সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) – খণ্ড ২ (শেষ): রাষ্ট্র, নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
ভূমিকা
আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিশীলতায় সন্ত্রাসবাদ যখন কোনো একক ভৌগোলিক সীমানা বা নির্দিষ্ট আন্ডারগ্রাউন্ড দলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ ধারণ করে, তখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা। কোনো সমাজ যখন সন্ত্রাসের মুখে পড়ে, তখন প্রথম প্রতিরোধটি গড়ে তোলে রাষ্ট্র। তবে সেই রাষ্ট্র নিজেই যখন তার সার্বভৌম ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ছায়াযুদ্ধের প্রক্সি হিসেবে সন্ত্রাসকে ব্যবহার করে, তখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা এক গভীর নৈতিক ও আইনি সংকটের মুখে পতিত হয়। আধুনিক পৃথিবীতে সহিংসতা আর কোনো সরল দ্বিমুখী লড়াই নয়; এটা রূপ নিয়েছে এক বহুমাত্রিক সমীকরণে, যার সাথে যুক্ত রয়েছে প্রযুক্তিগত রূপান্তর, অপরাধী চক্রের অন্ধকার নেটওয়ার্ক এবং জটিল অর্থনৈতিক প্রবাহ।
এই পর্বে সন্ত্রাসবাদের সেই কাঠামোগত বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা কেবল কোনো সামরিক ফ্রন্টলাইনের বিষয় নয়, বরং এটি জড়িত আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা (International Legal Framework), বহুপাক্ষিক গোয়েন্দা সমন্বয় এবং আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির সাথে। বিশ্বায়নের অগ্রগতির ফলে তথ্য, পণ্য ও পুঁজির অবাধ প্রবাহ যেমন সমৃদ্ধির পথ খুলে দিয়েছে, তেমনি তা সহিংস গোষ্ঠীগুলোর জন্য সীমানাহীন কার্যক্ষমতা তৈরি করেছে। বর্তমান যুগে একটি একক কমান্ড সেন্টার ছাড়াই ডিজিটাল মাধ্যমে সাইবার হামলা চালানো সম্ভব, এনক্রিপ্টেড চ্যানেলে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ অর্থ স্থানান্তর করা যায় এবং জৈব বা রাসায়নিক অস্ত্রের ঝুঁকি দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে জিম্মি করা যায়। ফলে সমকালীন কাউন্টার-টেররিজম (Counterterrorism) কৌশলগুলোকে অতীতের সনাতন চিন্তার বাইরে এসে সম্পূর্ণ নতুন ও বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে সাজাতে হচ্ছে।
একই সাথে জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে এই হুমকির বহিঃপ্রকাশ কীভাবে ঘটে, তা বোঝার জন্য নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ অপরিহার্য। দক্ষিণ এশিয়ার জটিল নিরাপত্তা গতিশীলতা এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল সমাজে অভ্যন্তরীণ মৌলবাদ, সীমান্ত সন্ত্রাস এবং অর্থপাচারের নেটওয়ার্কের পারস্পরিক সংযোগ পর্যালোচনা করা ছাড়া সার্বিক চিত্র স্পষ্ট হতে পারে না। সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও, সেই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ভারসাম্য রক্ষা করা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সবচেয়ে সংবেদনশীল পরীক্ষা। রাষ্ট্র যদি সন্ত্রাস দমনের নামে নিজেই বেআইনি বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়, তবে তা সমাজে নতুন ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতাকে আরও উসকে দেয়। এই দ্বিতীয় পর্বের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র, সমাজ ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই জটিল আন্তঃক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করা এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর স্বরূপ বস্তুনিষ্ঠভাবে উন্মোচন করা।
রাষ্ট্র, সমাজ ও সমকালীন সন্ত্রাসবাদ (State, Society and Contemporary Terrorism): বৈশ্বিক পরিবর্তন ও নতুন হুমকি
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস (State Terror): রাষ্ট্রের সহিংসতা
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ধারণা ও ঐতিহাসিক উৎস (Concept and Historical Origins of State Terror)
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সন্ত্রাসবাদ শব্দটি উচ্চারিত হলেই সাধারণত কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন, বোমা হামলাকারী দল কিংবা সশস্ত্র মিলিশিয়ার চেহারা ভেসে ওঠে। তবে রাষ্ট্রচিন্তার গভীর ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, আধুনিক সন্ত্রাসের জন্ম হয়েছিল কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে নয়, স্বয়ং রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে। ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল পর্বে ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সালের মধ্যে ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়ের (Maximilien Robespierre)-এর নেতৃত্বাধীন জ্যাকোবিন প্রশাসন বিপ্লব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিপক্ষ দমনের উদ্দেশ্যে যে নিয়মতান্ত্রিক হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিল, তাকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror) বলা হয়েছিল। সেই সময়ে রাষ্ট্র প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে নিজের নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করেছিল এবং যুক্তি দিয়েছিল যে বিপ্লবকে বাঁচাতে হলে সন্ত্রাস অপরিহার্য (Stohl & Lopez, 1984)। সুতরাং, উৎপত্তিগত দিক থেকে সন্ত্রাস কোনো গোপন অপতৎপরতা ছিল না, এটা ছিল রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রকাশ্য মহড়া।
সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ভেবার (Max Weber) রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছিলেন, রাষ্ট্র হলো এমন এক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে বলপ্রয়োগের বৈধ অধিকারের একচেটিয়া দাবি প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই বলপ্রয়োগ যখন আইনের সীমারেখা অতিক্রম করে নিজের নাগরিকদের ভেতরে স্থায়ী ভয় ও মানসিক পক্ষাঘাত সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা আইনসংগত শাসন থাকে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল স্টোহল (Michael Stohl) সাধারণ রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্যকার পার্থক্য নির্দেশ করে দেখিয়েছেন, সাধারণ দমনমূলক পদক্ষেপে রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো অপরাধী বা বিদ্রোহীকে নিষ্ক্রিয় করতে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে। অপরপক্ষে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস (State Terror) এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রক্রিয়া যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিশানা করে পুরো সমাজকে এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের মধ্যে আটকে রাখা হয়, যেন ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে না ওঠে (Stohl, 2006)।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই সহিংসতা কেবল প্রাচীন রোম কিংবা মধ্যযুগীয় ইনকুইজিশনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর এর বিস্তার ঘটেছে আরও পদ্ধতিগত উপায়ে। বিশ শতকের রাজনৈতিক সংকটের মুখে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি শাখাকে সন্ত্রাসের কাজে পুনর্বিন্যাস করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জর্জ লোপেজ (George A. Lopez) বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্র যখন তথাকথিত ‘জাতীয় স্বার্থ’ কিংবা ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ নির্মূলের নামে নিজের নিরাপত্তা কাঠামোর লাগামহীন অপব্যবহার শুরু করে, তখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস একটি সাধারণ প্রশাসনিক অভ্যাসে রূপান্তরিত হয় (Stohl & Lopez, 1984)। এই হিংস্রতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটা সুপরিকল্পিত নীতিনির্ধারণ, আমলাতান্ত্রিক আদেশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের যৌথ রূপ।
আইনি ও তাত্ত্বিক কাঠামো: বৈধ বলপ্রয়োগ বনাম সন্ত্রাস (Legal and Theoretical Frameworks: Monopoly of Violence vs. Terrorism)
রাষ্ট্র কখন আইনসম্মতভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা করছে আর কখন তা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে পর্যবসিত হচ্ছে, সেই সীমারেখা অত্যন্ত সংবেদনশীল। জার্মান আইনতাত্ত্বিক কার্ল স্মিট (Carl Schmitt) তার সার্বভৌম সিদ্ধান্তবাদ (Sovereign Decisionism) তত্ত্বে ঘোষণা করেছিলেন, জরুরি অবস্থা বা চরম সংকটময় মুহূর্তে যিনি সংবিধান স্থগিত করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তিনিই প্রকৃত সার্বভৌম। স্মিটের এই ধারণাকে সমকালীন বাস্তবতায় নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক জর্জিও আগামবেন (Giorgio Agamben)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সমকালীন শাসনব্যবস্থাগুলো তথাকথিত নিরাপত্তা সংকটের অজুহাতে ব্যতিক্রমী অবস্থা (State of Exception)-কে এক ধরনের স্থায়ী শাসনপদ্ধতিতে রূপান্তর করে (Agamben, 2005)। রাষ্ট্র যখন বিশেষ আইন বা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সাংবিধানিক অধিকারগুলো অকার্যকর করে দেয়, তখন সাধারণ মানুষ পরিণত হয় অধিকারহীন নিছক জৈবিক সত্তায়, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন হোমো সাকের (Homo Sacer)।
রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের এই রূপান্তরকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার জর্জ (Alexander George) প্রচলিত রাজনৈতিক ডিসকোর্সের ভণ্ডামি তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়শই দেখা যায়, কোনো ক্ষুদ্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়, অথচ একই ধরনের বা তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী ধ্বংসযজ্ঞ যখন রাষ্ট্র নিজে পরিচালনা করে, তখন তাকে ‘শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা’ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয় (George, 1991)। তাত্ত্বিক দিক থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি উপাদানের ওপর:
- প্রথমত, মূল শিকার এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য দর্শকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি করা;
- দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে গোপন বা প্রকাশ্য বলপ্রয়োগ করা; এবং
- তৃতীয়ত, সমাজের ভেতর এক সর্বব্যাপী অনিশ্চয়তা চালু রাখা যাতে কেউ নিজেকে নিরাপদ মনে না করে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো রাষ্ট্রই নিজের নাগরিকদের বিচারহীনভাবে হত্যা, নির্যাতন কিংবা আতঙ্কিত করার সার্বভৌম অধিকার রাখে না। জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। নিরাপত্তা গবেষক রুথ ব্লেক্লি (Ruth Blakeley) রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য চারটি শর্ত উল্লেখ করেছেন। তার মতে, কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে বলপ্রয়োগকারীকে হতে হবে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া কোনো প্রতিনিধি; সেখানে চরম শারীরিক সহিংসতার ভীতি বা প্রয়োগ থাকতে হবে; সহিংসতার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ভীতি তৈরি করা; এবং এই ভীতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা (Blakeley, 2009)। এই শর্তগুলো পূরণ হলে রাষ্ট্রের সেই বলপ্রয়োগকে কোনোভাবেই আইনসংগত দাবি করা যায় না, বরং তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিসেবে গণ্য হয়।
অভ্যন্তরীণ দমনযন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাসের কর্মপদ্ধতি (Apparatus of Internal Suppression and Modalities of State Terror)
একটি রাষ্ট্র যখন নিজের সীমানার ভেতরে সন্ত্রাসের কৌশল প্রয়োগ করে, তখন সেটিকে কার্যকর করার জন্য এক জটিল ও প্রাতিষ্ঠানিক দমনযন্ত্র গড়ে তোলে। এই কাঠামোর ভেতরে থাকে বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক কমান্ডো দল, গোপন পুলিশ এবং অনেক সময় সরকারের মদদপুষ্ট অনিবন্ধিত ডেথ স্কোয়াড (Death Squads)। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে এই ধরনের দমনযন্ত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল। চিলি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়েতে সামরিক জান্তাগুলো সমন্বিতভাবে অপারেশন কনডোর (Operation Condor) পরিচালনা করেছিল। এই যৌথ অপারেশনের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বী, বামপন্থী কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরি করে সীমান্ত অতিক্রম করেও হত্যা করা হতো। চিলিতে অগাস্টো পিনোশে (Augusto Pinochet)-এর শাসনামলে জাতীয় স্টেডিয়ামকে বন্দিশিবিরে রূপান্তর করে শত শত মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান পদ্ধতি হলো গুম (Enforced Disappearance) বা ব্যক্তিকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করে দেওয়া। গুমের মূল লক্ষ্য কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীকে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং পুরো পরিবার ও সমাজকে এক স্থায়ী মানসিক অনিশ্চয়তার ভেতরে আটকে রাখা। পরিবারটি কখনোই জানতে পারে না তাদের স্বজন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। এই ঝুলন্ত বাস্তবতা আশেপাশের মানুষদের মনে গভীর ভীতির জন্ম দেয়। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড হারম্যান (Edward S. Herman) এবং নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) তাদের যৌথ কাজগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বের বহু স্বৈরতান্ত্রিক সরকার পশ্চিমাদের নীরব সমর্থনে এই অভ্যন্তরীণ দমনযন্ত্র কার্যকর রেখেছিল (Chomsky & Herman, 1979)। জাতীয় নিরাপত্তার নামে সাধারণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, কৃষক আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং শিক্ষকদের নির্বিচারে গুম করা হতো।
এই দমনযন্ত্রের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নির্যাতনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। গোপন বন্দিশালাগুলোতে বন্দিদের ওপর এমন শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়, যাতে তারা নিজেদের মানবিক সত্তা হারিয়ে ফেলে। এরপর যদি কাউকে ছেড়েও দেওয়া হয়, সে সমাজের বুকে এক জীবন্ত সতর্কবার্তা হিসেবে ঘুরে বেড়ায়। অন্য নাগরিকরা তাকে দেখে অনুধাবন করে রাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার পরিণতি কী হতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড ক্লারিডজ (David Claridge) উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে শারীরিক মৃত্যুর চেয়েও কার্যকর অস্ত্র হলো এই সামাজিক পক্ষাঘাত সৃষ্টি করা (Claridge, 1996)। বিচারব্যবস্থাকে কবজা করে সাজানো বিচার বা বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটক রাখা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র পুরো সমাজকে একটি উন্মুক্ত কারাগারের রূপ দেয়।
মতাদর্শিক ন্যায্যতা ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার মনস্তত্ত্ব (Ideological Justifications and the Psychology of Authoritarian Systems)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কখনোই কেবল শারীরিক অস্ত্রের জোরে টেকে না, এর পেছনে প্রয়োজন হয় এক শক্তিশালী মতাদর্শিক বয়ান যা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধবোধকে মুছে দেয়। রাজনৈতিক দার্শনিক হ্যানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তার আকরগ্রন্থ The Origins of Totalitarianism-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসকে তাদের শাসনের কেন্দ্রীয় নীতিতে রূপান্তর করে (Arendt, 1951)। আরেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণ স্বৈরশাসকেরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাজনৈতিক বিরোধীদের ভয় দেখায়, কিন্তু সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র সন্ত্রাস প্রয়োগ করে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য এবং মানবিক মর্যাদাকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য। এখানে মতাদর্শকে এমন এক পরম সত্য হিসেবে হাজির করা হয় যার বাস্তবায়নে লাখ লাখ মানুষের জীবন বলি দেওয়াকেও ‘পবিত্র দায়িত্ব’ বলে প্রচার করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী হুয়ান লিঞ্জ (Juan J. Linz) তার কর্তৃত্ববাদী ও সর্বগ্রাসী শাসনের তুলনামূলক গবেষণায় মতাদর্শের এই বিধ্বংসী চরিত্র তুলে ধরেছেন (Linz, 2000)। নাৎসি জার্মানিতে আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে ইহুদি, রোমানি এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছিল, তা ছিল জাতিগত মতাদর্শের চরম বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে স্তালিনবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নে তথাকথিত সাম্যবাদী বিপ্লব সুরক্ষার নামে ‘শ্রেণিশত্রু’ ও ‘কুলাক’দের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল গ্রেট পার্জ (Great Purge)। এই কাঠামোগুলোতে রাষ্ট্র প্রথমে নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে, তারপর রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের সহায়তায় তাদের বিমানবিকীকরণ (Dehumanization) ঘটায়। তাদের সমাজদেহের ‘ক্যান্সার’ বা ‘ক্ষতিকর পরজীবী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ জনগণের চোখে তাদের বিনাশকে একটি প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান মনে হয়।
এই ধরনের মতাদর্শিক উন্মাদনায় রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মচারীরা আর নিজেদের হত্যাকারী মনে করে না, বরং তারা নিজেদের এক কাল্পনিক মহৎ লক্ষ্যের সেবক ভাবতে শুরু করে। কম্বোডিয়ায় পল পটের খেমার রুজ প্রশাসন নগরজীবন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে সমাজতন্ত্রের শত্রু গণ্য করে পুরো দেশকে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল। চশমা পরা বা বিদেশি ভাষা জানার অপরাধেই মানুষকে ‘জাতীয় শত্রু’ সাব্যস্ত করে হত্যা করা হতো। বাথিস্ট ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ১৯৮৮ সালে কুর্দিদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে পরিচালিত আনফাল অভিযান (Anfal Campaign) ছিল একই ধরনের মতাদর্শিক ও নৃতাত্ত্বিক আধিপত্য বজায় রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা। এই ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো দেখায় যে রাষ্ট্র যখন কোনো মতাদর্শকে পরম জ্ঞান করে মানবিক সহানুভূতির ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অবধারিত হয়ে ওঠে।
উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ ও বর্ণবাদী শাসনযন্ত্র (Colonialism, Imperial Control, and Apartheid State Terror)
বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যে গভীর ইতিহাস রয়েছে, তার অন্যতম নিকৃষ্ট অধ্যায় রচিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তখন সেই কাঠামোর মূল স্তম্ভই ছিল নিয়মতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাস। মার্টিনিকের চিন্তাবিদ ফ্রাঞ্জ ফানঁ (Frantz Fanon) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ The Wretched of the Earth-এ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা অস্ত্রের মুখে পরিচালিত হতো (Fanon, 1961)। ফানঁর মতে, উপনিবেশের পুলিশ ও সেনাসদস্যরা শাসকের সাথে স্থানীয় জনগণের কোনো স্বাভাবিক সংলাপ তৈরি করত না; তারা আসত লাঠি, জলকামান আর বুলেটের ভাষা নিয়ে। উপনিবেশ নিজেই ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী সন্ত্রাসবাদী কাঠামো, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও অধিকারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করা হতো।
ক্যামেরুনীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আশিল এমবেম্বে (Achille Mbembe) এই বাস্তবতাকে তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন তার বিখ্যাত নেক্রোপলিটিক্স (Necropolitics) বা মরণরাজনীতি তত্ত্বে (Mbembe, 2003)। এমবেম্বে দেখিয়েছেন, সার্বভৌম ক্ষমতা কেবল জীবন বাঁচানো বা পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে কে বাঁচবে আর কার মৃত্যু ঘটবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতার মাধ্যমে। ঔপনিবেশিক এবং বর্ণবাদী রাষ্ট্রগুলোতে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে এমন এক জায়গায় নিক্ষেপ করা হতো যেখানে তাদের জীবন কোনো মূল্যবান বিষয় ছিল না। ব্রিটিশ রাজত্বকালে ভারতে ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরীহ মানুষের ওপর জেনারেল ডায়ারের গুলি চালানোর আদেশ কিংবা ১৯৫০-এর দশকে কেনিয়ায় মাউ মাউ বিদ্রোহ দমনের নামে ব্রিটিশ প্রশাসনের হাজার হাজার মানুষকে নির্যাতন শিবিরে আটকে রাখা ছিল এই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রত্যক্ষ নজির।
একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘকালীন অ্যাপার্থাইড (Apartheid) বা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছিল সরাসরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাহমুদ মামদানি (Mahmood Mamdani) দেখিয়েছেন কীভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকার কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠদের ওপর পাশবিক আইন ও নিরাপত্তা বলয় চাপিয়ে দিয়েছিল (Mamdani, 1996)। সেখানে ১৯৬০ সালের শার্পভিল হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ১৯৭৬ সালের সোয়েটো ছাত্র আন্দোলন পর্যন্ত, যেকোনো গণদাবি দমনে রাষ্ট্র সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। বর্ণবাদী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কেবল তৎকালীন জীবনের ক্ষতি করেনি, এটা কয়েক প্রজন্ম ধরে একটি জনগোষ্ঠীর ভেতর অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বঞ্চনা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেছে।
গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত নিধন ও ডেমোসাইডের বাস্তবতা (Genocide, Extrajudicial Purges, and the Reality of Democide)
রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাত্রা যখন একক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছাড়িয়ে সমষ্টিগত বিনাশের দিকে ধাবিত হয়, তখন তা রূপ নেয় গণহত্যা ও ডেমোসাইডে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক রুডলফ রামেল (Rudolph Rummel) বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দমননীতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি উদ্বেগজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, গত এক শতকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে যত মানুষ নিহত হয়েছে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে নিজ দেশের সরকারের প্রত্যক্ষ নিধনযজ্ঞ ও কাঠামোগত সন্ত্রাসের কারণে (Rummel, 1994)। রামেল এই ধরনের রাষ্ট্রীয় অপরাধকে চিহ্নিত করতে ডেমোসাইড (Democide) প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন, যার অন্তর্ভুক্ত হলো গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক দুর্ভিক্ষ তৈরি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংগঠিত নিধনযজ্ঞ।
সোভিয়েত ইউনিয়নের গুলাগ (Gulag) ব্যবস্থা ছিল এই ডেমোসাইডের এক প্রকট উদাহরণ। সেখানে কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয় মতবাদের সাথে বিন্দুমাত্র ভিন্নমত পোষণ করত, তবে তাকে সুদূর সাইবেরিয়ার কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। প্রচণ্ড ঠান্ডায় অমানবিক খাটুনি আর অনাহারের মুখে ফেলে লাখ লাখ বন্দিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এই মৃত্যুগুলোকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড হিসেবে দেখানো হতো না, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এই ফলাফল নিশ্চিত করা হতো। একইভাবে রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালে হুতু চরমপন্থী সরকার নিয়ন্ত্রিত রেডিও স্টেশন রেডিও টেলিভিশন লিব্রে ডেস মিল কলিন্স (Radio Télévision Libre des Mille Collines)-এর মাধ্যমে তুৎসি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে উসকানি ছড়ানো হয়েছিল, তা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক নির্মম গণহত্যা।
ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসেও এই নিধনের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। গুয়াতেমালায় সামরিক একনায়কতন্ত্রের সময় মায়া আদিবাসীদের গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল ‘কমিউনিস্ট গেরিলা সহায়তাকারী’ সন্দেহে। সমাজবিজ্ঞানী টমাস কুশম্যান (Thomas Cushman) এই জাতীয় ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র যখন কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে তার নিরাপত্তার জন্য ‘স্থায়ী হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সব আইনি ও নৈতিক বাঁধ ভেঙে যায় (Cushman, 2005)। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তখন আর কোনো সাময়িক কৌশল থাকে না, এটা একটি পুরো সম্প্রদায়কে ভৌগোলিক বা শারীরিকভাবে মুছে ফেলার সর্বাত্মক অভিযানে রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিক আইন, দায়বদ্ধতা এবং বৈশ্বিক বিচারহীনতার সংকট (International Law, Accountability, and the Crisis of Global Impunity)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলার পথটি আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (State Sovereignty) এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাক্রমণ নীতির ওপর। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ফক (Richard Falk) দেখিয়েছেন, এই সার্বভৌমত্বের ধারণাকেই স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো নিজেদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে (Falk, 1988)। যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের সীমানার ভেতরে নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাস চালায়, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না, কারণ বহিরাগত যেকোনো হস্তক্ষেপকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের শামিল মনে করা হয়। ফক আরও উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বরাজনীতির পরাশক্তিগুলো যখন কোনো সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে তাদের ভূরাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পায়, তখন তারা সেখানকার চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনকেও নির্দ্বিধায় উপেক্ষা করে যায়।
১৯৯৮ সালে রোম সংবিধি গৃহীত হওয়া এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court – ICC) প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি বড় আইনি অগ্রগতি ছিল। এই আদালত কোনো রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপ্রধান বা রাজনৈতিক নেতাকে তাদের রাষ্ট্রীয় পদের আড়ালে লুকানোর সুযোগ দেয় না; মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes Against Humanity) এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে। তবে এই কাঠামোর কার্যকারিতা নির্ভর করে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক নিকোলাস হুইলার (Nicholas Wheeler) তার Saving Strangers গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রায়শই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে (Wheeler, 2000)। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ভেটো ক্ষমতা বহুবার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিচার নিশ্চিত করার আরেকটি উপায় হলো সার্বজনীন বিচারিক এখতিয়ার (Universal Jurisdiction) প্রয়োগ। এই নীতির অধীনে যেকোনো দেশের জাতীয় আদালত বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে, অপরাধী বা ভুক্তভোগীর জাতীয়তা যাই হোক না কেন। ১৯৯৮ সালে লন্ডনে চিলির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশেকে স্প্যানিশ আদালতের পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করার ঘটনা ছিল এই নীতির একটি ঐতিহাসিক নজির। তবুও বাস্তব রাজনীতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সবসময়ই এই ধরনের বিচারের ঊর্ধ্বে থেকে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন সকল রাষ্ট্রের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য না হবে এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানব মর্যাদাকে অগ্রাধিকার না দেওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না। নাগরিক সমাজের নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধ, মানবাধিকার নথিবদ্ধকরণ এবং বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই কাঠামোগত সন্ত্রাসের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ (State-Sponsored Terrorism): প্রক্সি ও সমর্থন
রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদের ধারণা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি (Concept and Theoretical Foundations of State-Sponsored Terrorism)
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক কৌশলের ইতিহাসে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে অন্য কোনো গোষ্ঠীকে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার চর্চা বহু প্রাচীন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই চর্চা যখন চরম সহিংস রূপ নেয়, তখন তাকে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ (State-Sponsored Terrorism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সাধারণ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যেখানে নিজের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে নাগরিকদের ওপর ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শাসন টিকিয়ে রাখে, রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ সেখানে কাজ করে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরোক্ষ ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, দুর্বল বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো যখন সরাসরি প্রচলিত সামরিক যুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করতে পারে না, তখন তারা সহিংস রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে ‘প্রক্সি’ বা প্রতিনিধি হিসেবে কাজে লাগায় (Byman, 2005)।
সন্ত্রাসবাদ গবেষক পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) যুক্তি দিয়েছেন, রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ কোনো আকস্মিক বিশৃঙ্খলা নয়; এটা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি সুপরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী সম্প্রসারণ (Wilkinson, 2011)। একটি প্রচলিত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিচালনা করতে যে বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়, সামরিক রসদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়, কোনো সশস্ত্র মিলিশিয়া বা গোপন গোষ্ঠীকে মদদ দিয়ে প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডে অস্থিরতা তৈরি করতে তার সামান্য অংশই ব্যয় হয়। ফলে, কৌশলগত দিক থেকে এটা দুর্বল রাষ্ট্রের কাছে এক ধরণের অসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare) হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাষ্ট্র যখন কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিজের প্রক্সি হিসেবে নির্বাচন করে, তখন তাদের কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত দায় নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলার এক ধরনের কূটনৈতিক সুবিধাও তৈরি হয়।
এই ধরনের সন্ত্রাসবাদের গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তার গ্রন্থ Inside Terrorism-এ উল্লেখ করেছেন, কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন যখন কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন পায়, তখন তার সক্ষমতা দ্রুত বহুগুণ বেড়ে যায় (Hoffman, 2006)। সাধারণ একটি গোপন দল যেখানে অর্থ সংগ্রহ ও অস্ত্রের জন্য চোরাকারবারিদের ওপর নির্ভর করে, রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গ্রুপ সেখানে পায় সুরক্ষিত পাসপোর্ট, কূটনৈতিক ব্যাগেজে অস্ত্র পরিবহনের সুবিধা, সামরিক মানের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল। হফম্যানের মতে, সার্বভৌম রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা যখন কোনো সন্ত্রাসী চক্রের পেছনে দাঁড়ায়, তখন সেই সন্ত্রাস কেবল সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থাকে না; এটা আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক জটিল খেলায় পরিণত হয়।
তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে একটি স্বার্থের মেলবন্ধন ঘটে। রাষ্ট্র চায় তার আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে, আর সশস্ত্র গোষ্ঠীটি চায় টিকে থাকার মতো নিরবচ্ছিন্ন রসদ ও রাজনৈতিক বৈধতা। এই সমীকরণে অনেক সময় আদর্শিক মিল থাকা জরুরি হয় না। জাতীয় স্বার্থের নামে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কোনো ধর্মনিরপেক্ষ মার্ক্সবাদী গেরিলা গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে পারে, আবার ধর্মনিরপেক্ষ সরকারও অন্য দেশের ভেতর চরমপন্থী কোনো ধর্মীয় দলকে অর্থায়ন করতে দ্বিধা করে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় জাতীয় স্বার্থসিদ্ধির বিশুদ্ধ বাস্তববাদী প্রয়োগ, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে কৌশলগত লাভই প্রধান চালিকাশক্তি।
কৌশলগত প্রণোদনা ও যুক্তিবাদ: প্রক্সি ব্যবহারের রাজনীতি (Strategic Incentives and Rational Choice: Politics of Proxy Warfare)
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্বের নিরিখে রাষ্ট্র সবসময় তার নিজের টিকে থাকা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মারশাইমার (John Mearsheimer) তার আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (Offensive Realism) তত্ত্বে যুক্তি দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রগুলো সবসময় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে এবং সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার পথ খোঁজে (Mearsheimer, 2001)। রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ এই বাস্তববাদী রাজনীতির একটি বাস্তব রূপ। যখন কোনো দেশ সরাসরি সামরিক সংঘাতের মারাত্মক ঝুঁকি এড়াতে চায়, অথচ প্রতিপক্ষকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখতে চায়, তখন প্রক্সি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া তাদের কাছে একটি যৌক্তিক পছন্দ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিশ্বাসযোগ্য অস্বীকারের সুযোগ (Plausible Deniability)। গবেষক ডেভিড গার্টেনস্টাইন-রস (Daveed Gartenstein-Ross) এবং তার সহ-লেখকরা দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রক্সি বাহিনীকে এমনভাবে পরিচালনা করে যাতে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ আন্তর্জাতিক আদালতে হাজির করা না যায় (Gartenstein-Ross & Grossman, 2009)। কোনো বিদেশি দূতাবাসে বোমা হামলা কিংবা সীমান্তপারের কোনো জনবহুল বাজারে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটলে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে বিবৃতি দিয়ে বলতে পারে যে এই হামলার সাথে তাদের কোনো সংযোগ নেই এবং এটা সম্পূর্ণ স্বাধীন কোনো সন্ত্রাসী দলের কাজ। এই মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি ধোঁয়াশা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সরাসরি প্রতিশোধমূলক সামরিক হামলা থেকে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেয়।
একইভাবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক বোয়াজ গ্যানর (Boaz Ganor) রাষ্ট্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্ককে একটি স্বার্থকেন্দ্রিক পারস্পরিক লেনদেন হিসেবে দেখেছেন (Ganor, 2005)। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রয়োজন হয় ধারাবাহিক অর্থের জোগান, আধুনিক সমরাস্ত্র এবং গ্রেপ্তার এড়ানোর নিরাপদ স্থান। অন্যদিকে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় এমন এক আত্মঘাতী জনবল যারা কোনো প্রশ্ন না তুলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে। এই দুই পক্ষের স্বার্থ যেখানে মিলে যায়, সেখানেই রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করে। ফলে প্রক্সি বাহিনী কেবল ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করে না; তারা একটি রাষ্ট্রের অঘোষিত পরোক্ষ সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়।
তাছাড়া প্রক্সি ব্যবহারের পেছনে অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত থাকে। একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন, তাদের মাসিক বেতন, পেনশন ও যুদ্ধাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় অনেক বেশি। তার তুলনায় একটি অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সীমিত অর্থ এবং হালকা অস্ত্র সরবরাহ করে বছরের পর বছর সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখা যায়। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা বাহিনীকে দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করে ফেলা সম্ভব হয়। আক্রমণকারী রাষ্ট্র নিজে কোনো সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির শিকার না হয়েও প্রতিপক্ষের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এভাবে প্রতিনিয়ত আঘাত করতে পারে।
সমর্থনের রূপরেখা: অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, নিরাপদ আশ্রয় ও অস্ত্র সরবরাহ (Typologies of Support: Funding, Training, Safe Havens, and Weaponry)
রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদের ধরন ও মাত্রা সবসময় এক রকম থাকে না। কোনো রাষ্ট্র সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করে, আবার কোনো রাষ্ট্র কেবল নীরব সমর্থক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। আইনি তাত্ত্বিক আসা কাশার (Asa Kasher) এবং তার সহ-গবেষকরা এই পৃষ্ঠপোষকতাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছেন: সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা (Active Sponsorship) এবং নিষ্ক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা (Passive Sponsorship) (Kasher & Yadlin, 2005)। সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্র নিজেই সন্ত্রাসী দলকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দেয়, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে এবং হামলার দিনক্ষণ ঠিক করে। অপরদিকে নিষ্ক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্র কোনো গোষ্ঠীকে সরাসরি অর্থ বা অস্ত্র হয়তো দেয় না, কিন্তু তাদের নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগটি নীরবে মেনে নেয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মাইকেল হরোভিটজ (Michael Horowitz) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে রাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচনা করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন (Horowitz, 2010)। সাধারণ বন্দুক বা দেশীয় বিস্ফোরক দিয়ে শুরু করা একটি ছোট দল যখন কোনো রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তখন তারা পায় নাইট-ভিশন সরঞ্জাম, অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, রিমোট কন্ট্রোলড ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED) এবং এমনকি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো এই প্রক্সি সদস্যদের সাধারণ পথযোদ্ধা থেকে দক্ষ ও পেশাদার কমান্ডো বাহিনীতে পরিণত করে।
আরেকটি বড় উপাদান হলো নিরাপদ আশ্রয় (Sanctuary) প্রদান করা। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক জেরাল্ড স্টেইনবার্গ (Gerald Steinberg) দেখিয়েছেন, কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন আন্তর্জাতিক চাপ ও প্রতিপক্ষের সামরিক অভিযানের মুখে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি পায় যখন কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডে সুরক্ষিত ঘাঁটি গাড়ার অনুমতি দেয় (Steinberg, 2008)। সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা এই নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলো থেকে প্রক্সিরা পার্শ্ববর্তী দেশে ঝটিকা হামলা চালিয়ে আবার নিরাপদ সীমানায় ফিরে আসতে পারে। প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র যদি সেই আস্তানায় আঘাত হানতে চায়, তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্ত লঙ্ঘনের দায়ে তারা নিজেরাই অপরাধী হিসেবে চিত্রিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
পাশাপাশি আর্থিক নেটওয়ার্কের সুরক্ষাও রাষ্ট্রের আরেকটি বড় অবদান। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে সাধারণ অপরাধীদের অর্থ লেনদেন দ্রুত ধরা পড়ে যায়। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যখন তার নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ছদ্মবেশী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করে সন্ত্রাসী তহবিলের পথ পরিষ্কার করে দেয়, তখন সেই অর্থপ্রবাহ বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র নিজের জ্বালানি তেল বিক্রির অর্থ বা বিশেষ বাজেটের কালো টাকা নানা ভুয়া দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে প্রক্সি বাহিনীর হাতে পৌঁছে দেয়। এই আর্থিক নিরাপত্তা সশস্ত্র দলগুলোকে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে এবং সমাজের অসচ্ছল অংশ থেকে নতুন সদস্য রিক্রুট করতে সাহায্য করে।
স্নায়ুযুদ্ধের ভূরাজনীতি ও পরাশক্তির প্রক্সি যুদ্ধ (Cold War Geopolitics and Superpower Proxy Warfare)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালটি ছিল রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদের বৈশ্বিক বিকাশের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। তৎকালীন দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি পরমাণু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বজুড়ে গড়ে তুলেছিল অসংখ্য প্রক্সি নেটওয়ার্ক। আন্তর্জাতিক ইতিহাসের গবেষক ওড আর্ন ওয়েস্টাড (Odd Arne Westad) তার গ্রন্থ The Global Cold War-এ তুলে ধরেছেন কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে পরাশক্তিগুলো তাদের আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল (Westad, 2005)। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় এমন কোনো বড় সংঘাত ছিল না যেখানে কোনো না কোনো পরাশক্তির অর্থ ও গোপন অস্ত্রের উপস্থিতি ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ফ্রেড হ্যালিডে (Fred Halliday) উল্লেখ করেছেন, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, সৌদি অর্থায়ন এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরিচালিত অপারেশন সাইক্লোন (Operation Cyclone) ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সশস্ত্র তৎপরতা (Halliday, 2002)। সেই সময়ে সোভিয়েত বাহিনীকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার যোদ্ধাকে সারা বিশ্ব থেকে জড়ো করে সামরিক প্রশিক্ষণ ও উন্নত স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। এই রাষ্ট্রীয় সহায়তা আফগান যুদ্ধকে এক চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেই প্রশিক্ষিত জনবলই বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের জন্ম দিয়েছিল।
এই জাতীয় রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতার সবচেয়ে বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চালমার্স জনসন (Chalmers Johnson) সংজ্ঞায়িত করেছেন ব্লোব্যাক (Blowback) হিসেবে (Johnson, 2000)। জনসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যখন নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থে কোনো সশস্ত্র ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চরমপন্থী গোষ্ঠীকে লালন-পালন করে, তখন এক সময় সেই গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং নিজের সাবেক পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তুলে নেয়। লাতিন আমেরিকায় নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা সরকারকে উৎখাত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট কনট্রা (Contras) বিদ্রোহীদের কর্মকাণ্ড হোক কিংবা আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের পরবর্তী রূপান্তর – স্নায়ুযুদ্ধের এই ছায়াযুদ্ধগুলো দেখায় যে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন সন্ত্রাসকে কৌশল হিসেবে বেছে নেয়, তখন তার দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী সংকট ডেকে আনে।
একইভাবে আফ্রিকার আঙ্গোলা, মোজাম্বিক এবং কঙ্গোতে পরাশক্তিগুলোর মদদপুষ্ট সশস্ত্র দলগুলো বছরের পর বছর ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। ইউনিটার (UNITA) মতো মিলিশিয়া গ্রুপগুলো বিদেশি অর্থ ও সমরাস্ত্র পেয়ে পুরো দেশকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল। সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, কিন্তু পরাশক্তিগুলোর কাছে তা ছিল নিছকই প্রভাব বলয় বিস্তারের খেলা। স্নায়ুযুদ্ধের এই ধারা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসকে পরোক্ষ যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সেই রক্তক্ষয়ী প্রক্রিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণ ও আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব (Middle Eastern Dynamics and Regional Rivalries)
মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক রাজনীতি রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ এবং প্রক্সি লড়াইয়ের সবচেয়ে জটিল ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে তেহরান তার বৈদেশিক নীতিতে অসম প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক বিস্তৃত প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যাকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রতিরোধের অক্ষ (Axis of Resistance) বলা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়ালি নাসর (Vali Nasr) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি আন্দোলন এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন মিলিশিয়াকে সরাসরি অর্থ, সমরাস্ত্র ও সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে ইরান নিজের সীমানা থেকে বহু দূরে কৌশলগত প্রভাব তৈরি করেছে (Nasr, 2006)। এর মাধ্যমে তারা সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধে না জড়িয়েও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের এক শক্ত প্রতিরক্ষামূলক বলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ কেনেথ পোলক (Kenneth Pollack) বিষয়টির তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, কেবল ইরানই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি আঞ্চলিক শক্তিই কমবেশি এই প্রক্সি রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছে (Pollack, 2002)। লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে আয়ারল্যান্ডের আইআরএ থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনের আবু নিদাল অর্গানাইজেশন পর্যন্ত বহু সহিংস গোষ্ঠীকে অর্থ ও নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকার্বির আকাশে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ১০৩ বিমানে বোমা বিস্ফোরণের পেছনে লিবীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রীয় মদদের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এই আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধকে এক ধ্বংসাত্মক রূপ দেয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক রেমন্ড হিনবুশ (Raymond Hinnebusch) দেখিয়েছেন কীভাবে আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা, আর অন্যদিকে আসাদবিরোধীদের সমর্থনে বিভিন্ন পরাশক্তির অর্থায়ন সিরিয়াকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে (Hinnebusch, 2019)। এই বিশৃঙ্খলার ভেতরে ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস) এবং আল-কায়েদার মতো দলগুলো বিভিন্ন পক্ষের অস্ত্র ও অর্থ পাচারের সুযোগ নিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘ সংঘাত স্পষ্ট করে যে মতাদর্শ যাই হোক না কেন, ক্ষমতার আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে রাষ্ট্রগুলো সবসময়ই সহিংস প্রক্সিদের ওপর নির্ভর করেছে।
ইয়েমেনের পরিস্থিতিও এই সমীকরণের বাইরে নয়। হুথি বিদ্রোহীদের কাছে উন্নত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত স্থানান্তর কেবল একটি গৃহযুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করেনি, বরং লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হাতে এই ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র চলে যাওয়ার ফলে এখন রাষ্ট্রবহির্ভূত দলগুলোও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে জিম্মি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বগুলো এক আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ছায়াযুদ্ধ ও আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক (South Asian Shadow Wars and Cross-Border Networks)
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ একটি গভীর ও কাঠামোগত নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে বিরাজ করছে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস এই ছায়াযুদ্ধের প্রভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন ফেয়ার (C. Christine Fair) তার Fighting to the End: The Pakistan Army’s Way of War গ্রন্থে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো ভারতের প্রচলিত সামরিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাশ্মীরে এবং ভারতের অভ্যন্তরে প্রক্সি গোষ্ঠী ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করেছিল (Fair, 2014)। ফেয়ারের মতে, লস্কর-ই-তৈয়্যবা কিংবা জইশ-ই-মুহাম্মদের মতো সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের পরোক্ষ মদদপুষ্ট হয়ে সীমান্তের ওপারে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ সুমিত গাঙ্গুলী (Sumit Ganguly) ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি এই অঞ্চলে প্রক্সি সন্ত্রাসকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে (Ganguly, 2008)। একে কৌশলগত পরিভাষায় স্থিতিশীলতা-অস্থিতিশীলতা আপাতবিরোধ (Stability-Instability Paradox) বলা হয়। উভয় দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। আর এই পরমাণু ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রগুলো ছোটখাটো সন্ত্রাসী হামলা বা ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস পায়, কারণ আক্রমণকারী পক্ষ মনে করে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় প্রতিপক্ষ দেশ সহজে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবে না। ২০০১ সালের ভারতীয় সংসদ ভবনে হামলা কিংবা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলা ছিল এই বিপজ্জনক সামরিক জুয়ার প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
একই সাথে আফগানিস্তানকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন কোহেন (Stephen P. Cohen) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে কৌশলগত গভীরতা (Strategic Depth) বজায় রাখার উদ্দেশ্যে হাক্কানি নেটওয়ার্ক এবং আফগান তালেবানের বিভিন্ন অংশকে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছিল (Cohen, 2004)। অন্যদিকে পাকিস্তান প্রায়শই অভিযোগ করে থাকে যে ভারতও আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের গোপনে সহায়তা দিয়ে থাকে। এই পাল্টাপাল্টি ছায়াযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়াকে পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক পারমাণবিক ফ্ল্যাশপয়েন্টে পরিণত করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কের প্রভাব কেবল কাশ্মীর বা আফগানিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটা পুরো অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তবর্তী চোরাচালান, জাল মুদ্রা পাচার এবং বেআইনি অস্ত্রের সরবরাহকে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রক্সি যুদ্ধের রসদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সীমান্তের দুই পারের সাধারণ নাগরিকদের জীবন চরম নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত হয়েছে, অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার সব উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা এবং জবাবদিহিতার সংকট (International Legal Frameworks, Sanctions, and Enforcement Challenges)
রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপগুলো সবসময়ই রাজনৈতিক স্বার্থ ও জটিল আইনি ব্যাখ্যার বেড়াজালে আটকে পড়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিশেষজ্ঞ আন্তোনিও কাসেসে (Antonio Cassese) দেখিয়েছেন, কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য একটি রাষ্ট্রকে সরাসরি আন্তর্জাতিকভাবে দায়ী করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় প্রমাণের ক্ষেত্রে (Cassese, 2005)। ১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) নিকারাগুয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলায় আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, কোনো রাষ্ট্রের ওপর প্রক্সি বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দায় চাপাতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে রাষ্ট্রটির ওই বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ (Effective Control) ছিল। কিন্তু বাস্তব জগতে কোনো আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থাই লিখিত নির্দেশ বা প্রকাশ্য নথির মাধ্যমে প্রক্সি পরিচালনা করে না, ফলে আন্তর্জাতিক আদালতে রাষ্ট্রের অপরাধ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আইনবিদ শন মার্ফি (Sean D. Murphy) আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা আলোচনা করেছেন (Murphy, 2004)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ সাল থেকে নিজস্ব আইনের অধীনে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক তালিকা (State Sponsors of Terrorism List) পরিচালনা করে আসছে। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র রফতানি নিষিদ্ধকরণ এবং বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের ঋণ আটকে দেওয়ার মতো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে মার্ফি যুক্তি দেখিয়েছেন, এই তালিকাটি অনেক সময়ই বস্তুনিষ্ঠ আইনি মূল্যায়নের চেয়ে ভূরাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কোনো দেশ চরম সন্ত্রাসী দলকে মদদ দেওয়া সত্ত্বেও পরাশক্তির বন্ধু হলে তালিকায় আসে না, আবার কৌশলগত শত্রুভাবাপন্ন দেশকে দ্রুত তালিকাভুক্ত করা হয়।
আর্থিক নজরদারির ক্ষেত্রে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (Financial Action Task Force – FATF) রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদের অর্থায়ন বন্ধে কিছু শক্তিশালী মানদণ্ড তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক ইরোকা নাগাল (Iroka Ngal) উল্লেখ করেছেন, কোনো দেশকে এফএটিএফ-এর ‘ধূসর’ বা ‘কালো’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেই দেশের ব্যাংকিং খাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চরম বাধার মুখে পড়ে (Ngal, 2012)। এই ধরনের বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক চাপ কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নীতি বদলাতে বাধ্য করে। তবুও বাস্তব রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলোর ভেটো ক্ষমতা এবং নিজেদের মিত্রদের বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা এই সংকটকে টিকিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সমাজ যতদিন পর্যন্ত সকল প্রকার রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে একটি অভিন্ন ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড গড়ে তুলতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত এই ছায়াযুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়।
বিশ্বায়ন ও সন্ত্রাসবাদ (Globalization and Terrorism): আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের প্রভাব
বিশ্বায়নের রূপরেখা ও সন্ত্রাসবাদের ধারণাগত রূপান্তর (Contours of Globalization and Conceptual Transformation of Terrorism)
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে পৃথিবী যখন ভৌগোলিক সীমানার দেয়াল ভেঙে এক আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করল, তখন তার সাথে তাল মিলিয়ে বদলে গেল সংঘাতের চিরাচরিত ব্যাকরণও। অর্থনৈতিক উদারীকরণ, তথ্যপ্রযুক্তির নাটকীয় বিকাশ এবং মানুষের সীমান্তপারের অবাধ চলাচলের ফলে দূরবর্তী অঞ্চলের ঘটনাগুলোও স্থানীয় জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়াল। তবে এই উন্মুক্ততা কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা জ্ঞান বিনিময়ের পথ খুলে দেয়নি, এর সমান্তরালে সহিংস রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সামনেও নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড হেল্ড (David Held) বিশ্বায়নকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, বিশ্বায়ন হলো স্থান-কালের এমন এক সংকোচন যা পৃথিবীর এক প্রান্তের রাজনৈতিক বা সামাজিক সিদ্ধান্তকে অন্য প্রান্তের মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের নিয়ামক করে তোলে (Held et al., 1999)। সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রেও ঠিক এই রূপান্তরটি ঘটেছে; স্থানীয় কোনো ক্ষুদ্র ক্ষোভ আর নিজের ভৌগোলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা দ্রুত বৈশ্বিক রূপ ধারণ করার সুযোগ পেয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিক মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তার তাত্ত্বিক কাজগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে সমকালীন সমাজ একটি নেটওয়ার্ক সমাজ (Network Society)-এ রূপ নিয়েছে (Castells, 1996)। ক্যাসেলসের মতে, আধুনিক যুগে ক্ষমতা আর কোনো একক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের হাতে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে বিকেন্দ্রীভূত নানা নোড বা সংযোগবিন্দুর ভেতর দিয়ে। সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো এই রূপান্তরকে সবচেয়ে দক্ষতার সাথে কাজে লাগিয়েছে। অতীতের কঠোর অনুক্রমিক বা পিরামিড সদৃশ সামরিক কমান্ড কাঠামোর বদলে তারা গড়ে তুলেছে আনুভূমিক ও স্বায়ত্তশাসিত সেল-ভিত্তিক নেটওয়ার্ক। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে কোনো একটি দেশের একটি নির্দিষ্ট আস্তানা বা শীর্ষ নেতাকে ধ্বংস করলেও সংগঠনের সার্বিক অস্তিত্ব মুছে ফেলা রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঐতিহাসিক রূপান্তরকে গভীর তাত্ত্বিক কাঠামোয় বিশ্লেষণ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড সি. রাপোপোর্ট (David C. Rapoport)। তার আলোচিত সন্ত্রাসবাদের চার তরঙ্গ (Four Waves of Terrorism) তত্ত্বে তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৭৯ সালের পর শুরু হওয়া চতুর্থ তরঙ্গ বা ধর্মীয় ভাবাদর্শের সন্ত্রাস বিশ্বায়নের অগ্রগতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত (Rapoport, 2004)। উনিশ শতকের শেষভাগে টেলিগ্রাফ ও বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বিকাশের ফলে প্রথম তরঙ্গের নৈরাজ্যবাদী সন্ত্রাস যেভাবে আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছিল, বিংশ শতাব্দীর শেষে কৃত্রিম উপগ্রহ, ইন্টারনেট এবং জেট বিমানের সহজলভ্যতা চতুর্থ তরঙ্গের সহিংসতাকে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করেছে। বিশ্বায়ন সন্ত্রাসকে একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহের পর্যায় থেকে টেনে তুলে বৈশ্বিক কৌশলগত হুমকির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই প্রক্রিয়ায় জাতিরাষ্ট্রের চিরাচরিত সার্বভৌমত্বও এক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। আগে কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানা ছিল তার নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রধান ঢাল। কিন্তু বিশ্বায়িত ব্যবস্থায় সীমান্তের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে সীমান্তকে যত বেশি উন্মুক্ত ও নমনীয় করা হয়েছে, সন্ত্রাসী উপাদানগুলোর জন্য সেই পথ ধরে প্রবেশ করা ততটাই সহজ হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা আর কেবল সেনাবাহিনীর সীমান্ত পাহারার বিষয় থাকেনি; এটা পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহ, ব্যাংকিং লেনদেন এবং সাইবার স্পেসের নজরদারির এক জটিল সমন্বিত লড়াইয়ে।
যোগাযোগ বিপ্লব, ডিজিটাল পরিমণ্ডল ও তাৎক্ষণিক প্রচার (Communication Revolution, Digital Sphere, and Instant Propaganda)
সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য সবসময়ই ছিল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের চেয়ে অনেক বড় এক দর্শকগোষ্ঠীকে ভীতি প্রদর্শন করা। আর এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর জ্বালানি জুগিয়েছে আধুনিক যোগাযোগ বিপ্লব। ইন্টারনেট ও উপগ্রহ টেলিভিশনের আগে কোনো সন্ত্রাসী হামলা ঘটলে সেই সংবাদ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে বেশ সময় লাগত এবং সেখানে প্রথাগত গণমাধ্যমের একটি কড়া সেন্সরশিপ থাকত। কিন্তু ডিজিটাল পরিমণ্ডলের উত্থান সেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যান (Gabriel Weimann) তার গ্রন্থ Terror on the Internet-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সহিংস গোষ্ঠীগুলো ইন্টারনেটকে একটি বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পুনর্বিন্যাস করেছে (Weimann, 2006)। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে নিজেদের তৈরি প্রোপাগান্ডা, ভিডিও বার্তা এবং আদর্শিক ব্যাখ্যা সরাসরি কোটি কোটি মানুষের পর্দায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পায়।
মনোবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মার্ক সেগম্যান (Marc Sageman) এই ডিজিটাল রূপান্তরকে পর্যালোচনা করে নেতাহীন জিহাদ (Leaderless Jihad) প্রত্যয়টি সামনে নিয়ে আসেন (Sageman, 2008)। সেগম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বায়িত ডিজিটাল পরিমণ্ডলে কোনো ব্যক্তিকে উগ্র মতাদর্শে দীক্ষিত করার জন্য এখন আর শারীরিকভাবে কোনো গোপন প্রশিক্ষণ শিবিরে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, চ্যাটরুম এবং পরবর্তীতে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের কল্যাণে নিজ ঘরের ভেতরে বসে একাকী একজন মানুষ উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে। অনলাইনে গড়ে ওঠা এই ভার্চুয়াল যোগাযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের ভেতর এক ধরনের কৃত্রিম সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলে, যার পরিণতিতে তথাকথিত ‘লোন উলফ’ বা নিঃসঙ্গ নেকড়েদের প্রাণঘাতী হামলার জন্ম হয়।
প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা গবেষক অড্রি কার্থ ক্রনিন (Audrey Kurth Cronin) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিস্তারকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন (Cronin, 2020)। আধুনিক বিশ্বে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার, উন্নত ভিডিও এডিটিং টুল এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের সুযোগ নিয়ে সহিংস দলগুলো নিজেদের প্রচারণাকে আকর্ষণীয় ও সিনেমাটিক করে তুলেছে। ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস)-এর অনলাইন ম্যাগাজিন এবং হলিউড স্টাইলের উচ্চমানের ভিডিও নির্মাণ এর সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল। ক্রনিনের মতে, ডিজিটাল পরিমণ্ডলে আধুনিক সন্ত্রাস কেবল শারীরিক অস্ত্রের লড়াই নয়, এটা এক সর্বাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও ন্যারেটিভ যুদ্ধ, যেখানে প্রথাগত রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে প্রায়শই এই গতিশীল নেটওয়ার্কের চেয়ে পিছিয়ে পড়ে।
তাছাড়া এনক্রিপশন প্রযুক্তির বিস্তার রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বিশাল অন্ধবিন্দু তৈরি করেছে। সাধারণ বাণিজ্যিক অ্যাপগুলোতে যুক্ত হওয়া এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন একদিকে যেমন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে, অন্যদিকে তা অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের জন্য নিজেদের পরিকল্পনা গোপন রাখার একটি দুর্ভেদ্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে হামলার আগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ বহুগুণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্য বিশ্বায়নের সেই চিরন্তন সংকটকেই তুলে ধরে, যেখানে মানবকল্যাণে উদ্ভাবিত উন্মুক্ত প্রযুক্তি নিজেই নিজের ধ্বংসের কারণ হয়ে দেখা দেয়।
অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও অবৈধ আর্থিক নেটওয়ার্ক (Economic Globalization and Illicit Financial Networks)
বিশ্বায়নের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার, শুল্কমুক্ত লেনদেন এবং বিশ্বজুড়ে পুঁজির অবাধ গতিশীলতা নিশ্চিত করা। তবে এই উন্মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল ছায়া অর্থনীতি, যা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের টেকসই অর্থায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ লোরেটা নেপোলিওনি (Loretta Napoleoni) তার আকরগ্রন্থ Terror Incorporated-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো বিশ্বায়িত অর্থনীতির অন্ধিসন্ধি ব্যবহার করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছে (Napoleoni, 2005)। নেপোলিওনি যুক্তি দেন, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা যখন কিছুটা সংকুচিত হয়, তখন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, হীরা ও তেলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে নিজেদের যুক্ত করে নেয় এবং গড়ে তোলে এক বিশ্বব্যাপী সমান্তরাল অর্থনীতি, যাকে তিনি সন্ত্রাসের অর্থনীতি (Terror Economy) বলে চিহ্নিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক পিটার আর. নয়ম্যান (Peter R. Neumann) অর্থায়নের এই মিশ্র বা হাইব্রিড কাঠামোর কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করেছেন (Neumann, 2017)। প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কড়া নজরদারি এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তর করার জন্য সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো একদিকে যেমন শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হুন্ডি বা হাওয়ালা (Hawala) পদ্ধতির ওপর ভরসা করে, অন্যদিকে তারা আধুনিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করে। হাওয়ালা ব্যবস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত ব্যাংক রেকর্ড থাকে না; কেবল বিশ্বাস ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে মুহূর্তের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে লাখ লাখ ডলার লেনদেন হয়ে যায়। পাশাপাশি অফশোর ফিনান্সিয়াল হাব এবং নামসর্বস্ব কাগুজে বা শেল কোম্পানির মাধ্যমে বৈধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চালানের আড়ালে সন্ত্রাসী তহবিল পাচার করা হয়।
সন্ত্রাসী অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ লেভিট (Matthew Levitt) হিজবুল্লাহর বৈশ্বিক আর্থিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বায়িত দাতব্য ব্যবস্থা এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে অপব্যবহার করা হয় (Levitt, 2007)। বিশ্বায়নের ফলে বিদেশে বসবাসকারী কোনো অভিবাসী এক মিনিটের মধ্যে নিজ দেশে যেকোনো ধর্মীয় বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠাতে পারেন। এই সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে কিছু চরমপন্থী চক্র মানবিক সহায়তার নামে অর্থ সংগ্রহ করে তা পরোক্ষভাবে বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করে। ফলে যে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল বৈশ্বিক সমৃদ্ধি ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে, সেটাই অনেক ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত সহিংসতার স্থায়ী আর্থিক পাইপলাইনে পরিণত হয়েছে।
এই অবৈধ আর্থিক প্রবাহের আরেকটি বড় দিক হলো পণ্যের বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বা ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং। আমদানি ও রফতানি পণ্যের মূল্যে কারসাজি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হয়, যা শুল্ক গোয়েন্দাদের পক্ষে সাধারণ বাণিজ্যের ভিড়ে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী কাঠামোর যে গতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা, তা প্রকারান্তরে সহিংস গোষ্ঠীগুলোর টিকে থাকার অর্থনৈতিক জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
সীমান্তহীন বিশ্ব, মানব গতিশীলতা ও পরিযায়ী রাজনীতি (Borderless World, Human Mobility, and Migratory Politics)
বিশ্বায়নের একটি অনিবার্য ফলাফল হলো মানুষের শারীরিক চলাচলের গতি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। সস্তা বিমান চলাচল, পর্যটনের বিকাশ এবং ইউরোপের শেনজেন অঞ্চলের মতো সীমান্তহীন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিক মানব সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে ভৌগোলিক বাধার এই অবলুপ্তি সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর আন্তর্জাতিক চলাচলের পথকেও অনেক সহজ করে দিয়েছে। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী মেরি কালডোর (Mary Kaldor) তার বিখ্যাত নতুন যুদ্ধ (New Wars) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, বিশ্বায়নের যুগে যুদ্ধ আর দুটি দেশের নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যে নির্দিষ্ট রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকে না (Kaldor, 1999)। এই নতুন সংঘাতগুলো পরিচালিত হয় রাষ্ট্র, আধাসামরিক দল, আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এক অদ্ভুত মিশ্রণে, যেখানে জাতীয় সীমানাগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
নরওয়েজীয় নৃবিজ্ঞানী থমাস এরিকসন (Thomas Hylland Eriksen) আন্তঃসীমান্ত মানব গতিশীলতার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন (Eriksen, 2007)। তীব্র গতির পরিবহন ব্যবস্থার কারণে অপরাধ সংঘটনের পর কোনো ব্যক্তির জন্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেখা গিয়েছিল সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের সময়ে। বিশ্বের এক শতাধিক দেশ থেকে প্রায় চল্লিশ হাজার বিদেশি যোদ্ধা বা ফরেন টেররিস্ট ফাইটার (Foreign Terrorist Fighters – FTFs) তুরস্কের উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবহার করে যুদ্ধের ময়দানে যোগ দিয়েছিল। অতীতের কোনো স্থানীয় সশস্ত্র সংঘাতে এত বিপুল সংখ্যক বহুজাতিভিত্তিক যোদ্ধার দ্রুত সমাবেশ ঘটানো ছিল অকল্পনীয়।
