মানবাধিকার

বিশ্ব রাজনীতিতে মানবাধিকার ও মানবিক সংকটসমূহ (Human Rights & Humanitarian Issues in Global Politics): বিশ্বমঞ্চে মানুষের অধিকার ও মানবতার সংকট

Table of Contents

ভূমিকা

মানুষ খুব অদ্ভুত এক প্রাণী। এই সুবিশাল পৃথিবীতে সে জন্মায় সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে। তার গায়ে কোনো পোশাক থাকে না, পকেটে থাকে না কোনো পরিচয়পত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জন্মের পর মুহূর্ত থেকেই তার কিছু জন্মগত দাবি বা অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যায়। সে নিশ্বাস নিতে চায়, বাঁচতে চায়, এবং সবচেয়ে বড় কথা – সে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং মাথা উঁচু করে হাঁটার অন্তর্নিহিত ইচ্ছে থেকেই মূলত জন্ম নিয়েছে মানবাধিকার (Human Rights)। আদিম যুগে যখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি চলত, তখন অধিকারের কোনো বালাই ছিল না। পেশিশক্তিই ছিল শেষ কথা। কিন্তু মানুষ যত সভ্য হয়েছে, সে বুঝতে পেরেছে একা ভালো থাকার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে হয়, আর তার জন্যই প্রয়োজন হয় একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের।

বিশ্ব রাজনীতির (Global Politics) মঞ্চটা বড় নিষ্ঠুর এবং গোলকধাঁধায় পূর্ণ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সবাই শান্তির কথা বলছে, কিন্তু ভেতরের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ক্ষমতা আর স্বার্থের খেলা চলে অহর্নিশ। বড় রাষ্ট্রগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দিয়ে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে গিলে খেতে চায়। আবার রাষ্ট্রের ভেতরে যারা ক্ষমতায় বসে থাকে, তারা নিজেদের গদি বাঁচাতে দুর্বল এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। এই যে অবিরাম সংঘাত, ক্ষমতার এই যে নির্লজ্জ দাপট – এর মাঝেই সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কিছু লিখিত ও অলিখিত নিয়মকানুন তৈরি হয়েছে। এই নিয়মগুলোই হলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক সংকট মোকাবেলার মূল ভিত্তি (Donnelly, 2013)। কেউ কাউকে দয়া করে এই নিয়মগুলো দেয়নি, বরং শতাব্দীপ্রাচীন বঞ্চনার জবাব হিসেবেই এগুলো মানুষের সম্মিলিত প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে।

পৃথিবীটা মানচিত্রে নানা রঙে ভাগ করা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে, পাসপোর্ট আর ভিসার নিয়ম দিয়ে আমরা একে অপরকে আলাদা করে রেখেছি। আমরা নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছি আলাদা আলাদা ভূখণ্ডের নামে। কিন্তু কাঁটাতারের এপার আর ওপার – সব জায়গাতেই মানুষের রক্তের রঙ লাল, কান্নার সুর ঠিক একই রকম। বিশ্বমঞ্চে যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর অবিচার হয়, তখন তা কেবল সেই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না। আজকের এই সংযুক্ত পৃথিবীতে তা মুহূর্তের মধ্যে হয়ে দাঁড়ায় সমগ্র মানবতার সংকট। মানবাধিকারের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই, এটি সর্বজনীন।

এই আর্টিকেলে আমরা মানুষের অধিকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইনের খুঁটিনাটি, যুদ্ধকালীন মানবিকতা এবং সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলব। আন্তর্জাতিক আইন কীভাবে কাজ করে, কিংবা আদৌ কাজ করে কি না – সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। প্রতিটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, অনেকটা সুতোর মতো। এক জায়গায় টান দিলে পুরো কাপড়টাই নড়ে ওঠে। চলুন, বিশ্বমঞ্চে মানুষের অধিকারের এই জটিল কিন্তু অবশ্যম্ভাবী যাত্রার গল্পটা শুরু করা যাক।

মানবাধিকারের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন (Magna Carta, American Revolution, French Revolution)

প্রাচীন ধারণা এবং অধিকারের দার্শনিক বিবর্তন

মানুষের অধিকারের ধারণাটি কোনো একদিন সকালে হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি। বর্তমান সময়ে আমরা যে মানবাধিকারের কথা বলি, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের এক দীর্ঘ এবং ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাস। প্রাচীনকালের সমাজব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার বলে তেমন কিছু ছিল না। রাজারা ছিলেন সর্বেসর্বা, আর সাধারণ মানুষ ছিল কেবলই প্রজা। মেসোপটেমিয়ার হাম্বুরাবির কোড বা প্রাচীন অন্যান্য আইনি কাঠামোগুলো মূলত সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য নয়। তবে এই প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেই প্রথমবারের মতো ন্যায়বিচার এবং আইনের একটি লিখিত রূপ মানুষের সামনে আসতে শুরু করে। অধিকারের এই বিবর্তনে একটি বড় বাঁক আসে প্রাচীন গ্রিস এবং রোম সাম্রাজ্যের সময়কালে। গ্রিক দার্শনিকরা সমাজে আইনের শাসন এবং নাগরিকত্বের ধারণার ওপর জোর দিতে শুরু করেন। তারা মনে করতেন, সমাজের প্রতিটি মানুষের কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব এবং অধিকার থাকা উচিত। এই চিন্তাধারাই পরবর্তীতে অধিকারের দার্শনিক ভিত্তি তৈরিতে বিশাল ভূমিকা রাখে।

অধিকারের এই দার্শনিক যাত্রায় সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনটি নিয়ে আসে স্টোয়িকবাদ (Stoicism)। স্টোয়িক দার্শনিকরা একটি যুগান্তকারী চিন্তার জন্ম দেন, যা প্রাকৃতিক আইন (Natural Law) নামে পরিচিতি লাভ করে। তাদের মতে, পুরো মহাবিশ্ব একটি যৌক্তিক এবং প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত হয় এবং মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণেই প্রতিটি মানুষের ভেতরে সেই যৌক্তিকতার একটি অংশ থাকে। রোমান দার্শনিক এবং রাষ্ট্রনায়ক মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো (Marcus Tullius Cicero) এই প্রাকৃতিক আইনের ধারণাকে আরও সুনির্দিষ্ট রূপ দেন। সিসেরো যুক্তি দেখান যে, মানুষের অধিকারগুলো কোনো রাজা বা সম্রাটের দয়ার দান নয়। এই অধিকারগুলো প্রকৃতির নিয়মেই মানুষের প্রাপ্য। রাজা চাইলেই তার ইচ্ছেমতো আইন বানিয়ে মানুষের এই জন্মগত অধিকার কেড়ে নিতে পারেন না। সিসেরোর এই চিন্তাধারা সে সময়ের জন্য ছিল একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক বিস্ফোরণ। কারণ, এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় আইনের ঊর্ধ্বে মানুষের একটি চিরন্তন এবং সর্বজনীন অধিকারের কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়। এই প্রাকৃতিক আইনের ধারণাই শত শত বছর ধরে ইউরোপের চিন্তাবিদদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করেছে (Ishay, 2008)।

মধ্যযুগে এসে ইউরোপের সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সামন্তবাদের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হতো তার জমির মালিকানা এবং জন্মগত সামাজিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। একজন সাধারণ কৃষকের জীবন, সম্পত্তি এবং বিচারের ভার পুরোপুরি তার এলাকার সামন্ত প্রভুর মর্জির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই দীর্ঘ সময়টিতে ব্যক্তির স্বাধীন সত্তার কোনো স্বীকৃতি ছিল না। রাজারা দাবি করতেন যে তারা সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়েছেন, যাকে ঈশ্বরের প্রদত্ত অধিকার (Divine Right of Kings) বলা হতো। এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বা অভিজাত শ্রেণি কেউই সহজে কথা বলার সাহস পেত না। তারপরও এই অন্ধকারের মাঝেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাজার ক্ষমতাকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য ছোট ছোট লড়াই শুরু হয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে যে, ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বেঁধে না রাখলে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা থাকে না। এই বোধ এবং প্রাকৃতিক আইনের দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে মানবাধিকারের ইতিহাসের প্রথম বড় মাইলফলকটির জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে।

ম্যাগনা কার্টা এবং আইনি শাসনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত

ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বেশ উত্তাল। রাজা জনের শাসনকাল নানা কারণে ইংরেজ অভিজাত শ্রেণি বা ব্যারনদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। রাজা জন ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে প্রচুর অর্থ নষ্ট করেন এবং সেই অর্থের জোগান দিতে ব্যারনদের ওপর যথেচ্ছভাবে কর আরোপ করতে শুরু করেন। কেউ কর দিতে অস্বীকার করলে রাজা তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতেন বা তাকে বিনা বিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করতেন। রাজার এই স্বেচ্ছাচারিতা এবং আইনের তোয়াক্কা না করার প্রবণতা ব্যারনদের শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেয়। ১২১৫ সালের জুন মাসে টেমস নদীর ধারের রানিমিড নামক একটি প্রান্তরে ব্যারনরা রাজাকে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটিই ম্যাগনা কার্টা (Magna Carta) বা স্বাধীনতার মহাসনদ নামে বিশ্ব ইতিহাসে পরিচিত। এই সনদে মোট ৬৩টি অনুচ্ছেদ ছিল, যেখানে রাজার ক্ষমতাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় এবং ব্যারনদের কিছু অধিকারের লিখিত স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটি কোনোভাবেই আজকের দিনের মতো সাধারণ মানুষের মানবাধিকারের দলিল ছিল না, বরং এটি ছিল রাজা এবং অভিজাত শ্রেণির মধ্যকার একটি ক্ষমতার আপস-রফা (Holt, 1992)।

ম্যাগনা কার্টা সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি না হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি অনুচ্ছেদ পুরো বিশ্বের আইনি ইতিহাসে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। সনদের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় যে, দেশের প্রচলিত আইন এবং সমকক্ষদের দ্বারা বিচার ব্যতীত কোনো স্বাধীন মানুষকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দী, সম্পত্তিচ্যুত বা নির্বাসিত করা যাবে না। এই একটি বাক্য মূলত আধুনিক বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভিত্তিটি স্থাপন করে, যা যথোপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া (Due Process of Law) নামে পরিচিত। এর অর্থ হলো, রাজা চাইলেই নিজের খেয়ালখুশিমতো কাউকে শাস্তি দিতে পারবেন না, তাকে অবশ্যই দেশের আইনের পথ অনুসরণ করতে হবে। এই অনুচ্ছেদটি প্রথমবারের মতো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণা প্রতিষ্ঠা করে যে, আইন রাজার চেয়েও বড়। রাজাকেও আইনের অধীনে থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ আইনজ্ঞ এডওয়ার্ড কোক (Edward Coke) এই ম্যাগনা কার্টাকে একটি পবিত্র আইনি দলিল হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি সপ্তদশ শতাব্দীতে স্টুয়ার্ট রাজাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় ম্যাগনা কার্টাকে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

কালের পরিক্রমায় ম্যাগনা কার্টা কেবল একটি আইনি চুক্তি থেকে স্বাধীনতার একটি কালজয়ী প্রতীকে পরিণত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এই সনদের অধিকারগুলো কেবল ‘স্বাধীন মানুষ’ অর্থাৎ ব্যারন বা নাইটদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। সমাজের বিশাল একটি অংশ, যারা ভূমিদাস হিসেবে কাজ করত, তারা এই সনদের কোনো সুবিধাই পায়নি। তারপরও ম্যাগনা কার্টার গুরুত্ব এর দার্শনিক বার্তার মধ্যে নিহিত। এটি মানুষের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয় যে, লিখিত আইনের মাধ্যমে শাসকের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব। এই সনদের পথ ধরেই ইংল্যান্ডে পরবর্তীতে হেবিয়াস কর্পাস আইন এবং বিল অব রাইটসের মতো যুগান্তকারী আইনগুলো পাস হয়। ম্যাগনা কার্টা প্রমাণ করে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কখনো নিরঙ্কুশ হতে পারে না। শাসকের ক্ষমতার সাথে শাসিতের অধিকারের একটি ভারসাম্য থাকতে হবে। এই একটি দলিল শত শত বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মানুষকে সাহস জুগিয়েছে এবং আধুনিক মানবাধিকারের কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে।

আমেরিকান বিপ্লব এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে মানবাধিকারের আলোচনায় একটি নতুন এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা হয় আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে। উত্তর আমেরিকার তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশ দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল। ব্রিটিশ সরকার উপনিবেশগুলোর ওপর নানা ধরনের কর আরোপ করতে শুরু করে, কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উপনিবেশের মানুষদের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। এই অবিচারের বিরুদ্ধে ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়’ স্লোগান তুলে আমেরিকার সাধারণ মানুষ ফুঁসে ওঠে। এই বিদ্রোহ কেবল কর কমানোর জন্য ছিল না, এটি ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি তাত্ত্বিক লড়াই। এই সময়ে ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তির যুগের দার্শনিকদের চিন্তাধারা আমেরিকার নেতাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইংরেজ দার্শনিক জন লক (John Locke) তার টু ট্রিটাইজেস অব গভর্নমেন্ট (Two Treatises of Government) বইয়ে যে প্রাকৃতিক অধিকার এবং সামাজিক চুক্তির কথা বলেছিলেন, আমেরিকার নেতারা সেই তত্ত্বকে তাদের বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে একটি সরকার যদি জনগণের প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে (Armitage, 2007)।

এই দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার নেতারা একটি ঐতিহাসিক দলিল গ্রহণ করেন, যা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Declaration of Independence) নামে পরিচিত। এই ঘোষণাপত্রের মূল খসড়া তৈরি করেছিলেন টমাস জেফারসন (Thomas Jefferson)। জেফারসন এই দলিলে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় কিছু চিরন্তন সত্য তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, “আমরা এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি যে, সকল মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট এবং তাদের স্রষ্টা তাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার দান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের সন্ধান।” এই বাক্যটি ছিল মানবাধিকারের ইতিহাসে এক বিশাল ভূমিকম্পের মতো। এর আগে পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি যে মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণেই সবার সমান অধিকার রয়েছে। জেফারসনের এই ঘোষণাপত্র রাজা বা সম্রাটের ক্ষমতার উৎসকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে সাধারণ মানুষের সম্মতিকে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং মানবিক সংজ্ঞা।

আমেরিকান বিপ্লব এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, এটি পুরো বিশ্বের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়। অবশ্য এই ঘোষণাপত্রের একটি বড় ঐতিহাসিক বৈপরীত্যও রয়েছে। যে নেতারা ‘সকল মানুষ সমান’ কথাটি লিখেছিলেন, তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনে দাসপ্রথার সাথে যুক্ত ছিলেন। সেই সময়ে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না এবং আদিবাসী আমেরিকানদের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছিল। এই সীমাবদ্ধতাগুলোর পরও ঘোষণাপত্রের মূল আদর্শগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। পরবর্তীতে দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলন বা নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা এই ঘোষণাপত্রের কথাগুলোকেই নিজেদের অধিকার আদায়ের প্রধান যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আমেরিকার এই বিপ্লব প্রমাণ করে দেয় যে অধিকার আদায়ের জন্য মানুষ একটি পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও জয়লাভ করতে পারে। এটি ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকার স্বাধীনতাকামী মানুষদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করে এবং আধুনিক মানবাধিকারের ধারণাকে একটি শক্ত রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করায়।

ফরাসি বিপ্লব এবং অধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র

আমেরিকায় যখন স্বাধীনতার বাতাস বইছে, ঠিক সেই সময়ে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ফ্রান্স এক গভীর সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফরাসি সমাজ ব্যবস্থা তখন তিনটি এস্টেট বা শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যাজক এবং অভিজাত শ্রেণি সমাজের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত এবং তাদের কোনো কর দিতে হতো না। অন্যদিকে, সমাজের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ – যাদের মধ্যে কৃষক, কারিগর এবং ব্যবসায়ীরা ছিলেন – তারা করের ভারে জর্জরিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। এই চরম বৈষম্য এবং খাদ্যাভাবের কারণে ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে এক বিশাল গণবিস্ফোরণ ঘটে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে পুরো রাজতন্ত্রকে ভস্মীভূত করে দেয়। ফরাসি বিপ্লবীরা প্যারিসের বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটিয়ে তাদের বিপ্লবের সূচনা করেন। এই বিপ্লবের পেছনে দার্শনিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন জঁ-জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) এবং ভলতেয়ারের মতো চিন্তাবিদরা। ফরাসি জনগণ স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের স্লোগান তুলে রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারকে চিরতরে উপড়ে ফেলার শপথ গ্রহণ করে (Hunt, 2007)।

বিপ্লবের এই উত্তাল সময়ে ফরাসি জাতীয় পরিষদ একটি ঐতিহাসিক দলিল প্রণয়ন করে, যা ১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র (Declaration of the Rights of Man and of the Citizen) নামে গৃহীত হয়। এই দলিলের খসড়া তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ফরাসি নেতা মার্কুইস দে লাফায়েত (Marquis de Lafayette), যাকে এই কাজে সহায়তা করেছিলেন আমেরিকায় নিযুক্ত থমাস জেফারসন। এই ঘোষণাপত্রটি আমেরিকান ঘোষণাপত্রের চেয়েও অনেক বেশি সার্বজনীন এবং দার্শনিক দিক থেকে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ছিল। এতে বলা হয়, মানুষ স্বাধীন ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং সারা জীবন সেই অধিকার ভোগ করে। স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ – এই চারটি অধিকারকে মানুষের প্রাকৃতিক এবং অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে আরও বলা হয় যে আইনের চোখে সব নাগরিক সমান এবং যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্রের যেকোনো পদে নিয়োগ পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। এই ঘোষণাপত্রটি ছিল মূলত সামন্তবাদ এবং বংশানুক্রমিক সুবিধার বিরুদ্ধে একটি শক্ত আইনি চপেটাঘাত।

ফরাসি বিপ্লবের এই ঘোষণাপত্রটি মানবাধিকারের ধারণাকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ম্যাগনা কার্টা বা ইংলিশ বিল অব রাইটস মূলত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষের আইনি অধিকার নিয়ে কথা বলেছিল। ফরাসি ঘোষণাপত্রটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মানবজাতির অধিকারের কথা ঘোষণা করে। তারা অধিকারের একটি সার্বজনীনতা (Universality) প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। অবশ্য বিপ্লবের পরবর্তী বছরগুলোতে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চরম আকার ধারণ করে। ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবেসপিয়ের (Maximilien Robespierre)-এর নেতৃত্বে ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয় এবং অধিকারের কথা বলে হাজার হাজার মানুষকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। এই রক্তপাত প্রমাণ করে যে কেবল অধিকারের কথা ঘোষণা করলেই সমাজে শান্তি আসে না, সেই অধিকার রক্ষার জন্য একটি স্থিতিশীল এবং সহনশীল রাজনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন। এত রক্তপাত এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পরও ফরাসি বিপ্লবের সেই ঘোষণাপত্রটির আবেদন কখনোই ম্লান হয়নি। এটি পুরো ইউরোপের রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে বদলে দেয় এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের একটি চিরস্থায়ী স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিল অব রাইটস এবং আধুনিক মানবাধিকারের কাঠামোগত ভিত্তি

আমেরিকার স্বাধীনতার পর যখন নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন সেখানে এক নতুন ধরনের বিতর্কের জন্ম হয়। ১৭৮৭ সালে তৈরি করা মূল সংবিধানে সরকারের কাঠামো এবং ক্ষমতার কথা বলা হলেও, নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার জন্য সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা ছিল না। এই বিষয়টি নিয়ে অনেকেই তীব্র আপত্তি তোলেন। তারা যুক্তি দেখান যে, সরকারের ক্ষমতাকে নির্দিষ্ট করে না দিলে এই নতুন সরকারও ভবিষ্যতে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের মতো স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য সংবিধানে অধিকারের একটি স্পষ্ট তালিকা থাকা অপরিহার্য বলে তারা মনে করেন। এই দাবির মুখে আমেরিকার অন্যতম প্রধান স্থপতি জেমস ম্যাডিসন (James Madison) সংবিধানের প্রথম দশটি সংশোধনী খসড়া করেন। ১৭৯১ সালে এই সংশোধনীগুলো চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়, যা ইতিহাসে বিল অব রাইটস (Bill of Rights) নামে পরিচিতি লাভ করে (Dunn, 1999)।

এই বিল অব রাইটস আধুনিক মানবাধিকারের আইনি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিশাল রূপান্তর নিয়ে আসে। এতে মানুষের বেশ কিছু মৌলিক অধিকারকে সাংবিধানিক সুরক্ষার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়। প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তী সংশোধনীগুলোতে নাগরিকদের অকারণে তল্লাশি থেকে মুক্তি, সুষ্ঠু বিচারের অধিকার এবং নিষ্ঠুর শাস্তির হাত থেকে বাঁচার অধিকারগুলোকে স্পষ্ট আইনি ভাষা দেওয়া হয়। এই অধিকারগুলো কেবল ভালো কথার স্তূপ ছিল না; এগুলোকে আদালতের মাধ্যমে প্রয়োগযোগ্য নাগরিক স্বাধীনতা (Civil Liberties) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে রাষ্ট্র চাইলেই সংখ্যাগরিষ্ঠের দোহাই দিয়ে কোনো নাগরিকের এই অধিকারগুলো কেড়ে নিতে পারে না। বিল অব রাইটস মূলত প্রাকৃতিক অধিকারের সেই পুরনো দার্শনিক ধারণাগুলোকে আধুনিক আদালতের কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসে একটি অত্যন্ত বাস্তব এবং শক্তিশালী রূপ দান করে।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ম্যাগনা কার্টা থেকে শুরু করে আমেরিকান এবং ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা মূলত মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠারই এক নিরন্তর সংগ্রাম। ম্যাগনা কার্টা দেখিয়েছিল যে শাসকের ক্ষমতা অসীম নয়। আমেরিকান বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে অধিকার মানুষের জন্মগত এবং শাসকের ক্ষমতার উৎস সাধারণ মানুষ। আর ফরাসি বিপ্লব এই অধিকারগুলোকে একটি সার্বজনীন রূপ দিয়েছিল। এই তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনা একত্রে মিলে একটি শক্ত তাত্ত্বিক এবং আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, যার ওপর ভর করে বিংশ শতাব্দীর মানবাধিকার আন্দোলন তার ডানা মেলতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে যখন জাতিসংঘ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র তৈরি করে, তখন সেই দলিলের প্রতিটি অনুচ্ছেদে এই ঐতিহাসিক বিপ্লবগুলোর চেতনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। অধিকারের এই বিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানবাধিকার কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। এটি যুগে যুগে মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং সচেতনতার মধ্য দিয়ে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া, যা একটি মানবিক পৃথিবী গড়ার স্বপ্নকে প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখে।

মানবাধিকারের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক বোঝাপড়া (Philosophical and Theoretical Understanding of Human Rights)

প্রাকৃতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রাথমিক ধারণা

অধিকার জিনিসটা আসলে কী? কেউ কি আমাদের এটা দয়া করে দেয়? দার্শনিকরা বলেন, না। মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণেই কিছু অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের প্রাপ্য (Sen, 2004)। একে বলা হয় প্রাকৃতিক অধিকার (Natural Rights)। রাষ্ট্র বা কোনো রাজা এই অধিকার সৃষ্টি করেনি, তাই তারা চাইলেই তা কেড়ে নিতে পারে না। মানবাধিকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদার (Inherent Dignity) ওপর। প্রাচীন গ্রিক দর্শন থেকে শুরু করে মধ্যযুগের নানা লেখায় এই অধিকারের ধারণাটি বিভিন্নভাবে ঘুরেফিরে এসেছে। তবে বিষয়টি সবচেয়ে পোক্ত রূপ পায় সপ্তদশ শতাব্দীতে। সেসময় ইংরেজ দার্শনিক জন লক (John Locke) তার বিখ্যাত বই টু ট্রিটাইজেস অব গভর্নমেন্ট (Two Treatises of Government)-এ স্পষ্টভাবে বললেন, প্রতিটি মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির ওপর জন্মগত অধিকার রয়েছে। এই অধিকারগুলো ঈশ্বরপ্রদত্ত বা প্রকৃতির আদি নিয়ম থেকেই পাওয়া। রাজা বা শাসকের মূল কাজ হলো এই অধিকারগুলো পাহারা দেওয়া। কোনো শাসক যদি সেই কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই শাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার। লকের এই সহজ চিন্তাটি সেকালের রাজনৈতিক কাঠামোতে রীতিমতো ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছিল। কারণ তার আগে সবাই ধরে নিত, রাজার কথাই শেষ কথা এবং রাজার ইচ্ছাই হলো চূড়ান্ত আইন। কিন্তু লক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, রাজার ক্ষমতার ঊর্ধ্বেও মানুষের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে, যা কোনো পরিস্থিতিতেই বাতিল করা যায় না।

অন্যদিকে আরেক বিখ্যাত দার্শনিক থমাস হবস (Thomas Hobbes) বিষয়টি একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন। তার সাড়া জাগানো লেভিয়াথান (Leviathan) বইতে তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনের অনেক আগে মানুষ এক ধরনের প্রাকৃতিক অবস্থায় বা স্টেটস অব নেচারে বাস করত। সেখানে কোনো আইন-কানুন ছিল না, ফলে সবার জীবন ছিল সবসময় হুমকিপূর্ণ। যে কেউ যেকোনো সময় অপরের সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে পারত বা কাউকে আঘাত করতে পারত। এই নিরাপত্তাহীনতা এবং মৃত্যুভয় থেকে বাঁচতেই মানুষ নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং রাষ্ট্র নামের এক শক্তিশালী কাঠামোর জন্ম দেয়। হবস যদিও শক্তিশালী শাসকের পক্ষে ছিলেন, তারপরও তার তত্ত্বে একটি বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল – মানুষ মূলত নিজের জীবন রক্ষার জন্যই রাষ্ট্রের কাছে কিছু ক্ষমতা হস্তান্তর করে। অর্থাৎ জীবনের অধিকারটুকু রক্ষার তাগিদেই রাষ্ট্র বা সমাজকাঠামোর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজই হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অধিকারের এই ধারণাটি মোটেও কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়। মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে শুরু করার পর থেকেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু অলিখিত নিয়ম তৈরি করে নিয়েছিল, যা কালক্রমে দার্শনিকদের লেখনীতে তাত্ত্বিক রূপ লাভ করে।

প্রাকৃতিক অধিকারের এই পুরোনো ধারণাটিই কালের বিবর্তনে আজকের আধুনিক মানবাধিকারের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সময়ের সাথে সাথে এর সংজ্ঞায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে কেবল জীবন বা সম্পত্তির কথা বলা হতো, এখন সেখানে মানুষের সার্বিক বিকাশের কথা বলা হয়। অধিকারকে আর কেবল বেঁচে থাকার হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্র হয়তো সংসদে আইন পাস করে এই অধিকারগুলোকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু রাষ্ট্র কখনোই এই অধিকারগুলোর জন্মদাতা নয়। রাষ্ট্র বড়জোর একজন পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে পারে। একজন মানুষ যখন পৃথিবীতে আসে, সে তার অস্তিত্বের মাঝেই এই দাবিগুলো নিয়ে আসে। এগুলো কেউ কাউকে দান করে না বা উৎসবের উপহার হিসেবে দেয় না। তাই কোনো সরকার বা ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান যদি দাবি করে যে তারা জনগণকে অধিকার দিচ্ছে, তবে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই দাবি সম্পূর্ণ ভুল। অধিকার দেওয়া যায় না, অধিকার কেবল সযত্নে রক্ষা করা যায় অথবা নিষ্ঠুরভাবে লঙ্ঘন করা যায়।

সামাজিক চুক্তি ও শাসকের বাধ্যবাধকতা

অধিকারের আলোচনায় অবধারিতভাবেই রাষ্ট্র এবং নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি চলে আসে। আমরা কেন রাষ্ট্রের আইন মেনে চলি? রাষ্ট্র কেন আমাদের ওপর কর বসায় বা নিয়ম চাপিয়ে দেয়? এই প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর খুঁজতে গিয়ে দার্শনিকরা সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব (Social Contract Theory) তৈরি করেছেন। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, রাষ্ট্র কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে আকাশ থেকে নেমে আসেনি। সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের জন্য একমত হয়ে রাষ্ট্র নামের এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে। ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (The Social Contract)-এ লিখেছেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সমাজের সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত। এই শৃঙ্খলগুলো মানুষ নিজেই তৈরি করেছে একটি সুশৃঙ্খল সমাজের আশায়। রুশোর মতে, সমাজ বা রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো জনগণের সাধারণ ইচ্ছা বা জেনারেল উইল। এর মানে দাঁড়ায়, রাষ্ট্র এমন কোনো আইন বা নিয়ম তৈরি করতে পারবে না যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্যাণের পরিপন্থী। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল উৎস দেশের জনগণ, কোনো রাজা বা সামরিক স্বৈরশাসক নয়। ফলে রাষ্ট্র যখন কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করে, তখন সে মূলত সেই আদি সামাজিক চুক্তিরই সরাসরি বরখেলাপ করে।

চুক্তির এই অভিনব ধারণাটি মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। আগে ব্যাপকভাবে মনে করা হতো মানুষের অধিকার নির্ভর করে শাসকের মর্জির ওপর। শাসক দয়ালু হলে মানুষ শান্তিতে থাকবে, আর শাসক অত্যাচারী হলে মানুষকে নীরবে সবকিছু সইতে হবে। কিন্তু সামাজিক চুক্তির ধারণা এই পুরোনো সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দিল। এখন রাষ্ট্রকে আর দয়ালু রক্ষক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং তাকে একটি কঠিন বাধ্যবাধকতার জালে আটকে ফেলা হয়। নাগরিকরা রাষ্ট্রকে ক্ষমতা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই ক্ষমতার একটি খুব স্পষ্ট সীমা থাকে। রাষ্ট্র কোনোভাবেই ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তা, ধর্মীয় বিশ্বাস বা বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। মানুষ তার প্রাকৃতিক স্বাধীনতার কিছু অংশ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় শুধু এই শর্তে যে, রাষ্ট্র তার বদলে তাকে শতভাগ নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীন একটি জীবন নিশ্চিত করবে। সুতরাং, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা নিজেই নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রের প্রতি আর কোনো আনুগত্য দেখানোর বাধ্যবাধকতা থাকে না।

এই দার্শনিক অবস্থান থেকেই পরবর্তীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় বড় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এবং অনেক পরাক্রমশালী স্বৈরাচারী শাসকের পতন ঘটেছে। অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করাটা তাই কেবল সাময়িক আবেগ নয়, এর পেছনে একটি শক্ত আইনি ও তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে। আমরা যখন মানবাধিকারের কথা বলি, তখন আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই অলিখিত চুক্তির কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিই। রাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী হতে পারে, তার হাতে সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী বা পুলিশ থাকতে পারে, তারপরও দার্শনিক মানদণ্ডে রাষ্ট্র জনগণের সেবক মাত্র। নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, এটি তার অস্তিত্ব টিকে থাকার প্রধান শর্ত। এই শর্ত ভঙ্গ করলে রাষ্ট্রের বৈধতা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঠিক এই জায়গাটিতেই তীক্ষ্ণ নজর রাখে। কোনো দেশ যখন তার নিজের নাগরিকদের অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করতে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক আইন সেই দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের যুক্তিকে আর গ্রাহ্য করে না। কারণ চুক্তির বরখেলাপ করে কোনো রাষ্ট্রই তার শাসন করার বৈধতা অনন্তকাল ধরে রাখতে পারে না।

উপযোগবাদ বনাম মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা

দর্শনশাস্ত্রে অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হলো সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ বনাম ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার। অষ্টাদশ শতাব্দীতে উপযোগবাদ (Utilitarianism) নামে একটি নতুন দার্শনিক চিন্তার উদ্ভব হয়, যা পুরো ইউরোপে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এই চিন্তাধারার অন্যতম প্রবক্তা জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham) দৃঢ়ভাবে মনে করতেন, আইন বা রাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বোচ্চ সুখ নিশ্চিত করা। বেন্থামের কাছে অধিকার বা প্রাকৃতিক আইন বলতে কিছু ছিল না, তিনি এগুলোকে কাল্পনিক কথাবার্তা বা ননসেন্স আপন স্টিলটস বলে অবজ্ঞা করেছিলেন। উপযোগবাদীদের যুক্তি বেশ সহজ এবং আপাতদৃষ্টিতে খুব গোছানো। তারা মনে করেন, কোনো একটি কাজের ফলাফল যদি সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জন্য ভালো হয়, তবে কাজটি নৈতিকভাবে শতভাগ সঠিক। কিন্তু এই গোছানো চিন্তাধারার ভেতরে একটি ভয়ংকর বিপদের ফাঁদ লুকিয়ে আছে। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সুখের জন্য গুটিকয়েক নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার করা হয়, উপযোগবাদের দৃষ্টিতে সেটি পুরোপুরি বৈধ হয়ে যায়। অর্থাৎ, দশজনের কল্যাণের জন্য একজনকে বলির পাঁঠা বানানো এই তত্ত্বে দোষণীয় কিছু নয়। মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় ঠিক এখানেই, কারণ মানবাধিকার কখনো বৃহত্তর কল্যাণের দোহাই দিয়ে একজনের ওপর নিপীড়নকে মেনে নেয় না।

বেন্থামের এই চিন্তার সবচেয়ে মোক্ষম ও দার্শনিক জবাব দিয়েছিলেন জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant)। কান্টের দর্শন ছিল উপযোগবাদীদের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। তিনি মানুষের জীবনের মর্যাদাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন। কান্টের মতে, প্রতিটি মানুষ নিজের কাছে নিজেই একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য, তাকে কখনো অন্য কোনো বৃহত্তর উদ্দেশ্য হাসিলের সাধারণ মাধ্যম বা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তিনি একে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন ক্যাটাগরিকাল ইম্পারেটিভ (Categorical Imperative) হিসেবে। কান্ট খুব স্পষ্ট করে বলেছিলেন, আপনি দশজনকে বাঁচানোর জন্য একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পারেন না। কারণ ওই একজন মানুষেরও নিজস্ব আত্মমর্যাদা ও বেঁচে থাকার অলঙ্ঘনীয় অধিকার রয়েছে, যা সমাজের কোনো গণিত বা হিসাব-নিকাশ দিয়ে বাতিল করা যায় না। উপযোগবাদীরা যেখানে মানুষের অধিকারকে সমাজের লাভের পাল্লায় মেপে দেখেন, কান্ট সেখানে অধিকারকে মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সগৌরবে ঘোষণা করেন। তার মতে, অধিকার কোনো বাজারের দরকষাকষির বিষয় নয়। সমাজ বা রাষ্ট্রের যতই সাময়িক উপকার হোক না কেন, কোনো মানুষের মৌলিক মর্যাদায় আঘাত করা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং অগ্রহণযোগ্য।

আধুনিক মানবাধিকারের তাত্ত্বিক কাঠামো মূলত কান্টের এই বলিষ্ঠ দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন বিশ্বজুড়ে নির্যাতন, বৈষম্য বা অবিচারের প্রতিবাদ করি, তখন আসলে কান্টের সেই অন্তর্নিহিত মর্যাদার কথাই বারবার ঘুরেফিরে আসে। দাসপ্রথা বাতিল, বর্ণবাদ বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন বা নারী অধিকার – এসবকিছুর মূলেই রয়েছে উপযোগবাদকে ছাপিয়ে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক নিরন্তর লড়াই। রাষ্ট্র অনেক সময় মেগা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বা জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চায়। তারা বোঝানোর চেষ্টা করে যে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কিছু মানুষকে সামান্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিন্তু মানবাধিকারের দর্শন এই ধরনের যুক্তিতর্ককে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। একটি আদর্শ সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা বা মত কখনোই একজন সাধারণ ব্যক্তির মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করার লাইসেন্স হতে পারে না। ফলে কান্টের দর্শন আমাদের খুব ভালোভাবে শিখিয়েছে অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস নেই, কোনো বৃহত্তর কল্যাণের ধোঁয়াশা তুলে মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদাকে তিল পরিমাণ ছোট করা যাবে না।

অধিকারের আধুনিক ভিত্তি ও সক্ষমতা

বিংশ শতাব্দীতে এসে অধিকারের তাত্ত্বিক আলোচনায় সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়। আগে দার্শনিকরা মূলত প্রাকৃতিক অধিকার বা নৈতিকতার দিকটিতেই বেশি জোর দিতেন। কিন্তু আধুনিক সময়ে অধিকারের ধারণাকে আরও অনেক বেশি বাস্তবমুখী এবং প্রয়োগযোগ্য করার চেষ্টা শুরু হয়। কারণ, কেবল কাগজে-কলমে বড় বড় অধিকার থাকলেই হয় না, সেই অধিকার ভোগের প্রকৃত সামর্থ্যও মানুষের থাকতে হয়। একজন হতদরিদ্র মানুষকে যদি বলা হয় তোমার স্বাধীনভাবে সারা দেশ ভ্রমণ করার অধিকার আছে, তবে তার কাছে এই গালভরা অধিকারের কোনো মূল্য নেই, কারণ তার পকেটে বাসভাড়া দেওয়ার টাকা নেই। এই কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আধুনিক তাত্ত্বিকরা অধিকারের ভিত্তিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র যদি কেবল মানুষের ব্যক্তিগত কাজে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকে, তবেই সব অধিকার নিশ্চিত হয়ে যায় না। মানুষকে তার অধিকারগুলো সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ এবং সুযোগ করে দেওয়াটাও রাষ্ট্রের জন্য সমভাবে জরুরি। আর এভাবেই মানবাধিকারের আলোচনা কেবল আইনের শুষ্ক বই থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।

এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম পথিকৃৎ হলেন অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন (Amartya Sen)। তিনি অধিকারকে কেবল কিছু আইনি সুযোগ হিসেবে না দেখে, মানুষের সক্ষমতা বা ক্যাপাবিলিটি হিসেবে দেখার এক যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন। তার উদ্ভাবিত সক্ষমতা তত্ত্ব (Capability Approach) অনুযায়ী, একজন মানুষ তার জীবনে কী হতে পারে বা বাস্তবে কী করতে পারে, সেটাই তার প্রকৃত স্বাধীনতা। সেন মনে করেন, দারিদ্র্য কেবল টাকার অভাব নয়, বরং এটি হলো মানুষের সক্ষমতার চরম অভাব, যা তার মানবাধিকারকেই সরাসরি ক্ষুণ্ণ করে। তার সাড়া জাগানো বই ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম (Development as Freedom)-এ তিনি খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। একজন মানুষের ভোটাধিকার থাকা যেমন জরুরি, তেমনি তার পেট ভরা থাকাও সমভাবে জরুরি। সেনের এই তত্ত্ব মানবাধিকারের পুরোনো সংজ্ঞাকে বিশাল একটি ক্যানভাসে নিয়ে গেছে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজকাঠামো মানবাধিকারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে।

আধুনিক দর্শনে অধিকারকে মূলত দুটি বড় ভাগে ভাগ করে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এর মধ্যে একটি হলো নেতিবাচক অধিকার (Negative Rights), যার সহজ অর্থ হলো রাষ্ট্র বা অন্য কেউ মানুষের স্বাধীনতায় অযাচিত বাধা দেবে না। যেমন নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। অন্যদিকে রয়েছে ইতিবাচক অধিকার (Positive Rights), যার মানে হলো রাষ্ট্র নিজে থেকে সক্রিয়ভাবে নাগরিকদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেবে। যেমন সবার জন্য শিক্ষার অধিকার, বাসস্থানের অধিকার বা কাজের অধিকার। দার্শনিকদের মধ্যে এই দুই ধরনের অধিকার নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রের কেবল নেতিবাচক অধিকারগুলো নিশ্চিত করলেই চলে, বাকিটা মানুষ নিজের চেষ্টায় অর্জন করে নেবে। কিন্তু আধুনিক মানবাধিকার তাত্ত্বিকরা বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন, ইতিবাচক অধিকার ছাড়া নেতিবাচক অধিকারগুলো পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে যায়। একজন অক্ষরজ্ঞানহীন ও রোগাক্রান্ত মানুষ কখনোই তার কথা বলার স্বাধীনতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না। ফলে আজকের দিনে মানবাধিকার বলতে কেবল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে মুক্তি বোঝায় না, বরং একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধাকেও বোঝায়।

সর্বজনীনতা ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার দ্বন্দ্ব

মানবাধিকারের আলোচনায় সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল বিতর্কগুলোর একটি হলো এটি কি সারা বিশ্বের সব মানুষের জন্য সমান, নাকি স্থান ও সংস্কৃতির ভেদে এটি ভিন্ন হতে পারে? একদল তাত্ত্বিক গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, মানবাধিকার হলো সর্বজনীন। অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো দেশে বা সমাজে মানুষের কিছু মৌলিক অধিকার ঠিক একই রকম থাকবে। এই জোরালো ধারণাকে বলা হয় সর্বজনীনতা (Universalism)। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু আমরা সবাই দিনশেষে মানুষ, আমাদের সবার রক্তের রং এক এবং আমাদের সবারই কষ্ট বা ব্যথা অনুভব করার অভিন্ন ক্ষমতা আছে, তাই আমাদের অধিকারগুলোও অভিন্ন হওয়া উচিত। প্যারিসের একজন আধুনিক নাগরিকের যেমন মতপ্রকাশের অধিকার আছে, আফ্রিকার গহিন জঙ্গলে বাস করা কোনো আদিবাসীরও ঠিক একই অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র মূলত এই সর্বজনীনতার ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে, যেখানে ধরে নেওয়া হয়েছে পুরো পৃথিবী মানবাধিকারের একটি নির্দিষ্ট ও অভিন্ন নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলবে।

তবে এই ধারণার কড়া সমালোচনা করেছেন প্রাচ্য ও আফ্রিকার আরেক দল চিন্তাবিদ। তারা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Cultural Relativism) তত্ত্বের অবতারণা করেন। তাদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে যেভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক সমাজে তা হয়তো পুরোপুরি মানানসই নয়। কারণ প্রাচ্যের অনেক দেশেই ব্যক্তির চেয়ে পরিবার, সমাজ বা সম্প্রদায়কে অনেক বড় করে দেখা হয়। আপেক্ষিকতাবাদীদের দাবি, পশ্চিমাদের তৈরি করা মানবাধিকারের মানদণ্ড জোর করে অন্য সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা এক ধরনের নতুন সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবীর প্রতিটি সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জীবনযাপন প্রণালী রয়েছে। তাই একটি সমাজকে বাইরে থেকে পশ্চিমা চশমা দিয়ে বিচার করা ভুল। উদাহরণস্বরূপ, কিছু তাত্ত্বিক যুক্তি দেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে কড়া শাসন বা কিছু রাজনৈতিক অধিকার সাময়িকভাবে খর্ব করা প্রয়োজনীয় হতে পারে, যা পশ্চিমা ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তারা জোরালো প্রশ্ন তোলেন, মানবাধিকারের মিষ্টি কথার আড়ালে পশ্চিমা বিশ্ব আসলে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে কি না।

এই দুই বিপরীতমুখী এবং শক্তিশালী চিন্তার মধ্যে একটি কার্যকরী ভারসাম্য আনা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করাটা যেমন দরকার, তেমনি সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন চালানোকেও কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। সংস্কৃতির নামে নারী নির্যাতন, দাসপ্রথা বা ভিন্নমতাবলম্বীদের বিনাবিচারে হত্যা করা কখনোই বৈধ হতে পারে না। তাই আধুনিক তাত্ত্বিকরা একটি মাঝামাঝি রাস্তার কথা বলেন। তারা মনে করেন, জীবন রক্ষার অধিকার, দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার বা বিনাবিচারে আটকে না থাকার অধিকারগুলো সম্পূর্ণ সর্বজনীন। এগুলো নিয়ে কোনো সংস্কৃতির অজুহাত খাটবে না। তবে এই অধিকারগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার পদ্ধতিতে কিছু সাংস্কৃতিক ভিন্নতা থাকতে পারে। অর্থাৎ মূল দর্শনটি একদম ঠিক রেখে সমাজভেদে এর প্রয়োগের ধরনে বৈচিত্র্য থাকতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, মানবাধিকার কোনো পশ্চিমা বা প্রাচ্য দেশীয় একক সম্পত্তি নয়, এটি মানব সভ্যতার একটি সম্মিলিত অর্জন, যা পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতির ভালো দিকগুলোকে ধারণ করে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।

রাষ্ট্রহীন মানুষের অধিকারের গভীর সংকট

তাত্ত্বিক আলোচনার একেবারে শেষ ধাপে এসে আমাদের একটি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। আমরা এতক্ষণ ধরে বললাম যে মানুষ হওয়ার কারণেই আমাদের সবার কিছু প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি সত্যিই তাই ঘটে? ধরুন, কোনো কারণে একজন মানুষের রাষ্ট্র নেই, সে রাষ্ট্রহীন বা উদ্বাস্তু হয়ে অন্য দেশের সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তখন তার এই তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক অধিকার’ কে রক্ষা করবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) এই গভীর সংকটটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেন। তার বিখ্যাত বই দ্য অরিজিনস অব টোটালিটারিয়ানিজম (The Origins of Totalitarianism)-এ তিনি দেখিয়েছেন, মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এটি এমন একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়। মানুষ যখন রাষ্ট্র হারায়, তখন সে আসলে তার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সব আইনি অধিকারই হারিয়ে ফেলে। আরেন্ট একটি যুগান্তকারী শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন, তিনি এর নাম দিয়েছিলেন অধিকার থাকার অধিকার (The Right to Have Rights)। অর্থাৎ অধিকার ভোগ করার আগে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হওয়া, যারা তার অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে।

আরেন্টের এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আমাদের মানবাধিকারের তাত্ত্বিক দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আজ আমরা যখন সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে সমুদ্রে ডুবে মরতে বা কাঁটাতারের বেড়ার এপারে-ওপারে মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখি, তখন আরেন্টের কথাই অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। একজন মানুষের যখন কোনো বৈধ নাগরিক পরিচয় থাকে না, তখন কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা ঘোষণাপত্রই তাকে বাঁচাতে পারে না। রাষ্ট্রবিহীন মানুষ পৃথিবীর বুকে আক্ষরিক অর্থেই অধিকারবিহীন হয়ে পড়ে। এর মানে হলো, আমরা যতই বলি অধিকার জন্মগত, বাস্তবে অধিকার হলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোর ফসল। এই জটিল সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ উত্তর দর্শনশাস্ত্রে নেই। তবে এটি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, কেবল আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভরসা করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বিশ্বজুড়ে এমন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন যেখানে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মূল্যায়ন করার একটি বাস্তবসম্মত উপায় তৈরি হবে, যাতে কোনো মানুষ কেবল তার পাসপোর্ট না থাকার কারণে মৃত্যুর মুখে পতিত না হয়।

ন্যায়বিচার ও বৈশ্বিক মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ

সমসাময়িক এই সংকটগুলোর উত্তরণে মার্কিন দার্শনিক জন রল্স (John Rawls) তার বিখ্যাত ন্যায়বিচার তত্ত্ব (Theory of Justice) দিয়ে একটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন। রল্স বলেছেন, আমরা যদি এমন একটি কাল্পনিক অবস্থায় ফিরে যাই যেখানে আমরা কেউ জানি না সমাজে আমাদের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে – আমরা কি ধনী হবো না গরিব, কোন সম্প্রদায়ে জন্মাব বা আমাদের শারীরিক সক্ষমতা কেমন হবে – তবে আমরা স্বাভাবিকভাবেই এমন কিছু নিয়ম তৈরি করব যা সমাজের সবার জন্য সমান সুযোগ এবং মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই চমৎকার তাত্ত্বিক পদ্ধতিকে তিনি নাম দিয়েছেন অজ্ঞতার আবরণ (Veil of Ignorance)। রল্সের এই তত্ত্বটি শুধু একটি দেশের ভেতরে নয়, বৈশ্বিক পর্যায়ে মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্ত দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আমরা যদি গ্লোবাল পলিটিক্সেও এই অজ্ঞতার আবরণ নীতিটি প্রয়োগ করি, তবে বড় রাষ্ট্রগুলো ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর অবিচার করার আগে দুবার ভাববে। কারণ কে কখন দুর্বল অবস্থানে পড়বে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল।

সব মিলিয়ে, মানবাধিকারের দার্শনিক বোঝাপড়া কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। সমাজ বদলানোর সাথে সাথে এটি প্রতিনিয়ত ভাঙছে, গড়ছে এবং মানুষের নতুন নতুন সংকটের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে উন্নত করছে। আগে অধিকারের লড়াই ছিল কেবল রাজার বিরুদ্ধে, এখন সেই লড়াই বহুজাতিক কর্পোরেশন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির বিরুদ্ধেও বিস্তৃত হয়েছে। তবে প্রেক্ষাপট যতই বদলাক না কেন, মানবাধিকারের মূল সুরটি কিন্তু একই রয়ে গেছে। আর তা হলো, প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার একটি নিজস্ব মর্যাদা আছে। এই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন যেকোনো কাজই অন্যায়। দার্শনিকদের এই শত শত বছরের আলোচনা আমাদের কেবল বইয়ের পাতায় আবদ্ধ রাখেনি, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ভাষা জুগিয়েছে। অধিকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি যত মজবুত হবে, বিশ্বমঞ্চে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরও ঠিক ততটাই জোরালো হবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রীতিনীতি (International Human Rights Norms)

রীতিনীতি বা নর্মের মৌলিক কাঠামো এবং সামাজিক উন্মেষ

আইন জিনিসটা আসলে রাতারাতি আকাশ থেকে পড়ে না। কোনো দেশের সংসদ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা চাইলেই হুট করে একটি আইন চাপিয়ে দিয়ে সমাজের গভীরে পরিবর্তন আনতে পারে না। এর পেছনে একটি দীর্ঘ, জটিল এবং নীরব মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতির পর্ব থাকে। যেকোনো বিষয়ে আইন হওয়ার অনেক আগে সমাজে প্রথমে একটি সাধারণ বোধ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে শেখে কোন কাজটি সামাজিকভাবে সঠিক আর কোনটি পুরোপুরি বেঠিক। এই অলিখিত, অঘোষিত কিন্তু সামাজিকভাবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত সঠিক আচরণের মানদণ্ডটিকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় রীতিনীতি বা নর্ম বলা হয়। সহজ করে বললে, একটি নির্দিষ্ট পরিচয় বহনকারী গোষ্ঠীর জন্য সমাজের চোখে যে আচরণটি মানানসই, সেটিই হলো নর্ম (Katzenstein, 1996)। একটি সমাজে যখন অধিকাংশ মানুষ মনে করে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা ঠিক নয়, তখন সেই চিন্তাটি একটি রীতিনীতিতে পরিণত হয়। এই রীতিনীতিগুলোর কোনো পুলিশ বা আদালত থাকে না। তারপরও মানুষ এগুলো মেনে চলে, কারণ না মানলে সমাজের চোখে ছোট হওয়ার বা একঘরে হওয়ার ভয় থাকে। এখানে কোনো জবরদস্তি নেই, আছে কেবল এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক বোঝাপড়া। এই বোঝাপড়াগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মনের ভেতর গেঁথে যায়। ফলে একসময় এগুলোকে আর আলাদা করে মনে করিয়ে দিতে হয় না। মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই বুঝতে পারে যে অন্যকে সম্মান না করলে সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়বে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ব্যাপার ঘটে। রাষ্ট্রগুলো তো আর বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে বাস করে না, তারা একটি বৈশ্বিক সমাজের অংশ। এই বৈশ্বিক সমাজে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে কেমন আচরণ করবে, নিজের নাগরিকদের সাথে কেমন আচরণ করবে – তার কিছু অলিখিত মানদণ্ড সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা, বিশেষ করে যারা গঠনবাদ (Constructivism) নিয়ে কাজ করেন, তারা মনে করেন রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক লাভের হিসাব কষে চলে না। রাষ্ট্রের একটি নিজস্ব পরিচিতি এবং সম্মানবোধ থাকে (Wendt, 1999)। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে একটি সভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার একটা সুপ্ত বাসনা প্রতিটি দেশেরই থাকে। আর এই সভ্যতার প্রমাণ দিতে গিয়েই রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো মেনে চলতে হয়। এমনকি যেসব রাষ্ট্র ভেতরে ভেতরে চরম স্বৈরাচারী, তারাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানবাধিকারের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধার কথা বেশ জোর গলায় প্রচার করে। এই যে লোকদেখানো সম্মান প্রদর্শন, এটিও প্রমাণ করে যে বিশ্বে মানবাধিকারের একটি শক্তিশালী রীতিনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ রীতিনীতি না থাকলে কেউ লোকলজ্জার ভয়ে নিজের কাজের পক্ষে সাফাই গাইত না। রাষ্ট্রনায়করা খুব ভালো করেই জানেন, গায়ের জোরে হয়তো অনেক কিছু আদায় করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সম্মান আদায় করতে হলে এই বৈশ্বিক নিয়মগুলোর প্রতি অন্তত মৌখিক সমর্থন জানাতেই হয়। রাষ্ট্রের এই মনস্তত্ত্বটি অনেকটা মানুষের মতোই, সবাই চায় অন্যরা তাকে ভালো বলুক।

মানবাধিকারের এই রীতিনীতিগুলো মূলত কাজ করে একটি বৈশ্বিক নৈতিক কম্পাস হিসেবে। এগুলো রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় তাদের সীমানা ঠিক কতটুকু। কোনো রাষ্ট্র হয়তো তার দেশের ভেতরে ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য কঠোর আইন তৈরি করতে পারে। আইনি দিক থেকে রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতার জোরে এই কাজটি অনায়াসেই করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রীতিনীতির কারণে রাষ্ট্রটি বুঝতে পারে যে তার এই কাজটি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের চোখে মোটেও গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে রাষ্ট্রটি প্রকাশ্যে সমালোচনার মুখে পড়ে। মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় শক্তির একচেটিয়া আধিপত্যকে নৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে। এই রীতিনীতিগুলো সাধারণ মানুষকে একটি ভাষা দেয়, যে ভাষা ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রের অবিচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিযোগ জানাতে পারে। ফলে মানবাধিকার কেবল আর দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না, এটি সমগ্র বিশ্বের একটি অভিন্ন চিন্তার বিষয়ে পরিণত হয়। সহজ করে বললে, এই অলিখিত নিয়মগুলোই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতাবানরা এই ঢালটিকে ভয় পায়, আর একারণেই তারা প্রতিনিয়ত একে ভাঙার চেষ্টা করে। তবে সমাজের গভীরে প্রোথিত এই নিয়মগুলোকে চাইলেই রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এগুলো বাতাসের মতো, দেখা যায় না কিন্তু অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রীতিনীতির জীবনচক্র ও বিবর্তন

কোনো একটি সাধারণ ধারণা কীভাবে পুরো বিশ্বের কাছে একটি অবশ্য পালনীয় রীতিনীতিতে পরিণত হয়, তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বেশ কৌতূহল রয়েছে। এই কৌতূহল থেকেই তাত্ত্বিক মার্থা ফিনেমোর (Martha Finnemore) এবং ক্যাথরিন সিকিংক (Kathryn Sikkink) তাদের বিখ্যাত নর্ম জীবনচক্র (Norm Life Cycle) তত্ত্বটি দাঁড় করিয়েছেন। তাদের মতে, কোনো রীতিনীতি এমনি এমনি প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর জন্য কিছু মানুষকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়। এই মানুষদের তারা নাম দিয়েছেন নর্ম উদ্যোক্তা (Norm Entrepreneurs) (Finnemore & Sikkink, 1998)। এই উদ্যোক্তারা হতে পারেন কোনো মানবাধিকার কর্মী, কোনো বেসরকারি সংস্থা বা এমনকি জাতিসংঘের কোনো বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার। তারা সমাজের কোনো একটি নির্দিষ্ট অন্যায়কে চিহ্নিত করেন এবং সেটি বন্ধ করার জন্য একটি নতুন ধারণার প্রচার শুরু করেন। শুরুর দিকে তাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাবানরা তাদের পাগল বা রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু এই উদ্যোক্তারা হাল ছাড়েন না। তারা দেশে দেশে ঘোরেন, সম্মেলন করেন, তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তাদের নিরন্তর প্রচারণার ফলে একপর্যায়ে কিছু রাষ্ট্র সেই নতুন ধারণাটিকে গ্রহণ করতে রাজি হয়। রীতিনীতি প্রতিষ্ঠার এই প্রথম ধাপটি অত্যন্ত কঠিন এবং অনেক সময়সাপেক্ষ। এখানে উদ্যোক্তাদের মূল পুঁজি হলো তাদের অবিচল বিশ্বাস এবং নৈতিক অবস্থান। তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সত্যটা বারবার বলে যান।

প্রথম ধাপটি সফলভাবে পার হওয়ার পর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়, যাকে বলা হয় নর্ম ক্যাসকেড (Norm Cascade)। এই পর্যায়ে এসে নতুন ধারণাটি একটি ঝর্ণাধারার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাষ্ট্র যখন নতুন রীতিনীতিটি মেনে নেয়, তখন বাকি রাষ্ট্রগুলোর ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেউ পিছিয়ে পড়তে চায় না। ফলে অনেকটা দেখাদেখি বা আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্যই অনেক রাষ্ট্র নতুন রীতিনীতিটি নিজেদের দেশে প্রয়োগ করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, পরিবেশ রক্ষার বা নারীর ক্ষমতায়নের নানা আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনেক দেশ সই করে মূলত নিজেদের আধুনিক প্রমাণের তাগিদে। তারা গভীরভাবে বিষয়টি বিশ্বাস করুক বা না করুক, আন্তর্জাতিক সমমনা দেশগুলোর দলে ভেড়ার জন্য তারা এই নতুন মানদণ্ডকে স্বাগত জানায়। এই ধাপে রাষ্ট্রগুলোর আচরণের পেছনে নৈতিকতার চেয়ে সামাজিকীকরণ বেশি কাজ করে। তারা আন্তর্জাতিক সমাজের ভালো ছেলে হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। একারণে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ একটি নির্দিষ্ট নিয়মকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই দ্রুত পরিবর্তনের সময়টাতে বিশ্বরাজনীতির পুরো দৃশ্যপটটাই যেন বদলে যায়। ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে কথা বলতে শুরু করল, তখন বড় রাষ্ট্রগুলোও বাধ্য হলো সেই ধারণাকে স্বীকৃতি দিতে।

জীবনচক্রের একদম শেষ ধাপটি হলো আত্তীকরণ (Internalization)। একটি রীতিনীতি যখন এই ধাপে পৌঁছায়, তখন সেটি নিয়ে আর কোনো বিতর্ক বা আলোচনা থাকে না। বিষয়টি সমাজের একেবারে অস্থিমজ্জায় মিশে যায়। মানুষ ধরে নেয় যে এটাই স্বাভাবিক এবং এর বাইরে কিছু হতেই পারে না। দাসপ্রথা বাতিলের বিষয়টি এর একটি চমৎকার উদাহরণ। আজকের দিনে কেউ দাসপ্রথার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো সেমিনার করে না। দাসপ্রথা যে ভয়াবহ অপরাধ, সেটি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মনে একটি স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে গেঁথে গেছে। মানবাধিকারের অনেক রীতিনীতি এই শেষ ধাপে পৌঁছানোর জন্য এখনো লড়াই করছে। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন বা নারী-পুরুষের সমতার মতো বিষয়গুলো এখনো পৃথিবীর সব জায়গায় পুরোপুরি আত্তীকৃত হয়নি। তারপরও নর্ম জীবনচক্রের এই কাঠামোটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে ধাপে ধাপে একটি ছোট প্রতিবাদ একদিন পুরো বিশ্বের নিয়ম বদলে দিতে পারে। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনেই এমন দীর্ঘ এবং নীরব সংগ্রাম লুকিয়ে থাকে। ইতিহাস আসলে এই উদ্যোক্তাদের রক্ত ঘামে ভেজা গল্পেরই এক বিশাল সংকলন। একজন সাধারণ মানুষের ছোট একটি উদ্যোগ যে কতটা বিশাল আকার ধারণ করতে পারে, এটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র এবং নৈতিক মানদণ্ড

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পুরো বিশ্ব এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং হলোকাস্টের ভয়াবহতা মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রনেতারা বুঝতে পারেন, বিশ্বশান্তি বজায় রাখার জন্য কেবল যুদ্ধ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার জন্য একটি সাধারণ মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। এই তাড়না থেকেই ১৯৪৮ সালে জন্ম নেয় মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র বা ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস (Universal Declaration of Human Rights)। মজার ব্যাপার হলো, এটি কোনো আইনগতভাবে বাধ্যকর চুক্তি নয়। এটি কেবল একটি ঘোষণাপত্র। অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্র যদি এই ঘোষণাপত্রের নিয়ম না মানে, তবে তাকে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার কোনো সুযোগ এই দলিলে রাখা হয়নি। তারপরও এই ঘোষণাপত্রটি গত সাত দশকের বেশি সময় ধরে পুরো বিশ্বের জন্য এক বিশাল নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করেছে (Forsythe, 2012)। আইনের কঠোরতা না থাকা সত্ত্বেও এটি মানবাধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। এর মূল কারণ হলো এর ভেতরের অন্তর্নিহিত শক্তি, যা মানুষের মনের গহিনে নাড়া দিতে পেরেছিল। মানুষ অনুভব করেছিল যে এই কথাগুলো তাদেরই অধিকারের কথা বলছে।

এই ঘোষণাপত্রটি তৈরির কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা এক টেবিলে বসেছিলেন। তাদের সবার জীবন দর্শন ছিল আলাদা। পুঁজিবাদী আর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের স্নায়ুযুদ্ধেরসেই উত্তাল সময়ে একটি বিষয়ে সবাইকে একমত করা ছিল প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনা এবং বিতর্কের পর তারা এমন একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হন, যা পৃথিবীর সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। এই ঘোষণাপত্রটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণেই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কিছু অলঙ্ঘনীয় অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেঁচে থাকার অধিকার, দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার, স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার এবং মত প্রকাশের অধিকার। এই অধিকারগুলো কোনো রাষ্ট্র বা সরকার তার নাগরিকদের দান করে গঠন করেনি। রাষ্ট্র কেবল এগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে। ঘোষণাপত্রটি রাষ্ট্রগুলোর সামনে একটি আয়না হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রগুলো যখনই নিজেদের নাগরিকদের ওপর নিপীড়ন চালায়, তখন এই ঘোষণাপত্রের আয়নায় তাদের আসল চেহারাটা ধরা পড়ে যায়। তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও তারা একটি সাধারণ মানবিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, যা ছিল মানব ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এই ঘোষণাপত্রটির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। পরবর্তীকালে যতগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি তৈরি হয়েছে, তার সবগুলোরই মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে এই একটি মাত্র দলিল। বিশ্বের অনেক দেশের সংবিধানেএই ঘোষণাপত্রের ধারাগুলো হুবহু যুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের কাজের অনুপ্রেরণা পায় এই ঘোষণাপত্র থেকে। একটি ঘোষণাপত্র কীভাবে সময়ের পরিক্রমায় পুরো বিশ্বের চিন্তাধারাকে বদলে দিতে পারে, এটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রগুলো এখন আর আগের মতো ইচ্ছেমতো তাদের নাগরিকদের ওপর অত্যাচার করতে পারে না। তাদের মাথায় সবসময় একটি ভয় কাজ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের কাজের ওপর নজর রাখছে। মানবাধিকারের এই সার্বজনীন ঘোষণাপত্রটি মূলত রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার একচেটিয়া দাপটকে খর্ব করে সাধারণ মানুষের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে, মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নয়। সহজ করে বললে, এটি পৃথিবীর সব নিপীড়িত মানুষের জন্য একটি আশার আলো, যা তাদের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।

নরম আইন থেকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের বিবর্তন

আন্তর্জাতিক আইনের জগতেও রীতিনীতির একটি বিশেষ পথচলা রয়েছে। মানবাধিকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল শুরুতে সরাসরি কঠোর আইন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে না। এগুলো প্রথমে বিভিন্ন প্রস্তাবনা, ঘোষণাপত্র বা নির্দেশিকা হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আসে। এগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় নরম আইন (Soft Law) বলা হয়। নরম আইনের বৈশিষ্ট্য হলো, রাষ্ট্রগুলো এগুলো মেনে চলার ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে ঠিকই, কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার কোনো কঠিন খাঁচায় তারা নিজেদের বন্দি করে না। এর ফলে রাষ্ট্রগুলো খুব সহজেই এই দলিলগুলোতে স্বাক্ষর করতে বা সমর্থন দিতে রাজি হয়। তারা ভাবে, এটি তো আর আইন নয়, তাই মানতে না পারলে বড় কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হবে না। কিন্তু এখানেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতির আসল কৌশলটি লুকিয়ে থাকে। নরম আইনগুলো খুব ধীরেসুস্থে রাষ্ট্রগুলোর আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। রাষ্ট্রগুলো অভ্যাসবশত এই নিয়মগুলো চর্চা করতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে এগুলো তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একসময় রাষ্ট্রনেতারা ভুলেই যান যে এই নিয়মগুলো মানতে তারা আইনত বাধ্য নন। এই নীরব অনুপ্রবেশ নরম আইনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্রকে বুঝতে না দিয়েই তাকে নিয়মের ফ্রেমে বেঁধে ফেলে।

সময়ের সাথে সাথে এই চর্চা যখন একটি স্থায়ী রূপ পায়, তখন এক জাদুকরী রূপান্তর ঘটে। রাষ্ট্রগুলো যখন দীর্ঘকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট রীতিনীতি মেনে চলে এবং তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এই রীতিনীতিটি মেনে চলা তাদের জন্য আইনগতভাবেই বাধ্যতামূলক, তখন সেই নরম আইনটি শক্ত আইনে পরিণত হয়। একে বলা হয় প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (Customary International Law)। এই আইনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি কোনো চুক্তির ওপর নির্ভর করে না। কোনো রাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট কোনো মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর নাও করে, তারপরও তাকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হয়। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন তৈরি হওয়ার জন্য মূলত দুটি জিনিসের প্রয়োজন হয়। প্রথমটি হলো রাষ্ট্রগুলোর ধারাবাহিক আচরণ এবং দ্বিতীয়টি হলো ওপিনিও জুরিস (Opinio Juris) বা আইনি বাধ্যবাধকতার বিশ্বাস (Simma & Alston, 1988)। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলো কেবল অভ্যাসগতভাবে নয়, বরং আইনি দায়িত্ববোধ থেকেই কাজটি করছে – এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি একদিনে হয় না, কয়েক দশক বা শতাব্দী সময় লেগে যায় একটি নরম আইনকে প্রথাগত আইনে পরিণত হতে। এটি একটি ধীরস্থির এবং নীরব বিপ্লব।

প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের বেশ কিছু চমৎকার উদাহরণ বর্তমান বিশ্বে রয়েছে। যেমন, কাউকে দাস হিসেবে রাখা, গণহত্যা চালানো বা যুদ্ধবন্দিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা – এগুলো এখন প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই বলতে পারবে না যে তারা যেহেতু এই সংক্রান্ত কোনো চুক্তিতে সই করেনি, তাই তারা তাদের দেশের ভেতরে দাসপ্রথা চালু করতে পারবে। এই নিয়মগুলো এখন এতই শক্তিশালী যে এগুলোকে পেরেম্পটরি নর্ম (Peremptory Norms) বা জুস কোজেন্স (Jus Cogens) বলা হয়। অর্থাৎ এই নিয়মগুলোর কোনো ব্যতিক্রম নেই এবং কোনো রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে এদের বাতিল করা যায় না। মানবাধিকারের এই বিবর্তন আমাদের দেখায় কীভাবে সাধারণ কিছু ঘোষণাপত্র বা রীতিনীতি সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর সবচেয়ে অলঙ্ঘনীয় আইনে পরিণত হতে পারে। এটি মানব সভ্যতার একটি ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র, যেখানে নৈতিকতা ধীরে ধীরে আইনের রূপ ধারণ করে সমাজকে রক্ষা করে। ফলে যারা ভাবেন আন্তর্জাতিক আইনের কোনো দাঁত নেই, তারা আসলে রীতিনীতির এই অসীম ক্ষমতাকে ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। অলিখিত এই নিয়মগুলোই মূলত বিশ্বব্যবস্থার মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করে।

সুশীল সমাজ ও ট্রান্সন্যাশনাল নেটওয়ার্কের প্রভাব

মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো কেবল জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বা জেনেভায় বসে থাকা কূটনীতিকদের আলোচনা দিয়ে বাস্তবায়িত হয় না। রাষ্ট্রগুলো স্বভাবতই নিজেদের ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ থাকে। তারা মানবাধিকারের কথা মুখে বললেও কাজে তা বাস্তবায়ন করতে নানা অজুহাতে গড়িমসি করে। এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলো। তাত্ত্বিক মার্গারেট কেক (Margaret Keck) এবং ক্যাথরিন সিকিংক (Kathryn Sikkink) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা একসাথে কাজ করে। তারা এর নাম দিয়েছেন ট্রান্সন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক (Transnational Advocacy Networks) (Keck & Sikkink, 1998)। এই নেটওয়ার্কগুলো মূলত তথ্য, অর্থ এবং নৈতিক সমর্থন আদান-প্রদানের মাধ্যমে কাজ করে। একটি দেশের ভেতরের ছোট কোনো মানবাধিকার সংস্থা হয়তো একা শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। তখন তারা এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সাহায্য নেয়। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে তারা একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। তাদের এই একতা অনেক শক্তিশালী স্বৈরাচারী সরকারকেও বাধ্য করে নতি স্বীকার করতে। এটি অনেকটা দড়ির টানের মতো, এক প্রান্ত থেকে টানলে অন্য প্রান্তে কম্পন অনুভূত হয়।

এই প্রক্রিয়ার একটি দারুণ কাঠামো রয়েছে, যাকে তাত্ত্বিকরা বুমেরাং প্যাটার্ন (Boomerang Pattern) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ধরুন, একটি দেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চালাচ্ছে। দেশের ভেতরের মানবাধিকার কর্মীরা সরকারের কাছে এর প্রতিবাদ জানাল। কিন্তু সরকার সেই প্রতিবাদ কানে তুলল না, বরং উল্টো কর্মীদের জেলে পুরল। তখন সেই কর্মীরা বা তাদের সংগঠন অত্যন্ত গোপনে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তথ্য পাঠিয়ে দেয় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর কাছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো বড় সংগঠনগুলো তখন সেই তথ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু করে। তারা জাতিসংঘের মতো সংস্থায় যায়, বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশের সরকারের কাছে যায় এবং নিপীড়নকারী রাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগের অনুরোধ করে। এরপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেই নিপীড়নকারী রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। দেশের ভেতরের সাধারণ একটি প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ঘুরে বুমেরাংয়ের মতো আবার সেই রাষ্ট্রের ঘাড়েই এসে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র বাধ্য হয় তার আচরণের লাগাম টানতে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কার্যকরী এবং এর মাধ্যমে অনেক দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।

এই নেটওয়ার্কগুলোর মূল অস্ত্র হলো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করে এবং তা সারা বিশ্বের মানুষের সামনে তুলে ধরে। এর ফলে নিপীড়নকারী রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে চরম লজ্জার মুখে পড়ে। এই কৌশলটিকে বলা হয় নেমিং অ্যান্ড শেমিং (Naming and Shaming)। রাষ্ট্রগুলো যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে তারা বেশ সচেতন থাকে। বিদেশী বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ঋণ বা সাহায্য – এসবকিছুর জন্যই একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রয়োজন হয়। সুশীল সমাজের এই নেটওয়ার্কগুলো ঠিক সেই জায়গাতেই আঘাত করে। তারা মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলোকে কেবল বইয়ের পাতায় আবদ্ধ না রেখে বাস্তব ময়দানে প্রয়োগ করার ব্যবস্থা করে। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এই বৈশ্বিক সংহতি প্রমাণ করে যে, মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো ভৌগোলিক সীমানার বাধা অতিক্রম করে এক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে। বন্দুকের গুলির চেয়ে অনেক সময় নির্ভুল তথ্য অনেক বেশি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে এবং স্বৈরশাসকদের ভিত নাড়িয়ে দেয়।

বিশ্বায়নের যুগে রীতিনীতির টিকে থাকার সংগ্রাম

মানবাধিকারের এই রীতিনীতিগুলো যে একেবারে নির্বিঘ্নে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে বিশ্বায়নের এই যুগে, মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো নানা দিক থেকে প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রকাশ্যেই এই রীতিনীতিগুলোর প্রতি অনাস্থা জানাচ্ছে বা নিজেদের সুবিধামতো এগুলোকে বাঁকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রায়শই রাষ্ট্রগুলো সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করছে। তারা যুক্তি দেখাচ্ছে যে, রাষ্ট্রের টিকে থাকার চেয়ে বড় কোনো মানবাধিকার হতে পারে না। এই ধরনের যুক্তির আড়ালে মূলত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর এই আচরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক আইন কি কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্যই প্রযোজ্য? শক্তিশালী দেশগুলো কি সব আইনের ঊর্ধ্বে? এই প্রশ্নগুলো মানবাধিকারের ভিত্তিমূলেই আঘাত হানছে এবং মানুষের ভরসাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

এর পাশাপাশি সারা বিশ্বে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং পপুলিজমেরউত্থান মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলোর জন্য একটি নতুন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশের রাজনৈতিক নেতারা এখন প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতিগুলোকে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপিয়ে দেওয়া অ্যাজেন্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তারা বলছেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস রয়েছে এবং সেই অনুযায়ীই মানবাধিকারের মানদণ্ড নির্ধারিত হওয়া উচিত। এই ধরনের সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Cultural Relativism) যুক্তি দিয়ে মূলত নারী অধিকার হরণ, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বা ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতাকে জায়েজ বা ন্যায্য প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছেবিশ্বায়নের ফলে অর্থনীতি যেমন উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে রাষ্ট্রগুলো এখন নাগরিকদের ওপর নজরদারিও বহুগুণ বাড়িয়েছে। ফলে আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার কেবল আর শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন মানুষের চিন্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের স্বাধীনতার জগতেও গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তি একদিকে যেমন মানুষকে বিশ্বজুড়ে সংযুক্ত করেছে, অন্যদিকে এটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এটি যেন এক নতুন ধরনের অদৃশ্য কারাগার।

এতসব চ্যালেঞ্জ ও হতাশার মধ্যেও মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলোর একটি নিজস্ব টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তখন তারা চুপ থাকে না। তারা নানা ধরনের মিথ্যা বা সাজানো যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে তারা আসলে কোনো আইন ভাঙেনি (Risse et al., 1999)। এই যে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা, এটিই মানবাধিকারের রীতিনীতির আসল জয়। কারণ রীতিনীতিটি যদি আসলেই দুর্বল হতো, তবে রাষ্ট্রগুলো এর তোয়াক্কাই করত না। মানবাধিকারের যাত্রা কোনো সরলরেখা ধরে এগোয় না। এটি ক্রমাগত আলোচনা, সংগ্রাম এবং দরকষাকষির একটি চলমান প্রক্রিয়া। পৃথিবীতে যতদিন বৈষম্য থাকবে, ক্ষমতার দম্ভ থাকবে, ততদিন এই রীতিনীতিগুলো মানুষের প্রতিবাদের প্রধান ভাষা হিসেবে টিকে থাকবে। মানবাধিকার কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর পথচলা, যেখানে প্রতিটি প্রজন্মকে নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য নতুন করে লড়াইয়ের ময়দানে নামতে হয়। পথ যতই বন্ধুর হোক না কেন, মানুষের মর্যাদাবোধ কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এই স্পৃহা মানুষের ভেতরে চিরকাল বেঁচে থাকে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (International Human Rights Law)

চুক্তির বিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোর উন্মেষ

মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির খুব সাধারণ একটি রূপ আছে। একজন মানুষ অন্যজনকে কোনো কথা দিলে তা সাধারণত রাখার চেষ্টা করে। কথার খেলাপ করলে সমাজে তার সম্মান কমে যায়, মানুষ তাকে আর বিশ্বাস করতে চায় না। বিশ্ব রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলোর আচরণও অনেকটা মানুষের মতোই। রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে নানা বিষয়ে মৌখিক বা ঘোষণামূলক সম্মতি প্রকাশ করে। কিন্তু শুধু কথার ওপর ভিত্তি করে বড় কোনো বৈশ্বিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর একারণেই প্রয়োজন হয় লিখিত দলিলের, যাকে আইনি ভাষায় চুক্তি বলা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো যখন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এসে চুক্তির রূপ নেয় এবং রাষ্ট্রগুলো তাতে স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াটি একদিনে সম্পন্ন হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা, শব্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি বাক্যের অর্থ নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে অবিরাম বিতর্ক। একটি সাধারণ রীতি বা নর্ম থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সেটি একটি শক্ত আইনি দলিলে পরিণত হওয়ার এই যাত্রাপথ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় (Shaw, 2017)।

চুক্তি সই করার প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি ধাপে বিভক্ত থাকে, যা আইনের চোখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুরুতে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা একটি খসড়া নিয়ে আলোচনা করেন এবং একমত হলে তাতে স্বাক্ষর করেন। তবে কেবল স্বাক্ষর করলেই কোনো চুক্তি একটি দেশের জন্য আইনিভাবে বাধ্যকর হয়ে যায় না। স্বাক্ষরের পর রাষ্ট্রকে তার নিজ দেশের সংসদে বা আইনসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়মনীতি অনুযায়ী সেই চুক্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়, যাকে আইনের ভাষায় অনুমোদন (Ratification) বলা হয়। একটি রাষ্ট্র যখন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুসমর্থন বা রেটিফাই করে, তখন সে মূলত পুরো বিশ্বের সামনে একটি লিখিত অঙ্গীকার করে। সে ঘোষণা দেয় যে, তার নিজ দেশের সীমানার ভেতরে থাকা প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য সে এই চুক্তির সব নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। এই লিখিত অঙ্গীকারের ফলে মানবাধিকার আর কেবল কোনো নৈতিক উপদেশের পর্যায়ে থাকে না, এটি একটি জোরালো আইনি রূপ লাভ করে। রাষ্ট্র তখন বাধ্য থাকে তার অভ্যন্তরীণ আইনগুলোকে ওই আন্তর্জাতিক চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সাজাতে।

আন্তর্জাতিক আইনের একটি খুব প্রাচীন এবং মৌলিক নীতি আছে, যাকে লাতিন ভাষায় বলা হয় পাকতা সুন্ত সারভান্দা (Pacta Sunt Servanda)। এর সহজ অর্থ হলো, চুক্তি অবশ্যই পালন করতে হবে। এই নীতিটি আন্তর্জাতিক আইনের একেবারে হৃৎপিণ্ড হিসেবে কাজ করে। কোনো রাষ্ট্র স্বাধীন ইচ্ছায় একটি চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার পর মাঝপথে গিয়ে বলতে পারে না যে সে আর নিয়ম মানবে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার একটি শক্ত বাঁধনে আটকে ফেলে। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের ওপর নিপীড়ন চালায় বা তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, তবে চুক্তি অনুযায়ী সে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অপরাধী সাব্যস্ত হয়। এই আইনি কাঠামোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি সাধারণ মানুষকে সরাসরি রাষ্ট্রের সমকক্ষ একটি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। আগে যেখানে মনে করা হতো রাষ্ট্র সব ক্ষমতার অধিকারী এবং নাগরিকরা কেবল তার প্রজা, মানবাধিকার আইন সেই পুরোনো ধারণাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। এখানে নাগরিকের অধিকার একটি আইনি বাস্তবতা, আর সেই অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব (Higgins, 1994)।

রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অহংকার এবং আইনের সংঘাত

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে প্রতিটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অহংকারের জায়গা হলো তার সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্রগুলো মনে করে, তাদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে তারা যা খুশি তাই করতে পারে এবং বাইরের কারও সেখানে নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই। সপ্তদশ শতাব্দীতে ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অলঙ্ঘনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের উন্মেষ এই অহংকারের দেয়ালে একটি বিশাল ফাটল তৈরি করে দেয়। মানবাধিকার আইন খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, নিজের সীমানার ভেতরে হওয়া সত্ত্বেও কোনো সরকার তার নাগরিকদের বিনা বিচারে হত্যা করতে পারে না বা তাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। রাষ্ট্র যদি এমন কিছু করে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেখানে প্রশ্ন তোলার সম্পূর্ণ আইনি অধিকার রাখে। সার্বভৌমত্বের এই চিরায়ত ধারণার সাথে মানবাধিকারের এই নতুন আইনি কাঠামোর দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক আইনের জগতে একটি চিরস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে (Krasner, 1999)।

ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে সহজে মেনে নিতে চায় না। তারা বারবার নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের দোহাই দিয়ে মানবাধিকারের প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে খুব জোরালোভাবে দাবি করে যে, তাদের দেশের ভেতরের পুলিশি ব্যবস্থা বা বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বাইরের কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কথা বলাটা সরাসরি সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই যুক্তিকে সরাসরি খারিজ করে দেয়। এই আইনের মূল কথা হলো, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং আত্মমর্যাদা যেকোনো রাষ্ট্রীয় সীমানার চেয়ে অনেক বড়। রাষ্ট্রীয় সীমানা মানুষের তৈরি করা একটি কৃত্রিম বিভাজন, আর মানবাধিকার হলো মানুষের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে থাকা একটি চিরন্তন সত্য। ফলে রাষ্ট্র যখন নিজেই তার নাগরিকদের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সার্বভৌমত্বের অজুহাত দিয়ে কোনো অপরাধকে আর ঢেকে রাখা সম্ভব হয় না। মানবাধিকার আইন মূলত রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ওপর একটি আইনি লাগাম পরিয়ে দেয়।

এই সংঘাতের ফলাফল হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনে নতুন কিছু ধারণার জন্ম হয়েছে, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে আরও বেশি জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসে। মানবাধিকার চুক্তিগুলো রাষ্ট্রকে বাধ্য করে নিজেদের কাজের হিসাব আন্তর্জাতিক কমিটির কাছে জমা দিতে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে যখন অন্য দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির সামনে বসে তার নিজের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির জবাবদিহি করতে হয়, তখন সার্বভৌমত্বের অহংকার অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রই আর আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রগুলো হয়তো কাগজে-কলমে স্বাধীন, কিন্তু তাদের আচরণ পরিচালনার জন্য একটি বৈশ্বিক আইনি কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। এই কাঠামোটি খুব ধীরে হলেও রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। নাগরিকরা এখন জানে যে, তাদের নিজ দেশের সরকার অবিচার করলে আন্তর্জাতিক আইনের দরজায় কড়া নাড়ার একটি সুযোগ অন্তত তাদের সামনে খোলা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল দলিলসমূহ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র তৈরি হলো, তখন সবার মনে একটি আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু শিগগিরই বোঝা গেল, কেবল একটি ঘোষণাপত্র দিয়ে রাষ্ট্রগুলোর বেপরোয়া আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ঘোষণাপত্রটি ছিল একটি দিকনির্দেশনা, যার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত নেয় ঘোষণাপত্রের নীতিগুলোকে শক্ত চুক্তির রূপ দেওয়ার। সেই চেষ্টার ফসল হিসেবে ১৯৬৬ সালে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির জন্ম হয়। এর একটি হলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (International Covenant on Civil and Political Rights – ICCPR) এবং অন্যটি হলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights – ICESCR)। এই দুটি চুক্তি এবং পূর্বের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র – এই তিনটিকে একত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মূল ভিত্তি বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিল (International Bill of Human Rights) বলা হয়। এই দলিলগুলোই আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল খুঁটি।

এখানে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন আসতে পারে, একটি মাত্র চুক্তি না করে কেন দুটি আলাদা চুক্তি তৈরি করা হলো? এর পেছনে লুকিয়ে আছে তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির স্নায়ুযুদ্ধবা কোল্ড ওয়ারের ইতিহাস। সেই সময়ে পৃথিবী মূলত দুটি মতাদর্শের ব্লকে বিভক্ত ছিল। পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলো মনে করত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার বা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার মতো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোই সবচেয়ে বেশি জরুরি। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর দাবি ছিল, মানুষের যদি খাবার, বাসস্থান বা কাজের নিশ্চয়তা না থাকে, তবে ভোটের অধিকার দিয়ে সে কী করবে? তাদের কাছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো ছিল মুখ্য। দুই শিবিরের এই আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণেই অধিকারগুলোকে দুটি আলাদা চুক্তিতে ভাগ করতে হয়েছিল (Buergenthal, 2006)। তবে চুক্তি দুটি আলাদা হলেও আন্তর্জাতিক আইনে এদের সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি অধিকার পূর্ণ না হলে অন্য অধিকারগুলোও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এই দলিলগুলোর ভেতরে মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি দিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট ধারা রয়েছে। যেমন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের চুক্তিতে খুব স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কাউকে দাস হিসেবে রাখা যাবে না, জোরপূর্বক গুম করা যাবে না বা অন্যায্যভাবে আটক রাখা যাবে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের চুক্তিতে প্রতিটি মানুষের কাজের অধিকার, উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রগুলো যখন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তখন তারা এই ধারাগুলো নিজ দেশে বাস্তবায়ন করতে আইনিভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়। এই দলিলগুলো কেবল কিছু কাগজের স্তূপ নয়, এগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি আইনি স্বীকৃতি। বর্তমান বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিচার করার সময় এই দলিলগুলোকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

চুক্তির শর্ত, সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় কূটনীতি

আন্তর্জাতিক আইন তৈরি হওয়ার পর তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের আইনি জটিলতা দেখা যায়। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়, কিন্তু তারা চুক্তির প্রতিটি শব্দ বা শর্ত পুরোপুরি মেনে নিতে চায় না। আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রগুলোকে একটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যাকে বলা হয় সংরক্ষণ (Reservations)। এর মানে হলো, একটি রাষ্ট্র চুক্তিতে সই করার সময় লিখিতভাবে জানিয়ে দিতে পারে যে, সে চুক্তির নির্দিষ্ট এক বা একাধিক ধারা তার নিজ দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে না বলে মনে করে। রাষ্ট্রগুলো সাধারণত তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন, স্থানীয় প্রথা বা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হলে এই সংরক্ষণের সুযোগ নেয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ছাড় মনে হলেও, এর মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্র মানবাধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্যকেই দুর্বল করে দেয়। তারা চুক্তির খাতায় নিজেদের নাম লেখায় ঠিকই, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি ধারাগুলো পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে চতুরতার সাথে পাশ কাটিয়ে যায়।

রাষ্ট্রগুলোর এই কূটনীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কার্যকারিতাকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করে। উদাহরণস্বরূপ, নারী অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সিডও (CEDAW)-তে অনেক দেশ স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু তারা এর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় সংরক্ষণ দিয়ে রেখেছে। তারা যুক্তি দেখায় যে, ওই ধারাগুলো তাদের দেশের পারিবারিক বা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী। এর ফলে চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও ওই দেশগুলোতে নারীরা আইনি সুরক্ষার বাইরেই থেকে যায়। এই সংরক্ষণ প্রথাটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি বড় ফাঁকফোকর। তাত্ত্বিকভাবে একটি চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপন্থী কোনো সংরক্ষণ দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রগুলো এই নিয়মের খুব একটা তোয়াক্কা করে না। তারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকারের প্রবক্তা হিসেবে নিজেদের জাহির করার জন্য চুক্তিতে সই করে, আবার ভেতরের সংরক্ষণ দিয়ে নিজেদের দায়বদ্ধতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে (Goodman, 2002)।

আইন বিশেষজ্ঞরা এবং আন্তর্জাতিক কমিটিগুলো এই সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তারা রাষ্ট্রগুলোকে চাপ দেয় যেন তারা ধীরে ধীরে তাদের দেওয়া সংরক্ষণগুলো প্রত্যাহার করে নেয়। অনেক সময় অন্য রাষ্ট্রগুলোও কোনো একটি দেশের সংরক্ষণের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানায়। এই আইনি টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি নিয়মিত দৃশ্য। তবে এই সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক রাষ্ট্র হয়তো চুক্তির পুরোটা একসাথে মেনে নিতে ভয় পায়। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকলে তারা হয়তো কখনোই ওই চুক্তির ধারেকাছেও আসত না। কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও রাষ্ট্রগুলোকে একটি বৈশ্বিক আইনি কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসাটা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হয়। সময়ের সাথে সাথে অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে তাদের সংরক্ষণগুলো তুলে নিয়েছে এবং মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া

কোনো আইন যতই সুন্দর করে লেখা হোক না কেন, তা যদি বাস্তবায়ন করার কোনো প্রক্রিয়া না থাকে, তবে সেই আইনের কোনো মূল্য নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ক্ষেত্রেও এই কথাটি পুরোপুরি সত্যি। চুক্তিগুলো সই করার পর রাষ্ট্রগুলো সেগুলো ঠিকমতো মেনে চলছে কি না, তা তদারকি করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রতিটি প্রধান মানবাধিকার চুক্তির অধীনে একটি করে স্বাধীন কমিটি থাকে, যাদের বলা হয় চুক্তি ভিত্তিক সংস্থা (Treaty Bodies)। এই কমিটিগুলো সারা বিশ্বের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এই কমিটির কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় যে সে গত কয়েক বছরে নিজ দেশে মানবাধিকার রক্ষায় কী কী কাজ করেছে, কী আইন বানিয়েছে এবং কোথায় ব্যর্থ হয়েছে। এটি অনেকটা স্কুলের পরীক্ষার মতো, যেখানে রাষ্ট্রকে তার কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হয়।

তবে রাষ্ট্রগুলোর স্বভাব হলো নিজেদের ভালো কাজগুলো বড় করে দেখানো এবং ভুলগুলো সযত্নে লুকিয়ে রাখা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক আইনে একটি চমৎকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাষ্ট্র যখন তার সরকারি প্রতিবেদন জমা দেয়, তখন সেই দেশের ভেতরের বেসরকারি সংস্থাগুলো বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তাদের নিজস্ব একটি প্রতিবেদন কমিটির কাছে পাঠাতে পারে। একে বলা হয় বিকল্প প্রতিবেদন (Shadow Report)। স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা এই দুটি প্রতিবেদন পাশাপাশি রেখে পর্যালোচনা করেন। এরপর তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সরাসরি প্রশ্ন করেন। এই প্রশ্নোত্তর পর্বগুলো অনেক সময় বেশ তীক্ষ্ণ হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা অনেক সাজানো কথা বলতে চাইলেও স্বাধীন তথ্যপ্রমাণের সামনে তারা বাধ্য হন সত্যটি স্বীকার করতে বা অন্তত বিব্রত হতে। এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার শেষে কমিটি রাষ্ট্রকে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে, যা পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে একটি বড় চাপ হিসেবে কাজ করে (Alston & Crawford, 2000)।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক আইনে জবাবদিহিতার আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে, তা হলো ব্যক্তিগত অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া। কিছু কিছু চুক্তির অধীনে সুযোগ রাখা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি মনে করে তার নিজ রাষ্ট্র তার মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং সে দেশের ভেতরে কোনো আইনি প্রতিকার পায়নি, তবে সে সরাসরি আন্তর্জাতিক কমিটির কাছে অভিযোগ জানাতে পারে। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে একজন সাধারণ নাগরিক সরাসরি তার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনি লড়াই করার অধিকার লাভ করে। যদিও আন্তর্জাতিক কমিটিগুলোর কোনো নিজস্ব পুলিশ বাহিনী বা জেলখানা নেই, তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর একটি বিশাল নৈতিক ও আইনি ওজন রয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কমিটির রায় গেলে বিশ্বজুড়ে সেই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো মূলত রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে তার কাজের ওপর একটি বৈশ্বিক নজরদারি বজায় রয়েছে।

জাতীয় আইনে আন্তর্জাতিক আইনের রূপান্তর

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হলেও এর চূড়ান্ত প্রয়োগের জায়গা হলো মানুষের নিজ দেশ। একটি রাষ্ট্র জেনেভায় বা নিউইয়র্কে গিয়ে কোনো চুক্তিতে সই করার পর দেশের ভেতরে সেই আইনের মর্যাদা কেমন হবে, তা নিয়ে আইনি জগতে দুটি প্রধান মতবাদ রয়েছে। একটি মতবাদকে বলা হয় একত্ববাদ (Monism) এবং অন্যটিকে বলা হয় দ্বৈতবাদ (Dualism)। একত্ববাদে বিশ্বাসী দেশগুলোর ব্যবস্থাটি বেশ সহজ। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন এবং দেশের ভেতরের আইনকে একই আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্র কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করা মাত্রই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে পরিণত হয়। দেশের বিচারকরা সরাসরি সেই আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারা উল্লেখ করে আদালতে রায় দিতে পারেন। এর জন্য আলাদা করে দেশের সংসদে কোনো আইন পাস করার প্রয়োজন হয় না। এই ধরনের ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন সরাসরি সাধারণ মানুষের উপকারে আসে এবং নাগরিকরা সহজেই আন্তর্জাতিক অধিকারগুলো নিজ দেশের আদালতে দাবি করতে পারে।

অন্যদিকে দ্বৈতবাদী দেশগুলোর আইনি ব্যবস্থা একটু ভিন্ন এবং জটিল। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতীয় আইনকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জগত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি দ্বৈতবাদী রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করলেও সেই চুক্তির ধারাগুলো দেশের ভেতরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। চুক্তিটিকে কার্যকর করতে হলে দেশের সংসদকে সেই চুক্তির আদলে একটি নতুন দেশীয় আইন পাস করতে হয়। যতক্ষণ না সংসদ নতুন আইন তৈরি করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের বিচারকরা আন্তর্জাতিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে কোনো রায় দিতে পারেন না (Cassese, 2005)। দক্ষিণ এশিয়া সহ বিশ্বের অনেক দেশই মূলত এই দ্বৈতবাদী নীতি অনুসরণ করে। এর ফলে অনেক সময় দেখা যায়, রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মঞ্চে বড় বড় মানবাধিকার চুক্তিতে সই করে এসেছে, কিন্তু দেশের ভেতরে আইন পাস না করায় সাধারণ মানুষ সেই চুক্তির কোনো সুফল পাচ্ছে না। এটি আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত বাধা।

তবে দ্বৈতবাদী ব্যবস্থা হলেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রভাব একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে অস্পষ্টতা থাকে বা মানবাধিকার নিয়ে কোনো সরাসরি আইন থাকে না, তখন অনেক দেশের উচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর সাহায্য নেন। বিচারকরা তাদের রায়ে আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো উল্লেখ করে অভ্যন্তরীণ আইনের ব্যাখ্যা দেন। একে আইনি পরিভাষায় বলা হয় সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যার নীতি। এর মাধ্যমে সংসদ আইন পাস না করলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ধীরে ধীরে দেশের বিচার ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করে। মানবাধিকার কেবল আর আন্তর্জাতিক সেমিনারের বিষয় থাকে না, এটি দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আইনি অধিকারের অংশে পরিণত হয়। এটি প্রমাণ করে যে, আইনি কাঠামোর যে পদ্ধতিই অনুসরণ করা হোক না কেন, মানবাধিকারের সর্বজনীন নীতিগুলোকে কোনো সীমানা বা আইনি বেড়াজাল দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে রাখা সম্ভব নয়।

মানবাধিকার চুক্তির সংরক্ষণ (Reservations to Human Rights Treaties): আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব

চুক্তির সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত

আন্তর্জাতিক আইনের বিশাল এবং জমকালো মঞ্চে যখন কোনো রাষ্ট্রনেতা হাসিমুখে একটি মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তখন চারপাশের ক্যামেরার ফ্লাশ আর হাততালির শব্দে মনে হয় যেন পৃথিবীটা রাতারাতি অনেক বেশি মানবিক হয়ে গেল। দৃশ্যপটের এই চাকচিক্যের আড়ালে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং জটিল আইনি খেলা চলতে থাকে। চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সময় রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই একটি বিশেষ আইনি সুবিধার আশ্রয় নেয়, যাকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় চুক্তির সংরক্ষণ (Reservations to Treaties) বলা হয়। ব্যাপারটা সহজ করে বললে, একটি রাষ্ট্র পুরো চুক্তির সাথে একমত পোষণ করলেও চুক্তির নির্দিষ্ট একটি বা দুটি ধারার ক্ষেত্রে নিজেদের আপত্তি জানিয়ে রাখে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলে দেয় যে, চুক্তির ওই নির্দিষ্ট ধারাগুলো তাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে না। মানবাধিকারের মূল দর্শন হলো এর সার্বজনীনতা, অর্থাৎ পৃথিবীর সব মানুষের অধিকার সমান। কিন্তু এই সংরক্ষণের আইনি সুযোগটি সেই সার্বজনীনতার ধারণার মাঝখানে একটি বড় ধরনের দেয়াল তুলে দেয়। রাষ্ট্রগুলো মূলত এক হাতে মানবাধিকারের বৈশ্বিক আদর্শকে আলিঙ্গন করে, আর অন্য হাতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।

রাষ্ট্রগুলো কেন এই ধরনের সংরক্ষণের আশ্রয় নেয়, তার পেছনের মনস্তত্ত্বটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডের ভেতরের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে, যাকে আমরা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (State Sovereignty) বলে থাকি। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নিঃশর্তভাবে স্বাক্ষর করার অর্থ হলো নিজেদের আইনি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর বাইরের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ দেওয়া। অনেক রাষ্ট্রই এই ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হয় না। তারা চায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি প্রগতিশীল এবং আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে বিশ্বমঞ্চে একঘরে হয়ে পড়ার ভয় থাকে। তাই তারা চুক্তিতে যোগ দেয় ঠিকই, কিন্তু সংরক্ষণের ঢাল ব্যবহার করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনগুলোকে আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে সুরক্ষিত রাখে। এই দ্বিমুখী আচরণের কারণে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলো অনেক সময় তাদের মূল শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর কোনো বাস্তব প্রভাব পড়ে না।

এই আইনি এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের বিষয়টি নিয়ে প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ উইলিয়াম শাবাস (William Schabas) অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। শাবাস তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানবাধিকার চুক্তিতে সংরক্ষণের সুযোগ রাখাটা মূলত রাষ্ট্রগুলোকে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামির লাইসেন্স দেওয়ার সমতুল্য। তার মতে, একটি রাষ্ট্র যখন কোনো মানবাধিকার চুক্তির মূল চেতনার পরিপন্থী একটি সংরক্ষণ জুড়ে দেয়, তখন সেই চুক্তির আর কোনো আইনি বা নৈতিক মূল্য অবশিষ্ট থাকে না (Schabas, 1995)। শাবাস যুক্তি দেন যে, সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তির ক্ষেত্রে সংরক্ষণ মেনে নেওয়া যায়, কারণ সেখানে কেবল দুটি রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকে। কিন্তু মানবাধিকার চুক্তিগুলোর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষা দেওয়া। এখানে সংরক্ষণের সুযোগ রাখার অর্থ হলো রাষ্ট্রকে তার নিজের নাগরিকদের অধিকার হরণ করার একটি বৈধ আইনি পথ তৈরি করে দেওয়া। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অহংকার এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন দাবির মধ্যকার এই চিরস্থায়ী সংঘাতই মূলত চুক্তির সংরক্ষণের মূল ভিত্তিভূমি।

সংরক্ষণের আইনি কাঠামো এবং ভিয়েনা কনভেনশনের শর্তাবলি

আন্তর্জাতিক আইনে চুক্তির সংরক্ষণ কীভাবে কাজ করবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। এই রূপরেখাটি ভিয়েনা কনভেনশন (Vienna Convention on the Law of Treaties) নামে পরিচিত, যাকে আন্তর্জাতিক চুক্তির ‘সংবিধান’ বলা হয়ে থাকে। ভিয়েনা কনভেনশনের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগুলোকে চুক্তিতে সংরক্ষণ যুক্ত করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এই অধিকারটি কোনোভাবেই লাগামহীন বা সীমাহীন নয়। সেখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শর্তটি হলো, কোনো রাষ্ট্র এমন কোনো সংরক্ষণ যুক্ত করতে পারবে না যা সেই চুক্তির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের (Object and Purpose) সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রাষ্ট্র যদি নির্যাতন বিরোধী সনদে স্বাক্ষর করে এই শর্ত জুড়ে দেয় যে তারা বিশেষ প্রয়োজনে বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালানোর অধিকার সংরক্ষণ করে, তবে সেটি সরাসরি চুক্তির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হবে। ভিয়েনা কনভেনশনের এই শর্তটির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রগুলোকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি চুক্তির মূল স্পিরিট বা আত্মাকে রক্ষা করা।

আইনের খাতায় এই ‘উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের’ শর্তটি শুনতে খুব চমৎকার মনে হলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি এক বিশাল আইনি ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একটি সংরক্ষণ চুক্তির মূল লক্ষ্যের পরিপন্থী কি না, তা নির্ধারণ করার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো কেন্দ্রীয় বা স্বয়ংক্রিয় বিচার ব্যবস্থা নেই। কোনো রাষ্ট্র যখন একটি সংরক্ষণ যুক্ত করে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো সেই সংরক্ষণটি মূল্যায়ন করা। যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে সংরক্ষণটি চুক্তির উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক, তবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে। এই ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক আইনের বিকেন্দ্রীকৃত বা ডিসেন্ট্রালাইজড পদ্ধতি বলা হয়। এখানে কোনো আন্তর্জাতিক পুলিশ এসে বলে দেয় না যে আপনার সংরক্ষণটি অবৈধ। পুরো বিষয়টি নির্ভর করে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর। ফলে অনেক সময় দেখা যায়, চরম অযৌক্তিক এবং মানবাধিকার বিরোধী একটি সংরক্ষণ দেওয়ার পরও অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে কোনো আপত্তি জানায় না।

আন্তর্জাতিক আইনের এই বিকেন্দ্রীকৃত প্রকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্মতির গুরুত্ব নিয়ে ব্রিটিশ আইনজ্ঞ ইয়ান ব্রাউনলি (Ian Brownlie) তার প্রিন্সিপালস অব পাবলিক ইন্টারন্যাশনাল ল (Principles of Public International Law) গ্রন্থে বিশদ আলোচনা করেছেন। ব্রাউনলি দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন মূলত রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কোনো রাষ্ট্রকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো আইন মানতে বাধ্য করার সুযোগ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় খুবই সীমিত (Brownlie, 2008)। ব্রাউনলির এই তাত্ত্বিক অবস্থানটি সংরক্ষণের আইনি জটিলতাকে বুঝতে সাহায্য করে। যখন একটি রাষ্ট্র সংরক্ষণ দেয় এবং অন্য রাষ্ট্র আপত্তি জানায়, তখন সেই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তির ওই নির্দিষ্ট ধারাটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর ফলে একটি অভিন্ন মানবাধিকার চুক্তির ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জাল তৈরি হয়। একটি সর্বজনীন মানবাধিকার দলিল তখন মূলত একটি খণ্ডিত এবং দুর্বল আইনি দলিলে পরিণত হয়। ভিয়েনা কনভেনশন সংরক্ষণের জন্য যে আইনি কাঠামো তৈরি করেছিল, তা মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে গিয়ে মানবাধিকারের অখণ্ডতাকে চরমভাবে ব্যাহত করেছে।

নারী অধিকার সনদ এবং সংরক্ষণের বৈশ্বিক রাজনীতি

মানবাধিকার চুক্তিগুলোর মধ্যে সংরক্ষণের এই আইনি খেলাটি সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে নগ্নভাবে দেখা যায় সিডও (CEDAW) বা নারী বৈষম্য বিলোপ সনদের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এই চুক্তিটিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাতিসংঘের মূল মানবাধিকার চুক্তিগুলোর মধ্যে এই সিডও সনদেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রাষ্ট্র সংরক্ষণের আশ্রয় নিয়েছে। রাষ্ট্রগুলো সাধারণত নারী অধিকারের সাধারণ নীতিগুলোর সাথে একমত পোষণ করে, কিন্তু যখনই সেই নীতিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ পারিবারিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখনই তারা পিছু হটে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং সন্তানের অভিভাবকত্বের মতো বিষয়গুলোতে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক নিয়ম মানতে প্রবল আপত্তি জানায়। তারা যুক্তি দেয় যে, তাদের দেশের পারিবারিক আইনগুলো দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এই অজুহাতের আড়ালে রাষ্ট্রগুলো মূলত নারীদের প্রতি কাঠামোগত বৈষম্য টিকিয়ে রাখার একটি আন্তর্জাতিক লাইসেন্স আদায় করে নেয়।

সিডও সনদের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদটি বিবাহ এবং পারিবারিক জীবনে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে। বিশ্বের অসংখ্য দেশ ঠিক এই অনুচ্ছেদটির ওপরই সবচেয়ে বেশি সংরক্ষণ যুক্ত করেছে। এর ফলে সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী অংশটিই অনেক দেশের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একটি রাষ্ট্র একদিকে বলছে তারা নারী বৈষম্য দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, অন্যদিকে তারা আইনিভাবে নিশ্চিত করছে যে পরিবারের ভেতরে নারীরা পুরুষদের সমান অধিকার পাবে না। এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি বড় ধরনের স্ববিরোধিতা। অনেক প্রগতিশীল রাষ্ট্র এই সংরক্ষণগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, পারিবারিক জীবনে যদি নারীদের সমান অধিকার না থাকে, তবে জনজীবনে বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারী অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলাটা নিছক একটি প্রহসন। পারিবারিক কাঠামোর ভেতরের বৈষম্যই মূলত সমাজের অন্যান্য সব বৈষম্যের মূল ভিত্তি তৈরি করে। সিডও সনদের ওপর দেওয়া এই ব্যাপক সংরক্ষণগুলো প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রগুলো এখনো তাদের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার খোলস থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক আইনের এই পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ তাত্ত্বিক সমালোচনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ান আইনজ্ঞ হিলারি চার্লসওয়ার্থ (Hilary Charlesworth)। চার্লসওয়ার্থ তার নারীবাদী আইনি তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের পুরো কাঠামোটিই মূলত পুরুষদের দ্বারা এবং পুরুষদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার যে মহান নীতিগুলোর কথা আন্তর্জাতিক আইনে বলা হয়, সেগুলো মূলত রাষ্ট্রের ভেতরের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে বাইরের সমালোচনা থেকে রক্ষা করার জন্যই ব্যবহৃত হয় (Charlesworth, 1991)। চার্লসওয়ার্থ যুক্তি দেন যে, সিডও সনদে সংরক্ষণের এই ছড়াছড়ি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন নারী অধিকারকে মানবাধিকারের মূল স্রোতের অংশ হিসেবে না দেখে, একে একটি ঐচ্ছিক বা গৌণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রযন্ত্র খুব সহজেই বুঝতে পারে যে, পারিবারিক আইনের পরিবর্তন মানেই হলো তাদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক আধিপত্যের অবসান। তাই তারা সংরক্ষণের ঢাল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখে।

সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ বনাম মানবাধিকারের সার্বজনীনতা

মানবাধিকার চুক্তিতে সংরক্ষণের এই আইনি বিতর্কের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে একটি গভীর দার্শনিক সংঘাত। এই সংঘাতটি মূলত সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Cultural Relativism) এবং সার্বজনীনতাবাদ (Universalism)-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব। সার্বজনীনতাবাদের মূল কথা হলো, পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো একই রকম হওয়া উচিত। একজন মানুষ নিউইয়র্কে জন্ম নিক বা সাব-সাহারা আফ্রিকার কোনো দুর্গম গ্রামে, মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা এবং অধিকারের কোনো পার্থক্য থাকতে পারে না। অন্যদিকে, সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদীরা মনে করেন যে, অধিকারের ধারণাটি স্থান, কাল এবং সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাদের যুক্তি হলো, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের নিজেদের উদারনৈতিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে মানবাধিকারের মোড়কে পুরো পৃথিবীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এশিয়া, আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের সমাজকাঠামো মূলত পরিবার এবং সম্প্রদায়কেন্দ্রিক। সেখানে পশ্চিমা ধাঁচের ব্যক্তিগত অধিকারের ধারণাগুলো অনেক সময় সমাজের নিজস্ব রীতিনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। এই তাত্ত্বিক ভিন্নতার কারণেই অনেক রাষ্ট্র মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সময় নিজেদের সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে বিভিন্ন ধারায় সংরক্ষণ যুক্ত করে।

রাষ্ট্রগুলো যখন সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের কথা বলে, তখন তারা মূলত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রথাগুলোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা দাবি করে যে, তাদের দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক অনুশাসনগুলো তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফসল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির কোনো ধারা যদি সেই প্রথাগুলোর পরিপন্থী হয়, তবে রাষ্ট্র সেই ধারাটি মানতে বাধ্য নয়। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিটিকে খুব গণতান্ত্রিক এবং বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানোর একটি প্রয়াস বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে এই সাংস্কৃতিক সুরক্ষার আড়ালে অনেক সময় ভয়াবহ সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কঠোর শাস্তির মতো অমানবিক প্রথাগুলোকে অনেক রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের অংশ বলে দাবি করে। তারা সংরক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দেয় যে, তাদের দেশের ভেতরের ব্যাপারে বাইরের কারো নাক গলানোর অধিকার নেই। এটি মূলত সংস্কৃতির নামে রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারকে প্রশ্রয় দেওয়ার একটি অত্যন্ত সুকৌশলী পদ্ধতি।

এই সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের ধারণাকে অত্যন্ত জোরালো যুক্তির মাধ্যমে খণ্ডন করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাক ডনেলি (Jack Donnelly)। তার ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Universal Human Rights in Theory and Practice) গ্রন্থে তিনি সার্বজনীন মানবাধিকারের পক্ষে একটি শক্ত তাত্ত্বিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ডনেলি স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে এবং সেই ভিন্নতাকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু তিনি এই যুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেন যে সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে কোনো মানুষের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা যেতে পারে (Donnelly, 2013)। ডনেলির মতে, একজন মানুষকে বিনাবিচারে আটকে রাখা বা নির্যাতন করা পৃথিবীর কোনো সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। মানবাধিকারের মূল নীতিগুলো মানুষের জন্মগত মর্যাদার সাথে যুক্ত, এটি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক আবিষ্কার নয়। তিনি দেখিয়েছেন যে, যারা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের কথা বলে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার থাকে, তারা সাধারণত সেই সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। সমাজের যে মানুষগুলো নিপীড়নের শিকার হয়, তারা কখনোই সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে নিজেদের অধিকার ছাড়তে রাজি হয় না। ডনেলির এই দর্শন প্রমাণ করে যে, বৈচিত্র্য রক্ষার নামে মানুষের মর্যাদাকে বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মানবাধিকার কমিটিগুলোর ভূমিকা এবং আইনি টানাপোড়েন

ভিয়েনা কনভেনশন সংরক্ষণের যে অস্পষ্ট নিয়ম তৈরি করেছিল, তা থেকে বের হওয়ার জন্য নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিটিগুলো একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির তদারকির দায়িত্বে থাকা ‘হিউম্যান রাইটস কমিটি’ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৪ সালে তারা ‘জেনারেল কমেন্ট ২৪’ নামে একটি যুগান্তকারী সাধারণ মন্তব্য প্রকাশ করে। এই দলিলে কমিটি ঘোষণা করে যে, মানবাধিকার চুক্তির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের বৈধতা যাচাই করার অধিকার কেবল অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে একে অপরের সংরক্ষণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায় না। কমিটি দাবি করে যে, একটি সংরক্ষণ চুক্তির মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক কি না, তা নির্ধারণ করার চূড়ান্ত এখতিয়ার কেবল চুক্তির তদারকিতে থাকা স্বাধীন কমিটিরই রয়েছে। তারা আরও একটি বৈপ্লবিক কথা বলে। কমিটি জানায় যে, যদি কোনো রাষ্ট্র চুক্তির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী কোনো অবৈধ সংরক্ষণ যুক্ত করে, তবে সেই সংরক্ষণটি বাতিল বলে গণ্য হবে এবং ওই রাষ্ট্রকে পুরো চুক্তিটিই মেনে চলতে হবে।

