থান আনতে না পারলেও, এটি আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতার একটি স্থায়ী সাংগঠনিক মডেল দাঁড় করিয়ে দিয়ে যায়।
বিংশ শতাব্দীর জাতীয়তাবাদী ও অ্যান্টি-কলোনিয়াল সংগ্রাম (Twentieth-Century Nationalist and Anti-Colonial Struggles)
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। শত শত বছর ধরে চলা ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর ঔপনিবেশিক শাসন দুর্বল হতে শুরু করে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরাধীন জাতিগুলো নিজেদের স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায় জাতীয়তাবাদ (Nationalism) এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ (Separatism)। তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফ্রান্তজ ফানোঁ (Frantz Fanon) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ The Wretched of the Earth-এ এই উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রাম (Anti-Colonial Struggle)-এর একটি মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন (Fanon, 1963)। ফানোঁ যুক্তি দেন যে, উপনিবেশবাদীরা যেহেতু কাঠামোগত সহিংসতার মাধ্যমে একটি জাতিকে দাস বানিয়ে রাখে, তাই সেই দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য পরাধীন মানুষের সহিংস হয়ে ওঠা কেবল স্বাভাবিকই নয়, বরং মানসিকভাবে নিরাময়মূলক।
এই তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে ফ্রন্ট ডি লিবারেশন ন্যাশনাল বা এফএলএন (FLN) তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা ১৯৫০-এর দশকে আলজিয়ার্স শহরের কেন্দ্রস্থলে ক্যাফে, বাজার এবং বাসস্ট্যান্ডগুলোতে বোমা হামলা শুরু করে, যেখানে ফরাসি নাগরিকরা বেশি যাতায়াত করত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফরাসি সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া যে আলজেরিয়া তাদের জন্য আর নিরাপদ নয়। একই সময়ে ইউরোপের বুকে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা আইআরএ (IRA) ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ এবং গুপ্ত হামলা চালাতে থাকে। তারা প্রমাণ করে যে একটি সুসংগঠিত আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন চাইলে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীরও রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। এই গোষ্ঠীগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার ভেতর তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখত এবং তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল – নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন।
তবে ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে এসে এই গোষ্ঠীগুলো তাদের কৌশল পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এবং তাদের বিভিন্ন কট্টরপন্থী শাখা বুঝতে পারে যে কেবল নিজেদের ভূখণ্ডের ভেতর লড়াই করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। তারা বিমান ছিনতাইয়ের মতো অভিনব কৌশল বেছে নেয়। ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি অ্যাথলেটদের জিম্মি ও হত্যার ঘটনাটি ছিল এই আন্তর্জাতিকীকরণের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। অলিম্পিকের কারণে সেখানে উপস্থিত থাকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শত শত ক্যামেরার সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে যে, পৃথিবীর এক প্রান্তের রাজনৈতিক সংঘাত মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তে কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে।
আধুনিক যুগের ধর্মীয় নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তির ব্যবহার (Modern Era Religious Networks and the Use of Technology)
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে রাজনৈতিক আদর্শ এবং জাতীয়তাবাদের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করতে শুরু করে ধর্মের অপব্যাখ্যাভিত্তিক উগ্রবাদ। ১৯৭৯ সালটিকে এই পরিবর্তনের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। একদিকে ইরানে ইসলামি বিপ্লব, অন্যদিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে পাল্টে দেয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য সারা বিশ্ব থেকে আসা মুজাহিদিনদের যে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীতে সেটিই আল-কায়েদার মতো আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠনের জন্ম দেয়। সমাজবিজ্ঞানী মার্ক জুয়ের্গেন্সমেয়ার (Mark Juergensmeyer) তারTerror in the Mind of Godগ্রন্থে এই নতুন প্রবণতাকে কসমিক যুদ্ধ (Cosmic War) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Juergensmeyer, 2003)। এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, বরং তারা সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাকে নিজেদের বিকৃত বিশ্বাস অনুযায়ী নতুন করে সাজাতে চায়।
২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদার বিমান হামলা আধুনিক ইতিহাসের গতিপথ সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। এটি ছিল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক (Global Network) ভিত্তিক সহিংসতার সবচেয়ে বিধ্বংসী রূপ। এর আগ পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, কয়েকটি সাধারণ বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে একটি পরাশক্তির সামরিক ও অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ডে এতটা নিখুঁত আঘাত হানা সম্ভব। এই হামলার পর আমেরিকা সারা বিশ্বে যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তার ফলে ইরাক ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। আর এই শূন্যতা থেকেই পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএস-এর মতো আরও বেশি নৃশংস গোষ্ঠীর জন্ম হয়। তারা কেবল গুপ্ত হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিশাল একটি ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের খেলাফত ঘোষণা করেছিল, যা ছিল প্রথাগত রাজনৈতিক সহিংসতার ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে।
বর্তমান যুগে এই হুমকির স্বরূপ আরও একবার পরিবর্তিত হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অড্রে কার্থিন ক্রোনিন (Audrey Kurth Cronin) তার How Terrorism Ends গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন আর বড় কোনো আল-কায়েদা বা আইএসআইএস-এর মতো কেন্দ্রীয় কাঠামোর প্রয়োজন নেই (Cronin, 2009)। ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়ানোর সবচেয়ে বড় কারখানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেটে প্রোপাগান্ডা ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে একজন সাধারণ মানুষ একাই বড় ধরনের হামলা করে বসতে পারে। এই একাকী হামলাকারীদের লোন উলফ (Lone Wolf) বলা হয়, যাদের আগে থেকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সাইবার সন্ত্রাসবাদ (Cyber Terrorism)-এর বিশাল ঝুঁকি। এখন আর রক্তপাত না ঘটিয়েও কেবল কম্পিউটারের কয়েকটি কোড ব্যবহার করে একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা ব্যাংক খাতকে অচল করে দেওয়া সম্ভব। প্রাচীনকালের সিকারিদের খঞ্জর থেকে শুরু করে আজকের যুগের সাইবার স্পেস পর্যন্ত এই দীর্ঘ বিবর্তনে কৌশল পাল্টেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করে ফায়দা লোটার সেই আদিম রাজনীতি আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
সন্ত্রাসবাদের তরঙ্গসমূহ (Waves of Terrorism): ধারাবাহিক বিবর্তন
তরঙ্গ তত্ত্বের পটভূমি ও তাত্ত্বিক কাঠামো (Background and Theoretical Framework of the Wave Theory)
রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম কখনোই সরলরেখায় এগোয়নি। নির্দিষ্ট কিছু সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের আদর্শ ও কৌশল নিয়ে একাধিক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে, আবার কয়েক দশক পর সেই আদর্শের আবেদন ফুরিয়ে গেলে গোষ্ঠীগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই চমকপ্রদ প্যাটার্ন বা ধরনটিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রথমবার বিশ্লেষণ করেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডেভিড র্যাপোফোর্ট (David Rapoport)। তিনি ২০০৪ সালে তার এক যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে একটি নতুন তাত্ত্বিক মডেল উপস্থাপন করেন, যা অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে তরঙ্গ তত্ত্ব (Wave Theory) নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। তার মতে, আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক বিবর্তনের অংশ, যা উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত চারটি সুনির্দিষ্ট তরঙ্গের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এই তরঙ্গগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তির প্রভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায় এবং একপর্যায়ে শক্তি হারিয়ে মিলিয়ে যায়।
একটি তরঙ্গের জীবনকাল সাধারণত কত দিন হতে পারে, সে বিষয়ে র্যাপোফোর্ট একটি আকর্ষণীয় সমীকরণ দাঁড় করিয়েছেন। তার গবেষণায় দেখা যায়, প্রথম তিনটি তরঙ্গের প্রতিটি প্রায় চল্লিশ বছর বা একটি মানব প্রজন্মের সমপরিমাণ সময় ধরে স্থায়ী ছিল। একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের তরুণেরা যখন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বঞ্চনা বা আদর্শের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়, তখন তারা একটি নতুন তরঙ্গের জন্ম দেয়। সেই প্রজন্মের বয়স বাড়ার সাথে সাথে, কিংবা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জিত বা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই পুরোনো আদর্শের আর কোনো আবেদন থাকে না। ফলে পুরোনো তরঙ্গের বিলুপ্তি ঘটে এবং সমসাময়িক নতুন কোনো বৈশ্বিক সংকটের হাত ধরে নতুন আরেকটি তরঙ্গের সূচনা হয়। তবে প্রতিটি তরঙ্গ তার নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল, লক্ষ্য এবং সাংগঠনিক কাঠামো রেখে যায়, যা পরবর্তী তরঙ্গের কুশীলবরা নিজেদের প্রয়োজনে আরও উন্নত করে ব্যবহার করে। সহজ করে বললে, কোনো একটি গোষ্ঠীর পতন ঘটলেও তাদের উদ্ভাবিত ধ্বংসাত্মক কৌশলগুলো কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, বরং তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একধরনের ডার্ক ম্যানুয়াল বা অন্ধকার নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক চরিত্র। একটি তরঙ্গ কখনোই একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকে না। যাতায়াত ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে একটি দেশের রাজনৈতিক আদর্শ খুব দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষক মার্ক সেজউইক (Mark Sedgwick) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সফল ঘটনা পৃথিবীর অপর প্রান্তের মানুষকে উজ্জীবিত করে (Sedgwick, 2007)। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ায় জারের বিরুদ্ধে কোনো গুপ্ত হামলা সফল হলে, তা পড়ে স্পেনের বা আমেরিকার কোনো ক্ষুব্ধ তরুণ একই ধরনের হামলার পরিকল্পনা করতে শুরু করে। এই আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ এবং কৌশলগত আদান-প্রদানই একটি সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষোভকে একটি বৈশ্বিক তরঙ্গে রূপান্তরিত করে। র্যাপোফোর্টের এই চার তরঙ্গের মডেলটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কেন নির্দিষ্ট কিছু দশকে পুরো বিশ্বজুড়ে বিমান ছিনতাইয়ের হিড়িক পড়ে যায়, আবার কেন অন্য একটি দশকে আত্মঘাতী বোমারুদের আধিক্য দেখা যায়। সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার গতিপ্রকৃতি অনুধাবনের জন্য এই তাত্ত্বিক লেন্সটি বর্তমানে এক অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম তরঙ্গ: নৈরাজ্যবাদের উত্থান ও গুপ্তহত্যা (The First Wave: Rise of Anarchism and Assassination)
আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতার প্রথম ঢেউটি আছড়ে পড়েছিল উনিশ শতকের শেষভাগে, ১৮৮০-এর দশকে। এই সময়টিতে ইউরোপ ও রাশিয়ায় এক বিশাল আর্থসামাজিক রূপান্তর ঘটছিল। শিল্পবিপ্লবের ফলে একদিকে যেমন সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছিল, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমিক ও কৃষকদের জীবনে নেমে এসেছিল চরম বঞ্চনা। রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জন্ম নেয় এক নতুন উগ্র রাজনৈতিক দর্শন, যার নাম নৈরাজ্যবাদ (Anarchism)। নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করত যে রাষ্ট্রকাঠামো, আইন এবং প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু। রাশিয়ায় জারের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭৮ সালে একদল তরুণ গড়ে তোলে ‘নারোদনায়া ভোলিয়া’ (Narodnaya Volya) বা ‘জনগণের ইচ্ছা’ নামক একটি গোপন সংগঠন। তারা বুঝতে পেরেছিল, শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে প্রচলিত নিয়মে লড়াই করে জেতা সম্ভব নয়। তাই তারা একটি নতুন ধারণার প্রবর্তন করে, যাকে বলা হতো ‘কাজের মাধ্যমে প্রচার’ (Propaganda by Deed)। তাদের দর্শন ছিল অত্যন্ত সহজ – বক্তৃতা বা লিফলেট দিয়ে বিপ্লব হয় না, শাসকশ্রেণির রক্তপাতের মাধ্যমেই কেবল সাধারণ মানুষের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালানো সম্ভব।
এই তরঙ্গের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের কৌশল। তারা সাধারণ নিরপরাধ মানুষের ওপর আক্রমণ করত না। তাদের টার্গেট ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট – রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ প্রধান বা রাজপরিবারের সদস্যরা। তারা মনে করত, একটি অত্যাচারী সরকারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতা সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়বে। ১৮৮১ সালে নারোদনায়া ভোলিয়ার সদস্যরা সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায় বোমা ছুঁড়ে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনাটি পুরো ইউরোপে এক বিশাল ধাক্কা দেয়। গবেষক রিচার্ড জেনসেন (Richard Jensen) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, জারের এই গুপ্তহত্যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের নৈরাজ্যবাদীদের জন্য একটি চরম অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল (Jensen, 2014)। পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী, ইতালির রাজা এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলিও নৈরাজ্যবাদীদের গুপ্তহত্যার শিকার হন।
প্রযুক্তির একটি নতুন আবিষ্কার এই তরঙ্গটিকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করে তুলেছিল। আলফ্রেড নোবেলের আবিষ্কৃত ডিনামাইট এই প্রথম রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছায়। আগে গুপ্তহত্যা করতে হলে খঞ্জর বা রিভলবার নিয়ে লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছে যেতে হতো। ডিনামাইট আসার পর তারা দূর থেকে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। একই সাথে টেলিগ্রাফ এবং সংবাদপত্রের অভাবনীয় প্রসারের কারণে সকাল বেলার কোনো বোমা হামলার খবর বিকেলের মধ্যেই পুরো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ত। গণমাধ্যমের এই মনোযোগ নৈরাজ্যবাদীদের কাছে অক্সিজেনের মতো কাজ করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যায় এবং রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা কমিউনিস্টদের হাতে চলে গেলে এই নৈরাজ্যবাদী তরঙ্গের আবেদন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে। ১৯২০-এর দশকের মধ্যেই প্রথম তরঙ্গটি তার শক্তি হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে যায়, তবে রেখে যায় গুপ্তহত্যা ও বোমা হামলার এক স্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
দ্বিতীয় তরঙ্গ: উপনিবেশবাদ-বিরোধী ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম (The Second Wave: Anti-Colonial and Nationalist Struggles)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন প্রথম তরঙ্গটি স্তিমিত হয়ে আসছে, ঠিক তখনই বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় আরেকটি নতুন অধ্যায়। ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির পর এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ‘জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ’ বা সেলফ-ডিটারমিনেশন ধারণার প্রসারের ফলে পরাধীন জাতিগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। ১৯২০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া এই দ্বিতীয় তরঙ্গটি পরিচালিত হয়েছিল মূলত জাতীয়তাবাদ (Nationalism) এবং উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রাম (Anti-Colonial Struggle)-এর আদর্শকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের মতো বিশাল ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মানুষ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। এই তরঙ্গের কুশীলবরা নিজেদের নৈরাজ্যবাদী বা সন্ত্রাসী বলতে নারাজ ছিল; তারা নিজেদের পরিচয় দিত ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বা স্বাধীনতাকামী হিসেবে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বিদেশি শাসন উৎখাত করে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এই পর্যায়ে এসে কৌশলগত একটি বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রথম তরঙ্গের মতো কেবল একজন বা দুজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে ঔপনিবেশিক শক্তিকে তাড়ানো সম্ভব ছিল না। তাই তারা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি শহরাঞ্চলে গুপ্ত হামলার কৌশল গ্রহণ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশটিকে এমনভাবে অস্থিতিশীল করে তোলা, যাতে সেখানে শাসনকাজ চালানো ঔপনিবেশিক সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রিচার্ড ইংলিশ (Richard English) তার কাজগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে আয়ারল্যান্ডে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা আইআরএ (IRA) এই কৌশলটি নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেছিল (English, 2016)। তারা ব্রিটিশ পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে প্রশাসনকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফিলিস্তিনে ইহুদি আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীগুলো ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ।
দ্বিতীয় তরঙ্গের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি আদায়ের ওপর জোর দিত। উপনিবেশবাদীদের অত্যাচারে তারা কতটা নিপীড়িত হচ্ছে, সেই চিত্র তুলে ধরে তারা জাতিসংঘের মতো নবগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বীকৃতি আদায় করতে চাইত। আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট বা এফএলএন (FLN) তাদের গেরিলা যুদ্ধকে এমনভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উপস্থাপন করেছিল, যা ফরাসি সরকারের ওপর বিশাল কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, র্যাপোফোর্টের চারটি তরঙ্গের মধ্যে এই দ্বিতীয় তরঙ্গটিই সবচেয়ে বেশি সফলতার মুখ দেখেছিল। কারণ এই তরঙ্গের সাথে জড়িত বেশিরভাগ গোষ্ঠীই শেষ পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনে সক্ষম হয়। স্বাধীনতা লাভের পর এই গোষ্ঠীগুলোর নেতারা অনেকেই পরবর্তীতে তাদের নতুন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সফলতার মাপকাঠি কীভাবে একটি গোষ্ঠীর অতীত ইতিহাসকে মুছে দিয়ে তাদের আইনি বৈধতা প্রদান করে।
তৃতীয় তরঙ্গ: নতুন বামপন্থী ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ (The Third Wave: New Left and International Terrorism)
ষাট ও সত্তরের দশকে বিশ্ব রাজনীতি স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি চরম মোহভঙ্গ থেকে পশ্চিমা বিশ্বের তরুণ সমাজের মধ্যে এক নতুন ক্ষোভের জন্ম হয়। এই ক্ষোভ থেকেই উদ্ভব ঘটে তৃতীয় তরঙ্গের, যার আদর্শিক ভিত্তি ছিল নতুন বামপন্থী (New Left) দর্শন। এই তরঙ্গের কুশীলবরা মনে করত যে, প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আসলে একধরনের পুঁজিবাদী স্বৈরতন্ত্র, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে শোষণ করে টিকে আছে। পশ্চিম জার্মানির রেড আর্মি ফ্যাকশন (RAF), ইতালির রেড ব্রিগেডস (Red Brigades) কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ডের মতো সংগঠনগুলো নিজেদের রাষ্ট্রের ভেতরেই সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। তারা তাদের দেশের ধনিক শ্রেণি, ব্যাংকার, শিল্পপতি এবং ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের অপহরণ ও হত্যা করে সমাজতন্ত্রের একটি উগ্র সংস্করণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
তৃতীয় তরঙ্গের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল এর তীব্র আন্তর্জাতিকীকরণ। এই সময়ের গোষ্ঠীগুলো কেবল নিজেদের দেশের সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকেনি, তারা একে অপরের সাথে গভীর জোট বেঁধে কাজ শুরু করে। জাপানিজ রেড আর্মির সদস্যরা ফিলিস্তিনের পপুলার ফ্রন্টের (PFLP) হয়ে ইসরায়েলের লড বিমানবন্দরে হামলা চালায়, যা ছিল আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার এক বিস্ময়কর নজির। গবেষক ইয়োনা আলেকজান্ডার (Yonah Alexander) তার সম্পাদিত গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে এই গোষ্ঠীগুলো প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি বৈশ্বিক আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল (Alexander & Pluchinsky, 1992)। বিমান ছিনতাই হয়ে ওঠে এই দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌশল। একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে বিশ্বের যেকোনো বিমানবন্দরে অবতরণ করানো এবং যাত্রীদের জিম্মি করে নিজেদের রাজনৈতিক দাবি আদায় করার এই কৌশলটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত হতো।
এই তরঙ্গের আরেক চরম বৈশিষ্ট্য ছিল ‘থিয়েটার অফ টেরর’ (Theater of Terror) বা ভীতি প্রদর্শনের নাট্যরূপ। ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের জিম্মি করার ঘটনাটি ছিল এই নাটকের চূড়ান্ত রূপ, যেখানে পুরো বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি একটি আন্তর্জাতিক সংকটের সাক্ষী হয়। তবে সত্তরের দশকে দাপিয়ে বেড়ানো এই তরঙ্গটি আশির দশকের শেষভাগে এসে স্তিমিত হতে শুরু করে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, পশ্চিমা দেশগুলোর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে এবং কঠোর অভিযানের মাধ্যমে গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে এই বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের সবচেয়ে বড় আদর্শিক ও লজিস্টিক সমর্থন হারায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এসে নতুন বামপন্থী আদর্শের প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষণ একেবারেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং তৃতীয় তরঙ্গটি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়।
চতুর্থ তরঙ্গ: ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক (The Fourth Wave: Religious Inspiration and Global Networks)
১৯৭৯ সালটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে একটি বড় ধরনের বিভাজন রেখা টেনে দেয়। এই এক বছরে ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনা – ইরানে ইসলামি বিপ্লব, আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন এবং মক্কায় গ্র্যান্ড মসজিদে কট্টরপন্থীদের দখল – একটি নতুন তরঙ্গের ভিত গড়ে দেয়। এটিই হলো চতুর্থ তরঙ্গ, যার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ। আগের তিনটি তরঙ্গের মতো এই তরঙ্গের কুশীলবরা কোনো রাজনৈতিক সংস্কার বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ বৈশ্বিক ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে নিজেদের বিশ্বাসের আলোকে এক নতুন আধ্যাত্মিক বা ঐশী (Devine) শাসন প্রতিষ্ঠা করা। যদিও এই তরঙ্গে উগ্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তবে এটি কেবল একটি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাপানে আউম শিনরিকিও (Aum Shinrikyo) কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে চরমপন্থী খ্রিষ্টান আইডেন্টিটি গোষ্ঠীগুলোর উত্থান প্রমাণ করে যে, ধর্মকে বিকৃত করে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা ছিল বিশ্বব্যাপী।
এই তরঙ্গের কৌশলগত ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল। গবেষক অ্যাসফ মোগাডাম (Assaf Moghadam) তার The Globalization of Martyrdomগ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে আত্মঘাতী বোমা হামলা এই চতুর্থ তরঙ্গের সিগনেচার বা প্রধান পরিচায়ক কৌশল হয়ে ওঠে (Moghadam, 2008)। একজন হামলাকারী যখন তার নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে এবং মৃত্যুকে একটি পবিত্র কাজ হিসেবে বিশ্বাস করে, তখন তাকে ঠেকানোর মতো কোনো প্রথাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে থাকে না। এরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করার বদলে জনবহুল স্থানে গণহারে মানুষ হত্যা করার নীতি গ্রহণ করে। কারণ তাদের মতে, যারা তাদের মতাদর্শের সাথে একমত নয়, তারা প্রত্যেকেই বৈধ লক্ষ্যবস্তু। আল-কায়েদা এবং পরবর্তীতে আইএসআইএস (ISIS)-এর মতো সংগঠনগুলোর কার্যক্রম এই তরঙ্গের ভয়াবহতাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা কেবল আমেরিকার জন্য নয়, পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যই এক চরম সতর্কবার্তা ছিল।
চতুর্থ তরঙ্গের আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো এর স্থায়িত্ব এবং সীমানাহীন বিস্তার। র্যাপোফোর্টের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি তরঙ্গ চল্লিশ বছর স্থায়ী হলে এই তরঙ্গের আয়ু ২০২০ সালের দিকে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। বাস্তবে আল-কায়েদা বা আইএসআইএস-এর কেন্দ্রীয় কাঠামো অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়লেও, তাদের মতাদর্শিক শাখাগুলো আফ্রিকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে তারা অর্থ পাচার, সদস্য সংগ্রহ এবং প্রচারণার জন্য এক বিশাল ডিজিটাল সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দিয়ে তাদের কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়া গেলেও, ইন্টারনেটের জগতে তাদের উপস্থিতি মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। এই তরঙ্গের কুশীলবরা কোনো আপস বা আলোচনায় বিশ্বাস করে না, যা রাষ্ট্রগুলোর জন্য সংকট সমাধানের পথ আরও জটিল করে তুলেছে।
পঞ্চম তরঙ্গের বিতর্ক: সাইবার স্পেস ও একাকী নেকড়ে (The Fifth Wave Debate: Cyber Space and Lone Wolves)
চতুর্থ তরঙ্গটি যখন তার চার দশকের সীমানা পার করছে, তখন অ্যাকাডেমিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি নতুন বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, আমরা কি বর্তমানে একটি নতুন অর্থাৎ পঞ্চম তরঙ্গে প্রবেশ করছি? গবেষক জেফরি কাপলান (Jeffrey Kaplan) সহ অনেকেই মনে করেন যে, প্রথাগত সংগঠনের দিন শেষ হয়ে আসছে এবং আমরা এক সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি (Kaplan, 2016)। এই সম্ভাব্য নতুন তরঙ্গের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘একাকী নেকড়ে’ (Lone Wolf) বা স্বপ্রণোদিত হামলাকারীদের উত্থান। এরা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের আনুষ্ঠানিক সদস্য নয়, কোনো ট্রেনিং ক্যাম্পে যায় না, এমনকি অন্য কোনো চরমপন্থীর সাথে তাদের সরাসরি দেখাও হয় না। তারা কেবল ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে বিচরণ করে, বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ভিডিও দেখে নিজেদের মগজধোলাই করে এবং একাকী হামলার ছক কষে। এদের আগাম শনাক্ত করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য প্রায় অসাধ্য একটি কাজ।
এই পঞ্চম তরঙ্গের আরেকটি শঙ্কার জায়গা হলো আদর্শিক জগাখিচুড়ি বা হাইব্রিড আইডিওলজি। আগে যেমন বামপন্থী বা ধর্মীয় চরমপন্থীদের একটি সুনির্দিষ্ট ইশতেহার থাকত, এখনকার অনেক হামলাকারীর ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। তারা হয়তো একই সাথে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ, নারীবিদ্বেষ এবং রাষ্ট্রবিরোধী নৈরাজ্যের একটি মিশ্রণ নিজেদের ভেতর লালন করে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ বা নরওয়ের উটোয়া দ্বীপে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাযজ্ঞগুলো প্রমাণ করে যে, উগ্র ডানপন্থী এবং শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে একে অপরের ইশতেহার পড়ছে এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে হামলার ভয়াবহতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ। সাইবার সন্ত্রাসবাদ (Cyber Terrorism) এখন আর কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডার্ক ওয়েব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলোকে রাষ্ট্রের নজরদারির বাইরে থাকার এক বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে। থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে ঘরে বসেই মারণাস্ত্র তৈরি করা কিংবা ড্রোনের সাহায্যে দূর নিয়ন্ত্রিত হামলা চালানোর মতো কৌশলগুলো অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতার সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে। যদি সত্যিই এই পঞ্চম তরঙ্গের শাসন শুরু হয়ে থাকে, তবে এটি হবে রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ, যে শত্রুর কোনো নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো নেই, কোনো দৃশ্যমান নেতা নেই এবং যাদের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হলো মানুষের মন ও সাইবার স্পেস, প্রথাগত সামরিক শক্তি দিয়ে তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। এই নতুন বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য সমাজতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষার এক নতুন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
সন্ত্রাসবাদের ধরন ও বৈশিষ্ট্য (Types and Features of Terrorism): শ্রেণিবিন্যাস, বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য
মতাদর্শগত শ্রেণিবিন্যাস ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি (Ideological Typology and Political Dynamics)
রাজনৈতিক সহিংসতার জগতে মতাদর্শ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কোনো গোষ্ঠী কেন অস্ত্র তুলে নিচ্ছে, তাদের সহিংসতার গতিপথ কোন দিকে মোড় নেবে এবং তারা কাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছে – এই বিষয়গুলো সরাসরি নির্ধারিত হয় তাদের আদর্শিক কাঠামোর মাধ্যমে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সন্ত্রাসবাদকে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে ভাগ করার চল শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সমাজবিজ্ঞানী পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) এই মতাদর্শগত চরিত্রকে কেন্দ্র করে সহিংসতার শ্রেণিভাগের ওপর জোর দেন (Wilkinson, 1986)। তিনি দেখান যে মতাদর্শ নিছক কথার কথা নয়, বরং এটা সশস্ত্র দলগুলোর জন্য কৌশল নির্ধারণের মানচিত্র তৈরি করে দেয়। আদর্শের ভিন্নতা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
বামপন্থী আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদকে সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় বামপন্থী সন্ত্রাসবাদ (Left-Wing Terrorism) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উনিশ শতকের শেষার্ধের নৈরাজ্যবাদী ধারা থেকে শুরু করে বিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকের মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী বা মাওবাদী সশস্ত্র দলগুলো এই শ্রেণির অন্তর্গত। জার্মানির রেড আর্মি ফ্র্যাকশন (Red Army Fraction) কিংবা ইতালির রেড ব্রিগেড (Red Brigades) পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই গড়ে তুলতে চেয়েছিল (Crenshaw, 1981)। তাদের সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের ওপর পরিচালিত ছিল না। তারা আক্রমণ করত রাষ্ট্রপ্রধান, পুঁজিপতি, বিচারক কিংবা পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর। তাদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়ে সর্বহারা শ্রেণির কথিত বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করা। সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর পতনের পর ইউরোপে এই ধরনের সংগঠনের প্রভাব কমে গেলেও লাতিন আমেরিকা কিংবা এশিয়ার কিছু অংশে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই রূপটি টিকে রয়েছে।
বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে ডানপন্থী সন্ত্রাসবাদ (Right-Wing Terrorism)। এই ধারাটি সাধারণত চরম জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ কিংবা নব্য-নাৎসিবাদী ধ্যানধারণার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। ডানপন্থী চরমপন্থীরা সমাজ পরিবর্তনের চেয়ে বরং একটি কাল্পনিক অতীতকে ফিরিয়ে আনতে চায়, যেখানে বহিরাগত বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কোনো স্থান থাকবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় অভিবাসীবিরোধী মনোভাবের ওপর ভর করে এমন অনেক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। নিরাপত্তা গবেষক ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তাঁর বিশদ গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে ডানপন্থী সহিংসতা প্রায়শই বামপন্থীদের মতো সুসংগঠিত দলের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না, বরং এটি একটি অসংলগ্ন সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দেয় (Hoffman, 2006)। ফলে তাদের হামলাগুলো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিবিশেষের চেয়ে সাধারণ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচারে পরিচালিত হওয়ার প্রবণতা দেখায়।
মতাদর্শগত শ্রেণিবিন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জাতিগত-জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসবাদ (Ethno-Nationalist Terrorism) এবং ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ (Religious Terrorism)। জাতিগত সন্ত্রাসীরা একটি নিজস্ব ভূখণ্ড, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সহিংস পথ বেছে নেয়। স্পেনের বাস্কে অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইটিএ (ETA) কিংবা শ্রীলঙ্কার এলটিটিই (LTTE) এই জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের উদাহরণ (Byman, 1998)। এদের বিপরীতে ধর্মভিত্তিক দলগুলো তাদের লড়াইকে পার্থিব সীমানার বাইরে নিয়ে যায়। ধর্মীয় সহিংসতায় অংশ নেওয়া দলগুলো তাদের কর্মকাণ্ডকে ঐশ্বরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্ক জুয়ের্গেনসমেয়ার (Mark Juergensmeyer) ধর্মীয় সহিংসতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে এরা জাগতিক কোনো আপস-আলোচনায় বিশ্বাস করে না, বরং পুরো বিশ্বকে এক চিরন্তন মহাজাগতিক লড়াইয়ের যুদ্ধক্ষেত্র মনে করে (Juergensmeyer, 2003)। এই কারণে ধর্মীয় চরমপন্থা অনেক বেশি বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে।
পরিচালনাকারী সত্তা ও ক্ষমতার সমীকরণ (Actors, Agency and Power Equations)
সন্ত্রাসবাদকে কেবল কিছু গোপন বিদ্রোহী সংগঠনের কাজ হিসেবে দেখলে সহিংসতার পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। ক্ষমতা ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে সহিংসতার পরিচালনাকারী সত্তা পরিবর্তিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিচালনাকারীর ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে সহিংসতাকে প্রধানত দুটি ধারায় ভাগ করা হয়: অরাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল স্টোল (Michael Stohl) সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখান যে রাষ্ট্রের নিজেরও সন্ত্রাসবাদী কৌশল ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে (Stohl, 1984)। ফলে কারা এই সহিংসতা চালাচ্ছে এবং তাদের হাতে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা কতটা রয়েছে, তা এই শ্রেণিকরণের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।
অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ (Non-State Terrorism) হলো সবচেয়ে বেশি পরিচিত রূপ। এখানে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের আইন ও কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে গোপন সংগঠন গড়ে তোলে। তারা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায় কিংবা নিজেদের রাজনৈতিক দাবি মানতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। বিশ শতকের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আধুনিক বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলো অরাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়েছে। এই সংগঠনগুলো ছোট ছোট গোপন সেলে বিভক্ত থাকে এবং রাষ্ট্রের সামরিক ও আইনপ্রয়োগকারী শক্তির দুর্বল জায়গাগুলোতে অতর্কিত আঘাত হানে। তাদের টিকে থাকার কৌশল সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আত্মগোপন এবং জনসাধারণের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয়ের ওপর।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস (State Terror) পরিচালিত হয় স্বয়ং রাষ্ট্রের সামরিক, আধাসামরিক বা গোয়েন্দা কাঠামোর সরাসরি হস্তক্ষেপে। কোনো কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের স্তব্ধ করে দিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে জনসাধারণের মনে ত্রাস তৈরি করে, তখন তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আওতায় ফেলা হয় (Claridge, 1996)। বিশ শতকের লাতিন আমেরিকার সামরিক জান্তাদের পরিচালিত ‘অপারেশন কনডর’ এর অন্যতম ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার মানুষ আইনগত কোনো সুরক্ষা পায় না, কারণ আক্রমণকারী নিজেই এখানে আইনের অভিভাবক সেজে বসে থাকে।
এই দুই কাঠামোর মাঝামাঝি আরেকটি কৌশলগত রূপ রয়েছে, যাকে নিরাপত্তা তত্ত্বে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ (State-Sponsored Terrorism) বলা হয়। যখন কোনো রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করে অন্য কোনো রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ, উন্নত অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে, তখন তা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয় (Byman, 2005)। রাষ্ট্রগুলো একে প্রায়ই ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এর পাশাপাশি একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের বাইরে একক নেকড়ে বা লোন উলফ সন্ত্রাসবাদ (Lone Wolf Terrorism) নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গবেষক জেফ্রি ডি. সাইমন (Jeffrey D. Simon) দেখিয়েছেন যে এই ধরনের আক্রমণকারীরা কোনো নির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ডের অধীনে থাকে না, বরং তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের হামলা চালায় (Simon, 2013)।
কৌশলগত ও পদ্ধতিগত বৈচিত্র্য (Tactical and Methodological Variations)
সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেসব উপায় ও মাধ্যম অবলম্বন করে, তার ওপর ভিত্তি করে পদ্ধতিগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কৌশলগুলো সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকেনি। উনিশ শতকে যেখানে পিস্তল এবং সাধারণ ডিনামাইট দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিশানা করা হতো, বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেখানে জায়গা করে নেয় বিমান ছিনতাই, জিম্মিদশা তৈরি এবং দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক। কৌশল পরিবর্তনের পেছনে প্রধান লক্ষ্য থাকে কম খরচে বেশি মানুষের নজর কেড়ে নেওয়া। ব্রায়ান জেনকিন্স (Brian Jenkins) এই কৌশলগত দিকটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “সন্ত্রাসবাদ হলো এক ধরনের মঞ্চনাটক বা থিয়েটার” (Jenkins, 1975)। তাঁর মতে, এসব হামলায় কতজন মানুষ মারা গেল তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন মানুষ টেলিভিশনে বা চোখে সেটা দেখছে।
কৌশলের দিক থেকে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ভীতিকর পদ্ধতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদ (Suicide Terrorism)। এই প্রক্রিয়ায় আক্রমণকারী নিজেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং হামলার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ (Robert Pape) আত্মঘাতী হামলার পেছনের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে দেখান যে এটা কোনো উন্মাদ বা অযৌক্তিক আচরণ নয়, বরং সুপরিকল্পিত কৌশলগত জবরদস্তি (Pape, 2003)। আক্রমণকারী জানে যে তার পালানোর কোনো প্রয়োজন নেই, ফলে সে জনবহুল বা সুরক্ষিত জায়গায় সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম হয়। লেবাননের হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার এলটিটিই এবং পরবর্তীকালে আল-কায়েদার মতো দলগুলো এই কৌশলকে সাফল্যের সাথে ব্যবহার করেছে। গবেষক মিয়া ব্লুম (Mia Bloom) দেখিয়েছেন যে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতার ভেতরেও আত্মঘাতী হামলা দলগুলোর প্রভাব বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে (Bloom, 2005)।
আধুনিক যুগে প্রযুক্তির বিস্তার সহিংসতার কৌশলে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাইবার সন্ত্রাসবাদ (Cyber Terrorism)। সাইবার জগতে বড় ধরনের আক্রমণ চালিয়ে কোনো দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন কেন্দ্র, আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা, পারমাণবিক চুল্লি বা বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল করে দিয়ে ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরির প্রচেষ্টাকে এই তালিকায় রাখা হয় (Gordon & Ford, 2002)। তবে গবেষকরা প্রায়শই সতর্ক করেন যে সাধারণ সাইবার অপরাধ বা হ্যাকিংয়ের সাথে সাইবার সন্ত্রাসের পার্থক্য রয়েছে। সাইবার সন্ত্রাস তখনই বলা যাবে যখন ডিজিটাল আক্রমণের মাধ্যমে শারীরিক ক্ষতিসাধন, ভয় উৎপাদন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা হবে। বাস্তবে এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল আক্রমণ চালিয়ে বড় ধরনের শারীরিক ত্রাস তৈরির ঘটনা বিরল হলেও এর সম্ভাবনা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে অপরম্পরাগত অস্ত্রের ব্যবহার, যাকে সামরিক পরিভাষায় সিবিআরএন বা রাসায়নিক, জৈব, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদ (Chemical, Biological, Radiological, and Nuclear Terrorism) বলা হয়। ১৯৯৫ সালে জাপানের টোকিও পাতাল রেলে ওম শিনরিকিও (Aum Shinrikyo) নামক ধর্মীয় গোষ্ঠীর চালানো সারিন গ্যাস হামলা এই রাসায়নিক সন্ত্রাসের এক বাস্তব নমুনা (Lifton, 1999)। জৈব সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস (যেমন অ্যানথ্রাক্স) ছড়িয়ে দিয়ে মহামারি বা আতঙ্কের সৃষ্টি করা হয়। এই ধরনের অস্ত্র উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করার প্রযুক্তিগত জটিলতা অত্যন্ত বেশি। ফলে সক্ষমতা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থেকে যায়, যদিও তাদের তাত্ত্বিক ঝুঁকিকে কখনোই হালকাভাবে দেখা যায় না।
মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি (Psychological Features and Nature of Targets)
সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। যেকোনো সাধারণ যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের প্রাথমিক উদ্দেশ্য থাকে শত্রুর সৈন্যবল ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা। কিন্তু সন্ত্রাসবাদী হামলায় শারীরিক ক্ষতির চেয়ে মানসিক বিপর্যয় তৈরি করাই মূল লক্ষ্য থাকে। প্রত্যক্ষ শিকার কেবল মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, আসল নিশানা থাকে অনেক বড় কোনো জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রব্যবস্থা। সমাজতাত্ত্বিক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) সন্ত্রাসবাদের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে সন্ত্রাস হলো এমন এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক আচরণ যার মূল কাজ মানসিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শত্রুকে দুর্বল করা (Crenshaw, 1981)। আক্রান্ত সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে কেউই নিরাপদ নয় এবং রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে অক্ষম।
লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই মনস্তাত্ত্বিক মাত্রার প্রতিফলন ঘটে। সন্ত্রাসীরা মূলত দুই ধরনের নিশানা বেছে নেয়: ব্যবহারিক লক্ষ্যবস্তু এবং প্রতীকী লক্ষ্যবস্তু (Symbolic Targets)। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোনো পুলিশ ফাঁড়ি, সেনা চৌকি বা প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালানো হতে পারে যাতে নিরাপত্তা কাঠামো বিঘ্নিত হয়। তবে আধুনিক সন্ত্রাসবাদের বড় অংশজুড়ে থাকে প্রতীকী নিশানা। যেমন ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে চালানো হামলা। টুইন টাওয়ার কোনো সামরিক দুর্গ ছিল না, কিন্তু এটা ছিল বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। সেখানে আঘাত হেনে হামলাকারীরা পুরো বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতাকে নাটকীয়ভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিল (Hoffman, 2006)। একই সাথে সাধারণ বাজার, উপাসনালয়, নাট্যশালা বা ক্যাফেতে হামলা চালানো হয় যাতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক নিরাপত্তাবোধ ধ্বংস হয়ে যায়।
হামলার পেছনে যে মানসিক প্রস্তুতি ও মতাদর্শিক দীক্ষা কাজ করে, তা-ও একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয়। উগ্র মতাদর্শে জড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াটি একদিনে ঘটে না। মনোবিজ্ঞানী ফাতহালি মোগাদ্দাম (Fathali Moghaddam) তাঁর ‘সিঁড়ি তত্ত্ব’ বা স্টেয়ারকেস টু টেররিজমে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন সাধারণ ব্যক্তি ধীরে ধীরে বঞ্চনাবোধ, অন্যায়ের ক্ষোভ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে উগ্রপন্থার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছে যায় (Moghaddam, 2005)। এই প্রক্রিয়ায় অপরপক্ষকে পুরোপুরি বিমানবিকীকরণ বা ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। যখন একজন মানুষ প্রতিপক্ষকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না, কেবল শত্রু বা পাপী হিসেবে গণ্য করে, তখন নির্দ্বিধায় নারী, শিশু বা নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করার মানসিক ন্যায্যতা তৈরি হয়।
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখার পেছনেও গভীর মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ কাজ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স আব্রাহামস (Max Abrahms) একটি বিকল্প দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে দাবি করেন যে অনেকেই নিখাদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করার জন্য সন্ত্রাসবাদী দলে যোগ দেয় না, বরং যোগ দেয় একটি গভীর সামাজিক বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধের খোঁজে (Abrahms, 2008)। বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক যুবকদের এই দলগত একাত্মতা ও আত্মত্যাগের মানসিকতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে সংগঠনের স্বার্থে প্রাণ দেওয়াকে বীরত্ব মনে করা হয়। ফলে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে সন্ত্রাসবাদ একদিকে সমাজের ভেতর ভীতি ছড়ায়, অন্যদিকে নিজেদের সদস্যদের ভেতর এক ধরনের কৃত্রিম আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক বনাম অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের সীমারেখা (Transnational versus Domestic Terrorism Boundaries)
ভৌগোলিক পরিধি ও সীমানা অতিক্রমের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সন্ত্রাসবাদকে দুটি প্রধান ভাগে চিহ্নিত করা হয়: অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তর্জাতিক বা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ। এই বিভাজন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন কোনো একটি দেশের নাগরিকরা সম্পূর্ণ নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিজস্ব সম্পদ দিয়ে হামলা চালায়, তখন তাকে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ (Domestic Terrorism) হিসেবে গণ্য করা হয় (Sanchez-Cuenca & de la Calle, 2009)। এই ধরনের হামলায় বাইরের কোনো রাষ্ট্রের বা বিদেশি নাগরিকের সরাসরি উপস্থিতি থাকে না। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটির ফেডারেল ভবনে টিমোথি ম্যাকভেইয়ের চালানো বোমা হামলার কথা বলা যায়, যা ছিল সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ উগ্রপন্থার ফল।
বিপরীতভাবে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ (Transnational Terrorism) তখনই রূপ নেয় যখন একটি হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন কিংবা হামলার শিকার নাগরিকদের সম্পর্ক একাধিক দেশের সীমানায় ছড়িয়ে পড়ে (Enders & Sandler, 2006)। ১৯৬৮ সালে প্যালেস্টাইনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী কর্তৃক রোম থেকে তেল আবিবগামী ‘এল আল’ বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের সূচনাবিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধরনের সহিংসতায় এক দেশের সন্ত্রাসী অন্য কোনো দেশে গিয়ে হামলা চালায়, অথবা এমন কোনো লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয় যা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে, যেমন বিদেশি দূতাবাস, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা বহুজাতিক সংস্থার কার্যালয়। এতে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয় এবং একক কোনো দেশের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এই দুই ধারার মধ্যকার সীমারেখাকে অত্যন্ত অস্পষ্ট করে তুলেছে। অতীতে যেখানে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হতো, বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই সীমান্তহীন মতাদর্শিক যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লুইস রিচার্ডসন (Louise Richardson) দেখিয়েছেন যে আধুনিক বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলো কোনো নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় (Richardson, 2006)। আল-কায়েদা কিংবা আইএসের মতো সংগঠনগুলো মধ্যপ্রাচ্যে বসে ইউরোপের তরুণদের উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করে এবং সেই দেশগুলোতেই হামলা চালাতে উৎসাহিত করে।
অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই আন্তর্জাতিকীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং হুন্ডির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবাহিত হয়ে স্থানীয় কোনো উগ্র দলকে শক্তিশালী করে তোলে। নিরাপত্তা গবেষক অদ্রে কুরুথ ক্রনিন (Audrey Kurth Cronin) সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর টিকে থাকা ও পতনের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোকে ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রায় সমকক্ষভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে (Cronin, 2009)। ফলে বর্তমান সময়ে কোনো সন্ত্রাসী হামলা শতভাগ স্থানীয় বা শতভাগ আন্তর্জাতিক – এমন কঠোর বিভাজনে ফেলা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে।
সহিংসতার অন্যান্য রূপের সাথে ধারণাগত পার্থক্য (Conceptual Distinctions from Other Forms of Violence)
সন্ত্রাসবাদকে অন্যান্য রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক সহিংসতা থেকে আলাদা করে বোঝা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক জরুরি কাজ। প্রায়শই রাজনৈতিক বিতর্কে অসদুপায়ে প্রতিপক্ষের যেকোনো সহিংস কার্যকলাপকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে সন্ত্রাসবাদ, গেরিলা যুদ্ধ, বিদ্রোহ, যুদ্ধাপরাধ এবং সাধারণ অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid) সন্ত্রাসবাদের শত শত সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে সাধারণ অপরাধের সাথে সন্ত্রাসের মূল পার্থক্য নিহিত থাকে এর রাজনৈতিক ও মানসিক উদ্দেশ্যের মধ্যে (Schmid, 2011)। সন্ত্রাসী কেবল রক্তপাত ঘটায় না, সে সেই রক্তপাতকে বার্তার বাহক হিসেবে ব্যবহার করে।
গেরিলা যুদ্ধ (Guerrilla Warfare) এবং বিদ্রোহ (Insurgency) এর সাথে সন্ত্রাসবাদের পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর। সামরিক ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার লাকার (Walter Laqueur) তাঁর গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে গেরিলা যোদ্ধারা মূলত একটি সুসংগঠিত আধা-সামরিক কাঠামোয় কাজ করে এবং তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে শত্রুর সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াই করে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা (Laqueur, 1976)। গেরিলারা নিজেদের মুক্তাঞ্চল তৈরি করে এবং সরাসরি সাধারণ মানুষকে নিশানা না বানিয়ে বরং তাদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট থাকে। অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী কোনো ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে ধরে রাখার সামরিক ক্ষমতা রাখে না; তারা বেসামরিক মানুষের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আঘাত করে। তবে বাস্তবে অনেক বিদ্রোহী বা গেরিলা দল নিজেদের কার্যক্রমে সন্ত্রাসবাদী কৌশল ব্যবহার করায় এই সীমারেখা মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ে।
| মাত্রা / ধরন | সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) | গেরিলা যুদ্ধ (Guerrilla Warfare) | সংগঠিত অপরাধ (Organized Crime) | ঘৃণাজনিত অপরাধ (Hate Crime) |
| মূল উদ্দেশ্য | রাজনৈতিক বার্তা ও মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি | ভূখণ্ড দখল ও সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করা | অর্থনৈতিক লাভ ও অবৈধ ব্যবসার বিস্তার | ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিপীড়ন |
| প্রাথমিক নিশানা | বেসামরিক মানুষ ও প্রতীকী স্থাপনা | শত্রুসেনা, পুলিশ ও সামরিক অবকাঠামো | প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী, রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ী | সংখ্যালঘু বা নির্দিষ্ট সুরক্ষাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী |
| সাংগঠনিক কাঠামো | গোপন সেল বা বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক | দৃশ্যমান আধা-সামরিক বাহিনী ও চেইন অব কমান্ড | কঠোর স্তরভিত্তিক ও লাভভিত্তিক নেটওয়ার্ক | একক ব্যক্তি বা অনানুষ্ঠানিক ছোট দল |
| প্রচারণার ধরন | সর্বোচ্চ প্রচার ও দায় স্বীকারের প্রয়াস | স্থানীয় সমর্থন ও সামরিক উপস্থিতি প্রদর্শন | সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও প্রচারবিমুখতা | সাধারণত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচার থাকে না |
সংগঠিত অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদের মধ্যেও স্পষ্ট বিভাজন বিদ্যমান। মাফিয়া চক্র বা মাদক কারবারিরাও চরম সহিংসতা ঘটায়, হত্যাকাণ্ড চালায় এবং সমাজে ভয় তৈরি করে। কিন্তু অপরাধীদের চালিকাশক্তি হলো শুধুই অর্থনৈতিক মুনাফা। তারা রাষ্ট্রকে উল্টে দিতে চায় না, বরং রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যেতে চায় (Shelley, 2014)। একজন সন্ত্রাসী যেখানে নিজের মতাদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে, সেখানে একজন অপরাধী চায় জীবিত থেকে অর্থ ভোগ করতে। একই সাথে ঘৃণাজনিত অপরাধ (Hate Crimes) নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা বর্ণের প্রতি ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত বিদ্বেষ থেকে সংঘটিত হলেও, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো সামগ্রিক রাজনৈতিক রূপরেখা বা শাসনকাঠামো পরিবর্তনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সবসময় থাকে না।
প্রথাগত যুদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধ (War Crimes) এর ক্ষেত্রেও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একটি আইনি ব্যবধান রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালানো আইনত বৈধ বলে বিবেচিত হয়, যাকে ল্যাটিন পরিভাষায় ‘জুস ইন বেলো’ বা যুদ্ধের সঠিক আচরণ বলা হয়। কিন্তু কোনো নিয়মিত সৈন্যবাহিনী যখন ইচ্ছাকৃতভাবে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করে, ধর্ষণ চালায় বা জনপদে বোমাবর্ষণ করে, তখন তা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয় (English, 2009)। সন্ত্রাসবাদীরা কখনোই জেনেভা কনভেনশন বা যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না, কারণ তাদের অস্তিত্বই গড়ে ওঠে আইনের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে। এই মৌলিক পার্থক্যগুলো বোঝার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও আইনের সঠিক প্রয়োগ সম্ভব হয়ে ওঠে।
ইউরোপের নৈরাজ্যবাদী সন্ত্রাসবাদ (European Anarchist Terrorism): আধুনিক সন্ত্রাসের সূচনা
উনিশ শতকের ইউরোপীয় আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও নৈরাজ্যবাদের জন্ম (Nineteenth-Century European Socioeconomic Context and the Birth of Anarchism)
উনিশ শতকের ইউরোপের দিকে তাকালে এক তীব্র বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে বড় বড় শহরগুলোতে ধোঁয়া ওড়ার কারখানা গড়ে উঠছে, বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে এবং পুঁজিপতিদের সম্পদের পাহাড় আকাশ ছুঁতে চাইছে। অন্যদিকে, সেই একই কারখানায় কাজ করা সাধারণ শ্রমিকদের জীবন যাপন ছিল চরম অমানবিক। দৈনিক চৌদ্দ থেকে ষোল ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পরও তারা ঠিকমতো দুবেলা খেতে পেত না। অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে বস্তিতে গাদাগাদি করে থাকা এই মানুষগুলোর জীবনে শিক্ষার কোনো আলো ছিল না, চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। রাষ্ট্র বা সরকার পুরোপুরিভাবে কারখানার মালিক ও অভিজাত শ্রেণির পকেটে বন্দি ছিল। সাধারণ মানুষের এই সীমাহীন বঞ্চনা ও ক্ষোভ থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শনের উন্মেষ ঘটে, যাকে আমরা নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) হিসেবে জানি। ফরাসি চিন্তাবিদ পিয়ের-জসেফ প্রুধোঁ সর্বপ্রথম নিজেকে গর্বভরে নৈরাজ্যবাদী হিসেবে দাবি করেন এবং তার বিখ্যাত উক্তি “সম্পত্তি মানেই চুরি” সেসময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রুধোঁর দর্শনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান রাশিয়ান বুদ্ধিজীবী মিখাইল বাকুনিন।
বাকুনিন বিশ্বাস করতেন যে, রাষ্ট্রের আইনকানুন, পুঁজিপতিদের অর্থ এবং গির্জার ধর্ম – এই তিনটি প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। সমসাময়িক আরেক প্রখ্যাত তাত্ত্বিক কার্ল মার্ক্স চাইতেন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। বাকুনিন এই ধারণার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রকাঠামো টিকিয়ে রেখে ক্ষমতার হাতবদল হলে নতুন শাসকেরাও একসময় অত্যাচারী হয়ে উঠবে। তাই মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কোনো ধরনের সরকার বা কেন্দ্রীয় শাসন থাকবে না; মানুষ ছোট ছোট সমবায় বা কমিউনের মাধ্যমে নিজেদের সমাজ নিজেরাই পরিচালনা করবে। ইতিহাসবিদ জর্জ উডকক (George Woodcock) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Anarchism: A History of Libertarian Ideas and Movements-এ দেখিয়েছেন কীভাবে বাকুনিনের এই উদ্দীপ্ত ভাষণগুলো ইউরোপের ঘর্মাক্ত কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের মনে জাদুর মতো কাজ করেছিল (Woodcock, 1962)। বাকুনিন প্রচার করেছিলেন যে ধ্বংসের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আসলে একধরনের সৃজনশীল প্রবৃত্তি, যা নতুন পৃথিবী গড়ার প্রথম শর্ত।
শুরুতে নৈরাজ্যবাদীরা শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট বা শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। তবে ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের রক্তাক্ত পতন তাদের সেই মোহ পুরোপুরি ভেঙে দেয়। ফরাসি সরকার সেনাবাহিনীর সাহায্যে সাধারণ শ্রমিকদের গড়ে তোলা সেই কমিউন অত্যন্ত নির্মমভাবে গুঁড়িয়ে দেয় এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। এই ঘটনাটি ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণিকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্র তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যেকোনো মাত্রার বলপ্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা লেখালেখি দিয়ে এই জগদ্দল পাথর সরানো সম্ভব নয়। পুঁজিপতি ও শাসকেরা যেহেতু বন্দুকের ভাষায় কথা বলে, তাই তাদের উত্তরটাও সেই ভাষাতেই দিতে হবে। রাষ্ট্রকাঠামোর এই কাঠামোগত নিপীড়ন সাধারণ ক্ষুব্ধ তরুণদের মনস্তত্ত্বে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে, যা আধুনিক রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার পথ প্রশস্ত করে। তারা বুঝতে পারে যে, আইনি পথে বিচার পাওয়ার কোনো আশা নেই, বরং নিজেদের বিচার নিজেদেরই হাতে তুলে নিতে হবে।
কাজের মাধ্যমে প্রচার: তাত্ত্বিক ভিত্তি ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর (Propaganda by Deed: Theoretical Foundation and Psychological Transformation)
শান্তিপূর্ণ পথে পরিবর্তনের আশা ছেড়ে দেওয়ার পর নৈরাজ্যবাদীরা একটি নতুন কৌশলগত ধারণার জন্ম দেয়। এই ধারণার নাম ছিল কাজের মাধ্যমে প্রচার (Propaganda by Deed)। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক পল ব্রুস এবং ইতালীয় বিপ্লবী কার্লো পিসাকানে এই তত্ত্বের প্রাথমিক রূপকার ছিলেন। পিসাকানে বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের চিন্তার মাধ্যমে বিপ্লব আসে না, বরং কাজের মাধ্যমেই চিন্তার প্রসার ঘটে। পাতার পর পাতা বই লিখে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ঘুমন্ত সাধারণ মানুষকে জাগানো যাবে না। সাধারণ মানুষ তত দিন পর্যন্ত শাসকদের ভয় পাবে, যত দিন না তারা দেখবে যে শাসকেরাও রক্তমাংসের মানুষ এবং তাদেরও মৃত্যু হতে পারে। অর্থাৎ, একটি সফল গুপ্তহত্যা বা একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ হাজার হাজার লিফলেটের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরীভাবে বিপ্লবের বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম। এই কাজগুলো কেবল শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য নয়, এগুলো সাধারণ মানুষের মনে সাহস সঞ্চার করার এক মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিল।
এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় দিকটি ছিল লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। নৈরাজ্যবাদীরা সাধারণ কোনো অপরাধী ছিল না যারা অর্থের জন্য খুন করত। তাদের প্রতিটি আক্রমণের পেছনে একটি স্পষ্ট প্রতীকী বার্তা লুকানো থাকত। তারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী রাজা, রানি, প্রধানমন্ত্রী বা সেনাপতিদের নিশানা বানাত। তাদের যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরল – একজন অত্যাচারী রাজাকে প্রকাশ্যে হত্যা করতে পারলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি মোটেও অজেয় নয়। গবেষক মিচেল আবিডোর (Mitchell Abidor) তার Death to the Bourgeoisie: The Anarchist Action বইতে নৈরাজ্যবাদীদের এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Abidor, 2016)। নৈরাজ্যবাদীদের কাছে এই আক্রমণগুলো ছিল চরম সাহসিকতার প্রমাণ। আক্রমণকারী জানত যে এই কাজের পর তার নিজের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত, তারপরও তারা হাসিমুখে গিলোটিন বা ফাঁসির দড়ি বরণ করে নিত। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের কাজের সপক্ষে দীর্ঘ বক্তৃতা দিত, যা পরের দিন পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়ে হাজারো তরুণের রক্ত গরম করে তুলত।
কালের আবর্তনে এই তত্ত্বের একটি ভয়ংকর বিবর্তন ঘটে। প্রথম দিকে কেবল রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিশানা করা হলেও, ধীরে ধীরে নৈরাজ্যবাদীরা বুঝতে শুরু করে যে কেবল রাজাকে সরিয়ে দিলে সমাজ বদলায় না। পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া শ্রেণি, যারা এই রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে, তারাও সমানভাবে অপরাধী। তাই আক্রমণ নেমে আসে সাধারণ বুর্জোয়াদের দৈনন্দিন জীবনে। অভিজাত রেস্তোরাঁ, কফি শপ, অপেরা হাউস বা স্টক এক্সচেঞ্জের মতো জায়গাগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এই রূপান্তরটি রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি বড় ধরনের বাঁকবদল ছিল। আগে যারা কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর আঘাত করত, তারা এখন শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাধারণ মানুষের মনে সরাসরি ভীতি সঞ্চারের পথ বেছে নেয়। এই কৌশলটিই আধুনিক যুগের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর কাজের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করাই প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়।
প্রযুক্তির বিকাশ ও ডিনামাইট বিপ্লব (Technological Advancements and the Dynamite Revolution)
কৌশলগত পরিবর্তনের পাশাপাশি উনিশ শতকের শেষভাগে বিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার নৈরাজ্যবাদীদের হাতে অভাবনীয় এক ক্ষমতা তুলে দেয়। ১৮৬৭ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেন। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল খনি খনন, রাস্তা তৈরি বা পাহাড় কাটার কাজ সহজ করা। বিজ্ঞানের এই নিরীহ আবিষ্কারটি খুব দ্রুতই ক্ষুব্ধ বিপ্লবীদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। ডিনামাইট আবিষ্কারের আগে গুপ্তহত্যা করতে হলে খঞ্জর বা সাধারণ পিস্তল নিয়ে লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছে যেতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। ডিনামাইট আসার পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। এটি খুব সহজেই বহন করা যেত, লুকানো সহজ ছিল এবং দূর থেকে বিশাল আকারের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব ছিল। সাধারণ একজন শ্রমিক একটি ছোট ডিনামাইট ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিশাল সামরিক বাহিনীর সমান শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা অর্জন করে। প্রযুক্তি এইভাবে ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকারকে সাধারণ মানুষের হাতে বিকেন্দ্রীভূত করে দেয়।
ডিনামাইট সংগ্রহ করাও তখন খুব একটা কঠিন ছিল না। নৈরাজ্যবাদীরা রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন খনি বা নির্মাণ সাইট থেকে ডিনামাইট চুরি করত। আবার অনেকেই নিজেদের ঘরের ভেতর ছোটখাটো ল্যাবরেটরি তৈরি করে বোমা বানানোর চেষ্টা চালাত। জার্মান বংশোদ্ভূত নৈরাজ্যবাদী জোহান মোস্ট এই বোমা তৈরির জ্ঞান সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখেন। তিনি একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেন, যেখানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় বাড়িতে বসে কীভাবে বিস্ফোরক তৈরি করা যায়, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া ছিল। এটি অনেকটা আজকের দিনের ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বোমা তৈরির ম্যানুয়ালের মতোই কাজ করেছিল। জোহান মোস্ট ডিনামাইটকে দরিদ্র মানুষের গোলন্দাজ বাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নৈরাজ্যবাদীদের এমন এক আত্মবিশ্বাস এনে দেয় যে, তারা মনে করত বিজ্ঞান তাদের হাতে বুর্জোয়া সমাজ ধ্বংস করার অকাট্য চাবিকাঠি তুলে দিয়েছে।
বিজ্ঞানের পাশাপাশি যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশও এই সময় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। টেলিগ্রাফের আবিষ্কার এবং দ্রুতগামী ছাপার যন্ত্রের ফলে খবরের কাগজ সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। প্যারিসের কোনো ক্যাফেতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লন্ডন, মাদ্রিদ বা নিউইয়র্কের মানুষ সেই খবর পড়তে পারত। ইতিহাসবিদ জন মেরিম্যান (John Merriman) তার বহুল পঠিত The Dynamite Club: How a Bombing in Fin-de-Siècle Paris Ignited the Age of Modern Terror গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে গণমাধ্যমের এই প্রসার বোমাবাজদের জন্য একটি বিশাল প্রচার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল (Merriman, 2009)। নৈরাজ্যবাদীরা এই প্রচারণার বিষয়টি খুব ভালো করেই বুঝত। তারা জানত, দশজনকে হত্যা করার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো লাখো মানুষের কাছে সেই ভয়ের খবরটি পৌঁছে দেওয়া। আধুনিক যুগের ‘মিডিয়া স্পেকটাকল’ বা গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণের যে কৌশল আমরা বর্তমানে দেখতে পাই, তার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল এই ডিনামাইট বিপ্লবের হাত ধরেই।
ফ্রান্সে নৈরাজ্যবাদী হামলা ও রাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ (Anarchist Attacks in France and the State’s Countermeasures)
১৮৯২ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে, বিশেষ করে প্যারিসে, নৈরাজ্যবাদী বোমাবাজির একটি প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ে, যা পুরো ইউরোপকে স্তব্ধ করে দেয়। এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল রাভাচল। সে একাধারে ছিল চোর, ডাকাত এবং নৈরাজ্যবাদী। ১৮৯২ সালে ফরাসি পুলিশ যখন কিছু শ্রমিক নেতার ওপর নির্মম অত্যাচার চালায়, তখন রাভাচল এর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সেই বিচারক ও কৌঁসুলিদের বাসভবনে অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যারা ওই শ্রমিকদের সাজা দিয়েছিল। এই ঘটনা ফরাসি প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। রাভাচলকে যখন গ্রেপ্তার করে গিলোটিনের সামনে দাঁড় করানো হয়, তখন সে এক মুহূর্তের জন্যও অনুশোচনা প্রকাশ করেনি; উল্টো সে ফরাসি বুর্জোয়াদের ধ্বংস কামনা করে স্লোগান দেয়। সাধারণ শ্রমিকদের একটি বড় অংশের কাছে রাভাচল এক পরম পূজনীয় রবিনহুড চরিত্রের মর্যাদা লাভ করে, যাকে নিয়ে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় গান রচিত হয়েছিল।
রাভাচলের মৃত্যুর পর নৈরাজ্যবাদী হামলাগুলো আরও বেশি সহিংস রূপ ধারণ করে। ১৮৯৩ সালে অগাস্ত ভ্যালিয়ান্ত নামক আরেক বেকার শ্রমিক ফ্রান্সের পার্লামেন্ট ভবনে (চেম্বার অফ ডেপুটিজ) সরাসরি বোমা ছুঁড়ে মারে। যদিও এই হামলায় কেউ মারা যায়নি, তবে রাষ্ট্রের আইনসভার ভেতরে এমন হামলার দুঃসাহস ফরাসি সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে। এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১৮৯৪ সালে, যখন এমিল হেনরি নামের এক উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্যারিসের অত্যন্ত বিলাসবহুল ক্যাফে টার্মিনাসে একটি টাইম বোমা রেখে আসে। বিস্ফোরণে একজন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। আদালতে এমিল হেনরি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ঘোষণা করে যে, “কোনো বুর্জোয়া নিরপরাধ হতে পারে না।” সে যুক্তি দেয় যে, কারখানার মালিক, ব্যাংকার বা সাধারণ মধ্যবিত্ত – সবাই এই শোষণমূলক কাঠামোর অংশ, তাই এদের রক্তপাত ঘটানো সম্পূর্ণ বৈধ। সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো এই হামলা ফরাসি সমাজের প্রতিটি স্তরে এক গভীর আতঙ্কের বীজ বপন করে দেয়।
রাষ্ট্রও হাত গুটিয়ে বসে ছিল না। এই ধারাবাহিক হামলার জবাবে ফরাসি সরকার ১৮৯৩-৯৪ সালে পর পর তিনটি কঠোর আইন পাস করে, যা ইতিহাসে ‘লুইস সেলেরাতস’ বা ঘৃণ্য আইন নামে পরিচিত। এই আইনগুলোর মাধ্যমে নৈরাজ্যবাদী মতাদর্শ প্রচার, ছাপাখানা চালানো বা এমনকি সহানুভূতি প্রকাশ করাকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় যে কারও বাড়িতে তল্লাশি চালানোর অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়। হাজার হাজার সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রের এই কঠোর পাল্টাপাল্টি দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে ক্ষোভের আগুনকে আরও উসকে দেয়। রাষ্ট্র ও নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী ইঁদুর-বেড়াল খেলা প্রমাণ করে যে, কেবল আইন প্রণয়ন বা পুলিশি শক্তি প্রয়োগ করে একটি আদর্শিক ক্ষোভকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া নতুন করে উগ্রায়নের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
স্পেন ও ইতালিতে রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা (Political Assassinations in Spain and Italy)
ফ্রান্সের বাইরে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে নৈরাজ্যবাদ আরও বেশি শিকড় গাড়তে সক্ষম হয়েছিল, কারণ সেখানকার আর্থসামাজিক অবস্থা ছিল আরও বেশি শোচনীয়। স্পেনের আন্দালুসিয়া এবং কাতালোনিয়া অঞ্চলে ভূমিহীন কৃষক ও কারখানার শ্রমিকদের জীবন এতটাই দুর্বিষহ ছিল যে, তারা খুব সহজেই নৈরাজ্যবাদী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়। ১৮৯৬ সালে বার্সেলোনায় একটি ধর্মীয় মিছিলে বোমা হামলার পর স্প্যানিশ সরকার মন্টজুইক দুর্গে কয়েক শ নির্দোষ শ্রমিক ও নৈরাজ্যবাদীকে বন্দি করে তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। অনেককে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়। এই নির্যাতনের খবর ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও ক্যানোভাস দেল কাস্টিলোর ওপর চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৮৯৭ সালে ইতালীয় নৈরাজ্যবাদী মিশেল অ্যাঞ্জিওলিলো স্পেনে গিয়ে স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে মন্টজুইক নির্যাতনের প্রতিশোধ গ্রহণ করেন।
ইতালি সেসময় নৈরাজ্যবাদের এক বিশাল চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। তীব্র দারিদ্র্য এবং সরকারের দমননীতির কারণে হাজার হাজার ইতালীয় শ্রমিক কাজের সন্ধানে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। তারা সাথে করে নিয়ে যায় নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষোভ। ইতিহাসবিদ নুনজিও পার্নিকোন (Nunzio Pernicone) তার গবেষণাItalian Anarchism-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ইতালীয় প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল (Pernicone, 1993)। ১৮৯৮ সালে ইতালির মিলান শহরে সাধারণ মানুষের এক রুটি বিদ্রোহে ইতালীয় সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে কয়েক শ মানুষকে হত্যা করে। ইতালির রাজা উমবার্তো এই গণহত্যার জন্য সেনাপতিকে পদক দিয়ে পুরস্কৃত করেন। এই খবর আমেরিকায় অবস্থানরত ইতালীয় নৈরাজ্যবাদী গায়তানো ব্রেসির কাছে পৌঁছালে সে নিজের জমানো টাকায় ইতালিতে ফিরে আসে এবং ১৯০০ সালে রাজা উমবার্তোকে জনসমক্ষে গুলি করে হত্যা করে।
এই গুপ্তহত্যাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এগুলো ছিল একটি আন্তঃসীমান্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের চরম পরিণতি। ইতালীয় নৈরাজ্যবাদীরা কেবল নিজেদের দেশের রাজাকেই হত্যা করেনি, তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদেরও নিশানা করেছিল। ১৮৯৪ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট সাদি কার্নোকে হত্যা করে সান্তা জেরোনিমো কাসেরিও নামক এক ইতালীয় যুবক। ১৮৯৮ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী এলিসাবেথকে একটি তীক্ষ্ণ ফাইল দিয়ে বুকে আঘাত করে হত্যা করে লুইজি লুচেনি নামক আরেক ইতালীয় নৈরাজ্যবাদী। এই ঘাতকরা এক দেশে বসে পরিকল্পনা করত, অন্য দেশে গিয়ে অস্ত্র জোগাড় করত এবং তৃতীয় কোনো দেশে গিয়ে হামলা চালাত। সীমান্ত পার হয়ে এ ধরনের পরিকল্পিত হামলা সেসময়ের পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ হতবাক করে দিয়েছিল। আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলো যেভাবে সীমানা পেরিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে, উনিশ শতকের শেষভাগের এই নৈরাজ্যবাদীরা ঠিক সেই কাঠামোরই প্রথম সার্থক রূপরেখা তৈরি করে দিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের সূচনা ও নৈরাজ্যবাদের পতন (The Dawn of International Policing and the Fall of Anarchism)