আইন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিলিপ ববিত (Philip Bobbitt) তার গ্রন্থ The Shield of Achilles-এ জাতিরাষ্ট্রের বিবর্তন আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, সনাতন জাতিরাষ্ট্রগুলো ক্রমান্বয়ে রূপ নিচ্ছে মার্কেট স্টেট (Market State) বা বাজার রাষ্ট্রে (Bobbitt, 2002)। একটি বাজার রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য থাকে পুঁজি, সেবা ও দক্ষ মানবসম্পদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা। কিন্তু এই উন্মুক্ততার নীতিই রাষ্ট্রের চিরাচরিত অভ্যন্তরীণ সীমান্ত পাহারা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের শক্তিকে খর্ব করে। আন্তর্জাতিক কার্গো শিপিং কন্টেইনার এবং কোটি কোটি আন্তর্জাতিক যাত্রীর ভিড়ে নিখুঁতভাবে অস্ত্র, রাসায়নিক উপাদান কিংবা উগ্রপন্থী সদস্যদের শনাক্ত করা যেকোনো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক প্রায় অসম্ভব প্রযুক্তিগত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর ফলে তৈরি হয়েছে পরিযায়ী রাজনীতির এক নতুন সংকট। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে যখন লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আন্তর্জাতিক শরণার্থী হয়ে উঠছে, তখন কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সেই মানবিক সংকটের সুযোগ নিচ্ছে। একদিকে কিছু উগ্রবাদী উপাদান এই শরণার্থীর ভিড়ে মিশে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর ডানপন্থী চরমপন্থীরা এই অভিবাসনকে দেখিয়ে সমাজে ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদী বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। ফলে মানব গতিশীলতার এই সংকট বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসের ক্ষেত্রকেও উর্বর করে তুলছে।
সাংস্কৃতিক সংঘাত, সমজাতীয়করণ ও পরিচয়ের সংকট (Cultural Friction, Homogenization, and Identity Crisis)
বিশ্বায়ন কেবল পণ্য বা তথ্যের আদান-প্রদান নয়, এটা সংস্কৃতিরও এক তীব্র সংঘাতময় ক্ষেত্র। মার্কিন নেতৃত্বাধীন কর্পোরেট পুঁজিবাদ, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং হলিউড-কেন্দ্রিক বিনোদন যখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে প্রবেশ করতে শুরু করল, তখন অনেক ঐতিহ্যবাহী ও রক্ষণশীল সমাজ একে তাদের নিজস্ব অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে গ্রহণ করল। রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বেঞ্জামিন বারবার (Benjamin Barber) তার বিখ্যাত Jihad vs. McWorld গ্রন্থে এই টানাপোড়েনকে তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন (Barber, 1995)। বারবারের মতে, একদিকে রয়েছে পশ্চিমা কর্পোরেট পুঁজিবাদ ও সাংস্কৃতিক সমজাতীয়করণের বিশ্বায়ন (ম্যাকওয়ার্ল্ড), আর অন্যদিকে রয়েছে এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্থানীয়, গোত্রীয় ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় রক্ষার অন্ধ সহিংস প্রতিক্রিয়া (জিহাদ)। এই দুই বিপরীতমুখী শক্তির সংঘর্ষ থেকেই জন্ম নেয় চরমপন্থী আদর্শ ও সহিংস প্রতিরোধ।
সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী অর্জুন আপ্পাদুরাই (Arjun Appadurai) তার Fear of Small Numbersগ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বায়নের ফলে জাতীয় পরিচয়ের স্পষ্ট সীমারেখাগুলো ঝাপসা হয়ে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এক কাল্পনিক অস্তিত্বের সংকটে ভোগে (Appadurai, 2006)। নিজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার এই ভয় সমাজে সংখ্যালঘু বা বহিরাগত জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস আক্রমণকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। আপ্পাদুরাইয়ের মতে, বিশ্বায়ন মানুষের ভেতরে নিজের সংকীর্ণ জাত্যভিমান বা ধর্মীয় পরিচয় আঁকড়ে ধরার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে উগ্র শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ কিংবা উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী সন্ত্রাসী হামলায়।
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক অলিভিয়ার রোয়া (Olivier Roy) তার Globalized Islam গ্রন্থে পশ্চিমা সমাজে অভিবাসী মুসলিম তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Roy, 2004)। রোয়া দেখিয়েছেন, ইউরোপের বড় বড় শহরে বেড়ে ওঠা অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের দেশীয় ঐতিহ্য থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আবার তারা যে পশ্চিমা সমাজে বাস করছে সেখানেও সমান নাগরিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা পায় না। এই সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা বা ডিকালচারাইজেশন (Deculturation) তাদের ভেতর এক গভীর পরিচয়হীনতার জন্ম দেয়। বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো এই সুযোগটি নেয়। তারা এই দিকভ্রান্ত তরুণদের সামনে এক সীমানাহীন, বিশুদ্ধ ও কাল্পনিক বৈশ্বিক উম্মাহর ধারণা হাজির করে এবং সহিংসতার মাধ্যমে তাদেরকে তাৎপর্যপূর্ণ এক পরিচয়ের অংশীদার হওয়ার প্রলোভন দেখায়।
ফলে বিশ্বায়িত যুগে সন্ত্রাসবাদ কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিকার আদায়ের লড়াই থেকে সরে গিয়ে বিমূর্ত এক পরিচয়ের আধিপত্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো তরুণ নিজের বাস্তব জীবনে সমাজের সাথে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পায় না, তখন সে বৈশ্বিক কোনো সহিংস বয়ানের ভেতর নিজের অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজতে শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর দেখায় যে অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত বিশ্বায়ন যদি মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মিকরণ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই ফাঁক গলেই উগ্রবাদের চাষাবাদ হয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও সার্বভৌমত্বের সংঘাত (International Security Responses, Intelligence Networks, and Sovereignty Dilemmas)
যেহেতু বিশ্বায়নের ফলে সন্ত্রাসবাদ জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে একটি বৈশ্বিক আন্তঃসংযুক্ত জালে পরিণত হয়েছে, তাই একক কোনো দেশের পক্ষে একে নিজের সীমানার ভেতর বন্দি রাখা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে বহুপাক্ষিক গোয়েন্দা সহযোগিতা ও যৌথ সমন্বয়ের প্রসার ঘটেছে। মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক জুলিয়েট কায়িয়েম (Juliette Kayyem) দেখিয়েছেন, ২০০১ সালের এগারোই সেপ্টেম্বরের হামলার পর আন্তর্জাতিক স্তরে দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের পরিধি নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছায় (Kayyem, 2022)। ইন্টারপোল, ইউরোপোল এবং দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো এখন বিমানযাত্রীদের বায়োমেট্রিক ডেটা, নো-ফ্লাই লিস্ট এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধির রিয়েল-টাইম তথ্য একে অপরের সাথে ভাগ করে নিচ্ছে।
আইনি গবেষক ডেভিড হ্যারিস (David Harris) এই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নাগরিক অধিকারের চরম সংকোচনের বিষয়টি সামনে এনেছেন (Harris, 2005)। সন্ত্রাস দমনের নামে আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিশাল নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তা অনেক সময়ই জাতীয় আদালতের বিচারিক নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে যায়। বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের দেশের আইনি বিধিনিষেধ এড়াতে অন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিজ নাগরিকদের ওপর বেআইনি আড়িপাতা ও নজরদারির কাজ সম্পন্ন করে। ফলে সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি – নাগরিকের গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
সমাজবিজ্ঞানী মার্টিন শ (Martin Shaw) তার তাত্ত্বিক আলোচনায় দেখিয়েছেন কীভাবে এই বিশ্বায়িত নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি বৈশ্বিক নজরদারি রাষ্ট্র (Global Surveillance State)-এর কাঠামো গড়ে তুলছে (Shaw, 2000)। তবে এই বৈশ্বিক সহযোগিতার সামনে সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রথাগত জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা। কোনো একটি রাষ্ট্র যখন অন্য দেশের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোনো সন্ত্রাসীকে ধরতে চায়, তখন আন্তর্জাতিক আইন এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব সামনে চলে আসে। কৌশলগত বৈরিতার কারণে এক পরাশক্তি অন্য পরাশক্তির সাথে স্পর্শকাতর তথ্য ভাগ করতে চায় না। এই ভূরাজনৈতিক আস্থাহীনতা এবং দ্বিমুখী নীতির সুযোগ নিয়েই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
তাছাড়া গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য উন্নত দেশগুলো যখন ড্রোন হামলা বা সীমান্তে অনুপ্রবেশের মতো একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ঘটায় এবং আক্রান্ত অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে। এই প্রতিক্রিয়া দেখায় যে বিশ্বায়িত সন্ত্রাস মোকাবেলা করতে গিয়ে যদি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারকে পদদলিত করা হয়, তবে তা সন্ত্রাস নির্মূল না করে বরং দীর্ঘমেয়াদে নতুন নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।
বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ গতিপথ ও নতুন প্রজন্মের বৈশ্বিক হুমকি (Future Trajectories of Globalization and New Generations of Global Threats)
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বায়ন ও সন্ত্রাসবাদের সম্পর্কটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন প্রযুক্তি এবং বায়োটেকনোলজির প্রসারের ফলে এক সম্পূর্ণ নতুন ও অনিশ্চিত যুগে প্রবেশ করছে। সন্ত্রাসবাদ গবেষক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) সমকালীন সন্ত্রাসের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, বিশ্বায়নের ফলে যে প্রযুক্তিগত বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে, তা সহিংস অ-রাষ্ট্রীয় দলগুলোকে এমন সব বিধ্বংসী সক্ষমতা এনে দিয়েছে যা অতীতে কেবল পরাশক্তিগুলোর হাতেই সংরক্ষিত ছিল (Crenshaw, 2020)। আজ একটি ক্ষুদ্র গ্রুপও ডার্ক ওয়েব থেকে থ্রি-ডি প্রিন্টারে তৈরি অস্ত্রের নকশা নামিয়ে নিতে পারে কিংবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ড্রোনকে সামান্য রূপান্তর করে বিস্ফোরকবাহী ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক আয়ান ব্রেমার (Ian Bremmer) সমকালীন বিশ্বব্যবস্থাকে একটি জি-জিরো বিশ্ব (G-Zero World) বা একক নেতৃত্বহীন বিশ্ব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Bremmer, 2012)। কোনো পরাশক্তি যখন বৈশ্বিক শৃঙ্খলার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, তখন আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ব্রেমারের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষমতার এই বহুমুখী বিভাজন এবং ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণহীন অ্যালগরিদম ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসবাদকে আরও স্বয়ংক্রিয়, অদৃশ্য এবং বিকেন্দ্রীভূত করে তুলবে। ভবিষ্যৎ হামলার জন্য আর কোনো বড় সামরিক ক্যাম্প বা দৃশ্যমান শীর্ষ কমান্ডারের প্রয়োজন হবে না; ডার্ক নেটে অর্থায়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগঠিত সেলগুলো যেকোনো মুক্ত সমাজে আকস্মিক হামলা চালিয়ে নিজেদের পরিচয় মুছে ফেলতে পারবে।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ সুসান স্ট্রেঞ্জ (Susan Strange) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ The Retreat of the State-এ আগেই সতর্ক করেছিলেন যে বিশ্বায়ন জাতিরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে দিচ্ছে (Strange, 1996)। রাষ্ট্র যখন একচ্ছত্রভাবে তথ্যপ্রবাহ, মুদ্রা সরবরাহ কিংবা নিজের সীমান্তের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে পারে না, তখন সনাতন নিরাপত্তা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশই নিজের চারদিকে লোহার দেয়াল তুলে নিজেকে একটি সুরক্ষিত দ্বীপ বানিয়ে রাখতে পারবে না। একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের উন্মুক্ততা বজায় রেখে কীভাবে এই সীমানাহীন বৈশ্বিক অন্ধকারের মোকাবেলা করা সম্ভব, সেটাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। বিশ্বায়ন যেমন জ্ঞান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনা এনে দিয়েছে, তেমনি এর তৈরি করা নেটওয়ার্ক সন্ত্রাসকে পরিণত করেছে মানবজাতির এক দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সংকটে।
সভ্যতার সংঘাত ও বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব (Clash of Civilizations and World-System Theory): বৈশ্বিক ব্যাখ্যা
বিশ্ব-ব্যবস্থার তাত্ত্বিক কাঠামো ও বৈশ্বিক সংঘাতের উৎস (Theoretical Frameworks of the World-System and Sources of Global Conflict)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংঘাত ও সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কাঠামোগত তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে আসছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein)-এর প্রস্তাবিত বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory)। ওয়ালারস্টেইনের মতে, ষোড়শ শতাব্দী থেকে বিকশিত হওয়া আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতি একক কোনো জাতিরাষ্ট্রের সীমানায় আবদ্ধ নয়, বরং এটা একটি অখণ্ড বৈশ্বিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে (Wallerstein, 1974)। এই ব্যবস্থাকে তিনি তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত করেছেন: কেন্দ্র বা কোর (Core), আধা-প্রান্ত বা সেমি-পেরিফেরি (Semi-Periphery) এবং প্রান্ত বা পেরিফেরি (Periphery)। এই স্তরবিন্যাসের মূল চালিকাশক্তি হলো অসম অর্থনৈতিক বিনিময়, যেখানে সম্পদ ক্রমাগত প্রান্তিক অঞ্চল থেকে শোষিত হয়ে কেন্দ্রের ধনী রাষ্ট্রগুলোতে পুঞ্জীভূত হয়।
এই কাঠামোগত বৈষম্য কীভাবে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসের জন্ম দেয়, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিশরীয় অর্থনীতিবিদ সামির আমিন (Samir Amin) কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যকার এই অসম বিকাশকে সামনে এনেছেন (Amin, 1976)। আমিনের মতে, প্রান্তিক দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তারা কখনোই স্বাধীনভাবে স্বনির্ভর হতে না পারে। যখন কোনো অঞ্চলের মানুষ যুগ যুগ ধরে অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক পরনির্ভরশীলতা এবং স্থানীয় স্বৈরশাসকদের দমনপীড়নের শিকার হয়, তখন সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক সময় প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির সীমা অতিক্রম করে। সহিংস প্রতিরোধ ও উগ্রবাদী মতাদর্শগুলো ঠিক এই অর্থনৈতিক বঞ্চনার জমিতেই দ্রুত শিকড় বিস্তার করে।
ইতালীয় রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ জোভানি আরিঘি (Giovanni Arrighi) বৈশ্বিক পুঁজির স্থানান্তর এবং হেজিমোনিক বা আধিপত্যবাদী চক্রের সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন (Arrighi, 1994)। আরিঘির বিশ্লেষণ দেখায়, যখনই কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি তার অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারাতে শুরু করে, তখনই পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যায়। বিশ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া মার্কিন আধিপত্যের টানাপোড়েন এবং নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়নের আগ্রাসন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি কোণঠাসা করেছে। বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিষয় নয়, বরং এটা বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরে তৈরি হওয়া কাঠামোগত শোষণ ও ক্ষমতার চরম অসমতার এক বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া।
এই ব্যবস্থায় কেন্দ্র নিজের স্বার্থে প্রান্তের কাঁচামাল এবং সস্তা শ্রম নিয়ন্ত্রণ করে, আর তার বিনিময়ে প্রান্তিক সমাজে রেখে যায় দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। যখন সাধারণ মানুষের সামনে বৈধ উপায়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো পথ খোলা থাকে না, তখন সমাজদেহে এক ধরনের তীব্র হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। এই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সুযোগ নেয় বিভিন্ন সশস্ত্র দল। তারা প্রান্তের এই বাস্তব ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পুরো বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্বের চোখে সন্ত্রাস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবিচারের এক অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব: সংস্কৃতি, ধর্ম ও পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ (Clash of Civilizations: Culture, Religion, and Identity-Based Polarization)
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে হার্ভার্ডের অধ্যাপক স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington) এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা হাজির করেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার আলোচিত প্রবন্ধ এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের গ্রন্থ The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order-এ তিনি দাবি করেন, নতুন বিশ্বে সংঘাতের মূল কারণ আর মতাদর্শগত বা অর্থনৈতিক থাকবে না (Huntington, 1996)। তার মতে, মানুষের মধ্যে প্রধান বিভাজন এবং সংঘাতের উৎস হবে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়। তিনি বিশ্বকে প্রধান কয়েকটি সভ্যতায় বিভক্ত করেন – যার মধ্যে পশ্চিমা, কনফুসীয়, জাপানি, ইসলামিক, হিন্দু, স্লাভিক-অর্থোডক্স এবং ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতা উল্লেখযোগ্য। হান্টিংটনের ধারণা অনুযায়ী, জাতিরাষ্ট্রগুলো টিকে থাকলেও তারা মূলত একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হবে।
এই তত্ত্বের পূর্বাভাস ছিল, ভিন্ন সংস্কৃতির মিলনস্থল বা ফল্ট-লাইন (Fault Lines)-এ সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলো ঘটবে। প্রাচ্যতাত্ত্বিক বার্নার্ড লুইস (Bernard Lewis) ১৯৯০ সালের একটি নিবন্ধে সর্বপ্রথম সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations) শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন (Lewis, 1990)। লুইস যুক্তি দিয়েছিলেন, মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের ক্ষোভ কেবল পশ্চিমা বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং তা পশ্চিমা জীবনদর্শন, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার বিরুদ্ধেই এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। হান্টিংটন এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে বলেন, বিশ্বায়নের ফলে যখন বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ কাছাকাছি আসছে, তখন তাদের মধ্যকার মিল বাড়ার বদলে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার তাগিদ এবং পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ আরও তীব্র হচ্ছে।
অপরদিকে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা (Francis Fukuyama) তার The End of History and the Last Man গ্রন্থে দাবি করেছিলেন যে পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রই মানব ইতিহাসের চূড়ান্ত রূপ এবং সব সমাজই শেষ পর্যন্ত এই মডেলে একীভূত হবে (Fukuyama, 1992)। হান্টিংটন সরাসরি ফুকুইয়ামার এই ধারণাকে নাকচ করে দেন। হান্টিংটন দেখান, পশ্চিমা মূল্যবোধকে সার্বজনীন মনে করার এই ভুল ধারণাই অ-পশ্চিমা সমাজগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে। নাইন-ইলেভেনের টুইন টাওয়ার হামলা এবং পরবর্তী বৈশ্বিক ঘটনাবলী অনেক বিশ্লেষকের কাছে হান্টিংটনের তত্ত্বের প্রতিফলন হিসেবে মনে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে তখন অনেকেই নিছক ভূরাজনীতি না দেখে পশ্চিমা আধুনিকতা ও প্রথাগত ধর্মীয় সংস্কৃতির মধ্যকার এক অনিবার্য সংঘর্ষ হিসেবে চিত্রিত করতে শুরু করেন।
হান্টিংটনের এই সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স দ্রুত পশ্চিমা নিরাপত্তা নীতিতে এক শক্তিশালী স্থান দখল করে নেয়। রাজনীতিবিদ ও সামরিক তাত্ত্বিকরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংঘাতগুলোকে জটিল স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে নিছক ‘সভ্যতার লড়াই’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এই মানসিকতা একদিকে যেমন পশ্চিমা সমাজে অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে অ-পশ্চিমা সমাজগুলোতেও পশ্চিমাদের প্রতি এক স্থায়ী শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব তৈরি করে। ফলে সংস্কৃতির নাম দিয়ে যে বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল, তা নিজেই একটি সংঘাতের জ্বালানিতে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক অসমতা বনাম সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন: সন্ত্রাসবাদের দ্বৈত ব্যাখ্যা (Economic Inequality vs. Cultural Friction: Dual Explanations of Terrorism)
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকড় কোথায় – অর্থনৈতিক শোষণে নাকি সাংস্কৃতিক বৈরিতায় – এই বিতর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল আলোচনার বিষয়। বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব যেখানে বস্তুগত বাস্তবতা, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং ক্ষমতার রাজনীতিকে প্রধান চালিকাশক্তি মনে করে, সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব সেখানে মানুষের বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন এবং ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ক্ষোভকে প্রাধান্য দেয়। বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাইদ (Edward W. Said) হান্টিংটনের সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাকে একপেশে ও বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে একে অজ্ঞতার সংঘাত (The Clash of Ignorance) বলে অভিহিত করেন (Said, 2001)। সাইদের মতে, সংস্কৃতিগুলো কোনো স্থবির বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; ইতিহাস জুড়ে তারা একে অপরের সাথে আদান-প্রদানের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। হান্টিংটন জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বগুলোকে একটি সরলীকৃত ধর্মীয় লেবেল পরিয়ে দিয়েছেন, যা প্রকারান্তরে পশ্চিমাদের সামরিক আগ্রাসনকে নৈতিক ভিত্তি দেয়।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্ব তুলে ধরে সমাজবিজ্ঞানী আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক (Andre Gunder Frank) তার অধীনতা তত্ত্ব (Dependency Theory)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নয়ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং তা উন্নত বিশ্বের ধনী হওয়ারই একটি প্রত্যক্ষ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Frank, 1966)। যখন মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পশ্চিমা কোর রাষ্ট্রগুলো সেখানকার স্বৈরশাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তখন স্থানীয় জনগণের ভেতর চরম হতাশার জন্ম নেয়। অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত এবং রাজনৈতিক অধিকারহীন মানুষ যখন দেখে তাদের সম্পদ লুণ্ঠিত হচ্ছে অথচ তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, তখন তাদের ক্ষোভকে খুব সহজেই সশস্ত্র দলগুলো ব্যবহার করতে পারে। এই বিশ্লেষণ দেখায়, সহিংসতার পেছনের মূল কারণ বস্তুগত বৈষম্য, যদিও তার ওপর প্রায়ই সংস্কৃতির একটি আবরণ পরিয়ে দেওয়া হয়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তার গ্রন্থ Identity and Violence: The Illusion of Destiny–তে পরিচয়ভিত্তিক সহিংসতার মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদটি উন্মোচন করেছেন (Sen, 2006)। সেন দেখিয়েছেন, একজন মানুষের একাধিক পরিচয় থাকে – সে একই সাথে একজন নাগরিক, পেশাজীবী, ভাষাগত সত্তা এবং নির্দিষ্ট বিশ্বাসের অনুসারী হতে পারে। কিন্তু সভ্যতার সংঘাতের মতো তত্ত্বগুলো মানুষকে কেবল তার ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকীর্ণ বাক্সে বন্দি করে ফেলে। সহিংস সংগঠনগুলো এই বিভাজনের রাজনীতিকে পুঁজি করে এবং মানুষকে বোঝায় যে তার অন্য সকল পরিচয় অর্থহীন, কেবল তার সভ্যতার লড়াইটাই আসল। ফলে অর্থনৈতিক বঞ্চনা যেখানে ক্ষোভের বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করে, সাংস্কৃতিক বয়ান সেখানে সেই ক্ষোভকে একটি কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্রে রূপান্তর করে।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক পাঠ থেকে দেখা যায়, কোনো একটি একক কারণ দিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনৈতিক শোষণ প্রান্তিক সমাজে যে শূন্যতা তৈরি করে, সেই শূন্যস্থানেই উগ্র সাংস্কৃতিক মতাদর্শ ডালপালা মেলে। যখন একজন তরুণ দেখে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তখন সে কোনো উগ্রবাদী সাংস্কৃতিক বয়ানের ভেতর নিজের অস্তিত্বের এক মিথ্যা মর্যাদা খুঁজে পায়। সুতরাং অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক মেরুকরণ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটায়।
কোর-পেরিফেরি বৈষম্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া (Core-Periphery Asymmetry and Peripheral Armed Backlash)
বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য হলো কেন্দ্র বা কোর অঞ্চলের সমৃদ্ধি টিকে থাকে প্রান্ত বা পেরিফেরি অঞ্চলের অব্যাহত প্রান্তিকীকরণের ওপর। ল্যাটিন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো হেনরিক কার্ডোসো (Fernando Henrique Cardoso) তার সহ-গবেষকের সাথে মিলে দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসন না থাকলেও বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সুবিধাভোগী এলিটদের মাধ্যমে এই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে (Cardoso & Faletto, 1979)। প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ মানুষ এই অর্থনৈতিক ফাঁদে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, বেকারত্ব এবং চরম জীবনযাত্রার সংকটে ভোগে। এই কাঠামোগত সহিংসতা যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে স্থায়ী রূপ নেয়, তখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিংবা বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পাল্টা সহিংসতা এক ধরণের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে হাজির হয়।
মার্কিন ভূগোলবিদ ও তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে (David Harvey) এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক রূপান্তরকে বঞ্চনার মাধ্যমে পুঁজিপাট্টা (Accumulation by Dispossession) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (Harvey, 2003)। হার্ভে দেখিয়েছেন, নব্য-উদারবাদী যুগে বেসরকারীকরণ, প্রাকৃতিক সম্পদের দখল এবং সামাজিক সুরক্ষা বাতিলের মাধ্যমে কেন্দ্র কীভাবে প্রান্তের সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে ফেলে। ইরাক যুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি যুক্তি দেন, সেই সামরিক অভিযানের পেছনে তথাকথিত গণতন্ত্র বা সভ্যতার সুরক্ষার চেয়ে তেল সম্পদ এবং ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই ছিল আসল লক্ষ্য। যখন কোনো সমাজ তার অস্তিত্বের জায়গাগুলো একে একে হারাতে থাকে, তখন তাদের তরুণেরা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন বা শৃঙ্খলার প্রতি আর কোনো আনুগত্য অনুভব করে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ তারিক আলি (Tariq Ali) তার গ্রন্থ The Clash of Fundamentalisms-এ এই প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন (Ali, 2002)। আলি দেখান, একদিকে রয়েছে পশ্চিমা নব্য-উদারবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মৌলবাদ, যা মুক্তবাজার ও সামরিক আধিপত্য ছাড়া আর কিছু বোঝে না; অন্যদিকে রয়েছে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদ, যা এই আগ্রাসনের জবাবে তৈরি হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসবাদ কোনো উন্নত সামাজিক বিকল্প তৈরি করতে পারে না বটে, তবে তা কেন্দ্রের একচ্ছত্র আধিপত্যকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র যখন কোনো অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব ও মানবিক মর্যাদা ধ্বংস করে দেয়, তখন সেই প্রান্ত থেকে জন্ম নেওয়া সহিংস প্রতিক্রিয়া কেন্দ্রের সুরক্ষাবলয়কেও চুরমার করে দেয়।
প্রান্তিক অঞ্চলের এই সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া প্রায়শই অসম যুদ্ধের রূপ নেয়। দুর্বল পক্ষ যখন জানে যে তারা প্রচলিত সামরিক শক্তিতে কেন্দ্রের সাথে পেরে উঠবে না, তখন তারা চোরাগোপ্তা হামলা, আত্মঘাতী বিস্ফোরণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক স্থাপনায় আঘাত হানার কৌশল বেছে নেয়। এই কৌশলগুলো কেবল সামরিক ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির মসৃণ চলাচলকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয়। সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা কিংবা আন্তর্জাতিক জ্বালানি পাইপলাইনে নাশকতা এই কোর-পেরিফেরি দ্বন্দ্বেরই সহিংস বহিঃপ্রকাশ।
ইসলাম ও পাশ্চাত্য: বিতর্কিত সীমানা এবং ‘ফল্ট-লাইন’ যুদ্ধ (Islam and the West: Contested Frontiers and ‘Fault-Line’ Wars)
হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত অংশ ছিল ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে তার বক্তব্য। তিনি দাবি করেছিলেন যে ইসলামের সীমানা রক্তাক্ত এবং তার আশেপাশের অন্যান্য সভ্যতার সাথেই এর বিরোধ সবচেয়ে বেশি। তবে এই সরল সমীকরণকে অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে ভ্রান্ত বলে দেখিয়েছেন। ইসলামিক স্টাডিজের গবেষক জন এস্পোসিটো (John L. Esposito) তার গ্রন্থ The Islamic Threat: Myth or Reality?-এ দেখিয়েছেন, ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত কোনো অন্তর্নিহিত ধর্মতাত্ত্বিক বৈরিতার ফল নয় (Esposito, 1992)। এই দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অটোমান সাম্রাজ্যের ব্যবচ্ছেদ, মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিম সীমানা চাপিয়ে দেওয়া এবং ফিলিস্তিন সংকটের মতো বাস্তব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ।
মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গার্গেস (Fawaz A. Gerges) আল-কায়েদা এবং অন্যান্য উগ্রবাদী আন্দোলনের উত্থান বিশ্লেষণ করে হান্টিংটনের ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন (Gerges, 2005)। গার্গেস দেখান, তথাকথিত সভ্যতার লড়াইয়ের প্রবক্তারা প্রায়শই ভুলে যান যে আধুনিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতার প্রধান শিকার হয়েছে মুসলিমরাই। আল-কায়েদা বা পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেট যত হামলা পশ্চিমা দেশগুলোতে চালিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণহানি ঘটিয়েছে ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে। সুতরাং একে ইসলাম বনাম পাশ্চাত্যের একক লড়াই হিসেবে দেখা বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখার শামিল; এটা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার এক জটিল প্রকাশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ফ্রেড হলিডে (Fred Halliday) তার গ্রন্থ Islam and the Myth of Confrontation-এ উল্লেখ করেছেন, সংঘাতগুলোর রূপ সাংস্কৃতিক মনে হলেও তার চালিকাশক্তি সবসময়ই ভূরাজনীতি ও স্বার্থের হিসাব (Halliday, 1996)। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানে সমাজতন্ত্র ঠেকাতে ধর্মীয় যোদ্ধাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়েছিল, তখন সভ্যতার কোনো সংঘাত দেখা যায়নি; বরং সেখানে দেখা গিয়েছিল ভূরাজনৈতিক মিত্রতা। কিন্তু স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার সাথে সাথেই সেই মিত্ররা রাতারাতি শত্রু হিসেবে পরিচিতি পায়। এই বাস্তবতা দেখায়, সংস্কৃতি বা ধর্ম কোনো চিরস্থায়ী শত্রুতা তৈরি করে না, বরং রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদ রক্ষার প্রয়োজনেই ধর্মের ছদ্মবেশে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকার সংঘাতগুলো মূলত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের ত্রিভুজ সংকটের ফল। পশ্চিমা দেশগুলো যখন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় গণবিরোধী শাসকদের সমর্থন দেয়, তখন সাধারণ জনগণের ক্ষোভ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর গিয়ে পড়ে। এই ক্ষোভকে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো ধর্মীয় ভাষার মোড়কে উপস্থাপন করে নিজেদের লড়াইকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ বলে দাবি করে। ফলে এটা কোনো সভ্যতার চিরায়ত সংঘাত নয়, বরং ক্ষমতার ভুল নীতি ও রাজনৈতিক শোষণের এক নির্মম পরিণতি।
ভূরাজনৈতিক আধিপত্য, হেজিমনি পতন ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা (Geopolitical Hegemony, Hegemonic Decline, and Global Instability)
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব বহুলাংশে নির্ভর করে কোনো একক পরাশক্তি বা হেজিমনের ক্ষমতার ওপর। তবে কোনো হেজিমনিই চিরস্থায়ী হয় না। সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্ব-ব্যবস্থা তাত্ত্বিক ক্রিস্টোফার চেজ-ডান (Christopher Chase-Dunn) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, অতীতে ডাচ সাম্রাজ্য কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের সময় যেভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনীতিতে তীব্র নৈরাজ্য তৈরি হয়েছিল, মার্কিন আধিপত্য দুর্বল হওয়ার সাথে সাথেও পৃথিবী একই ধরনের অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েছে (Chase-Dunn, 1998)। হেজিমন রাষ্ট্র যখন নিজের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না, তখন সে সামরিক শক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শুরু করে। এই অতিরিক্ত সামরিকায়ন পুরো বিশ্বজুড়ে সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেয় বহুমুখী সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির তাত্ত্বিক রবার্ট কক্স (Robert W. Cox) হেজিমনি বা আধিপত্যের ধারণাকে কেবল সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি দেখিয়েছেন এটা বস্তুগত ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান এবং ভাবাদর্শের একটি ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধন (Cox, 1981)। কক্সের মতে, একটি সফল হেজিমন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করে যা প্রান্তিক দেশগুলোর এলিটদেরও বোঝাতে সক্ষম হয় যে এই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা সবার জন্যই লাভজনক। কিন্তু যখন এই ভাবাদর্শিক বৈধতা নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রান্তের মানুষ উপলব্ধি করে যে এই ব্যবস্থা কেবল কেন্দ্রের মুষ্টিমেয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে, তখন হেজিমোনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এই ক্ষয়ে যাওয়া ব্যবস্থার শূন্যস্থানেই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করতে শুরু করে।
উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজতাত্ত্বিক জুলিয়ান গো (Julian Go) দেখিয়েছেন কীভাবে মার্কিন বৈশ্বিক আধিপত্যের পতন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নতুন মাত্রার সহিংসতা ও অস্থিরতা তৈরি করছে (Go, 2011)। গো-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক পরাশক্তি যখন অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে না, তখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়াতে প্রক্সি যুদ্ধ ও ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে আজ যে ধারাবাহিক সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ দেখা যাচ্ছে, তা কোনো আকস্মিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটা বৈশ্বিক কাঠামোর শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্বল হয়ে পড়ার এবং নতুন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠার মধ্যবর্তী বিশৃঙ্খলার প্রকাশ।
আধিপত্যের এই ক্ষয়িষ্ণু পর্বে আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কার্যকারিতা হারায়। জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালতের মতো সংস্থাগুলো পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দেয় যেখানে কোনো নিয়মশৃঙ্খলা কাজ করে না। সহিংস রাষ্ট্রবহির্ভূত দলগুলো এই বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার পূর্ণ সুযোগ নেয় এবং নিজেদের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালায়।
তত্ত্বদ্বয়ের মেলবন্ধন ও সমকালীন বৈশ্বিক নিরাপত্তার রূপরেখা (Synthesizing the Theories and the Future of Contemporary Global Security)
সমকালীন বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে গভীরভাবে বুঝতে হলে এককভাবে বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব কিংবা সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির একটি সুষম সংশ্লেষণ। সমাজবিজ্ঞানী সাসকিয়া সাসেন (Saskia Sassen) তার Expulsions: Brutality and Complexity in the Global Economyগ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক পুঁজিবাদ কোটি কোটি মানুষকে ভূমি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষাবলয় থেকে আক্ষরিক অর্থেই উচ্ছেদ করছে (Sassen, 2014)। সাসেনের এই বিশ্লেষণ পরিষ্কার করে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোই মানুষকে প্রান্তিক করে তোলে। তবে এই বাস্তুচ্যুত ও ক্ষমতাহীন মানুষ যখন তাদের ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা খোঁজে, তখন তারা ফিরে যায় নিজের আদিম সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কাছে। সুতরাং, অর্থনৈতিক বঞ্চনা তৈরি করে বস্তুগত প্রেক্ষাপট, আর সাংস্কৃতিক পরিচয় জোগায় মানসিক ঐক্যের প্রেরণা।
কৌশলগত নিরাপত্তা গবেষক ম্যাথু ক্রেনিগ (Matthew Kroenig) সমকালীন বৈশ্বিক সংঘাতের বহুমুখী চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন (Kroenig, 2020)। ক্রেনিগ দেখান, আজকের সন্ত্রাসবাদী হুমকিগুলো কোনো একক কারণে পরিচালিত হয় না। একটি সন্ত্রাসী দল একই সাথে বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হতে পারে (যা বিশ্ব ব্যবস্থার কেন্দ্র-প্রান্ত সংঘাতের প্রতীক), আবার তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে পশ্চিমা ভোগবাদের বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক লড়াই হিসেবে প্রচার করতে পারে (যা সভ্যতার সংঘাতের ভাষা)। ফলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের বুঝতে হবে যে কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে বা সীমানা প্রাচীর তুলে এই হুমকি দূর করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হবে এবং তাদের সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সহিংসতার এই চক্র বন্ধ করা যাবে না।
ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী মেরি কালডোর (Mary Kaldor) এই নতুন বাস্তবতায় বৈশ্বিক নিরাপত্তার একটি বিকল্প রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন (Kaldor, 2007)। কালডোর যুক্তি দেন, সনাতন সামরিক নিরাপত্তার বদলে বিশ্বকে এখন মানব নিরাপত্তা (Human Security)-র ধারণার দিকে এগোতে হবে। মানব নিরাপত্তা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সীমানা বা সভ্যতার সীমানা রক্ষার কথা বলে না; এটা ব্যক্তির ক্ষুধা, দারিদ্র্য, জলবায়ু সংকট এবং রাজনৈতিক নির্যাতন থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা দাবি করে। বিশ্বায়ন যদি কেবল কেন্দ্রের পুঁজিপতিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আর প্রান্তের মানুষকে সহিংসতার মুখে ফেলে রাখে, তবে সেই বিশৃঙ্খলার আঁচ একদিন কেন্দ্রের নগরগুলোতেও পৌঁছাবে। সভ্যতার কৃত্রিম বিভাজন রেখা মুছে ফেলে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোগত শোষণ দূর করার মাধ্যমেই কেবল একটি টেকসই ও নিরাপদ আন্তর্জাতিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ হলো বিশ্ব-ব্যবস্থার অর্থনৈতিক অসাম্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রাজনীতির এক বিপজ্জনক সংযোগস্থল। একে পরাজিত করতে হলে কেবল সামরিক বা গোয়েন্দা তৎপরতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং পারস্পরিক সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাবোধ। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব একপেশে শোষণ এবং অপরকে শত্রু বানানোর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বৈশ্বিক শান্তির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
গণমাধ্যম, যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ (Media, War and Terrorism): প্রচার ও তথ্যযুদ্ধ
গণমাধ্যম ও সন্ত্রাসবাদের মিথোজীবী সম্পর্ক (The Symbiotic Relationship Between Media and Terrorism)
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সন্ত্রাসবাদ ও গণমাধ্যমের সম্পর্ককে বহু গবেষক এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক মিথোজীবিতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেখানে নিজের অস্তিত্ব গোপন রাখতে চায়, সেখানে সন্ত্রাসবাদের অস্তিত্বই নির্ভর করে তার প্রকাশ্য উপস্থিতির ওপর। কোনো সন্ত্রাসী হামলা কেবল তাৎক্ষণিকভাবে নিহত বা আহত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয় না; এর আসল লক্ষ্য থাকে সেই কোটি কোটি দর্শক, যারা সংবাদমাধ্যমের পর্দায় ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক ব্রায়ান মাইকেল জেনকিন্স (Brian Michael Jenkins) ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই বাস্তবতাকে তুলে ধরে একটি ক্লাসিক পর্যবেক্ষণ হাজির করেছিলেন: “সন্ত্রাসবাদ হলো এক ধরণের থিয়েটার বা নাটক” (Jenkins, 1975)। এই নাটকে সন্ত্রাসীরা হলো অভিনেতা, তাদের অস্ত্র হলো মঞ্চের সাজসজ্জা, আর গণমাধ্যম হলো সেই শক্তিশালী প্রচারক, যা এই রক্তক্ষয়ী দৃশ্যকে পুরো পৃথিবীর দরবারে পৌঁছে দেয়। গণমাধ্যমের ক্যামেরা না থাকলে সন্ত্রাসের বার্তা তার তাৎক্ষণিক ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে না।
যোগাযোগ ও সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid) এই সম্পর্কের অভ্যন্তরীণ রসায়ন বিশ্লেষণ করেছেন (Schmid, 1989)। স্মিড দেখান, সন্ত্রাসীদের যেমন তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য একটি ব্যাপক প্রচার কাঠামোর প্রয়োজন হয়, তেমনি আধুনিক বাণিজ্যিক গণমাধ্যমেরও তাদের পাঠক বা দর্শক ধরে রাখার জন্য দরকার পড়ে চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল খবর। চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল এবং ইন্টারনেট পোর্টালগুলোর মধ্যে শুরু হওয়া রেটিং ও ক্লিকের তীব্র প্রতিযোগিতা সন্ত্রাসীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ এনে দেয়। কোনো স্থানে একটি জিম্মি সংকট বা ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটলে গণমাধ্যম যেভাবে প্রতিটি মুহূর্ত লাইভ সম্প্রচার করতে থাকে, তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ভীতির জন্ম দেয়। একই সাথে এই সম্প্রচার হামলাকারী সংগঠনকে এমন এক বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়, যা বিপুল অর্থ খরচ করেও সাধারণ উপায়ে অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশ্লেষক ব্রিজিট এল. নাকোস (Brigitte L. Nacos) তার Mass-Mediated Terrorism গ্রন্থে এই প্রক্রিয়ার মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন করেছেন (Nacos, 2002)। নাকোসের মতে, আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কোনো অপারেশন পরিচালনার আগে একটি নিখুঁত মিডিয়া কৌশল তৈরি করে। তারা এমন লক্ষ্যবস্তু এবং সময় নির্বাচন করে যা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বাধ্য করে। ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদদের ওপর ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গোষ্ঠীর হামলা ছিল এই কৌশলের একটি প্রারম্ভিক নজির। সারা বিশ্বের নজর যখন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিকে নিবদ্ধ ছিল, তখন সেই বিশ্বমঞ্চকে সন্ত্রাসীরা নিজেদের বার্তা প্রচারের মাইক হিসেবে ছিনতাই করে নিয়েছিল। ফলে গণমাধ্যম আধুনিক যুগে সন্ত্রাসের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক অনিচ্ছাকৃত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর সহযোগী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই মিথোজীবী সম্পর্ক সমাজের সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত এক ধরণের পরোক্ষ সন্ত্রাসের মুখোমুখি করে। কোনো একটি শহরে বোমা পড়লে সেই খবর দেখে হাজার মাইল দূরের অন্য একটি শহরের মানুষও নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে শুরু করে। এর ফলে সন্ত্রাসীদের মূল উদ্দেশ্য – অর্থাৎ সমাজে সর্বব্যাপী আতঙ্ক ও মানসিক পক্ষাঘাত সৃষ্টি করা – খুব সহজেই সফল হয়ে যায়। গণমাধ্যমের এই অতিরিক্ত প্রচার উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংগ্রহ এবং তহবিল সংগ্রহের পথকেও প্রশস্ত করে তোলে।
সংবাদ কাঠামোকরণ, এজেন্ডা নির্ধারণ ও ভয়ের সংস্কৃতি (News Framing, Agenda-Setting, and the Culture of Fear)
গণমাধ্যম কোনো ঘটনাকে কীভাবে উপস্থাপন করছে, তার ওপর নির্ভর করে সমাজের চিন্তাভাবনা এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কীভাবে গড়ে উঠবে। যোগাযোগ তাত্ত্বিক রবার্ট এম. এন্টম্যান (Robert M. Entman) তার কাঠামোকরণ তত্ত্ব (Framing Theory)-এ দেখিয়েছেন, সংবাদমাধ্যম কোনো সংবাদের কিছু নির্দিষ্ট দিককে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে এমনভাবে সাজায়, যাতে পাঠকেরা সেই ঘটনাটিকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে বাধ্য হয় (Entman, 1993)। যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের সংবাদে এই কাঠামোকরণ অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। একটি নির্দিষ্ট সহিংস ঘটনাকে কি ‘স্বাধীনতাকামী জনগণের বিদ্রোহ’ বলা হবে নাকি ‘বর্বর সন্ত্রাসী আক্রমণ’ হিসেবে প্রচার করা হবে, সেই ভাষাগত কাঠামোর মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক জনমতের গতিপথ নির্ধারিত হয়ে যায়।
গণযোগাযোগ গবেষক ম্যাক্সওয়েল ম্যাককম্বস (Maxwell McCombs) তার প্রণীত এজেন্ডা নির্ধারণ তত্ত্ব (Agenda-Setting Theory)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে গণমাধ্যম মানুষের চিন্তার পরিধি নিয়ন্ত্রণ করে (McCombs, 2004)। ম্যাককম্বসের মতে, গণমাধ্যম হয়তো সরাসরি মানুষকে বলে দিতে পারে না যে সে কী ভাববে, কিন্তু গণমাধ্যম এটা নিশ্চিত করে দেয় যে মানুষ কোন বিষয়টি নিয়ে ভাববে। সংবাদমাধ্যমে যখন দিনের পর দিন সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত সংঘাত এবং যুদ্ধের আশঙ্কাকে প্রধান শিরোনাম হিসেবে রাখা হয়, তখন সাধারণ মানুষ মনে করে যে তাদের অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে। এর ফলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা স্বাস্থ্য খাতের সংকটের মতো মৌলিক সামাজিক সমস্যাগুলো জনদৃষ্টির আড়ালে চলে যায় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর নিরাপত্তা পদক্ষেপগুলো সহজে গণঅনুমোদন লাভ করে।
সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড এল. আলথাইড (David L. Altheide) গণমাধ্যমের এই প্রবণতাকে ভয়ের সংস্কৃতি (Culture of Fear) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Altheide, 2002)। আলথাইডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গণমাধ্যম প্রায়ই সন্ত্রাসবাদের বাস্তব ঝুঁকিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যাতে সমাজে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতাবোধ তৈরি হয়। এই ভয়ের পরিবেশ একদিকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংকুচিত করার যৌক্তিকতা তৈরি করে, অন্যদিকে সমাজের ভেতরে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যালঘু বা অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি সাধারণ মানুষের সন্দেহ উসকে দেয়। এর ফলে তথ্যের প্রবাহ কেবল বাস্তব ঘটনা তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটা সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট করে এক ধরণের মারমুখী পরিবেশ তৈরি করে।
সংবাদের এই কাঠামোকরণ রাজনৈতিক দল ও শাসকগোষ্ঠীর জন্যও এক সুবিধাজনক হাতিয়ার। যখনই কোনো দেশে নির্বাচন বা রাজনৈতিক সংকট ঘনিয়ে আসে, তখন গণমাধ্যমে নির্দিষ্ট সুরের সংবাদ পরিবেশন করে জাতীয়তাবাদী আবেগকে চাঙ্গা করা হয়। সাধারণ নাগরিকেরা যখন সার্বক্ষণিক আতঙ্কের মধ্যে থাকে, তখন তারা যেকোনো কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে। ফলে কাঠামোকরণ ও এজেন্ডা নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই ভয়ের সংস্কৃতি সমাজের গণতান্ত্রিক চর্চাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলে।
রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র, সম্মতি উৎপাদন ও যুদ্ধের বয়ান (State Propaganda, Manufacturing Consent, and War Narratives)
যুদ্ধ ও সংঘাতের সময়ে গণমাধ্যম প্রায়ই তার স্বাধীন সত্তা হারিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। প্রখ্যাত যুদ্ধ সাংবাদিক ও লেখক ফিলিপ নাইটলি (Phillip Knightley) তার ক্লাসিক গ্রন্থ The First Casualty-তে দেখিয়েছেন যে যেকোনো যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই সত্য প্রথম শিকারে পরিণত হয় (Knightley, 1975)। প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত প্রতিটি বড় সামরিক অভিযানের আগেই রাষ্ট্রগুলো গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এক ধরনের রণোন্মাদনা তৈরি করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ যুদ্ধকে একটি অবশ্যম্ভাবী ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ বলে মনে করে। সরকারগুলো তথ্য গোপন, সেন্সরশিপ এবং সুপরিকল্পিত তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে যুদ্ধের অনুকূলে জনমত তৈরি করে থাকে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ইতিহাসবিদ ফিলিপ এম. টেলর (Philip M. Taylor) তার Munitions of the Mind গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে তথ্যকে বোমারু বিমানের মতোই এক বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয় (Taylor, 2003)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধের পুরো পর্ব জুড়ে রাষ্ট্রগুলো গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এক ধরণের সম্মতি উৎপাদন (Manufacturing Consent) নিশ্চিত করেছিল। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে পশ্চিমা মূলধারার বহু সংবাদমাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের কাছে তথাকথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে একতরফা প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তা ছিল এই রাষ্ট্রীয় প্রচারযুদ্ধের এক আধুনিক উদাহরণ। পরবর্তীতে কোনো অস্ত্র না পাওয়া গেলেও যুদ্ধের পক্ষে গণঅনুমোদন তৈরির কাজটি গণমাধ্যম ততদিনে সম্পন্ন করে ফেলেছিল।
মিডিয়া ও যুদ্ধ গবেষক সুসান এল. কারুথার্স (Susan L. Carruthers) তার গ্রন্থ The Media at War-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক যুদ্ধে সাংবাদিকদের সামরিক ইউনিটের সাথে জুড়ে দেওয়ার বা এমবেডেড জার্নালিজম (Embedded Journalism)-এর মাধ্যমে সংবাদকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় (Carruthers, 2000)। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সুরক্ষায় থেকে সাংবাদিকরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ পাঠান, তখন তারা অবচেতনভাবেই সামরিক বাহিনীর চোখ দিয়ে পরিস্থিতি দেখতে বাধ্য হন। এর ফলে যুদ্ধের বাস্তব রূপ – সাধারণ মানুষের কান্না, রক্তপাত এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের মর্মান্তিক দৃশ্য – ক্যামেরার ফ্রেম থেকে বাদ পড়ে যায়। এর বদলে যুদ্ধ টেলিভিশনের পর্দায় এক পরিচ্ছন্ন ও রোমাঞ্চকর অভিযানের রূপ নেয়, যা সাধারণ মানুষের বিবেককে অসাড় করে দেয়।
এই রাষ্ট্রীয় তথ্যযুদ্ধ কেবল বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয় না, দেশের ভেতরে থাকা যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্যও ব্যবহৃত হয়। যারা যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, গণমাধ্যমের প্রচারণায় তাদেরকে দ্রুত ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘শত্রুর দালাল’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ফলে গণমাধ্যম তখন স্বাধীন মতপ্রকাশের প্ল্যাটফর্ম না থেকে শাসকগোষ্ঠীর ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের এক অনুগত প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়।
টেলিভিশন যুগ, সিএনএন প্রভাব ও লাইভ সংঘাত (The Television Era, CNN Effect, and Live Conflict)
স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং চব্বিশ ঘণ্টার সরাসরি সংবাদ সম্প্রচারের বিকাশ যুদ্ধ ও সংঘাতের চরিত্রকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বাগদাদে বোমা হামলার দৃশ্য সিএনএন-এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিয়ার্স রবিনসন (Piers Robinson) এই ঘটনাপ্রবাহকে তাত্ত্বিক রূপ দিতে গিয়ে সিএনএন প্রভাব (CNN Effect) প্রত্যয়টি ব্যাখ্যা করেন (Robinson, 2002)। রবিনসনের মতে, রিয়েল-টাইম সংঘাতের আবেগঘন দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের কারণে নীতিনির্ধারকদের ওপর তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। সরকারগুলো তখন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনার চেয়ে টেলিভিশনের পর্দায় তৈরি হওয়া জনমতের ক্ষোভ সামলাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ বদ্রিলার্দ (Jean Baudrillard) ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালীন তার আলোচিত গ্রন্থে লিখেছিলেন: “উপসাগরীয় যুদ্ধ বাস্তবে ঘটেনি” (Baudrillard, 1995)। বদ্রিলার্দের এই বক্তব্যের মূল কথা ছিল, সাধারণ মানুষ পর্দায় যে যুদ্ধটি দেখেছিল তা আসল রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছিল না, বরং তা ছিল টেলিভিশনের ক্যামেরায় নির্মিত এক ধরণের কৃত্রিম বাস্তবতা বা সিমুলাক্রা (Simulacra)। নাইট-ভিশন ক্যামেরার সবুজ আলোর ঝলকানি এবং কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মিসাইলের নিখুঁত লক্ষ্যভেদের দৃশ্যগুলো যুদ্ধের রক্তপাত, পোড়া লাশের গন্ধ এবং মানুষের অবর্ণনীয় হাহাকারকে ঢেকে দিয়েছিল। এর ফলে যুদ্ধ ড্রয়িংরুমের দর্শকদের জন্য একটি রোমাঞ্চকর ভিডিও গেমের বিনোদনে রূপান্তরিত হয়েছিল।
যোগাযোগ গবেষক স্টিভেন লিভিংস্টন (Steven Livingston) চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চক্র কীভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, তা বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Livingston, 1997)। সরাসরি সম্প্রচারের এই যুগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও তাদের কার্যপদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে। তারা জানে যে কোনো একটি জিম্মি সংকট তৈরি করতে পারলে স্যাটেলাইট সম্প্রচারের মাধ্যমে সারা বিশ্বের চোখ তাদের দিকে নিবদ্ধ হবে। এই বাস্তবতায় উদ্ধার অভিযান চালানো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এক চরম কৌশলগত সংকট হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি পদক্ষেপের সরাসরি সম্প্রচার সন্ত্রাসীদের কাছে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান ফাঁস করে দিতে পারে, যা বন্দিদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
টেলিভিশন সংবাদের এই সংবেদনশীলতা যুদ্ধের মানবিক দিককে পেছনে ফেলে কেবল ভিজ্যুয়াল নাটকীয়তাকে প্রাধান্য দেয়। যেখানে ক্যামেরা থাকে, কেবল সেখানকার সংকটই গুরুত্ব পায়; আর ক্যামেরার আড়ালে থাকা বহু বড় মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা নীতি অনেক সময়ই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের বদলে টেলিভিশনের সংবাদের গতিপথ দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করে।
ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধ, সোশ্যাল মিডিয়া ও মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন (Digital Information Warfare, Social Media, and Psychological Operations)
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তার গণমাধ্যম, যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের সম্পর্কের সমীকরণকে এক সম্পূর্ণ নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। বর্তমান যুগে সন্ত্রাসীদের আর তাদের বার্তা প্রচারের জন্য প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের করুণার ওপর নির্ভর করতে হয় না; এখন তারা নিজেরাই কন্টেন্ট নির্মাতা এবং পরিবেশক। প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি গবেষক পি. ডব্লিউ. সিঙ্গার (P. W. Singer) এবং এমরসন ব্রুকিং (Emerson T. Brooking) তাদের সাড়া জাগানো গ্রন্থ LikeWar: The Weaponization of Social Media-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো যুদ্ধের সরাসরি ময়দানে পরিণত হয়েছে (Singer & Brooking, 2018)। তাদের মতে, আধুনিক যুগে একটি স্মার্টফোন দিয়ে তৈরি করা ভাইরাল ভিডিও কিংবা একটি পরিকল্পিত হ্যাশট্যাগ আন্দোলন একটি ভারী ট্যাংকের মতোই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাইবার যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ থমাস রিড (Thomas Rid) আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন (Psychological Operations) বা সাইকপস-এর রূপান্তর নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন (Rid, 2020)। আধুনিক বিশ্বে সহিংস গোষ্ঠীগুলো এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ক্ষোভ, ঘৃণা ও ধর্মীয় মেরুকরণ উসকে দেওয়া কন্টেন্টগুলো অ্যালগরিদমের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস) যেভাবে টুইটার, টেলিগ্রাম এবং ইউটিউব ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল এবং নিজেদের দলে ভিড়িয়েছিল, তা দেখায় যে ডিজিটাল পরিমণ্ডলে সীমানা প্রাচীর দিয়ে উগ্রবাদের বিস্তার ঠেকানো যায় না।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক গ্যাব্রিয়েল ওয়েইম্যান (Gabriel Weimann) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া সন্ত্রাসীদের জন্য একটি নিরাপদ ভার্চুয়াল ক্যাম্পাসে পরিণত হয়েছে (Weimann, 2006)। এখানে তারা কেবল প্রপাগান্ডাই ছড়ায় না, বরং বিস্ফোরক তৈরির কৌশল শেখানো, গোপন যোগাযোগ রক্ষা এবং অর্থ সংগ্রহের মতো জটিল কাজগুলো সম্পন্ন করে। অনলাইন ফোরামগুলোতে তৈরি হওয়া ইকো-চেম্বার বা চিন্তার আবদ্ধ বলয় একজন সাধারণ ব্যক্তিকে খুব দ্রুত উগ্রপন্থী মতাদর্শে অন্ধ করে তোলে। ফলে শারীরিক অস্ত্রের চেয়েও ডিজিটাল ন্যারেটিভ অনেক বেশি শক্তিশালী মারণাস্ত্র হয়ে উঠছে।
এই ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধের একটি বড় দিক হলো এর অতি-বিকেন্দ্রীকরণ। এখন কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড ছাড়াই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের একজন ব্যক্তি একটি ভুয়া খবর বা উসকানিমূলক ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এর ফলে যুদ্ধের ময়দানে কারা লড়াই করছে আর কারা কেবল অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, সেই পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। যুদ্ধ এখন কেবল সামরিক ফ্রন্টলাইনে নয়, প্রতিটি নাগরিকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দিনরাত অব্যাহত রয়েছে।
ভুয়ো খবর, ডিসইনফর্মেশন ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিকৃত বাস্তবতা (Fake News, Disinformation, and Distorted Realities of the Battlefield)
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সাথে সাথে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কৌশলগত হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রচার বা ডিসইনফর্মেশন। যোগাযোগ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান গবেষক ক্যাথলিন হল জেমিসন (Kathleen Hall Jamieson) তার গ্রন্থ Cyberwar-এ বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্য দেশের সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ভেঙে দিতে পারে (Jamieson, 2018)। কোনো সংকটময় মুহূর্তে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া ভুয়ো খবর সমাজে দ্রুত প্যানিক তৈরি করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতাকে পঙ্গু করে দেয়।
তথ্য বিশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞ ক্লারি ওয়ার্ডল (Claire Wardle) তার যৌথ গবেষণায় তথ্যের এই বিকৃতিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন: অনিচ্ছাকৃত ভুল তথ্য (Misinformation), উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষতিকর মিথ্যা তথ্য (Disinformation) এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে ক্ষতি করার প্রবণতা (Malinformation) (Wardle & Derakhshan, 2017)। যুদ্ধ চলাকালে প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে এবং আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন করতে উভয় পক্ষই ব্যাপক হারে এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে। পুরনো সংঘাতের ছবিকে বর্তমান সংঘাতের বলে চালিয়ে দেওয়া, সাজানো লাশের ভিডিও প্রচার করা এবং কৃত্রিম অ্যাকাউন্ট দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রেন্ড তৈরি করা এখন যুদ্ধের নিয়মিত অংশ।
প্রযুক্তি ও রাজনীতি বিশ্লেষক সামান্থা ব্র্যাডশ (Samantha Bradshaw) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে সরকারগুলো এবং উগ্র গোষ্ঠীগুলো পেইড ট্রল ফার্ম এবং স্বয়ংক্রিয় বট ব্যবহার করে জনমতকে বিভ্রান্ত করছে (Bradshaw & Howard, 2018)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও এবং অডিও এই সংকটকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। যুদ্ধরত কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে যদি ভুয়া ভিডিওতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা প্রচার করা হয়, তবে তা মুহূর্তের মধ্যে রণাঙ্গনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর ফলে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এতই কঠিন হয়ে পড়েছে যে সাধারণ মানুষ কোন খবর বিশ্বাস করবে আর কোনটা করবে না, সেই বিভ্রান্তিতে এক স্থায়ী মানসিক সংকটে বাস করে।
এই ভুয়ো তথ্যের বন্যা কেবল যুদ্ধের মাঠেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করে না, শান্তি আলোচনার পথকেও রুদ্ধ করে দেয়। যখন দুই পক্ষের সাধারণ মানুষই প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষ সম্পর্কে মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য পেয়ে থাকে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কোনো সমঝোতাই আর সম্ভব হয় না। ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্যযুদ্ধ সংঘাতের স্থায়িত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
নৈতিক সাংবাদিকতা, প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা (Ethical Journalism, Counter-Narratives, and Democratic Accountability)
গণমাধ্যম যখন যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের প্রপাগান্ডায় ব্যবহৃত হওয়ার বড় ঝুঁকিতে থাকে, তখন সংবাদমাধ্যমের ইতিবাচক ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকার প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বখ্যাত শান্তি গবেষক ইয়োহান গালতুং (Johan Galtung) এই সংকটের বিকল্প হিসেবে শান্তি সাংবাদিকতা (Peace Journalism)-এর তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করেছিলেন (Galtung, 1998)। গালতুং দেখান, প্রচলিত যুদ্ধ সাংবাদিকতা (War Journalism) সবসময় সংঘাতকে একটি দ্বিমুখী লড়াই হিসেবে দেখে, যেখানে কেবল সেনা ও সহিংস নেতাদের কথা গুরুত্ব পায় এবং ধ্বংসের ওপর আলোকপাত করা হয়। বিপরীতে, শান্তি সাংবাদিকতা সংঘাতের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এবং অহিংস সমাধানের পথগুলোকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে।
শান্তি সাংবাদিকতার গবেষক জেক লিঞ্চ (Jake Lynch) বিষয়টিকে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত করে যুক্তি দেখিয়েছেন যে সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো সন্ত্রাসীদের ভীতি ছড়ানোর ফাঁদে পা না দেওয়া (Lynch & McGoldrick, 2005)। কোনো হামলার পর গণমাধ্যম যদি কেবল রক্ত, আর্তনাদ এবং আতঙ্ক প্রচার করতে থাকে, তবে তারা পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যকেই সফল করে তোলে। কিন্তু সাংবাদিকরা যদি দায়িত্বশীলতার সাথে ঘটনাটি তুলে ধরেন, ভুক্তভোগীদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প প্রচার করেন এবং সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেন, তবে সন্ত্রাসের মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। এটা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সমাজের এক ধরণের প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
মিডিয়া নীতিশাস্ত্রবিদ ক্লিফোর্ড ক্রিশ্চিয়ানস (Clifford G. Christians) গণতান্ত্রিক সমাজে যুদ্ধ ও সন্ত্রাস কাভারেজের নৈতিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন (Christians et al., 2009)। ক্রিশ্চিয়ানসের মতে, সাংবাদিকতার পরম দায়িত্ব হলো ক্ষমতার অন্ধ তোষণ না করে সত্যের অনুসন্ধান করা এবং জাতীয় নিরাপত্তার নামে সরকারের বিচারহীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে সাহসের সাথে তুলে ধরা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখা যেকোনো মুক্ত সমাজের প্রধান লড়াই। গণমাধ্যম যদি স্বৈরাচারী প্রচারযন্ত্র কিংবা উগ্রবাদীদের অন্ধ মোহের কাছে আত্মসমর্পণ না করে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে অবিচল থাকে, তবেই তা একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে থাকতে পারবে।
প্রযুক্তি, সাইবার ও জৈব-সন্ত্রাসবাদ (Technology, Cyber and Bioterrorism): নতুন প্রজন্মের হুমকি
প্রযুক্তির দ্বৈত ব্যবহার ও সমকালীন সন্ত্রাসবাদের বিবর্তন (Dual-Use Technology and the Evolution of Contemporary Terrorism)
একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি মানব সভ্যতার জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ ও গতিশীল করেছে, তেমনি তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সামনে নজিরবিহীন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। প্রযুক্তির এই অন্ধকার দিকটিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দ্বৈত ব্যবহারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব (Dual-Use Dilemma) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে ড্রোন দিয়ে কৃষিজমিতে কীটনাশক ছিটানো হয় বা সিনেমাটোগ্রাফির কাজ করা হয়, সেই একই ড্রোনকে বিস্ফোরকবাহী ক্ষেপণাস্ত্রে রূপান্তর করা এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কম্পিউটেশনাল বিজ্ঞান এবং নিরাপত্তা তাত্ত্বিক ডরোথি ই. ডেনিং (Dorothy E. Denning) তার গবেষণাগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ রাষ্ট্র ও সহিংস অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যকে পরিবর্তন করে দিয়েছে (Denning, 1999)। অতীতের মতো বিধ্বংসী ক্ষমতা অর্জনের জন্য এখন আর বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট কিংবা রাষ্ট্রীয় গবেষণাগারের প্রয়োজন পড়ে না; বাণিজ্যিক ও বেসামরিক প্রযুক্তির সামান্য রূপান্তর ঘটিয়েই ছোট ছোট দলগুলো মারাত্মক প্রাণঘাতী আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করছে।
সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিচার্ড এ. ক্লার্ক (Richard A. Clarke) তার আলোচিত গ্রন্থ Cyber War-এ দেখিয়েছেন যে ডিজিটাল প্রযুক্তি যুদ্ধের চিরাচরিত ভূগোলকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে (Clarke & Knake, 2010)। আগে কোনো শত্রু রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আক্রমণ করতে হলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হতো। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসারের ফলে হাজার মাইল দূরে বসে কম্পিউটারের কিবোর্ডে কয়েকটি কমান্ড টাইপ করেই একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়া সম্ভব। ক্লার্কের মতে, আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো তাদের প্রাত্যহিক কার্যক্রমে ইন্টারনেটের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, ততই তাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা বাড়ছে। সহিংস গোষ্ঠীগুলো এই দুর্বলতাকে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মার্টিন সি. লিবিচকি (Martin C. Libicki) প্রযুক্তির এই রূপান্তরকে একটি অসম রণকৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (Libicki, 2007)। লিবিচকির মতে, প্রযুক্তিগত সন্ত্রাসবাদের বড় সুবিধা হলো এর অতি কম খরচ এবং গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষমতা। প্রথাগত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়ার সামর্থ্য কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের থাকে না। তবে যখন তারা আধুনিক সফটওয়্যার, ডার্ক নেটের বাণিজ্যিক সেবা এবং সহজলভ্য হার্ডওয়্যার একত্রিত করে, তখন তারা একটি অদৃশ্য শত্রুতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র বা সাঁজোয়া বহর নিয়ে এই অদৃশ্য প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রায়শই অসহায় বোধ করে। প্রযুক্তি ফলে কেবল সন্ত্রাসের মাধ্যমকে বদলায়নি, এটা সংঘাতের মনস্তত্ত্ব ও রণনীতিকে এক সম্পূর্ণ নতুন যুগে নিয়ে গেছে।