কমিটির এই আইনি অবস্থানের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল বিতর্কের ঝড় ওঠে। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো কমিটির এই দাবির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। তাদের যুক্তি ছিল অত্যন্ত সোজা। আন্তর্জাতিক আইন তৈরি হয় রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সম্মতির ভিত্তিতে। একটি রাষ্ট্র চুক্তির যতটুকু অংশ মানতে রাজি হয়েছে, তাকে কেবল ততটুকুই মানতে বাধ্য করা যেতে পারে। কমিটিগুলো মূলত কিছু স্বাধীন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি উপদেষ্টা পর্ষদ মাত্র। তাদের কোনো আইনি রায় দেওয়ার ক্ষমতা নেই। রাষ্ট্রগুলো অভিযোগ করে যে, কমিটি নিজেদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। যদি একটি অবৈধ সংরক্ষণকে বাতিল করে রাষ্ট্রকে পুরো চুক্তিটি মানতে বাধ্য করা হয়, তবে সেটি হবে রাষ্ট্রের সম্মতির নীতির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। এই টানাপোড়েনটি মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একদিকে রয়েছে মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের তাগিদ, অন্যদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অহংকার।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ক্ষমতা এবং আইনের বিবর্তন নিয়ে ব্রিটিশ আইনজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের সাবেক বিচারক রোজালিন হিগিনস (Rosalyn Higgins) একটি চমৎকার তাত্ত্বিক রূপরেখা দিয়েছেন। তার প্রবলেমস অ্যান্ড প্রসেস: ইন্টারন্যাশনাল ল অ্যান্ড হাউ উই ইউজ ইট (Problems and Process: International Law and How We Use It) গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন কেবল কিছু স্থির এবং অপরিবর্তনীয় নিয়মের সমষ্টি নয়। এটি মূলত একটি গতিশীল প্রক্রিয়া (Higgins, 1994)। হিগিনস মনে করেন, আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর ব্যাখ্যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে বাধ্য। চুক্তি তদারকি করার জন্য যে কমিটি বা প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করা হয়েছে, তাদের কাজ কেবল নীরব দর্শকের মতো বসে থাকা নয়। আন্তর্জাতিক আইনের প্রগতিশীল বিকাশে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। হিগিনসের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবাধিকার কমিটিগুলো যখন সংরক্ষণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা মূলত আন্তর্জাতিক আইনকে সময়ের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে একটি আধুনিক এবং মানবিক রূপ দেওয়ার চেষ্টাই করে। রাষ্ট্রগুলোর চরম সম্মতির নীতির বাইরে এসে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সক্রিয়তা মানবাধিকারের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিবর্তনের গতিপথ

চুক্তিতে সংরক্ষণ যুক্ত করার বিষয়টিকে পুরোপুরি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক আইনের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সংরক্ষণের সুযোগটি না থাকলে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি দেশ হয়তো কোনো মানবাধিকার চুক্তিতেই স্বাক্ষর করত না। সংরক্ষণ মূলত একটি সাময়িক আপসরফা বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এটি রক্ষণশীল এবং দ্বিধান্বিত রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। একটি রাষ্ট্র যখন কোনো চুক্তির কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তার ওপর আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ – উভয় দিক থেকেই একটি নৈতিক চাপ তৈরি হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে দেশের ভেতরের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো ওই নির্দিষ্ট সংরক্ষণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র একসময় বাধ্য হয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ আইনে পরিবর্তন আনে এবং চুক্তির ওপর থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে নেয়। একে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় ‘সোশ্যালাইজেশন’ বা সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া বলা হয়। এটি প্রমাণ করে যে সংরক্ষণ কোনো স্থায়ী বাধা নয়, এটি মূলত মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পথে একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার অংশ মাত্র।

এই দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার বিষয়টি বুঝতে হলে মানবাধিকারকে একটি আইনি লড়াইয়ের বদলে একটি সংলাপ বা ডায়ালগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার পরের দিন সকালেই কোনো দেশের শত বছরের পুরনো সামাজিক প্রথা বা পারিবারিক আইন বদলে যায় না। এর জন্য সমাজের ভেতরে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলো মূলত সেই পরিবর্তনের জন্য একটি মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রগুলো যখন সংরক্ষণ দেয়, তখন তারা মূলত স্বীকার করে নেয় যে তাদের বর্তমান আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে মিলছে না। এই স্বীকারোক্তিটিই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যান দেখলে একটি খুব আশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটে ওঠে। বিশ্বের অনেক দেশই এখন স্বেচ্ছায় নারী অধিকার বা শিশু অধিকার সনদের ওপর থেকে তাদের পুরনো সংরক্ষণগুলো তুলে নিচ্ছে। তারা তাদের অভ্যন্তরীণ আইন সংস্কার করছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বিজয়। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় অহংকারের চেয়ে মানুষের আত্মমর্যাদার দাবি শেষ পর্যন্ত অনেক বেশি টেকসই এবং প্রভাবশালী হয়।

আন্তর্জাতিক আইনের এই ধীর কিন্তু অবিচল অগ্রযাত্রা নিয়ে প্রখ্যাত আমেরিকান আইনজ্ঞ লুইস হেনকিন (Louis Henkin) একটি অত্যন্ত বিখ্যাত এবং আশাবাদী তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তার হাউ নেশনস বিহেভ (How Nations Behave) বইতে তিনি একটি কালজয়ী কথা বলেছেন। হেনকিনের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন, বাস্তব সত্য হলো প্রায় সব রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক আইনের প্রায় সব নিয়মকানুন প্রায় সবসময় মেনে চলে (Henkin, 1979)। মানবাধিকার চুক্তির সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও হেনকিনের এই কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রগুলো কিছু নির্দিষ্ট ধারায় আপত্তি জানালেও চুক্তির সিংহভাগ অধিকারই তারা নিজেদের আইনি কাঠামোতে গ্রহণ করে নেয়। সংরক্ষণের এই আইনি জটিলতাগুলো প্রমাণ করে না যে মানবাধিকারের ধারণাটি ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি প্রমাণ করে যে মানবাধিকার এখন বিশ্ব রাজনীতির এমন একটি শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠেছে, যাকে কোনো রাষ্ট্রই আর পুরোপুরি অগ্রাহ্য করতে পারে না। সংরক্ষণের এই বাধাগুলো পেরিয়ে পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যকার বিভেদের রেখাগুলো মুছে গিয়ে মানুষের সার্বজনীন মর্যাদাই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে অধিকার ও বাধ্যবাধকতা (Rights and Obligations Under International Human Rights Law)

অধিকার ও বাধ্যবাধকতার সমীকরণ

আইনের বইগুলোতে অধিকার এবং বাধ্যবাধকতার সমীকরণটা খুব সাধারণ একটা পাল্লার মতো। পাল্লার একপাশে থাকে মানুষের অধিকার, অন্যপাশে থাকে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ভারসাম্যের ওপর। এখানে রাষ্ট্র কোনো দয়াবান জমিদার নয় যে সে খুশি হয়ে সাধারণ মানুষকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দান করবে। বরং আইনের চোখে সাধারণ মানুষ হলো অধিকারধারী (Rights-holders) এবং রাষ্ট্র হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা (Duty-bearers)। এই ধারণার প্রথম চমৎকার আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন আইনজ্ঞ ওয়েসলি হোহফেল্ড, যাকে আইনি পরিভাষায় হোহফেল্ডিয়ান বিশ্লেষণ (Hohfeldian Analysis) বলা হয়। তার মতে, একজনের অধিকার থাকার অর্থই হলো অন্য কারও ওপর সেই অধিকার পূরণের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি দায়িত্ব থাকা (Hohfeld, 1913)। অর্থাৎ অধিকার কখনো শূন্যে ভাসতে পারে না। আমার যদি স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার থাকে, তবে অন্য কাউকে অবশ্যই সেই কথা বলার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনে এই দায়িত্বটি সরাসরি রাষ্ট্রের কাঁধে চাপানো হয়েছে।

রাষ্ট্র কেন এই দায়িত্ব নেবে, এই প্রশ্নটা অনেকেই করতে পারেন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত একটি বিশাল কাঠামোগত চুক্তি। মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের জন্যই রাষ্ট্র নামের এই পরাক্রমশালী প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে। নাগরিকদের করের টাকায় রাষ্ট্রের বিশাল প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী চলে। ফলে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকদের কিছু মৌলিক পাওনা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন নাগরিকদের সেই পাওনাগুলোকেই আইনি স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতরে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রথম কাজ। রাষ্ট্র যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে তার শাসন করার কোনো বৈধতা থাকে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অধিকার আর বাধ্যবাধকতা অনেকটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। সরকার বা ক্ষমতাবানরা অনেক সময় সাধারণ মানুষের অধিকারকে দয়ার দান হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে। কিন্তু মানবাধিকার আইন খুব কঠোরভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, এগুলো কোনো করুণা নয়, এগুলো মানুষের পাওনা এবং রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।

আন্তর্জাতিক আইনের এই কাঠামোটি মূলত ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার উলম্ব সম্পর্ক বা ভার্টিক্যাল রিলেশনশিপ নিয়ে কাজ করে। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের বিশাল ক্ষমতার সামনে একেবারেই অসহায়। রাষ্ট্রের হাতে আছে আইন, পুলিশ এবং জেলখানা। এই অসীম ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্যই মানবাধিকার আইন রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার শক্ত বাঁধনে আটকে ফেলে। রাষ্ট্র তার ইচ্ছেমতো কোনো নাগরিকের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না (Shelton, 2014)। তাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মগুলো মেনে চলতে হয়। অধিকারের এই সমীকরণে রাষ্ট্র চাইলেই নিজের সুবিধামতো পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। কেউ যদি ভাবে রাষ্ট্র শুধু আইন বানিয়ে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে সে বোকার স্বর্গে বাস করছে। কারণ আন্তর্জাতিক আইন সাধারণ মানুষকেও এমন কিছু আইনি হাতিয়ার দিয়েছে, যা দিয়ে তারা রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে।

সম্মান করার বাধ্যবাধকতা

মানবাধিকার আইনের অধীনে রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান কাজের প্রথমটি হলো অধিকারকে সম্মান করা। আইনি ভাষায় একে বলা হয় সম্মান করার বাধ্যবাধকতা (The Obligation to Respect)। এর মানে খুব সহজ। রাষ্ট্র নিজে থেকে এমন কোনো কাজ করবে না, যার ফলে সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার খর্ব হয়। এটি মূলত একটি নেতিবাচক দায়িত্ব, যাকে তাত্ত্বিকরা নেতিবাচক অধিকার (Negative Rights) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে থাকেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে কেবল তার হাত গুটিয়ে রাখতে হবে। রাষ্ট্র অকারণে কারও বাড়িতে তল্লাশি চালাবে না, কাউকে বিনা বিচারে আটকে রাখবে না বা কারও স্বাধীন মতপ্রকাশে বাধা দেবে না। রাষ্ট্রের পুলিশ বা গোয়েন্দা বাহিনী ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে পারবে না। সহজ করে বললে, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত রাখাই হলো সম্মান করার বাধ্যবাধকতার মূল কথা। রাষ্ট্রকে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যেন সে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ না করে।

এই বাধ্যবাধকতাটি শুনতে খুব সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি পালন করা রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন। কারণ রাষ্ট্রের স্বভাবই হলো নিয়ন্ত্রণ করা। যেকোনো দেশের সরকার চায় তার বিরুদ্ধে কেউ যেন কথা না বলে। ভিন্নমত দমন করার জন্য রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইন তৈরি করে বা সেন্সরশিপ আরোপ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্পষ্ট বলে দেয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাতেও মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো দেশের সরকার এমন কোনো আইন পাস করে যার ফলে একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে না পারে, তবে সেই সরকার সরাসরি তার সম্মান করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে (Nowak, 2005)। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকদের ওপর ছড়ি ঘোরানো নয়, বরং তাদের স্বাধীনভাবে বাঁচার পথ সুগম করে দেওয়া।

সম্মান করার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি কাঠামোর ভেতরেই কিছু রক্ষাকবচ থাকতে হয়। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ বা প্রশাসন অনেক সময় ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যায়। সেই অন্ধত্ব কাটানোর জন্য একটি স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রয়োজন হয়। আদালতকে নিশ্চিত করতে হয় যেন রাষ্ট্র তার সীমানা অতিক্রম না করে। কেউ যদি বিনা কারণে গ্রেফতার হয়, তবে আদালতের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করা এবং ওই ব্যক্তিকে মুক্ত করা। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ – হোক সেটা পুলিশ, প্রশাসন বা বিচার বিভাগ – সবারই সমান দায়িত্ব থাকে মানবাধিকারকে সম্মান করার। রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো একটি অংশ যদি অন্যায় করে, তবে পুরো রাষ্ট্রকেই আন্তর্জাতিক আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। এই বাধ্যবাধকতা মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অহংকার চূর্ণ করে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ আসনে বসায়।

রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা

রাষ্ট্র নিজে হয়তো কারও অধিকার লঙ্ঘন করছে না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে। এখানেই আসে মানবাধিকার আইনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক, যাকে বলা হয় রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা (The Obligation to Protect)। এর মানে হলো, রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন অন্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই ধারণাটিকে অনুভূমিক প্রভাব (Horizontal Effect) বলা হয়। অর্থাৎ কেবল রাষ্ট্র আর নাগরিকের সম্পর্ক নয়, নাগরিকের সাথে নাগরিকের বা নাগরিকের সাথে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কেও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে। ধরা যাক, একটি লোকালয়ের পাশেই বিশাল এক কারখানা তৈরি হলো এবং সেই কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এলাকার নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেল। এখানে রাষ্ট্র সরাসরি পানি দূষণ করেনি, করেছে একটি বেসরকারি কোম্পানি। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সেই কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব পুরোপুরি রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে ধরে নেওয়া হবে রাষ্ট্র তার রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

এই বাধ্যবাধকতা পালনের জন্য আন্তর্জাতিক আইনে একটি বিশেষ মানদণ্ড রয়েছে, যার নাম যথাযথ সতর্কতা বা ডিউ ডিলিজেন্স (Due Diligence)। রাষ্ট্রকে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সব রকম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পারিবারিক সহিংসতা বা কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানির ঘটনাগুলো এর চমৎকার উদাহরণ। পরিবার বা অফিসের ভেতরে ঘটা অপরাধগুলোতে রাষ্ট্র সরাসরি জড়িত থাকে না। তবে রাষ্ট্রকে এমন আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়, যেন কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। যদি অপরাধ ঘটেই যায়, তবে রাষ্ট্রকে দ্রুত অপরাধীর বিচার করতে হবে এবং ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে (Clapham, 2006)। রাষ্ট্র যদি বলে যে, “এটি তো পারিবারিক ব্যাপার, এখানে আমাদের কিছু করার নেই,” তবে সেই যুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের দরবারে এক মুহূর্তও টিকবে না।

রক্ষা করার এই বাধ্যবাধকতা মূলত সমাজকে অরাজকতা থেকে বাঁচায়। শক্তিশালীরা যেন দুর্বলদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে না পারে, সেই ভরসার জায়গাটুকু রাষ্ট্রকেই তৈরি করতে হয়। একটি দেশের পুলিশ বাহিনী বা আদালত যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মাফিয়া বা বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে চায়। মানবাধিকার আইন রাষ্ট্রকে বাধ্য করে এই দুর্বৃত্তদের লাগাম টেনে ধরতে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় যে সে কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও সাধারণ মানুষের রক্ষাকর্তা। কেউ যদি রাস্তার মোড়ে ছিনতাইয়ের শিকার হয় বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিজের বাড়িঘর হারায়, তার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আইনশৃঙ্খলার অভাবই এই ধরনের অপরাধীদের জন্ম দেয়।

বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতা

অধিকার এবং বাধ্যবাধকতার আলোচনার সবচেয়ে বিস্তৃত এবং গভীর অংশটি হলো বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতা (The Obligation to Fulfill)। রাষ্ট্র শুধু চুপচাপ বসে থেকে মানুষকে হয়রানি থেকে বাঁচালেই চলবে না, তাকে সক্রিয়ভাবে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। একে আইনি তত্ত্বে ইতিবাচক বাধ্যবাধকতা (Positive Obligations) বলা হয়। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কিছু মৌলিক জিনিস প্রয়োজন হয়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থান – এগুলো ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষেই মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে তার নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য এই সুযোগগুলো তৈরি করে দিতে হয়। এই বাধ্যবাধকতাটির মূল লক্ষ্য হলো সমাজে সুযোগের সমতা (Equality of Opportunity) প্রতিষ্ঠা করা। একজন গরিব ঘরের সন্তান যেন কেবল টাকার অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

এই বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতাকে আন্তর্জাতিক আইনে আরও তিনটি ছোট উপভাগে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়। এগুলো হলো: সুবিধা দেওয়া (Facilitate), প্রদান করা (Provide) এবং প্রচার করা (Promote)। রাষ্ট্রকে এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হয় যেখানে মানুষ নিজের চেষ্টায় নিজের খাবার বা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। রাষ্ট্র কাজের সুযোগ তৈরি করে বা কৃষি কাজে ভর্তুকি দিয়ে এই সুবিধাটুকু দেয়। তবে অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী বা চরম দারিদ্র্যের কারণে মানুষ নিজের চেষ্টায় টিকতে পারে না। তখন রাষ্ট্রকে সরাসরি খাদ্য, ওষুধ বা অর্থ প্রদান করতে হয়। এছাড়া সমাজে মানবাধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা এবং মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানানোটাও এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ। রাষ্ট্র যদি জনগণকে অন্ধকারে রাখে, তবে জনগণ কখনোই তাদের অধিকার দাবি করতে পারে না।

দার্শনিক হেনরি শু তার বিখ্যাত বই বেসিক রাইটস: সাবসিস্টেন্স, অ্যাফ্লুয়েন্স, অ্যান্ড ইউ.এস. ফরেন পলিসি (Basic Rights: Subsistence, Affluence, and U.S. Foreign Policy)-তে চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে নেতিবাচক এবং ইতিবাচক অধিকারের মধ্যে আসলে কোনো শক্ত দেয়াল নেই (Shue, 1996)। একটি সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকারকে সাধারণত নাগরিক অধিকার ধরা হয়, যেখানে রাষ্ট্রের কেবল হস্তক্ষেপ না করার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা দাঁড় করাতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। আদালত ভবন তৈরি করা, বিচারকদের বেতন দেওয়া এবং পুলিশি তদন্তের খরচ বহন করা – এসবকিছুর জন্যই রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে বিশাল বাজেটের ব্যবস্থা করতে হয়। ফলে যেকোনো অধিকারই পুরোপুরি ভোগ করতে হলে রাষ্ট্রের এই বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতা অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মানবাধিকারের ধারণাগুলো কেবল বইয়ের পাতায় সুন্দর সুন্দর বুলি হয়েই থেকে যায়।

প্রগতিশীল বাস্তবায়ন এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা

অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবেই একটি বড় বাধার সম্মুখীন হতে হয়, আর তা হলো অর্থের অভাব। বিশ্বের সব দেশ সমান ধনী নয়। উন্নত দেশগুলোর পক্ষে রাতারাতি সবার জন্য উচ্চমানের হাসপাতাল বা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা যতটা সহজ, উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর পক্ষে তা একরকম অসম্ভব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বাস্তবতার এই রূঢ় দিকটি খুব ভালোভাবে বোঝে। তাই এসব অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যাকে বলা হয় প্রগতিশীল বাস্তবায়ন (Progressive Realization)। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রকে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করতে হবে না। তবে তাকে ধাপে ধাপে, ক্রমাগত সামনের দিকে এগোতে হবে। রাষ্ট্রকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে যেন সময়ের সাথে সাথে দেশের সাধারণ মানুষ আরো ভালো স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত খাবার পায়।

তবে এই প্রগতিশীল বাস্তবায়নের একটি বড় শর্ত আছে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে সে তার সর্বোচ্চ প্রাপ্ত সম্পদের ব্যবহার (Maximum Available Resources) করছে। রাষ্ট্র বলতে পারবে না যে আমাদের টাকা নেই, তাই আমরা হাসপাতাল বানাব না। আন্তর্জাতিক কমিটিগুলো তখন খতিয়ে দেখবে যে রাষ্ট্রের বাজেটের টাকা আসলে কোথায় খরচ হচ্ছে। যদি দেখা যায় রাষ্ট্র শিক্ষার বাজেট কমিয়ে দিয়ে প্রচুর পরিমাণে সামরিক অস্ত্র কিনছে বা মন্ত্রীদের বিলাসবহুল জীবনযাপনে অঢেল অর্থ ব্যয় করছে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। সম্পদের অভাব কোনোভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজুহাত হতে পারে না। রাষ্ট্রকে তার সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সবচেয়ে জরুরি খাতগুলোতে আগে নজর দিতে হয় (Sepúlveda, 2003)।

এই নীতিটি অনেক সময় ক্ষমতাবান সরকারগুলোর জন্য একটি সুরক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করে। তারা অনন্তকাল ধরে প্রগতিশীলতার কথা বলে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিতে চায়। তারা বড় বড় মেগা প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে মৌলিক অধিকার পূরণের কাজগুলো পিছিয়ে দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই ধোঁকাবাজি ধরতে পারেন। তারা শুধু সরকারি প্রতিশ্রুতি শোনেন না, তারা দেখেন পাঁচ বছর আগের তুলনায় মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে কি না, বা স্কুলে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা কমেছে কি না। যদি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি, বা পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে, তবে রাষ্ট্র আর সম্পদের সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখাতে পারে না। প্রগতিশীল বাস্তবায়ন মানে হলো একটি স্থির গতিতে অবিরাম যাত্রা, যেখানে থেমে থাকা বা পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই।

অ-অবনমন নীতি ও ন্যূনতম মূল বাধ্যবাধকতা

প্রগতিশীল বাস্তবায়নের ফাঁক গলে রাষ্ট্রগুলো যেন পিছিয়ে না যেতে পারে, তার জন্য আন্তর্জাতিক আইনে দুটি অত্যন্ত কঠোর নীতি যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো অ-অবনমন নীতি (Non-Retrogression Principle)। এই নীতির মূল কথা হলো, রাষ্ট্র মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পেছনের দিকে হাঁটতে পারবে না। রাষ্ট্র যদি কোনো এক বছর দেশের সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করে, তবে পরের বছর হুট করে বাজেটের দোহাই দিয়ে সেই সুবিধা কেড়ে নিতে পারবে না। মানুষের অর্জিত অধিকার একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তা আর খর্ব করা যায় না। কেবল চরম জাতীয় সংকট বা ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মতো খুব বিরল ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে পারে, এবং সেক্ষেত্রেও তাকে আন্তর্জাতিক কমিটির কাছে শক্ত প্রমাণ হাজির করতে হয়।

দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী নীতিটি হলো ন্যূনতম মূল বাধ্যবাধকতা (Minimum Core Obligations)। রাষ্ট্র যতই গরিব হোক না কেন, তার সম্পদের যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন, প্রতিটি অধিকারের একটি ন্যূনতম পর্যায় তাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একে অধিকারের একেবারে শেকড় বলা যেতে পারে। ক্যাথরিন ইয়াং তার কন্সটিটিউটিং ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রাইটস (Constituting Economic and Social Rights) বইতে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন (Young, 2012)। কোনো মানুষ যেন না খেয়ে মারা না যায়, মহামারী দেখা দিলে অতি প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ যেন মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং গৃহহীন মানুষ যেন মাথার ওপর অন্তত একটি ছাদ পায় – এগুলো হলো ন্যূনতম মূল বাধ্যবাধকতার উদাহরণ। এই বিষয়গুলোতে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। রাষ্ট্র কোনোভাবেই বলতে পারবে না যে সম্পদের অভাবে কিছু মানুষ না খেয়ে মারা গেছে এবং এতে তাদের কিছু করার ছিল না।

এই ন্যূনতম মানদণ্ডগুলো মূলত অর্থনৈতিক অধিকারগুলোকে একটি শক্ত আইনি ভিত্তি দেয়। আগে অনেক পণ্ডিত মনে করতেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো আসলে কোনো অধিকারই নয়, এগুলো বড়জোর রাষ্ট্রের প্রতি কিছু রাজনৈতিক দাবি। কিন্তু ন্যূনতম মূল বাধ্যবাধকতার ধারণা সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, চরম দারিদ্র্য এবং বঞ্চনা কোনো নিয়তি নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রের আইনি ব্যর্থতা। একটি রাষ্ট্র যখন তার দেশের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে খাবার বা ওষুধ থেকে বঞ্চিত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তখন সে আসলে একটি গুরুতর মানবাধিকার অপরাধ করে। এই নীতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বন্টনের নীতি নিয়েও আইনি কাঠামোর ভেতরে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অধিকারের অবিভাজ্যতা এবং আন্তঃনির্ভরশীলতা

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে অধিকার নিয়ে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল। ভাবা হতো, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে এই পুরোনো ধারণাকে চিরতরে কবর দেওয়া হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় যে, সকল মানবাধিকার মূলত অবিভাজ্য এবং একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় অধিকারের অবিভাজ্যতা (Indivisibility of Rights) এবং আন্তঃনির্ভরশীলতা (Interdependence)। আপনি একজন মানুষকে তার ভোটের অধিকার দিলেন, কিন্তু সে না খেয়ে আছে। সেই ক্ষুধার্ত মানুষটি কি কখনো স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে? আবার একজন মানুষের পেট ভরা আছে, কিন্তু তার কথা বলার কোনো অধিকার নেই। সেই মানুষটির জীবন কি কখনো মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে? উত্তর হলো, না।

অধিকারগুলোকে আসলে আলাদা আলাদা বক্সে বন্দি করে রাখা যায় না। একটি অধিকার খর্ব হলে তার প্রভাব অন্য অধিকারগুলোর ওপরও পড়ে। একজন নারী যদি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সে পরবর্তী জীবনে ভালো কর্মসংস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, এবং শেষ পর্যন্ত সে সমাজে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতাও হারিয়ে ফেলবে। অধিকারের এই আন্তঃনির্ভরশীলতা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রকে সব ধরনের অধিকার নিয়ে একই সাথে কাজ করতে হবে (Baderin & McCorquodale, 2007)। রাষ্ট্র বলতে পারবে না যে, আমরা আগে সবার পেটে খাবার দেব, তারপর তাদের কথা বলার স্বাধীনতা দেব। মানবাধিকার কোনো রেস্টুরেন্টের মেনু কার্ড নয় যেখান থেকে রাষ্ট্র নিজের পছন্দমতো দু-একটি আইটেম বেছে নেবে।

অধিকার ও বাধ্যবাধকতার এই পুরো সমীকরণটি আমাদের একটি চমৎকার আইনি কাঠামোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সম্মান করা, রক্ষা করা এবং বাস্তবায়ন করা – এই তিনটি বাধ্যবাধকতা কেবল রাজনৈতিক বা কেবল অর্থনৈতিক অধিকারের জন্য আলাদা নয়। এগুলো সব অধিকারের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। এই সমন্বিত আইনি দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনকে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাস হিসেবে দেখে। আইন এখানে কেবল শাসন করার হাতিয়ার নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক বিকাশের একটি রক্ষাকবচ। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে প্রতিনিয়ত ক্ষমতাশালীরা দুর্বলদের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। সেই অসম লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সাধারণ মানুষের হাতে একটি অমোঘ অস্ত্র তুলে দেয়। এই অস্ত্র হলো জবাবদিহিতার দাবি, যা রাষ্ট্রকে বারবার মনে করিয়ে দেয় – ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের অধিকার চিরন্তন।

তথ্য জানার অধিকার (Right to Information)

তথ্যের অধিকারের দার্শনিক ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার মনস্তত্ত্ব

রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দীর্ঘ ও পুরোনো ঐতিহ্য হলো গোপনীয়তা। প্রাচীনকালের রাজারা বা সম্রাটরা মনে করতেন, রাষ্ট্রের খুঁটিনাটি বিষয় সাধারণ প্রজাদের জানার কোনো প্রয়োজন নেই। ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটি যত বেশি অন্ধকারে ঢাকা থাকবে, শাসকের প্রতি সাধারণ মানুষের ভীতি ও সমীহ তত বেশি অটুট থাকবে। এই গোপনীয়তার সংস্কৃতির মূলে রয়েছে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যবাদ। সহজ করে বললে, যার কাছে তথ্য আছে, তার কাছে ক্ষমতা আছে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের কাছ থেকে তথ্য লুকিয়ে রাখে, তখন সে মূলত নাগরিকদের ক্ষমতাহীন করে দেয়। প্রশাসনযন্ত্র একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখে সাধারণ মানুষ এবং নীতিনির্ধারকদের মাঝখানে। এই দেয়ালের ওপাশে বসে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ পুরো রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে, আর সাধারণ মানুষ কেবল তার ফলাফল ভোগ করতে বাধ্য হয়। এই অসম ক্ষমতার সম্পর্কটিকে ভেঙে ফেলার জন্যই আধুনিক যুগে তথ্যের অধিকারের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। এটি কোনো দয়ার দান নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিক হিসেবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। আপনি যদি নাই জানেন আপনার দেওয়া করের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে, বা আপনার এলাকার হাসপাতালটিতে কেন ওষুধ নেই, তবে নাগরিক হিসেবে আপনার অস্তিত্ব মূলত একটি কাগুজে পরিচয়ে পরিণত হয়।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) এই বিষয়ে একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন, যা পাবলিক স্ফিয়ার (Public Sphere) নামে পরিচিত। হাবারমাসের মতে, একটি সুস্থ সমাজের জন্য এমন একটি উন্মুক্ত পরিসর প্রয়োজন, যেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে স্বাধীনভাবে তর্কবিতর্ক করতে পারবে। এই তর্কবিতর্ক করার জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদানটি হলো নির্ভুল তথ্য। রাষ্ট্র যদি তথ্যই সরবরাহ না করে, তবে এই পাবলিক স্ফিয়ার মূলত একটি ফাঁকা বক্সে পরিণত হয়। নাগরিকরা তখন অন্ধের মতো হাতড়ে বেড়ায় এবং রাষ্ট্রের তৈরি করা প্রোপাগান্ডাকেই সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হয় (Habermas, 1989)। হাবারমাস দেখিয়েছেন, আঠারো শতকের ইউরোপে কফি হাউস বা সেলুনগুলোতে মানুষ যখন খবরের কাগজ পড়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করল, তখন থেকেই রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভিত নড়ে উঠেছিল। তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আবরণ ভেদ করে যখন সত্য বাইরে আসে, তখন তা সমাজের ভেতরে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ তৈরি করে। এই জাগরণ স্বৈরশাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ। তাই তারা যেকোনো মূল্যে তথ্যের চাবিকাঠি নিজেদের পকেটে লুকিয়ে রাখতে চায়।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, তথ্য জানার অধিকার মানুষের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার সাথে সরাসরি যুক্ত। আপনার চিন্তার জগৎটি পরিচালিত হয় আপনার কাছে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। রাষ্ট্র যদি আপনাকে ভুল তথ্য দেয় বা প্রয়োজনীয় তথ্য লুকিয়ে রাখে, তবে আপনার চিন্তার প্রক্রিয়াটিও ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) তার ধ্রুপদী রচনা অন লিবার্টি (On Liberty)-তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে যে অকাট্য যুক্তিগুলো দিয়েছিলেন, তার একেবারে কেন্দ্রে ছিল তথ্যের অবাধ প্রবাহের দাবি। মিল বিশ্বাস করতেন, সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হলো সব ধরনের মত ও তথ্যকে কোনো বাধা ছাড়াই প্রকাশ হতে দেওয়া। ভুল তথ্য বা মতবাদকে জোর করে চেপে না রেখে, সঠিক তথ্যের মাধ্যমেই তার মোকাবেলা করতে হবে। রাষ্ট্র যখন কোনো তথ্য গোপন করে, তখন সে মূলত মানুষের সত্য জানার পথটি রুদ্ধ করে দেয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের এমন মানসিক অন্ধকারের মধ্যে ফেলে রাখতে পারে না। তথ্যের অধিকার তাই কেবল কিছু সরকারি ফাইল দেখার অনুমতি নয়, এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি অত্যন্ত গভীর এবং শাশ্বত দার্শনিক দাবি।

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকারের যে কাঠামোটি আমরা আজ দেখতে পাই, তার শুরুটা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ যখন মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র তৈরি করে, তখন সেখানে মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান দেওয়া হয়েছিল। এই ঘোষণাপত্রের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেকেরই মতামতের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। একই সাথে এই অনুচ্ছেদে আরেকটি অত্যন্ত যুগান্তকারী কথা যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, যেকোনো মাধ্যম দিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় সীমানার তোয়াক্কা না করে তথ্য ও ধারণা খোঁজার, পাওয়ার এবং ছড়ানোর অধিকার এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক আইন খুব স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নেয় যে, তথ্য খোঁজা এবং পাওয়া মানুষের একটি অবিচ্ছেদ্য জন্মগত অধিকার। এরপর ১৯৬৬ সালে যখন নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) প্রণীত হয়, সেখানেও এই অধিকারটিকে একটি বাধ্যতামূলক আইনি রূপ দেওয়া হয়। বিশ্বনেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে দিলে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানে তথ্য অধিকারকে একটি আলাদা এবং পূর্ণাঙ্গ মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত করার হিড়িক পড়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানী অ্যান ফ্লোরিনি (Ann Florini) তার গবেষণামূলক বই দ্য রাইট টু নো (The Right to Know)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে তথ্য জানার অধিকার একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে (Florini, 2007)। ফ্লোরিনি এই প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছতার বৈশ্বিক রূপান্তর (Global Transformation of Transparency) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নাগরিক সমাজের ক্রমাগত চাপের ফলেই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের পুরনো গোপনীয়তার আইনগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। আগে যেখানে রাষ্ট্র মনে করত তথ্য দেওয়া তাদের ইচ্ছা বা দয়ার ব্যাপার, সেখানে এখন তারা তথ্য দেওয়াকে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি বিশাল এবং অবিস্মরণীয় বিজয়। তথ্য অধিকার আইন পাস করার মাধ্যমে রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয় যে, জনগণের করের টাকায় তৈরি হওয়া সব তথ্য মূলত জনগণেরই নিজস্ব সম্পত্তি।

আন্তর্জাতিক আইন কাঠামোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্রমাগত বিবর্তন। আঞ্চলিক মানবাধিকার আদালতগুলো, যেমন ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত বা আন্তঃআমেরিকান মানবাধিকার আদালত, তাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে তথ্য অধিকারের পরিসরকে আরও প্রশস্ত করেছে। ক্লদ রেয়েস বনাম চিলি মামলায় আন্তঃআমেরিকান আদালত রায় দিয়েছিল যে, রাষ্ট্রের কাছে থাকা তথ্যে জনগণের প্রবেশাধিকার একটি অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকার এবং রাষ্ট্র কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। এই রায়গুলো মূলত একটি আন্তর্জাতিক আইনি বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার চাইলেও সাধারণ মানুষকে তথ্যবঞ্চিত করে রাখতে পারে না। মানবাধিকার কর্মীরা এই আন্তর্জাতিক আইনগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের দেশের আইনি কাঠামো সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। তথ্য জানার অধিকার আজ আর কেবল পশ্চিমা বিশ্বের কোনো বিলাসী ধারণা নেই, এটি এখন পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষের অধিকার আদায়ের একটি সর্বজনীন এবং অত্যন্ত কার্যকর আইনি হাতিয়ার।

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং স্বচ্ছতার রাজনৈতিক অর্থনীতি

গণতন্ত্র মানে কেবল পাঁচ বছর পর পর উৎসবমুখর পরিবেশে একটি ব্যালট বাক্সে কাগজ ঢোকানো নয়। নির্বাচন একটি প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র, এটি কোনোভাবেই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজে নির্বাচন থেকে নির্বাচনের মধ্যবর্তী যে দীর্ঘ সময়টুকু থাকে, তখন নাগরিকদের নিরন্তর সতর্ক থাকতে হয়। এই সতর্ক থাকার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্রটি হলো সরকারি নথিপত্র এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা। অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম (Development as Freedom)-এ একটি অত্যন্ত চমৎকার ধারণা তুলে ধরেছেন, যাকে তিনি স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা (Transparency Guarantees) বলে আখ্যায়িত করেছেন (Sen, 1999)। সেনের মতে, সমাজে মানুষ একে অপরের সাথে যে চুক্তি বা লেনদেনে আবদ্ধ হয়, তা নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থার ওপর। রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্কটিও এর ব্যতিক্রম নয়। যখন এই আস্থার অভাব ঘটে এবং চারপাশের সবকিছু অস্বচ্ছ হয়ে যায়, তখন সমাজে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে এবং মানুষের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা মূলত মানুষকে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ দেয়, যেখানে তারা রাষ্ট্রের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস সঞ্চয় করতে পারে।

এই স্বচ্ছতার অভাবেই মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হয়, যাকে তাত্ত্বিক ভাষায় প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যা (Principal-Agent Problem) বলা হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ জনগণ হলো মূল মালিক বা প্রিন্সিপাল, আর নির্বাচিত সরকার এবং আমলারা হলো তাদের নিয়োগ করা প্রতিনিধি বা এজেন্ট। মালিক তার এজেন্টকে নিয়োগ দেয় তার কাজগুলো সঠিকভাবে করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু এজেন্ট যদি মালিকের কাছে তার কাজের হিসাব না দেয় এবং অন্ধকারে নিজের পকেট ভারি করার চেষ্টা করে, তবে সেই ব্যবস্থা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে। তথ্য জানার অধিকার মূলত এই সমস্যার একটি আইনি সমাধান। এটি মালিককে অর্থাৎ সাধারণ নাগরিককে ক্ষমতা দেয় তার এজেন্টের প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব চাওয়ার। একটি ব্রিজের নির্মাণ ব্যয় কেন এত বেশি হলো, বা একটি নিয়োগ পরীক্ষায় কেন নির্দিষ্ট কিছু লোকই সুযোগ পেল – এই প্রশ্নগুলো করার অধিকার নাগরিকের রয়েছে। রাষ্ট্র যখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে বাধ্য থাকে, তখন সরকারি কর্মকর্তাদের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের লাগাম টেনে ধরা অনেক সহজ হয়ে যায়।

তথ্যের অবাধ প্রবাহ কেবল রাজনৈতিক কাঠামোকেই শক্ত করে না, এটি একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। যখন একটি রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা থাকে, তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হয়। তারা বুঝতে পারে যে, এখানে কোনো গোপন সিন্ডিকেট বা রাষ্ট্রীয় চাঁদাবাজির ভয় নেই। অন্যদিকে, রাষ্ট্র যখন তথ্য লুকিয়ে রাখে, তখন একধরনের অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। যারা ক্ষমতাবান এবং যাদের রাষ্ট্রের ভেতরে লোক আছে, তারা আগে থেকেই সরকারি নীতির খবর পেয়ে যায় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করে প্রচুর মুনাফা লুটে নেয়। সাধারণ মানুষ এই অসম খেলায় সবসময় পরাজিত হয়। তথ্য অধিকার আইন এই বৈষম্যটি দূর করার চেষ্টা করে। এটি রাষ্ট্রের সব তথ্যকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী তথ্য কুক্ষিগত করে অর্থনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে। গণতন্ত্র এবং অর্থনীতি – উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ একটি আধুনিক এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্র গড়ার সবচেয়ে প্রাথমিক এবং অলঙ্ঘনীয় শর্ত।

দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের বাস্তব রূপরেখা

দুর্নীতি সাধারণত অন্ধকারে সবচেয়ে ভালো ডালপালা মেলে। যখন সরকারি কাজের কোনো হিসাব সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ থাকে না, তখন সরকারি কোষাগার লুটে নেওয়াটা অত্যন্ত সহজ একটি কাজে পরিণত হয়। একজন সাধারণ গ্রামের মানুষ যখন জানতে পারেন না যে তার এলাকার রাস্তা মেরামতের জন্য সরকার ঠিক কত টাকা বরাদ্দ করেছে, তখন স্থানীয় চেয়ারম্যান বা ঠিকাদার খুব সহজেই সেই টাকার অর্ধেক নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিতে পারেন। তথ্য জানার অধিকার এই অন্ধকার ঘরগুলোতে হঠাৎ করে এক ঝলক আলো ফেলে দেয়। নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ (Joseph Stiglitz) তার গবেষণায় এই বিষয়টিকে তথ্যগত অসাম্য (Information Asymmetry) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দ্য প্রাইস অফ ইনইকুয়ালিটি (The Price of Inequality) বইতে তিনি দেখিয়েছেন যে, বাজারে বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এক পক্ষের কাছে যখন অন্য পক্ষের চেয়ে বেশি তথ্য থাকে, তখন ক্ষমতাবান পক্ষ সেই তথ্যের জোরে সাধারণ মানুষকে ভয়াবহভাবে শোষণ করে (Stiglitz, 2012)। স্টিগলিটজ যুক্তি দেন যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপই হলো এই তথ্যগত অসাম্য দূর করা। নাগরিকের হাতে তথ্য তুলে দেওয়া মানে হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাকে একটি শক্ত ঢাল প্রদান করা।

বাস্তব জীবনে তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের একটি জাদুকরী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ভারতে যখন ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ বা আরটিআই আইন পাস হলো, তখন দেখা গেল সাধারণ কৃষকরা এই আইন ব্যবহার করে তাদের রেশন কার্ড বা পেনশনের টাকা আদায় করতে শুরু করেছেন। একজন সাধারণ মানুষ যখন একটি সাদা কাগজে আবেদন লিখে সরকারি কর্মকর্তার কাছে তথ্য চান, তখন সেই কর্মকর্তার ভেতর একটি জবাবদিহিতার ভয় তৈরি হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে তার কাজের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। এই ভয়টিই মূলত প্রশাসনের ভেতরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে। সুশাসন কোনো আকাশ থেকে পড়া উপহার নয়, এটি প্রতিনিয়ত আদায় করে নিতে হয়। রাষ্ট্র কখনোই নিজ থেকে তার ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চায় না। আইন থাকার পরও সরকারি কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে তথ্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তারা কখনো বলেন ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কখনো অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করেন। তারপরও এই আইনটি নাগরিকদের এমন একটি আইনি ভরসা দেয়, যার ওপর দাঁড়িয়ে তারা রাষ্ট্রের বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস পান।

এই ক্ষমতায়নের একটি বড় সামাজিক প্রভাব রয়েছে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ, যারা যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে, তারা যখন তথ্য অধিকারের চর্চা করতে শেখে, তখন সমাজে একধরনের নীরব বিপ্লব ঘটে যায়। তারা বুঝতে শুরু করে যে সরকারি অনুদান বা সাহায্য কোনো নেতার ব্যক্তিগত দান নয়, এটি তাদের আইনগত পাওনা। এই উপলব্ধি তাদের মধ্যে একটি নতুন আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করে। সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো এবং সাংবাদিকরা এই তথ্য অধিকার আইনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বড় বড় দুর্নীতির চিত্র জনসমক্ষে তুলে আনেন। এর ফলে সরকার অনেক সময় বাধ্য হয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং নিজেদের ভুল নীতিগুলো সংশোধন করে। তথ্য অধিকার আইন এভাবেই একটি সাধারণ সমাজকে একটি সচেতন এবং কার্যকর পাহারাদার বা ওয়াচডগে পরিণত করে। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের হাতের একটি ছোট তথ্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, নজরদারি এবং তথ্যের অধিকারের সমসাময়িক সংকট

আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যাকে তথ্যের যুগ বা ইনফরমেশন এজ বলা হয়। ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের কল্যাণে আমাদের হাতের মুঠোয় এখন পুরো পৃথিবীর তথ্য ভাণ্ডার চলে এসেছে। এক ক্লিকেই আমরা জানতে পারছি পৃথিবীর অপর প্রান্তে কী ঘটছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, তথ্য জানার অধিকারের এই বুঝি চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়ে গেল। বাস্তবে পরিস্থিতি এতটা সহজ নয়। প্রযুক্তি যেমন তথ্য পাওয়া সহজ করেছে, ঠিক তেমনি এটি নতুন কিছু অত্যন্ত জটিল এবং ভয়ংকর সংকটেরও জন্ম দিয়েছে। স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রাইজ অফ দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি (The Rise of the Network Society)-তে এই নতুন ডিজিটাল কাঠামোর বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। ক্যাসেলসের মতে, আধুনিক সমাজটি মূলত অসংখ্য ডিজিটাল জালের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত, যাকে তিনি নেটওয়ার্ক সমাজ (Network Society) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই নেটওয়ার্ক সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এখানে তথ্যের অভাব নেই, বরং এখানে তথ্যের বন্যায় মানুষ আসল সত্যটি হারিয়ে ফেলছে। রাষ্ট্র এবং বড় বড় কর্পোরেশনগুলো এখন এই ডিজিটাল জাল ব্যবহার করে খুব সুকৌশলে মানুষের মন এবং চিন্তার জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করছে (Castells, 1996)।

বর্তমান সময়ে তথ্যের অধিকারের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ভুল তথ্য বা ডিসইনফরমেশন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন এত পরিমাণ ভুয়া খবর, গুজব এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ছড়ানো হয় যে, একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল সত্যটি খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট অনেক গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিভ্রান্তিগুলো ছড়ায়, যাতে মানুষ সরকারের আসল ব্যর্থতাগুলো ভুলে গিয়ে কাল্পনিক কোনো শত্রু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যখন চারপাশের সব তথ্য নিয়েই মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়, তখন তথ্যের অধিকার তার প্রকৃত অর্থ হারিয়ে ফেলে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক অ্যালগরিদমের কারসাজি। ফেসবুক বা গুগলের মতো কোম্পানিগুলো তাদের অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজায় যে, একজন মানুষ কেবল সেই তথ্যগুলোই দেখতে পায় যা সে দেখতে পছন্দ করে। একে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘ইকো চেম্বার’ বা ‘ফিল্টার বাবল’ বলা হয়। এর ফলে মানুষ ভিন্নমত বা আসল সত্য জানার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়। এই ডিজিটাল গোলকধাঁধায় আটকে পড়া মানুষেরা মূলত একধরনের অদৃশ্য তথ্যগত পরাধীনতার শিকার।

এই সংকটের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো রাষ্ট্রীয় নজরদারি। একসময় মানুষ রাষ্ট্রের কাছে তথ্য চাইত, আর এখন রাষ্ট্র উল্টো প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সব তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, ফোনের মেসেজ বা ব্রাউজিং হিস্ট্রি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত নজরদারি করছে। যখন নাগরিকের নিজের জীবনের কোনো গোপনীয়তা থাকে না, অথচ রাষ্ট্রের সব কাজ গোপন নথির আড়ালে ঢাকা থাকে, তখন মানবাধিকারের চরম বিপর্যয় ঘটে। তথ্যের এই একমুখী প্রবাহ সমাজকে একটি আধুনিক স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেয়। সমসাময়িক মানবাধিকার আন্দোলনগুলো এখন তাই কেবল সরকারের কাছ থেকে তথ্য চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন ডেটা প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়েও সমানভাবে সোচ্চার। আধুনিক যুগে তথ্য অধিকারের লড়াইটি মূলত এই দ্বিমুখী তরোয়ালের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো – একদিকে রাষ্ট্রের অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়ানো মিথ্যা এবং নজরদারির বিরুদ্ধে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম।

জাতীয় নিরাপত্তা বনাম জনস্বার্থ: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম সীমারেখা

তথ্য জানার অধিকার কখনোই সীমাহীন বা শর্তহীন অধিকার নয়। আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রতিটি দেশের সংবিধানেই এই অধিকারের ওপর কিছু যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ বা রেস্ট্রিকশন আরোপ করা হয়েছে। একটি রাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোপন কৌশল, আন্তর্জাতিক চুক্তির স্পর্শকাতর দিক বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যপ্রণালীর সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারে না। এটি করলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। ঠিক একইভাবে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য, যেমন কারো চিকিৎসা রেকর্ড বা ব্যাংকের হিসাব, জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে দিলে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হবে। একারণে রাষ্ট্রকে সব সময় একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বা ব্যালেন্স বজায় রেখে চলতে হয়। আইনশাস্ত্রে এই বিষয়টিকে ক্ষতির পরীক্ষা (Harm Test) বলা হয়। অর্থাৎ, কোনো তথ্য প্রকাশ করলে তা রাষ্ট্রের বা ব্যক্তির যে ক্ষতি করবে, সেই ক্ষতি কি তথ্য লুকিয়ে রাখার চেয়েও বেশি কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করতে হয়। যদি দেখা যায় তথ্যটি প্রকাশ করলে রাষ্ট্রের মারাত্মক ক্ষতি হবে, তবে সেই তথ্য আটকে রাখার আইনি বৈধতা রয়েছে।

সমস্যা হলো, অনেক সময় রাষ্ট্র এই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা’র ঢালটিকে একটি নিখুঁত অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে। সরকারের কোনো বড় দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা বেআইনি কার্যকলাপের তথ্য যখন ফাঁস হওয়ার উপক্রম হয়, তখন রাষ্ট্র খুব সহজেই সেই তথ্যের গায়ে ‘টপ সিক্রেট’ বা অতি গোপনীয়তার সিলমোহর মেরে দেয়। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন বা অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট নামক পুরনো এবং ঔপনিবেশিক আইনগুলো ব্যবহার করে সাংবাদিক বা তথ্য অধিকার কর্মীদের মাসের পর মাস জেলে আটকে রাখা হয়। এই স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকানোর জন্য আধুনিক তথ্য অধিকার আইনে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি রক্ষাকবচ যুক্ত করা হয়েছে, যাকে জনস্বার্থের পরীক্ষা (Public Interest Test) বলা হয়। এর মূল কথা হলো, কোনো তথ্য যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও স্পর্শকাতর হয়, কিন্তু সেই তথ্য প্রকাশ করলে যদি ব্যাপক জনস্বার্থ রক্ষিত হয় বা কোনো বড় ধরনের অপরাধ উন্মোচিত হয়, তবে সেই তথ্য প্রকাশ করতে রাষ্ট্র আইনত বাধ্য। অর্থাৎ, কোনো গোপনীয়তাই জনস্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না।

এই জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করেন সমাজের সেই মানুষগুলো, যারা রাষ্ট্রের ভেতরের অন্যায়গুলো সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে আসেন। তাত্ত্বিক আলোচনায় এদেরকে হুইসেলব্লোয়ার (Whistleblower) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দেখেন যে তার দপ্তরে ভয়াবহ দুর্নীতি চলছে বা পরিবেশের ক্ষতি করার মতো কোনো বেআইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তখন বিবেকের তাড়নায় তিনি সেই গোপন নথিগুলো ফাঁস করে দেন। রাষ্ট্র এই হুইসেলব্লোয়ারদের চরম শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের ওপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো ভয়াবহ অভিযোগ আনে। কিন্তু মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই মানুষগুলো হলেন সমাজের প্রকৃত নায়ক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে অবশ্যই আইন করে এই হুইসেলব্লোয়ারদের আইনি এবং শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় অপরাধ লুকিয়ে রাখার এই অপচেষ্টা মূলত রাষ্ট্রের নিজের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তথ্য জানার অধিকারের এই চূড়ান্ত লড়াইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি স্বাধীন সমাজে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো সত্যের নিরাপত্তা, এবং কোনো কালাকানুন বা রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তি দিয়ে এই সত্যকে চিরকাল ধামাচাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

সমতা এবং বৈষম্যহীনতা (Equality and Non-Discrimination)

সমতার তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভিত্তি

প্রকৃতির দিকে তাকালে একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার বোঝা যায়। সেখানে বৈচিত্র্য আছে, উঁচুনুচু ভেদাভেদ নেই। কোনো গাছ অনেক লম্বা, কোনো গাছ একেবারে মাটিতে লতিয়ে থাকে। সবার বাঁচার ধরন আলাদা, রূপ আলাদা। সমাজকাঠামো ঠিক এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে মেনে নিতে চায় না। মানুষ নিজেদের তৈরি করা নিয়মের যাঁতাকলে ফেলে কিছু মানুষকে ওপরে বসায়, আর কিছু মানুষকে পায়ের নিচে পিষে মারে। গায়ের রঙ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের মতো সম্পূর্ণ দৈবচয়িত বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়। এই অযৌক্তিক এবং অমানবিক বিভাজনের বিরুদ্ধেই মানবাধিকারের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারটি তৈরি হয়েছে, যাকে আমরা সমতা (Equality) বলে থাকি। অধিকারের দর্শন নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা মনে করেন সমতা কোনো গাণিতিক হিসাব নয় যে সবাইকে সমান মাপে কেটে এক ছাঁচে ফেলতে হবে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টোটল (Aristotle) বহু আগে এর একটি চমৎকার ধারণা দিয়েছিলেন। তার মতে, যারা সমান তাদের সাথে সমান আচরণ করতে হবে, আর যারা অসমান তাদের সাথে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। এই সহজ কথাটির ভেতরেই মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় দর্শনটি লুকিয়ে আছে। সমতা মানে সবার জন্য একই সাইজের জুতো তৈরি করা নয়। এর আসল অর্থ হলো সবার খালি পায়ে জুতো নিশ্চিত করা, তা যার যে সাইজই লাগুক না কেন।

আইনশাস্ত্রের গভীরে গেলে আমরা সমতার দুটি ভিন্ন রূপ দেখতে পাই। এর একটি হলো আকারগত সমতা (Formal Equality)। এই ধারণার মূল কথা হলো আইনের চোখে সবাই সমান। একজন কোটিপতি আর একজন দিনমজুর যদি একই অপরাধ করে, তবে আদালতের কাঠগড়ায় তাদের বিচার একই আইনে হবে। কাগজে-কলমে এই ধারণাটি খুব সুন্দর মনে হলেও বাস্তবে এটি অনেক সময় চরম অবিচারের জন্ম দেয়। একারণে আধুনিক মানবাধিকার তাত্ত্বিকরা প্রকৃত সমতা (Substantive Equality) প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। প্রখ্যাত মার্কিন আইনজ্ঞ রোনাল্ড ডরকিন (Ronald Dworkin) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ টেকিং রাইটস সিরিয়াসলি (Taking Rights Seriously)-এ সমতার এই নতুন রূপটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ডরকিন মনে করেন, রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের প্রতি সমান মনোযোগ এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। একজন সুস্থ সবল মানুষের প্রতিদিনের জীবনে রাষ্ট্রের যে পরিমাণ মনোযোগ দরকার, একজন শারীরিকভাবে ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য রাষ্ট্রের তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ এবং সম্পদের প্রয়োজন হয়। প্রকৃত সমতা বলতে বোঝায় মানুষের জীবনের শুরুর দিকের বৈষম্যগুলো দূর করে সবাইকে একটি সমান প্রতিযোগিতার মাঠে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। সহজ করে বললে, দৌড় প্রতিযোগিতায় একজনের পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে রেখে সবাইকে এক সাথে দৌড় শুরু করতে বলাটা কোনো সমতা নয়। সমতা হলো আগে সেই শিকল খুলে নেওয়া এবং তারপর প্রতিযোগিতার বাঁশি বাজানো।

মানবাধিকারের পুরো ইমারতটি মূলত এই বৈষম্যহীনতা (Non-Discrimination) নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অধিকারের কথা বলতে গেলেই অবধারিতভাবে বৈষম্যহীনতার কথা চলে আসে। আপনি একজনকে কথা বলার অধিকার দিলেন, কিন্তু তার ধর্মের কারণে তাকে চাকরি দিলেন না। এর মানে দাঁড়ায় আপনি তার মানুষের মর্যাদাকেই অস্বীকার করলেন। অধিকারগুলো কখনো খণ্ডিতভাবে কাজ করতে পারে না। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৈষম্য করা মানে হলো একজন মানুষকে তার মানবসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। রাষ্ট্র বা সমাজ যখন গায়ের রঙ বা ভাষার কারণে কাউকে ছোট করে, তখন তারা আসলে সেই মানুষটির ভেতরে থাকা অসীম সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে। বৈষম্যহীনতার নীতি আমাদের শেখায় যে, মানুষের পরিচয় কখনো তার জন্মগত কোনো বৈশিষ্ট্যের ফ্রেমে আটকে থাকতে পারে না। প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব কর্ম ও মেধা দিয়ে মূল্যায়িত হবে। এই নীতিটি পৃথিবীর সব মানবাধিকার চুক্তির একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে। মানুষে মানুষে বিভেদ করাটা কেবল অন্যায় নয়, এটি মানবাধিকারের সরাসরি এবং সবচেয়ে নিষ্ঠুর লঙ্ঘন। এই লঙ্ঘন সমাজে একটি স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঞ্চনার রূপ নিয়ে বেঁচে থাকে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে বৈষম্যহীনতার অবস্থান

আন্তর্জাতিক আইনগুলো খুব সতর্কতার সাথে বৈষম্যহীনতার এই নীতিটিকে প্রতিটি দলিলের ছত্রে ছত্রে গেঁথে দিয়েছে। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের একেবারে ২ নম্বর অনুচ্ছেদেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, বা অন্য কোনো মতাদর্শের ভিত্তিতে মানুষের অধিকারে কোনো ধরনের ভেদাভেদ করা যাবে না। পরবর্তীকালে আসা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদটি এই নীতিকে আরও শক্ত আইনি ভিত্তি দিয়েছে। এই চুক্তির অধীনে থাকা মানবাধিকার কমিটি (Human Rights Committee) তাদের বিখ্যাত ‘জেনারেল কমেন্ট ১৮’-তে বৈষম্যহীনতার একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছে (Moeckli, 2008)। তাদের মতে, বৈষম্য মানে হলো এমন যেকোনো ধরনের পার্থক্যকরণ, বর্জন, বা বিধিনিষেধ যার উদ্দেশ্য বা ফলাফল হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষের সমান অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। এখানে একটি ব্যাপার খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করার মতো। আন্তর্জাতিক আইন কেবল উদ্দেশ্য দেখেই থেমে থাকে না, তারা কাজের ফলাফলটাও হিসাব করে। রাষ্ট্র বলতে পারবে না যে তাদের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল কিন্তু ভুলে কিছু মানুষের ক্ষতি হয়ে গেছে। আইনের কাছে ফলাফলের গুরুত্ব অনেক বেশি।

আইনের পরিভাষায় বৈষম্যকে মূলত দুটি বড় ভাগে ভাগ করে দেখা হয়। প্রথমটি হলো প্রত্যক্ষ বৈষম্য (Direct Discrimination)। এটি খুব নগ্ন এবং সরাসরি। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দেশের সংবিধানে যদি লেখা থাকে যে নারীরা দেশের প্রধান বিচারপতি হতে পারবেন না, তবে সেটি একটি প্রত্যক্ষ বৈষম্য। এর বিরুদ্ধে লড়াই করা তুলনামূলকভাবে সহজ, কারণ আইনটি সবার সামনেই দৃশ্যমান থাকে। কিন্তু সমস্যার আসল জায়গা হলো দ্বিতীয় ধরনটি, যাকে বলা হয় পরোক্ষ বৈষম্য (Indirect Discrimination)। এটি খুব ধূর্ত একটি পদ্ধতি। এখানে রাষ্ট্রের আইন বা নীতিটি দেখতে একদম নিরপেক্ষ মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে গেলে দেখা যায় কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধরুন, পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে এটি কাজের প্রয়োজনেই করা হয়েছে। বাস্তবে দেখা গেল দেশের একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের গড় উচ্চতা সেই নির্ধারিত মাপের চেয়ে কম। ফলে সেই গোষ্ঠীর কেউ আর পুলিশে চাকরি পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইন এ ধরনের আপাত-নিরপেক্ষ কিন্তু ফলাফল-ভিত্তিক বৈষম্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় যে তাদের তৈরি করা এই নিয়মের পেছনে খুব জোরালো এবং যৌক্তিক কোনো কারণ রয়েছে।

এই বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট চুক্তিও তৈরি হয়েছে। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ এবং সব ধরনের বর্ণবৈষম্য বিলোপ সনদ এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় দুটি উদাহরণ। এই বিশেষায়িত চুক্তিগুলো তৈরি করার পেছনে একটি বড় আইনি যুক্তি ছিল। সাধারণ মানবাধিকার চুক্তিগুলোতে সব অধিকারের কথা একত্রে বলা থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে এতটাই শোষিত হয়েছে যে, তাদের জন্য আলাদা সুরক্ষার দরকার ছিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labour Organization) কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করার জন্য আলাদা কনভেনশন তৈরি করেছে। এই চুক্তিগুলো রাষ্ট্রকে বাধ্য করে তাদের অভ্যন্তরীণ আইন সংস্কার করতে। রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করেই পার পেয়ে যায় না, তাকে সক্রিয়ভাবে এমন কিছু নীতি গ্রহণ করতে হয় যাতে সমাজে বৈষম্যের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মুছে যায়। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক আইনের কাছে বৈষম্যহীনতা কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থান নয়। এটি একটি সক্রিয় লড়াই, যেখানে রাষ্ট্রকে তার পুরো প্রশাসনযন্ত্র নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হয়।

কাঠামোগত বৈষম্য এবং ঐতিহাসিক বঞ্চনার স্বরূপ

বৈষম্য জিনিসটা সবসময় যে কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট অফিসের বদমেজাজি বসের মাধ্যমে ঘটে, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় বৈষম্য লুকিয়ে থাকে রাষ্ট্রের একেবারে শিরা-উপশিরায়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একেই সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কাঠামোগত বৈষম্য (Structural Discrimination)। এটি এমন এক ধরনের অদৃশ্য জাল, যা খালি চোখে দেখা যায় না কিন্তু এর প্রভাব খুব মারাত্মক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা, বাজার অর্থনীতি – সবকিছু এমনভাবে সাজানো থাকে যে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পিছিয়ে পড়তে থাকে। ধরুন, কোনো দেশের ভালো স্কুলগুলো সব বড় বড় শহরে অবস্থিত এবং গ্রামের গরিব কৃষকের সন্তানদের সেখানে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। এই কৃষকের সন্তানরা বড় হয়ে ভালো চাকরি পাবে না, তাদের আয় কম হবে এবং তাদের সন্তানরাও আবার ওই একই দরিদ্র চক্রে আটকা পড়বে। এখানে কোনো একজন ব্যক্তি এই কৃষকের সাথে শত্রুতা করে তার অধিকার কেড়ে নেয়নি। পুরো সমাজকাঠামোটিই এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে দরিদ্র মানুষের পক্ষে সেখান থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। কাঠামোগত বৈষম্য মানুষের ব্যক্তিগত প্রতিভাকে কোনো দাম দেয় না, এটি কেবল মানুষের সামাজিক অবস্থানকে মূল্যায়ন করে।

এই কাঠামোগত বৈষম্যের আলোচনায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা হলো আন্তঃবিভাগীয়তা (Intersectionality)। প্রখ্যাত মার্কিন আইনজ্ঞ কিম্বারলে ক্রেনশ (Kimberlé Crenshaw) সর্বপ্রথম এই যুগান্তকারী ধারণাটি সামনে নিয়ে আসেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের পরিচয় কেবল একটি সুতোর ওপর ঝুলে থাকে না। একজন মানুষের একই সাথে একাধিক পরিচয় থাকতে পারে এবং সেই পরিচয়গুলো একত্রে মিলে বৈষম্যের এক নতুন এবং জটিল রূপ তৈরি করে। একজন নারীর কথা চিন্তা করা যাক। সমাজে সে এমনিতেই নারী হওয়ার কারণে বৈষম্যের শিকার হয়। সেই নারীটি যদি আবার একটি দরিদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশ হয়, তবে তার ওপর বঞ্চনার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। ক্রেনশ এই অবস্থাকে একটি চৌরাস্তার সাথে তুলনা করেছেন। বিভিন্ন দিক থেকে আসা বৈষম্যের গাড়িগুলো এসে এই চৌরাস্তায় তাকে একসাথে ধাক্কা মারে (Crenshaw, 1989)। মানবাধিকারের প্রচলিত আইনি কাঠামোগুলো অনেক সময় এই জটিল সমীকরণটি বুঝতে ব্যর্থ হয়। তারা লিঙ্গবৈষম্য বা বর্ণবৈষম্যকে আলাদা আলাদা ফোল্ডারে রেখে বিচার করতে চায়। কিন্তু আন্তঃবিভাগীয়তার তত্ত্ব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে মানুষের জীবনের কষ্টগুলোকে এভাবে আলাদা বক্সে বন্দি করা যায় না।

কাঠামোগত বৈষম্যের সবচেয়ে বড় কারণ হলো ঐতিহাসিক বঞ্চনা (Historical Disadvantage)। আজকের দিনে সমাজে আমরা যে বৈষম্যগুলো দেখি, তা এক দিনে আকাশ থেকে পড়েনি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা উপনিবেশবাদ, দাসপ্রথা বা বর্ণাশ্রম প্রথার মতো ভয়াবহ অতীত এই বৈষম্যের বীজ বপন করে গেছে। রাষ্ট্র হয়তো আজ নতুন আইন পাস করে সবাইকে সমান অধিকার দিয়েছে। তারপরও সেই পুরোনো বঞ্চনার ক্ষতগুলো মুছে যায়নি। যারা শত শত বছর ধরে জমি, শিক্ষা এবং সম্মান থেকে বঞ্চিত ছিল, তারা হুট করে একটি আইনের প্রজ্ঞাপনে রাতারাতি সবার সমান হয়ে যেতে পারে না। তাদের পিঠে বঞ্চনার বিশাল এক পাহাড় বাঁধা আছে। ঐতিহাসিক বঞ্চনার শিকার হওয়া এই মানুষগুলোকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য কেবল আইনের চোখে সমতার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। অতীত অন্যায়ের স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেই অন্যায়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করাটা সমতা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় শর্ত। সমাজ থেকে এই গভীর শেকড়যুক্ত বৈষম্য উপড়ে ফেলতে হলে রাষ্ট্রকে তার অতীতের ভুলগুলো সাহসের সাথে স্বীকার করে নিতে হয়।

ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং সমতার বাস্তবায়ন

সমাজের এই গভীরভাবে প্রোথিত বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য রাষ্ট্রকে অনেক সময় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা আপাতদৃষ্টিতে বৈষম্যমূলক মনে হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভাষায় একে বলা হয় ইতিবাচক পদক্ষেপ (Positive Measures) বা অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন (Affirmative Action)। একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই তোলা হয়। রাষ্ট্র যদি সবাইকে সমান চোখে দেখবে, তবে চাকরিতে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য কোটা বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন থাকবে? এটি তো সমতার মূল নীতির সাথেই সাংঘর্ষিক হওয়ার কথা। কিন্তু মানবাধিকারের দার্শনিকরা এর সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তারা বলেন, অসম মানুষদের সাথে সমান আচরণ করাটাই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈষম্য। যারা যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে আছে, তাদের মূল স্রোতে তুলে আনার জন্য সাময়িকভাবে কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়াটা কোনোভাবেই বৈষম্য নয়, এটি মূলত সমতা প্রতিষ্ঠারই একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। বিখ্যাত মার্কিন দার্শনিক জন রল্স (John Rawls) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ আ থিওরি অব জাস্টিস (A Theory of Justice)-এ একে বলেছেন ‘পার্থক্য নীতি’ বা ডিফারেন্স প্রিন্সিপাল। রল্সের মতে, সমাজে অসাম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন সেই অসাম্যের ফলে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া মানুষটি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়।

ইতিবাচক বৈষম্যের এই ধারণাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে খুব জোরালোভাবে সমর্থিত। বর্ণবৈষম্য বিলোপ সনদ (ICERD) খুব স্পষ্টভাবে বলেছে যে, কোনো পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য সাময়িক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা আইনত বৈষম্য হিসেবে গণ্য হবে না। তবে এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদ থাকতে হবে। যে উদ্দেশ্যে কোটা বা বিশেষ সুবিধা চালু করা হয়েছিল, সেই গোষ্ঠী যখন সমাজের অন্যান্য অংশের সাথে সত্যিকারের সমতার পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তখন এই সুবিধাগুলো বাতিল করে দিতে হবে। এগুলো কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন করে দেখতে হয় তাদের নেওয়া এই অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশনগুলো আসলেই কাজে দিচ্ছে কি না। অনেক সময় দেখা যায়, যে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের জন্য কোটা রাখা হয়েছে, সেই সম্প্রদায়ের ভেতরের প্রভাবশালী গুটিকয়েক মানুষ সব সুবিধা ভোগ করছে আর প্রকৃত গরিবরা আগের মতোই অন্ধকারে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রকে এই ধরনের ফাঁকফোকর বন্ধ করার জন্য অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।

এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্য হলো সমাজে বৈচিত্র্য এবং প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। একটি দেশের বিচার বিভাগ, পুলিশ বাহিনী বা প্রশাসনে যদি সমাজের সব স্তরের মানুষের আনুপাতিক উপস্থিতি না থাকে, তবে সেই প্রশাসন কখনোই সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে না। নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করাটা এ কারণেই এত বেশি জরুরি। এটি কেবল তাদের একটি পদ দেওয়া নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের কণ্ঠস্বরকে জায়গা করে দেওয়া। সমতা মানে কেবল কারও অধিকার কেড়ে না নেওয়া নয়। সমতা মানে হলো অধিকারগুলো যেন সত্যিকার অর্থে সবার দোরগোড়ায় পৌঁছায় তার ব্যবস্থা করা। ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি অস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী সেতু হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্র যখন পিছিয়ে পড়া মানুষদের হাত ধরে টেনে ওপরে তোলে, তখন রাষ্ট্রের নিজের মর্যাদাও বহুগুণ বেড়ে যায়।

আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি ও বৈষম্যের নতুন ধরন

সময়ের সাথে সাথে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। আগে মানুষকে তার গায়ের রঙ বা ধর্ম দেখে সরাসরি কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। আধুনিক যুগে বৈষম্য করার পদ্ধতিগুলো অনেক বেশি পরিশীলিত এবং প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যালগরিদমের এই যুগে আমরা এক নতুন ধরনের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি, যাকে বলা হয় অ্যালগরিদমিক বৈষম্য (Algorithmic Bias)। ব্যাংক লোন দেওয়া, চাকরির সিভি বাছাই করা বা এমনকি পুলিশের অপরাধী খোঁজার কাজে এখন কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করে কম্পিউটার কখনো ভুল করতে পারে না বা কম্পিউটারের কোনো নিজস্ব পক্ষপাত নেই। কিন্তু বাস্তবে এই অ্যালগরিদমগুলো তৈরি করে মানুষ এবং তারা অতীত ডেটার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। অতীত সমাজে যেহেতু বর্ণবাদ বা লিঙ্গবৈষম্য প্রবল ছিল, তাই সেই ডেটা থেকে শেখা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও অবধারিতভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে শুরু করে। প্রখ্যাত গণিতবিদ ক্যাথি ওনিল (Cathy O’Neil) তার উইপনস অব ম্যাথ ডেসট্রাকশন (Weapons of Math Destruction) বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে এই অস্বচ্ছ অ্যালগরিদমগুলো গরিব এবং সংখ্যালঘু মানুষদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে (O’Neil, 2016)। একটি রোবট বা কোড যখন কাউকে বৈষম্য করে, তখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো বা বিচার চাওয়াটা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

প্রযুক্তির এই যুগে বৈষম্যের আরেকটি ভয়ংকর রূপ হলো প্রযুক্তিগত বিভাজন (Digital Divide)। ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন এখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এগুলো বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, বা সরকারি অনুদান – সবকিছুই এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মে চলে গেছে। ফলে যে মানুষটির ইন্টারনেট সংযোগ নেই বা স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য নেই, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি না থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় সামাজিক বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র সবকিছু ডিজিটাল করে দিয়ে হয়তো হাততালি কুড়াচ্ছে, কিন্তু এর আড়ালে যে কোটি কোটি মানুষ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। এই ডিজিটাল বিভাজন মূলত পুরনো অর্থনৈতিক বৈষম্যকেই এক নতুন এবং আধুনিক মোড়কে আমাদের সামনে হাজির করেছে। এটি মানবাধিকারের এক নতুন রণক্ষেত্র, যেখানে মানুষের ভার্চুয়াল অস্তিত্ব তার বাস্তব জীবনের অধিকারগুলোকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে আমরা এখন জেনেটিক বৈষম্য (Genetic Discrimination) নামের এক সম্পূর্ণ অচেনা বিপদের মুখোমুখি। মানুষের ডিএনএ বা জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে এখন বলে দেওয়া সম্ভব ভবিষ্যতে তার কোন ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইনস্যুরেন্স কোম্পানি বা নিয়োগকর্তারা যদি এই জিনগত তথ্যগুলো হাতে পেয়ে যায়, তবে তারা খুব সহজেই একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষকে চাকরি বা স্বাস্থ্যবিমা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা ভেবে আগেভাগেই তাকে বাতিল করে দেবে। মানুষ তার ভবিষ্যৎ রোগের জন্য, যা এখনো হয়নি এবং হয়তো কখনোই হবে না, তার জন্য আগে থেকেই শাস্তি পাওয়া শুরু করবে। সমতার তাত্ত্বিক আলোচনায় এটি এক বিশাল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। মানুষের জন্মগত পরিচয় বা লিঙ্গের মতো তার জিনগত কাঠামোও সম্পূর্ণ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরের একটি বিষয়। আধুনিক মানবাধিকার আইনকে এখন গায়ের রঙ বা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের এই জিনগত গোপনীয়তা এবং অ্যালগরিদমিক অধিকার রক্ষার জন্য নতুন করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

বৈশ্বিক রাজনীতিতে সমতার সংকট ও রাষ্ট্রের দায়

মানবাধিকারের আলোচনায় আমরা সাধারণত দেশের ভেতরের সমতার কথা বেশি বলি। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে তাকালে আমরা এক ভয়াবহ বৈশ্বিক অসমতা (Global Inequality) দেখতে পাই। পৃথিবীর সম্পদের সিংহভাগ মাত্র গুটিকয়েক দেশের হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। এই দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মকানুন নিজেদের সুবিধামতো তৈরি করে এবং অনুন্নত দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে আটকে রাখে। ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি (Thomas Piketty) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ক্যাপিটাল ইন টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি (Capital in the Twenty-First Century)-তে খুব স্পষ্টভাবে পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ধনীদের সম্পদ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আর গরিবের আয় স্থবির হয়ে আছে। এই বৈশ্বিক অসাম্য মানবাধিকারের একেবারে শেকড় ধরে টান দেয়। একটি দরিদ্র দেশের সরকারের পক্ষে তার নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসাসেবা বা মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয় না, কারণ তাদের বাজেটের বড় অংশই চলে যায় বিদেশি ঋণের সুদ গুনতে। এখানে বৈষম্যটা আর ব্যক্তি পর্যায়ে থাকছে না, একটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই আন্তর্জাতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

আধুনিক বিশ্বের এই অর্থনৈতিক অসাম্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে নয়া-উদারতাবাদ (Neoliberalism)। এই অর্থনৈতিক মডেলে সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। রাষ্ট্রকে বলা হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা বাসস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো থেকে হাত গুটিয়ে নিতে এবং এগুলো বেসরকারি খাতের কাছে বিক্রি করে দিতে। এর সোজা হিসাব হলো, যার পকেটে টাকা আছে সে ভালো সেবা কিনবে, আর যার টাকা নেই সে রাস্তায় পড়ে থাকবে। নয়া-উদারনীতিবাদ মানবাধিকারের মূল দর্শন অর্থাৎ মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদার ধারণাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এটি মানুষকে কেবল একজন ক্রেতা বা ভোক্তা হিসেবে বিবেচনা করে (Harvey, 2005)। রাষ্ট্র যখন এই নীতি অন্ধভাবে অনুসরণ করে, তখন সে আসলে তার নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যহীনতার যে আইনি দায়বদ্ধতা আছে, তা থেকে সরে আসে। বেসরকারি হাসপাতাল বা স্কুলগুলো কখনো সমতার নীতি মেনে চলে না, তারা কেবল লাভের হিসাব বোঝে। ফলে সমাজে এক ভয়াবহ শ্রেণিবৈষম্যের সৃষ্টি হয় যা মানবাধিকারের যেকোনো ঘোষণাপত্রকে উপহাসে পরিণত করে।

সব মিলিয়ে, সমতা এবং বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের জন্য কেবল একটি আইনি দায়িত্ব নয়, এটি একটি নিরন্তর নৈতিক সংগ্রাম। সমাজ প্রতিনিয়ত বৈষম্যের নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি করে। কখনো তা ধর্মের নামে, কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, আবার কখনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মিথ্যা আশ্বাসের নামে মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে। রাষ্ট্রকে এই ফাঁদগুলো চিহ্নিত করতে হয় এবং অত্যন্ত শক্ত হাতে এগুলো ভেঙে দিতে হয়। আদালত, মানবাধিকার কমিশন এবং সুশীল সমাজকে সব সময় সজাগ থাকতে হয় যেন রাষ্ট্র কোনোভাবেই তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করতে না পারে। মানুষ তার জন্মগত পরিচয়ের বাইরে এসে কেবল তার মেধা, সততা এবং মানবিকতা দিয়ে মূল্যায়িত হবে – মানবাধিকারের এই স্বপ্নটি খুব সহজে ধরা দেওয়ার নয়। পদে পদে বাধা আসবে, পুরনো শোষকরা নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করবে। তারপরও মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের একমাত্র চাবিকাঠি হলো এই বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। রাষ্ট্র এবং নাগরিক উভয়কেই এই লড়াইয়ে সমান অংশীদার হতে হয়। কারণ যেখানে সমতা নেই, সেখানে আসলে কোনো অধিকারেরই স্বাধীন অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার (Civil, Political, Economic, Social and Cultural Rights)

অধিকারের ঐতিহাসিক বিভাজন এবং মতাদর্শিক টানাপোড়েন

মানবাধিকারের ধারণাটি কোনো একক আইনি নথির মাধ্যমে রাতারাতি পূর্ণতা পায়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এক বিস্তৃত ইতিহাস। আধুনিক বিশ্বে মানুষের অধিকারগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ভেতরে আনার প্রথম বড় উদ্যোগ নেওয়া হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এই ঘোষণাপত্রের প্রণেতাদের মনে একটি অখণ্ড এবং পূর্ণাঙ্গ অধিকারের ছবি ছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই ঘোষণাপত্রের ভেতরে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার এবং বাসস্থানের অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়েছিল। প্রণেতারা চেয়েছিলেন পৃথিবীর সব মানুষের জন্য এমন একটি বিশ্বজনীন মানদণ্ড তৈরি করতে, যা কোনো রাজনৈতিক সীমানার কাছে বাধাগ্রস্ত হবে না। এই অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রমাণ করে, মানুষের জীবনের বহুমাত্রিক প্রয়োজনগুলোকে আলাদা করে দেখার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই (Morsink, 1999)। একটিমাত্র দলিলে সব ধরনের অধিকারের বীজ নিহিত থাকার বিষয়টি মানবজাতির ইতিহাসে এক সাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হয়।

সমস্যা তৈরি হয় ঘোষণাপত্রটিকে যখন আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত করার সময় আসে। ঠিক সেই সময়ে পুরো বিশ্ব স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে দুটি সুস্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপাশে ছিল পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলো, অন্যপাশে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার ছিল সবচেয়ে বেশি দামি। তারা মনে করত, রাষ্ট্রকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক ব্লক মনে করত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমতা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূল্য নেই। তাদের যুক্তি ছিল, পেটে ক্ষুধা নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার কোনো কাজেই আসে না। এই দুটি ব্লকের মধ্যে অধিকারের অগ্রাধিকার নিয়ে এক বিশাল মতাদর্শিক সংঘাত শুরু হয়। একটি নির্দিষ্ট আদর্শের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে তারা মানবাধিকারের অখণ্ডতাকে মেনে নিতে পারছিল না। পৃথিবীর দুই পরাশক্তির এই মতাদর্শিক জেদের কারণেই মানবাধিকারের মূল ধারণাটি মাঝখান থেকে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার একটি শঙ্কা তৈরি হয়।

এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলাফল হিসেবে মানবাধিকারের আইনি কাঠামোটি শেষ পর্যন্ত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটির বদলে দুটি আলাদা আন্তর্জাতিক চুক্তি গ্রহণ করে। এর একটি হলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি, আর অন্যটি হলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি। এই বিভাজনটি আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। একটি মানুষের অধিকারকে আইনের বইয়ে দুই ভাগে ভাগ করা হলেও, বাস্তব জীবনে একজন মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় না। একজন নাগরিকের একই সাথে ভোটের অধিকার যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি তার কর্মসংস্থানের অধিকারও সমানভাবে জরুরি। স্নায়ুযুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে বিশ্বনেতারা এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাদের এই রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে দশকের পর দশক ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবাধিকারের চর্চা একটি অসম্পূর্ণ এবং ভারসাম্যহীন পথে অগ্রসর হয়েছে।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের তাত্ত্বিক কাঠামো

নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকারগুলো মূলত একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের যথেচ্ছ ক্ষমতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়েছে। এই অধিকারগুলোর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া। জীবনের অধিকার, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার এবং একটি সুষ্ঠু বিচারের অধিকার – এগুলো সবই নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এই অধিকারগুলো ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র যদি যেকোনো সময় বিনাবিচারে একজন নাগরিককে কারাগারে নিক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে, সেখানে মানুষের স্বাধীন সত্তার কোনো মূল্য থাকে না। এই অধিকারগুলো একজন নাগরিককে রাষ্ট্রের বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর চোখে চোখ রেখে কথা বলার আইনি সাহস জোগায়। সাধারণ মানুষ যেন রাষ্ট্রের ভয়ে গুটিয়ে না থাকে, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এই অধিকারগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য।

এই অধিকারগুলোর একটি গভীর তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে। দার্শনিক আইসাইয়াহ বার্লিন (Isaiah Berlin) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ টু কনসেপ্টস অফ লিবার্টি (Two Concepts of Liberty)-তে একটি চমৎকার ধারণার অবতারণা করেছেন, যাকে তিনি নেতিবাচক স্বাধীনতা (Negative Liberty) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বার্লিনের মতে, নেতিবাচক স্বাধীনতা মানে হলো ব্যক্তির কাজে বাইরের কোনো বাধা বা হস্তক্ষেপ না থাকা। রাষ্ট্রকে এখানে একটি সুনির্দিষ্ট সীমানার বাইরে থাকতে বলা হয় (Berlin, 1958)। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো মূলত এই নেতিবাচক স্বাধীনতার ধারণার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রকে বলা হয়, তুমি মানুষের বাকস্বাধীনতায় বাধা দিয়ো না, তুমি মানুষের ধর্ম পালনে হস্তক্ষেপ কোরো না, তুমি কাউকে বিনাবিচারে আটকে রেখো না। এখানে রাষ্ট্রের কাজ হলো মূলত কিছু ‘না’ করা। রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তাই এখানে ব্যক্তির জন্য স্বাধীনতার একটি বিস্তৃত প্রান্তর তৈরি করে দেয়। বার্লিনের এই তত্ত্বটি খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেয়, মানুষের নিজস্ব বিকাশের জন্য রাষ্ট্রের খবরদারি থেকে মুক্ত থাকাটা কতটা জরুরি।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই অধিকারগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। একটি রাষ্ট্র কখনোই বলতে পারে না যে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ বা সম্পদ নেই বলে তারা পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করতে পারছে না। একজন মানুষকে নির্যাতন না করার জন্য কোনো বিশাল রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রয়োজন হয় না, এর জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার প্রয়োজন হয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক আইনে বলা হয়েছে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো প্রতিটি রাষ্ট্রকে অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে। এখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কোনো অজুহাত দেখানোর সুযোগ নেই। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এই অধিকারগুলোকে সাধারণত সংবিধানের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দেশের উচ্চ আদালতগুলো এই অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে। একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এই তাৎক্ষণিক আইনি সুরক্ষাই মূলত আধুনিক বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি।

অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রায়োগিক দিক

অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন মাথায় আসতে পারে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কী মূল্য থাকতে পারে? যার থাকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই, যে রোগে ভুগলে কোনো চিকিৎসা পায় না, তাকে যদি বলা হয় তুমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক, সে হয়তো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে। এই মানুষগুলোর জীবনকে অর্থবহ করার জন্যই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ধারণাটি আন্তর্জাতিক আইনে যুক্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার, মানসম্মত বাসস্থান, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকারগুলো এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করে যেন প্রতিটি মানুষ একটি ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। মানুষের জীবন কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। একটি সম্মানজনক জীবন কাটানোর জন্য মানুষের যে মৌলিক উপকরণগুলো প্রয়োজন, এই অধিকারগুলো মূলত সেই উপকরণগুলোরই আইনি স্বীকৃতি।

এই অধিকারগুলোর তাত্ত্বিক কাঠামো নাগরিক অধিকারের চেয়ে বেশ আলাদা। সমাজবিজ্ঞানী টি. এইচ. মার্শাল (T. H. Marshall) তার বিখ্যাত রচনা সিটিজেনশিপ অ্যান্ড সোশ্যাল ক্লাস (Citizenship and Social Class)-এ একটি নতুন ধারণার পরিচয় করিয়ে দেন, যাকে তিনি সামাজিক নাগরিকত্ব (Social Citizenship) বলেছেন। মার্শালের মতে, নাগরিকত্ব কেবল ভোট দেওয়ার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্বের জন্য মানুষের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও অপরিহার্য (Marshall, 1950)। এই ধারণাটি ইতিবাচক অধিকার (Positive Rights)-এর দর্শনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। নেতিবাচক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে যেমন কিছু কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়, ইতিবাচক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ঠিক উল্টো কাজটি করতে হয়। এখানে রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসে মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হয়। স্কুল তৈরি করা, হাসপাতাল বানানো, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা – এগুলো রাষ্ট্রের সক্রিয় পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব।

এই অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। কারণ স্কুল বা হাসপাতাল বানাতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশের পক্ষেই রাতারাতি সবার জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা বা নিশ্চিত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতার কারণেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলোকে অনেক সময় আদালতে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য বা এনফোর্সেবল হিসেবে গণ্য করা হয় না। একজন বেকার মানুষ আদালতে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে সরাসরি চাকরি আদায় করতে পারেন না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, এই অধিকারগুলোর কোনো মূল্য নেই। এই অধিকারগুলো মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। সরকারকে তার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বা জাতীয় বাজেট তৈরির সময় অবশ্যই এই অধিকারগুলোর কথা মাথায় রাখতে হয়। রাষ্ট্রীয় নীতির এই বাধ্যবাধকতাই ধীরে ধীরে সমাজে একটি টেকসই অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

অধিকারের অবিভাজ্যতা এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমন্বয়

মানবাধিকারের এই দুই ভাগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা তাত্ত্বিক বিবাদটি একসময় আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তোলে। তারা বুঝতে পারেন, মানুষের জীবনকে এভাবে খণ্ড খণ্ড করে দেখার প্রবণতাটি মূলত মানবাধিকারের মূল চেতনার সাথেই সাংঘর্ষিক। এই বিচ্ছিন্নতাকে দূর করার জন্য ফরাসি-চেক আইনজ্ঞ কারেল ভাসাক (Karel Vasak) একটি চমৎকার তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রস্তাব করেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের তিনটি মূল স্লোগান – স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব – এর ওপর ভিত্তি করে মানবাধিকারকে তিনটি প্রজন্মে ভাগ করেন। ভাসাক দেখান, প্রথম প্রজন্ম বা নাগরিক অধিকারগুলো মূলত মানুষের স্বাধীনতার সাথে যুক্ত, আর দ্বিতীয় প্রজন্ম বা অর্থনৈতিক অধিকারগুলো মানুষের সাম্যের সাথে যুক্ত। ভাসাকের এই অধিকারের তিন প্রজন্ম (Three Generations of Rights) তত্ত্বটি পরিষ্কার করে দেয় যে, একটি প্রজন্ম আরেকটির প্রতিযোগী নয়, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক (Vasak, 1977)। একটি সমাজে যদি সাম্য না থাকে, তবে সেখানকার স্বাধীনতা কেবল কিছু বিত্তবান মানুষের বিলাসে পরিণত হয়।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ফলেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ভুল বুঝতে শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ১৯৯৩ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেন। ভিয়েনা ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি সুনির্দিষ্ট ধারণাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া, যা অধিকারের অবিভাজ্যতা (Indivisibility of Rights) নামে পরিচিত। বিশ্বনেতারা একমত হন যে, সব মানবাধিকার সার্বজনীন, অবিভাজ্য, পরস্পর নির্ভরশীল এবং সম্পর্কযুক্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাক ডনেলি (Jack Donnelly) তার ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Universal Human Rights in Theory and Practice) গ্রন্থে এই অবিভাজ্যতার দর্শনটিকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Donnelly, 2013)। ডনেলি প্রমাণ করেছেন, একটি নির্দিষ্ট অধিকারকে বাদ দিয়ে অন্য অধিকারগুলো কখনোই পূর্ণতা পেতে পারে না।

এই অবিভাজ্যতার ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা করে। আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা না করে কেবল নির্বাচনের আয়োজন করলে একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। অনেক দেশের সংবিধানে এখন শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক অধিকারগুলোকে মৌলিক অধিকারের সমমর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। দেশের উচ্চ আদালতগুলোও তাদের যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে এই দুই ধরনের অধিকারের মধ্যে একটি চমৎকার আইনি সমন্বয় তৈরি করছে। আদালতগুলো জীবনের অধিকারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছে, জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, সম্মানজনক জীবিকা নিয়ে বেঁচে থাকা। এই সৃজনশীল আইনি ব্যাখ্যার ফলে অর্থনৈতিক অধিকারগুলো ধীরে ধীরে নাগরিক অধিকারের কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করছে। এটি মানবাধিকারের ইতিহাসে একটি বিশাল বাঁকবদল, যা মানুষের জীবনের বহুমাত্রিক প্রয়োজনগুলোকে একটি অভিন্ন আইনি ছাতার নিচে নিয়ে আসার সফল চেষ্টা করে যাচ্ছে।

প্রগতিশীল বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতার চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নাগরিক অধিকারগুলোর চেয়ে বেশ আলাদা। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ আইনি মেকানিজমের কথা বলা হয়েছে। এই মেকানিজমকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় প্রগতিশীল বাস্তবায়ন (Progressive Realization) বলা হয় (Steiner et al., 2007)। এর সহজ অর্থ হলো, একটি রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য এবং উপলব্ধ সম্পদ ব্যবহার করে ধাপে ধাপে এই অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করবে। একটি দরিদ্র দেশ হয়তো আজই তার সব নাগরিকের জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারবে না, কিন্তু তাকে অবশ্যই এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এই অধিকারগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পেছনের দিকে হাঁটতে পারবে না। প্রগতিশীল বাস্তবায়নের এই ধারণাটি রাষ্ট্রগুলোকে সম্পদের সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা মেনে নিয়েও মানবাধিকারের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি যৌক্তিক পথ তৈরি করে দেয়।

তবে এই প্রগতিশীল বাস্তবায়নের সুযোগ নিয়ে অনেক রাষ্ট্র প্রায়শই তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তারা যেকোনো ব্যর্থতার জন্য সম্পদের অভাবকে প্রধান অজুহাত হিসেবে দাঁড় করায়। এখানেই মানবাধিকারের তাত্ত্বিকরা একটি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম (Development as Freedom)-এ এই অজুহাতের অসারতা প্রমাণ করেছেন। সেন তার সক্ষমতা তত্ত্ব (Capability Approach)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক অধিকারগুলো কেবল কিছু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নয়, এগুলো মূলত মানুষের সক্ষমতা বা ফ্রিডম। সেন যুক্তি দেন, সম্পদের অভাবের চেয়েও সম্পদের অসম বণ্টন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বেশি দায়ী (Sen, 1999)। একটি রাষ্ট্র যখন মেগা প্রজেক্ট বা সামরিক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, অথচ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বাজেট বরাদ্দ কমায়, তখন সেই রাষ্ট্র সম্পদের সীমাবদ্ধতার দোহাই দিতে পারে না। এটি মূলত তাদের নীতিগত ব্যর্থতা এবং মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা।

রাষ্ট্রের এই নীতিগত ব্যর্থতাগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য বর্তমান সময়ে অনেক নতুন আইনি কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবং মানবাধিকার কর্মীরা রাষ্ট্রীয় বাজেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছেন। তারা আদালতে গিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, সরকার তার উপলব্ধ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে না। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কিছু দেশের সর্বোচ্চ আদালত ইতিমধ্যে রায় দিয়েছে যে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার দরিদ্র নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধরনের আইনি সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক অধিকারগুলো কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়। এগুলোকে আইনিভাবে দাবি করা সম্ভব। প্রগতিশীল বাস্তবায়ন মানে অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করা নয়। এর মানে হলো একটি নির্দিষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হবে যে তারা তাদের নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সাংস্কৃতিক অধিকারের স্বরূপ এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এর অবস্থান

অধিকারের আলোচনাগুলোতে সাধারণত অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিষয়গুলোই বেশি প্রাধান্য পায়। এই ডামাডোলের মাঝে সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো প্রায়শই কিছুটা আড়ালে পড়ে যায়। অথচ একজন মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি জুড়ে থাকে তার নিজস্ব সংস্কৃতি। নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার, নিজস্ব ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব পালন করার অধিকার এবং সাহিত্য বা শিল্পের চর্চা করার অধিকারগুলোই মূলত সাংস্কৃতিক অধিকারের মূল কথা। এর পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সুফল ভোগ করার অধিকারকেও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি সমাজে যখন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাষাকে হেয় করা হয় বা তাদের সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা দেওয়া হয়, তখন সেই জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা গভীরভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো মূলত সমাজের এই বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে। মানুষের মনের ভেতরের সৃজনশীলতা এবং তার নিজস্ব পরিচয়ের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা একটি মানবিক সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বিশ্বায়নের এই যুগে সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো এক নতুন ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে শক্তিশালী দেশগুলোর সংস্কৃতি খুব সহজেই দুর্বল দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। এর ফলে আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব ভাষা এবং ঐতিহ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই বৈচিত্র্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রকে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্রকে উল্টো এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যেন এই পিছিয়ে পড়া সংস্কৃতিগুলো নিজেদের স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকতে পারে। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতি মানবজাতির একটি অমূল্য সম্পদ। একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে মানুষের চিন্তার একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মৃত্যু হওয়া। সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো এই বৈশ্বিক সমতলায়নের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মানুষের শেকড়কে সুরক্ষিত রাখে।

সাংস্কৃতিক অধিকারের এই চর্চায় একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং স্পর্শকাতর বিতর্কের জায়গাও রয়েছে। অনেক সময় সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সমাজে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা বৈষম্যমূলক প্রথাগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এই দ্বন্দ্বটিকে তাত্ত্বিক আলোচনায় সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ বনাম বিশ্বজনীনতার বিতর্ক বলা হয়। একটি সংস্কৃতিতে হয়তো নারীদের দমিয়ে রাখা বা শিশুদের বাল্যবিবাহ দেওয়াকে সাধারণ রেওয়াজ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী এই প্রথাগুলো সরাসরি মানুষের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। একটি আধুনিক মানবাধিকার কাঠামো কখনোই সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে মানুষের ওপর নিপীড়ন মেনে নিতে পারে না। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে হবে, তবে সেই সংস্কৃতি কোনোভাবেই সার্বজনীন মানবাধিকারের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারবে না। এই দুইয়ের মাঝে একটি যৌক্তিক এবং মানবিক ভারসাম্য তৈরি করাটাই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে বড় সফলতা। মানুষের সংস্কৃতি মানুষের বিকাশের সহায়ক হবে, তার শোষণের হাতিয়ার নয় – এই দর্শনটিই সাংস্কৃতিক অধিকারের মূল নির্যাস।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থা (International System of Human Rights Protection)

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জাতিসংঘের ভূমিকা

আইনের বইগুলোতে বড় বড় অধিকারের কথা খুব সুন্দর করে সাজানো থাকে। কিন্তু সেই আইনগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য যদি কোনো পাহারাদার বা তদারকি করার মতো প্রতিষ্ঠান না থাকে, তবে সেগুলো নিছক কিছু মিষ্টি কথায় পরিণত হয়। একটি দেশের ভেতরে আইন প্রয়োগের জন্য পুলিশ, আদালত এবং প্রশাসন থাকে। বিশ্ব রাজনীতির জটিল ময়দানে কেবল চুক্তি সই করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। জাতিসংঘের (UN) নেতৃত্বে বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার একটি বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে আছে মানবাধিকার কাউন্সিল (Human Rights Council) এবং বিভিন্ন চুক্তির অধীনে গঠিত কমিটিগুলো। এরা সারা বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখে, রাষ্ট্রগুলোর কাজের পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনে সমালোচনা করে। একটি বৈশ্বিক পাহারাদার বা ওয়াচডগ হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারিতাকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার ভেতরে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় এক রাতে তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো পৃথিবী যখন লাশের স্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেছিলেন যে মানবাধিকার কেবল কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে না। এই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করেই একটি বৈশ্বিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়, যা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে (Alston & Goodman, 2013)।

জাতিসংঘের মূল সনদ বা গঠনতন্ত্র (UN Charter) ১৯৪৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়। এই সনদের ভেতরেই মানবাধিকার সুরক্ষার একটি কাঠামোগত ভিত্তি লুকিয়ে ছিল। সনদের ৬৮ নম্বর অনুচ্ছেদে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদকে (ECOSOC) নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য একটি কমিশন গঠন করার। সেই নির্দেশের সূত্র ধরেই ১৯৪৬ সালে জন্ম নেয় মানবাধিকার কমিশন (Commission on Human Rights)। এই কমিশনটি প্রথমদিকে মূলত মানদণ্ড নির্ধারণ বা আইন তৈরির কাজেই বেশি ব্যস্ত ছিল। প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী এলিনর রুজভেল্টের নেতৃত্বে এই কমিশনই সেই ঐতিহাসিক সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরি করেছিল। শুরুর দিকে কমিশনের কোনো ক্ষমতা ছিল না রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো তদন্ত করার। তারা অনেকটা তাত্ত্বিক আলোচনার কেন্দ্র হিসেবেই কাজ করত। তবে সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গুম, খুন এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মাত্রা বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজ একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থার দাবি তোলে। ফলে সত্তর এবং আশির দশকে এসে এই কমিশন ধীরে ধীরে আইন তৈরির পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়ে সরাসরি কাজ করতে শুরু করে।

একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিরপেক্ষতা। জাতিসংঘের এই সুরক্ষা ব্যবস্থাটি মূলত দুটি বড় পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর একটি হলো সনদ-ভিত্তিক সংস্থা (Charter-based Bodies), যার আইনি ভিত্তি সরাসরি জাতিসংঘের মূল সনদের সাথে যুক্ত। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বর্তমান মানবাধিকার কাউন্সিল। অন্যদিকে রয়েছে চুক্তি-ভিত্তিক সংস্থা (Treaty-based Bodies), যেগুলো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে কাজ করে। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে পুরো বিশ্বের ওপর একটি নজরদারির জাল বিছিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্রগুলো সাধারণত এই বৈশ্বিক নজরদারিকে খুব একটা পছন্দ করে না। তারা সব সময় চেষ্টা করে জাতিসংঘের এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এড়িয়ে চলতে বা এদের সিদ্ধান্তগুলোকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করতে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাটি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের একটি ভরসার জায়গা হিসেবে টিকে আছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই, তারপরও তাদের প্রতিবেদন এবং সুপারিশগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তোলার ক্ষমতা রাখে।

মানবাধিকার কাউন্সিল এবং বৈশ্বিক নজরদারির নতুন অধ্যায়

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটির নাম হলো মানবাধিকার কাউন্সিল (Human Rights Council)। ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে পুরোনো মানবাধিকার কমিশনকে বাতিল করে এই নতুন কাউন্সিলটি গঠন করে (Schabas, 2015)। পুরোনো কমিশনটি বাতিল করার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ ছিল। সেই কমিশনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল এর চরম মাত্রার রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। অনেক সময় এমন সব দেশ সেই কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হতো, যাদের নিজেদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। একারণে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এই কলঙ্ক মোচনের জন্যই সম্পূর্ণ নতুন ম্যান্ডেট এবং কাঠামো নিয়ে মানবাধিকার কাউন্সিলের জন্ম হয়। এই কাউন্সিলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচিত মোট ৪৭টি সদস্য রাষ্ট্র থাকে। সাধারণ পরিষদ গোপন ভোটের মাধ্যমে এই সদস্যদের তিন বছরের জন্য নির্বাচিত করে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই কাউন্সিলের সদর দপ্তর অবস্থিত এবং তারা বছরে অন্তত তিনবার নিয়মিত অধিবেশনে মিলিত হয়।

এই নতুন কাউন্সিলের সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং অভিনব পদ্ধতিটির নাম হলো সার্বজনীন পর্যায়বৃত্ত পর্যালোচনা (Universal Periodic Review)। এটিকে সংক্ষেপে ইউপিআর (UPR) বলা হয়। এই পদ্ধতির মূল কথা হলো, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই মানবাধিকার নজরদারির বাইরে থাকতে পারবে না, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন। প্রতি সাড়ে চার বছর পরপর জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে এই পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। এটি মূলত একটি পিয়ার রিভিউ বা সমকক্ষদের দ্বারা মূল্যায়নের ব্যবস্থা। এখানে একটি রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে এবং সুপারিশ প্রদান করে। পর্যালোচনার সময় তিনটি ভিন্ন দলিল বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রথমত, রাষ্ট্র নিজেই তার দেশের পরিস্থিতি নিয়ে একটি জাতীয় প্রতিবেদন জমা দেয়। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ ওই দেশের ওপর একটি স্বাধীন তথ্যচিত্র তৈরি করে। এবং তৃতীয়ত, দেশের ভেতরের এবং বাইরের বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব তথ্য-প্রমাণ জমা দেয়। এই ত্রিমাত্রিক তথ্য বিশ্লেষণের ফলে রাষ্ট্রের কোনো গাফিলতি থাকলে তা খুব সহজেই সবার সামনে চলে আসে।

সার্বজনীন পর্যায়বৃত্ত পর্যালোচনার কক্ষের পরিবেশটি বেশ শ্বাসরুদ্ধকর হয়। উন্নত বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোও যখন এই কাঠগড়ায় দাঁড়ায়, তখন তাদের অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা অনেক সময় কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের ত্রুটিগুলো ঢাকার চেষ্টা করেন। তবে সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো আগে থেকেই অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের সত্য ঘটনাগুলো জানিয়ে রাখে। ফলে মানবাধিকার কাউন্সিলের এই অধিবেশনগুলো হয়ে ওঠে বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার এক অনন্য সাধারণ প্ল্যাটফর্ম। কাউন্সিল হয়তো সরাসরি কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে না, কিন্তু তারা যে প্রকাশ্য সমালোচনা করে, তার কূটনৈতিক মূল্য অনেক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাষ্ট্রগুলো তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত থাকে। এই কাঠামোগত সমালোচনার ফলে অনেক রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সম্মান বাঁচানোর তাগিদে দেশের ভেতরে থাকা বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করে বা নতুন কোনো সুরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করে।

চুক্তি-ভিত্তিক কমিটি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার মানদণ্ড

মানবাধিকার কাউন্সিলের মতো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তৈরি আরেকটি শক্তিশালী কাঠামো রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় চুক্তি-ভিত্তিক সংস্থা (Treaty Bodies)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল চুক্তিগুলো যখন তৈরি হয়েছিল, তখন প্রতিটি চুক্তির ভেতরেই একটি করে তদারকি কমিটি গঠনের কথা বলা ছিল। বর্তমানে এরকম দশটি মূল কমিটি রয়েছে, যেমন মানবাধিকার কমিটি, শিশু অধিকার বিষয়ক কমিটি, বা নির্যাতন বিরোধী কমিটি। এই কমিটিগুলোর সদস্যরা কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি নন। তারা নিজ নিজ দেশের সরকার দ্বারা মনোনীত হলেও কাজ করেন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ব্যক্তিগত মর্যাদায়। তারা মূলত আইনজীবী, শিক্ষাবিদ বা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ মানবাধিকার কর্মী। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে কেবল আইনি মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাই হলো এই কমিটিগুলোর প্রধান কাজ (Ramcharan, 2011)।

চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রতিটি রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এই কমিটিগুলোর কাছে তাদের কাজের বিস্তারিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় গঠনমূলক সংলাপ (Constructive Dialogue)। রাষ্ট্র যখন তার প্রতিবেদন পাঠায়, তখন তারা সাধারণত দেশের ইতিবাচক দিকগুলোই বেশি তুলে ধরে। কিন্তু কমিটি কেবল সরকারের কথার ওপর ভরসা করে বসে থাকে না। তারা দেশের ভেতরের সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিকল্প তথ্য সংগ্রহ করে। এই বেসরকারি তথ্যগুলোকে আইনি পরিভাষায় বিকল্প প্রতিবেদন (Shadow Report) বলা হয়। জেনেভায় যখন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কমিটির মুখোমুখি বসেন, তখন বিশেষজ্ঞরা এই বিকল্প প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের একের পর এক শক্ত প্রশ্ন করতে থাকেন। দেশের ভেতরের প্রকৃত সত্যগুলো তখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্মোচিত হয়। আলোচনার শেষে কমিটি কিছু সুনির্দিষ্ট সমাপনী পর্যবেক্ষণ বা সুপারিশ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়, যা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের জন্য আইনিভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

কিছু কিছু চুক্তির অধীনে এই কমিটিগুলোর একটি বিশেষ আইনি ক্ষমতা রয়েছে, যাকে ব্যক্তিগত অভিযোগ প্রক্রিয়া (Individual Complaints Mechanism) বলা হয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী দিক। কোনো সাধারণ নাগরিক যদি দেখে যে তার নিজ রাষ্ট্র তার মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং দেশের আদালতের কাছে গিয়েও সে কোনো বিচার পায়নি, তবে সে সরাসরি এই আন্তর্জাতিক কমিটিগুলোর কাছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারে। কমিটি তখন একটি আধা-বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত জানায়। যদিও এই কমিটিগুলো কোনো প্রথাগত আন্তর্জাতিক আদালত নয় এবং তাদের কোনো পুলিশ বাহিনী নেই, তাদের আইনি সিদ্ধান্তের ওজন অনেক ভারী। আন্তর্জাতিক মহলে এই সিদ্ধান্তগুলোর বিশাল সম্মান রয়েছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নিজ নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়, তখন সেটি সেই সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের নৈতিক পরাজয় হিসেবে কাজ করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর

জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থার বিশাল এই কর্মযজ্ঞটি পরিচালনা করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনের সুপারিশ অনুযায়ী সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (Office of the High Commissioner for Human Rights – OHCHR) গঠন করে। এই দপ্তরটি মূলত পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর স্নায়ুকেন্দ্র বা সচিবালয় হিসেবে কাজ করে। হাইকমিশনার হলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা। তিনি সরাসরি জাতিসংঘের মহাসচিবের অধীনে কাজ করেন এবং পুরো বিশ্বে মানবাধিকারের নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বনেতাদের সাথে প্রতিনিয়ত দেনদরবার করেন। জেনেভা এবং নিউইয়র্কে অবস্থিত এই বিশাল দপ্তরের কাজ কেবল অফিসিয়াল কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করা নয়, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকারের একটি নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা (Ramcharan, 2002)।

হাইকমিশনারের দপ্তরের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি হলো তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম। কেবল জেনেভায় বসে বিশ্বের সব দেশের সঠিক পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। একারণে ওএইচসিএইচআর (OHCHR) পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত বা মানবাধিকার ঝুঁকিতে থাকা দেশে তাদের নিজস্ব অফিস স্থাপন করে। এই মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলেন এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে প্রশিক্ষণ দেন। কোনো দেশে যদি দাঙ্গা বা বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়, তবে এই দপ্তরের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে ছুটে যান। তারা নিরপেক্ষভাবে ঘটনার বিবরণ নথিভুক্ত করে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে পাঠান। তাদের পাঠানো এই বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

হাইকমিশনারের এই পদটি চরম মাত্রায় কূটনৈতিক এবং একই সাথে সাংঘাতিক সংবেদনশীল। তাকে প্রতিনিয়ত একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। একদিকে তাকে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়, অন্যদিকে তাকে খেয়াল রাখতে হয় যেন সেই রাষ্ট্রগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে জাতিসংঘের অনুদান বন্ধ করে না দেয় বা মাঠপর্যায়ের কাজ করতে বাধা না দেয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে হাইকমিশনার প্রকাশ্যে বিবৃতি দেন এবং অনেক সময় রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে সরাসরি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় এই দপ্তরের সমালোচনা করে তাদের কাজকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাইকমিশনারের দপ্তর বারবার প্রমাণ করেছে যে, মানবাধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলে না। তাদের এই নিরন্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মানবাধিকারের এজেন্ডাকে সব সময় প্রাসঙ্গিক করে রাখে।

বিশেষ প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা

মানবাধিকার কাউন্সিলের চোখ এবং কান হিসেবে কাজ করে জাতিসংঘের একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যার আনুষ্ঠানিক নাম হলো বিশেষ প্রক্রিয়া (Special Procedures)। এটি সম্ভবত জাতিসংঘের পুরো মানবাধিকার কাঠামোর সবচেয়ে গতিশীল এবং সরাসরি হস্তক্ষেপকারী একটি ব্যবস্থা। এর অধীনে মূলত বিভিন্ন স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সাধারণত স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য বলা হয়। এই বিশেষজ্ঞরা জাতিসংঘের কোনো বেতনভুক্ত কর্মচারী নন। তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং অবৈতনিকভাবে এই কাজ করেন, যা তাদের কাজের নিরপেক্ষতা এবং স্বাধীনতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ প্রক্রিয়াগুলোকে মূলত দুটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো দেশভিত্তিক ম্যান্ডেট, যেখানে একজন বিশেষজ্ঞকে একটি নির্দিষ্ট দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আরেকটি হলো বিষয়ভিত্তিক ম্যান্ডেট, যেখানে একজন বিশেষজ্ঞ পুরো বিশ্বজুড়ে একটি নির্দিষ্ট বিষয়, যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্যাতন, বা চরম দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করেন।

এই স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো তারা সরাসরি বিভিন্ন দেশে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করতে পারেন। একে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন (Fact-finding Mission) বলা হয়। কোনো রাষ্ট্র যখন তাদের দেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়, তখন তারা সেখানে গিয়ে কারাগারগুলো পরিদর্শন করেন, সরকারি কর্মকর্তা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে বসেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, তারা এমন অনেক ভুক্তভোগীর সাথে অত্যন্ত গোপনে কথা বলার সুযোগ পান, যারা সরকারের ভয়ে এত দিন মুখ খুলতে পারেনি। সফর শেষে তারা মানবাধিকার কাউন্সিলের কাছে একটি বিস্তারিত এবং জনসমক্ষে উন্মুক্ত প্রতিবেদন পেশ করেন। তাদের এই প্রতিবেদনগুলো অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ সেখানে অনেক ধামাচাপা দেওয়া সত্য উন্মোচিত হয়।

দীর্ঘমেয়াদি পর্যালোচনার পাশাপাশি এই বিশেষ প্রক্রিয়াগুলো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও দারুণ কাজ করে। বিশ্বের কোথাও যদি কোনো সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বা কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আয়োজন চলে, তবে এই বিশেষজ্ঞরা কালক্ষেপণ না করে সরাসরি ওই দেশের সরকারকে একটি জরুরি বার্তা বা আর্জেন্ট আপিল (Urgent Appeal) পাঠান। তারা সরকারকে মনে করিয়ে দেন আন্তর্জাতিক আইনে তাদের দায়বদ্ধতার কথা। অনেক সময় কেবল এই একটি চিঠির কারণেই অনেক বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন আটকে যায়। রাষ্ট্রগুলো এই বিশেষজ্ঞদের খুব একটা সহজভাবে নেয় না। অনেক দেশ তাদের ভিসা দেয় না, বা দেশে ঢুকতে দিলেও নানাভাবে তাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। তারপরও এই বিশেষজ্ঞরা তাদের মেধা এবং সাহসিকতা দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রামাণ্য দলিল তৈরি করে চলেছেন, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে বা রাজনৈতিক আলোচনায় শক্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ সংস্কার

জাতিসংঘের এই বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি দেখতে অনেক জাঁকজমকপূর্ণ মনে হলেও এর ভেতরে বেশ কিছু গভীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত এর কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এই ব্যবস্থার সরাসরি কোনো প্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্ট ক্ষমতা নেই। যদি কোনো রাষ্ট্র মানবাধিকার কাউন্সিলের সুপারিশ বা চুক্তি-ভিত্তিক কমিটির সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকার করে, তবে তাদের বাধ্য করার জন্য জাতিসংঘের হাতে নিজস্ব কোনো বৈশ্বিক পুলিশ বা সামরিক বাহিনী নেই। এই পুরো ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে মূলত রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছা এবং কূটনৈতিক চাপের ওপর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা একে অনেক সময় নেমিং অ্যান্ড শেমিং (Naming and Shaming) বা নাম ধরে লজ্জা দেওয়ার কৌশল বলে থাকেন। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় এই লজ্জাকে পরোয়া করে না, বিশেষ করে যখন দেশের ভেতরে তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয় থাকে। ফলে বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন এবং প্রস্তাবনা অনেক সময় কেবল ফাইলের স্তূপেই আটকে থাকে, মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের জীবনে এর কোনো সুফল পৌঁছায় না।

এর পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতির চরম মেরুকরণ এবং দ্বৈত নীতি এই ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো বা তাদের মিত্ররা অনেক সময় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেও আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে খুব সহজেই পার পেয়ে যায়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে থাকা পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা (Veto Power) এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভিলেন হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের কোথাও যখন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বা গণহত্যা চলতে থাকে, তখন এই পরাশক্তিগুলো নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা করে অনেক সময় নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগ করে বসে। ফলে জাতিসংঘের সব অঙ্গসংগঠন এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়ে। মানবাধিকার কাউন্সিলও পুরোপুরি রাজনীতির প্রভাবমুক্ত নয়। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় মানবাধিকারের প্রশ্নগুলোকে নিজেদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, যা এই পুরো ব্যবস্থার মূল দর্শনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

