আব্বাসীয় খিলাফত (Abbasid Caliphate): ইতিহাসের সোনালী মরীচিকা এবং ক্ষমতার দাবাখেলা
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 বিপ্লবের প্রেক্ষাপট: ক্ষোভের বারুদ এবং হাশিমী প্রোপাগান্ডা
- 3 কালো পতাকার উত্থান: আবু মুসলিম এবং জাবের যুদ্ধ
- 4 প্রকৃত স্থপতি: আল-মনসুর এবং গোলকধাঁধার শহর বাগদাদ
- 5 হারুনুর রশীদ: মিথ, বাস্তবতা এবং বার্মাকি ট্র্যাজেডি
- 6 বায়তুল হিকমাহ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহাবিস্ফোরণ
- 7 মুতাজিলা মতবাদ: যুক্তির জয়গান এবং মিহনা
- 8 অর্থনীতি, সমাজ এবং বিলাসিতা: আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের অন্দরমহল
- 9 সাহিত্য এবং বিনোদন: মদের পেয়ালা, কবিতার ছন্দ এবং আদব সংস্কৃতির বিকাশ
- 10 অবনতির শুরু: ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ এবং তুর্কি প্রহরীদের উত্থান
- 11 ১২৫৮ সালের মহাপ্রলয়: বাগদাদের পতন এবং সভ্যতার যবনিকা
- 12 আব্বাসীয় ইতিহাসের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: ইবনে খালদুন থেকে হজসন
- 13 উপসংহার: ইতিহাসের শিক্ষা ও মহাকালের রায়
- 14 তথ্যসূত্র
ভূমিকা
মহাকাল এক বড় অদ্ভুত ও খেয়ালি জাদুকর। তার বিশাল ঝুলিতে নশ্বর মানুষের জন্য কেবল দুটি জিনিসই বরাদ্দ থাকে – বিস্মৃতি অথবা ইতিহাস। আমরা আজ এক বিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়ে যে আধুনিক সভ্যতা নিয়ে গর্ব করি, যে বিজ্ঞান, দর্শন আর প্রযুক্তির মায়াজাল আমাদের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে, তার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে মধ্যযুগের ধুলোবালি ওড়া এক ধূসর অতীতের দিকে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু বাঁক থাকে, যখন পুরো পৃথিবীর গতিপথ বদলে যায়, যখন পুরনো সব ধ্যান-ধারণা চূর্ণ হয়ে জন্ম নেয় এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। অষ্টম শতকের মধ্যভাগ ছিল তেমনই এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। উমাইয়াদের (Umayyads) দাম্ভিকতা আর আরব আভিজাত্যবাদের প্রাসাদে ফাটল ধরিয়ে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছিল, যাদের নাম আব্বাসীয় (Abbasids)। এই পরিবর্তন কেবল একটি রাজবংশের পতন আর আরেকটির উত্থান ছিল না; এটি ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে এক বিশ্বজনীন সভ্যতা গড়ার প্রথম ধাপ।
সময়টা ছিল বড় গোলমেলে, যেন এক প্রলয়ের পূর্বাভাস। আরব মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশিতে তখন রক্তের দাগ আর বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। ৭৫-এর দশক, তবে সেটা বিংশ শতাব্দীর নয়, অষ্টম শতাব্দীর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ। এই একটি সাল কেবল শাসকের পরিবর্তন নির্দেশ করে না, এটি নির্দেশ করে মানুষের চিন্তার এক আমূল পরিবর্তন। দামেস্কের (Damascus) সংকীর্ণ আরব জাতীয়তাবাদ থেকে সরে এসে বাগদাদে (Baghdad) গড়ে উঠল এক কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য, যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মেধার মূল্যায়ন হতো। এই সাম্রাজ্যের শাসকরা তরবারির চেয়ে কলমের কালিতে বেশি বিশ্বাস করতেন – এমনটা ভাবা ভুল হবে। তারা কলম ভালোবাসতেন ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে সেই কলম দিয়েই অবলীলায় মৃত্যুর পরোয়ানা সই করতেন। মানুষের মাথার খুলি দিয়ে মিনার বানানো আর লাইব্রেরিতে বসে অ্যারিস্টটল অনুবাদ করা – এই দুটি কাজই তারা সমান দক্ষতায় ও নিপুণতায় করত। একদিকে তারা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরম পৃষ্ঠপোষক, অন্যদিকে ছিল নির্মম স্বৈরাচার। এই অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা বা ডুয়ালিজম (Dualism)-ই আব্বাসীয়দের ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং রহস্যময় দিক।
আজকের এই লেখায় আমরা আব্বাসীয় খিলাফতের সেই দীর্ঘ ৫০০ বছরের ইতিহাসের অলিগলি ব্যবচ্ছেদ করব। আমরা দেখব, কীভাবে একটি সুসংগঠিত গোপন আন্দোলন (Underground Movement) বা ‘দাওয়া’ ধর্মকে পুঁজি করে রাষ্ট্রক্ষমতায় এল, কীভাবে তারা মরুভূমির বুকে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ’ (Golden Age of Islam) গড়ে তুলল, এবং কেনই বা সেই প্রবল প্রতাপশালী সাম্রাজ্য মঙ্গোলদের ঘোড়ার খুরের নিচে ধুলোয় মিশে গেল। এখানে কোনো দৈববাণী নেই, নেই কোনো অলৌকিকতার আশ্রয়। আছে কেবল মানুষের আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা (Ambition), ধূর্ত রাজনীতি (Cunningness), জ্ঞানের প্রতি অদম্য তৃষ্ণা এবং সময়ের নির্মম পরিহাস। ইতিহাস যে কেবল রাজা-বাদশাহদের সাল-তারিখের হিসাব নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা আর সমাজ পরিবর্তনের জীবন্ত দলিল – এই লেখাটি সেই যাত্রাপথেই হাঁটবে। আমরা দেখব, শতাব্দী পাল্টালেও মানুষের মৌলিক প্রবৃত্তি বদলায় না, মানুষ আসলে বদলায় না, কেবল সময় আর প্রেক্ষাপট বদলায়।
বিপ্লবের প্রেক্ষাপট: ক্ষোভের বারুদ এবং হাশিমী প্রোপাগান্ডা
ইতিহাসের এক নির্মম কৌতুক হলো, যে সাম্রাজ্যকে বাইরে থেকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে হয়, তার ভেতরের হাড়গোড় হয়তো অনেক আগেই ঘুণপোকা খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। উমাইয়া খিলাফতের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল। দামেস্কের সিংহাসনে বসে যখন খলিফারা ভাবছিলেন তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী, ঠিক তখনই তাদের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছিল। কোনো বিশাল সাম্রাজ্যই একদিনে ধসে পড়ে না; তার পতনের শব্দ শোনার বহু আগে থেকেই পতনের আয়োজন সম্পন্ন হতে থাকে। উমাইয়াদের পতনের বীজটি লুকিয়ে ছিল তাদের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে, যাকে ভদ্র ভাষায় বলা যায় আরব আভিজাত্যবাদ (Arab Aristocracy), আর স্পষ্ট ভাষায় – জাতিগত আধিপত্যবাদ। উমাইয়া শাসকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় এক ধরনের সংকীর্ণ আরব-কেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। সমস্যাটি ধর্মান্তরকরণে বাধা দেওয়া বা উৎসাহ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সমস্যাটি ছিল সদ্য মুসলিম হওয়া অনারব জনগোষ্ঠী বা ‘মাওয়ালি’দের (Mawali) সাথে রাষ্ট্রের আচরণে। ইসলাম গ্রহণ করার পরেও এই অনারব মুসলিমদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরবদের সমকক্ষ মনে করা হতো না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ওপর অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত কর বা জিজিয়া চাপিয়ে রাখা হতো, যা ছিল মূলত অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য। রাষ্ট্রযন্ত্র এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেখানে মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে আরব গোত্রীয় পরিচয়ই ছিল মুখ্য। এই কাঠামোগত বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক শোষণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, তা আগ্নেয়গিরির লাভা থেকেও বেশি উত্তপ্ত। মানুষ দেখল, শাসকের ঘোষিত ধর্মীয় সাম্য আর রাষ্ট্রীয় আচরণের মধ্যে রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব। উমাইয়ারা ভুলে গিয়েছিল, তরবারি দিয়ে ভূখণ্ড জয় করা যায়, কিন্তু শাসন টিকে থাকে ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) নীতির ওপর। আর এই ন্যায়বিচারের অভাবটাই ছিল তাদের কফিনের শেষ পেরেক।
মাওয়ালি সংকট: দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের হাহাকার
অনারব মুসলিম, যাদের তৎকালীন পরিভাষায় বলা হতো মাওয়ালি (Mawali) – যেমন পারসিক, তুর্কি, কুর্দি বা কপ্টিকরা – তারা ছিল এই বৈষম্যের প্রধান শিকার। এই ‘মাওয়ালি’ শব্দটি নিজেই ছিল বেশ অপমানজনক, যার অর্থ অনেকটা ‘আশ্রিত’ বা ‘ক্লায়েন্ট’। বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা দরকার। একজন পারসিক হয়তো ইসলাম গ্রহণ করেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরবদের চেয়ে ঢের এগিয়ে আছেন, তার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস আছে, কিন্তু সামাজিকভাবে তিনি একজন সাধারণ আরব বেদুইনের চেয়েও নিচে। একজন অনারব মুসলিম দেখত, মসজিদে সে আরবদের সাথে একই কাতারে নামাজ পড়ছে, খোদা বা ঈশ্বরের কাছে সে সমান, কিন্তু মসজিদ থেকে বেরোলেই রাষ্ট্র তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে তার ‘আসল’ অবস্থান। তাকে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত কর বা জিজিয়া (Jizya), যা মূলত অমুসলিমদের ওপর ধার্য থাকার কথা। ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেও এই কর বা ভূমি কর বা খারাজ (Kharaj) থেকে তাদের রেহাই ছিল না। উমাইয়া প্রশাসন ভয় পেত, সবাই যদি মুসলমান হয়ে যায় এবং কর মওকুফ পায়, তবে রাজকোষ খালি হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ধর্ম এখানে গৌণ, অর্থনীতি এবং রাজস্ব নীতি (Fiscal Policy) এখানে মুখ্য। একজন সদ্য মুসলিম হওয়া ব্যক্তিকে যখন জিজিয়া দিতে বাধ্য করা হতো, তখন তার মনে হতো রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দিচ্ছে তার বিশ্বাসের জন্য।
এই চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অপমান মানুষের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, তা আগ্নেয়গিরির লাভা থেকেও বেশি উত্তপ্ত। বিশেষ করে খোরাসানের মতো অঞ্চলগুলোতে, যেখানে পারসিকরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে এই ক্ষোভ দানা বাঁধছিল বহুদিন ধরে। তারা দেখল, উমাইয়া শাসকরা ইসলামের সাম্যের বুলি আওড়ায়, কিন্তু বাস্তবে তারা আরব গোত্রতন্ত্রের পূজারি। এই দ্বিচারিতা বা ভণ্ডামি (Hypocrisy) মাওয়ালিদের মনে রাষ্ট্রবিরোধী চেতনা জাগিয়ে তোলে। তারা এমন কাউকে খুঁজছিল, যে তাদের এই অপমানের প্রতিশোধ নেবে, যে তাদের সমান অধিকার দেবে। মানুষ তখন আর ধর্মের বাণী শুনতে চায় না, সে চায় বদলা, সে চায় মুক্তি। এই ক্ষোভের বারুদস্তূপের ওপর বসে উমাইয়ারা যখন আয়েশি জীবন কাটাচ্ছিল, তখন আব্বাসীয়রা তৈরি করছিল দিয়াশলাই। মাওয়ালিরা হয়ে উঠল আব্বাসীয় বিপ্লবের পদাতিক বাহিনী, যারা উমাইয়াদের পতন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত থামেনি (Kennedy, 2004)।
হাশিমীয়া দাওয়াহ: ছায়ার আড়ালে ক্ষমতার জাল
মানুষ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন সে মুক্তির পথ খোঁজে, আর সেই পথ দেখানোর জন্য দরকার হয় চতুর নেতৃত্বের। আব্বাসীয়রা ছিল সেই চতুর রাজনীতিকের দল, যারা জানত জনরোষকে কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। তারা ছিল মহানবীর চাচা আব্বাসের বংশধর। রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে এবং মানুষকে নিজের দলে টানতে হলে ‘ব্র্যান্ডিং’ খুব জরুরি। আব্বাসীয়রা সেই ব্র্যান্ডিংটা করল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কৌশলে। তাদের মূল ঘাঁটি ছিল জর্ডানের এক নিভৃত পল্লী হুমায়মাতে, কিন্তু তাদের চোখ ছিল বিশ্ব শাসনের দিকে। তারা সরাসরি বলল না যে “আমরা ক্ষমতা চাই” বা “আমরা সিংহাসন চাই”। কারণ ক্ষমতা চাইলে মানুষ ভাববে এরাও উমাইয়াদের মতোই লোভী। তাই তারা ধর্মকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করল। তারা গড়ে তুলল এক বিশাল গোপন নেটওয়ার্ক (Underground Network) বা আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্ট, যার নাম হাশিমীয়া দাওয়াহ (Hashemite Dawah)।
এই ‘দাওয়াহ’ বা আহ্বান ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক তৎপরতা, কিন্তু তার মোড়ক ছিল ধর্মীয়। তারা উমাইয়াদের বিরুদ্ধে মানুষকে ডাকত না, তারা ডাকত ‘সত্য’ ও ‘ন্যায়বিচার’-এর দিকে। মানুষের চিরন্তন হাহাকার – ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা – সেটিকেই তারা পুঁজি করল। আব্বাসীয়দের এই সংগঠনটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। এর গঠনতন্ত্র ছিল আজকের দিনের যেকোনো আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থা বা বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির মতো। এর কেন্দ্রে ছিলেন একজন ‘ইমাম‘, যিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেন। তার নিচে থাকত নুকাবা (Nuqaba) বা নেতাদের একটি দল, যা সাধারণত ১২ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হতো। এবং তাদের অধীনে থাকত হাজার হাজার দায়ী (Da’i) বা প্রচারক। এই প্রচারকরা বণিক, তীর্থযাত্রী বা সুফি সাধকের ছদ্মবেশে সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াত। কুফা ছিল তাদের নার্ভ সেন্টার। সেখান থেকে নির্দেশ যেত খোরাসানে। তারা হাটে-বাজারে, সরাইখানায় মানুষের কানে কানে বিষ ঢেলে দিত উমাইয়াদের বিরুদ্ধে। তারা বলত, উমাইয়ারা ধর্মত্যাগী, তারা মদ্যপ, তারা এজিদের বংশধর যারা নবী পরিবারকে হত্যা করেছে। এই নেতিবাচক প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা ওয়ারফেয়ার (Propaganda Warfare) উমাইয়াদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছিল। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, উমাইয়াদের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা (Sharon, 1983)।
এই প্রোপাগান্ডায় আব্বাসীয়রা কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করত:
- চরিত্র হনন: উমাইয়া খলিফাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা রটানো, তাদের মদ্যপান ও নারীসঙ্গের গল্প ছড়িয়ে দেওয়া।
- ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট: কারবালার ঘটনা এবং নবী মুহাম্মদের পরিবারের ওপর উমাইয়াদের নির্যাতনের ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেওয়া।
- ভবিষ্যদ্বাণী: বিভিন্ন জাল হাদিস ও ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করা যেখানে বলা হতো শীঘ্রই কালো পতাকাবাহী এক দল এসে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।
আল-রিদা এবং শিয়াদের হাইজ্যাক করার কৌশল
আব্বাসীয়দের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাল ছিল শিয়াদের আবেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা। শিয়া সম্প্রদায় বিশ্বাস করত, খিলাফতের প্রকৃত হকদার হলো আলীর বংশধররা। আব্বাসীয়রা জানত, আলীর বংশধরদের জনপ্রিয়তা তাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাই তারা সরাসরি নিজেদের নাম ঘোষণা করলে জনসমর্থন পাবে না। এখান থেকেই এল তাদের মাস্টারস্ট্রোক স্লোগান – ‘আল-রিদা মিন আল-মুহম্মাদ’ (Al-Rida min Al-Muhammad)। এর অর্থ হলো, তারা নবী পরিবারের (Family of the Prophet) এমন একজনকে ক্ষমতায় বসাতে চায়, যার ওপর সকলের সন্তুষ্টি বা ‘রিদা’ আছে।
লক্ষ্য করুন, তারা কিন্তু সুনির্দিষ্ট করে কারো নাম বলেনি। তারা বলেনি যে আবুল আব্বাস বা আল-মনসুর খলিফা হবে। এই কৌশলগত অস্পষ্টতা (Strategic Ambiguity) ছিল তাদের তুরুপের তাস। এর ফলে শিয়া (Shia) সম্প্রদায়, যারা আলীর বংশধরদের ক্ষমতায় দেখতে চাইত, তারা ভাবল, নিশ্চয়ই আলীর বংশের কেউ আসবে; তাই তারা জানপ্রাণ দিয়ে আব্বাসীয়দের সমর্থন দিল। আব্বাসীয়রা খুব গোপনে প্রচার করত যে, আলীর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আল-হানাফিয়ার ছেলে আবু হাশিম মৃত্যুর আগে আব্বাসীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আলীকে খিলাফতের দায়িত্ব বা ওয়াসিয়্যা (Wasiyya) দিয়ে গেছেন। এই তত্ত্বটি ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট, কিন্তু রাজনীতিতে সত্যের চেয়ে গল্পের জোর বেশি। একে বলা হয় কায়সানিয়া মতবাদ (Kaisanites) বা কায়সানি শিয়াদের বিশ্বাস। আব্বাসীয়রা এই মতবাদ ব্যবহার করে শিয়াদের সমর্থন হাইজ্যাক করে নিল। তারা আলীর বংশধরদের রক্ত আর ঘাম ব্যবহার করে নিজেদের সিংহাসনের রাস্তা তৈরি করল। সুন্নিরা এবং সাধারণ আরবরা ভাবল, আব্বাসের বংশধর বা হাশিমী গোত্রের কেউ আসবে, যারা উমাইয়াদের চেয়ে ভালো। সবাইকে ধোঁকা দিয়ে, সবার সমর্থন নিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর এই রাজনীতি আব্বাসীয়রা শুরু থেকেই আয়ত্ত করেছিল। ধর্ম যে মানুষকে একত্রিত করার এবং একই সাথে বিভ্রান্ত করার কত বড় হাতিয়ার হতে পারে, তা এই আন্দোলন না দেখলে বোঝা যায় না (El-Hibri, 1999)।
গোত্রীয় দ্বন্দ্ব: উমাইয়াদের আত্মহনন
উমাইয়াদের পতনের আরেকটি বড় কারণ ছিল আরব গোত্রগুলোর মধ্যকার চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব, যা আব্বাসীয়রা খুব ভালোমতো কাজে লাগিয়েছিল। আরব সমাজ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল – উত্তরের আরব বা মুদারি/কায়েস (Qays/Mudar) এবং দক্ষিণের আরব বা ইয়ামানি (Yaman/Kalb)। এই দুই গ্রুপের রেষারেষি ছিল অনেকটা জাতিগত দাঙ্গার মতো। উমাইয়া খলিফারা নিরপেক্ষ থাকার বদলে প্রায়ই কোনো এক পক্ষের সমর্থন নিতেন। বিশেষ করে শেষের দিকের উমাইয়া খলিফারা কায়েসী গোত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এতে ইয়ামানি গোত্রগুলো, যারা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল এবং খোরাসানে প্রভাবশালী ছিল, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আব্বাসীয় বিপ্লবীরা এই ফাটলটি চমৎকারভাবে ব্যবহার করে। তারা ইয়ামানিদের বোঝায় যে উমাইয়ারা তাদের শত্রু। ফলে সেনাবাহিনীর একটা বিশাল অংশ উমাইয়াদের বিরুদ্ধে চলে যায়। একে বলা হয় গোত্রীয় সংহতি বা আসাবিয়্যা (Asabiyya)-র নেতিবাচক প্রভাব। উমাইয়ারা নিজেদের গোত্রীয় রাজনীতির জালে নিজেরাই আটকা পড়েছিল, আব্বাসীয়রা কেবল সেই জালে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল (Wellhausen, 1927)।
খোরাসান: বিপ্লবের আঁতুড়ঘর এবং আবু মুসলিমের উত্থান
বিপ্লব কখনো রাজধানীর বিলাসবহুল প্রাসাদের আশেপাশে দানা বাঁধে না, বিপ্লব জন্ম নেয় সীমান্তে, যেখানে কেন্দ্রীয় শাসনের বাঁধন আলগা। আব্বাসীয়রা তাদের আন্দোলনের মূল কেন্দ্র বা ‘লঞ্চপ্যাড’ হিসেবে বেছে নিল খোরাসানকে (Khorasan)। বর্তমান ইরান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এই বিশাল অঞ্চলটি ছিল বাগদাদ বা দামেস্ক থেকে অনেক দূরে। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা – এই দুই মিলিয়ে খোরাসান ছিল বিপ্লবীদের স্বর্গরাজ্য। সেখানকার জনমিতি বা ডেমোগ্রাফি (Demography) ছিল অদ্ভুত। সেখানে ছিল প্রচুর পারসিক মুসলিম, যারা উমাইয়াদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক সুলভ আচরণে ত্যক্ত-বিরক্ত। আবার সেখানে ছিল অনেক আরব সৈনিক, যারা উমাইয়া শাসকদের বেতন বৈষম্য এবং গোত্রীয় রাজনীতির শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ ছিল। খোরাসান ছিল এক বারুদের স্তূপ, দরকার ছিল কেবল একটি স্ফুলিঙ্গের।
এই বারুদে আগুন দেওয়ার জন্য আব্বাসীয়দের দরকার ছিল একজন দক্ষ কারিগরের, একজন জাদুকরের, যিনি মানুষকে সম্মোহিত করতে পারেন। তারা খুঁজে পেল সেই কারিগরকে – আবু মুসলিম খোরাসানি (Abu Muslim Khorasani)। ইতিহাসের পাতায় তিনি এক রহস্যপুরুষ। কেউ নিশ্চিত করে জানে না তার আসল পরিচয় কী, তিনি আরব ছিলেন নাকি পারসিক, নাকি কোনো কৃতদাস। সম্ভবত তিনি ছিলেন একজন পারসিক কৃতদাস, যার মেধা এবং নিষ্ঠুরতা তাকে জিরো থেকে হিরো বানিয়েছিল। ৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় ইমাম তাকে খোরাসানে পাঠান বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। আবু মুসলিম জানতেন, কেবল যুক্তি দিয়ে মানুষকে যুদ্ধে নামানো যায় না, দরকার আবেগ এবং প্রতীক। তিনি মসিহবাদ (Messianism) বা ত্রাণকর্তার ধারণাকে কাজে লাগালেন। তিনি প্রচার করলেন যে, শিগগিরই একজন ত্রাণকর্তা বা মাহদি (Mahdi) আসছেন, যিনি পৃথিবীকে পাপমুক্ত করবেন।
আবু মুসলিমের বাগ্মিতা ছিল প্রলয়ঙ্করী। তিনি খোরাসানের গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করলেন। তিনি সেখানকার আরব গোত্রগুলোর মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিবাদ – ইয়ামানি বনাম মুদারি দ্বন্দ্ব – খুব কৌশলে ব্যবহার করলেন। উমাইয়ারা সাধারণত মুদারি বা কায়েস গোত্রের সমর্থন করত, তাই আবু মুসলিম ইয়ামানি গোত্রগুলোকে নিজের দলে ভিরিয়ে নিলেন। অর্থাৎ, তিনি আরবদের দিয়েই আরবদের মারার ব্যবস্থা করলেন। তার নির্দেশে বিপ্লবীরা কালো পোশাক পরল, ওড়ালো কালো পতাকা। এই ‘কালো পতাকা’ বা ব্ল্যাক ব্যানার (Black Banners) ছিল আব্বাসীয়দের প্রতীক। এর পেছনেও ছিল মনস্তাত্ত্বিক খেলা। কালো রং শোকের প্রতীক, আবার এটি আসন্ন ঝড়ের ইঙ্গিত দেয়। তারা বলত, এই কালো রং হলো সেই অন্ধকার রাতের প্রতীক, যে রাতের শেষে আসবে নতুন ভোর। আবার কেউ কেউ বলত, এটি শেষ জমানার যুদ্ধের সংকেত। মানুষ এই প্রতীকের নিচে জড়ো হলো পঙ্গপালের মতো (Crone, 1980)।
আবু মুসলিম খোরাসানি কেবল একজন সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি পারসিক জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামের সাম্যবাদ – এই দুই ভিন্ন ধারাকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। তিনি মাওয়ালিদের বোঝালেন, আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় এলে আরব-অনারব ভেদাভেদ থাকবে না। তিনি কৃষকদের প্রতিশ্রুতি দিলেন কর কমানোর। ফলে তার সেনাবাহিনীতে কেবল সৈনিক নয়, যোগ দিল হাজার হাজার সাধারণ কৃষক, কামার, কুমার। এটি আর কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল রইল না, এটি রূপ নিল একটি গণবিপ্লবে। ৭৪৮ সালে আবু মুসলিম যখন মার্ভ দখল করলেন, তখন উমাইয়া গভর্নর নাসর ইবনে সায়ার দামেস্কে চিঠি লিখেছিলেন, “আমি ছাইয়ের নিচে আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখতে পাচ্ছি, যা শিগগিরই দাবানল হয়ে জ্বলে উঠবে। আমি বুঝতে পারছি না যারা এগিয়ে আসছে তারা কি মানুষ নাকি জিন।” খলিফা মারওয়ান সেই চিঠির গুরুত্ব দেননি, যখন দিলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আবু মুসলিমের নেতৃত্বে এই বাহিনী যখন পশ্চিম দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন তাদের সামনে কোনো বাধাই টিকতে পারছিল না। কারণ, উমাইয়া সৈন্যরা লড়ছিল কেবল বেতনের জন্য, আর আবু মুসলিমের সৈন্যরা লড়ছিল একটি বিশ্বাসের জন্য, একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্নের জন্য। যদিও সেই স্বপ্ন ছিল আব্বাসীয়দের তৈরি করা এক সুনিপুণ মরীচিকা। আব্বাসীয় নেতারা তখনো আড়ালে, তারা সামনে আনেনি কাকে তারা খলিফা বানাবে। এই ধোঁয়াশা বজায় রাখা ছিল তাদের চূড়ান্ত বিজয়ের চাবিকাঠি। আবু মুসলিম জানতেন, নেতার নাম ঘোষণা করলেই ঐক্যে ফাটল ধরবে। তাই তিনি ‘অদেখা’ নেতার নামে আনুগত্য আদায় করে নিলেন। রাজনীতিতে অদৃশ্য শক্তি অনেক সময় দৃশ্যমান শক্তির চেয়ে বেশি প্রবল হয়, আব্বাসীয় বিপ্লব তার ধ্রুপদী উদাহরণ (Daniel, 1979)।