এই দ্বৈত ব্যবহারের সংকট কেবল সাইবার স্পেসেই সীমাবদ্ধ নেই; এটা ছড়িয়ে পড়েছে উপাদান বিজ্ঞান, থ্রি-ডি প্রিন্টিং এবং যোগাযোগ সরঞ্জামের প্রতিটি শাখায়। বাণিজ্যিক কারখানা থেকে কেনা সাধারণ রাসায়নিক দিয়ে ড্রোন প্রস্তুত করা কিংবা প্লাস্টিক ফিলামেন্ট দিয়ে ঘরে বসেই ট্রেসলেস আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করার সুযোগ উগ্রবাদীদের হাতে নতুন ক্ষমতা এনে দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য প্রচলিত উপায়ে অস্ত্র পাচার বা নজরদারি করা দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সাইবার সন্ত্রাসবাদ: সমালোচনামূলক অবকাঠামো ও ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকি (Cyberterrorism: Critical Infrastructure and Digital Security Risks)
আধুনিক নগরজীবন এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এখন পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড অটোমেশন ও নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ বিতরণ, জল সরবরাহ, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং লেনদেন এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো সেবাগুলো পরিচালিত হয় ডিজিটাল সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা একুইজিশন বা স্কাডা (SCADA) সিস্টেমের মাধ্যমে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষক অ্যান্ড্রু এম. কলিসন (Andrew M. Colarik) তার Cyber Terrorism: Political and Economic Implicationsগ্রন্থে সতর্ক করেছেন যে এই সমালোচনামূলক অবকাঠামোগুলোই সাইবার সন্ত্রাসীদের প্রধান নিশানা (Colarik, 2006)। কোনো একটি বড় শহরের পাওয়ার গ্রিড যদি ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে কয়েক দিনের জন্য অচল করে দেওয়া যায়, তবে সেখানে যে বিশৃঙ্খলা ও মানবিক বিপর্যয় তৈরি হবে, তা কোনো প্রচলিত বোমা হামলার চেয়ে কম নয়।
সাইবার যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ টমাস রিড (Thomas Rid) অবশ্য সাইবার সন্ত্রাসবাদের সক্ষমতা ও প্রচারণার মধ্যে একটি স্পষ্ট তাত্ত্বিক সীমারেখা টেনেছেন (Rid, 2013)। রিডের যুক্তি অনুযায়ী, ইন্টারনেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা প্রচার বা সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করে বিকৃত করাকেই সরাসরি সাইবার সন্ত্রাস বলা যায় না; একে বড়জোর হ্যাকটিভিজম (Hacktivism) বলা যেতে পারে। প্রকৃত সাইবার সন্ত্রাসবাদ (Cyberterrorism) তখনই ঘটে যখন ডিজিটাল হামলার মাধ্যমে সরাসরি ভৌত জগতে প্রাণহানি, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা জনগণের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করা হয়। ২০১০ সালে ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে আঘাত হানা স্টাক্সনেট (Stuxnet) ম্যালওয়্যার দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে নিছক কোডিংয়ের মাধ্যমে একটি শক্তপোক্ত শিল্পাঞ্চলীয় ভৌত অবকাঠামোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। এই ধরনের ম্যালওয়্যার কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছালে তারা যেকোনো দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা রাসায়নিক প্ল্যান্টে বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রায়ান সি. হ্যাগার্টি (Brian C. Haggerty) আধুনিক সাইবার র্যানসমওয়্যার এবং লকার ম্যালওয়্যারের বিস্তারের ওপর আলোকপাত করেছেন (Haggerty, 2017)। হ্যাগার্টি দেখান, সমকালীন সময়ে বহু উগ্র গোষ্ঠী ও ভাড়াটে হ্যাকার গ্যাং হাসপাতাল, জরুরি সেবা এবং তেল সরবরাহ লাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক এনক্রিপ্ট করে জিম্মি করে ফেলছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোনিয়াল পাইপলাইনে সাইবার হামলার পর হাজার হাজার গ্যাস স্টেশনে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে ডিজিটাল লাইফলাইনে আঘাত হেনে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা মুহূর্তের মধ্যে ধসিয়ে দেওয়া সম্ভব।
তাছাড়া সমুদ্র তলদেশের অপটিক্যাল ফাইবার কেবল কিংবা উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানার ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় পুরো লেনদেনই এই ডিজিটাল হাইওয়ের ওপর দিয়ে সম্পন্ন হয়। কোনো চরমপন্থী নেটওয়ার্ক যদি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুইচিং সিস্টেমে ত্রুটি তৈরি করতে পারে, তবে তা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক প্যানিক সৃষ্টি করবে। সাইবার স্পেসের এই ঝুঁকি রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ধারণাকে সবচেয়ে বেশি নাজুক করে তুলেছে।
ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টো-ইকোসিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় অপরাধ চক্র (Dark Web, Crypto-Ecosystems, and Automated Crime Rings)
সাধারণ ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটের যে অংশটি ব্যবহার করেন, তা পুরো ডিজিটাল বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ইন্টারনেটের গভীরে থাকা এনক্রিপ্টেড অংশ, যা বিশেষ সফটওয়্যার ছাড়া প্রবেশ করা যায় না, তাকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব (Dark Web)। প্রযুক্তি ও সমাজ গবেষক জেমি বার্টলেট (Jamie Bartlett) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ The Dark Net-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ডার্ক নেটওয়ার্কগুলো চরমপন্থী ও আন্তর্জাতিক অপরাধীদের জন্য এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে (Bartlett, 2015)। অনিয়ন রাউটিং বা টর (Tor) নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত এই আন্ডারগ্রাউন্ড সাইটগুলোতে ব্যবহারকারীর আইপি অ্যাড্রেস এবং ভৌগোলিক অবস্থান সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এখানে বসে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় নজরদারির ভয় ছাড়াই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে।
সাবেক মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রধান মাইকেল চেরটফ (Michael Chertoff) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন কীভাবে ডার্ক ওয়েবের এই বাজারগুলো সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে (Chertoff, 2018)। সিল্ক রোড বা অ্যালফাবেটের মতো ডার্ক ওয়েব মার্কেটপ্লেসগুলোতে বেআইনি অস্ত্র, বিস্ফোরক তৈরির রেসিপি, জাল পাসপোর্ট এবং সামরিক প্রযুক্তির তথ্য অবাধে কেনাবেচা হয়। এই লেনদেনের প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করে বিটকয়েন, মনরো এবং জি-ক্যাশের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তথাকথিত ‘নো ইওর কাস্টমার’ (KYC) নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে এক সেকেন্ডে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ অর্থ সীমান্ত পেরিয়ে যায়।
নিরাপত্তা অর্থনীতিবিদ রবার্ট হান্টার (Robert Hunter) এই আর্থিক স্বয়ংক্রিয়তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধের সাথে সন্ত্রাসবাদের একটি স্থায়ী সংযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Hunter, 2021)। হান্টারের মতে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এখন আর কেবল চাঁদা বা প্রবাসীদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে না; তারা ডার্ক ওয়েবে ডেটা চুরি, পরিচয় জালিয়াতি এবং বিভিন্ন সাইবার অপরাধ পরিচালনা করে স্বয়ংক্রিয় আয়ের উৎস তৈরি করেছে। বিভিন্ন মিক্সার ও টাম্বলার সার্ভিস ব্যবহার করে ক্রিপ্টোকারেন্সির ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলা হয়, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সেই অর্থের উৎস বা গন্তব্য ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই আর্থিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে গড়ে উঠছে স্বয়ংক্রিয় সাইবার অপরাধ চক্র, যাদের কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেই। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ফোরাম থেকে ফ্রিল্যান্স হ্যাকারদের ভাড়া করে একটি নির্দিষ্ট অপারেশন পরিচালনা করা হয় এবং কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ পরিশোধ করে সেলটি ভেঙে দেওয়া হয়। এই নেটওয়ার্কভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ জাতিরাষ্ট্রের চিরাচরিত ভৌগোলিক আইন প্রয়োগকারী কাঠামোর জন্য এক বিশাল কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বিস্তার (Artificial Intelligence and the Proliferation of Autonomous Weapons)
একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও বিতর্কিত উদ্ভাবন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence – AI)। সামরিক বিশ্লেষক ও গবেষক পল শারে (Paul Scharre) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Army of None: Autonomous Weapons and the Future of War-এ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Scharre, 2018)। শারে দেখিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় ড্রোন বা রোবট এমন এক প্রযুক্তি যা মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজেই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে এবং আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই প্রযুক্তি যখন রাষ্ট্রবহির্ভূত উগ্র দলগুলোর নাগালে পৌঁছাবে, তখন তা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ ধারণ করতে পারে।
এমআইটির পদার্থবিজ্ঞানী ও এআই গবেষক ম্যাক্স টেগমার্ক (Max Tegmark) তার Life 3.0গ্রন্থে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সন্ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অন্ধকার চিত্র তুলে ধরেছেন (Tegmark, 2017)। টেগমার্ক সতর্ক করেছেন যে ভবিষ্যতে এআই-চালিত ক্ষুদ্রাকৃতির ড্রোন ঝাঁক (Drone Swarms) তৈরি করা সম্ভব হবে, যা মানুষের মুখের অবয়ব বা ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নিখুঁতভাবে আত্মঘাতী হামলা চালাতে পারবে। একটি সাধারণ ব্যাগে করে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ড্রোন বহন করা সম্ভব হবে এবং একটি বোতাম টিপেই পুরো একটি জনবহুল সম্মেলন কক্ষে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানো যাবে। এই ধরনের অস্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো হামলাকারীকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয় না, ফলে হামলাকারীকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট রাসেল (Stuart Russell) স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন (Russell, 2019)। রাসেলের মতে, প্রচলিত অস্ত্রের চেয়ে এআই অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা অনেক কঠিন, কারণ এর মূল উপাদানটি কোনো ভারী ধাতু নয়, বরং অ্যালগরিদম ও সফটওয়্যার কোড। ওপেন-সোর্স কোডিংয়ের এই যুগে যেকোনো দক্ষ প্রোগ্রামার বাণিজ্যিক ড্রোনের সাথে এআই অ্যালগরিদম যুক্ত করে তাকে একটি প্রাণঘাতী শিকারে পরিণত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই গণতন্ত্রীকরণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পুরো ধারণাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
তাছাড়া এআই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চালানো যেতে পারে স্বয়ংক্রিয় সাইবার আক্রমণ। প্রচলিত সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যারগুলো যেখানে মানুষের প্রতিক্রিয়া সময়ের ওপর নির্ভর করে, সেখানে এআই অ্যালগরিদম মিলিসেকেন্ডের মধ্যে কোনো সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে নিয়ে নিজে থেকেই কোড তৈরি করে আক্রমণ পরিচালনা করতে সক্ষম। এর ফলে একটি দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক কোনো মানুষের হস্তক্ষেপের আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অচল হয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তি যখন মানুষের চিন্তার চেয়েও দ্রুত গতিতে ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তখন সন্ত্রাসের পরিধি কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়।
জৈব-সন্ত্রাসবাদ: প্যাথোজেন, জিন প্রকৌশল ও বিষাক্ত অস্ত্রের হুমকি (Bioterrorism: Pathogens, Genetic Engineering, and Toxic Threats)
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে নীরব ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভীতিপ্রদ অস্ত্র হলো জৈব অস্ত্র। কোনো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের মতো সংক্রামক জীবাণু কিংবা তাদের বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার করে যখন কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়, তখন তাকে জৈব-সন্ত্রাসবাদ (Bioterrorism) বলা হয়। জৈব অস্ত্র বিশেষজ্ঞ জোনাথন বি. টাকার (Jonathan B. Tucker) তার আকরগ্রন্থ Toxic Terror-এ অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর জৈব অস্ত্র অর্জনের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন (Tucker, 2000)। টাকার দেখিয়েছেন, ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রজনীশ সম্প্রদায়ের অনুসারীরা একটি স্থানীয় শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া মিশিয়ে শত শত মানুষকে অসুস্থ করে দিয়েছিল, যা ছিল আধুনিক আমেরিকার প্রথম নথিবদ্ধ জৈব হামলা। এছাড়া জাপানের কুখ্যাত ওম শিনরিকিও সম্প্রদায় ১৯৯০-এর দশকে অ্যানথ্রাক্স এবং বোটুলিনাম টক্সিন তৈরির জন্য ব্যাপক গবেষণাগার গড়ে তুলেছিল।
জৈব নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেভিড আর. ফ্রাঞ্জ (David R. Franz) প্যাথোজেনের অস্ত্রায়নের জটিলতা ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছেন (Franz, 2004)। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে নাইন-ইলেভেন হামলার ঠিক পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে সাদা গুঁড়ো ভর্তি চিঠির মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স (Anthrax) জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই হামলায় মাত্র পাঁচজন নিহত হলেও পুরো মার্কিন ডাক ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রশাসন কয়েক সপ্তাহের জন্য অচল হয়ে পড়েছিল এবং কোটি কোটি মানুষ অজানা আতঙ্কে দিন কাটাতে শুরু করেছিল। ফ্রাঞ্জের মতে, জৈব সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় ধ্বংস ক্ষমতা নিহিত থাকে তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে। অদৃশ্য এক জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে মানুষ যখন একে অপরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে শুরু করে, তখন সমাজের পুরো অর্থনৈতিক ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ে।
সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা গবেষক জেসিকা স্টার্ন (Jessica Stern) তার বিখ্যাত The Ultimate Terrorists গ্রন্থে সিন্থেটিক বায়োলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নতুন ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন (Stern, 1999)। আধুনিক যুগে সিআরআইএসপিআর (CRISPR-Cas9)-এর মতো জিন সম্পাদনা প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতের মতো এখন আর কোনো মারাত্মক ভাইরাস প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতে হয় না; ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে কোনো সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার জিনগত রূপান্তর ঘটিয়ে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী মারাত্মক মারণাস্ত্রে রূপ দেওয়া সম্ভব। যদি কোনো চরমপন্থী বিজ্ঞানী এই ধরনের কোনো ‘সুপারবাগ’ বা কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত ভাইরাস জনবহুল শহরের বায়ুপ্রবাহ বা জল সরবরাহের মধ্যে ছেড়ে দেয়, তবে তা নিমেষেই এক বৈশ্বিক মহামারীর রূপ নিতে পারে।
জৈব অস্ত্রের এই রূপান্তর আধুনিক জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার সীমারেখাকে একাকার করে দিয়েছে। কোনো একটি এলাকায় হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া রোগ কি কোনো প্রাকৃতিক মহামারী নাকি কোনো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা, তা নিশ্চিত করতেই অনেক সময় লেগে যায়। এই তথ্যের ঘাটতি ও শনাক্তকরণের বিলম্ব আক্রান্ত সমাজকে আরও দ্রুত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্রের ঝুঁকি: তথাকথিত ‘ডার্টি বম’ (Chemical and Radiological Threats: The Spectre of Dirty Bombs)
জৈব অস্ত্রের পাশাপাশি রাসায়নিক এবং তেজস্ক্রিয় অস্ত্রের সহজলভ্যতাও নতুন প্রজন্মের সন্ত্রাসের এক বড় অংশ। ১৯৯৫ সালের ২০ মার্চ জাপানের রাজধানী টোকিওর পাতাল রেলে ওম শিনরিকিও গোষ্ঠী কর্তৃক নার্ভ গ্যাস সারিন (Sarin) ব্যবহারের ঘটনা বিশ্ববাসীকে প্রথম দেখায় যে একটি স্বাধীন চরমপন্থী সংগঠন কতটা পেশাদারভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করতে পারে। নিরস্ত্রীকরণ গবেষক অ্যামি ই. স্মিথসন (Amy E. Smithson) তার বিস্তৃত গবেষণা Ataxia: The Chemical and Biological Terrorism Threat and the US Response-এ দেখিয়েছেন, ওম শিনরিকিও গ্রুপের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ এবং প্রশিক্ষিত রসায়নবিদদের একটি দল ছিল, যারা নিজস্ব কারখানায় এই প্রাণঘাতী গ্যাস তৈরি করেছিল (Smithson & Levy, 2000)। সেই হামলায় তেরো জন নিহত এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে জনবহুল নগর কেন্দ্রগুলো এই ধরনের রাসায়নিক সন্ত্রাসের সামনে কতটা অসুরক্ষিত।
পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মাইকেল বারলেটা (Michael Barletta) তথাকথিত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ যন্ত্র (Radiological Dispersal Device – RDD) বা ডার্টি বম (Dirty Bomb)-এর ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছেন (Barletta, 2002)। ডার্টি বম কোনো পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক বোমা নয়; এটা হলো সাধারণ ডিনামাইট বা আরডিএক্সের মতো রাসায়নিক বিস্ফোরকের সাথে হাসপাতাল বা শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ (যেমন সিজিয়াম-১৩৭, কোবাল্ট-৬০ বা স্ট্রনশিয়াম-৯০) মিশিয়ে তৈরি করা একটি অস্ত্র। এই বোমা ফাটলে পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো বিশাল মাশরুম ক্লাউড তৈরি হয় না বটে, তবে এটি কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অদৃশ্য প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে সেই অঞ্চলটি কয়েক দশকের জন্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়।
রাসায়নিক ও পারমাণবিক সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ গ্রিগোরি ডি. কোবলেন্টজ (Gregory D. Koblentz) তারLiving Weapons গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে বাণিজ্যিক ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হাজার হাজার তেজস্ক্রিয় উৎসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ (Koblentz, 2009)। বিশ্বজুড়ে বহু উন্নয়নশীল দেশের হাসপাতাল বা গবেষণা কেন্দ্রে এই আইসোটোপগুলো অত্যন্ত দুর্বল সুরক্ষায় সংরক্ষিত থাকে। কোনো আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র বা সন্ত্রাসী দল যদি সেখান থেকে সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ চুরি করতে পারে, তবে তা দিয়ে একটি বড় শহরের প্রাণকেন্দ্রে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করা সম্ভব।
রাসায়নিক সন্ত্রাসের আরেকটি সহজ রূপ হলো শিল্প কারখানার রাসায়নিক পদার্থকে অস্ত্রে রূপান্তর করা। ক্লোরিন, অ্যামোনিয়া বা ফসজিনের মতো সাধারণ শিল্প রাসায়নিকের ট্যাঙ্কারে দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এই ধরনের হামলা চালানোর জন্য কোনো বিশেষ বৈজ্ঞানিক দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না, কেবল পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নজরদারি ফাঁকি দিতে পারলেই চলে। ফলে আধুনিক শিল্প নগরীগুলো নিজেই নিজের পেটের ভেতর এই সন্ত্রাসের উপাদান বহন করে চলেছে।
বৈশ্বিক প্রতিরোধ রূপরেখা, জৈব-নিরাপত্তা ও আইনি চ্যালেঞ্জ (Global Countermeasures, Biosafety, and Legal-Regulatory Challenges)
প্রযুক্তি, সাইবার এবং জৈব-সন্ত্রাসবাদের বহুমুখী হুমকি মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন চুক্তি ও আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, তবে তাদের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৭৫ সালে কার্যকর হওয়া জৈব অস্ত্র কনভেনশন (Biological Weapons Convention – BWC) জৈব অস্ত্রের উন্নয়ন ও মজুদ নিষিদ্ধ করেছে বটে, কিন্তু এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এতে কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা বা ভেরিফিকেশন প্রটোকল নেই। জৈব নিরাপত্তা গবেষক ম্যালকম ডান্ডো (Malcolm Dando) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান গোপনে জৈব অস্ত্র তৈরি করছে কিনা, তা বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো দিয়ে নিশ্চিত করা অসম্ভব (Dando, 2006)। একই কথা প্রযোজ্য সাইবার স্পেসের ক্ষেত্রেও; ২০০১ সালের বুদাপেস্ট কনভেনশন অন সাইবারক্রাইম থাকলেও পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক সাইবার চুক্তি আজও আলোর মুখ দেখেনি।
জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি এইচ. কর্ডসম্যান (Anthony H. Cordesman) সমকালীন নিরাপত্তা অবকাঠামো পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, প্রথাগত সামরিক প্রতিরোধ তত্ত্ব বা ডিটারেন্স এই নতুন প্রজন্মের সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে অকার্যকর (Cordesman, 2005)। পারমাণবিক শক্তিধর কোনো রাষ্ট্রকে পাল্টা হামলার ভয় দেখিয়ে শান্ত রাখা যায়, কিন্তু কোনো অদৃশ্য সাইবার সেল বা আত্মঘাতী জৈব-সন্ত্রাসীকে কীভাবে প্রতিহত করা সম্ভব? তাদের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড নেই যার ওপর পাল্টা হামলা চালানো যায়। ফলে সুরক্ষার একমাত্র উপায় হলো আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সার্বক্ষণিক ডিজিটাল ও বায়োলজিক্যাল নজরদারি এবং সংকট পরবর্তী জরুরি স্বাস্থ্য ও সাইবার সুরক্ষার অবকাঠামো তৈরি রাখা।
সাবেক মার্কিন স্বাস্থ্য ও বায়োডিফেন্স বিশেষজ্ঞ রবার্ট পি. ক্যাডলেক (Robert P. Kadlec) জাতীয় স্তরে জৈব প্রস্তুতি ও দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন (Kadlec, 2003)। ক্যাডলেকের মতে, প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রে এমন একটি সেন্সর নেটওয়ার্ক থাকা প্রয়োজন যা বাতাসের প্যাথোজেন বা তেজস্ক্রিয়তার অস্বাভাবিক উপস্থিতি কয়েক মিনিটের মধ্যে শনাক্ত করতে পারে। একই সাথে স্বাস্থ্য কর্মীদের জরুরি ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিডোটের পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। তবে এই ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক বিপুল অর্থনৈতিক বোঝার মতো। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জৈব ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানো না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব নিরাপত্তা সবসময়ই ঝুঁকির মুখে থাকবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়; সমাধান হলো প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা। মুক্ত সমাজের নাগরিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে কীভাবে এই অদৃশ্য ডিজিটাল ও বায়োলজিক্যাল হুমকিগুলো প্রতিরোধ করা যায়, সেটাই মানবজাতির সামনে এই শতাব্দীর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিজেদের সংকীর্ণ ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ভুলে যৌথভাবে কাজ না করে, তবে আগামী দিনে প্রযুক্তির এই নতুন রূপ সন্ত্রাসকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে যা মানব সভ্যতার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের সংযোগ (Crime–Terror Nexus): অপরাধী নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতা
অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের সংযোগের তাত্ত্বিক রূপরেখা (Theoretical Framework of the Crime–Terror Nexus)
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সংগঠিত অপরাধ এবং মতাদর্শিক সন্ত্রাসবাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতীতে এই দুই ধারণাকে সম্পূর্ণ আলাদা বিবেচনা করা হতো; কারণ সাধারণ অপরাধী চক্রের মূল চালিকাশক্তি থাকে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জন, অন্যদিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশ্য থাকে রাজনৈতিক, আদর্শিক কিংবা শাসনতান্ত্রিক রূপান্তর। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তামারা মাকারেঙ্কো (Tamara Makarenko) তার যুগান্তকারী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে এই দুই জগতের মধ্যে কোনো অনতিক্রম্য দেয়াল নেই, বরং তারা একটি অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় অবস্থান করে, যাকে তিনি ক্রাইম–টেরর কন্টিনিউয়াম (Crime–Terror Continuum) বলে অভিহিত করেছেন (Makarenko, 2004)। মাকারেঙ্কোর মতে, এই সংযোগ কখনো অস্থায়ী বাণিজ্যিক লেনদেন বা পারস্পরিক সহযোগিতার রূপ নেয়, কখনো তা অভিন্ন কর্মকাণ্ডে রূপান্তরিত হয়, আর চূড়ান্ত ধাপে এটি জন্ম দেয় এক হাইব্রিড সত্তার, যেখানে অপরাধ এবং সন্ত্রাস একই দেহে বিলীন হয়ে যায়।
নিরাপত্তা গবেষক ফিল উইলিয়ামস (Phil Williams) এই রূপান্তরকে বিশ্বায়িত নেটওয়ার্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন (Williams, 2008)। উইলিয়ামস দেখান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত শিথিল হওয়া এবং অবৈধ বাণিজ্যের প্রসারের ফলে অপরাধী চক্র ও সন্ত্রাসী দলগুলো একে অপরের লজিস্টিক্যাল সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সন্ত্রাসী দলের প্রয়োজন পড়ে অস্ত্র, জাল পাসপোর্ট, নিরাপদ যোগাযোগ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ। এই সম্পদগুলো দ্রুত পাওয়ার জন্য তারা আন্তর্জাতিক মাফিয়া বা চোরাচালান চক্রের দ্বারস্থ হয়। অপরদিকে অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে অনেক সময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সহিংস পেশিশক্তির সহায়তা নেয়। এর ফলে জন্ম নেয় এক অন্ধকারের জোট, যা জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসনকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ লুইস শেলি (Louise Shelley) তার মৌলিক গ্রন্থDirty Entanglements: Corruption, Crime, and Terrorism-এ এই সম্পর্কের অর্থনৈতিক জটিলতা তুলে ধরেছেন (Shelley, 2014)। শেলি দেখান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কমে যাওয়ার পর আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো পুরোপুরি স্বাবলম্বী হওয়ার দিকে ঝুঁকেছে। এই আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের একমাত্র পথ ছিল অপরাধের জগতে প্রবেশ করা। মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, বেআইনি খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে তারা যে বিপুল অর্থ উপার্জন করে, তা অপরাধী সিন্ডিকেটগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ফলে বাহ্যিক মতাদর্শিক বয়ান যাই থাকুক না কেন, মাঠপর্যায়ে তাদের কাজের ধরন আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের মতোই লোভ ও সহিংসতার এক সমন্বিত প্রদর্শনীতে রূপ নেয়।
এই তাত্ত্বিক মেলবন্ধন প্রথাগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এক গভীর বিভ্রান্তি তৈরি করে। কারণ পুলিশ বাহিনী প্রশিক্ষিত হয় সাধারণ অপরাধ দমন করার জন্য, আর সামরিক বাহিনী কাজ করে জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস মোকাবেলার জন্য। যখন একটি সংগঠন একই সাথে মাদক পাচার করে এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভাগীয় পৃথকীকরণ এই দ্বিমুখী সংকট সামাল দিতে হিমশিম খায়।
মাদক-সন্ত্রাসবাদ: পপি, কোকেন এবং বৈশ্বিক চোরাচালান করিডোর (Narco-Terrorism: Poppy, Cocaine, and Global Smuggling Corridors)
সংগঠিত অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদের মিলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও লাভজনক রূপটি হলো মাদক-সন্ত্রাসবাদ। আশির দশকে পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো বেলাউন্দে তেরি সর্বপ্রথম মাদক-সন্ত্রাসবাদ (Narco-Terrorism) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন বামপন্থী গেরিলা গোষ্ঠী শাইনিং পাথের কোকেন চোরাচালানের সাথে যুক্ততাকে বোঝাতে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ র্যাচেল এরেনফেল্ড (Rachel Ehrenfeld) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে মাদক উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সশস্ত্র আন্দোলনের প্রধান অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে (Ehrenfeld, 2003)। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী বা ফার্ক (FARC) দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কলম্বিয়ার আমাজন অঞ্চলে কোকেন উৎপাদন ও পাচারের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তাদের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে এই সংযোগের সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ ছিল আফগানিস্তান। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক ভানচে কর্নফেল্ড (Vanda Felbab-Brown) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Shooting Up: Counterinsurgency and the Opium Trade-এ দেখিয়েছেন আফগান আফিম বা পপি চাষের সাথে তালেবান আন্দোলনের গভীর সংশ্লিষ্টতা (Felbab-Brown, 2010)। আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের পপি চাষীদের থেকে কর আদায়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের সীমান্ত পারাপারের নিরাপত্তা দিয়ে তালেবান প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করত। এই বিপুল মাদক বাণিজ্য তালেবানকে এমন এক আর্থিক ভিত্তি দিয়েছিল যা তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর সামরিক অভিযানের মুখেও তাদের টিকে থাকা নিশ্চিত করেছিল।
সংঘাত অর্থনীতিবিদ জোনাথন গুডহ্যান্ড (Jonathan Goodhand) মাদক করিডোরের সাথে যুদ্ধ অর্থনীতির সংযোগ ব্যাখ্যা করেছেন (Goodhand, 2005)। মধ্য এশিয়ার উত্তর রুট (Northern Route) কিংবা ইরান ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপে যাওয়ার বালকান রুট (Balkan Route) কেবল সাধারণ হেরোইন পাচারের পথ নয়; এগুলো হলো আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের নিরাপদ লজিস্টিক্যাল করিডোর। এই রুটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় অপরাধী চক্র এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রক্তাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। ফলে মাদক কেবল সন্ত্রাসীদের অর্থ জোগায় না, বরং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর সাধারণ কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে এই অবৈধ ফসলের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, যা রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাভাবিক উন্নয়ন কাজ পরিচালনা অসম্ভব করে দেয়।
মাদক বাণিজ্যের এই বিস্তার কেবল আফগানিস্তান বা কলম্বিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (AQIM) এবং লাতিন আমেরিকার ড্রাগ কার্টেলগুলোর মধ্যে এক ভৌগোলিক জোট গড়ে উঠেছে। লাতিন আমেরিকার কোকেন আফ্রিকার এই দুর্বল নিরাপত্তা অঞ্চলের ভেতর দিয়ে ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করে। আর তার বিনিময়ে সাহেল অঞ্চলের সশস্ত্র দলগুলো পায় আধুনিক সামরিক অস্ত্র ও বিশাল অঙ্কের ট্রানজিট ফি। এই বৈশ্বিক করিডোর সন্ত্রাস ও অপরাধকে এক অভিন্ন ছায়ায় নিয়ে এসেছে।
অর্থপাচার, চাঁদাবাজি ও আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি (Money Laundering, Extortion, and the Underground Economy)
সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে দলগুলোকে প্রতিনিয়ত নগদ অর্থের প্রবাহ সচল রাখতে হয় এবং সেই অর্থকে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার নজরদারি থেকে রক্ষা করতে হয়। এর জন্য তারা সংগঠিত অপরাধের চিরাচরিত পদ্ধতিগুলো হুবহু গ্রহণ করে। আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ মাইকেল ফ্রিম্যান (Michael Freeman) তার গবেষণায় সন্ত্রাসী অর্থায়নের বহুমুখী উৎসের ওপর আলোকপাত করেছেন (Freeman, 2012)। ফ্রিম্যান দেখান, আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সবচেয়ে নিয়মিত আয়ের উৎস হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অবৈধ কর বা চাঁদাবাজি চাপিয়ে দেওয়া। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল নিজেদের দখলে নেওয়ার পর তারা সেখানকার দোকানপাট, কৃষি খামার, পরিবহন এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ওপর নিয়মিত খাজনা আদায় করে, যা প্রচলিত আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়াদের প্রোটেকশন র্যাকেটের মতোই কাজ করে।
নিরাপত্তা ও অপরাধ গবেষক কলিন ক্লার্ক (Colin P. Clarke) তার Terrorism, Inc. গ্রন্থে মুক্তিরপণের জন্য অপহরণ (Kidnapping for Ransom – KFR)-কে সন্ত্রাসের অন্যতম লাভজনক ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Clarke, 2015)। ইয়েমেনে আল-কায়েদা, নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম কিংবা ফিলিপাইনে আবু সায়াফ গোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে বিদেশি সাংবাদিক, পর্যটক ও বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তাদের অপহরণ করে কোটি কোটি ডলার মুক্তিপণ আদায় করেছে। ইউরোপের বহু দেশ গোপনে এই মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাদের নাগরিকদের উদ্ধার করেছে, যা প্রকারান্তরে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর তহবিলের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। এই মুক্তিপণের অর্থ লেনদেনের জন্য তারা আন্তর্জাতিক অপরাধী সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যস্থতা ও মানি লন্ডারিং ব্যবস্থার সহায়তা গ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক অর্থপাচার বিশ্লেষক ডেভিড সি. জর্ডান (David C. Jordan) দেখিয়েছেন কীভাবে অবৈধ অর্থকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করিয়ে বৈধ সম্পদে রূপান্তর করা হয় (Jordan, 1999)। এই প্রক্রিয়ায় তারা ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং (Trade-Based Money Laundering) বা বাণিজ্যের চালান জালিয়াতির পথ বেছে নেয়। আমদানি ও রফতানি পণ্যের ভুয়া রসিদ তৈরি করে এক দেশের কালো টাকা অন্য দেশে অত্যন্ত সহজে স্থানান্তর করা হয়। এর পাশাপাশি নামসর্বস্ব কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এবং ক্যাসিনোর মাধ্যমে এই অর্থকে সাদা করা হয়। অপরাধী চক্রগুলোর গড়ে তোলা এই বিস্তৃত আন্ডারগ্রাউন্ড আর্থিক অবকাঠামো সন্ত্রাসীদের জন্য এক দুর্ভেদ্য ঢাল তৈরি করে দেয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অর্থের মূল উৎস খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।
তাছাড়া সমকালীন ডিজিটাল বিশ্বে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং এনক্রিপ্টেড ওয়ালেটের বিস্তার এই অর্থপাচারকে আরও সহজ ও গতিশীল করেছে। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই কোটি কোটি ডলারের অবৈধ তহবিল এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই আর্থিক স্বয়ংক্রিয়তা অপরাধী সিন্ডিকেট এবং সন্ত্রাসী সেলগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অস্ত্রের অবৈধ বাজার ও আন্তঃসীমান্ত পাচার চক্র (Illicit Arms Markets and Cross-Border Smuggling Rings)
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর টিকে থাকা এবং তাদের সহিংস কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে অস্ত্রের অবিচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর। যেহেতু তারা কোনো আন্তর্জাতিক বৈধ চুক্তির মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে পারে না, তাই তাদের একমাত্র ভরসা হলো আন্ডারগ্রাউন্ড ব্ল্যাক মার্কেট বা কালোবাজার। আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক মোয়েসেস নাইম (Moisés Naím) তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ Illicit: How Smugglers, Traffickers, and Copycats are Hijacking the Global Economy-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষুদ্র অস্ত্রের চোরাচালান আন্তর্জাতিক অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে (Naím, 2005)। নাইমের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের বিশাল অস্ত্রের গুদামগুলো থেকে লাখ লাখ কালাশনিকভ রাইফেল, রকেট প্রপেলড গ্রেনেড এবং গোলাবারুদ আন্তর্জাতিক চোরাচালানিদের হাতে চলে যায়, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী দলগুলোর প্রধান রসদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ গবেষক ম্যাট শ্রোয়েডার (Matt Schroeder) এবং রাচেল স্টিওল (Rachel Stohl) তাদের যৌথ কাজগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন কুখ্যাত অস্ত্র কারবারি পুরো পৃথিবীর সংঘাতের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে (Schroeder et al., 2007)। রুশ অস্ত্র ব্যবসায়ী ভিক্টর বাউট – যাকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে “মৃত্যুর সওদাগর” বলা হতো – ছিল এই অপরাধ-সন্ত্রাস সংযোগের জীবন্ত প্রতীক। তিনি নিজস্ব কার্গো বিমান বহর ব্যবহার করে লাইবেরিয়ার চার্লস টেলর থেকে শুরু করে কলম্বিয়ার ফার্ক এবং আফগানিস্তানের তালেবান পর্যন্ত সবার কাছে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র পৌঁছে দিতেন। অস্ত্র পাচারকারীরা কোনো আদর্শ বা বিশ্বাসের অনুসারী নয়; তাদের একমাত্র আদর্শ হলো মুনাফা, আর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো হলো তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ক্রেতা।
এই অবৈধ অস্ত্রের বাজারে এখন যুক্ত হয়েছে ভারী সামরিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা। কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বা ম্যানপ্যাডস (MANPADS) আন্তর্জাতিক কালোবাজারে চলে আসায় বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ার সরকারি অস্ত্রের গুদামগুলো লুটের শিকার হয় এবং সেখান থেকে হাজার হাজার টন সমরাস্ত্র সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে মালি, নাইজার ও সিনাই উপদ্বীপের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছায়। অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো এই ভৌগোলিক বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে এমন এক সাপ্লাই চেইন তৈরি করে যা যেকোনো দেশের সরকারি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারিকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
ফলে অস্ত্রের কালোবাজার কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটা সন্ত্রাসবাদের জ্বালানি সরবরাহকারী কেন্দ্রীয় রক্তনালী। যতক্ষণ পর্যন্ত এই অবৈধ অস্ত্র তৈরি, পাচার ও বিক্রির নেটওয়ার্কগুলো আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা খর্ব করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মানব পাচার, অভিবাসী চোরাচালান ও পরিচয়পত্র জালিয়াতি (Human Trafficking, Migrant Smuggling, and Document Fraud)
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের সংযোগের আরেকটি অন্ধকার অধ্যায় হলো মানব পাচার এবং পরিচয়পত্র জালিয়াতির যৌথ নেটওয়ার্ক। যুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যখন লাখ লাখ মানুষ নিজেদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, তখন সেই মানবিক বিপর্যয়ের সুযোগ নেয় আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র। অপরাধবিজ্ঞানী লুইস শেলি (Louise Shelley) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মানব পাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান এখন আন্তর্জাতিক অপরাধীদের কাছে মাদক বাণিজ্যের চেয়েও বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে, কারণ এতে ধরা পড়ার ঝুঁকি কম কিন্তু মুনাফা অত্যন্ত বেশি (Shelley, 2014)। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এই অভিবাসী করিডোরগুলোকে তাদের নিজেদের সদস্যদের গোপনে সীমানা পার করানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক অ্যালেক্সিস এ. অ্যারোনভিৎজ (Alexis A. Aronowitz) অভিবাসী চোরাচালান এবং সন্ত্রাসীদের কৌশলগত সংযোগ বিশ্লেষণ করেছেন (Aronowitz, 2009)। ইউরোপে শরণার্থী সংকটের সময়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার নৌকাগুলো নিয়ন্ত্রণ করত লিবীয় ও তুর্কি অপরাধী সিন্ডিকেট। সন্ত্রাসী সেলগুলো এই সিন্ডিকেটগুলোকে অর্থ দিয়ে তাদের প্রশিক্ষিত ক্যাডারদের সাধারণ শরণার্থীদের ভিড়ে মিশিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে পাঠিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ২০১৫ সালের প্যারিস হামলা এবং ২০১৬ সালের ব্রাসেলস হামলার তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। অপরাধী চক্রগুলো অর্থের বিনিময়ে কাউকে সীমান্ত পার করে দিচ্ছে, আর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো সেই ফাঁক দিয়ে নিজেদের অপারেশনাল সেল তৈরি করছে।
এর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্র জালিয়াতির বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড শিল্প। সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অ্যান্টোনিও মারিয়া কস্তা (Antonio Maria Costa) দেখিয়েছেন, উচ্চমানের জাল পাসপোর্ট, বায়োমেট্রিক চিপ জালিয়াতি এবং ভুয়া ভিসা তৈরির পেছনে রয়েছে অত্যন্ত পেশাদার আন্তর্জাতিক মাফিয়া নেটওয়ার্ক (Costa, 2008)। এই জালিয়াতির জাল এতটাই নিখুঁত যে সাধারণ বিমানবন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তা ধরা পড়ে না। একজন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সহজেই বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব ও নাম সম্বলিত একাধিক আসল মানের জাল পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। অপরাধী চক্রগুলো এই নথিপত্র তৈরি করে এবং সন্ত্রাসীরা তা কিনে নিয়ে নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রাখে।
তাছাড়া সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে নারী ও শিশুদের জিম্মি করে যৌন দাসত্বে বাধ্য করা কিংবা জোরপূর্বক তাদের মানববোমায় রূপান্তর করার মতো জঘন্য কাজেও এই দুই দলের সহযোগিতা দেখা যায়। বোকো হারাম বা ইসলামিক স্টেটের মতো দলগুলো মানব পাচারের মাধ্যমে সংগৃহীত নারীদের নিজেদের যোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করত কিংবা তাদের অর্থ সংগ্রহের জন্য দাস হিসেবে বিক্রি করত। ফলে মানব পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, এটা সন্ত্রাসবাদের অন্যতম অমানবিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।
কারাগার সংযোগ, রূপান্তর ও হাইব্রিড অপরাধী-সন্ত্রাসী সত্তা (The Prison Nexus, Transformation, and Hybrid Gang-Terror Entities)
আধুনিক নগরকেন্দ্রগুলোতে অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের সংযোগের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি দেখা যায় কারাগারের অভ্যন্তরে এবং অপরাধী গ্যাংগুলোর বিবর্তনে। অপরাধবিজ্ঞান ও সন্ত্রাসবাদ গবেষক রাজান বাসার (Rajan Basra) এবং পিটার আর. নিউম্যান (Peter R. Neumann) তাদের গবেষণায় ক্রাইম–টেরর নেক্সাস (Crime–Terror Nexus)-এর এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন (Basra & Neumann, 2016)। ইউরোপের বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তারা দেখান যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর বহু হামলাকারী কোনো ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিত বা দীর্ঘদিনের উগ্রপন্থী ছিল না; তারা ছিল মূলত সাধারণ চোর, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী কিংবা দাগী অপরাধী। কারাগারে থাকার সময়ে তারা উগ্র মতাদর্শে দীক্ষিত হয় এবং মুক্তির পর নিজেদের অপরাধের দক্ষতা ব্যবহার করে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করে।
অপরাধবিজ্ঞানী মার্ক হাম (Mark S. Hamm) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ The Spectacular Few: Prisoner Radicalization and the Evolving Terrorist Threat-এ কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কীভাবে উগ্রবাদের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে তা বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Hamm, 2013)। কারাগারে সাধারণ অপরাধীরা এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপরাধবোধে ভোগে। সেখানে থাকা উগ্রবাদী নেতারা তাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় এবং তাদেরকে বোঝায় যে অতীতে করা সকল অপরাধের ‘পাপমোচন’ সম্ভব যদি তারা নিজেদের জীবন কোনো তথাকথিত পবিত্র লড়াইয়ে উৎসর্গ করে। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের ফলে দাগী অপরাধী রাতারাতি এক চরম আত্মঘাতী যোদ্ধায় পরিণত হয়।
এই হাইব্রিড অপরাধী-সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো তাদের পূর্ববর্তী অপরাধ জীবনের অভিজ্ঞতা। তারা ইতিমধ্যে অস্ত্র চালানো জানে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত, জাল নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারে এবং চরম সহিংসতায় তাদের হাত কাঁপে না। ফলে একজন তাত্ত্বিক উগ্রপন্থীর চেয়ে এই অপরাধী-সন্ত্রাসীরা অনেক বেশি কার্যকর ও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ল্যাটিন আমেরিকার কুখ্যাত গ্যাং মারা সালভাতরুচা (MS-13) কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রাগ গ্যাংয়ের সাথে আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থীদের এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া শহরগুলোতে এক স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া হাইব্রিড গোষ্ঠীগুলোর কাছে আদর্শ কেবল একটি বাহ্যিক পোশাক, আর অপরাধ হলো তাদের আসল জীবনপদ্ধতি। তারা দিনে মাদক কেনাবেচা করে এবং রাতে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ব্যানারে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে এদেরকে নির্দিষ্ট কোনো একটি আইনি ছাঁচে ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে, যা তাদের বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও বড় জটিলতা সৃষ্টি করে।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া: বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা ও প্রতিকার কৌশল (Legal and Institutional Responses: Multilateral Security and Counter-Strategies)
অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের এই জটিল মেলবন্ধন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র নতুন আইনি কাঠামো ও যৌথ কৌশল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ২০০০ সালে গৃহীত হওয়া ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম সম্পর্কিত জাতিসংঘ কনভেনশন (Palermo Convention) এবং ২০১৯ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া রেজোলিউশন ২৪৮২ (UNSCR 2482) এই সংযোগের বিরুদ্ধে এক সমন্বিত আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের রূপরেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত এই প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে সংগঠিত অপরাধী চক্র এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর পারস্পরিক লেনদেন বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক সম্মিলিত হুমকি এবং এদের দমনে রাষ্ট্রগুলোকে যৌথ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও আর্থিক নজরদারি জোরদার করতে হবে।
সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক তাত্ত্বিক অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid) এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছেন (Schmid, 2018)। স্মিড দেখান, অধিকাংশ দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখনো পুরনো দিনের বিভাগীয় বিভাজনে বন্দি। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, রাজস্ব গোয়েন্দা, অভিবাসন পুলিশ এবং কাউন্টার-টেররিজম ইউনিট আলাদাভাবে কাজ করে এবং একে অপরের সাথে সহজে তথ্য শেয়ার করতে চায় না। এই প্রাতিষ্ঠানিক জড়তার সুযোগ নিয়ে অপরাধী-সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যায়। স্মিডের মতে, এই দ্বিমুখী হুমকি রুখতে হলে প্রথাগত কাঠামোর বাইরে এসে ফিউশন সেন্টার (Intelligence Fusion Centers) গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সকল বিভাগের বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দারা এক টেবিলে বসে কাজ করবেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ পল জে. স্মিথ (Paul J. Smith) তার The Terrorism Ahead গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই বহুমাত্রিক সিন্ডিকেট দমন করা অসম্ভব (Smith, 2008)। যেহেতু এদের মূল চালিকাশক্তি হলো অর্থ ও চোরাচালান, তাই এদের আর্থিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়াই হলো প্রধান সমাধান। মানি লন্ডারিং বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা এফএটিএফ (FATF)-এর কঠোর নজরদারি, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্যানিং ব্যবস্থার প্রচলন এই লড়াইয়ে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সাথে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয় জনগণের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো রাষ্ট্র আফিম চাষী বা দুর্বল অভিবাসীদের সুরক্ষা দিতে পারে না, তখন অপরাধী চক্রগুলোই তাদের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠে। ফলে এই অন্ধকারের জোট ভাঙতে হলে আইনি ও পুলিশি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির এক সার্বিক উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসের এই যৌথ বাস্তুতন্ত্রকে সামগ্রিকভাবে আঘাত না করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব নিরাপত্তা সবসময়ই এক চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদ (Suicide Terrorism): প্রকৃতি, কারণ ও যুক্তি
আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের ধারণা ও ঐতিহাসিক বিবর্তন (Concept and Historical Evolution of Suicide Terrorism)
সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে আত্মঘাতী আক্রমণ সবচেয়ে মারাত্মক, ভীতিপ্রদ এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধ্বংসাত্মক একটি রূপ। সাধারণ সামরিক বা গেরিলা হামলায় আক্রমণকারীর উদ্দেশ্য থাকে আঘাত হেনে নিরাপদে নিজের ঘাঁটিতে ফিরে আসা। তবে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদ (Suicide Terrorism)-এর ক্ষেত্রে হামলাকারীর নিজের মৃত্যুই অভিযানের সাফল্যের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত থাকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পেপ (Robert A. Pape) তার যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন, আত্মঘাতী আক্রমণ কোনো আকস্মিক পাগলামি নয়; এটা চরম সামরিক বৈষম্যের পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে সর্বোচ্চ আঘাত হানার একটি সচেতন ও সুপরিকল্পিত কৌশল (Pape, 2003)। হামলাকারী যখন নিজের শরীরকে একটি জীবন্ত বোমায় রূপান্তর করে, তখন সে যেকোনো প্রচলিত নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে যেতে পারে।
ইতিহাসের পাতায় আত্মঘাতী সহিংসতার নানা দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে। প্রাচীন যুগে রোমান সাম্রাজ্যের শাসনের বিরুদ্ধে ইহুদি জিলট ও সিকারি সম্প্রদায়ের আত্মঘাতী লড়াই কিংবা মধ্যযুগে হাসান-ই-সাব্বাহর নেতৃত্বাধীন হাশাশিন দলের কার্যক্রম এর আদি রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি পাইলটদের পরিচালিত কামিকাজে (Kamikaze) আক্রমণ আত্মঘাতী যুদ্ধকে আধুনিক সামরিক কৌশলের রূপ দিয়েছিল। সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের নতুন যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে লেবাননের বৈরুতে মার্কিন ও ফরাসি সামরিক ব্যারাকে হিজবুল্লাহর ট্রাক বোমা হামলার মাধ্যমে। সেই হামলায় তিন শতাধিক সৈন্য নিহত হয়েছিল এবং মার্কিন প্রশাসন লেবানন থেকে নিজেদের সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। এই আপাত সামরিক সাফল্য পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সশস্ত্র দলগুলোর কাছে আত্মঘাতী হামলাকে একটি লোভনীয় ও কার্যকর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আমি পেদাহজুর (Ami Pedahzur) তার গ্রন্থ Suicide Terrorism-এ দেখিয়েছেন কীভাবে এই কৌশল দ্রুত মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল (Pedahzur, 2005)। শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল গেরিলা দল লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (LTTE) আত্মঘাতী আক্রমণকে একটি নিয়মিত সামরিক শাখা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তাদের আত্মঘাতী দল ব্ল্যাক টাইগার্স (Black Tigers) একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ধারণ করা সত্ত্বেও আত্মঘাতী বিস্ফোরণকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। পেদাহজুরের মতে, এই ঐতিহাসিক বিস্তার প্রমাণ করে যে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদ কোনো একক ধর্ম বা সংস্কৃতির বিষয় নয়; এটা হলো যেকোনো আদর্শিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের দ্বারা ব্যবহৃত একটি বিধ্বংসী অস্ত্র।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক মার্টিন ক্রেমার (Martin Kramer) আত্মঘাতী হামলার ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিবর্তন আলোচনা করেছেন (Kramer, 1990)। ক্রেমার দেখান, ১৯৮০-এর দশকের আগে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আত্মহত্যাকে চরম পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু লেবানন ও ফিলিস্তিনের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কিছু উগ্র তাত্ত্বিক এই মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ না বলে ‘শাহাদাত’ বা আত্মোৎসর্গ হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে। এই ভাষাগত ও ধারণাগত রূপান্তর তরুণদের ভেতর মৃত্যুর ভয় দূর করতে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে তথাকথিত পবিত্র দায়িত্বে রূপ দিতে সাহায্য করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আত্মঘাতী আক্রমণ একটি নিয়মিত সামরিক অভ্যাসে পরিণত হয়।
কৌশলগত যুক্তি: অসম যুদ্ধে যুক্তিবাদী পছন্দ (Strategic Logic: Rational Choice in Asymmetric Warfare)
বাইরের দৃষ্টিতে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে হলেও সাংগঠনিক পর্যায়ে এর পেছনে থাকে ঠান্ডা মাথার হিসাব-নিকাশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পেপ (Robert A. Pape) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Dying to Win: The Strategic Logic of Suicide Terrorism-এ এই কৌশলগত যুক্তি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Pape, 2005)। ১৯৮০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ঘটা প্রতিটি আত্মঘাতী হামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পেপ দেখিয়েছেন, এই হামলাগুলো কোনো উদ্দেশ্যহীন উন্মাদনা নয়। বরং এর মূল লক্ষ্য থাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে সামরিক দখলদারিত্ব প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত জনমতের চাপের প্রতি সংবেদনশীল হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী হতাহতের ভয় পায়, ফলে আত্মঘাতী সন্ত্রাসীরা এই গণতান্ত্রিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের চেষ্টা করে।
নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ গবেষক মিয়া ব্লুম (Mia Bloom) তার গ্রন্থ Dying to Kill: The Allure of Suicide Terror-এ আত্মঘাতী হামলাকে একটি চরম মিতব্যয়ী ও কার্যকর সামরিক অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Bloom, 2005)। ব্লুম দেখান, সাধারণ গেরিলা হামলায় যে পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সদস্যের ঝুঁকি থাকে, একটি আত্মঘাতী হামলায় তার চেয়ে অনেক কম খরচে কয়েক গুণ বেশি হতাহত ও ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করা সম্ভব। হামলাকারী নিজেই অস্ত্রের দিকনির্দেশক হওয়ায় সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তন করতে পারে। যদি রাস্তায় কোনো তল্লাশি চৌকি থাকে, সে তা ফাঁকি দিয়ে ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অভিযান সফল করতে পারে। ফলে সামরিক পরিভাষায় এটা হলো সবচেয়ে নিখুঁত ও প্রাণঘাতী মানব-চালিত ক্রুজ মিসাইল।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ মার্সেলো ফেরেরো (Marcello Ferrero) যুক্তিবাদী পছন্দ তত্ত্ব বা র্যাশনাল চয়েস থিওরি (Rational Choice Theory)-র নিরিখে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাগুলো ব্যাখ্যা করেছেন (Ferrero, 2006)। ফেরেরোর মতে, আত্মঘাতী হামলার সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক সুবিধা হলো ধরা পড়ার কোনো ভয় থাকে না। একজন সাধারণ সন্ত্রাসী জীবিত ধরা পড়লে গোয়েন্দা সংস্থার নির্যাতনের মুখে পুরো সংগঠনের গোপন আস্তানা, অর্থদাতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে। কিন্তু আত্মঘাতী হামলাকারী ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করায় সংগঠনের ভেতরের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে। তাছাড়া এই ধরনের নিঃশর্ত আত্মত্যাগ বিরোধী পক্ষের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি করে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মাইকেল হরোভিটজ (Michael C. Horowitz) বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মঘাতী প্রযুক্তির বিস্তার বিশ্লেষণ করেছেন (Horowitz, 2010)। হরোভিটজ দেখান, যখন কোনো অঞ্চলে একাধিক বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী সংগঠন একই লক্ষ্যের জন্য লড়াই করে, তখন তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মঘাতী হামলার মতো চরমপন্থা বেছে নেয়। জনগণের সহানুভূতি ও আন্তর্জাতিক প্রচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ হামলার চেয়ে আত্মঘাতী হামলা অনেক বেশি দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে। ফলে কৌশলগত দিক থেকে এটি দুর্বল সংগঠনগুলোকে রাতারাতি প্রভাবশালী খেলোয়াড়ে পরিণত হওয়ার এক শর্টকাট পথ এনে দেয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও কাল্ট অব মার্টারডম (Organizational Dynamics and the Cult of Martyrdom)
কোনো সাধারণ মানুষকে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা এক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এই কাজটি করার জন্য এক পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক বলয় তৈরি করে, যাকে সমাজবিজ্ঞানে শাহাদাত সংস্কৃতি (Cult of Martyrdom) বলা হয়। সন্ত্রাসবাদ গবেষক আসাফ মোগাডাম (Assaf Moghadam) তার The Globalization of Suicide Terrorismগ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে সংগঠনগুলো সাধারণ তরুণদের মগজধোলাই করে আত্মঘাতী বোমারুতে রূপান্তর করে (Moghadam, 2008)। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত ব্যক্তিকে তার পরিবার ও স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। তাকে সার্বক্ষণিক ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী প্রচারণার ভেতর রাখা হয় এবং বোঝানো হয় যে তার এই মৃত্যু তাকে অমরত্ব এনে দেবে এবং তার জাতি বা ধর্মের জন্য চূড়ান্ত মুক্তির পথ খুলে দেবে।
ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এরিয়েল মেরারি (Ariel Merari) আত্মঘাতী হামলাকারীদের প্রস্তুত করার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াটি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Merari, 2010)। মেরারি দেখান, শেষ মুহূর্তে যাতে কোনো হামলাকারী ভয় পেয়ে পিছু হটতে না পারে, তার জন্য সংগঠনগুলো কিছু বাধ্যতামূলক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। হামলার আগে প্রার্থীকে দিয়ে বিদায়ী ভিডিও বা ‘লাস্ট উইল’ রেকর্ড করানো হয়, যেখানে সে গর্বের সাথে নিজের আত্মাহুতির ঘোষণা দেয় এবং পরিবারের কাছে দোয়া চায়। এই ভিডিওগুলো দলের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এই সামাজিক প্রতিশ্রুতির কারণে প্রার্থীর পক্ষে ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়; কারণ পিছু হটলে সে সমাজের চোখে এক চরম কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
সন্ত্রাসবাদ গবেষক মিয়া ব্লুম (Mia Bloom) এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আউটবিডিং তত্ত্ব (Outbidding Theory) উপস্থাপন করেছেন (Bloom, 2005)। ফিলিস্তিনি রাজনীতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি দেখান কীভাবে হামাস এবং ফাতাহর মতো দলগুলো নিজেদের জনপ্রিয় করার জন্য আত্মঘাতী হামলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। যখন কোনো দল দেখে যে আত্মঘাতী হামলা চালালে সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং বিদেশি অনুদান বেশি পাওয়া যায়, তখন অন্য দলগুলোও পিছিয়ে না থাকার জন্য একই পথ বেছে নেয়। এই সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আত্মঘাতী সহিংসতাকে পুরো সমাজের ভেতরে স্বাভাবিক ও প্রশংসনীয় একটি বিষয়ে পরিণত করে।
এই কাঠামোর আরেকটি বড় দিক হলো হামলাকারীর পরিবারের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেক সংগঠন আত্মঘাতী সদস্যের পরিবারকে নিয়মিত মাসিক ভাতা দেয়, তাদের বাড়ি তৈরি করে দেয় এবং সমাজে তাদের ‘শহীদের পরিবার’ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেয়। পোস্টার, গান ও দেয়াললিখনের মাধ্যমে হামলাকারীকে এক বীরের আসনে বসানো হয়। এই সম্মিলিত সামাজিক অনুমোদন অন্যান্য তরুণদেরও একই পথে পা বাড়াতে উৎসাহিত করে। ফলে ব্যক্তি মারা গেলেও সংগঠনের এই আত্মঘাতী উৎপাদনের কারখানাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল থাকে।
মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত প্রেরণা: মনস্তত্ত্ব বনাম সামাজিক কারণ (Psychological and Individual Motivations: Psyche vs. Social Pressures)
দীর্ঘদিন ধরে একটি সাধারণ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে যারা আত্মঘাতী হামলা চালায় তারা হয়তো মানসিকভাবে অসুস্থ, চরম হতাশ অথবা অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণাগুলো এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল বলে দেখিয়েছে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখাইম (Émile Durkheim) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ Suicide-এ আত্মহত্যার বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে গিয়ে পরার্থপর আত্মহত্যা (Altruistic Suicide) প্রত্যয়টি আলোচনা করেছিলেন (Durkheim, 1897)। ডুরখাইমের মতে, কোনো ব্যক্তি যখন নিজের চেয়ে তার দল বা সম্প্রদায়কে বড় মনে করে এবং দলের অস্তিত্বের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়াকে চূড়ান্ত দায়িত্ব মনে করে, তখন এই ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। আত্মঘাতী সন্ত্রাসীরা নিজেদের হতাশা থেকে মরে না; তারা বিশ্বাস করে তাদের এই মৃত্যু তাদের সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অস্তিত্বকে রক্ষা করবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা গবেষক জেরাল্ড পোস্ট (Jerrold M. Post) শতাধিক আত্মঘাতী হামলাকারী ও তাদের পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখিয়েছেন যে তাদের বেশিরভাগই চিকিৎসাগতভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ ছিল (Post, 2007)। তাদের মধ্যে কোনো ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা আত্মহত্যার স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল না। পোস্টের মতে, তাদের মূল চালিকাশক্তি হলো গভীর সমষ্টিগত অপমানবোধ এবং অন্যায়ের তীব্র অনুভূতি। যখন কোনো তরুণ নিজের চোখের সামনে নিজের জাতিকে সামরিক বাহিনীর দ্বারা লাঞ্ছিত হতে দেখে, স্বজনদের নিহত হতে দেখে কিংবা বাড়িঘর ধ্বংস হতে দেখে, তখন তার মধ্যে এক সর্বগ্রাসী প্রতিশোধের স্পৃহা তৈরি হয়। চরমপন্থী সংগঠনগুলো এই ক্ষোভ ও ব্যক্তিগত মানসিক আঘাতকে কাজে লাগিয়ে তাকে চরম সহিংসতার দিকে পরিচালিত করে।
সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান স্পেকার্ড (Anne Speckhard) তার ফিল্ড গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং আদর্শিক প্রচারের মিলনই আত্মঘাতী ইচ্ছার জন্ম দেয় (Speckhard, 2012)। স্পেকার্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাকারীদের অনেকের জীবনেই ট্রমা বা গভীর মানসিক আঘাতের ইতিহাস থাকে – যেমন কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু বা কারাগারে চরম নির্যাতনের শিকার হওয়া। এই ট্রমা তাদের মধ্যে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তখন উগ্রবাদী প্রচারকেরা তাদের সামনে এই ধারণাকে তুলে ধরে যে প্রতিশোধ নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল এই আত্মিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ফলে আত্মঘাতী হামলাকারী নিজের মৃত্যুকে কোনো সমাপ্তি মনে করে না; সে একে দেখে এক বীরত্বপূর্ণ রূপান্তর হিসেবে।
সামাজিক পরিবেশের চাপও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। বন্ধুদলের পারস্পরিক আনুগত্য এবং এক সাথে আত্মাহুতি দেওয়ার শপথ তরুণদের ভেতর এক কৃত্রিম সাহস তৈরি করে। দলের অন্য সদস্যরা যখন আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়, তখন একা পিছিয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে আত্মঘাতী সন্ত্রাস কোনো একক মানসিক ব্যাধির ফল নয়; এটা গভীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ, সামাজিক চাপ এবং নিখুঁত আদর্শিক ম্যানিপুলেশনের এক সমন্বিত বিষাক্ত মিশ্রণ।
লিঙ্গ রাজনীতি ও নারী আত্মঘাতী হামলাকারী (Gender Politics and Female Suicide Bombers)
আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে নারী যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলগত ও সামাজিক মাত্রার জন্ম দিয়েছে। অতীতে সামরিক অভিযানগুলোকে পিতৃতান্ত্রিক ভাবা হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে নারীদের আত্মঘাতী হামলায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক লরা সজোবার্গ (Laura Sjoberg) এবং কারিন জোন্স (Caron E. Gentry) তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ Mothers, Monsters, Whores-এ দেখিয়েছেন কীভাবে গণমাধ্যম ও সমাজ নারী আত্মঘাতী হামলাকারীদের একপেশেভাবে মূল্যায়ন করে (Sjoberg & Gentry, 2007)। তাদের মতে, কোনো পুরুষ হামলা চালালে তাকে আদর্শিক বা রাজনৈতিক যোদ্ধা হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু কোনো নারী যখন একই হামলা চালায় তখন তাকে ‘প্রেমিকের প্রতারণার শিকার’, ‘পাগল মা’ অথবা ‘পারিবারিক কলহের শিকার’ হিসেবে চিত্রিত করে তার রাজনৈতিক এজেন্সিকে অস্বীকার করা হয়।
বাস্তবে নারী আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহারের পেছনে সংগঠনগুলোর সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকে। সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ মিয়া ব্লুম (Mia Bloom) তার Bombshell: Women and Terrorismগ্রন্থে দেখিয়েছেন, নারীদের তল্লাশি চৌকি ফাঁকি দেওয়া অনেক সহজ হয় (Bloom, 2011)। ঐতিহ্যবাহী সমাজগুলোতে পুরুষ নিরাপত্তা কর্মীরা নারীদের দেহ তল্লাশি করতে দ্বিধা বোধ করে। গর্ভবতীর ছদ্মবেশ ধারণ করে পেটের সাথে বিস্ফোরক বেঁধে নারীরা খুব সহজেই ভিআইপি জোনে বা স্পর্শকাতর সামরিক অবস্থানে প্রবেশ করতে পারে। ১৯৯১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে হত্যার জন্য এলটিটিইর নারী আত্মঘাতী সদস্য ধানু ঠিক এই পদ্ধতিই ব্যবহার করেছিল। ফুলের মালা দেওয়ার অজুহাতে সে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে যায় এবং নিজের শরীরে থাকা বিস্ফোরকের বোতাম টিপে দেয়।
চেচনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে রাশিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেওয়া তথাকথিত কালো বিধবা (Black Widows) বা শাহিদিকারা ছিল নারী আত্মঘাতী সন্ত্রাসের আরেক আলোচিত রূপ। রুশ বাহিনীর হাতে স্বামী, ভাই বা সন্তান হারানো এই নারীরা চরম প্রতিশোধস্পৃহা থেকে আত্মঘাতী ইউনিটে যোগ দিয়েছিল। ২০০২ সালের মস্কো থিয়েটার জিম্মি সংকট এবং ২০০৪ সালের বেসলান স্কুল ট্র্যাজেডিতে এই নারী যোদ্ধারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। ফিলিস্তিনের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ২০০২ সালে ওয়াফা ইদ্রিসের আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে নারী হামলার এক নতুন সূচনা। পরবর্তীতে নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম শত শত তরুণী ও বালিকাকে অপহরণ করে জোরপূর্বক মানববোমা হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা নারী সন্ত্রাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও অমানবিক দিকটিকে উন্মোচিত করে।
নারীদের এই আত্মঘাতী রাজনীতি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে উগ্র আন্দোলনের প্রচারণাকে এক ধাক্কা দেয়। সংগঠনগুলো পুরুষদের লজ্জা দিয়ে বলে: “যখন নারীরা নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে, তখন পুরুষরা ঘরে বসে কী করছে?” এই লিঙ্গভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক উসকানি সমাজের অন্য পুরুষদেরও দ্রুত সহিংসতায় যোগ দিতে বাধ্য করে। ফলে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদে নারীদের অন্তর্ভুক্তি কেবল নতুন যোদ্ধা তৈরি করে না, বরং পুরো আন্দোলনের ভেতরে এক তীব্র সামাজিক চাপ ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে।
ধর্ম, মতাদর্শ ও সেক্যুলার আত্মঘাতী সহিংসতা (Religion, Ideology, and Secular Suicide Violence)
আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই ধর্মকে এর একমাত্র উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তবে তুলনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখায় যে ধর্মীয় মতাদর্শ যেমন আত্মঘাতী হামলাকে উৎসাহিত করতে পারে, তেমনি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী মতাদর্শও একই ধরনের আত্মঘাতী মানসিকতা তৈরি করতে সক্ষম। সমাজবিজ্ঞানী মার্ক জুয়ার্গেনমেয়ার (Mark Juergensmeyer) তার ক্লাসিক গ্রন্থ Terror in the Mind of God-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্ম বাস্তব রাজনৈতিক লড়াইকে এক ধরণের মহাজাগতিক যুদ্ধ (Cosmic War)-এ রূপান্তর করে (Juergensmeyer, 2003)। ধর্মীয় তাত্ত্বিকেরা পার্থিব সংঘাতকে ভালো ও মন্দের এক চিরন্তন স্বর্গীয় লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে কোনো আপসের সুযোগ থাকে না। এই মহাজাগতিক লড়াইয়ে আত্মত্যাগকারীকে অনন্ত সুখ ও মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা মানুষের মৃত্যুর ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করে দেয়।
