দেবদেবীদের ব্যভিচার
আগেই বলা হয়েছে যে দেবসমাজের পরিমণ্ডলটা মানুষ তার নিজ সমাজের প্রতিচ্ছবিতেই কল্পনা করেছিল। সেজন্য মনুষ্যসমাজে যেসব অজাচার ও ব্যভিচারের প্রচলন ছিল, দেবসমাজেও তাই ছিল। পৌরাণিক যুগেব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর, এই তিন দেবতা সব দেবতার উচ্চে স্থান পেয়েছিল। বেদে কিংবা ব্রাহ্মণে কিন্তু ব্রহ্মার নাম পাওয়া যায় না। পৌরাণিক যুগে ব্রহ্মাই ছিলেন সৃষ্টিকর্তা। বেদে ও ব্রাহ্মণে সৃষ্টি কর্তাকে হিরণ্যগর্ভ প্রজাপতি বলা হয়েছে। তা থেকে মনে হয় ব্রহ্মা ছিলেন বৈদিক যুগের প্রজাপতিরই পরবর্তীকালের রূপ। পুরাণে সরস্বতীকে ব্রহ্মার স্ত্রী বলা হয়েছে। শতরূপা ব্রহ্মার কন্যা। কিন্তু ব্রহ্মা নিজ কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে অজাচারে লিপ্ত হন। এই অজাচারের ফলে শতরূপার গর্ভে স্বায়ম্ভূব মনুর জন্ম হয়। অন্য কাহিনী অনুযায়ী শতরূপা ব্রহ্মার স্ত্রী, মনুর মাতা নন। আর এক কাহিনী অনুযারী ব্রহ্মা নিজেকে দুই অংশে বিভক্ত করেন- নর ও নারী। এদের সঙ্গমের ফলে মনুর জন্ম হয়। আর নারীকে সাবিত্রী বলা হয়। পুরাণে আছে ব্রহ্মা প্রথম নয়জন মানস পুত্র সৃষ্টি করেন। তারপর এক কন্যা সৃষ্টি করেন। এই কন্যার নাম শতরূপা। শতরূপা নানা নামে পরিচিতা- শতরূপা, সাবিত্রী, গায়ত্রী, সরস্বতী ও ব্রাহ্মণী। ব্রহ্মা এই কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে একেই বিবাহ করেন। এই কন্যারই গর্ভ হতে স্বায়ম্ভূব মনুর জন্ম হয়। আবার বলা হয়েছে স্বায়ম্ভূব মনু হতে শতরূপার গর্ভে প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ নামে দুই পুত্র ও কাকুতি ও প্রসূতি নামে দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে। তাদের পিত্রকন্যা থেকেই মনুষ্যজাতির উদ্ভব হয়। বিভিন্ন কাহিনীগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে অজাচারের মধ্যে দিয়েই মনুষ্যসমাজের সৃষ্টি হয়েছিল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও ব্রহ্মাকে কামুক দেবতা হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। সেখানে ব্রহ্মা গোপকন্যার গায়ে গা লাগিয়ে উপবিষ্ট হয়ে আছেন।

যদিও বেদে এইসব কাহিনী নেই, তা হলেও বেদে অজাচারের একাধিক দৃষ্টান্ত আছে। প্রথমেই উষার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ঋগ্বেদের কুড়িটা সুক্তে উষা স্তুত হয়েছেন। তিনি প্রজাপতির কন্যা, কাঞ্চনবর্ণা ও সূর্যের ভগিনী। তিনি বক্ষদেশ উন্মুক্ত রাখতেন। ব্রহ্মার ন্যায় প্রজাপতিও একজন কামুক দেবতা। কৃষ্ণ যজুর্বেদের মৈত্রায়নিসংহিতা (৪/২/২২) অনুযায়ী প্রজাপতি নিজ কন্যা ঊষাতে উপগত হয়েছিলেন। ঊষা মৃগী রূপ ধারণ করেছিল। প্রজাপতিও মৃগ রূপ ধারণ করে সঙ্গম করেছিল। পিতা প্রজাপতি চন্দ্রের সঙ্গে ঊষার বিবাহ দেবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু তার বিবাহের খবর পেয়ে অগ্নি, সূর্য, ইন্দ্র ও অশ্বিনীদ্বয় সকলেই তার পাণিপ্রার্থী হয়ে হাজির হন। প্রজাপতি তখন ঘোষণা করেন যে অনন্ত আকাশপথ অনুধাবনে যিনি সমর্থ হবেন, তারই হাতে তিনি ঊষাকে সমর্পণ করবেন। একথা শুনে অগ্নি, ইন্দ্র ও সূর্য আজীবন অনুধাবনের জন্য চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। একমাত্র অশ্বিনীদ্বয়ই সমর্থ হন। কিন্তু এরা সূর্যের অনুচর বলে, সূর্যের প্রীতিকামনায় ঊষাকে প্রতিগ্রহ করেন না। তারফলে সূর্যই ঊষাকে বরণ করে নেন।