পরিশেষে, জাবের যুদ্ধের ময়দানে যখন উমাইয়া বাহিনী আব্বাসীয়দের মুখোমুখি হলো, তখন তা কেবল দুটি সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না। সেটি ছিল দুটি মতাদর্শের যুদ্ধ। একদিকে উমাইয়াদের ক্ষয়িষ্ণু, দাম্ভিক এবং আরব-কেন্দ্রিক রাজতন্ত্র; অন্যদিকে আব্বাসীয়দের নেতৃত্বে এক বহুজাতিগত, ক্ষুব্ধ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় মত্ত জনস্রোত। উমাইয়াদের পতন অনিবার্য ছিল, কারণ তারা সময়ের দেয়াললিখন পড়তে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা বুঝতে পারেনি যে, তরবারি দিয়ে মানুষের শরীর দখল করা যায়, কিন্তু মন দখল করতে হলে দরকার হয় গল্পের, দরকার হয় স্বপ্নের। আব্বাসীয়রা মানুষকে সেই গল্পটিই শুনিয়েছিল – সাম্যের গল্প, সুবিচারের গল্প। যদিও ক্ষমতায় বসার পর সেই গল্পটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে সময় লাগেনি, কিন্তু বিপ্লবের সেই মুহূর্তগুলোতে হাশিমী প্রোপাগান্ডা ছিল অপ্রতিরোধ্য। মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে কীভাবে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করা যায়, আব্বাসীয়দের এই উত্থানপর্ব তার এক নিখুঁত পাঠ্যবই।
কালো পতাকার উত্থান: আবু মুসলিম এবং জাবের যুদ্ধ
ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে মাঝে মাঝে এমন কিছু চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে, যারা কোনো রাজা নন, কোনো সম্রাট নন, অথচ রাজাদের ভাগ্য তাদের হাতেই লেখা থাকে। আবু মুসলিম খোরাসানি ছিলেন তেমনই এক চরিত্র – একজন ‘কিংমেকার’, যার নিজের কোনো মুকুট ছিল না, কিন্তু যার ইশারায় মুকুট বদল হতো। তাকে ঘিরে যে রহস্যের ধুম্রজাল, তা আজও ঐতিহাসিকদের ধাঁধায় ফেলে দেয়। কেউ জানে না তার আসল পরিচয় কী। কেউ বলে তিনি ছিলেন একজন সাধারণ ক্রীতদাস, কেউ বলে তিনি ছিলেন শেষ পারসিক সম্রাটের বংশধর, আবার কারো মতে তিনি ছিলেন আরব। তবে তার পরিচয় বা বংশলতিকা (Genealogy) আব্বাসীয়দের কাছে মুখ্য ছিল না; মুখ্য ছিল তার কারিশম্যাটিক নেতৃত্ব (Charismatic Leadership) এবং সাংগঠনিক দক্ষতা। তিনি ছিলেন সেই জাদুকর, যিনি শূন্য থেকে এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। খোরাসানের রুক্ষ মাটিতে তিনি বিপ্লবের যে বীজ বুনেছিলেন, তা ছিল মূলত মসিহবাদ (Messianism) বা ত্রাণকর্তার ধারণার ওপর ভিত্তি করে। তিনি মানুষকে এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যেখানে কোনো অন্যায় থাকবে না, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতীক ছিল ‘কালো পতাকা’। আব্বাসীয়দের এই কালো পতাকা কেবল কাপড়ের টুকরো ছিল না; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতীকবাদ (Political Symbolism)। হাদিসে বর্ণিত শেষ জামানার যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণীকে কাজে লাগিয়ে তারা প্রচার করেছিল যে, পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকাবাহী দল আসবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। এই মনস্তাত্ত্বিক খেলায় আবু মুসলিম ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ – কৃষক, কারিগর, এবং বঞ্চিত সৈনিকরা – জড়ো হতে লাগল, যেন তারা কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধে নয়, বরং এক পবিত্র ধর্মযুদ্ধে নামছে।
৭৪৭ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসে সিকাদঞ্জ গ্রামে আবু মুসলিম প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন করেন। সেই মুহূর্তটি ছিল মুসলিম ইতিহাসের এক ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’। তিনি কেবল আবেগ দিয়েই কাজ সারেননি, তিনি ছিলেন একজন ঠান্ডা মাথার সামরিক কৌশলী। খোরাসানে বসবাসরত আরব গোত্রগুলোর মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব – ইয়ামানি বনাম মুদারি – তিনি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন। উমাইয়া গভর্নর নাসর ইবনে সায়ার যখন বুঝতে পারলেন কী ঘটছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। নাসরের সেই বিখ্যাত উক্তি, “হে উমাইয়ারা! তোমরা কি ঘুমাচ্ছ? আমি কিন্তু প্রলয় দেখতে পাচ্ছি” – ইতিহাসের পাতায় এক করুণ সতর্কবাণী হয়ে আছে। আবু মুসলিমের বাহিনী যখন পশ্চিম দিকে এগোতে শুরু করল, তখন তাদের থামানোর সাধ্য কারো ছিল না। তারা কুফা দখল করল এবং সেখানেই ৭৪৯ সালে আবুল আব্বাসকে প্রথম খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হলো। তবে আসল ফয়সালা তখনো বাকি। উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ান তখনো বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছেন। চূড়ান্ত খেলাটি অনুষ্ঠিত হবে টাইগ্রিস বা দজলা নদীর একটি শাখা নদী, গ্রেট জাবের তীরে।
জাবের যুদ্ধ: যেখানে ভাগ্য নির্ধারিত হলো
৭৫০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাস। উত্তর ইরাকের হাড়কাঁপানো শীত। জাব নদীর দুই তীরে মুখোমুখি হলো দুই বিশাল বাহিনী। একদিকে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্যের সুসজ্জিত বাহিনী, অন্যদিকে আব্বাসীয় সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে আলীর (যিনি ছিলেন আবু মুসলিমের অনুগত এবং আব্বাসীয় পরিবারের সদস্য) নেতৃত্বে তুলনামূলক ছোট বাহিনী। কিন্তু যুদ্ধে সংখ্যাতত্ত্ব সব সময় কাজ করে না, যা কাজ করে তা হলো মনোবল (Morale) এবং কৌশল। উমাইয়া বাহিনী ছিল আকারে বিশাল, কিন্তু তাদের ভেতরে ছিল পচনের গন্ধ। সৈনিকরা ছিল ক্লান্ত, বেতন নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং গোত্রীয় দ্বন্দ্বে জর্জরিত। খলিফা মারওয়ান ছিলেন একজন দক্ষ যোদ্ধা, কিন্তু তার সেনাপতিরা তাকে বিশ্বাস করত না। অন্যদিকে, আব্বাসীয় বাহিনী ছিল ‘খোরাসানি স্পিরিট’-এ উজ্জীবিত। তারা লড়ছিল এমন এক গভীর বিশ্বাস বা মতাদর্শগত প্রত্যয় (Ideological Conviction) নিয়ে, যা মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে দেয়।
যুদ্ধের ময়দানে আব্বাসীয়রা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করল, যা বর্শা প্রাচীর (Spear Wall) নামে পরিচিত। উমাইয়াদের প্রধান শক্তি ছিল তাদের অশ্বারোহী বাহিনী বা ক্যাভালরি। আব্বাসীয় পদাতিক সৈন্যরা হাঁটু গেড়ে বসে বর্শাগুলো মাটির দিকে তাক করে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করল। যখন উমাইয়া অশ্বারোহীরা চার্জ করল, তখন তারা এই বর্শার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ঘোড়াগুলো বর্শার আঘাতে আহত হয়ে নিজেদের সৈনিকদেরই পদদলিত করতে শুরু করল। যুদ্ধের এই পর্যায়ে আব্বাসীয়দের শৃঙ্খলা ছিল দেখার মতো। তারা একচুলও নড়েনি। উমাইয়া বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লে খলিফা মারওয়ান একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার সৈন্যরা হয়তো পালিয়ে যাবে, তাই তিনি পেছনের ব্রিজটি কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এটি ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পালানোর পথ বন্ধ দেখে উমাইয়া সৈন্যরা মরণপণ যুদ্ধ করার বদলে আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দিল। হাজার হাজার সৈনিক তরবারির আঘাতে নয়, বরং জাব নদীর হিমশীতল জলে ডুবে মারা গেল। কথিত আছে, নদীর জল মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল এবং মৃতদেহের স্তূপের কারণে নদীর স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। মারওয়ান কোনোমতে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেন, কিন্তু তার সাম্রাজ্য সেখানেই সলিল সমাধি লাভ করল। এই যুদ্ধের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, একটি পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যকে কেবল সংখ্যার জোরে টিকিয়ে রাখা যায় না, যদি না তার রাজনৈতিক বৈধতা (Political Legitimacy) থাকে (Kennedy, 2004)।
মারওয়ানের পলায়ন ছিল এক করুণ অধ্যায়। তিনি ইরাক থেকে সিরিয়া, সিরিয়া থেকে প্যালেস্টাইন, এবং শেষ পর্যন্ত মিশরে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু আব্বাসীয়রা ছিল শিকারি কুকুরের মতো নাছোড়বান্দা। তারা তাকে ধাওয়া করে মিশরের এক ছোট গ্রাম বুসিরে ধরে ফেলে এবং হত্যা করে। এর মাধ্যমে উমাইয়াদের ৯০ বছরের শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু আব্বাসীয়রা কেবল জয়েই সন্তুষ্ট ছিল না; তারা চেয়েছিল উমাইয়াদের অস্তিত্বই পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে। এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়, যা রক্ত আর নিষ্ঠুরতার কালিতে লেখা।
আস-সাফফাহ: রক্তপিপাসু নাকি মহাদাতা?
বিপ্লবের পর ক্ষমতায় বসলেন আবুল আব্বাস। কুফার মসজিদে দাঁড়িয়ে তিনি যে প্রথম ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা ছিল একই সাথে ভীতিকর এবং প্রলোভনপূর্ণ। তিনি নিজেকে ‘আস-সাফফাহ’ (As-Saffah) উপাধিতে ভূষিত করলেন। আরবি ভাষায় এই শব্দটির একটি দ্বৈত অর্থ বা অর্থগত অস্পষ্টতা (Semantic Ambiguity) রয়েছে। এর সাধারণ অর্থ হলো ‘রক্তপিপাসু’ বা যে প্রচুর রক্তপাত ঘটিয়েছে। আবার প্রাচীন আরবিতে এর আরেকটি অর্থ হলো ‘মহাদাতা’ বা যে উদারহস্তে দান করে (যেমন করে জবাই করা পশুর রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়)। আবুল আব্বাস হয়তো বুঝিয়েছিলেন যে, শত্রুদের জন্য তিনি যমদূত, আর বন্ধুদের জন্য তিনি অবারিত দাতা। তবে ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে তার প্রথম অর্থটির জন্যই। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, বিপ্লব সফল হওয়ার পর বিপ্লবীরা অনেক সময় পূর্ববর্তী শাসকদের চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। আব্বাসীয়রা প্রচার করেছিল তারা ‘নবী পরিবারের’ শাসন কায়েম করবে, যেখানে থাকবে দয়া আর ন্যায়বিচার। কিন্তু আস-সাফফাহ দেখালেন, রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখতে হলে দয়া জিনিসটা বিসর্জন দিতে হয়। তিনি উমাইয়াদের প্রতি যে নীতি গ্রহণ করলেন, তাকে আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় গণহত্যা (Genocide) বা জাতিগত নির্মূল অভিযান।
আস-সাফফাহ কেবল জীবিত উমাইয়াদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি মৃতদের ওপরও প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এটি ছিল নেক্রোপলিটিক্স (Necropolitics) বা মৃতদেহের রাজনীতির এক জঘন্য উদাহরণ। তার নির্দেশে দামেস্কের উমাইয়া খলিফাদের কবর খোঁড়া হলো। মুয়াবিয়া, এজিদ, আব্দুল মালিক – কারো কবর রেহাই পেল না। কথিত আছে, খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের লাশ যখন কবর থেকে তোলা হয়, তখনো তা পুরোপুরি পচেনি। আব্বাসীয়রা সেই লাশকে চাবুক মেরে, জনসম্মখে ঝুলিয়ে রেখে, শেষে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা জনগণকে এই বার্তা দিতে চেয়েছিল যে, উমাইয়ারা এতটাই অভিশপ্ত যে তাদের কবরেও শান্তি পাওয়ার অধিকার নেই। এই ধরনের আচরণ কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল না, এটি ছিল উমাইয়াদের স্মৃতি ও ইতিহাসকে মুছে ফেলার এক ক্যালকুলেটেড ইরেজার (Calculated Erasure) বা পরিকল্পিত বিস্মৃতির রাজনীতি।
রক্তের ভোজসভা: আভিজাত্যের চূড়ান্ত পতন
আস-সাফফাহর নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে লোমহর্ষক এবং কুখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিল ফিলিস্তিনের আবু ফুতরুস নামক স্থানে (মতান্তরে হিরায়)। উমাইয়া রাজবংশের যারা তখনো লুকিয়ে ছিল বা পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, আস-সাফফাহ তাদের জন্য এক সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, “অতীত ভুলে যাও, আমরা এখন ভাই ভাই। এসো, আমরা একসাথে ভোজন করি এবং নতুন যুগের সূচনা করি।” জীবন বাঁচানোর আশায় এবং নতুন খলিফার মহানুভবতায় বিশ্বাস করে প্রায় ৮০ জন উমাইয়া রাজপুত্র এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সেই ভোজসভায় উপস্থিত হলেন। পরিবেশটা ছিল জমকালো। সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ, নরম গালিচা, আর রাজকীয় আতিথেয়তা। কিন্তু এই আতিথেয়তা ছিল এক মরণফাঁদ।
খাওয়া যখন মাঝপথে, সবাই যখন নিশ্চিন্ত মনে গল্পগুজব করছে, ঠিক তখনই আস-সাফফাহর ইশারায় একদল খোরাসানি রক্ষী খোলা তরবারি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। কোনো কথা বা বিচার ছাড়াই তারা অতিথিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে ভোজসভা পরিণত হলো এক কসাইখানায়। ৮০ জন মেহমানকে সেখানেই পিটিয়ে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হলো। কারো কারো মৃত্যু নিশ্চিত হলো, আবার কেউ কেউ হয়তো তখনো আধমরা হয়ে কাতরাচ্ছিল। কিন্তু আস-সাফফাহর নিষ্ঠুরতার তখনো বাকি ছিল। তিনি নির্দেশ দিলেন মৃত এবং অর্ধমৃত দেহগুলোর ওপর চামড়ার বড় বড় চাদর বিছিয়ে দিতে। এরপর সেই চাদরের ওপর আবার নতুন করে খাবার পরিবেশন করা হলো। আস-সাফফাহ এবং তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীরা সেই লাশের স্তূপের ওপর বসে পুনরায় খাওয়া শুরু করলেন। নিচে তখনো হয়তো কেউ কেউ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছিল, তাদের গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু আস-সাফফাহ নির্বিকার চিত্তে খাবার উপভোগ করলেন এবং সঙ্গীদের সাথে হাস্যরসে মেতে উঠলেন। তিনি বলেছিলেন, “এই খাবারের মতো সুস্বাদু খাবার আমি জীবনে আর খাইনি, কারণ এর সাথে মিশে আছে আমার শত্রুদের বিনাশের তৃপ্তি।”
এই ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল ম্যাকিয়াভেলিয়ান (Machiavellian) রাজনীতির এক চরম বহিঃপ্রকাশ, যদিও ম্যাকিয়াভেলির জন্ম হতে তখনো বহু দেরি। আস-সাফফাহ এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন যে, আব্বাসীয়দের বিরোধিতা করার পরিণতি কী হতে পারে। তিনি চেয়েছিলেন উমাইয়া বংশের এমন কোনো পুরুষ যেন বেঁচে না থাকে, যে ভবিষ্যতে তাদের চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে ইতিহাসের পরিহাস হলো, এই হত্যাকাণ্ড থেকে একজন উমাইয়া রাজপুত্র অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন – তার নাম আব্দুর রহমান। তিনি পালিয়ে স্পেনে চলে যান এবং সেখানে এক নতুন উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু প্রাচ্যে আব্বাসীয়রা তাদের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে সক্ষম হয়েছিল। এই ‘রক্তের ভোজসভা’ বা Banquet of Blood ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে, যা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার লড়াইয়ে মানুষ পশুর চেয়েও অধম হতে পারে (Hitti, 1970; Lassner, 1980)।
আস-সাফফাহর রাজত্বকাল খুব দীর্ঘ ছিল না, মাত্র চার বছর। কিন্তু এই চার বছরে তিনি যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করেছিল। তিনি এবং তার ভাই আল-মনসুর মিলে যে রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করেছিলেন, তা ছিল কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রিত। তারা আবু মুসলিম খোরাসানিকে ব্যবহার করেছিলেন উমাইয়াদের পতনের জন্য, আবার কাজ শেষে তাকেও ছুড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করেননি। আবু মুসলিমের জনপ্রিয়তা যখন আস-সাফফাহ এবং পরবর্তীতে মনসুরের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াল, তখন তাকেও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল। যে কালো পতাকার নিচে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল সাম্যের আশায়, সেই পতাকাই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল একনায়কতন্ত্রের প্রতীক। আব্বাসীয় বিপ্লব সফল হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। তারা কেবল এক প্রভুর বদলে আরেক প্রভুকে পেয়েছিল, আর সাথে পেয়েছিল একরাশ স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করে, বিপ্লব তার নিজের সন্তানদেরই খেয়ে ফেলে, আর ক্ষমতার মসনদ চিরকালই পিচ্ছিল – তা রক্ত দিয়ে ভেজানো থাকে বলেই হয়তো।
প্রকৃত স্থপতি: আল-মনসুর এবং গোলকধাঁধার শহর বাগদাদ
ইতিহাসের পাতায় আস-সাফফাহ ছিলেন আব্বাসীয় বিপ্লবের অগ্নিমুখ, কিন্তু সেই আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে যিনি একটি দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যের ইস্পাত-কঠিন কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন, তিনি হলেন আবু জাফর আল-মনসুর (Abu Ja’far al-Mansur)। ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি খলিফার মসনদে বসেন, তখন পরিস্থিতি ছিল নড়বড়ে। চারদিকে বিদ্রোহের আগুন, ঘরের ভেতরে ষড়যন্ত্র, আর বাইরে উমাইয়াদের প্রেতাত্মা। মনসুর ছিলেন একাধারে একজন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক এবং আবেগহীন, ঠান্ডা মাথার খুনি। তার চরিত্রটি ছিল স্ববিরোধিতায় পূর্ণ; তিনি কবিতা ভালোবাসতেন কিন্তু কবিদের হত্যা করতে দ্বিধা করতেন না; তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, আবার চরম কৃপণতার জন্য লোকে তাকে আড়ালে ডাকত ‘আবু আল-দাওয়ানিক’ বা ‘পয়সাওয়ালা বাবা’ বলে। তিনি জানতেন, উমাইয়াদের পুরনো রাজধানী দামেস্কে বসে এই নতুন সাম্রাজ্য চালানো যাবে না। সিরিয়া ছিল উমাইয়াদের দুর্গ, সেখানকার বাতাসও যেন আব্বাসীয়দের শত্রু। অন্যদিকে কুফা বা আনবার – শহরগুলো ছিল অস্থিরমতি শিয়াদের আখড়া। মনসুরের দরকার ছিল একটি ‘টাবুলারাসা’ বা অলিখিত স্লেট, যেখানে তিনি নিজের মতো করে ক্ষমতার মানচিত্র আঁকতে পারবেন। তিনি এমন এক জায়গা খুঁজছিলেন, যা হবে ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। দজলা (টাইগ্রিস) ও ফোরাত (ইউফ্রেটিস) – মেসোপটেমিয়ার এই দুই প্রাণভোমরার সংযোগস্থলের কাছাকাছি, প্রাচীন পারসিক রাজধানী টেসিফোনের ধ্বংসাবশেষের কাছে তিনি খুঁজে পেলেন সেই স্বপ্নের মাটি। জায়গাটি ছিল উর্বর, জলপথে বাণিজ্যের জন্য আদর্শ এবং সামরিকভাবে সুরক্ষিত।
মদিনাতুস সালাম: গোলকধাঁধার জ্যামিতিক দর্শন
৭৬২ খ্রিস্টাব্দ। দজলা বা টাইগ্রিস নদীর পশ্চিম তীরে শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাভিলাষী নির্মাণযজ্ঞ। মনসুর তার নতুন রাজধানীর নাম দিলেন ‘মদিনাতুস সালাম’ (Madinat al-Salam), যার অর্থ শান্তির নগরী। কিন্তু ইতিহাসের কৌতুক হলো, শান্তির এই নগরী তার জীবদ্দশাতেই হয়ে উঠেছিল ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার রক্তক্ষয়ী নাট্যমঞ্চ। লোকমুখে অবশ্য এর নাম হয়ে গেল বাগদাদ। এই নামের উৎপত্তি নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকের মতে, এটি প্রাক-ইসলামী যুগের একটি পারসিক নাম, যার অর্থ ‘ঈশ্বরের দান’ (God-given)। আবার কারো মতে, ‘বাগ’ মানে বাগান আর ‘দাদ’ মানে দান। মনসুর অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক শহর, যার নকশা দেখেই শত্রুর বুকে কাঁপন ধরবে। তিনি নির্দেশ দিলেন শহরটি হবে সম্পূর্ণ বৃত্তাকার। এই বৃত্তাকার নগর পরিকল্পনা (Circular Urban Planning) কেবল নান্দনিকতার জন্য ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক প্রতীকবাদ (Political Symbolism) এবং সামরিক কৌশল। বৃত্তের কোনো শুরু বা শেষ নেই; এর সব বিন্দু কেন্দ্র থেকে সমান দূরে। মনসুর নিজেকে এবং তার প্রাসাদকে রাখলেন সেই কেন্দ্রের বিন্দুতে। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে এক নীরব বার্তা দিলেন – খলিফাই হলেন মহাবিশ্বের অক্ষ, পৃথিবী তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। ইউক্লিডীয় জ্যামিতির এই রাজনৈতিক প্রয়োগ ইতিহাসে বিরল (Bennison, 2009)।
শহরটির নির্মাণশৈলী ছিল দুর্ভেদ্য। একে ঘিরে ছিল তিনটি বিশাল প্রাচীর। বাইরের প্রাচীরটি ছিল গভীর পরিখা বা খালের দ্বারা সুরক্ষিত। এরপর ছিল ফাঁকা জায়গা, তারপর ভেতরের মূল প্রাচীর। এই প্রাচীরগুলো ছিল এতটাই চওড়া যে, এর ওপর দিয়ে অনায়াসে ঘোড়া দৌড়ানো যেত। শহরের চারটি প্রধান তোরণ ছিল – কুফা তোরণ, বসরা তোরণ, খোরাসান তোরণ এবং দামেস্ক তোরণ। এই চারটি নাম কেবল চারটি দিক নির্দেশ করত না, বরং আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের চারটি প্রধান শক্তি কেন্দ্রের প্রতীক ছিল। প্রতিটি তোরণের ওপর ছিল বিশাল গম্বুজ এবং প্রহরী কক্ষ। তোরণগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে, সরাসরি শহরে ঢোকা যেত না; বরং একটি বাঁকানো পথ বা বেন্ট এন্ট্রান্স (Bent Entrance) দিয়ে ঢুকতে হতো, যা ছিল তৎকালীন সামরিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর ফলে শত্রুবাহিনী চাইলেই সোজা আক্রমণ করে গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকতে পারত না। শহরের ঠিক মাঝখানে ছিল খলিফার প্রাসাদ, যার নাম ছিল ‘গোল্ডেন গেট প্যালেস’ বা বাব আল-ধাহাব। প্রাসাদের পাশেই ছিল প্রধান মসজিদ। এই প্রাসাদের চূড়ায় ছিল একটি বিশাল সবুজ গম্বুজ (Green Dome), যা বহু দূর থেকে দেখা যেত। কথিত আছে, গম্বুজের ওপর ছিল একটি অশ্বারোহীর মূর্তি, যার হাতে ছিল একটি বর্শা। বাতাসের গতিতে মূর্তিটি ঘুরত এবং বর্শার ফলা যেদিকে নির্দেশ করত, খলিফা মনে করতেন সেদিক থেকেই শত্রুর আক্রমণ আসবে। এটি হয়তো লোককথা, কিন্তু এটি প্রমাণ করে যে খলিফার নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কী পরিমাণ মিথ চালু ছিল।
মনসুরের বাগদাদ ছিল একটি কসমিক মডেল বা মণ্ডল (Mandala)। তিনি শহরের ভেতরে সাধারণ মানুষকে থাকতে দেননি। বৃত্তাকার শহরের ভেতরে বা ‘রাউন্ড সিটি’-তে কেবল খলিফার বিশ্বাসভাজন সেনাপতি, উচ্চপদস্থ আমলা এবং তার দেহরক্ষীরা থাকত। সাধারণ বাজার এবং জনবসতি গড়ে উঠেছিল শহরের দেয়ালের বাইরে, যা আল-কার্খ (Al-Karkh) নামে পরিচিত ছিল। মনসুর বলেছিলেন, “আমি চাই না বাজারের হট্টগোল এবং সাধারণ মানুষের নিঃশ্বাস আমার প্রাসাদের পবিত্রতা নষ্ট করুক।” এই নগর বিভাজন (Urban Segregation) ছিল আব্বাসীয় শাসনের এক বড় বৈশিষ্ট্য – শাসক ও শাসিতের মধ্যে দেওয়াল তুলে দেওয়া। উমাইয়া খলিফারা যেখানে জনগণের সাথে মিশতেন, আব্বাসীয়রা সেখানে হয়ে উঠলেন অদৃশ্য দেবতা, যারা কেবল পর্দার আড়াল থেকেই হুকুম দেন। বাগদাদ হয়ে উঠল এক গোলকধাঁধা, যেখানে ঢুকলে বের হওয়ার পথ পাওয়া কঠিন, আর খলিফার কাছে পৌঁছানো তো আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো (Lassner, 1980)।
নক্ষত্রের ইশারা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা: জ্যোতির্বিজ্ঞানের রাজনৈতিক ব্যবহার
বাগদাদ শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনক্ষণ ঠিক করার ঘটনাটি আব্বাসীয়দের মানসজগৎ বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। মনসুর কোনো ধর্মীয় নেতা বা ইমামকে ডেকে দিনক্ষণ ঠিক করতে বলেননি। তিনি ডেকেছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন নওবাখত (Nawbakht), একজন পারসিক জরাথুস্ট্রবাদী যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করেন, এবং মাশাল্লাহ (Mashallah), একজন পারসিক ইহুদি। তারা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করে, বিশেষ করে বৃহস্পতি বা জুপিটার গ্রহের অবস্থান দেখে ৭৬২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুলাই তারিখটি নির্ধারণ করেন। তাদের গণনা অনুযায়ী, এই সময়ে সিংহ রাশিতে সূর্যের অবস্থান এবং অন্যান্য গ্রহের বিন্যাস এমন ছিল যে, এই শহরে কখনো কোনো খলিফা যুদ্ধে মারা যাবেন না। অদ্ভুতভাবে, আব্বাসীয় খলিফারা আততায়ীর হাতে বা বিষপ্রয়োগে মারা গেলেও, বাগদাদের ভেতরে কোনো যুদ্ধে বা অবরোধে খলিফার মৃত্যুর ঘটনা ১২৫৮ সালের মঙ্গোল আক্রমণের আগ পর্যন্ত ঘটেনি।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের মতো কেবল আরব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। তারা পারসিকদের সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation) এবং প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে লাগাতে শুরু করেছিল। মনসুর জানতেন, একটি বিশ্বসাম্রাজ্য চালাতে হলে ধর্মের পাশাপাশি যুক্তি, বিজ্ঞান এবং প্রাচীন জ্ঞানের সংমিশ্রণ দরকার। নওবাখত এবং মাশাল্লাহর মতো অনারব পণ্ডিতদের এই গুরুত্ব দেওয়াটা ছিল এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এখান থেকেই পরবর্তীতে বায়তুল হিকমাহ বা ‘হাউজ অফ উইজডম’-এর বীজের অঙ্কুরোদগম হয়। মনসুর নিজেই ইউক্লিডীয় জ্যামিতি এবং পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী ছিলেন। তিনি ভারত থেকে আসা কঙ্কহ (Kankah) নামের এক পণ্ডিতের মাধ্যমে ভারতীয় জোতির্বিদ্যার বই ‘সিদ্ধান্ত‘ আরবিতে অনুবাদ করার ব্যবস্থা করেন। বাগদাদ নির্মাণের এই ‘বৈজ্ঞানিক‘ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষ‘ পদ্ধতি প্রমাণ করে যে, আব্বাসীয়রা ছিল মূলত একটি প্রাগমেটিক (Pragmatic) বা প্রয়োগবাদী শক্তি, যারা ক্ষমতার প্রয়োজনে যেকোনো উৎস থেকে জ্ঞান নিতে প্রস্তুত ছিল।
