বিপদে মোরে রক্ষা করো?
আমার এক অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, নাম বলবো না, বেশ কয়েকদিন ধরে নাস্তিক্যবাদী লেখা পড়েটরে খানিকটা নাস্তিক টাইপের হয়ে গেছে। আসলে নাস্তিক না, তার মনে অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে এবং সংশয় দেখা দিয়েছে। সে মোল্লাদের সাথে এখন ভালই তর্ক করে। যুক্তিতর্ক দিয়ে রীতিমত ধরাশায়ীও করে দেয় অনেককে। এবং তাদের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে হাসাহাসিও করে।
কয়েকদিন আগে তার একটা এক্সিডেন্ট হয়। এক্সিডেন্টের ফলে সে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে যায় এবং যুক্তি বুদ্ধি বিবেচনা সব বাদ দিয়ে আল্লাহকে ডাকা শুরু করে। পরে হাসপাতালে পৌঁছায়, এবং ক্ষয়ক্ষতি অল্পের ওপর দিয়েই যায়। যদিও বেশ রক্তারক্তি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম না। তারপরেও, তার ধারণা, আরো অনেক ক্ষতি হতেই পারতো। আর ভয়াবহ ক্ষতি যে হয় নি, সে কারণে সে সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আমাকে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানায়।
আমাকে বলে, ভাই, এইরকম অবস্থায় কারো এত যুক্তিতর্ক তথ্য প্রমাণ মাথায় থাকে না। ভয় লাগে। আমি আল্লারে অবিশ্বাস করার কারণেই আমার এই এক্সিডেন্টটা হইছে। এইটাই আল্লাহর প্রমাণ। আর কোনদিন অবিশ্বাস করবো না। আল্লাহ নিজেই তার প্রমাণ আমাকে দিছে।
আমি তাকে বললাম, তুমি আল্লায় এখন বিশ্বাস করো, খুব ভাল কথা। আমি কখনই তোমাকে নাস্তিক হতে বলি নাই। কিন্তু তুমি বিপদের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছো, অতি উত্তম। কিন্তু সেটা আসলে আমাদের পয়েন্ট আরো ভালভাবে প্রমাণ করে। যে, লোভ এবং ভয়, এই দুটোই ধর্ম এবং আল্লাহদের টিকিয়ে রাখে। এই দুই বাদে আল্লাহদের তেমন কোন কার্যকারিতা নেই। লোভ এবং ভয়ের ভেতরেই তাদের অস্তিত্ব।
সেই সাথে, তুমি যে বিষয়টা ভুলে যাচ্ছো, আল্লাহ তোমাকে এক্সিডেন্টের বিপদ থেকে রক্ষা করেছে বলে তোমার মনে হচ্ছে, একটু ভেবে দেখলে বুঝবে, এক্সিডেন্টটা সেই একই যুক্তিতে তোমার আল্লাহই ঘটিয়েছেন। শুধুমাত্র সামান্য কিছু প্রশ্ন করার দায়ে যেই হিংসুটে সত্ত্বা তোমার ক্ষতি করে, বিপদে ফেলে, ব্লাকমেইল করে তাকে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করে, একজন সুস্থ চিন্তাশীল মানুষ সেই একই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে কিনা!
অন্যদিকে, তুমি যেই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছ, সেটা হয়তো কোন খ্রিস্টান ইহুদী নাস্তিকদের বানানো হাসপাতাল। যেই ঔষধগুলো ব্যবহার করেছো, যারা ঔষধগুলো আবিষ্কার করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, ইহুদী কিংবা খ্রিস্টান। হিন্দু বা বৌদ্ধ বা মুসলিমও আছে। কিন্তু সেই হাসপাতালে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করা হয় নি, তুমি কোন ধর্মের। মুসলিম হওয়ার কারণে এক রকম চিকিৎসা, হিন্দু বা ইহুদী হলে আরেকরকম, সেরকম কোন হাসপাতালে করা হয় না। আল্লায় বিশ্বাস করলে চিকিৎসা করবো, বা যীশুকে বিশ্বাস করলে ঔষধ দেবো, এরকম কোন হাসপাতালে করা হয় না সভ্য সমাজে। কেউ করলে সেটা চরম অসভ্যতা হবে। আল্লাহ যেমন করে। বিশ্বাস করলে সুস্থ করে তুলবে, বিশ্বাস না করলে ক্ষতি করবে! ধর্ম আর বিশ্বাসের ওপর ঈশ্বরের করুণা বা দয়া নির্ভরশীল?