নৈরাজ্যবাদীদের এই সীমান্তবিহীন হামলাগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, এটি আর কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। একজন ইতালীয় নাগরিক ফ্রান্সে বসে স্পেনের কোনো নেতাকে হত্যার ছক কষতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রেখে প্রথমবারের মতো একযোগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৯৮ সালে ইতালির রোমে ইউরোপের ২১টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘অ্যান্টি-অ্যানার্কিস্ট কনফারেন্স’ বা নৈরাজ্যবাদ-বিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এটি ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে নৈরাজ্যবাদীদের কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হবে না, বরং তাদের সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য করে দ্রুত প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন করা হবে।
এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার হাত ধরেই আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার ব্যাপক আধুনিকায়ন ঘটে। অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য সিগন্যালেটিক বা ফিজিক্যাল মেজারমেন্ট সিস্টেম এবং পরবর্তীতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ সংরক্ষণের প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ফরাসি পুলিশ কর্মকর্তা আলফঁস বার্টিলনের উদ্ভাবিত পরিচয় শনাক্তকরণ পদ্ধতি ইউরোপের সব দেশের পুলিশ গ্রহণ করে। দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের মধ্যে সন্দেহভাজন নৈরাজ্যবাদীদের ছবি, ঠিকানা এবং যাতায়াতের তথ্য নিয়মিত আদান-প্রদান করতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাথিউ ডেফ্লেম (Mathieu Deflem) তার Policing World Society: Historical Foundations of International Police Cooperation গ্রন্থে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন যে, নৈরাজ্যবাদ দমনের এই তাগিদ থেকেই পরবর্তীতে ইন্টারপোল (Interpol)-এর মতো বিশাল আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থার প্রাথমিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল (Deflem, 2005)। রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পেরেছিল যে নেটওয়ার্কভিত্তিক হুমকির মোকাবিলা কেবল আরেকটি নেটওয়ার্ক দিয়েই করা সম্ভব।
তবে কেবল পুলিশি তৎপরতা বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই নৈরাজ্যবাদের পতনের একমাত্র কারণ ছিল না। বিশ শতকের প্রথম দশকের পর থেকে এই আন্দোলন ধীরে ধীরে ভেতর থেকেই তার শক্তি হারাতে শুরু করে। কাজের মাধ্যমে প্রচার তত্ত্বটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। গুপ্তহত্যা বা বোমাবাজি সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে কোনো বিপ্লবের আগুন জ্বালাতে তো পারেইনি, উল্টো নিরীহ মানুষ মারা যাওয়ার কারণে সাধারণ শ্রমিকেরা এই পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর বদলে ট্রেড ইউনিয়ন বা সিন্ডিক্যালিজম অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে শ্রমিকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য দর-কষাকষির পথে হাঁটে। এরপর ১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন পুরো পৃথিবীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। ইউরোপের তরুণেরা নৈরাজ্যবাদের স্বপ্ন ভুলে গিয়ে নিজ নিজ দেশের পতাকাতলে জাতীয়তাবাদী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামার মাঝেই ইউরোপের এই প্রলয়ংকরী নৈরাজ্যবাদী তরঙ্গের চিরস্থায়ী সলিলসমাধি ঘটে।
তিনটি ধর্মীয় ঐতিহ্যে সন্ত্রাসবাদ (Terrorism in Three Religious Traditions): তুলনামূলক পর্যালোচনা
ধর্মীয় সহিংসতার তাত্ত্বিক কাঠামো ও কসমিক যুদ্ধ (Theoretical Framework of Religious Violence and Cosmic War)
রাজনীতি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যখন ধর্মকে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই সংঘাতের মাত্রা ও ভয়াবহতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ ধারণ করে। সাধারণ রাজনৈতিক বা জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড দখল বা রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তনের জন্য লড়াই করে। তাদের লক্ষ্যবস্তু থাকে পরিষ্কার এবং তারা অনেক সময় রাষ্ট্রের সাথে আপস বা আলোচনায় বসতেও রাজি থাকে। কিন্তু যখন কোনো সংঘাতকে ঈশ্বরের নির্দেশ বা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন সেই সংঘাতের আর কোনো জাগতিক সীমানা থাকে না। সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মতাত্ত্বিক মার্ক জুয়ের্গেন্সমেয়ার (Mark Juergensmeyer) তার যুগান্তকারী গ্রন্থTerror in the Mind of God-এ এই ধারণাকে কসমিক যুদ্ধ (Cosmic War) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Juergensmeyer, 2003)। তার মতে, চরমপন্থীরা বিশ্বাস করে যে পৃথিবীতে একটি স্বর্গীয় এবং দানবীয় শক্তির মধ্যে অনন্তকাল ধরে যুদ্ধ চলছে। তারা নিজেদের সেই স্বর্গীয় শক্তির সৈনিক হিসেবে মনে করে। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে জাগতিক লাভ-ক্ষতির কোনো স্থান নেই; এখানে মৃত্যু মানেই শাহাদাত বা পবিত্র আত্মত্যাগ, আর জয় মানে ঈশ্বরের জয়।
এই কসমিক যুদ্ধের ধারণাটি চরমপন্থীদের যেকোনো মাত্রার সহিংসতাকে নিজেদের কাছে নৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেয়। সাধারণ রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় সাধারণ মানুষের সমর্থন হারানোর ভয়ে মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত এড়িয়ে চলে। কিন্তু ধর্মীয় চরমপন্থীরা মনে করে যে তারা কোনো সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ নয়, তাদের জবাবদিহি কেবল ঈশ্বরের কাছে। তারা বিশ্বাস করে যে সমাজ এতটাই দূষিত ও পাপপূর্ণ হয়ে গেছে যে, একে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে নতুন করে পবিত্র সমাজ গড়া সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস তাদের মধ্যে একধরনের আদর্শিক শূন্যতা (Ideological Absolutism) তৈরি করে, যেখানে তাদের মতাদর্শের বাইরে থাকা পৃথিবীর সব মানুষকেই তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে। একটি শিশু, একজন বৃদ্ধ নারী বা প্রার্থনা রত কোনো মানুষ – সবাই তাদের চোখে অশুভ শক্তির অংশ। এই চরম মেরুকরণের ফলে তারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় গণহারে মানুষ হত্যার মতো ঘটনা ঘটাতে পারে, যা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক সহিংসতার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভয়ংকর।
ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং ইসলাম – এই তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মেই আমরা এই কসমিক যুদ্ধের ধারণার বিকৃত প্রয়োগ দেখতে পাই। যদিও প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব এবং বিকাশের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা, তবে উগ্রপন্থীরা যখন ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখ্যা করে, তখন তাদের কৌশলগত এবং মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। তিনটি ধর্মের চরমপন্থীরাই মনে করে যে তাদের বিশ্বাস চরম হুমকির মুখে এবং তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা নিজেদের ধর্মগ্রন্থের কিছু নির্দিষ্ট আয়াত বা শ্লোককে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং সেগুলোকে বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহার করে। তারা একটি কাল্পনিক সোনালি অতীতের স্বপ্ন বিক্রি করে, যেখানে দাবি করা হয় যে কেবল ঈশ্বরের নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই বর্তমানের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে এই তিনটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতর থেকে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ঘটেছে এবং তারা কীভাবে ধর্মকে নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ইহুদি ঐতিহ্যে চরমপন্থা: পবিত্র ভূমি ও মেসিয়ানিজম (Extremism in the Jewish Tradition: Holy Land and Messianism)
ইহুদি ধর্মের ভেতরে চরমপন্থার যে শেকড়, তা মূলত আবর্তিত হয়েছে নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ড এবং ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির ধারণাকে কেন্দ্র করে। ইহুদি ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমান ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি হলো ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত পবিত্র ভূমি, যা কেবল ইহুদিদের জন্যই বরাদ্দ। বিশ শতকের শুরুতে জায়নবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে ইউরোপ থেকে ইহুদিরা যখন দলে দলে এই অঞ্চলে আসতে শুরু করে, তখন থেকেই এই পবিত্র ভূমির দখল নিয়ে সংঘাতের সূত্রপাত। চরমপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীগুলো বিশ্বাস করে যে এই ভূমির প্রতিটি ইঞ্চি ঈশ্বরের দান এবং এর কোনো অংশ অন্য কোনো জাতি বা ধর্মের মানুষের কাছে হস্তান্তর করা সরাসরি ঈশ্বরের নির্দেশের অবমাননা। এই বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছে মেসিয়ানিজম (Messianism) বা ত্রাণকর্তার আগমনের ধারণা। কট্টরপন্থীরা মনে করে, তারা যদি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পুরো পবিত্র ভূমি দখল করে এবং সেখানে থাকা অ-ইহুদিদের বিতাড়িত করে, তবেই ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত সেই ত্রাণকর্তা বা মসিহ পৃথিবীতে নেমে আসবেন।
এই মতাদর্শের একটি বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো কাচ (Kach) নামক একটি উগ্র রাজনৈতিক দল, যা ১৯৭১ সালে রাব্বি মেয়ার কাহানে দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কাহানে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রচার করতেন যে আরবদের ইসরায়েলে থাকার কোনো আইনি বা ধর্মীয় অধিকার নেই। তিনি দাবি করতেন যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ইহুদি ধর্মতত্ত্ব কখনোই একসাথে চলতে পারে না। তার মতে, ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমস্ত আরবকে জোরপূর্বক বের করে দিতে হবে। ইতিহাসবিদ ইয়ান লুস্টিক (Ian Lustick) তার কাজগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে এই উগ্র মতাদর্শ ইসরায়েলের কট্টরপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের প্রভাবিত করেছিল (Lustick, 1988)। ১৯৯৪ সালে বারুচ গোল্ডস্টেইন নামক একজন মার্কিন বংশোদ্ভূত ইহুদি চিকিৎসক হেবরনের একটি মসজিদে ঢুকে প্রার্থনারত ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসলমানকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। গোল্ডস্টেইন কাহানের কট্টর অনুসারী ছিল এবং সে বিশ্বাস করত যে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সে তার ধর্মের একটি পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক চরমপন্থী ইহুদি তাকে একজন মহান বীর হিসেবে পূজা করতে শুরু করে এবং তার কবরে তীর্থযাত্রার আয়োজন করে।
ইহুদি চরমপন্থার আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো তারা কেবল ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরই আক্রমণ করে না, বরং যারা তাদের মতাদর্শের সাথে একমত নয়, সেই সব প্রগতিশীল বা উদারপন্থী ইহুদিদেরও তারা সমানভাবে শত্রু মনে করে। ১৯৯৫ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইজাক রাবিনকে হত্যা করার ঘটনাটি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইজাক রাবিন ফিলিস্তিনিদের সাথে অসলো চুক্তির মাধ্যমে শান্তির একটি পথ তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন, যেখানে ফিলিস্তিনিদের কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। কট্টরপন্থী রাব্বিরা ঘোষণা করে যে রাবিন একজন বিশ্বাসঘাতক এবং ইহুদি আইন অনুযায়ী তাকে হত্যা করা বৈধ। জিগাল আমির নামক এক কট্টর ইহুদি যুবক একটি শান্তি সমাবেশে রাবিনকে গুলি করে হত্যা করে। আদালতে সে অত্যন্ত গর্বের সাথে দাবি করে যে সে ঈশ্বরের নির্দেশ পালন করেছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইহুদি চরমপন্থা কেবল একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং এটি একটি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক বিভ্রম, যা রাজনৈতিক আপসকে ঈশ্বরের সাথে বেঈমানি হিসেবে গণ্য করে।
খ্রিষ্টান ঐতিহ্যে উগ্রবাদ: আইডেন্টিটি মুভমেন্ট ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য (Extremism in the Christian Tradition: Identity Movement and White Supremacy)
খ্রিষ্টধর্মের ভেতরে যে চরমপন্থার বিস্তার, তার প্রকৃতি ইহুদি বা ইসলামি উগ্রবাদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া খ্রিষ্টান চরমপন্থা একটি নির্দিষ্ট জাতিগত অহংবোধের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই চরমপন্থার সবচেয়ে বড় রূপ হলো খ্রিষ্টান আইডেন্টিটি মুভমেন্ট (Christian Identity Movement)। এটি একটি অত্যন্ত বর্ণবাদী ও বিকৃত ধর্মতত্ত্ব, যা ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে আমেরিকায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের বিশ্বাস অনুযায়ী, উত্তর ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরাই হলো বাইবেলে উল্লেখিত প্রাচীন ইসরায়েলের আসল বংশধর এবং ঈশ্বরের একমাত্র মনোনীত জাতি। তারা দাবি করে যে বর্তমানের ইহুদিরা শয়তানের বংশধর এবং অন্য সব অ-শ্বেতাঙ্গ জাতি হলো মানুষের চেয়েও নিচু স্তরের প্রাণী। এই বিকৃত বিশ্বাস তাদের মনস্তত্ত্বে এক গভীর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ (White Supremacy)-এর জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে আমেরিকায় অসংখ্য গুপ্ত হামলা ও বর্ণবাদী সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এই চরমপন্থী চিন্তাধারার সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে আমেরিকার ওকলাহোমা সিটিতে। টিমোথি ম্যাকভেই নামক একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক একটি ফেডারেল ভবনে বিশাল গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, যেখানে ১৬৮ জন মানুষ নিহত হয়, যাদের মধ্যে ১৯ জন শিশুও ছিল। ম্যাকভেই সরাসরি কোনো আইডেন্টিটি চার্চের সদস্য না হলেও, সে তাদের মতাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। গবেষক মাইকেল বারকুন (Michael Barkun) তার Religion and the Racist Right গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই গোষ্ঠীগুলো আমেরিকাকে একটি স্বর্গীয় শ্বেতাঙ্গ জাতিতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখে এবং ফেডারেল সরকারকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে (Barkun, 1994)। ম্যাকভেইয়ের কাছে ফেডারেল সরকার ছিল একটি স্বৈরাচারী দানবীয় শক্তি, যা সাধারণ শ্বেতাঙ্গদের অধিকার হরণ করছে। এই গোষ্ঠীগুলোর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এদের অ্যান্টি-অ্যাবোরশন বা গর্ভপাত-বিরোধী সহিংসতা। তারা মনে করে গর্ভপাত করা একটি মহাপাপ এবং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অসংখ্য গর্ভপাত ক্লিনিক এবং চিকিৎসকের ওপর এরা বোমা হামলা ও গুপ্তহত্যা চালিয়েছে।
খ্রিষ্টান চরমপন্থার আরেকটি ভয়ংকর দিক দেখা যায় আফ্রিকা মহাদেশে। উগান্ডায় জোসেফ কোনির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা লর্ডস রেসিস্ট্যান্স আর্মি (LRA) এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কোনি নিজেকে ঈশ্বরের নবী হিসেবে দাবি করত এবং তার লক্ষ্য ছিল উগান্ডায় বাইবেলের দশ আজ্ঞা (Ten Commandments) অনুযায়ী একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সে কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার শিশু অপহরণ করে তাদের মগজধোলাই করে শিশু সৈনিকে পরিণত করেছে এবং গ্রামের পর গ্রামে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। খ্রিষ্টান চরমপন্থার এই দুই রূপ – একদিকে আমেরিকার অত্যাধুনিক বর্ণবাদী নেটওয়ার্ক এবং অন্যদিকে আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা – প্রমাণ করে যে ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখ্যা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই সমানভাবে ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। তারা যিশুর শান্তির বাণীকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী ক্ষোভ মেটানোর এক ঐশী হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
ইসলামি ঐতিহ্যে জিহাদের অপব্যাখ্যা ও আধুনিক চরমপন্থা (Misinterpretation of Jihad in the Islamic Tradition and Modern Extremism)
ইসলামি ঐতিহ্যে আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতার যে বিস্তার, তা বুঝতে হলে নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ইসলামী ঐতিহ্যে ‘জিহাদ’ শব্দটি বহু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ‘জাহাদা’ (jāhada) ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দটির মৌলিক অর্থ চেষ্টা, সাধনা বা সংগ্রাম করা। কুরআন, হাদিস এবং পরবর্তী ইসলামী চিন্তায় জিহাদ কখনো বিশ্বাস ও নৈতিক জীবনের জন্য ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক প্রচেষ্টা, আবার কখনো সশস্ত্র সংগ্রামের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী আইনশাস্ত্রে সশস্ত্র জিহাদ একটি সুগঠিত আইনি ধারণায় পরিণত হয় এবং এর উদ্দেশ্য, বৈধতা, কর্তৃত্ব ও সীমা নিয়ে বিভিন্ন মাজহাব ও যুগে ভিন্ন ব্যাখ্যা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ধ্রুপদি ফিকহের জিহাদতত্ত্ব কেবল আত্মরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক যুগে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ জিহাদের প্রতিরক্ষামূলক, নৈতিক ও আত্মিক মাত্রার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন ইসলামপন্থী ও জিহাদি আন্দোলন ধারণাটির ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যাখ্যা হাজির করেছে। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের তাত্ত্বিক নেতা সাইয়্যেদ কুতুব (Sayyid Qutb) তার রচনায় দাবি করেন যে বর্তমান বিশ্বের সমস্ত মুসলিম রাষ্ট্র আসলে ‘জাহিলিয়াত‘ বা অন্ধকারের যুগে প্রবেশ করেছে, কারণ তারা সরাসরি ঈশ্বরের আইন (শরিয়া) দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে না। তার মতে, এই ধর্মত্যাগী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করা প্রত্যেক মুসলমানের পবিত্র দায়িত্ব। কুতুবের এই চরমপন্থী ব্যাখ্যাটিই পরবর্তীতে আধুনিক ইসলামি উগ্রবাদের মূল দার্শনিক ভিত্তিরূপে কাজ করেছে।
এই তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আল-কায়েদা এবং পরবর্তীতে আইএসআইএস (ISIS)-এর মতো বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলোর জন্ম হয়। ফরাসি গবেষক জিল কেপেল (Gilles Kepel) তারJihad: The Trail of Political Islamগ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক হস্তক্ষেপ এই গোষ্ঠীগুলোকে এক বিশাল রাজনৈতিক মূলধন এনে দেয় (Kepel, 2002)। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন প্রচার করেছিলেন যে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকা, ইসলামি বিশ্বের সম্পদ লুণ্ঠন এবং ধর্ম ধ্বংস করার জন্য একটি নতুন ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ শুরু করেছে। এই ধারণাটি অনেক ক্ষুব্ধ মুসলিম তরুণের মনে কসমিক যুদ্ধের বিশ্বাস গেঁথে দেয়। তারা মনে করতে শুরু করে যে পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং এমনকি সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা করা সম্পূর্ণ বৈধ, কারণ এটি তাদের ধর্মের ওপর হওয়া কল্পিত আঘাতের একটি আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
আইএসআইএস-এর উত্থান এই চরমপন্থাকে এক নতুন ও অভাবনীয় মাত্রায় নিয়ে যায়। আল-কায়েদা যেখানে কেবল গুপ্ত হামলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, আইএসআইএস সেখানে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের খেলাফত ঘোষণা করে। তারা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ইসলামি আইনের এক অত্যন্ত কঠোর ও চরমপন্থী ব্যাখ্যা কার্যকর করে, যেখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের হত্যা, নারীদের দাসী বানানো এবং ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদের প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা করার ঘটনা প্রতিদিনের রুটিনে পরিণত হয়। তারা তাদের এই নৃশংসতাকে অত্যন্ত উচ্চমানের ভিডিওর মাধ্যমে ইন্টারনেটে প্রচার করে, যাতে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের তরুণরাও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ইসলামি চরমপন্থার এই আধুনিক রূপটি দেখায় যে, এটা কেবল কোরআন বা হাদিসের কেবল আক্ষরিক বা চরমপন্থী পাঠ নয়; সেই সাথে এটা মূলত ভূ-রাজনৈতিক ক্ষোভ, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রতি আক্রোশ এবং ক্ষমতার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে ধর্মের আবরণে মুড়িয়ে তৈরি করা একটি সর্বনাশা রাজনৈতিক মতাদর্শ।
ধর্মীয় গ্রন্থ ও প্রতীকের মনস্তাত্ত্বিক অপব্যবহার (Psychological Abuse of Religious Texts and Symbols)
ধর্মীয় চরমপন্থীরা যখন সাধারণ মানুষকে তাদের দলে টানে বা নিজেদের কাজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়, তখন তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মগ্রন্থের নির্দিষ্ট কিছু অংশ ব্যবহার করে। তারা কখনোই কোনো ধর্মগ্রন্থের সামগ্রিক শান্তির বার্তা বা ক্ষমার কথা প্রচার করে না। এর বদলে তারা অত্যন্ত সযত্নে সেই অংশগুলো বেছে নেয় যেখানে প্রাচীনকালের কোনো যুদ্ধ বা শত্রুকে বিনাশ করার কথা বলা হয়েছে। এই পদ্ধতিটিকে তাত্ত্বিক ভাষায় টেক্সচুয়াল সিলেক্টিভিটি (Textual Selectivity) বা ঐচ্ছিক পাঠ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইহুদি চরমপন্থীরা তোরাহ বা ওল্ড টেস্টামেন্টের সেই অংশগুলো বারবার পাঠ করে, যেখানে ঈশ্বর ইসরায়েলিদের নির্দেশ দিচ্ছেন কানান দেশের সব শত্রুকে সমূলে বিনাশ করার জন্য। খ্রিষ্টান চরমপন্থীরা বুক অফ রেভিলেশন বা প্রকাশিত বাক্যের আক্ষরিক ব্যাখ্যা করে দাবি করে যে খুব শিগগিরই পৃথিবীতে একটি বিশাল যুদ্ধ হতে যাচ্ছে এবং তাদের এখন থেকেই অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে। ঠিক একইভাবে ইসলামি চরমপন্থীরা কোরআনের যুদ্ধের আয়াতগুলোকে, যেগুলো মূলত সপ্তম শতাব্দীর নির্দিষ্ট কিছু সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছিল, বর্তমান যুগের সব অমুসলিম এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্বিচারে প্রয়োগ করে।
ধর্মগ্রন্থের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীকগুলোর অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ব্যবহার চরমপন্থীদের একটি বড় হাতিয়ার। একটি সাধারণ রাজনৈতিক দলের পতাকার চেয়ে একটি ধর্মীয় প্রতীক অঙ্কিত পতাকার আবেদন সাধারণ মানুষের মনে অনেক বেশি গভীর হয়। আইএসআইএস যখন তাদের কালো পতাকায় কালেমা বা ধর্মের মূল বিশ্বাসটি লিখে রাখে, তখন তারা মূলত বোঝাতে চায় যে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানে স্বয়ং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। এই প্রতীকী মনস্তত্ত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি করে, যার ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে তাদের বিরোধিতা করতে সাহস পায় না। একইভাবে খ্রিষ্টান চরমপন্থীরা তাদের পোশাকে ক্রুশ বা বাইবেলের শ্লোক খোদাই করে রাখে, যা তাদের মনে একধরনের ঐশী সুরক্ষার বিভ্রম তৈরি করে। তারা বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর স্বয়ং তাদের এই যুদ্ধে পথ দেখাচ্ছেন। সমাজতাত্ত্বিকরা এই প্রক্রিয়াটিকে স্যাক্রালাইজেশন অফ ভায়োলেন্স (Sacralization of Violence) বা সহিংসতার পবিত্রকরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে একটি সাধারণ খুন বা রক্তপাতকে আধ্যাত্মিক মোড়কে পেঁচিয়ে একটি পবিত্র আচারে পরিণত করা হয়।
এই মনস্তাত্ত্বিক অপব্যবহারের সবচেয়ে করুণ শিকার হয় তরুণ প্রজন্ম। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তরুণদের মগজধোলাই করে। তারা এমন এক আখ্যান তৈরি করে যেখানে তরুণদের বোঝানো হয় যে তাদের বর্তমান জাগতিক জীবনটি সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং কেবল ঈশ্বরের জন্য আত্মত্যাগ করার মাধ্যমেই তারা অনন্ত জীবনের স্বাদ পেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় একজন সাধারণ তরুণ বা তরুণী তার পরিবার, সমাজ এবং নিজস্ব যৌক্তিক চিন্তাভাবনা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা একসময় একটি বদ্ধ ইকো-চেম্বারের ভেতরে আটকা পড়ে, যেখানে তারা কেবল চরমপন্থী নেতাদের নির্দেশকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শেখে। একটি সাধারণ রাজনৈতিক মগজধোলাই থেকে বেরিয়ে আসা হয়তো সম্ভব, কিন্তু যখন সেই মগজধোলাইয়ের সাথে অনন্তকালের নরকবাসের ভয় বা স্বর্গের লোভ জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেই মনস্তাত্ত্বিক খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: পার্থক্য ও অন্তর্নিহিত সাযুজ্য (Comparative Analysis: Differences and Inherent Similarities)
ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং ইসলাম – এই তিনটি ধর্মের চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ঐতিহাসিক পটভূমি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইহুদি চরমপন্থা মূলত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের দখল এবং মেসিয়ানিক যুগের অপেক্ষায় আবর্তিত। খ্রিষ্টান চরমপন্থা, বিশেষ করে আমেরিকায়, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ এবং রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর ইসলামি চরমপন্থা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হতে পারে যে এদের মধ্যে কোনো মিল নেই। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক এবং কৌশলগত কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে, এই তিন গোষ্ঠীর কাজের ধরন এবং চিন্তার প্রক্রিয়ায় অদ্ভুত সব সাযুজ্য রয়েছে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড র্যাপোফোর্ট (David Rapoport) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় চরমপন্থাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এরা কোনো ধরনের রাজনৈতিক আপস বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না (Rapoport, 1984)। তাদের কাছে রাষ্ট্রব্যবস্থা হতে হবে সম্পূর্ণ ঐশী বা ধর্মতান্ত্রিক, যেখানে তাদের ব্যাখ্যাকৃত ধর্মীয় আইনই হবে শেষ কথা।
এই তিন গোষ্ঠীর আরেকটি বড় মিল হলো তাদের দ্বৈতবাদী বিশ্বদৃষ্টি (Dualistic Worldview)। তারা পুরো পৃথিবীকে দুটি সুস্পষ্ট ভাগে ভাগ করে – একটি হলো ঈশ্বরের পক্ষ, আর অন্যটি হলো শয়তানের পক্ষ। তাদের এই অভিধানে মাঝখানে কোনো ধূসর এলাকা নেই। যে তাদের মতাদর্শের সাথে একমত হবে না, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শয়তানের পক্ষে চলে যাবে, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, আইএসআইএস সবচেয়ে বেশি হত্যা করেছে সাধারণ মুসলমানদের, ইহুদি চরমপন্থীরা হত্যা করেছে শান্তিকামী ইহুদি নেতাদের, আর খ্রিষ্টান চরমপন্থীরা আক্রমণ করেছে সাধারণ খ্রিষ্টান রাষ্ট্রকাঠামোকে। এই গোষ্ঠীগুলোর কাছে তাদের ধর্মের সাধারণ অনুসারীরাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তারা মনে করে যে এই সাধারণ মানুষেরা ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে সরে গিয়ে আপসকামিতার পথ বেছে নিয়েছে।
পরিশেষে, এই তিনটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের চরমপন্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমাদের একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর তা হলো, ধর্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে উগ্রবাদী বানায় না। উগ্রবাদ মূলত মানুষের রাজনৈতিক ক্ষোভ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং বঞ্চনাবোধ থেকে জন্ম নেয়। ধর্ম এখানে কেবল একটি বাহন বা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, যা সেই ক্ষোভকে একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক বৈধতা প্রদান করে। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোতে কাঠামোগত বৈষম্য, ভূ-রাজনৈতিক শোষণ এবং সামাজিক অবিচার থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু সুযোগসন্ধানী নেতা সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে পুঁজি করে ধর্মের নামে সহিংসতার আগুন জ্বালাতেই থাকবে। তাই এই সমস্যার সমাধান কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি বৈষম্যহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে কোনো তরুণকে তার বঞ্চনার জবাব খুঁজতে গিয়ে ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হবে না।
অ-আব্রাহামিক ধর্মে উগ্রবাদ ও সহিংসতা (Extremism and Violence in Non-Abrahamic Religions): মিথ, জাতীয়তাবাদ ও ভূরাজনীতি
বৌদ্ধ উগ্রবাদ ও এথনো-জাতীয়তাবাদ (Buddhist Extremism and Ethno-Nationalism): অহিংসার আড়ালে সংঘাত
পশ্চিমা বিশ্ব এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, প্রাচ্যের ধর্মগুলো, বিশেষ করে বৌদ্ধধর্ম, প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত অহিংস এবং শান্তিবাদী। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা এবং ধ্যানের ধারণাগুলো বিশ্বব্যাপী এমনভাবে প্রচারিত হয়েছে, যা অনেককেই বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে এই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে চরমপন্থা বা রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো স্থান নেই। বাস্তব চিত্রটি অবশ্য অনেকটাই ভিন্ন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ধর্মতত্ত্বের গবেষক মাইকেল জেরিজন (Michael Jerryson) তাঁর Buddhist Warfareগ্রন্থে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখিয়েছেন যে, ইতিহাসে বৌদ্ধধর্মের সাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সামরিক সংঘাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে। জেরিজনের মতে, যেকোনো ধর্মীয় কাঠামোর মতোই বৌদ্ধধর্মকেও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বা রাজাদের যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এই ধারণাটি অহিংসার রোমান্টিক ধারণাকে ভেঙে দেয় এবং প্রমাণ করে যে, কাঠামোগত বঞ্চনা বা জাতিগত সংঘাতের ক্ষেত্রে অ-আব্রাহামিক ধর্মগুলোও সমানভাবে উগ্র ও সহিংস রূপ ধারণ করতে পারে (Jerryson, 2010)।
সমকালীন বিশ্বে বৌদ্ধ উগ্রবাদের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলো দেখা যায় শ্রীলঙ্কা এবং মিয়ানমারে। এই দুটি দেশেই সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে চরম হুমকির মুখে বলে মনে করে। শ্রীলঙ্কায় ‘বদু বালা সেনা’ এবং মিয়ানমারে ‘৯৬৯ আন্দোলন‘-এর মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো গড়ে উঠেছে, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন কট্টরপন্থী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। এই গোষ্ঠীগুলো একটি সুনির্দিষ্ট এথনো-জাতীয়তাবাদ (Ethno-Nationalism) বা জাতিগত-জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছে। তারা প্রচার করে যে তাদের ভূখণ্ডটি কেবল তাদের ধর্মের অনুসারীদের জন্যই পবিত্র এবং অন্য ধর্মাবলম্বীরা, বিশেষ করে মুসলিম বা তামিল হিন্দুরা, তাদের এই পবিত্র ভূমির জন্য সরাসরি হুমকি। মাইকেল জেরিজন বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই সন্ন্যাসীরা তাদের ধর্মগ্রন্থের নির্দিষ্ট কিছু অংশের অপব্যাখ্যা করে সহিংসতাকে বৈধতা প্রদান করেন। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝান যে, ধর্মকে রক্ষা করার জন্য অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ওপর বলপ্রয়োগ করা কোনো পাপ নয়, এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব।
এই ধরনের উগ্রবাদ বিস্তারের পেছনে ঐতিহাসিক পুরাণ বা মিথলজির একটি বিশাল প্রভাব রয়েছে। শ্রীলঙ্কার উগ্রপন্থী সন্ন্যাসীরা প্রায়শই ‘মহাবংশ‘ নামক একটি প্রাচীন পালি মহাকাব্যের উল্লেখ করেন। এই মহাকাব্যে এমন সব যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, ধর্ম রক্ষার জন্য বিধর্মীদের হত্যা করা দোষের কিছু নয়। আধুনিক ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, মহাবংশ কোনো বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের বই নয়; এটি প্রধানত প্রাচীনকালের সাহিত্যিক কল্পনা এবং পৌরাণিক আখ্যানের একটি মিশ্রণ। উগ্রবাদী নেতারা এই সাহিত্যিক কল্পনাকেই অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। তারা মিথলজিকে ব্যবহার করে এমন এক আবেগ তৈরি করেন, যা সাধারণ মানুষকে অন্ধভাবে সহিংসতায় অংশ নিতে বাধ্য করে। জেরিজনের গবেষণা থেকে এটি পরিষ্কার হয় যে, বৌদ্ধ উগ্রবাদ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় আবেগ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, জাতিগত আধিপত্য এবং পৌরাণিক আখ্যানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক মতাদর্শ।
হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক সহিংসতা (Hindu Nationalism and Political Violence): পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে আরেকটি প্রভাবশালী অ-আব্রাহামিক চরমপন্থার রূপ হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হিন্দুত্ববাদ (Hindutva) নামে পরিচিত। হিন্দুধর্মের প্রাচীন দর্শনগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্র্য এবং বহুত্ববাদ থাকা সত্ত্বেও, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই ধর্মীয় পরিচয়টিকে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফ জাফ্রেলট (Christophe Jaffrelot) তাঁর The Hindu Nationalist Movement in India গ্রন্থে হিন্দুত্ববাদের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। জাফ্রেলট দেখিয়েছেন, বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতো তাত্ত্বিকেরা হিন্দুত্ববাদকে কোনো আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় দর্শন হিসেবে নয়, একটি কট্টর জাতিগত ও ভৌগোলিক পরিচয় হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। সাভারকরের মতাদর্শ অনুযায়ী, ভারতীয় ভূখণ্ডে যাদের পবিত্র তীর্থস্থান নেই, তারা এই জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে না। এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি একটি ভয়াবহ বিভাজনের জন্ম দেয়, যা ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে একটি ধর্মীয় সংখ্যাগুরু আধিপত্যের রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখে (Jaffrelot, 1996)।
এই উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)-এর মতো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এই সংগঠনগুলো নিজেদের সাংস্কৃতিক সংগঠন বলে দাবি করলেও, জাফ্রেলটের গবেষণা অনুযায়ী এগুলো দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তারা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত করার জন্য অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন প্রতীক ও আখ্যান ব্যবহার করে। এর সবচেয়ে বড় এবং ধ্বংসাত্মক উদাহরণ হলো ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা। উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে যে, ঠিক ওই স্থানেই তাদের দেবতা রামের জন্ম হয়েছিল এবং প্রাচীনকালে সেখানে থাকা একটি মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন বা ইতিহাস চর্চায় এই নির্দিষ্ট দাবির পক্ষে অকাট্য কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলেও, রাজনৈতিক নেতারা এই পৌরাণিক বিশ্বাসটিকেই তাদের সহিংস প্রচারণার প্রধান উপজীব্য করে তোলেন।
রাজনৈতিক সহিংসতার পেছনে কাজ করে একটি তীব্র পরিচয় সংকট এবং অতীতমুখী আখ্যান। উগ্রবাদীরা একটি কাল্পনিক স্বর্ণযুগের কথা প্রচার করে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে পুরো উপমহাদেশ তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করে। তারা বর্তমানের আর্থসামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করে। ক্রিস্টোফ জাফ্রেলট বিশ্লেষণ করেছেন যে, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো কোনো আকস্মিক দাঙ্গা ছিল না, এগুলো ছিল দীর্ঘমেয়াদী মেরুকরণ এবং কাঠামোগত প্রোপাগান্ডার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। হিন্দুত্ববাদ প্রমাণ করে যে, একটি ধর্মের ভেতরে কোনো কেন্দ্রীয় ধর্মগ্রন্থ বা একক ঈশ্বর না থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে একটি কাল্পনিক শত্রুর ভয় তৈরি করা গেলে সেই ধর্মের অনুসারীদের দিয়েও ভয়াবহ মাত্রার চরমপন্থা উসকে দেওয়া সম্ভব। এটি এমন এক ধরনের উগ্রবাদ, যা আধ্যাত্মিকতার চেয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের দিকেই বেশি মনোযোগী।
শিখ চরমপন্থা ও খালিস্তান আন্দোলন (Sikh Extremism and the Khalistan Movement): বঞ্চনা ও সশস্ত্র বিদ্রোহ
ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাসে অ-আব্রাহামিক চরমপন্থার আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় হলো আশির দশকে শুরু হওয়া শিখদের খালিস্তান আন্দোলন। শিখধর্ম ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মের অনেকগুলো সমন্বয়বাদী ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। শান্তি, সাম্য এবং লঙ্গরখানার মতো মানবিক ধারণাগুলো এই ধর্মের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। এরপরও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ধর্মের ভেতর থেকে একটি অত্যন্ত ভয়ংকর সশস্ত্র চরমপন্থার উদ্ভব ঘটে। সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মতাত্ত্বিক মার্ক জুয়ের্গেন্সমায়ার (Mark Juergensmeyer) তাঁর Terror in the Mind of God গ্রন্থে জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শিখ চরমপন্থার মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। জুয়ের্গেন্সমায়ার দেখিয়েছেন যে, শিখদের এই চরমপন্থা শূন্য থেকে জন্ম নেয়নি; এর পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সংকট এবং একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার পরিচয় হারিয়ে ফেলার গভীর আশঙ্কা (Juergensmeyer, 2003)।
ভিন্দ্রানওয়ালের মতো নেতারা শিখ যুবকদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। তারা দাবি করেন যে, শিখদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ হলো একটি স্বাধীন ও ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠা করা। জুয়ের্গেন্সমায়ার বিশ্লেষণ করেছেন যে, ভিন্দ্রানওয়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে শিখদের প্রাচীন বীরত্বগাথা এবং শহীদত্বের ইতিহাসকে আধুনিক রাজনৈতিক সংঘাতের সাথে যুক্ত করেছিলেন। তিনি সাধারণ যুবকদের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেন যে, তারা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না, তারা তাদের পবিত্র ধর্মীয় স্থানগুলোকে রক্ষার জন্য এক ঐশ্বরিক যুদ্ধে লিপ্ত। এই মতাদর্শিক মগজধোলাইয়ের ফলে বব্বর খালসা এবং খালিস্তান লিবারেশন ফোর্সের মতো অসংখ্য সশস্ত্র সংগঠন গড়ে ওঠে, যারা পাঞ্জাব জুড়ে গুপ্তহত্যা, বোমাহামলা এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর নির্বিচার আক্রমণ শুরু করে।
এই চরমপন্থা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে ১৯৮৪ সালে, ভারত সরকার শিখদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান স্বর্ণমন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টার পরিচালনা করার পর। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই সামরিক অভিযান চরমপন্থীদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে করা হলেও, এটি সাধারণ শিখদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানে। এর প্রতিশোধ হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর নিজের শিখ দেহরক্ষীরাই হত্যা করে, যার প্রতিক্রিয়ায় ভারতজুড়ে ভয়াবহ শিখ-বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়। জুয়ের্গেন্সমায়ারের গবেষণা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষোভ প্রশমনে ব্যর্থ হয়ে অতিরিক্ত সামরিক শক্তির প্রয়োগ করলে সেই গোষ্ঠীর ভেতরে চরমপন্থা আরও বেশি বৈধতা পেয়ে যায়। শিখ চরমপন্থার এই ইতিহাস আমাদের দেখায় যে, একটি তুলনামূলক আধুনিক ও সমন্বয়বাদী ধর্মও রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং ভূরাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হলে খুব সহজেই সহিংসতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহের পথে পা বাড়াতে পারে।
আউম শিনরিকিও এবং ডুমসডে কাল্ট (Aum Shinrikyo and Doomsday Cults): সাইবারনেটিক যুগ ও রাসায়নিক সন্ত্রাস
উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ কেবল প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া নতুন ধর্মীয় আন্দোলন বা নিউ এজ মুভমেন্টগুলোও চরমপন্থার এক নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। এর সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ হলো জাপানের আউম শিনরিকিও নামক সংগঠনটি। ১৯৯৫ সালে টোকিওর সাবওয়ে বা পাতালরেলে এই সংগঠনের সদস্যরা সারিন গ্যাস হামলা চালায়, যা সারা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক রবার্ট জে. লিফটন (Robert J. Lifton) তাঁর Destroying the World to Save It গ্রন্থে এই সংগঠনটির ভিন্নধর্মী মতাদর্শ এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছেন। লিফটন দেখিয়েছেন, আউম শিনরিকিও কোনো একক ধর্মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এর প্রতিষ্ঠাতা শোকো আসাহারা বৌদ্ধধর্ম, হিন্দু দেবতা শিবের ধ্বংসাত্মক রূপ, যোগব্যায়াম এবং খ্রিষ্টধর্মের অ্যাপোক্যালিপটিক বা যুগান্তকারী ধ্বংসের ধারণাগুলোকে একসাথে মিশিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন ডুমসডে কাল্ট (Doomsday Cult) বা মহাপ্রলয়বাদী ধর্ম তৈরি করেছিলেন (Lifton, 1999)।
আউম শিনরিকিওর মতাদর্শটি ছিল চরমভাবে বিজ্ঞানবিরোধী, অথচ তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রগুলোকে ব্যবহার করেছিল। লিফটন বিশ্লেষণ করেছেন যে, আসাহারা তাঁর অনুসারীদের বোঝাতেন খুব শিগগিরই পৃথিবীতে একটি পারমাণবিক যুদ্ধ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে যাচ্ছে এবং কেবল তাঁর অনুসারীরাই সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে পারবে। ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সাধারণত একটি অত্যন্ত বদ্ধ ইকো-চেম্বার তৈরি করে। আউম শিনরিকিওর সদস্যরা, যাদের মধ্যে অনেক মেধাবী বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকও ছিলেন, বাইরের সমাজ থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন। লিফটন এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে ‘মেগালোম্যানিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা নিজেকে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের সমতুল্য বলে দাবি করেন এবং তাঁর অনুসারীরা অন্ধভাবে তাঁর যেকোনো নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত থাকে।
টোকিওর সাবওয়েতে সারিন গ্যাস হামলার ঘটনাটি বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর আগে মনে করা হতো, কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা বিশাল কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের পক্ষেই রাসায়নিক বা জৈবিক অস্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব। আউম শিনরিকিও প্রমাণ করে দেয় যে, একটি ছোট, ধর্মান্ধ এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল গোষ্ঠীও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র বা ডব্লিউএমডি (WMD) তৈরি করতে পারে। লিফটনের গবেষণা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে, অ-আব্রাহামিক বা নতুন ধর্মীয় আন্দোলনগুলো আধুনিক সমাজের বিচ্ছিন্নতা, তরুণদের পরিচয় সংকট এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠে। এ কারণে তারা প্রথাগত রাজনৈতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর চেয়েও অনেক বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে। তাদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি থাকে না, তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে বর্তমান মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়া।
মিথলজি ও ইতিহাসের সংঘাত (Conflict of Mythology and History): প্রাচীন আখ্যানের রাজনৈতিক ব্যবহার
অ-আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে চরমপন্থা বিস্তারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মিথলজি বা পৌরাণিক আখ্যানকে বাস্তব ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা। প্রাচ্যের ধর্মগুলোতে সাধারণত বিশাল বিশাল মহাকাব্য এবং রূপকথার গল্প রয়েছে, যেগুলো প্রধানত নৈতিকতা, দর্শন বা সাহিত্যের অংশ। উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো এই গল্পগুলোকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে এবং বর্তমানের সংঘাতগুলোতে সেগুলোর প্রয়োগ ঘটায়। নৃবিজ্ঞানী ও ধর্মতাত্ত্বিক পিটার ভ্যান ডার ভির (Peter van der Veer) তাঁর Religious Nationalism: Hindus and Muslims in India গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক সংঘাতের বিষয়টি চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ভ্যান ডার ভির দেখিয়েছেন যে, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো রামায়ণ বা মহাভারতের মতো মহাকাব্যগুলোকে নিখুঁত ইতিহাস বলে দাবি করার মাধ্যমে বর্তমানের রাজনৈতিক সীমানা বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় ভিত্তি তৈরি করতে চায় (van der Veer, 1994)।
ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ব সবসময় বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ, কার্বন ডেটিং এবং পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মহাকাব্যগুলোতে বর্ণিত অনেক রাজ্য, অলৌকিক অস্ত্র বা বিশাল যুদ্ধগুলোকে বাস্তবতার চেয়ে সাহিত্যিক কল্পনার ওপর বেশি নির্ভরশীল হিসেবে প্রমাণ করা হলে উগ্রবাদীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। ভ্যান ডার ভির বিশ্লেষণ করেছেন যে, উগ্রবাদীরা বিজ্ঞান এবং আধুনিক ইতিহাস চর্চাকে তাদের ধর্মের প্রতি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝায় যে, বিজ্ঞান তাদের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর একটি প্রোপাগান্ডা মাত্র। এই ধরনের মানসিকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিজ্ঞানবিমুখতা এবং যুক্তিবিরোধী চিন্তার জন্ম দেয়। তারা মিথলজিকে ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করে কারণ মিথলজি তাদের একটি কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি দেয়, যা বাস্তব পৃথিবীর বঞ্চনা বা ব্যর্থতাগুলোকে সাময়িকভাবে ভুলিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
মিথলজিকে ইতিহাস হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার এই কৌশলটির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রয়োগ দেখা যায় জাতিগত নিধনের ক্ষেত্রে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো হাজার বছর আগের কোনো মহাকাব্যে বর্ণিত খলনায়কদের বংশধর হিসেবে বর্তমান সময়ের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে তাদের ওপর নির্বিচার আক্রমণ চালায়। পিটার ভ্যান ডার ভিরের গবেষণা প্রমাণ করে যে, পৌরাণিক আখ্যানগুলোর এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার মানুষের স্বাভাবিক বিচারবোধকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। একজন সাধারণ মানুষ তখন যুক্তিবাদী অবস্থান থেকে কোনো কিছু যাচাই করতে পারে না, অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে মহাকাব্যের কাল্পনিক শত্রুদের বাস্তবে খুঁজে বেড়ায়। এভাবেই মিথলজি এবং ইতিহাসের মধ্যকার কৃত্রিম সংঘাত প্রাচ্যের সমাজগুলোতে আধুনিক চরমপন্থা ও অসিষ্ণুতার অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
আব্রাহামিক ও অ-আব্রাহামিক উগ্রবাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ (Comparative Analysis of Abrahamic and Non-Abrahamic Extremism): ভূরাজনীতি ও স্থানীয় বাস্তবতা
আব্রাহামিক (ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলাম) এবং অ-আব্রাহামিক (বৌদ্ধ, হিন্দু, শিখ) চরমপন্থার মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক কাঠামোগত এবং কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তাঁর Inside Terrorism গ্রন্থে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, আব্রাহামিক উগ্রবাদ অনেক সময় একটি বৈশ্বিক বা ট্রান্সন্যাশনাল এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে। আল-কায়েদা বা আইএসআইএস-এর মতো সংগঠনগুলো কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, তাদের লক্ষ্য থাকে একটি বৈশ্বিক ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে, অ-আব্রাহামিক চরমপন্থা সাধারণত অনেক বেশি স্থানীয় বা এথনো-সেন্ট্রিক হয়ে থাকে। হিন্দু জাতীয়তাবাদ, বৌদ্ধ উগ্রবাদ বা শিখ চরমপন্থা– এগুলো সবই একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা এবং জাতিগত পরিচয়ের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তারা বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখে না, তারা তাদের নিজস্ব নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে অন্য সম্প্রদায়ের প্রভাবমুক্ত করে একটি একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করতে চায় (Hoffman, 2006)।
স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই অ-আব্রাহামিক চরমপন্থা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আব্রাহামিক চরমপন্থীরা প্রায়শই রাষ্ট্রকাঠামোকে তাদের শত্রু মনে করে এবং সেটি ধ্বংস করার চেষ্টা করে। শ্রীলঙ্কা বা ভারতের মতো দেশগুলোতে দেখা যায়, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রের ভেতরেই একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন লাভ করে। ব্রুস হফম্যান বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ধরনের চরমপন্থাকে মোকাবিলা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অনেক বেশি কঠিন। কোনো উগ্র মতাদর্শ রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়ে গেলে সেটিকে আর সাধারণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তারা রাষ্ট্রের আইন, শিক্ষাব্যবস্থা এবং গণমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের মতাদর্শকে বৈধতা প্রদান করে এবং সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে।
পরিশেষে, আব্রাহামিক হোক বা অ-আব্রাহামিক, যেকোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যে জন্ম নেওয়া চরমপন্থার কারণগুলো প্রায় একই রকম। রাজনৈতিক বঞ্চনা, জাতিগত পরিচয় হারানোর ভয়, রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যই এর প্রধান কারণ। ধর্মীয় বিশ্বাস নিজে থেকে কাউকে সন্ত্রাসী বানায় না। কিছু সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা সাধারণ মানুষের এই আর্থসামাজিক ক্ষোভগুলোকে পুঁজি করেন এবং তাদের নিজস্ব ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার জন্য ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। ব্রুস হফম্যান এবং অন্যান্য গবেষকদের বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার এই বৈশ্বিক সংকটকে কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি বস্তুনিষ্ঠ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে কোনো পৌরাণিক আখ্যানকে ইতিহাসের নামে চালিয়ে দিয়ে বা কোনো কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি তুলে অন্য কোনো মানুষের জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
ধর্ম, মতাদর্শ ও উগ্রবাদ (Religion, Ideology and Extremism): বিশ্বাস, রাজনীতি ও সহিংসতা
ধর্ম, রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসবাদ (Religion, State and Terrorism): সম্পর্ক ও সংঘাত
ধর্ম ও রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া (Historical Interaction of Religion and State)
মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক বরাবরই একটি জটিল ও বহুমাত্রিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত এই সম্পর্কের বাঁকগুলো নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাচীন সমাজগুলোতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য টানা যেত না। সেই সময়ের শাসকেরা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করতেন, আবার কখনও কখনও স্বয়ং ঈশ্বর হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতেন। এই ধরনের শাসনব্যবস্থায় রাজার নির্দেশ আর ঈশ্বরের নির্দেশ প্রায় সমার্থক বলে ধরে নেওয়া হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে এই ধারণায় ফাটল ধরতে শুরু করে। বিশেষ করে ইউরোপে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি (Treaty of Westphalia) রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ককে একটি নতুন রূপরেখা প্রদান করে। এই চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার বীজ বপন করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রের সীমানা এবং সার্বভৌমত্ব ধর্মীয় প্রভাব থেকে আলাদা একটি ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর দিকে ধাবিত হতে থাকে।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই পরিবর্তনের সাথে সাথে সহিংসতার ধরনেও পরিবর্তন আসে। প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক উইলিয়াম ক্যাভানাঘ (William Cavanaugh) তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিজের বৈধতা প্রমাণের জন্য অনেক সময় ধর্মীয় সহিংসতার একটি নির্দিষ্ট ভাষ্য তৈরি করে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে একমাত্র যৌক্তিক সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য ধর্মীয় সংঘাতের ভয়াবহতাকে অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। ক্যাভানাঘের এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ খুব সহজে বা শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ঘটেনি। বরং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উদীয়মান আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের নীরব বা সরব সংঘাত লেগেই ছিল। রাষ্ট্র চেয়েছিল সমাজের প্রতিটি স্তরের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া ছিল।
এই ঐতিহাসিক বিবর্তনের পথ ধরেই পরবর্তীতে সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) এর সাথে ধর্মের একটি নতুন ধরনের সমীকরণ তৈরি হয়। যখন আধুনিক রাষ্ট্রগুলো ক্রমশ ধর্মনিরপেক্ষ নীতির দিকে ঝুঁকতে থাকে, তখন সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালনায় ধর্মীয় অনুশাসনকে অপরিহার্য মনে করতেন, তারা নতুন এই রাষ্ট্রকাঠামোকে নিজেদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এভাবেই রাষ্ট্রীয় নীতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে একটি শূন্যস্থান তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে নানা ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, এই সংঘাতগুলো অনেক সময়ই শুধুমাত্র আদর্শিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করেছে। ধর্মীয় পুরাণ বা মিথোলজিকে অনেক গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে সেগুলোকে অবিতর্কিত ইতিহাস হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে, যাতে করে রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা একটি পবিত্র রূপ পায়। এভাবেই রাষ্ট্র ও ধর্মের ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া সমকালীন বিশ্বে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশের জন্ম দিয়েছে।
ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি (Theoretical Foundations of Religious Terrorism)
ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে বোঝার জন্য রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কিছু তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। সাধারণ রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের সাথে এর একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য লড়াই করে। তাদের লক্ষ্য থাকে একটি দৃশ্যমান পার্থিব ফলাফল অর্জন করা। কিন্তু যখন কোনো গোষ্ঠী তাদের কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় মোড়কে আবৃত করে, তখন তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পার্থিব সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তাত্ত্বিক মার্ক জুয়ের্গেন্সমায়ার (Mark Juergensmeyer) এই বিষয়টিকে তাঁর কসমিক ওয়ার (Cosmic War) বা ব্রহ্মাণ্ডিক যুদ্ধ (Cosmic War) তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তাদের পার্থিব রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগ্রামকে একটি বৃহত্তর, মহাজাগতিক রূপ দান করে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা স্বয়ং ঈশ্বরের পক্ষে লড়ছে এবং তাদের প্রতিপক্ষ শুধু কোনো রাষ্ট্র বা সরকার নয়, বরং তারা সরাসরি অশুভ শক্তির প্রতিনিধি।
এই ধরনের মানসিকতা একটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, কারণ যখন কোনো গোষ্ঠী মনে করে যে তারা ঐশ্বরিক নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে, তখন তারা প্রচলিত সামাজিক বা মানবিক আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না। জুয়ের্গেন্সমায়ার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Terror in the Mind of God-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষোভ একটি পবিত্র দায়িত্বে পরিণত হয়। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা অনেক সময়ই নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ মানুষের সমর্থন বা রাজনৈতিক বৈধতার প্রয়োজন বোধ করে না। তাদের কাজের একমাত্র জবাবদিহিতা থাকে তাদের কল্পিত ঐশ্বরিক সত্তার কাছে। এ কারণে তাদের হামলায় সাধারণ রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণহানি ঘটে। কারণ তারা মনে করে, তাদের লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের আপস করা মানেই ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
আরেকজন প্রখ্যাত গবেষক ডেভিড রাপোপোর্ট (David Rapoport) ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের উদ্ভবকে আধুনিক সন্ত্রাসবাদের চতুর্থ তরঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৭৯ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ (Religious Terrorism) এর একটি নতুন উত্থান পরিলক্ষিত হয়। রাপোপোর্ট দেখিয়েছেন যে, এই ধারার সন্ত্রাসীরা প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, পুরাণ ও মিথোলজিক্যাল ঘটনাগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে। তারা এমনভাবে এই পুরাণগুলোকে ব্যবহার করে যেন সেগুলো কোনো প্রমাণিত ঐতিহাসিক দলিল এবং বর্তমান সময়ের নির্দেশিকা। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ধর্মীয় বৈধতাকরণ (Religious Legitimation)। তারা তাদের অনুসারীদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে, রাষ্ট্র বা সমাজের বর্তমান কাঠামো সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং একে ভেঙে ফেলে একটি পবিত্র ব্যবস্থা কায়েম করা তাদের পবিত্র দায়িত্ব। রাপোপোর্ট আরও বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ধরনের সংগঠনগুলো অনেক সময় আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ব্যবহার করলেও আদর্শগতভাবে তারা একটি কাল্পনিক অতীত ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়। এভাবেই তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ তার নিজস্ব একটি জগৎ তৈরি করে নেয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিক্রিয়া ও সহিংসতা (State Policy Reactions and Violence)
রাষ্ট্র কীভাবে তার ভেতরের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে আচরণ করে, তার ওপর অনেক সময় নির্ভর করে সেই সমাজে উগ্রবাদের উত্থান ঘটবে কি না। রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে অনেক সময় সমাজে এমন এক ধরনের মেরুকরণ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। গবেষক জোনাথন ফক্স (Jonathan Fox) ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত নিয়ে বিশদ কাজ করেছেন। তাঁর মতে, কোনো রাষ্ট্র যখন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর কাঠামোগত বৈষম্য চাপিয়ে দেয় বা তাদের ধর্মীয় আচার পালনে অতিরিক্ত আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করে, তখন সেই গোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন (State Repression) এর অনুভূতি তীব্র হয়। রাষ্ট্র হয়তো ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য বা নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করার জন্যই এই নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তবে এর ফলাফল হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিবাদ করার সুযোগ না পেয়ে সেই গোষ্ঠীর কিছু অংশ অনেক সময় আত্মগোপনে চলে যায় এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় নীতির এই দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক সময় রাষ্ট্র নিজেই নিজের জন্য শত্রু তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকার কিছু দেশে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো যখন সব ধরনের রাজনৈতিক বিরোধিতাকে কঠোর হাতে দমন করেছে, তখন বিরোধীরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের একত্রিত হওয়ার একমাত্র নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। সাধারণ রাজনৈতিক দাবিগুলো তখন ধীরে ধীরে ধর্মীয় রূপ লাভ করেছে। জোনাথন ফক্স দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি অনেক সময় মধ্যপন্থী ধর্মীয় নেতাদের দুর্বল করে দেয় এবং উগ্রবাদীদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়। কারণ, নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে উগ্রবাদীরাই সবচেয়ে বেশি সরব হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে। এভাবেই রাষ্ট্রের ভুল নীতি একটি ছোট রাজনৈতিক সমস্যাকে ভয়ানক ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদে পরিণত করতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে, কিছু রাষ্ট্র আবার উল্টো নীতিও গ্রহণ করে থাকে। তারা হয়তো উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরির জন্য এই গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই নীতি কখনোই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনে না। যারা একসময় রাষ্ট্রের সহায়তায় শক্তিশালী হয়, তারা একপর্যায়ে সেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং খোদ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ব্লোব্যাক (Blowback)। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধর্মীয় সহিংসতার উত্থান একটি জটিল চক্র। রাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত কঠোর হয়, তবে তা বিদ্রোহের জন্ম দেয়; আবার রাষ্ট্র যদি তাদের ব্যবহার করতে চায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ধ্বংসের কারণ হতে পারে। এই ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিয়েই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে এবং নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়।
পবিত্র যুদ্ধ বনাম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Holy War vs. Secular State)
আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় আদর্শিক সংঘাতগুলোর একটি হলো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের পবিত্র যুদ্ধের ধারণার মধ্যকার দ্বন্দ্ব। আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো সংবিধান, যেখানে মানুষের তৈরি করা আইন দ্বারা সমাজ পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা মনে করে সমাজের একমাত্র নিয়ামক হওয়া উচিত ঐশ্বরিক আইন বা ধর্মগ্রন্থের বিধান। নৃতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক তালাল আসাদ (Talal Asad) ধর্মনিরপেক্ষতার গঠন নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফূর্ত বিষয় নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামো, যা ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডিতে আটকে রাখতে চায়। আসাদ দেখিয়েছেন, যখন আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মকে জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী বিষয়টিকে তাদের পরিচিতি এবং অস্তিত্বের প্রতি চরম আঘাত হিসেবে গ্রহণ করে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে পবিত্র যুদ্ধ (Holy War) এর ধারণা। বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যেই কোনো না কোনোভাবে ন্যায়যুদ্ধের বা পবিত্র যুদ্ধের মিথোলজিক্যাল বর্ণনা রয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এই প্রাচীন পুরাণ ও রূপকগুলোকে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে ফেলে। তারা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে সেই পৌরাণিক কাহিনীর খলনায়কদের সাথে তুলনা করে এবং নিজেদের সেই কাহিনীর বীর যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করে। প্রখ্যাত দার্শনিক চার্লস টেলর (Charles Taylor) তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ধর্মনিরপেক্ষ যুগে মানুষের বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের মধ্যে যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, ধর্মীয় চরমপন্থীরা সেটাকে কাজে লাগিয়ে একটি দ্বৈত পৃথিবী তৈরি করে। তাদের চোখে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলো পাপ ও দুর্নীতির আখড়া, এবং একে ধ্বংস করার মাধ্যমে তারা একটি বিশুদ্ধ ও পবিত্র সমাজ গঠন করতে পারবে। টেলর এই আধুনিক যুগের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে খুব সুন্দরভাবে তাঁর তত্ত্বে ফুটিয়ে তুলেছেন।
এই পবিত্র যুদ্ধের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো খুব সহজেই তরুণদের মগজ ধোলাই করতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে অনেক সময় সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক বৈষম্য, ন্যায়বিচারের অভাব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। উগ্রবাদী নেতারা রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতাগুলোকে তুলে ধরে প্রচার করে যে, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের তৈরি আইন কখনোই সমাজে শান্তি আনতে পারে না। তাদের মতে, একমাত্র ঐশ্বরিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তারা তাদের অনুসারীদের বোঝায় যে, এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে উৎখাত করা কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি মহৎ কাজ। এভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) এর বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের এই যুদ্ধ একটি বৈশ্বিক রূপ লাভ করেছে। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন এদের দমন করতে যায়, তখন এরা সেই দমনপীড়নকেও তাদের পবিত্র যুদ্ধের অংশ হিসেবেই প্রচার করে, যাতে করে নতুন সদস্য সংগ্রহ করা সহজ হয়।
জাতীয়তাবাদ, পরিচয় ও ধর্মীয় উগ্রবাদ (Nationalism, Identity and Religious Extremism)
ধর্ম ও রাষ্ট্রের সংঘাতের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জাতীয়তাবাদ এবং মানুষের পরিচয়ের সংকট। আধুনিক যুগে জাতীয়তাবাদ সাধারণত ভাষা, সংস্কৃতি বা ভৌগোলিক সীমানার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু যখন এই জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্ম এসে যুক্ত হয়, তখন তা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী রজার ফ্রিডল্যান্ড (Roger Friedland) ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছেন। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ (Religious Nationalism) আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের একটি সরাসরি বিকল্প হিসেবে কাজ করে। ফ্রিডল্যান্ডের মতে, যখন সাধারণ জাতীয়তাবাদ মানুষকে একটি শক্ত পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়, তখন ধর্ম সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসে। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা মনে করে, তাদের জাতি এবং তাদের ধর্ম একে অপরের পরিপূরক। যারা তাদের ধর্মের অনুসারী নয়, তারা সেই জাতিরও অংশ হতে পারে না।
পরিচয় রাজনীতির এই খেলাটি সমাজকে তীব্রভাবে বিভক্ত করে ফেলে। পরিচয় রাজনীতি (Identity Politics) এর কারণে মানুষ নিজেদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলে এবং বাইরের সবাইকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। যখন কোনো রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে তাদের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করে, তখন সেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকে অনেক সময় পাল্টা উগ্রবাদের জন্ম হয়। আবার অন্যদিকে, যদি কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠী মনে করে যে রাষ্ট্র তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে, তখন তারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফ্রিডল্যান্ড বিশ্লেষণ করেছেন যে, আধুনিকায়নের ফলে মানুষের সনাতনী পরিচয়গুলো যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন তারা ধর্মের কাছে আশ্রয় খোঁজে। ধর্ম তাদেরকে একটি সুনির্দিষ্ট, অপরিবর্তনীয় এবং পবিত্র পরিচয় প্রদান করে, যা কোনো রাষ্ট্র বা সরকার তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না বলে তারা বিশ্বাস করে।
এই পরিচয়ের সংকট থেকে জন্ম নেওয়া উগ্রবাদ খুব সহজেই সন্ত্রাসবাদে রূপ নিতে পারে। কারণ, যখন একটি গোষ্ঠী মনে করে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তখন তারা আত্মরক্ষার খাতিরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। তারা তাদের রাজনৈতিক দাবিগুলোকে ধর্মীয় আবরণে ঢেকে দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়, জাতিগত সংঘাতগুলো ধীরে ধীরে ধর্মীয় সংঘাতে পরিণত হয়েছে। নেতারা খুব সুকৌশলে প্রাচীন ধর্মীয় মিথোলজিগুলোকে জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথে মিশিয়ে দেন। সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেও পারে না যে, তারা কোনো ঐতিহাসিক সত্যের জন্য লড়াই করছে না, বরং কিছু পৌরাণিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হচ্ছে। এভাবেই জাতীয়তাবাদ, পরিচয় এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের একটি বিষাক্ত ত্রিভুজ তৈরি হয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিচ্ছে।
সমকালীন বিশ্বে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি (Dynamics of Religious Terrorism in the Contemporary World)
একুশ শতকে এসে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ একটি নতুন এবং আরও জটিল রূপ লাভ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিশ্বায়নের ফলে সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন আর কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব নয়। প্রখ্যাত সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তাঁর ইনসাইড টেরোরিজম নামক গ্রন্থে সমকালীন ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। হফম্যানের মতে, আধুনিক ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রাণঘাতী মাত্রা। অতীতের রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালাত, যাতে তাদের রাজনৈতিক দাবি আদায় করা যায়। কিন্তু আধুনিক ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা চায় সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটাতে। কারণ তারা মনে করে, তাদের কাজের কোনো পার্থিব দর্শক নেই; তাদের একমাত্র দর্শক হলো স্বয়ং ঈশ্বর।
এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বায়ন (Globalization) একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্বায়নের ফলে যেমন বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে, তেমনি উগ্রবাদী মতাদর্শও খুব সহজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সন্ত্রাসীরা এখন খুব সহজেই আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক (Transnational Networks) গড়ে তুলতে পারছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে তারা অন্য প্রান্তের তরুণদের র্যাডিকালাইজড বা উগ্রপন্থী করতে সক্ষম হচ্ছে। হফম্যান দেখিয়েছেন যে, এই নেটওয়ার্কগুলোর কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থাকে না। এরা বিভিন্ন ছোট ছোট সেলে বিভক্ত হয়ে কাজ করে, যা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক এই সন্ত্রাসবাদীরা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে অসম যুদ্ধ (Asymmetrical Warfare) এর কৌশল বেছে নিয়েছে। তারা আত্মঘাতী হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং জনবহুল স্থানে বোমাহামলার মতো কৌশলগুলো ব্যবহার করে রাষ্ট্রে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চায়।
সমকালীন বিশ্বে এই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি প্রতিনিয়ত তার কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে তাদের ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করছে। তারা ইন্টারনেটে তাদের নিজস্ব প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, যেখানে তারা ধর্মীয় মিথোলজিগুলোকে নিখুঁত ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে বাস্তব ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যারা নিজেদের জীবনে হতাশাগ্রস্ত বা যাদের মধ্যে পরিচয়ের সংকট রয়েছে, তারা খুব সহজেই এই চকচকে প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পা দেয়। হফম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এই নতুন ধরনের হুমকির মুখোমুখি হতে গিয়ে প্রায়শই খেই হারিয়ে ফেলছে। কারণ এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা শুধু অস্ত্র দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মতাদর্শিক লড়াই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি ধর্মীয় মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। ফলে, সমকালীন বিশ্বে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার এই সংঘাত আগামী দিনে আরও নতুন মাত্রা পাবে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য একটি স্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে।
ধর্মনিরপেক্ষতা, মৌলবাদ ও উগ্রবাদ (Secularization, Fundamentalism and Extremism): আধুনিক রূপান্তর
ধর্মনিরপেক্ষীকরণ তত্ত্ব ও তার ঐতিহাসিক বিবর্তন (Secularization Theory and Its Historical Evolution)
ইউরোপীয় নবজাগরণ ও শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানবসমাজের চিন্তাচেতনায় এক বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং যুক্তিবাদী দর্শনের প্রসার সমাজের উপর থেকে ধর্মীয় অনুশাসনের দীর্ঘদিনের প্রভাবকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে ধর্মনিরপেক্ষীকরণ (Secularization) বলা হয়। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) এই প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর বিখ্যাত ‘জগতের মোহমুক্তি’ বা ডিসএনচ্যান্টমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ধারণার অবতারণা করেন। ওয়েবারের মতে, আধুনিকায়নের সাথে সাথে সমাজ থেকে জাদুবিদ্যা, অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রভাব কমতে থাকে এবং তার জায়গা দখল করে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও যৌক্তিক হিসাবনিকাশ। মানুষ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারির জন্য কোনো ঐশ্বরিক ক্রোধকে দায়ী না করে, বরং এর পেছনের কার্যকারণ খুঁজতে শুরু করে। এই যৌক্তিকীকরণের পথ ধরেই রাষ্ট্র, শিক্ষা, আইন ও চিকিৎসাব্যবস্থার মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে নিজেদের স্বাধীন সত্তা গড়ে তোলে।
এই তত্ত্বের আরও গভীরে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী স্টিভ ব্রুস (Steve Bruce) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ধর্মনিরপেক্ষীকরণ কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি শিল্পায়িত সমাজের একটি অনিবার্য পরিণতি। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও শিল্পায়নের কারণে সমাজের মানুষের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিকাশ ঘটে। আগে যেখানে মানুষ একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত, আধুনিক রাষ্ট্রে এসে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অধিকার ও পছন্দের ওপর বেশি জোর দিতে থাকে। ব্রুস ব্যাখ্যা করেছেন যে, সমাজ যখন ছোট ছোট সম্প্রদায় থেকে বৃহৎ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়, তখন সেখানে নানা ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্যই রাষ্ট্রকে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পক্ষ নেয়, তবে সমাজে বিভাজন ও অশান্তি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো নিজের স্বার্থেই ধর্মকে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।