তবে ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষ আত্মঘাতী সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো শ্রীলঙ্কার এলটিটিই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মধ্যপ্রাচ্য গবেষক মোহাম্মদ এম. হাফেজ (Mohammed M. Hafez) তার Manufacturing Human Bombsগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আত্মঘাতী হামলার আধুনিক উদ্ভাবক ছিল একটি মার্ক্সবাদী ও জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শে পরিচালিত তামিল দল (Hafez, 2006)। তামিল টাইগারদের কোনো ধর্মীয় স্বর্গের ধারণা ছিল না; তাদের ত্যাগ ছিল সম্পূর্ণ পার্থিব ভূমির জন্য – ‘তামিল ইলম’ নামক একটি স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের প্রধান প্রভাকরণের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং জাতীয়তাবাদী গর্বই তাদের শত শত ব্ল্যাক টাইগারকে আত্মঘাতী বোমায় পরিণত করেছিল। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (PKK) তুরস্কে যে আত্মঘাতী হামলাগুলো পরিচালনা করেছিল, তাও ছিল সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত।
সন্ত্রাসবাদ গবেষক ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ধর্ম আসলে কোনো মৌলিক কারণ নয়, বরং এটা হলো একটি শক্তিশালী অনুঘটক বা গুণক (Force Multiplier) (Hoffman, 2006)। হফম্যানের মতে, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর চেয়ে ধর্মীয় ভাবাদর্শ ধারণ করা আত্মঘাতী গোষ্ঠীগুলো অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়। কারণ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল রাজনৈতিক সমঝোতা হলে আত্মঘাতী হামলা বন্ধ করতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় চরমপন্থীরা তাদের লড়াইকে কোনো পার্থিব সীমানায় বাঁধে না। আল-কায়েদা কিংবা পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেটের মতো বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলো আত্মঘাতী হামলাকে এক সীমানাহীন আত্মশুদ্ধির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা সংঘাতকে কোনো ভৌগোলিক সমাধানের বাইরে নিয়ে যায়।
ফলে মতাদর্শ যাই হোক না কেন – তা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস হোক কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদ – এর মূল কৌশলটি একই। মতাদর্শ মানুষকে বোঝায় যে তার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো মূল্য নেই যদি না তা সমষ্টির আদর্শিক লক্ষ্যের সাথে যুক্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের বাস্তব যুক্তি ও আত্মরক্ষার আদিম প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং তার জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয় আত্মঘাতী হিংস্রতা। মতাদর্শের এই বিষাক্ত শক্তিই মানুষকে দিয়ে এমন এক জঘন্য কাজ করায় যা কোনো সাধারণ যুক্তিবাদী সত্তার পক্ষে করা অসম্ভব।
প্রতিরোধের সংকট, কাউন্টার-মেজারস ও ভবিষ্যৎ গতিপথ (Countermeasures, Deterrence Failure, and Future Trajectories)
আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদ দমন করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এর প্রধান কারণ হলো চিরাচরিত সামরিক প্রতিরোধ তত্ত্ব বা ডিটারেন্স (Deterrence) এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রচলিত আইনে কোনো অপরাধীকে শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করা যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেই মরার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছে, তাকে আপনি কোন শাস্তির ভয় দেখাবেন? মৃত্যুর ভয় যেখানে শেষ হয়ে যায়, সেখানে প্রচলিত পুলিশি ও বিচারিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতাও মুখ থুবড়ে পড়ে।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক বোয়াজ গ্যানর (Boaz Ganor) আত্মঘাতী সন্ত্রাস মোকাবেলার ব্যবহারিক পদ্ধতিগুলো আলোচনা করতে গিয়ে কাঠামোগত সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন (Ganor, 2005)। গ্যানরের মতে, আত্মঘাতী হামলা রুখতে হলে তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে: প্রথমত, আগাম গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আত্মঘাতী সেলগুলো হামলার পরিকল্পনার পর্যায়েই ধ্বংস করে দেওয়া; দ্বিতীয়ত, স্পর্শকাতর জনবহুল স্থান ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে শক্ত নিরাপত্তা বলয় দিয়ে ঘিরে ফেলা বা টার্গেট হার্ডেনিং (Target Hardening) করা; এবং তৃতীয়ত, বিস্ফোরকের উৎস ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া। সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং আধুনিক বায়োমেট্রিক স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে অনেক দেশ সাময়িকভাবে এই হামলা কমাতে পারলেও পুরো ঝুঁকি কখনোই শূন্যে নামিয়ে আনা যায় না।
সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ অড্রি কার্থ ক্রনিন (Audrey Kurth Cronin) তার বিখ্যাত গ্রন্থ How Terrorism Ends-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আত্মঘাতী সংগঠনগুলোর পতন ঘটে (Cronin, 2009)। ক্রনিনের গবেষণা অনুযায়ী, আত্মঘাতী সন্ত্রাসীরা যখন অতিরিক্ত মাত্রায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড শুরু করে, তখন তারা সাধারণ জনগণের সহানুভূতি হারাতে শুরু করে। জর্ডানের রাজধানী আম্মানে ২০০৫ সালে আল-কায়েদার আত্মঘাতী বোমা হামলায় একটি বিয়ের আসরে বহু সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার পর পুরো দেশে তাদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে পড়েছিল। এই গণপ্রত্যাখ্যান সন্ত্রাসীদের নতুন সদস্য সংগ্রহ ও আর্থিক রসদ পাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে কঠোর নিরাপত্তা অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে উগ্র মতাদর্শকে অকার্যকর করে তোলাই হলো দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধের আসল উপায়।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোনের যুগে আরও জটিল রূপ নিতে পারে। মানুষ হয়তো শারীরিকভাবে মরবে না, কিন্তু স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরনিয়ন্ত্রিত আত্মঘাতী ড্রোন ও রোবটের ব্যবহার সংঘাতকে এক নতুন দিকে নিয়ে যাবে। তবে যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবৈধ সামরিক দখলদারিত্ব, জাতিগত নিপীড়ন, গভীর রাজনৈতিক অবিচার এবং পরিচয়ভিত্তিক উগ্র মতাদর্শের চাষাবাদ বন্ধ না হবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো না কোনো হতাশ ও দিকভ্রান্ত মানুষ নিজের শরীরকে বোমায় রূপান্তর করতে প্রস্তুত থাকবে। আত্মঘাতী সন্ত্রাস কেবল একটি নিরাপত্তা সংকট নয়; এটা মানব সমাজের রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতার এক চূড়ান্ত রক্তক্ষয়ী স্মারক।
সন্ত্রাসবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা (Counterterrorism and International Security): আইন, পুলিশ ও প্রতিরোধ
সন্ত্রাসবাদ দমনের কৌশল (Counterterrorism Strategies): প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া
সন্ত্রাসবাদ দমনের তাত্ত্বিক মডেল: যুদ্ধ মডেল বনাম অপরাধ বিচার মডেল (Theoretical Models of Counterterrorism: War Model vs. Criminal Justice Model)
সন্ত্রাসবাদ দমনে একটি রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে রাষ্ট্রটি এই সংকটকে কোন তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিবেচনা করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক রোনাল্ড ক্রেলিনস্টেন (Ronald Crelinsten) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ Counterterrorism-এ সন্ত্রাস মোকাবেলার চারটি প্রধান মডেলের রূপরেখা দাঁড় করিয়েছেন: অপরাধ বিচার মডেল, যুদ্ধ মডেল, প্রতিরোধমূলক বা আত্মরক্ষামূলক মডেল এবং পুনর্মিলন মডেল (Crelinsten, 2009)। এই কাঠামোগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় অপরাধ বিচার মডেল (Criminal Justice Model) এবং যুদ্ধ মডেল (War Model)-এর মধ্যে। অপরাধ বিচার মডেলে সন্ত্রাসবাদকে কোনো বহিঃশত্রুর সামরিক আক্রমণ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে বিবেচনা করা হয় একটি চরম আইনগত অপরাধ হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পুলিশ এবং বিচার বিভাগই থাকে দমনের কেন্দ্রবিন্দুতে, যেখানে সংবিধান, নিয়মিত আদালত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
বিপরীতে, যুদ্ধ মডেলে সন্ত্রাসবাদকে দেখা হয় রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর এক সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা আক্রমণ হিসেবে। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ (Global War on Terrorism) ছিল এই মডেলের সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রয়োগ। আইনি গবেষক লরা কে. ডনোহিউ (Laura K. Donohue) তার গ্রন্থ The Cost of Counterterrorism: The Power of the State in the Early Twenty-First Century-এ দেখিয়েছেন কীভাবে যুদ্ধ মডেল গ্রহণ করার পর রাষ্ট্রগুলো প্রচলিত ফৌজদারি আইনকে একপাশে সরিয়ে রেখে সামরিক বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষার মূল কর্তৃত্বে বসায় (Donohue, 2008)। এই মডেলে সন্দেহভাজনদের ‘যুদ্ধবন্দি’ বা ‘অবৈধ যোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে তাদের সাধারণ আদালতের নাগরিক সুরক্ষা ও জামিনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা সহজ হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সন্ত্রাস দমনের নৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন (Wilkinson, 2011)। উইলকিনসনের মতে, সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি নিজেই আইনের শাসনকে বিসর্জন দেয় এবং সামরিক যুদ্ধ মডেলের অতিরিক্ত প্রয়োগ ঘটিয়ে মানবাধিকার হরণ শুরু করে, তবে প্রকারান্তরে সন্ত্রাসীদের চূড়ান্ত লক্ষ্যটিই অর্জিত হয়। কারণ সন্ত্রাসীরা চায় সমাজকে মেরুকরণ করতে এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ধ্বংস করতে। ফলে একটি টেকসই দমন কৌশলের প্রধান শর্ত হলো অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক বৈধতাকে চূর্ণ করা।
এই দুই মডেলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রযন্ত্রকে সবসময় এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। অপরাধ বিচার মডেল দীর্ঘমেয়াদে সমাজে আইনের শাসনকে শক্তিশালী রাখলেও জরুরি মুহূর্তে তা অনেক সময় ধীরগতির মনে হতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধ মডেল তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক সাফল্য বা সন্ত্রাসীদের ঘাঁটির বিনাশ নিশ্চিত করতে পারলেও তা সমাজে স্থায়ী ক্ষত এবং নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই কারণে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই এই দুই মডেলের একটি মিশ্র কৌশল গ্রহণ করার চেষ্টা করে।
কঠোর নিরাপত্তা কৌশল: সামরিক অভিযান, টার্গেটেড কিলিং ও ড্রোন যুদ্ধ (Hard Security Strategies: Military Campaigns, Targeted Killings, and Drone Warfare)
সন্ত্রাস দমনের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ হলো কঠোর নিরাপত্তা বা তথাকথিত ‘হার্ড পাওয়ার’-এর প্রয়োগ। যখন কোনো সন্ত্রাসী দল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে কিংবা নিয়মিত আধা-সামরিক কায়দায় হামলা চালাতে থাকে, তখন রাষ্ট্রগুলো পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেনা জর্ডান (Jenna Jordan) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ Leadership Decapitation: Strategic Targeting of Terrorist Organizations-এ সন্ত্রাসবাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার কৌশল বা শিরশ্ছেদ কৌশল (Decapitation Strategy)-এর কার্যকারিতা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Jordan, 2019)। জর্ডান দেখান, কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের শীর্ষ তাত্ত্বিক বা কমান্ডারকে হত্যা করলেই পুরো দল ভেঙে পড়ে না। যেসব সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত থাকে, তারা শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পরও দ্রুত নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) বিশেষ করে আধুনিক টার্গেটেড কিলিং (Targeted Killings) এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ হাজির করেছেন (Byman, 2011)। বাইম্যানের মতে, মনুষ্যবিহীন ড্রোন প্রযুক্তি রাষ্ট্রগুলোকে কোনো পদাতিক সৈন্যের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে সুদূর পাহাড়ি বা দুর্গম আস্তানায় লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের নিখুঁতভাবে নিশানা করার সক্ষমতা এনে দিয়েছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী এলাকায় আল-কায়েদা এবং অন্যান্য চরমপন্থী দলের বিরুদ্ধে পরিচালিত ড্রোন হামলা তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ও বড় ধরনের অপারেশনের পরিকল্পনা করার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল।
তবে সামরিক শক্তির এই অতি-ব্যবহারের মারাত্মক কৌশলগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। অস্ট্রেলীয় সামরিক তাত্ত্বিক ও কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি বিশেষজ্ঞ ডেভিড কিলকালেন (David Kilcullen) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Accidental Guerrilla-তে দেখিয়েছেন কীভাবে অন্ধ সামরিক হামলা সাধারণ মানুষকে অনিচ্ছাকৃতভাবে উগ্রপন্থীদের শিবিরে ঠেলে দেয় (Kilcullen, 2009)। ড্রোনের ভুল নিশানা কিংবা ভারী আর্টিলারির বোমাবর্ষণে যখন নিরপরাধ সাধারণ নাগরিক ও শিশুদের প্রাণহানি ঘটে, তখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়, তাকে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সহজেই নতুন রিক্রুট পেয়ে যায়। কিলকালেন একে আখ্যা দিয়েছেন কৌশলগত বুমেরাং (Strategic Blowback) হিসেবে।
ফলে সামরিক শক্তির কঠোর প্রয়োগ একা কখনোই সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে পারে না। সামরিক অভিযান বড়জোর একটি তাৎক্ষণিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সন্ত্রাসীদের তৎপরতাকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দেয়। কিন্তু সেই সামরিক সাফল্যের পরপরই যদি সুশাসন ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা না যায়, তবে সামরিক বাহিনী ফিরে যাওয়ার সাথে সাথেই সহিংস গোষ্ঠীগুলো আবার পুনরুত্থিত হয়।
গোয়েন্দা নজরদারি, আগাম তথ্য সংগ্রহ ও টার্গেট সুরক্ষা (Intelligence Surveillance, Early Warning, and Target Hardening)
সন্ত্রাসবাদ দমনে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও রক্তপাতহীন উপায় হলো হামলা ঘটার আগেই তা নস্যাৎ করে দেওয়া। আর এই কাজের মূল ভিত্তি হলো গোয়েন্দা তথ্য বা ইন্টেলিজেন্স। গোয়েন্দা বিষয়ের ইতিহাসবিদ রিচার্ড জে. অলড্রিচ (Richard J. Aldrich) দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক ডিজিটাল যুগে সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা নজরদারির পরিধি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে (Aldrich, 2009)। সংকেতভিত্তিক নজরদারি বা সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স (SIGINT)-এর মাধ্যমে কোটি কোটি ফোন কল, ইমেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া মেসেজ ফিল্টার করে উগ্রবাদীদের গোপন যোগাযোগের সূত্র খুঁজে বের করা হয়। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক ইন্টারসেপশনের সমন্বয়ে গঠিত এই স্বয়ংক্রিয় গোয়েন্দা বলয় যেকোনো বড় হামলার ব্লুপ্রিন্ট আগেই প্রকাশ করে দিতে পারে।
তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, মানুষের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের গুরুত্ব কখনো শেষ হয়ে যায় না। সাবেক সিআইএ ও এনএসএ প্রধান মাইকেল ভি. হেইডেন (Michael V. Hayden) তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Playing to the Edge-এ উল্লেখ করেছেন যে সন্ত্রাসী কোষের গভীরতম পরিকল্পনা বোঝার জন্য এখনো মানবীয় গোয়েন্দাগিরি বা হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT) অপরিহার্য (Hayden, 2016)। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভেতরে নিজেদের চর ঢোকানো কিংবা স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তাদের গোপন বৈঠকের তথ্য সংগ্রহ করা ছাড়া নিখুঁত প্রি-এম্পটিভ অ্যাকশন নেওয়া অসম্ভব। হেইডেনের মতে, সিগিন্ট এবং হিউমিন্টের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গোয়েন্দা তথ্যই মূলত আধুনিক শহরগুলোকে বহু বড় রক্তপাত থেকে রক্ষা করে থাকে।
গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হলো স্পর্শকাতর স্থানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা, যাকে বলা হয় টার্গেট হার্ডেনিং (Target Hardening)। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ স্টিফেন স্লোন (Stephen Sloan) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, সরকারি সচিবালয় কিংবা জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে মেটাল ডিটেক্টর, এক্স-রে স্ক্যানার এবং বোলার্ড বসিয়ে এমন এক ভৌগোলিক বাধা তৈরি করা হয় যাতে হামলাকারীরা সহজে প্রবেশ করতে না পারে (Sloan, 2006)। যখন কোনো সফট টার্গেটকে হার্ড টার্গেটে রূপান্তর করা হয়, তখন সন্ত্রাসীদের পক্ষে আক্রমণ চালানো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তারা প্রায়ই তাদের হামলার পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
তবুও শতভাগ টার্গেট হার্ডেনিং করা কোনো উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। একটি শহরের প্রতিটি বাসস্টপ, রেস্তোরাঁ কিংবা খেলার মাঠকে সামরিক দুর্গে পরিণত করা অসম্ভব। তাছাড়া অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের গতি কমিয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে আধুনিক কাউন্টার-টেররিজম কৌশলে সার্বক্ষণিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে কেবল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতেই বিশেষ সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা হয়।
সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ ও অর্থনৈতিক অবরোধ (Countering the Financing of Terrorism and Economic Sanctions)
অর্থ হলো সন্ত্রাসবাদী যেকোনো বড় কাঠামোর প্রাণভোমরা। অস্ত্র কেনা, নিরাপদ ঘর ভাড়া করা, ক্যাডারদের পরিবারকে ভাতা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রচারযন্ত্র চালানোর জন্য বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হয়। এই অর্থনৈতিক জীবনীশক্তি কেটে দেওয়ার কৌশলকে বলা হয় সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ (Countering the Financing of Terrorism – CFT)। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ টমাস জে. বিয়ারস্টেকার (Thomas J. Biersteker) তার সম্পাদিত গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ২০০১ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ১৩৭৩ গ্রহণের পর থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে সন্ত্রাসী অর্থপ্রবাহ বন্ধ করার লড়াই এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে (Biersteker & Eckert, 2008)। এই আইনের আওতায় প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয় সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও সংগঠনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তাৎক্ষণিকভাবে অবরুদ্ধ করতে।
মার্কিন অর্থ বিভাগের সাবেক সহকারী মন্ত্রী ও আর্থিক যুদ্ধকৌশল বিশেষজ্ঞ জুয়ান সি. জারাতে (Juan C. Zarate) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Treasury’s War-এ দেখিয়েছেন কীভাবে মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক আধিপত্যকে সন্ত্রাস দমনের এক শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে (Zarate, 2013)। জারাতে ব্যাখ্যা করেন, সুইফট (SWIFT) মেসেজিং সিস্টেম এবং গ্লোবাল ক্লিয়ারিং হাউজগুলোরওপর নজরদারি বসিয়ে কীভাবে ওয়াশিংটন আল-কায়েদা ও অন্যান্য উগ্র দলের আন্তর্জাতিক লেনদেন আটকে দিয়েছিল। এমনকি যেসব বিদেশি ব্যাংক সন্ত্রাসীদের সাথে লেনদেনে যুক্ত থাকত, তাদেরকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে পুরো বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতকে এই নজরদারির অংশীদার করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আর্থিক নীতি গবেষক মার্টিন এ. ওয়েইস (Martin A. Weiss) দেখিয়েছেন যে আধুনিক যুগে সন্ত্রাসের অর্থায়ন কেবল ব্যাংকিং চ্যানেলে সীমাবদ্ধ নেই; এটা ছড়িয়ে পড়েছে ছায়া অর্থনীতিতে (Weiss, 2005)। হুন্ডি ও হাওয়ালা ব্যবস্থার মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক মানি ট্রান্সফার চ্যানেলগুলো কোনো সরকারি রেকর্ড ছাড়াই অর্থ আদান-প্রদান করতে পারে। এর পাশাপাশি বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং নামসর্বস্ব ভুয়া দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিল বন্ধ করা কাউন্টার-টেররিজম সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (FATF) এই অবৈধ অর্থপাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশের ওপর কড়া শর্ত আরোপ করে আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রেখেছে।
আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ জব্দের এই পদক্ষেপগুলো হয়তো কোনো উগ্রপন্থীর মস্তিষ্কের বিশ্বাসকে বদলে দিতে পারে না, কিন্তু এটা তাদের বড় কোনো আক্রমণ বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যকে গুঁড়িয়ে দেয়। যখন একটি সংগঠনের কাছে বুলেট বা বিস্ফোরক কেনার অর্থ থাকে না, তখন তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে স্থানীয় বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট গ্রুপে রূপ নেয় এবং তাদের আগ্রাসী কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।
নরম কৌশল: উগ্রপন্থা নিরসন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি (Soft Strategies: Countering Violent Extremism and Deradicalization)
সন্ত্রাসবাদ দমনে কেবল অস্ত্র ও কারাগারের ওপর নির্ভর করার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে বিশ্বজুড়ে একবিংশ শতাব্দীতে নরম কৌশল বা সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধ (Countering Violent Extremism – CVE) ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো কোনো ব্যক্তি যাতে সহিংস মতাদর্শের দিকে পা না বাড়ায় সেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যারা ইতিমধ্যে জড়িত হয়েছে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জন হোরগান (John Horgan) তার বিখ্যাত গবেষণা Walking Away from Terrorism-এ দেখিয়েছেন যে একজন ব্যক্তির সহিংস পথ ছেড়ে দেওয়া বা ডিসএনগেজমেন্ট (Disengagement) এবং তার আদর্শিক বিশ্বাস বদলে ফেলা বা ডির্যাডিকালাইজেশন (Deradicalization) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া (Horgan, 2009)। হোরগানের মতে, সব সন্ত্রাসীর অন্ধ বিশ্বাস তাৎক্ষণিকভাবে মুছে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়, তবে উপযুক্ত প্রণোদনা দিয়ে তাকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করা পুরোপুরি সম্ভব।
নরওয়েজীয় সমাজবিজ্ঞানী ও উগ্রপন্থা গবেষক টোর বিয়োর্গো (Tore Bjørgo) তরুণদের চরমপন্থা থেকে বের করে আনার সামাজিক উপায়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন (Bjørgo & Horgan, 2009)। বিয়োর্গোর মতে, তরুণরা প্রায়ই উগ্রবাদী দলে যোগ দেয় মতাদর্শের চেয়েও সামাজিক সম্মান, ভ্রাতৃত্ববোধ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে। ফলে তাদের ফিরিয়ে আনতে হলে এমন একটি নিরাপদ পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে তারা নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো পুনর্বাসন কর্মসূচি সফল হতে পারে না। কারাগার থেকে বের হয়ে কোনো ব্যক্তি যদি সমাজে আবার একঘরে হয়ে পড়ে, তবে সে দ্রুত নিজের পুরনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রোহান গুণরত্ন (Rohan Gunaratna) শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবের পুনর্বাসন মডেলগুলো পর্যালোচনা করেছেন (Gunaratna & Ali, 2015)। এই কর্মসূচিগুলোতে ধর্মীয় ও দার্শনিক আলোচনার মাধ্যমে উগ্রপন্থীদের ভ্রান্ত ও চরমপন্থী ব্যাখ্যার অসারতা তুলে ধরা হয় এবং তাদেরকে সহনশীল চিন্তাভাবনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। একই সাথে মনোবিজ্ঞানীদের দিয়ে তাদের ট্রমা দূর করার কাউন্সিলিং করানো হয়। গুণরত্ন দেখান, যেসব দেশ সুপরিকল্পিত পুনর্বাসন নীতি চালু করেছে, সেখানে উগ্রপন্থীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার সাধারণ বন্দিদের চেয়ে অনেক কম দেখা গেছে।
নরম কৌশলের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো কমিউনিটি পুলিশিং এবং পরিবারের সম্পৃক্ততা। একজন তরুণ যখন ধীরে ধীরে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকতে থাকে, তখন তার প্রথম পরিবর্তনটি লক্ষ্য করে তার পরিবার, শিক্ষক ও স্থানীয় সমাজ। রাষ্ট্র যদি এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে পরিবার কোনো ভয় ছাড়াই পুলিশের সাহায্য নিতে পারে, তবে বহু তরুণকে বিপথগামী হওয়ার শুরুতেই রক্ষা করা সম্ভব হয়।
মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের দ্বন্দ্ব (Human Rights, Civil Liberties, and the Rule of Law Dilemma)
সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে তীব্র নৈতিক ও আইনি সংঘাতটি দেখা দেয় নাগরিক স্বাধীনতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সীমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। কানাডীয় রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ মাইকেল ইগনাটিয়েফ (Michael Ignatieff) তার বহুল পঠিত গ্রন্থ The Lesser Evil: Political Ethics in an Age of Terror-এ এই কঠিন নীতিগত সংকটের ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Ignatieff, 2004)। ইগনাটিয়েফের মতে, সন্ত্রাসী হুমকি থেকে নাগরিকদের বাঁচানোর জন্য গণতান্ত্রিক সরকারকে হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ সময়ের চেয়ে কঠোর বা ‘কম ক্ষতিকর মন্দ’ পথ বেছে নিতে হতে পারে। তবে বিপদ হলো, এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপগুলো একবার চালু হলে তা ধীরে ধীরে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে ফেলে এবং পরবর্তীতে সাধারণ নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতেই রাষ্ট্রযন্ত্র তা ব্যবহার করতে শুরু করে।
যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার আইনের অধ্যাপক কনর গিয়ার্টি (Conor Gearty) তার গ্রন্থ Can Human Rights Survive?-এ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কড়া সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন (Gearty, 2006)। গিয়ার্টি দেখান, নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বজুড়ে প্রণীত ব্ল্যাক ল বা বিশেষ নিরাপত্তা আইনগুলো নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাবলয়কে ভেঙে দিয়েছে। বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা, তথাকথিত এক্সট্রাঅর্ডিনারি রেন্ডিশন (Extraordinary Rendition) বা সন্দেহভাজনকে গোপনে তুলে নিয়ে অন্য দেশের গোপন কারাগারে নির্যাতন করা এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ধূলিসাৎ করার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক শর্তগুলোকে লঙ্ঘন করেছে। গুয়ান্তানামো বে এবং আবু গারিব কারাগারের নির্মম নির্যাতন কোনোভাবেই সন্ত্রাস কমাতে সাহায্য করেনি, বরং তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পশ্চিমাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।
আইনবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ডেভিড কোল (David Cole) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে সরকারগুলো জাতীয় নিরাপত্তার ভয় দেখিয়ে বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করে ফেলে (Cole & Dempsey, 2002)। যখন আদালত নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর নজরদারি করতে ব্যর্থ হয়, তখন আইনের শাসন ভেঙে পড়ে এবং ক্ষমতার একচ্ছত্র অপব্যবহার শুরু হয়। কোল যুক্তি দেন, সন্ত্রাস দমনের জন্য মানবাধিকার ত্যাগ করা একটি মিথ্যা দ্বিধাদ্বন্দ্ব। ইতিহাস দেখায়, যেসব দেশ মানবাধিকারকে সম্মান জানিয়ে আইনি কাঠামোর ভেতরে সন্ত্রাস মোকাবেলা করেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছে।
নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে রাষ্ট্রের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন দেখে যে সন্ত্রাস দমনের নামে তাদের প্রতিনিয়ত সন্দেহ ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে, তখন সমাজের ভেতরে এক গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যই উগ্রবাদী দলগুলোর প্রচারণার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফলে আইনের শাসন বজায় রাখা কোনো দুর্বলতা নয়; এটা সন্ত্রাস প্রতিরোধের সবচেয়ে মৌলিক পূর্বশর্ত।
বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ (Multilateral International Cooperation and Sustainable Solutions)
যেহেতু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকে না, তাই কোনো একক দেশের পক্ষে এর চিরতরে সমাধান করা সম্ভব নয়। এই কারণে ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় জাতিসংঘের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল (UN Global Counter-Terrorism Strategy)। নিরাপত্তা গবেষক এরিক রোসান্দ (Eric Rosand) এই বহুপাক্ষিক কাঠামোর চারটি মূল স্তম্ভের ওপর আলোকপাত করেছেন: সন্ত্রাসের অনুকূল পরিস্থিতি দূরীকরণ, সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও দমন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সকল পদক্ষেপে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ (Rosand et al., 2008)। এই রূপরেখা স্পষ্ট করে দেয় যে সামরিক দমননীতি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমনের একটি অংশ মাত্র, কিন্তু চূড়ান্ত সমাধান নিহিত রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের গভীরে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পিটার রোমুয়ানুক (Peter Romaniuk) বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ইন্টারপোল, ইউরোপোল এবং যৌথ সামরিক টাস্কফোর্সগুলোর মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত সমন্বয় গড়ে উঠছে (Romaniuk, 2010)। রোমুয়ানুকের মতে, তথ্যের অবাধ বিনিময়, প্রত্যর্পণ চুক্তি সহজীকরণ এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে অভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রণয়ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলোর চলাচলের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। তবে এই বৈশ্বিক সহযোগিতার সামনে বড় অন্তরায় হলো বড় শক্তিগুলোর নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং তথাকথিত ‘ভালো সন্ত্রাসী বনাম খারাপ সন্ত্রাসী’র সুবিধাবাদী বিভাজন। পরাশক্তিগুলো যতদিন নিজেদের প্রক্সি বা মিত্রদের রক্ষা করার দ্বিমুখী নীতি থেকে বেরিয়ে না আসবে, ততদিন পর্যন্ত একটি নিখুঁত আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে ওঠা কঠিন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস এ. পিয়াজা (James A. Piazza) সন্ত্রাসবাদের মূল বা কাঠামোগত কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছেন (Piazza, 2006)। পিয়াজার গবেষণা থেকে দেখা যায়, কোনো দেশের চরম দারিদ্র্য সরাসরি সন্ত্রাসবাদের কারণ না হলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা সরাসরি উগ্রবাদের পালে হাওয়া দেয়। যে সমাজে সুশাসন থাকে না, যেখানে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে এবং নাগরিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় না, সেখানে সশস্ত্র সহিংসতার পথটি দ্রুত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে সন্ত্রাস দমনের সবচেয়ে টেকসই দীর্ঘমেয়াদী পথ হলো সমাজের কাঠামোগত অবিচার দূর করা, কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে সন্ত্রাসবাদ দমন কোনো একক সামরিক অভিযান বা একটি বিশেষ আইনের মাধ্যমে রাতারাতি অর্জিত হওয়ার বিষয় নয়। এটা এক বহুমাত্রিক, দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত প্রক্রিয়া যেখানে কঠোর নিরাপত্তা পদক্ষেপের সাথে নরম সামাজিক পুনর্বাসন, নিখুঁত গোয়েন্দা নজরদারির সাথে মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং জাতীয় সুরক্ষার সাথে আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মৌলিক মানবিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দেবে, কেবল তখনই সন্ত্রাসবাদের এই রক্তক্ষয়ী ছায়া থেকে বিশ্বকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রত্যর্পণ, রেন্ডিশন ও সীমান্তের বাইরে গ্রেপ্তার (Extradition, Rendition and Extraterritorial Arrest): আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা
প্রত্যর্পণের ধারণা, ঐতিহাসিক বিবর্তন ও মূল আইনি নীতি (Concept, Historical Evolution, and Core Legal Principles of Extradition)
আন্তর্জাতিক আইনের পরিমণ্ডলে সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে যাওয়া অপরাধী বা সন্ত্রাসীদের বিচারের মুখোমুখি করার সবচেয়ে প্রাচীন ও বিধিবদ্ধ পদ্ধতি হলো প্রত্যর্পণ। যখন কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ সংগঠন করে অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আশ্রয় নেয়, তখন অপরাধ সংঘটিত হওয়া রাষ্ট্রটির অনুরোধে আশ্রয়দানকারী রাষ্ট্র কর্তৃক সেই ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করার আইনি প্রক্রিয়াকে প্রত্যর্পণ (Extradition) বলা হয়। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ এম. চেরিফ বাসিউনি (M. Cherif Bassiouni) তার আকরগ্রন্থ International Extradition: United States Law and Practice-এ দেখিয়েছেন, প্রত্যর্পণ কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; এটা নির্ভর করে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, পারস্পরিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুনির্দিষ্ট নীতির ওপর (Bassiouni, 2014)। প্রাচীন মিসর ও হিট্টাইট সাম্রাজ্যের মধ্যকার শান্তিচুক্তিতে যুদ্ধবন্দি হস্তান্তরের প্রাথমিক রূপ দেখা গেলেও আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সাথে এটি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ আইন প্রধানত কয়েকটি সার্বজনীন নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্বৈত অপরাধযোগ্যতা নীতি (Principle of Double Criminality)। এই নীতি অনুযায়ী, যে অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, সেই কাজটি আবেদনকারী রাষ্ট্র এবং আশ্রয়দানকারী রাষ্ট্র – উভয় দেশের আইনেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে হবে। আইন বিশারদ জিওফ গিলবার্ট (Geoff Gilbert) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, দ্বৈত অপরাধযোগ্যতার নীতি কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো কাজের জন্য বিদেশে হস্তান্তরিত হওয়া থেকে রক্ষা করে যা তার আশ্রয় নেওয়া দেশের আইনে কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য নয় (Gilbert, 1998)। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি হলো বিশেষত্বের নীতি (Rule of Specialty), যার অর্থ হলো যে নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ দেখিয়ে কোনো ব্যক্তিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাকে কেবল সেই অপরাধের জন্যই বিচার করা যাবে; আশ্রয়দানকারী দেশের পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোনো পুরনো বা নতুন অভিযোগে তার বিচার করা যাবে না।
আইন তাত্ত্বিক আইভর শেয়ারার (I. A. Shearer) প্রত্যর্পণের কাঠামোগত ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক সন্ত্রাসবাদ এই ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াটিকে জটিলতার মুখে ফেলেছে (Shearer, 1971)। প্রথাগত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির এবং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও বিচারিক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। আশ্রয়দানকারী দেশের আদালতে আবেদনকারী দেশের আনা অভিযোগের প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়। শেয়ারারের মতে, যখন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কগুলো দ্রুত গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করে একাধিক দেশে নাশকতা চালাতে শুরু করে, তখন এই শতাব্দীপ্রাচীন আমলাতান্ত্রিক প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা আধুনিক নিরাপত্তার তাৎক্ষণিক চাহিদার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পড়ে।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাস দমনের জন্য অনেক সময় দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে বহুপাক্ষিক কনভেনশনের আশ্রয় নেয়। বিমান ছিনতাই, জিম্মি সংকট কিংবা সমুদ্রপথে জলদস্যুতা সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশনগুলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর একটি বাধ্যতামূলক নীতি চাপিয়ে দেয়, যাকে ল্যাটিন পরিভাষায় বলা হয় অট ডেডেরে অট জুডিকেয়ার (Aut Dedere Aut Judicare) – অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হয় সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, নয়তো নিজ দেশের আদালতে তার বিচার সম্পন্ন করতে হবে। এই নীতি কোনো সন্ত্রাসীকে ভৌগোলিক সীমানার সুযোগ নিয়ে চিরতরে বিচারহীনতার আশ্রয় পাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়।
রাজনৈতিক অপরাধ ব্যতিক্রম ও সন্ত্রাসবাদের টানাপোড়েন (The Political Offense Exception and the Tension with Terrorism)
প্রত্যর্পণ আইনের দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সংবেদনশীল উপাদানটি হলো রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ না করার বিধান। উনিশ শতকের ইউরোপীয় উদারনৈতিক বিপ্লবগুলোর পর আন্তর্জাতিক আইনে এই নীতিটি শক্ত অবস্থান নেয় যে কোনো ব্যক্তি যদি নিছক রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে কোনো স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসে, তবে তাকে সেই রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। একে বলা হয় রাজনৈতিক অপরাধ ব্যতিক্রম (Political Offense Exception)। আন্তর্জাতিক আইনের গবেষক ক্রিস্টিন ভ্যান ডেন উইঙ্গার্ট (Christine Van den Wyngaert) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Political Offence Exception to Extradition-এ দেখিয়েছেন কীভাবে এই নীতিটি রাজনৈতিক আশ্রয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষার একটি মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে (Van den Wyngaert, 1980)।
তবে এই রাজনৈতিক ব্যতিক্রম নীতিটি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে এক বিরাট আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই দাবি করে যে তাদের সহিংস কর্মকাণ্ড কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং তা একটি রাজনৈতিক বা আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ। আইন বিশারদ এডওয়ার্ড এম. ওয়াইজ (Edward M. Wise) এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরেছেন (Wise, 1993)। ওয়াইজ দেখান, কোনো সরকার যখন বিরোধী মত দমন করতে চায়, তখন তারা রাজনৈতিক আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যর্পণ দাবি করে; আবার অন্যদিকে প্রকৃত সন্ত্রাসীরাও নিরীহ মানুষের ওপর বোমা হামলা চালিয়ে বিদেশের আদালতে নিজেদের ‘রাজনৈতিক বিপ্লবী’ বলে দাবি করে প্রত্যর্পণ এড়ানোর চেষ্টা করে। এই অস্পষ্টতা কাটাতে আন্তর্জাতিক আদালতগুলো বিশুদ্ধ রাজনৈতিক অপরাধ (যেমন রাষ্ট্রদ্রোহ বা গুপ্তচরবৃত্তি) এবং আপেক্ষিক রাজনৈতিক অপরাধের (যেখানে রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে চরম সাধারণ অপরাধ যুক্ত থাকে) মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ জন ডুগার্ড (John Dugard) সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর বিবর্তন আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্ব সম্প্রদায় ধীরে ধীরে সন্ত্রাসকে এই রাজনৈতিক ছাড়ের বাইরে নিয়ে এসেছে (Dugard & van den Wyngaert, 1998)। ১৯৭৭ সালের ইউরোপীয় সন্ত্রাস দমন কনভেনশন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার আক্রমণ, বোমা হামলা, বিমান ছিনতাই এবং ভিআইপি হত্যাকাণ্ডের মতো কাজগুলোকে কোনো অবস্থাতেই ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ডুগার্ডের মতে, এই আইনি সংস্কার সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক পোশাক খুলে ফেলে তাদের সাধারণ অপরাধী হিসেবে আন্তর্জাতিক বিচারের আওতায় আনার পথ সুগম করেছে।
এর ফলে আশ্রয়দানকারী দেশের আদালতগুলোর দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। বিচারকদের এখন নিখুঁতভাবে যাচাই করতে হয় যে প্রত্যর্পণের অনুরোধটি কি সত্যিই কোনো নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার নিরপেক্ষ বিচারের জন্য করা হয়েছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বানিয়ে মৃত্যুদণ্ড বা অমানবিক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেওয়ার গোপন উদ্দেশ্য। এই জটিল আইনি ভারসাম্য রক্ষা করাই সমকালীন প্রত্যর্পণ আদালতের প্রধান পরীক্ষা।
এক্সট্রাঅর্ডিনারি রেন্ডিশন: রাষ্ট্রীয় অপহরণ ও গোপন বন্দিশালা (Extraordinary Rendition: State Kidnapping and Secret Detention)
প্রথাগত প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা এড়ানোর জন্য কোনো কোনো পরাশক্তি এক সম্পূর্ণ বেআইনি ও বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক্সট্রাঅর্ডিনারি রেন্ডিশন (Extraordinary Rendition) বা বিচারবহির্ভূত গোপন হস্তান্তর বলা হয়। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) বিশ্বজুড়ে এই গোপন অভিযান ব্যাপকভাবে পরিচালনা করেছিল। আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক লায়লা নাদ্যা সাদাত (Leila Nadya Sadat) তার গবেষণায় রেন্ডিশনকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, এটি হলো কোনো সাধারণ আইনি বা বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই কোনো সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ড থেকে কোনো ব্যক্তিকে গোপনে অপহরণ করে অন্য কোনো দেশে বা গোপন বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া (Sadat, 2006)।
মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ মার্গারেট এল. স্যাটারথওয়েট (Margaret L. Satterthwaite) এই রেন্ডিশন নেটওয়ার্কের পেছনের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছেন (Satterthwaite, 2007)। স্যাটারথওয়েট দেখান, সিআইএ সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের আটক করে তথাকথিত ব্ল্যাক সাইটস (Black Sites) বা গোপন বন্দিশিবিরে নিয়ে যেত, যেগুলো পোল্যান্ড, রোমানিয়া, থাইল্যান্ড এবং আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে স্থাপন করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের এমন সব দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতো (যেমন মিশর, জর্ডান বা সিরিয়া) যেখানে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চরম নির্যাতন চালানো একটি সাধারণ প্রশাসনিক অভ্যাস ছিল। উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইনের বিধিনিষেধ এড়িয়ে বিদেশি গোয়েন্দাদের মাধ্যমে বন্দির কাছ থেকে বলপূর্বক তথ্য আদায় করা, যাকে সরকারি ভাষায় কুখ্যাত উন্নত জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি (Enhanced Interrogation Techniques) বলা হতো।
আন্তর্জাতিক আইনজীবী ও চিন্তাবিদ ফিলিপ স্যান্ডস (Philippe Sands) তার আলোচিত গ্রন্থ Torture Team-এ দেখিয়েছেন কীভাবে এই গোপন বন্দিশালা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আইনের মূল স্তম্ভগুলোকে চূর্ণ করেছিল (Sands, 2008)। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র একাধারে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, জেনেভা কনভেনশন এবং নির্যাতন বিরোধী সনদের প্রতিটি শর্ত লঙ্ঘন করেছে। বন্দিদের কোনো আদালতে হাজির করা হতো না, তাদের কোনো আইনজীবীর সহায়তা নেওয়ার সুযোগ ছিল না এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও জানতে পারত না তারা কোথায় হারিয়ে গেছে। স্যান্ডসের মতে, রেন্ডিশন ছিল আইনের শাসনকে বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সুসংগঠিত অপহরণ, যা বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের ধারণাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং কাউন্সিল অব ইউরোপের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক তদন্তে পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে বহু ইউরোপীয় রাষ্ট্র এই গোপন রেন্ডিশন ফ্লাইটের জন্য নিজেদের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সিআইএ-র এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। এই উন্মোচন আন্তর্জাতিক মহলে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং বিশ্বমঞ্চে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নৈতিক অবস্থানকে সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
সীমান্তের বাইরে গ্রেপ্তার ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন: কের-ফ্রিসবি মতবাদ (Extraterritorial Arrest and Sovereignty Violations: The Ker-Frisbie Doctrine)
যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য দেশের আদালতের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে সরাসরি বিদেশি ভূখণ্ডে নিজের কমান্ডো বা গোয়েন্দা পাঠিয়ে কোনো আসামিকে ধরে নিয়ে আসে, তখন আন্তর্জাতিক আইনে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের এক জটিল সংকট তৈরি হয়। একে বলা হয় সীমান্তের বাইরে গ্রেপ্তার (Extraterritorial Arrest)। ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬০ সালে, যখন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস থেকে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী অ্যাডলফ আইখম্যানকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ ছাড়াই অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও আইন বিশেষজ্ঞ মাইকেল শ্যাফ (Michael P. Scharf) দেখিয়েছেন, আইখম্যানকে পরবর্তীতে একটি উন্মুক্ত ও সুষ্ঠু বিচারে ফাঁসি দেওয়া হলেও আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের দায়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল (Scharf, 1993)।
এই ধরনের বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের জাতীয় আদালত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিতর্কিত আইনি মতবাদ অনুসরণ করে এসেছে, যাকে বলা হয় কের-ফ্রিসবি মতবাদ (Ker-Frisbie Doctrine)। আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক লরেন্স আর. হেলফার (Laurence R. Helfer) এই মতবাদের উৎস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এটি দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন ল্যাটিন ধারণার ওপর: মেইল ক্যাপ্টাস, বেনে ডিটেন্টাস (Male Captus, Bene Detentus) – যার অর্থ হলো “ভুলভাবে আটক করা হলেও, বৈধভাবেই আটকে রাখা যায়” (Helfer, 1993)। অর্থাৎ, একজন আসামিকে কীভাবে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হলো (তা কোনো অপহরণের মাধ্যমে হোক বা বেআইনি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে), তা দিয়ে আদালতের বিচারিক এখতিয়ার খর্ব হয় না। ১৯৯২ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ইউনাইটেড স্টেটস বনাম আলভারেজ-ম্যাচাইন (United States v. Alvarez-Machain) মামলায় মেক্সিকো থেকে এক ডাক্তারকে অপহরণ করে আনার ঘটনাকে এই মতবাদের ভিত্তিতে বৈধতা দেয়।
তবে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। আইন তাত্ত্বিক স্টেফান ওটার (Stefan Oeter) যুক্তি দিয়েছেন যে কের-ফ্রিসবি মতবাদ আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিমূলকে অস্বীকার করে (Oeter, 1995)। ওটারের মতে, একটি রাষ্ট্র যদি অন্য দেশের সীমানার ভেতরে ঢুকে নিজের ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার চালাতে পারে, তবে জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার সার্বভৌম সমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। তাছাড়া যে প্রক্রিয়ায় একজন নাগরিককে বিদেশের মাটি থেকে বলপূর্বক তুলে আনা হয়, তা তার মৌলিক মানবাধিকার এবং নিরপেক্ষ বিচারের অধিকারকে শুরুতেই পদদলিত করে।
ফলে সমকালীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতগুলো এই মতবাদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে কোনো বেআইনি অপহরণের মাধ্যমে আটক ব্যক্তির বিচার চালানো মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী। সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসন রক্ষা করতে হলে যেকোনো মূল্যে এই ধরনের একতরফা সামরিক বা গোয়েন্দা দুঃসাহসিকতা বন্ধ করতে হবে।
ইউরোপীয় গ্রেফতারি পরোয়ানা ও আধুনিক প্রত্যর্পণ সংস্কার (European Arrest Warrant and Modern Extradition Reforms)
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অপরাধী হস্তান্তরের চিরাচরিত প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করে এক যুগান্তকারী ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। একে বলা হয় ইউরোপীয় গ্রেফতারি পরোয়ানা (European Arrest Warrant – EAW)। ২০০৪ সালে কার্যকর হওয়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শতাব্দীপ্রাচীন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতা বাদ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া চালু করা হয়। ইউরোপীয় আইন বিশেষজ্ঞ সুসান ন্যাশ (Susan Nash) এবং তার সহ-লেখকরা দেখিয়েছেন, ইএডাব্লিউ প্রত্যর্পণকে কোনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দরকষাকষির বিষয় থেকে মুক্ত করে সরাসরি এক দেশের আদালতের সাথে অন্য দেশের আদালতের বিচারিক যোগাযোগের রূপ দিয়েছে (Nash et al., 2004)।
আইনি গবেষক মার্টিন ওয়াশকিশ (Martin Wasmeier) এই ব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন (Wasmeier, 2001)। ইউরোপীয় গ্রেফতারি পরোয়ানার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো পারস্পরিক স্বীকৃতির নীতি (Principle of Mutual Recognition)। অর্থাৎ, ইইউভুক্ত একটি দেশের বিচারক যখন কোনো আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করবেন, তখন অন্য সদস্য রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সেই পরোয়ানাকে নিজের দেশের আদালতের আদেশের মতোই সমমর্যাদা দিয়ে কার্যকর করবে। সন্ত্রাসবাদ, মানব পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধসহ ৩২টি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী দ্বৈত অপরাধযোগ্যতার পরীক্ষাও শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যর্পণ সম্পন্ন করার গড় সময়কাল এক বছর থেকে কমে মাত্র কয়েক সপ্তাহে নেমে এসেছে।
তবে এই গতিশীল ব্যবস্থার পাশাপাশি মানবাধিকারের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞ মার্ক পিয়ার্স (Mark Mackarel) দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপীয় আদালতগুলো এই দ্রুত হস্তান্তরের মাঝেও মানবাধিকার সুরক্ষাকবচ বজায় রেখেছে (Mackarel, 2007)। বিখ্যাত সোয়ারিং বনাম যুক্তরাজ্য (Soering v. United Kingdom) মামলার ঐতিহাসিক রায়ের সূত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে হস্তান্তর করা যাবে না যেখানে সে চরম অমানবিক নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারে। ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারে যে হস্তান্তরিত হলে তার মৌলিক অধিকার বা নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার সুযোগ বিনষ্ট হবে, তবে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে অস্বীকার করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং অভিন্ন আইনি মানদণ্ড থাকলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার জন্য জাতীয় সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি না দিয়েও একটি কার্যকর ও দ্রুত বিচারিক প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্বের অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের জন্য এটি একটি অনুকরণীয় আইনি মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন, নন-রিফাউলমেন্ট ও আন্তর্জাতিক বিচারিক নজরদারি (Convention Against Torture, Non-Refoulement, and Judicial Oversight)
প্রত্যর্পণ ও অপরাধী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হলো ১৯৮৪ সালে গৃহীত জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (UN Convention Against Torture – UNCAT)। এই সনদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক আইনের এক আপসহীন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে: কোনো রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠাতে, বহিষ্কার করতে বা প্রত্যর্পণ করতে পারবে না, যেখানে ওই ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার হওয়ার যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের এই মৌলিক নীতিকে বলা হয় নন-রিফাউলমেন্ট (Non-Refoulement)। নির্যাতন বিষয়ক জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিবেদক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ম্যানফ্রেড নোয়াক (Manfred Nowak) তার ভাষ্যে উল্লেখ করেছেন, নন-রিফাউলমেন্ট কোনো শর্তসাপেক্ষ নীতি নয়; জাতীয় নিরাপত্তা বা সন্ত্রাসবাদের মতো চরম সংকটের মুহূর্তেও এই নীতি স্থগিত করা যায় না (Nowak & McArthur, 2008)।
সন্ত্রাস দমনের নামে অনেক রাষ্ট্র এই আইনি বাধ্যবাধকতা এড়ানোর জন্য এক ধরণের চতুর কূটনৈতিক কৌশল ব্যবহার করতে শুরু করে, যাকে বলা হয় কূটনৈতিক নিশ্চয়তাপত্র (Diplomatic Assurances)। কোনো দেশে বন্দি পাঠানোর আগে আবেদনকারী রাষ্ট্র একটি লিখিত চিঠি দিয়ে জানায় যে তারা বন্দির ওপর কোনো নির্যাতন চালাবে না এবং তাকে মানবিক সুরক্ষা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড ওয়েইসব্রড (David Weissbrodt) এই চর্চার অসারতা তুলে ধরেছেন (Weissbrodt & Bergquist, 2006)। ওয়েইসব্রড দেখান, যেসব দেশের শাসনব্যবস্থায় নির্যাতন একটি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস, তাদের দেওয়া কোনো কূটনৈতিক চিঠির কোনো আইনি বা বাস্তব ভিত্তি থাকে না। পর্দার আড়ালে বন্দির ওপর নির্যাতন চললেও বিদেশি কূটনীতিকদের পক্ষে তা মনিটর করা অসম্ভব। ফলে এই নিশ্চয়তাপত্র আসলে রাষ্ট্রগুলোর বেআইনি প্রত্যর্পণকে বৈধতা দেওয়ার একটি কাগুজে ছলনা মাত্র।
আন্তর্জাতিক আইনজীবী জেসিকা গ্যাভ্রিলেটোস (Jessica Gavron) আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর ক্রমবর্ধমান নজরদারির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন (Gavron, 2005)। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এবং জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি বারবার রায় দিয়েছে যে কেবল কূটনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আদালতগুলো জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তের ওপর বিচারিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর আগে তার আবেদনটি উন্মুক্ত আদালতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করে যে সন্ত্রাসীদের ধরতে গিয়ে রাষ্ট্র নিজেই যেন কোনো আইনহীন দানবে পরিণত না হয়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের এই মৌলিক নীতিগুলো সমুন্নত রাখা ছাড়া আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের কোনো দীর্ঘমেয়াদী নৈতিক ভিত্তি টিকে থাকতে পারে না।
আইনি সংকট, ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ (Legal Impasse, Geopolitics, and the Future of International Justice)
একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতিতে প্রত্যর্পণ ও বহিঃসীমান্তীয় আইনের প্রয়োগ দিন দিন পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথের নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে প্রত্যর্পণ চুক্তি কেবল সাধারণ অপরাধী স্থানান্তরের মাধ্যম থাকেনি, এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দরকষাকষির এক শক্তিশালী অস্ত্রে। আন্তর্জাতিক আইন তাত্ত্বিক অ্যান্টনি ড’আমাতো (Anthony D’Amato) দেখিয়েছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ প্রায়শই পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে (D’Amato, 1995)। উদাহরণস্বরূপ, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের দীর্ঘ প্রত্যর্পণ লড়াই কিংবা হুয়াওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝু-কে কানাডায় গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রমাণ করে যে আইনের ভাষা কীভাবে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বাণিজ্যিক যুদ্ধের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মেরি রবিনসন (Mary Robinson) সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন (Robinson, 2008)। রবিনসনের মতে, নাইন-ইলেভেনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে একতরফাবাদ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকে বিশ্বকে ধীরে ধীরে বহুপাক্ষিকতার পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। দুর্বল দেশগুলোর ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করা কিংবা তাদের নাগরিকদের বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়। একটি টেকসই বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে সকল রাষ্ট্রকে – তা সে পরাশক্তি হোক বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র – আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির সমান আনুগত্য স্বীকার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম এ. শাবাস (William A. Schabas) তার আকরগ্রন্থ An Introduction to the International Criminal Court-এ একটি বিকল্প রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন (Schabas, 2020)। শাবাসের মতে, যখন কোনো দেশ নির্দিষ্ট কোনো সন্ত্রাসীকে অন্য দেশের রাজনৈতিক আদালতের হাতে তুলে দিতে ভয় পায়, তখন সেই সংকটের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সমাধান হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) বা কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার পরিচালনা করা। সার্বজনীন বিচারিক এখতিয়ারের আওতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই বৈশ্বিক বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করে, তবে কোনো অপরাধীই আর আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।
ভবিষ্যতের বিশ্বকে নিরাপদ করতে হলে সন্ত্রাস দমনের প্রয়োজনকে মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সীমান্তের বাইরে গ্রেপ্তার কিংবা গোপন বন্দিশালার মতো বেআইনি পদ্ধতির বদলে আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গতি বৃদ্ধি করাই একমাত্র সঠিক পথ। রাষ্ট্র যখন আইনের শাসনের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা জোরদার করবে, কেবল তখনই সন্ত্রাসবাদের হুমকি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে এবং একই সাথে রক্ষা পাবে মানবজাতির কষ্টার্জিত আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলা (Responding to State Terrorism): নীতি ও জবাবদিহি
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাবদিহিতার তাত্ত্বিক সংকট ও আইনি অপ্রতিসাম্য (Theoretical Dilemmas of Accountability and Legal Asymmetry in State Terrorism)
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে রাষ্ট্রবহির্ভূত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে দ্রুত বৈশ্বিক আইন, সামরিক জোট এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা গড়ে উঠেছে, রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত সন্ত্রাসের বেলায় সেই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা সবসময়ই এক বিরাট বাধার মুখে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ভিত্তি – ওয়েস্টফেলিয়ান সার্বভৌমত্ব (Westphalian Sovereignty)। রাষ্ট্র যখন নিজের সীমানার ভেতরে নাগরিকদের ওপর বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতন চালায়, তখন সে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যেকোনো সমালোচনাকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অবৈধ হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও যুদ্ধ নীতিশাস্ত্রবিদ মাইকেল ওয়ালজার (Michael Walzer) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ Just and Unjust Wars–এ দেখিয়েছেন, সার্বভৌমত্বের অধিকার কোনো নিরঙ্কুশ লাইসেন্স নয়; রাষ্ট্র যখন নিজেই নিজের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী নিপীড়ন শুরু করে, তখন সে তার সার্বভৌম নৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলে (Walzer, 1977)।
সমালোচনামূলক সন্ত্রাসবাদ গবেষক রিচার্ড জ্যাকসন (Richard Jackson) আন্তর্জাতিক আইনের এই গভীর অপ্রতিসাম্য বা অসমতাকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Jackson, 2008)। জ্যাকসন দেখান, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত সংজ্ঞায় সন্ত্রাসকে সবসময় রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীর কাজ হিসেবে ফ্রেম করা হয়, যার ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা সংঘটিত অনেক বেশি প্রাণঘাতী সহিংসতা ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’ কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা’র ছদ্মবেশে ঢাকা পড়ে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিচারিতার কারণে কোনো ক্ষুদ্র গেরিলা দল বোমা হামলা চালালে তাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়, অথচ কোনো স্বৈরাচারী সরকার যখন হাজার হাজার মানুষকে গুম করে বা বন্দিশিবিরে হত্যা করে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিছক কূটনৈতিক বিবৃতি দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে।
আইন ও মানবাধিকারের ইতিহাসবিদ স্যামুয়েল ময়েন (Samuel Moyn) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের এই হিংস্র ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বারবার বাস্তব রাজনীতির দেয়ালে হোঁচট খেয়েছে (Moyn, 2010)। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এমনভাবে তৈরি যা রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে যে রাষ্ট্র নিজে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হোতা, সে কখনোই নিজের বিচার করার মতো কোনো আন্তর্জাতিক সনদে স্বেচ্ছায় সম্মতি দেয় না। এই আইনি সীমাবদ্ধতাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীদের জন্য এক স্থায়ী বিচারহীনতার বলয় তৈরি করে দেয়।
এই তাত্ত্বিক অচলাবস্থা ভাঙতে হলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে না দেখে একে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় হুমকি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তির বেঁচে থাকার অধিকারকে আন্তর্জাতিক আইনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের স্থায়ী জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও ট্রাইব্যুনাল: সার্বজনীন এখতিয়ারের প্রয়োগ (International Judicial Mechanisms and Tribunals: Applying Universal Jurisdiction)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে, যেখানে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠিত হয় যে রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ব্যক্তিরাও তাদের অপরাধের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক আইনের কাছে দায়ী থাকবেন। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডা ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত জাতিসংঘ ট্রাইব্যুনালগুলো এই নীতিকে আরও সুসংহত করে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ জোসে ই. আলভারেজ (José E. Alvarez) তার International Organizations as Law-makers গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে এই অ্যাড-হক ট্রাইব্যুনালগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল (Alvarez, 2005)। ১৯৯৮ সালে রোম সংবিধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court – ICC) প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয় অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
আইনি গবেষক ডায়ান ওরেন্টলিকার (Diane F. Orentlicher) এই বিচারিক জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ হাজির করেছেন (Orentlicher, 1991)। ওরেন্টলিকায়ের যুক্তি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যখন মানবতাবিরোধী অপরাধ বা ব্যাপক নিধনযজ্ঞ চালায়, তখন আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী ওই অপরাধীদের বিচার করা কেবল একটি পছন্দ নয়, বরং এটি সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। আইসিসির রোম সংবিধিতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সামরিক জেনারেলদের জন্য কোনো ধরনের সার্বভৌম দায়মুক্তি (Sovereign Immunity) রাখা হয়নি। ফলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাও এখন তাত্ত্বিকভাবে আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে পড়তে পারেন।
আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার আরেকটি শক্তিশালী এবং কার্যকর অস্ত্র হলো সার্বজনীন বিচারিক এখতিয়ার (Universal Jurisdiction) নীতি। আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক লুক রেপেক (Luc Reydams) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কিছু অপরাধের মাত্রা এতই ভয়াবহ (যেমন নির্যাতন, গণহত্যা ও বিচারবহির্ভূত নিধন) যে পৃথিবীর যেকোনো দেশের আদালত সেই অপরাধীদের বিচার করতে পারে, অপরাধটি যেখানেই ঘটুক না কেন (Reydams, 2003)। ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যের মাটিতে চিলির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশেকে স্প্যানিশ আদালতের আদেশে গ্রেপ্তার করা কিংবা পরবর্তীতে সেনেগালে চাদের সাবেক স্বৈরশাসক হিসেন হাবরের বিচার ছিল এই নীতির যুগান্তকারী প্রয়োগ। এই ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে বার্তা দিয়েছিল যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকেরা বিদেশের মাটিতে নিজেদের সম্পদ বা অবসর উদযাপনের জন্য আর নিরাপদ নন।
তবে সার্বজনীন এখতিয়ার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বড় রাজনৈতিক সংকট রয়েছে। শক্তিশালী পশ্চিমা দেশগুলো প্রায়শই উন্নয়নশীল বা দুর্বল দেশগুলোর স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করতে পারলেও, নিজেদের মিত্র বা শক্তিশালী দেশের নেতাদের ক্ষেত্রে এই এখতিয়ার ব্যবহার করতে ভয় পায়। ফলে আন্তর্জাতিক আদালতগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং সার্বজনীনভাবে কার্যকর করার লড়াইটি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক চাপ (Economic Sanctions, Asset Freezes, and Multilateral Diplomatic Pressures)
সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই কোনো সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি গ্রহণ করে থাকে। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ড্রেজনার (Daniel W. Drezner) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Sanctions Paradox-এ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করেছেন (Drezner, 1999)। ড্রেজনার দেখান, প্রথাগত ঢালাও নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়, অথচ শাসকগোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একবিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত হয়েছে লক্ষ্যভিত্তিক স্মার্ট নিষেধাজ্ঞা (Smart Sanctions)। এর আওতায় নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের সাধারণ অর্থনীতির ওপর আঘাত না হেনে কেবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ গ্যারি সি. হুফবাওয়ার (Gary Clyde Hufbauer) এবং তার সহ-লেখকরা শত বছরের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে সমন্বিত বহুপাক্ষিক চাপ কাজ করে (Hufbauer et al., 2007)। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া এবং পরবর্তীতে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে গৃহীত ম্যাগনিটস্কি আইন (Magnitsky Legislation) রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হোতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে কোনো দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিদেশি সম্পদ তাৎক্ষণিকভাবে বাজেয়াপ্ত করা যায়। যখন একজন স্বৈরশাসক বা তার জেনারেলরা বুঝতে পারেন যে বিদেশে পাচার করা তাদের গোপন সম্পদ নিরাপদ নয়, তখন তা তাদের অভ্যন্তরীণ দমননীতির গতি কিছুটা হলেও ধীর করতে বাধ্য করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ কিম রিচার্ড নসল (Kim Richard Nossal) রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন (Nossal, 1989)। কোনো সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করা, জাতিসংঘ বা আঞ্চলিক জোটগুলোতে তাদের ভোটাধিকার স্থগিত করা এবং অন্য দেশগুলো থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেওয়া শাসকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতাকে ভেঙে দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের পতনের পেছনে এই ধরনের আন্তর্জাতিক বয়কট এবং কূটনৈতিক চাপ এক অত্যন্ত বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
তবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সফলতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো এর বহুপাক্ষিক ঐক্য। কোনো একটি দেশ যদি একতরফাভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, আর অন্য কোনো পরাশক্তি যদি সেই সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে গোপনে আর্থিক সহায়তা বা বিকল্প বাণিজ্যিক পথ খুলে দেয়, তবে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপকে সফল করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত রাজনৈতিক ঐকমত্য অপরিহার্য।
সুরক্ষা দেওয়ার দায়বদ্ধতা (R2P) ও মানবিক সামরিক হস্তক্ষেপ (Responsibility to Protect [R2P] and Humanitarian Intervention)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যখন চরম মাত্রায় পৌঁছে নিজের নাগরিকদের ওপর প্রকাশ্য গণহত্যা বা জাতিগত নিধনের রূপ নেয়, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার নৈতিক ও আইনি প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় ঐতিহাসিক সুরক্ষা দেওয়ার দায়বদ্ধতা (Responsibility to Protect – R2P) মতবাদ। সাবেক অস্ট্রেলীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যারেথ ইভানস (Gareth Evans), যিনি এই ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা, তার গ্রন্থ The Responsibility to Protect: Ending Mass Atrocity Crimes Once and for All-এ দেখিয়েছেন কীভাবে এই নীতি সার্বভৌমত্বের চিরাচরিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে (Evans, 2008)। আরটুপির মূল বক্তব্য হলো, সার্বভৌমত্ব কোনো সুযোগ নয়, এটা একটি দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নিজ নাগরিকদের গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় কিংবা নিজেই এই অপরাধগুলোর হোতা হয়, তবে সেই সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক অ্যালেক্স জে. বেল্লামি (Alex J. Bellamy) আরটুপি কাঠামোর তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর আলোকপাত করেছেন (Bellamy, 2009)।
