বনু কুরাইজার গণহত্যাঃ ইসলামি ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়
Table of Contents
- 1 সারসংক্ষেপ
- 2 ভূমিকা
- 3 গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূল
- 4 জেনেভা কনভেনশনঃ ঐশ্বরিক বনাম মানুষের বিধান
- 5 মদিনায় হিজরত এবং মুহাম্মদের জীবনে ইহুদিদের ভূমিকা
- 6 ইহুদিদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত এবং দ্বন্দ্ব
- 6.1 নবী মুহাম্মদের জাতিবিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতা
- 6.2 নবী মুহাম্মদের ইহুদি উচ্ছেদের পরিকল্পনা
- 6.3 বদর-যুদ্ধ জয়ঃ মুসলিমদের পক্ষে থেকে ইহুদীদের হুমকি
- 6.4 বনু কায়নুকার ঘটনাঃ মুসলিম নারীকে লাঞ্ছনার অভিযোগ
- 6.5 ইহুদিদের জমির মালিক আল্লাহ ও তার রাসুল
- 6.6 বনু নাদীরের বিতর্ক থেকে পলায়ন ও আক্রমণ
- 6.7 কোন কারণ ছাড়াই বনু কুরাইজাকে আক্রমণ
- 6.8 যুদ্ধবন্দী হত্যাই উত্তমঃ কোরআনে আল্লাহর বিধান
- 7 বনু কুরাইজাকে অবরোধ এবং ধারাবাহিকতা
- 7.1 গনিমতের মাল ছাড়াই খন্দকের যুদ্ধ
- 7.2 বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতাঃ প্রমাণহীন অলৌকিক তথ্য
- 7.3 সিরাতে রাসুলুল্লাহঃ বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ
- 7.4 তাফসীরে মাযহারীঃ বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ
- 7.5 মানচিত্রঃ বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতা বাস্তবতা
- 7.6 বিশ্বাসঘাতকতার বাস্তব কোন প্রমাণ নেই
- 7.7 জিবরাইলের আগমন সম্পর্কিত জটিলতা
- 8 মদিনা সনদঃ বনু কুরাইজার সাথে কথিত চুক্তি
- 8.1 সিরাতে রাসুল্লাল্লাহ – ইবনে ইসহাক
- 8.2 The Life Of Muhammad, by Ibn Ishaq
- 8.3 চুক্তির ঐতিহাসিক ভিত্তিহীনতাঃ সিরাতুল মুস্তফা – আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী
- 8.4 তাফসীরে মাযহারী – ছানাউল্লাহ্ পানিপথী
- 8.5 চুক্তিতে কি পাইকারি গণহত্যার উল্লেখ ছিল?
- 8.6 মদিনা সনদে না থাকলে কিসের চুক্তি ছিল?
- 8.7 মদিনা সনদ আসলে কে ভঙ্গ করেছিল?
- 8.8 চুক্তিভঙ্গ কী গণহত্যাকে জায়েজ করে?
- 9 বনু কুরাইজা অবরোধঃ নারী ও শিশুদের হাহাকার
- 10 ন্যায়বিচার ও বিচারকের নিরপেক্ষতা
- 11 রায়ে নবী ও আল্লাহর প্রতিক্রিয়া
- 12 বিচারের রায় কার্যকর হলো যেভাবে
- 12.1 পুরো গোত্র একটি ঘরে বন্দী এবং গণকবর খনন
- 12.2 উলঙ্গ করে গোপনাঙ্গের চুল পরীক্ষা করে হত্যা
- 12.3 নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবকে জবাই
- 12.4 নবীর উপস্থিতিতে আনন্দের সাথে জবাই উৎসব
- 12.5 গণ-জবাই দেখে মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া
- 12.6 গনিমতের মাল বণ্টন, দাসীভোগ ও বিক্রি
- 12.7 মালে গনিমত থেকে নবীর এক পঞ্চমাংশ
- 12.8 বিচারক অসঙ্গতিঃ সা’দ ইবনে মুআযের রায় বনাম নবীর ক্ষমা
- 12.9 ব্যক্তিগত ঋণ বনাম রাষ্ট্রীয় বিচারঃ ন্যায়বিচারের দ্বিমুখী নীতি
- 13 অকল্পনীয় নৃশংসতাঃ দুইজন ইহুদি নারীর ইতিহাস
- 14 উপসংহার
সারসংক্ষেপ
এই প্রবন্ধে মদিনার শেষ বৃহৎ ইহুদি রাজনৈতিক শক্তি বনু কুরাইজা–কে লক্ষ্য করে পরিচালিত সামরিক অভিযান ও পরবর্তী গণহত্যাকে ঐতিহাসিক উৎসসমালোচনা এবং সমসাময়িক মানবাধিকার-নৈতিকতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রবন্ধটির কেন্দ্রীয় দাবি হলো—একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত নিধনযজ্ঞ, দাসত্ব ও সম্পদদখলকে “ন্যায়সঙ্গত” দেখাতে আক্রমণকারী পক্ষ সাধারণত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’, কিংবা ‘চুক্তিভঙ্গ’–এর একটি বা একাধিক রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ করে; এরপর সেই বয়ানের আড়ালে সমষ্টিগত শাস্তি (Collective Punishment) কার্যকর করা হয়। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই এসব অভিযোগের অন্তঃসারশূন্যতা প্রায়শই বোধগম্য হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা কোন অভিযোগ আরোপ করেই ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি দেয়া যায় না।
এই আলোচনায় প্রাথমিক ইসলামি উৎস—কোরআন, সীরাত, হাদিস ও ইসলামধর্মের অনুসারীদের কাছে স্বীকৃত তাফসির গ্রন্থগুলো—কে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে যে, বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে উত্থাপিত “চুক্তিভঙ্গ”-এর অভিযোগের ক্ষেত্রে বর্ণনাগুলো প্রাথমিক সূত্রগুলো অনুসারে সরাসরি বস্তুগত সাক্ষ্য-প্রমাণ নয়, বরং অলৌকিক/অতীন্দ্রিয় বার্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঘটনার পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যামূলক দাবি–নির্ভর। খন্দকের যুদ্ধের পর (৬২৭ খ্রিস্টাব্দ) যে প্রক্রিয়াটি অনুসৃত হয়—দীর্ঘ অবরোধ, রসদ বন্ধ করে শারীরিক-মানসিক ভাঙন তৈরি, আত্মসমর্পণের পরে “বিচার”–নামক পূর্ব থেকে নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, এবং শেষে কয়েকশ পুরুষকে একত্রে শিরশ্ছেদ—তা শুধু সামরিক বিজয়ের বর্ণনা নয়; এটি একটি ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি তৈরি করে, ক্ষমতা-স্থাপনের নীতিমালা হিসেবে কাজ করে, যেখানে ভবিষ্যতের সব ধরণের প্রতিরোধের সম্ভাবনাকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়।
এ অভিযানের পরিণতি ছিল বহুমাত্রিক: (১) গুপ্তকেশ গজানো পুরুষদের সমষ্টিগতভাবে হত্যা, (২) গণকবর খনন করে একসাথে জবাই করে কবর দেয়া, (৩) নারী ও শিশুদের দাসে পরিণত করা, (৪) কিছু দাসীকে যৌন দাসী হিসেবে ভোগ করা, (৫) অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে উলঙ্গ করে বয়ঃসন্ধির চিহ্ন (যেমন গুপ্তকেশ) দেখে “প্রাপ্তবয়স্ক” নির্ধারণ করে হত্যার বাছাই-পদ্ধতি, এবং (৬) সম্পত্তি ও মানবদেহকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে গণ্য করে বণ্টন/বিক্রির মাধ্যমে রাজনৈতিক-সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে—বিশেষত যুদ্ধবন্দী, অবরোধ, নির্বিচার হত্যা এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর সাথে আচরণ সংক্রান্ত নীতিমালায়—এ ধরনের কার্যক্রমকে সমষ্টিগত শাস্তি, অমানবিক আচরণ এবং বহু ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে দেখা হয়। এই প্রবন্ধে বনু কুরাইজা গোত্রের প্রতি হওয়া অন্যায়কে আইনগতভাবে অপরাধ সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়, যেহেতু সেইসময়ে এই আইন প্রচলিত ছিল না, তবে এই ঘটনার অনৈতিকতা এবং বর্বরতার পর্দা উত্তোলনই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। বিশেষ করে দাবীটি যখন মহাবিশ্বের স্রষ্টার প্রেরিত রাসুলের কর্মকাণ্ড নিয়ে, তাই এর নৈতিক দিক বিবেচনার দাবী রাখে।
প্রবন্ধটি ধর্মীয় আবেগ বা আনুগত্যের ভাষা সরিয়ে রেখে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে: বিচারকের নিরপেক্ষতা আদৌ ছিল কি না, “চুক্তি”–র ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ কতটা অস্পষ্ট/ক্ষমতাকেন্দ্রিক, আত্মসমর্পণের পর “বিচার” কীভাবে একপক্ষীয় সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, এবং যুদ্ধের নামে মানবসমাজের কোন সীমা অতিক্রমকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করে প্রবন্ধটি ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে কেবল কাহিনি হিসেবে নয়, বরং নীতি, ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের সংকট হিসেবে উন্মোচনের চেষ্টা করেছে। শুরুতেই এক নজরে পুরো টাইমলাইনটি দেখে নেয়া যাকঃ
-
নতুন শহরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নির্মাণমদিনার কিছু ইহুদি ও পৌত্তলিক গোত্র মুহাম্মদকে আশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে মুহাম্মদ মদিনায় হিজরত করে। সেখানে ইহুদি ও পৌত্তলিকদের আশ্রয়ে এবং সহযোগিতায় মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা নতুন জীবন শুরু করে। এরপর মদিনায় বিভিন্ন আরব ও ইহুদি গোত্রের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলিল—যা প্রচলিতভাবে মদিনা সনদ নামে পরিচিত—সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়। কাগজে–কলমে সহাবস্থানের ভাষ্য থাকলেও, ক্ষমতার কার্যকর কেন্দ্র ধীরে ধীরে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে।
-
আকৃষ্ট করার চেষ্টা, কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া আসে নামদিনায় বসবাসরত ইহুদি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় আলোচনা-বিতর্ক এবং ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ-এর প্রসঙ্গ ইসলামী বর্ণনায় পাওয়া যায়। পাশাপাশি, ইহুদিদের কাছাকাছি যাওয়ার একটি প্রতীকী চেষ্টা হিসেবে শুরুর দিকে কিবলা জেরুজালেমমুখী থাকার কথা ইসলামি সূত্রগুলো থেকে জানা যায়; পরে তা মক্কামুখী করা হয়। কিন্তু এই ধরনের নীতি/প্রতীকী পরিবর্তন সত্ত্বেও, ইহুদি গোত্রগুলো সামগ্রিকভাবে ইসলামের প্রতি প্রত্যাশিত মাত্রায় আকৃষ্ট হয়নি—এমনই চিত্র বহু বর্ণনায় ফুটে ওঠে।
-
সামরিক বিজয়ের পর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধিবদরে মুসলিম বাহিনীর বিজয় মদিনার ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা। ইসলামি বর্ণনায় দেখা যায়, এই বিজয়ের পর ইহুদি গোত্রগুলোর উদ্দেশে প্রত্যক্ষ হুমকি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির প্রবণতা বাড়ে—যেন তারা প্রতিরোধ থেকে সরে আসে। এই পর্যায়ে লক্ষ্য ছিল প্রকাশ্য উচ্ছেদ নয়; বরং ভয় দেখিয়ে অবস্থান দুর্বল করা এবং সম্ভাব্য বিরোধিতাকে আগেভাগে দূর্বল বা বিনাশ করে ফেলা।
-
অভিযোগকে অজুহাত বানিয়ে প্রথম গোত্র-উচ্ছেদবনু কায়নুকার বিরুদ্ধে এক মুসলিম নারীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাদের দুর্গ অবরোধের বর্ণনা পাওয়া যায়। বর্ণনায় আরও দেখা যায়, প্রাথমিকভাবে নবীর ম্যাসাকারের কঠোর সিদ্ধান্তের প্রবণতা থাকলেও রাজনৈতিক চাপ/মধ্যস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত গোত্রটি মদিনা থেকে নির্বাসিত হয়। এর ফলে ইহুদি উপস্থিতি কমানোর প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ সম্পন্ন হয়।
-
“ষড়যন্ত্র” বয়ান → আক্রমণ → সম্পদদখল → নির্বাসনবনু নাদীরের নেতারা মুহাম্মদ ও সাহাবীদেরকে বিতর্ক/আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল—এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু পরে অভিযোগ তোলা হয় যে তারা নাকি হত্যাচেষ্টা করেছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বনু নাদীরের ওপর সামরিক চাপ/আক্রমণ, সম্পদ দখল এবং মদিনা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বর্ণিত রয়েছে। একই পর্যায়ে বনু কুরাইজার দুর্গে অগ্রসর হয়ে চাপ সৃষ্টি এবং “যুদ্ধ না করার” অঙ্গীকার নেওয়ার কথাও পাওয়া যায়।
-
দীর্ঘ অবরোধ-প্রতিরোধের চাপ, মনোবল নড়বড়ে হওয়াখন্দকের যুদ্ধকে অনেক বর্ণনায় অত্যন্ত শ্রমসাধ্য প্রতিরক্ষা-পর্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়— খাল খোঁড়া, ঠান্ডা-ক্ষুধা, দীর্ঘদিনের স্নায়ুচাপ, এবং সরাসরি আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা—সব মিলিয়ে নবীর সাহাবীদের ওপর বড় ধরণের শারীরিক-মানসিক চাপ পড়ে। কিন্তু যেহেতু এটি মূলত প্রতিরোধমূলক অবরোধ ছিল, তাই যুদ্ধশেষে উল্লেখযোগ্য গনিমতের মাল হাতে না আসায় অসন্তোষ/হতাশার আবহ তৈরি হয়—এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষিতটি পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর জন্য একটি মানসিক পটভূমি তৈরি করে।
-
“চুক্তিভঙ্গ” অভিযোগের পরিণতি: অবরোধ → আত্মসমর্পণ → ধ্বংসখন্দকের যুদ্ধশেষে বর্ণনায় দেখা যায়, যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ঘাটতি ও মানসিক ক্লান্তি মুসলিম শিবিরে হতাশা তৈরি করে। ঠিক এই পর্বেই বর্ণিত হয় যে জিব্রাইল মুহাম্মদকে জানান—বনু কুরাইজা নাকি চুক্তি ভেঙেছে। এরপর তাদের দুর্গ দীর্ঘ সময় অবরোধ করা হয়; অবরোধের অংশ হিসেবে রসদ-সরবরাহে কঠোর বাধা আরোপের বর্ণনাও পাওয়া যায়।
- ১ দীর্ঘ অবরোধ ও রসদ-সংকট: দুর্গ ঘিরে রেখে খাদ্য ও পানির সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়—এমন বর্ণনা রয়েছে। এর ফলে নারী-শিশুসহ অভ্যন্তরের লোকজন চরম দুর্দশায় পড়ে।
- ২ আবু লুবাবা ও “পরিণতির ইঙ্গিত”: মুসলিম পক্ষের আবু লুবাবা বনু কুরাইজা গোত্রের দুর্গে পরিদর্শনে আসেন। অসহায় নারী ও শিশুদের দুর্দশা দেখে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পরেন। বর্ণনায় আছে, তিনি ইঙ্গিতে জানান—বনু কুরাইজা আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই, এবং নবীর পরিকল্পনা হচ্ছে, তারা আত্মসমর্পণ করলে মৃত্যুদণ্ড/গণহত্যা অনিবার্য।
- ৩ আত্মসমর্পণ ও সা‘দ ইবন মুআয: রসদ-সংকট ও অবরোধজনিত বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের বর্ণনা পাওয়া যায়। পরে রায় প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয় বনু কুরাইজার প্রতি ক্ষুব্ধ, যার শেষ ইচ্ছাই ছিল বনু কুরাইজাকে ধ্বংস করা, সেই সা‘দ ইবন মুআয–কে। যদিও তাকে “সালিশ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু প্রক্রিয়াটি কার্যত একপক্ষীয় ছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষতা এবং ব্যক্তিগত অপরাধ নির্ধারণ—সবই অগুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়।
- ৪ “বিচার” ও রায়ের কাঠামো: রায় ছিল—প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা, নারী ও শিশুদের দাসত্ব, এবং সম্পত্তি বণ্টন। বর্ণনায় আরও রয়েছে যে, মুহাম্মদ এই রায়কে “উপরে থেকে প্রদত্ত” সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রশংসা করেন—ফলে বিচারটি নিছক মানবিক ন্যায়বিচারের পরিবর্তে আল্লাহর বিধান এবং ক্ষমতানির্ভর সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
- ৫ বয়ঃসন্ধির চিহ্ন দেখে বাছাই ও শিরশ্ছেদ: বর্ণনায় আছে, পুরুষদের উলঙ্গ করে “প্রাপ্তবয়স্ক” নির্ধারণে গুপ্তকেশ দেখা হয়। যাদের ক্ষেত্রে চিহ্ন পাওয়া যায়, তাদেরকে সারিবদ্ধ করে গর্ত খুঁড়ে একে একে হত্যা করা হয়—কয়েকশ মানুষের শিরশ্ছেদের বর্ণনা পাওয়া যায়।
- ৬ নারীর প্রতিবাদ ও হত্যা (বর্ণিত ঘটনা): কিছু সীরাত বর্ণনায় এক নারীর প্রতিবাদ/গালাগালির প্রসঙ্গ আছে, এবং তার পরিণতিতে তাকে হত্যা করা হয়—এমন দাবিও পাওয়া যায়। ঘটনাবলী পড়লে বোঝা যায়, গনিমতের মাল হিসেবে মুসলিমদের যৌনদাসী হয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার চেয়ে তিনি মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছিলেন।
- ৭ রায়হানা ও যৌন-দাসত্বের মাত্রা: বর্ণনায় আছে, বনু কুরাইজার নারীদের একটি অংশ বণ্টনের মাধ্যমে দাসী করা হয়, এবং রায়হানা–কে মুহাম্মদ নিজের যৌনদাসী হিসেবে গ্রহণ করে নেন—যা এই অভিযানের দাসত্ব ও যৌনদাসত্বের মাত্রাকে প্রকাশ করে।
- ৮ বাজারে বিক্রি করে অস্ত্র-ঘোড়া ক্রয়: নারী ও শিশুদের একটি অংশকে গনিমত হিসেবে গ্রহণের পর উল্লেখযোগ্য অংশ বাজারে বিক্রি করা হয়—এমন বর্ণনা পাওয়া যায়, এবং সেই অর্থে পরবর্তী অভিযানের জন্য অস্ত্র ও ঘোড়া কেনার প্রসঙ্গও আসে।
এই ধাপগুলোর সমষ্টিগত অর্থ কেবল “শাস্তি” নয়; বরং একটি ভীতিনির্ভর রাজনৈতিক বার্তা— ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে উচ্ছেদেই শেষ নয়, প্রয়োজন হলে গণহত্যা ও দাসত্বও বৈধ বলে উপস্থাপিত হতে পারে। -
ধারাবাহিক তিন ধাপের রাজনৈতিক ফলাফলধারাবাহিকভাবে—বনু কায়নুকা (নির্বাসন), বনু নাদীর (সম্পদদখলসহ নির্বাসন) এবং বনু কুরাইজা (গণহত্যা ও দাসত্ব)— এই তিনটি পর্যায়ের পর মদিনায় ইহুদি রাজনৈতিক উপস্থিতি কার্যত নির্মূল হয়। “সহাবস্থান”–এর ভাষ্য থেকে সরে এসে শহরটি বাস্তবে একচেটিয়া রাজনৈতিক–সামরিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তরিত হয়।
ভূমিকা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ, পরিকল্পিত গণহত্যা, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা এবং পরাজিত বা ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে দাসত্বে আবদ্ধ করার প্রথা—এসবই সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়গুলোর মধ্যে পড়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অগণিত মানুষ এই নিধনযজ্ঞের শিকার হয়েছে, আর সেই বাস্তবতাই মানব ইতিহাসকে একই সঙ্গে নির্মম ও জটিল করে তুলেছে। আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে একজন স্বাধীন মানুষের পক্ষে দাসত্বের শৃঙ্খল বা যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতার সামাজিক-মানসিক ভয়াবহতা পূর্ণমাত্রায় কল্পনা করা কঠিন; তবু বাস্তবতা হলো, মানব সমাজের একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল এই নিপীড়নের কাঠামোর ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল। তবে আধুনিক যুগের মূল অর্জনগুলোর একটি হলো—এই বর্বরতাকে নীতিগতভাবে অস্বীকার করার নৈতিক সক্ষমতা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ার আকাঙ্ক্ষা। এই কারণেই আধুনিক মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ যুদ্ধ, গণহত্যা, যুদ্ধবন্দীদের অমানবিক ব্যবহার, দাসত্বে পরিণতকরণ কিংবা ধর্ষণের মতো যে কোনো যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নেন।
এই নীতিগত অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জেনেভা কনভেনশন–জাতীয় আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ গৃহীত হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো যুদ্ধাবস্থায়ও বিরোধী পক্ষগুলোকে ন্যূনতম মানবিক আচরণের মানদণ্ডে বাধ্য করা। বাস্তবে আজও পৃথিবীর বহু স্থানে পরাজিত সৈন্য ও বেসামরিক জনগণের ওপর নির্যাতনের খবর আসে; তবু আধুনিক যুগে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে: এই অপরাধগুলোকে “স্বাভাবিক” বা “অনিবার্য” বলে মেনে নেওয়ার বদলে আমরা এগুলোর জন্য জবাবদিহি দাবি করতে পারি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিন্দা ও চাপ তৈরি করতে পারি, এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতেও সক্ষম হই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও সহিংসতার সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ—এগুলো দেখায় যে, বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু নীতিগতভাবে অপরাধকে “অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করা ও জবাবদিহি দাবি করা সম্ভব। ফলে “অতীতে এমন হয়েছে” বা “সব অপরাধের বিচার হয়নি”—এই যুক্তি দিয়ে বর্তমানের কোনো যুদ্ধাপরাধকে বৈধতা দেওয়া (Justification) যুক্তিগত ও নৈতিক উভয় অর্থেই গ্রহণযোগ্য নয়।
যুদ্ধের এই নৃশংসতা আরও গভীর ও জটিল হয়ে ওঠে যখন এর পেছনে ধর্মীয় অনুপ্রেরণা বা উগ্রবাদী আদর্শ কাজ করে। স্বাভাবিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন মানুষ হত্যা করলে অপরাধবোধ, দ্বিধা, কিংবা সামাজিক নিন্দার ভয় কাজ করতে পারে; কিন্তু যখন হত্যাকে “ঈশ্বরের আদেশ”, “পবিত্র দায়িত্ব”, কিংবা “ধর্মরক্ষার কর্তব্য” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেই নৈতিক প্রতিবন্ধকতাগুলো অনেকাংশে ভেঙে যায়। এই অবস্থায় হত্যাকারীর কাছে সহিংসতা আর কেবল একটি অপরাধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে “পুণ্য” বা “ধর্মীয় কর্তব্য”–এর অংশ। “বিধর্মীকে হত্যা করলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হবেন”, “তাদের নারীকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) বা যৌনদাসী করলে পুরস্কৃত হওয়া যাবে”—এ ধরনের ধারণা মানুষের মধ্যে ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা ও মানব-বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক করে, এবং সহিংসতার জন্য এক ধরনের নৈতিক ছাড়পত্র তৈরি করে। যখন কোনো মতাদর্শ সহিংসতাকে নৈতিক ভিত্তি দেয়, তখন অপরাধ থেকে বিরত রাখার সামাজিক-নৈতিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে; কারণ অপরাধী বিশ্বাস করে সে ‘ভালো’ কাজ করছে বা ‘পবিত্র’ লক্ষ্য পূরণ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তমনা, নাস্তিক ও সংশয়বাদী ধারার বহু লেখালেখিতে একটি দালিলিক অভিযোগ বারবার উঠে আসে: নবী মুহাম্মদের সময়ে মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর ওপর পরিচালিত সামরিক অভিযানে গণহত্যা, জাতিগত নিধন/উচ্ছেদ (Ethnic Cleansing) এবং আত্মসমর্পণকারী জনগোষ্ঠীর ওপর অমানবিক আচরণের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। আলোচনার কেন্দ্রে থাকে শিশু-কিশোরদের দাসত্বে পরিণতকরণ, নারীকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যৌনদাসীতে পরিণত করার নীতি, বন্দিদের বিক্রি করে অর্থ/সম্পদ অর্জনের প্রথা, এবং সম্পূর্ণ একটি গোত্রকে ভূমি থেকে উৎখাত করার ধারাবাহিকতা। সত্যিকার অর্থে বেশ কয়েকটি গোত্রকেই সমূলে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, কিন্তু এই প্রবন্ধটি একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনায় দেখা যায়, হিজরতের প্রাথমিক পর্বে ইহুদিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সহাবস্থানের সম্পর্কের উল্লেখ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক ক্রমে সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক দলিল-আলোচনার একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো—মুহাম্মদ আশা করেছিলেন যে ইহুদিরা তার নবুওয়াত দাবিকে স্বীকৃতি দেবে, এবং সে লক্ষ্যেই কিবলা-সংক্রান্ত পরিবর্তনসহ নানা রাজনৈতিক-ধর্মীয় পদক্ষেপের উল্লেখ পাওয়া যায়; কিন্তু প্রত্যাশিত সমর্থন না আসায় পারস্পরিক অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও তিক্ততা ঘনীভূত হয়। এই সংঘাতের ধারাবাহিকতার একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিফলন হিসেবেও অনেকে মুসলিম সমাজে ইহুদি-বিরোধী সন্দেহপ্রবণতা বা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব (Conspiracy Theory)–এর প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করেন—যা বহু সময় বাস্তব রাজনীতির বাইরে গিয়ে মানসিক বিকার-সদৃশ ঘৃণার ভাষা তৈরি করে।
তবে ঐতিহাসিক তুলনার ক্ষেত্রে একটি সতর্কতা জরুরি: মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান শাসনের তুলনায় ইসলামি খিলাফতের অধীনে ইহুদিরা বহু সময় তুলনামূলকভাবে কম নির্যাতিত ছিল—এমন পর্যবেক্ষণ অনেক ইতিহাসবিদের লেখায় পাওয়া যায়, এবং কোথাও কোথাও একে ‘মন্দের ভালো’ (lesser evil) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু এই তুলনা কোনো নৈতিক নিষ্কৃতি নয়। “অন্যরা আরও খারাপ ছিল”—এ কথা বললেই কোনো শাসনব্যবস্থা বা কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার নৈতিক প্রশ্ন নিষ্প্রভ হয়ে যায় না; বরং এতে কেবল তুলনার একটি মাত্রা যোগ হয়। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য খ্রিস্টান বা পরবর্তী শাসনব্যবস্থার সামগ্রিক ইতিহাস রচনা নয়; বরং নবী মুহাম্মদের সময়কাল—বিশেষভাবে বনু কুরাইজা (Banu Qurayza) গোত্রকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নিধনযজ্ঞের প্রকৃত কাঠামো, ন্যায্যতার দাবি, এবং তার নৈতিক-রাজনৈতিক ফলাফলকে বিশ্লেষণ করে দেখা।
গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূল
যুদ্ধ আসলে কী?
‘যুদ্ধ’ বলতে সাধারণত দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রীয়/অরাষ্ট্রীয় পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক, সুসংগঠিত এবং সশস্ত্র সংঘর্ষকে বোঝানো হয়—যেখানে উভয় পক্ষই (কমবেশি) প্রতিরোধ, পাল্টা আক্রমণ বা কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম থাকে। কিন্তু সব সহিংস ঘটনাকে একই ছাঁচে ‘যুদ্ধ’ বলা যায় না। একতরফাভাবে শক্তিশালী একটি পক্ষ যদি অবরোধ, ঘেরাও, রসদ বন্ধ, অথবা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অপর পক্ষকে কার্যত প্রতিরোধহীন অবস্থায় নামিয়ে আনে—তখন ঘটনাটি প্রচলিত অর্থে সমতুল্য যুদ্ধ না হয়ে একতরফা সামরিক অভিযান, শাস্তিমূলক অভিযান বা ঘেরাও-পরবর্তী দমন—এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ; কারণ ‘যুদ্ধ’ শব্দটি প্রায়ই এমন এক ধরনের বৈধতার আবহ তৈরি করে, যেন উভয় পক্ষ সমানভাবে ‘যোদ্ধা’ ছিল এবং পরিণতিটিও স্বাভাবিক “যুদ্ধের ক্ষতি”। বনু কুরাইজার ঘটনাকে এই সংজ্ঞার আলোকে দেখলে, অবরোধ, আত্মসমর্পণ এবং এরপর গণহত্যা—এই ধারাবাহিকতাকে সরলভাবে ‘যুদ্ধ’ বলে চিহ্নিত করা বিশ্লেষণকে আড়াল করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে এটিকে সামরিক অবরোধ-পরবর্তী দমনপ্রক্রিয়া হিসেবে নামকরণ করা তুলনামূলকভাবে বেশি যথাযথ।
জেনোসাইড বা গণহত্যা কাকে বলে?
‘গণহত্যা’ শব্দটি দৈনন্দিন কথাবার্তায় অনেক সময় “অনেক লোককে একসাথে হত্যা” বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও আন্তর্জাতিক আইনে Genocide একটি নির্দিষ্ট ও কঠোর সংজ্ঞাবদ্ধ অপরাধ। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের Genocide Convention–এ জেনোসাইডকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন কিছু কাজ হিসেবে, যা করা হয় কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে—যেমন (ক) গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, (খ) গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, (গ) এমন জীবনযাত্রার শর্ত চাপিয়ে দেওয়া যা ধ্বংস ডেকে আনে, (ঘ) জন্ম প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ, বা (ঙ) গোষ্ঠীর শিশুদের জোরপূর্বক অন্য গোষ্ঠীতে স্থানান্তর।
এখানে “অভিপ্রায়” (intent)–ই হলো মুখ্য উপাদান। অর্থাৎ কেবল হত্যাকাণ্ড ঘটলেই জেনোসাইড প্রমাণ হয় না; লক্ষ্য ছিল কি নির্দিষ্ট পরিচয়ের একটি জনগোষ্ঠীকে ‘গোষ্ঠী হিসেবে’ ধ্বংস করা—এই প্রশ্নটি কেন্দ্রীয়। আবার উল্টোভাবে, জেনোসাইড কেবল “অত্যধিক সংখ্যা”র ওপর দাঁড়ায় না; অভিপ্রায় এবং নীতিগত কাঠামো থাকলে তুলনামূলক কম সংখ্যার ক্ষেত্রেও জেনোসাইডের আলোচনায় আসতে পারে—কারণ আইনটি “সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস”–এর কথা বলে।
এই অংশে আরেকটি সাধারণ বিভ্রান্তি পরিষ্কার করা জরুরি। অনেক সূত্রে দেখা যায়, “এক ঘটনায় চার বা তার অধিক মানুষকে হত্যা”–কে ‘গণহত্যা’ বলা হয়—এটি আসলে জেনোসাইড নয়; এটি মূলত mass murder–জাতীয় শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বর্ণনা। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিগত আলোচনায় “mass murder”–কে প্রায়ই “একই ঘটনায় চার বা ততোধিক হত্যাকাণ্ড” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে, ‘বেশ কয়েকজনকে একসাথে হত্যা’ বনাম ‘কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়’—এই দুইটি ধারণাকে আলাদা রাখা দরকার; নইলে আলোচনার ভেতরেই টার্ম-ডিসিপ্লিন ভেঙে যায়।
ইতিহাসে গণহত্যা কখনও সরাসরি সেনা-নেতৃত্বের আদেশে ঘটে, আবার কখনও “বিচার”–এর নামে এক ধরনের প্রক্রিয়াগত ছদ্মবৈধতা (procedural façade) তৈরি করে সংঘটিত হয়—যেখানে অভিযুক্ত গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত অপরাধ নিরূপণ, আত্মপক্ষ সমর্থন, নিরপেক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ, এবং স্বাধীন বিচারকের ভূমিকা কার্যত অনুপস্থিত থাকে। কখনও কখনও জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ, সম্পদ-দখল, অথবা রাজনৈতিক আধিপত্য স্থায়ী করার লক্ষ্য ব্যর্থ হলে ‘শাস্তি’–কে গোষ্ঠীগত নির্মূলের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
সমষ্টিগত শাস্তি (Collective Punishment) কেন যুদ্ধাপরাধ?
Collective Punishment বা সমষ্টিগত শাস্তি হলো—কয়েকজনের কথিত অপরাধ, কিংবা শাসকপক্ষের সন্দেহ/অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে ‘একক অপরাধী’ হিসেবে ধরে শাস্তি প্রদান। এটি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার (individual responsibility) মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, কারণ এখানে অপরাধ প্রমাণের কেন্দ্রে ব্যক্তি নয়—পরিচয় (identity) ও সদস্যত্ব (membership) দাঁড়ায়। এই ধরনের শাস্তিতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় এমন নিরপরাধ ব্যক্তি, নারী ও শিশু—সবাই কেবল তাদের গোষ্ঠীগত পরিচয়ের কারণে শাস্তির আওতায় পড়ে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে (IHL) সমষ্টিগত শাস্তি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। উদাহরণ হিসেবে, ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন–এর Article 33 বলছে: “Collective penalties … prohibited”—অর্থাৎ সমষ্টিগত শাস্তি এবং ভীতিসঞ্চারমূলক ব্যবস্থা (measures of intimidation/terrorism) নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল নৈতিক আপত্তি নয়—এটি যুদ্ধ-আইনের একটি কোর নীতি: শাস্তি হবে ব্যক্তির বিরুদ্ধে, গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়।
বনু কুরাইজার ঘটনার ক্ষেত্রে বর্ণনাগুলো যে প্রক্রিয়া তুলে ধরে—কথিত ‘চুক্তিভঙ্গ’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো গোত্রের পুরুষদের ঢালাওভাবে হত্যা, এবং নারী-শিশুদের দাসত্বে পরিণতকরণ—এটি আধুনিক নৈতিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে punishing the blameless–এর ধারণার সঙ্গে মিলে যায়: যেখানে অপরাধের ব্যক্তিগত নিরূপণ অনুপস্থিত, কিন্তু শাস্তি সর্বজনীন। এই অংশের আলোচনায় তাই “একজন/কয়েকজনের অপরাধ” বনাম “পুরো গোষ্ঠীর ধ্বংস/দাসত্ব”—এই অসমতা (disproportionality) এবং পরিচয়ভিত্তিক শাস্তির (identity-based punishment) কাঠামোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা জরুরি।
জাতিগত নিধন বা ‘এথনিক ক্লিনজিং’ কেন মানবতাবিরোধী অপরাধ?
‘এথনিক ক্লিনজিং’ (Ethnic Cleansing) বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয়—একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে জাতিগত/ধর্মীয়ভাবে “সমজাতীয়” (homogeneous) করতে অন্য কোনো গোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে, জোরপূর্বক ও ভয় দেখিয়ে উৎখাত/স্থানান্তর করা। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাসন, ভীতিপ্রদর্শন, সম্পত্তি দখল, আটক, গণহত্যা এবং কখনও যৌন সহিংসতা—সবই কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে একটি টেকনিক্যাল বিষয় মনে রাখা দরকার: Ethnic cleansing আন্তর্জাতিক আইনে স্বতন্ত্র “একটি আলাদা অপরাধ-শিরোনাম” (independent crime label) হিসেবে সব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং বাস্তবে এটি প্রায়ই genocide, crimes against humanity, war crimes—এই ক্যাটাগরিগুলোর অন্তর্ভুক্ত কাজের সমষ্টিগত বিবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাতিসংঘের Genocide Prevention রিসোর্সেও বলা হয়, “Ethnic cleansing” পৃথক স্বাধীন অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়; কিন্তু এর অধীনে সংঘটিত কাজগুলো অন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিচারযোগ্য হতে পারে।
ইতিহাসে দেখা যায়, অপরাধী পক্ষ প্রায়ই তাদের এই উৎখাত/নিধনকে “আত্মরক্ষা”, “রাষ্ট্র নিরাপত্তা”, “বিশুদ্ধতা রক্ষা”, কিংবা “অভ্যন্তরীণ শত্রু দমন”—এই জাতীয় ফ্রেমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসেবে:
- হলোকাস্ট: নাৎসি শাসন ইহুদিদের ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে দাগিয়ে পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ চালায়—এখানে ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ বয়ানটি সহিংসতার ছদ্মবৈধতা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- রুয়ান্ডা (১৯৯৪): হুতু চরমপন্থীরা তুতসিদের “হুমকি” হিসেবে চিত্রিত করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়—সহিংসতার আগে ও পরে প্রোপাগান্ডা এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
- আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে নিধন/স্থানান্তর (১৯১৫): উসমানীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের অধীনে ব্যাপক উচ্ছেদ ও মৃত্যু ঘটে—ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক থাকলেও ‘রাষ্ট্র নিরাপত্তা’ বয়ানটি এখানে একটি কেন্দ্রীয় যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যুদ্ধাপরাধের আইনগত সংজ্ঞা এবং মানবাধিকার আইন
যুদ্ধাপরাধ (War crimes) বলতে সশস্ত্র সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে নিষিদ্ধ এমন কর্মকাণ্ড বোঝায়—যেমন বেসামরিক নাগরিককে লক্ষ্য করে হত্যা, যুদ্ধবন্দীকে হত্যা/নির্যাতন, লুণ্ঠন, নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ, যৌন সহিংসতা, বা সুরক্ষিত ব্যক্তি/স্থাপনার বিরুদ্ধে আক্রমণ ইত্যাদি। যুদ্ধাপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো: এটি “যুদ্ধের অনিবার্য ক্ষতি” নয়, বরং নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ আচরণ—যা সংঘাতের মধ্যেও মানবিকতার ন্যূনতম সীমা লঙ্ঘন করে।
যুদ্ধাপরাধীরা প্রায়ই নিজেদের সহিংসতাকে বৈধ দেখাতে ভিকটিমদের “জঙ্গি”, “সন্ত্রাসী”, “রাষ্ট্রদ্রোহী” বা “ভিতরের শত্রু” হিসেবে চিত্রিত করে। এই ফ্রেমিং দুইভাবে কাজ করে: (১) বেসামরিক জনগোষ্ঠীকেও ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করে তাদের অধিকার অস্বীকার করা সহজ হয়; (২) অপরাধী পক্ষের সমর্থকদের কাছে সহিংসতাকে “প্রতিরক্ষা” হিসেবে বিক্রি করা যায়। এমনকি শিশু হত্যাকে ন্যায্যতা দিতে “বড় হলে শত্রু হবে”—জাতীয় ভবিষ্যদ্বাণীমূলক যুক্তিও হাজির করা হয়, যা ব্যক্তিগত নির্দোষতার নীতিকে অস্বীকার করে পরিচয়ভিত্তিক শাস্তিকে স্বাভাবিক করে তোলে।
এই ধরনের অপরাধ আড়াল করার জন্য ইতিহাস বিকৃতি, তথ্য গোপন, এবং পরাজিতদের কণ্ঠরোধ—প্রায়ই একসাথে চলে। তাই যে কোনো সভ্য সমাজের নৈতিক দায়িত্ব হলো: (ক) টার্ম ও মানদণ্ডকে স্পষ্ট রাখা (জেনোসাইড/এথনিক ক্লিনজিং/যুদ্ধাপরাধ—কোথায় কোনটি), (খ) প্রমাণ ও ন্যারেটিভকে আলাদা করে দেখা, এবং (গ) ‘অতীতে ঘটেছে’ বা ‘অপর পক্ষও করেছে’—এই যুক্তি দিয়ে কোনো অপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতাকে নাকচ করা। ঠিক এই কারণেই বনু কুরাইজার ঘটনার আলোচনায় “শুধু ইতিহাস” নয়—বরং অপরাধের বয়ান কীভাবে তৈরি হয়, এবং গোষ্ঠীগত শাস্তি কীভাবে বৈধতা পায়—সেটিই বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রাখা জরুরি।
জেনেভা কনভেনশনঃ ঐশ্বরিক বনাম মানুষের বিধান
মানব সভ্যতার যুদ্ধ-ইতিহাসের একটি কঠিন বাস্তবতা হলো—যুদ্ধ যখন “জিততে হবে”–এই তাগিদে থাকে, তখন পরাজিত, আহত, বন্দী এবং বেসামরিক মানুষের মানবিক মর্যাদা সবচেয়ে দ্রুত ভেঙে পড়ে। এই ভাঙ্গনকে আইনি সীমারেখায় বাঁধার যে দীর্ঘ প্রচেষ্টা, তার অন্যতম কেন্দ্রীয় ফল হলো জেনেভা কনভেনশনসমূহ। ১৮৬৪ সালে জেনেভায় প্রথম কনভেনশনের মাধ্যমে যে মানবিক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত ও সংশোধিত হয়ে ১৯৪৯ সালে চারটি প্রধান কনভেনশনের মাধ্যমে আধুনিক কাঠামো পায়। আজ ‘জেনেভা কনভেনশন’ বলতে সাধারণত ১৯৪৯ সালের এই চারটি কনভেনশন এবং তাদের পরবর্তী অতিরিক্ত প্রোটোকল–গুলোর (বিশেষত ১৯৭৭ ও ২০০৫) সমষ্টিগত কাঠামোকেই বোঝানো হয়—যা যুদ্ধের মধ্যে ন্যূনতম মানবিকতার “আইনি দেয়াল” বা প্রটেকশন হিসেবে কাজ করে।
এখানেই একটি নৈতিক-দার্শনিক প্রশ্ন সামনে আসে, যা এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় আলোচনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যদি আল্লাহকে সর্বজ্ঞ, সর্বদয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ ধরা হয়—তবে মানুষের তৈরি, তুলনামূলকভাবে “ন্যূনতম” মানবিক শর্তগুলো (যেমনঃ আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা না করা, নারী-শিশুকে দাসে না পরিণত করা, বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ড না দেওয়া, সমষ্টিগত শাস্তি না চাপানো) কেন ঐশ্বরিক বিধান বা নবী-অনুসৃত নীতিতে একই মাত্রায় দৃশ্যমান নয়—এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। কেউ যদি বলেন “সেই যুগের আরব ছিল ভিন্ন”—তাহলে পাল্টা প্রশ্ন দাঁড়ায়: স্রষ্টা যদি সময় ও স্থানের ঊর্ধ্বে হন, তবে নৈতিকতার মানদণ্ড কেন কেবল সমকালীন সমাজ-রীতির সীমার মধ্যেই আটকে থাকবে, এবং কেন এমন কাজগুলো ধর্মীয় বৈধতা পাবে যেগুলোকে আধুনিক মানবিক বিচারবোধ স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে?
জেনেভা কনভেনশনের বিবর্তন ও পর্যায়সমূহ
জেনেভা কনভেনশনের লক্ষ্য যুদ্ধকে “ভালো” করা নয়; বরং যুদ্ধের মধ্যেও কিছু সীমা টানা—যাতে যারা সরাসরি যুদ্ধ করছে না (বেসামরিক মানুষ, চিকিৎসাকর্মী, ত্রাণকর্মী) এবং যারা আর যুদ্ধ করতে সক্ষম নয় (আহত, অসুস্থ, জাহাজডুবিতে আক্রান্ত, যুদ্ধবন্দী)—তাদের জীবনের মর্যাদা ন্যূনতমভাবে সুরক্ষিত থাকে। ইতিহাসগতভাবে এই কাঠামো চারটি প্রধান ধাপে গড়ে ওঠে, পরে তা অতিরিক্ত প্রোটোকল দিয়ে আরও বিস্তৃত হয়:
| পর্যায় | সময়কাল | মূল লক্ষ্য ও বিষয়বস্তু |
| প্রথম ধাপ | ১৮৬৪ | যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ও অসুস্থ সেনাদের চিকিৎসা, হাসপাতাল/চিকিৎসা সেবার সুরক্ষা, চিকিৎসাকর্মীর নিরপেক্ষতা—এসবের প্রাথমিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। |
| দ্বিতীয় ধাপ | ১৯০৬ | ১৮৬৪–এর কাঠামোর সংশোধন ও সম্প্রসারণ—আহত/অসুস্থদের সুরক্ষার নিয়ম আরও বিস্তারিত ও মানসম্মত করা। (এটি মূলত ১৮৬৪–এরই আপডেটেড রূপ) |
| তৃতীয় ধাপ | ১৯২৯ | বিশেষভাবে যুদ্ধবন্দী (POW)–দের মানবিক আচরণ, নির্যাতন নিষিদ্ধকরণ, ন্যূনতম অধিকার—এসবকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে বিধিবদ্ধ করা; পাশাপাশি পূর্ববর্তী নিয়মগুলোরও সংশোধন। |
| চূড়ান্ত আধুনিক কাঠামো | ১৯৪৯ (কার্যকর: ২১ অক্টোবর ১৯৫০) | চারটি কনভেনশনের পূর্ণ কাঠামো: (I) স্থলযুদ্ধে আহত/অসুস্থ, (II) সমুদ্রে আহত/অসুস্থ/জাহাজডুবিতে আক্রান্ত, (III) যুদ্ধবন্দী, (IV) বেসামরিক জনগণ—বিশেষত দখলকৃত অঞ্চলে তাদের সুরক্ষা। |
| পরিপূরক প্রোটোকল | ১৯৭৭ ও ২০০৫ | ১৯৪৯–এর কাঠামোকে পরিপূরক করা (প্রতিস্থাপন নয়): আন্তর্জাতিক ও অ-আন্তর্জাতিক সংঘাতে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা আরও স্পষ্ট করা, এবং নতুন প্রতীক (emblem) সংযোজন ইত্যাদি। |
কনভেনশনের গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার বিশ্লেষণ
জেনেভা কনভেনশন ধর্মীয় গ্রন্থ নয়—এটি রাষ্ট্রসমূহের স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি। তবু নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর তাৎপর্য বড়: এটি যুদ্ধের মাঝেও “মানুষ” ধারণাটিকে আইনি ভাষায় টিকিয়ে রাখে। অন্যদিকে, ধর্মীয় যুদ্ধবর্ণনা বা প্রাচীন গোত্রীয় যুদ্ধনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়—বিজয়, প্রতিশোধ, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ, এবং গনিমত-দাসত্বের অর্থনীতি একসাথে জুড়ে যায়। ফলে যখন বনু কুরাইজা–জাতীয় ঘটনার বর্ণনার পাশে জেনেভা কনভেনশনের ন্যূনতম মানদণ্ড বসানো হয়, তখন নৈতিক বিভাজনটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পার্ট-১: সাধারণ বিধান ও ‘কমন আর্টিকেল ৩’
জেনেভা কনভেনশনগুলো মূলত রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতের জন্য বিস্তারিত হলেও চারটি কনভেনশনেরই একটি অভিন্ন ধারা আছে—যাকে বলা হয় Common Article 3 (কমন আর্টিকেল ৩)। এই ধারার গুরুত্ব হলো: এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ” না হলেও (অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভেতরে সংঘাত/গৃহযুদ্ধধর্মী পরিস্থিতিতেও) ন্যূনতম মানবিক সুরক্ষা দাবি করে। এই ন্যূনতম মানদণ্ড কিছু কাজকে সর্বাত্মকভাবে নিষিদ্ধ করে—
- যে কোনো ধরনের হত্যা, অঙ্গচ্ছেদ, নির্মম আচরণ, নির্যাতন ও অমানবিক ব্যবহার।
- জিম্মি করা বা বন্দীকে দরকষাকষির পণ্য বানানো।
- ব্যক্তিগত মর্যাদার ওপর আঘাত—বিশেষত অপমানজনক ও অবমাননাকর আচরণ।
- নিয়মিত গঠিত আদালত এবং মৌলিক বিচারিক নিশ্চয়তা ছাড়া রায় ঘোষণা বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা।
এই ধারা এক অর্থে “যুদ্ধের মাঝেও ন্যূনতম ন্যায়বিচার”–এর রূপরেখা। বনু কুরাইজা–জাতীয় ঘটনায় যখন আত্মসমর্পণের পর গণহত্যা, বন্দী নারী-শিশুর দাসত্ব, বা বিচারপ্রক্রিয়ার একপক্ষীয় কাঠামোর বর্ণনা আসে—তখন এই ন্যূনতম মানদণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষটি চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে।
পার্ট-২: বেসামরিক জনগণের সার্বজনীন সুরক্ষা
চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন (Civilians) বেসামরিক জনগণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর ধারা ১৩ (Part II)–এ নীতিগতভাবে বলা হয়—সংঘাতে জড়িত দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী এই সাধারণ সুরক্ষার আওতায় থাকবে এবং জাতি, বর্ণ, ধর্ম বা অনুরূপ পরিচয়ের ভিত্তিতে “adverse distinction” (অবনতিমূলক বৈষম্য) করা যাবে না। অর্থাৎ “তারা আমাদের গোত্র/ধর্মের নয়”—এই যুক্তিতে কারও মানবিক মর্যাদা বাতিল করা যাবে না।
পার্ট-৩: সংরক্ষিত ব্যক্তিদের মর্যাদা, নির্যাতন-সমষ্টিগত শাস্তির নিষেধাজ্ঞা
এই অংশটি আধুনিক যুদ্ধনৈতিকতার মেরুদণ্ড—কারণ এখানে “ক্ষমতা আছে বলেই সব বৈধ”–এর ধারণাকে আইনি ভাবে থামানোর চেষ্টা করা হয়। বিশেষত:
- ধারা ৩২ (হত্যা/নির্যাতন/বর্বরতা নিষেধ): সংরক্ষিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, শারীরিক কষ্ট সৃষ্টি করে এমন ব্যবস্থা, কর্পোরাল পানিশমেন্ট, অমানবিকতা—এসবকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- ধারা ৩৩ (Collective Punishment নিষিদ্ধ): সমষ্টিগত শাস্তি এবং ভীতি প্রদর্শন/সন্ত্রাসমূলক ব্যবস্থা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ একজন/কয়েকজনের অভিযোগকে ভিত্তি করে পুরো গোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না—এখানে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা (individual responsibility) মূল নীতি। বনু কুরাইজার ঘটনায় “চুক্তিভঙ্গ”–এর অভিযোগে অপরাধের ব্যক্তিগত মাত্রা নির্ণয় না করে শত শত পুরুষকে একত্রে হত্যা এবং নারী-শিশুকে দাসত্বে পরিণত করার বর্ণনা এই নীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
- ধারা ৪৯ (জোরপূর্বক স্থানান্তর/নির্বাসন নিষিদ্ধ): দখলকৃত ভূখণ্ডে সংরক্ষিত ব্যক্তিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর বা নির্বাসন নিষিদ্ধ; সীমিত ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রে “evacuation” সাময়িক হতে হবে এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে তাদের ঘরে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও ধারায় উল্লেখ আছে।
জেনেভা কনভেনশনের শক্তি এখানে—এটি যুদ্ধের বাস্তবতা মেনে নিয়েও যুদ্ধকে “নিয়মশূন্য এলাকা” হতে দেয় না। তবে একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতাও আছে: কনভেনশন মানুষের তৈরি চুক্তি হওয়ায় এর প্রয়োগ নির্ভর করে রাষ্ট্রের সম্মতি, বাস্তব ক্ষমতার ভারসাম্য, এবং আন্তর্জাতিক চাপ-জবাবদিহির ওপর। তা সত্ত্বেও আধুনিক সভ্যতার বড় অর্জন হলো—এই নীতিগুলোকে ‘আদর্শ’ হিসেবে স্থাপন করা, যুদ্ধাপরাধকে বৈধতা না দিয়ে বরং তাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা, এবং প্রমাণ-ভিত্তিক জবাবদিহির দিকে এগোনোর চেষ্টা। ঠিক এই কারণেই প্রাচীন গোত্রীয় যুদ্ধের বিবরণ যখন ধর্মীয় বৈধতার দাবিতে উপস্থাপিত হয়, তখন জেনেভা কনভেনশনের মানদণ্ড আমাদেরকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: “নৈতিকতা” কি কেবল ক্ষমতাবান পক্ষের সিদ্ধান্ত, নাকি মানব মর্যাদা রক্ষার কিছু সার্বজনীন সীমা সত্যিই থাকা উচিত?
মদিনায় হিজরত এবং মুহাম্মদের জীবনে ইহুদিদের ভূমিকা
মদিনায় আমন্ত্রণ এবং পৌত্তলিক ও ইহুদিদের আতিথেয়তা
মক্কার কুরাইশদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত মুহাম্মদ [1] যখন মদিনায় (তৎকালীন ইয়াসরিব) হিজরত করেন, তখন তিনি কোনো শূন্য বা শত্রুভাবাপন্ন ভূমিতে পা রাখেননি। বরং মদিনার তৎকালীন অধিবাসী—যাদের অধিকাংশই ছিল পৌত্তলিক আরব এবং একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনী কিন্তু সংখ্যালঘু অংশ ছিল ইহুদি—তাঁকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মদিনার প্রধান দুই আরব গোত্র ‘আউস’ ও ‘খাযরাজ’ (যারা তখনো পর্যন্ত মূলত পৌত্তলিক ছিল এবং পরবর্তীতে ‘আনসার’ হিসেবে পরিচিতি পায়) নিজেদের গোত্রীয় সংঘাত নিরসনের আশায় মুহাম্মদকে একজন নিরপেক্ষ সালিসকারী ও নেতা হিসেবে মদিনায় নিমত্রণ জানায়। উল্লেখ্য, এই পৌত্তলিক গোত্রগুলোর সাথে ইহুদিদের বড় গোত্রগুলোর শত্রুতা ছিল দীর্ঘদিনের, কিন্তু সংখ্যাগুরু হওয়ার পরেও মদিনায় প্রভাবের দিক দিয়ে ইহুদিরাই এগিয়ে ছিল, যেহেতু তাদের কিতাব রয়েছে এবং ইহুদিরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী ছিল।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মদিনায় হিজরত করার পর মুহাজিরদের (মক্কা থেকে আগত মুসলিমরা) আবাসন ও খাদ্যের সংকট মেটাতে মদিনার এই স্থানীয় অধিবসীরা নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করেছিল। ইসলামের ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘মুয়াত্তা’ বা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নামে পরিচিত হলেও, এর মূল জোগানদাতা ছিল মদিনার স্থানীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, যার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ইহুদি এবং স্থানীয় আরব গোত্রগুলো।
বিশেষ করে মদিনা সনদের (Constitution of Medina) মাধ্যমে মদিনার ক্ষুদ্র ইহুদি গোত্রগুলো মুহাম্মদের নেতৃত্বের অধীনে একটি যৌথ রাষ্ট্রকাঠামোতে সম্মত হয়। এই চুক্তিতে বড় ইহুদি গোত্র যেমন বনু নাদীর, বনু কাইনুকা বা বনু কুরাইজা ছিল কিনা, তা এই প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। এই সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, চুক্তিবদ্ধ মুসলিম এবং ইহুদিরা একে অপরের মিত্র হিসেবে গণ্য হবে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ বা যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষই যুদ্ধের ব্যয়ভার ও রসদ বহন করবে। সনদের শর্তানুযায়ী, ইহুদিরা তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা পাবে এবং মুসলিমদের পাশাপাশি তারাও নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। মদিনার ইহুদিরা যদি সেদিন মুহাম্মদকে মেনে না নিত বা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সহযোগিতা না করত, তবে মদিনায় ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা অসম্ভব ছিল। যেই ইহুদিদের পরবর্তীতে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে নির্বিচারে হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়, অথচ হিজরতের শুরুর দিনগুলোতে তাদেরই স্বাক্ষরিত চুক্তি ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক সহযোগিতায় মুসলিমরা মদিনায় থিতু হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
মূলত, মদিনার সেই সময়কার পৌত্তলিক সমাজ এবং ইহুদি গোত্রগুলোর উদারতা, আতিথেয়তা এবং নিরাপত্তার চাদরেই মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, পরবর্তীতে এই আশ্রয়দাতাদেরই করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল। আসুন মদিনায় মুহাম্মদকে নিমন্ত্রণের দলিল দেখে নিই, [2]
সীরাতুল মুস্তফা (সা.) — পৃষ্ঠা: ২৮৬
মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামের সূচনা (১১শ নববী বর্ষ)
মদিনার অধিকাংশ অধিবাসী ছিল আউস ও খাযরাজ সম্প্রদায়ভুক্ত, যারা ছিল মুশরিক ও মূর্তিপূজক। আর এদের সাথে কিছু ইয়াহুদিও বাস করত, যারা ছিল আহলে কিতাব ও শিক্ষিত। মদিনায় ইয়াহুদিরা যেহেতু সংখ্যালঘু ছিল, কাজেই যখন তাদের সাথে আউস বা খাযরাজের ঝগড়া-বিবাদ লেগে যেত, তখন ইয়াহুদিরা বলত— “শীঘ্রই আখেরি নবী প্রেরিত হতে যাচ্ছেন, আমরা তাঁর আনুগত্য করব এবং তাঁকে সাথে নিয়ে আমরা তোমাদেরকে ‘আদ ও ইরাম জাতির মতো ধ্বংস ও পর্যুদস্ত করব।”
যখন হজের মৌসুম এলো, খাযরাজের কিছু লোক মক্কায় আগমন করল। এটা ছিল নবুয়তের ১১শ বর্ষ। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের কাছে গেলেন এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন; তাদের সামনে কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত করেন। এই ব্যক্তিগণ তাঁকে দেখামাত্র চিনে ফেললেন এবং পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন— “আল্লাহর কসম, ইয়াহুদিরা যাঁর উল্লেখ করে থাকে, তিনি সেই নবী। দেখ, এমনটি না হয় যে, সৌভাগ্য ও মর্যাদার দিক থেকে ইয়াহুদিরা যেন আমাদের অগ্রগামী হয়ে না যায়।”
আর ওই বৈঠক থেকে ওঠার পূর্বেই তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আরজ করলেন— “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা তো আপনার প্রতি ঈমান আনলাম; আর ইয়াহুদিদের সাথে আমাদের প্রায়ই ঝগড়া হয়। যদি আপনি অনুমতি দেন তো আমরা ফিরে গিয়ে তাদেরও ইসলামের দাওয়াত দিতে পারি। যদি ওরাও এই দাওয়াত গ্রহণ করে আর এ অবস্থায় তারা এবং আমরা একতাবদ্ধ হই, তাহলে অতঃপর আপনার চেয়ে শক্তিশালী কেউ হবে না।”
এই ঈমান আনয়নকারী ছিলেন খাযরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তি; নিম্নে তাঁদের নাম দেওয়া হলো:
১. হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)
২. হযরত আউফ ইবনে হারিস (রা.)
৩. হযরত রাফি ইবনে মালিক ইবনে আজলান (রা.)
৪. হযরত কুতায়বা ইবনে আমির (রা.)
৫. হযরত উকবা ইবন যুরারা (রা.)
৬. হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রাবাব (রা.)