দুই
অপর এক কাহিনী হচ্ছে যম-যমীর কাহিনী। ঋগ্বেদ অনুযায়ী তারা বিবস্বান ও সরন্যুর সন্তান ও যমজ ভ্রাতা ও ভগিনী। যমী যমের সঙ্গে সঙ্গম আকাঙ্ক্ষা করেন, কিন্তু যম তা প্রত্যাখ্যান করেন। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দশম সুক্তে এই কাহিনীটি আছে। সেখানে যমী যমকে বলছে- ‘বিস্তীর্ণ সমুদ্রমধ্যবর্তী এ দ্বীপে এসে এ নির্জন প্রদেশে তোমার সহবাসের জন্য আমি অভিলাষিনী, কারণ গর্ভাবস্থা অবধি তুমি আমার সহচর। বিধাতা মনে মনে চিন্তা করে রেখেছেন যে তোমার ঐরসে আমার গর্ভে আমাদের পিতার একটি সুন্দরনপ্তা (নাতি) জন্মিবে। ‘ যম তার উত্তরে বলেছে- ‘তোমার গর্ভ সহচর তোমার সাথে এ প্রকার সম্পর্ক কামনা করে না, যেহেতু তুমি সহোদরা ভগিনী, তুমি অগম্যা। ‘ যমী তার উত্তরে বলেছে-‘ যদিচ কেবল মানুষের পক্ষে এ প্রকার সংসর্গ নিষিদ্ধ, তথাপি দেবতারা এরূপ সংসর্গ ইচ্ছাপূর্বক করে থাকেন। অতএব আমার যেরূপ ইচ্ছা হচ্ছে, তুমিও তদ্রুপ ইচ্ছা কর। তুমি আমার প্রতি অভিলাষযুক্ত হও, এস একস্থানে শয়ন করি। পত্নী যেমন পতির নিকট তদ্রুপ আমি তোমার নিকট নিজ দেহ সমর্পণ করে দিই’ যমের উক্তি- ‘তোমার ভ্রাতার এরূপ অভিলাষ নেই। ‘ উত্তরে যমী বলছে- ‘তুমি নিতান্ত দুর্বল পুরুষ দেখছি। ‘ (ঋগ্বেদ ১০/১০/৭-১৪)
তিন
ইন্দ্র দেবলোকের রাজা। ইন্দ্র ইন্দ্রিয়দোষে দুষ্ট। রামায়ণ অনুযায়ী ইন্দ্র গৌতম ঋষির স্ত্রী অহল্যার সতীত্ব নাশ করেছিলেন। অহল্যা ছিলেন ব্রহ্মার মানসী কন্যা ও শতানন্দের জননী। অহল্যার সৌন্দর্যের মধ্যে বিন্দুমাত্র ‘হল’ বা বিরূপতা ছিল না। সেজন্যই ব্রহ্মা তার নাম দিয়েছিলেন অহল্যা। তিনি বহুদিন অহল্যাকে সংযমচিত্ত গৌতম ঋষির কাছে রেখেছিলেন, গৌতম যখন তাকে পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক অবস্থায় ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন তখন ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে গৌতমের সঙ্গে অহল্যার বিবাহ দেন। এতে ইন্দ্র ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন, কেননা ইন্দ্র ভেবেছিলেন, এই অপূর্ব সুন্দরী নারী তারই প্রাপ্য। একদিন গৌতম স্নান করবার জন্য আশ্রমের বাহিলে গেলে ইন্দ্র গৌতমের রূপ ধরে অহল্যার কাছে আসেন ও তার সঙ্গম প্রার্থনা করেন। অহল্যা ইন্দ্রকে চিনতে পেরেও সেই সময় কামার্তা ছিলেন বলে দুর্মতি বশত তার সঙ্গে সঙ্গমে রত হয়। ইতিমধ্যে গৌতম এসে উপস্থিত হন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন যে ইন্দ্র নপুংসক হবেন। সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রের অণ্ড খসে পড়ে। কিন্তু ইন্দ্র দেবতাদের কাছে নিজের দুর্দশার কথা বললে, দেবতারা মেষাণ্ড উৎপাটিত করে ইন্দ্রের দেহে সংযুক্ত করেন। (ইন্দ্রের এই দুর্গতির কারণ সম্পর্কে আগের অধ্যায় দ্রষ্টব্য)
