ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে
Table of Contents
- 1 সারসংক্ষেপ
- 2 ভূমিকা
- 3 শিক্ষক ও পরীক্ষার উদাহরণ
- 4 ঘটে যাওয়া খেলার ভিডিও ও ফলাফল
- 5 স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইল কাকে বলে?
- 6 তাকদীর (নিয়তি) কাকে বলে?
- 7 তাকদীরে অবিশ্বাসের ফলাফল
- 8 তাকদীর বিষয়ে কোরআন
- 9 তাফসীর থেকে তাকদীরের ব্যাখ্যা
- 10 বান্দা করবে বলে আল্লাহ লিখেছে?
- 11 আল্লাহর লিখে রাখার কারণ কী?
- 12 তাকদীর নিয়ে লুকোচুরি
- 13 গুনাহের জন্যেই মানুষের সৃষ্টি
- 14 বুদ্ধিমত্তাও তাকদীরে নির্ধারিত
- 15 আল্লাহ মানুষকে দিয়ে করিয়ে নেন
- 16 স্বাধীন ইচ্ছা বনাম সব নির্ধারিত
- 17 মানুষ কী স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে কিছু করতে সক্ষম?
- 18 আমলের কি আসলেই কোন মূল্য হয়েছে?
- 19 মানুষের যিনা ব্যভিচার পূর্ব নির্ধারিত
- 20 তাকদীর বিষয়ে আরো হাদিস
- 21 মায়ের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় ভাগ্য নির্ধারণ
- 22 মানুষের স্বকীয়তা নাকি ঐশ্বরিক প্রজেকশন
- 23 আদম ও মুসার বাদানুবাদ
- 24 চোরের ওপর বাটপারি
- 25 নূহ নবীর অভিশাপ
- 26 আল্লাহর আরশ কেন কাঁপে
- 27 পরীক্ষায় লেভেল প্লেইং ফিল্ড
- 27.1 শয়তানকে কে পথভ্রষ্ট করেছিল?
- 27.2 নবী হওয়ার যোগ্যতা
- 27.3 নবীর স্বজনপ্রীতি ও ইনসাফ
- 27.4 জন্মগতভাবে কাফির?
- 27.5 আবূ লাহাবের ভবিষ্যত পূর্ব নির্ধারিত
- 27.6 আবু লাহাব প্যারাডক্স ও লজিক্যাল ইনএভিটেবিলিটি
- 27.7 খুন হওয়া শিশুরা কোথায় যাবে?
- 27.8 আল্লাহর লিখিত তাকদীর কি পরিবর্তনযোগ্য?
- 27.9 হায়াত নির্ধারিত হলে খুনীর শাস্তি কেন?
- 27.10 দোয়া বনাম তাকদীর: ওমনিসায়েন্স প্যারাডক্স
- 28 আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
- 29 স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মের ফলাফল বিষয়ে স্ববিরোধিতা
- 30 পরীক্ষার বিভ্রম (The Illusion of Trial)
- 31 কাদরিয়া, জাবরিয়া এবং আহলে-সুন্নাত ওয়াল জামাত
- 32 দর্শন শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা পড়া হারাম
- 33 উপসংহার
সারসংক্ষেপ
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘তাকদীর’ (Predestination) বা ভাগ্য কেবল একটি বিশ্বাস নয়, বরং একটি অনড় মহাজাগতিক পাণ্ডুলিপি। তবে ধ্রুপদী যুক্তিবিদ্যা এবং কার্যকারণ (Causality) সম্পর্কের বিচারে তাকদীরের ধারণা এবং ‘পরকাল’-এর বিচারব্যবস্থা পরস্পর সাংঘর্ষিক (Mutually Exclusive)। যদি একজন সর্বজ্ঞানী (Omniscient) এবং সর্বশক্তিমান (Omnipotent) সত্তা মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বেই প্রতিটি পরমাণুর গতিপথ এবং মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্থির (অপরিবর্তনীয়) করে রাখেন, তবে মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ (Free Will) বাস্তবিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। পিয়ের-সিমন লাপ্লাসের ‘যান্ত্রিক ডিটারমিনিজম’ বা লাপ্লাসের ডিমন (Laplace’s Demon) তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থা তার অতীতের ফল এবং ভবিষ্যতের কারণ [1]। ইসলামি ‘লাওহে মাহফুজ’ বা সংরক্ষিত ফলকের ধারণা মূলত এই ডিটারমিনিজমেরই একটি আধিভৌতিক সংস্করণ, যেখানে ঈশ্বর সেই ‘সুপার-ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে কাজ করেন যিনি চেইন অফ কজালিটির প্রতিটি লিঙ্ক আগে থেকেই জানেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন।
ডেভিড হিউমের কার্যকারণ তত্ত্বের (Causality) আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যদি প্রতিটি মানবিক ক্রিয়া পূর্বনির্ধারিত কোনো আদি-কারণ (First Cause) বা ঐশ্বরিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে ব্যক্তির স্বকীয় এজেন্সী বা কর্মতৎপরতা একটি মানসিক বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয় [2]। এই প্রবন্ধটি তাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দলিলের সমন্বয়ে প্রমাণ করে যে, তাকদীরের প্রচলিত কাঠামোয় মানুষের কোনো নৈতিক দায়বদ্ধতা (Moral Responsibility) থাকতে পারে না। ফলস্বরূপ, মানুষের কৃত পাপের জন্য তাকেই দণ্ড প্রদান করার বিষয়টি একটি গুরুতর ‘লজিক্যাল ফ্যালাসি’ বা যৌক্তিক বিভ্রান্তিতে পর্যবসিত হয়। ইসলামী টেক্সটগুলোতে এই অন্তর্নিহিত স্ববিরোধিতা মোকাবিলা করতে মধ্যযুগ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত ইসলামিক স্কলাররা কোরআন-হাদিসের অর্থ বিকৃত করে, শব্দ পরিবর্তন করে, বা কিছু অংশ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সমন্বয়ের নামে তাকদীরের ধারণাকে যৌক্তিকতার ছদ্মবেশ দিতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এসব প্রয়াসের মূলে রয়েছে পূর্বধারণাঃ আগে ইসলামকে অবিসংবাদী সত্য ধরে নিয়ে পরে তাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নতুন নতুন শর্ত বা ব্যাখ্যা যোগ করা—দর্শনের পরিভাষায় যাকে “Ad Hoc Hypothesis” বলা হয়। যখন কোনো তত্ত্ব (যেমন ইসলাম বা ঈশ্বরবাদ) যৌক্তিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তখন সেই তত্ত্বকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মূল কাঠামোয় অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা শর্ত সংযোজন করাই এই কুযুক্তির সার। তবে যুক্তিবিদ্যার একটি মৌলিক নীতি হলো Occam’s Razor: কোনো বিষয়ের একাধিক ব্যাখ্যা থাকলে সেইটিই গ্রহণযোগ্য যাতে সবচেয়ে কম অনুমান বা অপ্রমাণিত ধারণা জড়িত। এই প্রবন্ধে সেই নীতি অনুসরণ করে বিশুদ্ধ কোরআন, হাদিস এবং ইসলামিক আকিদাকে ভিত্তি ধরে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু অতিরিক্ত অলৌকিক অনুমান বা ব্যাখ্যাগুলোকে—যা শুধুমাত্র Ad Hoc বা Special Pleading-এর মাধ্যমে তৈরি—সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মূল টেক্সট, তাফসির ইত্যাদির যৌক্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই প্রবন্ধটি একাডেমিক স্কেপ্টিসিজম (Academic Skepticism) এবং ফরমাল লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করে লিখিত। এখানে ধর্মতাত্ত্বিক ‘অ্যাড হক হাইপোথিসিস’ (Ad Hoc Hypothesis) ও ‘স্পেশাল প্লিডিং’-এর মতো কুযুক্তিগুলো বর্জন করে অকামস রেজোর (Occam’s Razor) ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলামি আকর গ্রন্থগুলোর (কুরআন, হাদিস, বিশুদ্ধতাবাদী স্কলারদের) আক্ষরিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো কোনো অতিপ্রাকৃত বা উত্তর-ব্যাখ্যামূলক (Explanatory) অনুমান ছাড়াই মূল টেক্সটের অভ্যন্তরীণ যৌক্তিক কাঠামো এবং বৈপরীত্যসমূহ নিরপেক্ষভাবে উন্মোচন করা।
ভূমিকা
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে ‘তাকদীর’ (qadar)—অর্থাৎ সৃষ্টিজগতের ঘটনাপ্রবাহ পূর্বনির্ধারিত—একটি কেন্দ্রীয় বিশ্বাস হিসেবে উপস্থিত। বহু হাদিস-সংকলনে ঈমানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে “ভালো-মন্দ—উভয় প্রকার তাকদীরে বিশ্বাস”-কে মৌলিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (হাদিস জিবরাইলের বর্ণনা-ধারা)। কোরআনের কিছু আয়াতে “সবকিছু পরিমিত/পূর্বনির্ধারিত” এবং “সৃষ্টির আগে রেকর্ডে লিখিত” থাকার ভাষাও পাওয়া যায়—যা আকিদাগত গ্রম্থগুলোতে ‘কিতাব/রেকর্ড’ এবং অনেক ব্যাখ্যায় ‘লওহে মাহফুজ (Preserved Tablet)’ ধারণার সাথে যুক্ত করে বোঝানো হয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন এই ‘পূর্বনির্ধারণ’ ধারণাকে মানুষের “স্বাধীন ইচ্ছা” (free will) এবং নৈতিক দায় (moral responsibility)-এর সাথে পাশাপাশি বসানো হয়। যদি আমার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কাজ—কারণসহ—অগ্রিম নির্দিষ্ট থাকে, তবে “আমি অন্যভাবে করতে পারতাম” (could have done otherwise) —এই ধারণা কতটা অর্থবহ থাকে? আর যদি “অন্যভাবে করা সম্ভবই নয়”, তাহলে শাস্তি-পুরস্কারের ন্যায্যতা কীভাবে দাঁড়ায়—এ প্রশ্ন দর্শন ও যুক্তিবাদের আলোচনায় দীর্ঘদিনের। এই বিতর্কে সাধারণভাবে দুই ধরনের অবস্থান দেখা যায়: (ক) incompatibilism—নির্ধারণবাদ সত্য হলে মুক্ত ইচ্ছা/দায় টিকে না; (খ) compatibilism—কিছু সংজ্ঞা ও শর্ত বদলালে নির্ধারণের মধ্যেও দায় আরোপ সম্ভব।
ধার্মিক আলোচনায় এই টানাপোড়েন “মিটিয়ে ফেলার” জন্য নানান উপমা-উদাহরণ প্রায়ই হাজির করা হয়—যার উদ্দেশ্য সাধারণত একটাই: “আগে থেকে জানা/লিখে রাখা” মানেই “জোর করে করানো” নয়; তাই দায় মানুষেরই। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক উপমা ‘জ্ঞান’ (foreknowledge) আর ‘কারণ-সৃষ্টি/নিয়ন্ত্রণ’ (causation/creation/control) —এই দুইকে কৌশলে একাকার করে ফেলে। ফলে উপমাটি শুনতে স্বাভাবিক লাগলেও, মূল প্যারাডক্সটি থেকেই যায়: যে ফলাফল অভ্রান্তভাবে সত্য—তার বাইরে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা কোথায়? একইসাথে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ, যিনি হও বললেই সব হয়ে যায়, তার তো আসলে জোর করেও কিছু করাবার দরকার হয় না। জোর করার দরকার হয় সীমিত শক্তির কোন সত্তার, সর্বশক্তিমানের ক্ষেত্রে জোর করার প্রসঙ্গই অর্থহীন। কারণ তিনি চাইলেই সেটি ঘটে যাবে। জোরের দরকারই হবে না। নিচে প্রচলিত দুটি উপমা বা উদাহরণ আলাদা করে দেখানো হলো, এবং কেন এগুলো মূল সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ—তার বিশ্লেষণও দেওয়া হলো।
শিক্ষক ও পরীক্ষার উদাহরণ
তাকদীরকে “ন্যায়সঙ্গত” দেখাতে একটি পরিচিত উপমা হলো শিক্ষক–পরীক্ষার গল্প। বলা হয়: একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন পড়ানোর ফলে মোটামুটি বুঝে ফেলেন কার ফল ভালো হবে, কার খারাপ হবে। তিনি যদি পরীক্ষার আগে নোটবুকে লিখে রাখেন—“অমুক এ-প্লাস পাবে, অমুক ফেল করবে”—এবং পরে পরীক্ষায় ঠিক সেটাই ঘটেও যায়—তাহলে কি ছাত্রের ফেলের দায় শিক্ষকের ওপর পড়বে? না; কারণ শিক্ষক কেবল জানতেন/অনুমান করেছিলেন—তিনি ছাত্রকে ফেল করাননি। অতএব, “আগে থেকে জানা/লিখে রাখা” ছাত্রের স্বাধীন ইচ্ছা নষ্ট করে না। প্রথমত, এই ধরণের তুলনা দেয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কঠোর অপরাধ বলে গণ্য, কারণ এরকম উদাহরণ সরাসরি শিরক, যেখানে আল্লাহর সাথে শিক্ষকের তুলনা দেয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই উদাহরণের মাধ্যমে সমস্ত কিছুর ওপর আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব নিয়েই জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্লেষণ ও অসারতা: এই উপমাটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও, যুক্তিগতভাবে কয়েক জায়গায় ভেঙে পড়ে—
- এটা ‘অনুমান’, ‘অলঙ্ঘনীয় নির্ধারণ’ নয়: শিক্ষক সর্বোচ্চ যা করেন, তা হলো সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ধারণা বা প্রেডিক্ট করা। ছাত্র শেষ মুহূর্তে আচরণ বদলাতে পারে, বেশি পড়তে পারে, পরীক্ষায় অন্যভাবে করতে পারে—ফল উল্টে যেতে পারে। কিন্তু “তাকদীর”কে যদি এমনভাবে ধরা হয় যে ফলাফল অনিবার্য, তাহলে শিক্ষক-উপমার “উল্টে যেতে পারা” বৈশিষ্ট্যটাই হারিয়ে যায়।
- শিক্ষক ‘কারণ-নিয়ন্ত্রক’ নন: শিক্ষক ছাত্রের জিনগত সক্ষমতা, মানসিক গঠন, পারিবারিক পরিবেশ, পরীক্ষা দেওয়ার মুহূর্তের মনোযোগ—এসবের স্রষ্টা/নিয়ন্ত্রক নন। ইসলামী ‘তাকদীর’ কাঠামোতে আল্লাহকে কেবল পর্যবেক্ষক-জ্ঞানী হিসেবে নয়, বরং সৃষ্টিকর্তা ও সর্বক্ষম নিয়ন্তা হিসেবেও ধরা হয়—যেখানে “কী হবে” শুধু জানা নয়, “কীভাবে হবে” তার সব উপাদানও তাঁর সৃষ্টি/ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচিত। এই জায়গায় শিক্ষক–আল্লাহ তুলনা কাঠামোগতভাবে অসম।
- জ্ঞান বনাম দায়—সমীকরণটি বদলে যায়: শিক্ষক জানলেও ছাত্রের ব্যর্থতার জন্য শিক্ষককে দায়ী না করার কারণ হলো—ছাত্রের সামনে বাস্তব বিকল্প (alternate possibilities) খোলা থাকে, এবং শিক্ষক তা বন্ধ করে দেন না। কিন্তু ‘অভ্রান্ত পূর্বলিখন’ যদি সত্য হয়, তাহলে বিকল্পের দরজা আদৌ খোলা আছে কি না—সেটাই প্রশ্ন। উপমা এই মূল প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে যায়।
ফলে শিক্ষক-উপমা আসলে এক ধরনের ক্যাটাগরি মিস্টেক (category mistake) তৈরি করে: সীমিত তথ্যভিত্তিক মানব-অনুমানকে (যা ভুল হতে পারে) সর্বজ্ঞ/অভ্রান্ত পূর্বনির্ধারণের (যা ভুল হতে পারে না) সমতুল্য ধরে নেয়। তাই এটি “আগে থেকে জানা” আর “আগে থেকে অনিবার্য করে দেওয়া”—এই দুইয়ের পার্থক্য দেখালেও, স্রষ্টা-নিয়ন্ত্রকের প্রশ্ন এবং “অন্যভাবে করার বাস্তব সম্ভাবনা”—এই মূল দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দিতে পারে না।
দ্রুত বুঝতে: এই উপমায় কোন ২টা জিনিস গুলিয়ে ফেলা হয়?
- অনুমান (ভুল হতে পারে) বনাম অভ্রান্ত সত্য/ডিক্রি (ভুল হওয়ার সুযোগ নেই)
- পর্যবেক্ষক শিক্ষক (কারণ/স্রষ্টা নয়) বনাম স্রষ্টা/নিয়ন্ত্রণ যুক্ত কাঠামো (কারণ-চেইনকেও অন্তর্ভুক্ত করে)
এবারে আসুন এই প্রসঙ্গে ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার একটি বক্তব্য শুনি, যেখানে বিশুদ্ধাতাবাদী এই সালাফি আলেম খুব পরিষ্কারভাবেই বলছেন, ছাত্র শিক্ষকের উদাহরণ তাকদীরের ক্ষেত্রে ভুল, কারণ শিক্ষক নিশ্চিতভাবে কিছুই জানেন না, আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই সব জানেন,
অনেকেই আবার গেম ডেভেলপার বা রোবট তৈরির উদাহরণ দেয়। সেই উদাহরণ দিয়ে বলেন রোবটের প্রোগ্রামার কোড তৈরি করে দেয়, কিন্তু রোবটগুলো নিজ ইচ্ছাতেই কোন কাজের ক্ষেত্রে অপশন বেছে নিতে পারে। অর্থাৎ তারা বোঝাতে চান রোবট যদি কোন অপরাধ করে সেক্ষেত্রে কোড ডেভেলপার বা প্রোগ্রামারের কোন দায় নেই। প্রোগ্রামার বা ডেভেলপার অনেকগুলো অপশন রেখেছিল, সেই রোবটটিই নির্দিষ্ট অপশন বেছে নিয়েছে। কিন্তু এই উদাহরণও ভুল। এবারে আসুন এই প্রসঙ্গে ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার একটি বক্তব্য শুনি, যেখানে বিশুদ্ধাতাবাদী এই সালাফি আলেম খুব পরিষ্কারভাবেই বলছেন, এই উদাহরণ ইসলামের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল আকীদা। কারণ আল্লাহ ডেভেলপারের মত অনেক অপশন তৈরি করে বান্দার বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেন না,
ঘটে যাওয়া খেলার ভিডিও ও ফলাফল
আরেকটি জনপ্রিয় উপমা হলো “আগে দেখা ম্যাচের রেকর্ডিং”। বলা হয়: ধরুন আপনি একটি ক্রিকেট ম্যাচ একবার লাইভ দেখেছেন। ফলে আপনি জানেন—একটি নির্দিষ্ট বলে ব্যাটসম্যান ছক্কা মারবে। এখন আপনি দ্বিতীয়বার ভিডিও দেখার সময় আগেই ফল জানেন—তাতে কি ব্যাটসম্যানের স্বাধীন ইচ্ছা নষ্ট হলো? আপনার জানার কারণে কি সে ছক্কা মারছে? না। অতএব, আল্লাহ আগে থেকে জানলেও মানুষের কাজ “জোর করে করানো” হয় না।
সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ: এই উপমাটি কেন উল্টো ফল দেয়—এখানে কয়েকটি স্তরে সমস্যা আছে, এবং মজার ব্যাপার হলো: উপমাটি ঠিকভাবে ধরলে এটি বরং “নির্ধারণ মানেই অনিবার্যতা”—এই কথাটাই জোরালো করে।
- ভিডিও ‘জীবিত এজেন্ট’ নয়: স্ক্রিনে যে দৃশ্য চলছে, তা একজন সচেতন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী মানুষ নয়—এটা অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সংরক্ষিত রেকর্ড। কম্পিউটারে সংরক্ষিত কিছু ডেটা যা স্ক্রিনে ভিডিও হিসেবে চলছে। তাই ভিডিওর ভেতরের চরিত্রগুলোর কিছু ডেটা মাত্র যেগুলোর “সিদ্ধান্ত বদলাবার কোন সুযোগ নেই” — বা এমন কোনো বাস্তব ক্ষমতাই থাকে না।
- রেকর্ডেড দৃশ্যের ভেতরে বিকল্প সম্ভাবনা শূন্য: ভিডিও যদি সত্যিই রেকর্ডেড হয়, তাহলে সেখানে যা ঘটছে তা ফ্রেম-টু-ফ্রেম নির্দিষ্ট। দর্শক না জানলেও দৃশ্য বদলায় না, জানলেও বদলায় না। অর্থাৎ “আগে জানা” এখানে নৈতিক/কারণগতভাবে নিরীহ মনে হলেও—রেকর্ডেড ভিডিওর সামনে কোন বিকল্প পথ নেই।
- ‘অভ্রান্ত জানা’ থাকলে বাইরে যাওয়ার রাস্তা থাকে না—এই পয়েন্টটাই বিপজ্জনক: এই উপমার লুকানো মেসেজ হলো—যদি ফলাফল আগেই নিশ্চিতভাবে সত্য হয়, তবে সেটির বাইরে যাওয়া অসম্ভব। ভিডিওর ব্যাটসম্যান যেমন ওই বলে “চাইলেও” আউট হতে পারে না (কারণ রেকর্ড বদলানো সম্ভব নয়), ঠিক তেমনই ‘অভ্রান্ত পূর্বলিখন/পূর্বনির্ধারণ’ যদি ধরা হয়, তাহলে মানুষের পক্ষেও “অন্যভাবে করা” সম্ভব থাকে না—ফলে দায় আরোপের ভিত্তি দুর্বল হয়।
অর্থাৎ এই উপমা “ফোরনলেজ বনাম কজেশন” দেখানোর বদলে আসলে “ফিক্সড স্ক্রিপ্ট” (স্থির চিত্রনাট্য)-এর দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু মানুষকে যদি এমন এক স্ক্রিপ্টের ভেতর রাখা হয়, যেখানে ফলাফল অনিবার্য—তাহলে মানুষ হয়ে পড়ে রেকর্ডিংয়ের চরিত্রের মতো: দেখাতে জীবন্ত, কিন্তু কার্যত বিকল্প-ক্ষমতাহীন। সেখান থেকেই নৈতিক প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়—শাস্তি/পুরস্কার কি তখন কেবল ‘ঘোষিত নিয়ম’, নাকি ন্যায়সঙ্গত বিচার?
শিক্ষক-উপমা এবং ভিডিও-উপমা—দুটিই সাধারণত একটি কাজ করে: “আগে জানা”কে সামনে এনে “জোর করে করানো”কে আড়াল করে। কিন্তু ‘তাকদীর’ যদি কেবল পূর্ব-ধারণা না হয়ে অভ্রান্ত পূর্বলিখন/পূর্বনির্ধারণ হয়—এবং যদি কোরআনের “রেকর্ডে লেখা” ও “পূর্বনির্ধারিত” ভাষাকে সেই অর্থেই ধরা হয়—তবে উপমাগুলো মূল সমস্যার কোন সমাধান করতে পারে না। তারা হয় মানব-অনুমানকে (যা ভুল হতে পারে) ঐশী নির্ধারণের (ভুল হতে পারে না) জায়গায় বসিয়ে দেয়, নয়তো ভিডিওর মতো “আগে থেকেই স্থির” কিছুকে উদাহরণ বানিয়ে অনিচ্ছায় দেখিয়ে ফেলে—স্থিরতা থাকলে মুক্ত ইচ্ছার জায়গা কতটা সংকুচিত হয়ে যায়।
দ্রুত বুঝতে: “ভিডিও” কেন আলাদা কেস?
- ভিডিও হলো অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সংরক্ষিত ফ্রেম।
- রিপ্লেতে চরিত্র “এখন” নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় থাকে না—কারণ দৃশ্য আগে থেকেই ফিক্সড।
- তাই এই উপমা দিয়ে “বিকল্প সম্ভাবনা” (could have done otherwise) সহজে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইল কাকে বলে?
‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বা ‘ফ্রি উইল’ কী—এই প্রশ্নটি তাকদীর, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ বা শাস্তি–পুরস্কারের আলোচনা শুরু করার ক্ষেত্রে একেবারে ভিত্তিগত। কারণ ‘মানুষ স্বাধীন’—এই দাবিটি না বুঝলে তাকদীরের সঙ্গে তার সম্পর্কও বোঝা যায় না। প্রথম প্রশ্নটি হলো: আমরা আসলে স্বাধীন ইচ্ছা বলতে কী বুঝি? “আমি চাইলে পাখির মতো আকাশে উড়তে পারি”—এটিকে কি ফ্রি উইল বলা যায়? হ্যাঁ, ইচ্ছা হিসেবে এটি স্বাধীন, কিন্তু এটি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক ও জৈবিক সক্ষমতা আমাদের নেই। তাই ফ্রি উইলকে কোনো অলৌকিক শক্তি বা অতিমানবিক ক্ষমতা হিসেবে দেখা হয় না—এটি মানুষের মানসিক, যুক্তিক ও মূল্যবোধগত ক্ষমতার একটি বিশেষ রূপ। এই আলোচনার জন্য একটি কার্যকর সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
“স্বাধীন ইচ্ছা হলো এমন মানসিক সক্ষমতা যেখানে একজন ব্যক্তি তার নিজের ইচ্ছা, মূল্যবোধ, বিচারশক্তি এবং বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—এবং সেই সিদ্ধান্ত কোনো সচেতন এজেন্টের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জবরদস্তি (intentional coercion) বা সূক্ষ্ম ম্যানিপুলেশন (covert manipulation) দ্বারা নির্ধারিত বা বাতিল করা হয় না। প্রাকৃতিক বা অবচেতন কারণ-কার্য সম্পর্ক (causal factors) ফ্রি উইলকে ধ্বংস করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ব্যক্তির নিজের অভ্যন্তরীণ মোটিভেশনাল কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।”
এই সংজ্ঞাটি আধুনিক সংগতিবাদী (Compatibilist) দার্শনিকদের মতের সাথে সবচেয়ে বেশি মেলে, কারণ তারা ফ্রি উইলকে ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ নয় বরং একটি মানসিক-নৈতিক সক্ষমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। দর্শনে ফ্রি উইল বিতর্কে মূল বিভাজনটা সাধারণভাবে compatibilism বনাম incompatibilism। Compatibilism বলে—ডিটারমিনিজম সত্য হলেও “স্বাধীনতা”কে বোঝানো যায় এভাবে যে, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা/কারণ/মূল্যবোধ অনুযায়ী নেয় এবং বাহ্যিক জোর-জবরদস্তি বা নিয়ন্ত্রণ নেই; তাই নৈতিক দায় (moral responsibility) টিকে থাকতে পারে। অন্যদিকে Incompatibilism দাবি করে—ডিটারমিনিজম সত্য হলে “অন্যভাবে করার বাস্তব সক্ষমতা” (genuine alternatives) অর্থে ফ্রি উইল থাকে না; ফলে ডিটারমিনিজমের সাথে ফ্রি উইলকে একসাথে ধরা যাবে না। [3] যদিও লিবার্টেরিয়ান দার্শনিকরা (যেমন রবার্ট কেন) ফ্রি উইলকে সম্পূর্ণ অ-নির্ধারিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন, কিন্তু তাকদীরের কঠোর ডিটারমিনিজম এটিকেও অসম্ভব করে তোলে। এখানে এই সংজ্ঞার দার্শনিক যৌক্তিকতা ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. প্রাকৃতিক কার্যকারণ বনাম সচেতন জবরদস্তি: ফ্রি উইলের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় হলো ‘কারণ থাকা’ এবং ‘কেউ কারণ আরোপ করা’—এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা। দার্শনিক W.T. Stace দেখিয়েছেন—মানুষের কাজের পেছনে কারণ থাকা ফ্রি উইল নষ্ট করে না, কিন্তু কারণ যদি কোনো বাহ্যিক এজেন্ট সচেতনভাবে চাপিয়ে দেয়, তাহলেই স্বাধীনতা নষ্ট হয়। উদাহরণ হিসেবে: একজন পথশিশু খাবার না পেয়ে অনাহারে মারা গেলে সেটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা প্রাকৃতিক কারণ; কিন্তু মহাত্মা গান্ধী জেলের ভেতর নৈতিক আদর্শের জন্য স্বেচ্ছায় অনশন করলে সেটি তার স্বাধীন ইচ্ছার ফল। উভয় ক্ষেত্রেই পেটে খাবার নেই—কিন্তু সিদ্ধান্তের উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এটি ড্যানিয়েল ডেনেটের ব্যাখ্যার সাথেও মেলে। Daniel Dennett যুক্তি দেন: আমরা পদার্থবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে নই, কিন্তু যতক্ষণ সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছি ‘আমরা নিজেরাই’—ততক্ষণ ফ্রি উইল বজায় থাকে। অর্থাৎ, কোনো ‘অদৃশ্য সুতো টানা প্রভু’ না থাকলেই স্বাধীনতা বিদ্যমান।
২. অভ্যন্তরীণ মোটিভেশনাল স্ট্রাকচার: সংজ্ঞার দ্বিতীয় স্তরে আসে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ ইচ্ছা-গঠনের কাঠামো। দার্শনিক Harry Frankfurt দেখিয়েছেন যে মানুষের ইচ্ছা স্তরীভূত—প্রথম স্তরের ইচ্ছা (তাৎক্ষণিক তাড়না) এবং দ্বিতীয় স্তরের ইচ্ছা (গভীর মূল্যবোধ ও দীর্ঘমেয়াদী বিচার)। একজন মানুষ তখনই স্বাধীন যখন সে তার প্রথম স্তরের ইচ্ছাকে দ্বিতীয় স্তরের বিচার দ্বারা মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যদি কোনো বাহ্যিক সত্তা প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরের ইচ্ছাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে—তাহলে স্বাধীনতা বিলুপ্ত। যেমন: কেউ চাইলো রাগের মাথায় মারধর করতে, কিন্তু তার উচ্চতর মূল্যবোধ (দ্বিতীয় স্তরের ইচ্ছা) তাকে থামাল—এটি স্বাধীনতা। কিন্তু যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই কেউ তার মন-মানসিকতায় গোপনে হস্তক্ষেপ করে—তাহলে আর স্বাধীনতা থাকে না।
৩. ম্যানিপুলেশন ও নিয়ন্ত্রিত উৎস (Sourcehood): আমাদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—যদি কোনো সচেতন এজেন্ট সিদ্ধান্ত-গঠনের উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ফ্রি উইল ধ্বংস হয়। Alfred Mele তার বিখ্যাত ‘Zygote Argument’-এ দেখিয়েছেন: যদি ভবিষ্যতে কেউ কী করবে তা এক অলৌকিক নকশাকার পূর্বনির্ধারিতভাবে মানুষের ভিতরে স্থাপন করে দেয়, তবে মানুষের কাজগুলো দেখতে ‘স্বেচ্ছায়’ মনে হলেও বাস্তবে তা পূর্বনির্ধারিত। অর্থাৎ—নিয়ন্ত্রণ যদি সম্পূর্ণভাবে অন্যের হাতে থাকে, তবে ব্যক্তি শুধুই ফল ভোগ করে, সিদ্ধান্তের মালিক থাকে না।
এইভাবে দেখা যায়: ফ্রি উইল হলো কোনো মানুষের মানসিক সক্ষমতা—যেখানে সে নিজস্ব মূল্যবোধের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, এবং সিদ্ধান্তটি তার নিজের অভ্যন্তর থেকে উদ্ভূত হয়—কোনো সচেতন বাহ্যিক এজেন্টের কাছ থেকে নয়। আমরা এই প্রবন্ধে যা আলোচনা করবো, শুরুতেই তার একটি ভিজুয়াল ডায়াগ্রাম দেখে নেয়া যাক,
স্বাধীন ইচ্ছার সংজ্ঞা বনাম ইসলামী তাকদীর
(No Conscious Coercion)
নিজের ইচ্ছা + মূল্যবোধ + বিবেচনা
৫০ হাজার বছর আগে সব লিখে রেখেছেন।
অন্তরে মোহর (Seal) + হিদায়াত নিয়ন্ত্রণ
ইসলামে আল্লাহ একজন সচেতন এজেন্ট (Conscious Agent) যিনি মানুষের ইচ্ছা এমনকি জন্মের পূর্বেই ফলাফল নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করেন—ফলে এই সংজ্ঞানুযায়ী ইসলামে স্বাধীন ইচ্ছা থাকা অসম্ভব।
তাকদীর (নিয়তি) কাকে বলে?
ইসলামে কাযা (ভাগ্য) ও তাকদীর (নিয়তি)-এর প্রতি বিশ্বাস ঈমানের অন্যতম মূলস্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন মুসলিমের ঈমান তখনই পূর্ণ হবে যখন সে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, যা ঘটেছে তা আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারেই ঘটেছে এবং যা ঘটেনি, তা কোনো অবস্থাতেই ঘটতে পারত না। কারণ আল্লাহ তায়ালা পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, কী ঘটবে আর কী ঘটবে না। এটি পরিবর্তনযোগ্য নয়। ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, যারা এই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নেয় যে, সকল কিছু আল্লাহর কাযা ও তাকদীর অনুযায়ী ঘটে, তারাই প্রকৃত অর্থে মুসলিম হিসেবে গণ্য। এই বিশ্বাস ছাড়া ইসলামের প্রতি ঈমান পূর্ণ হয় না। ইসলামে তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস রাখা ইসলামের মৌলিক আচার ও শিক্ষার একটি অংশ এবং মুসলিমদের জন্য এটি পালন করা বাধ্যতামূলক। এটি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসেরই নয়, বরং মুসলমানদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং আত্মসমর্পণের প্রতীক। এই বিষয়ে হাদিসে বলা হয়েছে [4] –
সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম।তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ,আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির‘আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা (تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। জেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ (আল মাদানী প্রকাশনী)
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
তিরমিযী শরীফ বইটি থেকেও সরাসরি দেখে নিই [5] –