ঐতিহাসিক বিবর্তনের এই পর্যায়ে এসে ধর্ম তার সর্বব্যাপী ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় পুরাণের বদলে শেখানো শুরু হয় বিজ্ঞান ও ইতিহাস, আর বিচারব্যবস্থায় ঐশ্বরিক আইনের জায়গা দখল করে মানুষের তৈরি করা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান। সহজ করে বললে, ধর্মনিরপেক্ষীকরণ মানে ধর্মের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি নয়; বরং জনপরিসর, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে ধর্মের কাঠামোগত অপসারণ। কিন্তু এই রূপান্তরটি রাতারাতি ঘটেনি বা সব সমাজে একইভাবে প্রভাব ফেলেনি। অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের একটি রক্ষণশীল অংশ এই পরিবর্তনকে তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত জগৎ ও মূল্যবোধের প্রতি সরাসরি আক্রমণ হিসেবে ধরে নেয়। রাষ্ট্র ও সমাজের এই যৌক্তিক রূপান্তরকে তারা মেনে নিতে পারে না, যার ফলে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। এই টানাপোড়েন থেকেই পরবর্তীতে আধুনিক যুগের নতুন একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকটের জন্ম হয়, যা সমাজকে এক ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
মৌলবাদের উৎপত্তি ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি (Origins and Psychological Foundations of Fundamentalism)
অনেকের ধারণা, মৌলবাদ (Fundamentalism) হলো প্রাচীনকালের কোনো ধর্মীয় প্রথা বা পুরনো ধ্যানধারণার অপরিবর্তিত রূপ। বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ একটি আধুনিক প্রবণতা, যা ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বিংশ শতাব্দীতে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহাসিকভাবে দেখতে গেলে, মৌলবাদ শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছিল ১৯১০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সেই সময় কিছু রক্ষণশীল ধর্মতাত্ত্বিক The Fundamentals নামের বেশ কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যেখানে তারা দাবি করেন যে খ্রিষ্টধর্মের কিছু আক্ষরিক ব্যাখ্যা বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে ডারউইনের বিবর্তনবাদ এবং বাইবেলের ঐতিহাসিক সমালোচনার বিরুদ্ধে তারা তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে এই শব্দটি খ্রিষ্টধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের রক্ষণশীল ও আক্ষরিকতাবাদী আন্দোলনগুলোকে বোঝাতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ফান্ডামেন্টালিজম প্রজেক্টের দুই প্রধান গবেষক মার্টিন মার্টি (Martin Marty) এবং আর স্কট অ্যাপলবি (R. Scott Appleby) মৌলবাদের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দিক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তাঁদের মতে, মৌলবাদীরা কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রাচীন গোষ্ঠী নয়; তারা আধুনিক সমাজেরই অংশ এবং তারা আধুনিকতার ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবেলা করতে চায়। আধুনিক সমাজ মানুষকে যে বহুমাত্রিক চিন্তার স্বাধীনতা দেয়, মৌলবাদীরা তাকে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখে। মার্টি ও অ্যাপলবি দেখিয়েছেন যে, মৌলবাদীরা নিজেদের বিশ্বাস ও পরিচিতিকে রক্ষা করার জন্য একটি সুস্পষ্ট সীমানা বা দেয়াল তৈরি করে। তারা বিশ্বকে সাদা এবং কালো, অর্থাৎ ‘আমরা বনাম তারা‘ এই দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। তাদের দৃষ্টিতে, যারা তাদের আক্ষরিক বিশ্বাসের সাথে একমত নয়, তারা সবাই বিপথগামী বা শত্রু। এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো তাদেরকে একটি কৃত্রিম নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়, কারণ আধুনিক বিশ্বের অনিশ্চয়তা ও জটিলতার মাঝে তারা ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যার মধ্যে একটি নিশ্চিত ও পরম সত্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে।
মৌলবাদের আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো এক ধরনের কল্পিত স্বর্ণযুগের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। তারা বিশ্বাস করে যে অতীতে এমন একটি সময় ছিল যখন সমাজ সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ এবং ঐশ্বরিক নিয়মে পরিচালিত হতো। আধুনিক যুগের ধর্মনিরপেক্ষতা সেই বিশুদ্ধতাকে নষ্ট করে দিয়েছে। তাই তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে সমাজকে সেই কল্পিত অতীতের কাঠামোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। একে তো তারা আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে, তার ওপর তারা মনে করে যে রাষ্ট্রীয় আইন তাদের ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী। এরপরও মজার ব্যাপার হলো, মৌলবাদীরা আধুনিকতা বা বিজ্ঞানের সবকিছু বর্জন করে না। তারা আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং অস্ত্রশস্ত্র খুব সহজেই গ্রহণ করে, কিন্তু আধুনিকতার যে দার্শনিক ভিত্তি – যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নারী অধিকার বা বহুমাত্রিকতা – সেগুলোকে তারা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ, তারা যন্ত্রকে ব্যবহার করে যন্ত্রের পেছনের দর্শনকে ধ্বংস করার জন্য।
আধুনিকতার সংকট ও মৌলবাদী প্রতিক্রিয়া (Crisis of Modernity and Fundamentalist Response)
আধুনিকায়ন শুধু ভৌত কাঠামোর পরিবর্তন ঘটায় না, মানুষের জীবনযাপন, চিন্তা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ধরনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আধুনিকতার এই বহুমুখী প্রভাব অনেক সময় সমাজে এমন এক ধরনের সংকট তৈরি করে, যা রক্ষণশীল মানুষদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্টনি গিডেন্স (Anthony Giddens) আধুনিকতার এই রূপান্তরকে একটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজ প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রশ্ন করে এবং পুনর্গঠন করে, যার ফলে কোনো নির্দিষ্ট প্রথা বা ঐতিহ্য বিনা প্রশ্নে টিকে থাকতে পারে না। এই নিরবচ্ছিন্ন পরিবর্তনের ফলে সমাজের অনেক মানুষ শিকড়হীনতা বা আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে। বিশেষ করে বিশ্বায়নের যুগে যখন বিভিন্ন সংস্কৃতির অবাধ মিশ্রণ ঘটে, তখন সনাতন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক কাঠামোগুলো হুমকির মুখে পড়ে। গিডেন্স ব্যাখ্যা করেছেন যে, আধুনিকতার এই অনিশ্চয়তার হাত থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের একটি সুদৃঢ় পরিচয় ধরে রাখতে অনেকেই ঐতিহ্যবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা প্রায়শই মৌলবাদী রূপ ধারণ করে।
মৌলবাদীরা আধুনিকতার বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট দিক নিয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, নারী অধিকার ও জেন্ডার সমতার মতো আধুনিক ধারণাগুলো তাদের কাছে পিতৃতান্ত্রিক ধর্মীয় কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নারীরা যখন ঘরের বাইরে এসে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশ নেয়, তখন মৌলবাদীরা একে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে প্রচার করে। তারা মনে করে, ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে মানুষের মধ্যে আর কোনো চূড়ান্ত নৈতিক মানদণ্ড অবশিষ্ট নেই। সবকিছুই আপেক্ষিক হয়ে গেছে। অন্যদিকে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় যখন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মহাবিশ্ব বা প্রাণের উৎপত্তির মতো বিষয়গুলো পড়ানো হয়, তখন মৌলবাদীদের দীর্ঘদিনের লালিত মিথলজিক্যাল বিশ্বাসগুলো ধাক্কা খায়। বিজ্ঞান যখন প্রমাণ নির্ভর তথ্য উপস্থাপন করে, তখন ধর্মীয় আক্ষরিকতাবাদীরা সেই প্রমাণগুলোকে মেনে নেওয়ার বদলে আধুনিক বিজ্ঞানকেই প্রত্যাখ্যান করে বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নেয়।
এই সংকট মোকাবেলায় মৌলবাদীরা যে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা কেবল নীরব আপত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা করে। তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার কৌশল গ্রহণ করে। অনেক সময় তারা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মিডিয়া তৈরি করে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা একটি সমান্তরাল সমাজকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তাদের লক্ষ্য থাকে আধুনিক রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আইনকে বাতিল করে সেখানে ধর্মীয় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষত, যেসব সমাজে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে মৌলবাদীরা অত্যন্ত সুকৌশলে রাষ্ট্রের এই দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগায়। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং একমাত্র তাদের প্রস্তাবিত ধর্মীয় ব্যবস্থাই সমাজে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। ফলে, আধুনিকতার সংকট পরোক্ষভাবে মৌলবাদের রাজনৈতিক বিস্তারে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
উগ্রবাদের দিকে রূপান্তর ও মতাদর্শিক চরমপন্থা (Transition to Extremism and Ideological Radicalization)
মৌলবাদ যখন তার বিশ্বাস ও দাবি আদায়ের জন্য রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে এবং সহিংসতাকে একটি বৈধ হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন তা উগ্রবাদ (Extremism) এর রূপ নেয়। একজন মৌলবাদী ব্যক্তি হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে পারেন এবং অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন, কিন্তু একজন উগ্রবাদী সেই অনুশাসনকে জোর করে পুরো সমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। গবেষক অ্যালেক্স শ্মিড (Alex Schmid) উগ্রবাদ ও র্যাডিক্যালাইজেশনের প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। শ্মিডের মতে, র্যাডিক্যালাইজেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধীরে ধীরে চরমপন্থী মতাদর্শ গ্রহণ করে এবং একপর্যায়ে তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহিংসতাকে অপরিহার্য বলে মনে করতে শুরু করে। এটি কোনো একমুখী ঘটনা নয়, বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত রূপান্তর, যেখানে ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষোভ, মতাদর্শিক প্রচার এবং দলীয় গতিশীলতা একসাথে কাজ করে।
উগ্রবাদের দিকে এই রূপান্তরের একটি বড় কারণ হলো অন্যকে পুরোপুরি বিমানবিকীকরণ বা ডিহিউম্যানাইজেশন করার প্রক্রিয়া। উগ্রবাদীরা কেবল ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন করেই থেমে থাকে না; তারা সেই ‘তারা’-কে অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে মানুষের মর্যাদাই দিতে চায় না। তারা তাদের মতাদর্শের বাইরের সবাইকে অপবিত্র, বিশ্বাসীঘাতক বা ধ্বংসযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে। শ্মিড তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেদের একটি মহাজাগতিক যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে কল্পনা করে, তখন তারা পৃথিবীর কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বা মানবিক আইনের তোয়াক্কা করে না। তারা মনে করে, তারা এমন এক উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালন করছে, যা তাদের যেকোনো ধরনের নির্মম কাজ করার বৈধতা দেয়। এই চরমপন্থী মতাদর্শের ভেতরে ঢুকে গেলে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে আর যৌক্তিক চিন্তাভাবনা করা সম্ভব হয় না। তারা নিজেদের তৈরি করা একটি আবদ্ধ ইকো-চেম্বারের মধ্যে বাস করতে শুরু করে, যেখানে কেবল তাদের নিজেদের মতাদর্শেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
উগ্রবাদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণগুলো অনুঘটকের কাজ করে, তবে মতাদর্শই এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলো যখন উগ্রবাদীদের দমনের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার করে, তখন উগ্রবাদীরা সেটাকে তাদের প্রতি ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে প্রচার করে। তারা নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে। উগ্রবাদের এই পর্যায়ে এসে সংগঠনগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত রূপ নেয় এবং তারা সমাজের নির্দিষ্ট কিছু কাঠামো – যেমন পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, লেখক, মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের – সরাসরি টার্গেট করে হামলা চালাতে শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে সমাজে এমন এক মাত্রার ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে সাধারণ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং উগ্রবাদীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এভাবেই একটি সাধারণ মৌলবাদী চিন্তাধারা ধীরে ধীরে একটি প্রাণঘাতী চরমপন্থায় রূপান্তরিত হয়ে আধুনিক সভ্যতার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
মিথলজি বনাম ইতিহাস: উগ্রবাদী বয়ানের বিনির্মাণ (Mythology vs. History: Deconstruction of Extremist Narratives)
উগ্রবাদী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো পুরাণ বা মিথলজিকে প্রকৃত ইতিহাস হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা। ধর্মীয় পুরাণগুলোতে সাধারণত অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনা, অলৌকিক বিজয় এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্যের কথা বলা থাকে। এই গল্পগুলো হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে বা ধর্মগ্রন্থে সংরক্ষিত হয়ে এসেছে। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান এবং ঐতিহাসিক গবেষণায় এই পুরাণগুলোর বাস্তব অস্তিত্বের স্বপক্ষে খুব কমই প্রমাণ পাওয়া যায়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ধর্ম ও ইতিহাস গবেষক ব্রুস লিঙ্কন (Bruce Lincoln) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মিথ বা পুরাণ কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লিঙ্কনের মতে, পুরাণ হলো এমন এক ধরনের গল্প যা বর্তমানের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য অতীতের একটি কাল্পনিক চিত্র নির্মাণ করে। উগ্রবাদীরা এই তত্ত্বটিকেই অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগায়। তারা ধর্মীয় মিথলজিগুলোকে অপরিবর্তনীয় ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে দাবি করে এবং এর ভিত্তিতে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসতার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে চায়।
বাস্তবে, বিজ্ঞান ও ইতিহাস যখন প্রমাণ করে যে উগ্রবাদীদের দাবি করা সেই ‘স্বর্ণযুগ’ বলতে আদৌ কিছু ছিল না, বা ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত অনেক রাজ্য ও যুদ্ধ কেবলই রূপক বা অতিরঞ্জিত গল্প, তখন উগ্রবাদীরা প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়ে। ঐতিহাসিকরা যখন তাম্রলিপি, শিলালিপি, কার্বন ডেটিং বা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে দেখান যে প্রাচীনকালের সমাজকাঠামো ধর্মগ্রন্থের বর্ণনার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, তখন উগ্রবাদীরা এই বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণগুলোকে সরাসরি অস্বীকার করে। তারা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলোকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়। কারণ, তারা খুব ভালো করেই জানে যে, মিথলজি এবং ইতিহাসের এই পার্থক্য যদি সাধারণ মানুষ বুঝতে শুরু করে, তবে তাদের মতাদর্শিক ভিত্তিটাই ধসে পড়বে। তারা পুরাণকে ইতিহাস হিসেবে চালিয়ে দেয় কারণ পুরাণ মানুষকে আবেগতাড়িত করে, যুক্তিবাদী হতে দেয় না। আর অন্ধ আবেগই হলো উগ্রবাদের সবচেয়ে বড় জ্বালানি।
এই বয়ান বিনির্মাণের প্রক্রিয়াটি কেবল অতীতকে বিকৃত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সরাসরি বর্তমানের ভূরাজনীতি ও সহিংসতাকে উসকে দেয়। উগ্রবাদীরা তাদের অনুসারীদের বোঝায় যে, হাজার বছর আগের কোনো ধর্মীয় মিথলজিতে যে শত্রুর কথা বলা হয়েছে, আধুনিক যুগের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট কোনো জাতি সেই প্রাচীন শত্রুরই আধুনিক রূপ। ফলে, সেই প্রাচীন শত্রুকে ধ্বংস করার পৌরাণিক নির্দেশটি আধুনিক যুগের মানুষের ওপরও প্রযোজ্য। লিঙ্কন ব্যাখ্যা করেছেন যে, ধর্মীয় আখ্যানগুলোকে এভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সাধারণ রাজনৈতিক সংঘাতকে পবিত্র যুদ্ধে পরিণত করা হয়। সাধারণ মানুষ, যাদের ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই, তারা খুব সহজেই এই মিথলজিক্যাল ফাঁদে পা দেয়। তারা ধর্মীয় আবেগে উদ্বেলিত হয়ে এমন সব সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যা আদতে কোনো ঐতিহাসিক সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং একদল চতুর রাজনৈতিক উগ্রবাদীর তৈরি করা কাল্পনিক আখ্যানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্বায়নের যুগে ধর্মনিরপেক্ষতা ও উগ্রবাদের সংঘাত (Clash of Secularism and Extremism in the Age of Globalization)
একুশ শতকে এসে ধর্মনিরপেক্ষতা ও উগ্রবাদের এই দ্বন্দ্ব সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে, যার প্রধান কারণ হলো বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসার। একসময় মনে করা হতো যে, বিশ্বায়ন এবং পুঁজিবাদের প্রসারের ফলে পৃথিবীর সব দেশ ধীরে ধীরে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বায়ন যেমন ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাকে ছড়িয়ে দিয়েছে, ঠিক একইভাবে এটি উগ্রবাদী মতাদর্শকেও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রূপ পেতে সাহায্য করেছে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অলিভিয়ের রয় (Olivier Roy) বিশ্বায়িত বিশ্বে ধর্মের রূপান্তর নিয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বায়নের ফলে ধর্ম তার নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রয় এই প্রক্রিয়াটিকে ‘পবিত্র অজ্ঞতা’ বা হলি ইগনোরেন্স হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, উগ্রবাদীরা এখন এমন একটি প্রমিত বা বৈশ্বিক ধর্মের মডেল তৈরি করেছে, যা পৃথিবীর যেকোনো দেশের তরুণদের কাছে সহজেই বাজারজাত করা যায়।
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো এখন কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভূখণ্ডে বসে না থেকেই বিশ্বজুড়ে তাদের মতাদর্শ প্রচার করতে পারছে। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের নাগরিকদের উন্নত জীবনযাপন, শিক্ষা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুযোগ করে দিচ্ছে, তখন উগ্রবাদীরা সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানছে। অলিভিয়ের রয় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক উগ্রবাদীরা অনেক ক্ষেত্রেই প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত নয়। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে খণ্ডিত ও চরমপন্থী ব্যাখ্যাগুলো পড়ে র্যাডিক্যালাইজড হয়। তারা যে সমাজে বসবাস করে, সেই সমাজের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর প্রতি তাদের তীব্র ঘৃণা তৈরি হয়। এই ঘৃণা থেকে তারা নিজ দেশেই আত্মঘাতী হামলা বা লোন উলফ বা একাকী নেকড়ে স্টাইলে আক্রমণ চালায়। অর্থাৎ, আধুনিক উগ্রবাদ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রের সমস্যা নয়, এটি একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মতো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু উগ্রবাদীরা রাষ্ট্রের এই গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সুযোগগুলো ব্যবহার করেই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করে। বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময়ই এই আন্তঃদেশীয় উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলোর গতিবিধি ট্র্যাক করতে হিমশিম খায়। কারণ উগ্রবাদীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা সাইবার স্পেসকে তাদের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে, যেখানে তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটানা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, আধুনিক রূপান্তরে ধর্মনিরপেক্ষতা ও উগ্রবাদের এই সংঘাত এখন আর কেবল মতাদর্শিক বিতর্কের পর্যায়ে নেই; এটি আধুনিক সভ্যতার অস্তিত্ব, মানুষের যুক্তিবাদী চিন্তাধারা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক চূড়ান্ত ও স্থায়ী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
সালাফিবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ (Salafism and Violent Extremism): মতাদর্শের বিশ্লেষণ
সালাফিবাদের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Origins and Historical Context of Salafism)
সমকালীন বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের আলোচনায় একটি অত্যন্ত আলোচিত এবং বিতর্কিত মতাদর্শ হলো সালাফিবাদ (Salafism)। এই মতাদর্শের অনুসারীরা দাবি করেন যে, তারা ইসলামের আদি রূপ বা প্রথম তিন প্রজন্মের মুসলিমদের দেখানো পথে চলতে চান। আরবি শব্দ ‘সালাফ’ অর্থ পূর্বসূরি বা প্রাচীনকাল। এই মতাদর্শের প্রবক্তারা মনে করেন, সময়ের সাথে সাথে সমাজে নানা ধরনের কুসংস্কার ও বাইরের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কলুষিত করেছে। তাই তারা একটি কল্পিত বিশুদ্ধ অতীতে ফিরে যাওয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্প গ্রহণ করেন। তবে শিক্ষায়তনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সালাফিদের এই কল্পিত অতীত কাঠামোর অনেকটাই ঐতিহাসিক বাস্তবতার চেয়ে ধর্মীয় মিথলজি বা পুরাণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। প্রত্নতাত্ত্বিক বা নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক গবেষণায় প্রায়শই দেখা যায় যে, সালাফিরা তাদের সোনালি অতীতের যে নির্ভেজাল রূপের কথা প্রচার করেন, বাস্তবে প্রাচীন সমাজগুলো অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ ছিল।
আধুনিক সালাফিবাদের এই তাত্ত্বিক ভিত্তিটি বুঝতে হলে সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক কুইন উইকটোরাউইচ (Quintan Wiktorowicz) এর বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সালাফিবাদ কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়; বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট বিশ্বাসভিত্তিক কাঠামো, যা বিভিন্ন সময় ও ভূরাজনীতির ওপর নির্ভর করে নানা রূপ ধারণ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপে শুরু হওয়া সংস্কার আন্দোলনগুলো থেকে এর প্রাথমিক ধারণাগুলো নেওয়া হলেও, আধুনিক সালাফিবাদের বিস্তার ঘটে মূলত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। উইকটোরাউইচ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আধুনিক যুগের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা, পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং বিশ্বায়নের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রক্ষণশীল সমাজে এক ধরনের পরিচয়ের সংকট তৈরি হয়। এই সংকট মোকাবেলায় সেখানকার কিছু ধর্মতাত্ত্বিক এমন একটি কঠোর মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করেন, যা বাইরের যেকোনো দার্শনিক প্রভাবকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। তারা মনে করতেন, একমাত্র তাদের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকৃত জীবনব্যবস্থাই সঠিক, আর বাকি সবকিছু বাতিলযোগ্য।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, সালাফিবাদ সবসময় সরাসরি সহিংসতার কথা বলেনি। প্রথম দিকে এই আন্দোলনটি প্রধানত সমাজ সংস্কার, নির্দিষ্ট পোশাকবিধি পালন এবং ধর্মীয় আচার পালনের কঠোরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারা পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষ আইন এবং আধুনিক দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের একটি আবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে আটকে রাখার চেষ্টা করত। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো যখন তাদের এই ব্যক্তিগত ও সামাজিক গণ্ডিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়। সালাফি মতাদর্শীরা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করলেও, তারা এর পেছনের যুক্তিবাদী দর্শনকে কখনোই গ্রহণ করেনি। বরং তারা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বা যুক্তির বদলে তাদের প্রাচীন গ্রন্থগুলোর আক্ষরিক ব্যাখ্যার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে। এভাবেই একটি সাধারণ রক্ষণশীল ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে এমন একটি অসহিষ্ণু মতাদর্শে পরিণত হয়, যা আধুনিক বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুমাত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
সালাফি মতাদর্শের বিভাজন ও রাজনৈতিক ধারা (Divisions and Political Streams in Salafi Ideology)
সালাফিবাদ কোনো সমসত্ত্ব বা মনোলিথিক মতাদর্শ নয়। বাইরে থেকে দেখলে সব সালাফিকে একই রকম মনে হলেও, তাদের ভেতরে কৌশল ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তাত্ত্বিক উইকটোরাউইচ সালাফি মতাদর্শকে প্রধান তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন: শুদ্ধতাবাদী সালাফি (Purist Salafis), রাজনৈতিক সালাফি (Politico Salafis) এবং জিহাদি সালাফি (Jihadi Salafis)। এই বিভাজনটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর মাধ্যমেই বোঝা যায় কীভাবে একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সহিংস উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হয়। শুদ্ধতাবাদী সালাফিরা সাধারণত রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। তাদের প্রধান মনোযোগ থাকে অহিংস উপায়ে ধর্ম প্রচার, শিক্ষা প্রদান এবং নিজেদের অনুসারীদের ‘বিশুদ্ধ’ রাখা। তারা মনে করেন, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা মানেই ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করা। তাই তারা সমাজকে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পক্ষপাতী এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার বিরোধী।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক সালাফিরা মনে করেন যে শুধু শিক্ষা ও প্রচারের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়; এর জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক স্টেফান লাক্রোয়া (Stephane Lacroix) সৌদি আরবের ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Awakening Islam-এ এই রাজনৈতিক সালাফিদের উত্থানের পেছনের কারণগুলো বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। লাক্রোয়া দেখিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যখন বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান নেয়, তখন রাজনৈতিক সালাফিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা আধুনিক রাজনৈতিক কৌশল, যেমন – পিটিশন দাখিল, রাজনৈতিক দল গঠন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ আইন পরিবর্তন করে ধর্মীয় আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। তারা আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে, কিন্তু সেই কাঠামোর গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিগুলোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। লাক্রোয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক সালাফিরা রাষ্ট্রের সাথে সংঘাতে জড়ালেও তারা সরাসরি অস্ত্র তুলে নেওয়ার বদলে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল বেশি পছন্দ করে।
তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারাটি হলো জিহাদি সালাফিবাদ। এই গোষ্ঠীর অনুসারীরা শুদ্ধতাবাদী ও রাজনৈতিক সালাফিদের কৌশলগুলোকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও আপসকামিতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে। তারা বিশ্বাস করে যে, আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং এর পরিচালকদের সাথে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা বা আপস সম্ভব নয়। তাদের মতে, সহিংসতা বা সশস্ত্র সংঘাতই হলো তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ। জিহাদি সালাফিরা তাদের সহিংস কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার জন্য প্রাচীন ধর্মীয় পুরাণ ও আখ্যানগুলোকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে। তারা তাদের অনুসারীদের মগজ ধোলাই করে বোঝায় যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং একমাত্র অস্ত্রের মাধ্যমেই এই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একটি পবিত্র শাসন কায়েম করা সম্ভব। এভাবেই সালাফিবাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনগুলো সাধারণ রক্ষণশীলতা থেকে শুরু করে ভয়াবহ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের রূপ ধারণ করে, যা বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সহিংস সালাফিবাদ ও জিহাদিজমের তাত্ত্বিক ভিত্তি (Theoretical Foundations of Violent Salafism and Jihadism)
সহিংস সালাফিবাদ বা সালাফি-জিহাদিজম (Salafi-Jihadism) রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং সুনির্দিষ্ট কিছু তাত্ত্বিক ধারণার বিকাশ। এই ধারার সবচেয়ে ভয়ংকর তাত্ত্বিক ভিত্তিটি হলো তাকফির (Takfir) এর ধারণা। তাকফির মানে হলো অন্য কোনো ব্যক্তিকে ধর্মচ্যুত বা অবিশ্বাসী ঘোষণা করা। সাধারণ সালাফিরা যেখানে নিজেদের জীবনযাপনের কঠোরতার ওপর জোর দেয়, সেখানে জিহাদি সালাফিরা তাকফিরের ধারণাকে ব্যবহার করে তাদের প্রতিপক্ষকে হত্যার বৈধতা তৈরি করে। তারা কেবল ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরই নয়, বরং যেসব ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনায়ক বা সাধারণ নাগরিক তাদের কঠোর মতাদর্শ মেনে চলে না, তাদের সবাইকেই অবিশ্বাসী হিসেবে রায় দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা যেকোনো ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে নিজেদের সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়।
এই চরমপন্থী মতাদর্শের বিকাশ নিয়ে ডাচ গবেষক ও তাত্ত্বিক জোয়রিক ওয়াগেমাকারস (Joas Wagemakers) গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, সালাফি-জিহাদি তাত্ত্বিকরা কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোকে প্রাচীন মিথলজিক্যাল শত্রুদের সাথে তুলনা করে। ওয়াগেমাকারস দেখিয়েছেন যে, জিহাদি নেতারা তাদের অনুসারীদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ আইনকে সরাসরি ঈশ্বরের আইনের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রচার করে। তারা বোঝায় যে, মানুষের তৈরি করা আইন মানা মানেই পৌত্তলিকতা বা মূর্তিপূজার শামিল। এই অদ্ভুত যুক্তির মাধ্যমে তারা আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধান, বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণকে একটি ধর্মীয় রূপ দান করে। ওয়াগেমাকারস এর মতে, সালাফি-জিহাদিজমের তাত্ত্বিকরা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হতাশাগুলোকে অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মীয় মোড়কে আবৃত করে ফেলে, যার ফলে একজন সাধারণ ক্ষুব্ধ নাগরিক খুব সহজেই একজন চরমপন্থী যোদ্ধায় পরিণত হতে পারে।
সহিংস সালাফিবাদের তাত্ত্বিক কাঠামোর আরেকটি বড় দিক হলো মহাজাগতিক যুদ্ধের ধারণা। তারা তাদের সশস্ত্র সংগ্রামকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে না। তারা বিশ্বাস করে, তারা অন্ধকার ও আলোর মধ্যকার এক চিরন্তন মহাজাগতিক যুদ্ধে লিপ্ত। এই তাত্ত্বিক ভিত্তি তাদের যেকোনো ধরনের ভয়াবহ কৌশল, যেমন আত্মঘাতী হামলা বা বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞকে ন্যায়সঙ্গত বলে ভাবতে শেখায়। কারণ, যখন কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার নির্দেশ সরাসরি কোনো উচ্চতর ঐশ্বরিক সত্তার কাছ থেকে আসছে, তখন সে আর পার্থিব মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা করে না। সালাফি-জিহাদিরা তাদের নিজস্ব একটি আবদ্ধ ইকো-চেম্বার তৈরি করে, যেখানে আধুনিক যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান বা মানবিকতার কোনো স্থান নেই। সেখানে কেবল রয়েছে প্রাচীন আখ্যানের অন্ধ অনুকরণ এবং সেই অনুকরণের ওপর ভিত্তি করে রচিত ধ্বংসযজ্ঞের নীলশা।
মিথলজি, অতীতচারিতা ও আদর্শিক বয়ানের বিনির্মাণ (Mythology, Nostalgia and the Deconstruction of Ideological Narratives)
সালাফি উগ্রবাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও মতাদর্শিক দিক হলো তাদের অতীতচারিতা এবং প্রাচীন মিথলজি বা পুরাণকে ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তারা যে সোনালি অতীতের কথা বলে, আধুনিক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তার কোনো বাস্তব প্রমাণ মেলে না। বরং তাদের এই অতীতটি বিভিন্ন সময়ে রচিত ধর্মীয় গল্প ও আখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি কাল্পনিক ইউটোপিয়া। সালাফি-জিহাদিরা এই মিথলজিগুলোকে সাধারণ মানুষের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন এগুলো অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য। তারা বর্তমানের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও আধুনিক সমাজব্যবস্থার নানা ত্রুটি ও ব্যর্থতাগুলোকে পুঁজি করে প্রচার করে যে, একমাত্র সেই পৌরাণিক সমাজব্যবস্থায় ফিরে গেলেই পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় তারা বিজ্ঞান ও যুক্তির বদলে আবেগ ও অন্ধবিশ্বাসের ওপর জোর দেয়।
এই মতাদর্শিক বয়ানের বিনির্মাণ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও তাত্ত্বিক ফয়সাল দেবজি (Faisal Devji) তাঁর Landscapes of the Jihad গ্রন্থে চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন। দেবজির মতে, বৈশ্বিক সালাফি-জিহাদিজম প্রথাগত ধর্মীয় কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি একটি আধুনিক, নান্দনিক ও নৈতিক বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, আল-কায়েদা বা আইএসআইএস-এর মতো সংগঠনগুলো তাদের প্রচারণায় কেবল শুষ্ক ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি ব্যবহার করে না; বরং তারা এক ধরনের রোমান্টিক অতীতচারিতা এবং আত্মত্যাগের নান্দনিক চিত্র তৈরি করে। তারা আধুনিক ভিডিও প্রযুক্তি, হলিউড স্টাইলের সিনেমাটোগ্রাফি এবং আবেগপূর্ণ সংগীত ব্যবহার করে তাদের সহিংসতার ভিডিওগুলোকে এক ধরনের শিল্পের রূপ দেয়। দেবজি ব্যাখ্যা করেছেন যে, আধুনিক বিশ্বের একঘেয়েমি এবং পরিচয়ের সংকটে ভোগা তরুণদের কাছে এই পৌরাণিক আখ্যান এবং বীরত্বের গল্পগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়। তারা বাস্তব পৃথিবীর জটিল সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা না করে, এই কাল্পনিক জিহাদের জগতে প্রবেশ করে নিজেদের একটি বৃহত্তর মহাকাব্যের নায়ক হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
মিথলজি ও ইতিহাসের এই মিশ্রণ অত্যন্ত ভয়াবহ ফলাফল নিয়ে আসে। যখন কোনো গোষ্ঠী বিশ্বাস করতে শুরু করে যে হাজার বছর আগের কোনো ধর্মীয় আখ্যানে বর্ণিত শত্রুরাই আধুনিক যুগের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বা ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ, তখন তারা সেই প্রাচীন আখ্যানের নির্দেশাবলি আধুনিক যুগে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞান ও ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে প্রাচীনকালের যুদ্ধ ও সমাজের নিয়মকানুনগুলো বর্তমান সময়ের মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এরপরও সালাফি উগ্রবাদীরা এই বৈজ্ঞানিক সত্যগুলোকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেয়। তারা তাদের অনুসারীদের বোঝায় যে, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান মানুষের নৈতিকতাকে ধ্বংস করেছে। এভাবেই তারা একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও প্রমাণহীন পৌরাণিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তিমূলে আঘাত করার চেষ্টা করে। তাদের এই মতাদর্শিক বয়ান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিনির্মাণ করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ যুক্তিবাদী চিন্তা থেকে দূরে সরে গিয়ে অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সালাফি নেটওয়ার্ক (Modern Technology and Global Salafi Networks)
সালাফিবাদ ও এর সহিংস রূপগুলোর একটি সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো আধুনিকতার সাথে তাদের সম্পর্ক। তারা আধুনিক দর্শন, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করে। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ফলগুলোকে তারা নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র – এ সবকিছুই আজ বৈশ্বিক সালাফি নেটওয়ার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তির এই ব্যাপক ব্যবহারের ফলে সালাফি উগ্রবাদ এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পরিণত হয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা একটি ভার্চুয়াল উম্মাহ (Virtual Ummah) বা সীমানাহীন সম্প্রদায় গড়ে তুলেছে, যেখানে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের তরুণরা যুক্ত হতে পারে।
ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক গিলস কেপেল (Gilles Kepel) তাঁর Jihad: The Trail of Political Islam সহ অন্যান্য গবেষণায় এই বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন। কেপেল আধুনিক জিহাদিদের তিনটি প্রজন্মে ভাগ করেছেন। তাঁর মতে, প্রথম প্রজন্ম আফগান যুদ্ধে লড়াই করেছিল, দ্বিতীয় প্রজন্ম আল-কায়েদার মতো সংগঠিত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। আর বর্তমানের তৃতীয় প্রজন্মটি সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কেপেল দেখিয়েছেন যে, এই তৃতীয় প্রজন্মের জিহাদিদের কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। এরা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা চরমপন্থী বয়ানগুলো পড়ে নিজেরাই র্যাডিক্যালাইজড বা উগ্রবাদী হয়ে ওঠে। তারা ইউটিউবের ভিডিও, বিভিন্ন গোপন ফোরাম এবং ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে বোমা বানানোর কৌশল শেয়ার করে। এরা যে দেশগুলোতে বড় হয়, সেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধেই ছোট ছোট সেল গঠন করে বা একাকী হামলা চালায়। কেপেল এই প্রক্রিয়াটিকে ‘বটম-আপ’ বা নিচ থেকে উঠে আসা র্যাডিকালাইজেশন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আধুনিক প্রযুক্তি সালাফি-জিহাদিদের জন্য একটি বিশাল সুবিধা এনে দিয়েছে, কারণ এর মাধ্যমে তারা প্রচলিত ধর্মীয় স্কলারদের কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। একসময় কোনো ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার করার জন্য মসজিদের বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হতো। এখন একজন চরমপন্থী নেতা ইন্টারনেটে বসে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে যেতে পারে। তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে তথ্যযুদ্ধ পরিচালনা করে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তখন তারা ইন্টারনেটে অপপ্রচার চালিয়ে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা এমন সব গ্রাফিক ভিডিও প্রচার করে যা সাধারণ তরুণদের আবেগতাড়িত করে। ফলে, আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এই বৈশ্বিক সালাফি নেটওয়ার্কগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এক অভূতপূর্ব সাইবার ও ভৌতিক হুমকির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত এই সাইবার স্পেসে তাদের গতিবিধি শনাক্ত করার চেষ্টা করলেও, বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর কারণে তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ভূরাজনীতি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি (Geopolitics, State Sponsorship and Future Dynamics)
সালাফিবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার কেবল মতাদর্শিক বা প্রযুক্তিগত কারণে ঘটেনি; এর পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত বিশ্বের অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে বিশ্বব্যাপী সালাফি মতাদর্শের প্রচার করেছে। তারা বিভিন্ন দেশে মাদ্রাসা, মসজিদ ও দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোতে এই অর্থায়ন অনেক সময়ই স্থানীয় সংস্কৃতি ও সহনশীল পরিবেশকে নষ্ট করে দিয়ে একটি কঠোর ও অসহিষ্ণু কাঠামোর জন্ম দিয়েছে।
এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ও তাত্ত্বিক ফাওয়াজ গেরগেস (Fawaz Gerges) তাঁর The Far Enemy: Why Jihad Went Global গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গেরগেস দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রথম দিকে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী বিরোধী দলগুলোকে দমন করার জন্য সালাফি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি সাধারণ নিয়ম হলো ব্লোব্যাক (Blowback)। যারা একসময় রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ছিল, তারাই পরবর্তীতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গেরগেস তাঁর বইয়ে বিশ্লেষণ করেছেন যে, জিহাদি সালাফিদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে একটি বিতর্ক ছিল তারা কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে – ‘কাছের শত্রু’ (স্থানীয় ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরাচারী সরকার) নাকি ‘দূরের শত্রু’ (পশ্চিমা পরাশক্তি)। পরবর্তীতে তারা যখন বুঝতে পারে যে স্থানীয় সরকারগুলোকে সহজে উৎখাত করা সম্ভব নয়, তখন তারা তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করে বৈশ্বিক পর্যায়ে হামলা চালাতে শুরু করে। এভাবেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত একটি আঞ্চলিক সমস্যা বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের রূপ নেয়।
ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সালাফি উগ্রবাদ খুব সহজে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সুশাসনের অভাব যতক্ষণ সমাজে বিদ্যমান থাকবে, ততক্ষণ উগ্রবাদীরা এই দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে তাদের সদস্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখবে। তাছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও সম্পদ বন্টনের অসমতার কারণে অনেক অঞ্চলে রাষ্ট্রকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর ঠিক সেই শূন্যস্থানগুলোতেই সালাফি-জিহাদি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিকদের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার অক্ষুণ্ন রেখে এই মতাদর্শিক ও প্রযুক্তিগত হুমকি মোকাবেলা করা। কারণ, সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রমাণহীন, পৌরাণিক ও চরমপন্থী মতাদর্শকে পরাজিত করতে হলে প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাব্যবস্থা, যুক্তিবাদী চিন্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ব্যাপক প্রসার।
ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ (Religious Fanaticism and Terrorism): সহিংস বিশ্বাসের রূপ
ধর্মান্ধতার মনস্তত্ত্ব ও বিশ্বাসকাঠামো (Psychology of Fanaticism and Belief Structures)
সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মান্ধতার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে একটি বিশাল ব্যবধান রয়েছে। একজন সাধারণ বিশ্বাসী তার দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় আচার পালন করলেও, অনেক ক্ষেত্রে তার মধ্যে এক ধরনের সংশয় বা সহনশীলতা কাজ করতে পারে। কিন্তু ধর্মান্ধতা বা ফ্যানাটিসিজম সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে সন্দেহের কোনো স্থান নেই। ধর্মান্ধ ব্যক্তি তার নিজস্ব বিশ্বাসকাঠামোকে চূড়ান্ত এবং অবিতর্কিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিজ্ঞান ও যুক্তির প্রতি তীব্র অনীহা। বিজ্ঞান সবসময় প্রমাণের ওপর নির্ভর করে এবং নতুন তথ্য পেলে পুরনো ধারণাকে বাতিল করতে প্রস্তুত থাকে। অন্যদিকে, ধর্মান্ধতা প্রমাণের ধার ধারে না; বরং এটি পুরনো এবং অপ্রমাণিত ধারণাকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই নিরঙ্কুশ নিশ্চয়তাবোধ থেকেই জন্ম নেয় ভয়াবহ ধরনের অসহিষ্ণুতা।
রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞান ও সন্ত্রাসবাদের প্রখ্যাত গবেষক জেরোল্ড পোস্ট (Jerrold Post) সন্ত্রাসীদের মানসিকতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের চিন্তাধারা একটি সুনির্দিষ্ট মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যায়। পোস্ট এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটিকে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ধর্মান্ধরা নিজেদের একটি পবিত্র, শুদ্ধ ও ঈশ্বর-মনোনীত গোষ্ঠীর অংশ বলে মনে করে। বাইরের পৃথিবীকে তারা দেখে পাপে নিমজ্জিত এবং ধ্বংসযোগ্য একটি জায়গা হিসেবে। জেরোল্ড পোস্ট দেখিয়েছেন যে, এই ধরনের মানসিকতা অনেক সময়ই ব্যক্তিগত হতাশা বা আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে জন্ম নেয়। উগ্রবাদী দলগুলো এই ব্যক্তিগত সংকটগুলোকে পুঁজি করে এবং একজন সাধারণ মানুষকে এমন একটি সামষ্টিক পরিচয়ে যুক্ত করে, যেখানে তার নিজের কোনো স্বাধীন চিন্তার সুযোগ থাকে না। সে কেবল দলের অন্ধ অনুসারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ব্যাখ্যা করেছেন তাত্ত্বিক অ্যারি ক্রুগলানস্কি (Arie Kruglanski)। তিনি তাঁর গবেষণায় কগনিটিভ ক্লোজার (Cognitive Closure) বা জ্ঞানীয় সমাপ্তির ধারণার অবতারণা করেছেন। ক্রুগলানস্কির মতে, কিছু মানুষের মধ্যে যেকোনো প্রশ্নের একটি সুনির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনীয় উত্তর পাওয়ার তীব্র বাসনা থাকে। তারা জীবনের অস্পষ্টতা বা জটিলতা একদমই সহ্য করতে পারে না। আধুনিক বিশ্ব ভীষণ জটিল, এখানে সমাজ, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের অনেক প্রশ্নেরই কোনো সহজ উত্তর নেই। ধর্মান্ধ মতাদর্শগুলো এই সুযোগটি নেয়। তারা তাদের অনুসারীদের খুব সহজ, কাটখোট্টা এবং চূড়ান্ত কিছু উত্তর সরবরাহ করে। ক্রুগলানস্কি দেখিয়েছেন যে, কগনিটিভ ক্লোজারের চাহিদা যাদের বেশি, তারা খুব সহজেই উগ্রবাদে আকৃষ্ট হয়। কারণ, ধর্মীয় উগ্রবাদ তাদের আশ্বস্ত করে যে তাদের হাতেই পৃথিবীর সমস্ত সমস্যার একমাত্র সঠিক সমাধান রয়েছে। ফলে, তারা নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য বা ভিন্নমতের মুখোমুখি হতে চায় না এবং প্রয়োজনে সেই ভিন্নমতকে সহিংসভাবে দমন করার চেষ্টা করে।
ঐশ্বরিক নির্দেশ ও নৈতিকতার স্খলন (Divine Mandate and Moral Disengagement)
সাধারণ সমাজে মানুষ কিছু সর্বজনীন নৈতিক নিয়ম মেনে চলে। হত্যা করা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা ধ্বংসযজ্ঞ চালানোকে সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ অপরাধ হিসেবেই গণ্য করে। এরপরও দেখা যায়, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা হাসিমুখে নিরীহ মানুষের ওপর বোমাহামলা চালাচ্ছে বা হত্যাযজ্ঞ ঘটাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে একজন মানুষ এমন নিষ্ঠুর কাজ করার মানসিক বৈধতা পায়? এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরটি ব্যাখ্যা করার জন্য প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) তাঁর নৈতিক স্খলন (Moral Disengagement) তত্ত্বটি প্রদান করেছেন। বান্দুরার মতে, মানুষ যখন কোনো ভয়াবহ অপরাধ করে, তখন সে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেই কাজটিকে একটি ভিন্ন মোড়কে সাজায়, যাতে তার নিজের বিবেকের কাছে অপরাধবোধ তৈরি না হয়। ধর্মান্ধরা তাদের সহিংসতাকে ‘সন্ত্রাস’ বলে মনে করে না; তারা এটিকে একটি পবিত্র দায়িত্ব বা ঐশ্বরিক নির্দেশ পালনের কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। বান্দুরা দেখিয়েছেন যে, প্রতিপক্ষকে বিমানবিকীকরণ করা এবং ঈশ্বর বা কোনো কাল্পনিক পরাশক্তির দোহাই দিয়ে নিজের কাজের দায়ভার এড়ানোই হলো এই নৈতিক স্খলনের প্রধান হাতিয়ার।
এই ঐশ্বরিক নির্দেশের ধারণার পেছনের অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন ধর্ম ও সংঘাত বিষয়ক গবেষক হেক্টর অ্যাভালোস (Hector Avalos)। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Fighting Words-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, বেশিরভাগ ধর্মীয় সংঘাতের মূলে রয়েছে কিছু কাল্পনিক ও অপ্রমাণিত সম্পদের জন্য লড়াই। সাধারণ মানুষ যেমন ভূমি, পানি বা তেলের মতো বাস্তব সম্পদের জন্য যুদ্ধ করে, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তেমনি পবিত্র স্থান, ঐশ্বরিক অনুগ্রহ বা পরকালের মুক্তির মতো অবাস্তব সম্পদের জন্য লড়াই করে। অ্যাভালোস এই ধারণাটিকে ধর্ম সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, যেহেতু এই ‘পবিত্র সম্পদ’গুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তাই এগুলোর মালিকানা নিয়ে কোনো যৌক্তিক মীমাংসাও সম্ভব নয়। একজন ধর্মান্ধ ব্যক্তি যখন বিশ্বাস করে যে সে ঈশ্বরের পক্ষে একটি পবিত্র ভূমি রক্ষার কাজ করছে, তখন সে আধুনিক রাষ্ট্রের কোনো আইন বা মানবাধিকার সনদের তোয়াক্কা করে না।
এই কাল্পনিক নির্দেশনার কারণে উগ্রবাদীরা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো এবং মানবিক আইনকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা মনে করে, মানুষের তৈরি করা সংবিধানে ভুল থাকতে পারে, কিন্তু তাদের কাছে থাকা ধর্মীয় গ্রন্থ বা প্রাচীন আখ্যানগুলোর প্রতিটি শব্দ অবিতর্কিতভাবে সত্য। সহজ করে বললে, তারা নিজেদের এমন একটি উচ্চতর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে কল্পনা করে, যার কাছে পৃথিবীর কোনো বিচারালয়েরই জবাবদিহি করার ক্ষমতা নেই। অ্যাভালোস বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই অহমিকা বোধ উগ্রবাদীদের যেকোনো মাত্রার সহিংসতা চালাতে প্ররোচিত করে। তারা সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করাকে কোনো অপরাধ বলে তো মনে করেই না, উল্টো তারা বিশ্বাস করে যে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তারা কোনো এক ঐশ্বরিক সত্তাকে সন্তুষ্ট করছে। এভাবেই একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও প্রমাণহীন বিশ্বাসের ওপর ভর করে আধুনিক সমাজে ভয়াবহ সব ধ্বংসযজ্ঞের ন্যায্যতা তৈরি করা হয়।
মিথলজি, ইতিহাস ও সংঘাতের ন্যায্যতা (Mythology, History and the Justification of Conflict)
ধর্মীয় উগ্রবাদের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো প্রাচীন পুরাণ বা মিথলজিকে প্রকৃত ইতিহাস হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে সাধারণত মহাকাব্যিক যুদ্ধ, অলৌকিক বিজয় এবং নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর পবিত্রতার গল্প থাকে। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব বা ইতিহাস গবেষণায় এসব গল্পের বেশিরভাগেরই কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না। তারপরও উগ্রবাদীরা এই রূপক গল্পগুলোকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং বর্তমান যুগের রাজনৈতিক সংঘাতে সেগুলোর প্রয়োগ ঘটায়। জীববিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins) ধর্মীয় উগ্রবাদের এই বিস্তারকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একে একটি মাইন্ড ভাইরাস (Mind Virus) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ডকিন্স মনে করেন, ক্ষতিকর জৈবিক ভাইরাস যেমন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ ছড়ায়, ঠিক তেমনি কিছু ক্ষতিকর ধর্মীয় বিশ্বাস বা মিম মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে তার যৌক্তিক চিন্তার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এই মাইন্ড ভাইরাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংঘাত ও ঘৃণার ধারণাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে।
মিথলজিকে কীভাবে সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তা নিয়ে বিশদ কাজ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী চার্লস সেলেঙ্গুট (Charles Selengut)। তাঁর গ্রন্থ Sacred Fury-তে তিনি দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা নিজেদের সবসময় একটি পৌরাণিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে কল্পনা করে। সেলেঙ্গুট বিশ্লেষণ করেছেন যে, উগ্রবাদীরা বর্তমান সময়ের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বা আধুনিক চিন্তাধারার মানুষকে সেই প্রাচীন পুরাণের খলনায়কদের সাথে তুলনা করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন কার্বন ডেটিং বা বৈজ্ঞানিক খননের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে ধর্মগ্রন্থের অনেক ঘটনাই কেবল কল্পনাপ্রসূত, তখন উগ্রবাদীরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বিজ্ঞানকে তাদের বিশ্বাসের প্রতি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেয়। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে যে, মিথলজি আর ইতিহাসের পার্থক্য যদি সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, তবে তাদের রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো ভিত্তিই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
এই পৌরাণিক ন্যায্যতা উগ্রবাদীদের একটি বিশেষ সুবিধা দেয়। রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের নির্দিষ্ট কোনো দাবি থাকে, যা পূরণ হলে সংঘাত থামানো সম্ভব। কিন্তু সেলেঙ্গুট দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের দাবিগুলো সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং অপার্থিব। তারা এমন একটি কাল্পনিক অতীত সমাজে ফিরে যেতে চায়, যার আসলে কোনো ঐতিহাসিক অস্তিত্বই ছিল না। তারা তাদের অনুসারীদের বোঝায় যে, এই মিথলজিক্যাল সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য যত রক্তই ঝরুক না কেন, তা সম্পূর্ণ বৈধ। ডকিন্স-এর মাইন্ড ভাইরাস তত্ত্বের সাথে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এই ধরনের প্রোপাগান্ডা তরুণদের মস্তিষ্কে খুব দ্রুত কাজ করে। তারা বাস্তব পৃথিবীর অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানের যৌক্তিক পথ খোঁজার বদলে, কাল্পনিক জিহাদ বা পবিত্র যুদ্ধের রোমান্টিক আখ্যানে হারিয়ে যায়। ফলে, মিথলজি ও ইতিহাসকে গুলিয়ে ফেলার এই ভয়াবহ চর্চা সমকালীন বিশ্বে সন্ত্রাসবাদকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও অনতিক্রম্য রূপ দান করেছে।
আত্মত্যাগের মোহ ও পুরষ্কারের ভ্রান্তি (The Illusion of Sacrifice and the Delusion of Reward)
সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী কৌশল হলো আত্মঘাতী হামলা। একজন মানুষ কীভাবে নিজের জীবন শেষ করে দিয়ে অন্যকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়, তা বোঝার জন্য উগ্রবাদের পরকালীন ধারণাকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ধর্মীয় উগ্রবাদ এমন একটি ভ্রান্তির জন্ম দেয়, যেখানে এই বাস্তব এবং দৃশ্যমান পৃথিবীটাকে সম্পূর্ণ মূল্যহীন বলে প্রচার করা হয়। প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ও দার্শনিক স্যাম হ্যারিস (Sam Harris) তাঁর The End of Faith গ্রন্থে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস এবং সহিংসতার এই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। হ্যারিসের মতে, উগ্রবাদীরা মনে করে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এটি একটি অনন্ত ও আনন্দময় জীবনের শুরু। তারা এই জীবনটাকে কেবল একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখে। হ্যারিস দেখিয়েছেন যে, যখন কোনো মতাদর্শ মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে আত্মত্যাগের মাধ্যমে সে পরকালে অসীম পুরস্কার এবং ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করবে, তখন সেই মতাদর্শ খুব সহজেই মানুষের জীবনকে একটি সস্তা অস্ত্রে পরিণত করতে পারে।
এই আত্মত্যাগের মোহকে আরও গভীরভাবে বুঝতে হলে তাত্ত্বিক রেনে জিরার (Rene Girard) এর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণটি অত্যন্ত সহায়ক। জিরার তাঁর গবেষণায় স্কেপগোট মেকানিজম (Scapegoat Mechanism) বা বলির পাঁঠা বানানোর প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, মানবসমাজের অনেক সংকটের সময় মানুষ তাদের নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করে এবং তাদের ওপর সহিংসতা চালায়। উগ্রবাদীরা আধুনিক রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো, ভিন্নমতাবলম্বী বা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের এই বলির পাঁঠা হিসেবে বেছে নেয়। তারা বিশ্বাস করে যে, এই ‘অপবিত্র’ মানুষদের হত্যা করার মাধ্যমে তারা সমাজকে পরিশুদ্ধ করছে। জিরারের তত্ত্ব অনুযায়ী, উগ্রবাদীরা তাদের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সংকট এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতাগুলো ঢাকতেই এই পবিত্র সহিংসতার আশ্রয় নেয়। তারা এই হত্যাযজ্ঞকে কোনো অপরাধ নয়, বরং একটি মহৎ ধর্মীয় আচার হিসেবে উপস্থাপন করে।
এই পুরষ্কারের ভ্রান্তিটি পুরোপুরি একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে পরকাল, স্বর্গ বা নরকের কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ নেই। তারপরও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো তরুণদের মগজ ধোলাই করার সময় এই প্রমাণহীন গালগল্পগুলোকেই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা তরুণদের বোঝায় যে, পার্থিব জীবনের দুঃখ, বঞ্চনা বা ব্যর্থতার কোনো গুরুত্ব নেই; আসল পুরষ্কার অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ওপারে। স্যাম হ্যারিস খুব তীক্ষ্ণভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের বিশ্বাস মানুষের মধ্য থেকে স্বাভাবিক মানবিক মায়া বা সহানুভূতি কেড়ে নেয়। কারণ, যে ব্যক্তি নিজের জীবনকেই তুচ্ছ মনে করে, সে স্বভাবতই অন্য কোনো নিরীহ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য দেয় না। আত্মত্যাগের এই রোমান্টিক কিন্তু ভয়াবহ ধারণাটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি অফুরন্ত জ্বালানি হিসেবে কাজ করে, যার ফলে তারা প্রতিনিয়ত নতুন আত্মঘাতী যোদ্ধা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
অন্ধবিশ্বাস ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডা (Blind Faith and Institutional Propaganda)
ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত কিছু সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী প্রোপাগান্ডার ফসল। উগ্রবাদী সংগঠনগুলো একটি বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজকাঠামো তৈরি করে, যেখানে বিজ্ঞান, দর্শন বা মুক্তচিন্তার কোনো প্রবেশাধিকার থাকে না। দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক এরিক হফার (Eric Hoffer) তাঁর বিখ্যাত বই The True Believer-এ এই গণ-আন্দোলনগুলোর প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। হফার দেখিয়েছেন যে, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো সাধারণত সমাজে যারা হতাশ, একাকী বা আত্মপরিচয়হীনতায় ভুগছে, তাদের লক্ষ্য করে প্রোপাগান্ডা চালায়। এই সংগঠনগুলো তাদের অনুসারীদের ব্যক্তিস্বত্বাকে পুরোপুরি মুছে ফেলে তাদের একটি বৃহত্তর অন্ধবিশ্বাসী দলের অংশ করে নেয়। হফারের মতে, একজন ‘ট্রু বিলিভার’ বা অন্ধবিশ্বাসী যুক্তির ধার ধারে না; সে কেবল অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করে এবং নেতার যেকোনো নির্দেশ পালনে প্রস্তুত থাকে, তা যতই অমানবিক হোক না কেন।
এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডা কীভাবে মানব সভ্যতার স্বাভাবিক অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে, তা নিয়ে কাজ করেছেন মনোবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক স্টিভেন পিংকার (Steven Pinker)। তিনি তাঁর গ্রন্থ The Better Angels of Our Nature-এ দেখিয়েছেন যে, ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীতে সহিংসতার মাত্রা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) বা আলোকায়নের যুগে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকারের বিকাশকে চিহ্নিত করেছেন। পিংকার ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানুষ যখন ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তিবাদী হতে শুরু করে, তখনই সমাজে প্রকৃত সহনশীলতা তৈরি হয়। কিন্তু উগ্রবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো এই আলোকায়নের সরাসরি বিরোধিতা করে। তারা বুঝতে পারে যে, সাধারণ মানুষ যদি বিজ্ঞানমনস্ক হয় এবং যুক্তির চর্চা করে, তবে তাদের অন্ধবিশ্বাসের ব্যবসা টিকবে না। তাই তারা সুপরিকল্পিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা ও মুক্তচিন্তকদের ওপর আক্রমণ চালায়।
এই সংগঠনগুলোর প্রোপাগান্ডার একটি বড় কৌশল হলো তথ্য নিয়ন্ত্রণ। তারা তাদের সদস্যদের নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় গ্রন্থ এবং তাদের নিজেদের তৈরি করা ব্যাখ্যা ছাড়া অন্য কোনো কিছু পড়তে বা দেখতে নিষেধ করে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তারা এই প্রোপাগান্ডাকে আরও নিখুঁতভাবে ব্যবহার করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা এমন কিছু ভিডিও বা টেক্সট তৈরি করে, যা তরুণদের আবেগ নিয়ে খেলা করে। এরিক হফার যেমন বলেছিলেন, অন্ধবিশ্বাসীরা সবসময় একটি কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলো প্রতিনিয়ত সেই কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে। তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সেটি তাদের ধর্ম ধ্বংস করার জন্য তৈরি হয়েছে। ফলে, সাধারণ যুক্তিবোধ হারিয়ে তরুণেরা এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পড়ে নিজেদের অজান্তেই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়।
সভ্যতার সংকট ও ধর্মান্ধতার ভবিষ্যৎ (Crisis of Civilization and the Future of Fanaticism)
আধুনিক বিশ্বে ধর্মান্ধতা কেবল একটি নিরাপত্তা সমস্যা নয়, এটি মানব সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির জন্য একটি বড় সংকট। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ হয়তো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে পারে, কিন্তু যে মতাদর্শ মানুষের মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা বন্দুক দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইট (Jonathan Haidt) তাঁর গবেষণায় মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গ্রুপিশনেস (Groupishness) বা দলবদ্ধতার ধারণার কথা বলেছেন। হাইট দেখিয়েছেন যে, মানুষের মনস্তত্ত্বে বিবর্তনের কারণেই দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি প্রবণতা রয়েছে। ধর্মান্ধ মতাদর্শগুলো মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিটিকে হাইজ্যাক করে। তারা এমন একটি উগ্র দলীয় পরিচিতি তৈরি করে, যা তাদের বাইরের পৃথিবীর যেকোনো সত্য বা প্রমাণের প্রতি সম্পূর্ণ অন্ধ করে দেয়। হাইটের মতে, এই অন্ধ দলবদ্ধতার কারণেই ধর্মান্ধরা নিজেদের দলের ভয়াবহ অপরাধগুলোকেও মহৎ কাজ হিসেবে জাস্টিফাই করতে পারে।
সভ্যতার এই সংকট মোকাবেলা করা বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই উগ্রবাদ দমনে কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে, যা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। সামরিক অভিযান অনেক ক্ষেত্রে উগ্রবাদীদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে এবং তাদের প্রোপাগান্ডাকে শক্তিশালী করার সুযোগ দেয়। ধর্মান্ধতার এই শেকড় উপড়ে ফেলতে হলে প্রয়োজন কাঠামোগত বৌদ্ধিক লড়াই। বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী দর্শনের প্রসার ঘটানো অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের শেখানো দরকার কীভাবে প্রাচীন মিথলজি আর আধুনিক ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। তাদেরকে বোঝানো প্রয়োজন যে, ধর্মীয় গ্রন্থগুলো কোনো বৈজ্ঞানিক জার্নাল নয়, বরং এগুলো প্রাচীনকালের মানুষের কল্পনা ও রূপকথার সংকলন মাত্র।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট যে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এই লড়াইটি দীর্ঘস্থায়ী হবে। বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের উগ্রবাদীরা এখন একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারছে এবং তাদের সহিংস বিশ্বাসগুলো খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। তবে আশার কথা হলো, আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের সামনে জ্ঞানের এক বিশাল জগৎ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। মানুষ যত বেশি যুক্তিবাদী প্রশ্ন করতে শিখবে, অন্ধবিশ্বাসের ভিত ততটাই নড়বড়ে হবে। জোনাথন হাইট যেমন বলেছেন, মানুষকে কেবল যুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা কঠিন; তাদের আবেগ ও নৈতিকতার জায়গাতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। একটি ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই কেবল এই উগ্র ধর্মান্ধতার ভয়াল থাবা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায়, প্রমাণহীন বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সহিংস মতাদর্শগুলো আধুনিক সভ্যতার ভিত্তিমূলে আঘাত হানতেই থাকবে।
বাংলাদেশে মৌলবাদী বক্তব্য (Fundamentalist Discourse in Bangladesh): স্থানীয় বাস্তবতা
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি (Colonial Legacy and Politics of Religious Identity)
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও সমাজকাঠামোর ঐতিহাসিক বিবর্তনে বঙ্গীয় বদ্বীপের একটি নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে এসেছে। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে এখানকার সাধারণ মানুষের পরিচয়ের ভিত্তি কেবল ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাদের ভৌগোলিক ও পেশাগত পরিচয়ও অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এই সামাজিক বুননে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাস গবেষক সুফিয়া উদ্দিন (Sufia Uddin) তাঁর Constructing Bangladesh গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে ব্রিটিশদের ভাগ করো ও শাসন করো (Divide and Rule) নীতির কারণে সমাজের নানা স্তরে ধর্মীয় পরিচয়ের একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি হতে শুরু করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং পরবর্তীকালে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সুফিয়া উদ্দিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষের ওপর কোনো একক ধর্মীয় পরিচয় উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে, স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে তার একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত তৈরি হওয়া অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতায় রক্ষণশীল ও উগ্রবাদী বক্তব্যের শেকড় বুঝতে অত্যন্ত সহায়ক। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি একটি ধর্মীয় ঐক্যের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল। পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। শাসকেরা তাদের শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ধর্মীয় বয়ানের আশ্রয় নিত। তারা বাংলা ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে অনেক সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রভাবপুষ্ট বলে আখ্যা দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় সমাজ গঠনের প্রকল্প হাতে নেয়। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীন দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ চব্বিশ বছরের সেই ধর্মীয় রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সামরিক শাসনগুলো নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য পুনরায় সেই পুরনো ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে দুর্বল করে সেখানে ধর্মীয় পরিচিতিকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ করা হয়।
পরবর্তী দশকগুলোতে এই রাজনৈতিক শূন্যস্থান ও আপসকামিতার সুযোগ নিয়েই বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো তাদের বক্তব্য ও মতাদর্শ প্রচারের একটি শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায়। তারা সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যে, বাঙালি সংস্কৃতি এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা অনেক সময় প্রাচীন আখ্যান ও ঐতিহ্যকে আদর্শ সমাজের ঐতিহাসিক মডেল হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এরিক হবসবাউম (Eric Hobsbawm) এ ধরনের প্রক্রিয়াকে উদ্ভাবিত ঐতিহ্য (Invented Tradition) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। হবসবাউম ও রেঞ্জার তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বর্তমান দাবিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য অনেক সময় এমন কিছু অতীত ঐতিহ্যের কথা প্রচার করে, যা ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ নিখুঁত বা প্রমাণিত নয়। বাংলাদেশেও ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো তাদের রাজনৈতিক দাবিগুলোকে এমনভাবে সাজায়, যেন রাষ্ট্রকাঠামো তাদের নির্দেশিত অনুশাসন অনুযায়ী না চললে সাধারণ মানুষের পরিচয় হুমকির মুখে পড়বে। সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু হওয়া পরিচয়ের এই সংকট আধুনিক বাংলাদেশে এসে এক ধরনের রক্ষণশীল মতাদর্শের বিস্তারে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
গ্রামীণ ওয়াজ মাহফিল ও মতাদর্শিক প্রচার (Rural Waj Mahfils and Ideological Propaganda)
বাংলাদেশে রক্ষণশীল ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারের অন্যতম প্রধান একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হলো ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় সমাবেশ। বিশেষ করে শীতকালে দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে মফস্বল শহরগুলোতে এই ধরনের সমাবেশের ব্যাপক আয়োজন চোখে পড়ে। বাইরে থেকে দেখলে এগুলোকে সাধারণ ধর্মীয় উপাসনা মনে হতে পারে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো সমাজে একটি শক্তিশালী জনমত গঠনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই সমাবেশগুলোর রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাসশির হাসান (Mubashar Hasan)। তাঁর Islam and Politics in Bangladesh গ্রন্থে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে এই গ্রামীণ জমায়েতগুলোতে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ বক্তৃতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে উম্মাহ (Ummah) বা একটি বৈশ্বিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়। হাসানের মতে, বক্তাদের একটি বড় অংশের লক্ষ্য থাকে সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরনের আবেগিক মেরুকরণ তৈরি করা। তারা এমন একটি বয়ান তৈরি করেন যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা বা মানবাধিকারের মতো ধারণাগুলোকে পশ্চিমা মতাদর্শিক প্রভাব হিসেবে সমালোচনা করা হয়।
বক্তারা অনেক সময় স্থানীয় আর্থসামাজিক সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে দূরবর্তী কোনো দেশের সংঘাত বা প্রাচীন আখ্যানকে বর্তমানের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরেন। হাজার বছর আগের বিভিন্ন যুদ্ধ, অলৌকিক ঘটনা এবং বিজয়গাথাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দাবি করা হয়। শ্রোতাদের একটি বড় অংশের যেহেতু ইতিহাস বা বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে গভীর পড়াশোনা থাকে না, তাই তারা বক্তাদের এই বক্তব্যগুলোকে অকাট্য সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে বক্তারা এক ধরনের সুনির্দিষ্ট আবেগপূর্ণ বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেন, যা শ্রোতাদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। এই পরিবেশনার কারণে সাধারণ মানুষ বক্তার যুক্তির চেয়ে তার আবেগের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। এর মাধ্যমে শ্রোতাদের ভেতরে একটি কাল্পনিক পরিচিতি তৈরি হয়, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের একটি বৃহত্তর ধর্মীয় কাঠামোর অংশ ভাবতে শুরু করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় পরিচয় অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়।
মতাদর্শিক প্রচারের এই কৌশলটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বক্তারা সরাসরি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংসতার ডাক না দিলেও, সমাজবিজ্ঞানীদের মতে তারা এমন একটি রক্ষণশীল মানসিকতা তৈরি করেন যা পরবর্তীতে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি করে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, মুক্তমনা লেখক বা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের জীবনযাপনকে তারা সমাজের অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আধুনিক আইন ও বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলোকে তুলে ধরে তারা দাবি করেন যে তাদের প্রস্তাবিত ধর্মীয় আইনেই সমাজের সব সমস্যার সমাধান নিহিত আছে। এই সমাবেশগুলোতে সাধারণত বক্তাকে প্রশ্ন করার বা তার দাবির সত্যতা যাচাই করার কোনো কাঠামোগত সুযোগ থাকে না। এর মানে দাঁড়ায়, এটি একটি বিশাল জ্ঞানীয় প্রতিধ্বনি-প্রকোষ্ঠ (Cognitive Echo-Chamber) হিসেবে কাজ করে। এখানে মানুষ কেবল সেই কথাই শোনে, যা তাদের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ধর্মীয় সমাবেশগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে একটি রক্ষণশীল জনভিত্তি তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে আসছে।
শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন ও মাদ্রাসা শিক্ষাক্রম (Division in Education System and Madrasa Curriculum)
যে কোনো দেশের সমাজকাঠামো এবং নাগরিকদের মনস্তত্ত্ব গঠনে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা, অন্যদিকে রয়েছে বিশাল একটি মাদ্রাসা শিক্ষাকাঠামো, যা আবার আলিয়া ও কওমি এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) তাঁর Islamist Militancy in Bangladesh: A Complex Webগ্রন্থে এই দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। রীয়াজ দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও সুনির্দিষ্ট নীতির অভাবে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়তে বাধ্য হয়। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীনভাবে তাদের নিজস্ব পাঠ্যক্রম পরিচালনা করে। গবেষক নিয়াজ আসাদুল্লাহ ও নাজমুল চৌধুরী তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে আধুনিক বিজ্ঞান, বিশ্ব ইতিহাস, অর্থনীতি বা যুক্তিবাদী দর্শনের চর্চা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সীমিত। সেখানে ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা এবং সনাতন শিক্ষাপদ্ধতির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়।
এই বিভাজিত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে সমাজের ভেতরে দুটি ভিন্ন মনস্তত্ত্বের প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণেরা আধুনিক বৈশ্বিক প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা মানবাধিকার নিয়ে চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণেরা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিশ্ববীক্ষা নিয়ে বড় হয়। আলী রীয়াজ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষার অভাবে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাস করা অনেক তরুণের জন্য আধুনিক কর্মক্ষেত্রে সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। এই অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বেকারত্ব তাদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো তরুণদের এই অর্থনৈতিক ক্ষোভকে খুব সহজেই মতাদর্শিক রূপ দান করতে সক্ষম হয়। তারা বোঝাতে চেষ্টা করে যে, তাদের এই বেকারত্ব বা বঞ্চনার পেছনের কারণ হলো আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো। রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন করে ধর্মীয় শাসন কায়েম করা গেলে তাদের এই বঞ্চনার অবসান ঘটবে বলে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতার আরও গুরুতর পরিণতি দেখা যায় তখন, যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে মতাদর্শিক রাজনীতি যুক্ত হয়। মাদ্রাসা, ধর্মীয় রাজনীতি ও উগ্রবাদের এই সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার বিষয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ২০০২ সালের Pakistan: Madrasas, Extremism and the Military প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখানো হয়েছিল, কীভাবে নির্দিষ্ট মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন এবং জঙ্গিবাদী কাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল (International Crisis Group, 2002)। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক কিছু সাদৃশ্য থাকলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। এ কারণে বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝার জন্য সংস্থাটির Bangladesh Today এবং পরবর্তী Countering Jihadist Militancy in Bangladesh প্রতিবেদন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিবেদনে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইসলামপন্থী সংগঠন, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কের বিস্তারকে বাংলাদেশের বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে (International Crisis Group, 2006, 2018)।
এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা নিজেই সরাসরি একজন শিক্ষার্থীকে উগ্রবাদী বানায় – এমন সরল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই; কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতা উগ্রবাদী মতাদর্শ বিস্তারের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে যখন সীমিত কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একটি সংকীর্ণ মতাদর্শিক বিশ্ববীক্ষা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বা উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর জন্য হতাশ তরুণদের ক্ষোভকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আখ্যানে রূপান্তর করা সহজ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জেএমবি ও অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠনের বিকাশও দেখিয়েছে যে, ধর্মীয় মতাদর্শকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত করে তরুণদের সংগঠিত করার চেষ্টা বাস্তব একটি নিরাপত্তাগত সমস্যা। ফলে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কোনো মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ব্যক্তিগতভাবে উগ্রবাদী কি না, তা নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাকাঠামো কতটা শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, আধুনিক ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিস্তৃত জগতের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম।
শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতার আরও গুরুতর পরিণতি দেখা যায় তখন, যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে মতাদর্শিক রাজনীতি যুক্ত হয়। মাদ্রাসা, ধর্মীয় রাজনীতি ও উগ্রবাদের এই সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার বিষয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ২০০২ সালের Pakistan: Madrasas, Extremism and the Military প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখানো হয়েছিল, কীভাবে নির্দিষ্ট মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন এবং জঙ্গিবাদী কাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল (International Crisis Group, 2002)। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক কিছু সাদৃশ্য থাকলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। এ কারণে বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝার জন্য সংস্থাটির Bangladesh Today এবং পরবর্তী Countering Jihadist Militancy in Bangladesh প্রতিবেদন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিবেদনে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইসলামপন্থী সংগঠন, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কের বিস্তারকে বাংলাদেশের বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে (International Crisis Group, 2006, 2018)।
এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা নিজেই সরাসরি একজন শিক্ষার্থীকে উগ্রবাদী বানায় – এমন সরল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই; কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতা উগ্রবাদী মতাদর্শ বিস্তারের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে যখন সীমিত কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একটি সংকীর্ণ মতাদর্শিক বিশ্ববীক্ষা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বা উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর জন্য হতাশ তরুণদের ক্ষোভকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আখ্যানে রূপান্তর করা সহজ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জেএমবি ও অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠনের বিকাশও দেখিয়েছে যে, ধর্মীয় মতাদর্শকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত করে তরুণদের সংগঠিত করার চেষ্টা বাস্তব একটি নিরাপত্তাগত সমস্যা। ফলে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কোনো মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ব্যক্তিগতভাবে উগ্রবাদী কি না, তা নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাকাঠামো কতটা শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, আধুনিক ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিস্তৃত জগতের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজনের সমস্যাটি আরও গভীর। সমাজের একটি বড় অংশ যদি এমন একটি জ্ঞানগত পরিসরে বেড়ে ওঠে যেখানে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং সমালোচনামূলক বিতর্কের সুযোগ সীমিত থাকে, তাহলে সমাজে পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিবর্তে পৃথক ও পরস্পরবিরোধী বিশ্ববীক্ষা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রচারকের পক্ষে জটিল সামাজিক সমস্যাকে একটি সরল মতাদর্শিক ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষাকে উগ্রবাদের একমাত্র বা স্বয়ংক্রিয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যথার্থ না হলেও, আধুনিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, কর্মবাজার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং সমালোচনামূলক জ্ঞানচর্চার ঘাটতির সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মেরুকরণ যুক্ত হলে এই শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা উগ্রবাদী ও মৌলবাদী মতাদর্শ বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সাইবার স্পেস, ডিজিটাল র্যাডিক্যালাইজেশন ও সংঘাত (Cyber Space, Digital Radicalization and Conflict)
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। প্রযুক্তিগত এই রূপান্তর মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সহজ করলেও, এটি ধর্মভিত্তিক উগ্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী প্রচারযন্ত্র হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। একসময় যারা কেবল গ্রামীণ মাহফিল বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বক্তব্য রাখতেন, তারা এখন ফেসবুক, ইউটিউব এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তনটি বাংলাদেশে ডিজিটাল র্যাডিক্যালাইজেশন (Digital Radicalization) এর একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত দ্রুত প্রযুক্তির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে এবং একটি সুসংগঠিত তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare) পরিচালনা করছে। তারা ভিডিও এডিটিং, আকর্ষণীয় থাম্বনেইল এবং ইমোশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করে তাদের রক্ষণশীল ধারণাগুলোকে আধুনিক মোড়কে তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করছে।
এই ভার্চুয়াল জগতে তারা একটি বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তারা নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীদের কাছে বারবার একই ধরনের উগ্র মতাদর্শের কনটেন্ট পৌঁছে দেয়। সাধারণ তরুণ, যাদের ইতিহাস পাঠের অভ্যাস নেই, তারা সোশ্যাল মিডিয়ার এই চটকদার ভিডিওগুলো দেখে খুব সহজেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং সাইবার স্পেসে গড়ে ওঠা ঘৃণার সংস্কৃতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। সাইবার স্পেসে ভিন্নমত বা যুক্তির প্রকাশ অনেক সময় চরমভাবে দমন করা হয়। কেউ যুক্তির মাধ্যমে তাদের দাবির সমালোচনা করার চেষ্টা করলে সংঘবদ্ধ সাইবার বাহিনী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভিন্নমতাবলম্বীদের ধর্মবিদ্বেষী হিসেবে ট্যাগ দিয়ে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল উগ্রবাদের ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায় ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে। সেই সময়ে সাইবার স্পেসের এই ঘৃণা বাস্তব জীবনের সংঘাতে রূপ নেয়। বেশ কয়েকজন মুক্তমনা লেখক, বিজ্ঞানমনস্ক ব্লগার ও প্রকাশককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে এই মানুষগুলোর বিরুদ্ধে একটি ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেছিল। তারা ব্লগারদের লেখাগুলোকে খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়েছিল। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দেশের ভেতরের ছোট ছোট সেল গঠন করে এবং হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। এই হত্যাকাণ্ডগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই মানুষের মনস্তত্ত্ব আধুনিক হয়ে ওঠে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবের সুযোগ নিয়ে ডিজিটাল র্যাডিক্যালাইজেশন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
নারী, প্রগতি ও রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া (Women, Progress and Conservative Backlash)
বাংলাদেশে ধর্মীয় রক্ষণশীল বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে নারী অধিকার, তাদের পোশাক এবং সামাজিক প্রগতির বিরোধিতা। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নীরব কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে, যার অন্যতম প্রধান কারিগর হলো তৈরি পোশাক শিল্প। লাখ লাখ প্রান্তিক নারী গ্রামীণ গণ্ডি পেরিয়ে শহরের কারখানাগুলোতে কাজ করতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এর ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ ও শিক্ষা কার্যক্রম গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে। নারীর এই দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং জনপরিসরে তাদের অবাধ উপস্থিতি ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল সমাজকাঠামোতে একটি বিশাল ধাক্কা দেয়। রাজনীতি ও জেন্ডার বিষয়ক গবেষক এলোরা শেহাবউদ্দীন (Elora Shehabuddin) তাঁর Reshaping the Holyগ্রন্থে নারী, উন্নয়ন এবং ধর্মীয় রাজনীতির এই সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছেন।
এলোরা শেহাবউদ্দীন দেখিয়েছেন, কীভাবে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো নারীর এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রগতিকে তাদের সনাতন পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে গ্রহণ করে। ধর্মীয় বক্তারা তাদের প্রচারপত্রগুলোতে প্রচার করেন যে, নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করাটা সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক ভাঙনের কারণ। শেহাবউদ্দীন তাঁর গবেষণায় বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই গোষ্ঠীগুলো একটি কাল্পনিক আদর্শ সমাজের ধারণা প্রচার করে। তারা দাবি করে, নারীদের ঘরের ভেতরে আবদ্ধ থাকাই হলো ধর্মীয় বিধান এবং আদর্শ সমাজব্যবস্থা। আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতেও নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি মাঠে-ঘাটে কাজ করত। গবেষকদের মতে, ঘরবন্দী নারীর ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ফসল। এরপরও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো এই বয়ানটিকে ঐশ্বরিক বিধান হিসেবে জনসমাজে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
এই রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া কেবল মৌখিক প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগের রূপ ধারণ করেছে। বিভিন্ন সময় গ্রামীণ ফতোয়ার মাধ্যমে নারীদের জনপরিসরে কাজ করতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করে নারী উন্নয়ন নীতিমালা পরিবর্তনের দাবি তুলেছে। তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যে, নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হলে সমাজের ধর্মীয় ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ডেটা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, নারীর ক্ষমতায়ন একটি রাষ্ট্রের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনীতির এই বস্তুনিষ্ঠ ডেটাগুলোকে পাশ কাটিয়ে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব সামাজিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ধর্মীয় আখ্যানের ওপর নির্ভর করে সমাজে একটি পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অনেক সমাজতাত্ত্বিক মনে করেন।
পৌরাণিক আখ্যান ও সমকালীন রাজনৈতিক বৈধতা (Mythological Narratives and Contemporary Political Legitimacy)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রক্ষণশীল ও মৌলবাদী বক্তব্যের একটি অন্যতম কৌশল হলো প্রাচীন আখ্যান বা পুরাণকে ব্যবহার করে সমকালীন রাজনৈতিক সংঘাত ও দাবিগুলোর বৈধতা আদায় করা। প্রাচীনকালের বিভিন্ন গ্রন্থে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ থাকে, যেখানে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী তাদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে। আধুনিক যুগের চরমপন্থী নেতারা এই আখ্যানগুলোকে সমকালীন রাজনৈতিক সংঘাতে রূপক হিসেবে ব্যবহারের বদলে সরাসরি ঐতিহাসিক নির্দেশিকা হিসেবে উপস্থাপন করেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তারা একটি বিকল্প ইতিহাস নির্মাণ করেন, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ বা আধুনিক ইতিহাসতত্ত্বের প্রয়োগ প্রায় থাকে না বললেই চলে। তারা বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার বা মুক্তমনা নাগরিকদের সেই প্রাচীন আখ্যানের খলনায়কদের সাথে তুলনা করেন। অনুসারীদের বোঝানো হয় যে, হাজার বছর আগের সেই সংঘাত আজও চলমান রয়েছে এবং আধুনিক যুগের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো পরিবর্তন করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।
এই আখ্যানগুলোর ব্যবহার রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরকে অত্যন্ত সংকুচিত করে ফেলে। কোনো রাজনৈতিক দাবি অর্থনীতির ডেটা বা সামাজিক নীতির ওপর ভিত্তি করে উঠলে সেখানে যৌক্তিক আলোচনা বা বিতর্কের সুযোগ থাকে। দাবিটি কোনো অপরিবর্তনীয় ধর্মীয় নির্দেশের ওপর ভিত্তি করে উঠলে সেখানে আপসের খুব একটা জায়গা থাকে না। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো আধুনিক শাসনতন্ত্রকে মানবসৃষ্ট এবং ত্রুটিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করে। তারা প্রচার করে যে, তাদের কাছে এমন একটি শাসনব্যবস্থার মডেল আছে, যা বাস্তবায়িত হলে সমাজে কোনো বৈষম্য থাকবে না। আধুনিক ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণাগুলো দেখায় যে, প্রাচীন সমাজগুলোও যুদ্ধ, মহামারি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ ছিল। একটি নিখুঁত বা সংঘাতহীন সমাজের ধারণা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ইউটোপিয়া মাত্র। বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদী বয়ানে এই ঐতিহাসিক জটিলতাগুলোকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও অনেক সময় এই ধর্মীয় বয়ানকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিয়ে এসেছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের জনসমর্থন ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় এই রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর দাবিগুলোর সাথে আপস করেছে। পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে কঠোর আইন প্রণয়নের মতো ঘটনাগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এই ধরনের রাজনৈতিক তোষণ নীতি ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তারা বুঝতে পারে যে, ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমাজে বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষার কাঠামোগত প্রসার প্রয়োজন। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও প্রমাণভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে একটি প্রগতিশীল মনন তৈরি করা না গেলে, এই ধরনের আখ্যানগুলোর ওপর ভর করে রক্ষণশীল রাজনীতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বহুমাত্রিক সামাজিক কাঠামোকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করতেই থাকবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইসলাম (Political Islam in Bangladesh): রাজনীতি ও নিরাপত্তা
রাজনৈতিক ইসলামের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো (Historical Evolution of Political Islam and State Structure)
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক একটি দীর্ঘ ও জটিল বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। প্রাক-ঔপনিবেশিক বঙ্গীয় বদ্বীপের সমাজকাঠামো ছিল প্রধানত সমন্বয়বাদী, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ একটি মিশ্র সংস্কৃতির আবহে পাশাপাশি বসবাস করত। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় তাদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের অংশ হলেও, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সেটি খুব একটা ব্যবহৃত হতো না। আধুনিক যুগে এসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল এবং সমাজ পরিচালনার একটি সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ হিসেবে ধর্মের যে কাঠামোগত ব্যবহার দেখা যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে রাজনৈতিক ইসলাম (Political Islam) বলা হয়। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক আলী রীয়াজ (Ali Riaz) তাঁর God Willing: The Politics of Islamism in Bangladesh গ্রন্থে বাংলার সাধারণ গ্রামীণ ধর্মচর্চা এবং রাজনৈতিক ইসলামের মধ্যকার কাঠামোগত পার্থক্যের বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। রীয়াজ দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের চিরায়ত ধর্মচর্চা ছিল অনেক বেশি স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা একটি বিষয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ইসলামের প্রবক্তারা ধর্মকে একটি আধুনিক রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে দাঁড় করাতে চান, যা স্থানীয় সংস্কৃতিকে অনেক সময় বিশুদ্ধতার পরিপন্থী বলে মনে করে এবং ধর্মকে একটি একক, কঠোর ও অপরিবর্তনীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করে।
উপমহাদেশে রাজনৈতিক ইসলামের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও শক্তিশালী রূপ দেখা যায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের শেষের দিকে এবং পাকিস্তান সৃষ্টির প্রক্রিয়ার মধ্যে। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার সময় পরিচয়ের রাজনীতি একটি নতুন মাত্রা পায়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মানুষকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ধর্মকে একটি অত্যন্ত কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি একটি ধর্মীয় ঐক্যের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র প্রথম থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক অধিকারকে দমন করার জন্য ধর্মীয় বয়ানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। তারা প্রচার করত যে, রাষ্ট্রীয় নীতি বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থই হলো ধর্মীয় ঐক্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধরনের কাঠামোগত নিপীড়নের ফলেই পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করার সময় এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়, কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে এই দলগুলোর একটি বড় অংশের ভূমিকা ছিল চরম বিতর্কিত এবং মানবতাবিরোধী। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ধীরগতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শাসকগোষ্ঠীর নানামুখী সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এক ধরনের হতাশা তৈরি হতে শুরু করে। রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে বা একটি স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে হিমশিম খেলে রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা সেই সামাজিক শূন্যস্থানের সুযোগ নেয়। তারা সুকৌশলে প্রচার করতে থাকে যে, আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং ধর্মীয় অনুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করতে পারলেই সমাজের সমস্ত বঞ্চনার অবসান ঘটবে। ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই দুর্বলতাগুলোই পরবর্তীকালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইসলামের পুনরুত্থানের জন্য একটি উর্বর ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
সামরিক শাসন, সাংবিধানিক রূপান্তর ও ধর্মীয় রাজনীতির বৈধতা (Military Rule, Constitutional Transformations and Legitimacy of Religious Politics)
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সামরিক শাসনগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় কাঠামোগত রূপান্তর নিয়ে আসে। সামরিক শাসকেরা অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর তাদের সবচেয়ে বড় সংকট থাকে রাজনৈতিক বৈধতা বা লেজিটিমেসি অর্জন করা। জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট না থাকায় তারা নিজেদের শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানারকম বিকল্প কৌশল গ্রহণ করেন। ইতিহাসবিদ ও গবেষক উইলেম ভ্যান শেন্ডেল (Willem van Schendel) তাঁর A History of Bangladesh গ্রন্থে সামরিক শাসন এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ভ্যান শেন্ডেল দেখিয়েছেন, সামরিক সরকারগুলো ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনামলে সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতিটি বাদ দেওয়া হয় এবং এর বদলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটি যুক্ত করা হয়, সেই সাথে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করা হয়। এই সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো কেবল কিছু শব্দের রদবদল ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে মুছে ফেলে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের সুদূরপ্রসারী প্রকল্প।
রাষ্ট্রীয় এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসার আইনি অধিকার লাভ করে। সামরিক সরকারগুলো নিজেদের ক্ষমতা সংহত করার জন্য এই দলগুলোর সাথে এক ধরনের অঘোষিত রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি করে। গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গোলাম হোসেন (Golam Hossain) তাঁর General Ziaur Rahman and the BNP গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে সামরিক শাসনামলে ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ‘ নামে একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক ধারণার জন্ম দেওয়া হয়। হোসেনের মতে, এই নতুন জাতীয়তাবাদী ধারণায় ধর্মকে একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে যুক্ত করা হয়, যাতে করে ধর্মনিরপেক্ষ বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা যায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রেডিও, টেলিভিশন এবং অন্যান্য সরকারি মাধ্যমে ধর্মীয় প্রচারণার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য সামরিক সরকারগুলো নিজেদের এই নতুন ইসলামি পরিচয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রাজনৈতিক ইসলামকে সমাজের একেবারে প্রান্তিক পর্যায় থেকে মূলধারায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হলে রাজনৈতিক ইসলামের অবস্থান আরও বেশি সুসংহত হয়। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুনরায় ফিরিয়ে আনা হলেও, রাষ্ট্রধর্মের বিধান এবং বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম অপরিবর্তিত রাখা হয়। কিছু সাংবিধানিক বিশ্লেষকের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্মের এই সহাবস্থান সাংবিধানিকভাবে এক ধরনের স্ববিরোধী কাঠামোর জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি রাষ্ট্রে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হলে সেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো সামাজিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভোগে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সামরিক শাসকদের এই বৈধতা খোঁজার শর্টকাট কৌশলগুলো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় রাজনীতির এমন একটি শেকড় তৈরি করেছে, যা থেকে রাষ্ট্রকাঠামো আজও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
গণতন্ত্রায়ন, নির্বাচনী জোট ও মতাদর্শিক আপস (Democratization, Electoral Alliances and Ideological Compromise)
নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন গণতান্ত্রিক যুগের সূচনা হয়। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব আদর্শ ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে জনগণের কাছে ভোট চাইবে। নির্বাচনী রাজনীতির বাস্তবতায় দেখা গেল একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক সুসংহত করার পাশাপাশি ক্ষমতার মসনদে বসার জন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞানী ও উন্নয়ন গবেষক ডেভিড লুইস (David Lewis) তাঁর Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society গ্রন্থে গণতন্ত্রায়নের এই জটিল সমীকরণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। লুইসের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদী আদর্শের চেয়ে তাৎক্ষণিক নির্বাচনী বিজয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রধান ধর্মনিরপেক্ষ বা মধ্যপন্থী দলগুলো রাজনৈতিক ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে জোট গঠন করার মাধ্যমে তাদেরকে এক ধরনের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রদান করে।
এই নির্বাচনী জোটগুলোর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। রাজনৈতিক ইসলামপন্থী দলগুলোর নিজস্ব ভোটব্যাংক হয়তো তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল, তারপরও তারা মূলধারার দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে নিজেদের মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। ডেভিড লুইস বিশ্লেষণ করেছেন যে, মূলধারার দলগুলো ভেবেছিল তারা ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিজেদের নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাস্তবতায় ধর্মভিত্তিক দলগুলোই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও আর্থিক ভিত্তি মজবুত করে নিয়েছিল। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক দপ্তরে নিজেদের কর্মী ও সমর্থকদের নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে একটি স্থায়ী শক্তিবলয় তৈরি করে। এই রাজনৈতিক আপসকামিতার কারণে সমাজের প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক অংশটি ধীরে ধীরে কোণঠাসা হতে থাকে।
নির্বাচনী রাজনীতির এই আপসকামিতা রাজনৈতিক ইসলামের নেতাদের জনসমক্ষে একটি পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি তৈরিতে সাহায্য করে। তারা টেলিভিশন টকশো, পত্রপত্রিকা এবং জাতীয় সংসদে বসে আধুনিক রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ডেভিড লুইসের গবেষণা অনুযায়ী, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় প্রমাণের চেয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগার বিষয়ে বেশি সতর্ক থেকেছে। পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা, মুক্তমনা লেখকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো এই মতাদর্শিক আপসেরই প্রত্যক্ষ ফসল। গণতন্ত্রায়নের এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ইসলামকে দুর্বল করার বদলে এটিকে রাষ্ট্রের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য মধ্যপন্থী দলগুলোর এই নিরন্তর আপসকামিতা রাজনৈতিক ইসলামের দাবিগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মতাদর্শিক সংগঠন ও ভ্যানগার্ড পার্টির ধারণা (Ideological Organizations and the Concept of Vanguard Party)
উপমহাদেশে রাজনৈতিক ইসলামের সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী রূপটি দেখা যায় জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami) নামক সংগঠনটির কাঠামোর ভেতরে। এটি প্রথাগত কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ক্যাডারভিত্তিক মতাদর্শিক সংগঠন। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভালি নসর (Seyyed Vali Reza Nasr) তাঁর The Vanguard of the Islamic Revolutionগ্রন্থে এই সংগঠনটির তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে অত্যন্ত গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। নসর দেখিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদী একটি ভ্যানগার্ড পার্টি (Vanguard Party) বা অগ্রগামী দলের ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন। মওদুদীর মতে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সাধারণ মানুষের ঢালাও জনসমর্থনের চেয়ে একদল নিবেদিতপ্রাণ, সুশিক্ষিত ও মতাদর্শগতভাবে অনড় কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন বেশি। এই কর্মীবাহিনী রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অনুপ্রবেশ করবে এবং ওপর থেকে নিচে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। ভালি নসরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মওদুদী কার্যত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লেনিনবাদী সাংগঠনিক কাঠামোটিকেই একটি ধর্মীয় রূপ প্রদান করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর কাজের ধরন সাধারণ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তারা কেবল নির্বাচনের সময় ভোট চাওয়ার মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে না। তারা সমাজের ভেতরে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক সেবার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ভালি নসর তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের দলগুলো আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের কার্যপ্রণালী খুব ভালোভাবে বোঝে। তারা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির পেছনের যুক্তিবাদী দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে। তারা হাসপাতাল, ব্যাংক, কোচিং সেন্টার, প্রকাশনা সংস্থা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করে একটি বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়; এগুলো তাদের মতাদর্শ প্রচার এবং নতুন কর্মী সংগ্রহের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। একজন সাধারণ মানুষ যখন তাদের হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণ করে, তখন পরোক্ষভাবে সে তাদের মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
জামায়াতে ইসলামীর এই কাঠামোগত বিস্তৃতি রাজনৈতিক ইসলামের একটি অত্যন্ত আধুনিক ও সুপরিকল্পিত রূপ। তারা প্রাচীন আখ্যান বা আবেগের পাশাপাশি আধুনিক সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে। তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে, ধর্ম কেবল একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। ভালি নসরের মতে, জামায়াতে ইসলামীর এই ভ্যানগার্ড মডেলটি উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদী মতাদর্শিক সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো যেখানে অনেক বেশি অসংগঠিত এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদে লিপ্ত, সেখানে এই ধরনের ক্যাডারভিত্তিক দলগুলো একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ধীর কিন্তু নিশ্চিত পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাদের এই সাংগঠনিক দৃঢ়তা রাজনৈতিক ইসলামকে বাংলাদেশের সমাজকাঠামোতে একটি স্থায়ী ও প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত করেছে।
অ-রাষ্ট্রীয় কুশীলব ও ধর্মভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন (Non-State Actors and Religion-Based Social Movements)
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটে অ-রাষ্ট্রীয় কুশীলব বা নন-স্টেট অ্যাক্টর (Non-State Actor) দের উত্থানের মধ্য দিয়ে। এরা প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না বা সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়ার দাবি করে না, কিন্তু এরা সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। হেফাজতে ইসলাম (Hefazat-e-Islam) এর মতো কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনগুলো এই ধারার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক হিরণ্ময় কার্লেকার (Hiranmay Karlekar) তাঁর Bangladesh: The Next Afghanistan?গ্রন্থে ধর্মভিত্তিক এই অ-রাষ্ট্রীয় কুশীলবদের সামাজিক শক্তি এবং তাদের কারণে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করেছেন। কার্লেকার দেখিয়েছেন, কীভাবে এই গোষ্ঠীগুলো হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাস্তায় নেমে এসে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নিজেদের দাবি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের প্রধান শক্তি হলো তাদের বিশাল স্ট্রিট পাওয়ার বা রাজপথ দখলের ক্ষমতা।
এই সামাজিক আন্দোলনগুলোর দাবিদাওয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা আধুনিক শিক্ষা, নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ আইনের সরাসরি বিরোধিতা করে। তারা ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অজুহাতে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি তোলে, যা প্রকারান্তরে সমাজে বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। কার্লেকার তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, এই গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পেশিশক্তি প্রদর্শন করে। তারা আধুনিক রাষ্ট্রের শিক্ষাক্রম ও কাঠামোগুলোকে ভিনদেশি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং একটি রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা কায়েমের জন্য সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কোনো ধর্মনিরপেক্ষ সরকার তাদের এই বিপুল স্ট্রিট পাওয়ার দেখে ভয় পেয়ে গেলে এবং তাদের সাথে আপস করতে শুরু করলে, এই গোষ্ঠীগুলো আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এই অ-রাষ্ট্রীয় কুশীলবদের উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। পূর্বে রাজনৈতিক ইসলাম বলতে সাধারণ মানুষ কেবল নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝাত। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি নতুন মডেল তৈরি হয়েছে। সরকার অনেক সময় এই গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা বা শিক্ষাব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে। হিরণ্ময় কার্লেকারের গবেষণার সূত্র ধরে বলা যায়, এই ধরনের তুষ্টীকরণ নীতি সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মতাদর্শ প্রচারে আরও বেশি বৈধতা লাভ করে। ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া বা ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই সামাজিক আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক ইসলামের এমন একটি রূপ, যা নির্বাচনে না দাঁড়িয়েও সমাজের চিন্তার জগতকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, অর্থায়ন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি (International Geopolitics, Financing and Security Risks)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইসলামের বিকাশ কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়; এর সাথে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থায়নের একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। সত্তরের দশকের পর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে পেট্রো-ডলারের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল মতাদর্শগুলো বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক রওনক জাহান (Rounaq Jahan) তাঁর Bangladesh: Promise and Performance গ্রন্থে রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অভাব এবং বহিরাগত মতাদর্শিক অর্থায়নের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন বিদেশি দাতব্য সংস্থা ও এনজিও তৃণমূল পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। এই অর্থের একটি বড় অংশ এমন ধরনের প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসায় ব্যয় করা হয়, যেখানে আধুনিক যুক্তিবাদী শিক্ষার চর্চা তুলনামূলকভাবে কম। রওনক জাহানের মতে, রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন এই বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ধর্মীয় নেটওয়ার্কগুলো একটি সমান্তরাল কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এই বিদেশি অর্থায়ন ও মতাদর্শিক বিস্তারের একটি সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া। রাজনৈতিক ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যখন উগ্র ও অসহিষ্ণু চিন্তাধারার প্রবেশ ঘটে, তখন তা অনেক সময় সশস্ত্র চরমপন্থায় রূপ নেয়। আশির দশকে আফগান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক বাংলাদেশি যোদ্ধা দেশে ফিরে এসে বিভিন্ন গোপন সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এই ব্লোব্যাক বা উল্টো প্রতিক্রিয়ার কারণে পরবর্তীতে জেএমবি বা হুজি-এর মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়। তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বদলে সরাসরি সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা শুরু করে। রওনক জাহানের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, মধ্যপন্থী রাজনৈতিক ইসলাম এবং সহিংস চরমপন্থার মধ্যকার সীমারেখাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। মূলধারার রাজনীতিতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে বৈধতা দেওয়া হলে সেটি পরোক্ষভাবে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকেই উৎসাহিত করে। চরমপন্থীরা মনে করে, রাষ্ট্র যেহেতু এমনিতেই তাদের কিছু দাবি মেনে নিচ্ছে, তাই সশস্ত্র চাপ প্রয়োগ করলে হয়তো পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব।
ভবিষ্যতের সমীকরণ বিবেচনা করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহজে শেষ হওয়ার নয়। বিশ্বায়নের যুগে সাইবার স্পেস এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে রাজনৈতিক ইসলামের নতুন নতুন রূপ ও বয়ান তৈরি হচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল সামরিক বা পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই মতাদর্শিক ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সুশাসন নিশ্চিত করা, শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার আনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসার ঘটানো। রওনক জাহানের গবেষণার আলোকে বলা যায়, রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করতে পারে এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারে, তবেই কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতির আবেদন হ্রাস পাবে। ভূরাজনৈতিক প্রভাব, বিদেশি অর্থায়ন এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ইসলাম বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য একটি স্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি হিসেবেই থেকে যাবে।
সন্ত্রাসী সংগঠন ও আচরণ (Terrorist Organizations and Behavior): সংগঠন, কৌশল ও মনোবিজ্ঞান
র্যাডিক্যালাইজেশন ও চরমপন্থা (Radicalization and Extremism): ধারণা, প্রক্রিয়া ও পার্থক্য
ধারণাগত ভিত্তি ও সংজ্ঞায়ন (Conceptual Foundations and Definitions)
মানুষের চিন্তাভাবনা হঠাৎ করে এক রাতে বদলে যায় না। শান্তশিষ্ট একজন তরুণ কীভাবে সমাজের স্বাভাবিক মূল্যবোধ অস্বীকার করে চরম মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সেই রহস্য ভেদ করতে সমাজবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছেন। এই রূপান্তরের পথটি বুঝতে গেলে দুটি ধারণার মুখোমুখি হতে হয়: র্যাডিক্যালাইজেশন ও চরমপন্থা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক পিটার নিউম্যান (Peter Neumann) এই রূপান্তরকে একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে একজন ব্যক্তি ধীরে ধীরে এমন সব বিশ্বাস গ্রহণ করে যা প্রচলিত গণতান্ত্রিক ও সামাজিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত (Neumann, 2013)। এই প্রক্রিয়াটি রাতারাতি ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি দীর্ঘ যাত্রা।
‘র্যাডিক্যাল’ শব্দের আদি উৎস ল্যাটিন শব্দ ‘রেডিক্স’, যার অর্থ শিকড় বা মূল। ঐতিহাসিকভাবে সমাজের কোনো প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর মূলে পরিবর্তন আনার দাবি তোলা ব্যক্তিদের র্যাডিক্যাল বলা হতো। উনিশ শতকে ইউরোপে ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত সংস্কারপন্থীদেরও র্যাডিক্যাল ভাবা হতো, যার সাথে সহিংসতার কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে র্যাডিক্যালাইজেশন (Radicalization) প্রত্যয়টি একটি ভিন্ন মাত্রা ধারণ করেছে। গবেষক অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid) র্যাডিক্যালাইজেশনের বহুমাত্রিক রূপ ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে এটা এমন এক মানসিক ও আচরণগত উত্তরণ, যেখানে ব্যক্তি বা দল রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বর্জন করে চরম পথ বেছে নেয় (Schmid, 2013)। এখানে চিন্তার পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে চরমপন্থা (Extremism) কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটা একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক অবস্থান। চরমপন্থার অনুসারীরা বিশ্বাস করে যে তাদের নিজস্ব গোষ্ঠী বা মতবাদই একমাত্র সত্য এবং অন্য সব মত বা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকা অনুচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জে. এম. বার্গার (J. M. Berger) চরমপন্থার একটি স্পষ্ট কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মতে, চরমপন্থা হলো এমন একটি বিশ্বাসব্যবস্থা যেখানে একটি দল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা বা সাফল্যের জন্য অন্য কোনো দলের প্রতি বৈরী আচরণ বা সহিংসতাকে অপরিহার্য মনে করে (Berger, 2018)। এখানে পরমতসহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ ও সমঝোতার কোনো স্থান থাকে না। চরমপন্থা যখন শুধু মুখের কথায় বা তাত্ত্বিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তাকে জ্ঞানীয় বা চিন্তাভিত্তিক চরমপন্থা বলা যায়। কিন্তু যখন সেই চিন্তার সাথে ধ্বংসাত্মক কর্ম যুক্ত হয়, তখন তা হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে।
এই দুই ধারণার মধ্যে সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য রয়েছে যা নীতি-নির্ধারকদের মনে রাখা দরকার। র্যাডিক্যালাইজেশন হলো সেই পথ বা প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে হেঁটে একজন মানুষ চরমপন্থী অবস্থানে পৌঁছায়। অর্থাৎ র্যাডিক্যালাইজেশন একটি দিকনির্দেশক যাত্রা, আর চরমপন্থা হলো সেই যাত্রার শেষ প্রান্ত বা নির্দিষ্ট মতাদর্শিক মঞ্জিল। সব র্যাডিক্যাল চিন্তাই সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় না, কারণ অনেক সময় প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে র্যাডিক্যাল সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। তবে সমকালীন নিরাপত্তা পর্যালোচনায় যখন এই শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজবিরোধী এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদবিরোধী বিপজ্জনক রূপান্তরকেই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরা হয়।
মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক অনুঘটক (Psychological and Sociological Catalysts)
কেন একজন মানুষ নিজের সাজানো-গোছানো জীবন পেছনে ফেলে বিপজ্জনক পথে পা বাড়ায়, তার উত্তর কোনো একটি নির্দিষ্ট উপাদানে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর পেছনে কাজ করে কতগুলো জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক বাস্তবতা। গবেষক কুইন্টান ভিক্টোরোভিচ (Quintan Wiktorowicz) একে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘জ্ঞানীয় উন্মুক্ততা’ বা কগনিটিভ ওপেনিং (Cognitive Opening) ধারণার অবতারণা করেছেন (Wiktorowicz, 2005)। ব্যক্তির জীবনে যখন কোনো তীব্র ব্যক্তিগত সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা পারিবারিক আঘাত আসে, তখন তার প্রচলিত বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে সে জীবনের অর্থ নতুন করে খুঁজতে শুরু করে এবং চরমপন্থী মতাদর্শের বার্তাগুলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে সবচেয়ে জোরালো প্রভাব ফেলে মানুষের মর্যাদাবোধ ও আত্মপরিচয়ের সংকট। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরি ক্রুগলানস্কি (Arie Kruglanski) তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে মানুষের ভেতরে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবার একটি গভীর আকাঙ্ক্ষা থাকে, যাকে তিনি মর্যাদা অনুসন্ধানের তত্ত্ব (Significance Quest Theory) নাম দিয়েছেন (Kruglanski et al., 2014)। একজন ব্যক্তি যখন সমাজে নিজেকে অবহেলিত, মূল্যহীন বা লাঞ্ছিত মনে করে, তখন চরমপন্থী দলগুলো তাকে সম্মান, মর্যাদা ও এক বীরোচিত পরিচয়ের প্রস্তাব দেয়। নিজের জীবনের তুচ্ছতা মুছে ফেলে কোনো এক বিশাল ঐতিহাসিক বা মহাজাগতিক লড়াইয়ের অংশ হওয়ার এই লোভ মানুষকে সহজেই মোহগ্রস্ত করে।
সামাজিক স্তরে বঞ্চনাবোধ ও রাজনৈতিক ক্ষোভ এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। সমাজবিজ্ঞানী জন হর্গান (John Horgan) তাঁর বিশদ গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়া ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজেদের কোনো বৃহত্তর নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রক্ষক বা প্রতিনিধি হিসেবে কল্পনা করতে ভালোবাসে (Horgan, 2008)। চারপাশের দুর্নীতি, বিচারহীনতা, সামাজিক বৈষম্য বা রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন তাদের মনে এই ধারণা স্থায়ী করে দেয় যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট নেই। এই সম্মিলিত বঞ্চনাবোধ যখন কোনো উগ্র মতাদর্শের ছাঁচে ঢালাই হয়, তখন ব্যক্তি নিজের সহিংস আচরণকে অপরাধ মনে না করে বরং এক পরম কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
এর পাশাপাশি বন্ধু ও সামাজিক বলয়ের প্রভাবও অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। নির্জন ঘরে বসে ইন্টারনেটে উগ্র বক্তব্য পড়ার চেয়ে বরং সমমনা বন্ধুদের আড্ডা, ছোট ছোট পাঠচক্র বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রুদ্ধদ্বার গ্রুপগুলোতে মানুষ অনেক দ্রুত চরমপন্থী মতবাদে দীক্ষিত হয়। দলবদ্ধতার এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত সংশয়গুলো হারিয়ে যায় এবং দলের সম্মিলিত মতামতই ব্যক্তির চূড়ান্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়। ভালোবাসার অভাব, সাহচর্যের ক্ষুধা এবং উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপনের শূন্যতা মানুষকে অনেক সময় এমন এক অন্ধকারে টেনে নেয়, যেখান থেকে সাধারণ যুক্তি বা বাস্তবতার আলো সহজে পৌঁছাতে পারে না।
র্যাডিক্যালাইজেশনের তাত্ত্বিক মডেল ও ধাপসমূহ (Theoretical Models and Stages of Radicalization)
র্যাডিক্যালাইজেশনের গতিপথ বোঝার জন্য সমাজবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বেশ কিছু তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছেন। এই মডেলগুলো দেখায় কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ ধাপে ধাপে নিজের মানসিক রূপান্তর ঘটিয়ে বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছায়। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত একটি বিশ্লেষণ কাঠামো উপস্থাপন করেছেন অপরাধবিজ্ঞানী র্যান্ডি বোরাম (Randy Borum) (Borum, 2003)। তিনি দেখান যে এই রূপান্তরটি প্রধানত চারটি মনস্তাত্ত্বিক ধাপের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়:
- বঞ্চনার অনুভূতি (It’s not right): ব্যক্তি কোনো একটি সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজের বা নিজের দলের জন্য ক্ষতিকর ও অন্যায্য বলে চিহ্নিত করে।
- অন্যায়ের অভিযোগ (It’s not fair): সাধারণ বঞ্চনাবোধ তখন কাঠামোগত বৈষম্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয় এবং ব্যক্তি অনুভব করে যে তার সাথে পরিকল্পিতভাবে অবিচার করা হচ্ছে।
- দোষারোপের নিশানা (It’s your fault): এই পর্যায়ে অন্যায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শত্রু বা প্রতিপক্ষ দলকে দায়ী করা হয়।
- শত্রুর অমানবিকীকরণ (You’re evil): চিহ্নিত শত্রুকে সম্পূর্ণ অশুভ ও দানবীয় হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে নৈতিকভাবে সঠিক মনে হতে থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল প্রস্তাব করেছেন নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বিশ্লেষক মিচেল ডি. সিলবার (Mitchell D. Silber) এবং আর্লিন ভাট (Arvin Bhatt) (Silber & Bhatt, 2007)। তাঁরা বাস্তব ঘটনাবলির ওপর ভিত্তি করে দেখিয়েছেন যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি চারটি পৃথক স্তরের মাধ্যমে অগ্রসর হয়। শুরুর ধাপে থাকে প্রাক-উগ্রপন্থা বা সাধারণ সামাজিক জীবন। এর পরের ধাপে ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দেয় এবং সে নতুন মতাদর্শের সন্ধান করে। তৃতীয় ধাপে ঘটে গভীর আদর্শিক দীক্ষা, যেখানে ব্যক্তি নিজের পুরনো সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করে পুরোপুরি চরমপন্থী চিন্তাকেই নিজের জীবনের চালিকাশক্তি বানিয়ে নেয়। আর শেষ ধাপে গিয়ে সে সরাসরি নাশকতামূলক বা চরম সহিংসতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিজেকে সঁপে দেয়।
এদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্লার্ক ম্যাককলে (Clark McCauley) এবং সোফিয়া মসকালেঙ্কো (Sophia Moskalenko) এই গতিপথকে পিরামিডের সাথে তুলনা করেছেন (McCauley & Moskalenko, 2008)। পিরামিডের প্রশস্ত ভিত্তিস্তরে থাকে সেইসব সাধারণ মানুষ, যারা চরমপন্থীদের রাজনৈতিক দাবির প্রতি মৌন সহানুভূতি পোষণ করে। যত উপরের দিকে যাওয়া যায়, মানুষের সংখ্যা তত কমতে থাকে কিন্তু তাদের সংকল্পের তীব্রতা তত বাড়ে। পিরামিডের চূড়ায় অবস্থান করে সেই মুষ্টিমেয় কয়েকজন, যারা নিজেদের বিশ্বাসের জন্য রক্ত ঝরাতে বা নিজের রক্ত দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।
মনস্তাত্ত্বিক গবেষক মার্ক সেজম্যান (Marc Sageman) তাঁর বহুল পঠিত গ্রন্থে প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনার চেয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন (Sageman, 2004)। তিনি দেখিয়েছেন যে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশের চেয়ে সমমনা একদল তরুণের পারস্পরিক আবেগীয় যোগাযোগ র্যাডিক্যালাইজেশনের গতিকে অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। এই সমস্ত মডেলগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি কখনোই সরলরেখায় চলে না। মানুষ বিভিন্ন ধাপে অগ্রসর হতে পারে, আবার বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তনে যেকোনো ধাপ থেকে ফিরেও আসতে পারে।
চরমপন্থার রূপভেদ ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্য (Varieties of Extremism and Ideological Diversity)
চরমপন্থার বহুমাত্রিক প্রকাশ রয়েছে এবং একে কেবল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের ছাঁচে বেঁধে রাখা যায় না। রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় যে কোনো বিশ্বাসব্যবস্থাই যদি অন্ধ গোঁড়ামি এবং অন্যকে মুছে ফেলার আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়, তবে তা চরমপন্থার জন্ম দিতে পারে। আধুনিক বিশ্বে প্রধান প্রধান চরমপন্থী ধারাগুলোকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কাস ম্যুদে (Cas Mudde) রাজনৈতিক চরমপন্থা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে গণতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধগুলোর বিরোধিতা করাই হলো সব ধরনের চরমপন্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য (Mudde, 2000)। মতাদর্শ ভিন্ন হলেও তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়।
একটি অন্যতম প্রধান ধারা হলো কট্টর ডানপন্থী চরমপন্থা (Far-Right Extremism)। এই মতবাদের অনুসারীরা সাধারণত জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রচার চালায়। তারা সমাজকে কোনো একটি নির্দিষ্ট রক্তের বা ঐতিহ্যের মানুষের জন্য একক স্থান হিসেবে কল্পনা করে এবং যেকোনো বহিরাগত বা সংখ্যালঘু উপস্থিতিকে নিজেদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি হুমকি বলে প্রচার করে। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থী চরমপন্থা (Far-Left Extremism) সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সম্পূর্ণ উচ্ছেদে বিশ্বাসী। বিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে ইউরোপ ও এশিয়ায় এই ধারাটি অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। তারা সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লব ত্বরান্বিত করার অজুহাতে সমাজকাঠামোর প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহিংস উপায়ে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।
সমকালীন বিশ্বে আরেকটি ব্যাপক আলোচিত রূপ হলো ধর্মীয় চরমপন্থা (Religious Extremism)। কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসকে যখন পরম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার বানানো হয় এবং অন্য ধর্ম বা নিজ ধর্মের ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর জোরপূর্বক সেই অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে, তখন তা ধর্মীয় চরমপন্থায় রূপ নেয়। সমাজবিজ্ঞানী টোর বজরগো (Tore Bjørgo) দেখিয়েছেন যে ধর্মীয় চরমপন্থীরা তাদের কর্মকাণ্ডকে কোনো পার্থিব রাজনৈতিক বোঝাপড়া হিসেবে দেখে না, বরং এক পরম সত্যের সাথে পরম মিথ্যার লড়াই হিসেবে দেখে (Bjørgo, 2005)। ফলে এই ধারায় প্রতিপক্ষের সাথে আপসের সুযোগ থাকে সবচেয়ে কম। মধ্যপ্রাচ্যের সালাফি-জিহাদি আন্দোলন, মায়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কিংবা ভারতের চরম হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর আচরণ এই সত্যকেই তুলে ধরে।
এর বাইরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একক ইস্যুভিত্তিক চরমপন্থা (Single-Issue Extremism) বেশ শক্তি সঞ্চয় করেছে। এখানে কোনো সামগ্রিক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দাবি থাকে না, বরং একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে সহিংস মানসিকতা গড়ে ওঠে। পরিবেশ রক্ষা বা প্রাণী অধিকারের নামে গড়ে ওঠা চরমপন্থী দলগুলো যেমন ল্যাবরেটরি বা বাণিজ্যিক খামারে আক্রমণ চালায়, তেমনি আধুনিক ইন্টারনেটের জগতে গড়ে ওঠা নারীবিদ্বেষী ‘ইনসেল’ (অনিচ্ছাকৃত কৌমার্য) আন্দোলনও এই একক ইস্যুর চরম রূপ। প্রতিটি চরমপন্থার নিজস্ব যুক্তি ও ভাষা থাকে, কিন্তু দিনশেষে তারা সবাই একটি জায়গায় এক হয়ে যায়: নিজেদের মতের বাইরে অন্য কোনো অস্তিত্বকে তারা মেনে নিতে পারে না।
সহিংস বনাম অহিংস চরমপন্থা ও সংযোগসূত্র (Violent versus Non-Violent Extremism and the Nexus)
চরমপন্থার আলোচনায় সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত ক্ষেত্রটি হলো সহিংস ও অহিংস চরমপন্থার মধ্যকার সম্পর্ক। সমাজে এমন বহু মানুষ বা সংগঠন রয়েছে যারা উগ্র, অগণতান্ত্রিক এবং তীব্র বৈষম্যমূলক বিশ্বাস ধারণ করে, কিন্তু তারা সরাসরি কোনো বোমা হামলা বা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় না। এই ধরনের ধারাকে অহিংস চরমপন্থা (Non-Violent Extremism) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে যারা নিজেদের মতাদর্শিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য অস্ত্র তুলে নেয় এবং সরাসরি রক্তক্ষয়ী পথ বেছে নেয়, তাদের রাখা হয় সহিংস চরমপন্থা (Violent Extremism) এর আওতায়। নিরাপত্তা গবেষকদের সামনে প্রধান প্রশ্ন হলো: অহিংস চরমপন্থা কি শেষ পর্যন্ত সহিংসতার পথ তৈরি করে দেয়, নাকি এরা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ?
নীতি-নির্ধারণী মহলে একসময় কনভেয়ার বেল্ট তত্ত্ব (Conveyor Belt Theory) অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এই তত্ত্বে দাবি করা হতো যে একজন ব্যক্তি প্রথমে অহিংস চরমপন্থী মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সেই মতাদর্শ তাকে একটি কারখানার কনভেয়ার বেল্টের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একদিন সহিংসতার দিকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এই সরলীকরণকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের গবেষক অ্যান্থনি রিচার্ডস (Anthony Richards) চরমপন্থা ও সহিংসতার সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে দেখান যে মৌলবাদী বা কট্টর চিন্তা থাকলেই একজন মানুষ সহিংস সন্ত্রাসী হয়ে উঠবে – এমন কোনো অনিবার্য কার্যকারণ সম্পর্ক বাস্তবে পাওয়া যায় না (Richards, 2015)। বহু মানুষ সারা জীবন তীব্র রক্ষণশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা লালন করেও কোনোদিন আইনভঙ্গ বা সহিংসতায় লিপ্ত হয় না।
তবে অহিংস চরমপন্থাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ হিসেবে দেখারও কোনো সুযোগ নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ম্যাগনাস রানস্টর্প (Magnus Ranstorp) দেখিয়েছেন যে অহিংস চরমপন্থী দলগুলো সমাজে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় পরিবেশ তৈরি করে, যা সহিংস চরমপন্থীদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে (Ranstorp, 2010)। অহিংস প্রচারকেরা সমাজের ভেতরে বিভাজন তৈরি করে, ঘৃণার চাষ করে এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি গভীর অবিশ্বাস উসকে দেয়। ফলে তাদের তৈরি করা এই আদর্শিক পটভূমির ওপর দাঁড়িয়ে অন্য কোনো গোষ্ঠী বা তরুণ সহজেই অস্ত্রের ভাষা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। এই অর্থে অহিংস চরমপন্থা সরাসরি বন্দুক না চালালেও বন্দুকের জন্য বারুদ প্রস্তুত করার কাজটি করে দেয়।
জ্ঞানীয় র্যাডিক্যালাইজেশন (বিশ্বাসের পরিবর্তন) এবং আচরণগত র্যাডিক্যালাইজেশন (সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া) সবসময় একসাথে ঘটে না। একজন মানুষ উগ্র আচরণ করতে পারে কোনো গভীর আদর্শিক বোঝাপড়া ছাড়াই, কেবল বন্ধুদের চাপে পড়ে বা উত্তেজনার বশে। আবার কেউ কঠোর উগ্রবাদী বিশ্বাস ধারণ করেও শান্ত জীবনযাপন করতে পারে। এই পার্থক্যটি বুঝতে না পারলে সন্ত্রাসবিরোধী নীতিমালা লক্ষ্যচ্যুত হতে পারে। রাষ্ট্র যদি কেবল মানুষের চিন্তার ওপর পাহারা বসাতে যায়, তবে মতপ্রকাশের মৌলিক স্বাধীনতা বিপন্ন হয়; আবার উগ্র মতাদর্শের বিষবাষ্প ছড়ানোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে তা একসময় জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দেয়।
ডির্যাডিক্যালাইজেশন ও প্রতিরোধ কৌশল (Deradicalization and Prevention Strategies)
উগ্রপন্থা যখন একটি জটিল মানসিক ও সামাজিক ব্যাধি, তখন কেবল জেল-জুলুম বা সামরিক শক্তি দিয়ে একে নির্মূল করা যায় না। যে মতাদর্শের কারণে মানুষ ধ্বংসের পথে যায়, সেই মতাদর্শকে নিষ্ক্রিয় করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা আধুনিক সন্ত্রাসদমন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা কাজ করে: ডির্যাডিক্যালাইজেশন এবং ডিজেনগেজমেন্ট। মনোবিজ্ঞানী জন হর্গান (John Horgan) এবং কার্ট ব্র্যাডক (Kurt Braddock) এই দুই প্রক্রিয়ার তাত্ত্বিক পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন (Horgan & Braddock, 2010)। ডিজেনগেজমেন্ট হলো ব্যক্তির সহিংস কর্মকাণ্ড বা সশস্ত্র দল ত্যাগ করা, যা একটি বাস্তব আচরণগত পরিবর্তন। কিন্তু ডির্যাডিক্যালাইজেশন হলো ব্যক্তির মন থেকে সেই উগ্র বিশ্বাস ও ঘৃণার শিকড় উপড়ে ফেলে তার মানসিক রূপান্তর ঘটানো।
ডির্যাডিক্যালাইজেশন (Deradicalization) এর ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ধরনের পুনর্বাসন মডেল তৈরি করেছে। যেমন সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর বা ডেনমার্কের ‘আরহাস মডেল’। এসব কর্মসূচিতে কারাবন্দী চরমপন্থীদের সাথে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিদ এবং আধুনিক চিন্তার ব্যক্তিত্বরা নিয়মিত সংলাপে বসেন। সেখানে উগ্র মতাদর্শের ভ্রান্তিগুলো যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধরিয়ে দেওয়া হয়। একই সাথে তাদের পরিবারকে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়, যাতে ব্যক্তি কারাগার থেকে বের হয়ে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশের ছায়া পায়। কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং তাদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয় যাতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের পুনরায় পুরনো অন্ধকার পথে টেনে না নেয়।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে উগ্রপন্থা প্রতিরোধের ধারণায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে, যাকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় পিভিই বা সহিংস চরমপন্থা প্রতিরোধ (Preventing Violent Extremism – PVE) এবং সিভিই বা সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলা (Countering Violent Extremism – CVE) বলা হয়। গবেষক অ্যান স্পেকহার্ড (Anne Speckhard) প্রতিরোধ কৌশলের ওপর আলোকপাত করে দেখিয়েছেন যে মানুষ যাতে উগ্রপন্থার ডাকে সাড়া না দেয়, সেই জন্য সামাজিক পর্যায়ে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা রেজিলিয়েন্স গড়ে তোলাই হলো দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ (Speckhard, 2012)। এর মধ্যে রয়েছে তরুণদের মধ্যে ক্রিটিকাল থিংকিং বা সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটানো, ইন্টারনেটে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন।
কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরের যৌথ অংশগ্রহণ অপরিহার্য। শিক্ষক, অভিভাবক, সামাজিক নেতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে কোনো তরুণকে বিপথগামিতার প্রথম ধাপে থাকা অবস্থায় শনাক্ত করে ফিরিয়ে আনতে। রাষ্ট্র যখন সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখে এবং ক্ষোভ প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক পথ উন্মুক্ত রাখে, তখন উগ্রপন্থার বয়ানগুলো এমনিতেই তাদের আকর্ষণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সহিংসতা দমনে শক্তির প্রয়োগ হয়তো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু চরমপন্থার চিরতরে অবসান ঘটাতে হলে মানুষের চিন্তার জমিনেই আলো ফেলতে হবে।
সন্ত্রাসবাদের মূল কারণসমূহ (Root Causes of Terrorism): কাঠামো, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত প্রেরণা
সামাজিক ও কাঠামোগত কারণ: বঞ্চনা ও বৈষম্যের রাজনীতি (Societal and Structural Factors: Politics of Deprivation and Inequality)
একটি শান্ত সমাজ হঠাৎ করে কীভাবে চরম সহিংসতার পথ বেছে নেয়, সেই প্রশ্ন সমাজবিজ্ঞানীদের বহুদিন ধরে ভাবিয়ে আসছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে কিছু বিপথগামী মানুষ হঠাৎ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সহিংসতার শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত থাকে। সমাজের সামগ্রিক কাঠামো, সুযোগের অসম বণ্টন এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য মানুষের ভেতর গভীর অসন্তোষের জন্ম দেয়। কাঠামোগত স্তরে যখন একদল মানুষ নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবতে শুরু করে, তখন সেখানে চরমপন্থার বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এই ধরনের কাঠামোগত বঞ্চনা বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার (Ted Robert Gurr) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হোয়াই মেন রেবেল (Why Men Rebel)-এ আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ তত্ত্ব (Relative Deprivation Theory) উপস্থাপন করেন (Gurr, 1970)। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে মানুষ কেবল দরিদ্র হওয়ার কারণে বিদ্রোহ করে না। মানুষ তখনই বিক্ষুব্ধ হয় যখন সে দেখে সমাজে তার যা পাওয়ার কথা ছিল (প্রত্যাশিত প্রাপ্তি) এবং বাস্তবে সে যা পাচ্ছে (প্রকৃত প্রাপ্তি) – এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশীর সমৃদ্ধি এবং নিজের ক্রমাগত অবনমন মানুষের ভেতর তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ধরে চরমপন্থী মতাদর্শগুলো সমাজে প্রবেশ করে এবং কাঠামোগত ক্ষোভকে রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতায় রূপ দেয়।
সামাজিক রূপান্তরের গতিও এই কাঠামোগত বিশৃঙ্খলাকে উসকে দিতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস সি. ডেভিস (James C. Davies) তাঁর প্রস্তাবিত জে-কার্ভ তত্ত্ব (J-Curve Theory)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে দীর্ঘ অর্থনৈতিক উন্নতির পর হঠাৎ তীব্র মন্দা দেখা দিলে সমাজে বিপ্লব বা সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয় (Davies, 1962)। মানুষ যখন উন্নত জীবনের স্বপ্নে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তখন আকস্মিক পতন তাদের চরম হতাশায় ফেলে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী জেমস এ. পিয়াজ্জা (James A. Piazza) বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে যেসব সমাজে জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কাঠামোগত অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়, সেখানে রাজনৈতিক সন্ত্রাস মাথাচাড়া দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায় (Piazza, 2011)। কাঠামোগত স্তরে রাষ্ট্র যখন সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন সহিংসতার পরিবেশ নিজে থেকেই তৈরি হতে থাকে।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও আধুনিকায়নের প্রভাব (Economic Strain and the Impact of Modernization)
অর্থনৈতিক দুর্দশাকে সাধারণ দৃষ্টিতে সন্ত্রাসবাদের প্রধান চালিকাশক্তি মনে করা হলেও বাস্তব চিত্রটি বেশ জটিল। সাধারণ যুক্তিতে মনে হতে পারে যে দরিদ্র মানুষই পেটের দায়ে অস্ত্রের পথ বেছে নেয়। তবে অর্থনীতিবিদ অ্যালেন ক্রুগার (Alan B. Krueger) এবং জিতকা মালেকোভা (Jitka Malečková) তাঁদের প্রভাবশালী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে দারিদ্র্য এবং নিরক্ষরতার সাথে সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ার সরাসরি কোনো অকাট্য সম্পর্ক নেই (Krueger & Malečková, 2003)। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র দলের সদস্যদের পটভূমি বিশ্লেষণ করে দেখতে পান যে অনেক হামলাকারী মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষিত। এর মানে দাঁড়ায়, স্রেফ ক্ষুধার কারণে মানুষ সন্ত্রাসী হয় না; অর্থনৈতিক অনুঘটক কাজ করে অনেক ভিন্ন মাত্রায়।
অর্থনৈতিক অসমতা এবং সুযোগের অভাব সমাজে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধ্যাত্ব তৈরি করে। বিশেষ করে দ্রুত আধুনিকায়ন ও নগরায়ণের ফলে সনাতন গ্রামীণ জীবনের সামাজিক নিরাপত্তা জাল ভেঙে পড়ে। গ্রামের তরুণ যখন কাজের খোঁজে শহরে এসে দেখে যে আধুনিক অর্থনীতির চাকচিক্য কেবল গুটিকয়েক মানুষের জন্য সংরক্ষিত, তখন তার ভেতর তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতাবোধ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল কোলিয়ার (Paul Collier) এবং অঞ্জিকে হোফলার (Anke Hoeffler) তাঁদের ‘লোভ বনাম ক্ষোভ’ বা গ্রিড ভার্সেস গ্রিভেন্স তত্ত্ব (Greed versus Grievance Theory)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং বেকারত্ব সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে (Collier & Hoeffler, 2004)। সমাজে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত অথচ বেকার যুবকের উপস্থিতি সংঘাতের জন্য সুলভ জনবল তৈরি করে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যখন সুষমভাবে বণ্টিত হয় না, তখন সমাজের এক প্রান্তে তৈরি হয় আকাশচুম্বী প্রাচুর্য আর অন্য প্রান্তে সীমাহীন বঞ্চনা। এই বৈষম্য তরুণদের মনে সমাজব্যবস্থার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা তৈরি করে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই অর্থনৈতিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেয়। অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্তো আব্বাদি (Alberto Abadie) বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক উপাত্ত পর্যালোচনা করে যুক্তি দেন যে দারিদ্র্যের চেয়েও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমসুযোগের অনুপস্থিতি সন্ত্রাসবাদ বিকাশে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে (Abadie, 2006)। ফলে অর্থনৈতিক দৈন্য সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে অসন্তোষের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও নিপীড়ন (Political Environment, Institutional Failure and Repression)
একটি দেশে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা রয়েছে, তার ওপর সহিংসতার মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করে। যখন কোনো রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি জানানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়, বিরোধী কণ্ঠকে নিষ্ঠুরভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় এবং ভোট বা নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন মানুষ আইনবহির্ভূত পথের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য বোধ করে। সমাজতাত্ত্বিক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) সন্ত্রাসবাদের রাজনৈতিক উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি ধারণার পার্থক্য তুলে ধরেন: পূর্বশর্ত বা প্রিকন্ডিশনস এবং তাৎক্ষণিক উসকানি বা প্রেসিপিট্যান্টস (Crenshaw, 1981)। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদী পূর্বশর্ত, আর কোনো নিরীহ মানুষের ওপর পুলিশের অত্যাচার বা রাজনৈতিক নেতার গ্রেফতার কাজ করে তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ হিসেবে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করে। যে রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা দলীয়করণের শিকার এবং পুলিশ প্রশাসন সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বদলে শাসকগোষ্ঠীর লাঠিয়ালে পরিণত হয়, সেখানে নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেনিফার এল. হোম্স (Jennifer L. Holmes) লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রের নির্বিচার দমনপীড়ন কখনোই শান্তি আনে না, বরং তা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দেয় (Holmes, 2001)। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অনেক সময় অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়ার একটি নৈতিক অজুহাত তৈরি করে দেয়।
আরেকটি বড় সংকট দেখা দেয় ব্যর্থ বা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে। যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সীমান্ত অরক্ষিত থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজস্ব সমান্তরাল শাসন কায়েম করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট রটবার্গ (Robert Rotberg) রাষ্ট্র কাঠামোর ধস এবং সন্ত্রাসের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলো চরমপন্থীদের জন্য নিরাপদ স্বর্গ তৈরি করে দেয় (Rotberg, 2002)। এসব অঞ্চলে রাষ্ট্র না পারে নাগরিকদের মৌলিক নাগরিক সেবা দিতে, না পারে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে। এই প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী দলগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে এবং অসহায় মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা হাসিল করে।
মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক ও ব্যক্তিগত প্রেরণা (Psychological Catalysts and Personal Motivation)
একই সমাজ, একই রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং একই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বসবাস করেও সবাই অস্ত্রের পথ বেছে নেয় না। কোটি মানুষের মধ্যে অল্প কয়েকজন কেন নিজের জীবন বাজি রেখে ধ্বংসাত্মক পথে পা বাড়ায়, তা বুঝতে হলে মানুষের মনের ভেতরে তাকাতে হয়। দীর্ঘকাল ধরে অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করতেন যে সন্ত্রাসীরা হয়তো কোনো মানসিক রোগে ভোগে। কিন্তু আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এই ধারণা বাতিল করে দিয়েছে। গবেষক অ্যান্ড্রু সিল্ক (Andrew Silke) আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে অধিকাংশ সন্ত্রাসী মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে (Silke, 1998)। তারা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এবং ঠান্ডা মাথায় নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ব্যক্তিগত স্তরে বঞ্চনা, অপমান এবং আত্মপরিচয়ের সংকট মানুষকে উগ্র মতবাদের দিকে ধাবিত করে। কোনো ব্যক্তি যখন সমাজে নিজেকে অপদস্থ বা শক্তিহীন মনে করে, তখন সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যপদ তাকে এক ধরনের কৃত্রিম কর্তৃত্ব ও সম্মানের অনুভূতি দেয়। সমাজবিজ্ঞানী ভিক্টর ভিক্টোরফ (Jeff Victoroff) সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বসমূহ পর্যালোচনা করে দেখান যে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য, আগ্রাসী মনোভাব এবং দলগত আনুগত্যের সংমিশ্রণে ব্যক্তির ভেতরে সহিংস আচরণ তৈরি হয় (Victoroff, 2005)। চরমপন্থী মতাদর্শ ব্যক্তির ব্যক্তিগত শোক বা ক্ষোভকে এক বৃহত্তর আদর্শিক লড়াইয়ের রূপ দেয়। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার এই লড়াই ব্যক্তিপূজার বাইরে গিয়ে পুরো সমাজের মুক্তির একমাত্র উপায়।
দলগত মনস্তত্ত্ব বা গ্রুপ ডায়নামিক্স ব্যক্তিগত প্রেরণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। দলবদ্ধ অবস্থায় মানুষ এমন অনেক কাজ করতে পারে যা সে একা কখনোই করার সাহস পেত না। মনোবিজ্ঞানী ক্লার্ক ম্যাককলে (Clark McCauley) এবং সোফিয়া মসকালেঙ্কো (Sophia Moskalenko) তাঁদের গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে দলগত আবেগ, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং তথাকথিত শহীদি মর্যাদা পাওয়ার বাসনা সাধারণ তরুণের ভেতরের মানবিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব মুছে ফেলে (McCauley & Moskalenko, 2011)। দলের ভেতরে প্রবেশ করার পর বাইরের পৃথিবী থেকে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দলের নিয়ম, নেতার নির্দেশ এবং সমমনা সঙ্গীদের প্রশংসাই তার কাছে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
ভূরাজনীতি, বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ও আঞ্চলিক সংঘাত (Geopolitics, Foreign Intervention and Regional Conflicts)
সন্ত্রাসবাদের বিকাশ কখনোই নিছক কোনো অভ্যন্তরীণ সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত এবং বাইরের হস্তক্ষেপ স্থানীয় সহিংসতাকে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক রূপ দেয়। বিশ শতকের স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় পরাশক্তিই নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশে প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধে মদদ জুগিয়েছে। আফগানিস্তানে আশির দশকে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যেভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে চরমপন্থীদের সংগঠিত করা হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে বৈশ্বিক জিহাদি নেটওয়ার্কের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল পিলার (Paul R. Pillar) তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেন কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল চাল এবং বৈদেশিক সামরিক উপস্থিতি স্থানীয় উগ্রপন্থার জন্য অজুহাত তৈরি করে (Pillar, 2001)।