এতসব সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক টানাপোড়েনের পরও এই আন্তর্জাতিক সুরক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার নয়। বর্তমানে চুক্তি-ভিত্তিক সংস্থাগুলোর কাজের চাপ কমানোর জন্য এবং তাদের প্রতিবেদনগুলোকে আরও কার্যকর করার জন্য জাতিসংঘের ভেতরে বেশ কিছু সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিশ্বজুড়ে সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে নিজেদের যুক্ত করছে। রাষ্ট্রগুলোর শত অপচেষ্টা সত্ত্বেও জাতিসংঘের এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি অধিকার বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এটি হয়তো নিখুঁত নয়, এর হয়তো অনেক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। তারপরও এই ব্যবস্থাটি বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার নিজ নাগরিকদের সাথে যা খুশি তাই করতে পারে না। মানবাধিকার রক্ষার এই বৈশ্বিক কাঠামো মূলত ক্ষমতার দম্ভের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি অবিরাম সংগ্রাম।

চার্টার-ভিত্তিক বনাম চুক্তিভিত্তিক মানবাধিকার ব্যবস্থা (Charter-based vs Treaty-based Mechanisms)

জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন এবং মানবাধিকারের দ্বৈত কাঠামো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবিক বিপর্যয়ের পর বিশ্বের নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করেছিলেন, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য কেবল সামরিক শক্তিই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমতা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এই গভীর উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করেই ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের সনদ বা চার্টার প্রণীত হয়। সনদের একেবারে শুরুতেই মৌলিক মানবাধিকার, মানুষের মর্যাদা এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকারের প্রতি পুনরায় আস্থা জ্ঞাপনের কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে। এই সনদটি মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নতুন নিয়মাবলি তৈরি করে দেয়, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকারও আইনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সনদ প্রণয়নের সময় একটি বড় ধরনের আইনি শূন্যতা ছিল। সেখানে মানবাধিকারের কথা বলা হলেও, ঠিক কোন কোন অধিকারগুলো মানুষ পাবে বা রাষ্ট্র কীভাবে সেই অধিকারগুলো রক্ষা করবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা বা আইনি বাধ্যবাধকতা সনদের ভেতরে বিস্তারিতভাবে লেখা ছিল না। অধিকারের এই অস্পষ্টতাকে দূর করার জন্যই পরবর্তী কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনি কাঠামোর জন্ম দেয়, যা সময়ের সাথে সাথে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মূলত দুটি প্রধান কাঠামোর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। এর একটি হলো চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থা, যা সরাসরি জাতিসংঘের মূল সনদ থেকে তার ক্ষমতা ও বৈধতা গ্রহণ করে। অন্যটি হলো চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা, যা পরবর্তীতে তৈরি হওয়া নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। বেলজিয়ান আইনজ্ঞ এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ের দে শ্যুটার (Olivier De Schutter) তার ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ল (International Human Rights Law) গ্রন্থে এই দুই কাঠামোর সমান্তরাল যাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক দ্বৈততা (Institutional Duality) হিসেবে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দে শ্যুটারের মতে, এই দ্বৈত ব্যবস্থা কোনো আইনি ত্রুটি বা পরিকল্পনার অভাব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এই দুটি ধারা তৈরি করেছে, কারণ রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাজনৈতিক চাপ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা – উভয় ধরনের হাতিয়ারেরই সমান প্রয়োজন রয়েছে। চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো মূলত জাতিসংঘের একটি রাজনৈতিক অঙ্গ হিসেবে কাজ করে, যেখানে পৃথিবীর সব সদস্য রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার একটি সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট এবং আইনি মোড়কে আবদ্ধ, যা কেবল সেই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর ওপরই প্রযোজ্য হয়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক দ্বৈততার পেছনের দার্শনিক ভিত্তিটি অত্যন্ত মজবুত। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র সাধারণত বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জবাবদিহি করতে চায় না। আন্তর্জাতিক আইন তৈরি হয় রাষ্ট্রগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে। চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় চুক্তিতে সই করে এবং বিশেষজ্ঞদের কাছে নিজেদের কাজের হিসাব দিতে রাজি হয়। অনেক রাষ্ট্রই মানবাধিকারের কঠোর আইনি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে ভয় পায় বা স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। সেই রাষ্ট্রগুলো যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে পুরোপুরি পার পেয়ে না যায়, তার জন্যই চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থাটিকে একটি সর্বজনীন পাহারাদার হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। আপনি জাতিসংঘের সদস্য মানেই আপনি সনদের মূল নীতিগুলো মেনে চলতে বাধ্য, আর সেই সূত্র ধরেই আপনাকে চার্টার-ভিত্তিক কাঠামোর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সহজ করে বললে, চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা হলো একটি নির্দিষ্ট আইনি চুক্তি, আর চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থা হলো একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব। এই দুটি কাঠামো একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং একটি অখণ্ড বৈশ্বিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে এরা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক চরিত্র এবং সার্বজনীন প্রয়োগ

চার্টার-ভিত্তিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ (Human Rights Council)। ২০০৬ সালের আগে এই দায়িত্ব পালন করত মানবাধিকার কমিশন, যা চরম রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। নতুন এই পরিষদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি সরাসরি অধীনস্থ সংস্থা হিসেবে গঠিত হয়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সার্বজনীন প্রয়োগ বা ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই দাবি করতে পারবে না যে তারা এই পরিষদের নজরদারির বাইরে। মানবাধিকার পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সাধারণ পরিষদের ভোটে নির্বাচিত হয় এবং সেখানে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের সুষম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ফোরাম, যেখানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা তাদের নিজ নিজ দেশের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বসেন। এখানে কোনো স্বাধীন আইনজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ বিচারকের আসনে বসেন না। কূটনীতিকদের উপস্থিতি এই ব্যবস্থার পুরো চরিত্রটিকে একটি রাজনৈতিক রূপ দান করে। এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলোচনার পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মিত্রতা রক্ষার একটি নীরব খেলা সব সময় চলতে থাকে।

এই পরিষদের সবচেয়ে যুগান্তকারী উদ্ভাবন হলো ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (UPR) বা সার্বজনীন পুনর্বীক্ষণ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার অধীনে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিটিকেই প্রতি সাড়ে চার বা পাঁচ বছর পরপর মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন, তা নিয়ে অন্য দেশগুলো সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে এবং বিভিন্ন সুপারিশ প্রদান করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি কোনো আইনি আদালতের জেরা নয়, এটি মূলত সমকক্ষ রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক পর্যালোচনা বা পিয়ার রিভিউ। উন্নত দেশ হোক বা উন্নয়নশীল দেশ, চরম ক্ষমতাধর পরাশক্তি হোক বা ক্ষুদ্র কোনো দ্বীপরাষ্ট্র – সবাইকে একই নিয়মের অধীনে এই ইউপিআর প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হয়। রাষ্ট্রগুলো এখানে নিজেদের সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি অন্য দেশের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়। প্রখ্যাত মানবাধিকার তাত্ত্বিক ফিলিপ অ্যালস্টন (Philip Alston) এই ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি চমৎকার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রগুলো স্বভাবতই একে অপরের সমালোচনা করতে পছন্দ করে, আর ইউপিআর সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে মানবাধিকার উন্নয়নের একটি হাতিয়ারে পরিণত করেছে (Alston, 1992)।

মানবাধিকার পরিষদের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো স্পেশাল প্রসিডিউরস বা বিশেষ প্রক্রিয়া। এর অধীনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, বিশেষ দূত বা ওয়ার্কিং গ্রুপ নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা নির্দিষ্ট কোনো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অথবা নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করেন। দাসত্ব, গুম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা চরম দারিদ্র্যের মতো নির্দিষ্ট বিষয়গুলোতে তদন্ত করার জন্য এই বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হয়। এই বিশেষ দূতরা পরিষদের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং ভুক্তভোগী মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলে জাতিসংঘের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। তাদের কাজকে প্রায়শই জাতিসংঘের ‘চোখ এবং কান’ বলা হয়। তারা কোনো দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেন না, কিন্তু তাদের তৈরি করা প্রতিবেদনগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থা এভাবেই আইনি বাধ্যবাধকতার অভাবকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বৈশ্বিক জনমতের মাধ্যমে পূরণ করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায়।

চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার আইনি বাধ্যবাধকতা এবং বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা

জাতিসংঘের সনদ সাধারণ মানবাধিকারের কথা বললেও, নারী অধিকার, শিশু সুরক্ষা, নির্যাতন প্রতিরোধ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ কিছু মূল মানবাধিকার চুক্তি বা কোর হিউম্যান রাইটস ট্রিটি প্রণয়ন করে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (ICCPR), অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার চুক্তি (ICESCR) বা নারী বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) হলো এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রতিটি চুক্তি প্রণয়নের সময় সেই চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকি করার জন্য একটি করে কমিটি গঠন করা হয়, যাদের আইনি পরিভাষায় ট্রিটি বডি বা চুক্তিভিত্তিক সংস্থা বলা হয়। এই কমিটিগুলোর গঠনকাঠামো চার্টার-ভিত্তিক মানবাধিকার পরিষদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকরা বসেন না। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর ভোটে নির্বাচিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের স্বাধীন আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই কমিটিতে স্থান পান। তারা তাদের নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতায় কাজ করেন।

চুক্তিতে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো একটি আইনি বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ হয়। প্রতিটি রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট সময় পরপর এই বিশেষজ্ঞ কমিটিগুলোর কাছে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করতে হয়, চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলার জন্য তারা দেশের ভেতরে কী কী আইন পাস করেছে এবং বাস্তবে সেই আইনগুলোর প্রয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে। শুধু সরকারি প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে কমিটিগুলো দেশের ভেতরের সুশীল সমাজ বা এনজিওগুলোর কাছ থেকেও সমান্তরাল বা শ্যাডো রিপোর্ট গ্রহণ করে। এরপর জেনেভায় একটি উন্মুক্ত অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সাথে বিশেষজ্ঞদের একটি দীর্ঘ এবং গঠনমূলক আইনি পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকান আইনজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের সাবেক বিচারক থমাস বার্গেনথাল (Thomas Buergenthal) তার আলোচনায় দেখিয়েছেন, এই প্রক্রিয়াটি মূলত একটি আধা-বিচারিক ব্যবস্থা (Quasi-judicial Mechanism) হিসেবে কাজ করে। কমিটিগুলো রাষ্ট্রকে সরাসরি কোনো শাস্তি দিতে পারে না, কিন্তু তাদের গভীর আইনি বিশ্লেষণ এবং জেরা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের জন্য একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পর্যালোচনার শেষে কমিটিগুলো ‘কনক্লুডিং অবজারভেশন’ বা চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে, যা রাষ্ট্রের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে (Buergenthal, 2006)।

রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদনের পাশাপাশি অনেক চুক্তিভিত্তিক সংস্থার কাছে ব্যক্তি পর্যায়ে অভিযোগ দায়ের করার একটি অসাধারণ সুযোগ রয়েছে। কোনো দেশের সাধারণ নাগরিক যদি মনে করেন রাষ্ট্র তার মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং দেশের ভেতরের সব আদালত ঘুরেও তিনি কোনো ন্যায়বিচার পাননি, তবে তিনি সরাসরি জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ কমিটিগুলোর কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। কমিটিগুলো তখন একটি আদালতের মতো কাজ করে এবং রাষ্ট্র ও অভিযোগকারীর যুক্তিতর্ক শুনে নিজেদের আইনি মতামত প্রদান করে। এর পাশাপাশি, কমিটিগুলো সময় সময় চুক্তির বিভিন্ন ধারার আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করে, যা ‘জেনারেল কমেন্ট’ বা সাধারণ মন্তব্য নামে পরিচিত। একটি চুক্তির কোনো শব্দ বা বাক্যের আধুনিক যুগে কী অর্থ দাঁড়াবে, তা এই মন্তব্যগুলোর মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন কাঠামোর ভেতরে মানবাধিকারের নতুন নতুন ধারণাগুলো যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই জেনারেল কমেন্টগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা মূলত রাজনৈতিক আবরণের বাইরে গিয়ে মানবাধিকারকে একটি নিরেট আইনি শৃঙ্খলার ভেতরে নিয়ে আসার সবচেয়ে সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা বনাম আইনি মানদণ্ড: দুই ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ

চার্টার-ভিত্তিক এবং চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি গভীর তুলনামূলক আলোচনা করলে আন্তর্জাতিক কাঠামোর অনেকগুলো মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচিত হয়। চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থাটি মূলত রাজনৈতিক সমতা এবং সমকক্ষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি ফোরাম। এখানে একটি দেশের প্রতিনিধি অন্য একটি দেশের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক লেনদেনের সুযোগ থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, মানবাধিকার কাউন্সিলে মিত্র রাষ্ট্রগুলো একে অপরের ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যায় এবং কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য মানবাধিকারের প্রশ্নগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, চুক্তিভিত্তিক সংস্থাগুলোতে বসা বিশেষজ্ঞরা কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মিত্র বা শত্রু নন। তাদের মূল কাজ হলো একটি দেশের আইন এবং বাস্তব পরিস্থিতির সাথে আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারাগুলো মিলিয়ে দেখা। সেখানে রাজনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ খুব কম থাকে। বিশেষজ্ঞের জেরা সাধারণত অনেক বেশি তীক্ষ্ণ, তথ্যভিত্তিক এবং আইনি যুক্তিতে পরিপূর্ণ হয়, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের জন্য এড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

কাজের পরিধির দিক থেকেও এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থার নজরদারি অত্যন্ত প্রশস্ত। ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (UPR)-এ একটি দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন পর্যন্ত সব কিছু নিয়েই সংক্ষেপে মন্তব্য করা হয়। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীরে যাওয়ার সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, চুক্তিভিত্তিক সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে অত্যন্ত গভীরভাবে কাজ করে। নারী অধিকার বিষয়ক কমিটি কেবল নারীদের প্রতি হওয়া বৈষম্যের খুঁটিনাটি নিয়ে রাষ্ট্রকে জেরা করবে। তারা দেশের পারিবারিক আইন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার বা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের মতো আইনি জটিলতাগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিশ্লেষণ করে। এই গভীর আইনি পর্যালোচনার কারণেই চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর সুপারিশ প্রদান করতে সক্ষম হয়, যা রাষ্ট্রগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ আইন সংস্কারে সরাসরি সহায়তা করে।

বাস্তবায়ন এবং বাধ্যবাধকতার প্রশ্নে উভয় ব্যবস্থাই একটি অভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে লজ্জা ও নিন্দার কৌশল (Naming and Shaming Strategy) বলা হয়। জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো পুলিশ বা সামরিক বাহিনী নেই, যারা গিয়ে কোনো স্বৈরশাসককে গ্রেপ্তার করে আনবে। তাদের একমাত্র শক্তি হলো তথ্য প্রকাশ করে বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রকে লজ্জিত করা। চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থায় এই লজ্জা দেওয়ার কাজটি হয় সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে এবং প্রকাশ্য জনসমক্ষে। অন্যদিকে, চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় এই লজ্জা দেওয়ার কাজটি হয় আইনি যুক্তির মাধ্যমে। একটি রাষ্ট্র যখন দেখে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা তাদের আইনের ত্রুটিগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তথ্যপ্রমাণসহ তুলে ধরছেন, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীরা এই প্রতিবেদনগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ফলে আইনি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও, এই দুই ব্যবস্থার সম্মিলিত রাজনৈতিক এবং আইনি চাপ রাষ্ট্রগুলোকে তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে এক ধরনের নীরব বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলে দেয়।

রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সাথে মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত এবং সংস্কারের দাবি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর সাথে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক সব সময়ই একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সময় রাষ্ট্রগুলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রগতিশীল হিসেবে তুলে ধরতে চায়। পরবর্তীতে যখন জাতিসংঘের কমিটিগুলো সেই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (State Sovereignty)-এর ঢাল ব্যবহার করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। তারা দাবি করে যে, তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ আইন, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর বাইরের কোনো সংস্থার হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। এই সার্বভৌমত্বের অহংকার থেকে রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় চুক্তিভিত্তিক সংস্থাগুলোর সুপারিশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়। রাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত চতুরতার সাথে চুক্তিগুলোতে ‘সংরক্ষণ’ বা রেজারভেশন যুক্ত করে রাখে, যাতে চুক্তির মূল ধারাগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তারা পার পেয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আচরণ মূলত মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয় এবং রাষ্ট্রগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স প্রদান করে।

চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাগুলোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত রিপোর্টিংয়ের চাপ। বর্তমানে নয়টি মূল মানবাধিকার চুক্তি এবং বেশ কয়েকটি ঐচ্ছিক প্রটোকল রয়েছে। একটি রাষ্ট্র যদি সব চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তবে তাকে প্রতি বছরই কোনো না কোনো কমিটির কাছে বিশদ প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। উন্নত দেশগুলোর জন্য এটি সম্ভব হলেও, উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এতগুলো বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এর ফলে দেখা যায়, অনেক দেশ বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয় না, যাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘রিপোর্টিং ফ্যাটিগ’ বা প্রতিবেদন ক্লান্তি বলা হয়। কমিটিগুলোর কাছেও পর্যাপ্ত বাজেট বা লোকবল থাকে না, যার কারণে জমে থাকা প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করতে তাদের বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আইনি কাঠামোর এই দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা অনেক সময় চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিয়ত সংস্কারের দাবি উঠছে। অস্ট্রিয়ান আইনজ্ঞ এবং জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ দূত ম্যানফ্রেড নোয়াক (Manfred Nowak) এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অত্যন্ত জোরালো তাত্ত্বিক এবং বাস্তবমুখী প্রস্তাব দিয়েছেন। নোয়াক দেখিয়েছেন, বর্তমানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য কমিটি মূলত কাজের পুনরাবৃত্তি করে এবং রাষ্ট্রগুলোর ওপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি করে। তিনি সব চুক্তিভিত্তিক সংস্থাকে একীভূত করে একটি একক এবং স্থায়ী মানবাধিকার আদালত বা অন্তত একটি স্থায়ী ইউনিফাইড ট্রিটি বডি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন (Nowak, 2003)। তার মতে, একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো থাকলে রাষ্ট্রগুলো আর সহজে ফাঁকি দিতে পারবে না এবং ভুক্তভোগী মানুষেরা অনেক দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে। যদিও নোয়াকের এই বিশ্ব মানবাধিকার আদালতের ধারণাটি অনেক রাষ্ট্রের কাছেই এখনো একটি ইউটোপিয়া বা অকল্পনীয় বিষয় মনে হয়, তারপরও এই ধরনের সংস্কার প্রস্তাবগুলো প্রমাণ করে যে বর্তমান ব্যবস্থাটি তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোকে তার প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে হলে অবশ্যই এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতাগুলো কাটিয়ে আরও বেশি গতিশীল এবং একীভূত হতে হবে।

বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের সন্ধানে পরিপূরক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা

চার্টার-ভিত্তিক এবং চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার আলোচনাটি কোনো প্রতিযোগিতামূলক বিতর্ক নয়। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে কোনটি বেশি শক্তিশালী বা কোনটি বেশি কার্যকর, সেই বিচার করাটা মূলত অর্থহীন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিশাল ইমারতটি মূলত এই দুটি পিলারের ওপরই ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে। একটি রাষ্ট্র হয়তো কৌশলগত কারণে নারী অধিকার বা নির্যাতন বিরোধী কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকতে পারে। চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় সেই রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোনো আইনি সুযোগ থাকে না। ঠিক সেই মুহূর্তে চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থাটি তার রাজনৈতিক জাল বিস্তার করে। ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউর মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রটিকে বিশ্বমঞ্চে দাঁড় করিয়ে মানবাধিকারের সাধারণ মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। আবার কোনো রাষ্ট্র হয়তো মানবাধিকার কাউন্সিলে রাজনৈতিক মিত্রদের সাহায্যে পার পেয়ে গেল, কিন্তু চুক্তিভিত্তিক কমিটির স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের তীক্ষ্ণ আইনি জেরার সামনে তাদের সেই রাজনৈতিক ফায়দা কোনো কাজে আসে না। এই দুটি ব্যবস্থা মূলত একে অপরের ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করে একটি নিশ্ছিদ্র বৈশ্বিক নজরদারির ব্যবস্থা তৈরি করে।

বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এই দুটি ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের চমৎকার মিথস্ক্রিয়া দেখা যায়। চার্টার-ভিত্তিক ব্যবস্থার অধীনে কাজ করা বিশেষ দূতরা যখন কোনো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত করতে যান, তখন তারা প্রায়শই চুক্তিভিত্তিক সংস্থাগুলোর দেওয়া আইনি পর্যবেক্ষণগুলোকে তাদের কাজের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। একইভাবে, চুক্তিভিত্তিক সংস্থাগুলোও যখন কোনো রাষ্ট্রের প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে, তখন তারা বিশেষ দূতদের সরেজমিন তদন্তের রিপোর্টগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা এবং তথ্যের আদান-প্রদান জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামোকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চার্টার এবং চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা ঠিক সেই ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। এদের যৌথ লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দম্ভকে কমিয়ে এনে সাধারণ মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

মানবাধিকারের এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলোর যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। শত শত বছরের রাজতান্ত্রিক এবং স্বৈরতান্ত্রিক ইতিহাস পার হয়ে আসা মানবসভ্যতা মাত্র কয়েক দশক হলো এই ধরনের আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সাথে পরিচিত হয়েছে। এই ব্যবস্থাগুলো এখনো সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়, পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক চাপের কাছে এদের প্রায়শই অসহায় মনে হয়। তারপরও, এই কাঠামোটি বিশ্বজুড়ে অধিকার আদায়ের একটি অভিন্ন ভাষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আজকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কোনো মানুষের ওপর নির্যাতন হলে তা আর কেবল সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। জেনেভায় বসে থাকা বিশেষজ্ঞ বা কূটনীতিকরা সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নথি তৈরি করেন। চার্টার-ভিত্তিক এবং চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার এই নিরন্তর আইনি এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম মূলত আমাদের একটি আশাবাদী ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ে মানুষের মর্যাদা অনেক বেশি দামি, এবং সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন এবং আইনি কাঠামোর উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে।

আঞ্চলিক মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থা: ইইউ, আসিয়ান, সার্ক (Regional System of Human Rights Protection: EU, ASEAN, SAARC)

আঞ্চলিক সুরক্ষার দার্শনিক ভিত্তি ও রাষ্ট্রীয় নৈকট্যের মনস্তত্ত্ব

জাতিসংঘের বিশাল সদর দপ্তরটি নিউইয়র্কে অবস্থিত, আর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা মূল কাঠামোগুলোর অবস্থান জেনেভায়। সেখান থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো গ্রামের সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা আসলেই অনেক কঠিন কাজ। পৃথিবীর মানচিত্রটা বড়, সমস্যাগুলো আরও বড় এবং বৈচিত্র্যময়। ঠিক এই উপলব্ধি থেকেই আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism) নামের একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনি ধারণার জন্ম হয়। পাড়ার কোনো সমস্যা হলে সবার আগে প্রতিবেশীরাই এগিয়ে আসে। রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম। একই অঞ্চলের দেশগুলোর ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ কাছাকাছি থাকে। তারা একে অপরের সমস্যাগুলো অনেক গভীরভাবে এবং দ্রুত অনুধাবন করতে পারে। তাত্ত্বিকরা এই ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক নৈকট্যকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গঠনবাদ (Constructivism) নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলেন যে রাষ্ট্রগুলোর পরিচয় মূলত তাদের চারপাশের পরিবেশ দ্বারাই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় (Wendt, 1999)। একটি দেশের সরকার তার পাশের দেশের সরকারের সমালোচনাকে যতটা ভয় পায়, দূরের কোনো অচেনা দেশের সমালোচনাকে ততটা গুরুত্ব দেয় না। ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে তা জাতিসংঘের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলো রাতারাতি তৈরি হয়নি। এগুলো গড়ে ওঠার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিশ্বাস অর্জনের ইতিহাস থাকে। একটি অঞ্চলে যদি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংখ্যা বেশি হয়, তবে সেখানে মানবাধিকারের ধারণা খুব দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। অন্যদিকে, স্বৈরাচারী দেশগুলোর অঞ্চলে এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাক ডনেলি (Jack Donnelly) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Universal Human Rights in Theory and Practice)-এ আঞ্চলিক ব্যবস্থার এই দ্বিমুখী রূপটি খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Donnelly, 2013)। তিনি দেখিয়েছেন, ইউরোপে মানবাধিকার ব্যবস্থা যতটা সফল হয়েছে, এশিয়া বা আফ্রিকায় ততটা হয়নি। এর মূল কারণ হলো ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার অহংকার সরিয়ে রেখে একটি সাধারণ আইনি কাঠামোতে একমত হতে পেরেছিল। এশিয়ার দেশগুলোর কাছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বা ক্ষমতার দাপটটাই সবসময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক সময় আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলো মানবাধিকার রক্ষার হাতিয়ার না হয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের পিঠ বাঁচানোর একটি নিরাপদ ক্লাব হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

এরপরও আঞ্চলিক মানবাধিকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত বৈশ্বিক আইনের একটি পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। জাতিসংঘের আইনগুলো খুব সাধারণ ভাষায় লেখা থাকে, যা সব দেশের স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সরাসরি খাপ খায় না। আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলো সেই বৈশ্বিক আইনগুলোকে স্থানীয় ছাঁচে ফেলে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে তোলে। মানুষ অনুভব করতে পারে যে এই নিয়মগুলো তাদের নিজেদের এলাকার জন্যই তৈরি হয়েছে। ফলে আইনের প্রতি তাদের এক ধরনের মানসিক টান তৈরি হয়। একটি কার্যকর আঞ্চলিক আদালত বা কমিশন থাকলে সাধারণ মানুষকে আর সুবিচারের আশায় জেনেভা পর্যন্ত দৌড়াতে হয় না। তারা নিজেদের বাড়ির কাছেই বিচারের একটি বিশ্বস্ত জায়গা পেয়ে যায়। অধিকার আদায়ের আইনি পথটা যত সহজ হয়, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরও ঠিক ততটাই জোরালো হয়।

ইউরোপীয় মানবাধিকার ব্যবস্থা এবং একটি শক্তিশালী আদালতের উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ইউরোপের দেশগুলোকে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে কেবল ধ্বংসই ডেকে আনা যায়, শান্তি আনা যায় না। এই রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯৪৯ সালে তারা ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’ গঠন করে। এর ঠিক পরের বছরই স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন (ECHR)। এটি কোনো সাধারণ চুক্তি ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের ক্ষমতাকে একটি আন্তর্জাতিক আইনের হাতে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করার দলিল। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চমকটি আসে ১৯৫৯ সালে, যখন ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (European Court of Human Rights) প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশ্বের অন্য যেকোনো ব্যবস্থার চেয়ে এটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী। এই আদালতটি মূলত অধি-জাতীয়তাবাদ (Supranationalism) ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ আইনের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

এই আদালতের সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকটি হলো ব্যক্তিগত অভিযোগ দায়েরের সুযোগ। ইউরোপের যেকোনো সাধারণ নাগরিক যদি মনে করেন তার নিজ দেশের সরকার তার অধিকার কেড়ে নিয়েছে, এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতও তাকে বিচার দেয়নি, তবে তিনি সরাসরি স্ট্রাসবুর্গের এই আদালতে মামলা করতে পারেন। এটি আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি অভাবনীয় ব্যাপার। আগে মনে করা হতো আন্তর্জাতিক আইনে কেবল রাষ্ট্রগুলোই মামলা করতে পারে। কিন্তু ইউরোপীয় আদালত সেই পুরোনো ধারণাকে ভেঙে সাধারণ মানুষকে সরাসরি রাষ্ট্রের সমকক্ষ বানিয়ে দিয়েছে। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ উইলিয়াম শাবাস (William Schabas) তার দ্য ইউরোপীয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস: আ কমেন্টারি (The European Convention on Human Rights: A Commentary) বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে এই আদালতটি সময়ের সাথে সাথে পুরো ইউরোপের জন্য একটি অবিসংবাদিত সাংবিধানিক আদালতে পরিণত হয়েছে (Schabas, 2015)। আদালতের দেওয়া রায়গুলো মানা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য আইনত বাধ্যতামূলক। কোনো রাষ্ট্র যদি আদালতের নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাকে কাউন্সিল অব ইউরোপ থেকে বহিষ্কার করার মতো কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়।

ইউরোপীয় মানবাধিকার ব্যবস্থার এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণও জড়িয়ে আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) যোগ দিতে হলে বা তাদের সাথে বাণিজ্য সুবিধা পেতে হলে একটি দেশকে অবশ্যই মানবাধিকারের শর্তগুলো পূরণ করতে হয়। একে আইনের ভাষায় বলা হয় কন্ডিশনালিটি বা শর্তযুক্ততা। ফলে রাষ্ট্রগুলো কেবল নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে নয়, বরং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বাঁচানোর জন্যই আদালতের রায়গুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এই ব্যবস্থার কারণে ইউরোপের অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সমকামীদের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা রিমান্ডে নির্যাতন বন্ধের মতো বিষয়ে ইউরোপীয় আদালত অনেক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বেরঅহংকারকে আইনি কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ইউরোপের এই ব্যবস্থাটি সারা বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আসিয়ান কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক আপসের সংস্কৃতি

ইউরোপের জমকালো সাফল্য থেকে চোখ সরিয়ে যদি আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তাকাই, তবে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। ১৯৬৭ সালে গঠিত অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস বা আসিয়ানের (ASEAN) জন্ম হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং স্নায়ুযুদ্ধেরসময়কার কমিউনিস্ট প্রভাব ঠেকানোর জন্য। মানবাধিকার তাদের গঠনতন্ত্রের কোথাও ছিল না। দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলের নেতারা একটি বিশেষ তাত্ত্বিক যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় এশীয় মূল্যবোধ (Asian Values)। এই তাত্ত্বিক ধারণার মূল প্রবক্তা ছিলেন সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ এবং মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ। তারা দাবি করতেন, এশিয়ার সমাজব্যবস্থা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। এখানে ব্যক্তির চেয়ে সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ (Krasner, 1999)। এই যুক্তির আড়ালে মূলত স্বৈরাচারী শাসন, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়নকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো।

তবে আন্তর্জাতিক চাপ এবং সুশীল সমাজের ক্রমাগত আন্দোলনের মুখে আসিয়ানকে শেষ পর্যন্ত নমনীয় হতে হয়। ২০০৯ সালে তারা আসিয়ান আন্তঃসরকারি মানবাধিকার কমিশন (AICHR) গঠন করে এবং ২০১২ সালে একটি মানবাধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল আসিয়ানের বরফ গলতে শুরু করেছে। বাস্তবে এই কমিশনটি জন্ম থেকেই একটি দাঁতহীন বাঘ। আসিয়ানের কাজের মূল ভিত্তি হলো ‘আসিয়ান ওয়ে’ বা আসিয়ানের নিজস্ব পথ। এর দুটি প্রধান শর্ত আছে – সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। মানবাধিকার কমিশনেও এই নিয়মগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, মিয়ানমারে যদি রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চলে, তবে কমিশন তার নিন্দা জানাতে পারে না, কারণ মিয়ানমার নিজেই কমিশনে ভেটো দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতাকে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Cultural Relativism) দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়, যেখানে সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনকেও জায়েজ বা ন্যায্য প্রতিপন্ন করার সুযোগ থাকে।

আসিয়ানের এই মানবাধিকার কমিশন সাধারণ মানুষের কোনো অভিযোগ গ্রহণ করতে পারে না, তাদের কোনো আদালতের ব্যবস্থা নেই, এমনকি তারা স্বাধীনভাবে কোনো দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তও করতে পারে না। তারা মূলত কিছু সচেতনতামূলক সেমিনার করা এবং গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে। অনেক সমালোচক মনে করেন, আসিয়ান এই কমিশনটি তৈরি করেছে মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। তারা দেখাতে চায় যে তাদেরও একটি মানবাধিকার কাঠামো আছে, যাতে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যায়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এটি সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। মানবাধিকারের প্রশ্নটি আসিয়ানের কাছে সবসময় একটি অস্বস্তিকর রাজনৈতিক আপসের বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে। তারা ব্যবসা বাণিজ্য বাড়াতে চায়, রাস্তাঘাট বানাতে চায়, কিন্তু রাষ্ট্রের পুলিশ বা সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের সাথে কী আচরণ করছে – সেটি নিয়ে তারা কখনোই কোনো প্রকাশ্য আলোচনায় বসতে রাজি নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাশা এবং সার্কের কাঠামোগত স্থবিরতা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আমরা যদি আমাদের নিজেদের অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ায় আসি, তবে হতাশার মাত্রা আরও গভীর হয়। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এই অঞ্চলে বাস করে। চরম দারিদ্র্য, ধর্মীয় সংঘাত, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম-খুনের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট এই অঞ্চলের নিত্যদিনের চিত্র। তারপরও সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন বা সার্কের (SAARC) কাঠামোতে মানবাধিকার রক্ষার জন্য দৃশ্যমান বা কার্যকরী কোনো মেকানিজম এখনো গড়ে ওঠেনি। ১৯৮৫ সালে যখন সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর মূল ঘোষণাপত্রেই অত্যন্ত সুকৌশলে এমন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছিল, যা মানবাধিকার আলোচনার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়। সার্ক সনদের দশম অনুচ্ছেদে খুব স্পষ্টভাবে বলা আছে, দ্বিপাক্ষিক এবং বিতর্কিত কোনো বিষয় সার্কের আলোচনায় তোলা যাবে না। এই একটি মাত্র বাক্য ব্যবহার করে রাষ্ট্রগুলো যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে উড়িয়ে দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার এই কাঠামোগত স্থবিরতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং চিরস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতা। এখানে জাতীয়তাবাদ (Nationalism) একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আক্রমণাত্মক রূপ নিয়ে বেঁচে আছে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যকার রেষারেষি পুরো সার্ক কাঠামোকে জিম্মি করে রেখেছে। এক দেশ যদি অন্য দেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে চায়, তবে তা সাথে সাথেই রাজনৈতিক ইন্ধন হিসেবে দেখা হয়। কোনো রাষ্ট্রই চায় না তাদের ভেতরের দুর্বলতা বা অবিচারের খবরগুলো আঞ্চলিক ফোরামে আলোচনা হোক। ফলে সার্কের শীর্ষ সম্মেলনগুলো মূলত নেতাদের ফটোসেশন এবং কিছু লোকদেখানো মিষ্টি কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইউরোপ যেমন তাদের ঐতিহাসিক তিক্ততা ভুলে একত্র হতে পেরেছিল, দক্ষিণ এশিয়া সেই অতীত বৈরিতার শেকল এখনো ভাঙতে পারেনি। এখানে প্রতিবেশীকে বন্ধু নয়, বরং সম্ভাব্য শত্রু হিসেবেই বেশি দেখা হয়।

সার্কের অধীনে সামাজিক সনদের মতো কিছু নরম দলিল রয়েছে। নারী ও শিশু পাচার রোধে একটি কনভেনশনও সই হয়েছে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের জন্য কোনো চাপ প্রয়োগ করার ক্ষমতা সার্ক সচিবালয়ের নেই। কোনো স্বাধীন কমিশন নেই, বিচার চাওয়ার কোনো আদালত নেই। এমনকি সার্ক অঞ্চলে সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো যে একসাথে বসে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, তারও উপায় নেই। ভিসা জটিলতার কারণে এক দেশের মানবাধিকার কর্মী খুব সহজে অন্য দেশে যেতে পারেন না। এই অঞ্চলে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সীমানাকে মানবাধিকারের চেয়ে অনেক বড় করে দেখে। সার্কের এই করুণ অবস্থা প্রমাণ করে যে, কেবল ভৌগোলিক নৈকট্য থাকলেই একটি সফল আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মানবাধিকারের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা এখনো সেই রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করতে পারেননি, ফলে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এই আঞ্চলিক কাঠামোর কোনো সুফল পাচ্ছে না।

সুশীল সমাজ ও আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যকার নীরব সংঘাত

আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলোতে রাষ্ট্রগুলো যখন মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে অনীহা দেখায়, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য এগিয়ে আসে সাধারণ মানুষ এবং বেসরকারি সংগঠনগুলো। রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং একটি নীরব প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাত্ত্বিক মার্গারেট কেক (Margaret Keck) এবং ক্যাথরিন সিকিংক (Kathryn Sikkink) এই ধরনের উদ্যোগকে ট্রান্সন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক (Transnational Advocacy Networks) হিসেবে অভিহিত করেছেন (Keck & Sikkink, 1998)। ইউরোপের ক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্কগুলো খুব সহজেই আদালতের দারস্থ হতে পারে। তারা ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দেয়, মামলা পরিচালনার খরচ বহন করে এবং আদালতের রায়ের পর তা বাস্তবায়নের জন্য নিজ নিজ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। ইউরোপীয় আদালতের অনেক যুগান্তকারী রায় মূলত এই বেসরকারি সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের ফসল। সেখানে সুশীল সমাজ এবং আঞ্চলিক আদালত একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

কিন্তু আসিয়ান বা সার্কের মতো অঞ্চলে সুশীল সমাজের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। আসিয়ানের মানবাধিকার কমিশনের সভাগুলোতে বেসরকারি সংগঠনগুলোকে খুব একটা ঢুকতে দেওয়া হয় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতেই বেশি পছন্দ করেন। তারপরও এই সংগঠনগুলো হাল ছাড়ে না। তারা কমিশনের সভার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে, বিকল্প তথ্য সম্বলিত ছায়া প্রতিবেদন (Shadow Report) প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। অনেক সময় তারা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছে ধর্ণা দেয়, যাতে তারা আসিয়ানের দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াটি অনেক সময় সফল হলেও, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুশীল সমাজকে সব সময় রাষ্ট্রের শত্রু বা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে তকমা দেওয়ার একটি অপচেষ্টা থাকে। সরকারগুলো চায় না তাদের ব্যর্থতার খবর কোনোভাবেই আঞ্চলিক মঞ্চে আলোচিত হোক।

দক্ষিণ এশিয়াতে এই সংঘাত আরও বেশি স্পষ্ট এবং নির্মম। সার্কের কোনো কার্যকর কাঠামো না থাকায় এখানকার মানবাধিকার কর্মীরা মূলত জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটির ওপরই বেশি নির্ভরশীল। তারপরও তারা ‘পিপলস সার্ক’ বা ‘সাউথ এশিয়ান হিউম্যান রাইটস’ নামের কিছু সমান্তরাল নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে তারা একে অপরের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং আইনি লড়াইয়ের কৌশল বিনিময় করেন। তবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই নেটওয়ার্কগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখে। আঞ্চলিক এই নীরব সংঘাতটি আমাদের দেখায় যে, মানবাধিকার কেবল কিছু চুক্তিপত্রে সই করার বিষয় নয়। এটি ক্ষমতার সাথে সাধারণ মানুষের একটি অবিরাম রাজনৈতিক লড়াই। রাষ্ট্রগুলো হয়তো আঞ্চলিক ফোরামগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে চায়, কিন্তু সচেতন নাগরিক সমাজ সেই নিষ্ক্রিয়তার দেয়াল ভাঙার জন্য প্রতিনিয়ত আঘাত করে যাচ্ছে।

আঞ্চলিকতাবাদের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক মানবাধিকারের সেতুবন্ধন

ইউরোপ, আসিয়ান এবং সার্কের তুলনামূলক এই আলোচনা আমাদের একটি খুব পরিষ্কার বার্তা দেয়। আঞ্চলিক মানবাধিকার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করে সেই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব (Democratic Peace Theory) আমাদের শেখায় যে গণতান্ত্রিকদেশগুলো নিজেদের মধ্যে খুব কমই সংঘাতে জড়ায় এবং তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি আন্তরিক হয় (Kant, 1795; Doyle, 1983)। ইউরোপের সাফল্যের পেছনে এই তত্ত্বের একটি বড় প্রমাণ রয়েছে। যতক্ষণ না এশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণভাবে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল চুক্তি করে কোনো শক্তিশালী আঞ্চলিক মানবাধিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের ভেতরে ভিন্নমত সহ্য করার মানসিকতা তৈরি না হলে আঞ্চলিক পর্যায়ে গিয়ে কেউ হঠাৎ করে মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে না।

এর মানে এই নয় যে আসিয়ান বা সার্কের মতো সংস্থাগুলোকে বাতিল করে দিতে হবে। এগুলো যেমন আছে তেমনই থাকুক, তবে এর কাঠামোতে কিছু মৌলিক সংস্কার আনা অত্যন্ত জরুরি। আসিয়ানকে ধীরে ধীরে তাদের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ কট্টর নীতি থেকে সরে আসতে হবে। অন্তত ভয়াবহ গণহত্যা বা জাতিগত নিধনের মতো ঘটনাগুলোতে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। অন্যদিকে সার্ককে তাদের সনদের দশম অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অন্তত মানবাধিকার কমিশন গঠনের পথ উন্মুক্ত করতে হবে। এই পরিবর্তনগুলো এক দিনে আসবে না। দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং নাগরিক সমাজের অবিরাম চাপের মাধ্যমেই রাষ্ট্রগুলোকে এই পথে হাঁটতে বাধ্য করতে হবে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার যাত্রাটি কোনো স্প্রিন্ট রেস নয়, এটি একটি দীর্ঘ ম্যারাথন।

সবশেষে, আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলোকে কোনোভাবেই বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ভাবা উচিত নয়। এগুলো মূলত জাতিসংঘের বিশাল কাঠামোর সাথে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের একটি শক্ত সেতুবন্ধন মাত্র। জাতিসংঘের বৈশ্বিক মানদণ্ডগুলো থাকবে ছাতা হিসেবে, আর আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলো সেই ছাতার নিচে থেকে স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার অপব্যবহারকে খুব সহজেই রুখে দিতে পারে। পৃথিবীটা কেবল ক্ষমতাশীলদের নয়, এটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের। এই সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো যখন তাদের নিজেদের অঞ্চলের ভেতরে আইনি স্বীকৃতি পাবে এবং সুরক্ষিত হবে, তখনই বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে মানবাধিকারের সত্যিকার বিজয় নিশ্চিত হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, একদিন হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার কোনো সাধারণ মানুষও ন্যায়বিচারের আশায় নিজের অঞ্চলের কোনো শক্তিশালী আদালতের দরজায় নির্ভয়ে কড়া নাড়তে পারবে।

জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান (National Human Rights Institutions)

রাষ্ট্রের ভেতরে পাহারাদারের ধারণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন

আন্তর্জাতিক আইনের বিশাল বইগুলোতে মানবাধিকারের খুব সুন্দর এবং গোছানো কিছু সংজ্ঞা দেওয়া আছে। জেনেভা বা নিউইয়র্কের মতো বড় বড় শহরে বসে কূটনীতিকরা সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে লম্বা আলোচনা করেন। বাস্তবের চিত্রটা অনেক সময় এর চেয়ে বেশ আলাদা হয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হয় তার নিজের মহল্লায়, গ্রামের ফসলের মাঠে কিংবা স্থানীয় থানায়। জেনেভায় বসে থাকা কোনো আন্তর্জাতিক কমিটির পক্ষে একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের জমি দখলের বিচার করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। ঠিক এই বাস্তব উপলব্ধি থেকেই রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে একটি নিজস্ব পাহারাদার বা তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিটি দেশের নিজস্ব মানবাধিকার কমিশন বা প্রতিষ্ঠান (NHRI) থাকে। এদের কাজ হলো দেশের ভেতরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করা, সরকারকে পরামর্শ দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যত স্বাধীন হবে, সে দেশে মানুষের অধিকার তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে। এই কথাটি শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিক সত্য লুকিয়ে আছে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যার কাজ হবে খোদ সেই রাষ্ট্রেরই ভুলত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া – বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ। স্বাভাবিকভাবেই কোনো ক্ষমতাবান সরকার চায় না তার কাজের ওপর কেউ সার্বক্ষণিক নজরদারি করুক। তারপরও পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই এখন এই ধরনের জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা (State Accountability) নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক চাপ। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে মানবাধিকারের ধারণাটি যখন বিশ্বজুড়ে প্রবল জনপ্রিয়তা পায়, তখন রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারে যে কেবল আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করলেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশের ভেতরে সেই আইনগুলো প্রয়োগ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দরকার হয়। তাত্ত্বিক রিচার্ড কার্ভার (Richard Carver) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত আন্তর্জাতিক আইনকে দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সাথে যুক্ত করার একটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে (Carver, 2012)। সরকারগুলো নিজেদের আধুনিক এবং গণতান্ত্রিকহিসেবে প্রমাণ করার জন্যই মূলত এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনি বৈধতা দেয়।

প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের দিক থেকে চিন্তা করলে এই কমিশনগুলো চিরাচরিত আদালত বা পুলিশি ব্যবস্থার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। পুলিশের কাজ হলো অপরাধীকে ধরা, আর আদালতের কাজ হলো বিচার করা। কিন্তু মানবাধিকার কমিশন কাজ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমীকরণে। তারা সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনে, রাষ্ট্রের প্রশাসনের গাফিলতিগুলো তদন্ত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্র অনেক সময় নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের নিপীড়নমূলক আইন তৈরি করে। সেই আইনের ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ যখন চরম অসহায় হয়ে পড়ে, তখন এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই তাদের জন্য শেষ ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিষ্ঠানটির গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, এর আসল পরীক্ষা হয় সংকটের সময়ে। একটি দেশের সরকার যখন স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করে, তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে, নাকি সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে সরকারের চোখে চোখ রেখে কথা বলবে – তার ওপরেই মূলত পুরো মানবাধিকার সুরক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

প্যারিস নীতিমালা এবং স্বাধীনতার মাপকাঠি

একটি মানবাধিকার কমিশন তৈরি করে তার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেই সেটি রাতারাতি সাধারণ মানুষের বন্ধু হয়ে যায় না। সরকার চাইলে খুব সহজেই দলীয় লোকদের দিয়ে একটি আজ্ঞাবহ কমিশন গঠন করতে পারে, যারা দিনরাত কেবল সরকারের গুণগান গাইবে। এ ধরনের সাজানো প্রতিষ্ঠানগুলো মানবাধিকার রক্ষার বদলে উল্টো সরকারের সব অন্যায়কে জায়েজ বা ন্যায্য প্রতিপন্ন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ভয়াবহ ফাঁকিটি বন্ধ করার জন্য জাতিসংঘ একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করেছে, যা সারা বিশ্বে প্যারিস নীতিমালা (Paris Principles) নামে পরিচিত। ১৯৯১ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই ঐতিহাসিক নীতিমালাটি গ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এই নীতিমালার মূল কথা হলো, একটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই পুরোপুরি স্বাধীন হতে হবে। এই স্বাধীনতার কোনো আপস নেই। প্যারিস নীতিমালা মূলত একটি লিটমাস পেপারের মতো কাজ করে। এটি দিয়ে খুব সহজেই মেপে নেওয়া যায় কোন দেশের কমিশন সত্যিই স্বাধীন, আর কোনটি কেবল লোকদেখানো একটি সরকারি দপ্তর মাত্র (Cardenas, 2014)।

প্যারিস নীতিমালার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বহুত্ববাদ (Pluralism) নিশ্চিত করা। একটি কমিশনে কেবল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা বা বিচারকদের বসিয়ে রাখলে চলবে না। সেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আইনজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যেন এই কমিশনে কাজের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হয়। সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়াটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধান তার একক ক্ষমতাবলে কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন, তবে সেই চেয়ারম্যান স্বভাবতই সরকারের প্রতি অনুগত থাকবেন। নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন বাছাই কমিটি থাকা বাঞ্ছনীয়, যেখানে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের শক্তিশালী অংশগ্রহণ থাকবে। প্রখ্যাত গবেষক সোনিয়া কার্দেনাস (Sonia Cardenas) তার চেইনস অব জাস্টিস: দ্য গ্লোবাল রাইজ অব স্টেট ইনস্টিটিউশনস ফর হিউম্যান রাইটস (Chains of Justice: The Global Rise of State Institutions for Human Rights) বইতে দেখিয়েছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে একটি প্রতিষ্ঠান জন্মের আগেই তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।

স্বাধীনতার আরেকটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর মাপকাঠি হলো আর্থিক স্বাধীনতা (Financial Independence)। একটি কমিশনের হাতে যতই আইনি ক্ষমতা থাকুক না কেন, তাদের যদি খরচের জন্য প্রতি মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তবে তারা কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। সরকার অনেক সময় সরাসরি কমিশনের ওপর হস্তক্ষেপ করে না, তারা খুব সুকৌশলে কমিশনের বাজেট কমিয়ে দেয়। টাকা না থাকলে কমিশন নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে পারে না, মাঠপর্যায়ে গিয়ে তদন্ত করতে পারে না, এমনকি সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তাও দিতে পারে না। প্যারিস নীতিমালায় খুব স্পষ্টভাবে বলা আছে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন বাজেটের ব্যবস্থা করতে হবে। এই বাজেটটি সরাসরি দেশের সংসদ থেকে অনুমোদিত হওয়া উচিত, যাতে কোনো সরকারি আমলা চাইলেই তা আটকে দিতে না পারে। একটি কমিশনের নিজস্ব কর্মী নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা থাকাটাও এই স্বাধীনতার একটি বড় অংশ। সরকারি কর্মকর্তাদের ডেপুটেশনে বা ধার করে এনে কমিশন চালালে সেই কর্মকর্তারা সবসময় তাদের মূল মন্ত্রণালয়ের প্রতিই বেশি অনুগত থাকেন, যা কমিশনের নিরপেক্ষতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অভিযোগ তদন্ত এবং আইনি প্রতিকারের প্রক্রিয়া

জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং জনগুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অভিযোগ গ্রহণ করা এবং তার তদন্ত করা। দেশের সাধারণ বিচার ব্যবস্থা অনেক সময় দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত জটিল হয়। একজন দরিদ্র দিনমজুরের পক্ষে বড় আইনজীবী নিয়োগ করে উচ্চ আদালতে গিয়ে রাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা চালানো প্রায় অকল্পনীয়। মানবাধিকার কমিশন ঠিক এই শূন্যস্থানটি পূরণ করে। এখানে অভিযোগ করার জন্য কোনো টাকা লাগে না, জটিল আইনি ভাষার প্রয়োজন হয় না। সাধারণ মানুষ একটি সাদা কাগজে তাদের বঞ্চনার কথা লিখে কমিশনের কাছে জমা দিতে পারে। কমিশন এই অভিযোগগুলোকে একটি আধা-বিচারিক সংস্থা (Quasi-judicial Body) হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে। তারা ঘটনাটি পর্যালোচনা করে দেখে এতে রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীর গাফিলতি আছে কি না, বা কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করেছে কি না।

তদন্ত করার জন্য একটি কার্যকর কমিশনের হাতে বেশ কিছু শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার থাকে। তারা যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করতে পারে। একে আইনি ভাষায় সমন জারি করার ক্ষমতা (Power to Summon) বলা হয়। কোনো সরকারি অফিস যদি তথ্য লুকাতে চায়, তবে কমিশন সরাসরি সেই অফিসে গিয়ে নথিপত্র তল্লাশি করার ক্ষমতা রাখে। অনেক দেশে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে সহযোগিতা করতে চায় না। তারা ভাবে, আমরা তো রাষ্ট্রেরই একটি অংশ, কমিশন আমাদের কী করবে? কিন্তু একটি স্বাধীন কমিশন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই অহংকারকে ভেঙে দিতে পারে। তারা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তলব করে জবাবদিহি করতে পারে। যদি দেখা যায় পুলিশ হেফাজতে কোনো ব্যক্তির ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তবে কমিশন নিজস্ব চিকিৎসকদের দিয়ে সেই ঘটনার নিরপেক্ষ ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে পারে। তদন্তের এই ক্ষমতাটি মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানকে কমিয়ে আনে (Reif, 2004)।

তবে এই কমিশনগুলোর একটি বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তারা সাধারণত সরাসরি কাউকে শাস্তি দিতে বা জেলে পাঠাতে পারে না। তদন্ত শেষে তারা সরকারের কাছে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করে। এখানেই অনেক সময় একটি বড় ধরনের আইনি অচলাবস্থা তৈরি হয়। সরকার যদি কমিশনের সুপারিশগুলো আমল না করে ফাইলবন্দি করে রাখে, তবে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য শক্তিশালী কমিশনগুলো বেশ কিছু ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। তারা তাদের তদন্তের প্রতিবেদনগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ করে দেয়। একে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় নেমিং অ্যান্ড শেমিং (Naming and Shaming) বলা হয়। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে সরকারের ওপর একটি বিশাল সামাজিক এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি, অনেক দেশের কমিশন সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি উচ্চ আদালতে রিট বা মামলা করার ক্ষমতা রাখে। সরকারের অনীহা দেখলে কমিশন নিজেই ভুক্তভোগীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নেমে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের মনে ন্যায়বিচারের প্রতি গভীর আস্থা তৈরি করে।

সরকারের উপদেষ্টা এবং আইন পর্যালোচনার ভূমিকা

মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর তদন্ত করাটা অনেকটা রোগের চিকিৎসার মতো। কিন্তু আধুনিক মানবাধিকারের ধারণা কেবল চিকিৎসা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে না, তারা রোগ প্রতিরোধের ওপর সমান জোর দেয়। এই প্রতিরোধমূলক কাজটি করার জন্য জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করে। দেশের সংসদ যখন নতুন কোনো আইন তৈরি করে, কমিশন তখন স্বপ্রণোদিত হয়ে সেই খসড়া আইনটি পরীক্ষা করে দেখে। একে বলা হয় আইনগত পর্যালোচনা (Legislative Review)। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে সরকার এমন কিছু আইন পাস করার চেষ্টা করে, যা সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে চরমভাবে খর্ব করে। কমিশন তখন সেই আইনের বিপদজনক ধারাগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলো সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে বা সংসদীয় কমিটির কাছে লিখিত মতামত পাঠায়। এটি মূলত রাষ্ট্রকে কোনো বড় ধরনের ভুল করার হাত থেকে আগেভাগেই রক্ষা করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

সরকার অনেক সময় কমিশনের এই গঠনমূলক সমালোচনাকে খুব একটা সহজভাবে গ্রহণ করে না। তারা ভাবে, কমিশন তাদের দৈনন্দিন কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ জুলি মেরটাস (Julie Mertus) তার হিউম্যান রাইটস ম্যাটারস: লোকাল পলিটিক্স অ্যান্ড ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (Human Rights Matters: Local Politics and National Human Rights Institutions) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিকরাষ্ট্রে সরকার এবং কমিশনের মধ্যে এই ধরনের গঠনমূলক বিতর্ক অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর (Mertus, 2009)। কমিশন কেবল নতুন আইনের খসড়াই দেখে না, তারা দেশের প্রচলিত পুরোনো আইনগুলোও প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা করে। অনেক দেশেই এমন কিছু ব্রিটিশ বা ঔপনিবেশিক আমলের আইন রয়ে গেছে যা আধুনিক মানবাধিকারের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান। কমিশন সরকারকে লাগাতার চাপ দিতে থাকে যেন তারা সেই সেকেলে এবং বৈষম্যমূলক আইনগুলো দ্রুত বাতিল করে। একটি দেশের আইনি কাঠামোকে আধুনিক এবং মানবিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের এই নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।

উপদেষ্টা হিসেবে কমিশনের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষায় সাহায্য করা। পৃথিবীর কোনো দেশই মানবাধিকারের সব আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করেনি। কমিশন সরকারকে প্রতিনিয়ত তাগিদ দেয় বাকি চুক্তিগুলোতে স্বাক্ষর করার জন্য এবং যেসব চুক্তিতে রাষ্ট্র সংরক্ষণের বা আপত্তির কথা জানিয়ে রেখেছে, সেগুলো প্রত্যাহার করার জন্য। জাতিসংঘে রাষ্ট্রকে প্রতি কয়েক বছর পরপর তার মানবাধিকার পরিস্থিতির যে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়, সেই প্রতিবেদন তৈরিতেও কমিশন সরকারকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা দেয়। একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যে ওয়াদাগুলো করে আসে, দেশের ভেতরে সেই ওয়াদাগুলো ঠিকমতো পালিত হচ্ছে কি না – তার হিসাব রাখার কাজটি মূলত এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই করে থাকে। তারা একাধারে রাষ্ট্রের সমালোচক এবং একই সাথে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের একজন বিশ্বস্ত সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে।

মানবাধিকার শিক্ষা এবং সুশীল সমাজের সাথে সেতুবন্ধন

মানুষ যদি তার নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো আইন বা কমিশন তাকে রক্ষা করতে পারবে না। অধিকার আদায়ের প্রথম শর্তই হলো অধিকারকে চিনতে পারা। একারণে জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের একটি বিশাল অংশ জুড়ে থাকে মানবাধিকার শিক্ষা (Human Rights Education)। দেশের সাধারণ মানুষ, স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার দায়িত্বটি এই কমিশনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে। তারা বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজন করে, সহজ ভাষায় অধিকারের পুস্তিকা ছাপে এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণার ব্যবস্থা করে। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বাহিনী, যেমন পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানসিকতায় পরিবর্তন আনা ছাড়া মানবাধিকার পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি কিছুতেই সম্ভব নয়। তাদেরকে শেখানো হয় কীভাবে বলপ্রয়োগ না করে বা সাধারণ মানুষকে নির্যাতন না করেও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করা যায়।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি কোনো একটি নির্দিষ্ট কমিশনের একার পক্ষে সারা দেশে পরিচালনা করা অসম্ভব। একারণে কমিশনকে দেশের ভেতরের বেসরকারি সংগঠন বা সুশীল সমাজ (Civil Society)-এর সাথে একটি শক্ত সেতুবন্ধন তৈরি করতে হয়। বেসরকারি সংগঠনগুলো একেবারে মাঠপর্যায়ে কাজ করে। তারা সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে এবং সমাজের ভেতরের আসল চিত্রটি তাদের নখদর্পণে থাকে। একটি কার্যকর কমিশন এই সংগঠনগুলোর কাজকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদেরকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় রোষানলে পড়েন। সরকার তাদের নানাভাবে হয়রানি করে বা তাদের সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল করার হুমকি দেয়। এই কঠিন সময়গুলোতে মানবাধিকার কমিশন সুশীল সমাজের জন্য একটি সুরক্ষামূলক ঢাল (Protective Shield) হিসেবে কাজ করে। কমিশন প্রকাশ্যে এই সংগঠনগুলোর কাজের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে মানবাধিকার কর্মীরা রাষ্ট্রের শত্রু নন, বরং তারা রাষ্ট্রেরই একটি ইতিবাচক সহযোগী।

গবেষক টমাস পেগ্রাম (Thomas Pegram) তার গবেষণায় একটি খুব চমৎকার বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যে দেশে মানবাধিকার কমিশন এবং সুশীল সমাজের মধ্যে সম্পর্ক যত বেশি গভীর, সে দেশের সরকারের পক্ষে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা ততটাই কঠিন (Pegram, 2010)। অনেক সময় সরকার সুশীল সমাজকে পাত্তা দিতে চায় না, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানবাধিকার কমিশনকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। সুশীল সমাজ তাদের মাঠপর্যায়ের তথ্যগুলো কমিশনের হাতে তুলে দেয়, আর কমিশন তার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সেই তথ্যগুলোকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে সমাজে অধিকার আদায়ের একটি শক্তিশালী এবং অবিচ্ছেদ্য নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ তখন অনুভব করে যে তাদের অধিকারের কথা বলার জন্য কেবল কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট নয়, বরং রাষ্ট্রের ভেতরের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

বৈশ্বিক কাঠামোতে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাদের একটি অত্যন্ত সরব এবং শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার নাম গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অফ ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (Global Alliance of National Human Rights Institutions) বা সংক্ষেপে গ্যানরি (GANHRI)। জেনেভা-ভিত্তিক এই সংগঠনটি সারা বিশ্বের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করে এবং তাদের মধ্যে কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এর চেয়েও বড় কথা হলো, এই সংগঠনটি প্যারিস নীতিমালার আলোকে বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানবাধিকার কমিশনকে একটি নির্দিষ্ট গ্রেড বা স্বীকৃতি প্রদান করে। তারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ, বি, বা সি (A, B, C) ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। একটি কমিশন যদি প্যারিস নীতিমালার সব শর্ত শতভাগ পূরণ করে, তবেই কেবল তাকে ‘এ’ মর্যাদা দেওয়া হয়। এই মর্যাদাটি আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত সম্মানজনক বলে বিবেচিত হয় (Goodman & Pegram, 2012)।

এই গ্রেডিং সিস্টেমটি মূলত রাষ্ট্রগুলোর ওপর একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক এবং কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে কেবল ‘এ’ মর্যাদা পাওয়া কমিশনগুলোই স্বাধীনভাবে বক্তব্য রাখার এবং আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। কোনো দেশের কমিশন যদি ‘বি’ মর্যাদায় নেমে যায়, তবে সেই দেশের সরকারের জন্য এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি চরম লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সরকারগুলো তখন বাধ্য হয়ে তাদের কমিশনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা বন্ধ করে বা নতুন আইন পাস করে কমিশনকে আরও শক্তিশালী করে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর একটি পরোক্ষ কিন্তু অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র। জাতিসংঘ যখন কোনো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ বা ইউপিআর (UPR) পরিচালনা করে, তখন সেখানে সরকারের পাশাপাশি ওই দেশের মানবাধিকার কমিশনও একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আলাদা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অধিকার রাখে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রের ভেতরের আসল সত্যটি জানার একটি নির্ভরযোগ্য সুযোগ করে দেয়।

তবে আধুনিক বিশ্বে এই জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশ কিছু কঠিন এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদ বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উত্থান এই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। অনেক দেশের সরকার এখন প্রকাশ্যেই কমিশনের কাজে বাধা দিচ্ছে, তাদের বাজেট কেটে রাখছে বা সরকারদলীয় লোকদের জোর করে কমিশনে বসিয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার অজুহাতে মানবাধিকার খাতগুলোতে অর্থায়ন কমানো হচ্ছে। এতসব বৈরী পরিবেশের পরও এই প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিজেদের অপরিহার্য প্রমাণ করে চলেছে। এগুলো রাতারাতি সমাজের সব অসংগতি দূর করে দিতে পারে না সত্য, কিন্তু এগুলো সাধারণ মানুষের মনে একটি গভীর আশার সঞ্চার করে। একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান মূলত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোকে কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার লড়াই মূলত সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকারই একটি অবিরাম লড়াই।

সুশাসন ও মানবাধিকার (Good Governance and Human Rights)

সুশাসনের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং মানবাধিকারের আন্তঃসম্পর্ক

রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটি আসলে কীভাবে কাজ করে এবং কেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর এত বেশি প্রভাব, সেটি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানে দীর্ঘকাল ধরে নানামুখী আলোচনা হয়ে আসছে। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে কিছু মানুষের বসবাস এবং একজন শাসকের উপস্থিতি থাকলেই তাকে আধুনিক রাষ্ট্র বলা চলে না। আধুনিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সেই দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা। এই কার্যকারিতার জায়গা থেকেই মূলত সুশাসন (Good Governance) ধারণাটির উদ্ভব ঘটেছে। আশির দশকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো প্রথম এই শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। শুরুতে তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা। তারা ভেবেছিল, আমলাতন্ত্রকে একটু গতিশীল করলে এবং ফাইলের কাজ দ্রুত শেষ করতে পারলেই বুঝি দেশের উন্নয়ন তরতর করে এগিয়ে যাবে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই চিন্তাধারার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাত্ত্বিকরা বুঝতে পারেন, একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাস্তাঘাট বানাতে পারে বা অর্থনীতি পরিচালনা করতে পারে, কিন্তু তাকে কোনোভাবেই সুশাসন বলা যায় না। সুশাসনের জন্য প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি একটি গভীর নৈতিক এবং আইনি ভিত্তির প্রয়োজন হয়, আর সেই ভিত্তিটিই হলো মানবাধিকার। মানুষের অধিকারকে বাদ দিয়ে সুশাসনের চিন্তা করা মূলত একটি প্রাণহীন যান্ত্রিক কাঠামোর কল্পনার সমতুল্য।

এই কাঠামোগত সম্পর্কটিকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড্যারন এসেমোগ্লু (Daron Acemoglu) এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জেমস রবিনসন (James A. Robinson)। তাদের যুগান্তকারী গ্রন্থ হোয়াই নেশনস ফেইল (Why Nations Fail)-এ তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ইতিহাস ঘেঁটে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরেছেন। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন: অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান (Inclusive Institutions) এবং নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান (Extractive Institutions)। তাদের মতে, সুশাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের সব স্তরের মানুষকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সমান সুযোগ দেয়। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোটি মূলত মানবাধিকারের সাম্য এবং বৈষম্যহীনতার নীতির ওপরই পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের গুটিকয়েক ক্ষমতাধর মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখে। এসেমোগ্লু এবং রবিনসন জোরালো যুক্তি দিয়েছেন যে, যে রাষ্ট্রগুলো সাধারণ মানুষের অধিকারকে সম্মান করতে ব্যর্থ হয়, তারা সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের পতন অনিবার্য (Acemoglu & Robinson, 2012)। তাদের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে, সুশাসন কোনো আলংকারিক শব্দ নয়, এটি মূলত রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যকার একটি সুস্থ ও অধিকারভিত্তিক সম্পর্কের ব্যবহারিক রূপ।

মানবাধিকার এবং সুশাসনের এই আন্তঃসম্পর্কটি অনেকটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। একটিকে ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব প্রায় অসম্ভব। ধরা যাক, কোনো দেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখন সেই দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, হাসপাতালগুলোতে যদি সময়মতো ওষুধ না পৌঁছায় এবং চিকিৎসকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি চরম অস্বচ্ছতা থাকে, তবে সংবিধানে লেখা সেই অধিকারের কোনো বাস্তব মূল্য থাকে না। অর্থাৎ, মানবাধিকারকে কেবল আইনের বই থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সুশাসনের নিরন্তর চর্চা অপরিহার্য। একইভাবে, সুশাসন নিশ্চিত করার জন্যও মানবাধিকারের হাতিয়ারগুলো প্রয়োজন হয়। সাধারণ মানুষের যদি স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার না থাকে, সংবাদমাধ্যমের যদি রাষ্ট্রের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা না থাকে, তবে সরকার কখনোই নিজের ত্রুটিগুলো সংশোধন করার তাগিদ অনুভব করবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা (Francis Fukuyama) তার পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিকে (Political Order and Political Decay) বইতে দেখিয়েছেন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে অবশ্যই আইনের শাসনের প্রতি অনুগত থাকতে হবে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আওতায় কাজ করতে হবে (Fukuyama, 2014)। ফুকুইয়ামার এই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবাধিকারের মানদণ্ডগুলো মূলত রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতাকে একটি জনকল্যাণমুখী শৃঙ্খলার ভেতরে আটকে রাখার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: কাঠামোগত সুরক্ষাবলয় এবং নাগরিক অধিকার

যেকোনো প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা। মানুষের হাতে যখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চলে আসে, তখন তার ভেতরে একধরনের ভ্রান্ত অহংকারের জন্ম হয়। সে ভাবতে শুরু করে যে তার কোনো কাজের জন্যই কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে না। এই বিপজ্জনক প্রবণতাকে রুখে দেওয়ার জন্য সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ হলো জবাবদিহিতা (Accountability) এবং স্বচ্ছতা (Transparency)। জবাবদিহিতা মানে কেবল ওপরের স্তরের কর্মকর্তার কাছে ফাইলের হিসাব দেওয়া নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর প্রকৃত অর্থ হলো, রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং কাজের জন্য চূড়ান্তভাবে সাধারণ জনগণের কাছে উত্তরদায়ী থাকা। সরকার যখন কোনো মেগা প্রকল্প হাতে নেয় বা কোনো নতুন কর আরোপ করে, তখন তাকে অবশ্যই সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হয় কেন এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো এবং এর ফলে সমাজের কী লাভ হবে। জবাবদিহিতার এই সংস্কৃতিটি যখন ভেঙে পড়ে, তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি স্বৈরতান্ত্রিক খোলসে ঢুকে যায়। নাগরিকরা তখন আর রাষ্ট্রের অংশীদার থাকে না, তারা পরিণত হয় কেবল আদেশের নীরব পালনকারীতে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই জবাবদিহিতার অভাব মূলত মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার করার শামিল।

জবাবদিহিতাকে একটি কার্যকর রূপ দেওয়ার জন্য আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গুইলারমো ও’ডোনেল (Guillermo O’Donnell) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী তাত্ত্বিক ধারণার অবতারণা করেছেন। তিনি একে অনুভূমিক জবাবদিহিতা (Horizontal Accountability) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ও’ডোনেলের মতে, সাধারণ মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারকে যে জবাবদিহির আওতায় আনে, তা হলো উল্লম্ব বা ভার্টিক্যাল জবাবদিহিতা। এটি অত্যন্ত জরুরি হলেও যথেষ্ট নয়, কারণ নির্বাচন আসে অনেক বছর পর পর। এর মাঝখানের সময়টাতে সরকারকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রের ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই একে অপরের ওপর নজরদারি করতে হয়। একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, একটি শক্তিশালী অডিটর জেনারেলের কার্যালয়, কিংবা মানবাধিকার কমিশন যখন রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের কোনো অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তখন তাকে অনুভূমিক জবাবদিহিতা বলে। ও’ডোনেল দেখিয়েছেন, নতুন এবং ভঙ্গুর গণতন্ত্রগুলোতে এই অনুভূমিক জবাবদিহিতার চরম অভাব থাকে। সরকারপ্রধানরা প্রায়শই এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব করে নিজেদের ইচ্ছেমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান (O’Donnell, 1998)। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতা মানবাধিকারের জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত, কারণ পাহারাদার প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার আর কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকে না।

জবাবদিহিতার এই পুরো প্রক্রিয়াটি আবার পুরোপুরি নির্ভর করে স্বচ্ছতার ওপর। রাষ্ট্রীয় নথিপত্র এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যদি গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকে, তবে কারো পক্ষেই সরকারকে প্রশ্ন করা সম্ভব হয় না। স্বচ্ছতা মানে হলো রাষ্ট্রীয় কাজগুলোকে একটি কাঁচের ঘরের ভেতর নিয়ে আসা, যাতে বাইরের যেকোনো মানুষ দেখতে পায় ভেতরে কী হচ্ছে। যখন রাষ্ট্রীয় কেনাকাটায় স্বচ্ছতা থাকে, তখন সাধারণ করদাতার অর্থের অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। স্বচ্ছতার অভাব মূলত একধরনের তথ্যগত অসাম্য বা ইনফরমেশন অ্যাসিমমেট্রি তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা আগে থেকে তথ্য জেনে নিয়ে নিজেদের আখের গোছায় আর প্রান্তিক মানুষগুলো সব সময় অন্ধকারে থাকে। একটি রাষ্ট্রে যখন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হয়, তখন সাংবাদিক, গবেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের নীতিগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করার সুযোগ পান। তারা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারেন কোথায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অর্থাৎ, স্বচ্ছতা কোনো দাপ্তরিক নিয়ম নয়, এটি সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন এবং তাদের মর্যাদা রক্ষার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বাস্তব হাতিয়ার।

আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

সুশাসনের আলোচনায় একটি বহুল ব্যবহৃত এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছ হলো আইনের শাসন (Rule of Law)। অনেকেই ভুল করে মনে করেন, দেশে প্রচুর আইন থাকা এবং সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার নামই আইনের শাসন। এই ভুল ধারণার সুযোগ নিয়ে পৃথিবীর অনেক স্বৈরশাসকই আইনের নামে চরম নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা কায়েম করে রাখেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে আইনের শাসন বলা হয় না, একে বলা হয় ‘আইন দ্বারা শাসন’ বা রুল বাই ল। আইনের শাসনের প্রকৃত অর্থ হলো, আইনটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনকি যারা আইন তৈরি করেন বা যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারাও এই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না। একটি রাষ্ট্রে যখন সাধারণ নাগরিক এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি একই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সমান আইনি বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন, কেবল তখনই সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমতার নীতিটি মানবাধিকারের একেবারে হৃদপিণ্ড। রাষ্ট্র যদি তার নিজের তৈরি করা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, তবে নাগরিকদের কাছ থেকে আইন মানার প্রত্যাশা করাটা চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

আইনের শাসনের এই দার্শনিক এবং প্রায়োগিক দিক নিয়ে অত্যন্ত বিশদ কাজ করেছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ বিচারক এবং আইনজ্ঞ টম বিংহাম (Tom Bingham)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রুল অফ ল (The Rule of Law)-তে তিনি আটটি সুনির্দিষ্ট নীতির কথা উল্লেখ করেছেন, যা একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। বিংহামের মতে, আইন হতে হবে সবার কাছে বোধগম্য, পরিষ্কার এবং অনুমানযোগ্য। আইন কখনো পেছনের দিক থেকে বা রেট্রোস্পেকটিভভাবে কার্যকর করা যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রের মন্ত্রী বা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সৎ উদ্দেশ্যে। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অধিকার খর্ব করতে পারবেন না। বিংহাম অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার কোনো আলাদা বিষয় নয়। যে আইনি ব্যবস্থায় মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলোকে সম্মান করা হয় না, সেই ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই আইনের শাসন বলা চলে না (Bingham, 2010)। তার এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামো থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই কাঠামোর ভেতরে মানবিকতা এবং ন্যায়বিচারের নির্যাসটুকু থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

আইনের শাসনকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো একটি স্বাধীন এবং শক্তিশালী বিচার বিভাগ। বিচারকরা যদি সরকারের ভয়ে তটস্থ থাকেন বা রাজনৈতিক প্রভাবে রায় পরিবর্তন করতে বাধ্য হন, তবে সুশাসনের পুরো ইমারতটি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। একজন সাধারণ মানুষ যখন রাষ্ট্রের পুলিশ বা প্রশাসনের দ্বারা অন্যায়ের শিকার হন, তখন তার শেষ ভরসার জায়গা হলো আদালত। সেই আদালত যদি স্বাধীন না হয়, তবে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো স্রেফ কাগুজে বাক্যে পরিণত হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি বিচার পাওয়ার অধিকার বা অ্যাক্সেস টু জাস্টিস সুশাসনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইনি প্রক্রিয়া যদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে দরিদ্র মানুষ কখনোই আদালতের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। সমাজে যখন গরিব মানুষ বুঝতে পারে যে ন্যায়বিচার কেবল টাকাওয়ালাদের কেনা সম্পত্তি, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের গভীর ক্ষোভ এবং অবিশ্বাসের জন্ম হয়। সুশাসন নিশ্চিত করার অর্থ হলো এমন একটি আইনি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও বিনা পয়সায় বা নামমাত্র খরচে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার সাহস এবং সুযোগ পায়।

দুর্নীতির বিস্তার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের অবক্ষয়

সুশাসন এবং মানবাধিকারের জন্য সবচেয়ে নিরবচ্ছিন্ন এবং সর্বগ্রাসী হুমকি হলো দুর্নীতি। আমরা সাধারণত দুর্নীতি বলতে টেবিলে বসে ঘুষ নেওয়া বা সরকারি কোষাগার থেকে টাকা চুরি করাকে বুঝে থাকি। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সাধারণ আর্থিক অপরাধ মনে হলেও, এর পেছনের সামাজিক এবং মানবিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। দুর্নীতি মূলত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি চরম বৈষম্যমূলক এবং অদৃশ্য কর হিসেবে কাজ করে। একজন বিত্তবান মানুষ সহজেই ঘুষ দিয়ে তার কাজ আদায় করে নিতে পারেন, কিন্তু একজন দিনমজুরের পক্ষে সেই বাড়তি টাকা জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রের সেবাগুলো থেকে তিনি পুরোপুরি বঞ্চিত হন। দুর্নীতির কারণে যখন একটি সরকারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ করা ওষুধের টাকা আত্মসাৎ করা হয়, তখন মূলত অসংখ্য দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার অধিকার হরণ করা হয়। একটি কালভার্ট বা ব্রিজ নির্মাণে যখন রডের বদলে বাঁশ দেওয়া হয়, তখন কেবল টাকারই অপচয় হয় না, সেই ব্রিজ ভেঙে যখন মানুষের মৃত্যু হয়, তখন মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকেই সরাসরি কেড়ে নেওয়া হয়।

দুর্নীতির এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং এর পেছনের অর্থনীতি নিয়ে অত্যন্ত যুগান্তকারী গবেষণা করেছেন আমেরিকান রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ সুসান রোজ-অ্যাকারম্যান (Susan Rose-Ackerman)। তার করাপশন অ্যান্ড গভর্নমেন্ট (Corruption and Government) গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, দুর্নীতি কেবল কিছু খারাপ মানুষের ব্যক্তিগত লোভের ফসল নয়। এটি মূলত ত্রুটিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি উপসর্গ। রোজ-অ্যাকারম্যানের মতে, যখন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের হাতে প্রচুর স্বেচ্ছাধীন বা ডিসক্রিশনারি ক্ষমতা থাকে এবং তাদের কাজের ওপর কোনো স্বচ্ছ নজরদারি থাকে না, তখন দুর্নীতি একটি নিয়মে পরিণত হয়। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে, উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি বা গ্র্যান্ড করাপশনের কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এবং রাজনৈতিক নেতারা মিলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াগুলোকেই নিজেদের স্বার্থে কিনে নেয়, যাকে ‘স্টেট ক্যাপচার’ বলা হয়। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের বাজেট বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি হয় না, তৈরি হয় গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজের পকেট ভারী করার জন্য (Rose-Ackerman, 1999)। রোজ-অ্যাকারম্যানের এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি মূলত মানবাধিকার রক্ষা এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার একটি প্রধান হাতিয়ার।

দুর্নীতির বিস্তার একটি সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে সৎ পথে চলে জীবনধারণ করা কঠিন, আর দুর্নীতিবাজরা সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান পাচ্ছে, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি ভুল মূল্যবোধ নিয়ে বড় হতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এই আস্থাহীনতার সুযোগ নিয়ে সমাজে নানা ধরনের উগ্রপন্থী এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটে। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে প্রতিটি মানুষের জন্য সম্মানজনক জীবন, উন্নত শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত বাসস্থানের যে অধিকারগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ওপর। দুর্নীতি মূলত এই সম্পদ বণ্টনের পাইপলাইনে একটি বিশাল ছিদ্র তৈরি করে দেয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই ছিদ্রটি বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার একটি নিশ্ছিদ্র এবং কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে বা এর সাথে আপস করে পৃথিবীতে কখনোই মানবাধিকারের কোনো টেকসই মডেল দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা

একটি রাষ্ট্র কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কিছু নির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে না। সুশাসনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণ মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ বা পার্টিসিপেশন। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যদি সাধারণ মানুষের কোনো মতামতের মূল্য না থাকে, তবে সেই নীতি কখনোই জনকল্যাণমুখী হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, একটি এলাকায় যখন কোনো বাঁধ বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন সেই এলাকার পরিবেশ এবং মানুষের জীবিকার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা সবচেয়ে ভালো জানেন স্থানীয় অধিবাসীরা। সরকার যদি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় এবং স্থানীয় মানুষকে উচ্ছেদ করে, তবে তা সুশাসনের চরম পরিপন্থী একটি কাজ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র (Participatory Democracy) বলা হয়। এই ব্যবস্থায় ভোট দেওয়াটাই নাগরিকের একমাত্র দায়িত্ব নয়। স্থানীয় সরকার কাঠামো থেকে শুরু করে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন – সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষের মতামত এবং সমালোচনাকে সাদরে গ্রহণ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হয়। এই অংশগ্রহণ মূলত মানুষের রাজনৈতিক এবং নাগরিক অধিকারের সবচেয়ে বড় প্রায়োগিক রূপ।

আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই অংশগ্রহণের সংকট নিয়ে কাজ করেছেন ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিপ্পা নরিস (Pippa Norris)। তার ডেমোক্রেটিক ডেফিসিট (Democratic Deficit) বইতে তিনি একটি গভীর সমস্যার দিকে আলোকপাত করেছেন। নরিস দেখিয়েছেন, বর্তমান যুগে মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রত্যাশা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের কথা না শুনে কেবল দলীয় বা ব্যবসায়িক স্বার্থে কাজ করছে, তখন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের একধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। এই পার্থক্যটিকেই নরিস গণতান্ত্রিক ঘাটতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, এই ঘাটতি দূর করার একমাত্র উপায় হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি উন্মুক্ত করা এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত করার নতুন নতুন পথ তৈরি করা (Norris, 2011)। মানুষের মধ্যে এই বঞ্চনাবোধ যখন বাড়তে থাকে, তখন সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই গণতান্ত্রিক ঘাটতি পূরণে এবং সরকারের কাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে একটি স্বাধীন সুশীল সমাজ (Civil Society)। মানবাধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সমিতি, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন হলো এই সুশীল সমাজের মূল চালিকাশক্তি। এরা সরকারের প্রতিটি কাজের ওপর একটি তীক্ষ্ণ নজর রাখে এবং কোনো অন্যায় হলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করে। সুশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো এই সুশীল সমাজকে কাজ করার একটি নিরাপদ পরিবেশ বা সিভিক স্পেস প্রদান করা। অনেক দেশেই দেখা যায়, সরকার তাদের সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে এনজিও বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ওপর নানা ধরনের আইনি এবং মানসিক চাপ প্রয়োগ করে। তাদের বিদেশি ফান্ডিং বন্ধ করে দেওয়া হয় বা ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। যখন একটি রাষ্ট্র সুশীল সমাজের কণ্ঠরোধ করে, তখন বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্র মূলত সুশাসনের পথ থেকে পুরোপুরি সরে গেছে। সুশীল সমাজের এই সংগঠনগুলো মূলত সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের শেষ আশ্রয়স্থল, এদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সামনের দিকে এগোতে পারে না।

বিশ্বায়নের যুগে সুশাসনের নতুন চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা

আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে রাষ্ট্রীয় সীমানাগুলো অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত কারণে অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। বিশ্বায়নের এই তুমুল স্রোতে সুশাসনের ধারণাটিও কিছু সম্পূর্ণ নতুন এবং জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। আগে একটি দেশের সরকারই ছিল সেই দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষমতাবান সত্তা। এখন বড় বড় বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের চেয়েও বহুগুণ বেশি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কোনো উন্নয়নশীল দেশে কাজ করতে আসে, তখন তারা প্রায়শই স্থানীয় শ্রম আইন বা পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা করে না। সাধারণ মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে এই বিশাল কর্পোরেশনগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা স্থানীয় সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড হেল্ড (David Held) তার গ্লোবাল কভেন্যান্ট (Global Covenant) বইতে এই বিশ্বায়িত ক্ষমতার সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন। হেল্ড যুক্তি দিয়েছেন যে, বিশ্বায়ন কেবল অর্থনীতির ক্ষেত্রে ঘটলে চলবে না, এর সাথে সাথে একটি বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক কাঠামো বা গ্লোবাল গভর্ন্যান্স তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি মানবাধিকার এবং সুশাসনের মানদণ্ডে জবাবদিহি করা না যায়, তবে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব হবে না (Held, 2004)।

প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ সুশাসনের ক্ষেত্রে একই সাথে আশীর্বাদ এবং অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বা ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় খুব সহজেই সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে জমির পর্চা তোলা বা পাসপোর্টের আবেদনের মতো কাজে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং ছোটখাটো দুর্নীতি অনেকটাই কমেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় নজরদারির এক ভয়াবহ ফাঁদ। সরকার এখন ডিজিটাল নিরাপত্তার অজুহাতে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মানুষের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে। এছাড়া ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide)-এর কারণে সমাজের দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষগুলো, যাদের কাছে ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন নেই, তারা সরকারি সেবাগুলো থেকে আরও বেশি পিছিয়ে পড়ছে। প্রযুক্তিকে যদি মানবাধিকারের মোড়কে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এটি সুশাসনের হাতিয়ার হওয়ার বদলে একটি আধুনিক এবং ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিতে পারে।

ভবিষ্যতের দিনগুলোতে সুশাসনের মানদণ্ডগুলো আরও বেশি বিস্তৃত এবং মানবাধিকারমুখী হতে বাধ্য। সুইডিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বো রথস্টাইন (Bo Rothstein) তার দ্য কোয়ালিটি অফ গভর্নমেন্ট (The Quality of Government) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সরকারের কাজের গুণগত মানের ওপর। রথস্টাইন প্রমাণ করেছেন যে, যেখানে সুশাসন থাকে এবং সরকার নিরপেক্ষভাবে কাজ করে, সেখানে মানুষের মধ্যে সামাজিক বিশ্বাস বা সোশ্যাল ট্রাস্ট অনেক বেশি থাকে। এই পারস্পরিক বিশ্বাসই একটি সমাজকে যেকোনো সংকট থেকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। তার মতে, দুর্নীতিমুক্ত এবং নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র মূলত একটি নৈতিক জনকল্যাণের হাতিয়ার (Rothstein, 2011)। সুশাসন এবং মানবাধিকারের এই অবিরাম যাত্রা আমাদের একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়। রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষ রাষ্ট্রের দাসে পরিণত হওয়ার জন্য নয়। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, এবং জবাবদিহিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকে প্রতিনিয়ত শানিত করার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি। এই লড়াই কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি প্রজন্মকে নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য নতুন করে সোচ্চার হতে হয়।

দুর্নীতি ও মানবাধিকার (Corruption and Human Rights)

দুর্নীতির মনস্তত্ত্ব এবং মানবাধিকারের কাঠামোগত অবক্ষয়

রাতের অন্ধকারে কেউ পকেট থেকে মানিব্যাগ তুলে নিলে আমরা তাকে চুরি বলি। প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার নাম হয় দুর্নীতি। সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে ঘটা এই অপরাধগুলো খুব নীরবে আমাদের জীবন থেকে কেড়ে নেয় বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার। দুর্নীতির এই রূপটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে মিশে যায় যে, একসময় মানুষ একে খুব স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে। একজন নাগরিক যখন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে বিনামূল্যে ওষুধ পান না, তখন তিনি হয়তো ভাবেন দেশের সম্পদের অভাব রয়েছে। বাস্তবে সেই ওষুধের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা হয়তো কোনো এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পকেটে ঢুকে গেছে। এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি একজন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকে খর্ব করে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, দুর্নীতি কোনোভাবেই ক্ষতিপূরণযোগ্য অপরাধ নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বসে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তারা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে নিলামে তুলে দেয়। একটি সভ্য সমাজে এমন প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে পারে না।

অর্থনীতির তাত্ত্বিক আলোচনায় এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি বিশেষ ধারণার অবতারণা করা হয়েছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ গর্ডন টুলক (Gordon Tullock) এই প্রক্রিয়াটিকে রেন্ট-সিকিং (Rent-Seeking) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Tullock, 1967)। তার মতে, সমাজের ভেতরে নতুন কোনো সম্পদ তৈরি না করে, বিদ্যমান সম্পদের একটি বড় অংশ নিজেদের পকেটে পুরে নেওয়ার নামই হলো রেন্ট-সিকিং। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এবং ক্ষমতাবান ব্যবসায়ীরা মিলে এমন একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকে না। তারা রাষ্ট্রের আইন এবং নীতিগুলোকে নিজেদের অনুকূলে পরিবর্তন করে নেন, যাতে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি তাদের লাভের জন্য কাজ করে। টুলকের এই তত্ত্ব আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয়, দুর্নীতির কারণে সমাজে কোনো নতুন মূল্য সংযোজিত হয় না। সমাজের এক অংশের মানুষের সম্পদ জোরপূর্বক অন্য অংশের মানুষের হাতে গিয়ে জমা হয়। এই জোরপূর্বক সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি মানবাধিকারের সাম্য এবং ন্যায়বিচারের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ করে দেয়।

এই কাঠামোগত অবক্ষয়ের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবটি আরও বেশি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। সমাজে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে সৎভাবে জীবনযাপন করা মানুষের জন্য একটি কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ দেখতে পায়, সততার কোনো পুরস্কার নেই, দুর্নীতিবাজরাই সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই দৃশ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ভেঙে দেয়। অফিসে একটি সাধারণ কাজের জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া নাগরিক ধীরে ধীরে নিজের আত্মমর্যাদা হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রীয় সেবার বিনিময়ে ঘুষ প্রদান করাটা একসময় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের দুষ্টচক্র বলা যেতে পারে। চক্রের ভেতরে আটকে পড়া মানুষগুলো রাষ্ট্রের প্রতি তাদের সব ধরনের আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা বুঝতে পারে, রাষ্ট্র তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্য কাজ করছে না, রাষ্ট্র কিছু দুর্নীতিবাজের স্বার্থ রক্ষার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই আস্থাহীনতা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি করে।

দুর্নীতির রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে দুর্নীতির একটি গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতা যখন জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখন তা খুব সহজেই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশেই রাজনীতি এখন জনকল্যাণের মাধ্যম না হয়ে সম্পদ অর্জনের একটি লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের সময় বিপুল পরিমাণ কালো টাকা বিনিয়োগ করে ক্ষমতায় আসার পর, সেই টাকার কয়েকগুণ তুলে নেওয়ার এক বেপরোয়া প্রতিযোগিতা শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় বড় বড় প্রকল্প, মেগা অবকাঠামো এবং কেনাকাটার খাতগুলো এই টাকা তোলার প্রধান উৎসে পরিণত হয়। একটি ব্রিজ বা রাস্তা নির্মাণের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়, দুর্নীতির কারণে তার অর্ধেক টাকাও আসল কাজে ব্যয় হয় না। ফলে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সেই রাস্তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এখানে কেবল রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয় না, সাধারণ মানুষের চলাফেরার নিরাপত্তা এবং জীবনের অধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। ক্ষমতার এই অপব্যবহার সমাজে এমন এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করে, যা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই রাজনৈতিক মদদপুষ্ট দুর্নীতির স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল জনস্টন (Michael Johnston) তার বিখ্যাত গ্রন্থ সিনড্রোমস অফ করাপশন (Syndromes of Corruption)-এ একটি চমৎকার তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির ধরনকে চারটি দুর্নীতির সিনড্রোম (Syndromes of Corruption)-এ ভাগ করেছেন (Johnston, 2005)। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট, যেখানে রাজনৈতিক নেতা, আমলা এবং পুঁজিপতিরা মিলে একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি করে। তারা রাষ্ট্রের সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয় এবং আইনকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে। জনস্টনের এই বিশ্লেষণ আমাদের দেখায়, দুর্নীতি কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়, এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক অর্থনীতি। এই অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের কোনো স্থান নেই। রাষ্ট্রের সম্পদ যখন গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়, তখন সমাজের বৃহত্তর অংশের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা বা বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না।

দুর্নীতির এই রাজনৈতিক অর্থনীতি সমাজে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ধনী আরও ধনী হয়, আর গরিব মানুষ তার ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। এই ব্যবস্থাকে অনেক সময় ক্লাইয়েন্টেলিজম (Clientelism) বা পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি বলা হয়। এখানে রাজনৈতিক নেতারা তাদের অনুগত কর্মী বা সমর্থকদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিলিয়ে দেন, আর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ভোট এবং রাজনৈতিক আনুগত্য আদায় করেন। যারা এই পৃষ্ঠপোষকতার জালের বাইরে থাকে, তারা রাষ্ট্রের সব ধরনের সুবিধা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যায়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও, দুর্নীতির কারণে অধিকারগুলো মূলত রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত হয়। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের একেবারে মূল চেতনার পরিপন্থী। মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে এবং রাষ্ট্রীয় সেবাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে দুর্নীতি মূলত একটি সমাজকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের ওপর সর্বগ্রাসী প্রভাব

মানবাধিকারের আলোচনায় সাধারণত কথা বলার স্বাধীনতা বা ভোটের অধিকারের মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে এই রাজনৈতিক অধিকারগুলোর কোনো মূল্য থাকে না। মানুষের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পর্যাপ্ত বাসস্থানের মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো অপরিহার্য। দুর্নীতি এই মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক আঘাত হানে। সরকারি স্কুলগুলোতে যখন শিক্ষকদের নিয়োগ দুর্নীতির মাধ্যমে হয়, তখন অযোগ্য শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। এর ফলে একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষার অধিকার নষ্ট হয়। স্কুলের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাৎ করার কারণে বাচ্চারা জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস করতে বাধ্য হয়। একইভাবে, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরবরাহ করে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, এগুলো দুর্নীতির কারণে ঘটা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন।

সমাজের ওপর দুর্নীতির এই অদৃশ্য আঘাতকে ব্যাখ্যা করার জন্য নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহান গালতুং (Johan Galtung) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণার অবতারণা করেছেন, যাকে তিনি কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Galtung, 1969)। গালতুংয়ের মতে, সহিংসতা মানেই কাউকে সরাসরি আঘাত করা বা খুন করা নয়। সমাজের ভেতরে এমন কিছু অন্যায্য কাঠামো বা নিয়ম থাকতে পারে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মানকে নিচে নামিয়ে দেয় এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতির কারণে যখন একটি গ্রামের মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত হয় এবং পানিবাহিত রোগে মারা যায়, তখন সেখানে কোনো বন্দুকের ব্যবহার হয় না। তারপরও এটি এক ধরনের ভয়াবহ সহিংসতা, কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্নীতির কারণেই এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে। গালতুংয়ের এই তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, দুর্নীতির কারণে ঘটা নীরব মৃত্যুগুলো কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, এগুলো কাঠামোগত হত্যার শামিল।

দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সমাজের প্রান্তিক এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর। একজন বিত্তবান মানুষ সহজেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন বা নিজের সন্তানকে দামি স্কুলে পড়াতে পারেন। কিন্তু সমাজের হতদরিদ্র মানুষগুলোর জন্য সরকারি সেবাই একমাত্র ভরসা। দুর্নীতির কারণে সেই সরকারি সেবাগুলো যখন তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন তারা আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা প্রতিবন্ধী ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকাগুলো যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আত্মসাৎ করেন, তখন মানুষের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়। অর্থনীতি এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির এই অক্টোপাসের মতো বিস্তার মূলত সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অধিকারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা তাই কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের শর্ত নয়, এটি মানুষের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি সুরক্ষার গভীর সংকট

যেকোনো রাষ্ট্রে নাগরিকের শেষ ভরসার জায়গা হলো তার বিচার ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মানুষ যখন অন্যায়ের শিকার হয়, তখন সে পুলিশের কাছে যায় বা আদালতের দ্বারস্থ হয়। যদি এই রক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে নাগরিকের আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করার জন্য ঘুষ নেওয়াটা একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। যারা ঘুষ দিতে পারে না, তাদের অভিযোগের কোনো তদন্ত হয় না। অনেক সময় দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তারা মিথ্যা মামলায় সাধারণ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন। এই চর্চাগুলো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষার অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেয়। বিচার বিভাগেও যখন দুর্নীতির কালো ছায়া পড়ে, তখন ন্যায়বিচার বিক্রি হতে শুরু করে। টাকার বিনিময়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, আর নির্দোষ মানুষ বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জীবন কাটায়। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত বিচার ব্যবস্থা মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় শত্রু।

দুর্নীতির এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারকে গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রবার্ট ক্লিটগার্ড (Robert Klitgaard)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ কন্ট্রোলিং করাপশন (Controlling Corruption)-এ তিনি দুর্নীতির সমীকরণ (Equation of Corruption) নামের একটি যুগান্তকারী ধারণা প্রদান করেছেন (Klitgaard, 1988)। তার সূত্রটি হলো: দুর্নীতি = একচেটিয়া ক্ষমতা + স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা – জবাবদিহিতা। ক্লিটগার্ড দেখিয়েছেন, যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের হাতে একচেটিয়া ক্ষমতা থাকে, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তাদের কাজের কোনো জবাবদিহিতা থাকে না, তখন সেখানে দুর্নীতি হওয়াটা অবধারিত। বিচার ব্যবস্থা বা পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে এই সমীকরণটি একেবারে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। পুলিশ যখন কাউকে বিনাবিচারে আটকে রাখার অসীম ক্ষমতা পায় এবং এর জন্য তাকে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না, তখন সেখানে ঘুষ এবং নির্যাতনের সংস্কৃতি তৈরি হয়। ক্লিটগার্ডের এই তত্ত্ব প্রমাণ করে, দুর্নীতি কোনো নৈতিক স্খলন মাত্র নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জবাবদিহিতাহীনতার একটি অনিবার্য পরিণতি।

এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সমাজে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে কেউ আর সত্য বলার সাহস পায় না। সাংবাদিক বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দুর্নীতির কোনো খবর প্রকাশ করলে তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় রোষানল নেমে আসে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অন্যান্য নিবর্তনমূলক আইনের অপব্যবহার করে তাদের কণ্ঠরোধ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ চক্রের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা সত্য প্রকাশকারীদের গুম বা খুন করে ফেলে। যারা রাষ্ট্রের ভেতরের অন্যায়গুলো প্রকাশ করেন, সেই হুইসেলব্লোয়ারদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এই চূড়ান্ত অবক্ষয় প্রমাণ করে যে, দুর্নীতিবাজরা তাদের চুরি লুকানোর জন্য যেকোনো মাত্রার মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে প্রস্তুত। একটি রাষ্ট্র যখন দুর্নীতিবাজদের শাস্তি না দিয়ে সত্য প্রকাশকারীদের শাস্তি দিতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এবং বৈশ্বিক দুর্নীতির নেটওয়ার্ক

দুর্নীতি এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে নেই। এটি একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে চুরি করা অর্থ খুব সহজেই উন্নত দেশগুলোর ব্যাংক বা অফশোর অ্যাকাউন্টগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা সুইস ব্যাংক বা পানামার মতো করস্বর্গগুলোতে তাদের কালো টাকা লুকিয়ে রাখছেন। এই পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ এতই বিশাল যে, তা দিয়ে একটি দেশের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হতো। আন্তর্জাতিক এই আর্থিক নেটওয়ার্ক মূলত দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের সম্পদ কেড়ে নিয়ে ধনী দেশগুলোর অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করছে। এই ব্যবস্থাকে অনেক সময় রিভার্স ক্যাপিটাল ফ্লাইট বা উল্টো পুঁজি পাচার বলা হয়। যখন দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, তখন দেশে বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান তৈরি হয় না এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। বৈশ্বিক এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে মানবাধিকার নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

এই বৈশ্বিক কাঠামোর ভয়াবহতা নিয়ে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ পল কলিয়ার (Paul Collier)। তার সাড়া জাগানো বই দ্য বটম বিলিয়ন (The Bottom Billion)-এ তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র এক বিলিয়ন মানুষের দুর্দশার কারণগুলো অনুসন্ধান করেছেন। কলিয়ার তার গবেষণায় শাসনব্যবস্থার ফাঁদ (Governance Trap) নামের একটি তত্ত্ব তুলে ধরেছেন (Collier, 2007)। তার মতে, দরিদ্র দেশগুলোর এই দুরবস্থার জন্য কেবল সম্পদের অভাব দায়ী নয়, বরং সেখানকার দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অযোগ্য শাসনব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় বাধা। এই শাসনব্যবস্থার ফাঁদে একবার আটকে গেলে কোনো দেশ সহজে বের হতে পারে না, কারণ দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠী সব সময় সংস্কারের বিরোধিতা করে। কলিয়ার আরও দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক সময় এই দুর্নীতিবাজ সরকারগুলোর সাথে ব্যবসা করে তাদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তার এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, স্থানীয় দুর্নীতি মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি অত্যন্ত জটিল এবং অন্যায্য কাঠামোর ফসল।

এই আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলার জন্য ২০০৩ সালে জাতিসংঘ একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী সনদ (United Nations Convention against Corruption – UNCAC) প্রণয়ন করে, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক আইনি দলিল। এই সনদে অর্থ পাচার রোধ, চুরি হওয়া সম্পদ ফেরত আনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সনদের একটি বড় দিক হলো, এটি দুর্নীতিকে একটি মানবাধিকার বিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে তথ্য বিনিময় এবং দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে বাধ্য থাকে। আইনি এই দলিলে সই করার মাধ্যমে বিশ্বনেতারা মেনে নিয়েছেন যে, দুর্নীতি কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের একটি বড় সংকট। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে এখনো অনেক আইনি জটিলতা থাকলেও, এই সনদটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন এবং মানবাধিকারের টেকসই ভবিষ্যৎ

দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী রূপ থেকে মুক্তির পথ কী? এর সবচেয়ে কার্যকর এবং শক্তিশালী প্রতিষেধক হলো স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। রাষ্ট্রীয় কাজগুলো যদি গোপন নথির আড়ালে না রেখে সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে দুর্নীতি করার সুযোগ অনেক কমে যায়। এই কারণেই আধুনিক বিশ্বে তথ্য জানার অধিকারকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি বাজেট কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কোন প্রকল্পের জন্য কত টাকা খরচ হচ্ছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারা অংশ নিচ্ছে – এই সব তথ্য যদি একটি ওয়েবসাইটে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, তবে সেখানে দুর্নীতিবাজদের লুকিয়ে থাকার জায়গা থাকে না। এর পাশাপাশি ই-গভর্ন্যান্স বা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সরকারি সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মানুষের ভোগান্তি এবং ঘুষের লেনদেন অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পারে। স্বচ্ছতা মূলত সাধারণ মানুষকে এমন একটি ক্ষমতা প্রদান করে, যার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে।

এই পরিবর্তনের জন্য কেবল আইন করাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ (Douglass North) তার ইনস্টিটিউশন্স, ইনস্টিটিউশনাল চেঞ্জ অ্যান্ড ইকোনমিক পারফরম্যান্স (Institutions, Institutional Change and Economic Performance) গ্রন্থে এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। নর্থ দেখিয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠান বলতে কেবল সরকারি ভবন বোঝায় না, প্রতিষ্ঠান হলো সমাজে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার নিয়মাবলি বা রুলস অফ দ্য গেম। তিনি একে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন (Institutional Change) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (North, 1990)। নর্থের মতে, সমাজে যদি এমন নিয়ম চালু থাকে যা দুর্নীতিকে পুরস্কৃত করে, তবে সেই সমাজে কখনোই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি টেকসই পরিবর্তনের জন্য আইনের পাশাপাশি মানুষের মূল্যবোধ এবং সামাজিক নিয়মগুলোরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নর্থের এই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রাম।

পরিশেষে, দুর্নীতি এবং মানবাধিকারের এই সম্পর্কটি আমাদের সামনে একটি পরিষ্কার আয়না তুলে ধরে। আমরা বুঝতে পারি, একটি সমাজ কতটা মানবিক তা কেবল সংবিধানে লেখা অধিকার দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ কতটা নিরপেক্ষভাবে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই মানবাধিকারের আসল মাপকাঠি। দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে, যাকে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র বলা হয়। বাজেটের অডিট করা বা স্থানীয় প্রকল্পের তদারকিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দুর্নীতির পথ চিরতরে বন্ধ করতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা মানে কেবল কিছু টাকা বাঁচানো নয়, এটি মূলত মানুষের মর্যাদা, সাম্য এবং বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার এক পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কোনো রাষ্ট্রই নিজেকে সভ্য বা গণতান্ত্রিক হিসেবে দাবি করতে পারে না।

নারীদের অধিকার (The Rights of Women)

পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো এবং বঞ্চনার ইতিহাস

পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ নারী, অথচ যুগ যুগ ধরে তারা বৈষম্যের শিকার। নারীদের অধিকার আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ত না, যদি পৃথিবীটা সবার জন্য সমান হতো। কিন্তু তা হয়নি। সমাজবিজ্ঞানের পাতা উল্টালে খুব সহজেই চোখে পড়ে কীভাবে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে অর্ধেক জনসংখ্যাকে সুকৌশলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে পিতৃতন্ত্র (Patriarchy)। এটি এমন এক ধরনের সমাজকাঠামো, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নৈতিক কর্তৃত্ব, সামাজিক সম্মান এবং সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে। এই ব্যবস্থাটি এক দিনে তৈরি হয়নি। শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক প্রথা এবং আইনের মোড়কে পিতৃতন্ত্রকে সমাজের একেবারে অস্থিমজ্জায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ জন্মানোর পর থেকেই দেখতে শেখে যে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পুরুষ নিচ্ছে আর নারী কেবল নীরবে তা মেনে চলছে। এই নিরন্তর পর্যবেক্ষণের ফলে বৈষম্যের বিষয়টি একসময় সমাজের চোখে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি নিয়মে পরিণত হয়। ফরাসি দার্শনিক সিমন দ্য বোভোয়ার তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ দ্য সেকেন্ড সেক্স (The Second Sex)-এ খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, সমাজে নারীকে নারী হিসেবে জন্ম নিতে হয় না, বরং সমাজ তাকে নারী হিসেবে তৈরি করে। সমাজ পুরুষের বিপরীতে নারীকে ‘অন্য’ বা সেকেন্ডারি হিসেবে দাঁড় করায়, যার নিজের কোনো স্বাধীন পরিচিতি নেই।

ঐতিহাসিকভাবে নারীদের এই আইনি এবং সামাজিক অবদমনের চিত্রটি বেশ ভয়াবহ। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের প্রথম দিক পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি আইনি ব্যবস্থাতেই নারীদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। বিয়ের পর একজন নারীর নিজস্ব কোনো আইনি সত্তা থাকত না। তার সম্পত্তি, তার উপার্জন এবং এমনকি তার নিজের শরীরের ওপরও আইনি অধিকার চলে যেত স্বামীর হাতে। সমাজে নারীদের মূল্যায়ন করা হতো মূলত তাদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা এবং গৃহস্থালির কাজের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে। রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে নারীরা সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। ভোটাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা রাজপথে নামে, যা ইতিহাসে ভোটাধিকার আন্দোলন (Suffrage Movement) নামে পরিচিত। অধিকার আদায়ের এই পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। নারীদের রাস্তায় নামা নিয়ে সেকালের তথাকথিত সুশীল সমাজ প্রবল আপত্তি তুলেছিল। তারা যুক্তি দেখিয়েছিল যে রাজনীতিতে অংশ নিলে নারীদের স্বভাবসুলভ কমনীয়তা নষ্ট হয়ে যাবে এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। তারপরও তীব্র আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রগুলো বাধ্য হয় নারীদের ভোটাধিকার মেনে নিতে।

ভোটাধিকার অর্জন করার মাধ্যমে নারীরা প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পায়। ভোটাধিকার একটি বিরাট অর্জন হলেও এটি ছিল অধিকার আদায়ের দীর্ঘ যাত্রার কেবল একটি শুরু। ভোট দেওয়ার ক্ষমতা পেলেও সমাজের গভীরে প্রোথিত বৈষম্যগুলো রাতারাতি দূর হয়নি। কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং সম্পত্তির ওপর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীদের সংগ্রাম চলতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে নারীবাদ (Feminism) একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনটি কেবল আইনের পরিবর্তন চায়নি, তারা সমাজের মূলে থাকা পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে আঘাত করেছিল। নারীবাদীরা প্রশ্ন তুলেছিল কেন সব নিয়ম কেবল নারীদের জন্যই তৈরি হবে। তাদের এই নিরন্তর প্রশ্ন এবং প্রতিবাদের ফলেই মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নারীদের অধিকারের বিষয়টি একটি আলাদা এবং বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। নারীদের এই সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, সমাজে কোনো অধিকারই এমনি এমনি পাওয়া যায় না, প্রতিটি অধিকার আদায় করে নিতে হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নারীর অধিকারের ক্রমবিকাশ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর জন্ম হয়, তখন সবার মনে একটি বড় আশা তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে খুব সুন্দর করে বলা হয়েছিল যে পৃথিবীর সব মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদায় সমান। ঘোষণাপত্রটি পড়ার সময় মনে হতে পারে যে এটি নারী এবং পুরুষ সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে মানবাধিকারের সার্বজনীনতা (Universality of Human Rights) বলা হয়। বাস্তবে এই সার্বজনীনতার ভেতরে একটি বড় ধরনের ফাঁকি লুকিয়ে ছিল। মানবাধিকারের প্রাথমিক দলিলগুলো মূলত পুরুষদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। সেখানে মানুষের যে অধিকারগুলোর কথা বলা হয়েছিল, সেগুলো মূলত জনপরিসরে রাষ্ট্রের নিপীড়ন থেকে একজন নাগরিককে বাঁচানোর জন্য ডিজাইন করা। পুরুষরা যেহেতু জনপরিসরে বেশি সক্রিয় থাকত, তাই এই আইনগুলো পরোক্ষভাবে পুরুষদের স্বার্থকেই বেশি রক্ষা করত। নারীদের জীবনের মূল লড়াইটা ছিল পরিবার এবং সমাজের চার দেয়ালের ভেতরে, যা আন্তর্জাতিক আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ফলে ঘোষণাপত্রে সবার সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও, নারীরা ঠিক আগের মতোই বৈষম্যের শিকার হতে থাকে (Charlesworth, 1994)।

এই আইনি সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য সত্তরের দশকে বিশ্বজুড়ে এক নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে। জাতিসংঘের ভেতরে এবং বাইরে থাকা নারী অধিকার কর্মীরা বুঝতে পারেন যে, কেবল লিঙ্গনিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার করে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নারীদের বঞ্চনার ধরন যেহেতু সম্পূর্ণ আলাদা, তাই তাদের সুরক্ষার জন্য আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকেই মূলত অধিকারের জেন্ডারভিত্তিক বিশ্লেষণ (Gender-based Analysis of Rights) শুরু হয়। এই বিশ্লেষণের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রীয় আইন বা নীতিগুলো নারী এবং পুরুষের ওপর কেমন ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং মেক্সিকো সিটিতে প্রথমবারের মতো বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনটি ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ইতিহাসে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের নারীরা এক ছাদের নিচে জড়ো হয়ে তাদের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তারা বিশ্বনেতাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, নারী অধিকারকে সাধারণ মানবাধিকারের বিশাল ছাতার নিচে ফেলে রাখলে চলবে না, একে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

এই ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চেষ্টার ফলেই মানবাধিকার আইনে নারীদের অধিকারগুলো ধীরে ধীরে একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে নারীদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নেই, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও আইনি বঞ্চনা। ফলে রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করার জন্য নতুন নতুন চুক্তির খসড়া তৈরি হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি খুব সহজ ছিল না। অনেক রাষ্ট্রই ধর্ম বা সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে নারী অধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারপরও বৈশ্বিক নারী আন্দোলনের প্রবল চাপে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে নমনীয় হতে হয়। নব্বইয়ের দশকে এসে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় যে, নারী অধিকার হলো সর্বজনীন মানবাধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঘোষণার মাধ্যমে আইনি বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটে এবং আন্তর্জাতিক আইনে নারীদের অধিকার একটি স্থায়ী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন লাভ করে। এটি ছিল পিতৃতান্ত্রিক আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীদের একটি বড় ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক বিজয়।

সিডও সনদ এবং কাঠামোগত বৈষম্য বিলোপের রূপরেখা

আন্তর্জাতিক আইনে নারী অধিকারের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর দলিলটি হলো ১৯৭৯ সালে গৃহীত সিডও সনদ। এর পুরো নাম নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women – CEDAW)। এই সনদটিকে অনেক সময় নারীদের জন্য আন্তর্জাতিক অধিকারের বিল বলা হয়ে থাকে। এর আগের চুক্তিগুলো মূলত নারীদের কিছু নির্দিষ্ট অধিকার নিয়ে খণ্ডিতভাবে কাজ করেছিল। কিন্তু সিডও সনদ নারী অধিকারকে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসে। এই সনদের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর বিস্তৃতি। এটি কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি নারীদের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনের অধিকারগুলো নিয়েও খুব স্পষ্টভাবে কথা বলেছে। সনদের প্রথম অনুচ্ছেদেই নারীর প্রতি বৈষম্যের একটি বিস্তারিত আইনি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জেন্ডারের ভিত্তিতে এমন কোনো পার্থক্য বা বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে না, যার ফলে সমাজে নারীদের সমান অধিকার খর্ব হয়। এই সংজ্ঞাটি রাষ্ট্রগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বৈষম্য কেবল সরাসরি হয় না, অনেক সময় আইনের মোড়কেও বৈষম্য লুকিয়ে থাকে (Fassbender, 2009)।

সিডও সনদের একটি অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এটি কেবল আকারগত সমতা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এটি মূলত সমাজে প্রকৃত সমতা (Substantive Equality) প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। আইনের বইয়ে নারী ও পুরুষ সমান – এটুকু লেখাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ করার জন্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে দেখতে হবে সেই আইন বাস্তবে প্রয়োগ করার মতো পরিবেশ নারীদের আছে কি না। সিডও সনদের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগুলোকে সাময়িকভাবে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। পিছিয়ে পড়া নারীদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্র চাইলে শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে কোটা বা বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারে। একে অনেক সময় ইতিবাচক পদক্ষেপ বলা হয়। সনদের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদটি আরও যুগান্তকারী। সেখানে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সমাজের গভীরে থাকা কুসংস্কার এবং প্রথাগত চর্চাগুলো দূর করার জন্য। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণত কোনো দেশের সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। কিন্তু সিডও সনদ খুব সাহসের সাথে ঘোষণা করেছে যে, কোনো সংস্কৃতি যদি নারীদের ছোট করে বা তাদের অবদমনকে জায়েজ বা ন্যায্য প্রতিপন্ন করে, তবে সেই সংস্কৃতিকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