তাকদীরে অবিশ্বাসের ফলাফল
অনেক মুসলমানই ইসলামে তাকদীর বিষয়ে যা বলা আছে, তা মানেন না বা তাকদীর সম্পর্কে নিজের মনগড়া কথাবার্তা বলেন। অথচ, ইসলামের অত্যন্ত মৌলিক এই বিষয়ে ইসলামে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই বিশ্বাস না করলে সে সরাসরি কুফরিই করে [6] [7] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৫-(৩৭) ইবনু আদ্ দায়লামী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছে আমি তাকে বললাম, তাক্বদীর সম্পর্কে আমার মনে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কিছু হাদীস শুনান যাতে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমার মন থেকে (তাক্বদীর সম্পর্কে) এসব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাঁর সৃষ্টজীবের সকলের প্রতিই রহমত করেন, তবে তাঁর এ রহমত তাদের জন্য সকল ‘আমল হতে উত্তম হবে। সুতরাং তুমি যদি উহুদ পাহাড়সম স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান কর, তোমার থেকে তিনি তা গ্রহণ করবেন না, যে পর্যন্ত তুমি তাক্বদীরে বিশ্বাস না করবে এবং যা তোমার ভাগ্যে ঘটেছে তা তোমার কাছ থেকে কক্ষনো দূরে চলে যাবে না- এ কথাও তুমি বিশ্বাস না করবে, আর যা এড়িয়ে গেছে তা কক্ষনো তোমার নিকট আর আসবে না- এ বিশ্বাস স্থাপন করা ব্যতীত যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
ইবনু আদ্ দায়লামী বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর এ বর্ণনা শুনে আমি সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে এ কথাই প্রত্যুত্তর করলেন। তিনি বলেন, তারপর হুযায়ফাহ্ ইবনু ইয়ামান (রাঃ)-এর নিকট যেয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে একই প্রত্যুত্তর করলেন। এরপর যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর কাছে আসলাম। তিনি স্বয়ং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করেই আমাকে একই ধরনের কথা বললেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)(1)
(1) সহীহ : আহমাদ ২১১৪৪, আবূ দাঊদ ৪৬৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৭৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৬-(৩৮) নাফি‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর নিকট এসে বলল, অমুক লোক আপনাকে সালাম দিয়েছে। উত্তরে ইবনু ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি, সে নাকি দীনের মধ্যে নতুন মত তৈরি করেছে (অর্থাৎ- তাক্বদীরের প্রতি অবিশ্বাস করছে)। যদি প্রকৃতপক্ষে সে দীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করে থাকে, তাহলে আমার পক্ষ হতে তাকে কোন সালাম পৌঁছাবে না। কেননা আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমার উম্মাতের অথবা এ উম্মাতের মধ্যে জমিনে ধ্বসে যাওয়া, চেহারা বিকৃত রূপ ধারণ করা, শিলা পাথর বর্ষণের মতো আল্লাহর কঠিন ‘আযাব পতিত হবে, তাদের ওপর যারা তাক্বদীরের প্রতি অস্বীকারকারী হবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্; ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব)(1)
(1) হাসান : তিরমিযী ২১৫২, ইবনু মাজাহ্ ৪০৬১, আবূ দাঊদ ৪৬১৩।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
তাকদীর বিষয়ে কোরআন
আল্লাহ আগে ইচ্ছা করেন, বান্দার ইচ্ছা নির্ভরশীল
ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন কিছু ইচ্ছা করতে পারে না। এর অর্থ হচ্ছে, কেউ যদি ধর্ষণ করার ইচ্ছা করে, সেটি অবশ্যই আল্লাহ তার জন্য ইচ্ছা করে দেয়। সে নিজে থেকে এই ইচ্ছাটি আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া করতে পারে না। একইভাবে কেউ যদি নামাজ পড়ার ইচ্ছা করে, সেটিও আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। মানুষের পক্ষে শুধু সেটি ইচ্ছে করাই সম্ভব, যা আল্লাহ তার জন্য ইচ্ছে করে দিয়েছেন।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, মানুষের ইচ্ছাশক্তি আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। অর্থাৎ, মানুষ আল্লাহর ইচ্ছা স্বাধীন এবং বান্দার ইচ্ছা নির্ভরশীল। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু ইচ্ছাও করতে পারে না। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি মন্দ কিছু করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, সেটি আল্লাহর ইচ্ছার মাধ্যমেই ঘটে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি যদি সৎকর্মের ইচ্ছা করে, সেটিও আল্লাহর ইচ্ছাতেই সম্ভব হয়। আল্লাহ মানুষের হৃদয় ও অনুভূতিগুলোর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন কার অন্তরে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা থাকবে। কোরআনে আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ কিছু মানুষের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন, যার ফলে তারা সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ, যা তিনি লওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন। তাই, মানুষের পক্ষে কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে সম্ভব নয়। যাই ঘটুক না কেন, তা আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, আর যাকে ইচ্ছা তাকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কাজই সম্পাদন করা সম্ভব নয়, এবং সৃষ্টিজগতে যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ইচ্ছা ও পরিকল্পনার ফলাফল। আসুন এই বিষয়ে কোরআনের আয়াতগুলো পড়ি [8] –
তোমরা ইচ্ছে কর না যদি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছে না করেন।
Taisirul Quran
তোমরা ইচ্ছা করবেনা, যদি জগতসমূহের রাব্ব আল্লাহ ইচ্ছা না করেন।
Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন।
Rawai Al-bayan
আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন (১)।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অনেক মুসলিম ধর্ম প্রচারক ইসলামের এই বিষয়টি প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপন করেন, কিংবা জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার করেন এভাবে যে, “বান্দার ইচ্ছা আর আল্লাহর ইচ্ছা নাকি সমান্তরালে চলে!” অথচ এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। বান্দার ইচ্ছা আর আল্লাহর ইচ্ছা মোটে সমান্তরালে একইসাথে চলে না। কোরআন হাদিসে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা আছে, আবু লাহাব কী করবে তা আল্লাহ আগে থেকেই ইচ্ছা করে রেখেছেন, যখন আবু লাহাবের ইচ্ছা তো ডুরের কথা জন্মি হয়নি [9]। আসুন ডায়াগ্রামের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝি,
আল্লাহ মোহর মারেন, বা হেদায়াত দেন
আল্লাহ্ কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, তিনি কিছু মানুষের অন্তরে মোহর মেরে দেন, কানসমূহ বন্ধ করে দেন, চোখে পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন। যার ফলে তারা ইসলামকে জানতে এবং বুঝতে পারে না। যার ফলশ্রুতিতে তারা কাফের হয়ে যায়। এখন আমার মত নাস্তিকের অন্তরে আল্লাহ যদি মোহর লাগিয়ে দেন, সেই কারণে যদি আমি ইসলামের সত্যতা অনুধাবন করতে না পারি, এর জন্য দায়ী আসলে কে? [10] –
আল্লাহ তাদের অন্তর ও কানের উপর মোহর করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখে আছে আবরণ আর তাদের জন্য আছে মহা শাস্তি।
Taisirul Quran
আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের উপর ও তাদের কর্ণসমূহের উপর মোহরাংকিত করে দিয়েছেন এবং তাদের চক্ষুসমূহের উপর আবরণ পড়ে আছে এবং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।
Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
Rawai Al-bayan
আল্লাহ্ তাদের হৃদয়সমূহ ও তাদের শ্রবণশক্তির উপর মোহর করে দিয়েছেন (১), এবং তাদের দৃষ্টির উপর রয়েছে আবরণ। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সবকিছু তাকদীর অনুসারে সৃষ্টি
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, তিনি সমস্ত বস্তুকেই তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি করেছেন [11] –
আমি প্রত্যেক বস্তুকে তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।
এই পৃথিবীতে যত ধরণের ভাল ঘটনা ঘটে, বিপদ-আপদ ঘটে, ফিতনা-ফাসাদ আপতিত হয় আল্লাহ্ তাআলা সেসব ঘটার আগেই সে সম্পর্কে জানেন এবং সেটি তিনি লওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন। যা বিশ্বাস করা প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে [12] –
পৃথিবীতে ও তোমাদের জানের উপর যে বিপদই আসুক না কেন আমরা তা সৃষ্টি করার আগেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।
আল্লাহ ইচ্ছা নির্ভরশীল নয়, স্বাধীন
ইসলাম ধর্ম অনুসারে প্রতিটি মুসলিমের অবশ্যই এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কোন কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে ঘটে না। হোক না সেটি আল্লাহর কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট অথবা মাখলুকের কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ যা ইচ্ছা নির্ধারণ করেন, যাকে ইচ্ছা তাকে মনোনীত করেন। কোন বিষয়েই আল্লাহ কারো ওপর নির্ভরশীল নন, কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্বাধীনভাবে যা খুশি তাই করেন। বান্দার ওপর নির্ভর করে তিনি কোন ইচ্ছা করেন না। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে [13] –
আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং (যা ইচ্ছা) মনোনীত করেন।
আল্লাহ আরো বলেন, তিনি যেটি ইচ্ছা করেন সেটিই করেন বা ঘটান। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে [14] –
এবং আল্লাহ যা ইচ্ছা সেটাই করেন
আল্লাহ বলেন, তিনি যেভাবে ইচ্ছা মাতৃগর্ভেই আকৃতি দান করেন। এগুলো নিতান্তই তার সার্বভৌম ইচ্ছাধীন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যেসকল অসংখ্য শিশু নানা ধরণের শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়, সেগুলো আল্লাহ পাক ইচ্ছা করেই তাদের ঐরকম আকৃতি দান করেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে [15] –
তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে।
আল্লাহ পাক সেই সাথে আরো বলেন, আল্লাহ না চাইলে কেউ কিছু করতেও পারতো না। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে [16] [17] –
তোমার রব যদি ইচ্ছা করত, তবে তারা তা করত না
তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।
তাছাড়া গোটা মহাবিশ্ব আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন। অতএব, তার মালিকানাভুক্ত রাজ্যে কোন কিছু তার অজ্ঞাতসারে অথবা অনিচ্ছায় ঘটা সম্ভব নয়। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে [18] [19] –
আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।
যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথ ভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
শয়তান কাদের পথভ্রষ্ট করতে পারে?
কোরআনে এটিও খুব স্পষ্ট ভাষায় বলা আছে, শয়তান মানুষকে কুমন্ত্রণা বা প্ররোচনা দেয় আল্লাহর অনুমতিক্রমেই। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সে কাউকে পথভ্রষ্ট করতে সক্ষম নয়। কোরআনে বলা হয়েছে [20] –
গোপন পরামর্শ হল মু’মিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য শয়ত্বান প্ররোচিত কাজ। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। মু’মিনদের কর্তব্য হল একমাত্র আল্লাহরই উপর ভরসা করা।
( Taisirul Quran )
শাইতানের প্ররোচনায় হয় এই গোপন পরামর্শ, মু’মিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শাইতান তাদের সামান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। মু’মিনদের কর্তব্য হল আল্লাহর উপর নির্ভর করা।
( Sheikh Mujibur Rahman )
গোপন পরামর্শ তো হল মুমিনরা যাতে দুঃখ পায় সে উদ্দেশ্যে কৃত শয়তানের কুমন্ত্রণা মাত্র। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সে তাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। অতএব আল্লাহরই ওপর মুমিনরা যেন তাওয়াক্কুল করে।
( Rawai Al-bayan )
গোপন পরামর্শ তো কেবল শয়তানের প্ররোচনায় হয় মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া শয়তান তাদের সামান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। অতএব, আল্লাহ্র উপরই মুমিনরা যেন নির্ভর করে।
( Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria )
হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শয়তান শুধুমাত্র তাদেরকেই গুমরাহ করতে পারে, যাদের জন্য আল্লাহ জাহান্নামকে ওয়াজিব করেছেন [21] –
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ৬. সুন্নাতের অনুসরণ করা জরুরী।
৪৫৩৯. আবূ কামিল (রহঃ) …. খালিদ হাযযা (রহঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করি, এ আয়াতের অর্থ কি? যেখানে বলা হয়েছেঃ শয়তান তোমাদের কাউকে গুমরাহ করতে পারে না, তবে যে জাহান্নামে যাবে, (তার কথা স্বতন্ত্র)। তিনি বলেনঃ অবশ্যই শয়তান তার গুমরাহীর ফাঁদে তাকেই আবদ্ধ করবে, যার জন্য আল্লাহ্ জাহান্নাম ওয়াজিব করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ খালিদ আল-হাজ্জা (রহঃ)
তাফসীর থেকে তাকদীরের ব্যাখ্যা
এবারে আসুন, একটি আয়াত তাফসীর সহ পড়ি [22]
MUHIUDDIN KHAN
আল্লাহর অভিপ্রায় ব্যতিরেকে তোমরা অন্য কোন অভিপ্রায় পোষণ করবে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।
সৌদি সরকার দ্বারা সত্যায়িত আল বায়ান ফাউন্ডেশনের অনুবাদটিও দেখে নিইঃ

এবারে এই আয়াতটির তাফসীর পড়ি, তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে [23] –

এবারে আসুন এই আয়াতটির তাফসীর পড়ে দেখি, [24] –

এবারে আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে আরেকটি পৃষ্ঠার অংশবিশেষ পড়ে নেয়া যাক [25] –

বান্দা করবে বলে আল্লাহ লিখেছে?
ইদানীং বহু ইসলামিক দায়ী ও বক্তা নিয়মিতভাবে একটি জনপ্রিয় দাবি করে থাকেন—“আল্লাহ লিখে রাখেন বান্দা কোনো কাজ করতে চাইবে বা করবে; তার ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, আল্লাহর লেখা মানুষের কাজের ওপর নির্ভরশীল।” এই বক্তব্যকে তারা নিয়ত ও স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে একটি যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন, যেন আল্লাহ কেবল মানুষের কর্মের ওপর ভিত্তি করে লিখে রেখেছেন।
কিন্তু ইসলামি আক্বীদার (বিশ্বাসব্যবস্থা) প্রথাগত, প্রামাণ্য এবং শাস্ত্রীয় অবস্থান এর সম্পূর্ণ বিপরীত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূলধারার আকীদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—আল্লাহর লেখা, জ্ঞান, সিদ্ধান্ত বা তাকদীর কোনও কিছুই মানুষের কাজ, সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং মানুষের কাজই নির্ভরশীল আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত লেখার ওপর। আল্লাহর ইলম (জ্ঞান), মাশিয়াত (ইচ্ছা), কিতাবাহ (লেখা) ও খালক (সৃষ্টি) —এই চারটি স্তম্ভের ভিত্তিতেই কদর বা তাকদীরের সম্পূর্ণ কাঠামো গঠিত, এবং এগুলোর কোনোটিই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে না।
বিশিষ্ট ইসলামি আলেম, আকীদার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাকার এবং হাদিস–তাফসিরের স্বনামধন্য পণ্ডিতদের বর্ণনা অনুযায়ী—
- আল্লাহ কিয়ামতের ৫০,০০০ বছর আগে থেকেই সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর সম্পূর্ণভাবে লওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন।
- মানুষের জন্ম, মৃত্যু, রিজিক, সুখ–দুঃখ, ঈমান–কুফর, এমনকি মানুষের পাতার পতন পর্যন্ত সবকিছুই আল্লাহর পূর্বলিখিত সিদ্ধান্তের অংশ বলে বিবেচিত।
- ইসলামি মতবাদ অনুসারে, আল্লাহর জ্ঞান বা লেখা—কোনো সৃষ্টি বা ঘটনার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয় না।
- বরং মানুষ যা কিছু করে, তা সেই পূর্বনির্ধারিত লেখারই ফল; অর্থাৎ, মানুষের কাজ নিজ শক্তিতে নতুন কিছু সৃষ্টি করে না, বরং আল্লাহর সিদ্ধান্তের অধীনেই ঘটে।
এই কারণে আধুনিক কিছু দাঈ যে দাবি করেন—“আল্লাহ লিখেন মানুষের কাজের ওপর নির্ভর করে”—এটি ইসলামের মূলধারার আকীদা অনুযায়ী একটি গুরুতর বিকৃতি এবং সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা। কারণ যদি আল্লাহ মানুষের ভবিষ্যৎ কাজের ওপর নির্ভর করে লেখেন, তাহলে আল্লাহর পূর্বজ্ঞান, সর্বশক্তিমানত্ব এবং পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ধারণাই ভেঙে পড়ে, যা ইসলামি আকীদা স্পষ্টভাবে মানে না।
সুতরাং, শাস্ত্রীয় ইসলামে আল্লাহর লেখাই নির্ধারণ করে মানুষের কাজ; মানুষের কাজ নির্ধারণ করে না আল্লাহর লেখা। মানুষ যেসব কাজ করবে, সেগুলো তাঁর ইচ্ছা, জ্ঞান এবং পূর্বলিখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ঘটে—এটাই শতাব্দীব্যাপী ইসলামি আকীদার প্রধান অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আসুন এই বিষয়ে আলেমদের বক্তব্য শুনি,
আসুন বিষয়টি ডায়াগ্রামের মাধ্যমে আরও ভালভাবে বুঝি,
“বান্দার কাজের ওপর আল্লাহর লেখা নির্ভরশীল” বনাম “আল্লাহর লেখার ওপর বান্দার কাজ নির্ভরশীল”
বামে আধুনিক কিছু দাঈর দাবি, ডানে ক্লাসিকাল তাকদীর–মডেল (ইলম → মাশিয়াত → কিতাবাহ → খালক → মানবকর্ম)আধুনিক কিছু দাঈর প্রচারিত মডেল
এখানে আল্লাহর লেখা বান্দার ভবিষ্যৎ কাজের ওপর নির্ভরশীল বলে ধরা হয়।
শাস্ত্রীয় ইসলামি আকীদায় তাকদীর-মডেল
এখানে আল্লাহর ইলম, ইচ্ছা ও লেখা থেকেই সব সৃষ্টি ও মানবকর্ম ঘটে।
- বাম পাশের মডেলে আল্লাহর লেখা মানুষের ভবিষ্যৎ কাজের ওপর নির্ভরশীল দেখানো হয়েছে – এখানে তাকদীরকে প্রতিক্রিয়াশীল ও নির্ভরশীল বানানো হয়।
- ডান পাশের মডেলে দেখানো হয়েছে যে ইসলামের শাস্ত্রীয় আকীদা অনুযায়ী ইলম → মাশিয়াত → কিতাবাহ → খালক → মানবকর্ম – এই ধারাতেই সবকিছু সংগঠিত, যেখানে আল্লাহর লেখা ও সিদ্ধান্তই মূল, আর মানুষের কাজ সেই পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর ভেতরে বাস্তবায়িত হয়।
আল্লাহর লিখে রাখার কারণ কী?
ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, তাকদীর হলো সেই অদৃশ্য লিপিবদ্ধ মহাগ্রন্থ বা পরিকল্পনা বা লগবুক যা লওহে মাহফুজে সেই কলমটি লিখে রেখেছেন—যা শুধুমাত্র একমাত্র আল্লাহরই জানা, এবং কোনো নবী, রাসুল বা ফেরেশতারও এতে অ্যাক্সেস নেই [26]। কোরআনের সূরা আল-হাদীদ (৫৭:২২) এবং সূরা আল-বুরুজ (৮৫:২১-২২)-এর মতো আয়াতগুলোতে এই লিখিত তাকদীরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে পৃথিবীতে কোনো বিপর্যয় বা সৌভাগ্য ঘটার আগেই তা “আমরা লিখে রেখেছি”।
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক যৌক্তিক প্রশ্ন উঠে আসে: সর্বজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান এবং অসীম আল্লাহর এই তাকদীর লিখে রাখার কারণ কী? আমরা মানুষেরা কোনো কিছু লিখে রাখি মূলত দুটি কারণেঃ
- প্রথমত, আমাদের স্মৃতি সীমিত, তাই ভুলে যাওয়ার ভয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ডকুমেন্ট করি;
- দ্বিতীয়ত, পরবর্তী প্রজন্ম বা অন্যদের জন্য রেখে যাই, যাতে আমাদের অনুপস্থিতিতে সেই জ্ঞান বা নির্দেশনা অটুট থাকে এবং পৌঁছায়।
উদাহরণস্বরূপ, একজন লেখক তার বই লিখে রাখেন যাতে তার মৃত্যুর পরও তার চিন্তা জীবিত থাকে, অথবা একটি কোম্পানির মালিক তার উইল লিখে রাখেন যাতে তার সম্পত্তি সঠিকভাবে বণ্টিত হয়। এরকম অসংখ্য মনুষ্য কারণে কোনকিছু লিখে রাখার প্রয়োজন হয়, যেহেতু মানুষের ভুল হয় এবং মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতাগুলো তো অস্তিত্বহীন! তিনি সর্বজ্ঞানী (আল-আলীম), তার জ্ঞান অসীম এবং অব্যর্থ—তিনি কখনো ভুলে যান না, কোনো স্মৃতির সহায়তা প্রয়োজন পড়ে না। তাহলে এই লিখে রাখার প্রয়োজনটি কী?
যদি বলা হয় যে এটি ফেরেশতাদের জন্য বা কোনো নির্দেশনাপত্র হিসেবে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: ফেরেশতারা তো এই লিখিত তাকদীর জানেন না, এমনকি জিবরীল-এর মতো প্রধান ফেরেশতাও শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে কাজ করেন, লওহে মাহফুজে কি লিখিত আছে তা জানার অধিকার বা যোগ্যতা তাদের নেই (হাদিসে বলা হয়েছে যে নবী মুহাম্মদও তাকদীরে কি লিখিত আছে সেই জ্ঞান রাখে না, শুধুমাত্র তাকে যতটুকু জানানো হয়েছে ততটুকুই জানে)। আর নির্দেশনাপত্র বা ডকুমেন্টেশনের কথা যদি হয়, তাহলে কার জন্য এই নির্দেশনা? বা ডকুমেন্টেশন? আল্লাহর নিজের জন্য? ফেরেশতারা তো আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করে, তাহলে আলাদা করে সেগুলো লিখিত রাখা কেন প্রয়োজনীয়? একইসাথে আল্লাহ নিজেই তো সর্বোচ্চ বিচারক, তার কথাই চূড়ান্ত প্রমাণ—কোনো লিখিত দলিলের দরকার পড়ে না।
এছাড়া, আল্লাহ অমর এবং একক, কোনো “পরবর্তী আল্লাহ” নেই যার জন্য ডকুমেন্টেশন করতে হবে। এই লিখে রাখার ধারণাটি আসলে আল্লাহকে মানবিকীকরণ(মানবসুলভ বৈশিষ্ট্য দান) করে (anthropomorphism), যা ইসলামেরই তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক—কারণ এটি তাঁকে সীমিত সত্তার মতো চিত্রিত করে, যেন তিনি আমাদের মতো ভুলে যাওয়ার ভয়ে বা ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা লিখে রাখেন। যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি তাকদীরের আরেকটি স্ববিরোধী স্তর: যদি আল্লাহর জ্ঞান অসীম হয়, তাহলে লিখিত রেকর্ডের প্রয়োজনীয়তা শুধুমাত্র মানুষের তৈরি কিছু কুযুক্তি, যা ধর্মীয় বিশ্বাসকে আরও অযৌক্তিক করে তোলে। এমন একটি ধারণা এখানে ধরা হচ্ছে, যা যুক্তিবিদ্যার অ-স্ববিরোধিতা নীতির সাথে সংঘাতে পড়ে—কারণ “সর্বজ্ঞতা” যদি পূর্ণ অর্থে সত্য হয়, তাহলে জ্ঞান ধরে রাখতে “লিখিত স্মৃতি/রেকর্ডের সহায়তা”কে প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে দেখানো যায় না। তাই “আগে থেকে লিখে রাখা”কে স্মৃতি-সাহায্য হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তাকদীরের কাঠামো আরও নড়বড়ে হয়, এবং এটি মানুষের তৈরি ব্যাখ্যাগত জোড়াতালি বলেই প্রতীয়মান হয়—যা সর্বশক্তিমানতার ধারণার সাথে সহজে খাপ খায় না।
আল্লাহ “লিখে রাখেন” → এরপর নির্দেশ দেন → ফেরেশতারা বাস্তবায়ন করে
ইসলামী ধারণা অনুযায়ী তাকদীর লওহে মাহফুজে “যা কিছুই ঘটবে সবই লিখিত”; কিন্তু এতে পূর্ণ অ্যাক্সেস শুধুই আল্লাহর—ফেরেশতারা লিখিত রেকর্ড পড়ে কাজ করে না, তারা আল্লাহর নির্দেশ পেয়েই কাজ করে।ধারণাটি হলো—পৃথিবীতে যেকোনো কিছু, বা কোনো বিপর্যয়/সৌভাগ্য ঘটার আগেই তা “লিখে রাখা” আছে। এই “লিখিত” তাকদীরকে এক ধরনের মহাগ্রন্থ/লগবুক হিসেবে কল্পনা করি।
ফেরেশতারা লওহে মাহফুজ খুলে “তাকদীর পড়ে” কাজ করে—এমন নয়; তারা নির্দিষ্ট কাজের জন্য আল্লাহর কাছ থেকে নির্দেশ/আদেশ পায়।
নির্দেশ অনুসারে ঘটনাগুলো বাস্তবায়িত হয়—যা-ই হোক (ঘটনা, বিপর্যয়, রিজিক/ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি)। এখানে কার্যকরভাবে কাজ হচ্ছে “নির্দেশ” দিয়ে, “তাকদীরে লিখিত রেকর্ড” দিয়ে নয়।
যদি “লিখিত তাকদীর” কেবল আল্লাহরই জানা থাকে, আর ফেরেশতারা কেবল আল্লাহর নির্দেশ পেয়েই কাজ করে—তাহলে লিখে রাখাটি বাস্তবে কী ভূমিকা রাখছে? এর প্রয়োজনীয়তা কি?
- স্মৃতির জন্য? — সর্বজ্ঞ সত্তার ভুলে যাওয়ার ভয় বা নোট রাখার প্রয়োজন নেই।
- ফেরেশতাদের নির্দেশনাপত্র? — ফেরেশতারা তো লিখিত তাকদীর পড়েই কাজ করছে না; নির্দেশ আসে সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে।
- সাক্ষ্য/প্রমাণ হিসেবে? — আল্লাহ নিজেই চূড়ান্ত বিচারক; “কার সামনে” লিখিত দলিল দরকার?
- পরবর্তী কারও জন্য রেখে যাওয়া? — আল্লাহ অমর ও একক; কোনো “পরবর্তী আল্লাহ” নেই যার জন্য ডকুমেন্টেশন দরকার হবে।
একই সাথে যখন বলা হয় এই রেকর্ডে কারও অ্যাক্সেস নেই এবং বাস্তব কাজ হয় সরাসরি নির্দেশে, তখন “লিখে রাখা” ধারণাটি যুক্তিগতভাবে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।
তাকদীর নিয়ে লুকোচুরি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই তাকদীরের বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা তর্ক বিতর্ক করতে নবী নিষেধ করে গেছে। উনি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হতেন, যখন কেউ এই নিয়ে আলোচনা করতো। উনি চাইতেন, অন্ধভাবেই এগুলো তার উম্মতগণ বিশ্বাস করুক। ভয় দেখাবার জন্য বলেছেন, এই নিয়ে আলোচনা করলে ধ্বংস হয়ে যাবে [27]।
সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ তাকদীর নিয়ে আলোচনায় মত্ত হওয়া সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী।
২১৩৬. আবদুল্লাহ ইবন মুআবিয়া জুমাহী (রহঃ) ……. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বের হয়ে এলেন। আমরা তখন তাকদীর বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করছিলাম। তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। এমনকি তাঁর চেহারা লাল হয়ে উঠল, তাঁর দুই কপালে যেন ডালিম নিংড়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেনঃ এই বিষয়েই কি তোমরা নির্দেশিত হয়েছ? আর এই নিয়েই কি আমি তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি? তোমাদের পূর্ববর্তীরা যখন এ বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে তখনই তারা ধ্বংস হয়েছে। দৃঢ়ভাবে তোমাদের বলছি, তোমরা যেন এ বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত না হও। হাসান, মিশকাত ৯৮, ৯৯, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৩৩ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এ বিষয়ে উমার, আয়িশা ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটি গারীব। সালিহ মুররী-এর রিওয়ায়াত হিসাবে এ সূত্র ছাড়া এটি সম্পর্কে আমরা অবহিত নই, সালিহ মুররি বেশ কিছু গারীব রিওয়ায়াত রয়েছে। যেগুলির বিষয়ে তিনি একা।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এবারে আসুন আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকীদা গ্রন্থগুলোতে এই বিষয়ে কী লেখা রয়েছে তা পড়ে দেখা যাক। শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া অত্যন্ত বিখ্যাত একটি আকীদা গ্রন্থ, যার লেখক ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী। তিনি তার বইতে ইসলামের এই আকীদাগত বিষয়টি স্পষ্টভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং সকল উম্মতকে এই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন, অনুসন্ধান, চিন্তা করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন। কারণ এই বিষয়ে চিন্তাভাবনা করলেই ইসলামের ঈমান দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই সকল আলেম ওলামা একমত [28] –


