আকাঙ্ক্ষা ছিল ঝড়ের
একবার এক চিত্রকর সমগ্র পৃথিবীকে একটি বিশাল ক্যানভাসে সাজাতে চাইছিলেন। কিন্তু কিছুতেই পারছিলেন না। কোথায় যেন, কীভাবে যেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছিল। অনেক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তিনি উপলব্ধি করলেন, সমাজের ও রাষ্ট্রের বিরাজমান বিপত্তি ও অনিয়ম পৃথিবীটাকে সাজাতে দিচ্ছে না তাঁকে। একজন চিত্রকরও বিপ্লবী হতে পারেন। আর একজন বিপ্লবীর কাজ হল পৃথিবীকে নতুন ক’রে সাজানো এবং এটা করতে চাইলে, ঐ বিপত্তিগুলো, অনিয়মগুলো দূর করতে হবে আগে। রাষ্টের শুধু সংস্কার নয়, রাষ্টের খোল-নলচে পালটে দেওয়ার নাম বিপ্লব। বিত্তশালী, প্রভাবশালী, বিশেষ পরিবার গোষ্ঠীর বিপরীতে নানাভাবে বঞ্চনার শিকার শ্রমজীবী মানুষ যাতে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে— এরকম একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণই বিপ্লব।
সংস্কার দিয়ে রাষ্ট্রের আইনে পরিবর্তন আনা যায়, কিন্তু মানুষের মনোজাগতিক পরিবর্তনের আয়োজন ছাড়া পুরনো ব্যবস্থা ফিরে আসতে বাধ্য। নষ্ট রাজনৈতিক শক্তিই পুরনো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে। একমাত্র মনোজাগতিক পরিবর্তন হলেই জনগণ চিরদিনের জন্য নষ্ট রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে। বিষয়টি বুঝতে আমরা আন্তোনিও গ্রামসির সাহায্য নিতে পারি। লেনিনের মতো গ্রামসিও মনে করেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত যে প্রতিবাদ, অমান্যতা বা বিদ্রোহ, তাকে বিপ্লব বলা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার সাথে সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক উপাদান যুক্ত হয়। বাংলাদেশে ৫ই আগস্ট যেটা হল, তার মধ্যে অখণ্ড কোন সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বিষয় ছিল না, ছিল না সর্বস্তরের জনগণের সমানুপাতিক অংশগ্রহণ। অতএব, এটাকে গণ অভ্যুত্থান না বলে শুধু অভ্যুত্থান বলা ভালো, যেখানে শুধুই সরকার বদল হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লবের আদলে যাঁরা এটাকে জুলাই বিপ্লব বলেন, তাঁরা ভুল বলেন।
গ্রামসি বিশ্বাস করতেন, শাসক শ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও ক্ষমতা বজায় রাখে। তাঁর দৃষ্টিতে, একটি গণঅভ্যুত্থান শুধুমাত্র রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে না, শাসক শ্রেণীর সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জ করে। এটি একটি পাল্টা-আধিপত্য তৈরি করে, যেখানে বিকল্প ধারণা এবং মূল্যবোধগুলি ধীরে ধীরে জনসাধারণের মধ্যে একটি নতুন ঐক্যমত তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের তৈরি কী সেই সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক আধিপত্য? এক কথায় মুক্তিযুদ্ধ। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা সংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের নেতৃত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বয়ান। এর প্রত্যেকটিই ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পরবর্তী নেতারা কি সেই চেতনা, সেই মূল্যবোধ ধারণ করেন? বাংলাদেশের মানুষ তা বিশ্বাস করে না। আন্দোলনকারীরা হাসিনা সরকারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, কিন্তু বিকল্প ধারণার এবং মূল্যবোধগুলির ওপর ভিত্তিতে পাল্টা-আধিপত্য তৈরি করতে পারেন নি।
২০২৪-এর আগস্টের পট পরিবর্তন বিষয়ে ‘বিপ্লব’ শব্দটি ব্যবহার করা নিরর্থক। তবে মনে রাখতে হবে যে, সংস্কার দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা যাবে না। এ জন্য দরকার বৈপ্লবিক পরিবর্তন, যে পরিবর্তনে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য হিস্যা পাবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, ‘শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষ’ পরিভাষাটিই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত আন্দোলনকারীদের, সরকারের ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের বয়ানে। আমরা প্রশ্ন করতে চাই, আপনারা যে সংস্কার করতে চাইছেন, তাতে কি মেহনতি মানুষের জীবনমানের উল্লম্ফণ ঘটবে? ঘটলে কতটুকু
ঘটবে? ধনী, পুঁজিপতি শ্রেণীর যতোটা ঘটবে, তাঁদেরও কি ততোটা ঘটবে? যদি না ঘটে, এমন সংস্কার দিয়ে আমরা কী করব?
বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ যুক্ত হওয়াটা একটি ধোঁকাবাজী। এটি যুক্ত হয়েছিল সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে। কারণ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বিনির্মাণের কোন পরিকল্পণা আওমী লীগের ছিল না। এটা করা হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ বামধারাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। বাঙালি জাতীয়বাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে হয়তো তারা আন্তরিক ছিলেন। বাংলাদেশের বর্তমান কর্তব্যক্তিরা বাঙালিত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কোন কথা বলছেন না, যা খুবই রহস্যজনক ও উদবেগের।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান বলেছিলেন, বাংলাদেশের যাবতীয় সমস্যা আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে উদ্ভূত। গভীর অর্থবহ এই বক্তব্য। আমি কি বাঙালি মুসলমান নাকি মুসলমান বাঙালি? হিন্দুত্ব আগে নাকি বাঙালিত্ব আগে? ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়ই-বা কী? এই সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না জানার ফলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে সমাজে। আরবীয়দের মতো, আমরা আমাদের জাতীয় পরিচয়কে প্রধান করতে পারি নি। এই অবস্থায় ৭২-এর সংবিধান আমাদের জন্য একটি মাইল ফলক। এখানে ফিরে গিয়ে, তারপর নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে। বাঙালিত্বে ও ধর্মনিরপেক্ষতায় আমাদের ফিরে যেতেই হবে। এর ব্যত্যয় হলে, ফিরে যেতে হবে ২০২৪-এরও পেছনে, আরও বেশি অন্ধকারে। মনে রাখতে হবে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয় গৌণ, জাতীয় পরিচয় মুখ্য। ধর্মনিরপেক্ষতা আধুনিক রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য।
কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন ‘বৈষম্যবিরোধী’ অভিধা পেল, তখন খুব আশার সঞ্চার হয়েছিল। ভেবেছিলাম, ছাত্ররা এবার সত্যি সত্যিই জেগে উঠেছে। ভেবেছিলাম, জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া, একটি মাত্র ক্ষেত্রে এককভাবে বৈষম্য নিরসণ করা যায় না— এই সত্য এবার তাঁরা উপলব্ধি করেছে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা তাঁরা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে যে, ছাত্র ভর্তিতে ও চাকরিতে
সমান সুযোগের চেয়েও কৃষক-শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি। কারণ বাংলাদেশে যত টুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার ভিত্তি শ্রমশোষণ। এই উন্নয়নের কারণেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে, তাদের ছেলেময়েরা পড়াশুনা করতে পারছে এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনও করতে পারছে। কিন্তু সেখানে প্রান্তিক কৃষক ও শ্রমিক বা দিনমজুরের ছেলেমেয়েরা কোথায়? এই প্রশ্নের সমাধান না ক’রে সাম্য
স্থাপন অসম্ভব।
সংস্কার দিয়ে আইন পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু আইন মানতে মানুষকে বাধ্য করা যায় না। কারণ আইন বহিরাঙ্গের আর আইনের প্রতি আনুগত্য একটি অন্তর্গত বিষয়, যার জন্য দরকার মনোজাগতিক পরিবর্তন। মনোজাগতিক পরিবর্তনের জন্য দরকার বিপ্লব। শিল্প বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকান বিপ্লব, কিউবার বিপ্লব, রুশ বিপ্লব রাষ্ট্রের খোল-নলচে পালটে দিয়ে সৃষ্টি করেছিল নতুন মানুষ। এ জন্য দরকার
গভীর জ্ঞানচর্চা ও নিরবিচ্ছিন্ন সাধনা, দরকার দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সীমাহীন ধৈর্য।
ফরাসি বিপ্লবের পূর্বক্ষণে জনগণের প্রস্তুতির পর্বটি খেয়াল করুন। ভল্তেয়ার, রুশোসহ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে কালের অগ্রবর্তী চিন্তাবিদদের এবং লেখকদের একটি দল ব্যাপকভাবে লেখালিখি শুরু করেন। এগুলো ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, মহাবিশ্ব, মানুষ, ঈশ্বর ইত্যাদি সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তা। এই দর্শনে ছিল মানবিক যুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব। আর ছিল প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও বিরাজমান রাজনৈতিক অনুশীলনের সমালোচনা। ফ্রান্সের জনগণ তাঁদের এই দর্শন ব্যাপকভাবে পাঠ করে, গ্রহণ করে এবং ঘোরতর পরিবর্তন সাধনের জন্য সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়।
মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোন ‘শর্ট-কাট’ বা সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। প্রথম কাজ হল, নিজেকে প্রস্তুত করা তারপর ব্যাপক জনসংযোগ এবং মানুষ তৈরি। তারপর দল গঠন এবং অবশেষে রাষ্ট্রক্ষমতা। নিজেকে প্রস্তুত করা মানে নিজেকে মানবিক, শিক্ষিত, প্রাজ্ঞ, দক্ষ করার কঠিন ব্রত গ্রহণ করা। এ জন্য দরকার দীর্ঘ সময়। যাঁরা রাতারাতি ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের অভিসন্ধি নিজস্ব খ্যাতি অথবা অর্থ উপার্জন। বাংলাদেশে ২০০৭-০৮ সালে পট পরিবর্তনের কালেও কিছু মানুষের এ রকম খায়েশ লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
বঞ্চিত মানুষের প্রতি ভালোবাসাই বিপ্লবীর জীবনের ভিত্তিমূল এবং এর নিদর্শন কৈশোরেই দেখা যায়। ধীশক্তিসম্পন্ন এ সব মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা গভীর। তাঁরা চট ক’রে ধরে ফেলেন, রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া বঞ্চনা অবসানের কোন পথ নেই। উদাহরণ মার্ক্স, লেনিন, ভলতেয়ার, চে গুয়েভারা, ক্যাস্ট্রো— এমনকি গান্ধী, সুভাষ বসু, নেলসন ম্যান্ডেলা, শেখ মুজিবও।
চে গুয়েভারা সম্পর্কে জীবনীকার বলছেন, শৈশবেই তিনি গরীবদের প্রতি গভীর সহানুভূতি অনুভব করেন। তারপর বিভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক মতবাদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। স্কুল জীবন থেকে যার প্রস্তুতি শুরু, তার পরিণতি ঘটে কিউবায় সফল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ৩১ বছর বয়সে। অনেক সম্মানের সাথে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে একটি নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে পারতেন তিনি। কিন্তু মানুষের মুক্তির জন্য পৃথিবীব্যাপি একটি অখণ্ড কমিউনিস্ট ব্যবস্থা নির্মাণের ডাক শুনতে পেয়েছিলেন এই মহান বিপ্লবী। বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য কিউবা থেকে তিনি চলে যান কংগো, তারপর বলিভিয়া। বলিভিয়ার গহীন অরণ্যে তিনি আস্তান গাড়েন সহযোদ্ধাদের নিয়ে। সি.আই.এ-র মদদপুষ্ট বলিভিয়ান আর্মির হাতে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে যবনিকা ঘটে চে
গুয়েভারার বর্ণাঢ্য জীবনের!
নাজিম হিকমত ছেলেবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, একদিন মানুষের মুক্তি হবে। স্বপ্ন দেখতেন, নিম্নবর্গের মানুষ একদিন রাষ্ট্রে তাঁদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। স্বপ্ন থেকেই শুরু হয় সংগ্রাম। খুব অল্প বয়সেই বুঝতে পারলেন, বিপ্লব ছাড়া মুক্তি নেই। বুঝলেন, বিশ্বব্যাপি কমিউনিস্ট ব্যবস্থা নির্মাণের মধ্য দিয়েই পূর্ণ হতে পারে তাঁর সেই স্বপ্ন। যুক্ত হয়ে গেলেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। ৬১ বছরের জীবনে জেলই খাটলেন ১৭ বছর। ২০২৪-এর ‘বিপ্লবে’ ছাত্র-জনতার মধ্যে একজন চে গুয়েভারা বা নাজিম হিকমত কোথায়? কৃষক-শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তনের অ্যাজেন্ডা কোথায়? নাজিম হিকমতের মতো এই ক্রান্তিকালে কবিতার ভাষায় আমরাও বলি:
আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল ঝড়ের
সে ঝড় আজও ওঠে নি
তাই আমি ক্ষুব্ধ,
আমার তৃষ্ণা ছিল সমুদ্রের
সে তৃষ্ণা আজ কুপমণ্ডক
তাই আমি অতৃপ্ত,
আমার অভিমান ছিল বিদ্যুতের
সে অভিমান আজ মেঘে
তাই আমি অভিমানী !
About This Article
এই লেখাটি লেখকের নিজস্ব মতামত। সংশয় ডট কম এই মতামতের দায় গ্রহণ করে না।
সংশয় ডট কম মূল সাইটের প্রবন্ধ, জ্ঞানকোষ এবং রেফারেন্সভিত্তিক লেখাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন করতে পারে; কিন্তু মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বক্তব্য, বিশ্লেষণ ও অবস্থান লেখকের নিজস্ব বলে গণ্য হবে।