মদিনার তিনটি প্রধান ইহুদি গোত্র এবং তাদের পরিচয়
মদিনার আশেপাশে সেই সময়ে বেশ কয়েকটি ইহুদি গোত্র ছিল, যাদের মধ্যে প্রধান ছিল বনু কায়নুকা, বনু নাদির এবং বনু কুরাইজা। মুহাম্মদ প্রথমে বনু কায়নুকা গোত্রকে আক্রমণ করে, এরপর বনু নাদির এবং এরপরে বনু কুরাইজা গোত্রকে। এই সময়ক্রম বা টাইমলাইনটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি এই কারণে যে, বনু নাদির গোত্রকে আক্রমণের মাঝখানে মুহাম্মদ হুট করে কোন কারণ ছাড়াই বনু কুরাইজা গোত্রকেও আক্রমণ করে বসেছিল। এই বিষয়গুলো ধীরে ধীরে আলোচনা করা হবে। আসুন আপাতত এই আক্রমণগুলোর সময়ক্রম দেখে নেয়া যাকঃ
| ঘটনা | সময়কাল | দলিল |
| নবী মদিনায় আগমন করলেন | ৬২২ সালের ২১ জুন হতে ২ জুলাইয়ের মধ্যে। নবী মুহাম্মাদ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন | |
| ইহুদিদের সাথে চুক্তি | মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর সাথে চুক্তি সম্পাদন। ইহুদি গোত্রগুলো ছিল মূলত আল খাজরাজ এবং আল আউস ভুক্ত। আল খাজরাজ ভুক্ত গোত্রগুলো হচ্ছে বনু আউফ, বনু সাইদা, বনু আল-হারিস, বনু জুশাম, বনু আল নাজ্জার। এবং আল আউসভুক্ত গোত্রগুলো হচ্ছে, বনু আমর ইবনে আউফ, বনু আল নাবিত, বনু আল আউস। এছাড়া আরও চুক্তি করেছিল বনু সালাবা, সালাবার আরেকটি গোত্র জাফনা, বনু আল শুতায়বা। | [3] [4] |
| বদরের যুদ্ধ | ১৭ মার্চ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ। বদরের যুদ্ধে বিজয় লাভের পরেই মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং তারা ইহুদিদের ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে বলে, দ্রুত ইসলাম গ্রহণ না করলে বদরের মত বিপর্যয় ইহুদিদের ভাগ্যেও ঘটবে। | [5] |
| বনু কায়নুকা আক্রমণ | এপ্রিল ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ। পেশায় কর্মকার, স্বর্ণকার ও তৈজসপত্র নির্মাতা বনু কায়নুকা গোত্রকে মুহাম্মদ ও মুসলিম বাহিনী আক্রমণ করে একজন মুসলিম নারীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে। | [6] |
| বনু নাদিরের নিমন্ত্রণ | বনু নাদির গোত্রের প্রধানগণ নবী মুহাম্মদ ও তার সাহাবীদের নিমন্ত্রণ করেছিল আলোচনার উদ্দেশ্যে, যেন নবী সেখানে গিয়ে তার নবী হওয়ার প্রমাণ দেন। অর্থাৎ নবীর পরীক্ষা নেবেন, তাদের পক্ষের তিশজন ইহুদি রাবাইকে নিয়ে এসে। নবী সেখানে গেলেন তার সাহাবীগণ সহ। রাতের বেলা হঠাৎ তিনি সেখান থেকে উঠে কাউকে কিছুই না বলে চলে আসলেন। অর্থাৎ ইহুদিদের রাবাইদের কাছে নবী হওয়ার পরীক্ষা তিনি দিলেন না। অন্য সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন, এরপরে আরেকজনার কাছ থেকে শুনলেন নবী মদিনা চলে গেছেন। তারা মদিনা ফিরে আসলেন। ফিরে আসার পরে জানতে পারলেন, নবীকে নাকি জিব্রাইল এসে বলেছে, তারা যেখানে বসে ছিল সেই ঘরের ছাদে কিছু লোক নবীকে হত্যা করার জন্য বসে ছিল। কিন্তু সেই লোকগুলো কেন নবীর সাহাবীদের হত্যা করলো না, কেন সাহাবীদের কেউই এরকম কাউকে দেখতে পেলেন না, নবীও বা কাউকে কিছু না বলে একা একা চলে আসলেন কেন, তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। অর্থাৎ এই বিশ্বাসঘাতকতার কথা শুধুমাত্র নবী একাই জানেন, যার কোন বাস্তব প্রমাণ নেই। | [7] |
| বনু নাদির আক্রমণ | মে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ বনু নাদির আক্রমণ। ইহুদি রাবাইদের কাছে নবী হওয়ার পরীক্ষা না দিয়ে রাতের বেলা আচমকা ফেরত চলে এসে তার পরেই নবী মুহাম্মদ তাদের ওপর আক্রমণ চালান। | |
| বনু কুরাইজাকে আচানক আক্রমণ | এই সময়ে বনু নাদিরের সাথে নবী মুহাম্মদ ও তার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধের মধ্যেই তিনি বনু নযীরকে বাদ দিয়ে বনু কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে বনু কুরাইজা নবী মুহাম্মদের সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বাধ্য হয় যে, তারা নবীকে সাহায্য করবে। এই অঙ্গীকার মোটেও ইচ্ছাকৃতভাবে ছিল না, জোরপুর্বক আচমকা আক্রমণের মাধ্যমে বাধ্য করা হয়েছিল। | [8] |
| খন্দকের যুদ্ধ | জানুয়ারি – ফেব্রুয়ারি ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ। নবী মুহাম্মদ খন্দকের যুদ্ধ করেন। | |
| বনু কুরাইজার দুর্গ অবরোধ এবং আক্রমণ | জানুয়ারি ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ। নবী মুহাম্মদ খন্দকের যুদ্ধে থেকে ফেরত এসে অস্ত্র ত্যাগ না করেই বনু কুরাইজা আক্রমণ করেন, কারণ সেই সময় নাকি জিব্রাইল এসে তাকে খবর দিয়েছে যে, বনু কুরাইজা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে! যার বাস্তব কোন প্রমাণ নেই। তারা কাউকে হত্যাও করেনি, কাউকে আক্রমণও করেনি। ২৫ দিন তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখার পরে তারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। |
এবারে আসুন মানচিত্রটিও দেখে নেয়া যাক,

ইহুদিদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত এবং দ্বন্দ্ব
মদিনায় হিজরতের পর প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাম্মদের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং নিজেকে পূর্ববর্তী নবুয়ত-ধারার ধারাবাহিকতায় গ্রহণযোগ্য করে তোলা—এমন ব্যাখ্যা অসংখ্য ইসলামিক সূত্রে খুব সরাসরিই পাওয়া যায়। ওই অঞ্চলে ইহুদিরা সংখ্যায় সংখ্যালঘু হলেও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং “আহলে কিতাব” পরিচয়ে সামাজিক প্রভাবশালী ছিল। ফলে তাদের সমর্থন বা স্বীকৃতি মিললে অন্যান্য গোষ্ঠীর কাছেও নতুন ধর্মীয় নেতৃত্বের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দৃঢ় হতে পারত—এমন রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতাও ছিল। এই প্রেক্ষিতে দেখা যায়, মদিনায় আগমনের পর মুসলিমরা একটি সময় পর্যন্ত জেরুজালেমমুখী কিবলার দিকে নামাজ আদায় করতেন; পরে ইহুদিদের কাছ থেকে যথেষ্ট সাড়া না পেয়ে কিবলা কাবামুখী করা হয়—আর এই পরিবর্তনকে ঘিরে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথাও বিভিন্ন উৎসে আলোচিত। আলোচনা সংক্ষিপ্ত রাখবার জন্য সেই প্রসঙ্গগুলো এখানে আবারো আলোচনা করা হচ্ছে না, কিন্তু আগ্রহী পাঠকগণ এই প্রবন্ধগুলো পড়তে পারেন [9] [10] [11]।
নবী মুহাম্মদের জাতিবিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতা
এখানে একটি মৌলিক নীতির ওপর আমাদের স্পষ্ট হওয়া দরকার: কোনো গোষ্ঠীর একজন বা কয়েকজন ব্যক্তির কাজের জন্য পুরো জনগোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করা, শাস্তি দেওয়া, কিংবা তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উস্কানি দেওয়া—এটি নৈতিক ও আইনি দুই অর্থেই অন্যায়। কারণ অপরাধের জবাবদিহি ব্যক্তির ওপর পড়ে; জন্ম, জাতি, ধর্ম, গোত্র, অথবা পরিচয়—এসবকে “অপরাধের প্রমাণ” বানিয়ে ফেললে তা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই ভেঙে দেয়। ধরুন, আগামীকাল ইউরোপে কোনো একজন বাঙালি বোমা বিস্ফোরণে জড়িত ছিল—এমন দাবি উঠল। এর প্রতিক্রিয়ায় যদি কেউ বলতে শুরু করে, “যেখানেই বাঙালি পাও, হত্যা করো”—তাহলে সেটি হবে সরাসরি গণউসকানি এবং ভয়াবহ অপরাধ। কারণ অপরাধ যদি সত্যিই ঘটেও থাকে, তা করেছে নির্দিষ্ট ব্যক্তি; তার জন্য নারী-শিশু-বৃদ্ধ-প্রতিবন্ধী—সহ পুরো বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করার কোনো নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই। এই ধরনের পরিচয়ভিত্তিক দোষারোপ ও শাস্তির চিন্তাই হলো জাতিবিদ্বেষ ও বর্ণবাদ।
একইভাবে, কোনো বাঙালি যদি অপরাধ করেও থাকে, আধুনিক আইনব্যবস্থার ন্যূনতম মানদণ্ড হলো—অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া, প্রমাণ যাচাই করা, এবং একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা। কিন্তু একজনের অপরাধের অজুহাতে পুরো জাতির বিরুদ্ধে হত্যা/ধর্ষণ/আক্রমণের হুমকি বা নির্দেশ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উদাহরণ হিসেবে যদি কেউ বলে, “শেখ হাসিনা চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাই বাঙালি পুরুষদের হত্যা করো এবং তাদের স্ত্রী-কন্যাদের গনিমতের মাল বানাও”—তবে সেটি হবে মানবতার চরম অবমাননা এবং সমষ্টিগত শাস্তির উন্মত্ত প্রকাশ। একই নীতি সব পরিচয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য: কোনো মুসলমান যদি জঙ্গি হয়, তার জন্য ঢালাওভাবে সব মুসলমানকে হত্যার কথা বলা যায় না। কোনো রোহিঙ্গা যদি অপরাধ করে, তার জন্য গোটা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে “জন্মগত অপরাধী” বলে চিহ্নিত করা যায় না। কেউ যদি বলে, “রোহিঙ্গারা সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী—তাই তাদের হত্যা করা উচিত”—এটি হবে বর্ণবাদী উসকানি, এবং সামাজিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক অপরাধ।
এই নীতির ব্যাপ্তি আরও বড়: ইহুদি, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, আহমদিয়া, শিয়া, সুন্নি, নাস্তিক, আস্তিক—যে কোনো ধর্মীয়/মতাদর্শিক পরিচয়; সমকামী/বিষমকামী—যে কোনো যৌন পরিচয়; নারী/পুরুষ—যে কোনো লিঙ্গপরিচয়—কোনো ক্ষেত্রেই কেবল পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে হত্যা করতে বলা যায় না। ধরুন, আমার এক খ্রিস্টান বন্ধু আমার টাকা ধার নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না—এটি একটি ব্যক্তিগত আর্থিক বিরোধ। এর জন্য আমি বলতে পারি না, “খ্রিস্টানরা খারাপ—তাদের হত্যা করো”। এমন বক্তব্য ব্যক্তি-অপরাধকে গোষ্ঠী-অপরাধ বানিয়ে ফেলে—যা সরাসরি সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, উসকানি, এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো ব্যক্তি বা কিছু ব্যক্তির অপরাধকে কেন্দ্র করে ধর্ম/জাতি/গোত্র/সম্প্রদায় ধরে একটি পুরো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেওয়া, তাদের ‘নিচু’ বা ‘অপবিত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা, নির্যাতনকে ন্যায্যতা দেওয়া, কিংবা উচ্ছেদের দাবি তোলা—এসবই জাতিবিদ্বেষের ধ্রুপদি উদাহরণ।
এখন নিচের হাদিসটি আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে উদ্ধৃত করছি: কোনো ধর্মীয় পাঠ যদি “পরিচয়ের ভিত্তিতে” সমষ্টিগত হত্যাকে ভবিষ্যৎ-আকাঙ্ক্ষা বা নৈতিক কর্তব্য হিসেবে কল্পনা করতে শেখায়, তাহলে তা সামাজিক বাস্তবতায় বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। অর্থাৎ এখানে আলোচনার প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই ধরনের ভাষ্য কি মানুষের মধ্যে ‘গোষ্ঠীগত ঘৃণা’কে উর্বর করে, এবং সেই ঘৃণা কীভাবে বাস্তব জীবনে উসকানিতে রূপ নেয়? [12]
রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন)
১৮/ বিবিধ চিত্তকর্ষী হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
তাওহীদ পাবলিকেশন নাম্বারঃ ১৮২৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮২০
১৩/১৮২৯। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ’’কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যে পর্যন্ত মুসলিমরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করবে। এমনকি ইহুদী পাথর ও গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলে পাথর ও গাছ বলবে ’হে মুসলিম! আমার পিছনে ইহুদী রয়েছে। এসো, ওকে হত্যা কর।’ কিন্তু গারক্বাদ গাছ [এরূপ বলবে] না। কেননা এটা ইহুদীদের গাছ।’’ (বুখারী-মুসলিম) [1]
[1] সহীহুল বুখারী ২৯২৬, মুসলিম ১৫৭, ২৯২২, আহমাদ ৮৯২১, ১০৪৭৬, ২০৫০২
(370)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমসাময়িক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। দেশে বহু ইসলামি বক্তৃতা/ওয়াজে প্রায় নিয়মিতভাবে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক ভাষা, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, কিংবা পরিচয়-ভিত্তিক শত্রু নির্মাণ দেখা যায়—এবং এই ভাষ্য কেবল বক্তার মধ্যে সীমিত থাকে না; শ্রোতাদের একটি অংশের বিশ্বাস-গঠনের ভেতরেও তা ঢুকে পড়ে। প্রশ্ন হলো: এসব বক্তব্য কেন ও কীভাবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে? ধর্মীয় কর্তৃত্ব, “পবিত্রতা”র দাবি, এবং শত্রু-পরিচয় তৈরির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব—এই তিনটি উপাদান কীভাবে একত্রে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি –
নবী মুহাম্মদের ইহুদি উচ্ছেদের পরিকল্পনা
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বিতাড়ন, কিংবা জোরপূর্বক স্থানান্তর—মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। আধুনিক যুগেও আমরা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন ও বাস্তুচ্যুতি, ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘস্থায়ী উচ্ছেদ/অধিকারহানি, কাশ্মীর প্রশ্নে জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতা—ইত্যাদি নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হই। এসব ঘটনায় একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রায়ই দেখা যায়: ক্ষমতাধর পক্ষ অস্ত্র, আইন, প্রশাসন ও প্রচারণাকে একত্রে ব্যবহার করে “অন্য” হিসেবে চিহ্নিত একটি জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখিয়ে, কোণঠাসা করে, এবং শেষ পর্যন্ত ভূমি-অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এই প্রক্রিয়া মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক—কারণ উচ্ছেদ মানে শুধু ঘরবাড়ি হারানো নয়; স্মৃতি, জীবিকা, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা—সব কিছুর ওপর একযোগে আঘাত। বাংলাদেশের ইতিহাসেও (বিশেষত ১৯৪৭–এর পর এবং ১৯৭১–কে কেন্দ্র করে) সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ভীতি ও বৈষম্যের কারণে বহু হিন্দু পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার বাস্তবতার কথা অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং প্রশ্নটি কেবল অতীতের নয়—এটি একটি সার্বজনীন নৈতিক প্রশ্ন: ধর্মীয় পরিচয়ের নামে উচ্ছেদ ও নির্মূল কি কোনো শিক্ষার “বৈধ” অংশ হতে পারে?
এই প্রশ্নকে নবী মুহাম্মদের জীবনের প্রেক্ষাপটে আনলে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সামনে আসে। মক্কায় ধর্মপ্রচার শুরু করার সময় মুহাম্মদের অনুসারী ছিল সীমিত; রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামরিক শক্তি—কোনোটাই তখন তার হাতে ছিল না। ফলে সে পর্যায়ে সংঘাত ব্যবস্থাপনা ছিল মূলত সামাজিক প্রতিরোধ, বয়কট, এবং দমন-পীড়নের মধ্যে আবর্তিত। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পরে ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে শুরু করে। রাজনৈতিক জোট, সামরিক সংগঠন, এবং অর্থনৈতিক সম্পদ—এই তিনটি উপাদান ধীরে ধীরে কেন্দ্রিভূত হতে থাকে। সীরাত-ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোতে দেখা যায়, এই সময়ে বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ, সম্পদ অধিগ্রহণ, এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত)–এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়—যা আবার সামরিক শক্তি তৈরিতে সহায়ক হয়। একইসঙ্গে, মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে প্রথমদিকে যে ধরনের রাজনৈতিক সহাবস্থানের ভাষ্য পাওয়া যায়, তা সময়ের সঙ্গে সংঘাতের দিকে গড়ায়; এবং পর্যায়ক্রমে এই গোত্রগুলোকে চাপে রাখা, অবরোধ, উচ্ছেদ বা নির্মূল—এই ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠে।
এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি কেবল “একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া” হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা-সংহতি ও রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবেও পাঠ করা যায়। অর্থাৎ ‘মদিনা’কে এমন একটি কেন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করা—যেখানে বিরোধী বা “অবাঞ্ছিত” পরিচয় ধীরে ধীরে নির্মূল হবে, এবং ক্ষমতার বৈধতার একচেটিয়া উৎস হবে একটিমাত্র রাজনৈতিক-ধর্মীয় পরিচয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ভাষ্য হাদিসে পাওয়া যায়—এখানে সেগুলোকে তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, রিরাইট নয়: [13] [14]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৯/ মদীনার ফাযীলাত
পরিচ্ছেদঃ ২৯/২. মদীনার ফযীলত। মদীনাহ (অবাঞ্ছিত) লোকজনকে বহিষ্কার করে দেয়।
১৮৭১. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এমন এক জনপদে হিজরত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যে জনপদ অন্য সকল জনপদের উপর জয়ী হবে। লোকেরা তাকে ইয়াসরিব বলে থাকে। এ হল মদিনা। তা অবাঞ্ছিত লোকদেরকে এমনভাবে বহিষ্কার করে দেয়, যেমনভাবে কামারের অগ্নিচুলা লোহার মরিচা দূর করে দেয়। (মুসলিম ১৫/৮৮, হাঃ ১৩৮২, আহমাদ ৮৯৯৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৭৪৭ )
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ (হজ্জ/হজ)
পরিচ্ছেদঃ ৮৫. মদীনা নিজের মধ্য থেকে নিকৃষ্ট জিনিস বের করে দিবে এবং মদীনার অপর নাম ‘তাবা’ ও ‘তায়বা’
৩২২৩। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এমন একটি জনপদে (হিজরতের) জন্য আদিষ্ট যা সমস্ত জনপদ খেয়ে ফেলবে (আধিপত্য বিস্তার করবে)। লোকেরা তাকে ইয়াসরীব নামে অভিহিত করেছে। আর এটা হল মদিনা। তা লোকদের এমনভাবে বের করবে যেমনিভাবে হাপর লোহার ময়লা বের করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো—বিভিন্ন সহিহ হাদিসের ভাষ্যে আরব উপদ্বীপকে “শুধু মুসলিমের জন্য” রেখে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা/নির্দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ লক্ষ্যটি কেবল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং একটি ভূখণ্ডকে ধর্মীয়ভাবে একরঙা করা—যেখানে মুসলিম ব্যতীত অন্য পরিচয়ের উপস্থিতি “অবাঞ্ছিত” হিসেবে ধরা হবে। এই বক্তব্যগুলো কৌশলগতভাবে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এমন একটি নীতি থাকলে বাস্তবায়নের জন্য ‘অজুহাত’ তৈরির প্রণোদনাও তৈরি হয়ঃ চুক্তিভঙ্গ, ষড়যন্ত্র, রাষ্ট্রদ্রোহ—এই ধরনের অভিযোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নৈতিকভাবে অমানবিকীকরণ (Dehumanize) করে দেখানো সহজ হয়, এবং উচ্ছেদ/হত্যাকে “শাস্তি” হিসেবে উপস্থাপন করা যায় [15] [16]।
সুনানে ইবনে মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ৯. ঈমানের বিবরণ
১৪/৭১। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্র রাসূল এবং তারা সালাত কায়িম করে এবং যাকাত দেয়।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: বুখারী ১৪০০, ২৯৪৬, ৬৯২৪, ৭২৮৫; মুসলিম ২০, ২১/১-৩; তিরমিযী ২৬০৬-৭, নাসায়ী ২৪৪৩, ৩০৯০-৯৩, ৩০৯৫, ৩৯৭০-৭৮; আবূ দাঊদ ২৬৪০, আহমাদ ৬৮, ১১৮, ৩৩৭, ২৭৩৮০, ৮৩৩৯, ৮৬৮৭, ৯১৯০, ২৭২১৪, ৯৮০২, ২৭২৮৪, ১০১৪০, ১০৪৪১, ১০৪৫৯।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ মুতাওয়াত্বির। তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৪০৭। উক্ত হাদিসের রাবী আবু জা’ফার সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, মুগীরাহ থেকে হাদিস বর্ণনায় সংমিশ্রণ করেছেন। আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, হাদিস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য নন। বু হাতিম আর-রাযী ও আলী ইবনুল মাদীনী এবং ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, তিনি সিকাহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৮. লোকেদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ যতক্ষণ না তারা স্বীকার করে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সালাত কায়িম করে, যাকাত দেয়, নাবী যে শারীআতের বিধান এনেছেন তার প্রতি ঈমান আনে, যে ব্যক্তি এসব করবে সে তার জান মালের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে শারীআত সম্মত কারণ ব্যতীত, তার অন্তরের খবর আল্লাহর কাছে; যে ব্যক্তি যাকাত দিতে ও ইসলামের অন্যান্য বিধান পালন করতে অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইমামের গুরুত্বারোপ করার নির্দেশ।
৩৭-(৩৭/২৩) সুওয়াইদ ইবনু সাঈদ আবূ উমর (রহঃ) ….. আবূ মালিক তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, এ কথা স্বীকার করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য উপাস্যকে অস্বীকার করে, তার জান-মাল নিরাপদ? আর তার হিসাব নিকাশ আল্লাহর নিকট। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মালিক আল আশ্‘আরী (রাঃ)
এই ধরনের ভাষ্য থেকে প্রবন্ধের আলোচ্য যুক্তি দাঁড়ায়ঃ মুহাম্মদের সামরিক-রাজনৈতিক লক্ষ্য যদি হয়—অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, এবং একইসঙ্গে আরব উপদ্বীপে মুসলিম ব্যতীত অন্য সম্প্রদায়কে স্থায়ীভাবে না থাকতে দেওয়া—তাহলে মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা ‘ইন্সিডেন্ট’ হিসেবে দেখানো কঠিন হয়। বরং এগুলোকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা যায়—যেখানে ফলাফল তিন স্তরে দাঁড়ায়: (১) ইসলাম গ্রহণ, (২) অধীনতা/কর (জিজিয়া)–জাতীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নতজানু অবস্থান, অথবা (৩) হত্যা/উচ্ছেদ। এই প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক লিংকটি অপরিবর্তিত থাকবে: [17]।
এবারে আসুন প্রাসঙ্গিক হাদিসগুলো পড়া যাক, [18] [19] [20]।
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার
৪৪৪২। যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার করবো। পরিশেষে মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেয়া
৪৪৮৬-(৬৩/১৭৬৭) যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) ….. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্ৰীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেবো। তারপর মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৪)
যুহায়র ইবনু হারব ও সালামাহ্ ইবনু শাবীব (রহঃ) ….. উভয়েই আবূ যুবায়র (রহঃ) থেকে এ সানাদে অনুরূপ বর্ণনা করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৪৩. আরব উপদ্বীপ হতে ইয়াহুদী-নাসারাদের বের করে দেওয়া প্রসঙ্গে
১৬০৭। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ আমি ইহুদী ও নাসারাদের আরব উপদ্বীপ হতে অবশ্যই বহিষ্কার করব। মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে সেখানে বসবাস করতে দিব না।
সহীহ, সহীহা (১১৩৪), সহীহ আবূ দাউদ, মুসলিম
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানেই যৌক্তিক প্রশ্ন ওঠেঃ যখন কোনো নীতিতে ঘোষণা থাকে যে, একটি ভূখণ্ডে “মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না”—তখন বাস্তবায়নের জন্য অপর পক্ষকে পর্যায়ক্রমে কোণঠাসা করা, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগকে “চূড়ান্ত” রূপ দেওয়া, এবং শেষে উচ্ছেদ/নিধনের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি অনুমেয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। বনু কুরাইজার ঘটনাকে এই পটভূমিতে বসালে দেখা যায়, ‘চুক্তিভঙ্গ’–জাতীয় অভিযোগটি কেবল একটি সামরিক অভিযোগ নয়; বরং একটি বৃহত্তর লক্ষ্য—ভূখণ্ডকে একচেটিয়া পরিচয়ে রূপান্তর—এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ন্যারেটিভ টুল হিসেবেও কাজ করে।
সবশেষে, “যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ স্বীকার না করবে, ততক্ষণ কিতাল- যুদ্ধ”—জাতীয় নির্দেশবাক্যগুলো এই প্রকল্পের নৈতিক ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এগুলোকে যদি কেবল ‘ধর্মতাত্ত্বিক বাক্য’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে রাজনৈতিক ফলাফল আড়াল হয়ে যায়; কিন্তু যদি এগুলোকে রাষ্ট্র-গঠন ও ভূখণ্ড-অধিপত্যের ভাষ্য হিসেবে দেখা হয়, তাহলে উচ্ছেদ-নিধনের ঘটনাগুলো আর ‘ব্যতিক্রম’ থাকে না—বরং নীতির একটি পরিণতি হয়ে ওঠে। এই অংশে হাদিসগুলো অপরিবর্তিত থাকবে: [21] [22]।
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১. যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করতে আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি
২৬০৭। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পর আবূ বকর (রাযিঃ) যখন খলীফা নির্বাচিত হন, তখন আরবের কিছু সংখ্যক লোক কাফির হয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে কিভাবে অস্ত্ৰধারণ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যে পর্যন্ত না “আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” এই কথার স্বীকৃতি দিবে সেই পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। আর যে ব্যক্তি বললো, “আল্লাহ ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” সে আমার থেকে তার মাল ও রক্ত (জীবন) নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের অধিকার সম্পর্কে ভিন্ন কথা। আর তাদের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ রয়েছে আল্লাহ তা’আলার দায়িত্বে।
আবূ বকর (রাযিঃ) বললেনঃ আল্লাহর শপথ নামায ও যাকাতের মধ্যে যে ব্যক্তি পার্থক্য করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। কেননা যাকাত সম্পদের হাক্ক। কেউ উটের একটি রশি দিতেও যদি অস্বীকার করে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দিত, আল্লাহর কসম! আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। তারপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দেখতে পেলাম আল্লাহ যেন যুদ্ধের জন্য আবূ বাকরের অন্তর উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
সহীহঃ সহীহাহ (৪০৭), সহীহ আবূ দাউদ (১৩৯১-১৩৯৩), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ। শু’আইব ইবনু আবী হামযা (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস মামার-যুহরী হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে, তিনি আবূ বাকর (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে ইমরান আল-কাত্তান বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাটি ভুল। ‘ইমরানের ব্যাপারে মা’মার হতে বর্ণিত বর্ণনাতে বিরোধিতা করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ২. আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং নামায আদায় করবে
২৬০৮। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও তার রাসূল এবং আমাদের কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করবে, আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাবে এবং আমাদের মতো নামায আদায় করবে। তারা এগুলো করলে তাদের জান ও মালে হস্তক্ষেপ করা আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলামের অধিকারের বিষয়টি ভিন্ন। মুসলিমদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা তারাও পাবে এবং মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়-দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তাবে।
সহীহঃ সহীহাহ (৩০৩) ও (১/১৫২), সহীহ আবূ দাউদ (২৩৭৪), বুখারী অনুরূপ।
মুআয ইবনু জাবাল ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এই অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ এবং উপরোক্ত সূত্রে গারীব। ইয়াহইয়া (রাহঃ) হুমাইদ হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বদর-যুদ্ধ জয়ঃ মুসলিমদের পক্ষে থেকে ইহুদীদের হুমকি
বদর যুদ্ধে জয়লাভের পরে মুসলিম যোদ্ধাগণ ইহুদিদের নানারকম ভয়ভীতি দেখাতো, হুমকিধামকি দিতো। বলতো যে, ইসলাম কবুল না করলে ঐ ইহুদিদেরও একই অবস্থা হবে। আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে দেখে নেয়া যাক [23]
ইব্ন জারীর (র). ..যুহরী (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, যুহরী (র) বলেন :যখন বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় ঘটে, তখন মুসলমানরা তাহাদের ইয়াহূদী বন্ধুদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাইয়া বলেন যে, বদরের মত বিপর্যয় তোমাদের ভাগ্যেও ঘটিবে। উহার উত্তরে ইয়াহূদী নেতা মালিক ইব্ন সাইফ বলে যে, যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কতক কুরায়শদের উপর বিজয় লাভ করিয়া অহংকারে মাতিয়া উঠিও না। যদি কখনো আমাদের সহিত তোমাদের যুদ্ধ হয়, তখন যুদ্ধ কাহাকে বলে দেখিবে। তখন উবাদা ইবনে সামিত (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আসিয়া বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের ইয়াহূদী বন্ধুদের অন্তর বড় কঠিন। যদিও তাহাদের অস্ত্র শানিত এবং তাহারা যুদ্ধবাজ, তবুও আমি তাহাদের বন্ধুত্ব ছিন্ন করিয়া আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করিতেছি। এখন হইতে একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলই আমার প্রকৃত বন্ধু । তখন আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই বলে, আমি ইয়াহুদীর সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিব না । আমি ভাবিয়া কাজ করি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হে আবুল হুবাব! তুমি ইয়াহূদীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত রাখিয়া উবাদা হইতে নিচে নামিয়া গিয়াছে। অথচ তোমারও ইহা করা উচিত! এই কথোপকথনের প্রেক্ষিতে নাযিল হইল :