ইন্দ্র একবার বৃষণশ্চ রাজার কন্যা মেনা অভিমুখী হয়েছিলেন। পরে মেনাকে প্রাপ্তযৌবনা দেখে স্বয়ং তার সঙ্গে সহবাস অভিলাষ করেছিলেন। (ঋগ্বেদ ১/৫২/১৩ সম্বন্ধে সায়ণ ভাষ্য দেখুন)
চার
বৈদিক যুগে ইন্দ্র যেমন শ্রেষ্ঠ দেবতা, পৌরাণিক যুগে বিষ্ণু তেমনই সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা। বিষ্ণুও ব্যভিচার দোষ থেকে মুক্ত নন। বিষ্ণুর ব্যভিচার সম্বন্ধে দুটা কাহিনী বিবৃত আছে। একটা হচ্ছে জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দা সম্বন্ধে আর একটা শঙ্খচূড়ের স্ত্রী তুলসী সম্বন্ধে। প্রথমেই বলছি তুলসীর কথা। তুলসী রাধিকার সহচরী। একদিন গোলোকে কৃষ্ণের সঙ্গে তাকে ক্রীড়ারত দেখে, রাধিকা তুলসীকে অভিশাপ দেন যে সে মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করবে। কিন্তু কৃষ্ণ তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, তুলি দুঃখিতা হয়ো না, কেননা তপস্যা দ্বারা তুমি আমার এক অংশ পাবে। তুলসী ধর্মধ্বজ রাজার স্ত্রী মাধবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে ব্রহ্মার তপস্যায় রত হন। ব্রহ্মা তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর চাইতে বলেন। তুলসী বলে, তিনি নারায়ণকে স্বামীরূপে পেতে চান। ব্রহ্মা বলেন, কৃষ্ণের অঙ্গ সম্ভূত সুদাম দানবগৃহে শঙ্খচূড় নামে জন্মগ্রহণ করেছে। তুমি তার স্ত্রী হবে এবং পরে নারায়ণের পাশে বৃক্ষ রূপে জন্মগ্রহণ করবে। তোমাকে না হলে নারায়ণের পূজাই হবে না। যথা সময় শঙ্খচূড়ের সঙ্গে তুলসীর বিবাহ হয়। শঙ্খচূড়ের বর ছিল যে তার স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট না হলে, তার মৃত্যু হবে না। শঙ্খচূড়ের অত্যাচার ও উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা ব্রহ্মা ও শিবের সঙ্গে নারায়ণের কাছে যায়। নারায়ণ বলেন, শিব শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধে রত হলে, তিনি তুলসীর সতীত্ব নষ্ট করবেন। যুদ্ধের সময় নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে, তুলসীর সতীত্ব নষ্ট করে। তখন শিবের হাতে শঙ্খচূড় নিহত হয়। নারায়ণ ছদ্মবেশে তার সতীত্ব নষ্ট করেছে জানতে পেরে তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেয়, ‘আজ থেকে তুমি পাষাণে পরিণত হও। ‘ সেই থেকে নারায়ণ শিলারূপে অবস্থিত হয়ে সর্বদা তুলসীযুক্ত হয়ে থাকেন। এটা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের কাহিনী। পদ্মপুরাণের কাহিনী অনুযায়ী তুলসী জলন্ধর নামে এক অসুরের স্ত্রী বৃন্দা। শিবের সঙ্গে জলন্ধরের যুদ্ধ হয়। বৃন্দা স্বামীর প্রাণ রক্ষার জন্য বিষ্ণু পূজায় প্রবৃত্ত হয়। তখন বিষ্ণু জলন্ধরের রূপ ধারণ করে বৃন্দার সামনে এসে উপস্থিত হন। স্বামীকে অক্ষত দেহে ফিরে আসতে দেখে, বৃন্দা পূজা অসমাপ্ত রেখে উঠে পড়ে। তাতেই জলন্ধরের মৃত্যু হয়। বৃন্দা বিষ্ণুকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে, বিষ্ণু ভীত হয়ে বৃন্দাকে বলে, তুমি সহমৃতা হও, তোমার ভস্ম থেকে(অন্য মতে কেশ থেকে) তুলসী বৃক্ষ উৎপন্ন হবে, এবং তুমি লক্ষ্মীর ন্যায় আমার প্রিয়া হবে। তোমা ব্যতীত নারায়ণের পূজা হবে না।