তবে এই শক্তিশালী দলিলটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশ এই সনদে স্বাক্ষর করলেও অনেক দেশ এর বিভিন্ন ধারায় সংরক্ষণ বা আপত্তি দিয়ে রেখেছে। তারা যুক্তি দেখায় যে সনদের কিছু কিছু ধারা তাদের দেশের ধর্মীয় আইন বা পারিবারিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় একে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Cultural Relativism) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অনেক সরকার সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে মূলত দেশের ভেতরের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। তারা সম্পত্তিতে নারীদের সমান অধিকার বা বিবাহ বিচ্ছেদের সমান অধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সিডও কমিটি এই ধরনের সংরক্ষণের তীব্র সমালোচনা করে। কমিটি মনে করে, সনদের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী কোনো সংরক্ষণ আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সংস্কৃতির নামে কোনোভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করা চলতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর এই দ্বিমুখী আচরণের বিরুদ্ধে সিডও কমিটি এবং বিশ্বজুড়ে সুশীল সমাজ প্রতিনিয়ত একটি কঠিন আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

জনপরিসর বনাম ব্যক্তিগত পরিসরের বিভাজন এবং আইনি সংকট

মানবাধিকার আইনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় যে তাত্ত্বিক গলদটি ছিল, তা হলো সমাজকে দুটি আলাদা ভাগে বিভক্ত করে দেখা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যুগ যুগ ধরে সমাজকে জনপরিসর (Public Sphere) এবং ব্যক্তিগত পরিসর (Private Sphere) – এই দুটি ভাগে ভাগ করে এসেছেন। জনপরিসর বলতে বোঝায় রাষ্ট্রীয় কাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আদালতের মতো জায়গাগুলোকে, যেখানে সাধারণত পুরুষদের আধিপত্য থাকে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত পরিসর বলতে বোঝায় পরিবার, ঘরোয়া কাজ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাকে, যা মূলত নারীদের বিচরণের ক্ষেত্র। পুরোনো মানবাধিকার আইনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল জনপরিসরে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা। পুলিশ যেন কাউকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার না করে বা রাষ্ট্র যেন কারো বাকস্বাধীনতা কেড়ে না নেয় – সেগুলোই ছিল মানবাধিকারের মূল আলোচ্য বিষয়। কিন্তু ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে একজন নারী যখন তার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হতো, তখন রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক আইন সেখানে নাক গলাত না। তারা মনে করত এটি পরিবারের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার (Radacic, 2008)।

এই কৃত্রিম বিভাজনটি নারীদের জীবনে ভয়াবহ আইনি সংকট তৈরি করেছিল। নারীবাদীরা এই বিভাজনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। তাদের একটি বিখ্যাত স্লোগান ছিল, “ব্যক্তিগত মানেই রাজনৈতিক” (The personal is political)। তারা প্রমাণ করে ছাড়েন যে পরিবারেরভেতরে ঘটা নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি মূলত সমাজে পুরুষের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। পরিবারের ভেতরে ক্ষমতা কাঠামোর যে চর্চা হয়, তার প্রভাব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপরেও পড়ে। ফলে মানবাধিকার আইন কেবল জনপরিসরে আটকে থাকলে নারীরা কখনোই ন্যায়বিচার পাবে না। নারীবাদীদের এই জোরালো যুক্তির মুখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের পুরোনো ধারণা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। তারা বুঝতে পারে, যে ঘরে নারীদের সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকার কথা, সেই ঘরই অনেক সময় তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। ফলে পারিবারিক সহিংসতা (Domestic Violence) মানবাধিকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

ব্যক্তিগত পরিসরের অপরাধগুলোকে মানবাধিকারের আওতায় আনার ফলে আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ধারণায় একটি বিশাল পরিবর্তন আসে। আগে রাষ্ট্র কেবল নিজের করা অন্যায়ের জন্য দায়ী থাকত। কিন্তু নতুন আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরের কেউ যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তার দায়ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনে একে যথাযথ সতর্কতা (Due Diligence) নীতি বলা হয়। এর মানে হলো, রাষ্ট্রকে অবশ্যই পারিবারিক সহিংসতা বা ব্যক্তিগত পরিসরের অপরাধগুলো ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো নারী যদি স্বামী দ্বারা নির্যাতিত হয়, তবে রাষ্ট্র বলতে পারবে না যে এটি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সেই নির্যাতনের সঠিক তদন্ত করতে হবে, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং ভুক্তভোগী নারীকে আইনি ও চিকিৎসায় সহায়তা দিতে হবে। রাষ্ট্র যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে রাষ্ট্র নিজেই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী হিসেবে অপরাধী সাব্যস্ত হবে। এই নীতিটি মূলত নারীদের জন্য ঘরের ভেতরে এবং বাইরে – সব জায়গায় একটি সমান আইনি সুরক্ষার বলয় তৈরি করেছে।

সমসাময়িক বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি এবং সভ্যতার অনেক বিকাশ ঘটলেও নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্রে খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। এটি যেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক অদৃশ্য মহামারী। রাস্তাঘাটে হয়রানি থেকে শুরু করে সাইবার বুলিং বা কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন – সবখানেই নারীরা প্রতিনিয়ত এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিয়ে যায়। এই সহিংসতাগুলো কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিটিগুলো এগুলোকে জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা (Gender-based Violence) হিসেবে চিহ্নিত করে। এর মানে হলো, একজন মানুষের ওপর কেবল নারী হওয়ার কারণেই এই সহিংসতাগুলো চালানো হয়। এটি সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যকার অসম ক্ষমতা সম্পর্কের একটি রূঢ় প্রকাশ। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো নারীকে তার অধীনস্থ রাখতে চায়, আর যখনই নারী সেই শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা করে, তখনই তার ওপর সহিংসতার খড়্গ নেমে আসে। রাষ্ট্র অনেক সময় আইন তৈরি করে তার দায়িত্ব শেষ করতে চায়। কিন্তু সমাজে যদি অপরাধীদের বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি বা ইমপিউনিটি বজায় থাকে, তবে আইনের কাগজগুলো কেবল ফাইলবন্দি হয়েই পড়ে থাকে (Merry, 2006)।

সহিংসতার এই আলোচনায় আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত জরুরি ধারণা হলো আন্তঃবিভাগীয়তা (Intersectionality)। সমাজে সব নারী সমানভাবে সহিংসতার শিকার হয় না। একজন নারীর পরিচয় কেবল নারী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ধর্ম, তার বর্ণ, বা তার অর্থনৈতিক অবস্থাও তার ওপর হওয়া সহিংসতার মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। একজন আদিবাসী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী যে পরিমাণ বঞ্চনা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হন, শহরের একজন বিত্তবান নারী হয়তো তা কল্পনাও করতে পারবেন না। ক্ষমতার কাছাকাছি যারা থাকেন, তারা সহজে বিচার পান। কিন্তু সমাজের একেবারে নিচের স্তরে থাকা নারীদের ওপর যখন সহিংসতা হয়, তখন পুলিশ বা প্রশাসন অনেক সময় অভিযোগই নিতে চায় না। আন্তঃবিভাগীয়তার এই ধারণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, মানবাধিকার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক নারীদের দিকে আলাদা এবং বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সব নারীর সমস্যার সমাধান একটি সাধারণ সূত্র দিয়ে করা সম্ভব নয়।

নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত লড়াইটি চলছে মূলত তাদের নিজস্ব শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে। মানবাধিকারের পরিভাষায় একে প্রজনন অধিকার (Reproductive Rights) বলা হয়। একজন নারী কখন মা হবেন, কয়টি সন্তান নেবেন, বা আদৌ সন্তান নেবেন কি না – এই একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার অধিকার তার নিজের থাকা উচিত। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই রাষ্ট্র, ধর্ম এবং সমাজ মিলে নারীদের শরীরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অনেক দেশে এখনো নারীদের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা এবং গর্ভপাতের অধিকার থেকে আইন করে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় এই আইনগুলো অনেক সময় নারীদের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নারীদের প্রজনন অধিকার মূলত তাদের শারীরিক স্বায়ত্তশাসন এবং মর্যাদার সাথে সরাসরি যুক্ত। কোনো রাষ্ট্র যখন জোর করে একজন নারীর শরীরের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, তখন তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অধিকার আদায়ের লড়াইটি প্রমাণ করে যে, নারীদের স্বাধীনতার সংগ্রাম এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে বাকি।

বিশ্বায়নের যুগে নারী শ্রম এবং অর্থনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম

বর্তমান পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের সাথে অন্য প্রান্তের অর্থনৈতিক যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে বিশ্বায়ন (Globalization) নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ নারী এখন পোশাক শিল্প সহ বিভিন্ন কারখানায় কাজ করছেন। তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছেন এবং পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। কিন্তু এই চকচকে ছবির ঠিক পেছনেই রয়েছে শোষণের এক বিশাল এবং অন্ধকার জগৎ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সস্তায় পণ্য বানানোর জন্য মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর সস্তা নারী শ্রমকে ব্যবহার করছে। নারীরা কাজ পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের কাজের কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই, কাজের পরিবেশ নিরাপদ নয় এবং তাদের মজুরি পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বায়ন মূলত নারীদের দারিদ্র্য দূর করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের নতুন ধরনের শোষণের মুখে ঠেলে দিয়েছে (Jaggar, 2001)।

এই অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে বড় এবং অদৃশ্য রূপটি হলো গৃহস্থালির কাজ। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সমাজেই পরিবারের রান্নাবান্না, সন্তান লালনপালন এবং বয়স্কদের সেবা করার দায়িত্বটি অলিখিতভাবে নারীদের ঘাড়ে চাপানো থাকে। অর্থনীতির ভাষায় একে অবৈতনিক সেবামূলক কাজ (Unpaid Care Work) বলা হয়। একজন নারী কারখানায় বা অফিসে সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন বাসায় ফেরেন, তখন তাকে আবার ঘরের সব কাজ করতে হয়। এই দ্বিগুণ ভার নারীদের জীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় জিডিপি বা অর্থনীতির কোনো হিসেবেই নারীদের এই বিপুল পরিমাণ কাজের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। যদি পৃথিবীর সব নারী এক দিন ঘরের কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তবে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক চাকা মুহূর্তের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়বে। তারপরও এই কাজের কোনো অর্থনৈতিক বা আইনি স্বীকৃতি নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এখন জোরালোভাবে দাবি তুলছে যেন রাষ্ট্র নারীদের এই অবৈতনিক কাজগুলোর সঠিক মূল্যায়ন করে এবং পারিবারিক দায়িত্বগুলোর সমবণ্টন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক নীতিমালা তৈরি করে।

অধিকারের আলোচনায় অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। একজন মানুষের পকেটে যদি টাকা না থাকে, তবে তার পক্ষে অন্য কোনো আইনি অধিকারই পুরোপুরি ভোগ করা সম্ভব হয় না। একারণে মানবাধিকারের আধুনিক তাত্ত্বিকরা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন (Economic Empowerment)-কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। একজন নারী যখন নিজের উপার্জনে বাঁচতে শেখে, তখন সে পরিবারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে বৈষম্য দূর করা এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের সহজ শর্ত দেওয়া রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। নারীদের অধিকারের এই দীর্ঘ আলোচনা আমাদের একটি পরিষ্কার সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পৃথিবীতে সত্যিকারের শান্তি এবং উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের অর্ধেক অংশ তাদের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। নারীদের অধিকার আদায়ের এই নিরন্তর সংগ্রাম কেবল নারীদের নিজস্ব লড়াই নয়, এটি মূলত একটি মানবিক এবং সভ্য সমাজ নির্মাণের সবচেয়ে বড় শর্ত।

শিশুর অধিকার (Rights of the Child)

শিশু অধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

পৃথিবীতে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া একটি মানবশিশুর চেয়ে অসহায় আর কেউ নেই। তার নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, প্রতিবাদ করার শক্তি নেই এবং নিজের খাবার জুটিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও নেই। সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে তাকে জীবনের প্রথম ধাপগুলো পার করতে হয়। এই অসীম দুর্বলতার কারণেই শিশুরা যুগ যুগ ধরে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হয়েছে। প্রাচীন সমাজব্যবস্থায় শিশুদের আলাদা কোনো পরিচিতি বা আইনি সত্তা ছিল না। তাদের দেখা হতো মূলত পরিবারেরবা পিতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে। রোমান আইনে এর একটি সুনির্দিষ্ট নাম ছিল, যাকে বলা হতো প্যাট্রিয়া পটেস্টাস (Patria Potestas) বা পিতার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। এই ক্ষমতা বলে একজন পিতা চাইলে তার সন্তানকে বিক্রি করে দিতে পারতেন, এমনকি তাকে হত্যা করার অধিকারও পিতার ছিল। সমাজের চোখে শিশুরা ছিল স্রেফ অপূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাদের নিজস্ব কোনো মত বা ইচ্ছার দাম নেই। আইন বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো শিশুদের এই বঞ্চনার দিকে ফিরেও তাকাত না, কারণ ধরে নেওয়া হতো পরিবারের ভেতরের বিষয়ে রাষ্ট্রের নাক গলানোর কিছু নেই।

সময়ের সাথে সাথে মানুষের চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে, বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর। কলকারখানাগুলো যখন সস্তায় কাজ করানোর জন্য ছোট ছোট শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে বাধ্য করতে শুরু করল, তখন শিশুদের জীবনের ভয়াবহ চিত্রটি সমাজের সামনে খুব নগ্নভাবে উঠে আসে। কারখানার অন্ধকারে অকালে ঝরে যাওয়া শিশুদের দেখে সমাজ সংস্কারকরা নড়েচড়ে বসেন। তারা বুঝতে পারেন যে শিশুদের শরীর ও মন প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের সুরক্ষার জন্য আলাদা আইনের প্রয়োজন রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এসে এই ভাবনাটি আন্তর্জাতিক রূপ পেতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এমার্জেন্সি পরিস্থিতিতে শিশুদের বাঁচানোর জন্য এগলান্টাইন জেব নামের একজন ব্রিটিশ অধিকারকর্মী ১৯২৪ সালে প্রথম জেনেভা ঘোষণার খসড়া তৈরি করেন। সেই ঘোষণায় প্রথম বারের মতো বলা হয় যে, মানবজাতির কাছে শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভালো জিনিসটি দেওয়ার একটি অবশ্য পালনীয় ঋণ রয়েছে। এটি ছিল শিশুদের নিছক দয়ার পাত্র থেকে অধিকারের অংশীদার হিসেবে দেখার পথে একটি বড় পদক্ষেপ।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুদের এই নতুন মূল্যায়নের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন ইংরেজ তাত্ত্বিক জন লক (John Locke)। তার বিখ্যাত রচনা সাম থটস কনসার্নিং এডুকেশন (Some Thoughts Concerning Education)-এ তিনি শিশুদের মনকে একটি সাদা কাগজের সাথে তুলনা করেছিলেন, দর্শনের ভাষায় যাকে ট্যাবুলা রাসা (Tabula Rasa) বলা হয়। লকের মতে, শিশুরা কোনো জন্মগত পাপ বা অপরাধ নিয়ে জন্মায় না, চারপাশের পরিবেশ ও শিক্ষাই তাদের গড়ে তোলে (Locke, 1693)। এই চমৎকার ধারণাটি সমাজকে একটি নতুন বার্তা দেয়। সমাজ বুঝতে শেখে যে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া কোনো করুণা নয়, এটি সমাজেরই টিকে থাকার মূল শর্ত। শিশুরা যদি শুরু থেকেই একটি অবহেলিত ও নিপীড়িত পরিবেশের মধ্য দিয়ে বড় হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা একটি সুস্থ সমাজের অংশ হতে পারবে না। অধিকারের এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরটিই মূলত পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে শিশুদের জন্য একটি বিশাল এবং স্বতন্ত্র সুরক্ষাবলয় তৈরির পথ প্রশস্ত করে দেয়।

শিশু অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের নতুন দিগন্ত

দীর্ঘদিনের আলোচনা ও বিতর্কের পর ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এমন একটি দলিল গ্রহণ করে, যা মানবাধিকারের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল। এই দলিলটির নাম শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child – CRC)। আন্তর্জাতিক আইনের জগতে এই সনদটি একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো মানবাধিকার চুক্তিতে এত বেশি সংখ্যক রাষ্ট্র এত দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাক্ষর করেনি। এই সনদটি মূলত শিশুদের প্রতি পুরো বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিকে একেবারে শেকড় থেকে বদলে দেয়। আগে শিশুদের দেখা হতো কেবল কল্যাণের বা চ্যারিটির বস্ত হিসেবে। অর্থাৎ, বড়রা দয়া করে তাদের কিছু খেতে দেবে বা পরতে দেবে। কিন্তু এই সনদ খুব দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, শিশুরা কারো দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়; তারা নিজেরাই এক একজন পূর্ণাঙ্গ অধিকারধারী সত্তা (Rights-holders)। ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি মানবসন্তানকে এই সনদের আওতায় শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং তাদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে।

শিশু অধিকার সনদের পুরো আইনি কাঠামোটি মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভ বা মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম নীতিটি হলো বৈষম্যহীনতা, যার মানে হলো জন্মস্থান, ধর্ম, লিঙ্গ বা পিতা-মাতার সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো শিশুর প্রতি বঞ্চনা করা যাবে না। দ্বিতীয়টি হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, যা প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়টি হলো বেঁচে থাকা ও সার্বিক বিকাশের অধিকার এবং চতুর্থটি হলো শিশুর নিজস্ব মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন (Archard, 2015)। এই চারটি নীতি একসাথে মিলে এমন একটি আইনি জাল তৈরি করে, যা শিশুর জীবনের প্রায় প্রতিটি দিককে স্পর্শ করে। রাষ্ট্র যখন এই সনদে স্বাক্ষর করে, তখন সে আইনত বাধ্য থাকে দেশের ভেতরের সব নিয়মকানুনকে এই সনদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সাজাতে। রাষ্ট্র বলতে পারবে না যে শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত আইন বা বাজেট নেই।

এই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং পরিবারের মধ্যকার সম্পর্কেও একটি নতুন আইনি মাত্রা যোগ হয়। স্বাভাবিকভাবেই শিশুর লালনপালনের প্রাথমিক দায়িত্ব থাকে তার পিতা-মাতা বা পরিবারের ওপর। আন্তর্জাতিক আইন পরিবারের এই পবিত্র দায়িত্বকে পূর্ণ সম্মান করে। কিন্তু পরিবার যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হয়, বা খোদ পরিবারই যদি শিশুর জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্র আর চুপ করে বসে থাকতে পারে না। আইনি তত্ত্বে একে বলা হয় প্যারেন্স প্যাট্রিয়া (Parens Patriae) বা রাষ্ট্রের চূড়ান্ত অভিভাবকত্ব। এর মানে হলো, রাষ্ট্র আসলে দেশের প্রতিটি শিশুর চূড়ান্ত এবং আইনি অভিভাবক। পিতা-মাতা যদি সন্তানকে নির্যাতন করে বা তাকে স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে পাঠায়, তবে রাষ্ট্রের পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই পরিবারের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। এই সনদ রাষ্ট্রকে শুধু একজন নীরব পাহারাদার হিসেবে রাখে না, বরং তাকে শিশুর জীবনের একজন সক্রিয় রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা

শিশু অধিকার সনদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে এমন একটি জাদুকরী বাক্যের প্রয়োগ করা হয়েছে, যা পুরো সনদের প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করে। সেখানে বলা হয়েছে, শিশুদের বিষয়ে যেকোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ (Best Interests of the Child) সবার আগে বিবেচনা করতে হবে (Freeman, 2007)। কথাটি শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। আদালত, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইনসভা বা এমনকি বেসরকারি সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান – সবাই এই নীতিটি মেনে চলতে আইনত বাধ্য। কোনো বিচারক যখন পারিবারিক কোনো মামলার রায় দেন, তখন তাকে দেখতে হয় ওই রায়ে শিশুর ভবিষ্যৎ কতটুকু সুরক্ষিত হচ্ছে। একইভাবে সরকার যখন কোনো নতুন নীতি তৈরি করে বা বাজেট ঘোষণা করে, তখন তাদের ভাবতে হয় সেই পদক্ষেপটি শিশুদের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলবে। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি নির্দেশ।

বাস্তব জীবনে এই নীতিটির প্রয়োগ নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের আইনি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পিতা-মাতার বিবাহ বিচ্ছেদের পর শিশু কার কাছে থাকবে – এমন মামলাগুলোতে আদালতকে খুব কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। পিতা বা মাতা উভয়েরই হয়তো সন্তানের ওপর অধিকারের দাবি থাকে, কিন্তু আদালতের কাছে তাদের দাবির চেয়ে শিশুর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। আবার অনেক সময় অভিবাসন বা রাষ্ট্রহীন মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি শিশুকে তার পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলার উপক্রম হয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো তার নিজস্ব অভিবাসন আইনের দোহাই দিয়ে পরিবারটিকে তাড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের নীতিটি সেখানে রাষ্ট্রের কঠোর আইনের সামনে একটি বড় ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক কমিটিগুলো বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় নীতি বা প্রশাসনিক সুবিধার চেয়ে একটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ অনেক বেশি মূল্যবান।

তবে এই সর্বোত্তম স্বার্থ নির্ধারণ করার কাজটি মোটেও সহজ নয়। এটি কোনো গণিতের সূত্র নয় যে সহজেই হিসাব করে বের করা যাবে। একেক শিশুর জন্য সর্বোত্তম স্বার্থ একেক রকম হতে পারে। অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন, এই ধারণাটি খুব বেশি ব্যক্তিনির্ভর বা সাবজেক্টিভ। আদালত বা সমাজকর্মীরা অনেক সময় নিজেদের ব্যক্তিগত বা প্রাপ্তবয়স্কদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে শিশুর ভালো-মন্দ বিচার করতে যান। এই ফাঁকিটি বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন কিছু বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। শিশুর বয়স, তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্তর, তার পরিবেশ এবং সবচেয়ে বড় কথা, ওই বিষয়ে শিশুর নিজের কী মত – সেসব কিছু বিবেচনা করেই তবেই সর্বোত্তম স্বার্থের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এই নীতিটি মূলত সমাজকে বাধ্য করে শিশুদের চোখে পৃথিবীকে দেখতে এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করতে।

শিশুর নিজস্ব মতামত এবং অংশগ্রহণের অধিকার

দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে শিশুরা কিছুই বোঝে না, তাই তাদের কথা শোনারও কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের কাজ হলো বড়দের আদেশ নিঃশব্দে পালন করা। শিশু অধিকার সনদের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ এই প্রাচীন এবং নিপীড়নমূলক ধারণার মূলে সরাসরি কুঠারাঘাত করেছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, একটি শিশু যে বিষয়ে নিজের মত তৈরিতে সক্ষম, সেই বিষয়ে তাকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে এবং তার মতামতকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। একে অধিকারের ভাষায় বলা হয় অংশগ্রহণের অধিকার (Right to Participation)। শিশুরা কেবল রাষ্ট্রের দয়ার পাত্র নয়, বা তারা বাবা-মায়ের কোনো সম্পত্তি নয়। তাদের নিজেদের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে এমন যেকোনো সিদ্ধান্তে তাদের কণ্ঠস্বর শোনার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আদালতে, স্কুলে বা এমনকি ঘরের ভেতরেও শিশুকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে সম্মান করার কথা এই নীতিতে খুব জোরালোভাবে বলা হয়েছে।

শিশুদের এই অংশগ্রহণের বিষয়টি মূলত বয়সের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই চমৎকার ধারণাটিকে বলা হয় ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা (Evolving Capacities)। প্রখ্যাত গবেষক জেরিস ল্যান্সডাউন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একটি শিশু যত বড় হতে থাকে, তার ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা তত বাড়তে থাকে (Lansdown, 2005)। পাঁচ বছরের একটি শিশুর মতামতের চেয়ে পনেরো বছরের একজন কিশোরের মতামত স্বভাবতই অনেক বেশি পরিণতি লাভ করে। আন্তর্জাতিক আইন বলছে, শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার ওপর থেকে পরিবারের বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে এবং তাকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। এটি সুরক্ষার খোলস থেকে বেরিয়ে এসে ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসনের দিকে এগোনোর একটি প্রাকৃতিক এবং আইনি প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হয় যেখানে শিশুরা ভয়হীনভাবে তাদের মনের কথাগুলো প্রকাশ করতে পারে।

তবে এই অধিকারটি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজের পিতৃতান্ত্রিক এবং প্রাপ্তবয়স্ক-কেন্দ্রিক মানসিকতা। এই বিশেষ ধরনের বৈষম্যকে তাত্ত্বিকরা অ্যাডাল্টিজম (Adultism) বলে থাকেন। সমাজ মনে করে বড়রা সবসময় ঠিক সিদ্ধান্ত নেয় আর ছোটরা ভুল করে। এই অহংকারের কারণে স্কুলগুলোতে শিশুদের মতামত নেওয়া হয় না, পারিবারিক আলোচনায় তাদের বাইরে রাখা হয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না। কিন্তু একটি শিশু যখন দেখে যে তার কথার কোনো দাম নেই, তখন তার ভেতরে এক ধরনের হীনমন্যতা এবং ক্ষোভ তৈরি হয়। তাকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়াটা মূলত তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রগুলোকে তাগিদ দেয় এই অ্যাডাল্টিজমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। শিশু পার্লামেন্ট গঠন করা বা স্কুলের কমিটিতে শিশুদের প্রতিনিধি রাখার মতো উদ্যোগগুলো মূলত এই আইনি বাধ্যবাধকতারই বাস্তব প্রতিফলন।

সুরক্ষা, বেঁচে থাকা এবং সার্বিক বিকাশের অধিকার

জীবনের অধিকার বলতে কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকাকে বোঝায় না। একটি গাছকেও যদি আলো-বাতাস থেকে সরিয়ে অন্ধকারে রাখা হয়, তবে সে বেঁচে থেকেও মূলত মৃত হয়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু অধিকার সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে শুধু বেঁচে থাকার কথা বলা হয়নি, সেখানে অত্যন্ত জোর দিয়ে শিশুর সার্বিক বিকাশের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা, পুষ্টি, আর বাসযোগ্য একটি পরিবেশ পাওয়া শিশুদের জন্য কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি তাদের অলঙ্ঘনীয় অধিকার। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার সর্বোচ্চ সম্পদ ব্যবহার করে প্রতিটি শিশুর জন্য সুষম খাবার, পরিষ্কার পানীয় জল এবং মানসম্মত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি একটি শিশুর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য শিক্ষাকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করাটা রাষ্ট্রের একটি ন্যূনতম মূল বাধ্যবাধকতা, যা থেকে পিছিয়ে আসার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

বিকাশের পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে। পৃথিবীতে শিশুরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ভয়াবহ শোষণের শিকার হয়। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে অনেক শিশু কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হয়, আবার অনেককে বাল্যবিবাহের নামে এক ধরনের বৈধ দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এই বঞ্চনাগুলোর পেছনে কেবল দারিদ্র্য দায়ী নয়, এর পেছনে কাজ করে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence)। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যখন বৈষম্যমূলক হয়, তখন দরিদ্র ঘরের শিশুরাই সবার আগে এই সহিংসতার শিকার হয়। শিশু অধিকার সনদ রাষ্ট্রকে খুব পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দেয় শিশুদের সব ধরনের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এবং অর্থনৈতিক শোষণ থেকে রক্ষা করার জন্য। কেবল আইন পাস করাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রকে অবশ্যই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানকে শ্রমে যুক্ত না করে।

সহিংসতার সবচেয়ে চরম এবং ভয়াবহ রূপটি দেখা যায় সশস্ত্র সংঘাত বা যুদ্ধের সময়। যখন বড়রা নিজেদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন তার সবচেয়ে চড়া মূল্য চোকাতে হয় নিরীহ শিশুদের। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং শিশু অধিকার সনদ – উভয় জায়গাতেই যুদ্ধকালীন সময়ে শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। অনেক সময় শিশুদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে বা সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চোখে একটি ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ। যুদ্ধের কারণে একটি শিশুর মনের গভীরে যে ট্রমা বা মানসিক ক্ষত তৈরি হয়, তা সারা জীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হয়। রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো শিশুদের এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে দূরে রাখা। কোনো অবস্থাতেই শিশুদের যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা যাবে না এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রকে সব ধরনের পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ: জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল বিশ্ব

আধুনিক বিশ্বে শিশুদের অধিকারের সামনে সম্পূর্ণ নতুন এবং ভয়াবহ কিছু সংকট এসে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৮৯ সালে সনদ তৈরির সময় হয়তো সেভাবে কল্পনাও করা যায়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আজ থেকে কয়েক দশক পর পৃথিবীটা মানুষের বসবাসের যোগ্য থাকবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শিশুরা মোটেও দায়ী নয়, কিন্তু এর ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে তাদেরকেই। আন্তর্জাতিক আইনের নতুন তাত্ত্বিক আলোচনায় একে আন্তঃপ্রজন্মগত ন্যায়বিচার (Intergenerational Justice) হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য পরিবেশ ধ্বংস করছে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদের জন্য একটি বিপন্ন পৃথিবী রেখে যাচ্ছে। এটি শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। রাষ্ট্রগুলোর ওপর এখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে যেন তারা পরিবেশ রক্ষার নীতিগুলো প্রণয়নের সময় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল বিশ্ব শিশুদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ইন্টারনেট একদিকে যেমন শিশুদের সামনে অসীম তথ্যের ভাণ্ডার খুলে দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে এক অদৃশ্য এবং ভয়ংকর বিপদের মুখেও তাদের ঠেলে দিয়েছে। সাইবার বুলিং, অনলাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই ডিজিটাল পরিবেশে শিশুদের কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অনেক সময় শিশুদের তথ্যের গোপনীয়তাকে সম্মান করে না বা তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয় না। রাষ্ট্রকে এখন বাধ্য হয়ে ডিজিটাল জগতের জন্য নতুন সুরক্ষামূলক আইন তৈরি করতে হচ্ছে। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধা দেওয়াটা কোনো সমাধান নয়, কারণ সেটি তাদের তথ্য জানার অধিকারকে খর্ব করে। আসল সমাধান হলো এই ভার্চুয়াল জগতকে তাদের জন্য একটি নিরাপদ এবং শিক্ষণীয় জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা।

এতসব আইন এবং নজরদারির পরও পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু এখনো তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক অসমতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা শিশুদের জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করে তুলছে। শিশু অধিকার সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো অনেক শিশুর কাছেই পৌঁছায়নি। তবে এই সনদ আমাদের একটি আইনি এবং নৈতিক মাপকাঠি দিয়েছে, যা দিয়ে আমরা অন্যায়ের বিচার করতে পারি। শিশুদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ করা এক দিনে সম্ভব নয়। এটি একটি নিরন্তর এবং সম্মিলিত লড়াই। রাষ্ট্র, পরিবার এবং সমাজ – সবাইকে একসাথে এই লড়াইয়ে অংশ নিতে হয়। কারণ আজকের শিশুরা যদি অধিকারবঞ্চিত হয়ে অন্ধকারে বেড়ে ওঠে, তবে আগামী দিনের মানবসভ্যতা কখনোই আলোর মুখ দেখবে না। শিশুদের অধিকার রক্ষা করা মূলত মানবজাতির নিজের অস্তিত্বকেই রক্ষা করার সমতুল্য।

সংখ্যালঘুদের অধিকার (The Rights of the Minorities)

সংখ্যাগরিষ্ঠতার মনস্তত্ত্ব এবং আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা

যেকোনো সমাজেই একটা অলিখিত নিয়ম খুব নীরবে কাজ করে। যার সংখ্যা বেশি, তার গলার জোরও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। দশজন মানুষ যদি একটা বিষয়ে একমত হয়, তবে সেখানে থাকা বাকি দুজন মানুষের ভিন্নমত খুব সহজেই হারিয়ে যায়। এই যে সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট, এটি মানুষের এক ধরনের সহজাত প্রবৃত্তি। সমাজ বা রাষ্ট্র সাধারণত এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা, ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির আদলেই নিজেদের সব নিয়মকানুন সাজিয়ে নেয়। তারা বুঝতেও পারে না যে তাদের এই বিশাল আয়োজনের নিচে চাপা পড়ে অন্য একটি ছোট গোষ্ঠীর দম বন্ধ হয়ে আসছে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই ছোট এবং ক্ষমতাহীন গোষ্ঠীটিকেই সংখ্যালঘু (Minority) বলা হয়। তবে সংখ্যালঘু মানে কেবল সংখ্যায় কম হওয়া নয়। একটি গোষ্ঠীর সংখ্যা হয়তো অনেক বেশি হতে পারে, কিন্তু তাদের হাতে যদি কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা না থাকে, তবে তারাও মূলত সংখ্যালঘুর মতোই জীবনযাপন করে। মানবাধিকারের মূল দর্শনটি এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ করে। মানবাধিকার বিশ্বাস করে যে, সমাজের মানদণ্ড কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। একটি সমাজ কতটা সভ্য বা মানবিক, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সেই সমাজ তার ভেতরের সবচেয়ে দুর্বল এবং সংখ্যায় কম মানুষগুলোর সাথে কেমন আচরণ করছে।

গণতন্ত্রশুনতে খুব চমৎকার একটি শব্দ। এর মূল কথাই হলো জনগণের শাসন। কিন্তু এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অনেক সময় সংখ্যালঘুদের জন্য বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ অন লিবার্টি (On Liberty)-তে এই বিপদের কথা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি একটি নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র (Tyranny of the Majority) (Mill, 1859)। মিল দেখিয়েছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার চাইলেই ভোটের জোরে এমন সব আইন পাস করতে পারে, যা সংখ্যালঘুদের জীবনকে নরকে পরিণত করে। ধরুন, কোনো দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একটি বিশেষ রঙের পোশাক পরতে পছন্দ করে। তারা যদি সংসদে আইন পাস করে দেয় যে অন্য কোনো রঙের পোশাক পরা বেআইনি, তবে সেই আইনটি গণতান্ত্রিকভাবে পাস হলেও তা মোটেও ন্যায়ভিত্তিক হবে না। মানবাধিকার আইন ঠিক এখানেই একটি শক্ত দেয়াল তুলে দেয়। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার ওপর একটি আইনি লাগাম পরিয়ে দেয়, যাতে তারা ভোটের জোরে সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে না পারে।

সংখ্যালঘু হিসেবে বেঁচে থাকার একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপ রয়েছে। এই মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে তারা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে তাদের এক ধরনের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। একজন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের ভাষা বা ধর্ম পালন করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। তাকে কখনো নিজের পরিচয় নিয়ে ভাবতে হয় না। কিন্তু একজন সংখ্যালঘু মানুষকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তার নিজের ভিন্ন পরিচিতির কথা নতুন করে উপলব্ধি করতে হয়। তার উৎসবের দিনগুলোতে হয়তো রাষ্ট্রে কোনো সরকারি ছুটি থাকে না, তার মাতৃভাষায় হয়তো কোনো সাইনবোর্ড লেখা থাকে না। এই প্রতিনিয়ত ‘অন্য’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ার অনুভূতি মানুষের আত্মবিশ্বাসকে চরমভাবে ভেঙে দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সংখ্যালঘুদের এই মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য কাজ করে। আইন নিশ্চিত করতে চায় যেন সমাজের কোনো মানুষকেই তার নিজস্ব পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে না হয়।

আন্তর্জাতিক আইনে সংখ্যালঘু সুরক্ষার ঐতিহাসিক বিবর্তন

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একেবারে নতুন কিছু নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মানচিত্র যখন নতুন করে আঁকা হচ্ছিল, তখন বহু মানুষ রাতারাতি নিজেদের দেশের ভেতরেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তৎকালীন লিগ অফ নেশনস বেশ কিছু দেশের সাথে আলাদা আলাদা চুক্তি করেছিল, যাকে ‘মাইনরিটি ট্রিটিজ’ বলা হতো। এই চুক্তিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নতুন রাষ্ট্রগুলোতে থাকা সংখ্যালঘুদের ভাষা ও ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ব্যবস্থাটি খুব একটা সফল হয়নি। রাষ্ট্রগুলো এই চুক্তিগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছিল। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং আমরা সবাই জানি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হয়েছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, কেবল রাজনৈতিক চুক্তির ওপর ভরসা করে কোনো দুর্বল গোষ্ঠীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সার্বজনীন আইনি কাঠামোর প্রয়োজন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন জাতিসংঘের জন্ম হলো, তখন বিশ্বনেতারা একটি ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা ভাবলেন, আমরা যদি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার বা মানবাধিকারের সার্বজনীনতা (Universality of Human Rights) নিশ্চিত করতে পারি, তবে সংখ্যালঘুদের জন্য আর আলাদা কোনো আইনের দরকার হবে না। তারা বিশ্বাস করতেন, সমতা এবং বৈষম্যহীনতার নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেই সংখ্যালঘুদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একারণেই ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আলাদা কোনো অনুচ্ছেদ রাখা হয়নি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এই ধারণার অসারতা প্রমাণ হতে শুরু করে। রাষ্ট্রগুলো হয়তো কাগজে-কলমে বৈষম্যহীনতার কথা বলছিল, কিন্তু বাস্তবে সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি বা ভাষা হারিয়ে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে, একজন মানুষকে কেবল ব্যক্তি হিসেবে অধিকার দিলেই তার ভেতরের সংখ্যালঘু সত্তাটি সুরক্ষিত হয় না। কারণ সংখ্যালঘুদের অধিকারগুলো মূলত তাদের দলগত বা গোষ্ঠীগত পরিচয়ের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

এই উপলব্ধি থেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে একটি বড় ধরনের বাঁকবদল ঘটে। ১৯৬৬ সালে যখন নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) চূড়ান্ত হয়, তখন তার ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘুদের অধিকারকে সুস্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়, যেসব রাষ্ট্রে জাতিগত, ধর্মীয় বা ভাষাগত সংখ্যালঘু রয়েছে, সেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুদের নিজেদের সংস্কৃতি উপভোগ করার, নিজেদের ধর্মের চর্চা করার এবং নিজেদের ভাষা ব্যবহার করার অধিকার থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যাবে না। পরবর্তীতে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকো কাপোতোরতি (Francesco Capotorti) সংখ্যালঘুর একটি চমৎকার আইনি সংজ্ঞা প্রদান করেন (Capotorti, 1991)। তার মতে, সংখ্যালঘু হলো এমন একটি গোষ্ঠী যারা রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার চেয়ে সংখ্যায় কম, যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন এবং যাদের এমন কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তারা পরম যত্নে টিকিয়ে রাখতে চায়। এই সংজ্ঞা এবং আইনি ধারাগুলো মিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব রক্ষার একটি শক্ত ভিত তৈরি করে।

পরিচয়, সংস্কৃতি এবং নিজস্বতা টিকিয়ে রাখার লড়াই

মানুষের পরিচয় কেবল তার নাম বা ঠিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি মানুষ কোন ভাষায় স্বপ্ন দেখে, কোন সুরে গান গায়, বা কোন রীতিতে তার মৃত পরিজনের সৎকার করে – এসব কিছুই তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা এবং সংস্কৃতি হলো একটি সম্প্রদায়ের শ্বাস নেওয়ার মাধ্যম। আপনি যদি কোনো গোষ্ঠীর কাছ থেকে তাদের মাতৃভাষা কেড়ে নেন, তবে আপনি কেবল তাদের মুখের কথাই কেড়ে নিলেন না, আপনি তাদের শত শত বছরের স্মৃতি, লোককথা এবং ইতিহাসকেও চিরতরে মুছে দিলেন। সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে বড় লড়াইটা হলো এই নিজস্বতা টিকিয়ে রাখার লড়াই। রাষ্ট্র যখন তার সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতিকে একটি ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ হিসেবে সবার ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতিগুলো ধীরে ধীরে দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে থাকে। মানবাধিকার আইন এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে সরাসরি প্রতিরোধ করে। আইন পরিষ্কারভাবে বলে যে, সংস্কৃতি কোনো একক বা একচেটিয়া বিষয় নয়। একটি রাষ্ট্রের ভেতরে একাধিক সংস্কৃতির সহাবস্থান কেবল সম্ভবই নয়, বরং তা একটি রাষ্ট্রের সৌন্দর্য এবং শক্তির বড় প্রমাণ।

অধিকারের এই পর্যায়ে এসে আইনশাস্ত্রে একটি খুব গভীর তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। সাধারণত মানবাধিকার বলতে আমরা একজন ব্যক্তির অধিকারকে বুঝি। কিন্তু সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতি বা ভাষা রক্ষা করার অধিকারটি কি কেবল একজনের অধিকার? একজন মানুষ তো একা একা তার সংস্কৃতি পালন করতে পারে না, বা একা একা তার মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না। এর জন্য পুরো সম্প্রদায়কে প্রয়োজন হয়। এখান থেকেই যৌথ অধিকার (Collective Rights) নামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণার জন্ম হয়। তাত্ত্বিকরা যুক্তি দেন যে, কিছু কিছু অধিকার কেবল গোষ্ঠীবদ্ধভাবেই ভোগ করা সম্ভব। সংখ্যালঘুদের অধিকারগুলো মূলত এই যৌথ অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একটি একক সত্তা হিসেবে তার নিজস্ব স্কুল প্রতিষ্ঠা করার, নিজস্ব উপাসনালয় পরিচালনা করার এবং নিজেদের রীতিনীতি অনুযায়ী জীবনযাপন করার অধিকার রাখে। এই যৌথ অধিকারগুলো ব্যক্তির অধিকারের পরিপন্থী নয়, বরং এগুলো ব্যক্তিকে তার নিজ সম্প্রদায়ের ভেতরে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

এই নিজস্বতা টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রের কেবল নীরব থাকলেই চলে না। অনেক সরকার মনে করে যে, তারা সংখ্যালঘুদের ভাষা বা সংস্কৃতি পালনে সরাসরি কোনো বাধা দিচ্ছে না, এটাই তাদের বড় কৃতিত্ব। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের এই নিষ্ক্রিয়তাকে সমর্থন করে না। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই কিছু ইতিবাচক বাধ্যবাধকতা (Positive Obligations) পালন করতে হয়। রাষ্ট্রকে তার বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সংখ্যালঘুদের স্কুল তৈরি করে দিতে হয়, তাদের ভাষার পাঠ্যবই ছাপিয়ে দিতে হয় এবং তাদের সংস্কৃতির প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়। একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে এতই দুর্বল থাকে যে, রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া তাদের পক্ষে নিজেদের ভাষা বা ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র যদি কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তবে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতির স্রোতে সংখ্যালঘুরা এমনিতেই ভেসে যাবে। তাই রাষ্ট্রকে একজন সক্রিয় পাহারাদারের মতো এই বৈচিত্র্যগুলোকে সযত্নে রক্ষা করতে হয়।

আত্তীকরণ বনাম বহুসংস্কৃতিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নীতি

রাষ্ট্রগুলোর একটি খুব সাধারণ এবং পুরোনো স্বভাব হলো সবাইকে একই ছাঁচে ফেলা। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তৈরি হওয়ার সময় থেকেই তারা একটি ‘জাতীয় পরিচয়’ নির্মাণের ওপর জোর দিয়ে এসেছে। তাদের ধারণা, দেশের সব মানুষ যদি একই ভাষায় কথা বলে, একই পোশাক পরে এবং একই মূল্যবোধ ধারণ করে, তবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা অনেক সহজ হয়। এই চিন্তাধারা থেকে রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় সংখ্যালঘুদের ওপর এক ধরনের নীরব বলপ্রয়োগ করে। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় আত্তীকরণ (Assimilation) বলা হয়। আত্তীকরণের মূল লক্ষ্য হলো সংখ্যালঘুদের নিজস্ব পরিচয় সম্পূর্ণভাবে মুছে দিয়ে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতির সাথে মিশিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্র নানাভাবে এই কাজটি করে। তারা হয়তো শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে সাজায় যেখানে সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ইতিহাস পড়ানো হয় না, অথবা সরকারি চাকরিতে এমন শর্ত জুড়ে দেয় যা সংখ্যালঘুদের পক্ষে পূরণ করা কঠিন হয়। আত্তীকরণ শুনতে খুব একটা সহিংস মনে না হলেও, এটি মূলত একটি সংস্কৃতির ধীরগতির মৃত্যু বা কালচারাল জেনোসাইড ছাড়া আর কিছু নয়।

আত্তীকরণের এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমাজকে বের করে আনার জন্য বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন তাত্ত্বিক ধারণার বিকাশ ঘটে। এর নাম বহুসংস্কৃতিবাদ (Multiculturalism)। এই ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হলেন কানাডিয়ান দার্শনিক উইল কিমলিকা (Will Kymlicka)। তিনি তার সাড়া জাগানো বই মাল্টিকালচারাল সিটিজেনশিপ (Multicultural Citizenship)-এ দেখিয়েছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার ভেতরে থাকা বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে (Kymlicka, 1995)। বহুসংস্কৃতিবাদের মূল কথা হলো ‘সালাদ বোল’ বা সালাদের বাটি। একটি সালাদের বাটিতে যেমন টমেটো, শসা এবং পেঁয়াজ তাদের নিজস্ব স্বাদ ও রূপ বজায় রেখেও একসাথে একটি চমৎকার খাবার তৈরি করে, সমাজেও ঠিক তেমনি বিভিন্ন সংস্কৃতি তাদের নিজস্বতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। কাউকে জোর করে গলিয়ে একটি অভিন্ন স্যুপ বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কিমলিকা যুক্তি দেন যে, সংখ্যালঘুদের বিশেষ কিছু অধিকার দেওয়াটা সমতা নীতির লঙ্ঘন নয়, বরং এটি সত্যিকারের সমতা প্রতিষ্ঠার জন্যই অপরিহার্য।

কিমলিকা তার তত্ত্বে অধিকারকে খুব চমৎকার দুটি ভাগে ভাগ করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু বাহ্যিক সুরক্ষা (External Protections) প্রয়োজন। এর মানে হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ যেন সংখ্যালঘুদের ওপর তাদের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। অন্যদিকে, তিনি অভ্যন্তরীণ বিধিনিষেধ (Internal Restrictions)-এর ঘোর বিরোধিতা করেছেন। এর অর্থ হলো, একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের নিজেদের সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে তাদের নিজেদের ভেতরের কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সম্প্রদায় যদি বলে যে তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী নারীরা স্কুলে যেতে পারবে না, তবে বহুসংস্কৃতিবাদ কখনোই সেই প্রথাকে সমর্থন করবে না। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করবে ঠিকই, কিন্তু সেই সংস্কৃতি যদি মানবাধিকারের সার্বজনীন মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে আইনের চোখে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগাভাগি

কোনো সমাজের মানুষের অধিকার আসলেই সুরক্ষিত কি না, তা বোঝার একটি খুব সহজ উপায় আছে। দেখতে হবে সেই সমাজের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। একটি দেশে যদি সংখ্যালঘুরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে, নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের কোনো কথা বলার সুযোগ না থাকে, তবে বুঝতে হবে তাদের অধিকারগুলো খুব নড়বড়ে অবস্থায় আছে। প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যার ভোট বেশি, সেই সরকার গঠন করে। এই ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুরা ভোট দিতে পারলেও, তারা কখনোই নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না, কারণ তাদের সংখ্যা সবসময়ই কম থাকে। ফলে সংসদের ভেতরে বা মন্ত্রিসভায় তাদের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ থাকে না। আন্তর্জাতিক আইন মনে করে, এই ধরনের প্রান্তিকীকরণ বা মার্জিনালাইজেশন মানবাধিকারের একটি বড় লঙ্ঘন। সংখ্যালঘুদের কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেই হবে না, তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হতে হবে।

এই রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বেশ কিছু কাঠামোগত সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কার্যকর ধারণাটি হলো ক্ষমতা ভাগাভাগি তত্ত্ব (Consociationalism)। ডাচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরেন্ড লিজফার্ট (Arend Lijphart) তার বিখ্যাত গ্রন্থ প্যাটার্নস অফ ডেমোক্রেসি (Patterns of Democracy)-তে এই তত্ত্বটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Lijphart, 1999)। তার মতে, যেসব সমাজে গভীর জাতিগত বা ধর্মীয় বিভাজন রয়েছে, সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন কাজ করে না। সেখানে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হয় যেখানে সমাজের সব গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা একসাথে মিলে দেশ চালায়। এর জন্য সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশনের মতো নির্বাচন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে সংখ্যালঘুরা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে সংসদে আসন পায়। এর পাশাপাশি, যেসব সিদ্ধান্ত সংখ্যালঘুদের জীবন, ধর্ম বা সংস্কৃতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে, সেসব সিদ্ধান্তে তাদের ভেটো বা বাতিল করার অধিকার থাকতে হবে।

ক্ষমতা ভাগাভাগির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো স্বায়ত্তশাসন বা অটোনমি। যদি কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেশের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে রাষ্ট্র চাইলে সেই অঞ্চলটিকে স্থানীয়ভাবে পরিচালনা করার জন্য বিশেষ ক্ষমতা দিতে পারে। তারা নিজেদের স্কুল, হাসপাতাল এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিজেদের মতো করে পরিচালনা করতে পারে। এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজস্বতা বজায় রাখার একটি আইনি ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক আইন এই ধরনের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে খুব উৎসাহিত করে। যখন সংখ্যালঘুরা দেখে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি রয়েছে এবং তাদের কথাগুলো গুরুত্বের সাথে শোনা হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের গভীর আনুগত্য তৈরি হয়। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত একটি সংখ্যালঘু সমাজ কখনোই বিচ্ছিন্নতার পথে হাঁটে না। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্ষমতার এই যৌক্তিক ভাগাভাগি মূলত দেশের অখণ্ডতা এবং শান্তি বজায় রাখার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

সমসাময়িক সংকট ও রাষ্ট্রহীনতার অভিশাপ

আধুনিক বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক প্রসার ঘটলেও, সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণুতার চিত্রটি মোটেও বদলায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। বর্তমান বিশ্বে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং পপুলিজম বা জনতুষ্টিবাদের যে ব্যাপক উত্থান ঘটেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো। অনেক দেশের রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য খুব পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের একটি কাল্পনিক শত্রু হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বোঝাচ্ছেন যে, দেশের সব অর্থনৈতিক সংকট বা নিরাপত্তার অভাবের পেছনে এই সংখ্যালঘুরাই দায়ী। এই ধরনের বিষাক্ত প্রচারণার ফলে সমাজে চরম মেরুকরণ তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রীয় মদদেই সংখ্যালঘুদের ওপর নানা ধরনের আইনি এবং সামাজিক নিপীড়ন নেমে আসে। এই সমসাময়িক সংকটগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল আইনের বইয়ে কিছু ভালো কথা লিখে রাখলেই সমাজ রাতারাতি মানবিক হয়ে যায় না। এর জন্য ক্রমাগত রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়।

এই নিপীড়নের আলোচনায় একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো আন্তঃবিভাগীয়তা (Intersectionality)। সংখ্যালঘুদের জীবনের বঞ্চনাগুলো কখনোই একটিমাত্র সমতলে ঘটে না। একটি সম্প্রদায়ের মানুষ যখন ভাষাগত বা ধর্মীয় কারণে সংখ্যালঘু হয়, তখন তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক দিক থেকেও পিছিয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের কারণে তারা ভালো চাকরি পায় না, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে না। ফলে সংখ্যালঘু হওয়ার পাশাপাশি তারা দরিদ্র এবং ক্ষমতাহীন শ্রেণীরও অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। এই অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে। একটি দরিদ্র সংখ্যালঘু পরিবারের পক্ষে তাদের মাতৃভাষায় স্কুল চালানো বা তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলোর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। মানবাধিকার আইন যখন সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, তখন এই অর্থনৈতিক বঞ্চনার দিকটিও তাদের সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়। কারণ পেটে ক্ষুধা নিয়ে আর যাই হোক, নিজের সংস্কৃতির গৌরব রক্ষা করা যায় না।

সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের সবচেয়ে চরম এবং ভয়াবহ পরিণতিটি হলো রাষ্ট্রহীনতা (Statelessness)। রাষ্ট্র যখন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে নিজের দেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে, তখন তাদের জীবন আক্ষরিক অর্থেই একটি জীবন্ত নরকে পরিণত হয়। তাদের কোনো পাসপোর্ট থাকে না, তারা ভোট দিতে পারে না, তাদের সন্তানরা স্কুলে যেতে পারে না এবং এমনকি আইনিভাবে তাদের কোনো অস্তিত্বও থাকে না। এই মানুষগুলো নিজেদের জন্মভূমিতেই ভিনদেশী বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্টের সেই বিখ্যাত কথাটি এখানে খুব নিখুঁতভাবে মিলে যায়, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অধিকার। রাষ্ট্রহীন সংখ্যালঘুরা মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে অধিকারবঞ্চিত মানুষ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই রাষ্ট্রহীনতার অভিশাপ দূর করার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। একটি সভ্য সমাজ কখনোই তার কোনো অংশকে রাষ্ট্রহীন করে রাখার মতো নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে না। সংখ্যালঘুদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণই মূলত প্রমাণ করে যে সেই রাষ্ট্রটি তার মানবিক এবং আইনি দায়িত্ব পালনে কতটা আন্তরিক।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার (The Rights Indigenous People)

সভ্যতার সংঘাত এবং আদিবাসী জীবনের দর্শন

আধুনিক নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে বনের গহিনে বা পাহাড়ের চূড়ায় বাস করা মানুষদের জীবন দর্শন পুরোপুরি বোঝা বেশ কঠিন একটি কাজ। শহরের মানুষের কাছে জমি হলো একটি সাধারণ সম্পত্তি, যার কেনাবেচা চলে এবং যার একটি নির্দিষ্ট বাজারদর আছে। উল্টোদিকে, প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থাকা মানুষগুলোর কাছে তাদের চারপাশের বন, নদী এবং পাহাড়ের কোনো আর্থিক মূল্য নেই, কারণ এই সবকিছুই তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মানুষগুলোকেই আমরা আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (Indigenous People) বলে থাকি। এদের বেঁচে থাকার ধরন, সামাজিক রীতিনীতি এবং বিচার ব্যবস্থা আধুনিক রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শত শত বছর ধরে তারা প্রকৃতির সাথে এক ধরনের গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তারা বিশ্বাস করে যে পৃথিবী তাদের সম্পত্তি নয়, বরং তারাই পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্র অংশ। এই সহজ এবং প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনধারার কারণেই তারা আধুনিক সভ্যতার তথাকথিত আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে। শিল্প বিপ্লব এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত তাদের নিজস্ব ভূমি এবং বন হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নেরবিশাল কর্মযজ্ঞে তাদের জীবন দর্শনকে সবসময়ই একটি সেকেলে বা অনুন্নত ধারণা হিসেবে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে।

ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, এই বঞ্চনার শুরুটা হয়েছিল মূলত উপনিবেশবাদের হাত ধরে। ইউরোপীয়রা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন ভূখণ্ড দখল করতে শুরু করল, তখন তারা সেখানকার আদি বাসিন্দাদের মানুষ হিসেবে কোনো মর্যাদাই দেয়নি। তারা একটি আইনি ধারণার জন্ম দিয়েছিল, যাকে বলা হয় টেরা নালিয়াস (Terra Nullius), যার সহজ অর্থ হলো জনমানবহীন বা মালিকানাবিহীন ভূমি। ইউরোপীয়রা ধরে নিয়েছিল যে, যেহেতু এই আদিবাসীদের কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত আইন নেই বা তারা আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে না, তাই এই জমির ওপর তাদের কোনো আইনি অধিকারও থাকতে পারে না। এই ভয়ংকর খোঁড়া যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদিবাসীদের তাদের নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রখ্যাত গবেষক এস. জেমস আনায়া তার ইন্ডিজেনাস পিপলস ইন ইন্টারন্যাশনাল ল (Indigenous Peoples in International Law) বইতে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক আইন তার শুরুর দিনগুলোতে আদিবাসীদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছিল (Anaya, 2004)। আইন মূলত তৈরি হয়েছিল শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষা করার জন্য, আর সেই আইনের ছাঁচে ফেলে আদিবাসীদের জীবনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর ভিনদেশি ভাষা এবং সংস্কৃতি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

দীর্ঘ সময় পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ধীরে ধীরে নিজেদের এই ঐতিহাসিক ভুল বুঝতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবাধিকারের ধারণা যখন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলল, তখনও আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়টি বেশ অবহেলিতই ছিল। রাষ্ট্রগুলো ভাবত যে, সময়ের সাথে সাথে এই মানুষগুলো আধুনিক সমাজের সাথে পুরোপুরি মিশে যাবে এবং তাদের আলাদা কোনো পরিচয়ের দরকার হবে না। কিন্তু আদিবাসীরা তাদের নিজস্বতা ছাড়তে রাজি ছিল না। তারা বুঝতে পেরেছিল যে আধুনিক সমাজের স্রোতে গা ভাসালে তাদের হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি এবং ভাষার মৃত্যু ঘটবে। ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হতে শুরু করে। তারা জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে নিজেদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করে। এই নিরন্তর সংগ্রামের ফলেই আন্তর্জাতিক আইন আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আইন বুঝতে শেখে যে, সমতা মানে সবাইকে এক ছাঁচে ফেলা নয়, বরং প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব জীবনধারাকে সম্মান করাটাই হলো সত্যিকারের সমতার ভিত্তি।

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাঁকবদল

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রথম বড় পদক্ষেপটি নিয়েছিল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও। ১৯৫৭ সালে তারা একটি কনভেনশন তৈরি করেছিল, তবে সেই দলিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের আধুনিক সমাজের সাথে মিশিয়ে দেওয়া বা আত্তীকরণ করা। সময়ের সাথে সাথে এই নীতিটি চরমভাবে সমালোচিত হয়। পরবর্তীকালে, ১৯৮৯ সালে আইএলও একটি সংশোধিত এবং অনেক বেশি যুগান্তকারী দলিল গ্রহণ করে, যা আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (ILO Convention 169) নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই নতুন কনভেনশনটি আগের সব ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করে। এখানে স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং বিশ্বদর্শন আধুনিক সমাজের চেয়ে আলাদা হতে পারে এবং এই আলাদা পরিচয়ে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। এই আইনি দলিলটি রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করে আদিবাসীদের জমি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের নিজস্ব মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি বিশাল বাঁকবদল, যা আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে একেবারে শেকড় থেকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

এর পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা এবং বিতর্কের পর ২০০৭ সালে একটি ঐতিহাসিক দলিল গ্রহণ করে। এই দলিলের নাম জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র (United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples – UNDRIP)। এই ঘোষণাপত্রটি কোনো শূন্য থেকে তৈরি হয়নি, এর প্রতিটি শব্দ আদিবাসী প্রতিনিধিদের নিজেদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে লেখা হয়েছিল। এই দলিলের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (Right to Self-Determination)-এর সুস্পষ্ট স্বীকৃতি। এই অধিকারের অর্থ এই নয় যে আদিবাসীরা রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙে একটি আলাদা দেশ তৈরি করবে। এর মূল কথা হলো, আদিবাসী মানুষগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করার আইনি ক্ষমতা পাবে। রাষ্ট্র তাদের ওপর বাইরে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না। তারা নিজেদের স্থানীয় সরকার পরিচালনা করতে পারবে, নিজেদের বিচার ব্যবস্থা বজায় রাখতে পারবে এবং নিজেদের সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে (Xanthaki, 2007)।

এই আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষমতার ভিত্তিকে বেশ জোরালোভাবে নাড়া দেয়। সাধারণত রাষ্ট্র চায় তার সীমানার ভেতরে থাকা সব নাগরিকের ওপর সমান এবং একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে। কিন্তু আদিবাসীদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রকে কিছুটা ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এই ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াটা রাষ্ট্রের জন্য অনেক সময় অস্বস্তিকর হলেও, একটি বহুসংস্কৃতির সমাজে এর কোনো বিকল্প নেই। ঘোষণাপত্রটি খুব পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, আদিবাসীদের তাদের ভূমি এবং সংস্কৃতির ওপর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে। তারা যদি তাদের নিজস্ব ভাষা এবং রীতির ওপর ভিত্তি করে তাদের সমাজ পরিচালনা করতে চায়, তবে রাষ্ট্রকে সেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি এবং আর্থিক সহযোগিতা দিতে হবে। এই ঘোষণাপত্রটি মূলত আদিবাসীদের হাজার বছরের বঞ্চনার একটি আনুষ্ঠানিক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করে। এটি রাষ্ট্রকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার কেবল তাদের নিজেদের হাতেই ন্যস্ত।

ভূমি, বন এবং পৈতৃক সম্পত্তির আইনি লড়াই

আদিবাসী জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো তাদের ভূমি। একজন আধুনিক নাগরিকের কাছে জমি হারিয়ে গেলে ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া খুব সহজ একটি কাজ। কিন্তু একজন আদিবাসী মানুষের কাছে তার ভূমি কেবল থাকার জায়গা নয়, এটি তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি, তার ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু এবং তার পুরো পরিচয়ের ভিত্তি। ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে একটি আদিবাসী সম্প্রদায় তার নিজস্ব সত্তাটাই হারিয়ে ফেলে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই গভীর সম্পর্কটিকে আইনি পরিভাষায় যৌথ মালিকানা (Collective Ownership) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। আদিবাসীদের সমাজে সাধারণত জমির কোনো ব্যক্তিগত দলিল বা পর্চা থাকে না। পুরো বন বা পাহাড়টি সম্প্রদায়ের সবার যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থা এই যৌথ মালিকানার ধারণাটি খুব সহজে মেনে নিতে চায় না। রাষ্ট্র সব সময় চায় কাগজে-কলমে লিখিত দলিল, যা দিয়ে সে সহজে কর আদায় করতে পারে বা জমি কেনাবেচা করতে পারে। এই কাঠামোগত দ্বন্দ্বের কারণেই আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত নিজেদের পৈতৃক ভূমি থেকে আইনি মারপ্যাঁচে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে।

এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মেকানিজম বা পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। একে বলা হয় অবাধ, পূর্বাবহিত ও সম্মতিমূলক অধিকার (Free, Prior and Informed Consent – FPIC)। এই আইনি নীতির অর্থ হলো, কোনো রাষ্ট্র বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যদি আদিবাসীদের জমিতে কোনো প্রকল্প হাতে নিতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই আগে থেকে আদিবাসীদের পূর্ণ সম্মতি নিতে হবে। এই সম্মতিটি হতে হবে সম্পূর্ণ বাধাহীন, অর্থাৎ ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আদায় করা যাবে না। প্রকল্পের ভালো-মন্দ সব দিক সম্পর্কে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় এবং তাদের বোধগম্য উপায়ে আগে থেকে জানাতে হবে। সিগফ্রাইড উইসনার তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই এফপিআইসি (FPIC) নীতিটি আদিবাসীদের ভূমি সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে (Wiessner, 1999)। রাষ্ট্র যদি আদিবাসীদের অমতে তাদের জমিতে কোনো খনি স্থাপন করে বা বাঁধ নির্মাণ করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে তা সরাসরি মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।

বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্য অনেক সময় এই আইনি বাধ্যবাধকতার ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে বা উন্নয়নের কথা বলে রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় আদিবাসীদের তাদের নিজ ভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা ন্যাশনাল পার্ক তৈরির নামে আদিবাসীদের তাদের আদি নিবাস থেকে তাড়িয়ে দেয়। বন রক্ষার নামে যারা হাজার বছর ধরে সেই বনকে সন্তানের মতো লালন করে এসেছে, তাদেরকেই অপরাধী বানানো হয়। আদিবাসীদের এই ভূমিহীন হওয়ার কষ্টটা কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি ভয়াবহ মানসিক ট্রমা। তারা যখন নিজেদের ভূমি ছেড়ে শহরের বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, তখন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সামাজিক বন্ধন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করে যেন তারা আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকারকে লিখিতভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ভূমির অধিকার নিশ্চিত না করে কোনোভাবেই আদিবাসীদের অন্য কোনো অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়।

সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষা এবং ঐতিহ্যের বিলুপ্তি রোধ

জমি হারানোর পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের পরিচয় হারানোর এক বিশাল এবং নীরব সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একটি সম্প্রদায়ের ভাষা যখন হারিয়ে যায়, তখন সেই সম্প্রদায়ের নিজস্ব ইতিহাস এবং লোকজ্ঞানও চিরতরে হারিয়ে যায়। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি ভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, যার প্রায় সবগুলোই কোনো না কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষা। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাতেই পরিচালিত হয়, ফলে আদিবাসী শিশুদের বাধ্য হয়ে নিজেদের মাতৃভাষা ছেড়ে অন্য ভাষায় পড়াশোনা করতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র খুব সুকৌশলে আদিবাসী শিশুদের মন থেকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা মুছে দেয়। অনেক দেশে অতীতে এমন ভয়াবহ নিয়ম ছিল যে আদিবাসী শিশুদের তাদের পরিবার থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে সরকারি বোর্ডিং স্কুলে রাখা হতো। সেখানে তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল এবং তাদের পোশাক ও রীতিনীতি পাল্টে দেওয়া হতো। এই নির্মম ইতিহাসকে আধুনিক মানবাধিকার তাত্ত্বিকরা সাংস্কৃতিক গণহত্যা (Cultural Genocide) হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে আন্তর্জাতিক আইন আদিবাসীদের জন্য কিছু বিশেষ অধিকারের কথা ঘোষণা করেছে। আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে (UNDRIP) খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের তাদের নিজস্ব ভাষা পুনরুজ্জীবিত করার, ব্যবহার করার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা হস্তান্তর করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই এমন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যেখানে আদিবাসী শিশুরা তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে। ফেদেরিকো লেনজেরিনি তার সম্পাদিত রিপারেশনস ফর ইন্ডিজেনাস পিপলস (Reparations for Indigenous Peoples) বইতে আলোচনা করেছেন কীভাবে অতীত সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য রাষ্ট্রগুলোকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হচ্ছে (Lenzerini, 2008)। সংস্কৃতি কোনো জাদুঘরে সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চর্চা। তাই আদিবাসীদের ধর্মীয় উৎসব, তাদের বিশেষ পোশাক এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি পালনের পথে রাষ্ট্র কোনো ধরনের আইনি বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এই লড়াইয়ে একটি নতুন এবং অত্যন্ত জটিল মাত্রা যোগ হয়েছে আদিবাসীদের প্রথাগত জ্ঞানের মেধা স্বত্বের ক্ষেত্রে। বংশপরম্পরায় আদিবাসীরা প্রকৃতির নানা লতাপাতা থেকে অসুখ সারানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। আধুনিক বিশ্বের বড় বড় ওষুধ কোম্পানি বা ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো অনেক সময় বিনা অনুমতিতে আদিবাসীদের এই জ্ঞান চুরি করে এবং তার ওপর পেটেন্ট বা নিজেদের মালিকানা দাবি করে বিশাল অঙ্কের ব্যবসা করে। আইনি ভাষায় এই ধরনের চৌর্যবৃত্তিকে বায়োপাইরেসি (Biopiracy) বলা হয়। আদিবাসীদের উদ্ভাবিত জ্ঞান ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা মুনাফা করলেও আদিবাসী সম্প্রদায় তার কানাকড়িও পায় না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন চুক্তি এখন আদিবাসীদের এই প্রথাগত জ্ঞান (Traditional Knowledge) এবং জিনগত সম্পদের ওপর তাদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কোম্পানিগুলো যদি আদিবাসীদের কোনো জ্ঞান ব্যবহার করতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই এফপিআইসি (FPIC) নীতি মেনে আদিবাসীদের সাথে লভ্যাংশ ভাগ করে নেওয়ার চুক্তি করতে হবে। এটি আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক সম্পত্তির সুরক্ষায় একটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।

আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন বনাম আদিবাসীদের বাস্তুচ্যুতি

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আদিবাসী অধিকারের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের জায়গাটি হলো উন্নয়ন বা ডেভেলপমেন্ট। বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্ধ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তাদের প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন কয়লা, তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর যে জায়গাগুলোতে এখনো এসব প্রাকৃতিক সম্পদ অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে, তার বেশিরভাগই আদিবাসীদের বসবাসরত অঞ্চল। ফলে যখনই কোনো মেগা প্রকল্প বা বড় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়, তখন তার প্রথম কোপটি গিয়ে পড়ে আদিবাসী গ্রামগুলোর ওপর। আধুনিক এই অর্থনৈতিক দর্শনকে সমাজবিজ্ঞানীরা নয়া-উদারতাবাদ (Neoliberalism) বলে থাকেন, যেখানে পরিবেশ বা মানুষের জীবনের চেয়ে কর্পোরেট মুনাফাকে অনেক বড় করে দেখা হয়। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে হয়তো শহরের মানুষের ঘর আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে, কিন্তু এর বিনিময়ে হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ চিরতরে নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। এই অসম উন্নয়নের যূপকাষ্ঠে আদিবাসীদের জীবনকে প্রতিনিয়ত বলি দেওয়া হচ্ছে।

এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে আদিবাসীরা যখন প্রতিবাদ করে, তখন রাষ্ট্র খুব সহজে তাদের ওপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে দেয়। সিজার রদ্রিগেজ-গারাভিতো তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন কীভাবে এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে একটি সামাজিক মাইনফিল্ড বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে (Rodríguez-Garavito, 2011)। আদিবাসী অধিকার কর্মী বা পরিবেশ রক্ষাকারীরা অনেক সময় গুম বা হত্যার শিকার হন। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে নির্মমভাবে দমন করে। রাষ্ট্রীয় আইনগুলো অনেক সময় এমনভাবে সাজানো থাকে যে কর্পোরেশনগুলো খুব সহজেই বনভূমির ইজারা পেয়ে যায়, কিন্তু আদিবাসীরা তাদের শত বছরের পুরোনো বাসস্থানের কোনো বৈধ কাগজ দেখাতে পারে না। ফলে আইনি লড়াইয়েও তারা প্রতিনিয়ত হেরে যায়। এই পরিস্থিতি আমাদের একটি খুব কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তা হলো আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উন্নয়নের মডেলে মূলত আদিবাসীদের জন্য কোনো সম্মানজনক জায়গা রাখা হয়নি।

উন্নয়ন মানে যে কেবল দালানকোঠা বানানো বা জিডিপি বাড়ানো নয়, এই সহজ কথাটি রাষ্ট্রকে বোঝাতে মানবাধিকার কর্মীদের অনেক ঘাম ঝরাতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট বলে যে, আদিবাসীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি কোনো অপরিহার্য কারণে আদিবাসীদের ভূমি ব্যবহার করতেই হয়, তবে তাদের আগে থেকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেই পুনর্বাসন হতে হবে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের কেবল কিছু টাকার চেক ধরিয়ে দিয়ে শহরের কোনো ঘিঞ্জি এলাকায় ফেলে রাখাটা কোনোভাবেই আইনি ক্ষতিপূরণ হতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন সেটিই, যা সমাজের প্রতিটি মানুষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখে। আদিবাসীদের জীবনকে বিপন্ন করে যে উন্নয়ন আসে, তা মূলত সভ্যতার নামে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ ছাড়া আর কিছু নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাই রাষ্ট্রগুলোকে এই নয়া-উদারতাবাদী উন্নয়নের মডেল থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশ এবং মানববান্ধব উন্নয়নের পথে হাঁটার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে।

আইনি সুরক্ষার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা

এতসব আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন এবং ঘোষণাপত্রের পরও বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রকৃত অবস্থাটি বেশ হতাশা ব্যঞ্জক। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো কাগজে-কলমে অনেক সুন্দর হলেও এগুলো বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব থাকে মূলত দেশগুলোর নিজস্ব সরকারের ওপর। অনেক দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আদিবাসী শব্দটিকে স্বীকৃতি দিতেই ভয় পায়। তারা মনে করে আদিবাসী হিসেবে কাউকে স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে তারা আলাদা ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা দাবি করে বসতে পারে। ফলে সরকারগুলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি এ ধরনের নানা শব্দ ব্যবহার করে তাদের আসল আইনি অধিকারগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। জেফ কর্নটাসেল তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অধিকারের স্বীকৃতি পাওয়া একটি জিনিস, আর নিজ দেশে সেই অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বাস্তবতা (Corntassel, 2008)। আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার এই আন্দোলনটি কোনো নির্দিষ্ট আইনের পাতায় আটকে নেই, এটি একটি চলমান রাজনৈতিক এবং আইনি সংগ্রাম।

ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে ভাবতে গেলে সবার আগে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি চলে আসে। একটি দেশের সংবিধানে যদি আদিবাসীদের ভূমি এবং সংস্কৃতির অধিকার সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে, তবে কেবল আন্তর্জাতিক আইন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। অনেক লাতিন আমেরিকান দেশ তাদের সংবিধানে আদিবাসী অধিকারের বিষয়গুলো যুক্ত করে একটি ভালো উদাহরণ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি আদিবাসীদের নিজেদের ভেতরকার রাজনৈতিক সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা এখন আর কেবল নিজেদের বনের ভেতরে বসে নেই। তারা জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা লড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের এই বৈশ্বিক উপস্থিতি রাষ্ট্রগুলোর ওপর একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক এবং নৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

পরিশেষে একটি কথা খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার এই লড়াইটি কেবল তাদের নিজেদের বেঁচে থাকার লড়াই নয়, এটি মূলত সমগ্র মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার লড়াই। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রথাগত জ্ঞান যে কতটা কার্যকর, তা আজ বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করে নিচ্ছেন। আমরা যদি আমাদের উন্নয়নের অন্ধ মোহে এই আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোকে ধ্বংস করে দিই, তবে আমরা মূলত প্রকৃতির সাথে আমাদের নিজস্ব যোগাযোগের শেষ সেতুবন্ধনটুকুও হারিয়ে ফেলব। আধুনিক সভ্যতার দম্ভ নিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে অনেক কিছু জয় করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে মানুষের টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তাই আইএলও কনভেনশন বা জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র কেবল কিছু আইনি দলিল নয়, এগুলো আমাদের একটি মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব গড়ে তোলার পথপ্রদর্শক। আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষিত করার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি টেকসই এবং বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে পারি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার (The Rights of Persons with Disabilities)

প্রতিবন্ধকতার তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং সামাজিক মডেল

প্রকৃতির দিকে খুব ভালোভাবে তাকালে একটি চমৎকার বিষয় চোখে পড়ে। সেখানে কোনো একঘেয়েমি নেই, আছে কেবল অন্তহীন বৈচিত্র্য। মানবসভ্যতাও ঠিক এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের একটি অংশ। পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষের শারীরিক বা মানসিক গঠন হুবহু একরকম হয় না। কেউ জন্মগতভাবেই চোখে দেখতে পায় না, আবার কেউ হয়তো জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এসে হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘকাল ধরে সমাজ এই ভিন্নতাগুলোকে একটি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এসেছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রাথমিক যুগে ধারণা করা হতো যে, মানুষের শরীরের এই ভিন্নতাগুলো মূলত রোগ বা ত্রুটি, যা সারিয়ে তোলা প্রয়োজন। এই চিন্তাধারাটিকে অধিকারের তাত্ত্বিকরা চিকিৎসা মডেল (Medical Model) বলে আখ্যায়িত করেন। এই মডেলের মূল সমস্যা হলো, এটি ধরে নেয় যে সমস্ত ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা মানুষের নিজের ভেতরেই রয়েছে। সমাজ মনে করত, যেহেতু এই মানুষগুলো স্বাভাবিক নিয়মে চলতে পারছে না, তাই তাদের আলাদা করে কোনো হাসপাতালে বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আটকে রাখা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি যুগ যুগ ধরে ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তারা অধিকারের দাবিদার নয়, বরং সমাজের চোখে কেবলই দয়ার পাত্র হিসেবে পরিগণিত হতো।

বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে এই সেকেলে এবং বৈষম্যমূলক ধারণার মূলে একটি বিশাল তাত্ত্বিক আঘাত আসে। প্রতিবন্ধী অধিকার কর্মীরা নিজেরাই সমাজকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী মাইক অলিভার (Mike Oliver) তার যুগান্তকারী বই দ্য পলিটিক্স অফ ডিজেবলমেন্ট (The Politics of Disablement)-এ সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণার জন্ম দেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে সামাজিক মডেল (Social Model) নামে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত (Oliver, 1990)। অলিভার খুব সহজ একটি যুক্তি দাঁড় করালেন। তিনি বললেন, একজন মানুষের পা কাজ করে না, এটি তার শারীরিক ভিন্নতা। কিন্তু সে যে বাড়ির বাইরে বের হতে পারছে না, তার মূল কারণ পা নয়, বরং সমাজের তৈরি করা সিঁড়ি। সমাজ যদি সিঁড়ির বদলে সব জায়গায় র‍্যাম্প বা ঢালু পথের ব্যবস্থা রাখত, তবে ওই মানুষটি আর কারো ওপর নির্ভরশীল থাকত না। অর্থাৎ, সমাজ যখন এমনভাবে তার রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে একজন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না, তখন আসলে ওই মানুষটি প্রতিবন্ধী নয়, বরং পুরো সমাজটাই একটি প্রতিবন্ধী পরিবেশ (Disabling Environment)

এই তাত্ত্বিক রূপান্তরটি মানবাধিকারের জগতে রীতিমতো একটি ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছিল। এটি প্রমাণ করে দিল যে প্রতিবন্ধকতা কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, এটি মূলত সমাজের কাঠামোগত ব্যর্থতা। আপনি যদি একজন দৃষ্টিহীন মানুষকে ব্রেইল পদ্ধতির বই না দিয়ে সাধারণ ছাপানো বই পড়তে দেন এবং সে পড়তে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতা ওই মানুষটির নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার। সামাজিক মডেল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, সমাজ তার নিজের সুবিধামতো একটি তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মানুষের মানদণ্ড তৈরি করে নিয়েছে। যারা সেই মানদণ্ডের বাইরে পড়ে যায়, সমাজ তাদের প্রতি পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ফলে প্রতিবন্ধী মানুষেরা আর নিজেদের গুটিয়ে রাখলেন না। তারা বুঝতে পারলেন যে তাদের সুস্থ হওয়ার জন্য কোনো জাদুর প্রয়োজন নেই, বরং সমাজকে তার বৈষম্যমূলক কাঠামো থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে। অধিকার আদায়ের এই বোধটি তাদের ভেতরে এক অভূতপূর্ব আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়, যা আন্তর্জাতিক আইন সংশোধনের দীর্ঘ পথকে প্রশস্ত করে।

মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ এবং আইনি কাঠামোর বিবর্তন

মানবাধিকারের প্রাথমিক ইতিহাস ঘাটলে একটি অত্যন্ত দুঃখজনক সত্য বেরিয়ে আসে। পৃথিবীর বড় বড় সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে সবার কথা বলা হলেও, প্রতিবন্ধী মানুষদের কথা খুব সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে বর্ণ, ধর্ম বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হলেও সেখানে প্রতিবন্ধকতার কোনো উল্লেখ ছিল না। এর পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো মনে করত, প্রতিবন্ধী মানুষদের বিষয়টি কোনো আইনি বা রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটি পুরোপুরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক আইনের এই পুরোনো চিন্তাধারাকে কল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি (Welfare Approach) বলা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে রাষ্ট্রগুলো প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য কিছু ভাতা বা অনুদান দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করত। রাষ্ট্র কখনোই তাদের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে ভাবতে পারেনি, যাদের ভোট দেওয়ার, চাকরি করার বা স্বাধীনভাবে পরিবার গঠন করার অধিকার রয়েছে।

এই অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদটি শুরু হয় খোদ প্রতিবন্ধী মানুষদের নিজেদের ভেতর থেকেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সত্তরের দশকে শুরু হওয়া স্বতন্ত্র জীবনযাপন আন্দোলন (Independent Living Movement) পুরো বিশ্বে একটি নতুন চেতনার ঢেউ তুলে দেয়। এই আন্দোলনের কর্মীরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী স্লোগান তৈরি করেছিলেন – “আমাদের বাদ দিয়ে আমাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নয়” (Nothing about us without us)। তারা দাবি করেন যে তাদের জীবনের ভালোমন্দ কেবল চিকিৎসকরা বা আমলারা বসে বসে ঠিক করে দিতে পারে না। তাদের জীবন পরিচালনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজেদের হাতেই থাকতে হবে। এই প্রবল নাগরিক আন্দোলনের মুখে জাতিসংঘ ধীরে ধীরে নড়েচড়ে বসে। নব্বইয়ের দশকে কিছু ঘোষণাপত্র এবং স্ট্যান্ডার্ড রুলস তৈরি করা হলেও সেগুলোর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। রাষ্ট্রগুলো ওই নিয়মগুলো মানতে বাধ্য ছিল না, ফলে মাঠপর্যায়ে সাধারণ প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসছিল না।

একুশ শতকের শুরুতে এসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে, প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য একটি শক্ত এবং বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তির কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘ কয়েক বছরের নিরলস আলোচনা এবং বিতর্কের পর ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি ঐতিহাসিক দলিল গ্রহণ করে। এই দলিলের নাম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ (Convention on the Rights of Persons with Disabilities – CRPD)। এটি একুশ শতকের প্রথম এবং সবচেয়ে দ্রুত কার্যকর হওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি। আইনি বিশেষজ্ঞ রোজমেরি কায়েস (Rosemary Kayess) এবং ফিলিপ ফ্রেঞ্চ (Phillip French) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সিআরপিডি মূলত কোনো নতুন অধিকার সৃষ্টি করেনি, বরং এটি প্রচলিত মানবাধিকারগুলোকে প্রতিবন্ধী মানুষদের বাস্তব জীবনের আলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে (Kayess & French, 2008)। এই সনদটি বিশ্বকে খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয় যে, মানববৈচিত্র্যকে সম্মান করা কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা। এর মাধ্যমে কল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয় এবং অধিকারভিত্তিক একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।

সিআরপিডি সনদের মূলনীতি এবং প্রবেশগম্যতার ধারণা

সিআরপিডি সনদের পুরো কাঠামোটি এমন কিছু জোরালো মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসে। সনদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে এই নীতিগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তির অন্তর্নিহিত মর্যাদা এবং নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। রাষ্ট্র কোনোভাবেই তার নিজের সিদ্ধান্ত একজন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না। বৈষম্যহীনতা এবং সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ হলো এই সনদের আরেকটি বড় স্তম্ভ। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো প্রতিবন্ধী মানুষ কেবল তার শারীরিক বা মানসিক অবস্থার কারণে সমাজের কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। এই নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক আইনে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী আইনি ধারণার প্রয়োগ করা হয়েছে, যাকে বলা হয় যৌক্তিক আবাসন (Reasonable Accommodation)

যৌক্তিক আবাসন ধারণাটি সমতার পুরোনো সংজ্ঞাকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়। এর অর্থ হলো, সমাজে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র বা কর্মক্ষেত্রকে অনেক সময় কিছু বিশেষ ছাড় বা পরিবর্তন করতে হয়। ধরুন, একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ একটি অফিসে চাকরি পেলেন, কিন্তু তার ডেস্কটি এমনভাবে বানানো যে সেখানে হুইলচেয়ার ঢোকে না। এখন অফিস কর্তৃপক্ষ যদি সেই ডেস্কটি একটু উঁচু করে না দেয়, তবে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের চোখে সরাসরি বৈষম্য হিসেবে গণ্য হবে। ব্রিটিশ আইনজ্ঞ অ্যানা লসন (Anna Lawson) তার গবেষণায় ব্যাখ্যা করেছেন, যৌক্তিক আবাসন কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং এটি হলো একটি অন্যায্য বাধাকে অপসারণ করার আইনি প্রক্রিয়া (Lawson, 2008)। রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ছোটখাটো পরিবর্তনগুলো করতে হবে, যতক্ষণ না সেটি তাদের জন্য একটি অসঙ্গত মাত্রায় বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো নিয়োগকর্তা বলতে পারবেন না যে একজন মানুষকে তার বিশেষ চাহিদার কারণে চাকরি দেওয়া যাচ্ছে না।

এর পাশাপাশি সনদের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রবেশগম্যতা (Accessibility) নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমাদের সমাজে প্রবেশগম্যতা বলতে সাধারণত কেবল বড় বড় ভবনের সামনে একটি র‍্যাম্প বা ঢালু পথ বানানোকেই বোঝানো হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এই ধারণাটি অনেক বেশি বিস্তৃত। প্রবেশগম্যতা কেবল ভৌত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি তথ্য, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তির জগতেও সমভাবে প্রযোজ্য। একজন বধির মানুষের জন্য সরকারি টিভিতে খবর প্রচারের সময় ইশারা ভাষার ব্যবস্থা রাখা, অথবা একজন দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য সরকারি ওয়েবসাইটগুলো স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারের উপযোগী করে তৈরি করা – এগুলো সবই প্রবেশগম্যতার অংশ। একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা কেবল তাদের বড় বড় ফ্লাইওভার দেখে বোঝা যায় না। সমাজ কতটা উন্নত তা বোঝা যায়, সেই সমাজের রাস্তা দিয়ে একজন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ একা একা, কারো সাহায্য ছাড়া কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারে, তা দেখে। প্রবেশগম্যতা মূলত মানুষের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

অন্তর্ভুক্তি, সমতা এবং সক্ষমতার দর্শন

অধিকারের তাত্ত্বিক আলোচনায় সমতার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। আমরা যদি সবাইকে সমানভাবে একই জিনিস দিই, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তার বিখ্যাত সক্ষমতা তত্ত্ব (Capability Approach)-এর মাধ্যমে এই আইনি এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের একটি চমৎকার সমাধান দিয়েছেন (Sen, 2009)। সেনের মতে, রাষ্ট্রের কেবল সম্পদ বণ্টন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং দেখতে হয় সেই সম্পদ ব্যবহার করে একজন মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত জীবন যাপন করতে পারছে কি না। একজন সুস্থ মানুষ এবং একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে সমান পরিমাণ টাকা দিলেও তাদের জীবনের মান সমান হবে না, কারণ ওই প্রতিবন্ধী মানুষটির চিকিৎসায় বা চলাফেরায় বাড়তি খরচ রয়েছে। সক্ষমতা তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, সমতা মানে হলো মানুষের কিছু করার এবং কিছু হওয়ার বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রকে এমনভাবে তার সামাজিক নীতিমালা সাজাতে হয়, যেন একজন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষও তার প্রতিভা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

এই সক্ষমতা তৈরির সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো শিক্ষাব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আলাদা বা বিশেষায়িত স্কুল তৈরির রেওয়াজ ছিল। সমাজ মনে করত, এই শিশুদের আলাদা রাখাই তাদের জন্য ভালো। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী এবং মানবাধিকার কর্মীরা প্রমাণ করেছেন যে, এই পৃথকীকরণ বা সেগ্রিগেশন মূলত সমাজে একটি স্থায়ী বিভেদের দেয়াল তৈরি করে। যারা ছোটবেলা থেকেই মূল সমাজ থেকে আলাদা হয়ে বড় হয়, তারা পরবর্তী জীবনে কখনোই সমাজের মূল স্রোতে মিশতে পারে না। সিআরপিডি সনদের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এই আলাদা শিক্ষাব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা (Inclusive Education)-এর ধারণাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মূল কথা হলো, সমাজের সব শিশু – সে প্রতিবন্ধী হোক বা না হোক – একই স্কুলে, একই ক্লাসরুমে বসে পড়াশোনা করবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন সেটি প্রতিটি শিশুর নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে পারে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। একটি ক্লাসরুমে যখন একজন স্বাভাবিক শিশু তার একজন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন সহপাঠীর সাথে বড় হয়, তখন সে খুব ছোটবেলা থেকেই মানববৈচিত্র্যকে সম্মান করতে শেখে। সে বুঝতে শেখে যে তার সহপাঠীটি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সে কোনোভাবেই তার চেয়ে কম নয়। এই শিশুরা বড় হয়ে যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাজ করে, তখন তারা স্বভাবতই অনেক বেশি মানবিক এবং সহনশীল হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের শুরুটা এভাবেই স্কুল থেকে হতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই কেবল আইন পাস করে বসে থাকলে চলে না, সাধারণ স্কুলগুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয় এবং শিক্ষার উপকরণগুলোকে সবার জন্য উপযোগী করে তৈরি করতে হয়। শিক্ষা কোনো প্রতিযোগিতার দৌড় নয়, এটি মূলত মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলার একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়া।

আইনি সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বায়ত্তশাসন

প্রতিবন্ধী অধিকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং যুগান্তকারী পরিবর্তনের জায়গাটি হলো আইনি সক্ষমতার প্রশ্ন। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বিশেষ করে যাদের মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, রাষ্ট্র খুব সহজেই তাদের আইনি অধিকার কেড়ে নেয়। প্রচলিত আইন মনে করে, এই মানুষগুলো নিজেদের ভালোমন্দ বুঝতে অক্ষম। তাই আদালত অনেক সময় তাদের জন্য একজন অভিভাবক নিয়োগ করে দেয়, যিনি ওই মানুষটির জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আইনি পরিভাষায় এই ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Substituted Decision-Making) বলা হয়। এর ফলে ওই প্রতিবন্ধী মানুষটি নিজের নামে কোনো সম্পত্তি কিনতে পারে না, ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারে না, এমনকি নিজের পছন্দমতো বিয়েও করতে পারে না। তাকে আক্ষরিক অর্থেই একটি আইনি মৃত্যু বা সিভিল ডেথ-এর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। যুগ যুগ ধরে এই অভিভাবকত্ব প্রথাটিকে সুরক্ষার একটি উপায় হিসেবে দেখানো হলেও, এটি মূলত মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সবচেয়ে বড় লঙ্ঘন।

সিআরপিডি সনদের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ এই সেকেলে এবং নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, প্রতিটি প্রতিবন্ধী মানুষের আইনের চোখে সমান স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী টিনা মিনকোভিৎস (Tina Minkowitz) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একজন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কম হতে পারে, কিন্তু তার আইনি সক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের নেই (Minkowitz, 2006)। সিআরপিডি একটি নতুন এবং মানবিক আইনি ব্যবস্থার প্রস্তাব করে, যাকে সমর্থিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Supported Decision-Making) বলা হয়। এই নতুন মডেলে রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নেয় না, বরং তাকে তার নিজের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বা সাপোর্ট প্রদান করে। অর্থাৎ, সিদ্ধান্তটি ওই মানুষটিই নেবে, অভিভাবক কেবল তাকে বিভিন্ন বিকল্প বুঝতে এবং তার ইচ্ছাকে অন্যদের কাছে প্রকাশ করতে সাহায্য করবে।

এই তাত্ত্বিক রূপান্তরটি আধুনিক আইনশাস্ত্রে একটি বিশাল আলোড়ন তৈরি করেছে। অনেক দেশের প্রচলিত আইন ব্যবস্থাই এই নতুন ধারণাকে সহজে মেনে নিতে পারছে না, কারণ তারা যুগ যুগ ধরে অভিভাবকত্ব প্রথায় অভ্যস্ত। কিন্তু মানবাধিকারের দর্শন এখানে খুব পরিষ্কার। মানুষ মাত্রই কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। আমরা সবাই জীবনে নানা ভুল করি এবং সেই ভুল থেকে শিখি। কিন্তু একজন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষকে কখনোই কোনো ঝুঁকি নিতে দেওয়া হয় না বা তাকে তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে দেওয়া হয় না। সমর্থিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মূলত মানুষের সেই অন্তর্নিহিত মর্যাদাকে ফিরিয়ে দেয়। রাষ্ট্রকে তার অভ্যন্তরীণ আইনগুলো সংস্কার করে এই সহায়তামূলক ব্যবস্থাগুলো তৈরি করতে হয়। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজে কেউ পুরোপুরি স্বাধীন নয়, আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা মানুষের দুর্বলতা নয়, এটি মূলত মানবিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ এবং প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব

আইন এবং চুক্তির এতসব বিশাল আয়োজনের পরও বাস্তব পৃথিবীটা প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য এখনো অনেক বেশি কঠিন এবং রূঢ়। বিশ্বজুড়ে চরম দারিদ্র্যের সাথে প্রতিবন্ধকতার একটি গভীর এবং ধ্বংসাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। এটি একটি দুষ্টচক্রের মতো কাজ করে। দারিদ্র্যের কারণে পুষ্টিহীনতা বা চিকিৎসার অভাবে মানুষের শরীরে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, আবার প্রতিবন্ধকতার কারণে মানুষ চাকরি বা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসাটা অত্যন্ত কঠিন। এর পাশাপাশি রয়েছে আন্তঃবিভাগীয়তা (Intersectionality)-এর ভয়াবহ প্রভাব। একজন মানুষ যখন নারী হয় এবং একই সাথে তার শারীরিক কোনো ভিন্নতা থাকে, তখন সমাজের বৈষম্যের রূপটি বহুগুণ ভয়ংকর হয়ে ওঠে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখনো প্রতিবন্ধী নারীদের জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চিকিৎসা দেওয়ার মতো অমানবিক প্রথা চালু রয়েছে। রাষ্ট্র অনেক সময় সুরক্ষার নামে এই নারীদের তাদের নিজস্ব শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ থেকে আইনিভাবে বঞ্চিত করে।

আধুনিক যুগে এই বৈষম্যের একটি নতুন রূপান্তর ঘটেছে প্রযুক্তির হাত ধরে। প্রযুক্তি একই সাথে একটি আশীর্বাদ এবং একটি নতুন ধরনের বাধা হিসেবে কাজ করছে। একদিকে স্ক্রিন রিডার, ভয়েস কমান্ড বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো সহায়ক প্রযুক্তি (Assistive Technology) প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবনে অভাবনীয় স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। তারা এখন এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে পড়াশোনা করতে পারছে, দূর থেকে চাকরি করতে পারছে এবং বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে। কিন্তু অন্যদিকে, প্রযুক্তির নকশা করার সময় যদি সার্বজনীন প্রবেশগম্যতার কথা মাথায় না রাখা হয়, তবে তা এক নতুন ধরনের বঞ্চনার জন্ম দেয়। একে আধুনিক পরিভাষায় ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide) বলা হয়। অনেক সরকারি সেবা বা জরুরি তথ্য যখন কেবল মোবাইল অ্যাপ বা জটিল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তখন একটি বিশাল অংশের ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ সেই সেবা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি তখন তাদের যুক্ত করার বদলে সমাজ থেকে আরও বেশি দূরে ঠেলে দেয়।

অধিকার আদায়ের এই সংগ্রাম তাই কোনো স্থির বা শেষ হয়ে যাওয়া বিষয় নয়। সিআরপিডি সনদের মাধ্যমে আমরা কেবল একটি মানবিক বিশ্বের আইনি রূপরেখা পেয়েছি, কিন্তু সেই রূপরেখায় রং ভরার কাজ এখনো অনেক বাকি। রাষ্ট্রকে তার কাঠামোগত বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হবে। সমাজকে বুঝতে হবে যে, ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের মূল স্রোতে যুক্ত করাটা তাদের প্রতি কোনো করুণা বা চ্যারিটি নয়, এটি সমাজের নিজস্ব অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির জন্যই অপরিহার্য। একটি সমাজ যখন তার চারপাশের পরিবেশকে সবার জন্য প্রবেশগম্য করে তোলে, তখন সেই সুবিধা কেবল প্রতিবন্ধী মানুষেরাই পায় না, বরং বৃদ্ধ, শিশু এবং সমাজের প্রতিটি মানুষ সেই নিরাপদ পরিবেশের সুফল ভোগ করে। প্রতিবন্ধকতার আলোচনা আমাদের মূলত মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের দুর্বলতা এবং একই সাথে আমাদের অসীম শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বৈচিত্র্যকে উৎসবের মতো উদযাপন করতে পারলেই সমাজ সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে ওঠে।

সকল অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা (The Protection of Rights of all Migrant Workers)

দেশান্তরের মনস্তত্ত্ব এবং শ্রমশোষণের বৈশ্বিক রূপরেখা

পেটের ক্ষুধা খুব প্রবল একটা জিনিস। এর কাছে মানুষের শেকড়ের চেনা টান বা জন্মভূমির দীর্ঘদিনের মায়া খুব সহজেই হার মানে। একজন মানুষ শখ করে নিজের পরিবার বা পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের অচেনা কোনো দেশে পাড়ি জমায় না। এর পেছনে থাকে বাঁচার তীব্র তাগিদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটু ভালো জীবনের স্বপ্ন। সমাজবিজ্ঞানী এভারেট লি (Everett Lee) তার বিখ্যাত পুশ-পুল তত্ত্ব (Push-Pull Theory)-এর মাধ্যমে এই দেশান্তরের চমৎকার একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তার মতে, মানুষ মূলত দুটি কারণে নিজ ভূমি ছাড়ে। প্রথমটি হলো বিকর্ষণ বা পুশ ফ্যাক্টর, যেমন দেশের ভেতরের চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, যা মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। আর দ্বিতীয়টি হলো আকর্ষণ বা পুল ফ্যাক্টর, যেমন উন্নত দেশের উচ্চ মজুরি, কাজের সুযোগ এবং নিরাপদ জীবনের হাতছানি। এই দুই শক্তির মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়। তারা ভাবে, ভিনদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও অন্তত পরিবারটা দুবেলা পেট ভরে খেতে পারবে। এই স্বপ্নটাই তাদের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে (Lee, 1966)। দেশ ছাড়ার এই সিদ্ধান্তটি নিতে একজন মানুষকে রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাতে হয়। কারণ সে জানে, একবার নিজের সীমানা পেরিয়ে গেলে সে আর দেশের একজন সাধারণ নাগরিক থাকে না, সে পরিণত হয় একজন পরিচয়হীন অভিবাসী শ্রমিকে।

ভিনদেশের মাটিতে পা রাখার পর এই শ্রমিকদের জীবনের আসল সংগ্রাম শুরু হয়। তারা যে দেশে যায়, সে দেশের বিশাল সব ইমারত, ঝকঝকে রাস্তা বা আধুনিক সেতুগুলো তাদেরই ঘামে তৈরি হয়। কিন্তু সেই চকচকে শহরের কোনো সুবিধা তারা ভোগ করতে পারে না। তাদের জীবন কাটে শহরের এক প্রান্তে থাকা অস্বাস্থ্যকর, আলো-বাতাসহীন ছোট ছোট ঘরে, যেখানে গাদাগাদি করে অনেককে একসঙ্গে থাকতে হয়। বিশ্বায়নের এই যুগে রাষ্ট্রগুলো মানুষের চেয়ে সস্তা শ্রমকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সমাজবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্যাসেলস (Stephen Castles) এবং মার্ক মিলার (Mark Miller) তাদের দি এজ অব মাইগ্রেশন (The Age of Migration) বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে উন্নত দেশগুলো অভিবাসীদের কেবল একটি অর্থনৈতিক যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি এই সস্তা শ্রম ছাড়া এক দিনও চলতে পারবে না। তারপরও তারা এই শ্রমিকদের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক অধিকার দিতে রাজি নয়। এই শ্রমিকরা সমাজের সব কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অসম্মানজনক কাজগুলো করে দেয়, যা ওই দেশের স্থানীয় নাগরিকরা করতে চায় না। অর্থনীতিতে একে থ্রি-ডি জব (3D Jobs) – ডার্টি, ডেঞ্জারাস এবং ডিমান্ডিং বলা হয়। এত কষ্ট করার পরও সমাজ তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয় না। অনেক সময় উটকো ঝামেলা বা বহিরাগত হিসেবে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা হয়।

শ্রমিকদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির দালাল এবং নিয়োগকর্তা শোষণের জাল বিছিয়ে রাখে। অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগই ভাষাগত সমস্যা এবং স্থানীয় আইনের অজ্ঞতার কারণে এই শোষণের শিকার হন। তাদের যে বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, বাস্তবে তার অর্ধেকও দেওয়া হয় না। কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না, ছুটি বলে কিছু থাকে না এবং কর্মক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসার খরচও মালিক বহন করে না। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন অনেক সময় এই শোষণ দেখেও না দেখার ভান করে। কারণ মালিকপক্ষ শক্তিশালী এবং তারা দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ মূলত শ্রমের পণ্যকরণ (Commodification of Labor)-এর একটি বাস্তব রূপ। এখানে মানুষের কোনো দাম নেই, দাম কেবল তার গায়ের জোরের। একটি কারখানার মেশিনের যেমন কোনো অধিকার থাকে না, অভিবাসী শ্রমিকদেরও ঠিক সেভাবেই বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ঠিক এই অমানবিক জায়গাটিতেই সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চায়। আইন মনে করিয়ে দেয় যে, একজন মানুষ তার নিজের দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে গেলেই তার মানুষ হিসেবে জন্মগত অধিকারগুলো বাতিল হয়ে যায় না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো এবং অভিবাসীদের আইনি স্বীকৃতি

নাগরিকত্বের ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি বড় খুঁটি। রাষ্ট্র সাধারণত তার নিজের নাগরিকদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা এবং আইনি সুরক্ষা দিয়ে থাকে। কিন্তু একজন মানুষ যখন অন্য দেশের পাসপোর্ট নিয়ে কাজ করতে আসে, তখন রাষ্ট্র তাকে নাগরিকের সমমর্যাদা দিতে অস্বীকার করে। এই বৈষম্য দূর করার জন্যই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি যুগান্তকারী চুক্তি গ্রহণ করে, যার নাম সকল অভিবাসী কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সুরক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (International Convention on the Protection of the Rights of All Migrant Workers and Members of Their Families – ICRMW)। এই সনদটি অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি অভিবাসী শ্রমিকদের কেবল অর্থনীতির চাকায় ঘোরানো শ্রমিক হিসেবে দেখে না, তাদেরকে একটি পরিবার এবং সামাজিক সত্তা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এই সনদে খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা চলবে না। স্থানীয় শ্রমিকরা কাজের ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিবেশ, পারিশ্রমিক এবং নিরাপত্তা পেয়ে থাকে, একজন বিদেশি শ্রমিককেও ঠিক একই সুবিধা দিতে হবে। মালিক চাইলেই বিদেশি শ্রমিকের পাসপোর্ট আটকে রাখতে পারবে না বা তাকে জোর করে কাজে বাধ্য করতে পারবে না। সনদে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা হলো শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। ভিনদেশে একা একজন শ্রমিকের পক্ষে মালিকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রায় অসম্ভব। তারা যদি সংঘবদ্ধ হতে পারে, তবে তাদের দাবি আদায় করা সহজ হয়। এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য সনদের অধীনে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে (Pécoud & de Guchteneire, 2007)। রাষ্ট্রগুলোকে নির্দিষ্ট সময় পরপর এই কমিটির কাছে তাদের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। কমিটি তখন যাচাই করে দেখে রাষ্ট্র আসলেই অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছে কি না, নাকি কেবল কাগজে-কলমে আইন বানিয়ে রেখেছে।

তবে আন্তর্জাতিক আইনের এই চমৎকার কাঠামোটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে। এই চুক্তিতে মূলত স্বাক্ষর করেছে সেইসব দেশ, যারা সাধারণত কর্মী পাঠায়। কিন্তু যেসব উন্নত দেশ এই কর্মীদের নিয়োগ দেয়, তাদের বেশিরভাগই এই চুক্তিতে সই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা মনে করে, এই চুক্তিতে সই করলে তাদের দেশের ভেতরে অভিবাসীদের অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যা তাদের অর্থনীতির জন্য লাভজনক নয়। তারা অভিবাসীদের সস্তা শ্রম ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু তাদের আইনি অধিকারের দায়িত্ব নিতে চায় না। এই দ্বিমুখী আচরণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labour Organization – ILO) প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। আইএলও বেশ কিছু আলাদা কনভেনশন তৈরি করেছে, যা অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়। রাষ্ট্রগুলো চুক্তি সই করুক বা না করুক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে যেন কোনো দেশই মানবাধিকারের এই মৌলিক মানদণ্ডগুলো এড়িয়ে যেতে না পারে।

অনথিভুক্ত অভিবাসীদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং জটিল অংশটি হলো অনথিভুক্ত বা যাদের সাধারণত ‘অবৈধ’ বলা হয়, তাদের অধিকারের বিষয়টি। রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম খুব সহজেই এই মানুষদের গায়ে একটি অপরাধীর তকমা লাগিয়ে দেয়। মানবাধিকার তাত্ত্বিকরা এই ‘অবৈধ’ শব্দটির তীব্র বিরোধিতা করেন। সমাজবিজ্ঞানী নিকোলাস ডি জেনোভা (Nicholas De Genova) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একজন মানুষ কখনোই অবৈধ হতে পারে না, বড়জোর তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নাও থাকতে পারে (De Genova, 2002)। তিনি এই অবস্থাকে অভিবাসীর বেআইনিকরণ (Migrant Illegality) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রাষ্ট্র নিজের তৈরি করা ইমিগ্রেশন আইন দিয়ে কিছু মানুষকে বৈধ এবং কিছু মানুষকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে। অনেক সময় একজন শ্রমিক সম্পূর্ণ বৈধ পথে, সব কাগজপত্র নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর নিয়োগকর্তা হয়তো তার ভিসার মেয়াদ আর বাড়ায় না বা তাকে প্রতারণা করে পথে বসিয়ে দেয়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে সেই বৈধ শ্রমিকটি রাতারাতি অনথিভুক্ত অভিবাসীতে পরিণত হয়। এখানে শ্রমিকের কোনো দোষ না থাকলেও রাষ্ট্রীয় আইনের খড়্গ মূলত তারই ঘাড়ে এসে পড়ে।

অনথিভুক্ত হওয়ার কারণে এই শ্রমিকরা সমাজের সবচেয়ে বেশি শোষণযোগ্য শ্রেণিতে পরিণত হন। নিয়োগকর্তারা খুব ভালো করেই জানেন যে এই শ্রমিকরা পুলিশের কাছে যেতে পারবে না, কারণ পুলিশে গেলে তাদের উল্টো দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এই ভয়ের সুযোগ নিয়ে মালিকরা তাদের দিয়ে বিনা পয়সায় বা নামমাত্র মজুরিতে দিনের পর দিন অমানুষিক পরিশ্রম করিয়ে নেয়। তারা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে পারে না, কেউ তাদের মারধর করলে বিচার চাইতে পারে না। তারা আক্ষরিক অর্থেই সমাজের একটি অদৃশ্য এবং অধিকারহীন ছায়ায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এখানে একটি খুব শক্ত অবস্থান নিয়েছে। আইন পরিষ্কারভাবে বলে যে, একজন মানুষের কাছে ভিসা বা পাসপোর্ট থাকুক বা না থাকুক, তার বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো কোনোভাবেই কেড়ে নেওয়া যাবে না। জাতিসংঘের অভিবাসী সনদে খুব স্পষ্ট করে বলা আছে যে, শিক্ষা, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে নথিভুক্ত এবং অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা চলবে না।

রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই এই অনথিভুক্ত অভিবাসীদের আটক করে বিশেষ ধরনের বন্দিশিবির বা ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখে। এসব ডিটেনশন সেন্টারের পরিবেশ অনেক সময় জেলের চেয়েও ভয়াবহ হয়। বছরের পর বছর বিনা বিচারে তাদের সেখানে আটকে রাখা হয়, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। দার্শনিক জর্জো আগামবেন (Giorgio Agamben) এই ধরনের পরিস্থিতিকে বেয়ার লাইফ (Bare Life) বা নিছক প্রাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মানুষের রাজনৈতিক বা আইনি অধিকার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং সে কেবল একটি জৈবিক সত্তা হিসেবে বেঁচে থাকে। আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রগুলোকে বারবার সতর্ক করে যে, অভিবাসন আইন ভাঙা কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। তাই এর জন্য কাউকে অপরাধীদের মতো শাস্তি দেওয়া বা বছরের পর বছর আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। রাষ্ট্র চাইলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটিও হতে হবে সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে এবং মানুষের পূর্ণ মর্যাদা বজায় রেখে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কোনো সাধারণ মানুষের ওপর এমন অমানবিক আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

নারী অভিবাসী শ্রমিক এবং আন্তঃবিভাগীয় বঞ্চনার স্বরূপ

অভিবাসনের এই কঠিন পথ চলায় নারী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা পুরুষদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি কষ্টকর। বিশ্বায়নের ফলে এখন লাখ লাখ নারী তাদের পরিবারকে দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচাতে মধ্যপ্রাচ্য বা উন্নত দেশগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছেন। এই নারীরা যে ধরনের বঞ্চনা এবং শোষণের শিকার হন, তা অনেক সময় সমাজের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। সমাজবিজ্ঞানী রেচেল পারেনাস (Rhacel Parreñas) তার গবেষণায় এই নারী গৃহকর্মীদের জীবন সংগ্রাম তুলে ধরেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন যত্নের আন্তর্জাতিকীকরণ (Internationalization of Care) (Parreñas, 2001)। উন্নত দেশের নারীরা যখন চাকরি বা ক্যারিয়ারের জন্য ঘরের বাইরে যাচ্ছেন, তখন তাদের ঘরের কাজ এবং সন্তান পালনের দায়িত্ব এসে পড়ছে এই দরিদ্র দেশের নারী অভিবাসীদের ঘাড়ে। এই নারীরা নিজেদের সন্তানদের দেশে অন্যের কাছে রেখে ভিনদেশের শিশুদের পরম মমতায় লালনপালন করেন। এই আত্মত্যাগের কোনো সঠিক মূল্যায়ন সমাজ বা রাষ্ট্র কখনোই করে না। তাদের কাজকে ‘আসল কাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই অনেকের প্রবল আপত্তি থাকে।

এই নারী শ্রমিকদের বঞ্চনা বুঝতে হলে আমাদের আন্তঃবিভাগীয়তা (Intersectionality) ধারণাটির সাহায্য নিতে হবে। একজন নারী অভিবাসী একই সাথে তিন দিক থেকে শোষণের শিকার হন। প্রথমত তিনি একজন নারী, দ্বিতীয়ত তিনি একজন দরিদ্র শ্রমিক এবং তৃতীয়ত তিনি একজন বিদেশি। এই তিনটি পরিচয় একত্রে মিলে তাকে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল এবং অরক্ষিত অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। গৃহকর্মীদের কাজের জায়গাটি হলো নিয়োগকর্তার বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর। সেখানে বাইরের পৃথিবীর কোনো নজরদারি থাকে না। তারা খুব সহজেই শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, বাইরের কারো সাথে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না এবং অনেক সময় তাদের ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হয় না। তারা মূলত এক ধরনের আধুনিক বন্দিদশার মধ্যে দিন পার করেন। বাড়ির ভেতরের এই কাজগুলোকে সাধারণত দেশের মূল শ্রম আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়। ফলে এই নারীদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না এবং তারা কোনো আইনি সুরক্ষাও পান না।

এই নীরব নির্যাতন বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ২০১১ সালে একটি ঐতিহাসিক কনভেনশন গ্রহণ করে, যা ‘গৃহকর্মী কনভেনশন’ বা আইএলও কনভেনশন ১৮৯ নামে পরিচিত। এই কনভেনশনটি বিশ্বকে প্রথমবারের মতো বাধ্য করে গৃহকর্মীদের কাজকে অন্যান্য সাধারণ পেশার মতোই একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে। এই দলিলের মাধ্যমে দাবি জানানো হয় যে, গৃহকর্মীদেরও সপ্তাহে অন্তত একদিন পূর্ণ ছুটি পাওয়ার অধিকার আছে, তাদের কাজের সময় নির্দিষ্ট হতে হবে এবং তাদের পারিশ্রমিক অবশ্যই ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর আওতায় থাকতে হবে। রাষ্ট্রগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ আইন পরিবর্তন করে এই গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারী অভিবাসী শ্রমিকরা কোনো দয়ার পাত্রী নন, তারা তাদের শ্রম দিয়ে দুটি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। তাই তাদের কাজের পরিবেশ নিরাপদ করা এবং তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অবশ্য পালনীয় আইনি এবং নৈতিক দায়িত্ব।

স্পনসরশিপ প্রথা এবং কাঠামোগত দাসত্বের আধুনিক রূপ

বিশ্বের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন কিছু আইনি ব্যবস্থা চালু আছে, যা শুনলে মনে হয় আমরা বুঝি মধ্যযুগের দাসপ্রথার যুগে ফিরে গেছি। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত হলো কফিল বা স্পনসরশিপ প্রথা। এই ব্যবস্থার মূল কথা হলো, একজন বিদেশি শ্রমিক যখন কাজ করতে আসবেন, তখন তাকে অবশ্যই স্থানীয় কোনো নাগরিক বা কোম্পানির স্পনসরশিপ নিয়ে আসতে হবে। এই স্পনসর বা কফিলই মূলত ওই শ্রমিকের ভিসা, কাজের অনুমতি এবং দেশে থাকার আইনি বৈধতা নিয়ন্ত্রণ করেন। শুনতে এটি একটি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মনে হলেও বাস্তবে এটি এক ধরনের ভয়াবহ কাঠামোগত নির্ভরতা (Structural Dependency) তৈরি করে। শ্রমিকের জীবনের পুরো চাবিকাঠি চলে যায় মালিকের হাতে। মালিক যদি কোনো কারণে খুশি না থাকেন, তবে তিনি খুব সহজেই শ্রমিকের ভিসা বাতিল করে তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারেন। এই আইনি কাঠামোর কারণে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।