- প্রথম স্তম্ভটি হলো প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব নাগরিকদের রক্ষা করার দায়িত্ব;
- দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে এই সুরক্ষা সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা; এবং
- তৃতীয় স্তম্ভ হলো রাষ্ট্র যদি চরম সন্ত্রাসী আচরণ করে তবে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে কূটনীতি, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং প্রয়োজনে শেষ অস্ত্র হিসেবে জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে সামরিক হস্তক্ষেপ পরিচালনা করা।
২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনী যখন বেনগাজির আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার বিমান হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিল, তখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ১৯৭৩-এর আওতায় পরিচালিত সামরিক অভিযান ছিল আরটুপির অন্যতম প্রত্যক্ষ প্রয়োগ।
তবে এই নীতিগত হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর সাম্রাজ্যবাদী অপব্যবহারের আশঙ্কা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড সি. লাক (Edward C. Luck) আরটুপির বাস্তবায়ন সংকটের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন (Luck, 2010)। লাক দেখান, পশ্চিমা শক্তিগুলো যখন আরটুপিকে শাসন পরিবর্তনের বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর গোপন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলো নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়ে আরটুপির বৈধতা আটকে দেয়। সিরিয়া কিংবা মিয়ানমারে লাখ লাখ মানুষের ওপর চলা চরম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখেও নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থার কারণে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর মানবিক সামরিক হস্তক্ষেপ চালাতে পারেনি। ফলে আরটুপি নীতিটি কাগজপত্রে এক মহৎ মানবিক দর্শন হিসেবে টিকে থাকলেও মাঠপর্যায়ে এটি পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কাছে প্রতিনিয়ত পরাস্ত হচ্ছে।
সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে অনেক সময় সংঘাত নিরসন হওয়ার বদলে দেশটি এক দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে পতিত হয়, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে তাদের এই পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও বেশি রক্তক্ষয়ী করে তুলবে না।
আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা ও সত্য উন্মোচন (International Civil Society, Human Rights Monitors, and Truth Unveiling)
যেখানে রাষ্ট্র নিজেই অপরাধী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভূরাজনীতির ফাঁদে বন্দি, সেখানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখোশ উন্মোচনে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সমাজবিজ্ঞানী মার্গারেট ই. কেক (Margaret E. Keck) এবং ক্যাথরিন সিকিঙ্ক (Kathryn Sikkink) তাদের যুগান্তকারী গ্রন্থ Activists Beyond Borders-এ একটি তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, যাকে বলা হয় বুমেরাং প্যাটার্ন (Boomerang Pattern) (Keck & Sikkink, 1998)। এই তত্ত্বে দেখানো হয়, যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নিপীড়িত নাগরিকেরা নিজেদের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আইনি প্রতিকার পায় না, তখন তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ) সাথে যোগাযোগ করে। এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তখন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে বিশ্বদরবারে এবং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে তুলে ধরে। এর ফলে আন্তর্জাতিক চাপের সেই বুমেরাং এসে সরাসরি ওই সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের মাথায় আঘাত হানে এবং তাকে দমননীতি শিথিল করতে বাধ্য করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তাত্ত্বিক থমাস রিসি (Thomas Risse) এবং তার সহ-লেখকরা এই প্রক্রিয়ার সামাজিকীকরণ নিয়ে গবেষণা করেছেন (Risse et al., 1999)। রিসি দেখান, কোনো রাষ্ট্র যতই কর্তৃত্ববাদী হোক না কেন, সে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্পূর্ণ ‘অস্পৃশ্য’ বা অপাংক্তেয় হয়ে বাঁচতে চায় না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবেদন এবং তথ্যানুসন্ধান যখন কোনো সরকারের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করে দেয়, তখন সেই সরকারের আন্তর্জাতিক ঋণ, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক মর্যাদা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই ধারাবাহিক চাপ স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার ভেতরেও এক ধরণের বিভক্তি ও নীতি পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি করে।
সমকালীন ডিজিটাল যুগে এই সত্য উন্মোচনের লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (Open Source Intelligence – OSINT) এবং ফরেনসিক স্থাপত্যের মতো নতুন প্রযুক্তি। বেলিংক্যাটের মতো স্বাধীন নাগরিক গবেষক দলগুলো স্যাটেলাইট ছবি, সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও এবং ডিজিটাল মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপন অপরাধ ও মিথ্যাচার মুহূর্তের মধ্যে ফাঁস করে দিচ্ছে। সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র হামলা কিংবা ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো গুলির ডিজিটাল প্রমাণগুলো এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে জমা দেওয়া হচ্ছে। নাগরিক সমাজের এই প্রযুক্তিগত নজরদারি রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডাকে ভেঙে দিয়ে অপরাধের তথ্যকে চিরতরে নথিবদ্ধ করে রাখছে।
নাগরিক সমাজের এই কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই মানবাধিকার কর্মীদের ‘বিদেশি চর’ বা ‘সন্ত্রাসী সহায়তাকারী’ আখ্যা দিয়ে জেলে পাঠায়, তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে এবং বিদেশি অনুদান নেওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবুও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইটিই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদী ঢাল হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
ট্রানজিশনাল জাস্টিস: সত্য কমিশন, ক্ষতিপূরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার (Transitional Justice: Truth Commissions, Reparations, and Institutional Reform)
কোনো স্বৈরাচারী বা সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থার পতনের পর সেই সমাজের পুনর্গঠন এবং অতীতের ক্ষত নিরাময়ের জন্য যে আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়, তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলা হয় রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার (Transitional Justice)। আইনি তাত্ত্বিক রোটি টিটাল (Ruti G. Teitel) তার ক্লাসিক গ্রন্থ Transitional Justice-এ দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সমাজ স্বৈরতন্ত্র ও সহিংসতার অন্ধকার থেকে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে উত্তরণ ঘটায় (Teitel, 2000)। টিটালের মতে, এই প্রক্রিয়ায় কেবল পুরনো অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং পুরো বিচার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল কাঠামোগত সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র আর কখনোই নিজের নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসের অস্ত্র প্রয়োগ করতে না পারে।
ট্রানজিশনাল জাস্টিসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন (Truth and Reconciliation Commission – TRC)। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের অবসানের পর আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু এবং আইনি বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার এল. বোরেন (Alexander L. Boraine)-এর নেতৃত্বে গঠিত সত্য কমিশন বিশ্বজুড়ে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল (Boraine, 2000)। বোরেন দেখান, অপরাধীদের কেবল আদালতে ফাঁসি দিলে অনেক সময় তারা মুখ খোলে না এবং অতীতের বহু অপরাধ চিরতরে অজানা থেকে যায়। সত্য কমিশনের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা যখন প্রকাশ্যে তাদের অপরাধ স্বীকার করে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের কবরের সন্ধান দেয়, তখন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অন্তত সত্য জানার মানসিক শান্তি পায়। এই প্রক্রিয়া প্রতিশোধের সংঘাতময় বৃত্ত ভেঙে দিয়ে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথ তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার বিশেষজ্ঞ প্রিসিলা বি. হেইনার (Priscilla B. Hayner) তার গ্রন্থ Unspeakable Truths: Transitional Justice and the Challenge of Truth Commissions-এ বিশ্বজুড়ে গঠিত অর্ধশতাধিক সত্য কমিশনের কাজের মূল্যায়ন করেছেন (Hayner, 2011)। হেইনারের মতে, সত্য উন্মোচনের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া, প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার বা লাস্ট্রেশন (Lustration) নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের স্থায়ীভাবে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার একটি ভঙ্গুর সমাজকে নতুন করে বাঁচার শক্তি জোগায়। অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া যেমন নতুন স্বৈরাচারের জন্ম দিতে পারে, তেমনি কেবল অন্ধ প্রতিশোধস্পৃহা সমাজকে আবার গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সত্য, বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি সুষম সমন্বয়ই পারে রাষ্ট্রযন্ত্রকে তার সন্ত্রাসী অতীতের ছায়া থেকে মুক্ত করে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে।
ভূরাজনীতি, ভেটো কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার ভবিষ্যৎ (Geopolitics, Veto Diplomacy, and the Future of International Accountability)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলার চূড়ান্ত লড়াইটি সবসময়ই আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতির সাথে জড়িত। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিচার প্রায়শই একতরফা রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার গবেষক ডেভিড পি. ফরসাইথ (David P. Forsythe) তার গ্রন্থ Human Rights in International Relations-এ স্পষ্ট দেখিয়েছেন কীভাবে পরাশক্তিগুলো নিজেদের মিত্রদের শত অপরাধকে সুরক্ষা দেয়, অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে মানবাধিকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে (Forsythe, 2017)। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের (P5) হাতে থাকা ভেটো ক্ষমতা (Veto Power) আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার পথকে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার মধ্যে ফেলে রেখেছে। কোনো পরাশক্তি বা তার আশ্রিত কোনো রাষ্ট্র যখন চরম সন্ত্রাস চালায়, তখন একটিমাত্র ভেটো দিয়ে পুরো বৈশ্বিক বিচার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক মানবিক ব্যবস্থার গবেষক মাইকেল বার্নেট (Michael Barnett) এই কাঠামোগত দ্বিচারিতাকে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার এক নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Barnett, 2011)। বার্নেটের মতে, পরাশক্তিগুলো যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা সার্বজনীন এখতিয়ারের মতো নিরপেক্ষ সংস্থাগুলোকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের স্বার্থে ‘নির্বাচিত বিচার’ চাপিয়ে দেয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। গ্লোবাল সাউথ বা তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ মনে করতে শুরু করে যে আন্তর্জাতিক আইন কেবল দুর্বলদের শায়েস্তা করার একটি পশ্চিমা হাতিয়ার, যা শক্তিশালী দেশগুলোর নিজেদের অপরাধের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অন্ধ থাকে।
আইনি ইতিহাসবিদ জেরি সিম্পসন (Gerry Simpson) তারGreat Powers and Outlaw States গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে পরাশক্তিগুলো নিজেদের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের উর্ধ্বে একটি বিশেষ স্থান তৈরি করে রেখেছে (Simpson, 2004)। এই অন্যায্য ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিতে না পারলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলায় কোনো বৈশ্বিক ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের বিশ্বকে নিরাপদ করতে হলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ারকে সকল দেশের জন্য সমানভাবে বাধ্যতামূলক করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলা কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধানযোগ্য লড়াই নয়। এটি হলো ক্ষমতার অন্ধ অহংকার ও বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের এক অবিরাম সংগ্রাম। রাষ্ট্র যখন নিজেই অপরাধী হয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল কোনো একটি দেশের একক আদালতে করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী নাগরিক সংহতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সার্বভৌমত্বের দেয়াল ভেঙে যখন প্রতিটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে তার নিজের জনগণের কাছে এবং বিশ্ব মানবতার আদালতে প্রতিটি বলপ্রয়োগের জন্য সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ করা যাবে, কেবল তখনই পৃথিবী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই দুঃস্বপ্ন থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে।
নতুন সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি ও কার্যপদ্ধতি (Nature and Operations of New Terrorism): উদ্দেশ্য, মতাদর্শ, নিয়োগ ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক
নতুন বনাম পুরাতন সন্ত্রাসবাদের তাত্ত্বিক বিভাজন (Theoretical Divide between Old and New Terrorism)
বিশ শতকের শেষ দশকে এসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে সহিংসতার ব্যাকরণে এক স্পষ্ট রূপান্তর দেখা যায়। গবেষকরা লক্ষ্য করলেন, অতীতের সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে সমকালীন গোষ্ঠীগুলোর চিন্তা ও কাজের ধরনে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ওয়াল্টার লাকার (Walter Laqueur) তার ১৯৯৯ সালের বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য নিউ টেররিজম: ফ্যানাটিসিজম অ্যান্ড দ্য আর্মস অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশন (The New Terrorism: Fanaticism and the Arms of Mass Destruction)-এ প্রথম এই কাঠামোগত পরিবর্তনকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেন (Laqueur, 1999)। তিনি তুলে ধরেন যে, বিশ শতকের মধ্যভাগে সক্রিয় থাকা গোষ্ঠীগুলো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করত। কিন্তু শতাব্দীর শেষভাগে এসে এমন কিছু সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে যাদের কাছে সহিংসতার পরিধি জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ ধারণ করে। এই নতুন রূপকে অ্যাকাডেমিক পরিসরে নতুন সন্ত্রাসবাদ (New Terrorism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা পূর্ববর্তী পুরাতন সন্ত্রাসবাদ (Old Terrorism) থেকে বেশ কিছু মৌলিক জায়গায় আলাদা।
আগের দিনের সংগঠনগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের রাজনৈতিক সমঝোতার ইচ্ছা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ষাট ও সত্তরের দশকের ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী দলগুলো নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহিংসতাকে ব্যবহার করত একটি দরকষাকষির মাধ্যম হিসেবে (Hoffman, 2006)। আয়ারল্যান্ডের আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা ফিলিস্তিনের পিএলও-র মতো দলগুলোর একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকত। তারা চাইত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে অথবা বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোয় পরিবর্তন আনতে। এই কারণে তাদের সহিংসতা ছিল সুনির্দিষ্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা তাদের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে মিলত না, কারণ তাতে জনগণের সমর্থন হারানোর বড় ঝুঁকি থাকত। গবেষক মার্থা ক্রেনশ (Martha Crenshaw) এই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেন যে, পুরনো ধারার সশস্ত্র দলগুলো সবসময় জনসমর্থন ও রাজনৈতিক বৈধতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিত (Crenshaw, 1981)।
বিপরীতে, নতুন ধারার সন্ত্রাসীদের মধ্যে এই ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো জায়গা দেখা যায় না। ইয়ান লেসার (Ian Lesser) এবং তার সহযোগী গবেষকরা গবেষণা সংস্থা র্যান্ড কর্পোরেশনের এক সমীক্ষায় তুলে ধরেন যে, আধুনিক চরমপন্থীরা কোনো সীমিত দাবি নিয়ে মাঠে নামে না (Lesser et al., 1999)। তাদের লক্ষ্য অনেক বেশি ব্যাপক, বিমূর্ত এবং সর্বগ্রাসী। তারা কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে চায় না, বরং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলতে চায়। এখানে প্রচলিত রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার চেয়ে এক ধরনের চরম ধ্বংসাত্মক বাসনা কাজ করে। পুরনো গোষ্ঠীগুলো যেখানে নিজেদের কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে বেঁধে রাখত, সেখানে নতুন গোষ্ঠীগুলোর কাছে কোনো আন্তর্জাতিক বা মানবিক নিয়মের তোয়াক্কা থাকে না।
তবে সব তাত্ত্বিক এই বিভাজনকে পরম সত্য বলে মেনে নেননি। সমালোচকদের মতে, সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে এই তথাকথিত রূপান্তর যতটা না সম্পূর্ণ নতুন, তার চেয়ে অনেক বেশি বিবর্তনের ফল। নিরাপত্তা গবেষক ইসাবেল ডুইভেস্টেইন (Isabelle Duyvesteyn) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, নতুন সন্ত্রাসবাদের যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয় – যেমন নির্বিচারে মানুষ হত্যা বা ধর্মীয় অনুভূতির ব্যবহার – তা উনবিংশ ও বিশ শতকের বহু চরমপন্থী দলের মধ্যেও দেখা যেত (Duyvesteyn, 2004)। একই সুরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড টাকার (David Tucker) যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, সংগঠনগুলোর যোগাযোগ মাধ্যম ও অস্ত্রের ধরনে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও তাদের মূল রাজনৈতিক চালিকাশক্তি একই রকম রয়ে গেছে (Tucker, 2001)। এই বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও সমকালীন বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে, সহিংসতার বিস্তৃতি, প্রাণহানির মাত্রা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আধুনিক সন্ত্রাসবাদ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিধ্বংসী রূপ নিয়েছে।
উদ্দেশ্য ও মাত্রাগত রূপান্তর: অসীম ধ্বংসের রাজনীতি (Objectives and Dimensional Shift: Politics of Catastrophic Destruction)
সহিংসতার লক্ষ্য এবং তার মাত্রার ক্ষেত্রে নতুন সন্ত্রাসবাদ এক ভয়ংকর রূপান্তরের জন্ম দিয়েছে। সত্তরের দশকে প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান জেনকিন্স (Brian Michael Jenkins) একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, সন্ত্রাসীরা চায় বহু মানুষ তাদের কর্মকাণ্ড দেখুক, কিন্তু বহু মানুষ মারা যাক তা তারা চায় না (Jenkins, 1975)। পুরনো দিনের সন্ত্রাসবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভয় তৈরি করে জনমত ও নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে এই যুক্তির সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যেতে শুরু করে। সমকালীন চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশ্য কেবল মনোযোগ আকর্ষণ নয়, বরং প্রতিপক্ষের ওপর সর্বোচ্চ পরিমাণ মানবিক ও বস্তুগত বিপর্যয় চাপিয়ে দেওয়া।
সহিংসতার এই মাত্রাগত পরিবর্তনকে সমাজবিজ্ঞানী মার্ক জুয়ার্গেনসমেয়ার (Mark Juergensmeyer) এক গভীর তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন। তার গবেষণামূলক গ্রন্থ টেরর ইন দ্য মাইন্ড অব গড: দ্য গ্লোবাল রাইজ অব রিলিজিয়াস ভায়োলেন্স (Terror in the Mind of God: The Global Rise of Religious Violence)-এ তিনি একে বর্ণনা করেছেন মহাজাগতিক যুদ্ধ (Cosmic War) হিসেবে (Juergensmeyer, 2000)। তার বিশ্লেষণ অনুসারে, আধুনিক উগ্রপন্থীরা নিজেদের লড়াইকে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সংঘাত মনে করে না। তারা বিশ্বাস করে তারা এক পরম সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত। এই ধরনের মনস্তত্ত্বে প্রতিপক্ষকে আর কোনো মানুষ বা নাগরিক হিসেবে দেখা হয় না; তাদেরকে দেখা হয় পরম শত্রু হিসেবে। যখন একটি লড়াইকে মহাজাগতিক স্তরে উন্নীত করা হয়, তখন সেখানে কোনো যুদ্ধবিরতি, শান্তিচুক্তি বা মানবিক বিবেচনার স্থান থাকে না। ফলে সেখানে তৈরি হয় সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ (Unbounded Destruction) ঘটানোর এক উন্মাদনা।
এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ধারাও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিশ শতকের দলগুলো সাধারণত সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা বা কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করত। কিন্তু আধুনিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যকার সীমারেখা মুছে গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অড্রে কার্থ ক্রোনিন (Audrey Kurth Cronin) তার গ্রন্থ হাউ টেররিজম এন্ডস (How Terrorism Ends)-এ দেখিয়েছেন যে, আধুনিক সন্ত্রাসবাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে নরম লক্ষ্যবস্তু (Soft Targets) যেমন – বাজার, সাবওয়ে স্টেশন, কনসার্ট হল বা উপাসনালয় (Cronin, 2009)। এই জায়গাগুলোতে কোনো নিরাপত্তা পাহারা থাকে না বললেই চলে, আর সাধারণ মানুষের উপস্থিতি থাকে উপচে পড়া। ফলে খুব সহজেই ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানো সম্ভব হয়।
উদ্দেশ্যের এই রূপান্তরটি সমাজে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পেপ (Robert Pape) আত্মঘাতী সহিংসতার কৌশলগত যুক্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে গণবিধ্বংসী হামলাগুলো সাধারণ নাগরিকদের মনে রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তোলে (Pape, 2003)। যখন মানুষ দেখে যে তার প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণতম স্থানগুলোও নিরাপদ নয়, তখন পুরো সমাজে এক ধরনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত ভীতির সৃষ্টি হয়। নতুন সন্ত্রাসবাদ রাষ্ট্রকে এই ধরনের দুর্বল পরিস্থিতিতে ফেলতে চায়। তারা এমন এক চরম অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে সরকার হয় অতিরিক্ত দমনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নেবে, নয়তো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আধুনিক সন্ত্রাসবাদ রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কাজ করে।
মতাদর্শিক প্রেরণা ও রূপরেখা: ধর্মান্ধতা থেকে চরমপন্থা (Ideological Drivers: From Religious Dogma to Extremism)
মতাদর্শগত দিক থেকে নতুন সন্ত্রাসবাদের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে চরমপন্থী ধর্মীয় বয়ান এবং কট্টর চরমপন্থা। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড রাপোপোর্ট (David C. Rapoport) তার বিখ্যাত চার তরঙ্গের তত্ত্ব (Four Waves Theory) উপস্থাপন করেন (Rapoport, 2002)। এই তত্ত্বে তিনি দেখান যে, উনবিংশ শতাব্দীর নৈরাজ্যবাদী তরঙ্গ, বিশ শতকের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী তরঙ্গ এবং বামপন্থী তরঙ্গের পর ১৯৭৯ সাল থেকে বিশ্বে শুরু হয়েছে ধর্মীয় চরমপন্থার তরঙ্গ। এই চতুর্থ তরঙ্গে এসে সমাজতান্ত্রিক বা জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ পেছনে পড়ে যায়। তার জায়গায় প্রধান হয়ে ওঠে এক ধরনের সর্বগ্রাসী বিশ্বাস, যা রাজনীতিকে কোনো বাস্তবমুখী সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে দেখে না, বরং দেখে অলৌকিক আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হিসেবে।
ধর্মীয় মতাদর্শকে যখন চরমপন্থার হাতিয়ার করা হয়, তখন তা এক ভয়ংকর রূপ নেয়। গবেষক জেসিকা স্টার্ন (Jessica Stern) তার গবেষণামূলক গ্রন্থ টেরর ইন দ্য নেম অব গড: হোয়াই রিলিজিয়াস মিলিট্যান্টস কিল (Terror in the Name of God: Why Religious Militants Kill)-এ দেখিয়েছেন যে, মতাদর্শিক নেতারা সাধারণ মানুষের হতাশা ও ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এক ধরনের চরমপন্থী মনোজগত তৈরি করে (Stern, 2003)। এই মনোজগতে পুরো মানবজাতিকে কৃত্রিমভাবে দুটি বিপরীত মেরুতে ভাগ করে ফেলা হয় – একদিকে নিজেদের তথাকথিত পরিশুদ্ধ গোষ্ঠী, আর অন্যদিকে বাকি সমগ্র পৃথিবী। এই বিভাজন অনুসারীদের মনে এমন এক গভীর অন্ধত্ব তৈরি করে যার ফলে তারা যে কোনো ধরনের নৃশংসতাকে একটি মহৎ দায়িত্ব মনে করতে শুরু করে।
এই চরমপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে প্রায়শই যুক্ত হয় অ্যাপোক্যালিপ্টিক মতাদর্শ (Apocalyptic Ideology) বা শেষ জমানার লড়াইয়ের ধারণা। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা গবেষক টমাস হেগহ্যামার (Thomas Hegghammer) উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক বহু চরমপন্থী দল তাদের প্রচারণায় এমন একটি বয়ান তৈরি করে যেন পৃথিবীর শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে এবং তাদের দলই সেই চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে (Hegghammer, 2010)। এই ধরনের সর্বনাশা চিন্তা কর্মীদের মনে তাৎক্ষণিক আত্মত্যাগের উন্মাদনা তৈরি করে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পার্থিব লাভ-ক্ষতি বা নিজস্ব জীবনের কোনো মূল্য নেই। তাদের একমাত্র কাজ হলো ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিজেদের নির্দিষ্ট মতাদর্শকে বিজয়ী করা।
শুধু কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে নয়, সমকালীন বিশ্বে এই মতাদর্শিক চরমপন্থা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। গবেষক রোহান গুণরত্ন (Rohan Gunaratna) তার গ্রন্থ ইনসাইড আল-কায়েদা: গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব টেরর (Inside Al-Qaeda: Global Network of Terror)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে একটি আঞ্চলিক সংকটের ভাষা আন্তর্জাতিক রূপ নিয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষের চিন্তা জগতকে প্রভাবিত করে (Gunaratna, 2002)। বর্তমানে পাশ্চাত্য সমাজগুলোতেও উগ্র ডানপন্থী এবং শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী দলগুলোর মধ্যে প্রায় একই ধরনের অন্ধ মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো লক্ষ্য করা যায়। তারাও বিশ্বাস করে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে এবং সহিংসতাই বাঁচার একমাত্র পথ। এই মতাদর্শগুলো কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি বা যৌক্তিক চিন্তাকে সহ্য করে না। তারা মানুষের মধ্যে ভয় ও ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়ে এক চরমপন্থী অনুগত বাহিনী গড়ে তুলতে চায়, যারা যে কোনো মুহূর্তে নিজেদের ও অন্যদের জীবন ধ্বংস করতে প্রস্তুত থাকে।
অনানুষ্ঠানিক ও বিকেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামো (Decentralized and Networked Organizational Structures)
সাংগঠনিক কাঠামোর দিক থেকে নতুন সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরিভাবে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক বিন্যাস থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশ শতকের সশস্ত্র সংগঠনগুলো পরিচালিত হতো একটি কঠোর পিরামিড কাঠামোর অধীনে। সেখানে একজন শীর্ষ নেতা বা কেন্দ্রীয় কমিটি থাকত, যাদের নির্দেশ ধাপে ধাপে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে পৌঁছাত। কিন্তু আধুনিক যোগাযোগ ও নজরদারি প্রযুক্তির যুগে সেই পুরনো কাঠামো টেকসই নয়। মার্কিন চিন্তাবিদ জন আরকুইলা (John Arquilla) এবং ডেভিড রনফেল্ড (David Ronfeldt) সন্ত্রাসবাদের এই নতুন সাংগঠনিক রূপকে বর্ণনা করার জন্য নেটওয়ার্ক যুদ্ধ (Netwar) তত্ত্বটি সামনে আনেন (Arquilla & Ronfeldt, 2001)। তাদের মতে, আধুনিক চরমপন্থীরা কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে কাজ করে না; বরং তারা অসংখ্য স্বাধীন, স্বয়ংক্রিয় নোড বা সেলের একটি শিথিল জালের মতো কাজ করে।
এই বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর কারণে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মার্ক সেজম্যান (Marc Sageman) তার ক্লাসিক গ্রন্থ আন্ডারস্ট্যান্ডিং টেরর নেটওয়ার্কস (Understanding Terror Networks)-এ তুলে ধরেছেন যে, এই নেটওয়ার্কগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠে না (Sageman, 2004)। তিনি একে নেতৃত্বহীন চরমপন্থা (Leaderless Extremism) বলে অভিহিত করেন। সমমনা কিছু তরুণ যখন কোনো সামাজিক চক্র, খেলাধুলার ক্লাব বা ইন্টারনেট ফোরামে একত্রিত হয়, তখন তারা নিজেরাই একটি ছোট সেল তৈরি করে ফেলে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের কোনো অপারেশনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয় না, তারা কেবল একটি সাধারণ মতাদর্শিক দিকনির্দেশনা দেয়। মাঠপর্যায়ের দলগুলো সেই বার্তা অনুযায়ী নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা সাজায় ও বাস্তবায়ন করে।
এই নতুন বিন্যাসকে অনেকে বাণিজ্যিক জগতের ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জেসন বার্ক (Jason Burke) তার আল-কায়েদা: দ্য ট্রু স্টোরি অব র্যাডিক্যাল ইসলাম (Al-Qaeda: The True Story of Radical Islam) গ্রন্থে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে একটি একক সংগঠন কালক্রমে একটি বৈশ্বিক মতাদর্শ বা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে (Burke, 2004)। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক বিদ্রোহী দলগুলো মূল সংগঠনের প্রতি মৌখিক আনুগত্য প্রকাশ করে নিজেদের স্থানীয় কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। এতে কেন্দ্রীয় সংগঠনের সরাসরি কোনো খরচ বা ঝুঁকি থাকে না, অথচ বিশ্বজুড়ে তাদের প্রভাব ও ভীতির পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
সাংগঠনিক এই রূপান্তরের ফলে আধুনিক চরমপন্থী দলগুলো অভাবনীয় মাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে, প্রথাগত সংগঠনের শীর্ষ নেতাকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করলে পুরো সংগঠন পঙ্গু হয়ে যেত (Wilkinson, 2006)। কিন্তু আধুনিক নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক ব্যবস্থায় কোনো একক কেন্দ্র বা প্রধান নেতা থাকে না। ফলে একটি সেল ধ্বংস হয়ে গেলেও নেটওয়ার্কের বাকি অংশগুলোর কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হয় না। তারা অনায়াসেই নতুন রূপ নিয়ে আবার আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সংগঠনের এই স্থিতিস্থাপকতা এবং তরল রূপটিই আধুনিক সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি।
ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট ও সাইবার র্যাডিক্যালাইজেশন (Digital Recruitment and Cyber Radicalization)
সদস্য সংগ্রহ এবং চরমপন্থা বিস্তারের পদ্ধতিতে ইন্টারনেট এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগের দিনে কোনো ব্যক্তিকে চরমপন্থায় দীক্ষিত করতে হলে সরাসরি মুখোমুখি যোগাযোগ, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত আলাপ এবং শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হতো। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লব এই পুরো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল ও দ্রুতগামী করে তুলেছে। নিরাপত্তা গবেষক পিটার নিউম্যান (Peter R. Neumann) তার গবেষণা গ্রন্থ ওল্ড অ্যান্ড নিউ টেররিজম (Old and New Terrorism)-এ পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, ইন্টারনেট সন্ত্রাসবাদের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে (Neumann, 2009)। আজ কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন ব্যক্তি নিজের শোবার ঘরে বসেই হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো উগ্র মতাদর্শের সংস্পর্শে আসতে পারছে এবং ধীরে ধীরে চরমপন্থায় দীক্ষিত হয়ে পড়ছে।
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে তাত্ত্বিকরা সাইবার র্যাডিক্যালাইজেশন (Cyber Radicalization) নামে অভিহিত করেছেন। চরমপন্থী দলগুলো সাইবার স্পেসকে এক উন্মুক্ত প্রোপাগান্ডার যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে। গবেষক গাব্রিয়েল ওয়েইম্যান (Gabriel Weimann) তার অগ্রগামী কাজ টেরর অন দ্য ইন্টারনেট: দ্য নিউ এরিনা, দ্য নিউ ফ্রন্টিয়ার্স (Terror on the Internet: The New Arena, The New Frontiers)-এ তুলে ধরেন কীভাবে এই সংগঠনগুলো ওয়েবসাইট, চ্যাটরুম ও ফোরাম থেকে শুরু করে মূলধারার সোশ্যাল মিডিয়াকে তাদের অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে (Weimann, 2006)। তারা উচ্চমানের ভিডিও নির্মাণ করে, যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যগুলোকে জনপ্রিয় ভিডিও গেমের মতো করে উপস্থাপন করে এবং তরুণদের আবেগকে নাড়া দেয় এমন আকর্ষণীয় অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি করে।
যোগাযোগ মাধ্যমের এই দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার সুযোগ নেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্রিজিট নাকোস (Brigitte L. Nacos) তার গ্রন্থ ম্যাস-মিডিয়েটেড টেররিজম (Mass-Mediated Terrorism)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক সন্ত্রাসবাদ মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চ্যানেলগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বিকল্প সত্য তৈরি করে (Nacos, 2002)। যখন একজন তরুণ কোনো কারণে নিজের সমাজ বা জীবনে বিচ্ছিন্নতা ও হতাশায় ভোগে, তখন চরমপন্থীদের তৈরি কৃত্রিম রোমাঞ্চ ও বীরত্বের গল্পগুলো তাকে দারুণভাবে টানে। এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম যেমন টেলিগ্রাম, ডিসকর্ড বা সিগন্যালে নিয়ে গিয়ে তাকে এমন এক বদ্ধ পরিবেশের ভেতর রাখা হয় যেখানে বাইরের কোনো যৌক্তিক তথ্য পৌঁছাতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানী র্যান্ডি বোরুম (Randy Borum) চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ার মানসিক ধাপগুলো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন (Borum, 2011)। ইন্টারনেটে অ্যালগরিদমের কারণে একজন ব্যবহারকারী যখন একবার কোনো উগ্র কনটেন্টে ক্লিক করে, তখন তার ফিডে অনবরত একই ধরনের ক্ষোভ উদ্রেককারী ভিডিও ও লেখা আসতে থাকে। একে বলা হয় ইকো-চেম্বার (Echo Chamber) বা প্রতিধ্বনি কক্ষ। গবেষক মিয়া ব্লুম (Mia Bloom) নারী ও শিশুদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ভার্চুয়াল সহমর্মিতার ফাঁদে ফেলে তরুণদের আত্মঘাতী পথে ঠেলে দেওয়া হয় (Bloom, 2011)। ইন্টারনেটের এই অন্ধকার জগত সন্ত্রাসবাদকে একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করেছে, যেখানে ভৌগোলিক দূরত্ব বা কঠোর সীমান্ত পাহারা দিয়েও চরমপন্থার বিষবাষ্প ছড়ানো ঠেকানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈশ্বিক সেল, লোন উলফ ও আধুনিক অভিযোজন (Global Cells, Lone Wolf and Modern Operational Tactics)
আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একক ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হামলা। নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এই ধরনের আক্রমণকারীদের লোন উলফ সন্ত্রাসবাদ (Lone Wolf Terrorism) বলা হয়। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ রামন স্পাইকয়ারবোয়ের (Ramon Spaaij) তার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গ্রন্থ আন্ডারস্ট্যান্ডিং লোন উলফ টেররিজম: গ্লোবাল প্যাটার্নস, মোটিভেশনস অ্যান্ড প্রিভেনশন (Understanding Lone Wolf Terrorism: Global Patterns, Motivations and Prevention)-এ এই ধরনের আক্রমণকারীদের প্রকৃতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Spaaij, 2012)। তার মতে, এরা কোনো আনুষ্ঠানিক সন্ত্রাসী দলের সক্রিয় সদস্য নয় এবং কোনো দল থেকে সরাসরি নির্দেশও পায় না। এরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে মতাদর্শ গ্রহণ করে এবং সম্পূর্ণ একা হামলার ছক আঁকে।
একক আক্রমণকারীদের এই কৌশল নিরাপত্তা গোয়েন্দাদের সব প্রথাগত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেফ্রি ক্যাপলান (Jeffrey Kaplan) এবং তার সহ-গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, লোন উলফ ধাঁচের সন্ত্রাসীদের কোনো বাহ্যিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক না থাকায় তাদের আগাম শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব (Kaplan et al., 2014)। এরা কোনো বড় অস্ত্রের চালান সংগ্রহ করে না, কোনো গোপন বৈঠকে যায় না এবং কারো সঙ্গে ফোনে সন্দেহজনক কথা বলে না। ফলে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারির রাডারে এদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে খুবই কম। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এরা যেকোনো সাধারণ দিনে জনাকীর্ণ স্থানে আক্রমণ চালিয়ে বসে।
হামলার হাতিয়ার এবং পদ্ধতির ক্ষেত্রেও এক চমকপ্রদ কিন্তু মারাত্মক পরিবর্তন এসেছে। উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র বা জটিল বোমার বদলে আধুনিক সন্ত্রাসীরা দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ জিনিসপত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। একটি সাধারণ লরি বা ট্রাক চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে পথচারীদের ওপর, রান্নাঘরের সাধারণ ছুরি দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর, কিংবা অনলাইনে পাওয়া সহজ নির্দেশিকা দেখে তৈরি করা হচ্ছে সাধারণ প্রেসার কুকার বোমা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিলিপ ববিট (Philip Bobbitt) তার গ্রন্থ টেরর অ্যান্ড কনসেন্ট: দ্য ওয়ার্স ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি (Terror and Consent: The Wars for the Twenty-First Century)-এ তুলে ধরেন কীভাবে বিশ্বায়নের উন্মুক্ত সুযোগ-সুবিধাগুলোকেই সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে (Bobbitt, 2008)। অল্প পুঁজিতে ও সহজলভ্য উপাদানে সর্বোচ্চ মাত্রার ক্ষতিসাধন করাই হয়ে উঠেছে সমকালীন রণকৌশল।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এই অভিযোজন অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রথাগত ব্যাংকিং চ্যানেলে কঠোর নজরদারি আরোপ করার পর সন্ত্রাসীরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে। সন্ত্রাসী অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ মাইকেল ফ্রিডম্যান (Michael Freeman) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আজকের দিনে একটি বড় হামলা চালানোর জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয় না (Freeman, 2012)। ব্যক্তিগত সঞ্চয়, ক্ষুদ্র পারিবারিক ঋণ, সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সংগৃহীত সামান্য অর্থ দিয়েই ভয়ংকর অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। এই সমস্ত উপাদান একত্রিত হয়ে নতুন সন্ত্রাসবাদকে একটি বহুরূপী, অদৃশ্য এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ দিয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নাগরিকদের জন্য এই হুমকি মোকাবেলা করতে হলে কেবল অস্ত্রের শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও কৌশলগত বোঝাপড়া।
গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও সন্ত্রাসবাদ (Weapons of Mass Destruction and Terrorism): কৌশলগত হুমকি
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ধারণাগত রূপরেখা ও সিবিআরএন হুমকি (Conceptual Framework of WMD and the CBRN Threat Matrix)
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার আলোচনায় বিশ শতকের শেষভাগ থেকে সবচেয়ে ভীতিজনক যে দৃশ্যকল্পটি সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে অপ্রচলিত ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তির প্রবেশ। প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এই অস্ত্রগুলোকে সম্মিলিতভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of Mass Destruction) বলা হয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিমণ্ডলে এই হুমকিকে সাধারণত সিবিআরএন সন্ত্রাসবাদ (CBRN Terrorism) কাঠামোর অধীনে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, জৈব, তেজস্ক্রিয় এবং পারমাণবিক উপাদান। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফার সেন্টারের নিরাপত্তা গবেষক গ্রাহাম অ্যালিসন (Graham Allison) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ নিউক্লিয়ার টেররিজম: দ্য আলটিমেট প্রিভেন্টেবল ক্যাটাস্ট্রফি (Nuclear Terrorism: The Ultimate Preventable Catastrophe)-এ উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক চরমপন্থীদের হাতে এই ধরনের সক্ষমতা পৌঁছালে তা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিতে পারে (Allison, 2004)।
প্রচলিত অস্ত্রের সঙ্গে এই বিশেষ ক্যাটাগরির অস্ত্রের মূল পার্থক্য কেবল প্রাণহানির সংখ্যায় নয়, বরং এর ধ্বংসের ধরনে। প্রচলিত যেকোনো বিস্ফোরক একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে সরাসরি আঘাত হানে। অন্যদিকে রাসায়নিক বা জৈব এজেন্টের মতো উপাদানগুলো বাতাস বা জলের মাধ্যমে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ, খাদ্যশৃঙ্খল এবং মানবদেহের জৈবিক গঠনকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রিচার্ড ফ্যালকেনরাথ (Richard A. Falkenrath) এবং তার সহ-গবেষকরা তাদের যৌথ গবেষণাগ্রন্থ আমেরিকা’স অ্যাকিলিস হিল: নিউক্লিয়ার, বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল টেররিজম অ্যান্ড কভার্ট অ্যাটাক (America’s Achilles’ Heel: Nuclear, Biological, and Chemical Terrorism and Covert Attack)-এ দেখিয়েছেন যে, এই অস্ত্রগুলোর বিস্তার ও প্রয়োগের মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত প্রচলিত সমরাস্ত্রের চেয়ে হাজার গুণ বেশি (Falkenrath et al., 1998)। মানুষ যে বিপদকে খালি চোখে দেখতে পায় না কিংবা যার বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক শারীরিক প্রতিরোধ গড়া সম্ভব নয়, তার প্রতি ভয় সবচেয়ে গভীর হয়।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য এই অস্ত্রগুলোর প্রতি আকর্ষণ তৈরির পেছনে কাজ করে এক ধরনের অসম যুদ্ধকৌশল। একটি দুর্বল বা সীমিত সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দল কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রথাগত সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখ সমরে কখনোই পেরে উঠবে না। কিন্তু গণবিধ্বংসী উপাদানের সামান্য একটি অংশ ব্যবহার করে তারা পুরো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডেভিড ওলব্রাইট (David Albright) তার বিশ্লেষণে তুলে ধরেন যে, চরমপন্থীদের কাছে সিবিআরএন উপাদান কেবল একটি সামরিক অস্ত্র নয়, বরং এটা হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রাচীরকে ভেদ করার সবচেয়ে কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার (Albright, 2010)। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই হুমকিকে আর কোনো কাল্পনিক আশঙ্কা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটা এক অত্যন্ত বাস্তব কৌশলগত ঝুঁকি।
বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতি এই ঝুঁকিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে এই ধরনের অস্ত্র তৈরির জটিল বৈজ্ঞানিক সূত্র এবং কাঁচামাল কেবল কয়েকটি পরাশক্তি রাষ্ট্রের গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত থাকত। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং জৈবপ্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সেই গোপনীয়তার প্রাচীর অনেকটাই ভেঙে গেছে। তবে কাঁচামাল বা তত্ত্ব জানা থাকলেই যে কোনো অস্ত্র কার্যকরভাবে তৈরি করে ফেলা যায়, বিষয়টি এত সহজ নয়। তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং মাঠপর্যায়ে তা প্রয়োগ করার সক্ষমতার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান থাকে। এই ব্যবধান সন্ত্রাসীরা কীভাবে অতিক্রম করার চেষ্টা করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীগুলো কীভাবে তা আটকে দেয়, সেই সমীকরণের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক নিরাপত্তা।
রাসায়নিক ও জৈব সন্ত্রাসবাদ: ঐতিহাসিক নজির ও কার্যক্ষমতা (Chemical and Biological Terrorism: Historical Precedents and Operational Viability)
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের তালিকায় রাসায়নিক এবং জৈব উপাদানকে প্রায়শই সবচেয়ে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর প্রধান কারণ হলো, পারমাণবিক বোমার মতো বিপুল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ছাড়াই গবেষণাগারের সাধারণ যন্ত্রপাতি ও বাণিজ্যিক রাসায়নিক উপাদান দিয়ে এই ধরনের বিষাক্ত পদার্থ উৎপাদন করা সম্ভব। নিরাপত্তা গবেষক জোনাথন টাকার (Jonathan B. Tucker) তার সম্পাদিত বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ টক্সিক টেরর: অ্যাসেসিং টেররিস্ট ইউজ অব কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস (Toxic Terror: Assessing Terrorist Use of Chemical and Biological Weapons)-এ দেখিয়েছেন যে, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস ও জীবাণু ব্যবহারের প্রচেষ্টা বহু দশকের পুরনো (Tucker, 2000)। তবে রাসায়নিক ও জৈব এজেন্টের বাস্তব প্রয়োগ যে কতটা জটিল, তার প্রমাণ মেলে ইতিহাসের কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনায়।
রাসায়নিক অস্ত্রের আধুনিক ব্যবহারের সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ হলো ১৯৯৫ সালে জাপানের টোকিও পাতাল রেলে সংঘটিত সারিন গ্যাস আক্রমণ। এই হামলার পেছনে ছিল অউম শিনরিকিও (Aum Shinrikyo) নামের একটি চরমপন্থী দল, যাদের বিপুল আর্থিক সম্পদ এবং রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানীদের একটি দল ছিল। গবেষক অমি স্মিথসন (Amy E. Smithson) তার মনোগ্রাফ অ্যাট এনি কস্ট: হাউ অউম শিনরিকিও প্রডিউসড অ্যান্ড ডেপ্লয়েড কেমিক্যাল ওয়েপনস (At Any Cost: How Aum Shinrikyo Produced and Deployed Chemical Weapons)-এ বিস্তারিত নথিভুক্ত করেছেন কীভাবে দলটি শত কোটি ডলার খরচ করে নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে সারিন গ্যাস উৎপাদন করেছিল (Smithson, 2000)। তারা টোকিওর ব্যস্ত পাতাল রেলে ব্যাগে করে তরল সারিন নিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেট ফুটো করে ছড়িয়ে দেয়। এতে ১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ছয় হাজার মানুষ বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনার গভীর বিশ্লেষণ একটি চমকপ্রদ সত্য উন্মোচন করে। অউম শিনরিকিও দলের উদ্দেশ্য ছিল লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা, কিন্তু বাস্তবে তাদের তৈরি সারিনের বিশুদ্ধতার অভাব এবং কার্যকর স্প্রে করার প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে প্রাণহানির সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ রবার্ট ব্লিৎজার (Robert Blitzer) এফবিআই-এর সন্ত্রাসবিরোধী অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছেন যে, বিষাক্ত উপাদান তৈরি করা এক জিনিস, আর তা বাতাসে নিখুঁতভাবে অ্যারোসল আকারে ছড়িয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত জটিল একটি কারিগরি বিদ্যা (Blitzer, 1999)। বাতাসে আর্দ্রতার তারতম্য, বাতাসের গতি এবং সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে বেশিরভাগ রাসায়নিক ও জৈব উপাদান খুব দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
একই সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে জৈব সন্ত্রাসের ক্ষেত্রেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর হামলার পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সিনেটরের কার্যালয়ে পাঠানো অ্যানথ্রাক্স গুঁড়াযুক্ত চিঠির ঘটনা সারা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক রোনাল্ড অ্যাটলাস (Ronald M. Atlas) জৈব নিরাপত্তার ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখান যে, অ্যানথ্রাক্সের মতো সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া চাষ করা কঠিন না হলেও তাকে সঠিক মাইক্রোন সাইজের গুঁড়ায় রূপান্তর করা অত্যন্ত জটিল এবং বিপজ্জনক কাজ (Atlas, 2002)। সামান্য ভুল হলেই প্রস্তুতকারীর নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। ফলে চরমপন্থী দলগুলোর প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্রকে কার্যকরভাবে অস্ত্রায়ন করা তাদের জন্য এক বিশাল প্রযুক্তিগত বাধা হিসেবেই রয়ে গেছে।
পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় হুমকি: নোংরা বোমা বনাম বিভাজন অস্ত্র (Nuclear and Radiological Threats: Dirty Bombs versus Fissile Devices)
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে চরম এবং ধ্বংসাত্মক দৃশ্যপট হলো পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার। তাত্ত্বিকভাবে এই হুমকিকে দুটি স্বতন্ত্র ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হলো প্রকৃত পারমাণবিক বিভাজন বা ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো, যাকে বলা হয় অশোধিত পারমাণবিক অস্ত্র (Improvised Nuclear Device)। দ্বিতীয়টি হলো প্রচলিত বিস্ফোরকের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য যুক্ত করে তৈরি করা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ যন্ত্র (Radiological Dispersal Device), যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘নোংরা বোমা’ বা ডার্টি বম্ব নামে পরিচিত। নিউক্লিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ বান (Matthew Bunn) তার বার্ষিক প্রতিবেদন সিরিজ সিকিউরিং দ্য বম্ব (Securing the Bomb)-এ দেখিয়েছেন যে, এই দুই ধরনের অস্ত্রের প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং প্রভাবের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে (Bunn, 2010)।
একটি প্রকৃত পারমাণবিক বোমা তৈরি করা যেকোনো অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর জন্য প্রায় অসম্ভব একটি বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। এর জন্য প্রয়োজন হয় অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (Highly Enriched Uranium) অথবা প্লুটোনিয়াম, যা কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রিঅ্যাক্টর বা সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্টেই তৈরি হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানী এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক চার্লস ফার্গুসন (Charles D. Ferguson) ও উইলিয়াম পটার (William C. Potter) তাদের সমন্বিত গবেষণাগ্রন্থ দ্য ফোর ফেসেস অব নিউক্লিয়ার টেররিজম (The Four Faces of Nuclear Terrorism)-এ উল্লেখ করেছেন যে, কোনো সন্ত্রাসী দলের পক্ষে শুরু থেকে পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধ করা কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব (Ferguson & Potter, 2005)। তবে তাদের মূল ঝুঁকিটি তৈরি হয় কোনো অস্থিতিশীল পারমাণবিক রাষ্ট্রের অরক্ষিত সামরিক মজুত থেকে তৈরি বোমা চুরি হওয়া বা ব্ল্যাক মার্কেটের মাধ্যমে ফিশন উপাদান সংগ্রহের সম্ভাবনা থেকে।
অন্যদিকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ যন্ত্র বা নোংরা বোমার প্রযুক্তিগত বাধা অনেক কম। এই ধরনের অস্ত্রের উদ্দেশ্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো নয়, বরং প্রচলিত ডিনামাইট বা আরডিএক্স ফাটিয়ে তেজস্ক্রিয় উপাদান চারপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে দেওয়া। হাসপাতালগুলোর রেডিওথেরাপি ইউনিট, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ল্যাব কিংবা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ যেমন – সিজিয়াম-১৩৭, কোবাল্ট-৬০ বা স্ট্রনশিয়াম-৯০ তুলনামূলক কম সুরক্ষায় সংরক্ষিত থাকে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকেল লেভি (Michael A. Levi) তার গবেষণাগ্রন্থ অন নিউক্লিয়ার টেররিজম (On Nuclear Terrorism)-এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, নোংরা বোমার ফলে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণে হয়তো সীমিতসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হবে, কিন্তু তেজস্ক্রিয় ধূলিকণার দূষণের কারণে একটি পুরো শহরের অর্থনৈতিক কার্যক্রম কয়েক মাসের জন্য স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে (Levi, 2007)।
তেজস্ক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের মূল প্রভাবটি তাই শারীরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক। একটি শহরের কেন্দ্রস্থলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লে সেখানে যে ভয় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া যেকোনো প্রশাসনের জন্য কঠিন। সেই অঞ্চলকে তেজস্ক্রিয়তামুক্ত করতে যে কোটি কোটি ডলার খরচ হবে এবং আবাসন ও বাণিজ্যের যে ক্ষতি হবে, তা কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ক্ষতির চেয়ে কম নয়। চরমপন্থী সংগঠনগুলো এই বাস্তবতাকে খুব ভালো করেই জানে। তাই প্রকৃত পারমাণবিক বোমা অর্জনে ব্যর্থ হলেও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ হস্তগত করে একটি সমাজে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষত তৈরি করাই তাদের আধুনিক কৌশলগত পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, হস্তান্তর ও চোরাচালান চক্র (Technological Barriers, Proliferation and Illicit Smuggling Networks)
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ত্রাসবাদী ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের বিপরীতে এই অস্ত্র তৈরির বাস্তব প্রকৌশলগত দিকগুলো খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাগারে একটি বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়া তৈরি করা বা রাসায়নিক ফর্মুলা উদ্ধার করার সঙ্গে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য করার প্রক্রিয়ায় শত শত প্রযুক্তিগত বাধা রয়েছে। একে বলা হয় অস্ত্রায়ন প্রযুক্তি (Weaponization Technology)। বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডেভিড ওলব্রাইট (David Albright) তার গভীর অনুসন্ধানী গ্রন্থ পেডলিং পেরিল: হাউ দ্য সিক্রেট নিউক্লিয়ার ট্রেড আর্মড আওয়ার এনিমিস (Peddling Peril: How the Secret Nuclear Trade Armed Our Enemies)-এ তুলে ধরেছেন যে, পারমাণবিক উপাদান চোরাচালান চক্রগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নজরদারির মুখে ভেঙে পড়ে (Albright, 2010)। একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট মেকানিজম তৈরি করা কয়েকজন উগ্রপন্থীর পক্ষে গোপনে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-এর দশকে একটি বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলের অরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকে অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল এবং বেকার হয়ে পড়া বিজ্ঞানীরা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের হাতে চলে যেতে পারেন। এই ঘটনাকে নিরাপত্তা তত্ত্বে ব্রেন ড্রেন ঝুঁকি (Brain Drain Risk) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নিউক্লিয়ার গবেষক মর্টেন ব্রেমার মায়ের্লি (Morten Bremer Mærli) পারমাণবিক চোরাচালানের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে দেখান যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তথাকথিত ‘রেড মার্কারি’ বা পারমাণবিক বোমার উপাদানের নামে বহু ভুয়া ও প্রতারণামূলক লেনদেন ঘটেছে (Mærli, 2001)। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র বা ছদ্মবেশী গোয়েন্দা সংস্থার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়েছে।
তাছাড়া রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রের ক্ষেত্রেও দ্বিমুখী প্রযুক্তি (Dual-Use Technology) নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হয়েছে। যেসব ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম বা রাসায়নিক কাঁচামাল কীটনাশক বা ওষুধ তৈরির জন্য ব্যবহার করা যায়, সেগুলোর আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি এখন কড়া নজরদারির আওতায় থাকে। আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞ জোনাথন টাকার (Jonathan B. Tucker) তার রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ঐতিহাসিক মূল্যায়নে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক নজরদারির কারণে কোনো সংগঠন বিপুল পরিমাণে পূর্বসূরি বা প্রিকারসার রাসায়নিক সংগ্রহ করতে গেলেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা বেজে ওঠে (Tucker, 2010)।
বাস্তবতার এই দিকটি এটা নির্দেশ করে যে, একটি অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর পক্ষে একক প্রচেষ্টায় গণবিধ্বংসী অস্ত্রের পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করা অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত জটিল। কোনো একটি দুর্বল রাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা বা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদি দলীয় সম্পৃক্ততা ছাড়া এই ধরনের অস্ত্রের সামরিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে চোরাচালানের পথগুলো বন্ধ করা এবং সংবেদনশীল দ্বিমুখী প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে কঠোর পর্যবেক্ষণ বজায় রাখাই এই ধরনের অপ্রচলিত হুমকি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
কৌশলগত অভিপ্রায় ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব (Strategic Intent and Psychological Dimensions of WMD Use)
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কেন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল প্রযুক্তির পেছনে ছোটে, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্যের গভীরে প্রবেশ করেছেন। ঐতিহ্যবাহী প্রতিরোধ তত্ত্বে রাষ্ট্রগুলো গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুত করে আত্মরক্ষার স্বার্থে, যাতে শত্রু পক্ষ আক্রমণ করার সাহস না পায়। কিন্তু অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা রক্ষার মতো সার্বভৌম ভূখণ্ড থাকে না। ফলে তাদের উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা নয়, বরং ধ্বংসের মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দেওয়া। সন্ত্রাসবাদ ও অপ্রচলিত অস্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা গবেষক গ্যারি অ্যাকারম্যান (Gary Ackerman) দেখিয়েছেন যে, চরমপন্থী দলগুলোর মধ্যে অস্ত্র ব্যবহারের প্রণোদনা নির্ভর করে তাদের চরম মতাদর্শ এবং নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থানে এক বিশাল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার ওপর (Ackerman, 2003)।
রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী জেরল্ড পোস্ট (Jerrold M. Post) তার তাত্ত্বিক কাজ দ্য মাইন্ড অব দ্য টেররিস্ট (The Mind of the Terrorist)-এ চরমপন্থী নেতাদের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন (Post, 2007)। তিনি দেখিয়েছেন যে, যেসব দল বিশ্বাস করে তারা এক চূড়ান্ত অস্তিত্বের লড়াইয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে গণবিধ্বংসী অস্ত্র সংগ্রহের তীব্র ইচ্ছা তৈরি হয়। প্রচলিত আক্রমণ করে যখন সাধারণ রাজনৈতিক লক্ষ্য আদায় হয় না, তখন তারা এক ধরনের সর্বগ্রাসী অভিপ্রায় (Existential Intent) গ্রহণ করে। তারা মনে করে, লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন করে রাষ্ট্রকে যদি এক চরম সংকটের মুখে ফেলা যায়, তবেই কেবল তাদের মতাদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল, যাকে বলা হয় গণমনস্তাত্ত্বিক পক্ষাঘাত (Mass Psychological Paralysis)। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক অ্যাডাম ডোলনিক (Adam Dolnik) চরমপন্থীদের কৌশলগত উদ্ভাবন নিয়ে রচিত গ্রন্থ আন্ডারস্ট্যান্ডিং টেররিস্ট ইনোভেশন: টেকনোলজি, ট্যাকটিকস অ্যান্ড গ্লোবাল ট্রেন্ডস (Understanding Terrorist Innovation: Technology, Tactics and Global Trends)-এ বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে অস্ত্রের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে ভয়ের তীব্রতা বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায় (Dolnik, 2007)। সাধারণ বন্দুকযুদ্ধ বা প্রচলিত বোমায় মানুষ মারা গেলে সমাজ একভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু যদি বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে বা খাবারে মারাত্মক জীবাণু মিশিয়ে আক্রমণ করা হয়, তবে সমাজের মানুষ নিরাপত্তাহীনতার এক চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
এই মনস্তাত্ত্বিক ভয় মানুষকে নিজ রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যকারিতার ওপর থেকে পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে বাধ্য করে। মানুষ তখন ঘরের বাতাস নিতে ভয় পায়, সরবরাহ করা জল পান করতে দ্বিধাবোধ করে এবং প্রতিটি অপরিচিত বস্তুকে প্রাণঘাতী মনে করতে থাকে। সমাজ যখন এই ধরনের অন্ধ ভীতি ও সন্দেহের কবলে পড়ে, তখন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক লেনদেন, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সামাজিক গতিশীলতা স্থবির হয়ে যায়। আধুনিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্যই হলো এই ভয়কে পুঁজি করে রাষ্ট্রের কাঠামোকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়া। অস্ত্রের বাস্তব কার্যকারিতার চেয়েও এই অদৃশ্য ভয়ের প্রভাব অনেক বেশি বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে।
প্রতিরোধ নীতি, নিরস্ত্রীকরণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্থাপত্য (Deterrence, Non-Proliferation and International Security Architecture)
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ত্রাসবাদী ব্যবহারের ঝুঁকি আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ ও নিরাপত্তা স্থাপত্যকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে বাধ্য করেছে। স্নায়ুযুদ্ধকালীন পারমাণবিক কৌশল গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস (Mutually Assured Destruction) বা ম্যাড তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে। সেখানে দুই পরাশক্তি জানত যে এক পক্ষ আক্রমণ করলে অন্য পক্ষ এমন পাল্টা আঘাত হানবে যাতে উভয়েরই বিনাশ ঘটবে। কিন্তু এই প্রতিরোধ নীতি আত্মঘাতী মনোভাবাপন্ন কোনো চরমপন্থী নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অচল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ লরেন্স ফ্রিডম্যান (Lawrence Freedman) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ডিটারেন্স (Deterrence)-এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, যার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ঠিকানা নেই এবং যে নিজের জীবনের বিনাশকেই চূড়ান্ত সাফল্য মনে করে, তাকে পাল্টা আক্রমণের ভয় দেখিয়ে আটকে রাখা যায় না (Freedman, 2004)।
এই কারণে প্রথাগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার বদলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জোর দিয়েছে আগাম প্রতিরোধ এবং উপাদান নিয়ন্ত্রণের ওপর। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ২০০৪ সালে সর্বসম্মতভাবে নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাব ১৫৪০ (UN Security Council Resolution 1540) গ্রহণ করে (United Nations Security Council, 2004)। এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবের অধীনে বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রের জন্য সিবিআরএন উপাদান, তাদের ডেলিভারি সিস্টেম এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর কাছে তা পৌঁছানো রোধ করতে কঠোর জাতীয় আইন প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া প্রসারণ-রোধ নিরাপত্তা উদ্যোগ (Proliferation Security Initiative) আন্তর্জাতিক জলসীমায় এবং আকাশপথে সন্দেহভাজন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের চালান তল্লাশি ও জব্দের আইনি ও কৌশলগত পথ তৈরি করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্কট সেগান (Scott D. Sagan) পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর দুর্ঘটনা ও অব্যবস্থাপনার ঝুঁকি নিয়ে তার ক্লাসিক গ্রন্থ দ্য লিমিটস অব সেফটি: অর্গানাইজেশনস, অনসাইট নিউক্লিয়ার পাওয়ার অ্যান্ড দ্য রিস্কস অব অ্যাক্সিডেন্ট (The Limits of Safety)-এ উল্লেখ করেছেন যে, কেবল বহিরাগত আক্রমণ ঠেকানোই যথেষ্ট নয়, বরং পারমাণবিক ও রাসায়নিক স্থাপনাগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করাও চরমপন্থা প্রতিরোধের অন্যতম পূর্বশর্ত (Sagan, 1993)। অসন্তুষ্ট কর্মচারী, অবহেলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা অভ্যন্তরীণ ঘুষ লেনদেনের সুযোগ নিয়ে চরমপন্থীরা বিপজ্জনক উপাদানে হাত দিতে পারে। ফলে বিশ্বব্যাপী সিবিআরএন সুরক্ষাকে একটি ত্রুটিহীন সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই বহুমুখী নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে একযোগে কাজ করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা ওপিসিডব্লিউ-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পরিদর্শনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রযুক্তিগত নজরদারির পরেও চূড়ান্ত নিরাপত্তা নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছা এবং গোয়েন্দা তথ্যের সার্বক্ষণিক আদান-প্রদানের ওপর। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি তাই কোনো একক দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটা পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের রক্ষার এক সার্বজনীন সংগ্রাম। প্রযুক্তির অন্ধকার দিককে নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জালকে নিশ্ছিদ্র করেই কেবল এই ভয়াবহ কৌশলগত বিপর্যয় থেকে মানবসমাজকে রক্ষা করা সম্ভব।
সন্ত্রাসবাদের সমাজতত্ত্ব (Sociology of Terrorism): সমাজ, পরিচয় ও উগ্রায়ন
সন্ত্রাসবাদের সমাজতাত্ত্বিক পাঠ ও তাত্ত্বিক ভিত্তি (Sociological Approaches and Theoretical Foundations of Terrorism)
সন্ত্রাসবাদকে বহু বছর ধরে কেবল রাজনৈতিক চক্রান্ত বা কোনো ব্যক্তির বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হতো। তবে বিশ শতকের শেষ ভাগে সমাজবিজ্ঞানীরা দেখাতে শুরু করেন যে, কোনো মানুষ শূন্য থেকে হঠাৎ করে চরমপন্থী হয়ে ওঠে না। তার পেছনে কাজ করে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপট, প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন এবং সমষ্টিগত পরিচয়ের সংকট। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসবাদ হলো সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংঘাতের একটি চরম বহিঃপ্রকাশ। প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক অস্টিন টার্ক (Austin T. Turk) তার মৌলিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সন্ত্রাসবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটা মূলত রাষ্ট্র ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক গোষ্ঠীর এক ধরনের সহিংস প্রতিক্রিয়া (Turk, 1982)। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন কিছু সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সমাজবিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করেন কেন সমাজের একটি অংশ সেই সহিংস পথ বেছে নিতে বাধ্য বোধ করল।
সমাজতত্ত্বের ধ্রুপদী তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলো থেকে সন্ত্রাসবাদের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা কাঠামোগত এবং প্রক্রিয়াগত উভয় দিককেই সামনে এনেছেন। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খাইম (Émile Durkheim)-এর সামাজিক সংহতি এবং সংহতিহীনতার ধারণা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক (Durkheim, 1893/1997)। একটি সমাজ যখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার সনাতন মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে এবং নতুন কোনো সুদৃঢ় কাঠামো গড়ে ওঠে না। এই রূপান্তরকালীন অস্থিরতায় মানুষ তার আত্মপরিচয় ও সামাজিক নোঙর হারিয়ে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানী আলবার্ট বার্গেসেন (Albert Bergesen) এবং ওমার লিজার্ডো (Omar Lizardo) বিশ্ব-ব্যবস্থা ও সন্ত্রাসবাদের আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তুলে ধরেন যে, বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের অভিঘাত কীভাবে আঞ্চলিক স্তরে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও চরমপন্থাকে উসকে দেয় (Bergesen & Lizardo, 2004)।
একই সাথে সংঘাত তত্ত্বের আলোকে সমাজবিজ্ঞানীরা ক্ষমতা ও সম্পদের অসম বণ্টনকে সন্ত্রাসবাদের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যার হাতে রয়েছে বলপ্রয়োগের বৈধ একচেটিয়া অধিকার (Weber, 1919/1946)। সমাজতত্ত্ববিদরা দেখান যে, যখন কোনো সামাজিক বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মনে করে রাষ্ট্রের এই বলপ্রয়োগের প্রক্রিয়াটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং তাদের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন সেই বৈধতার সংকট থেকেই বিকল্প সহিংসতার ভিত্তি তৈরি হয়। সুতরাং, সমাজতাত্ত্বিক পাঠে কোনো ব্যক্তিকে খলনায়ক বা উন্মাদ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেয়ে তার পেছনের সামাজিক চালিকাশক্তিগুলোকে উন্মোচন করাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সন্ত্রাসবাদের সমাজতত্ত্ব কোনো সরল একমাত্রিক ব্যাখ্যা দেয় না। এটা ব্যক্তি, দল এবং বৃহত্তর সমাজকাঠামোর জটিল পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝা যায় কীভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয় এবং রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন একত্রিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সহিংসতার দিকে ধাবিত করে। এই কারণেই সমকালীন নিরাপত্তা গবেষণায় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ এক অপরিহার্য স্থান দখল করে নিয়েছে।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অ্যানোমি ও কাঠামোবদ্ধ বঞ্চনা (Social Alienation, Anomie and Structural Grievances)