বাইরের দেশের সরাসরি সামরিক আক্রমণ বা দখলদারিত্ব কোনো ভূখণ্ডের স্বাভাবিক ভারসাম্য গুঁড়িয়ে দেয়। ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আক্রমণের পর রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মুখে ঠেলে দেয়। অধ্যাপক রবার্ট পেপ (Robert Pape) এবং জেমস ফেল্ডম্যান (James K. Feldman) তাঁদের যৌথ গবেষণায় দেখান যে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো বিদেশি সামরিক বাহিনীর দখলদারিত্ব থেকে নিজের ভূখণ্ড মুক্ত করার জাতীয়তাবাদী বাসনা (Pape & Feldman, 2010)। যখন একটি দেশের মানুষ দেখে যে বিদেশি সেনারা তাদের সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব ও দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানছে, তখন স্থানীয় ক্ষোভ দ্রুত আন্তর্জাতিক চরমপন্থার সাথে হাত মেলায়।
এর পাশাপাশি রয়েছে আঞ্চলিক বিরোধ ও প্রতিবেশীর ছায়াযুদ্ধ। গবেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) দেখিয়েছেন যে দুর্বল বা ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোতে প্রতিপক্ষ দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাপে রাখতে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে (Byman, 2005)। ফলে অনেক অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাইরের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে। কাশ্মীর, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা সাব-সাহারান আফ্রিকার সংঘাতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের সাথে যখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতি যুক্ত হয়, তখন যেকোনো সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সন্ত্রাসবাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে।
বহুমাত্রিক কারণের সংশ্লেষণ: সমন্বিত বিশ্লেষণ কাঠামো (Synthesizing Multicausal Drivers: An Integrated Analytical Framework)
সন্ত্রাসবাদের কোনো একক বা জাদুকরী কারণ নেই। কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক স্বৈরাচার, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব – এই সবগুলো নদীর মতো এসে এক মোহনায় মিলিত হলে তবেই সন্ত্রাসবাদের মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতা বুঝতে হলে সামগ্রিক একটি বিশ্লেষণ কাঠামোর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক টোর বজরগো (Tore Bjørgo) সন্ত্রাসবাদের মূল কারণগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করে একটি সমন্বিত মডেল প্রস্তাব করেছেন (Bjørgo, 2005)। এই মডেলটি বিভিন্ন কারণের মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগ বুঝতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে:
- কাঠামোগত পূর্বশর্ত (Structural Preconditions): এর মধ্যে রয়েছে আধুনিকায়নের সংকট, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং জনসংখ্যাগত রূপান্তর যা সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
- প্ররোচনামূলক উপাদান (Precipitants): সরকারের আকস্মিক কোনো কঠোর পদক্ষেপ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা রাজনৈতিক সংকট যা চাপা ক্ষোভকে তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় নামায়।
- স্থায়িত্ব দানকারী অনুঘটক (Sustaining Factors): সন্ত্রাসী দলগুলোর নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, অর্থায়নের নেটওয়ার্ক এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি যা সহিংসতাকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখে।
- ব্যক্তিগত প্রেরণা (Individual Motivations): দলগত পরিচয়, ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং আদর্শিক অন্ধত্ব যা একক মানুষকে বোমার বোতামে আঙুল রাখতে প্ররোচিত করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid) এই বহুমাত্রিক কাঠামোকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেছেন: ম্যাক্রো বা বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক স্তর, মেসো বা মধ্যবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক-দলগত স্তর এবং মাইক্রো বা ব্যক্তিগত স্তর (Schmid, 2013)। ম্যাক্রো স্তরে থাকে রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও বিশ্বরাজনীতি; মেসো স্তরে থাকে সন্ত্রাসী দলের প্রচার, প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের কৌশল; আর মাইক্রো স্তরে কাজ করে মানুষের ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও জীবনের অর্থ খোঁজার প্রচেষ্টা। কেবল একটি স্তরের ওপর নজর দিলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
| বিশ্লেষণের স্তর | প্রধান উপাদানসমূহ | ভূমিকা ও প্রভাব |
| ম্যাক্রো স্তর (Macro Level) | কাঠামোগত বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ব্যর্থ রাষ্ট্র, ভূরাজনৈতিক সংঘাত | দীর্ঘমেয়াদী অসন্তোষ তৈরি করে এবং সহিংসতার সামাজিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করে |
| মেসো স্তর (Meso Level) | চরমপন্থী দল, মতাদর্শিক প্রচারণা, নেটওয়ার্কিং, লজিস্টিক ও অর্থায়ন | ক্ষোভকে সংগঠিত রূপ দেয় এবং সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে হামলার নকশা আঁকে |
| মাইক্রো স্তর (Micro Level) | ব্যক্তিগত বঞ্চনা, আত্মপরিচয়ের সংকট, মানসিক টানাপোড়েন, দলগত আনুগত্য | ব্যক্তিকে চরম পথ বেছে নিতে মানসিক সিদ্ধান্ত ও নৈতিক সমর্থন জোগায় |
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী কৌশলে এই বহুমুখী বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। রাষ্ট্র যদি কেবল মেসো স্তরে দল ভাঙার বা নেতা হত্যার চেষ্টা করে, কিন্তু ম্যাক্রো স্তরের রাজনৈতিক অবিচার ও কাঠামোগত বৈষম্য দূর না করে, তবে এক দল ধ্বংস হলেও অন্য নামে আরেক দল দাঁড়িয়ে যাবে। একইভাবে মাইক্রো স্তরে মানুষের মানসিক রূপান্তর না ঘটালে অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ করেও শান্তি ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই সন্ত্রাসবাদের কারণকে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে না দেখে সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের সামগ্রিক টানাপোড়েন হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত সমাধানের একমাত্র পথ।
সন্ত্রাসী সংগঠনের কাঠামো (Structure of Terrorist Organizations): নেটওয়ার্ক ও নেতৃত্ব
সনাতন বা অনুক্রমিক কাঠামো (Traditional or Hierarchical Structure): আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড
যেকোনো সশস্ত্র বা গোপন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের টিকিয়ে রাখা এবং একই সাথে লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ শতকের শুরুর দিকে বা মাঝামাঝি সময়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রথাগত সামরিক বাহিনীর আদলে নিজেদের সাজিয়েছিল। এই ধরনের কাঠামোকে বলা হয় অনুক্রমিক কাঠামো (Hierarchical Structure)। এখানে ওপর থেকে নিচে একটি সুস্পষ্ট চেইন অব কমান্ড বা আদেশের শৃঙ্খল থাকে। সবার ওপরে থাকেন একজন সুপ্রিম লিডার বা কেন্দ্রীয় কমিটি। তাদের নিচে থাকে বিভিন্ন আঞ্চলিক কমান্ডার, আর একেবারে নিচে থাকে সাধারণ মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা। প্রখ্যাত সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Inside Terrorism-এ আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা পিএলও-এর মতো সংগঠনগুলোর কাঠামোগত বিবর্তন নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। হফম্যান দেখিয়েছেন, এই সংগঠনগুলো একটি রাষ্ট্রের মতোই নিজেদের ভেতরে রাজনৈতিক উইং, সামরিক উইং, গোয়েন্দা শাখা এবং অর্থায়নের জন্য আলাদা আলাদা বিভাগ তৈরি করেছিল।
এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো (Bureaucratic Structure) একটি সংগঠনের জন্য বেশ কিছু সুবিধা নিয়ে আসে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এখানে বেশ গোছানো থাকে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নির্ধারণ করতে পারে এবং মাঠপর্যায়ে সেই কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করতে পারে। তাত্ত্বিক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) তাঁর গবেষণায় সন্ত্রাসবাদকে একটি যৌক্তিক ও হিসাবনিকাশ নির্ভর কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর ইন্সট্রুমেন্টাল পদ্ধতি (Instrumental Approach) তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সংগঠন তার কাঠামোগত সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করেই হামলার ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করে। ক্রেনশ বিশ্লেষণ করেছেন যে, অনুক্রমিক কাঠামোতে নেতারা তাদের কর্মীদের ওপর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হন। কে কোথায় হামলা চালাবে, কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবে এবং হামলার পর সংগঠনের রাজনৈতিক শাখা কীভাবে সেই হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেবে – এসব কিছু একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। চেইন অব কমান্ড স্পষ্ট থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা খুব একটা দেখা যায় না।
এত সুবিধা থাকার পরও এই সনাতন কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। এই ধরনের সংগঠনগুলো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে খুব সহজেই উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি কোনোভাবে এই পিরামিড কাঠামোর শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করতে বা হত্যা করতে সক্ষম হয়, তবে পুরো সংগঠনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস করার এই সামরিক কৌশলকে বলা হয় ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক (Decapitation Strike) বা মুণ্ডচ্ছেদ কৌশল। তাছাড়া, নিচের দিকের কোনো সদস্য ধরা পড়লে গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ওপরের দিকের নেতাদের পরিচয় বের করে ফেলতে পারেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এই সংগঠনগুলোতে যেকোনো সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া এদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। হফম্যানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যত বেড়েছে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এই সনাতন অনুক্রমিক কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।
বিকেন্দ্রীভূত ও নেটওয়ার্ক কাঠামো (Decentralized and Network Structure): সেলুলার বিন্যাস ও আধুনিক রূপান্তর
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং ক্রমাগত সাঁড়াশি অভিযানের মুখে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় নতুন এক কাঠামোগত কৌশলের আশ্রয় নেয়। পিরামিড আকৃতির সনাতন কমান্ড কাঠামোর বদলে তারা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যার কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র নেই। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে একে বলা হয় নেটওয়ার্ক তত্ত্ব (Network Theory)। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও সামরিক বিশ্লেষক জন আরকুইলা (John Arquilla) এবং ডেভিড রনফেল্ডট (David Ronfeldt) এই নতুন রূপান্তরটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য নেটওয়ার্ক যুদ্ধ (Netwar) ধারণার অবতারণা করেছেন। তাঁদের মতে, আধুনিক সংঘাতগুলোতে যারা প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে লড়বে, তারা নেটওয়ার্ক ভিত্তিক সংগঠনগুলোর কাছে পরাস্ত হবে। কারণ একটি নেটওয়ার্কের কোনো নির্দিষ্ট শীর্ষ বিন্দু থাকে না যাকে ধ্বংস করলেই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। নেটওয়ার্ক কাঠামোতে অসংখ্য ছোট ছোট গ্রুপ বা নোড থাকে, যারা একে অপরের সাথে সরাসরি যুক্ত না থেকেও একটি সাধারণ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়।
এই বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর সবচেয়ে সফল প্রয়োগ দেখা যায় একুশ শতকের বৈশ্বিক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। গবেষক মার্ক সেজম্যান (Marc Sageman) তাঁর বিখ্যাত বই Understanding Terror Networks-এ আল-কায়েদার মতো সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সেজম্যান দেখিয়েছেন যে, এই সংগঠনগুলো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশের জন্য বসে থাকে না। বরং সমমনা কিছু মানুষ বা বন্ধু-বান্ধব মিলে ছোট ছোট দল তৈরি করে, যাকে তিনি ‘বাঞ্চ অফ গাইজ’ (Bunch of Guys) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই ছোট দলগুলো এক একটি সেল হিসেবে কাজ করে। একটি সেলের সদস্যরা অন্য সেলের সদস্যদের পরিচয় জানে না। ফলে একটি সেল গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্কের কোনো ক্ষতি হয় না। সেজম্যানের গবেষণা প্রমাণ করে যে, এই আধুনিক সেলুলার বিন্যাস কোনো কেন্দ্রীয় নেতার নির্দেশনার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং মতাদর্শিক ঐক্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
নেটওয়ার্ক কাঠামোর এই বিন্যাসটি অনেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার মডেলের মতো কাজ করে। একটি বৈশ্বিক সংগঠন তাদের মতাদর্শ এবং ব্র্যান্ডের নাম ছেড়ে দেয়, আর স্থানীয় ছোট ছোট গোষ্ঠীগুলো সেই নাম ব্যবহার করে নিজেদের মতো করে অপারেশন চালায়। আরকুইলা এবং রনফেল্ডট বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ধরনের সংগঠনগুলো সাধারণ সামরিক বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় হয়। তারা খুব দ্রুত পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। কোথায় হামলা করতে হবে বা কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাদের কোনো দূরবর্তী কমান্ডারের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় সেলগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে। এই কাঠামোগত স্বাধীনতার কারণে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এদের প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এখানে কোনো নির্দিষ্ট সাপ্লাই চেইন বা দৃশ্যমান কমান্ড সেন্টার থাকে না, যা ধ্বংস করে দিলে আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবেই বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক কাঠামো সমকালীন সন্ত্রাসবাদকে এক অপ্রতিরোধ্য ও সীমানাহীন রূপ দান করেছে।
একাকী নেকড়ে বা লোন উলফ মডেল (Lone Wolf Model): বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি ও মতাদর্শিক সংযোগ
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাঠামোগত বিবর্তনের সবচেয়ে চরম এবং আধুনিক পর্যায়টি হলো লোন উলফ বা একাকী নেকড়ে মডেল। এখানে কাঠামোর ধারণাটিই এক অর্থে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কোনো নির্দিষ্ট সেল বা নেটওয়ার্কের অংশ না হয়েও একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয় এবং একাকী হামলা চালায়। তাত্ত্বিক লুইস বিম (Louis Beam) নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর জন্য নেতৃত্বহীন প্রতিরোধ (Leaderless Resistance) নামক একটি কৌশলের প্রস্তাব করেছিলেন। বিম বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারি এতোটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে কোনো ধরনের শারীরিক সংগঠন বা সেল টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই তিনি প্রস্তাব করেন যে, কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা চেইন অব কমান্ড থাকবে না। প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের কমান্ডার হিসেবে কাজ করবে। তারা একটি সাধারণ মতাদর্শকে ধারণ করবে এবং সেই মতাদর্শের নির্দেশিকা অনুযায়ী নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একাই আঘাত হানবে।
পরবর্তী সময়ে লোন উলফ সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী রামন স্পাই (Ramon Spaaij)। তাঁর Understanding Lone Wolf Terrorismগ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন যে, একজন একাকী নেকড়ে কখনোই প্রথাগত অর্থে কোনো সংগঠনের আনুষ্ঠানিক সদস্য হয় না। তারা হয়তো কখনোই কোনো সন্ত্রাসী নেতার সাথে সরাসরি দেখা করেনি বা কোনো গোপন প্রশিক্ষণ শিবিরে যায়নি। স্পাই বিশ্লেষণ করেছেন যে, শারীরিক যোগাযোগের অভাবটি এখানে পূরণ করে মতাদর্শিক সংযোগ। এই ব্যক্তিরা সাধারণত সমাজে নিজেদের একাকী বা বিচ্ছিন্ন মনে করে। তারা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা চরমপন্থী মতাদর্শের সংস্পর্শে এসে নিজেদের সেই বৃহত্তর কাল্পনিক সম্প্রদায়ের অংশ ভাবতে শুরু করে। স্পাই-এর গবেষণা অনুযায়ী, একাকী নেকড়েরা অনেক সময় মানসিক টানাপোড়েন বা ব্যক্তিগত হতাশা থেকে চরমপন্থার দিকে ধাবিত হয় এবং তাদের সেই ব্যক্তিগত ক্ষোভকে তারা একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় রূপ দান করে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এই লোন উলফ মডেলটি সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। অনুক্রমিক বা নেটওয়ার্ক কাঠামোতে অন্তত সদস্যদের মধ্যে কিছু না কিছু যোগাযোগ থাকে, অর্থ বা অস্ত্রের লেনদেন হয়, যা গোয়েন্দারা ট্র্যাক করতে পারেন। লুইস বিম যেমনটি বলেছিলেন, নেতৃত্বহীন প্রতিরোধে কোনো দৃশ্যমান যোগাযোগ থাকে না। একজন ব্যক্তি হয়তো তার নিজের বেডরুমে বসে ইন্টারনেটে প্রোপাগান্ডা দেখে র্যাডিক্যালাইজড হচ্ছে, এবং রান্নাঘরের সাধারণ ছুরি বা ভাড়ায় চালিত গাড়ি ব্যবহার করে রাস্তায় নেমে হামলা চালাচ্ছে। যেহেতু সে কারো সাথে নিজের পরিকল্পনার কথা শেয়ার করে না, তাই আগে থেকে এই হামলা ঠেকানোর কোনো উপায় থাকে না। একাকী নেকড়েরা প্রমাণ করেছে যে, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য বিশাল কোনো সংগঠন বা কাঠামোর প্রয়োজন নেই; কেবল একটি অন্ধবিশ্বাস এবং একজন আত্মঘাতী মানুষই একটি আধুনিক শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্থবির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মতাদর্শিক সংযোগের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা এই একক কাঠামোটি সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত পরিবর্তন।
নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব ও ভূমিকা (Psychology and Role of Leadership): ক্যারিশমা, নিয়ন্ত্রণ ও কৌশল
বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক বা লোন উলফ মডেলের প্রসারের পরও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোতে নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি। তবে আধুনিক যুগে নেতার ভূমিকাটি অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও মতাদর্শিক। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) নেতৃত্বের ধরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্ব (Charismatic Authority) ধারণার অবতারণা করেছিলেন। ওয়েবারের মতে, কিছু নেতার অনুসারীরা বিশ্বাস করে যে তাদের নেতার মধ্যে অতিমানবিক বা ঐশ্বরিক কোনো ক্ষমতা রয়েছে। এই বিশ্বাসটি বস্তুনিষ্ঠ বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি সম্পূর্ণ একটি মনস্তাত্ত্বিক আবেগ। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা ঠিক এই ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্বকেই কাজে লাগান। তারা নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারা সরাসরি কোনো উচ্চতর আদর্শ বা ঐশ্বরিক সত্তার প্রতিনিধি। অনুসারীরা তাদের নেতার নির্দেশকে কোনো রাজনৈতিক কমান্ড হিসেবে না দেখে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে।
নেতৃত্বের এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী জেরোল্ড পোস্ট (Jerrold Post)। তাঁর Leaders and Their Followers in a Dangerous World গ্রন্থে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে একজন নেতা তার অনুসারীদের মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করেন। পোস্ট দেখিয়েছেন, সন্ত্রাসী নেতারা সাধারণত ‘আমরা বনাম তারা‘ নামক একটি বিভাজনের মানসিকতা তৈরি করেন। নেতারা প্রাচীন কোনো পৌরাণিক আখ্যান বা ঐতিহাসিক ক্ষোভকে অত্যন্ত সুকৌশলে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে মিশিয়ে ফেলেন। তারা তাদের অনুসারীদের বোঝান যে, বাইরের পৃথিবী সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং কেবল তাদের নির্দিষ্ট গোষ্ঠীটিই খাঁটি। জেরোল্ড পোস্ট বিশ্লেষণ করেছেন যে, অনেক সময় সংগঠনগুলোর ভেতরে নানারকম উপদলীয় কোন্দল বা কৌশলগত মতবিরোধ দেখা দেয়। একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা তার ব্যক্তিগত প্রভাব এবং বাগ্মিতা ব্যবহার করে এই বিবাদগুলো মেটান এবং সংগঠনকে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন।
নেতৃত্বের আরেকটি বড় কৌশল হলো সংগঠনের কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদান করা। সাধারণ মানুষ হত্যা করা বা বোমাহামলা চালানো স্বাভাবিক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম অপরাধ। কিন্তু শীর্ষ নেতারা তাদের প্রচারণার মাধ্যমে এই অপরাধগুলোকে একটি মহৎ আত্মত্যাগ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তারা যুক্তির বদলে অন্ধ অনুকরণকে উৎসাহিত করেন। ওয়েবারের তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্যারিশম্যাটিক নেতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের ক্যারিশমা ধরে রাখা। তাই নেতারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রোপাগান্ডা তৈরি করেন এবং অনুসারীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই সফল হচ্ছে, এমনকি চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও। নেতারা সরাসরি মাঠে নেমে যুদ্ধ না করলেও, তারা সংগঠনের একটি মনস্তাত্ত্বিক ভরকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেন। তারা এমন একটি আবদ্ধ ইকো-চেম্বার তৈরি করেন, যেখানে নেতার কথার বাইরে নতুন কোনো তথ্য বা ভিন্নমত প্রবেশ করতে পারে না। এভাবেই একটি সংগঠন তার নেতার মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের জালে আটকে পড়ে সহিংস কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
অর্থায়ন, লজিস্টিকস ও সহায়ক বলয় (Financing, Logistics and Support Rings): সংগঠনের প্রাণশক্তি
সন্ত্রাসী সংগঠন বলতে সাধারণ মানুষ কেবল কিছু অস্ত্রধারী যোদ্ধাকেই কল্পনা করে। বাস্তবে একজন যোদ্ধাকে মাঠে নামানোর পেছনে এক বিশাল কাঠামোগত আয়োজন থাকে। অর্থ, নিরাপদ আশ্রয়, যোগাযোগের সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা ছাড়া কোনো গোপন সংগঠন এক সপ্তাহও টিকে থাকতে পারে না। গবেষক জ্যাকব শাপিরো (Jacob Shapiro) তাঁর The Terrorist’s Dilemma গ্রন্থে গোপন সংগঠনগুলোর এই অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকসের বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। শাপিরো দেখিয়েছেন যে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে প্রতিনিয়ত একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়, যাকে তিনি নিরাপত্তা-দক্ষতা আপস (Security-Efficiency Trade-off) বলে উল্লেখ করেছেন। সংগঠন চালানোর জন্য অর্থের নিখুঁত হিসাব রাখা প্রয়োজন, যাতে কেউ তহবিল তছরুপ করতে না পারে। হিসাব রাখার জন্য নথিপত্র তৈরি করতে হয়। অন্যদিকে, নথিপত্র বা রেকর্ড রাখা মানেই হলো গোয়েন্দাদের হাতে প্রমাণ তুলে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ানো। শাপিরো বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ডায়লেমা বা উভয়সঙ্কট প্রতিটি সন্ত্রাসী কাঠামোকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কাঠামোকে যদি বৃত্তাকার হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে এর একেবারে কেন্দ্রে থাকে শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সক্রিয় যোদ্ধারা। কিন্তু তাদের ঘিরে থাকে বিশাল একটি সহায়ক বলয় বা সাপোর্ট নেটওয়ার্ক। এই বলয়ের প্রথম স্তরে থাকে সক্রিয় সমর্থকেরা, যারা নিজেরা হয়তো সরাসরি হামলায় অংশ নেয় না, কিন্তু যোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ বাড়ির ব্যবস্থা করে, ভুয়া পাসপোর্ট বানিয়ে দেয় বা বিস্ফোরক সংগ্রহ করে। এর বাইরের স্তরে থাকে প্যাসিভ বা নীরব সমর্থকেরা। এরা সাধারণত সাধারণ জীবনের আড়ালে থাকে এবং সংগঠনকে নিয়মিত চাঁদা দেয় বা আইনি সহায়তা প্রদান করে। শাপিরোর গবেষণায় দেখা যায়, অনেক সময় সাধারণ চ্যারিটি বা দাতব্য সংস্থার আড়ালে এই নীরব সমর্থকেরা বিশাল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে। হুন্ডি বা হাওয়ালার মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করে সেই অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছে দেওয়া হয়, যেখানে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার নজরদারি কাজ করে না।
লজিস্টিকস বা রসদ সরবরাহ কীভাবে একটি সংগঠনের কাঠামো নির্ধারণ করে, তার অনেক উদাহরণ রয়েছে। যারা অস্ত্র বা বিস্ফোরক সরবরাহ করে, তারা সাধারণত সরাসরি কমান্ড কাঠামোর বাইরের মানুষ হয়। অনেক সময় আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র বা চোরাকারবারীদের সাথে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হয়। অপরাধীরা অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র দেয়, আর সন্ত্রাসীরা সেই অস্ত্র ব্যবহার করে। জ্যাকব শাপিরো দেখিয়েছেন, অর্থায়ন নিশ্চিত করার জন্য সংগঠনগুলোকে অনেক সময় স্থানীয় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা বা অপহরণের মতো সাধারণ অপরাধমূলক কাজ করতে হয়। অর্থাৎ, মতাদর্শিক লক্ষ্য যতই উঁচুতে থাকুক না কেন, সংগঠন টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের প্রাত্যহিক অর্থনীতি অত্যন্ত বস্তুবাদী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন শুধু যোদ্ধাদের ওপর নজরদারি করে না, বরং তারা এই সহায়ক বলয় এবং অর্থের গতিপথ ধ্বংস করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। কারণ অর্থ এবং লজিস্টিকসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে যেকোনো শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক আপনাআপনিই স্থবির হয়ে পড়তে বাধ্য।
সাইবার স্পেস ও ভার্চুয়াল সংগঠন (Cyber Space and Virtual Organization): ডিজিটাল যুগের নেটওয়ার্কিং
একুশ শতকে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের ফলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ভৌত কাঠামো অনেকাংশেই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। একসময় সংগঠন চালানোর জন্য গোপন আস্তানা বা ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ থাকাটা অপরিহার্য ছিল, কিন্তু এখন সাইবার স্পেসই তাদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যান (Gabriel Weimann) তাঁর Terror on the Internet গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইন্টারনেটকে তাদের সাংগঠনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। ওয়েইম্যানের মতে, ইন্টারনেট একই সাথে একটি লাইব্রেরি, একটি ট্রেনিং ক্যাম্প এবং একটি কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করে। সংগঠনগুলো এখন আর সদস্যদের শারীরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। তারা ডার্ক ওয়েব এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড ফোরাম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে এমনভাবে যোগাযোগ স্থাপন করে, যা বিশ্বের যেকোনো আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থার জন্যই ট্র্যাক করা অত্যন্ত দুরূহ।
এই ভার্চুয়াল কাঠামোর প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা গবেষক মউরা কনওয়ে (Maura Conway)। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল যুগে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইন্টারনেটে এক একটি ভার্চুয়াল হাব (Virtual Hub) তৈরি করে। কনওয়ে বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই হাবগুলো কেবল প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জায়গা নয়; এগুলো এক একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম। এখানে নতুন সদস্যদের মগজ ধোলাই করা হয়, বোমা বানানোর ম্যানুয়াল শেয়ার করা হয় এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বেনামে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। কনওয়ের মতে, সাইবার স্পেসের কারণে সংগঠনের সীমানা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে আটকে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি মরুভূমিতে বসে একজন নেতা হয়তো ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইউরোপ বা এশিয়ার কোনো তরুণকে র্যাডিক্যালাইজড করছে। এই প্রক্রিয়ায় সংগঠনের কাঠামো হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত এবং ভৌগোলিক সীমানামুক্ত।
ডিজিটাল যুগের এই নেটওয়ার্কিং সংগঠনগুলোর অপারেশনাল নিরাপত্তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। টেলিগ্রাম বা সিগন্যালের মতো এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপগুলো এখন চরমপন্থীদের ভার্চুয়াল সেফ হাউস বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল। গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যান সতর্ক করেছেন যে, সাইবার স্পেসে সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে। রাষ্ট্র যখন তাদের একটি ওয়েবসাইট বা ফোরাম বন্ধ করে দেয়, তখন তারা খুব দ্রুত অন্য প্ল্যাটফর্মে নিজেদের নেটওয়ার্ক স্থানান্তর করে নেয়। অর্থাৎ, আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাঠামো এখন আর কোনো ইট-পাথরের দেয়াল বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি এমন একটি পরিবর্তনশীল অ্যালগরিদম ও ডেটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাকে ধ্বংস করা প্রথাগত সামরিক শক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে হাতিয়ার করে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো আধুনিক সভ্যতার ভিত্তিমূলে আঘাত করার জন্য নিজেদের কাঠামোগত সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
সন্ত্রাসী কৌশল (Terrorist Tactics): হামলা ও অপারেশন
বোমাহামলা ও ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (Bombings and Improvised Explosive Devices): প্রযুক্তি ও ত্রাস
যেকোনো সশস্ত্র বা গোপন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সবচেয়ে ব্যবহৃত এবং কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হলো বোমাহামলা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডিনামাইট আবিষ্কারের পর থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বোমার ব্যবহার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কৌশলের জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কিছু বস্তুনিষ্ঠ কারণ রয়েছে। বোমা তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ, উপাদানগুলো সহজেই সংগ্রহ করা যায় এবং হামলাকারীর ধরা পড়ার ঝুঁকি বেশ কম থাকে। র্যান্ড কর্পোরেশন (RAND Corporation) এর প্রখ্যাত নিরাপত্তা গবেষক ব্রায়ান মাইকেল জেনকিন্স (Brian Michael Jenkins) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সন্ত্রাসীরা বোমাহামলাকে একটি থিয়েটার বা মঞ্চনাটক হিসেবে ব্যবহার করে। জেনকিন্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের হামলার প্রধান উদ্দেশ্য কেবল কিছু মানুষকে হত্যা করা নয়, বরং একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেওয়া। বোমাহামলা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্বলতাগুলোকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দেয়।
বোমাহামলার কৌশলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (Improvised Explosive Device) বা আইইডি-এর ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে। সামরিক কারখানায় তৈরি বোমার বাইরে গিয়ে সাধারণ রাসায়নিক সার, পেরেক ও ব্যাটারি ব্যবহার করে তৈরি করা এসব ডিভাইস নগরকেন্দ্রিক সংঘাতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। নগর তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ মাইক ডেভিস (Mike Davis) তাঁরBuda’s Wagon: A Brief History of the Car Bombগ্রন্থে গাড়িবোমার ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ডেভিস দেখিয়েছেন, গাড়িবোমা আধুনিক সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে সস্তা অথচ ভয়ংকর সমরাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। একটি সাধারণ ট্রাকে বিস্ফোরক ভর্তি করে কোনো সরকারি ভবন বা জনবহুল বাজারের সামনে বিস্ফোরণ ঘটালে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর একটি বিমান হামলার প্রায় সমতুল্য। ডেভিসের গবেষণায় স্পষ্ট হয় যে, লেবাননের বৈরুত থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটি পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় গাড়িবোমা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এক অকল্পনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চাপ তৈরি করেছে।
বোমাহামলার আরেকটি কৌশলগত সুবিধা হলো এর সময় ও স্থান নির্ধারণের স্বাধীনতা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা আন্তর্জাতিক আইন মেনে যুদ্ধ পরিচালনা করে। গোপন সংগঠনগুলো সেই নিয়মের তোয়াক্কা করে না। তারা এমন সময় ও স্থান বেছে নেয় যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবচেয়ে শিথিল থাকে। উদাহরণস্বরূপ, রেলওয়ে স্টেশন, শপিং মল বা ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে টার্গেট করা হয় যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ আতঙ্ক ছড়ানো যায়। গবেষক ব্রায়ান মাইকেল জেনকিন্স ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই ধরনের অপ্রত্যাশিত হামলার কারণে রাষ্ট্রকে তার সুরক্ষামূলক বাজেট বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে হয়। প্রতিটি সরকারি ভবন, বিমানবন্দর বা জনবহুল স্থানে মেটাল ডিটেক্টর এবং সশস্ত্র প্রহরী বসানোর ফলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একটি বিশাল চাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ, একটি সাধারণ এবং সস্তা বোমাহামলা কেবল ভৌত কাঠামোরই ক্ষতি করে না, এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
গুপ্তহত্যা ও টার্গেটেড কিলিং (Assassinations and Targeted Killings): রাজনৈতিক শূন্যতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর আরেকটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো গুপ্তহত্যা বা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো। সাধারণ বোমাহামলায় যেখানে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে, সেখানে গুপ্তহত্যার লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট একজন বা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া। এই কৌশলের পেছনের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক হিসাবনিকাশ নিয়ে গবেষণা করেছেন জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয় (George Mason University) এর অধ্যাপক অড্রে কার্থিন বোয়েম (Audrey Kurth Cronin)। তাঁর How Terrorism Ends: Understanding the Decline and Demise of Terrorist Campaigns গ্রন্থে বোয়েম দেখিয়েছেন যে, গুপ্তহত্যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সমাজে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করা। যখন কোনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারক বা বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়, তখন সাধারণ নাগরিকদের মনে এই ধারণা জন্মায় যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে সুরক্ষিত মানুষগুলোকেই বাঁচাতে পারছে না, ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সেখানে একেবারেই অর্থহীন। বোয়েমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের হত্যাকাণ্ড সমাজে মেরুকরণ বৃদ্ধি করে এবং অনেক সময় রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত দমনমূলক নীতি গ্রহণে প্ররোচিত করে।
গুপ্তহত্যার কৌশলে আধুনিক যুগে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে গুপ্তহত্যা বলতে কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক নেতাদের হত্যা করা বোঝাত। বর্তমানে দেখা যায়, অনেক চরমপন্থী গোষ্ঠী সুনির্দিষ্টভাবে প্রগতিশীল লেখক, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাবিদ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রায়শই প্রাচীন ধর্মীয় আখ্যান বা পুরাণকে ব্যবহার করে একটি মনস্তাত্ত্বিক ন্যায্যতা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। ঘাতকেরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হাজার বছর আগের কোনো কাল্পনিক শত্রুর সাথে তুলনা করে। প্রত্নতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক গবেষণায় এই ধরনের আখ্যানগুলোর কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া না গেলেও, হামলাকারীরা এই মিথলজিক্যাল গল্পগুলোকেই তাদের মতাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। অড্রে কার্থিন বোয়েম তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, মতাদর্শিক প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার এই কৌশলটি সংগঠনগুলোর জন্য একটি দ্বিমুখী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। একদিকে এটি সমাজে ভয় ছড়ায়, অন্যদিকে এটি সংগঠনের ভেতরের উগ্র কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করে।
তবে কৌশলগত দিক থেকে গুপ্তহত্যা সবসময় সংগঠনগুলোর জন্য সুফল বয়ে আনে না। অনেক ক্ষেত্রে একটি সফল গুপ্তহত্যার পর রাষ্ট্র তার সমস্ত শক্তি নিয়ে সেই সংগঠনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বোয়েম তাঁর গ্রন্থে এমন অনেক উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যার পর সাধারণ মানুষের সমর্থন হারিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো বিলুপ্তির পথে ধাবিত হয়েছে। তাছাড়া, একটি রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে হত্যা করে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। গুপ্তহত্যার ফলে সাময়িক একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। এরপরও গোপন সংগঠনগুলো এই কৌশলটি ব্যবহার করে, কারণ এটি তাদের নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করার এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করার একটি সহজ পথ। একটি নিখুঁত গুপ্তহত্যা প্রমাণ করে যে সংগঠনের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দক্ষতা অত্যন্ত নিখুঁত, যা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জন্য একটি স্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকে।
বিমান ছিনতাই ও জিম্মি সংকট (Hijackings and Hostage Crises): থিয়েটার অব টেরর ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ
বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে সন্ত্রাসী কৌশলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল বিমান ছিনতাই এবং জিম্মি সংকট। এই কৌশলটি একটি স্থানীয় রাজনৈতিক দাবিকে মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান খবরে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) তাঁরTerrorism and the Liberal State গ্রন্থে এই কৌশলটিকে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উইলকিনসনের মতে, একটি বিমান ছিনতাই বা জিম্মি নাটক যখন শুরু হয়, তখন রাষ্ট্রের সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা থাকে। রাষ্ট্র যদি জিম্মিকারীদের দাবি মেনে নেয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বেশি ছিনতাইকে উৎসাহিত করে। আবার রাষ্ট্র যদি দাবি মানতে অস্বীকার করে এবং সামরিক অভিযান চালায়, তবে সাধারণ জিম্মিদের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। এই উভয়সংকট বা ডায়লেমা তৈরি করাই হলো ছিনতাইকারীদের প্রধান লক্ষ্য। তারা আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে পুরো বিশ্বকে তাদের এই জিম্মি নাটকের দর্শক বানিয়ে ফেলে।
গণমাধ্যমের সাথে সন্ত্রাসী কৌশলগুলোর এই মিথস্ক্রিয়া নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Columbia University) এর গবেষক ব্রিজিত নাকোস (Brigitte L. Nacos)। তাঁরMass-Mediated Terrorismগ্রন্থে নাকোস সংক্রামক প্রভাব (Contagion Effect) নামক একটি তত্ত্বের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নাকোসের গবেষণায় দেখা যায়, একটি সফল বিমান ছিনতাই বা জিম্মি সংকট যখন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়, তখন তা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের গোষ্ঠীগুলোকেও একই ধরনের হামলায় প্ররোচিত করে। মিডিয়া কভারেজ ছিনতাইকারীদের একটি সাময়িক রাজনৈতিক বৈধতা ও প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে। তারা জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে কেবল তাদের কারাবন্দী সাথীদের মুক্তিই চায় না, বরং তারা আন্তর্জাতিক টেলিভিশনে তাদের ইশতেহার বা দাবিগুলো প্রচার করার সুযোগ পায়। নাকোস বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই কৌশলটি পুরোপুরি একটি প্রচারযুদ্ধ। যতক্ষণ ক্যামেরা চালু থাকে এবং মানুষ ভয়ে টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে, ততক্ষণ ছিনতাইকারীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিজয়ী অবস্থানে থাকে।
তবে সময়ের সাথে সাথে এই কৌশলের কার্যকারিতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পল উইলকিনসন তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রগুলো যখন জিম্মি উদ্ধারের জন্য বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনী গঠন করা শুরু করে এবং বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করে, তখন প্রথাগত ছিনতাইয়ের হার কমে আসে। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা বিমান ছিনতাইয়ের ধারণাকেই সম্পূর্ণ বদলে দেয়। সেই হামলায় বিমানটিকে জিম্মিদের মুক্তির জন্য ব্যবহার করা হয়নি, বরং বিমানটিকেই একটি বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর জিম্মি সংকটের কৌশলগত হিসাবনিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। বর্তমানে জিম্মি করার উদ্দেশ্য শুধু দরকষাকষি নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এর উদ্দেশ্য থাকে দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্থানে সংঘাত জারি রাখা এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রাণহানি ঘটানো। বিমান ছিনতাই থেকে শুরু করে আধুনিক নগরকেন্দ্রিক জিম্মি সংকট প্রমাণ করে যে, কৌশলগতভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সবসময় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছিদ্রগুলো খুঁজে বের করতে এবং তা কাজে লাগাতে অত্যন্ত পারদর্শী।
সশস্ত্র হামলা ও ফেদাইন অপারেশন (Armed Assaults and Fedayeen Operations): অসম যুদ্ধ ও নগরকেন্দ্রিক সংঘাত
একুশ শতকে সন্ত্রাসী হামলার ধরনে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, যেখানে বোমাহামলা বা জিম্মি নাটকের বদলে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সরাসরি সম্মুখ সমরের কৌশল গ্রহণ করা হয়। একে বলা হয় ফেদাইন অপারেশন বা আধুনিক অ্যাকটিভ শুটার দৃশ্যপট। এই কৌশলের সবচেয়ে ভয়ংকর ও নিখুঁত প্রয়োগ দেখা যায় ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যাশলি টেলিস (Ashley J. Tellis) কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)-এর জন্য লেখা তাঁর গবেষণাপত্রে এই ধরনের হামলাকে অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare) এর একটি নতুন পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। টেলিস দেখিয়েছেন যে, মুম্বাই হামলায় দশজন অস্ত্রধারী ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে একটি বিশাল শহরের যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছিল। তারা জিপিএস, স্যাটেলাইট ফোন এবং অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে একটি দীর্ঘস্থায়ী নগরকেন্দ্রিক সংঘাতের জন্ম দেয়। তাদের লক্ষ্য জিম্মিদের বাঁচিয়ে রেখে কোনো দরকষাকষি করা ছিল না, বরং তাদের লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা।
সশস্ত্র হামলার এই কৌশলটি প্রথাগত বোমাহামলার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। একটি বোমাহামলা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একটি সশস্ত্র হামলা কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। অ্যাশলি টেলিস বিশ্লেষণ করেছেন যে, হামলাকারীরা যখন কোনো বিলাসবহুল হোটেল, শপিং মল বা জনবহুল স্থানে প্রবেশ করে, তখন তারা সাধারণ নাগরিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সামরিক বা কমান্ডো বাহিনীর জন্য পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কমান্ডোরা ভারী অস্ত্র বা বিস্ফোরক ব্যবহার করতে পারে না কারণ তাতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বাড়বে। এই কৌশলগত সুবিধাটি কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সরাসরি সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত হওয়ার সুযোগ পায়। টেলিসের গবেষণা অনুযায়ী, এই ধরনের হামলার জন্য হামলাকারীদের দীর্ঘ শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাদের এমনভাবে মগজ ধোলাই করা হয় যাতে তারা মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার বদলে সেটিকে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করে।
এই কৌশলটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো হামলাকারীদের বাইরের কোনো নিয়ন্ত্রণকক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। মুম্বাই বা পরবর্তীতে কেনিয়ার ওয়েস্টগেট মলে হওয়া হামলাগুলোতে দেখা গেছে, হামলাকারীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের দূরবর্তী হ্যান্ডলার বা নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশনায় কাজ করছে। হ্যান্ডলাররা নিউজ চ্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়া দেখে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে এবং সেই অনুযায়ী হামলাকারীদের স্থান পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। অ্যাশলি টেলিস একে একটি আধুনিক সামরিক কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা রাষ্ট্রের প্রথাগত পুলিশ বা বিশেষায়িত বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের ফেদাইন অপারেশন প্রমাণ করে যে, একটি ছোট কিন্তু সুসংগঠিত দল আধুনিক প্রযুক্তি ও নগর ভূগোলের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে দিনের পর দিন চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। এটি সন্ত্রাসবাদের এমন এক রূপ, যা সাধারণ অপরাধ বা প্রথাগত যুদ্ধের সব সংজ্ঞাকে অকার্যকর করে দেয়।
আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের কৌশলগত হিসাবনিকাশ (Strategic Calculus of Suicide Terrorism): মনস্তত্ত্ব, মিথলজি ও প্রাণঘাতী কার্যকারিতা
সন্ত্রাসী কৌশলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে ভীতিকর কৌশল হলো আত্মঘাতী হামলা। সাধারণ মানুষের কাছে এটি প্রায়শই অন্ধ ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতীয়মান হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক রবার্ট পেপ (Robert A. Pape) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ Dying to Win: The Strategic Logic of Suicide Terrorism-এ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। পেপ ১৯৮০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সংঘটিত প্রতিটি আত্মঘাতী হামলার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্মের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ও কৌশলগত পছন্দ, যার মূল লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে তাদের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা। পেপ প্রমাণ করেছেন যে, আত্মঘাতী হামলার পেছনে কাজ করে কৌশলগত পছন্দ তত্ত্ব (Strategic Choice Theory)। গোপন সংগঠনগুলো যখন বুঝতে পারে যে প্রথাগত সামরিক উপায়ে তারা পরাশক্তিকে পরাজিত করতে পারবে না, তখন তারা এই চরম কৌশলটি বেছে নেয়, কারণ এটি একই সাথে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটায় এবং রাষ্ট্রের ওপর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে।
আত্মঘাতী হামলাকারীর কৌশলগত কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করেছেন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় (University of Maryland) এর গবেষক আসাফ মোগাদ্দাম (Assaf Moghadam)। তাঁর The Globalization of Martyrdom গ্রন্থে মোগাদ্দাম আত্মঘাতী বোমারুকে “চূড়ান্ত স্মার্ট বোমা” বা আল্টিমেট স্মার্ট বোম্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একটি মিসাইল বা টাইম বোমা যেখানে একবার সেট করার পর আর পরিবর্তন করা যায় না, সেখানে একজন আত্মঘাতী হামলাকারী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করতে পারে। সে ভিড় দেখে নিজের অবস্থান বদলাতে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতে পারে। তাছাড়া, এই হামলায় হামলাকারীকে উদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা করতে হয় না, যা সংগঠনের জন্য একটি বড় লজিস্টিক্যাল সুবিধা। মোগাদ্দামের গবেষণায় দেখা যায়, আত্মঘাতী হামলার কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হামলাকারীর কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারে না, কারণ প্রধান সাক্ষী নিজেই ঘটনাস্থলে ধ্বংস হয়ে যায়। এই বস্তুনিষ্ঠ কৌশলগত সুবিধাগুলোর কারণেই সংগঠনগুলো তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনগুলোতে আত্মঘাতী বোমারুদের ব্যবহার করে।
সংগঠনগুলো কৌশলগত কারণে এই পদ্ধতি বেছে নিলেও, সাধারণ তরুণদের এই হামলায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য তারা প্রচুর মিথলজি বা পৌরাণিক আখ্যানের আশ্রয় নেয়। আসাফ মোগাদ্দাম বিশ্লেষণ করেছেন যে, রিক্রুটাররা তরুণদের বোঝায় যে এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে তারা পরকালে অসীম পুরষ্কার লাভ করবে। তারা প্রাচীন রূপকথার গল্পগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। তরুণদের মস্তিষ্কে এই অবাস্তব ধারণাগুলো গেঁথে দিয়ে তাদের জীবনের স্বাভাবিক মানবিক মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। প্রত্নতত্ত্ব বা ইতিহাসে পরকালের কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ না থাকলেও, এই কাল্পনিক প্রতিশ্রুতিগুলো তরুণদের আত্মঘাতী হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। রবার্ট পেপ এবং আসাফ মোগাদ্দামের গবেষণাগুলো পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের পেছনের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও কাঠামোগত। মিথলজি বা রূপকথাগুলো কেবল সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সস্তা মানববোমা তৈরির একটি মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার মাত্র।
নতুন প্রজন্মের কৌশল ও সাইবার অপারেশন (Next-Generation Tactics and Cyber Operations): ড্রোন, ডেটা ও ভবিষ্যৎ হুমকি
একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ সন্ত্রাসী কৌশলগুলোতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখন আর হামলার জন্য কেবল বিস্ফোরক বা আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয় না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক কোলিন ক্লার্ক (Colin P. Clarke) তাঁর Terrorism, Inc.: The Financing of Terrorism, Insurgency, and Irregular Warfare গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আধুনিক বাণিজ্যিক প্রযুক্তিকে নিজেদের সমরাস্ত্রে পরিণত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (UAV) একসময় কেবল পরাশক্তিগুলোর সামরিক ভাণ্ডারেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ বাণিজ্যিক ড্রোন কিনে সেগুলোতে ছোট বিস্ফোরক যুক্ত করে সামরিক বা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলা চালানো হচ্ছে। কোলিন ক্লার্ক বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ধরনের প্রযুক্তিগত অভিযোজন ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জন্য এক নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সাধারণ রাডার ব্যবস্থা অনেক সময়ই এই ছোট বাণিজ্যিক ড্রোনগুলোকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্লাস্টিকের অস্ত্র তৈরি করার কৌশলও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে, যা মেটাল ডিটেক্টর ফাঁকি দিতে সক্ষম।
প্রযুক্তির এই অপব্যবহারের সবচেয়ে বিস্তৃত রূপটি হলো সাইবার সন্ত্রাসবাদ (Cyber Terrorism)। যোগাযোগ ও প্রযুক্তি গবেষক গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যান (Gabriel Weimann) তাঁর Terror on the Internetগ্রন্থে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ডিজিটাল কৌশল নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। ওয়েইম্যান দেখিয়েছেন যে, সাইবার স্পেসকে এখন আর কেবল প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, এটি সরাসরি হামলার একটি নতুন ফ্রন্ট। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ গ্রিড, হাসপাতাল বা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া এখন আর কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। ওয়েইম্যানের গবেষণা অনুযায়ী, চরমপন্থীরা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীদের কাছ থেকে ম্যালওয়্যার বা র্যানসমওয়্যার কিনে সেগুলো দিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর ওপর আক্রমণ চালায়। তারা সাধারণ মানুষের ডেটা চুরি করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সেই অর্থ সংগ্রহ করে, যা কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্র্যাক করতে পারে না।
এই নতুন প্রজন্মের কৌশলগুলো ভৌত ও ডিজিটাল জগতের মধ্যকার সীমারেখাকে সম্পূর্ণ মুছে দিয়েছে। গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যান উল্লেখ করেছেন যে, অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ক্রাউডসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়। অনুসারীদের বলা হয় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ঠিকানা বা গতিবিধি অনলাইনে ফাঁস করে দিতে, যাকে বলা হয় ডক্সিং। এরপর স্থানীয় কোনো একাকী হামলাকারী সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গুপ্তহত্যা চালায়। কোলিন ক্লার্ক এবং গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যানের বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। আগামী দিনের সংঘাতগুলো কেবল রাজপথে বা যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডেটা, অ্যালগরিদম এবং বাণিজ্যিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হওয়া এই নতুন প্রজন্মের কৌশলগুলো বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে জটিল ও অদৃশ্য হুমকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
সন্ত্রাসী মতাদর্শ (Terrorist Ideology): বিশ্বাস ও বৈধতার দাবি
মতাদর্শের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি ও কগনিটিভ ক্লোজার (Psychological Foundations of Ideology and Cognitive Closure)
সন্ত্রাসবাদ কেবল অস্ত্র বা বিস্ফোরকের ব্যবহার নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তাকাঠামো বা মতাদর্শের বাস্তবায়ন। মতাদর্শ হলো এমন একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা, যা মানুষকে তার চারপাশের জগৎ বুঝতে, সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং সেই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পথ বেছে নিতে সাহায্য করে। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী অ্যারি ক্রুগলানস্কি (Arie W. Kruglanski) তাঁর গবেষণায় মতাদর্শের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কগনিটিভ ক্লোজার (Cognitive Closure) বা জ্ঞানীয় সমাপ্তির ধারণার অবতারণা করেছেন। ক্রুগলানস্কির মতে, আধুনিক বিশ্ব অত্যন্ত জটিল এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর। এই জটিলতা অনেক মানুষের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে। কগনিটিভ ক্লোজারের চাহিদা যাদের বেশি, তারা যেকোনো প্রশ্নের একটি সুনির্দিষ্ট, দ্রুত এবং অপরিবর্তনীয় উত্তর পেতে চায়। সন্ত্রাসী মতাদর্শগুলো ঠিক এই জায়গাতেই কাজ করে। তারা অত্যন্ত জটিল ভূরাজনৈতিক বা আর্থসামাজিক সমস্যার অত্যন্ত সরল, চূড়ান্ত এবং ছকবাঁধা সমাধান প্রস্তাব করে। ক্রুগলানস্কির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের মতাদর্শ গ্রহণ করার পর একজন ব্যক্তি আর কোনো ভিন্নমত বা নতুন তথ্য গ্রহণ করতে চায় না, কারণ তা তার অর্জিত জ্ঞানীয় সমাপ্তিকে হুমকির মুখে ফেলে।
সন্ত্রাসী মতাদর্শগুলো সাধারণত একটি দ্বৈতবাদী বা সাদাকালো বিশ্ববীক্ষা তৈরি করে। তারা পুরো পৃথিবীকে দুটি সুস্পষ্ট ভাগে বিভক্ত করে – ‘আমরা’ এবং ‘তারা’। ‘আমরা’ বলতে তারা বোঝায় একটি পবিত্র, নিষ্পেষিত বা আদর্শিক গোষ্ঠীকে, আর ‘তারা’ বলতে বোঝায় সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত, পাপী বা ধ্বংসযোগ্য প্রতিপক্ষকে। এই মানসিক বিভাজনের কারণে মতাদর্শের অনুসারীরা নিজেদের যেকোনো কাজকে, তা যতই সহিংস হোক না কেন, নিখুঁত বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। ক্রুগলানস্কি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটি সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য তৈরি করে। যখন একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার মতাদর্শই একমাত্র পরম সত্য, তখন সে সাধারণ মানবিক বা রাষ্ট্রীয় আইনের কোনো তোয়াক্কা করে না। তার কাছে তখন সংলাপ বা আপসের কোনো অর্থ থাকে না, কারণ আপস করাকে সে নিজের বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করে।
এই মতাদর্শিক কাঠামোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অপরিবর্তনীয় প্রকৃতি। বিজ্ঞান বা যুক্তিবাদী দর্শন যেমন নতুন প্রমাণ সাপেক্ষে পুরনো ধারণাকে বাতিল করতে প্রস্তুত থাকে, সন্ত্রাসী মতাদর্শ ঠিক তার বিপরীত। ক্রুগলানস্কি ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই মতাদর্শগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যাতে এগুলোকে কোনোভাবেই ভুল প্রমাণ করা না যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো সন্ত্রাসী হামলা ব্যর্থ হয়, তবে মতাদর্শিক নেতারা সেটিকে কৌশলগত ভুল হিসেবে না দেখে শত্রুর ষড়যন্ত্র বা নিজেদের বিশ্বাসের ঘাটতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ, মতাদর্শের ভেতরেই সবকিছুর একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত ব্যাখ্যা বা জাস্টিফিকেশন তৈরি করা থাকে। এই আবদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক চক্রের কারণেই সাধারণ যুক্তিতর্ক দিয়ে একজন কট্টর মতাদর্শীকে পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। কগনিটিভ ক্লোজারের এই চাহিদা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে একটি স্থিতিশীল কর্মী বাহিনী সরবরাহ করে, যারা যেকোনো মূল্যে তাদের বিশ্বাস বাস্তবায়নে প্রস্তুত থাকে।
মিথলজি, ইতিহাস ও স্বর্ণযুগের আখ্যান (Mythology, History and the Narrative of Golden Age)
সন্ত্রাসী মতাদর্শের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো অতীতমুখী আখ্যান বা স্বর্ণযুগের ধারণা। প্রায় প্রতিটি চরমপন্থী গোষ্ঠী, তা ধর্মীয় হোক বা ধর্মনিরপেক্ষ, এমন একটি কাল্পনিক অতীতের কথা প্রচার করে যখন সমাজ সম্পূর্ণ নিখুঁত, ন্যায়ভিত্তিক এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী ব্রুস লিঙ্কন (Bruce Lincoln) তাঁর Discourse and the Construction of Society গ্রন্থে মিথলজি বা পুরাণের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। লিঙ্কনের মতে, পুরাণ হলো এমন এক ধরনের গল্প যা বর্তমানের কোনো রাজনৈতিক দাবিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য অতীতের একটি কাল্পনিক চিত্র নির্মাণ করে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এই পুরাণগুলোকে আক্ষরিক ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। তারা দাবি করে যে বর্তমানের সমস্ত সংকটের মূল কারণ হলো সমাজ সেই স্বর্ণযুগ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং একমাত্র তাদের প্রস্তাবিত সহিংস পন্থায় সমাজকে সেই কাল্পনিক অতীতে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায় যে, এই ধরনের নিখুঁত বা সংঘাতহীন স্বর্ণযুগের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব কখনোই ছিল না। প্রাচীন সমাজগুলোও যুদ্ধ, মহামারি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বৈষম্যে পরিপূর্ণ ছিল। ব্রুস লিঙ্কন বিশ্লেষণ করেছেন যে, চরমপন্থী নেতারা খুব সতর্কতার সাথে ইতিহাসের এই বস্তুনিষ্ঠ সত্যগুলোকে গোপন রাখেন। তারা কেবল সেই ঘটনাগুলোকেই বেছে নেন যা তাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতকে সমর্থন করে। যখন আধুনিক ঐতিহাসিকরা কার্বন ডেটিং বা শিলালিপির মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিয়ে দেখান যে চরমপন্থীদের বর্ণিত অনেক পৌরাণিক আখ্যান কেবলই সাহিত্যিক কল্পনা বা অতিরঞ্জন, তখন মতাদর্শিক নেতারা সেই বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলোকে সরাসরি অস্বীকার করেন। তারা বিজ্ঞানকে তাদের মতাদর্শের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ তারা জানেন, মিথলজি আর বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের পার্থক্য সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলে তাদের মতাদর্শিক ভিত্তি ধসে পড়বে।
এই পৌরাণিক আখ্যানগুলোর একটি ভয়াবহ প্রায়োগিক দিক রয়েছে। চরমপন্থীরা তাদের বর্তমান রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিপক্ষকে হাজার বছর আগের সেই পুরাণের খলনায়কদের সাথে তুলনা করে। ব্রুস লিঙ্কনের গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি আধুনিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে মহাকাব্যিক রূপ দেওয়া হয়। সাধারণ তরুণ, যাদের ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে গভীর ধারণা নেই, তারা এই আখ্যানগুলোর রোমান্টিকতায় প্রভাবিত হয়। তারা বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা না করে, নিজেদের সেই প্রাচীন পুরাণের বীর যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে। মিথলজিকে ইতিহাস হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার এই কৌশলটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এটি মানুষকে যুক্তিবাদী হতে দেয় না, বরং তাদেরকে অন্ধ আবেগের দাসে পরিণত করে। এভাবেই একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও প্রমাণহীন আখ্যানের ওপর ভর করে তারা আধুনিক সমাজে বাস্তব ধ্বংসযজ্ঞের বৈধতা তৈরি করে।
বিমানবিকীকরণ ও নৈতিক স্খলনের বৈধতা (Dehumanization and Justification of Moral Disengagement)
সাধারণ সমাজে মানুষ কিছু সর্বজনীন মানবিক ও নৈতিক নিয়ম মেনে চলে। নিরীহ মানুষকে হত্যা করা বা জনবহুল স্থানে বোমা হামলা চালানো স্বাভাবিক মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য অপরাধ। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে তাদের অনুসারীদের মনস্তত্ত্বে এই অপরাধবোধকে মুছে ফেলে, তা ব্যাখ্যার জন্য প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) তাঁর নৈতিক স্খলন (Moral Disengagement) তত্ত্বটি প্রদান করেছেন। বান্দুরার মতে, কোনো সুস্থ মানুষ যখন ভয়ংকর কোনো অপরাধ করে, তখন সে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেই কাজটিকে একটি ভিন্ন মোড়কে সাজায়। সন্ত্রাসীরা তাদের সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে একটি মহৎ উদ্দেশ্য বা উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালনের কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। বান্দুরা তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মতাদর্শিক নেতারা বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অনুসারীদের এই নৈতিক স্খলনে সাহায্য করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিপক্ষকে বিমানবিকীকরণ বা ডিহিউম্যানাইজেশন করা।
বিমানবিকীকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে প্রতিপক্ষকে মানুষের মর্যাদাই দেওয়া হয় না। সন্ত্রাসী মতাদর্শে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাধারণ নাগরিকদের ‘পোকামাকড়’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বা ‘অপবিত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আলবার্ট বান্দুরা বিশ্লেষণ করেছেন যে, যখন কোনো গোষ্ঠীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, তখন তাদের হত্যা করা বা তাদের ওপর নির্যাতন চালানো অনেক সহজ হয়ে যায়। কারণ তখন হামলাকারীর মনে আর কোনো মানবিক সহানুভূতি বা অপরাধবোধ কাজ করে না। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী একটি বাজারে বোমা হামলা চালায়, তখন তারা সেখানে থাকা সাধারণ মানুষগুলোকে নিরীহ নাগরিক হিসেবে দেখে না; তারা তাদের দেখে একটি ‘পাপী’ বা ‘শত্রু’ রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ হিসেবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা যেকোনো মাত্রার সহিংসতাকে নিজেদের বিবেকের কাছে জাস্টিফাই করতে সক্ষম হয়।
নৈতিক স্খলনের আরেকটি বড় হাতিয়ার হলো দায়ভার এড়ানো। মতাদর্শিক গোষ্ঠীগুলো তাদের অনুসারীদের বোঝায় যে তারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বরং তারা কোনো ঐতিহাসিক নির্দেশ বা উচ্চতর কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করছে মাত্র। বান্দুরার তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন একজন ব্যক্তি মনে করে যে তার কাজের জন্য সে নিজে দায়ী নয়, বরং তার নেতা বা তার মতাদর্শ দায়ী, তখন সে যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুর কাজ করতে প্রস্তুত থাকে। তাছাড়া, চরমপন্থীরা অনেক সময় নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা দাবি করে যে তারা বাধ্য হয়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। এই ভুক্তভোগী মানসিকতা বা ভিকটিমহুড তাদের আক্রমণাত্মক কাজগুলোকে একটি আত্মরক্ষামূলক রূপ দান করে। আলবার্ট বান্দুরার গবেষণা পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসী মতাদর্শগুলো কোনোভাবেই আবেগহীন নয়; বরং এগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিগুলোকে বিকৃত করে একটি প্রাণঘাতী মনস্তত্ত্বের জন্ম দেয়।
মহাজাগতিক যুদ্ধ ও ঐশ্বরিক আদেশের রাজনীতি (Cosmic War and the Politics of Divine Mandate)
সন্ত্রাসী মতাদর্শগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে সেই মতাদর্শগুলো, যারা তাদের সংঘাতকে একটি পার্থিব গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মতাত্ত্বিক মার্ক জুয়ের্গেন্সমায়ার (Mark Juergensmeyer) তাঁর Terror in the Mind of God গ্রন্থে এই বিষয়টিকে মহাজাগতিক যুদ্ধ (Cosmic War) তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। জুয়ের্গেন্সমায়ারের মতে, সাধারণ রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানা, সম্পদের অধিকার বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য লড়াই করে। কিন্তু যখন কোনো গোষ্ঠী তাদের সংঘাতকে একটি মহাজাগতিক রূপ দান করে, তখন তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা আলো ও অন্ধকারের মধ্যকার এক অনন্ত যুদ্ধে লিপ্ত। এই ধরনের মতাদর্শে প্রতিপক্ষ শুধু কোনো সরকার বা রাষ্ট্র নয়, বরং তারা সরাসরি অশুভ শক্তির প্রতিনিধি। জুয়ের্গেন্সমায়ার বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ধরনের মানসিকতা একটি সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধকে এমন একটি পবিত্র রূপ দেয়, যেখানে আপসের কোনো সুযোগ থাকে না।
এই মহাজাগতিক যুদ্ধের ধারণার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ঐশ্বরিক বা অপার্থিব আদেশের দাবি। ধর্ম ও সংঘাত বিষয়ক গবেষক হেক্টর অ্যাভালোস (Hector Avalos) তাঁর Fighting Words গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় এমন কিছু সম্পদের জন্য লড়াই করে যার কোনো বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক অস্তিত্ব নেই। সাধারণ মানুষ যেমন ভূমি বা জলের জন্য যুদ্ধ করে, এই গোষ্ঠীগুলো তেমনি ‘পবিত্র ভূমি’, ‘পরকালের পুরষ্কার’ বা ‘ঐশ্বরিক অনুগ্রহ’ এর মতো অপার্থিব ধারণার জন্য সংঘাত তৈরি করে। অ্যাভালোস একে কৃত্রিম সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যেহেতু এই ‘পবিত্র’ সম্পদগুলোর কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ নেই, তাই এগুলোর অধিকার নিয়ে কোনো যৌক্তিক মীমাংসাও সম্ভব নয়। চরমপন্থীরা যখন বিশ্বাস করে যে তারা এমন একটি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজ করছে যার ক্ষমতা আধুনিক রাষ্ট্রের যেকোনো আইনের ঊর্ধ্বে, তখন তারা রাষ্ট্রীয় সংবিধান বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো তোয়াক্কা করে না।
এই ধরনের মতাদর্শিক দাবি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি কাঠামোগত হুমকি। জুয়ের্গেন্সমায়ার তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মহাজাগতিক যুদ্ধের প্রবক্তারা আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোকে তাদের এই কাল্পনিক পবিত্রতার প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে। রাষ্ট্রের তৈরি করা ধর্মনিরপেক্ষ আইনকে তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এবং দাবি করে যে একমাত্র তাদের কাছে থাকা প্রাচীন গ্রন্থ বা আখ্যানই হলো সমাজ পরিচালনার একমাত্র বৈধ ভিত্তি। তারা তাদের অনুসারীদের বোঝায় যে, এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য যত সাধারণ মানুষই মারা যাক না কেন, সেটি কোনো অপরাধ নয়, বরং সেটি একটি পবিত্র দায়িত্ব। হেক্টর অ্যাভালোসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও প্রমাণহীন বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক সমাজে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের ন্যায্যতা তৈরি করার এই কৌশলটিই মহাজাগতিক যুদ্ধের মতাদর্শকে এতটা প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
মতাদর্শিক প্রচার ও সাইবার স্পেসের ভূমিকা (Ideological Propaganda and the Role of Cyber Space)
আধুনিক যুগে সন্ত্রাসী মতাদর্শের বিস্তারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে। একসময় মতাদর্শ প্রচারের জন্য শারীরিক উপস্থিতি, গোপন বই বা ক্যাসেটের প্রয়োজন হতো। বর্তমানে সাইবার স্পেসই চরমপন্থী মতাদর্শের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ গবেষক মউরা কনওয়ে (Maura Conway) চরমপন্থায় ইন্টারনেটের ভূমিকা নিয়ে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো মতাদর্শিক প্রচারের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান সুবিধা প্রদান করে: বৈশ্বিক বিস্তৃতি, কম খরচ এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো এখন অত্যন্ত চকচকে ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক এবং অনলাইন ম্যাগাজিন তৈরি করে যা আধুনিক তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যায়। কনওয়ে বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডাগুলো কেবল তথ্য প্রদান করে না, এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে। নিখুঁত ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে তারা তাদের সহিংসতাগুলোকে একটি নান্দনিক রূপ প্রদান করে।
সাইবার স্পেসে মতাদর্শিক প্রচারের একটি বড় দিক হলো অ্যালগরিদমের ভূমিকা। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম সাধারণত ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখাতে থাকে। কনওয়ের গবেষণা অনুযায়ী, যখন কোনো তরুণ কৌতূহলবশত কোনো চরমপন্থী ভিডিও দেখে, তখন অ্যালগরিদম তাকে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি উগ্র ও চরমপন্থী কনটেন্ট দেখাতে শুরু করে। এটি একটি ডিজিটাল ইকো-চেম্বার তৈরি করে, যেখানে ব্যবহারকারী কেবল সেই তথ্যগুলোই দেখতে পায় যা তার মনে গড়ে ওঠা উগ্র ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। এই প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তি তার চারপাশের বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ইন্টারনেটে গড়ে ওঠা একটি কাল্পনিক সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে যায়। ভিন্নমত বা যুক্তিবাদী চিন্তাধারা এই ডিজিটাল বুদবুদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে, কোনো আনুষ্ঠানিক সংগঠনে যোগ না দিয়েই একজন সাধারণ তরুণ ঘরে বসে র্যাডিক্যালাইজড বা চরমপন্থী হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তি কেবল প্রচারের মাধ্যম নয়, এটি মতাদর্শকে বৈধতা দেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় ভুয়া খবর বা ফেক নিউজ তৈরি করে সেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। তারা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকে বিকৃত করে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। মউরা কনওয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা বা তথ্য যাচাই করার ক্ষমতা কম থাকার কারণে অনেকেই এই প্রোপাগান্ডাগুলোকে বিশ্বাস করে ফেলে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন কোনো চরমপন্থী ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়, তারা খুব দ্রুত ডার্ক ওয়েব বা এনক্রিপ্টেড অ্যাপগুলোতে তাদের মতাদর্শিক কার্যক্রম স্থানান্তর করে নেয়। সাইবার স্পেসের এই সীমানাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত চরিত্র আধুনিক সন্ত্রাসী মতাদর্শগুলোকে এক অভূতপূর্ব স্থায়িত্ব ও বিস্তার প্রদান করেছে, যা মোকাবেলা করা প্রথাগত পুলিশি ব্যবস্থার জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
মতাদর্শের পতন ও ডির্যাডিক্যালাইজেশন (Decline of Ideology and Deradicalization): কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রতিরোধ
সন্ত্রাসী মতাদর্শগুলো যতই শক্তিশালী বা অনড় বলে মনে হোক না কেন, এগুলোর নিজস্ব কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে যা সময়ের সাথে সাথে এদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক অড্রে কার্থিন বোয়েম (Audrey Kurth Cronin) তাঁর How Terrorism Ends গ্রন্থে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পতন নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। বোয়েম দেখিয়েছেন যে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র পার করে। অনেক সময় মতাদর্শিক লক্ষ্য এবং বাস্তব কৌশলগত ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে সংগঠনের ভেতরেই অন্তর্কোন্দল শুরু হয়। নেতারা যখন সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত সহিংসতা চালায়, তখন তারা তাদের মূল জনসমর্থন হারিয়ে ফেলে। বোয়েমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মতাদর্শের পতন সাধারণত দুটি উপায়ে ঘটে: হয় সংগঠনটি তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, নয়তো তারা তাদের নিজেদের তৈরি করা অতিরিক্ত সহিংসতার ভারে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়।
এই মতাদর্শিক পতনকে ত্বরান্বিত করার জন্য আধুনিক রাষ্ট্রগুলো কেবল সামরিক অভিযানের ওপর নির্ভর না করে ডির্যাডিক্যালাইজেশন (Deradicalization) বা মতাদর্শিক পুনর্বাসনের কৌশল গ্রহণ করছে। সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স শ্মিড (Alex P. Schmid) ডির্যাডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একজন চরমপন্থীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য কেবল তাকে শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়, তার জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ কাঠামোগুলোকে পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শ্মিডের মতে, ডির্যাডিক্যালাইজেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে যুক্তিবাদী শিক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং এবং সামাজিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে চরমপন্থীদের বোঝানো হয় যে তাদের লালিত মিথলজিক্যাল বা সাদাকালো বিশ্ববীক্ষাটি ভুল। অনেক দেশে কারাবন্দী সন্ত্রাসীদের সাথে সমাজবিজ্ঞানী ও যুক্তিবাদী বিশ্লেষকদের আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে প্রমাণভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে তাদের মতাদর্শের অসারতা তুলে ধরা হয়।
