ইসলাম, সঙ্গীত ও সুরের দ্বন্দ্ব: এক ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক পরিভ্রমণ
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 বিতর্কের উৎস – ধর্মগ্রন্থ ও ঐতিহ্যের নীরব ও সরব বয়ান
- 3 দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের চোখে সঙ্গীত – আত্মার আরোহণ নাকি পতন?
- 4 প্রয়োগের ভুবন – সুফিবাদ ও রাজদরবারের সঙ্গীত
- 5 সুরের ব্যাকরণ থেকে আধুনিক বিদ্রোহ – ইসলামী সঙ্গীতের তত্ত্ব ও রূপান্তর
- 6 নিষেধাজ্ঞার নবজাগরণ – সমসাময়িক গোঁড়া ইসলাম ও সঙ্গীতের প্রত্যাখ্যান
- 7 তত্ত্বের আয়নায় সুরের প্রতিবিম্ব – তাত্ত্বিকদের চোখে ইসলাম ও সঙ্গীত
- 7.1 ঐতিহাসিক-পাঠ্যভিত্তিক ধারা (The Historico-Textual School): অতীতের সন্ধানে
- 7.2 নৃতাত্ত্বিক ও সঙ্গীততাত্ত্বিক পালাবদল (The Ethnomusicological and Anthropological Turn): জীবন্ত ঐতিহ্যের খোঁজে
- 7.3 সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন ও উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি (Cultural Studies and Post-Colonial Perspectives): আধুনিকতার সাথে বোঝাপড়া
- 8 শেষ কথা
- 9 তথ্যসূত্র
ভূমিকা
মানুষের গল্প ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়, তা বলা মুশকিল। সভ্যতার প্রথম ঊষালগ্নে হয়তো কোনো আদিম মানুষ প্রথমবার দুটি পাথরের টুকরোকে একসাথে ঠুকে একটি ছন্দের জন্ম দিয়েছিল। অথবা হয়তো শিকার শেষে ক্লান্তি দূর করতে আগুনের পাশে বসে নিচু স্বরে গুনগুন করে গেয়ে উঠেছিল কোনো সুর। সেই সুরের অর্থ কী ছিল, তা আমরা কোনোদিন জানব না। কিন্তু আমরা এটা জানি, ধ্বনি আর ছন্দকে সাজিয়ে তোলার এই প্রবণতা মানুষের মজ্জাগত। সুর আমাদের ভাষার চেয়েও পুরোনো, যুক্তির চেয়েও গভীর। মায়ের গর্ভে শিশুর প্রথম যে ধ্বনিটির সাথে পরিচয় হয়, তা হলো হৃদস্পন্দনের ছন্দ – এক লয়বদ্ধ স্পন্দন। এই স্পন্দনই হয়তো পৃথিবীর আদিমতম সঙ্গীত।
এই সুরের যাত্রা সরলরৈখিক নয়। এর পথে পথে রয়েছে অজস্র বাঁক, দ্বিধা আর গভীর দর্শন। বিশেষ করে যখন সুরের এই আদিম আবেদন কোনো সুসংগঠিত ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার মুখোমুখি হয়, তখন জন্ম নেয় এক জটিল বিতর্কের। ইসলাম ও সঙ্গীতের সম্পর্কটি ঠিক তেমনই এক দীর্ঘ, আকর্ষণীয় এবং অমীমাংসিত উপাখ্যান। চৌদ্দশ বছরের দীর্ঘ এই যাত্রাপথে সঙ্গীতকে কখনও দেখা হয়েছে আত্মার খোরাক, স্বর্গীয় অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে, আবার কখনও একে চিহ্নিত করা হয়েছে আত্মার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁদ, শয়তানের প্রলোভন হিসেবে। একই ধর্মগ্রন্থ, একই ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে একদল পণ্ডিত সুরকে বলেছেন আধ্যাত্মিক আরোহণের সোপান, অন্যদল বলেছেন নৈতিক অধঃপতনের রাজপথ।
এই যে বিশাল এক ধাঁধা, এর উত্তর খোঁজাটাই আমাদের আজকের উদ্দেশ্য। আমরা কোনো বিচারকের আসনে বসব না, কোনো রায় ঘোষণা করব না। আমাদের উদ্দেশ্য কেবল একজন পর্যবেক্ষকের নির্মোহ চোখে পুরো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করা। আমরা ডুব দেব ইতিহাসের অতলে, হাঁটব দর্শনের সূক্ষ্ম পথে, কান পাতব ধর্মতত্ত্বের উত্তপ্ত বিতর্কে আর ঘুরে আসব সংস্কৃতির হাজারো অলিগলি থেকে। এই পরিভ্রমণে আমরা দেখব, কীভাবে সুরের এই প্রশ্নটি ইসলামী সভ্যতাকে বার বার ভাবিয়েছে, আলোড়িত করেছে, বিভক্ত করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সমৃদ্ধও করেছে। চলুন, এই দীর্ঘ এবং সম্ভবত কিছুটা ক্লান্তিকর, কিন্তু নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় যাত্রা শুরু করা যাক।
বিতর্কের উৎস – ধর্মগ্রন্থ ও ঐতিহ্যের নীরব ও সরব বয়ান
যেকোনো বিতর্কের একটি মূল থাকে, একটি উৎসভূমি। ইসলামে সঙ্গীত নিয়ে বিতর্কের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর দুটি প্রধান ফাউন্ডেশনাল টেক্সট বা মূল ভিত্তির কাছে: কুরআন (Quran) এবং হাদিস (Hadith)। অবাক করা ব্যাপার হলো, এই দুই জায়গাতেই বিষয়টি বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, যা পরবর্তীকালের অন্তহীন ব্যাখ্যার দরজা খুলে দিয়েছে।
কুরআনের বয়ান: এক অদ্ভুত নীরবতার জগৎ
আপনি যদি ‘সঙ্গীত’ বা আরবিতে ‘মুসিকা’ (موسيقى – musiqa) শব্দটি আক্ষরিক অর্থে পবিত্র কুরআনে খুঁজতে যান, তাহলে আপনাকে হতাশ হতে হবে। শব্দটি সেখানে নেই। কুরআন সরাসরি সঙ্গীতকে ‘বৈধ’ বা ‘অবৈধ’ – কোনোটাই বলেনি। এই আশ্চর্যজনক নীরবতাই বিতর্কের প্রধান উর্বর ক্ষেত্র। যেখানে স্পষ্ট কোনো নির্দেশ নেই, সেখানে ব্যাখ্যার অবকাশ তৈরি হয়। আর এই অবকাশকে কেন্দ্র করেই শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে দুটি বিপরীতধর্মী চিন্তার সৌধ।
সঙ্গীতকে যারা সন্দেহের চোখে দেখেন বা নিষিদ্ধ মনে করেন, তারা কিছু আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন এবং সেগুলোর প্রতীকী বা পরোক্ষ অর্থ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত আয়াতটি হলো সূরা লুকমানের ৬ নম্বর আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে:
“আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছে যে অর্থহীন কথাবার্তা (lahw al-hadith) ক্রয় করে, যাতে সে অজ্ঞতাবশত মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে এবং আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে। এদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।”
এখানে মূল চাবিকাঠি হলো ‘লাহওয়াল হাদিস’ (لَهْوَ الْحَدِيثِ – lahw al-hadith) – এই আরবি শব্দবন্ধটি। এর আক্ষরিক অর্থ ‘অনর্থক কথাবার্তা’, ‘অসার আলাপ’ বা ‘মন ভোলানো কথা’। সঙ্গীতের কঠোর বিরোধীরা দাবি করেন, এই ‘লাহওয়াল হাদিস’ বলতে গান-বাজনাকেই বোঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যার সমর্থনে তারা ইসলামের প্রাথমিক যুগের কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উদাহরণ দেন। যেমন, নবী মুহাম্মদের অন্যতম সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ শপথ করে বলতেন যে, এই আয়াতে ‘লাহওয়াল হাদিস’ বলতে গান (ghina) বোঝানো হয়েছে। একই ধরনের মতামত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বা জাবির ইবনে আবদুল্লাহর মতো সাহাবীদের থেকেও বর্ণিত হয়েছে বলে দাবি করা হয় (Ibn Kathir, Tafsir al-Qur’an al-Azim)। তাদের যুক্তি হলো, যে কথা বা সুর মানুষকে আল্লাহর স্মরণ বা জীবনের গভীর উদ্দেশ্য থেকে ভুলিয়ে রাখে, তাই ‘লাহওয়াল হাদিস’ এবং তা বর্জনীয়।
কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়। এক বিশাল সংখ্যক পণ্ডিত এই সংকীর্ণ ব্যাখ্যার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, ‘লাহওয়াল হাদিস’ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এর দ্বারা যেকোনো ধরনের মিথ্যা, কুরুচিপূর্ণ, ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যহীন কথাকে বোঝানো হতে পারে যা মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত করে। সেটা হতে পারে গান, অশ্লীল কবিতা, পরনিন্দা, ভিত্তিহীন গল্প, এমনকি নিছক সময় নষ্টকারী আড্ডাও। তাদের যুক্তি হলো, একটি সাধারণ শব্দকে টেনে এনে পুরো একটি শিল্প মাধ্যমকে ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া যৌক্তিক নয়। এই মতের অনুসারীরা বলেন, এখানে মূল বিচার্য বিষয় হলো গানের বিষয়বস্তু (content), তার মাধ্যম (medium) নয়। একটি গান যদি মহৎ বার্তা দেয়, নৈতিকতার কথা বলে বা প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করে, তাহলে তা কীভাবে ‘অনর্থক’ হতে পারে? প্রখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইমাম আল-গাজ্জালি (Imam Al-Ghazali) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইহয়া উলুম আদ-দীন’-এ এই যুক্তিকেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, গানের কথা (আল কালাম বা الكلام) যেমন ভালো বা মন্দ হতে পারে, ঠিক তেমনি সুরের সাথে যুক্ত কথাও ভালো বা মন্দ হতে পারে। বিচার করতে হবে কথার উপর ভিত্তি করে, সুরের উপর নয় (Al-Ghazali, Ihya’ Ulum al-Din)।
আরেকটি আয়াত যা প্রায়শই উদ্ধৃত করা হয়, তা হলো সূরা আল-ইসরা-এর ৬৪ নম্বর আয়াত, যেখানে ঈশ্বর শয়তানকে বলছেন:
“তোর কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারিস উত্তেজিত কর…”
সঙ্গীতবিরোধীরা বলেন, এখানে ‘শয়তানের কণ্ঠ’ (sawt) বলতে গান-বাজনা এবং অনর্থক সুরকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে অন্য ব্যাখ্যাকাররা বলেন, এখানে যেকোনো ধরনের পাপের প্রতি আহ্বান, কুমন্ত্রণা বা প্রলোভনকেই বোঝানো হয়েছে, যা কোনো নির্দিষ্ট শিল্প মাধ্যমের সাথে সীমাবদ্ধ নয় (Shiloah, 1995)।
সুতরাং, কুরআনের পাঠ থেকে যা স্পষ্ট হয় তা হলো, এটি সরাসরি সঙ্গীতের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেয়নি। এর নীরবতা এবং পরোক্ষ আয়াতগুলো দুই পক্ষকেই নিজ নিজ যুক্তির রসদ জুগিয়েছে। এক পক্ষ বলছে, যা সরাসরি নিষিদ্ধ নয়, তা অনুমোদিত, যদি না তা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কাজের দিকে নিয়ে যায়। অন্য পক্ষ বলছে, যা মানুষকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করার সম্ভাবনা রাখে, তাই পরোক্ষভাবে নিষিদ্ধ, এবং সঙ্গীত সেই কাতারে পড়ে। এই মৌলিক মতপার্থক্যই পরবর্তী বিতর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
হাদিসের জগৎ: আরও গভীর ও জটিল বিতর্ক
কুরআনের পর ইসলামী ঐতিহ্যের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হলো হাদিস – নবী মুহাম্মদের কথা, কাজ এবং তার সামনে করা কোনো কাজে তার মৌন সম্মতির বিবরণ। হাদিসের বিশাল জগতে এসে সঙ্গীত নিয়ে বিতর্ক আরও স্পষ্ট, জোরালো এবং জটিল রূপ ধারণ করে। এখানেই আমরা সঙ্গীতের পক্ষে ও বিপক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিলগুলো খুঁজে পাই।
সঙ্গীতের বিপক্ষে দলিল:
সঙ্গীতকে অবৈধ মনে করার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে যে হাদিসটি উপস্থাপন করা হয়, তা সহীহ আল-বুখারিতে সংকলিত হয়েছে। হাদিসটি নিম্নরূপ:
নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই এমন একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা ব্যভিচার (zina), রেশমি বস্ত্র (পুরুষের জন্য), মদ (khamr) এবং বাদ্যযন্ত্রকে (ma’azif) হালাল বা বৈধ মনে করবে।” (Sahih al-Bukhari, 5590)
এই হাদিসে ‘মা’আজিফ’ (مَعَازِف – ma’azif) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আরবি ভাষায় সাধারণত সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র, বিশেষ করে তারের এবং ফুঁ দিয়ে বাজানো যন্ত্রকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই হাদিসের যুক্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এখানে বাদ্যযন্ত্রকে ব্যভিচার এবং মদের মতো সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বিষয়ের সাথে একই কাতারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ফিকাহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্রের অনেক ইমাম, যেমন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের অনুসারীদের একটি বড় অংশ বাদ্যযন্ত্রসহ সঙ্গীতকে হারাম বা নিষিদ্ধ বলে রায় দিয়েছেন।
তবে এখানেও পাল্টা যুক্তি এবং গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে। হাদিসশাস্ত্রের (science of hadith) দৃষ্টিকোণ থেকে, এই হাদিসটির সনদ বা বর্ণনা পরম্পরা (isnad) নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রখ্যাত আন্দালুসীয় জাহিরি মতবাদের পণ্ডিত ইমাম ইবন হাযম (Ibn Hazm) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুহাল্লা’-তে এই হাদিসটির সনদকে বিচ্ছিন্ন বা মুনকাত্বি (منقطع) বা ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ ইমাম বুখারি এবং মূল বর্ণনাকারীর মধ্যে একজন রাবী বা বর্ণনাকারী অনুপস্থিত। ইবন হাযমের মতে, একটি হাদিসের সনদ যদি পুরোপুরি সংযুক্ত (muttasil) না হয়, তবে তার উপর ভিত্তি করে এত বড় একটি বিষয়কে – যা মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ – নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যায় না (Ibn Hazm, Al-Muhalla)। যদিও অধিকাংশ হাদিস বিশারদ ইবন হাযমের এই সমালোচনাকে গ্রহণ করেননি এবং হাদিসটিকে সহীহ বা বিশুদ্ধ বলেই মনে করেন, তবুও এই বিতর্কটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
সঙ্গীতের পক্ষে বা অনুমোদনের পক্ষে দলিল:
অন্যদিকে, এমন অনেক নির্ভরযোগ্য হাদিস রয়েছে যা থেকে সঙ্গীতের – অন্তত কিছু নির্দিষ্ট ধরনের সঙ্গীতের – অনুমোদনের পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়।
- ঈদের দিনের গান: নবীর স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিস, যা বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থেই রয়েছে, এই বিতর্কে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। তিনি বর্ণনা করেন, ঈদের দিনে দুটি আনসার বালিকা তার ঘরে দফ (এক প্রকার একমুখো ড্রাম বা তাম্বুরা) বাজিয়ে বু’আস যুদ্ধের বীরত্বগাথা নিয়ে গান গাইছিল। এসময় নবীর অন্যতম প্রধান সাহাবী আবু বকর (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করেন এবং এই দৃশ্য দেখে বিরক্ত হয়ে বলেন, “রাসূলের ঘরে শয়তানের বাঁশি (mizmar al-shaytan)?” তখন নবী মুহাম্মদ (সাঃ), যিনি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন, মুখ খুলে বলেন, “হে আবু বকর, ওদের গাইতে দাও। প্রত্যেক জাতিরই উৎসবের দিন আছে, আর এটা আমাদের উৎসবের দিন।” (Sahih al-Bukhari, 952; Sahih Muslim, 892)। এই হাদিসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়: (ক) বিশেষ উৎসবের দিনে গান গাওয়া অনুমোদিত। (খ) ‘দফ’-এর মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। (গ) গানের বিষয়বস্তু ছিল বীরত্বগাথা, কোনো অশ্লীলতা নয়। (ঘ) আবু বকরের মতো কঠোর ব্যক্তিত্বের প্রাথমিক আপত্তি সত্ত্বেও নবী নিজে এর অনুমোদন দিয়েছেন।
- বিয়ের অনুষ্ঠানের গান: নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বিয়েতে আনন্দ প্রকাশ এবং বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার জন্য গান গাওয়ার উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি একবার এক আনসার ব্যক্তির বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কোনো গান-বাজনার ব্যবস্থা না দেখে তিনি বলেন, “হে আনসার সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে কি বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই? আনসাররা তো কাব্য ও সঙ্গীত ভালোবাসে।” (Ibn Majah, 1898)। অন্য একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি আয়েশাকে বলেছিলেন, বিয়েতে এমন কাউকে পাঠাতে যে গান গেয়ে বলবে, “আমরা তোমাদের কাছে এসেছি, আমরা তোমাদের কাছে এসেছি…”। এটি প্রমাণ করে, সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে বিয়েতে গান গাওয়া কেবল অনুমোদিতই নয়, বরং উৎসাহিতও ছিল।
- হাবশিদের সামরিক নৃত্য: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ঈদের দিনে কিছু হাবশি (Abyssinian) বর্শা ও ঢাল নিয়ে মসজিদের প্রাঙ্গণে তাদের ঐতিহ্যবাহী সামরিক নৃত্য ও কলাকৌশল প্রদর্শন করছিল। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে আয়েশাকে নিয়ে সেই প্রদর্শনী দেখেছিলেন। (Sahih al-Bukhari, 454)। যদিও এটি সরাসরি গান নয়, তবে এতে ছন্দ, গতি এবং প্রদর্শনীর উপাদান ছিল, যা এক ধরনের পারফর্মিং আর্ট।
এই পরস্পরবিরোধী হাদিসগুলো ইসলামী আইনবিদদের (jurists) মধ্যে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তারা এই হাদিসগুলোকে মেলানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন:
- নিষিদ্ধকরণ মতবাদ (Prohibitionist View): এই মতের অনুসারীরা বলেন, ‘মা’আজিফ’ সম্পর্কিত বুখারির হাদিসটি হলো মূলনীতি। এটি সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রকে নিষিদ্ধ করে। আর যেসব হাদিসে (যেমন ঈদের গান) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমগুলো শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু শর্তের অধীনে প্রযোজ্য: (ক) শুধুমাত্র ‘দফ’ বাজানো যাবে, অন্য কোনো তারের বা ফুঁয়ের যন্ত্র নয়। (খ) শুধুমাত্র নারীরা ও বালিকারা গাইতে পারবে। (গ) শুধুমাত্র বিয়ে বা ঈদের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানে গাওয়া যাবে। (ঘ) গানের কথায় কোনো অনৈতিকতা বা ইসলামবিরোধী বিষয় থাকতে পারবে না। এই শর্তগুলোর বাইরে যেকোনো ধরনের সঙ্গীত নিষিদ্ধ।
- অনুমোদন মতবাদ (Permissivist View): এই মতের অনুসারীরা, যেমন ইবন হাযম, আল-গাজ্জালি এবং আধুনিক অনেক পণ্ডিত, বলেন যে, নিষেধাজ্ঞার হাদিসগুলো হয় দুর্বল, অথবা সেগুলো এমন সঙ্গীতকে নির্দেশ করে যা অনৈতিকতা, মদ বা অন্যান্য পাপ কাজের সাথে যুক্ত। তাদের মতে, অনুমোদনের হাদিসগুলোই হলো মূলনীতি, যা প্রমাণ করে যে ইসলাম সঙ্গীতবিরোধী নয়। মূল বিচার্য বিষয় হলো সঙ্গীতের উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং প্রভাব। যে সঙ্গীত মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করে বা নির্দোষ বিনোদন দেয়, তা অনুমোদিত। আর যে সঙ্গীত কুরুচিপূর্ণ বা অনৈতিক কাজে উৎসাহিত করে, কেবল সেটিই নিষিদ্ধ।
সুতরাং, ধর্মগ্রন্থ ও ঐতিহ্য ঘেঁটে আমরা কোনো একটি সরল সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম না। বরং দেখলাম, বিষয়টি শুরু থেকেই ছিল ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল। আর এই ব্যাখ্যার ভিন্নতাই জন্ম দিয়েছে পরবর্তী হাজার বছরের দর্শন, শিল্পকলা আর সামাজিক রীতিনীতির ভিন্ন ভিন্ন ধারা।
দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের চোখে সঙ্গীত – আত্মার আরোহণ নাকি পতন?