একটি সমাজে যখন ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তার অর্জনের বাস্তব সুযোগের আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়, তখন সেখানে গভীর অসন্তোষের জন্ম নেয়। এই পরিস্থিতিকে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে মার্টন (Robert K. Merton) তার বিখ্যাত স্ট্রেন তত্ত্ব (Strain Theory)-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন (Merton, 1938)। মার্টনের মতে, সমাজ মানুষকে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের স্বপ্ন দেখায়, যেমন অর্থনৈতিক সাফল্য বা সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ উপায় – যেমন ভালো শিক্ষা, উপযুক্ত কর্মসংস্থান বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব – সমাজের সব মানুষের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকে না। ফলে যাদের সামনে বৈধ পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তারা লক্ষ্য অর্জনের জন্য বা বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে অবৈাধ ও সহিংস পথ বেছে নেয়। এই অবস্থাকে সমাজতত্ত্বে অ্যানোমি (Anomie) বা আদর্শহীনতা বলা হয়।
কাঠামোবদ্ধ এই বঞ্চনার অনুভূতি যখন ব্যক্তিগত পর্যায় ছাড়িয়ে সমষ্টিগত রূপ নেয়, তখন তা চরমপন্থার রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিক টেড রবার্ট গার (Ted Robert Gurr) তার ধ্রুপদী গ্রন্থ হোয়াই মেন রেবেল (Why Men Rebel)-এ আপেক্ষিক বঞ্চনা তত্ত্ব (Relative Deprivation Theory) প্রস্তাব করেন (Gurr, 1970)। গারের মতে, মানুষ কেবল চরম দারিদ্র্যের কারণে বিদ্রোহ বা সহিংসতায় জড়ায় না; বরং তারা সহিংস হয়ে ওঠে যখন দেখে যে তাদের প্রাপ্য অধিকার বা সুযোগগুলো অন্য কেউ অন্যায্যভাবে ভোগ করছে। নিজেদের অবস্থানের সঙ্গে অন্যদের অনুকূল অবস্থানের এই তুলনামূলক বৈষম্যই মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
আধুনিক সমাজে এই ধরনের বঞ্চনা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানী জেফ্রি পোর্টার (Jeffery M. Paige) গ্রামীণ সমাজকাঠামো ও কৃষক বিদ্রোহের ওপর কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঠেলে দেয় (Paige, 1975)। কোনো সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে গণতান্ত্রিক বা শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের দাবি আদায় করা সম্ভব নয়, তখন তাদের কাছে সহিংসতাই বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার একমাত্র কার্যকর উপায় মনে হতে থাকে।
এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। যখন তরুণরা নিজেদের পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে, তখন তারা এমন এক শূন্যতার মুখে পড়ে যা তাদের মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নাজুক করে তোলে। সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, চরমপন্থী সংগঠনগুলো ঠিক এই বিচ্ছিন্ন ও দিকভ্রান্ত তরুণদের টার্গেট করে। তারা এই তরুণদের সামনে একটি কৃত্রিম পরিচয় এবং মর্যাদার হাতছানি তুলে ধরে, যা তাদের বিচ্ছিন্নতার গ্লানি মুছে দিয়ে এক কাল্পনিক বীরত্বের বোধে উদ্দীপ্ত করে।
পরিচয় সংকট, সামাজিক বন্ধন ও ইন-গ্রুপ ডায়নামিক্স (Identity Crisis, Social Bonds and In-Group Dynamics)
মানুষের আত্মপরিচয় কোনো স্থির বিষয় নয়, বরং এটা গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ এবং পারিপার্শ্বিক মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। যখন কোনো ব্যক্তি আধুনিকায়নের চাপে বা অভিবাসনের কারণে তার পুরনো সামাজিক শিকড় হারিয়ে ফেলে, তখন তার মধ্যে তীব্র পরিচয় সংকট (Identity Crisis) তৈরি হয়। সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাইফেল (Henri Tajfel) এবং জন টার্নার (John C. Turner) উদ্ভাবিত সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব (Social Identity Theory) দেখায় যে, মানুষ সবসময় কোনো না কোনো দলের সদস্য হয়ে নিজের আত্মমর্যাদা বাড়াতে চায় (Tajfel & Turner, 1979)। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি নিজের দলকে বলে ইন-গ্রুপ (In-Group) এবং দলের বাইরের মানুষকে গণ্য করে আউট-গ্রুপ (Out-Group) হিসেবে।
চরমপন্থী সংগঠনগুলোতে এই ইন-গ্রুপ ডায়নামিক্স অত্যন্ত তীব্র রূপ ধারণ করে। সমাজতাত্ত্বিক ট্র্যাভিস হির্শি (Travis Hirschi) তার সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব (Social Control Theory)-এ ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, প্রচলিত সমাজকাঠামো, পরিবার, বিদ্যালয় ও কর্মস্থলের সঙ্গে মানুষের চারটি বন্ধন থাকে – সংযুক্তি, প্রতিশ্রুতি, সম্পৃক্ততা ও বিশ্বাস (Hirschi, 1969)। যখন এই সামাজিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যায়, তখন মানুষ খুব সহজেই বিচ্যুত আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তখন প্রচলিত সমাজের বিকল্প হিসেবে এক নতুন কৃত্রিম পরিবারের ভূমিকা নেয়। সেখানে নতুন সদস্যকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়, যা তার মনের দীর্ঘদিনের একাকীত্ব ও হীনম্মন্যতা দূর করে দেয়।
দলের ভেতরে এই সংহতি যত গভীর হয়, বাইরের পৃথিবীর প্রতি শত্রুভাবাপন্নতা তত বাড়তে থাকে। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম গ্রাহাম সামনার (William Graham Sumner) উনবিংশ শতাব্দীর শেষেই দলগত আত্মকেন্দ্রিকতা বা এথনোসেন্ট্রিজম (Ethnocentrism)-এর ধারণা দিয়েছিলেন, যেখানে নিজের দলকে কেন্দ্রবিন্দু মনে করে বাকি সবাইকে তাচ্ছিল্য বা সন্দেহের চোখে দেখা হয় (Sumner, 1906)। চরমপন্থী গোষ্ঠীর ভেতর এই বিভাজনকে এমন এক মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয় যে, আউট-গ্রুপের মানুষদের মানুষ হিসেবে গণ্য করাই বন্ধ হয়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন ডেসোশিয়ালাইজেশন (Desocialization), যেখানে পূর্বের সমস্ত সামাজিক মূল্যবোধ মুছে ফেলে দলের চরমপন্থী নিয়মাবলীকে একমাত্র সত্যি বলে গ্রহণ করা হয়।
এই দলগত গতিশীলতায় পিয়ার প্রেশার বা সমবয়সীদের পারস্পরিক প্রভাব এক বিশাল ভূমিকা রাখে। প্রায়শই দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি একা চরমপন্থী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়নি; বরং তার ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের মাধ্যমে সে দলে প্রবেশ করেছে। দলের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করার এক ধরনের তীব্র সামাজিক তাগিদ তৈরি হয়। সদস্যদের মধ্যে গড়ে ওঠা এই অন্ধ ভ্রাতৃত্ববোধ তাদের এমন সব ভয়াবহ অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা হয়তো একা একজন মানুষ হিসেবে সে কখনোই করার কথা ভাবতে পারত না।
সামাজিক আন্দোলন তত্ত্ব ও রাজনৈতিক সুযোগের রূপরেখা (Social Movement Theory and Political Opportunity Structures)
সন্ত্রাসবাদকে কেবল কিছু অপরাধীর গোপন অপতৎপরতা হিসেবে না দেখে একে একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক আন্দোলন হিসেবে বিশ্লেষণ করার রেওয়াজ সমাজতত্ত্বে বেশ প্রভাবশালী। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী সিডনি টারো (Sidney Tarrow) তার বিখ্যাত গ্রন্থ পাওয়ার ইন মুভমেন্ট (Power in Movement)-এ দেখিয়েছেন যে, কীভাবে সামাজিক আন্দোলনগুলো নিজেদের শক্তি ও সুযোগের ওপর ভিত্তি করে অহিংস বিক্ষোভ থেকে সংঘাতময় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে (Tarrow, 1998)। চরমপন্থী সংগঠনগুলো শূন্যে ভেসে থাকা কোনো উপদল নয়; তারাও সমাজ থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে, কর্মী নিয়োগ করে এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
এই কাঠামোর অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক হলেন ডগ ম্যাকঅ্যাডাম (Doug McAdam), যিনি রাজনৈতিক সুযোগের কাঠামো (Political Opportunity Structure) তত্ত্বের বিস্তার ঘটিয়েছেন (McAdam, 1982)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্রে যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে ওঠে, প্রাতিষ্ঠানিক দমন ক্ষমতা হ্রাস পায় বা অভিজাত শ্রেণির মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়, তখন সুযোগ তৈরি হয় বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীর সংগঠিত হওয়ার। কিছু দল এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলে, আর কিছু উগ্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে দুর্বল দেখে সরাসরি সশস্ত্র পথ বেছে নেয়। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বাতাবরণ কতটা উন্মুক্ত বা বন্ধ, তার ওপর নির্ভর করে অসন্তোষের প্রকাশ কোন পথে ঘটবে।
একই সাথে সংঘাতের সমাজতত্ত্বে চার্লস টিলি (Charles Tilly)-র অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার গ্রন্থ দ্য পলিটিক্স অব কালেক্টিভ ভায়োলেন্স (The Politics of Collective Violence)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, সমষ্টিগত সহিংসতা কোনো অবাস্তব বা হঠকারী আচরণ নয়; বরং এটা ক্ষমতা ও সম্পদ আদায়ের একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল (Tilly, 2003)। টিলি এই সহিংস কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন রূপকে বর্ণনা করেছেন সংগ্রহমূলক কর্মকাণ্ডের ভাণ্ডার (Repertoire of Collective Action) হিসেবে। কোনো গোষ্ঠী যদি দেখে যে ধর্মঘট, মিছিল বা আইনি লড়াইয়ে কোনো ফল আসছে না, অথচ সহিংস হামলায় রাষ্ট্রের মনোযোগ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে, তখন তারা তাদের কৌশলগত ভাণ্ডারে সন্ত্রাসবাদকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
এর পাশাপাশি কাজ করে ফ্রেইমিং প্রক্রিয়া (Framing Processes), যা সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড স্নো (David A. Snow) এবং রবার্ট বেনফোর্ড (Robert D. Benford) বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Snow & Benford, 1988)। চরমপন্থী নেতারা সাধারণ ঘটনাগুলোকে এমন একটি আদর্শিক ফ্রেমে উপস্থাপন করে যাতে মনে হয় জনগোষ্ঠীটি এক বিরাট অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারা সমাজবাস্তবতাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যা সাধারণ মানুষকে বোঝায় যে, সহিংসতা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ খোলা নেই। এই ফ্রেইমিং সফল হলে সমাজের একটি অংশের মধ্যে চরমপন্থার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়, যা সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
কাল্টিশ গ্রুপ, সামাজিকীকরণ ও উগ্রায়নের সমাজতত্ত্ব (Cultish Groups, Socialization and Sociology of Radicalization)
উগ্রায়নের প্রক্রিয়াটি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো আকস্মিক মোড় পরিবর্তন নয়, বরং এটি এক ধারাবাহিক ও নিবিড় সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। সমাজবিজ্ঞানী লরেন ডসন (Lorne L. Dawson) চরমপন্থী ও ধর্মীয় কাল্টগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই দলগুলো তাদের সদস্যদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য একটি বন্ধ সামাজিক বলয় তৈরি করে (Dawson, 2010)। সাধারণ সমাজে একজন মানুষ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকে – পরিবার, বন্ধুমহল, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ। কিন্তু একটি কাল্ট সদৃশ উগ্রপন্থী দল তার সদস্যদের সমস্ত বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং দলকেই তাদের একমাত্র বাস্তবতায় পরিণত করে।
এই প্রক্রিয়ার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অলিভিয়ে রোয়া (Olivier Roy) সমকালীন উগ্রপন্থাকে বর্ণনা করেছেন এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। তার বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ হলো, আমরা যা দেখছি তা ধর্মের উগ্রায়ন নয়, বরং এটি হলো চরমপন্থার ইসলামায়ন (Islamization of Radicalism) বা চরমপন্থার ধর্মীয় রূপান্তর (Roy, 2004)। রয় তার গবেষণায় তুলে ধরেন যে, পশ্চিমা সমাজে বেড়ে ওঠা বহু তরুণ নিজেদের মূল শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কোনো প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ধারার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। তারা ধর্মকে কোনো গভীর আধ্যাত্মিক অনুশাসন হিসেবে শেখে না; বরং সমাজের ওপর নিজেদের ক্ষোভ ও বিদ্রোহ প্রকাশের জন্য এক ধরনের অতি-মৌলবাদী পরিচয় বেছে নেয়।
একই ধারাবাহিকতায় সমাজবিজ্ঞানী ফারহাদ খোসরোখাভার (Farhad Khosrokhavar) তার গবেষণামূলক কাজ ইনসাইড জিহাদিজম: আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোশ্যাল মুভমেন্টস অ্যান্ড সোশিওলোজিক্যাল মোটিভেশনস (Inside Jihadism: Understanding Social Movements and Sociological Motivations)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের আত্মঘাতী বীরত্বের আকুলতা তৈরি হয় (Khosrokhavar, 2009)। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের তরুণদের ওপর গবেষণা করে তিনি দেখান যে, বর্ণবাদ, বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎহীনতার মুখে পড়া তরুণরা চরমপন্থী মতাদর্শের ভেতরে এক ধরনের কৃত্রিম পরিত্রাণের খোঁজ পায়। তারা মনে করে, সমাজের চোখে ব্যর্থ বা নগণ্য হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে আত্মাহুতির মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক প্রভাব তৈরি করা অনেক বেশি অর্থবহ।
এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াটি সফল হয় কারণ চরমপন্থী সংগঠনগুলো মানুষের মৌলিক কিছু আবেগকে অত্যন্ত দক্ষভাবে পরিচালনা করে। তারা তরুণদের মনে অপরাধবোধ, পবিত্রতা এবং বিশেষ নির্বাচিত দলের সদস্য হওয়ার অহংকার ঢুকিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী জন লোফল্যান্ড (John Lofland) এবং রডনি স্টার্ক (Rodney Stark) ধর্মীয় রূপান্তরের ধ্রুপদী মডেলে দেখিয়েছিলেন যে, তীব্র মানসিক সংকট, ব্যক্তিগত বন্ধনের প্রভাব এবং বিকল্প সম্পর্কের অভাব একজন ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে মূলধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের বাসিন্দা বানিয়ে ফেলে (Lofland & Stark, 1965)। ফলে বাইরের সমাজের কাছে যাকে চরম বর্বরতা মনে হয়, সেই দলবদ্ধ সদস্যদের কাছে তা হয়ে ওঠে এক সুমহান সামাজিক দায়িত্ব।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া, মোরাল প্যানিক ও পাল্টা প্রভাব (Societal Responses, Moral Panic and Counter-Effects)
সন্ত্রাসবাদ কেবল সমাজের একটি অংশ থেকে জন্ম নেয় না; এটি ঘটার পর পুরো সমাজ কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানায়, তা সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন (Stanley Cohen) তার অবিস্মরণীয় গ্রন্থ ফোক ডেভিলস অ্যান্ড মোরাল প্যানিকস: দ্য ক্রিয়েশন অব দ্য মডস অ্যান্ড রকার্স (Folk Devils and Moral Panics: The Creation of the Mods and Rockers)-এ নৈতিক আতঙ্ক (Moral Panic) প্রত্যয়টি উদ্ভাবন করেন (Cohen, 1972)। কোহেনের মতে, যখন কোনো ঘটনা সমাজের স্থিতিশীলতা ও মূল্যবোধের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেটিকে অতিরঞ্জিত করে এমন এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে যেন পুরো সমাজ ধ্বংসের মুখে। এই প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সমাজের শত্রু বা লোকশয়তান (Folk Devils) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সন্ত্রাসবাদী হামলার পর এই ধরনের নৈতিক আতঙ্ক সমাজে এক বিপজ্জনক সামাজিক মেরুকরণ তৈরি করে। সমাজতাত্ত্বিক এরিখ গুড (Erich Goode) এবং নাচমান বেন-ইহুদা (Nachman Ben-Yehuda) তাদের যৌথ গ্রন্থ মোরাল প্যানিকস: দ্য সোশ্যাল কনস্ট্রাকশন অব ডেভিয়েন্স (Moral Panics: The Social Construction of Deviance)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এই আতঙ্ককে ব্যবহার করে কঠোর আইন প্রণয়ন ও নজরদারি বাড়ানোর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে (Goode & Ben-Yehuda, 1994)। কিন্তু এই ব্যবস্থার ফলে কোনো কোনো সময় নিরীহ বা নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষ সামাজিক সন্দেহের শিকার হয়। এই গণহারে সন্দেহপ্রবণতা সমাজের ভেতরে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা চরমপন্থীদের সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রকে আরও উর্বর করে তোলে।
এই প্রক্রিয়াকে অপরাধবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান তত্ত্ব লেবেলিং তত্ত্ব (Labeling Theory) দিয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সমাজবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড বেকার (Howard S. Becker) তার বিখ্যাত গ্রন্থ আউটসাইডার্স: স্টাডিজ ইন দ্য সোশিওলজি অব ডেভিয়েন্স (Outsiders: Studies in the Sociology of Deviance)-এ তুলে ধরেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না; সমাজ যখন তার ওপর কোনো নেতিবাচক তকমা এঁটে দেয়, তখন সে নিজেকে সেই তকমা অনুযায়ী ভাবতে শুরু করে (Becker, 1963)। যখন একটি পুরো জনগোষ্ঠী বা তাদের তরুণদের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন তারা মূল সমাজ থেকে নিজেদের আরও গুটিয়ে নেয়। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের ভেতরে থাকা ক্ষোভকে চূড়ান্ত রূপ দেয় এবং প্রকারান্তরে উগ্রপন্থার জালকেই শক্তিশালী করে।
অতএব, সন্ত্রাসবাদের সমাজতত্ত্ব আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। চরমপন্থা কোনো একক ঘটনা নয়, বরং এটা সমাজ, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির মধ্যকার এক নিরন্তর মিথস্ক্রিয়ার ফল। কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বা কাউকে খলনায়ক বানিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা অসম্ভব। সমাজকাঠামোর ভেতরের বৈষম্যগুলো দূর করা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সমাজের ভেতরে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই উগ্রায়নের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার একমাত্র টেকসই পথ।
সন্ত্রাসবাদের মনোবিজ্ঞান (Psychology of Terrorism): র্যাডিক্যালাইজেশন ও আচরণ
মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি: মানসিক অসুস্থতা বনাম স্বাভাবিকতার বিভ্রান্তি (Psychological Foundations: Psychopathology versus the Normality Paradigm)
সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রথম যে ধারণাটি আসে তা হলো – যে মানুষটি এমন নৃশংস কাজ করতে পারে, সে নিশ্চয়ই মানসিকভাবে অসুস্থ বা পাগল। বহু বছর ধরে অপরাধবিজ্ঞান ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির গবেষকরাও এই একই ধারণার বশবর্তী হয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট মানসিক রোগ বা জটিল ব্যক্তিত্বের ব্যাধি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দশকের নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন এবং সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার সন্ধান দিয়েছে। বিশিষ্ট সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানী জন হর্গান (John Horgan) তার আকর গ্রন্থ দ্য সাইকোলজি অব টেররিজম (The Psychology of Terrorism)-এ দেখিয়েছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সন্ত্রাসীর মধ্যে কোনো ধরনের ক্লিনিক্যাল মানসিক ব্যাধি বা উন্মাদনার লক্ষণ পাওয়া যায় না (Horgan, 2005)।
এই গবেষণার ফলাফল মনস্তাত্ত্বিকদের এক নতুন চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যাকে নিরাপত্তা তত্ত্বে স্বাভাবিকতার প্যারাডাইম (Normality Paradigm) বলা হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মনোবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু সিল্কে (Andrew Silke) সন্ত্রাসীদের মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করেন যে, সমাজের সাধারণ সুস্থ মানুষদের মতোই সন্ত্রাসীরা তাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বুঝতে পারে এবং অত্যন্ত সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় (Silke, 2003)। তারা কোনো তাৎক্ষণিক মানসিক বিভ্রান্তির শিকার হয়ে নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও যুক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জেরল্ড পোস্ট (Jerrold M. Post) মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন চরমপন্থী বন্দিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখিয়েছেন যে, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিরা আসলে কোনো চরমপন্থী সংগঠনের জন্য সম্পদ হওয়ার বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়ায় (Post, 2007)। কারণ তাদের আচরণ অননুমেয় হওয়ায় তারা যেকোনো সুপরিকল্পিত গোপন অপারেশনের গোপনীয়তা ফাঁস করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তিত্বের কিছু বিশেষ প্রবণতা বা বৈশিষ্ট্যকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেন না। মনোরোগ গবেষক জেফ ভিক্টরফ (Jeff Victoroff) সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক উৎস পর্যালোচনা করতে গিয়ে তুলে ধরেন যে, চরমপন্থীদের মধ্যে মানসিক রোগ না থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট স্বভাবগত ঝোঁক দেখা যায় (Victoroff, 2005)। যেমন – তীব্র রোমাঞ্চপ্রিয়তা, ঝুঁকি নেওয়ার অতিরিক্ত প্রবণতা, সমাজ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং নিজস্ব মূল্যহীনতার বোধ থেকে মুক্তির আকুলতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি সন্ত্রাসী বানায় না, কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ ও উসকানিমূলক মতাদর্শের সংস্পর্শে এলে তা সহিংস আচরণে রূপ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সন্ত্রাসবাদ কোনো মানসিক পাগলামির ফসল নয়, বরং এটা হলো সুস্থ মানুষের এক চরম অস্বাস্থ্যকর মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হওয়ার ফল। সাধারণ মানুষ কীভাবে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চরম নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডকে নিজের কাছে স্বাভাবিক ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, সেই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের রহস্য উন্মোচন করাই সমকালীন সন্ত্রাসবাদের মনোবিজ্ঞানের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
র্যাডিক্যালাইজেশনের মনস্তাত্ত্বিক ধাপ ও মডেল (Psychological Stages and Models of Radicalization)
কোনো ব্যক্তি একদিনে হঠাৎ করে চরমপন্থী হয়ে ওঠে না; এর পেছনে কাজ করে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। এই রূপান্তরকে নিরাপত্তা ও আচরণবিজ্ঞানে র্যাডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়া (Radicalization Process) বলা হয়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক ফথালি মোগাদ্দাম (Fathali M. Moghaddam) এই মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তার বিখ্যাত সন্ত্রাসবাদের সিঁড়ি মডেল (Staircase to Terrorism Model)-এর মাধ্যমে (Moghaddam, 2005)। মোগাদ্দামের মতে, এই রূপান্তরকে একটি বহুতল ভবনের সিঁড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায়। ভবনের নিচতলায় থাকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ, কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে যত ওপরের তলায় যাওয়া যায়, মানুষের সংখ্যা তত কমতে থাকে এবং সহিংসতার তীব্রতা বাড়তে থাকে।
মোগাদ্দামের মডেল অনুযায়ী, নিচতলায় থাকে মানুষের বস্তুগত সুযোগের অভাব এবং আপেক্ষিক বঞ্চনার অনুভূতি। যখন মানুষ মনে করে তার সমাজে ন্যায়বিচার নেই, তখন সে প্রথম তলায় ওঠে এবং প্রতিকারের উপায় খোঁজে। সেখানে বৈধ পথ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে সে নিজের ক্ষোভের জন্য কোনো বহিরাগত শত্রুকে দায়ী করে। তৃতীয় তলায় এসে ব্যক্তি চরমপন্থী মতাদর্শের সংস্পর্শে আসে এবং সহিংসতাকে একটি নৈতিক কর্তব্য হিসেবে দেখতে শুরু করে। চতুর্থ তলায় সে সরাসরি চরমপন্থী দলের ক্ষুদ্র সেলের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতায় পুরোপুরি আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সবশেষে পঞ্চম ও শীর্ষ তলায় পৌঁছে ব্যক্তি নিজেকে সমাজের সব প্রচলিত নৈতিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে ফেলে এবং আত্মঘাতী হামলা বা নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালাতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়।
এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন সমাজবিজ্ঞানী কুইন্টান উইকটোরোভিচ (Quintan Wiktorowicz)। তিনি ইসলামী চরমপন্থী আন্দোলনের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে জ্ঞানীয় উন্মোচন (Cognitive Opening) ধারণাটি প্রস্তাব করেন (Wiktorowicz, 2005)। ব্যক্তির জীবনে যখন কোনো বড় ধরনের ব্যক্তিগত সংকট, যেমন – চাকরি হারানো, ঘনিষ্ঠ কারো মৃত্যু বা চরম সামাজিক অবমাননার ঘটনা ঘটে, তখন তার প্রচলিত বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়। এই মানসিক ভঙ্গুর মুহূর্তে সে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজতে শুরু করে। এই সময়ে কোনো চরমপন্থী মতাদর্শের বার্তা তার মনের ভেতর খুব দ্রুত জায়গা করে নেয় এবং সে নিজেকে নতুন এক আত্মপরিচয়ে সাজাতে চায়।
একইভাবে গবেষক ক্লার্ক ম্যাককলি (Clark McCauley) এবং সোফিয়া মোসকালেঙ্কো (Sophia Moskalenko) তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ফ্রিকশন: হাউ র্যাডিকালাইজেশন হ্যাপেনস টু দেম অ্যান্ড আস (Friction: How Radicalization Happens to Them and Us)-এ দেখিয়েছেন যে, র্যাডিক্যালাইজেশন কোনো একমাত্রিক রাস্তা নয় (McCauley & Moskalenko, 2011)। তারা একে দ্বিমুখী পিরামিড মডেল (Two Pyramids Model) দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে মতাদর্শগত পরিবর্তন এবং বাস্তব কর্মতৎপরতা সবসময় সমান্তরালে চলে না। হাজার হাজার মানুষ হয়তো উগ্র মতাদর্শ মনে মনে সমর্থন করে, কিন্তু তাদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনই বাস্তবে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। মনস্তাত্ত্বিক এই ফিল্টারিং কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
মোরাল ডিসএনগেজমেন্ট ও শত্রু নির্মাণ (Moral Disengagement and Dehumanization of the Other)
যেকোনো সাধারণ মানুষের মনের ভেতরেই অপরের প্রতি সহানুভূতি এবং অহেতুক রক্তপাত এড়ানোর একটি প্রাকৃতিক সংবেদনশীলতা থাকে। কিন্তু একজন সন্ত্রাসী যখন নিরপরাধ মানুষ, এমনকি নারী ও শিশুদের ওপর হামলা চালায়, তখন সে এই স্বাভাবিক মানবিক অনুশোচনাকে কীভাবে দমিয়ে রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন প্রখ্যাত মার্কিন মনস্তাত্ত্বিক আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) তার অবিস্মরণীয় নৈতিক বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব (Moral Disengagement Theory)-এর মাধ্যমে (Bandura, 1999)। বান্দুরা দেখিয়েছেন যে, মানুষ এমন কিছু মানসিক কৌশল ব্যবহার করে যার মাধ্যমে সে নিজের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারে এবং নিজের কাজের জন্য কোনো অপরাধবোধ অনুভব করে না।
বান্দুরার মতে, এই নৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রধান হাতিয়ার হলো নৈতিক ন্যায্যতা প্রদান (Moral Justification) এবং শব্দের মারপ্যাঁচ (Euphemistic Labeling)। চরমপন্থীরা তাদের সহিংসতাকে কোনো অপরাধ হিসেবে দেখে না; বরং তারা দাবি করে যে তারা এক সুমহান উদ্দেশ্য বা নিপীড়িত মানবতার মুক্তির জন্য এই আত্মত্যাগ করছে। তারা হত্যাকাণ্ডের মতো সরাসরি শব্দ ব্যবহার না করে ‘শাস্তি প্রদান’, ‘পবিত্র দায়িত্ব পালন’ কিংবা ‘অপারেশন পরিচালনা’-এর মতো নিরীহ পরিভাষা ব্যবহার করে। এর ফলে কাজের প্রকৃত নৃশংসতা তাদের নিজেদের মনস্তত্ত্বের কাছে আড়াল হয়ে যায় এবং তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের কাজ চূড়ান্ত অর্থে প্রশংসনীয়।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে বিপজ্জনক যে মনস্তাত্ত্বিক কৌশলটি কাজ করে তা হলো ডিহিউম্যানাইজেশন (Dehumanization) বা প্রতিপক্ষের মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিম্বার্দো (Philip Zimbardo) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য লুসিফার ইফেক্ট: আন্ডারস্ট্যান্ডিং হাউ গুড পিপল টার্ন ইভিল (The Lucifer Effect: Understanding How Good People Turn Evil)-এ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে সাধারণ মানুষ পরিস্থিতির চাপে পড়ে শয়তানে রূপান্তরিত হয় (Zimbardo, 2007)। যখন কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠী বা শত্রুপক্ষকে কীট-পতঙ্গ, পশুর সমতুল্য বা অপবিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তাদের হত্যা করাকে আর মানুষ হত্যার মতো মনে হয় না।
এই প্রক্রিয়ায় আরও যুক্ত হয় দায়বদ্ধতার বিস্তার বা বিকেন্দ্রীকরণ। আত্মঘাতী হামলাকারী মনে করে সে কেবল একটি বড় দলের আদেশের অনুগত সৈনিক মাত্র, তাই কোনো ব্যক্তিগত পাপের দায় তার নয়। আবার দল মনে করে তারা কোনো এক বিমূর্ত ঐতিহাসিক বা ঐশ্বরিক নির্দেশের বাস্তবায়ন করছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের কোনো একক নৈতিক দায় কারো ওপর বর্তায় না। মনস্তাত্ত্বিক এই আত্মপ্রবঞ্চনার জাল একজন সচেতন মানুষকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় চরম অমানবিক আচরণ করার ক্ষমতা এনে দেয়।
তাৎপর্য সন্ধানের তত্ত্ব ও আত্মমর্যাদার তাড়না (Significance Quest Theory and the Drive for Self-Worth)
মানুষের মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো নিজের জীবনের একটি অর্থ ও তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া। মানুষ চায় সমাজ তাকে গুরুত্ব দিক, তাকে শ্রদ্ধা করুক এবং তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিক। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট মনস্তত্ত্ববিদ আরি ক্রুগলানস্কি (Arie W. Kruglanski) এবং তার সহযোগীরা সন্ত্রাসবাদের একটি সার্বজনীন মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হিসেবে তাৎপর্য সন্ধানের তত্ত্ব (Significance Quest Theory) উপস্থাপন করেন (Kruglanski et al., 2009)। তাদের মতে, যখন কোনো ব্যক্তি তীব্র অপমান, অবহেলা, সামাজিক ব্যর্থতা বা বৈষম্যের শিকার হয়ে নিজের আত্মমর্যাদা হারিয়ে ফেলে, তখন তার মনের ভেতরে সেই মর্যাদা ফিরে পাওয়ার এক তীব্র তৃষ্ণা তৈরি হয়।
চরমপন্থী সংগঠনগুলো মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাকে দারুণভাবে কাজে লাগায়। ক্রুগলানস্কি তার গবেষণাগ্রন্থ দ্য থ্রি এনস অব র্যাডিকালাইজেশন: নিডস, নেটওয়ার্কস, অ্যান্ড ন্যারেটিভস (The Three Ns of Radicalization: Needs, Networks, and Narratives)-এ দেখিয়েছেন যে, উগ্রায়ন ঘটে তিনটি উপাদানের মিথস্ক্রিয়ায় (Kruglanski et al., 2019)। প্রথমটি হলো আত্মমর্যাদার তীব্র প্রয়োজন বা নিড, দ্বিতীয়টি হলো একটি সহমর্মী সামাজিক যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক, এবং তৃতীয়টি হলো এমন একটি আদর্শিক আখ্যান বা ন্যারেটিভ যা দাবি করে যে একমাত্র আত্মাহুতি ও সহিংসতার মাধ্যমেই সমাজে সর্বোচ্চ বীরত্ব ও চিরস্থায়ী মর্যাদা অর্জন সম্ভব। সমাজের কাছে একজন ব্যর্থ ও অবহেলিত তরুণ চরমপন্থীদের আখ্যানে রাতারাতি একজন বীর যোদ্ধায় রূপান্তরিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
এই আত্মমর্যাদার তাগিদ মানুষকে জীবনের নিরাপত্তা বা বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক প্রবৃত্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী চালিকাশক্তি এনে দেয়। মনস্তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড ডেসি (Edward L. Deci) এবং রিচার্ড রায়ান (Richard M. Ryan) তাদের আত্ম-সংকল্প তত্ত্ব (Self-Determination Theory)-এ তুলে ধরেছিলেন যে, মানুষের আচরণ পরিচালিত হয় স্বায়ত্তশাসন, সক্ষমতা এবং সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা (Deci & Ryan, 2000)। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের সদস্যদের এমন একটি কৃত্রিম অনুভূতি দেয় যেখানে তারা মনে করে তারা এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারিগর। এই বিভ্রান্তিকর ক্ষমতায়ন তাদের মৃত্যুর ভয়কে তুচ্ছ করে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে বাধ্য করে।
তাছাড়া চরমপন্থা মানুষের মন থেকে জীবনের অনিশ্চয়তা দূর করে দেয়। ক্রুগলানস্কির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ধারণা হলো জ্ঞানীয় সমাপনী (Need for Cognitive Closure)। বাস্তব পৃথিবী জটিল ও বিভ্রান্তিকর; কিন্তু চরমপন্থী মতাদর্শ সবকিছুকে খুব সহজ সাদা-কালো সমীকরণে ফেলে দেয়। সেখানে স্পষ্ট করে বলা থাকে কে বন্ধু আর কে শত্রু, কী করা উচিত আর কী অনুচিত। এই সহজ ও দ্ব্যর্থহীন উত্তরের নিশ্চয়তা মানুষের মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে দেয়। ফলে তাৎপর্যের সন্ধান করতে গিয়ে মানুষ স্বেচ্ছায় চরম মতাদর্শের শৃঙ্খলাকে জড়িয়ে ধরে।
দলীয় গতিশীলতা, গ্রুপথিঙ্ক ও অন্ধ আনুগত্য (Group Dynamics, Groupthink and Blind Obedience)
সন্ত্রাসবাদের মনস্তত্ত্বে ব্যক্তির একক চিন্তার চেয়ে দলের সম্মিলিত গতিশীলতা অনেক সময় বহুগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একটি চরমপন্থী দল যখন বাইরের সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার ভেতরে এক রুদ্ধশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি হয়। প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আরভিং জেনিস (Irving L. Janis) এই দলগত বিভ্রান্তিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদ্ভাবন করেন গ্রুপথিঙ্ক (Groupthink) প্রত্যয়টি (Janis, 1972)। গ্রুপথিঙ্ক এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যেখানে দলের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার তাগিদে সদস্যরা নিজস্ব যুক্তি, নৈতিকতা ও ভিন্নমত প্রকাশ করা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। দলের নেতার সিদ্ধান্তকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অন্ধভাবে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হয়।
এই দলগত আবহে কোনো বিকল্প চিন্তার সুযোগ থাকে না। দলের সদস্যরা নিজেদের এক অজেয় ও সর্বশক্তিমান সত্তা মনে করতে শুরু করে। তারা বিশ্বাস করে তাদের নৈতিক উদ্দেশ্য এতই পবিত্র যে তাদের নেওয়া কোনো কৌশল ভুল হতে পারে না। সমাজ-মনোবিজ্ঞানী সলোমন অ্যাশ (Solomon E. Asch) তার ঐতিহাসিক গবেষণায় স্পষ্ট করেছিলেন কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের মুখে একজন মানুষ নিজের চোখের স্পষ্ট সত্যকেও অস্বীকার করে দলের ভুল মতকে মেনে নেয় (Asch, 1956)। চরমপন্থী সেলের ভেতরে এই সামাজিক সঙ্গতির চাপ এতটাই তীব্র হয় যে, কোনো সদস্যের মনে যদি সামান্যতম সংশয়ও জাগে, সে দলচ্যুত হওয়ার বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে তা চেপে রাখে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় কর্তৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের মনস্তত্ত্ব। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম (Stanley Milgram) তার যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ ওবিডিয়েন্স টু অথরিটি: অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল ভিউ (Obedience to Authority: An Experimental View)-এ দেখিয়েছেন যে, কোনো বৈধ বা প্রভাবশালী কর্তৃত্ব যখন নির্দেশ দেয়, তখন সাধারণ মানুষ চরম নিষ্ঠুর কাজ করতেও পিছপা হয় না (Milgram, 1974)। মিলগ্রামের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, সাধারণ সুস্থ মানুষ কেবল একজন পরিচালকের নির্দেশে অন্য একজন মানুষের ওপর প্রাণঘাতী বৈদ্যুতিক শক দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে। চরমপন্থী সংগঠনগুলোতে নেতাদের যে ক্যারিশম্যাটিক ও প্রায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তা অনুসারীদের যুক্তিহীন আনুগত্যের দিকে ঠেলে দেয়।
দলের ভেতরে তৈরি হওয়া এই তীব্র ভ্রাতৃত্ববোধ ও আনুগত্য সদস্যদের মধ্যে আত্মত্যাগের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে। একে অন্যের চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ও সাহসী প্রমাণ করার এই মানসিকতা দলের ভেতরের সিদ্ধান্তগুলোকে ক্রমশ আরও বেশি উগ্র ও সহিংস করে তোলে। একে মনস্তত্ত্বে বলা হয় গ্রুপ পোলারাইজেশন (Group Polarization)। একটি চরমপন্থী সেলের ভেতরে সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে এমন এক সম্মিলিত দানবীয় রূপ ধারণ করে যার সামনে ব্যক্তির স্বাধীন বিবেক পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।
মনস্তাত্ত্বিক ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া (Psychological De-radicalization and Disengagement Processes)
যেভাবে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ উগ্রায়নের পথে পা বাড়ায়, ঠিক তেমনিভাবে সেই পথ থেকে ফিরে আসার প্রক্রিয়াটিও সহজ নয়। এই ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদের মনোবিজ্ঞান দুটি ধারণাগত পার্থক্যের ওপর জোর দেয় – একটি হলো ডিসএনগেজমেন্ট (Disengagement) এবং অন্যটি হলো ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন (Deradicalization)। নরওয়ের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ টরে বোরগো (Tore Bjørgo) এবং জন হর্গান (John Horgan) তাদের সম্পাদিত গবেষণাগ্রন্থ লিভিং টেররিজম বাহাইন্ড: ইন্ডিভিজুয়াল অ্যান্ড কালেক্টিভ ডিসএনগেজমেন্ট (Leaving Terrorism Behind: Individual and Collective Disengagement)-এ এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করেছেন (Bjørgo & Horgan, 2009)। ডিসএনগেজমেন্ট হলো কেবল সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে শারীরিকভাবে সরে আসা, যেখানে মনের ভেতরের উগ্র বিশ্বাসটি হয়তো থেকেই যায়। অন্যদিকে ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন হলো ব্যক্তির মনোজগতে এক মৌলিক পরিবর্তন আনা, যার ফলে সে তার পূর্বের চরম মতাদর্শকে নিজেই বাতিল করে দেয়।
সন্ত্রাসীদের সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নিয়ে বিস্তৃত কাজ করেছেন জার্মান গবেষক ড্যানিয়েল কোহলার (Daniel Köhler)। তার গবেষণাগ্রন্থ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ডি-র্যাডিকালাইজেশন: পাথস অন অ্যান্ড অফ টেররিজম (Understanding Deradicalization: Paths on and off Terrorism)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, জোরপূর্বক বা কেবল কঠোর শাস্তির মাধ্যমে কারো মনের উগ্র বিশ্বাস উপড়ে ফেলা যায় না (Köhler, 2016)। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তির মনে যে আত্মমর্যাদার শূন্যতা বা পরিচয় সংকট ছিল, সেটিকে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক উপায়ে পূরণ করা। ব্যক্তি যখন দেখতে পায় যে সমাজের মূলধারায় ফিরে এলেও সে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেতে পারে, তখনই কেবল সে চরমপন্থী দলের বিষাক্ত মায়া কাটাতে সক্ষম হয়।
এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে চরমপন্থী দলের ভেতরের অসঙ্গতি ও ভণ্ডামিগুলো ব্যক্তির সামনে উন্মোচন করা। বহু চরমপন্থী একসময় উপলব্ধি করতে পারে যে তাদের নেতারা যেসব আদর্শের কথা বলেছিল, বাস্তবে তারা নিজেরাই স্বার্থপর ও দুর্নীতিগ্রস্ত। এই মনস্তাত্ত্বিক মোহভঙ্গকে গবেষকরা বলেন ডিসিলুশনমেন্ট (Disillusionment)। যখন কোনো সদস্যের মনে এই সন্দেহ তৈরি হয়, তখন সঠিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং এবং পরিবারের সহমর্মিতা তাকে মূল সমাজে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সবশেষে বলা যায়, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া কোনো বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য এক হাতিয়ার। কোনো মানুষকে চরমপন্থী আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়ে সে কোন মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে পড়ে এই অন্ধ গলিতে পা বাড়িয়েছিল তা খুঁজে বের করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি ব্যক্তির আত্মমর্যাদা রক্ষার সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ দূর করতে পারে, তবেই কেবল চরমপন্থার মানসিক ভিত্তিটি চিরতরে ধসিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের ইতিহাস (History of International Policing): বৈশ্বিক আইনপ্রয়োগের বিকাশ
আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের উৎপত্তি ও উনিশ শতকের প্রেক্ষাপট (Origins of International Policing and the 19th Century Context)
আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের ইতিহাস কোনো একক চুক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং এটা বিকশিত হয়েছে মানবসমাজের প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং অপরাধের ভৌগোলিক বিস্তার রোধের তাগিদ থেকে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে বাষ্পীয় ইঞ্জিন, রেলপথ এবং টেলিগ্রাফের দ্রুত প্রসার ঘটল, তখন মানুষের চলাচলের গতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেল। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি অপরাধীদের জন্যও এক দেশ থেকে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও পুলিশিং ইতিহাসের গবেষক ম্যাথিউ ডিফলেম (Mathieu Deflem) তার বিখ্যাত আকর গ্রন্থ পোলিসিং ওয়ার্ল্ড সোসাইটি: হিস্টোরিক্যাল ফাউন্ডেশনস অব ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ কোঅপারেশন (Policing World Society: Historical Foundations of International Police Cooperation)-এ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতার প্রথম তাগিদটি কোনো আন্তর্জাতিক আদর্শবাদ থেকে আসেনি, এসেছিল জাতীয় সীমানা পেরিয়ে যাওয়া অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনার বাস্তব প্রয়োজন থেকে (Deflem, 2002)।
সেই সময়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ধারণা। ওয়েস্টফালীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ তার সীমানার ভেতরে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী ছিল এবং অন্য কোনো দেশের পুলিশ বা তদন্তকারীকে নিজ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়াকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হতো। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ পিটার আন্দ্রেয়াস (Peter Andreas) এবং ইথান নাদেলম্যান (Ethan Nadelmann) তাদের যৌথ গবেষণাগ্রন্থ পোলিসিং দ্য গ্লোব: ক্রিমিনালাইজেশন অ্যান্ড ক্রাইম কন্ট্রোল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স (Policing the Globe: Criminalization and Crime Control in World Politics)-এ উল্লেখ করেছেন যে, শুরুর দিকে দ্বিপাক্ষিক স্তরে পুলিশ কর্মকর্তারা গোপনে ও অনানুষ্ঠানিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতেন (Andreas & Nadelmann, 2006)। কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই এক দেশের গোয়েন্দা অন্য দেশের সহকর্মীকে চিঠি পাঠিয়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে পলাতক অপরাধীর গতিবিধি সম্পর্কে সতর্ক করত।
এই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে জাল মুদ্রা তৈরি, নারী ও শিশু পাচার এবং আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রগুলোর বিস্তার ইউরোপীয় দেশগুলোকে এক জায়গায় বসতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যালকম অ্যান্ডারসন (Malcolm Anderson) তার গবেষণাগ্রন্থ পোলিসিং দ্য ওয়ার্ল্ড: ইন্টারপোল অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ কোঅপারেশন (Policing the World: Interpol and the Politics of International Police Cooperation)-এ তুলে ধরেন যে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ চুক্তি ও আইনি সহায়তার রূপরেখা খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়েছিল (Anderson, 1989)। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং একে অপরের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের কারণে বহু বছর ধরে কোনো সার্বজনীন আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
এর ফলে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। একদিকে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে সীমানা পার হয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারত, অন্যদিকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের জাতীয় সীমানার কাঁটাতারে এসে থমকে যেত। এই প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের একত্রিত হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করে, যা আধুনিক বৈশ্বিক আইনপ্রয়োগ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে।
নৈরাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই ও ১৮৯৮ সালের রোম সম্মেলন (The Anti-Anarchist Struggle and the 1898 Rome Conference)
আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতাকে ত্বরান্বিত করার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক সহিংসতা। বিশেষ করে নৈরাজ্যবাদী সন্ত্রাসবাদ (Anarchist Terrorism) সেই সময়ের ইউরোপীয় রাজতন্ত্র ও সরকারগুলোর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করত যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক স্তরবিন্যাসকে ভেঙে ফেলতে হলে শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ওপর সরাসরি আঘাত হানতে হবে। ১৮৮১ সালে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার, ১৮৯৪ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সাদি কার্নো, ১৮৯৭ সালে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও ক্যানোভাস এবং ১৮৯৮ সালে অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ আততায়ীর হাতে নিহত হন। এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ফলে ইউরোপের রাষ্ট্রনায়কদের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথের হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরেই ইতালি সরকারের উদ্যোগে ১৮৯৮ সালে আয়োজিত হয় ঐতিহাসিক রোম সম্মেলন (Rome Anti-Anarchist Conference 1898)। ইতিহাসবিদ রিচার্ড বাচ জেনসেন (Richard Bach Jensen) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ দ্য ব্যাটেল অ্যাগেইনস্ট অ্যানার্কিস্ট টেররিজম: অ্যান ইন্টারন্যাশনাল হিস্ট্রি, ১৮৭৮–১৯৩৪ (The Battle Against Anarchist Terrorism: An International History, 1878–1934)-এ বিস্তারিত নথিভুক্ত করেছেন কীভাবে ২১টি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কূটনীতিক ও পুলিশ প্রধানরা এই সম্মেলনে একত্রিত হয়েছিলেন (Jensen, 2014)। এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক চরমপন্থীদের ওপর নজরদারি করার জন্য একটি গোপন তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তাদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে নির্বাসন বা প্রত্যর্পণের কঠোর নিয়ম তৈরি করা।
রোম সম্মেলন আন্তর্জাতিক আইনপ্রয়োগের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দেয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের নামে সাধারণ মানুষের ওপর বোমা নিক্ষেপ বা হত্যাযজ্ঞ চালানো হলে তাকে আর সাধারণ রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম নীতি (Political Offense Exception)-এর আওতায় সুরক্ষা দেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ওয়াল্টার লাকার (Walter Laqueur) তার ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে, রোম সম্মেলনই প্রথমবারের মতো সন্ত্রাসবাদকে সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধ থেকে আলাদা করে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সম্মিলিত প্রয়াস পেয়েছিল (Laqueur, 2001)। সম্মেলনে দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহভাজনদের আঙুলের ছাপ, ছবি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কার্ড-ইনডেক্সিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
যদিও গ্রেট ব্রিটেন এবং সুইজারল্যান্ডের মতো উদারনৈতিক দেশগুলো রাজনৈতিক আশ্রয়ের অধিকার পুরোপুরি খর্ব করতে রাজি না হওয়ায় রোম সম্মেলনের সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি, তবু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। রোম সম্মেলনের হাত ধরেই বিভিন্ন দেশের পুলিশ বিভাগ বুঝতে পারে যে, রাজনৈতিক সীমানার বাইরে গিয়ে অপরাধীদের ডেটাবেজ তৈরি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ছাড়া আন্তঃসীমান্ত চরমপন্থা দমন করা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়।
১৯২৩ সালের ভিয়েনা কংগ্রেস ও আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ কমিশন (The 1923 Vienna Congress and the International Criminal Police Commission)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় রাজনীতি ও অর্থনীতি এক চরম বিশৃঙ্খলার মুখে পড়ে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, নতুন নতুন সীমান্ত তৈরি হয় এবং যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দার সুযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের দূরদর্শী পুলিশ প্রেসিডেন্ট ইয়োহান শোবার (Johann Schober) একটি বাস্তববাদী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯২৩ সালে তিনি ভিয়েনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ প্রধানদের এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান। এই সম্মেলনেই আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ কমিশন (International Criminal Police Commission – ICPC), যা আজকের ইন্টারপোলের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি।
ভিয়েনা কংগ্রেসের সাফল্যের মূল রহস্য ছিল একটি বিশেষ তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। ইয়োহান শোবার বুঝতে পেরেছিলেন যে, পুলিশ যদি রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে যায়, তবে আন্তর্জাতিক বিভেদ ও দ্বন্দ্বের কারণে এই সহযোগিতা ভেঙে পড়বে। ইতিহাসবিদ ফেনটন ব্রেসলার (Fenton Bresler) তার গবেষণাধর্মী বই ইন্টারপোল (Interpol)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে শোবার আইসিপিসি-কে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক রাখার শর্ত যুক্ত করেছিলেন (Bresler, 1992)। সিদ্ধান্ত হয় যে এই কমিশন কেবল সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ – যেমন খুন, চুরি, জালিয়াতি এবং চোরাচালান নিয়ে কাজ করবে। কোনো ধর্মীয়, সামরিক, জাতিগত বা রাজনৈতিক বিরোধে এই সংস্থা কোনো ভূমিকা রাখবে না। এই অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতিই ভিন্ন মতাদর্শের দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
আইসিপিসি প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ভিয়েনায় সংস্থার প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয় এবং সেখানে গড়ে তোলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধীদের একটি বিশদ ফাইল বা রেকর্ড আর্কাইভ। অপরাধবিজ্ঞানী মাইকেল ফেভার (Michael Fooner) তার গবেষণাগ্রন্থ ইন্টারপোল: ইস্যুজ ইন ওয়ার্ল্ড ক্রাইম অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনল ক্রিমিনাল জাস্টিস (Interpol: Issues in World Crime and International Criminal Justice)-এ তুলে ধরেছেন যে, ১৯২০-এর দশকেই আইসিপিসি প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ান্টেড তালিকা এবং সন্দেহভাজনদের আঙুলের ছাপের আন্তর্জাতিক সিস্টেম প্রবর্তন করে (Fooner, 1989)। তখন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে টেলিগ্রাফ ও রেডিও বার্তার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধীদের তথ্য আদান-প্রদান শুরু হয়।
এই কমিশনের মাধ্যমে পুলিশিং পেশা কূটনীতির জটিল মারপ্যাঁচ থেকে আলাদা হয়ে একটি প্রযুক্তিগত ও পেশাদার সহযোগিতার রূপ লাভ করে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রতিটি দেশের পুলিশ নিজস্ব সদর দপ্তরে বসে অন্য দেশের পুলিশের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার যে প্রাতিষ্ঠানিক মডেল ভিয়েনায় তৈরি হয়েছিল, তা-ই পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন (World War II, Nazi Control and Post-War Reconstruction)
১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কালো মেঘ আইসিপিসি-র ওপর নেমে আসে। ১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানি যখন অস্ট্রিয়াকে দখল করে নেয় (যা ইতিহাসে আনশ্লুস নামে পরিচিত), তখন ভিয়েনায় অবস্থিত আইসিপিসি-র সদর দপ্তর সরাসরি নাৎসিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। নাৎসি নেতৃত্ব সংস্থাটির নিরপেক্ষ চরিত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে একে তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক দমনপীড়নের যন্ত্রে পরিণত করে।
১৯৪০ সালে কুখ্যাত নাৎসি কর্মকর্তা রেইনহার্ড হাইড্রিচ নিজেকে আইসিপিসি-র সভাপতি ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে সংস্থার সদর দপ্তর ভিয়েনা থেকে বার্লিনে স্থানান্তর করা হয়। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাথিউ ডিফলেম (Mathieu Deflem) তার বিস্তারিত গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে কীভাবে নাৎসি জার্মানির রাইখ মেইন সিকিউরিটি অফিস (Reich Main Security Office – RSHA) আন্তর্জাতিক পুলিশ কমিশনের মূল্যবান অপরাধী ডেটাবেজ ও নেটওয়ার্ককে নিজেদের যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ইহুদিদের শনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করেছিল (Deflem, 2002)। এর ফলে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু মিত্রশক্তিভুক্ত দেশ আইসিপিসি থেকে নিজেদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সংস্থাটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বার্লিনের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এই সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ১৯৪৬ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ফ্রান্সের পুলিশ প্রধান ফ্লোরেন্ট লুয়াগ (Florent Louwage)-এর নেতৃত্বে ইউরোপীয় পুলিশ কর্মকর্তারা সংস্থাটিকে নতুন করে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। নাৎসি কলঙ্ক মুছে ফেলার জন্য সংস্থার সদর দপ্তর প্যারিসের সেন্ট ক্লাউডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয় যে, সংস্থাটি তার পূর্বের অরাজনৈতিক চরিত্রে ফিরে যাবে এবং মানবাধিকার ও নিরপেক্ষতার আদর্শ মেনে কাজ করবে।
এই যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালে একটি আধুনিক সংবিধান গৃহীত হয়। এই সম্মেলনেই আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সংস্থা (International Criminal Police Organization – ICPO-INTERPOL), যা বিশ্বজুড়ে কেবল ইন্টারপোল নামেই সমধিক পরিচিতি লাভ করে। সংবিধানের মাধ্যমে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রে একটি করে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (National Central Bureau – NCB) প্রতিষ্ঠা বাধ্যতামূলক করা হয়। এর মাধ্যমে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে এক নতুন ও সুসংহত আন্তর্জাতিক পুলিশি কাঠামোর যাত্রা শুরু হয়।
স্নায়ুযুদ্ধকালীন মেরুকরণ ও ইন্টারপোলের আধুনিকায়ন (Cold War Polarization and the Modernization of Interpol)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনপ্রয়োগের ক্ষেত্রকে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক টানাপোড়েনের মুখে ফেলে দেয়। পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ্ব এবং সমাজতান্ত্রিক পূর্ব ব্লকের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বে আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের নিরপেক্ষতা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের তাত্ত্বিক ডেভিড বেইলি (David H. Bayley) তার বিখ্যাত গ্রন্থ প্যাটার্নস অব পোলিসিং: আ কম্পারেটিভ ইন্টারন্যাশনাল অ্যানালাইসিস (Patterns of Policing: A Comparative International Analysis)-এ দেখিয়েছেন যে, কীভাবে ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন সবসময় বৈশ্বিক আইনপ্রয়োগের পথে অদৃশ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় (Bayley, 1985)।
এই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হিসেবে ইন্টারপোল তার সংবিধানের অনুচ্ছেদ তিন (Article 3 of the Interpol Constitution) কঠোরভাবে প্রয়োগ করার নীতি গ্রহণ করে। এই অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, সংস্থাটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত চরিত্রের কোনো কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ বা সহায়তা করতে পারবে না। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে রাজনৈতিক কারণে পালিয়ে যাওয়া বহু মানুষকে যখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অপরাধী হিসেবে দাবি করে তাদের ফেরত চাইত, ইন্টারপোল এই অনুচ্ছেদ তিন ব্যবহার করে তাদের রেড নোটিশ জারি করতে অস্বীকৃতি জানাত। যদিও এই কঠোর নিরপেক্ষতার কারণে কোনো কোনো সময় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া ধীরগতির হয়ে পড়ত, তবু এটি বৈশ্বিক মেরুকরণের মধ্যে ইন্টারপোলকে টিকে থাকতে সহায়তা করেছিল।
বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের এক নতুন জোয়ার শুরু হয়। অপরাধবিজ্ঞানী জঁ-পল ব্রোদার (Jean-Paul Brodeur) তার আকর গ্রন্থ দ্য পোলিসিং ওয়েব (The Policing Web)-এ উল্লেখ করেছেন যে, এই সময়ে আন্তর্জাতিক পুলিশিং কেবল চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্বয়ংক্রিয় ডেটা নেটওয়ার্কের রূপ নেয় (Brodeur, 2010)। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্টারপোল তার প্রথম কম্পিউটারাইজড ডাটাবেজ স্থাপন করে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ রক্ষার জন্য বিশেষ কোডেড বার্তা ব্যবস্থা চালু করে।
একই সময়ে বিশ্বজুড়ে বিমানের আন্তর্জাতিক হাইজ্যাকিং এবং মাদক চোরাচালানের ভয়াবহ বৃদ্ধি সদস্য দেশগুলোকে বোঝায় যে, সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধকে কেবল রাজনৈতিক বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৮৪ সালে ইন্টারপোল তার নীতিতে এক ঐতিহাসিক সংশোধন আনে, যার ফলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সাধারণ ফৌজদারি সহিংসতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে তথ্য আদান-প্রদানের পথ উন্মুক্ত হয়। এই আধুনিকায়নের ফলেই স্নায়ুযুদ্ধের শেষভাগে ইন্টারপোল একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হতে সক্ষম হয়।
জাতিসংঘ পুলিশিং, সীমান্তপারের নেটওয়ার্ক ও সমকালীন রূপান্তর (UN Policing, Transnational Networks and Contemporary Evolution)
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বৈশ্বিক আইনপ্রয়োগের ধারণাটি কেবল ইন্টারপোলের মতো ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৯০-এর দশক থেকে বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রয়োজনে জাতিসংঘ এক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের সূচনা করে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালিস হিলস (Alice Hills) তার গবেষণাগ্রন্থ পোলিসিং পোস্ট-কনফ্লিক্ট সিটিজ (Policing Post-Conflict Cities)-এ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে সামরিক বাহিনীর চেয়ে পুলিশের ভূমিকা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে (Hills, 2009)। এই কাঠামোর অধীনে গড়ে ওঠে জাতিসংঘ পুলিশ (United Nations Police – UNPOL), যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা গড়ে তুলতে কাজ করে।
একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে একটি বহুমাত্রিক নেটওয়ার্কের রূপ ধারণ করেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ গবেষক বেন বোহেন (Ben Bowling) এবং জেমস শেপটিস্কি (James Sheptycki) তাদের যৌথ গ্রন্থ গ্লোবাল পোলিসিং (Global Policing)-এ তুলে ধরেছেন যে, সমকালীন আইনপ্রয়োগ আর কোনো একক আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীল নয় (Bowling & Sheptycki, 2012)। বর্তমানে আঞ্চলিক স্তরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপোল, আমেরিকার আমেরিপোল কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানাপোল-এর মতো বিশেষায়িত জোটগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাজ করছে। একে সমাজবিজ্ঞানীরা ট্রান্সন্যাশনাল পোলিসিং নেটওয়ার্ক (Transnational Policing Network) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।
এই আধুনিক রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে সাইবার অপরাধ, মানবপাচার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক জালিয়াতির মতো নতুন প্রজন্মের আন্তঃসীমান্ত হুমকি। বর্তমান যুগে অপরাধীরা কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়াই ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক মহাদেশে বসে অন্য মহাদেশের ব্যাংক বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অচল করে দিতে পারে। গবেষক জেমস শেপটিস্কি (James Sheptycki) তার সম্পাদিত গ্রন্থ ইন সার্চ অব ট্রান্সন্যাশনাল পোলিসিং: টুয়ার্ডস আ সোসিওলজি অব গ্লোবাল পলিসিং (In Search of Transnational Policing)-এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আধুনিক পুলিশিং এখন ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে ডেটা প্রবাহ ও সাইবার গোয়েন্দা তথ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল (Sheptycki, 2000)। ইন্টারপোলের আধুনিক আই-টুয়েন্টিফোর/সেভেন (I-24/7) সুরক্ষিত বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমানে যেকোনো দেশের বিমানবন্দর বা সীমান্ত চৌকিতে বসে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ান্টেড অপরাধী বা চুরি যাওয়া পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের এই দীর্ঘ বিবর্তন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, জাতীয় সার্বভৌমত্বের কঠোর প্রাচীর ধীরে ধীরে ভেঙে এক সমন্বিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা শাসনের জন্ম হয়েছে। উনিশ শতকের সাধারণ চিঠি চালাচালি থেকে শুরু করে আজকের রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ও সাইবার ডেটাবেজ পর্যন্ত – আইনপ্রয়োগের এই ইতিহাস আসলে অপরাধের ক্রমাগত আন্তর্জাতিকীকরণের বিপরীতে সভ্য সমাজের টিকে থাকারই এক যৌথ সংগ্রাম।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশ (Police and Counterterrorism): ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা
সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের পরিবর্তিত ভূমিকা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম (The Evolving Role of Police in Counterterrorism and Intelligence-Led Policing)
ঐতিহ্যগতভাবে পুলিশের মূল কাজ ছিল কোনো অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর তার তদন্ত করা, অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা এবং আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করে বিচার নিশ্চিত করা। একে অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় প্রতিক্রিয়ামূলক বা রিঅ্যাক্টিভ পুলিশিং। কিন্তু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিস্তার এই প্রচলিত পুলিশি ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে বাধ্য করেছে। সন্ত্রাসবাদী হামলার পর তদন্ত করে অপরাধীকে ধরা হয়তো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি, কিন্তু তা দিয়ে শত শত নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করা যায় না। এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের কাজের ধরনে এক মৌলিক পরিবর্তন আনে, যার নাম গোয়েন্দা-নির্ভর পুলিশিং (Intelligence-Led Policing – ILP)। অপরাধবিজ্ঞানী জেরি র্যাটক্লিফ (Jerry H. Ratcliffe) তার আকর গ্রন্থ ইন্টেলিজেন্স-লেড পোলিসিং (Intelligence-Led Policing)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে অপরাধ ঘটার আগে তা শনাক্ত ও প্রতিহত করাই আধুনিক পুলিশিংয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে (Ratcliffe, 2008)।
পুলিশের এই পরিবর্তিত ভূমিকায় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। সন্ত্রাসবাদ দমন বিশেষজ্ঞ মার্টিন ইনিস (Martin Innes) তার সিগন্যাল ক্রাইম তত্ত্বে তুলে ধরেন যে, বড় ধরনের হামলার আগে সমাজে নানা ধরনের ছোটখাটো অস্বাভাবিক সংকেত বা সিগন্যাল তৈরি হয় (Innes, 2014)। মাঠপর্যায়ের সাধারণ টহল পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিশেষায়িত গোয়েন্দা শাখা পর্যন্ত সবাইকে সেই সংকেতগুলো দ্রুত শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কাজ এখন আর কেবল রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বা সাধারণ চুরি-ডাকাতি ঠেকানো নয়; বরং সন্দেহভাজন গতিবিধি, অর্থের অস্বাভাবিক লেনদেন এবং উগ্র মতাদর্শিক তৎপরতার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা। এর ফলে তৈরি হয়েছে পূর্বানুমানমূলক পুলিশিং (Predictive Policing) ব্যবস্থা, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা ব্যবহার করে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি আগে থেকেই নিরূপণ করার চেষ্টা করা হয়।
তবে এই নতুন ভূমিকার কারণে পুলিশের চিরাচরিত কাঠামোর ভেতরে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশিং বিশেষজ্ঞ ডেভিড বেইলি (David H. Bayley) এবং ডেভিড ওয়েইসবুর্ড (David Weisburd) তাদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং প্রথাগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার ফারাক মুছে যাওয়ায় পুলিশের প্রতিদিনের কাজের অগ্রাধিকার বদলে যাচ্ছে (Bayley & Weisburd, 2009)। সাধারণ অপরাধ দমনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডে বেশি যুক্ত করার ফলে অনেক সময় স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা অবহেলিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তা সত্ত্বেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আধুনিক বিশ্বে পুলিশ বাহিনী কেবল শান্তি রক্ষার সাধারণ রক্ষক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই রূপান্তরের ফলে আধুনিক পুলিশ প্রশাসনকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমান্তরালে কাজ করতে হচ্ছে। আগে যেখানে পুলিশের সাথে সামরিক বা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনো দৃশ্যমান সংযোগ থাকত না, আজ সেখানে সমন্বিত সন্ত্রাসবিরোধী সেল বা ফিউশন সেন্টারগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে। ফলে সমকালীন পুলিশ কর্মকর্তাটি কেবল একজন সাধারণ আইন প্রয়োগকারী নন, একই সাথে তিনি একজন সক্রিয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকও বটে।
কমিউনিটি পুলিশিং ও স্থানীয় তথ্যের গুরুত্ব (Community Policing and the Critical Role of Local Intelligence)
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকড় উপড়ে ফেলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি হলো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পুলিশের নিবিড় সম্পর্ক। বড় বড় প্রযুক্তিগত নজরদারি বা স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং দিয়ে হয়তো অনেক কিছু জানা যায়, কিন্তু পাড়া-মহল্লায় কোনো ব্যক্তি ধীরে ধীরে উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকছে কি না, তা সবচেয়ে আগে টের পায় তার পরিবার, প্রতিবেশী বা স্থানীয় সমাজের মানুষ। এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে কমিউনিটি পুলিশিং (Community Policing) দর্শন। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের প্রবক্তা রবার্ট ট্রোজানোভিচ (Robert Trojanowicz) এবং তার সহযোগী গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, পুলিশ যখন নিজেকে জনগণের শাসক না ভেবে সমাজের অংশীদার মনে করে, তখনই কেবল অপরাধ প্রতিরোধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হয় (Trojanowicz et al., 1998)।
সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে এই সামাজিক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। যুক্তরাজ্যের ক্রিমিনোলজিস্ট বাসিয়া স্পালেক (Basia Spalek) তার গবেষণাগ্রন্থ কাউন্টার-টেররিজম: কমিউনিটি-বেসড অ্যাপ্রোচেস টু প্রিভেন্টিং টেররিজম (Counter-Terrorism: Community-Based Approaches to Preventing Terrorism)-এ তুলে ধরেছেন কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশের বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক উগ্রায়ন রোধে সাহায্য করে (Spalek, 2012)। যখন একটি সংখ্যালঘু বা বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষ পুলিশকে তাদের সুরক্ষাকারী বন্ধু মনে করে, তখন তারা কোনো চরমপন্থী প্রচারণার খবর পেলে তা লুকিয়ে না রেখে দ্রুত পুলিশকে জানায়। কিন্তু পুলিশ যদি পুরো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখে বা তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযান চালায়, তবে সেই মূল্যবান মানবিক গোয়েন্দা তথ্যের উৎস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই ক্ষেত্রে আইন ও মনোবিজ্ঞানের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক টম টাইলার (Tom R. Tyler) তার পদ্ধতিগত ন্যায়বিচার তত্ত্ব (Procedural Justice Theory)-এর মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন (Tyler, 2006)। টাইলারের মতে, মানুষ আইনের প্রতি তখনই আনুগত্য প্রকাশ করে এবং পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে, যখন তারা দেখে যে পুলিশের আচরণ নিরপেক্ষ, শ্রদ্ধাশীল এবং স্বচ্ছ। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে পুলিশ যদি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে বা অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করে, তবে পুলিশের বৈধতা বা লেজিটিমেসি (Legitimacy) চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, যা সন্ত্রাসীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
সুতরাং, সন্ত্রাসবাদ দমনে কমিউনিটি পুলিশিং কোনো হালকা বা গৌণ কৌশল নয়; বরং এটি কঠোর অভিযানের চেয়েও বেশি কার্যকর প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করে। পুলিশের টহল দল যদি স্থানীয় ধর্মীয় উপাসনালয়, স্কুল, তরুণদের ক্লাব এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ বজায় রাখে, তবে চরমপন্থীদের সদস্য সংগ্রহের সব অপচেষ্টা শুরুতেই অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেওয়া সম্ভব হয়। স্থানীয় মানুষকে আস্থায় নেওয়াই তাই সমকালীন পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র।
পুলিশের সামরিকীকরণ ও বিশেষ কৌশলগত ইউনিট (Police Militarization and Specialized Tactical Units)