আবু মুসলিম: রাজার চেয়েও বড় রাজা এবং বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি
বাগদাদ যখন ইটের পর ইট গেঁথে মাথা তুলছে, তখন মনসুরের মনে অন্য এক ঝড়। সেই ঝড়ের নাম আবু মুসলিম খোরাসানি। আব্বাসীয় বিপ্লবের এই মহানায়ক তখন খোরাসানের গভর্নর, কিন্তু তার ক্ষমতা খলিফার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন কিংমেকার (Kingmaker)। মনসুর জানতেন, আবু মুসলিমের আঙুলের ইশারায় খোরাসান থেকে লক্ষ লক্ষ সৈন্য বাগদাদে ধেয়ে আসতে পারে। রাজনীতিতে একটি নির্মম সত্য আছে – রাজার কোনো বন্ধু থাকে না, থাকে কেবল স্বার্থ। আর যখন কোনো প্রজা রাজার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন তার বেঁচে থাকার অধিকার ফুরিয়ে যায়। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় প্রিটোরিয়ানইজম (Praetorianism) বা সেনাবাহিনীর অত্যধিক ক্ষমতার সংকট, যা মনসুর শুরুতেই দমন করতে চেয়েছিলেন।
মনসুর অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে ফাঁদ পাতলেন। তিনি আবু মুসলিমকে চিঠি লিখলেন, তাকে ‘ভাই’ এবং ‘আংকল’ বলে সম্বোধন করলেন। তিনি তাকে হজ করার পথে বাগদাদে এসে খলিফার আতিথেয়তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানালেন। আবু মুসলিমের উপদেষ্টারা তাকে বারণ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, “বাঘের গুহায় প্রবেশ করবেন না।” কিন্তু আবু মুসলিম ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, যার জন্য এই সিংহাসন, তাকে হত্যা করার সাহস মনসুরের হবে না। ৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে আবু মুসলিম বাগদাদে প্রবেশ করলেন। মনসুর তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন, কিন্তু তার মনে ছিল খুনের নেশা।
চূড়ান্ত দিনটিতে মনসুর তার ব্যক্তিগত রক্ষীদের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখলেন। তিনি তাদের নির্দেশ দিলেন, “আমি যখন হাতে তালি দেব, তখন তোমরা বেরিয়ে আসবে এবং এই লোকটির মাথা ধড় থেকে আলাদা করে ফেলবে।” আবু মুসলিম যখন খলিফার খাস কামরায় প্রবেশ করলেন, তখন মনসুর প্রথমে তার সাথে খোশগল্প শুরু করলেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি অভিযোগের ফর্দ খুললেন। তিনি বললেন, “তুমি অমুক সময়ে আমার আদেশ অমান্য করেছ, তুমি আমার চেয়ে নিজেকে বড় মনে করো।” আবু মুসলিম বিনীতভাবে উত্তর দিচ্ছিলেন, তার অতীতের ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “হে আমিরুল মুমিনিন, আমি সেই ব্যক্তি যে উমাইয়াদের পতন ঘটিয়েছে।” ঠিক তখনই মনসুর চিৎকার করে উঠলেন, “তুই কিছুই করিসনি! যা হয়েছে তা আমাদের ভাগ্যে ছিল, তুই কেবল একটা মাধ্যম ছিলি। এখন তুই আমার সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি।” সাথে সাথে তিনি তালি দিলেন। পর্দার আড়ালে থাকা উসমান ইবনে নাহিক এবং অন্য ঘাতকরা বেরিয়ে এল। আবু মুসলিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরবারির আঘাতে তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল বিপ্লবের নায়কের রক্ত।
আবু মুসলিমের লাশ একটি কার্পেটে মুড়িয়ে রাখা হলো। কিছুক্ষণ পর যখন সেনাপতি জাফর ইবনে হানজালা ঘরে ঢুকলেন এবং খলিফাকে আবু মুসলিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন মনসুর কার্পেটটি সরিয়ে লাশটি দেখালেন। সেনাপতি ভয়ে শিউরে উঠলেন। মনসুর তখন এক অট্টহাসি দিয়ে একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, যা ম্যাকিয়াভেলিয়ান (Machiavellian) দর্শনের সারসংক্ষেপ: “যে ব্যক্তি তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।” আবু মুসলিমের মৃত্যুতে খোরাসানে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল, কিন্তু মনসুর অত্যন্ত কঠোর হাতে তা দমন করেন। তিনি প্রমাণ করলেন, আব্বাসীয় খিলাফতে ‘কৃতজ্ঞতা’ বলে কোনো শব্দ নেই, আছে কেবল ‘আনুগত্য’ অথবা ‘মৃত্যু’ (Kennedy, 1990)।
প্রশাসনিক ইস্পাত এবং গোয়েন্দা জাল: উজির এবং বারিদ
মনসুর কেবল শহর বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য এক নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। উমাইয়ারা ছিল মূলত গোত্রপ্রধানদের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু মনসুর চাইলেন একটি কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসি (Bureaucracy)। তিনি পারসিক মডেলে ‘উজির’ বা ভিজিয়ার (Vizier) পদের প্রবর্তন করলেন। উজির ছিলেন খলিফার ডান হাত, প্রশাসনের প্রধান নির্বাহী। খালিদ আল-বার্মাকিকে তিনি উচ্চ পদে নিয়োগ দেন, যার মাধ্যমে পরবর্তীতে বার্মাকি পরিবারের উত্থান ঘটে। মনসুর বলতেন, “একটি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য চারটি স্তম্ভের দরকার: একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক, একজন কঠোর পুলিশ প্রধান, একজন দক্ষ অর্থমন্ত্রী এবং একজন বিশ্বস্ত ডাক বিভাগ।”
এই ‘ডাক বিভাগ’ বা বারিদ (Barid) ছিল মূলত তার গোয়েন্দা সংস্থা। মনসুরের গোয়েন্দা জাল ছিল নিখুঁত। বাজারের কুলি থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম – সবাই ছিল তার গোয়েন্দা। বলা হতো, বাগদাদের প্রতিটি দেয়ালে খলিফার কান পাতা আছে। কোনো গভর্নর যদি বিদ্রোহের চিন্তা করত, তবে সেই চিন্তা কাজে পরিণত করার আগেই খলিফার কাছে খবর পৌঁছে যেত। তিনি বাজারদর থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর রসদ – সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখতেন। তার কৃপণতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি প্রতিটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রার হিসাব নিতেন, এমনকি তেলের প্রদীপের খরচও নিজে তদারকি করতেন। তিনি বলতেন, “আজকের সঞ্চয় আগামীকালের যুদ্ধের রসদ।” এই কঠোর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার কারণেই তিনি তার উত্তরাধিকারীদের জন্য একটি উপচে পড়া রাজকোষ রেখে যেতে পেরেছিলেন।
মনসুরের শাসনামলে আলীর বংশধররা বা শিয়ারা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করেছিল। বিশেষ করে মদিনায় মুহাম্মদ আল-নাফস আল-জাকিয়্যা এবং বসরায় তার ভাই ইব্রাহিমের বিদ্রোহ ছিল প্রবল। মনসুর এই বিদ্রোহগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করেন। তিনি আলীর বংশধরদের অনেককে জ্যান্ত দেয়ালের ভেতর গেঁথে দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। তার এই নিষ্ঠুরতা এবং সন্দেহের বাতিক তাকে একাকী করে তুলেছিল। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, শাসকের কাজ ভালোবাসা পাওয়া নয়, শাসকের কাজ ভয় জাগিয়ে রাখা। বাগদাদের গোলকধাঁধায় বসে তিনি যে ক্ষমতার জাল বুনেছিলেন, তা পরবর্তী পাঁচশ বছর ধরে মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তিনি ছিলেন সেই স্থপতি, যিনি জানতেন সৌন্দর্যের চেয়ে শক্তির প্রয়োজন বেশি, আর ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের আয়ু দীর্ঘ।
হারুনুর রশীদ: মিথ, বাস্তবতা এবং বার্মাকি ট্র্যাজেডি
ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে এমন কিছু চরিত্রের আগমন ঘটে, যারা তাদের প্রকৃত সত্তাকে ছাপিয়ে এক বিশাল মিথ বা লোককথায় পরিণত হন। আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা হারুনুর রশীদ (Harun al-Rashid) হলেন তেমনই এক চরিত্র। ৭৮৬ থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত তার তেইশ বছরের শাসনকালকে বলা হয় আব্বাসীয়দের ‘স্বর্ণযুগ’। কিন্তু আমরা তাকে যতটা না ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে চিনি, তার চেয়ে বেশি চিনি ‘আরব্য রজনী’ বা One Thousand and One Nights–এর জাদুকরী গল্পের মাধ্যমে। গল্পের পাতায় তিনি এক রোমান্টিক নায়ক, যিনি রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে বাগদাদের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান, প্রজাদের সুখ-দুঃখের খবর নেন, আর তার সঙ্গী থাকে বিশ্বস্ত উজির জাফর বার্মাকি এবং জল্লাদ মাসরুর। কিন্তু রূপকথার এই রঙিন পর্দার আড়ালে যে হারুন লুকিয়ে ছিলেন, তিনি ছিলেন রক্তমাংসের এক জটিল মানুষ। তিনি ছিলেন একাধারে একজন ধর্মপ্রাণ শাসক, যিনি পায়ে হেঁটে হজে যেতেন, আবার অন্যদিকে তিনি ছিলেন এক চরম ভোগবাদী সম্রাট, যার হেরেম ছিল হাজারো নারী আর মদের স্রোতে ভাসমান। তার চরিত্রের এই দ্বৈততা (Duality) বা স্ববিরোধিতাই তাকে ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় এবং ভীতিকর চরিত্রে পরিণত করেছে। তিনি একদিকে বিজ্ঞান ও শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, অন্যদিকে ছিলেন সন্দেহবাতিকগ্রস্ত এক স্বৈরাচার, যিনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে কাছের বন্ধুকেও হত্যা করতে দ্বিধা করতেন না। হারুনের রাজত্বকাল ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শীর্ষবিন্দু (Cultural and Political Zenith), কিন্তু এই আলোর নিচেই ঘনীভূত হচ্ছিল এক গাঢ় অন্ধকার, যা পরবর্তীতে সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
ঐশ্বর্যের নগরী এবং শার্লামেনের সাথে বন্ধুত্ব
হারুনুর রশীদের সময়ে বাগদাদ কেবল একটি রাজধানী ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন পৃথিবীর হৃৎপিণ্ড। দজলা বা টাইগ্রিস নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহরটি ছিল প্রাচুর্যের এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী। চীন থেকে আসত রেশম ও পোর্সেলিন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসত মসলা, সুগন্ধি ও রঞ্জক পদার্থ, রাশিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আসত পশম ও অ্যাম্বার, আর আফ্রিকা থেকে আসত সোনা ও হাতির দাঁত। বাগদাদের বাজারগুলো ছিল বিশ্ব-বাণিজ্যের মিলনমেলা। এই বিশাল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক বা মার্কেন্টাইল সিস্টেম (Mercantile System) আব্বাসীয় অর্থনীতিকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। খলিফার রাজকোষ বা ‘বায়তুল মাল’ উপচে পড়ছিল দিরহাম আর দিনারে। কথিত আছে, খলিফার স্ত্রী জুবাইদা (Zubaydah) এতটাই বিলাসপ্রিয় ছিলেন যে, তার জুতায় দামি রত্ন খচিত থাকত এবং তিনি রৌপ্যপাত্র ছাড়া জল পান করতেন না। বাগদাদের এই জৌলুস ইউরোপের তৎকালীন অবস্থার সাথে তুলনা করলে মনে হয় যেন দুটি ভিন্ন গ্রহ। যখন বাগদাদের রাস্তায় রাতে ল্যাম্পপোস্ট জ্বলত, তখন লন্ডন বা প্যারিসের রাস্তা ছিল কাদা ও গোবরে পূর্ণ অন্ধকার এক জনপদ।
হারুনের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি ছিল বিশাল। তার সাথে সুদূর ফ্রান্সের ক্যারোলিনজিয়ান সম্রাট শার্লিমেনের (Charlemagne) বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। যদিও তাদের মধ্যে কখনো সরাসরি দেখা হয়নি, কিন্তু দূতের মাধ্যমে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল রিয়েলপলিটিক (Realpolitik) বা বাস্তববাদী রাজনীতি। উভয়েরই সাধারণ শত্রু ছিল স্পেনের উমাইয়া শাসক এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। তাই শত্রুর শত্রু বন্ধু – এই নীতিতে তারা একে অপরের মিত্র ছিলেন। ৮০২ খ্রিস্টাব্দে হারুন শার্লিমেনের কাছে এক জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিনিধিদল পাঠান। তারা সাথে নিয়ে গিয়েছিল দুর্লভ সব উপহার – দামি কাপড়, সুগন্ধি, এবং একটি বিশাল সাদা হাতি, যার নাম ছিল ‘আবুল আব্বাস’। হাতিটি দেখে ইউরোপীয়রা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।
তবে উপহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল একটি জটিল যান্ত্রিক জলঘড়ি বা ওয়াটার ক্লক (Water Clock)। এটি ছিল পিতলের তৈরি। প্রতি ঘণ্টায় এর ভেতর থেকে একটি করে ছোট ধাতব বল নিচে রাখা একটি পাত্রে পড়ত এবং শব্দ হতো। দুপুর বারোটার সময় বারোজন অশ্বারোহী পুতুল বেরিয়ে এসে বৃত্তাকারে ঘুরত। ঘড়িটির কারিগরি দক্ষতা দেখে শার্লিমেনের রাজসভার লোকেরা এতটাই ভড়কে গিয়েছিল যে, তারা ভেবেছিল এর ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো ডিমন আছে, যে কলকাঠি নাড়ছে। তারা ভয়ে ঘড়িটি ভেঙে ফেলার উপক্রম করেছিল। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে, অষ্টম শতাব্দীতে প্রযুক্তিতে এবং যান্ত্রিক প্রকৌশল (Mechanical Engineering) বিদ্যায় প্রাচ্য বা মুসলিম বিশ্ব পাশ্চাত্যের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিল। পাশ্চাত্য যখন কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত, বাগদাদ তখন অটোমেশন নিয়ে খেলছে (Hourani, 1991)।
বার্মাকি পরিবার: সাম্রাজ্যের প্রকৃত চালিকাশক্তি
হারুনুর রশীদের শাসনের জাঁকজমক যতটা খলিফার নিজের কৃতিত্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি কৃতিত্ব ছিল একটি পরিবারের – বার্মাকিরা (Barmakids)। এই পরিবারের উত্থান এবং পতন আব্বাসীয় ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়। বার্মাকিদের আদি নিবাস ছিল আফগানিস্তানের বলখ বা বর্তমান মাজার-ই-শরিফ অঞ্চলে। তারা মূলত ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং সেখানকার বিখ্যাত ‘নওবাহার’ (সংস্কৃত ‘নব বিহার’) বৌদ্ধ মঠের প্রধান পুরোহিত বা ‘পরমক’ ছিল তাদের পূর্বপুরুষ। এই ‘পরমক’ শব্দ থেকেই আরবিতে ‘বার্মাকি’ নামের উৎপত্তি। পরবর্তীতে তারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের নজরে আসে। তারা পারসিক আমলাতন্ত্রের বা সাসানীয় প্রশাসনিক মডেল (Sasanian Administrative Model)-এর ধারক ও বাহক ছিল। তারা জানত কীভাবে বিশাল সাম্রাজ্য চালাতে হয়, কীভাবে কর আদায় করতে হয় এবং কীভাবে রাজকোষ ভরতে হয়।
হারুন যখন খুব ছোট, তখন তার শিক্ষার ভার দেওয়া হয়েছিল ইয়াহইয়া আল-বার্মাকির ওপর। ইয়াহইয়া ছিলেন হারুনের কাছে পিতার মতো। হারুন খলিফা হওয়ার পর ইয়াহইয়াকে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে উজির বা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। ইয়াহইয়া এবং তার দুই সুযোগ্য পুত্র – ফজল এবং জাফর – সাম্রাজ্যের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফজল ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক, আর জাফর ছিলেন খলিফার ব্যক্তিগত সঙ্গী। হারুন জাফরকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, কথিত আছে তাদের দুজনকে এক পোশাকে দেখা যেত। জাফর ছিলেন সুদর্শন, বাগ্মী, এবং ফ্যাশন আইকন। বাগদাদের তরুণরা জাফরের পোশাক ও কথা বলার ভঙ্গি নকল করত। বার্মাকিরা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদার পৃষ্ঠপোষক। তারা সংস্কৃত থেকে আরবিতে বহু বই অনুবাদ করিয়েছিল। তাদের বদান্যতা বা পেট্রোনেজ (Patronage) এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, আরবি সাহিত্যে ‘বার্মাকি’ শব্দটি উদারতার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাম্রাজ্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বার্মাকিদের লোক বসানো ছিল। এক কথায়, খলিফা ছিলেন হারুন, কিন্তু শাসন করত বার্মাকিরা। এই অবস্থাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে ডায়ার্কি (Diarchy) বা দ্বৈত শাসন, যদিও কাগজে-কলমে খলিফাই সর্বেসর্বা।
ট্র্যাজেডির রাত: বন্ধু যখন ঘাতক
ক্ষমতা এমন এক নেশা, যা ভাগ করে নেওয়া যায় না। বার্মাকিদের এই আকাশচুম্বী ক্ষমতা, অঢেল সম্পদ এবং জনপ্রিয়তা হারুনের মনে ধীরে ধীরে সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। খলিফা দেখছিলেন, তার প্রাসাদে যত মানুষ আসে, তার চেয়ে বেশি মানুষ ভিড় করে জাফরের প্রাসাদে। কবিরা খলিফার চেয়ে জাফরের প্রশংসায় বেশি কবিতা লেখে। এই ঈর্ষা বা জেলাসি (Jealousy) ছিল বার্মাকিদের পতনের অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক কারণ। এছাড়া ধর্মীয় কারণও ছিল; বার্মাকিরা ছিল কিছুটা উদারপন্থী, যা রক্ষণশীল মুসলিমরা ভালো চোখে দেখত না। আবার অর্থনৈতিক কারণও ছিল প্রবল – বার্মাকিদের বাজেয়াপ্ত করলে রাজকোষে বিশাল সম্পদ জমা হবে।
তবে ঐতিহাসিকদের মতে, বার্মাকিদের পতনের পেছনে একটি রোমান্টিক এবং স্ক্যান্ডালস গুজবও ছিল, যা ‘আব্বাসা কেলেঙ্কারি’ (Abbasa Affair) নামে পরিচিত। হারুনের বোন আব্বাসা ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী। হারুন চাইতেন তার প্রিয় বন্ধু জাফর এবং প্রিয় বোন আব্বাসা – উভয়েই তার সাথে রাতের আড্ডায় বা মজলিশে থাকুক। কিন্তু তৎকালীন শরিয়াহ আইন অনুযায়ী গায়রে-মাহরাম নারী-পুরুষের মেলামেশা নিষিদ্ধ। তাই হারুন জাফর ও আব্বাসার মধ্যে একটি নামমাত্র বিয়ে বা ফরমাল ম্যারেজ (Formal Marriage) করিয়ে দেন, এই শর্তে যে তারা কখনো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মিলিত হবে না বা সন্তান নেবে না। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তি বা হিউম্যান নেচার (Human Nature) সব নিয়ম মানে না। জাফর ও আব্বাসার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং গোপনে তাদের একটি সন্তান হয়, যাকে তারা মক্কায় পাঠিয়ে দেয়। এই খবর যখন হারুনের গুপ্তচরদের মাধ্যমে তার কানে পৌঁছায়, তখন তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করেন। তিনি ভাবলেন, বার্মাকিরা কেবল তার ক্ষমতাই কেড়ে নিচ্ছে না, তার রাজকীয় রক্ত বা রয়্যাল ব্লাডলাইন (Royal Bloodline) কলুষিত করছে।
৮০৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসের এক অন্ধকার রাত। হারুন শিকার থেকে ফিরেছেন। তিনি তার বিশ্বস্ত জল্লাদ মাসরুরকে ডেকে পাঠালেন। তিনি মাসরুরকে নির্দেশ দিলেন, “এখনই জাফরের কাছে যাও এবং তার কাটা মাথা আমার কাছে নিয়ে এসো।” মাসরুর নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। জাফর তখনো জানতেন না তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। মাসরুর যখন জাফরের কক্ষে প্রবেশ করলেন, জাফর তখন গান শুনছিলেন। মাসরুর খলিফার আদেশ শোনালেন। জাফর প্রথমে ভাবলেন খলিফা হয়তো মাতাল অবস্থায় এই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মাসরুরকে অনুরোধ করলেন খলিফার কাছে একবার শেষবার নিয়ে যেতে। কিন্তু খলিফা তার মুখ দেখতে চাইলেন না। শেষ পর্যন্ত মাসরুর জাফরের মাথা কেটে খলিফার সামনে পেশ করলেন। জাফর ছিলেন হারুনের ১৭ বছরের সঙ্গী। সেই বন্ধুর ছিন্ন মস্তক দেখে হারুন কেঁদেছিলেন কিনা জানা যায় না, তবে তিনি এরপর ইয়াহইয়া এবং ফজলসহ পুরো বার্মাকি পরিবারকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। জাফরের দেহ দ্বিখণ্ডিত করে বাগদাদের দুই ব্রিজে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে সবাই দেখতে পায় খলিফার ক্ষমতার দাপট।
এই ঘটনাটি ইতিহাসে ‘বার্মাকি ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত। এটি প্রমাণ করে, স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় বা ডেস্পটিজম (Despotism)-এ কারো অবস্থানই নিরাপদ নয়। আজ যে খলিফার ডান হাত, কাল সে লাশ। হারুন পরবর্তী জীবনে এই কাজের জন্য অনুশোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। একবার তিনি বলেছিলেন, “হায়! যদি আমি জানতাম জাফর আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।” কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বার্মাকিদের পতনের সাথে সাথে আব্বাসীয় প্রশাসনের মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল, কারণ তাদের মতো দক্ষ প্রশাসক আর কেউ ছিল না (Clot, 1989)।
আল-খাইজুরান: পর্দার আড়ালের সম্রাজ্ঞী
হারুনুর রশীদের জীবনে আরেকজন প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন তার মা, আল-খাইজুরান (Al-Khayzuran)। আব্বাসীয় ইতিহাসের নারীদের অবস্থান বুঝতে হলে খাইজুরানকে বোঝা জরুরি। তিনি রাজবংশের কেউ ছিলেন না, ছিলেন ইয়েমেন থেকে আসা এক সামান্য দাসী। খলিফা আল-মাহদি তাকে দেখে মুগ্ধ হন, তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন এবং বিয়ে করেন। কিন্তু খাইজুরান কেবল হারেমের শোভা হয়ে থাকেননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন। মাহদির শাসনামলেই তিনি পর্দার আড়াল থেকে বা বিহাইন্ড দ্য সিন (Behind the Scene) রাষ্ট্র পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করতেন।
মাহদির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে আল-হাদি খলিফা হন। হাদি তার মায়ের এই হস্তক্ষেপ পছন্দ করতেন না। তিনি মাকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। কিন্তু খাইজুরান তা মানতে নারাজ ছিলেন। মা ও ছেলের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। ৭৮৬ সালে খলিফা হাদি রহস্যজনকভাবে মারা যান। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, খাইজুরান তার নিজের ছেলেকে দাসীদের দিয়ে বালিশ চাপা দিয়ে বা বিষ প্রয়োগে হত্যা করিয়েছিলেন, কারণ হাদি তার ছোট ভাই হারুনকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন। খাইজুরান হারুনকে বেশি ভালোবাসতেন এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ মনে করতেন।
হারুন খলিফা হওয়ার পর খাইজুরানের ক্ষমতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘কুইন মাদার’। রাজ্যের বড় বড় নিয়োগ, বদলি – সবই তার ইশারায় হতো। উজিররা খলিফার আগে খাইজুরানের সাথে দেখা করতেন। আব্বাসীয় রাজনীতিতে এই ঘটনাকে হারেমি পলিটিক্স (Harem Politics) বা হারেমের রাজনীতির সূচনা বলা যেতে পারে। নারীরা সরাসরি সিংহাসনে বসতে পারতেন না ঠিকই, কিন্তু তারা সন্তান বা স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ করে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হতেন। খাইজুরান ৭৮৯ সালে মারা যান। তার মৃত্যুতে হারুন গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিলেন এবং নগ্ন পায়ে তার জানাজার পেছনে হেঁটেছিলেন, যা একজন খলিফার জন্য ছিল বিরল ঘটনা। খাইজুরানের জীবন আমাদের দেখায়, মধ্যযুগের পিতৃতান্ত্রিক সমাজেও নারীরা বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারতেন (Abbott, 1946)।
হারুনুর রশীদের শাসনকাল ছিল আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। তিনি বাগদাদকে স্বর্গে পরিণত করেছিলেন, কিন্তু সেই স্বর্গের ভিত্তি ছিল ভয় আর রক্তের ওপর। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, আবার সেই প্রদীপের আলোতেই তার বন্ধুর মৃত্যুদণ্ডনামা লিখেছিলেন। বার্মাকিদের পতন এবং খাইজুরানের প্রভাব – সব মিলিয়ে হারুনের যুগ ছিল আব্বাসীয়দের গৌরবের, একই সাথে তাদের নৈতিক স্খলনেরও এক দলিল।