তবে শ্মিড সতর্ক করেছেন যে, ডির্যাডিক্যালাইজেশন একটি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। একটি মতাদর্শ যখন মানুষের মগজে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তখন সেটি রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। অনেক চরমপন্থী পুনর্বাসন কেন্দ্রে যাওয়ার পরও ভেতরে ভেতরে তাদের মতাদর্শ ধরে রাখে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা প্রিভেন্ট স্ট্র্যাটেজির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। বোয়েম এবং শ্মিডের গবেষণাগুলো ইঙ্গিত করে যে, সন্ত্রাসী মতাদর্শ মোকাবেলা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সমাজে কাঠামোগতভাবে বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটানো। শিক্ষার্থীদের যদি শুরু থেকেই শেখানো হয় কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে মিথলজি ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়, তবে চরমপন্থী প্রোপাগান্ডা তাদের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। একটি সহনশীল, প্রগতিশীল এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমাজব্যবস্থাই হলো চরমপন্থী মতাদর্শের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক।
সন্ত্রাসী আচরণ (Terrorist Behavior): ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মনোবিজ্ঞান
মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি ও চরমপন্থার সূচনা (Psychological Foundations and Onset of Extremism)
সাধারণ মানুষের মনে একটা সাধারণ ধারণা প্রবলভাবে প্রচলিত আছে যে, যারা নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় বা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে যুক্ত হয়, তারা মানসিকভাবে অসুস্থ বা বিকারগ্রস্ত। প্রারম্ভিক পর্যায়ের অনেক গবেষক ও বিশ্লেষক এই ধরনের কাজকে মনোবিশ্লেষণ তত্ত্ব (Psychoanalytic Theory) দিয়ে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। সেই সময়ের তাত্ত্বিক কাঠামোতে ধরে নেওয়া হতো যে অপরাধীর ভেতরে কোনো এক ধরনের জন্মগত মানসিক বৈকল্য, তীব্র সাইকোপ্যাথি বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো কোনো রোগের উপস্থিতি কাজ করছে। তবে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের ডেটা এই ধারণাকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে। প্রখ্যাত গবেষক ও মনস্তাত্ত্বিক জেরল্ড পোস্ট (Jerrold Post) দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীর কারাবন্দী সদস্যদের অত্যন্ত নিবিড় সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখিয়েছেন যে, এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা মানসিক দিক থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের অন্য দশটা সাধারণ মানুষের মতোই সুস্থ (Post, 2007)। তার বিখ্যাত গ্রন্থThe Mind of the Terrorist-এ তিনি খুব স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, তাদের ভেতরে ক্লিনিক্যাল সাইকোপ্যাথি বা অন্য কোনো গুরুতর মানসিক রোগের উপস্থিতি সাধারণত পাওয়া যায় না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সমাজের অন্য যেকোনো সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি সুশৃঙ্খল, লক্ষ্যস্থির এবং যুক্তিবাদী আচরণের অধিকারী হয়ে থাকে। এই সত্যটা আমাদের সামনে একটা বড় প্রশ্ন ও ধন্দ দাঁড় করিয়ে দেয় – সুস্থ মস্তিষ্কের একজন সাধারণ, স্বাভাবিক মানুষ ঠিক কোন মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়ে এত ভয়াবহ একটা পথে পা বাড়ায়? এখান থেকে খুব সহজেই দেখা যায় যে, চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ার কারণটা কোনোভাবেই জন্মগত মানসিক বিকার নয়, বরং এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি, অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর প্রক্রিয়া, যাকে মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় র্যাডিক্যালাইজেশন (Radicalization) বলা হয়।
এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করে নানাবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবক। অনেক সময় একজন ব্যক্তি তার নিজের জীবনে বা সমাজের কোনো একটা নির্দিষ্ট অংশের ওপর ঘটে চলা অবিচার দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করে। সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার (Ted Robert Gurr) তার গবেষণায় এই বিষয়টিকে আপেক্ষিক বঞ্চনা (Relative Deprivation) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Gurr, 1970)। এই বঞ্চনাবোধ সবসময় বস্তুগত বা অর্থনৈতিক হতে হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা কথা নেই; অনেক সময় এটা ধারণাগত, রাজনৈতিক অধিকার হরণ বা সামাজিক সম্মানহানির অনুভূতির সাথেও নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকে। একজন ব্যক্তি যখন মনে করতে শুরু করে যে তার বা তার সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্র বা সমাজ পদ্ধতিগতভাবে অবিচার করে যাচ্ছে এবং প্রচলিত আইনি কাঠামোর ভেতর থেকে এর কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান পাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়, তখন তার ভেতরে একটা তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী হতাশা থেকেই জন্ম নেয় বিকল্প কোনো পথের সন্ধান। ঠিক এই দুর্বল বা সংবেদনশীল সময়ে যদি কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মতাদর্শ তার সামনে এসে পড়ে, তবে সে খুব সহজেই সেই সুসংগঠিত মতাদর্শের দিকে আকৃষ্ট হয়। এই প্রক্রিয়াটা রাতারাতি বা একদিনে ঘটে না। ধাপে ধাপে ব্যক্তির চিন্তাজগতে একটা আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে, যেখানে সে পুরো পৃথিবীকে খুব সরল দুটো ভাগে ভাগ করে ফেলে – একদিকে তার নিজের শোষিত বা নির্যাতিত সম্প্রদায়, আর অন্যদিকে অত্যাচারী শত্রুপক্ষ।
চরমপন্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্যক্তির জীবনে কোনো একটা আকস্মিক বা মানসিক আঘাতজনিত ঘটনা অনেক সময় শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এই ঘটনা হতে পারে নিজের কাছের কোনো মানুষের অন্যায় মৃত্যু, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা বিনাবিচারে নির্যাতিত হওয়া, অথবা ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় বা ব্যর্থতা। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিকরা একে জ্ঞানীয় উন্মুক্তকরণ (Cognitive Opening) বলে থাকেন। এই মানসিক অবস্থায় ব্যক্তির আগের সব চিরায়ত বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে, আর সে নতুন কোনো ধারণাকে বা চরম কোনো পথকে গ্রহণ করার জন্য মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যায়। ঠিক এই দুর্বল মুহূর্তটাতেই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রচারণার বীজ বপন করে। তারা ঐ ব্যক্তিকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে তার এই ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক দুর্দশার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো একটা শত্রু দায়ী, আর সেই শত্রুকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে শান্তি বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। একজন সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের নৈতিকতার সংজ্ঞাগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে শুরু করে। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শেখে যে বৃহত্তর কোনো মঙ্গলের জন্য প্রচলিত আইন ভাঙা বা সাধারণ মানুষের জীবনের মায়া ত্যাগ করাটা কোনো অপরাধ নয়, বরং এটা এক ধরনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ বা বীরত্ব।
এই চরমপন্থায় দীক্ষিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক সময় ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে। যেসব এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে সংঘাত বা যুদ্ধ চলছে, সেখানে সহিংসতার সংস্কৃতিটাই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা একজন তরুণের কাছে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হয় না। বরং তার কাছে এটাই সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটা অংশ হিসেবে প্রতিভাত হয়। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের শান্ত শহরগুলোতে বেড়ে ওঠা তরুণেরা যখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরদেশের কোনো সংঘাতের ভিডিও বা খবর দেখে, তখন তাদের ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ বা দায়িত্ববোধ কাজ করে। তারা দূর থেকে সেই কাল্পনিক বা বাস্তব অবিচারের শিকার মানুষদের সাথে একটা মনস্তাত্ত্বিক আত্মীয়তা অনুভব করতে শুরু করে। এই ভার্চুয়াল সংযোগ এবং প্রোপাগান্ডা তাদের মগজে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, তারা নিজেদের নিরাপদ জীবন ছেড়ে দূরবর্তী কোনো দেশের সশস্ত্র সংঘাতে যোগ দিতে পর্যন্ত দ্বিধা করে না। এই সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক অভিযাত্রা এটা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে যে, সন্ত্রাসী আচরণ কোনো একক ঘটনা নয়, বরং অসংখ্য মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক উপাদানের একটা জটিল মিশ্রণ।
পরিচয় সংকট ও অন্তর্ভুক্তির আকাঙ্ক্ষা (Identity Crisis and the Desire for Belonging)
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার পেছনে অনেক সময় রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ধর্মীয় কারণের চেয়েও ব্যক্তির নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা বা বিচ্ছিন্নতাবোধ বেশি কাজ করে। আধুনিক যুগের জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক সমাজব্যবস্থায় অনেক মানুষই নিজেকে ভীষণ একা এবং বিচ্ছিন্ন অনুভব করে। বিশেষ করে অভিবাসী সম্প্রদায় বা দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে এই সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করতে দেখা যায়। তারা না পারে নিজেদের শেকড়ের সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ধারণ করতে, না পারে যে পশ্চিমা বা নতুন সমাজে তারা বড় হচ্ছে সেই সমাজের মূল স্রোতের সাথে নির্বিঘ্নে মিশে যেতে। এই সাংস্কৃতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক তীব্র পরিচয় সংকট। গবেষক ও সাবেক গোয়েন্দা বিশ্লেষক মার্ক স্যাগম্যান (Marc Sageman) তার গবেষণায় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, অনেক তরুণ উগ্রবাদী গোষ্ঠীতে যোগ দেয় আদর্শের অন্ধ টানে নয়, বরং সমমনা বন্ধুদের প্রভাবে (Sageman, 2004)। তিনি একে “বন্ধুদের আড্ডা” (Bunch of Guys) থিওরি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই তরুণরা যখন চায়ের দোকানে, খেলার মাঠে, মসজিদের বারান্দায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একসাথে সময় কাটায়, তখন তারা একে অপরের সাথে নিজেদের হতাশা, বেকারত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেয়। এই ছোট ছোট দলগুলোতেই তৈরি হয় এক ধরনের তীব্র ভ্রাতৃত্ববোধ, যা তাদের মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতাকে পূরণ করে।
এই প্রক্রিয়ার পেছনের মনস্তত্ত্ব আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব (Social Identity Theory) বেশ কার্যকরী একটা তাত্ত্বিক ধারণা। প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক হেনরি তাইফেল (Henri Tajfel) এবং তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের আত্মসম্মান এবং আত্মপরিচয় অনেকাংশেই নির্ভর করে সে সামাজিকভাবে কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত তার ওপর (Tajfel & Turner, 1979)। একটা চরমপন্থী বা গোপন সংগঠন একজন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষকে এমন একটা শক্তিশালী ও রোমাঞ্চকর পরিচয় এনে দেয়, যা সে তার সাধারণ জীবনে আগে কখনো পায়নি। সংগঠনে যোগ দেওয়ার পর ঐ ব্যক্তি আর সমাজের অবহেলিত, বেকার বা গুরুত্বহীন কেউ থাকে না; সে নিজেকে একটা মহৎ বৈশ্বিক লক্ষ্যের সামনের সারির সৈনিক হিসেবে ভাবতে শুরু করে। সংগঠন তাকে একটা নতুন ছদ্মনাম, নতুন পোশাক, নতুন জীবনযাত্রা এবং সর্বোপরি একটা নতুন পরিবার দেয়। এই নতুন পরিবারের সদস্যরা তার প্রতি যে নিঃশর্ত সমর্থন ও ভালোবাসা দেখায়, সেটা তার কাছে এক নতুন জগতের দরজা খুলে দেয়। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অবিচারকে সে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে এবং দলের অন্য সদস্যদের সুরক্ষার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করতেও সে তৈরি থাকে।
পরিচয়ের এই রূপান্তর একটা পর্যায়ে গিয়ে এমন এক চরম বিন্দুতে পৌঁছায়, যাকে মনস্তাত্ত্বিকরা পরিচয় সংমিশ্রণ (Identity Fusion) বলে থাকেন। গবেষক উইলিয়াম সোয়ান (William Swann) এবং তার সহযোগীরা দেখিয়েছেন যে, সাধারণ সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার নিজস্ব সত্তা এবং দলের সত্তার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট পার্থক্য বজায় রাখে (Swann et al., 2012)। কিন্তু পরিচয় সংমিশ্রণের ক্ষেত্রে এই মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্যটা পুরোপুরি মুছে যায়। ব্যক্তি আর নিজেকে দলের বাইরে আলাদা কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব হিসেবে ভাবতেই পারে না। দলের অপমানকে সে আক্ষরিক অর্থেই তার নিজের অপমান হিসেবে ধরে নেয়, আর দলের সাফল্যকে নিজের জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা বলে মনে করে। এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ঐ ব্যক্তিকে আর সাধারণ যুক্তি বা তর্ক দিয়ে দল থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। কারণ দল ছাড়ার অর্থ তার কাছে কেবল একটা সংগঠন ত্যাগ করা নয়, বরং নিজের অস্তিত্বকেই পুরোপুরি অস্বীকার করা বা নিজেকে ধ্বংস করার সামিল।
এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার কারণেই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের সদস্যদের কাছ থেকে এতটা অন্ধ ও প্রশ্নহীন আনুগত্য আদায় করে নিতে পারে। সংগঠনের প্রতি এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই অনেক সময় তাদের পরিচালিত করে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতের দিকে। অন্তর্ভুক্তির এই আকাঙ্ক্ষা এতটাই তীব্র হয় যে, নতুন সদস্যরা নিজেদের যোগ্যতা ও দলের প্রতি বিশ্বস্ততা প্রমাণ করার জন্য অনেক সময় পুরনো সদস্যদের চেয়েও বেশি চরমপন্থী আচরণ প্রদর্শন করে। তারা দলের ভেতরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনগুলো স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেয়। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই তরুণদের কাছে চরমপন্থা কেবল একটা রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, বরং এটা একটা বিকল্প সমাজব্যবস্থা, যেখানে তারা নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সম্মান এবং পরিচয় ফিরে পায়। এই মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা প্রমাণ করে যে, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বা আইন কঠোর করে এই ধরনের আচরণের মূলোৎপাটন করা সম্ভব নয়, কারণ সমস্যার মূল শিকড়টা রয়ে গেছে মানুষের পরিচয়ের সংকটের একেবারে গভীরে।
গোষ্ঠীগত গতিশীলতা ও দলীয় আনুগত্য (Group Dynamics and In-Group Loyalty)
ব্যক্তি যখন একবার কোনো চরমপন্থী বা আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীর ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তার চিন্তাচেতনা আর কেবল তার নিজের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দলের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা তার মনস্তত্ত্বকে সম্পূর্ণ নতুন করে গড়তে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার একটা বড় অংশ হলো সমমনা মানুষদের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং ভিন্নমতের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। আইনজ্ঞ ও গবেষক কাস সানস্টেইন (Cass Sunstein) এই প্রক্রিয়াটিকে গোষ্ঠী মেরুকরণ (Group Polarization) হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Sunstein, 2009)। তার গবেষণায় সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়, যখন একই রকম চিন্তাধারার কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তখন আলোচনার শেষে তাদের পূর্ববর্তী বিশ্বাসগুলো আরও বেশি উগ্র এবং চরম আকার ধারণ করে। একটা গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনের সদস্যরা নিরাপত্তার স্বার্থেই বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাদের কাছে তথ্য আসার একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় সংগঠনের নিজস্ব লিফলেট, অডিও-ভিডিও বার্তা, গোপন ম্যাগাজিন বা নেতাদের আবেগঘন বক্তৃতা। এই ধরনের একটা আবদ্ধ পরিবেশের বা ইকো-চেম্বারের ভেতরে বাইরের কোনো ভিন্নমতের প্রবেশাধিকার থাকে না। ফলে নিজেদের বিশ্বাসের সত্যতা নিয়ে তাদের মনে সামান্যতম যে সন্দেহটুকুও জাগে, তা দলের অন্য সদস্যদের অবিচল বিশ্বাস দেখে মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।
দলের ভেতরে এই চিন্তার একমুখীতা বজায় রাখার পেছনে কাজ করে দলীয় চিন্তন (Groupthink) নামক আরেকটা অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রপঞ্চ। মনস্তাত্ত্বিক আরভিং জেনিস (Irving Janis) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ছোট এবং সুসংহত দলের ভেতরে ঐক্য বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় সদস্যদের বাস্তবসম্মত চিন্তা করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় (Janis, 1972)। চরমপন্থী সংগঠনগুলোতে দলের নেতার সিদ্ধান্ত বা দলের সামগ্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রশ্ন তোলাটাকে দেখা হয় চরম বিশ্বাসঘাতকতা বা বিদ্রোহ হিসেবে। কোনো সদস্য যদি মনে মনে বুঝতেও পারে যে তাদের পরবর্তী হামলার পরিকল্পনাটা নৈতিকভাবে ভুল, কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর বা নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটাবে, তারপরও সে মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস পায় না। তার ভেতরে এই প্রবল ভয় কাজ করে যে, ভিন্নমত প্রকাশ করলে দলের অন্যান্য সদস্যরা তাকে একঘরে করে দেবে বা তাকে শত্রু পক্ষের গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করবে। এই প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে দলের প্রত্যেকেই বাইরের দিক থেকে দলের সব সিদ্ধান্তে একমত পোষণ করে, যা দলীয় সিদ্ধান্তগুলোকে দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
এর পাশাপাশি দলের ভেতরের দায়িত্ববণ্টন বা ভূমিকা নির্ধারণও সদস্যদের মনস্তত্ত্বের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একটা সন্ত্রাসী সংগঠনের সবাই সরাসরি হামলায় বা সম্মুখ সমরে অংশ নেয় না। কেউ হয়তো কেবল তথ্য সংগ্রহ করে, কেউ অস্ত্র পরিবহন করে, কেউ অর্থ জোগাড় করে, আবার কেউবা কেবল সদস্যদের লুকিয়ে থাকার জন্য আশ্রয় দেওয়ার কাজটা করে। এই ছোট ছোট কাজগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ বা অহিংস মনে হলেও, এগুলো সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দলের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। একজন সদস্য যখন দিনের পর দিন দলের ছোট ছোট নির্দেশ পালন করতে থাকে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের যান্ত্রিক আনুগত্য তৈরি হয়। সে আর কাজের ভালোমন্দ বিচার করার প্রয়োজন বোধ করে না। দলের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কাজের এই ছোট ছোট বিভাজন তাকে মূল অপরাধের ভয়াবহতা থেকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা দূরে রাখে, কিন্তু সংগঠনের লক্ষ্যের সাথে তাকে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করে দেয়।
দলের অন্য সদস্যদের সাথে একসাথে বিপদ মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা তাদের ভেতরের বন্ধনকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে একজন কমরেডের জীবন বাঁচানো বা তার রক্তের বদলা নেওয়ার আবেগ যেকোনো মতাদর্শগত যুক্তির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর তাড়া খেয়ে যখন তারা একসাথে দিনের পর দিন না খেয়ে কাটায়, তখন তাদের ভেতরের পারস্পরিক নির্ভরতা একটা ঐশ্বরিক রূপ লাভ করে। এই সময়গুলোতে সংগঠনের মতাদর্শ বা রাজনৈতিক লক্ষ্যের চেয়ে দলের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা এবং শত্রুর প্রতি ঘৃণাই তাদের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় দেখা যায়, একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় লক্ষ্য নিয়ে সংগঠন তৈরি হলেও, একটা সময়ের পর সেই লক্ষ্যটা হারিয়ে যায় এবং সংগঠনের টিকে থাকা বা কমরেডদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়াটাই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। দলের ভেতরের এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক গতিশীলতা একজন সাধারণ মানুষকে এমনভাবে বদলে দেয় যে, দলের বাইরে তার আর নিজস্ব কোনো পৃথিবী অবশিষ্ট থাকে না।
নেতৃত্বের প্রভাব ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ (Influence of Leadership and Psychological Control)
সন্ত্রাসী আচরণ বিশ্লেষণ করতে গেলে সংগঠনের নেতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যেকোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সাফল্যের পেছনে একজন নেতার ব্যক্তিগত আকর্ষণ বা সম্মোহনী ক্ষমতার বিশাল ভূমিকা থাকে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) অনেক আগেই তার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব (Charismatic Leadership) ধারণার মাধ্যমে বিশদভাবে দেখিয়েছিলেন যে, কীভাবে একজন নেতা তার ব্যক্তিগত গুণের জোরে অনুসারীদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভ করতে পারেন (Weber, 1947)। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নেতারা সাধারণত খুব ভালো বক্তা ও কৌশলী হয়ে থাকেন। তারা সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বঞ্চনার অনুভূতিগুলোকে খুব নিখুঁতভাবে আবেগঘন বাক্যে রূপ দিতে পারেন। অনুসারীরা যখন নেতার বক্তৃতা শোনে, তখন তাদের মনে হয় যে এই মানুষটাই কেবল তাদের মনের গহিনের কথাগুলো বুঝতে পেরেছে। নেতা নিজেকে এমন একজন ত্রাতা বা উদ্ধারকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যার কাছে সমাজের সমস্ত জটিল সমস্যার সহজ সমাধান রয়েছে। তার এই আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা অনুসারীদের মনে একটা গভীর নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। তারা নিজেদের সমস্ত দায়বদ্ধতা নেতার ওপর চাপিয়ে দিয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভার হতে চায়।
নেতারা তাদের অনুসারীদের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ এবং কার্যকর কৌশল হলো তথ্য প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। নেতা নির্ধারণ করে দেন অনুসারীরা কোন বই পড়বে, কোন খবর শুনবে, কার সাথে কথা বলবে এবং সমাজকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবে। অনেক সময় সদস্যদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত রাখার কৌশলও নেওয়া হয়। প্রতিনিয়ত কঠোর নিয়মকানুন, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সাংগঠনিক কাজের চাপে রাখার ফলে সদস্যদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মতো সময় বা মানসিক শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। নেতার প্রতি এই নির্ভরশীলতা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নেতার নির্দেশকে তারা ঐশ্বরিক বা পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। নেতা যদি কোনো সাধারণ মানুষকে হত্যা করার নির্দেশ দেন, অনুসারীরা সেটাকে কোনো অপরাধ হিসেবে দেখে না; বরং সেটাকে নেতার প্রতি তাদের ভক্তি প্রমাণের একটা পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে। মনস্তাত্ত্বিক এই নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী হয় যে, অনুসারীরা নিজেদের সহজাত যুক্তিবোধকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে নেতার ইচ্ছার কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে।
অনেক ক্ষেত্রে নেতার সাথে অনুসারীদের সম্পর্কটা একটা পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মতো হয়ে দাঁড়ায়। যেসব তরুণ নিজেদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বা সমাজের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে একটা অজানা ঠিকানায় এসব সংগঠনে এসে ভেড়ে, তারা নেতার ভেতরে একটা আদর্শ অভিভাবকের ছায়া খুঁজে পায়। নেতা তাদের কাজের প্রশংসা করেন, তাদের ভুলত্রুটি শুধরে দেন এবং তাদের দিশেহারা জীবনের একটা নতুন অর্থ প্রদান করেন। এই মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার কারণে নেতার যেকোনো সমালোচনা অনুসারীদের কাছে তাদের পিতৃসম বা দেবতুল্য কারো ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে মনে হয়। তারা নেতার সম্মান রক্ষার জন্য যেকোনো সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে সদা প্রস্তুত থাকে। এমনকি নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারের জন্য দেওয়া নির্দেশকেও তারা বৃহত্তর মতাদর্শিক লক্ষ্যের অংশ হিসেবেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। এই অন্ধ ভক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব একটা সাধারণ মানুষকে দিয়ে এমন সব ভয়াবহ কাজ করিয়ে নিতে পারে, যা সে তার স্বাভাবিক জীবনে ঘুণাক্ষরেও কল্পণাও করতে পারত না।
নেতারা অনেক সময় সদস্যদের ভেতরে অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলার কৌশলও প্রয়োগ করেন। তারা অনুসারীদের বোঝান যে, সাধারণ জীবনযাপন করাটা এক ধরনের স্বার্থপরতা, বিশেষ করে যখন তাদের সম্প্রদায়ের অন্য মানুষেরা চরম কষ্টে আছে। এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে তারা সশস্ত্র সংগ্রামকে বেছে নিতে বাধ্য করে। নেতার এই চতুর মনস্তাত্ত্বিক ম্যানিপুলেশন সদস্যদের মধ্যে একটা কৃত্রিম জরুরি অবস্থা তৈরি করে। তারা ভাবতে শুরু করে যে এখনই কিছু একটা না করলে সব শেষ হয়ে যাবে। নেতার সৃষ্ট এই বিভ্রান্তিকর বাস্তবতার ভেতরে আটকা পড়ে সদস্যরা নিজেদের জীবনকে একটা বৃহত্তর নাটকের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে, যেখানে নেতা হলেন পরিচালক আর তারা হলো কেবল আজ্ঞাবহ পাত্র-পাত্রী। নেতৃত্বের এই মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বেরিয়ে আসাটা যেকোনো সদস্যের জন্যই অত্যন্ত দুরূহ একটা কাজ, কারণ এর অর্থ হলো নিজের এতদিনের বিশ্বাস এবং অস্তিত্বের ভিত্তিটাকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করা।
সহিংসতার মনস্তত্ত্ব ও নৈতিক বিচ্যুতি (Psychology of Violence and Moral Disengagement)
একজন সাধারণ মানুষ সাধারণত আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে বা তার সামান্যতম ক্ষতি করতে মানসিকভাবে তীব্র বাধা অনুভব করে। আমাদের সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ আমাদেরকে অহিংসা এবং সহমর্মিতা শেখায়। তাহলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা কীভাবে দিনের পর দিন এত সহজে নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়? এই অত্যন্ত জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) তার বিখ্যাত নৈতিক বিচ্যুতি (Moral Disengagement) তত্ত্বের অবতারণা করেছেন (Bandura, 1999)। বান্দুরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের মনস্তত্ত্বে এমন কিছু প্রক্রিয়া আছে, যার মাধ্যমে সে তার নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ডগুলোকে সাময়িকভাবে অকার্যকর করে রাখতে পারে। এর মধ্যে একটা অন্যতম কৌশল হলো ভাষাগত কারসাজি বা শব্দের মোড়কীকরণ। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে কখনোই সরাসরি ‘হত্যা’, ‘খুন’ বা ‘সন্ত্রাস’ শব্দগুলো ব্যবহার করে না। তারা এর বদলে ‘শুদ্ধি অভিযান’, ‘টার্গেট এলিমিনেশন’, ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বা ‘পবিত্র যুদ্ধ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে। এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করার ফলে কাজের ভয়াবহতা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেক কমে যায়। সদস্যদের কাছে মনে হয় তারা কোনো জঘন্য অপরাধ করছে না, বরং তারা একটা পবিত্র বা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছে।
এই প্রক্রিয়ার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ ধাপ হলো বিমানবিকীকরণ (Dehumanization)। চরম সহিংসতা ঘটানোর আগে আক্রমণকারীকে তার লক্ষ্যবস্তুর মানবিক সত্তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে অস্বীকার করতে হয়। তারা শত্রুপক্ষের মানুষদের রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখে না, যাদের পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে বা বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বরং তাদের দেখা হয় একটা অশুভ শক্তির প্রতিভূ, সমাজের জঞ্জাল বা কীটপতঙ্গের মতো ক্ষতিকর কোনো বস্তু হিসেবে। প্রতিনিয়ত প্রচারণার মাধ্যমে সদস্যদের মগজে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, শত্রুরা আসলে মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। যখন লক্ষ্যবস্তুর মানবিক পরিচয় পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তাদের ওপর আক্রমণ করাটা আর নৈতিক স্খলন বলে মনে হয় না। এটা অনেকটা কৃষিজমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করা বা শরীর থেকে রোগজীবাণু ধ্বংস করার মতো একটা যান্ত্রিক কাজে পরিণত হয়। এই বিমানবিকীকরণের কারণেই অনেক সময় দেখা যায় যে, হামলাকারীরা তাদের শিকারের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখায় না; বরং তারা এই পাশবিক কাজটাকে উদ্যাপন করে এবং গর্ববোধ করে।
নৈতিক বিচ্যুতির আরেকটা অত্যন্ত কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হলো দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণ (Diffusion of Responsibility)। যখন কোনো ব্যক্তি একা একটা অপরাধ করে, তখন তার সম্পূর্ণ দায়ভার তাকেই নিতে হয়। কিন্তু যখন সে একটা সংগঠনের অংশ হিসেবে কাজ করে, তখন এই মনস্তাত্ত্বিক চাপটা সবার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। হামলাকারী নিজেকে বারবার বোঝায় যে, সে তো কেবল ওপর মহলের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে মাত্র। এখানে তার নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল না। যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে তার দায়ভার সংগঠনের নেতাদের, তার নয়। মনস্তাত্ত্বিক এই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা তাকে অনুশোচনা বা ভয়াবহ অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দেয়। বান্দুরার তত্ত্বে আরেকটা দিকের কথা বলা হয়েছে, যাকে সুবিধাজনক তুলনা (Advantageous Comparison) বলা হয়। সন্ত্রাসীরা নিজেদের কাজকে শত্রুর কাজের সাথে তুলনা করে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে। তারা যুক্তি দেয় যে, “আমরা তো কেবল কয়েকজনকে মেরেছি, কিন্তু শত্রুরা তো আমাদের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।” এই তুলনামূলক বিচারের মাধ্যমে তারা নিজেদের নৃশংসতাকে অনেক লঘু করে দেখে।
সম্মিলিত মনস্তাত্ত্বিক এই প্রক্রিয়াগুলো একজন সাধারণ, স্নেহশীল মানুষকে একটা নির্দয় হত্যাযন্ত্রে পরিণত করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। যখন সংগঠনের ভেতরের সবাই একই ধরনের বিশ্বাস ধারণ করে এবং সহিংসতার চর্চা করে, তখন সেটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ সমাজের নৈতিকতা বা আইনকানুন তখন তাদের কাছে হাস্যকর বা অর্থহীন মনে হয়। তারা নিজেদের একটা আলাদা নৈতিক মহাবিশ্বের বাসিন্দা বলে মনে করে, যেখানে প্রচলিত ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা খাটে না। এই নৈতিক বিচ্যুতির কারণে তারা এমনকি নারী, শিশু বা নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর হামলা চালাতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। তারা বিশ্বাস করে যে চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য এই ধরনের ছোটখাটো ত্যাগ বা ক্ষতি অপরিহার্য। মনস্তাত্ত্বিক এই অন্ধত্ব দূর করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ তারা নিজেদের কাজের পক্ষে এমন সব শক্ত যুক্তি দাঁড় করায়, যা তাদের নিজেদের কাছে পুরোপুরি নিখুঁত এবং অকাট্য বলে মনে হয়।
সন্ত্রাসী আচরণের সমাপ্তি বা প্রত্যাবর্তন (Termination of Terrorist Behavior or Disengagement)
মানুষ যেমন বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়ে ধাপে ধাপে চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ে, ঠিক একইভাবে একসময় অনেকে এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরেও আসে। মনস্তাত্ত্বিক জন হর্গান (John Horgan) এই ফিরে আসার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন এবং তিনি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, মতাদর্শগত পরিবর্তন এবং আচরণগত পরিবর্তন সম্পূর্ণ দুটো আলাদা জিনিস। তিনি এই ফিরে আসাকে প্রত্যাবর্তন (Disengagement) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা ডির্যাডিক্যালাইজেশন থেকে আলাদা (Horgan, 2009)। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি তার চরমপন্থী বিশ্বাস বা মতাদর্শ থেকে একচুলও সরে আসেনি, কিন্তু তারপরও সে স্বেচ্ছায় সংগঠন ছেড়ে চলে এসেছে বা সহিংসতা ত্যাগ করেছে। এর পেছনের কারণটা মতাদর্শিক নয়, বরং সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক। দীর্ঘ সময় ধরে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনে কাজ করাটা প্রচণ্ড মানসিক চাপের ব্যাপার। সারাক্ষণ ধরা পড়ার ভয়, পালিয়ে বেড়ানোর ক্লান্তি এবং স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে সদস্যদের ভেতরে এক ধরনের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অবসাদ বা ‘বার্নআউট‘ দেখা দেয়। একটা সময়ের পর তারা আর এই ক্রমাগত মানসিক চাপটা শারীরিক ও মানসিকভাবে সহ্য করতে পারে না।
অনেক সময় সংগঠনের ভেতরের রূঢ় বাস্তবতা দেখে সদস্যদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক মোহভঙ্গ (Psychological Disillusionment) তৈরি হয়। তারা যে পবিত্র লক্ষ্য এবং মহৎ আদর্শের কথা ভেবে জীবন বাজি রেখে সংগঠনে যোগ দিয়েছিল, বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে গিয়ে দেখে তার সাথে কোনো মিল নেই। তারা হয়তো অবাক হয়ে দেখে যে সংগঠনের নেতারা নিজেদের সুবিধার জন্য দুর্নীতি করছে, মিথ্যা বলছে, প্রতিপক্ষের সাথে গোপন আঁতাত করছে অথবা তুচ্ছ কারণে নিজেদের কমরেডদের নির্মমভাবে হত্যা করছে। এই ধরনের ভণ্ডামি সদস্যদের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে শুরু করে যে তাদের আবেগ এবং আত্মত্যাগকে সুকৌশলে ব্যবহার করে নেতারা কেবল নিজেদের ক্ষমতা ও অর্থসম্পদ বাড়াচ্ছে। এছাড়া নিরীহ মানুষের রক্তপাত চোখের সামনে দেখতে দেখতে অনেক সময় তাদের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতা জেগে ওঠে। তারা যে কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করার স্বপ্ন দেখেছিল, বাস্তবে যখন দেখে যে তাদের বোমার আঘাতে সাধারণ নারী-শিশুরা মারা যাচ্ছে, তখন সেই দৃশ্য তাদের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। এই মোহভঙ্গ তাদের ভেতরকার দলীয় আনুগত্যের বাঁধনটাকে ধীরে ধীরে আলগা করে দেয়।
জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলোও প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। অনেকেই গোপনে বিয়ে করে বা সন্তান জন্ম নেওয়ার পর একটা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের দায়িত্ববোধ অনুভব করে। তখন তারা আর আগের মতো বেপরোয়া ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা তাদের সন্তানদের জন্য একটা নিরাপদ এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করে, যা আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনে থেকে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নতুন এই পারিবারিক পরিচয় তাদের পুরোনো চরমপন্থী পরিচয়কে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত করে। তারা বুঝতে পারে যে তাদের বর্তমান পথটা তাদের প্রিয়জনদের জন্য কেবল বিপদই ডেকে আনবে। জীবনের এই নতুন অর্থ খোঁজার তাগিদ তাদেরকে সংগঠন ছাড়তে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে। তারা তখন এমন একটা পথের সন্ধান করে, যেখানে তারা মতাদর্শকে বুকের ভেতর লালন করেও অন্তত একটা সাধারণ জীবনযাপন করতে পারবে।
তবে এই ফিরে আসার পথটা মোটেও সহজ নয়। একবার সংগঠন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেই সব সমস্যার রাতারাতি সমাধান হয়ে যায় না। সমাজ তাদেরকে সহজে গ্রহণ করতে চায় না, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সন্দেহের চোখে থাকে এবং সবচেয়ে বড় ভয়টা থাকে পুরোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে। সংগঠন ত্যাগ করাকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়, তাই অনেক সময় তাদের ওপর প্রাণনাশের হুমকিও থাকে। এই ত্রিমুখী চাপের কারণে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলে নতুন করে সাধারণ জীবনে ফিরে আসার এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা চরমপন্থায় যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ার মতোই দীর্ঘ এবং জটিল একটা অধ্যায়। অনেকেই ফিরে আসার পর দীর্ঘকাল পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভোগে। তারা বুঝতে পারে না নতুন সমাজে তারা ঠিক কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবে। এই ফিরে আসার প্রক্রিয়াটা পরিষ্কারভাবে দেখায় যে, চরমপন্থী জীবন কখনোই একটা রৈখিক পথ নয়; বরং এটা মনস্তাত্ত্বিক উত্থান-পতনের এমন একটা আবর্তন, যেখানে একজন মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের বিশ্বাস, অস্তিত্ব এবং বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে চলে।
আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক সংগঠন (Underground Political Organizations): গোপন নেটওয়ার্ক
গোপন সংগঠনের রাজনৈতিক ভিত্তি ও উদ্ভব (Political Foundations and Emergence of Secret Organizations)
রাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক বিরোধীদের সংঘাতের ইতিহাস অনেক পুরোনো। একটি রাষ্ট্রে যখন গণতান্ত্রিক উপায়ে মত প্রকাশের সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন ভিন্নমতাবলম্বীরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য গোপন রাস্তার সন্ধান করে। প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন সংগঠনে রূপ নিতে বাধ্য হয়। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সন্ত্রাসবাদ গবেষক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভাব একটি সাধারণ রাজনৈতিক আন্দোলনকে গোপন ও সশস্ত্র বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ (Crenshaw, 1981)। খোলা মাঠে যখন সমাবেশ করা যায় না, পত্রিকায় যখন নিজেদের বক্তব্য ছাপানো যায় না, তখন সরকারবিরোধীদের সামনে কেবল দুটো পথ খোলা থাকে। হয় তাদের রাষ্ট্রের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে হয়, নচেৎ রাষ্ট্রের নজরদারি এড়িয়ে সম্পূর্ণ গোপন একটা সমান্তরাল কাঠামো তৈরি করতে হয়। যারা দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়, তারাই আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেয়। এই ধরনের সংগঠনের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মতাদর্শের প্রচার এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা।
গোপন রাজনৈতিক সংগঠনের তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভের কিছু রাজনৈতিক চিন্তাধারার কথা চলে আসে। সাধারণ রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষের গণঅংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে, সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলো কাজ করে অত্যন্ত নির্বাচিত ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের নিয়ে। রুশ বিপ্লবী তাত্ত্বিক ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin) তার বিখ্যাত গ্রন্থ What Is to Be Done?-এ প্রথম একটি পেশাদার বিপ্লবী সংগঠনের রূপরেখা হাজির করেছিলেন (Lenin, 1902)। তার মতে, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ নিজে থেকে কোনো বড় রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন এমন একদল সার্বক্ষণিক কর্মীর, যাদের জীবনের একমাত্র কাজই হলো গোপন রাজনীতি করা। তিনি এই ধরনের কর্মীদের নিয়ে গঠিত সংগঠনকে ভ্যানগার্ড পার্টি (Vanguard Party) বা অগ্রগামী দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। লেনিনের এই ধারণা পরবর্তীকালে পৃথিবীর অসংখ্য আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনকে প্রভাবিত করেছে। তারা নিজেদের সাধারণ জনতার পথের দিশারী হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তাদের বিশ্বাস থাকে যে, একটা সুশৃঙ্খল ও গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা এমন একটা আঘাত হানতে পারবে, যা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেবে।
প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে গোপন রাজনীতিতে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটা বেশ জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। একটা দল যখন প্রকাশ্যে কাজ করে, তখন তাদের হাজার হাজার সমর্থক থাকে। কিন্তু দলটা যখন রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়, তখন সেই বিশাল জনসমর্থন ধরে রাখা আর সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর ভয়ে সাধারণ মানুষ এদের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সংগঠনটি সাধারণ সমাজ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নিজেদের একটা আলাদা বদ্ধ জগতে প্রবেশ করে। এই নতুন জগতে টিকে থাকার জন্য তাদেরকে সম্পূর্ণ নতুন কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে হয়। আগের দিনের খোলা মঞ্চের বক্তারা তখন পরিণত হন গোপন ইশতেহারের লেখকে। সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটাও আর গণতান্ত্রিক থাকে না। গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে সাধারণ কর্মীদের মতামত নেওয়ার সুযোগ থাকে না; বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কঠোর নির্দেশ ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসে। এভাবে একটা প্রকাশ্য রাজনৈতিক আন্দোলন সময়ের পরিক্রমায় একটা গোপন, রহস্যময় এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংস নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও সেলুলার নেটওয়ার্ক (Organizational Structure and Cellular Networks)
যেকোনো গোপন সংগঠনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। গোয়েন্দারা সব সময় চেষ্টা করে সংগঠনের ভেতরে ঢুকে এর পুরো কাঠামোটা চিনে নিতে। এই অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলো এক বিশেষ ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো ব্যবহার করে, যাকে বলা হয় সেলুলার নেটওয়ার্ক (Cellular Network)। এই কাঠামোর মূল নীতি হলো তথ্যের বিভাজন বা কম্পার্টমেন্টালাইজেশন। একটা সংগঠনে যদি একশ জন কর্মী থাকে, তবে তারা সবাই সবাইকে চিনতে পারে না। কর্মীদের সাধারণত তিন থেকে পাঁচজনের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। এই একেকটা ছোট দলকেই ‘সেল’ বলা হয়। একটা সেলের সদস্যরা কেবল নিজেদের সেলের সদস্যদেরই চেনে। অন্য সেলে কারা কাজ করছে, তাদের নাম কী বা তারা কোথায় থাকে, সেটা তাদের জানার কোনো উপায় থাকে না। এই কাঠামোর সুবিধা হলো, যদি কোনো এক সেলের একজন কর্মী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং নির্যাতনের মুখে সংগঠনের তথ্য ফাঁস করেও দেয়, তবে সে কেবল তার নিজের সেলের কয়েকজনের নামই বলতে পারবে। পুরো সংগঠনটা এতে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
আধুনিক যুগের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোর কাঠামো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সামরিক বিশ্লেষক জন আর্কিলা (John Arquilla) এবং ডেভিড রনফেল্ট (David Ronfeldt) তাদের নেটওয়ার্ক যুদ্ধ (Netwar) তত্ত্বের অবতারণা করেছেন (Arquilla & Ronfeldt, 2001)। তাদের মতে, প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে গোপন সংগঠনগুলো আর আগের মতো পিরামিড আকৃতির কঠোর অনুক্রমিক কাঠামো মেনে চলে না। এখনকার সংগঠনগুলো অনেকটা জালের মতো ছড়ানো থাকে। এই কাঠামোতে একটা কেন্দ্রীয় কমান্ড থাকে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ের সেলগুলো নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেশ ভালো স্বাধীনতা ভোগ করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কেবল একটা সাধারণ নির্দেশিকা বা মতাদর্শিক লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। এরপর কখন, কোথায় এবং কীভাবে কাজটা করা হবে, সেটা মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই নির্ধারণ করে। এই ধরনের বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর কারণে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা যদি ধরাও পড়েন বা মারা যান, তারপরও নিচের দিকের সেলগুলো নিজেদের মতো করে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। একটা সেল ধ্বংস হয়ে গেলে খুব দ্রুত অন্য একটা সেল সেই শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলে।
সাংগঠনিক কাঠামোর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক শাখা এবং সামরিক শাখার মধ্যকার কঠোর বিভাজন। আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোর একটা অংশ থাকে যারা কেবল রাজনৈতিক প্রচার, লিফলেট বিলি বা অর্থ সংগ্রহের কাজ করে। আর আরেকটা অংশ থাকে যারা সরাসরি সশস্ত্র কার্যক্রমে অংশ নেয়। এই দুই শাখার কর্মীদের মধ্যে কখনো সরাসরি যোগাযোগ রাখা হয় না। রাজনৈতিক শাখার কর্মীরা জনসমক্ষে যতটা সম্ভব সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করে, যাতে তাদের ওপর পুলিশের সন্দেহ না পড়ে। অন্যদিকে সামরিক শাখার কর্মীরা পুরোপুরি আত্মগোপনে থাকে। এই দুই শাখার মধ্যে সমন্বয় করার জন্য বিশেষ কয়েকজন সমন্বয়কারী বা লিয়াঁজো কর্মী থাকে। যদি সামরিক শাখার কেউ ধরা পড়ে, তবে সে রাজনৈতিক শাখার কাউকে ধরিয়ে দিতে পারে না, কারণ সে কাউকেই চেনে না। এই নিখুঁত কাঠামোগত বিভাজনের কারণেই অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনী বছরের পর বছর চেষ্টা করেও একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনের শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পারে না।
সদস্য সংগ্রহ, গোপনীয়তা ও দীক্ষাদান (Recruitment, Secrecy and Initiation)
গোপন সংগঠনে নতুন সদস্য সংগ্রহ করাটা একটা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিপৎসংকুল কাজ। প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলের মতো এখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাইক বাজিয়ে বা পোস্টার লাগিয়ে লোক ডাকার কোনো সুযোগ নেই। একটা ভুল মানুষকে সংগঠনে টেনে আনার অর্থ হলো পুরো সংগঠনের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া। তাই নতুন সদস্য বাছাই করার ক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলো দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত সতর্ক একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। সমাজবিজ্ঞানী ডনটেলা দেল্লা পোর্তা (Donatella della Porta) ইতালির বিভিন্ন গোপন সংগঠনের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোতে নতুন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে (della Porta, 1995)। অপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে হঠাৎ করে সংগঠনে নেওয়া হয় না। সাধারণত সংগঠনের পুরোনো সদস্যদের আত্মীয়স্বজন, ছোটবেলার বন্ধু বা দীর্ঘদিনের পরিচিত কাউকেই কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে বিবেচনা করা হয়। কারণ একজন মানুষের অতীত ইতিহাস এবং তার পরিবারের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে গোপন সংগঠনগুলো তাকে বিশ্বাস করতে পারে না।
প্রাথমিকভাবে কাউকে বাছাই করার পর তার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি চালানো হয়। তাকে সরাসরি সংগঠনের কথা বলা হয় না। বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক আড্ডা বা সাধারণ আলোচনার ছলে তার মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করা হয়। দেখা হয় যে রাষ্ট্রের প্রতি তার ক্ষোভ কতটা তীব্র এবং সংগঠনের মতাদর্শের প্রতি তার সমর্থন আছে কি না। যদি মনে হয় যে ছেলেটি বা মেয়েটি সংগঠনের জন্য উপযুক্ত, তখন তাকে ছোটখাটো কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়। যেমন হয়তো বলা হলো কোনো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একটা চিঠি পৌঁছে দিতে বা কয়েকটা লিফলেট লুকিয়ে রাখতে। এই ছোট কাজগুলোর মাধ্যমে তার সাহস এবং গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষমতা যাচাই করা হয়। এই পর্যায়টিকে বলা হয় গ্রুমিং বা প্রস্তুতকরণ। একজন সম্ভাব্য সদস্যকে দিনের পর দিন একটু একটু করে আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের কঠোর বাস্তবতার জন্য মানসিকভাবে তৈরি করা হয়। যখন ওপর মহলের নেতারা পুরোপুরি নিশ্চিত হন যে এই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করা যায়, কেবল তখনই তাকে সংগঠনের আনুষ্ঠানিক সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
সদস্য হিসেবে চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আগে একটা অলিখিত পরীক্ষা দিতে হয়, যাকে অনেক সময় দীক্ষাদান বা ইনিশিয়েশন বলা হয়। এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন সদস্যকে এমন একটা কাজের সাথে যুক্ত করা, যা তাকে রাষ্ট্রের চোখে অপরাধীতে পরিণত করবে। অনেক সময় নতুন সদস্যকে একটা ব্যাংক ডাকাতিতে অংশ নিতে বলা হয়, কোনো অস্ত্র বহন করতে বলা হয় বা কোনো হামলায় সহায়তা করতে বলা হয়। যখন সে এই বেআইনি কাজটা সম্পন্ন করে, তখন তার আর পেছনের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। সে বুঝতে পারে যে পুলিশ এখন তাকেও খুঁজছে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপটা তাকে সংগঠনের সাথে চিরস্থায়ীভাবে বেঁধে ফেলে। সে তখন পুরোপুরি বুঝতে পারে যে সংগঠনের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তার আর বেঁচে থাকার কোনো পথ নেই। এই ধরনের চূড়ান্ত পরীক্ষার পর একটা গোপন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নতুন সদস্য তখন তার পুরোনো নাম এবং পরিচয় মুছে ফেলে একটা নতুন সাংগঠনিক নাম বা ছদ্মনাম গ্রহণ করে। এখান থেকেই শুরু হয় তার পুরোপুরি নতুন এক আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যের নিরাপত্তা (Communication Systems and Information Security)
যেকোনো গোপন নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গা হলো তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। সংগঠনের নেতাদের নির্দেশ যদি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে না পৌঁছায়, তবে সেই সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। আবার এই নির্দেশ পাঠাতে গিয়ে যদি গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে যায়, তবে পুরো সংগঠনটাই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সন্ত্রাসবাদ ও গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, প্রযুক্তির যতই উন্নতি হোক না কেন, অনেক গোপন সংগঠন এখনো তাদের যোগাযোগের জন্য সনাতন পদ্ধতির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে (Hoffman, 2006)। আধুনিক টেলিফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করাটা তাদের কাছে একটা বড় ফাঁদ বলে মনে হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুব সহজেই এসব ইলেকট্রনিক যোগাযোগ আড়িপেতে শুনতে পারে। তাই অত্যন্ত জরুরি কোনো নির্দেশ পাঠাতে হলে তারা বিশ্বস্ত বার্তাবাহক বা কুরিয়ার ব্যবহার করে। এই বার্তাবাহকরা সংকেতলিপিতে লেখা কাগজ বা পেনড্রাইভ নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াত করে।
সনাতন যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটা খুব জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ‘ডেড ড্রপ’ (Dead Drop)। এই পদ্ধতিতে দুজন মানুষের কখনো সরাসরি দেখা হয় না। প্রথমজন কোনো একটা গোপন তথ্য বা নির্দেশ একটা নির্দিষ্ট জায়গায়, যেমন পার্কের কোনো বেঞ্চের নিচে, কোনো পুরোনো দালানের ইটের ফাঁকে বা পাবলিক টয়লেটের ফ্লাশ ট্যাংকের ভেতরে লুকিয়ে রেখে আসে। এরপর সে একটা নির্দিষ্ট সংকেত দেয়, যেমন হয়তো রাস্তার পাশের কোনো ল্যাম্পপোস্টে একটা চকের দাগ কেটে দেয়। দ্বিতীয়জন সেই দাগ দেখে বুঝতে পারে যে তার জন্য কোনো তথ্য অপেক্ষা করছে। সে তখন সুযোগ বুঝে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তথ্যটা সংগ্রহ করে নেয়। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যদি তথ্য সংগ্রহ করার সময় দ্বিতীয় ব্যক্তি পুলিশের হাতে ধরাও পড়ে, তবে সে প্রথম ব্যক্তির কোনো হদিস দিতে পারবে না, কারণ তাদের মধ্যে কখনো সামনাসামনি দেখাই হয়নি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় গুপ্তচররা এই পদ্ধতি ব্যবহার করত, যা পরবর্তীকালে পৃথিবীর প্রায় সব আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের কাজে লাগিয়েছে।
তবে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোও প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কর্মীরা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ডার্ক ওয়েবের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তারা সাধারণ ফোন কল এড়িয়ে চলে এবং ইন্টারনেটে এমন সব সফটওয়্যার ব্যবহার করে যা তাদের আসল আইপি অ্যাড্রেস লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এরপরও বিপদের ঝুঁকি থেকেই যায়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা সংকেত গোয়েন্দাগিরি এখন এতটাই উন্নত যে, তারা যেকোনো ডিজিটাল পদচিহ্ন ধরে ফেলা সক্ষম। একারণে গোপন সংগঠনের কর্মীরা সাধারণত একটা মোবাইল ফোন খুব বেশি দিন ব্যবহার করে না। তারা ‘বার্নার ফোন’ বা সস্তায় কেনা এমন ফোন ব্যবহার করে, যা একবার ব্যবহার করেই ভেঙে ফেলে দেওয়া যায়। যোগাযোগ সুরক্ষার এই ইঁদুর-বিড়াল খেলাটা আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনের প্রাত্যহিক জীবনের একটা বড় অংশ। একটা ছোট ভুলে বা একটা অসতর্ক ফোন কলেই সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের অবস্থান ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবেলা (Countering State Surveillance and Espionage)
আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলো কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সরাসরি আক্রমণের ভয়েই থাকে না, তাদের সবচেয়ে বড় ভয়টা থাকে নিজেদের ভেতরে থাকা বিশ্বাসঘাতকদের নিয়ে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সবসময় চেষ্টা করে সংগঠনের ভেতরে নিজেদের গুপ্তচর ঢুকিয়ে দিতে অথবা সংগঠনের দুর্বল কোনো সদস্যকে ব্ল্যাকমেইল করে তথ্য আদায় করতে। এই ভয়াবহ ঝুঁকি সামাল দেওয়ার জন্য প্রায় প্রতিটি বড় গোপন সংগঠনের নিজস্ব একটা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স উইং থাকে। এই উইংয়ের একমাত্র কাজ হলো সংগঠনের অন্য সদস্যদের ওপর কড়া নজর রাখা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, গোপন সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ব্যবস্থা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার চেয়েও বেশি নির্মম হয়ে থাকে (Wilkinson, 2011)। যদি কোনো কর্মীর জীবনযাত্রায় হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়, যেমন তার হাতে হঠাৎ অনেক টাকা আসা বা সে কোনো অস্পষ্ট কারণে নির্দিষ্ট সময়ে উধাও হয়ে যাওয়া, তখন এই নিরাপত্তা উইং তার ওপর নজরদারি শুরু করে।
গুপ্তচর সন্দেহে কাউকে আটক করা হলে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোর বিচারের পদ্ধতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর হয়। তাদের তো আর আনুষ্ঠানিক কোনো আদালত বা জেলখানা নেই, তাই তাদের বিচারগুলো হয় খুব সংক্ষিপ্ত এবং এর রায় হয় ভয়াবহ। সন্দেহভাজন সদস্যকে গোপন কোনো আস্তানায় নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অনেক সময় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তার ওপর অমানবিক নির্যাতনও চালানো হয়। যদি একবার প্রমাণিত হয় যে সে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছে তথ্য পাচার করেছে, তবে তার একমাত্র শাস্তি হয় মৃত্যুদণ্ড। সংগঠনের অন্য সদস্যদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক সময় এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিটা অত্যন্ত নৃশংসভাবে করা হয়। বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা বোঝানোর জন্য মৃতদেহটা এমনভাবে ফেলে রাখা হয় যাতে সবাই দেখতে পায়। এই নির্মমতার কারণে সাধারণ সদস্যরা ভয়ে তটস্থ থাকে এবং কেউ চাইলেও সহজে পুলিশের সাথে হাত মেলাতে সাহস পায় না।
তবে এই অভ্যন্তরীণ নজরদারির একটা নেতিবাচক দিকও আছে। গুপ্তচরবৃত্তির ভয় অনেক সময় সংগঠনের ভেতরে এক ধরনের তীব্র প্যারানয়া বা মনস্তাত্ত্বিক ভীতির জন্ম দেয়। নেতারা সব সময় ভাবতে থাকেন যে তাদের চারপাশের সবাই হয়তো রাষ্ট্রের চর। এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তারা অনেক সময় সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং অনুগত কর্মীদেরও হত্যা করে বসেন। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে একটা শক্তিশালী আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হামলায় নয়, বরং নিজেদের ভেতরের সন্দেহের বশে একে অপরকে হত্যা করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। সংগঠনের ভেতরে যখন আস্থার সংকট তৈরি হয়, তখন কর্মীরা আর মন খুলে কাজ করতে পারে না। তারা বাইরের শত্রুর চেয়ে নিজেদের কমরেডদের বেশি ভয় পেতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে সংগঠনের ভেতরে এই সন্দেহের বীজ বুনে দেয়, যাতে তারা নিজেদের ভেতরে লড়াই করে দুর্বল হয়ে পড়ে।
গোপন জীবনযাপন ও প্রাত্যহিক বাস্তবতা (Underground Living and Daily Reality)
বাইরের মানুষের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনকে অনেক সময় খুব রোমাঞ্চকর এবং বীরত্বপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। সিনেমার পর্দায় বা উপন্যাসের পাতায় গোপন বিপ্লবীদের যেভাবে চিত্রিত করা হয়, তার সাথে বাস্তবের আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। বাস্তবের গোপন জীবনটা ভীষণ একঘেয়ে, চরম বিরক্তিকর এবং প্রতিনিয়ত স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টিকারী একটা অস্তিত্ব। গবেষক জে. বোয়ার বেল (J. Bowyer Bell) তার The Dynamics of the Armed Struggle বইতে গোপন নেটওয়ার্কের সদস্যদের দৈনন্দিন জীবনের একটা নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন (Bell, 1998)। একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মীকে দিনের বেশিরভাগ সময়ই কোনো একটা বদ্ধ ঘরে বা ‘সেইফ হাউজে’ লুকিয়ে থাকতে হয়। সেইফ হাউজের নিয়মকানুন থাকে অত্যন্ত কড়া। দিনের বেলা জানালার পর্দা সরানো যায় না, জোরে কথা বলা যায় না, এমনকি আশপাশের প্রতিবেশীদের চোখে পড়ার ভয়ে বারান্দায় যাওয়াও নিষেধ থাকে। মাসের পর মাস একটা ছোট ঘরে চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকার এই অভিজ্ঞতা মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিক হলো নিজের আসল পরিচয়টা সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া। একজন কর্মীকে সব সময় একটা মিথ্যা পরিচয়ে বাঁচতে হয়। তার পকেটে থাকে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, আর মুখে থাকে একটা সাজানো জীবনের গল্প। সে যে এলাকায় ভাড়ায় থাকে, সেখানকার মানুষের কাছে তাকে প্রমাণ করতে হয় যে সে একজন সাধারণ চাকরিজীবী বা ছাত্র। মুদির দোকানি থেকে শুরু করে বাড়ির মালিক – সবার সাথেই তাকে অনর্গল মিথ্যা বলতে হয়। এই প্রতিনিয়ত অভিনয় করতে করতে একটা সময় সে নিজেই নিজের আসল পরিচয়টা হারিয়ে ফেলে। তার ওপর সব সময় এই ভয় কাজ করে যে, কোনো একটা ছোট ভুল বা একটা অসতর্ক মন্তব্যের কারণে তার আসল পরিচয় ফাঁস হয়ে যেতে পারে। রাস্তায় পুলিশের গাড়ি দেখলে বা রাতের বেলা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেই তাদের বুক কেঁপে ওঠে। এই সার্বক্ষণিক ভয় এবং উৎকণ্ঠা তাদের স্নায়ুকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে, অনেকেই অনিদ্রা এবং চরম হতাশায় ভুগতে শুরু করে।
এর পাশাপাশি থাকে পরিবার এবং প্রিয়জনদের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকার কষ্ট। গোপন রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর একজন কর্মীর পক্ষে তার বাবা-মা, স্ত্রী বা সন্তানদের সাথে যোগাযোগ রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সে জানে যে পুলিশ তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ওপর কড়া নজর রাখছে। একটা ফোন কল করলেই পুলিশ তার অবস্থান জেনে যাবে। তাই বছরের পর বছর কেটে যায়, কিন্তু পরিবারের সাথে তার কোনো কথা হয় না। অনেক সময় বাবা-মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও সে শেষবারের মতো তাদের মুখ দেখতে যেতে পারে না। এই অমানবিক বিচ্ছিন্নতা তাদের ভেতরে একটা গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারে যে তারা একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্যের জন্য নিজেদের জীবনের সমস্ত ব্যক্তিগত আনন্দ এবং সম্পর্কগুলোকে বিসর্জন দিয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন মানে কেবল পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধ নয়; এটা আসলে নিজের ভেতরের একাকীত্ব এবং হতাশার সাথে প্রতিদিনকার একটা নিঃশব্দ লড়াই।
আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে মূলধারায় রূপান্তর ও পতন (Transition to Mainstream and Decline)
যেকোনো গোপন রাজনৈতিক সংগঠন অনন্তকাল ধরে আন্ডারগ্রাউন্ডে টিকে থাকতে পারে না। একটা সময়ের পর তাদের এই গোপন যাত্রার একটা পরিসমাপ্তি ঘটা আবশ্যিক হয়ে পড়ে। এই পরিসমাপ্তিটা কয়েকভাবে হতে পারে। কখনো তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়, কখনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, আবার অনেক সময় একটা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তারা মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসে। সন্ত্রাসবাদ এবং সশস্ত্র সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞ অড্রে কার্থ ক্রোনিন (Audrey Kurth Cronin) তারHow Terrorism Ends বইয়ে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে, আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলো কীভাবে তাদের সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে (Cronin, 2009)। তার মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং গোপন সংগঠন একটা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর উভয় পক্ষই বুঝতে পারে যে সামরিকভাবে কাউকে পুরোপুরি পরাজিত করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত উভয় পক্ষকেই ক্লান্ত করে তোলে। তখন বাধ্য হয়ে তারা একটা আলোচনা বা শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে এগোয়।
গোপন জীবন থেকে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসার এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। একটা সংগঠন যখন অস্ত্র জমা দিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সংগঠনের ভেতরেই তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। যেসব কর্মী বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটা আপসহীন সশস্ত্র সংগ্রামের স্বপ্ন দেখে এসেছে, তারা হঠাৎ করে এই সমঝোতাকে মেনে নিতে পারে না। তাদের কাছে মনে হয় নেতারা এতদিনের আত্মত্যাগ এবং শহিদদের রক্তের সাথে চরম বেইমানি করছে। এই ক্ষোভ থেকে অনেক সময় মূল সংগঠনটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। একটা বড় অংশ হয়তো শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, কিন্তু কিছু কট্টরপন্থী কর্মী অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা নতুন করে আরেকটা ছোট কিন্তু অনেক বেশি সহিংস আন্ডারগ্রাউন্ড সেল গঠন করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। শান্তি প্রক্রিয়ার সময় এই দলছুট বা স্প্লিন্টার গ্রুপগুলোই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যারা মূলধারায় ফিরে আসে, তাদের জন্যও নতুন জীবনটা খুব একটা সহজ হয় না। একটা মানুষ যখন তার জীবনের সেরা সময়গুলো আন্ডারগ্রাউন্ডে, জঙ্গলে বা গোপন আস্তানায় কাটিয়ে দেয়, তখন হঠাৎ করে তাকে একটা সাধারণ নাগরিক জীবনে মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট করতে হয়। সমাজে তাদের অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। পুরোনো শত্রুরা বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কিছু অতি-উৎসাহী সদস্য শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। এছাড়া যে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে, সেই দলের ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব দেখা যায়। কারণ যারা বছরের পর বছর বন্দুকের জোরে এবং কঠোর গোপনীয়তায় দল চালিয়েছে, তারা রাতারাতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা ভিন্নমত সহ্য করার মানসিকতা অর্জন করতে পারে না। ফলে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে এবং একটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই রূপান্তরটা একটা দীর্ঘ সমাজতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক বিবর্তনের অংশ।
সন্ত্রাসবাদের মূল কারণসমূহ (Root Causes of Terrorism): কাঠামো, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত প্রেরণা
সামাজিক ও কাঠামোগত কারণ: বঞ্চনা ও বৈষম্যের রাজনীতি (Societal and Structural Factors: Politics of Deprivation and Inequality)
একটি শান্ত সমাজ হঠাৎ করে কীভাবে চরম সহিংসতার পথ বেছে নেয়, সেই প্রশ্ন সমাজবিজ্ঞানীদের বহুদিন ধরে ভাবিয়ে আসছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে কিছু বিপথগামী মানুষ হঠাৎ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সহিংসতার শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত থাকে। সমাজের সামগ্রিক কাঠামো, সুযোগের অসম বণ্টন এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য মানুষের ভেতর গভীর অসন্তোষের জন্ম দেয়। কাঠামোগত স্তরে যখন একদল মানুষ নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবতে শুরু করে, তখন সেখানে চরমপন্থার বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এই ধরনের কাঠামোগত বঞ্চনা বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার (Ted Robert Gurr) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হোয়াই মেন রেবেল (Why Men Rebel)-এ আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ তত্ত্ব (Relative Deprivation Theory) উপস্থাপন করেন (Gurr, 1970)। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে মানুষ কেবল দরিদ্র হওয়ার কারণে বিদ্রোহ করে না। মানুষ তখনই বিক্ষুব্ধ হয় যখন সে দেখে সমাজে তার যা পাওয়ার কথা ছিল (প্রত্যাশিত প্রাপ্তি) এবং বাস্তবে সে যা পাচ্ছে (প্রকৃত প্রাপ্তি) – এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশীর সমৃদ্ধি এবং নিজের ক্রমাগত অবনমন মানুষের ভেতর তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ধরে চরমপন্থী মতাদর্শগুলো সমাজে প্রবেশ করে এবং কাঠামোগত ক্ষোভকে রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতায় রূপ দেয়।
সামাজিক রূপান্তরের গতিও এই কাঠামোগত বিশৃঙ্খলাকে উসকে দিতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস সি. ডেভিস (James C. Davies) তাঁর প্রস্তাবিত জে-কার্ভ তত্ত্ব (J-Curve Theory)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে দীর্ঘ অর্থনৈতিক উন্নতির পর হঠাৎ তীব্র মন্দা দেখা দিলে সমাজে বিপ্লব বা সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয় (Davies, 1962)। মানুষ যখন উন্নত জীবনের স্বপ্নে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তখন আকস্মিক পতন তাদের চরম হতাশায় ফেলে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী জেমস এ. পিয়াজ্জা (James A. Piazza) বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে যেসব সমাজে জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কাঠামোগত অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়, সেখানে রাজনৈতিক সন্ত্রাস মাথাচাড়া দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায় (Piazza, 2011)। কাঠামোগত স্তরে রাষ্ট্র যখন সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন সহিংসতার পরিবেশ নিজে থেকেই তৈরি হতে থাকে।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও আধুনিকায়নের প্রভাব (Economic Strain and the Impact of Modernization)
অর্থনৈতিক দুর্দশাকে সাধারণ দৃষ্টিতে সন্ত্রাসবাদের প্রধান চালিকাশক্তি মনে করা হলেও বাস্তব চিত্রটি বেশ জটিল। সাধারণ যুক্তিতে মনে হতে পারে যে দরিদ্র মানুষই পেটের দায়ে অস্ত্রের পথ বেছে নেয়। তবে অর্থনীতিবিদ অ্যালেন ক্রুগার (Alan B. Krueger) এবং জিতকা মালেকোভা (Jitka Malečková) তাঁদের প্রভাবশালী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে দারিদ্র্য এবং নিরক্ষরতার সাথে সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ার সরাসরি কোনো অকাট্য সম্পর্ক নেই (Krueger & Malečková, 2003)। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র দলের সদস্যদের পটভূমি বিশ্লেষণ করে দেখতে পান যে অনেক হামলাকারী মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষিত। এর মানে দাঁড়ায়, স্রেফ ক্ষুধার কারণে মানুষ সন্ত্রাসী হয় না; অর্থনৈতিক অনুঘটক কাজ করে অনেক ভিন্ন মাত্রায়।
অর্থনৈতিক অসমতা এবং সুযোগের অভাব সমাজে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধ্যাত্ব তৈরি করে। বিশেষ করে দ্রুত আধুনিকায়ন ও নগরায়ণের ফলে সনাতন গ্রামীণ জীবনের সামাজিক নিরাপত্তা জাল ভেঙে পড়ে। গ্রামের তরুণ যখন কাজের খোঁজে শহরে এসে দেখে যে আধুনিক অর্থনীতির চাকচিক্য কেবল গুটিকয়েক মানুষের জন্য সংরক্ষিত, তখন তার ভেতর তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতাবোধ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল কোলিয়ার (Paul Collier) এবং অঞ্জিকে হোফলার (Anke Hoeffler) তাঁদের ‘লোভ বনাম ক্ষোভ’ বা গ্রিড ভার্সেস গ্রিভেন্স তত্ত্ব (Greed versus Grievance Theory)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং বেকারত্ব সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে (Collier & Hoeffler, 2004)। সমাজে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত অথচ বেকার যুবকের উপস্থিতি সংঘাতের জন্য সুলভ জনবল তৈরি করে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যখন সুষমভাবে বণ্টিত হয় না, তখন সমাজের এক প্রান্তে তৈরি হয় আকাশচুম্বী প্রাচুর্য আর অন্য প্রান্তে সীমাহীন বঞ্চনা। এই বৈষম্য তরুণদের মনে সমাজব্যবস্থার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা তৈরি করে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই অর্থনৈতিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেয়। অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্তো আব্বাদি (Alberto Abadie) বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক উপাত্ত পর্যালোচনা করে যুক্তি দেন যে দারিদ্র্যের চেয়েও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমসুযোগের অনুপস্থিতি সন্ত্রাসবাদ বিকাশে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে (Abadie, 2006)। ফলে অর্থনৈতিক দৈন্য সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে অসন্তোষের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও নিপীড়ন (Political Environment, Institutional Failure and Repression)
একটি দেশে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা রয়েছে, তার ওপর সহিংসতার মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করে। যখন কোনো রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি জানানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়, বিরোধী কণ্ঠকে নিষ্ঠুরভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় এবং ভোট বা নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন মানুষ আইনবহির্ভূত পথের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য বোধ করে। সমাজতাত্ত্বিক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) সন্ত্রাসবাদের রাজনৈতিক উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি ধারণার পার্থক্য তুলে ধরেন: পূর্বশর্ত বা প্রিকন্ডিশনস এবং তাৎক্ষণিক উসকানি বা প্রেসিপিট্যান্টস (Crenshaw, 1981)। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদী পূর্বশর্ত, আর কোনো নিরীহ মানুষের ওপর পুলিশের অত্যাচার বা রাজনৈতিক নেতার গ্রেফতার কাজ করে তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ হিসেবে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করে। যে রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা দলীয়করণের শিকার এবং পুলিশ প্রশাসন সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বদলে শাসকগোষ্ঠীর লাঠিয়ালে পরিণত হয়, সেখানে নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেনিফার এল. হোম্স (Jennifer L. Holmes) লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রের নির্বিচার দমনপীড়ন কখনোই শান্তি আনে না, বরং তা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দেয় (Holmes, 2001)। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অনেক সময় অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়ার একটি নৈতিক অজুহাত তৈরি করে দেয়।
আরেকটি বড় সংকট দেখা দেয় ব্যর্থ বা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে। যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সীমান্ত অরক্ষিত থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজস্ব সমান্তরাল শাসন কায়েম করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট রটবার্গ (Robert Rotberg) রাষ্ট্র কাঠামোর ধস এবং সন্ত্রাসের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলো চরমপন্থীদের জন্য নিরাপদ স্বর্গ তৈরি করে দেয় (Rotberg, 2002)। এসব অঞ্চলে রাষ্ট্র না পারে নাগরিকদের মৌলিক নাগরিক সেবা দিতে, না পারে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে। এই প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী দলগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে এবং অসহায় মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা হাসিল করে।
মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক ও ব্যক্তিগত প্রেরণা (Psychological Catalysts and Personal Motivation)
একই সমাজ, একই রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং একই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বসবাস করেও সবাই অস্ত্রের পথ বেছে নেয় না। কোটি মানুষের মধ্যে অল্প কয়েকজন কেন নিজের জীবন বাজি রেখে ধ্বংসাত্মক পথে পা বাড়ায়, তা বুঝতে হলে মানুষের মনের ভেতরে তাকাতে হয়। দীর্ঘকাল ধরে অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করতেন যে সন্ত্রাসীরা হয়তো কোনো মানসিক রোগে ভোগে। কিন্তু আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এই ধারণা বাতিল করে দিয়েছে। গবেষক অ্যান্ড্রু সিল্ক (Andrew Silke) আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে অধিকাংশ সন্ত্রাসী মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে (Silke, 1998)। তারা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এবং ঠান্ডা মাথায় নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ব্যক্তিগত স্তরে বঞ্চনা, অপমান এবং আত্মপরিচয়ের সংকট মানুষকে উগ্র মতবাদের দিকে ধাবিত করে। কোনো ব্যক্তি যখন সমাজে নিজেকে অপদস্থ বা শক্তিহীন মনে করে, তখন সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যপদ তাকে এক ধরনের কৃত্রিম কর্তৃত্ব ও সম্মানের অনুভূতি দেয়। সমাজবিজ্ঞানী ভিক্টর ভিক্টোরফ (Jeff Victoroff) সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বসমূহ পর্যালোচনা করে দেখান যে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য, আগ্রাসী মনোভাব এবং দলগত আনুগত্যের সংমিশ্রণে ব্যক্তির ভেতরে সহিংস আচরণ তৈরি হয় (Victoroff, 2005)। চরমপন্থী মতাদর্শ ব্যক্তির ব্যক্তিগত শোক বা ক্ষোভকে এক বৃহত্তর আদর্শিক লড়াইয়ের রূপ দেয়। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার এই লড়াই ব্যক্তিপূজার বাইরে গিয়ে পুরো সমাজের মুক্তির একমাত্র উপায়।
দলগত মনস্তত্ত্ব বা গ্রুপ ডায়নামিক্স ব্যক্তিগত প্রেরণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। দলবদ্ধ অবস্থায় মানুষ এমন অনেক কাজ করতে পারে যা সে একা কখনোই করার সাহস পেত না। মনোবিজ্ঞানী ক্লার্ক ম্যাককলে (Clark McCauley) এবং সোফিয়া মসকালেঙ্কো (Sophia Moskalenko) তাঁদের গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে দলগত আবেগ, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং তথাকথিত শহীদি মর্যাদা পাওয়ার বাসনা সাধারণ তরুণের ভেতরের মানবিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব মুছে ফেলে (McCauley & Moskalenko, 2011)। দলের ভেতরে প্রবেশ করার পর বাইরের পৃথিবী থেকে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দলের নিয়ম, নেতার নির্দেশ এবং সমমনা সঙ্গীদের প্রশংসাই তার কাছে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