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মাত্রা ও অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকায়নের ফলে সাধারণ পুলিশ বাহিনীর পক্ষে আধুনিক ভারী অস্ত্রে সজ্জিত চরমপন্থীদের মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিশ শতকের সত্তরের দশক থেকে, বিশেষ করে ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক হত্যাকাণ্ডের পর, বিশ্বজুড়ে পুলিশের ভেতরে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ট্যাকটিক্যাল ইউনিট গঠনের সূচনা হয়। জার্মানির জিএসজি-৯, ফ্রান্সের জিআইজিএন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোয়াট দলের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো তৈরি করা হয় সরাসরি জিম্মি উদ্ধার এবং চরমপন্থী হামলার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্য। এই ধরনের ইউনিটগুলোর উপস্থিতি পুলিশের সনাতন চরিত্রকে বদলে দিয়ে এক আধা-সামরিক রূপ দিয়েছে, যা অপরাধবিজ্ঞানে পুলিশের সামরিকীকরণ (Police Militarization) হিসেবে আলোচিত হয়।
এই সামরিকীকরণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক নিয়ে সমাজবিজ্ঞান ও নিরাপত্তা গবেষণায় গভীর বিতর্ক রয়েছে। বিশিষ্ট অপরাধবিজ্ঞানী পিটার ক্রাস্কা (Peter B. Kraska) তার গবেষণাধর্মী কাজ মিলিটারাইজিং দ্য আমেরিকান ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম: দ্য চেঞ্জিং রোলেস অব দ্য মিলিটারি অ্যান্ড দ্য পুলিশ (Militarizing the American Criminal Justice System: The Changing Roles of the Military and the Police)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে যুদ্ধের ময়দানের অস্ত্র ও কৌশলগুলো অভ্যন্তরীণ পুলিশিংয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছে (Kraska, 2001)। আধুনিক পুলিশ এখন সাঁজোয়া যান, স্বয়ংক্রিয় অ্যাসাল্ট রাইফেল, স্নাইপার প্রযুক্তি এবং বডি আর্মার ব্যবহার করছে। আকস্মিক কোনো আত্মঘাতী হামলা বা জিম্মি সংকটের সময় সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই ধরনের বিশেষায়িত সক্ষমতা অত্যন্ত অপরিহার্য।
তবে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও অত্যন্ত স্পষ্ট। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও বিশ্লেষক রাডলি বালকো (Radley Balko) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই রাইজ অব দ্য ওয়ারিয়র কপ: দ্য মিলিটারাইজেশন অব আমেরিকা’স পুলিশ ফোর্সেস (Rise of the Warrior Cop: The Militarization of America’s Police Forces)-এ সতর্ক করেছেন যে, অতিরিক্ত সামরিকীকরণ পুলিশের মানসিকতায় পরিবর্তন আনে (Balko, 2013)। সাধারণ পুলিশ যখন নিজেকে ‘নাগরিকের সুরক্ষাকারী’ না ভেবে একজন ‘রণক্ষেত্রের যোদ্ধা’ ভাবতে শুরু করে, তখন তারা সাধারণ মানুষকেও সম্ভাব্য শত্রু হিসেবে দেখতে পারে। ভূগোলবিদ ও নগর গবেষক স্টিভেন গ্রাহাম (Stephen Graham) তার সিটিজ আন্ডার সিজ: দ্য নিউ মিলিটারি আরবানইজম (Cities Under Siege: The New Military Urbanism) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শহরের রাস্তায় সার্বক্ষণিক ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশের উপস্থিতি নাগরিকদের মনে এক স্থায়ী ভীতির পরিবেশ তৈরি করে (Graham, 2011)।
এই বাস্তবতায় আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা। সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর আক্রমণ রুখতে যেমন বিশেষ কৌশলী ইউনিটের প্রস্তুতি থাকতে হবে, ঠিক তেমনি সেই শক্তির ব্যবহারকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট রাখতে হবে। সামরিক শক্তিকে সাধারণ দৈনন্দিন পুলিশিংয়ের অংশ না বানিয়ে কেবল চরম জরুরি পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত রাখাই হলো এই সামরিকীকরণের ক্ষতিকর প্রভাব এড়ানোর প্রধান উপায়।
আইনি সুরক্ষাকবচ, মানবাধিকার ও জবাবদিহির সংকট (Legal Safeguards, Human Rights Dilemmas and Accountability)
সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের ভূমিকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গাটি হলো মানবাধিকার এবং আইনি সুরক্ষাকবচের প্রশ্ন। যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, গোপনীয়তার অধিকার এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের ভয় এতটাই সর্বগ্রাসী যে, রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই বিশেষ সন্ত্রাসবিরোধী আইন পাস করে পুলিশকে অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রদান করে। এই পরিস্থিতিতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা অনেক সময় আইনি জবাবদিহির বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে নাগরিক স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দেয়।
ব্রিটিশ আইনবিদ ও নিরাপত্তা গবেষক লুসিয়া জেডনার (Lucia Zedner) তার বিখ্যাত গ্রন্থ সিকিউরিটি (Security)-এ তুলে ধরেছেন কীভাবে সমকালীন রাষ্ট্রগুলো একটি প্রাক-অপরাধ সমাজ (Pre-Crime Society) তৈরির দিকে ঝুঁকছে (Zedner, 2009)। এই সমাজব্যবস্থায় অপরাধ ঘটার অপেক্ষা না করে কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মানুষকে আটক করা, বিনা বিচারে দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখা বা নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা হয়। জেডনার দেখান যে, নিরাপত্তার তাগিদে পুলিশের এই আগাম পদক্ষেপ বহু সময় নিরপরাধ মানুষকে আইনি সুরক্ষাহীন এক অন্ধকারে ফেলে দেয়।
একই সুর পাওয়া যায় মার্কিন মানবাধিকার আইনজীবী ও আইন অধ্যাপক ডেভিড কোল (David Cole)-এর লেখায়। তিনি তার গবেষণায় স্পষ্ট করেছেন যে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নামে গৃহীত কঠোর পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে সমাজের সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর (Cole, 2003)। পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, ফোনে আড়িপাতা, ইন্টারনেট ট্রাফিক মনিটরিং এবং তথাকথিত সন্দেহভাজনদের গোপন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ফলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার (Right to Privacy) ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ কনর জিওর্টি (Conor Gearty) তার বিশ্লেষণমূলক বই টেররিজম অ্যান্ড দ্য রুল অব ল (Terrorism and the Rule of Law)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সন্ত্রাসবাদের ভীতিকে পুঁজি করে আইনের শাসনকে পাশ কাটানোর এক বৈশ্বিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে (Gearty, 2007)।
পুলিশ বাহিনীর জন্য এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন সামাল দেওয়া এক কঠিন পরীক্ষা। একদিক থেকে তাদের ওপর চাপ থাকে যেকোনো মূল্যে হামলা ঠেকানোর, অন্যদিকে থাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি। তবে ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দেখায় যে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বা বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোনো সমাজে সন্ত্রাসবাদ চিরতরে দমন করা যায়নি। বরং পুলিশের অপব্যবহার ও দমনপীড়নের ঘটনাগুলো চরমপন্থীদের প্রচারণাকে বৈধতা দেয় এবং নতুন কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্র তৈরি করে। সুতরাং, আইনি জবাবদিহি ও কঠোর মানবাধিকার সুরক্ষার ভেতরে থেকেই সন্ত্রাস দমন করাই আইনের শাসনের আসল সৌন্দর্য ও শক্তি।
সংস্থাগুলোর মধ্যকার দ্বৈরথ ও তথ্য সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা (Inter-Agency Rivalries and Constraints on Intelligence Sharing)
সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশ বাহিনীর কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে অন্যান্য নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তাদের তথ্য সমন্বয়ের ওপর। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বজুড়ে একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা হলো বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং তথ্য লুকানোর প্রবণতা। পুলিশ, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক গোয়েন্দা শাখা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে প্রায়শই এক ধরনের পেশাদার প্রতিযোগিতা কাজ করে। প্রতিটি সংস্থা চায় কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে রাখতে, যার ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল তথ্য সময়মতো মাঠপর্যায়ের পুলিশের কাছে পৌঁছায় না।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক গ্রেগরি ট্রেভারটন (Gregory F. Treverton) তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ রিমেকিং ডোমেস্টিক ইন্টেলিজেন্স (Remaking Domestic Intelligence)-এ এই প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন (Treverton, 2009)। তিনি দেখান যে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণত অত্যন্ত গোপনীয়তায় কাজ করতে অভ্যস্ত, যেখানে পুলিশ কাজ করে আদালতের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও প্রকাশ্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ফলে সামরিক বা জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের তথ্যের উৎস ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে স্থানীয় পুলিশকে বিস্তারিত জানাতে চায় না। তথ্যের এই বিচ্ছিন্ন সংরক্ষণকে নিরাপত্তা পরিমণ্ডলে তথ্য আদান-প্রদানের দেওয়াল (Intelligence Silos) বলা হয়।
এই তথ্য সমন্বয়ের ব্যর্থতা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তার সবচেয়ে প্রামাণ্য নজির হলো ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যামি জেগার্ট (Amy B. Zegart) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ স্পাইং ব্লাইন্ড: দ্য সিআইএ, দ্য এফবিআই, অ্যান্ড দ্য অরিজিনস অব নাইন-ইলেভেন (Spying Blind: The CIA, the FBI, and the Origins of 9/11)-এ বিস্তারিত নথিভুক্ত করেছেন কীভাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা ও আমলাতান্ত্রিক জড়তা সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের শনাক্ত করার সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছিল (Zegart, 2007)। হামলাকারীদের কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা সত্ত্বেও সেই তথ্য নিয়মিত পুলিশ বা স্থানীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে সময়মতো পৌঁছায়নি।
আইনবিদ ও অর্থনীতিবিদ রিচার্ড পসনার (Richard A. Posner) জাতীয় নিরাপত্তা সংস্কারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তন কেবল নতুন আইন করে সমাধান করা যায় না (Posner, 2005)। প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি থাকে, যা অন্য সংস্থার সঙ্গে সহজে মিশতে চায় না। স্থানীয় পুলিশ অনেক সময় মনে করে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো তাদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা মনে করে সাধারণ পুলিশের সংবেদনশীল তথ্য সামলানোর মতো পেশাদারিত্ব নেই। এই পারস্পরিক অহমিকা ও সমন্বয়ের ঘাটতি সন্ত্রাসীদের জন্য এক বিশাল ফাঁকফোকর তৈরি করে দেয়, যার সুযোগ নিয়ে তারা নির্বিঘ্নে হামলার পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও স্থানীয় পুলিশের কাঠামোগত দুর্বলতা (Transnational Terrorism and Structural Limitations of Local Police)
আধুনিক সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি হলো বৈশ্বিক এবং সীমানাহীন, অথচ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ার কঠোরভাবে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ। একজন চরমপন্থী হয়তো অন্য কোনো মহাদেশে বসে অনলাইনে হামলার পরিকল্পনা করছে, তৃতীয় কোনো দেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে এবং স্থানীয় কোনো দুর্বল তরুণকে দিয়ে নিজ শহরে হামলা বাস্তবায়ন করাচ্ছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় একটি শহরের সাধারণ পুলিশ বাহিনীর সামনে যে কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়, তা কাটিয়ে ওঠা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও পুলিশিং গবেষক জেমস শেপটিস্কি (James Sheptycki) তার সম্পাদিত গ্রন্থ ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম অ্যান্ড পাবলিক সিকিউরিটি (Transnational Crime and Public Security)-এ তুলে ধরেছেন যে, স্থানীয় পুলিশিং ব্যবস্থা মূলত জাতীয় আইনের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে (Sheptycki, 2002)। যখন কোনো অপরাধের আলামত বা নির্দেশ বিদেশি কোনো ডিজিটাল সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে, তখন সাধারণ পুলিশের পক্ষে সেখানে প্রবেশ করার কোনো আইনি অধিকার থাকে না। বিদেশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি চালাচালি করতে করতে মাস বা বছর পার হয়ে যায়, অথচ সন্ত্রাসীরা সেকেন্ডের মধ্যে তাদের ডিজিটাল অস্তিত্ব মুছে ফেলে নতুন ছক আঁকে।
একইভাবে ইউরোপীয় নিরাপত্তা গবেষক মনিকা ডেন বোর (Monica den Boer) আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের প্রেক্ষিতে আইনি কাঠামোর জটিলতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন বিচারব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সীমান্তপারের সহযোগিতা অত্যন্ত শ্লথ হয়ে পড়ে (den Boer, 2008)। কোনো একটি দেশে যা চরম অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, অন্য দেশে হয়তো তার সংজ্ঞাই আলাদা। এর ফলে প্রত্যর্পণ বা তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘ আইনি জটিলতা তৈরি হয়, যা পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ট্রেভর জোন্স (Trevor Jones) এবং টিম নিউবার্ন (Tim Newburn) তাদের তুলনামূলক পুলিশিং গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, স্থানীয় পুলিশ বাহিনীকে যদি পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা এবং সাইবার ফরেনসিকের সক্ষমতা না দেওয়া হয়, তবে তারা আধুনিক ট্রান্সন্যাশনাল সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হয়ে অসহায় বোধ করবে (Jones & Newburn, 2006)। ফলে সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের সাফল্য কেবল তাদের নিজস্ব নিষ্ঠা বা সাহসের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার অবাধ গতির ওপর। এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে না পারলে আধুনিক নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক চরমপন্থাকে কার্যকরভাবে থামিয়ে রাখা স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর জন্য এক কঠিন সংগ্রাম হয়েই থাকবে।
ইন্টারপোল, ইউরোপোল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা (Interpol, Europol and International Cooperation): সীমান্তপারের সমন্বয়
ইন্টারপোলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বৈশ্বিক নোটিশ ব্যবস্থা (Institutional Framework and Global Notice System of Interpol)
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার কোনো একক দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন অপরাধী এক দেশে বসে অপরাধের পরিকল্পনা করে, দ্বিতীয় দেশে অর্থ লেনদেন করে এবং তৃতীয় দেশে গিয়ে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে নিমেষেই অন্য কোনো দেশে গা ঢাকা দিতে পারে। এই ধরনের জটিল আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে পুলিশি সহযোগিতার প্রধান আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করে ইন্টারপোল। অপরাধবিজ্ঞানী মাইকেল ফেভার (Michael Fooner) তার গবেষণাগ্রন্থ ইন্টারপোল: ইস্যুজ ইন ওয়ার্ল্ড ক্রাইম অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনল ক্রিমিনাল জাস্টিস (Interpol: Issues in World Crime and International Criminal Justice)-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইন্টারপোল কোনো একক বৈশ্বিক পুলিশ বাহিনী নয় যার সদস্যরা বন্দুক হাতে বিভিন্ন দেশে গিয়ে সরাসরি অভিযান চালাতে পারে (Fooner, 1989)। বরং এটা হলো ১৯৫টি সদস্য রাষ্ট্রের স্বাধীন পুলিশ বাহিনীগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের একটি নিরাপদ বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।
ইন্টারপোলের এই সমন্বিত ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিটি সদস্য দেশে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (National Central Bureau – NCB)। ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরে অবস্থিত ইন্টারপোলের সাধারণ সচিবালয় কোনো দেশের অভ্যন্তরে সরাসরি তদন্ত চালায় না। তারা প্রতিটি দেশের এনসিবি-র মাধ্যমে স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে। নিরাপত্তা গবেষক মার্সেলো অ্যাম্পেরিয়াস (Marcelo Aebi) আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের প্রশাসনিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এনসিবি-গুলো জাতীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলের মধ্যে একটি দ্বিমুখী সংযোগসেতু হিসেবে কাজ করে (Aebi, 2011)। এর ফলে এক দেশের সাধারণ তদন্তকারী কর্মকর্তা অন্য প্রান্তের কোনো দেশের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি ও দ্রুততম সময়ে তথ্য চেয়ে পাঠাতে পারেন।
এই সমন্বয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং কার্যকর মাধ্যম হলো ইন্টারপোলের কালার-কোডেড নোটিশ ব্যবস্থা (Color-Coded Notice System)। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি আটটি ভিন্ন রঙের আন্তর্জাতিক নোটিশ জারি করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও প্রভাবশালী হলো রেড নোটিশ (Red Notice), যা কোনো পলাতক অপরাধীকে সাময়িকভাবে আটক বা গ্রেপ্তার করে প্রত্যর্পণের জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি একটি আন্তর্জাতিক অনুরোধপত্র। এছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে জারি করা হয় ইয়োলো নোটিশ, অজ্ঞাত মৃতদেহের পরিচয়ের জন্য ব্ল্যাক নোটিশ, অপরাধীদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সতর্ক করতে ব্লু নোটিশ এবং সন্ত্রাসী হামলার আসন্ন হুমকি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে সতর্ক করতে জারি করা হয় অরেঞ্জ নোটিশ। গবেষক নিক গ্রুমব্রিজ (Nick Groombridge) পুলিশি যোগাযোগের মাধ্যম নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তুলে ধরেছেন যে, এই রঙ-ভিত্তিক নোটিশ ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের ভাষার ভিন্নতা দূর করে এক সর্বজনীন নিরাপত্তা সংকেত তৈরি করেছে (Groombridge, 2008)।
এই নোটিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বিপজ্জনক অপরাধী ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীকে প্রতিদিন শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে। জাতীয় সীমানার কাঁটাতারের বাধা অতিক্রম করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীদের ছবি, আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ প্রোফাইল পৌঁছে দেওয়ার এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই আধুনিক আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের মূল স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইউরোপোল: আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইউরোপীয় সমন্বয় (Europol: Regional Security Integration and European Coordination)
ইন্টারপোল যেখানে একটি সর্বজনীন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে অনেক বেশি নিবিড় ও সমন্বিত একটি আঞ্চলিক পুলিশি সংস্থা – ইউরোপোল। ১৯৯২ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক মাস্ট্রিক্ট চুক্তি (Maastricht Treaty)-এর মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলো তাদের অভিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত এই সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৯ সালে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে। ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্রিশ্চিয়ান কাগলার (Christian Kaunert) এবং সারা লিওনার্ড (Sarah Léonard) তাদের গবেষণাগ্রন্থ ইউরোপোল অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব ইইউ পুলিশ কোঅপারেশন (Europol and the Politics of EU Police Cooperation)-এ দেখিয়েছেন যে, শেঙ্গেন চুক্তির আওতায় ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যকার সীমান্ত তুলে দেওয়ার পর থেকেই এই ধরনের একটি অতি-রাষ্ট্রীয় পুলিশ সমন্বয় ব্যবস্থার প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল (Kaunert & Léonard, 2012)।
ইউরোপোলের কার্যপদ্ধতি ইন্টারপোলের চেয়ে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আলাদা এবং অনেক বেশি গভীর। এটি কোনো সাধারণ নোটিশ জারির প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং এটি হলো একটি উচ্চমানের অপরাধ গোয়েন্দা ও বিশ্লেষণ কেন্দ্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার সংস্থার লিয়াজোঁ অফিসাররা দ্য হেগে অবস্থিত ইউরোপোলের সদর দপ্তরে একসঙ্গে বসে কাজ করেন। নিরাপত্তা গবেষক মনিকা ডেন বোর (Monica den Boer) ইউরোপীয় পুলিশি একীকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে লিখেছেন যে, ইউরোপোলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর যৌথ তদন্ত দল এবং সমন্বিত গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ক্ষমতা (den Boer, 2010)। ২০১৫ সালে প্যারিস হামলা এবং ২০১৬ সালে ব্রাসেলস হামলার পর সংস্থাটির ভেতরে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইউরোপীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্র (European Counter Terrorism Centre – ECTC)। এই কেন্দ্রটি ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সন্দেহভাজন চরমপন্থী নেটওয়ার্ক, তাদের ডিজিটাল তৎপরতা এবং অর্থায়নের গতিপথ ট্র্যাক করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সার্বক্ষণিক কৌশলগত ও পরিচালনাগত সহায়তা প্রদান করে।
ইউরোপোলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুমাত্রিক ডেটা বিশ্লেষণ ক্ষমতা। সংস্থাটি কেবল সাধারণ অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করে না; বরং তারা বিগ ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপরাধ চক্রগুলোর মধ্যকার অদৃশ্য সংযোগগুলো উন্মোচন করে। আইন ও সমাজবিজ্ঞানী মিয়া ডেভিস (Mia Davis) ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা নীতি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপোল মাদক চোরাচালান, মানবপাচার এবং সাইবার অপরাধের মতো বহুমাত্রিক অপরাধগুলোকে একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসে বিশ্লেষণ করে (Davis, 2015)।
এই নিবিড় আঞ্চলিক সহযোগিতার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর পুলিশিং ব্যবস্থা বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ রূপ লাভ করেছে। জাতীয় সার্বভৌমত্বের কিছু অংশ যৌথ নিরাপত্তার স্বার্থে ছেড়ে দিয়ে ইউরোপোল যে মডেল তৈরি করেছে, তা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সীমান্তহীন অপরাধীদের থামাতে সীমান্তহীন সমন্বিত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা সম্ভব।
তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটাবেজ ও রিয়েল-টাইম সমন্বয় (Information Technology, Databases and Real-Time Coordination)
আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতার মূল চালিকাশক্তি হলো ডিজিটাল ডেটা এবং সুরক্ষিত যোগাযোগ পরিকাঠামো। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করার সনাতন পদ্ধতিগুলো আজ সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপ ধারণ করেছে। এই ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হলো তাদের বিশ্বমানের নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা আই-টুয়েন্টিফোর/সেভেন (I-24/7 Global Police Communications System) নামে পরিচিত। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ গবেষক কাটজা ফ্রাঙ্কো (Katja Franko Aas) তার গ্রন্থ গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ক্রাইম (Globalization and Crime)-এ তুলে ধরেছেন যে, এই সিস্টেমটি বিশ্বের প্রতিটি সদস্য দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ২৪ ঘণ্টা রিয়েল-টাইমে ইন্টারপোলের সেন্ট্রাল ডেটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে (Aas, 2013)। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো সীমান্ত চৌকির একজন সাধারণ ইমিগ্রেশন অফিসারও চোখের পলকে যাচাই করে নিতে পারেন তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ান্টেড কি না।
ইন্টারপোলের এই সিস্টেমের অধীনে সংরক্ষিত রয়েছে বেশ কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশদ ডেটাবেজ। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো চুরি যাওয়া ভ্রমণ নথিপত্রের ডেটাবেজ (Stolen and Lost Travel Documents – SLTD)। আন্তর্জাতিক চরমপন্থীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলাচলের জন্য প্রায়শই চুরি যাওয়া বা জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে থাকে। ইন্টারপোলের এসএলটিডি ডেটাবেজে বর্তমানে বিশ্বের কোটি কোটি হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া পাসপোর্টের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক দিদিয়ের বিগো (Didier Bigo) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে এই ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করা চরমপন্থীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে (Bigo, 2006)।
একইভাবে ইউরোপোলের রয়েছে নিজস্ব সুরক্ষিত যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম, যার নাম সিয়েনা যোগাযোগ ব্যবস্থা (Secure Information Exchange Network Application – SIENA)। এই প্ল্যাটফর্মটি ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে অত্যন্ত গোপনীয় ও এনক্রিপ্টেড উপায়ে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ করে দেয়। নিরাপত্তা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জেরাল্ড স্টেইনার (Gerald Steiner) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, সিয়েনা সিস্টেমের মাধ্যমে অপরাধের ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট, আড়িপাতার অডিও ফাইল এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের তথ্য কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তদন্ত দলের টেবিলে পৌঁছে যায় (Steiner, 2018)।
ডিজিটাল এই সংযোগের ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে যেখানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত, আজ সেখানে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ ডেটা পয়েন্ট মিলিয়ে অপরাধীর অবস্থান ও গতিপথ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই সীমান্তপারের পুলিশি সহযোগিতাকে সমকালীন বিশ্বে এক অপরাজেয় ভিত্তি দান করেছে।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব বনাম অতি-রাষ্ট্রীয় পুলিশিং দ্বন্দ্ব (National Sovereignty versus Supranational Policing Tensions)
আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতার পথ কখনোই সম্পূর্ণ মসৃণ ছিল না। এর পেছনে সবচেয়ে বড় যে অদৃশ্য দেয়ালটি সবসময় কাজ করে, তা হলো জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ড, আইন এবং নাগরিকদের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। যখনই কোনো আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা বা বিদেশি তদন্তকারী দল কোনো স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তথ্য চাইতে যায় বা যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দেয়, তখনই সেখানে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার এক গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ইথান নাদেলম্যান (Ethan Nadelmann) তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে একে বর্ণনা করেছেন আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের চিরন্তন সার্বভৌমত্ব দ্বন্দ্ব হিসেবে (Nadelmann, 1993)।
এই দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় অত্যন্ত জরুরি আন্তর্জাতিক তদন্তগুলোও মাঝপথে থমকে যায়। সমাজবিজ্ঞানী সাসকিয়া সাসেন (Saskia Sassen) তার ক্লাসিক গ্রন্থ টেরিটরি, অথরিটি, রাইটস: ফ্রম মেডেভাল টু গ্লোবাল এসেম্বলেজেস (Territory, Authority, Rights: From Medieval to Global Assemblages)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বায়নের যুগে ভৌগোলিক সীমানা শিথিল হলেও রাষ্ট্রগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ সহজে ছাড়তে চায় না (Sassen, 2006)। কোনো দেশ যদি মনে করে যে অন্য কোনো দেশকে গোয়েন্দা তথ্য দিলে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে, তবে তারা আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে।
তাছাড়া বিভিন্ন দেশের বিচারব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্যও এই ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায়। আইনবিজ্ঞানী মার্টিন রেইনার্ড (Martin Reichard) আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আইনি ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কোনো একটি গণতান্ত্রিক দেশে যা সংবিধিবদ্ধ মৌলিক মানবাধিকারের অংশ, অন্য কোনো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে হয়তো তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে (Reichard, 2006)। উদাহরণস্বরূপ, বাকস্বাধীনতা বা রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন দেশের আইন সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। ফলে কোনো অপরাধীকে চিহ্নিত বা প্রত্যর্পণ করার ক্ষেত্রে এক দেশের পুলিশি কার্যক্রম অন্য দেশের বিচারিক সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
এই সার্বভৌমত্বের টানাপোড়েন স্পষ্ট করে দেয় যে, আন্তর্জাতিক পুলিশিং কোনো একক বিশ্ব-সরকারের অধীন নয়। এটা হলো অসংখ্য স্বাধীন দেশের সমঝোতা ও আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভঙ্গুর ভারসাম্য। এই ভারসাম্যে সামান্য ফাটল ধরলেই বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ভেঙে পড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাগুলোকে সবসময় প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় সংবেদনশীলতা ও সার্বভৌম মর্যাদাকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানিয়েই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
রেড নোটিশের অপব্যবহার ও রাজনৈতিক বিতর্ক (Abuse of Red Notices and Human Rights Controversies)
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের দমনে এক অনন্য হাতিয়ার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর অপব্যবহার নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির সংবিধানের অনুচ্ছেদ তিনে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, ইন্টারপোল কোনো রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত বিরোধে অংশ নেবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কিছু কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকার তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্তা করার জন্য এই আন্তর্জাতিক রেড নোটিশ ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও ব্যবসায়ী বিল ব্রাউডার (Bill Browder)। তার বহুল আলোচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রেড নোটিশ: আ ট্রু স্টোরি অব হাই ফাইন্যান্স, মার্ডার, অ্যান্ড ওয়ান ম্যানস ফাইট ফর জাস্টিস (Red Notice: A True Story of High Finance, Murder, and One Man’s Fight for Justice)-এ তিনি বিস্তারিত নথিভুক্ত করেছেন কীভাবে কিছু রাষ্ট্র ভুয়া আর্থিক অপরাধের অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে বারবার ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির চেষ্টা করেছিল (Browder, 2015)। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একবার ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হলে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ান্টেড হিসেবে চিহ্নিত হন, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হয়ে যায় এবং যেকোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখলেই তাকে আটক করা হতে পারে। একজন নির্দোষ ভিন্নমতাবলম্বীর জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য এই ধরনের অপব্যবহার অত্যন্ত মারাত্মক।
আন্তর্জাতিক আইন গবেষক রুথ ডেলভেচিও (Ruth Del Vecchio) ইন্টারপোলের আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, সংস্থাটির সাধারণ সচিবালয়ের কাছে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ নোটিশের আবেদন জমা পড়ে যে প্রতিটি মামলার গভীর সত্যতা আগাম যাচাই করা তাদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না (Del Vecchio, 2019)। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু রাষ্ট্র সহজেই নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করে। ইতিহাসবিদ ইউরি ফেলশটিনস্কি (Yuri Felshtinsky) রাজনৈতিক নির্বাসিতদের ওপর আন্তঃসীমান্ত দমনপীড়নের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছেন যে, এই ধরনের অপব্যবহার আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের সার্বিক নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে (Felshtinsky, 2010)।
এই সমালোচনা ও সংকটের মুখে ইন্টারপোল তাদের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা তাদের স্বাধীন তদারকি সংস্থা ইন্টারপোলের ফাইল নিয়ন্ত্রণ কমিশন (Commission for the Control of Interpol’s Files – CCF)-এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এখন কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নোটিশ জারি করা হয়েছে, তবে তিনি সরাসরি এই কমিশনের কাছে আবেদন করে সেই নোটিশ বাতিল করার দাবি জানাতে পারেন। আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে এই ধরনের অপব্যবহার কঠোর হস্তে বন্ধ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতার ভবিষ্যৎ ও বহুপাক্ষিক শাসন (The Future of International Police Cooperation and Multilateral Governance)
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বজুড়ে অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের রূপ যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতার কৌশলকেও নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সাইবার হামলা, মহাকাশভিত্তিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং বায়ো-সন্ত্রাসবাদের মতো অতি-জটিল হুমকি মোকাবিলা করতে হবে। এই নতুন বাস্তবতায় কেবল ইন্টারপোল বা ইউরোপোলের মতো প্রথাগত সংস্থাগুলো একা সমস্ত বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে না। অপরাধবিজ্ঞানী বেন বোহেন (Ben Bowling) এবং জেমস শেপটিস্কি (James Sheptycki) তাদের তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক পুলিশিং এখন একটি বহুপাক্ষিক ও স্তরভিত্তিক বৈশ্বিক নিরাপত্তা শাসনের রূপ ধারণ করছে (Bowling & Sheptycki, 2012)।
ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে বিভিন্ন আঞ্চলিক পুলিশ জোটের পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ। ইউরোপের ইউরোপোলের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকায় আমেরিপোল (Ameripol), দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ানাপোল (Aseanapol) এবং আফ্রিকায় আফরিলপোল (Afripol) তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক স্টিফেন শুল্টজ (Stephen Schultz) এই আঞ্চলিক ব্লকগুলোর বিকাশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বিশ্বায়িত অপরাধ দমনে এই ধরনের আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলো স্থানীয় বাস্তবতা ও ভাষাগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ে তথ্য বিনিময় করতে পারে (Schultz, 2017)। এই আঞ্চলিক জোটগুলো যখন বৈশ্বিক স্তরে ইন্টারপোলের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করে, তখন অপরাধীদের লুকানোর জায়গা বিশ্বজুড়ে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সাইবার জগত এবং ডার্ক ওয়েবের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের প্রধান ময়দান আর শহরের রাস্তা বা সীমান্ত চৌকি থাকবে না; এর বড় একটি অংশ পরিচালিত হবে ক্লাউড সার্ভার এবং এনক্রিপ্টেড মেটাবার্সের গভীরে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালিস হিলস (Alice Hills) ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর রূপরেখা নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, প্রযুক্তি জায়ান্ট এবং বেসরকারি আইটি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারি পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া আগামী দিনের সাইবার সন্ত্রাসবাদ থামানো অসম্ভব হবে (Hills, 2014)। পুলিশকে এখন কম্পিউটার প্রোগ্রামার, এথিক্যাল হ্যাকার এবং ডেটা সায়েন্টিস্টদের নিয়ে যৌথ তদন্ত দল গঠন করতে হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেবল কিছু পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত বিষয় নয়; এটি সমকালীন বিশ্বের অস্তিত্বের লড়াই। জাতীয় স্বার্থের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মানবজাতির নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই বৈশ্বিক আইনি পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক সংঘাত, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং সার্বভৌমত্বের সমস্ত টানাপোড়েন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এই নিঃশব্দ সমন্বয়ই পৃথিবীকে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ হিসেবে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল।
স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, সামরিক হস্তক্ষেপ ও মানবাধিকার (Local Law Enforcement, Military Intervention and Human Rights): নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ভারসাম্য
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সামরিক বাহিনী বনাম স্থানীয় পুলিশ (Military Intervention versus Local Law Enforcement in Internal Security)
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বেসামরিক পুলিশ বাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত থাকে। স্থানীয় পুলিশ কাজ করে অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে। তাদের প্রশিক্ষণের মূল কথাই হলো ন্যূনতম বলপ্রয়োগ এবং আইনানুগ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাজকে শান্ত রাখা। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর মৌলিক প্রশিক্ষণ হলো যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য, যেখানে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শত্রুকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও তীব্র অভ্যন্তরীণ সহিংসতার যুগে এই দুই বাহিনীর মধ্যকার কার্যগত সীমারেখা ক্রমেই ধূসর হয়ে পড়ছে। প্রখ্যাত সামরিক ইতিহাসবিদ ও নিরাপত্তা গবেষক রিচার্ড কোহন (Richard H. Kohn) তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন যে, অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে সামরিক বাহিনীকে নিয়মিতভাবে যুক্ত করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তির ওপর এক ধরনের অদৃশ্য চাপ তৈরি করে (Kohn, 1997)।
এই টানাপোড়েন বোঝার জন্য একটি ঐতিহাসিক আইনি নীতিকে জানা দরকার, যা অ্যাংলো-স্যাক্সন আইনশাস্ত্রে পস কোমিট্যাটাস নীতি (Posse Comitatus Principle) নামে পরিচিত। এই নীতির মূল কথা হলো, বেসামরিক প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সামরিক বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ আইনপ্রয়োগের কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। আইনবিজ্ঞানী চার্লস ডনল্যাপ (Charles J. Dunlap Jr.) তার বিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, সামরিক বাহিনীর মানসিকতা এবং বেসামরিক পুলিশের মানসিকতা কখনোই এক হতে পারে না (Dunlap, 2001)। পুলিশ যখন কোনো অপরাধীকে দেখে, সে তাকে একজন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু একজন সৈনিক যখন মাঠে নামে, তার দেখার চোখ থাকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো – যেখানে সামনে থাকা পক্ষটি হলো ধ্বংসযোগ্য শত্রু। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধংদেহী মানসিকতার অনুপ্রবেশ বহু সময় সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক সংকট ডেকে আনে।
তবে বাস্তবতার অন্য একটি দিকও রয়েছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী স্যামুয়েল ফাইনবার্গ (Samuel E. Finer) তার ক্লাসিক গ্রন্থ দ্য ম্যান অন হর্সব্যাক: দ্য রোল অব দ্য মিলিটারি ইন পলিটিক্স (The Man on Horseback: The Role of the Military in Politics)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর অস্ত্র ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্র বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায় (Finer, 1962/2002)। যখন কোনো দেশে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত আন্তর্জাতিক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো একযোগে হামলা চালায় বা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল দখল করে নেয়, তখন সাধারণ থানা-পুলিশের পক্ষে সেই সংকট সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ধরনের চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র যখন সামরিক বাহিনীকে তলব করে, তখন সামরিক শক্তির দক্ষতা তাৎক্ষণিকভাবে বড় বিপর্যয় হয়তো ঠেকিয়ে দেয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সামরিক অপারেশনের স্থায়িত্ব বাড়ার সাথে সাথে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্ব সংকুচিত হয়ে পড়ে।
অতএব, অভ্যন্তরীণ আইনপ্রয়োগে সামরিক হস্তক্ষেপ কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়; এটা হলো চরম রাষ্ট্রীয় সংকটের একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। সামরিক বাহিনীকে যদি নিয়মিত পুলিশিংয়ের কাজে বেশিদিন নিয়োজিত রাখা হয়, তবে তা বেসামরিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি পেশাদারিত্ব ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে রাষ্ট্রকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যেন জরুরি সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই স্থায়ী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিতে রূপান্তরিত না হয়।
ব্যতিক্রমী অবস্থা, জরুরি আইন ও সাংবিধানিক সুরক্ষা (State of Exception, Emergency Laws and Constitutional Protections)
সন্ত্রাসবাদের অভিঘাত যখন তীব্র রূপ নেয়, তখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই সাধারণ আইন সাময়িকভাবে স্থগিত করে জরুরি অবস্থা বা বিশেষ নিরাপত্তা আইন জারি করে। রাজনৈতিক দর্শন ও আইনশাস্ত্রে এই পরিস্থিতিকে ব্যতিক্রমী অবস্থা (State of Exception) বলে অভিহিত করা হয়। এই ধারণার সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইতালীয় চিন্তাবিদ জর্জিও আগামবেন (Giorgio Agamben) তার বিখ্যাত গ্রন্থ স্টেট অব এক্সেপশন (State of Exception)-এ (Agamben, 2005)। আগামবেন দেখান যে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো জরুরি অবস্থাকে কেবল একটি সাময়িক পরিস্থিতি হিসেবে দেখে না; বরং তারা সংকটের সুযোগ নিয়ে এমন সব নির্বাহী ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয় যা সাধারণ সময়ে সংবিধান অনুমোদন করে না। এর ফলে আইনের ভেতরে থেকেই এক ধরনের আইনহীনতার পরিসর তৈরি হয়।
আগামবেনের এই চিন্তার গোড়ায় ছিল বিতর্কিত জার্মান আইনবিদ কার্ল স্মিট (Carl Schmitt)-এর রাজনৈতিক দর্শন। স্মিট তার ১৯২২ সালের বইতে একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, “যিনি ব্যতিক্রমী অবস্থা নির্ধারণ করেন, তিনিই সার্বভৌম” বা ‘সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী তিনিই যিনি সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেন’ (Schmitt, 1922/1985)। স্মিটের যুক্তি ছিল, একটি রাষ্ট্র যখন চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন সংবিধানের সাধারণ নিয়মগুলো মেনে দেশ পরিচালনা করা যায় না। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাষ্ট্রপ্রধানকে সংবিধানের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। সমকালীন সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে বহু সরকার ঠিক এই যুক্তি ব্যবহার করে বিচার বিভাগ ও আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নির্বাহী আদেশে বিশেষ অভিযান, সেনা মোতায়েন বা গণগ্রেপ্তার পরিচালনা করে থাকে।
কিন্তু এই ধরনের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের ফলে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইনের গবেষক ওরেেন গ্রস (Oren Gross) এবং ফিওনুয়ালা নি আওলাইন (Fionnuala Ní Aoláin) তাদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ল ইন টাইমস অব ক্রাইসিস: ইমার্জেন্সি পাওয়ারস ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Law in Times of Crisis: Emergency Powers in Theory and Practice)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সাময়িক জরুরি আইনগুলো ধীরে ধীরে দেশের স্থায়ী আইনে রূপ নেয় (Gross & Ní Aoláin, 2006)। একবার কোনো বিশেষ আইন পাস করে পুলিশ বা সেনাবাহিনীকে বিচারবহির্ভূত কর্তৃত্ব দেওয়া হলে, সংকট কেটে যাওয়ার পরও রাষ্ট্র আর সেই ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চায় না।
এর চূড়ান্ত পরিণতি হয় এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিকাশ। নাগরিকরা যখন দেখে যে কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যে কাউকে আটক করা যায়, তল্লাশি চালানো যায় এবং তার চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায়, তখন সংবিধানের সুরক্ষাকবচগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। সুতরাং, জাতীয় নিরাপত্তার নামে জারি করা যেকোনো ব্যতিক্রমী ক্ষমতার ওপর কঠোর আইনি সীমাবদ্ধতা এবং সময়ের সুনির্দিষ্ট সীমা বেঁধে না দিলে তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয়।
মানবাধিকারের সংকোচন ও প্রাক-বিচারিক আটক (Erosion of Human Rights and Pre-Trial Detention Dilemmas)
সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় অভিঘাতটি পড়ে মানবাধিকারের ওপর। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, প্রতিটি মানুষের সুবিচার পাওয়ার অধিকার, নির্যাতনমুক্ত থাকার অধিকার এবং যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে অভিযোগ ছাড়া মুক্তি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের মতো অপ্রচলিত ঝুঁকি মোকাবিলার নামে রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই প্রাক-বিচারিক আটক (Pre-Trial Administrative Detention)-এর মতো চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই কেবল সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় একজন নাগরিককে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখার এই ব্যবস্থা আইনের মূল সুরকেই আঘাত করে।
এই নৈতিক ও আইনি দ্বন্দ্বের তাত্ত্বিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন কানাডীয় দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ মাইকেল ইগনাটিয়েফ (Michael Ignatieff) তার গ্রন্থ দ্য লেসার ইভিল: পলিটিক্যাল এথিক্স ইন অ্যান এজ অব টেরর (The Lesser Evil: Political Ethics in an Age of Terror)-এ (Ignatieff, 2004)। ইগনাটিয়েফ যুক্তি দেন যে, বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা রুখতে রাষ্ট্রকে কখনো কখনো ‘কম মন্দ’ পথ বেছে নিতে হতে পারে, যার মধ্যে কিছু নাগরিক অধিকার সাময়িকভাবে সংকুচিত করার মতো বিষয় থাকে। কিন্তু তিনি একই সাথে সতর্ক করে দেন যে, রাষ্ট্র যদি এই কম মন্দ কাজ করতে গিয়ে নিজের নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলে এবং নিজেই সন্ত্রাসীদের মতো অমানবিক হয়ে ওঠে, তবে সেই লড়াইয়ে রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে পরাজিত হয়।
মার্কিন বিচারশাস্ত্রবিদ রোনাল্ড ডওয়ার্কিন (Ronald Dworkin) তার গ্রন্থ ইজ ডেমোক্রেসি পসিবল হিয়ার? প্রিন্সিপলস ফর আ নিউ পলিটিক্যাল ডিবেট (Is Democracy Possible Here?)-এ মানবাধিকারের এই সংকোচনকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন (Dworkin, 2006)। ডওয়ার্কিন দেখিয়েছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তার নামে যখন মানবাধিকার খর্ব করা হয়, তখন সমাজ আসলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং খর্ব করা হয় নির্দিষ্ট কিছু দুর্বল বা সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করে তারা নিরাপদে আছে, অথচ আইনের সুরক্ষা বঞ্চিত হয় তারা যাদের কোনো রাজনৈতিক আওয়াজ নেই। এই অন্যায় বৈষম্য একটি সমাজের নৈতিক সংহতিকে ভেঙে দেয়।
ব্রিটিশ মানবাধিকার আইনজীবী অ্যান্টনি লেস্টার (Anthony Lester) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, আটকের সময় নির্যাতন বা অমানবিক আচরণ নিষিদ্ধ করার আইনটি একটি পরম অধিকার, যা কোনো যুদ্ধ বা জাতীয় জরুরি অবস্থার অজুহাতেও লঙ্ঘন করা যায় না (Lester, 2005)। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গোপন আটক কেন্দ্রগুলোতে সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনীগুলো তথাকথিত ‘উন্নত জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল’-এর নামে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এই ধরনের নির্যাতন কেবল ব্যক্তির মানবিক মর্যাদাকেই পদদলিত করে না, বরং এই উপায়ে আদায় করা তথ্যের আইনি কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না এবং তা চরমপন্থা নির্মূলের পথকে আরও জটিল করে তোলে।
নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতা: গণতান্ত্রিক প্যারাডক্স ও তাত্ত্বিক বিতর্ক (Security versus Liberty: The Democratic Paradox and Theoretical Debates)
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো – একটি সমাজ কতটা নিরাপত্তার জন্য তার কতটা স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে? যদি রাষ্ট্র নাগরিকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় তবে সেখানে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে; আবার যদি নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা দিতে চায় তবে রাষ্ট্রকে একটি নজরদারি ও পুলিশি রাষ্ট্রে রূপ নিতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই সংকটকে গণতান্ত্রিক প্যারাডক্স (Democratic Paradox) বলা হয়। মার্কিন রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন (Benjamin Franklin) অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই বিষয়ে এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যারা সাময়িক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য স্বাধীনতা ত্যাগ করে, তারা স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা কোনোটিরই যোগ্য নয়” বা ‘অস্থায়ী সুরক্ষার বিনিময়ে মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিলে পরিণামে কিছুই বাঁচে না’ (Franklin, 1755/1907)।
আধুনিক যুগে এই বিতর্কের তাত্ত্বিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করেছেন আইন দার্শনিক জেরেমি ওয়ালড্রন (Jeremy Waldron) তার অবিস্মরণীয় গ্রন্থ টর্চার, টেরর, অ্যান্ড ট্রেড-অফস: ফিলোসফি ফর দ্য হোয়াইট হাউজ (Torture, Terror, and Trade-Offs: Philosophy for the White House)-এ (Waldron, 2010)। ওয়ালড্রন নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যকার সম্পর্ককে কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেনের মতো ট্রেড-অফ হিসেবে দেখার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, যখনই সরকার নিরাপত্তার স্বার্থে স্বাধীনতার কিছু অংশ কেটে ফেলার কথা বলে, তখন বাস্তবে সাধারণ মানুষ কোনো অতিরিক্ত নিরাপত্তা পায় না; বরং তারা রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার মুখে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার বিসর্জন কখনো প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
বিপরীতে সমাজবিজ্ঞানী অ্যামিতাই ইতজিওনি (Amitai Etzioni) তার কমিউনিটারিয়ানিজম (Communitarianism) তত্ত্বের মাধ্যমে বিষয়টি অন্যভাবে দেখেছেন। তার বই হাউ প্যাট্রিয়টিক ইজ দ্য প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট? (How Patriotic is the Patriot Act?)-এ তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, কোনো সমাজ যদি ধ্বংস হয়ে যায় বা প্রতিদিন রক্তপাতের শিকার হয়, তবে সেখানে কোনো নাগরিক স্বাধীনতা কার্যকর থাকতে পারে না (Etzioni, 2004)। তার মতে, অধিকারের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সমষ্টিগত সমাজের প্রতি কিছু দায়িত্ব রয়েছে। চরম সংকটের মুহূর্তে সমষ্টির সুরক্ষার স্বার্থে ব্যক্তিগত সুবিধায় কিছু বিধিনিষেধ মেনে নেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক পরাজয় নয়, বরং তা সমাজের বৃহত্তর টিকে থাকারই একটি বাস্তবসম্মত কৌশল।
এই তাত্ত্বিক সংঘাতটি আধুনিক রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত এক টানাপোড়েন তৈরি করে। নীতিনির্ধারকদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যেন সন্ত্রাসবাদের ভীতি তাদেরকে এক অন্ধ অন্ধকারের দিকে ঠেলে না দেয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্যই একটি মৌলিক দায়িত্ব, কিন্তু সেই নিরাপত্তা অর্জনের প্রক্রিয়ায় যদি গণতন্ত্রের মৌলিক আত্মাই বিলীন হয়ে যায়, তবে সেই বিজয় অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা, নজরদারি ও দায়মুক্তির সংকট (Extrajudicial Powers, Mass Surveillance and the Crisis of Impunity)
সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভেতরে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাধিটি বাসা বাঁধে, তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি (Culture of Impunity)। যখন পুলিশ বা সেনাবাহিনীকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে ফলাফলই আসল, পদ্ধতি কীভাবে অর্জিত হলো তা বিবেচ্য নয়, তখন তারা বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা প্রয়োগে উৎসাহিত হয়। আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড লুবান (David Luban) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ লিগ্যাল এথিক্স অ্যান্ড হিউম্যান ডিগনিটি (Legal Ethics and Human Dignity)-এ এই অধঃপতনকে চিহ্নিত করেছেন (Luban, 2007)। লুবান দেখিয়েছেন কীভাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে একটি আইনি শূন্যতা (Legal Black Holes) তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কোনো বেআইনি কাজের জন্য আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সুযোগ নিয়ে পরিচালিত গণনজরদারি (Mass Surveillance)। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তাদের নাগরিকদের প্রতিটি ফোন কল, ইমেইল, আর্থিক লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গতিবিধির ওপর নজরদারি চালানোর জন্য বিপুল অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। হার্ভার্ডের গবেষক শ্যারন সাক্সেনিয়ান (Sharon Saxenian) প্রযুক্তি ও ক্ষমতার সম্পর্ক পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার আজ কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে (Saxenian, 2006)। রাষ্ট্র দাবি করে যে চরমপন্থীদের নেটওয়ার্ক ভাঙার জন্য এই নজরদারি অপরিহার্য, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এই নজরদারির জাল সাধারণ রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং মানবাধিকার কর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এই বিচারবহির্ভূত ক্ষমতার চরমতম রূপ হলো কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। যখন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা নিজেই বিচারক এবং নিজেই জল্লাদের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তখন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইনবিদ অ্যালান ডারশোভিচ (Alan Dershowitz) তার বই হোয়াই টেররিজম ওয়ার্কস: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য থ্রেট, রেসপন্ডিং টু দ্য চ্যালেঞ্জ (Why Terrorism Works: Understanding the Threat, Responding to the Challenge)-এ সন্ত্রাসবাদের কঠিন বাস্তবতাগুলো আলোচনা করলেও স্বীকার করেছেন যে, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে যদি কোনো নিয়ন্ত্রক ছাড়া ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে তারা এক অনিয়ন্ত্রিত দানবে পরিণত হয় (Dershowitz, 2002)।
আইনের শাসন ভেঙে পড়ার এই প্রক্রিয়া সমাজের ভেতরে গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে রক্ষকই ভক্ষকের রূপ নিয়েছে এবং রাষ্ট্রের অপরাধের কোনো বিচার হচ্ছে না, তখন সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নৈতিক কর্তৃত্ব ধসে পড়ে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল মানবাধিকারকেই ধ্বংস করে না, বরং এটি উগ্র মতাদর্শীদের প্রচারণাকে আরও উসকে দেয় যে এই অন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কেবল অস্ত্রের মাধ্যমেই জবাব দেওয়া সম্ভব।
ভারসাম্য রক্ষা: বিচারিক তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রূপরেখা (Striking the Balance: Judicial Oversight and Institutional Reform Frameworks)
নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার এই জটিল সমীকরণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে পাওয়া অসম্ভব কোনো স্বপ্ন নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই তখনই টেকসই হতে পারে যখন প্রতিটি নিরাপত্তা পদক্ষেপের পেছনে বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালতের সাবেক বিচারপতি অ্যালিক স্যাক্স (Albie Sachs) তার স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ দ্য স্ট্রেঞ্জ অ্যালকেমি অব লাইফ অ্যান্ড ল (The Strange Alchemy of Life and Law)-এ লিখেছেন যে, চরম জাতীয় সংকটের সময়েও আদালতকে অবশ্যই মানবাধিকারের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে (Sachs, 2009)। নির্বাহী বিভাগ যদি নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায়, তবে আদালতকে সেই ক্ষমতার বৈধতা ও সংখ্যানুপাতিকতা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো সংখ্যানুপাতিকতা নীতি (Principle of Proportionality)। আইন গবেষক লরা ডনোহিউ (Laura K. Donohue) তার আকর গ্রন্থ দ্য কস্ট অব সিকিউরিটি: আ স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য ফিউচার (The Cost of Security: A Strategy for the Future)-এ দেখিয়েছেন যে, সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য গৃহীত ব্যবস্থাটি ঝুঁকির পরিমাণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে (Donohue, 2008)। কোনো ছোট হুমকি প্রতিহত করতে গিয়ে একটি পুরো অঞ্চলের মানুষের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া বা ঢালাওভাবে কারফিউ জারি করা এই নীতির চরম লঙ্ঘন। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা এমন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারে সবচেয়ে কম আঘাত লাগে।
ভারসাম্য রক্ষার দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনবিদ টমাস বিউয়ার (Thomas Buergenthal) দেখিয়েছেন যে, পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তাদের মানবাধিকার, জাতিগত সংবেদনশীলতা এবং পেশাদারিত্বের আধুনিক পাঠ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি (Buergenthal, 2006)। সামরিক বাহিনীকে পুলিশিংয়ের বিকল্প না বানিয়ে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীকে আরও উন্নত প্রযুক্তি, সাইবার তদন্তের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। একই সাথে প্রয়োজন একটি স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ কমিশন, যা যেকোনো বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা অপব্যবহারের তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকরভাবে লড়ছে তার পরিমাপ কেবল কতজন চরমপন্থী নিহত হলো তা দিয়ে হয় না; বরং তার চেয়েও বড় পরিমাপ হলো এই লড়াইয়ের পর রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা অক্ষত ও বলবান থাকল। মানবাধিকারের মূল সুরকে বিসর্জন দিয়ে যে নিরাপত্তা কেনা হয়, তা এক ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা মাত্র। নাগরিকের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত রেখেই সন্ত্রাসবাদকে দমন করার কঠিন পথটিতে হাঁটাটাই একটি সভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
অর্থায়ন, বাংলাদেশ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ (Financing, Bangladesh and Future Challenges): অর্থ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
সন্ত্রাসী অর্থায়ন (Terrorist Financing): উৎস ও সংগ্রহপদ্ধতি
সন্ত্রাসী অর্থায়নের তাত্ত্বিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয়তা (Theoretical Framework and Necessity of Terrorist Financing)
সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা সশস্ত্র তৎপরতা টিকিয়ে রাখার পেছনে অর্থের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাধারণ মানুষের চোখে সন্ত্রাসবাদ বলতে হয়তো হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো আত্মঘাতী হামলা বা আকস্মিক গুলির ঘটনাই দৃশ্যমান হয়। কিন্তু এই ধরনের একেকটি দৃশ্যমান ঘটনার পেছনে যে অদৃশ্য এবং জটিল অর্থনৈতিক অবকাঠামো কাজ করে, তা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। একটি সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করতে তুলনামূলকভাবে অল্প অর্থের প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু সেই হামলাকারীকে প্রস্তুত করা, তাকে দীর্ঘদিন গোপন আশ্রয়ে রাখা, তার পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া এবং সর্বোপরি সংগঠনের অস্তিত্ব বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়মিত অর্থের জোগান লাগে। অর্থ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক সংগঠন সশস্ত্র নেটওয়ার্কের রূপ নিতে পারে না।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার (Gary Becker) তার যুক্তিশীল পছন্দ তত্ত্ব (Rational Choice Theory)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে যেকোনো বেআইনি কাজের পেছনে লাভ ও ক্ষতির বস্তুনিষ্ঠ হিসাব থাকে (Becker, 1968)। সন্ত্রাসীরাও এই অর্থনৈতিক যুক্তির বাইরে নয়। তারা তাদের সীমিত সম্পদ কীভাবে সর্বোচ্চ ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করবে এবং সেই সম্পদের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকেল ফ্রিম্যান (Michael Freeman) সন্ত্রাসী অর্থায়নের একটি বিশদ তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করেন (Freeman, 2012)। ফ্রিম্যানের মতে, যেকোনো সশস্ত্র সংগঠনের অর্থায়নের উৎস মূল্যায়নের জন্য ছয়টি নির্দিষ্ট মানদণ্ড কাজ করে: তহবিলের পরিমাণ, উৎসের নির্ভরযোগ্যতা, তহবিলের ওপর সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ, অর্থ সংগ্রহের নিরাপত্তা বা ঝুঁকি, অর্জিত তহবিলের ব্যবহারের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বৈধতা। কোনো সংগঠন যদি এমন কোনো উৎসের ওপর নির্ভর করে যার ওপর তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই সংগঠনের টিকে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আইন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিকোলাস রাইডার (Nicholas Ryder) সন্ত্রাসী তহবিলকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করেছেন: প্রত্যক্ষ পরিচালন ব্যয় এবং সাংগঠনিক টিকে থাকার ব্যয় (Ryder, 2015)। পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে পড়ে অস্ত্র কেনা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা যাতায়াত খরচ। অন্যদিকে সাংগঠনিক টিকে থাকার ব্যয় অনেক ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে কারাবন্দী সদস্যদের আইনি সহায়তা, নিহত সদস্যদের পরিবারকে মাসিক ভাতা, গোপন আস্তানা ভাড়া, প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনা এবং নতুন সদস্য টানার জন্য প্রচারকাজ চালানো। সন্ত্রাসী অর্থায়ন এবং সাধারণ অর্থপাচারের মধ্যে একটি গভীর তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। অর্থপাচারের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ অর্থকে বিভিন্ন হাতবদলের মধ্য দিয়ে আইনি বা বৈধ আর্থিক কাঠামোয় প্রবেশ করানো হয়। বিপরীতভাবে, সন্ত্রাসী অর্থায়নে সম্পূর্ণ বৈধভাবে উপার্জিত অর্থও চরমপন্থী মতাদর্শের প্রভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মতো অবৈধ ও সহিংস উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে (Acharya, 2009)। এই দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং নজরদারি দিয়ে সন্ত্রাসী অর্থ প্রবাহ পুরোপুরি আটকে দেওয়া আর্থিক গোয়েন্দাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সন্ত্রাসীদের অর্থনৈতিক চাহিদা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস শেলিং (Thomas Schelling) সংঘাতের কৌশল আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন যে সহিংস গোষ্ঠীগুলোর দরকষাকষির ক্ষমতা তাদের আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে (Schelling, 1960)। যে সংগঠন যত বেশি স্বাধীনভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা ততটাই জটিল হয়। অর্থায়নের এই কাঠামোটি তাই কেবল মুদ্রার লেনদেন নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রণকৌশল, যা মতাদর্শিক সহিংসতাকে দীর্ঘায়িত করার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও ভূরাজনৈতিক প্রক্সি অর্থায়ন (State Sponsorship and Geopolitical Proxy Financing)
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অর্থ সংগ্রহের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা থেকে শুরু করে সমসাময়িক ভূরাজনীতি পর্যন্ত বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজেদের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে দুর্বল করা বা সরাসরি যুদ্ধের দায় এড়ানোর জন্য অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়মিত অর্থায়ন করে আসছে। কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যখন কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক ছত্রচ্ছায়া পায়, তখন তাদের পরিচালনা ক্ষমতা সাধারণ অপরাধী চক্রের সীমা ছাড়িয়ে আধা-সামরিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বহুমুখী মাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রগুলো মূলত তিনটি ভিন্ন উপায়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে: সরাসরি আর্থিক অনুদান, পরোক্ষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা (Byman, 2005)। বাইম্যানের মতে, রাষ্ট্র যখন সরাসরি অর্থ দেয়, তখন তা প্রায়শই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন বাজেট থেকে নগদে বা সুরক্ষিত চ্যানেলে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া তেল, গ্যাস বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ কম মূল্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তা বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের একটি বড় দুর্বলতাও রয়েছে। কোনো গোষ্ঠী যদি পুরোপুরি একটি পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে ওই গোষ্ঠীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।
নিরাপত্তা গবেষক মাইকেল স্ট্রোল (Michael Stohl) রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসবাদকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি সাশ্রয়ী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে (Stohl, 2006)। সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করার চেয়ে কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা অনেক সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা ইয়েমেনের হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোর টিকে থাকার পেছনে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক সহায়তার ভূমিকা রয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো কেবল অস্ত্রই পায় না, বরং তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যও পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র থেকে নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ পেয়ে থাকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল গিলবার্ট (Paul Gilbert) আধুনিক যুদ্ধের রূপান্তর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি জোরদার হওয়ার ফলে রাষ্ট্রগুলো এখন আর সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে পারে না (Gilbert, 2003)। এর পরিবর্তে রাষ্ট্রগুলো ফ্রন্ট কোম্পানি, ভুয়া বাণিজ্যিক চুক্তি এবং কূটনৈতিক ব্যাগের অনাক্রম্যতার সুযোগ নিয়ে নগদ অর্থ এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে অফশোর ব্যাংকিং হাব এবং ট্যাক্স হ্যাভেনে বেনামি শেল কোম্পানি খুলে সেই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ সহকারে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করা রাজনৈতিক ও আইনিভাবে জটিল হয়ে ওঠে।
অপরাধ ও অবৈধ অর্থনীতির বিস্তার (Crime and the Expansion of Illicit Economy)
নব্বইয়ের দশকে দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটার পর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সামনে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের টানাপোড়েন শুরু হয়। এর ফলে তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচলিত অপরাধ জগতের সাথে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়। নিরাপত্তা গবেষণায় মতাদর্শিক চরমপন্থা এবং সংগঠিত অপরাধের এই মেলবন্ধনকে অপরাধ-সন্ত্রাস ধারাবাহিকতা (Crime-Terror Continuum) বলা হয়। অপরাধবিজ্ঞানী তামারা মাকারেঙ্কো (Tamara Makarenko) এই রূপান্তরের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের মধ্যে একসময় যে স্পষ্ট পার্থক্যের সীমারেখা ছিল, তা ধীরে ধীরে মুছে গেছে (Makarenko, 2004)। মাকারেঙ্কোর মতে, মতাদর্শিক সংগঠনগুলো প্রথমে রসদ ও অস্ত্রের প্রয়োজনে অপরাধীদের ওপর নির্ভর করলেও ধীরে ধীরে তারা নিজেরাই পুরোদস্তুর অপরাধমূলক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদ ও অনুসন্ধানী গবেষক লরেটা নাপোলিওনি (Loretta Napoleoni) তার গবেষণা গ্রন্থ Terror Incorporated: Tracking the Money Behind Global Terrorism-এ তুলে ধরেছেন যে আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সমান্তরালে একটি দুর্বৃত্ত অর্থনীতি (Rogue Economics) গড়ে তুলেছে (Napoleoni, 2005)। এই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো মাদক চোরাচালান, যা নিরাপত্তা গবেষণায় নার্কো-সন্ত্রাসবাদ (Narcoterrorism) নামে পরিচিত। উদাহরণস্বরূপ, আফগানিস্তানে তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আফিম চাষ ও হেরোইন প্রক্রিয়াকরণ ল্যাবরেটরি থেকে নিয়মিত কর আদায় করত। গবেষক ভানিয়া ফেলবাব-ব্রাউন (Vanda Felbab-Brown) দেখিয়েছেন যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কেবল মাদক পাচারকারীদের কাছ থেকে চাঁদা নেয় না, বরং কৃষক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারী পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে শত শত মিলিয়ন ডলারের সমান্তরাল অর্থনীতি পরিচালনা করে (Felbab-Brown, 2010)। একই চিত্র দেখা গেছে ল্যাটিন আমেরিকার কলম্বিয়ায়, যেখানে ফার্ক তাদের মোট আয়ের সিংহভাগ অর্জন করত কোকেন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে।