আসুন এবারে তাকদীর নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করা যে ইসলামে নিষিদ্ধ, সে সম্পর্কে ড. আবু বকর যাকারিয়ার বক্তব্য শুনি,
গুনাহের জন্যেই মানুষের সৃষ্টি
সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ যদি গুনাহ না করতো, তবে আল্লাহ তাদেরকে সরিয়ে এমন জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত। অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে গুনাহকারী এবং তার ক্ষমা প্রার্থনাকারী গুনাহ না করা মানুষের চাইতে অনেক বেশি প্রিয়। আল্লাহ চান বান্দারা যেন বেশি বেশি গুনাহ করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। কারণ গুনাহ না করলে ক্ষমা চাওয়ারও দরকার হয় না। গুনাহ থাকলেই মানুষ জাতির অস্তিত্ব থাকবে। গুনাহ না থাকলে আল্লাহও হয়তো অস্তিত্ব সংকটে পড়বে [29] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০. আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ – ক্ষমা ও তাওবাহ্
২৩২৮-(৬) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি তোমরা গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে সরিয়ে এমন জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত ও আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চাইত। আর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন। (মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : মুসলিম ২৭৪৯, শু‘আবূল ঈমান ৬৭০০, সহীহাহ্ ১৯৫০, সহীহ আত্ তারগীব ৩১৪৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আসুন এই বিষয়ে মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্য শুনি,
বুদ্ধিমত্তাও তাকদীরে নির্ধারিত
মানুষের বুদ্ধিমত্তা যদি তাকদীর বা পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে এটি ইসলামের ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক এবং যৌক্তিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। ন্যায়বিচারের মূলনীতি হলো, প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব কর্মের জন্য দায়ী এবং বিচার হবে তার স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে, একই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে অবস্থা করে। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের ফল হয়, তবে তার জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা বা বিচক্ষণতার ওভাবের কারণে নেয়া সিদ্ধান্তের জন্য তাকে দায়ী করা ন্যায়সংগত হয় না।
প্রথমত, যদি বুদ্ধিমত্তা আল্লাহর ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়, তাহলে একজন কম বুদ্ধিমান ব্যক্তি, যার চিন্তাশক্তি সীমিত, তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাবে যদি ইসলামের সত্যতা বুঝতে না পারে, তাহলে কেন সে শাস্তি বা তিরস্কার পাবে? নৈতিক ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে, কোনো ব্যক্তিকে এমন কিছু কারণে শাস্তি দেওয়া অন্যায়, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়: যদি আল্লাহ ইচ্ছাকৃতভাবে একজনকে বুদ্ধিহীন তৈরি করেন, তবে সেই ব্যক্তির পক্ষে নৈতিক বা ধর্মীয়ভাবে উন্নতি করা সম্ভব কি? ইসলামের সত্যতা বোঝা কীভাবে সম্ভব? এর ফলে নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, যা ন্যায়বিচার ধারণার বিপরীত।
দ্বিতীয়ত, এই ধারণা স্বাধীন ইচ্ছার বিপরীতে যায়। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ভিত্তি হলো মানুষের “ফ্রি উইল” বা স্বাধীন ইচ্ছা, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী। কিন্তু যদি বুদ্ধিমত্তা ও নির্বুদ্ধিতা পূর্বনির্ধারিত হয়, তবে সেই “ফ্রি উইল” বা স্বাধীন ইচ্ছা কার্যকর থাকে না। মানুষ তার নিজস্ব চিন্তা ও কর্মে স্বাধীন এবং সমান অবস্থানে না থাকলে তাকে তার সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী করা অসঙ্গত।
ফলস্বরূপ, বুদ্ধিমত্তা যদি আল্লাহর তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তা ইসলামের ন্যায়বিচারের ধারণাকে অসার করে এবং মানুষকে নৈতিকভাবে দায়ী করার ভিত্তি নষ্ট করে দেয়। এবারে আসুন হাদিসে বলা হয়েছে, দেখে নেয়া যাক। হাদিসে বর্ণিত আছে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত। আসুন হাদিসটি পড়ি, [30] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১: ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
৮০-[২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেকটি জিনিসই আল্লাহর ক্বদর (কদর) (তাক্বদীর/ভাগ্য) অনুযায়ী রয়েছে, এমনকি নির্বুদ্ধিতা ও বিচক্ষণতাও। (মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : মুসলিম ২৬৫৫, আহমাদ ৫৮৯৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৪৯, সহীহাহ্ ৮৬১, সহীহ আল জামি‘ ৪৫৩১। ইমাম বুখারী (রহঃ) ও সহীহ বুখারীর خَلْقُ أَفْعَالِ الْعِبَادً (বান্দাদের কর্মসমূহ সৃষ্টিকরণ) নামক অধ্যায়ে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিছু সমসাময়িক মুহাদ্দিস ভুলবশত হাদীসটি ইমাম মুসলিমের সাথে মুত্বলাক্বভাবে যুক্ত করেছেন। ইমাম মালিক (রহঃ)-ও হাদীসটি তার ‘‘মুয়াত্ত্বা’’য় বর্ণনা সংকলন করেছেন। আর ইমাম মালিক-এর সনদে ইমাম বুখারী মুসলিম-এর হাদীসটি নিয়ে এসেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
আল্লাহ মানুষকে দিয়ে করিয়ে নেন
আল্লাহ যদি মানুষকে দিয়ে আগে থেকেই নির্ধারিত কাজ করিয়ে নেন, যেমন জান্নাতিদের কাজ বা জাহান্নামীদের কাজ, তাহলে তা ইসলামের ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক। এই বিশ্বাসে আল্লাহ এমন একটি ব্যবস্থায় মানুষের জীবন পরিচালনা করেন, যেখানে তাদের কর্মের ওপর তাদের কোনো বাস্তব নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলস্বরূপ, এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে শাস্তি বা পুরস্কৃত করা একটি গুরুতর দার্শনিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়।
প্রথমত, যদি আল্লাহ পাক আগে থেকেই জান্নাতী ও জাহান্নামীদের নির্ধারণ করে দেন এবং তাদেরকে সেই অনুযায়ী কাজ করিয়ে নেন, তাহলে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যক্তি তার কর্মের জন্য জবাবদিহি করবে, কিন্তু যদি সেই কর্ম আল্লাহর দ্বারা পূর্বনির্ধারিত হয় এবং আল্লাহ নিজেই সেই কাজ করিয়ে নেন, তাহলে ব্যক্তি কীভাবে তার কর্মের জন্য দায়ী হতে পারে? উদাহরণস্বরূপ, যদি আল্লাহ আগে থেকেই একজন ব্যক্তিকে জাহান্নামের জন্য নির্ধারণ করে তার থেকে জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন, তাহলে সেই ব্যক্তি তো বাধ্য হয়েই সেই কাজ করবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ কাউকে দিয়ে কোন কাজ করিয়ে নিলে কোন মানুষের পক্ষে কী তা না করে থাকা সম্ভব? এ পরিস্থিতিতে, তাকে শাস্তি দেওয়া একটি অসঙ্গত ও অবিচারমূলক পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, এই ধারণা নৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। যদি আল্লাহ আগে থেকেই নির্ধারণ করেন কারা জান্নাতবাসী হবে এবং কারা জাহান্নামী হবে, তবে কিছু মানুষ জন্মসূত্রেই বিশেষ সুবিধা নিয়ে আসে এবং অন্যরা নির্দোষভাবেই শাস্তির জন্য তৈরি হয় এবং আল্লাহ তাদের দিয়ে সেটিই করান যা আল্লাহ নির্ধারন করে রেখেছেন। এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের ন্যায়বিচারের মূলনীতির সাথে সরাসরি বিরোধপূর্ণ, যা দাবি করে যে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব কর্মের জন্য বিচার পাবে। কিন্তু যখন আল্লাহ নিজেই তাদের কর্ম নির্ধারণ করেন এবং সেই কাজ করান, তখন বিচার প্রক্রিয়াটি একটি মিথ্যে প্রতিশ্রুতি হয়ে দাঁড়ায়। শাস্তি বা পুরস্কার তখন কেবল একটি পূর্বনির্ধারিত নাটকের অংশ হয়ে যায়, যার ওপর ব্যক্তির কোনো প্রভাব থাকে না। আল্লাহর ইচ্ছা বা পূর্বনির্ধারিত তাকদীরই সেখানে প্রভাব রাখে।
তৃতীয়ত, এই বিশ্বাসটি আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আল্লাহ ন্যায়বিচারক, দয়ালু এবং পরম জ্ঞানসম্পন্ন। কিন্তু যদি তিনি এমন একটি ব্যবস্থায় মানুষের কর্ম নির্ধারণ করেন, যেখানে কেউ জান্নাত বা জাহান্নামের জন্য পূর্বনির্ধারিত এবং তাদের দ্বারা সেই কাজ করান যা তাদের ভাগ্য স্থির করে দেয়, তবে সেই দয়ালুতা এবং ন্যায়বিচারের ধারণা কীভাবে বজায় থাকে? একজন সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী স্রষ্টা কীভাবে একজন মানুষকে এমন পথে পরিচালিত করতে পারেন, যেখানে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং তারপর তাকে সেই কাজের জন্য শাস্তি দিতে পারেন? আসুন এবারে কোরআনের একটি আয়াত পড়ে নেয়া যাক। কোরআনে বলা হয়েছে [31] –
যাকে তার মন্দ কর্ম শোভনীয় ক’রে দেখানো হয়, অতঃপর সে সেটাকে উত্তম মনে করে (সে কি তার সমান, যে সৎ পথে পরিচালিত?) আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিপথগামী করেন, আর যাকে ইচ্ছে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। কাজেই তাদের জন্য আক্ষেপ ক’রে, তুমি তোমার জীবনকে ধ্বংস হতে দিও না। তারা যা করে আল্লাহ তা খুব ভালভাবেই জানেন।
— Taisirul Quran
কেহকেও যদি তার মন্দ কাজ শোভন করে দেখানো হয় এবং সে ওটাকে উত্তম মনে করে সেই ব্যক্তি কি তার সমান যে সৎ কাজ করে? আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথে পরিচালিত করেন। অতএব তুমি তাদের জন্য আক্ষেপ করে তোমার প্রাণকে ধ্বংস করনা। তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
কাউকে যদি তার অসৎ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয় অতঃপর সে ওটাকে ভাল মনে করে, (সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যে ভালকে ভাল এবং মন্দকে মন্দ দেখে?) কেননা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন আর যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন; অতএব তাদের জন্য আফসোস করে নিজে ধ্বংস হয়ো না। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন।
— Rawai Al-bayan
কাউকে যদি তার মন্দকাজ শোভন করে দেখানো হয় ফলে সে এটাকে উত্তম মনে করে, (সে ব্যক্তি কি তার সমান যে সৎকাজ করে?) তবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছে হিদায়াত করেন [১]। অতএব তাদের জন্য আক্ষেপ করে আপনার প্রাণ যেন ধ্বংস না হয়। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এবারে আসুন একটু ভেবে দেখি। বলুন তো, আমাকে যদি মন্দ কাজটি সুশোভিত করে আল্লাহ দেখান এই ইচ্ছায় যে, তিনি আমাকে গোমরাহ করবেন, তাহলে আমার কাছে তো সেই মন্দ কাজটিই ভাল মনে হবে, তাই না? আমি তো তখন উত্তম কাজ মনে করে সেই মন্দ কাজটিই করবো, কারণ আল্লাহই তা ইচ্ছে করেছেন। আল্লাহ যদি ইচ্ছে করে আমাকে পথভ্রষ্ট না করতো, তাহলে আমার মত সামান্য সৃষ্টির পক্ষে কুপথে চলে আসা সম্ভব?
এবারে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আমরা পড়ে নিই, হাদিসটি শুধুমাত্র সুনানু আবু দাউদ শরীফের সহিহ হাদিসই নয়, সেই সাথে মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী দ্বারা তাহক্বীককৃত সহিহ হাদিস। হাদিসটিতে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা আছে, আল্লাহ পাক সেই আদি অবস্থাতেই সকলের জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারিত করে রেখেছেন। শুধু নির্ধারণ করেই শেষ হয়নি, আল্লাহ পাক যাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাকে দিয়ে জান্নাতবাসীদের কাজ করিয়ে নেন, আর যাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন। এবারে একটু ভাবুন তো, এর অর্থ কী? হাদিসটি পাবেন এখানে [32] [33] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
৪৭০৩। মুসলিম ইবনু ইয়াসার আল-জুহানী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলোঃ ‘‘যখন তোমার রব আদম সন্তানের পিঠ থেকে তাদের সমস্ত সন্তানদেরকে বের করলেন…’’ (সূরা আল-আ‘রাফঃ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, আল-কা‘নবী এ আয়াত পড়েছিলেন। উমার (রাঃ) বলেন, আমি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রশ্ন করতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর স্বীয় ডান হাতে তাঁর পিঠ বুলিয়ে তা থেকে তাঁর একদল সন্তান বের করে বললেন, আমি এদেরকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং এরা জান্নাতবাসীর উপযোগী কাজই করবে।
অতঃপর আবার তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে একদল সন্তান বেরিয়ে এনে বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং জাহান্নামীদের উপযোগী কাজই করবে। একথা শুনে এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমলের কি মূল্য রইলো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তার দ্বারা জান্নাতবাসীদের কাজই করিয়ে নেন। শেষে সে জান্নাতীদের কাজ করেই মারা যায়। আর আল্লাহ এর বিনিময়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোনো বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন। অবশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করে মারা যায়। অতঃপর এজন্য তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।(1)
সহীহ, পিঠ বুলানো কথাটি বাদে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


আসুন এই হাদিসটি মুয়াত্তা মালিক হাদিস গ্রন্থ থেকে দেখে নেয়া যাক, [34] [35]
গ্রন্থের নামঃ মুয়াত্তা মালিক
অধ্যায়ঃ ৪৬. তকদীর অধ্যায়
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১. তকদীরের ব্যাপারে বিতর্ক করা নিষেধ
রেওয়ায়ত ২. মুসলিম ইবন ইয়াসার জুহানী (রহঃ) হইতে বর্ণিত, উমর (রাঃ)-এর নিকট (وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ) (সূরা আ’রাফঃ ১৭২) আয়াত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইল। তিনি বলিলেন, আমি শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হইয়াছিল। তিনি বলিয়াছিলেন, আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করিলেন এবং তাহার পৃষ্ঠে স্বীয় দক্ষিণ হস্ত দ্বারা মুসেহ করিলেন, অতঃপর আদমের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহার সন্তানদেরকে বাহির করিলেন এবং বলিলেন, আমি ইহাদেরকে বেহেশতের জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। ইহারা বেহেশতের কাজ করবে। অতঃপর পুনরায় তাহার পৃষ্ঠদেশে স্বীয় দক্ষিণ হস্ত বুলাইলেন এবং তাহার আর কিছু সংখ্যক সন্তান বাহির করিলেন এবং বলিলেন, আমি ইহাদেরকে দোযখের জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। ইহারা দোযখের কাজ করবে। এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা হইলে আমল করায় লাভ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহু পাক যখন কোন বান্দাকে বেহেশতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তাহার দ্বারা বেহেশতীদের কাজ করান আর মৃত্যুর সময়েও সে নেক কাজ করিয়া মৃত্যুবরণ করে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করাইয়া থাকেন। আর যখন কোন বান্দাকে দোযখের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তাহার দ্বারা দোযখীদের কাজ করাইয়া থাকেন। অতঃপর মৃত্যুর সময়েও তাহাকে খারাপ কাজ করাইয়াই মৃত্যুবরণ করান। আর আল্লাহ তখন তাহাকে দোযখে প্রবেশ করাইয়া থাকেন।

এই হাদিসগুলোর অর্থ কী? আল্লাহ পাক আদমকে সৃষ্টি করার পরে তার পিঠ থেকে জান্নাতী এবং জাহান্নামী মানুষকে বের করেছিলেন, যা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ জান্নাতের জন্য কিছু মানুষ নির্দিষ্ট করে সৃষ্টি করেছেন, এবং জাহান্নামের জন্য কিছু মানুষকে। আল্লাহ পাক যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, করিয়ে নিচ্ছেন, মানুষের পক্ষে তা পরিবর্তন সম্ভব নয় [36]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাক্বদীরের প্রতি ঈমান
৯৫-(১৭) মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে কুরআনের এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ‘‘(হে মুহাম্মাদ!) আপনার রব যখন আদম সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের সব সন্তানদেরকে বের করলেন’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭: ১৭২) (…আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। অতঃপর আপন ডান হাত তাঁর পিঠ বুলালেন। আর সেখান থেকে তাঁর (ভবিষ্যতের) একদল সন্তান বের করলেন। অতঃপর বললেন, এসবকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি, তারা জান্নাতীদের কাজই করবে। আবার আদামের পিঠে হাত বুলালেন এবং সেখান থেকে (অপর) একদল সন্তান বের করলেন এবং বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তারা জাহান্নামীদেরই ‘আমাল করবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে ‘আমালের আর আবশ্যকতা কি? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজই করিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত সে জান্নাতীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে এবং আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। এভাবে আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজই করিয়ে নেন। পরিশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে, আর এ কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করেন। (মালিক, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : وَمَسَحَ ظَهْرَهٗ অংশটুকু ব্যতীত। মুয়াত্ত্বা মালিক ১৩৯৫, আবূ দাঊদ ৪০৮১, তিরমিযী ৩০০১; সহীহ সুনান আবূ দাঊদ। হাদীসের সানাদের রাবীগণ নির্ভরযোগ্য ও তারা বুখারী মুসলিমের রাবী। তবে এ সানাদে মুসলিম ইবনু ইয়াসার ও ‘উমারের মাঝে বিচ্ছিনণতা রয়েছে তথাপি হাদীসের অনেক শাহিদ বর্ণনা থাকায় হাদীসটি সহীহ। আর সহীহ সুনানে আবী দাঊদে আলবানী (রহঃ) হাদীসটিকে وَمَسَحَ ظَهْرَهٗ অংশটুকু ছাড়া সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মূল বই থেকেও দেখি [37]
![ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে 22 গ্রন্থের নামঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) হাদিস নম্বরঃ [95] অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস) (كتاب الإيمان) পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি](https://assets.shongshoy.com/2019/09/A9Uc2ei.jpg.webp)
নিচের হাদিসটিও দেখে নিই [38] –
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে।
৪৬৩০. আবদুল্লাহ্ কা’নাবী (রহঃ) ……. মুসলিম ইবন জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবন খাওাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেনঃ
إِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ
অর্থাৎ স্মরণ কর! তোমার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারুক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেঃ নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী থাকলাম। (৭ঃ১৭২)
রাবী বলেনঃ কা’নাবী এ আয়াত তিলাওয়াত করলে উমার (রাঃ) বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনি। জবাবে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মহান আল্লাহ্ আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর, তার পিঠকে স্বীয় ডান হাত দিয়ে মাসেহ করেন। ফলে অনেক আদম সন্তান সৃষ্টি হয়। এরপর তিনি বলেনঃ আমি এদের জান্নাতে জন্য সৃষ্টি করেছি। এরা জান্নাতীদের ন্যায় আমল করবে। এরপর আল্লাহ্ তার হাত দিয়ে আদমের পিঠকে মাসেহ করেন। ফলে তার আরো সন্তান সৃষ্টি হয়। তিনি বলেনঃ আমি এদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তারা জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করবে। তখন এক ব্যক্তি বলেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাহলে আমলের প্রয়োজনীয়তা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জান্নাতীদের আমল করিয়ে নেন। ফলে, সে ব্যক্তি জান্নাতীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করান। ফলে সে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আরেকটি বিখ্যাত হাদিস পড়ে নিই, যেখানে বলা হচ্ছে, প্রতিটি মানুষ ঐ কাজই করবে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা যা তার জন্য সহজ করা হয়েছে [39],
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮২/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৮২/২. আল্লাহর ইলম-মুতাবিক (লেখার পর) কলম শুকিয়ে গেছে।
আল্লাহর বাণীঃ ‘‘আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে গুমরাহ করেছেন’’- (সূরাহ জাসিয়াহ ৪৫/২৩) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ যার সম্মুখীন তুমি হবে (তোমার যা ঘটবে) তা লেখার পর কলম শুকিয়ে গেছে। ইবনু ‘আব্বাস(রাঃ) বলেছেন,(لَهَا سَابِقُوْنَ) তাদের উপর নেকবখতি প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
৬৫৯৬. ‘ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জাহান্নামীদের থেকে জান্নাতীদেরকে চেনা যাবে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। সে বলল, তাহলে ‘আমলকারীরা ‘আমল করবে কেন? তিনি বললেনঃ প্রতিটি লোক ঐ ‘আমলই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অথবাযা তার জন্য সহজ করা হয়েছে। [৭৫৫১; মুসলিম ৩৮/১, হাঃ ২৬৪৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬১৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ)
আরো একটি হাদিসে বলা হয়েছে, শয়তান শুধুমাত্র তাদেরকেই গুমরাহ করতে পারে, যাদের জন্য আল্লাহ জাহান্নামকে ওয়াজিব করেছেন! এর অর্থ কী তা পাঠকগণই সিদ্ধান্ত নেবেন [40] –
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ৬. সুন্নাতের অনুসরণ করা জরুরী।
৪৫৩৯. আবূ কামিল (রহঃ) …. খালিদ হাযযা (রহঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করি, এ আয়াতের অর্থ কি? যেখানে বলা হয়েছেঃ শয়তান তোমাদের কাউকে গুমরাহ করতে পারে না, তবে যে জাহান্নামে যাবে, (তার কথা স্বতন্ত্র)। তিনি বলেনঃ অবশ্যই শয়তান তার গুমরাহীর ফাঁদে তাকেই আবদ্ধ করবে, যার জন্য আল্লাহ্ জাহান্নাম ওয়াজিব করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ খালিদ আল-হাজ্জা (রহঃ)
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মানুষ যদি ধর্ষণ করে, তা কি আল্লাহ আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছে, নাকি সেটি ঐ ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত নিয়ে করছে?
স্বাধীন ইচ্ছা বনাম সব নির্ধারিত
ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হচ্ছে, তাকদীরে প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ই লিখিত এবং পূর্বনির্ধারিত। শুরুতেই আসুন ড. আবু বকর যাকারিয়ার একটি বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
আসুন আরও একটি আলোচনা শুনি,
এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে একটি পৃষ্ঠা পড়ে নেয়া যাক, [41]

এবারে আসুন আরো একটি হাদিস পড়ি, যেখানে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে, সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত [42] –
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩০/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৩. সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য
২১৩৫৷ আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উমর (রাঃ) প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমলের ক্ষেত্রে আপনার অভিমত কি? আমরা যেসব কাজ করি তা কি নতুনভাবে ঘটল না আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে? তিনি বললেনঃ হে খাত্তাবের পুত্র! তা আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে। আর সকলের করণীয় বিষয় সহজ করে রাখা হয়েছে। যারা সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত তারা অবশ্যই সাওয়াবের কাজ সম্পাদন করে আর যারা দুর্ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত তারা দুর্ভাগ্যজনক কাজই সম্পাদন করে থাকে।
সহীহ, যিলালুল জান্নাহ (১৬১, ১৬৭)।
আবূ ঈসা বলেন, আলী, হুযাইফা ইবনু উসাইদ, আনাস ও ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
আসুন এবারে আরেকটি হাদিস পড়ি, [43]

এবারে আরও একটি হাদিস পড়ি, যেখানে আল্লাহ বলছেন যে, তাকদীরের বিষয়াদি আল্লাহ নির্ধারণ করে রাখেন কারো পরোয়া না করেই। আল্লাহ সদম্ভে ঘোষণা করেন, তিনি কারোরই পরোয়া করেন না, যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই করেন [44]