ধরো, এলাকার এক গুণ্ডা তোমার কাছে চাঁদা চাচ্ছে। তুমি সৎ মানুষ, চাঁদা দিচ্ছো না। গুণ্ডাটি তোমার ছেলেকে তুলে নিয়ে তার একটা হাত কেটে ফেললো। এরপরে তুমি ভয়ে তাকে চাঁদা দিতে শুরু করলে, এবং তোমার ছেলেকে গুণ্ডাটি ফেরত দিলো। তখন তুমি বলতে লাগলে, গুণ্ডাটি কতই না করুণাময় এবং মহান। যে তোমার ছেলেটাকে শুধু একটা হাত কেটেই ফেরত দিয়েছে। খুন করে নি। ইচ্ছা করলে সে খুনও করতে পারতো। তা না করে মাত্র একটা হাত কেটেই ফেরত দিয়েছে। কী মহৎ হৃদয়ের অধিকারী সেই গুণ্ডাটি। আহা! এরকম মহান মানুষ আর পাওয়া যায় না। রীতিমত পরমকরুণাময় আর কী!
কিন্তু ভেবে দেখছো না, তোমার ছেলের হাত সেই কেটেছে। এবং তোমাকে ভয় দেখিয়েছে। চাঁদা না পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ক্ষতি করেছে। ব্লাকমেইল করেছে। যদি তোমার আল্লাহ নামক সত্ত্বাটি সত্য হয়েই থাকে, যে তোমাকে এক্সিডেন্টের পরে আরো বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছে বলে তোমার মনে হচ্ছে, তোমার সূত্রানুসারে সেই একই মহান এবং করুণাময় আল্লাহ সামান্য প্রশ্ন করার কারণে তোমার এতবড় বিপদ ঘটিয়েছেও। তোমাকে পরীক্ষার নামে? সিরিয়াসলি? যেই বাচ্চা মেয়েটা দশজন নরপশুদ্বারা গণধর্ষণের শিকার, সেটা কেমন পরীক্ষা? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের একটি দেয়ালে একজন ইহুদী লিখেছিল, ঈশ্বর যদি সত্যি থেকেও থাকেন, আমার কাছে করজোড়ে তার ক্ষমা চাইতে হবে। কেন লিখেছিলেন, কে লিখেছিলেন, ভাবতে পারো?
একজন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষ এরকম জিম্মি করে কাউকে বিশ্বাস এবং প্রার্থণা করতে বাধ্য করানো সত্ত্বার কাছে নতি স্বীকার করবেন না। অন্তত আমি করবো না। ভেবে দেখো, অসংখ্য বিজ্ঞানী দিনরাত পরিশ্রম করে তোমার সুস্থ হওয়ার জন্য নানা ঔষধ আবিষ্কার করেছেন। তোমার কাছে বিনিময়ে কিছুই চান নি। তাদের ছবি বাসায় টাঙিয়ে ডেইলি পাঁচবার সেখানে মাথা ঠুকতে বলেন নি। তাদের শ্রদ্ধা না করলে তারা আমাকে দোজখে নিয়ে শিক কাবাব বানাবে, এরকম হুমকিও দিচ্ছে না তারা। কারণ তারা এতটা ইতর স্বভাবের নয়। মানুষের সেবা করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। উপাসনা পাওয়া নয়। তাদের নামও তুমি হয়তো জানো না। আমি তাদের শ্রদ্ধা জানাই। তারা আমাকে ভয় দেখিয়ে শ্রদ্ধা আদায় করছেন না। মন থেকেই আমি শ্রদ্ধা করি তাদের।
ধরো, কাল যদি আমি একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স সম্পন্ন রোবট তৈরি করি, যা একটি স্বাধীন সত্ত্বা, তার মনে যদি কোন প্রশ্ন জাগে, কীভাবে তাকে বানালাম, বা সন্দেহ তৈরি হয়, আমি নির্দ্বিধায় তার প্রশ্নের জবাব দেবো। তার মাথায় এমন সফটওয়ার ইন্সটল করবো, যাতে সে আরও ভালভাবে বিষয়গুলো বুঝতে পারে। সে যেন অশিক্ষিত মুর্খ অন্ধবিশ্বাসী নয়, যুক্তি বুদ্ধি তর্ক প্রমাণ গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানী হয়ে ওঠে। সে যদি আমার কথা না শোনে, আমি বুঝে নেবো, প্রোগ্রামিং এ কিছু গণ্ডগোল ছিল। ঠিকভাবে রোবটটি আমি প্রোগ্রাম করতে পারি নি। সেগুলো মেরামত করা প্রয়োজন।