এই প্রথার সবচেয়ে অমানবিক দিকটি হলো পাসপোর্ট আটকে রাখা। শ্রমিক ভিনদেশে পা রাখার সাথে সাথেই নিয়োগকর্তা তার পাসপোর্ট নিজের কাছে জমা নিয়ে নেন। এটি মূলত শ্রমিকের চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি একটি আক্রমণ। পাসপোর্ট না থাকায় শ্রমিকটি নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরতে পারেন না, অন্য কোনো কোম্পানিতে ভালো বেতনে চাকরি পেলেও সেখানে যোগ দিতে পারেন না। মালিকের অনুমতি ছাড়া তার কিছুই করার ক্ষমতা থাকে না। অনেক মানবাধিকার সংগঠন এই কফিল প্রথাকে নয়া-দাসত্ব (Neo-slavery) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রাচীন যুগে যেমন দাসদের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো, এই আধুনিক যুগে শেকলের জায়গা দখল করেছে পাসপোর্ট আটকে রাখার আইনি মারপ্যাঁচ। শ্রমিক যদি দেখেন যে তার মালিক তাকে বেতন দিচ্ছেন না বা অমানবিক খাটুনি খাটাচ্ছেন, তারপরও তিনি কাজ ছাড়তে পারেন না। কারণ কাজ ছাড়লেই পুলিশ তাকে অবৈধ হিসেবে গ্রেপ্তার করবে। আইনের এই ফাঁদে পড়ে শ্রমিকরা দিনের পর দিন সব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করে যান।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই ধরনের শোষণমূলক কাঠামোর ঘোর বিরোধী। আইএলও এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার কমিটি বারবার এই স্পনসরশিপ প্রথা বাতিল করার বা সংস্কার করার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে চাপ দিয়ে আসছে। কোনো আইনি চুক্তির শর্তই এমন হতে পারে না যা মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। চুক্তিভিত্তিক কাজের মানে এই নয় যে একজন মানুষ তার মালিকের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের শ্রম আইনে শ্রমিকদের যেকোনো সময় কাজ ছাড়ার বা পেশা পরিবর্তন করার পূর্ণ অধিকার স্বীকৃত। অনেক দেশ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে তাদের এই পুরোনো কফিল প্রথায় কিছু পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। তারা শ্রমিকদের সরাসরি নিজেদের স্পনসরে চাকরি খোঁজার বা মালিকের অনুমতি ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ দিচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক, তবে এই পরিবর্তনগুলো খুব ধীরগতিতে হচ্ছে।

বিশ্বায়নের অর্থনীতি বনাম শ্রমিকের মর্যাদা: ভবিষ্যতের রূপরেখা

অভিবাসী শ্রমিকরা যে কেবল গন্তব্য দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করেন, তা নয়; তারা নিজেদের দেশের অর্থনীতিও বাঁচিয়ে রাখেন। প্রবাস থেকে তারা যে রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির সবচেয়ে বড় জীবনীশক্তি। এই রেমিট্যান্সের টাকায় দেশে স্কুল, হাসপাতাল এবং রাস্তাঘাট তৈরি হয়। গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলো দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ পায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে মানুষগুলো নিজেদের রক্ত পানি করে এই বিশাল অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন, রাষ্ট্র অনেক সময় তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে ব্যর্থ হয়। তারা যখন দেশে ছুটিতে ফেরেন, তখন বিমানবন্দরেই তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। দালালদের প্রতারণা রোধ করা বা বিদেশে বিপদে পড়লে আইনি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে সক্রিয় ভূমিকা থাকা দরকার, তা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। রাষ্ট্র কেবল তাদের পাঠানো অর্থের হিসাব কষেই খুশি থাকে, কিন্তু সেই অর্থের পেছনে থাকা মানুষের ঘাম এবং কষ্টের মূল্য দিতে চায় না।

আধুনিক বিশ্বের এই অর্থনৈতিক মডেলটি মূলত নয়া-উদারতাবাদ (Neoliberalism) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই দর্শন অনুযায়ী, পুঁজি বা টাকা খুব সহজেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অবাধে চলাচল করতে পারে। বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিনা বাধায় সীমানা পেরিয়ে ব্যবসা করতে পারে। যখনই কোনো দরিদ্র দেশের মানুষ শ্রমজীবী হিসেবে সীমানা পার হতে চায়, তখনই তাদের সামনে ভিসা, কাঁটাতার এবং কঠোর ইমিগ্রেশন আইনের বিশাল দেয়াল তুলে দেওয়া হয়। বিশ্বায়ন মূলত পণ্যের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের জন্য তা বন্ধ করে রেখেছে। অর্থনীতিবিদরা এই বৈপরীত্যকে আধুনিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি হিসেবে দেখেন। একটি ন্যায্য এবং মানবিক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে হলে কেবল পুঁজির অবাধ প্রবাহ নয়, শ্রমের অবাধ এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রবাহও নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে কেবল সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে দেখার এই নিষ্ঠুর মানসিকতা থেকে রাষ্ট্রগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে।

  • অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা
  • গন্তব্য দেশে তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয় তৈরি করা
  • উৎস ও গন্তব্য দেশের মধ্যে জবাবদিহিতামূলক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়ন করা

ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে ভাবতে গেলে সবার আগে অভিবাসী শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তারা যে দেশে যৌবনের মূল্যবান সময়গুলো কাটিয়ে দেন, বৃদ্ধ বয়সে সেই দেশ তাদের কোনো দায়িত্ব নেয় না। তাদের জন্য কোনো পেনশন বা স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা থাকে না। এই অবিচার দূর করার জন্য দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলো আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। গন্তব্য দেশ এবং উৎস দেশ – উভয়কেই অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সমান দায়িত্ব নিতে হবে। সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে এই শ্রমিকদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার কাজ আরও ব্যাপকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। অভিবাসী শ্রমিকরা ভিনদেশের মাটিতে কোনো দয়ার পাত্র নন। তারা তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখছেন। তাই তাদের পারিশ্রমিক, কাজের পরিবেশ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাটা কোনো করুণা নয়, এটি তাদের অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকার। এই অধিকারগুলো যেদিন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেদিনই কেবল আমরা একটি সত্যিকারের সভ্য এবং মানবিক বৈশ্বিক সমাজের দাবি করতে পারব।

মানবাধিকার এবং সশস্ত্র সংঘাত (Human Rights and Armed Conflicts)

যুদ্ধ ও শান্তির মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং আইনি সীমারেখা

শান্তির সময় একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজে কোনো মানুষকে হত্যা করা সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্র তার পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে। ঠিক একই মানুষটিকে রাষ্ট্র যখন সৈনিকের পোশাক পরিয়ে যুদ্ধের ময়দানে পাঠায়, তার হাতে তুলে দেয় অত্যাধুনিক অস্ত্র, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সেখানে শত্রুপক্ষের মানুষকে হত্যা করাটা কোনো অপরাধ নয়, সেটাকে দেখা হয় পরম সাহসিকতা ও বীরত্বের কাজ হিসেবে। মানুষ হিসেবে আমাদের মনস্তত্ত্বে এই যে বিশাল রূপান্তর, আইনের চোখে এটি একটি বিরাট চিন্তার বিষয়। সাধারণ মানুষের মনে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বোধ হয় সব ধরনের আইনের মৃত্যু ঘটে। তারা ধরে নেন যুদ্ধের ময়দান হলো এমন এক জায়গা যেখানে পেশিশক্তি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া আর কোনো নিয়মকানুন নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই ভুল ধারণাকে একেবারে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে। আইনবিদরা খুব জোরালোভাবে বলেন, যুদ্ধ কোনো নিয়মহীন খেলা নয়। মানুষ একে অপরের দিকে বন্দুক তাক করলেও কিছু জন্মগত অধিকার কোনোভাবেই বাতিল হয়ে যায় না। সশস্ত্র সংঘাতের ময়দানেও মানুষের বেঁচে থাকার একটি নির্দিষ্ট আইনি সীমারেখা বজায় থাকে।

যুদ্ধের নিজস্ব কিছু দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে। প্রাচীনকালের দার্শনিকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সংঘাত মানব প্রকৃতির একটি অংশ হলেও একে পুরোপুরি লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সেন্ট অগাস্টিন এবং পরবর্তীতে থমাস অ্যাকুইনাস জাস্ট ওয়ার থিওরি (Just War Theory) বা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের একটি চমৎকার তাত্ত্বিক রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, যুদ্ধ শুরু করার যেমন একটি যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে, যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতেও থাকতে হবে মানবিকতার ছোঁয়া। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় যুদ্ধ পরিচালনার এই আইনি নিয়মকানুনগুলোকে জুস ইন বেলো (Jus in Bello) বলা হয়। রাষ্ট্রগুলো হয়তো নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করার জন্য বা শত্রুকে পরাজিত করার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে, কিন্তু সেই যুদ্ধ জয়ের জন্য তারা যেকোনো পৈশাচিক পথ বেছে নিতে পারবে না। মানুষের আত্মমর্যাদার ধারণাটি এতই শক্তিশালী যে, যুদ্ধের দামামার মধ্যেও তা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। একজন সৈনিক হয়তো শত্রুকে গুলি করতে পারে, কিন্তু সেই শত্রু যদি অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করে, তবে তাকে নির্যাতন করার কোনো অধিকার ওই সৈনিকের থাকে না। এই আইনি সীমারেখাটি মূলত প্রমাণ করে যে যুদ্ধক্ষেত্রটি আইনের বাইরে থাকা কোনো অন্ধকার জগত নয়।

সৈনিকদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিবেচনা করলেও এই আইনের প্রয়োজনীয়তা খুব সহজে বোঝা যায়। রাষ্ট্র একজন সাধারণ নাগরিককে সৈনিক হিসেবে তৈরি করার সময় তাকে শেখায় কীভাবে নির্দেশ পালন করতে হয় এবং কীভাবে ধ্বংস করতে হয়। এই প্রশিক্ষণ অনেক সময় মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। মানবাধিকার আইন ঠিক এই জায়গাটিতে একটি নৈতিক ও আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করে। আইনটি সৈনিকদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের সামনের মানুষটিও দিনশেষে একজন রক্তমাংসের মানুষ। তাকে পরাজিত করার অধিকার রাষ্ট্রের আছে, কিন্তু তার মানবসত্তাকে অপমান করার অধিকার কারো নেই। এই সাধারণ বোধ থেকেই আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধাপরাধ (War Crimes)-এর ধারণাটি আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। কোনো কমান্ডার যদি তার বাহিনীকে নির্দেশ দেন কোনো গ্রামের সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে বা সাধারণ মানুষকে পাইকারি হারে হত্যা করতে, তবে সেই নির্দেশটি আইনত অবৈধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ধরনের অপরাধকে কোনোভাবেই ক্ষমা করে না। যুদ্ধের ময়দানেও আইনের এই কঠোর উপস্থিতি মূলত মানবসভ্যতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার একটি আপ্রাণ চেষ্টা।

মানবাধিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আন্তঃসম্পর্ক

আইনশাস্ত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি গভীর তাত্ত্বিক বিতর্ক চলে আসছিল। অনেকেই মনে করতেন যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধকালীন আইন সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জগতে বাস করে। তাদের যুক্তি ছিল, মানবাধিকার আইন কেবল শান্তির সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরের সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। আর যুদ্ধ শুরু হলে সেই আইনের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায় এবং সেখানে কেবল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা জেনেভা কনভেনশনের নিয়মকানুনগুলো কাজ করে। এই বিভাজনের ধারণাটি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থায় আর ধোপে টেকে না। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে তাদের একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, সশস্ত্র সংঘাত শুরু হওয়ার কারণে মানবাধিকার আইনের প্রয়োগ কোনোভাবেই বন্ধ হয়ে যায় না। এই দুটি আইন একে অপরের শত্রু নয়, এরা একসাথে কাজ করে মানুষের সুরক্ষার বলয়টিকে আরও মজবুত করার জন্য। আইনি পরিভাষায় এই বিশেষ প্রয়োগ পদ্ধতিটিকে লেক্স স্পেশালিস (Lex Specialis) বলা হয়। এর মানে হলো, সাধারণ আইনের পাশাপাশি যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির জন্য বিশেষ আইন থাকে, তবে সেই বিশেষ আইনটি প্রাধান্য পাবে, কিন্তু সাধারণ আইনটি বাতিল হবে না।

এই আন্তঃসম্পর্কীয় প্রয়োগ (Interrelated Application) কীভাবে কাজ করে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, যুদ্ধের ময়দানে কোনো একটি দেশের সেনাবাহিনী কিছু সাধারণ নাগরিককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করল। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বলছে, এই নাগরিকদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। একই সাথে মানবাধিকার আইন বলছে, এই নাগরিকদের বিনাবিচারে দীর্ঘকাল আটকে রাখা যাবে না এবং তাদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ, মানবিক আইন যেখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা কমানোর চেষ্টা করছে, মানবাধিকার আইন সেখানে মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। আইন দুটো মিলে আটক থাকা মানুষটির জন্য একটি দ্বিগুণ সুরক্ষার আবরণ তৈরি করে। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ থিওডোর মেরন (Theodor Meron) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ হিউম্যান রাইটস ইন ইন্টারনাল স্ট্রাইফ (Human Rights in Internal Strife)-এ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন কীভাবে এই দুই আইনি ব্যবস্থার মেলবন্ধন যুদ্ধের ময়দানে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে (Meron, 1987)। মানবাধিকার আইন মূলত মানবিক আইনের ফাঁকফোকরগুলো পূরণ করে দেয়।

রাষ্ট্রগুলো স্বভাবতই আইনের এই দ্বৈত প্রয়োগকে খুব একটা সহজে মেনে নিতে চায় না। তারা সব সময় চেষ্টা করে যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখতে। অনেক বড় বড় পরাশক্তি জোরালো দাবি তোলে যে, তাদের দেশের সীমানার বাইরে গিয়ে যখন তাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধ করে, তখন তাদের নিজস্ব মানবাধিকার চুক্তির দায়বদ্ধতা আর থাকে না। তারা একে ভিনদেশি ভূখণ্ডের দোহাই দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মানবাধিকার চুক্তিগুলোর তদারকি কমিটি এবং আন্তর্জাতিক আদালতগুলো এই যুক্তিকে সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে। তাদের আইনি ব্যাখ্যা হলো, একটি রাষ্ট্র যেখানেই তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, সেখানেই তাকে মানবাধিকার আইন মেনে চলতে হবে। যদি কোনো দেশের সেনাবাহিনী অন্য দেশের একটি নির্দিষ্ট এলাকা দখল করে নেয়, তবে ওই এলাকার মানুষের মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব দখলদার বাহিনীর ওপরই বর্তায়। ভূগোলের সীমানা দিয়ে মানুষের জন্মগত অধিকারগুলোকে আটকে রাখা যায় না। এই আইনি অবস্থানটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে একটি বিশাল আইনি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

সামরিক প্রয়োজনীয়তা এবং মানবিকতার চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব

যুদ্ধ পরিচালনার নিয়মকানুনের একেবারে কেন্দ্রে একটি চিরস্থায়ী এবং অত্যন্ত জটিল দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে। একজন সামরিক কমান্ডারের প্রধান লক্ষ্য থাকে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধে জয়লাভ করা বা শত্রুকে পরাস্ত করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে অনেক সময় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আইনের ভাষায় একে সামরিক প্রয়োজনীয়তা (Military Necessity) বলা হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আইন বলছে যুদ্ধ জয়ের জন্য সবকিছু করা বৈধ নয়। যুদ্ধে এমন কোনো অস্ত্র বা কৌশল ব্যবহার করা যাবে না, যা মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়। সামরিক প্রয়োজনীয়তা এবং মানবিকতার এই দ্বন্দ্বটি যুদ্ধক্ষেত্রকে একটি কঠিন মনস্তাত্ত্বিক এবং আইনি পরীক্ষার জায়গায় পরিণত করে। একজন কমান্ডার চাইলেই শত্রুপক্ষের খাবার পানির উৎসে বিষ মিশিয়ে দিতে পারবেন না, অথবা এমন কোনো গ্যাস ব্যবহার করতে পারবেন না যা মানুষকে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আইন এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরি করে। আইন স্বীকার করে নেয় যে যুদ্ধে মানুষের মৃত্যু হবে, কিন্তু সেই মৃত্যুকে অকারণে নিষ্ঠুর করার কোনো অধিকার রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি।

এই ভারসাম্য রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পার্থক্যকরণের নীতি (Principle of Distinction)। সশস্ত্র সংঘাতের আইনের এটি এক প্রকার হৃদপিণ্ড। এই নীতির মূল কথা হলো, যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে বা কমব্যাট্যান্ট, কেবল তাদের ওপরই আক্রমণ চালানো যাবে। যারা যুদ্ধ করছে না, যেমন সাধারণ কৃষক, স্কুলের শিশু, হাসপাতালের ডাক্তার বা নিরস্ত্র মানুষ, তাদের ওপর কোনোভাবেই আঘাত করা যাবে না। সামরিক বাহিনীকে সব সময় খুব সতর্কতার সাথে সাধারণ মানুষ এবং যোদ্ধাদের মধ্যে এই পার্থক্যটি বজায় রাখতে হয়। একটি আবাসিক ভবনের ভেতর যদি কোনো যোদ্ধা না থাকে, তবে সেই ভবনে বোমা ফেলা সরাসরি একটি যুদ্ধাপরাধ। সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন যোদ্ধারা সাধারণ মানুষের পোশাক পরে তাদের মধ্যে মিশে যায়। আধুনিক যুদ্ধগুলোতে এটি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তখন সামরিক বাহিনীর জন্য পার্থক্য করাটা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও আন্তর্জাতিক আইন বলছে, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পুরো গ্রামের ওপর আক্রমণ চালানো যাবে না। সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর জন্য সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হবে।

দ্বন্দ্বের আরেকটি বিশাল জায়গা হলো সমানুপাতিকতার নীতি (Principle of Proportionality)। যুদ্ধের ময়দানে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি আসে যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করলে আশপাশে থাকা কিছু সাধারণ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। আইন বলছে, সেই সামরিক ঘাঁটি থেকে যে পরিমাণ সামরিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তার তুলনায় সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেন কোনোভাবেই মাত্রাতিরিক্ত না হয়। এটি একটি অত্যন্ত শীতল এবং নিষ্ঠুর হিসাব-নিকাশ। একজন জেনারেলকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে একটি শত্রুঘাঁটি ধ্বংস করার জন্য কয়েকজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় কি না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই হিসাবের ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ আসনে বসানোর নির্দেশ দেয়। যদি দেখা যায় যে সাধারণ মানুষের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে, তবে ওই সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ বাতিল করতে হবে। সামরিক সুবিধার দোহাই দিয়ে পাইকারি হারে সাধারণ মানুষ হত্যার কোনো আইনি সুযোগ নেই। এই নীতিগুলো বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ জয়ের চেয়েও মানবতা রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর আইনি অবস্থান

টেলিভিশনের পর্দায় বা খবরের কাগজে আমরা সাধারণত যে যুদ্ধগুলোর খবর দেখি, তার বেশিরভাগই দুটি আলাদা দেশের মধ্যে ঘটে না। বর্তমান বিশ্বের সংঘাতগুলোর চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন যুদ্ধগুলো মূলত একটি দেশের ভেতরেই সংঘটিত হয়, যেখানে একদিকে থাকে রাষ্ট্রের নিজস্ব সেনাবাহিনী এবং অন্যদিকে থাকে কোনো বিদ্রোহী বা স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই সংঘাতগুলোকে গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত (Non-International Armed Conflicts) বলা হয়। সিরিয়া, ইয়েমেন বা আফ্রিকার অনেক দেশের চলমান সংঘাতগুলো এর জ্বলন্ত উদাহরণ। একটা সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন মূলত দুটি দেশের মধ্যকার যুদ্ধ নিয়েই ব্যস্ত ছিল। ভাবা হতো দেশের ভেতরের বিদ্রোহ দমন করা রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের ৩ নম্বর সাধারণ অনুচ্ছেদ এই চিন্তাধারায় একটি বিশাল আইনি বিপ্লব নিয়ে আসে। এই অনুচ্ছেদটি খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, সংঘাত দেশের ভেতরে হলেও কিছু ন্যূনতম মানবিক নিয়মকানুন উভয় পক্ষকেই মেনে চলতে হবে।

এখানে একটি বড় ধরনের আইনি এবং তাত্ত্বিক প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের সরকারগুলো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করে এবং সেই আইন মানতে বাধ্য থাকে। কিন্তু একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী তো কোনো চুক্তিতে সই করেনি, তারা রাষ্ট্রের নিয়মও মানে না। তাহলে তারা কেন আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে? এর চমৎকার ব্যাখ্যা দেয় প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (Customary International Law)। আইনি পণ্ডিতরা বলেন, মানুষ হত্যা না করা, বন্দিদের নির্যাতন না করা বা সাধারণ মানুষের ওপর বোমা না ফেলার মতো নিয়মগুলো কোনো চুক্তির মুখাপেক্ষী নয়। এগুলো মানবসভ্যতার একদম মৌলিক এবং অলিখিত আইন। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কোনো আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি না থাকলেও, সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের ওপর এই নিয়মগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতা চলে আসে (Cassese, 2008)। তারা বলতে পারে না যে যেহেতু তারা রাষ্ট্র নয়, তাই তারা ইচ্ছেমতো সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে পারবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত অনেক দেশের বিদ্রোহী নেতাদের এই প্রথাগত আইনের ভিত্তিতেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সময় রাষ্ট্রগুলোর আচরণ অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা সাধারণত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করে। রাষ্ট্র দাবি করে যে সন্ত্রাসীদের দমন করার জন্য তাদের কোনো আন্তর্জাতিক আইন মানার প্রয়োজন নেই। তারা দেশের ভেতরে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং সাধারণ মানুষের মানবাধিকারগুলোকে পদদলিত করে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সাধারণ মানুষের জন্য একমাত্র ঢাল হিসেবে কাজ করে। আইন পরিষ্কারভাবে বলে, রাষ্ট্র তার অখণ্ডতা রক্ষার অধিকার রাখে, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে কোনোভাবেই নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে না। বিদ্রোহী দমনের নামে পুরো একটি সম্প্রদায়ের মানুষকে গ্রামছাড়া করা বা তাদের খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন। অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলোতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে কঠিন কাজ হলেও, মানবাধিকারের তাত্ত্বিক কাঠামো এই জবাবদিহিতার দাবি থেকে কখনোই সরে আসে না।

যুদ্ধকালীন মৌলিক অধিকারের অ-অবনমন নীতি

সশস্ত্র সংঘাত বা বড় ধরনের কোনো জাতীয় সংকটের সময় রাষ্ট্রগুলো সাধারণত একটি বিশেষ আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয় যে, দেশের জরুরি পরিস্থিতির কারণে তারা সাময়িকভাবে কিছু মানবাধিকার চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলতে পারবে না। আইনি পরিভাষায় এই সাময়িক স্থগিতকরণকে অবনমন বা স্থগিতকরণ (Derogation) বলা হয়। যেমন যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীনভাবে চলাফেরার ওপর কারফিউ জারি করতে পারে, অথবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করতে পারে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই ধরনের ছোটখাটো অধিকার স্থগিত করাকে আন্তর্জাতিক আইন একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত মেনে নেয়। কিন্তু এই স্থগিতকরণের একটি খুব শক্ত এবং অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা রয়েছে। রাষ্ট্র চাইলেই তার ইচ্ছামতো যেকোনো অধিকার বাতিল করে দিতে পারে না। মানুষের জীবনের কিছু অধিকার এতই পবিত্র এবং মৌলিক যে যুদ্ধ, মহামারী বা পৃথিবীর যেকোনো বিপর্যয়ের মধ্যেও সেগুলো স্থগিত করা যায় না।

এই অধিকারগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় অ-অবনমনযোগ্য অধিকার (Non-Derogable Rights) বলা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার বা রাইট টু লাইফ। কোনো জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র বিনাবিচারে কোনো মানুষকে হত্যা করার অধিকার পায় না। এর পাশাপাশি রয়েছে দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার। যুদ্ধ চলছে বলে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষকে ধরে এনে জোর করে বেগার খাটাতে পারবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ-অবনমনযোগ্য অধিকারটি হলো নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি নিষেধাজ্ঞা। কোনো বন্দির কাছ থেকে গোপন তথ্য আদায় করার জন্য রাষ্ট্র তাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করতে পারবে না। অনেক সময় রাষ্ট্রগুলো যুক্তি দেখায় যে, একজন বন্দি হয়তো একটি বড় বোমা হামলার তথ্য জানে, তাকে নির্যাতন করে তথ্য বের করতে পারলে হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। দর্শনের ভাষায় একে ‘টিকিং টাইম বম’ বা টিকটিক করা বোমার পরিস্থিতি বলা হয়। কিন্তু মানবাধিকার আইন এই যুক্তি সরাসরি খারিজ করে দেয়। আইন বলে, নির্যাতনের মতো অমানবিক কাজ কোনো উদ্দেশ্যেই বৈধ হতে পারে না।

এই মৌলিক অধিকারগুলো অ-অবনমনযোগ্য হওয়ার পেছনে একটি খুব গভীর দার্শনিক কারণ রয়েছে। এই অধিকারগুলো সরাসরি মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদার সাথে যুক্ত। রাষ্ট্র যখন কোনো মানুষকে নির্যাতন করে, তখন সে কেবল ওই মানুষটির শরীরেই আঘাত করে না, সে মূলত ওই মানুষটির মানবসত্তাকে চরমভাবে অপমান করে। একটি সভ্য রাষ্ট্র যদি যুদ্ধ জয়ের জন্য বা শত্রুকে দমনের জন্য নির্যাতনের পথ বেছে নেয়, তবে সেই রাষ্ট্রের সাথে সন্ত্রাসীদের আর কোনো নৈতিক পার্থক্য থাকে না। আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ জোহানেস মরসিংক (Johannes Morsink) তার লেখায় দেখিয়েছেন যে, মানবাধিকারের এই অ-অবনমনযোগ্য চরিত্রটি মূলত মানবসভ্যতার সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে একটি নৈতিক বাতিঘর হিসেবে কাজ করে (Morsink, 1999)। যুদ্ধক্ষেত্র যত ভয়ংকরই হোক না কেন, মানুষের কিছু ন্যূনতম অধিকার সবসময় অক্ষত থাকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দম্ভ কখনোই মানুষের এই মৌলিক মর্যাদাগুলোকে বিলুপ্ত করতে পারে না।

সমসাময়িক যুদ্ধের ধরন এবং আইনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

আমরা যদি আগের দিনের যুদ্ধগুলোর কথা চিন্তা করি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল একটি প্রান্তর যেখানে দুই পক্ষের সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। আধুনিক যুগের যুদ্ধগুলো সেই চিরাচরিত রূপ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছে। এখনকার সংঘাতগুলো অনেক বেশি জটিল, অদৃশ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর। বর্তমান বিশ্ব মূলত অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare)-এর সাক্ষী হচ্ছে। এখানে এক পক্ষের হাতে থাকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, আর অন্য পক্ষের হাতে থাকে কেবল সাধারণ রাইফেল। এই অসমতার কারণে দুর্বল পক্ষ অনেক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে গিয়ে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ চালায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পুরোনো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনগুলো প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৯ সালে বসে যারা জেনেভা কনভেনশন লিখেছিলেন, তারা হয়তো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি যে একদিন যুদ্ধ পরিচালিত হবে হাজার মাইল দূরে এসি রুমে বসে কম্পিউটারের জয়স্টিক দিয়ে। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব বিকাশ মানবাধিকার আইনের সামনে এক বিশাল এবং অচেনা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

এই নতুন চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সামরিক ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানের ব্যবহার। শক্তিশালী দেশগুলো এখন অন্য দেশের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হত্যা করছে। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় এই পদ্ধতিকে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা (Targeted Killing) বলা হয়। রাষ্ট্রগুলো দাবি করে যে তারা সন্ত্রাস দমনের জন্য এই কাজ করছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি হলো, যেখানে কোনো সক্রিয় যুদ্ধ চলছে না, সেখানে ড্রোন দিয়ে কাউকে হত্যা করা মূলত একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। মানবাধিকার আইন বলে, পুলিশি পরিস্থিতিতে কাউকে সন্দেহ হলে তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আকাশ থেকে বোমা ফেলে বিনাবিচারে মেরে ফেলার কোনো আইনি বৈধতা নেই। ফিলিপ অ্যালস্টনের মতো জাতিসংঘের বিশেষ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের ড্রোন হামলার ফলে প্রচুর নিরীহ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং রাষ্ট্রগুলো আইনের ফাঁক গলে এই হত্যাকাণ্ডগুলোর কোনো দায় নিচ্ছে না (Alston, 2011)।

প্রযুক্তির আরও একটি ভয়াবহ রূপ হলো সাইবার যুদ্ধ বা সাইবার অ্যাটাক। এখন আর শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য গোলাগুলি করার দরকার হয় না। কোনো হ্যাকার গোষ্ঠী যদি শত্রু দেশের হাসপাতালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হ্যাক করে বন্ধ করে দেয়, তবে সেখানে চিকিৎসাধীন সাধারণ মানুষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়। এই ধরনের আক্রমণগুলোতে সরাসরি কোনো রক্তপাত হয় না, কিন্তু এর ফলাফল প্রথাগত যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন এখন এই সাইবার যুদ্ধগুলোকে মানবাধিকারের মানদণ্ডে বিচার করার চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি যতই বদলাক না কেন, আইনের মূল দর্শনটি একই থাকে। সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো যাবে না এবং অকারণে মানুষের কষ্ট বাড়ানো যাবে না। আধুনিক যুদ্ধের এই নতুন ময়দান প্রমাণ করে যে মানবাধিকার আইন কোনো স্থির বিষয় নয়। এটি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয় এবং মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য নিত্যনতুন আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সশস্ত্র সংঘাতের নির্মমতা হয়তো কখনো পুরোপুরি বন্ধ হবে না, কিন্তু আইনের উপস্থিতি এই সংঘাতগুলোকে কিছুটা হলেও মানবিক রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায়।

জেনেভা কনভেনশন (The Geneva Conventions)

সলফেরিনোর প্রান্তর এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের উন্মেষ

ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, সংঘাত সবসময়ই মানবসভ্যতার একটি দীর্ঘস্থায়ী ছায়া হয়ে থেকেছে। ক্ষমতার মোহ, ভূখণ্ডের দখল বা মতাদর্শের লড়াই যুগে যুগে মানুষকে অস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, মৃত্যু এবং অবর্ণনীয় কষ্ট। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সংঘাতের ময়দানে কোনো সুনির্দিষ্ট বা লিখিত নিয়মকানুন ছিল না। আহত সৈনিকদের ভাগ্যে জুটত ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু অথবা প্রতিপক্ষের বেয়নেটের নির্দয় আঘাত। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মোড় ঘুরে যায় ১৮৫৯ সালের জুন মাসে, ইতালির সলফেরিনো প্রান্তরে। সেখানে ফরাসি ও অস্ট্রিয়ান বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী লড়াই সংঘটিত হয়। এক দিনে প্রায় চল্লিশ হাজার সৈনিক হতাহত হয়। সেই সময় ইতালিতে ব্যবসায়িক কাজে গিয়েছিলেন এক সুইস ভদ্রলোক, যার নাম অঁরি দ্যুনান। তিনি দুর্ঘটনাবশত সেই যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি উপস্থিত হন। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার মৃত ও মুমূর্ষু সৈনিকের দৃশ্য তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। চিকিৎসকের অভাবে সামান্য আঘাতেই সৈনিকরা মারা যাচ্ছিল। তিনি নিজের ব্যবসার কথা ভুলে গিয়ে স্থানীয় গ্রামের নারীদের সংঘবদ্ধ করেন। তারা শত্রুমিত্র বিচার না করে সব আহত সৈনিকের সেবা শুশ্রূষা শুরু করেন। তাদের মূলমন্ত্র ছিল ‘তুত্তি ফ্রাতেল্লি’, যার অর্থ হলো সবাই ভাই। এই মানবিক উদ্যোগটি ছিল একটি বিশাল পরিবর্তনের প্রথম বীজ।

সলফেরিনো থেকে ফিরে এসে অঁরি দ্যুনান একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বই লেখেন। বইটির নাম আ মেমোরি অব সলফেরিনো (A Memory of Solferino)। তিনি এই বইতে সংঘাতের ভয়াবহতার একেবারে নগ্ন চিত্র তুলে ধরেন (Dunant, 1862)। পাশাপাশি তিনি দুটি যুগান্তকারী প্রস্তাব রাখেন। প্রথমত, প্রতিটি দেশে এমন একটি স্থায়ী ও নিরপেক্ষ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা দরকার, যারা সংকটের সময় আহতদের সেবা করবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রগুলোকে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে উপনীত হতে হবে, যাতে এই স্বেচ্ছাসেবকদের এবং আহত সৈনিকদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকে। তার এই বইটি ইউরোপের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সামরিক কর্তারা তার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবতে শুরু করেন। এই চিন্তাধারার ফসল হিসেবেই জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি। দ্যুনানের ব্যক্তিগত একটি আবেগি উদ্যোগ খুব দ্রুতই একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। এর কয়েক বছর পর, ১৮৬৪ সালে, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইউরোপের বারোটি দেশের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে প্রথম জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল মাত্র দশটি অনুচ্ছেদের একটি ছোট্ট দলিল। এই চুক্তির মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law)-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

১৮৬৪ সালের সেই প্রথম চুক্তিটি খুব সাধারণ হলেও এর দর্শন ছিল অত্যন্ত গভীর। রাষ্ট্রগুলো প্রথমবারের মতো একমত হলো যে, নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং ধ্বংস করার ক্ষমতারও একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত। তারা মেনে নিল যে সংঘাতের ময়দানেও মানবিকতার কিছু অলঙ্ঘনীয় নিয়ম বজায় রাখা সম্ভব (Best, 1994)। এই চুক্তিতে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের নিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করা হলো। সাদা জমিনের ওপর একটি লাল ক্রস চিহ্নকে এই নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো। এই চিহ্নের নিচে থাকা কোনো ব্যক্তি বা স্থাপনার ওপর আক্রমণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে স্বীকৃত হলো। এটি ছিল মানুষের চিন্তার জগতে এক বিশাল বিপ্লব। এর আগে রাষ্ট্রগুলো মনে করত শত্রুকে পরাজিত করার জন্য যেকোনো কিছুই বৈধ। জেনেভার এই প্রথম দলিলটি প্রমাণ করল যে, সভ্য রাষ্ট্রগুলো চাইলে উন্মাদনার মাঝেও আইন এবং শৃঙ্খলার একটি মানবিক রেখা টেনে দিতে পারে। এই ছোট চুক্তিটিই পরবর্তীতে একটি বিশাল আইনি ইমারতের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে, যা আজকের দিনে ১৯৪৯ সালের চারটি জেনেভা কনভেনশন নামে পরিচিত।

প্রথম ও দ্বিতীয় কনভেনশন: আহত সৈনিক এবং নৌবাহিনীর সুরক্ষা

১৯৪৯ সালে রচিত প্রথম জেনেভা কনভেনশনটি মূলত স্থলযুদ্ধে আহত এবং অসুস্থ সৈনিকদের সুরক্ষার জন্য নিবেদিত। লড়াইয়ের ময়দানে একজন সৈনিকের হাতে অস্ত্র থাকা অবস্থায় সে প্রতিপক্ষের একটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু। প্রতিপক্ষ তাকে পরাস্ত করার বা হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখে। গুলিবিদ্ধ হয়ে বা গুরুতর আহত হয়ে সৈনিকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তার আইনি মর্যাদায় একটি বিশাল পরিবর্তন আসে। সে তখন আর কোনো হুমকি নয়। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় এই অবস্থাকে অর দ্য কমব্যাট (Hors de combat) বা যুদ্ধ অক্ষম অবস্থা বলা হয়। এই কনভেনশন খুব স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দেয় যে, কোনো যুদ্ধ অক্ষম সৈনিকের ওপর আর আক্রমণ চালানো যাবে না। তাকে হত্যা করা বা নির্যাতন করা সরাসরি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি সে যদি শত্রু বাহিনীরও সদস্য হয়, তবু তাকে নিজ দেশের আহত সৈনিকদের মতোই সমমর্যাদায় চিকিৎসা দিতে হবে। চরম ঘৃণার মুহূর্তে শত্রুর প্রাণ রক্ষা করার এই নিয়মটি মেনে চলা যেকোনো সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলার জন্য একটি বিশাল পরীক্ষা।

আহত সৈনিকদের এই সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য চিকিৎসা কর্মীদের এবং হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। প্রথম কনভেনশন অনুযায়ী, সামরিক চিকিৎসক, নার্স এবং স্ট্রেচার বহনকারীদের কোনোভাবেই লক্ষ্যবস্তু বানানো যাবে না। তারা রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট প্রতীক ধারণ করে নির্ভয়ে রণাঙ্গনে কাজ করার অধিকার রাখেন (Pictet, 1952)। হাসপাতাল বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা তাঁবুগুলোতে কোনো অবস্থাতেই বোমা ফেলা বা গোলাবর্ষণ করা চলবে না। লড়াই শেষ হওয়ার পর উভয় পক্ষকেই মৃতদেহগুলো খুঁজে বের করার এবং সম্মানজনকভাবে সৎকার করার দায়িত্ব পালন করতে হয়। মৃতদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের পরিবারকে খবর দেওয়ার জন্য একটি তথ্য কেন্দ্র খোলার আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এই নিয়মগুলো প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সংঘাতের কারণে মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদাকে কোনোভাবেই ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া যায় না। একজন মৃত সৈনিকেরও সম্মানের সাথে সমাহিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।

দ্বিতীয় জেনেভা কনভেনশনটি মূলত প্রথম কনভেনশনের নীতিগুলোকেই সমুদ্রবক্ষে বা নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। সাগরের বুকে লড়াই স্থলযুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হতে পারে। একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর সৈনিকরা সম্পূর্ণ অসহায়ভাবে বিশাল এবং শীতল জলরাশির মাঝে ভেসে থাকে। এই কনভেনশন অনুযায়ী, জাহাজডুবি হওয়া বা সমুদ্রে ভাসমান শত্রু নৌবাহিনীর সদস্যদের উদ্ধার করা এবং তাদের চিকিৎসা দেওয়া বাধ্যতামূলক। নৌযুদ্ধে ব্যবহৃত হাসপাতাল জাহাজগুলোকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই জাহাজগুলো সম্পূর্ণ সাদা রঙের হতে হয় এবং এর গায়ে বড় করে রেড ক্রস প্রতীক আঁকা থাকে। এগুলো কোনো সামরিক কাজে ব্যবহার করা যায় না বা এদের মাধ্যমে কোনো সামরিক তথ্য আদান-প্রদান করা যায় না। ডুবোজাহাজ বা যুদ্ধবিমান থেকে কোনো হাসপাতাল জাহাজে আক্রমণ করা চরম আন্তর্জাতিক অপরাধ। বিশাল এবং নির্দয় সমুদ্রের মাঝে মানুষের সৃষ্ট এই আইনি সুরক্ষাবলয় মূলত সভ্যতার একটি বড় অহংকার। চরম শত্রুতার মাঝেও মানুষকে সমুদ্রের শীতল মৃত্যু থেকে বাঁচানোর এই নিয়মগুলো মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

তৃতীয় কনভেনশন: যুদ্ধবন্দীদের অধিকার এবং আইনি মর্যাদা

প্রাচীনকালে ময়দানে শত্রুকে বন্দি করার মানেই ছিল এক ভয়াবহ পরিণতির সূচনা। বন্দিদের অনেক সময় দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হতো, তাদের দিয়ে জোরপূর্বক অমানবিক পরিশ্রম করানো হতো অথবা স্রেফ বিনোদনের জন্য জনসমক্ষে তাদের হত্যা করা হতো। মানুষের এই নিষ্ঠুর অতীতকে চিরতরে কবর দেওয়ার জন্য ১৯৪৯ সালের তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন একটি সম্পূর্ণ নতুন আইনি কাঠামোর জন্ম দেয়। এই দলিলের মাধ্যমে বন্দি হওয়া সৈনিকদের যুদ্ধবন্দী (Prisoner of War) হিসেবে একটি বিশেষ এবং সম্মানজনক আইনি মর্যাদা প্রদান করা হয়। কনভেনশনটি খুব চমৎকার একটি দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দর্শনটি হলো, একজন সৈনিক তার দেশের হয়ে লড়াই করে কোনো অপরাধ করেনি। সে কেবল তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছে। তাকে বন্দি করার উদ্দেশ্য তাকে শাস্তি দেওয়া নয়। তাকে আটকে রাখার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সে যেন পুনরায় অস্ত্র হাতে রণক্ষেত্রে ফিরে যেতে না পারে। যুদ্ধবন্দিত্ব কোনো কারাগারের সাজা নয়, এটি মূলত একটি সাময়িক প্রশাসনিক আটকাদেশ।

যুদ্ধবন্দীদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, তার একটি অত্যন্ত বিস্তারিত নির্দেশিকা এই কনভেনশনে রয়েছে। বন্দিদের পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। বন্দিশিবিরগুলো কোনোভাবেই রণাঙ্গনের কাছাকাছি বা বিপজ্জনক কোনো এলাকায় স্থাপন করা যাবে না। জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। একজন যুদ্ধবন্দী কেবল তার নাম, পদবি, জন্মতারিখ এবং সামরিক সিরিয়াল নম্বর জানাতে বাধ্য। সামরিক কৌশল বা অন্য কোনো গোপন তথ্য আদায় করার জন্য বন্দির ওপর কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চালানো সম্পূর্ণ বেআইনি (Solis, 2010)। আধুনিক যুগে অনেক রাষ্ট্র এই নিয়মগুলো ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বন্দিদের মাসের পর মাস অন্ধকার ঘরে একাকী আটকে রেখে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এই ধরনের সব সূক্ষ্ম এবং মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বন্দিদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনো কাজই আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

যুদ্ধবন্দীদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি এক অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে। কনভেনশন অনুযায়ী রেড ক্রসের প্রতিনিধিরা যেকোনো সময় বন্দিশিবির পরিদর্শন করার অধিকার রাখেন। তারা বন্দিদের সাথে একান্তে কথা বলে তাদের অভাব অভিযোগ শোনেন। অনেক সময় রাষ্ট্রগুলো বাইরের দুনিয়ার কাছে বন্দিশিবিরের আসল চেহারা লুকাতে চায়। রেড ক্রসের নিরপেক্ষ উপস্থিতির কারণে সেই লুকোচুরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া বন্দিদের সাথে তাদের পরিবারের যোগাযোগের ব্যবস্থা করাও একটি বড় মানবিক কাজ। বন্দিরা রেড ক্রসের মাধ্যমে চিঠি লিখে পরিবারকে জানাতে পারেন যে তারা বেঁচে আছেন। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় পরাজিত সৈনিকদের টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে এনে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক বিবৃতি দেওয়ায় বা তাদের লাঞ্ছিত করে। জেনেভা কনভেনশন বন্দিদের জনসমক্ষের কৌতূহল এবং অপমান থেকে রক্ষা করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়। সংঘাত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বন্দিদের কোনো বিলম্ব ছাড়া নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা এই চুক্তির একটি অন্যতম প্রধান শর্ত।

চতুর্থ কনভেনশন: বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং মানবিক দায়িত্ব

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ধরনে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। আগের দিনের সংঘাতগুলো মূলত দুটি সামরিক বাহিনীর মধ্যে ময়দানে সীমাবদ্ধ থাকত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আকাশ থেকে বোমারু বিমান এসে ঘুমন্ত শহরের ওপর বোমা ফেলতে শুরু করল। আসল বলি হলো সাধারণ নিরীহ মানুষ। পরিকল্পিত গণহত্যা, শহর অবরুদ্ধ করে সাধারণ মানুষকে ভাতে মারা এবং নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো – এসব ঘটনা বিশ্ববিবেককে স্তব্ধ করে দেয়। যুদ্ধবাজদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর এই তীব্র তাগিদ থেকেই ১৯৪৯ সালে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন রচিত হয়। এই দলিলটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর একেবারে মূল ভিত্তি হলো পার্থক্যকরণের নীতি (Principle of Distinction)। যুদ্ধরত সামরিক বাহিনীকে প্রতিটি আক্রমণের আগে অবশ্যই সাধারণ মানুষ এবং যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে (Dinstein, 2016)। যারা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে না বা বেসামরিক নাগরিক, তাদের ওপর কোনো অবস্থাতেই ইচ্ছাকৃত আক্রমণ চালানো যাবে না।

এই কনভেনশনটি সামরিক দখলদারিত্ব বা অক্যুপেশনের ক্ষেত্রে কিছু অত্যন্ত কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। কোনো শক্তিশালী দেশের সেনাবাহিনী যখন দুর্বল দেশের কোনো এলাকা দখল করে নেয়, তখন সেই দখলদার বাহিনীর ওপর ওই এলাকার সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সব দায়িত্ব বর্তায়। দখলদার বাহিনী চাইলেই স্থানীয় মানুষের সহায়সম্বল লুটপাট করতে পারে না বা তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করতে পারে না। তাদের অবশ্যই ওই এলাকার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, পানীয় জল এবং ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দখলকৃত এলাকার স্কুল বা হাসপাতালগুলো সচল রাখার দায়িত্বও তাদের। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সামরিক বাহিনী কোনো এলাকায় প্রতিরোধের মুখে পড়লে পুরো গ্রামের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নেয়। চতুর্থ কনভেনশন এই ধরনের সম্মিলিত শাস্তি (Collective Punishment) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। কোনো একজন ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে শাস্তি দেওয়া একটি বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধ। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা বা জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত, আইন তাদের জন্য একটি বিশেষ সুরক্ষাবলয় তৈরি করে। শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের নিরাপত্তার বিষয়টি এই চুক্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় সামরিক কর্তারা যুক্তি দেখান যে, শত্রু বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ধ্বংস করতে গেলে আশপাশের কিছু সাধারণ মানুষ মারা যেতে পারে। আইন এই ক্ষেত্রে সমানুপাতিকতা (Proportionality)-এর নীতি প্রয়োগ করার নির্দেশ দেয়। আক্রমণের ফলে যে সামরিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তার তুলনায় সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি যেন অতিরিক্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হয়। যদি দেখা যায় যে একজন শত্রু কমান্ডারকে মারতে গিয়ে একটি পুরো আবাসিক ভবন ধসিয়ে দিতে হবে, তবে আন্তর্জাতিক আইন সেই আক্রমণকে অবৈধ ঘোষণা করে। সাধারণ মানুষের জীবনকে কেবল সাময়িক হিসাব-নিকাশের বলি করা যায় না।

অতিরিক্ত প্রটোকল এবং সমসাময়িক যুদ্ধবিধিতে এর প্রয়োগ

১৯৪৯ সালে জেনেভা কনভেনশনগুলো রচিত হওয়ার পর বিশ্ব পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। ষাট এবং সত্তরের দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই সংঘাতগুলো প্রথাগত লড়াইয়ের মতো ছিল না। এখানে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ চলত, আর যোদ্ধারা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকত। পুরোনো জেনেভা কনভেনশনগুলো এই নতুন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই ১৯৭৭ সালে দুটি নতুন চুক্তি প্রণয়ন করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের জগতে অতিরিক্ত প্রটোকল (Additional Protocols) নামে পরিচিত। প্রথম প্রটোকলটি আন্তর্জাতিক বা দুই দেশের মধ্যকার সশস্ত্র সংঘাতের নিয়মগুলোকে আরও যুগোপযোগী করে। এই প্রটোকলটি প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করার কথা বলে। শত্রুকে ভাতে মারার জন্য ফসলের ক্ষেত পুড়িয়ে দেওয়া, নদীর পানিতে বিষ মেশানো বা বাঁধ ধ্বংস করে বন্যা সৃষ্টি করাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য পরিবেশকে ধ্বংস করা মূলত পুরো মানবজাতিকে হুমকির মুখে ফেলার সমতুল্য।

দ্বিতীয় প্রটোকলটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। পৃথিবীর বেশিরভাগ সংঘাত এখন আর দুটি আলাদা দেশের মধ্যে হয় না। সংঘাতগুলো হয় একটি দেশের ভেতরে, সরকারি বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। একে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত (Non-International Armed Conflicts) বলা হয় (Cassese, 2008)। সরকারগুলো সাধারণত এই বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সব ধরনের আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে চায়। দ্বিতীয় প্রটোকলটি খুব স্পষ্ট করে বলে দেয় যে, লড়াই দেশের ভেতরে হলেও মানবিকতার কিছু ন্যূনতম নিয়ম উভয় পক্ষকেই মেনে চলতে হবে। সরকার বিদ্রোহ দমনের নামে নিজের দেশের সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করতে পারে না। বন্দি বিদ্রোহীদের নির্যাতন করা বা বিনাবিচারে হত্যা করাও এই প্রটোকলের আওতায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার দেশের প্রচলিত আইনে হতে পারে, কিন্তু সেই বিচারের আগে তাদের মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার কোনো অধিকার রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি।

সমসাময়িক বিশ্বে এই প্রটোকলগুলো প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে বিশাল সব চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। আধুনিক সময়ের সংঘাতগুলোকে তাত্ত্বিকরা অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare) বলে থাকেন। এক পক্ষের হাতে ড্রোন, স্যাটেলাইট এবং অত্যাধুনিক মিসাইল থাকে, আর অন্য পক্ষের হাতে থাকে কেবল সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র। এই অসমতার কারণে দুর্বল পক্ষ অনেক সময় আত্মঘাতী হামলার পথ বেছে নেয় এবং বেসামরিক নাগরিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর জন্য তখন পার্থক্যকরণের নীতি মেনে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তারা অনেক সময় সন্ত্রাস দমনের নামে এমন সব আক্রমণ চালায় যেখানে প্রচুর নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। ড্রোন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করা বা সাইবার হামলার মাধ্যমে শত্রু দেশের হাসপাতালের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়ার মতো আধুনিক কৌশলগুলো জেনেভা কনভেনশনের পুরোনো ধারাগুলোর সামনে নতুন আইনি প্রশ্ন তৈরি করেছে। আইনজ্ঞরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন এই নতুন প্রযুক্তি এবং কৌশলগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কঠোর কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসতে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের সংকট

জেনেভা কনভেনশন এবং এর প্রটোকলগুলো পড়লে মনে হতে পারে মানবজাতি বুঝি সংঘাতের ময়দানকেও পুরোপুরি শৃঙ্খলার ভেতরে নিয়ে এসেছে। বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্রগুলো এই আইনি দস্তাবেজগুলোর দিকে তাকালে নিছক উপহাসই করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সবচেয়ে বড় এবং রূঢ় সত্যটি হলো, এর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। কোনো দেশের পুলিশ বা আদালত যেমন দেশের ভেতরে সহজে অপরাধীকে ধরতে পারে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেমন কোনো বৈশ্বিক পুলিশ বাহিনী নেই। রাষ্ট্রগুলো জেনেভায় গিয়ে বড় বড় চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ঠিকই, কিন্তু ময়দানে তারা অনেক সময় সেই নিয়মগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। শক্তিশালী পরাশক্তিগুলো তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য অনেক সময় নিজেদের মিত্র দেশগুলোর ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোকে নির্লজ্জভাবে সমর্থন করে। আন্তর্জাতিক আইনের এই চরম অসহায়ত্ব সাধারণ মানুষের মনে ন্যায়বিচারের প্রতি এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে শুরু করে যুগোস্লাভিয়া এবং রুয়ান্ডারজন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো এর বড় প্রমাণ। একুশ শতকে এসে স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা হয়েছে। এই আদালতগুলো মূলত সর্বজনীন এখতিয়ার (Universal Jurisdiction)-এর ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে (Kalshoven & Zegveld, 2011)। এর অর্থ হলো যুদ্ধাপরাধীরা পুরো মানবজাতির শত্রু এবং পৃথিবীর যেকোনো দেশে তাদের বিচার হতে পারে। বড় সামরিক শক্তিগুলো এই আদালতের সদস্য হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা ভয় পায় যে তাদের নিজস্ব সৈন্য বা রাজনৈতিক নেতারা আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে থাকা স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেটো ক্ষমতার কারণে অনেক সময় স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের ঘটনাগুলোতেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। ক্ষমতার এই নোংরা রাজনীতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সবচেয়ে বড় বাধা।

সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের এত সংকটের পরও জেনেভা কনভেনশনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। এই কনভেনশনগুলো আমাদের একটি অভিন্ন মানবিক ভাষা দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে কোনো স্বৈরশাসক সাধারণ মানুষের ওপর বোমা ফেললে, আমরা অন্তত জেনেভা কনভেনশনের দোহাই দিয়ে বলতে পারি যে একটি অন্যায় সংঘটিত হয়েছে। এই আইনগুলো না থাকলে যুদ্ধবাজদের বিচারের দাবি তোলার কোনো নৈতিক বা আইনি ভিত্তিই আমাদের থাকত না। পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে রেড ক্রসের কর্মীরা এই কনভেনশনের নিয়মগুলো দেখিয়েই চেকপোস্ট পার হন এবং মুমূর্ষু মানুষের কাছে ওষুধ পৌঁছে দেন। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে এই আইনগুলো পড়ানো হয়, যা অনেক সৈনিককে যুদ্ধাপরাধ করা থেকে বিরত রাখে। জেনেভা কনভেনশন হয়তো পৃথিবীর সব সংঘাত থামাতে পারেনি বা সব নিরপরাধ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারেনি। এটি মূলত মানবসভ্যতার একটি নিরন্তর নৈতিক সংগ্রাম, যা চরম অন্ধকারের মাঝেও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা মানুষ এবং আমাদের মানবিকতার কিছু অমোঘ দায়বদ্ধতা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law)

মানবিক আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আইনি দর্শন

সংঘাত এবং ধ্বংসের ইতিহাস মানবসভ্যতার একদম আদিম কাল থেকে চলে আসছে। রাষ্ট্রগুলো যুগে যুগে নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বা ভূখণ্ডের সীমানা প্রসারিত করার জন্য অপরের ওপর অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে সংঘাতের ময়দানটি হলো এক ধরনের উন্মুক্ত বধ্যভূমি, যেখানে পেশিশক্তি এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া আর কোনো নিয়মকানুনের অস্তিত্ব নেই। এই ভুল ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আইন বিশারদরা এক সম্পূর্ণ নতুন আইনি দর্শনের জন্ম দিয়েছেন। মানবাধিকার আইনের একটি বিশেষ শাখা হলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law)। এটি কেবল যুদ্ধের সময় কার্যকর হয়। এর মূল লক্ষ্য দুটি: এক. যুদ্ধের পদ্ধতি এবং অস্ত্র ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং দুই. যারা যুদ্ধ করছে না, তাদের রক্ষা করা। এটি মূলত যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা কমানোর একটি আইনি চেষ্টা (Cassese, 2013)। এই আইনটি রাষ্ট্রগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একে অপরের প্রতি চরম শত্রুতার মুহূর্তেও কিছু নির্দিষ্ট মানবিক সীমারেখা অতিক্রম করা যায় না। রণাঙ্গনে গোলার শব্দ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মানুষের জন্মগত অধিকারগুলোর মৃত্যু ঘটে না। বরং সেই চরম সংকটের মুহূর্তে মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য একটি বিশেষ এবং কঠোর আইনি কাঠামোর প্রয়োজন হয়।

এই আইনি কাঠামোর পেছনে একটি খুব গভীর দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে। ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (The Social Contract)-এ প্রথম এই মানবিক দর্শনের একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। রুশোর মতে, সংঘাত মূলত দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার একটি রাজনৈতিক লড়াই, এটি কোনোভাবেই সাধারণ মানুষদের মধ্যকার ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়। একজন সৈনিক যতক্ষণ হাতে অস্ত্র নিয়ে রাষ্ট্রের হয়ে লড়ছে, ততক্ষণই সে কেবল প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তু। তার হাত থেকে অস্ত্র পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই সে তার সৈনিকের পরিচয় হারিয়ে পুনরায় একজন সাধারণ মানুষে পরিণত হয়। সেই নিরস্ত্র এবং অসহায় মানুষটিকে আঘাত করা বা হত্যা করা কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় অধিকারের পর্যায়ে পড়ে না। রুশোর এই চিন্তাটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনের একটি অলঙ্ঘনীয় নিয়মে পরিণত হয়। আইনটি মূলত সংঘাতের ভয়াবহতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর আটকে রাখার চেষ্টা করে। রাষ্ট্র হয়তো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে লড়াই করতে পারে, কিন্তু সেই লড়াইয়ের জন্য সাধারণ মানুষের জীবনকে অকারণে বিপন্ন করার কোনো অধিকার কোনো দেশের সরকারকে দেওয়া হয়নি।

আইনশাস্ত্রের গভীরে গেলে এই মানবিক আইনের কার্যকারিতার একটি খুব স্পষ্ট বিভাজন চোখে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন মূলত দুটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। প্রথম প্রশ্নটি হলো কোনো রাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তটি আইনিভাবে বৈধ কি না, যাকে তাত্ত্বিক ভাষায় জুস অ্যাড বেলাম (Jus ad bellum) বলা হয়। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো সংঘাত শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেই রণাঙ্গনে সৈনিকরা নিয়ম মেনে লড়ছে কি না, যাকে জুস ইন বেলো (Jus in Bello) বলা হয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মূলত এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়েই কাজ করে। কোনো একটি দেশ যদি সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে অন্য কোনো দেশে আক্রমণ চালায়, তবুও সেই আগ্রাসী দেশের সৈনিকদের মানবিক আইন মেনে চলতে হয়। আবার আক্রান্ত দেশের সৈনিকরাও আত্মরক্ষার দোহাই দিয়ে শত্রুপক্ষের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে বোমা ফেলতে পারে না। সংঘাতের কারণটি যতই ন্যায়সঙ্গত বা অন্যায় হোক না কেন, রণাঙ্গনের ভেতরের নিয়মগুলো উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এই নিখুঁত আইনি সমতাটি মূলত নিশ্চিত করে যে, চরম অরাজকতার মাঝেও মানবতা একেবারে হারিয়ে যায় না।

যুদ্ধ পরিচালনার নিয়ম এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা

সংঘাতের ময়দানে বিজয়ী হওয়ার জন্য যেকোনো পন্থাই বৈধ – এই পুরোনো এবং পাশবিক চিন্তাধারা থেকে বিশ্বকে বের করে আনার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯৯ এবং ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশনগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই চুক্তিগুলোকে একত্রে হেগ আইন (Hague Law) বলা হয়। এই আইনের মূল ফোকাস হলো সংঘাতের পদ্ধতি এবং অস্ত্র ব্যবহারের ওপর লাগাম পরানো। একটি দেশের সামরিক বাহিনী চাইলেই তাদের পছন্দমতো যেকোনো অস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুকে ধ্বংস করতে পারে না। অস্ত্রের ব্যবহার এমন হতে হবে যা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুকেই আঘাত করে। এমন কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না যা লক্ষ্যবস্তু এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারে না। এই সাধারণ নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক অস্ত্র, জীবাণু অস্ত্র এবং ক্লাস্টার বোমার মতো ভয়াবহ মারণাস্ত্রগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই অস্ত্রগুলো ব্যবহারের ফলাফল এতই বিধ্বংসী যে, এগুলো রণাঙ্গনের সীমানা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের লোকালয়ে বিপর্যয় ডেকে আনে।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই আইনি বাধ্যবাধকতার পেছনে একটি নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক মানদণ্ড কাজ করে। আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ ক্রিস্টোফার গ্রিনউড (Christopher Greenwood) তার আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, মানবিক আইনের একটি অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো অপ্রয়োজনীয় কষ্ট (Unnecessary Suffering) এড়িয়ে চলার নীতি (Greenwood, 2008)। একজন সৈনিকের মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রুপক্ষের সৈনিককে পরাস্ত করা বা যুদ্ধ করতে অক্ষম করে দেওয়া। শত্রুকে এমন কোনো অস্ত্রে আঘাত করা যাবে না যা তার শরীরে অকারণে দীর্ঘস্থায়ী এবং বীভৎস যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, এমন কোনো বুলেট ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পর বিস্ফোরিত হয়ে যায় বা বিষক্রিয়া তৈরি করে। লক্ষ্য অর্জনের জন্য যতটুকু বল প্রয়োগ করা প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই ব্যবহার করতে হবে। এর বেশি যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা আন্তর্জাতিক আইনের চোখে সরাসরি অপরাধ। রাষ্ট্রগুলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অস্ত্র আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকলেও, তাদের তৈরি করা প্রতিটি নতুন অস্ত্রকে এই আইনি মানদণ্ডের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে প্রতিনিয়ত এমন সব নতুন অস্ত্র তৈরি হচ্ছে, যার ব্যবহার নিয়ে পুরোনো আইনে হয়তো সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় আইনের এই নীরবতার সুযোগ নিয়ে নতুন মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে চায়। এই ফাঁকফোকর বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রক্ষাকবচ রয়েছে, যাকে মার্টেন্স ক্লজ (Martens Clause) বলা হয়। ১৮৯৯ সালের হেগ কনভেনশনে রাশিয়ার প্রতিনিধি ফ্রেডরিক ফন মার্টেন্স এই ধারাটি যুক্ত করেছিলেন। এই ধারার মূল কথা হলো, কোনো একটি নির্দিষ্ট অস্ত্রের বিষয়ে যদি আন্তর্জাতিক আইনে লিখিত কোনো নিষেধাজ্ঞা নাও থাকে, তবুও সেই অস্ত্রের ব্যবহার মানবতা এবং জনবিবেকের পরিপন্থী হতে পারবে না। এটি মূলত একটি আইনি সেফটি নেট বা নিরাপত্তা জালের মতো কাজ করে। রাষ্ট্র বলতে পারে না যে, যেহেতু লেজার অস্ত্র বা স্বয়ংক্রিয় রোবট নিয়ে আইনে কিছু বলা নেই, তাই আমরা এগুলো ইচ্ছেমতো ব্যবহার করব। বিশ্ববিবেক এবং মানবিকতার অলিখিত নিয়মগুলো যেকোনো নতুন প্রযুক্তি বা অস্ত্রের ব্যবহারের ওপর একটি স্বয়ংক্রিয় আইনি বাধা তৈরি করে দেয়।

যোদ্ধা এবং বেসামরিক নাগরিকের আইনি পার্থক্যকরণ

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পুরো ইমারতটি মূলত একটি মাত্র শক্তিশালী পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সংঘাতের ময়দানে কাকে আঘাত করা যাবে আর কাকে আঘাত করা যাবে না, তা নির্ধারণ করাই হলো এই আইনের সবচেয়ে বড় কাজ। এই নিয়মটিকে তাত্ত্বিক ভাষায় পার্থক্যকরণের নীতি (Principle of Distinction) বলা হয়। আইন খুব পরিষ্কারভাবে সংঘাতপূর্ণ এলাকার মানুষদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে। একদল হলো কমব্যাট্যান্ট বা যোদ্ধা, আর অন্যদল হলো সিভিলিয়ান বা বেসামরিক নাগরিক। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংঘাতের সময় শত্রুকে হত্যা করার এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার আইনি ছাড়পত্র দেওয়া থাকে। আন্তর্জাতিক আইন এই অধিকারটিকে যোদ্ধার অধিকার (Combatant Privilege) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একজন বৈধ যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে যা কিছুই করুক না কেন, সাধারণ হত্যা বা ভাঙচুরের দায়ে তাকে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার করা যায় না। শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়লে তাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে সম্মানজনক মর্যাদা দিতে হয়।

অন্যদিকে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যারা সরাসরি সংঘাতে অংশ নিচ্ছে না, তাদের ওপর কোনো অবস্থাতেই ইচ্ছাকৃত আক্রমণ চালানো যাবে না। সামরিক বাহিনীকে প্রতিটি অভিযানের আগে নিশ্চিত হতে হয় যে তাদের লক্ষ্যবস্তুটি একটি সামরিক স্থাপনা, কোনো আবাসিক ভবন বা স্কুল নয়। সন্দেহ হলে ধরে নিতে হবে যে ওই স্থাপনাটি একটি বেসামরিক জায়গা এবং সেখানে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ নিলস মেলজার (Nils Melzer) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই পার্থক্যকরণের নিয়মটি ঠিকমতো মেনে না চলার কারণেই আধুনিক সংঘাতগুলোতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার এত বেশি (Melzer, 2009)। সামরিক কমান্ডারদের অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কিন্তু আইন তাদের সেই তাড়াহুড়োর অজুহাতকে কোনোভাবেই ক্ষমা করে না। একটি লোকালয়ে যদি কয়েকজন যোদ্ধা লুকিয়েও থাকে, তবুও পুরো লোকালয়ের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা সামরিক বাহিনীর একটি আইনি দায়িত্ব।

সমস্যাটি চরম আকার ধারণ করে যখন সাধারণ মানুষ নিজেরাই হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। অনেক সময় দেশপ্রেমের টানে বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেসামরিক নাগরিকরা সরাসরি শত্রুর ওপর আক্রমণ করে বসে। আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এটি একটি অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি। একজন বেসামরিক মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজ বাড়িতে নিরস্ত্র অবস্থায় আছে, ততক্ষণ সে আইনি সুরক্ষা পাবে। সে যদি অস্ত্র হাতে নিয়ে শত্রুর দিকে গুলি ছোড়ে, তবে সেই মুহূর্ত থেকে সে তার বেসামরিক সুরক্ষাটি হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থাকে বলা হয় সরাসরি অংশগ্রহণ (Direct Participation in Hostilities)। অস্ত্র হাতে নেওয়ার কারণে শত্রুপক্ষ তাকে লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালাতে পারে। সবচেয়ে বিপদের বিষয় হলো, এই মানুষগুলো ধরা পড়লে যুদ্ধবন্দীর মর্যাদাও পায় না। রাষ্ট্র তাদের সাধারণ সন্ত্রাসী বা অপরাধী হিসেবে বিচার করতে পারে। একারণে আন্তর্জাতিক আইন সাধারণ মানুষকে সংঘাত থেকে দূরে থাকার জন্য প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। পার্থক্যকরণের এই সূক্ষ্ম সীমারেখাটি মূলত রণাঙ্গনের বিশৃঙ্খলার মাঝে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র আইনি ভরসা।

সামরিক প্রয়োজনীয়তা বনাম মানবিকতার ভারসাম্য

রণাঙ্গনের বাস্তব পরিস্থিতি আর আইনের বইয়ের পাতার মধ্যে সব সময় একটি বিস্তর ব্যবধান থাকে। একজন সামরিক কমান্ডারের কাঁধে তার দেশের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার বিশাল দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। তাকে প্রতিনিয়ত শত্রুর ঘাঁটিতে আক্রমণ করতে হয় এবং সামরিক দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থান দখল করতে হয়। এই লক্ষ্য অর্জনের তাগিদকে আইনের ভাষায় সামরিক প্রয়োজনীয়তা (Military Necessity) বলা হয়। অন্যদিকে তার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, যা তাকে নির্দেশ দেয় কোনো অবস্থাতেই সাধারণ মানুষের ক্ষতি করা যাবে না। একজন কমান্ডারকে তাই সব সময় এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী শক্তির মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। তিনি চাইলেই কেবল সামরিক সুবিধার কথা চিন্তা করে একটি জনবহুল বাজারে মিসাইল ছুড়তে পারেন না। সামরিক প্রয়োজনীয়তা কখনোই মানবিকতাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নেওয়ার লাইসেন্স হতে পারে না। এই ভারসাম্যটি রক্ষা করা সামরিক নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন এবং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা।

ভারসাম্য রক্ষার এই আইনি প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সমানুপাতিকতার নীতি (Principle of Proportionality)। সংঘাতের সময় অনেক সময় সামরিক লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছাকাছি সাধারণ মানুষের বসবাস থাকে। একটি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করতে গেলে আশপাশের কিছু বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা দেখা দেয়। আইন এই ধরনের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে না, বরং একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেয়। কমান্ডারকে আক্রমণের আগে হিসাব কষতে হয় যে, ওই আক্রমণ থেকে তিনি যে পরিমাণ সুনির্দিষ্ট সামরিক সুবিধা পাবেন, তার তুলনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হবে কি না। আইনি পণ্ডিত মাইকেল শ্মিট (Michael Schmitt) তার বিশ্লেষণে এই নীতিটির বাস্তব প্রয়োগের জটিলতাগুলো তুলে ধরেছেন (Schmitt, 2012)। একজন কমান্ডারকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে একজন শত্রু জেনারেলকে হত্যা করার জন্য একটি আবাসিক ভবন ধসিয়ে দেওয়াটা সমানুপাতিক হবে কি না। যদি সাধারণ মানুষের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে নিশ্চিত সামরিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ওই আক্রমণটি বাতিল করতে হয়।

আক্রমণের আগে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সামরিক বাহিনীকে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হয়। এগুলোকে বলা হয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা (Precautionary Measures)। আক্রমণকারী বাহিনীকে তাদের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হয়। সম্ভব হলে আক্রমণের আগে লোকালয়ের সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য আগাম সতর্কবার্তা দিতে হয়। অস্ত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। একটি ছোট লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য এমন কোনো বড় বোমা ব্যবহার করা যাবে না, যার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। একই সাথে আত্মরক্ষাকারী বাহিনীকেও সতর্ক থাকতে হয়। তারা সাধারণ মানুষের ভিড়ের মাঝে নিজেদের অস্ত্রাগার বা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারবে না। সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করাটা আন্তর্জাতিক আইনের চোখে একটি ঘৃণ্য অপরাধ। সতর্কতামূলক ব্যবস্থার এই নিয়মগুলো মূলত প্রমাণ করে যে, যুদ্ধজয়ের অঙ্কে সাধারণ মানুষের জীবনকে কেবল সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই।

সমসাময়িক সংঘাত এবং মানবিক আইনের প্রয়োগ সংকট

বিংশ শতাব্দীর বিশ্বযুদ্ধগুলোর পর সংঘাতের ধরন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আগে দুটি দেশের নিয়মিত সামরিক বাহিনী বিশাল কোনো প্রান্তরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়ত। এখনকার সংঘাতগুলো মূলত শহরের অলিগলিতে এবং আবাসিক এলাকার ভেতরে সংঘটিত হয়। এই নতুন ধরনের লড়াইকে শহুরে যুদ্ধ (Urban Warfare) বলা হয়। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যখন দুই পক্ষ ভারী অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন পার্থক্যকরণের নীতি বা সমানুপাতিকতার নীতিগুলো মেনে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। যোদ্ধারা সাধারণ মানুষের বাড়ির ভেতর থেকে গুলি ছোড়ে, আর পাল্টা আক্রমণে সেই সাধারণ মানুষের বাড়িটিই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এই ধরনের সংঘাতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। আধুনিক শহরগুলোর পানি, বিদ্যুৎ বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে হাজার হাজার মানুষ চরম অমানবিক অবস্থার মধ্যে পতিত হয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এই নতুন বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে কীভাবে রক্ষা করবে, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন আইনি কাঠামোর সন্ধান করছে।

সমসাময়িক সংঘাতগুলোর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর প্রবল উপস্থিতি। অনেক সময় দেশের ভেতরেই বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। এই গোষ্ঠীগুলোকে আইনের ভাষায় অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী (Non-State Armed Groups) বলা হয়। সমস্যা হলো, এই গোষ্ঠীগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তিতে সই করে না এবং তারা প্রচলিত যুদ্ধের নিয়মকানুন মানতেও খুব একটা আগ্রহী থাকে না। তারা অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, আত্মঘাতী হামলা চালায় এবং বন্দিদের ওপর নির্মম নির্যাতন করে। তাদের এই বেপরোয়া আচরণের কারণে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোও অনেক সময় আইন ভাঙার প্ররোচনা পায়। রাষ্ট্র তখন সন্ত্রাস দমনের নামে এমন সব কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। এই ধরনের অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare)-এ মূলত আইন পরিণত হয় উভয় পক্ষেরই খেলনায়। তারপরও আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ মার্কো সাসোলি (Marco Sassòli) মনে করেন, পরিস্থিতি যতই জটিল হোক না কেন, মানবিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড থেকে কোনো পক্ষেরই সরে আসার সুযোগ নেই (Sassòli, 2019)।

প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি সংঘাতের ময়দানে এক নতুন এবং অচেনা বিপদের জন্ম দিয়েছে। ড্রোন বা চালকবিহীন বিমান ব্যবহার করে এখন হাজার মাইল দূরে বসে নিরাপদ কক্ষে থেকে শত্রুর ওপর মিসাইল ছোড়া যায়। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা তৈরি করেছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা (Autonomous Weapons Systems) বা কিলার রোবট। এই অস্ত্রগুলো মানুষের কোনো নির্দেশ ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজেরাই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে এবং আক্রমণ চালায়। একটি রোবট কি কখনো বুঝতে পারবে যে তার সামনের মানুষটি একজন ভয়ংকর যোদ্ধা নাকি একজন নিরীহ কৃষক? একটি মেশিনের পক্ষে কি কখনো সমানুপাতিকতার মতো জটিল এবং মানবিক হিসাব কষা সম্ভব? আন্তর্জাতিক আইনের সামনে এটি এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। অনেক মানবাধিকার সংগঠন এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তুলছে। প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেলে রণাঙ্গনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

জবাবদিহিতা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া

আইনের বইয়ে যত সুন্দর কথাই লেখা থাকুক না কেন, যদি অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তবে সেই আইন মূল্যহীন হয়ে পড়ে। সংঘাতের ময়দানে মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুদ্ধাপরাধ (War Crimes) হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণ মানুষের ওপর ইচ্ছাকৃত আক্রমণ, যুদ্ধবন্দীদের নির্যাতন, বা হাসপাতালে বোমা ফেলার মতো কাজগুলো অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইনে এই অপরাধগুলোর জন্য সরাসরি ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বিধান রয়েছে। একজন সৈনিক কখনোই বলতে পারবে না যে সে কেবল ওপরওয়ালার নির্দেশ পালন করছিল। যদি নির্দেশটি সরাসরি বেআইনি বা অমানবিক হয়, তবে সেই নির্দেশ অমান্য করার আইনি অধিকার এবং নৈতিক দায়িত্ব একজন সৈনিকের রয়েছে। চোখ বন্ধ করে অপরাধমূলক নির্দেশ পালন করলে সেই সৈনিককেও আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আইনের এই কঠোর অবস্থানটি মূলত সামরিক কাঠামোর ভেতরে অন্ধ আনুগত্যের বদলে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার একটি চেষ্টা।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি তত্ত্ব হলো কমান্ডারের দায়বদ্ধতা (Command Responsibility)। একজন জেনারেল বা সামরিক নেতা যদি সরাসরি নিজে কোনো অপরাধ নাও করেন, কিন্তু তার অধীনস্থ সেনারা সাধারণ মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবুও সেই নেতাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। কমান্ডার যদি জানেন যে তার সেনারা অপরাধ করছে এবং তিনি তা থামানোর জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেন, তবে আইনের চোখে তিনি নিজেও একজন অপরাধী। এই নিয়মটি সামরিক নেতৃত্বের ওপর একটি বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। তাদের কেবল যুদ্ধ পরিচালনা করলেই চলে না, বাহিনীর ভেতরে কঠোর আইনি শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজটিও তাদেরই করতে হয়। বিখ্যাত আইনজ্ঞ উইলিয়াম শাবাস (William Schabas) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই কমান্ডারের দায়বদ্ধতার নীতিটি মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর একটি হাতিয়ার (Schabas, 2012)। ক্ষমতাশালীদের বিচার না হলে সাধারণ মানুষের মনে ন্যায়বিচারের প্রতি কোনো আস্থা থাকে না।

এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্থায়ী বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (International Criminal Court – ICC) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই আদালতটি বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার করে থাকে। যদিও বড় বড় অনেক পরাশক্তি এখনো এই আদালতের সদস্য হয়নি এবং তারা প্রতিনিয়ত এর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি বিশাল অর্জন। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির নোংরা হিসাব-নিকাশের কারণে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। কিন্তু একটি বৈশ্বিক আদালতের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত তাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার দম্ভ চিরস্থায়ী নয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন হয়তো পৃথিবীর সব সংঘাত থামাতে পারেনি, কিন্তু এটি একটি শক্তিশালী আইনি এবং নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করেছে। এই মানদণ্ডটি আমাদের শিখিয়েছে যে, যুদ্ধের অন্ধকারেও ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার মশালটি জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব।

মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes against Humanity)

আইনি ধারণার ঐতিহাসিক উন্মেষ ও নুরেমবার্গের প্রেক্ষাপট

সাধারণত খুন বা গুমের মতো ঘটনাগুলোকে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হয়। পুলিশের কাজ অপরাধীকে ধরা আর আদালতের কাজ বিচার করা। সমস্যা দেখা দেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জায়গায়। পুলিশ বা রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই খুনি হয়ে উঠলে সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার চাইবে? এই ভয়ংকর শূন্যস্থান থেকে আইনি জগতে একটি নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে। রাষ্ট্র তার নিজস্ব সীমানার ভেতরে নিজের নাগরিকদের ওপর যাই করুক না কেন, তা নিয়ে বাইরের কারো কথা বলার অধিকার নেই – এমন একটি শক্ত ধারণা শত শত বছর ধরে টিকে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ধারণাটি প্রবল ধাক্কা খায়। নাৎসি জার্মানি তাদের নিজেদের দেশের ইহুদি এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু নাগরিকদের ওপর যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা প্রচলিত কোনো আইনি কাঠামো দিয়ে বিচার করা সম্ভব ছিল না। কারণ সেই সময়ে প্রচলিত যুদ্ধের আইন বা যুদ্ধাপরাধের ধারণাগুলো কেবল এক দেশের সাথে অন্য দেশের সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নিজের দেশের মানুষের ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার মতো কোনো আন্তর্জাতিক আইন সেসময় ছিল না। মিত্রশক্তির বিজয়ী দেশগুলো বুঝতে পারে, এই অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। ফলে তারা একটি সম্পূর্ণ নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়।

এই উদ্যোগের চূড়ান্ত ফসল হলো ১৯৪৫ সালের নুরেমবার্গ ট্রায়াল (Nuremberg Trials)। এই বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ কথাটি আন্তর্জাতিক আইনে জায়গা করে নেয়। এই যুগান্তকারী আইনি ধারণার পেছনে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রেখেছিলেন পোলিশ-ব্রিটিশ আইনজ্ঞ হার্শ লাউটারপ্যাচ (Hersch Lauterpacht)। তিনি খুব জোরালো যুক্তি দাঁড় করান যে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের আড়ালে কোনো নেতাকে তার নিজের দেশের মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর আইনি ছাড়পত্র দেওয়া যায় না। লাউটারপ্যাচ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইন্টারন্যাশনাল ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (International Law and Human Rights)-এ দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইনের মূল কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্র নয়, বরং একক মানুষ (Lauterpacht, 1950)। একজন মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার যেকোনো রাষ্ট্রীয় সীমানার চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র। নুরেমবার্গের বিচারকরা এই দর্শনটি গ্রহণ করেন। তারা নাৎসি নেতাদের এই নতুন অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর মাধ্যমে মানব ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় আইনি বিচারের আওতায় আসে। এই বিচারটি প্রমাণ করে দেয়, দেশের ভেতরের কোনো চরম নিষ্ঠুরতা আর কেবল দেশের নিজস্ব ব্যাপার থাকে না, পুরো বিশ্ববিবেক সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে।

ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণের মনস্তত্ত্ব

একটি সাধারণ খুনের মামলা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। একজন ব্যক্তি রাগের মাথায় বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে আরেকজনকে হত্যা করলে সেটি সাধারণ অপরাধ। এই অপরাধকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেনে আনার কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো কাজকে আন্তর্জাতিক অপরাধের পর্যায়ে নিতে হলে তার একটি নির্দিষ্ট আইনি মাত্রা বা স্কেল থাকতে হয়। রোম সংবিধির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। সেখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, এই অপরাধগুলোকে অবশ্যই কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো একটি ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণ (Widespread or Systematic Attack)-এর অংশ হতে হবে। সহজ করে বললে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা হতে পারবে না। এখানে ব্যাপক বলতে মূলত বিপুল সংখ্যক ভুক্তভোগী এবং বিশাল ভৌগোলিক এলাকাকে বোঝানো হয়। একসাথে অনেকগুলো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া বা হাজার হাজার মানুষকে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা এর পরিষ্কার উদাহরণ। অন্যদিকে পরিকল্পিত কথাটি দিয়ে বোঝানো হয় যে আক্রমণটি অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে, একটি নির্দিষ্ট ছক মেনে করা হয়েছে। এটি কোনো দাঙ্গাকারীদের এলোপাতাড়ি হামলা নয়।

এই আইনি উপাদানটি মূলত অপরাধীদের কাজের ভয়াবহতাকে চিহ্নিত করে। প্রখ্যাত আইন বিশারদ এম চেরিফ বাসিওনি (M. Cherif Bassiouni) এই বিষয়ে তার দীর্ঘ গবেষণায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তার রচিত ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি ইন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ল (Crimes Against Humanity in International Criminal Law) বইতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এই অপরাধগুলো একটি বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় (Bassiouni, 2011)। অপরাধীদের মনে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে এবং তারা জানে যে তাদের কাজটি একটি বড় আক্রমণের অংশ। আইনের ভাষায় এই মানসিক অবস্থাকে মেনস রিয়া বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য বলা হয়। একজন সাধারণ সেনাসদস্য হয়তো কেবল কয়েকজন মানুষকে গুলি করেছে, কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে যে তার এই কাজ একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞের ক্ষুদ্র অংশ। এই মানসিক সম্পৃক্ততাই তার কাজটিকে সাধারণ হত্যা থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধে উন্নীত করে। এখানে আক্রমণের শিকার হয় মূলত সাধারণ বেসামরিক মানুষ। কোনো সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আক্রমণকে এই সংজ্ঞায় ফেলা যায় না।

ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণের এই শর্তটি মূলত আইনি কাঠামোর একটি বড় ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় নিজেদের বিচ্ছিন্ন কোনো পুলিশি বাড়াবাড়িকে আড়াল করার চেষ্টা করে। তারা দাবি করে, কয়েকজন বিপথগামী সদস্য ভুলবশত কিছু সাধারণ মানুষকে মেরে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক তদন্তকারীরা খুব সহজেই এই মিথ্যা দাবি ধরতে পারেন। তারা দেখেন হত্যাযজ্ঞের কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ধরন আছে কি না। নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীকে বেছে বেছে মারা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হয়। পাশাপাশি লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহের বিষয়টিও নজরে আনা হয়। হাজার হাজার মানুষকে ট্রাকে করে তুলে নেওয়া বা তাদের জন্য বিশেষ বন্দিশিবির তৈরি করা কোনো বিচ্ছিন্ন পুলিশি কাজ হতে পারে না। এর পেছনে বিশাল প্রস্তুতি এবং অর্থায়ন থাকে। এই প্রস্তুতি এবং আয়োজনের ভয়াবহ চিত্রটিই প্রমাণ করে যে আক্রমণটি পরিকল্পিত ছিল। ফলে রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার খুব সহজেই আন্তর্জাতিক আদালতের সামনে ধোপে টেকে না।

রাষ্ট্রীয় মদদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতির সমীকরণ

মানবতাবিরোধী অপরাধ কখনো একা একা করা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। আইনি কাঠামোর শর্ত অনুযায়ী, এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে একটি রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতি (State or Organizational Policy) থাকতে হয়। রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করে এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। একটি রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। সামাজিক চুক্তির এই মৌলিক শর্তটি ভেঙে রাষ্ট্র যখন নিজেই খাদক হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র থাকে, আইন থাকে এবং পুরো একটি প্রশাসন থাকে। এই বিশাল ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা খুব সহজেই যেকোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। এই রাষ্ট্রীয় মদদই অপরাধটিকে এত বেশি ভয়ংকর এবং অমানবিক করে তোলে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সিদ্ধান্ত নেন, আর মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী। প্রত্যেকেই যন্ত্রের মতো কাজ করে যায়, কেউ কোনো প্রশ্ন তোলে না।

আধুনিক বিশ্বে অবশ্য এই ধারণায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। শুধু রাষ্ট্রই নয়, অনেক সময় রাষ্ট্র নয় এমন কিছু শক্তিশালী সংগঠনও এই অপরাধ করতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী বা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর হাতেও অনেক সময় বিশাল এলাকা এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকে। তারা ওই এলাকায় নিজেদের মতো করে একটি সমান্তরাল প্রশাসন চালায়। এই সংগঠনগুলো যদি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে তাদের কাজকেও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আইনের এই সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি ছিল। কারণ অনেক দেশে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, পুরো দেশ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি থাকে। এই গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। এদের বিচার করার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতির শর্তটিকে কিছুটা শিথিল করে সাংগঠনিক নীতির আওতায় আনা হয়েছে। ফলে কোনো অপরাধীই আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে না।

এই নীতি প্রমাণের বিষয়টি আইনি বিচারে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কারণ কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনই লিখিতভাবে কোনো কাগজে সই করে গণহত্যা বা নির্যাতনের নির্দেশ দেয় না। তারা খুব সতর্কতার সাথে কাজ করে। আইনজ্ঞ উইলিয়াম শাবাস (William Schabas) তার অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (An Introduction to the International Criminal Court) বইতে এই নীতি প্রমাণের উপায়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Schabas, 2011)। তার মতে, কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও কাজের ধরন দেখেই এই নীতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। সরকারি বাহিনী যখন দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালায় এবং রাষ্ট্র তার কোনো বিচার করে না, তখন এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই একটি নীরব রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এই সব কিছু মিলে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতির অস্তিত্ব প্রমাণ করে। আন্তর্জাতিক আদালতগুলো এই পারিপার্শ্বিক প্রমাণগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে।

সুনির্দিষ্ট অপরাধের ধরন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা

রোম সংবিধির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের তালিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা বা খুন হলো সবচেয়ে পরিচিত অপরাধ। তবে এর বাইরেও এমন কিছু অপরাধ রয়েছে যা মানুষের অস্তিত্বকে চরমভাবে বিপন্ন করে তোলে। এর মধ্যে একটি হলো নিশ্চিহ্নকরণ (Extermination)। এটি সাধারণ হত্যার চেয়েও ভয়াবহ। এর অর্থ হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের জীবনধারণের পরিবেশ নষ্ট করে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। একটি নির্দিষ্ট এলাকার খাবার বা ওষুধের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া এর একটি বড় উদাহরণ। না খেয়ে বা বিনা চিকিৎসায় হাজার হাজার মানুষ যখন মারা যায়, তখন তা নিশ্চিহ্নকরণের পর্যায়ে পড়ে। পাশাপাশি রয়েছে জোরপূর্বক গুম (Enforced Disappearance)। রাষ্ট্র বা তার মদদপুষ্ট কোনো বাহিনী যখন কাউকে তুলে নিয়ে যায় এবং পরে তার অবস্থানের কথা অস্বীকার করে, তখন এই অপরাধটি সংঘটিত হয়। গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার দিনের পর দিন চরম মানসিক যন্ত্রণায় কাটায়, তারা জানেও না মানুষটি বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। এই অনিশ্চয়তা এক ধরনের চরম মানসিক নির্যাতন।

এই তালিকায় দাসত্ব (Enslavement) এবং জোরপূর্বক স্থানান্তরের মতো ভয়ংকর কাজগুলোও রয়েছে। সাধারণ মানুষকে তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দিয়ে ট্রাকে বা ট্রেনে তুলে অজানা কোনো জায়গায় ফেলে আসাকে ডিপোর্টেশন (Deportation) বা জোরপূর্বক স্থানান্তর বলা হয়। মানুষের শেকড় ছিন্ন করার এই প্রক্রিয়াটি চরম অমানবিক। নির্যাতনের বিষয়টি এই অপরাধের একটি বড় অংশ। পুলিশের সাধারণ মারধর আর আন্তর্জাতিক আইনের নির্যাতনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এখানে নির্যাতন বলতে বোঝায় রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারো ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তীব্র শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণা চাপিয়ে দেওয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালগুলোর কল্যাণে যৌন সহিংসতা এবং ধর্ষণ এখন আর কেবল যুদ্ধের ড্যামেজ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয় না। রুয়ান্ডাএবং যুগোস্লাভিয়ার বিচারে খুব স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ধর্ষণকে একটি সুনির্দিষ্ট অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ধরন।

আরেকটি বড় অপরাধ হলো নির্যাতনমূলক বৈষম্য (Persecution) রাজনৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয় বা লিঙ্গভিত্তিক কারণে কোনো গোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারগুলোকে ধারাবাহিকভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে কেড়ে নেওয়াকেই পারসিকিউশন বলা হয়। তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়। এর সবচেয়ে চরম রূপ হলো অ্যাপার্টহাইট (Apartheid) বা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ। দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে এই প্রথা চালু ছিল, যেখানে গায়ের রঙের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্য করা হতো। একটি গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে অবদমন করে রাখার জন্য রাষ্ট্র যখন তার পুরো আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে, তখন এই অপরাধ ঘটে। তালিকাভুক্ত এই প্রতিটি কাজই মূলত মানুষের বেঁচে থাকার সাধারণ অধিকার এবং সম্মানকে একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। এগুলো মানুষের পরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হানে এবং সমাজকে ভেতর থেকে টুকরো টুকরো করে ফেলে।

যুদ্ধ ও শান্তির বিভাজন বিলুপ্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো

প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বাধা ছিল। যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য একটি সশস্ত্র সংঘাতের অস্তিত্ব প্রমাণ করা অপরিহার্য। অনেক স্বৈরশাসক আছেন যারা দেশের ভেতরে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা না করেই নীরবে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেন। শান্তির সময়ে ঘটা এই ভয়াবহ অপরাধগুলোর বিচার করার জন্য যুদ্ধাপরাধের আইন কোনো কাজে আসত না। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে সরাসরি যুক্ত করে দেখা হয়েছিল। তখন মনে করা হতো, এই অপরাধগুলো কেবল যুদ্ধের সময়ই ঘটতে পারে। সময়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক আইনের এই পুরোনো ধারণাটি পুরোপুরি বদলে গেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারেন, মানুষের জীবন শান্তি এবং যুদ্ধের এই কৃত্রিম আইনি বিভাজনের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না।

কয়েক দশকের বিবর্তনের পর প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন এই অপরাধটিকে সংঘাতের শর্ত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে। ১৯৯৮ সালে গৃহীত রোম সংবিধি (Rome Statute) এই তাত্ত্বিক বিভাজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে। এই সংবিধিতে খুব স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধ যুদ্ধকালীন বা শান্তিকালীন যেকোনো সময়েই সংঘটিত হতে পারে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক অভাবনীয় অগ্রগতি। এর মানে দাঁড়ায়, কোনো রাষ্ট্রনায়ক আর এই অজুহাত দিতে পারবেন না যে দেশে কোনো যুদ্ধ চলছে না, তাই তিনি তার নাগরিকদের ওপর ইচ্ছেমতো বলপ্রয়োগ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক আইন শান্তিকালীন সময়েও রাষ্ট্রের আচরণের ওপর একটি কড়া নজরদারি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই আইনি পরিবর্তনটি স্বৈরাচারী সরকারগুলোর জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। তারা বুঝতে পারে যে, দেশের সীমানার ভেতরে বসে নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে পার পেয়ে যাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে।

আইনের এই রূপান্তর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের চিরাচরিত ধারণাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ আন্তোনিও কাসেস (Antonio Cassese) তার ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ল (International Criminal Law) গ্রন্থে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পর থেকে রাষ্ট্রগুলোর যে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের অহংকার ছিল, এই একটি আইনি ধারণা সেই অহংকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে (Cassese, 2013)। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি যৌথ আইনি এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা পুরো মানবজাতির রয়েছে। রাষ্ট্র যদি সেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা নিজেই ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে। এটি মূলত মানবতার স্বার্থে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সীমানাকে অতিক্রম করার একটি যুগান্তকারী আইনি প্রক্রিয়া।

জবাবদিহিতা এবং বৈশ্বিক বিচার ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ

খাতায়-কলমে এত সুন্দর আইন থাকার পরও বাস্তব পৃথিবীটা অনেক সময় অপরাধীদের পক্ষেই কাজ করে। মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো যারা করে, তারা সাধারণত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বসে থাকে। কোনো স্বৈরশাসক কখনোই নিজের পুলিশকে নির্দেশ দেন না নিজেকে গ্রেপ্তার করার জন্য। ফলে দেশের ভেতরের আদালতে এই ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিচার করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই কাঠামোগত অক্ষমতা দূর করার জন্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি বৈশ্বিক বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court – ICC) এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই আদালতটি স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের রাষ্ট্রপ্রধান বা সামরিক কর্মকর্তাকে অপরাধের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ক্ষমতা রাখে। এটি আন্তর্জাতিক বিচারের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী এবং নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান।

ক্ষমতাধর অপরাধীদের বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক আইনে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে, যাকে সার্বজনীন এখতিয়ার (Universal Jurisdiction) বলা হয়। সাধারণ নিয়মে কোনো দেশে অপরাধ হলে কেবল সেই দেশই তার বিচার করতে পারে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মাত্রা এতই ভয়াবহ যে, একে পুরো মানবজাতির বিরুদ্ধে করা অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। সার্বজনীন এখতিয়ারের ধারণাটি পৃথিবীর যেকোনো দেশকে অধিকার দেয় এই অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং বিচার করার, তা সেই অপরাধ যেখানেই ঘটুক না কেন বা অপরাধীর জাতীয়তা যাই হোক না কেন। ১৯৯৮ সালে স্পেনের এক বিচারকের নির্দেশে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিলির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশেটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এটি ছিল এই আইনি নীতির একটি ঐতিহাসিক প্রয়োগ। এই নীতিটি অপরাধীদের জন্য পুরো পৃথিবীটাকে একটি ছোট জায়গায় পরিণত করে। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর তারা আর অন্য কোনো দেশে গিয়ে নিরাপদে জীবন কাটাতে পারে না।

বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থা এখনো রাজনীতি এবং ক্ষমতার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় এই আদালতের কার্যক্রমে অসহযোগিতা করে। তারা নিজেদের মিত্রদের বাঁচানোর জন্য রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেয়। অনেক অপরাধীর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও তারা বিভিন্ন দেশে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। এই রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাগুলো সাধারণ মানুষের মনে আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা তৈরি করে। তারপরও এই আইনি কাঠামোটির গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। অন্ততপক্ষে অপরাধীদের একটি আইনি স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিচারের রায়গুলো ইতিহাসের পাতায় একটি স্থায়ী দলিল হয়ে থাকে। স্বৈরশাসকরা বুঝতে পারে যে, তাদের কাজের হিসাব একদিন না একদিন কাউকে দিতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই আইনি ধারণাটি মূলত নিরপরাধ মানুষের কান্নার শব্দকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় অনুবাদ করে, যা চিরকাল ন্যায়বিচারের জন্য একটি নৈতিক চাপ তৈরি করে রাখে।

প্রধান ‘অ্যাড-হক’ ট্রাইব্যুনাল এবং আদালত (Major ‘Ad-hoc’ Tribunals and Courts)

অস্থায়ী বিচার ব্যবস্থার জন্মকথা এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার ভিত্তি

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে বলে সমাজে একটি পুরোনো কথা চালু আছে। একজন সাধারণ মানুষ আরেকজনকে খুন করলে রাষ্ট্রের পুলিশ তাকে ধরে সোজা জেলে পোরে এবং প্রচলিত আদালতে তার বিচার হয়। হাজার হাজার মানুষ হত্যাকারী কোনো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কের ক্ষেত্রে এই সাধারণ নিয়মটি আর খাটে না। একটি রাষ্ট্র যখন নিজেই খুনি হয়ে ওঠে, তার নিজস্ব সীমানার ভেতরে থাকা সব আদালত এবং বিচারক মূলত সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। দেশের ভেতরের বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এই ভয়াবহ শূন্যস্থান পূরণের জন্যই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সংঘাত শেষ হওয়ার পর অপরাধীদের বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিছু বিশেষায়িত আদালত গঠন করে, যাকে আইনি ভাষায় অ্যাড-হক ট্রাইব্যুনাল (Ad-hoc Tribunal) বলা হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো স্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। সুনির্দিষ্ট কোনো সংঘাতের পর, একটি নির্দিষ্ট এলাকার এবং নির্দিষ্ট সময়ের অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্যই মূলত এগুলো তৈরি করা হয়। উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেলে এই আদালতগুলোর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে গুটিয়ে ফেলা হয়।

এই অস্থায়ী আদালতগুলো তৈরির পেছনে একটি খুব গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক দর্শন কাজ করে। সংঘাত শেষ হওয়ার পর সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি সমাজে অপরাধীদের যদি কোনো শাস্তি না হয়, তবে ভুক্তভোগীদের মনে ক্ষোভ জমতে থাকে এবং প্রতিশোধের স্পৃহা থেকে আবারও নতুন করে রক্তপাত শুরু হওয়ার শঙ্কা থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদ এবং আইনজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল সমাজে একটি স্থায়ী শান্তির বীজ বপন করা সম্ভব। এই ট্রাইব্যুনালগুলো মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি (Culture of Impunity) ভেঙে দেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা যেন বুঝতে পারেন যে, রাষ্ট্রীয় পদের আড়ালে লুকিয়ে তারা আজীবন পার পেয়ে যাবেন না। তাদের কাজের হিসাব নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে বিচারকরা এসে হাজির হবেন। এই ভীতিটুকু প্রতিষ্ঠা করা আন্তর্জাতিক আইনের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

আইনি কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই ট্রাইব্যুনালগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পুরোনো অনেক রীতিনীতিকে একেবারে শেকড় থেকে বদলে দিয়েছে। আগে ভাবা হতো আন্তর্জাতিক আইন কেবল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের নামে মামলা করতে পারে। কিন্তু এই অস্থায়ী ট্রাইব্যুনালগুলো প্রমাণ করে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইনে একক ব্যক্তিরও বিচার হতে পারে। একজন সেনাপ্রধান বা একজন মন্ত্রীকে তার নিজের করা অপরাধের জন্য সরাসরি আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। আইনি পরিভাষায় একে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতা (Individual Criminal Responsibility) বলা হয়। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে অস্থায়ী আদালতগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের যে দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে স্বৈরশাসকরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতেন, এই ট্রাইব্যুনালগুলো সেই দেয়ালে একটি বিশাল ফাটল ধরিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য যে রাষ্ট্রের চেয়েও বড়, এই বার্তাটি বারবার উচ্চারিত হতে থাকে।

নুরেমবার্গ এবং টোকিও ট্রায়াল: আইনি মাইলফলক নাকি বিজয়ীদের বিচার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থামার পর পুরো পৃথিবী এক ভয়াবহ মানসিক আঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। লাখ লাখ মানুষের লাশের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয়ী মিত্রশক্তি একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়। নাৎসি জার্মানির শীর্ষ নেতাদের কি বিনাবিচারে সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে, নাকি তাদের একটি নিয়মতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার করা হবে? দীর্ঘ আলোচনার পর মিত্রশক্তি একটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ১৯৪৫ সালে জন্ম নেয় ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল (International Military Tribunal), যা বিশ্বজুড়ে নুরেমবার্গ ট্রায়াল নামেই বেশি পরিচিত। এই বিচার প্রক্রিয়াটি ছিল মানব ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠন করে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধের মতো বিষয়গুলোর আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। অ্যান এবং জন তুসা তাদের গবেষণামূলক গ্রন্থ দ্য অ্যানাটমি অব দ্য নুরেমবার্গ ট্রায়ালস (The Anatomy of the Nuremberg Trials)-এ দেখিয়েছেন, এই বিচার কেবল কিছু মানুষের শাস্তির ব্যবস্থাই করেনি, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল আইনি প্রামাণ্য দলিল তৈরি করে রেখে গেছে (Tusa & Tusa, 1983)।

নুরেমবার্গের ঠিক পরপরই দূরপ্রাচ্যে জাপানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য টোকিও ট্রায়াল আয়োজন করা হয়। এই দুটি বিচার প্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এর আগে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সামরিক কর্তাকে এমনভাবে আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। বিচারকরা খুব স্পষ্টভাবে একটি নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেন যে, সরকারি নির্দেশের দোহাই দিয়ে কোনো বড় অপরাধ থেকে পার পাওয়া যাবে না। একজন সৈনিক যদি দেখে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশটি মানবতাবিরোধী, তবে সেই নির্দেশ অমান্য করার আইনি এবং নৈতিক দায়িত্ব তার রয়েছে। এই নীতিটি আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আজও পড়ানো হয়। অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই বলতে না পারে যে তারা কেবল রাষ্ট্রের আইন মেনে চলছিল, সেই পথটি নুরেমবার্গ ট্রায়াল চিরতরে বন্ধ করে দেয়। এই বিচার প্রক্রিয়া মানববিবেককে নাড়া দিয়েছিল এবং বিশ্বনেতাদের বাধ্য করেছিল মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে।

এই দুটি ঐতিহাসিক বিচারের একটি বড় সমালোচনাও রয়েছে, যা আইনশাস্ত্রে এখনো একটি তীব্র বিতর্কের বিষয়। অনেক আইনি পণ্ডিত এই বিচারগুলোকে বিজয়ীদের বিচার (Victor’s Justice) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, এই আদালতগুলোতে কেবল পরাজিত পক্ষের দেশগুলোর নেতাদেরই বিচার করা হয়েছিল। মিত্রশক্তির দেশগুলোও যুদ্ধে কম ধ্বংসযজ্ঞ চালায়নি। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা কিংবা ড্রেসডেনে সাধারণ মানুষের ওপর বোমাবর্ষণের মতো ঘটনাগুলোর জন্য মিত্রশক্তির কোনো নেতার বিচার হয়নি। আদালত গঠন করেছিল বিজয়ীরা এবং বিচারকও ছিলেন তাদেরই নিয়োগ দেওয়া ব্যক্তিরা। ফলে এই বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু থেকেই একটি বড় ধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকে যায়। এতসব আইনি এবং রাজনৈতিক ত্রুটি থাকার পরও এই বিচারগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এরা মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, সদিচ্ছা থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব। এই অস্থায়ী আদালতগুলোই পরবর্তী প্রজন্মের আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞদের জন্য একটি শক্ত পাটাতন তৈরি করে দিয়েছিল।

যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল এবং স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী আইনি কাঠামো

নুরেমবার্গের পর প্রায় পাঁচ দশক বিশ্ব রাজনীতি এক গভীর স্থবিরতার মধ্যে দিয়ে পার হয়। স্নায়ুযুদ্ধেরসেই দীর্ঘ সময়ে পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো বড় অপরাধের বিচার করা সম্ভব হয়নি। নব্বইয়ের দশকে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। বলকান অঞ্চলে সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার সময় এক ভয়াবহ জাতিগত সংঘাত শুরু হয়। ইউরোপের মাটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং পরিকল্পিত ধর্ষণ আর দেখা যায়নি। বিশ্ববিবেক আবারও নড়েচড়ে বসে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৯৩ সালে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে যুগোস্লাভিয়া বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Criminal Tribunal for the former Yugoslavia – ICTY) গঠন করে। এটি ছিল নুরেমবার্গের পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক আদালত এবং জাতিসংঘের তৈরি করা প্রথম সত্যিকারের অস্থায়ী ট্রাইব্যুনাল। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে এই আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

এই ট্রাইব্যুনালটির কাজ শুরু করার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রথমদিকে তাদের নিজস্ব কোনো বিচারক বা পূর্ণাঙ্গ অফিস ছিল না এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার জন্য তাদের হাতে কোনো পুলিশ বাহিনীও ছিল না। তাদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর। অনেক রাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয় দিয়ে রাখত এবং ট্রাইব্যুনালের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানাত। এতসব বাধা পেরিয়েও এই আদালত আইনি জগতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়। র‍্যাচেল কের তার দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফরমার যুগোস্লাভিয়া (The International Criminal Tribunal for the Former Yugoslavia) বইতে এই আদালতের সাফল্যের একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন (Kerr, 2004)। এই ট্রাইব্যুনালই প্রথম প্রমাণ করে যে, একটি আন্তর্জাতিক আদালত কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকেও বিচারের আওতায় আনতে পারে। সার্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচকে গ্রেপ্তার করে হেগে নিয়ে আসা হয়। ক্ষমতার সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকা একজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা ছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক অভাবনীয় বার্তা।

আইনি ব্যাখ্যার দিক থেকে এই ট্রাইব্যুনাল অনেক নতুন রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কমান্ডারের দায়বদ্ধতা (Command Responsibility) নীতির পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ। একজন সামরিক জেনারেল যদি সরাসরি কোনো হত্যা নাও করেন, কিন্তু তার বাহিনীর সৈন্যরা সাধারণ মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে সেই জেনারেলকেও সমান অপরাধী হিসেবে শাস্তি পেতে হবে। এই নীতিটি সামরিক নেতৃত্বের ওপর একটি বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি স্রেব্রেনিৎসার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলোকে এই আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়। যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল মূলত আন্তর্জাতিক আইনকে বইয়ের পাতা থেকে বের করে এনে বাস্তবের ময়দানে প্রয়োগ করার একটি সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তারা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সীমানা বা রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পথে চিরস্থায়ী কোনো বাধা হতে পারে না।

রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল এবং গণহত্যার বিচারের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা

যুগোস্লাভিয়ায় যখন যুদ্ধ চলছে, প্রায় একই সময়ে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় ঘটে যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস একটি ঘটনা। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় আট লাখ তুতসি এবং মধ্যপন্থী হুতু সম্প্রদায়ের মানুষকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই গণহত্যা ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। সেই ব্যর্থতার গ্লানি মোচনের জন্যই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আরেকটি বিশেষ আদালত গঠন করে, যার নাম রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Criminal Tribunal for Rwanda – ICTR)। তানজানিয়ার আরুশা শহরে এই আদালতের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। এটি ছিল আফ্রিকার মাটিতে হওয়া প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়া। এই ট্রাইব্যুনালটির কাঁধে একটি বিশাল দায়িত্ব ছিল। তাদের কেবল অপরাধীদের শাস্তি দিলেই হতো না, বরং রুয়ান্ডার ক্ষতবিক্ষত সমাজকে নতুন করে জোড়া লাগানোর জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার উদাহরণ তৈরি করতে হতো।

এই আদালতের সবচেয়ে বড় আইনি অবদান ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ধর্ষণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান। এর আগে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে ধর্ষণকে একটি স্বাধীন এবং সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিচার করা হয়নি। রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল তাদের একটি যুগান্তকারী রায়ে খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয় যে, ধর্ষণ কেবল যুদ্ধের একটি সাধারণ অনুষঙ্গ নয়। এটিকে সুনির্দিষ্টভাবে একটি সম্প্রদায়কে মানসিকভাবে ধ্বংস করার জন্য এবং গণহত্যার হাতিয়ার (Weapon of Genocide) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ উইলিয়াম শাবাস তার দ্য ইউএন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনালস (The UN International Criminal Tribunals) গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে এই একটিমাত্র রায় নারী অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের পুরো গতিপথ বদলে দিয়েছিল (Schabas, 2006)। এর ফলে পরবর্তী সময়ের সব সংঘাতের ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতাকে একটি ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করার শক্ত আইনি নজির তৈরি হয়।

গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও এই ট্রাইব্যুনাল একটি অসাধারণ আইনি সিদ্ধান্ত প্রদান করে। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় কিছু রেডিও স্টেশন থেকে অনবরত তুতসি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছিল এবং তাদের হত্যা করার জন্য সাধারণ মানুষকে উসকানি দেওয়া হচ্ছিল। ট্রাইব্যুনাল এই রেডিও স্টেশনের পরিচালকদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে। রায়ে বলা হয় যে, যারা সরাসরি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়নি কিন্তু প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে লাখ লাখ মানুষকে খুনে প্ররোচিত করেছে, তারাও গণহত্যার জন্য সমানভাবে দায়ী। এটি বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক এবং মিডিয়া মালিকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল। কথা বলার স্বাধীনতা কখনোই একটি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার উসকানি হতে পারে না। রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল মূলত এই ধরনের উসকানিমূলক বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech)-কে আন্তর্জাতিক অপরাধের কাতারে নিয়ে আসে। এই আদালতের রায়গুলো হাজার হাজার ভুক্তভোগীকে অন্তত এই সান্ত্বনাটুকু দিয়েছিল যে, তাদের কষ্টের কথাগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে।

হাইব্রিড আদালত বা মিশ্র বিচার ব্যবস্থা: স্থানীয় ও বৈশ্বিক আইনের সেতুবন্ধন

যুগোস্লাভিয়া এবং রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালগুলো আন্তর্জাতিক আইনে অনেক বড় অবদান রাখলেও এদের কাজের পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এই আদালতগুলো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বিচার প্রক্রিয়া ছিল খুব ধীরগতির। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এদের ভৌগোলিক অবস্থান। অপরাধগুলো ঘটেছিল রুয়ান্ডা বা বলকান অঞ্চলে, কিন্তু বিচার হচ্ছিল তানজানিয়া বা নেদারল্যান্ডসে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের পক্ষে হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে সেই বিচার প্রক্রিয়া দেখা বা তাতে অংশ নেওয়া সম্ভব ছিল না। মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, আন্তর্জাতিক বিচার মূলত পশ্চিমা দুনিয়ার একটি বিলাসবহুল আইনি প্রক্রিয়া, যার সাথে স্থানীয় মানুষের কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই। এই দূরত্ব কমানোর জন্য এবং বিচার ব্যবস্থাকে আরও বেশি বাস্তবমুখী করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি নতুন ধরনের আদালতের মডেল তৈরি করে। একে বলা হয় হাইব্রিড বা মিশ্র আদালত (Hybrid or Mixed Courts)। এই আদালতগুলো মূলত স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের একটি চমৎকার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

এই হাইব্রিড আদালতগুলোর একটি বড় উদাহরণ হলো সিয়েরা লিওনের বিশেষ আদালত। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে সিয়েরা লিওনে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে শিশু সৈন্যদের ব্যবহার এবং অঙ্গহানির মতো নৃশংস অপরাধ ঘটেছিল। জাতিসংঘের সহায়তায় সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনেই এই আদালত স্থাপন করা হয়। এই ধরনের বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল (Specialized Tribunals)-এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এদের বিচারক প্যানেলে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক – উভয় ধরনের বিচারকরা একসাথে বসেন। দেশের নিজস্ব আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনের সংমিশ্রণে বিচারকার্য পরিচালিত হয়। লরা ডিকিনসন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মিশ্র আদালতগুলো মূলত স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে (Dickinson, 2003)। আন্তর্জাতিক বিচারকরা যখন স্থানীয় বিচারকদের সাথে বসে কাজ করেন, তখন স্থানীয় আইনি কাঠামোতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডগুলো খুব সহজেই প্রবেশ করে। বিচার শেষ হয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয় বিচারকরা সেই অভিজ্ঞতা নিজেদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় কাজে লাগাতে পারেন।

কম্বোডিয়ায় খেমার রুজ নেতাদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল এবং লেবাননের বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোও এই হাইব্রিড মডেলের সফল উদাহরণ। এই আদালতগুলো সরাসরি সেই দেশেই স্থাপিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বিচারের খবর রাখতে পারে। ভুক্তভোগীরা খুব সহজেই আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে এবং অপরাধীদের চোখের সামনে শাস্তি পেতে দেখে তাদের মনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়। এটি সমাজে পুনর্মিলন বা রিকনসিলিয়েশনের পথকে অনেক বেশি সুগম করে তোলে। একটি দেশের ভেতরে বসে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ক্ষমতাধর অপরাধীদের বিচার করাটা স্থানীয় মানুষের মনে আইনের শাসনের প্রতি গভীর আস্থা তৈরি করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে, বিচার কেবল করলেই হয় না, বিচার যে হচ্ছে তা ভুক্তভোগীদের দেখাতেও হয়। হাইব্রিড আদালতগুলো মূলত আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে সাধারণ মানুষের অনেক বেশি কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি অত্যন্ত সফল প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল।

অস্থায়ী আদালত থেকে স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের উত্তরণ

এতগুলো অস্থায়ী ট্রাইব্যুনাল এবং হাইব্রিড আদালতের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি খুব পরিষ্কার বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রতিটি নতুন সংঘাতের পর নতুন করে একটি আদালত তৈরি করা, তার জন্য বিচারক নিয়োগ দেওয়া এবং আলাদা বাজেট পাস করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ক্লান্তিকর একটি প্রক্রিয়া। অনেক সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রাজনীতির কারণে নতুন আদালত গঠন করা সম্ভবও হয় না। বিশ্বনেতারা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করেন যে, বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের মনে ভয় তৈরি করার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানার প্রয়োজন। এই নিরন্তর দাবির মুখেই ১৯৯৮ সালে ইতালির রোম শহরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির নাম রোম সংবিধি এবং এর মাধ্যমেই জন্ম হয় বিশ্বের প্রথম স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court – ICC)-এর। এই ঘটনাটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের দীর্ঘ বিবর্তনের একটি চূড়ান্ত মুকুট।