বনু কায়নুকার ঘটনাঃ মুসলিম নারীকে লাঞ্ছনার অভিযোগ
নবী মুহাম্মদ এর নতুন ধর্মটি যারা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল, বিশেষ করে মদিনার আশেপাশের কয়েকটি ইহুদি গোত্র, সেগুলোর একটি গোত্রের নাম ছিল বনু কায়নুকা। বনু কুরাইজা গোত্রে আক্রমণের আগে বেশ কিছুদিন ধরেই অজুহাত খুঁজছিলেন, একটি বড় ধরণের গণহত্যা চালাবার, যাতে তিনি ঐ অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেন এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপে যেন তার নাম আতঙ্ক হয়ে ছড়িয়ে যায়। তার অংশ হিসেবেই তিনি বেশ কয়েকটি ইহুদি গোত্রকে আক্রমণ করেন, উচ্ছেদ এবং বিতাড়িত করেন। এই বিষয়ে আলোচনার আগে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সম্পর্কে বলে নেয়া জরুরি। উবাই ছিলেন বনু খাজরাজ গোত্রের প্রধান এবং মদিনার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যিনি গোত্রে গোত্রে শত্রুতা মেটানোর জন্য তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। মূলত নবী মুহাম্মদকে মদিনায় আমন্ত্রণই জানানো হয়েছিল ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে চলে আসা দ্বন্দ্ব সংঘাত যেন থামানো যায়, সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখে। কিন্তু নবী মুহাম্মদের মদিনায় আগমনে আবারো গোত্রে গোত্রে শত্রুতা বৃদ্ধি পায়। আর এই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলেন নানাভাবে ইহুদিদের সাথে সম্পর্কিত। ইসলামের ইতিহাসে তাকে একজন মুনাফিক (ভণ্ড, প্রতারক) এবং মুনাফিকদের সর্দার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
ইহুদিদের বনু কাইনুকা গোত্র ছিল পেশায় কর্মকার, স্বর্ণকার ও তৈজসপত্র নির্মাতা। বদর যুদ্ধের কিছুদিন পর তাদের বাজারে এক মুসলিম মেয়ে এক ইহুদি স্বর্ণের দোকানে একটি কাজে গিয়েছিল। ঐ মুসলিম মহিলা যখন ঐ দোকানে গিয়েছিলেন তখন ঐ ইহুদি কর্মচারী মুসলিম মহিলাটির মুখ খুলতে বলে। কিন্তু মহিলাটি তার মুখ খুলতে রাজি না হওয়ায় মহিলাটি যখন স্বর্ণের দোকানের একটি চেয়ারে বসে, তখন ইহুদি কর্মচারীটি ওই মহিলার পোশাকে পেরেক মেরে চেয়ারের সাথে আটকে দেয়, ফলে উঠতে গিয়ে ঐ মহিলার জামা ছিঁড়ে সারা শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। মুসলিম মহিলার আর্তনাদ শুনে এক মুসলিম পথচারী এটা দেখে খেপে গিয়ে ঐ ইহুদি কর্মচারীকে হত্যা করেন, এরপর ইহুদি কর্মচারীর পক্ষের কয়েকজন ইহুদি মিলে ঐ মুসলমানকে হত্যা করে ফেলে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নবী মুহাম্মদ বনু কায়নুকা গোত্র আক্রমণ করেন। তার ইচ্ছে ছিল, এই অজুহাতে সমস্ত বনু কায়নুকা গোত্রকেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলবেন। কিন্তু ঐ অপরাধটি যারা করেছে, তারা ছাড়া অন্যদের ওপর এই অপরাধের দায় চাপানো কতটা মানবিক ও যৌক্তিক, নাকি নৃশংসা এক যুদ্ধনেতার গণহত্যা চালাবার অজুহাত, তা পাঠকই সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু একজন মানবিক মানুষ মাত্রই বুঝবেন, কোন অপরাধ ঘটে থাকলে সেই অপরাধীদের চিহ্নিত করা, তাদের যথাযোগ্য শাস্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু কিছু মানুষের অপরাধে গোটা গোত্রের ওপর নিধনযজ্ঞ, নারী শিশুদের গনিমতের মাল বানানো, সম্পত্তি সব দখল করা, এগুলো বড় ধরনের অন্যায় এবং অন্যায্য কাজ।
৬২৪ খ্রিস্টাব্দে নবী মুহাম্মদ ইহুদি গোত্র বানী কাইনুকার উপরে ১৫ দিন ব্যাপী একটি অবরোধ চালিয়েছিলেন। উপায় না দেখে বনু কাইনুকা গোত্রটি নিঃশর্তভাবে মুহাম্মদের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। মুহাম্মদ সেই গোত্রের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের শিরশ্ছেদ করে তাদের নারী ও শিশুদের দাস বানাতে চেয়েছিলেন, যেন সমস্ত আরব উপদ্বীপে ত্রাস সৃষ্টি করা যায়। বনু কায়নূকার ঘটনার সময় মদিনার শক্তিশালী স্থানীয় নেতা ছিলেন খাজরাজ বংশের প্রধান আবদুল্লাহ বিন উবাই। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং মুহাম্মদের হিজরতের সময় মদিনার নেতা। মুহম্মদের উত্থানের সাথে তার প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। বনু কায়নুকার অবরোধের সময় আবদুল্লাহ বিন উবাই মুহাম্মদের গণহত্যার ইচ্ছেটি বুঝতে পারেন, এবং রক্তপিপাসু এই নবীকে জামার কলার ধরে এই গণহত্যা থেকে নিবৃত করেন। মুহাম্মদ রেগেমেগে প্রায় কালো হয়ে যান, কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাই প্রায় জোর করেই মুহাম্মদকে বাধ্য করেন, যেন বনু কায়নুকাকে মুহাম্মদ নৃশংসভাবে জবাই করতে না পারে। এর থেকে বোঝা যায়, নবী মুহাম্মদের ইচ্ছে ছিল, বনু কায়নুকার সমস্ত পুরুষকে হত্যা করা এবং মেয়ে ও শিশুদের গনিমতের মাল বানানো। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ইবনে হিশামের সীরাত গ্রন্থ থেকেই [24] [25] –
আসিম ইবনে উমর ইবনে কাতাদার ভাষ্য অনুযায়ী ইহুদিদের মধ্যে বনু কায়নুকা প্রথম রাসুলের(সা.) সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সেটি ঘটে বদর ও উহুদের মধ্যবর্তী সময়ে। রাসুল(সা.) তাদের অবরোধ করেন ও তারা আত্মসমর্পণ করে। আল্লাহ রাসুলকে (সা.) এমনি করে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাঁর কাছে গিয়ে বলেছিল, ‘আমার লোকজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন, হে মুহাম্মদ।’
রাসুল(সা.) তাকে পাত্তা দিলেন না। লোকটা আবার একই অনুরোধ করল। রাসুল(সা.) মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তখন লোকটা রাসুলের(সা.) কোর্তার কলার চেপে ধরল। রাগে রাসুলের(সা.) চেহারা কালো হয়ে গেল।
তিনি বললেন, ‘ছাড়ো বলছি, যেতে দাও আমাকে।’
‘না, আল্লাহর কসম, যেতে দেব না, আগে বলুন তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন, চার শ লোকের বর্ম নেই, তিনজন বর্মধারী, আমাকে আমার সব দুশমনের হাত থেকে রক্ষা করেছে। এক সকালে সবাইকে কেটে ফেলবেন আপনি?’
রাসুল(সা.) বললেন, “ঠিক আছে, আপনি নিয়ে যান ওদের।“


সিরাতে ইবনে হিশাম [26] গ্রন্থে এই বর্ণনাটি একটি ভিন্নভাবে পাওয়া যায় –
ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অবরোধ করে অনুকূল শর্তে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। এভাবে আল্লাহর সাহায্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নতজানু করলে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল তাঁর কাছে এসে বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি সহৃদয় আচরণ করুন।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ কথার কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের সাথে সদয় আচরণ করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এবার সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্মের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলে তিনি বললেন, “আমাকে ছাড়।” এই সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত ক্রুদ্ধ হন যে, তাঁর মুখমণ্ডল রক্তিম হয়ে যায়। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, “আরে আমাকে ছাড় তো! ” সে বললো, “না, আমার মিত্রদের সাথে সদয় আচরণের নিশ্চয়তা আগে দিন, তারপর ছাড়বো। বিশ্বাস করুন, চারশো নাঙ্গামাথা যোদ্ধা এবং তিনশো বর্মধারী যোদ্ধা আমাকে সারা দুনিয়ার মানুষ থেকে নিরাপদ করে দিয়েছে। আর আপনি কিনা একদিনেই তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছেন। আমি তাদের ছাড়া এক মুহূর্তও নিরাপদ নই”। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আচ্ছা, বেশ। ওদেরকে তোমার মর্জির ওপর ছেড়ে দিলাম।”

ইসলামের ইতিহাসে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই একজন অত্যন্ত ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত আছে। কিন্তু যেই কাজের জন্য উবাইকে মুসলিমগণ আজ পর্যন্ত ঘৃণা করে, সেটি কিন্তু ছিল খুব মানবিক একটি কাজ। নবীর সামনে দাঁড়িয়ে নবীর একটি গণহত্যার বিরোধিতা করা এবং নবীকে গণহত্যা বন্ধ করতে থামানো সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু ফলাফল হিসেবে তার ভাগ্যে জোটে মুনাফিকদের সর্দার নাম [27] –

উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, নবী মুহাম্মদ আসলে বনু কায়নুকা গোত্রের সকল পুরুষকে হত্যা করে তাদের জায়গাজমি দখল, নারী ও শিশুদের দাস বানাবার পরিকল্পনাই করেছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কারণে মুহাম্মদের এই ইচ্ছাটি অপূর্ণই থেকে যায়। কিন্তু বনু কুরাইজা গোত্রের সময় তিনি আর ভুল করেন নি। তিনি দায়িত্ব এমন একজনকেই দিয়েছিলেন, যিনি আগে থেকেই বনু কুরাইজার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। যার প্রমাণ আমরা কিছুক্ষণ পরেই পাবো।
ইহুদিদের জমির মালিক আল্লাহ ও তার রাসুল
এবারে আমরা কয়েকটি হাদিস পড়বো, যেখানে খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, ইহুদিদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য রীতিমত ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন নবী মুহাম্মদ। এই হাদিস-বর্ণনাগুলোর ভাষা ও কাঠামোকে যেভাবে আছে সেভাবেই নিলে, বাড়তি এড হক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ “ইনিয়ে বিনিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা”-গুল বাদ দিয়ে সরল অর্থে নিলে, এগুলোকে কোনভাবেই “ধর্মের দাওয়াত” বা ” সত্য ধর্মের প্রচার” বা “নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া বা বোঝানো” হিসেবে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব; বরঞ্চ এসব হাদিসে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, এখানে ধর্মীয় আনুগত্যকে নিরাপত্তা-শর্ত বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আলটিমেটাম দেওয়া হচ্ছে। “ইসলাম কবুল করো—নিরাপদ থাকবে”—এই বাক্যটি নিজেই conditional protection-এর ঘোষণা: অর্থাৎ নিরাপত্তা কোনো সার্বজনীন অধিকার নয়, বরং বিশ্বাস বদলালে, ইসলামে দাখিল হলে তবেই প্রাপ্য। এবং সেটি একই নিঃশ্বাসে পরিণত হচ্ছে উচ্ছেদ-হুমকিতে—“আমি তোমাদের এ এলাকা থেকে উচ্ছেদ করতে চাই… যমীন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের”—যা কার্যত শত শত বছর ধরে বসবাস করা কোন জনোগোষ্ঠির ভূমির-অধিকারকে বাতিল করে জোরপূর্বক স্থানচ্যুতির বৈধতা নির্মাণ। এখানে “অপরাধ”-এর শাস্তি হলে ন্যূনতম যে কাঠামো দরকার—নির্দিষ্ট অভিযোগ, ব্যক্তিগত দায় নিরূপণ, প্রমাণ-ভিত্তিক বিচার, এবং অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দণ্ড—তার কিছুই নেই। বরং দেখা যাচ্ছে collective coercion: একটি গোটা জনগোষ্ঠীর সামনে দুই বিকল্প—(ক) বিশ্বাস বদলাও, (খ) ভূমি ছাড়ো। ফলে এটি কোনো “শাস্তিমূলক ন্যায়” হিসেবে চালিয়ে দেয়া অসম্ভব; এটি নিপীড়নমূলক অনুগত্য-উৎপাদন (obedience through threat)। [28] [29]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৫/ কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারন
পরিচ্ছেদঃ ৩০৯২. মহান আল্লাহর বাণীঃ মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয় (১৮ঃ ৫৪)। মহান আল্লাহর বাণীঃ তোমরা কিতাবীদের সাথে বিতর্ক করবে না………. (২৯ঃ ৪৬)
৬৮৪৭। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা মসজিদে নববীতে ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ থেকে বের হয়ে আমাদেরকে বললেনঃ তোমরা চলো ইহুদীদের সেখানে যাই। আমরা তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। অবশেষে আমরা বায়তুল মিদরাসে (তাদের শিক্ষাগারে) পৌছলাম। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দাঁড়িয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম কবুল কর, এতে তোমরা নিরাপদে থাকবে। ইহুদীরা বলল, হে আবূল কাসিম! আপনার পৌছানোর দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন। এরপর তিনি বললেনঃ আমার ইচ্ছা তোমরা ইসলাম কবুল কর এবং শান্তিতে থাক। তারাও আবার বলল, হে আবূল কাসিম! আপনার পৌছানোর দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেনঃ আমি এরূপই ইচ্ছা রাখি। তৃতীয়বারেও তিনি তাই বললেন। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জেনে রেখো, যমীন একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুলের। আমি তোমাদেরকে এই এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে দিতে চাই। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাদের অস্থাবর সম্পত্তি আছে, তা যেন সে বিক্রি করে দেয়। অন্যথায় জেনে রেখো যমীন আল্লাহ ও তার রাসুলের।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ১৪/ কর, ফাই ও প্রশাসক
৩০০৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমরা মাসজিদে উপস্থিত ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বেরিয়ে এসে বললেনঃ ইয়াহুদীদের এলাকায় চলো। ‘আমরা তাঁর সাথে বের য়ে সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম কবূল করো শান্তিতে থাকবে। তারা বললো, হে আবুল কাসিম! আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আবার বললেনঃ তোমরা ইসলাম কবূল করো, নিরাপত্তা পাবে। তারা বললো, হে আবুল কাসিম! আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেনঃ এ দাওয়াত পৌঁছে দেয়াই আমার উদ্দেশ্য ছিলো। তৃতীয় বারও তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বললেনঃ জেনে রাখো! এ ভুখন্ডের মালিকানা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। আমি তোমাদের এ ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করতে চাই। সুতরাং তোমরা কোনো জিনিস বিক্রি করতে সক্ষম হলে বিক্রি করো। অন্যথায় জেনে রাখো! এ ভূখন্ডের মালিক আল্লাহ ও তাঁর রাসূল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই চাপ-পরিকাঠামোর সামাজিক স্তরটিও একইসুরে চলে: পথে দেখা হলে “রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিও”—জাতীয় নির্দেশ শুধু আচরণবিধি নয়, বরং মর্যাদা-হ্রাসকে নীতিতে রূপ দেওয়া; অর্থাৎ সহাবস্থানের ন্যূনতম সমতার বদলে কর্তৃত্বের প্রদর্শন। যুক্তির দিক থেকে তাই “এটা তৎকালীন রাজনীতি/যুদ্ধপরিস্থিতি” বললেও মূল সত্য বদলায় না: রাজনীতি থাকুক বা না থাকুক, এখানে যে মডেলটি দাঁড়ায় তা হলো—ধর্ম গ্রহণ = নিরাপত্তা, ধর্ম না গ্রহণ = উচ্ছেদ/অপমানজনক শৃঙ্খলা। একে নৈতিক দাওয়াত হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতার ভাষায় ‘মানো, নইলে ক্ষতি’—গ্যাংস্টার/মাফিয়া-ধাঁচের আলটিমেটামের একটি রাষ্ট্রীয় সংস্করণ হিসেবেই সবচেয়ে সোজাসাপ্টা ও সৎভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। [30]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছদঃ ৪১. আহলে কিতাবদের সালাম প্রদান প্রসঙ্গে
১৬০২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের প্রথমে সালাম প্রদান করো না। তোমরা রাস্তায় চলাচলের সময় তাদের কারো সাথে দেখা হলে তাকে রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিও।
সহীহ, সহীহা (৭০৪), ইরওয়া (১২৭১), মুসলিম, বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ২৮৫৫ নং হাদীসটির আলোচনা আসবে।
ইবনু উমার, আনাস ও আবূ বাসরা আল-গিফারী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বনু নাদীরের বিতর্ক থেকে পলায়ন ও আক্রমণ
বনু নাদির গোত্রের প্রধানগণ নবী মুহাম্মদ ও তার সাহাবীদের নিমন্ত্রণ করেছিল আলোচনার উদ্দেশ্যে, চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল নবী মুহাম্মদের নবী হওয়ার প্রমাণ দেখাতে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুহাম্মদ যদি ইহুদি আলেমদের সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন, তাহলে বনু নাদীর গোত্রের সবাই ইসলামের সত্যতা বুঝতে পারবে এবং ইসলামকে কবুল করে নিবে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে মুহাম্মদ ৩০ জন সঙ্গী নিয়ে আসবে, অপরদিকে ইহুদিরাও ৩০ জনকে নিয়ে আসবে। নবী সেখানে গেলেন তার সাহাবীগণ সহ। কিন্তু বিতর্ক শুরুর আগেই হঠাৎ তিনি সেখান থেকে উঠে চলে আসলেন, অন্য সবাইকে ফেলে চুপিচুপি, অর্থাৎ কাউকেই কিছু বলে গেলেন না। অন্য সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন, কিন্তু নবীর আর কোন খোঁজ খবর নেই! তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরে আরেকজনার কাছ থেকে শুনলেন নবী মদিনা চলে গেছেন। তারা নবীকে আর কোথাও না পাওয়ায় মদিনা ফিরে আসলেন। ফিরে আসার পরে জানতে পারলেন, নবীকে নাকি জিব্রাইল এসে চুপিচুপি বলেছে, “তারা যেখানে বসে ছিল সেই ঘরের ছাদে কিছু লোক নবীকে হত্যা করার জন্য বসে ছিল।”
কিন্তু সেই লোকগুলো কেন নবীর সাহাবীদের হত্যা করলো না, কেন সাহাবীদের কেউই এরকম কাউকে দেখতে পেলেন না, নবীও বা কাউকে কিছু না বলে একা একা চলে আসলেন কেন, তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। অর্থাৎ এই ইহুদিদের এই গোপন ষড়যন্ত্রের কথা শুধুমাত্র নবী একাই জানেন, যার কোন বাস্তব প্রমাণ নেই। সেইদিন বন্ধু সঙ্গি সাথীদের বিপদের মুখে ফেলে নবীর একা একাই পালিয়ে আসার এই ঘটনাটি কতটা হাস্যকর এবং ইহুদিদের সাথে বিতর্ক এড়াবার কৌশল, তা বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই বুঝবেন। কারণ সত্যিকারের বিপদ যদি নবী আসলেই বুঝে থাকতেন, তিনি নিশ্চয়ই তার সাহাবীদের এই সম্পর্কে অবগত করতেন, একা পালিয়ে আসতেন না। কারণ উপরে বড় পাথর নিয়ে কেউ বসে থাকলে, সেই পাথরের চাপে তো আবি বকর, উমর, আলির মত সাহাবীরাও আহত বা নিহত হতে পারতো।
এর পরদিনই মুহাম্মদের নেতৃত্বে বনু নাদিরের ওপর আক্রমণ চালানো হয় [31] –
রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাদের একটি ঘরের দেয়ালের পাশে বসা ছিলেন। তারা বলল, কে আছে যে, ছাদে উঠে ওখান থেকে একটি পাথর ফেলে দিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে আমাদেরকে তাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি দেবে? আমর ইবন জাহহাশ এগিয়ে এসে বলল, আমি এ জন্যে প্রস্তুত আছ। সে মতে পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে সে স্থানে উঠে । রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখনও সেখানে একদল সাহাবীসহ বসা ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু বকর (রা) উমর (রা) এবং আলী (রা)। ওদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আসমানী সংবাদ এসে যায়। তিনি কাউকে কিছু না বলে উঠে পড়েন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দীর্ঘক্ষণ ঘটনাস্থলে ফিরে না আসায় সাহাবীগণ তাঁর খোঁজে বের হন, মদীনার দিক থেকে আগত এক লোককে দেখে তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা তাকে জিজ্ঞেস করে। সে ব্যক্তি বলেছিল যে, আমি তো তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। এ সংবাদ পেয়ে সাহাবীগণ সকলে মদীনায় ফিরে এলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট সমবেত হলেন। তিনি ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা তাঁদেরকে অবহিত করলেন।

উপরের দলিলে দেখতে পালেন যে, মুহাম্মদ হুট করে তার নবুয়্যতের প্রমাণ না দিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। এবারে আসুন দেখা যাক, এর আগে পরে কী ঘটেছিল [8]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬১. বনূ নযীরের ঘটনা সম্পর্কে।
২৯৯৪. মুহাম্মদ ইবন দাঊদ ইবন সুফইয়ান (রহঃ) ……. আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে,কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তি-পূজক সাথীদের, যারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক, এ মর্মেপত্র লেখে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের আগে মদীনায় অবস্থান করছিলেনঃ তোমরা আমাদের সাথী (মুহাম্মদ) কে জায়গা দিয়েছ। এ জন্য আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি,হয়তো তাঁর সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো তাঁকে বের করে দাও। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের আমাদের দখলে আনব।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তিপূজারী সাথীরা এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগেযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এ খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌছবার পর তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বলেনঃ তোমরা কুরায়শদের নিকট হতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী চিঠি পেয়েছ, কিন্তু তা তোমাদের জন্য এত মারাত্মক নয়, যত না ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করবে। কেননা, তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প করছ।
তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরূপ কথা শুনলো,তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। এ খবর কুরায়শ কাফিরদের কাছে পৌছলে তারাবদর যুদ্ধের পর ইয়াহুদীদের নিকট লিখলোঃ তোমরা ঘরবাড়ী ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধ করা। অন্যথায় আমরা তোমাদের সাথে এরূপ করব, সেরূপ করব।আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা এরূপ চিঠি পেল,তখন বনূ নযীরের ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব।
পরদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর হামলা করেন এবং তাদের অবরোধ করে বলেনঃ আল্লাহ্র শপথ! তোমরা যতক্ষণ অঙ্গীকার না করবে, ততক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তখন তারা (ইয়াহুদীরা) অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে। ফলে তিনি সেদিন তাদের সাথে দিনভর যুদ্ধে রত থাকেন।পরদিন তিনি বনূ নযীরকে বাদ দিয়ে বনূ কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে তারা তাঁর সংগে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তখন তিনি তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বনূ নযীরকে অবরোধ করেন এবং তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করেন, যতক্ষণ না তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
বনূ নযীরের লোকেরা তাদের উটের পিঠে ঘরের দরজা, চৌকাঠ ইত্যাদি যে পরিমাণ মালামাল নেওয়া সম্ভব ছিল, তা নিয়ে যায়। এবার বনূ নযীরের খেজুরের বাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে আসে, যা আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلاَ رِكَابٍ
অর্থাৎ আল্লাহ্ কাফিরদের মাল হতে যে সস্পদ তাঁর রাসূলকে প্রদান করেন, তা হাসিলের জন্য তোমরা তোমাদের ঘোড়া অথবা উট হাঁকাও নি, অর্থাৎ ঐ সম্পদ বিনা যুদ্ধে হাসিল হয়।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মালের অধিকাংশই মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং অভাবগ্রস্ত দু’জন আনসারকে তা হতে অংশ প্রদান করেন। এ দু’জন ছাড়া অন্য আনসার সাহাবীদের মাঝে এ মাল বিতরণ করা হয়নি। অবশিষ্ট মাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদকা স্বরূপ ছিল, যা বনূ ফাতিমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
কোন কারণ ছাড়াই বনু কুরাইজাকে আক্রমণ
উপরের বর্ণিত হাদিসটি এখানে আরও একবার পড়ে দেখতে হবে। পাঠক লক্ষ্য করুন, নবূ মুহাম্মদের সাথে নবু নাদীরের যুদ্ধ চলছিল। এই যুদ্ধের মাঝে একদম হঠাৎ করেই কোন কারণ ছাড়াই বনু কুরাইজাকেও আক্রমণ করে বসা হয়। এই আক্রমণ কেন হয়েছিল? বনু কুরাইজা এই সময়ে কী করেছিল? [32]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬১. বনূ নযীরের ঘটনা সম্পর্কে।
২৯৯৪. মুহাম্মদ ইবন দাঊদ ইবন সুফইয়ান (রহঃ) ……. আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে,কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তি-পূজক সাথীদের, যারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক, এ মর্মেপত্র লেখে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের আগে মদীনায় অবস্থান করছিলেনঃ তোমরা আমাদের সাথী (মুহাম্মদ) কে জায়গা দিয়েছ। এ জন্য আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি,হয়তো তাঁর সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো তাঁকে বের করে দাও। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের আমাদের দখলে আনব।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তিপূজারী সাথীরা এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগেযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এ খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌছবার পর তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বলেনঃ তোমরা কুরায়শদের নিকট হতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী চিঠি পেয়েছ, কিন্তু তা তোমাদের জন্য এত মারাত্মক নয়, যত না ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করবে। কেননা, তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প করছ।
তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরূপ কথা শুনলো,তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। এ খবর কুরায়শ কাফিরদের কাছে পৌছলে তারাবদর যুদ্ধের পর ইয়াহুদীদের নিকট লিখলোঃ তোমরা ঘরবাড়ী ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধ করা। অন্যথায় আমরা তোমাদের সাথে এরূপ করব, সেরূপ করব।আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা এরূপ চিঠি পেল,তখন বনূ নযীরের ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব।
পরদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর হামলা করেন এবং তাদের অবরোধ করে বলেনঃ আল্লাহ্র শপথ! তোমরা যতক্ষণ অঙ্গীকার না করবে, ততক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তখন তারা (ইয়াহুদীরা) অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে। ফলে তিনি সেদিন তাদের সাথে দিনভর যুদ্ধে রত থাকেন।পরদিন তিনি বনূ নযীরকে বাদ দিয়ে বনূ কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে তারা তাঁর সংগে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তখন তিনি তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বনূ নযীরকে অবরোধ করেন এবং তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করেন, যতক্ষণ না তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
বনূ নযীরের লোকেরা তাদের উটের পিঠে ঘরের দরজা, চৌকাঠ ইত্যাদি যে পরিমাণ মালামাল নেওয়া সম্ভব ছিল, তা নিয়ে যায়। এবার বনূ নযীরের খেজুরের বাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে আসে, যা আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلاَ رِكَابٍ
অর্থাৎ আল্লাহ্ কাফিরদের মাল হতে যে সস্পদ তাঁর রাসূলকে প্রদান করেন, তা হাসিলের জন্য তোমরা তোমাদের ঘোড়া অথবা উট হাঁকাও নি, অর্থাৎ ঐ সম্পদ বিনা যুদ্ধে হাসিল হয়।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মালের অধিকাংশই মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং অভাবগ্রস্ত দু’জন আনসারকে তা হতে অংশ প্রদান করেন। এ দু’জন ছাড়া অন্য আনসার সাহাবীদের মাঝে এ মাল বিতরণ করা হয়নি। অবশিষ্ট মাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদকা স্বরূপ ছিল, যা বনূ ফাতিমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
যুদ্ধবন্দী হত্যাই উত্তমঃ কোরআনে আল্লাহর বিধান
কয়েকটি যুদ্ধ হওয়ার পরে নবী মুহাম্মদের হাতে বেশ কিছু যুদ্ধবন্দী আসা শুরু করে। সেই সময়ে একটি বাস্তব পর্যসন উঠেছিল, এই যুদ্ধবন্দীদের সাথে কী করা হবে? এই সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনায় হযরত উমর এবং সা’দ ইবনু মুআয যুদ্ধবন্দীদের জবাই করে ফেলার পক্ষে মত দেন, অন্যরা মুক্তিপণের মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীদের ছেড়ে দেয়ার পক্ষে মত দেন। এই সময়ে আল্লাহর আয়াত নামে, হযরত উমর এবং সা’দ ইবনু মুআযকে সমর্থন করে। এই বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ইসলামিক জিহাদের পরে অমুসলিম যুদ্ধবন্দীদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কীরকম হবে, ইসলামে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়া হয় এই ঘটনার পরে। আসুন সে সম্পর্কে শুরুতেই পড়ি ইবনে কাসীর থেকে, কোরআনের একটি আয়াতের তাফসীরে কী বলা হয়েছে [33] –
তাফসীরঃ উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ পাক কাফিরদের প্রতি তাঁহার ঘৃণা এবং তাহাদের অপকর্মের বর্ণনা দিয়া বলিতেছেন যে, ভূপৃষ্ঠে জীবকুলের মধ্যে বেঈমান কাফিরগণই হইল আল্লাহর নিকট অতি নিকৃষ্ট জীব। উহাদের মধ্যকার যাহাদের সাথে তুমি যখনই কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হও, তখনই উহারা সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে। যখন উহাদিগকে বিশ্বাস করিয়া আস্থা স্থাপন কর, তখন বিশ্বাস ভঙ্গ করিয়া তোমার আস্থা নষ্ট করিয়া ফেলে। উহারা আল্লাহকে আদৌ কোনরূপ ভয়ই করে না। নির্ভয় দাম্ভিকতার সহিত পাপাচারে লিপ্ত হয়। আলোচ্য আয়াতাংশের মর্ম হইলঃ তুমি যদি উহাদের যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া বিজয় লাভ করিতে পার, তবে কঠোরভাবে বন্দী করিয়া জ্বালা-যন্ত্রণা দিবে। এই ব্যাখ্যা প্রদান করেন ইবন আব্বাস (রা)।
হাসান বসরী, যাহহাক, সুদ্দী, আতা খুরাসানী ও ইবন উআয়না (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলেনঃ যুদ্ধে উহাদিগকে পরাস্ত করিতে পারিলে অতি কঠোরভাবে শাস্তি দিবে এবং নির্দয়ভাবে উহাদিগকে হত্যা করিবে যেন ইহাদের ছাড়া আরবের অন্যান্য শত্রুগণ এই শাস্তির কথা শুনিয়া ভীত হয় এবং নসীহত ও শিক্ষা গ্রহণ করে। তাহাদের মধ্যে লজ্জা ও অনুশোচনার সৃষ্টি হয়।