দেবলোকের খুব চাঞ্চল্যকর ব্যভিচার হচ্ছে দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারার সঙ্গে চন্দ্রের ব্যভিচার। তারার রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে চন্দ্র একবার তারাকে হরণ করে। এই ঘটনায় বৃহস্পতি ক্রুদ্ধ হয়ে চন্দ্রকে শাস্তি দেবার জন্য দেবতাদের সাহায্য প্রার্থনা করে। তারাকে ফেরত দেবার জন্য দেবতা ও ঋষিগণ চন্দ্রকে অনুরোধ করে। চন্দ্র তারাকে ফেরত দিতে অরাজী হয়, এবং দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের সাহায্য প্রার্থনা করে। রুদ্রদেব বৃহস্পতির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দেবাসুরের মধ্যে এক ভীষণ যুদ্ধের আশঙ্কায় ব্রহ্মা মধ্যস্থ হয়ে বিবাদ মিটিয়ে দেন। চন্দ্র তারাকে বৃহস্পতির হাতে প্রত্যর্পণ করে। কিন্তু তারা ইতিমধ্যে চন্দ্র কর্তৃক অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায়, বৃহস্পতি তাকে গর্ভত্যাগ করে তার কাছে আসতে বলে। তারা গর্ভত্যাগ করার পর এক পুত্রের জন্ম হয়। এর নাম দস্যু সুন্তম। ব্রহ্মা তারাকে জিজ্ঞাসা করেন, এই পুত্র চন্দ্রের ঔরসজাত কিনা? তারা ইতিবাচক উত্তর দিলে চন্দ্র সেই পুত্রকে গ্রহণ করে, ও তার নাম রাখে বুধ।
আর্যদেবতামণ্ডলীর দেবতাদের ব্যভিচারের আরও দৃষ্টান্ত আছে। এখানে আরও একটা উদাহরণ দিচ্ছি। বরুণ ঋগ্বেদের একজন প্রধান দেবতা। ঋগ্বেদের ঋষিরা আকাশকে সমুদ্রের সঙ্গে কল্পনা করে আকাশের দেবতা বরুণকে জলময় মনে করতেন। মহাভারতে আছে যে বরুণ চন্দ্রের কন্যা উতথ্যের স্ত্রী ভদ্রার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে হরণ করে নিয়ে যায়। অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও বরুণ যখন ভদ্রাকে ফিরিয়ে দিল না, উতথ্য তখন সমস্ত জলরাশি পান করতে উদ্যত হলেন। তখন বরুণ ভয় পেয়ে ভদ্রাকে দিল।
আমরা আবার পড়ি একবার অশ্বিনীকুমারদ্বয় শর্যাতি রাজার মেয়ে যৌবনদীপ্তা সুকন্যাকে স্নানের পর নগ্নাবস্থায় দেখে তার রূপে মুগ্ধ হয়ে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ স্বামী চব্যনকে ত্যাগ করে তাদের গ্রহণ করতে প্রলুব্ধ করেছিল। আর্যদেবতামণ্ডলীর যৌনজীবনে পরস্ত্রীকে এভাবে ফুসলে নিয়ে যাওয়া- আদর্শ নীতির পরিচায়ক নয়।
আবার রামায়ণের আদিকাণ্ডে আমরা পড়ি যে, একবার পবনদেব রাজর্ষি কুশনাভের একশত পরম রূপবতী কন্যাদের ধর্ষণ করতে অভিলাষ করেছিলেন। মেয়েগুলি অস্বীকৃত হলে, পবনদেব তাদের শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে, তাদের শরীর ভগ্ন করে দেন। পবনদেব কেশরীরাজ অঞ্জনার গর্ভে হনুমানকে উৎপাদন করেছিলেন।