ইসলামের স্বর্ণযুগ (Golden Age) কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা এক জ্ঞানচর্চার ঝলমলে ভোর। যখন ইউরোপ তার ‘অন্ধকার যুগে’ পথ হাতড়াচ্ছিল, তখন বাগদাদ, কর্ডোবা, কায়রো আর সমরখন্দের মতো শহরগুলো ছিল পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক ককপিট। গ্রিক, পারস্য, ভারত আর সিরীয় সভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডারকে আরবি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছিল। এই জ্ঞানসমুদ্র মন্থন করেই উঠে এসেছিলেন আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবন সিনার মতো দার্শনিক এবং আল-গাজ্জালির মতো ধর্মতাত্ত্বিকরা।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে সঙ্গীতকে কেবল বিনোদন বা ধর্মীয় অনুশাসনের বস্তু হিসেবে দেখা হয়নি। দার্শনিকরা একে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের একটি চাবিকাঠি হিসেবে দেখেছিলেন। তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন – সুরের উৎস কী? এটি কীভাবে মানুষের আত্মাকে প্রভাবিত করে? এর সাথে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের সম্পর্ক কী? তাদের চোখে সঙ্গীত ছিল একাধারে গণিত, কসমোলজি, মনোবিজ্ঞান এবং নীতিশাস্ত্র। অন্যদিকে, ধর্মতত্ত্বের ময়দানে চলছিল আরেক লড়াই – সঙ্গীত কি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে স্রষ্টার কাছাকাছি নিয়ে যায়, নাকি তাকে প্রবৃত্তি ও আবেগের দাসে পরিণত করে? এই অধ্যায়ে আমরা সেই দুই ভিন্ন জগতের গভীর ও প্রায়শই সাংঘর্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝার চেষ্টা করব।
আল-কিন্দি: সঙ্গীতের গণিত এবং মহাজাগতিক সুর
নবম শতাব্দীর বাগদাদে ‘আরবদের দার্শনিক’ (Philosopher of the Arabs) নামে খ্যাত আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি (Al-Kindi) ছিলেন এই দার্শনিক ধারার পথিকৃৎ। খলিফা আল-মামুনের ‘বায়ত আল-হিকমাহ’ (House of Wisdom) বা জ্ঞানগৃহের বিশাল পাঠাগারে বসে তিনি গ্রিক দর্শনকে আত্মস্থ করেছিলেন এবং তাকে ইসলামী চিন্তার কাঠামোর সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিলেন। সঙ্গীতের উপর তিনি প্রায় ১৫টি গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে রিসালা ফি খুবর তা’লিফ আল-আলহান (Risala fi khubr ta’lif al-alhan – On the Composition of Melodies) সবচেয়ে বিখ্যাত।
আল-কিন্দির সঙ্গীত দর্শন মূলত নিও-পিথাগোরিয়ান (neo-Pythagorean) চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। পিথাগোরাসের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্বের সবকিছুই সংখ্যা ও গাণিতিক অনুপাতের উপর ভিত্তি করে চলে। তার মতে, সঙ্গীত হলো এই মহাজাগতিক শৃঙ্খলারই শ্রবণযোগ্য রূপ। তিনি দেখান যে, সঙ্গীতের নোট (note), স্কেল (scale) এবং ছন্দের (rhythm) পেছনে সুনির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাত কাজ করে। তিনি ‘উদ’ (Oud) বাদ্যযন্ত্রের চারটি তারকে মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক উপাদানের (মাটি, পানি, বায়ু, আগুন), চারটি ঋতুর এবং মানবদেহের চারটি হিউমার বা রসের (কালো পিত্ত, কফ, রক্ত, হলুদ পিত্ত) সাথে তুলনা করেন। তারের দৈর্ঘ্য, তার কম্পন এবং সৃষ্ট সুরের মধ্যেকার সম্পর্ককে তিনি নির্ভুল গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন (Farmer, 1929)।
তবে আল-কিন্দির সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদান ছিল সঙ্গীতের মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসাগত প্রভাব বা ‘তা’থির’ (تأثير – ta’thir) নিয়ে তার গবেষণা। তিনি নিছক তাত্ত্বিক ছিলেন না, তিনি এই জ্ঞানকে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ব্যবহারের কথা ভেবেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যেহেতু মানবদেহ এবং মহাবিশ্ব একই গাণিতিক নীতির উপর চলে, তাই সঙ্গীতের সুর মানবদেহের ভারসাম্যকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। তিনি গ্যালেনের (Galen) ‘চার হিউমার’ (Four Humors) তত্ত্বের সাথে সঙ্গীতের সংযোগ স্থাপন করেন। তার মতে, নির্দিষ্ট সুর বা মোড (mode) মানবদেহের এই রসগুলোর ভারসাম্যহীনতাকে ঠিক করতে পারে। যেমন, ভারী ও ধীরগতির সুর হয়তো কালো পিত্তের (melancholy) আধিক্য কমাতে পারে, আবার দ্রুত ও চঞ্চল সুর রক্তের (sanguine) প্রভাব বাড়াতে পারে। তিনি পক্ষাঘাত, মানসিক অবসাদ এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যথার চিকিৎসায় নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের নির্দিষ্ট সুর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটি ছিল আজকের মিউজিক থেরাপির (music therapy) এক আদিম কিন্তু অসাধারণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি (Horden, 2000)।
আল-কিন্দির চোখে সঙ্গীত কোনো পাপ বা শয়তানের প্রলোভন ছিল না; বরং তা ছিল মহাবিশ্বের গাণিতিক সৌন্দর্যকে অনুধাবন করার, প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রহস্য উন্মোচন করার এবং মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তার কাছে, একজন সঙ্গীতজ্ঞ কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি একাধারে একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং চিকিৎসক।
আল-ফারাবি: সঙ্গীতের ‘দ্বিতীয় গুরু’
আল-কিন্দির রেখে যাওয়া ভিত্তির উপর যিনি এক বিশাল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সৌধ নির্মাণ করেন, তিনি হলেন আবু নাসর আল-ফারাবি (Al-Farabi)। দর্শনে অ্যারিস্টটলের পর তাকে ‘দ্বিতীয় গুরু’ (Al-Mu’allim al-Thani) হিসেবে সম্মান করা হতো, কারণ তিনিই অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনকে ইসলামী বিশ্বে সবচেয়ে সুসংহতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। সঙ্গীতের উপর তার লেখা ম্যাগনাম ওপাস ‘কিতাব আল-মুসিকা আল-কবির’ (كتاب الموسيقى الكبير – Kitab al-Musiqa al-Kabir বা The Great Book of Music) কেবল ইসলামী সভ্যতার নয়, বরং বিশ্ব সঙ্গীততত্ত্বের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই বিশাল গ্রন্থে আল-ফারাবি সঙ্গীতকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কেবল গ্রিক তত্ত্বের অনুবাদক বা ব্যাখ্যাকার ছিলেন না, বরং তিনি নিজে একজন দক্ষ সঙ্গীতশিল্পী ও উদ্ভাবক ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সঙ্গীতের তত্ত্বকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে এক অভূতপূর্ব বিস্তারিত ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা করেন:
- পদার্থবিদ্যা (Physics of Sound): তিনি শব্দের প্রকৃতি, কম্পন (vibration) এবং বাতাসে এর তরঙ্গায়িত চলাচল নিয়ে আলোচনা করেন, যা আধুনিক অ্যাকোস্টিক্সের (acoustics) ভিত্তি।
- সঙ্গীততত্ত্ব (Music Theory): তিনি সুরের ব্যবধান (intervals), কনসোনেন্স ও ডিসোনেন্স, অক্টেভ (octave) এবং স্কেলের গাণিতিক ভিত্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি গ্রিক টেট্রাকর্ড (tetrachord) পদ্ধতির উন্নতি সাধন করে আরব সঙ্গীতের উপযোগী একটি জটিল টোনাল সিস্টেম (tonal system) তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালের মাকাম পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করে (Wright, 1978)।
- বাদ্যযন্ত্র (Organology): তিনি তার সময়ের প্রায় সকল পরিচিত বাদ্যযন্ত্রের গঠন, তাদের সুর তৈরির পদ্ধতি এবং তাদের ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন।
- ছন্দ (Rhythm): তিনি আরবি কবিতার ছন্দের (arud) সাথে মিলিয়ে সঙ্গীতের ছন্দ বা ‘ইকা’ (iqa’) -এর একটি বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস করেন।
তবে আল-ফারাবির সবচেয়ে গভীর অবদান ছিল সঙ্গীতের নান্দনিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে তার দর্শন। তিনি সঙ্গীতের প্রভাবকে তিনটি ক্রমবর্ধমান স্তরে ভাগ করেন:
- আনন্দের জন্য সঙ্গীত (ladhdha): এটি সঙ্গীতের সবচেয়ে প্রাথমিক স্তর, যা কেবল ইন্দ্রিয়কে তৃপ্তি দেয় এবং মনে এক ধরনের ভাসা ভাসা আনন্দ তৈরি করে।
- আবেগের জন্য সঙ্গীত (infa’al): এটি উচ্চতর স্তর, যেখানে সঙ্গীত মানুষের মনে নির্দিষ্ট আবেগ (যেমন, আনন্দ, দুঃখ, সাহস, সমবেদনা, ক্রোধ) জাগিয়ে তোলে। একজন দক্ষ সুরকার পারেন তার সুরের মাধ্যমে শ্রোতার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
- কল্পনার জন্য সঙ্গীত (takhyil): এটি সঙ্গীতের সর্বোচ্চ স্তর। এই স্তরে সঙ্গীত কেবল আবেগকেই নাড়া দেয় না, বরং মানুষের কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করে এবং তাকে বিভিন্ন চিত্র বা ধারণার জগতে নিয়ে যায়। এটি শ্রোতাকে জাগতিক বাস্তবতা থেকে এক উচ্চতর ভাবনার জগতে পৌঁছে দিতে পারে।
প্লেটোর রিপাবলিক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল-ফারাবি বিশ্বাস করতেন যে, সঙ্গীত একটি শক্তিশালী নৈতিক এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার। তার আদর্শ রাষ্ট্র (al-madina al-fadila) -এর নাগরিকদের নৈতিকভাবে উন্নত করার জন্য তিনি সঠিক ধরনের সঙ্গীতের ব্যবহারের উপর জোর দেন। ভালো সঙ্গীত মানুষের মধ্যে মহৎ গুণাবলী (virtues) যেমন – সাহস, প্রজ্ঞা, সংযম জাগিয়ে তোলে এবং তাকে একজন ভালো নাগরিকে পরিণত করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, মন্দ, উচ্ছৃঙ্খল বা ভারসাম্যহীন সঙ্গীত মানুষের আত্মাকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়। তাই আল-ফারাবির কাছে প্রশ্নটা ‘সঙ্গীত বৈধ কি অবৈধ’ – এই ধর্মীয় বাইনারিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার কাছে মূল প্রশ্ন ছিল: কোন ধরনের সঙ্গীত মানুষের আত্মা ও সমাজের জন্য উপকারী আর কোনটি অপকারী? (Shiloah, 1995)।
ইখওয়ান আল-সাফা এবং ইবন সিনা: আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সংশ্লেষণ
দশম শতাব্দীর বসরায় ‘ইখওয়ান আল-সাফা’ (إخوان الصفا – Brethren of Purity) নামে একটি গুপ্ত দার্শনিক সংঘ ছিল, যারা তাদের ৫১টি পত্র বা রাসাইল (Epistles) এর মাধ্যমে তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখাকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের দর্শন ছিল নিও-পিথাগোরিয়ান এবং নিও-প্ল্যাটোনিক (neo-Platonic) চিন্তার এক মরমি সংশ্লেষণ। তাদের দর্শনে সঙ্গীত একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত।
ইখওয়ান আল-সাফা একধাপ এগিয়ে বলেন, সঙ্গীত হলো আত্মার আসল, ভুলে যাওয়া ভাষা। তাদের মতে, মানবাত্মা তার স্বর্গীয় উৎস বা ‘আত্মার জগৎ’ (‘alam al-arwah) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই জড় জগতে পতিত হয়েছে এবং সে সব সময় তার উৎসের কাছে ফিরে যেতে চায়। সঙ্গীতের সুর সেই স্বর্গীয় জগতের স্মৃতির (dhikr) প্রতিধ্বনি। তাই যখন কোনো সংবেদনশীল আত্মা সঙ্গীতের সুর শোনে, তখন তার সেই আদি বাড়ির স্মৃতি জেগে ওঠে এবং সে এক ধরনের তীব্র আকুলতা বা নস্টালজিয়া অনুভব করে। তারা বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর সঙ্গীত আসলে মহাজাগতিক ঐকতানের (musica universalis) একটি দুর্বল প্রতিধ্বনি মাত্র, যা গ্রহ-নাক্ষত্রের ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট হয়। তাই সঙ্গীতচর্চার মাধ্যমে মানুষ মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্য অনুধাবন করতে পারে এবং নিজের আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটিয়ে সেই স্বর্গীয় উৎসের সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে (Nasr, 1964)।