এই বিষয়ে কোরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত নাজিল হয়, যেই আয়াতে খুব পরিষ্কারভাবে আল্লাহ ঘোষণা দিয়ে দেন যে, যুদ্ধের পরে কাফের যুদ্ধবন্দীদের ওপর যথেষ্ট পরিমাণ হত্যাকাণ্ড এবং রক্তপাত ঘটানো না পর্যন্ত তাদেরকে মুক্তিপণের জন্য বন্দী করা নবীর জন্য জায়েজ নেই। অর্থাৎ আল্লাহ খুব পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন, যুদ্ধে যেসকল কাফের পরাজিত এবং বন্দী হবে, তাদের যথেষ্ট পরিমাণ রক্তপাত ঘটানো জরুরি! [34]
কোন নবীর সাথে যুদ্ধরত কাফিরদের মাঝে প্রচুর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তাদেরকে ভালোভাবে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত নিজের কাছে বন্দী রাখা তাঁর জন্য উচিৎ হবে না। যেন তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চারিত হয় এবং তারা তাঁর সাথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করতে না আসে। হে মু’মিনরা! তোমরা মূলতঃ বদরের কাফিরদেরকে বন্দী করে তাদের থেকে মুক্তিপণ নিতে চাও। অথচ আল্লাহ তা‘আলা আখিরাত চাচ্ছেন যা ধর্মের বিজয় ও তার পরাক্রমশীলতার মাধ্যমে হাসিল করা সম্ভব। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও ক্ষমতায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তাঁকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। তেমনিভাবে তিনি তাঁর শরীয়ত প্রণয়নে ও তাক্বদীর নির্ধারণে অতি প্রজ্ঞাময়।
— Bengali Mokhtasar
কোন নাবীর জন্য এটা সঠিক কাজ নয় যে, দেশে (আল্লাহর দুশমনদেরকে) পুরোমাত্রায় পরাভূত না করা পর্যন্ত তার (হাতে) যুদ্ধ-বন্দী থাকবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও আর আল্লাহ চান আখিরাত (এর সাফল্য), আল্লাহ প্রবল পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞানী।
— Taisirul Quran
কোন নাবীর পক্ষে তখন পর্যন্ত বন্দী (জীবিত) রাখা শোভা পায়না, যতক্ষণ পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠ (দেশ) হতে শক্র বাহিনী নির্মূল না হয়, তোমরা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ কামনা করছ, অথচ আল্লাহ চান তোমাদের পরকালের কল্যাণ, আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
— Sheikh Mujibur Rahman
কোন নবীর জন্য সঙ্গত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে (এবং পণের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে মুক্ত করবেন) যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছ, অথচ আল্লাহ চাচ্ছেন আখিরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।
— Rawai Al-bayan
কোনো নবীর জন্য সংগত নয় যে [১] তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে, যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন [২]। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ [৩] এবং আল্লাহ্ চান আখেরাত; আর আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই আয়াতটির অনুবাদ তাফসীরে জালালাইন থেকে পড়ে নিই [35] –
৬৭. বদর যুদ্ধে বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ গ্রহণ করলে এই আয়াত নাজিল হয় যে, পৃথিবীতে ভালোভাবে রক্ত প্রবাহিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে কাফের-বধ না হওয়া পর্যন্ত [প্রথমপুরুষ, পুংলিঙ্গ) ও [প্রথমপুরুষ, স্ত্রীলিঙ্গ) উভয়রূপেই পঠিত রয়েছে। বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্য সঙ্গত নয়। হে মুমিনগণ! মুক্তিপণ গ্রহণ করে তোমরা পার্থিব সম্পদ তার তুচ্ছ সামগ্রী কামনা কর,

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা পড়ে দেখা যাক [36] –
সুরা আনফাল : আয়াত ৬৭ ما كان النبي أن يكون له أثرى حتى يثخن في الأرض تريدون عرض الدنيا والله يريد الأخرة والله عزيز حكيم → দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে; তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ্ চাহেন পরলোকের কল্যাণ; আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। ‘মা কানা লিনাবিয়্যিন আঁয়্যাকুনা লাহু আস্সা হাত্তা ইউছখিনা ফিল আরদ্ধা অর্থ— দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্য সংগত নয়। জ্ঞাতব্যঃ কাযী আবুল ফজল আয়ায তাঁর আশ শিফা গ্রন্থে লিখেছেন ‘দেশে সম্পূর্ণরূপে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্য সংগত নয়’ কথাটির মাধ্যমে রসুল স. এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি। বরং এ কথাটির মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে রসুল স. এর অনন্য সাধারণ মর্যাদা। যেমন অন্যান্য নবীগণের জন্য গণিমতের মাল গ্রহণ করা হালাল ছিলো না। কিন্তু রসুল স. এর জন্য তা হালাল করা হয়েছে। তাই তিনি স. বলেছেন, যুদ্ধলব্ধ- সম্পদ অন্য নবীদের জন্য হালাল ছিলো না। কিন্তু আমার জন্য হালাল। কাযী আয়ায আরো লিখেছেন, ‘তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ’ এ কথাটিও রসুল স. কিংবা তাঁর সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বলা হয়নি। বলা হয়েছে ওই সকল লোককে লক্ষ্য করে, যারা পৃথিবীর বিত্ত-বৈভবের প্রতি লালসাপরায়ণ। জুহাকের বর্ণনায় এসেছে, বদর যুদ্ধের দিন যখন অংশীবাদী সৈন্যরা পালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন বিজয় নিশ্চিত জেনে কেউ কেউ তাদের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলো। হজরত ওমর তখন আশংকা করেছিলেন, এ রকম করলে অংশীবাদীরা হয় তো পুনরাক্রমণের উদ্যোগ নিতে পারে। ‘ইউছখিনা’ অর্থ নিপাত করা, নিশ্চিহ্ন করা, পরাভূত করা, হত্যা করা অথবা পরাস্ত করা। এখানে মূল কর্ম বা হত্যা করার কথাটি রয়েছে অনুক্ত। এভাবে আয়াতে এই নির্দেশনাটি দেয়া হয়েছে— শত্রুকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত বন্দীদেরকে ছেড়ে দেয়া যাবে না। হত্যা করতে হবে তাদেরকে। এ রকম দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। যেমন— ‘আছখানা ফলানা’ অর্থ অমুক ব্যক্তিকে নিপাত করা হয়েছে, ‘আছখানা ফিল আদুবি’ অর্থ শত্রুকে যথেষ্ট পরিমাণে আঘাত করা হয়েছে ইত্যাদি। এরপর বলা হয়েছে ‘তুরিদুনা আরদ্বাদ দুন্ইয়া’ (তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ)। এ কথার অর্থ- হে মুসলমানেরা! তোমরা চাও ধ্বংসশীল পার্থিব বৈভব। শেষে বলা হয়েছে- ‘ওয়াল্লহু ইউরিদুল আখিরা’ ওয়াল্লহু আযিযুন্ হাকীম’ (এবং আল্লাহ্ চান পরলোকের কল্যাণ; আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়)। এ কথার অর্থ— আল্লাহ্তায়ালা পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তাই তিনি চান তাঁর অপার পরাক্রমের অধীনে এবং অতুলনীয় প্রজ্ঞাময়তার অনুসরণে তোমরা পরকালাভিমুখী হও। অংশীবাদীদেরকে হত্যা করে সাহায্যকারী হও সত্যধর্মের। অর্জন করো পুণ্য এবং আল্লাহ্তায়ালার সন্তুষ্টি। হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, ঘটনাটি ঘটেছিলো বদর যুদ্ধের সময়। তখন মুসলমান সৈন্যের সংখ্যা ছিলো অল্প। পরবর্তী সময়ে যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলো তখন অবতীর্ণ হলো— ‘ফাইম্মা মান্না বা’দু ওয়া ইন্না ফিদাআন্ (এরপর হয় অনুগ্রহ করবে নয়তোবা রক্তপণ নেবে)। এই আয়াতের মাধ্যমে রসুল স. কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেয়া হলো। যুদ্ধবন্দীকে হত্যা, অথবা তাদেরকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীতে পরিণত করা কিংবা মুক্তিপণ গ্রহণের মাধ্যমে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তখন থেকে রসুল স. কে এবং মুসলমানদেরকে দেয়া হয়েছে। মাসআলাঃ আলেমগণের ঐকমত্য এই যে, মুসলমানদের শাসক বা অধিনায়ককে এই আয়াতের মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা করার অধিকার দেয়া হয়েছে। তাই রসুল স. বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বন্দী করার পর হত্যা করিয়েছিলেন নজর বিন হারেস, তাইমিয়া বিন আদী এবং উকবা বিন আবী মুঈতকে। সাবিলুর রাশাদ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, উকবা বিন আবী মুঈত তখন বলেছিলো, মোহাম্মদ শিশুদেরকে দেখবে কে? রসুল স. বলেছিলেন, আগুন। ইবনে ইসহাক বলেছেন, উকবাকে হত্যা করেছিলেন হজরত ইবনে আবীল আফলা। ইবনে হিশাম বলেছেন, হজরত আবী ইবনে আবী তালেব । মাসআলাঃ বন্দীদেরকে ক্রীতদাসে পরিণত করা সিদ্ধ। আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত। এর মাধ্যমে অংশীবাদীতা নিপাত করা হয় এবং সম্মানিত করা হয় ইসলামকে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, শাসক বা অধিনায়ক ছাড়া বন্দীকে হত্যা করার অধিকার অন্য কারো নেই। প্রয়োজনবোধে কেবল শাসকই যুদ্ধবন্দীকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে কেউ যদি অতর্কিতে কোনো যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করে ফেলে তবে এর জন্য তাকে রক্তপণ দিতে হবে না।


এবারে আসুন দেখি, ইসলামের বিধান অনুসারে যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করাটি উত্তম আমল নাকি তাদের মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া উত্তম আমল সেটি। উল্লেখ্য, উপরের বর্ণনাতে উল্লেখ করা হযরত উমর এবং সা’দ ইবনু মুআয এর এই বিষয়ে মতামতের বিষয়টি এখানে আরও স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে [37] –
অথবা ফিদিয়া— যে কোনো একটিকে আপনি গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু ফিদিয়া গ্রহণ করলে প্রতি বন্দীর পরিবর্তে আপনার দলের একজন মৃত্যুবরণ করবে। রসুল স. এ কথা সাহাবীগণকে জানালেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসুল! বন্দীরা আমাদেরই স্বজন। তাদেরকে ফিদিয়ার বিনিময়ে মুক্ত করে দিলে ফিদিয়ার অর্থে আমরা সমর-সরঞ্জাম বৃদ্ধি করতে পারবো। আর তাদের একজনের বদলে আমাদের একজন যদি শহীদও হয়, তবুও তা আমাদের নিকট অপছন্দনীয় নয়। তাই হয়েছিলো। বদরের সত্তরজন যুদ্ধবন্দীর বদলে উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন সত্তরজন সাহাবী। জ্ঞাতব্যঃ কাযী আবুল ফজল আয়ায তাঁর আশিফা গ্রন্থে লিখেছেন, হত্যা ও মুক্তিপণ গ্ৰহণ— দু’টোই ছিলো বৈধ। তবে হত্যা ছিলো উত্তম এবং মুক্তিপণ গ্রহণের মাধ্যমে বন্দী মুক্তির ব্যাপারটি ছিলো অনুত্তম। রূপকার্থে তাই মুক্তিপণ গ্রহণ করাকে অন্যায় বলা হয়েছে। নির্দেশনাটি ছিলো এ রকম- উত্তম আমল গ্রহণ করাই সমীচীন। তিবরানীও এ রকম বলেছেন। হজরত ওমর এবং হজরত সা’দ গ্রহণ করেছিলেন উত্তম আমলটি। তাই রসুল স. বলেছিলেন, আযাব এলে ওমর ও সা’দ ছাড়া আর কেউ বাঁচতে পারতো না। কিন্তু তকদীরের নির্ধারণ ছিলো আযাব আসবে না। তাই আযাব আসেনি। দাউদ জাহেরী বলেছেন, পূর্বাহ্নে ফিদিয়াকে নিষেধ করা হয়নি। নিষেধ করা হলেও এ কথা বলা যেতো না যে রসুল স. আল্লাহ্র নিষেধের বাইরে কোনো কাজ করেন। এ রকম করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাই বলা হয়েছে ‘আল্লাহ্র পূর্ব বিধান না থাকলে’। এভাবে বলে বরং রসুল স. কে সম্মানিতই করা হয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে আল্লাহ্র প্রতি রসুল স. এর একনিষ্ঠ আনুগত্যকে। বাগবী লিখেছেন, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে সাহাবীগণ ফিদিয়ার অর্থ গ্রহণের প্রতি তাঁদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তখন অবতীর্ণ হয় নিম্নের আয়াত। সুরা আনফালঃ আয়াত ৬৯ فكلوا مماغيمة حللاطباء واتقوا الله إن الله غفورة حيم b → যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ করিয়াছ তাহা বৈধ ও উত্তম বলিয়া ভোগ কর ও আল্লাহ্কে ভয় কর, আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আলোচ্য আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে– হে বিশ্বাসীগণ! গণিমত ও ফিদিয়া হিসাবে যুদ্ধের মাধ্যমে তোমাদের যা কিছু অর্জিত হয়, তা তোমরা ভক্ষণ করতে এবং ব্যবহার করতে পারবে। এটা তোমাদের জন্য মোবাহ্ (বৈধ)। তবে তোমাদের অন্তরে সর্বদা জাগরুক রাখতে হবে আল্লাহর ভয়। এ কথাও মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ্ ক্ষমাপরবশ ও পরম দয়ার্দ্র। তাফসীরে মাযহারী/২০৭

বনু কুরাইজাকে অবরোধ এবং ধারাবাহিকতা
গনিমতের মাল ছাড়াই খন্দকের যুদ্ধ
খন্দকের যুদ্ধে মুহাম্মদের সাথে ছিল প্রায় তিন হাজার সৈন্য। এতো বিপুল পরিমাণ সৈন্য নিয়েও এই যুদ্ধে মুহাম্মদের সৈন্যরা কোন গনিমতের মাল পেলো না। খুব স্বাভাবিকভাবেই, গনিমতের মাল ছাড়াই এত সাহাবী এত পরিশ্রম করলো, সবই বৃথা গেল। [38]

আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এই যুদ্ধের পরে সাহাবীদের মধ্যে গনিমত না পাওয়ার এক তীব্র হতাশা লক্ষ্য করা যায়। একজন তো সরাসরিই কথাটি বলেই দিয়েছিল [39]
পরাভূত হবে? কখনোই নয় । আর যদি সে রকম কিছু হয়েও যায়, তবে তোমাকে আমি কথা দিচ্ছি জীবন থাকতে আমি তোমার সঙ্গ ত্যাগ করবো না। মোহাম্মদের দিক থেকে আক্রমণের আশংকা দেখা দিলে আমি আমার লোকজনকে নিয়ে অবশ্যই তা প্রতিহত করবো। কাআ’ব এবার নরম হলো। কথা দিলো, সে-ও তার লোকজনকে নিয়ে কুরায়েশ বাহিনীকে সাহায্য করবে।
সংবাদ খুব শীঘ্রই পৌঁছে গেলো রসুল স. এর কানে। তিনি স. বিষয়টির সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য বনী কুরায়জার কাছে পাঠালেন সর্ব হজরত আউস গোত্রের নেতা সা’দ ইবনে মুয়াজ আশহালী, খাজরাজ গোত্রের নেতা সা’দ ইবনে উবাদা সায়েদী, আবদুল্লাহ্ ইবনে রওয়াহা খাজরাজী এবং খাওয়াত ইবনে যোবায়ের আমেরীকে। তাঁদেরকে বলে দিলেন, তোমরা যদি বুঝতে পারো ঘটনা সত্য, তাহলে সেকথা আমাকে জানিয়ো ইশারা-ইঙ্গিতে। না হলে আমাদের অনেকের মনোবল যাবে ভেঙে। আর যদি দ্যাখ্যো, ঘটনা সত্য নয়, তবে বিষয়টি প্রকাশ্যেই আমাকে জানাতে পারবে। তারা সকলে পৌঁছে গেলো বনী কুরায়জাদের বসতিতে। তাদের সঙ্গে আলাপ করে সহজেই বুঝতে পারলো অবস্থা বেগতিক। তারা স্পষ্ট করেই জানালো, মোহাম্মদের সঙ্গে আমাদের কোনো অঙ্গীকার নেই। হজরত সা’দ ইবনে উবাদা ছিলেন তেজস্বী। তিনি তাদেরকে শুনিয়ে দিলেন কঠোর প্রকৃতির কিছু কথা । হজরত সা’দ ইবনে মুয়া’জ বাধা দিয়ে বললেন, যেতে দাও। বড় বাড় বেড়েছে ওদের। একথা বলে সকলে প্রত্যাবর্তন করলেন। রসুল স. এর দয়ার্দ্র সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রসুল! আপনার সহচরবৃন্দের সঙ্গে প্রতারণা তো সাংঘাতিক ব্যাপার। আল্লাহু আকবর! হে মুসলিম ভ্রাতৃবর্গ! শুভ সংবাদ শ্রবণ করো। সাহাবীগণ আঁচ করতে পারলেন, পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধের নয় । ভিতরে বাইরে শত্রু। সংশয়ের কালো মেঘ ছায়াপাত করতে শুরু করলো তাঁদের উপর। মুনাফিকেরা সবই বুঝলো। তাদের দলের মা’তাব ইবনে কুশাইর আমেরী প্রকাশ্যে বলেই বসলো, মোহাম্মদ! আপনি তো অঙ্গীকার করেছেন, আমাদের দখলে আসবে রোম ও পারস্যের ধনভাণ্ডার। কিন্তু এখন তো আমাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আমরা তো জঙ্গলে গিয়েও আর প্রাণরক্ষা করতে পারবো না। তাহলে কী আপনার ও আপনার আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি প্রতারণাপূর্ণ নয়? আর এক মুনাফিক আউস ইবনে কিবতী বললো, হে আল্লাহ্র প্রতিনিধি! আমার গৃহ অরক্ষিত। বাড়িও বেশ দূরে। আমাকে এবার বাড়ি ফিরে যাবার অনুমতি দেওয়া হোক। এভাবে বিভিন্ন বাহানায় অন্য মুনাফিকেরাও সরে পড়তে লাগলো ।
আমি বলি, কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গের ঘটনাটি কাআ’ব তার গোত্রনেতাদেরকে ডেকে জানালো। ওই গোত্রনেতাদের মধ্যে ছিলো, যোবায়ের ইবনে বালতা, নাব্বাশ ইবনে কায়েস, উকবা ইবনে জায়েদ ও আরো অনেকে। তারা সকলেই

বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতাঃ প্রমাণহীন অলৌকিক তথ্য
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় ধরনের গণহত্যা বা জাতিগত নিধনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আক্রমণকারী পক্ষ সাধারণত ভিকটিম বা আক্রান্ত গোষ্ঠীর ওপর ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’-র তকমা আরোপ করে। এটি একটি সুপরিচিত প্রোপাগান্ডা কৌশল, যা আক্রমণকারীর সহিংসতাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে চিত্রিত করতে সাহায্য করে।
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সমান্তরাল উদাহরণঃ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন গণহত্যা চালায়, তখন তারা এর স্বপক্ষে যুক্তি দিয়েছিল যে, বাঙালিরা পাকিস্তানের ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ এবং অখণ্ডতার বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতের সাথে হাত মিলিয়েছে। বাঙালিদের তারা ‘গাদ্দার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল যাতে সাধারণ মানুষের চোখে এই নিধনযজ্ঞকে একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবশ্যকতা হিসেবে দেখানো যায়। বর্তমান সময়েও গণহত্যাকে বৈধতা দেয়ার জন্য ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রগুলো আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে ‘জঙ্গি’, ‘টেরোরিস্ট’ বা ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ওপর চালানো সহিংসতাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে।
২. বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ড ও মুসলিম এপোলোজিস্টদের বয়ানঃ একই ধরনের কৌশল লক্ষ্য করা যায় বনু কুরাইজা গোত্রের গণহত্যার স্বপক্ষে দেওয়া যুক্তিগুলোতে। প্রথাগত ইসলামী ইতিহাসবিদ এবং এপোলোজিস্টরা দাবি করেন যে, খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরাইজা গোত্র মুসলিমদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কয়েকশ মানুষকে একত্রে হত্যার ঘটনাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
৩. যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক অসামঞ্জস্যতা এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়:
- তথ্যের একপাক্ষিকতা: বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার বিবরণ মূলত বিজয়ী পক্ষের (ইসলামী সীরাত ও হাদিস) বর্ণনা থেকে আসা। নিরপেক্ষ বা সমসাময়িক কোনো ভিন্ন উৎস থেকে এই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র প্রমাণ পাওয়া যায় না।
- দ্বিচারিতা: আধুনিক বিশ্বে যখন ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল বা তাদের হত্যার ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তা’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ যুক্তি দেয়, তখন মুসলিমরা সংগত কারণেই তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। কিন্তু একই ধরনের ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বা ‘চুক্তিভঙ্গ’র অজুহাতে যখন বনু কুরাইজার ঐতিহাসিক গণহত্যাকে সমর্থন করা হয়, তখন তা একটি নৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবে গণ্য হয়।
গণহত্যাকে জায়েজ করার জন্য ব্যবহৃত ‘গাদ্দার’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ ন্যারেটিভটি মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। বনু কুরাইজার ক্ষেত্রেও এই একই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে যৌক্তিক ও নিরাসক্ত বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। কারণ, অভিযুক্ত পক্ষ যখন বিচারক এবং জল্লাদ উভয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সেই ঐতিহাসিক বর্ণনার সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক।
সিরাতে রাসুলুল্লাহঃ বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ
সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বনু কুরাইজা আসলে কী এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল যে, তাদের সমূলে উচ্ছেদ করতে হলো, নারী এবং শিশুদের ক্রীতদাস বানাতে হলো, সেই বিশ্বাসঘাতকতাটি কী, এর দ্বারা মুসলিমরা কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কতজন মুসলিম তাদের জঙ্গি হামলায় নিহত বা আহত হয়েছে, এর ঠিক কোন সদুত্তর তারা দিতে পারে না।
উল্টোদিকে দেখা যায়, মুহাম্মদের বিরোধী গ্রুপের নেতা আবু সুফিয়ান বনু কুরাইজা গোত্রে মুহাম্মদের আক্রমণের কিছুদিন আগেই বনু কুরাইজার কাছে সাহায্যের কামনা করেছিল, এবং বনু কুরাইজা আবু সুফিয়ানের বাহিনীকে সাহায্য করতে চায় নি। বনু কুরাইজা যদি মুহাম্মদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাই করে থাকবে, তাহলে তাদের তো উচিৎ ছিল, আবু সুফিয়ানকে সাহায্য করা। আসুন ইবনে ইসহাকের গ্রন্থ থেকে তথ্যটি জেনে নিই [40] –
তারপর আবু সুফিয়ান বলল, ‘হে কোরাইশগণ, আমাদের শিবির পাকা নয়। ঘোড়া – উট সব মরে যাচ্ছে। বনু কুরাইজা ওয়াদা খেলাপ করেছে। তাদের সম্পর্কে গোলমেলে খবর কানে আসছে। এদিকে দেখতেই পাচ্ছ, প্রবল বাতাসে হাঁড়ি- পাতিল, আগুন, তাঁবু সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। তোমরা সব ভাগো, আমি চললাম। ‘

তাফসীরে মাযহারীঃ বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ
এবারে আসুন এই বর্ণনাটি তাফসীরে মাযহারী থেকে পড়ি। লক্ষ্য করুন, সত্যিকার অর্থে বনু কুরাইজা কুরাইশদের কোন সহযোগিতাই করেনি। কুরাইশদের সাহায্যের আবেদনে বনু কুরাইজা বলেছিল, কুরাইশরা যদি তাদের গণ্যমান্য কয়েকজনকে জামানত হিসেবে দেয়, তবেই শুধুমাত্র তারা কুরাইশদের সাহায্য করতে পারে। কুরাইশরা সেটি করতে অস্বীকৃতি জানায়। অর্থাৎ বনু কুরাইজা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে আসলে সক্রিয় কোন যুদ্ধ বা আক্রমণ কিছুই করেনি [41]
কুরায়জার নিকটে। তারা যেয়ে বনী কুরায়জাকে বললো, দ্যাখো, আমরা তো এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করবার জন্য আসিনি। আমাদের যুদ্ধাশ্ব ও উটগুলোও শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এবার শুরু করবো সর্বাত্মক যুদ্ধ। তোমারাও প্রস্তুত হও। মোহাম্মদের সঙ্গে এবার হোক আমাদের চূড়ান্ত বোঝাপড়া।
বনী কুরায়জা বললো, আজ শনিবার, তোমরা তো জানোই শনিবার আমাদের কাছে কীরূপ সম্মানার্হ । সুতরাং আজ তো আমরা যুদ্ধের ময়দানে নামতে পারবোই না। তাছাড়া এ সম্পর্কে আমাদের কিছু বক্তব্যও আছে। বক্তব্যটি হচ্ছে— যুদ্ধে আমাদের জয় যদি হয়, তবে তো ভালোই। আর যদি পরাজয় হয়, তবে তো তোমরা পালিয়ে গিয়ে প্রাণরক্ষা করতে পারবে। তখন একা পেয়ে মোহাম্মদের দল আমাদেরকে সমূলে উৎখাত করে ফেলবে। তাই আমরা চাই, তোমরা তোমাদের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে জামানতস্বরূপ আমাদের অধীনে রেখে দাও। প্রতিনিধি দল ফিরে গেলো। সেনাপতি আবু সুফিয়ানের কাছে খুলে বললো সব। সে এবং তাদের দলের নেতারা তখন বলে উঠলো, নাঈম ইবনে মাসউদের কথাই তাহলে ঠিক। বনী কুরায়জা বিশ্বাস ঘাতক। একথা ভেবেই তারা বনী কুরায়জাকে বলে পাঠালো, আমরা এরকম জামানত রাখতে অসম্মত। বনী কুরায়জার নেতারা তখন বললো, নাঈম তো তাহলে ঠিক কথাই বলেছে। বহিরাগতদের মনে রয়েছে দূরভিসন্ধি। তারা জয়ী হলে গণিমত নিয়ে সরে পড়বে। আর পরাজয়ের সম্ভাবনা দেখলেই আমাদেরকে অসহায় অবস্থায় রেখে যাবে পালিয়ে। তখন বেঘোরে জীবন দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায়ই থাকবে না। এভাবে পারম্পরিক অবিশ্বাসের কারণে শত্রুবাহিনী হয়ে পড়লো হতোদ্যম। এর মধ্যে হঠাৎ এক রাতে শুরু হলো ভয়ংকর তুফান। তখন উনুনে চড়ানো ছিলো সৈন্যদের খাদ্যপ্রস্তুত করার ডেগ। প্রচণ্ড বাতাসে সেগুলো হয়ে গেলো লণ্ডভণ্ড। তাঁবুগুলো গেলো উড়ে। তাঁবুর খুঁটি, খুঁটির দড়ি সব কিছু ছড়িয়ে পড়লো এদিকে ওদিকে। উড়ন্ত খুঁটির আঘাত খেয়ে ঘোড়াগুলো পালাতে শুরু করলো দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। প্রচণ্ড শীতে সৈন্যরা কাঁপতে লাগলো ঠক ঠক করে । সকলে হয়ে গেলো কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

মানচিত্রঃ বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতা বাস্তবতা
সেইসাথে, বনু কুরাইজা গোত্র কীভাবে কুরাইশদের সাহায্য করেছিল সেটিও এক বিরাট প্রশ্ন। নিচের মানচিত্রটি আবারো দেখুন। খন্দকের যুদ্ধের সময় যেই পরিখা খনন হয়, তা ভেদ করে বনু কুরাইজা গোত্র কুরাইশদের কীভাবে সাহায্য করলো? আবার সাথে সাথেই, নিজ দুর্গে ফিরেও গেল? যেখানে নবী মুহাম্মদ যুদ্ধ থেকে ফিরেই, কোন বিরতি না দিয়েই বনু কুরাইজা আক্রমণ করে? [42]

বিশ্বাসঘাতকতার বাস্তব কোন প্রমাণ নেই
বনু কুরাইজা গোত্রের তথাকথিত বিশ্বাসঘাতকতার স্বপক্ষে আধুনিক ঐতিহাসিক বিচারে কোনো বস্তুগত বা পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইসলামী ইতিহাস বা সীরাত গ্রন্থগুলোর দাবি অনুযায়ী, খন্দকের যুদ্ধের পর যখন নবী মুহাম্মদ যুদ্ধের সাজপোশাক ত্যাগ করছিলেন, তখন ফেরেশতা জিব্রাইল এসে তাকে বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দেন। উৎসগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই অভিযানের মূল সিদ্ধান্তটি ছিল জিব্রাইলের সেই অলৌকিক বার্তার ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, কয়েকশ মানুষের প্রাণদণ্ড কার্যকর করার মতো একটি চরম সিদ্ধান্তের পেছনে সমসাময়িক কোনো নথিপত্র, কোনো গুপ্তচর মারফত পাওয়া সংবাদ বা নিরপেক্ষ কোনো সাক্ষী ছিল না; বরং তা ছিল সম্পূর্ণ একপাক্ষিক এবং অলৌকিক দাবিনির্ভর, যা যাচাই করার কোনো উপায় নেই।
কোনো আধুনিক বিচারব্যবস্থা বা যুক্তিগ্রাহ্য ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে কেবল একজন ব্যক্তির দেখা অশরীরী সত্তার বক্তব্যকে অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। বনু কুরাইজার ঘটনার ক্ষেত্রে মুসলিম পক্ষই ছিল অভিযোগকারী, বিচারক এবং জল্লাদ; যেখানে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই। যখন কোনো ঐতিহাসিক নিধনযজ্ঞের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে এমন এক অলৌকিক নির্দেশকে দাঁড় করানো হয় যা অন্য কেউ দেখেনি বা শোনেনি, তখন সেই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র দাবিটি ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে প্রমাণের অভাবে এই অভিযোগটিকে নিছক একটি ধর্মীয় বয়ান বা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ হিসেবেই গণ্য করা যুক্তিযুক্ত। আসুন দেখি, বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার দাবিটি [43] –
মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। আর মুসলমানরা অস্ত্রশস্ত্র খুলে ফেলেন। ইমাম যুহুরী (রা-এর বর্ণনামতে যুহরের সময় হযরত জিবরাঈল (আ) রেশমী বস্ত্রের পাগড়ি পড়ে খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এলেন। খচ্চরটির পিঠে একটি মোটা রেশমী চাদর বিছানো ছিল । তিনি বললেন ঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! আপনি কি হাতিয়ার খুলে ফেলেছেন ? রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইতিবাচক জবাব দিলে জিব্রাঈল (আ) বললেন, ফেরেশতারাতো এখনো অস্ত্র খুলেননি। আর আমি ফিরে এসেছি কাফির সম্প্রদায়ের পশ্চাদ্ধাবনের জন্য। হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ্ তা’আলা তো আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন বনু কুরায়যার উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হতে। আর আমিও তাদের দিকে ধাবিত হওয়ার মনস্থ করেছি। আমি তাদের অভ্যন্তরে ফাটল ধরাবো। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) একজন ঘোষককে লোকজনের মধ্যে ঘোষণা প্রচার করার নির্দেশ দান করেনঃ যে এ ঘোষণা শুনছে এবং অনুগত রয়েছে এমন ব্যক্তিরা যেন বনূ কুরায়যার জনপদে না পৌঁছে আসরের সালাত আদায় না করে । ইবন হিশামের বর্ণনা মতে (এ সময়) রাসূলুল্লাহ্ (সা) আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উম্মে মাকতূমকে মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। আর ইমাম বুখারী (র) আব্দুল্লাহ্ ইব্ন আবূ শায়বা সূত্রে হযরত আইশা (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলছেন :
রাসূলুল্লাহ্ (সা) খন্দক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে অস্ত্র খুলে গোসল করার সাথে সাথে জিব্রাঈল (আ) তাঁর নিকট আগমন করে বললেন- আপনি অস্ত্র খুলে ফেলেছেন ? আল্লাহর কসম! আমরা এখনো অস্ত্র খুলিনি। আপনি ওদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ুন! তিনি জানতে চাইলেন, কোন্ দিকে ? জিব্রাইল (আ) বললেন, এদিকে। একথা বলে তিনি বনু কুরায়যার প্রতি ইঙ্গিত করলেন । তখন নবী করীম (সা) বের হয়ে পড়লেন। ইমাম আহমদ (র) হাসান ও আইশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আহযাব যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে গোসল করার জন্য গোসল খানায় প্রবেশ করলে তাঁর নিকট হযরত জিব্রাঈল (আ) আগমন করলেন । দরজার ফাঁক দিয়ে আমি জিব্রাঈল (আ)-কে দেখতে পাই যে, তাঁর মাথায় ধুলাবালি লেগে আছে । তখন তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনারা কি অস্ত্র খুলে রেখেছেন ? আমরাতো এখনো অস্ত্র খুলিনি। আপনি দ্রুত বনূ কুরায়যা অভিমুখে রওয়ানা করুন।
ইমাম বুখারী (র) মূসা, জারীর – – – – -আনাস ইব্ন মালিক সূত্রে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বনু কুরায়যা অভিমুখে রওয়ানা করেন তখন বনূ গনম এর গলিতে জিব্রাঈল (আ)-এর সওয়ারীর (চলাচলের ফলে উত্থিত) ধূলাবালি যেন আমি নিজ চক্ষে অবলোকন করছি। অতঃপর ইমাম বুখারী (র) আব্দুল্লাহ ইব্ন মুহাম্মাদ – – – – – ইবন উমর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আহযাব যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন : বনূ কুরায়যার এলাকায় না পৌঁছে কেউ যেন আসরের সালাত আদায় না করে। পথে কারো কারো আসরের সালাতের সময় হয়ে যায়। তখন কেউ কেউ বললেন, আমরা বনূ কুরায়যায় জনপদে না পৌঁছে আসরের সালাত আদায় করবো না । আবার কেউ কেউ বললো, বরং আমরা সালাত আদায় করে নেবো। আমরা সালাত আদায় না করি এটা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্য ছিল না, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে আলোচনা করা হলে তিনি কারো ক্ষেত্রেই অসন্তুষ্টি ব্যক্ত করলেন না। মুসলিম (র) ও আবদুল্লাহ্ ইব্ন মুহাম্মাদ ইব্ন আসমা সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকী হাফিয আবূ আবদুল্লাহ কাযী আবূ বকর আহমদ ইব্ন হাসান-এর সূত্র উল্লেখ করেন : আবুল আব্বাস মুহাম্মাদ ইব্ন কা’ব ইবন

এই প্রসঙ্গে আয়েশার একটি অতি বিখ্যাত হাদিস রয়েছে, যা পড়া সকলের জন্য জরুরি [44] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্ তা’আলার বাণীঃ ترجئ من تشاء منهن وتؤوي إليك من تشاء ومن ابتغيت ممن عزلت فلا جناح عليك “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার কাছে স্থান দিতে পার। আর তুমি যাকে দূরে রেখেছ, তাকে কামনা করলে তোমার কোন অপরাধ নেই। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন ترجئ দূরে রাখতে পার। أرجئه তাকে দূরে সরিয়ে দাও, অবকাশ দাও।
৪৪২৫। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেসব মহিলা নিজকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হেবাস্বরূপ ন্যাস্ত করে দেন, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি (মনে মনে) বলতাম, মহিলারা কি নিজেকে অর্পণ করতে পারে? এরপর যখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেনঃ “আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন। আর আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে আপনার কোন অপরাধ নেই।” তখন আমি বললাম, আমি দেখছি যে, আপনার রব আপনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই পূরণ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
জিবরাইলের আগমন সম্পর্কিত জটিলতা
বনু কুরাইজা যে আসলেই বিশ্বাসঘাতকতা বা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, নবী মুহাম্মদকে নাকি এই তথ্যটি আল্লাহর তরফ থেকে খোদ জিবরাইল এসে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। তাই ঐ ঘটনাটি পর্যালোচনা করে বোঝা প্রয়োজন, আসলেই সেই সময়ে জিবরাইল এসে মুহাম্মদকে বিষয়টি জানিয়েছিল, নাকি অন্য কেউ? আসুন ঘটনাটি জানি। এই সম্পর্কে জানা যায়, মুহাম্মদ উম্মে সালমাহর ঘরে আসার পরে জিবরাইলের আগমন ঘটে এবং জিবরাইল নাকি বনু কুরাইজার চুক্তিভঙ্গ এবং বিশ্বাসঘাতকতার গোপন খবরটি নবীকে জানায় [45]
বনু কুরায়যা চুক্তি ভঙ্গ করিল । রাসূলুল্লাহ্ ও সাহাবায়ে কিরাম ইহা জানিতে পারিয়া বড়ই দুঃখিত ও ব্যথিত হইলেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা’আলা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিজয়ী করিলেন, সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হইয়া ব্যর্থতার গ্লানি লইয়া প্রত্যাবর্তন করিল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং অস্ত্র খুলিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ্ হযরত উম্মে সালমাহ (র)-এর ঘরে প্রবেশ করিয়া গোসল করিতেছিলেন, এমন সময় হযরত জিবরীল (আ)-এর আগমন ঘটিল। তিনি ইস্তাবরাক (রেশম)-এর পাগড়ী পরিহিত অবস্থায় একটি খচ্চরের উপর আরোহণ করিয়া আসিয়াছিলেন এবং খচ্চরের উপর ছিল রেশমের একটি গদি। তিনি আগমন করিয়াই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি অস্ত্র খুলিয়া ফেলিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। জিবরীল (আ) বলিলেন, কিন্তু ফেরেশতাগণ এখনও তাহাদের অস্ত্র খুলিয়া ফেলেন নাই। আমি তো এখন কাফিরদিগকে ধাওয়া করিয়া ফিরিয়া আসিতেছি। অতঃপর তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে অভিযান চালাইতে নির্দেশ দান করিয়াছেন। তিনি ইহাও বলিলেন, আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে হুকুম দিয়াছেন, আমি যেন তাহাদিগকে উলট-পালট করিয়া দেই

এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি, যা থেকে জানা যায়, উম্মে সালমাহর ঘরে সেইদিন উম্মে সালমাহ দাহিয়া কালবীকে নবীর কাছে আসতে দেখেছিল। কিন্তু নবী সালমাহকে এবং অন্যদের জানায় যে, ঐ লোকটি আসলে নাকি জিবরাইল ছিল, দাহিয়া কালবী সেজে সে নবীর সাথে কথা বলছিল। এরকম ছদ্মবেশ ধারণ, অন্য একজন সাহাবীর বেশ ধরে কাউকে ধোঁকা দেয়া বা প্রতারণা করা একজন গণ্যমান্য ফেরেশতার জন্য কতটুকু শোভনীয়, তা পাঠকই বিবেচনা করবেন। কিন্তু এই হাদিস থেকে জানার বিষয় হচ্ছে, উম্মে সালমাহর মতে ঐদিন দাহিয়া কালবীই নবীর সাথে পরামর্শ করছিল [46]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ওহী কিভাবে নাযিল হয় এবং সর্বপ্রথম কোন আয়াত নাযিল হয়েছিল। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, الْمُهَيْمِنُ মানে- আমীন। কুরআন পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী গ্রন্থের জন্য আমীন স্বরূপ।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৮০
৪৬১৯। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আবূ উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে অবগত করা হয়েছে যে, একদা জিব্রাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমন করলেন। তখন উম্মে সালামা (রাঃ) তাঁর কাছে ছিলেন। জিবরীল(আলাইহিস সালাম) তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? অথবা তিনি এ ধরনের কোন কথা জিজ্ঞেস করলেন। উম্মে সালামা (রাঃ) বললেন, ইনি দাহইয়া (রাঃ)। তারপর জিবরীল(আলাইহিস সালাম) উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণে জিবরীল(আলাইহিস সালাম) এর খবর না শুণা পর্যন্ত আমি তাঁকে সে দাহইয়া (রাঃ)-ই মনে করেছি। অথবা তিনি (বর্ণনাকারী) অনুরূপ কোন কথা বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারী মুতামির (রহঃ) বলেন, আমার পিতা সুলায়মান বলেছেন, আমি উসমান (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কার থেকে এ ঘটনা শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামা ইবনু যায়দের কাছ থেকে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ ‘উসমান (রহঃ)
এবারে আসুন আরেকটি হাদিস পড়ি, [47] [48]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৬/ কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা
পরিচ্ছেদঃ ৯৬/৩. বেশি বেশি প্রশ্ন করা এবং অকারণে কষ্ট করা নিন্দনীয়।
৭২৯৩. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’উমার (রাঃ)-এর কাছে ছিলাম। তখন তিনি বললেনঃ (যাবতীয়) কৃত্রিমতা হতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।[1] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৯৫)
[1] যাবতীয় মুনাফেকী নীতি অবলম্বন করা, ইবাদাতের ক্ষেত্রে অনর্থক বাড়তি কষ্ট করা, নাটক করা, অন্যের চরিত্রে অভিনয় করা, নকল চুল, দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে অন্যের মত হওয়া, যেমন খুশি তেমন সাজা, ছেলেদের পাকা চুল, দাড়ি লাগিয়ে মুরুবিব সাজা ইত্যাদি যাবতীয় কৃত্রিমতা গ্রহণ করতে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নিষেধ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

মদিনা সনদঃ বনু কুরাইজার সাথে কথিত চুক্তি
ইসলামের সপক্ষের লেখকগণ নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেন যে, বনু কুরাইজা চুক্তিভঙ্গকারী, বিশ্বাসঘাতক, তাই নবী তাদের উপযুক্ত শাস্তিই দিয়েছিল! অথচ, বনু কুরাইজার সাথে আদৌ নবীর কোন চুক্তি ছিল, সেরকম কোন শক্তিশালী প্রমাণই পাওয়া যায় না। যাদের সাথে চুক্তিই নেই, তারা কীভাবে চুক্তি ভঙ্গ করলো সেটিই প্রশ্ন। মুহাম্মদ মদিনা যাওয়ার পরে কয়েকটি ইহুদি গোত্রের সাথে চুক্তি করেছিল, এ কথার প্রমাণ মেলে। কিন্তু সর্বাধিক প্রাচীন সিরাত গ্রন্থগুলোতে চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলোর মধ্যে বনু কুরাইজার নাম পাওয়া যায় না। হাজার বছর পরে লিখিত কিছু সিরাত গ্রন্থে ( যেমন আল্লামা ইদ্রিস কান্ধলভি রচিত সিরাতুল মুস্তফা, যিনি ১৮৯৯ সালে জন্ম নেয়া একজন দেওবন্দ আলেম ) দাবী করা হয়, বনু কুরাইজা গোত্রের সাথে নাকি নবীর চুক্তি ছিল! অথচ প্রাচীন কোন সিরাত গ্রন্থে বনু কুরাইজার সাথে চুক্তির কোন দলিল মেলে না। আসুন শুরুতেই চুক্তিটি পড়ি, [49]
ভূমিকা: পরম দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার নামে আরম্ভ করছি। আল্লাহর নবী মুহাম্মদের (সা.) তরফ থেকে সম্পাদিত এই দলিল কুরাইশ ও ইয়াসরিবের সব বিশ্বাসী ও মুসলিম এবং তাঁদের অনুসরণ করে যাঁরা তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান ও তাঁদের সঙ্গে থেকে কাজ করেন, তাঁদের সবার মধ্যবর্তী সম্পর্ক নির্দেশক।
১. উম্মাহর ধারণা ও অভ্যন্তরীণ সংহতি
এক উম্মাহ: মানবেতর নির্বিশেষে তাঁরা সবাই মিলে এক সম্প্রদায় বা এক ‘উম্মাহ’।
রক্তপণ ও মুক্তিপণ: কুরাইশ মুহাজিররা তাঁদের প্রচলিত প্রথা ও সংখ্যা অনুযায়ী রক্তপণ প্রদান করবে এবং বিশ্বাসীসুলভ দয়া ও ন্যায়নীতি অনুযায়ী তাঁদের বন্দীদের মুক্ত করবে।
গোত্রভিত্তিক দায়িত্ব: বনু আউফ, বনু সাইদা, বনু আল-হারিস, বনু জুশাম, বনু আল-নাজ্জার, বনু আমর ইবনে আউফ, বনু আল-নাবিত এবং বনু আল-আউস—প্রত্যেক গোত্র তাদের প্রচলিত প্রথা ও ন্যায়নীতি অনুসারে রক্তপণ প্রদান করবে এবং বন্দীদের মুক্ত করবে।
দরিদ্রদের সহায়তা: মুক্তিপণ বা দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে রক্তপণ প্রদান না করে বিশ্বাসীগণ কাউকে নিঃস্ব রাখতে পারবে না।
২. সামাজিক নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা
বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে ঐক্য: আল্লাহভীরু মুমিনগণ ওই বিদ্রোহীর বিরোধিতা করবে, যে মুমিনদের মধ্যে অন্যায়, পাপ, শত্রুতা বা দুর্নীতি ছড়ায়। এমনকি সেই বিদ্রোহী যদি তাদের নিজেদের সন্তানও হয়, তবুও সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
অবিশ্বাসীর স্বার্থ: কোনো বিশ্বাসী অন্য কোনো বিশ্বাসীকে কোনো অবিশ্বাসীর স্বার্থে হত্যা করবে না বা অবিশ্বাসীকে সাহায্য করবে না।
নিরাপত্তা: আল্লাহর নিরাপত্তা প্রদান অদ্বিতীয়। বিশ্বাসীরা পরস্পরের বন্ধু। যেসব ইহুদি আমাদের অনুসরণ করবে, তাদের জন্য সহায়তা ও সমমর্যাদা নিশ্চিত থাকবে।
৩. যুদ্ধ ও শান্তিনীতি
অবিভাজ্য শান্তি: মুমিনদের শান্তি অবিভাজ্য। আল্লাহর পথে যুদ্ধের সময় পৃথকভাবে কোনো শান্তি স্থাপিত হবে না; শর্তাবলি অবশ্যই ন্যায়সংগত ও সবার জন্য সমান হতে হবে।
রক্তের প্রতিশোধ: আল্লাহর পথে এক বিশ্বাসীর রক্তক্ষরণ হলে অন্য বিশ্বাসী তার প্রতিশোধ নেবে।
কুরাইশদের বর্জন: কোনো বহু-ঈশ্বরবাদী (মদীনার নাস্তিক বা মূর্তিপূজক আরব) কোনো কুরাইশের জান বা মাল নিজের জিম্মায় নিতে পারবে না।
৪. ইহুদিদের অধিকার ও দায়িত্ব
ধর্মীয় স্বাধীনতা: বনু আউফের ইহুদিরা বিশ্বাসীদের সাথে একই উম্মাহভুক্ত। ইহুদিদের নিজেদের ধর্ম আছে এবং মুসলমানদেরও নিজেদের ধর্ম। এই শর্ত বনু আল-নাজ্জার, বনু আল-হারিস, বনু সাইদা, বনু জুশাম, বনু আল-আউস, বনু সালাবা এবং বনু আল-শুতাইবা—সবার জন্য প্রযোজ্য।
যুদ্ধব্যয়: ইহুদিরা বিশ্বাসীদের পাশে থেকে যুদ্ধে নিয়োজিত থাকলে যুদ্ধের ব্যয়ের নিজ নিজ ভাগ বহন করবে।
পারস্পরিক সহায়তা: এই দলিলের অন্তর্গত কোনো মানুষ আক্রান্ত হলে পক্ষগুলো পরস্পরকে অবশ্যই সাহায্য করবে। তারা পারস্পরিক পরামর্শ ও উপদেশ গ্রহণ করবে।
৫. মদীনার পবিত্রতা ও বিচার ব্যবস্থা
পবিত্র স্থান: এই দলিলের অন্তর্গত মানুষের জন্য ইয়াসরিব (মদীনা) একটি নিরাপদ ও পবিত্র স্থান।
আশ্রিত ব্যক্তি: আশ্রিত অপরিচিত ব্যক্তি তার গৃহস্বামীর সমমর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে গণ্য হবে, যদি সে কোনো ক্ষতি বা অপরাধ না করে।
বিরোধ নিষ্পত্তি: যদি কোনো বিবাদ বা মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, তবে তার চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদের (সা.) শরণাপন্ন হতে হবে।
চুক্তির সীমাবদ্ধতা: এই দলিল কোনো অন্যায়কারী বা পাপিষ্ঠকে নিরাপত্তা দেবে না। আল্লাহ ভালো ও আল্লাহভীরু মানুষের আশ্রয়দাতা।
সিরাতে রাসুল্লাল্লাহ – ইবনে ইসহাক
এবারে আসুন দেখি, মদিনা যাওয়ার পরে যেই চুক্তিটি হয়েছিল এবং যাদের সাথে চুক্তি হয়েছিল তাদের বিবরণ দেখি সর্বাধিক প্রাচীন সিরাত গ্রন্থ ইবনে ইসহাকের সিরাত থেকে [3]
(সীরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.), ইবনে ইসহাক; পৃষ্ঠা ২৭১-২৭২)
মুসলিম, মদিনাবাসী ও ইহুদিদের মধ্যে চুক্তি
রাসুলে করিম (সা.) মুহাজির ও আনসারদের বিষয়ে একটি দলিল প্রণয়ন করেন। তাতে ইহুদিদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক স্থাপনের মতৈক্যসহ ইহুদিদের নিজেদের ধর্ম ও সহায়-সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, এতে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের দায়িত্বও চিহ্নিত করা হয়। সেই চুক্তি ছিল নিম্নরূপ:
পরম দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার নামে আরম্ভ করছি। আল্লাহর নবী মুহাম্মদের তরফ থেকে সম্পাদিত এই দলিল কুরাইশ ও ইয়াসরিবের সব বিশ্বাসী ও মুসলিম এবং তাঁদের অনুসরণ করে যাঁরা তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান ও তাঁদের সঙ্গে থেকে কাজ করেন, তাঁদের সবার মধ্যবর্তী সম্পর্ক নির্দেশক। মানবেতর নির্বিশেষে তাঁরা সবাই মিলে এক সম্প্রদায়, এক উম্মাহ।
কুরাইশ মুহাজিররা তাঁদের প্রচলিত প্রথা ও তাঁদের সংখ্যা অনুযায়ী রক্তপণ প্রদান করবে এবং বিশ্বাসীসুলভ দয়া ও ন্যায়নীতি অনুযায়ী তাঁদের বন্দীদের মুক্ত করবে। নিজেদের প্রথা অনুযায়ী বনু আউফ জাহেলিয়াত (নাস্তিক) থাকা অবস্থায় যে রক্তপণ দিত, তা-ই দিতে থাকবে। বিশ্বাসীসুলভ দয়া ও ন্যায়নীতি অনুসারে সমস্ত গোত্র তাঁদের বন্দীদের মুক্ত করবে। বনু সাইদা, বনু আল-হারিস, বনু জুশাম এবং বনু আল-নাজ্জারও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (১)
বনু আমর ইবনে আউফ, বনু আল-নাবিত এবং বনু আল-আউসও একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (২) মুক্তিপণ বা দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে রক্তপণ প্রদান না করে বিশ্বাসীগণ কাউকে নিঃস্ব রাখতে পারবে না। কোনো বিশ্বাসী অন্য কারও মুক্ত দাসকে সেই লোকের বিরুদ্ধে মিত্রভাবে গ্রহণ করতে পারবে না। আল্লাহভীরু মুমিনগণ বিদ্রোহীর অথবা যে মুমিনদের মধ্যে অন্যায় অথবা পাপ অথবা শত্রুতা অথবা দুর্নীতি ছড়ায়, তার বিরোধিতা করবে এবং সব মানুষের হাত তার বিরুদ্ধে উত্থিত হবে, সে লোক তাঁদের নিজেদের কারও সন্তান হলেও।
কোনো বিশ্বাসী অন্য কোনো বিশ্বাসীকে কোনো অবিশ্বাসীর স্বার্থে হত্যা করবে না, কোনো বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে কোনো অবিশ্বাসীকে সাহায্যও করবে না। আল্লাহর নিরাপত্তা প্রদান অদ্বিতীয়, তবে তাঁরা তাঁদের তরফ থেকে কোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা প্রদান করতে পারে। বিশ্বাসীরা পরস্পরের বন্ধু, সেখানে বহিরাগত বহিরাগতই। যেসব ইহুদি আমাদের অনুসরণ করে তাদের জন্য সহায়তা ও সমমর্যাদা নিশ্চিত থাকবে। তার প্রতি কোনো অন্যায় করা যাবে না, তার কোনো শত্রুকে সাহায্য প্রদান করা যাবে না। মুমিনদের শান্তি অবিভাজ্য। আল্লাহর পথে যখন বিশ্বাসীগণ যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকবেন, তখন পৃথকভাবে কোনো শান্তি স্থাপিত হবে না। শর্তাবলি অবশ্যই ন্যায়সংগত ও সবার জন্য সমান হবে।
সব আক্রমণের সময় প্রত্যেক অশ্বারোহী তার পেছনে আরেকজন আরোহী গ্রহণ করবে। আল্লাহর পথে এক বিশ্বাসীর রক্তক্ষরণ হলে অন্য বিশ্বাসী তার প্রতিশোধ নেবে। আল্লাহভীরু মুমিন সর্বোত্তম ও সর্বাধিক যুক্তিযুক্ত উপদেশ লাভ করবে। কোনো বহু-ঈশ্বরবাদী (৩) কোনো কুরাইশের জান বা মাল নিজের জিম্মায় নিতে পারবে না, কোনো বিশ্বাসীর ব্যাপারে সে হস্তক্ষেপও করতে পারবে না। সংগত কারণে বিনা দোষে কোনো বিশ্বাসীকে হত্যার অভিযোগে কেউ দণ্ডিত হলে এবং নিহত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয় রক্তপণে সন্তুষ্ট না হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করা যাবে এবং সকল বিশ্বাসী তার বিরুদ্ধে এক হবে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে।
আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এবং এই দলিল দ্বারা আবদ্ধ কোনো বিশ্বাসীর জন্য কোনো দুষ্কৃতকারীকে সাহায্য করা বা আশ্রয় দেওয়া বৈধ হবে না। যদি কেউ সে রকম কাজ করে, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর অভিশাপ ও গজব তার ওপর নাজিল হবে এবং কোনো প্রকার অনুতাপ বা ক্ষতিপূরণ তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না। কোনো বিষয়ে কখনো কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে তার ফয়সালার জন্য আল্লাহ অথবা মুহাম্মদের (সা.) শরণাপন্ন হতে হবে।
ইহুদিরা বিশ্বাসীদের পাশে থেকে যুদ্ধে নিয়োজিত থাকলে যুদ্ধের ব্যয়ের নিজ নিজ ভাগ বহন করবে। বনু আউফের ইহুদিরা (ইহুদিদের নিজেদের ধর্ম আছে, মুসলমানদেরও নিজেদের ধর্ম) বিশ্বাসী, বিশ্বাসীদের মুক্তি পাওয়া দাস এবং অন্যায় বা পাপাচরণে যারা নিজেদের বা স্বীয় পরিবারের ক্ষতি করে না—তাদের এমন আপনজনের সঙ্গে এক ও অভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত। এই শর্ত বনু আল-নাজ্জার, বনু আল-হারিস, বনু সাইদা, বনু জুশাম, বনু আল-আউস, বনু সালাবা, সালাবার আরেকটি গোত্র জাফনা এবং বনু আল-শুতায়বার ইহুদিদের জন্য প্রযোজ্য হবে।
আনুগত্য হলো বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিশেষ। সালাবার মুক্ত দাসেরা মুক্ত থাকবে। ইহুদিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুজন যেমন আছে, তেমন থাকবে। মুহাম্মদের (সা.) অনুমতি ছাড়া তাদের কেউ যুদ্ধে যাবে না, তবে কোনো আঘাতের জন্য প্রতিশোধ নেওয়ায় কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না। কেউ যদি অন্য কাউকে সাবধান না করে হত্যা করে, তাহলে সে নিজেকে ও নিজের পরিবারকেই হত্যা করে। তবে কেউ তার প্রতি অন্যায় আচরণ করলে তা সে করতে পারে, আল্লাহ তার সে অজুহাত গ্রহণ করবেন।
ইহুদিরা তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বহন করবে, মুসলমানরা করবে তাদেরটা। এই দলিলের অন্তর্গত কোনো মানুষকে কেউ আক্রমণ করলে পরস্পর পরস্পরকে অবশ্যই সাহায্য করবে। তারা অবশ্যই পারস্পরিক পরামর্শ ও উপদেশ গ্রহণ করবে এবং আনুগত্য বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিশেষ। কেউ তার মিত্রের অপকর্মের জন্য দায়ী হতে পারে না। যার প্রতি অন্যায় করা হয়, তাকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। যত দিন যুদ্ধ চলবে, তত দিন বিশ্বাসীদের মতো ইহুদিরাও অর্থ প্রদান করবে।
এই দলিলের অন্তর্গত মানুষের জন্য ইয়াসরিব নিরাপদ পবিত্র স্থান। আশ্রিত অপরিচিত ব্যক্তি তার গৃহস্বামীর সমমর্যাদাসম্পন্ন, ধরে নিতে হবে সে কোনো ক্ষতি করেনি বা কোনো অপরাধ করেনি। কোনো মহিলাকে কেবল তার পরিবারের সম্মতিক্রমে আশ্রয় দেওয়া হবে। যদি কোনো বিবাদ বা মতবিরোধ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়, তাহলে তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদের (সা.) কাছে অবশ্যই পেশ করতে হবে। এই দলিলে যা ধর্মানুরাগ ও সদাচারের শামিল, তা আল্লাহ গ্রহণ করছেন।
কুরাইশ এবং তাদের সহায়তাকারীদের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে না। ইয়াসরিবের ওপর যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ সব পক্ষ একে অপরকে সাহায্য করতে অবশ্যই বাধ্য থাকবে। তাদের যদি সন্ধি স্থাপন এবং প্রতিপালন করার জন্য আহ্বান জানানো হয়, তাহলে তারা তা করবে। এবং তারা যদি মুসলমানদের ওপর অনুরূপ দাবি জানায়, ধর্মযুদ্ধ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে মুসলমানরা অনুরূপ আচরণ করবে। যে যে পক্ষের লোক, সে সেই পক্ষের জন্য প্রযোজ্য সবকিছু লাভ করবে।
আল-আউসের ইহুদিরা নিজেরা এবং তাদের মুক্ত দাসেরা এই দলিলে উল্লিখিত সব মানুষের অকৃত্রিম আনুগত্যসহ এই দলিলভুক্ত সব মানুষের সমান মর্যাদা লাভ করবে। আনুগত্য বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে এক নিরাপত্তা। যে যা কিছু অর্জন করে, তা সে নিজের জন্য অর্জন করে। আল্লাহ এই দলিল অনুমোদন করেন। এই দলিল অন্যায়কারী ও পাপীকে কোনো নিরাপত্তা দেবে না। যুদ্ধেই যাক কিংবা শহরে ঘরেই থাকুক, অন্যায়কারী ও পাপাচারী না হলে সে নিরাপদ। আল্লাহ ভালো ও আল্লাহভীরু মানুষের আশ্রয়দাতা এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।
(১. এদের সবাই আল-খাজরাজভুক্ত। ২. এরা সবাই আল-আউসভুক্ত। ৩. সম্ভবত মদিনার মূর্তিপূজক আরবদের কথা বলা হয়েছে।)


The Life Of Muhammad, by Ibn Ishaq
আসুন Alfred Guillaume অনূদিত The Life Of Muhammad, by Ibn Ishaq গ্রন্থ থেকেও এই অংশটি পড়ি [4] –

চুক্তির ঐতিহাসিক ভিত্তিহীনতাঃ সিরাতুল মুস্তফা – আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী
আল্লামা ইদরীস কান্ধলবীর গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায় যে, বনু কুরাইজার সাথে এই মদিনা সনদের সময়ই চুক্তি হয়েছিল। এই তথ্যটি ঐতিহাসিক মানদণ্ডে অত্যন্ত বিতর্কিত এবং সম্ভবত একটি পরবর্তীকালীন রাজনৈতিক সংযোজন। প্রধান সমস্যাটি হলো ‘প্রাইমারী সোর্স’ বা সমসাময়িক দালিলিক প্রমাণের অনুপস্থিতি। ইবনে ইসহাক তাঁর সীরাত গ্রন্থে ‘মদীনার সনদ’-এর যে পাঠটি সংকলন করেছেন, সেখানে মদীনার বিভিন্ন আরব গোত্রের আশ্রিত ইহুদিদের উল্লেখ থাকলেও বনু কুরাইজা, বনু নাযির বা বনু কায়নুকা—এই বড় তিনটি গোত্রের নাম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। মূল সনদের তালিকায় এই গোত্রগুলোর নাম না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালীন বর্ণনায় তাদের ‘চুক্তিভুক্ত’ ও ‘চুক্তিভঙ্গকারী’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সমসাময়িক দলিলে যাদের নাম নেই, পরবর্তীতে তাদের সাথে চুক্তির দাবি করা ঐতিহাসিক মানদণ্ডে একটি বড় ধরনের অসঙ্গতি এবং এটি নির্দেশ করে যে, এই আখ্যানটি সম্ভবত পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বা আইনি প্রয়োজনে সংযোজন করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বনু কুরাইজার গণহত্যার মতো একটি চরম মাত্রার সহিংসতাকে নৈতিকভাবে জায়েজ করার জন্য একটি ‘লিখিত চুক্তি ভঙ্গের’ অজুহাত দাঁড় করানো পরবর্তীকালের সীরাতকার ও আইনবিদদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। ইবনে ইসহাক ঘটনার প্রায় দেড়শ বছর পর কোনো সুনির্দিষ্ট ‘চেইন অফ ন্যারেটর’ বা নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়াই এই বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ করেন, কিন্তু সেখানেও বনু কুরাইজার নাম অনুপস্থিত। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, যদি সত্যিই মদীনার প্রধান তিনটি ইহুদি গোত্রের সাথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ লিখিত চুক্তি থাকত, তবে মদীনার সনদের আদি পাঠে তাদের নাম না থাকাটা রীতিমত বিস্ময়কর এবং অসম্ভব। কারণ সেই সময়ে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি গোত্রই ছিল এই তিনটি গোত্র। সুতরাং, সমসাময়িক দালিলিক প্রমাণের অভাব এবং মূল সনদে তাদের নাম না থাকা এটাই প্রমাণ করে যে, বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই আইনি ভিত্তিটি মূলত পরবর্তীকালের সীরাত সাহিত্যে রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তথাকথিত ‘মদীনার সনদ’-এর যে পাঠ আমরা সীরাত গ্রন্থে পাই, সেখানেও বনু কায়নুকা, বনু নাযির বা বনু কুরাইজার মতো প্রধান তিনটি গোত্রের নাম উল্লেখ নেই। অনেক ঐতিহাসিকই মত দিয়েছেন, বনু কুরাইজার গণহত্যার এই বিবরণগুলো মূলত পরবর্তীকালের মুসলিম আইনবিদদের (Jurists) দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, যারা যুদ্ধের আইন ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি নির্ধারণের জন্য একটি কঠোর ঐতিহাসিক নজির খুঁজছিলেন। সুতরাং, সমসাময়িক কোনো নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের অভাব এবং বর্ণনার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান এটিই নির্দেশ করে যে, এই ‘চুক্তি’ মূলত একটি রাজনৈতিক বয়ান যা গণহত্যার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য পরবর্তীতে সীরাত সাহিত্যে সংযোজিত হয়েছে।
আসুন আল্লামা ইদরীস কান্ধলবীর গ্রন্থ থেকে তথ্যটি জেনে নিই, যেই গ্রন্থে এই তিনটি ইহুদি গোত্রের নাম উল্লেখ রয়েছে। আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী এই তথ্যের সপক্ষে ইবন হাজার আসকালানির ‘ফাতহুল বারী’ (৭ম খণ্ড, পৃ. ৩১৪) গ্রন্থকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অথচ ইবন হাজার আসকালানি (মৃ. ১৪৪৯ খ্রি.) মূল ঘটনার প্রায় আটশ বছর পরের লেখক। যেখানে খোদ ইবনে ইসহাকের সংকলিত সনদের আদি পাঠে এই নামগুলো নেই, সেখানে কয়েক শতাব্দী পরের কোনো সংকলনকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করা তথ্যগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, বনু কুরাইজার মতো তৎকালীন মদীনার সবচাইতে শক্তিশালী গোত্রগুলো যদি সত্যিই চুক্তিবদ্ধ থাকত, তবে সনদের মূল তালিকায় তাদের নাম না থাকাটা রীতিমতো অসম্ভব। সুতরাং, এই ‘চুক্তি’র আখ্যানটি মূলত একটি রাজনৈতিক বয়ান, যা বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য পরবর্তীতে সীরাত ও ফিকহ গ্রন্থগুলোতে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক কারণে সংযোজিত হয়েছে। [50]

তাফসীরে মাযহারী – ছানাউল্লাহ্ পানিপথী
এবারে আসুন দেখে নিই, বনু কুরাইজা সেই চুক্তি বা অঙ্গীকার সম্পর্কে আসলে কী বলেছিল [39]

চুক্তিতে কি পাইকারি গণহত্যার উল্লেখ ছিল?
ইসলামি আলোচকরা প্রায়শই বনু কুরাইজার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বা ‘চুক্তিভঙ্গ’-এর শাস্তি হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইহুদিরা মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গ করেছিল, তাই এই শাস্তি তাদের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়—মদিনা সনদের কোনো ধারায় কি আদৌ লেখা ছিল যে, চুক্তি ভঙ্গ করলে সেই গোত্রের সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে হত্যা করা হবে এবং নারী-শিশুদের দাস বানানো হবে?
ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক এবং ইবনে হিশাম সংরক্ষিত মদিনা সনদের (Constitution of Medina) যে টেক্সট বা অনুলিপি পাওয়া যায়, তার ৪৭টি ধারার কোথাও ‘চুক্তিভঙ্গের শাস্তি’ হিসেবে গণহত্যা’ করা হবে এমন কিছু উল্লেখ নেই। সনদের মূল ফোকাস ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, দিয়াত (রক্তপণ) পরিশোধ এবং মদিনার প্রতিরক্ষা। সনদে বলা ছিল, কেউ অপরাধ করলে তার দায় ব্যক্তিগতভাবে তার ওপর বর্তাবে, পুরো গোত্রের ওপর নয়।
তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, তবুও আধুনিক বা তৎকালীন কোনো সুস্থ আইনি কাঠামোতেই চুক্তি ভঙ্গের শাস্তি ‘ম্যাসাকার’ বা ‘গণহত্যা’ হতে পারে না। সাধারণত রাজনৈতিক বা সামরিক চুক্তি লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে চুক্তি বাতিল করা, জরিমানা আরোপ, অবরোধ অথবা বড়জোর ওই অঞ্চল থেকে নির্বাসন। নবী মুহাম্মদ নিজেও বনু কুরাইজার আগে বনু কায়নুকা এবং বনু নাদির গোত্রের ক্ষেত্রে নির্বাসনের নীতি অবলম্বন করেছিলেন।
কিন্তু বনু কুরাইজার ক্ষেত্রে মদিনা সনদের দোহাই দিয়ে যে শাস্তি কার্যকর করা হয়েছিল, তা সনদের কোনো শর্তের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি নতুন এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, যা পূর্বনির্ধারিত কোনো আইনি কাঠামোর তোয়াক্কা করেনি। অর্থাৎ, এই গণহত্যাকে ‘চুক্তি ভঙ্গের শাস্তি’ বলে চালিয়ে দেওয়াটা মূলত একটি ‘পোস্ট-হক জাস্টিফিকেশন’ বা ঘটনার পরে তৈরি করা খোঁড়া যুক্তি। আদতে, কোনো লিখিত দলিলেই ইহুদিরা এমন কোনো শর্তে স্বাক্ষর করেনি যেখানে বলা ছিল—“আমরা কথা না রাখলে আমাদের সবাইকে জবাই করা হবে।”
মদিনা সনদে না থাকলে কিসের চুক্তি ছিল?
উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, মুহাম্মদ মদিনায় আসার পরে বনু কুরাইজা গোত্র তার সাথে কোন ধরণের চুক্তি করেছিল, এরকম কোন প্রমাণ প্রাইমারি সোর্সগুলোতে নেই। পরবর্তী সময়ে লিখিত সীরাত গ্রন্থগুলোতে এটি পাওয়া যায়, তবে প্রাইমারি সোর্স উল্লেখ ছাড়া। তাহলে বনু কুরাইজার সাথে কিসের অঙ্গীকার হয়েছিল? আসুন আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর হাদিস থেকে খুঁজে দেখি। হাদিস থেকে জানা যায়, মুহাম্মদকে বনু নযীর গোত্র নিমন্ত্রণ জানায়, তার নবুয়্যেত প্রমাণ দিয়ে যেতে। তারা মুহাম্মদকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব। মুহাম্মদ তাদের কাছে নিজের নবুয়্যতের প্রমাণ দিতে গিয়ে রাতের বেলা কোন কারণ ছাড়াই সেখান থেকে হুট করে চলে আসে। সেটার প্রমাণ আগে দেয়া হয়েছে। এরপরেই মুহাম্মদ বনু নযীর বা বনু নাদির গোত্রকে আক্রমণ করে। তাদের সাথে যখন মুহাম্মদের সৈন্যরা পারছিল না, সেই সময়ে তারা হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই বনু কুরাইজাকেও আক্রমণ করে বসে। বনু কুরাইজা গোত্র এই আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য অঙ্গীকার করে যে, মুহাম্মদের সৈন্যদের তারা আক্রমণ করবে না। আসুন হাদিস থেকে দেখে নেয়া যাক [8]। পাঠক লক্ষ্য করে পড়ুন, বনু কুরাইজাকে হঠাৎ আক্রমণের কিন্তু কোন কারণই ছিল না।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬১. বনূ নযীরের ঘটনা সম্পর্কে।
২৯৯৪. মুহাম্মদ ইবন দাঊদ ইবন সুফইয়ান (রহঃ) ……. আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তি-পূজক সাথীদের, যারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক, এ মর্মে পত্র লেখে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের আগে মদীনায় অবস্থান করছিলেনঃ তোমরা আমাদের সাথী (মুহাম্মদ) কে জায়গা দিয়েছ। এ জন্য আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি, হয়তো তাঁর সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো তাঁকে বের করে দাও। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের আমাদের দখলে আনব।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তিপূজারী সাথীরা এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এ খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌছবার পর তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বলেনঃ তোমরা কুরায়শদের নিকট হতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী চিঠি পেয়েছ, কিন্তু তা তোমাদের জন্য এত মারাত্মক নয়, যত না ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করবে। কেননা, তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প করছ।
তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরূপ কথা শুনলো, তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। এ খবর কুরায়শ কাফিরদের কাছে পৌছলে তারা বদর যুদ্ধের পর ইয়াহুদীদের নিকট লিখলোঃ তোমরা ঘরবাড়ী ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধ করা। অন্যথায় আমরা তোমাদের সাথে এরূপ করব, সেরূপ করব। আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা এরূপ চিঠি পেল, তখন বনূ নযীরের ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব।
পরদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর হামলা করেন এবং তাদের অবরোধ করে বলেনঃ আল্লাহ্র শপথ! তোমরা যতক্ষণ অঙ্গীকার না করবে, ততক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তখন তারা (ইয়াহুদীরা) অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে। ফলে তিনি সেদিন তাদের সাথে দিনভর যুদ্ধে রত থাকেন। পরদিন তিনি বনূ নযীরকে বাদ দিয়ে বনূ কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে তারা তাঁর সংগে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তখন তিনি তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বনূ নযীরকে অবরোধ করেন এবং তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করেন, যতক্ষণ না তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
বনূ নযীরের লোকেরা তাদের উটের পিঠে ঘরের দরজা, চৌকাঠ ইত্যাদি যে পরিমাণ মালামাল নেওয়া সম্ভব ছিল, তা নিয়ে যায়। এবার বনূ নযীরের খেজুরের বাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে আসে, যা আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلاَ رِكَابٍ
অর্থাৎ আল্লাহ্ কাফিরদের মাল হতে যে সস্পদ তাঁর রাসূলকে প্রদান করেন, তা হাসিলের জন্য তোমরা তোমাদের ঘোড়া অথবা উট হাঁকাও নি, অর্থাৎ ঐ সম্পদ বিনা যুদ্ধে হাসিল হয়।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মালের অধিকাংশই মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং অভাবগ্রস্ত দু’জন আনসারকে তা হতে অংশ প্রদান করেন। এ দু’জন ছাড়া অন্য আনসার সাহাবীদের মাঝে এ মাল বিতরণ করা হয়নি। অবশিষ্ট মাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদকা স্বরূপ ছিল, যা বনূ ফাতিমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মদিনা সনদ আসলে কে ভঙ্গ করেছিল?
প্রথমত, মদিনা সনদে বানু কুরাইজা মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, এরকম কোন প্রাথমিক ইসলামিক দলিল নেই। যেটি আছে তা হচ্ছে, বহুবছর পরে লিখিত কিছু সীরাত গ্রন্থে প্রাথমিক সূত্র উল্লেখ না করেই বনু কুরাইজার সাথে মদিনা সনদের চুক্তির কথা বলা আছে। সেটি যদি আমরা সত্য ধরেও নিই, তাহলেও একটি বড় সমস্যা দেখা যায়। সেই মদিনা সনদ কে বা কারা ভঙ্গ করেছিল? বানু কুরাইজা নাকি খোদ মুহাম্মদ? আসুন সেটি একবার যাচাই করি। আসুন নিচের এই বিবরণটি পড়ি। যেখানে দেখা যাচ্ছে, খন্দকের যুদ্ধের পরে অর্থাৎশাওয়াল – যিলকদ, ৫ হিজরি বা জানুয়ারি – ফেব্রুয়ারি ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ এর পরে বানু কুরাইজার চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে মুহাম্মদ তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফেরার সাথে সাথেই জিবরাইল নাকি এসে মুহাম্মদকে বিষয়টি জানিয়েছিল, বানু কুরাইজার চুক্তি ভঙ্গের কথা। এই সম্পর্কে জানা যায়, মুহাম্মদ উম্মে সালমাহর ঘরে আসার পরে জিবরাইলের আগমন ঘটে এবং জিবরাইল নাকি বনু কুরাইজার চুক্তিভঙ্গ এবং বিশ্বাসঘাতকতার গোপন খবরটি নবীকে জানায় [45]

এর অর্থ হচ্ছে, যদি বানু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করেও থাকে (যার নির্ভরযোগ্য কোন দলিল নেই), তার কথা মুহাম্মদ জানতে পারে খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পরে। কিন্তু তার আগেই তো সে বানু কুরাইজা গোত্রকে আরও একবার আক্রমণ করেছিল। তাহলে মদিনা সনদে বানু কুরাইজা যদি মুহাম্মদের সাথে চুক্তি করেও থাকে, সেটি তো মুহাম্মদই ভঙ্গ করেছিল। আসুন দেখি, বানু নাদীর আক্রমণের সময়ই মুহাম্মদ বানু কুরাইজাকে আক্রমণ করেছিল। উল্লেখ্য, বানু নাদীর আক্রমণ ঘটেছিল৬২৫ সালের আগস্ট মাসে বা রবিউল আউয়াল, ৪ হিজরি [8]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬১. বনূ নযীরের ঘটনা সম্পর্কে।
২৯৯৪. মুহাম্মদ ইবন দাঊদ ইবন সুফইয়ান (রহঃ) ……. আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তি-পূজক সাথীদের, যারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক, এ মর্মে পত্র লেখে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের আগে মদীনায় অবস্থান করছিলেনঃ তোমরা আমাদের সাথী (মুহাম্মদ) কে জায়গা দিয়েছ। এ জন্য আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি, হয়তো তাঁর সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো তাঁকে বের করে দাও। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের আমাদের দখলে আনব।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তিপূজারী সাথীরা এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এ খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌছবার পর তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বলেনঃ তোমরা কুরায়শদের নিকট হতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী চিঠি পেয়েছ, কিন্তু তা তোমাদের জন্য এত মারাত্মক নয়, যত না ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করবে। কেননা, তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প করছ।
তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরূপ কথা শুনলো, তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। এ খবর কুরায়শ কাফিরদের কাছে পৌছলে তারা বদর যুদ্ধের পর ইয়াহুদীদের নিকট লিখলোঃ তোমরা ঘরবাড়ী ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধ করা। অন্যথায় আমরা তোমাদের সাথে এরূপ করব, সেরূপ করব। আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা এরূপ চিঠি পেল, তখন বনূ নযীরের ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব।
পরদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর হামলা করেন এবং তাদের অবরোধ করে বলেনঃ আল্লাহ্র শপথ! তোমরা যতক্ষণ অঙ্গীকার না করবে, ততক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তখন তারা (ইয়াহুদীরা) অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে। ফলে তিনি সেদিন তাদের সাথে দিনভর যুদ্ধে রত থাকেন। পরদিন তিনি বনূ নযীরকে বাদ দিয়ে বনূ কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে তারা তাঁর সংগে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তখন তিনি তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বনূ নযীরকে অবরোধ করেন এবং তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করেন, যতক্ষণ না তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
বনূ নযীরের লোকেরা তাদের উটের পিঠে ঘরের দরজা, চৌকাঠ ইত্যাদি যে পরিমাণ মালামাল নেওয়া সম্ভব ছিল, তা নিয়ে যায়। এবার বনূ নযীরের খেজুরের বাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে আসে, যা আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلاَ رِكَابٍ
অর্থাৎ আল্লাহ্ কাফিরদের মাল হতে যে সস্পদ তাঁর রাসূলকে প্রদান করেন, তা হাসিলের জন্য তোমরা তোমাদের ঘোড়া অথবা উট হাঁকাও নি, অর্থাৎ ঐ সম্পদ বিনা যুদ্ধে হাসিল হয়।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মালের অধিকাংশই মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং অভাবগ্রস্ত দু’জন আনসারকে তা হতে অংশ প্রদান করেন। এ দু’জন ছাড়া অন্য আনসার সাহাবীদের মাঝে এ মাল বিতরণ করা হয়নি। অবশিষ্ট মাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদকা স্বরূপ ছিল, যা বনূ ফাতিমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
| নাম | সময়কাল | ঘটনা |
|---|---|---|
| মদিনা সনদ | ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে বা ১লা হিজরি সাল | মদিনায় কয়েকটি ইহুদি গোত্রের সাথে মুসলিমদের চুক্তি [3] [4] |
| বানু নাদীর আক্রমণ | ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ আগস্ট মাস বা ৪ হিজরি, রবিউল আউয়াল | বিতর্কের আহবান থেকে পালিয়ে এসে বানু নাদির আক্রমণ, বানু নাদির আক্রমণের মাঝখানে অহেতুক বানু কুরাইজাকেও আক্রমণ [7] [8] |
| বানু কুরাইজার কথিত চুক্তিভঙ্গ | ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ জানু-ফেব্রু বা ৫ হিজরি, শাওয়াল – যিলকদ | বানু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করেছে বলে জিবরাইলের আগমন [45] |
চুক্তিভঙ্গ কী গণহত্যাকে জায়েজ করে?
বাঙলায় একটি প্রবাদ আছে যে, দুষ্টের ছলের অভাব হয় না। ইসলামিক এপোলোজিস্টরা বনু কুরাইজা গোত্রের ওপর যেই গণহত্যা চালায়, তাকে জায়েজ করতে বনু কুরাইজা গোত্রের চুক্তি ভঙ্গের কথা বারবার ব্যবহার করেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, কিন্তু সেটিও কী একটি গোটা গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদের যৌনদাসী এবং ক্রীতদাস বানানোকে জায়েজ করতে পারে?
কাশ্মীরে যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়, ভারতীয় সংবিধান লঙ্ঘন কিংবা চুক্তি ভঙ্গের নাম দিয়ে, সেটিও তো তাহলে জায়েজ হয়ে যায়। কিংবা ধরুন, ততকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা আধুনিক বাঙলাদেশে পাক আর্মি যখন গণহত্যা চালায়, দেশের স্বার্বোভৌমত্ব রক্ষার নাম দিয়ে, কিংবা পাকিস্তানের সাথে আমাদের চুক্তি ভঙ্গের নাম দিয়ে, তাহলে তো সেটিও জায়েজ হয়ে যায়। সত্য হচ্ছে, এগুলো খুবই সস্তা এবং খোড়া অজুহাত, যা একইসাথে অমানবিকও বটে। এই ধরণের অজুহাত কোন অবস্থাতেই এই ধরণের কাজকে জায়েজ করতে পারে না।
বনু কুরাইজা অবরোধঃ নারী ও শিশুদের হাহাকার
ফেরেশতা জিবরাইল মারফত কথিত বিশ্বাসঘাতকতার খবর পেয়ে নবী মুহাম্মদ তার যোদ্ধা বাহিনীকে নিয়ে বনু কুরাইজাকে দ্বিতীয়বার আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। এই সময়ে তিনি প্রায় ২৫ দিন বনু কুরাইজার দূর্গ অবরোধ করে রাখেন। বাইরে থেকে খাদ্য ও পানীয় আসা যাওয়া বন্ধ করে দেন, যার ফলাফল হিসেবে এক অমানবিক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। নারী শিশুদের হাহাকার ওঠে, ক্ষুধা তৃষ্ণায় তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়।
আবু লুবাবার ইঙ্গিতঃ সবাইকে জবাই করা হবে
বনু কুরাইজা গোত্রের সাথে সাথে নবী মুহাম্মদের কী করার পরিকল্পনা, সেটি নবী মুহাম্মদেরই এক অনুসারী আবূ লূবাবা ফাঁস করে দিয়েছিলেন। বনু কুরাইজা গোত্রকে ২৫ দিন অবরোধ করে রাখার পরে আবূ লূবাবাকে তিনি পাঠিয়েছিলেন বনু কুরাইজার দূর্গে। সেখানে ঢোকার পরেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তারা আবূ লূবাবার কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানাতে থাকে। নবী মুহাম্মদের অনুসারী হওয়ার পরেও নারী শিশুদের সেই কান্না দেখে মন গলে যায় আবূ লূবাবার। তিনি ইঙ্গিতে তাদের জানিয়ে দেন, আত্মসমর্পণ করলে তাদের হত্যা করা হবে। নবী মুহাম্মদ সেই পরিকল্পনা করেই এসেছেন। [51] [52]