ভূরাজনীতি, বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ও আঞ্চলিক সংঘাত (Geopolitics, Foreign Intervention and Regional Conflicts)
সন্ত্রাসবাদের বিকাশ কখনোই নিছক কোনো অভ্যন্তরীণ সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত এবং বাইরের হস্তক্ষেপ স্থানীয় সহিংসতাকে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক রূপ দেয়। বিশ শতকের স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় পরাশক্তিই নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশে প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধে মদদ জুগিয়েছে। আফগানিস্তানে আশির দশকে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যেভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে চরমপন্থীদের সংগঠিত করা হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে বৈশ্বিক জিহাদি নেটওয়ার্কের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল পিলেয়ার (Paul R. Pillar) তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেন কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল চাল এবং বৈদেশিক সামরিক উপস্থিতি স্থানীয় উগ্রপন্থার জন্য অজুহাত তৈরি করে (Pillar, 2001)।
বাইরের দেশের সরাসরি সামরিক আক্রমণ বা দখলদারিত্ব কোনো ভূখণ্ডের স্বাভাবিক ভারসাম্য গুঁড়িয়ে দেয়। ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আক্রমণের পর রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মুখে ঠেলে দেয়। অধ্যাপক রবার্ট পেপ (Robert Pape) এবং জেমস ফেল্ডম্যান (James K. Feldman) তাঁদের যৌথ গবেষণায় দেখান যে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো বিদেশি সামরিক বাহিনীর দখলদারিত্ব থেকে নিজের ভূখণ্ড মুক্ত করার জাতীয়তাবাদী বাসনা (Pape & Feldman, 2010)। যখন একটি দেশের মানুষ দেখে যে বিদেশি সেনারা তাদের সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব ও দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানছে, তখন স্থানীয় ক্ষোভ দ্রুত আন্তর্জাতিক চরমপন্থার সাথে হাত মেলায়।
এর পাশাপাশি রয়েছে আঞ্চলিক বিরোধ ও প্রতিবেশীর ছায়াযুদ্ধ। গবেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) দেখিয়েছেন যে দুর্বল বা ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোতে প্রতিপক্ষ দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাপে রাখতে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে (Byman, 2005)। ফলে অনেক অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাইরের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে। কাশ্মীর, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা সাব-সাহারান আফ্রিকার সংঘাতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের সাথে যখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতি যুক্ত হয়, তখন যেকোনো সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সন্ত্রাসবাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে।
বহুমাত্রিক কারণের সংশ্লেষণ: সমন্বিত বিশ্লেষণ কাঠামো (Synthesizing Multicausal Drivers: An Integrated Analytical Framework)
সন্ত্রাসবাদের কোনো একক বা জাদুকরী কারণ নেই। কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক স্বৈরাচার, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব – এই সবগুলো নদীর মতো এসে এক মোহনায় মিলিত হলে তবেই সন্ত্রাসবাদের মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতা বুঝতে হলে সামগ্রিক একটি বিশ্লেষণ কাঠামোর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক টোর বজরগো (Tore Bjørgo) সন্ত্রাসবাদের মূল কারণগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করে একটি সমন্বিত মডেল প্রস্তাব করেছেন (Bjørgo, 2005)। এই মডেলটি বিভিন্ন কারণের মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগ বুঝতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে:
- কাঠামোগত পূর্বশর্ত (Structural Preconditions): এর মধ্যে রয়েছে আধুনিকায়নের সংকট, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং জনসংখ্যাগত রূপান্তর যা সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
- প্ররোচনামূলক উপাদান (Precipitants): সরকারের আকস্মিক কোনো কঠোর পদক্ষেপ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা রাজনৈতিক সংকট যা চাপা ক্ষোভকে তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় নামায়।
- স্থায়িত্ব দানকারী অনুঘটক (Sustaining Factors): সন্ত্রাসী দলগুলোর নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, অর্থায়নের নেটওয়ার্ক এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি যা সহিংসতাকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখে।
- ব্যক্তিগত প্রেরণা (Individual Motivations): দলগত পরিচয়, ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং আদর্শিক অন্ধত্ব যা একক মানুষকে বোমার বোতামে আঙুল রাখতে প্ররোচিত করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid) এই বহুমাত্রিক কাঠামোকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেছেন: ম্যাক্রো বা বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক স্তর, মেসো বা মধ্যবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক-দলগত স্তর এবং মাইক্রো বা ব্যক্তিগত স্তর (Schmid, 2013)। ম্যাক্রো স্তরে থাকে রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও বিশ্বরাজনীতি; মেসো স্তরে থাকে সন্ত্রাসী দলের প্রচার, প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের কৌশল; আর মাইক্রো স্তরে কাজ করে মানুষের ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও জীবনের অর্থ খোঁজার প্রচেষ্টা। কেবল একটি স্তরের ওপর নজর দিলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
| বিশ্লেষণের স্তর | প্রধান উপাদানসমূহ | ভূমিকা ও প্রভাব |
| ম্যাক্রো স্তর (Macro Level) | কাঠামোগত বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ব্যর্থ রাষ্ট্র, ভূরাজনৈতিক সংঘাত | দীর্ঘমেয়াদী অসন্তোষ তৈরি করে এবং সহিংসতার সামাজিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করে |
| মেসো স্তর (Meso Level) | চরমপন্থী দল, মতাদর্শিক প্রচারণা, নেটওয়ার্কিং, লজিস্টিক ও অর্থায়ন | ক্ষোভকে সংগঠিত রূপ দেয় এবং সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে হামলার নকশা আঁকে |
| মাইক্রো স্তর (Micro Level) | ব্যক্তিগত বঞ্চনা, আত্মপরিচয়ের সংকট, মানসিক টানাপোড়েন, দলগত আনুগত্য | ব্যক্তিকে চরম পথ বেছে নিতে মানসিক সিদ্ধান্ত ও নৈতিক সমর্থন জোগায় |
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী কৌশলে এই বহুমুখী বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। রাষ্ট্র যদি কেবল মেসো স্তরে দল ভাঙার বা নেতা হত্যার চেষ্টা করে, কিন্তু ম্যাক্রো স্তরের রাজনৈতিক অবিচার ও কাঠামোগত বৈষম্য দূর না করে, তবে এক দল ধ্বংস হলেও অন্য নামে আরেক দল দাঁড়িয়ে যাবে। একইভাবে মাইক্রো স্তরে মানুষের মানসিক রূপান্তর না ঘটালে অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ করেও শান্তি ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই সন্ত্রাসবাদের কারণকে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে না দেখে সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের সামগ্রিক টানাপোড়েন হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত সমাধানের একমাত্র পথ।
সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী সংগঠনের তুলনামূলক অধ্যয়ন (Comparative Study of Armed and Terrorist Organizations): মতাদর্শ, সংগঠন ও কৌশলের বৈচিত্র্য
হিজবুল্লাহ (Hizbullah): আঞ্চলিক সশস্ত্র আন্দোলন
উৎপত্তি, লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Origins, Lebanese Civil War and Historical Context)
লেবাননের বৈরুত শহরের দক্ষিণে কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের রুক্ষ পাহাড়ি পথগুলোতে হাঁটলে এক ধরনের রাজনৈতিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝলমলে আধুনিক শহর, অন্যদিকে দেয়ালে দেয়ালে সশস্ত্র যোদ্ধাদের পোস্টার আর হলুদ পতাকার সারি। এই বৈপরীত্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে এমন একটি সংগঠন, যা মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন রাজনীতিতে রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে থাকে। সংগঠনটির নাম হিজবুল্লাহ বা ঈশ্বরের দল। হিজবুল্লাহর উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটা ছিল লেবাননের রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের গভীর ভূরাজনৈতিক সংকটের সরাসরি পরিণতি।
১৯৭৫ সালে লেবাননে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ দেশটির বহুত্ববাদী সমাজকাঠামোকে তছনছ করে দিয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মেতে ওঠে। ঐতিহাসিক কারণে লেবাননের শিয়া জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও প্রান্তিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। ঠিক এমন এক ভঙ্গুর সময়ে ১৯৮২ সালে ইসরায়েল লেবাননে পূর্ণমাত্রায় সামরিক আগ্রাসন চালায়। রাজধানী বৈরুত পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনার অগ্রযাত্রা এবং সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের শিয়া যুবকদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক অগাস্টাস রিচার্ড নর্টন (Augustus Richard Norton) তার বিশদ গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে ইসরায়েলি আগ্রাসনই শিয়া জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক উত্থানকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে এবং একটি নতুন প্রতিরোধ আন্দোলনের পথ খুলে দেয় (Norton, 2007)।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এই নতুন শক্তির পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি (IRGC)-এর শত শত সদস্য লেবাননের বেকা উপত্যকায় এসে পৌঁছায়। তারা স্থানীয় তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক অস্ত্র এবং সুসংগঠিত মতাদর্শিক দীক্ষা দিতে শুরু করে। এভাবে সাবেক ‘আমাল’ আন্দোলনের কট্টরপন্থী অংশ এবং তরুণ আলেমদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে হিজবুল্লাহ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুডিথ পালমার হারিক (Judith Palmer Harik) দেখিয়েছেন কীভাবে একটি অসংগঠিত মিলিশিয়া ইরানের অর্থ ও কৌশলের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে (Harik, 2004)। ১৯৮৫ সালে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠির মাধ্যমে সংগঠনটি নিজেদের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের কঠোর অবস্থানের জানান দেয়।
মতাদর্শিক ভিত্তি: বিলায়াত-ই-ফকিহ ও প্রতিরোধ বয়ান (Ideological Foundations: Wilayat al-Faqih and the Resistance Narrative)
হিজবুল্লাহর চিন্তার জগৎ বুঝতে হলে তাদের মতাদর্শিক ভিত্তির দিকে তাকাতে হয়। সংগঠনটির কাঠামোগত বিশ্বাসের মূলে রয়েছে আয়াতুল্লাহ খোমেনি কর্তৃক প্রণীত বিলায়াত-ই-ফকিহ (Wilayat al-Faqih) বা ইসলামি আইনবিদের অভিভাবকত্ব তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একজন যোগ্য ইসলামি আইনবিদের ওপর ন্যস্ত থাকে। হিজবুল্লাহ সূচনালগ্ন থেকেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে তাদের অভিভাবক হিসেবে মেনে নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের চিন্তক আমাল সাদ-গোরায়েব (Amal Saad-Ghorayeb) হিজবুল্লাহর রাজনীতি ও ধর্মীয় চিন্তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে সংগঠনের সদস্যদের কাছে ধর্মীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ (Saad-Ghorayeb, 2002)। তাদের কাছে প্রতিরোধ কোনো সাময়িক কৌশল নয়, বরং এক পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব।
তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে হিজবুল্লাহ নিজেদের মূল মতাদর্শিক অবস্থানে কৌশলগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। আশির দশকে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল লেবাননে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু লেবাননের জটিল বাস্তবতায় যেখানে খ্রিষ্টান ম্যারোনাইট, সুন্নি মুসলিম, দ্রুজ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে একক ধর্মীয় শাসন কায়েম করা অসম্ভব ছিল। গবেষক জোসেফ এলিক (Joseph Alagha) হিজবুল্লাহর আদর্শিক রূপান্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে নব্বইয়ের দশক থেকে সংগঠনটি ‘লেবাননিকরণ’ বা জাতীয় রাজনৈতিক মূলধারায় যুক্ত হওয়ার নীতি গ্রহণ করে (Alagha, 2006)। তারা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় প্রতিরোধের বয়ান সামনে নিয়ে আসে।
এই মতাদর্শিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহ ২০০৯ সালে তাদের নতুন রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। সেখানে তারা লেবাননের বহুত্ববাদী চরিত্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং নিজেদের একটি জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান এবং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা তাদের মূল রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়। এই বয়ান তাদের কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেই নয়, বরং লেবাননের কিছু বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী খ্রিষ্টান গোষ্ঠীর সাথেও কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের কট্টরতা বজায় রেখেও তারা একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
সাংগঠনিক কাঠামো, সমাজসেবা ও সমান্তরাল রাষ্ট্র (Organizational Structure, Social Welfare and the Parallel State)
হিজবুল্লাহর সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো তাদের দ্বৈত সত্তা। একদিকে তারা এক অপ্রতিরোধ্য সশস্ত্র বাহিনী, অন্যদিকে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সংগঠনের শীর্ষে রয়েছে একটি সুসংগঠিত পরিচালনা পরিষদ, যা ‘শুরা কাউন্সিল’ নামে পরিচিত। এই কাউন্সিলের নেতৃত্বে থাকেন একজন মহাসচিব, যিনি সার্বিক রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি নির্ধারণ করেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ম্যাগনাস রানস্টর্প (Magnus Ranstorp) হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যেমন কঠোর শৃঙ্খলায় আবদ্ধ, তেমনি মাঠপর্যায়ে তাদের স্থানীয় নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ (Ranstorp, 1997)।
সংগঠনটির জনপ্রিয়তা কেবল অস্ত্রের মুখে অর্জিত হয়নি। দক্ষিণ বৈরুত, দক্ষিণ লেবানন এবং বেকা উপত্যকার মতো অঞ্চলে হিজবুল্লাহ গড়ে তুলেছে এক বিশাল সামাজিক কল্যাণ কাঠামো। তারা নিজস্ব হাসপাতাল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কৃষি সমবায় এবং ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা পরিচালনা করে। রাষ্ট্র যখন চরম অর্থনৈতিক মন্দায় সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা বা খাবার জল পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছে, হিজবুল্লাহ তখন নিজস্ব অর্থায়নে সমান্তরাল সেবা নিশ্চিত করেছে। গবেষক বেনেদেত্তা বের্তি (Benedetta Berti) এই ধরনের সংগঠনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাইব্রিড অ্যাক্টর বা সংকর শক্তি (Hybrid Actor) প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন (Berti, 2013)। তার মতে, হিজবুল্লাহ একই সাথে সামাজিক সেবাদাতা এবং সামরিক শক্তির রূপ ধারণ করে রাষ্ট্রের ভেতরের দুর্বলতাকে নিজেদের শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।
এই সমান্তরাল সামাজিক ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে বিশাল আর্থিক অবকাঠামো। স্থানীয় অনুদান ছাড়াও ইরান থেকে আসা অর্থ এবং প্রবাসী লেবাননি শিয়া ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক থেকে হিজবুল্লাহর তহবিলে অর্থ আসে। অনুসন্ধানী গবেষক ম্যাট লেভিট (Matthew Levitt) হিজবুল্লাহর বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে লাতিন আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা ও ইউরোপের বাণিজ্য রুটগুলোকে ব্যবহার করে সংগঠনটি আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করে (Levitt, 2013)। নিজস্ব সামাজিক সেবা, অর্থায়ন এবং সামরিক নিরাপত্তার এই জাল হিজবুল্লাহকে লেবানন রাষ্ট্রের ভেতরে একটি প্রায় সম্পূর্ণ ‘সমান্তরাল রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে।
সামরিক সক্ষমতা, অসম যুদ্ধকৌশল ও সংঘাতের ইতিহাস (Military Capabilities, Asymmetric Warfare and History of Conflicts)
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে হিজবুল্লাহকে কোনো সাধারণ অরাষ্ট্রীয় মিলিশিয়া বলা চলে না। গত চার দশকে তারা একটি গেরিলা দল থেকে প্রায় আধা-নিয়মিত বা নিয়মিত সামরিক বাহিনীর মতো সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ শতকের আশির দশকে মার্কিন দূতাবাস এবং বহুজাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও পশ্চিমা নাগরিকদের জিম্মি করার মধ্য দিয়ে তাদের রক্তাক্ত যুদ্ধকৌশল শুরু হয়েছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন আসে। তারা প্রচলিত গেরিলা যুদ্ধের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির সফল মিশ্রণ ঘটিয়ে গড়ে তোলে এক জটিল অসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare)।
সামরিক ইতিহাসবিদ নিকোলাস ব্ল্যানফোর্ড (Nicholas Blanford) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের শৃঙ্খলা, গোপন সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক নির্মাণ এবং রকেট প্রযুক্তির ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো প্রথাগত সেনাবাহিনীর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে (Blanford, 2011)। ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনার দীর্ঘ আঠারো বছরের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে হিজবুল্লাহ পুরো আরব বিশ্বে নিজেদের বীরোচিত প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে জাহির করে। এরপর ২০০৬ সালের ৩৪ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যেভাবে উন্নত ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং দূরপাল্লার রকেট ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল, তা আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের বিস্মিত করে।
| সংঘাতের পর্যায় | সময়কাল | প্রধান প্রতিপক্ষ | ব্যবহৃত মূল সামরিক কৌশল ও প্রভাব |
| আদি প্রতিরোধ ও জিম্মিদশা | ১৯৮২–১৯৮৫ | ইসরায়েল ও বহুজাতিক বাহিনী | আত্মঘাতী বোমা হামলা, চোরাগোপ্তা আক্রমণ ও জিম্মি সংকট |
| গেরিলা অভিযান | ১৯৮৫–২০০০ | ইসরায়েল ও সাউথ লেবানন আর্মি | সুড়ঙ্গ যুদ্ধ, আইইডি বিস্ফোরণ এবং ২০০০ সালে ইসরায়েলি প্রত্যাহার |
| লেবানন যুদ্ধ (জুলাই যুদ্ধ) | ২০০৬ | ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী | ব্যাপক রকেট নিক্ষেপ, ট্যাংক-বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল ও বাংকার প্রতিরোধ |
| সিরীয় গৃহযুদ্ধে সম্পৃক্ততা | ২০১২–২০২০ | সিরীয় বিদ্রোহী ও আইএসআইএস | নগর যুদ্ধ, প্রচলিত পদাতিক আক্রমণ ও অঞ্চল দখলের লড়াই |
সামরিক বিশ্লেষক স্টিভেন বিডল (Stephen Biddle) এবং জেফ্রি ফ্রাইডম্যান (Jeffrey A. Friedman) ২০০৬ সালের যুদ্ধের সামরিক দিকটি খতিয়ে দেখে দেখিয়েছেন যে হিজবুল্লাহ কেবল হিট-অ্যান্ড-রান গেরিলা কৌশলে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা সুদৃঢ় বাংকারে অবস্থান নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ইসরায়েলি পদাতিক ও সাঁজোয়া বহরের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান বজায় রেখেছিল (Biddle & Friedman, 2008)। বর্তমানে তাদের হাতে রয়েছে লক্ষাধিক নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র, যা গভীর সমুদ্রের গ্যাসক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের প্রধান শহরগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম। ফলে হিজবুল্লাহকে কেবল একটি মিলিশিয়া না বলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আধা-রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
আঞ্চলিক প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রতিরোধ অক্ষ (Regional Power Dynamics and the Axis of Resistance)
হিজবুল্লাহ কেবল লেবাননের সীমানার ভেতরে আবদ্ধ কোনো আন্দোলন নয়, বরং তারা ইরানের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষ (Axis of Resistance)-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই আঞ্চলিক জোটের লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব খর্ব করা এবং ইসরায়েলকে অবরুদ্ধ করে রাখা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধের সমীকরণ ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে হিজবুল্লাহ ইরানের জন্য এক অমূল্য কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে কাজ করে (Byman, 2015)। তেহরান যখন সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না, তখন হিজবুল্লাহ তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ বাস্তবায়নের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।
২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে হিজবুল্লাহর আঞ্চলিক ভূমিকায় এক ঐতিহাসিক বাঁক দেখা যায়। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে রক্ষা করতে হিজবুল্লাহ হাজার হাজার যোদ্ধা পাঠিয়ে সরাসরি রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়। কুসাইর ও আলেপ্পোর মতো কৌশলগত শহরগুলোতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসাদ সরকারের টিকে থাকা নিশ্চিত করে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক রডজার শানাহান (Rodger Shanahan) দেখিয়েছেন যে সিরিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে হিজবুল্লাহ কেবল লেবাননের শিয়া স্বার্থ নয়, বরং একটি আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তিতে পরিণত হয় (Shanahan, 2015)। তবে এই সম্পৃক্ততা তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক ক্ষতিও ডেকে আনে; বহু সাধারণ সুন্নি আরব জনগোষ্ঠীর চোখে হিজবুল্লাহ তার সাবেক জনপ্রিয় ‘প্রতিরোধের নায়ক’ ভাবমূর্তি হারিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক মিলিশিয়া হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে।
সিরিয়ার বাইরেও এই সংগঠনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর সাথে প্রযুক্তি ও তথ্য আদান-প্রদানে হিজবুল্লাহ প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। ইতিহাসবিদ ডমিনিক অ্যাভন (Dominique Avon) এবং অ্যানা-মেলিসা খালাফ (Anaïs-Trissa Khatchadourian) দেখিয়েছেন যে হিজবুল্লাহ কীভাবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি আদর্শ প্রাতিষ্ঠানিক মডেল ও পরামর্শক শক্তিতে পরিণত হয়েছে (Avon & Khatchadourian, 2012)। এইভাবে লেবাননের স্থানীয় একটি আন্দোলন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক একীভবন ও সমকালীন সংকট (Internal Political Integration and Contemporary Dilemmas)
লেবাননের জটিল ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হিজবুল্লাহ বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী নিয়ামক শক্তি। ১৯৯২ সালে প্রথমবার সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। এরপর থেকে প্রতিটি সরকার গঠনে হিজবুল্লাহর সমর্থন বা ভেটো ক্ষমতা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সালে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডের পর যখন লেবাননের রাজনীতি ‘১৪ মার্চ’ (পশ্চিমা ও সৌদিপন্থি) এবং ‘৮ মার্চ’ (হিজবুল্লাহ ও সিরিয়াপন্থি) ব্লকে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন হিজবুল্লাহ জোট রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
তবে এই রাজনৈতিক আধিপত্য হিজবুল্লাহকে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখেও দাঁড় করিয়েছে। ২০০৮ সালে লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর নিজস্ব টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বন্ধ করার উদ্যোগ নিলে বৈরুতের রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। হিজবুল্লাহ সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে বৈরুতের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সাময়িকভাবে দখল করে নেয়, যা লেবাননের খ্রিষ্টান ও সুন্নি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে। সমাজবিজ্ঞানী পল সালেম (Paul Salem) এই সংকট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডার লেবাননের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে এক চিরন্তন দ্বন্দ্বে লিপ্ত (Salem, 2008)। একদিকে তারা সংসদের অংশীদার, অন্যদিকে তাদের সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের কোনো আইনি নজরদারির তোয়াক্কা করে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লেবাননের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ধস হিজবুল্লাহর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালের গণবিক্ষোভে লেবাননের হাজার হাজার মানুষ সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে, যেখানে তারা প্রচলিত দলগুলোর পাশাপাশি হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয়। যদিও সংগঠনের শীর্ষ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ এসব বিক্ষোভকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভ পুরোপুরি মুছে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় ভূরাজনীতিতে ইসরায়েলের সাথে নিয়মিত উত্তেজনা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং লেবাননের রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্ব হিজবুল্লাহকে এক দ্বিমুখী টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তারা কি লেবাননের একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রের মূলধারায় মিশে যাবে, নাকি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সশস্ত্র দাবার ঘুঁটি হিসেবেই নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে – এই প্রশ্নটিই এখন তাদের অস্তিত্বের মূল পরীক্ষা।
আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (Irish Republican Army): জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাস
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিভাজন ও রক্তক্ষয়ী সূচনা (Historical Context: Partition and Bloody Beginnings)
আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট কিংবা ডেরির অলিগলিতে হাঁটলে ধূসর ইটের দেয়ালগুলোতে আঁকা বিশাল সব দেয়ালচিত্র চোখে পড়ে। কোথাও রাইফেল হাতে মুখোশধারী গেরিলা যোদ্ধা, কোথাও বা অনশনরত যুবকের মলিন মুখ। এই ছবিগুলো কোনো সাধারণ চিত্রকর্ম নয়, বরং এগুলো হলো উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। এই লড়াইয়ের পুরোভাগে কয়েক দশক ধরে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত ছিল, তা হলো আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা সংক্ষেপে আইআরএ। এই সংগঠনের জন্ম কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ছিল না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আইরিশ অসন্তোষের ধারাবাহিক পরিণতি।
আইরিশ জাতীয়তাবাদের আধুনিক পর্বের সূচনা হয়েছিল ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক ডাবলিনে। সেখানে কবি, শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মীরা মিলে শুরু করেছিলেন এক সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যা ইতিহাসে ইস্টার রাইজিং (Easter Rising) নামে পরিচিত। ব্রিটিশ বাহিনী সেই বিদ্রোহ দমন করে এবং শীর্ষ বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে এই রক্তপাত আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার বদলে আইরিশ জনগণের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। ইতিহাসবিদ টিম প্যাট কুগান (Tim Pat Coogan) তার আকর গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে এই অভ্যুত্থানের ধ্বংসস্তূপ থেকেই আদি আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির জন্ম হয়েছিল (Coogan, 2002)। মাইকেল কলিন্সের মতো তুখোড় গেরিলা নেতার পরিচালনায় এই আদি বাহিনী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক সফল চোরাগোপ্তা যুদ্ধ পরিচালনা করে।
এর পরিণতিতে ১৯২১ সালে স্বাক্ষরিত হয় বহুল আলোচিত অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের ২৬টি কাউন্টি নিয়ে গঠিত হয় ‘আইরিশ ফ্রি স্টেট’ (পরবর্তীকালে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র)। কিন্তু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬টি প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টি নিয়ে গঠিত হয় উত্তর আয়ারল্যান্ড, যা যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থেকে যায়। এই বিভাজনকে মেনে নিতে পারেনি আইরিশ রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ। লেখক রিচার্ড ইংলিশ (Richard English) আইআরএ-র ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে দ্বীপটির এই কৃত্রিম বিভাজনই পরবর্তী কয়েক দশকের সহিংসতার মূল বীজ বপন করেছিল (English, 2003)। বিভক্ত আয়ারল্যান্ডকে পুনরায় একত্রিত করে একটি অবিভাজ্য ও স্বাধীন সর্ব-আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র কায়েম করাই হয়ে দাঁড়ায় আইরিশ রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক আদর্শ।
দ্য ট্রাবলস ও প্রোভিশনাল আইআরএ-র উত্থান (The Troubles and the Rise of the Provisional IRA)
উত্তর আয়ারল্যান্ড রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকলেও সেখানকার অভ্যন্তরীণ সমাজব্যবস্থা ছিল চরম বৈষম্যমূলক। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রোটেস্ট্যান্ট ইউনিয়নবাদীরা রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশ প্রশাসন ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। সংখ্যালঘু ক্যাথলিক জাতীয়তাবাদীরা সেখানে কর্মসংস্থান, আবাসন ও ভোটাধিকারের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল। ষাটের দশকের শেষভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিকরা শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সমাবেশ শুরু করে। কিন্তু এই অহিংস আন্দোলনকে দমন করতে ইউনিয়নবাদী চরমপন্থীরা এবং স্থানীয় পুলিশ বাহিনী সশস্ত্র হামলা চালায়।
সহিংসতার মুখে ক্যাথলিক জনপদগুলোতে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানী নিয়াল ও ডকার্টেইগ (Niall Ó Dochartaigh) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৬৯ সালের অগাস্ট মাসে ডেরির ‘ব্যাটল অব দ্য বগসাইড’ এবং বেলফাস্টের দাঙ্গাই পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয় (Ó Dochartaigh, 1997)। এই সময় ব্রিটিশ সরকার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাস্তায় নিয়মিত সেনাবাহিনী নামায়। ক্যাথলিকরা শুরুতে ব্রিটিশ সেনাদের ত্রাণকর্তা মনে করে স্বাগত জানালেও অল্পদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। ব্রিটিশ বাহিনী যখন ইউনিয়নবাদীদের পক্ষ নিয়ে ক্যাথলিক এলাকাগুলোতে কারফিউ ও ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে, তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা আইআরএ নেতৃত্ব নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
১৯৬৯ সালের শেষভাগে মতাদর্শিক ও কৌশলগত প্রশ্নে আইআরএ বিভক্ত হয়ে যায়। প্রাচীন মার্ক্সবাদী অংশটি সংস্কারের কথা বললেও তরুণ কট্টরপন্থীরা দ্রুত সশস্ত্র আত্মরক্ষার ডাক দেয়। এভাবেই জন্ম নেয় প্রোভিশনাল আইআরএ (Provisional IRA) বা প্রোভোস। অনুসন্ধানী সাংবাদিক এডওয়ার্ড মলনি (Ed Moloney) আইআরএ-র গোপন ইতিহাস উন্মোচন করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে সাধারণ ক্যাথলিকদের কাছে প্রোভিশনালরা ছিল তাদের একমাত্র সশস্ত্র রক্ষাকবচ (Moloney, 2002)। এরপর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ডেরি শহরে ঘটে যায় এক রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি, যা ব্লাডি সানডে (Bloody Sunday) নামে পরিচিত। ব্রিটিশ প্যারাট্রুপাররা নিরস্ত্র মিছিলের ওপর গুলি চালিয়ে ১৪ জন সাধারণ নাগরিককে হত্যা করে। এই ঘটনা হাজার হাজার আইরিশ তরুণকে সরাসরি প্রোভিশনাল আইআরএ-র গোপন সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করে এবং এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূচনা ঘটায়, যাকে ইতিহাসে দ্য ট্রাবলস (The Troubles) বলা হয়।
আদর্শিক ভিত্তি: আইরিশ জাতীয়তাবাদ বনাম ধর্মনিরপেক্ষ রিপাবলিকানিজম (Ideological Foundations: Irish Nationalism versus Secular Republicanism)
আইরিশ রিপাবলিকান আন্দোলনের বৈচারিক ভিত্তি ছিল বেশ জটিল। সাধারণ দৃষ্টিতে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই লড়াইকে প্রায়শই একটি ক্যাথলিক বনাম প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে চিত্রিত করা হতো। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে আইআরএ নিজেকে কখনোই কোনো সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় শক্তি হিসেবে দাবি করেনি। তাদের আদর্শিক শেকড় প্রোথিত ছিল অষ্টাদশ শতকের মহান আইরিশ বিপ্লবী উলফ টোনের ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক দর্শনে। সেই দর্শনের লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলে সব আইরিশ নাগরিককে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করা।
বাস্তবতার জমিনে পরিস্থিতি ছিল বেশ ভিন্ন। গবেষক রবার্ট হোয়াইট (Robert W. White) রিপাবলিকান আন্দোলনকারীদের মৌখিক ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে সদস্যদের বড় অংশই ধর্মীয় পরিচয়ে ক্যাথলিক পরিবারের সন্তান হলেও তাদের রাজনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল কড়া ঔপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদ (White, 1993)। তারা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে দেখত এক অবৈধ দখলদার শক্তি হিসেবে। তাদের কাছে ব্রিটিশ সেনাদের উপস্থিতি ছিল আইরিশ সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। ফলে জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে ধর্ম এখানে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে, যদিও আনুষ্ঠানিক নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা সবসময় তুলে ধরা হতো।
নব্বইয়ের দশকের দিকে রিপাবলিকান আন্দোলন তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে আরও শাণিত করে। তাদের রাজনৈতিক শাখা শিন ফেইন (Sinn Féin) এক নতুন রণকৌশল গ্রহণ করে, যা ইতিহাসে ব্যালট ও আরমালাইট কৌশল (Armalite and Ballot Box Strategy) নামে পরিচিতি পায়। এই কৌশলের প্রবক্তারা ঘোষণা করেন যে তারা এক হাতে আরমালাইট রাইফেল দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে এবং অন্য হাতে ব্যালট পেপার দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্রেন্ডন ও’লিয়ারি (Brendan O’Leary) এই দ্বৈত কাঠামোর বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে সামরিক চাপ এবং রাজনৈতিক দরকষাকষিকে একসাথে ব্যবহার করে আইআরএ ব্রিটিশ সরকারকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছিল (O’Leary, 2005)।
সাংগঠনিক কাঠামো, সবুজ বই ও শহীদি বয়ান (Organizational Structure, The Green Book and the Martyrdom Narrative)
শুরুর দিকে প্রোভিশনাল আইআরএ প্রচলিত সামরিক বাহিনীর মতো ব্যাটালিয়ন ও কোম্পানি কাঠামোতে কাজ করত। কিন্তু সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ এবং স্থানীয় পুলিশের ইনফর্মার বা তথ্যদাতার বিস্তার তাদের বড় বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়। এই সংকট থেকে বাঁচতে ১৯৭৭ সালের দিকে আইআরএ তাদের পুরো সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে ফেলে এবং গোপন সেল পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়। এই ছোট ছোট দলগুলোকে বলা হতো অ্যাক্টিভ সার্ভিস ইউনিট (Active Service Units – ASU)। একেকটি সেলে মাত্র তিন থেকে চারজন যোদ্ধা থাকত এবং এক সেলের সদস্যরা অন্য সেলের সদস্যদের পরিচয় জানত না।
এই গোপন সংগঠনটি পরিচালিত হতো একটি কঠোর প্রশিক্ষণ ও আচরণবিধির মাধ্যমে। প্রতিটি সদস্যকে পড়তে হতো তাদের অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা বই, যার নাম ছিল দ্য গ্রিন বুক (The Green Book)। নিরাপত্তা বিশ্লেষক জে. বাউয়ার বেল (J. Bowyer Bell) এই বইটির গুরুত্ব তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে এটা কেবল অস্ত্র চালনার নিয়ম শেখাত না, বরং ব্রিটিশ সেনাদের হাতে ধরা পড়লে জিজ্ঞাসাবাদ কীভাবে প্রতিরোধ করতে হবে এবং মানসিক শক্তি কীভাবে ধরে রাখতে হবে, তার বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দিত (Bell, 1997)। এই বইতে সদস্যদের স্পষ্ট করে বলা হতো যে ব্রিটিশ আদালতকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া যাবে না এবং আদালতে দাঁড়িয়ে কোনো আইআরএ সদস্য নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে কোনো কথা বলবে না।
সংগঠনটির সদস্যদের ধরে রাখার পেছনে আরেকটি বড় শক্তি ছিল আত্মত্যাগ ও শহীদি বয়ান। ১৯৮১ সালে ব্রিটিশ কারাগারের ভেতরে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘট এই আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার যখন আইআরএ বন্দীদের রাজনৈতিক মর্যাদা বাতিল করে সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন, তখন তরুণ নেতা ববি স্যান্ডস অনশন শুরু করেন। ৬৬ দিন না খেয়ে থাকার পর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ববি স্যান্ডস মৃত্যুবরণ করেন এবং তার পথ ধরে আরও নয়জন তরুণ আইআরএ যোদ্ধা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সাংবাদিক কেভিন টুলিস (Kevin Toolis) এই আত্মত্যাগের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বর্ণনা করে দেখিয়েছেন যে এই অনশন ধর্মঘট আইরিশ রিপাবলিকান আন্দোলনকে বিশ্বমঞ্চে এক গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক সহানুভূতির স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল (Toolis, 1995)।
কৌশলগত সহিংসতা ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ (Strategic Violence and Economic Targeting)
প্রোভিশনাল আইআরএ-র সামরিক কার্যক্রম কেবল উত্তর আয়ারল্যান্ডের পাহাড়ি সীমান্ত কিংবা বেলফাস্টের গলিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সত্তরের দশক থেকে তারা সংঘাতের আঁচ সরাসরি ব্রিটেনের মাটিতে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে। তাদের যুক্তি ছিল, লন্ডনের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধের ভয় ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিজের চোখে না দেখবে, ততক্ষণ তারা আয়ারল্যান্ড ছাড়বে না। এই উদ্দেশ্যে তারা ব্রিটেনের বড় বড় শহরে একের পর এক শক্তিশালী বোমা হামলা চালাতে শুরু করে। বার্মিংহাম ও গিল্ডফোর্ডের পানশালায় বোমা বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে রাজপথে প্রহরারত ব্রিটিশ অশ্বারোহী বাহিনীর ওপর হামলা ছিল সেই কৌশলেরই অংশ।
আইআরএ-র অন্যতম দুঃসাহসিক অপারেশন ছিল ১৯৮৪ সালের ব্রাইটন গ্র্যান্ড হোটেলে চালানো বোমা হামলা। সেখানে ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির বার্ষিক সম্মেলন চলছিল এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার উপস্থিত ছিলেন। থ্যাচার অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও পাঁচজন নিহত হন। হামলার পর আইআরএ এক বিখ্যাত বিবৃতিতে ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করে বলেছিল: “আজ আপনারা ভাগ্যবান ছিলেন, কিন্তু মনে রাখবেন, আপনাদের সবসময় ভাগ্যবান হতে হবে; আমাদের কেবল একবার সফল হলেই চলবে।” গবেষক এম. এল. আর. স্মিথ (M. L. R. Smith) আইআরএ-র এই সামরিক কৌশল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে তাদের মূল লক্ষ্য ব্রিটিশ বাহিনীকে সরাসরি সামরিকভাবে পরাস্ত করা ছিল না, বরং তাদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করা (Smith, 1995)।
নব্বইয়ের দশকে আইআরএ তাদের হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ডকে। তারা লন্ডনের ফিন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট, বিশপসগেট, ক্যানারি ওয়ার্ফ এবং ম্যানচেস্টারের বাণিজ্যিক কেন্দ্রে দানবীয় আকারের ট্রাক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন ম্যাকগ্যারি (John McGarry) অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব মূল্যায়ন করে দেখিয়েছেন যে এই বাণিজ্যিক অবকাঠামোগুলোতে কোটি কোটি পাউন্ডের ক্ষয়ক্ষতি ব্রিটিশ পুঁজিপতি ও সরকারকে এই বার্তা দেয় যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংঘাতকে সামরিকভাবে দমিয়ে রাখা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব (McGarry, 2001)। এই অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক সেমটেক্স বিস্ফোরক এবং কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছিল লিবিয়ার তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি, যা আইআরএ-কে দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামরিক সক্ষমতা দিয়েছিল।
| হামলার ঘটনা | সাল | স্থান | লক্ষ্য ও কৌশলগত প্রভাব |
| ব্লাডি ফ্রাইডে | ১৯৭২ | বেলফাস্ট | ৮০ মিনিটের ব্যবধানে ২২টি বোমা বিস্ফোরণ; নগর পরিবহন ও জনজীবন অচল করার প্রয়াস |
| মাউন্টব্যাটেন হত্যাকাণ্ড | ১৯৭৯ | স্লিগো উপকূল | ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বোটে বিস্ফোরণ; রাজপরিবারে গভীর মানসিক আঘাত |
| ব্রাইটন হোটেল বোমা হামলা | ১৯৮৪ | ব্রাইটন | কনজারভেটিভ পার্টির সম্মেলন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে হত্যার চেষ্টা |
| ডাউনিং স্ট্রিট মর্টার হামলা | ১৯৯১ | লন্ডন | প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন দূরপাল্লার মর্টার শেল নিক্ষেপ |
| বিশপসগেট ও ক্যানারি ওয়ার্ফ | ১৯৯৩/১৯৯৬ | লন্ডন | ব্রিটেনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ডে কোটি কোটি পাউন্ডের অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি |
শান্তি প্রক্রিয়া, গুড ফ্রাইডে চুক্তি ও নিরস্ত্রীকরণ (Peace Process, Good Friday Agreement and Decommissioning)
তিন দশকের সংঘাত, সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব উত্তর আয়ারল্যান্ডের উভয় পক্ষকেই এক ক্লান্তিকর অচলাবস্থার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। আইআরএ বুঝতে পেরেছিল যে কেবল বন্দুকের নল দিয়ে ব্রিটিশদের সম্পূর্ণ বিতাড়িত করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারও উপলব্ধি করেছিল যে শত চেষ্টা করেও সামরিক উপায়ে আইআরএ-কে পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না। ঠিক এই জায়গায় শুরু হয় গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যান্ড লেবার পার্টির নেতা জন হিউম এবং শিন ফেইনের নেতা জেরি অ্যাডামসের মধ্যে দীর্ঘ গোপন সংলাপ এই অচলাবস্থা ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ তৈরি করে।
১৯৯৪ সালে আইআরএ তাদের সামরিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯৮ সালের ১০ এপ্রিল স্বাক্ষরিত হয় এক যুগান্তকারী চুক্তি, যা ইতিহাসে গুড ফ্রাইডে চুক্তি (Good Friday Agreement) বা বেলফাস্ট চুক্তি নামে পরিচিত। শান্তি গবেষক রজার ম্যাকগিন্টি (Roger Mac Ginty) এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক ক্ষমতার ভারসাম্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Mac Ginty, 2006)। চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল ‘সম্মতির নীতি’ বা প্রিন্সিপাল অব কনসেন্ট। এতে বলা হয়, উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ থাকবে যতক্ষণ না সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ একটি গণতান্ত্রিক গণভোটের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের সাথে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সাথে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ভিত্তিতে একটি যৌথ সরকার গঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়।
চুক্তি বাস্তবায়নের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল আইআরএ-র অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা। দীর্ঘ আলোচনা ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর কানাডার জেনারেল জন ডি চ্যাসটেলিনের নেতৃত্বাধীন স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ কমিশন (Independent International Commission on Decommissioning) এর তত্ত্বাবধানে ২০০৫ সালের মধ্যে আইআরএ তাদের সমস্ত অস্ত্র, গোপন বাংকার ও বিস্ফোরক আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের সামনে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেয়। ইতিহাসবিদ মার্টিন ম্যাককলেই (Martin McCleery) নিরস্ত্রীকরণের এই প্রক্রিয়াকে ইউরোপের অন্যতম সফল শান্তি প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (McCleery, 2015)।
যদিও কিছু কট্টরপন্থী বিভক্ত গোষ্ঠী যেমন ‘রিয়েল আইআরএ’ কিংবা ‘কন্টিনিউটি আইআরএ’ ১৯৯৮ সালের ওমা বোমা হামলার মতো সহিংসতা ঘটিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া বানচালের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল, তবে তাদের সেই প্রয়াস সাধারণ জনগণের সমর্থন পায়নি। আজ প্রোভিশনাল আইআরএ আর কোনো সশস্ত্র লড়াইয়ের ময়দানে নেই। তাদের রাজনৈতিক শাখা শিন ফেইন বর্তমানে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ভোটের মাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। ব্যারাকের অন্ধকার আর বারুদের গন্ধ পেছনে ফেলে একটি রক্তাক্ত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হতে পারে, আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির ইতিহাস সেই বাস্তবতারই এক অনন্য নিদর্শন।
ফার্ক (FARC): গেরিলা ও বিপ্লবী সহিংসতা
ঐতিহাসিক পটভূমি: লা ভায়োলেন্সিয়া, কৃষক আত্মরক্ষা ও মারকুয়েতালিয়া প্রজাতন্ত্র (Historical Background: La Violencia, Peasant Self-Defense and the Marquetalia Republic)
কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটার কোলাহল ছেড়ে দক্ষিণ বা পূর্বাঞ্চলের দিকে গেলে আন্দিজ পর্বতমালার বিশাল বিস্তার চোখে পড়ে। পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমে থাকে, নিচে ঘন সবুজ বনাঞ্চল। শান্ত এই প্রকৃতির আড়ালে লুকিয়ে আছে ল্যাটিন আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে এই পর্বতমালার খাঁজে খাঁজে এবং গভীর অরণ্যে চলেছে এক অসম লড়াই। এই দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পুরোভাগে যে নামটি বিশ্বের নজর কেড়েছিল, তা হলো রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া বা ফার্ক (FARC)। পাহাড়ি ট্রেইলে ভারী বুটের শব্দ, কাঁধে ঝোলানো স্বয়ংক্রিয় রাইফেল আর রেশনের ব্যাগে মার্ক্সবাদী পুস্তিকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই গেরিলারা কোনো আকস্মিক দলছুট চক্র ছিল না। তাদের শেকড় পোঁতা ছিল কলম্বিয়ার গ্রামীণ কৃষকদের দীর্ঘদিনের ভূমি সংকট, অর্থনৈতিক অবিচার এবং এক সর্বগ্রাসী গৃহযুদ্ধের ভেতর।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সূচনা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিলের এক বিষাদময় দুপুরে। বোগোটার রাজপথে সেদিন সাধারণ মানুষের প্রিয় উদারপন্থী নেতা হোর্হে এলিয়েসার গাইতানকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজপথে শুরু হয় ভয়াবহ জনবিস্ফোরণ, যা ইতিহাসে ‘বোগোতাজো’ নামে পরিচিত। মুহূর্তের মধ্যে পুরো কলম্বিয়া এক সর্বগ্রাসী সংঘাতের মুখে পড়ে, যাকে বলা হয় লা ভায়োলেন্সিয়া (La Violencia) বা সহিংসতার যুগ। কনজারভেটিভ পার্টি ও লিবারেল পার্টির মধ্যকার সেই রক্তক্ষয়ী দশকে প্রায় দুই লক্ষ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক গ্রাম ছেড়ে দুর্গম পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা গড়ে তোলে নিজস্ব সশস্ত্র আত্মরক্ষা কমিটি, যাদের স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘আউতোদেফেনসাস কাম্পেসিনাস’। ইতিহাসবিদ এডুয়ার্ডো পিজারো লিওনগোমেজ (Eduardo Pizarro Leongómez) ফার্কের উৎপত্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে লা ভায়োলেন্সিয়ার সেই অন্ধ সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের মুখে কৃষকদের এই যৌথ আত্মরক্ষা কমিটিগুলোই ছিল ভবিষ্যতের বিপ্লবী গেরিলাদের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (Pizarro Leongómez, 1996)।
১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে এসে এসব বাস্তুচ্যুত কৃষক দক্ষিণাঞ্চলের মারকুয়েতালিয়া, রিওচিকিতো এবং এল পাতোর মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের কয়েকটি স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল গড়ে তোলে। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো শাসন ছিল না। কৃষকেরা যৌথ খামারের মাধ্যমে চাষাবাদ করত, জলসেচের ব্যবস্থা করত এবং নিজস্ব সমবায় সমিতির মাধ্যমে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখত। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে কলম্বিয়া সরকার ও মার্কিন প্রশাসন এই স্বশাসিত এলাকাগুলোকে মেনে নিতে পারেনি। রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের চোখে এগুলো ছিল সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতরে ‘স্বাধীন কমিউনিস্ট ছিটমহল’। ১৯৬৪ সালের মে মাসে কলম্বিয়া সেনাবাহিনী মার্কিন সামরিক সহায়তায় ‘অপারেশন মারকুয়েতালিয়া’ পরিচালনা করে সেই নিরীহ কৃষক বসতিতে নির্বিচার বিমান ও পদাতিক হামলা চালায়। সমাজবিজ্ঞানী মার্ক চেরনিক (Marc Chernick) এই আগ্রাসনের ফলাফল ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এই বোমাবর্ষণ গ্রামীণ কৃষকদের মনে এই বিশ্বাস স্থায়ী করে দেয় যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাঁচার কোনো অধিকার তাদের নেই (Chernick, 2007)। মারকুয়েতালিয়ার পতনের পর পেদ্রো আন্তোনিও মারিন (যিনি পরবর্তীকালে ‘ম্যানুয়েল মারুলান্দা ভেলেজ’ বা ‘তিরোফিক্সো’ নামে পরিচিত হন) মাত্র ৪৮ জন কৃষক সঙ্গীকে নিয়ে গহিন অরণ্যে আত্মগোপন করেন। ১৯৬৪ সালের ২৭ মে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সশস্ত্র গেরিলা আন্দোলনের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে ফার্ক নামে আত্মপ্রকাশ করে।
মতাদর্শিক বিবর্তন: মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ, কৃষি বিপ্লব ও বলিভারীয় রাজনীতি (Ideological Evolution: Marxism-Leninism, Agrarian Revolution and Bolivarian Politics)
ফার্কের বৈচারিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে উঠেছিল একটি দ্বিমুখী দর্শনের ওপর। একদিকে ছিল ধ্রুপদী মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ (Marxism-Leninism) এবং অন্যদিকে ছিল ল্যাটিন আমেরিকার মহান মুক্তিদাতা সিমন বলিভারের আদর্শ থেকে নেওয়া লাতিন জাতীয়তাবাদ। সূচনালগ্নে সংগঠনটি কলম্বিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক শাখা হিসেবে কাজ করত। তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল একটি সশস্ত্র সর্বহারা বিপ্লবের মাধ্যমে কলম্বিয়ার অলিগার্কি বা মুষ্টিমেয় ধনিক শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাদের কাছে কলম্বিয়ার প্রচলিত সংসদীয় ব্যবস্থা ছিল বড় বড় জমিদার ও পুঁজিপতিদের শোষণ টিকিয়ে রাখার একটি রাজনৈতিক ফাঁদ মাত্র।
ফার্কের রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রে সবসময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাদের কৃষি সংস্কার কর্মসূচি। কলম্বিয়ার গ্রামীণ সমাজের সবচেয়ে বড় অভিশাপ ছিল জমির চরম অসম বণ্টন। দেশের শতকরা এক ভাগ প্রভাবশালী ভূস্বামী পুরো দেশের অর্ধেকের বেশি উর্বর জমি নিজেদের দখলে রেখেছিল, আর লাখ লাখ সাধারণ কৃষক ছিল দিনমজুর। ফার্ক তাদের ১৯৬৪ সালের ঐতিহাসিক ‘কৃষি কর্মসূচি’র মাধ্যমে ঘোষণা করে যে তারা বড় বড় জমিদারি ভেঙে দিয়ে ভূমিহীন চাষিদের মাঝে জমি পুনর্বণ্টন করবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাজিম রিকানি (Nazih Richani) কলম্বিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে ফার্ক নিজেকে সবসময় শোষিত গরিব কৃষকের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে (Richani, 2002)। তারা কৃষকদের ফসল ফলানোর অধিকার দেওয়া, মহাজনদের শোষণ থেকে রক্ষা করা এবং স্থানীয় পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সামাজিক সালিশের দাবি জানিয়ে সাধারণ গ্রামীণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেছিল।
১৯৮২ সালে অনুষ্ঠিত ফার্কের সপ্তম গেরিলা সম্মেলনে তাদের মতাদর্শিক ও কৌশলগত অবস্থানে এক গভীর রূপান্তর ঘটে। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনে তারা নামের শেষে ‘ইপি’ বা পিপলস আর্মি (Ejército del Pueblo – EP) প্রত্যয়টি যুক্ত করে। তারা সাধারণ আঞ্চলিক আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরে এসে পুরো দেশজুড়ে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে রাজধানী বোগোটাকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করা। গবেষক মারিয়া ভিক্টোরিয়া লোরেন্তে (María Victoria Llorente) এই সামরিক রূপান্তর ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে আশির দশক থেকেই ফার্ক নিজেকে কেবল গ্রামীণ প্রতিরোধ আন্দোলন না ভেবে একটি জাতীয় মুক্তির সমান্তরাল সেনাবাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে (Llorente, 2002)। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বলয় ভেঙে পড়লে ফার্ক তাদের প্রচারণায় বলিভারীয় জাতীয়তাবাদের ওপর জোর বাড়ায়। তারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তির বয়ান সামনে এনে ল্যাটিন আমেরিকার অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথেও ভাবাদর্শিক মৈত্রী গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কঠোর নিয়মাবলী ও অরণ্যের সমান্তরাল শাসন (Institutional Structure, Strict Codes and Forest Parallel Governance)
একটি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংগঠন কীভাবে বৈরী পাহাড়ি জঙ্গলে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে পারে, তার রহস্য নিহিত ছিল ফার্কের কঠোর স্তরভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার মধ্যে। সংগঠনটি কোনো বিশৃঙ্খল মিলিশিয়া ছিল না, বরং তাদের পুরো কাঠামো সাজানো হয়েছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত সামরিক বিন্যাসে। সংগঠনের শীর্ষে অবস্থান করত সাত সদস্যের একটি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি, যাকে বলা হতো ‘সেক্রেটারিয়েট’ বা সচিবালয়। এর নিচে ছিল ২৫ সদস্যের সেন্ট্রাল হাই কমান্ড বা ‘এস্তাদো মেয়র সেন্ট্রাল’। সারা দেশের ভৌগোলিক অঞ্চলগুলোকে তারা সাতটি বড় ব্লকে ভাগ করেছিল, যেমন পূর্বাঞ্চলীয় ব্লক বা দক্ষিণাঞ্চলীয় ব্লক। প্রতিটি ব্লকের অধীনে সক্রিয় ছিল একাধিক ফ্রন্ট বা ‘ফ্রেন্তে’। প্রতিটি ফ্রন্টে নির্দিষ্ট সংখ্যক সশস্ত্র যোদ্ধা কঠোর কমান্ড কাঠামোর আওতায় দায়িত্ব পালন করত।
ফার্কের শিবিরের ভেতরের জীবন ছিল এক কঠিন শৃঙ্খলার অধীন। তাদের একটি লিখিত নিজস্ব সংবিধান, অভ্যন্তরীণ আচরণবিধি এবং কঠোর সামরিক দণ্ডবিধি ছিল। গেরিলাদের প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, অস্ত্র পরিষ্কার করা, শারীরিক কসরত এবং বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক ক্লাসে অংশ নিতে হতো। কোনো সদস্যের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলাভঙ্গ, মদ্যপান, ঊর্ধ্বতন কমান্ডারের আদেশ অমান্য করা, সাধারণ মানুষের সম্পদ চুরি কিংবা দলত্যাগের চেষ্টার বিচার হতো যুদ্ধকালীন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। শান্তি গবেষক ভার্জিনি বুভিয়ে (Virginia M. Bouvier) ফার্কের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে সাধারণ গ্রামীণ তরুণ-তরুণীদের শিবিরে এনে এক ধরনের কঠোর যৌথ জীবনে পুরোপুরি অভ্যস্ত করা হতো (Bouvier, 2009)। এই সংগঠনে নারী যোদ্ধাদের অনুপাত ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পুরো বাহিনীর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সদস্যই ছিল নারী, যারা পুরুষ সহযোদ্ধাদের মতোই পাহাড়ি রণাঙ্গনে ভারী অস্ত্র বহন করত এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত।
যেসব দুর্গম অঞ্চলে কলম্বিয়া রাষ্ট্রের কোনো প্রশাসনিক কাঠামো বা বিচারালয় ছিল না, সেখানে ফার্ক গড়ে তুলেছিল তাদের নিজস্ব সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা। স্থানীয় মানুষের বিরোধ মেটানো, বিবাহ বিচ্ছেদ, চুরি-ডাকাতি দমন এবং বনজ সম্পদ ব্যবহারের নিয়ম কানুন ফার্কের কমান্ডারেরাই ঠিক করে দিত। তারা বড় বড় ব্যবসায়ী ও খামার মালিকদের ওপর কর আরোপ করত এবং সেই অর্থ দিয়ে জঙ্গল এলাকায় কাঁচা রাস্তা, কাঠের সাঁকো ও চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণ করত। নিরাপত্তা গবেষক সান্দ্রা বোর্দা (Sandra Borda) ফার্কের এই অঞ্চলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রহীন গ্রামীণ জনপদে ফার্ক একটি সমান্তরাল শাসনকর্তার রূপ পরিগ্রহ করেছিল (Borda, 2012)। প্রান্তিক কৃষকদের কাছে আদালতের বিচারক বা পুলিশের চেয়ে ফার্কের স্থানীয় কমান্ডারের নির্দেশই ছিল চূড়ান্ত আইন। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ফার্ককে সাধারণ গেরিলাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এক সামাজিক শক্তিতে পরিণত করেছিল।
যুদ্ধ অর্থনীতি: কোকেন বাণিজ্য, অপহরণ ও চাঁদা আদায়ের অর্থনীতি (War Economy: Cocaine Trade, Kidnapping and Extortion Dynamics)
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ফার্কের বিপ্লবী চরিত্রে এক গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর যখন বিদেশি ভাবাদর্শিক অনুদান বন্ধ হয়ে গেল, তখন নিজেদের বিশাল সামরিক ব্যয় মেটাতে সংগঠনটি অবৈধ অর্থনীতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময়েই কলম্বিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের কাকায়েতা, গুয়াভিয়ারে এবং পুতুমায়োর মতো দুর্গম জঙ্গলগুলোতে কোকেন তৈরির প্রধান উপাদান কোকা পাতার চাষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফার্কের গেরিলারা শুরুতে কোকা চাষি বা ‘কোকালেরো’দের সরকারি আক্রমণ থেকে রক্ষা করার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের ওপর ‘গ্রামাজে’ বা নিরাপত্তা কর বসাতে শুরু করে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তারা নিজেরাই এই লাভজনক বাণিজ্যের প্রত্যক্ষ নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়।
মাদক অর্থনীতির সাথে এই গভীর সম্পৃক্ততা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জগতে ফার্ককে অপরাধ ও সন্ত্রাসের সংযোগ বা ক্রাইম-টেরর নেক্সাসের এক ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। গবেষক ফিল উইলিয়ামস (Phil Williams) ফার্কের যুদ্ধ অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে দলটি কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রেরণায় লড়াই করেনি, বরং কোকেন বাণিজ্যের শত শত মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক আয় তাদের এই যুদ্ধযন্ত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছিল (Williams, 2008)। মাদক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ভান্ডা ফেলবাব-ব্রাউন (Vanda Felbab-Brown) দেখিয়েছেন কীভাবে কোকা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ফার্ককে স্থানীয় কৃষকদের জীবিকার একমাত্র ভরসায় পরিণত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক কালোবাজার থেকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কেনার অবাধ আর্থিক সামর্থ্য জুগিয়েছিল (Felbab-Brown, 2010)। তারা অরণ্যের গভীরে নিজস্ব গবেষণাগারে কোকেন প্রক্রিয়াজাত করত এবং গোপন রানওয়ে দিয়ে বিমানে করে তা আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের হাতে তুলে দিত।
অর্থ উপার্জনের জন্য ফার্ক আরেকটি অমানবিক ও ভয়ংকর পথ বেছে নেয়, যা ছিল বিত্তবানদের অপহরণ। তারা ধনী শিল্পপতি, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, বড় খামার মালিক এবং বিদেশি প্রকৌশলীদের অপহরণ করে গহিন জঙ্গলে বছরের পর বছর আটকে রাখত এবং কোটি কোটি ডলার মুক্তিপণ আদায় করত। মহাসড়কে হঠাৎ ব্যারিকেড দিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্য থেকে সম্পদশালীদের বাছাই করে তুলে নেওয়ার এই কৌশলকে তারা নাম দিয়েছিল ‘পেসকাস মিলাগ্রোসাস’ বা অলৌকিক মাছ শিকার। ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ইনগ্রিদ বেতানকুরকে অপহরণ করার ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়। এর পাশাপাশি তারা বড় বড় তেল কোম্পানি ও বহুজাতিক সংস্থার ওপর তাদের কুখ্যাত ‘আইন ০০২’ জারি করে নিয়মিত চাঁদা বা বিপ্লবী ট্যাক্স দাবি করত। এই সব অনৈতিক অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং মাদক বাণিজ্যের কারণে ফার্ক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের সমস্ত নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর কাছে একটি সন্ত্রাসী মাদক কার্টেল হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
সর্বাত্মক যুদ্ধ, ড্রোন-স্মার্ট বোমা ও শীর্ষ নেতৃত্বের পতন (Total War, Smart Munitions and the Decapitation of Leadership)
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ফার্ক তাদের সামরিক শক্তির চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছিল। তখন তাদের সার্বক্ষণিক সশস্ত্র যোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় বিশ হাজারে। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস পাস্তরানা ফার্কের সাথে একটি ঐতিহাসিক শান্তি সংলাপ শুরু করার উদ্দেশ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুইজারল্যান্ডের সমান আয়তনের এক বিশাল এলাকাকে সম্পূর্ণ সেনামুক্ত ঘোষণা করেন, যা ‘কাগুয়ান শান্তি অঞ্চল’ নামে পরিচিত ছিল। তবে শান্তি আলোচনার সেই চার বছর ফার্ক তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দেওয়ার বদলে সেই সেনামুক্ত অঞ্চলকে অস্ত্র মজুত করার দুর্গ, গোপন বিমানঘাঁটি এবং অপহৃত ব্যক্তিদের আটকে রাখার নিরাপদ আস্তানায় পরিণত করে। ফলে ২০০২ সালের গোড়ার দিকে সেই শান্তি সংলাপ সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
২০০২ সালের নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কট্টরপন্থী নেতা আলভারো উরিবে, যার নিজের পিতাকে ফার্ক একসময় হত্যা করেছিল। উরিবে ক্ষমতায় এসেই ‘গণতান্ত্রিক নিরাপত্তা নীতি’ ঘোষণা করেন এবং ফার্ককে পুরোপুরি সামরিক উপায়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেন। এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ার বাহিনীকে পুনর্গঠন করতে ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’ কর্মসূচির আওতায় শত শত কোটি ডলারের আধুনিক সামরিক সহায়তা পাঠায়। অত্যাধুনিক ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের সাহায্যে গভীর জঙ্গলে দ্রুত সেনা মোতায়েন, নাইট ভিশন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উপগ্রহের সাহায্যে গোপন আস্তানা শনাক্ত করার মাধ্যমে কলম্বিয়ার যৌথ সামরিক বাহিনী ফার্কের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলোতে আঘাত হানতে শুরু করে। সামরিক কৌশলবিদ অ্যানজেল রাবাসা (Angel Rabasa) এবং পিটার চালকার (Peter Chalk) যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি ও নিখুঁত লেজার গাইডেড বোমার ব্যবহার ফার্কের সনাতন গেরিলা আস্তানাগুলোকে একে একে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছিল (Rabasa & Chalk, 2001)।
২০০৮ সালটি ছিল ফার্কের জন্য এক চরম সামরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের বছর। সেই বছরের ১ মার্চ ইকুয়েডর সীমান্তের ভেতরে ফার্কের আন্তর্জাতিক মুখপাত্র ও শীর্ষ কমান্ডার রাউল রেয়েসের গোপন ঘাঁটিতে কলম্বিয়ার বিমান হামলায় রেয়েস নিহত হন। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘ চার দশকের সর্বাধিনায়ক ম্যানুয়েল মারুলান্দা ভেলেজ (তিরোফিক্সো) বার্ধক্যজনিত রোগে অরণ্যের আস্তানায় মারা যান। এরপর ২০১০ সালে বিশেষ সামরিক অভিযানে নিহত হন ফার্কের সবচেয়ে দুধর্ষ সামরিক কমান্ডার মোনো খোজয় এবং ২০১১ সালে বিমান হামলায় প্রাণ হারান পরবর্তী শীর্ষ নেতা আলফোনসো কানো। ইতিহাসবিদ ম্যালকম ডিভেলিস (Malcolm Deas) কলম্বিয়ার সংঘাতের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক পতন, মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি এবং হাজার হাজার সাধারণ যোদ্ধার দলত্যাগ ফার্কের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল (Deas, 2012)। পাহাড়ে কোণঠাসা হয়ে পড়া গেরিলারা শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করতে বাধ্য হয় যে বন্দুকের নলের জোরে বোগোটার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা আর কখনোই সম্ভব নয়।
হাভানা শান্তি চুক্তি, ঐতিহাসিক নিরস্ত্রীকরণ ও পরবর্তী বাস্তবতা (Havana Peace Accords, Historic Disarmament and Post-Conflict Realities)
দীর্ঘ পাঁচ দশকের লড়াই, আড়াই লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি, হাজার হাজার মানুষের গুম এবং লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ মানুষের বাস্তুচ্যুতির পর অবশেষে কলম্বিয়ার সামনে শান্তির এক ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়। ২০১২ সালে কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সান্তোস এবং ফার্কের নতুন প্রধান রদ্রিগো লন্দোনিও (যিনি তিমোশেঙ্কো নামে সমধিক পরিচিত) কিউবার রাজধানী হাভানায় আনুষ্ঠানিক শান্তি সংলাপ শুরু করেন। নরওয়ে ও কিউবার সার্বক্ষণিক মধ্যস্থতায় টানা চার বছর ধরে চলা এই গভীর ও জটিল আলোচনায় মূলত পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়: গ্রামীণ ভূমি সংস্কার, সাবেক গেরিলাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অবৈধ মাদক বাণিজ্যের সমাধান, সংঘাতের শিকার মানুষদের ক্ষতিপূরণ এবং চূড়ান্ত নিরস্ত্রীকরণ।
বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৬ সালের অগাস্টে ঐতিহাসিক চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হয়। চুক্তিটি শুরুতে একটি জাতীয় গণভোটে সামান্য ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খায়, তবে পরবর্তীতে বিরোধীদের কিছু মতামত অন্তর্ভুক্ত করে কলম্বিয়ার কংগ্রেসে তা অনুমোদন করা হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ফার্ক তাদের পাঁচ দশকের সশস্ত্র লড়াইয়ের আনুষ্ঠানিক ইতি টানতে সম্মত হয়। জাতিসংঘের সরাসরি নজরদারিতে ফার্কের প্রায় সাত হাজার নিয়মিত গেরিলা তাদের সমস্ত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং জঙ্গল ক্যাম্প আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের কাছে হস্তান্তর করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সিনথিয়া আরনসন (Cynthia J. Arnson) এই শান্তি প্রক্রিয়াকে লাতিন আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল অথচ ফলপ্রসূ রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Arnson, 2016)। এই ঐতিহাসিক অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সান্তোসকে ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
অস্ত্র সমর্পণের পর ফার্ক একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যার নাম রাখা হয় ‘কমুনস’। চুক্তির অংশ হিসেবে কোনো নির্বাচনে না জিতেও তারা দেশটির জাতীয় সংসদে দশটি নির্দিষ্ট আসন লাভ করে, যাতে তারা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের কথা বলতে পারে। সাবেক যোদ্ধাদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠন করা হয় ‘স্পেশাল জুরিসডিকশন ফর পিস’ (জেইপি), যেখানে সাবেক কমান্ডাররা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেয়। তবে শান্তি-পরবর্তী কলম্বিয়ার পথচলা পুরোপুরি মসৃণ থাকেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল শিফটার (Michael Shifter) শান্তি বাস্তবায়নের সংকটগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে সরকারি প্রতিশ্রুতির ধীরগতি, সাবেক গেরিলাদের ওপর উগ্র ডানপন্থী প্যারামিলিটারি বাহিনীর গুপ্তহামলা এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি করেছে (Shifter, 2017)।
এই সংকটের সুযোগ নিয়ে ফার্কের কিছু বিদ্রোহী কমান্ডার, বিশেষ করে ইভান মার্কেজ ও জেসুস সান্ত্রিচের মতো শীর্ষ নেতারা শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করে পুনরায় জঙ্গলে ফিরে যান এবং ‘সেগুন্দা মারকুয়েতালিয়া’ নামে নতুন সশস্ত্র চক্র গড়ে তোলেন। এছাড়া ফার্কের খালি করে যাওয়া দুর্গম পাহাড়ি কোকেন রুটগুলো দখল করতে তৎপর হয়ে ওঠে আরেক বামপন্থী গেরিলা দল ইএলএন এবং ভয়ংকর অপরাধী সিন্ডিকেট ‘ক্লান দেল গোলফো’। তা সত্ত্বেও ফার্কের মূল সাংগঠনিক কাঠামোর এই বিলুপ্তি কলম্বিয়ার মাটিতে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। এই ইতিহাস দেখায় যে আদর্শের নামে শুরু হওয়া লড়াই যখন অপরাধের জালে জড়িয়ে যায়, তখন তা কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে; আবার সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেও আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শান্তির পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব।
আল-কায়েদা (Al-Qaeda): বৈশ্বিক জিহাদি নেটওয়ার্ক
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ভিত্তি: আফগান যুদ্ধ থেকে পেশোয়ারের আড্ডা (Origins and Historical Foundations: From the Afghan War to the Peshawar Encampments)
পাকিস্তানের সীমান্ত শহর পেশোয়ারের ধূলিমলিন অলিগলিতে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা তরুণদের ভিড় জমতে শুরু করেছিল। এদের কারও গায়ে ছিল লম্বা আরব আলখাল্লা, কারও মাথায় পাকানো পাগড়ি। আপাতদৃষ্টিতে এদের সাধারণ পর্যটক মনে হলেও এদের সবার চোখেমুখে ছিল এক ধরনের তীব্র রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শিক উন্মাদনা। তারা এসেছিল আফগানিস্তানের রুক্ষ পাহাড়ি গিরিখাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মির বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে অংশ নিতে। তৎকালীন আন্তর্জাতিক স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলো এই প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছিল। সেই সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আসা এই বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকদের আশ্রয় ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে গড়ে উঠেছিল ‘মাকতাব আল-খিদমাত’ নামের একটি সেবা দফতর। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আলেম আবদুল্লাহ আজম এবং সৌদি আরবের এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান ওসামা বিন লাদেন যৌথভাবে এই দফতর পরিচালনা করতেন। কিন্তু সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করার পর এই সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়।
১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে পেশোয়ারের এক গোপন আস্তানায় ওসামা বিন লাদেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা একটি দীর্ঘ বৈঠকে বসেন। সেই ঐতিহাসিক বৈঠকের হাতে লেখা কার্যবিবরণীতে প্রথমবার ‘আল-কায়েদা আল-আসকারিয়া’ বা সামরিক ভিত্তিমূল শব্দবন্ধটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করা হয়। প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক লরেন্স রাইট (Lawrence Wright) তার আকর গ্রন্থদ্য লুমিং টাওয়ার (The Looming Tower)-এ বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন যে আল-কায়েদা সূচনালগ্নে কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ছিল না, বরং এটা ছিল আফগান রণাঙ্গনে লড়াই করা অভিজ্ঞ আরব যোদ্ধাদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার ও লজিস্টিক রেজিস্ট্রি (Wright, 2006)। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্থায়ী প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী প্রস্তুত রাখা, যাতে মুসলিম বিশ্বের যেখানেই সংঘাত তৈরি হবে, সেখানেই এই বাহিনীকে দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব হয়।
আফগান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে ওসামা বিন লাদেন যখন নিজের দেশ সৌদি আরবে ফিরে যান, তখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন সংকটের বিস্ফোরণ ঘটে। ১৯৯০ সালের আগস্টে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকি বাহিনী কুয়েত দখল করে নেয়। এই পরিস্থিতিতে সৌদি রাজপরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীকে সৌদি আরবের মাটিতে ঘাঁটি গাড়ার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়। ইসলামের দুটি প্রধান পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মক্কা ও মদিনার ভূমিতে অমুসলিম পশ্চিমা সেনাদের এই অবস্থানকে বিন লাদেন তার বিশ্বাসের ওপর চরম আঘাত হিসেবে গণ্য করেন। তিনি রাজপরিবারের তীব্র সমালোচনা শুরু করেন, যার ফলে তাকে দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। প্রথমে সুদান এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ফের আফগানিস্তানের তোরাবোরা পাহাড়ে ফিরে এসে তালেবানদের আশ্রয়ে বিন লাদেন নতুন উদ্যমে সংগঠন পুনর্গঠন শুরু করেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেসন বার্ক (Jason Burke) আল-কায়েদার এই আদি রূপান্তর বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে আফগান রণাঙ্গনের একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক সেল ধাপে ধাপে বিশ্ব কাঁপানো সশস্ত্র নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়েছিল (Burke, 2003)।
আফগানিস্তানের কান্দাহার ও জালালাবাদের দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় তালেবানদের দেওয়া রাজনৈতিক আশ্রয় আল-কায়েদাকে এক নিরাপদ স্বর্গ উপহার দেয়। সেখানে তারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলে, যেখানে অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক তৈরি এবং চোরাগোপ্তা যুদ্ধের কৌশল শেখানো হতো। সুদান থেকে আফগানিস্তানে ফিরে আসার এই পর্বটি ছিল সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দৃঢ় করার সময়। ওসামা বিন লাদেন কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ধনাঢ্য লজিস্টিক ব্যবস্থাপক, যিনি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা বিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থীদের একটি একক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মতাদর্শিক বিবর্তন: নিকট শত্রু বনাম দূরবর্তী শত্রু (Ideological Evolution: Near Enemy versus Far Enemy)
আল-কায়েদার মনস্তাত্ত্বিক ও ভাবাদর্শিক জগৎ বুঝতে হলে তাদের আদর্শিক বিবর্তনের দীর্ঘ পথরেখা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মিসরের বিতর্কিত চিন্তক সাইয়্যেদ কুতুবের রচনায় যে ‘জাহিলিয়াত’ ও ‘হাকিমিয়াত’ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনা গড়ে উঠেছিল, তা থেকেই আল-কায়েদা তাদের মতাদর্শিক রসদ সংগ্রহ করে। কুতুবের মতে, যেসব সমাজ বা রাষ্ট্র ঐশ্বরিক বিধান বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি আইনে পরিচালিত হয়, সেগুলো আসলে অজ্ঞতার যুগে বাস করছে। তবে আল-কায়েদার রণকৌশলে সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে ‘শত্রু’ চিহ্নিতকরণের প্রশ্নে। বিশ শতকের সত্তরের ও আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী জিহাদি দলগুলো প্রধানত নিজেদের দেশের স্বৈরাচারী শাসকদের উৎখাত করার লড়াইয়ে মগ্ন ছিল। কৌশলগত পরিভাষায় এই স্থানীয় ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদের বলা হতো নিকট শত্রু (Near Enemy) বা আল-আদু আল-কারিব।
মিসরের ‘তানজিম আল-জিহাদ’ দলের সাবেক নেতা এবং পরবর্তীতে আল-কায়েদার প্রধান তাত্ত্বিক আইমান আল-জাওয়াহিরি এই সনাতন কৌশলে এক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি এবং বিন লাদেন যুক্তি দেন যে কেবল ঘরের ভেতরের স্থানীয় শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কোনো সুফল মিলবে না। কারণ এই স্থানীয় পুতুল সরকারগুলোর পেছনে রয়েছে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক খুঁটি। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত সেই পেছনের খুঁটি ভেঙে না ফেলা যাচ্ছে, ততক্ষণ স্থানীয় কোনো বিপ্লব সফল হতে পারে না। এই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে আল-কায়েদা তাদের প্রধান আক্রমণের নিশানা হিসেবে বেছে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের, যাদের তারা আখ্যা দেয় দূরবর্তী শত্রু (Far Enemy) বা আল-আদু আল-বাইদ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফাওয়াজ গার্গেস (Fawaz A. Gerges) আল-কায়েদার এই কৌশলগত বাঁক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছেন যে দূরবর্তী শত্রুর ওপর আঘাত হেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে টেনে আনাই ছিল তাদের মূল কৌশলগত চাল (Gerges, 2005)। তাদের হিসাব ছিল, মার্কিন সেনারা যখন সরাসরি মুসলিম দেশগুলোতে আক্রমণ চালাবে, তখন সাধারণ মুসলিম সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়বে এবং তারা সব ভেদাভেদ ভুলে আল-কায়েদার পতাকাতলে এসে সমবেত হবে। এই ধারণার ওপর ভর করেই ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওসামা বিন লাদেন এবং আইমান আল-জাওয়াহিরি যৌথভাবে এক ঐতিহাসিক ফতোয়া জারি করেন। তারা ঘোষণা করেন ‘ইহুদি ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিশ্ব ইসলামিক ফ্রন্ট’।