অন্যদিকে, একাদশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক ইবন সিনা (Avicenna) সঙ্গীতকে আরও বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। আল-ফারাবির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনিও সঙ্গীতকে গণিত ও বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবেই গণ্য করতেন। তার বিখ্যাত বিশ্বকোষ ‘আল-শিফা’ (The Book of Healing)-এর গণিত অংশে তিনি সঙ্গীতের উপর একটি অধ্যায় রচনা করেন। সেখানে তিনি সুরের ব্যবধান (intervals), কনসোনেন্স (consonance) এবং ডিসোনেন্স (dissonance) নিয়ে বিস্তারিত গাণিতিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি শব্দের পদার্থবিদ্যা নিয়েও গবেষণা করেন এবং প্রমাণ করেন যে, শব্দ বাতাসের তরঙ্গের মাধ্যমে বাহিত হয় – এটি ছিল এক যুগান্তকারী ধারণা (Goodman, 2003)।
চিকিৎসক হিসেবে ইবন সিনা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানুন ফি আল-তিব্ব’ (The Canon of Medicine)-এ সঙ্গীতের থেরাপিউটিক ব্যবহারেও আগ্রহী ছিলেন। তিনি মানসিক রোগ, বিশেষ করে বিষণ্ণতা বা মেলানকোলিয়ার (melancholia) চিকিৎসায় সঙ্গীত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সঠিক সুর ও ছন্দ রোগীর মনকে শান্ত করতে পারে এবং তার দেহের হিউমারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। ইবন সিনা ছিলেন সেই সংশ্লেষণের প্রতীক, যেখানে আল-কিন্দির প্রায়োগিক চিকিৎসা ভাবনা এবং আল-ফারাবির গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ একসাথে মিলিত হয়েছিল।
ধর্মতত্ত্বের ময়দানে ভিন্ন সুর: আল-গাজ্জালি বনাম ইবন তাইমিয়া
দার্শনিকদের এই উদারনৈতিক, বৈজ্ঞানিক এবং প্রায়শই অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গির সমান্তরালে ধর্মতাত্ত্বিক (mutakallimun) এবং আইনবিদদের (fuqaha) মধ্যে বিতর্কটি ছিল আরও উত্তপ্ত এবং সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক। এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল শাস্ত্রীয় প্রমাণ এবং নৈতিকতার প্রশ্ন। এই বিতর্কের দুই বিপরীত মেরুতে ছিলেন দুজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যাদের চিন্তাধারা আজও মুসলিম বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে: ইমাম আল-গাজ্জালি এবং তাকি আল-দিন ইবন তাইমিয়া।
ইমাম আল-গাজ্জালি (Imam Al-Ghazali)
একাদশ শতাব্দীর এই প্রভাবশালী চিন্তাবিদকে ‘হজ্জাতুল ইসলাম’ বা ইসলামের প্রমাণ (Proof of Islam) বলা হয়। তিনি তার জীবনের এক পর্যায়ে গভীর আধ্যাত্মিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যান, যেখানে তিনি নিছক যুক্তিনির্ভর দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেন এবং সুফিবাদের মরমি পথে মুক্তি খোঁজেন। এই ব্যক্তিগত যাত্রাই সঙ্গীত বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে এক অসাধারণ গভীরতা ও ভারসাম্য দিয়েছে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইহয়া উলুম আদ-দীন’ (The Revival of the Religious Sciences)-এ আদাব আস-সামাআ ওয়াল-উইজ্জ (‘آداب السماع والوجد’ বা The Etiquette of Listening and Ecstasy বা )আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাসের শিষ্টাচার বা নিয়মাবলি) শীর্ষক অধ্যায়ে তিনি সঙ্গীতকে ঢালাওভাবে হালাল বা হারাম ঘোষণা করেননি। তিনি একদল কঠোরপন্থী ধর্মতত্ত্ববিদ এবং অন্যদল লাগামছাড়া সুফি – উভয়েরই সমালোচনা করেন।
আল-গাজ্জালি একটি সূক্ষ্ম কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে সঙ্গীতের বৈধতা আপেক্ষিক এবং তা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল:
- সময়, স্থান এবং সঙ্গ (Time, Place, and Company): কোথায়, কখন এবং কাদের সাথে গান শোনা হচ্ছে? যদি কোনো অনৈতিক পরিবেশে, যেমন মদের আড্ডা, বা মন্দ লোকদের সাথে গান শোনা হয়, তবে তা বর্জনীয়। কারণ পরিবেশ মানুষের মনকে অনিবার্যভাবে প্রভাবিত করে।
- শ্রোতার অবস্থা (The State of the Listener): এটিই তার বিশ্লেষণের সবচেয়ে বৈপ্লবিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অংশ। তার মতে, সঙ্গীত অনেকটা আয়নার মতো, যা শ্রোতার অন্তরের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। যার হৃদয়ে যা আছে, সঙ্গীত তাকেই তীব্রতর করে। যদি কোনো তরুণের মনে কুপ্রবৃত্তি বা যৌন কামনা সুপ্ত থাকে, তবে প্রেমের গান তার সেই প্রবৃত্তিকে উস্কে দেবে – তার জন্য সঙ্গীত শোনা ক্ষতিকর। কিন্তু যার মন পরিশুদ্ধ এবং স্রষ্টার প্রেমে নিমগ্ন, তার জন্য একই প্রেমের গান রূপক অর্থে স্রষ্টার প্রতি তার ভালোবাসাকে আরও গভীর করবে এবং তাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে দেবে।
- গানের বিষয়বস্তু (The Content of the Song): গানের কথায় কী বলা হচ্ছে? যদি অশ্লীলতা, মদের প্রশংসা, অনৈতিকতার বর্ণনা বা ইসলামবিরোধী কথা থাকে, তবে সে গান নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ।
- বাদ্যযন্ত্র (Musical Instruments): আল-গাজ্জালি বাদ্যযন্ত্রের বিষয়ে কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন। তিনি দফ, বাঁশি এবং কিছু ড্রামের অনুমোদন দিয়েছেন, কিন্তু সেই সময়ের রাজদরবারের বিলাসী সঙ্গীতের সাথে সম্পর্কিত তার বা মদের সাথে সম্পর্কিত যন্ত্রগুলোকে (যেমন, kiran, barbat) তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন, কারণ সেগুলো অনৈতিক পরিবেশের সাথে যুক্ত ছিল।
আল-গাজ্জালির এই বিশ্লেষণ অত্যন্ত আধুনিক। তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমকে নয়, বরং এর ব্যবহার, উদ্দেশ্য ও প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এই মধ্যপন্থী অবস্থান বহু শতাব্দী ধরে বহু মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে সুফিদের মধ্যে, সঙ্গীতের গ্রহণযোগ্যতার প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে (Al-Ghazali, Ihya’ Ulum al-Din)।
ইবন তাইমিয়া (Ibn Taymiyyah)
ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই কঠোরপন্থী, আপসহীন এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী পণ্ডিত ছিলেন আল-গাজ্জালির সম্পূর্ণ বিপরীত। মঙ্গোল আক্রমণের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইবন তাইমিয়া ইসলামের ‘বিশুদ্ধ’ রূপে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, মুসলিমদের দুর্বলতার কারণ হলো তারা কুরআন ও সুন্নাহর সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে দর্শন, মরমিবাদ এবং বিভিন্ন ‘বিদআত’ (religious innovation)-এর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। সঙ্গীত ছিল তার আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তার মতে, বাদ্যযন্ত্রসহ যেকোনো ধরনের সঙ্গীত কঠোরভাবে হারাম। তার যুক্তিগুলো ছিল অত্যন্ত সুসংহত এবং শক্তিশালী:
- শাস্ত্রীয় প্রমাণের আক্ষরিক ব্যাখ্যা: তিনি ‘মা’আজিফ’ সম্পর্কিত বুখারির হাদিসকে কোনো ধরনের রূপক বা আপস ছাড়াই গ্রহণ করেছেন। তার মতে, এটি সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রকে দ্ব্যর্থহীনভাবে নিষিদ্ধ করে। ঈদের দিনের গানের মতো ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলোকে তিনি অত্যন্ত সীমিত শর্তের মধ্যে আবদ্ধ করেছেন।
- বিদআত এবং অমুসলিমদের অনুকরণ: তিনি, বিশেষ করে সুফিদের ‘সামা’ বা সঙ্গীতানুষ্ঠানকে একটি নিন্দনীয় বিদআত বলে মনে করতেন। তার মতে, সাহাবী বা ইসলামের প্রথম প্রজন্মের মধ্যে এ ধরনের অনুশীলন ছিল না। এটি খ্রিষ্টানদের উপাসনার অনুকরণ।
- আধ্যাত্মিক মাদকতা: ইবন তাইমিয়ার মতে, সঙ্গীত মানুষের আবেগকে এমনভাবে নাড়া দেয় যা এক ধরনের আধ্যাত্মিক মাদকতা বা উন্মাদনা (sukr) তৈরি করে। এই মাদকতা মানুষকে আল্লাহর স্থির, জ্ঞানভিত্তিক স্মরণ (dhikr) থেকে গাফেল করে দেয়। তার মতে, কুরআন তিলাওয়াতই হলো আত্মার একমাত্র সত্যিকারের খোরাক, যা আত্মাকে শান্ত, স্থির এবং জ্ঞানী করে তোলে। সঙ্গীত হলো একটি নকল খোরাক বা “শয়তানের কুরআন” (Qur’an al-Shaytan), যা আত্মাকে বিভ্রান্ত করে এবং সাময়িক আবেগের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
- দার্শনিকদের প্রত্যাখ্যান: তিনি আল-ফারাবি বা ইবন সিনার মতো দার্শনিকদের সঙ্গীত সম্পর্কিত তত্ত্বকে গ্রিকদের থেকে ধার করা ইসলামবিরোধী, পৌত্তলিক ধারণা বলে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, মহাজাগতিক সুর বা সঙ্গীতের মাধ্যমে চিকিৎসার ধারণা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক।
ইবন তাইমিয়ার এই কঠোর অবস্থান পরবর্তীকালে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের মাধ্যমে সৌদি আরবে ওয়াহাবি মতবাদের ভিত্তি স্থাপন করে এবং আধুনিক যুগে অনেক সালাফি ধারার অনুসারীদের দ্বারা গৃহীত হয়েছে, যা আজও সঙ্গীত নিয়ে বিতর্কে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সোচ্চার ধারা (Laoust, 1971; Michot, 2006)।
এই দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক থেকে একটা বিষয় কাচের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়: ইসলামে সঙ্গীতের স্থান নিয়ে কোনো একক, সর্বজনস্বীকৃত মত নেই। এটি একটি চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। একদিকে রয়েছে যুক্তি, দর্শন, বিজ্ঞান ও শিল্পের স্বাধীনতার পতাকা, যা সঙ্গীতকে দেখে মহাবিশ্বের এক সুরেলা প্রকাশ হিসেবে। অন্যদিকে রয়েছে কঠোর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা, নৈতিক পবিত্রতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন, যা সঙ্গীতকে দেখে আত্মার জন্য এক বিপজ্জনক প্রলোভন হিসেবে। এই দুই চিন্তার টানাপোড়েনই ইসলামী সভ্যতায় সঙ্গীতের যাত্রাকে এত জটিল, এত আকর্ষণীয় এবং এত জীবন্ত করে রেখেছে।
প্রয়োগের ভুবন – সুফিবাদ ও রাজদরবারের সঙ্গীত
তত্ত্ব আর বিতর্কের শুষ্ক জগৎ থেকে বেরিয়ে আমরা যদি ইতিহাসের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রঙিন চিত্র দেখতে পাই। মানুষের জীবন তো কেবল আইন আর দর্শনের ছকে চলে না। তার আনন্দ-বেদনা, উৎসব-আরাধনা প্রকাশের জন্য নিজস্ব পথ খুঁজে নেয়। মুসলিম বিশ্বজুড়ে সঙ্গীত কেবল টিকে থাকেনি, বরং কখনও কখনও চরম উৎকর্ষও লাভ করেছে। ধর্মতাত্ত্বিকদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর দার্শনিকদের সূক্ষ্ম তত্ত্ব – এই দুইয়ের সমান্তরালে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে শুরু করে অভিজাতদের আসর পর্যন্ত সুরের এক ফল্গুধারা বয়ে গেছে।
এই বিকাশ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দুটি ভিন্ন জগতে দেখা যায়, যাদের উদ্দেশ্য ও মেজাজ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি হলো সুফিদের খানকাহ (hospice) বা দরগাহ (shrine) – যেখানে সঙ্গীত ছিল আত্মার খোরাক, আধ্যাত্মিক আরোহণের সোপান। অন্যটি হলো রাজা-বাদশাহদের জাঁকজমকপূর্ণ দরবার – যেখানে সঙ্গীত ছিল ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, বিলাসিতা ও সংস্কৃতির প্রতীক। খানকাহ ছিল আত্মার গবেষণাগার, আর দরবার ছিল শিল্পের প্রদর্শনী। এই দুই ভিন্ন ধারার মাধ্যমেই ইসলামী সভ্যতার সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য তার সবচেয়ে সমৃদ্ধ রূপটি খুঁজে পেয়েছিল।
সুফিবাদ ও সামা: আত্মার মুক্তির সুর
ইসলামের মরমি বা আধ্যাত্মিক ধারা হলো সুফিবাদ (Sufism)। সুফিদের মূল লক্ষ্য হলো শাস্ত্রের অক্ষর ছাড়িয়ে এর ভেতরের অন্তর্নিহিত প্রেম ও সত্যকে উপলব্ধি করা। তাদের পথ যুক্তির চেয়ে বেশি অনুভবের, জ্ঞানের চেয়ে বেশি আস্বাদনের (dhawq)। তাহলে সুফিরা কেন এমন একটি বিতর্কিত মাধ্যম, সঙ্গীতকে তাদের সাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিলেন? এর উত্তর নিহিত আছে তাদের দর্শনের গভীরে।