বায়তুল হিকমাহ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহাবিস্ফোরণ
মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, যখন মানুষের মগজে এক ধরনের মহাজাগতিক বিস্ফোরণ ঘটে – জ্ঞানপিপাসা তখন কেবল কৌতূহল থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক সর্বগ্রাসী নেশা। আব্বাসীয় খিলাফতের সময়, বিশেষ করে অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বাগদাদে ঠিক এই ঘটনাটি ঘটেছিল। মরুভূমির রুক্ষ বালুকারাশির ওপর দাঁড়িয়ে আব্বাসীয় শাসকরা বুঝতে পেরেছিল, তরবারি দিয়ে ভূখণ্ড জয় করা যায়, কিন্তু সভ্যতা গড়তে হলে এবং তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য বা ইন্টেলেকচুয়াল হেজিমনি (Intellectual Hegemony)। তারা প্রাচীন গ্রিক, পারসিক এবং ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে নিজেদের করে নেওয়ার এক মহাউদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগ ইতিহাসে অনুবাদ আন্দোলন (Translation Movement) নামে পরিচিত, যা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলেছিল। এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাগদাদের কিংবদন্তিতল্য প্রতিষ্ঠান ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা ‘হাউজ অফ উইজডম’ (House of Wisdom)। এটি আজকের দিনের লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ছিল না; এটি ছিল তার চেয়েও বেশি কিছু – একই সাথে গবেষণাগার, মানমন্দির, অনুবাদ ব্যুরো এবং বিদগ্ধজনের আড্ডাস্থল। সাসানীয় আমলের ‘জুন্দিশাপুর একাডেমি’-র আদলে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল মধ্যযুগের সিলিকন ভ্যালি, যেখানে জ্ঞানের কাঁচামাল আসত সারা বিশ্ব থেকে, আর প্রক্রিয়াজাত হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ত সভ্যতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এখানে বসে মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝতে শিখেছিল যে, জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের সম্পত্তি নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির উত্তরাধিকার।
বায়তুল হিকমাহর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন খলিফা হারুনুর রশীদ, তবে এটিকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন এবং এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন তার পুত্র খলিফা আল-মামুন (Al-Mamun)। মামুনের জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল অনেকটা পাগলামির পর্যায়ে। কথিত আছে, তিনি একবার স্বপ্নে এরিস্টটলকে দেখেছিলেন। স্বপ্নে তিনি গ্রিক দার্শনিককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ভালো কী?” এরিস্টটল উত্তর দিয়েছিলেন, “যা যুক্তিতে ভালো, তাই ভালো।” এই স্বপ্ন মামুনের জীবনদর্শন বদলে দেয়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ধর্ম এবং যুক্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং যুক্তিই হলো সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ বা র্যাশনালিজম (Rationalism)। এরপর থেকে তিনি গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান সংগ্রহের জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠেন। বাইজেন্টাইন সম্রাটদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি সোনাদানা বা ভূখণ্ড চাইতেন না, সন্ধিচুক্তি হিসেবে চাইতেন কনস্টান্টিনোপলের লাইব্রেরিতে পড়ে থাকা ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপিগুলো। টলেমি (Ptolemy), গ্যালেন (Galen), ইউক্লিড (Euclid), আর্কিমিডিস – কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি। বাগদাদে তখন উটের পিঠে চড়ে আসত জ্ঞানের বহর। মামুনের এই উদ্যোগ ছিল মূলত রাষ্ট্রপরিচালিত এক জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্প, যার উদ্দেশ্য ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। তিনি বাগদাদের উপকণ্ঠে ‘শাম্মাসিয়া’ মানমন্দির স্থাপন করেন, যেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের নক্ষত্ররাজি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং টলেমির গণনাগুলো নতুন করে যাচাই করতেন।
ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুত্ববাদ: জ্ঞানের কোনো ধর্ম নেই
বায়তুল হিকমাহর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এবং সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল এর ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) এবং বহুত্ববাদী চরিত্র। এখানে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র কোনো বাধা ছিল না। এটি ছিল এক কসমোপলিটান আসর যেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, সাবিয়ান, জরাথুস্ট্রবাদী – সব ধর্মের পণ্ডিতরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন। তাদের একমাত্র পরিচয় ছিল তারা ‘জ্ঞানের সেবক’। এই উদারতা বা ইনটেলেকচুয়াল ওপেননেস (Intellectual Openness) আব্বাসীয়দের স্বর্ণযুগের মূল চালিকাশক্তি ছিল। আব্বাসীয় খলিফারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, জ্ঞান আহরণের জন্য মেধা দরকার, বিশ্বাস নয়। উদাহরণস্বরূপ, এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান অনুবাদক ছিলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক (Hunayn ibn Ishaq), যিনি ছিলেন একজন নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টান। তাকে বলা হতো ‘অনুবাদকদের শেখ’। তিনি গ্রিক ভাষায় এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, হোমারের কবিতাও তিনি অবলীলায় আবৃত্তি করতে পারতেন। তিনি এবং তার ছাত্ররা গ্যালেনের প্রায় সব চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক বই আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন। খলিফা আল-মামুন হুনাইনকে এতটাই সম্মান করতেন যে, তিনি হুনাইনের অনুবাদ করা বইয়ের ওজনের সমান সোনা দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করতেন। চিন্তা করা যায়? জ্ঞানের মূল্য সোনার চেয়েও বেশি ছিল তাদের কাছে। এটি কেবল খলিফার খেয়াল ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নীতি বা স্টেট পলিসি (State Policy), যার মাধ্যমে মেধাবীদের বাগদাদে আকৃষ্ট করা হতো (Gutas, 1998)।
এই বহুত্ববাদের আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন সাবিয়ান সম্প্রদায়ের থাবিত ইবনে কুররা (Thabit ibn Qurra)। হারান নামক শহর থেকে আসা এই পণ্ডিত ছিলেন একজন গাণিতিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং মেকানিক। তিনি গ্রিক গণিতবিদ অ্যাপোলোনিয়াস, আর্কিমিডিস, ইউক্লিড এবং টলেমির রচনা অনুবাদ করেন। তবে তিনি কেবল অনুবাদক ছিলেন না, তিনি আর্কিমিডিসের গোলক ও সিলিন্ডার বিষয়ক জটিল জ্যামিতিক সমস্যাগুলোর সমাধান নতুন করে দিয়েছিলেন এবং সংখ্যাতত্ত্বে ‘বন্ধু সংখ্যা’ বা অ্যামিকেবল নাম্বারস (Amicable Numbers)-এর ধারণা দিয়েছিলেন। ইহুদি পণ্ডিতরা হিব্রু এবং সিরিয়াক ভাষা থেকে প্রাচীন জ্ঞান আরবিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করতেন। এই যে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মিলনমেলা, একে আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় ক্রস-কালচারাল পলিনেশন (Cross-cultural Pollination)। এর ফলেই বাগদাদে এমন এক হাইব্রিড বা সংকর জ্ঞানচর্চার ধারা তৈরি হয়েছিল, যা ছিল গ্রিক যুক্তিবাদ, ভারতীয় গণিত এবং পারসিক সাহিত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এই পণ্ডিতরা কেবল প্রাচীন বই অনুবাদ করেননি, তারা সেগুলোর টীকা-টিপ্পনী লিখেছেন, ভুল সংশোধন করেছেন এবং নতুন জ্ঞান যোগ করেছেন। একে বলা যায় জ্ঞানের সৃজনশীল আত্তীকরণ (Creative Assimilation)।
আল-খোয়ারিজমি: আধুনিক গণিতের স্থপতি
বায়তুল হিকমাহর গবেষকদের মধ্যে যার নাম সবার আগে নিতে হয়, তিনি হলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি (Al-Khwarizmi)। তিনি ছিলেন পারস্যের খোয়ারিজম (বর্তমান উজবেকিস্তান) থেকে আসা এক গণিতবিদ। তার অবদান ছাড়া আজকের ডিজিটাল বিশ্ব কল্পনাও করা যায় না। তিনি ভারতীয় সংখ্যাতত্ত্বকে (বিশেষ করে শূন্যের ব্যবহার এবং দশমিক পদ্ধতি) আরব বিশ্বে এবং পরে ইউরোপে পরিচিত করান। তার লেখা বিখ্যাত বই কিতাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা (দ্য কম্পেনডিয়াস বুক অন ক্যালকুলেশন বাই কমপ্লিশন অ্যান্ড ব্যালেন্সিং) থেকেই ‘অ্যালজেবরা’ বা বীজগণিত (Algebra) শব্দটির উৎপত্তি। তিনি গণিতকে কেবল বিমূর্ত তত্ত্বে আটকে রাখেননি, তিনি একে বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করেছিলেন। জমির ভাগ-বাটোয়ারা, উত্তরাধিকার আইন, খালের গভীরতা মাপা – সবকিছুর গাণিতিক সমাধান বা অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স (Applied Mathematics) তিনি দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে অজানা রাশি (x, y) ব্যবহার করে জটিল সমীকরণ সমাধান করা যায়। এই বিমূর্তায়ন (Abstraction) গণিতের ইতিহাসে ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
তার নাম থেকেই এসেছে ‘অ্যালগরিদম’ (Algorithm) শব্দটি। আজকের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, গুগল সার্চ, বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা – সবকিছুর মূলে রয়েছে এই অ্যালগরিদম বা ধাপে ধাপে সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি। আল-খোয়ারিজমি যদি সেদিন ভারতীয় গণিত এবং গ্রিক জ্যামিতিকে মেলানোর চেষ্টা না করতেন, তবে হয়তো রেনেসাঁস বা শিল্প বিপ্লব অনেক দেরি করে আসত। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানেও বিশাল অবদান রেখেছিলেন। খলিফা মামুনের নির্দেশে তিনি বিশ্বের একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, যা টলেমির মানচিত্রের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল ছিল। তিনি পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ের জন্য সিনজার মরুভূমিতে একটি বৈজ্ঞানিক অভিযান চালিয়েছিলেন, যেখানে বিজ্ঞানীরা সূর্যের উন্নতি কোণ মেপে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বের করার চেষ্টা করেছিলেন। তার এই কাজগুলো ছিল এম্পিরিকাল সায়েন্স (Empirical Science) বা পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের আদি রূপ। তিনি ‘জিজ’ বা জ্যোতির্বিজ্ঞান সারণি তৈরি করেছিলেন, যা দিয়ে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের পূর্বাভাস দেওয়া যেত।
আল-কিন্দি, আল-রাজি এবং ইবনে আল-হাইসাম: ত্রয়ী নক্ষত্র
আব্বাসীয় জ্ঞানচর্চার আকাশে আরও তিনটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন – আল-কিন্দি, আল-রাজি এবং ইবনে আল-হাইসাম। আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি (Al-Kindi) ছিলেন প্রথম মুসলিম দার্শনিক, যাকে বলা হয় ‘আরবদের দার্শনিক’। তিনি গ্রিক দর্শন, বিশেষ করে এরিস্টটল এবং প্লেটোর দর্শনকে ইসলামের একেশ্বরবাদের সাথে মেলানোর এক দুঃসাহসী চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন পলিম্যাথ। তিনি বলতেন, “সত্য যেখান থেকেই আসুক না কেন, তাকে গ্রহণ করতে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত নয়, এমনকি তা যদি দূরবর্তী জাতি বা ভিন্ন ধর্মের কাছ থেকেও আসে।” তিনি ক্রিপ্টোগ্রাফি বা সংকেত পাঠোদ্ধার বিদ্যা নিয়েও কাজ করেছিলেন এবং ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস পদ্ধতির জনক ছিলেন। সঙ্গীতকেও তিনি গণিতের ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে নির্দিষ্ট সুর মানুষের মেজাজ বা স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা আজকের মিউজিক থেরাপি (Music Therapy)-র পূর্বসূরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি (Al-Razi), যিনি ইউরোপে ‘রাজেস’ নামে পরিচিত। তাকে বলা হয় মুসলিম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি পরীক্ষানির্ভর বিজ্ঞানী। তিনি প্রথম হাম (Measles) এবং গুটিবসন্তের (Smallpox) পার্থক্য সঠিকভাবে নির্ণয় করেন তার বিখ্যাত বই কিতাব আল-জুদারি ওয়া আল-হাসবা-তে। বাগদাদে যখন নতুন হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা করা হয়, তখন স্থান নির্বাচনের জন্য তিনি এক অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তিনি শহরের বিভিন্ন মহল্লায় কাঁচা মাংসের টুকরো ঝুলিয়ে রাখেন। কয়েক দিন পর তিনি দেখলেন কোন এলাকার মাংসটি সবচেয়ে কম পচেছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সেখানেই হাসপাতাল হবে, কারণ সেখানকার বাতাস সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং জীবাণুমুক্ত। এই যে পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞান, এর চর্চা তখন তুঙ্গে। আল-রাজি ছিলেন একজন মুক্তচিন্তক বা ফ্রি থিঙ্কার (Free Thinker), যিনি কোনো কিছুই অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন না, এমনকি ধর্মীয় ডগমাও নয়। তার রচিত কিতাব আল-হাবি বা ‘দ্য কমপ্রিহেনসিভ বুক’ চিকিৎসাশাস্ত্রে কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপের পাঠ্যপুস্তক ছিল।
ইবনে আল-হাইসাম (Ibn al-Haytham), যিনি ইউরোপে ‘আলহাজেন’ নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের এক দৈত্য। তাকে বলা হয় আলোকবিজ্ঞান বা অপটিক্স (Optics)-এর জনক। তার কিতাব আল-মানাজির বা বুক অফ অপটিক্স (Book of Optics) ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাইলফলক। গ্রিকরা, বিশেষ করে টলেমি ও ইউক্লিড বিশ্বাস করতেন চোখ থেকে আলো বের হয়ে বস্তুর ওপর পড়ে, তাই আমরা দেখি। একে বলা হতো ‘ইমিশন থিওরি’। ইবনে আল-হাইসাম প্রমাণ করলেন এটি ভুল। তিনি দেখালেন আলো বস্তুর ওপর পড়ে এবং সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। তিনি চোখের গঠন বা এনাটমি (Anatomy) নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন এবং ‘ক্যামেরা অবস্কিউরা’ বা পিনহোল ক্যামেরার নীতি আবিষ্কার করেন। নিউটনের জন্মের প্রায় ৭০০ বছর আগে তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Scientific Method)-র ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন – যেখানে হাইপোথিসিস, এক্সপেরিমেন্ট এবং ভেরিফিকেশন অপরিহার্য। তিনি বলতেন, “যে সত্যের সন্ধান করে, সে কোনো বইয়ের ওপর অন্ধবিশ্বাস রাখে না; বরং সে তার যুক্তি দিয়ে সবকিছু যাচাই করে।”
যান্ত্রিক প্রকৌশল: বানু মুসা এবং অটোমেশন
বায়তুল হিকমাহ কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের কেন্দ্র ছিল না, এখানে প্রকৌশলবিদ্যা নিয়েও প্রচুর কাজ হতো। এ প্রসঙ্গে ‘বানু মুসা’ বা মুসার তিন পুত্র – মুহাম্মদ, আহমদ এবং আল-হাসানের কথা না বললেই নয়। তারা ছিলেন খলিফা মামুনের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তারা কিতাব আল-হিয়াল বা বুক অফ ইনজেনিয়াস ডিভাইসেস (Book of Ingenious Devices) নামে একটি বই লেখেন, যেখানে প্রায় ১০০টি যান্ত্রিক ডিভাইসের বর্ণনা ও নকশা ছিল। এর মধ্যে ছিল স্বয়ংক্রিয় ঝর্ণা, যান্ত্রিক বাঁশি এবং এমন সব পাত্র যা নিজে নিজেই পূর্ণ হতো। তারা ভালভ, ক্র্যাঙ্ক এবং সাইফন প্রযুক্তির ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তাদের তৈরি করা ‘ফ্লুট প্লেয়ার’ বা যান্ত্রিক বাঁশি বাদকটিকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম আদি অটোমাটা (Automata) বা রোবট। আব্বাসীয়রা প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকৃতির শক্তিকে বাগে আনার চেষ্টা করেছিল, যা ছিল তৎকালীন সময়ে জাদুর চেয়ে কম কিছু নয় (Saliba, 2007)।
কাগজের বিপ্লব: তথ্যের গণতন্ত্রীকরণ
জ্ঞানের এই মহাবিস্ফোরণের পেছনে একটি প্রযুক্তিগত অনুঘটক ছিল – কাগজ। ৭৫১ সালে আব্বাসীয়রা তালাসের যুদ্ধে (Battle of Talas) চীনাদের পরাজিত করে। এই যুদ্ধে বন্দি হওয়া কিছু চীনা কারিগরের কাছ থেকে মুসলমানরা কাগজ তৈরির গোপন কৌশল শিখে নেয়। এটি ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঘটনা। এর আগে লেখার জন্য প্যাপিরাস (যা মিসরে পাওয়া যেত এবং ভঙ্গুর ছিল) অথবা পার্চমেন্ট (প্রাণীর চামড়া, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল) ব্যবহার করা হতো। কাগজ ছিল সস্তা, টেকসই এবং সহজলভ্য। বাগদাদে খুব দ্রুত কাগজের কল বা পেপার মিল (Paper Mill) গড়ে ওঠে এবং সমরকন্দ থেকে শুরু করে স্পেন পর্যন্ত এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে।
কাগজ সহজলভ্য হওয়ায় বইয়ের দাম কমে গেল এবং জ্ঞান আর অভিজাতদের ড্রয়িংরুমে বা রাজপ্রাসাদে বন্দি রইল না। জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ল সাধারণের মাঝে। বাগদাদে তখন ১০০টিরও বেশি বইয়ের দোকান ছিল, যা ‘সুস আল-ওয়াররাকিন’ বা স্টেশনার্স মার্কেট নামে পরিচিত ছিল। লেখকরা তাদের পাণ্ডুলিপি কপি করার জন্য অনুলিপিকারক বা স্ক্রাইব (Scribe) নিয়োগ করতেন। এই ‘পেপার রিভোলিউশন’ বা কাগজ বিপ্লবকে আজকের ইন্টারনেট বিপ্লবের সাথে তুলনা করা চলে। তথ্যের এই প্রবাহ আব্বাসীয় সমাজকে একটি লিটারেট সোসাইটি (Literate Society) বা শিক্ষিত সমাজে রূপান্তর করতে সাহায্য করেছিল। রাস্তায় বসে গল্প বলা বা কবিতা আবৃত্তি করা যেমন বিনোদন ছিল, তেমনি বই পড়া বা লাইব্রেরিতে যাওয়াও ছিল এক ধরনের সামাজিক স্ট্যাটাস। শিক্ষার এই ব্যাপক প্রসার আব্বাসীয়দের স্বর্ণযুগকে দীর্ঘস্থায়ী করেছিল।
বায়তুল হিকমাহ এবং এই অনুবাদ আন্দোলন কেবল মুসলিম বিশ্বের জন্যই নয়, পুরো মানব সভ্যতার জন্য ছিল আশীর্বাদ। প্রাচীন গ্রিক জ্ঞান যা ইউরোপে হারিয়ে গিয়েছিল বা চার্চের অন্ধকারে চাপা পড়েছিল, তা আরবরা সংরক্ষণ করেছিল। পরবর্তীতে যখন বাগদাদ ধ্বংস হয়ে যায়, তখন এই অনুবাদ করা বইগুলোর ল্যাটিন সংস্করণ ইউরোপে পৌঁছেছিল। স্পেনের কর্ডোভা এবং সিসিলি হয়ে এই জ্ঞান ইউরোপে প্রবেশ করে এবং সেখানে রেনেসাঁস (Renaissance) ঘটাতে সাহায্য করে। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা এবং দর্শন – সবকিছুর শেকড় কোনো না কোনোভাবে বাগদাদের সেই বায়তুল হিকমাহর সাথে যুক্ত। আব্বাসীয়রা হয়তো তরবারি দিয়ে পৃথিবী শাসন করতে পারেনি, তাদের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে গেছে, কিন্তু কলম দিয়ে তারা যা জয় করেছিল, তা কোনো সীমান্ত বা সময় মানে না (Bloom, 2001; Lindberg, 1976)।
মুতাজিলা মতবাদ: যুক্তির জয়গান এবং মিহনা
বাগদাদের জ্ঞানচর্চা যখন তুঙ্গে, তখন সেই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ঢেউ কেবল বিজ্ঞানাগার বা মানমন্দিরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা আছড়ে পড়েছিল ধর্মের গভীর তাত্ত্বিক জগতেও। মানুষ যখন ইউক্লিডীয় জ্যামিতি বাএরিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা দিয়ে বিশ্বকে বুঝতে শিখল, তখন তারা সেই একই যুক্তির ছাঁচে ধর্মকেও বিচার করতে চাইল। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মতাত্ত্বিক আন্দোলন, যার নাম মুতাজিলা (Mu’tazila)। এটি কোনো সাধারণ মাজহাব বা উপদল ছিল না; এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্ব (Rationalist Theology) বা কালাম শাস্ত্র (Ilm al-Kalam)-এর পদ্ধতিগত রূপ। এর জন্ম হয়েছিল বসরার হাসান আল-বাসরির আসর থেকে, যখন ওয়াসিল ইবনে আতা কোনো এক পাপীর অবস্থান নিয়ে গুরুর সাথে দ্বিমত পোষণ করে দলত্যাগ করেছিলেন। ‘মুতাজিলা’ শব্দের অর্থই হলো ‘যারা সরে গেছে’ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী‘। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই পরবর্তীতে আব্বাসীয় খিলাফতের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শে পরিণত হয়েছিল। মুতাজিলারা বিশ্বাস করত যে, ওহি বা প্রত্যাদেশের (Revelation) চেয়ে মানুষের বিবেক এবং যুক্তি (Reason) অনেক ক্ষেত্রে বেশি শক্তিশালী। তাদের মূল কথা ছিল – ঈশ্বর মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন তাকে ব্যবহার করার জন্য, অন্ধভাবে প্রাচীন প্রথা বা হাদিস মেনে চলার জন্য নয়। তারা মনে করত, ধর্মগ্রন্থের যেসব আয়াত মানুষের যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলোকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে, আক্ষরিক অর্থে নয়। এই রূপক ব্যাখ্যা (Metaphorical Interpretation) বা তাওইল (Ta’wil) ছিল তাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার, যা রক্ষণশীল আলেমদের চক্ষুশূল ছিল।
ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির লড়াই
মুতাজিলা দর্শনের পাঁচটি মূল স্তম্ভ বা উসুল আল-খামসা (Usul al-Khamsa) ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো তাওহীদ (Divine Unity) এবং আদল (Divine Justice)। তারা নিজেদের বলত ‘আহল আল-আদল ওয়া আল-তাওহীদ’ বা ন্যায়বিচার ও একত্বের অনুসারী। তাদের মতে, ঈশ্বর হলেন পরম ন্যায়বিচারক। তিনি কখনো অন্যায় করতে পারেন না এবং মানুষকে এমন কোনো কাজের জন্য শাস্তি দিতে পারেন না, যা করার ক্ষমতা মানুষের নেই। এখান থেকেই আসে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free Will) বা কদর (Qadar)-এর ধারণা। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এবং উমাইয়া শাসকরা প্রচার করত জাবরিয়া মতবাদ (Jabriyya) বা নিয়তিবাদ। জাবরিয়ারা বলত, মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই, সবকিছু ঈশ্বরের ইশারায় ঘটে। উমাইয়া শাসকরা তাদের স্বৈরাচারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই নিয়তিবাদ ব্যবহার করত; তারা বলত, “আমরা যে ক্ষমতায় আছি এবং অত্যাচার করছি, তা ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই হচ্ছে।” মুতাজিলারা এই ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করল। তারা বলল, মানুষ তার নিজের কাজের স্রষ্টা। মানুষ যদি ভালো কাজ করে তবে পুরস্কার পাবে, আর খারাপ কাজ করলে শাস্তি পাবে। যদি ঈশ্বর মানুষের ভাগ্য আগেই লিখে রাখেন এবং জোর করে তাকে দিয়ে পাপ করান, তবে তাকে নরকে পাঠানো হবে অবিচার। আর ঈশ্বর কখনো অবিচারক হতে পারেন না। এই যুক্তিবাদী অবস্থান মানুষকে তার কর্মের প্রতি দায়বদ্ধ করেছিল এবং স্বৈরাচারী শাসকদের ‘ঈশ্বরের দোহাই’ দেওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছিল (Watt, 1948)।
কুরআনের সৃষ্টিতত্ত্ব: অনাদি বনাম সৃষ্ট
মুতাজিলাদের সাথে রক্ষণশীল সুন্নি বা ঐতিহ্যবাদী (Traditionalist) আলেমদের সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুরআনের প্রকৃতি নিয়ে এক জটিল দার্শনিক বিতর্ক। প্রশ্নটি ছিল: কুরআন কি ঈশ্বরের মতো অনাদি বা আনক্রিয়েটেড (Uncreated), নাকি এটি ঈশ্বরের সৃষ্টি বা ক্রিয়েটেড (Created)? সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি তাত্ত্বিক ক্যাচাল মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে ছিল গভীর তাত্ত্বিক সংকট (Theological Crisis)। রক্ষণশীলরা এবং ইমাম আহমেদ ইবনে হাম্বল বিশ্বাস করতেন, কুরআন হলো ঈশ্বরের কালাম বা কথা, এবং ঈশ্বরের কথা তার সত্তার অংশ, তাই তা অনাদি। কিন্তু মুতাজিলারা যুক্তি দেখাল, যদি আমরা মেনে নিই যে কুরআন অনাদি, তবে আমরা ঈশ্বরের পাশাপাশি আরেকটি অনাদি সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিচ্ছি। এটি তাদের মতে খ্রিস্টানদের ট্রিনিটি বা ত্রিত্ববাদের মতো হয়ে যায় এবং ইসলামের মৌলিক একেশ্বরবাদ (Monotheism) বা তাওহীদের লঙ্ঘন।