এবারে আসুন বাঙলাদেশের প্রখ্যাত আলেম ড. আবু বকর যাকারিয়ার কাছ থেকে শুনি তাকদীর সম্পর্কে,
মানুষ কী স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে কিছু করতে সক্ষম?
এই হাদিসটি ইসলামী বিশ্বাসে মানব স্বাধীন ইচ্ছা ও তাকদীর (divine predestination) সম্পর্কিত মৌলিক ধারণাগত পরস্পরবিরোধীতাকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে। এতে দেখা যায়, প্রাক-ইসলামিক যুগে অজ্ঞ মানুষরা যেকোনো ঘটনার জন্য তাকদীরকে দায়ী করত—অর্থাৎ তারা মনে করত, মানুষের কর্মকাণ্ডের পেছনে স্বাধীন ইচ্ছা নয়, বরং কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির নিয়ন্ত্রণ কার্যকর। ইসলাম এই ধারণাকে কেবল অব্যাহত রাখেনি, বরং ধর্মতাত্ত্বিকভাবে আরও দৃঢ় করেছে। মানে পূর্বের অজ্ঞদের সেই ধারনাকেই পাকাপোক্ত করেছে।
হাদিসের বর্ণনায় উমর ইবনু আব্দুল আজীয উল্লেখ করেন যে, তাকদীরের এই ধারণা কোনো নতুন চিন্তাধারা নয়; বরং জাহিলিয়াত যুগেও মানুষ নিজেদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তাকদীরকেই দায়ী করত। ইসলাম এসে এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক আকার দিয়েছে এবং নবী মুহাম্মদের বাণী ও হাদিসসমূহের মাধ্যমে তাকদীরকে এক সর্বব্যাপী নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ আর স্বাধীন সত্তা নয়, বরং ঈশ্বরের ইচ্ছানির্ভর এক নির্বাহী সত্তা—যার কর্ম, সিদ্ধান্ত, এমনকি নৈতিক প্রবণতাও পূর্বনির্ধারিত।
এই বিশ্বাসের কেন্দ্রে রয়েছে এক প্রকার নির্ধারণবাদ (determinism), যেখানে ঈশ্বরই সর্বকিছুর নিয়ন্তা এবং মানুষের কোনো কর্মকাণ্ডই তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত সংঘটিত হতে পারে না। এর ফলে নৈতিক দায়বদ্ধতা ও স্বাধীন ইচ্ছার ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যদি মানুষ কেবল ঈশ্বরের নির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুসারেই কাজ করে, তবে সৎ বা অসৎ আচরণের জন্য নৈতিক প্রশংসা বা নিন্দা—উভয়ই যুক্তিগতভাবে অসঙ্গত হয়ে যায়।
সুতরাং, এই হাদিস ইসলামী চিন্তাধারায় এক গভীর দার্শনিক সমস্যার দিক নির্দেশ করে, যাকে বলা যায় ইসলামের “ফিলোসফিকাল ডিজাস্টার”—যেখানে তাকদীরের ধারণা মানব স্বাধীনতার ধারণাকে বিলোপ করে দেয়। এটি এক প্রকার ধর্মীয় নির্ধারণবাদের (theological determinism) প্রতিনিধিত্ব করে, যা মানুষকে অনৈতিক কাজের জন্য দায়ী দায়ী করলেও, তার কার্যকর স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ আল্লাহ তাদের দিয়ে কী করাবেন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আছেন, রীতিমত নির্ধারণ করে রেখেছেন, এবং সেসব কাজ তাদের দিয়ে করিয়েও নেন, এরপরে তাদেরি সেই কাজের দায়ভার দিয়ে তাদের জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি দেন [45]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ৭. সুন্নাত অনুসরণে আহবান
৪৬১২। আবুস সালাত (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর নিকট তাকদীর সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি লিখলো। উত্তরে তিনি লিখেন, অতঃপর আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, আল্লাহকে ভয় করো, ভারসাম্যপূর্ণভাবে তাঁর হুকুম মেনে চলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করো, তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভের ও সংরক্ষিত হওয়ার পর বিদ’আতীদের বিদ’আত বর্জন করো। সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। কারণ এ সুন্নাত তোমাদের জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে রক্ষাকবজ। জেনে রাখো! মানুষ এমন কোনো বিদ’আত করেনি যার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বা তার বিরুদ্ধে এমন কোনো শিক্ষা নেই যা তার ভ্রান্তি প্রমাণ করে। কেননা সুন্নাতকে এমন এক ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, যিনি সুন্নাতের বিপরীত সম্বন্ধে অবগত।
আর ইবনু ফাসির তার বর্ণনায় ’’তিনি জানতেরন ভুলত্রটি, অজ্ঞতা ও গোঁড়ামি সম্পর্কে’’ এ কথাগুলো উল্লেখ করেননি। কাজেই তুমি নিজের জন্য ঐ পথ বেছে নিবে যা তোমার পূর্ববর্তী মহাপুরুষগণ তাদের নিজেদের জন্য অবলম্বন করেছেন। কারণ তারা যা জানতে পেরেছেন তার পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতার সঙ্গে বিরত থেকেছেন এবং তারা দীন সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন, আর যা করতে তারা নিষেধ করেছেন, তা জেনে-শুনেই নিষেধ করেছেন। তারা দীনের অর্থ উপলদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে অনেক জ্ঞানী ছিলেন। আর তোমাদের মতাদর্শ যদি সঠিক পথ হয় তাহলে তোমরা তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে গেলে। আর যদি তোমরা বলো যে, তারা দীনের মধ্যে নতুন কথা উদ্ভাবন করেছেন তবে বলো, পূর্ববর্তী লোকেরাই উত্তম ছিলেন এবং তারা এদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন। যতটুকু বর্ণনা করার তা তারা বর্ণনা করেছেন, আর যতটুকু বলার প্রয়োজন তা তারা বলেছেন। এর অতিরিক্ত বা এর কমও বলার নেই। আর এক গোত্র তাদেরকে উপেক্ষা করে কিছু কমিয়েছে, তারা সঠিক পথ থেকে সরে গেছে, আর যারা বাড়িয়েছে তারা সীমালঙ্ঘন করেছে। আর পূর্ববর্তী মহাপুরুষগণ ছিলেন এর মাঝামাঝি সঠিক পথের অনুসারী।
পত্রে তুমি তাকদীরে বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চেয়ে লিখেছো। আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি এমন ব্যক্তির নিকট এ বিষয়ে জানতে চেয়েছো যিনি এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ। আমার জানা মতে, তাকদীরে বিশ্বাসের উপর বিদ’আতীদের নবতর মতবাদ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এটা কোনো নতুন বিষয় নয়; জাহিলিয়াতের সময়ও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।অজ্ঞ লোকেরা তখনও তাদের আলোচনা ও কবিতায় এ বিষয়টি উল্লেখ করতো এবং তাদের ব্যর্থতার জন্য তাকদীরকে দায়ী করতো। ইসলাম এসে এ ধারণাকে আরো বদ্ধমূল করেছে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর মুসলিমগণ তাঁর নিকট সরাসরি শুনেছে এবং তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে পরস্পর আলোচনা করেছে।
তারা অন্তরে বিশ্বাস রেখে, তাদের রবের অনুগত হয়ে, নিজেদেরকে অক্ষম মনে করে এ বিশ্বাস স্থাপন করেছে যে, এমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহর জ্ঞান, কিতাব ও তাকদীর বহির্ভূত। এছাড়া তা আল্লাহর আমোঘ কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। আর যদি তোমরা বলো, কেন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেছেন এবং কেন এ কথা বলেছেন, তবে জেনে রাখো! তারাও কিতাবের ঐসব বিষয় পড়েছেন যা তোমরা পড়েছো; উপরন্ত তারা সেসব ব্যাখ্যা ছিলেন যা তোমরা জানো না। এতদসত্ত্বেও তারা বলেছেন,সবকিছু আল্লাহর কিতাব ও তকদীর অনুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তা অবশ্যই ঘটবে, আল্লাহ যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। লাভ বা ক্ষতি কোনো কিছুই আমরা নিজেদের জন্য করতে সক্ষম নই। অতঃপর তারা ভালো কাজের প্রতি উৎসাহী ও খারাপ কাজের ব্যাপারে সাবধান হয়েছেন।[1]
সহীহ মাকতু।
[1]. আজরী ‘আশ-শারী‘আহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এবারে আসুন শায়েখ আহমদুল্লাহর একটি বক্তব্য শুনি,
আমলের কি আসলেই কোন মূল্য হয়েছে?
উপরের হাদিস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহ তাকদীর আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। এর সাথে আমলের কী আদৌ কোন মূল্য রয়েছে? আমল করে কী আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর পরিবর্তন সম্ভব? এমনকি নবী নিজেই এই হাদিস যদি শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন, তার জান্নাত প্রাপ্তিও শতভাগ নিশ্চিত নয়। আসুন হাদিস থেকেই পড়ি, [46] [47] [48]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে
৬৮৫২। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে জান্নাতে দাখিল করতে পারে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমিও নই। তবে আমার পালনকর্তা যদি তার অনুগ্রহের দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে
৬৮৫৩। মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে নাজাত দিতে পারে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? উত্তরে তিনি বললেনঃ আমিও নই। তবে যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে তার ক্ষমা ও রহমতের দ্বারা ঢেকে নেন। বর্ণনাকারী ইবনু আউন (রহঃ) তাঁর হাত দ্বারা নিজ মাথার দিকে ইশারা করে বললেন, আমিও না। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা’আলা তাঁর ক্ষমা ও রহমত দ্বারা আমাকে ঢেকে নেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে
৬৮৫৪। যুহারয়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে নাজাত দিতে পারে। তারা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? তিনি বলেন, আমিও নই। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে তাঁর রহমত দ্বারা রক্ষা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এবারে আসুন তাফসীর গ্রন্থ থেকে একটি বক্তব্য দেখে নিই, [49]

মানুষের যিনা ব্যভিচার পূর্ব নির্ধারিত
একজন মানুষ কতটুকু যিনা ব্যভিচার করবে, তা কি আল্লাহ যতটুকু লিখেছেন ততটুকু সে করবেই? আসুন দেখা যাক, হাদিস কি বলে! [50] [51] [52] [53] [54]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৫. বনী আদমের যিনা ইত্যাদির অংশ পূর্ব নির্ধারিত
৬৫১৩। ইসহাক ইবনু মানসুর (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সুত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আদম সন্তানের উপর যিনার যে অংশ লিপিবদ্ধ আছে তা অবশ্যই সে প্রাপ্ত হবে। দু’চোখের যিনা হল দৃষ্টিপাত করা, দু’কানের যিনা হল শ্রবণ করা, জিহ্বার যিনা হল কথোপকথন করা, হাতের যিনা হল স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হল হেঁটে যাওযা, অন্তরের যিনা হল আকৃষ্ট ও বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা বাস্তবায়িত করে এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৫. বনী আদমের যিনা ইত্যাদির অংশ পূর্ব নির্ধারিত
৬৫১২। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) যা বলেছেন, ‘লামাম’ (জাতীয় গোনাহ) সম্পর্কে তার চাইতে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন কিছু আমি দেখিনি। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ আদম সন্তানের যিনার যে অংশ নির্ধারিত করেছেন, তা সে অবশ্যই পাবে (করবে)। আর দু’চোখের যিনা দৃষ্টিপাত করা, কানের যিনা শ্রবণ করা, জিহ্বার যিনা কথোপকথন করা, অন্তরে বাসনা করে। আর লজ্জাস্থান তা বাস্তবায়িত করে কিংবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) তাঊস (রহঃ) এর বর্ণনায় বলেছেন যে, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে শুনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৭। তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৫. আদাম সন্তানের উপর ব্যভিচার ও অন্যান্য বিষয়ের অংশ পরিমিত
৬৬৪৬-(২০/২৬৫৭) ইসহাক ইবনু ইব্রাহীম ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) যা বলেছেন ‘লামাম (আকর্ষণীয় বড় গুনাহ) বিষয়ে তার চেয়ে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ কোন বিষয় আমি দেখিনি। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের যে ভাগ লিখেছেন, নিঃসন্দেহে তা সে পাবে। দু’চোখের ব্যভিচার দেখা, যবানের ব্যভিচার, পরস্পর কথোপকথনের ব্যভিচার, মনের ব্যভিচার কামনা-বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা সত্যায়িত করে অথবা মিথ্যা সাব্যস্ত করে।
আবদ (রহঃ) তাউস এর বর্ণনায় বলেছেন যে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে শুনেছেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫১২, ইসলামিক সেন্টার ৬৫৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৪৪. যে বিষয়ে দৃষ্টি সংযত রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে
২১৫২। ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূত্রে বর্ণিত হাদীসের চাইতে সগীরাহ গুনাহ সম্পর্কিত কোনো হাদীস দেখিনি। তিনি বলেছেনঃ মহান আল্লাহ প্রতিটি আদম সন্তানের মধ্যে যিনার একটি অংশ নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা সে অবশ্যই করবে। সুতরাং দৃষ্টি হচ্ছে চোখের যিনা, প্রেমালাপ হচ্ছে জিহবার যিনা এবং অন্তরের যিনা হচ্ছে তা ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা, আর গুপ্তস্থান তা সত্য কিংবা মিথ্যায় পরিণত করে।(1)
সহীহ।
(1). বুখারী, মুসলিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
৮৬-(৮) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তা‘আলা আদম সন্তানের জন্য তার ব্যভিচারের অংশ লিখে রেখেছেন, সে তা নিশ্চয়ই করবে। চোখের ব্যভিচার হলো দেখা, জিহবার ব্যভিচার কথা বলা (যৌন উদ্দীপ্ত কথা বলা)। আর মন চায় ও আকাঙ্ক্ষা করে এবং গুপ্তাঙ্গ তাকে সত্য বা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে। (বুখারী, মুসলিম)(1)
কিন্তু সহীহ মুসলিম-এর অপর এক বর্ণনায় আছে, আদম সন্তানের জন্য তাক্বদীরে যিনার অংশ যতটুকু নির্ধারণ করা হয়েছে, সে ততটুকু অবশ্যই পাবে। দুই চোখের যিনা তাকানো, কানের যিনা যৌন উদ্দীপ্ত কথা শোনা, মুখের যিনা আবেগ উদ্দীপ্ত কথা বলা, হাতের যিনা (বেগানা নারীকে খারাপ উদ্দেশে) স্পর্শ করা আর পায়ের যিনা ব্যভিচারের উদ্দেশে অগ্রসর হওয়া এবং মনের যিনা হলো চাওয়া ও প্রত্যাশা করা। আর গুপ্তাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে।(2)
(1) সহীহ : বুখারী ৬২৪৩, মুসলিম ২৬৫৭, আবূ দাঊদ ২১৫২, আহমাদ ৭৭১৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪৪২০, ইরওয়া ১৭৮৭, সহীহ আল জামি‘ ১৭৯৭।
(2) সহীহ : মুসলিম ২৬৫৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
তাকদীর বিষয়ে আরো হাদিস
ধরা যাক, ছয়মাসের একটি বাচ্চা শিশুকে ধর্ষণের পরে হত্যা করেছে একজন লোক। লোকটি নিজ ইচ্ছাতে এই কাজটি করেছে? এই কাজটির সম্পূর্ণ দায় এই লোকটির? নাকি তিনি যে এই কাজটি করবেন তা সৃষ্টির বহু আগেই নির্ধারিত ছিল! এবং আল্লাহ তাকে দিয়ে এই কাজটি করিয়ে নিয়ে তাকে জাহান্নামে প্রেরণের ব্যবস্থা করেছেন, যেহেতু আল্লাহ তাকে জাহান্নামে পোড়াবার উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন? উপরে বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে কিন্তু সেটি স্পষ্ট।
সেইসাথে, নবী এটিও নিশ্চিত করেছেন যে, পিতার মেরুদণ্ডে অবচেতন থাকতেই কে জাহান্নামে আর কে জান্নাতে যাবে তা নির্ধারিত বিষয়। অর্থাৎ সে ভাল কাজ করবে না খারাপ কাজ, সেসব কাজ করার আগেই তার ভাগ্য নির্ধারিত [55] –
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ১০. তাকদীর (রাঃ) ভাগ্যলিপির বর্ণনা
৭/৮২। উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আনসার সম্প্রদায়ের এক বালকের জানাযা পড়ার জন্য ডাকা হল। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! তার জন্য সুসংবাদ, সে জান্নাতের চড়ুই পাখিদের মধ্যে এক চড়ুই যে পাপ কাজ করেনি এবং তা তাকে স্পর্শও করেনি। তিনি বলেনঃ হে আয়িশাহ! এর ব্যতিক্রমও কি হতে পারে? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা একদল লোককে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে অবচেতন থাকতেই তিনি তাদেরকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি জাহান্নামের জন্যও একদল সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে অবচেতন থাকতেই তিনি তাদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: মুসলিম ২৬৬২/১-২, নাসায়ী ১৯৪৭, আবূ দাঊদ ৪৭১৩, আহমাদ ২৩৬১২, ২৫২১৪।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
নিচের হাদিসটি মন দিয়ে পড়ুন। বেশ পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহ পাক জাহান্নামি জান্নাতি কারা কোথায় যাবে তা আগেই ঠিক করে রেখেছেন [56] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুশরিকদের শিশু সন্তান সম্পর্কে
৪৭১৩। উম্মুল মু‘মিনীন আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জানাযার সালাতের জন্য এক আনসারী বালকের লাশ আনা হলো। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এর কি সৌভাগ্য সে কোনো গুনাহ করেনি এবং তার বয়সও পায়নি। তিনি বললেন, হে আয়িশাহ! এর বিপরীত কি হতে পারে না? মহান আল্লাহ জান্নাত ও তার অধিবাসীদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা যখন তাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তখন তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে ছিলো। আবার তিনি জাহান্নাম ও তার জন্য একদল ভুক্তভোগী সৃষ্টি করেছেন এবং তা তাদের জন্য যখন তিনি সৃষ্টি করেছেন তখন তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে ছিলো।(1)
সহীহ।
(1). মুসলিম, নাসায়ী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সেই সাথে, আল্লাহ পাক তার সমস্ত সৃষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে কয়েকটি বিষয় নির্ধারিত করে রেখেছেন, সেগুলো হচ্ছে [57] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৩-(৩৫) আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ ‘আয্যা ওয়াজাল্লা পাঁচটি বিষয়ে তাঁর সৃষ্টজীবের জন্য চূড়ান্তভাবে (তাক্বদীরে) লিখে দিয়ে নির্ধারিত করে রেখেছেনঃ (১) তার আয়ুষ্কাল (জীবনকাল), (২) তার ‘আমল (কর্ম), (৩) তার অবস্থান বা মৃত্যুস্থান, (৪) তার চলাফেরা (গতিবিধি) এবং (৫) এবং তার রিয্ক্ব (রিজিক/রিযিক) (জীবিকা)। (আহমাদ)(1)
(1) সহীহ : আহমাদ ২০৭২৯, ইবনু আবুল ‘আস্-এর তাহ্ক্বীকুস্ সুন্নাহ, ৩০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহিহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকূল সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টিকূলের তাকদীর লিখে রেখেছেন [58] [59] –
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৭। আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সারহ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ তাঁআলা সমগ্র সৃষ্টির ভাগ্যলিপি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, সে সময় আল্লাহর আরশ পানির উপরে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
![ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে 31 গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ) অধ্যায়ঃ ৪৮/ তাকদীর (كتاب القدر) হাদিস নম্বরঃ [6507] পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন](https://assets.shongshoy.com/2019/09/6S2r7mP.jpg.webp)
হাদীস একাডেমী প্রকাশিত তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ গ্রন্থে হাদীসগুলোর তাহক্বীক প্রধানত শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ) এর তাহক্বীক মিশকাতুল মাসাবীহ থেকে নেয়া হয়েছে। মিশকাতের বিখ্যাত শরাহ গ্রন্থ “মিরআতুল মাফাতীহ” হতে ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে [60]।

হাদিসে কুদসি [61], যাকে বলা হয় আল্লাহরই বানী, মুহাম্মদের মুখ থেকে নির্গত, সেখানে হযরত মুহাম্মদ বলেন,
“আল্লাহ তাআলা প্রথম সৃষ্টি করেছেন কলম। সৃষ্টির পর কলমকে বললেন: ‘লিখ’। কলম বলল: ইয়া রব্ব! কী লিখব? তিনি বললেন: কেয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক জিনিসের তাকদীর লিখ।”
( আবু দাউদ- ৪৭০০) আলবানি সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

মায়ের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় ভাগ্য নির্ধারণ
আল্লাহ পাক মাতৃগর্ভে সন্তান থাকবার সময়ই ফেরেশতা পাঠিয়ে লিখে দেন, সন্তানটির রিজক, আমাল, আয়ু এবং দুর্ভাগ্য সম্পর্কে। যার আমলে ওই ফেরেশতা কাফের লিখে দেবেন, সে বড় হয়ে কাফেরই হবে। কোন মানুষের পক্ষে আল্লাহর লিখিত বিধান পরিবর্তন সম্ভব নয় [62] [63] [64] [65] [66] [67]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছদঃ ৯৭/২৮. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ কথা আগেই স্থির হয়ে গেছে। (সূরাহ আস্ সাফফাত ৩৭/১৭১)
৭৪৫৪. ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি ‘সত্যবাদী’ এবং ‘সত্যবাদী বলে স্বীকৃত’ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি হলো এমন বীর্য থেকে যাকে মায়ের পেটে চল্লিশ দিন কিংবা চল্লিশ রাত একত্রিত রাখা হয়। তারপর তেমনি সময়ে আলাক হয়, তারপর তেমনি সময়ে গোশতপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ্ তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। এই ফেরেশতাকে চারটি বিষয় সম্পর্কে লেখার করার জন্য হুকুম দেয়া হয়। যার ফলে ফেরেশেতা তার রিযক, ‘আমাল, আয়ু এবং দুর্ভাগা কিংবা ভাগ্যবান হওয়া সম্পর্কে লিখে দেয়। তারপর তার মধ্যে প্রাণ ফুঁকে দেয়া হয়। এজন্যই তোমাদের কেউ জান্নাতীদের ‘আমাল করে এতটুকু এগিয়ে যায় যে, তার ও জান্নাতের মাঝে কেবল এক গজের দূরত্ব থাকতেই তার ওপর লিখিত তাক্দীর প্রবল হয়ে যায়। তখন সে জাহান্নামীদের ‘আমাল করে। শেষে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ জাহান্নামীদের মত ‘আমাল করে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক গজের দূরত্ব থাকতে তার উপর তাকদীরের লেখা প্রবল হয়, ফলে সে জান্নাতীদের মত ‘আমাল করে, শেষে জান্নাতেই প্রবেশ করে। (৩২০৮) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯৪৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮৬/ জাহ্মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছদঃ ৩১৩০. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে। (৩৭ঃ ১৭১)
৬৯৪৬। আদম (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি সত্যবাদী এবং সত্যবাদী বলে স্বীকৃত আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি হল এরূপ বীর্য থেকে যাকে মায়ের পেটে চল্লিশ দিন কিংবা চল্লিশ রাত একত্রিত রাখা হয়। তারপর অনুরূপ সময়ে আলাক হয়, তারপর অনুরূপ সময়ে গোশতপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তা’আলা তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। এই ফেরেশতাকে চারটি জিনিস সম্পর্কে লিপিবদ্ধ করার জন্য হুকুম দেয়া হয়। যার ফলে ফেরেশতা তার রিযিক, আমল, আয়ু এবং সৌভাগ্য কিংবা হতভাগ্য হওয়া সম্পর্কে লিখে দেয়। তারপর তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা হয়। এজন্যই তোদের কেউ জান্নাতীদের আমল করে এতটুকু অগ্রগামী হয়ে যায় যে, তার ও জান্নাতের মাঝখানে মাত্র এক গজেঁর দূরত্ব থাকতেই তার ওপর লিখিত তাকদীর প্রবল হয়ে যায়। তখন সে দোযখীদের আমল করে। পরিশেষে সে দোযখেই প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ দোযখীদের ন্যয় আমল করে। এমন পর্যায়ে পৌছে যে, তার ও দোযখের মধ্যে মাত্র এক গজের দূরত্ব থাকতে তার উপর তাকদীরের লেখনী প্রবল হয়, যদ্দরুন সে জান্নাতীদের ন্যায় আমল করে, ফলে জান্নাতেই প্রবেশ করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ৫৯/৬. ফেরেশতাদের বর্ণনা।
৩২০৮. যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, সত্যবাদী হিসেবে গৃহীত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাঁকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিয্ক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যক্তি ‘আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত পার্থক্য থাকে। এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। তখন সে জাহান্নামবাসীর মত আমল করে। আর একজন ‘আমাল করতে করতে এমন স্তরে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত তফাৎ থাকে, এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মত ‘আমল করে। (৩৩৩২, ৬৫৯৪, ৭৪৫৪) (মুসলিম ৪৭/১ হাঃ ৩৬৪৩, আহমাদ ৩৬২৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৭৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আন্-নওয়াবীর চল্লিশ হাদীস
অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ
পাবলিশারঃ ইসলাম হাউস
পরিচ্ছদঃ কোন পরিচ্ছদ নেই
৪। আবূ আব্দির রহমান আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন— রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম— যিনি সত্যবাদী ও যার কথাকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয়— তিনি আমাদেরকে বলেছেন:
তোমাদের সকলের সৃষ্টি নিজের মায়ের পেটে চল্লিশ দিন যাবৎ শুক্ররূপে জমা হওয়ার মাধ্যমে শুরু হতে থাকে, পরবর্তী চল্লিশ দিন জমাট বাঁধা রক্তরূপে থাকে, পরবর্তী চল্লিশ দিন গোশতপিণ্ড রূপে থাকে, তারপর তার কাছে ফিরিশ্তা পাঠানো হয়। অতঃপর সে তার মধ্যে রূহ প্রবেশ করায় এবং তাকে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য হুকুম দেয়া হয়- তার রুজি, বয়স, কাজ এবং সে কি সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান।
অতএব, আল্লাহর কসম-যিনি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ্ নেই-তোমাদের মধ্যে একজন জান্নাতবাসীর মত কাজ করে(1)- এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত ব্যবধান থাকে, এ অবস্থায় তার লিখন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে বলে সে জাহান্নামবাসীর মত কাজ শুরু করে এবং তার ফলে তাতে প্রবেশ করে।
এবং তোমাদের মধ্যে অপর এক ব্যক্তি জাহান্নামীদের মত কাজ শুরু করে দেয়- এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে মাত্র এক হাত ব্যবধান থাকে, এ অবস্থায় তার লিখন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে বলে সে জান্নাতবাসীদের মত কাজ শুরু করে আর সে তাতে প্রবেশ করে।
(বুখারী: ৩২০৮, মুসলিম: ২৬৪৩) (1) অর্থাৎ বাহ্যিক দৃষ্টিতে তার কাজটি সবার নিকট জান্নাতবাসীদের কাজ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতের কাজ করেনি। কারণ, তার ঈমান ও ইখলাসের মধ্যে কোথাও কোন ঘাটতি ছিল। (সম্পাদক)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – তাক্বদীরের প্রতি ঈমান
৮২-(৪) ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলে স্বীকৃত আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেরই জন্ম হয় এভাবে যে, তার মায়ের পেটে (প্রথমে তার মূল উপাদান) শুক্ররূপে চল্লিশ দিন পর্যন্ত থাকে। অতঃপর তা চল্লিশ দিন পর্যন্ত লাল জমাট রক্তপিন্ডরূপ ধারণ করে। তারপর পরবর্তী চল্লিশ দিনে মাংসপিন্ডর রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা একজন মালাককে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য পাঠন। সে মালাক লিখেন তার- (১) ‘আমাল (সে কি কি ‘আমাল করবে), (২) তার মৃত্যু, (৩) তার রিয্ক্ব (রিজিক/রিযিক) ও (৪) তার নেককার বা দুর্ভাগা হওয়ার বিষয় আল্লাহর হুকুমে তার তাক্বদীরে লিখে দেন, তারপর তন্মধ্যে রূহ্ প্রবেশ করান। অতঃপর সে সত্তার কসম, যিনি ব্যতীত প্রকৃত আর কোন ইলাহ নেই! তোমাদের মধ্যে কেউ জান্নাতবাসীদের ‘আমাল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার প্রতি তাক্বদীরের লিখা তার সামনে আসে। আর তখন সে জাহান্নামীদের কাজ করতে থাকে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে। তোমাদের কোন ব্যক্তি জাহান্নামীদের মতো ‘আমাল করতে শুরু করে, এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে। এমন সময় তার প্রতি সে লেখা (তাক্বদীর) সামনে আসে, তখন সে জান্নাতীদের কাজ করতে শুরু করে, ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। (বুখারী, মুসলিম)(1) (1) সহীহ : বুখারী ৩২০৮, মুসলিম ২৬৪৩, আবূ দাঊদ ৪৭০৮, ইবনু মাজাহ ৭৬, তিরমিযী ২১৩৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৭৪, আহমাদ ৩৯৩৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
![ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে 36 গ্রন্থের নামঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) হাদিস নম্বরঃ [82] অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস) (كتاب الإيمان) পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি](https://assets.shongshoy.com/2019/09/7nHYQGw.jpg.webp)
মানুষের স্বকীয়তা নাকি ঐশ্বরিক প্রজেকশন
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে দাবি করা হয় যে, মানুষকে ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা বা ‘চয়েস’ দেওয়া হয়েছে। তবে কুরআনের মূল পাঠ্য বা টেক্সচুয়াল এভিডেন্স এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দেয়। কুরআনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, মানুষের প্রতিটি কাজ—তা ভালো হোক বা মন্দ—সবই আল্লাহর নিজস্ব সৃষ্টি। কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ যা করে অর্থাৎ মানুষের কর্মের সরসতা আল্লাহই [68] [69]
আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে আর তোমরা যা তৈরি কর সেগুলোকেও।
— Taisirul Quran
প্রকৃত পক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর তা’ও।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘অথচ আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন’?
— Rawai Al-bayan
অথচ আল্লাহ্ই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর তাও [১]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াতটি দর্শনের ভাষায় ‘হার্ড ডিটারমিনিজম’ (Hard Determinism)-এর একটি চূড়ান্ত দলিল। সপ্তদশ শতাব্দীর দার্শনিক বারুখ স্পিনোজার (Baruch Spinoza) প্যানথেইস্টিক ডিটারমিনিজমের আলোকে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। স্পিনোজার মতে, মহাবিশ্বে কোনো কিছুই আকস্মিক নয়; বরং সবকিছুই ঐশ্বরিক প্রকৃতির আবশ্যকতা থেকে উদ্ভূত হয়। স্পিনোজা মনে করতেন, মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করে কেবল তার নিজের কর্মের পেছনের প্রকৃত ‘কারণ’ সম্পর্কে সে অজ্ঞ বলে [70]। ইসলামি প্রেক্ষাপটে, মানুষ মূলত আল্লাহর একটি ‘এক্সটেনশন’ বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যদি মানুষের কর্ম বা ‘Action’ স্বয়ং আল্লাহরই সৃষ্টি (Creation) হয়, তবে একজন অপরাধীর কৃত অপরাধের আদি-স্রষ্টাও আল্লাহ। এখানে অপরাধী কেবল একটি ‘বায়োলজিক্যাল প্রক্সি’, যার নিউরাল সার্কিট ও পরিস্থিতি ব্যবহার করে আল্লাহ নিজের পূর্বনির্ধারিত পাণ্ডুলিপি বাস্তবায়ন করছেন।
এই আধিভৌতিক ধারণাকে বর্তমানে আধুনিক নিউরোসায়েন্সের মাধ্যমে আরও জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ করা যায়। বিশেষ করে সত্তর ও আশির দশকে পরিচালিত বেঞ্জামিন লিবেটের (Benjamin Libet) বিখ্যাত নিউরোসাইকোলজিক্যাল পরীক্ষাগুলো মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’র অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। লিবেট দেখিয়েছেন যে, একজন মানুষ কোনো কাজ করার জন্য ‘সচেতন ইচ্ছা’ (Conscious Will) পোষণ করার প্রায় কয়েকশ মিলিসেকেন্ড আগেই তার মস্তিষ্কে একটি অবচেতন বৈদ্যুতিক সংকেত বা ‘রেডিনেস পটেনশিয়াল’ (Readiness Potential) তৈরি হয় [71]। অর্থাৎ, আমরা যখন মনে করি যে আমরা ‘নিজ ইচ্ছায়’ হাত তুলছি বা কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তার আগেই আমাদের মস্তিষ্ক সেই সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলে। আমাদের সচেতন মন কেবল সেই অবচেতন সিদ্ধান্তের একটি ‘আফটার-দ্য-ফ্যাক্ট’ ব্যাখ্যা তৈরি করে।
কুরআনের সূরা বাকারার ৭ নম্বর আয়াতের সাথে লিবেটের এই এক্সপেরিমেন্টের একটি অদ্ভুত সমান্তরালতা লক্ষ্য করা যায় [72],
“আল্লাহ তাদের অন্তরে ও তাদের কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর রয়েছে পর্দা…”
নিউরোসায়েন্সের ভাষায় বললে, যদি কারো সিদ্ধান্ত-নির্ণায়ক ব্যবস্থা—বিশেষ করে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স—আগে থেকেই এমনভাবে “প্রোগ্রামড” বা কার্যত ‘সিল’ করে দেওয়া হয় যে বিকল্প সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার কাছ থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। আর যদি কোনো সৃষ্টিকর্তা কারো নৈতিক-স্নায়বিক বা আধ্যাত্মিক সক্ষমতাই নিষ্ক্রিয় করে দেন (মোহর মেরে দেন), তারপর সেই নিষ্ক্রিয়তাকেই ভিত্তি করে অনন্ত শাস্তি দেন—তাহলে সেটি ন্যায়বিচারের সাথে মেলে না। এটা এমন এক খেলায় নামানো, যেখানে খেলোয়াড়ের হাত-পা বেঁধে রেখে গোল না করার “অপরাধে” তাকে দণ্ডিত করা হচ্ছে।
স্পিনোজার দর্শন এবং লিবেটের নিউরোসায়েন্স—উভয়ই ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষের ‘ইচ্ছা’ মূলত একটি সেকেন্ডারি প্রসেস। ইসলামি গড-মডেলে আল্লাহ যখন কোনো কাজ সৃষ্টি করেন এবং মানুষের অন্তরে মোহর মেরে দেন, তখন তিনি মূলত একজন মানুষের নৈতিক এজেন্সিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। এমতাবস্থায়, বিচার দিবস বা জাহান্নামের ভয় কেবল একটি ভিক্টিম-ব্লেমিং মেকানিজম ছাড়া আর কিছুই নয়।
আদম ও মুসার বাদানুবাদ
তাকদীরের ধারণায় সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকটটি হলো—পাপের দায় কার? যদি প্রতিটি কর্ম সৃষ্টির পূর্বেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে অপরাধীর অপরাধ মূলত একটি স্ক্রিপ্টেড পারফরম্যান্স। এই দায়মুক্তির বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেছিল খোদ ইবলিশ বা শয়তান। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আদমকে সেজদা না করার অপরাধে যখন ইবলিশকে বহিষ্কার করা হয়, তখন সে সরাসরি আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল [73]
“সে (ইবলিশ) বলল: আপনি যেভাবে আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন (bi-mā aghwaytanī), তজ্জন্য আমি অবশ্যই আপনার সরল পথে তাদের (মানুষের) জন্য ওত পেতে বসে থাকব।”
লক্ষণীয় যে, ইবলিশ এখানে নিজের অবাধ্যতার জন্য নিজেকে দায়ী করেনি, বরং ‘আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন’—এই তথ্যটি তুলে ধরেছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, আল্লাহর অনুমতি বা ইচ্ছা ছাড়া যেহেতু কোনো কিছুই ঘটে না, তাই ইবলিশের এই দাবিটি তাত্ত্বিকভাবে সঠিক। এই একই ধরনের প্যারাডক্স আমরা দেখতে পাই ষোড়শ শতাব্দীর খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ জন ক্যালভিনের (John Calvin) ‘ডাবল প্রিডেস্টিনেশন’ (Double Predestination) তত্ত্বে। ক্যালভিনের মতে, ঈশ্বর তার সার্বভৌম ক্ষমতায় নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে পরিত্রাণের জন্য এবং বাকিদের অনন্তকাল ধ্বংসের জন্য পূর্বেই মনোনীত করে রেখেছেন [74]। ক্যালভিনিজমের এই কঠোর নিয়তিবাদ যেমন ঈশ্বরকে ‘পাপের হোতা’ (Author of Sin) হিসেবে অভিযুক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে, ইসলামি তাকদীরের ধারণাটিও ঠিক একইভাবে অপরাধীকে নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে অব্যহতি দেয়।
এই ‘থিউলজিক্যাল ইমিউনিটি’ বা ধর্মীয় দায়মুক্তির সবচেয়ে ক্লাসিক উদাহরণ হলো আদম ও মুসা -এর মধ্যকার সেই বিখ্যাত বিতর্ক, যা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আদম এবং হযরত মুসার একবার একটি বিষয় নিয়ে বাদানুবাদ হয়েছিল, যা সহিহ হাদিস গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। হাদিসগুলো দেখুন [75] [76]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০১। মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম, ইবরাহীম ইবনু দীনার, ইবনু আবূ উমর মাক্কী ও আহমাদ ইবনু আবদ দাব্বিয়্যু ও তাঊস (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) এর মধ্যে বিতর্ক হয়। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আদম! আপনি আমাদের পিতা, আপনি আমাদের বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদের বের করে দিয়েছেন। তখন আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি তো মূসা। আল্লাহ তা’আলা আপনার সঙ্গে কথা বলে আপনাকে মনোনীত (সম্মানিত) করেছেন এবং আপনার জন্য তার হাতে লিখে (কিতাব তাওরাত) দিয়েছেন। আপনি কি এমন বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করছেন যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর তর্কে বিজয়ী হলেন।
আর ইবনু আবূ উমর ও ইবনু আবাদাহ বর্ণিত হাদীসে তাদের একজন বলেছেন,خَطَّ অন্যজন বলেছেন,كَتَبَ তিনি তার হাতে তোমার জন্য তাওরাত লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০২। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) পরস্পরে বিতর্কে অবতীর্ণ হলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই আদম (আলাইহিস সালাম) যিনি লোকদের গোমরাহ করেছেন এবং জান্নাত থেকে তাদের বহিস্কার করেছেন। তখন আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই ব্যক্তি (নবী) যাতে আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ে ইলম দান করেছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হ্যাঁ। আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমাকে এমন একটি ব্যাপারে ভৎসনা করেছেন, যা আমার সৃষ্টির পূর্বে আমার উপর নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৩। ইসহাক ইবনু মূসা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মূসা, ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ আনসারী (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁদের প্রতিপালকের কাছে তর্কে অবতীর্ণ হলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর বিজয়ী হলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই আদম (আলাইহিস সালাম) যাকে আল্লাহ তা’আলা আপন হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মাঝে তিনি তাঁর রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, তিনি তাঁর ফিরিশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন এবং তাঁর জান্নাত আপনাকে বসবাস করতে দিয়েছেন। এরপর আপনি আপনার ভুলের দ্বারা মানুষকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছেন।
আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই মূসা (আলাইহিস সালাম) যাকে আল্লাহ তা’আলা রিসালাতের দায়িত্ব ও তার কালামসহ বিশেষ মর্যাদায় মনোনীত করেছেন এবং আপনাকে দান করেছেন ফলকসমূহ (তাওরাত কিতাব), যাতে সব কিছুর বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে এবং একান্তে কথোপকথনের জন্য অন্যান্যকে নৈকট্য দান করেছেন। আচ্ছা আমার সৃষ্টির কত বছর আগে আল্লাহ তায়ালা তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন বলে আপনি দেখতে পেয়েছেন? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, চল্লিশ বছর আগে। আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি কি তাতে একথা পেয়েছেন, আদম তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করেছে এবং পথ হারা হয়েছে। বললেন, হ্যাঁ।
আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, এরপর আপনি আমাকে আমার এমন কাজের জন্য কেন তিরস্কার করছেন যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর আগে আল্লাহ তাআলা আমার উপর নির্ধারণ করে রেখেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর বিজয়ী হলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)