সুফিদের মতে, মানবাত্মা এক স্বর্গীয় সুরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই পৃথিবীতে এসেছে। প্লেটোর দর্শনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এই ধারণায়, আত্মা তার আদি উৎসের জন্য এক তীব্র বিরহ বা আকুলতা অনুভব করে। সঙ্গীতের সুর, বিশেষ করে যখন তা প্রেমময় কবিতার সাথে মিলিত হয়, তখন তা আত্মার সেই ভুলে যাওয়া স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। এই স্মৃতি তাকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা বা ভাবে বিভোর করে তোলে, যাকে বলা হয় ‘ওয়াজদ’ (وجد – wajd বা ecstasy)। এই ‘ওয়াজদ’ অবস্থায় সুফি সাধক জাগতিক সবকিছু ভুলে গিয়ে স্রষ্টার প্রেমে লীন হয়ে যান। তাদের কাছে সঙ্গীত কোনো বিনোদন নয়, এটি একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক প্রযুক্তি, একটি ধ্যান। এই সঙ্গীতানুষ্ঠানকে বলা হয় ‘সামা’ (سماع – Sama), যার আক্ষরিক অর্থ ‘শোনা’ – তবে এ শোনা কেবল কান দিয়ে শোনা নয়, এ হলো আত্মা দিয়ে শোনা।
‘সামা’ কোনো অনিয়ন্ত্রিত আবেগ বা উচ্ছৃঙ্খল নাচ-গান নয়। এটি অত্যন্ত সুগঠিত একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা একজন অভিজ্ঞ আধ্যাত্মিক গুরু বা শায়খের (Shaykh) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। শায়খ নির্ধারণ করেন কখন সামা শুরু হবে, কোন কবিতা বা সুর পরিবেশন করা হবে এবং অংশগ্রহণকারীদের আধ্যাত্মিক অবস্থা (hal) পর্যবেক্ষণ করে পুরো অনুষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে এটি নিছক আবেগের প্রদর্শনীতে পরিণত না হয়ে সত্যিকারের আধ্যাত্মিক যাত্রায় রূপান্তরিত হয় (Ernst, 2003)।
জালালউদ্দিন রুমি ও মৌলভি তরিকা: মহাজাগতিক ঘূর্ণন
এই ধারার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং কাব্যিক উদাহরণ হলো ত্রয়োদশ শতাব্দীর পারস্যের কবি ও দার্শনিক জালালউদ্দিন রুমি (Jalaluddin Rumi) এবং তার প্রতিষ্ঠিত মৌলভি (Mevlevi) তরিকা। রুমির জীবন পাল্টে গিয়েছিল শামস-ই তাবরিজি নামের এক রহস্যময় দরবেশের সাথে তার সাক্ষাতের পর। এই তীব্র বন্ধুত্ব ও আধ্যাত্মিক প্রেমই রুমির ভেতর থেকে বের করে এনেছিল তার অমর কাব্যগ্রন্থ মসনবী এবং দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি। শামসের অন্তর্ধানের পর যে তীব্র বিরহ রুমিকে গ্রাস করেছিল, তা থেকে মুক্তি পেতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন সঙ্গীত, কবিতা এবং নৃত্যের মধ্যে।
মৌলভি দরবেশদের ঘূর্ণায়মান নৃত্য (whirling dervish) কোনো সাধারণ নাচ নয়, এটি মূলত এক ধরনের চলমান ধ্যান (meditation in motion) এবং মহাজাগতিক প্রতীকী রূপ। এর প্রতিটি ভঙ্গির গভীর অর্থ রয়েছে। দরবেশের মাথার লম্বা উটের লোমের টুপি (sikke) হলো তার অহং বা ‘নফস’-এর সমাধিলিপি (tombstone)। তার সাদা লম্বা পোশাক (tennure) হলো তার অহং-এর কাফন (shroud)। নৃত্য শুরুর আগে গায়ে থাকা কালো আলখাল্লাটি খুলে ফেলা হয়, যা জাগতিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আধ্যাত্মিক সত্যের জগতে পুনর্জন্মের প্রতীক।
ডান হাত আকাশের দিকে এবং বাম হাত মাটির দিকে রেখে দরবেশরা যখন সঙ্গীতের ছন্দে ঘুরতে থাকেন, তখন তারা প্রতীকীভাবে স্বর্গ থেকে ঐশ্বরিক করুণা বা জ্ঞান গ্রহণ করে তা পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তারা নিজেদের অক্ষের উপর ঘোরার মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুর ঘূর্ণনকে এবং গ্রহ-নক্ষত্রের পরিক্রমাকে নিজেদের শরীরে ধারণ করেন। এই নৃত্যের সাথে থাকে ‘নে’ (Ney) বা বাঁশের বাঁশির করুণ সুর। রুমির মসনবী-র প্রথম ১৮টি পঙক্তিই এই ‘নে’ বাঁশিকে নিয়ে লেখা, যা তার মূল উৎস অর্থাৎ বাঁশবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরহের সুরে কাঁদছে – ঠিক যেমন মানবাত্মা তার স্বর্গীয় উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরহে কাতর (Lewis, 2007)।
চিশতিয়া তরিকা ও কাওয়ালি: প্রেমের শক্তিশালী প্রকাশ
ভারতীয় উপমহাদেশে সঙ্গীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার চর্চায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চিশতিয়া (Chishti) তরিকা। খাজা মইনুদ্দিন চিশতির হাত ধরে এই ধারার সূচনা হলেও, ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিল্লির মহান কবি, সঙ্গীতজ্ঞ এবং নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য আমির খসরুর (Amir Khusrau) হাতে এটি এক নতুন এবং শক্তিশালী শিল্প মাধ্যমে রূপান্তরিত হয় – ‘কাওয়ালি’ (Qawwali)। আমির খসরু পারস্যের সঙ্গীত ঐতিহ্যকে ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের সাথে মিলিয়ে এক নতুন ধারার জন্ম দেন, যা আজও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক সঙ্গীত।
কাওয়ালি হলো এক ধরনের সম্মেলক সঙ্গীত, যেখানে একজন প্রধান গায়ক (mohri) এবং একদল সহশিল্পী (hamnawa) থাকেন। হারমোনিয়াম (যা পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছে), তবলা এবং জোরালো হাততালির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান ছন্দময় আবহ তৈরি করা হয়। কাওয়ালির পরিবেশনা একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে। এটি ধীরগতিতে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এর গতি ও আবেগ বাড়তে থাকে। গায়করা কবিতার একটি পঙক্তিকে বার বার পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে (takrar) একটি সম্মোহনী পরিবেশ তৈরি করেন। এর উদ্দেশ্য হলো শিল্পী ও শ্রোতা উভয়ের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক ভাব বা ‘হাল’ (hal) তৈরি করা, যা তাদের ধীরে ধীরে ‘ওয়াজদ’-এর দিকে নিয়ে যায় (Qureshi, 1995)। কাওয়ালির বিষয়বস্তু হলো স্রষ্টা, নবী মুহাম্মদ এবং সুফি সাধকদের প্রতি তীব্র প্রেম (ishq), ভক্তি ও সমর্পণ। আজও আজমীর বা দিল্লির নিজামউদ্দিনের দরগায় কাওয়ালি এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষকে আকর্ষণ করে।
তবে মজার ব্যাপার হলো, সব সুফি তরিকা ‘সামা’-কে গ্রহণ করেনি। যেমন, মধ্য এশিয়ার নকশবন্দি (Naqshbandi) তরিকার মতো কিছু অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারা সঙ্গীতকে আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য ক্ষতিকর এবং মনকে বিক্ষিপ্তকারী বলে মনে করে। তারা নীরব ধ্যান বা ‘জিকরে খফি’ (silent remembrance)-এর উপর জোর দেয়, কারণ তাদের মতে, উচ্চকিত সঙ্গীত মানুষের অহং এবং লোক দেখানো ভক্তিকে (riya) উস্কে দিতে পারে। সুতরাং, খোদ সুফিদের জগতেও সঙ্গীত নিয়ে বিতর্কটি অমীমাংসিতই থেকে গেছে, যা এই বিষয়ের গভীর জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
রাজদরবারের ঐতিহ্য: ক্ষমতা, বিলাসিতা ও শিল্পের মেলবন্ধন
ধর্মীয় বিতর্কের উত্তাপ এবং সুফিদের আধ্যাত্মিক আর্তি থেকে বহু দূরে, মুসলিম বিশ্বের রাজদরবারগুলো ছিল সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক এবং বিকাশের কেন্দ্র। উমাইয়া খলিফাদের দামেস্ক থেকে শুরু করে আব্বাসীয়দের বাগদাদ, ফাতেমিদের কায়রো, আন্দালুসের কর্ডোবা, উসমানীয়দের ইস্তাম্বুল এবং মুঘলদের দিল্লি – সবখানেই সঙ্গীত ও সঙ্গীতশিল্পীরা রাজকীয় মর্যাদা এবং অঢেল পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছেন। দরবারের সঙ্গীত ছিল পরিশীলিত (refined), অভিজাত এবং প্রায়শই ধর্মনিরপেক্ষ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসকের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির উচ্চতাকে প্রদর্শন করা এবং দরবারের সভাসদদের পরিশীলিত বিনোদন প্রদান করা।
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ: সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ
বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাদের দরবার, বিশেষ করে হারুন আল-রশিদ (Harun al-Rashid) এবং আল-মামুনের (Al-Ma’mun) দরবার ছিল সঙ্গীত, কাব্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক ঝলমলে কেন্দ্র। দশম শতাব্দীর আবু আল-ফারাজ আল-ইসফাহানির (Abu al-Faraj al-Isfahani) লেখা কিতাব আল-আঘানি (Kitab al-Aghani – The Book of Songs) নামক বিশাল গ্রন্থটি সেই সময়ের সাঙ্গীতিক জীবনের এক জীবন্ত দলিল। এই গ্রন্থে হাজার হাজার গান, কবিতা এবং সঙ্গীতশিল্পীদের জীবনী সংকলিত হয়েছে (Kilpatrick, 2003)।
ইব্রাহিম আল-মাওসিলি, তার পুত্র ইসহাক আল-মাওসিলি এবং তাদের কিংবদন্তী শিষ্য জিরিয়াব (Ziryab) ছিলেন সে যুগের মহাতারকা। এই সঙ্গীতশিল্পীরা কেবল গায়ক বা বাদক ছিলেন না, তারা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী এবং দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তারা সঙ্গীতের তত্ত্ব, কবিতা, ইতিহাস এবং শিষ্টাচারের উপর পণ্ডিত ছিলেন। তাদের সঙ্গীত ছিল অভিজাত, পরিশীলিত এবং জটিল। এছাড়া, দরবারে ‘কাইনাত’ (qaynat) বা প্রশিক্ষিত গায়িকাদের একটি বিশেষ স্থান ছিল, যারা সঙ্গীত ও কাব্যের পাশাপাশি নানা শিল্পকলায় পারদর্শী ছিলেন।
আন্দালুসিয়া ও জিরিয়াব: সংস্কৃতির স্থপতি
আব্বাসীয় দরবারের সঙ্গীত ঐতিহ্য তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনে। বাগদাদ থেকে নির্বাসিত হয়ে জিরিয়াব যখন কর্ডোবায় খলিফা দ্বিতীয় আবদ আল-রহমানের দরবারে আশ্রয় নেন, তখন তিনি সেখানে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটান। তিনি কর্ডোবায় বিশ্বের প্রথম সঙ্গীত কনজারভেটরিগুলোর একটি স্থাপন করেন এবং সঙ্গীত শিক্ষাকে একটি সুসংহত রূপ দেন। তিনিই ‘উদ’ (oud) বাদ্যযন্ত্রে পঞ্চম তারটি যোগ করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে, যা যন্ত্রটির সুরের পরিসরকে বাড়িয়ে দেয়।
জিরিয়াব কেবল সঙ্গীতজ্ঞই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ফ্যাশন আইকন এবং লাইফস্টাইল গুরু। তিনিই স্পেনে ঋতু অনুযায়ী পোশাক পরার রীতি, নির্দিষ্ট ধরনের চুলের ছাঁট এবং এমনকি অ্যাস্পারাগাস খাওয়ার প্রচলন করেন। তিনি খাবারের মেনুকে স্যুপ, মূল ডিশ এবং ডেজার্ট – এই তিন ভাগে ভাগ করার রীতিও চালু করেন, যা আজও বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। জিরিয়াব প্রমাণ করেন যে সঙ্গীত কেবল একটি বিচ্ছিন্ন শিল্প নয়, এটি একটি সামগ্রিক পরিশীলিত জীবনযাত্রার অংশ (Farmer, 1929)। তার প্রতিষ্ঠিত আন্দালুসীয় সঙ্গীত বা ‘নূবা’ (Nuba) আজও মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ায় এক সমৃদ্ধ ধ্রুপদী সঙ্গীত হিসেবে টিকে আছে।
উসমানীয় ও মুঘল সাম্রাজ্য: সাম্রাজ্যের সুর
পরবর্তীকালের দুটি বিশাল সাম্রাজ্য – উসমানীয় ও মুঘল – দরবারী সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
- উসমানীয় দরবার: ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদে (Topkapi Palace) উসমানীয় সুলতানরা একটি অত্যন্ত বিকশিত ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারা বা ‘মাকাম’ (Makam) সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। প্রাসাদের ভেতর ‘এন্দেরুন’ (Enderun) নামক একটি বিশেষ স্কুল ছিল, যেখানে সাম্রাজ্যের সেরা সঙ্গীতজ্ঞ, শিল্পী এবং প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এর পাশাপাশি ছিল বিখ্যাত ‘মেহতার’ (Mehter) বা মিলিটারি ব্যান্ড। বিশাল ড্রাম (davul), করতাল, এবং তীক্ষ্ণ সুরের ‘জুরনা’ (zurna) নামক সানাই জাতীয় যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত এই ব্যান্ডের সঙ্গীত ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। যুদ্ধের ময়দানে এটি সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করত এবং শত্রুদের মনে ভয় জাগাত। ইউরোপীয়রা এই সঙ্গীতের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিল যে, আঠারো শতকে মোজার্ট এবং বিথোভেনের মতো সুরকাররাও তাদের কম্পোজিশনে ‘তুর্কি স্টাইল’ (Alla Turca) অনুকরণ করেন (Feldman, 2016)।