নতুন এই স্থায়ী আদালতটি মূলত আগের সব অস্থায়ী ট্রাইব্যুনালগুলোর ফেলে যাওয়া ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। নুরেমবার্গ থেকে শুরু করে রুয়ান্ডা বা যুগোস্লাভিয়ার আদালতগুলো তাদের রায়ের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার যে আইনি সংজ্ঞাগুলো তৈরি করেছিল, রোম সংবিধি মূলত সেগুলোকেই একটি স্থায়ী এবং সুশৃঙ্খল আইনি কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসেছে। অস্থায়ী আদালতগুলো প্রমাণ করেছিল যে আন্তর্জাতিক বিচার করা সম্ভব। সেই আস্থার ওপর ভর করেই রাষ্ট্রগুলো একটি স্থায়ী আদালতের ধারণাকে মেনে নিতে রাজি হয়েছিল। এই উত্তরণটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক। এখন আর কোনো সংঘাতের পর বিচার হবে কি হবে না, তা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। স্থায়ী আদালতের প্রসিকিউটর চাইলে নিজেই তদন্ত শুরু করতে পারেন। এটি বিশ্বজুড়ে একটি স্বয়ংক্রিয় আইনি পাহারাদারের ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

অস্থায়ী ট্রাইব্যুনালগুলো তাদের কাজ শেষ করে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। তাদের অনেক সমালোচনা আছে, অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তারা হয়তো সব অপরাধীর বিচার করতে পারেনি বা পৃথিবীর সব সংঘাত থামাতে পারেনি। এদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, এরা মানবসভ্যতাকে একটি নতুন আইনি ভাষা শিখিয়েছে। এরা বিশ্বকে দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করার দিন শেষ হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বর্তমান যে শক্তিশালী অবস্থান, তা মূলত এই অস্থায়ী আদালতগুলোর দশকের পর দশক ধরে করা আইনি লড়াইয়েরই ফসল। এই ট্রাইব্যুনালগুলো না থাকলে আধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিশাল ইমারতটি কখনোই গড়ে উঠত না। সাময়িক সময়ের জন্য তৈরি হলেও মানবতা এবং ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

মানবিক হস্তক্ষেপ (Humanitarian Intervention)

মানবিক হস্তক্ষেপের তাত্ত্বিক ধারণা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সংকট

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একটি বহুল প্রচলিত এবং শক্তিশালী ধারণা হলো রাষ্ট্রীয় সীমানার অলঙ্ঘনীয়তা। সপ্তদশ শতাব্দীতে ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (State Sovereignty) নামের যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার মূল কথা ছিল খুব সোজা। একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে যা খুশি তাই করতে পারবে এবং বাইরের কোনো রাষ্ট্র সেখানে অনধিকার প্রবেশ করতে পারবে না। যুগের পর যুগ ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূলত এই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়ে এসেছে। সমস্যা হলো, এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে অনেক রাষ্ট্রনায়ক নিজেদের দেশের ভেতরেই একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন এবং ক্ষমতার দম্ভে সাধারণ মানুষের ওপর চরম অত্যাচার শুরু করেন। ধরা যাক, একটি রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা নিজের নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করছে, তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। এমন একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি কেবল সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে? এই নৈতিক এবং আইনি দ্বিধা থেকেই আন্তর্জাতিক আইনে একটি নতুন এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী ধারণার জন্ম হয়, যাকে মানবিক হস্তক্ষেপ (Humanitarian Intervention) বলা হয়। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ জে. এল. হোলজগ্রিফ (J. L. Holzgrefe) তার আলোচনায় এই ধারণার একটি চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন। তার মতে, অন্য একটি রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে থাকা সাধারণ নাগরিকদের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে, সেই রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়াই বলপ্রয়োগ করার পদ্ধতিই হলো মানবিক হস্তক্ষেপ (Holzgrefe, 2003)।

এই হস্তক্ষেপের ধারণাটি আন্তর্জাতিক আইনের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতির মধ্যে একটি সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার চিরাচরিত নিয়ম, অন্যদিকে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার সার্বজনীন অধিকার। মানবাধিকারের দর্শন বিশ্বাস করে যে মানুষের জীবন যেকোনো রাজনৈতিক সীমানার চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র। রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। কোনো সরকার যদি তার নাগরিকদের রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয় বা নিজেই খুনি হয়ে ওঠে, তবে সেই সরকারের আর সার্বভৌমত্ব দাবি করার কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি থাকে না। আইন বিশারদ শন মারফি (Sean Murphy) তার হিউম্যানিটারিয়ান ইন্টারভেনশন: দ্য ইউএন ইন অ্যান ইভলভিং ওয়ার্ল্ড অর্ডার (Humanitarian Intervention: The UN in an Evolving World Order) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, মানবাধিকারের এই সার্বজনীন রূপটি মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অহংকারকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে (Murphy, 1996)। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব মানে আর কেবল শাসন করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নয়, এর সাথে নাগরিকদের প্রতি একটি বিশাল দায়িত্ববোধও জড়িয়ে আছে। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার যৌক্তিক অধিকার রাখে।

তবে তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে এটি ততটাই জটিল এবং বিপজ্জনক। একটি দেশের ভেতরে অন্য দেশের সেনাবাহিনী ঢুকে পড়া মানেই সেখানে যুদ্ধ শুরু হওয়া। মানবিক কারণ দেখিয়ে আক্রমণ করলেও বোমা বা মিসাইলের আঘাতে সাধারণ মানুষ মারা যায়, দেশের অবকাঠামো ধ্বংস হয়। অনেক সময় একটি ছোট সংঘাত এই হস্তক্ষেপের ফলে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তাছাড়া, কোন পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ বলা হবে, তার কোনো সর্বজনসম্মত গাণিতিক মাপকাঠি আন্তর্জাতিক আইনে নেই। এক লাখ মানুষ মারা গেলে হস্তক্ষেপ করা হবে, নাকি দশ হাজার মানুষ মারা গেলেই করা যাবে – এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর পাওয়া যায় না। ফলে পুরো বিষয়টি মূলত বড় রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মানবিক হস্তক্ষেপ তাই আন্তর্জাতিক আইনের এমন একটি ধূসর এলাকা, যেখানে নৈতিকতার মোড়কে অনেক সময় পাশবিক শক্তির মহড়া চলে। মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো একটি মহৎ উদ্দেশ্য কীভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিতর্কিত হাতিয়ারে পরিণত হয়, মানবিক হস্তক্ষেপ মূলত তারই একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

জাতিসংঘ সনদের আইনি কাঠামো এবং বলপ্রয়োগের নিয়ম

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ময়দান থেকে গায়ের জোর বা পেশিশক্তির ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করার জন্য ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ তৈরি করা হয়েছিল। এই সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা (Prohibition of the Use of Force) আরোপ করা হয়েছে। এখানে বলা আছে, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে না। এই অনুচ্ছেদটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি অলঙ্ঘনীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। সনদ প্রণেতারা মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রগুলোর একে অপরের ওপর আক্রমণ করার পথটি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাত্ত্বিকভাবে মানবিক হস্তক্ষেপের কোনো আইনি বৈধতা জাতিসংঘের মূল সনদে সরাসরি খুঁজে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রগুলো চাইলেই মানবিকতার দোহাই দিয়ে অন্য দেশের সীমানা অতিক্রম করতে পারে না, কারণ সেটি সরাসরি ২(৪) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে।

তবে জাতিসংঘ সনদ রাষ্ট্রগুলোকে একেবারে হাত-পা বেঁধে রাখেনি। বলপ্রয়োগের এই কঠোর নিয়মের মাত্র দুটি আইনি ব্যতিক্রম সনদে রাখা হয়েছে। প্রথমটি হলো ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে আত্মরক্ষা (Self-defense)-এর অধিকার, যা কোনো রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে প্রয়োগ করতে পারে। আর দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমটি রয়েছে সনদের সপ্তম অধ্যায়ে। এই অধ্যায় অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি কোনো হুমকি তৈরি হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ চাইলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন (Security Council Authorization) সাপেক্ষে সামরিক বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিতে পারে। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হলে সেটি আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকি কি না, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক ছিল। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নিরাপত্তা পরিষদ এই ধারণার একটি নতুন এবং বিস্তৃত আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। আইনজ্ঞ থমাস ফ্র্যাঙ্ক (Thomas Franck) দেখিয়েছেন কীভাবে নিরাপত্তা পরিষদ দেশের ভেতরের বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় বা ব্যাপক শরণার্থী সংকটকে আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতি হুমকি (Threat to International Peace) হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে (Franck, 2002)। এই ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করেই মূলত নিরাপত্তা পরিষদ বিভিন্ন দেশে মানবিক হস্তক্ষেপের আইনি বৈধতা প্রদান করে।

এই আইনি কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নিরাপত্তা পরিষদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র। নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের হাতে রয়েছে কুখ্যাত ভেটো ক্ষমতা। এর অর্থ হলো, এই পাঁচটি দেশের যেকোনো একটি যদি কোনো সামরিক হস্তক্ষেপে অসম্মতি জানায়, তবে পুরো জাতিসংঘ স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো একটি দেশে ভয়াবহ গণহত্যা চলছে, কিন্তু সেই দেশের সরকার নিরাপত্তা পরিষদের কোনো একটি স্থায়ী সদস্যের খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে সেই মিত্র রাষ্ট্রটি ভেটো প্রয়োগ করে জাতিসংঘের যেকোনো ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপ আটকে দেয়। আইনের চোখে এটি একটি মারাত্মক কাঠামোগত ত্রুটি। জাতিসংঘের এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হয়। মানবিক হস্তক্ষেপের আইনি ভিত্তি তাই কেবল সনদের কালো অক্ষরের ওপর নির্ভর করে না, এটি মূলত পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর জিম্মি হয়ে থাকে। আইন এখানে মানবিকতার সেবক না হয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়।

নৈতিকতার বনাম ভূ-রাজনীতি: হস্তক্ষেপের পেছনের আসল উদ্দেশ্য

মানবিক হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গাটি হলো এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য বা মোটিভ। একটি রাষ্ট্র যখন কোটি কোটি ডলার খরচ করে এবং নিজেদের সৈনিকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য একটি দেশে মানুষ বাঁচাতে যায়, তখন সেই মহত্ত্বের আড়ালে আসলেই কি কেবল মানবিকতা কাজ করে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা, বিশেষ করে যারা বাস্তববাদ (Realism) দর্শনে বিশ্বাস করেন, তারা এই মহত্ত্বকে চরম সন্দেহের চোখে দেখেন। বাস্তববাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো মূলত তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ (National Interest) দ্বারা পরিচালিত হয়। কোনো রাষ্ট্রই নিছক দয়াপরবশ হয়ে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যায় না। বড় বড় পরাশক্তিগুলো যখন কোনো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তখন তারা প্রকাশ্যে মানবাধিকার রক্ষার কথা খুব জোরালোভাবে প্রচার করে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, সেই হস্তক্ষেপের পেছনে ওই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা বা নিজেদের পছন্দমতো একটি পুতুল সরকার বসানোর মতো গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে।

এই দ্বিমুখী আচরণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় পরাশক্তিগুলোর বেছে বেছে হস্তক্ষেপ করার নীতির দিকে তাকালে। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সিলেক্টিভ ইন্টারভেনশন বলা হয়। বিশ্বজুড়ে অনেক দেশেই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে, কিন্তু বড় রাষ্ট্রগুলো সব জায়গায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে না। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ কোনো দেশে যদি সামান্য রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে সেখানে গণতন্ত্রএবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য খুব দ্রুত যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়। অন্যদিকে আফ্রিকার কোনো দরিদ্র দেশে যদি বছরের পর বছর ধরে ভয়াবহ গণহত্যা চলতে থাকে, তবে সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) তার দ্য নিউ মিলিটারি হিউম্যানিজম (The New Military Humanism) বইতে এই পশ্চিমা কপটতার তীব্র সমালোচনা করেছেন (Chomsky, 1999)। তিনি জোরালো যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, মানবাধিকারের এই বুলিগুলো মূলত পরাশক্তিগুলোর নয়া-সাম্রাজ্যবাদ (Neo-imperialism)-কে বৈধতা দেওয়ার একটি আধুনিক এবং পরিশীলিত হাতিয়ার মাত্র। তারা নিজেদের পছন্দমতো দেশগুলোতে আক্রমণ চালানোর জন্য মানবিক হস্তক্ষেপের লেবেলটি খুব সুকৌশলে ব্যবহার করে।

এই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণেই হস্তক্ষেপকারী রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় সংঘাতের মূল সমস্যা সমাধানের চেয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে বেশি মনোযোগ দেয়। তারা হয়তো অত্যাচারী শাসককে সরিয়ে দেয়, কিন্তু দেশটিতে একটি টেকসই শান্তি বা গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করার কোনো দায়িত্ব নেয় না। ফলে হস্তক্ষেপের পর দেশটি অনেক ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে পতিত হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষক অ্যালেক্স বেলামি (Alex Bellamy) মনে করেন, হস্তক্ষেপে অংশ নেওয়া রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্য যদি সম্পূর্ণ মিশ্রও হয়, তারপরও যদি তারা একটি বড় গণহত্যা থামাতে পারে, তবে তাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয় (Bellamy, 2009)। কিন্তু মুশকিল হলো, শক্তির এই অপব্যবহার এতই বেশি ঘটে যে, সাধারণ মানুষ এখন আর পশ্চিমা দেশগুলোর এই ‘মানবিকতার’ দাবিকে বিশ্বাস করতে চায় না। নৈতিকতার এই ঢাল ব্যবহার করে অনেক নিরীহ দেশের সার্বভৌমত্বকে যেভাবে পদদলিত করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি বড় ধরনের কলঙ্ক হিসেবেই থেকে যাবে।

নব্বইয়ের দশকের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং রুয়ান্ডার ব্যর্থতা

স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার শেষ হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ভেটোর স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে এসে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকটাকে মানবিক হস্তক্ষেপের একটি স্বর্ণযুগ হিসেবে অনেকেই আখ্যায়িত করেছিলেন। ১৯৯১ সালে উত্তর ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে কুর্দিদের বাঁচানোর জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল বা সেফ হেভেন তৈরি করা হয়েছিল। এরপর ১৯৯২ সালে সোমালিয়ায় দেখা দেয় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং গৃহযুদ্ধ। সেখানে সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সামরিক বলপ্রয়োগের অনুমোদন দেয়, যা ইতিহাসে সোমালিয়া সংকট (Somalia Crisis) নামে পরিচিত। এই ঘটনাগুলো বিশ্ববাসীকে একটি বার্তা দিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন আর কোনো স্বৈরশাসককে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার করতে দেবে না। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ধারণাটি যেন হঠাৎ করেই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছিল।

কিন্তু এই আশার আলো খুব দ্রুতই নিভে যায় ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। রুয়ান্ডায় যখন মাত্র তিন মাসের মধ্যে আট লাখের বেশি তুতসি এবং মধ্যপন্থী হুতু মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন পুরো বিশ্ব একটি নীরব এবং নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। রুয়ান্ডায় জাতিসংঘের একটি শান্তিরক্ষী বাহিনী আগে থেকেই মোতায়েন ছিল। সেই বাহিনীর কানাডিয়ান কমান্ডার জেনারেল রোমিও ডালেয়ার (Roméo Dallaire) বারবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে সেখানে একটি পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি কেবল কিছু বাড়তি সৈন্য এবং বলপ্রয়োগের অনুমতি চেয়েছিলেন। তার লেখা বিখ্যাত স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ শেক হ্যান্ডস উইথ দ্য ডেভিল (Shake Hands with the Devil)-এ তিনি অত্যন্ত বেদনার সাথে বর্ণনা করেছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার সেই আকুল আবেদনগুলো দিনের পর দিন উপেক্ষা করেছিল (Dallaire, 2003)। আমেরিকা এবং ইউরোপের বড় বড় দেশগুলো সোমালিয়ার ব্যর্থতার পর আফ্রিকার কোনো দেশে নিজেদের সৈন্য পাঠাতে একেবারেই রাজি ছিল না। তারা রুয়ান্ডার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে নিছক একটি উপজাতীয় দাঙ্গা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

রুয়ান্ডার এই ঘটনাটি মূলত আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তা (International Inaction)-এর সবচেয়ে ভয়াবহ এবং লজ্জাজনক উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে দেয় যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সব মানুষের রক্তের দাম সমান নয়। পরাশক্তিগুলোর যদি কোনো ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ না থাকে, তবে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুও তাদের বিচলিত করতে পারে না। রুয়ান্ডায় মানবিক হস্তক্ষেপ না করার এই সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক আইনের কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না, এটি ছিল বিশ্বনেতাদের ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক ব্যর্থতা। এই গণহত্যা বিশ্ববিবেককে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে, এরপর থেকে জাতিসংঘের যেকোনো মানবাধিকার আলোচনায় রুয়ান্ডার নাম একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে উচ্চারিত হয়। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, কেবল আইনের বইয়ে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা থাকলেই হয় না, সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য যে নৈতিক সাহস এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় তার চরম অভাব রয়েছে।

একপাক্ষিক হস্তক্ষেপ এবং কসোভো সংকটের আইনি বিতর্ক

মানবিক হস্তক্ষেপের আলোচনায় সবচেয়ে জটিল আইনি প্রশ্নটি দেখা দেয় তখন, যখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। ভেটোর কারণে নিরাপত্তা পরিষদ যদি স্থবির হয়ে থাকে, তবে কোনো রাষ্ট্র বা জোট কি নিজেদের উদ্যোগে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে? এই পদ্ধতিটিকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় একপাক্ষিক হস্তক্ষেপ (Unilateral Intervention) বলা হয়। ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার প্রদেশ কসোভোতে ঠিক এই পরিস্থিতিটি তৈরি হয়েছিলসার্বিয়ার তৎকালীন সরকার কসোভোর আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ওপর ব্যাপক জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু করে। লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চেষ্টা করলেও, নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া এবং চীনের ভেটোর হুমকির কারণে জাতিসংঘের তরফ থেকে কোনো সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই অচলাবস্থার মুখে ন্যাটো (NATO) জোট কোনো ধরনের জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই সার্বিয়ার ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে।

ন্যাটোর এই আক্রমণটি আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্রে একটি বিশাল এবং দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো দেশের ওপর সামরিক হামলা করাটা জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। সেই দিক থেকে বিচার করলে ন্যাটোর এই কাজটি ছিল পুরোপুরি বেআইনি। কিন্তু অন্যদিকে, তারা যদি আক্রমণ না করত, তবে কসোভোতে লাখ লাখ মানুষ হয়তো গণহত্যার শিকার হতো। এই আইনি এবং নৈতিক সংকট সমাধানের জন্য পরবর্তীতে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন তাদের রিপোর্টে একটি অত্যন্ত চমৎকার কিন্তু বিতর্কিত শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে। তারা বলে যে ন্যাটোর এই হস্তক্ষেপটি আইনি দিক থেকে ‘অবৈধ’, কিন্তু নৈতিক দিক থেকে এটি ছিল ‘বৈধ’ বা লেজিটিমেট। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ আন্তোনিও কাসেস (Antonio Cassese) এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন (Cassese, 1999)। তিনি দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক আইন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে মানবাধিকার রক্ষা এবং বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একটি সরাসরি সংঘাত তৈরি হয়েছে, যার কোনো সহজ আইনি সমাধান নেই।

কসোভো সংকটের এই ‘অবৈধ কিন্তু বৈধ’ ধারণাটি বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে। এটি মূলত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের বাইরে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো যুদ্ধ শুরু করার একটি অঘোষিত লাইসেন্স দিয়ে দেয়। যদি নিয়ম করে দেওয়া হয় যে নৈতিকতার দোহাই দিয়ে আইন ভাঙা যাবে, তবে আইনের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। পরবর্তীতে এই একই যুক্তির অপব্যবহার করে অনেক পরাশক্তি বিভিন্ন দেশে আক্রমণ চালিয়েছে এবং মানবিকতার নাম ভাঙিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করেছে। একপাক্ষিক হস্তক্ষেপ মূলত আন্তর্জাতিক আইনের একটি বড় ধরনের পরাজয়। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যবস্থা এখনো এমন কোনো নিরপেক্ষ এবং কার্যকরী প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেনি, যা পরাশক্তিগুলোর মুখাপেক্ষী না হয়ে স্বাধীনভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করতে পারে। কসোভো সংকট তাই আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

মানবিক হস্তক্ষেপ নিয়ে নব্বইয়ের দশকের এই বিশাল বিতর্কগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারে যে ‘হস্তক্ষেপ’ শব্দটি নিজেই অনেক বেশি নেতিবাচক এবং আগ্রাসী। এটি শুনলেই মনে হয় একটি শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। এই তাত্ত্বিক সংকট দূর করার জন্য ২০০১ সালে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণার প্রস্তাব করে, যা ‘সুরক্ষার দায়িত্ব’ বা রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট নামে পরিচিতি পায়। এই নতুন ধারণাটি বিতর্কের মোড়কে পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়। আগে যেখানে বড় রাষ্ট্রগুলোর অন্য দেশে হস্তক্ষেপ করার ‘অধিকার’ নিয়ে আলোচনা হতো, সেখানে এখন প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকদের রক্ষা করার ‘দায়িত্ব’-এর ওপর জোর দেওয়া হয়। এটি মূলত মানবিক হস্তক্ষেপের একটি পরিশীলিত এবং অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য রূপ, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে খর্ব না করে বরং তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।

ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় মানবিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা একেবারে ফুরিয়ে যাবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীতে যতদিন ক্ষমতাধর স্বৈরশাসক থাকবে এবং জাতিগত বিদ্বেষ থাকবে, ততদিন নিরীহ মানুষের ওপর নিপীড়ন চলতেই থাকবে। আসল চ্যালেঞ্জটি হলো এই সামরিক বলপ্রয়োগের প্রক্রিয়াটিকে কীভাবে পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে রাখা যায়। গবেষক নিকোলাস হুইলার (Nicholas Wheeler) তার বিখ্যাত গ্রন্থ সেভিং স্ট্রেঞ্জারস: হিউম্যানিটারিয়ান ইন্টারভেনশন ইন ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি (Saving Strangers: Humanitarian Intervention in International Society)-এ একটি অত্যন্ত আশাবাদী চিত্র তুলে ধরেছেন (Wheeler, 2000)। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সমাজ ধীরে ধীরে এমন একটি নৈতিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করাটা রাষ্ট্রগুলোর একটি অভিন্ন দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। হুইলার জোর দিয়ে বলেন যে, হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সেগুলো কেবল মানবতা রক্ষার সেই একটিমাত্র উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হতে হবে।

পরিশেষে, মানবিক হস্তক্ষেপ মূলত আমাদের বিশ্ববিবেকের সামনে একটি বড় আয়না তুলে ধরে। যখন আমরা টেলিভিশনের পর্দায় বা খবরের কাগজে দেখি যে সিরিয়া, মিয়ানমার বা অন্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদে একটি শিশু বোমার আঘাতে ছটফট করছে, অথবা কিছু নিরীহ মানুষ কেবল একটু আশ্রয়ের আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করছে, তখন এই তথাকথিত সভ্যতার সব আইনি কাঠামো আমাদের কাছে অত্যন্ত অসহায় মনে হয়। আমরা বুঝতে পারি যে জাতিসংঘ বা বড় বড় আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো ক্ষমতাশালীদের ভেটোর কাছে কতটা জিম্মি। এই জিম্মিদশা থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। মানবিক হস্তক্ষেপ যেন কখনো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেদিকে সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক আদালতগুলোকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। মানুষের জীবন বাঁচানোর এই নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোভাবেই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না, তবে সেই বাঁচার পথটি যেন ন্যায়ভিত্তিক হয়, তা নিশ্চিত করাটাই এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সুরক্ষার দায়িত্ব (Responsibility to Protect – R2P)

মানবিক হস্তক্ষেপের সংকট এবং নতুন চিন্তার উন্মেষ

নব্বইয়ের দশকের বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে বেশ হতাশ হতে হয়। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবাই ভেবেছিল পৃথিবীতে বোধ হয় এবার একটি স্থায়ী শান্তির সুবাতাস বইবে। বাস্তবে ঘটল উল্টো ঘটনা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে, বিশেষ করে রুয়ান্ডাএবং বলকান অঞ্চলে, এমন সব ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো যা বিশ্ববিবেককে একেবারে হতবাক করে দেয়। রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের রক্ষা করার বদলে নিজেই তাদের ওপর বুলেটের বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করল। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। অন্য কোনো স্বাধীন দেশের সীমানার ভেতরে ঢুকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর অধিকার কি বাইরের কোনো রাষ্ট্রের আছে? এই প্রশ্ন থেকেই মূলত মানবিক হস্তক্ষেপ (Humanitarian Intervention) নামের একটি চরম বিতর্কিত ধারণার জন্ম হয়েছিল। বিতর্কের মূল কারণ ছিল, পশ্চিমা শক্তিশালী দেশগুলো এই মানবিকতার দোহাই দিয়ে প্রায়শই নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করত। তারা দুর্বল দেশগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে বলত যে তারা মানুষ বাঁচাতে এসেছে, কিন্তু এর আড়ালে থাকত তেল, গ্যাস বা সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার গোপন বাসনা। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই হস্তক্ষেপের ধারণাকে চরম সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। তাদের কাছে এটি ছিল এক ধরনের নতুন সাম্রাজ্যবাদ।

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান বিশ্বনেতাদের সামনে একটি খুব কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানবিক হস্তক্ষেপ যদি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর একটি অগ্রহণযোগ্য আঘাত হয়, তবে রুয়ান্ডা বা স্রেব্রেনিৎসার মতো ভয়াবহ গণহত্যার ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? আমরা কি কেবল আইনের বই বুকে জড়িয়ে ধরে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু চেয়ে চেয়ে দেখব? এই একটি প্রশ্ন আন্তর্জাতিক কূটনীতির হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে দেয় (Annan, 2000)। বিশ্বনেতারা বুঝতে পারেন, পুরোনো ধারণায় আটকে থাকলে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা যাবে না। ঠিক এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্যই ২০০০ সালে কানাডা সরকারের উদ্যোগে একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের নাম ছিল হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (International Commission on Intervention and State Sovereignty – ICISS)গ্যারেথ ইভান্স এবং মোহাম্মদ সাহনুন নামের দুজন প্রাজ্ঞ কূটনীতিক এই কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের মূল কাজ ছিল এমন একটি আইনি এবং নৈতিক পথ খুঁজে বের করা, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে, আবার একই সাথে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।

কমিশন দীর্ঘ গবেষণা এবং বিশ্বব্যাপী আলোচনার পর ২০০১ সালে তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনেই প্রথমবারের মতো একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং জাদুকরী শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়, যা হলো সুরক্ষার দায়িত্ব (Responsibility to Protect) বা সংক্ষেপে R2P। কমিশন খুব সুকৌশলে পুরো বিতর্কের দিকটাই ঘুরিয়ে দিল। তারা বলল, কোনো দেশের ওপর বাইরের কারো ‘হস্তক্ষেপ করার অধিকার’ নিয়ে আমাদের আর মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আমাদের মনোযোগ দিতে হবে ‘সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব’-এর দিকে (ICISS, 2001)। শব্দগুলোর এই সামান্য পরিবর্তন আন্তর্জাতিক আইনে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। যখনই আপনি ‘হস্তক্ষেপ’ শব্দটি বলবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে কেউ একজন আপনার ঘরে জোর করে ঢুকছে। কিন্তু যখন আপনি ‘দায়িত্ব’ শব্দটি বলবেন, তখন সেটি আর কোনো জবরদস্তি মনে হয় না, বরং সেটি একটি নৈতিক এবং আইনি কর্তব্যের রূপ নেয়। এই নতুন ধারণাটি খুব সহজেই বিশ্বনেতাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়। এটি প্রমাণ করে যে, অনেক সময় কেবল ভাষার পরিবর্তন দিয়েও শত বছরের পুরোনো রাজনৈতিক জট খুলে ফেলা সম্ভব।

সার্বভৌমত্বের ধারণায় তাত্ত্বিক পরিবর্তন

আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে পুরোনো এবং শক্ত খুঁটি হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। সপ্তদশ শতাব্দীর ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পর থেকে এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, একটি দেশের সীমানার ভেতরে সেই দেশের শাসকই সর্বেসর্বা। তিনি তার প্রজাদের সাথে কেমন আচরণ করবেন, তা নিয়ে অন্য কোনো দেশের মাথা ঘামানোর কোনো অধিকার নেই। রাষ্ট্রীয় সীমানাকে একটি লোহার প্রাচীরের মতো ভাবা হতো, যার ভেতরে বাইরের কোনো আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারত না। শত শত বছর ধরে এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অহংকার নিয়ে রাষ্ট্রগুলো টিকে ছিল। কিন্তু সুরক্ষার দায়িত্ব বা আরটুপি (R2P) ধারণাটি এই পুরোনো লোহার প্রাচীরে একটি বিশাল ফাটল তৈরি করে দেয়। এই নতুন ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তিটি মূলত তৈরি করেছিলেন সুদানের বিশিষ্ট কূটনীতিক এবং গবেষক ফ্রান্সিস ডেং (Francis Deng)। তিনি এবং তার সহকর্মীরা নব্বইয়ের দশকে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে কাজ করার সময় একটি যুগান্তকারী তত্ত্বের অবতারণা করেন। তারা এর নাম দিয়েছিলেন দায়িত্ব হিসেবে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty as Responsibility) (Deng et al., 1996)।

এই তত্ত্বের মূল কথা খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত ধারালো। একটি রাষ্ট্র কেন তৈরি হয়? মানুষের মঙ্গলের জন্যই তো। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতেই না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের কোনো আইনি বৈধতা থাকে না। ফ্রান্সিস ডেং যুক্তি দেখিয়েছেন যে, সার্বভৌমত্ব মানে কেবল শাসন করার একচেটিয়া লাইসেন্স নয়। এটি মূলত নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের একটি পবিত্র চুক্তি। রাষ্ট্র যখন এই চুক্তি ভঙ্গ করে এবং নিজের নাগরিকদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তখন সে মূলত তার সার্বভৌমত্বের অধিকারটিকেই নিজ হাতে ধ্বংস করে ফেলে। আপনি যদি একটি বাড়ির মালিক হন, এর মানে এই নয় যে আপনি সেই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ভেতরের মানুষদের পুড়িয়ে মারার অধিকার রাখেন। রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতরেও ঠিক একই নিয়ম খাটে। সুরক্ষার দায়িত্বের ধারণাটি এই তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপরই পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে। এটি রাষ্ট্রগুলোকে মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিতে হলে সবার আগে নিজ দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তাত্ত্বিক এই পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাতেও একটি বড় ধরনের বদল আসে। আগে মনে করা হতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হলো একটি পাহারাদার, যে কেবল সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু নতুন তাত্ত্বিক রূপরেখায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি ‘বিকল্প সুরক্ষাবলয়’ বা ব্যাকআপ সিস্টেম হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। গ্যারেথ ইভান্স তার দ্য রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট: এন্ডিং ম্যাস অ্যাট্রোসিটি ক্রাইমস ওয়ান্স অ্যান্ড ফর অল (The Responsibility to Protect: Ending Mass Atrocity Crimes Once and for All) বইতে এই বিষয়টির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন (Evans, 2008)। তার মতে, প্রাথমিক দায়িত্ব সব সময় রাষ্ট্রের নিজের কাঁধেই থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করে বা ব্যর্থ হয়, তবে সেই সুরক্ষার দায়িত্বটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাঁধে গিয়ে বর্তায়। মানবতাকে তখন আর রাষ্ট্রীয় সীমানার বেড়াজালে আটকে রাখা যায় না। সার্বভৌমত্বের এই আধুনিক ব্যাখ্যাটি মূলত ক্ষমতার দম্ভকে একটি গভীর মানবিক দায়বদ্ধতার শেকলে বেঁধে ফেলার অত্যন্ত সফল একটি আইনি প্রচেষ্টা।

সুরক্ষার দায়িত্বের তিনটি মূল স্তম্ভ

সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল একটি ফাঁকা বুলি নয়। এর একটি খুব গোছানো এবং কার্যকরী কাঠামো রয়েছে। ২০০৯ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি-মুন একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি এই ধারণাকে বাস্তবায়নের জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভ বা পিলারের কথা উল্লেখ করেন (Ban, 2009)। এই তিনটি স্তম্ভ একত্রে মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি এবং রাজনৈতিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করে। প্রথম স্তম্ভটি হলো রাষ্ট্রের নিজস্ব দায়িত্ব। প্রতিটি রাষ্ট্র তার সীমানার ভেতরে থাকা সব মানুষকে চারটি সুনির্দিষ্ট ভয়াবহ অপরাধ থেকে রক্ষা করতে বাধ্য থাকবে। এই অপরাধগুলো হলো: গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। এখানে খেয়াল করার মতো একটি বিষয় হলো, সাধারণ কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এই নীতি প্রয়োগ করা যাবে না। সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল তখনই আসবে, যখন মানুষের জীবন এই চারটি সুনির্দিষ্ট এবং ব্যাপক মাত্রার অপরাধের মুখে পড়বে। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এই দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে আসতে পারবে না।

দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। এটি মূলত এই পুরো ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবচেয়ে অবহেলিত অংশ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল বসে বসে দেখবে না যে একটি রাষ্ট্র কখন ব্যর্থ হয়। তাদের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রগুলোকে আগে থেকেই সাহায্য করা। অনেক সময় একটি দরিদ্র দেশের সরকার হয়তো সত্যিই তার নাগরিকদের রক্ষা করতে চায়, কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত পুলিশ, দক্ষ বিচার ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকে না। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। তারা সেই দেশটিকে অর্থনৈতিক সাহায্য দেবে, তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মানবাধিকারের প্রশিক্ষণ দেবে এবং দেশে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিকপরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করবে। সহজ করে বললে, রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। গবেষক অ্যালেক্স বেলামি (Alex Bellamy) দেখিয়েছেন যে, সুরক্ষার দায়িত্বের বেশিরভাগ কাজই মূলত এই দ্বিতীয় স্তম্ভের অধীনে নীরবে এবং শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়, যা গণমাধ্যমে সেভাবে কখনোই উঠে আসে না (Bellamy, 2009)।

সবচেয়ে আলোচিত এবং স্পর্শকাতর জায়গাটি হলো তৃতীয় স্তম্ভ। যদি কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়, অথবা রাষ্ট্র নিজেই যদি তার জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে ওই চারটি অপরাধের যেকোনো একটি সংঘটিত করতে শুরু করে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আর চুপ করে বসে থাকতে পারবে না। তাদের অবশ্যই একটি সময়োপযোগী এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি নির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে। শুরুতেই কেউ গিয়ে বোমা ফেলতে পারবে না। প্রথমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান খুঁজতে হবে। কূটনৈতিক আলোচনা, অর্থনৈতিক অবরোধ, বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা করার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি এই সব শান্তিপূর্ণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়, কেবল তখনই সর্বশেষ উপায় হিসেবে সামরিক বলপ্রয়োগের কথা ভাবা যাবে। আর এই বলপ্রয়োগটি অবশ্যই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সুস্পষ্ট অনুমোদন সাপেক্ষে হতে হবে। কোনো একটি দেশ নিজের খেয়ালখুশিমতো অন্য দেশে সৈন্য পাঠাতে পারবে না। এই কঠিন নিয়মগুলো তৈরি করা হয়েছে মূলত সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথটিকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রিত রাখার জন্য।

জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলন এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি

কোনো একটি তাত্ত্বিক ধারণাকে আন্তর্জাতিক আইনের পাতায় জায়গা করে নেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রচুর কূটনৈতিক দেনদরবার এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়ার প্রয়োজন হয়। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্কে একটি ঐতিহাসিক বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধানদের এত বড় সমাবেশ এর আগে কখনো হয়নি। এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সুরক্ষার দায়িত্ব বা আরটুপি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু কাজটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতারা এই ধারণাটি নিয়ে চরম আপত্তি তোলেন। তাদের মনে একটি গভীর ভয় কাজ করছিল। তারা ভাবছিলেন, পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকারের এই সুন্দর মোড়কটি ব্যবহার করে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার একটি স্থায়ী আইনি লাইসেন্স আদায় করে নিতে চাইছে। ভারত, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করে।

এই চরম বিরোধিতার মুখে পড়ে পুরো উদ্যোগটি প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। তখন কূটনীতির টেবিলে একটি দারুণ আপস-মীমাংসা বা কম্প্রোমাইজ হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সিদ্ধান্ত নেয় যে, সুরক্ষার দায়িত্বের পরিধি অনেক ছোট করে আনা হবে। শুরুতে অনেকেই চেয়েছিলেন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা এইচআইভি/এইডস-এর মতো বড় মহামারীর ক্ষেত্রেও যেন রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নীতি ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু ২০০৫ সালের সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণাপত্রে সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্বনেতারা একমত হন যে, কেবল গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ – এই চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই সুরক্ষার দায়িত্বের নীতিটি প্রয়োগ করা যাবে। তাত্ত্বিক টমাস ভাইস (Thomas Weiss) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, এই পরিধি ছোট করে আনার ফলেই মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের আপত্তি তুলে নিতে রাজি হয়েছিল (Weiss, 2007)। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই চারটি অপরাধ এতই ভয়াবহ যে এগুলোর পক্ষে সাফাই গাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

২০০৫ সালের বিশ্ব সম্মেলনের চূড়ান্ত দলিলে (World Summit Outcome Document) ১৩৮ এবং ১৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষার দায়িত্বের এই নীতিটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সব দেশের একমত হওয়াটা ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা (UNGA, 2005)। এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল আর একটি তাত্ত্বিক কমিশন রিপোর্ট হিসেবে থাকল না, এটি বিশ্ব রাজনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নীতি বা পলিটিক্যাল নর্মে পরিণত হলো। এর ফলে স্বৈরশাসকদের মনে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে যায় যে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব কোনো অবিভেদ্য ঢাল নয়। দেশের ভেতরে দরজা বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে কচুকাটা করার যে অলিখিত অধিকার স্বৈরশাসকরা ভোগ করতেন, ২০০৫ সালের এই সম্মেলন সেই অধিকারের কফিনে চূড়ান্ত পেরেকটি ঠুকে দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কাঁধে সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর এই বিশাল নৈতিক দায়ভার তুলে নেয়।

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব

কাগজে-কলমে এত সুন্দর একটি নীতি গ্রহণ করার পরও বাস্তব পৃথিবীতে এর প্রয়োগ করতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট খেতে হয়। ২০১১ সালের লিবিয়া সংকট ছিল সুরক্ষার দায়িত্ব নীতির প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। লিবিয়ার তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন যে তিনি বেনগাজি শহরের প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে তার বিরোধীদের ইঁদুরের মতো হত্যা করবেন, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নড়েচড়ে বসে। গাদ্দাফির এই হুমকি স্পষ্টতই একটি আসন্ন গণহত্যার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব (Resolution 1973) পাস করে এবং সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর জন্য লিবিয়ার আকাশে ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে। ন্যাটো বাহিনী সামরিক হস্তক্ষেপ করে। প্রথমদিকে এটিকে সুরক্ষার দায়িত্বের একটি অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ন্যাটো বাহিনী কেবল সাধারণ মানুষকে রক্ষা করেই থেমে থাকেনি, তারা সরাসরি গাদ্দাফির পতন নিশ্চিত করে লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তনের খেলায় মেতে ওঠে (Thakur, 2016)।

লিবিয়ার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ভয়াবহ আস্থার সংকট তৈরি করে। রাশিয়া, চীন এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশ বুঝতে পারে যে, মানবিকতার দোহাই দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো মূলত তাদের পুরনো সাম্রাজ্যবাদী খেলাটাই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সুরক্ষার দায়িত্বের ম্যান্ডেটকে সম্পূর্ণভাবে অপব্যবহার করেছে। এই অবিশ্বাসের চড়া মূল্য চোকাতে হয় সিরিয়ার সাধারণ মানুষকে। লিবিয়া সংকটের পরপরই যখন সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলো এবং বাশার আল-আসাদ তার নিজের জনগণের ওপর নির্বিচারে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার থেকে শুরু করে ব্যারেল বোমা ফেলতে শুরু করলেন, তখন নিরাপত্তা পরিষদ পুরো স্থবির হয়ে পড়ে। রাশিয়া এবং চীন সিরিয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের শাস্তিমূলক প্রস্তাবে একের পর এক ভেটো দিতে থাকে। তাদের যুক্তি ছিল, লিবিয়ার মতো সিরিয়াতেও পশ্চিমা দেশগুলো সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করছে। পরাশক্তিগুলোর এই ভূ-রাজনৈতিক ইগোর লড়াইয়ে সিরিয়ার লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এবং কোটি মানুষ দেশছাড়া হয়। সিরিয়ার এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে দেয় যে, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থার কাছে সুরক্ষার দায়িত্বের এই মহান নীতি কতটা অসহায় এবং জিম্মি।

এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য ব্রাজিল একটি চমৎকার নতুন ধারণার প্রস্তাব করেছিল, যাকে সুরক্ষা প্রদানের সময় দায়িত্বশীলতা (Responsibility while Protecting – RwP) বলা হয় (Tourinho et al., 2016)। ব্রাজিলের যুক্তি ছিল, যারা সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ করতে যাবে, তাদের নিজেদেরও কাজের জবাবদিহি করতে হবে। তারা ইচ্ছেমতো বোমা ফেলে একটি দেশকে ধ্বংস করে দিয়ে চলে আসতে পারবে না। তাদের সামরিক অভিযানের প্রতিটি ধাপ জাতিসংঘের নজরদারিতে থাকতে হবে। ধারণাটি খুবই যৌক্তিক ছিল, কিন্তু পরাশক্তিগুলো নিজেদের সামরিক স্বাধীনতার ওপর কোনো ধরনের লাগাম পরাতে রাজি ছিল না। ফলে এই আলোচনা খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। বাস্তবে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা পলিটিক্যাল উইল ছাড়া কোনো আইনি নীতিই কাজ করে না। কোনো দেশের সাধারণ মানুষের রক্ত যদি পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে না মেলে, তবে সেই রক্তের কোনো মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে থাকে না। সুরক্ষার দায়িত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ভয়াবহ রাজনৈতিক কপটতা থেকে বেরিয়ে আসা।

ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রূপরেখা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা

অনেক সমালোচক সিরিয়ার ব্যর্থতার পর বলতে শুরু করেছিলেন যে সুরক্ষার দায়িত্বের নীতিটি বোধ হয় অকালেই মারা গেছে। কিন্তু পরিস্থিতি আসলে ততটা নৈরাশ্যজনক নয়। এই নীতিটি হয়তো সব ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করেনি, কিন্তু এটি বিশ্ব কূটনীতির ভাষাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। আজ পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন না যে, তার দেশের ভেতরে তিনি যাকে খুশি তাকে হত্যা করার অধিকার রাখেন। এই যে একটি মানসিক এবং আইনি দেয়াল তৈরি হয়েছে, এটি একটি বিশাল অর্জন (Luck, 2010)। সুরক্ষার দায়িত্বের নীতিটি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় এখন গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের একজন বিশেষ উপদেষ্টা রয়েছেন যিনি কেবল গণহত্যা প্রতিরোধের বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিল প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং কোথায় কোথায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটতে পারে, তার একটি আগাম সংকেত বা আর্লি ওয়ার্নিং তৈরি করে।

ভবিষ্যতের দিনগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে প্রতিরোধমূলক কাজের ওপরেই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। তাত্ত্বিক জেমস প্যাটিনসন (James Pattison) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, যখন সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন বুঝতে হবে আমরা প্রতিরোধে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি (Pattison, 2010)। আসল কাজ হলো একটি সমাজকে এমনভাবে গড়ে তোলা যেখানে জাতিগত বা ধর্মীয় বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এর জন্য সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হয়। অনেক দেশ এখন নিজেদের সরকারের ভেতরেই সুরক্ষার দায়িত্বের জন্য একজন নির্দিষ্ট ফোকাল পয়েন্ট বা কর্মকর্তা নিয়োগ দিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো, দেশের ভেতরের যেকোনো বৈষম্যমূলক নীতি বা প্রথাকে শুরুতেই চিহ্নিত করা এবং সেগুলো দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া। একটি সহনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি করা ছাড়া এই ভয়াবহ অপরাধগুলো চিরতরে নির্মূল করার কোনো জাদুর কাঠি কারো হাতে নেই।

শেষ কথা হলো, সুরক্ষার দায়িত্ব বা আরটুপি (R2P) মানবসভ্যতার কাছে করা একটি পবিত্র অঙ্গীকার। আমরা হয়তো প্রায়শই এই অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থ হই। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে এমন একটি মহান নীতিকে ছুড়ে ফেলা যায় না। অতীতে যখন গণহত্যা হতো, তখন রাষ্ট্রগুলো বলত যে এটি তাদের দেখার বিষয় নয়। এখন অন্তত তারা সেই কথাটি বলতে পারে না। তাদের কাজের কৈফিয়ত দিতে হয়। এই জবাবদিহিতার কাঠামোটাই সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য একটি বড় রক্ষাকবচ। পরাশক্তিগুলোর নোংরা রাজনীতি, জাতিসংঘের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় অহংকারের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই এই নীতিটিকে টিকে থাকতে হবে। মানুষের জন্য মানুষের এই লড়াই কখনো শেষ হওয়ার নয়। সুরক্ষার দায়িত্ব মূলত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যখন একজন নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরে, তখন তার দায়ভার পুরো মানবজাতির ওপরই এসে পড়ে। এই নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সমসাময়িক সমস্যা এবং মানবাধিকার (Contemporary Issues and Human Rights)

প্রযুক্তির আগ্রাসন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নতুন সংকট

একটা সময় ছিল, মানুষ ভাবত তার নিজের ঘরটিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে বাইরের দুনিয়ার আর কোনো প্রবেশাধিকার থাকে না। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের এই নিরাপত্তা নিয়েই মূলত পুরোনো দিনের আইনগুলো তৈরি হয়েছিল। সময় অনেকটাই পাল্টে গেছে, সেই সাথে পাল্টেছে আমাদের বেঁচে থাকার ধরন। আমরা এখন ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে জিনিসটি হাতে নিই, তা হলো একটি ইন্টারনেট যুক্ত স্মার্টফোন। আমাদের সারাদিনের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি আমাদের মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনাগুলোও এখন আর আমাদের নিজেদের কাছে গোপন থাকছে না। অধিকারের পুরনো সংজ্ঞায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর শারীরিক নির্যাতন থেকে বাঁচার কথা বলা হতো। আজকের দিনে মানুষের শরীরের ওপর হয়তো আঘাত আসছে না, কিন্তু তার মন এবং ব্যক্তিগত তথ্যের জগৎটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য কে কীভাবে ব্যবহার করছে, তা এখন আর নিছক কোনো প্রযুক্তির বিষয় নেই, এটি একটি বিশাল এবং ভয়ংকর মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আমরা প্রতিদিন খুব স্বেচ্ছায় এবং হাসিমুখে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যগুলো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছি। একটি নতুন অ্যাপ ব্যবহার করার আগে আমরা না পড়েই শর্তাবলীতে সম্মতি দিয়ে দিই। সমাজবিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক শশানা জুবফ (Shoshana Zuboff) এই নতুন অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোর একটি চমৎকার নাম দিয়েছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য এজ অব সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম (The Age of Surveillance Capitalism)-এ তিনি একে নজরদারি পুঁজিবাদ (Surveillance Capitalism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Zuboff, 2019)। জুবফের মতে, আগেকার দিনের পুঁজিবাদ প্রকৃতি থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কারখানায় পণ্য তৈরি করত। আজকের দিনের নজরদারি পুঁজিবাদ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং আচরণকে কাঁচামাল হিসেবে গ্রহণ করে। আপনি ইন্টারনেটে কী খুঁজছেন, কোন ভিডিও কতক্ষণ দেখছেন, এমনকি আপনার হাঁটার গতি কেমন – সবকিছু নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা হচ্ছে। এই ডেটাগুলো বিশ্লেষণ করে কোম্পানিগুলো মানুষের ভবিষ্যৎ আচরণ অনুমান করার পণ্য তৈরি করছে এবং তা চড়া দামে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে।

ব্যাপারটা বেশ চিন্তার। আমাদের অজান্তেই আমাদের জীবনকে একটি খোলা বইয়ে পরিণত করা হয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যে তথ্যগুলো সংগ্রহ করছে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুব সহজেই সেই তথ্যের ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায়। একজন মানুষের জীবনের যদি কোনো গোপনীয়তাই না থাকে, তবে তার পক্ষে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানুষ যখন জানে যে তার প্রতিটি কাজের ওপর নজর রাখা হচ্ছে, তখন সে নিজের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সরশিপ তৈরি করে নেয়। সে নতুন কিছু ভাবতে ভয় পায়, ভিন্ন মত প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করে। মানবাধিকারের মূল ভিত্তি হলো মানুষের ব্যক্তিসত্তার স্বাধীনতা। এই নজরদারি পুঁজিবাদ মানুষের সেই ব্যক্তিসত্তাকেই একটি লাভজনক পণ্যে পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি এখন আর কোনো বিলাসী অধিকার নয়, এটি আধুনিক ডিজিটাল যুগে মানুষের স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ার সবচেয়ে মৌলিক শর্ত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যালগরিদমিক বৈষম্যের উত্থান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমরা অনেকেই বিশ্বাস করি যে, যন্ত্রের কোনো আবেগ নেই, তাই যন্ত্র কোনো মানুষের সাথে অবিচার করতে পারে না। মানুষের তৈরি করা বিচার ব্যবস্থায় অনেক সময় ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের কারণে বৈষম্য দেখা যায়। অনেকেই ভেবেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিনের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দিলে সমাজ থেকে সব বৈষম্য দূর হয়ে যাবে। বাস্তবে ঘটছে ঠিক এর উল্টো ঘটনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, সে তার ভেতরের অ্যালগরিদম এবং তাকে খাওয়ানো পুরনো ডেটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। মানুষের ইতিহাস যেহেতু দীর্ঘদিনের বৈষম্য এবং বঞ্চনায় ভরা, তাই সেই পুরোনো ডেটা থেকে মেশিনও বৈষম্য করতেই শেখে। আধুনিক যুগে এই সমস্যাটিকে অ্যালগরিদমিক বৈষম্য (Algorithmic Bias) বলা হয়। একটি রোবট বা কোড যখন কোনো মানুষের সাথে অবিচার করে, তখন সেই অবিচারটি এতটাই নীরবে ঘটে যে ভুক্তভোগী টেরও পায় না কেন তার অধিকার হরণ করা হলো।

এই অ্যালগরিদমিক বৈষম্যের প্রভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খুব গভীরভাবে পড়তে শুরু করেছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এখন পুলিশের টহল, ব্যাংক লোন অনুমোদন বা চাকরির সিভি বাছাই করার কাজগুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হচ্ছে। মার্কিন গবেষক ভার্জিনিয়া ইউব্যাংকস (Virginia Eubanks) তার সাড়া জাগানো বই অটোমেটিং ইনইকুয়ালিটি (Automating Inequality)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলো গরিব এবং পিছিয়ে পড়া মানুষদের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলছে (Eubanks, 2018)। উদাহরণস্বরূপ, অপরাধ দমনের জন্য তৈরি করা সফটওয়্যারগুলো সাধারণত দরিদ্র বা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পুলিশকে বেশি টহল দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর কারণ হলো, অতীত রেকর্ডে ওই এলাকাগুলোতেই পুলিশ বেশি তল্লাশি চালিয়েছে এবং বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। সফটওয়্যার সেই অতীত ডেটা বিশ্লেষণ করে ধরে নেয় যে ওই এলাকার মানুষ জন্মগতভাবেই অপরাধী। যন্ত্রের এই ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয় হয়রানির শিকার হতে থাকে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

সবচেয়ে ভয়ের জায়গাটি হলো এই প্রযুক্তিগুলোর জবাবদিহিতার অভাব। একজন মানুষ বিচারক যদি কারো জামিন নামঞ্জুর করেন, তবে তার কাছে কারণ জানতে চাওয়া যায়। উচ্চ আদালতে আপিল করা যায়। একটি মেশিন লার্নিং সফটওয়্যার যখন কোনো মানুষের চাকরির আবেদন বাতিল করে দেয়, তখন এর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণটি অনেক সময় সেই সফটওয়্যারের নির্মাতারাও ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে পারেন না। একে প্রযুক্তির ভাষায় ‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যা বলা হয়। মানবাধিকারের একটি বড় শর্ত হলো ন্যায্য বিচার এবং জবাবদিহিতা। এমন একটি অদৃশ্য এবং অস্বচ্ছ কোডের হাতে মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো ছেড়ে দেওয়া হলে, মানুষের অধিকার আদায়ের কোনো নির্দিষ্ট জায়গাই অবশিষ্ট থাকে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই উত্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির উন্নয়ন মানেই সব সময় মানবাধিকারের উন্নয়ন নয়। প্রযুক্তিকে অবশ্যই মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনি জবাবদিহিতার শক্ত বাঁধনে আটকে রাখতে হবে।

সাইবার জগৎ, রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

ইন্টারনেট যখন প্রথম পৃথিবীতে আসে, তখন অনেকেই একে একটি চরম গণতান্ত্রিক মাধ্যম হিসেবে ভেবেছিলেন। মনে করা হয়েছিল, এবার আর কোনো স্বৈরশাসক সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করতে পারবে না। প্রতিটি মানুষের হাতেই একটি করে প্রচারযন্ত্র থাকবে। প্রথম কয়েক বছর এমনটা মনে হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র খুব দ্রুতই এই নতুন মাধ্যমের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। ইন্টারনেটের সেই মুক্ত প্রান্তর এখন রাষ্ট্রীয় নজরদারির সবচেয়ে বড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের সরকার এখন সাইবার নিরাপত্তার কথা বলে এমন সব কঠোর আইন তৈরি করছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই নতুন প্রবণতাকে ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্র (Digital Authoritarianism) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সরকারগুলো যুক্তি দেখায় যে, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং গুজব ঠেকানোর জন্য সাইবার স্পেসে কঠোর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। এই খোঁড়া যুক্তির আড়ালে সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রতিনিয়ত গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে।

এই নজরদারির কাজে সরকারগুলো এখন অত্যন্ত আধুনিক এবং ব্যয়বহুল স্পাইওয়্যার ব্যবহার করছে। কিছুদিন আগেই বিশ্বজুড়ে ‘পেগাসাস‘ নামের একটি ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার নিয়ে ভয়াবহ তথ্য ফাঁস হয়। এই ধরনের সফটওয়্যারগুলো একজন মানুষের ফোনে ঢোকার জন্য কোনো লিংকে ক্লিক করারও প্রয়োজন হয় না। মানুষের পকেটে থাকা অত্যন্ত দামি স্মার্টফোনটি মুহূর্তের মধ্যেই রাষ্ট্রের একজন সার্বক্ষণিক গুপ্তচরে পরিণত হয়। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিজেন ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা রোনাল্ড ডেইবার্ট (Ronald J. Deibert) তার ব্ল্যাক কোড (Black Code) বইতে এই সাইবার নজরদারির ভয়াবহ জগতটি উন্মোচন করেছেন (Deibert, 2013)। এই স্পাইওয়্যারগুলো ব্যবহার করে মূলত সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং বিরোধী দলের নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনের সব তথ্য চুরি করা হয়। সরকার যখন একজন মানুষের ব্যক্তিগত মেসেজ, ইমেইল এবং ফোনের ক্যামেরা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তখন সেই মানুষটির স্বাধীন অস্তিত্ব বলে আর কিছু থাকে না। এটি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়, এটি একটি পুরো সমাজকে ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে আটকে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল।

সাইবার জগতে মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আরেকটি সাধারণ পদ্ধতি হলো ইন্টারনেট শাটডাউন বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। দেশের কোথাও কোনো রাজনৈতিক প্রতিবাদ শুরু হলে বা সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামলে, কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই ওই নির্দিষ্ট এলাকার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। তারা এর নাম দেয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সাময়িক ব্যবস্থা। আধুনিক জীবনে ইন্টারনেট ছাড়া বেঁচে থাকা মানে হলো পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। ইন্টারনেট না থাকলে মানুষ জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে যোগাযোগ করতে পারে না, ব্যবসায়িক লেনদেন বন্ধ হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এটি মূলত কোনো নির্দিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, এটি পুরো একটি এলাকার মানুষের ওপর ঢালাওভাবে শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে। সাইবার জগতে মতপ্রকাশের এই লড়াই প্রমাণ করে যে, বন্দুকের গুলির চেয়েও তথ্যের প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়াটা স্বৈরশাসকদের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী একটি অস্ত্র।

গিগ অর্থনীতি এবং আধুনিক শ্রমদাসত্বের নতুন রূপ

কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির জগতেও প্রযুক্তি এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। একটা সময় মানুষ নির্দিষ্ট কোনো অফিসে বা কারখানায় কাজ করত। তাদের নির্দিষ্ট বেতন ছিল, ছুটির দিন ছিল এবং অবসরের পর পেনশনের ব্যবস্থা ছিল। স্মার্টফোন অ্যাপ এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন কাজের একটি নতুন মডেল বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই নতুন মডেলকে অর্থনীতির ভাষায় গিগ অর্থনীতি (Gig Economy) বলা হয়। বাংলাদেশে উবার, পাঠাও, কিংবা ফুডপান্ডার মতো রাইড শেয়ারিং এবং খাবার ডেলিভারি অ্যাপগুলো এই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোম্পানিগুলো খুব সুন্দর সুন্দর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের আকর্ষণ করে। তারা বলে, এখানে কোনো বসের বকাঝকা নেই, আপনি নিজেই নিজের বস, যখন খুশি কাজ করবেন, যখন খুশি কাজ বন্ধ রাখবেন। আপাতদৃষ্টিতে এই কথাগুলো খুব স্বাধীনতাপূর্ণ মনে হলেও, এর পেছনের বাস্তবতা অত্যন্ত রূঢ় এবং শোষণমূলক। এই গিগ অর্থনীতি মূলত আধুনিক বিশ্বে শ্রমদাসত্বের একটি নতুন এবং পরিশীলিত রূপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

এই ব্যবস্থায় কাজ করা মানুষদের কোম্পানিগুলো কখনোই তাদের কর্মী বা শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের বলা হয় ‘স্বাধীন চুক্তিভিত্তিক কর্মী’ বা ইন্ডিপেনডেন্ট কন্ট্রাক্টর। এই একটিমাত্র আইনি ফাঁকি ব্যবহার করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্বজুড়ে দশকের পর দশক ধরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সব শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় এই রাইডার বা চালকরা কোনো ন্যূনতম মজুরি পান না, কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার খরচ পান না এবং তাদের কোনো স্বাস্থ্যবিমাও থাকে না। তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। পরিবার চালানোর মতো পর্যাপ্ত টাকা আয় করার জন্য একজন ডেলিভারি কর্মীকে অনেক সময় দিনে বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা অমানবিক পরিশ্রম করতে হয়। রোদ, বৃষ্টি বা তীব্র শীতের মাঝেও তারা রাস্তায় পড়ে থাকেন। কোম্পানিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা করলেও, যাদের ঘামের ওপর ভিত্তি করে এই মুনাফা আসে, সেই মানুষদের জীবনের কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকে না।

সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হলো, এই গিগ কর্মীদের কোনো রক্তমাংসের বস থাকে না। তাদের পুরো কর্মজীবন নিয়ন্ত্রণ করে একটি সফটওয়্যার। এই ব্যবস্থাকে অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থাপনা (Algorithmic Management) বলা হয়। একজন রাইডার যদি যানজটের কারণে খাবার পৌঁছে দিতে পাঁচ মিনিট দেরি করে, তবে অ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার রেটিং কমিয়ে দেয় বা তার আয় থেকে টাকা কেটে রাখে। যন্ত্রের কোনো মায়াদয়া নেই, সে কোনো মানুষের বিপদের কথা শুনতে চায় না। রেটিং একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নেমে গেলে অ্যাকাউন্টটি চিরতরে ব্লক করে দেওয়া হয়, যার মানে হলো ওই কর্মীর চাকরিটি এক নিমেষে শেষ। এই কর্মীদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই, তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মালিকের কাছে দাবি দাওয়া পেশ করতে পারে না। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে একজন শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়া একটি জন্মগত অধিকার। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ব্যবসার নামে খুব সুকৌশলে এই অধিকারগুলো কেড়ে নিচ্ছে এবং সমাজ সেই শোষণকে খুব স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিচ্ছে।

ডিজিটাল বিভাজন এবং তথ্য অধিকারের বৈশ্বিক অসমতা

প্রযুক্তির এই বিপুল প্রসারের যুগে আমরা প্রায়ই একটি কথা খুব গর্ব করে বলি যে, পুরো পৃথিবীটা এখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। পৃথিবী মূলত তাদের হাতের মুঠোয় এসেছে, যাদের কাছে একটি ভালো স্মার্টফোন এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। পৃথিবীর একটি বিশাল জনসংখ্যার কাছে এখনো ইন্টারনেটের সুবিধা পৌঁছায়নি বা তাদের সেই ইন্টারনেট কেনার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তিগত বৈষম্যটিকে ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide) নামে ডাকা হয়। একটা সময় সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য মাপা হতো কার কত জমি আছে বা কার ব্যাংক ব্যালেন্স কত, তা দিয়ে। এখনকার সমাজে বৈষম্যের নতুন মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে তথ্যের অধিকার এবং ইন্টারনেট সংযোগ। যারা ইন্টারনেটের বাইরে অবস্থান করছে, তারা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রায় সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছিটকে পড়ছে।

বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য রাইজ অব দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি (The Rise of the Network Society)-তে এই নেটওয়ার্ক বা সংযুক্তির ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Castells, 1996)। তার মতে, আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা মূলত এই নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যেই বিরাজ করে। আপনি যদি এই নেটওয়ার্কের অংশ না হন, তবে সামাজিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে আপনার কোনো অস্তিত্বই নেই। আমরা সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বড় মহামারী কোভিডের সময় এই ডিজিটাল বিভাজনের ভয়াবহ রূপটি দেখেছি। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সব শিক্ষাকার্যক্রম অনলাইনে চলে যায়। শহরের বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা ল্যাপটপ এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজেই তাদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। গ্রামের দরিদ্র কৃষকের সন্তান, যার ঘরে তিন বেলা খাবারই জোটে না, তার পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব ছিল না। ফলে লাখ লাখ শিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়েছে। প্রযুক্তির এই বৈষম্য মূলত সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অর্থনৈতিক বৈষম্যকেই আরও বেশি স্থায়ী এবং মজবুত করে তুলেছে।

তথ্য পাওয়ার অধিকার বা রাইট টু ইনফরমেশন এখন মানবাধিকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তাদের সব সরকারি সেবা, চাকরির আবেদন, স্বাস্থ্যসেবার নিবন্ধন – সবকিছুই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে গেছে। এর ফলে যে মানুষটির ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা নেই, সে রাষ্ট্রের চোখে অনেকটা অদৃশ্য হয়ে যায়। সে সরকারি অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারে না, ব্যাংকিং সুবিধা নিতে পারে না এবং নিজের আইনি অধিকারগুলো সম্পর্কে জানতে পারে না। রাষ্ট্র সবকিছু ডিজিটাল করে দিয়ে হয়তো নিজেদের খুব আধুনিক হিসেবে জাহির করে, কিন্তু এর ফলে সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষগুলো যে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারো খেয়াল থাকে না। ইন্টারনেট এখন আর কেবল বিনোদন বা বন্ধু বানানোর মাধ্যম নয়। এটি আধুনিক জীবনে বেঁচে থাকার এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার প্রধান হাতিয়ার। তাই ডিজিটাল বিভাজন দূর করে সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করাটা রাষ্ট্রের একটি বড় মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

বায়োমেট্রিক ডেটা এবং ভবিষ্যৎ মানবাধিকারের রূপরেখা

বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের শরীরের ভেতরের গঠনকেও এখন ডেটায় রূপান্তর করে ফেলেছে। মানুষের আঙুলের ছাপ, চোখের মণি, এমনকি মুখের গড়নও এখন আর তার নিজস্ব ব্যক্তিগত পরিচয় নেই, এগুলো ডিজিটাল আইডেন্টিটি বা ডিজিটাল পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশই এখন তাদের নাগরিকদের পরিচয় প্রমাণের জন্য এই ধরনের শারীরিক তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রযুক্তির ভাষায় একে বায়োমেট্রিক নজরদারি (Biometric Surveillance) বলা হয়। রাষ্ট্রগুলো যুক্তি দেখায় যে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং সরকারি সেবাগুলো সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা অপরিহার্য। সাধারণ মানুষও খুব সহজেই সরকারের এই কথায় বিশ্বাস করে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যগুলো রাষ্ট্রের ডেটাবেসে জমা দিয়ে দিচ্ছে। আমরা বুঝতেও পারছি না যে এর মাধ্যমে আমরা মূলত আমাদের নিজেদের শরীরের ওপর থেকে আমাদের শেষ অধিকারটুকুও রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিচ্ছি।

এই বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গাটি হলো তথ্যের নিরাপত্তা। একটি সাধারণ পাসওয়ার্ড বা পিন নম্বর চুরি হয়ে গেলে আপনি খুব সহজেই সেটি বদলে ফেলতে পারেন। কিন্তু কোনো হ্যাকার গোষ্ঠী বা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা যদি আপনার আঙুলের ছাপ বা চোখের রেটিনার ডেটা চুরি করে, তবে আপনি তো আর নিজের চোখ বা আঙুল বদলে ফেলতে পারবেন না। একবার এই তথ্যগুলো বেহাত হয়ে গেলে একজন মানুষের পরিচয় চিরকালের জন্য হুমকির মুখে পড়ে যায়। অনেক দেশের সরকার এই বিপুল পরিমাণ ডেটা জমা রাখার জন্য পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে না। এর চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, অনেক স্বৈরাচারী সরকার এই বায়োমেট্রিক ডেটা ব্যবহার করে তাদের দেশের রাস্তাঘাটে লাখ লাখ সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা শনাক্তকরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আপনি কখন ঘর থেকে বের হচ্ছেন, কার সাথে দেখা করছেন, কোথায় যাচ্ছেন – সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে বেনামে বা পরিচয় লুকিয়ে হেঁটে বেড়ানোর যে স্বাধীনতা মানুষের ছিল, তা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতের মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা এখন সম্পূর্ণ নতুন কিছু অধিকারের কথা বলতে শুরু করেছেন। প্রযুক্তি যেভাবে আমাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা চিন্তার ধারা পর্যন্ত পড়ে ফেলার চেষ্টা করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মনের ভেতরের স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়বে। চিলির মতো কিছু দেশ ইতিমধ্যে তাদের সংবিধানে ‘নিউরো-রাইটস’ বা স্নায়বিক অধিকার যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে কোনো প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্ক হ্যাক করতে না পারে। সমসাময়িক এই সমস্যাগুলো আমাদের একটি খুব পরিষ্কার বার্তা দেয়। ১৯৪৮ সালে যখন মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র তৈরি হয়েছিল, তখন এই ডিজিটাল যুগের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পুরনো সেই আইনগুলো দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির এই আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব নয়। মানবাধিকারের দর্শনটিকে ঠিক রেখে আমাদের আইনি কাঠামোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রযুক্তি মানবকল্যাণের জন্য তৈরি হয়েছে, প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করাটাই এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার (Democracy and Human Rights)

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার তাত্ত্বিক টানাপোড়েন

রাষ্ট্র পরিচালনার নানা রকম পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল চর্চিত ব্যবস্থার নাম হলো গণতন্ত্র। সহজ কথায়, এটি জনগণের শাসন। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সব মানুষ মিলে তাদের নেতা নির্বাচন করবে, এটি শুনতে বেশ চমৎকার একটি ধারণা। সমস্যা তৈরি হয় ঠিক ওই ‘সব মানুষ’ শব্দগুচ্ছ নিয়ে। বাস্তবে কখনোই সব মানুষ কোনো একটি বিষয়ে একমত হতে পারে না। ফলে বাধ্য হয়েই মাথা গোনার একটি পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হয়। ১০০ জন মানুষের মধ্যে ৫১ জন যেদিকে ভোট দেবে, সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। এই মাথা গোনার প্রক্রিয়াটিই হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একেবারে প্রাথমিক রূপ। গাণিতিক এই সমাধানে আপাতদৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি চোখে পড়ে না। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই একটি ভয়ংকর বিপদের সম্ভাবনা উঁকি দেয়। যদি সেই ৫১ জন মানুষ একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে বাকি ৪৯ জন মানুষকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে বা তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে, তবে সেই সিদ্ধান্তটিকে আমরা কী বলব? মাথা গোনার হিসাব অনুযায়ী এটি শতভাগ গণতান্ত্রিক একটি সিদ্ধান্ত। ঠিক এখানেই মানবাধিকারের ধারণাটি একটি শক্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। মানবাধিকার খুব জোরালো ভাষায় ঘোষণা করে যে, গরিষ্ঠ সংখ্যার দোহাই দিয়ে কোনো মানুষের জীবন বা স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অধিকার পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রের নেই।

গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার অনেকটা যমজ ভাইবোনের মতো, যারা একে অপরের হাত ধরে হাঁটে। একটি ছাড়া আরেকটি পুরোপুরি অচল। ফরাসি চিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস দ্য তকভিল (Alexis de Tocqueville) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা (Democracy in America)-এ এই বিপদের একটি খুব পরিষ্কার তাত্ত্বিক রূপরেখা দিয়েছিলেন (Tocqueville, 1835)। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র (Tyranny of the Majority)। তকভিলের মতে, একজন রাজা বা স্বৈরশাসক কেবল মানুষের শরীরের ওপর অত্যাচার করতে পারেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন মানুষের মন এবং চিন্তার ওপর একটি অদৃশ্য শেকল পরিয়ে দেয়। সমাজ যখন একটি নির্দিষ্ট দিকে ধাবিত হয়, তখন যারা সেই স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে চায়, সমাজ তাদের নির্মমভাবে পিষে মারে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্যই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উদারনৈতিক গণতন্ত্র (Liberal Democracy) ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। এই ধারণার মূল কথা হলো, ভোটের বাক্স খোলার আগে সমাজকে এমন কিছু মৌলিক নিয়মে একমত হতে হবে, যা কোনো ভোটের মাধ্যমেই পরিবর্তন করা যাবে না। ওই মৌলিক নিয়মগুলোই হলো মানবাধিকার। অর্থাৎ, আপনি নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে পারেন, কিন্তু সেই ক্ষমতার জোরে আপনি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ধর্ম পালনের অধিকার বা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে পারবেন না।

অধিকারের এই সীমারেখাটি মূলত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কোনো সীমাহীন বা নিরঙ্কুশ রূপ হতে পারে না। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে সরাসরি গণতন্ত্র চালু ছিল, যেখানে নাগরিকরা মাঠে জড়ো হয়ে হাত তুলে আইন পাস করত। সেই ‘নিখুঁত’ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই কিন্তু দার্শনিক সক্রেটিসকেহেমলক পানে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এথেন্সের বেশিরভাগ মানুষ মনে করেছিল সক্রেটিসের কথাবার্তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আজকের দিনের মানবাধিকার আইন থাকলে সক্রেটিসকে কখনোই সেই অন্যায় বিচারের শিকার হতে হতো না। কারণ আধুনিক মানবাধিকার খুব স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, কোনো মানুষের চিন্তাভাবনা বা প্রশ্ন করার অধিকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভয়ে বিলুপ্ত করা যায় না। মানবাধিকার মূলত সেই ব্রেক বা লাগাম, যা গণতন্ত্রের দ্রুতগামী গাড়িকে খাদের কিনারে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এটি নিশ্চিত করে যেন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতাটি কেবল সংখ্যাধিক্যের জোরে একটি নির্দয় দানবে পরিণত না হয়। একজন সাধারণ নাগরিকের মর্যাদাকে রাষ্ট্রের বিশাল কাঠামোর চেয়েও বড় করে দেখার এই দর্শনটিই মূলত আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় অর্জন।

মানবাধিকারের বর্ম এবং সাংবিধানিক রক্ষাকবচ

সংখ্যাগরিষ্ঠের এই সম্ভাব্য দাপটকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রে একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত কাঠামোর প্রয়োজন হয়। কেবল মুখে মুখে ভালো কথা বললেই কেউ ক্ষমতার লোভ সামলে রাখতে পারে না। ক্ষমতার একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো সে তার নিজের সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়। এই ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর বেঁধে রাখার আইনি দলিলটি হলো দেশের সংবিধান। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই ধারণাটিকে সাংবিধানিকতাবাদ (Constitutionalism) বলা হয়। একটি আদর্শ সংবিধানেরসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো এর মৌলিক অধিকারের অধ্যায়। এই অধ্যায়টি মূলত সরকারের জন্য একটি ‘কী কী করা যাবে না’ তার তালিকা। এখানে খুব স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয় যে, সংসদ চাইলেও এমন কোনো আইন পাস করতে পারবে না যা নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চলাফেরার অধিকার বা জীবনের নিরাপত্তাকে খর্ব করে। সংবিধান হলো সেই আইনি বর্ম, যা সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতার সামনে রক্ষা করে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পাঁচ বছর বা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ক্ষমতার স্বাদ পান, কিন্তু সংবিধানের ভেতরে থাকা মানবাধিকারের এই ধারাগুলো চিরস্থায়ী একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

এই রক্ষাকবচটিকে বাস্তবে কার্যকর করার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। সেই প্রতিষ্ঠানটি হলো বিচার বিভাগ। দেশের উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট মূলত সংবিধানের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে। সংসদ যদি কখনো গরিষ্ঠতার অহংকারে এমন কোনো আইন পাস করে যা মানবাধিকারের পরিপন্থী, তবে আদালত সেই আইনটিকে বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে। আইনি পরিভাষায় একে বিচারিক পর্যালোচনা (Judicial Review) বলা হয়। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল (Robert A. Dahl) তার ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইটস ক্রিটিকস (Democracy and its Critics) বইতে এই ব্যবস্থার একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন (Dahl, 1989)। ডাল দেখিয়েছেন, অনেক সময় নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা বিচারকদের এই ক্ষমতাকে মেনে নিতে চান না। তারা যুক্তি দেখান যে, কোটি কোটি মানুষের ভোটে নির্বাচিত সংসদের সিদ্ধান্তকে কয়েকজন অনির্বাচিত বিচারক কীভাবে বাতিল করতে পারেন? এটি তো সরাসরি জনগণের ইচ্ছার চরম অবমাননা। এই যুক্তির উত্তরে মানবাধিকারের দর্শন বলে, জনগণের ইচ্ছা অনেক সময় আবেগ বা সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হতে পারে। কিন্তু আদালত কোনো আবেগে চলে না, আদালত চলে সেই চিরস্থায়ী লিখিত চুক্তির ওপর ভিত্তি করে, যা রাষ্ট্র গঠনের শুরুতেই সবাই মিলে মেনে নিয়েছিল।

বিচার বিভাগ এবং নির্বাচিত সরকারের মধ্যকার এই টানাপোড়েন একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার খুব সাধারণ চিত্র। সরকার সবসময় চাইবে নিজেদের কাজগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তারা পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বাড়তি ক্ষমতা দিতে চায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা হুমকির মুখে পড়ে। আদালত তখন মাঝখানে এসে দাঁড়ায় এবং সরকারকে তার আইনি সীমা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিচারকরা যখন কোনো নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য সরকারের কোনো নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দেন, তখন সেটি কোনোভাবেই গণতন্ত্রের পরাজয় নয়। বরং সেটি হলো সাংবিধানিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিজয়। কারণ একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা কেবল তার চকচকে ইমারত দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্র কতটা সভ্য তা মাপা হয়, সেই রাষ্ট্রের একজন দুর্বল এবং ক্ষমতাহীন নাগরিকের অধিকার রক্ষায় উচ্চ আদালত কতটা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে, তা দিয়ে। সাংবিধানিক এই রক্ষাকবচগুলো ছাড়া গণতন্ত্র খুব দ্রুতই একটি সংখ্যাগরিষ্ঠের উচ্ছৃঙ্খলতায় রূপ নিতে বাধ্য।

ভিন্নমতের অধিকার এবং সহনশীলতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি

গণতন্ত্রের একেবারে জীবনীশক্তি বা অক্সিজেন হলো ভিন্নমত। একটি সমাজে যদি সবাই সব বিষয়ে একমত হয়ে যায়, তবে সেখানে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থারই আর প্রয়োজন পড়ে না। মানুষে মানুষে চিন্তার অমিল থাকবে, স্বার্থের সংঘাত থাকবে এবং সেই সংঘাতগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল কাজ। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অচল হয়ে পড়বে যদি সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Speech) না থাকে। আমি আপনার কথার সাথে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু আপনার সেই কথা বলার অধিকারটুকু রক্ষা করার জন্য আমি আমার জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকব – এটিই হলো একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক সমাজের মূলমন্ত্র। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ক্ষমতাবানরা সাধারণত সমালোচনা শুনতে একদমই পছন্দ করেন না। তারা সব সময় চান সংবাদপত্রে এবং টেলিভিশনে কেবল তাদের উন্নয়নের গল্পগুলোই প্রচার করা হোক। কেউ যদি সরকারের কোনো নীতির ভুল ধরে বা দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে, তবে সরকার খুব সহজেই তার গায়ে রাষ্ট্রদ্রোহী বা ষড়যন্ত্রকারীর তকমা লাগিয়ে দেয়। মানবাধিকারের কাজ হলো এই সমালোচকদের জন্য একটি নিরাপদ আইনি আশ্রয় তৈরি করা।

ভিন্নমতকে কেবল সহ্য করাই যথেষ্ট নয়, একে রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকার করে নিতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই ধারণাটিকে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ (Political Pluralism) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বহুত্ববাদ বিশ্বাস করে যে সমাজ কোনো একক বা সমজাতীয় ব্লক নয়। সমাজে বিভিন্ন ধর্মের, নানা পেশার এবং ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ বাস করে। প্রতিটি গোষ্ঠীর নিজস্ব কিছু দাবিদাওয়া থাকে এবং তারা সেই দাবিগুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক দল বা সংগঠন তৈরি করতে পারে। ক্ষমতায় থাকা দলটি কখনোই দাবি করতে পারে না যে কেবল তারাই দেশের ভালো বোঝে এবং বিরোধী দলগুলো সব দেশের শত্রু। বিরোধী দলকে দেশের শত্রু ভাবার এই মানসিকতাটি একটি ভয়ংকর ব্যাধি। একটি সুস্থ গণতন্ত্রেবিরোধী দল হলো সরকারের একটি বিকল্প বা কম্পিটিটর। তারা প্রতিনিয়ত সরকারের ভুলগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরবে এবং আগামী নির্বাচনে নিজেদের যোগ্যতর হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে। মানবাধিকার এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাটিকে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ভয়ভীতি থেকে মুক্ত রাখার গ্যারান্টি দেয়।

এই ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখার জন্য আইনের চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন একটি পরমতসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সহনশীলতা কোনো আইনের ধারায় লিখে মানুষের মনের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্চার বিষয়। নাগরিকদের বুঝতে হয় যে, যাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করি, তারও আমার মতোই স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার রয়েছে। সমাজে যখন এই সহনশীলতার অভাব দেখা দেয়, তখন মানুষ যুক্তির বদলে পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য গুম, খুন বা গায়েবি মামলার মতো অমানবিক পথ বেছে নেওয়া হয়। একটি সমাজে যখন ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সমাজে খুব শান্তি বিরাজ করছে। কিন্তু সেই শান্তি হলো গোরস্তানের শান্তি। ভেতরে ভেতরে সেখানে ক্ষোভের এক বিশাল আগ্নেয়গিরি তৈরি হতে থাকে, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ভিন্নমতের চর্চা মূলত রাষ্ট্রকে এই ধরনের ভয়াবহ বিস্ফোরণের হাত থেকে রক্ষা করার একটি সেফটি ভালভ হিসেবে কাজ করে।

ভোটাধিকার বনাম প্রকৃত ক্ষমতায়ন: একটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

অধিকাংশ মানুষের মনে গণতন্ত্র সম্পর্কে একটি খুব সরল ছবি আঁকা থাকে। তারা মনে করেন, পাঁচ বছর পর পর একটি উৎসবমুখর পরিবেশে লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যালট বাক্সে কাগজ ঢোকানোর নামই হলো গণতন্ত্রনির্বাচন বা ভোটাধিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঠিকই, কিন্তু এটি পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই ধরনের নির্বাচন-সর্বস্ব ব্যবস্থাকে প্রক্রিয়াগত গণতন্ত্র (Procedural Democracy) বলে থাকেন। পৃথিবীর অনেক স্বৈরশাসকই এই প্রক্রিয়াগত গণতন্ত্রকে খুব ভালোবাসেন। তারা নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন করেন, সেই নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাদের জেলে পোরেন এবং ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে বিশ্ববাসীকে দেখান যে তারা অত্যন্ত গণতান্ত্রিক একটি সরকার চালাচ্ছেন। এই ধরনের লোকদেখানো নির্বাচনের মাধ্যমে মূলত জনগণের কোনো প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয় না। এখানে ভোটাধিকার কেবল একটি যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, যার সাথে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক থাকে না।

এই যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানবাধিকারের তাত্ত্বিকরা প্রকৃত গণতন্ত্র (Substantive Democracy) প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। এর অর্থ হলো, কেবল ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেই চলবে না, সেই ভোট দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও মানুষের থাকতে হবে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তার ডেমোক্রেসি অ্যাজ আ ইউনিভার্সাল ভ্যালু (Democracy as a Universal Value) নামক বিখ্যাত প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, রাজনৈতিক অধিকার এবং মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনার মধ্যে একটি খুব গভীর সম্পর্ক রয়েছে (Sen, 1999)। তার একটি বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ হলো, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কোনো স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক দেশে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ হয়নি। এর কারণ হলো, যখন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে এবং একটি স্বাধীন গণমাধ্যম থাকে, তখন সরকার বাধ্য হয় অনাহারে থাকা মানুষদের জন্য দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা করতে। ভোট হারানোর ভয়ে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। অর্থাৎ, মানুষের রাজনৈতিক অধিকারগুলো শেষ পর্যন্ত তার অর্থনৈতিক বেঁচে থাকার অধিকারকেই সুনিশ্চিত করে।

প্রকৃত গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কেবল নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নির্বাচনের মধ্যবর্তী যে বিশাল সময়টুকু থাকে, তখন সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার কাজটি করে মূলত সুশীল সমাজ (Civil Society)মানবাধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্বাধীন সংবাদপত্র হলো এই নাগরিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি। তারা সরকারের প্রতিটি কাজের ওপর কড়া নজর রাখে। বাজেটের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে, পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো কারখানা করা হচ্ছে কি না, বা পুলিশের হাতে কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না – এইসব বিষয়ে তারা প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তোলে। একটি কার্যকর নাগরিক সমাজ ছাড়া সরকারের ক্ষমতা অচিরেই স্বৈরতন্ত্রের রূপ নিতে বাধ্য। মানবাধিকার আইন এই নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্রীয় রোষানল থেকে রক্ষা করে। তারা যেন নির্ভয়ে তাদের কাজ করে যেতে পারে, তার জন্য আইনি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে। ভোটাধিকার মূলত মানুষকে রাজা বানায় না, ভোটাধিকারের সাথে এই মানবাধিকারের চর্চা যুক্ত হলেই কেবল মানুষ রাষ্ট্রের সত্যিকারের মালিকে পরিণত হয়।

সমসাময়িক পপুলিজম এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদটি কোনো সামরিক ট্যাঙ্কের ওপর চড়ে আসেনি। অতীতের মতো এখন আর রাতের অন্ধকারে সামরিক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখলের রেওয়াজ খুব একটা দেখা যায় না। এখনকার সংকটটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং ভয়ংকর। নির্বাচিত নেতারা এখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করেই ভেতর থেকে গণতন্ত্রের মূল খুঁটিগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে এই নতুন এবং ধ্বংসাত্মক প্রবণতাকে জনতুষ্টিবাদ (Populism) বা পপুলিজম বলা হয়। পপুলিস্ট নেতারা একটি খুব চটকদার এবং বিভেদমূলক রাজনীতি করেন। তারা দাবি করেন যে কেবল তারাই দেশের ‘আসল’ জনগণের একমাত্র এবং খাঁটি প্রতিনিধি। যারা তাদের সমালোচনা করে বা তাদের নীতির বিরোধিতা করে, তারা জনগণের শত্রু বা বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী। এই নেতারা সমাজের ভেতরে থাকা জাতিগত বা ধর্মীয় বিভাজনগুলোকে সুকৌশলে উসকে দেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করেন।

পপুলিজমের এই উত্থান মানবাধিকারের কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি (Steven Levitsky) এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাট (Daniel Ziblatt) তাদের সাড়া জাগানো গ্রন্থ হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই (How Democracies Die)-তে খুব নিখুঁতভাবে এই অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াটি তুলে ধরেছেন (Levitsky & Ziblatt, 2018)। তারা একে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ (Democratic Backsliding) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পপুলিস্ট নেতারা ক্ষমতায় এসে প্রথমেই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণ চালান। তারা বিচার বিভাগে নিজেদের অনুগত বিচারক নিয়োগ দেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কেড়ে নেন এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের মালিকদের ওপর নানা ধরনের ব্যবসায়িক চাপ প্রয়োগ করেন। সবকিছু এমনভাবে করা হয় যা দেখতে সম্পূর্ণ আইনি মনে হয়। তারা সংবিধানে পরিবর্তন আনেন, নতুন নতুন আইন পাস করেন। কিন্তু এই সব আইনি মারপ্যাঁচের আড়ালে মূলত রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে গিয়ে কুক্ষিগত হয়। সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়

এই আধুনিক স্বৈরতন্ত্রের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো মানবাধিকারের প্রতি সমাজের প্রতিটি মানুষের একটি গভীর এবং আপসহীন অঙ্গীকার। গণতন্ত্র কোনো স্বয়ক্রিয় যন্ত্র নয় যে একবার চালু করে দিলেই অনন্তকাল চলতে থাকবে। এর জন্য প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে লড়াই করতে হয়। পপুলিস্ট নেতাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সমাজের ভেতরের বিভাজন। তারা বোঝাতে চায় যে, কিছু মানুষের অধিকার কেড়ে নিলে বা তাদের জেলে ভরলে দেশের খুব বড় উন্নয়ন হবে। নাগরিকদের এই মায়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে, আজ যদি আমার প্রতিবেশীর অধিকার হরণ করা হয় এবং আমি চুপ থাকি, তবে কাল সেই একই রাষ্ট্রযন্ত্র আমার দরজায় এসে কড়া নাড়বে। অধিকার কখনো খণ্ডিতভাবে টিকে থাকতে পারে না। এটি হয় সবার জন্য থাকবে, নয়তো কারো জন্যই থাকবে না। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের এই যমজ সম্পর্কটি মূলত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে একটি সহনশীল সমাজ গড়ে তোলা ছাড়া মানুষের মুক্তির আর কোনো দ্বিতীয় পথ নেই।

মানবাধিকারের ওপর বিশ্বায়নের প্রভাব (Globalization’s Impact on Human Rights)

অর্থনৈতিক মুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা নতুন বিশ্বব্যবস্থা

পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে অনেকগুলো আঁকাবাঁকা দাগ চোখে পড়ে। এই দাগগুলো মূলত এক দেশের সাথে আরেক দেশের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। একটা সময় ছিল, এই সীমানাগুলো পার হওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির সবকিছুই এই গণ্ডির ভেতরে আটকে থাকত। সময়ের পরিক্রমায় সেই পুরনো দেয়ালগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। পুঁজি, পণ্য এবং প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ পুরো পৃথিবীটাকে আক্ষরিক অর্থেই একটি ছোট গ্রামে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অর্থনীতির ভাষায় এই যুগান্তকারী পরিবর্তনটিকে বিশ্বায়ন (Globalization) বলা হয়। প্রাথমিক দিকে এই ধারণাটি বিশ্বজুড়ে এক বিপুল আশার সঞ্চার করেছিল। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছিল যে, বাণিজ্যের কোনো সীমানা থাকবে না, উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি খুব সহজেই দরিদ্র দেশগুলোতে পৌঁছে যাবে এবং এর ফলে পুরো পৃথিবীতে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে। দারিদ্র্য নামের অভিশাপটি জাদুঘরের বস্তুতে পরিণত হবে। এই চকচকে স্বপ্নের ওপর ভর করেই মূলত আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা তার নতুন যাত্রা শুরু করেছিল।

বাস্তবতার চিত্রটি অবশ্য এই স্বপ্নের মতো এত মসৃণ থাকেনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরেছে ঠিকই, কিন্তু সেই চাকার নিচে চাপা পড়েছে অসংখ্য সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। বিশ্বায়নের ফলে সম্পদের পাহাড় তৈরি হয়েছে, তবে সেই সম্পদ সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। গুটিকয়েক মানুষের হাতে পৃথিবীর সিংহভাগ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং নোবেল বিজয়ী জোসেফ স্টিগলিটজ (Joseph Stiglitz) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস (Globalization and Its Discontents)-এ খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিগুলো মূলত ধনী দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তৈরি করা হয়েছে (Stiglitz, 2002)। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর এই নীতিগুলো অনেকটা জোর করেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বায়নের এই অসম প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণাটি। আগে মনে করা হতো মানবাধিকার মানে কেবল স্বাধীনভাবে কথা বলা বা ভোট দেওয়ার অধিকার। কিন্তু বিশ্বায়ন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অর্থনৈতিক শোষণ এবং বঞ্চনাও মানবাধিকারের ওপর এক ভয়াবহ এবং নীরব আঘাত হানতে পারে।

এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় মানবাধিকারের সংজ্ঞা এবং তার প্রয়োগের জায়গাগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল আকার ধারণ করেছে। মানুষ এখন আর কেবল তার নিজ দেশের সরকারের নীতির কারণেই অধিকারবঞ্চিত হয় না। হাজার মাইল দূরে বসে থাকা কোনো বহুজাতিক কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে একটি দরিদ্র দেশের হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনকে পথে বসিয়ে দিতে পারে। অধিকার লঙ্ঘনের এই নতুন এবং অদৃশ্য কাঠামোটিকে প্রচলিত কোনো আইনি ব্যবস্থা দিয়ে সহজে ধরা যায় না। কারণ এখানে আক্রমণকারী হিসেবে সরাসরি পুলিশের লাঠি বা মিলিটারির বন্দুক থাকে না। এখানে থাকে বাজারের অদৃশ্য হাত, যা খুব নীরবে এবং আইনি মোড়কে মানুষের জীবনধারণের ন্যূনতম মানদণ্ডগুলোকে কেড়ে নেয়। বিশ্বায়ন মূলত মানবাধিকারের আলোচনায় এক সম্পূর্ণ নতুন রণক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে লড়াইটা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং এক বিশাল এবং ক্ষমতাবান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে।

বহুজাতিক কর্পোরেশনের আধিপত্য এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সংকট

বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। এরা পৃথিবীর এক প্রান্তে কাঁচামাল সংগ্রহ করে, আরেক প্রান্তে পণ্য তৈরি করে এবং অন্য কোনো প্রান্তে সেই পণ্য বিক্রি করে। অর্থনীতির ভাষায় এদেরকে বহুজাতিক কর্পোরেশন (Multinational Corporations) বলা হয়। এই কর্পোরেশনগুলোর অর্থনৈতিক শক্তি এতটাই বিশাল যে, পৃথিবীর অনেক স্বাধীন দেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও এদের এক বছরের মুনাফার পরিমাণ বেশি থাকে। এই অসীম অর্থনৈতিক ক্ষমতার কারণেই তারা বিশ্ব রাজনীতিতে এক ধরনের অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার নিজের দেশের আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে সাধারণত তার নাগরিকদের কল্যাণের কথা মাথায় রাখে। কিন্তু বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর উপস্থিতির কারণে রাষ্ট্রের সেই স্বাধীনতা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। কর্পোরেশনগুলো তাদের বিশাল বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের শর্তে আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য করে।

এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক ধারণার ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। যুগ যুগ ধরে আমরা জেনে এসেছি যে একটি রাষ্ট্র তার নিজ সীমানার ভেতরে সর্বেসর্বা। একেই আমরা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (State Sovereignty) বলে থাকি। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে এই সার্বভৌমত্ব একটি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুজান স্ট্রেঞ্জ (Susan Strange) তার দ্য রিট্রিট অব দ্য স্টেট (The Retreat of the State) বইতে এই ক্ষমতার পটপরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Strange, 1996)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধীরে ধীরে এই কর্পোরেশনগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার সবসময় ভয়ে থাকে যে, তারা যদি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কোনো কড়া আইন পাস করে বা পরিবেশ রক্ষার জন্য কারখানার ওপর কোনো বাড়তি কর আরোপ করে, তবে এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ব্যবসা গুটিয়ে অন্য দেশে চলে যাবে। এই ভয় থেকে সরকারগুলো অনেক সময় নিজেদের নাগরিকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোম্পানিগুলোর জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা উন্মুক্ত করে দেয়। রাষ্ট্র মূলত তার পাহারাদারের ভূমিকা থেকে সরে এসে কর্পোরেট সুবিধার এক নীরব পাহারাদারে পরিণত হয়।

এই প্রতিযোগিতাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রেস টু দ্য বটম’ বা নিচের দিকে নামার প্রতিযোগিতা বলা হয়। সস্তা শ্রম এবং আইনি ছাড় দেওয়ার এই প্রতিযোগিতায় নেমে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের চেয়ে পিছিয়ে পড়তে চায় না। এর সবচেয়ে বড় মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে। রাষ্ট্র অনেক সময় এই কোম্পানিগুলোকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন তৈরি করে দেয়, যেখানে দেশের সাধারণ শ্রম আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর থাকে। সেখানে শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারে না, তাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না এবং তারা কোনো আইনি সুরক্ষাও পায় না। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্র নিজেই নিজের দেশের একটি অংশের মানুষের মানবাধিকারগুলো স্থগিত করে রাখে। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর এই একচেটিয়া আধিপত্য মূলত প্রমাণ করে যে, বিশ্বায়নের যুগে মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ অনেক সময় রাষ্ট্র নয়, বরং রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসা এই বিশাল পুঁজির পাহাড়।

সস্তা শ্রমের খোঁজ এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে শ্রমিকের অবস্থান

বিশ্বায়নের চাকা মূলত ঘোরে সস্তা শ্রমের জ্বালানি পুড়িয়ে। উন্নত বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন আর নিজেদের দেশে কোনো কারখানা তৈরি করে না। সেখানে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি, কারণ সেখানকার শ্রমিকদের উচ্চ মজুরি এবং অনেক সামাজিক সুবিধা দিতে হয়। এই খরচ কমানোর জন্য কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা পাঠিয়ে দেয় এশিয়া বা আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন (Global Supply Chain) বা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বলা হয়। এই সাপ্লাই চেইনের একেবারে নিচের ধাপে অবস্থান করে সেই হতদরিদ্র শ্রমিকরা, যারা দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে উন্নত বিশ্বের জন্য ঝকঝকে সব পণ্য তৈরি করে। এই শ্রমিকরা যে পরিবেশে কাজ করে, তা অনেক সময় আধুনিক যুগের দাসত্বেরই নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। কারখানার ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে না, অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা থাকে না এবং ভবনগুলো যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। উন্নত বিশ্বের একজন ভোক্তা যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শোরুম থেকে একটি দামি পোশাক কেনেন, তখন সেই পোশাকের সাথে জড়িয়ে থাকা হাজারো শ্রমিকের ঘাম এবং বঞ্চনার গল্পটি তার একেবারেই অজানা থেকে যায়।

এই অমানবিক শ্রম ব্যবস্থাকে তাত্ত্বিকরা শ্রমের পণ্যকরণ (Commodification of Labor) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। এখানে মানুষের কোনো আলাদা সত্তা বা মর্যাদা নেই। একজন শ্রমিককে বিবেচনা করা হয় কেবল কারখানার একটি মেশিনের অংশ হিসেবে। তার কাজ কেবল উৎপাদন বাড়ানো। সমাজকর্মী এবং লেখক নেওমি ক্লাইন (Naomi Klein) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ নো লোগো (No Logo)-তে এই বৈশ্বিক ব্রান্ডগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থার ভয়াবহ রূপটি তুলে ধরেছেন (Klein, 2000)। কোম্পানিগুলো সবসময় এমন দেশ খোঁজে যেখানে মানুষের পেটে ক্ষুধা বেশি এবং কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র। এই ক্ষুধার সুযোগ নিয়ে তারা শ্রমিকদের এমন মজুরি দেয় যা দিয়ে একজন মানুষের পক্ষে মানসম্মত জীবনযাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটিকে জীবনধারণের উপযোগী মজুরি বা লিভিং ওয়েজ বলা যায় না, এটি বড়জোর না খেয়ে মরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার একটি ব্যবস্থা। বিশ্বায়ন এইভাবে কোটি কোটি মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই কাজের ভেতর থেকে মানুষের আত্মমর্যাদাকে পুরোপুরি শুষে নিয়েছে।

এই সাপ্লাই চেইনে সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হন নারীরা। পোশাক শিল্পসহ অনেক কারখানায় নারী শ্রমিকদের আনুপাতিক হার সবচেয়ে বেশি। এর একটি বড় কারণ হলো, সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নারীরা খুব সহজে প্রতিবাদ করতে পারেন না এবং তাদের অনেক কম মজুরিতে কাজ করানো যায়। কারখানার ভেতরে তারা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হন। মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো ন্যূনতম আইনি সুবিধাগুলো থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়। একটু বয়স হয়ে গেলে বা কাজের গতি কমে গেলে তাদের বিনা নোটিশে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সমান কাজে সমান মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা বারবার বলা হয়েছে। বাস্তবে এই গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের জটিল কাঠামোর আড়ালে সেই আইনগুলো ডুকরে কাঁদে। ব্র্যান্ডগুলো দাবি করে যে কারখানা তাদের নয়, তারা কেবল চুক্তিতে কাজ করায়। আর কারখানার মালিকরা দাবি করে যে ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্যের এত কম দাম দেয় যে এর চেয়ে বেশি মজুরি দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই দোষ চাপানোর খেলায় শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব দায়ভার ওই অসহায় শ্রমিকের কাঁধেই এসে পড়ে।

নয়া-উদারনীতিবাদ এবং সামাজিক অধিকারের কাঠামোগত অবক্ষয়

বিশ্বায়নের পেছনে যে মূল অর্থনৈতিক দর্শনটি কাজ করে, তার নাম হলো নয়া-উদারনীতিবাদ (Neoliberalism)। এই দর্শনের মূল কথা হলো, বাজারের ওপর রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকা চলবে না। সবকিছু মুক্ত বাজারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। বাজার নিজেই মানুষের সব চাহিদা মিটিয়ে দেবে। এই চিন্তাধারার বশবর্তী হয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের অর্থনীতিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তারা সরকারি কলকারখানাগুলো পানির দরে বেসরকারি খাতের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে এবং ভর্তুকি কমানোর নামে শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক খাতগুলো থেকে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ গুটিয়ে নিয়েছে। এই প্রক্রিয়াগুলোকে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বলা হয়, যা অনেক সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার শর্ত হিসেবে চাপিয়ে দেয়। নয়া-উদারনীতিবাদ মূলত মানবজীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টে দিয়েছে। এখানে নাগরিকদের দেখা হয় ভোক্তা হিসেবে, আর মৌলিক অধিকারগুলোকে দেখা হয় পণ্য হিসেবে।

এই দর্শনের সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ প্রভাবটি পড়েছে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের ওপর। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, প্রতিটি মানুষের সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনামূল্যে শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু নয়া-উদারনীতিবাদের যুগে স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা পরিণত হয়েছে চরম লাভজনক ব্যবসায়। বেসরকারি হাসপাতাল এবং ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর ছড়াছড়ি তৈরি হয়েছে। যার পকেটে অঢেল টাকা আছে, সে আধুনিক সব সুবিধা ভোগ করছে। আর যার টাকা নেই, তাকে সরকারি হাসপাতালের মেঝেতে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হচ্ছে। বিখ্যাত ভূগোলবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে (David Harvey) তার আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব নিওলিবারেলিজম (A Brief History of Neoliberalism) গ্রন্থে এই অবস্থাকে পুঁজির আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Harvey, 2005)। হার্ভের মতে, এই ব্যবস্থাটি মূলত সমাজের দরিদ্র মানুষের সম্পদ চুষে নিয়ে ধনীদের পকেট ভারী করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি মাত্র। এটি এমন এক ধরনের কাঠামোগত সহিংসতা যা কোনো বুলেট বা বোমা ছাড়াই মানুষের জীবনকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়।

মানবাধিকার আইন সাধারণত এমন অপরাধগুলো নিয়ে বেশি কাজ করে যেখানে সরাসরি কাউকে হত্যা করা হয় বা বিনাবিচারে জেলে পোরা হয়। নয়া-উদারনীতিবাদের এই কাঠামোগত বঞ্চনাগুলোকে মানবাধিকারের প্রচলিত ছাঁচে ফেলা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র এখানে সরাসরি কাউকে আক্রমণ করছে না, রাষ্ট্র কেবল তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু এই সরে দাঁড়ানোর ফলে সমাজে যে চরম বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, তা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকেই সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একটি সমাজ তখনই মানবিক হয় যখন সেখানে দুর্বলদের জন্য একটি শক্ত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বা সোশ্যাল সেফটি নেট থাকে। বিশ্বায়নের ঢেউয়ে সেই বেষ্টনীগুলো একের পর এক ভেঙে পড়েছে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে, যাতে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে আন্দোলন করতে না পারে। মানুষে মানুষে সামাজিক সংহতির বদলে তৈরি হয়েছে এক তীব্র এবং স্বার্থপর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা। নয়া-উদারনীতিবাদ মূলত মানবাধিকারের সামষ্টিক ধারণাকে দুর্বল করে দিয়ে একটি বিভক্ত এবং অসম সমাজব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব দান করেছে।

উন্নয়নের মাপকাঠি বনাম পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়

আধুনিক বিশ্বে একটি দেশের সফলতা মাপা হয় তার জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের আকার দিয়ে। দেশের জিডিপি বাড়ছে মানেই দেশ খুব উন্নতি করছে, এমন একটি সরল সমীকরণ বিশ্বজুড়ে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই উন্নয়ন তত্ত্ব (Development Theory)-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি কেবল টাকার হিসাব বোঝে, কিন্তু সেই টাকা রোজগারের পেছনে কত মানুষের চোখের জল লুকিয়ে আছে, তার কোনো হিসাব রাখে না। বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মেগা প্রকল্প, বিশাল বাঁধ নির্মাণ এবং ব্যাপক হারে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। এই প্রকল্পগুলোর জন্য লাখ লাখ একর কৃষিজমি এবং বনভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে যারা বংশপরম্পরায় সেই জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল, তারা রাতারাতি ভূমিহীন উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। তাদের উচ্ছেদ করার সময় কোনো আইনি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয় না। রাষ্ট্র উন্নয়নেরদোহাই দিয়ে খুব সহজেই নিজ দেশের নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার অধিকারকে পদদলিত করে।

এই তথাকথিত উন্নয়নের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটি পড়ছে পরিবেশের ওপর। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের নিজেদের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য সব দূষণকারী শিল্পকারখানাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থানান্তর করে দিয়েছে। ফলে দরিদ্র দেশগুলোর নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে, বাতাস নিশ্বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এবং আবাদি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশকর্মী এবং দার্শনিক বন্দনা শিবা (Vandana Shiva) তার আর্থ ডেমোক্রেসি (Earth Democracy) গ্রন্থে বিশ্বায়নের এই ধ্বংসাত্মক রূপটিকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Shiva, 2005)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পেটেন্ট আইনের মাধ্যমে কৃষকদের নিজস্ব বীজের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানির রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। এর ফলে কৃষকরা চরম ঋণের ফাঁদে পড়ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্বায়ন মূলত একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে গুটিকয়েক মানুষের লাভের জন্য সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যগত যে বিপর্যয় ঘটছে, তা সরাসরি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। একটি দূষিত পরিবেশে মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই আর অবশিষ্ট থাকে না। সমাজবিজ্ঞানে এই ধারণাটিকে এখন পরিবেশগত ন্যায়বিচার (Environmental Justice) হিসেবে আলোচনা করা হয়। এই ন্যায়বিচারের মূল কথা হলো, পরিবেশ দূষণের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির ভাগ সমাজের সব মানুষকে সমানভাবে নিতে হবে। বাস্তবে দেখা যায়, কারখানাগুলো তৈরি হয় দরিদ্র মানুষের লোকালয়ে, আর তার মুনাফা ভোগ করে ধনীরা। দরিদ্র মানুষগুলো বাধ্য হয়ে সেই বিষাক্ত পরিবেশেই জীবন পার করে এবং নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। বিশ্বায়নের এই উন্নয়নের মডেলটি মূলত মানবাধিকারের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কিছু মানুষের সাময়িক বিলাসবহুল জীবনের জন্য কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ এবং প্রকৃতির ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা এবং কর্পোরেট জবাবদিহিতার ভবিষ্যৎ

মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক আইনগুলো মূলত তৈরি হয়েছিল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। চুক্তিগুলোতে রাষ্ট্রগুলোই স্বাক্ষর করে এবং নিয়ম ভাঙলে রাষ্ট্রকেই জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে এসে দেখা গেল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক বড় বড় ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি দায়ী বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো। সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক আইনে এই কর্পোরেশনগুলোকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মতো কোনো শক্ত আইনি কাঠামো নেই। তারা আন্তর্জাতিক আইনের এই ফাঁকফোকরগুলোর খুব চমৎকার ব্যবহার করে। এক দেশে অপরাধ করে তারা খুব সহজেই তাদের মূল কোম্পানির সদর দপ্তরে গিয়ে আইনি সুরক্ষা লাভ করে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে একটি বিলিয়ন ডলারের কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা লড়ে ন্যায়বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এই আইনি সীমাবদ্ধতাটি কর্পোরেশনগুলোকে এক ধরনের বেপরোয়া ক্ষমতা এনে দিয়েছে, যা তারা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ব্যবহার করে।

এই চরম জবাবদিহিতাহীন অবস্থা দূর করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (Corporate Social Responsibility) বা সিএসআর (CSR) ধারণাটি। কোম্পানিগুলো দাবি করে যে, তারা স্বেচ্ছায় কিছু নিয়মকানুন মেনে চলে এবং লাভের একটি অংশ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করে। তারা সুন্দর সুন্দর স্কুল বানায় বা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে। মানবাধিকার কর্মীরা এই সিএসআর-কে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না। তারা একে অনেক সময় ‘গ্রিনওয়াশিং‘ বা লোকদেখানো প্রচারণার কৌশল হিসেবেই দেখেন। কারণ একটি কোম্পানি একদিকে তাদের কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করবে, আর অন্যদিকে কিছু টাকা দান করে মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়ন সাজবে, এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই স্বেচ্ছায় মেনে চলা নিয়মগুলোর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কোম্পানি চাইলে মানতে পারে, না চাইলে তাদের কোনো শাস্তি দেওয়ার সুযোগ এই ব্যবস্থায় থাকে না।

এই স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থার ব্যর্থতা বুঝতে পেরে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল একটি নতুন এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন রাগী (John Ruggie)-র নেতৃত্বে ২০১১ সালে জাতিসংঘ ‘ব্যবসা ও মানবাধিকার সম্পর্কিত নির্দেশনামূলক নীতিমালা’ (Guiding Principles on Business and Human Rights) অনুমোদন করে (Ruggie, 2013)। এই নীতিমালায় তিনটি মূল স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে: মানবাধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ব্যবসার দায়িত্ব, এবং কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা। এই নীতিমালাটি কোনো আইন না হলেও, এটি বিশ্বজুড়ে একটি নতুন নৈতিক এবং রাজনৈতিক মানদণ্ড তৈরি করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বাধ্যতামূলক বা বাইন্ডিং চুক্তি তৈরির জোরালো দাবি উঠছে, যা কর্পোরেশনগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সরাসরি জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে। বিশ্বায়নের অসীম শক্তির সামনে সাধারণ মানুষের অধিকারকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই ধরনের একটি বৈশ্বিক আইনি কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই। কর্পোরেট মুনাফার চেয়ে মানুষের জীবনের মর্যাদা যে অনেক বেশি দামি, এই শাশ্বত সত্যটি প্রতিষ্ঠা করাই হবে আগামী দিনের মানবাধিকার সংগ্রামের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

কর্পোরেট দায়বদ্ধতা ও মানবাধিকার (Corporate Responsibilities for Human Rights)

পুঁজির বিশ্বায়ন এবং মানবাধিকারের নতুন সংকট

ঐতিহাসিকভাবে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোগুলো মূলত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিরাচরিত ধারণাগুলোতে রাষ্ট্রকেই প্রধান নিপীড়ক হিসেবে ধরে নেওয়া হতো, কারণ পুলিশের লাঠি বা সামরিক বাহিনীর বন্দুক রাষ্ট্রের হাতেই ন্যস্ত থাকে। সময়ের সাথে সাথে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। বর্তমান যুগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় এবং জটিল ক্ষেত্রগুলো আর কেবল রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতর বা সরকারি বাহিনীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুঁজির অবাধ প্রবাহ এবং বিশ্বায়নের ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন রাষ্ট্রের ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যায়। বিশাল বিশাল কারখানার ধোঁয়া, খনি খননের ফলে আদিবাসীদের উচ্ছেদ, বা কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের অমানবিক জীবনযাপন – এগুলো সবই কর্পোরেট শক্তির সরাসরি ফলাফল। মানবাধিকারের তাত্ত্বিক আলোচনায় এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় নির্যাতন থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য যে আন্তর্জাতিক আইনগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো কর্পোরেট পুঁজির এই অদৃশ্য এবং বহুমাত্রিক আগ্রাসন ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই কর্পোরেট আচরণের পেছনের আদর্শিক ভিত্তিটি আধুনিক অর্থনীতির একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান (Milton Friedman) তার যুগান্তকারী শেয়ারহোল্ডার তত্ত্ব (Shareholder Theory)-এর মাধ্যমে এই দর্শনের সবচেয়ে জোরালো রূপরেখাটি প্রদান করেছিলেন। ফ্রিডম্যান যুক্তি দেখান যে, একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একমাত্র এবং প্রধান সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো তার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মুনাফা বৃদ্ধি করা। এই তত্ত্বটি কর্পোরেট জগৎকে একটি নির্দিষ্ট এবং সংকীর্ণ লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে, যেখানে সমাজের প্রতি তাদের অন্যান্য দায়বদ্ধতাগুলো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়। মুনাফা সর্বোচ্চ করার এই নিরন্তর প্রতিযোগিতায় পরিবেশের ক্ষতি, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো কোম্পানির ব্যালেন্স শিটে বা হিসাবের খাতায় কোনো স্থান পায় না। ফ্রিডম্যানের এই দর্শনটি মূলত পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এমন একটি যান্ত্রিক রূপ দিয়েছে, যেখানে মানুষের জীবনের মর্যাদার চেয়ে পুঁজির বৃদ্ধি অনেক বেশি আরাধ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কর্পোরেশনগুলোকে ‘লিগ্যাল পারসন’ বা আইনি সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তারা মানুষের মতোই সম্পত্তি কিনতে পারে, চুক্তি করতে পারে এবং মামলা লড়তে পারে। কিন্তু একটি রক্তমাংসের মানুষের যে নৈতিক বোধ বা সহানুভূতি থাকে, আইনি সত্তা হিসেবে কর্পোরেশনের ভেতরে তার চরম অভাব রয়েছে। কানাডিয়ান আইনজ্ঞ জোল বাকান (Joel Bakan) তার অত্যন্ত প্রশংসিত দ্য কর্পোরেশন (The Corporation) গ্রন্থে কর্পোরেট সত্তার এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। বাকান দেখিয়েছেন যে, একটি কর্পোরেশনকে যদি মানুষের মনস্তত্ত্বের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তবে তাকে একজন ‘সাইকোপ্যাথ’ বা চরম মাত্রায় অনুভূতিহীন সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। কারণ কর্পোরেশনগুলো নিজেদের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না এবং সেই ক্ষতির জন্য তারা কোনো অপরাধবোধও অনুভব করে না। সমাজের ঘাড়ে নিজেদের অপকর্মের দায় চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতাকে অর্থনীতিতে ‘এক্সটার্নালিটি‘ বলা হয়। বাকানের এই বিশ্লেষণ আমাদের খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়, কেবল মুনাফার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি সত্তার কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানবাধিকার রক্ষার প্রত্যাশা করাটা কতটা অবাস্তব।

বহুজাতিক কর্পোরেশনের উত্থান এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা

বিশ্বায়নের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং প্রভাবশালী প্রতিচ্ছবি হলো বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর অভাবনীয় উত্থান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই; তাদের উৎপাদন, বিপণন এবং লজিস্টিকস পুরো বিশ্বজুড়ে এক জটিল জালের মতো ছড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক আকারের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, শীর্ষস্থানীয় অনেক বহুজাতিক কর্পোরেশনের বার্ষিক রাজস্ব বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি-কেও ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতার কারণে বৈশ্বিক রাজনীতির মাঠেও ক্ষমতার এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার নিজেদের দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য এবং বেকারত্ব কমানোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকে। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো অত্যন্ত নিজেদের সুবিধামতো শর্তে চুক্তি স্বাক্ষর করে। তারা অনেক সময় কর মওকুফ, সস্তা জমি এবং নমনীয় শ্রম আইনের দাবি জানায়। সরকারগুলো বিনিয়োগ হারানোর ভয়ে তাদের এই অন্যায্য দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়, যা প্রকারান্তরে দেশের সাধারণ নাগরিকদের মানবাধিকারকেই নিলামে তুলে দেয়।

রাষ্ট্র এবং বাজারের এই অসম প্রতিযোগিতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদ সুসান স্ট্রেঞ্জ (Susan Strange) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ধারণার অবতারণা করেছেন। তিনি একে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পশ্চাদপসরণ (The Retreat of the State) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্ট্রেঞ্জের মতে, বিশ্বায়িত বাজারের চাপে পড়ে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তাদের অনেক মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর কাছে রাষ্ট্র এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। কোনো দেশ যদি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কঠোর আইন পাস করতে চায় বা কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত করতে বাধ্য করে, তবে কর্পোরেশনগুলো খুব সহজেই ভয় দেখায় যে তারা ব্যবসা গুটিয়ে অন্য কোনো সস্তা দেশে চলে যাবে। বিনিয়োগ চলে যাওয়ার এই ভয়কে পুঁজি করে কর্পোরেশনগুলো এক দেশ থেকে অন্য দেশে ‘রেস টু দ্য বটম’ বা নিচের দিকে নামার এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতা তৈরি করে। স্ট্রেঞ্জের এই তাত্ত্বিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এখন আর কোনো অজেয় শক্তি নয়; এটি বৈশ্বিক পুঁজির কাছে প্রতিনিয়ত আপস করতে বাধ্য হচ্ছে।

এই কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে করুণ শিকার হয় গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষগুলো, বিশেষ করে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে। তেল, গ্যাস বা কয়লা খনি তৈরি করার জন্য বিশাল বিশাল বনভূমি উজাড় করা হয় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোকে তাদের ভিটেমাটি থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করা হয়। প্রখ্যাত ভূগোলবিদ ডেভিড হার্ভে (David Harvey) পুঁজিবাদের এই আগ্রাসী রূপটিকে দখলদারিত্বের মাধ্যমে পুঞ্জীভবন (Accumulation by Dispossession) হিসেবে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। হার্ভে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক পুঁজিপতিরা কেবল কারখানায় পণ্য তৈরি করেই ক্ষান্ত হয় না, তারা সাধারণ মানুষের ব্যবহার করা জমি, নদী বা বনের মতো সাধারণ সম্পদগুলোকে জোরপূর্বক দখল করে সেগুলোকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে। এই দখলদারিত্বের ফলে স্থানীয় মানুষের জীবিকার অধিকার, বাসস্থানের অধিকার এবং সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক আইনে এই বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মতো কোনো শক্ত মেকানিজম না থাকায়, তারা এই মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো করেই খুব সহজে আইনি সুরক্ষার আড়ালে পার পেয়ে যায়।

জন রাগির নির্দেশিকা এবং সুরক্ষা, সম্মান ও প্রতিকার ফ্রেমওয়ার্ক

কর্পোরেট অপরাধগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনার জন্য জাতিসংঘ দশকের পর দশক ধরে নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর প্রবল লবিং এবং উন্নত দেশগুলোর অসহযোগিতার কারণে কোনো বাধ্যতামূলক আইনি চুক্তি কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য ২০০৫ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন রাগি (John Ruggie)-কে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্যবসা এবং মানবাধিকারের মধ্যকার জটিল সম্পর্কটির একটি বাস্তবমুখী সমাধান খুঁজে বের করার। রাগি বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাষ্ট্র এবং কর্পোরেশনগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলে কোনো আইনি সমাধান আসবে না। তাই তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে একটি নতুন এবং প্রায়োগিক কাঠামোর প্রস্তাব করেন, যা ২০০৮ সালে সুরক্ষা, সম্মান ও প্রতিকার ফ্রেমওয়ার্ক (Protect, Respect, and Remedy Framework) নামে জাতিসংঘের সর্বসম্মত অনুমোদন লাভ করে। এই ফ্রেমওয়ার্কটি মূলত মানবাধিকারের আলোচনায় কর্পোরেট দায়বদ্ধতাকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং কাঠামোগত রূপ প্রদান করে।

এই ফ্রেমওয়ার্কের তিনটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে, যা রাষ্ট্র এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বগুলোকে খুব স্পষ্টভাবে আলাদা করে দিয়েছে। প্রথম স্তম্ভটি হলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা যেকোনো তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ কর্পোরেশনগুলোর দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয় স্তম্ভটি সরাসরি কর্পোরেশনগুলোর দিকে নির্দেশ করে। বলা হয়েছে যে, কর্পোরেশনগুলোর একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব রয়েছে মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার। অর্থাৎ, তাদের এমন কোনো কাজ করা যাবে না যা মানুষের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। আর তৃতীয় স্তম্ভটি হলো প্রতিকার বা রেমিডি। যখন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, তখন ভুক্তভোগী মানুষগুলো যেন আদালতের মাধ্যমে বা বিকল্প উপায়ে একটি কার্যকর এবং ন্যায্য প্রতিকার পায়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র এবং কর্পোরেশন উভয়েরই দায়িত্ব। এই তিনটি স্তম্ভ মিলে একটি অখণ্ড সুরক্ষাবলয় তৈরি করে, যা কর্পোরেট মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেছে।

এই তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কটিকে বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালে প্রণীত হয় জাতিসংঘের নির্দেশক নীতিমালা (UN Guiding Principles on Business and Human Rights)। এই নীতিমালার সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন হলো ‘হিউম্যান রাইটস ডিউ ডিলিজেন্স’ বা মানবাধিকার বিষয়ক যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের বাধ্যবাধকতা। এর অর্থ হলো, কোম্পানিগুলোকে আগে থেকেই যাচাই করে দেখতে হবে যে তাদের ব্যবসার কারণে কারো মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার ঝুঁকি আছে কি না, এবং সেই ঝুঁকি কমানোর জন্য তাদের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। জন রাগি তার জাস্ট বিজনেস (Just Business) গ্রন্থে এই নীতিমালা প্রণয়নের পেছনের দীর্ঘ কূটনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের কথা বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। রাগি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র, সুশীল সমাজ এবং কর্পোরেট জগতের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। যদিও এই নীতিমালাগুলো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তারপরও এগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যবসা এবং মানবাধিকারের মানদণ্ড নির্ধারণে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এগুলো প্রমাণ করেছে যে, মানবাধিকার কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের কাজের মানবিক প্রভাবের হিসাব দিতে হবে।

কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বনাম মানবাধিকারের আইনি বাধ্যবাধকতা

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা যখন বাড়তে শুরু করে, তখন তারা নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য একটি নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়। এই কৌশলটি বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা সিএসআর (CSR) নামে পরিচিতি লাভ করে। কোম্পানিগুলো দাবি করতে শুরু করে যে তারা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ এবং তারা স্বেচ্ছায় অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করে থাকে। তারা কোথাও স্কুল বানিয়ে দেয়, কোথাও হাসপাতালে অনুদান দেয়, আবার কোথাও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে। আপাতদৃষ্টিতে এই কাজগুলোকে খুব মহৎ মনে হলেও, মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো চরম বিভ্রান্তিকর। সিএসআর মূলত এক ধরনের দাতব্য কার্যক্রম, যা কোম্পানির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কোম্পানি চাইলে অনুদান দেবে, না চাইলে দেবে না। অন্যদিকে, মানবাধিকার হলো মানুষের জন্মগত পাওনা, যা নিশ্চিত করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। একটি কোম্পানি যদি কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দিয়ে বা নদীর জল দূষিত করে বাইরে একটি স্কুল বানিয়ে দেয়, তবে সেই স্কুল কোনোভাবেই তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধকে ঢেকে দিতে পারে না।

কর্পোরেট জগতের এই দ্বিমুখী আচরণকে তাত্ত্বিকরা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় সমালোচনা করেছেন। কোম্পানিগুলো প্রায়শই পরিবেশ রক্ষার নামে বড় বড় বিজ্ঞাপন প্রচার করে, যাকে ‘গ্রিনওয়াশিং‘ বলা হয়। প্রখ্যাত দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক সমালোচক স্লাভয় জিজেক (Slavoj Žižek) আধুনিক পুঁজিবাদের এই আচরণকে সাংস্কৃতিক পুঁজিবাদ (Cultural Capitalism) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জিজেক দেখিয়েছেন যে, কোম্পানিগুলো এখন পণ্যের সাথে সাথে এক ধরনের নৈতিক সান্ত্বনাও বিক্রি করে। যখন বলা হয় যে এক কাপ কফি কিনলে তার লাভের একটি অংশ দরিদ্র কৃষকের কাছে যাবে, তখন ক্রেতা সেই কফি কিনে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। জিজেকের মতে, এই ব্যবস্থাটি মূলত আসল শোষণটিকে আড়াল করার একটি নিখুঁত পদ্ধতি। ক্রেতাকে বোঝানো হয় যে তিনি ভোগ করার মাধ্যমেই পৃথিবীর সমস্যা সমাধান করছেন, ফলে কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে কোনো কাঠামোগত আন্দোলন গড়ে ওঠে না। সিএসআর-এর এই মোহময় আবরণটি মূলত কর্পোরেট অপরাধগুলোকে আইনি কাঠামোর বাইরে রাখার একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত কৌশল মাত্র।

এই স্বেচ্ছামূলক সিএসআর মডেলের অকার্যকারিতা উপলব্ধি করে বিশ্বজুড়ে এখন একটি বাধ্যতামূলক আইনি চুক্তির দাবি জোরালো হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো জাতিসংঘের কাছে দাবি জানাচ্ছে এমন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের, যা বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোকে সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। এই প্রস্তাবিত চুক্তিটির মূল লক্ষ্য হলো, কর্পোরেশনগুলো যখন কোনো দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তখন তাদের যেন আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা যায়। পশ্চিমা দেশগুলো এবং বড় বড় কর্পোরেট লবিস্টরা এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকাই যথেষ্ট এবং কড়া আইন করলে বিশ্ববাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। এই বিতর্কটি মূলত নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং আইনি জবাবদিহিতার মধ্যকার চিরস্থায়ী সংঘাতের প্রতিফলন। যতক্ষণ পর্যন্ত কর্পোরেট অপরাধের জন্য আইনি শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সিএসআর-এর মতো লোকদেখানো উদ্যোগগুলো দিয়ে মানবাধিকারের প্রকৃত সুরক্ষা কখনোই সম্ভব নয়।

গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং প্রান্তিক শ্রমিকের অধিকার

আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখন আর কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। একটি পণ্য তৈরি হওয়ার পেছনের গল্পটি এখন অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল। একটি স্মার্টফোন বা এক জোড়া জুতো তৈরি করতে গিয়ে কাঁচামাল হয়তো আসছে আফ্রিকা থেকে, এর যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে এশিয়ার কোনো দেশে, আর পণ্যটির চূড়ান্ত নকশা এবং বিপণন হচ্ছে ইউরোপ বা আমেরিকায়। এই বিশাল এবং খণ্ডিত উৎপাদন ব্যবস্থাকে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বলা হয়। এই সাপ্লাই চেইনের একেবারে শীর্ষে থাকে বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো। তারা সরাসরি কোনো কারখানা মালিক নয়, তারা কেবল স্থানীয় কারখানার মালিকদের চুক্তিতে কাজ দেয়। এই চুক্তির কাঠামোর কারণে যখন স্থানীয় কারখানায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে বা শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো খুব সহজেই দাবি করে যে তারা এই ঘটনার জন্য দায়ী নয়। মালিকানার এই বিচ্ছিন্নতা মূলত ব্র্যান্ডগুলোকে একটি চমৎকার আইনি রক্ষাকবচ প্রদান করে, যার আড়ালে বসে তারা অত্যন্ত সস্তায় পণ্য তৈরি করিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করে।

এই বৈশ্বিক উৎপাদন জালের কাঠামোটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী গ্যারি গেরেফি (Gary Gereffi) একটি যুগান্তকারী তাত্ত্বিক ধারণার প্রবর্তন করেন, যা গ্লোবাল কমোডিটি চেইন (Global Commodity Chains) নামে পরিচিত। গেরেফি দেখিয়েছেন যে, বর্তমান অর্থনীতিতে ব্র্যান্ডগুলো বা বড় রিটেইলাররা কারখানার মালিক না হয়েও পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তারা নির্ধারণ করে দেয় পণ্যের দাম কত হবে এবং কত দ্রুত পণ্যটি বানিয়ে দিতে হবে। এই শীর্ষ কোম্পানিগুলোর দাম কমানোর প্রবল চাপের কারণেই মূলত স্থানীয় কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে রাখতে এবং কারখানার নিরাপত্তার বিষয়ে আপস করতে বাধ্য হন। গেরেফির এই বিশ্লেষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে ঘটা মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো মূলত ব্র্যান্ডগুলোর চাপিয়ে দেওয়া অসম অর্থনৈতিক কাঠামোর অনিবার্য পরিণতি। প্রান্তিক শ্রমিকরা এই চেইনের একেবারে নিচের ধাপে অবস্থান করে, যেখানে তাদের গায়ের ঘাম এবং অমানবিক পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ব অর্থনীতির চকচকে ইমারতটি দাঁড়িয়ে থাকে।

সরবরাহ শৃঙ্খলে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য প্রাইভেট অডিটিং বা বেসরকারি পরিদর্শনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ব্র্যান্ডগুলো বিভিন্ন অডিট কোম্পানিকে ভাড়া করে কারখানার কর্মপরিবেশ যাচাই করার জন্য। বাস্তবে এই অডিট ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক সময় আগে থেকেই জানিয়ে অডিট করা হয়, ফলে কারখানার মালিকরা পরিদর্শনের দিন সবকিছু ঠিকঠাক করে রাখেন। এছাড়া কোবাল্ট খনিতে শিশুশ্রম বা কৃষিখাতে আধুনিক দাসত্বের মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো এই ধরনের অডিট দিয়ে কখনোই নির্মূল করা সম্ভব নয়। সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য স্বেচ্ছামূলক অডিটের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ভ্যালু চেইন (Value Chain)-এর প্রতিটি স্তরে আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্র্যান্ডগুলোকে বাধ্য করতে হবে যেন তারা তাদের সাপ্লাই চেইনের একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মানবাধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। উৎপাদকের দেশ থেকে শুরু করে ভোক্তার দেশ পর্যন্ত পুরো আইনি কাঠামোটিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন মুনাফার ভাগীদার সবাই সমানভাবে দায়বদ্ধতারও ভাগীদার হয়।

পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং কর্পোরেট জবাবদিহিতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা

কর্পোরেট কর্মকাণ্ডের সাথে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রূপটি দেখা যায় পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলা, যথেচ্ছভাবে বনভূমি উজাড় করা এবং মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমন করে বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত করার পেছনে প্রধানত দায়ী বিশ্বের বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। এই পরিবেশ দূষণের খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। যখন কোনো কারখানার বর্জ্যে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে যায়, তখন নদীর পাড়ে বাস করা জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকার অধিকার এবং সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্যের অধিকার সরাসরি লঙ্ঘিত হয়। এই বাস্তবতা থেকেই উদ্ভব হয়েছে পরিবেশগত ন্যায়বিচার (Environmental Justice) আন্দোলনের। এই আন্দোলনের মূল দাবি হলো, পরিবেশ দূষণের মাত্রা এবং এর ক্ষতির প্রভাব সমাজের সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। কর্পোরেশনগুলো সাধারণত তাদের দূষণকারী কারখানাগুলো এমন সব এলাকায় স্থাপন করে, যেখানে দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষের বসবাস বেশি। এই মানুষগুলোর প্রতিবাদ করার মতো যথেষ্ট আইনি বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে না। পরিবেশগত ন্যায়বিচার মূলত কর্পোরেট দূষণের এই বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত মানবাধিকারভিত্তিক প্রতিরোধ।

কর্পোরেশনগুলো তাদের এই পরিবেশ ধ্বংসের কাজকে নির্বিঘ্ন রাখার জন্য অনেক সময় চরম দমনমূলক আইনি কৌশলের আশ্রয় নেয়। যখন কোনো পরিবেশকর্মী বা স্থানীয় সম্প্রদায় কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তখন কোম্পানি তাদের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার মানহানির মামলা ঠুকে দেয়। আইনি পরিভাষায় একে স্ট্র্যাটেজিক লসুট অ্যাগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন (SLAPP) বলা হয়। এই মামলাগুলোর উদ্দেশ্য বিচার পাওয়া নয়, বরং আন্দোলনকারীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা এবং তাদের আর্থিকভাবে দেউলিয়া করে দেওয়া। এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জমি দখল এবং খনি খননের প্রতিবাদ করায় আদিবাসী নেতাদের গুম বা হত্যা করার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। কর্পোরেট স্বার্থের পাহারাদার হিসেবে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনী এই মানবাধিকার রক্ষকদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়। এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পরিবেশ রক্ষার লড়াইটি এখন কেবল গাছ বাঁচানোর আন্দোলন নেই, এটি কর্পোরেট পুঁজির অসীম ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার এক মরণপণ সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

কর্পোরেট জবাবদিহিতার এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিমণ্ডলে ভবিষ্যতের রূপরেখাটি ধীরে ধীরে একটি নতুন আইনি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্তরের নরম বা ঐচ্ছিক আইনগুলো এখন বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ কঠোর আইনে পরিণত হতে শুরু করেছে। ফ্রান্স তাদের দেশে ডিউটি অফ ভিজিল্যান্স আইন পাস করেছে এবং জার্মানি সাপ্লাই চেইন আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনগুলোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো কোম্পানি যদি তার সাপ্লাই চেইনে পরিবেশ বা মানবাধিকারের ক্ষতি করে, তবে সেই কোম্পানিকে তার নিজ দেশের আদালতেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আইনের এই বহিঃরাষ্ট্রীয় প্রয়োগ বা এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল রিচ কর্পোরেট জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে একটি বিশাল আশার সঞ্চার করেছে। এটি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দায় এড়ানোর সব পুরনো আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে দিচ্ছে। কর্পোরেট দায়বদ্ধতা এখন আর কোনো জনসংযোগের কৌশল বা স্বেচ্ছামূলক দয়ার বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে এমন একটি কঠোর আইনি শৃঙ্খলার রূপ নিচ্ছে, যেখানে পুঁজির বিস্তারের চেয়ে মানবজীবনের অন্তর্নিহিত মর্যাদা এবং পৃথিবীর পরিবেশের সুরক্ষাই আইনি ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবাধিকার (Climate Change and Human Rights)

জলবায়ু সুবিচারের দার্শনিক ভিত্তি এবং ঐতিহাসিক অবিচার

পরিবেশ নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা দীর্ঘকাল ধরে বেশ শৌখিন একটি পর্যায়ে আটকে ছিল। বিগত কয়েক দশক আগেও বিশ্বনেতারা গাছ বাঁচানো, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রক্ষা করা বা বরফ গলার গল্প নিয়ে আলোচনা করতেন। এই আলোচনাগুলোতে এক ধরনের রোমান্টিকতা ছিল, কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র হাহাকার খুব একটা শোনা যেত না। সময়ের হাত ধরে পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। মানুষ এখন খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়া মানে কেবল কয়েকটি প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, এটি মূলত মানুষের নিজের অস্তিত্বের ওপর কুঠারাঘাত। পরিবেশের এই বিপর্যয়কে এখন আর কেবল বিজ্ঞানের সমস্যা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সর্বগ্রাসী মানবাধিকার সংকটে রূপ নিয়েছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার কারণে যে মানুষটি আজ তার বসতবাড়ি হারাচ্ছে, সে হয়তো জীবনে কোনোদিন একটি কারখানাও দেখেনি। এই নিরীহ মানুষগুলোর জীবনের অধিকার, বাসস্থানের অধিকার এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশের এই ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর এমনভাবে আঘাত হানছে, যা প্রচলিত কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংজ্ঞায় সহজে মাপা যায় না।

এই সংকটের একেবারে মূলে রয়েছে এক বিশাল ঐতিহাসিক বৈষম্য। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেছে। তারা বিশাল বিশাল কারখানা তৈরি করেছে, সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষাক্ত ধোঁয়ায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভরিয়ে দিয়েছে। আজ সেই অতিরিক্ত কার্বনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, সমুদ্রের জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে পৃথিবীর সেই দরিদ্র অঞ্চলগুলোকে, যাদের কার্বন নির্গমনের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে অধিকারের তাত্ত্বিকরা জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice) নামের একটি শক্তিশালী আইনি এবং দার্শনিক ধারণার জন্ম দিয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মেরি রবিনসন তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ ক্লাইমেট জাস্টিস: হোপ, রেজিলিয়েন্স, অ্যান্ড দ্য ফাইট ফর আ সাসটেইনেবল ফিউচার (Climate Justice: Hope, Resilience, and the Fight for a Sustainable Future)-এ দেখিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মূলত মানবাধিকারের চিরন্তন সমতা নীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপহাস করে (Robinson, 2018)। যারা অপরাধ করল তারা থাকল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নিরাপদ ঘরে, আর যারা নির্দোষ তারা ভাসল জলোচ্ছ্বাসের নোনা পানিতে। মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এর চেয়ে বড় অবিচার পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।

আইন এবং দর্শনের জায়গা থেকে এই অবিচারকে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত উপযোগবাদ (Utilitarianism) হয়তো কোনো এককালে বৃহত্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পরিবেশের এই ক্ষতিকে জায়েজ বা ন্যায্য প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করত। তারা ভাবত, শিল্পায়নের ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে, তাই কিছু পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়াই যায়। কিন্তু মানবাধিকারের দর্শন এই ধরনের গাণিতিক হিসাব-নিকাশকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। একজন মানুষের বাড়িঘর এবং জীবিকা কেড়ে নিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে দশজনের জন্য আরামদায়ক জীবন নিশ্চিত করাটা মানবাধিকারের চোখে সরাসরি একটি অপরাধ। শিল্পোন্নত দেশগুলো এখন আর বলতে পারে না যে তারা অজ্ঞতাবশত এই ক্ষতি করেছে। বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণের পরও তারা নিজেদের মুনাফার লোভে কার্বন নির্গমন অব্যাহত রেখেছে। এই কাজটিকে আন্তর্জাতিক আইনের অনেক বিশেষজ্ঞ একটি নীরব এবং কাঠামোগত সহিংসতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মানবাধিকার আইন এই সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে এবং দাবি করে যে, যারা পরিবেশের ক্ষতি করেছে তাদেরকেই এই ক্ষতির সম্পূর্ণ আইনি এবং আর্থিক দায়ভার বহন করতে হবে।

বাস্তুচ্যুতি এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পরিচয় সংকট

সমুদ্রের কাছাকাছি বা বদ্বীপ অঞ্চলে বাস করা মানুষদের জীবনের সাথে জলের একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকে। জল তাদের জীবন বাঁচায়, আবার জলই তাদের জীবন কেড়ে নেয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই উপকূলীয় মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ একটি ভয়াবহ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। নোনা জল লোকালয়ে প্রবেশ করে আবাদি জমির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে। মিষ্টি জলের আধারগুলো বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে মানুষ তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি ফেলে শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। এই যে মানুষগুলো নিজেদের জমি হারাল, এরা কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দাঙ্গা বা যুদ্ধের কারণে দেশছাড়া হয়নি। এরা শিকার হয়েছে প্রকৃতির একটি মনুষ্যসৃষ্ট রোষানলের। সমাজবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক আইনের গবেষকরা এই মানুষগুলোকে জলবায়ু উদ্বাস্তু (Climate Refugees) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাড়িঘর হারানোর কষ্ট এমনিতেই অনেক তীব্র। তার ওপর এই মানুষগুলোর কাঁধে চেপে বসে এক অদ্ভুত পরিচয়হীনতার বোঝা। তারা নিজেদের দেশের ভেতরেই এক প্রকার পরবাসী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে শুরু করে।

আন্তর্জাতিক আইনের একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সুরক্ষার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট এবং বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ১৯৫১ সালের আন্তর্জাতিক শরণার্থী সনদে মূলত ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষদেরই রিফিউজি বা শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফ্রাঙ্ক বিয়ারম্যান এবং ইনগ্রিড বোয়াস তাদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, পরিবেশগত কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষগুলো আন্তর্জাতিক আইনের এই পুরোনো সংজ্ঞার ফাঁক গলে একটি ভয়াবহ আইনি শূন্যতায় পতিত হয় (Biermann & Boas, 2010)। তারা যদি সীমানা পেরিয়ে অন্য কোনো দেশে চলেও যায়, তবুও তারা আইনিভাবে শরণার্থীর মর্যাদা পায় না। তাদের স্রেফ অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখা হয় এবং যেকোনো সময় জোর করে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি থাকে। একটি রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক কারণে কাউকে তাড়িয়ে দিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সোচ্চার হয়। অথচ উন্নত দেশগুলোর কার্বন দূষণের কারণে লাখ লাখ মানুষ যখন চিরতরে নিজেদের ঠিকানা হারায়, তখন আন্তর্জাতিক আইন তাদের আশ্রয় দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা অনুভব করে না। এটি মানবাধিকারের বৈশ্বিক কাঠামোর একটি বড় ধরনের ত্রুটি।

বাস্তুচ্যুতির এই যন্ত্রণা সমাজের সব স্তরে সমানভাবে আঘাত করে না। এখানেও সেই পরিচিত লিঙ্গ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। একটি পরিবার যখন সবকিছু হারিয়ে শহরের বস্তিতে এসে আশ্রয় নেয়, তখন নারীদের নিরাপত্তা এবং শিশুদের শিক্ষা সবচেয়ে আগে হুমকির মুখে পড়ে। কিশোরী মেয়েদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত হতে হয় অথবা বাল্যবিবাহের বলি হতে হয়। পুরুষরা হয়তো দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু একটি স্বাধীন কৃষক পরিবার থেকে রাতারাতি শহরের ভাসমান মানুষে পরিণত হওয়ার যে মানসিক ট্রমা, তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। মানবাধিকার মানে হলো মানুষের মর্যাদার সাথে বাঁচার অধিকার। এই মানুষগুলোর মর্যাদা তো বটেই, তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাই খুব দ্রুত এই আইনি শূন্যতা পূরণ করতে হবে এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য একটি নতুন এবং কার্যকর সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে হবে, যাতে তারা কোনো করুণার পাত্র না হয়ে নিজেদের অধিকারের জোরেই নতুন জীবন শুরু করতে পারে।

আন্তঃপ্রজন্মগত সমতা এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অধিকার

অধিকারের আলোচনাগুলো সাধারণত বর্তমান সময়ের মানুষদের ঘিরেই আবর্তিত হয়। আমরা যারা আজ বেঁচে আছি, তারা নিজেদের ভোট দেওয়ার অধিকার, কথা বলার অধিকার বা সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিয়েই বেশি সোচ্চার থাকি। জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটটি আমাদের এই চিরাচরিত চিন্তার গণ্ডি ভেঙে একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি আজ আমরা করছি, তার চূড়ান্ত ফলাফল আমাদের হয়তো পুরোপুরি ভোগ করতে হবে না। আগামী পঞ্চাশ বা একশ বছর পর যে শিশুটি পৃথিবীতে জন্ম নেবে, তাকে একটি জ্বলন্ত উনুন এবং চরম বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে শ্বাস নিতে হবে। সে এসে দেখবে তার জন্য কোনো পরিষ্কার পানীয় জল নেই, চাষ করার মতো উর্বর জমি নেই। এই অনাগত প্রজন্মের প্রতি আমাদের কি কোনো আইনি বা নৈতিক দায়িত্ব নেই? এই প্রশ্ন থেকেই আধুনিক মানবাধিকার আইনে আন্তঃপ্রজন্মগত সমতা (Intergenerational Equity) নামক একটি যুগান্তকারী তাত্ত্বিক ধারণার জন্ম হয়েছে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ এডিথ ব্রাউন ওয়াইস তার ইন ফেয়ারনেস টু ফিউচার জেনারেশন্স (In Fairness to Future Generations) বইতে এই ধারণাটিকে একটি শক্ত আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন (Weiss, 1989)।

এই তত্ত্বের মূল দর্শন হলো, পৃথিবীটা আমাদের কোনো পৈতৃক সম্পত্তি নয় যা আমরা ইচ্ছেমতো ভোগদখল করে ধ্বংস করে দিতে পারি। আমরা মূলত এই পৃথিবীর একজন সাময়িক জিম্মাদার বা ট্রাস্টি। আমাদের দায়িত্ব হলো পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছিলাম, অন্তত তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় যেন উত্তরসূরিদের হাতে তুলে না দিই। বর্তমান প্রজন্মের সীমাহীন ভোগবিলাস এবং সম্পদের লোভ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকারকে সরাসরি কেড়ে নিচ্ছে। আমরা মাটির নিচ থেকে সব খনিজ সম্পদ তুলে নিচ্ছি এবং বায়ুমণ্ডলে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি অবাসযোগ্য গ্রহ রেখে যাচ্ছি। মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এটি হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদের ওপর এক ধরনের চরম ডাকাতি। যারা এখনো জন্মায়নি, তাদের কোনো ভোটাধিকার নেই, তারা কোনো আন্দোলনে নামতে পারে না। তাই তাদের অধিকারগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের বিবেকবান মানুষ এবং আন্তর্জাতিক আইন কাঠামোর ওপরই বর্তায়। রাষ্ট্রগুলোকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়নের সময় অবশ্যই এই অনাগত মানুষদের কথা মাথায় রাখতে হবে।

খুব আশার কথা হলো, বিশ্বজুড়ে তরুণ এবং কিশোররা এখন এই আন্তঃপ্রজন্মগত অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে বয়স্ক রাজনীতিবিদরা কয়েক বছর পর মারা যাবেন, কিন্তু এই ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে তাদেরকেই দীর্ঘজীবন কাটাতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণরা এখন তাদের নিজস্ব সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করছে। তারা দাবি করছে যে সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে মূলত তাদের সাংবিধানিক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত আরজেন্ডা (Urgenda) মামলায় সে দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছিল যে, কার্বন নির্গমন কমানো সরকারের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা এবং এটি নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার সাথেই সরাসরি যুক্ত। এই ধরনের রায়গুলো আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। একটি সুস্থ এবং বাসযোগ্য পরিবেশ যে মানুষের একটি মৌলিক মানবাধিকার, তা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে আদালতের রায়ের মাধ্যমে একটি কঠোর আইনি নিয়মে পরিণত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য একটি বড় রক্ষাকবচ।

চরম আবহাওয়া, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং বেঁচে থাকার অধিকার

মানবাধিকারের সবচেয়ে আদিম এবং মৌলিক অধিকারটি হলো মানুষের জীবনের অধিকার। একটি রাষ্ট্র যদি বিনাবিচারে কাউকে হত্যা করে, তবে পুরো বিশ্ব প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ায় যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, তখন সেটিকে খুব সহজে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে চালিয়ে দেওয়ার একটি অশুভ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞানীরা এখন খুব পরিষ্কার ভাষায় বলছেন যে, এই দুর্যোগগুলো আর পুরোপুরি প্রাকৃতিক নেই। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং তাপপ্রবাহের মাত্রা এবং তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা বা ভয়াবহ বন্যার কারণে মানুষের মৃত্যু কোনো নিয়তির লিখন নয়, এটি মূলত পরিবেশ ধ্বংসকারী রাষ্ট্রগুলোর পরোক্ষ হত্যার শামিল। যখন কোনো দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বয়স্ক মানুষ বা শিশুরা হিটস্ট্রোকে মারা যায়, তখন তাদের জীবনের অধিকার সরাসরি লঙ্ঘিত হয়। এই মৃত্যুগুলোর দায় কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security)-এর ওপর। কৃষিকাজ পুরোপুরি প্রকৃতির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির সময় বৃষ্টি না হলে বা অসময়ে অতিবৃষ্টি হলে কৃষকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা ফসল মুহূর্তের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ এখনো সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। ঋতুচক্রের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষ এবং পুষ্টিহীনতা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার অধিকারকে একটি মৌলিক সামাজিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন গত কয়েক দশকের দারিদ্র্য বিমোচন এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের সব সাফল্যকে এক নিমেষে ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে। দরিদ্র কৃষক যখন ফসল ফলাতে না পেরে ঋণের দায়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন, তখন সেই মৃত্যুর পেছনে থাকা কাঠামোগত মানবাধিকার লঙ্ঘনটি অনেক সময় আমাদের নজরেই আসে না।

এর পাশাপাশি রয়েছে মানুষের স্বাস্থ্যগত অধিকারের চরম বিপর্যয়। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো ভেক্টর-বাহিত রোগগুলো নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে আগে এই রোগগুলোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ার কারণে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই নতুন এবং অচেনা স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা করার জন্য একেবারেই প্রস্তুত নয়। এছাড়া বারবার দুর্যোগের মুখে পড়ে সব হারানোর ভয়ে মানুষের মনে যে চরম হতাশা এবং মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে, আধুনিক মনোবিজ্ঞানে তাকে ইকো-অ্যাংজাইটি (Eco-anxiety) বলা হয়। একটি সুস্থ শরীরে এবং সুস্থ মনে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে। পরিবেশের এই অবক্ষয় মানুষের শরীর এবং মন – উভয় জায়গাতেই বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। মানবাধিকার কেবল আইন দিয়ে রক্ষা করা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন মানুষের বেঁচে থাকার একটি সহায়ক এবং নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ।

নয়া-উদারনীতিবাদ এবং পরিবেশ ধ্বংসের অর্থনীতি

জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ সংকটের পেছনের আসল কারণটি খুঁজতে গেলে আমাদের আধুনিক অর্থনীতির মূল কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি মূলত নয়া-উদারনীতিবাদ (Neoliberalism)-এর দর্শন দ্বারা পরিচালিত হয়। এই দর্শনের মূল কথা হলো, বাজারের কোনো সীমারেখা নেই এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা অনন্তকাল ধরে ঘুরতে হবে। সমস্যা হলো, আমরা যে গ্রহে বাস করি তার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। একটি সসীম পৃথিবীতে অসীম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কল্পনা করাটা মূলত একটি গাণিতিক এবং লজিক্যাল ভুল। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য প্রকৃতির ওপর এক ধরনের নির্মম আগ্রাসন চালায়। তারা পরিবেশের ক্ষতিটাকে ব্যবসার একটি সাধারণ হিসাব হিসেবে দেখে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘এক্সটার্নালিটি‘ বা বাহ্যিক প্রভাব বলা হয়। এই কোম্পানিগুলোর কাছে নদীর জল বিষাক্ত হয়ে যাওয়া বা জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ার কোনো আর্থিক মূল্য নেই, যতক্ষণ না সেটি তাদের মুনাফার খাতায় সরাসরি আঘাত করে।

এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি বড় হাতিয়ার হলো উত্তোলনবাদ (Extractivism)। এর মানে হলো মাটির নিচ থেকে কয়লা, তেল, গ্যাস বা অন্যান্য খনিজ সম্পদ যথেচ্ছভাবে তুলে আনা এবং তা পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করা। এই উত্তোলন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বলি হন বন এবং পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসী এবং প্রান্তিক মানুষেরা। বড় বড় খনি বা মেগা প্রকল্প করার জন্য রাষ্ট্র এই মানুষগুলোকে তাদের আদি বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করে। বিখ্যাত লেখক ও পরিবেশকর্মী নেওমি ক্লাইন তার দিস চেঞ্জেস এভরিথিং: ক্যাপিটালিজম ভার্সেস দ্য ক্লাইমেট (This Changes Everything: Capitalism vs. The Climate) গ্রন্থে খুব জোরালোভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে, পুঁজিবাদের এই সীমাহীন লোভের সাথে একটি সুস্থ পরিবেশ এবং মানবাধিকারের সহাবস্থান কোনোভাবেই সম্ভব নয় (Klein, 2014)। ক্লাইন দেখিয়েছেন, পরিবেশকর্মীরা যখন এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদ করেন, তখন রাষ্ট্র কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ বা মিথ্যা মামলার খড়্গ নামিয়ে আনে। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন তাই এখন আর কেবল গাছ বাঁচানোর আন্দোলন নেই, এটি সরাসরি মানবাধিকার এবং জীবনের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রএবং কর্পোরেশনগুলো এই সংকট সমাধানের জন্য অনেক সময় কিছু বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার কথা বলে, যেমন কার্বন ট্রেডিং বা কার্বন অফসেট। এর মানে হলো, একটি কোম্পানি এক জায়গায় দূষণ করে অন্য কোথাও কিছু গাছ লাগিয়ে সেই দূষণের প্রায়শ্চিত্ত করবে। মানবাধিকার তাত্ত্বিকরা এই ধরনের মেকি সমাধানের তীব্র সমালোচনা করেন। মানুষের জীবন এবং পরিবেশ কোনো ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট নয় যে এক দিকের ক্ষতি অন্য দিক দিয়ে পুষিয়ে দেওয়া যাবে। আপনি যদি একটি গ্রামের মানুষের পানীয় জল বিষাক্ত করে দেন, তবে অন্য দেশে কয়েকটি গাছ লাগালে ওই গ্রামের মানুষদের স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হবে না। দূষণ করার অধিকার কিনে নেওয়ার এই ব্যবস্থা মূলত মানবাধিকারের মূল ভিত্তিকে চরমভাবে অবমাননা করে। পরিবেশ রক্ষায় প্রকৃত সাফল্য পেতে হলে আমাদের এই আগ্রাসী অর্থনৈতিক মডেলে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে, যেখানে মুনাফার চেয়ে মানুষের জীবন এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বেশি গুরুত্ব পাবে।

আন্তর্জাতিক আইনের শূন্যতা এবং মানবাধিকারভিত্তিক সমাধান

বিশ্বনেতারা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা নিয়ে প্রচুর আলোচনা করেন। প্যারিস চুক্তির মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়, নেতারা করমর্দন করে হাসিমুখে ছবি তোলেন। কিন্তু এই চুক্তিগুলোর একটি বড় দুর্বলতা হলো, এগুলো মূলত রাষ্ট্রগুলোর স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মানবাধিকার চুক্তিতে যেমন একটি রাষ্ট্রকে আইনত জবাবদিহি করার কঠোর ব্যবস্থা থাকে, জলবায়ু চুক্তিগুলোতে সেই ধরনের কোনো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আদালত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই। একটি রাষ্ট্র যদি কার্বন নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে তাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক আইনে এখনো অনেক বেশি অস্পষ্ট। পরিবেশ আইন এবং মানবাধিকার আইনের এই যে দূরত্ব, এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতা। এই দুটি আইনকে আলাদা ফোল্ডারে রেখে কোনোভাবেই জলবায়ু সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

এই শূন্যতা পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে এখন একটি নতুন ধারণা প্রবল হচ্ছে, যাকে অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি (Rights-based Approach) বলা হয়। এর মূল কথা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর জন্য রাষ্ট্র যে নীতিগুলো গ্রহণ করবে, তার কেন্দ্রে অবশ্যই মানবাধিকার থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে সৌরবিদ্যুৎ বা সবুজ শক্তির দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায্য রূপান্তর হতে হবে। সবুজ শক্তি তৈরির জন্য যদি আবার আদিবাসীদের জমি দখল করা হয় বা কয়লাখনির শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়, তবে সেই রূপান্তর কখনোই ন্যায্য হতে পারে না। সমাধানের নামে নতুন করে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। রাষ্ট্রকে প্রতিটি পরিবেশগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাচাই করতে হবে যে, সেই সিদ্ধান্তের ফলে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল এবং পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর ওপর কেমন প্রভাব পড়বে।

সবশেষে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক সংহতি। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক ভুলের দায় স্বীকার করে নিতে হবে। তারা যে লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কথা বলে, সেটি দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি কোনো দয়ার দান নয়। এটি হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে করা পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের আইনি এবং নৈতিক ক্ষতিপূরণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে বড় বড় দূষণকারী রাষ্ট্র এবং কর্পোরেশনগুলোকে মানবাধিকার ভঙ্গের দায়ে সরাসরি আইনের আওতায় আনা যায়। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী নামের এই ছোট গ্রহটিতে আমরা সবাই একটি অভিন্ন ভাগ্য নিয়ে বাস করছি। এখানে সীমানা টেনে কাউকে রক্ষা করা যাবে না। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং প্রকৃতির অধিকার মূলত একই সুতোয় গাঁথা। এই দুইয়ের মাঝে একটি সম্মানজনক এবং টেকসই ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই কেবল মানবসভ্যতা তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার (Human Rights in South Asia)

বৈপরীত্যের অঞ্চল এবং কাঠামোগত দারিদ্র্যের ভয়াবহতা

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রের দিকে তাকালে এক ধরনের গভীর বিষণ্ণতা ভর করে। এই অঞ্চলের মাটিতে যেমন পলিমাটির উর্বরতা আছে, ঠিক তেমনি প্রতিটি ইঞ্চিতে লেগে আছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর রক্তের দাগ। বাইরে থেকে দেখলে এই অঞ্চলকে এখন এক বিশাল সম্ভাবনার জায়গা মনে হয়। অর্থনৈতিক সূচকে এখানকার অনেক দেশ তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় শহরগুলোতে আকাশচুম্বী দালানকোঠা উঠছে, মেট্রো রেল আর ফ্লাইওভারের চাকচিক্যে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। শেয়ার বাজারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে এবং কোটিপতিদের তালিকায় প্রতিদিন নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। এই ঝকঝকে উন্নয়নেরঠিক উল্টো পিঠেই লুকিয়ে আছে আরেক ভয়াবহ পৃথিবী। সেই ফ্লাইওভারের নিচে বা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক পেছনের বস্তিগুলোতে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন আধপেটা খেয়ে ঘুমাতে যায়। এই যে আকাশ এবং পাতালের বিস্তর ব্যবধান, এটি কোনো প্রাকৃতিক নিয়মের ফসল নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) বলে আখ্যায়িত করেন। এই সহিংসতায় সরাসরি কোনো বন্দুকের গুলি চলে না, কেউ কাউকে প্রকাশ্যে কোপায় না। অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার এমন একটি অদৃশ্য জাল বিছিয়ে রাখা হয়, যার ফলে সমাজের একেবারে নিচের স্তরের মানুষগুলো ধীরে ধীরে দম বন্ধ হয়ে মারা যায়। তাদের দারিদ্র্য কোনো ব্যক্তিগত অলসতার ফল নয়, এটি রাষ্ট্রের তৈরি করা একটি নিষ্ঠুর ফাঁদ।

দারিদ্র্যকে এখানে কেবল টাকার অভাব হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত মানুষের বেঁচে থাকার সব ধরনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার বিভিন্ন লেখায় এই বঞ্চনাকে সক্ষমতার অভাব (Capability Deprivation) হিসেবে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। একজন গরিব ঘরের সন্তান টাকার অভাবে স্কুলে যেতে পারে না, পুষ্টির অভাবে তার শারীরিক বিকাশ ঘটে না এবং সামান্য অসুস্থতায় বিনা চিকিৎসায় সে মারা যায়। সমাজের উঁচু স্তরের মানুষজন এই দারিদ্র্যকে খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে মেনে নিয়েছে। তারা মনে করে, কিছু মানুষ গরিব হয়েই জন্মায় এবং এটাই তাদের নিয়তি। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা নেপালের মতো দেশগুলোতে এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের সাথে যুক্ত হয়েছে বর্ণপ্রথা, জাতিভেদ এবং শ্রেণিগত অহংকার। নিচু জাতের বা প্রান্তিক শ্রেণির একজন মানুষকে প্রতিনিয়ত সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। রাষ্ট্রীয় বাজেটগুলো তৈরি হয় মূলত শহরের বিত্তবান মানুষদের সুবিধা দেওয়ার জন্য। মেগা প্রজেক্টের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়, অথচ জনস্বাস্থ্য বা প্রাথমিক শিক্ষার মতো জরুরি খাতগুলোতে বরাদ্দের পরিমাণ থাকে খুবই নগণ্য। এই বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি মানবাধিকারের একেবারে মূল ভিত্তিকে চরমভাবে উপহাস করে।

এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের আড়ালেই আবার একটি চমৎকার গণতান্ত্রিক প্রলেপ লাগিয়ে রাখা হয়। পাঁচ বছর পরপর ভোটের সময় সাধারণ গরিব মানুষদের খুব কদর বাড়ে। নেতারা তাদের কাছে গিয়ে নানা রকম মনভোলানো প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন। ভোট শেষ হওয়ার পরের দিন থেকেই সেই মানুষগুলো আবার রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য হয়ে যায়। জঁ দ্রেজ এবং অমর্ত্য সেন তাদের যৌথ গবেষণামূলক গ্রন্থ অ্যান আনসার্টেন গ্লোরি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কনট্রাডিকশনস (An Uncertain Glory: India and its Contradictions)-এ এই বৈপরীত্যের খুব নিখুঁত একটি চিত্র তুলে ধরেছেন (Drèze & Sen, 2013)। তারা দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে না। রাষ্ট্র যদি সক্রিয়ভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার পেছনে বিনিয়োগ না করে, তবে সেই প্রবৃদ্ধির পুরো সুফল গুটিকয়েক ধনী মানুষের পকেটেই চলে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো এই বিশাল নীরব জনসমুদ্রের অধিকারহীনতা। তাদের কথা বলার কেউ নেই, বিচার চাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তারা কেবল রাষ্ট্রের উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হওয়া কিছু সস্তা শ্রমের জোগানদাতা হিসেবেই বেঁচে থাকে। একটি সমাজ কতটা মানবিক, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সেই সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কেমন আছে তা দেখে। সেই বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্পটি মানবাধিকারের চরম এক ব্যর্থতারই গল্প।

ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাতের দীর্ঘস্থায়ী মনস্তত্ত্ব

উপনিবেশিক শাসনের একটি বড় অভিশাপ হলো বিভাজনের বীজ। ব্রিটিশরা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এমন কিছু অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়ে গেছে, যা আজও এখানকার মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। তারা খুব সুকৌশলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ বা শিখদের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল। সেই অবিশ্বাসের ওপর ভর করেই বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে। এখানে মানুষের পরিচয় তার মেধা বা কর্ম দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ধর্ম বা জাতিসত্তা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই বিষয়টিকে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি (Identity Politics) বলা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো খুব ভালো করেই জানে যে, মানুষকে শিক্ষা বা বাসস্থানের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে ভোট দিতে বললে অনেক জবাবদিহিতা করতে হবে। এর চেয়ে অনেক সহজ উপায় হলো মানুষের ধর্মীয় আবেগকে উসকে দেওয়া। তারা মানুষকে বোঝায় যে, অন্য ধর্মের বা অন্য জাতির মানুষেরা তাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এই কাল্পনিক ভয়ের ওপর ভিত্তি করেই তারা নিজেদের ভোটব্যাংক শক্ত করে। সাধারণ মানুষও খুব সহজেই এই আবেগের ফাঁদে পা দেয় এবং নিজেদের প্রতিবেশীকে চিরস্থায়ী শত্রু হিসেবে ভাবতে শুরু করে।

এই অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি সাধারণ এবং অভিন্ন প্যাটার্ন রয়েছে, যা সব দেশেই কমবেশি দেখা যায়। একে তাত্ত্বিক ভাষায় সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদ (Majoritarianism) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে দেশে যে ধর্মের বা জাতির মানুষের সংখ্যা বেশি, তারা সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে এবং সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে কোণঠাসা করে রাখে। ভারতে যেমন উগ্র হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে অনেক সময় উগ্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলো একইভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হয়। শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাগুরু সিংহলি বৌদ্ধদের সাথে সংখ্যালঘু তামিলদের দীর্ঘ রক্তাক্ত সংঘাত এই আধিপত্যবাদেরই চরম পরিণতি। রাষ্ট্র অনেক সময় এই সংঘাতগুলো থামাতে চায় না। বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে অথবা সংখ্যাগুরু আক্রমণকারীদের পক্ষ নেয়। রাষ্ট্রের এই নীরব সমর্থন আক্রমণকারীদের মনে এক ধরনের চরম বেপরোয়া মনোভাব তৈরি করে। তারা বুঝতে পারে যে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালালে বা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিলে তাদের কোনো শাস্তি হবে না।

সংখ্যালঘু হিসেবে বেঁচে থাকার মানসিক যন্ত্রণা এই অঞ্চলের অন্যতম বড় একটি মানবাধিকার সংকট। একজন সংখ্যালঘু মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে সে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত। তার উৎসবের দিনগুলোতে সবসময় হামলার এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করে। পল ব্রাস তার গবেষণামূলক বই দ্য প্রোডাকশন অফ হিন্দু-মুসলিম ভায়োলেন্স ইন কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া (The Production of Hindu-Muslim Violence in Contemporary India)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে দাঙ্গা বা সংঘাতগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় (Brass, 2003)। এগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক মদদে তৈরি করা হয়। রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য একটি নির্দিষ্ট ছক মেনে দাঙ্গা বাধানো হয় এবং এরপর রাষ্ট্রীয় মদদেই অপরাধীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। এই বিচারহীনতার কারণে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের মাত্রা বেড়ে যায়। তারা নিজেদের পৈতৃক ভিটা ছেড়ে অচেনা গন্তব্যের দিকে পাড়ি জমায়। দক্ষিণ এশিয়ার এই ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাতগুলো মূলত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখানে সবার জন্য সমান নয়। রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পাহারাদার হিসেবে কাজ করছে, যা মানবাধিকারের সর্বজনীন ধারণাকে প্রতিনিয়ত ভুলুণ্ঠিত করে চলেছে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বিস্তার

দেশপ্রেম মানুষের একটি খুব স্বাভাবিক এবং সুন্দর আবেগ। নিজের জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা থাকাটা যেকোনো সুস্থ মানুষের জন্যই কাঙ্ক্ষিত। এই স্বাভাবিক ভালোবাসার সাথে যখন অন্য দেশের প্রতি চরম ঘৃণা এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অন্ধ অহংকার মিশে যায়, তখন সেটি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে উগ্র জাতীয়তাবাদ (Ultra-Nationalism) বলা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদ এখন রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক এই জাতীয়তাবাদেরসবচেয়ে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। নেতারা দেশের ভেতরে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংকট দেখা দিলেই প্রতিবেশী দেশের জুজু দেখিয়ে মানুষের মনোযোগ ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দেন। তারা বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, দেশ একটি চরম বিপদের মধ্যে আছে এবং এই মুহূর্তে সরকারের কোনো সমালোচনা করা মানেই হলো দেশের সাথে বেইমানি করা। উগ্র জাতীয়তাবাদ মূলত একটি কাল্পনিক শত্রুর ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। এই শত্রুর জুজু দেখিয়ে তারা সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারগুলোকে খুব সহজেই কেড়ে নেয়।

এই জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার সবচেয়ে বড় শিকার হয় রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলা বা প্রতিবাদ করা নাগরিকের একটি আইনি অধিকার। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই ভিন্নমতকে কোনোভাবেই সহ্য করা হয় না। কেউ যদি সরকারের কোনো নীতির গঠনমূলক সমালোচনাও করে, তবে তাকে সাথে সাথে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘বিদেশি চর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সরকারগুলো তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা (Sedition) আইন বা কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনগুলোর চরম অপব্যবহার করে। ব্রিটিশ আমলের তৈরি করা এই পুরনো আইনগুলো ব্যবহার করে সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকার কর্মী এবং সাধারণ ছাত্রদের মাসের পর মাস জেলে আটকে রাখা হয়। তাদের বিরুদ্ধে এমন সব ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়, যার কোনো আইনি প্রমাণ আদালতে টিকতে পারে না। তারপরও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নষ্ট হয়। ভিন্নমত দমনের এই সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেয়। মানুষ ভয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং সমাজ একটি বিশাল নীরবতার চাদরে ঢেকে যায়।

নির্বাচন ব্যবস্থা থাকলেও এই দেশগুলোতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চার চরম অভাব রয়েছে। ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলট তার বিশ্লেষণী গ্রন্থ দ্য পাকিস্তান প্যারাডক্স: ইনস্ট্যাবিলিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (The Pakistan Paradox: Instability and Resilience)-এ দক্ষিণ এশিয়ার এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন (Jaffrelot, 2015)। ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে। বিরোধী দলের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া, তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং রাজনৈতিক সমাবেশ পণ্ড করে দেওয়া এখানকার একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নির্বাচনের সময় পেশিশক্তি এবং কালো টাকার ছড়াছড়ি দেখা যায়। এই পরিবেশে একজন সাধারণ নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার মূলত একটি হাস্যকর আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে ঢাকা এই রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলো ভেতরে ভেতরে চরম কর্তৃত্ববাদী আচরণ করে। তারা মানুষের অধিকারের কথা মুখে বললেও, বাস্তবে তারা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য এই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা একটি নীরব এবং অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক ক্যানসারের মতো কাজ করে যাচ্ছে।

সীমান্ত বিরোধ এবং রাষ্ট্রহীনতার চিরস্থায়ী সংকট

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রটি খুব স্বাভাবিক কোনো প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়নি। ঔপনিবেশিক শাসকরা বিদায় নেওয়ার সময় অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে এবং দায়িত্বহীনভাবে পেন্সিল দিয়ে দাগ টেনে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সেই পেন্সিলের দাগগুলো এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের ওপর দিয়ে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী রেখা টেনে দিয়েছে। র‍্যাডক্লিফ লাইনের মতো কৃত্রিম বিভাজনগুলো হাজার হাজার গ্রামকে দুই ভাগ করে দিয়েছে, আত্মীয়স্বজনকে চিরতরে আলাদা করে ফেলেছে। এই সীমান্তরেখা (Borderlines)-গুলো আজ বিশ্বের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ এবং বিপদজনক এলাকায় পরিণত হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে শুরু করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত – সব জায়গাতেই প্রতিদিন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যকার গোলাগুলিতে প্রায়শই নিরীহ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়। গরু চোরাচালান বা সামান্য সীমানা ভুলের কারণে একজন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা এখানকার একটি অত্যন্ত সাধারণ খবর। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে এই সীমান্তে বিনাবিচারে মানুষ হত্যা একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে, যার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার কখনোই হয় না।

এই সীমান্ত জটিলতার কারণে জন্ম নিয়েছে মানবাধিকারের সবচেয়ে করুণ একটি সংকট, যাকে রাষ্ট্রহীনতা (Statelessness) বলা হয়। রাষ্ট্রহীন একজন মানুষের পৃথিবীতে কোনো আইনি অস্তিত্ব থাকে না। তার কোনো পাসপোর্ট নেই, সে কোথাও ভোট দিতে পারে না এবং কোনো দেশের আইনি সুরক্ষা সে দাবি করতে পারে না। মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হওয়া রোহিঙ্গাদের অবস্থা এর সবচেয়ে বড় এবং মর্মান্তিক উদাহরণ। নিজ জন্মভূমি থেকে বিতারিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ এখন প্রতিবেশী দেশে রিফিউজি ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই রাষ্ট্রহীনতার সংকট কেবল রোহিঙ্গাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আসামের এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরির প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ বাংলাভাষী মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েক পুরুষ ধরে একটি দেশে বাস করার পরও যখন কাউকে হঠাৎ করে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নেওয়া মূলত একজন মানুষকে জীবন্ত লাশে পরিণত করার সমতুল্য।

উইলেম ভ্যান শেন্ডেল তার বিখ্যাত গবেষণামূলক বই দ্য বেঙ্গল বর্ডারল্যান্ড: বিয়ন্ড স্টেট অ্যান্ড নেশন ইন সাউথ এশিয়া (The Bengal Borderland: Beyond State and Nation in South Asia)-এ এই সীমান্তবাসী মানুষদের জীবন সংগ্রামের খুব নিখুঁত একটি ছবি এঁকেছেন (Van Schendel, 2005)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রীয় কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে থাকা এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত একটি আইনি এবং মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে বেঁচে থাকে। রাষ্ট্র তাদের উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া দেয় না, কিন্তু তাদের ওপর খবরদারি করার জন্য সব সময় বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোরাকারবারি, মানব পাচারকারী এবং সীমান্তরক্ষীদের এই ত্রিমুখী চক্রের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে যায়। তারা প্রতিনিয়ত ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটায়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সীমান্তের কাছাকাছি থাকার কারণে তারা নিজেদের দেশে এক ধরনের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার এই সীমান্তগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অহংকার এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের মধ্যকার একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল নজরদারির বিস্তৃতি

আধুনিক যুগে একটি স্বাধীন এবং সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সেখানে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এই মাপকাঠিতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এখানকার সরকারগুলো যেকোনো মূল্যে সত্যকে ধামাচাপা দিতে চায়। সাংবাদিকতা এই অঞ্চলে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশায় পরিণত হয়েছে। কোনো সাংবাদিক যদি সরকারের দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো খবর প্রকাশ করেন, তবে তাকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হুমকি নিয়ে বাঁচতে হয়। অনেক সময় সাহসী সাংবাদিকদের গুম করে ফেলা হয় অথবা দিনের পর দিন অজানা কোনো জায়গায় আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। সত্য বলার এই চড়া মূল্য চোকাতে গিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো ধীরে ধীরে তাদের মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর মালিকানা চলে যাচ্ছে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা সরকারদলীয় ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা গণমাধ্যমকে সরকারের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। রবীন্দ্র কৌর তার ব্র্যান্ড নিউ নেশন: ক্যাপিটালিস্ট ড্রিমস অ্যান্ড ন্যাশনালিস্ট ডিজাইনস ইন টোয়েন্টি-ফার্স্ট-সেঞ্চুরি ইন্ডিয়া (Brand New Nation: Capitalist Dreams and Nationalist Designs in Twenty-First-Century India) বইতে চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট পুঁজি হাত মিলিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয় (Kaur, 2020)।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে এই নিয়ন্ত্রণের ধরনটি আরও অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। আগে সরকার কেবল পত্রিকা বা টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ করত, এখন তারা সাধারণ মানুষের হাতের মোবাইল ফোনটির ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ডিজিটাল নজরদারি (Digital Surveillance) এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর একটি প্রিয় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতা, অ্যাক্টিভিস্ট এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ফোনের তথ্যও চুরি করা হচ্ছে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কোনো গোপনীয়তাই আর রাষ্ট্রের কাছে সুরক্ষিত নেই। এই নজরদারির ফলে সমাজে এক ধরনের মানসিক ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ বুঝতে পারছে যে তাদের প্রতিটি মেসেজ, প্রতিটি ফেসবুক পোস্ট রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। এই ভয়ের কারণে মানুষ নিজের মনের কথা বলা থেকে বিরত থাকছে, যা মানবাধিকারের চরম একটি বিপর্যয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর এই ধরনের ঢালাও নজরদারি কোনোভাবেই আইনি বা নৈতিক বৈধতা পেতে পারে না।

ডিজিটাল মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই দেশগুলো সাইবার সিকিউরিটি বা ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে এমন সব আইন তৈরি করছে, যা মূলত ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার। এই আইনগুলোতে অপরাধের সংজ্ঞাগুলো এতই অস্পষ্টভাবে লেখা থাকে যে, সরকারের সমালোচনা করা যেকোনো সাধারণ কথাকেই ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। একটি কার্টুন আঁকা, ফেসবুকে একটি সাধারণ লাইক দেওয়া বা কোনো খবর শেয়ার করার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মাসের পর মাস কারাগারে পচতে হয়। এই আইনগুলোর আসল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সমাজের সবার মনে একটি গভীর ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। এই ভয়ের সংস্কৃতি সমাজে স্ব-সেন্সরশিপ (Self-censorship)-এর জন্ম দেয়। মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠরোধ করে ফেলে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু লেখার আগে দশবার ভাবে যে এর জন্য তাকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে কি না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এই করুণ মৃত্যু মূলত একটি সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি এই ডিজিটাল শৃঙ্খলের কারণে এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করেছে।

আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এবং সুশীল সমাজের অবিরাম সংগ্রাম

মানুষ যখন রাষ্ট্রের দ্বারা অন্যায়ের শিকার হয়, তখন তার শেষ ভরসার জায়গা হলো দেশের বিচার বিভাগ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিচার ব্যবস্থার দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের সেই ভরসা খুব দ্রুতই হতাশায় রূপ নেয়। এখানকার আদালতগুলো মামলার পাহাড়ে জর্জরিত। বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা (Judicial Delay) এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একটি সাধারণ জমিজমার বা অধিকার হরণের মামলার রায় পেতে অনেক সময় মানুষের জীবন পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল বিচার প্রক্রিয়া মূলত দরিদ্র এবং ক্ষমতাহীন মানুষের জন্য আদালতের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয়। যাদের টাকা আছে এবং ক্ষমতা আছে, তারা খুব সহজেই বিচারের এই ফাঁকফোকরগুলো ব্যবহার করে পার পেয়ে যায়। অনেক সময় বিচার বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও চরম দলীয়করণ লক্ষ্য করা যায়। সরকার নিজেদের পছন্দমতো বিচারক নিয়োগ দিয়ে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। যখন মানুষের অধিকার রক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠানটিই রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে, তখন মানবাধিকারের কথাগুলো কেবল আইনের বইয়েই বন্দী হয়ে থাকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের আচরণ এই অঞ্চলের আরেকটি ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ জনগণের সেবক হিসেবে কাজ না করে ক্ষমতাসীন দলের একটি লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে আচরণ করে। রিমান্ডের নামে হেফাজতে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা, মিথ্যা সাজানো বন্দুকযুদ্ধে বা ক্রসফায়ারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা এখানকার পুলিশিং ব্যবস্থার একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। আয়েশা জালাল তার ডেমোক্রেসি অ্যান্ড অথরিটারিয়ানিজম ইন সাউথ এশিয়া (Democracy and Authoritarianism in South Asia) বইতে এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর খুব নিখুঁত একটি ছবি এঁকেছেন (Jalal, 1995)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে গণতান্ত্রিকআবরণের নিচে এই দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় বাহিনী চরম স্বৈরাচারী আচরণ করে। এই হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনগুলোর কোনো সুষ্ঠু তদন্ত কখনোই হয় না। পুলিশের এই অপরাধগুলোর জন্য তাদের কখনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি (Culture of Impunity) মূলত রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে আরও বেশি বেপরোয়া এবং রক্তপিপাসু করে তোলে। সাধারণ মানুষ রক্ষককে ভক্ষক হিসেবে দেখতে বাধ্য হয় এবং রাষ্ট্রীয় পোশাক পরা মানুষদের তারা চরম আতঙ্কের চোখে দেখে।

এতসব গাঢ় অন্ধকার এবং হতাশার মাঝেও দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার রক্ষার একটি ক্ষীণ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী আশার আলো বেঁচে আছে। এই আলোটি জ্বালিয়ে রেখেছে এখানকার প্রাণবন্ত সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা। শত শত বাধা, রাষ্ট্রীয় রোষানল এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়েও একদল সাহসী আইনজীবী, সাংবাদিক এবং অ্যাক্টিভিস্ট সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে যাচ্ছেন। তারা গুম হওয়া মানুষদের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে রাষ্ট্রের অন্যায়গুলোকে তুলে ধরছেন। অনেক মানবাধিকার কর্মীকে গুম করা হয়েছে, অনেককে হত্যা করা হয়েছে, তারপরও তারা পিছপা হননি। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের এই অদম্য লড়াকু মানসিকতাই মূলত এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি। রাষ্ট্র যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, মানুষের মর্যাদাবোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর স্পৃহা কখনো চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার এই গভীর খাদের কিনারে দাঁড়িয়েও সুশীল সমাজের এই নিরন্তর সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, মানবাধিকার কোনো বিদেশি আমদানি করা ধারণা নয়, এটি এই মাটির সাধারণ মানুষের বাঁচার অধিকারের এক চিরন্তন দাবি।

বাংলাদেশে মানবাধিকারের ‘রীতিনীতি’ (Human Rights ‘Norms’ in Bangladesh)

সংবিধানের দার্শনিক ভিত্তি এবং মানবাধিকারের প্রতিচ্ছবি

যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনের দলিল হলো তার সংবিধান। একটি দেশের সংবিধান নিছক কিছু আইনকানুনের শুষ্ক সংকলন নয়, এটি মূলত সেই ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক দর্শনের একটি সুস্পষ্ট লিখিত রূপ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পেছনের ইতিহাসটি বেশ ঘটনাবহুল এবং রক্তক্ষয়ী একটি সংগ্রামের সাথে সরাসরি যুক্ত। স্বাধীনতার পরপরই একটি নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়, সেখানে খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। একটি দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসা মানুষগুলো খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিল যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তা এবং মর্যাদার আইনি স্বীকৃতি কতটা জরুরি। এই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করেই ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলোর একটি চমৎকার এবং অত্যন্ত সুদৃঢ় তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করা হয় (Kamal, 1994)। বিশ্বমঞ্চে ততদিনে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র একটি শক্তিশালী নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা সেই বিশ্বজনীন মানদণ্ডগুলোকে খুব সযত্নে নিজেদের দেশের সর্বোচ্চ আইনের পাতায় খোদাই করে দেন।

সংবিধানের প্রস্তাবনা বা মুখবন্ধ পড়লেই এর পেছনের গভীর দর্শনটি খুব সহজে ধরা পড়ে। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, এই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করা হবে। এই কথাগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের চটকদার বুলি নয়, এগুলো হলো একটি রাষ্ট্র গঠনের আদি এবং অকৃত্রিম চুক্তি। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে সামাজিক চুক্তি (Social Contract) বলা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের কিছু ক্ষমতা হস্তান্তর করে এই শর্তে যে, রাষ্ট্র তাদের জীবনের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করবে। সংবিধানের এই প্রস্তাবনাটি মূলত পুরো আইনি কাঠামোর একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোনো শাখা – হোক তা নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা বা বিচার বিভাগ – সবাইকে এই প্রস্তাবনার আলোকেই নিজেদের কাজ পরিচালনা করতে হয়। এখানে মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক রীতিনীতিগুলোকে কোনো বিদেশি ধারণা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, এগুলোকে মূলত এই ভূখণ্ডের মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি যৌক্তিক পরিণতি হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছে।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের এই সংযোজন মূলত সংবিধানবাদ (Constitutionalism) ধারণার একটি নিখুঁত উদাহরণ। সংবিধানবাদের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অসীম বা নিরঙ্কুশ হতে পারে না। ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে এবং সেই সীমারেখাটি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন সাধারণ মানুষের অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে এই কাজটি করা হয়েছে মানুষের অধিকারগুলোকে ‘মৌলিক‘ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে। একটি অধিকার যখন মৌলিক হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়, তখন সেটি রাষ্ট্রের সাধারণ আইন বা সংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। সরকার চাইলেই নিজেদের সুবিধামতো এই অধিকারগুলোকে বাতিল বা সংকুচিত করতে পারে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকারের যে রীতিনীতিগুলো নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে তার একটি পূর্ণাঙ্গ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। কাগজে-কলমে অধিকারের এমন সুবিন্যস্ত এবং শক্তিশালী উপস্থিতি বিশ্বের খুব কম দেশের সংবিধানেই দেখতে পাওয়া যায়।

মৌলিক অধিকারের আইনি নিশ্চয়তা এবং নাগরিক স্বাধীনতা

সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নাগরিকদের যেসব অধিকারের কথা লেখা আছে, সেগুলো পড়লে মনে হয় যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কোনো উন্নত পাঠ্যবই পড়া হচ্ছে। এই অংশে মূলত মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক চুক্তির নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার (Civil and Political Rights)-এর সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সবাই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। এই একটিমাত্র বাক্য সমাজের ভেতরের দীর্ঘদিনের বৈষম্যের ভিত্তিকে আইনিভাবে গুঁড়িয়ে দেয়। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের চোখে একজন সাধারণ কৃষক এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অপরাধ করলে দুজনকেই একই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দুজনের অধিকারই সম্পূর্ণ সমান। এই সমতার নীতিটি মূলত মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় শর্ত এবং বাংলাদেশের সংবিধান একে বিনা দ্বিধায় সর্বোচ্চ আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে (Halim, 1998)।

এর পাশাপাশি সংবিধানে মানুষের ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতা এবং চিন্তার বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের অধিকারের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, এবং চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখানে আইনি সুরক্ষাবলয় পেয়েছে। কোনো নাগরিককে বিনাবিচারে আটকে রাখা যাবে না, জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা যাবে না এবং ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের কারণে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করতে পারবে না। ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে নারীদের সমঅধিকারের বিষয়টি খুব জোর দিয়ে বলা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র এবং জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এই ধারাগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত আইনি দেয়াল তৈরি করে। সরকার তার ইচ্ছেমতো নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ করতে পারে না। একটি স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য মানুষের যে শ্বাস নেওয়ার জায়গা প্রয়োজন হয়, সংবিধানের এই মৌলিক অধিকারের অধ্যায়টি নাগরিকদের সেই প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে।

এই অধিকারগুলোকে কেবল কিছু উপদেশ বা ভালো কথার স্তূপে পরিণত হতে দেওয়া হয়নি। সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে একটি অত্যন্ত কঠোর আইনি বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে, এই মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন রাষ্ট্র তৈরি করতে পারবে না। যদি সংসদ এমন কোনো আইন পাসও করে, তবে সেই আইনের যতটুকু অংশ মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হবে, ঠিক ততটুকু অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। আইনের পরিভাষায় এই ব্যবস্থাকে মানবাধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্রকে মূলত এই অধিকারগুলোর কাছে দায়বদ্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক দেশই মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে, কিন্তু নিজেদের দেশের সংবিধানে সেই অধিকারগুলোকে এমন আইনি শক্তি দেয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের এই আন্তর্জাতিক রীতিনীতিগুলো কেবল নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে থাকেনি, এগুলো দেশের সর্বোচ্চ আইনের অবিচ্ছেদ্য এবং প্রয়োগযোগ্য অংশে পরিণত হয়েছে, যা রীতির দিক থেকে একটি অত্যন্ত মজবুত আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং আর্থসামাজিক অধিকারের অঙ্গীকার

মানুষের জীবনের অধিকার কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পেটে ক্ষুধা নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার মানুষের কোনো কাজেই আসে না। এই রূঢ় বাস্তবতাটি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। একারণেই সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি (Fundamental Principles of State Policy) নামে একটি আলাদা অধ্যায় যুক্ত করা হয়। এই অধ্যায়টি মূলত আন্তর্জাতিক আইনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার (Economic and Social Rights)-এর একটি নিখুঁত দেশীয় সংস্করণ। এখানে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে মেহনতি মানুষকে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্ত করা এবং নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণগুলোর ব্যবস্থা করা। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সবার জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নাগরিকরা যেন তাদের কাজের জন্য যুক্তিসঙ্গত মজুরি পায়, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই নীতিগুলো মূলত একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র বা ওয়েলফেয়ার স্টেট গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করে দেয় (Islam, 2003)।

মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে একটি বড় আইনি পার্থক্য রয়েছে। মৌলিক অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হলে সরাসরি আদালতে গিয়ে বিচার চাওয়া যায়, যাকে আইনের ভাষায় বলবৎযোগ্য বা এনফোর্সেবল বলা হয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়। একজন নাগরিক আদালতে গিয়ে মামলা করতে পারেন না যে রাষ্ট্র তাকে চাকরি দেয়নি বা তার বাসস্থানের ব্যবস্থা করেনি। এই পার্থক্যের কারণে অনেকেই মনে করেন যে দ্বিতীয় ভাগের এই নীতিগুলোর হয়তো কোনো আইনি মূল্য নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা এই ধারণার সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেন। সংবিধানে খুব পরিষ্কারভাবে বলা আছে যে, এই নীতিগুলো দেশের শাসন পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে, রাষ্ট্র আইন তৈরি করার সময় এই নীতিগুলো প্রয়োগ করবে এবং এগুলো হবে রাষ্ট্রের সব কাজের পথপ্রদর্শক। অর্থাৎ, এই নীতিগুলো আদালতের মাধ্যমে আদায় করা না গেলেও, এগুলো সরকারের জন্য একটি অবশ্য পালনীয় রাজনৈতিক এবং নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।

এই আর্থসামাজিক অধিকারগুলোকে সংবিধানে স্থান দেওয়ার পেছনের দর্শনটি অত্যন্ত গভীর। একটি সদ্য স্বাধীন এবং আর্থিকভাবে দুর্বল দেশের পক্ষে রাতারাতি সবার জন্য উন্নত শিক্ষা বা চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এই বাস্তবতাটিকে স্বীকার করে নিয়ে প্রগতিশীল বাস্তবায়ন বা প্রোগ্রেসিভ রিয়ালাইজেশনের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে ঠিক সেই চিন্তাধারারই প্রতিফলন ঘটেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো মূলত সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়। সরকারগুলোকে তাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং জাতীয় বাজেটগুলো এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে ধীরে ধীরে এই আর্থসামাজিক অধিকারগুলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়। এই নীতিগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের ধারণাটি কোনো খণ্ডিত বা একপেশে ধারণা নয়। এখানে মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি তার অর্থনৈতিক মুক্তিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে, যা একটি আধুনিক এবং মানবিক সমাজ গঠনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়।

বিচার বিভাগের ভূমিকা এবং সাংবিধানিক রক্ষাকবচ

কাগজে-কলমে যত সুন্দর আইনি অধিকারই লেখা থাকুক না কেন, সেগুলো রক্ষা করার জন্য যদি কোনো স্বাধীন এবং শক্তিশালী পাহারাদার না থাকে, তবে সেই অধিকারগুলো খুব দ্রুতই অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধানে এই পাহারাদারের দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ওপর। সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য যেকোনো নাগরিক সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারবেন। এই অধিকারটি নিজেই একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের বিচার চাওয়ার পথটি রাষ্ট্র কোনোভাবেই বন্ধ করতে পারবে না। হাইকোর্ট বিভাগের এই বিশেষ আইনি ক্ষমতাকে রিট এখতিয়ার (Writ Jurisdiction) বলা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অঙ্গ, যেমন পুলিশ, প্রশাসন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যদি কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করে, তবে হাইকোর্ট সরাসরি নির্দেশ দিয়ে সেই অন্যায় কাজ বন্ধ করতে পারে এবং ভুক্তভোগীকে আইনি প্রতিকার দিতে পারে। বিচার বিভাগের এই ক্ষমতা মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে।

সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় এবং সৃজনশীল ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে দেশে জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation – PIL) নামের একটি নতুন আইনি ধারণার বিকাশ ঘটে (Hoque, 2011)। সাধারণ নিয়মে যার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে, কেবল তাকেই আদালতে গিয়ে মামলা করতে হয়। দরিদ্র, অশিক্ষিত এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষে বড় বড় আইনজীবী নিয়োগ করে উচ্চ আদালতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সুপ্রিম কোর্ট নিয়ম শিথিল করে দেয়। আদালত রায় দেয় যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনায় জনস্বার্থে যেকোনো সচেতন নাগরিক বা মানবাধিকার সংগঠন ভুক্তভোগীদের পক্ষে মামলা দায়ের করতে পারবে। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে মানবাধিকার রক্ষার আইনি লড়াইয়ে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। পরিবেশ দূষণ, বস্তি উচ্ছেদ, ভেজাল খাবার প্রতিরোধ বা কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের মতো অসংখ্য বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আদালতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে রায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

উচ্চ আদালত সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকারগুলোর সংজ্ঞাকেও অনেক বেশি বিস্তৃত এবং আধুনিক করেছে। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আদালত এই ‘জীবন’-এর সংজ্ঞাকে কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বিচারকরা তাদের বিভিন্ন রায়ে ব্যাখ্যা করেছেন যে, জীবন মানে হলো মানুষের মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকা। একটি সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ পাওয়ার অধিকার, নিরাপদ খাবার পাওয়ার অধিকার এবং সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের অধিকারও এই জীবনের অধিকারের ভেতরেই পড়ে। আদালতের এই সৃজনশীল ব্যাখ্যার ফলে সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ না থাকা অনেক নতুন নতুন মানবাধিকারও এখন মৌলিক অধিকারের মর্যাদা পাচ্ছে। বিচার বিভাগের এই সাহসী এবং জনমুখী অবস্থান প্রমাণ করে যে, রীতিনীতি হিসেবে মানবাধিকারের যে ভিত্তিগুলো সংবিধানে রচিত হয়েছিল, তা কেবল তাত্ত্বিক বইয়ের পাতায় আটকে নেই, বরং তা সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক চুক্তির সাথে দেশীয় আইনের সমন্বয় এবং আইনি দ্বৈতবাদ

বাংলাদেশ জাতিসংঘের একটি দায়িত্বশীল সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার চুক্তি, নারী বৈষম্য বিলোপ সনদ এবং শিশু অধিকার সনদের মতো আন্তর্জাতিক আইনের মূল দলিলগুলোতে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি রয়েছে। এই আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনের সম্পর্কটি কেমন হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্রে দুটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে। একটি হলো একত্ববাদ (Monism), যেখানে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করার সাথে সাথেই তা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে পরিণত হয়। বাংলাদেশ মূলত অন্য তত্ত্বটি অনুসরণ করে, যাকে দ্বৈতবাদ (Dualism) বলা হয়। এর অর্থ হলো, সরকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এলেই তা দেশের সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার হিসেবে আদালতে দাবি করা যায় না। সেই আন্তর্জাতিক চুক্তিকে দেশের ভেতরে কার্যকর করতে হলে সংসদকে অবশ্যই তার ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন দেশীয় আইন পাস করতে হয় (Hasan, 2004)।

এই দ্বৈতবাদী ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হয়। রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকার রক্ষার ওয়াদা করে আসে, কিন্তু দেশের ভেতরে সেই অনুযায়ী আইন তৈরি করতে অনেক সময় পার করে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ সেই আন্তর্জাতিক চুক্তির সুফল থেকে সরাসরি বঞ্চিত হয়। এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর জন্য বাংলাদেশের উচ্চ আদালত আবারও একটি চমৎকার আইনি সমাধানের পথ তৈরি করেছে। বিচারকরা তাদের রায়ে বলেন যে, যদিও আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সরাসরি দেশের আইন হিসেবে কাজ করে না, তবুও দেশের প্রচলিত আইনের ব্যাখ্যা করার সময় আদালত অবশ্যই সেই আন্তর্জাতিক চুক্তির নীতিগুলোকে বিবেচনায় নেবে। যদি দেশের কোনো আইনের একাধিক অর্থ করা সম্ভব হয়, তবে আদালত সেই অর্থটিই গ্রহণ করবে যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, সংসদ নতুন আইন পাস না করলেও, আদালতের ব্যাখ্যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলো খুব সুকৌশলে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করছে।

দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতির এই সমন্বয় সাধন একটি অত্যন্ত ইতিবাচক আইনি সংস্কৃতি। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। এখানকার আইনি ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক মানবাধিকারের মানদণ্ডগুলোর সাথে নিজেকে আপডেট করার চেষ্টা করছে। অনেক সময় দেশের সংবিধানে থাকা মৌলিক অধিকারগুলোর ব্যাপ্তি পরিষ্কার করার জন্যও আদালত আন্তর্জাতিক চুক্তির বিভিন্ন ধারার সাহায্য নেয়। নারী অধিকার বা শিশু সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল মামলাগুলোতে বিচারকরা নিয়মিতভাবে সিডও (CEDAW) বা শিশু অধিকার সনদের (CRC) উদ্ধৃতি দেন। এই প্রক্রিয়াটি দেশের বিচার ব্যবস্থাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং আধুনিক করে তুলেছে। তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের সংবিধান মানবাধিকারের যে শক্ত ভিত তৈরি করেছিল, আন্তর্জাতিক আইনের এই পরোক্ষ প্রয়োগ সেই ভিতকে আরও বেশি প্রাণবন্ত এবং কার্যকর করে তুলছে। এটি এমন এক আইনি সেতুবন্ধন যা বিশ্বজনীন মানবাধিকারের স্বপ্নকে একটি দেশের সীমানার ভেতরে বাস্তব রূপ দিতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার চর্চা (Human Rights Practices in Bangladesh)

আইনি প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার কাঠামোগত ব্যবধান

কাগজে লেখা আইনের ধারা আর বাস্তবের ধুলোমাখা পৃথিবীর মধ্যে সব সময় একটি বিস্তর ব্যবধান থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের পাতাগুলো উল্টালে যে কারও মনে হতে পারে, এটি মানবাধিকারের এক নিশ্ছিদ্র দুর্গ। সেখানে জীবনের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার এবং চলাফেরার স্বাধীনতার কথা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং জোরালো ভাষায় লেখা আছে। আদালতের রায়গুলোতেও প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির চমৎকার সব উদ্ধৃতি দেখা যায়। কিন্তু সেই সুরক্ষিত আদালতের সীমানা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠে। সেখানে আইনি প্রতিশ্রুতিগুলো অনেক সময়ই কাচের মতো ভেঙে পড়ে। সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও, বাস্তব চর্চায় ক্ষমতা এবং অর্থের দাপট সেই সমতাকে প্রতিনিয়ত উপহাস করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় এই অবস্থাকে আইন ও বাস্তবতার দ্বৈততা (Dichotomy of Law and Reality) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একটি দেশের আইন যত সুন্দরই হোক না কেন, সেই আইন প্রয়োগ করার প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দুর্বল বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের অধিকার কখনোই সুরক্ষিত হতে পারে না।

এই কাঠামোগত ব্যবধানের পেছনের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে ভারতীয় আইন বিশারদ উপেন্দ্র বক্সী (Upendra Baxi)-র চিন্তাধারার দিকে তাকাতে হয়। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ফিউচার অফ হিউম্যান রাইটস (The Future of Human Rights)-এ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি অত্যন্ত রূঢ় চিত্র এঁকেছেন (Baxi, 2002)। তার মতে, উন্নয়নশীল বা সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য খুব দ্রুত বড় বড় মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সংবিধানে চমৎকার সব ধারা যুক্ত করে। বাস্তবে এই রাষ্ট্রগুলো তাদের পুরনো ঔপনিবেশিক আমলের শাসনব্যবস্থা থেকেই পুরোপুরি বের হতে পারে না। পুলিশ বা প্রশাসনের কাঠামোটি সেই ব্রিটিশ আমলের মতোই সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তাদের সেবা করার জন্য নয়। ফলে মানবাধিকারের ভাষাটি কেবল রাষ্ট্রীয় নথিপত্র এবং বুদ্ধিজীবীদের সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সাধারণ একজন কৃষক বা কারখানার শ্রমিক যখন থানায় গিয়ে আইনি সহায়তা চান, তখন তিনি সংবিধানের সেই সুরক্ষার কোনো ছোঁয়াই পান না। এই প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা মূলত মানবাধিকারের ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে একটি দূরের নক্ষত্রের মতো অস্পৃশ্য করে তোলে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রটি একারণে অত্যন্ত জটিল এবং সদা পরিবর্তনশীল। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ছকে ফেলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যায় না। রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে অসাধারণ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে। নারী শিক্ষার প্রসার, মাতৃমৃত্যুর হার কমানো বা গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণের মতো প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একই সাথে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের চর্চার ক্ষেত্রে চরম অবক্ষয় দেখা যায়। রাষ্ট্র যখন উন্নয়নেরমহাসড়কে দ্রুত গতিতে ছুটতে চায়, তখন তারা অনেক সময় ভিন্নমত বা সমালোচনাকে উন্নয়নের পথের বাধা হিসেবে বিবেচনা করে। এই মানসিকতার কারণে রাষ্ট্রে এক ধরনের কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই সহিংসতায় সরাসরি কেউ কাউকে আঘাত করে না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমেই কিছু মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে খুব সুকৌশলে কেড়ে নেওয়া হয়। আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের এই নিত্যদিনের টানাপোড়েন মূলত প্রমাণ করে যে, কেবল কাগজে অধিকারের কথা লিখে রাখলেই সমাজ রাতারাতি মানবিক হয়ে যায় না, এর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে একটি গভীর মানসিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।

রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা

যেকোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান শর্ত হলো সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক চর্চার ইতিহাসটি দীর্ঘকাল ধরেই গভীর অবিশ্বাসের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে রাজনীতি মানে কেবল নীতি বা আদর্শের প্রতিযোগিতা নয়, এটি মূলত একটি শূন্য সমষ্টির খেলা বা জিরো-সাম গেম। ক্ষমতায় থাকা মানে হলো রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা এবং আইনি কাঠামোর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, আর ক্ষমতার বাইরে থাকার অর্থ হলো প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয় হয়রানির শিকার হওয়া। এই পরিস্থিতি সমাজে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক মেরুকরণ (Political Polarization) তৈরি করেছে। একটি রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় বসে, তখন তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের দলীয় সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হাজার হাজার মামলা দেওয়া হয়। অনেক সময় একটি সাধারণ রাজনৈতিক সমাবেশ করার জন্যও পুলিশের অনুমতির নামে দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিরোধীদের দমন করার এই সংস্কৃতি মূলত মানবাধিকারের সবচেয়ে প্রাথমিক শর্ত অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূলে সরাসরি আঘাত হানে।

বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের এই সংকট নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ল্যারি ডায়মন্ড (Larry Diamond) তার ইলউইন্ডস (Ill Winds) বইতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Diamond, 2019)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ করতে শুরু করে। ডায়মন্ড একে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ (Democratic Backsliding) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় সরকার সরাসরি সামরিক শাসন জারি করে না, বরং তারা আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই বিরোধী দল এবং সুশীল সমাজের কাজের পরিসর বা স্পেস সংকুচিত করে দেয়। বাংলাদেশেও এই পশ্চাদপসরণের চিত্র বেশ স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেক সময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পুলিশ বা প্রশাসন যখন বুঝতে পারে যে বিরোধী দলের ওপর শক্তি প্রয়োগ করলে তাদের জবাবদিহি করতে হবে না, বরং পুরস্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তখন তারা চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে আইনের শাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং সমাজে এক ধরনের ভীতিকর নীরবতা নেমে আসে।

এই অসহিষ্ণুতার সবচেয়ে বড় শিকার হয় সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা। রাজনীতি যখন চরম সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সমাজের প্রতিটি স্তর – বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পেশাজীবী সংগঠন পর্যন্ত – সবকিছুই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। নিরপেক্ষ বা স্বাধীন কোনো মতামতের আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। আপনি যদি সরকারের কোনো ভুল নীতির সমালোচনা করেন, তবে আপনাকে খুব সহজেই বিরোধী দলের তকমা লাগিয়ে দেওয়া হবে। এই ধরনের বিচারহীন এবং অসহিষ্ণু পরিবেশে মানবাধিকারের চর্চা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে বারবার এই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার কথা তুলে ধরে। তারা সতর্ক করে যে, একটি রাষ্ট্রে যদি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মতপ্রকাশের কোনো আইনি এবং নিরাপদ উপায় না থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিককাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ভিন্নমতের প্রতি এই প্রাতিষ্ঠানিক ভীতি মূলত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকেই সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আইনি জবাবদিহিতার সংকট

একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানুষের জীবনের অধিকার হরণ করার ক্ষমতা কেবল আদালতের কাছেই থাকে, এবং সেটিও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর। বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে অপরাধ দমনের নামে একটি ভয়ংকর শর্টকাট বা সংক্ষিপ্ত পথের উদ্ভব হয়েছে। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সাধারণ মানুষ বা সন্দেহভাজন অপরাধীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো সমাজের একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী দাবি করে যে, তারা অপরাধীদের ধরতে গেলে অপরাধীরা প্রথমে গুলি চালায় এবং আত্মরক্ষার্থে তারা পাল্টা গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়। প্রায় প্রতিটি ঘটনার বিবরণ হুবহু একই রকম হয়, যা জনমনে চরম অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। মানবাধিকার কর্মীরা এই মৃত্যুগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (Extrajudicial Killing) হিসেবে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। একজন মানুষ যতই ভয়ংকর অপরাধী হোক না কেন, তাকে বিনা বিচারে রাস্তায় গুলি করে মেরে ফেলার অধিকার পৃথিবীর কোনো সংবিধানে বা আইনে রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি। এটি সরাসরি আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর চরম কুঠারাঘাত।

এই ধরনের রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন (Stanley Cohen) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ স্টেটস অফ ডিনায়াল (States of Denial)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের করা জঘন্য অপরাধগুলোকে অত্যন্ত সুকৌশলে অস্বীকার করে (Cohen, 2001)। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তখন সরকার প্রথমেই ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকার করে। তারা একটি বিকল্প আখ্যান বা ন্যারেটিভ তৈরি করে, যেখানে নিহত ব্যক্তিকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী বা মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোহেন একে অস্বীকারের সংস্কৃতি (State of Denial) বলেছেন। সাধারণ মানুষের একটি অংশ অনেক সময় বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতায় বিরক্ত হয়ে এই ধরনের তাৎক্ষণিক ‘বিচার’-এ খুশি হয়। তারা ভাবে, একজন মাদক ব্যবসায়ী মরেছে, এতে সমাজের ভালোই হয়েছে। রাষ্ট্র মানুষের এই হতাশা এবং আবেগকে পুঁজি করে নিজেদের বেআইনি কাজগুলোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে না যে, আজ যে বেআইনি বুলেট একজন মাদক ব্যবসায়ীর বুকে বিদ্ধ হচ্ছে, কাল সেই একই বুলেট কোনো রাজনৈতিক বিরোধী বা একজন সাধারণ নিরীহ নাগরিকের বুকেও বিদ্ধ হতে পারে। আইনের শাসন একবার ভেঙে গেলে তার চরম মূল্য সমাজের সবাইকেই চোকাতে হয়।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত এই বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সরব থাকে। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্রকে অবশ্যই প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে দেখা যায়, যে বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, সেই বাহিনীই আবার ঘটনার তদন্ত করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তদন্ত প্রতিবেদনগুলো একপেশে হয় এবং অভিযুক্তরা খুব সহজেই আইনি ছাড় পেয়ে যায়। এই আইনি জবাবদিহিতার সংকট (Crisis of Legal Accountability) মূলত রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে। তারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি ভয়াবহ বিপর্যয়। একটি রাষ্ট্রে যদি জীবন কেড়ে নেওয়ার কোনো জবাবদিহিতা না থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রে মানুষের অন্যান্য অধিকারের কথা আলোচনা করাটাই চরম হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়।

গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধান এবং ভয়ের মনস্তত্ত্ব

মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ কোনো শাস্তি যদি পৃথিবীতে থেকে থাকে, তবে সেটি হলো গুম হয়ে যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়া। একটি মানুষের মৃতদেহ অন্তত তার পরিবারকে একটি যন্ত্রণাদায়ক সমাপ্তি বা ক্লোজার দেয়। কিন্তু কেউ যখন হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় এবং তারপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না, তখন তার পরিবারের সদস্যরা এক অন্তহীন এবং দুর্বিষহ অপেক্ষার মধ্যে পতিত হয়। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেই তাদের বুক কেঁপে ওঠে, এই বুঝি তাদের প্রিয় মানুষটি ফিরে এল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এই জঘন্য অপরাধটিকে বলপূর্বক অন্তর্ধান (Enforced Disappearance) বলা হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী বা সমালোচকদের গুম হওয়ার অভিযোগগুলো মানবাধিকারের ক্যানভাসে সবচেয়ে গাঢ় এবং কালো দাগ তৈরি করেছে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত এই ধরনের অভিযোগগুলো সরাসরি উড়িয়ে দেয় এবং দাবি করে যে ওই ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে চলে গেছে। কিন্তু ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলো রাষ্ট্রের এই দাবির অসারতা প্রমাণ করে দেয়।

গুমের উদ্দেশ্য কেবল একজন মানুষকে সরিয়ে দেওয়া নয়, এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য হলো পুরো সমাজে একটি মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস তৈরি করা। দার্শনিক হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তার বিখ্যাত বই দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম (The Origins of Totalitarianism)-এ স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই ভয়াবহ কৌশলটি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন (Arendt, 1951)। তার মতে, যখন মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়, তখন সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং মানুষ প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামে। কিন্তু যখন কোনো মানুষকে রাতের অন্ধকারে নীরবে গুম করে ফেলা হয়, তখন সমাজে ক্ষোভের বদলে এক ধরনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত ভয়ের জন্ম হয়। মানুষ নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে ভয় পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে ভয়ের সংস্কৃতি (Culture of Fear) বলা হয়। এই ভয়ের সংস্কৃতি মূলত সমাজকে ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কেউ কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে চায় না, পাছে কোনো বিপদ এসে পড়ে। গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবারগুলো থানায় জিডি করতে গেলে অনেক সময় পুলিশ তা গ্রহণ করতে চায় না, আদালতের কাছে বিচার চেয়েও কোনো আইনি সুরাহা মেলে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই কাঠামোগত নির্লিপ্ততা মূলত গুমের মতো অপরাধকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা প্রদান করে।

বলপূর্বক অন্তর্ধানের এই চর্চাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একেবারে ভিত্তিমূলে আঘাত করে। জাতিসংঘ বলপূর্বক অন্তর্ধানের বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি করেছে, যেখানে স্পষ্ট বলা আছে যে যুদ্ধ বা জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়েও গুমের মতো অপরাধকে জায়েজ করা যাবে না। বাংলাদেশে গুমের শিকার পরিবারগুলো ‘মায়ের ডাক’ নামের সংগঠনের মতো বিভিন্ন মঞ্চ তৈরি করে বছরের পর বছর ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিচার দাবি করে যাচ্ছে। তাদের কান্না এবং আকুতি বিশ্ববিবেকের কাছে পৌঁছালেও রাষ্ট্রীয় বধিরতা এখনো কাটেনি। গুমের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখানে কেবল মানুষের শরীরের ওপরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, তারা মানুষের মন এবং সাহসকেও চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চায়। মানবাধিকারের লড়াইয়ে তাই গুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কেবল জীবনের অধিকার রক্ষার লড়াই নয়, এটি মূলত একটি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা এবং মানুষের স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার অধিকার রক্ষার অবিরাম সংগ্রাম।

ডিজিটাল নজরদারি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সেলফ-সেন্সরশিপ

প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের সাথে সাথে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরনগুলোতেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় ভিন্নমত দমনের জন্য সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হতো বা সরাসরি ছাপাখানায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। এখনকার ডিজিটাল যুগে মানুষের হাতের স্মার্টফোনটিই সবচেয়ে বড় সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই নতুন সাইবার স্পেসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো অত্যন্ত কঠোর কিছু আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এই আইনগুলোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য সাইবার অপরাধ দমন করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এগুলো পরিণত হয়েছে ভিন্নমত দমনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারে। আইনের ধারাগুলোতে অপরাধের সংজ্ঞাগুলো এতই অস্পষ্ট এবং বিস্তৃতভাবে লেখা থাকে যে, সরকারের সমালোচনা করা যেকোনো সাধারণ ফেসবুক পোস্ট বা কার্টুনকেও ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা’ বা ‘গুজব ছড়ানো’র অভিযোগে গ্রেপ্তার করার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সাংবাদিক, লেখক এবং সাধারণ নাগরিককে কেবল একটি সামান্য ডিজিটাল মতামতের কারণে মাসের পর মাস বিনা বিচারে কারাগারে কাটাতে হয়েছে।

এই ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের পরিণতি সম্পর্কে গবেষক ইভজেনি মরোজভ (Evgeny Morozov) তার দ্য নেট ডিলিউশন (The Net Delusion) বইতে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন (Morozov, 2011)। একসময় ভাবা হতো ইন্টারনেট সব স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটাবে। মরোজভ দেখিয়েছেন যে, বাস্তবে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এই ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল মাধ্যমগুলোকেই মানুষের ওপর নজরদারি করার এবং তাদের দমন করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশে এই অবস্থাকে ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্র (Digital Authoritarianism) বলা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মেসেজ বা ফোনের কথোপকথন অত্যন্ত গোপনে নজরদারি করে। ফলে সাইবার জগৎ আর মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের কোনো নিরাপদ আশ্রয়স্থল থাকে না। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার প্রতিটি ডিজিটাল পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় নজরদারির আওতায় রয়েছে, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু লেখার আগে বা শেয়ার করার আগে বারবার চিন্তা করে যে এর জন্য তাদের কোনো আইনি বিপদে পড়তে হবে কি না।

রাষ্ট্রের এই ডিজিটাল ভীতি প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় এবং নীরব ফলাফল হলো স্ব-সেন্সরশিপ (Self-Censorship)। এটি এমন এক ধরনের অদৃশ্য শেকল, যেখানে রাষ্ট্রকে আর আপনার মুখ চেপে ধরতে হয় না, আপনি নিজেই ভয়ে নিজের মুখ বন্ধ করে রাখেন। সংবাদপত্রের সম্পাদকরা সরকারের সমালোচনা ছাপানোর আগে দুবার ভাবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এই নীরব মৃত্যু একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র যখন মানুষের চিন্তার জগৎকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন তা সরাসরি মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে। ডিজিটাল স্পেসে মতপ্রকাশের এই লড়াইটি মূলত একুশ শতকের মানবাধিকার সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল একটি রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং নাগরিক সমাজের অবিরাম সংগ্রাম

মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য একটি দেশে শক্তিশালী আইনি কাঠামোর পাশাপাশি কিছু স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নামের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মূল কাজ হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করা এবং সরকারকে পরামর্শ দেওয়া। বাস্তবে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো চরম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা (Institutional Weakness)-তে ভোগে। এদের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী তদন্তকারী দল থাকে না এবং প্রয়োজনীয় বাজেটেরও চরম অভাব থাকে। সবচেয়ে বড় আইনি দুর্বলতা হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে কমিশন সরাসরি তার তদন্ত করতে পারে না, তাদের সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে হয়। এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশন অনেক সময় একটি কাগুজে বাঘে পরিণত হয়। তারা বড় বড় সেমিনার করে বা বিবৃতি দেয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর এবং শক্ত আইনি পদক্ষেপ নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দুর্বলতা মূলত রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার অভাবকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে।

এতসব কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় ভীতি প্রদর্শনের পরও বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত ধারা টিকে আছে। এই ধারাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে দেশের অকুতোভয় নাগরিক সমাজ (Civil Society)। সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড লুইস (David Lewis) তার বাংলাদেশ: পলিটিক্স, ইকোনমি অ্যান্ড সিভিল সোসাইটি (Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society) গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে এই দেশের নাগরিক সমাজ চরম বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে (Lewis, 2011)। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন থেকে শুরু করে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই – সব জায়গাতেই এই মানবাধিকার কর্মীরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা দাবি করছেন। তাদের ওপর অনেক সময় সরকারি রোষানল নেমে আসে, বিদেশি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হয়, এমনকি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়। তারপরও তারা দমে যান না।

মানবাধিকার চর্চার এই ভবিষ্যৎ রূপরেখা তাই কেবল হতাশার নয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি যেমন রাষ্ট্রকে নজরদারি করার সুযোগ দিয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষকেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত সংঘবদ্ধ হওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। একটি অবিচার হলে মুহূর্তের মধ্যেই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে অনেক সময় জনমতের চাপে পিছু হটতে বাধ্য হতে হয়। বাংলাদেশে মানবাধিকারের এই লড়াইটি কোনো ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট নয়, এটি একটি ম্যারাথন দৌড়। এখানে জাদুকরী কোনো সমাধান নেই। রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রকৃত চর্চা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। এতসব অন্ধকার এবং রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তির আস্ফালনের মাঝেও নাগরিক সমাজের এই অবিরাম লড়াই প্রমাণ করে যে, মানুষের মর্যাদাবোধ এবং অধিকার আদায়ের স্পৃহাকে কোনো কালাকানুন বা বুলেট দিয়েই চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে মানবাধিকার এবং পুলিশিং (Human Rights ‘n’ Policing in Bangladesh)

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং পুলিশিংয়ের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

উপমহাদেশের যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে থানা বা পুলিশের নাম শুনলেই এক ধরনের চাপা ভীতির সঞ্চার হয়। বিপদে পড়ে থানায় যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও মানুষ দ্বিতীয়বার ভাবে, পাছে তাকে নতুন কোনো হয়রানির শিকার হতে হয়। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে নাগরিকদের এমন দূরত্ব থাকার কথা ছিল না। এই ভীতির পেছনের কারণ খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে, বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকরা বুঝতে পেরেছিল যে, এই উপমহাদেশের মানুষকে দমিয়ে রাখার জন্য একটি সুসংগঠিত শক্তির প্রয়োজন। এই চিন্তার ফসল হিসেবে ১৮৬১ সালে পুলিশ আইন তৈরি করা হয়। সেই আইনের মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়া বা অপরাধ দমন করা ছিল না। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনকে নিষ্কণ্টক রাখা। এই ব্যবস্থাটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় উপনিবেশবাদ (Colonialism) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আমাদের পুলিশিং ব্যবস্থার সেই ঔপনিবেশিক ডিএনএ পুরোপুরি বদলায়নি। পুলিশের ইউনিফর্ম, থানার গঠনকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার ধরনে এখনো সেই শাসক এবং শাসিতের মনস্তত্ত্ব খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে পুলিশ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থার এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নাগরিকরা পুলিশকে তাদের সেবক বা বন্ধু ভাবতে পারে না, তারা পুলিশকে দেখে রাষ্ট্রের একটি ভীতিকর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে। আধুনিক বিশ্বে জনবান্ধব পুলিশিং (Community Policing) নামের একটি চমৎকার ধারণা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর মূল কথা হলো, পুলিশ সমাজের সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে অপরাধ দমন করবে। বাংলাদেশেও এই ধারণাটি নিয়ে অনেক সেমিনার বা কর্মশালা হয়, কাগজে-কলমে অনেক কমিটিও গঠন করা হয়। বাস্তবে এই ধারণাটি খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। কারণ আস্থার সম্পর্ক তৈরি করার জন্য যে সমতা এবং শ্রদ্ধাবোধ প্রয়োজন, সেটি থানার প্রাত্যহিক কার্যক্রমে অনুপস্থিত থাকে। একজন গরিব কৃষক বা রিকশাচালক যখন থানায় অভিযোগ নিয়ে যান, তখন তার সাথে যে আচরণ করা হয়, একজন বিত্তবান মানুষের সাথে করা আচরণের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। এই বৈষম্যমূলক আচরণ মূলত প্রমাণ করে যে, পুলিশিং ব্যবস্থা এখনো সমাজের ক্ষমতাবানদের পাহারাদার হিসেবেই কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সাধারণ মানুষের কাছে তাই থানা একটি ভরসার জায়গা হওয়ার বদলে এক ধরনের আতঙ্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার একটি দার্শনিক দিক রয়েছে, যা পুলিশিং ব্যবস্থার সাথে সরাসরি যুক্ত। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) তার তাত্ত্বিক আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বৈধভাবে বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার। অর্থাৎ, সমাজের ভেতরে শান্তি বজায় রাখার জন্য কেবল রাষ্ট্রই বৈধভাবে অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে বা শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে। পুলিশ হলো রাষ্ট্রের এই শক্তি প্রয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান মাধ্যম। ওয়েবারের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পুলিশের হাতে ক্ষমতা থাকাটা যৌক্তিক। সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন এই অসীম ক্ষমতার ওপর কোনো নজরদারি থাকে না। পুলিশ যদি মনে করে যে শক্তি প্রয়োগ করার জন্য তাদের কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না, তবে সেই ক্ষমতা খুব দ্রুত নিপীড়নে রূপ নেয়। একটি গণতান্ত্রিকসমাজে পুলিশের এই বলপ্রয়োগের ক্ষমতাকে আইনের কঠোর শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা হয়। বাংলাদেশে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় সংকট হলো, অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের এই বলপ্রয়োগের ক্ষমতা আইনি সীমারেখা অতিক্রম করে যায়। সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য দেওয়া ক্ষমতা অনেক সময় সাধারণ মানুষের অধিকার হরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার কাঠামোগত শূন্যতা

যেকোনো পেশাদার বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিরপেক্ষতা। পুলিশ যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করতে শুরু করে, তবে তাদের পেশাদারিত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশে পুলিশিং ব্যবস্থার একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো এর চরম দলীয়করণ। ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলো সব সময় চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পণ্ড করে দেওয়া, বিরোধী নেতা-কর্মীদের নামে হাজার হাজার মামলা দেওয়া এবং তাদের হয়রানি করা পুলিশের একটি অলিখিত দায়িত্বে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ (Political Polarization) বলা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতি বা ভালো জায়গায় বদলি হওয়ার ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতার চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। এর ফলে বাহিনীর ভেতরে যারা সৎ এবং পেশাদার কর্মকর্তা, তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। একটি বাহিনী যখন বুঝতে পারে যে তাদের ভালো পোস্টিং বা প্রমোশন রাজনৈতিক নেতাদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল, তখন তারা সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে রাজনৈতিক নেতাদের খুশি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

এই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হলো জবাবদিহিতার চরম শূন্যতা। পুলিশ যখন কোনো সাধারণ নাগরিকের ওপর নির্যাতন করে বা কোনো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেই ঘটনার তদন্ত কারা করবে? প্রচলিত ব্যবস্থায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত পুলিশ নিজেই করে। এটি আইনের একটি বড় ধরনের কাঠামোগত ত্রুটি। নিজের বিভাগের সহকর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাকে শাস্তির আওতায় আনার মতো মানসিকতা বা নিরপেক্ষতা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ফলে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা বড় বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো অনেক সময় ধামাচাপা পড়ে যায়। এই পরিস্থিতি সমাজে এক ভয়াবহ বিচারহীনতার সংস্কৃতি (Culture of Impunity) তৈরি করেছে। একজন পুলিশ সদস্য যখন দেখেন যে বেআইনি কাজ করার পরও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না, তখন তিনি আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এই বিচারহীনতা মূলত রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। অনেক দেশে পুলিশের কাজ নজরদারি করার জন্য স্বাধীন পুলিশ কমিশন থাকে, কিন্তু আমাদের দেশে এই ধরনের কোনো স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

জবাবদিহিতার এই অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষগুলো। বিত্তবান বা ক্ষমতাবান মানুষেরা অর্থের জোরে বা রাজনৈতিক পরিচয়ে পুলিশের কাছ থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। একজন সাধারণ দিনমজুর বা রিকশাচালকের পক্ষে সেই সুরক্ষা কেনা সম্ভব হয় না। অনেক সময় এই প্রান্তিক মানুষগুলো বিনা অপরাধে হয়রানিমূলক মামলার শিকার হন। তাদের ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর ঘুষের জন্য চাপ দেওয়া হয়, এবং ঘুষ দিতে না পারলে তাদের বিভিন্ন পেন্ডিং মামলায় ফাঁসিয়ে কোর্টে চালান করে দেওয়া হয়। এই কাজগুলো মানবাধিকারের একেবারে ভিত্তিমূলে আঘাত করে। আইনের শাসন মানে হলো আইন সবার জন্য সমান হবে। থানা যদি ন্যায়বিচারের বদলে এক ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে অর্থের বিনিময়ে আইনি সহায়তা বেচাকেনা হয়, তবে সেই সমাজে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাটাই একটি বড় যুদ্ধের মতো হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের এই ধরনের আচরণ মূলত রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সামাজিক চুক্তিকে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে চলেছে।

রিমান্ড, পুলিশি হেফাজত এবং মানবাধিকারের সংকট

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অপরাধের তদন্ত করার জন্য সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনেক সময় আসামিকে আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়, যাকে সাধারণ ভাষায় রিমান্ড বলা হয়। রিমান্ডের তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য হলো আসামির কাছ থেকে তথ্য বের করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। বাস্তবে এই রিমান্ড শব্দটি দেশের সাধারণ মানুষের মনে এক ভয়াবহ ত্রাসের জন্ম দিয়েছে। থানায় আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করার নামে আসামির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আধুনিক মানবাধিকার আইনে এই বিষয়টিকে হেফাজতে নির্যাতন (Custodial Torture) হিসেবে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। রিমান্ডে নেওয়ার পর আসামির হাত-পা বেঁধে পেটানো, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া বা দিনের পর দিন ঘুমাতে না দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়। এই নির্যাতনের মূল উদ্দেশ্য হলো আসামির কাছ থেকে একটি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা, যা অনেক সময় প্রকৃত ঘটনার সাথে একেবারেই মেলে না।

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার এক বিশাল ক্ষমতা দিয়েছে। এই ধারার অপব্যবহার নিয়ে সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসছেন। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করে ১৬৭ ধারার অধীনে রিমান্ডে নেওয়ার এই যুগলবন্দি মূলত পুলিশকে এক ধরনের অসীম ক্ষমতা এনে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট বিখ্যাত ব্লাস্ট (BLAST) মামলায় এই ৫৪ ধারা এবং রিমান্ডের অপব্যবহার রোধে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল যে, রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদ কাঁচের দেয়াল ঘেরা কক্ষে করতে হবে, আসামির আইনজীবীকে উপস্থিত থাকার সুযোগ দিতে হবে এবং গ্রেপ্তারের পরপরই আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। আইনের বইয়ে বা আদালতের রায়ে এই নির্দেশনাগুলো খুব সুন্দরভাবে লেখা থাকলেও, থানা পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে আদালতের এই নির্দেশনাগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যা আইনের শাসনের প্রতি চরম এক অবজ্ঞা।

এই শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি একটি ভয়াবহ মানসিক ট্রমা ভুক্তভোগী এবং তার পরিবারকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। রিমান্ড থেকে ফিরে আসা একজন মানুষ অনেক সময় তার স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে যে, কাউকে তার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। পুলিশি হেফাজতে নেওয়া জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির কোনো আইনগত ভিত্তি আদালতে নেই। তারপরও পুলিশ কেন এই পথ বেছে নেয়? এর একটি বড় কারণ হলো তদন্তের কাজে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং ফরেনসিক প্রযুক্তির চরম অভাব। পুলিশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ বা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রমাণ জোগাড় করার চেয়ে আসামিকে পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করাকে অনেক সহজ কাজ মনে করে। এই শর্টকাট পদ্ধতিটি মূলত তদন্তের প্রকৃত উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে। একজন নির্দোষ মানুষকে নির্যাতন করে অপরাধী বানালে প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যায়, যা সমাজে অপরাধ প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। হেফাজতে নির্যাতন মূলত মানবমর্যাদার চরম অবমাননা।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আইনের শাসনের অবক্ষয়

গত দুই দশকে বাংলাদেশে অপরাধ দমনের নামে এক ভয়ংকর সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে, যা মানবাধিকারের সমস্ত নিয়মকানুনকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধ – নাম যাই হোক না কেন, এর মূল কথা হলো সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে গুলি করে মেরে ফেলা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী সাধারণত দাবি করে যে, আসামিকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে আসামির সহযোগীরা পুলিশের ওপর গুলি চালায় এবং আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে আসামি মারা যায়। এই গল্পটি এতবার বলা হয়েছে যে এটি এখন মানুষের কাছে একটি চরম হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই মৃত্যুগুলোকে সুস্পষ্টভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (Extrajudicial Killing) হিসেবে বর্ণনা করে। একটি গণতান্ত্রিকরাষ্ট্রে একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কেবল আদালতের রায়ের মাধ্যমেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর কাজ হলো অপরাধীকে ধরে আদালতের সামনে হাজির করা। রাষ্ট্র যখন নিজেই বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রে আইনের শাসনের মৃত্যু ঘটে।

এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের পেছনে অনেক সময় সাধারণ মানুষের একটি ভ্রান্ত আবেগ কাজ করে। মানুষ যখন দেখে যে বিচার ব্যবস্থায় অনেক দীর্ঘসূত্রিতা এবং বড় বড় অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা হতাশ হয়ে ক্রসফায়ারের মতো সংক্ষিপ্ত পথকে সমর্থন করতে শুরু করে। তারা ভাবে, একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী বা মাদক ব্যবসায়ী মরে গেলে সমাজের ভালোই হবে। এই জনসমর্থন রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, রাষ্ট্রকে এই লাইসেন্স টু কিল বা হত্যার ছাড়পত্র দেওয়াটা কতটা বিপজ্জনক। আজ যে বন্দুক একজন সন্ত্রাসীর দিকে তাক করা হচ্ছে, কাল সেই একই বন্দুক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা কোনো নিরীহ মানুষের দিকেও তাক করা হতে পারে। ক্ষমতার এই অবাধ প্রয়োগের ফলে অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে বা টাকার বিনিময়েও সাধারণ মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। এটি প্রমাণ করে যে, শর্টকাট বা সংক্ষিপ্ত পথে কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না, এটি কেবল সমাজে একটি স্থায়ী ভীতির জন্ম দেয়।