যখন আবূ লুবাবা সেখানে উপস্থিত হল তখন পুরুষগণ তাকে দেখে দৌঁড়ে তার নিকট এল এবং শিশু ও মহিলাগণ করুন কণ্ঠে ক্রন্দন শুরু করল। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আবূ লুবাবার অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হল। ইহুদীগণ বলল, ‘আবূ লুবাবা! আপনি কি যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন যে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করি?’
বলল, ‘হ্যাঁ’, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হাত দ্বারা কণ্ঠনালির দিকে ইঙ্গিত করল, যার অর্থ ছিল হত্যা।

নবীর পূর্ব পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেল
ক্ষমতাশালী হলেই যে নবী মুহাম্মদ ইহুদিদের কচুকাটা করবেন, সেই ইঙ্গিত নবী ও তার সাহাবীগণ বহু আগে থেকেই দিয়ে আসছিলেন। বিষয়টি আগেই একবার বলা হয়েছে, বদর যুদ্ধের পরে নবীর সাহাবীগণ ইহুদিদের বলে, দ্রুত ইসলাম গ্রহণ না করলে তাদের অবস্থাও পৌত্তলিকদের মতই হবে। এই তথ্যটি জানা যায় ইবনে কাসীরের তাফসীর গ্রন্থ থেকে। একইসাথে আবু লুবাবা যে নবীর পূর্ব থেকে নেয়া গোপন সিদ্ধান্ত ইহুদিদের বলে দিয়েছিল, সেই সম্পর্কেও আয়াত নাজিল হয় [5] –

উপরে আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী এর লিখিত আর-রাহীকুল মাখতূম এবং ইবনে হিশামের সীরাতুন নবী (সা.) থেকে যেই দলিল দেয়া হয়েছে, যেখানে আবূ লুবাবা নবী মুহাম্মদের গোপন সিদ্ধান্তটি যে আগেই ইহুদিদের বলে দিয়েছিল, সেটি মুয়াত্তা মালিকের হাদিস গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে স্পষ্টভাবেই প্রমাণ হয় যে, বনু কুরাইজা গোত্রের ওপর গণহত্যা চালাবার সিদ্ধান্ত মুহাম্মদ আগেই নিয়ে রেখেছিলেন [51] [52] [53] [54] –
মুয়াত্তা মালিক
২২. মানত ও কসম সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ৯. কসম সম্পৰ্কীয় বিবিধ আহকাম
রেওয়ায়ত ১৬. ইবন শিহাব (রহঃ) জ্ঞাত হইয়াছেন, আবু লুবাবা ইবন আবদুল মুনজির (রাঃ) এর তওবা যখন আল্লাহ্ তা’আলা কবুল করেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের নিকট আসিয়া আরয করিলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আমি যেইখানে বাস করি, আমার যেই বাড়িটিতে আমি গুনাহ করিয়াছিলাম, যেইখানে আমার এই গুনাহ হইয়াছিল, উহা ত্যাগ করিয়া আপনার নিকট আসিয়া থাকিব কি? আর আল্লাহ ও তাহার রাসূলের ওয়াস্তে এই বাড়িটি সদকা করিব কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেনঃ তোমার ধন-সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ সদকা দিয়া দিলেই যথেষ্ট হইবে।[1]
[1] আবু লুবাবা (রাঃ) মদীনার ইহুদী বসতি বনু কুরায়যায় বসবাস করিতেন। ইহাদের সহিত মুসলিমদের যুদ্ধ শুরু হইলে ইনি মুসলিমদের তরফ হইতে আলোচনা করিতে যান এবং ইহাদের সহানুভূতিতে ইশারায় ইহাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন সিদ্ধান্ত জানাইয়া দেন। পরে এই জন্য অত্যন্ত অনুতপ্ত হন এবং মসজিদে নববীর একটি স্তম্ভের সহিত নিজেকে বাঁধিয়া রাখেন ও বলেনঃ যতদিন আল্লাহ আমার এই গুনাহু মাফ না করিবেন ততদিন এই অবস্থায়ই আমি থাকিব। শুধু প্রশ্ৰাব-পায়খানার সময় তাহার স্ত্রী বাঁধন খুলিয়া দিতেন, পরে আবার বাঁধিয়া রাখিতেন। শেষে আল্লাহ তা’আলা তাহার ক্ষমার ঘোষণা করেন। তখন তিনি আনন্দে সকল কিছু সদকা করিয়া দিতে চাহিয়াছিলেন।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ ইবনু শিহাব আয-যুহরী (রহঃ)

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারীতে এই বিষয়ে কী বলা আছে জেনে নেয়া যাক। পাঠক লক্ষ্য করুন, বনু কুরাইজা গোত্রের সবাইকে যে নবী মুহাম্মদ জবাই করবেন, সেই সিদ্ধান্তটি আগে থেকেই নেয়া ছিল। বনু কুরাইজার অসহায় নারী শিশুদের কান্না শুনে যা আবু লুবাবা প্রকাশ করে দিয়েছিলেন [55]

ন্যায়বিচার ও বিচারকের নিরপেক্ষতা
ন্যায়বিচার হলো সভ্য সমাজের অন্যতম ভিত্তি, যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়। বিচারের ক্ষেত্রে আসামীর জন্ম পরিচয়, লিঙ্গ, জাতিসত্ত্বা, ইত্যাদি কোন অবস্থাতেই বিবেচ্য হতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে বিচারক এবং আসামীর মধ্যে যদি কোন পূর্ব শত্রুতা কিংবা পূর্ব সুসম্পর্ক থাকে, সেটি বিচারের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার কতে পারে। তাই এরকম বিচারক কখনই নিয়োগ দেয়া হয় না, যদি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবেন না। ধরুন, বিচারক এবং অভিযুক্ত আসামী পিতা এবং পুত্র। এরকম অবস্থায়, সেই বিচারককে সরিয়ে অন্য বিচারক নিয়োগ দিতে হবে, যেন কোনভাবেই বিচারকের পিতৃত্ব বিচারের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার না করতে পারে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে যদি কোন বিচার হয়, তাহলে সেখানে আরও বেশী স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রয়োজন, প্রয়োজন আসামী হিসেবে অভিযুক্তদের সম্পুর্ণ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া। সেগুলো না থাকলে সেটিকে অবিচার হিসেবেই গণ্য করতে হবে।
বিচারকের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতাঃ ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো বিচারকের নিরপেক্ষতা। যদি কোনো বিচারক ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ, বিদ্বেষ, বা পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হন, তবে তার সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত হবে না। এক্ষেত্রে বিচারককে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে থেকে কেবল আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের “বুশ বনাম গোর” মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল।
বিচারকের আত্মীয়তার প্রভাবঃ অনেক ক্ষেত্রে বিচারক যদি কোনো মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মীয় বা পরিচিত হন, তাহলে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে অনেক দেশে এমন পরিস্থিতিতে বিচারককে মামলার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। যেমন, ২০১১ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কে.জি. বালাকৃষ্ণান তার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি মামলার দায়িত্ব গ্রহণ করলে তা নিয়ে সমালোচনা হয় এবং পরে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন।
বিচারকের পূর্ব বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক প্রভাবঃ বিচারকদের পূর্ব বিদ্বেষও ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ১৯৩১ সালে জার্মানির “রাইখটাগ ফায়ার ট্রায়ালে” বিচারকের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে নিরপরাধ ব্যক্তিদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। আবার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক কারণে কিছু বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল, যেখানে বিরোধী দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে রায় পক্ষপাতমূলক বলে অভিযোগ উঠেছিল।
মিডিয়া ও জনমতের প্রভাবঃ বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে মিডিয়া ও জনমতের অযাচিত চাপ থেকে বিচারকদের মুক্ত থাকতে হয়। মিডিয়া ট্রায়াল কিংবা জনমত অথবা উত্তেজিত মব অনেক সময় বিচারকের উপর প্রভাব ফেলে, যার ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়। যেমন, ১৯৯৫ সালে আমেরিকার “ও. জে. সিম্পসন” মামলায় মিডিয়ার অত্যাধিক প্রচারের কারণে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিচার প্রক্রিয়ার বিচারক সা’দ ইবনু মুআয কী বানু কুরাইজা গোত্রের সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ জায়গায় থেকে তথ্য প্রমাণ যাচাই করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, নাকি তার এই গোত্র সম্পর্কে কোন পূর্ব রাগ বা ভালবাসা ছিল? যেকোনো বিচার প্রক্রিয়ার মৌলিক ও প্রাথমিক শর্ত হলো বিচারকের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা। ন্যায়সঙ্গত বিচার ব্যবস্থায় একজন কুদরত বা স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) থাকা ব্যক্তিকে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হলে সেই রায় অবৈধ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু বনু কুরাইজা গোত্রের বিচারে সা’দ ইবনু মুআযকে যখন সালিশ বা বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তিনি কি এই বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন? নাকি এই গোত্রের প্রতি তার মনে আগে থেকেই কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা ঘৃণা জমা ছিল? যদি কোনো বিচারক অভিযুক্ত পক্ষের প্রতি পূর্বশত্রুতা বা ব্যক্তিগত আক্রোশ পোষণ করেন, তবে আধুনিক ও প্রাচীন—উভয় বিচারব্যবস্থাতেই সেই নিয়োগ সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) হিসেবে গণ্য হয় এবং ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ঐতিহাসিক ও হাদিসের তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সা’দ ইবনু মুআয মোটেও কোনো নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন না। খন্দকের যুদ্ধে আহত হওয়ার পর শারীরিক যন্ত্রণা এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে বনু কুরাইজার প্রতি চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন বনু কুরাইজার চরম বিপর্যয় বা ধ্বংস স্বচক্ষে দেখার আগে তার মৃত্যু না হয়। অর্থাৎ, বিচারকের আসনে বসার আগেই তিনি আসামিপক্ষের জন্য একটি ‘চরম পরিণতি’ বা মৃত্যু কামনা করছিলেন। যখন একজন ব্যক্তি নিজেই বিবাদী পক্ষের ধ্বংস দেখার জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, তখন তার দেওয়া রায় কোনোভাবেই প্রভাবমুক্ত বা ন্যায়বিচার হওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি যে একটি পূর্বপরিকল্পিত প্রতিহিংসার বাস্তবায়ন ছিল, তা তার এই মানসিক অবস্থান থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সা’দ ইবনে মুআযের এই মনোভাব নবী মুহাম্মদ আগে থেকেই খুব ভালভাবে জানতেন। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবেই এরকম একজন ব্যক্তির কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত করা হয়, যেন নবীর পুর্ব পরিকল্পনা অনুসারেই রায় আসে [56]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮২। জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) আহযাব যুদ্ধের দিন তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এতে তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে যায়। তার ক্ষতস্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তারপর তার হাত ফুলে যায়। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠে। তিনি (সাদ) নিজের এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘হে আল্লাহ। আমার জীবনকে কেড়ে নিও না বানু কুরাইযার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ না জুড়ানো পর্যন্ত।” তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোটাও বের হয়নি।
সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ)-কে তারা (বানু কুরাইযা) সালিশ মানতে রাজী হয়। তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার (সাদের) নিকট লোক পাঠালেন (সমাধানের জন্য)। তিনি সমাধান দিলেন যে, বানু কুরাইযা গোত্রের পুরুষদেরকে মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদেরকে বাচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের ব্যাপারে তোমার মত সম্পূর্ণ আল্লাহ্ তা’আলার মতের অনুরূপ হয়েছে। তারা (পুরুষগণ) সংখ্যায় ছিল চার শত। লোকেরা তাদেরকে মেরে ফেলা সমাপ্ত করলে, তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হল এবং তিনি মৃত্যু বরণ করলেন।
সহীহ, ইরওয়া (৫/৩৮-৩৯)
আবূ সাঈদ ও আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
সা’দ ইবনু মুআয কে ছিলেন?
মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই দাবী করেন, সা’দ ইবনু মুআয তো ইহুদিদেরই লোক ছিল! এই কথাটি সম্পূর্ণভাবেই মিথ্যা কথা। কে ছিলেন এই সা’দ? সা’দ ইবনু মুআয ছিলেন ধর্মান্তরিত একজন মুসলিম। তিনি কী ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার প্রতি সহানুভূতুশীল ছিলেন? নাকি শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন? মুহাম্মদ তাকে এই কাজের দায়িত্ব কী জেনে বুঝে দিয়েছিলেন যে, একে দায়িত্ব দিলেই সা’দ সর্বোচ্চ নৃশংসতা দেখাবে? আসুন উপরের হাদিসটি আবারো পড়ি [56] –
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮২। জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) আহযাব যুদ্ধের দিন তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এতে তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে যায়। তার ক্ষতস্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তারপর তার হাত ফুলে যায়। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠে। তিনি (সাদ) নিজের এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘হে আল্লাহ। আমার জীবনকে কেড়ে নিও না বানু কুরাইযার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ না জুড়ানো পর্যন্ত।” তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোটাও বের হয়নি।
সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ)-কে তারা (বানু কুরাইযা) সালিশ মানতে রাজী হয়। তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার (সাদের) নিকট লোক পাঠালেন (সমাধানের জন্য)। তিনি সমাধান দিলেন যে, বানু কুরাইযা গোত্রের পুরুষদেরকে মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদেরকে বাচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের ব্যাপারে তোমার মত সম্পূর্ণ আল্লাহ্ তা’আলার মতের অনুরূপ হয়েছে। তারা (পুরুষগণ) সংখ্যায় ছিল চার শত। লোকেরা তাদেরকে মেরে ফেলা সমাপ্ত করলে, তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হল এবং তিনি মৃত্যু বরণ করলেন।
সহীহ, ইরওয়া (৫/৩৮-৩৯)
আবূ সাঈদ ও আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই ঘটনার বিচারক কে নির্ধারণ করেছিলেন? বনু কুরাইজা গোত্র স্বেচ্ছায় তাকে বিচারক নির্বাচিত করেছিল, নাকি নবী মুহাম্মদ নিজেই বিচারক নির্ধারণ করেছেন? ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার কী মুহাম্মদ কর্তৃক নির্ধারিত এই বিচারককে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল? [57] [58]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৩১. আহযাব যুদ্ধ থেকে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর বনূ কুরাইযাহ অভিযান ও তাদেরকে অবরোধ।
৪১২২. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধে সা‘দ (রাঃ) আহত হয়েছিলেন। কুরাইশ গোত্রের হিববান ইবনু আরেকা নামক এক ব্যক্তি তাঁর উভয় বাহুর মধ্যবর্তী রগে তীর বিদ্ধ করেছিল। নিকট থেকে তার সেবা করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নাববীতে একটি তাঁবু তৈরি করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যখন হাতিয়ার রেখে গোসল শেষ করলেন তখন জিব্রীল (আঃ) নিজ মাথার ধূলাবালি ঝাড়তে ঝাড়তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির হলেন এবং বললেন, আপনি হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি এখনো তা রেখে দেইনি। চলুন তাদের দিকে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায়? তিনি বানী কুরাইযা গোত্রের প্রতি ইশারা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযার মহল্লায় এলেন। অবশেষে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফায়সালা মান্য করে দূর্গ থেকে নিচে নেমে এল। কিন্তু তিনি ফয়সালার ভার সা‘দ (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করলেন। তখন সা‘দ (রাঃ) বললেন, তাদের ব্যাপারে আমি এই ফায়সালা দিচ্ছি যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হবে, নারী ও সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ বণ্টন করা হবে। বর্ণনাকারী হিশাম (রহ.) বলেন, আমার পিতা ‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, সা‘দ (রাঃ) আল্লাহর কাছে দু‘আ করেছিলেন, হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আপনার সন্তুষ্টির জন্য তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার চেয়ে কোন কিছুই আমার কাছে অধিক প্রিয় নয়। যে সম্প্রদায় আপনার রাসূলকে মিথ্যাচারী বলেছে এবং দেশ থেকে বের করে দিয়েছে হে আল্লাহ! আমি মনে করি (খন্দক যুদ্ধের পর) আপনি তো আমাদের ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। যদি এখনো কুরায়শদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ বাকী থেকে থাকে তাহলে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন, যাতে আমি আপনার রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারি। আর যদি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে থাকেন তাহলে ক্ষত হতে রক্ত প্রবাহিত করুন আর তাতেই আমার মৃত্যু দিন। এরপর তাঁর ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে তা প্রবাহিত হতে লাগল। মসজিদে বানী গিফার গোত্রের একটি তাঁবু ছিল। তাদের দিকে রক্ত প্রবাহিত হতে দেখে তারা বললেন, হে তাঁবুবাসীগণ! আপনাদের দিক থেকে এসব কী আমাদের দিকে আসছে? পরে তাঁরা জানলেন যে, সা‘দ (রাঃ)-এর ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ জখমের কারণেই তিনি মারা যান, আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকুন। [৪৬৩; মুসলিম ৩২/২২, হাঃ ১৭৬৯, আহমাদ ২৪৩৪৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৮১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ২২. যে ব্যক্তি চুক্তি ভঙ্গ করে তাকে হত্যা করা বৈধ হওয়া এবং দুর্গের অধিবাসীদের কোন ন্যায়পরায়ণ ক্ষমতা প্রদত্ত বিচারকের নির্দেশে অবতরণ বৈধ হওয়া
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৮৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৬৯
৪৪৮৯-(৬৫/১৭৬৯) আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ ও মুহাম্মাদ ইবনু ‘আলা হামদানী (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধের দিন সা’দ (রাযিঃ) আঘাতপ্রাপ্ত হন। কুরায়শের ইবনুল আরিকা নামক এক ব্যক্তি তার শিরায় তীর নিক্ষেপ করেছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দ (রাযিঃ) এর জন্যে মসজিদে একটি তাবু স্থাপন করে দিলেন, যেন নিকট থেকে তাকে দেখাশোনা করা যায়। যখন তিনি (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে অস্ত্র রেখে সবেমাত্র গোসলের কাজ সমাপ্ত করেছেন এমন সময় জিবরাঈল (আঃ) স্বীয় মাথা থেকে ধূলিবালি ঝাড়তে ঝাড়তে আগমন করলেন।
এরপর বললেন, আপনি অস্ত্র রেখে দিয়েছেন? আল্লাহর শপথ! আমরা তো অস্ত্র রাখিনি। তাদের দিকে গমন করুন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন দিকে? তখন তিনি বানু কুরাইযার দিকে ইঙ্গিত করলেন। এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে যুদ্ধ করলেন। তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে দূর্গ থেকে অবতরণ করলো। তারপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিচারের ভার (তাদের নেতা) সা’দ (রাযিঃ) এর উপর অর্পণ করলেন। সা’দ (রাযিঃ) বললেন, আমি নির্দেশ দিচ্ছি যে, তাদের মধ্যে যুদ্ধের উপযুক্ত (যুবক) লোকদেরকে হত্যা করা হোক, নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করা হোক এবং তাদের সম্পদগুলো ভাগ করা হোক। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪৬, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৩২/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ৩২/২২. চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির মধ্যস্থতায় দূর্গের লোকদের আত্মসমর্পণ করানো জায়িয।
১১৫৬. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধে সা’দ (রাঃ) আহত হয়েছিলেন। কুরাইশ গোত্রের হিব্বান ইবনু ইরকা নামক এক ব্যক্তি তার উভয় বাহুর মধ্যবর্তী রগে তীর বিদ্ধ করেছিল। নিকট থেকে তার সেবা করার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে একটি তাঁবু তৈরি করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যখন হাতিয়ার রেখে গোসল শেষ করলেন তখন জিহ্বীল (আঃ) তার মাথার ধূলাবালি ঝাড়তে ঝাড়তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির হলেন এবং বললেন, আপনি হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি এখনো তা রেখে দেইনি। চলুন তাদের প্রতি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায়? তিনি বানী কুরাইযা গোত্রের প্রতি ইশারা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযার মহল্লায় এলেন। অবশেষে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফয়সালা মান্য করে দুর্গ থেকে নিচে নেমে এল। কিন্তু তিনি ফয়সালার ভার সা’দ (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করলেন। তখন সা’দ (রাঃ) বললেন, তাদের ব্যাপারে আমি এই ফায়সালা দিচ্ছি যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হবে, নারী ও সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ বণ্টন করা হবে।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৬৪ : মাগাযী, অধ্যায় ৩০, হাঃ ৪১২২; মুসলিম, পর্ব ৩২ ; জিহাদ, অধ্যায় ২২, হাঃ ১৭৬৯
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
বিচারের নামে প্রহসনঃ পূর্ব নির্ধারিত রায়
ইবনে হিশামের প্রখ্যাত সীরাত গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বনু কুরাইজার সাথে কী করা হবে তা ছিল পূর্ব নির্ধারিত। বিচার আগেই ঠিক করা হয়েছিল, কোন তথ্য প্রমাণ যাচাই বাছাই ছাড়াই। ৬০০-৯০০ মানুষের বিচার, চুলচেরা বিশ্লেষণ, কে অপরাধী কে নিরাপরাধ, এগুলো একই দিনে বিচার করে ফেলা অসম্ভব ব্যাপার। বিচার যেভাবে হয়, তা হচ্ছে, একপক্ষ থাকে অভিযোগকারী, আরেকপক্ষ অভিযুক্ত। অভিযোগকারী অভিযোগ করে, অভিযুক্ত তা খণ্ডন করে। এরপরে প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিচারক সমস্ত তথ্যপ্রমাণের আলোকে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অথচ, এই ক্ষেত্রে বিচার আগে থেকেই নির্ধারিত হয়েছিল। কোন তথ্য প্রমাণ সাক্ষ্য যাচাই বাছাই ছাড়াই। আবু লুবাবার বক্তব্য থেকে যা একদমই পরিষ্কার। [59]
রাসুলুল্লাহ (সা) আবূ লুবাবাকে তাদের কাছে পাঠালেন। তাকে দেখামাত্র পুরুষগণ তাকে অভিভাদন জানাতে ছুটে আসল, আর নারী ও শিশুরা তার সামনে গিয়ে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ জানাল। তাদের সে বুকফাটা কান্না দেখে তাঁর অন্তর গলে গেল। তারা বললঃ ‘হে আবূ লুবাবা। আপনি কি বলেন, আমরা কি মুহাম্মাদের নির্দেশমত দুর্গ থেকে নেমে আসব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সে সাথে গলদেশের দিকেও ইঙ্গিত করলেন, অর্থাৎ পরিণাম যবাই।

আসুন তাফসীরে মাযহারীর এই পাতাটি আরও একবার পড়ে নিই। পাঠক লক্ষ্য করুন, বনু কুরাইজা গোত্রের সবাইকে যে নবী মুহাম্মদ জবাই করবেন, সেই সিদ্ধান্তটি আগে থেকেই নেয়া ছিল। বনু কুরাইজার অসহায় নারী শিশুদের কান্না শুনে যা আবু লুবাবা প্রকাশ করে দিয়েছিলেন [55]

প্রহসনের বিচারের রায় ঘোষণা
একটি বিচার প্রক্রিয়ায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অভিযুক্ত গোষ্ঠী আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে কিনা, এবং বিচারের সিদ্ধান্ত সাক্ষ্য ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন- সেগুলো যাচাই বাছাই করে তার ওপর ভিত্তি করে নেয়া নাকি সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে ফেলা! যদি এমন হয় যে, সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে তারপরে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়, তাহলে এই ধরণের বিচারকে প্রহসনের বিচারই বলতে হবে। একে কোন অবস্থাতেই সুবিচার বলা সম্ভব নয়। বনু কুরাইজা গোত্রের যেই বিচারের নামে প্রহসন হয়, তাতে বিচারের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাই একে কোনভাবেই বিচার বলা যায় না, বরঞ্চ সিদ্ধান্ত বলা যেতে পারে। নবী মুহাম্মদ এবং সা’দ ইবনু মুআয সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, গোপনাঙ্গে যাদের চুল উঠেছে, সেই সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে। এবং তাদের জায়গা জমি দখল করা হবে, তাদের নারী ও শিশুদের গনিমতের মাল হিসেবে ভাগাভাগি করে নেয়া হবে।
অর্থাৎ, বিচারের নামে যা হয়েছিল, সিদ্ধান্তটি এমন হয় নি যে, যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছে, তাদের শাস্তি দেয়া হবে! বরঞ্চ এটি হয়েছিল যে, গণহারে সকলকেই হত্যা করা হবে, এবং তা নির্ধারিত হবে কার গোপনাঙ্গে চুল উঠেছে তার ওপর ভিত্তি করে। যেই বাচ্চা ছেলেটির গোপনাঙ্গে মাত্র চুল ওঠা শুরু করেছে, সে কীভাবে এমন কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারে? ইসলামিক এপোলোজিস্টরা প্রায়শই বলেন, এই বাচ্চারা বড় হলে মুসলিমদের সাথে হয়তো শত্রুতা করতো। তাই তাদের হত্যা করা জায়েজ বলেই তারা দাবী করেন। কিন্তু এক ধরণের কথা কতটা বর্বর এবং অসভ্য, তা নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না। ইসরাইলের এক রাজনিতিবিদ একসময়ে বলেছিলেন, “প্যালেস্টাইনের সমস্ত মাকে হত্যা করা উচিৎ, যেন সেই মায়েরা টেরোরিস্ট জন্ম দিতে না পারে।” তার মানে, ঐ রাজনীতিবিদ ধরেই নিয়েছেন, প্যালেস্টাইনের মায়েরা বাচ্চা জন্ম দিলেই বাচ্চাগুলো বড় হয়ে জঙ্গি হবে! এবং সেই কারণে তাদের জন্মের আগেই মেরে ফেলতে হবে! কী ভয়াবহ অমানবিক কথা! [60] [61]
“They should die and their houses must be destroyed so that they do not give birth to terrorists.”
একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত সরাসরি কোন অপরাধ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের শাস্তি দেয়া যায় না। এটি সকল স্থান কাল প্রেক্ষাপটে সরাসরি মানবতা বিরোধী। কোন শিশু বড় হলে অপরাধ করতে পারে, এরকম চিন্তা করে তাদের শাস্তি দেয়ার মত অমানবিক চিন্তা আর কিছু সম্ভবত নেই। কিন্তু এই কথাগুলো কেন যেন ধর্মীয় চিন্তার মানুষদের মাথায় ঢোকে না!
ইসরাইলের এই রাজনীতিবিদ Ayelat Shaked সেই সাথে বলেছিলেন, প্যালেস্টাইনের মায়েরা ছোট ছোট সাপের বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে! তিনি সেই সাথে প্যালেস্টাইনের শিশুদেরও ছোট সাপ বলেও আখ্যায়িত করেছিলেন! এই কথাগুলো বলার পরে আমরা এই ধরণের বর্বর কথার তীব্র বিরোধীতা করেছিলাম। সেই সাথে মুসলিম বিশ্বও এই কথার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আসলেই, এই ধরনের কথা অত্যন্ত বর্বর, বর্বরতার সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলা। কিন্তু এই একই ধরণের যুক্তি কিন্তু মুসলিম এপোলোজিস্টরাও দেন, তাদের গণহত্যাকে জায়েজ করতে! বলুন তো, প্যালেস্টাইনের শিশুরা ছোট ছোট বিষাক্ত সাপের মত, প্যালেস্টাইনের মায়েরা জঙ্গি জন্ম দেয়, তাই প্যালেস্টাইনের শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের মেরে ফেলা উচিৎ, এই কথার সাথে, বনু কুরাইজা গোত্রের শিশুরা বড় হলে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাই গোপনাঙ্গে চুল গজানো সকল শিশু কিশোরকে হত্যা করতে হবে, এই কথা দুইটির মধ্যে পার্থক্য কী? আসুন নিচের হাদিসগুলো পড়ি [62] [63] [64] [65] [66] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালকের অপরাধের শাস্তি
৪৪০৪। আতিয়্যাহ আল-কুরাযী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বনী কুরাইযার বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। তারা দেখতো, যার নাভীর নীচে চুল উঠেছে তাকে হত্যা করা হতো; আর যার উঠেনি, তাকে হত্যা করা হতো না। আর আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, যাদের তা উঠেনি।(1)
সহীহ।
(1). তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালকের অপরাধের শাস্তি
৪৪০৫। আব্দুল মালিক ইবনু উমাইর (রহঃ) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত। আতিয়্যাহ (রাঃ) বলেন, তারা (মুসলিমরা) আমার নাভীর নীচ অনাবৃত করে দেখলো যে, চুল উঠেনি। সুতরাং তারা আমাকে বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত করলো।(1)
সহীহ।
(1). এর পূর্বেরটি দেখুন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালেগ ছেলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে।
৪৩৫২. মুহাম্মদ ইবন কাছীর (রহঃ)….আতিয়া কুরাযী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি কুরায়যা গোত্রের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, (যাদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল). সে সময় লোকেরা তদন্ত করে দেখছিল এবং যাদের নাভীর নীচে চুল উঠেছিল, তাদের হত্যা করা হচ্ছিল। আর আমি তাদের দলভুক্ত ছিলাম, যাদের তখনো নাভীর নীচে পশম উঠেনি। ফলে আমাকে হত্যা করা হয় নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮৪। আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমাদেরকে বানূ কুরাইযার যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আনা হল। যাদের লজ্জাস্থানের লোম উঠেছে (বালেগদের) তাদেরকে হত্যা করা হল, আর যাদের তা উঠেনি (নাবালেগদের) তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হল। আমার লজ্জাস্থানে তখনও লোম উঠেনি। একারণে আমাকে মুক্ত করে দেওয়া হল।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৫৪১)
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। এ হাদীস মোতাবিক একদল অভিজ্ঞ আলিম আমল করেছেন। তাদের মতে, যে লোকের বয়স এবং বীর্যপাতের ব্যাপারে সঠিকভাবে অনুমান করা না যাবে- তার নাভির নীচের লোম উঠাই বয়ঃপ্রাপ্তির লক্ষণ বলে গণ্য হবে। এই অভিমত দিয়েছেন ইমাম আহমাদ এবং ইসহাকও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
সুনানে ইবনে মাজাহ
১৪/ হদ্দ (দন্ড)
পরিচ্ছেদঃ ১৪/৪. যার উপর হদ্দ কার্যকর করা আবশ্যিক নয়
১/২৫৪১। আতিয়্যা আল-কুরাজী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরায়জাকে হত্যার দিন আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে উপস্থিত করা হলো। যার (লজ্জাস্থানের) লোম গজিয়েছিল, তাকে হত্যা করা হলো এবং যার লোম গজায়নি তাকে রেহাই দেয়া হলো। আমি ছিলাম লোম না গজানোদের অন্তর্ভুক্ত, তাই আমাকে রেহাই দেয়া হয়।
হাদিসটি ইমাম ইবনু মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী ফিস সুনান ৭/২৩৯, আল-হাকিম ফিল মুসতাদরাক ৪/৩৬৫, মিশকাত ৩৯৭৪।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
রায়ে নবী ও আল্লাহর প্রতিক্রিয়া
অনেক মুসলিমই বনু কুরাইজার ওপর চালানো গণহত্যাকে জায়েজ করার জন্য বলে থাকেন যে, “এই বিচারটি তো ইহুদিদের বিধান অনুসারে হয়েছিল! তাই এই গণহত্যায় মুসলিমদের কোন দায় নেই!” এরকম হাস্যকর কথা বলে যখন তারা এই গণহত্যাকে জায়েজ করতে চায়, তখন আসলে এরকম দাবী করা মানুষের সাথে আলোচনাটিও নিরর্থক হয়ে যায়। কারণ এসব যারা বলেন, তারা নিজেরাও ভালভাবেই জানেন, এগুলো একদমই মিথ্যা কথা। প্রথমত, এই শাস্তি এবং বিচার প্রক্রিয়া পুরোটাই মুসলিমদের তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, কোরআনেই আল্লাহ নবীকে নাজিলকৃত কিতাব অনুসারেই ফয়সালা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই অনুসারে ইহুদিদের সেই বিধানটিও আল্লাহরই বিধান। ইহুদিদের কিতাবের ঐ অংশটি যদি বিকৃত হয়ে থাকে, অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ না হয়ে থাকে, তাহলে নবী কেন সেই বিকৃত কিতাবের অনুসরণ করবেন? [67]
আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও এর উপর তদারককারীরূপে। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তুমি তার মাধ্যমে ফয়সালা কর এবং তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি শরীআত ও স্পষ্ট পন্থা এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে।
এর চাইতে বড় কথা হচ্ছে, এই রায়ে আসলে নবী মুহাম্মদ এবং আল্লাহর সম্পূর্ণ সায় ছিল। এই রায়কে আল্লাহ বা নবী কেউই অমানবিক বলে মনে করেন নি, বরঞ্চ সমর্থন দিয়েছেন। আমরা ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ইসলামিক বক্তার মুখে নবীর দয়া এবং করুনার যেসমস্ত কাল্পনিক গল্প শুনি, তার সাথে এই ঘটনার একেবারেই কোন মিল পাওয়া যায় না। বরঞ্চ এতবড় একটি গণহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আল্লাহ এবং তার নবী খুবই খুশী ছিলেন [56] –
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮২। জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) আহযাব যুদ্ধের দিন তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এতে তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে যায়। তার ক্ষতস্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তারপর তার হাত ফুলে যায়। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠে। তিনি (সাদ) নিজের এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘হে আল্লাহ। আমার জীবনকে কেড়ে নিও না বানু কুরাইযার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ না জুড়ানো পর্যন্ত।” তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোটাও বের হয়নি।
সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ)-কে তারা (বানু কুরাইযা) সালিশ মানতে রাজী হয়। তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার (সাদের) নিকট লোক পাঠালেন (সমাধানের জন্য)। তিনি সমাধান দিলেন যে, বানু কুরাইযা গোত্রের পুরুষদেরকে মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদেরকে বাচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের ব্যাপারে তোমার মত সম্পূর্ণ আল্লাহ্ তা’আলার মতের অনুরূপ হয়েছে। তারা (পুরুষগণ) সংখ্যায় ছিল চার শত। লোকেরা তাদেরকে মেরে ফেলা সমাপ্ত করলে, তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হল এবং তিনি মৃত্যু বরণ করলেন।
সহীহ, ইরওয়া (৫/৩৮-৩৯)
আবূ সাঈদ ও আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
সা’দ ইবনু মু’আয এই গণহত্যার রায় দেয়ায় আল্লাহ ও নবীর এতটাই প্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুতে সেই কারণে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল! [68]
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২১২২. স্বাদ ইবন মু’আয (রাঃ) এর মর্যাদা
৩৫৩১। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … জাবির (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) এর মৃত্যুতে আল্লাহ্ ত’আলার আরশ কেঁপে উঠেছিল। আমাশ (রহঃ) … নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যাক্তি জাবির (রাঃ) কে বলল, বারা ইবনু আযিব (রাঃ) তো বলেন, জানাযার খাট নড়েছিল। তদুত্তরে জাবির (রাঃ) বললেন, সা’দ ও বারা (রাঃ) এর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছুটা বিরোধ ছিল, (কিন্তু এটা ঠিক নয়) কেননা, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে عَرْشُ الرَّحْمَنِ অর্থাৎআল্লাহর আরশ সা’দ ইবনু মু’আযের (মৃত্যুতে) কেঁপে উঠল বলতে শুনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সা’দ ইবনু মুআয এর মৃত্যুতে মুহাম্মদ এটিও বলেন যে [69] –
‘আল্লাহর ফিরিশতাগণ তাঁর লাশ উত্তোলন করেছিলেন’
বিচারের রায় কার্যকর হলো যেভাবে
সিরাতে রাসুলুল্লাহ গ্রন্থে যা বর্ণিত রয়েছে, বন্দীদেরকে মদীনার বিনতে আল-হারিসের বাড়িতে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে তাদের মদিনা বাজারের গণকবর (খন্দক) পাশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাকি বন্দীরা যখন শুনছিল যে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের একে একে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তারা আর ফিরে আসছে না, তখন সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার সময়টি ছিল ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন। ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন যে, বন্দীরা তাদের নেতা কা’ব ইবনে আসাদকে জিজ্ঞেস করেছিল— “আমাদের সাথে কী করা হচ্ছে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন— “তোমরা কি দেখছ না যে, যাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে আর ফিরছে না? আল্লাহর কসম, এটি মৃত্যু।” এই আসন্ন মৃত্যুর আতঙ্ক এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্বজনদের আর্তনাদ শোনা আন্তর্জাতিক আইনে ‘মানসিক নির্যাতন’ হিসেবে স্বীকৃত। আসুন এক এক করে ঘটনাবলী পড়ি।
পুরো গোত্র একটি ঘরে বন্দী এবং গণকবর খনন
ইসলামিক সূত্রগুলোতে বর্ণিত আছে, বনু কুরাইজার সকল ইহুদিকে একটি ঘরে নবী মুহাম্মদ বন্দী করলেন। এটি খুব সহজেই বোধগম্য যে, সেই সময়ের একটি ঘরের আয়তন কতটুকু হতে পারে। সেই একটি ঘরে পুরো একটি গোত্রকে বেঁধে বন্দী করে রাখার বিষয়টি তাই বিজ্ঞ পাঠকের বুদ্ধিমত্তার ওপরই ছেড়ে দিলাম। [70]
এরপর তারা আত্মসমর্পণ করল। রাসুল (সা.) মদিনায় বনু আল-নাজ্জারের বিন্তে আল-হারিসের বাসভবনে তাদের অন্তরীণ করে রাখলেন। তারপর মদিনার বাজারে গিয়ে রাসুল (সা.) সেখানে পরিখা খনন করলেন (সেই বাজার এখনো আছে)। এরপর তাদের সেখানে আনা হলো এবং সেই সব পরিখায় তাদের শিরশ্ছেদ করা হলো। তাদের মধ্যে ছিল আল্লাহর শত্রু হুয়াই ইবনে আখতাব এবং তাদের প্রধান কা’ব ইবনে আসাদ। নিহতদের সংখ্যা ছিল মোট ৬০০ থেকে ৭০০ জন; কারও কারও মতে তা ৮০০ থেকে ৯০০ হবে।
দলে দলে ওদের যখন রাসুলের (সা.) কাছে আনা হচ্ছিল, তখন তারা কা’বকে জিজ্ঞেস করছিল— তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কা’ব বলল, “বুঝতে পারছ না? দেখছ না, নকিব হেঁকেই চলছে, যারা যাচ্ছে কেউ ফিরছে না? আল্লাহর ওয়াস্তে এর নাম মৃত্যু।” এভাবে তাদের সবাইকে নির্মূল করা হলো।
হুয়াই ইবনে আখতাব একটি বর্ণাঢ্য আলখাল্লা পরে এল। পোশাকটির সর্বত্র সে আঙুলের ডগার সমান অসংখ্য ছিদ্র করে দিয়েছিল, যাতে তার মৃত্যুর পর এই আলখাল্লা আর কেউ পরতে না পারে। তার দুই হাত ঘাড়ের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। রাসুলের (সা.) দিকে চোখ পড়তেই সে বলে উঠল, “আল্লাহর কসম, আপনার বিরোধিতা করার জন্য আমি নিজেকে দোষ দিই না। তবে এ কথা জানি, ঈশ্বরকে যে পরিত্যাগ করে, সে নিজেকেই পরিত্যাগ করে।” তারপর সে নিজের দলের মানুষের কাছে গিয়ে বলল, “আল্লাহর হুকুম যথার্থ। একটি কিতাব ও একটি হুকুম। ব্যস, ইসরাইলের সন্তানদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ লেখা হয়ে গেল।”