- মুঘল দরবার: মুঘল ভারতে সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহান ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের মহান পৃষ্ঠপোষক। সম্রাট আকবরের দরবারে মিয়াঁ তানসেনের মতো সঙ্গীতজ্ঞরা ‘নবরত্ন’-এর মর্যাদা পেয়েছিলেন। মুঘল দরবারে ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের সাথে পারস্যের সঙ্গীত পদ্ধতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে, যা থেকে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের (Hindustani Classical Music) বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। খেয়াল, ধ্রুপদ, ঠুমরির মতো সঙ্গীতের ধারাগুলো মুঘলদের পৃষ্ঠপোষকতায় চরম উৎকর্ষ লাভ করে (Wade, 1998)। তবে মুঘল দরবারেই এই বিতর্কের নাটকীয় রূপটিও দেখা যায়। সম্রাট আওরঙ্গজেব, যিনি ছিলেন একজন কঠোর সুন্নি মুসলিম, তার শাসনামলের শেষের দিকে দরবারে সঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে দিল্লির সঙ্গীতশিল্পীরা একটি প্রতীকী ‘সঙ্গীতের জানাজা’ বের করেন। আওরঙ্গজেব এই খবর পেয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “তাকে এত গভীরে কবর দিও যেন তার কণ্ঠ আর কখনও শোনা না যায়।” এই ঘটনাটি দরবারের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যেকার চিরন্তন দ্বন্দ্বকে মূর্ত করে তোলে।
রাজদরবারের এই সঙ্গীত প্রায়শই ধর্মতাত্ত্বিকদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ত। তারা অভিযোগ করতেন যে, এই সঙ্গীত বিলাসিতা, মদ এবং অনৈতিক প্রেমের কবিতার সাথে যুক্ত, যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়। কিন্তু শাসকরা প্রায়শই এই সমালোচনাকে উপেক্ষা করতেন। কারণ সঙ্গীত ছিল তাদের ক্ষমতা, সংস্কৃতি এবং আভিজাত্যের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা অনেক সময় ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খানকাহ এবং দরবার – এই দুই ভিন্ন জগৎ তাদের নিজস্ব উপায়ে ইসলামী সভ্যতার সাঙ্গীতিক মানচিত্রকে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছিল।
সুরের ব্যাকরণ থেকে আধুনিক বিদ্রোহ – ইসলামী সঙ্গীতের তত্ত্ব ও রূপান্তর
এতক্ষণের আলোচনায় আমরা দেখেছি ইসলামে সঙ্গীত নিয়ে বিতর্ক কতটা গভীর এবং বহুমুখী। কিন্তু বিতর্কের সমান্তরালেই আরব, পারস্য, তুরস্ক থেকে শুরু করে ভারতবর্ষ পর্যন্ত এক বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সঙ্গীতের এক সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র জগৎ। এই সঙ্গীতের নিজস্ব একটি ব্যাকরণ আছে, নিজস্ব নান্দনিকতা আছে, যা তাকে পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীত বা অন্য যেকোনো সঙ্গীত ঐতিহ্য থেকে আলাদা করে তোলে। আবার, উনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া বিশ্বায়ন, ঔপনিবেশিকতা এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লব এই ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণকে এক নতুন এবং জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা প্রথমে ইসলামী সঙ্গীততত্ত্বের মৌলিক উপাদানগুলো বোঝার চেষ্টা করব এবং তারপর দেখব আধুনিক যুগে এসে সেই তত্ত্ব ও প্রয়োগ কীভাবে রূপান্তরিত ও সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।
ইসলামী সঙ্গীততত্ত্বের উপাদান – সুরের নিজস্ব ব্যাকরণ
ইসলামী বিশ্বে যে সঙ্গীতের ধারাগুলো বিকশিত হয়েছিল, তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি মূলত মেলোডিক (melodic) এবং রিদমিক (rhythmic)। পশ্চিমা সঙ্গীতের মতো একাধিক সুরের যুগপৎ হারমোনি (harmony)-এর উপর এর ভিত্তি নয়। এর সৌন্দর্য নিহিত একটি একক সুররেখাকে (monophony) বিভিন্ন অলঙ্করণ, সূক্ষ্ম কারুকার্য, ইম্প্রোভাইজেশন এবং জটিল ছন্দের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার মধ্যে। এর প্রধান উপাদানগুলো হলো মাকাম, ইকা এবং বাদ্যযন্ত্রের বিশেষ ব্যবহার।
মাকাম ও সুরের কাঠামো (Maqam and Modal Structure): আত্মার মানচিত্র
পশ্চিমা সঙ্গীতে যেমন মেজর বা মাইনর স্কেল (scale) বা কী (key) একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, ইসলামী বিশ্বের সঙ্গীতে তেমনটাই হলো ‘মাকাম’ (مقام – Maqam)। এটি তুরস্ক ও বলকানে ‘মাকাম’ (Makam), ইরানে ‘দস্তগাহ’ (Dastgah), আজারবাইজানে ‘মুঘাম’ (Mugham) এবং উত্তর আফ্রিকায় ‘তব’ (Tab) নামে পরিচিত। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘রাগ’-এর সাথে এর ধারণাগত মিল থাকলেও, গঠন ও পরিবেশনে এটি স্বতন্ত্র।
কিন্তু মাকাম কেবল সাত বা আটটি স্বরের একটি আরোহী-অবরোহী কাঠামো নয়। এর ধারণাটি আরও অনেক ব্যাপক এবং গভীর। প্রতিটি মাকামের নিজস্ব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব থাকে:
- স্বরের বিন্যাস ও মাইক্রোটোনালিটি (Scale and Microtonality): প্রতিটি মাকামের একটি নির্দিষ্ট স্বর কাঠামো আছে, যেখানে কিছু স্বর অন্যগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ (tonic, dominant, leading tone ইত্যাদি)। তবে পশ্চিমা সঙ্গীতের ১২টি সমান দূরত্বের সেমিটোনের (semitone) পরিবর্তে, আরব ও তুর্কি সঙ্গীতে একটি অক্টেভকে ২৪টি কোয়ার্টার-টোনে (quarter-tone) ভাগ করা হয়। এই সূক্ষ্ম স্বর বা মাইক্রোটোন (microtone) মাকামগুলোকে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং আবেগ প্রকাশের গভীরতা দেয়, যা পিয়ানোর মতো সমান-টেম্পারামেন্টের যন্ত্রে বাজানো প্রায় অসম্ভব।
- মেলোডিক পথ বা সায়ের (Melodic Path or Sayr): মাকাম কেবল স্বরের সমষ্টি নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট মেলোডিক পথ বা যাত্রাপথ (sayr)। শিল্পী যখন একটি মাকাম পরিবেশন করেন, তখন তিনি কেবল স্কেলের নোটগুলোই বাজান না, বরং তিনি একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করেন – কোন স্বরে শুরু করতে হবে, কোন স্বরে বেশি সময় থাকতে হবে, কোন স্বর এড়িয়ে যেতে হবে এবং কীভাবে শেষ করতে হবে, তার একটি অলিখিত নিয়ম থাকে।
- মেলোডিক ফ্রেজ (Melodic Phrase): প্রতিটি মাকামের কিছু নিজস্ব পরিচিত সুরের অংশ বা চলন থাকে, যা শিল্পী তার ইম্প্রোভাইজেশনের (improvisation) বা ‘তাকসিম’ (taqsim) এর সময় ব্যবহার করেন। এই চলনগুলোই মাকামটিকে তার স্বতন্ত্র চরিত্র দেয় এবং শ্রোতাকে চিনতে সাহায্য করে।
- মেজাজ বা ভাব (Ethos/Mood): এটিই মাকামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন গ্রিক ধারণার মতো, প্রতিটি মাকাম একটি নির্দিষ্ট আবেগ বা ভাবের সাথে যুক্ত। যেমন, আরবি সঙ্গীতে মাকাম ‘সাবা’ (Saba) গভীর বিষাদ এবং আধ্যাত্মিক আর্তি প্রকাশ করে। মাকাম ‘রাসত’ (Rast), যার অর্থ ‘সঠিক’, প্রকাশ করে সাহস, শক্তি ও আনন্দ, এবং একে ‘মাকামদের পিতা’ বলা হয়। মাকাম ‘হিজাজ’ (Hijaz) এক ধরনের মরুভূমির বিষণ্ণতা বা দূরত্বের অনুভূতি জাগায়। শিল্পী যখন একটি মাকাম পরিবেশন করেন, তখন তার মূল লক্ষ্য থাকে সেই মাকামের ভেতরের আবেগ ও চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা এবং শ্রোতার মনে সেই ভাবটি সঞ্চার করা। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং আধ্যাত্মিক একটি শিল্প (Touma, 1996; Marcus, 2007)।
ইকা’ ও ছন্দের জগৎ (Iqa’ and Rhythmic Cycles): সময়ের আবর্তন
ইসলামী সঙ্গীতের আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এর জটিল এবং বৈচিত্র্যময় ছন্দ-কাঠামো, যা আরবিতে ‘ইকা’ (إيقاع – Iqa’) এবং তুর্কি ও ফারসিতে ‘উসুল’ (Usul) নামে পরিচিত। পশ্চিমা সঙ্গীতের মতো ৪/৪ বা ৩/৪-এর মতো সরল এবং পুনরাবৃত্তিমূলক তালের পরিবর্তে, আরবি, তুর্কি ও পারস্যের সঙ্গীতে ৫, ৭, ৯, ১০, ১৩, ১৭ বা তার চেয়েও জটিল এবং অপ্রতিসম (asymmetrical) মাত্রার ছন্দ-চক্র ব্যবহৃত হয়।
এই ছন্দগুলো কেবল গাণিতিক বিন্যাস নয়, এদেরও নিজস্ব নাম, চরিত্র এবং প্যাটার্ন আছে। প্রতিটি ইকা’র মধ্যে ‘দুম’ (dumm – নিচু ও ভারী শব্দ) এবং ‘তাক’ (takk – উঁচু ও হালকা শব্দ) এর একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস থাকে, যা একটি ছন্দ-চক্রকে পূর্ণ করে। যেমন, ‘সামাই’ (Samai) একটি ১০ মাত্রার ছন্দ (৩+২+২+৩), যা ধ্রুপদী সঙ্গীতের একটি জনপ্রিয় ফর্ম। আবার ‘জুরজুনা’ (Jurjuna) একটি ১৩ মাত্রার ছন্দ। এই জটিল ছন্দগুলো সঙ্গীতকে এক ধরনের গতিময়তা এবং গভীরতা দেয় এবং শ্রোতাকে এক সম্মোহনী ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়, যা সরল ছন্দে পাওয়া কঠিন।
বাদ্যযন্ত্র ও ধ্বনির বৈচিত্র্য (Instruments and Timbre)
ইসলামী বিশ্বের বাদ্যযন্ত্রগুলোও তার নিজস্ব ধ্বনি ও চরিত্র নিয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যদিও বাদ্যযন্ত্র নিয়েই ধর্মীয় বিতর্ক সবচেয়ে বেশি, তবুও এই অঞ্চলের সঙ্গীত বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রের ব্যবহারে বিকশিত হয়েছে।
- তত বা তারের যন্ত্র (Strings): এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘উদ’ (Oud), যা দেখতে নাশপাতির মতো এবং এর কোনো ফ্রেট (fret) নেই। এই ফ্রেটবিহীন গলা শিল্পীকে সূক্ষ্ম মাইক্রোটোনাল সুর এবং গ্লাইড (glide) বাজানোর সুযোগ দেয়। এটি ইউরোপীয় লুট (lute) এবং গিটারের পূর্বসূরি। এছাড়া আছে তুরস্কের লম্বা গলার ‘সাজ’ (Saz), পারস্যের ‘সেতার’ (Setar) ও ‘তার’ (Tar), এবং ধনুক দিয়ে বাজানো ‘রাবাব’ (Rabab) বা ‘কামানচেহ’ (Kamancheh)। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হলো ‘কানুন’ (Qanun), যা অনেকটা সমতলে রাখা হার্পের মতো এবং এর ঝঙ্কার তোলা শব্দ সঙ্গীতের বুননে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
- সুষির বা ফুঁয়ের যন্ত্র (Winds): বাঁশের বাঁশি ‘নে’ (Ney) সুফি সঙ্গীতে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এর বিষণ্ণ, নিঃশ্বাস মেশানো সুরকে মানবাত্মার আর্তি হিসেবে দেখা হয়, যা তার স্বর্গীয় উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
- অবনদ্ধ বা পারকাশন (Percussion): ‘দাফ’ (Daf), ‘রীক’ (Riqq – এক ধরনের খঞ্জনি), ‘দারবুকা’ (Darbuka) বা উপমহাদেশীয় ‘তাবলা’ (Tabla)-এর মতো পারকাশন যন্ত্রগুলো ইকা বা ছন্দকে ধরে রাখে। মজার ব্যাপার হলো, ধর্মীয় বিতর্কে পারকাশন যন্ত্রগুলো, বিশেষ করে ‘দাফ’, প্রায়শই সবচেয়ে কম আপত্তিকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, কারণ কিছু হাদিসে এর ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া যায়।
তবে এই সমস্ত বাদ্যযন্ত্রের উপরে স্থান দেওয়া হয় মানব কণ্ঠকে (human voice)। ইসলামী সঙ্গীত ঐতিহ্যে কণ্ঠকে সবচেয়ে নিখুঁত এবং আধ্যাত্মিক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, কারণ এটি সরাসরি আত্মা থেকে উৎসারিত হয় এবং এর মাধ্যমেই ঐশ্বরিক বাণী (কুরআন) বা প্রেমময় কবিতা প্রকাশ পায়।
আজান ও কুরআন তিলাওয়াত: সুর না আবৃত্তি?
সঙ্গীত ও আবৃত্তির মধ্যের সূক্ষ্ম রেখাটি বোঝার জন্য ‘আজান’ (أذان – Adhan বা Call to Prayer) এবং কুরআন তিলাওয়াত (qira’at) একটি অসাধারণ উদাহরণ। আজান নিঃসন্দেহে সুরেলা। মুয়াজ্জিনরা নামাজের আহ্বানের জন্য বিভিন্ন মাকাম ব্যবহার করে থাকেন। একটি সুরেলা আজান মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। একইভাবে, কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষ করে ‘তাজবিদ’ (tajwid) বা সঠিক উচ্চারণ ও সুরের নিয়ম মেনে পাঠ, এক অসাধারণ শৈল্পিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
কিন্তু মুসলিম বিশ্বে প্রায় সর্বসম্মতভাবে আজান বা কুরআন তিলাওয়াতকে ‘সঙ্গীত’ (ghina) বলা হয় না। একে বলা হয় ‘তারতিল’ (tartil) বা সুরেলা আবৃত্তি (recitation)। কেন এই কঠোর পার্থক্য?