এই ১৯৯৮ সালের ফতোয়ায় আল-কায়েদা যেকোনো স্থানে যেকোনো মার্কিন নাগরিক বা তাদের মিত্রদের হত্যা করাকে তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী এক সার্বজনীন দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করে। প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কিংবা ক্লাসিক্যাল যুদ্ধের নীতিকে তারা সম্পূর্ণ বর্জন করে। গবেষক টমাস হেগহামার (Thomas Hegghammer) আন্তর্জাতিক সালাফি-জিহাদি মতবাদের বিস্তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে আল-কায়েদা স্থানীয় রাজনৈতিক অসন্তোষ ও বঞ্চনাবোধকে একটি বৈশ্বিক মহাজাগতিক লড়াইয়ের বয়ানে রূপান্তরিত করেছিল (Hegghammer, 2010)। তারা প্রচার করত যে পুরো পাশ্চাত্য সভ্যতা মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে এক অবিরাম ক্রুসেড বা যুদ্ধে লিপ্ত, তাই এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সামরিক বা বেসামরিক লক্ষ্যের মধ্যে কোনো সীমারেখা টানা অর্থহীন।
সাংগঠনিক রূপান্তর: কেন্দ্রীয় দুর্গ থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্ক (Organizational Transformation: From Central Vanguard to Franchise Network)
আল-কায়েদা তার চার দশকের ইতিহাসে কখনোই একটি অনড় বা বদ্ধ কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিস্থিতি ও সুরক্ষার তাগিদে তাদের সাংগঠনিক রূপ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে আফগানিস্তানে তাদের যে সাংগঠনিক রূপ ছিল, তাকে গবেষকেরা আল-কায়েদা সেন্ট্রাল (Al-Qaeda Central – AQC) হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর শীর্ষে ছিলেন ওসামা বিন লাদেন এবং তার সহযোগী শুরা কাউন্সিল। এই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত সেল পরিচালিত হতো, যার মধ্যে ছিল সামরিক শাখা, অর্থনৈতিক শাখা, আইন শাখা এবং প্রচার শাখা। সামরিক কমিটির দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ আতেফের মতো অভিজ্ঞ কমান্ডাররা, যারা সরাসরি বড় বড় হামলার পরিকল্পনা আঁকতেন।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযানের মুখে আল-কায়েদার এই কেন্দ্রীয় কাঠামো তছনছ হয়ে যায়। তাদের বহু শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন এবং বাকিরা পাকিস্তানের দুর্গম উপজাতীয় এলাকায় আত্মগোপন করেন। এই অচলাবস্থার মুখে আল-কায়েদা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর গ্রহণ করে। তারা একটি ভৌগোলিক কেন্দ্রভিত্তিক দল থেকে সরে এসে বিকেন্দ্রীভূত ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্কের রূপ নেয়। নিরাপত্তা গবেষক রোহন গুণরত্ন (Rohan Gunaratna) তার প্রভাবশালী গ্রন্থে বিস্তারিত দেখিয়েছেন কীভাবে আল-কায়েদা বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রবাদী দলগুলোর সাথে ভাবাদর্শিক মৈত্রী গড়ে তুলে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা তৈরি করে (Gunaratna, 2002)।
এই নতুন সাংগঠনিক দর্শনের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একে একে গড়ে ওঠে আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা। ইয়েমেন ও সৌদি আরবের আরব উপদ্বীপে আত্মপ্রকাশ করে আল-কায়েদা ইন দ্য অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (AQAP), উত্তর আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলে গড়ে ওঠে আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (AQIM), সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করে আল-শাবাব (Al-Shabaab), সিরিয়ার যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে জাবহাত আল-নুসরা (Jabhat al-Nusra) এবং ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য গঠিত হয় আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)। প্রতিটি আঞ্চলিক শাখা নিজেদের অঞ্চলের বাস্তবতায় স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করত, তবে তারা আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে কেন্দ্রীয় আমিরের কাছে ‘বায়াত’ বা আনুগত্যের শপথ বজায় রাখত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক লিয়া ফারাল (Leah Farrall) আল-কায়েদার এই বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কের কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি মাঠপর্যায়ের প্রতিটি বোমা হামলার নির্দেশ না দিলেও সামগ্রিক কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিত (Farrall, 2011)। স্থানীয় শাখাগুলো তাদের নিজেদের অর্থায়ন, সদস্য সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক হামলার সিদ্ধান্ত নিজেরা নিত। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর হামলা চালিয়ে বা কোনো শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেও পুরো নেটওয়ার্ককে অচল করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এক জায়গায় আঘাত লাগলে অন্য শাখাগুলো নতুন উদ্যমে নিজেদের কার্যক্রম চালু রাখতে পারত।
কৌশলগত সহিংসতা ও বৈশ্বিক বর্ণালী: ১৯৯৮ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর (Strategic Violence and the Global Spectrum: From 1998 to September 11)
আল-কায়েদার সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, নিখুঁত এবং একই সাথে বিপুল প্রাণহানি ঘটানো। তারা এমন সব লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করত যার কেবল বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতিই নয়, বরং গভীর প্রতীকী ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী কৌশলগত মতবাদের প্রথম বড় প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯৮ সালের ৭ আগস্ট। সেদিন কেনিয়ার নাইরোবি এবং তানজানিয়ার দারুস সালামে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি আত্মঘাতী ট্রাক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সেই নৃশংস বিস্ফোরণে ২২৪ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন স্থানীয় আফ্রিকান পথচারী ও কর্মচারী। এই হামলার মাধ্যমে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানান দেয় যে তাদের পরিচালনার বিস্তার কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।
দূতাবাস হামলার সফলতায় উৎসাহিত হয়ে আল-কায়েদা তাদের নজর দেয় সমুদ্রপথে অসম যুদ্ধ পরিচালনার দিকে। ২০০০ সালের ১২ অক্টোবর ইয়েমেনের এডেন বন্দরে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য নোঙর করা মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস কোল’-এ একটি ছোট বিস্ফোরকভর্তি নৌকা নিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। সেই আঘাতে জাহাজের গায়ে বিশাল গর্ত তৈরি হয় এবং ১৭ জন মার্কিন নৌসেনা নিহত হন। অনুসন্ধানী লেখক স্টিভ কল (Steve Coll) আল-কায়েদার গোপন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে ওসামা বিন লাদেন ধাপে ধাপে দুঃসাহসিক হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে উসকানি দিয়ে এক সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করছিলেন (Coll, 2004)।
এই সংঘাতের চরম ও প্রলয়ংকরী প্রকাশ ঘটে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে। খালিদ শেখ মোহাম্মদের সামরিক পরিকল্পনায় এবং মোহাম্মদ আত্তার নেতৃত্বে ১৯ জন ছিনতাইকারী চারটি যাত্রীবাহী মার্কিন বাণিজ্যিক বিমান আকাশেই দখল করে নেয়। দুটি বিমান সরাসরি আঘাত হানে নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ারে, একটি বিমান আছড়ে পড়ে মার্কিন সামরিক সদর দফতর পেন্টাগনে এবং চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ার এক ফাঁকা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টুইন টাওয়ারের আকাশচুম্বী দুটি ভবন ধসে পড়ে প্রায় তিন হাজার সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক পিটার এল. বার্গেন (Peter L. Bergen) ৯/১১ হামলার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মূল্যায়ন করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে এই ঘটনা আধুনিক পৃথিবীর ভূরাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চিরতরে ওলটপালট করে দিয়েছিল (Bergen, 2006)।
৯/১১ হামলার মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন আধিপত্যের প্রতীকগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি করা। টুইন টাওয়ার ছিল পশ্চিমা পুঁজিবাদের প্রতীক, আর পেন্টাগন ছিল তাদের অপরাজেয় সামরিক শক্তির কেন্দ্র। সেখানে আঘাত হেনে আল-কায়েদা বিশ্ববাসীকে দেখাতে চেয়েছিল যে তথাকথিত পরাশক্তিগুলোও ভেতর থেকে কতটা অরক্ষিত। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করে আফগানিস্তান ও পরবর্তীতে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায়। বিন লাদেনের হিসাব ছিল এই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতিকে রক্তশূন্য করে দেবে, ঠিক যেভাবে আফগান যুদ্ধ একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
মিডিয়া যুদ্ধ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা: আস-সাহাব থেকে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা (Media Warfare and Psychological Propaganda: From As-Sahab to Digital Mobilization)
আল-কায়েদা হয়তো বিশ শতকের প্রথম আন্তর্জাতিক সশস্ত্র দল যারা খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিল যে আধুনিক যুগে বন্দুকের গুলির চেয়ে ভিডিও ক্যামেরার লেন্স অনেক বেশি কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র হতে পারে। শুরুর দিকে ওসামা বিন লাদেন দুর্গম পাহাড়ের গুহায় বসে রেকর্ড করা ভিডিও ও অডিও বার্তা কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরায় পাঠাতেন। হাতে একটি লাঠি, পেছনে ঝুলন্ত একে-৪৭ রাইফেল আর পরনে সাধারণ পোশাক – এই দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এক বৈরাগ্যময় অথচ আপসহীন সেনাপতিরূপে বিশ্ব মিডিয়ার সামনে দাঁড় করাতেন। সাধারণ পশ্চিমা ও আরব দর্শকদের কাছে এই ভিজ্যুয়াল ইমেজ ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার অংশ।
২০০০ সালের দিকে আল-কায়েদা নিজেদের প্রচারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গড়ে তোলে ‘আস-সাহাব মিডিয়া ফাউন্ডেশন’। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা উচ্চমানের সম্পাদনা, গ্রাফিক্স, ইংরেজি সাবটাইটেল এবং নেপথ্য নাশিদ (ইসলামি সঙ্গীত) যুক্ত করে দীর্ঘ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে শুরু করে। যোগাযোগ গবেষক ফিলিপ সেইব (Philip Seib) আধুনিক সন্ত্রাসবাদে স্যাটেলাইট মিডিয়ার ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে আল-কায়েদা গণমাধ্যমের সাধারণ ভোক্তা না থেকে নিজেরাই একটি বৈশ্বিক সম্প্রচার এজেন্সির মতো কাজ করত (Seib, 2008)। তাদের প্রতিটি অপারেশনের পূর্বে আত্মঘাতী হামলাকারীদের শেষ ভিডিও বার্তা এবং হামলার পরবর্তী বিশ্লেষণমূলক তথ্যচিত্র প্রচার করে তারা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের কাছে নিজেদের অবস্থান পৌঁছে দিত।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষভাগে ইন্টারনেটের বিস্তার এই প্রচারণায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এর প্রধান রূপকার ছিলেন ইয়েমেনে অবস্থানরত মার্কিন বংশোদ্ভূত উগ্র প্রচারক আনোয়ার আল-আওলাকি। আওলাকি সাবলীল ইংরেজি ভাষায় পশ্চিমা তরুণদের উদ্দেশ্য করে ভিডিও বার্তা ও অডিও বক্তৃতা দিতেন। তার নির্দেশনায় ২০১০ সালে আল-কায়েদার ইয়েমেন শাখা প্রকাশ করে আধুনিক ডিজিটাল ম্যাগাজিন ইন্সপায়ার (Inspire)। এই সাময়িকীতে কড়া মতাদর্শিক বয়ানের পাশাপাশি ঘরে বসে সহজে প্রেশার কুকার বোমা তৈরির মতো প্রযুক্তিগত নির্দেশিকা ছাপানো হতো।
গবেষক ডনাল্ড হলব্রুক (Donald Holbrook) আল-কায়েদার যোগাযোগ কৌশল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ডিজিটাল সাময়িকীগুলো পশ্চিমা সমাজের বিচ্ছিন্ন তরুণদের একক নেকড়ে বা লোন উলফ হামলায় অংশ নিতে প্ররোচিত করত (Holbrook, 2014)। সংগঠনের সাথে শারীরিক যোগাযোগ বা আফগানিস্তানে যাওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই কেবল ইন্টারনেটের নির্দেশিকা পড়ে বোস্টন ম্যারাথন হামলার মতো সহিংসতা চালানো সম্ভব হয়েছিল। এর মাধ্যমে আল-কায়েদা শারীরিক ভূখণ্ডের বাইরে একটি অদৃশ্য ‘ভার্চুয়াল জিহাদি ক্ষেত্র’ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
শীর্ষ নেতৃত্বের পতন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা (Decapitation, Internal Schisms and Contemporary Relevance)
৯/১১ পরবর্তী দশকে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিআইএর পরিচালিত গোপন ড্রোন কর্মসূচির মুখে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে থাকে। ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের সামরিক সেনানিবাস শহর অ্যাবোটাবাদের এক গোপন কম্পাউন্ডে মার্কিন নেভি সিলদের পরিচালিত ‘অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার’-এ ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন আইমান আল-জাওয়াহিরি। কিন্তু জাওয়াহিরির চরিত্রে বিন লাদেনের মতো ক্যারিশমা বা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিল না। তার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ২০১১ সালের আরব বসন্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেয়।
এই সময়ে আল-কায়েদার ভেতর সবচেয়ে বড় মতাদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাত তৈরি হয় তাদের সাবেক ইরাক শাখার সাথে, যা পরবর্তীতে আইএসআইএস (ISIS) বা ইসলামিক স্টেট নামে আলাদা দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। আবু বকর আল-বাগদাদির নেতৃত্বে আইএসআইএস চরম উগ্রপন্থা বেছে নেয় এবং শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচার গণহত্যা শুরু করে। জাওয়াহিরি এই অতিরিক্ত রক্তপাত এবং মুসলিম জনসাধারণের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে তড়িঘড়ি করে খেলাফত ঘোষণা করার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী জনসমর্থন ধরে রাখা জরুরি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বারাক মেন্ডেলসন (Barak Mendelsohn) আল-কায়েদার অভ্যন্তরীণ ফাটল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে খেলাফতের বৈধতা এবং তাকফিরি মতবাদের প্রশ্নে এই দুই সংগঠনের মধ্যে সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয় (Mendelsohn, 2016)। ২০১৪ সালে আল-কায়েদা আনুষ্ঠানিকভাবে আইএসের সাথে নিজেদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের এক বাড়ির ব্যালকনিতে মার্কিন ড্রোন হামলায় আইমান আল-জাওয়াহিরিও নিহত হন। জাওয়াহিরির মৃত্যুর পর সংগঠনের নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দিলেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কলিন পি. ক্লার্ক (Colin P. Clarke) সমকালীন জিহাদি ভূরাজনীতি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক পতন সত্ত্বেও আল-কায়েদা হারিয়ে যায়নি, বরং তারা নিজেদের অস্তিত্বকে স্থানীয় সমাজের গভীর স্তরে প্রোথিত করেছে (Clarke, 2019)। বর্তমানে সংগঠনটির অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বে রয়েছেন সাইফ আল-আদেলের মতো অভিজ্ঞ মিসরীয় সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা।
আফগানিস্তানে তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতা দখল আল-কায়েদাকে নতুন এক কৌশলগত স্বস্তি দিয়েছে। যদিও তালেবান প্রশাসন দাবি করে যে তারা তাদের ভূমি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না, তবে বাস্তবতায় আল-কায়েদা নেতৃত্ব সেখানে এক নীরব আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে তাদের শাখা জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং সোমালিয়ার আল-শাবাব প্রতিদিন বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। আল-কায়েদা এখন পশ্চিমা বিশ্বে বড় মাপের সংঘাত তৈরির চেয়ে বরং বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা শাসনব্যবস্থা পোক্ত করার কৌশল নিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক নিরাপত্তার মানচিত্রে আল-কায়েদা আজও একটি বিপজ্জনক, রূপান্তরশীল ও দীর্ঘস্থায়ী ছায়া হয়ে অবস্থান করছে।
আইএসআইএস (ISIS): খিলাফতবাদ ও বৈশ্বিক সন্ত্রাস
ঐতিহাসিক শিকড়: আবু মুসাব আল-জারকাউয়ি থেকে ইরাকের সংঘাত (Historical Roots: Abu Musab al-Zarqawi to the Iraqi Conflict)
ইরাকের রুক্ষ মরুভূমি ও প্রাচীন জনপদগুলোর বুক চিরে ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল, তা আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর বাগদাদে নিযুক্ত মার্কিন সামরিক প্রশাসনের প্রধান পল ব্রেমার যখন এক বিতর্কিত আদেশের মাধ্যমে সাবেক বাথ পার্টির সমস্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেন এবং ইরাকি নিয়মিত সেনাবাহিনী ভেঙে দেন, তখন দেশজুড়ে এক মারাত্মক প্রশাসনিক ও সামাজিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। লাখ লাখ সুন্নি আরব পরিবার রাতারাতি রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে ছিটকে পড়ে নিজেদের সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন, নিগৃহীত ও বেকার অবস্থায় আবিষ্কার করে। এই গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও তীব্র অর্থনৈতিক ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে সংঘাতের মাঠে দ্রুত আবির্ভূত হন জর্ডান থেকে আসা এক চরমপন্থী কমান্ডার, যার নাম আহমদ ফাদিল আল-খালাইলেহ, তবে বিশ্ব তাকে এক ভয়ংকর নামে চেনে – আবু মুসাব আল-জারকাউয়ি।
জারকাউয়ি আফগানিস্তানের হেরাত শহরে নিজস্ব প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ইরাকের সংঘাতময় প্রান্তরে প্রবেশ করেন এবং গড়ে তোলেন ‘জামাত আল-তাওহিদ ওয়াল-জিহাদ’ নামের এক সশস্ত্র চক্র। তার যুদ্ধকৌশল ছিল ওসামা বিন লাদেনের সনাতন চিন্তার চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও রক্তপিপাসু। তিনি কেবল দখলদার মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু বানাননি, বরং সুপরিকল্পিতভাবে ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্র, সাধারণ বাজার এবং মসজিদগুলোতে একের পর এক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে একটি সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধ উসকে দেন। ২০০৩ সালের আগস্টে নাজাফের ইমাম আলী মসজিদে হামলা এবং বাগদাদে জাতিসংঘের সদর দফতরে বোমা মেরে বিশেষ দূত সার্জিও ভিয়েরা দে মেলোকে হত্যা করা ছিল তার সেই চরম কৌশলেরই অংশ। ২০০৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশ করে ওসামা বিন লাদেনের দলের সাথে যুক্ত হন এবং গড়ে তোলেন ‘আল-কায়েদা ইন ইরাক’ (একিউআই)। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উইলিয়াম ম্যাকক্যান্টস (William McCants) তার গবেষণাধর্মী গ্রন্থদ্য আইএসআইএস অ্যাপোক্যালিপস (The ISIS Apocalypse)-এ দেখিয়েছেন যে জারকাউয়ির মূল লক্ষ্যই ছিল সমাজকে এমন এক চরম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মুখে ঠেলে দেওয়া, যাতে সাধারণ সুন্নি জনগোষ্ঠী আত্মরক্ষার তাগিদে তার চরমপন্থী দলকে সমর্থন করতে বাধ্য হয় (McCants, 2015)।
২০০৬ সালের জুন মাসে এক মার্কিন বিমান হামলায় জারকাউয়ি নিহত হলে সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন আবু ওমর আল-বাগদাদি এবং দলটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক’ (আইএসআই)। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন বা ‘সার্জ’ অভিযান এবং স্থানীয় সুন্নি উপজাতিদের নিয়ে গঠিত ‘সাহওয়া’ বা জাগরণ কাউন্সিলের তীব্র প্রতিরোধের মুখে এই সশস্ত্র চক্রটি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। বেঁচে থাকা শীর্ষ নেতাদের তখন বন্দি করে রাখা হয় মার্কিন পরিচালিত কুখ্যাত ‘ক্যাম্প বুকা’ সামরিক কারাগারে। এই কারাগারটি অজান্তেই আধুনিক চরমপন্থার এক যৌথ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেখানে সাবেক বাথিস্ট সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং কট্টর সালাফি তাত্ত্বিকরা পাশাপাশি বন্দি থেকে পরস্পরের সংস্পর্শে আসে। সামরিক কৌশলবিদ চার্লস লিস্টার (Charles Lister) তার বিশ্লেষণে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে ক্যাম্প বুকার কাঁটাতারের আড়ালে বাথিস্ট সামরিক পেশাদারিত্ব ও সালাফি উগ্রবাদের এক ভয়ংকর সংকর ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে নতুন এক দানবীয় শক্তির জন্ম দেয় (Lister, 2015)।
২০১০ সালে এক যৌথ অভিযানে আবু ওমর আল-বাগদাদি নিহত হওয়ার পর এই ধসে পড়া সংগঠনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল-বদরি, যিনি পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে আবু বকর আল-বাগদাদি নামে পরিচিত হন। বাগদাদি দায়িত্ব নিয়েই সাবেক ইরাকি সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠনের কেন্দ্রীয় সামরিক ও গোয়েন্দা পদে বসিয়ে দেন, যার মধ্যে সাবেক কর্নেল হাজি বকর ছিলেন অন্যতম প্রধান স্থপতি। ঠিক এই সময়েই ২০১১ সালে প্রতিবেশী সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ দ্রুত এক সর্বগ্রাসী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। বাগদাদির অনুসারীরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে সিরিয়ার বিশৃঙ্খল রণাঙ্গনে পা রাখে। তারা সিরিয়ার সমৃদ্ধ তেলক্ষেত্র ও গম উৎপাদনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নিজেদের নাম ঘোষণা করে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট (ISIL/ISIS) বা দায়েশ। ২০১৪ সালের গোড়ার দিকে তারা সিরিয়ার রাক্কা শহরকে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং একই বছরের জুন মাসে সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল মাত্র কয়েক দিনের ঝটিকা হামলায় দখল করে বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়।
মতাদর্শিক ভিত্তি: তাকফিরিজম, খিলাফতবাদ ও শেষ বিচারের বিশ্বাস (Ideological Foundations: Takfirism, Caliphatism and Apocalypticism)
আইএসআইএসের ভাবাদর্শিক জগতের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, তারা সনাতন সালাফি-জিহাদি মতবাদকে এক অভূতপূর্ব চরম ও অন্ধ রূপ দিয়েছিল। তাদের মতাদর্শের স্তম্ভ দাঁড়িয়ে ছিল মূলত তিনটি ধারণার ওপর: চরম তাকফিরিজম, ভৌগোলিক খিলাফতবাদ এবং শেষ বিচারের মহাজাগতিক পৌরাণিক বিশ্বাস। সাধারণ রাজনৈতিক বা জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড মুক্ত করা বা স্বৈরাচারী শাসককে হঠানোর জন্য লড়াই করত, আইএসআইএস সেখানে নিজেদের একমাত্র বিশুদ্ধ ঐশ্বরিক সত্যের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করত। তাদের বাইরে থাকা যে কোনো মানুষ, তা সে অন্য কোনো ধর্মের হোক কিংবা প্রচলিত রীতিনীতির অনুসারী সাধারণ কোনো মুসলিম, তাদের সবাইকে তারা ‘কাফের’ বা ‘মুরতাদ’ (ধর্মত্যাগী) হিসেবে আখ্যা দিয়ে হত্যা করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করত।
২০১৪ সালের ২৯ জুন ছিল এই ভাবাদর্শিক যাত্রার এক চূড়ান্ত ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মসুলের শতাব্দী প্রাচীন গ্রেট মস্ক অব আল-নুরির ঐতিহাসিক মিম্বরে কালো পোশাক ও পাগড়ি পরে হাজির হন আবু বকর আল-বাগদাদি। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য এক নতুন ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। নিজেকে মহানবীর বংশধর দাবি করে তিনি ‘খলিফা ইব্রাহিম’ নাম ধারণ করেন এবং ঘোষণা করেন যে পৃথিবীর প্রতিটি মুসলিমের জন্য তার প্রতি আনুগত্যের শপথ বা ‘বায়াত’ নেওয়া বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হাসান হাসান (Hassan Hassan) এই মতাদর্শিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে খিলাফত ঘোষণার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপটি ছিল আল-কায়েদার সাথে তাদের মূল দ্বন্দ্বের জায়গা (Hassan, 2016)। আল-কায়েদা যেখানে বিশ্বাস করত যে খিলাফত প্রতিষ্ঠা হলো এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য যা মুসলিম উম্মাহর সম্মতির ভিত্তিতে ধীরে ধীরে অর্জিত হবে, আইএসআইএস সেখানে দাবি করে যে ভূখণ্ড দখল করে অবিলম্বে খিলাফত কায়েম করাই একমাত্র বিশুদ্ধ ধর্মীয় বিধান।
আইএসআইএসের কর্মকাণ্ডে শেষ বিচারের মহাজাগতিক ভবিষ্যৎবাণী এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তারা প্রাচীন কিছু ধর্মীয় বয়ানকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে বিশ্বাস করত যে উত্তর সিরিয়ার ‘দাবিক’ নামক এক অখ্যাত প্রান্তরে পশ্চিমা ক্রুসেডার বাহিনীর সাথে তাদের চূড়ান্ত মহাযুদ্ধ সংঘটিত হবে। তাদের বিশ্বাস ছিল, এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই পৃথিবীতে অধর্মের বিনাশ ঘটবে এবং তাদের বিজয় নিশ্চিত হবে। প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক গ্রায়েম উড (Graeme Wood) আইএসআইএসের শীর্ষ চিন্তকদের বক্তব্য ও তাদের প্রকাশিত সাহিত্য ব্যবচ্ছেদ করে তুলে ধরেছেন কীভাবে এই গোষ্ঠীটি সপ্তম শতাব্দীর যুদ্ধকালীন আচার-আচরণকে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক জগতে অন্ধভাবে ফিরিয়ে আনার এক ভয়ংকর খেলায় মেতেছিল (Wood, 2017)।
এই অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভর করেই তারা হাজার হাজার নিরীহ ইয়াজিদি পুরুষকে হত্যা করে এবং তাদের নারীদের যৌনদাসী হিসেবে বাজারে বিক্রি করার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে ধর্মীয়ভাবে সঠিক কাজ বলে প্রচার করে। একই সাথে তারা পালমিরা ও নিনেভেহ শহরের হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জাদুঘরের ভাস্কর্য ও মাজারগুলোকে পৌত্তলিকতা আখ্যা দিয়ে হাতুড়ি ও ডিনামাইট দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করত যে মধ্যবর্তী কোনো ‘ধূসর এলাকা’ বলে কিছু থাকতে পারে না; পুরো পৃথিবী বিভক্ত কেবল দুটি শিবিরে – একটি হলো তাদের তথাকথিত খাঁটি বিশ্বাসের খিলাফত, আর অন্যটি হলো সমগ্র বাকি পৃথিবী যা ধ্বংসের যোগ্য।
আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক শাসন ও সন্ত্রাসী আমলাতন্ত্র (Territorial Control, Institutional Governance and Terrorist Bureaucracy)
বিশ্বের অন্যান্য সশস্ত্র দল যখন পাহাড়ের গুহা বা জঙ্গলের আস্তানায় লুকিয়ে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ চালাত, আইএসআইএস সেখানে বিশ্বকে দেখিয়েছিল তাদের সমান্তরাল রাষ্ট্র পরিচালনার এক বিষাক্ত রূপ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তারা সিরিয়া ও ইরাকের প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ডের ওপর সরাসরি ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই বিস্তৃত অঞ্চলের অধিবাসী ছিল প্রায় এক কোটি সাধারণ মানুষ। আইএসআইএস নিছক কোনো ডাকাত দল বা অস্থায়ী মিলিশিয়া হিসেবে এলাকা শাসন করেনি, বরং তারা গড়ে তুলেছিল এক কঠোর, নিষ্ঠুর এবং নিখুঁত আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো। তারা সমগ্র অঞ্চলকে বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক প্রদেশে বিভক্ত করেছিল, যেগুলোকে তারা নাম দিয়েছিল ‘উইলায়াত’।
এই সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হতো কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদ এবং বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, যাদের বলা হতো ‘দেওয়ান’। তাদের ছিল সামরিক দেওয়ান, অর্থ দেওয়ান, বিচার ও ফতোয়া দেওয়ান, প্রাকৃতিক সম্পদ দেওয়ান, শিক্ষা দেওয়ান এবং স্বাস্থ্য দেওয়ান। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক আয়মান জাওয়াদ আল-তামিমি (Aymenn Jawad Al-Tamimi) আইএসআইএসের ফেলে যাওয়া কয়েক হাজার দাপ্তরিক নথি উদ্ধার করে দেখিয়েছেন যে তারা জন্মসনদ, জমির মালিকানা, আদালতের রায়, ট্রাফিক চালান এবং করের রসিদ পর্যন্ত নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সিলমোহরযুক্ত কাগজে ছাপাত (Al-Tamimi, 2015)। তারা দখলকৃত স্কুলগুলোর পাঠ্যসূচি থেকে গণিত ছাড়া ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সমস্ত বই নিষিদ্ধ করে দেয় এবং শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক অস্ত্র চালনা ও ধর্মীয় উগ্রবাদের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করে এক নতুন প্রজন্মের মগজধোলাইয়ের আয়োজন করে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে আইএসআইএস ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিত্তশালী অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী সংগঠন। তাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল দখলকৃত সিরিয়া ও ইরাকের শত শত তেলকূপ থেকে দৈনিক লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে গোপন চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রি করা। এছাড়া তারা মসুলের সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের নগদ অর্থ ও সোনা লুট করেছিল। এর পাশাপাশি তারা সাধারণ গ্রামীণ মানুষের ফসলের ওপর জোরপূর্বক কর, অমুসলিমদের ওপর প্রাচীন ‘জিজিয়া’ কর এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর জবরদস্তিমূলক চাঁদাবাজি বসিয়ে দৈনিক লাখ লাখ ডলার রাজস্ব সংগ্রহ করত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কুইন মেহিয়েত (Quinn Mecham) তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই গোষ্ঠীটি খাবার জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ বিতরণ এবং পৌরসভা ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবা বজায় রাখার পাশাপাশি সমাজে চরম আতঙ্ক তৈরি করে মানুষের আনুগত্য নিশ্চিত করত (Mecham, 2015)।
আইএসআইএসের বিচারব্যবস্থা ছিল মানবিক অনুভূতির বাইরে থাকা এক পৈশাচিক শৃঙ্খলা। প্রতিটি শহরে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় পুলিশ বাহিনী বা ‘হিসবা’ সশস্ত্র গাড়িবহর নিয়ে টহল দিত। সামান্য সিগারেট খাওয়া, দাড়ি ছোট করা বা নারীদের মুখ পুরোপুরি না ঢাকার অপরাধে প্রকাশ্য দিবালোকে জনবহুল মোড়ে চাবুক মারা হতো। চুরির দায়ে হাত কেটে ফেলা, সমকামিতার অভিযোগে বহুতল ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা এবং রাষ্ট্রীয় বিরোধিতার সন্দেহে প্রকাশ্য চত্বরে শিরশ্ছেদ করে মৃতদেহকে ক্রুশবিদ্ধ করে রাখা ছিল তাদের প্রতিদিনের প্রশাসনিক রুটিন। এই চরম সন্ত্রাসের মুখে সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের সমস্ত আদেশ মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা, বিদেশি যোদ্ধা ও মনস্তাত্ত্বিক ভয় প্রদর্শন (Digital Propaganda, Foreign Fighters and Psychological Terror)
প্রচারমাধ্যম ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইএসআইএস আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তারা খুব ভালো করেই জানত যে যুদ্ধের ময়দানে দশটি সেনাকে হত্যা করার চেয়ে সেই হত্যার দৃশ্য সারা পৃথিবীর মানুষের স্মার্টফোনের পর্দায় পৌঁছে দেওয়া অনেক বেশি ভীতিকর প্রভাব ফেলে। এই উদ্দেশ্যে তারা হলিউড মানের সিনেমাটোগ্রাফি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা, ড্রোন শট এবং উন্নত অডিও ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করে এক পেশাদার মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তাদের প্রধান প্রচার সংস্থার নাম ছিল ‘আল-হায়াত মিডিয়া সেন্টার’ এবং ‘আল-ফুরকান ফাউন্ডেশন’।
২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কমলা রঙের পোশাক পরিয়ে মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফোলি এবং স্টিভেন সটলফের শিরশ্ছেদের রোমহর্ষক দৃশ্য ইন্টারনেটে প্রকাশ করে তারা পুরো পাশ্চাত্য সমাজকে এক গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে ফেলে দেয়। জর্ডানের যুদ্ধবন্দি পাইলট মুয়াত আল-কাসাসবেহকে লোহার খাঁচায় বন্দি করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার দৃশ্য তারা যেভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যামেরাবন্দি করে স্লো-মোশনে প্রচার করেছিল, তা বিশ্ববাসীকে তাদের চরম নিষ্ঠুরতার বার্তা স্পষ্ট করে দেয়। ব্রিটিশ যোগাযোগ গবেষক চার্লি উইন্টার (Charlie Winter) আইএসআইএসের মিডিয়া কৌশল গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে তাদের প্রচারণা কেবল রক্তপাত ও পৈশাচিকতা দেখাত না, বরং তারা সুপরিকল্পিতভাবে খিলাফতের ভেতর ফলমূলে ভরা বাজার, আধুনিক হাসপাতাল এবং শিশুদের খেলার সাজানো দৃশ্য দেখিয়ে পশ্চিমা তরুণদের কাছে এক কাল্পনিক ইসলামি স্বর্গরাজ্যের ছবি তুলে ধরত (Winter, 2015)।
তাদের এই চিত্তাকর্ষক ডিজিটাল প্রচারণার ফাঁদে পা দিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব আন্তঃসীমান্ত ঢল। বিশ্বের ১১০টিরও বেশি স্বাধীন দেশ থেকে প্রায় চল্লিশ হাজার বিদেশি তরুণ-তরুণী নিজেদের ঘরবাড়ি ও পরিবার ছেড়ে সিরিয়া ও ইরাকের রণক্ষেত্রে পাড়ি জমায়। সন্ত্রাসবাদ গবেষক রিচার্ড ব্যারেট (Richard Barrett) তার আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন কীভাবে ইউরোপের আধুনিক শহর – লন্ডন, প্যারিস কিংবা ব্রাসেলসের সচ্ছল পরিবারের তরুণরা পর্যন্ত ইন্টারনেটের মাধ্যমে মগজধোলাইয়ের শিকার হয়ে খিলাফতে যোগ দিতে ছুটে এসেছিল (Barrett, 2014)। কেবল পুরুষ যোদ্ধারাই নয়, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বহু তরুণী তথাকথিত ‘জিহাদি বধূ’ হিসেবে এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে।
এই নারীদের শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অনুশাসন তদারকির জন্য তারা গড়ে তুলেছিল ‘আল-খানসা ব্রিগেড’ নামের এক ভয়ংকর নারী মিলিশিয়া বাহিনী। বিদেশি এই যোদ্ধারা নিজ নিজ দেশে ফেরার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে রণাঙ্গনে সবচেয়ে মরিয়া ও নিষ্ঠুর বাহিনীতে পরিণত হয়। তারা তাদের ইংরেজি ম্যাগাজিন দাবিক (Dabiq), ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত দার আল-ইসলাম (Dar al-Islam) এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত রুমিয়াহ (Rumiyah) সাময়িকীর মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোতে বসে থাকা সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিত। টুইটার, টেলিগ্রাম এবং ডার্ক ওয়েবের মতো এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা এক বিশাল ভার্চুয়াল সেনাবাহিনী পরিচালনা করত, যা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমস্ত সনাতন নজরদারির সীমাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক হামলা ও একক নেকড়ে আক্রমণ (International Operations and Lone Actor Attacks)
সিরিয়া ও ইরাকের মরুভূমিতে নিজেদের ভৌগোলিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি আইএসআইএস তাদের রক্তাক্ত হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বের বড় বড় মেট্রোপলিটন শহরগুলোর দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রকে তারা সরাসরি পশ্চিমা বিশ্বের ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা তৈরি করেছিল একটি অত্যন্ত গোপন ও পেশাদার বহিরাগত অভিযান শাখা, যার আরবি নাম ছিল ‘আম্ন আল-খারাজি’। এই শাখার প্রধান দায়িত্ব ছিল ইউরোপের মাটিতে গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং উচ্চমাত্রার প্রাণঘাতী কমান্ডো ধাঁচের হামলা বাস্তবায়ন করা।
এই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের সবচেয়ে অন্ধকার রাত নেমে এসেছিল ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে বন্দুকধারী ও আত্মঘাতী হামলাকারীরা একযোগে প্যারিসের জাতীয় স্টেডিয়ামের বাইরে, ব্যস্ত রেস্তোরাঁগুলোতে এবং ঐতিহ্যবাহী বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে সাধারণ মানুষের ওপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে নির্বিচার গুলি চালায়। সেই নারকীয় হামলায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১৩০ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান এবং শত শত মানুষ আহত হন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২০১৬ সালের মার্চে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং জনবহুল পাতাল রেল স্টেশনে একই নেটওয়ার্কের সদস্যরা আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৩২ জনকে হত্যা করে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকেল এস. স্মিথ (Michael S. Smith II) আইএসআইএসের আন্তর্জাতিক সেলগুলোর বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই গোষ্ঠীটি ইউরোপের উন্মুক্ত সীমান্ত এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের কাজে লাগিয়ে এক ভয়ংকর লজিস্টিক নেটওয়ার্ক দাঁড় করিয়েছিল (Smith, 2016)।
সংগঠিত হামলার পাশাপাশি আইএসআইএস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু করে এক নতুন ধরনের কম খরচের অথচ অত্যন্ত আতঙ্কজনক আক্রমণ, যা ইতিহাসে ‘লোন উলফ’ বা একক নেকড়ে আক্রমণ হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের শীর্ষ মুখপাত্র আবু মোহাম্মদ আল-আদনানি এক অডিও বার্তায় অনুসারীদের প্রতি নির্দেশ দেন যে পশ্চিমা নাগরিকদের হত্যার জন্য কোনো বিশেষ অস্ত্র বা বোমা তৈরির দরকার নেই; সাধারণ পাথর, রান্নাঘরের ছুরি বা ঘরের মোটরগাড়ি দিয়েই এই হত্যাকাণ্ড চালানো সম্ভব। এই বিষাক্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের নিস শহরে বাস্তিল দিবসের আতশবাজি দেখতে আসা হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে এক সন্ত্রাসী একটি বিশালাকার ১৯ টনের ভারী লরি চালিয়ে দেয়। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে লরি দিয়ে পিষে ৮৬ জন নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
একই বছর জার্মানির বার্লিনে ক্রিসমাস মার্কেটে ট্রাক চালিয়ে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডোর একটি সমকামী নাইটক্লাবে রাইফেল দিয়ে হামলা চালিয়ে ৪৯ জনকে হত্যা করা হয়। অপরাধবিজ্ঞানী অমি পেডাহজুর (Ami Pedahzur) এই ধরনের ব্যক্তিগত উগ্রপন্থার রূপান্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে কোনো কাঠামোগত দলের সদস্য না হয়েও কেবল ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে একজন সাধারণ মানুষ একাকী এমন ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে (Pedahzur, 2017)। এই ধরনের একক হামলার কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা বা আগাম তথ্য না থাকায় বিশ্বের কোনো আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষেই তা শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না, যা বিশ্বজুড়ে এক চিরস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করে।
আঞ্চলিক খিলাফতের পতন ও গোপন নেটওয়ার্কে প্রত্যাবর্তন (The Fall of the Territorial Caliphate and Reversion to Clandestine Insurgency)
আইএসআইএসের সীমাহীন পৈশাচিকতা, ধর্মীয় নিধনযজ্ঞ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকির মুখে বিশ্বরাজনীতির সমস্ত পরাশক্তি ও আঞ্চলিক প্রতিপক্ষরা একটি অভূতপূর্ব সামরিক ঐকমত্যে পৌঁছায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আশিটিরও বেশি দেশের এক বিশাল আন্তর্জাতিক সামরিক জোট। একই সাথে ইরাকের জাতীয় সেনাবাহিনী, কুর্দিদের বীরত্বপূর্ণ পেশমার্গা ও ওয়াইপিজে মিলিশিয়া বাহিনী, ইরানের সহায়তায় গড়ে ওঠা শিয়া পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) এবং সিরিয়ার মাটিতে রাশিয়া ও সিরীয় সরকারি বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করে। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয় ইরাকের মসুল পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী নগর যুদ্ধ। টানা নয় মাস ধরে প্রতি ইঞ্চি গলিতে চলা লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে মসুল শহর সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে মুক্ত হয়। এর কয়েক মাসের মধ্যে সিরিয়ায় তাদের তথাকথিত প্রশাসনিক রাজধানী রাক্কা থেকেও তাদের বিতাড়িত করা হয়।
আইএসআইএসের ভৌগোলিক খিলাফতের চূড়ান্ত সমাধি রচিত হয় ২০১৯ সালের মার্চ মাসে, সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তের দূরবর্তী এক ছোট্ট গ্রাম বাঘুজে। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর অবিরাম বোমাবর্ষণে বাঘুজের শেষ মাটির সুড়ঙ্গ ও তাবুগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং তাদের হাজার হাজার যোদ্ধা পরিবারসহ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এর মাত্র কয়েক মাস পর, ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে সিরিয়ার ইদলিবের এক গোপন বাড়িতে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের পরিচালিত ‘অপারেশন কায়লা মুলার’-এ চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ হয়ে আবু বকর আল-বাগদাদি নিজের আত্মঘাতী ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজের দুই সন্তানসহ মৃত্যুবরণ করেন।
শারীরিক ভূখণ্ডের পরাজয় ঘটলেও এবং একের পর এক খলিফার মৃত্যু সত্ত্বেও এই মতাদর্শিক চক্রটি কিন্তু পুরোপুরি মুছে যায়নি। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ অ্যারন ওয়াই জেলিন (Aaron Y. Zelin) খিলাফত-পরবর্তী বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কীভাবে সংগঠনটি তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে পুনরায় নিজেদের পুরোনো দিনের মতো এক অদৃশ্য আন্ডারগ্রাউন্ড গেরিলা নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত করেছে (Zelin, 2020)। তারা ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ আনবার ও বাদিয়া মরুভূমির প্রাকৃতিক গুহায় ছোট ছোট স্লিপার সেল হিসেবে আত্মগোপন করে রয়েছে এবং রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতর্কিত চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি উত্তর সিরিয়ার আল-হোল ও আল-রোজের মতো বিশাল শরণার্থী ও বন্দিশিবিরে আটক থাকা হাজার হাজার উগ্রপন্থী নারী ও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক নতুন টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে।
একই সময়ে ইসলামিক স্টেট নিজেদের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অস্থিতিশীল প্রান্তে নিজেদের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত করেছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সক্রিয় তাদের শাখা আইএসআইএস-খোরাসান (ISKP) ইতিমধ্যে কাবুলের রাস্তায় এবং রাশিয়ার মস্কোর ক্রোকাস সিটি কনসার্ট হলে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ চালিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, মোজাম্বিক এবং নাইজেরিয়ার লেক চাদ অববাহিকায় তাদের শাখা আইএসডব্লিউএপি (ISWAP) আজ হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার গ্রামীণ এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। গবেষক হুগো ক্যাফার্টি (Hugo Kaaman) এই বিবর্তন পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ভৌগোলিক খিলাফতের অবসান ঘটলেও মতাদর্শিক চরমপন্থার যে বিষাক্ত জীবাণু এই দলটি ছড়িয়ে দিয়ে গেছে, তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সামনে আগামী কয়েক দশক ধরে এক জটিল, রূপান্তরশীল ও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবে বেঁচে থাকবে (Kaaman, 2021)। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কেবল কামানের গোলা ও বিমান হামলা দিয়ে সাময়িকভাবে কোনো উগ্র দলকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব হলেও, মানুষের মগজে বাসা বাঁধা অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক ক্ষোভের মূল কারণগুলো নির্মূল না করা পর্যন্ত এমন ধ্বংসাত্মক শক্তির পুনরাগমন কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না।
উপসংহার
একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আদর্শ যখন রক্তপাতের মধ্য দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়, তখন তা কেবল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের শান্তিকেই ধ্বংস করে না, বরং মানব সভ্যতার পারস্পরিক সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন মাত্রা ও রূপ নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার পর যে সত্যটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয় তা হলো, কোনো একক কারণ দিয়ে এই দানবীয় বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি একই সাথে ঐতিহাসিক বঞ্চনাবোধ, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত, অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণ এবং চরমপন্থী ভাবাদর্শের এক সম্মিলিত বিস্ফোরণ। রক্তক্ষয়ী কোনো হামলার পর ধ্বংসস্তূপের চিত্র দেখে শিউরে ওঠা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ধ্বংসের পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক ভিত্তিটি বুঝতে না পারলে এই অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কখনোই সম্ভব হবে না।
সহিংস চরমপন্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষমতা। প্রতিটি সশস্ত্র দলই তাদের প্রতিটি নৃশংসতার পেছনে এক ধরনের কৃত্রিম নৈতিক যুক্তি দাঁড় করায়। তারা নিজেদের অপরাধকে ‘ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিশোধ’ কিংবা ‘পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে সমাজের সামনে উপস্থাপন করতে চায়। এই মতাদর্শিক অন্ধত্ব (Ideological Fanaticism) মানুষের বিবেক ও বিচারবুদ্ধিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করাও তাদের কাছে গৌরবের বিষয় মনে হতে থাকে। ফলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটি কোনো সাধারণ পুলিশি বা সামরিক অভিযানের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত; এটি হলো মূলত মানুষের চিন্তা ও যুক্তির জগতে চলা এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংঘাত (Epistemological Conflict)।
অন্যদিকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের শারীরিক শক্তি বা অস্ত্রভাণ্ডারের চেয়ে তাদের কাঠামোগত স্থায়িত্ব (Structural Resilience) অনেক বেশি বিপজ্জনক। রাষ্ট্রের কঠোরতম দমন অভিযানের মুখেও বহু সংগঠন দশকের পর দশক ধরে নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পেরেছে, কারণ তারা সমাজের সুপ্ত ক্ষোভ ও রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখে। এক প্রজন্মের শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও মতাদর্শের বিষবাষ্প যদি সমাজে সক্রিয় থাকে, তবে নতুন প্রজন্মের মধ্য থেকে আবার নতুন নেতৃত্বের জন্ম হয়। এর মানে দাঁড়ায়, কেবল অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বা নেতৃত্বকে খতম করে সন্ত্রাসের স্থায়ী অবসান ঘটানো যায় না; বরং যে সামাজিক ও রাজনৈতিক জমিতে এই উগ্রবাদের চাষাবাদ হয়, সেই জমিকে অনুর্বর করে তোলাই হলো দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের একমাত্র পথ।
একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদের সংকট থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে হলে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ এবং অন্ধ বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। যখন কোনো সমাজ তার নাগরিকদের জন্য ন্যায়বিচার, অবাধ মতপ্রকাশের অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতার ফাঁক গলেই চরমপন্থা তার শক্তি সঞ্চয় করে। ফলে সহিংসতার এই মনস্তত্ত্বকে চূর্ণ করতে হলে প্রয়োজন একটি মুক্ত, যুক্তিবাদী ও মানবিক বিশ্বদর্শন গড়ে তোলা। ভয়ের প্রাচীর ভেঙে মানবজাতি তখনই একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে, যখন মানুষ অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে স্বাধীন যুক্তির শক্তিকে এবং অপরকে ধ্বংস করার চেয়ে মানবিক মর্যাদার অহিংস সুরক্ষাকে জীবনের পরম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবে।
তথ্যসূত্র
- Abadie, A. (2006). Poverty, political freedom, and the roots of terrorism. American Economic Review, 96(2), 50–56.
- Abidor, M. (2016). Death to the Bourgeoisie: The Anarchist Action. PM Press.
- Abrahms, M. (2008). What terrorists really want: Terrorist motives and counterterrorism strategy. International Security, 32(4), 78–105.
- Al-Tamimi, A. J. (2015). The evolution in Islamic State administration: The documentary evidence. Perspectives on Terrorism, 9(4), 117–129.
- Alagha, J. (2006). The shifts in Hizbullah’s ideology: Religious ideology, political ideology, and political program. Amsterdam University Press.
- Alexander, Y., & Pluchinsky, D. (1992). Europe’s Red Terrorists: The Fighting Communist Organizations. Routledge.
- Andress, D. (2006). The Terror: The Merciless War for Freedom in Revolutionary France. Farrar, Straus and Giroux.
- Annan, K. (2005). In Larger Freedom: Towards Development, Security and Human Rights for All. United Nations.
- Arquilla, J., & Ronfeldt, D. (Eds.). (2001). Networks and netwars: The future of terror, crime, and militancy. RAND Corporation.
- Arnson, C. J. (Ed.). (2016). Peace with the FARC: The challenges of implementation. Woodrow Wilson International Center for Scholars.
- Asad, T. (2003). Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity. Stanford University Press.
- Asadullah, M. N., & Chaudhury, N. (2016). To public or not to public? Madrasas in Bangladesh. International Journal of Educational Development, 49, 107-118.
- Avalos, H. (2005). Fighting Words: The Origins of Religious Violence. Prometheus Books.
- Avon, D., & Khatchadourian, A. T. (2012). Hezbollah: A history of the “Party of God”. Harvard University Press.
- Bandura, A. (1999). Moral disengagement in the perpetration of inhumanities. Personality and Social Psychology Review, 3(3), 193-209.
- Barkun, M. (1994). Religion and the Racist Right: The Origins of the Christian Identity Movement. University of North Carolina Press.
- Barrett, R. (2014). Foreign fighters in Syria. The Soufan Group.
- Beam, L. (1992). Leaderless Resistance. The Seditionist, 12, 12-13.
- Bell, J. B. (1997). The secret army: The IRA (3rd ed.). Transaction Publishers.
- Bell, J. B. (1998). The dynamics of the armed struggle. Frank Cass.
- Bergen, P. L. (2006). The Osama bin Laden I know: An oral history of al Qaeda’s leader. Free Press.
- Berger, J. M. (2018). Extremism. MIT Press.
- Berti, B. (2013). Armed political organizations: From conflict to integration. Johns Hopkins University Press.
- Biddle, S., & Friedman, J. A. (2008). The 2006 Lebanon campaign and the future of warfare: Implications for army and defense policy. Strategic Studies Institute, U.S. Army War College.
- Bjørgo, T. (Ed.). (2005). Root causes of terrorism: Myths, reality and ways forward. Routledge.
- Blanford, N. (2011). Warriors of God: Inside Hezbollah’s thirty-year struggle against Israel. Random House.
- Bloom, M. (2005). Dying to kill: The allure of suicide terror. Columbia University Press.
- Borda, S. (2012). Internationalization of the Colombian conflict: The role of regional and extra-regional actors. In B. M. Bagley & J. M. Rosen (Eds.), Drug trafficking, organized crime, and violence in the Americas today (pp. 243–266). University Press of Florida.
- Borum, R. (2003). Understanding the terrorist mindset. FBI Law Enforcement Bulletin, 72(7), 7–10.
- Bouvier, V. M. (Ed.). (2009). Colombia: Building peace in a time of war. United States Institute of Peace Press.
- Bruce, S. (2002). God is Dead: Secularization in the West. Blackwell Publishing.
- Burke, J. (2003). Al-Qaeda: Casting a shadow of terror. I.B. Tauris.
- Byman, D. (1998). The logic of ethnic terrorism. Studies in Conflict & Terrorism, 21(2), 149–169.
- Byman, D. (2005). Deadly connections: States that sponsor terrorism. Cambridge University Press.
- Byman, D. (2015). A high price: The triumphs and failures of Israeli counterterrorism. Oxford University Press.
- Cavanaugh, W. T. (2009). The Myth of Religious Violence: Secular Ideology and the Roots of Modern Conflict. Oxford University Press.
- Chernick, M. (2007). FARC-EP: From peasant self-defense to a guerrilla army. In M. A. Centeno & E. Ferraro (Eds.), State and nation making in Latin America and Spain: The rise and fall of the developmental state (pp. 179–204). Cambridge University Press.
- Chomsky, N. (2001). 9-11. Seven Stories Press.
- Claridge, D. (1996). State terrorism? Applying a definitional model. Terrorism and Political Violence, 8(3), 47–63.
- Clarke, C. P. (2015). Terrorism, Inc.: The Financing of Terrorism, Insurgency, and Irregular Warfare. Praeger.
- Clarke, C. P. (2019). After the caliphate: The Islamic State and the future of the terrorist diaspora. Polity Press.
- Coll, S. (2004). Ghost wars: The secret history of the CIA, Afghanistan, and bin Laden, from the Soviet invasion to September 10, 2001. Penguin Press.
- Collier, P., & Hoeffler, A. (2004). Greed and grievance in civil war. Oxford Economic Papers, 56(4), 563–595.
- Conway, M. (2017). Determining the Role of the Internet in Violent Extremism and Terrorism: Six Suggestions for Progressing Research. Studies in Conflict & Terrorism, 40(1), 77-98.
- Coogan, T. P. (2002). The IRA (Fully rev. and updated ed.). Palgrave Macmillan.
- Crenshaw, M. (1981). The causes of terrorism. Comparative Politics, 13(4), 379–399.
- Cronin, A. K. (2009). How terrorism ends: Understanding the decline and demise of terrorist campaigns. Princeton University Press.
- Davies, J. C. (1962). Toward a theory of revolution. American Sociological Review, 27(1), 5–19.
- Davis, M. (2007). Buda’s Wagon: A Brief History of the Car Bomb. Verso.
- Dawkins, R. (2006). The God Delusion. Bantam Books.
- Deas, M. (2012). The criminalisation of the Colombian conflict: Some historical perspectives. Third World Quarterly, 33(5), 785–798.
- Deflem, M. (2005). Policing World Society: Historical Foundations of International Police Cooperation. Oxford University Press.
- della Porta, D. (1995). Social movements, political violence, and the state: A comparative analysis of Italy and Germany. Cambridge University Press.
- Devji, F. (2005). Landscapes of the Jihad: Militancy, Morality, Modernity. Cornell University Press.
- Enders, W., & Sandler, T. (2006). The political economy of terrorism. Cambridge University Press.
- English, R. (2003). Armed struggle: The history of the IRA. Oxford University Press.
- English, R. (2009). Terrorism: How to respond. Oxford University Press.
- English, R. (2016). Does Terrorism Work? A History. Oxford University Press.
- Fanon, F. (1963). The Wretched of the Earth. Grove Press.
- Farrall, L. (2011). How al Qaeda works: What the organization’s subsidiaries say about its strength. Foreign Affairs, 90(2), 128–138.
- Felbab-Brown, V. (2010). Shooting up: Counterinsurgency and the war on drugs. Brookings Institution Press.
- Fox, J. (2004). Religion, Civilization, and Civil War: 1945 through the New Millennium. Lexington Books.
- Friedland, R. (2001). Religious Nationalism and the Problem of Collective Representation. Annual Review of Sociology, 27, 125-152.
- Gerges, F. A. (2005). The far enemy: Why Jihad went global. Cambridge University Press.
- Giddens, A. (1999). Runaway World: How Globalization is Reshaping Our Lives. Profile Books.
- Girard, R. (1977). Violence and the Sacred. Johns Hopkins University Press.
- Gordon, S., & Ford, R. (2002). Cyberterrorism?. Computers & Security, 21(7), 636–647.
- Gunaratna, R. (2002). Inside Al Qaeda: Global network of terror. Columbia University Press.
- Gurr, T. R. (1970). Why men rebel. Princeton University Press.
- Haidt, J. (2012). The Righteous Mind: Why Good People Are Divided by Politics and Religion. Pantheon Books.
- Harik, J. P. (2004). Hezbollah: The changing face of terrorism. I.B. Tauris.
- Harris, S. (2004). The End of Faith: Religion, Terror, and the Future of Reason. W. W. Norton & Company.
- Hasan, M. (2020). Islam and Politics in Bangladesh: The Followers of Ummah. Palgrave Macmillan.
- Hassan, H. (2016). The sectarianism of the Islamic State: Ideological roots and political context. Carnegie Endowment for International Peace, 1–24.
- Hegghammer, T. (2010). Jihad in Saudi Arabia: Violence and pan-Islamism since 1979. Cambridge University Press.
- Hobsbawm, E., & Ranger, T. (1983). The Invention of Tradition. Cambridge University Press.
- Hoffer, E. (1951). The True Believer: Thoughts on the Nature of Mass Movements. Harper & Row.
- Hoffman, B. (2006). Inside terrorism (Rev. and expanded ed. / 2nd ed.). Columbia University Press.
- Holbrook, D. (2014). The Al-Qaeda doctrine: The framing and evolution of the leadership’s public discourse. Bloomsbury Academic.
- Holmes, J. L. (2001). Terrorism and democratic stability revisited. Manchester University Press.
- Horgan, J. (2008). From profiles to pathways and roots to routes: Investigating loyalists and republicans in Northern Ireland. Terrorism and Political Violence, 20(1), 80–94.
- Horgan, J. (2009). Walking away from terrorism: Accounts of disengagement from radical and extremist movements. Routledge.
- Horgan, J., & Braddock, K. (2010). Rehabilitating the terrorists?: Challenges in assessing the effectiveness of de-radicalization programs. Terrorism and Political Violence, 22(2), 267–291.
- Hossain, G. (1988). General Ziaur Rahman and the BNP: Political Transformation of a Military Regime. University Press Limited.
- Human Rights Watch. (2015). Bangladesh: Stop Deadly Attacks on Free Thinkers. HRW Publications.
- International Crisis Group. (2002, July 29). Pakistan: Madrasas, extremism and the military (Asia Report No. 36). International Crisis Group.
- International Crisis Group. (2006, October 23). Bangladesh today (Asia Report No. 121). International Crisis Group.
- International Crisis Group. (2010). The Threat from Jamaat-ul Mujahideen Bangladesh (Asia Report No. 187). International Crisis Group.
- International Crisis Group. (2018, February 28). Countering jihadist militancy in Bangladesh (Asia Report No. 295). International Crisis Group.
- Jaffrelot, C. (1996). The Hindu Nationalist Movement in India. Columbia University Press.
- Jahan, R. (2000). Bangladesh: Promise and Performance. Zed Books.
- Janis, I. L. (1972). Victims of groupthink: A psychological study of foreign-policy decisions and fiascoes. Houghton Mifflin.
- Jenkins, B. M. (1975). International terrorism: A new mode of conflict. California Seminar on Arms Control and Foreign Policy / Crescent Publications.
- Jensen, R. B. (2014). The Battle against Anarchist Terrorism: An International History, 1878–1934. Cambridge University Press.
- Jerryson, M. (2010). Buddhist Warfare. Oxford University Press.
- Josephus, F. (1981). The Jewish War (G. A. Williamson, Trans.). Penguin Classics.
- Juergensmeyer, M. (2003). Terror in the Mind of God: The Global Rise of Religious Violence (3rd ed.). University of California Press.
- Kaaman, H. (2021). The improvised vehicle-borne improvised explosive device (SVBIED) in Islamic State military doctrine. Studies in Conflict & Terrorism, 44(8), 655–678.
- Kaplan, J. (2016). A Fifth Wave of Terrorism? Perspectives on Terrorism, 10(2), 61-71.
- Karlekar, H. (2005). Bangladesh: The Next Afghanistan? Sage Publications.
- Kepel, G. (2002). Jihad: The Trail of Political Islam. Harvard University Press.
- Krueger, A. B., & Malečková, J. (2003). Education, poverty and terrorism: Is there a causal connection?. Journal of Economic Perspectives, 17(4), 119–144.
- Kruglanski, A. W. (2004). The Psychology of Closed Mindedness. Psychology Press.
- Kruglanski, A. W., Gelfand, M. J., Bélanger, J. J., Sheveland, A., Hetiarachchi, M., & Gunaratna, R. (2014). The meaning of the quest for personal significance in terrorism. Political Psychology, 35(S1), 69–93.
- Lacroix, S. (2011). Awakening Islam: The Politics of Religious Dissent in Contemporary Saudi Arabia. Harvard University Press.
- Laqueur, W. (1976). Guerrilla warfare: A historical and critical study. Transaction Publishers.
- Laqueur, W. (1999). The New Terrorism: Fanaticism and the Arms of Mass Destruction. Oxford University Press.
- Laqueur, W. (2001). A History of Terrorism. Transaction Publishers.
- Lenin, V. I. (1902). What is to be done? Burning questions of our movement. (Various English translations).
- Levitt, M. (2013). Hezbollah: The global footprint of Lebanon’s Party of God. Georgetown University Press.
- Lewis, B. (1967). The Assassins: A Radical Sect in Islam. Basic Books.
- Lewis, D. (2011). Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society. Cambridge University Press.
- Lifton, R. J. (1999). Destroying the World to Save It: Aum Shinrikyo, Apocalyptic Violence, and the New Global Terrorism. Henry Holt and Company / Metropolitan Books.
- Lincoln, B. (1989). Discourse and the Construction of Society: Comparative Studies of Myth, Ritual, and Classification. Oxford University Press.
- Lister, C. (2015). The Islamic State: A brief introduction. Brookings Institution Press.
- Llorente, M. V. (2002). Demilitarization in times of war? The police and the Colombian conflict. In C. Welna & G. Gallón (Eds.), Peace, democracy, and human rights in Colombia (pp. 317–348). University of Notre Dame Press.
- Lustick, I. S. (1988). For the Land and the Lord: Jewish Fundamentalism in Israel. Council on Foreign Relations.
- Mac Ginty, R. (2006). No war, no peace: The rejuvenation of stalled peace processes and peace accords. Palgrave Macmillan.
- Makarenko, T. (2004). The Crime-Terror Continuum: Tracing the Interplay between Transnational Organised Crime and Terrorism. Global Crime, 6(1), 129-145.
- Marighella, C. (1969). Minimanual of the Urban Guerrilla. Tricontinental.
- Marty, M. E., & Appleby, R. S. (Eds.). (1991). Fundamentalisms Observed. University of Chicago Press.
- McCants, W. (2015). The ISIS apocalypse: The history, strategy, and doomsday vision of the Islamic State. St. Martin’s Press.
- McCauley, C., & Moskalenko, S. (2008). Mechanisms of political radicalization: Pathways toward terrorism. Terrorism and Political Violence, 20(3), 415–433.
- McCauley, C., & Moskalenko, S. (2011). Friction: How radicalization happens to them and us. Oxford University Press.
- McCleery, M. (2015). Operation Demetrius and its aftermath: A new history of the use of internment without trial in Northern Ireland 1971–75. Manchester University Press.
- McGarry, J. (Ed.). (2001). Northern Ireland and the divided world: The search for a peace dividend. Oxford University Press.
- Mecham, Q. (2015). How much of a state is the Islamic State?. The Washington Post, 1–5.
- Mendelsohn, B. (2016). The al-Qaeda franchise: The expansion of al-Qaeda and its consequences. Oxford University Press.
- Merriman, J. (2009). The Dynamite Club: How a Bombing in Fin-de-Siècle Paris Ignited the Age of Modern Terror. Houghton Mifflin Harcourt.
- Moghadam, A. (2008). The Globalization of Martyrdom: Al Qaeda, Salafi Jihad, and the Diffusion of Suicide Attacks. Johns Hopkins University Press.
- Moghaddam, F. M. (2005). The staircase to terrorism: A psychological exploration. American Psychologist, 60(2), 161–169.
- Moloney, E. (2002). A secret history of the IRA. W.W. Norton & Company.
- Mudde, C. (2000). The ideology of the extreme right. Manchester University Press.
- Nacos, B. L. (2016). Mass-Mediated Terrorism: Mainstream and Digital Media in Terrorism and Counterterrorism. Rowman & Littlefield.
- Nasr, S. V. R. (1996). The Vanguard of the Islamic Revolution: The Jama’at-i Islami of Pakistan. University of California Press.
- Neumann, P. R. (2013). The trouble with radicalization. International Affairs, 89(4), 873–893.
- Norton, A. R. (2007). Hezbollah: A short history. Princeton University Press.
- Ó Dochartaigh, N. (1997). From civil rights to armalites: Derry and the birth of the Irish Troubles. Cork University Press.
- O’Leary, B. (2005). Mission accomplished? Looking back at the IRA. Field Day Review, 1, 217–246.
- Pape, R. A. (2003). The strategic logic of suicide terrorism. American Political Science Review, 97(3), 343–361.
- Pape, R. A. (2005). Dying to Win: The Strategic Logic of Suicide Terrorism. Random House.
- Pape, R. A., & Feldman, J. K. (2010). Cutting the fuse: The explosion of global suicide terrorism and how to stop it. University of Chicago Press.
- Pedahzur, A. (2017). Suicide terrorism: The strategic logic and history. Polity Press.
- Pernicone, N. (1993). Italian Anarchism, 1864-1892. Princeton University Press.
- Piazza, J. A. (2011). Poverty, minority economic discrimination, and domestic terrorism. Journal of Peace Research, 48(3), 339–353.
- Pillar, P. R. (2001). Terrorism and U.S. foreign policy. Brookings Institution Press.
- Pinker, S. (2011). The Better Angels of Our Nature: Why Violence Has Declined. Viking Books.
- Pizarro Leongómez, E. (1996). Insurgencia sin revolución: La guerrilla en Colombia en una perspectiva comparada. Tercer Mundo Editores.
- Post, J. M. (2004). Leaders and Their Followers in a Dangerous World: The Psychology of Political Behavior. Cornell University Press.
- Post, J. M. (2007). The mind of the terrorist: The psychology of terrorism from the IRA to al-Qaeda. Palgrave Macmillan.
- Primoratz, I. (1990). What Is Terrorism? Journal of Applied Philosophy, 7(2), 129-138.
- Rabasa, A., & Chalk, P. (2001). Colombian labyrinth: The synergy of drugs and insurgency and its implications for regional stability. RAND Corporation.
- Ranstorp, M. (1997). Hizb’allah in Lebanon: The politics of the western hostage crisis. Macmillan.
- Ranstorp, M. (Ed.). (2010). Understanding violent radicalisation: Terrorist and jihadist movements in Europe. Routledge.
- Rapoport, D. C. (1984). Fear and Trembling: Terrorism in Three Religious Traditions. American Political Science Review, 78(3), 658-677.
- Rapoport, D. C. (2004). The Four Waves of Modern Terrorism. In A. K. Cronin & J. M. Ludes (Eds.), Attacking Terrorism: Elements of a Grand Strategy (pp. 46-73). Georgetown University Press.
- Riaz, A. (2004). God Willing: The Politics of Islamism in Bangladesh. Rowman & Littlefield Publishers.
- Riaz, A. (2008). Islamist Militancy in Bangladesh: A Complex Web. Routledge.
- Richani, N. (2002). Systems of violence: The political economy of war and peace in Colombia. State University of New York Press.
- Richards, A. (2015). From terrorism to ‘radicalization’ to ‘extremism’: Counter-terrorist discourse in the United States and the United Kingdom. International Affairs, 91(2), 371–380.
- Richardson, L. (2006). What terrorists want: Understanding the enemy, containing the threat. Random House.
- Rotberg, R. I. (2002). Failed states in a world of terror. Foreign Affairs, 81(4), 127–140.
- Roy, O. (2004). Globalized Islam: The Search for a New Ummah. Columbia University Press.
- Saad-Ghorayeb, A. (2002). Hizbu’llah: Politics and religion. Pluto Press.
- Sageman, M. (2004). Understanding terror networks. University of Pennsylvania Press.
- Salem, P. (2008). The Arab state: Assisting or thwarting change?. Carnegie Papers, 8, 1–24.
- Sanchez-Cuenca, I., & de la Calle, L. (2009). Domestic terrorism: The hidden side of political violence. Annual Review of Political Science, 12, 31–49.
- Schmid, A. P. (2013). Radicalisation, de-radicalisation, counter-radicalisation: A conceptual discussion and literature review. ICCT Research Paper, 4(2), 1–97.
- Schmid, A. P. (Ed.). (2011). The Routledge handbook of terrorism research. Routledge.
- Schmid, A. P., & Jongman, A. J. (1988). Political Terrorism: A New Guide to Actors, Authors, Concepts, Data Bases, Theories, and Literature. North-Holland Publishing.
- Sedgwick, M. (2007). Inspiration and the Origins of Global Waves of Terrorism. Studies in Conflict & Terrorism, 30(2), 97-112.
- Seib, P. (2008). The Al Jazeera effect: How the new global media are reshaping world politics. Potomac Books.
- Selengut, C. (2003). Sacred Fury: Understanding Religious Violence. AltaMira Press.
- Shanahan, R. (2015). The Shi’a of Lebanon: Clans, parties and clerics. I.B. Tauris.
- Shapiro, J. N. (2013). The Terrorist’s Dilemma: Managing Violent Covert Organizations. Princeton University Press.
- Shehabuddin, E. (2008). Reshaping the Holy: Democracy, Development, and Muslim Women in Bangladesh. Columbia University Press.
- Shelley, L. I. (2014). Dirty entanglement: Corruption, crime, and terrorism. Cambridge University Press.
- Shifter, M. (2017). Colombia’s elusive peace: The challenges of post-conflict reconstruction. Current History, 116(787), 43–48.
- Silber, M. D., & Bhatt, A. (2007). Radicalization in the West: The homegrown threat. Police Department, City of New York.
- Silke, A. (1998). Cheshire-cat logic: The recurring theme of terrorist abnormality in psychological research. Psychology, Crime & Law, 4(1), 51–69.
- Simon, J. D. (2013). Lone wolf terrorism: Understanding the growing threat. Prometheus Books.
- Smith, M. L. R. (1995). Fighting for Ireland?: The military strategy of the Irish republican movement. Routledge.
- Smith, M. S. (2016). The Islamic State’s external operations apparatus. CTC Sentinel, 9(5), 26–30.
- Spaaij, R. (2012). Understanding Lone Wolf Terrorism: Global Patterns, Motivations and Prevention. Springer.
- Speckhard, A. (2012). Talking to terrorists: Understanding the psycho-social motivations of militant Jihadi terrorists, mass hostage takers, suicide bombers & martyrs. Advances Press.
- Stohl, M. (1984). International dimensions of state terrorism. In M. Stohl & G. A. Lopez (Eds.), The state as terrorist: The dynamics of governmental violence and repression (pp. 43–58). Greenwood Press.
- Sunstein, C. R. (2009). Going to extremes: How like minds unite and divide. Oxford University Press.
- Swann, W. B., Jetten, J., Gómez, A., Whitehouse, H., & Bastian, B. (2012). When group membership gets personal: a theory of identity fusion. Psychological Review, 119(3), 441-456.
- Tajfel, H., & Turner, J. C. (1979). An integrative theory of intergroup conflict. In W. G. Austin & S. Worchel (Eds.), The social psychology of intergroup relations (pp. 33-47). Brooks/Cole.
- Taylor, C. (2007). A Secular Age. Harvard University Press.
- Tellis, A. J. (2012). The Menace That Is Lashkar-e-Taiba. The Washington Quarterly, 35(1), 73-89.
- Toolis, K. (1995). Rebel hearts: Journeys within the IRA’s soul. St. Martin’s Press.
- Uddin, S. M. (2006). Constructing Bangladesh: Religion, Ethnicity, and Language in an Islamic Nation. University of North Carolina Press.
- van der Veer, P. (1994). Religious Nationalism: Hindus and Muslims in India. University of California Press.
- Van Schendel, W. (2009). A History of Bangladesh. Cambridge University Press.
- Victoroff, J. (2005). The mind of the terrorist: A review and critique of psychological approaches. Journal of Conflict Resolution, 49(1), 3–42.
- Wagemakers, J. (2012). A Quietist Jihadi: The Ideology and Influence of Abu Muhammad al-Maqdisi. Cambridge University Press.
- Weber, M. (1947). The Theory of Social and Economic Organization. Oxford University Press.
- Weimann, G. (2006). Terror on the Internet: The New Arena, the New Challenges. United States Institute of Peace Press.
- White, R. W. (1993). Provisional Irish republicans: An oral and interpretive history. Greenwood Press.
- Wiktorowicz, Q. (2005). Radical Islam rising: Muslim extremism in the West. Rowman & Littlefield Publishers.
- Wiktorowicz, Q. (2006). Anatomy of the Salafi Movement. Studies in Conflict & Terrorism, 29(3), 207-239.
- Wilkinson, P. (1974). Political Terrorism. Macmillan.
- Wilkinson, P. (1977). Terrorism and the Liberal State. Macmillan.
- Wilkinson, P. (1986). Terrorism and the liberal state (2nd ed.). Macmillan.
- Wilkinson, P. (2011). Terrorism versus democracy: The liberal state response (3rd ed.). Routledge.
- Williams, P. (2008). Violent non-state actors and national security. PRISM, 1(1), 3–18.
- Winter, C. (2015). The virtual ‘caliphate’: Understanding Islamic State’s propaganda strategy. Quilliam Foundation.
- Wood, G. (2017). The way of the strangers: Encounters with the Islamic State. Random House.
- Woodcock, G. (1962). Anarchism: A History of Libertarian Ideas and Movements. Meridian Books.
- World Bank. (2019). Bangladesh – Voices to Choices: Bangladesh’s Journey in Women’s Economic Empowerment. World Bank Group.
- Wright, L. (2006). The looming tower: Al-Qaeda and the road to 9/11. Alfred A. Knopf.
- Zelin, A. Y. (2020). Your sons are at your service: Tunisia’s missionaries of jihad. Columbia University Press.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.