এখন আমি নিজেই যদি একটি ভাইরাস (শয়তান, ইবলিশ) বানিয়ে ছেড়ে দিই, সেই ভাইরাসের এমন ক্ষমতা দিই, যেই ক্ষমতা দিয়ে সে রোবটের ক্ষতি করতে পারে, এবং আমার বানানো রোবটটিকে বলি, এই ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করো, আমার পূজা কারো, আমাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করো, কোন যুক্তি প্রমাণ চাইবে না, পূজা না করলে মারপিট করবো, তাহলে সেসব হবে একদমই অপরিণত মস্তিষ্কের বাচ্চাছেলেদের মত কাজ হবে। রীতিমত ফাজলামি মার্কা আচরণ।
বরঞ্চ, রোবটটি যদি যুক্তি প্রমাণ দিয়ে আমার অস্তিত্ব অস্বীকার করে, তাহলে আমি বুঝে নেবো, সে যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে যা করার করেছে। অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে বসে থাকে নি। নিজের বুদ্ধি খাটিয়েছে। হয়তো যথেষ্ট তথ্য প্রমাণের অভাবে সে আমাকে বিশ্বাস করে নি, তারপরেও নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্ধ থাকে নি। সেটা তো প্রশংসার যোগ্য।
আবার ধরো, কাল আমি নিয়ম করলাম, আমার ফেইসবুকের বন্ধুতালিকায় যারা আছেন, তাদের সবাইকে আমার প্রোফাইলে ঢুকে নিয়মিত লাইক দিতে হবে। না দিলে তাদের ব্লক করবো। শুধু ব্লকই না, তাদের বাসায় গিয়ে তাদের মুখে এসিড ছুড়ে মারবো। সেই ভয়ে অনেকে আমাকে লাইক দেয়া শুরু করলো। এতে কী প্রমাণ হলো? আমার লেখাগুলো খুব উন্নত মানের? আমি খুব দয়ালু? করুণাময়? নাকি আমি একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাছেলে, যে লাইক না পেলে কান্নাকাটি করে? আল্লাহর চরিত্রটি নিয়ে একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে বুঝবে, সে একটা বাচ্চাছেলের মতই। দিনে পাঁচবার তাকে লাইক না দিলেই সে রেগেমেগে ফায়ার! হুমকি ধামকি দেয়, ক্ষতি করে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করে।
যাইহোক, তারপরেও তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস ফিরে পেয়েছো, ঈশ্বরের প্রমাণ পেয়েছো, সে কারণে সাধুবাদ। তবে তাই বলে চিন্তা করা যাবে না, যুক্তি প্রমাণ বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগানো যাবে না, অন্ধভাবে বিশ্বাসই করে যেতে হবে, এমনটাও না। নাস্তিক হওয়া জরুরি না, ভেতর থেকে এই ভয়ভীতি বেহেশতের লোভ লালসা বের করতে পারাটাই আসল। চেষ্টা করে যাও। নাস্তিক না হলেও ক্ষতি নেই। মনে রেখো, নাস্তিক থেকে আস্তিক হয়ে গেলে, কোন নাস্তিকই তোমাকে কোপাবে না। কেউ তোমাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে গেছে, এরকম ঘোষণাও দেবে না। আস্তিক হলে তোমাকে মরার পরে দোজখের আগুনে শিক কাবাব বানানো হবে, এমন হুমকিও কেউ দেবে না। তাহলে কারা শান্তিবাদী, কারা সন্ত্রাসী, সেটা তুমি নিজেই ভেবে নিও।
যুক্তি প্রমাণ বুদ্ধি বিবেক দিয়ে ভেবে বুঝে শুনে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নাও। সিদ্ধান্ত যাই হোক, আমার শুভকামনা রইবে।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


শুধুমাত্র ভাল বলে ছোট করব না অসম্ভব ধরনের ভাল।