আসুন এই সম্পর্কে আলেমদের বক্তব্য শুনি,
এই বিতর্কটি যুক্তিবিদ্যার খাতিরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়। আদম যদি তার ভুলের জন্য তাকদীরের দোহাই দিয়ে নির্দোষ সাব্যস্ত হতে পারেন, তবে পৃথিবীর অন্য কোনো অপরাধীকে কেন শাস্তি দেওয়া হবে? আদমের যুক্তিতে—যেহেতু কাজটি আগেই লেখা ছিল, তাই তার করার কিছুই ছিল না। ঠিক একইভাবে, যদি কোনো খুনি দাবি করে যে তার খুনের ঘটনাটি সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই ‘লাওহে মাহফুজে’ লেখা ছিল, তবে আদমের যুক্তি অনুযায়ী সে-ও নির্দোষ।
জন ক্যালভিনের প্রিডেস্টিনেশন এবং ইসলামি তাকদীরের এই সমান্তরাল অবস্থান প্রমাণ করে যে, একজন ‘সর্বশক্তিমান প্রণেতা’ (Omnipotent Author) থাকলে ‘ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা’ (Individual Responsibility) অর্থহীন হয়ে পড়ে। শয়তান থেকে শুরু করে আদম—সকলেই মূলত একই লজিক্যাল ঢাল ব্যবহার করেছেন: “আমি করিনি, আমার ভাগ্য করিয়েছে।” যদি এই যুক্তিটি স্বয়ং ঈশ্বর বা তার নবী দ্বারা স্বীকৃত হয়, তবে বিচার দিবসের পুরো ধারণাটিই একটি বিশাল প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
চোরের ওপর বাটপারি
তাহলে চলুন, এবার পড়ি একেবারে “ক্লাসিক কমেডি হাদিস”!
এই হাদিসে এমন এক দৃশ্য, যা পড়লে মনে হবে—প্রাচীন আরবে ধর্ম নয়, বরং লজিক বনাম লজিকের ম্যাচ চলছে। যেন মুমিন VS মুমিন!
এক রাতের ঘটনা। নবী মুহাম্মদ হঠাৎ তার জামাতা আলী আর মেয়ে ফাতিমার ঘরে হাজির। ঘুমন্ত দম্পতির পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ছ না?”
আলী আধো ঘুমে চোখ মেলে উত্তর দিল, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা তো আল্লাহর নিয়ন্ত্রণেই আছি। উনি চাইলে আমাদের জাগিয়ে দিতে পারতেন, তাই না? আল্লাহ যেহেতু জাগাননি, আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কীভাবে পড়ি?”
বাহ, কী দারুণ কন্ট্রোলার-লজিক! আলী আসলে নবীর নিজের তাকদীর সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো তার মুখের উপর ফিরিয়ে দিলেন। কারণ নবী নিজেই আগে বলেছেন—সবকিছু আল্লাহর তাকদীরে লেখা, মানুষকে দিয়ে ভাল মন্দ সব আল্লাহই করিয়ে নেন।
কিন্তু আলীর এই “তাকদীর-আলট্রা-প্রো” উত্তর শুনে নবীর চেহারায় একদম বেকুব হয়ে গেলেন। রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, আর নিজের উরুতে জোরে থাপ্পড় মারতে মারতে বিড়বিড় করছেন, “মানুষ তো বড়ই তর্কপ্রিয়!”
একটা সময় তিনি নিজেই যা প্রচার করেছেন, সেই তাকদীরের কল্পকাহিনীর ফাঁদেই এখন নিজে ধরা পড়লেন। আসলেই তো, তাকদীরে আল্লাহই সব আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখলে আলী যে ঘুমাবে, সেটি তো আল্লাহর প্রকাশ্য তত্ত্বাবধানেই হয়েছে, আল্লাহই তো করিয়ে নিয়েছে। তাহলে এখানে আলীর কী দোষ? এই এক হাদিসেই আলী আসলে মুহাম্মদকে সবচাইতে বড় বিপদে ফেলে দিলেন। চলুন, দেখি সেই হাদিস— [77] [78]
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬। মুসাফিরদের সালাত ও তার কসর
পরিচ্ছেদঃ ২৮. যে ব্যক্তি রাত্র ঘুমিয়ে সকাল করল তার প্রসঙ্গে আলোচনা
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ১৭০৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৭৫
১৭০৩-(২০৬/৭৭৫) কুতায়বাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ….. আলী ইবনু আবূ তালিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন রাতের বেলা তার ও ফাতিমাহ (রাযিঃ) এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি (তাহাজ্জুদের) সালাত আদায় কর না? তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ রসূল! আমরা সবাই তো আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি ইচ্ছা করলে আমাদেরকে জাগিয়ে দিতে পারেন। ’আলী (রাযিঃ) বলেছেনঃ আমি এ কথা বললে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে গেলেন। যখন তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন, আমি শুনলাম তখন তিনি উরুর উপরে সজোরে হাত চাপড়ে বলছেনঃ মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিতর্ক করতে অভ্যস্ত। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৬৮৮, ইসলামীক সেন্টার ১৬৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ মুসাফিরের সালাত ও কসর
পরিচ্ছেদঃ ২২. তাহজ্জুদের সালাতের প্রতি উৎসাহ দান যদিও তা পরিমানে স্বল্প হয়
১৬৯১। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রের বেলা তাঁর ও ফাতিমা (রাঃ) এর গৃহে আসলেন এবং বললেন, তোমরা কি সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করছ না? [আলী (রাঃ) বলেন] আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের আত্মা আল্লাহর কবজায়, তাই তিনি যখন আমাদের উঠাবার ইচ্ছা করেন, তখন উঠান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে চলে গেলেন, যখন আমি তাকে এ কথা বলি। আর তার একার যাওয়ার সময় আমি শুনতে পেলাম তিনি নিজের রানে হাত মারছেন এবং বলছেন,وَكَانَ الإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَىْءٍ جَدَلاً “মানুষ অধিকংশ ব্যাপারেই বিতর্ক প্রিয়” (সুরা কাহফঃ ৫৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)
নূহ নবীর অভিশাপ
এবারে আসুন কোরআনে বর্ণিত একটি গল্প পড়ে নেয়া যাক। গল্পটি সেই নূহ নবীর সময়ের কথা। নূহ নবী দীর্ঘদিন তার অঞ্চলের অবিশ্বাসীদের দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু আশানুরূপ ফলাফল পাচ্ছিলেন না। অনেক চেষ্টার পরেও যখন বেশিরভাগ অবিশ্বাসীকে হেদায়াত করতে তিনি সমর্থ হলেন না, তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, প্লাবনের সময় আল্লাহ যেন প্রতিটি অবিশ্বাসীকে হত্যা করে। যেন নূহের ধর্মে বিশ্বাসী ছাড়া একটি প্রাণও জীবিত না থাকে। অর্থাৎ নারী শিশু প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ সহ সকল কাফের মরে যায়। আল্লাহ যেন সকলকে মেরে ফেলে! আসুন নূহ নবীর প্রার্থনাটি পড়ি [79] [80] –
নূহ বলল, ‘হে আমার রব্ব! ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী কাফিরদের একজনকেও তুমি রেহাই দিও না।
— Taisirul Quran
নূহ আরও বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিওনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর নূহ বলল, ‘হে আমার রব! যমীনের উপর কোন কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না’।
— Rawai Al-bayan
নূহ্ আরও বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! যমীনের কাফিরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দেবেন না [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআন, সূরা নূহ, আয়াত ২৬
তুমি যদি তাদেরকে রেহাই দাও, তাহলে তারা তোমার বান্দাহদেরকে গুমরাহ করে দেবে আর কেবল পাপাচারী কাফির জন্ম দিতে থাকবে।
— Taisirul Quran
তুমি তাদেরকে অব্যাহতি দিলে তারা তোমার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুস্কৃতিকারী ও কাফির।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘আপনি যদি তাদেরকে অবশিষ্ট রাখেন তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং দুরাচারী ও কাফির ছাড়া অন্য কারো জন্ম দেবে না’।
— Rawai Al-bayan
আপনি তাদেরকে অব্যাহতি দিলে তারা আপনার বান্দাদেরকে বিভ্ৰান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে শুধু দুস্কৃতিকারী ও কাফির।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআন, সূরা নূহ, আয়াত ২৭
ভেবে দেখুন, কাফেররা কাফের সন্তান জন্ম দিতে পারে, এই কারণে নূহ নবী সকল কাফের মেরে ফেলার দোয়া করলেন! কী সীমাহীন নির্মমতা! এই আয়াতগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার বা বাঙলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইয়াহিয়া খানের উক্তিগুলোর কথা আমাদেকে মনে করিয়ে দেয়। হিটলার যেমন একটি একটি ইহুদি হত্যা করতে বলেছিল, বাঙলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইয়াহিয়া খান যেমন একটি একটি বাঙালি হত্যা করতে বলেছিল, ঠিক তেমনি। যেন তাদের বিপক্ষের আর কোন শিশুর জন্মই না হয়। আমরা কেউ কি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, একটি শিশু বড় হয়ে ভাল হবে না মন্দ হবে? তারা মন্দই হবে, এরকম ভেবে তাদের মৃত্যু কামনা করা ভয়াবহ অসভ্য আচরণ। এটি সকলের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বেশ কয়েকবারই ইসলামিক জঙ্গিরা হত্যার চেষ্টা করেছিল। বাঙলাদেশে অনেক নাস্তিককে তারা হত্যাও করেছে। কিন্তু তারপরেও আমি কোন মুসলিমের মৃত্যু কামনা করতে পারি না এই ভেবে যে, সে একটি ইসলামিক জঙ্গি সন্তান জন্ম দিতে পারে! যারা অপরাধের সাথে জড়িত, প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের শাস্তি আমি চাইতে পারি, কিন্তু তাদের জাতি বা সম্প্রদায় ধরে সমূলে উৎখাত করতে বা গণহত্যা চালাতে চাইতে পারি না। কারণ সব মুসলিম নিশ্চিতভাবেই জঙ্গি হতে পারে না, মুসলিমদের মধ্যে অনেক ভাল মানুষ নিশ্চয়ই আছেন। আছে শিশু নারী বৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধী মানুষও। একইভাবে কাশ্মীরে বা প্যালেস্টাইনে কোন মুসলিম শিশুকে যদি এই বলে হত্যা করা হয় যে, এরা তো বড় হয়ে ইসলামিক জঙ্গিই হবে, আল কায়েদা বা বোকো হারামের সদস্যই হবে, এরকম হলেও ব্যাপারটি যেমন সীমাহীন অসভ্যতা আর নির্মমতা হবে, একইভাবে কোন কাফের শিশু জন্মের আগেই তাদের বংশশুদ্ধ মেরে ফেলা এই ভয়ে যে, তারা কাফের সন্তান জন্ম দিবে, এটিও ভয়ঙ্কর অমানবিক ব্যাপার!
এবারে আসুন নবী মুহাম্মদের জীবন থেকে আরেকটি ঘটনা পড়ি। নবী অনেক চেষ্টার পরেও চাচা আবু তালিবকে ইসলামের পথে আনতে পারলেন না। তখন আল্লাহ একটি আয়াত নাজিল করে নবী মুহাম্মদকে জানালেন, হেদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহই। কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না, কাউকে হেদায়াত করা, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করে তাকে হেদায়াত দান করেন। আসুন আয়াতটি পড়ি [81] –
তুমি যাকে ভালবাস তাকে সৎপথ দেখাতে পারবে না, বরং আল্লাহ্ই যাকে চান সৎ পথে পরিচালিত করেন, সৎপথপ্রাপ্তদের তিনি ভাল করেই জানেন।
— Taisirul Quran
তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবেনা। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎ পথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎ পথ অনুসরণকারী।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।
— Rawai Al-bayan
আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহ্ই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআন, সূরা কাসাস, আয়াত ৫৬
কোরআনে এটিও বহুবারই বলা হয়েছে, আল্লাহ হচ্ছেন পথ দেখাবার এবং পথভ্রষ্ট করার একমাত্র মালিক [82] [83] –
আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।
যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথ ভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
এবারে বলুন তো, সূরা নূহের ২৬-২৭ নম্বর আয়াত এবং সূরা কাসাসের ৫৬ নম্বর আয়াত পড়ে আপনার মনে কোন প্রশ্নের উদ্ভব হচ্ছে কিনা? সৎভাবে ভাবুন তো, কোন প্রশ্নই কি মনে জাগছে না? নূহের সময় কাফেরদের আল্লাহই যদি হেদায়াত না দিয়ে থাকেন, তারা হেদায়াত পাবে কোথা থেকে? আর এই কারণে সব কাফের মেরে ফেলাটিই বা কেমন কথা?
আল্লাহর আরশ কেন কাঁপে
হাদিস থেকে জানা যায়, কোন এক সাহাবীর মৃত্যুতে আল্লাহ এতটাই দুঃখিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ যদি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একদম নিশ্চিতভাবে জেনে থাকেন, তাহলে কারো মৃত্যুতে আল্লাহর সিংহাসন কেঁপে উঠবে কেন? আমরা মানুষ, যারা ভবিষ্যৎ জানি না, তারা আমাদের পরিচিত কারো মৃত্যুতে দুঃখিত হই, কষ্ট পাই, সেই কারণে আমরা কেঁপে উঠতে পারি। কিন্তু আল্লাহ, যিনি নিজেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, কে কবে কীভাবে মারা যাবে, তার কেঁপে উঠার কারণ কী! [84]
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২১২২. স্বাদ ইবন মু’আয (রাঃ) এর মর্যাদা
৩৫৩১। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … জাবির (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) এর মৃত্যুতে আল্লাহ্ ত’আলার আরশ কেঁপে উঠে ছিল। আমাশ (রহঃ) … নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যাক্তি জাবির (রাঃ) কে বলল, বারা ইবনু আযিব (রাঃ) তো বলেন, জানাযার খাট নড়েছিল। তদুত্তরে জাবির (রাঃ) বললেন, সা’দ ও বারা (রাঃ) এর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছুটা বিরোধ ছিল, (কিন্তু এটা ঠিক নয়) কেননা, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে عَرْشُ الرَّحْمَنِ অর্থাৎ আল্লাহর আরশ সা’দ ইবনু মু’আযের (মৃত্যুতে) কেঁপে উঠল বলতে শুনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পরীক্ষায় লেভেল প্লেইং ফিল্ড
যেকোন পরীক্ষায় বা নির্বাচনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, পরীক্ষায় বা নির্বাচনে সকল পরীক্ষার্থী বা প্রার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছে কিনা। কোন পরীক্ষার্থীকে যদি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নকল সাপ্লাই দেন, বা সাহায্য করেন, বা উত্তর লিখে দেন, কানে কানে বলে দেন, সময় বেশি দেন, নিজের মনোনীত ব্যক্তি বলে স্বজনপ্রীতি করেন, তাহলে সেটি কোন অবস্থাতেই পরীক্ষা বলে গণ্য হতে পারে না। স্বজনপ্রীতি যদি সামান্যতমও সেখানে থাকে, সেটি সঠিক পরীক্ষা বলে গণ্য হতে পারে না। বা নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচনের সময় কোন প্রার্থীর ব্যালট বক্সে সিল মেরে দেন, বা কোনভাবে সাহায্য করেন, সেটি অন্য প্রার্থীদের সাথে অন্যায় বা অন্যায্য কাজ বলেই বিবেচিত হবে। এরকম হলে বুঝতে হয়, আসলে এরকম পরীক্ষার কোন লেজিটিমেসি (Legitimacy – বৈধতা) নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামের দাবী মোতাবেক আমাদের এই পৃথিবীটি একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। এই পরীক্ষাকেন্দ্রে আমরা সকল পরীক্ষার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছি কিনা।
শয়তানকে কে পথভ্রষ্ট করেছিল?
কোরআনের আয়াতে খুব স্পষ্টভাবেই বলা আছে, আদমকে সৃষ্টির পরে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আদমকে সিজদা না করায় আল্লাহ শয়তানকে অভিশাপ দিয়েছিল। এরপরেই সে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হলো। কিন্তু সেই অভিশাপ দেয়ার আগে তো শয়তান বলে কেউ ছিল না। তাহলে শয়তানকে কে কুমন্ত্রণা দিয়ে পথভ্রষ্ট করেছিল? আসুন এই বিষয়ে কোরআনেরই একটি আয়াত পড়ি, যেখান থেকে শয়তানের বক্তব্য আমরা জানতে পারবো [85] –
[Satan] said, “Because You have put me in error, I will surely sit in wait for them [i.e., mankind] on Your straight path.
— Saheeh International
(ইবলীস) বললঃ আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন এ কারণে আমিও শপথ করে বলছি – আমি আপনার সরল পথে অবশ্যই ওৎ পেতে বসে থাকব।
— Sheikh Mujibur Rahman
সে বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব।
— Rawai Al-bayan
সে বলল, ‘আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সে কারণে অবশ্যই অবশ্যই আমি আপনার সরল পথে মানুষের জন্য বসে থাকব [১]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
নবী হওয়ার যোগ্যতা
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, মুহাম্মদ কী নিজ কর্মগুণে নবী হয়েছিলেন, নাকি তার নবী হওয়া তার জন্মের আগে থেকেই বা শিশু বয়স থেকেই নির্ধারিত ছিল? সহিহ হাদিস অনুসারে, তিনি তার কর্মগুণে নবী হন নি, বরঞ্চ তার নবী হওয়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কারণ জিব্রাইল শিশু বয়সেই তার হৃদপিণ্ড পরিষ্কার করে পাপ মুক্ত করে দিয়েছিলেন। সেটি আল্লাহ পাক অন্য কোন সাধারণ মানুষের বেলাতে করেন নি। ভেবে দেখুন, আপনার হৃদপিণ্ড যদি জিব্রাইল এসে পরিষ্কার করে দিতো, আপনিও কোন পাপ করতেন না। একটি পরীক্ষাতে সকল পরীক্ষার্থীদেরকে সমান সুযোগ প্রদান করতে হয়, লেভেল প্লেইং ফিল্ড তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ পাকের পরীক্ষায় লেভেল প্লেইং ফিল্ড বলেই কিছু নেই। স্বেচ্ছাচারী আল্লাহ তার নিজ ইচ্ছামতই সব করেন। মুহাম্মদের শিশু বয়সেই, অর্থাৎ কোন ভাল কাজ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের আগেই তাকে নবী হিসেবে মনোনীয় করে ফেলেছেন। তার মানে মুহাম্মদের নবী হওয়াটি আগে থেকেই নির্ধারিত, কিন্তু আমার নবী হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, তা আমি যত ভাল কাজই করি না কেন। অর্থাৎ এখানে সকল পরীক্ষার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছে না। আল্লাহর ইচ্ছাই এখানে মুখ্য।
আমরা পৃথিবীতে বড় বড় পদে অনেক মানুষকে দেখি। এই যেমন ধরুন, জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়া কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক মেধা, পড়ালেখা, অনেক পরিশ্রমের পরে একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব সেই অবস্থানে যাওয়া। আবার ধরুন, কোন দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়া, অথবা গুগলের সিইও হওয়া, বা অ্যাপেল কোম্পানির বড় কোন পোস্টে চাকরি করা, এগুলো সবকিছুর জন্যেই একইসাথে পড়ালেখা, মেধা, যোগ্যতা সবই প্রয়োজন হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নবী হওয়ার জন্য কী যোগ্যতা লাগে? এই পদটি কী যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, নাকি আল্লাহ এটি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন যে, অমুককেই নবী করা হবে? যেমন ধরুন, প্রাচীন গ্রীসে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল কিংবা আরো পরের হাইপেশিয়া, উনারা নিজ গুণে, কর্মে, যোগ্যতায়, মেধায় অনন্য সাক্ষর রেখেছিলেন। উনাদের কথা যুগযুগ ধরে মানুষ মনে করে। দার্শনিক, বিজ্ঞানী কিংবা চিন্তক হিসেবে উনাদের কাছে মানবজাতি ঋণী। কিন্তু, নবী মুহাম্মদ কী যোগ্যতায় নবী হয়েছিল?
আল্লাহ যদি আবূ লাহাবকে শিশু অবস্থাতেই নবী হিসেবে মনোনীত করতেন, আবূ লাহাবের পক্ষে তাহলে কোন অবস্থাতেই পাপ করা সম্ভব হতো না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সকল পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় সমান সুযোগ পাচ্ছে না। আল্লাহ যেমন ইচ্ছে তেমন মনোনীত করছেন। আল্লাহর ইচ্ছে মানুষের কাজের ওপর নির্ভরশীল নয়, শুধুমাত্র তার ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল। আসুন এই বিষয়ে দুইটি হাদিস পাশাপাশি রেখে পড়ি, পড়ে বোঝার চেষ্টা করই যে, আবু লাহাব ও নবী মুহাম্মদের তাকদীর কবে থেকে লিখিত ছিল [86] [87] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৯: চারিত্রিক গুণাবলি ও মর্যাদাসমূহ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – নবীকুল শিরোমণি -এর মর্যাদাসমূহ
৫৭৫৮-[২০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য নুবুওয়্যাত কখন হতে নির্ধারণ করা হয়েছে? তিনি (সা.) বললেন, সে সময় হতে, যখন আদম আলায়হিস সালাম আত্মা ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। (তিরমিযী)
সহীহ: তিরমিযী ৩৬০৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ১৮৫৬, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৪২১০, আল মু’জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১২৪০৭, মুসনাদে আহমাদ ১৬৬৭৪, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩৬৫৫৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসরীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
حم* وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ * إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ * وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَدَيْنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ, আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির’আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা(تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। যেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এবারে আসুন আরো একটি হাদিস পড়ি, যেখানে বোঝা যায় নবীর হৃদপিণ্ড আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। এই কাজটি আবু লাহাবের বেলাতে করা হলে, আবু লাহাবও তো জান্নাতে যেতে পারতো, তাই না? [88] [89]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
৩১০। শায়বান ইবনু ফাররুখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এলেন, তখন তিনি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৃৎপিণ্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন এ অংশটি শয়তানের। এরপরহৎপিণ্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। তখন ঐ শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, মুহাম্মাদ -কে হত্যা করা হয়েছে। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বক্ষে সে সেলাই-এর চিহ্ন দেখেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