পার্থক্যটি মূলত উদ্দেশ্য (niyyah), প্রেক্ষাপট (context) এবং আধ্যাত্মিক মর্যাদায় (status)। আজান বা তিলাওয়াতের উদ্দেশ্য বিনোদন নয়, বরং একটি ধর্মীয় কর্তব্য পালন। এর কথাগুলো পবিত্র এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাজের অংশ। এখানে সুর বা মেলোডি মূল বিষয় নয়, বরং তা বার্তাটিকে সুন্দরভাবে এবং সম্মানের সাথে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। এই পার্থক্যটিই ইসলামী সংস্কৃতিতে ধ্বনি ও সুরের জটিল শ্রেণিবিন্যাসকে তুলে ধরে। যে সুর ধর্মীয় উদ্দেশ্যে একটি পবিত্র টেক্সটকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তা আবৃত্তি। আর যে সুর বিনোদন, শৈল্পিক প্রকাশ বা জাগতিক আবেগের জন্য, তা সঙ্গীত – এবং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু (Nelson, 2001)।
আধুনিক যুগ, বিশ্বায়ন এবং নতুন দ্বন্দ্ব – রূপান্তরিত সুরের ভুবন
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে এসে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গীত এক নতুন এবং অত্যন্ত জটিল বাঁকের সম্মুখীন হয়। ঔপনিবেশিকতা, জাতীয়তাবাদের উত্থান, প্রযুক্তিগত বিপ্লব (গ্রামোফোন, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট) এবং বিশ্বায়ন – এই সবকিছু মিলে সঙ্গীতের পুরনো বিতর্ক এবং আঙ্গিককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ঐতিহ্যবাহী মাকাম, ইকা আর দরবারি সঙ্গীতের জগৎ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
ঔপনিবেশিকতা, পাশ্চাত্যকরণ এবং সাংস্কৃতিক সংকট
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যখন মুসলিম দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে, তখন তারা কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনই আনেনি, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, নান্দনিকতা ও সঙ্গীত। পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীত, বড় অর্কেস্ট্রা, পিয়ানো, ভায়োলিনের মতো বাদ্যযন্ত্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, হারমোনি (harmony)-এর ধারণা স্থানীয় সঙ্গীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
অনেক স্থানীয় শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ পশ্চিমা সঙ্গীতের কৌশল গ্রহণ করতে শুরু করেন। মিশরের কিংবদন্তী শিল্পী উম্মে কুলসুম (Umm Kulthum) বা সঙ্গীতজ্ঞ মোহাম্মদ আবদেল ওয়াহাব (Mohammed Abdel Wahab) তাদের সঙ্গীতে বড় অর্কেস্ট্রা, সেলো, ডাবল বেস এবং পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার করেছেন। যদিও তাদের সঙ্গীতের মূল কাঠামো আরবি মাকামের উপরেই ভিত্তি করে ছিল, কিন্তু এর ধ্বনি, উপস্থাপনা এবং বিশালতা ছিল নতুন। এই সংমিশ্রণ একদিকে যেমন সঙ্গীতের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে এবং তাকে এক বিশাল সংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে ঐতিহ্যবাদীদের সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা একে ‘সাংস্কৃতিক দূষণ’ (gharbzadegi বা Westoxification) বা পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ হিসেবে দেখেছেন (Shannon, 2006; Danielson, 1997)।
জাতীয়তাবাদ, সঙ্গীত এবং রাষ্ট্র
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর নতুন জাতি-রাষ্ট্রগুলো (nation-states) তাদের নিজস্ব জাতীয় পরিচয় (national identity) গঠনের জন্য সঙ্গীতকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সঙ্গীত এখানে আর কেবল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিষয় থাকল না, হয়ে উঠল রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ।
- আরব জাতীয়তাবাদ: মিশরে জামাল আবদেল নাসেরের যুগে উম্মে কুলসুমের গান আরব জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। তার কণ্ঠস্বরকে আরবরা তাদের ঐক্য, শক্তি এবং গৌরবের প্রতীক হিসেবে দেখত। রেডিও কায়রোর মাধ্যমে তার সঙ্গীত পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ত এবং আরবদের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ঐক্য তৈরি করত।
- তুর্কি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক উসমানীয় দরবারী সঙ্গীতের পরিবর্তে তুর্কি লোকসঙ্গীত এবং পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীতকে প্রোৎসাহন দেন। তার উদ্দেশ্য ছিল একটি আধুনিক, সেক্যুলার তুর্কি জাতি গঠন করা এবং উসমানীয় অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
- ইরানি বিপ্লব: ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্রাথমিকভাবে প্রায় সব ধরনের সঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে, শুধুমাত্র বিপ্লবী, ধর্মীয় এবং ধ্রুপদী ফার্সি সঙ্গীতকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি দেখায় যে, রাষ্ট্র কীভাবে সঙ্গীতকে নিয়ন্ত্রণ করে তার নিজস্ব আদর্শ প্রচার করতে পারে।
সালাফি/ওয়াহাবি প্রভাব, ‘ইসলামী বিকল্প’ এবং নাশিদ
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থায়নে সালাফি বা ওয়াহাবি ধারার ইসলামের বিশ্বজুড়ে প্রসার ঘটে। ইবন তাইমিয়ার কঠোর মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে এই ধারাটি সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্রকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের এই সঙ্গীতবিরোধী বার্তা বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, একটি প্রভাবশালী মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই কঠোর মনোভাবের প্রতিক্রিয়া এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে চলার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে এক নতুন ধরনের সঙ্গীতের ধারা তৈরি হয়, যা ‘নাশিদ’ (نشيد – Nasheed) নামে পরিচিত। নাশিদ হলো মূলত ভোকাল মিউজিক (vocal music) বা কণ্ঠসঙ্গীত, যেখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় না (a cappella), অথবা শুধুমাত্র ‘দাফ’-এর মতো অনুমোদিত পারকাশন ব্যবহার করা হয়। নাশিদের বিষয়বস্তু সাধারণত ধর্মীয়, নৈতিক বা কখনও কখনও রাজনৈতিক হয়।
স্যামি ইউসুফ (Sami Yusuf), মাহের জাইন (Maher Zain) এর মতো শিল্পীরা এই ধারাটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন, যা ‘ইসলামিক পপ’ (Islamic Pop) নামে পরিচিতি পায়। তাদের সঙ্গীতে প্রায়শই পপ মিউজিকের মতো অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং সিন্থেসাইজার ব্যবহার করা হয়, কিন্তু গানের কথাগুলো ধর্মীয় ও ইতিবাচক হওয়ায় এটি অনেক রক্ষণশীল মুসলিমদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পায়। এটি আধুনিক বিশ্বের বিনোদনের চাহিদার সাথে ধর্মীয় অনুশাসনের একটি আপস করার চেষ্টা।
পপ, রক, হিপ-হপ এবং ডিজিটাল যুগের বিদ্রোহ
আজকের ডিজিটাল যুগে ইউটিউব, স্পটিফাই এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মুসলিম বিশ্বের তরুণদের কাছে সব ধরনের সঙ্গীত সহজলভ্য। তারা পশ্চিমা পপ, রক, মেটাল, হিপ-হপের মতো ধারার সাথে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতকে মিশিয়ে নতুন নতুন ধরনের প্রকাশভঙ্গি তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা বা ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিম অভিবাসী তরুণদের মধ্যে হিপ-হপ (Hip-hop) একটি বিশেষভাবে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা র্যাপের মাধ্যমে তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক হতাশা, পরিচয় সংকট, বর্ণবাদ এবং অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলছে। ইরাকি-কানাডিয়ান র্যাপার দ্য নার্সিসিস্ট (The Narcyst) বা ফিলিস্তিনি-ব্রিটিশ র্যাপার শাদিয়া মনসুর (Shadia Mansour)-এর মতো শিল্পীরা সঙ্গীতকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই শিল্পীরা প্রায়শই সঙ্গীত নিয়ে পুরনো ধর্মীয় বিতর্কের তোয়াক্কা করেন না। তাদের কাছে সঙ্গীত হলো আত্মপ্রকাশের এবং নিজেদের গল্প বলার একটি জরুরি মাধ্যম (Swedenburg, 2001)।
এই বিশ্বায়নের যুগে সঙ্গীত হালাল না হারাম – এই প্রশ্নটি অনেকের কাছেই হয়তো আগের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বরং প্রশ্নটি এখন এমন: সঙ্গীত কীভাবে আমাদের পরিচয় নির্মাণ করে? কীভাবে এটি আমাদের সম্প্রদায় তৈরি করে? এবং কীভাবে এটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে? সুরের সেই আদিম আবেদন আজ নতুন রূপে, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে, নতুন প্রজন্মের কাছে তার চিরন্তন গল্প বলে চলেছে।
নিষেধাজ্ঞার নবজাগরণ – সমসাময়িক গোঁড়া ইসলাম ও সঙ্গীতের প্রত্যাখ্যান
ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা যদি বর্তমানে ফিরে আসি, তবে এক অদ্ভুত প্যারাডক্স দেখতে পাই। একদিকে ডিজিটাল বিপ্লবের কল্যাণে সঙ্গীত আজ মানুষের হাতের মুঠোয়, সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বের একটি বড় এবং প্রভাবশালী অংশে সঙ্গীত নিয়ে বিরোধিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার, সুসংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। আল-ফারাবির দর্শন বা রুমির আধ্যাত্মিকতার জগৎ থেকে বহু দূরে, আজকের এই বিতর্কের চালিকাশক্তি হলো শাস্ত্রের আক্ষরিক ব্যাখ্যা এবং এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষার প্রবণতা।
বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত, বিশেষ করে কয়েকটি প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাধারার উত্থান ও প্রসারের ফলে সঙ্গীতের বৈধতা নিয়ে পুরনো বিতর্কটি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই ধারাগুলো সঙ্গীতকে কেবল একটি গৌণ বা দ্বিতীয় স্তরের ফিকহি বিষয় হিসেবে দেখে না, বরং একে বৃহত্তর আদর্শিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখে – যা একদিকে পবিত্রতা, ঈমান ও ইসলামী পরিচয়ের প্রতীক, এবং অন্যদিকে অনৈতিকতা, পশ্চিমা সংস্কৃতি ও অধঃপতনের প্রতীক। এই অধ্যায়ে আমরা সমসাময়িক গোঁড়া ইসলামপন্থী ধারাগুলোর সঙ্গীত বিরোধিতার তাত্ত্বিক ভিত্তি, তাদের যুক্তি এবং বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব বোঝার চেষ্টা করব।
আদর্শিক উৎসভূমি: সালাফিবাদ ও ওয়াহাবিবাদের পুনরুত্থান
আধুনিক যুগে সঙ্গীত বিরোধিতার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী তাত্ত্বিক ভিত্তিটি আসে সালাফি (Salafi) এবং ওয়াহাবি (Wahhabi) আন্দোলন থেকে। এই আন্দোলন নতুন কিছু নয়; এর শিকড় প্রোথিত আছে চতুর্দশ শতাব্দীর পণ্ডিত ইবন তাইমিয়া এবং তার ছাত্র ইবন কাইয়িম আল-জাওজিয়ার কঠোরপন্থী ব্যাখ্যার মধ্যে। পরবর্তীতে আঠারো শতকে আরবে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব এই চিন্তাকে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেন। তাদের মূলনীতি হলো ইসলামের আদি, বিশুদ্ধ রূপে ফিরে যাওয়া – অর্থাৎ, নবী মুহাম্মদ এবং তার প্রথম তিন প্রজন্মের (আল-সালাফ আল-সালিহ – the Pious Predecessors) অনুকরণ করা এবং পরবর্তীকালের সব ধরনের ‘বিদআত’ (religious innovation) বর্জন করা।
সালাফি দৃষ্টিকোণ থেকে সঙ্গীতের বিরোধিতা কয়েকটি শক্তিশালী যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে:
- শাস্ত্রের আক্ষরিক ও আপসহীন ব্যাখ্যা: সালাফি চিন্তাধারার মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও হাদিসের আক্ষরিক (literalist) ব্যাখ্যা গ্রহণ করা। তারা রূপক বা প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাকে দর্শন দ্বারা প্রভাবিত এবং মূল পথ থেকে বিচ্যুতি বলে মনে করে। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে, তারা সহীহ আল-বুখারিতে বর্ণিত ‘মা’আজিফ’ (বাদ্যযন্ত্র) সম্পর্কিত হাদিসটিকে তাদের প্রধানতম দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে। তাদের মতে, এই হাদিসটি দ্ব্যর্থহীনভাবে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রকে ব্যভিচার ও মদের মতো গুরুতর পাপের সাথে এক কাতারে ফেলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা ঈদের দিনে দফ বাজানোর মতো হাদিসগুলোকে অত্যন্ত সীমিত ব্যতিক্রম হিসেবে দেখে, যা কোনোভাবেই সাধারণ সঙ্গীতের বৈধতা প্রমাণ করে না। প্রখ্যাত সালাফি পণ্ডিত, যেমন – সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজ (Ibn Baz) বা নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি (Al-Albani), তাদের অসংখ্য ফতোয়া ও লেখনীতে এই অবস্থানকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন (Al-Albani, n.d.)।
- ‘সাদ্দ আল-যারা’ই’ বা মন্দ কাজের পথ রুদ্ধ করা: ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সাদ্দ আল-যারা’ই (Sadd al-Dhara’i’), যার অর্থ হলো – যেসব কাজ সরাসরি হারাম না হলেও হারামের দিকে নিয়ে যাওয়ার রাস্তা খুলে দেয়, সেগুলোকে নিষিদ্ধ করা। সালাফি পণ্ডিতরা এই নীতিটি সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। তাদের যুক্তি হলো, সঙ্গীত নিজে হয়তো কেবল কিছু সুরের সমষ্টি, কিন্তু এটি প্রায়শই মানুষকে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেয়। গান মানুষের মনে যৌন কামনা (shahwa) জাগিয়ে তোলে, যা ব্যভিচারের (zina) দিকে নিয়ে যেতে পারে। সঙ্গীত মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, যা সময় অপচয়ের শামিল। পপ কনসার্ট বা সঙ্গীতের আসরগুলোতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদক এবং উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। সুতরাং, এই সব মন্দ কাজের পথ বন্ধ করার জন্যই সঙ্গীতকে মূল থেকে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন (Ibn Uthaymeen, n.d.)।
- ‘বিদআত’ বা নব-আবিষ্কারের বিরোধিতা: সালাফিদের কাছে ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের মতে, ইবাদতের পদ্ধতি কঠোরভাবে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত। এর বাইরে যেকোনো নতুন সংযোজন হলো বিদআত, এবং ‘প্রত্যেক বিদআতই হলো পথভ্রষ্টতা’। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সুফিদের ‘সামা’ বা সঙ্গীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনা একটি গুরুতর বিদআত। তারা যুক্তি দেখান যে, নবী বা তার সাহাবীরা সঙ্গীতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেননি। তাই এটি একটি বর্জনীয় এবং পথভ্রষ্ট pratica।
- অমুসলিমদের অনুকরণ (তাশাব্বুহ বিল-কুফফার): আধুনিক পপ, রক, হিপ-হপ বা সিনেমার গানকে সালাফিরা পশ্চিমা বা অমুসলিম সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ (Tashabbuh bi’l-Kuffar) হিসেবে দেখে, যা হাদিসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের সঙ্গীত কেবল সুর বা যন্ত্রের বিষয় নয়, এটি একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থার অংশ, যা বস্তুবাদ, ভোগবাদ এবং নৈতিক অবক্ষয়কে তুলে ধরে। ইসলামী পরিচয় রক্ষার জন্য এই ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য।
দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট: দেওবন্দি ধারা ও তার প্রভাব
ভারতীয় উপমহাদেশে সঙ্গীত বিরোধিতার আরেকটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারা হলো দেওবন্দি (Deobandi) আন্দোলন। উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূচনা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুসলিমদের ধর্ম ও পরিচয়কে রক্ষা করা। দেওবন্দিরা ফিকহে হানাফি মাজহাবের অনুসারী, কিন্তু তাদের চিন্তাধারায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির সংস্কারবাদী চেতনা এবং একটি কঠোর নৈতিকতার ছাপ সুস্পষ্ট।