দেবতারা অনেক সময় আবার অস্বাভাবিক মৈথুনেও রত হতেন। সংজ্ঞা বিশ্বকর্মার কন্যা ও সূর্যের স্ত্রী। সংজ্ঞা সূর্যের তেজ সহ্য করতে না পেরে, নিজের অনুরূপ ছায়া নামে এক নারীকে সূর্যের কাছে রেখে, উত্তরকুরুবর্ষে ঘোটকীর রূপ ধরে বিচরণ করতে থাকে। পরে সূর্য যখন এটা জানতে পারে, তখন তিনি বিশ্বকর্মার কাছে গিয়ে নিজের তেজ কর্তন করে অশ্বরূপ ধারণ করে ঘোটকীরূপিনী সংজ্ঞার কাছে এসে তার সঙ্গে সঙ্গমে রত হয়। এই মিলনের ফলে প্রথমে যুগলদেবতা অশ্বিনীকুমার ও পরে রেবন্তের জন্ম হয়। এরপর সূর্য নিজের তেজ সংহত করায় সংজ্ঞা নিজের রূপ ধারণ করে স্বামী গৃহে ফিরে আসে।
প্রজাপতির কথা আগেই বলা হয়েছে। প্রজাপতির কন্যা ঊষা যখন মৃগী রূপ ধারণ করেছিল, প্রজাপতি তখন মৃগরূপ ধারণ করে কন্যার উপগত হয়েছিলেন। শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে যে এই অপকর্মের জন্য রুদ্র প্রজাপতিকে এক তীক্ষ্ণ বাণ দ্বারা আঘাত করেছিলেন। কিন্তু ঋগ্বেদ (১০/৬১/৫-৭) অনুযায়ী রুদ্র নিজেও এই অপকর্ম করেছিলেন।
পাঁচ
দেবলোকে যে মাত্র পুরুষরাই ব্যভিচার করত, তা নয়। দেবলোকের মেয়েরাও ব্যভিচারে লিপ্ত থাকত। আগেই বলেছি যে দক্ষকন্যা স্বাহা অগ্নিকে কামনা করতেন। সপ্তর্ষিদের যজ্ঞে অগ্নি (এ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে যে অগ্নিও একজন কামুক দেবতা) যখন সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের দেখে কামার্ত হয়ে ওঠে স্বাহা তখন এক ঋষিপত্নীর রূপ ধরে ছয়বার অগ্নির সঙ্গে সঙ্গম করে। ছয়বারই অগ্নির বীর্য কাঞ্চনকুম্ভে নিক্ষিপ্ত হয়। এই ঘটনার পর সপ্তর্ষিরা তাদের স্ত্রীদের সন্দেহ করে পরিত্যাগ করে। সপ্তর্ষিদের অন্যতম বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতীর তপোপ্রভাবে স্বাহা আর তার রূপ ধারণ করতে পারে নি। বিশ্বামিত্র প্রকৃত ব্যাপার জানতেন বলে তিনি ঋষি স্ত্রীদের নির্দোষী বলেন। কিন্তু ঋষিরা তা বিশ্বাস করেন না। পরে স্বাহা অগ্নির স্ত্রী হন। কিন্তু স্বর্গে গিয়েও স্বাহার স্বভাব পরিবর্তিত হয় না। তিনি নিজ স্বামীকে ছেড়ে, কৃষ্ণকে স্বামীরূপে পাবার জন্য তপস্যা করতে থাকেন। বিষ্ণুর বরে দ্বাপরে স্বাহা নগ্নজিৎ রাজার কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করে কৃষ্ণকে স্বামীরূপে পায়।
ছয়
আবার ইন্দ্রের কথাতেই ফিরে আসি। একবার দেবতা ও মহর্ষিরা ইন্দ্রকে স্বর্গ থেকে বিতারিত করেছিল। তারা নহুষকে ইন্দ্রের আসনে বসান। কিন্তু দোষ যাবে কোথায়? কিছুকাল পরে নহুষ ইন্দ্রের স্ত্রী শচীকে হস্তগত করবার চেষ্টা করে। শচী বিপদাপন্ন হয়ে নিজেকে নহুষের কামলালসা থেকে রক্ষা করবার জন্য বৃহস্পতির পরামর্শে শচী নহুষকে বলে যে নহুষ যদি সপ্তর্ষি-বাহিত যানে তার কাছে আসে, তা হলে সে নহুষের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। নহুষ সপ্তর্ষি বাহিত শিবিকায় যাবার সময় অগস্ত্যের মাথায় পা দিয়ে ফেলেন। এর ফলে, অগস্ত্যের শাপে নহুষ অজগর সর্প রূপে বিশাখযুপ বনে পতিত হন। এভাবে শচীর সতীত্ব রক্ষা পায়।
সাত
সমুদ্রমন্থনের পর দেবাসুরের যখন আবার যুদ্ধ হয়, বিপ্রচিত্তী তখন অসুরগণের সেনাপতি ছিলেন। বিপ্রচিত্তি কশ্যপের স্ত্রী দনুর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজের বৈমাত্রেয় ভগিনী সিংহিকাকে বিয়ে করেছিলেন।