উলঙ্গ করে গোপনাঙ্গের চুল পরীক্ষা করে হত্যা
কোনো যুদ্ধ বা সংঘাতের ইতিহাসে যখন মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত যখন শারীরিক কিছু জৈবিক চিহ্ন বা কৈশোরের লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না, বরং তা পরিণত হয় চরম মানবিক অবমাননায়। বনু কুরাইজার ঘটনার বর্ণনায় আমরা তেমনই এক শিউরে ওঠার মতো অমানবিক চিত্র দেখতে পাই।
তৎকালীন সময়ে কে শিশু আর কে প্রাপ্তবয়স্ক—এই পার্থক্য করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল এক অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিষ্ঠুর পদ্ধতি। আত্মসমর্পণকারী শিশু-কিশোরদের জনসমক্ষে বিবস্ত্র করে তাদের গুপ্তকেশ বা জননাঙ্গের লোম পরীক্ষা করা হয়েছিল। যার শরীরে এই চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল, তাকেই প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করে তরবারির নিচে মাথা পেতে দিতে হয়েছিল। আর যার মধ্যে এই চিহ্ন তখনও ফুটে ওঠেনি, তাকে গণ্য করা হয়েছিল ‘গনিমত’ বা যুদ্ধের পণ্য হিসেবে, যাকে পরবর্তীতে আজীবন দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার বন্দোবস্ত নবী করেছিলেন।
একটি মানুষের বেঁচে থাকা বা না থাকা যখন তার একান্ত ব্যক্তিগত অঙ্গের চুল গজানোর ওপর নির্ভর করে, তখন বিচার বা ইনসাফ শব্দটি তার মূল অর্থ হারিয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়াটি কেবল যে শারীরিক লাঞ্ছনা ছিল তা-ই নয়, বরং এটি ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন। যারা তখনও শিশু বা কিশোর, তাদের চোখের সামনে তাদেরই খেলার সাথী বা বড় ভাইদের এইভাবে উলঙ্গ করে মৃত্যুর মিছিলে পাঠিয়ে দেওয়া—যেকোনো সভ্য সমাজের মানবিক মানদণ্ডে একটি ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল একটি গোত্রকে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা ছিল না, বরং তাদের আত্মমর্যাদাকে ধূলিসাৎ করার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। [71] –

নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবকে জবাই
বনু কুরাইজার দুর্গের ভেতর কেবল সেই গোত্রের মানুষই ছিল না, বরং সেখানে উপস্থিত ছিলেন বনু নাদিরের বহিষ্কৃত প্রধান হুয়াই ইবনে আখতাব। যুদ্ধের কঠিন সময়ে তিনি বনু কুরাইজাকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে দুর্গে প্রবেশ করেছিলেন। আত্মসমর্পণের পর যখন হত্যার মিছিল শুরু হয়, তখন হুয়াই ইবনে আখতাবকেও হাত পা বাঁধা অবস্থায় নবী মুহাম্মদের সামনে হাজির করা হয়।
ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক এবং তাবারীর বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও হুয়াই ছিলেন অকুতোভয়। তিনি মুহাম্মদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম, তোমার সাথে শত্রুতা করার জন্য আমি নিজেকে লজ্জিত মনে করি না। তবে যাকে আল্লাহ পরিত্যাগ করেন, সে নিজেও পরিত্যক্ত হয়।” উল্লেখ্য, হুয়াই ইবনে আখতাব আরবের ইহুদি হওয়ায়, তিনিও তার ঈশ্বরকে আল্লাহই বলতেন। পাঠক ভাববেন না যে, তিনি ইসলামের আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে এটি বলেছেন। এরপর তিনি সমবেত জনগণের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “হে লোকসকল, আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিতে কোনো বাধা নেই। এটি বনু ইসরায়েলের কপালে লেখা ছিল একটি মহাবিপর্যয় এবং হত্যাকাণ্ড।” হুয়াই ইবনে আখতাবের এই শেষ উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি এই গণ-জবাইকে কোনো ন্যায়বিচার হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে তার জাতির ওপর নেমে আসা একটি নিয়তি বা ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এরপর তাকে মাটিতে বসিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয়।
ইসলামিক দলিল প্রমাণগুলোতে হুয়াই ইবনে আখতাবকে যুদ্ধের একজন উস্কানিদাতা হিসেবে দেখা হলেও, তাকে কোনো আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি সারিবদ্ধভাবে হত্যার মিছিলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাকে সেই যুদ্ধের উষ্কানিদাতা হিসেবে হত্যা করা হয়, যেই যুদ্ধই বাস্তবে ঘটেনি। বিশেষ করে তার পোশাকটি সে নিজেই ছিঁড়ে ফেলে যাতে তার মৃত্যুর পর সেটি কেউ লুণ্ঠন করতে না পারে। অর্থাৎ তিনি জানতেন, নবী মুহাম্মদের অনুসারীরা কতটা বর্বর এবং নির্লজ্জ, একজন মানুষকে হত্যা করে তার জামাটিও তারা খুলে নিয়ে যাবে! এই ক্ষুদ্র ডিটেইলসটি প্রমাণ করে যে, সেই সময়কার পরিবেশ কতটা ঘৃণা ও প্রতিহিংসায় আচ্ছন্ন ছিল। [72]
হুয়াঈ ইবন আখতারের কতল
আল্লাহ্র দুশমন হুয়াঈ ইব্ন আখতাবকেও আনা হলো । তার পরিধানে ছিল ফুকাহী বস্ত্র । ইবন হিশাম বলেন : ফুক্বাহী হচ্ছে এক প্রকার চাদর। সে তার পোশাকটি সব জায়গা থেকে কয়েক আংগুল করে ফুটো করে রেখেছিল, যাতে তার থেকে সেটা খুলে নেওয়া না হয়। তার হাত ছিল ঘাড়ের সাথে বাঁধা। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেখামাত্র সে বলে উঠলো: আল্লাহ্র কসম!
১. তাঁর নাম ছিল-কায়সা। তিনি আগে মুসায়লামা কায্যাবের স্ত্রী ছিলেন। পরে আবদুল্লাহ্ ইবন আমির (রা)-এর সংগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল।
২৩৮ সীরাতুন নবী (সা)
তোমার দুশমনীর কারণে আমি মোটেই অনুতপ্ত নই। তবে আল্লাহকে যে ত্যাগ করে তার ধ্বংস অনিবার্য। এরপর সে উপস্থিত লোকদের সম্বোধন করে বললো, হে জনমণ্ডলী! অসুবিধার কিছু নেই এটা আল্লাহ্ ফয়সালা । বনূ ইসরাঈলের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা এ পরিণতি ও হত্যাকাণ্ড নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। এই বলে সে বসে পড়লো এবং তার শিরশ্ছেদ করা হলো।

আসুন এই রেফারেন্সটি আরও একটি সূত্র থেকে দেখে নেয়া যাক, [73]
এভাবে বন্দীদের সকলের (যাদের সংখ্যা ছয় এবং সাত শতের মধ্যবর্তী ছিল) শিরচ্ছেদ করা হয়।
উল্লেখিত ব্যবস্থাপনার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিপক্ক অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বনু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্রোহের সম্পূর্ণরূপে মূলোৎপাটন করে ফেলা হয়। মুসলিমগণকে নিংশেষ করে ফেলার উদ্দেশ্যে তাঁদের দুঃখ দুর্দশা ও দারুন দুঃসময়ে শত্রুদের সাহায্য দান করে তারা যে জঘন্য যুদ্ধ অপরাধ করেছিল তাতে তারা যথার্থই প্রাণদণ্ড পাওয়ার যোগ্য হয়ে গিয়েছিল। বনু কুরাইযার ন্যায় বনু নাযীর গোত্রের নিকৃষ্ট শয়তান ও আহযাব যুদ্ধের বড় অপরাধী হুয়াই বিন আখতাব ও তার নানা অন্যায় অত্যাচারের কারণে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছিল।
এ ব্যক্তি উম্মুল মু’মিনীন কারণে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছিল। [এ ব্যক্তি উম্মুল মু’মিনীন সাফিয়ার (স)-এর পিতা ছিল। কুরাইশ এবং গাতফানদের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর যখন বনু কুরাইযাকে অবরোধ করা হয় এবং তারা দূর্গ মধ্যে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করতে থাকে তখন বনু কুরাইযার সঙ্গে হুয়াই বিন আখতাবও দূর্গের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। কারণ, আহযাব যুদ্ধের সময় এ ব্যক্তি যখন কা’ব বিন আসাদকে বিশ্বাসঘাতকতা ও গাদ্দারী করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে এসেছিল তখন সে অঙ্গীকার করেছিল তখন চলছিল সে অঙ্গীকারেরই বাস্তবায়ন।
তাকে যখন খিদমতে নববীতে নিয়ে আসা হল তখন সে এক জোড়া পরিধেয় বস্ত্র দ্বারা নিজেকে আবৃত করে রেখেছিল। এ পোষাককে সে নিজেই প্রত্যেক দিক থেকে এক এক আঙ্গুল করে চিরে রেখেছিল যাতে তাকে মোহরাঙ্কিত জান্নাতী সুধা 357 লুণ্ঠিত মালামালের মধ্যে গণ্য করা না হয়। তার হাত দুটি গ্রীবার পেছন দিকে দড়ি দ্বারা একত্রে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সে রাসূলে করীম -কে লক্ষ্য করে বলল, ‘আমি আপনার শত্রুতার জন্য নিজে নিজেকে নিন্দা করি নি। কিন্তু যে আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করে সে পরাজিত হয়।’
অতঃপর লোকজনকে সম্বোধন করে বলল, ‘ওহে লোকেরা আল্লাহর ফায়সালায় কোন অসুবিধা নেই। এটাতো ভাগ্যের লিখিত ব্যাপার। এটি হচ্ছে এক বড় হত্যাকণ্ড যা বনু ইসরাইলের উপর আল্লাহ তা’আলা লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। এরপর সে বসে পড়ল এবং তার গলা কেটে দেয়া হল।
এ ঘটনায় বনু কুরাইযার এক মহিলাকেও হত্যা করা হয়। সে খাল্লাদ বিন সোওয়ায়েদ -এর উপর যাঁতার একটি পাট নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করেছিল। তাই এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিদান হিসেবেই তাকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহর নির্দেশ প্রদান করেন যে, যাদের নাভির নিম্নদেশের লোম গজিয়েছে তাদের হত্যা করা হোক । আতিয়া কোরাযীর তখনো সে লোম গজায়নি যার ফলে তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তী কালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে অন্যতম সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

নবীর উপস্থিতিতে আনন্দের সাথে জবাই উৎসব
এই ঘটনাকে “যুদ্ধকালীন কঠোরতা” বলে ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ বর্ণনা অনুযায়ী হত্যাযজ্ঞটা নবীর উপস্থিতিতেই চলেছে—তিনি দূরে ছিলেন না, অন্ধকারে ঘটেনি, বরং তত্ত্বাবধানের মধ্যে সারি সারি মানুষের গলা কাটা হচ্ছিল। অর্থাৎ এখানে দায় এড়ানোর মতো কোনো নৈতিক ধোঁয়াশা নেই: এটি ছিল প্রকাশ্য, সচেতন এবং প্রশাসনিকভাবে পরিচালিত এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড।
আর দৃশ্যটা আরও ঘৃণ্য হয়ে ওঠে যখন একই বর্ণনায় আসে—নবী মুহাম্মদের মিত্র বনু খাযরাজ গোত্রের লোকেরা সেই সময় মানুষ জবাই করতে গিয়ে আনন্দে উদ্ভাসিত মুখে মেতে উঠেছিল; এবং নবী তা লক্ষ্যও করেন যে তাদের চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল। এই “আনন্দ” কোনো ধর্মীয় গৌরব নয়—এটা মানবিক বিবেকের মৃত্যু, যেখানে মানুষ হত্যা “কাজ” নয়, উৎসব হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মীয় ন্যারেটিভ পরে যতই এটাকে পবিত্রতার রঙে ঢাকতে চায়, এই বর্ণনার নগ্ন বাস্তবতা হলো: কারো সামনে দাঁড়িয়ে একদল মানুষকে কাটা হচ্ছে, আর কিছু লোক সেই কাটাকাটিতে উল্লাস পাচ্ছে—এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম স্বীকারোক্তি। [74]
বনু কুরায়যার ঘটনা
ইবন হিশাম বলেন : আমার কাছে আবূ উবায়দা (রা) আবূ আমর মাদানীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু কুরায়যার উপর বিজয় লাভ করেন, তখন তিনি তাদের প্রায় চারশো ইয়াহুদী পুরুষকে গ্রেফতার করেন। এরা বনু খাযরাজের বিপক্ষে বনূ আওসের মিত্র ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাদের শিরশ্ছেদের নির্দেশ দেন, তখন বনু খাযরাজ তাদের শিরশ্ছেদ করতে থাকে এবং এতে তারা বেশ আনন্দবোধ করছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) লক্ষ্য করলেন, খাযরাজের লোকদের চেহারা আনন্দে উদ্ভাসিত, আর বনূ আওসের প্রতি লক্ষ্য করলেন যে, তাদের মাঝে এর কোন চিহ্ন নেই। তখন তিনি বুঝতে পারলেন, আওস ও বনু কুরায়যার মাঝে বিদ্যমান মিত্রতাই এর কারণ। তখন বনু কুরায়যার মাত্র বারো জন অবশিষ্ট ছিল, তিনি তাদেরকে আওসের হাতে সমর্পণ করলেন। তিনি দুই দুই ব্যক্তিকে বনূ কুরায়যার এক একজনকে দিয়ে বললেন :
لِيَضْرِبُ فُلانٌ وَلْيُدْفَ فُلانٌ
“তার হত্যাকার্য অমুকে আরম্ভ করবে, আর অমুকে শেষ করবে।”

গণ-জবাই দেখে মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া
খেয়াল করার মতো বিষয় হলো—এত বড় পরিসরে মানুষকে সারিবদ্ধ করে জবাই করার পরও ইসলামী শিবিরের ভেতরে সবাই যে এটাকে নীরবে “ন্যায়” বলে মেনে নিয়েছিল, এমন নয়। বরং কিছু মানুষের অস্বস্তি, প্রশ্ন, এমনকি নৈতিক আপত্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়—আর সেই আপত্তিকেই দমিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হয় পরিচিত এক লেবেলিং-কৌশল: “এরা মুনাফিক।” অর্থাৎ ঘটনাটাকে প্রশ্ন করলেই মানুষকে নৈতিক আলোচনার জায়গা থেকে সরিয়ে চরিত্র-কলঙ্কের বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়—যাতে ‘কাজটা ঠিক ছিল কি না’ সেই প্রশ্নটাই আর উঠতে না পারে।
এই ধাঁচটা তাফসীরে মাযহারীর উদ্ধৃত এক বর্ণনায় আরও কুৎসিতভাবে ধরা পড়ে। আনাসের সূত্রে উল্লেখ আছে—সা’দ ইবনে মু’আযের মৃত্যুর সময় মুসলিমদের মধ্যেই কিছু মানুষ জানাজাকে “খুব হালকা” দেখে বনু কুরাইজার হত্যাযজ্ঞের সাথে সেটাকে জুড়ে দেয়; তারা এটিকে সা’দের সেই সিদ্ধান্ত/ভূমিকাকে ঘিরে একধরনের শাস্তি/পরিণতি হিসেবে ভাবছিল। আর ঠিক এখানেই নৈতিকতার শেষ পেরেক: যারা ওই গণ-জবাইকে অন্যায় বলে মনে করেছিল, তাদেরকে “মুনাফিক” আখ্যা দিয়ে কথার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়—মানে, অপরাধটা প্রশ্ন করলে অপরাধী বানানো হয় প্রশ্নকারীকে। [75]
হজরত সা’দ ইবনে মুয়াজের পরলোকগমনঃ বনী কুরায়জাদের পরাজয়ের অধ্যায় সমাপ্ত হলো। এদিকে হঠাৎ করেই অবনতি ঘটতে লাগলো হজরত সা’দ ইবনে মুয়াজের স্বাস্থের। ক্ষতস্থানের যন্ত্রণা বাড়তে লাগলো দিন দিন। রসুল স. হজরত আবু বকর ও হজরত ওমরকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে দেখতে গেলেন। জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, যার আনুরূপ্যবিহীন অধিকারে মোহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ্র জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি, আমি আমার ঘর থেকেই শুনতে পেলাম সা’দ ইবনে মুয়াজের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে আমার পিতা ও ওমরের কান্নার আওয়াজ। ওমরের রোদন ধ্বনিই ছিলো তীব্রতর। আমি জানতাম, তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো গভীর সম্প্রীতি, যেমন বলা হয়েছে আল্লাহ্র বাণীতে ‘রুহামাউ বায়নাহুম’ (পরস্পরের প্রতি মায়াময়)।
হজরত আনাস বর্ণনা করেছেন, সা’দ ইবনে মুয়াজের জানাযা গমনকালে মুনাফিকেরা মন্তব্য করতে লাগলো, দেখেছো জানাযার খাটিয়া কতো হালকা। সে বনী কুরায়জাদের প্রাণ সংহারের আদেশ দিয়েছিলো বলেই তার এরকম অবস্থা। রসুল স. এর কানে একথা যেতেই তিনি স. বললেন, তার খাটিয়া বহন করছে ফেরেশতারা। তিরমিজি। হজরত জাবের বর্ণনা করেছেন, আমি রসুল স.কে বলতে শুনেছি, সা’দের চিরপ্রস্থানের কারণে আল্লাহ্র আরশও আন্দোলিত হচ্ছে। বোখারী, মুসলিম। হজরত বারা ইবনে আজীব বর্ণনা করেছেন, একবার রসুল স. সকাশে পেশ করা হলো এক জোড়া চিত্তাকর্ষক রেশমী বস্ত্র। সাহাবীগণের কেউ কেউ বস্ত্ৰজোড়া নাড়াচাড়া করতে লাগলেন । রসুল স. বললেন, তোমরা এই বস্ত্রের সৌন্দর্য দর্শনে মুগ্ধ হচ্ছো। শুনে রাখো, জান্নাতে সা’দ ইবনে মুয়াজের রুমাল হবে এর চেয়ে অনেক অনেক গুণ মনোমুগ্ধকর। বোখারী, মুসলিম ।

গনিমতের মাল বণ্টন, দাসীভোগ ও বিক্রি
উপরে যে বিপুল দলিল-প্রমাণ হাজির করা হয়েছে, তার সারকথা একটাই: বনু কুরাইজা গোত্রের ওপর একটি গণহত্যার অভিপ্রায় নিয়েই অবরোধ করা হয়, সকল সাবালক পুরুষকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়, আর নারী-শিশুদের মানুষ হিসেবে নয়—যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি হিসেবে “বন্দী/দাস” বানিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দাসদের ভাগ্যে এরপর কী ঘটেছিল? এখানেই ঘটনাটা ধর্মীয় রোমান্টিসাইজিং ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়ঃ এই নারীরা ও শিশুরা পর্যন্ত “মানবিক নিরাপত্তা”টুকু পেলো না; তাদের একাংশকে বাজারি পণ্যের মতো বিক্রি করা হয়, এবং সেই বিক্রির টাকা দিয়ে নবীর অনুসারীরা অস্ত্র ও ঘোড়া কেনে—অর্থাৎ মানুষকে নগদে রূপান্তর করে যুদ্ধ-যন্ত্রে বিনিয়োগ। এই লেনদেনের ভেতরে নৈতিকতার কোনো ছাপ নেই; আছে কেবল মানুষকে বস্তু বা জিনিস হিসেবে উপস্থাপনের নির্মম বলপ্রয়োগ। [76]

মালে গনিমত থেকে নবীর এক পঞ্চমাংশ
ইবনে ইসহাকের সিরাতে রাসুলাল্লাহ গ্রন্থে গনিমতের মাল ভাগাভাগির আরো পরিষ্কার বিবরণ পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ নিজের জন্য এক পঞ্চমাংশ রেখেছিলেন, এবং একজন নারীও নিয়েছিলেন [77] –
[ ছাবিত ইবনে কায়েস এ সম্পর্কে বলেছেন:
আমার কর্তব্য শেষ, আমি উদারতা দেখিয়েছি,
অনেক চেষ্টা করেছি
অথচ বাকি সব ধৈর্যহারা হয়েছে
আমার ওপর জাবিরের সকলের চেয়ে বেশি দাবি
দড়ি দিয়ে হাত বাঁধা ছিল তার
তাকে মুক্ত করার জন্য রাসুলের (সা.) কাছে গেছি আমি।
তিনি ছিলেন আমাদের দয়ার সাগর । ]
রাসুলের (সা.) হুকুম ছিল, ওদের প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে যেন হত্যা করা হয়।
আতিয়া আল-কুরাজি সূত্রে আবদুল মালিক ইবনে উমায়র এবং তাঁর সূত্রে শুবা ইবনে আল-হাজ্জাজ আমাকে বলেছেন,বনু কুরাইজার সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমি তখন নাবালক ছিলাম, কাজেই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ।
আল-মুনজিরের জননী এবং সালিত ইবনে কায়েসের বোন সালমা বিনতে কায়েস ছিলেন রাসুলের (সা.) খালা। রাসুলের (সা.) সঙ্গে তিনি জেরুজালেম ও মক্কা উভয় দিকে মুখ করে নামাজ পড়েছেন। বনু আদি ইবনে আল-নাজ্জারের ভাই আইউব ইবনে আবদুর রহমান আমাকে বলেছেন, সালমার আশ্রিত রিফা ইবনে সামাওয়াল প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তিনি রাসুলের (সা.) কাছে তাঁর প্রাণ ভিক্ষা চান। তিনি বলেন, সেই লোক কসম খেয়েছে, সে নামাজ পড়বে, উটের মাংস খাবে। রাসুল (সা.) তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
বনু কুরাইজার সম্পত্তি ও স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের রাসুল (সা.) মুসলমানদের মধ্যে ভাগবণ্টন করে দেন। উট ও মানুষের অংশ সেদিনই স্থির হয়। তিনি গ্রহণ করেন এক-পঞ্চমাংশ। একজন ঘোড়াওয়ালা তিন অংশ পেয়েছিল, ঘোড়ার জন্য দুই আর আরোহীর জন্য এক। বনু কুরাইজার দিকে মোট ঘোড়ার সংখ্যা ছিল ছত্রিশ। এই প্রথম যুদ্ধ-সম্পদের ওপর লটারি হয় এবং এক-পঞ্চমাংশ আলাদা রাখা হয়। এই নজির পরবর্তী সময়ের অন্যান্য যুদ্ধে অনুসরণ করা হয়।
রাসুল (সা.) নিজের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন বনু আমর ইবনে কুরাইজার এক নারীকে। তার নাম রায়হানা বিনতে আমর ইবনে খুনাফা। তিনি আমৃত্যু তাঁর কর্তৃত্বের অধীন ছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বিয়ে করে পর্দানশিন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।কিন্তু রায়হানা বলেছিলেন, ‘তার চেয়ে বরং আপনি আমাকে আপনার কর্তৃত্বের আওতায় রাখুন। সেটা আপনার-আমার উভয়ের জন্য সহজ হবে।’ বন্দী হওয়ার সময় তিনি ইসলামের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি ধর্ম আঁকড়ে থাকেন। এতে রাসুল (সা.) নারাজ হন এবং তাঁকে আলাদা করে রাখেন। একদিন সাহাবিদের সঙ্গে বসে ছিলেন তিনি, তখন পেছনে চপ্পলের আওয়াজ হলো। তিনি বললেন, ‘ছালাবা ইবনে সাইয়া আসছে, রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে সেই সুখবর নিয়ে। ছালাবা সত্যিই সেই সুসংবাদ জ্ঞাপন করল। তিনি প্রীত হলেন। খন্দক ও বনু কুরাইজা বিষয়ে আল্লাহ সুরা আহজাবে তাদের বিচার, তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও সাহায্যের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে বাতাস এবং অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম। তোমাদের সব কাজের দ্রষ্টা আল্লাহ।’ শত্রুবাহিনী হচ্ছে কোরাইশ, গাতাফান ও বনু কুরাইজা। বাতাসের সঙ্গে প্রেরিত আল্লাহর বাহিনী ছিল ফেরেশতারা।
– ১. সুরা ৩৩।
– ৫০৬ ● সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)

বিচারক অসঙ্গতিঃ সা’দ ইবনে মুআযের রায় বনাম নবীর ক্ষমা
রিফা ইবনে সামাওয়ালকে ক্ষমা করার এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাটি বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ডের তথাকথিত ‘ন্যায়বিচার’কে একটি দ্বিমুখী সংকটে (Logical Dilemma) ফেলে দেয়। ইসলামিক বয়ান অনুযায়ী, সা’দ ইবনে মুআযের রায় ছিল ‘সাত আসমানের ওপর থেকে আসা খোদায়ী ফয়সালা’। এখন প্রশ্ন ওঠে—যদি প্রতিটি সক্ষম পুরুষকে হত্যা করাই খোদায়ী ন্যায়বিচার হয়ে থাকে, তবে নবী কর্তৃক একজনকে সেই রায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া কি সরাসরি ওই ‘ন্যায়বিচারের’ লঙ্ঘন নয়? আসুন এই বিবরণটি দেখে নেয়া যাক, [78]
আল-মুনজিরের জননী এবং সালিত ইবনে কায়েসের বোন সালমা বিনতে কায়েস ছিলেন রাসুলের (সা.) খালা। রাসুলের (সা.) সঙ্গে তিনি জেরুজালেম ও মক্কা উভয় দিকে মুখ করে নামাজ পড়েছেন। বনু আদি ইবনে আল-নাজ্জারের ভাই আইউব ইবনে আবদুর রহমান আমাকে বলেছেন, সালমার আশ্রিত রিফা ইবনে সামাওয়াল প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তিনি রাসুলের (সা.) কাছে তাঁর প্রাণ ভিক্ষা চান। তিনি বলেন, সেই লোক কসম খেয়েছে, সে নামাজ পড়বে, উটের মাংস খাবে। রাসুল (সা.) তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।

১. রায়ের অসারতা: যদি সা’দের রায়টি প্রতিটি ব্যক্তির অপরাধের ওপর ভিত্তি করে বস্তুনিষ্ঠ ও সুনির্দিষ্ট হতো, তবে নবী কোনোভাবেই সেই রায় পরিবর্তন বা শিথিল করতে পারতেন না। একজনের ক্ষমা পাওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, সা’দের রায়টি কোনো স্বতন্ত্র বিচারিক বিশ্লেষণ (Individualized Justice) ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পাইকারি দণ্ড (Blanket Punishment)। যেখানে অপরাধীর ব্যক্তিগত দায় যাচাই না করেই একটি পুরো গোষ্ঠীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়, সেখানে বিচারিক নৈতিকতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়।
২. ক্ষমা বনাম সুবিচার: নবীর এই ক্ষমা যদি ‘দয়া’ হয়ে থাকে, তবে তা বাকি ৬০০-৯০০ মানুষের প্রতি চরম অবিচার। কারণ, রিফাকে ক্ষমা করা হয়েছিল নবীর খালার সুপারিশে এবং তার ইসলাম কবুল করার প্রতিশ্রুতিতে। এটি পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, মদীনার সেই বিচার কোনো আইনি মানদণ্ডে পরিচালিত হয়নি, বরং তা ছিল ব্যক্তিগত প্রভাব এবং ধর্মীয় আনুগত্যের শর্তসাপেক্ষ।
ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টরা দাবি করেন, এই দলিল নাকি প্রমাণ করে যে, পুরো বনু কুরাইজা গোত্র ইসলাম গ্রহণ করলে সেদিন বেঁচে যেত। কিন্তু এই যুক্তিটিই মূলত তাদের ‘চুক্তিভঙ্গ’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র অভিযোগকে অন্তঃসারশূন্য করে তোলে।
- যৌক্তিক অসঙ্গতি: কোনো কথিত “ভয়ঙ্কর অপরাধী” যদি তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তবে তা তাকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেয় না। রিফাকে কেবল ‘নামাজ পড়া’ ও ‘উটের মাংস খাওয়ার’ (ইসলাম গ্রহণের প্রতীক) শর্তে ক্ষমা করে দেওয়ার অর্থ হলো—বনু কুরাইজার তথাকথিত ‘চুক্তিভঙ্গ’ আসলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয়ই ছিল না।
- মূল উদ্দেশ্য: এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বনু কুরাইজার হত্যাকাণ্ড ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের কৌশল। অপরাধের শাস্তি প্রদান নয়, বরং ইসলাম কবুল করিয়ে নেওয়া অথবা বিরুদ্ধ শক্তিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। রিফার ক্ষমা পাওয়ার মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয় যে, ‘চুক্তিভঙ্গ’ ছিল কেবল একটি অজুহাত; আসল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় আনুগত্য আদায়।
রিফা ইবনে সামাওয়ালের এই বিচ্ছিন্ন ক্ষমা নবী মুহাম্মদের ‘দয়ার সাগর’ হওয়ার প্রমাণ দেয় না, বরং এটি মদীনার সেই বিচারিক প্রহসনকে আরও নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, সা’দ ইবনে মুআযের রায়টি ছিল বিদ্বেষপ্রসূত ও প্রতিশোধপরায়ণ, যেখানে অপরাধের কোনো যাচাইবাছাই ছিল না, তা ন্যূনতম কোন ন্যায়বিচার ছিল না। একইসাথে, নবী কর্তৃক সুপারিশের ভিত্তিতে ক্ষমা প্রদানের বিষয়টি দেখায় যে, সেই সময় ন্যায়বিচারের চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় এবং ধর্মীয় ধর্মান্তরকরণই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল।
ব্যক্তিগত ঋণ বনাম রাষ্ট্রীয় বিচারঃ ন্যায়বিচারের দ্বিমুখী নীতি
আরও একটি বিবরণ পাওয়া যায়, যা বনু কুরাইজার বিচার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আল-জাবির ইবনে বাতার ক্ষমা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বনু কুরাইজার পুরুষদের ওপর দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিচার ছিল না। বরং এটি ছিল একটি বিদ্বেষপ্রসূত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। আসুন বিবরণটি পড়ি, [79]
ইবনে শিহাব আল-জুহরি আমাকে বলেছেন যে ছাবিত ইবনে কায়েস ইবনে আল-শাম্মাস আল- জাবির ইবনে বাতা আল-কুরাজির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আল-জাবিরের অন্য নাম আবু আবদুর রহমান। পৌত্তলিক যুগে একবার জাবির ছাবিতের প্রাণ রক্ষা করেছিল। আল-জাবিরের এক ছেলে আমাকে বলেছে যে বুয়াছের দিনে ছাবিত বন্দী হলে আল-জাবির তার সামনের চুল কেটে ছেড়ে দিয়েছিল। ছাবিত জাবিরের কাছে এল। জাবির তখন বৃদ্ধ। ছাবিত তাকে চিনতে পেরেছে কি না জিজ্ঞেস করলে আল-জাবির জবাব দিল, ‘তোমার মতো মানুষকে আমার মতো মানুষ চিনবে না, এটা একটা কথা হলো?’
ছাবিত বলল, ‘আপনি আমার জন্য যা করেছিলেন, আমি তার প্রতিদান দিতে চাই।’
‘মহৎ মহতের দেনা শোধ করে থাকে।’
ছাবিত রাসুলের (সা.) কাছে গিয়ে সব কথা বর্ণনা করলে রাসুল (সা.) বললেন, তাকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে। সেই কথা এসে জাবিরকে জানালে সে বলল, ‘আমার পরিবার-পরিজন কেউ না থাকলে আমি বৃদ্ধ মানুষ, এই জীবন দিয়ে আমি কী করব?”
ছাবিত আবার গেলেন রাসুলের (সা.) কাছে। জাবিরের পরিবার-পরিজনের প্রাণ ভিক্ষা করে আনলেন।
তখন আল-জাবির বলল, হিজাজের একটা পরিবার সহায়-সম্পত্তি ছাড়া বাঁচে কেমন করে?
ছাবিত আবার গেলেন রাসুলের (সা.) কাছে, তার সম্পত্তি প্রত্যর্পণের হুকুম নিয়ে এলেন।
তখন আল-জাবির বলল, ‘তার কী হলো ছাবিত, সেই যে কাব ইবনে আসাদ, যার চীনে আয়নার মতো চেহারায় গোত্রের সব কুমারী মেয়ে মুখ দেখত?’
‘নিহত।’
‘আর মরুভূমি ও মরূদ্যানের যুবরাজ হুইয়াই ইবনে আখতাব, তার খবর?”
‘নিহত।’
‘আমাদের আক্রমণের সময়ের সম্মুখভাগের সৈনিক আর পলায়নের সময়কার পশ্চাদ্গ্রহরী আজ্জাল ইবনে সামাওয়ালের কী হলো?’
‘নিহত।’
‘দুই জোটের খবর কী?’
দুই জোট মানে বনু কাব ইবনে কুরাইজা এবং বনু আমর ইবনে কুরাইজা ।
‘নিহত।’ ছাবিত বললেন।
তাহলে ছাবিত, আমাকে একটা অনুগ্রহ করো। তোমার ওপর আমার যে দাবি আছে, তার বদলে আমাকে আমার দলের মানুষের কাছে পাঠিয়ে দাও। ওরা সব চলে গেছে, আমার জীবনে আর কোনো আনন্দ নেই। প্রিয়জনদের কাছে যাওয়ার জন্য আমার আর তর সইছে না।’
তখন ছাবিত ওর কাছে এসে ওর শিরশ্ছেদ করলেন।
“প্রিয়জনদের কাছে যাওয়ার কথা আবু বকর (রা.) শুনে মন্তব্য করলেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সঙ্গে দেখা হবে জাহান্নামে, সেখানে থাকবে অনন্তকাল।
সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ৫০৫