সঙ্গীতের বিষয়ে দেওবন্দি অবস্থান সালাফিদের মতোই কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে, যদিও তাদের যুক্তির ধরনে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
- ফিকহি কঠোরতা: হানাফি মাজহাবের ক্লাসিক্যাল গ্রন্থগুলোতে সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রকে সাধারণত নিন্দনীয় (makruh) বা নিষিদ্ধ (haram) হিসেবেই দেখা হয়েছে। দেওবন্দি আলেমরা এই ক্লাসিক্যাল অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। তাদের ফতোয়াগুলোতে প্রায়শই ইমাম আবু হানিফার অনুসারী প্রাচীন ইমামদের উদ্ধৃতি দিয়ে বাদ্যযন্ত্রের অবৈধতা প্রমাণ করা হয়।
- আত্মশুদ্ধি ও নফস-এর বিপদ: দেওবন্দি চিন্তাধারায় আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়াতুন নফস (purification of the soul)-এর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। তারা সঙ্গীতকে মানুষের নফস বা নিম্ন প্রবৃত্তিকে শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখে। তাদের মতে, সঙ্গীত আত্মার খোরাক নয়, বরং এটি নফস-এর খোরাক, যা মানুষকে রিপুর দাসে পরিণত করে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতিতে বাধা দেয়।
- সুফিবাদের সাথে জটিল সম্পর্ক: দেওবন্দি ধারার আলেমরা নিজেদেরকে সুফি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করেন এবং তাদের অনেকেই চিশতিয়া বা অন্যান্য তরিকার সাথে যুক্ত। কিন্তু এটি এক ধরনের সংস্কারকৃত, ‘শরিয়ত-সম্মত’ সুফিবাদ, যা জালালউদ্দিন রুমি বা চিশতিয়া তরিকার সঙ্গীতময়, ভাবোন্মত্ত (ecstatic) সুফিবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা চিশতিয়া তরিকার কাওয়ালি বা ‘সামা’-কে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তাদের মতে এটি শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে এবং সাধারণ মানুষকে ভুল পথে চালিত করে (Metcalf, 1982)।
দেওবন্দি ধারার প্রভাব কেবল মাদ্রাসার চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। এর থেকে জন্ম নেওয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইসলামী আন্দোলন, তাবলিগ জামাত (Tablighi Jamaat), এই সঙ্গীতবিরোধী মনোভাবকে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মুসলিমদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে নীরব প্রচারক: তাবলিগ জামাত
তাবলিগ জামাত একটি অরাজনৈতিক, তৃণমূল পর্যায়ের ধর্মপ্রচার আন্দোলন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মুসলিমদেরকে ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান পালনে (যেমন – নামাজ, রোজা) ফিরিয়ে আনা। তাদের কার্যক্রমে সঙ্গীত বা শিল্পকলার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয় না। কিন্তু তাদের জীবনদর্শন এবং কর্মপন্থা পরোক্ষভাবে এক শক্তিশালী সঙ্গীতবিরোধী সংস্কৃতি তৈরি করে।
তাবলিগের কর্মীরা তাদের সময় ও শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে ধর্মপ্রচারের কাজে উৎসর্গ করেন। তাদের কাছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, যা আল্লাহর স্মরণে (dhikr) বা দ্বীনের প্রচারে (da’wah) ব্যয় করা উচিত। এই কর্মমুখর এবং কঠোর শৃঙ্খলিত জীবনধারায় সঙ্গীত বা যেকোনো ধরনের বিনোদনের স্থান নেই। এগুলোকে ‘লাঘু’ (laghw) বা অনর্থক কাজ হিসেবে দেখা হয়, যা মানুষকে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে। তাবলিগ জামাতের বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই জীবনদর্শনে প্রভাবিত হয়েছে, যার ফলে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সঙ্গীত স্বাভাবিকভাবেই বর্জনীয় হয়ে উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রচারের মাধ্যম: পেট্রো-ডলার থেকে ইন্টারনেট
প্রশ্ন উঠতে পারে, বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে এই কঠোরপন্থী ব্যাখ্যাগুলো কীভাবে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠল, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী সভ্যতায় সঙ্গীতের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল? এর পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট আর্থ-সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণ রয়েছে:
- পেট্রো-ডলারের প্রভাব: ১৯৭০-এর দশকে তেলের দাম বৃদ্ধির পর সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বজুড়ে তাদের ওয়াহাবি/সালাফি ধারার ইসলামের প্রসারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। এই অর্থ দিয়ে মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, ইসলামী কেন্দ্র স্থাপন, বই ও প্রচারপত্র ছাপানো এবং বিশ্বজুড়ে ইমাম ও প্রচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক শক্তির জোরে সালাফি ব্যাখ্যাটি অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ও উদারনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে (Lacroix, 2011)। বিশ্বজুড়ে বহু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতৃত্ব ধীরে ধীরে এই ধারার দ্বারা প্রভাবিত বা প্রতিস্থাপিত হয়।
- প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম: প্রথমে ক্যাসেট, তারপর স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং অবশেষে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া এই কঠোরপন্থী বার্তা প্রচারের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে। আশির দশকে অডিও ক্যাসেটে রেকর্ড করা আবেগপূর্ণ ওয়াজ বা লেকচার মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে, ‘পিস টিভি’-র মতো স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো জাকির নায়েকের মতো তারকা ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে সঙ্গীতসহ অনেক বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে লক্ষ লক্ষ দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। বর্তমানে ইউটিউব, ফেসবুক এবং টুইটারের যুগে যে কেউ একজন ‘অনলাইন শেখ’ বা ধর্মপ্রচারক হয়ে উঠতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা গভীর জ্ঞান ছাড়াই অনেক তরুণ প্রচারক সঙ্গীতকে হারাম ঘোষণা করে আকর্ষণীয় এবং সহজবোধ্য কন্টেন্ট তৈরি করছেন, যা তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করছে। এই ডিজিটাল পরিসরে, সূক্ষ্ম ও জটিল তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে সাদা-কালো, হালাল-হারামের সরল বাইনারি অনেক বেশি আবেদন তৈরি করতে সক্ষম হয় (Bunzel, 2015)।
- ‘ইসলামী বিকল্প’ বা নাশিদের উত্থান: এই কঠোর সঙ্গীতবিরোধী পরিবেশের মধ্যেই এক অদ্ভুত প্যারাডক্স হিসেবে জন্ম নিয়েছে ‘ইসলামী সঙ্গীত’ বা নাশিদ (Nasheed) শিল্প। যেহেতু তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গীত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা প্রায় অসম্ভব, তাই একটি ‘বৈধ বিকল্প’ হিসেবে বাদ্যযন্ত্রবিহীন বা কেবল দফ-সহযোগে গাওয়া গানের ধারা তৈরি করা হয়। কিন্তু বিশ্বায়নের চাপে এই নাশিদও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। আধুনিক নাশিদ শিল্পীরা প্রায়শই তাদের গানে অটো-টিউন, ভোকাল ইফেক্টস, সিন্থেসাইজড পারকাশন এবং এমনকি পশ্চিমা পপ সঙ্গীতের কাঠামো ব্যবহার করছেন। এটি খোদ গোঁড়া শিবিরেই এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে: কণ্ঠকে ডিজিটাল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বাদ্যযন্ত্রের মতো শোনালে তা কি বৈধ? ড্রাম মেশিন কি ‘মা’আজিফ’-এর অন্তর্ভুক্ত? এই বিতর্ক প্রমাণ করে যে, সংস্কৃতিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা প্রায় অসম্ভব; শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো রূপে তাকে গ্রহণ বা তার সাথে আপস করতেই হয়।
উপসংহারে বলা যায়, সমসাময়িক গোঁড়া ইসলামপন্থী ধারার সঙ্গীত বিরোধিতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি বৃহত্তর আদর্শিক প্রকল্পের অংশ, যা ইসলামের এক বিশেষ, আক্ষরিক ও বিশুদ্ধতাবাদী রূপকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সালাফিবাদ, দেওবন্দি ধারা এবং তাবলিগ জামাতের মতো আন্দোলনগুলো তাদের নিজস্ব তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং কর্মপন্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের মধ্যে এই ধারণাকে প্রোথিত করেছে যে, সঙ্গীত হলো একটি অনর্থক, বিপজ্জনক এবং বর্জনীয় বিষয়। পেট্রো-ডলারের আর্থিক শক্তি এবং আধুনিক প্রযুক্তির অসীম প্রচার ক্ষমতা এই নিষেধাজ্ঞার নবজাগরণকে এক অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে, যা ইসলামী বিশ্বের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং শৈল্পিক ঐতিহ্যের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তত্ত্বের আয়নায় সুরের প্রতিবিম্ব – তাত্ত্বিকদের চোখে ইসলাম ও সঙ্গীত
এতক্ষণ আমরা ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন আর সংস্কৃতির এক বিশাল ও প্রায়শই গোলকধাঁধাময় জগতে পরিভ্রমণ করেছি। আমরা দেখেছি পরস্পরবিরোধী হাদিস, দার্শনিকদের মহাজাগতিক তত্ত্ব, সুফিদের ভাবোন্মত্ততা, দরবারের জৌলুস আর আধুনিক যুগের নানা সংঘাত। এই বিপুল পরিমাণ তথ্য, ঘটনা আর বিতর্কের ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক। মনে হতে পারে, ইসলাম ও সঙ্গীতের সম্পর্কটা আসলে এক বিশৃঙ্খল জট, যার কোনো আগামাথা নেই।
ঠিক এখানেই তাত্ত্বিকদের (theorists) প্রয়োজন হয়। তাত্ত্বিকরা হলেন সেই মানুষ, যারা এই আপাত বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি কাঠামো বা প্যাটার্ন খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তারা নিছক ঘটনার বর্ণনা দেন না; তারা প্রশ্ন করেন ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’। কেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সঙ্গীতকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হলো, আবার অন্য সময়ে নিষিদ্ধ করা হলো? সঙ্গীত কীভাবে একটি সমাজের পরিচয় নির্মাণ করে? ধর্মীয় অনুশাসন আর সাংস্কৃতিক বাস্তবতা একে অপরের সাথে কীভাবে দর-কষাকষি করে?
এই অধ্যায়ে আমরা কয়েকজন প্রভাবশালী তাত্ত্বিকের তত্ত্বের আয়নায় ইসলাম ও সঙ্গীতের এই জটিল সম্পর্ককে দেখার চেষ্টা করব। তারা আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার বিভিন্ন বাঁককে বুঝতে এবং একটি গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে সাহায্য করবেন। তাদের কাজ আমাদের দেখাবে যে, এই বিষয়টি কেবল ধর্মীয় আইন বা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, এটি ক্ষমতা, সমাজ, রাজনীতি এবং পরিচয়ের এক জটিল বুনন।
ঐতিহাসিক-পাঠ্যভিত্তিক ধারা (The Historico-Textual School): অতীতের সন্ধানে
ইসলাম ও সঙ্গীতের অ্যাকাডেমিক বা পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিকদের হাত ধরে। এই ধারার গবেষকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন আরবি, ফার্সি এবং তুর্কি পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক গ্রন্থ এবং সঙ্গীতের তত্ত্ব বিষয়ক বইপত্র ঘেঁটে ইসলামী সভ্যতার ‘ধ্রুপদী’ সঙ্গীতের ইতিহাসকে পুনর্গঠন করা। তাদের কাজ ছিল প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো – ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান নিদর্শন খুঁজে বের করে অতীতের একটি চিত্র তৈরি করা।
হেনরি জর্জ ফার্মার (Henry George Farmer)
এই ধারার নির্বিবাদ জনক হলেন স্কটিশ সঙ্গীতজ্ঞ ও প্রাচ্যবিদ হেনরি জর্জ ফার্মার (Henry George Farmer, ১৮৮২-১৯৬৬)। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তিনি একাই বলতে গেলে ‘ইসলামী সঙ্গীততত্ত্ব’ নামক অ্যাকাডেমিক শাখাটির ভিত্তি স্থাপন করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ A History of Arabian Music to the XIIIth Century (১৯২৯) আজও একটি ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফার্মারের পদ্ধতি ছিল কঠোরভাবে পাঠ্যভিত্তিক (text-based)। তিনি আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবন সিনার মতো দার্শনিকদের সঙ্গীতের উপর লেখা গ্রন্থগুলো এবং কিতাব আল-আঘানি-র মতো বিশাল সঙ্গীতকোষকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে আরব সঙ্গীতের একটি কালানুক্রমিক ইতিহাস তৈরি করেন।
ফার্মারের কাজ আমাদের সামনে ইসলামের স্বর্ণযুগের দরবারী সঙ্গীতের এক ঝলমলে চিত্র তুলে ধরে। তিনি দেখান যে, সেই সময়ে সঙ্গীত কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল একটি উচ্চমার্গের বিজ্ঞান ও দর্শন। তার গবেষণার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি ‘উদ’ (oud) বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তন, জিরিয়াবের মতো শিল্পীদের অবদান এবং আব্বাসীয় খলিফাদের সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ সম্পর্কে।
তবে ফার্মারের কাজের সীমাবদ্ধতাও ছিল। তিনি ছিলেন তার সময়কার প্রাচ্যবাদী (Orientalist) চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত। তার লেখায় এক ধরনের নস্টালজিয়া কাজ করত – যেখানে ইসলামের স্বর্ণযুগকে এক মহৎ, অপরিবর্তনীয় এবং প্রায় হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনি মূলত অভিজাত ও দরবারী সঙ্গীতের উপর মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং সাধারণ মানুষ বা লোকসঙ্গীতের জগৎকে প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন। তার কাছে, ‘প্রকৃত’ ইসলামী সঙ্গীত ছিল সেই ধ্রুপদী ঐতিহ্য, যা প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু তার এই পথিকৃৎসুলভ কাজ ছাড়া পরবর্তীকালের গবেষণা প্রায় অসম্ভব ছিল (Farmer, 1929)।
অ্যামনন শিলোয়াহ (Amnon Shiloah)
ফার্মারের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয় অ্যামনন শিলোয়াহ (Amnon Shiloah, ১৯২৭-২০১৪)। তিনি ফার্মারের ঐতিহাসিক পদ্ধতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান এবং একে একটি ‘সমাজ-সাংস্কৃতিক’ (socio-cultural) মাত্রা দেন। তার গ্রন্থ Music in the World of Islam: A Socio-Cultural Study (১৯৯৫) এই বিষয়ের উপর একটি আকর গ্রন্থ। শিলোয়াহ কেবল সঙ্গীতের ইতিহাস বর্ণনা করেই থেমে থাকেননি, তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন সঙ্গীত কীভাবে বৃহত্তর ইসলামী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে – ধর্ম, দর্শন, সুফিবাদ, দরবার, দৈনন্দিন জীবন – ভূমিকা পালন করত।
তিনি সঙ্গীত নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষের বিতর্কগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, এই বিতর্ক নিছক ‘হালাল-হারাম’-এর বাইনারি নয়, বরং এর পেছনে গভীর সামাজিক ও আদর্শিক কারণ নিহিত ছিল। শিলোয়াহর কাজ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, ইসলামী সভ্যতায় সঙ্গীতের অবস্থান কখনোই একরৈখিক ছিল না, বরং এটি ছিল এক চলমান সংলাপ ও সংগ্রামের ক্ষেত্র (Shiloah, 1995)।
নৃতাত্ত্বিক ও সঙ্গীততাত্ত্বিক পালাবদল (The Ethnomusicological and Anthropological Turn): জীবন্ত ঐতিহ্যের খোঁজে
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে অ্যাকাডেমিক জগতে এক বড় ধরনের পালাবদল ঘটে। গবেষকরা কেবল প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আর ঐতিহাসিক গ্রন্থের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে, মাঠে-ময়দানে গিয়ে মানুষের জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। এই ‘নৃতাত্ত্বিক পালাবদল’ (anthropological turn) ইসলাম ও সঙ্গীতের গবেষণাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এখন প্রশ্ন আর কেবল ‘অতীতে কী ছিল?’ থাকল না, বরং প্রশ্ন হলো ‘বর্তমানে সঙ্গীত মানুষের জীবনে কীভাবে কাজ করে?’