মুতাজিলারা বলত, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তার কোনো শরিক নেই, তার সত্তার সমকক্ষ বা শাশ্বত আর কিছুই হতে পারে না। তাই কুরআন হলো ঈশ্বরের তৈরি করা একটি বস্তু বা সৃষ্টি, যা তিনি জিবরাঈলের মাধ্যমে নবীর কাছে পাঠিয়েছেন। এটি কোনো শাশ্বত সত্তা নয়। এই বিতর্কটি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক ছিল না, এটি ছিল রাজনৈতিক। যদি কুরআন অনাদি হয়, তবে তার ব্যাখ্যাকার হিসেবে আলেম বা উলেমাদের ক্ষমতা বেড়ে যায়। আর যদি কুরআন সৃষ্ট হয়, তবে খলিফা (যিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি) সময়ের প্রয়োজনে যুক্তির মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা পরিবর্তন করতে পারেন। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন এই বিতর্কে মুতাজিলাদের পক্ষ নিলেন, কারণ তিনি চেয়েছিলেন রাষ্ট্রের ক্ষমতা উলেমাদের চেয়ে বেশি হোক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং তারা ঈশ্বরকে মানুষের মতো হাত-পা বিশিষ্ট সত্তা বা নৃতত্ত্ববাদ (Anthropomorphism)-এর মাধ্যমে কল্পনা করে। মামুন চেয়েছিলেন একটি বিশুদ্ধ, বিমূর্ত এবং যুক্তিনির্ভর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে (Nawas, 1994)।
মিহনা: যুক্তির নামে ইনকুইজিশন
খলিফা আল-মামুন ছিলেন আব্বাসীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক শাসক। তিনি বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে জোয়ার এনেছিলেন, তা ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস হলো, যারা মুক্তচিন্তার কথা বলে, তারাই একসময় নিজেদের মতবাদ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। মামুন ভাবলেন, এই ‘মূর্খ’ প্রজা এবং গোঁড়া আলেমদের জোর করে প্রগতিশীল বানাতে হবে। তিনি ৮৩৩ সালে একটি বিশেষ বিচার বিভাগ বা ইনকুইজিশন চালু করলেন, যা ইতিহাসে মিহনা (Mihna) বা ‘অগ্নিপরীক্ষা’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারি কর্মচারী, বিচারক এবং আলেমদের ডেকে জিজ্ঞেস করা: “তুমি কি বিশ্বাস করো কুরআন সৃষ্ট?” যারা “হ্যাঁ” বলত, তারা মুক্তি পেত এবং পদোন্নতি পেত। আর যারা “না” বলত বা চুপ থাকতো, তাদের ওপর নেমে আসত খড়গ।
এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে রাষ্ট্র কর্তৃক ধর্মবিশ্বাস পরীক্ষার প্রথম এবং অন্যতম বড় ঘটনা। বাগদাদের প্রধান পুলিশ প্রধান ইসহাক ইবনে ইব্রাহিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এই পরীক্ষা চালানোর। শত শত আলেম ভয়ে বা লোভে মুতাজিলা মতবাদ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু রুখে দাঁড়ালেন কয়েকজন, যাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ইমাম আহমেদ ইবনে হাম্বল (Ahmad ibn Hanbal)। তিনি ছিলেন হাদিসপনন্থী রক্ষণশীল সমাজের নেতা। তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো, তিনি বললেন, “কুরআন আল্লাহর বাণী, এর বেশি আমি কিছু জানি না।” তাকে বলা হলো যুক্তি দিয়ে তর্ক করতে, তিনি বললেন, “কুরআন ও হাদিসে যা নেই, তা নিয়ে আমি তর্ক করব না।” মামুনের মৃত্যুর পর তার ভাই আল-মু’তাসিম এবং পরবর্তী খলিফা আল-ওয়াসিক এই মিহনা চালিয়ে যান। ইবনে হাম্বলকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং নির্মমভাবে চাবুক মারা হয়। কথিত আছে, তাকে টানা ২৮ মাস বন্দি রাখা হয়েছিল এবং তার ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা সাধারণ মানুষ সহ্য করতে পারত না। কিন্তু তিনি তার মত থেকে একচুলও নড়েননি। তার এই অনড় অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের চোখে নায়কে পরিণত করে। মানুষ দেখল, একদিকে প্রাসাদের বিলাসিতায় থাকা দার্শনিকরা যুক্তির কথা বলে নির্যাতন করছে, অন্যদিকে একজন বৃদ্ধ আলেম কেবল তার বিশ্বাসের জন্য চাবুক খাচ্ছে। জনসমর্থন মুতাজিলাদের বিপক্ষে চলে গেল। ইতিহাস আমাদের শেখায়, জোর করে যেমন ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি জোর করে প্রগতিশীলতা বা লিবারেলিজম (Liberalism)-ও চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে সম্মান না করলে যেকোনো মহৎ আদর্শই শেষ পর্যন্ত নিপীড়ক বা ফ্যাসিজম (Fascism)-এ রূপ নিতে পারে (Hurvitz, 2002)।
যুক্তির পতন এবং রক্ষণশীলতার বিজয়
প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা এই ‘মিহনা’ মুসলিম মানসজগতে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। ৮৪৭ সালে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল (Al-Mutawakkil) ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন চতুর রাজনীতিবিদ। তিনি বুঝতে পারলেন, মুতাজিলাদের সমর্থন করে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। জনগণ মুতাজিলাদের ‘নাস্তিক’ বা ‘ধর্মত্যাগী’ মনে করতে শুরু করেছে। নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এবং সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে তিনি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন। তিনি ‘মিহনা’ বাতিল ঘোষণা করলেন এবং মুতাজিলাদের ওপর পাল্টা দমনপীড়ন শুরু করলেন। আহমেদ ইবনে হাম্বলকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হলো। মুতাজিলা বইপত্র নিষিদ্ধ করা হলো, তাদের দার্শনিকদের বরখাস্ত করা হলো। বাগদাদের রাস্তায় ঘোষণা দেওয়া হলো, “যে কেউ কুরআনকে সৃষ্ট বলবে, তার রক্ত হালাল।”
এই ঘটনা ছিল মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক বড় মোড় বা টার্নিং পয়েন্ট (Turning Point)। এর ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা পূরণ করল এক নতুন মতবাদ, যার নাম আশারি মতবাদ (Ash’arism)। আবুল হাসান আল-আশারি, যিনি নিজে একসময় মুতাজিলা ছিলেন, তিনি যুক্তি এবং ওহির মধ্যে এক মধ্যপন্থা তৈরির চেষ্টা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশারি মতবাদ এবং হাম্বলি মতবাদ যুক্তির চেয়ে বিশ্বাস বা ফিডেইজম (Fideism)-কে বেশি গুরুত্ব দিল। তারা বলল, “ঈশ্বরের হাত আছে, কিন্তু তা কেমন আমরা জানি না (বিলা কাইফা), এবং এটা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না।” মুতাজিলাদের সেই ‘কেন’ এবং ‘কিভাবে’ প্রশ্ন করার সংস্কৃতি আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। দর্শন এবং বিজ্ঞান চর্চা কিছুদিন চললেও, ধর্মতাত্ত্বিক জগতে যুক্তির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এই মিহনা এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়াই মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞানচর্চার পতনের দীর্ঘমেয়াদি কারণ। যখন ধর্মকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা হয় এবং যুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন সেই সমাজের মেধা শুকিয়ে যেতে বাধ্য (Martin & Woodward, 1997)।
মুতাজিলা আন্দোলন ছিল এক অসমাপ্ত বিপ্লব। তারা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং যুক্তির যে মশাল জ্বালিয়েছিল, তা মিহনার অন্ধকারে নিভে গিয়েছিল। আব্বাসীয়রা যদি জোর করে এই মতবাদ চাপিয়ে না দিত, তবে হয়তো ইসলামের ইতিহাস অন্যরকম হতো। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ এবং অসহিষ্ণুতা সেই সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দিল। আজও যখন আমরা ধর্ম ও যুক্তির দ্বন্দ্বে পড়ি, তখন মুতাজিলাদের সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই নতুন করে সামনে আসে। তারা প্রমাণ করে গেছে, চিন্তা করার স্বাধীনতা মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার সেই চিন্তাকে যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
অর্থনীতি, সমাজ এবং বিলাসিতা: আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের অন্দরমহল
আব্বাসীয় খিলাফতের রাজনৈতিক ইতিহাস যদি হয় তরবারি ও ষড়যন্ত্রের আখ্যান, তবে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস হলো এক বিস্ময়কর বিশ্বায়ন (Globalization) এবং সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের গল্প। আব্বাসীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল নিঃসন্দেহে বাণিজ্য, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে এক বিশাল সংযোগ সেতু তৈরি করেছিল। বাগদাদ কেবল একটি প্রশাসনিক রাজধানী ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের বাণিজ্যিক হৃৎপিণ্ড বা এন্ট্রোপট (Entrepot)। দজলা (টাইগ্রিস) ও ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থান এবং পারস্য উপসাগরের সাথে সরাসরি সংযোগ আব্বাসীয়দের সমুদ্র বাণিজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি বানিয়েছিল। সিল্ক রোড (Silk Road) দিয়ে চীনের রেশম, পোর্সেলিন এবং কাগজ আসত; পূর্ব আফ্রিকা বা ‘জঞ্জ’ অঞ্চল থেকে আসত সোনা, হাতির দাঁত, পশুর চামড়া এবং দাস; রাশিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা ‘ভারাঞ্জিয়ান’দের কাছ থেকে আসত উন্নতমানের পশম, আম্বর এবং মোম; আর ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসত মসলা, সুগন্ধি, দামি কাঠ এবং রঞ্জক পদার্থ। এই বিশাল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক বা মার্কেন্টাইল সিস্টেম (Mercantile System) আব্বাসীয় অর্থনীতিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যা মধ্যযুগের অন্য কোনো সভ্যতার পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। বণিকরা এই সমাজে ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত শ্রেণি, যা সমসাময়িক ইউরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল, যেখানে বণিকদের নিচু চোখে দেখা হতো। আব্বাসীয় সমাজে বাণিজ্যের এই মর্যাদার পেছনে ধর্মীয় কারণও ছিল; যেহেতু নবী মুহাম্মদ এবং প্রথম খলিফা আবু বকর নিজেরা বণিক ছিলেন, তাই বাণিজ্যকে একটি সৎ এবং অভিজাত পেশা হিসেবে গণ্য করা হতো। সিন্দবাদ নাবিকের (Sinbad the Sailor) দুঃসাহসিক গল্পগুলো হয়তো কাল্পনিক, কিন্তু তা সেই সময়ের বসরা ও সিরাফ বন্দরের বণিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতারই ছায়া। উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চীন পর্যন্ত বাণিজ্য যাত্রা বা মেরিটাইম ট্রেড (Maritime Trade) ছিল সেই যুগের প্রেক্ষাপটে এক অকল্পনীয় ঝুঁকি ও সাহসের ব্যাপার।
অর্থনৈতিক লেনদেনের গতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আব্বাসীয়রা এক বৈপ্লবিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে, যাকে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের আদিম রূপ বলা যেতে পারে। তৎকালীন বিশ্বে যখন ধাতব মুদ্রার ওজনে লেনদেন হতো এবং বিশাল পরিমাণ সোনাদানা বহন করা ছিল ডাকাতদের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তখন আব্বাসীয় বণিকরা উদ্ভাবন করেন ‘সাক’ (Sakk) বা চেক ব্যবস্থা। এই ক্রেডিট সিস্টেম (Credit System) বা ঋণদান পদ্ধতি বাণিজ্যের চেহারা বদলে দেয়। একজন বণিক বাগদাদের কোনো সরাফ বা ব্যাংকারের কাছে টাকা জমা দিয়ে একটি সাক নিতেন এবং সেই কাগজ দেখিয়ে হাজার মাইল দূরে চীন, ভারত বা মরক্কোর কোনো এজেন্টের কাছ থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারতেন। এই পদ্ধতি কেবল নিরাপত্তাই দেয়নি, বাণিজ্যের মূলধন প্রবাহ বা ক্যাপিটাল ফ্লো (Capital Flow)-কে করেছিল দ্রুততর। এর সাথে যুক্ত ছিল হাওলা ব্যবস্থা (Hawala System), যা অনানুষ্ঠানিক বিশ্বাস-ভিত্তিক অর্থ স্থানান্তরের একটি মাধ্যম ছিল এবং আজও বিশ্বের অনেক প্রান্তে প্রচলিত। আব্বাসীয় দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) এবং দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রার মর্যাদা পেয়েছিল, অনেকটা আজকের দিনের মার্কিন ডলারের মতো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড পর্যন্ত আব্বাসীয় মুদ্রার সন্ধান পেয়েছেন, যা প্রমাণ করে তাদের অর্থনৈতিক প্রভাবের পরিধি কতটা বিশাল ছিল। এই সমৃদ্ধ অর্থনীতির আরেকটি গোপন ভিত্তি ছিল কৃষি বিপ্লব বা এগ্রিকালচারাল রিভোলিউশন (Agricultural Revolution)। পূর্ব দিক থেকে নতুন নতুন ফসল – যেমন চাল, আখ, তুলা, বেগুন, এবং বিভিন্ন সাইট্রাস ফল – পশ্চিমে আনা হয় এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে সেগুলোর ব্যাপক চাষাবাদ শুরু হয়। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস অববাহিকায় জটিল খাল ব্যবস্থা এবং পারস্যের কানাৎ (Qanat) প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি উৎপাদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা বিশাল জনসংখ্যা এবং বিলাসী জীবনযাত্রার জোগান দিতে সক্ষম ছিল (Watson, 1983)।
আব্বাসীয় সমাজব্যবস্থা ছিল প্রকৃত অর্থেই কসমোপলিটান (Cosmopolitan) বা বিশ্বজনীন। বাগদাদের রাস্তায় হাঁটলে আরবি, ফারসি, তুর্কি, গ্রিক, এবং ভারতীয় ভাষার মিশ্রণ শোনা যেত। তবে এই সমাজের ভেতরে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল, যা আরব ও অনারবদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করত। উমাইয়াদের পতনের পর অনারব মুসলিম বা মাওয়ালিদের মর্যাদা বাড়লেও, আরব আভিজাত্যবোধ পুরোপুরি লুপ্ত হয়নি। এর প্রতিক্রিয়ায় পারসিক বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের মধ্যে গড়ে ওঠে শুউবিয়া আন্দোলন (Shu’ubiyya Movement)। এটি ছিল মূলত একটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যেখানে অনারবরা সাহিত্য ও কৃষ্টিতে আরবদের চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করত। তারা দাবি করত যে, আরবদের যখন কোনো সভ্যতা ছিল না, তখন পারস্য হাজার বছরের ঐতিহ্য লালন করেছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই আব্বাসীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। সমাজ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল – ‘আল-খাসসা’ (অভিজাত শ্রেণি) এবং ‘আল-আম্মা’ (সাধারণ জনগণ)। অভিজাতদের মধ্যে ছিলেন খলিফার পরিবার, উচ্চপদস্থ আমলা, সেনাপতি, বড় বণিক এবং উলেমা বা ধর্মতাত্ত্বিকরা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল কৃষক, কারিগর, ছোট দোকানদার এবং সমাজের একেবারে নিচুতলায় থাকা দাস শ্রেণি। সমাজে আভিজাত্যের মাপকাঠি কেবল জন্ম বা বংশ ছিল না, বরং শিক্ষা বা আদব (Adab) এবং সম্পদও সামাজিক সচলতা বা সোশ্যাল মোবিলিটি (Social Mobility)-র সুযোগ করে দিত। একজন সাধারণ পরিবারের সন্তানও যদি মেধার প্রমাণ দিতে পারত, তবে সে উজির বা বিচারকের পদে আসীন হতে পারত, যদিও তা ছিল বিরল ঘটনা (Ahsan, 1979)।
বিলাসিতা এবং দাসপ্রথা: আলোর নিচে অন্ধকার
আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের জৌলুসের ঠিক নিচেই ছিল দাসপ্রথার এক অন্ধকার জগত। আব্বাসীয় অর্থনীতি এবং গৃহস্থালি জীবনের একটি বড় অংশ ছিল দাসশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। দাসপ্রথা বা স্লেভারি (Slavery) তৎকালীন সমাজে এতই স্বাভাবিক ছিল যে, এ নিয়ে খুব একটা নৈতিক প্রশ্ন তোলা হতো না। দাসদের প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেত: গৃহস্থালি দাস, সামরিক দাস বা মামলুক (Mamluk) এবং কৃষি বা শ্রম দাস। গৃহস্থালি দাসরা মূলত আফ্রিকা (নুবিয়ান), মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপ (স্লাভ) থেকে আসত। এদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ দাসীদের কদর ছিল বেশি এবং তাদের দামও ছিল আকাশচুম্বী। সুন্দরী এবং শিক্ষিতা দাসী, যারা গান-বাজনা, কবিতা আবৃত্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কথোপকথনে পারদর্শী ছিল, তাদের বলা হতো ‘কিয়ান’ বা গায়িকা। এই দাসীরা বা কনকিউবাইন (Concubine)-রা অনেক সময় খলিফা বা অভিজাতদের এতটাই প্রিয়ভাজন হয়ে উঠত যে, তারা প্রাসাদের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। খলিফাদের মায়েদের অনেকেই ছিলেন এই দাসী শ্রেণি থেকে আসা, যা প্রমাণ করে যে মাতৃসূত্রীয় বংশমর্যাদা আব্বাসীয়দের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। অন্যদিকে, তুর্কি দাসদের মূলত সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হতো তাদের যুদ্ধদক্ষতার জন্য। কিন্তু দাসপ্রথার সবচেয়ে অমানবিক রূপটি দেখা যেত দক্ষিণ ইরাকের কৃষি খামারে, যেখানে হাজার হাজার আফ্রিকান দাসকে পশুর মতো খাটানো হতো। এই দাসদের কোনো সামাজিক অধিকার ছিল না এবং তাদের জীবন ছিল দুর্বিষহ।
- দাস বিদ্রোহ এবং জাঞ্জ বিপ্লব:
আব্বাসীয় সমাজের এই চরম বৈষম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম বড় এবং রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহটি সংঘটিত হয় ৮৬৯ সালে, যা জাঞ্জ বিদ্রোহ (Zanj Rebellion) নামে পরিচিত। ‘জাঞ্জ’ শব্দটি পূর্ব আফ্রিকা থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। দক্ষিণ ইরাকের বসরা অঞ্চলের বিশাল লবণাক্ত জলাভূমি বা সল্ট মার্শ পরিষ্কার করে চাষযোগ্য জমি তৈরি এবং উপরের লবণের স্তর বা সল্টপিটার (Saltpeter) সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার জাঞ্জ দাসকে নিয়োজিত করা হয়েছিল। তাদের কাজের পরিবেশ ছিল অকল্পনীয় রকমের কঠোর; ম্যালেরিয়া-প্রবণ জলাভূমি, অপর্যাপ্ত খাবার এবং মালিকদের নিষ্ঠুর নির্যাতন ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। এই বারুদে আগুন দেন আলী ইবনে মুহাম্মদ নামক এক রহস্যময় নেতা। তিনি নিজেকে আলীর বংশধর দাবি করতেন এবং সম্ভবত তিনি খারিজি মতবাদ (Kharijite Ideology) দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যা বলত – “সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিই খলিফা হবে, এমনকি সে যদি ইথিওপিয়ান দাসও হয়।” আলী ইবনে মুহাম্মদ এই দাসদের মুক্তির স্বপ্ন দেখান এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দেন যে, বিজয়ী হলে তারা তাদের প্রভুদের সম্পদের মালিক হবে এবং প্রভুদের দাস বানাবে।এই বিদ্রোহ কেবল একটি দাঙ্গা ছিল না, এটি ছিল একটি সুসংগঠিত শ্রেণি সংগ্রাম (Class Struggle) বা গণবিপ্লব। বিদ্রোহীরা ‘আল-মুখতারা’ নামে নিজেদের একটি রাজধানী গড়ে তোলে, নিজস্ব মুদ্রা চালু করে এবং প্রায় ১৪ বছর ধরে (৮৬৯-৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের হৃদপিণ্ডে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা বসরা শহর দখল করে এবং ব্যাপক লুণ্ঠন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। আব্বাসীয় সেনাবাহিনী বারবার তাদের কাছে পরাজিত হয়, কারণ বিদ্রোহীরা জলাভূমির ভৌগোলিক সুবিধা বা গেরিলা যুদ্ধকৌশল (Guerrilla Warfare) ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। এই বিদ্রোহ আব্বাসীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় এবং বাগদাদের কেন্দ্রীয় শাসনকে নড়বড়ে করে তোলে। শেষ পর্যন্ত খলিফা আল-মুওতমিদের ভাই আল-মুওয়াফফাক এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে দীর্ঘ অবরোধ এবং অ্যামনেস্টি বা সাধারণ ক্ষমার প্রলোভন দেখিয়ে বিদ্রোহীদের মধ্যে ফাটল ধরান এবং বিদ্রোহ দমন করেন। আলী ইবনে মুহাম্মদের মাথা কেটে বাগদাদে আনা হয়। কিন্তু এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, আব্বাসীয়দের ঐশ্বর্যের ভিত্তি ছিল কতটা নড়বড়ে এবং শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে (Popovic, 1999)। - নারীদের অবস্থান এবং হারেম সংস্কৃতি:
আব্বাসীয় সমাজে নারীদের অবস্থান ছিল জটিল এবং বৈপরীত্যে ভরা। প্রাক-ইসলামী বা উমাইয়া যুগের তুলনায় আব্বাসীয় যুগে উচ্চবিত্ত নারীদের জনসমক্ষে চলাফেরা অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পারসিক সাসানীয় ঐতিহ্যের প্রভাবে নারীদের জন্য কঠোর পর্দা প্রথা এবং হারেমি সংস্কৃতি (Harem Culture) চালু হয়। খলিফা এবং অভিজাতদের প্রাসাদে ‘হারেম’ ছিল একটি পৃথক জগৎ, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তবে এই চার দেয়ালের ভেতরে থেকেও রাজপরিবারের নারীরা বা এলিট উইমেন (Elite Women)-রা অবিশ্বাস্য ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। খলিফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী জুবাইদা এবং মা খাইজুরান ছিলেন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জুবাইদা কেবল জনহিতৈষী ছিলেন না, তিনি ফ্যাশন আইকনও ছিলেন। তার পোশাক, জুতো এবং জীবনযাপন বাগদাদের অন্য নারীরা অনুকরণ করত। তিনি মক্কা ও মদিনায় তীর্থযাত্রীদের জলের কষ্ট দূর করার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে যে খাল খনন করেছিলেন, তা নহরে জুবাইদা (Zubaydah’s Spring) নামে পরিচিত এবং এটি আব্বাসীয় প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। অন্যদিকে, সাধারণ বা গরিব নারীদের জীবনে এই বিলাসিতা বা অবরোধ ছিল না; তাদের কৃষিকাজ, বুননশিল্প বা ছোটখাটো ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে হতো জীবন ধারণের জন্য। সমাজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল শিক্ষিত দাসী বা ‘জারিয়া‘, যারা অনেক স্বাধীন নারীর চেয়েও বেশি স্বাধীনতা ভোগ করত এবং পুরুষদের মজলিসে বসে সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে তর্ক করার অধিকার রাখত।
বিলাসিতা, ভোজনরসিকতা এবং সাংস্কৃতিক জীবন
আব্বাসীয় অভিজাতদের জীবনযাপন ছিল চরম বিলাসিতায় মোড়ানো, যাকে হেডোনিজম (Hedonism) বা সুখবাদ বলা যেতে পারে। বাগদাদের প্রাসাদগুলো ছিল স্থাপত্যশৈলীর এক একটি মাস্টারপিস। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে বাঁচার জন্য প্রাসাদের মাটির নিচে বিশেষ কক্ষ বা ‘সিরদাব’ (Sirdab) তৈরি করা হতো, যেখানে বাতাসের প্রবাহ এবং জলের ফোয়ারা ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে শীতল রাখত – যা ছিল তৎকালীন এয়ার কন্ডিশনিং (Air Conditioning) ব্যবস্থা। তাদের পোশাক-আশাকে ছিল আভিজাত্যের ছাপ; ঋতুভেদে তারা ভিন্ন ভিন্ন রঙের এবং উপাদানের পোশাক পরত। এই ফ্যাশন সচেতনতা বাগদাদে নিয়ে এসেছিলেন আন্দালুসিয়া থেকে আসা বিখ্যাত গায়ক ও ফ্যাশন ডিজাইনার জিরয়াব (Ziryab), যদিও তিনি পরে স্পেনে চলে যান। তিনি টুথপেস্ট, ডিওডোরেন্ট এবং খাবারের টেবিলে কাঁচের গ্লাস ব্যবহারের চল শুরু করেন। আব্বাসীয় রন্ধনশিল্প বা গ্যাস্ট্রোনমি (Gastronomy) ছিল অত্যন্ত উন্নত। কিতাব আল-তাবিখ (Book of Dishes) নামে দশম শতাব্দীর একটি রান্নার বই থেকে জানা যায় যে, তারা হাজার রকমের মসলা, মাংস এবং ফলের সমন্বয়ে জটিল সব খাবার তৈরি করত। বরফ দিয়ে শরবত ঠান্ডা করার পদ্ধতি এবং মিষ্টান্ন হিসেবে চিনির ব্যবহার (যা ইউরোপ তখনো জানত না) ছিল তাদের বিলাসিতার অংশ।