১. আসমানি ফয়সালার লঙ্ঘন: সা’দ ইবনে মুআযের রায়কে যখন ‘সাত আসমানের ওপর থেকে আসা আল্লাহর ফয়সালা’ হিসেবে দাবি করা হয়, তখন ছাবিত ইবনে কায়েসের ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে বিশেষ অনুরোধে সেই রায় পরিবর্তন করা সরাসরি ওই তথাকথিত ‘ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের’ অবমাননা। যদি বনু কুরাইজার প্রতিটি সক্ষম পুরুষকে হত্যা করাই আল্লাহর ইচ্ছা ও ন্যায়বিচার হতো, তবে একজন সাহাবীর জাহেলিয়াত যুগের ব্যক্তিগত ‘ঋণ’ শোধ করার জন্য সেই আসমানি আইন স্থগিত হওয়া অসম্ভব। এটি প্রমাণ করে যে, এই বিচার ছিল চরমভাবে স্বেচ্ছাচারী (Arbitrary) এবং ব্যক্তিগত প্রভাবাধীন।
২. ব্যক্তিগত অপরাধের অনুপস্থিতি: যদি বনু কুরাইজার পুরুষরা সত্যি ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বা ‘চুক্তিভঙ্গ’-এর মতো গুরুতর অপরাধে অপরাধী হতো, তবে কেবল ছাবিতের ব্যক্তিগত সুপারিশে একজনকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো চরম বিচারিক দুর্নীতি। এই ক্ষমা পাওয়ার ঘটনাটিই নিশ্চিত করে যে, সা’দ ইবনে মুআয প্রতিটি ব্যক্তির অপরাধ বিশ্লেষণ করে রায় দেননি; বরং তিনি পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের পরিচয় বা গোত্রের ভিত্তিতে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, যাকে ‘বিচার’ বলা হচ্ছে, তা আসলে ছিল একটি জাতিগত নির্মূলকরণ (Ethnic Cleansing)।
৩. নিষ্ঠুর দয়া ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন: নবী কর্তৃক আল-জাবিরকে ক্ষমা করা, তারপর তার পরিবার ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবটি বাহ্যিকভাবে ‘দয়া’ মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের নিষ্ঠুরতা। আল-জাবিরের প্রতিক্রিয়া—যেখানে সে তার প্রিয়জন ও গোত্রের নেতাদের হত্যার সংবাদ শুনে নিজেও মৃত্যু বেছে নেয়—তা প্রমাণ করে যে, একটি পুরো সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার পর একজনকে বাঁচিয়ে রাখা কোনো দয়া নয়, বরং তাকে তিলে তিলে মারার নামান্তর। জাবিরের প্রশ্নগুলো (কাব ইবনে আসাদ, হুইয়াই ইবনে আখতাবদের কী হলো?) এবং তার মৃত্যু বেছে নেওয়া এটাই ফুটিয়ে তোলে যে, সেই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি গোত্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বকে চিরতরে মুছে দেওয়া।
৪. ধর্মীয় বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ: আল-জাবির যখন তার প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মৃত্যু বেছে নিলেন, তখন আবু বকর (রা.)-এর মন্তব্য (“হ্যাঁ, আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সঙ্গে দেখা হবে জাহান্নামে”) প্রমাণ করে যে, এই বিচারটি কোনো নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় ঘৃণা ও রাজনৈতিক আধিপত্যের সংমিশ্রণ। তথাকথিত ‘চুক্তিভঙ্গ’ ছিল কেবল একটি আবরণ; এর নিচে চাপা পড়ে ছিল ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা এবং তাদের পরকালেও শাস্তি পাওয়ার তীব্র কামনা।
এটি খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এই উদাহরণটি নিয়ে এসে ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টরা সাহাবীদের দোয়ার সাগর প্রমাণ করতে চান। আল-জাবির ইবনে বাতার এই ঘটনাটি অ্যাপোলজিস্টদের জন্য ‘দয়ার’ নজির নয়, বরং সমালোচকদের জন্য ‘অন্যায়বিচারের’ অকাট্য দলিল। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে:
- বনু কুরাইজার অপরাধের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা ছিল না; থাকলে ব্যক্তিগত সুপারিশে কারো ব্যক্তগত সুসম্পর্কের কারণে দণ্ড মাফ হতো না।
- সা’দ ইবনে মুআযের রায়টি ছিল একটি নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের নামান্তর।
- নবীর ক্ষমা প্রদানের নীতিটি ছিল ব্যক্তিগত আনুগত্য বা সুপারিশ-নির্ভর, যা আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো নিরপেক্ষ বিচারিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
সার্বিকভাবে, বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ড কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নিধনযজ্ঞ, যাকে পরবর্তীতে ‘খোদায়ী ফয়সালা’র মোড়ক দেওয়া হয়েছে।
অকল্পনীয় নৃশংসতাঃ দুইজন ইহুদি নারীর ইতিহাস
ইহুদি নারী রায়হানার গল্প
রায়হানা বিনতে শামউন বিন যায়িদ ছিলেন ইহুদি সম্প্রদায়ভূক্ত একজন নারী। তিনি পিতার দিক থেকে বনু নাদ্বীর গোত্রের এবং স্বামীর দিক থেকে বনু কুরায়জা গোত্রের মহিলা ছিলেন। বনু কুরায়জা গোত্রের আল-হাকাম ছিল উনার স্বামী। নবী মুহাম্মদ উনার পরিবারকে হত্যার পরে উনাকে দেখে মুগ্ধ হন এবং যথারীতি বিবাহের প্রস্তাব দেন। বনু কুরাইজার রক্তস্নাত অধ্যায়ের অন্যতম করুণ সাক্ষী ছিলেন রায়হানা বিনতে যায়েদ। তার স্বামী আব্দুল হাকামকেও এই গণহত্যায় শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়েছিল। গোত্রের সমস্ত পুরুষকে হত্যার পর যে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুকে গনিমতের মাল বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বন্দি করা হয়, রায়হানা ছিলেন তাদেরই একজন।
বন্দিদের মধ্য থেকে নবী মুহাম্মদ রায়হানাকে নিজের জন্য বিশেষ অংশ বা ‘সাফি’ হিসেবে বেছে নেন। স্বামীর রক্ত শুকানোর আগেই রায়হানাকে তার গোত্রের হত্যাকারীর হাতে সমর্পিত হতে হয়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে, নবী মুহাম্মদ তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলে রায়হানা প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের ইহুদি ধর্মের ওপর অটল থাকার সিদ্ধান্ত জানান। তিনি বরং দাসী হয়ে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন, সম্ভবত স্বামী ও স্বজনদের হত্যাকারীর স্ত্রী হওয়ার মানসিক বৈপরীত্য মেনে নিতে পারেননি বলে। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়, তবে আমৃত্যু তার মনে সেই দগদগে ক্ষতের প্রভাব কতটা ছিল, তা বিজয়ী ইতিহাসের পাতায় খুব একটা উঠে আসেনি। ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মদিনাতেই ছিলেন, এককালের সম্ভ্রান্ত নারী থেকে ‘গনিমতের মাল’ হয়ে ওঠার এক দীর্ঘশ্বাসের নাম রায়হানা। আসুন তার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই, [80]
অন্যতমা হচ্ছেন, রায়হানা বিনত যায়দ -বনূ নাযীর গোত্রীয়া এবং মতান্তরে রক্ত ईর ভয় কিনী (র) বলেন, রায়হানা বিনত যায়দ ছিলেন বনূ নাযীর গোত্রের। তবে কেউ কেউ বলেছেন বনূ কুরায়জার। ওয়াকিদী (র) আরো বলেন, রায়হানা বিনত যায়দ ছিলেন বহু নাযীর গোত্রের এবং তিনি এ গোত্রেই বিবাহিতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে নিজের জন্য বাছাই করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সুন্দরী মহিলা। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি ইয়াহুদী ধর্ম পরিত্যাগে অস্বীকৃত হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে পরিত্যাগ করে রাখলেন এবং মনে মনে তাঁর আচরণে ব্যথা পেলেন পরে ইন শু’বা (ছা’লাব)-কে ডেকে পাঠিয়ে তার সংগে নবী করীম (সা) বিষয়টি আলোচনা করলেন। ইবন শু’বা বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত! সে ইসলাম গ্রহণ করবেই। তিনি তখন বের হয়ে গিয়ে রায়হানার কাছে পৌঁছলেন এবং তাকে বলতে লাগলেন, তুমি তোমার স্বগোত্রের অনুগামী হয়ে থেক না। তুমি তো দেখছই, (সর্দার) হুয়ায় ইব্ন আখতাব তাদের কি পরিণতিই না ঘটিয়েছে। তাই, (আমার পরামর্শ হচ্ছে) তুমি মুসলমান হয়ে যাও। রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে তাঁর ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ করে নেবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবীদের মাঝে ছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি এক জোড়া চপ্পলের আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, – – – ‘এ অবশ্যই ইব্ন শু’বার চপ্পলদ্বয়। সে আমাকে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিতে আসছে।’ তখনই ইবন শু’বা এসে বলতে লাগলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে নবী করীম (সা) আনন্দিত হলেন। ইবন ইসহাক (র) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বনূ কুরায়জাকে পরাজিত করার পরে রায়হানা বিনত আমর ইব্ন খিনাফাকে নিজের জন্য একান্ত করে নিলেন। নবী করীম (সা)-এ ওফাত পর্যন্ত তিনি তার নিকটে তাঁরই মালিকানাধীন ছিলেন। তিনি তাঁকে ইসলাম গ্রহণ কর এবং পরে তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কিন্তু তিনি ইয়াহুদী ধর্ম ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। এরপরে ইন ইসহাক তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত পূর্বোক্ত বিবরণ উল্লেখ করেছেন। ওয়াকিদী (র) বলেন, পরে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে উম্মুল মুনযির সালমা বিনত কায়স (রা)-এর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে অবস্থান কালে তার ঋতুস্রাব দেখা দেয় এবং এক বারের স্রাবের পরে তিনি পবিত্রা হলে উম্মুল মুনযির (রা) এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তা অবহিত করলেন। নবী করীম (সা) উম্মুল মুনযিরের বাড়িতে তাঁর কাছে গিয়ে বললেন,
ان احببت ان اعتقك و انزوجك فعلت – وان احببت ان تكونى في ملكي اطأك بالملك
“তোমার যদি পসন্দ হয় তবে তোমাকে মুক্ত করে দিয়ে আমি তোমাকে বিয়ে করি। তবে আমি তাই করব। আর যদি আমার মালিকানায় থাকা তোমার কাছে ভাল লাগে তবে মালিকানা সূত্রে আমি তোমাকে ব্যবহার করব।” সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দৃষ্টিতে আপনার জন্য এবং আমারও জন্য আপনার মালিকানাধীন থাকা অধিক নির্ঝঞ্চাট ও সহজ। ফলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মালিকানাধীন ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত ছিল। ওয়াকিদী (র) আরো বলেন, ইব্ন আবূ থি’ব (র) আমাকে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আমি যুহরী (র)-কে রায়হানা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাঁদী। পরে তিনি তাঁকে আযাদ করে দিয়ে দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। ফলে তিনি তার পরিবারের মাঝেও পর্দা করে থাকতেন এবং বলতেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে আর কেউ আমাকে দেখতে পাবে না। ওয়াকিদী (র) বলেন, হাদীসদ্বয়ের মাঝে এটিই আমাদের বিচারে | অধিক প্রামাণ্য। নবী করীম (সা)-এর পূর্বে তাঁর স্বামী ছিল হাকাম।
ওয়াকিদী (র) বলেন, আসিম ইব্ন আবদুল্লাহ ইবনুল হাকাম উমর ইবনুল হাকাম (র) | থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) রায়হানা বিনত যায়দ ইব্ন আমর ইব্ন খিনাফ কে আযাদ করে দিলেন। তিনি তার স্বামীর কাছে ছিলেন এবং স্বামী তাঁকে ভালবাসত এবং তাঁর যথাযোগ্য কদর করত। তাই তিনি বলেছিলেন, তার পরে কোন দিন আর কাউকে | আমি তার স্থানে গ্রহণ করব না। তিনি ছিলেন সৌন্দর্যের অধিকারিণী। পরে বনূ কুরায়জার | নারীদের বন্দী করা হলে বন্দিনীদের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে উপস্থিত করা হল। রায়হানা | বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে যাদেরকে উপস্থিত করা হয় তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তার আদেশে আমাকে পৃথক করে রাখা হল।
আর যে কোন গণীমতে তাঁর একান্ত কিছু অধিকার (ii) থাকত, আমাকে পৃথক করে রাখা হলে তিনি আমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ‘ইসতিখারা’ (কল্যাণবহ সিদ্ধান্ত কামনা) করলেন।
পরে কিছু দিনের জন্য আমাকে উম্মুল মুনযির বিনত কায়স (রা)-এর বাড়িতে পাঠিয়ে | দিলেন। ইত্যবসরে তিনি পুরুষ বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড দিলেন এবং নারী বন্দীদের বাটোয়ারা করে দিলেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা) আমার কাছে আগমন করলে আমি লজ্জায় পাশে সরে রইলাম। | তিনি আমাকে ডেকে তাঁর সামনে বসালেন। এবং বললেন, এ … “তুমি আল্লাহ এবয় রাসূলকে গ্রহণ করলে আল্লাহর রাসূল তাঁর নিজের জন্য তোমাকে গ্রহণ করবেন।” আমি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে মুক্ত করে দিলেন এবং আমাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করলেন। তিনি আমাকে বারো উকিয়ার কিছু অধিক (সাড়ে বারো উকিয়া =৫০০ দিরহাম) মহর দিলেন। যেমন তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের দিতেন। | তিনি উম্মুল মুনযির (রা)-এর বাড়িতে আমাকে নিয়ে বাসর উদযাপন করলেন। তিনি নিজের স্ত্রীদের জন্য রাত্রি যাপনের ‘পালা’ নির্ধারণ করতেন। আমার জন্য পর্দার বিধান সাব্যস্ত করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর প্রতি বিমুগ্ধ ছিলেন এবং তিনি কোন কিছুর জন্য আবদার করলে নবী করীম (সা) তা তাঁকে দিয়ে দিতেন। তাই তাঁকে বলা হয়, তুমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট বনূ কুরায়জার ব্যাপারে আবদার করলে তিনি অবশ্যই তাদের মুক্ত করে দিতেন। এর জবাবে তিনি বলতেন, বন্দিনীদের বন্টন (এবং পুরুষ বন্দীদের হত্যা) করার পরই তিনি আমার সংগে নিভৃতে মিলিত হয়েছিলেন। নবী করীম (সা) তাঁর সংগে নিভৃত বাস করতেন এবং প্রায়শ তা করতেন। এভাবে তিনি নবী করীম (সা)-এর নিকটেই ছিলেন | এবং অবশেষে বিদায় হজ্জ থেকে নবী করীম (সা)-এর প্রত্যাগমন কালে তাঁর মৃত্যু হল। নবী করিম (সা) তাঁকে বাকী গোরস্তানে দাফন করলেন। নবী করীম (সা) তাঁকে বিবাহ করেছিলেন হিজরতের ষষ্ঠ বর্ষে মুহাররম মাসে।
ইবন ওয়াহব (র) বলেছেন, ইউনুস ইব্ন ইয়াযীদ (র) সূত্রে যুহরী (র) থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বনূ কুরায়জার রায়হানাকে বাঁদী-পত্নীরূপে গ্রহণ করলেন। পরে তাঁকে মুক্তি দিয়ে দিলে তিনি তার পরিবার-পরিজনের সংগে মিলিত হলেন। আবূ উবায়দা মা’মার | ইবনুল মুদান্না (র) বলেছেন, রায়হানা বিনত যায়দ ইব্ন শাম’উন ছিলেন বনু নাযীর গোত্রের! আবার কারো মতে বনূ কুরায়জা গোত্রের। সাদাকার বাগানসমূহের এক খেজুর বাগানে তিনি | অবস্থান করতেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) মাঝে মধ্যে সেখানে মধ্যাহ্ন বিশ্রাম নিতেন। শাওয়াল, চার হিজরীতে তিনি তাঁকে বন্দিনী রূপে পান।
আবূ বকর ইব্ন আবূ খায়ছামা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দু’জন বাঁদী-পত্নী ছিলেন; মারিয়া কিবতীয়া ও রায়হানা বিনত শামউন ইব্ন যায়দ ইব্ন খিনাদা- কুরায়জার বনূ আমর- | এর লোক। প্রথমে তিনি যতদূর জানা যায়, তাঁর চাচাত ভাই হাকাম-এর স্ত্রী ছিলেন। নবী করীম (সা)-এর ওফাতের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। আবূ উবায়দা মা’মার ইবনুল মুছান্না (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চার জন বাঁদী ছিলেন মারিয়া, কিবতিয়া, রায়হানা কুরাজী, | আর একজন বাঁদী ছিলেন জমীলা সুন্দরী। নবী সহধর্মিণীগণ তার বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করলেন। তাঁদের আশংকা ছিল যে, নবী করীম (সা)-এর উপর তিনি তাদের তুলনায় প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলবেন এবং অন্য জন বাঁদী নফীসা – যাঁকে যায়নাব (রা) তাঁকে হিবা করেছিলেন। (ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে) নবী করীম (সা) সফিয়্যা বিনত হুয়ায় (রা)-এর কারণে যায়নাব (রা)-কে পরিত্যাগ করে রেখেছিলেন- যিলহজ্জ, মুহাররম ও সফর মাস। তার ওফাতের মাস রাবীউল আউয়াল শুরু হলে তিনি যায়নাব (রা) বললেন, আমি ভেবে স্থির করতে পারছি না যে আপনাকে কি প্রতিদান দেব ? পরে এ বাঁদীটিকে নবী করীম (সা)-কে হিবা করলেন।



স্বজনশোকে পাগল এক নারীর গল্প
মদিনার বাজারে যখন শত শত মানুষের শিরশ্ছেদ চলছিল এবং বাতাসে রক্তের গন্ধ ভারী হয়ে উঠেছিল, সেই বীভৎস পরিস্থিতির মাঝে এক অদ্ভূত ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন আয়েশা। বনু কুরাইজা গোত্রের এক নারী, যার নাম সম্ভবত আকাল বা বুনানা ছিল, তিনি সেই চরম মুহূর্তেও এক অদ্ভুত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলেন।
আয়েশার বর্ণনা অনুযায়ী, যখন একের পর এক পুরুষকে হত্যার জন্য ডেকে নেওয়া হচ্ছিল, তখন বনু কুরাইজার এই নারী আয়েশার পাশে বসে গল্প করছিলেন এবং হাসছিলেন। অথচ তিনি জানতেন যে তার গোত্রের সব পুরুষকে হত্যা করা হচ্ছে এবং তার নিজের মৃত্যুও সন্নিকটে। যখন তার নাম ধরে ডাকা হলো, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হাসতে হাসতেই জল্লাদের দিকে এগিয়ে যান। আয়েশা বিষ্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার কী হয়েছে? তুমি হাসছ কেন, অথচ তুমি জানো তোমাকে এখন হত্যা করা হবে?” জবাবে সেই নারী কেবল হাসতে হাসতেই মৃত্যুর দিকে পা বাড়িয়েছিলেন।
মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো সাধারণ হাসি ছিল না। নিজের চোখের সামনে স্বামী, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনদের এমন পাইকারি হত্যাকাণ্ড দেখে একজন মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পাওয়া বা ‘ট্রমা’র কারণে উন্মাদ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তার সেই অট্টহাসি ছিল মূলত এক চরম ঘৃণা এবং তীব্র মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুতেই এই দুঃসহ বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আয়েশা পরবর্তীতে বলেছিলেন যে, সেই নারীর সেই অট্টহাসি তিনি সারাজীবনেও ভুলতে পারেননি। যুদ্ধের ময়দানে তরবারির চেয়েও একজন স্বজনহারা নারীর এই আর্তহাসি ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হয়ে টিকে আছে। [81] [82]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১২১. নারী হত্যা সম্পর্কে
২৬৭১। ‘আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনী কুরাইযার কোনো মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। তবে এক মহিলাকে হত্যা করা হয়। সে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নাম ধরে ডেকে বললো, অমুক মহিলাটি কোথায়? সে বললো, আমি। আমি (‘আয়িশাহ) বললাম, তোমরা কি হলো, (ডাকছো কেন)? সে বললো, আমি যা ঘটিয়েছি সেজন্য (সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছিলো)। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো। আমি ঘটনাটি আজও ভুলতে পারিনি। আমি তার আচরণে অবাক হয়েছিলাম যে, তাকে হত্যা করা হবে একথা জেনেও সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো।(1)
(1). হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. মহিলাদের হত্যা সম্পর্কে।
২৬৬২. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুহাম্মদ নুফায়লী (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরাইযার মহিলাদের থেকে কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি, কিন্তু একজন মহিলাকে (হত্যা করা হয়), যে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পুরুষদের এক বাজারে হত্যা করেছিলেন। তখন জনৈক আহবানকারী সে মহিলার নাম ধরে ডাকে যে, অমুক মহিলা কোথায়? তখন সে বলে, এই তো আমি। আমি (আয়িশা) তাকে জিজ্ঞাসা করিঃ তোমার ব্যাপার কি? তখন সে বলেঃ আমি একটা ঘটনা ঘটিয়েছি, (অর্থাৎ সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়)। আয়িশাহ (রাঃ) বলেনঃ তখন সে (আহবানকারী) তাকে নিয়ে যায় এবং তার শিরচ্ছেদ করে। তিনি বলেনঃ আমি সেই ঘটনাটি এখনো ভুলতে পারিনি। কেননা তার আচরণে তাজ্জবের ব্যাপার এই ছিল যে, সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল, অথচ সে জানত যে, তাকে হত্যা করা হবে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
এই নারীটি সম্পর্কে আরও একটি হৃদয়বিদারক বিবরণ পাওয়া যায়। এই কিছুদিন আগেও এই নারীর প্রেমময় স্বামী ছিল, সংসার ছিল। তাদের এই দাম্পত্য সম্পর্কের গভীরতা ফুটে ওঠে অবরোধের শেষ দিনগুলোতে। যখন বনু কুরাইজার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন এই দম্পতির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—হয় চিরদিনের জন্য দাসত্বের শৃঙ্খল এবং বিচ্ছিন্নতা, নয়তো মৃত্যু। স্বামী জানতেন, বনু কুরাইজার পুরুষদের হত্যা করা হলেও নারীদের দাসী হিসেবে বণ্টন করা হবে। প্রিয়তমা স্ত্রীকে অন্যের দাসী হিসেবে দেখা তাঁর কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক ছিল। তাই এক চরম মরিয়া সিদ্ধান্তে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, “মুহাম্মদ তোমাকে হত্যা করবেন না, করবে যৌনদাসী। কিন্তু তুমি কারো দাসী হয়ে থাকবে—এই কল্পনাও আমার জন্য অসহনীয়।” স্বামীর এই আকুতি থেকেই বানানা এক অমানবিক পথ বেছে নেন। তিনি দুর্গের ওপর থেকে আটা পেষার যাঁতা গড়িয়ে দিয়ে একজন মুসলিম সৈন্যকে হত্যা করেন। এটি কোনো সাধারণ আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল মূলত নিজের ‘মৃত্যুদণ্ড’ নিশ্চিত করার এক আর্তচিৎকার। তিনি জানতেন, হত্যার অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এবং এর মাধ্যমেই তিনি নবী মুহাম্মদের অনুসারীদের চিরকালীন যৌনদাসী হওয়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর স্বামীর সাথে পরকালের পথে পাড়ি দিতে পারবেন।
আয়েশার বর্ণনায় আমরা বানানার শেষ মুহূর্তগুলোর যে চিত্র পাই, তা মানসিকভাবে বিদীর্ণ করার মতো। মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি আয়েশার কাছে বসে হাসছিলেন, কৌতুক করছিলেন। প্রিয়তম স্বামী ও স্বজনদের হত্যার মিছিলে পাঠিয়ে নিজে দাসী হওয়ার গ্লানি থেকে বাঁচার জন্য তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা আধুনিক সমাজতত্ত্বে ‘প্রটেস্ট সুইসাইড’ বা প্রতিবাদী আত্মাহুতির একটি রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আয়েশা নিজেই এই নারীর অদ্ভূত আনন্দ-উচ্ছলতা দেখে সারাজীবনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। বনু কুরাইজার গণহত্যার ইতিহাসে বানানা হয়ে আছেন সেই নারী, যিনি দাসত্বের অবমাননার চেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন। [83]
সেদিন বনী কুরায়জার রমণীদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিলো কেবল বানানা নাম্নী এক রমণীকে। সে ছিলো বনী নাজির সম্প্রদায়ের মেয়ে। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিলো বনী কুরায়জার এক যুবকের সাথে। তাদের দাম্পত্যপ্রণয় ছিলো অত্যন্ত গভীর। তখন অবরোধের শেষ পর্যায়। তাদের সকলেই বুঝলো, এবার আর তাদের নিস্তার নেই। বানানা তার স্বামীকে বললো, তোমাকে তো এবার আমার কাছ থেকে পৃথক করে ফেলা হবে। তাই যদি হয় তবে আমার আর বেঁচে থেকে কাজ কী? যুবক বললো, মোহাম্মদ জয়ী হলে তোমাকে হত্যা করবে না। করবে চিরদাসী। কারণ তার ধর্মে নারী হত্যার বিধান নেই। কিন্তু তুমি কারো দাসী হয়ে থাকবে, সে কল্পনাও আমার জন্য অসহনীয়। তার চেয়ে তুমি এক কাজ করো। ওই আটা পেশার যাঁতার চাকতিটি এখান থেকে নিচে গড়িয়ে দাও। যদি ওই চাকতির আঘাতে কোনো মুসলমান সৈনিক নিহত হয়, তবে সেই অপরাধে তোমাকে দেওয়া হবে মৃত্যুদণ্ড। আমি চাই তোমাকে মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক। বানানা তার স্বামীর কথামতো যাঁতার চাকতিটি দুর্গের একটি ফোকর দিয়ে নিচে গড়িয়ে দিলো। বাইরে তখন মধ্যাহ্নের প্রখর উত্তাপ। ওই সময় মুসলিম সৈন্যদের অনেকে দুর্গের দেয়ালের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। চাকতি সোজা গড়িয়ে পড়লো সেরকম বিশ্রামরত এক সৈনিকের মাথায়। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যে শাহাদত বরণ করলেন তিনি।
ওরওয়ার বর্ণনায় এসেছে, জননী আয়েশা বলেছেন, যখন বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়, তখন বানানা ছিলো আমার কাছে। প্রায় সারাক্ষণ হাস্য-কৌতুকে মেতে থাকা ছিলো তার স্বভাব। ওদিকে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হচ্ছিলো, আর সে মাঝে মাঝেই কৌতুক করে বলছিলো, কী মজা! আজ বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে বধ করা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, বানানা কোথায়? সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, এই যে আমি এখানে । আমি বললাম, হতভাগিনী! লোকটি তোমার কে? সে বললো, আমাকে ডাকা হচ্ছে হত্যা করার জন্য। আমি বললাম, কী কারণে? সে বললো, নিশ্চয় কোনো অপরাধ করেছি। জননী আয়েশা আরো বলেছেন, যার উপরে মৃত্যুর পরওয়ানা ঝুলছে, তার এরকম আনন্দ-উচ্ছলতা করার কথা আমি জীবনে শুনিনি। তার কথা আমার আজও মনে পড়ে যায় ।

উপসংহার
বনু কুরাইযার ঘটনার মতো ঐতিহাসিক সামরিক শাস্তির আলোচনায় প্রায়শই একটি প্রেক্ষাপটজনিত বিতর্ক উঠে আসে—সে সময়ে আধুনিক যুদ্ধাপরাধের মানদণ্ড বা জেনেভা কনভেনশন-এর মতো আন্তর্জাতিক আইন ছিল না। কিন্তু এই ধরনের কালেকটিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি নৈতিকতার এমন একটি মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করে, যা সময় নিরপেক্ষভাবেই অন্যায্য ও অমানবিক।
যৌথ শাস্তির মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার নীতির সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি। যেখানে ন্যায়বিচারের দাবি হলো অপরাধীকেই শাস্তি দিতে হবে, সেখানে এই শাস্তির মাধ্যমে গোটা একটি সম্প্রদায়কে—যার মধ্যে অনেকেই অপরাধে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিল না—কেবল তাদের গোত্রের পরিচয়ের কারণে হত্যা, দাসত্ব বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো চরম পরিণতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এটি মূলত দোষারোপহীনকে শাস্তি দেওয়া (punishing the blameless)-এর শামিল, যা সর্বজনীনভাবে একটি মৌলিক অন্যায়।
নৈতিক দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কালেকটিভ পানিশমেন্ট হলো ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধমূলক এবং ভীতিকর (deterrent) ব্যবস্থার প্রকাশ। প্রাচীন গ্রিক চিন্তাবিদ প্লেটোও গোত্রীয় সংঘাতের সময় সংযম ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, যদিও প্রাচীন সমাজে দলগত দায়বদ্ধতার (collective responsibility) ধারণা তখনও বহুল প্রচলিত ছিল [84]। প্রাচীন চীন ও মধ্যযুগীয় ফ্লোরেন্সেও রাজদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে পরিবার বা গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে শাস্তি দেওয়া হতো [85]। তবুও, এই ধরনের শাস্তি মানবিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এখানে শাস্তির লক্ষ্য ব্যক্তি নয়, বরং একটি গোষ্ঠী। এর ফলে অপরাধের মাত্রা ও শাস্তির মাত্রার মধ্যে চরম অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়—যা মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক সামঞ্জস্যের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়।
আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law – IHL) সুস্পষ্টভাবে কালেকটিভ পানিশমেন্টকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা এসেছে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার (individual criminal responsibility) মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে [86]। যদিও ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে এমন কোনো আইনি কাঠামো ছিল না, তবুও নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে এই ধরনের অন্যায় সর্বকালেই প্রশ্নবিদ্ধ।
মানব সভ্যতার নৈতিক অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, কোনো সম্প্রদায়ের একজন বা কয়েকজনের অপরাধের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে নির্মূল বা দাসত্বে বশীভূত করা কেবলই একটি নির্মম সামরিক কৌশল ছিল, যা নৈতিক মানদণ্ডে কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিহাসের এই অধ্যায় তাই শুধু ধর্মীয় নয়, বরং মানবতাবাদী পরিপ্রেক্ষিতেও একটি গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
উপরের আলোচনা থেকে এটি মোটামুটি পরিষ্কার যে, বনু কায়নুকা গোত্রের কিছু মানুষের অপরাধের কারণে নবী মুহাম্মদ তাদের গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা করতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কারণেই নবী এই কাজটি করতে সক্ষম হন নি। তাই নবী মুহাম্মদের পরিকল্পনা, যা ছিল আরব উপদ্বীপ থেকে মুসলিম বাদে সবাইকে উচ্ছেদ করা, নিশ্চিহ্ন করার প্রকল্পের অংশ হিসেবে তারা বনু কুরাইজা গোত্রকে আক্রমণ করে, এবং আগে থেকেই তাদের কী শাস্তি দেয়া হবে সেটি ঠিক করে রাখে। এরপরে বিচারের নামে যা হয়েছে তা নিয়ে উপরে সবকিছুই বর্ণনা করা হলো। পাঠক পুরো বিষয়টি বিচার বিবেচনা এবং বিশ্লেষণ করে বুঝবেন, এই গণহত্যা, কালেকটিভ পানিশমেন্ট এবং এথনিক ক্লিনজিং কতটা মানবিক এবং কতটা নৈতিক। আল্লাহ এবং তার প্রেরিত নবীর পক্ষে এই ধরনের কাজ করা কতটা সঠিক ছিল, এবং এখন পর্যন্ত মুসলিমদের এই রকম কাজকে অনুসরণ, অনুকরণ করা কতটা সভ্য আচরণ!
তথ্যসূত্রঃ
- ধর্ম অবমাননা, সাম্প্রদায়িকতা এবং মূর্তি ভাঙ্গার সুন্নত ↩︎
- সীরাতুল মুস্তফা (সা.), আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী, পৃষ্ঠা: ২৮৬ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৭১, ২৭২ 1 2 3
- The Life Of Muhammad, by Ibn Ishaq : Alfred Guillaume, পৃষ্ঠা ২৩২, ২৩৩ 1 2 3
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৭৩ 1 2
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪০১ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৮ 1 2
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৯৪ 1 2 3 4 5
- ইহুদীকন্যা সাফিয়ার না-বলা গল্প ↩︎
- ইসলামের জুডিও খ্রিস্টান এবং পৌত্তলিক ভিত্তি ↩︎
- নবী মুহাম্মদের গুপ্তহত্যার তালিকা ↩︎
- রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন), হাদিসঃ ১৮২৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ১৮৭১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশ, হাদিসঃ ৩২২৩ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, ১৪/৭১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৭ ↩︎
- ইসলামি শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৪২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৮৬ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হুসাইন আল-মাদানী পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ১৬০৭ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৭ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৮ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৩ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪০১ ↩︎
- Ibn Ishaq, The Life of Muhammad, Oxford University Press, 2007, p. 363 ↩︎
- সিরাতে ইবনে হিশাম, অনুবাদঃ আকরাম ফারুক, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৭৩-৫৭৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৮৪৭ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৩০০৩ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী, হাদিসঃ ১৬০২ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ২৯৯৪ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৮১ ↩︎
- সূরা আনফাল, আয়াত ৬৭ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০১ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯-২০০ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৭ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৫, ৪১৬ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৭ 1 2
- সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০০ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৯ ↩︎
- ছবিঃ উইকিপিডিয়া ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪২৫ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৯ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৬৪, ৬৫ 1 2 3
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬১৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৭২৯৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৪১ ↩︎
- সীরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.), ইবনে ইসহাক; পৃষ্ঠা ২৭১-২৭২ ↩︎
- সিরাতুল মুস্তফা ( সা ), আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৪ ↩︎
- আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৩৫৪ 1 2
- সীরাতুন নবী (সা.), ইবনে হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৩ 1 2
- মুয়াত্তা মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, হাদিসঃ ১০২৪ ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭১ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৭ 1 2
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৫৮২ 1 2 3
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪১২২ ↩︎
- সহীহুল বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪, ৯৫ ↩︎
- সীরাতুন নবী (সা.)- ইবনে হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৩ ↩︎
- Mothers of all Palestinians should also be killed,’ says Israeli politician ↩︎
- Israeli MP says mothers of all Palestinians should be killed ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৪০৪ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৪০৫ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৫২ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৫৮৪ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ২৫৪১ ↩︎
- সূরা মায়িদা, আয়াত ৪৮ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৫৩১ ↩︎
- জামে তিরমিযী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২২৫ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৪ ↩︎
- তাহাবী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৭৪৮, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৯ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৭-২৩৮ ↩︎
- আর-রাহীকুল মাখতুম, আল্লামা শফীউর রহমান মোবারকপুরি, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৩৫৬-৩৫৭ ↩︎
- সীরাতুন নবী (সা), ইবনে হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৪ ↩︎
- সীরাতে ইবনে হিশাম, মূলঃ ইবনে হিশাম, অনুবাদঃ আকরাম ফারুক, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, পৃষ্ঠা ২২৭ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৬ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৬ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৫ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৫০০- ৫০২ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ২৬৭১ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৬৬২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৪ ↩︎
- Kister, M. J. (Original reference to the academic debate on the incident and its historical sources) ↩︎
- Wikipedia / Brill (General Academic Sources): (Reference for the historical context of collective punishment in ancient societies and the philosophical debate on individual versus collective guilt) ↩︎
- ICRC: Customary IHL, Rule 103. (Reference for the modern legal view on Collective Punishment and Individual Responsibility) ↩︎


চমৎকার লেখা। অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও ঝরঝরে ভাষায় অমানবিক এই ঘটনার বিরুদ্ধে একটি অকাট্য দলিল। পুরো ঘটনার খুঁটিনাটি হাদীস ও সীরাত গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণিত সত্য অবলম্বনে লেখা হয়েছে। লেখাটি পড়ে বনু কুরাইজার সেইসব হতভাগ্য মানুষদের কথা ভাবলাম। তাদের স্ত্রীদের কথা ভাবলাম। এই নিষ্ঠুরতার কোন ক্ষমা ইতিহাস অন্তঃত করবে না, সেই প্রত্যাশা রাখি।
এরকম সব ঘটনা গুলো সম্পর্কে লিখবেন আশা করি
(১) কোরআন এবং হাদিসে থাকা অজস্র ভুল এবং
অসংগতির কথা এখানে বলা হয়। আরো বলা হয় নবীর অমানবিক সব কর্মকাণ্ডের কথা। প্রশ্ন হল, লক্ষ লক্ষ মুসলিম দার্শনিক, মুফাসসিরে কোরআন-যারা কোরআন এবং হাদিস নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের কাছে কেন এই অসংগতি গুলো ধরা পড়লো না? যদি ধরা পড়ে ও থাকে, কিসের আশায় তারা এগুলো তুলে ধরলেন না? আর যদি তুলে ধরে থাকেন, সেরকম কোন প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআনের লেখার রেফারেন্স দেওয়া যাবে?
(২) আমাদের দেশে করোনার পিক টাইমে ধর্মকে অনেকটাই কোনঠাসা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলাম। অনেককেই প্রকাশ্যে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল, জনমনেও ধর্ম নিয়ে কিছুটা সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু, এখন খেয়াল করছি, ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে অন্যরকম একটা উন্মাদনার সৃস্টি হয়েছে। ফ্রান্সের ঘটনায় ৯৯℅ মানুষকে দেখছি কতলকারির সমর্থক হিসেবে, ধর্ষণের জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে পোষাককে, ধর্ষণ প্রতিরোধে শরিয়া আইন প্রনয়নের দাবি জানানো হচ্ছে। হুজুররা করলে ঠিক ছিল, সাধারণ পাবলিকের ও দেখি একই দাবী! আপনাদের কাছে কি মনে হয়, এই দেশের জনগন হঠাৎ করেই কেন এত ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠলো?
“আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে যুদ্ধকালিন সংঘাতের সময় বেসরকারী জনগণকে খুন”
it should be “বেসামরিক”
চমৎকার এই লেখাটির জন্য ধন্যবাদ আসিফ ভাই।
মুহম্মদ সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট মানুষ, সবচেয়ে বড় গণহত্যাকারী।
আমার লেখাটিও পড়ুন সবাই।
https://vondomoderatemuslims.blogspot.com/2021/06/blog-post_15.html?m=1
https://vondomoderatemuslims.blogspot.com/2021/06/blog-post_15.html?m=1
সাধারণভাবে কোনো গণহত্যাই সমর্থন যোগ্য নয় মানবিকতার মানদন্ডে ! মনে রাখতে হবে যে যুদ্ধ অনেক সময় একটি জটিল প্রেক্ষাপট রচনা করে | যেক্ষেত্রে নিরীহ সাধারণ বেসামরিক মানুষ যুদ্ধের সঙ্গে এবং যুদ্ধের পেছনের রাজনীতি ও কোনো ধরণের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত নয় , চুক্তির সঙ্গে জড়িত নয়, যাদের কোনো মতামত কিংবা ভোটাভোটি চুক্তি বা যুদ্ধ এর সিদ্ধান্তের সময় নেওয়া হয়নি , তাদেরকে গণহত্যার শিকার বানানো কতটা যুক্তিযুক্ত এটা সত্যি ভেবে দেখার বিষয় !
২) সমাজ পারফেক্ট না , জীবন পারফেক্ট না | সাধারণ মানুষের কি স্বার্থ থাকবে না , মতামত ও অধিকার থাকবে না ? তাহলে কি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মুক্তি যুদ্ধ করে কিংবা তাতে পরোক্ষ সহায়তা দিয়ে ভুল করেছিল ? তাহলে তো পাকিস্তানিদের করা জেনোসাইড ন্যায্যতা পেয়ে যায় |
৩) তথাকথিত উদারপন্থী মানববাদীরা ১৫০০ বছর আগের ৯০০ জন নিরীহ বেসামরিক গণহত্যা নিয়ে চিন্তিত –সেটি ভালো কথা, কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের উপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে চল্লিশের দিকে ব্রিটিশ বাহিনীর সহায়তায় , হাজার হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনি গ্রামবাসীকে হত্যা করা হলো , নারীদেরকে ধর্ষণ করা ও তাদের অন্ত্র কেটে নেওয়া হলো ,
পরোক্ষভাবে সেই নৃশংস গণহত্যাকে সমর্থন দেওয়া কোন ধরণের মানববাদ ?
উদার মানববাদীরা ভিয়েতনামের গণহত্যা ও নৃশংসতা , চিলি, গুয়াতেমালা মেক্সিকো জ্যামাইকা ইত্যাদি ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলিতে সিআইএর পরিচালিত গণহত্যা (massacre ), বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গুম করে ফেলা –লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা নিয়ে একেবারেই নীরব ! এটা কি দ্বিচারিতা নয় ? তাহলে ধর্মবাদীদের সঙ্গে মানববাদের দাবিদারদের কি পার্থক্য ? ধর্মবাদীরা কি আকাশ থেকে পড়ে হঠাৎ করে ধর্মবাদী ও অমানবিক হয়েছে ? নাকি material conditions , that is, means of production, উৎপাদিকা শক্তির স্তর , socio-economic structure এগুলি এবং সাম্রাজ্যবাদের আরোপিত বিশ্ব ব্যাপী নব্য ঔপনিবেশিক অর্থ ব্যবস্থা এগুলি নির্ধারণ করে থাকে ? কেবল ব্যক্তির ইচ্ছায় এমন সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ঘটে বলে ভাবাটা ভাববাদী চিন্তা পদ্ধতি |
আর উদার মানববাদীরা কিভাবে নিজেদেরকে “মানববাদী” বলে দাবি করে সাম্রাজ্যবাদী ও লুটেরা দেশগুলির সমস্ত দানবীয় কার্যকলাপকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে ( ওই দেশগুলিকে “সভ্য” দেশ বলে মহিমান্বিত করে !)
তথাকথিত “সভ্য” ইউরোপীয় দেশগুলির গণতন্ত্র , ওয়েলফেয়ার ইত্যাদির জন্য আফ্রিকা ও লাতিন amerikaকে লুন্ঠন করতে হয়েছে, রক্ত ঝরাতে হয়েছে | অতএব এই ওয়েলফেয়ার ও সভ্যতা তৈরী হয়েছে অনেক হাহাকার ও কান্নার মূল্যে ! আলোর
নিচে থাকে অন্ধকার ! আফ্রিকার মানুশের রক্ত শোষণ করে তারা শিল্প কারখানা , এবং এর উপর ভিত্তি করে গণতন্ত্র পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ ও কল্যাণ ব্যবস্থা তৈরী করেছে |