নবীর স্বজনপ্রীতি ও ইনসাফ
নবী মুহাম্মদ তার পরিবারের অনেককেই জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। শুধু সুসংবাদই নয়, রীতিমত সর্দার হওয়ার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। নবীর পরিবারে ভাগ্যক্রমে জন্ম নেয়া বাদে তারা পৃথিবীর সকল মানুষের চাইতে কোন দিক দিয়ে উন্নত এবং মানুষের উপকারের জন্য তারা কী করেছে, তা বোধগম্য নয়। তথাপি, নবী তার কন্যা ফাতিমাকে জান্নাতে মহিলাদের সর্দার হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেছেন। তিনি কী মারিয়া কুরী কিংবা মাদার তেরেসার চাইতেও মহান কিছু কাজ করেছেন? বা হাইপেশিয়া, কিংবা বেগম রোকেয়া? করে থাকলে সেগুলো কী? কোন যোগ্যতায় তিনি জান্নাতে মহিলাদের সর্দার হলেন? নাকি, নবীর মেয়ে হওয়াই জান্নাতের সর্দার হওয়ার যোগ্যতা? [90]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০৯১. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট আত্মীয়দের মর্যাদা এবং ফাতিমা (রাঃ) বিনতে নবী (সাঃ) এর মর্যাদা। নবী (সাঃ) বলেছেন, ফাতিমা (রাঃ) জান্নাতবাসী মহিলাগণের সরদার
৩৪৪৭। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) … আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মাদসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারবর্গের প্রতি তোমরা অধিক সম্মান দেখাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)
শুধু তাই নয়, তার দুইজন নাতী হাসান এবং হোসেইনকেও জান্নাতের যুবকদের সর্দার হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেছেন। [91] [92]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৩১. আল-হাসান ইবনু ‘আলী এবং আল-হুসাইন ইবনু ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাযিঃ)-এর মর্যাদা
৩৭৬৮। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল-হাসান ও আল-হুসাইন (রাযিঃ) প্রত্যেকেই জান্নাতী যুবকদের সরদার।
সহীহঃ সহীহাহ (৭৯৬)
সুফইয়ান ইবনু ওয়াকী’-জারীর ও মুহাম্মাদ ইবনু ফুযাইল হতে, তিনি ইয়াযীদ (রাহঃ) হতে এই সনদে একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু আবী নুম হলেন আবদুর রহমান ইবনু আবী নুম আল-বাজালী, কুফার অধিবাসী। তার উপনাম আবূল হাকাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সুনানে ইবনে মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ১৪. ‘আলী বিন আবী ত্বলিব (রাঃ)-এর সম্মান
৫/১১৮। ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা এবং তাদের পিতা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৯৭৯। উক্ত হাদিসের রাবী মুআল্লা বিন আব্দুর রহমান সম্পর্কে আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, তার হাদিস দুর্বল এবং তার ব্যাপারে হাদিস বানিয়ে বর্ণনার অভিযোগ রয়েছে। ইবনু আদী বলেন, আশা করি তেমন কোন সমস্যা নেই। আবু হাতীম আর-রাযী বলেন, তার হাদিস দুর্বল। ইমাম দারাকুতনী বলেন, তিনি দুর্বল ও মিথ্যুক। উক্ত হাদিস শাহিদ এর ভিত্তিতে সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন উমর (রাঃ)
অপরদিকে, আবু লাহাব বা আবু জেহেলের জন্ম যদি নবীর ঘরে হতো, নবীর ছেলে হিসেবে, কিংবা ফাতিমার ছেলে হিসেবে, তাহলে তারাও তো জান্নাতের সর্দার হতে পারতো। তাই না? আমি কিংবা আপনি যদি নবীর নাতি হতাম, তাহলে তো মুফতেই জান্নাতে যেতে পারতাম। আল্লাহর নবীর এরকম স্বজনপ্রীতির কারণ কী? সেটি হয়ে থাকলে, হাসিনার ছেলে জয় কিংবা খালেদার ছেলে তারেকের ক্ষমতা পাওয়াকে আমরা স্বজনপ্রীতি বলি কেন? এগুলো তো সেই প্রাচীন আমলের জমিদারী কিংবা রাজা বাদশাহদেরই প্রথা যে, পারিবারিকভাবে কোন যোগ্যতা ছাড়াই তারা জমিদারী পেয়ে যেতো!
জন্মগতভাবে কাফির?
নবী মুহাম্মদ বলেছেন, মুমিনদের নাবালেগ বাচ্চারা যদি ছোট অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তবে তারা তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে, অর্থাৎ জান্নাতে যাবে। আবার, মুশরিকদের নাবালেগ বাচ্চারা তাদের পিতামাতার আমল অনুসারে জাহান্নামে যাবে। কোন আমল ছাড়াই [93] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১১-(৩৩) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মু’মিনদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের (জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত ব্যাপারে) কী হুকুম? তিনি উত্তরে বললেন, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আমি বললাম, কোন (নেক) ‘আমল ছাড়াই? তিনি বললেন, আল্লাহ অনেক ভালো জানেন, তারা জীবিত থাকলে কী ‘আমল করতো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা মুশরিকদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের কী হুকুম? তিনি বললেন, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। (অবাক দৃষ্টিতে) আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন (বদ) ‘আমল ছাড়াই? উত্তরে তিনি বললেন, সে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকলে কী ‘আমল করত, আল্লাহ খুব ভালো জানেন। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৮৯। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন : হাদীসটি দু’টি সানাদে বর্ণিত যার একটি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সূত্র ধরে সহিহ মুসলিম শরীফের একটি হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, খিজির নামক এক ব্যক্তি একবার এক বালককে বিনা কারণেই হত্যা করে। এই বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে, সে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দেয় যে, ছেলেটি জন্মগতভাবেই কাফের ছিল। তাই কুফরি কর্ম করার আগেই, তার পিতামাতাকে কুফরি কাজে বাধ্য করার আগেই তাকে হত্যা করে ফেলা হলো। খিযির আগেই জানতেন, এই ছেলেটি বড় হয়ে কুফরি করবে, বা আল্লাহকে মানবে না। ভেবে দেখুন, এই ছেলেটি সেই মূহুর্ত পর্যন্ত কোন অপরাধই করেনি। অথচ, অপরাধ করার আগেই বিনা অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো, কোন বিচার সাক্ষী প্রমাণ সব ছাড়াই। এবং এই কাজটি আবার হাদিসে খুব ভাল কাজ হিসেবে উল্লেখও করা হলো! যেই কাজ একজন করেই নি, তার জন্য তাকে কীভাবে শাস্তি দেয়া যেতে পারে?
এই ছেলেটি জাহান্নামে যাবে, নাকি জান্নাতে? সে তো কোন অপরাধই করেনি। যার জন্মই হয়েছে কাফির হিসেবে, সে নিশ্চয়ই জাহান্নামেই যাবে। এ কেমন বিচার! আল্লাহ তাকে কাফির হিসেবেই জন্ম দিলেন, আবার হত্যা করালেন বিনা অপরাধে, আবার জাহান্নামেও পাঠাবেন- এর নাম ইনসাফ? আসুন হাদিসগুলো পড়ি [94] [95] [96] –
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৭। তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রত্যেক শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মানোর মর্মার্থ এবং কাফির ও মুসলিমদের মৃত শিশুর বিধান
৬৬৫৯-(২৯/২৬৬১) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ ইবনু কা’নাব (রহঃ) ….. উবাই ইবনু কা’ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই যে ছেলেটিকে খাযির (আঃ) (আল্লাহর আদেশে) হত্যা করেছিলেন তাকে কফিরের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদি সে জীবিত থাকত তাহলে সে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফুরী করতে বাধ্য করত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫২৫, ইসলামিক সেন্টার ৬৫৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৪২. খিযির (আঃ) এর ফযীলত
৫৯৪৯। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল আলা কায়সী (রহঃ) … সাঈদ ইবনু যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বলা হলো, নাওফ দাবি করে যে, মূসা (আলাইহিস সালাম) যিনি জ্ঞান অন্বেষণে বের হয়েছিলেন। তিনি বনী ইসরাঈলের মূসা নন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, হে সাঈদ, তূমি কি তাকে এটা বলতে শুনেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, নাওফ মিথ্যা বলেছে। কেননা উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মূসা (আলাইহিস সালাম) একদা তার জাতির সামনে আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত এবং তাঁর শাস্তি পরীক্ষাসমূহ স্মরণ করিয়ে নসীহত করছিলেন। (কথা প্রসঙ্গে কারো প্রশ্নের জবাবে) তিনি বলে ফেললেন, পৃথিবীতে আমার চেযে উত্তম এবং বেশি জ্ঞানী কোন ব্যক্তি আছে বলে আমরে জানা নেই।
রাবী বলেন। আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) এর প্রতি ওহী পাঠালেনঃ আমি জানি তার (মূসা) থেকে উত্তম কে বা কার কাছে কল্যাণ রয়েছে। অবশ্যই পৃথিবীতে আরো ব্যক্তি আছে যে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আয় রব্ব! আমাকে তার পথ বাতলিয়ে দিন। তাকে বলা হলো লবণাক্ত একটি মাছ সঙ্গে নিয়ে যাও। যেখানে এ মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই সে ব্যক্তি। মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর খাদিম রওনা হলেন, অবশেষে তাঁরা একটি বিশাল পাথরের কাছে পৌছলেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর সাথীকে রেখে অগোচরে চলে গেলেন। এরপর মাছটি নড়েছরে পানিতে চলে গেল এবং পানিও খোপের মত হয়ে গেল মাছের পথে মিলিত হল না।
মূসা (আলাইহিস সালাম) এর খাদিম বললেন, আচ্ছা আমি আল্লাহর নাবীর সাথে মিলিত হয়ে তাঁকে এ ঘটনা বলবো। পরে তিনি ভুলে গেলেন। যখন তারা আরো সামনে অগ্রসর হলেন, তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমার নাশতা দাও, এ সফরে তো আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যতক্ষন তারা এ স্থানটি অতিক্রম করেন নি, ততক্ষণ তাদের ক্লান্তি আসে নি।
রাবী বলেন, তাঁর সাথীর যখন স্মরণ হল, এবং সে বলল, আপনি কি জানেন যখন আমরা পাথরে আশ্রয় নিয়েছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গেছি। আর শয়তানই আমাকে আপনার কাছে বলার কখা ভুলিয়ে দিয়েছে এবং বিস্ময়করভাবে মাছটি সমুদ্রে তার পথ করে নিয়েছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ-ই তো ছিল আমাদের উদ্দীষ্ট। অতএব তাঁরা পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চললেন। তখন তার খাদিম মাছের স্থানটি তাকে দেখালো।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ স্থানের বিবরনই আমাকে দেওয়া হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) খুজতে লাগলেন, এমন সময় তিনি বস্ত্রাবৃত খিযির (আলাইহিস সালাম) কে গ্রীবার উপর চিৎ হয়ে শায়িত দেখতে পেলেন। অথবা (অন্য বর্ননায়) সোজাসুজি গ্রীবার উপর। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আসসালামু আলাইকুম। খিযির (আলাইহিস সালাম) মুখ খেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, ওয়া আলাইকুম সালাম, তুমি কে? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি মূসা। তিনি বললেন, কোন মূসা? মূসা (আলাইহিস সালাম) উত্তর দিলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, কোন মহান ব্যাপারই আপনাকে নিয়ে এসেছে? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি এসেছি যেন আপনাকে যে সৎজ্ঞান দান করা হয়েছে, তা থেকে কিছু আপনি আমায় শিক্ষা দেন।
খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমার সঙ্গে আপনি ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হবেন না। আর কেমন করে আপনি ধৈর্য ধারণ করবেন এমন বিষয়ে, যার জ্ঞান দেওয়া হয় নি। এমন বিষয় হতে পারে যা করতে আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, আপনি যখন তা দেখবেন, তখন আপনি সবর করতে পারবেন না। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আমি আপনার কোন নির্দেশ অমান্য করব না।
খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি যদি আমার অনুগামী হন তবে আমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না যতক্ষণ না আমি নিজেই এ বিযয়ে উল্লেখ করি। এরপর উভয়ই চললেন, অবশেষে তারা একটি নৌকায় চড়লেন। (খিযির (আলাইহিস সালাম) তখন( তা ছিদ্র করলেন অর্থাৎ তাতে (একটি তক্তায়) সজোরে চাপ দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি কি নৌকাটি ভেঙ্গে ফেলেছেন, আরোহীদের ডুবিয়ে দেয়ার জন্যে? আপনি তো বড় আপত্তিকর কাজ করেছেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হবেন না? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি ভুলে গিয়েছি, আমাকে আপনি দোষী করবেন না। আমার বিষয়টিকে আপনি কঠোরতাপূর্ণ করবেন না।
আবার দু’জন চলতে লাগলেন। এক জায়গায় তাঁরা বালকদের পেলেন যারা খেলা করছে খিযির (আলাইহিস সালাম) অবলীলাক্রমে একটি শিশুর কাছে গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। এতে মূসা (আলাইহিস সালাম) খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, আপনি প্রাণের বিনিময় ব্যতীত একটি নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করলেন? বড়ই গর্হিত কাজ আপনি করেছেন। এ স্থলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহর রহমত বর্ষণ করুন আমাদের ও মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর। তিনি যদি তাড়াহুড়া না করতেন তাহলে আরো বিস্ময়কর ঘটনা দেখতে পেতেন। কিন্তু তিনি সহযাত্রী (খিযির (আলাইহিস সালাম)) এর সামনে লজ্জিত হয়ে বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোন প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমায় সঙ্গে রাখবেন না। তখন আপনি আমার ব্যাপারে অবশ্যই চূড়ান্ত অভিযোগ করতে পারবেন (এবং দায়মুক্ত হবেন)।
যদি মূসা (আলাইহিস সালাম) ধৈর্য ধরতেন, তাহলে আরো বিস্ময়কর বিষয় দেখতে পেতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন নাবীর উল্লেখ করতেন, প্রথমে নিজকে দিয়ে শুরু করতেন, বলতেন, আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন এবং আমার অমুক ভাইয়ের উপরও। এভাবে নিজেদের উপর আল্লাহর রহমত কামনা করতেন।
তারপর উভয়ে চললেন এবং ইতর লোকের একটি জনপদে গিয়ে উঠলেন। তাঁরা লোকদের বিভিন্ন সমাবেশে ঘুরে তাদের কাছে খাবার চাইলেন। তারা তাঁদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। এরপর তাঁরা একটি পতনোন্মুখ দেয়াল পেলেন। তিনি (খিযির (আলাইহিস সালাম)) সেটি ঠিকঠাক করে দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি চাইলে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, এবার আমার আর আপনার মধ্যে বিচ্ছেদ (এর পালা)।
খিযির (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাপড় ধরে বললেন, আপনি যেসব বিষয়ের উপর অধৈর্য হয়ে পড়েছিলে সে সবের তাৎপর্য বলে দিচ্ছি।
‘নৌকাটি ছিল কতিপয় গরীব লোকের যারা সমুদ্রে কাজ করতো’– আয়াতের শেষ পর্যন্ত। তারপর যখন এটাকে দখলকারী লোক আসলো তখন ছিদ্রযুক্ত দেখে ছেড়ে দিল। এরপর তারা একটা কাঠ দিয়ে নৌকাটি ঠিক করে নিলো। আর বালকটি সৃষ্টিতেই ছিল জন্মগত কাফির। তার মা-বাবা তাকে বড়ই স্নেহ করতো। সে বড় হলে ওদের দুজনকেই অবাধ্যতা ও কুফরির দিকে নিয়ে যেতো। সুতরাং আমি ইচ্ছে করলাম, আল্লাহ যেন তাদেরকে এর বদলে আরো উত্তম, পবিত্র স্বভাবের ও অধিক দয়াপ্রবন ছেলে দান করেন। ‘আর দেয়ালটি ছিল শহরের দুটো ইয়াতীম বালকের’ আয়াতের শেষ পর্যন্ত (সূরা কাহফঃ ৬০-৮২)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৪২. খিযির (আঃ) এর ফযীলত
৫৯৪৮। আমর ইবনুু মুহাম্মাদ আন-নাকিদ, ইসহাক ইবনু ইবরাহীম হানযালী, উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ও মুহাম্মাদ ইবনু আবূ উমর মাক্কী (রহঃ) … সাঈদ ইবনু জুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, নাওফ বিকালী বলেন যে, বনী ইসরাঈলের নাবী মূসা খিযির (আলাইহিস সালাম) এর সাথী মূসা নন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। আমি উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) থেকে শুনেছি, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) বনী ইসরাঈলের মধ্যে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বড় আলিম? তিনি উত্তর দিলেন, আমি সবচেয়ে বড় আলিম। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। কারণ মূসা (আলাইহিস সালাম) জ্ঞানকে আল্লাহর প্রতি ন্যস্ত করেননি।
অতঃপর আল্লাহর তার ওহী পাঠালেন যে, দু’সাগরের সঙ্গম স্থলে আমার বান্দাদের মধ্যে এক বান্দা আছে, যে তোমার চেয়েও অধিক জ্ঞানী। মূসা (আলাইহিস সালাম) প্রশ্ন করলেন আয় রব্ব! আমি কী করে তাঁকে পাব? তাঁকে বলা হলো, থলের ভেতর একটি মাছ নাও। মাছটি যেখানে হারিয়ে যাবে, সেখানেই তাঁকে পাবে। তারপর তিনি রওনা হলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর খাদিম ইউশা ইবনু নূনও চললেন এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) একটি মাছ থলিতে নিয়ে নিলেন।
তিনি ও তাঁর খাদিম চলতে চলতে একটি বিশাল পাথরের কাছে উপস্থিত হলেন। এখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁবু সাথীও ঘুমিয়ে পড়ল। মাছটি নড়েচড়ে থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়লো। এদিকে আল্লাহ তা’আলা পানির গতিরোধ করে দিলেন। এমনকি তা একটি খোপের মত হয়ে গেল এবং মাছটির জন্য একটি সুড়ঙ্গের মতো হয়ে গেল। মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তার খাদিমের জন্য এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার হল।
এরপর তাঁরা আবার দিন-রাতভর চললেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাথী খবরটি দিতে ভুলে গেলো। যখন সকাল হলো, মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর খাদিমকে বললেন, আমাদের নাশতা বের কর। আমরা তো এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আদেশকৃত (নির্ধারিত) স্থান অতিক্রম না করা পর্যন্ত তাঁরা ক্লান্ত হন নি। খাদিম বলল, আপনি কি জানেন, যখনই আমরা পাথরের উপর আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছের কথাটি ভুলে যাই, আর শয়তানই আমাকে আপনাকে বলার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে মাছটি সমুদ্রে তার নিজের পথ করে চলে গেল।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ জায়গাটই তো আমরা খুজছি। অতঃপর উভয়েই নিজ নিজ পদচিহ্ন অনুসরণ করে পাথর পর্যন্ত পৌছলেন। সেখানে (পানির উপরে ভাসমান অবস্থায়) চাঁদরে আচ্ছাদিত একজন লোক দেখতে পেলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম দিলেন। খিযির বললেন, তোমার এ দেশে সালাম কোত্থেকে? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি মূসা। তিনি প্রশ্ন করলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। খিযির বললেন, আল্লাহ তার জ্ঞানের এমন এক ইলম আপনাকে দিয়েছেন যা আমি জানি না। আর আল্লাহ তাঁর জ্ঞানের এমন এক ইলম আমাকে দিয়েছেন যা আপনি জানেন না।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি আপনার সাথে থাকতে চাই যেন আপনাকে প্রদত্ত জ্ঞান আমাকে দান করেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। আর কী করে ধৈর্য ধারণ করবেন, ঐ বিষয়ের উপর যা সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত নন? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আপনার কোন নির্দেশ আমি অমান্য করব না। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আচ্ছা আপনি যদি আমার অনুসরণ করেন, তবে আমি নিজে কিছু উল্লেখ না করা পর্যন্ত কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আাচ্ছা।
খিযির এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) উভয়ে সমুদ্র তীর ধরে চলতে লাগলেন। সম্মুখ দিয়ে একটি নৌকা আসল। তারা নৌকাওয়ালাকে তাঁদের তুলে নিতে বললেন। তারা খিযির (আলাইহিস সালাম) কে চিনে ফেললো, তাই দু’জনকেই বিনা ভাড়ায় তুলে নিল। এরপর খিযির (আলাইহিস সালাম) নৌকার একটি তক্তার দিকে লক্ষ্য করলেন এবং তা উঠিয়ে ফেললেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এরা তো এমন লোক যে, আমাদের বিনা ভাড়ায় নিয়েছে আর আপনি তাদের নৌকাটি ছিদ্র করে দিলেন যাতে নৌকা ডুবে যায়? আপনি তো সাংঘাতিক কাজ করেছেন! খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি কি আপনাকে বলি নি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে সক্ষম হবেন না? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমার এ ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিবেন। আর আমাকে কঠিন অবস্থায় ফেলবেন না। তারপর নৌকার বাইরে এলেন এবং উভয়ে সমুদ্র তীর ধরে চলতে লাগলেন।
হঠাৎ একটি বালকের সম্মুখীন হলেন, যে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করছিল। খিযির (আলাইহিস সালাম) তার মাথাটি হাত দিয়ে ধরে ছিঁড়ে ফেলে হত্যা করলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি কোন প্রাণের বিনিময় ছাড়াই একটা নিষ্পাপ প্রাণকে শেষ করে দিলেন? আপনি তো বড়ই খারাপ কাজ করলেন। খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি কি আপনাকে বলি নি যে, আমার সাথে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম হবেন না? রাবী বলেন, আর এ ভুল প্রথমটার চেয়ে আরো গুরুতর। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আচ্ছা, এরপর যদি আর কিছু সম্পর্কে প্রশ্ন করি, তাহলে আমাকে সাথে রাখবেন না। নিঃসন্দেহে আমার ব্যাপারে আপনার আপত্তি চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
এরপর উভয়েই চলতে লাগলেন এবং একটি গ্রামে পৌঁছে গ্রামবাসীর কাছে খাবার চাইলেন। তারা তাঁদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করলো। তারপর তাঁরা একটি দেয়াল পেলেন, যেটি ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে অর্থাৎ ঝুঁকে পড়েছে। খিজির (আলাইহিস সালাম) আপন হাতে সেটি ঠিক করে সোজা করে দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমরা এ সম্প্রদায়ের কাছে এলে তারা আমাদের মেহমানদারী করে নি এবং খেতে দেয় নি। আপনি চাইলে এদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারতেন? খিযির (আলাইহিস সালাম) বললেন, এবার আমার ও আপনার মাঝে বিচ্ছেদের পালা।
এখন আমি আপনাকে এসবের তাৎপর্য বলছি, যে সবের উপর আপনি ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হন নি (সূরা কাহফঃ ৬০-৮২)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর রহম করুন, আমার আকাঙ্ক্ষা হয় যে, যদি তিনি ধৈর্যধারণ করতেন, তাহলে আমাদের কাছে তাঁদের আরো ঘটনাসমূহের বিবরণ দেওয়া হতো।
রাযী বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রথমটা মূসা (আলাইহিস সালাম) ভুলে যাওয়ার কারণে করেছিলেন। এও বলেছেন, একটি চড়ুই এসে নৌকার পার্শ্বে বসে সমুদ্রে চঞ্চু মারল। তখন খিযির (আলাইহিস সালাম) মূসাকে বলেন, আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় এতই কম, যতখানি সমূদ্রের পানি থেকে এ চড়ুইটি কমিয়েছে।
সাঈদ জ্যুায়র বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) পড়তেনঃوَكَانَ أَمَامَهُمْ مَلِكٌ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ صَالِحَةٍ غَصْبًا (এদের সম্মুখে একজন বাদশাহ ছিল, যে সমস্ত ভালো নৌকা কেড়ে নিতো) তিনি আরো পড়তেনঃوَأَمَّا الْغُلاَمُ فَكَانَ كَافِرًا (আর সে বালকটি ছিল কাফির)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)
এবারে আসুন এই বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা পড়ে নিই, তাফসীরে মাযহারী থেকে [97] –
একটি নতুন প্রশ্ন ও তার সমাধানঃ দু’টি বস্তুর মধ্যে যদি প্রয়োজনীয় সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তাহলে একটি বস্তুর অস্তিত্ব হবে অপর বস্তুটির পূর্ণত্বের কারণ। যেমন সূর্যোদয় দিবস হওয়ার কারণ। অথবা বস্তু দু’টো হবে তৃতীয় কোনো কারণের মুখাপেক্ষী। ওই কারণটি তখন হবে কারণের কারণ বা কারণের উৎস। ওই উৎসই বস্তু দু’টোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেয়। যেমন দু’টো ইট তেরসাভাবে একটিকে অপরটির উপরে নির্ভরশীল করে দেয়া হলো। এভাবে দণ্ডায়মান ইট দু’টোর মধ্য থেকে যদি একটিকে সরিয়ে নেয়া হয় তবে অপর ইটটিও আর যথাস্থানে দণ্ডায়মান থাকতে পারবে না। লক্ষণীয় যে, ইট দু’টো কিন্তু নিজেরা একত্র হতে অথবা পরস্পরকে নির্ভর করে দণ্ডায়মান হতে সক্ষম হয়নি তাদেরকে দণ্ডায়মান করিয়ে দিয়েছিলো কোনো রাজমিস্ত্রী বা নির্মাতা। এখন যে কিশোরটিকে হজরত খিজির হত্যা করেছিলেন, তার বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করা যাক। তার বেঁচে থাকা ও জুলুম করার বিষয়টি ছিলো পরস্পরকে নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা ইট দু’টোর মতো। আর এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বা সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন আল্লাহ্। ওই সম্পর্কের কারণেই সে বেঁচে থাকলে কুফরী ও সীমালংঘন ছাড়া বেঁচে থাকতে পারতো না।
বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার জন্য তাসাউফপন্থীগণের জ্ঞানের মাপকাঠিতে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তাঁরা বলেন, দৃশ্যমান সকল সৃষ্টি অস্তিত্বশীল হয় প্রকাশ্য অবয়ব ধারণের পূর্বেই। সৃষ্ট বস্তুসমূহের ওই অপ্রকাশ্য অস্তিত্বকে বলে ‘হাকায়েকে ইমকানিয়াহ’ (সম্ভাব্য তত্ত্ব) এবং ‘আ’ইয়ানে ছাবেতাহ’ বা স্থিতির মৌল। আর ওই আ’ইয়ানে ছাবেতা হচ্ছে আল্লাহ্র গুণাবলীর প্রতিবিম্ব বা ছায়া। আবার ওই ছায়ার উৎস বা মূল হচ্ছে আল্লাহ্ সিফাত বা গুণাবলী। আল্লাহ্র সিফাত আবার বিভিন্ন রকমের। যেমন, হেদায়েত করা ও পথভ্রষ্ট করা দু’টোই আল্লাহ্ সিফাত। তাই আল্লাহ্ এক নাম ‘আল হাদী’ এবং আর এক নাম ‘আল মুদ্বিল্লু’। এভাবে যার অস্তিত্বে মূল প্রতিবিম্ব বা আইয়ানে ছাবেতার উপরে আল হাদী নামের বৈশিষ্ট্য পরিচিহ্নিত হয়, সে পায় হেদায়েত। আর যার আইয়ানে ছাবেতার প্রতি পতিত হয় ‘আল মুদ্বিল্লু’ নামের প্রতিক্রিয়া, সে হয়ে যায় গোমরাহ্ ও পথভ্রষ্ট। এভাবে বহির্জগত হয় অন্তর্জগতের প্রতিবিম্ব বা অনুগত। তাই সকল অবহিত ও দর্শিত বিষয়সমূহকে বলা হয় আল্লাহ্র জ্ঞানের মতো। অর্থাৎ আল্লাহ্র জ্ঞানই মূল এবং সমগ্র সৃষ্টি ওই জ্ঞানের অনুসৃতি মাত্র। সুতরাং যার ‘মাবদায়ে তা’য়ুন’ (সূচনাস্থল) আল্লাহ্ ‘আল মুঘি’ নামের প্রতিবিম্ব-প্রভাবিত, পথভ্রষ্ট হতে সে বাধ্য। আর যার মাবদায়ে তা’য়ুন আল্লাহ্র ‘আল হাদী’ নামের প্রতিবিম্ব- প্রভাবিত, হেদায়েত লাভও তার জন্য অনিবার্য। এ কারণেই রসুল স. বলেছেন, প্রত্যেকের জন্য ওই পথকে সহজ করে দেয়া হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যে ব্যক্তি সৃষ্টিগতভাবে পুণ্যবান, তার জন্য পুণ্যকর্মসমূহকে করে দেয়া হয় সহজ। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট, পাপ কর্মসমূহকে করে দেয়া হয় তার জন্য সহজ। হজরত আলী থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন বোখারী, মুসলিম।
হজরত খিজির কর্তৃক নিহত বালকটির ‘মাবদায়ে তা’য়ুন’ ছিলো সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহ্র ‘আলূমুদ্বিহু’ নামের প্রতিবিম্ব-পরিচিহ্নিত। তাই বেঁচে থাকলে সে কোনো দিনও পথপ্রাপ্ত হতো না। অতএব মৃত্যুই ছিলো তার জন্য কল্যাণকর এবং তার মাতাপিতার জন্যও মঙ্গলজনক। তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত দান আল্লাহ্র অনুগ্রহ বই অন্য কিছু নয়। কিন্তু এরকম অনুগ্রহ করতে আল্লাহ্ কখনো বাধ্য নন। যদি বাধ্য হতেন (যেমন মোতাজিলারা বলে), তাহলে তো সকল সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীকে আল্লাহ্ বালক বয়সে মৃত্যুদান করতেন। সুতরাং আল্লাহ্র অনুগ্রহ সম্পূর্ণতই তাঁরই অভিপ্রায়নির্ভর। তিনি ইচ্ছে করলে, কাউকে কল্যাণ দান করবেন। ইচ্ছে না করলে করবেন না । আল্লাহ্তায়ালাই প্রকৃত তত্ত্ব অবগত ।