তবে এই অতিরিক্ত বিলাসিতা এবং কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন (Conspicuous Consumption) বা লোক দেখানো ভোগবাদ সমাজের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে প্রকট করে তুলেছিল। একদিকে খলিফার প্রাসাদে যখন সোনা ও রত্নখচিত পাত্রে খাবার পরিবেশন করা হতো, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বা ‘আল-আম্মা’রা উচ্চ কর বা ট্যাক্সেশন (Taxation)-এর চাপে পিষ্ট হতো। কবি আবু নুওয়াসের কবিতায় মদের পেয়ালা আর প্রেমের উচ্ছ্বাস যেমন আছে, তেমনি আল-জাহিযের বুক অফ মাইজার্স-এ সমাজের কৃপণতা ও ভণ্ডামির ব্যঙ্গাত্মক চিত্রও ফুটে উঠেছে। এই বিলাসিতাই কালক্রমে আব্বাসীয়দের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ভোগবাদী শাসকগোষ্ঠী ক্রমশ প্রজা ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
সাহিত্য এবং বিনোদন: মদের পেয়ালা, কবিতার ছন্দ এবং আদব সংস্কৃতির বিকাশ
আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাস কেবল মসজিদ, মিনার আর বায়তুল হিকমাহর গম্ভীর জ্ঞানচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সমান্তরালে বাগদাদের বুকে প্রবাহিত ছিল এক উচ্ছল, প্রাণবন্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া বিনোদনের ফল্গুধারা। বাগদাদ ছিল একাধারে ধ্রুপদী জ্ঞান ও ধর্মীয় অনুশাসনের কেন্দ্র, আবার অন্যদিকে এটি ছিল সুর, সুরা এবং কবিতার এক মায়াবী জগত। এই দ্বান্দ্বিকতা বা ডুয়ালিজম (Dualism) আব্বাসীয় সংস্কৃতির প্রাণভ্রমরা ছিল। দিনের বেলায় যে বাগদাদ ছিল ফকিহ এবং মুহাদ্দিসদের কঠোর অনুশাসনে কম্পমান, রাতের বেলায় সেই বাগদাদই ডুবে যেত টাইগ্রিসের তীরে অভিজাতদের প্রাসাদে আয়োজিত জমকালো সব মজলিসে। এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সাহিত্য এবং বিনোদন কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল সামাজিক মর্যাদা বা সোশ্যাল স্ট্যাটাস (Social Status) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রধান হাতিয়ার। উমাইয়া যুগের মরু-সংস্কৃতি বা বেদুইন ঐতিহ্য থেকে সরে এসে আব্বাসীয়রা গড়ে তুলেছিল এক পরিশীলিত নগর-সংস্কৃতি বা আরবান কালচার (Urban Culture)। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ছাপ পড়েছিল আরবি কবিতা এবং গদ্য সাহিত্যে। প্রাক-ইসলামী যুগের কাসিদা, যা শুরু হতো ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রেমিকার তাঁবুর স্মৃতিচারণ বা ‘নাসিব‘ দিয়ে, আব্বাসীয় যুগে এসে তা রূপ নিল রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা, বাগানের সৌন্দর্য এবং মদের আড্ডার বর্ণনায়। এই নতুন ধারার সাহিত্যের নাম দেওয়া হলো ‘বদি‘ বা নতুন শৈলী (The New Style), যার মাধ্যমে আরবি সাহিত্য তার সনাতন খোলস ছেড়ে এক আধুনিক এবং কসমোপলিটান (Cosmopolitan) রূপ ধারণ করল। এই সাহিত্যিক বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিলেন একদল কবি, যাদের বলা হতো ‘মুহদাসুন’ বা আধুনিকরা, আর তাদের মধ্যমণি ছিলেন আবু নুওয়াস।
কবিতার নতুন দিগন্ত: আবু নুওয়াস এবং খামরিয়াত
আব্বাসীয় কবিতার আকাশে আবু নুওয়াস (Abu Nuwas) ছিলেন এক ধুমকেতু, যার আলো একই সাথে চোখ ধাঁধিয়ে দিত এবং পুড়িয়ে দিত। তার আসল নাম ছিল আল-হাসান ইবনে হানি আল-হাকামি। মা ছিলেন পারসিক এবং বাবা আরব, এই মিশ্র রক্ত তার মানসজগতে এক ধরনের বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল। তিনি ছিলেন খলিফা হারুনুর রশীদের এবং পরে তার পুত্র আল-আমিনের সমসাময়িক ও পানসঙ্গী বা ‘নাদিম’। আবু নুওয়াস আরবি কবিতাকে মরুভূমির রুক্ষতা থেকে বের করে এনে বাগদাদের বিলাসিতা এবং হেডোনিজম (Hedonism) বা সুখবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। তার কবিতায় উঠে এসেছে তৎকালীন সমাজের অবদমিত বাসনা, যা ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করত না। তিনি ছিলেন লিবারটিনিজম (Libertinism) বা স্বেচ্ছাচারী জীবনদর্শনের প্রবক্তা। তার কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মদ বা ‘খামর’, নারী এবং তরুণ বালকদের প্রতি প্রেম বা পেডেরাস্টি (Pederasty)। এই বিষয়গুলো তিনি এমন এক জাদুকরী ভাষায় প্রকাশ করতেন যে, তার কঠোর সমালোচকরাও তার ভাষাশৈলীর প্রশংসা করতে বাধ্য হতো। তিনি ‘খামরিয়াত’ (Khamriyyat) বা মদের কবিতাকে একটি স্বতন্ত্র ও উচ্চমার্গীয় সাহিত্যিক জঁরা বা লিটারোরি জঁরা (Literary Genre) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে মদের বর্ণনা ছিল কাসিদার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, কিন্তু আবু নুওয়াস মদকে করলেন কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি মদের রঙ, গন্ধ, পাত্রে ঢালার শব্দ এবং পান করার পর মনের অবস্থার যে নিখুঁত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বর্ণনা দিতেন, তা ছিল অভূতপূর্ব। তিনি লিখতেন, “মদ হলো তরল সূর্য, যা অন্ধকার আত্মাকে আলোকিত করে।”
আবু নুওয়াস কেবল মদ ও প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের বিদ্রোহী বা আইকনোক্লাস্ট (Iconoclast)। তিনি প্রথাগত আরবি কবিতার কঠোর নিয়মগুলোকে ব্যঙ্গ করতেন। প্রাক-ইসলামী কবিরা যেখানে কবিতার শুরুতে বেদুইনদের মতো পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জন্য কান্না করতেন, আবু নুওয়াস সেখানে বলতেন, “ওই শুকনো বালুর জন্য কেঁদো না, তার চেয়ে এসো আমরা সরাইখানায় বসে জীবন উপভোগ করি।” তার এই ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি বা স্যাটায়ার (Satire) ছিল রক্ষণশীল সমাজের গালে চপেটাঘাতের মতো। তিনি ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে কৌতুক করতে ভয় পেতেন না, যা তাকে বহুবার বিপদে ফেলেছিল এবং কারাগারেও যেতে হয়েছিল। তার বিখ্যাত উক্তি, “আমাকে লুকিয়ে মদ দিও না, প্রকাশ্যে দাও, কারণ লুকিয়ে খাওয়াটা পাপের চেয়েও নিচু,” এটি কেবল মদ্যপানের আহ্বান ছিল না; এটি ছিল সমাজের ভণ্ডামি বা হিপোক্রেসি (Hypocrisy)-র বিরুদ্ধে এক দার্শনিক প্রতিবাদ। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, গোপনে পাপ করে বাইরে সাধু সাজার চেয়ে প্রকাশ্যে নিজের দোষ স্বীকার করা অনেক বেশি সাহসিকতার। তার কবিতায় ‘মুজুন’ বা ফ্রিভোলিটি (Frivolity) এবং অশ্লীলতার যে প্রকাশ দেখা যায়, তা ছিল মূলত তৎকালীন বাগদাদের অভিজাত শ্রেণির গোপন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি বা সোশ্যাল মিরর (Social Mirror)। খলিফা আল-আমিন, যিনি নিজেও আমোদপ্রমোদ পছন্দ করতেন, তিনি ছিলেন আবু নুওয়াসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তবে আবু নুওয়াসের জীবনের শেষ দিকে অনুশোচনা বা ‘জুহদিয়াত’ (Zuhdiyyat) জাতীয় কবিতাও পাওয়া যায়, যেখানে তিনি তার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তার জীবন ও কর্ম আব্বাসীয় সমাজের সেই জটিল মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে, যেখানে পাপবোধ এবং পাপের প্রতি অদম্য আকর্ষণ একই সাথে বিরাজ করত (Kennedy, 2005)।
গদ্য সাহিত্যের জাদুকর: আল-জাহিয এবং আদব সংস্কৃতি
কবিতার পাশাপাশি আব্বাসীয় যুগে গদ্য সাহিত্যে এক বিশাল বিপ্লব ঘটে, যাকে বলা হয় আদব (Adab) সাহিত্যের বিকাশ। ‘আদব’ শব্দটির অর্থ কেবল শিষ্টাচার নয়; এটি ছিল এক ধরনের এনসাইক্লোপেডিক জ্ঞান, যার মধ্যে ব্যাকরণ, ইতিহাস, কবিতা, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। একজন আদর্শ আমলা বা ‘কাতিব’-এর জন্য এই আদব জ্ঞান ছিল অপরিহার্য। এই ধারার অবিসংবাদিত সম্রাট ছিলেন আল-জাহিয (Al-Jahiz)। বাসরায় জন্মগ্রহণকারী এই কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ছিলেন একজন প্রকৃত পলিম্যাথ (Polymath)। তার পুরো নাম ছিল আবু উসমান আমর ইবনে বাহর। তার চোখগুলো একটু বেশি বড় বা বিস্ফারিত ছিল বলে তাকে ‘আল-জাহিয’ বা ‘বিস্ফারিত নেত্র’ বলা হতো। তিনি ছিলেন মুতাজিলা মতবাদের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং তার লেখায় র্যাশনালিজম (Rationalism) বা যুক্তিবাদের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়, বরং মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো। তার গদ্যশৈলী ছিল অনন্য; তিনি গুরুগম্ভীর বিষয়ের সাথে লঘু কৌতুক এবং ব্যঙ্গ মিশিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে পাঠক কখনোই একঘেয়েমি অনুভব করত না। তিনি বলতেন, “সবচেয়ে ভালো সাহিত্য হলো তাই, যা গম্ভীরতাকে কৌতুক এবং কৌতুককে গম্ভীরতার সাথে মিশিয়ে দেয়।”
আল-জাহিযের রচনাগুলোর মধ্যে কিতাব আল-বুখালা বা বুক অফ মাইজার্স (Book of Misers) হলো সামাজিক ব্যঙ্গরচনার এক অনবদ্য দলিল। এই বইয়ে তিনি তৎকালীন সমাজের কৃপণ ব্যক্তিদের আচরণের অত্যন্ত হাস্যরসাত্মক কিন্তু বাস্তবসম্মত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ অর্থের লোভে নিজের এবং অন্যের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। এই বইটির মাধ্যমে তিনি কেবল কৃপণতাকে উপহাস করেননি, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব বা হিউম্যান সাইকোলজি (Human Psychology) এবং সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তার আরেকটি কালজয়ী সৃষ্টি হলো কিতাব আল-হায়াওয়ান বা বুক অফ অ্যানিমেলস (Book of Animals)। সাত খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থে তিনি ৩৫০টিরও বেশি প্রাণীর বর্ণনা দিয়েছেন। তবে এটি কোনো সাধারণ প্রাণিবিদ্যার বই নয়। এখানে তিনি প্রাণীদের আচরণের পাশাপাশি ধর্মতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান এবং দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, এই বইয়ে তিনি এমন কিছু ধারণা ব্যক্ত করেছেন যা চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের বা ইভোলিউশন থিওরি (Evolution Theory)-র পূর্বসূরি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ‘স্ট্রাগল ফর এক্সিস্টেন্স’ বা অস্তিত্বের সংগ্রাম, খাদ্য শৃঙ্খল এবং পরিবেশের প্রভাবে প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন বা এনভায়রনমেন্টাল ডিটারমিনিজম (Environmental Determinism) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “প্রাণীরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে; খাদ্যের জন্য এবং প্রজননের জন্য।” ডারউইনের হাজার বছর আগে একজন মুসলিম তাত্ত্বিক যে এভাবে প্রকৃতির নিয়ম নিয়ে ভেবেছিলেন, তা আল-জাহিযকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে (Pellat, 1969)।
মজলিস সংস্কৃতি এবং সঙ্গীতের ভুবন
আব্বাসীয় বিনোদন জগতের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘মজলিস’ বা সাহিত্য ও সঙ্গীতের আসর। খলিফা, উজির এবং ধনী বণিকদের প্রাসাদে নিয়মিত এই মজলিস বসত। এখানে কবি, গায়ক, দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীরা একত্রিত হতেন। এই আসরগুলোতে যেমন উচ্চমার্গীয় ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক হতো, তেমনি চলত গান-বাজনা এবং মদ্যপান। মজলিসের প্রাণ ছিল ‘নাদিম’ বা পানসঙ্গীরা। একজন ভালো নাদিমকে হতে হতো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী; তাকে জানতে হতো কবিতা, গান, ইতিহাস, এবং কৌতুক, যাতে সে তার প্রভুকে সর্বদা বিনোদিত রাখতে পারে। আব্বাসীয় সঙ্গীত জগত ছিল পারসিক এবং আরব সুরের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ বা ফিউশন (Fusion)। এই সময়ের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন ইশাক আল-মাওসিলি (Ishaq al-Mawsili) এবং ইব্রাহিম আল-মাওসিলি। তারা শাস্ত্রীয় আরব সঙ্গীতের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জিরয়াব (Ziryab), যিনি ছিলেন ইশাকের ছাত্র। কিংবদন্তি আছে যে, জিরয়াবের প্রতিভা দেখে ইশাক ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে বাগদাদ ছাড়তে বাধ্য করেন। জিরয়াব পরে স্পেনের কর্ডোভায় গিয়ে আন্দালুসীয় সঙ্গীতের জন্ম দেন এবং উদ বা আরবীয় লিউট (Lute)-এ পঞ্চম তারটি সংযোজন করেন।
মজলিসের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘কিয়ান’ বা গায়িকা দাসীরা। এই দাসীরা ছিল অত্যন্ত রূপসী এবং বুদ্ধিমতী। তাদের ছোটবেলা থেকে কবিতা, গান এবং আদব কায়দা শেখানো হতো। তারা পুরুষদের সাথে সমান তালে বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কে অংশ নিতে পারত। তাদের প্রেম এবং বিরহের গান মজলিসের পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে রাখত। আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানির লেখা কিতাব আল-আঘানি বা বুক অফ সংস (Book of Songs) গ্রন্থে এই সময়ের সঙ্গীত, গায়ক-গায়িকা এবং কবিদের জীবনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এটি কেবল গানের বই নয়, এটি আব্বাসীয় সামাজিক ইতিহাসের এক বিশাল আকর গ্রন্থ। এই বই থেকে জানা যায় যে, সঙ্গীত এবং কবিতা ছিল আব্বাসীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে মিশে থাকা এক অপরিহার্য উপাদান। খলিফা আল-মাহদি থেকে শুরু করে আল-ওয়াসিক পর্যন্ত অনেকেই ছিলেন দক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ বা সঙ্গীতের সমঝদার।
গল্পবলা এবং আরব্য রজনীর আখ্যান
উচ্চমার্গীয় সাহিত্য বা হাই লিটারেচার (High Literature)-এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য ছিল গল্প বলার ঐতিহ্য। বাগদাদের রাস্তায়, সরাইখানায় এবং বাজারের কোণে কিসসা-কথকরা জড়ো হওয়া মানুষদের শোনাত জীন-পরী, জাদুকর এবং বীরদের গল্প। এই মৌখিক ঐতিহ্যের বা ওরাল ট্র্যাডিশন (Oral Tradition)-এরই লিখিত রূপ হলো বিশ্ববিখ্যাত আরব্য রজনী বা দ্য থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস (The Thousand and One Nights/Alf Layla wa Layla)। যদিও এই গল্প সংকলনটি সরাসরি আব্বাসীয় আমলের সৃষ্টি নয় এবং এর মূল উৎস ভারতীয় ও পারসিক (হাজার আফসানা), তবুও এর বর্তমান রূপটি আব্বাসীয় বাগদাদের পটভূমিতেই গড়ে উঠেছে। এই গল্পগুলোতে খলিফা হারুনুর রশীদ, তার উজির জাফর বার্মাকি এবং জল্লাদ মাসরুরকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখা যায়, যারা ছদ্মবেশে রাতের বাগদাদে ঘুরে বেড়ান। যদিও ঐতিহাসিক হারুন এবং গল্পের হারুনের মধ্যে অনেক পার্থক্য, তবুও আরব্য রজনী আব্বাসীয় সমাজের একটি কাল্পনিক কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য চিত্র তুলে ধরে। এখানে আমরা দেখি বাগদাদের জাঁকজমক, বণিকদের সমুদ্রযাত্রা, জাদুকরী প্রদীপ এবং ভাগ্যের উত্থান-পতন। এই সাহিত্যকে তৎকালীন আদব লেখকরা খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না, একে তারা ‘খুরাফাত’ বা আজগুবি গল্প বলতেন। কিন্তু সময়ের বিচারে এই লোকসাহিত্যই বা ফোকলোর (Folklore) আব্বাসীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে। কালিলা ওয়া দিমনা (Kalila wa Dimna) ছিল আরেকটি জনপ্রিয় গল্পের বই, যা ইবনে আল-মুকাফফা পাহলভি থেকে আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন। এটি ছিল মূলত পশুপাখির গল্পের ছলে লেখা রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশিকা, যাকে মিরর ফর প্রিন্সেস (Mirror for Princes) জঁরা বলা হয়। এখানে শিয়ালের চরিত্রের মাধ্যমে রাজদরবারের ষড়যন্ত্র এবং কূটকৌশল শেখানো হতো।
উপসংহার: সংস্কৃতির স্বর্ণালী অধ্যায়
আব্বাসীয় সাহিত্য ও বিনোদন জগত ছিল এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে বিলাসিতা, মেধা এবং সৃজনশীলতার এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছিল। আবু নুওয়াসের বিদ্রোহী কবিতা, আল-জাহিযের যুক্তিবাদী গদ্য, এবং মজলিসের সুরলহরী – সব মিলিয়ে বাগদাদ হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতির এক গলনপাত্র বা মেল্টিং পট (Melting Pot)। মদের পেয়ালা আর কবিতার ছন্দে আব্বাসীয়রা জীবনকে উদযাপন করেছিল। তারা দেখিয়েছিল যে, একটি সভ্যতা কেবল যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে মহান হয় না, মহান হয় তার সাহিত্য, সঙ্গীত এবং জীবনবোধের গভীরতার মাধ্যমে। তাদের এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পরবর্তীকালে ইউরোপীয় রেনেসাঁস এবং আধুনিক আরব সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আব্বাসীয়দের রাজনৈতিক ক্ষমতা আজ লুপ্ত, কিন্তু আবু নুওয়াসের কবিতার পংক্তি বা আল-জাহিযের হাস্যরস আজও সাহিত্যের পাঠকদের মনে সেই সোনালী অতীতের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
অবনতির শুরু: ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ এবং তুর্কি প্রহরীদের উত্থান
হারুনুর রশীদের মৃত্যু ৮০৯ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী ও গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করলেও, তা একই সাথে সাম্রাজ্যের কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। হারুন তার জীবনদশার শেষ পর্যায়ে মক্কায় গিয়ে কাবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া এক চুক্তির মাধ্যমে তার দুই পুত্র – আল-আমিন এবং আল-মামুনের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক দলিলটি মক্কার প্রটোকল (The Meccan Protocols) নামে পরিচিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরব আভিজাত্যের প্রতীক আল-আমিন হবেন বাগদাদের খলিফা, আর পারসিক মায়ের সন্তান আল-মামুন হবেন পূর্বাঞ্চল বা খোরাসানের শাসনকর্তা এবং পরবর্তী উত্তরাধিকারী। হারুন ভেবেছিলেন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আরব ও পারসিক – সাম্রাজ্যের এই দুই প্রধান শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অফ পাওয়ার (Balance of Power) বজায় থাকবে। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রক্তের সম্পর্ক গৌণ হয়ে যায়। হারুনের মৃত্যুর পরপরই দুই ভাইয়ের মধ্যে অবিশ্বাস দানা বাঁধতে শুরু করে। আমিন তার উজির ফজল ইবনে রাবির কুপরামর্শে মামুনের অধিকার খর্ব করতে শুরু করেন এবং নিজের ছেলে মুসাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। এর ফলে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তা ইসলামের ইতিহাসে চতুর্থ ফিতনা (Fourth Fitna) নামে পরিচিত। এটি কেবল দুই ভাইয়ের লড়াই ছিল না; এটি ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুটি ভিন্ন মতাদর্শ ও জাতিসত্তার সংঘাত – একদিকে বাগদাদের ঐতিহ্যবাহী আরব বা আবনা আল-দাওলা (Abna al-Dawla), অন্যদিকে খোরাসানের উদীয়মান পারসিক শক্তি।
এই গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল নজিরবিহীন। মামুনের সেনাপতি তাহির ইবনে আল-হুসাইন যখন বাগদাদ অবরোধ করেন, তখন শান্তির নগরী বা ‘মদিনাতুস সালাম’ এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বাগদাদের সুন্দর প্রাসাদ, লাইব্রেরি এবং বাগানগুলো জ্বলতে থাকে। ঐতিহাসিকরা এই অবরোধকে তুলনা করেছেন এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের সাথে। শহরের সাধারণ মানুষ, যারা ‘আইয়ারুন’ বা ভবঘুরে গুণ্ডা নামে পরিচিত ছিল, তারা আমিনের পক্ষ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত ৮১৩ সালে মামুনের বাহিনী জয়ী হয়। আমিনের পলায়ন এবং পরবর্তীতে তার নির্মম হত্যাকাণ্ড আব্বাসীয় পরিবারের পবিত্রতা বা স্যাক্রালিটি (Sacrality) নষ্ট করে দেয়। কথিত আছে, আমিনের কাটা মস্তক যখন মামুনের সামনে পেশ করা হয়, তখন মামুন বিজয়ের আনন্দ পেলেও তার ভেতরে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই রক্তপাত আব্বাসীয় খিলাফতের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে বাগদাদের অবকাঠামো যেমন ধ্বংস হয়েছিল, তেমনি ধ্বংস হয়েছিল খিলাফতের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। খোরাসান থেকে বাগদাদ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতি ভীতি বা ডেটারেন্স (Deterrence) কমে গিয়েছিল। যদিও আল-মামুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্বর্ণযুগের স্থপতি ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি এমন এক সাম্রাজ্য পেয়েছিলেন যা ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছিল। ভাইয়ে ভাইয়ে এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র বা হেরিডিটারি মনার্কি (Hereditary Monarchy) ব্যবস্থায় উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম না থাকলে তা রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
তুর্কি বাহিনীর উত্থান: প্রিটোরিয়ানইজম এবং বিচ্ছিন্নতা
আল-মামুনের মৃত্যুর পর ৮৩৩ সালে তার ভাই আল-মু’তাসিম (Al-Mu’tasim) খলিফার মসনদে বসেন। মু’তাসিম ছিলেন একজন বাস্তববাদী কিন্তু কঠোর শাসক। তিনি তার বড় দুই ভাইয়ের পরিণতি দেখেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, আরব গোত্রগুলো বা ‘আবনা’ এখন আর নির্ভরযোগ্য নয়, তারা আমিনের পক্ষ নিয়েছিল এবং পরাজিত হয়েছে। অন্যদিকে, পারসিকরা মামুনের আমলে অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে এবং তারা প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। মু’তাসিম এমন এক শক্তির খোঁজ করছিলেন, যারা হবে জাতিগত রাজনীতি বা এথনিক পলিটিক্স (Ethnic Politics)-এর ঊর্ধ্বে এবং যাদের আনুগত্য থাকবে কেবল খলিফার প্রতি। তার এই অনুসন্ধানের ফল হলো মধ্য এশিয়া (ট্রান্সঅক্সিয়ানা) থেকে হাজার হাজার তুর্কি যুবককে দাস হিসেবে কিনে আনা। এই তুর্কিরা ছিল জন্মগতভাবে যোদ্ধা, দুর্দান্ত অশ্বারোহী এবং তীরন্দাজ। তাদের কোনো স্থানীয় আত্মীয়স্বজন বা সামাজিক পিছুটান ছিল না। মু’তাসিম এদের নিয়ে গঠন করলেন এক বিশেষ ব্যক্তিগত বাহিনী, যা ইতিহাসে মামলুক প্রতিষ্ঠান (Mamluk Institution) বা গুলাম বাহিনী নামে পরিচিত। তিনি ভেবেছিলেন, এই শিকড়হীন বা রুটলেস (Rootless) সৈন্যরা কেবল তাদের মনিব বা খলিফার আদেশের দাস হয়ে থাকবে।
কিন্তু মু’তাসিমের এই সিদ্ধান্ত ছিল এক বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল বা মিসক্যালকুলেশন (Miscalculation)। তিনি বাগদাদে এই তুর্কি সৈন্যদের বসবাস করার অনুমতি দিলে শহরের স্থানীয় আরব ও পারসিক জনগণের সাথে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। তুর্কি সৈন্যরা ছিল উদ্ধত; তারা ঘোড়া নিয়ে বাজারের ভেতর দিয়ে দৌড়ে যেত, সাধারণ মানুষকে অপমান করত। বাগদাদের জনগণ খলিফার বিরুদ্ধে ক্ষুঁসে উঠল। জনরোষ থেকে বাঁচতে এবং তার প্রিয় বাহিনীকে রক্ষা করতে ৮৩৬ সালে মু’তাসিম এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বাগদাদ ত্যাগ করে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে দজলা বা টাইগ্রিস নদীর তীরে ‘সামারা’ (Samarra) নামে এক নতুন রাজধানী গড়ে তুললেন। এই ঘটনাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় শাসকের এলিয়েনেশন (Alienation) বা প্রজা থেকে বিচ্ছিন্নতা। সামারা ছিল এক বিশাল সামরিক ছাঁউনি, যেখানে খলিফা তার তুর্কি প্রহরীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে থাকতেন। এর মাধ্যমে খলিফা নিজেই নিজেকে একটি সোনার খাঁচায় বন্দি করে ফেললেন। তিনি সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন এবং পুরোপুরি নির্ভর হয়ে পড়লেন তুর্কি সেনাপতিদের ওপর। এই ব্যবস্থা জন্ম দিল এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংকটের, যাকে বলা হয় প্রিটোরিয়ানইজম (Praetorianism) – যেখানে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের রক্ষক হওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রের মালিক হয়ে ওঠে। তুর্কিরা বুঝতে পারল, খলিফার টিকে থাকা তাদের বাহুবলের ওপর নির্ভরশীল। এই উপলব্ধি বা সেলফ-রিয়ালাইজেশন (Self-realization) তাদের আনুগত্যকে ক্ষমতায় রূপান্তর করতে উৎসাহিত করল (Gordon, 2001)।