লইস ইবসেন আল-ফারুকি (Lois Ibsen al-Faruqi):
এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক হলেন লইস ইবসেন আল-ফারুকি (Lois Ibsen al-Faruqi, ১৯২৭-১৯৮৬)। তিনি একজন আমেরিকান সঙ্গীততত্ত্ববিদ ছিলেন, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম বিশ্বে সঙ্গীতের স্থান বোঝার জন্য এক যুগান্তকারী তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেন। তিনি দেখান যে, ‘সঙ্গীত’ শব্দটি দিয়ে ইসলামী সংস্কৃতির ধ্বনি-শিল্পকে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ এই পশ্চিমা শব্দটি সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) বিনোদনের সাথে যুক্ত। এর পরিবর্তে তিনি ‘হান্দাসাহ আল-সাওত’ (هندسة الصوت – Handasah al-Sawt) বা ‘ধ্বনির শিল্প’ (The Art of Sound) নামক একটি ব্যাপকতর ধারণা প্রস্তাব করেন।
আল-ফারুকি ইসলামী সংস্কৃতির সমস্ত শ্রবণযোগ্য শৈল্পিক প্রকাশকে একটি স্তরবিন্যাস বা অনুক্রমের (hierarchy) মধ্যে সাজিয়েছেন। এই অনুক্রমের এক প্রান্তে রয়েছে সবচেয়ে সম্মানিত ও বৈধ ধ্বনি, এবং অন্য প্রান্তে রয়েছে সবচেয়ে নিন্দনীয় ও অবৈধ ধ্বনি। তার এই মডেলটি নিম্নরূপ:
- কুরআন তিলাওয়াত (কিরা’আত): এটি অনুক্রমের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থিত। এটি ‘সঙ্গীত’ নয়, বরং সুরেলা আবৃত্তি। এর বৈশিষ্ট্য হলো এটি অ-ম্যাট্রিক (non-metric), অর্থাৎ এর কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ বা তাল নেই, এবং এর মূল উদ্দেশ্য হলো পবিত্র বাণীর অর্থকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া।
- ধর্মীয় আহ্বান (আজান, তালবিয়া): এগুলোও আবৃত্তি, তবে কিছুটা বেশি সুরময়।
- সুরেলা ধর্মীয় স্তুতি (মাদহ, নাত): এগুলোতে ছন্দ থাকতে পারে, তবে তা সাধারণত সরল হয়।
- বৈধ সঙ্গীত (মুসিকা হালাল): এই স্তরে আসে বিয়ে বা উৎসবের গান, কাজের গান, সামরিক সঙ্গীত ইত্যাদি। এগুলোতে দফ-এর মতো নির্দিষ্ট পারকাশন যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
- বিতর্কিত সঙ্গীত (মুসিকা মুতাখাসাম ফিহা): এখানে আসে ধ্রুপদী বা আর্ট মিউজিক (যেমন – আরবি মাকাম, ফার্সি দস্তগাহ)। এগুলোর শৈল্পিক মূল্য অনেক, কিন্তু এগুলো প্রায়শই অভিজাত বিলাসিতা এবং অনৈতিক পরিবেশের সাথে যুক্ত বলে সমালোচিত হয়।
- অবৈধ সঙ্গীত (মুসিকা হারাম): অনুক্রমের সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে সেই সঙ্গীত, যা সরাসরি অনৈতিকতার সাথে যুক্ত – যেমন নাইটক্লাবের গান বা অশ্লীল কথার গান।
আল-ফারুকির এই মডেলটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, কারণ এটি প্রথমবারের মতো একটি ইমিক (emic) বা ‘ভেতরের মানুষের’ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী সংস্কৃতির সাঙ্গীতিক জগৎকে বোঝার চেষ্টা করেছে। এটি ব্যাখ্যা করে কেন একজন মুসলিম ক্বারী (কুরআন পাঠক)-এর সুরেলা তিলাওয়াত শুনে আধ্যাত্মিক ভাব অনুভব করতে পারেন, কিন্তু একই সাথে পপ সঙ্গীতকে অনৈসলামিক মনে করতে পারেন। এটি ‘সঙ্গীত’ বনাম ‘আবৃত্তি’-র সেই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকে একটি তাত্ত্বিক কাঠামো দেয় (al-Faruqi, 1985)।
রেগুলা বুর্খার্ড কোরেশি (Regula Burckhardt Qureshi)
কানাডীয় সঙ্গীততত্ত্ববিদ রেগুলা বুর্খার্ড কোরেশি (Regula Burckhardt Qureshi) আল-ফারুকির তত্ত্বকে মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে আরও বিকশিত করেছেন। তার যুগান্তকারী কাজ হলো ভারতীয় উপমহাদেশের সুফি সঙ্গীত ‘কাওয়ালি’ (Qawwali) নিয়ে। তার বই Sufi Music of India and Pakistan: Sound, Context and Meaning in Qawwali (১৯৯৫) দেখায় যে, কাওয়ালিকে কেবল একটি সঙ্গীতের ফর্ম হিসেবে বিশ্লেষণ করলে এর আসল উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না।
কোরেশি কাওয়ালিকে একটি ‘ritual performance’ বা ‘ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান’ হিসেবে দেখেছেন। তিনি দেখান যে, কাওয়ালির প্রতিটি উপাদান – কবিতার বিষয়বস্তু, সুরের কাঠামো (রাগ), ছন্দের গতি, শিল্পীদের পরিবেশনা এবং শ্রোতাদের অংশগ্রহণ – সবকিছু মিলে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করে। সেই লক্ষ্য হলো আধ্যাত্মিক ভাব বা ‘হাল’ (hal) তৈরি করা, যা অংশগ্রহণকারীদের ‘ওয়াজদ’ (wajd) বা ভাবোন্মত্ততার দিকে নিয়ে যায়।
তার তত্ত্ব অনুযায়ী, কাওয়ালির শক্তি নিহিত রয়েছে এর শব্দ (sound), প্রেক্ষাপট (context) এবং অর্থ (meaning) – এই তিনের আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে। একটি সুফি দরগাহর পবিত্র পরিবেশে যে কাওয়ালি আধ্যাত্মিক ভাব তৈরি করে, সেই একই কাওয়ালি একটি বাণিজ্যিক কনসার্টে হয়তো কেবল নান্দনিক আনন্দ দেবে। কোরেশির কাজ আমাদের শেখায় যে, সঙ্গীতের অর্থ স্থির নয়; এটি পরিবেশন এবং গ্রহণের প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভরশীল। তিনি সঙ্গীতকে ‘হালাল’ বা ‘হারাম’-এর আইনি বিতর্ক থেকে বের করে এনে, এটি মানুষের জীবনে কীভাবে কাজ করে, সেই কর্মপ্রক্রিয়ার উপর আলোকপাত করেন (Qureshi, 1995)।
সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন ও উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি (Cultural Studies and Post-Colonial Perspectives): আধুনিকতার সাথে বোঝাপড়া
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে তাত্ত্বিকরা সঙ্গীতকে কেবল ইতিহাস বা আচার-অনুষ্ঠানের বস্তু হিসেবে না দেখে, একে ক্ষমতা, রাজনীতি এবং পরিচয় নির্মাণের একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক (post-colonial) এবং সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের (cultural studies) তত্ত্বগুলো এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।
মার্টিন স্টোকস (Martin Stokes)
ব্রিটিশ সঙ্গীততত্ত্ববিদ মার্টিন স্টোকস (Martin Stokes) এই ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা। তার বই The Arabesk Debate: Music and Musicians in Modern Turkey (১৯৯২) একটি যুগান্তকারী গবেষণা। এই বইয়ে তিনি তুরস্কের ‘আরবেস্ক’ (Arabesk) নামক এক ধরনের জনপ্রিয় সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা গ্রামীণ এলাকা থেকে ইস্তাম্বুলের মতো বড় শহরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
তুরস্কের কামালিস্ট অভিজাতরা আরবেস্ক সঙ্গীতকে পশ্চাৎপদ, রুচিহীন এবং ‘অ-তুর্কি’ বলে ঘৃণা করত, কারণ এতে আরবি সঙ্গীতের প্রভাব ছিল। কিন্তু স্টোকস দেখান যে, আরবেস্ক সঙ্গীত এই অভিবাসী মানুষদের জন্য কেবল বিনোদন ছিল না। এটি ছিল আধুনিক শহরের বুকে তাদের বিচ্ছিন্নতা (alienation), একাকীত্ব এবং ফেলে আসা গ্রামের জন্য নস্টালজিয়া বা ‘গুরবেত’ (gurbet) প্রকাশ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
স্টোকসের মূল তত্ত্ব হলো, সঙ্গীত একটি ‘সামাজিকভাবে অর্থবহ স্থান’ (socially meaningful space) তৈরি করে, যেখানে মানুষ তাদের পরিচয় নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারে এবং তাদের আবেগ ও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে পারে, যা হয়তো অন্য কোনো উপায়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তার কাজ আমাদের দেখায় যে, সঙ্গীতের উপর নিষেধাজ্ঞা বা পৃষ্ঠপোষকতা প্রায়শই নিছক ধর্মীয় কারণে হয় না; এর পেছনে গভীর সামাজিক শ্রেণি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লড়াই জড়িত থাকে (Stokes, 1992)।
সমসাময়িক তাত্ত্বিকগণ
আজকের ডিজিটাল যুগে, টেড সুইডেনবার্গ (Ted Swedenburg) বা হিশাম আদিবের (Hisham Aidi) মতো তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন, কীভাবে হিপ-হপ (Hip-hop) মুসলিম তরুণদের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ, আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক মত প্রকাশের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তারা দেখান যে, এই তরুণরা মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির প্রতিবাদের ভাষাকে গ্রহণ করে তাকে তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে – যেমন, ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম বা ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে – ব্যবহার করছে (Aidi, 2014; Swedenburg, 2001)। এই সঙ্গীত প্রায়শই ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সঙ্গীতের ব্যাকরণকে অস্বীকার করে, কিন্তু এটি এক নতুন ধরনের ‘ইসলামী’ রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
এই তাত্ত্বিকদের কাজ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ইসলাম ও সঙ্গীতের সম্পর্কটি কোনো স্থির বা কালোত্তীর্ণ বিষয় নয়। এটি একটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং চলমান প্রক্রিয়া। হেনরি ফার্মারের পাঠ্যভিত্তিক ইতিহাস থেকে শুরু করে, লইস আল-ফারুকির কাঠামোগত মডেল, রেগুলা কোরেশির আচার-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণ এবং মার্টিন স্টোকসের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাখ্যা – প্রতিটি তত্ত্বই এই জটিল সম্পর্কের এক একটি দিককে আলোকিত করে।
কোনো একটি তত্ত্বই হয়তো সম্পূর্ণ চিত্রটি তুলে ধরতে পারে না। বিষয়টি অনেকটা একটি বহুমুখী স্ফটিকের (multi-faceted crystal) মতো। একেকজন তাত্ত্বিক একেকটি কোণ থেকে তার উপর আলো ফেলেন, আর আমাদের সামনে তার এক একটি নতুন তল বা ফ্যাসেট উদ্ভাসিত হয়। এই সমস্ত তত্ত্বকে একসাথে মেলাতে পারলেই আমরা হয়তো ইসলাম নামক এক বিশাল ঐতিহ্য এবং সঙ্গীত নামক এক আদিম মানব অনুভূতির মধ্যেকার এই দীর্ঘ, আকর্ষণীয় এবং অমীমাংসিত সংলাপের গভীরতাকে কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারব।
শেষ কথা
আমরা একটি দীর্ঘ এবং জটিল পথ পাড়ি দিয়ে এলাম। কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যার সূক্ষ্মতা থেকে শুরু করে হাদিসের পরস্পরবিরোধী বর্ণনা, দার্শনিকদের মহাজাগতিক তত্ত্ব, সুফিদের আধ্যাত্মিক সাধনা, রাজদরবারের জৌলুস, আধুনিক যুগের সংঘাত ও সংমিশ্রণ – এই বিশাল ক্যানভাসে আমরা সঙ্গীত ও ইসলামের বহুমুখী এবং প্রায়শই দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ককে দেখার চেষ্টা করলাম।
তাহলে এই দীর্ঘ পরিভ্রমণের শেষে আমরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম?
সিদ্ধান্তটি হলো, কোনো সরল সিদ্ধান্ত নেই। ‘ইসলামে সঙ্গীতের অবস্থান কী?’ – এই প্রশ্নের কোনো একক, কালোত্তীর্ণ উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ ‘ইসলাম’ কোনো একশিলা মূর্তি নয়। এটি একটি জীবন্ত, বহুমাত্রিক ঐতিহ্য, যা ১৪০০ বছর ধরে অগণিত সংস্কৃতি, সমাজ, ভাষা ও চিন্তাধারার সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।
একদিকে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞার একটি ধারা, যা ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যা, নৈতিক পবিত্রতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার উপর জোর দেয়। অন্যদিকে রয়েছে এক উদারনৈতিক, দার্শনিক ও মরমি ধারা, যা সঙ্গীতকে গণিত, বিজ্ঞান, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এবং শিল্পের সর্বোচ্চ প্রকাশ হিসেবে দেখে। আর এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে রয়েছে অগণিত ব্যাখ্যা, আপস, অভিযোজন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, যেখানে সুর আর ছন্দ মিশে আছে তাদের আনন্দ-বেদনায়, উৎসবে-বিরহে।
ব্যাপারটা অনেকটা এক বিশাল নদীর মতো। নদীর মূল উৎস হয়তো একটিই, কিন্তু চলার পথে তা অসংখ্য শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। কোনো শাখা হয়তো উর্বর পলি ফেলে নতুন সভ্যতার জন্ম দেয়, কোনোটা মরুভূমিতে গিয়ে শুকিয়ে যায়, কোনোটা আবার অন্য নদীর সাথে মিশে আরও বড় এবং বেগবান হয়ে ওঠে। ইসলাম ও সঙ্গীতের সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই। এর কোনো একটি ধারাকে একমাত্র ‘সঠিক’ এবং অন্যটিকে ‘ভুল’ বলার চেষ্টা করলে আসলে পুরো চিত্রটাই হারিয়ে যায়, এর গভীরতা এবং বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা হয়।
আজকের এই বিভক্ত পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বকে বোঝাটা খুব জরুরি। এটি আমাদের কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সংস্কৃতি নিয়ে নয়, বরং সাধারণভাবে মানুষের প্রকৃতি নিয়েই ভাবতে শেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে, বিশ্বাস, শিল্প, এবং সামাজিক নিয়ম – এই সবকিছুই নিরন্তর পরিবর্তনশীল। সুর আর শব্দের এই চিরন্তন বিতর্ক আসলে মানুষেরই গল্প – তার বিশ্বাস ও যুক্তির মধ্যেকার টানাপোড়েনের গল্প, তার ভয় ও ভালোবাসার গল্প, তার শরীর ও আত্মার গল্প, এবং তার সীমার মাঝে থেকেও অসীমকে ছোঁয়ার চেষ্টার গল্প।
এই গল্প হয়তো কখনও শেষ হবে না। আর এখানেই হয়তো এর আসল সৌন্দর্য।
তথ্যসূত্র
- Aidi, H. (2014). Rebel Music: Race, Empire, and the New Muslim Youth Culture. Pantheon.
- Al-Albani, M. N. (n.d.). Tahrim alat al-tarab (The Prohibition of Musical Instruments). Maktaba al-Islamiyya.
- al-Faruqi, L. I. (1985). Music, Musicians and Muslim Law. Asian Music, 17(1), 3–36.
- Al-Ghazali, A. H. (n.d.). Ihya’ Ulum al-Din (The Revival of the Religious Sciences). (Multiple translations available, including by Fazl-ul-Karim). Cairo: Dar al-Sha’b.
- Bunzel, C. (2015). The Kingdom and the Caliphate: Duel of the Islamic States. Carnegie Endowment for International Peace.
- Danielson, V. (1997). The Voice of Egypt: Umm Kulthūm, Arabic Song, and Egyptian Society in the Twentieth Century. University of Chicago Press.
- Ernst, C. W. (2003). The Spirit of Sama is Hearing. In Sufism: A Short Introduction (pp. 119-140). Oneworld Publications.
- Farmer, H. G. (1929). A history of Arabian music to the XIIIth century. Luzac & Co.
- Feldman, W. (2016). Music of the Ottoman Court: Makam, Composition and the Early Ottoman Instrumental Repertoire. Ergon Verlag.
- Goodman, L. E. (2003). Avicenna. Routledge.
- Horden, P. (Ed.). (2000). Music as Medicine: The History of Music Therapy since Antiquity. Ashgate Publishing.
- Ibn Hazm, A. (n.d.). Al-Muhalla bi’l-Athar. (Various modern editions, e.g., Beirut: Dar al-Fikr).
- Ibn Kathir, I. (n.d.). Tafsir al-Qur’an al-Azim. (Multiple translations available, e.g., Riyadh: Dar-us-Salam Publications).
- Ibn Uthaymeen, M. (n.d.). Fatawa Islamiyah (Islamic Verdicts). (Various compilations and translations available).
- Kilpatrick, H. (2003). Making the Great Book of Songs: Compilation and the Author’s Craft in Abū l-Faraj al-Iṣbahānī’s Kitāb al-aghānī. Routledge.
- Lacroix, S. (2011). Awakening Islam: The Politics of Religious Dissent in Contemporary Saudi Arabia. Harvard University Press.
- Laoust, H. (1971). Essai sur les doctrines sociales et politiques de Taki-d-Din Ahmad b. Taimiya. Institut Français d’Archéologie Orientale.
- Lewis, F. D. (2007). Rumi: Past and Present, East and West: The Life, Teachings, and Poetry of Jalal al-Din Rumi. Oneworld Publications.
- Marcus, S. L. (2007). Music in Egypt: Experiencing Music, Expressing Culture. Oxford University Press.
- Metcalf, B. D. (1982). Islamic Revival in British India: Deoband, 1860-1900. Princeton University Press.
- Michot, Y. (2006). A Mamluk Theologian’s Commentary on the “Fatiha”: A Critical Edition of the “Tafsir” of Ibn Taymiyya. Journal of Qur’anic Studies, 8(2), 163-171.
- Nasr, S. H. (1964). An Introduction to Islamic Cosmological Doctrines: Conceptions of Nature and Methods Used for Its Study by the Ikhwan al-Safa, al-Biruni, and Ibn Sina. Harvard University Press.
- Nelson, K. (2001). The art of reciting the Qur’an. The American University in Cairo Press.
- Qureshi, R. B. (1995). Sufi music of India and Pakistan: Sound, context and meaning in Qawwali. University of Chicago Press.
- Saoud, R. (2004). The Arab Contribution to Music of the Western World. Foundation for Science, Technology and Civilisation (FSTC).
- Shannon, J. H. (2006). Among the jasmine trees: Music and modernity in contemporary Syria. Wesleyan University Press.
- Shiloah, A. (1995). Music in the world of Islam: A socio-cultural study. Wayne State University Press.
- Stokes, M. (1992). The Arabesk Debate: Music and Musicians in Modern Turkey. Oxford University Press.
- Swedenburg, T. (2001). Islamic Hip-hop vs. Islamophobia. In T. Mitchell (Ed.), Global Noise: Rap and Hip-Hop Outside the USA (pp. 57–85). Wesleyan University Press.
- Touma, H. H. (1996). The music of the Arabs. Amadeus Press.
- Wade, B. C. (1998). Imaging Sound: An Ethnomusicological Study of Music, Art, and Culture in Mughal India. University of Chicago Press.
- Wright, O. (1978). The Modal System of Arab and Persian Music, A.D. 1250-1300. Oxford University Press.