রাষ্ট্রের এই একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস (Thomas Hobbes) তার ল লেভিয়াথান (The Leviathan) বইতে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন (Hobbes, 1651)। হবসের মতে, মানুষ রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের ক্ষমতা সমর্পণ করে কেবল নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য। রাষ্ট্র হলো সেই বিশাল লেভিয়াথান বা দানব, যার মূল কাজ হলো নাগরিকদের রক্ষা করা। কিন্তু সেই রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নিজেই নাগরিকদের বিনা বিচারে হত্যা করতে শুরু করে, তখন সেই সামাজিক চুক্তির কোনো অস্তিত্ব থাকে না। একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় তারা অপরাধীদের সাথে কেমন আচরণ করে তার ওপর ভিত্তি করে। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র যদি নিজেই অপরাধীর মতো আচরণ করতে শুরু করে, তবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কেবল একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না, এটি মূলত পুরো বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়।

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা এবং সংস্কারের রূপরেখা

পুলিশ হলো পুরো ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি প্রাথমিক অংশ। পুলিশের কাজের ওপর ভিত্তি করেই মূলত আদালতের বিচার প্রক্রিয়া সামনের দিকে এগোয়। পুলিশ যদি দুর্বল তদন্ত করে বা চার্জশিটে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকফোকর রেখে দেয়, তবে বিচারকের পক্ষে প্রকৃত অপরাধীকে সাজা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পুলিশিং ব্যবস্থার এই ত্রুটিগুলোর কারণে আমাদের দেশের আদালতগুলোতে মামলার বিশাল জট তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরেও ন্যায়বিচার পায় না। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে পুলিশিং ব্যবস্থায় আমূল এবং সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক আমলের সেই ১৮৬১ সালের আইন দিয়ে একুশ শতকের একটি আধুনিক এবং গণতান্ত্রিক দেশের পুলিশ বাহিনী চলতে পারে না। আমাদের এমন একটি নতুন পুলিশ আইন প্রয়োজন, যা পুলিশকে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর বদলে একটি পেশাদার এবং স্বাধীন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। সমাজবিজ্ঞানে এই ধরনের পরিবর্তনকে কাঠামোগত সংস্কার (Structural Reform) বলা হয়।

এই কাঠামোগত সংস্কারের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। কেবল মুখে মুখে পুলিশের আধুনিকায়নের কথা বললে কোনো লাভ হবে না, এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনি কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন। সংস্কারের জন্য নিচের বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া অবশ্য পালনীয়:

  • রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা, যারা পুলিশের নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির বিষয়টি দেখভাল করবে।
  • পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করার জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ পুলিশ কমপ্লেইন অথরিটি তৈরি করা।
  • অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়াকে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ থেকে পুরোপুরি আলাদা করা, যাতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
  • জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে জোরজুলুম বন্ধ করার জন্য প্রতিটি থানায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা এবং উন্নত ফরেনসিক ল্যাবরেটরি তৈরি করা।
  • মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাজের সময় নির্দিষ্ট করা, তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করা।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি একেবারে নিচের স্তরের কনস্টেবল বা উপ-পরিদর্শকদের কাজের পরিবেশ নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে। তারা অনেক সময় অমানবিক কর্মঘণ্টার মধ্যে কাজ করেন। তাদের কোনো নির্দিষ্ট ছুটির ব্যবস্থা থাকে না এবং আবাসন সুবিধাও অত্যন্ত মানবেতর হয়। একজন পুলিশ সদস্য যখন নিজের কর্মক্ষেত্রে হতাশা এবং মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তখন তার পক্ষে সাধারণ মানুষের সাথে ভালো আচরণ করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশের এই নিচের স্তরের সদস্যদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার পেছনে এই অর্থনৈতিক এবং কাঠামোগত বঞ্চনাগুলো অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। তাই পুলিশ বাহিনীর সংস্কার মানে কেবল নতুন গাড়ি বা অস্ত্র কিনে দেওয়া নয়। সংস্কার মানে হলো তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং তাদের ভেতরে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করা, যেখানে তারা নিজেদের জনগণের প্রভু নয়, বরং জনগণের বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করবে।

গণতান্ত্রিক সমাজে পুলিশিং এবং নাগরিক সুরক্ষার ভবিষ্যৎ

একটি আদর্শ গণতান্ত্রিকসমাজে পুলিশের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে অনেক তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে। গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হলো সাধারণ মানুষের সম্মতি এবং আস্থা। মানুষ পুলিশকে ভয় পাবে না, বরং মানুষ পুলিশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। রাস্তায় বিপদে পড়লে একজন মানুষ যেন অন্য কোনো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি পুলিশের কাছে ছুটে যেতে পারে, সেই আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই হলো আধুনিক পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য পুলিশকে আরও বেশি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে। পুলিশের কাজ কেবল অপরাধ দমন করা নয়, পুলিশের কাজ হলো সমাজে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের নাগরিক অধিকারগুলো ভোগ করতে পারে। মানবাধিকার এবং পুলিশিং কখনোই একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনী মানবাধিকারের নিয়মগুলো মেনেই সবচেয়ে দক্ষতার সাথে অপরাধ দমন করতে সক্ষম।

এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার কর্মীদের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তারা পুলিশের কাজের ওপর প্রতিনিয়ত নজরদারি করবে এবং কোনো অন্যায় হলে তা সমাজের সামনে তুলে ধরবে। পুলিশকে মনে রাখতে হবে যে, গণমাধ্যম বা মানবাধিকার কর্মীরা তাদের শত্রু নয়। তারা মূলত পুলিশকে তাদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন পুলিশের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়েছে। বডি-ওর্ন ক্যামেরা বা শরীরের সাথে যুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার করে পুলিশের প্রতিটি অভিযান রেকর্ড করা সম্ভব। এটি যেমন পুলিশকে বেআইনি কাজ করা থেকে বিরত রাখবে, ঠিক তেমনি কেউ যদি পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে, তবে সেই ক্যামেরার ভিডিও পুলিশকেও আইনি সুরক্ষা দেবে। প্রযুক্তিকে যদি সঠিক এবং মানবিক উপায়ে ব্যবহার করা যায়, তবে তা পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে।

পরিশেষে একটি কথা খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয় যখন সেই সমাজের মানুষ ভয়ে নয়, বরং শ্রদ্ধার জায়গা থেকে আইন মেনে চলে। পুলিশের বন্দুকের ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো রাস্তায় শান্তি বজায় রাখা যায়, কিন্তু সেই শান্তি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন মানুষের মনের ভেতরের ক্ষোভ এবং বঞ্চনাগুলো দূর করা। পুলিশকে সেই সামাজিক প্রক্রিয়ার একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে ঔপনিবেশিক মানসিকতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজেদের একটি সত্যিকারের সেবামূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রিমান্ডের নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অন্ধকার অধ্যায়গুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে। সাধারণ মানুষের চোখের জল এবং দীর্ঘশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে কখনো কোনো বাহিনীর গৌরব তৈরি হতে পারে না। মানবাধিকারের প্রতি অকৃত্রিম সম্মান এবং আইনের শাসনের প্রতি অবিচল আস্থাই মূলত আগামী দিনে একটি মানবিক এবং নিরাপদ বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করবে।

মানবাধিকারের সীমাবদ্ধতা (Limitations of Human Rights): তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও বাস্তবায়নের সংকট

জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham)এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke)

মানবাধিকারের ধারণাটিকে আমরা সাধারণত একটি পবিত্র এবং অনস্বীকার্য সত্য হিসেবে মেনে নিতে অভ্যস্ত। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের অধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রকাশ পেল, তখন পুরো বিশ্ব কিন্তু এই ঘোষণাকে বিনা বাক্যব্যয়ে স্বাগত জানায়নি। অধিকারের এই কাল্পনিক এবং বিমূর্ত ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম দিকে বেশ যুক্তিনির্ভর এবং কঠোর সমালোচনা করেছিলেন ইংরেজ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham)। তার মতে, রাষ্ট্র বা আইনি কাঠামোর বাইরে মানুষের জন্মগত বা প্রাকৃতিক অধিকার বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব। বেন্থাম আইনকে সরাসরি শাসকের আদেশ হিসেবে দেখতেন, যার মানে দাঁড়ায়, কোনো অধিকার তখনই বাস্তব রূপ পায় যখন সেটি বলবৎ করার মতো কোনো আইনি ব্যবস্থা থাকে। ফরাসি বিপ্লবীদের ঘোষিত প্রাকৃতিক অধিকারগুলোকে তিনি ‘ননসেন্স আপন স্টিল্টস’ বা অলীক প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে কোনো অধিকার নিয়ে আসে না, বরং সমাজ এবং রাষ্ট্র নিজেদের প্রয়োজনে কিছু নিয়ম তৈরি করে। তার এই উপযোগবাদ (Utilitarianism) মূলত সমাজের সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়, যেখানে বিমূর্ত ব্যক্তিগত অধিকারের কোনো আলাদা মূল্যায়ন নেই। বেন্থামের এই বিশ্লেষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়া মানবাধিকারের ঘোষণাগুলো মূলত রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।

অধিকারের এই ধারণাকে সমাজ এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছিল। বেন্থাম বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষ যদি ভাবতে শুরু করে যে রাষ্ট্রের আইনের ঊর্ধ্বে তাদের কিছু অলঙ্ঘনীয় অধিকার রয়েছে, তবে সমাজে দ্রুত নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে। মানুষ তখন নিজেদের খেয়ালখুশিমতো আইন ভাঙতে শুরু করবে এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। মানবাধিকারের সীমাবদ্ধতা মূলত এখানেই যে, এটি অনেক সময় ব্যক্তির দাবিকে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণের চেয়ে বড় করে দেখায়। একটি কার্যকর বিচার ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই অধিকারগুলোর কোনো প্রয়োগযোগ্যতা থাকে না। তাই বিমূর্ত দর্শনের ওপর ভর করে অধিকারের তালিকা লম্বা করার চেয়ে বাস্তবসম্মত আইনি কাঠামোর দিকে মনোযোগ দেওয়াটা বেশি জরুরি বলে উপযোগবাদীরা মনে করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, মানবাধিকারের ধারণাটি কোনো সার্বজনীন সত্য নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে তৈরি হওয়া একটি আইনি কৌশল মাত্র, যা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে (Bentham, 1843)।

এই অধিকারগুলোর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থান থেকে সমালোচনা করেছিলেন আরেক প্রখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke)। তিনি মানবাধিকারকে একটি রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভ লেন্স থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ রিফ্লেকশনস অন দ্য রেভোলিউশন ইন ফ্রান্স (Reflections on the Revolution in France)-এ তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিমূর্ত অধিকারগুলোর তীব্র বিরোধিতা করেন। বার্কের মতে, অধিকার কোনো দার্শনিক গবেষণাগারে তৈরি হওয়া সার্বজনীন ধারণা নয়, বরং এগুলো হলো একটি নির্দিষ্ট সমাজের শত শত বছরের ঐতিহ্য এবং রীতিনীতির ফসল। একজন ইংরেজ নাগরিকের অধিকার আর একজন ফরাসি নাগরিকের অধিকার কখনোই এক হতে পারে না, কারণ তাদের ইতিহাস এবং সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা। ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে যখন জোরপূর্বক কিছু কাল্পনিক অধিকার সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সমাজের স্বাভাবিক বুনন নষ্ট হয়ে যায়। বার্ক যুক্তি দেখান, এই ধরনের সার্বজনীন অধিকারের দাবিগুলো অনেক সময় সমাজে একনায়কতন্ত্র এবং রক্তপাতের জন্ম দেয়। তার এই রক্ষণশীল সমালোচনা প্রমাণ করে, কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানবাধিকারকে একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা মূলত একটি বড় ধরনের তাত্ত্বিক ভুল (Burke, 1790)।

কস্টাস ডুজিনাস (Costas Douzinas)মাকুয়া মুতুয়া (Makau Mutua)

আধুনিক যুগে মানবাধিকারকে অনেক সময় একটি মহান এবং সর্বজনীন ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এর কোনো রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক অভিসন্ধি নেই। ক্রিটিকাল লিগ্যাল স্টাডিজ বা সমালোচনামূলক আইনশাস্ত্রের পণ্ডিতরা এই ধারণার সাথে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেন। গ্রিক-ব্রিটিশ আইনজ্ঞ কস্টাস ডুজিনাস (Costas Douzinas) তার দ্য এন্ড অফ হিউম্যান রাইটস (The End of Human Rights) গ্রন্থে মানবাধিকারের এই অন্ধকার দিকটি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তার মতে, মানবাধিকার একসময় রাষ্ট্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের হাতিয়ার ছিল, কিন্তু এখন এটি খোদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের একটি শক্তিশালী কৌশলে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো এখন মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এবং নিজেদের সামরিক আগ্রাসনকে বৈধতা দেয়। ডুজিনাস দেখিয়েছেন, মানবাধিকার এখন আর কোনো নৈতিক প্রতিরোধ নয়, এটি একটি আমলাতান্ত্রিক এবং আইনি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে যা বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষা করে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে মানবাধিকার মূলত তার মূল বিপ্লবী চরিত্রটি হারিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে পরিণত হয়েছে (Douzinas, 2000)।

এই পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে উন্নয়নশীল বিশ্বের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে জোরালো সমালোচনাটি করেছেন কেনিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনজ্ঞ মাকুয়া মুতুয়া (Makau Mutua)। তিনি তৃতীয় বিশ্বের আন্তর্জাতিক আইন দৃষ্টিভঙ্গি (Third World Approaches to International Law – TWAIL)-এর অন্যতম প্রবক্তা। মুতুয়া মানবাধিকারের বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোটিকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপক বা মেটাফরের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো মূলত একটি ‘স্যাভেজ-ভিকটিম-সেভিয়র’ (বর্বর-শিকার-ত্রাণকর্তা) মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করে। এই আখ্যানে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে একটি বর্বর সত্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যারা নিজেদের নাগরিকদের ওপর অত্যাচার করছে। অন্যদিকে, ওই রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে অসহায় শিকার বা ভিকটিম হিসেবে দেখানো হয়, যাদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর নেই। আর পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবতীর্ণ হয় এক মহান ত্রাণকর্তার ভূমিকায়, যারা এই অসহায় মানুষদের উদ্ধার করতে আসে। মুতুয়া যুক্তি দেখান, এই রূপকটি মূলত পুরনো ঔপনিবেশিক মানসিকতারই একটি আধুনিক সংস্করণ, যা অ-পশ্চিমা সমাজগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

মুতুয়ার এই বিশ্লেষণ মানবাধিকারের সার্বজনীনতার দাবিকে একটি বড় ধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। মানবাধিকারের বর্তমান রূপরেখাটি মূলত ইউরোপীয় জ্ঞানদীপ্তির যুগ বা এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার নিজস্ব সাংস্কৃতিক এবং দার্শনিক চিন্তাধারার কোনো প্রতিফলন নেই। মুতুয়া মনে করেন, মানবাধিকার যদি সত্যিই একটি বৈশ্বিক ধারণা হতে চায়, তবে এর ভেতর থেকে এই ইউরোকেন্দ্রিক অহংকার দূর করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নতুন এবং বহুত্ববাদী অধিকারের কাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এটি একটি চাপিয়ে দেওয়া মতাদর্শ হিসেবেই থেকে যাবে। মানবাধিকারের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি অনেক সময় স্থানীয় মানুষের নিজস্ব আর্থসামাজিক বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং ওপর থেকে কিছু পশ্চিমা মানদণ্ড চাপিয়ে দিয়ে সমস্যার রাতারাতি সমাধান করতে চায়। এই ধরনের একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত মানবাধিকারের প্রতি উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষদের মনে এক গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয় (Mutua, 2001)।

কার্ল মার্ক্স (Karl Marx)স্লাভয় জিজেক (Slavoj Žižek)

মানবাধিকারের আলোচনায় সাধারণত রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, যেখানে অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টি প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে নিখুঁত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছিলেন জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স (Karl Marx)। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ অন দ্য জিউইশ কোশ্চেন (On the Jewish Question)-এ তিনি ফরাসি বিপ্লবের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের একটি বস্তুনিষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ করেন। মার্ক্স দেখিয়েছেন, এই ঘোষণাপত্রে যে সার্বজনীন অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণির অধিকার। সম্পত্তির অধিকার, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার যে আইনি সুরক্ষাগুলো দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একজন মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর ব্যক্তিতে পরিণত করে। মার্ক্সের মতে, এই অধিকারগুলো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কোনো কাজে আসে না, কারণ একটি বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আইনি অধিকার থাকলেও মানুষ তার পেট ভরাতে পারে না। মানবাধিকারের এই ধারণা মূলত সম্পদের মালিকদের তাদের সম্পত্তি স্বাধীনভাবে ভোগ করার একটি আইনি লাইসেন্স প্রদান করে, যেখানে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের কোনো স্থান নেই।

মার্ক্স মানুষের স্বাধীনতাকে দুটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করেছেন – রাজনৈতিক মুক্তি এবং মানবীয় মুক্তি। একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভোট দেওয়ার বা কথা বলার অধিকার পান, তখন তার কেবল রাজনৈতিক মুক্তি ঘটে। কিন্তু একটি পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় সেই একই মানুষ প্রতিদিন কারখানায় শোষণের শিকার হতে থাকেন। পেটের দায়ে তাকে এমন সব শর্তে কাজ করতে হয়, যেখানে তার কোনো মানবিক মর্যাদা অবশিষ্ট থাকে না। মার্ক্স যুক্তি দেন, সত্যিকারের মানবীয় মুক্তি তখনই সম্ভব যখন সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শ্রেণিগত শোষণ সম্পূর্ণভাবে দূর করা যাবে। মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি মানুষকে এই রাজনৈতিক মুক্তির একটি রঙিন চশমা পরিয়ে রাখে, যাতে মানুষ তার আসল অর্থনৈতিক বঞ্চনাটি বুঝতে না পারে। এটি মূলত রাষ্ট্রকে একটি নিরপেক্ষ পাহারাদার হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও বাস্তবে রাষ্ট্র পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই কাজ করে। অর্থনৈতিক অধিকার এবং সম্পদের সুষম বণ্টন ছাড়া মানবাধিকারের এই বিমূর্ত ধারণাগুলো মূলত একটি বড় ধরনের তাত্ত্বিক প্রতারণা (Marx, 1844)।

মার্ক্সের এই ধ্রুপদী সমালোচনাকে আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি শানিত করেছেন স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভয় জিজেক (Slavoj Žižek)। জিজেক বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামোকে একটি আদর্শিক মায়াজাল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব এখন মানবাধিকারের নামে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের সামরিক এবং অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। জিজেক দেখিয়েছেন, যখন কোনো দেশে মানবিক সংকট বা যুদ্ধ দেখা দেয়, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল সেই যুদ্ধের বাহ্যিক দিকগুলো নিয়ে কথা বলে এবং কিছু ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু এই যুদ্ধগুলো তৈরি করার পেছনে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের যে কাঠামোগত শোষণ রয়েছে, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। অর্থাৎ, মানবাধিকারের বর্তমান ডিসকোর্সটি মূলত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে কেবল তার নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো দূর করার চেষ্টা করে। এটি অনেকটা ক্যান্সারের রোগীকে কেবল ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো। জিজেক মনে করেন, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং পুঁজিবাদের শোষণমূলক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ না করে কেবল মানবাধিকারের কথা বলাটা এক ধরনের ভণ্ডামি, যা সমস্যার আসল শেকড়কে সব সময় আড়ালে রেখে দেয় (Žižek, 2005)।

কার্ল শ্মিট (Carl Schmitt)জর্জো আগামবেন (Giorgio Agamben)

অধিকারের ধারণাটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে খুব চমৎকারভাবে কাজ করলেও, রাষ্ট্র যখন কোনো চরম সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন এই অধিকারগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্র এবং আইনি কাঠামোর এই সংকটময় মুহূর্তটি নিয়ে কাজ করেছেন জার্মান আইনজ্ঞ কার্ল শ্মিট (Carl Schmitt)। তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের একটি অত্যন্ত রূঢ় এবং বাস্তববাদী সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। শ্মিটের মতে, সার্বভৌম শাসক হলেন তিনি, যিনি ব্যতিক্রমী অবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। যখন কোনো দেশে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ বা বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্র তার সংবিধান এবং সমস্ত আইনকে স্থগিত করে দিতে পারে। এই অবস্থাকে তিনি ব্যতিক্রমী অবস্থা (State of Exception) বলেছেন। শ্মিট দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় আইনের ভিত্তি কোনো বিমূর্ত নৈতিকতা নয়, বরং এটি বন্ধু এবং শত্রুর মধ্যে পার্থক্য করার একটি নিরন্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। সংকটের সময় রাষ্ট্র যেকোনো মানুষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে এবং তার সমস্ত অধিকার কেড়ে নিতে পারে। শ্মিটের এই তত্ত্ব প্রমাণ করে, মানবাধিকার কোনো অলঙ্ঘনীয় বিষয় নয়, এটি কেবল রাষ্ট্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল একটি সাময়িক আইনি সুবিধা মাত্র (Schmitt, 1922)।

শ্মিটের এই তাত্ত্বিক আলোচনাকে আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে নতুন করে তুলে এনেছেন ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জো আগামবেন (Giorgio Agamben)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হোমো সাকের (Homo Sacer)-এ তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এই ব্যতিক্রমী অবস্থাকে একটি স্থায়ী নিয়মে পরিণত করেছে। আগামবেন প্রাচীন রোমান আইনের একটি ধারণা ব্যবহার করেছেন, যাকে তিনি নগ্ন জীবন (Bare Life) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নগ্ন জীবন হলো এমন একজন মানুষ, যাকে আইনের সুরক্ষার বাইরে রাখা হয়েছে এবং যাকে বিনা বিচারে হত্যা করলেও সেটি কোনো আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। আগামবেন যুক্তি দেন, আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো প্রতিনিয়ত এই নগ্ন জীবন তৈরি করে চলেছে। গুয়ানতানামো বে-র মতো গোপন কারাগারগুলো কিংবা বিভিন্ন দেশের বন্দিশিবিরগুলো মূলত এই ব্যতিক্রমী অবস্থারই বাস্তব রূপ। সেখানে আটকে থাকা মানুষদের কোনো আইনি পরিচয় থাকে না, তারা আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো আইনের সুরক্ষাই পায় না।

আগামবেনের এই বিশ্লেষণ মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ সীমাবদ্ধতাটি আমাদের সামনে তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের নিয়মগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন কোনো মানুষ রিফিউজি বা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে, তখন তার এই অধিকারগুলো আর কোনো কাজে আসে না। রাষ্ট্রহীন একজন মানুষ স্রেফ একটি জৈবিক অস্তিত্বে পরিণত হয়, যার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো কার্যকর আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, যখন হাজার হাজার মানুষ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা যায়, তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন তাদের জীবন রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। কারণ, কোনো রাষ্ট্রই তাদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে চায় না। আগামবেনের দর্শন আমাদের এই রূঢ় সত্যটির মুখোমুখি দাঁড় করায় যে, নাগরিকত্বের রাজনৈতিক আবরণ ছাড়া একজন মানুষের নিছক মানবসত্তার কোনো আইনি বা নৈতিক মূল্য আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অবশিষ্ট নেই (Agamben, 1998)।

স্যামুয়েল হান্টিংটন (Samuel Huntington)মেরি অ্যান গ্লেনডন (Mary Ann Glendon)

মানবাধিকারের সার্বজনীনতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের যে অহংকার রয়েছে, তা পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। এই সাংস্কৃতিক বিভেদের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছিলেন প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন (Samuel Huntington)। তার আলোচিত তত্ত্ব দ্য ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশনস (The Clash of Civilizations)-এ তিনি দাবি করেছিলেন যে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে সংঘাতগুলো আর আদর্শিক কারণে হবে না, বরং এই সংঘাতের মূল কারণ হবে সংস্কৃতি ও ধর্ম। হান্টিংটনের মতে, পশ্চিমা বিশ্বের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, উদারনীতি এবং মানবাধিকারের ধারণাগুলো ইসলামিক, কনফুসীয় বা অর্থোডক্স সভ্যতাগুলোর নিজস্ব মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। অনেক অ-পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তি থেকে পরিবারের, সমাজের বা ধর্মের গুরুত্ব অনেক বেশি। পশ্চিমা বিশ্ব যখন তাদের এই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এবং সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে পুরো পৃথিবীর ওপর সার্বজনীন হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য সভ্যতাগুলো এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হান্টিংটনের এই তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানবাধিকারকে একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা মূলত বিশ্বজুড়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংঘাতের জন্ম দেয় (Huntington, 1996)।

এই সাংস্কৃতিক ভিন্নতার পাশাপাশি মানবাধিকারের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো অধিকারের ভাষার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। মার্কিন আইন বিশারদ মেরি অ্যান গ্লেনডন (Mary Ann Glendon) তার রাইটস টক (Rights Talk) গ্রন্থে এই সমস্যাটির বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। গ্লেনডন দেখিয়েছেন, আধুনিক সমাজে মানুষ তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক দাবিকে একটি চরম এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেছে। এর ফলে সমাজে যেকোনো ধরনের আপস বা ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গ্লেনডনের মতে, এই অধিকারের ভাষাটি অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক। এটি মানুষকে কেবল এই শিক্ষাই দেয় যে সে রাষ্ট্রের কাছ থেকে বা সমাজের কাছ থেকে কী পেতে পারে। কিন্তু সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষের যে কিছু নাগরিক দায়িত্ব বা কর্তব্য রয়েছে, এই অধিকারের ডিসকোর্সে তা পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকে। যখন সবাই কেবল নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয় এবং দায়িত্বের কথা ভুলে যায়, তখন সমাজের ভেতরে এক ধরনের কাঠামোগত ভাঙন তৈরি হয়।

গ্লেনডন আরও যুক্তি দেন যে, অধিকারের এই অতিব্যবহার মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কগুলোকেও বিষিয়ে তোলে। পরিবার বা সম্প্রদায়ের ভেতরে মানুষ যে পারস্পরিক সহানুভূতি এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বাস করে, আইনি অধিকারের ভাষা সেই সম্পর্কগুলোকে একটি যান্ত্রিক লেনদেনে পরিণত করে। একটি সুস্থ সমাজ কেবল আদালতের রায় আর আইনের ধারা দিয়ে চলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক প্রতিশ্রুতি। বর্তমান সময়ের মানবাধিকার কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অতিমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। এটি ব্যক্তিকে সমাজ থেকে আলাদা করে দেখে এবং সমাজের প্রতি তার দায়িত্বগুলোকে অস্বীকার করে। গ্লেনডনের এই বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, কর্তব্যের ধারণা বাদ দিয়ে কেবল অধিকারের চর্চা একটি সমাজকে কখনোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল এবং মানবিক রাখতে পারে না (Glendon, 1991)।

ওনরা ও’নিল (Onora O’Neill)মার্থা নুসবাউম (Martha Nussbaum)

মানবাধিকারের দলিলের ভাষাগুলো সাধারণত অত্যন্ত সুন্দর এবং আশা জাগানিয়া হয়। কিন্তু এই সুন্দর কথাগুলোর পেছনের আইনি শূন্যতা নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দার্শনিক সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ দার্শনিক ওনরা ও’নিল (Onora O’Neill)কান্টীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে ও’নিল দেখিয়েছেন যে, অধিকার এবং দায়িত্ব মূলত একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যদি কারো কোনো অধিকার থাকে, তবে সেই অধিকার পূরণের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অন্য কারো ওপর বর্তাতে হবে। ও’নিল আধুনিক মানবাধিকারের দলিলগুলোকে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলোকে, ‘ম্যানিফেস্টো রাইটস’ বা কেবল ঘোষণাপত্র সর্বস্ব অধিকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি বলা হয় প্রতিটি মানুষের পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তখন একটি যৌক্তিক প্রশ্ন আসে – এই খাবার দেওয়ার দায়িত্বটি কার? যদি এই দায়িত্বটি নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর আইনিভাবে চাপিয়ে দেওয়া না থাকে, তবে এই অধিকারটি মূলত একটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। ও’নিলের মতে, দায়িত্বহীন অধিকারের এই কাঠামোটি মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা, যা বাস্তবে সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসে না (O’Neill, 2005)।

ও’নিলের এই সমালোচনার রেশ ধরেই মানবাধিকারের প্রয়োগযোগ্যতাকে একটি বাস্তবসম্মত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন প্রখ্যাত আমেরিকান দার্শনিক মার্থা নুসবাউম (Martha Nussbaum)। নুসবাউম বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল সংবিধানে বা আন্তর্জাতিক আইনে কিছু অধিকার লিখে রাখলেই মানুষের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন ঘটে না। এর জন্য তিনি সক্ষমতা তত্ত্ব (Capability Approach) নামের একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রস্তাব করেন। নুসবাউম যুক্তি দেন যে, একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার দিয়েছে কি না, সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, সেই মানুষগুলোর কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা আছে কি না। একজন নারীর যদি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার আইনি অধিকার থাকে, কিন্তু রাস্তায় বের হলে তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়, তবে সেই আইনি অধিকারের কোনো মূল্য থাকে না। নুসবাউমের মতে, অধিকারকে কেবল নেতিবাচক বা আইনি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্রকে অবশ্যই মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত সামাজিক এবং বস্তুগত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

নুসবাউম মানুষের জন্য কিছু কেন্দ্রীয় মানব সক্ষমতার একটি তালিকা তৈরি করেছেন, যার মধ্যে শারীরিক স্বাস্থ্য, আবেগ প্রকাশ এবং চারপাশের পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। তার এই তত্ত্বটি মানবাধিকারের বিমূর্ত সীমাবদ্ধতাগুলোকে কাটিয়ে ওঠার একটি চমৎকার পথনির্দেশনা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, অধিকার কোনো বায়বীয় ধারণা নয়, এর সাথে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সক্ষমতা সরাসরি যুক্ত। রাষ্ট্র যদি এই সক্ষমতাগুলো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে মানবাধিকারের ঘোষণাগুলো স্রেফ আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি আলংকারিক বস্তুতে পরিণত হয়। ও’নিল এবং নুসবাউমের এই দার্শনিক আলোচনাগুলো মূলত আমাদের এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানবাধিকারের বাস্তবায়ন কেবল আইনের বইয়ে আটকে থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট আইনি দায়িত্ব বণ্টন এবং সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক ক্ষমতায়ন, যা ছাড়া মানবাধিকারের পুরো ধারণাটিই একটি বিশাল তাত্ত্বিক প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য (Nussbaum, 2011)।

মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কিত তাত্ত্বিকরা (Theorists Related to the Human Rights): রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের দার্শনিক পর্যালোচনা

টমাস হবস ও জন লক (Thomas Hobbes and John Locke)

মানবাধিকারের ধারণাটি কোনো শূন্যস্থান থেকে রাতারাতি তৈরি হয়নি। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ব্যক্তির অধিকারের মধ্যকার সম্পর্ক বুঝতে হলে আমাদের সতেরো শতকের ইউরোপীয় দর্শনের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। এই দার্শনিক পরিক্রমার অন্যতম প্রধান প্রথিকৃৎ হলেন ইংরেজ চিন্তাবিদ টমাস হবস (Thomas Hobbes)। তিনি মানুষের আদিম অবস্থাকে একটি ভয়াবহ এবং নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। সেই সময়ে মানুষের জীবন ছিল বিচ্ছিন্ন, দরিদ্র, বিশ্রী, পাশবিক এবং সংক্ষিপ্ত। হবস যুক্তি দেখান, এই ক্রমাগত যুদ্ধ এবং মৃত্যুভয় থেকে বাঁচার জন্যই মানুষ একে অপরের সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract) নামে পরিচিত। মানুষ নিজেদের সুরক্ষার খাতিরে তাদের সব ক্ষমতা একটি নিরঙ্কুশ এবং শক্তিশালী কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। হবস এই কর্তৃপক্ষকে ‘লেভিয়াথান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। হবসের এই তত্ত্বে ব্যক্তির স্বাধীনতার চেয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রগুলো জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার খর্ব করে। আসলে তারা হবসের এই নিরাপত্তা-সর্বস্ব দর্শনেরই একটি পরিবর্তিত রূপ অনুসরণ করে থাকে (Hobbes, 1651)।

হবসের এই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধারণাকে একটি ভিন্ন এবং অনেক বেশি মানবিক রূপ দেন আরেক বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক জন লক (John Locke)। লকের চিন্তাধারা আধুনিক মানবাধিকারের বিকাশে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। লকের মতে, রাষ্ট্রের জন্মের অনেক আগে থেকেই মানুষের কিছু অধিকার জন্মগতভাবে ছিল। তিনি এগুলোকে প্রাকৃতিক অধিকার (Natural Rights) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এই অধিকারগুলোর মধ্যে প্রধান হলো মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার। লক স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, রাষ্ট্র এই অধিকারগুলো মানুষকে দান করেনি। এই অধিকারগুলো রক্ষা করার জন্যই মানুষ রাষ্ট্র নামের প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে। সুতরাং, রাষ্ট্র কখনো তার এই মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে অথবা নিজেই মানুষের প্রাকৃতিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে শুরু করলে, নাগরিকদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার। লকের এই যুগান্তকারী দর্শনটি পরবর্তীতে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ফরাসি বিপ্লবের মানবাধিকার সনদের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল (Locke, 1689)।

লকের এই প্রাকৃতিক অধিকারের তত্ত্বটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাকেই সীমাবদ্ধ করেনি, পাশাপাশি এটি মানুষের ব্যক্তিগত সত্তাকে একটি শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল। তিনি মনে করতেন, মানুষের শ্রম এবং সম্পত্তির ওপর তার একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে, যা কোনো স্বৈরশাসক কেড়ে নিতে পারে না। আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে সম্পত্তির অধিকার বা জীবনের নিরাপত্তার কথাগুলো বলা হয়েছে। তার একেবারে গভীরে লকের এই দার্শনিক চিন্তার ছাপ সুস্পষ্ট। রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্কটি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে লক একটি চমৎকার রূপরেখা দিয়েছিলেন। আজকের গণতান্ত্রিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো এই রূপরেখা। তিনি বুঝিয়েছিলেন, শাসক কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা নিয়ে আসে না, তার ক্ষমতার একমাত্র উৎস হলো জনগণের সম্মতি। ফলে, মানবাধিকারের প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে এই দুজন তাত্ত্বিকের অবদানকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জঁ-জাক রুশো ও ম্যাক্স ওয়েবার (Jean-Jacques Rousseau and Max Weber)

সামাজিক চুক্তির ধারণায় একটি নতুন এবং সামষ্টিক মাত্রার যোগ ঘটান ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau)। রুশো বিশ্বাস করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সমাজের প্রতিটি স্তরে সে শেকলে আবদ্ধ। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণাই সমাজে বৈষম্য এবং হানাহানির জন্ম দিয়েছে বলে তিনি মনে করতেন। এই অসমতা থেকে মুক্তির জন্য রুশো একটি নতুন ধরনের সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব করেন। এটি মূলত সাধারণ ইচ্ছা (General Will)-এর ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রুশোর মতে, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সমাজের সব মানুষের সম্মিলিত এবং যৌক্তিক ইচ্ছার মাধ্যমে। এই ইচ্ছা সব সময় পুরো সম্প্রদায়ের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সামষ্টিক কল্যাণকে তিনি অনেক উঁচুতে স্থান দিয়েছিলেন। রুশোর এই দর্শনটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিলেও, অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন ‘সাধারণ ইচ্ছা’-এর দোহাই দিয়ে সংখ্যাগুরু মানুষেরা অনেক সময় সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। এরপরও, মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা এবং সাম্যের ধারণাকে আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে রুশোর অবদান আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় (Rousseau, 1762)।

রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে এবং কেন মানুষের অধিকার অনেক সময় রাষ্ট্রের বিশাল কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে যায়, তা বুঝতে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের কিছু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জরুরি। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতার একটি নিখুঁত এবং বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। ওয়েবারের মতে, আধুনিক রাষ্ট্র হলো এমন একটি মানব সম্প্রদায়, যারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভেতরে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার (Monopoly on Legitimate Use of Force) সফলভাবে দাবি করতে পারে। এর সহজ অর্থ হলো, সমাজের ভেতরে শান্তি বজায় রাখা বা আইন প্রয়োগ করার জন্য কেবল রাষ্ট্রই বৈধভাবে অস্ত্র বা শক্তি ব্যবহার করতে পারবে। পুলিশ বা সামরিক বাহিনী হলো রাষ্ট্রের এই শক্তি প্রয়োগের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ওয়েবারের এই বিশ্লেষণ আমাদের দেখায়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভেতরেই বলপ্রয়োগের একটি অন্তর্নিহিত বীজ লুকিয়ে থাকে। এই বলপ্রয়োগের ওপর আইনি বা সাংবিধানিক নজরদারির অভাব ঘটলে, রাষ্ট্র খুব সহজেই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে এবং মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন ঘটতে শুরু করে (Weber, 1919)।

রুশোর সামষ্টিক ইচ্ছার সাথে ওয়েবারের বলপ্রয়োগের তত্ত্বকে মেলালে আধুনিক রাষ্ট্রের একটি দ্বিমুখী চরিত্র ফুটে ওঠে। রাষ্ট্র একদিকে নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং সাম্যের নিশ্চয়তা দেয়, পাশাপাশি সেই নিশ্চয়তাটুকু টিকিয়ে রাখার জন্যই সে প্রতিনিয়ত শক্তির মহড়া চালায়। ওয়েবার খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, আধুনিক আমলাতন্ত্র হলো একটি বিশাল এবং আবেগহীন যন্ত্র, যা কেবল নিয়ম মেনে চলে। এই আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে একজন সাধারণ মানুষ অনেক সময় একটি নিছক ফাইলে পরিণত হয়। তার মানবিক অনুভূতিগুলোর কোনো মূল্য সেখানে থাকে না। মানবাধিকারের কাজ হলো রাষ্ট্রের এই আবেগহীন আমলাতন্ত্র এবং যান্ত্রিক বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে একটি আইনি ঢাল তৈরি করা। রাষ্ট্র যেন তার শক্তির দম্ভে নাগরিকদের সাধারণ ইচ্ছাকে পদদলিত করতে না পারে, তার জন্যই আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানবাধিকারের রীতিনীতিগুলোকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখতে হয় এবং এর ওপর জনগণের নজরদারি বজায় রাখতে হয়।

মিশেল ফুকো ও আচিল মেম্বে (Michel Foucault and Achille Mbembe)

ক্ষমতা প্রয়োগের চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেন ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault)। ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেবল পুলিশ বা জেলের ভয় দেখায় না। আধুনিক ক্ষমতা কাজ করে সুক্ষ্ম এবং অদৃশ্য উপায়ে। ফুকো তার তত্ত্বে জেরেমি বেন্থামের প্যানপটিকন (Panopticon)-এর উদাহরণ টেনে এনেছেন। প্যানপটিকন হলো এমন একটি গোলাকার কারাগার, যেখানে মাঝখানের ওয়াচটাওয়ারে থাকা একজন পাহারাদার চারপাশের সব বন্দিকে দেখতে পায়। বন্দিরা বুঝতে পারে না তাদের দিকে ঠিক কোন মুহূর্তে নজর রাখা হচ্ছে। ফুকো মনে করেন, আধুনিক সমাজটি মূলত এই প্যানপটিকনের মতোই একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ (Disciplinary Society)-তে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র সব সময় সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষ বুঝতে পারে, তাদের প্রতিটি কাজের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তারা নিজেদের ভেতরেই এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সরশিপ তৈরি করে নেয়। তারা এমন কিছু করা বা বলা থেকে বিরত থাকে, যা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। এই নিরন্তর নজরদারি মানুষের ব্যক্তিসত্তা এবং স্বাধীন চিন্তার অধিকারকে ভেতর থেকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয় (Foucault, 1975)।

ফুকো তার গবেষণায় ক্ষমতার আরও একটি চমৎকার দিক উন্মোচন করেছেন। তিনি একে জৈব-ক্ষমতা (Biopower) বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রাচীনকালের শাসকরা মানুষের মৃত্যুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের বেঁচে থাকার প্রক্রিয়াটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। রাষ্ট্র জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে, জনস্বাস্থ্য নীতি তৈরি করে এবং মানুষের শরীরকে কারখানার একটি উৎপাদনশীল মেশিনে পরিণত করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিদ্যার নিরপেক্ষ জ্ঞানকে রাষ্ট্র অনেক সময় মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। স্কুল, হাসপাতাল বা কারাগারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করা হয়েছে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে অনুগত এবং আজ্ঞাবহ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। ফুকোর এই তত্ত্ব থেকে খুব সহজেই বোঝা যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমেই সবসময় ঘটে না। রাষ্ট্র তার প্রশাসনিক নীতি বা শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে মানুষের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। মানুষকে তার নিজস্বতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এটি এক ধরনের গভীর এবং কাঠামোগত মানবাধিকার হরণ। আধুনিক যুগের পুলিশিং এবং প্রশাসনিক নজরদারির অন্তর্নিহিত স্বরূপ বুঝতে ফুকোর এই বিশ্লেষণগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

ফুকোর জৈব-ক্ষমতার ধারণাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে ক্যামেরুনের দার্শনিক আচিল মেম্বে (Achille Mbembe) নেক্রোপলিটিক্স (Necropolitics) বা মৃত্যুর রাজনীতির তত্ত্ব প্রদান করেছেন। মেম্বের মতে, আধুনিক যুগে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব মানুষের জীবন রক্ষার ওপর নির্ভর করে না। কার বেঁচে থাকার অধিকার আছে আর কাকে মরতে হবে – সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপরই মূলত রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে। অনেক রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক এলাকা বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে পদ্ধতিগতভাবে এমন এক অবস্থার মধ্যে রাখা হয়, যা মৃত্যুরই নামান্তর। তাদের এলাকায় কোনো উন্নয়ন হয় না, সেখানে সামরিক বাহিনীর সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকে এবং সেখানে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য থাকে না। মেম্বের এই তত্ত্বটি উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, মৃত্যু কোনো বুলেট বা বোমার কারণেই শুধু হয় না। রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং কাঠামোগত নিপীড়নের কারণেও মানুষ তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। মেম্বের দর্শন মূলত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি নতুন এবং আধুনিক রূপকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করে (Mbembe, 2003)।

জন রলস্ ও অমর্ত্য সেন (John Rawls and Amartya Sen)

মানবাধিকারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমতার প্রশ্ন। একটি সমাজে সম্পদ কীভাবে বণ্টন করা হবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক তত্ত্বটি দিয়েছেন আমেরিকান চিন্তাবিদ জন রলস্ (John Rawls)। তার যুগান্তকারী গ্রন্থ আ থিওরি অব জাস্টিস (A Theory of Justice)-এ তিনি মূলত একটি যৌক্তিক চিন্তন পরীক্ষার অবতারণা করেছেন। রলস্ এর নাম দিয়েছেন অজ্ঞতার অবগুণ্ঠন (Veil of Ignorance)। তিনি কল্পনা করতে বলেছেন, সমাজের নিয়মকানুন তৈরির আগে সব মানুষ এমন একটি পর্দার আড়ালে অবস্থান করছে, যেখানে কেউ জানে না সমাজে তার অবস্থান কী হবে। সে ধনী ঘরে জন্মাবে নাকি গরিব ঘরে, সে সুস্থ হবে নাকি প্রতিবন্ধী হবে – এই সবকিছু তার কাছে অজানা। রলস্ যুক্তি দেখান, এই অজ্ঞতার অবস্থাতেই মানুষ সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং ন্যায্য আইনগুলো তৈরি করতে পারবে। কারণ, কেউ গরিব বা দুর্বল হয়ে জন্মালে, সেই ভয়ে সে এমন নিয়ম তৈরি করবে যা সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটির জন্যও ন্যূনতম সুবিধা নিশ্চিত করে। রলসের এই ন্যায়বিচার তত্ত্ব (Theory of Justice) মানবাধিকারের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক এবং নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে (Rawls, 1971)।

রলসের এই তত্ত্বকে আরও বেশি বাস্তবমুখী এবং বিস্তৃত করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক অমর্ত্য সেন (Amartya Sen)। সেন মনে করেন, সম্পদ বা টাকা সমানভাবে ভাগ করে দিলেই সমাজে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তার বিখ্যাত সক্ষমতা তত্ত্ব (Capability Approach)-এর মূল কথা হলো, মানুষের কাছে সম্পদ থাকাই যথেষ্ট নয়। সেই সম্পদ ব্যবহার করে সে তার কাঙ্ক্ষিত জীবনযাপন করতে পারছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন সুস্থ মানুষকে এবং একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে সমান পরিমাণ টাকা দিলে তাদের জীবনের মান কখনো সমান হবে না। সেনের মতে, মানবাধিকার মানে রাষ্ট্রীয় বাধা দূর করা নয়, পাশাপাশি মানুষের ভেতরে থাকা সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা। শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ – এই সবকিছু মিলে একজন মানুষের সক্ষমতা তৈরি করে। রাষ্ট্র মানুষের এই সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ না করলে, কিছু আইনি অধিকার দিয়ে মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয় (Sen, 1999)।

অমর্ত্য সেনের এই ধারণাকে আরও সুনির্দিষ্ট রূপ দিয়েছেন আমেরিকান দার্শনিক মার্থা নুসবাউম (Martha Nussbaum)। নুসবাউম মানুষের জন্য দশটি কেন্দ্রীয় মানব সক্ষমতা (Central Human Capabilities)-এর একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করেছেন। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে স্বাভাবিক আয়ু পাওয়া, শারীরিক স্বাস্থ্য ও অখণ্ডতা বজায় রাখা, আবেগ প্রকাশ করতে পারা, এবং চারপাশের পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষমতা। নুসবাউমের যুক্তি হলো, একটি রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের জন্য এই সক্ষমতাগুলোর একটি ন্যূনতম স্তর নিশ্চিত করতে হবে। এই স্তরটি নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো মানুষের পক্ষেই মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নারী, শিশু বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে যে আলোচনাগুলো হয়, নুসবাউমের এই তত্ত্ব তাকে একটি সুদৃঢ় দার্শনিক কাঠামো প্রদান করে। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্র কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নয়, রাষ্ট্রকে মানুষের সার্বিক বিকাশের একজন সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে (Nussbaum, 2000)।

হানা আরেন্ট ও জর্জো আগামবেন (Hannah Arendt and Giorgio Agamben)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির হাতে লাখ লাখ মানুষের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বিশ্ববিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে সবচেয়ে নিবিড় দার্শনিক বিশ্লেষণটি করেছেন জার্মান-আমেরিকান চিন্তাবিদ হানা আরেন্ট (Hannah Arendt)। আরেন্ট তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষকে হত্যা করার আগে রাষ্ট্র সুকৌশলে তাদের আইনি এবং রাজনৈতিক পরিচয় কেড়ে নেয়। একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতির মানুষদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে, তারা মূলত রাষ্ট্রহীন বা রিফিউজি হয়ে পড়ে। আরেন্ট এই অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধিকার থাকার অধিকার (Right to Have Rights) নামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধারণার জন্ম দিয়েছেন। তার মতে, একজন মানুষ কোনো রাজনৈতিক সম্প্রদায় বা রাষ্ট্রের সদস্যপদ হারিয়ে ফেললে, তার বেঁচে থাকার অন্যান্য সব অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্রহীন একজন মানুষের কোনো আইনি সুরক্ষা থাকে না, সে স্রেফ একটি জীবন্ত মাংসে পরিণত হয়। আরেন্টের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আধুনিক যুগের রোহিঙ্গা বা ফিলিস্তিনিদের মতো রাষ্ট্রহীন মানুষদের দুর্দশা বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য দলিল (Arendt, 1951)।

রাষ্ট্র কীভাবে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই মানুষের অধিকার হরণ করে, তার একটি চমৎকার এবং ভীতিকর তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জো আগামবেন (Giorgio Agamben)। আগামবেনের দর্শনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে: ব্যতিক্রমী অবস্থা (State of Exception) এবং নগ্ন জীবন (Bare Life)। রাষ্ট্র অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তা বা জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে দেশের প্রচলিত আইন এবং সংবিধানকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয়। এই ব্যতিক্রমী অবস্থাতেই রাষ্ট্র চরম স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করে। আগামবেন দেখিয়েছেন, এই আইনের শূন্যতায় মানুষের জীবন একটি নগ্ন জীবনে পরিণত হয়, যাকে ইচ্ছেমতো হত্যা করা যায়, কিন্তু সেই হত্যার কোনো বিচার হয় না। গুয়ানতানামো বের মতো বন্দিশিবিরগুলো এই ব্যতিক্রমী অবস্থারই বাস্তব রূপ। সেখানে বন্দিদের কোনো আইনি পরিচয় থাকে না, তারা কোনো দেশের সাধারণ আইনের আওতায় পড়ে না। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাস দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা এনকাউন্টার চালায়। তারা সমাজকে এই ব্যতিক্রমী অবস্থার দিকেই ঠেলে দেয়, যা মানবাধিকারের একেবারে ভিত্তিমূল ধরে টান দেয় (Agamben, 1998)।

আরেন্ট এবং আগামবেনের তত্ত্বগুলো মূলত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অন্ধকার দিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমরা সাধারণত মনে করি, আইন এবং সংবিধান মানুষের অধিকার রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়েছে। এই দার্শনিকরা আমাদের দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র তার নিজস্ব সুবিধার জন্য খুব সহজেই সেই আইনকে নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। আইনি কাঠামোর ভেতরে থাকা ফাঁকফোকরগুলো ব্যবহার করে রাষ্ট্র কিছু মানুষকে সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাদের জীবনের কোনো মূল্য রাষ্ট্রের কাছে থাকে না। এই মানুষদের কোনো অধিকার দাবি করার জায়গাও অবশিষ্ট থাকে না। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রে প্রতিটি মানুষের আইনি পরিচয়ের কথা বলা হয়েছে। এই তাত্ত্বিকদের আলোচনা প্রমাণ করে, একটি কার্যকর রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হওয়া ছাড়া মানুষের অন্যান্য অধিকারগুলো একটি ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রহীনতা এবং ব্যতিক্রমী অবস্থার এই সংকটগুলো আধুনিক বিশ্বের মানবাধিকার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জোসেফ স্টিগলিটজ ও ডেভিড হার্ভে (Joseph Stiglitz and David Harvey)

বর্তমান পৃথিবী একটি বিশাল অর্থনৈতিক বলয়ের ভেতরে প্রবেশ করেছে, যাকে আমরা বিশ্বায়ন বলি। এই বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের সাথে অন্য প্রান্তের বাণিজ্য সহজ হয়েছে। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আড়ালে মানবাধিকারের যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটছে, তা নিয়ে জোরালো তাত্ত্বিক সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ (Joseph Stiglitz)। স্টিগলিটজ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপিয়ে দেওয়া নয়া-উদারনীতিবাদ (Neoliberalism)-এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এমন সব শর্ত চাপিয়ে দেয়, যা ওই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। বাজারকে উন্মুক্ত করার নামে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কৃষির মতো মৌলিক খাতগুলো থেকে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি তুলে নেওয়া হয়। এর ফলে সমাজের দরিদ্র মানুষগুলো এই সেবাগুলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়। স্টিগলিটজের এই বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে, বিশ্বায়নের নিয়মগুলো ধনী দেশ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সুবিধার্থে তৈরি হয়েছে। এটি মানবাধিকারের অর্থনৈতিক সমতার ধারণাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে (Stiglitz, 2002)।

পুঁজিবাদের এই আগ্রাসী রূপ নিয়ে আরও একটি বস্তুনিষ্ঠ তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন প্রখ্যাত ভূগোলবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে (David Harvey)। আধুনিক বিশ্বে পুঁজির প্রসারের প্রক্রিয়া বোঝাতে তিনি দখলদারিত্বের মাধ্যমে পুঞ্জীভবন (Accumulation by Dispossession) নামক একটি ধারণার অবতারণা করেছেন। হার্ভে দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদ কারখানায় শ্রমিক খাটিয়েই মুনাফা অর্জন করে না। তারা সাধারণ মানুষের ব্যবহার করা সাধারণ সম্পদ, যেমন জমি, জল এবং বনভূমি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। মেগা প্রজেক্ট বা খনি তৈরির নামে আদিবাসীদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াগুলোতে সাধারণ মানুষের সম্পত্তির অধিকার এবং বেঁচে থাকার অধিকারকে রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট পুঁজির সম্মিলিত শক্তির কাছে বলি দেওয়া হয়। হার্ভের এই বিশ্লেষণ কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের দিকে না ঝুঁকে খুব নিরপেক্ষভাবে দেখায় কীভাবে আধুনিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমাজের নিচের স্তরের মানুষের সম্পদ দখল করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে (Harvey, 2003)।

বিশ্বায়নের এই অর্থনৈতিক মডেলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি কাঠামোগত রূপ দেখা যায়। স্টিগলিটজ এবং হার্ভের তত্ত্বগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, মানবাধিকার কেবল রাজনৈতিক বা আইনি অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি রাষ্ট্র যখন তার অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করে, তখন সেই নীতির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর কেমন পড়বে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্ট অসমতা মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক শর্তগুলোকেই কেড়ে নিচ্ছে। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর অসীম ক্ষমতার কারণে স্থানীয় রাষ্ট্রগুলো শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। কোম্পানিগুলো খুব সহজেই ভয় দেখায়, শ্রমের দাম বাড়ালে তারা ব্যবসা গুটিয়ে অন্য দেশে চলে যাবে। এই ভয়ের কারণে রাষ্ট্র শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। বিশ্বায়নের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলো মানবাধিকারের লড়াইকে রাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিশাল রণক্ষেত্রে নিয়ে যায়।

উইলিয়াম রবিনসন ও নেওমি ক্লাইন (William I. Robinson and Naomi Klein)

বিশ্বায়নের ফলে শ্রমের বাজার কীভাবে শোষণের একটি নতুন বৈশ্বিক মডেলে পরিণত হয়েছে, তা নিয়ে কাজ করেছেন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম রবিনসন (William I. Robinson)। তিনি একটি নতুন শ্রেণির উত্থানের কথা বলেছেন, যাকে তিনি আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী শ্রেণি (Transnational Capitalist Class) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এই শ্রেণিটি কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়। তারা সারা বিশ্বজুড়ে তাদের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল ছড়িয়ে রেখেছে। তারা উন্নত বিশ্বে বসে পণ্য বিক্রি করে আর সেই পণ্য তৈরির জন্য এশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলোতে সস্তা শ্রম ব্যবহার করে। রবিনসন দেখিয়েছেন, এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অসীম ক্ষমতার কারণে স্থানীয় রাষ্ট্রগুলো শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। কোম্পানিগুলো খুব সহজেই ভয় দেখায়, শ্রমের দাম বাড়ালে তারা ব্যবসা গুটিয়ে অন্য দেশে চলে যাবে। এই ভয়ের কারণে রাষ্ট্র শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না (Robinson, 2004)।

এই অর্থনৈতিক আগ্রাসনের আরও একটি ভয়াবহ রূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন কানাডিয়ান সমাজকর্মী এবং লেখক নেওমি ক্লাইন (Naomi Klein)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য শক ডকট্রিন (The Shock Doctrine)-এ তিনি দুর্যোগের পুঁজিবাদ (Disaster Capitalism) নামের একটি ধারণার অবতারণা করেছেন। ক্লাইন দেখিয়েছেন, যখন কোনো দেশে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখন বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো সেই সুযোগটি গ্রহণ করে। মানুষ যখন ঘোরতর বিপদে থাকে এবং প্রতিবাদ করার মতো অবস্থায় থাকে না, তখন খুব দ্রুতগতিতে এমন সব অর্থনৈতিক সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের অধিকারকে পুরোপুরি কেড়ে নেয়। সরকারি সেবাগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়। ক্লাইনের মতে, এই ধরনের অর্থনৈতিক পলিসিগুলো মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের ওপর একটি সরাসরি আক্রমণ। দুর্যোগের সময় মানুষকে সাহায্য করার বদলে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মুনাফা লোটার এই মানসিকতা আধুনিক পুঁজিবাদের একটি কালো অধ্যায় (Klein, 2007)।

রবিনসন এবং ক্লাইনের তত্ত্বগুলো মূলত মানবাধিকারের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। আমরা সাধারণত মনে করি, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পুলিশ বা সামরিক বাহিনী। এই তাত্ত্বিকরা আমাদের দেখিয়েছেন, বড় বড় বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোও মানবাধিকারের সমান এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ লঙ্ঘনকারী হতে পারে। তাদের কোনো নির্দিষ্ট মুখাবয়ব নেই, তারা কোনো দেশের ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। তারা কেবল তাদের শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বাড়ানোর চিন্তাই করে। এই মুনাফার লোভে তারা পরিবেশ ধ্বংস করে, শ্রমিকদের শোষণের শিকার বানায় এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এই কর্পোরেশনগুলোকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো কোনো শক্ত কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। এই তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকারের লড়াইটি রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের পাশাপাশি কর্পোরেট পুঁজির অসীম ক্ষমতার বিরুদ্ধেও সমভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

স্টিভেন লেভিটস্কি ও ইয়ান-ওয়ের্নার মুলার (Steven Levitsky and Jan-Werner Müller)

আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকারের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরের অবক্ষয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি (Steven Levitsky) এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাট (Daniel Ziblatt) তাদের যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন, এখনকার দিনে গণতন্ত্র আর সামরিক ট্যাঙ্কের চাকায় পিষ্ট হয়ে মরে না। এখনকার গণতন্ত্রগুলো মারা যায় নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। তারা এই প্রক্রিয়াটিকে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ (Democratic Backsliding) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষমতায় আসার পর নেতারা সুকৌশলে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং গণমাধ্যমের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব করতে শুরু করেন। তারা বিরোধীদের ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করেন এবং ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করেন। লেভিটস্কি এবং জিব্ল্যাট জোর দিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্র কেবল লিখিত আইন দিয়ে টেকে না। এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আত্মসংযম। রাজনৈতিক নেতারা এই অলিখিত নিয়মগুলো ভাঙতে শুরু করলে ধীরে ধীরে একটি দেশ স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয় এবং মানবাধিকারের চরম বিপর্যয় ঘটে (Levitsky & Ziblatt, 2018)।

এই গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একটি নতুন রাজনৈতিক প্রবণতা, যার নাম পপুলিজম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়ান-ওয়ের্নার মুলার (Jan-Werner Müller) এই বিষয়ে চমৎকার একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছেন। মুলারের মতে, জনতুষ্টিবাদ (Populism) কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি মূলত একটি বিভেদমূলক মতাদর্শ। পপুলিস্ট নেতারা দাবি করেন যে কেবল তারাই দেশের ‘আসল’ বা ‘খাঁটি’ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। যারা তাদের সমালোচনা করে, তারা জনগণের শত্রু বা বিদেশি চক্রান্তকারী। এই ধরনের বিভেদমূলক রাজনীতি মূলত রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সরাসরি বিরোধী। পপুলিস্ট নেতারা সমাজে থাকা ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগকে উসকে দেন। এই অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশে সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে। মুলারের এই তত্ত্ব খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন থাকলেই কোনো সরকার গণতান্ত্রিক হয় না; গণতন্ত্রের আসল শর্ত হলো ভিন্নমত এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান প্রদর্শন (Müller, 2016)।

গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের এই পতন রোধ করার ক্ষেত্রে সমাজের ভেতরের বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম (Robert Putnam) তার গবেষণায় এই বন্ধনকে সামাজিক মূলধন (Social Capital) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পুটনামের মতে, একটি সমাজে মানুষ একে অপরের সাথে কতটা যুক্ত, তারা স্থানীয় সংগঠন, ক্লাব বা ট্রেড ইউনিয়নে কতটা সময় দিচ্ছে, তার ওপর সেই সমাজের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে। সমাজে এই সামাজিক মূলধন মজবুত থাকলে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি হয় এবং তারা যেকোনো রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে খুব সহজেই সংঘবদ্ধ হতে পারে। রাজনৈতিক মেরুকরণ বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কারণে মানুষ একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এই সামাজিক মূলধন ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। বিচ্ছিন্ন মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিশাল যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটি শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ ছাড়া মানবাধিকারের কোনো আইনি কাঠামোই দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না (Putnam, 2000)।

হার্শ লাউটারপ্যাচ ও রাফায়েল লেমকিন (Hersch Lauterpacht and Raphael Lemkin)

আন্তর্জাতিক আইন একসময় কেবল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার চুক্তি এবং যুদ্ধ-শান্তির নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। একক ব্যক্তি বা সাধারণ মানুষ যে আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে, এই বৈপ্লবিক ধারণাটি প্রথম আইনিভাবে প্রতিষ্ঠা করেন পোলিশ-ব্রিটিশ আইনজ্ঞ হার্শ লাউটারপ্যাচ (Hersch Lauterpacht)। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় লাউটারপ্যাচ জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন, রাষ্ট্রীয় সীমানার দোহাই দিয়ে কোনো নেতা তার নিজের দেশের মানুষের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানোর আইনি ছাড়পত্র পেতে পারে না। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes Against Humanity) ধারণাটিকে আন্তর্জাতিক আইনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করেন। লাউটারপ্যাচের এই তাত্ত্বিক অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের পুরো কেন্দ্রবিন্দুকেই পাল্টে দেয়। তিনি প্রমাণ করেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার অনেক বেশি পবিত্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোভাবেই এই অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না (Lauterpacht, 1950)।

প্রায় একই সময়ে আরেকজন পোলিশ আইনজ্ঞ রাফায়েল লেমকিন (Raphael Lemkin) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের জন্ম দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা পর্যবেক্ষণ করে লেমকিন বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা বর্ণগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার যে পরিকল্পনা, তাকে সংজ্ঞায়িত করার মতো কোনো শব্দ প্রচলিত আইনে নেই। তিনি গ্রিক এবং ল্যাটিন শব্দের সমন্বয়ে গণহত্যা (Genocide) শব্দটি তৈরি করেন। লেমকিনের নিরন্তর তাত্ত্বিক এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ গণহত্যা প্রতিরোধ সনদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। লেমকিন তার তত্ত্বে দেখিয়েছেন, গণহত্যা হঠাৎ করে ঘটা কোনো দাঙ্গা নয়, এটি রাষ্ট্র বা কোনো শক্তিশালী সংগঠনের একটি সুপরিকল্পিত এবং পদ্ধতিগত নিধনযজ্ঞ। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর শারীরিক অস্তিত্ব, তাদের সংস্কৃতি এবং পরিচয়কে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার এই অপরাধকে আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে লেমকিনের তাত্ত্বিক অবদান অনস্বীকার্য (Lemkin, 1944)।

বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের মধ্যকার এই আইনি দ্বন্দ্ব একটি নতুন মাত্রায় পৌঁছায়। নব্বইয়ের দশকে রুয়ান্ডা এবং বলকান অঞ্চলে ঘটা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞগুলো বিশ্ববিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কূটনীতিক গ্যারেথ ইভান্স (Gareth Evans) একটি নতুন তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন। এর নাম দেওয়া হয় সুরক্ষার দায়িত্ব (Responsibility to Protect) বা আরটুপি (R2P)। ইভান্স এবং তার কমিশন রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে পুরোপুরি পাল্টে দেন। তারা বলেন, সার্বভৌমত্ব মানে কেবল শাসন করার অধিকার নয়, এটি মূলত নাগরিকদের রক্ষা করার একটি পবিত্র দায়িত্ব। কোনো রাষ্ট্র তার জনগণকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেখানে হস্তক্ষেপ করার যৌক্তিক অধিকার লাভ করে। ইভান্সের এই তত্ত্বটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা পরাশক্তিগুলোর ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপের বদভ্যাসকে একটি নিয়মবদ্ধ এবং মানবিক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে (Evans, 2008)।

শশানা জুবফ ও ইভজেনি মরোজভ (Shoshana Zuboff and Evgeny Morozov)

একুশ শতকে এসে মানুষের অধিকারের ধারণাটি একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং অচেনা বিপদের মুখোমুখি হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের অভাবনীয় বিকাশ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শশানা জুবফ (Shoshana Zuboff) এই নতুন আর্থসামাজিক কাঠামোটিকে নজরদারি পুঁজিবাদ (Surveillance Capitalism) হিসেবে অত্যন্ত নিপুণভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জুবফ দেখিয়েছেন, বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন আর কেবল পণ্য বিক্রি করে না, তারা মানুষের অভিজ্ঞতা, আচরণ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে কাঁচামাল হিসেবে সংগ্রহ করে। আমরা ইন্টারনেটে কী দেখছি, কোথায় যাচ্ছি – এই বিপুল পরিমাণ ডেটা নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা হচ্ছে এবং বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির অধিকারটি সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। জুবফের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এই অসীম ক্ষমতার কারণে মানুষ স্বাধীন চিন্তার অধিকার হারিয়ে একটি বিশাল অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রিত পুতুলে পরিণত হচ্ছে (Zuboff, 2019)।

প্রযুক্তির এই আগ্রাসনের সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধরনও পাল্টে গেছে। একসময় ভাবা হতো ইন্টারনেট সব স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটাবে এবং পৃথিবীতে একটি অবাধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করবে। প্রযুক্তি গবেষক ইভজেনি মরোজভ (Evgeny Morozov) এই ধারণাকে নেট বিভ্রম (Net Delusion) হিসেবে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। মরোজভ বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো মূলত এই ইন্টারনেটকেই সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সাইবার হামলা চালাচ্ছে এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন ডিজিটাল কার্যক্রমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। এই নতুন শাসনব্যবস্থাকে ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্র (Digital Authoritarianism) বলা হয়। মরোজভের এই তত্ত্ব প্রমাণ করে, প্রযুক্তি নিজে থেকে কোনো অধিকার রক্ষা করে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতা না থাকলে, সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের সবচেয়ে নিষ্ঠুর হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে (Morozov, 2011)।

প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হওয়া আরেকটি বড় মানবাধিকার সংকট হলো অ্যালগরিদমিক বৈষম্য। ডেটা সায়েন্টিস্ট ক্যাথি ও’নিল (Cathy O’Neil) তার অত্যন্ত আলোচিত গ্রন্থ উইপনস অব ম্যাথ ডেস্ট্রাকশন (Weapons of Math Destruction)-এ এই বিষয়টির তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। আধুনিক যুগে পুলিশিং, কর্মী নিয়োগ বা ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদমের ওপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ও’নিল দেখিয়েছেন, এই অ্যালগরিদমগুলো যেহেতু মানুষের তৈরি করা পুরোনো ডেটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, তাই সমাজের দীর্ঘদিনের বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য এবং শ্রেণিগত বঞ্চনাগুলো এই সফটওয়্যারগুলোর ভেতরেও প্রবেশ করে। এই অস্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতাহীন গণবিধ্বংসী গণিত (Weapons of Math Destruction) মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, যার ফলে প্রান্তিক এবং দরিদ্র মানুষেরা বারবার পিছিয়ে পড়ছে। ও’নিলের এই বিশ্লেষণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মানবাধিকারের লড়াই এখন কেবল রাজপথে বা আদালতে সীমাবদ্ধ নেই, এই লড়াই এখন ছদ্মবেশী প্রযুক্তির কোডিং এবং অ্যালগরিদমের অদৃশ্য জগতেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক (O’Neil, 2016)।

ইয়ুর্গেন হাবারমাস ও জন স্টুয়ার্ট মিল (Jürgen Habermas and John Stuart Mill)

রাষ্ট্র যখন কোনো তথ্য গোপন করে, তখন সে কেবল একটি ফাইলের ওপর ‘গোপন’ সিলমোহর মারে না, বরং সে সাধারণ মানুষের চিন্তার দরজাতেও একটি বিশাল তালা ঝুলিয়ে দেয়। আধুনিক সমাজে নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের সবচেয়ে নিখুঁত দার্শনিক বিশ্লেষণটি করেছেন প্রখ্যাত জার্মান চিন্তাবিদ ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas)। তার মতে, একটি সুস্থ এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদান হলো একটি উন্মুক্ত পরিসর, যাকে তিনি পাবলিক স্ফিয়ার (Public Sphere) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই পাবলিক স্ফিয়ার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নয়, বরং এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্র, যেখানে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের যেকোনো নীতি নিয়ে স্বাধীনভাবে তর্কবিতর্ক করতে পারে। হাবারমাস দেখিয়েছেন, আঠারো শতকের ইউরোপে যখন কফি হাউসগুলোতে বসে মানুষ খবরের কাগজ পড়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করল, তখন থেকেই মূলত স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের ভিত নড়ে উঠেছিল। কিন্তু এই পাবলিক স্ফিয়ারকে বাঁচিয়ে রাখার প্রধান জ্বালানিই হলো নির্ভুল তথ্য। রাষ্ট্র যদি তথ্য সরবরাহ না করে বা ভুল তথ্য দেয়, তবে এই পরিসরটি একটি ফাঁকা বক্সে পরিণত হয়, আর নাগরিকরা পরিণত হয় রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ দাসে (Habermas, 1989)।

হাবারমাসের এই ধারণার অনেক আগেই মতপ্রকাশ এবং তথ্য জানার অধিকার নিয়ে একটি অকাট্য দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ চিন্তাবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill)। তার ধ্রুপদী রচনা অন লিবার্টি (On Liberty)-তে মিল অত্যন্ত জোরালোভাবে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন। মিলের দর্শনটি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং যৌক্তিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হলো সব ধরনের মত ও তথ্যকে কোনো রকম বাধা ছাড়াই প্রকাশ হতে দেওয়া। একটি মতবাদ ভুল হলেও তাকে জোর করে চেপে রাখা উচিত নয়, বরং সঠিক তথ্যের মাধ্যমেই তার মোকাবিলা করতে হবে। মিল যুক্তি দিয়েছিলেন, রাষ্ট্র যখন কোনো ভিন্নমতকে সেন্সর করে বা তথ্য লুকিয়ে রাখে, তখন সে মূলত পুরো সমাজকে সত্য জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। কারণ, যে মতটিকে আজ ভুল বা রাষ্ট্রবিরোধী মনে হচ্ছে, সেটিই হয়তো আগামীকালের চরম সত্য হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। মিলের এই দর্শন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, তথ্যের অবাধ প্রবাহ কেবল ব্যক্তির কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়, এটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার (Mill, 1859)।

এই দুই মহান তাত্ত্বিকের দর্শনকে একসাথে মেলালে তথ্যের অধিকারের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। হাবারমাস আমাদের বুঝিয়েছেন সমাজকে কীভাবে একটি আলোচনার মঞ্চে পরিণত করতে হয়, আর মিল আমাদের শিখিয়েছেন সেই মঞ্চে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কেন তথ্যের স্বাধীনতা অপরিহার্য। আধুনিক যুগে তথ্য অধিকার আইনগুলো মূলত এই দার্শনিক ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারণত তার নিজের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক রাখার জন্য সব সময়ই গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু হাবারমাস এবং মিলের তাত্ত্বিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের এমন মানসিক অন্ধকারের মধ্যে ফেলে রাখতে পারে না। তথ্যের অধিকার তাই কেবল কিছু সরকারি নথি দেখার অনুমতি নয়, এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং একটি যৌক্তিক সমাজ গঠনের সবচেয়ে গভীর এবং শাশ্বত দার্শনিক দাবি।

ইসাইয়াহ বার্লিন ও টি. এইচ. মার্শাল (Isaiah Berlin and T. H. Marshall)

অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রায়শই একটি বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয় – মানুষ আসলে কী ধরনের স্বাধীনতা চায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দার্শনিক ইসাইয়াহ বার্লিন (Isaiah Berlin) তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ টু কনসেপ্টস অফ লিবার্টি (Two Concepts of Liberty)-তে একটি যুগান্তকারী ধারণার অবতারণা করেন। তিনি স্বাধীনতার ধারণাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো নেতিবাচক স্বাধীনতা (Negative Liberty)। বার্লিনের মতে, নেতিবাচক স্বাধীনতা মানে হলো ব্যক্তির কাজে বাইরের কোনো বাধা বা হস্তক্ষেপ না থাকা। এখানে রাষ্ট্রকে একটি সুনির্দিষ্ট সীমানার বাইরে থাকতে বলা হয়। আধুনিক মানবাধিকারের যে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো রয়েছে – যেমন কথা বলার অধিকার, ধর্ম পালনের অধিকার বা বিনাবিচারে আটকে না থাকার অধিকার – এগুলো মূলত এই নেতিবাচক স্বাধীনতার ধারণার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রকে এখানে সক্রিয়ভাবে কিছু করতে হয় না, বরং তাকে কেবল মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। বার্লিনের এই তত্ত্ব খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেয়, মানুষের নিজস্ব বিকাশের জন্য রাষ্ট্রের খবরদারি থেকে মুক্ত থাকাটা কতটা জরুরি (Berlin, 1958)।

তবে একজন অভুক্ত মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় খবরদারি থেকে মুক্ত থাকার এই স্বাধীনতার আসলে কী মূল্য আছে? এই রূঢ় বাস্তবতাটির দার্শনিক উত্তর দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী টি. এইচ. মার্শাল (T. H. Marshall)। তার বিখ্যাত রচনা সিটিজেনশিপ অ্যান্ড সোশ্যাল ক্লাস (Citizenship and Social Class)-এ তিনি একটি নতুন ধারণার পরিচয় করিয়ে দেন, যাকে তিনি সামাজিক নাগরিকত্ব (Social Citizenship) বলেছেন। মার্শালের মতে, নাগরিকত্ব কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার বা আদালতে বিচার চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্বের জন্য মানুষের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও সমানভাবে অপরিহার্য। এই ধারণাটি মূলত ইতিবাচক স্বাধীনতা (Positive Liberty)-এর দর্শনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। নেতিবাচক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে যেমন কিছু কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়, ইতিবাচক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ঠিক উল্টো কাজটি করতে হয়। এখানে রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসে মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হয়। মার্শালের এই দর্শন প্রমাণ করে, স্কুল তৈরি করা, হাসপাতাল বানানো বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা কেবল রাষ্ট্রীয় দয়ার ব্যাপার নয়, এটি নাগরিকের অধিকার (Marshall, 1950)।

বার্লিন এবং মার্শালের এই তাত্ত্বিক অবস্থানগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ইতিহাসে একটি বিশাল মতাদর্শিক টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছিল, যা স্নায়ুযুদ্ধের সময় মানবাধিকার চুক্তিগুলোকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। পশ্চিমা বিশ্ব বার্লিনের নেতিবাচক স্বাধীনতাকে আঁকড়ে ধরেছিল, আর সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব মার্শালের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এই দুই তাত্ত্বিকের দর্শন একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক। একটি সমাজে যদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকে, তবে সেখানকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল কিছু বিত্তবান মানুষের বিলাসে পরিণত হয়। আবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো একটি সুসজ্জিত কারাগারে পরিণত হতে পারে। বার্লিন এবং মার্শালের এই বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনকে কেবল আইনি বা কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায় না। একটি সম্মানজনক জীবনের জন্য মানুষের যেমন স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ার জায়গা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি তার পেটের ক্ষুধা মেটানোর নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।

ড্যারন এসেমোগ্লু ও ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা (Daron Acemoglu and Francis Fukuyama)

সুশাসন এবং মানবাধিকারের মধ্যকার জটিল সম্পর্কটি বুঝতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কীভাবে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড্যারন এসেমোগ্লু (Daron Acemoglu) তার বিখ্যাত গ্রন্থ হোয়াই নেশনস ফেইল (Why Nations Fail)-এ এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান (Inclusive Institutions), যা সমাজের সব স্তরের মানুষকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সমান সুযোগ দেয়। এই কাঠামোটি মানবাধিকারের সাম্য এবং বৈষম্যহীনতার নীতির ওপর পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, তিনি চিহ্নিত করেছেন নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান (Extractive Institutions), যা গুটিকয়েক ক্ষমতাধর মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখে। এসেমোগ্লু জোরালো যুক্তি দিয়েছেন যে, কোনো রাষ্ট্র যদি সাধারণ মানুষের অধিকারকে সম্মান করতে ব্যর্থ হয় এবং নিষ্কাশনমূলক পথ বেছে নেয়, তবে তারা সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের পতন অনিবার্য (Acemoglu & Robinson, 2012)।

এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্পর্কটি নিয়ে বিশদ কাজ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা (Francis Fukuyama)। তার পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিকে (Political Order and Political Decay) বইতে তিনি দেখিয়েছেন, একটি সফল এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য কেবল শক্তিশালী সরকার থাকাই যথেষ্ট নয়। একটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে একই সাথে সক্ষম হতে হবে, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে আবার আইনের শাসন (Rule of Law) এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফুকুইয়ামার মতে, যদি রাষ্ট্রের কেবল ক্ষমতা থাকে কিন্তু আইনের শাসন না থাকে, তবে সেই রাষ্ট্র খুব দ্রুত একটি ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়। আবার যদি আইনের শাসন থাকে কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকে, তবে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। ফুকুইয়ামা প্রমাণ করেছেন, সুশাসন হলো ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য, যেখানে মানবাধিকারের মানদণ্ডগুলো মূলত রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতাকে একটি জনকল্যাণমুখী শৃঙ্খলার ভেতরে আটকে রাখার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে কাজ করে (Fukuyama, 2014)।

এসেমোগ্লু এবং ফুকুইয়ামার এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলোকে এক করলে সুশাসনের একটি অত্যন্ত পরিষ্কার এবং বাস্তবসম্মত চিত্র পাওয়া যায়। তারা আমাদের দেখিয়েছেন যে, মানবাধিকার কেবল আইনের বইয়ে লিখে রাখার মতো কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি রাষ্ট্র গঠনের একেবারে প্রাথমিক শর্ত। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন সে কেবল একটি অন্যায়ই করে না, সে মূলত তার নিজের ধ্বংসের বীজ বপন করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারে না। এই তাত্ত্বিকদের আলোচনাগুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, সুশাসন কোনো আলংকারিক বা কেতাবি শব্দ নয়। এটি মূলত রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যকার একটি সুস্থ, জবাবদিহিমূলক এবং অধিকারভিত্তিক সম্পর্কের ব্যবহারিক রূপ, যা ছাড়া আধুনিক সভ্যতার কোনো অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না।

ইয়োহান গালতুং ও রবার্ট ক্লিটগার্ড (Johan Galtung and Robert Klitgaard)

দুর্নীতিকে সাধারণত আমরা একটি আর্থিক অপরাধ বা নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু মানবাধিকারের লেন্স দিয়ে দেখলে এর চেহারাটি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার সবচেয়ে নিখুঁত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছিলেন নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহান গালতুং (Johan Galtung)। তিনি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণার অবতারণা করেছেন, যাকে তিনি কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গালতুংয়ের মতে, সহিংসতা মানেই কাউকে সরাসরি লাঠি বা বন্দুক দিয়ে আঘাত করা নয়। সমাজের ভেতরে এমন কিছু অন্যায্য কাঠামো বা নিয়ম থাকতে পারে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মানকে নিচে নামিয়ে দেয় এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতির কারণে যখন একটি গ্রামের মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত হয় এবং পানিবাহিত রোগে মারা যায়, তখন সেখানে কোনো গোলাগুলি হয় না। তারপরও এটি এক ধরনের ভয়াবহ সহিংসতা, কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্নীতির কারণেই এই অকাল মৃত্যুগুলো ঘটেছে। গালতুংয়ের এই তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, দুর্নীতির কারণে ঘটা নীরব মৃত্যুগুলো কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, এগুলো মূলত কাঠামোগত হত্যার শামিল (Galtung, 1969)।

দুর্নীতির এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঠিক কীভাবে ঘটে, তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে একটি গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রবার্ট ক্লিটগার্ড (Robert Klitgaard)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ কন্ট্রোলিং করাপশন (Controlling Corruption)-এ তিনি দুর্নীতির সমীকরণ (Equation of Corruption) নামের একটি যুগান্তকারী ধারণা প্রদান করেছেন। তার সূত্রটি হলো: দুর্নীতি = একচেটিয়া ক্ষমতা + স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা – জবাবদিহিতা। ক্লিটগার্ড দেখিয়েছেন, যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের হাতে একচেটিয়া ক্ষমতা থাকে, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তাদের কাজের ওপর কোনো স্বচ্ছ নজরদারি বা জবাবদিহিতা থাকে না, তখন সেখানে দুর্নীতি হওয়াটা অবধারিত। বিচার ব্যবস্থা, পুলিশিং বা মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই সমীকরণটি একেবারে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। পুলিশ যখন কাউকে বিনাবিচারে আটকে রাখার অসীম ক্ষমতা পায় এবং এর জন্য তাকে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না, তখন সেখানে ঘুষ এবং নির্যাতনের সংস্কৃতি তৈরি হয়। ক্লিটগার্ডের এই তত্ত্ব প্রমাণ করে, দুর্নীতি কোনো ব্যক্তিগত চারিত্রিক ত্রুটি নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জবাবদিহিতাহীনতার একটি অনিবার্য পরিণতি (Klitgaard, 1988)।

গালতুং এবং ক্লিটগার্ডের এই তাত্ত্বিক দর্শনগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে একটি নতুন মাত্রা দান করে। তারা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, দুর্নীতি মূলত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি অদৃশ্য এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর কর। একজন বিত্তবান মানুষ সহজেই ঘুষ দিয়ে তার কাজ আদায় করে নিতে পারেন, কিন্তু একজন দিনমজুরের পক্ষে সেই বাড়তি টাকা জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তিনি রাষ্ট্রের সব ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হন। ক্লিটগার্ডের সমীকরণটি ভেঙে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া গালতুংয়ের কাঠামোগত সহিংসতা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। এই দুই তাত্ত্বিকের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা কেবল দেশের অর্থনীতি বাঁচানোর শর্ত নয়, এটি মানুষের সম্মানজনক জীবন, সাম্য এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার সবচেয়ে প্রাথমিক এবং জরুরি পদক্ষেপ।

কারেল ভাসাক ও জ্যাক ডনেলি (Karel Vasak and Jack Donnelly)

মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র তৈরি হওয়ার পর নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিয়ে যে স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিভাজন তৈরি হয়েছিল, তা মানবাধিকারের অখণ্ডতাকে চরমভাবে ব্যাহত করে। এই তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে দূর করার জন্য ফরাসি-চেক আইনজ্ঞ কারেল ভাসাক (Karel Vasak) একটি চমৎকার তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রস্তাব করেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের তিনটি মূল স্লোগান – স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব – এর ওপর ভিত্তি করে মানবাধিকারকে তিনটি প্রজন্মে ভাগ করেন। ভাসাক দেখান, প্রথম প্রজন্ম বা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো মূলত মানুষের স্বাধীনতার সাথে যুক্ত। দ্বিতীয় প্রজন্ম বা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো মানুষের সাম্যের সাথে যুক্ত। আর তৃতীয় প্রজন্ম বা সংহতির অধিকারগুলো – যেমন পরিবেশের অধিকার বা উন্নয়নের অধিকার – মানুষের ভ্রাতৃত্বের সাথে যুক্ত। ভাসাকের এই অধিকারের তিন প্রজন্ম (Three Generations of Rights) তত্ত্বটি পরিষ্কার করে দেয় যে, একটি প্রজন্ম আরেকটির প্রতিযোগী নয়, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। মানবজীবনের পূর্ণতার জন্য এই তিন ধরনের অধিকারেরই সমান প্রয়োজন রয়েছে (Vasak, 1977)।

অধিকারের এই অবিভাজ্যতার পাশাপাশি মানবাধিকারের আরেকটি বড় তাত্ত্বিক সংকট হলো সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ বনাম সার্বজনীনতার বিতর্ক। অনেকেই যুক্তি দেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের মানদণ্ডগুলো এশিয়া বা আফ্রিকার ভিন্ন সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। এই আপেক্ষিকতাবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো এবং যৌক্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাক ডনেলি (Jack Donnelly)। তার ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Universal Human Rights in Theory and Practice) গ্রন্থে তিনি সার্বজনীন মানবাধিকারের পক্ষে একটি অকাট্য তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড় করিয়েছেন। ডনেলি স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে এবং সেই ভিন্নতাকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু তিনি এই যুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেন যে সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে কোনো মানুষের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা যেতে পারে। ডনেলির মতে, একজন মানুষকে বিনাবিচারে আটকে রাখা, নির্যাতন করা বা খাবার থেকে বঞ্চিত করা পৃথিবীর কোনো সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। মানবাধিকারের মূল নীতিগুলো মানুষের জন্মগত মর্যাদার সাথে যুক্ত, এটি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক আবিষ্কার নয় (Donnelly, 2013)।

ভাসাক এবং ডনেলির এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলো আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। ভাসাক আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষের জীবনের বহুমাত্রিক প্রয়োজনগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতে হয়, আর ডনেলি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে সেই অধিকারগুলোকে পৃথিবীর সব প্রান্তে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ডনেলি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, যারা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের কথা বলে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার থাকে, তারা সাধারণত সেই সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। সমাজের যে মানুষগুলো নিপীড়নের শিকার হয়, তারা কখনোই সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে নিজেদের অধিকার ছাড়তে রাজি হয় না। এই দুই তাত্ত্বিকের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম মূলত প্রমাণ করে যে, মানবাধিকারকে খণ্ডিত করে দেখার বা সংস্কৃতির মোড়কে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ আধুনিক সভ্যতায় নেই। মানুষের অবিভাজ্য অধিকার এবং সার্বজনীন মর্যাদাই হলো একটি মানবিক বিশ্বব্যবস্থার একমাত্র শর্ত।

উপসংহার

খুব দীর্ঘ একটা পথ আমরা হেঁটে এলাম। মানবাধিকারের দার্শনিক ভিত্তি থেকে শুরু করে বিশ্বায়নের প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় এবং আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচ – সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা। লেখাটির শুরুতেই বলেছিলাম, মানুষ অদ্ভুত প্রাণী। তার চরিত্রের বৈপরীত্য সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো। সে যেমন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য, একটুখানি ক্ষমতার জন্য অত্যন্ত নির্মমভাবে অন্যকে ধ্বংস করতে পারে; ঠিক তেমনি সে অন্যের অধিকার রক্ষার জন্য, একটি অচেনা শিশুর মুখের হাসির জন্য নিজের জীবনও হাসিমুখে বিলিয়ে দিতে পারে। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, মানুষের অধিকার কখনো কেউ রুপালি থালায় করে সাজিয়ে এগিয়ে দেয়নি। ক্ষমতাশালীরা কখনোই স্বেচ্ছায় তাদের ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। তাই প্রতিটি অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে, পথে নামার মাধ্যমে, এবং কখনো কখনো প্রচুর রক্তপাতের বিনিময়ে (Donnelly, 2013)।

আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে আমরা বড়াই করি। আমরা অহংকার করি আমাদের তাক লাগানো প্রযুক্তি নিয়ে, আকাশছোঁয়া দালানকোঠা আর বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে। আমরা অন্য গ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু যখন খবরের কাগজে দেখি সিরিয়ায় কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদে একটি শিশু বোমার আঘাতে ছটফট করছে, অথবা কাঁটাতারের সীমান্তে কিছু নিরীহ মানুষ কেবল একটু আশ্রয়ের আশায় দিনের পর দিন অভুক্ত অবস্থায় অপেক্ষা করছে, তখন এই তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার মুখোশটা খসে পড়ে। তখন আমরা খুব নগ্নভাবে বুঝতে পারি, আমাদের আইনি কাঠামো, জাতিসংঘের বড় বড় রেজুলেশন বা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো এখনো কতটা অসহায় এবং কাগুজে। ক্ষমতাশালীদের ভেটোর কাছে মানুষের জীবন যখন জিম্মি হয়ে যায়, তখন মানবাধিকারের বইগুলো শুধুই যেন লাইব্রেরির শোভা বর্ধন করে।

তবে কি সব আশা শেষ? আমরা কি কেবলই হতাশার গল্প বলে যাব? না। অন্ধকার যত ঘন হয়, আলোর কদর তত বাড়ে। বিশ্বরাজনীতির এই জটিল সমীকরণে, স্বার্থের এই নোংরা খেলায় মানবাধিকার হয়তো অনেক সময়ই সাময়িকভাবে পরাস্ত হয়, কিন্তু তা একেবারে মরে যায় না। পৃথিবীর নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষ, মানবাধিকার কর্মী, নির্ভীক সাংবাদিক এবং আইনজীবীরা অবিচারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাবানরা হয়তো নতুন নতুন আইন তৈরি করে বা বন্দুকের জোরে কণ্ঠরোধ করতে চায়। কিন্তু মানুষের ভেতরে যে জন্মগত মর্যাদাবোধ আছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে সহজাত প্রবৃত্তি আছে – তাকে চিরতরে মুছে ফেলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সত্যিকারের পরিবর্তন আসে এই সাধারণ মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর থেকেই।

আমাদের পথ চলা এখনো অনেক বাকি। এমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন আমরা দেখি, যেখানে মানুষকে কেবল তার ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে মৃত্যুর মুখে পড়তে হবে না। যেখানে কোনো শিশু অনাহারে ঘুমাবে না, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষক হবে, ভক্ষক নয়। আর যেখানে ক্ষমতাশীলরা সাধারণ মানুষের অধিকারকে কোনোভাবেই ‘দয়া’ বা ‘দান’ হিসেবে দেখবে না, বরং তাদের অলঙ্ঘনীয় ও জন্মগত প্রাপ্য হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হবে। সেই স্বপ্নের পৃথিবী একদিনে তৈরি হবে না, কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় সব বদলে যাবে না। কিন্তু সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ারও কোনো সুযোগ আমাদের নেই। মানুষের মর্যাদার জন্য, মানুষের বাঁচার জন্য এই নিরন্তর লড়াই চলবে।

তথ্যসূত্র

  • Acemoglu, D., & Robinson, J. A. (2012). Why nations fail: The origins of power, prosperity, and poverty. Crown Publishers.
  • Agamben, G. (1998). Homo sacer: Sovereign power and bare life. Stanford University Press.
  • Alston, P. (1992). The Commission on Human Rights. In P. Alston (Ed.), The United Nations and human rights: A critical appraisal (pp. 126-210). Clarendon Press.
  • Alston, P. (2011). The CIA and targeted killings beyond borders. Harvard National Security Journal, 2(2), 283-446.
  • Alston, P., & Crawford, J. (Eds.). (2000). The future of UN human rights treaty monitoring. Cambridge University Press.
  • Alston, P., & Goodman, R. (2013). International human rights. Oxford University Press.
  • Anaya, S. J. (2004). Indigenous peoples in international law. Oxford University Press.
  • Annan, K. A. (2000). We the peoples: The role of the United Nations in the 21st century. United Nations.
  • Archard, D. (2015). Children: Rights and childhood (3rd ed.). Routledge.
  • Arendt, H. (1951). The origins of totalitarianism. Harcourt, Brace and Co.
  • Armitage, D. (2007). The declaration of independence: A global history. Harvard University Press.
  • Baderin, M. A., & McCorquodale, R. (Eds.). (2007). Economic, social and cultural rights in action. Oxford University Press.
  • Bakan, J. (2004). The corporation: The pathological pursuit of profit and power. Free Press.
  • Ban, K. (2009). Implementing the responsibility to protect: Report of the Secretary-General (A/63/677). United Nations.
  • Bassiouni, M. C. (2011). Crimes against humanity in international criminal law (2nd ed.). Kluwer Law International.
  • Baxi, U. (2002). The future of human rights. Oxford University Press.
  • Bellamy, A. J. (2009). Responsibility to protect: The global effort to end mass atrocities. Polity Press.
  • Bentham, J. (1843). Anarchical fallacies. In J. Bowring (Ed.), The works of Jeremy Bentham (Vol. 2). William Tait.
  • Berlin, I. (1958). Two concepts of liberty. Oxford University Press.
  • Best, G. (1994). War and law since 1945. Clarendon Press.
  • Biermann, F., & Boas, I. (2010). Preparing for a warmer world: Towards a global governance system to protect climate refugees. Global Environmental Politics, 10(1), 60-88.
  • Bingham, T. (2010). The rule of law. Penguin Books.
  • Brass, P. R. (2003). The production of Hindu-Muslim violence in contemporary India. University of Washington Press.
  • Brownlie, I. (2008). Principles of public international law. Oxford University Press.
  • Buergenthal, T. (2006). The evolving international human rights system. American Journal of International Law, 100(4), 783-807.
  • Burke, E. (1790). Reflections on the revolution in France. J. Dodsley.
  • Capotorti, F. (1991). Study on the rights of persons belonging to ethnic, religious and linguistic minorities. United Nations.
  • Cardenas, S. (2014). Chains of justice: The global rise of state institutions for human rights. University of Pennsylvania Press.
  • Carver, R. (2012). A new answer to an old question: National human rights institutions and the domestication of international law. Human Rights Law Review, 10(1), 1-32.
  • Cassese, A. (1999). Ex iniuria ius oritur: Are we moving towards international legitimation of forcible humanitarian countermeasures in the world community?. European Journal of International Law, 10(1), 23-30.
  • Cassese, A. (2005). International law (2nd ed.). Oxford University Press.
  • Cassese, A. (2008). The human dimension of international law: Selected papers. Oxford University Press.
  • Cassese, A. (2013). Cassese’s international criminal law (3rd ed.). Oxford University Press.
  • Castells, M. (1996). The rise of the network society. Blackwell Publishers.
  • Castles, S., & Miller, M. J. (2009). The age of migration: International population movements in the modern world. Guilford Press.
  • Charlesworth, H. (1991). Feminist approaches to international law. American Journal of International Law, 85(4), 613-645.
  • Charlesworth, H. (1994). What are ‘women’s international human rights’? Human Rights of Women: National and International Perspectives, 58-84.
  • Chomsky, N. (1999). The new military humanism: Lessons from Kosovo. Common Courage Press.
  • Clapham, A. (2006). Human rights obligations of non-state actors. Oxford University Press.
  • Cohen, S. (2001). States of denial: Knowing about atrocities and suffering. Polity Press.
  • Collier, P. (2007). The bottom billion: Why the poorest countries are failing and what can be done about it. Oxford University Press.
  • Corntassel, J. (2008). Toward sustainable self-determination: Rethinking the contemporary Indigenous-rights discourse. Alternatives, 33(1), 105-132.
  • Crenshaw, K. (1989). Demarginalizing the intersection of race and sex: A Black feminist critique of antidiscrimination doctrine, feminist theory and antiracist politics. University of Chicago Legal Forum, 1989(1), 139-167.
  • Dahl, R. A. (1989). Democracy and its critics. Yale University Press.
  • Dallaire, R. (2003). Shake hands with the devil: The failure of humanity in Rwanda. Random House Canada.
  • De Genova, N. P. (2002). Migrant “illegality” and deportability in everyday life. Annual Review of Anthropology, 31(1), 419-447.
  • De Schutter, O. (2014). International human rights law: Cases, materials, commentary. Cambridge University Press.
  • Deibert, R. J. (2013). Black code: Surveillance, privacy, and the dark side of the Internet. Signal.
  • Deng, F. M., Kimaro, S., Lyons, T., Rothchild, D., & Zartman, I. W. (1996). Sovereignty as responsibility: Conflict management in Africa. Brookings Institution Press.
  • Diamond, L. (2019). Ill winds: Saving democracy from Russian rage, Chinese ambition, and American complacency. Penguin Press.
  • Dickinson, L. A. (2003). The promise of hybrid courts. American Journal of International Law, 97(2), 295-310.
  • Dinstein, Y. (2016). The conduct of hostilities under the law of international armed conflict (3rd ed.). Cambridge University Press.
  • Donnelly, J. (2013). Universal human rights in theory and practice (3rd ed.). Cornell University Press.
  • Douzinas, C. (2000). The end of human rights: Critical legal thought at the turn of the century. Hart Publishing.
  • Doyle, M. W. (1983). Kant, liberal legacies, and foreign affairs. Philosophy & Public Affairs, 12(3), 205-235.
  • Drèze, J., & Sen, A. (2013). An uncertain glory: India and its contradictions. Princeton University Press.
  • Dunant, H. (1862). A memory of Solferino. (English translation published by ICRC, 1986).
  • Dunn, S. (1999). Sister revolutions: French lightning, American light. Faber and Faber.
  • Dworkin, R. (1977). Taking rights seriously. Harvard University Press.
  • Eubanks, V. (2018). Automating inequality: How high-tech tools profile, police, and punish the poor. St. Martin’s Press.
  • Evans, G. (2008). The responsibility to protect: Ending mass atrocity crimes once and for all. Brookings Institution Press.
  • Fassbender, B. (2009). Securing human rights? Achievements and challenges of the UN Security Council. Oxford University Press.
  • Finnemore, M., & Sikkink, K. (1998). International norm dynamics and political change. International Organization, 52(4), 887-917.
  • Florini, A. (2007). The right to know: Transparency for an open world. Columbia University Press.
  • Forsythe, D. P. (2012). Human rights in international relations (3rd ed.). Cambridge University Press.
  • Foucault, M. (1975). Discipline and punish: The birth of the prison. Pantheon Books.
  • Franck, T. M. (2002). Recourse to force: State action against threats and armed attacks. Cambridge University Press.
  • Freeman, M. (2007). Article 3: The best interests of the child. Martinus Nijhoff Publishers.
  • Friedman, M. (1970, September 13). The social responsibility of business is to increase its profits. The New York Times Magazine.
  • Fukuyama, F. (2014). Political order and political decay: From the industrial revolution to the globalization of democracy. Farrar, Straus and Giroux.
  • Galtung, J. (1969). Violence, peace, and peace research. Journal of Peace Research, 6(3), 167-191.
  • Gereffi, G. (1994). The organization of buyer-driven global commodity chains: How U.S. retailers shape global production networks. In G. Gereffi & M. Korzeniewicz (Eds.), Commodity chains and global capitalism (pp. 95-122). Praeger.
  • Glendon, M. A. (1991). Rights talk: The impoverishment of political discourse. Free Press.
  • Goodman, R. (2002). Human rights treaties, invalid reservations, and state consent. American Journal of International Law, 96(3), 531-560.
  • Goodman, R., & Pegram, T. (Eds.). (2012). Human rights, state compliance, and social change: Assessing national human rights institutions. Cambridge University Press.
  • Greenwood, C. (2008). Historical development and legal basis. In D. Fleck (Ed.), The handbook of international humanitarian law (2nd ed., pp. 1-43). Oxford University Press.
  • Habermas, J. (1989). The structural transformation of the public sphere: An inquiry into a category of bourgeois society. MIT Press.
  • Halim, M. A. (1998). Constitution, constitutional law and politics: Bangladesh perspective. CCB Foundation.
  • Harvey, D. (2003). The new imperialism. Oxford University Press.
  • Harvey, D. (2005). A brief history of neoliberalism. Oxford University Press.
  • Hasan, K. M. (2004). International human rights law and domestic jurisdiction. Law Chronicle.
  • Held, D. (2004). Global covenant: The social democratic alternative to the Washington consensus. Polity Press.
  • Henkin, L. (1979). How nations behave: Law and foreign policy. Columbia University Press.
  • Higgins, R. (1994). Problems and process: International law and how we use it. Clarendon Press / Oxford University Press.
  • Hobbes, T. (1651). Leviathan. Andrew Crooke.
  • Hohfeld, W. N. (1913). Some fundamental legal conceptions as applied in judicial reasoning. Yale Law Journal, 23(1), 16-59.
  • Holt, J. C. (1992). Magna Carta. Cambridge University Press.
  • Holzgrefe, J. L. (2003). The humanitarian intervention debate. In J. L. Holzgrefe & R. O. Keohane (Eds.), Humanitarian intervention: Ethical, legal and political dilemmas (pp. 15-52). Cambridge University Press.
  • Hoque, R. (2011). Judicial activism in Bangladesh: A golden mean approach. Cambridge Scholars Publishing.
  • Hunt, L. (2007). Inventing human rights: A history. W. W. Norton & Company.
  • Huntington, S. P. (1996). The clash of civilizations and the remaking of world order. Simon & Schuster.
  • International Commission on Intervention and State Sovereignty (ICISS). (2001). The responsibility to protect. International Development Research Centre.
  • Ishay, M. R. (2008). The history of human rights: From ancient times to the globalization era. University of California Press.
  • Islam, M. (2003). Constitutional law of Bangladesh. Mullick Brothers.
  • Jaffrelot, C. (2015). The Pakistan paradox: Instability and resilience. Oxford University Press.
  • Jaggar, A. M. (2001). Is globalization good for women? Comparative Literature, 53(4), 298-314.
  • Jalal, A. (1995). Democracy and authoritarianism in South Asia: A comparative and historical perspective. Cambridge University Press.
  • Johnston, M. (2005). Syndromes of corruption: Wealth, power, and democracy. Cambridge University Press.
  • Kalshoven, F., & Zegveld, L. (2011). Constraints on the waging of war: An introduction to international humanitarian law (4th ed.). Cambridge University Press.
  • Kamal, M. (1994). Bangladesh constitution: Trends and issues. Dhaka University.
  • Kant, I. (1785). Groundwork of the metaphysics of morals. (H. J. Paton, Trans.). Harper Torchbooks.
  • Kant, I. (1795). Perpetual peace: A philosophical sketch. (Standard academic translations available).
  • Katzenstein, P. J. (Ed.). (1996). The culture of national security: Norms and identity in world politics. Columbia University Press.
  • Kaur, R. (2020). Brand new nation: Capitalist dreams and nationalist designs in twenty-first-century India. Stanford University Press.
  • Kayess, R., & French, P. (2008). Out of darkness into light? Introducing the Convention on the Rights of Persons with Disabilities. Human Rights Law Review, 8(1), 1-34.
  • Keck, M. E., & Sikkink, K. (1998). Activists beyond borders: Advocacy networks in international politics. Cornell University Press.
  • Kerr, R. (2004). The International Criminal Tribunal for the Former Yugoslavia: An exercise in law, politics, and diplomacy. Oxford University Press.
  • Klein, N. (2000). No logo: Taking aim at the brand bullies. Knopf Canada.
  • Klein, N. (2007). The shock doctrine: The rise of disaster capitalism. Metropolitan Books.
  • Klein, N. (2014). This changes everything: Capitalism vs. the climate. Simon and Schuster.
  • Klitgaard, R. (1988). Controlling corruption. University of California Press.
  • Krasner, S. D. (1999). Sovereignty: Organized hypocrisy. Princeton University Press.
  • Kymlicka, W. (1995). Multicultural citizenship: A liberal theory of minority rights. Clarendon Press.
  • Lansdown, G. (2005). The evolving capacities of the child. UNICEF Innocenti Research Centre.
  • Lauterpacht, H. (1950). International law and human rights. Stevens & Sons.
  • Lawson, A. (2008). Disability and equality law in Britain: The role of reasonable adjustment. Hart Publishing.
  • Lee, E. S. (1966). A theory of migration. Demography, 3(1), 47-57.
  • Lemkin, R. (1944). Axis rule in occupied Europe: Laws of occupation, analysis of government, proposals for redress. Carnegie Endowment for International Peace.
  • Lenzerini, F. (Ed.). (2008). Reparations for indigenous peoples: International and comparative perspectives. Oxford University Press.
  • Levitsky, S., & Ziblatt, D. (2018). How democracies die. Crown.
  • Lewis, D. (2011). Bangladesh: Politics, economy and civil society. Cambridge University Press.
  • Lijphart, A. (1999). Patterns of democracy: Government forms and performance in thirty-six countries. Yale University Press.
  • Locke, J. (1689). Two treatises of government. Awnsham Churchill.
  • Locke, J. (1693). Some thoughts concerning education. A. and J. Churchill.
  • Luck, E. C. (2010). The responsibility to protect: Growing pains or early promise? Ethics & International Affairs, 24(4), 349-365.
  • Marshall, T. H. (1950). Citizenship and social class and other essays. Cambridge University Press.
  • Marx, K. (1844). On the Jewish question. Deutsch-Französische Jahrbücher.
  • Mbembe, A. (2003). Necropolitics. Public Culture, 15(1), 11-40.
  • Melzer, N. (2009). Targeted killing in international law. Oxford University Press.
  • Meron, T. (1987). Human rights in internal strife: Their international protection. Grotius Publications.
  • Merry, S. E. (2006). Human rights and gender violence: Translating international law into local justice. University of Chicago Press.
  • Mertus, J. (2009). Human rights matters: Local politics and national human rights institutions. Stanford University Press.
  • Mill, J. S. (1859). On liberty. John W. Parker and Son.
  • Minkowitz, T. (2006). The United Nations Convention on the Rights of Persons with Disabilities and the right to be free from nonconsensual psychiatric interventions. Syracuse Journal of International Law and Commerce, 34, 405-428.
  • Moeckli, D. (2008). Equality and non-discrimination. In D. Moeckli, S. Shah, & S. Sivakumaran (Eds.), International human rights law (pp. 189-208). Oxford University Press.
  • Morozov, E. (2011). The net delusion: The dark side of Internet freedom. PublicAffairs.
  • Morsink, J. (1999). The Universal Declaration of Human Rights: Origins, drafting, and intent. University of Pennsylvania Press.
  • Müller, J.-W. (2016). What is populism? University of Pennsylvania Press.
  • Murphy, S. D. (1996). Humanitarian intervention: The UN in an evolving world order. University of Pennsylvania Press.
  • Mutua, M. (2001). Savages, victims, and saviors: The metaphor of human rights. Harvard International Law Journal, 42, 201-245.
  • North, D. C. (1990). Institutions, institutional change and economic performance. Cambridge University Press.
  • Norris, P. (2011). Democratic deficit: Critical citizens revisited. Cambridge University Press.
  • Nowak, M. (2003). Introduction to the international human rights regime. Martinus Nijhoff Publishers.
  • Nowak, M. (2005). U.N. Covenant on Civil and Political Rights: CCPR commentary (2nd ed.). N.P. Engel.
  • Nussbaum, M. C. (2000). Women and human development: The capabilities approach. Cambridge University Press.
  • Nussbaum, M. C. (2011). Creating capabilities: The human development approach. Harvard University Press.
  • O’Donnell, G. (1998). Horizontal accountability in new democracies. Journal of Democracy, 9(3), 112-126.
  • O’Neil, C. (2016). Weapons of math destruction: How big data increases inequality and threatens democracy. Crown.
  • O’Neill, O. (2005). The dark side of human rights. International Affairs, 81(2), 427-439.
  • Oliver, M. (1990). The politics of disablement. Macmillan Education.
  • Parreñas, R. S. (2001). Servants of globalization: Women, migration and domestic work. Stanford University Press.
  • Pattison, J. (2010). Humanitarian intervention and the responsibility to protect: Who should intervene? Oxford University Press.
  • Pécoud, A., & de Guchteneire, P. (Eds.). (2007). Migration without borders: Essays on the free movement of people. Berghahn Books.
  • Pegram, T. (2010). Diffusion across political systems: The global spread of national human rights institutions. Human Rights Quarterly, 32(3), 729-760.
  • Pictet, J. (Ed.). (1952). The Geneva Conventions of 12 August 1949: Commentary. International Committee of the Red Cross.
  • Piketty, T. (2014). Capital in the twenty-first century (A. Goldhammer, Trans.). Harvard University Press.
  • Putnam, R. D. (2000). Bowling alone: The collapse and revival of American community. Simon & Schuster.
  • Radacic, I. (2008). Gender equality jurisprudence of the European Court of Human Rights. European Journal of International Law, 19(4), 841-857.
  • Ramcharan, B. G. (2002). The United Nations High Commissioner for Human Rights: The challenges of international protection. Martinus Nijhoff Publishers.
  • Ramcharan, B. G. (2011). The UN Human Rights Council. Routledge.
  • Rawls, J. (1971). A theory of justice. Harvard University Press.
  • Reif, L. C. (2004). The ombudsman, good governance and the international human rights system. Martinus Nijhoff Publishers.
  • Risse, T., Ropp, S. C., & Sikkink, K. (Eds.). (1999). The power of human rights: International norms and domestic change. Cambridge University Press.
  • Robinson, M. (2018). Climate justice: Hope, resilience, and the fight for a sustainable future. Bloomsbury Publishing.
  • Robinson, W. I. (2004). A theory of global capitalism: Production, class, and state in a transnational world. Johns Hopkins University Press.
  • Rodríguez-Garavito, C. (2011). Ethnicity.gov: Global governance, indigenous peoples, and the right to prior consultation in social minefields. Indiana Journal of Global Legal Studies, 18(1), 263-305.
  • Rose-Ackerman, S. (1999). Corruption and government: Causes, consequences, and reform. Cambridge University Press.
  • Rothstein, B. (2011). The quality of government: Corruption, social trust, and inequality in international perspective. University of Chicago Press.
  • Rousseau, J.-J. (1762). The social contract. Marc-Michel Rey.
  • Ruggie, J. G. (2013). Just business: Multinational corporations and human rights. W. W. Norton & Company.
  • Sassòli, M. (2019). International humanitarian law: Rules, controversies, and solutions to problems arising in warfare. Edward Elgar Publishing.
  • Schabas, W. A. (1995). Reservations to human rights treaties: Time for innovation and reform. Canadian Yearbook of International Law, 32, 39-81.
  • Schabas, W. A. (2006). The UN international criminal tribunals: The former Yugoslavia, Rwanda and Sierra Leone. Cambridge University Press.
  • Schabas, W. A. (2011). An introduction to the International Criminal Court (4th ed.). Cambridge University Press.
  • Schabas, W. A. (2012). Unimaginable atrocities: Justice, politics, and rights at the war crimes tribunals. Oxford University Press.
  • Schabas, W. A. (2015). The European Convention on Human Rights: A commentary. Oxford University Press.
  • Schmitt, C. (1922). Political theology: Four chapters on the concept of sovereignty. Duncker & Humblot.
  • Schmitt, M. N. (2012). Precision attack and international humanitarian law. International Review of the Red Cross, 87(859), 445-466.
  • Sen, A. (1999). Democracy as a universal value. Journal of Democracy, 10(3), 3-17.
  • Sen, A. (1999). Development as freedom. Alfred A. Knopf.
  • Sen, A. (2004). Elements of a theory of human rights. Philosophy & Public Affairs, 32(4), 315-356.
  • Sen, A. (2009). The idea of justice. Harvard University Press.
  • Sepúlveda, M. (2003). The nature of the obligations under the International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights. Intersentia.
  • Shaw, M. N. (2017). International law (8th ed.). Cambridge University Press.
  • Shelton, D. (2014). Advanced introduction to international human rights law. Edward Elgar Publishing.
  • Shiva, V. (2005). Earth democracy: Justice, sustainability, and peace. South End Press.
  • Shue, H. (1996). Basic rights: Subsistence, affluence, and U.S. foreign policy (2nd ed.). Princeton University Press.
  • Simma, B., & Alston, P. (1988). The sources of human rights law: Custom, jus cogens, and general principles. Australian Year Book of International Law, 12, 82-108.
  • Solis, G. D. (2010). The law of armed conflict: International humanitarian law in war. Cambridge University Press.
  • Steiner, H. J., Alston, P., & Goodman, R. (2007). International human rights in context: Law, politics, morals. Oxford University Press.
  • Stiglitz, J. E. (2002). Globalization and its discontents. W. W. Norton & Company.
  • Stiglitz, J. E. (2012). The price of inequality: How today’s divided society endangers our future. W. W. Norton & Company.
  • Strange, S. (1996). The retreat of the state: The diffusion of power in the world economy. Cambridge University Press.
  • Thakur, R. (2016). The United Nations, peace and security: From collective security to the responsibility to protect (2nd ed.). Cambridge University Press.
  • Tocqueville, A. de. (1835). Democracy in America (H. Reeve, Trans.). Saunders and Otley.
  • Tourinho, M., Stuenkel, O., & Brockmeier, S. (2016). ‘Responsibility while protecting’: Reforming R2P implementation. Global Society, 30(1), 134-150.
  • Tullock, G. (1967). The welfare costs of tariffs, monopolies, and theft. Western Economic Journal, 5(3), 224-232.
  • Tusa, A., & Tusa, J. (1983). The anatomy of the Nuremberg trials. Stein and Day.
  • United Nations General Assembly (UNGA). (2005). 2005 World Summit Outcome (A/RES/60/1). United Nations.
  • Van Schendel, W. (2005). The Bengal borderland: Beyond state and nation in South Asia. Anthem Press.
  • Vasak, K. (1977). Human rights: A thirty-year struggle: The sustained efforts to give force of law to the Universal Declaration of Human Rights. UNESCO Courier.
  • Weber, M. (1919). Politics as a vocation. In H. H. Gerth & C. W. Mills (Eds.), From Max Weber: Essays in sociology (pp. 77-128). Oxford University Press.
  • Weiss, E. B. (1989). In fairness to future generations: International law, common patrimony, and intergenerational equity. Transnational Publishers.
  • Weiss, T. G. (2007). Humanitarian intervention: Ideas in action. Polity Press.
  • Wendt, A. (1999). Social theory of international politics. Cambridge University Press.
  • Wheeler, N. J. (2000). Saving strangers: Humanitarian intervention in international society. Oxford University Press.
  • Wiessner, S. (1999). Rights and status of indigenous peoples: A global comparative and international legal analysis. Harvard Human Rights Journal, 12, 57-128.
  • Xanthaki, A. (2007). Indigenous rights and United Nations standards: Self-determination, culture and land. Cambridge University Press.
  • Young, K. G. (2012). Constituting economic and social rights. Oxford University Press.
  • Žižek, S. (2005). Against human rights. New Left Review, 34, 115-131.
  • Zuboff, S. (2019). The age of surveillance capitalism: The fight for a human future at the new frontier of power. PublicAffairs.

Leave a comment

Your email will not be published.