সামারার নৈরাজ্য: খলিফা যখন দাবার ঘুঁটি
মু’তাসিমের মৃত্যুর পর তার ছেলে আল-ওয়াসিক ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু আসল ক্ষমতা তখন তুর্কি সেনাপতিদের হাতে চলে গেছে। ওয়াসিকের মৃত্যুর পর ৮৪৭ সালে আল-মুতাওয়াক্কিল (Al-Mutawakkil) খলিফা হন। তিনি ছিলেন একজন রক্ষণশীল এবং কিছুটা স্বাধীনচেতা শাসক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তুর্কিদের ক্ষমতা কমানো দরকার। তিনি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন এবং আরব ও অন্য গোষ্ঠীগুলোকে আবার সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তুর্কি সেনাপতিরা, বিশেষ করে বোগা আল-শারাবি এবং ওয়াসিফ আল-তুর্কি, খলিফার এই পরিকল্পনা আঁচ করতে পারেন। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ৮৬১ সালের এক অন্ধকার রাতে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের নিজের ছেলে আল-মুনতাসির তুর্কি ঘাতকদের সাথে হাত মিলিয়ে পিতাকে হত্যা করেন। আব্বাসীয় ইতিহাসে এটি ছিল প্রথম রেজিসাইড (Regicide) বা খলিফা হত্যা। এই ঘটনা খলিফার পদের পবিত্রতা বা ইনভায়োলাবিলিটি (Inviolability) ধূলিসাৎ করে দেয়। রক্ষীরা বুঝতে পারল, খলিফার শরীর রক্তমাংসেরই তৈরি এবং তাকে হত্যা করা সম্ভব।
মুতাওয়াক্কিলের হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়, যা সামারার নৈরাজ্য (Anarchy at Samarra) নামে পরিচিত (৮৬১-৮৭০ খ্রি.)। মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে চারজন খলিফা – আল-মুনতাসির, আল-মুসতাইন, আল-মুতাজ এবং আল-মুহতাদি – ক্ষমতায় আসেন এবং করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন বা ক্ষমতাচ্যুত হন। খলিফা নিয়োগ এবং বরখাস্ত করাটা তুর্কি সেনাপতিদের কাছে একটি খেলায় পরিণত হয়। কোনো খলিফা যদি তুর্কিদের বকেয়া বেতন দিতে না পারতেন বা তাদের অবাধ্য হতেন, তবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হতো অথবা মরুভূমিতে ফেলে রাখা হতো। কথিত আছে, খলিফা আল-মুতাজকে রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল এবং মারধর করা হয়েছিল যতক্ষণ না তিনি পদত্যাগ পত্রে সই করেন। খলিফারা হয়ে পড়েছিলেন তুর্কিদের হাতের পুতুল বা পাপেট রুলার (Puppet Ruler)। এই সময় রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে, কারণ তুর্কি সৈন্যরা ক্রমাগত তাদের বেতন বাড়ানোর দাবি করত। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে কর আসা বন্ধ হয়ে যায়, কারণ দুর্বল কেন্দ্রীয় শাসনকে কেউ আর তোয়াক্কা করত না। এই নৈরাজ্য প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি যদি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বা সিভিলিয়ান কন্ট্রোল (Civilian Control)-এর বাইরে চলে যায়, তবে তা রাষ্ট্রকেই খেয়ে ফেলে (Kennedy, 2004)।
বুয়াইদদের উত্থান এবং ‘আমির আল-উমারা’র যুগ
কেন্দ্রীয় শাসন বা সেন্ট্রাল অথরিটি (Central Authority) যখন সামারার বিলাসিতা ও ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত, তখন সাম্রাজ্যের দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে বা পেরিফেরি (Periphery)-তে ভাঙন শুরু হয়। একে বলা হয় কেন্দ্রবিমুখী শক্তি বা সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সেস (Centrifugal Forces)-এর উত্থান। মিশরে আহমদ ইবনে তুলুন স্বাধীনতা ঘোষণা করে তুলুনিদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন, ইরানে তাহিরিদ এবং সাফ্ফারিদরাও কার্যত স্বাধীন হয়ে যায়। তবে আব্বাসীয়দের জন্য চূড়ান্ত অপমান অপেক্ষা করছিল বুয়াইদদের (Buyids) হাতে। বুয়াইবরা ছিল কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ উপকূলের ডেলামাইট অঞ্চলের শিয়া মতাবলম্বী যোদ্ধা। তারা ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে এবং ৯৪৫ সালে বাগদাদ দখল করে নেয়। আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাকফি তখন এতটাই দুর্বল ছিলেন যে, তিনি বুয়াইদ নেতা মুইজ আল-দাউলা-কে স্বাগত জানাতে বাধ্য হন।
বুয়াইদদের বাগদাদ দখল আব্বাসীয় খলিফাদের রাজনৈতিক মৃত্যুর দলিল। বুয়াইদরা খলিফাকে হত্যা করেনি বা খিলাফত বিলুপ্ত করেনি। তারা একটি নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব বা পলিটিক্যাল থিওরি (Political Theory) প্রয়োগ করল। তারা খলিফাকে কেবল একজন ধর্মীয় নেতা বা ‘ইমাম’ হিসেবে রেখে দিল, যার কাজ কেবল জুমার খুতবা দেওয়া এবং ধর্মীয় উৎসবে উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, সেনাবাহিনী এবং অর্থনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিল বুয়াইদ শাসকরা। তারা নিজেদের জন্য আমির আল-উমারা (Commander of Commanders) বা প্রধান আমিরের পদবি গ্রহণ করল। এটি ছিল রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ বা সেকুলারাইজেশন অফ পাওয়ার (Secularization of Power)-এর একটি মধ্যযুগীয় রূপ, যেখানে ‘সুলতান’ বা ‘আমির’ হলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক, আর ‘খলিফা’ হলেন আধ্যাত্মিক প্রতীক। খলিফা তখন নিজের প্রাসাদে বসেই বন্দি, তার মাসিক হাতখরচও বরাদ্দ করত বুয়াইদ আমবরা। কখনো কখনো খলিফাকে দারিদ্র্যের কারণে প্রাসাদের আসবাবপত্র বিক্রি করতে হতো। বুয়াইদ শাসকরা শিয়া হওয়ার কারণে তারা বাগদাদে শিয়া আচার-অনুষ্ঠান, যেমন আশুরা এবং গাদির-ই-খুম পালন করা শুরু করে, যা সুন্নি খলিফার জন্য ছিল চরম অস্বস্তিকর। তবুও খলিফারা এই অপমান সহ্য করে নিয়েছিলেন কেবল টিকে থাকার স্বার্থে। এই ব্যবস্থা বা ডায়ার্কি (Diarchy) সেলজুকদের আগ পর্যন্ত বজায় ছিল। এই করুণ পরিণতি আমাদের শেখায় যে, রাজনৈতিক বৈধতা বা লেজিটিমেসি (Legitimacy) থাকলেও যদি জবরদস্তিমূলক শক্তি বা কোয়ারসিভ পাওয়ার (Coercive Power) না থাকে, তবে কোনো শাসকই টিকতে পারে না (El-Hibri, 2010)।
১২৫৮ সালের মহাপ্রলয়: বাগদাদের পতন এবং সভ্যতার যবনিকা
ইতিহাসের গতিপথ সর্বদা সরলরেখায় চলে না; কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মহাকালের বিশাল চাকা হঠাৎ করে থেমে যায় এবং এক ভয়াবহ বাঁক নেয়। ১২৫৮ সাল ছিল আব্বাসীয় খিলাফত এবং সামগ্রিক ইসলামি সভ্যতার জন্য তেমনই এক মহাপ্রলয়ঙ্করী সন্ধিক্ষণ বা টিপিং পয়েন্ট (Tipping Point)। পূর্ব দিগন্ত থেকে ধেয়ে আসা মঙ্গোল বাহিনী কোনো সাধারণ শত্রু ছিল না; তারা ছিল প্রকৃতির রুদ্ররোষের মতো অপ্রতিরোধ্য, যাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ছিল না। চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান (Hulagu Khan), যিনি তার বড় ভাই গ্রেট খান বা মঙ্গোল সম্রাট মংকু খানের আদেশে বিশ্বজয়ের নেশায় মত্ত ছিলেন, তার বিশাল বাহিনী নিয়ে বাগদাদের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হলেন। মঙ্গোলদের যুদ্ধকৌশল ছিল ত্রাস সৃষ্টি করা; তারা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare)-এ এতটাই দক্ষ ছিল যে, তাদের আগমনের খবর শুনেই শত্রুপক্ষ মানসিকভাবে পরাজিত হয়ে পড়ত। বাগদাদের পতনের আগে হালাকু খান পারস্যের দুর্ভেদ্য আলামুত দুর্গ ধ্বংস করে হাশাশিন বা অ্যাসাসিন (Assassins) সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন, যা ছিল বাগদাদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। কিন্তু আব্বাসীয় খলিফা এবং তার পারিষদবর্গ সেই দেয়াললিখন পড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মঙ্গোলরা তখন অপরাজেয় শক্তি, তাদের ঘোড়ার খুরের নিচে একের পর এক সমৃদ্ধ নগরী ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল, আর বাগদাদ ছিল তাদের তালিকার পরবর্তী শিকার। এই আগ্রাসন ছিল মূলত যাযাবর স্তেপ কৌশল (Nomadic Steppe Strategy) এবং চৈনিক প্রকৌশলবিদ্যার এক মারাত্মক সংমিশ্রণ, যার সামনে বাগদাদের প্রাচীন প্রাচীর ছিল নিতান্তই ঠুনকো।
তৎকালীন খলিফা আল-মুসতাসিম (Al-Musta’sim) ছিলেন আব্বাসীয় বংশের ৩৭তম শাসক, কিন্তু তার চরিত্রে আব্বাসীয়দের সেই তেজ বা প্রজ্ঞা কোনোটিই অবশিষ্ট ছিল না। তিনি ছিলেন দুর্বল চিত্তের, দাম্ভিক, অত্যন্ত কৃপণ এবং বাস্তবতাবর্জিত এক শাসক। তার দরবার ছিল শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে জর্জরিত। খলিফার প্রধান উজির ইবনে আল-আলকামি (যিনি শিয়া মতাবলম্বী ছিলেন) এবং প্রধান সেনাপতি দাওয়াৎদার (যিনি সুন্নি ছিলেন) একে অপরের ঘোর শত্রু ছিলেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, উজির আলকামি গোপনে হালাকু খানের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন এবং খলিফাকে ভুল বুঝিয়েছিলেন, যা অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাত (Internal Sabotage) হিসেবে কাজ করেছিল। খলিফার মন্ত্রীরা তাকে বারবার সতর্ক করেছিলেন যে মঙ্গোলদের সাথে কূটনৈতিক সমঝোতায় আসা উচিত অথবা যুদ্ধের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। কিন্তু খলিফা আল-মুসতাসিম এক ধরনের ধর্মীয় বিভ্রম বা থিওলজিক্যাল ডিলুশন (Theological Delusion)-এর মধ্যে বাস করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি ‘আমিরুল মুমিনিন’ বা বিশ্বাসীদের নেতা, তাই তার কোনো ক্ষতি হলে আল্লাহ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড উল্টে দেবেন এবং মরক্কো থেকে খোরাসান পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব তাকে বাঁচাতে ছুটে আসবে। তিনি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার বদলে খরচ কমানোর জন্য সৈন্যদের ছাঁটাই করেছিলেন এবং রাজকোষে টাকা জমিয়ে রাখতেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, মঙ্গোলরা কোনো ধর্ম, খলিফা বা পবিত্রতাকে পরোয়া করে না; তারা কেবল শক্তি চেনে। আর ভূ-রাজনীতির বা জিওপলিটিক্স (Geopolitics)-এর নির্মম বাস্তবতা হলো, শক্তিহীনের কোনো বন্ধু থাকে না।
অবরোধ এবং দেয়ালের পতন: মৃত্যুর আলিঙ্গন
হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণের আগে খলিফাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে চরমপত্র পাঠান। খলিফা আল-মুসতাসিম তখনো নিজের অবস্থান সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মঙ্গোলদের হুমকি দিয়ে পাল্টা চিঠি লেখেন, যা হালাকু খানকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। ১২৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে হালাকু তার বিশাল বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অবরোধ করেন। এই বাহিনীতে কেবল মঙ্গোলরাই ছিল না, তাদের সাথে ছিল জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান এবং কিছু চীনা প্রকৌশলী, যারা অবরোধ যুদ্ধকৌশল (Siege Warfare)-এ পারদর্শী ছিল। তারা বাগদাদের চারপাশে গভীর পরিখা খনন করে এবং প্রাচীর ঘেরাও করে ফেলে, যাতে একটি পিঁপড়াও শহর থেকে বের হতে না পারে। মঙ্গোলরা পাম গাছ এবং পাথর ব্যবহার করে ক্যাটাপোল্ট বা ম্যাংগোনেলজ (Mangonels) তৈরি করে এবং বাগদাদের প্রাচীরের ওপর বৃষ্টির মতো পাথর ও ন্যাপথা বোমা বর্ষণ শুরু করে। খলিফা আল-মুসতাসিম তখন বুঝতে পারলেন বিপদ কত সন্নিকটে, কিন্তু তখন আর করার কিছুই ছিল না। আব্বাসীয় সেনাবাহিনী শহরের বাইরে এসে মঙ্গোলদের বাধা দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। তারা দজলা বা টাইগ্রিস নদীর বাঁধ কেটে দিয়ে মঙ্গোল শিবির প্লাবিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু মঙ্গোলরা দ্রুত উঁচু জায়গায় সরে যায় এবং আব্বাসীয় সৈন্যদের ফাঁদে ফেলে হত্যা করে। খলিফার সেনাবাহিনীর পতন ছিল দ্রুত এবং শোচনীয়।
অবশেষে, ৫২৪ বছরের পুরনো আব্বাসীয় রাজধানী তার ভাগ্য মেনে নিল। খলিফা আল-মুসতাসিম উপায়ন্তর না দেখে ১০ ফেব্রুয়ারি, ১২৫৮ সালে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলেন। তিনি তার পুত্র ও অমাত্যদের নিয়ে হালাকু খানের শিবিরে উপস্থিত হলেন। কিন্তু মঙ্গোলদের নীতি ছিল – শত্রু যখন আত্মসমর্পণ করে, তখন তাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ মাথা তোলার সাহস না পায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গোল বাহিনী বাগদাদ শহরে প্রবেশ করল এবং শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা (Genocide)। মঙ্গোল সৈন্যরা শহরের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি ঘরে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালাল। নারী, শিশু, বৃদ্ধ – কাউকে রেহাই দেওয়া হলো না। বাগদাদের বিখ্যাত মসজিদ, প্রাসাদ এবং হাসপাতালগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। ঐতিহাসিকদের মতে, এই হত্যাযজ্ঞে প্রায় ২ থেকে ৮ লাখ (কারো কারো মতে ১০ লাখেরও বেশি) মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। বাগদাদের রাস্তাগুলো লাশের স্তূপে ভরে গেল, পচা লাশের গন্ধে বাতাস এতটাই ভারী হয়ে উঠল যে, হালাকু খানকে শহরের বাইরে শিবির স্থাপন করতে হয়েছিল। জর্জিয়ান খ্রিস্টান সৈন্যরা, যারা মঙ্গোলদের সহযোগী ছিল, তারা তাদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় আক্রোশ মেটানোর জন্য বাগদাদের মুসলমানদের ওপর বিশেষ নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছিল। আব্বাসীয়দের গর্বের ধন বাগদাদ, যা একসময় ‘শহরগুলোর মা’ বলা হতো, তা পরিণত হলো এক ভুতুড়ে শ্মশানে। এই ধ্বংসলীলা ছিল টোটাল ওয়ার (Total War) বা সর্বাত্মক যুদ্ধের এক নৃশংস দৃষ্টান্ত (Amitai-Preiss, 1995)।
দজলার কালো জল: জ্ঞানতাত্ত্বিক গণহত্যা
বাগদাদের পতনে সবচেয়ে অপূরণীয় ক্ষতিটি কোনো মানুষের মৃত্যু ছিল না, তা ছিল জ্ঞানের মৃত্যু। মঙ্গোলরা বাগদাদের গর্ব বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) এবং অন্যান্য অসংখ্য লাইব্রেরিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই লাইব্রেরিগুলোতে সঞ্চিত ছিল গ্রিক, পারসিক, ভারতীয় এবং আরব পণ্ডিতদের শত শত বছরের গবেষণালব্ধ জ্ঞান। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন এবং সাহিত্যের হাজার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট (Manuscript) মঙ্গোলরা দজলা (টাইগ্রিস) নদীতে ফেলে দেয়। কথিত আছে, দজলা নদীর জল প্রথমে মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল, আর পরে বইয়ের কালিতে কালো হয়ে গিয়েছিল। একে আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় জ্ঞানতাত্ত্বিক গণহত্যা (Epistemicide) – অর্থাৎ একটি জাতির জ্ঞানভাণ্ডার ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্মৃতিকে মুছে ফেলা। নাসির আল-দিন আল-তুসি, যিনি হালাকু খানের সাথে ছিলেন এবং একজন বিখ্যাত পারসিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী, তিনি কিছু বই রক্ষা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু যা হারিয়ে গেল তার পরিমাণ ছিল অকল্পনীয়। এরিস্টটলের অনেক অনুবাদ, আল-খোয়ারিজমির মূল পাণ্ডুলিপি, এবং আল-রাজি ও ইবনে সিনার অনেক কাজ চিরতরে হারিয়ে গেল। মঙ্গোলরা বইগুলোর চামড়ার মলাট ছিঁড়ে তাদের সৈন্যদের জুতোর তলা বানিয়েছিল এবং দর্শনের মহামূল্যবান বইগুলো দিয়ে আস্তাবলের আগুন জ্বালিয়েছিল। মানব সভ্যতার এই ক্ষতি আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয় এবং এক দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার সূচনা করে।
খলিফার মৃত্যু: স্বর্ণভোজের উপকথা এবং রাজরক্তের কুসংস্কার
খলিফা আল-মুসতাসিমের মৃত্যু নিয়ে ইতিহাসে নানা নাটকীয় এবং মর্মান্তিক বিবরণ পাওয়া যায়। মঙ্গোলদের একটি বিশেষ কুসংস্কার বা শামানিস্টিক বিশ্বাস (Shamanistic Belief) ছিল যে, কোনো রাজবংশের শাসক বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির রক্ত মাটিতে ফেলা অশুভ লক্ষণ, এতে আকাশ ও পৃথিবীর আত্মারা রুষ্ট হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে। তাই হালাকু খান খলিফাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করতে চাননি। সর্বাধিক প্রচলিত মত অনুযায়ী, খলিফাকে একটি কার্পেট বা কম্বলে মুড়িয়ে নেওয়া হয় এবং এরপর তার ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে দেওয়া হয়। ঘোড়ার পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে খলিফা মারা যান, কিন্তু তার রক্ত মাটিতে পড়েনি। এটি ছিল মঙ্গোলদের চোখে ‘সম্মানজনক’ মৃত্যু, কিন্তু আব্বাসীয়দের জন্য ছিল চূড়ান্ত অপমান। আরেকটি বিখ্যাত উপকথা বা মিথ (Myth) আছে খলিফার মৃত্যু নিয়ে। বলা হয়, হালাকু খান খলিফাকে একটি মিনারে বা প্রাসাদে আটকে রেখেছিলেন এবং তাকে কোনো খাবার না দিয়ে কেবল তার জমানো সোনা ও রত্নরাজি সামনে রেখে দিয়েছিলেন। খলিফা যখন ক্ষুধার্ত হয়ে খাবারের জন্য মিনতি করছিলেন, তখন হালাকু খান নাকি তাকে বলেছিলেন, “তুমি এই সোনা দিয়ে সৈন্য না বানিয়ে জমিয়ে রেখেছ কেন? এখন এই সোনা খাও।” খলিফা উত্তর দিয়েছিলেন, “সোনা তো খাওয়া যায় না।” তখন হালাকু বলেছিলেন, “তাহলে এই সোনা জমিয়ে রেখে তোমার লাভ কী হলো?” এই ঘটনাটি সত্য হোক বা রূপক, এটি আব্বাসীয় খলিফার মিসম্যানেজমেন্ট (Mismanagement) বা অব্যবস্থাপনা এবং কৃপণতার প্রতি এক ঐতিহাসিক ব্যঙ্গ।
খলিফার মৃত্যুর সাথে সাথে আব্বাসীয় পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকেই হত্যা করা হয়। কেবল খলিফার এক কনিষ্ঠ পুত্রকে মঙ্গোলরা বাঁচিয়ে রাখে এবং তাকে মঙ্গোলীয় এক নারীর সাথে বিয়ে দেয়, যদিও ইতিহাসে তাদের আর কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। আব্বাসীয় খলিফার পতন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীকী সমাপ্তি ঘোষণা করে। বাগদাদের পতনের পর খিলাফত ব্যবস্থা তার সর্বজনীনতা হারিয়ে ফেলে। যদিও পরে মিশরের মামলুক সুলতানরা আব্বাসীয় বংশের এক আত্মীয়কে কায়রোতে নামমাত্র খলিফা হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিলেন, কিন্তু তা ছিল কেবল মামলুক শাসনের বৈধতা বা লেজিটিমেসি (Legitimacy) আদায়ের কৌশল। ৫২৪ বছর ধরে যে পরিবারটি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের সমাপ্তি ঘটল ধুলো, রক্ত আর অপমানের এক বিষাদময় উপাখ্যানের মাধ্যমে। ১২৫৮ সালের পর মুসলিম বিশ্ব আর কখনোই এককেন্দ্রিক শক্তির অধীনে আসতে পারেনি, এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের সেই স্বর্ণযুগ আর ফিরে আসেনি (Morgan, 1988)।
ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন মেরুকরণ
বাগদাদের পতন ছিল মধ্যযুগীয় ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি আব্বাসীয়দের বিলাসিতা, প্রজা-বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক দুর্বলতার চরম মূল্য ছিল। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছিল। বাগদাদের পতনের মাত্র দুই বছর পর, ১২৬০ সালে, এই অপরাজেয় মঙ্গোল বাহিনী ফিলিস্তিনের আইন জালুতের যুদ্ধে (Battle of Ain Jalut) মিশরের মামলুক বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। এটি ছিল মঙ্গোলদের অগ্রযাত্রা থামানোর প্রথম বড় ঘটনা। বাগদাদ ধ্বংস হলেও ইসলামি সভ্যতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি; এর ভরকেন্দ্র বাগদাদ থেকে সরে গিয়ে কায়রো এবং ইস্তাম্বুলের দিকে ধাবিত হয়। আব্বাসীয়দের পতন আমাদের শেখায় যে, সভ্যতা কেবল অতীত গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। জ্ঞান, সামরিক শক্তি এবং ন্যায়বিচারের সমন্বয় না থাকলে, সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্যও বাইরের আঘাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। হালাকু খানের ঘোড়ার খুর বাগদাদের মাটি রক্তাক্ত করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই রক্তস্রোত ইতিহাসের পাতায় লিখে দিয়ে গেছে এক চিরন্তন সত্য – অহংকার এবং অযোগ্যতা যখন শাসকের সঙ্গী হয়, তখন পতন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আব্বাসীয় ইতিহাসের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: ইবনে খালদুন থেকে হজসন
ইতিহাস কেবল মৃত রাজাদের হাড়গোড় আর যুদ্ধের সাল-তারিখের সমষ্টি নয়; এটি হলো মানুষের আচরণের এক বিশাল পরীক্ষাগার। আব্বাসীয় খিলাফতের উত্থান ও পতনকে বুঝতে হলে আমাদের কেবল ঘটনার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আমাদের তাকাতে হবে সেই সব মনীষী ও তাত্ত্বিকদের দিকে, যারা ইতিহাসের এই বিশৃঙ্খল ঘটনাপ্রবাহের ভেতর থেকে একটি শৃঙ্খলা বা সূত্র বের করার চেষ্টা করেছেন। আব্বাসীয় সাম্রাজ্য ছিল এমন এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্বের জটিল সমীকরণগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ক্লাসিক্যাল যুগের মুসলিম চিন্তাবিদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ – সবাই এই সাম্রাজ্যকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাদের তত্ত্বগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন বাগদাদের মতো এত শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে পড়ল, কেন বিপ্লবীরা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে, এবং কীভাবে একটি সভ্যতা তার নিজের ভারেই ধসে পড়ে। আমরা এখানে এমন কয়েকজন তাত্ত্বিক এবং তাদের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করব, যারা আব্বাসীয় ইতিহাসকে দেখার জন্য আমাদের চোখে নতুন লেন্স পরিয়ে দেন।
ইবনে খালদুন এবং আসাবিয়্যার চক্রাকার ইতিহাস
আব্বাসীয় খিলাফতের পতনকে সবচেয়ে নিঁখুতভাবে এবং নিষ্ঠুর সততার সাথে যিনি ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি হলেন চতুর্দশ শতাব্দীর তিউনিসিয়ান ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন (Ibn Khaldun)। তার জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ মুকাদ্দিমা (The Muqaddimah) বা ‘প্রলেগাবেনা’-তে তিনি ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তা আব্বাসীয়দের ক্ষেত্রে হুবহু মিলে যায়। খালদুনের ইতিহাসের মূল চাবিকাঠি হলো আসাবিয়্যা (Asabiyya) বা সামাজিক সংহতি (Social Cohesion)। তিনি বলেন, রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য কোনো ঐশ্বরিক আশীর্বাদ নয়, এটি টিকে থাকে একটি গোষ্ঠীর পারস্পরিক বন্ধন বা ‘গ্রুপ ফিলিং’-এর ওপর। আব্বাসীয়রা যখন খোরাসান থেকে বিপ্লব শুরু করেছিল, তখন তাদের মধ্যে এই ‘আসাবিয়্যা’ ছিল প্রবল। তারা ছিল মরুভূমির রুক্ষ বা বাদাওয়াহ (Badawah) সংস্কৃতির মানুষ, যারা একতাবদ্ধ ছিল এবং মৃত্যুর ভয় করত না। এই সংহতিই তাদের উমাইয়াদের সুসজ্জিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে সাহায্য করেছিল।
কিন্তু খালদুন দেখান যে, সভ্যতার একটি নির্মম চক্রাকার তত্ত্ব (Cyclical Theory) আছে। যাযাবর বা গ্রামীণ মানুষ যখন তাদের আসাবিয়্যার জোরে শহর দখল করে এবং সভ্যতা বা হাদারা (Hadarah) গড়ে তোলে, তখন তারা শহরের বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয়। বাগদাদের জৌলুস, রেশম, মদ এবং হারেমের আয়েশ আব্বাসীয় খিলাফতের প্রথম দিকের সেই সংগ্রামী চেতনাকে নষ্ট করে দিয়েছিল। খালদুন বলেন, একটি রাজবংশ সাধারণত চার প্রজন্মের বেশি তাদের শক্তি ধরে রাখতে পারে না:
- প্রথম প্রজন্ম: যারা কঠোর পরিশ্রম করে এবং আসাবিয়্যার জোরে সাম্রাজ্য গড়ে তোলে (যেমন: আস-সাফফাহ বা মনসুর)।
- দ্বিতীয় প্রজন্ম: যারা বাপ-দাদার সংগ্রাম দেখেছে কিন্তু নিজেরা কিছুটা বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে (যেমন: হারুনুর রশীদ)।