আবূ লাহাবের ভবিষ্যত পূর্ব নির্ধারিত
আবু লাহাবকে নিয়ে আল্লাহ পাক মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বেই কোরআনে একটি সূরা লিখে ফেলেছেন, যেটি হচ্ছেঃ
সূরা আল লাহাব/সূরা আল মাসাদ
১. ধ্বংস হোক! আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সেও ধ্বংস হোক।
২. তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে তা তার কোন কাজে আসবে না।
৩. তাকে অচিরেই লেলিহান আগুনে ঠেলে দেওয়া হবে।
৪. আর তার স্ত্রীকেও, লাকড়ীর বোঝা বহনকারিণী।
৫. তার গলায় থাকবে খেজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।
কিন্তু আল্লাহ আগে থেকেই যদি এমন সূরা লিখে ফেলেন, যা আসলেই আল্লাহ আবূ লাহাবের জন্মের আগেই লিখে রেখেছেন, যেটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, তাহলে তো আবূ লাহাবের ইসলাম গ্রহণ করে মুমিন হয়ে যাওয়া সম্ভবই না। কারণ আবূ লাহাব যদি এই সূরা নাজিলের পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলতো, তাহলে আল্লাহর লিখিত সূরা মিথ্যা হয়ে যেত! অর্থাৎ আবূ লাহাবও এখানে বৈষম্যের শিকার হলো, কারণ আবূ লাহাব শত চেষ্টা করলে, কখনই মুমিন হতে পারতো না। কারণ আল্লহর সেরকম কোন ইচ্ছা ছিল না [98]
সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসরীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ, আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির‘আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা (تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। যেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ (আল মাদানী প্রকাশনী)
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আবু লাহাব প্যারাডক্স ও লজিক্যাল ইনএভিটেবিলিটি
ইসলামি ‘তাকদীর’ মূলত পিয়ের-সিমন লাপ্লাসের বর্ণিত ‘ডিটারমিনিজম’ (Determinism) বা নিয়তিবাদেরই একটি আধিভৌতিক রূপ। লাপ্লাসের তত্ত্ব অনুযায়ী, যদি কোনো এক মহাজাগতিক সত্তা (Laplace’s Demon) মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার বর্তমান অবস্থান এবং গতির খবর জানে, তবে তার পক্ষে অতীত ও ভবিষ্যৎ নিখুঁতভাবে গণনা করা সম্ভব। কারণ প্রতিটি ঘটনাই পূর্ববর্তী কারণের একটি অনিবার্য ফল [99]। ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বে এই ‘সর্বজ্ঞানী সত্তা’ বা আল্লাহ যখন ‘লাওহে মাহফুজে’ ভবিষ্যৎ লিখে রাখেন, তখন তা আর কেবল একটি ‘পূর্বাভাস’ থাকে না, বরং তা একটি ‘অপরিবর্তনীয় স্ক্রিপ্ট’ হয়ে দাঁড়ায়। এই হার্ড-ডিটারমিনিজমের সবচেয়ে শক্তিশালী লজিক্যাল উদাহরণ হলো ‘আবু লাহাব প্যারাডক্স’।
কুরআনের সূরা আল-মাসাদ-এ মক্কার কাফের আবু লাহাব সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীনভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে, সে এবং তার স্ত্রী জাহান্নামে যাবে [100]। এই সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় আবু লাহাব জীবিত ছিলেন এবং তার মৃত্যুর প্রায় দশ বছর পূর্বেই তার পরকালীন গন্তব্য চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হয়েছিল। এখানে সৃষ্টিকর্তার ‘পূর্বজ্ঞান’ (Foreknowledge) এবং মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ (Free Will) এর মধ্যে একটি অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব বা যৌক্তিক ফাঁদ তৈরি হয়, যা নিচের ধাপে বিশ্লেষণ করা যায়ঃ
- ১. ঐশ্বরিক অকাট্যতা (Divine Infallibility): যেহেতু ইসলাম অনুসারে কুরআন আল্লাহর বাণী এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, তাই তার কোনো তথ্য বা ঘোষণা ভুল হওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা শূন্য। অর্থাৎ, আবু লাহাবের জাহান্নামী হওয়া একটি ধ্রুব সত্য (Constant)।
- ২. স্বাধীন ইচ্ছার দাবি (The Claim of Free Will): ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবি করেন যে মানুষের তওবা করার বা ইসলাম গ্রহণ করার স্বাধীনতা থাকে। তাত্ত্বিকভাবে, আবু লাহাবের সামনেও ইসলাম গ্রহণ করার ‘অপশন’ খোলা থাকার কথা ছিল।
- ৩. যৌক্তিক দ্বন্দ্ব (Logical Contradiction): আবু লাহাব যদি সত্যিই তার তথাকথিত ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ ব্যবহার করে ইসলাম গ্রহণ করতেন, তবে কুরআনের ওই নির্দিষ্ট সূরাটি মিথ্যা প্রমাণিত হতো।
- ৪. ফলাফল: যেহেতু আল্লাহ মিথ্যা হতে পারেন না, সেহেতু আবু লাহাবের পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করা বা ভালো মানুষ হওয়া যৌক্তিকভাবে অসম্ভব (Logically Impossible) ছিল। অর্থাৎ, আবু লাহাবকে কুফরি করার জন্যই প্রোগ্রামড করা হয়েছিল যাতে কুরআনের সত্যতা রক্ষা পায়।
ডেভিড হিউমের কার্যকারণ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, আবু লাহাবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল মহাবিশ্বের আদি-কারণ বা আল্লাহর ইচ্ছার একটি অনিবার্য চেইন রিঅ্যাকশন মাত্র [101]। যদি কোনো ব্যক্তির প্রতিটি পদক্ষেপ সৃষ্টির শুরুতেই লিখে রাখা হয় এবং সেই লিখন অনুযায়ী কাজ করতে তাকে বাধ্য করা হয়, তবে তাকে ‘পরীক্ষা’ করার ধারণাটি কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং হাস্যকর।
এই প্যারাডক্সটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বে মানুষের ‘এজেন্সি’ বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একটি ‘কগনিটিভ ইলিউশন’ বা মানসিক বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ এখানে কেবল একটি ‘বায়োলজিক্যাল ভিক্টিম’, যার ভাগ্য ও পরিণতি তার জন্মের সহস্রাব্দ আগেই অন্য এক সত্তার কলমে সিলগালা হয়ে গেছে।
খুন হওয়া শিশুরা কোথায় যাবে?
নবী মুহাম্মদ বলেছেন, মুশরিকদের মধ্যে যেসকল মানুষ তাদের কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিয়েছে, তারা জাহান্নামে যাবে, সেই সব শিশুরা, যাদের জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছে, যাদের কোন পাপ পূন্য কিছুই ছিল না, তারাও জাহান্নামে যাবে। ঐ মেয়েগুলোর কী অপরাধ ছিল, এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই [102] –
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে।
৪৬৪২. ইব্রাহীম ইবন মূসা (রহঃ) ….. আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জীবন্ত প্রথিত কন্যা এবং তার মা- উভয়ই জাহান্নামী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ শা‘বী (রহঃ)
এবারে আসুন মুসলিমদের শিশু সন্তানরা কোথায় যাবে জেনে নিই, [103]

আল্লাহর লিখিত তাকদীর কি পরিবর্তনযোগ্য?
ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে আল্লাহ সর্বজ্ঞানী এবং তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কারো বুদ্ধি পরামর্শ তিনি শোনেন না। হাদিসে এটিও বলা আছে কলমের কালি শুকিয়ে গেছে, তাই আল্লাহর লিখিত তাকদীর বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু ইসলামের বিভিন্ন গ্রন্থেই আবার রয়েছে এমন কিছু অদ্ভুত কথা, যা ইসলামের সব বিশ্বাসকেই জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলে। আসুন একটি আলোচনা শুনি, যেখানে আল্লাহর লিখিত তাকদীর আদম বদলে ফেলতে বলেছিল, এবং আল্লাহ তা বদলে ফেলেছিল। অর্থাৎ আদম তার আয়ুর কিছু অংশ দাউদ নবীকে দান করেছিল। কলমের কালি শুকিয়ে গেলে, আল্লাহর লিখিত তাকদীরই চূড়ান্ত হলে, সেটি আল্লাহ বদলে দিলো কীভাবে?
হায়াত নির্ধারিত হলে খুনীর শাস্তি কেন?
এবারে আসুন আরও একটি ভিডিও দেখি, যেখানে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমদুল্লাহ প্রবলভাবে তাকদীরের এই গোঁজামিলকে মেলাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু চেষ্টা করতে গিয়ে বারবার নিজেই তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন। আসুন প্রথমে ভিডিওটি শুনি,
উনি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার যুক্তি তুলে ধরে এই প্রশ্নটির উত্তর দিচ্ছেন। প্রশ্নটি হচ্ছে, মানুষের হায়াত নির্ধারিত হয়ে থাকলে, খুনির শাস্তি কেন? আল্লাহই তো হায়াত নির্ধারণ করেছেন। এর উত্তর আহমদুল্লাহ সাহেব দিচ্ছেন ইবনে তাইমিয়্যার বই থেকে। ইবনে তাইমিয়্যা বলেছেন, তাকদীর নাকি আবার দুই প্রকার। চূড়ান্ত আর অচুড়ান্ত। চূড়ান্ত তাকদীর নাকি পরিবর্তন হয় না, আর অচুড়ান্ত তাকদীর পরিবর্তন হয়। সেই অচুড়ান্ত তাকদীর নাকি ফেরেশতারা লেখে। কিন্তু ফেরেশতারা সেই অচুড়ান্ত তাকদীর কার হুকুমে লেখে? আল্লাহই তো, তাই না? তাহলে আল্লাহ কেন চূড়ান্ত তাকদীর জেনেশুনে ভুল তথ্য ফেরেশতাদের দেন? ফেরেশতাদের কেন তিনি মিথ্যা বলেন? আবার, চূড়ান্ত অচুড়ান্ত কোন তাকদীরই লিখে রাখার প্রয়োজন কী? অচুড়ান্ত তাকদীর যেহেতু পরিবর্তনশীলই, তা আর শুধু শুধু রেখে লাভ কী?
এই ফ্লোচার্টটি দেখায়—“চূড়ান্ত/অচূড়ান্ত তাকদীর” তত্ত্বটি খুনীর শাস্তির প্রশ্নে কোথায় গিয়ে গোঁজামিল তৈরি করে।
হায়াত/মৃত্যু যদি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে—তাহলে খুনি কেন শাস্তি পাবে?
(ক) চূড়ান্ত তাকদীর: বদলায় না।
(খ) অচূড়ান্ত তাকদীর: বদলাতে পারে; ফেরেশতা লেখে; দোয়া/সদকা/কর্মে পরিবর্তন হয়।
অচূড়ান্ত অংশও আল্লাহর ইলম/চূড়ান্ত পরিকল্পনার ভেতরেই আগে থেকে স্থির।
মানুষের সিদ্ধান্ত/কর্মে আয়ু/ঘটনা বাস্তবে বদলে যায় (শুধু “দেখানো” নয়)।
যদি খুন “চূড়ান্ত পরিকল্পনার” অংশ হয়—খুনি কার্যত পূর্বনির্ধারিত কাজই করলো।
তখন নৈতিক দায় ও শাস্তির ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
যদি মানুষের কাজেই বাস্তবে আয়ু বদলায়—তাহলে “হায়াত আগে থেকেই নির্ধারিত” কথাটা অবধারিত থাকে না।
তখন “নির্ধারিত হায়াত” দাবি নড়বড়ে হয়ে যায়।
“চূড়ান্ত/অচূড়ান্ত” ভাগ করে তত্ত্বটি প্রশ্নটার সমাধান না করে দুইদিকে চাপ তৈরি করে—
একদিকে গেলে শাস্তির ন্যায্যতা দুর্বল, আরেকদিকে গেলে “নির্ধারিত হায়াত” দাবি দুর্বল।
দোয়া বনাম তাকদীর: ওমনিসায়েন্স প্যারাডক্স
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে যদি দাবি করা হয় যে, “দোয়া ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে” [104]। কিন্তু যখন আমরা একে স্রষ্টার ‘সর্বজ্ঞতা’ (Omniscience) এবং ‘নিখুঁত পূর্বজ্ঞান’ (Foreknowledge) এর সাথে মেলাই, তখন এটি একটি ক্লাসিক্যাল লজিক্যাল প্যারাডক্স বা স্ববিরোধিতা তৈরি করে। যদি আল্লাহ ‘আল-আলীম’ বা সর্বজ্ঞানী হন, তবে ২০২৬ সালে কোনো এক ব্যক্তি যে নির্দিষ্ট সময়ে দোয়া করবে, তা তিনি সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই জানতেন। অর্থাৎ, ওই ব্যক্তির দোয়া করা এবং তার ফলে ভাগ্যের তথাকথিত ‘পরিবর্তন’—পুরো ঘটনাটিই আদি পাণ্ডুলিপিতে (লাওহে মাহফুজ) আগে থেকেই রেকর্ড করা ছিল।
আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
আরো কিছু হাদিস [105] পড়ে নিই।





স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মের ফলাফল বিষয়ে স্ববিরোধিতা
ইসলামী বিশ্বাসে স্বাধীন ইচ্ছা (ফ্রি উইল) এবং কর্মের ফলাফল (পুরস্কার-শাস্তি) বিষয়ে একটি দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে। এরকম হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয় যে, নবী মুহাম্মদের মনে এক একসময়ে এক এক চিন্তার উদ্ভব হয়েছে, সেই সময়ে তিনি এক একরকম বক্তব্য দিয়েছেন। একদিকে, কোরআন এবং হাদিসে মানুষকে স্বাধীনভাবে ভালো-মন্দ কর্ম নির্বাচন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেমন সূরা আল-কাহফে (১৮:২৯) বলা হয়েছে যে, “যে ইচ্ছা করুক বিশ্বাস করুক, যে ইচ্ছা করুক অবিশ্বাস করুক”—যা স্বাধীন নির্বাচনের ইঙ্গিত দেয়; অন্যদিকে, কর্মের ফলাফল হিসেবে স্বর্গ-নরকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা মানুষের কর্মের উপর দায়িত্ববোধ স্থাপন করে। কিন্তু এই ধারণাগুলো তাকদীরের সাথে সরাসরি স্ববিরোধী, কারণ যদি সকল কর্ম এবং ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হয় (যেমন হাদিসে বলা হয়েছে যে, গর্ভে থাকতেই ভাগ্য লেখা হয়), তাহলে মানুষের স্বাধীন নির্বাচন কেবল একটি ভ্রম, এবং পুরস্কার-শাস্তি অযৌক্তিক হয়ে দাঁড়ায়—কারণ কোনো ব্যক্তি যা করার জন্য পূর্বনির্ধারিত, তার জন্য তাকে দায়ী করা যায় না। এটি যুক্তির কাঠামো ভেঙ্গে দেয়, বিশেষত যুক্তিবিদ্যার অ-স্ববিরোধিতার সূত্র (law of non-contradiction) লঙ্ঘন করে, যা বলে যে একই বিষয় একই সময়ে সত্য এবং অসত্য হতে পারে না—অর্থাৎ, কর্ম যদি স্বাধীন হয় তাহলে তা পূর্বনির্ধারিত হতে পারে না, এবং যদি পূর্বনির্ধারিত হয় তাহলে দায় বা স্বাধীনতা বা দায়িত্ব অসম্ভব। এই স্ববিরোধিতা যুক্তিবিদ্যার পরিচয়ের সূত্র (law of identity)-কেও প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ এতে স্বাধীনতা এবং নির্ধারণের পরিচয় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, যা যৌক্তিক বিশ্লেষণকে অসম্ভব করে তোলে, এরিস্টটলের ভাষায় যুক্তিহীনতা বা চিন্তার Chaos তৈরি করে।
একে যদি আমরা বিশুদ্ধ যুক্তির ছকে ফেলি:
- ১. প্রথম ভিত্তি (Premise 1): যদি কোনো কাজের ফলাফল ১০০% নিশ্চিতভাবে আগে থেকে জানা থাকে, তবে সেই কাজটি ঘটা ‘অনিবার্য’ (Necessary)।
- ২. দ্বিতীয় ভিত্তি (Premise 2): স্বাধীন ইচ্ছার (Free Will) অস্তিত্ব থাকতে হলে অন্তত একটি ‘বিকল্প সম্ভাবনা’ (Alternative Possibility) থাকতে হবে।
- ৩. তৃতীয় ভিত্তি (Premise 3): ইসলামিক টেক্সট (তাকদীর) অনুযায়ী, আল্লাহর লিখিত তাকদীর অব্যর্থ এবং প্রতিটি কাজ ১০০% নিশ্চিত এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে পূর্ব-নির্ধারিত।
- যৌক্তিক সিদ্ধান্ত (Logical Conclusion): যেহেতু ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত (Premise 3), সেহেতু সেখানে কোনো বিকল্প সম্ভাবনা নেই (Premise 2 এর পরিপন্থী)। অতএব, এই সিস্টেমে স্বাধীন ইচ্ছা একটি লজিক্যাল ইম্পসিবিলিটি বা গাণিতিক অসম্ভবতা।
পরীক্ষার বিভ্রম (The Illusion of Trial)
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে পৃথিবীকে একটি ‘পরীক্ষাগার’ হিসেবে দাবি করা হলেও, তাকদীরের কঠোর ডিটারমিনিজম এই দাবিকে সরাসরি নস্যাৎ করে দেয়। যদি একজন সৃষ্টিকর্তা (S) মহাবিশ্ব সৃষ্টির বহুপূর্বেই জানেন যে একজন মানুষ (A) একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট কাজ (X) করবে, তবে সেই কাজটির প্রকৃতি আর ‘ঐচ্ছিক’ থাকে না, বরং তা ‘অনিবার্য’ (Necessary) হয়ে পড়ে।
- ১. সর্বজ্ঞতা ও অমোঘতা: যদি S কোনো সময় t₀-তে নিশ্চিতভাবে জানেন যে A সময় t₁-তে X কাজ করবে, এবং যেহেতু S অভ্রান্ত বা ভুল করতে অক্ষম, তাই A-এর পক্ষে t₁ সময়ে X না করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
- ২. বিকল্পের অনুপস্থিতি: স্বাধীন ইচ্ছা বা ‘ফ্রি উইল’-এর মূল শর্ত হলো একাধিক বিকল্প থেকে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু এখানে A-এর সামনে বিকল্পের সেট থেকে অন্য কোনো অপশন ঈশ্বর সৃষ্টির পূর্বেই বাতিল করে রেখেছেন।
- ৩. প্রোগ্রামড এক্সিকিউশন: যখন বিকল্পের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন A আর কোনো ‘পরীক্ষার্থী’ থাকে না; সে কেবল S দ্বারা লিখিত একটি ‘কোড’ বা ‘প্রোগ্রাম’ রান করে মাত্র।
কাদরিয়া, জাবরিয়া এবং আহলে-সুন্নাত ওয়াল জামাত
প্রারম্ভিক ইসলামী থিওলজিতে তাকদীর এবং স্বাধীন ইচ্ছার মধ্যকার প্যারাডক্স সমাধানের প্রচেষ্টাগুলো মূলত গ্রীক যুক্তিবাদ ও দর্শনের মুখোমুখি হওয়ার পর শুরু হয়। ইসলামী স্কলারগণ যখন গ্রীক দর্শনের বিধিবদ্ধ যুক্তিবিদ্যার (Formal Logic) সংস্পর্শে আসেন, তখন তাঁরা এই কাঠামোগত অসংগতিটি নিরসনে বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ গড়ে তোলেন। এই বিবর্তনের ধারায় মূলত তিনটি প্রধান ধারা লক্ষ্য করা যায়:
১. কাদরিয়া ও জাবরিয়া: দুই প্রান্তিক মেরু
- কাদরিয়া (Qadariyah): এরা মানুষের নিরঙ্কুশ স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাসী ছিল। তাদের যুক্তি ছিল—মানুষ যদি স্বাধীন না হয় তবে স্রষ্টার বিচার প্রক্রিয়া অর্থহীন। তবে এই অবস্থানটি রক্ষা করতে গিয়ে তারা ‘তাকদীর’ সংক্রান্ত মৌলিক টেক্সটগুলোকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হয় এবং প্রকারান্তরে স্রষ্টার ‘সর্বজ্ঞানীতা’ (Omniscience)-কে সীমিত করে ফেলে।
- জাবরিয়া (Jabariyah): এরা ছিল ‘হার্ড ডিটারমিনিস্ট’ বা কঠোর নিয়তিবাদী। তারা টেক্সটগুলোকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করে দাবি করত যে, মানুষের কোনো ক্ষমতাই নেই। এই অবস্থানটি লজিক্যালি সংগতিপূর্ণ হলেও এটি একটি বিশাল নৈতিক সংকট তৈরি করে—যেখানে একজন মানুষকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়, যা ন্যায়বিচারের (Justice) ধারণাকেই ধূলিসাৎ করে দেয়।
২. আহলে-সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং ‘অ্যাড হক’ সংশ্লেষ এই দুই চরমপন্থার বিপরীতে আহলে-সুন্নাত ওয়াল জামাত (আশ’আরি ও মাতুরিদি স্কুল) একটি মধ্যপন্থী সমন্বয়ের দাবি করে। আশ’আরি স্কুলের ‘কাসব’ (Acquisition) তত্ত্ব বা মাতুরিদি স্কুলের ‘ডেলিগেটেড ইনটেনশন’ মূলত এই যৌক্তিক অসংগতি ঢাকার একটি প্রচেষ্টা। তবে নিরেট যুক্তিবিদ্যার আলোকে এই সমন্বয়গুলো নিম্নোক্ত কারণে ত্রুটিপূর্ণ:
- অ্যাড হক হাইপোথিসিস (Ad Hoc Hypothesis): যখন একটি মূল তত্ত্ব (যেমন: তাকদীর ও ফ্রি-উইলের সহাবস্থান) লজিক্যাল ডেড-এন্ড বা অসংগতির মুখে পড়ে, তখন তাকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই রক্ষা করার জন্য নতুন নতুন ধারণা (যেমন: ‘কাসব’) প্রবর্তন করা হয়। ‘কাসব’ মূলত একটি Black-box Theory; এটি কর্মের মালিকানা নিয়ে একটি দাবি করে কিন্তু তার ভৌত বা লজিক্যাল ক্রিয়াকৌশল (Mechanism) ব্যাখ্যা করতে পারে না। এটি কোনো প্রমাণিত সত্য নয়, বরং তত্ত্বকে বাঁচানোর জন্য উদ্ভাবিত একটি কৃত্রিম চলক মাত্র।
- ওকামস রেজরের (Occam’s Razor) লঙ্ঘন: যুক্তিবিদ্যার নীতি অনুযায়ী, কোনো সমস্যার সরলতম ব্যাখ্যাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। এখানে ‘স্রষ্টা ও মানুষের ইচ্ছার অসংগতি’ স্বীকার করে নেওয়ার চেয়ে অসংখ্য জটিল, রহস্যময় এবং অপ্রমাণিত শর্ত (যেমন: স্রষ্টা কর্ম সৃষ্টি করেন কিন্তু মানুষ তা অর্জন করে) জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অতিরিক্ত জটিলতা প্রমাণের পরিবর্তে সংশয়কেই ঘনীভূত করে।
- চক্রক যুক্তি বা সার্কুলার রিজনিং (Circular Reasoning): এই ধর্মতাত্ত্বিক স্কুলগুলো প্রথমেই ধরে নেয় (Assumption) যে “স্রষ্টা ন্যায়বান এবং ইসলাম সত্য”। এরপর তারা দাবি করে—যেহেতু স্রষ্টা ন্যায়বান, সেহেতু তাকদীর ও ফ্রি-উইলের মধ্যে অবশ্যই একটি যৌক্তিক সমন্বয় থাকতে হবে (Conclusion)। অর্থাৎ, তারা যা প্রমাণ করতে চাইছে, তাকেই প্রোপোজিশন বা যুক্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি একটি Propositional Fallacy, যেখানে প্রমাণের দায় (Burden of Proof) মেটানোর বদলে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ধর্মতাত্ত্বিক এই প্রচেষ্টাগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো বিধিবদ্ধ লজিক্যাল রেজল্যুশন দিতে ব্যর্থ হয়। কারণ, একটি Closed System (যেখানে ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত) এবং Open Choice (যেখানে বিকল্প বাছাইয়ের সুযোগ আছে)—এই দুটি বৈপরিত্যকে একই সমতলে স্থাপন করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। ফলে এই সমন্বয়গুলো শেষ পর্যন্ত যুক্তির ময়দান ছেড়ে মেটাফিজিক্যাল রহস্যময়তা, অতীন্দ্রিয়বাদ (Mysticism) বা ভাষাগত চাতুর্যের (Semantic Gymnastics) আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
দর্শন শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা পড়া হারাম
দর্শন শাস্ত্র, বা ইংরেজিতে ফিলোসফি শব্দটির অর্থ হচ্ছে, “জ্ঞানের প্রতি ভালবাসা”। আরো ভালভাবে বললে, মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, কারণ, মন এবং ভাষা সম্পর্কে সাধারণ এবং মৌলিক প্রশ্নগুলির অধ্যয়ন। মানব ইতিহাসে প্রায় সকল জ্ঞানই দর্শন থেকে উদ্ভুত, যার মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে যুক্তিবিদ্যা। বস্তুতপক্ষে, দর্শনই মানুষের সকল জ্ঞানের জননী। এই দর্শনের শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে সক্রেটিস, প্লেটো আর অ্যারিস্টটলের মত বড় দার্শনিকগণ আধুনিক ইউরোপীয় দর্শনের অনেকটা ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আজকের সারা পৃথিবীর সকল যুক্তিবিদ্যা যেই মৌলিক সূত্রের ওপর নির্ভরশীল, তা অ্যারিস্টটলের দেয়া। একই সঙ্গে, চিন্তার পদ্ধতি কীভাবে হলে সেটি যৌক্তিক হয়, তারও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় গ্রীক দার্শনিকদের থেকে।
ইসলামে তাকদীরের ধারণাকে যুক্তিবিদ্যা বা দর্শনের আলোয় পর্যালোচনা করলে, যুক্তিবিদ্যার কষ্টিপাথর দিয়ে দেখলে ইসলামের বিশুদ্ধ টেক্সটগুলোতে বর্ণিত তাকদীর ধারনাকে অযৌক্তিক হিসেবেই গণ্য করতে হবে, যা ইসলামকেই প্রশ্নের মুখোমুখি করে ফেলে। ইসলামিক স্কলারগণ যুগে যুগে এই সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন, নানাভাবে নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে, নতুন নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামের এই ধারনাকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। এরপরে কাজ না হওয়ায় তাকদীর নিয়ে আলোচনা বা কথা বলা হারাম করেছেন, তাতেও কাজ না হওয়ায় শেষমেশ দর্শন শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা পড়াকেই হারাম ঘোষণা করে ফেলেছেন। আমরা নিচে পৃথিবীর বেশ কয়েকজন বিখ্যাত সালাফি ইসলামিক স্কলারের বক্তব্য শুনবো, উনারা ব্যাখ্যা করবেন কেন যুক্তিবিদ্যা বা দর্শন শাস্ত্র অধ্যয়ন করা ইসলামে হারাম সে সম্পর্কে। বিস্তারিত জানার জন্য এই লেখাটি পড়া যেতে পারে [106]। প্রথমে আসুন বাঙলাদেশের বর্তমান সময়ের অন্যতম আলেম ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া সাহেবের একটি আলোচনা শুনি, যেখানে উনি মুসলমানদের যুক্তিবিদ্যা বা দর্শন পড়া উচিত নাকি অনুচিত সেই বিষয়ে আলোচনা করছেন,
এবারে আসুন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত একজন ইসলামিক স্কলার Assim al hakeem এর দুইটি বক্তব্য শুনে নিই,
উপসংহার
জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার (Arthur Schopenhauer) স্বাধীন ইচ্ছা সম্পর্কে একটি কালজয়ী উক্তি করেছিলেন: “Man can do what he wills but he cannot will what he wills” (মানুষ যা ইচ্ছা করে তা করতে পারে, কিন্তু সে কী ইচ্ছা করবে—তা সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না)। ইসলামি তাকদীরের নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে ঠিক এই চিত্রটিই পাওয়া যায়। একজন মানুষ হয়তো তার ইচ্ছামতো পানি পান করেন, কিন্তু ‘পিপাসা’ লাগার বিষয়টি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। একইভাবে, কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিসের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, মানুষের অন্তরে ভালো বা মন্দ কাজের ‘ইচ্ছা’ বা ‘প্রবৃত্তি’ জাগ্রত করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করার পরিস্থিতি তৈরি করা—সবই ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ। সারসংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামি ঈশ্বর বা আল্লাহ হচ্ছেন এমন এক নাট্যকার, যিনি নিজেই ভিলেন চরিত্র সৃষ্টি করেন, নিজেই তাকে দিয়ে অপরাধ সংঘটন করান (তাকদীর দ্বারা), এবং নাটকের শেষে সেই চরিত্রকে অনন্তকালের জন্য নরকে নিক্ষেপ করেন। একটি পূর্বনির্ধারিত (Pre-destined) ব্যবস্থায় ‘বিচার’, ‘পরীক্ষা’ বা ‘শাস্তি’ শব্দগুলো অর্থহীন। যেখানে স্বাধীন ইচ্ছার অস্তিত্ব নেই, সেখানে নৈতিক দায়বদ্ধতাও (Moral Responsibility) অচল। অতএব, নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকদীরের বিশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের ধারণা—এই দুটি একই সাথে সত্য হতে পারে না।
উপরে বর্ণিত সমস্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদিসসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিতভাবেই বলা চলে, ইসলাম অনুসারে সকল ঘটনা, সকল কর্ম, সকল অস্তিত্ব আল্লাহর ইচ্ছাই হয়। আল্লাহ আদম সৃষ্টির আগেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, আদমের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবজাতির সৃষ্টি করবেন। সেই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই শয়তান আদমকে ধোঁকা দেয় এবং সেটিও আসলে আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে। একইসাথে, আল্লাহ পাক সমস্ত কিছুর তাকদীর পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, যার কোন অন্যথায় হতে পারে না। আল্লাহ যা চান সেটিই হয়, তিনি যা চান না, সেটি হয় না বা হওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ যাদের অন্তরে মোহর মেরে দেন, তাদের পক্ষে চাইলেও মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। আর আল্লাহ যাদের পথ দেখান, তারা চাইলেও পথভ্রষ্ট হতে পারবে না। এই সমস্ত কিছুই পূর্ব নির্ধারিত এবং আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। সামান্যতম কোন বিষয় আল্লাহর ইচ্ছে ছাড়া ঘটা সম্ভব নয়। সেই কারণে, উপরের সমস্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদিসগুলো মেনে নিলে, স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইলের সমস্ত কিছুই আসলে মানুষের সাথে আল্লাহ পাকের এক নির্মম প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।
অথবা, এগুলো যৌক্তিকভাবে পরস্পরবিরোধী ধারণা হিসেবে দেখা যায়, যা ভয় এবং লোভের মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণের একটি মধ্যযুগীয় কৌশল হতে পারে।