- তৃতীয় প্রজন্ম: যারা কেবল বিলাসিতাই দেখেছে, ক্ষমতাকে তারা নিজেদের জন্মগত অধিকার মনে করে এবং তোষামোদকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে (যেমন: আল-আমিন)।
- চতুর্থ প্রজন্ম: যারা রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো যোগ্যতাই রাখে না, ফলে তাদের হাত থেকে ক্ষমতা ফসকে যায় এবং নতুন কোনো শক্তিশালী ‘আসাবিয়্যা’ সম্পন্ন গোষ্ঠী (যেমন: তুর্কি বা মঙ্গোলরা) এসে তাদের উৎখাত করে।
আব্বাসীয়দের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক এই চিত্রই দেখি। হারুনের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা যখন গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হলো, তখন তাদের সেই আদি ‘হাশিমী’ সংহতি ভেঙে গিয়েছিল। তারা তখন নিজেদের গোত্রের ওপর ভরসা না করে তুর্কি ক্রীতদাসদের ওপর নির্ভর করতে শুরু করল। খালদুনের মতে, যখন কোনো শাসক নিজের রক্তের বা গোত্রের লোকদের বিশ্বাস না করে ভাড়াটে সৈন্যদের ওপর নির্ভর করে, তখন তার পতন অনিবার্য। আব্বাসীয়রা যখন ‘আসাবিয়্যা’ হারিয়ে ফেলল, তখন বাগদাদ কেবল একটি ফলের মতো পেকে ছিল, যা মঙ্গোলদের সামান্য ধাক্কাতেই খসে পড়েছিল। ইবনে খালদুন আমাদের শেখান, বিলাসিতা এবং নগরজীবন বা আরবানাইজেশন (Urbanization) সভ্যতার জন্য আশীর্বাদ হলেও, এটি মানুষের লড়াই করার মানসিক শক্তিকে পঙ্গু করে দেয় (Ibn Khaldun, 1967)।
আল-মাওয়ার্দি এবং রাজনৈতিক বাস্তববাদ
আব্বাসীয় খিলাফতের শেষের দিকে, যখন খলিফারা বুয়াইদ বা সেলজুক সুলতানদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন, তখন রাষ্ট্রের বৈধতা নিয়ে এক বিশাল সংকট তৈরি হয়েছিল। খলিফার হাতে কোনো ক্ষমতা নেই, অথচ তাত্ত্বিকভাবে তিনিই সব ক্ষমতার উৎস – এই অদ্ভুত প্যারাডক্স বা কূটাভাস সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ফকিহ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দি (Al-Mawardi)। তার লেখা আল-আহকাম আল-সুলতানিয়া (The Ordinances of Government) হলো সুন্নি রাজনৈতিক তত্ত্বের বাইবেল। মাওয়ার্দি ছিলেন একজন ঘোরতর বাস্তববাদী (Realist) বা প্রাগমেটিস্ট। তিনি দেখছিলেন যে রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে, তাই তিনি এমন একটি তত্ত্ব দাঁড় করালেন যা বিদ্যমান বিশৃঙ্খলাকে থামিয়ে রাখতে পারে।
মাওয়ার্দি তার তত্ত্বে ‘প্রয়োজনীয়তার নীতি’ বা ডকট্রিন অফ নেসেসিটি (Doctrine of Necessity)-র অবতারণা করেন। তিনি বলেন, একজন আদর্শ খলিফার সব গুণাবলি বর্তমান খলিফার মধ্যে নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে খলিফাকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ তাতে ফিতনা (Fitna) বা গৃহযুদ্ধ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তিনি যুক্তি দিলেন যে, অন্যায্য বা দুর্বল শাসন নৈরাজ্যের চেয়ে ভালো। মাওয়ার্দি খলিফা এবং সুলতানের (যারা বাস্তবে ক্ষমতা চর্চা করত) সম্পর্কের একটি আইনি কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বললেন, সুলতানরা দেশ চালাবে, কিন্তু তাদের বৈধতা নিতে হবে খলিফার কাছ থেকে। এটি ছিল মূলত খলিফার সম্মান বাঁচানোর এবং আব্বাসীয় প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার একটি আইনি ফিকির। মাওয়ার্দির এই তত্ত্ব আব্বাসীয় খিলাফতকে আরও কয়েকশ বছর টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল, যদিও তা ছিল নামমাত্র। তিনি আমাদের দেখান, রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে স্থিতিশীলতা বা স্ট্যাবিলিটি (Stability) অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বিপ্লবের চেয়ে বিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন বিপ্লবের পরে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করা কঠিন (Mawardi, 1996)।
মার্শাল হজসন এবং ‘ইসলামিকেট’ সমাজের ধারণা
আধুনিক যুগে আব্বাসীয় ইতিহাসকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি যিনি আমূল বদলে দিয়েছেন, তিনি হলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মার্শাল হজসন (Marshall Hodgson)। তার কালজয়ী গ্রন্থ দ্য ভেঞ্চার অফ ইসলাম (The Venture of Islam) আব্বাসীয় সমাজ বিশ্লেষণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। হজসন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা বা টার্মিনোলজি উদ্ভাবন করেন, যা হলো ‘ইসলামিকেট’ (Islamicate)। তিনি ‘ইসলামিক’ (Islamic) এবং ‘ইসলামিকেট’ (Islamicate) – এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য করেন। ‘ইসলামিক’ বলতে তিনি বোঝান যা সরাসরি ধর্মের সাথে যুক্ত (যেমন: নামাজ, রোজা, হাদিস)। আর ‘ইসলামিকেট’ বলতে তিনি বোঝান সেই বিশাল সংস্কৃতিকে, যা মুসলিম শাসিত অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল কিন্তু যা ধর্মীয়ভাবে ইসলাম নয়।
আব্বাসীয় সমাজ ছিল মূলত একটি ‘ইসলামিকেট’ সমাজ। উদাহরণস্বরূপ, আবু নুওয়াসের মদের কবিতা, আল-খোয়ারিজমির গণিত, ইবনে আল-হাইসামের অপটিক্স, বা পারসিক ধারার স্থাপত্য – এগুলো ‘ইসলামিক’ বা ধর্মীয় কিছু নয়। এগুলো হলো সেই সময়ের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির অংশ, যা মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং নাস্তিকরা মিলেমিশে তৈরি করেছিল। হজসন দেখান যে, আব্বাসীয়দের সাফল্য কেবল ধর্মের কারণে আসেনি, এসেছিল এই ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার কালচারাল সিন্থেসিস (Secular Cultural Synthesis)-এর কারণে। তিনি আব্বাসীয় সমাজকে বলেছিলেন ওইকুমেন (Oikoumene) বা বিশ্বজনীন সমাজ, যেখানে বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত সংযুক্ত ছিল। হজসনের তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, আব্বাসীয় যুগে কেন এত বিজ্ঞান ও শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। কারণ তারা ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে সমাজকে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তিতে চালাতে চেয়েছিল। এই ‘ইসলামিকেট’ সংস্কৃতিই ছিল আব্বাসীয়দের সফট পাওয়ার, যা তরবারির চেয়েও বেশি প্রভাবশালী ছিল (Hodgson, 1974)।
প্যাট্রিসিয়া ক্রোন এবং নেটিভিস্ট থিসিস
আব্বাসীয় বিপ্লব এবং তাদের সামরিক কাঠামোর কঠোর সমালোচক এবং বিশ্লেষণকারী হলেন ডেনিশ-আমেরিকান ইতিহাসবিদ প্যাট্রিসিয়া ক্রোন (Patricia Crone)। তার বিখ্যাত বই স্লেভস অন হর্সেস (Slaves on Horses) আব্বাসীয় ইতিহাসের এক যুগান্তকারী বিশ্লেষণ। ক্রোন প্রচলিত ইতিহাসের বিরোধিতা করে রিভিশনিস্ট (Revisionist) দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেন। তিনি আব্বাসীয় বিপ্লবকে কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে দেখেননি, তিনি একে দেখেছিলেন একটি ‘নেটিভিস্ট’ বা জাতীয়তাবাদী পুনরুত্থান (Nativist Resurgence) হিসেবে। তার মতে, এটি ছিল আরব আধিপত্যের বিরুদ্ধে পারসিক বা অনারবদের (মাওয়ালি) একটি বিপ্লব। আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসার পর আরব গোত্রতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয় এবং পারসিক আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।
ক্রোনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো আব্বাসীয়দের সামরিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা। তিনি দেখান যে, আব্বাসীয়রা যখন নিজেদের গোত্রীয় সেনাবাহিনী বা ট্রাইবাল আর্মি (Tribal Army)-কে বিশ্বাস করতে পারছিল না, তখন তারা তুর্কি ক্রীতদাসদের নিয়ে একটি পেশাদার সেনাবাহিনী তৈরি করে। একে তিনি বলেন সামরিক বাহিনীর পেশাদারিকরণ (Professionalization)। কিন্তু এর ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। জনগণ আর যুদ্ধের অংশ রইল না, যুদ্ধ হয়ে গেল খলিফা এবং তার ভাড়াটে সৈন্যদের ব্যাপার। ক্রোন যুক্তি দেন যে, এই বিচ্ছিন্নতাই আব্বাসীয়দের পতনের মূল কারণ। যখন আপনার রক্ষীরা সমাজের অংশ নয়, তখন তারা সমাজের মঙ্গলের চেয়ে নিজেদের পকেটের দিকে বেশি তাকাবে। তুর্কি গার্ডদের হাতে খলিফাদের জিম্মি হওয়া বা প্রিটোরিয়ানিজম (Praetorianism) ছিল এই ভুল নীতিরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। প্যাট্রিসিয়া ক্রোন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, একটি রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ভাড়াটে শক্তির ওপর নির্ভর করে, তবে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য।
এডওয়ার্ড সাঈদ এবং ওরিয়েন্টালিজমের লেন্স
আব্বাসীয় খিলাফতকে, বিশেষ করে হারুনুর রশীদকে পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে দেখেছে, তার সমালোচনা করেছেন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said)। তার মাস্টারপিস ওরিয়েন্টালিজম (Orientalism) গ্রন্থে তিনি দেখান যে, পাশ্চাত্য বা ইউরোপ আব্বাসীয় খিলাফতকে একটি ফ্যান্টাসি বা অলীক কল্পনার জগৎ হিসেবে চিত্রিত করেছে। ‘আরব্য রজনী’র অনুবাদ এবং প্রাচ্যবিদদের লেখার মাধ্যমে তারা বাগদাদকে মায়াবী শহর, উড়ন্ত কার্পেট, জিন-পরী এবং কামুক হারেমের শহর হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সাঈদ বলেন, এই অক্সিডেন্টাল গেজ (Occidental Gaze) বা পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি আব্বাসীয়দের প্রকৃত ইতিহাসকে ঢেকে দিয়েছে।
পাশ্চাত্য আব্বাসীয়দের জ্ঞান-বিজ্ঞান বা প্রশাসনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের বিলাসিতা এবং ‘বর্বরতা’-কে হাইলাইট করেছে। সাঈদের মতে, এটি ছিল এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক সাম্রাজ্যবাদ (Epistemological Imperialism)। ইউরোপ আব্বাসীয়দের ইতিহাসকে এমনভাবে লিখেছে যাতে তাদের নিজেদের (ইউরোপের) শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। তারা দেখাতে চেয়েছে, “দেখো, প্রাচ্যের শাসকরা কত অযৌক্তিক এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণ, তাই তাদের শাসন করা আমাদের (পশ্চিমাদের) নৈতিক দায়িত্ব।” আব্বাসীয় ইতিহাস পড়ার সময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন আমরা এই ওরিয়েন্টালিস্ট ফাঁদে পা না দিই। হারুনুর রশীদ কেবল হারেমের নারীদের নিয়ে সময় কাটাতেন না, তিনি ছিলেন একজন জটিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব – সাঈদের তত্ত্ব আমাদের এই সত্যটি মনে করিয়ে দেয় (Said, 1978)।
মার্শাল হজসন এবং গানপাউডার এম্পায়ারস-এর পূর্বসূরি
যদিও গানপাউডার এম্পায়ারস (Gunpowder Empires) বা বারুদ সাম্রাজ্যের ধারণাটি মূলত পরবর্তী অটোমান, সাফাভিদ এবং মুঘলদের জন্য ব্যবহৃত হয়, কিন্তু আব্বাসীয়দের পতনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আব্বাসীয়রা কেন প্রযুক্তিতে এগিয়ে থেকেও সামরিক প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়ল? তাত্ত্বিকরা দেখান যে, আব্বাসীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত কিন্তু তাদের সামরিক প্রযুক্তি ছিল স্থবির। তারা মঙ্গোলদের মতো ক্ষিপ্রগতির অশ্বারোহী বাহিনী বা পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের মতো আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আয়ত্ত করতে পারেনি। আব্বাসীয়দের স্বর্ণযুগে বিজ্ঞান ছিল মূলত তাত্ত্বিক এবং নাগরিক জীবনের সুবিধার জন্য (যেমন: কৃষি, চিকিৎসা, স্থাপত্য)। কিন্তু সামরিক ক্ষেত্রে তারা ছিল রক্ষণশীল। এই প্রযুক্তিগত স্থবিরতা (Technological Stagnation) তাদের পতনের একটি বড় কারণ। আধুনিক সমরবিদরা মনে করেন, আব্বাসীয়রা যদি চীনের কাছ থেকে বারুদের ব্যবহার শিখে তা যুদ্ধে প্রয়োগ করত, তবে হয়তো মঙ্গোলদের ঠেকানো সম্ভব হতো। জ্ঞান যখন কেবল বইয়ের পাতায় থাকে এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বা সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি (Survival Strategy)-তে রূপান্তরিত না হয়, তখন তা একটি সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে না।
পরিশেষে, এই তাত্ত্বিকরা আব্বাসীয় ইতিহাসকে কেবল রাজা-রানিদের গল্পের বাইরে নিয়ে গিয়েছেন। ইবনে খালদুন দেখিয়েছেন সামাজিক সংহতির গুরুত্ব, মাওয়ার্দি দেখিয়েছেন বৈধতার সংকট, হজসন দেখিয়েছেন সংস্কৃতির শক্তি, ক্রোন দেখিয়েছেন কাঠামোগত দুর্বলতা আর সাঈদ দেখিয়েছেন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। এই সব তত্ত্ব মিলে আব্বাসীয় খিলাফতের এক বহুমাত্রিক বা মাল্টি-ডাইমেনশনাল (Multi-dimensional) ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরে। আমরা বুঝতে পারি, বাগদাদের পতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, কোনো সভ্যতাই অপরাজেয় নয়, যদি না সে নিজেকে সময়ের সাথে পরিবর্তন করতে পারে।
উপসংহার: ইতিহাসের শিক্ষা ও মহাকালের রায়
আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাস কেবল একটি রাজবংশের উত্থান-পতনের গতানুগতিক গল্প নয়; এটি মানব সভ্যতার এক বিশাল ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার। এখানে আমরা দেখি কীভাবে চরম যুক্তিবাদ আর অন্ধবিশ্বাস পাশাপাশি চলেছে। একদিকে আল-খোয়ারিজমির মতো গণিতবিদরা শূন্যের ধারণা দিয়ে বিশ্বকে বদলে দিচ্ছেন, অন্যদিকে হারেমের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলছে ক্ষমতার জঘন্য ষড়যন্ত্র। একদিকে আল-রাজি ও ইবনে সিনার মতো মনীষীরা চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছেন, অন্যদিকে জল্লাদ মাসরুর তার ধারালো তরবারি দিয়ে কারও মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। সৃজনশীলতার চূড়ান্ত শিখর এবং ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তির অতল গহ্বর – মানুষ যে একই সাথে কতটা মহান এবং কতটা নিচ হতে পারে, তার উজ্জ্বল প্রমাণ এই আব্বাসীয় যুগ। এটি আমাদের দেখায় যে, সভ্যতা কেবল ইমারত বা প্রযুক্তি দিয়ে মাপা যায় না, তা মাপা হয় মানুষের মননশীলতা এবং নৈতিকতার মাপকাঠিতে।
আব্বাসীয়রা আমাদের শিখিয়ে গেছে, জ্ঞানই প্রকৃত শক্তি। তারা তাদের সম্পদ তরবারির চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছিল কাগজে এবং কালিতে। তাদের তৈরি করা জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি এবং অনুবাদ আন্দোলনের ফলেই প্রাচীন গ্রিক ও ভারতীয় জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল, যা পরবর্তীতে ইউরোপে রেনেসাঁস ঘটাতে সাহায্য করেছিল। আজ আমরা যে বৈজ্ঞানিক মেথড বা অ্যালগরিদম (Algorithm) ব্যবহার করি, তার অনেক কিছুরই ভ্রূণ জন্ম নিয়েছিল বাগদাদের সেই ধুলোমাখা ল্যাবরেটরিগুলোতে। জ্ঞানকে সহজলভ্য করার এবং তাকে সর্বজনীন করার এই মহৎ প্রয়াস তাদের অমর করে রেখেছে। তারা প্রমাণ করেছে, সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু জ্ঞান অবিনশ্বর।
আবার তাদের পতন আমাদের শেখায়, ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয়। একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড যদি নিজস্ব জনগণের বদলে ভাড়াটে সৈন্যদের ওপর নির্ভর করে, তবে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। বিলাসিতা, অতিরিক্ত আরামপ্রিয়তা আর প্রজাদের থেকে বিচ্ছিন্নতা আব্বাসীয়দের পতনের বড় কারণ ছিল। শাসকরা যখন প্রাসাদের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়ে, চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে থাকে, তখন বাইরের ঝড়ের শব্দ তারা শুনতে পায় না। তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক কল্পনার জগতে বাস করে। আর যখন তারা সেই ঝড়ের গর্জন শোনে, তখন আর পালানোর পথ থাকে না। খলিফা আল-মুসতাসিম তার জমানো সোনা দিয়ে নিজের জীবন বা সম্মান – কোনোটিই বাঁচাতে পারেননি। ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা আজও প্রতিটি রাষ্ট্র ও শাসকের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজ বাগদাদের সেই জৌলুস নেই, নেই সেই বৃত্তাকার নগরীর জাদুকরী স্থাপত্য। দজলা নদী হয়তো এখনও বয়, কিন্তু সেই লাইব্রেরি, সেই বিতর্ক সভা, সেই বিজ্ঞানীদের পদচারণা – সব হারিয়ে গেছে মহাকালের অতল গর্ভে। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে আব্বাসীয়রা যে অধ্যায় লিখে গেছে, তা মুছে ফেলা অসম্ভব। তাদের আবিষ্কৃত বীজগণিত দিয়েই আজ আমরা মহাকাশে রকেট পাঠাই, তাদের চিকিৎসাশাস্ত্র আধুনিক মেডিসিনের ভিত্তি, তাদের দর্শন আজও আমাদের ভাবায়। তাদের রেখে যাওয়া জ্ঞান আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি কোণে মিশে আছে।
ইতিহাস বড় নির্মম, কিন্তু সে সর্বদা সত্য কথা বলে। আব্বাসীয়দের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় – উত্থান আছে মানেই পতন আছে, সৃষ্টি আছে মানেই ধ্বংস আছে। এই চক্রের বাইরে কেউ নয়। আমরা কেবল এই মহাজাগতিক নাট্যমঞ্চের এক একজন ক্ষুদ্র দর্শক মাত্র। পৃথিবী তার নিজস্ব গতিতে ঘুরতে থাকে, আর সময় তার ডায়েরিতে লিখে রাখে নতুন কোনো সাম্রাজ্যের নাম, যা হয়তো একদিন আব্বাসীয়দের মতোই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। এই নশ্বর পৃথিবীতে কেবল মানুষের কর্ম, সৃষ্টি আর জ্ঞানটুকুই হয়তো কিছুদিন টিকে থাকে, বাকি সব – ক্ষমতা, দম্ভ, সিংহাসন, ধনসম্পদ – সবই ধুলোয় মিশে যায়। মহাবিশ্বের এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে আমরা সবাই ক্ষণিকের অভিনেতা, আমাদের অভিনয় শেষ হলে পর্দা নেমে আসবে, আর দর্শক হিসেবে মহাকাল হয়তো মৃদু হেসে পরবর্তী দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করবে।
তথ্যসূত্র
- Abbott, N. (1946). Two Queens of Baghdad: Mother and Wife of Harun Al Rashid. University of Chicago Press.
- Ahsan, M. M. (1979). Social Life Under the Abbasids. Longman.
- Allen, R. M. A. (2000). An Introduction to Arabic Literature. Cambridge University Press.
- Amitai-Preiss, R. (1995). Mongols and Mamluks: The Mamluk-Ilkhanid War, 1260-1281. Cambridge University Press.
- Bennison, A. K. (2009). The Great Caliphs: The Golden Age of the ‘Abbasid Empire. Yale University Press.
- Bloom, J. M. (2001). Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World. Yale University Press.
- Boyle, J. A. (1968). The Cambridge History of Iran, Volume 5: The Saljuq and Mongol Periods. Cambridge University Press.
- Bray, J. (Ed.). (2006). Writing and Representation in Medieval Islam: Muslim Horizons. Routledge.
- Clot, A. (1989). Harun al-Rashid and the World of the Thousand and One Nights. New Amsterdam Books.
- Coppens, P. (2013). The Origins of the Mihna. Journal of Abbasid Studies.
- Crone, P. (1980). Slaves on Horses: The Evolution of the Islamic Polity. Cambridge University Press.
- Daniel, E. L. (1979). The Political and Social History of Khurasan under Abbasid Rule. Bibliotheca Islamica.
- El-Hibri, T. (1999). Reinterpreting Islamic Historiography: Harun al-Rashid and the Narrative of the Abbasid Caliphate. Cambridge University Press.
- El-Hibri, T. (2010). The Abbasid Caliphate: A History. Cambridge University Press.
- Gordon, M. S. (2001). The Breaking of a Thousand Swords: A History of the Turkish Military of Samarra (A.H. 200-275/815-889 C.E.). State University of New York Press.
- Gutas, D. (1998). Greek Thought, Arabic Culture: The Graeco-Arabic Translation Movement in Baghdad and Early ‘Abbasid Society (2nd-4th/8th-10th centuries). Routledge.
- Hillebrand, C. (1999). The Crusades: Islamic Perspectives. Edinburgh University Press.
- Hitti, P. K. (1970). History of the Arabs. Palgrave Macmillan.
- Hodgson, M. G. S. (1974). The Venture of Islam: Conscience and History in a World Civilization (Vol. 1). University of Chicago Press.
- Hourani, A. (1991). A History of the Arab Peoples. Warner Books.
- Hurvitz, N. (2002). The Formation of Hanbalism: Piety into Power. Routledge.
- Ibn Khaldun. (1967). The Muqaddimah: An Introduction to History (F. Rosenthal, Trans.). Princeton University Press.
- Irwin, R. (2004). The Arabian Nights: A Companion. Tauris Parke Paperbacks.
- Kennedy, H. (1990). The Early Abbasid Caliphate: A Political History. Croom Helm.
- Kennedy, H. (2004). The Prophet and the Age of the Caliphates: The Islamic Near East from the 6th to the 11th Century. Pearson Longman.
- Kennedy, H. (2005). The Court of the Caliphs: The Rise and Fall of Islam’s Greatest Dynasty. Weidenfeld & Nicolson.
- Lapidus, I. M. (2014). A History of Islamic Societies. Cambridge University Press.
- Lassner, J. (1980). The Shaping of ‘Abbasid Rule. Princeton University Press.
- Lewis, B. (1990). Race and Slavery in the Middle East: An Historical Enquiry. Oxford University Press.
- Lindberg, D. C. (1976). Theories of Vision from Al-kindi to Kepler. University of Chicago Press.
- Martin, R. C., & Woodward, M. R. (1997). Defenders of Reason in Islam: Mu’tazilism from Medieval School to Modern Symbol. Oneworld Publications.
- Mawardi, A. (1996). Al-Ahkam as-Sultaniyah: The Laws of Islamic Governance (A. Yate, Trans.). Ta-Ha Publishers.
- Montgomery, J. E. (2013). Al-Jahiz: In Praise of Books. Edinburgh University Press.
- Morgan, D. (1988). The Mongols. Blackwell Publishing.
- Nawas, J. A. (1994). A Reexamination of al-Ma’mun’s ‘Inquisition’. E.J. Brill.
- Pellat, C. (1969). The Life and Works of Jahiz. University of California Press.
- Popovic, A. (1999). The Revolt of African Slaves in Iraq in the 3rd/9th Century. Markus Wiener Publishers.
- Rashid al-Din. (1998). Jami’ al-tawarikh (Compendium of Chronicles). (W. M. Thackston, Trans.). Harvard University Department of Near Eastern Languages and Civilizations.
- Said, E. W. (1978). Orientalism. Pantheon Books.
- Saliba, G. (2007). Islamic Science and the Making of the European Renaissance. MIT Press.
- Sharon, M. (1983). Black Banners from the East: The Establishment of the ‘Abbasid State – Incubation of a Revolt. Magnes Press.
- Starkey, P. (2006). Modern Arabic Literature. Edinburgh University Press.
- Tabari, A. (1989). The History of al-Tabari Vol. 27: The Abbasid Revolution A.D. 743-750/A.H. 126-132. SUNY Press.
- Watson, A. M. (1983). Agricultural Innovation in the Early Islamic World: The Diffusion of Crops and Farming Techniques, 700–1100. Cambridge University Press.
- Watt, W. M. (1948). Free Will and Predestination in Early Islam. Luzac & Company.
- Wellhausen, J. (1927). The Arab Kingdom and its Fall. University of Calcutta.