- প্রবন্ধে কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের উদ্ধৃতিগুলো (যেমন সহিহ তিরমিজী ২১৫৫, সহিহ মুসলিম ৬৬৫৯) সঠিক রেফারেন্স সহ প্রদান করা হয়েছে, যা ইসলামী গ্রন্থের সাথে মিলে যায়।
- দার্শনিক রেফারেন্স যেমন W.T. Stace-এর ফ্রি উইল সংজ্ঞা এবং Daniel Dennett-এর যুক্তি সঠিকভাবে উপস্থাপিত, যা সমসাময়িক দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ইসলামী তাফসীর (যেমন ইবনে কাসীর এবং তাফসীরে মাযহারী) থেকে নেওয়া ব্যাখ্যাগুলো তথ্যগতভাবে নির্ভুল এবং প্রাসঙ্গিক।
- প্রবন্ধের যুক্তিগুলো ধাপে ধাপে গঠিত, যেমন তাকদীরের স্ববিরোধিতা দেখিয়ে ফ্রি উইল এবং নৈতিক দায়িত্বের অসঙ্গতি প্রমাণ করা হয়েছে।
- ডায়াগ্রাম এবং উদাহরণ (যেমন খিজিরের হত্যা বা আবু লাহাবের সূরা) ব্যবহার করে যুক্তি স্পষ্ট এবং লজিকাল ফ্যালাসি যেমন circular reasoning চিহ্নিত করা হয়েছে।
- প্রধান উৎস হিসেবে কুরআন, হাদিস (সহিহ বুখারী, মুসলিম, তিরমিজী, মিশকাতুল মাসাবীহ) এবং তাফসীর ব্যবহার করা হয়েছে, যা সহিহ হিসেবে চিহ্নিত এবং প্রমাণভিত্তিক।
- দার্শনিক উৎস যেমন ‘হাকায়েকে ইমকানিয়াহ’ এবং পশ্চিমা দার্শনিকদের রেফারেন্স যোগ করে প্রমাণের গভীরতা বাড়ানো হয়েছে।
- পশ্চিমা দর্শন (যেমন Harry Frankfurt-এর ইচ্ছার স্তর বা Alfred Mele-এর Zygote Argument) এর সাথে তুলনা করে যুক্তিবাদী এবং সমসাময়িক মানদণ্ড মেনে চলা হয়েছে।
- লজিকাল অসঙ্গতি যেমন অ-স্ববিরোধিতার সূত্র লঙ্ঘন এবং ad hoc ব্যাখ্যা চিহ্নিত করে বৈজ্ঞানিক যুক্তির মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে।
- ধর্মগ্রন্থের সরাসরি উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাকদীরের লজিকাল অসঙ্গতি এবং circular reasoning নির্মমভাবে উন্মোচন করা।
- চিন্তাশীল পাঠককে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস চ্যালেঞ্জ করতে উদ্বুদ্ধ করা, যা গভীর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
- প্রবন্ধটি একপক্ষীয়, ধর্মীয় পণ্ডিতদের প্রতিবাদী যুক্তি (যেমন আশ’আরী বা মুতাজিলা মতবাদ) উপেক্ষা করা হয়েছে।
- কিছু অংশে ভাষা অতিরঞ্জিত, যা নিরপেক্ষতা কমাতে পারে।
- ধর্মীয় প্রতিবাদী যুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে ভারসাম্য বাড়ানো যেতে পারে।
- আরও বৈচিত্র্যময় দার্শনিক রেফারেন্স যোগ করে গভীরতা বাড়ানো।
- উপসংহারে আরও নিরপেক্ষ সারাংশ প্রদান করে পাঠকের চিন্তা উদ্রেক করা।
| তথ্যগত সঠিকতা | 10 / 10 |
| যুক্তির গুণমান | 9.5 / 10 |
| উৎস-ব্যবহার | 9.5 / 10 |
| সামগ্রিক স্কোর | 9.5 / 10 |
চূড়ান্ত মন্তব্য: এটি একটি শক্তিশালী সমালোচনামূলক প্রবন্ধ যা ইসলামী তাকদীরের ধারণাকে যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চ্যালেঞ্জ করে, ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের স্ববিরোধিতা উন্মোচন করে।
তথ্যসূত্রঃ
- Laplace, P. S., A Philosophical Essay on Probabilities, 1814 ↩︎
- Hume, D., An Enquiry Concerning Human Understanding, 1748 ↩︎
- SEP: Compatibilism; Incompatibilist Theories of Free Will ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
- সহীহ আত-তিরমিযী, ৪র্থ খণ্ড, তাহক্বীকঃ মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, হোসেইন আল মাদানী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫২ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১৫ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১৬ ↩︎
- সূরা তাকভীর, আয়াত ২৯ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
- সূরা বাকারা, আয়াত ৭ ↩︎
- সূরা ক্বামার, আয়াত ৪৯ ↩︎
- সূরা হাদীদ, আয়াত ২২ ↩︎
- সূরা কাসাস, আয়াত ৬৮ ↩︎
- সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ২৭ ↩︎
- সূরা আল ইমরান, আয়াত ৬ ↩︎
- সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১১২ ↩︎
- সূরা ফুরকান, আয়াত:২ ↩︎
- কোরআন ১৮:১৭ ↩︎
- কোরআন ৭:১৭৮ ↩︎
- সূরা আল মুজাদিলা, আয়াত ১০ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৫৩৯ ↩︎
- কোরআন ৭৬:৩০ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৭২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী, হাকিমবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৫ ↩︎
- তাফসীর ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ১১তম খণ্ড , ইসলামিক ফাউন্ডেশন ,পৃষ্ঠা ৪৩২ ↩︎
- শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া, লেখক : ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী, প্রকাশনী : মাকতাবাতুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৪২৩, ৪২৪ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৩৬ ↩︎
- শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া, লেখক : ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী, প্রকাশনী : মাকতাবাতুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৪২৩, ৪২৪ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ২৩২৮ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৮০ ↩︎
- সূরা ফাতির, আয়াত ৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৭০৩ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ , পঞ্চম খণ্ড, আল্লামা আলবানী একাডেমী, পৃষ্ঠা ৪৪৫-৪৪৬ ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, হাদিসঃ ১৬৬০ ↩︎
- মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৬, ৬১৭ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৯৫ ↩︎
- তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬৩০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৬৫৯৬ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৫৩৯ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪২৩ ↩︎
- সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), ২১৩৫ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০-১১১ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৬ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৬১২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৮৫২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৮৫৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৮৫৪ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫১৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫১২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৬৬৪৬ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ২১৫২ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৮৬ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ৮২ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭১৩ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫০৭ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৬৯ ↩︎
- তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ, ১ম খণ্ড ↩︎
- সহিহ হাদিসে কুদসি ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭৪৫৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৯৪৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩২০৮ ↩︎
- আন্-নওয়াবীর চল্লিশ হাদীস, হাদিসঃ ৪ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৮২ ↩︎
- তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ (১ম খণ্ড) ↩︎
- সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৯৬ ↩︎
- তাফসীরে যাকারিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪৮ ↩︎
- Spinoza, B., Ethics, 1677 ↩︎
- Libet, B., Unconscious cerebral initiative and the role of conscious will in voluntary action, 1985 ↩︎
- সূরা আল-বাকারা ২:৭ ↩︎
- সূরা আল-আরাফ ৭:১৬ ↩︎
- Calvin, J., Institutes of the Christian Religion, 1536 ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ষষ্ঠ খণ্ড , ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৬৬-১৬৯ ↩︎
- তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ (১ম খণ্ড) ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি, হাদিসঃ ১৭০৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৬৯১ ↩︎
- কোরআন, সূরা নূহ, আয়াত ২৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা নূহ, আয়াত ২৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা কাসাস, আয়াত ৫৬ ↩︎
- কোরআন ১৮:১৭ ↩︎
- কোরআন ৭:১৭৮ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৫৩১ ↩︎
- সূরা আরাফ, আয়াত ১৬ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৫৭৫৮ ↩︎
- সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১০ ↩︎
- সহিহ মুসলিম খণ্ড ১ পৃষ্ঠা ১৯৮, ১৯৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৪৭ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ৩৭৬৮ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ , হাদিসঃ ১১৮ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৬৬৫৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৯৪৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৯৪৮ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১০, ৩১১ ↩︎
- সূনান তিরমিজী (ইফাঃ), হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
- Laplace, P. S., A Philosophical Essay on Probabilities, 1814 ↩︎
- সূরা আল-মাসাদ ১১১:১-৫ ↩︎
- Hume, D., An Enquiry Concerning Human Understanding, 1748 ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬৪২ ↩︎
- তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২ ↩︎
- জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২১৩৯ ↩︎
- হাদিস সম্ভার গ্রন্থ, ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, শাইখ আবদুল হামীদ ফাইযী আল মাদানি সঙ্কলিত ↩︎
- ইসলাম কি যাচাই করার সুযোগ দেয়? ↩︎


🙂
—–দৃষ্টিকোন—–
“ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে”
আরও অনেক জিজ্ঞাসা
https://drive.google.com/file/d/1wn5k02X2hDUatyGPAMnUNrokQAL4MP3b/view
সমস্যাটা তো এখানেই
এক দিকে যেখানে আল্লাহ না চাইলে কিছুই হবে না। যেখানে আমি জাহান্নামী নাকি জান্নাতি তা আল্লাহ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে, একজন খ্রিস্টান ঘরে জন্মানো সন্তান খ্রিস্টান ই হবে, অর্থাৎ সেই সন্তানের জাহান্নাম নিশ্চিত করে রেখেছে আল্লাহ ।
আবার অন্য দিকে আল্লাহ বলেন যার যার পাপের ভার তার তার। অথচ আল্লাহ আগে ই ঠিক করে রেখেছে কে পাপী হবে।
এটা কেমন বিচার হলো ? নিজের মতো নাটক সাজিয়ে নিজেই শাস্তি দেওয়া। এটা তো অন্যায় বিচার। আল্লাহ চাইলে ই সবাইকে মুসলমান বানাতে পারেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
লেখকের এই article লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত এটাই
খুব সুন্দর লাগলো ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এবং সংশয়.ডট.কম কে
তাকদির বিষয়ক আপনার সব সংশয়ের উত্তর এই ভিডিওটিতে বলা হয়েছে, ধন্যবাদ।
https://youtu.be/FnqDKMBDyNo
pore onk kisu jante parlam
tnx eto kosto kore sobgula akshte deuar joonooo
agiye jak manobota
sotto unmocito hok
dhonnobad
ভাইয়া আপনাদের কন্সেপ্ট এ ব্যাপক ভুল আছে অদৃশ্য (তাকদীর) বলতে কি বোঝানো হয়েছে তার মূল কথাটাই আপনারা বুঝেন নাই।
প্রথমত, আল্লাহ ইলমে গায়েব জানেন।
আপনি কি করবেন না করবেন সেটা আল্লাহ জানেন।
এটা বুঝেন না কেন!
যে ধরেন আপনি কাফির হবেন সেটা আল্লাহ লিখে রেখেছেন বিষয়টা এমন নয়;
বরং এমন যে আল্লাহ জানেন আপনি কাফির হবেন সেজন্যই লিখে রেখেছেন।
এটাই তাকদীর।
আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানেন ধরেন আপনি ডাক্তার হলেন, সেটা আল্লাহ লিখে রেখেছেন এজন্য হয়েছেন তা নয়।
বরং আল্লাহ আগে থেকেই জানেন আপনি ডাক্তার হবেন এজন্য ই এটা লিখা হয়েছে।
নরমাল ব্যাপার, এত জটিলের কিছুই নাই আল্লাহ অদৃশ্য ভবিষ্যৎ জানেন তাই কি হবে না হবে সে সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।
নিঃসন্দেহে আল্লাহ অদৃশ্য সম্পর্কে জানেন এবং আপনি যা করবেন সেটা আল্লাহ আগে থেকে জানেন বলেই লিখে রেখেছেন।
সৃষ্টিকর্তাকে আমাদের মত ভাবলে তো হবে নারে ভাই।
অবশ্যই তিনি মহাপরাক্রমশালী,মহাজ্ঞানী।
আমি যে এখানে কমেন্ট করবো তা আল্লাহ লিখে রাখছেন বলে করছিনা বরং আমি কমেন্ট করবো সেটা আল্লাহ জানেন তাই লিখে রাখছেন।
আপনাকে নির্দেশনা গাইডলাইন দেওয়া আছে, এরপর ও আপনি মানবেন না সেটা আল্লাহ জানেন তাই লিখে রেখেছেন।
ভাইয়া মাথায় কি কিছু আছে নাকি নাই,,,
ইলমে গায়েব বলেন আর যাই বলেন না কেন,,, আমি যা করবো তা যদি আল্লাহ আগে থেকেই জানেন বা লিখে রাখেন, ধরেন-আমি একজন কে হত্যা করবো,সেটা আল্লাহ জানেন আগে থেকেই, আর লিখে রেখেছেন তকদীর হিসেবে, এখন যদি আমি কুরান পড়ে জানলাম মানুষ কে হত্যা করলে পাপ হয়, এটা জানার পর মানুষ টিকে আর হত্যা করলাম না, তাহলে কি হলো ভাই?? আল্লাহর যেটা লিখে রাখলেন সেটা তো ভুল প্রমাণিত হলো, তাই নাহ????????
এখন আপনি যদি বলেন যে, আমার তকদীর এ যা লেখা হয়েছে সেটা আমি পরিবর্তন করতে পারবো না,তাহলে আমার ভাগ্যে যদি জাহান্নাম লেখা থাকে তাহলে যতই নামাজ পরি না কেন জান্নাতে আর আমি কোনদিন যেতে পারবো না????????????
তাহলে ইবাদত করে লাভ কি????????????
Ohh bhai , seta to unader o question. Jodi kopale jahannam like take , taile ibadat kore ki lab ? ato boro post leke unara ai kothai to bujailen
Ohh bhai , seta to unader o question. Jodi kopale jahannam like take , taile ibadat kore ki lab ? ato boro post leke unara ai kothai to bujailen
ভাই আপনি পুরোটা না পড়েই লাফাচ্ছেন কেনো? মুসা আর আদমের বাদানুবাদ টা ভালো করে পড়েন, সেখানেই বুঝবেন। বোঝার ভুল টা আপনার হয়েছে, লেখকের না
Abal ni mia apni … akane onek gulu kuran hadis r reference deuya ache, kutau ki ai kotha lika ache je allah janten bole like rekechen , But aikane lika ache , allah kichu manush ke jahannami r kichu jannati baniyechen . ja allah agei tik kore rekechen … ki bujlen ? Jakir nayek r moto ablami charen, chaglami jakir nayek chagol kei manay , Jodi manush ja korbe ta age tekei allah janen r tar jonnei like rekechen , taile aita ato important keno ? iman r jonne important keno , muslim houyar jonne o important keno? Allah jodi janen e ki hobe, taile allah like rakben keno? allah ki bule jan naki je like rakte hobe?
@allah banda
পূর্ণাঙ্গ ইসলামি আকীদা অনুযায়ী তাকদীর শুধু “আল্লাহ জানেন তাই লিখে রেখেছেন”–এ সীমাবদ্ধ নয়।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এর বিশ্বাস হলো—তাকদীরের চারটি স্তম্ভ আছে:
ইলম (জ্ঞান): আল্লাহ অতীত-ভবিষ্যৎ সব জানেন। (সূরা আনআম 6:59)
কিতাবাহ (লিখন): আল্লাহ সব কিছু লওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন, ৫০ হাজার বছর আগেই। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: 2653)
মাশিয়াহ (ইচ্ছা): যা ঘটে, সব আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। (সূরা তাকবীর 81:29)
খালক (সৃষ্টি): মানুষের কাজসহ সব কিছুর সৃষ্টিকারী আল্লাহ। (সূরা আস-সাফফাত 37:96)
📜 দলিল:
রাসূল ﷺ বলেন—
“আদমের সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে আল্লাহ সৃষ্টির তাকদীর লিখেছেন।” (সহীহ মুসলিম, 2653)
এবং ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের একটি হলো—“তাকদীর, ভাল-মন্দ—দুটোতেই ঈমান আনা।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস জিবরাইল)
🔍 আপনার ভুল কোথায়:
আপনি তাকদীরকে শুধু “পূর্বজ্ঞান” হিসাবে নিচ্ছেন, অথচ কুরআন-হাদিস স্পষ্ট করে বলেছে—
লিখন ও ইচ্ছাও তাকদীরের অংশ।
আল্লাহ শুধু জানেনই না, বরং তাঁর ইচ্ছা ও লেখন অনুযায়ীই সব ঘটে।
মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে, তবে সেটিও আল্লাহর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।
📖 উদাহরণ:
যেমন, কেউ কাফির হবে—আল্লাহ জানেন, লিখেছেন এবং তার ইচ্ছাতেই সে সেই পথে চলবে। তবে মানুষ নিজেই সেই পথ বেছে নেয়, তাই দায়ীও হবে।
@আল্লাহর বান্দা
প্রথম বক্তব্য:
“আল্লাহ ইলমে গায়েব জানেন। আপনি কি করবেন না করবেন সেটা আল্লাহ জানেন।”
✅ সঠিক অংশ: আল্লাহ অবশ্যই ইলমে গায়েব জানেন।
📖 দলিল:
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়াবলির চাবি তাঁর নিকটই রয়েছে, তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।” (সূরা আনআম 6:59)
⚠️ অসম্পূর্ণতা:
আপনি শুধু “জানা” পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রেখেছেন, অথচ তাকদীরের চারটি স্তম্ভ আছে—
ইলম (জ্ঞান)
কিতাবাহ (লিখন)
মাশিয়াহ (ইচ্ছা)
খালক (সৃষ্টি)
শুধু প্রথম ধাপ উল্লেখ করে বাকি তিনটি বাদ দেওয়া ভুল ব্যাখ্যা।
📖 দলিল:
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করলেন এবং বললেন: ‘লিখ।’ কলম বলল: ‘আমি কী লিখব?’ আল্লাহ বললেন: ‘কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিখ।’” (আবু দাউদ 4700, তিরমিযী 2155 – সহীহ)
দ্বিতীয় বক্তব্য:
“যে ধরেন আপনি কাফির হবেন সেটা আল্লাহ লিখে রেখেছেন বিষয়টা এমন নয়; বরং এমন যে আল্লাহ জানেন আপনি কাফির হবেন সেজন্যই লিখে রেখেছেন।”
⚠️ ভুল:
কুরআন ও হাদিস বলছে—আল্লাহ শুধু জানেন তাই লিখেছেন—এমন নয়; বরং যা হবে তা তাঁর ইচ্ছার অধীনে এবং তিনিই তা সৃষ্টি করেছেন।
📖 দলিল:
“আল্লাহ যাকে চান পথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে চান বিপথগামী করেন।” (সূরা ইবরাহিম 14:4)
“আল্লাহই তোমাদের এবং তোমরা যা কর তার স্রষ্টা।” (সূরা আস-সাফফাত 37:96)
📌 উদাহরণ:
ফিরআউনের কাফের হওয়া আল্লাহ জানতেন, লিখেছিলেন এবং তাঁর ইচ্ছার অধীনে তা ঘটেছে।
কিন্তু সে নিজেই তার কুফরির পথ বেছে নিয়েছিল, তাই শাস্তি পেয়েছে।
তৃতীয় বক্তব্য:
“আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানেন ধরেন আপনি ডাক্তার হলেন, সেটা আল্লাহ লিখে রেখেছেন এজন্য হয়েছেন তা নয়। বরং আল্লাহ আগে থেকেই জানেন আপনি ডাক্তার হবেন এজন্যই এটা লেখা হয়েছে।”
⚠️ ভুল যুক্তি:
কুরআন অনুযায়ী, যা কিছু ঘটে তা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া হতে পারে না। “লেখা” শুধু নথিবদ্ধকরণ নয়, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছার অংশ।
📖 দলিল:
“তোমরা কিছুই ইচ্ছা করবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক, ইচ্ছা করেন।” (সূরা তাকবীর 81:29)
📌 উদাহরণ:
আপনি ডাক্তার হবেন কি না—তা আল্লাহর জ্ঞান, লিখন ও ইচ্ছার সমন্বয়ে ঘটে। যদি আল্লাহ ইচ্ছা না করতেন, আপনি সেই পথে যেতে পারতেন না, যদিও চেষ্টা করতেন।
চতুর্থ বক্তব্য:
“আমি কমেন্ট করবো সেটা আল্লাহ লিখে রাখছেন বলে করছিনা বরং আমি কমেন্ট করবো সেটা আল্লাহ জানেন তাই লিখে রাখছেন।”
⚠️ ভুল:
এখানে আপনি আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টি অংশ অস্বীকার করছেন। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, আপনার সেই কমেন্ট করাটিও আল্লাহর সৃষ্টি—যদিও সিদ্ধান্ত আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী হয়েছে।
📖 দলিল:
“আল্লাহই তোমাদের এবং তোমরা যা কর তার স্রষ্টা।” (সূরা আস-সাফফাত 37:96)
📌 উদাহরণ:
আপনি টাইপ করছেন—এটি আপনার স্বাধীন ইচ্ছার ফল, কিন্তু আঙ্গুল নড়ানোর ক্ষমতা, টাইপ করার সুযোগ, বিদ্যুৎ, ডিভাইস—সব আল্লাহর সৃষ্টি ও ইচ্ছার অধীনে।
পঞ্চম বক্তব্য:
“আপনাকে নির্দেশনা গাইডলাইন দেওয়া আছে, এরপরও আপনি মানবেন না সেটা আল্লাহ জানেন তাই লিখে রেখেছেন।”
⚠️ অপূর্ণতা:
আল্লাহ জানেন, লিখেছেন, ইচ্ছা করেছেন—এবং মানুষ নিজের ইচ্ছায় তা মানে বা অমান্য করে। তাই দায়িত্বও মানুষের উপর।
📖 দলিল:
“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছি, এখন সে কৃতজ্ঞ হবে না অকৃতজ্ঞ হবে।” (সূরা আল-ইনসান 76:3)
📌 উদাহরণ:
আল্লাহ জানেন আপনি নামাজ পড়বেন না—তবে আপনিই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন না পড়ার, তাই আপনার উপর শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
তকদির বিষয়টা সত্যিই জটিল। এটা নিয়ে সঠিক সমাধান পাওয়া মুসকিল। এটা মতভেদপূর্ণ বিষয়, কয়েকটা মতবাদ আছে এ নিয়ে। আল্লাহ যেহেতু সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টির সময় থেকেই যদি একজন নির্দিষ্ট মানুষের ভবিষ্যৎ প্রতিটি কাজ জানেন, জান্নাত নাকি জাহান্নামে সে যাবে তাও জানেন তবে এটা পরোক্ষভাবে পূর্বনির্ধারণই হয়ে যায়। আবার পূর্ব নির্ধারিত বিষয়ের জন্য শাস্তি বা পুরষ্কার প্রদান করেও সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক হওয়াটা বিবেকের বিচারে অযৌক্তিক হয়ে যায়। কোরআনে বেশ কিছু আয়াতে এটা বুঝা যায় যে মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহর পছন্দ বা অপছন্দনীয় যেকোন প্রকার কাজ করার যোগ্যতা দেয়া হয়েছে, আল্লাহ ইচ্ছা করেই তাকে স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করার সামর্থ্য দিয়েছেন, তিনি চাইলে মানুষকে জোর পুর্বক তার পছন্দসই কাজ করাতে বাধ্য করতে পারতেন, ফলে মানুষ নিজের ইচ্ছায় কোন কাজ করলেও সেটা পরোক্ষভাবে আল্লাহর (অতাৎক্ষণিক) ইচ্ছায় হয়ে যায়, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায় বিচারক, এ বিষয়গুলোই মুমিনদের যথেষ্ট মনে করে স্বাভাবিক কাজকর্ম করা উচিৎ। ঐ হাদিসের সাথে একমত হয়ে বলতেছি, তকদির বা পূর্ব-নির্ধারনের আয়াতগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা মাথা ঘামানো ঠিক নয়, কারন এতে আল্লাহর জ্ঞান, পুর্বনির্ধারন, পরিচালনা পদ্ধতি, ন্যায়বিচারক হওয়া এগুলো বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানা নেই এমন কথা বলা হয়ে যায়। (এ সম্পর্কিত অন্য হাদিসগুলোতে যেখানে বলা হয়েছে সবই পূর্বনির্ধারিত সেগুলোতে খুব বেশি নির্ভরশীল হওয়া ঠিক নয়, কারন হাদিসে ভুল থাকতে পারে।) কোরআনে আছে, “শয়তানতো মানুষকে নির্দেশ দেয় অশ্লীল ও মন্দ কাজের এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলতে যা তোমরা জান না।” তাই আমি মনে করি, পুর্ব-নির্ধারনের আয়াতগুলো, আল্লাহর সবজান্তা হওয়া এবং ন্যায়বিচারক হওয়া এই বিষয়গুলো আমাদের জন্য ‘অস্পষ্ট আয়াত যার সঠিক ব্যাখ্যা আল্লাহই জানেন। মুমিনদের বলা উচিৎ (আমরা বুঝি বা জ্ঞানের স্বল্পতার দরুন না বুঝি) কোরআনের বাণী আল্লাহ থেকে অবতীর্ণ সত্য।’ (৩ঃ৭)
জনাব মহি, আমরা জানি কমলাপুর রেল স্টেশনে টিকিট বিহীন যাত্রীদের আটক বা জরিমানা করা হয়, আচ্ছা ধরুন আপনি সিলেট থেকে ঢাকায় আসবেন, আসার পথে জানতে পারলেন আজকে কমলাপুর টিকিট চেক হচ্ছে না, আবার কেউ বললো চেক হচ্ছে, তখন আপনি কি করবেন, বুদ্ধমান হলে টিকিট নিয়ে ট্রেনেই উঠবেন, কারণ যদি টিকিট চেক হয় তাহলে তো ধরা। ঠিক তেমনি ভাবে যেহেতু অনেক মহা গ্রন্থ ও মহা মানবগণ বলছেন পরকালে হিসাব হবে, তাই কিপটামি ও অলসতা না করে, টিকিট টা মানে ইসলাম ধর্মটা মেনেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েন, আর বাটন মোবাইলের বুদ্ধি/কর্মক্ষমতার সৃষ্টিজীব মানুষ হয়া, স্মার্ট বা কম্পিউটারের বুদ্ধি/কর্মক্ষমতা মাপতে গেলে কোল কিনারা পাইবেন না এটাই স্বাভাবিক!
কিছু ঘারত্যারা মুমিনদের জন্য:
https://www.shongshoy.com/archives/11475 (কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী তা আগে থেকেই ঠিক করা)
গ্রন্থের নামঃ সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [4630]
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে।
৪৬৩০. আবদুল্লাহ্ কা’নাবী (রহঃ) ……. মুসলিম ইবন জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবন খাওাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেনঃ
إِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ
অর্থাৎ স্মরণ কর! তোমার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারুক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেঃ নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী থাকলাম। (৭ঃ১৭২)
রাবী বলেনঃ কা’নাবী এ আয়াত তিলাওয়াত করলে উমার (রাঃ) বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনি। জবাবে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মহান আল্লাহ্ আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর, তার পিঠকে স্বীয় ডান হাত দিয়ে মাসেহ করেন। ফলে অনেক আদম সন্তান সৃষ্টি হয়। এরপর তিনি বলেনঃ আমি এদের জান্নাতে জন্য সৃষ্টি করেছি। এরা জান্নাতীদের ন্যায় আমল করবে। এরপর আল্লাহ্ তার হাত দিয়ে আদমের পিঠকে মাসেহ করেন। ফলে তার আরো সন্তান সৃষ্টি হয়। তিনি বলেনঃ আমি এদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তারা জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করবে। তখন এক ব্যক্তি বলেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাহলে আমলের প্রয়োজনীয়তা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জান্নাতীদের আমল করিয়ে নেন। ফলে, সে ব্যক্তি জান্নাতীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করান। ফলে সে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
https://www.shongshoy.com/archives/11459
এক দিকে যেখানে আল্লাহ না চাইলে কিছুই হবে না। যেখানে আমি জাহান্নামী নাকি জান্নাতি তা আল্লাহ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে, একজন খ্রিস্টান ঘরে জন্মানো সন্তান খ্রিস্টান ই হবে, অর্থাৎ সেই সন্তানের জাহান্নাম নিশ্চিত করে রেখেছে আল্লাহ ।
আবার অন্য দিকে আল্লাহ বলেন যার যার পাপের ভার তার তার। অথচ আল্লাহ আগে ই ঠিক করে রেখেছে কে পাপী হবে।
এটা কেমন বিচার হলো ? নিজের মতো নাটক সাজিয়ে নিজেই শাস্তি দেওয়া। এটা তো অন্যায় বিচার। আল্লাহ চাইলে ই সবাইকে মুসলমান বানাতে পারেন। কিন্তু তিনি তা করেননি
after reading its make me clear .
কি বলব এই তাকদীর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই, নাস্তিক হয়ে গেছি…..
ধন্যবাদ
টাইম মেশিন আবিস্কার না হওয়া পর্যন্ত তাকদীর কে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব না। আর তার প্রয়োজন আছে বলেও আমি মনে করিনা। কারন দিনশেষে আমি যা পাই তা আমার একান্তই নিজের কর্মফল। এটা কোথাও লেখা থাকুক বা নাই থাকুক- কিছুই যায় আসেনা। আমার ধারনা সৃষ্টিকর্তারও কিছুই যায় আসেনা কে তাঁকে বিশ্বাস করলো আর কে করলনা। মিথ্যা কথা না বলা আর অন্যের ক্ষতি না করা- এই দুইটি গুন সকল মানুষ রপ্ত করতে পারলে পৃথিবীতে এতো ধর্মের উদ্ভবও হতোনা।
অন্যদিকে বান্দা যদি তাকদীরের উপর নির্ভরশীল হয় তাহলেতো পরীক্ষা বলতে কিছু থাকেনা।
এদুটো বিষয় আল্লামিয়া ওরফে মোহাম্মক সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করেও স্বম্পূর্ণ ব্যার্থ হয়েছে।
আল্লামিয়ার অবস্থা এমন যে, শ্যাম রাখি না কুল রাখি!!!
বান্দা যদি নিজের ইচ্ছায় সব করতে পারে তাহলে আল্লার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
অন্যদিকে বান্দা যদি তাকদীরের উপর নির্ভরশীল হয় তাহলেতো পরীক্ষা বলতে কিছু থাকেনা।
এদুটো বিষয় আল্লামিয়া ওরফে মোহাম্মক সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করেও স্বম্পূর্ণ ব্যার্থ হয়েছে।
আল্লামিয়ার অবস্থা এমন যে, শ্যাম রাখি না কুল রাখি!!!
Sir I am a student(science 🔭).
Ami Islam tag korat chai
But Jadu ba kala Jadu ki
Jodi upni bolan tahola Islam tag korbo
Ami 2 year madrasa ta pora6i
Amar family kala jadu bisus Kora na
Kintu Amar family ka kala jadu kora hoa6i lo. Jodi nobi bola ku na taka tahola nobika kalajadu kora hoa6ilo upni amar question ta bujta para6an .
Please reply as soon as possible…
(সূচিপত্র নাম্বার ৭) এইখানে একটি লাইনে লেখা আছে:-
এবারে আসুন একটি ভেবে দেখি। এইখানে একটি শব্দটির জায়গায় একটু হবে।
(সূচিপত্র নাম্বার ১৪.৪)এইখানে একটি লাইনে লেখা আছে:- আবার, মুশরিকদের নানালেগ বাচ্চারা তাদের পিতামাতার আমল অনুসারে জাহান্নামে যাবে। এইখানে নানালেগ শব্দটির জায়গায় নাবালেগ হবে।
আমার কিছু কথা বলার ছিল আপনার সাথে
এই ধর্ম মানেই যন্ত্রণা। ধর্ম মানেই অন্ধকার সেটা যেটাই হোক না কেন।