মাদক বাণিজ্যের বাইরে সন্ত্রাসী অর্থায়নের আরেকটি লাভজনক খাত হলো মুক্তিপণের জন্য অপহরণ বা কিডন্যাপিং ফর র্যানসম (Kidnapping for Ransom)। অপরাধবিজ্ঞানী লুইস শেলি (Louise Shelley) তার Dirty Entanglements: Corruption, Crime, and Terrorism গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে সাহারা মরুভূমি অঞ্চল এবং উত্তর আফ্রিকায় সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও পর্যটকদের অপহরণ করে একে একটি লাভজনক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায় রূপ দিয়েছে (Shelley, 2014)। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের প্রাণ বাঁচাতে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে গোপনে মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরো মুক্তিপণ হিসেবে পরিশোধ করেছে, যা ওই অঞ্চলের সন্ত্রাসী অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তাছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট ও পাচারও সন্ত্রাসীদের একটি টেকসই আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট তাদের নিয়ন্ত্রিত তেলক্ষেত্রগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে স্থানীয় কালোবাজারে এবং সীমান্ত পেরিয়ে চোরাচালানকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করত। পাশাপাশি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চুরি, ঐতিহাসিক মুদ্রা পাচার এবং সংরক্ষিত বনভূমি থেকে কাঠ ও বন্যপ্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ আন্তর্জাতিক বাজারে চলে যায়। সাধারণ অপরাধের মতো মনে হলেও এসব চোরাচালান থেকে অর্জিত অর্থের চূড়ান্ত ব্যবহার হয় রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামরিক রসদ সংগ্রহের কাজে।
দাতব্য সংস্থা, এনজিও ও সামাজিক অনুদানের অপব্যবহার (Abuse of Charities, NGOs, and Social Donations)
সন্ত্রাসী অর্থায়নের সবচেয়ে ধূর্ত এবং বিভ্রান্তিকর পদ্ধতিগুলোর একটি হলো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক সংস্থা এবং ধর্মীয় অনুদানের ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করা। সাধারণ মানুষ প্রায়শই তাদের নৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দান করে থাকে। মানুষ যখন বিশ্বাস করে তাদের দেওয়া অর্থে কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের এতিম শিশুরা আশ্রয় পাচ্ছে কিংবা রোগীরা চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে, তখন তারা মুক্তহস্তে অর্থ দেয়। চরমপন্থী সংগঠনগুলো মানুষের এই মানবিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে চতুরতার সাথে ব্যবহার করে তাদের আর্থিক নেটওয়ার্ক সচল রাখে।
মধ্যপ্রাচ্যের চরমপন্থা বিষয়ক গবেষক ম্যাথিউ লেভিট (Matthew Levitt) তার গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও সংলগ্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সমাজকল্যাণমূলক শাখা বা দাওয়াহ (Da’wa) ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে (Levitt, 2006)। লেভিটের মতে, এই সংগঠনগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন করে। এসব দৃশ্যমান সমাজকল্যাণমূলক কাজের ছবি ও প্রতিবেদন দেখিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই তহবিলের একটি অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা হয়, আর বাকি অংশ গোপনে স্থানান্তর করা হয় অস্ত্র কেনা এবং আত্মঘাতী হামলাকারীদের পরিবারকে অনুদান দেওয়ার সামরিক ফান্ডে। একই কাঠামোর ভেতরে সমাজসেবা এবং সহিংসতা মিশে থাকার কারণে আর্থিক গোয়েন্দাদের পক্ষে বৈধ অনুদান থেকে সন্ত্রাসী তহবিলকে আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ রোহান গুণরত্ন (Rohan Gunaratna) বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে নব্বইয়ের দশকে বসনিয়া, চেচনিয়া এবং সোমালিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থাগুলোর ভেতরে চরমপন্থীরা কীভাবে নিজস্ব ফ্রন্ট স্থাপন করেছিল (Gunaratna, 2002)। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের অজান্তেই তাদের পরিবহন, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চরমপন্থীরা অর্থ ও রসদ সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পাচার করেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া অলাভজনক সংস্থা খুলে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে অনুদান সংগ্রহ করে তা সরাসরি সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যয় করার প্রমাণও মিলেছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (Financial Action Task Force) বা এফএটিএফ (FATF) তাদের ৮ নম্বর সুপারিশে স্পষ্ট করে বলেছে যে অলাভজনক সংস্থাগুলো সন্ত্রাসী অর্থায়নের জন্য একটি অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ খাত (FATF, 2014)। মনস্তত্ত্ববিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেরল্ড পোস্ট (Jerrold Post) চরমপন্থার মনস্তাত্ত্বিক অর্থনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে ধর্মীয় ও মতাদর্শিক গোষ্ঠীগুলো তাদের সমর্থকদের ভেতর এমন এক ধরনের মানসিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, যার ফলে সমর্থকরা নিজেদের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত সংগঠনকে দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে (Post, 2007)। ফলে এই অনুদান শুধু বাইরের বড় বড় দাতার ওপর নির্ভর করে না; বরং হাজার হাজার সাধারণ সমর্থকের দেওয়া ছোট ছোট অনুদান একত্রিত হয়ে একটি বিশদ সাংগঠনিক তহবিলে রূপ নেয়।
অপ্রাতিষ্ঠানিক মূল্য স্থানান্তর ও অর্থ পাচার পদ্ধতি (Informal Value Transfer Systems and Cash Smuggling)
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আধুনিক নজরদারি, গ্রাহক যাচাইকরণ পদ্ধতি বা কেওয়াইসি (KYC) এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণের কঠোর নিয়মের কারণে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো দ্রুত অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো হাওয়ালা (Hawala) এবং হুন্ডি (Hundi)। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকায় এই ব্যবস্থাটি শত শত বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে। এই পদ্ধতিতে কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত অতিক্রম করে শারীরিক মুদ্রা বা ইলেকট্রনিক বার্তা না পাঠিয়ে কেবল বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী বা ‘হাওয়ালাদার’দের অভ্যন্তরীণ হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে এক দেশের অর্থ অন্য দেশে পরিশোধ করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী নিকোস পাসাস (Nikos Passas) অপ্রাতিষ্ঠানিক মূল্য স্থানান্তর ব্যবস্থা বা আইভিটিএস (IVTS) নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে হাওয়ালা ব্যবস্থা কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি; বরং ব্যাংকিং সুবিধা বঞ্চিত প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা (Passas, 2003)। তবে পাসাসের মতে, এই ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা – যেমন লেনদেনের কোনো আনুষ্ঠানিক অডিট ট্রেইল বা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ না থাকা – একে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একজন ব্যক্তি দুবাই বা লন্ডনে হাওয়ালা এজেন্টের কাছে নগদ টাকা জমা দিয়ে একটি কোড নম্বর নিল, আর সেই কোড ব্যবহার করে একই দিনে পেশোয়ার বা সোমালিয়ার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে অন্য একজন সমপরিমাণ নগদ অর্থ তুলে নিল। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং নজরদারির কোনো সুযোগ থাকে না।
হাওয়ালা ব্যবস্থার পাশাপাশি আরেকটি প্রাচীন কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম হলো নগদ অর্থ চোরাচালান, যাকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় বাল্ক ক্যাশ স্মাগলিং (Bulk Cash Smuggling) বলা হয়। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, নগদ কাগুজে টাকার উপযোগিতা সন্ত্রাসীদের কাছে কখনোই কমেনি। নগদ টাকার কোনো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থাকে না এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ব্যবহার করা যায়। গবেষক ইনেস ভন বেইমার (Ines von Behr) এবং তার সহযোগীরা গবেষণা প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত মানব কুরিয়ার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে (Von Behr et al., 2013)। সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গাড়ির গোপন কুঠুরিতে, বাণিজ্যিক পণ্যের চালানের ভেতরে কিংবা দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত দিয়ে হেঁটে এই অর্থ বহন করা হয়।
আর্থিক অপরাধ গবেষক মার্টিন রেনহোল্ড (Martin Reinhold) বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বা ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং (TBML)-এর ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন (Reinhold, 2018)। এই পদ্ধতিতে সন্ত্রাসীরা বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেনের আড়ালে পণ্যের চালান দেখিয়ে পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক মূল্যের চেয়ে কম বা বেশি দেখায়। ধরা যাক, এক ডলার মূল্যের একটি পণ্য দশ ডলার মূল্য দেখিয়ে অন্য দেশে পাঠানো হলো; এর মাধ্যমে অতিরিক্ত নয় ডলার কোনো প্রকার ব্যাংকিং সন্দেহ তৈরি না করেই আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রাপকের কাছে পৌঁছে গেল। বাণিজ্যের এই জটিল মারপ্যাঁচ এবং অগণিত কনটেইনারের ভিড়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পক্ষে প্রতিটি চালানের প্রকৃত মূল্য এবং সন্ত্রাসী সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সাইবার অর্থায়ন (Digital Technology, Cryptocurrency, and Cyber-Financing)
একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক ইন্টারনেটের বিকেন্দ্রীভূত রূপ সন্ত্রাসী অর্থায়নের মানচিত্রে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ডিজিটাল বিশ্বের উন্মুক্ততা এবং ক্রিপ্টোগ্রাফিক সুরক্ষার সুযোগ নিয়ে সমকালীন সহিংস গোষ্ঠীগুলো প্রচলিত আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে অকেজো করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং, গোপনীয় সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেল এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে তাদের সমর্থকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে। একে বলা হয় মাইক্রো-ডোনেশন বা ক্ষুদ্র আর্থিক অনুদান। হাজার হাজার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিশ বা পঞ্চাশ ডলারের মতো ক্ষুদ্র অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করার ফলে ব্যাংকিং অ্যালগরিদমে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেনের সংকেত বাজে না, অথচ মাস শেষে তা একটি শক্তিশালী সামরিক বাজেটে রূপ নেয়।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি গবেষক সিন্থিয়া ডিওন-শোয়ার্টজ (Cynthia Dion-Schwarz) এবং তার দল ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুবিধা সন্ত্রাসীদের আর্থিক সুরক্ষাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে (Dion-Schwarz et al., 2019)। যদিও বিটকয়েনের মতো পাবলিক ব্লকচেইনে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড লেজারে সংরক্ষিত থাকে, তবুও সন্ত্রাসীরা মিক্সার (Mixer) বা টাম্বলার (Tumbler) সফটওয়্যার ব্যবহার করে অর্থের ডিজিটাল পথ অস্পষ্ট করে দেয়। এই সফটওয়্যারগুলো শত শত বৈধ ও অবৈধ লেনদেনকে একসাথে মিশিয়ে এমন এক জটিল জাল তৈরি করে যে মূল প্রেরক এবং চূড়ান্ত প্রাপকের মধ্যে কোনো যোগসূত্র বের করা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া মনরো বা জি-ক্যাশের মতো সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে লেনদেনের পরিমাণ ও ওয়ালেট অ্যাড্রেস কোনোভাবেই প্রকাশ্যে দেখার সুযোগ থাকে না।
সাইবার অপরাধের সাথে সন্ত্রাসী অর্থায়নের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি হয়েছে, যা নিরাপত্তা গবেষক ইরিনা অ্যারেনল্ড (Irina Arenlind) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন (Arenlind, 2021)। অ্যারেনল্ডের মতে, মতাদর্শিক গোষ্ঠীগুলো এখন বড় বড় বহুজাতিক কর্পোরেশন, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে র্যানসমওয়্যার (Ransomware) হামলা চালাচ্ছে। এই হামলায় আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ডেটা এনক্রিপ্ট বা লক করে দিয়ে তা ফিরে পাওয়ার বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে কোটি কোটি ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অনেক চরমপন্থী গোষ্ঠী সাইবার অপরাধীদের কাছ থেকে এই ধরনের ম্যালওয়্যার ভাড়া নিয়ে সরাসরি সাইবার চাঁদাবাজিতে নেমে পড়েছে।
অর্থনীতি ও ব্লকচেইন বিশ্লেষক ডেভিড কার্লিন (David Carlin) উল্লেখ করেছেন যে অনিয়ন্ত্রিত বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন বা ডিফাই (DeFi) প্ল্যাটফর্ম এবং নন-ফাঞ্জিবল টোকেন বা এনএফটি (NFT)-এর দ্রুত বিকাশ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে (Carlin, 2022)। কেন্দ্রীয় কোনো ব্যাংকিং বা সরকারি তদারকি না থাকায় এসব প্ল্যাটফর্মে ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সেকেন্ডের মধ্যে ডিজিটাল সম্পদের হাতবদল করা যায়। সন্ত্রাসীরা কোনো ভার্চুয়াল আর্ট বা টোকেন অতি চড়া মূল্যে কেনাবেচা দেখিয়ে মুহূর্তেই অর্থ সীমান্তপাড়ে স্থানান্তর করে নিচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন একটি ডিজিটাল চ্যানেল বন্ধ করার কৌশল খুঁজে বের করে, সন্ত্রাসীরা ততক্ষণে নতুন কোনো প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে শুরু করে।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসী অর্থায়ন (Terrorist Financing in Bangladesh): স্থানীয় নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশে সন্ত্রাসী অর্থায়নের ঐতিহাসিক গতিপথ ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো (Historical Trajectory and Internal Structure of Terrorist Financing in Bangladesh)
বাংলাদেশে সহিংস চরমপন্থার বিস্তার এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো সময়ের সাথে সাথে নিজেদের কৌশলে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন এনেছে। বিশ শতকের শেষ ভাগে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কিছু ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে যখন প্রাথমিক সশস্ত্র তৎপরতার সূচনা হয়, তখন তাদের যোগাযোগের একটি অংশ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত ছিল (Riaz, 2008)। নব্বইয়ের দশকে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (HuJI-B)-এর মতো প্রাথমিক সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংহতি ও বহিরাগত যোগাযোগের উপস্থিতি দেখা যেত। তবে একুশ শতকের শুরুতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের ওপর সার্বিক নজরদারি বৃদ্ধি পায়। ফলে বিদেশি উৎসের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করে টিকে থাকা স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সশস্ত্র দলগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোকে সংগঠিত করার দিকে জোর দেয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) তার গ্রন্থ Islamist Militancy in Bangladesh: A Complex Web-এ বাংলাদেশের চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিস্তার ও স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Riaz, 2008)। তার আলোচনায় উঠে আসে, দুই হাজার সালের শুরুর দিকে সক্রিয় হওয়া জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (JMB) তাদের সাংগঠনিক বিস্তারে পুরোপুরি কোনো একক বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং রীয়াজের আলোচনায় দেশীয় ও বিদেশি ব্যক্তিগত অনুদান, ধর্মীয় দান এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উৎসের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের একটি বহুমুখী কাঠামোর চিত্র পাওয়া যায় (Riaz, 2008)। রীয়াজের বিশ্লেষণ দেখায় যে এই ধরনের সম্পদ আহরণ দলটিকে এক ধরনের দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল, যার ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারির মধ্যেও তাদের সাংগঠনিক যোগাযোগ ও প্রচার কার্যক্রম অভ্যন্তরীণভাবে সচল রাখা সম্ভব হতো।
তাত্ত্বিক দিক থেকে নিরাপত্তা গবেষক মাইকেল ফ্রিম্যান (Michael Freeman) সন্ত্রাসী অর্থায়নের কাঠামো আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে তহবিলের উৎসের ওপর সংগঠনের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি (Freeman, 2012)। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি কেবল একটি একক বা বাইরের উৎসের ওপর নির্ভর করে, তবে সেই উৎসে টান পড়লে পুরো নেটওয়ার্ক ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিপরীতভাবে, স্থানীয় বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত স্বল্প পরিমাণ অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সামরিক সক্ষমতা তৈরি না করলেও তা দীর্ঘমেয়াদী সাংগঠনিক স্থায়িত্ব দিতে পারে। ফ্রিম্যানের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বাংলাদেশের স্থানীয় চরমপন্থী দলগুলোর তহবিল রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, যেখানে বহির্নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় স্তরে সংস্থান সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (International Crisis Group) বাংলাদেশে চরমপন্থার বিস্তার নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো একটি বিকেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে নিজেদের কার্যক্রম বজায় রাখত (International Crisis Group, 2018)। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নির্ভরতার বদলে আঞ্চলিক শাখাগুলোর উপস্থিতি সংগঠনগুলোকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার প্রাথমিক অভিযানের পরেও বিভিন্ন অঞ্চলে সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দেয়। এই ধরনের বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো সামগ্রিক আর্থিক সংস্থান ব্যবস্থাপনাতেও স্থানীয় সেলগুলোকে নিজস্ব পরিসরে তৎপর থাকার সুযোগ তৈরি করেছিল। ফলে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী অর্থায়নের ইতিহাস কেবল বহির্দেশের অর্থপ্রবাহের ইতিহাস নয়; বরং এটা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ও সাংগঠনিক সংস্থান কাজে লাগানোর একটি অভিযোজনমূলক প্রক্রিয়া।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় অর্থ সংগ্রহের সংযোগ (Criminal Activities and Local Resource Mobilization)
চরমপন্থী সংগঠনগুলোর অর্থনৈতিক রসদ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় অনেক সময় সাধারণ অপরাধ জগতের কৌশল ও পদ্ধতির সাথে সংযোগ তৈরি হয়। মতাদর্শিক সশস্ত্র দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় লক্ষ্যকে সামনে রেখে সহিংস পন্থায় অর্থ সংগ্রহকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা মনে করে যে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিপক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হস্তগত করা যুক্তিসঙ্গত। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের ফলে মতাদর্শিক সংগঠনগুলো এমন সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়, যা সাধারণ ডাকাতি, ছিনতাই বা চাঁদাবাজির সমতুল্য।
অপরাধবিজ্ঞানী তামারা মাকারেঙ্কো (Tamara Makarenko) তার অপরাধ-সন্ত্রাস ধারাবাহিকতা তত্ত্ব (Crime-Terror Continuum Theory)-তে উল্লেখ করেছেন যে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক চরমপন্থা এবং সংগঠিত অপরাধ পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোনো জগৎ নয় (Makarenko, 2004)। সংগঠনগুলো টিকে থাকার জন্য বা দ্রুত নগদ তহবিল সংগ্রহের জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়। একইভাবে নিরাপত্তা তাত্ত্বিক লুইস শেলি (Louise Shelley) তার গ্রন্থ Dirty Entanglements: Corruption, Crime, and Terrorism-এ মতাদর্শিক সংগঠন ও অপরাধ চক্রের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া তুলে ধরেন (Shelley, 2014)। শেলি দেখান যে মতাদর্শিক দলগুলো যখন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সংকট বা আর্থিক নজরদারির মুখে পড়ে, তখন তারা ঝুঁকি সত্ত্বেও নগদ অর্থ সংগ্রহের জন্য অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক লুণ্ঠন বা অপরাধমূলক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে।
বাংলাদেশে অপরাধ ও সহিংস চরমপন্থার এই সংযোগের একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয় ২০১৫ সালের আশুলিয়া ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায়। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের একটি শাখায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ লুট করার ঘটনা ঘটে। পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের সঙ্গে নিষিদ্ধ চরমপন্থী নেটওয়ার্কের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র প্রমাণিত হয়। ফলে ঘটনাটি বাংলাদেশে চরমপন্থী তৎপরতা ও অর্থসংগ্রহের সাথে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের বাস্তব সংযোগের একটি উল্লেখযোগ্য নজির হিসেবে বিবেচিত হয়। ঘটনাটি দেখায় যে চরমপন্থী নেটওয়ার্কের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড কখনো কখনো সাধারণ সহিংস ফৌজদারি অপরাধের সাথেও সরাসরি মিশে যেতে পারে।
ডাকাতি ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে জোরপূর্বক অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্ভাব্য অর্থসংগ্রহের কৌশল হতে পারে। কোনো চরমপন্থী সেল স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করলে সেই অর্থপ্রবাহ প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারে। ভুক্তভোগীরা পরিস্থিতির চাপে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে বিষয়টি না জানালে তা আর্থিক নজরদারির দৃষ্টিসীমায় সহজে আসে না। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে মতাদর্শিক লক্ষ্যসম্পন্ন সশস্ত্র সংগঠনের অর্থসংগ্রহের পদ্ধতি কখনো কখনো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের পদ্ধতির সাথে পুরোপুরি মিলে যেতে পারে।
ব্যক্তিক সংস্থান, শিক্ষিত পেশাজীবী ও আত্ম-অর্থায়ন (Personal Resources, Educated Professionals, and Self-Financing)
বাংলাদেশে উগ্রপন্থাকে প্রধানত মাদ্রাসাশিক্ষা, সামাজিক প্রান্তিকতা বা তীব্র অর্থনৈতিক বঞ্চনার সাথে যুক্ত করে দেখার যে প্রচলিত সামাজিক ধারণা ছিল, ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর তা গভীর বিশ্লেষণের মুখে পড়ে। সেই হামলায় দেখা যায় যে নগরকেন্দ্রিক সচ্ছল ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ চরমপন্থী মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সদস্যদের সামাজিক পটভূমিতে একটি বড় ধরনের বৈচিত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) ও সাজিদ পারভেজ (Sajid Parvez) ঢাকার গুলশান হামলার রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তুলে ধরেন যে এই ঘটনাটি চরমপন্থী সংগঠনের সদস্য সংগ্রহের চিরাচরিত ধারণাকে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে (Riaz & Parvez, 2018)। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমকালীন চরমপন্থী তৎপরতা কেবল নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক স্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও সচ্ছল যুবকদের সম্পৃক্ততা সংগঠনগুলোর জন্য একটি ভিন্ন ধরনের জনমিতিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল। এই ধরনের শিক্ষিত সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা দলীয় যোগাযোগ ও পরিচালন পদ্ধতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
নিরাপত্তা গবেষক ইফতেখারুল বাশার (Iftekharul Bashar) নব্য জেএমবির সাংগঠনিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের মধ্যে সচ্ছল ও শিক্ষিত সামাজিক পটভূমির ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে (Bashar, 2017)। বাশারের এই পর্যবেক্ষণ দেখায় যে চরমপন্থী দলে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছিল যাদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান মজবুত ছিল। এই ধরনের সদস্যদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বৈধ সম্পদ আত্ম-অর্থায়নের একটি সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠতে পারে।
আঞ্চলিক অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং সংস্থা এশিয়া/প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (Asia/Pacific Group on Money Laundering) তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে আত্ম-অর্থায়ন বা সেলফ-ফাইন্যান্সিং সমকালীন সন্ত্রাস দমন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জটিল এক চ্যালেঞ্জ (Asia/Pacific Group on Money Laundering, 2016)। বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব বৈধ সঞ্চয়, পারিবারিক অর্থ বা বৈধ পেশাগত আয়ের অংশবিশেষ সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তখন অর্থের প্রাথমিক উৎসে কোনো অবৈধতার ছাপ থাকে না। বৈধ উৎস থেকে আসা ক্ষুদ্র বা আপাত-স্বাভাবিক লেনদেনের অন্তর্নিহিত সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য কেবল লেনদেনের সাধারণ রূপ দেখে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ফলে এই ধরনের ব্যক্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে চরমপন্থী সেলগুলো দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের সাহায্য ছাড়াই স্থানীয়ভাবে রসদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
অলাভজনক খাত, সামাজিক অনুদান ও অপব্যবহারের ঝুঁকি (The Non-Profit Sector, Social Giving, and Risks of Abuse)
সমাজসেবা ও মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং দাতব্য খাত যেকোনো সমাজের জন্যই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চরম দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সংস্থাগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উভয় স্তরেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় সমাজের এই সহানুভূতিশীল ও জনহিতকর কাঠামোর সুযোগ নিয়ে নিজেদের তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। মানুষ যখন মানবিক কারণে দান করে, তখন সেই অর্থের চূড়ান্ত গতিপথ তদারকি করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সাধারণ নাগরিকের থাকে না। এই দুর্বলতার সুযোগে বৈধ সামাজিক ফ্রন্টকে অসদুপায়ে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (Financial Action Task Force) অলাভজনক খাতের ঝুঁকি বিষয়ে তাদের নির্দেশনায় উল্লেখ করেছে যে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো অলাভজনক সংস্থাকে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম বা তহবিল স্থানান্তরের গোপন পথ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে (Financial Action Task Force, 2014)। সংস্থাটির ৮ নম্বর সুপারিশে দেশগুলোকে এমনভাবে নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয় যাতে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কোনো আইনি এনজিও বা চ্যারিটির ছদ্মবেশ নিতে না পারে এবং বৈধ উদ্দেশ্যে সংগৃহীত অর্থ অন্য কোনো সহিংস খাতে সরিয়ে নিতে না পারে। তবে এই নজরদারির ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সাধারণ এবং বৈধ সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড অযথা ব্যাহত না হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) তার গবেষণায় আন্তর্জাতিক ইসলামি দাতব্য সংস্থা ও এনজিওর অর্থপ্রবাহ এবং বাংলাদেশের চরমপন্থী নেটওয়ার্কের সাথে তাদের সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে তৎকালীন বিভিন্ন তদন্ত ও অভিযোগের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন (Riaz, 2008)। গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কাজের আড়ালে কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তহবিল স্থানান্তরের প্রশ্ন ওঠার পর বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি সংস্থার কার্যক্রমের ওপর প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের ওপর কড়া নজরদারি চালু করা হয়।
আঞ্চলিক সংস্থা এশিয়া/প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (Asia/Pacific Group on Money Laundering)-এর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুদানের একটি অংশ তদারকির অভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে (Asia/Pacific Group on Money Laundering, 2016)। স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন সমিতি বা ট্রাস্টের নামে সংগৃহীত নগদ অর্থের ওপর যদি কোনো নিয়মিত অডিট বা নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে তা স্থানীয় চরমপন্থী নেতৃত্বের দ্বারা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। সাধারণ দাতার অজ্ঞাতসারে সেই অর্থ উগ্রপন্থী কর্মীদের আশ্রয় বা প্রচারণায় খরচ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য পরবর্তীতে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুদানের স্বচ্ছতা যাচাইয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন, হুন্ডি ও আর্থিক চ্যানেলসমূহের ঝুঁকি (Informal Value Transfers, Hundi, and Financial Channel Vulnerabilities)
সনাতন ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ স্থানান্তরের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে বিশ্বাসের ভিত্তিতে অর্থ হস্তান্তরের এই পদ্ধতিকে হাওয়ালা (Hawala) বা হুন্ডি (Hundi) বলা হয়। সমাজবিজ্ঞানী নিকোস পাসাস (Nikos Passas) অপ্রাতিষ্ঠানিক মূল্য স্থানান্তর ব্যবস্থা বা আইভিটিএস (IVTS)-এর ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই ব্যবস্থা মূলত কোনো ধরনের লিখিত অডিট ট্রেইল বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড ছাড়া কেবল মধ্যস্থতাকারীদের পারস্পরিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় (Passas, 2003)। পাসাস তুলে ধরেন, যদিও এই ব্যবস্থাটি মূলত সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেন ও অভিবাসী শ্রমিকদের অর্থ পাঠানোর সুবিধার্থে গড়ে উঠেছে, কিন্তু সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাহক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা না থাকায় এটি অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছেও অর্থ স্থানান্তরের একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশে গত এক দশকে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস (MFS)-এর দ্রুত বিকাশ দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সাথে এই দ্রুত ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে এশিয়া/প্যাসিফিক গ্রুপের মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী অর্থায়নের প্রধান ঝুঁকি মূলত ক্ষুদ্র পরিসরের অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ও নগদ লেনদেন থেকে আসে (U.S. Department of State, 2017)। প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক নগদ প্রবাহ বা দ্রুত লেনদেনযোগ্য মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরিত হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নজরদারির বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (Bangladesh Financial Intelligence Unit) তাদের নীতিমালায় সাধারণ অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধের কৌশল হিসেবে লেনদেন বিভাজন বা স্মার্ফিং (Smurfing) পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছে (Bangladesh Financial Intelligence Unit, 2020)। এই কৌশলে বড় অঙ্কের অর্থকে ছোট ছোট লেনদেনে বিভক্ত করা হয়, যা লেনদেনের সামগ্রিক প্রকৃতি ও মূল উদ্দেশ্য শনাক্তকরণকে জটিল করে তুলতে পারে।
আঞ্চলিক অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেলের সাথে স্থানীয় নগদ লেনদেনের সংযোগ আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম একটি দুর্বলতা (Asia/Pacific Group on Money Laundering, 2016)। উদাহরণস্বরূপ, প্রবাসে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি যদি অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ করেন এবং তা দেশে থাকা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে স্থানীয় বিভিন্ন ছোট অ্যাকাউন্টে বিতরণ করা হয়, তবে সেই তহবিলের মূল উৎস ও উদ্দেশ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত অর্থপ্রবাহ আর্থিক অপরাধ ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি চলমান প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইনি প্রতিরোধ কাঠামো, বিএফআইইউ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ (Legal Frameworks, BFIU, and Institutional Countermeasures)
সন্ত্রাসী অর্থায়নের এই অভ্যন্তরীণ ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে তার জাতীয় আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা, আর্থিক ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করা এবং সন্দেহভাজন লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পথ সুগম করা।
আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এশিয়া/প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (Asia/Pacific Group on Money Laundering) তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশে প্রণীত সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ (Anti-Terrorism Act, 2009) এবং ২০১২ ও ২০১৩ সালের সংশোধনী দেশের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সুসংহত করেছে (Asia/Pacific Group on Money Laundering, 2016)। এই আইনের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কাজে অর্থ জোগানোর প্রক্রিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনাগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিষিদ্ধ ঘোষিত ব্যক্তি বা সংগঠনের তহবিল অবরুদ্ধ করার আইনি প্রক্রিয়া প্রণয়ন করা হয়। এর পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (Money Laundering Prevention Act, 2012) প্রণয়নের মাধ্যমে অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনের পরিধি বিস্তৃত করা হয়।
এই প্রতিরোধ কাঠামোর কেন্দ্রীয় কারিগরি দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত বিশেষায়িত আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (Bangladesh Financial Intelligence Unit)। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে তারা বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থার কাছ থেকে নিয়মিত সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন বা এসটিআর (STR) এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড প্রতিবেদন বা এসএআর (SAR) সংগ্রহ করে থাকে (Bangladesh Financial Intelligence Unit, 2021)। বিএফআইইউ এসব আর্থিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কোনো অস্বাভাবিক গতিবিধি লক্ষ্য করলে বা সন্ত্রাসী অর্থায়নের যৌক্তিক উপাদান পেলে প্রাসঙ্গিক আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য সক্ষম তদন্তকারী ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে প্রেরণ করে।
এশিয়া/প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং-এর মূল্যায়নে বাংলাদেশের সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি স্বীকৃত হয়েছে (Asia/Pacific Group on Money Laundering, 2016)। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং আর্থিক গোয়েন্দা কাঠামোর ধারাবাহিক বিকাশ দেশটির আন্তর্জাতিক এএমএল/সিএফটি মানদণ্ড অনুসরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। তবে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরের বহুমুখী কৌশলের কারণে আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থাকে নতুন নতুন ঝুঁকির সাথে ক্রমাগত অভিযোজিত হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ (Terrorism in Bangladesh): ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতা
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি রূপ (Historical Context and Early Manifestations of Terrorism in Bangladesh)
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার নানা রূপ দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর নবগঠিত রাষ্ট্রটি মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটেছিল, যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে (Maniruzzaman, 1980)। একই সাথে সদ্য স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শিবিরের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। এই অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভূমিতে বাংলাদেশে আদি পর্বের রাজনৈতিক সহিংসতা ও আন্ডারগ্রাউন্ড চরমপন্থার উন্মেষ ঘটে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান (Talukder Maniruzzaman) তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ The Bangladesh Revolution and Its Aftermath-এ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কট্টর বামপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Maniruzzaman, 1980)। মনিরুজ্জামান দেখান যে মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই বেশ কয়েকটি কট্টর বামপন্থী সংগঠন বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোকে বুর্জোয়া ও অপূর্ণাঙ্গ আখ্যা দিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয়। এর মধ্যে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি এবং অন্যান্য মাওবাদী গোষ্ঠীগুলো গ্রামাঞ্চলে ভূস্বামী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ চালানো শুরু করে। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্র শাখা এবং জাসদ গণবাহিনীর মতো গ্রুপগুলোর তৎপরতা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। মনিরুজ্জামানের বিশ্লেষণ তুলে ধরে যে সেই সময়কার রাজনৈতিক সহিংসতা প্রধানত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থেকেই উৎসারিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মার্কাস ফ্রান্ডা (Marcus Franda) তার গবেষণায় স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণকে সহিংসতার প্রসারের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Franda, 1982)। ফ্রান্ডার মতে, রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক মতবিরোধকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থান দিতে ব্যর্থ হয় এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তখন গোপন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৭০-এর দশকের এই চরমপন্থা প্রধানত ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, থানা আক্রমণ এবং গোপন গেরিলা তৎপরতাই ছিল তাদের মূল কর্মপদ্ধতি।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান এবং সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানচিত্রে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লরেন্স লিফশুলজ (Lawrence Lifschultz) এই সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংস রূপান্তরকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন (Lifschultz, 1979)। লিফশুলজ দেখান যে সামরিক শাসনের অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অতিরিক্ত দমন-পীড়ন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে অসাংবিধানিক সহিংসতাকে উসকে দিয়েছিল। ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সহিংসতা প্রধানত কট্টর বামপন্থী সশস্ত্র তৎপরতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে।
আফগান ফেরত যোদ্ধা ও প্রথম প্রজন্মের ধর্মভিত্তিক চরমপন্থা (Afghan War Returnees and First-Generation Religious Extremism)
১৯৮০-এর দশকের শেষ ভাগ এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতায় কট্টর বামপন্থী চরমপন্থার পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক সশস্ত্র মতাদর্শ ক্রমশ একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে। এই রূপান্তরের পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক গভীর প্রভাব কাজ করেছিল। তৎকালীন সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকেও বেশ কিছু ব্যক্তি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নেয় (Riaz, 2008)। যুদ্ধ শেষে যখন এই ব্যক্তিরা দেশে ফিরে আসে, তখন তাদের সামরিক অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন ধরনের সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) তার গ্রন্থ Islamist Militancy in Bangladesh: A Complex Web-এ আফগান ফেরত যোদ্ধাদের ভূমিকা এবং বাংলাদেশে প্রথম প্রজন্মের ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসী কাঠামোর উত্থান বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Riaz, 2008)। রীয়াজ উল্লেখ করেন যে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (HuJI-B) তাদের আত্মপ্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। দলটির নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছিল। আফগানিস্তানের নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর সাথে তাদের যোগাযোগ ছিল। এই সংগঠনটির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র পন্থায় একটি ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা এবং সমাজ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মুছে ফেলা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক স্মৃতি এস পট্টনায়ক (Smruti S. Pattanaik) বাংলাদেশে প্রথম প্রজন্মের চরমপন্থার কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে তারা রাজনৈতিক সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক উৎসবের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালাত (Pattanaik, 2008)। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনে বোমা হামলা, একই বছর কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টা, ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা এবং একই বছর পল্টনে কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে হামলা এই ধারার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। পট্টনায়কের বিশ্লেষণ তুলে ধরে যে এই গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষকে সরাসরি নিশানা করে এক ধরনের সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করতে চেয়েছিল, যাতে সমাজের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই ধারার সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রকাশ ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে। এই হামলায় সামরিক মানের আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তদন্ত ও সমকালীন বিশ্লেষণে হামলার সঙ্গে হুজি-বি নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে (Riaz, 2008)। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হওয়ায় হামলাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জেএমবি, জাগ্রত মুসলিম জনতা ও দেশব্যাপী সুসংহত সহিংসতা (JMB, Jagrata Muslim Janata and Synchronized Nationwide Violence)
প্রথম প্রজন্মের হুজি-বি যখন মূলত চোরাগোপ্তা হামলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশানা করছিল, তখন ২০০০-এর দশকের শুরুতে উত্তরবঙ্গে একেবারে ভিন্ন ধরনের এক উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের জন্ম হয়। শায়খ আবদুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (JMB) এবং এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (JMJB)। উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরের প্রত্যন্ত অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এই গোষ্ঠীটি একটি সমান্তরাল কর্তৃত্ব চালু করার চেষ্টা চালায়। তারা স্থানীয় কট্টর বামপন্থী চরমপন্থীদের দমনের নামে নিজস্ব আদালত বসিয়ে বিচার ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মানোজ জোশী (Manoj Joshi) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে জেএমবির এই বিস্তার কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ সহিংসতা ছিল না; বরং এটা ছিল রাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামোকে সরাসরি অস্বীকার করার এক সংগঠিত প্রচেষ্টা (Joshi, 2006)। জোশী তুলে ধরেন, কীভাবে স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মহলের নীরব সমর্থনের সুযোগ নিয়ে জেএমবি নিজেদের আধা-সামরিক ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলেছিল। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দেশের গণতান্ত্রিক সংবিধান ও আইনব্যবস্থাকে বাতিল করে তাদের নিজস্ব মতাদর্শিক বিধিবিধান বলবৎ করা। সংগঠনটি তাদের সদস্যদের কঠোর মতাদর্শিক দীক্ষা দিয়ে আত্মঘাতী হামলার জন্য প্রস্তুত করত।
জেএমবির এই সুসংহত সাংগঠনিক ক্ষমতার সবচেয়ে প্রকাশ্য প্রমাণ মেলে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। এদিন সকালবেলা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতে প্রায় একযোগে পাঁচ শতাধিক ছোট আকারের বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয় (Riaz, 2008)। যদিও সেই হামলায় হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, কিন্তু হামলার সমন্বয় ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাকে হতবাক করে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) এই ঘটনাকে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Riaz, 2008)। রীয়াজ দেখান যে এই দেশব্যাপী বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে জেএমবি নিজেদের ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা জাহির করে এবং একই সাথে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে সরাসরি তাদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে।
১৭ আগস্টের পর জেএমবি সরাসরি বিচারক ও আদালত প্রাঙ্গণকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদকে বোমা মেরে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে গাজীপুর ও চট্টগ্রামের আদালত ভবনে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। বিচারক ও বিচারিক ভবনে এই ধারাবাহিক আক্রমণ রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সংগঠনটির মতাদর্শিক বিরোধিতার একটি সহিংস প্রকাশ ছিল। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের পর বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফাঁসি কার্যকর করা হলে এই নেটওয়ার্কটি সাংগঠনিকভাবে ভেঙে পড়ে।
মতাদর্শিক বিবর্তন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও লক্ষ্যভিত্তিক গুপ্তহত্যা (Ideological Mutation, Ansarullah Bangla Team and Targeted Assassinations)
জেএমবির শীর্ষ নেতৃত্বের পতনের পর কয়েক বছর আপাতদৃষ্টিতে চরমপন্থী তৎপরতা স্তিমিত থাকলেও ২০১৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের একটি নতুন কৌশলগত পর্যায়ের আবির্ভাব ঘটে। এবার আর কোনো বড় বোমা হামলা বা জেলাজুড়ে বিস্ফোরণ নয়; বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেলে বিভক্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র ও চাপাতি দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক গুপ্তহত্যা বা টার্গেটেড কিলিংয়ের পথ বেছে নেওয়া হয়। এই নতুন ধারার অগ্রভাগে ছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT), যা পরবর্তীতে আনসার আল-ইসলাম (Ansar al-Islam) নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং নিজেদের আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা বা একিউআইএস (AQIS)-এর বাংলাদেশ ফ্রন্ট হিসেবে দাবি করে।
নিরাপত্তা গবেষক ইফতেখারুল বাশার (Iftekharul Bashar) বাংলাদেশের এই মতাদর্শিক ও কৌশলগত রূপান্তর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কার্যপদ্ধতি পূর্ববর্তী যেকোনো চরমপন্থী সংগঠনের চেয়ে আলাদা ছিল (Bashar, 2015)। বাশার উল্লেখ করেন, দলটি সরাসরি ইন্টারনেটের শক্তিকে ব্যবহার করে তরুণদের চরমপন্থী করত। তারা ইয়েমেনভিত্তিক চরমপন্থী তাত্ত্বিক আনোয়ার আল-আওলাকির লেকচার বাংলায় অনুবাদ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিত। তাদের নিশানা ছিল নির্দিষ্ট: ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ, ব্লগার, লেখক, প্রকাশক এবং মুক্তমনা ব্যক্তিরা।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই গুপ্তহত্যার চক্র শুরু হয়। এরপর ২০১৫ সালে একের পর এক লেখক অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাশ, ওয়াশিকুর রহমান, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় এবং প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) এই লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডগুলোকে বর্ণনা করেছেন মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি মতাদর্শিক আক্রমণ হিসেবে (Riaz, 2016)। রীয়াজ দেখান যে আক্রমণকারীরা কোনো বড় ভিড় বা সাধারণ মানুষকে নিশানা না করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যগোষ্ঠীকে বাছাই করেছিল, যাতে সমাজে এক ধরনের ভীতি ও স্বনিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের এপ্রিলে সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে একইভাবে তাদের বাসায় ঢুকে হত্যা করা হয় (U.S. Department of State, 2017)। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডে আনসার আল-ইসলামের সম্পৃক্ততা এবং একিউআইএস কর্তৃক দায় স্বীকারের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হয় (U.S. Department of State, 2017)। এই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইন্টারনেটভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে তরুণ কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করত। মতাদর্শিক সাহিত্য ও অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীদের বৈশ্বিক ফ্রন্টের সাথে যুক্ত করার এই কৌশল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি জটিল সাইবার ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট তৈরি করেছিল।
গুলশান হামলা, নব্য জেএমবি ও আন্তর্জাতিক সংযোগের বিতর্ক (The Gulshan Attack, Neo-JMB and the Transnational Linkage Debate)
২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার কূটনীতিক পাড়া গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। অস্ত্রধারী তরুণেরা ক্যাফেতে প্রবেশ করে দেশি-বিদেশি সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এবং ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২০ জনকে হত্যা করে। পরদিন সকালে সামরিক কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে এই জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। এই হামলাটি কেবল প্রাণহানির সংখ্যার কারণেই আলোড়ন সৃষ্টি করেনি; হামলাকারীদের শ্রেণিগত পটভূমি এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) ও সাজিদ পারভেজ (Sajid Parvez) তাদের গবেষণা প্রবন্ধ Anatomy of Dhaka attack: A homegrown or globalized phenomenon?-এ হলি আর্টিজান হামলার বহুমুখী প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন (Riaz & Parvez, 2018)। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই হামলার পেছনে সক্রিয় ছিল তথাকথিত নব্য জেএমবি (Neo-JMB), যার শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন তামিম চৌধুরী। হামলাকারীদের কয়েকজন সচ্ছল পরিবার থেকে আসা এবং আধুনিক ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত তরুণ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করে এবং আক্রমণ চলাকালীন ক্যাফের ভেতরের ছবি তাদের নিজস্ব প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করে।
হামলাটি দেশীয় নাকি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কাজ – এ নিয়ে একটি গভীর বিতর্ক তৈরি হয়। রীয়াজ ও পারভেজের বিশ্লেষণে উঠে আসে যে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ দেশীয় বা সম্পূর্ণ বিদেশি হিসেবে একপেশেভাবে দেখার সুযোগ নেই (Riaz & Parvez, 2018)। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল যে হামলাকারীরা সবাই স্থানীয় এবং দেশে বিদেশি সন্ত্রাসীদের শারীরিক উপস্থিতি নেই। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ দেখায় যে সাংগঠনিক বাস্তবায়ন স্থানীয় ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হলেও বৈশ্বিক আইএসের মতাদর্শিক ও প্রতীকী প্রভাব সেখানে সুস্পষ্ট ছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইফতেখারুল বাশার (Iftekharul Bashar) নব্য জেএমবির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে তারা ঐতিহ্যবাহী চরমপন্থার সাথে আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া ও বৈশ্বিক প্রচারণার সমন্বয় ঘটিয়েছিল (Bashar, 2017)। এই মিশ্র বৈশিষ্ট্য চরমপন্থাকে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের পরিসরে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে। গুলশান হামলা স্পষ্ট করে দেয় যে সমকালীন সন্ত্রাসবাদ কেবল প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিতদের বিষয় নয়; এটি আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সমাজের যেকোনো স্তরের তরুণকে সহিংসতায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
সমকালীন নিরাপত্তা বাস্তবতা, নতুন মোড় ও অবশিষ্ট ঝুঁকি (Contemporary Security Reality, New Dimensions, and Residual Risks)
হলি আর্টিজান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সন্ত্রাস দমনে তাদের সার্বিক কৌশল ও নিরাপত্তা নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। পুলিশের বিশেষায়িত শাখা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি (CTTC) এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে দেশব্যাপী ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করা হয়। অপারেশন স্টর্ম ২৬ (কল্যাণপুর), অপারেশন হিট আউট এবং অপারেশন টুইলাইটের মতো সুনির্দিষ্ট অভিযানের মাধ্যমে নব্য জেএমবির মূল কমান্ড কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয় এবং শীর্ষ নেতাদের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই কঠোর প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা পদক্ষেপের ফলে প্রকাশ্যে বড় ধরনের নাশকতার সক্ষমতা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হাত থেকে অনেকটাই কেড়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (International Crisis Group) সন্ত্রাস দমন নীতির অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছে যে সমন্বিত পুলিশি অভিযান এবং কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতার ফলে দৃশ্যমান সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোকে ভেঙে দেওয়া গেছে (International Crisis Group, 2018)। তবে একই সাথে তারা সতর্ক করেছে যে কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চরমপন্থার মূল মানসিকতাকে নিঃশেষ করা যায় না। ক্রাইসিস গ্রুপ উল্লেখ করে, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার ঘাটতি দূর না হলে চরমপন্থার অন্তর্নিহিত কারণগুলো সুপ্তাবস্থায় থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের মানচিত্রে এক নতুন ও সংকর মাত্রার আবির্ভাব ঘটে। ২০২২ ও ২০২৩ সালের দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রকাশ পায় যে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র নৃগোষ্ঠীভিত্তিক দল কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ (KNF)-এর সাথে সমতলের নতুন উগ্রপন্থী দল জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়ার এক আঁতাত গড়ে উঠেছিল (Bashar, 2024)। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইফতেখারুল বাশার (Iftekharul Bashar) এই নতুন প্রবণতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে সমতলের ধর্মীয় চরমপন্থীরা পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ক্যাম্পে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল এবং নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে পাহাড়ি দলগুলো তাদের প্রশিক্ষণ ও আস্তানা সরবরাহ করছিল (Bashar, 2024) । পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং ধর্মীয় চরমপন্থার এই কৌশলগত মেলবন্ধন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সামনে সম্পূর্ণ নতুন এক ভৌগোলিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এছাড়া দৃশ্যমান বড় হামলা কমে গেলেও অনলাইন প্রচারণা, ইন্টারনেটভিত্তিক নেটওয়ার্ক গঠন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মতাদর্শিক দীক্ষার সম্ভাবনা অবশিষ্ট নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। অনলাইন প্রচারণার পাশাপাশি কারাগারভিত্তিক উগ্রায়ন এবং দণ্ডভোগ শেষে পুনর্বাসনের প্রশ্নও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সমকালীন সন্ত্রাসবাদের বাস্তবতাটি দাঁড়িয়ে আছে একদিকে রাষ্ট্রীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যদিকে ডিজিটাল ও ভৌগোলিক পরিসরে লুকিয়ে থাকা নতুন সংকর হুমকির সতর্ক মোকাবেলার মধ্যে। দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিরাপত্তা অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ, পারিবারিক সচেতনতা এবং সমন্বিত ডির্যাডিকালাইজেশন কার্যক্রম জারি রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের তরঙ্গসমূহ, ১৯৭৫–বর্তমান (Waves of Terrorism in Bangladesh, 1975–Present): পর্যায়, রূপান্তর ও ধারাবাহিকতা
সন্ত্রাসবাদের তরঙ্গ তত্ত্ব ও বাংলাদেশের বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো (Wave Theory of Terrorism and the Analytical Framework for Bangladesh)
সন্ত্রাসবাদের ঐতিহাসিক বিকাশকে কেবল বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনার সমষ্টি হিসেবে না দেখে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মতাদর্শিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আধুনিক সন্ত্রাসবাদের পর্যায়ক্রমিক বিকাশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড র্যাপোপোর্ট (David Rapoport) তার প্রভাবশালী চার তরঙ্গ তত্ত্ব (Four Waves of Terrorism Theory) উপস্থাপন করেন (Rapoport, 2004)। র্যাপোপোর্টের তাত্ত্বিক কাঠামো অনুসারে, ১৮৮০-এর দশক থেকে শুরু করে আধুনিক বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ চারটি প্রধান তরঙ্গে আবর্তিত হয়েছে: নৈরাজ্যবাদী তরঙ্গ, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী তরঙ্গ, নয়া-বামপন্থী তরঙ্গ এবং ১৯৭৯ সালের পর শুরু হওয়া ধর্মভিত্তিক তরঙ্গ। প্রতিটি তরঙ্গের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় এক প্রজন্ম বা কয়েক দশক, যার একটি নিজস্ব মতাদর্শিক চালিকাশক্তি, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং সুনির্দিষ্ট রণকৌশলগত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন এই তরঙ্গের ধারণা প্রয়োগ করা হয়, তখন একটি পদ্ধতিগত সতর্কতা মনে রাখা প্রয়োজন। এখানে ‘তরঙ্গ’ ধারণাটি র্যাপোপোর্টের বৈশ্বিক চার তরঙ্গের কোনো সরাসরি বা অবিকল প্রতিলিপি নয়; বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইতিহাস, নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং চরমপন্থার রূপান্তরকে সুসংহতভাবে বোঝার একটি বিশ্লেষণাত্মক শ্রেণিবিন্যাস মাত্র। বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার সংকট এবং সামাজিক কাঠামোর কারণে এদেশের সহিংসতার পর্যায়গুলো নিজস্ব কিছু স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে সমকালীন সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসকে পাঁচটি প্রধান তরঙ্গে বা পর্যায়ে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) বাংলাদেশের সহিংস চরমপন্থার সাংগঠনিক ও সামাজিক বিস্তার আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মতাদর্শ ও নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও পূর্ববর্তী কাঠামোর কিছু কৌশলগত ধারাবাহিকতা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত হয় (Riaz, 2008)। পুরোনো সংগঠনগুলোর ভাঙন বা রাষ্ট্রীয় অভিযানের মুখে তাদের আপাত সমাপ্তির পর অভিজ্ঞ কর্মীদের একটি অংশ নতুন নামে বা ভিন্ন কৌশলে পুনরায় সংগঠিত হয়। এর ফলে এক পর্যায়ের আপাত অবসান ঘটলেও তার অভ্যন্তরীণ রেশ ধরে পরবর্তী রূপান্তরের সূচনা ঘটে। সন্ত্রাসবাদের এই পর্যায়ক্রমিক পাঠ কেবল অস্ত্রের ব্যবহারের পরিবর্তনকেই স্পষ্ট করে না, বরং সদস্য সংগ্রহ, প্রচারণা এবং লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকেও বোঝার সুযোগ করে দেয়।
প্রথম তরঙ্গ: বামপন্থী চরমপন্থা ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা, ১৯৭৫–১৯৯০ (First Wave: Left-Wing Extremism and State Instability, 1975–1990)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তৎপরবর্তী ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির পটভূমিতে এই পর্বে প্রধানত কট্টর বামপন্থী বা সমাজতান্ত্রিক চরমপন্থার বিকাশ ঘটে, যাকে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের প্রথম তরঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই দলগুলো বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও আইনি কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান (Talukder Maniruzzaman) তার গ্রন্থে বিশদভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চরম বামপন্থী দলগুলো রাজনৈতিক সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিল (Maniruzzaman, 1980)। সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি এবং বিভিন্ন মাওবাদী গোষ্ঠী গ্রামাঞ্চলে ভূস্বামী, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করত। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মার্কাস ফ্রান্ডা (Marcus Franda)-র বিশ্লেষণে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের যে চিত্র উঠে আসে, তা গোপন সশস্ত্র রাজনীতির বিস্তারের অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ বুঝতে সহায়তা করে (Franda, 1982)। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে এই চরমপন্থী দলগুলো একাধিক উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে – যেমন খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনায় – এই দলগুলোর গুপ্তহত্যা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই গ্রামীণ জনজীবনের নিরাপত্তাকে গভীরভাবে বিঘ্নিত করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক লরেন্স লিফশুলজ (Lawrence Lifschultz) প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে আইনের শাসনের অবনতির দিকটি তুলে ধরেছেন (Lifschultz, 1979)। লিফশুলজের বিশ্লেষণ দেখায় যে সামরিক শাসনের অধীনে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সংকুচিত হওয়ার ফলে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে সহিংসতার বিস্তার ঘটেছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতাদর্শিক বিভাজন ও সাংগঠনিক ভাঙন দেখা যায়। নব্বইয়ের দশকে এদের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ সংকুচিত হয়; কিছু গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে মতাদর্শিক সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি স্থানীয় আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক তৎপরতার উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় তরঙ্গ: আফগান যুদ্ধের প্রভাব ও ধর্মভিত্তিক চরমপন্থার সূচনা, ১৯৯১–২০০৪ (Second Wave: Impact of the Afghan War and the Genesis of Religious Extremism, 1991–2004)
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা মানচিত্রে কট্টর বামপন্থী সহিংসতার সমান্তরালে ধর্মীয় মতাদর্শভিত্তিক চরমপন্থার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়। এই দ্বিতীয় তরঙ্গের পেছনে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। আশির দশকে আফগানিস্তানে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও যুদ্ধে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দেশে ফিরে এসে একটি সমন্বিত সশস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন (Riaz, 2008)। এই ধারার সবচেয়ে সুসংগঠিত প্রকাশ ছিল ১৯৯২ সালে আত্মপ্রকাশ করা হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (HuJI-B)। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকাঠামোকে নিজেদের ধর্মীয় মতাদর্শ অনুযায়ী পরিবর্তন করা; পাশাপাশি তাদের সহিংস কর্মকাণ্ডে ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পরিসরের প্রতি তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ পায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক স্মৃতি এস পট্টনায়ক (Smruti S. Pattanaik) এই পর্বের সহিংস তৎপরতা আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে দ্বিতীয় তরঙ্গের চরমপন্থীরা রাজনৈতিক সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল (Pattanaik, 2008)। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনে বোমা হামলা, কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টা এবং ২০০১ সালের রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে রক্তক্ষয়ী বিস্ফোরণ ছিল এই ধারার স্পষ্ট উদাহরণ। পট্টনায়কের মতে, সাধারণ নাগরিকদের জমায়েতে বোমা হামলা চালিয়ে এক ধরনের সামাজিক ভীতি তৈরি করা এবং সমাজে মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসরকে সংকুচিত করাই ছিল এই গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম কৌশল।
এই দ্বিতীয় তরঙ্গের সবচেয়ে ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে। সামরিক মানের আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহার করে হামলাটি এমনভাবে পরিচালিত হয়েছিল যে তৎকালীন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি এর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তদন্ত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসে যে এই হামলার সাথে হুজি-বির নেটওয়ার্কের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল (Riaz, 2008)। ২১ আগস্টের এই ঘটনা দেখায় যে দ্বিতীয় তরঙ্গের চরমপন্থা কেবল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আঘাত হানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরাসরি লক্ষ্য করার পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
তৃতীয় তরঙ্গ: জেএমবির উত্থান, দেশব্যাপী ধারাবাহিক হামলা ও বিচার বিভাগীয় লক্ষ্যবস্তু, ২০০১–২০০৮ (Third Wave: Rise of JMB, Synchronized Nationwide Attacks, and Judicial Targeting, 2001–2008)
হুজি-বি যখন মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছিল, তখন ২০০০-এর দশকের শুরুতে উত্তরবঙ্গে একেবারে ভিন্ন ধরনের এক সুসংগঠিত উগ্রপন্থী কাঠামোর উন্মেষ ঘটে। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (JMB) এবং এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (JMJB)। এটি ছিল বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের তৃতীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য ছিল এর তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক বিস্তার এবং রাষ্ট্রের প্রচলিত সাংবিধানিক ও বিচারিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতের অবস্থান গ্রহণ। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজস্ব আধা-সামরিক স্কোয়াড পরিচালনা করে তারা স্থানীয় পর্যায়ে সমান্তরাল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়।
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মানোজ জোশী (Manoj Joshi) জেএমবির এই উত্থানকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে এটি ছিল দুর্বল স্থানীয় প্রশাসনের সুযোগে গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ আধা-সামরিক নেটওয়ার্ক (Joshi, 2006)। জোশী তুলে ধরেন, কীভাবে চরম বামপন্থী সর্বহারাদের দমনের নামে জেএমবি স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছিল এবং পরবর্তীতে নিজেরাই একটি সুসংহত ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা গণতান্ত্রিক সংবিধান, আইনসভা ও আদালতকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজস্ব মতাদর্শিক শাসনব্যবস্থা কায়েমের ঘোষণা দেয়।
এই তৃতীয় তরঙ্গের সাংগঠনিক সক্ষমতার সবচেয়ে প্রকাশ্য মহড়া দেখা যায় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। এদিন সকালবেলা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতে প্রায় একযোগে পাঁচ শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয় (Riaz, 2008)। রীয়াজ উল্লেখ করেন, এই সমন্বিত হামলার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের দেশব্যাপী উপস্থিতির বার্তা দেওয়া। ১৭ আগস্টের পর জেএমবি সরাসরি বিচার বিভাগকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ঝালকাঠিতে বোমা মেরে দুই বিচারককে হত্যা এবং গাজীপুর ও চট্টগ্রামের আদালত প্রাঙ্গণে আত্মঘাতী বোমা হামলা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারিক ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে সরাসরি আক্রমণ। এই ধারাবাহিক আক্রমণ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর প্রতি তাদের তীব্র মতাদর্শিক বিরোধিতার সহিংস প্রকাশ ছিল। পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে এই সুসংহত কাঠামোর আপাত অবসান ঘটে।
চতুর্থ তরঙ্গ: ডিজিটাল চরমপন্থা, আনসারুল্লাহ ও নব্য জেএমবি, ২০১৩–২০১৬ (Fourth Wave: Digital Radicalism, Ansarullah and Neo-JMB, 2013–2016)
তৃতীয় তরঙ্গের শীর্ষ নেতৃত্বের পতনের পর কয়েক বছর আপাতদৃষ্টিতে সহিংসতা স্তিমিত থাকলেও ২০১৩ সালের পর থেকে চরমপন্থার একটি নতুন কৌশলগত পর্যায় দেখা দেয়, যাকে চতুর্থ তরঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই তরঙ্গের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে অনলাইন পরিসর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এবার আর বড় আকারের বোমা হামলা নয়; বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেলে বিভক্ত হয়ে ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্যভিত্তিক গুপ্তহত্যা বা টার্গেটেড কিলিংয়ের পথ বেছে নেওয়া হয়। এই তরঙ্গের অগ্রভাগে ছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT), যা পরবর্তীতে আনসার আল-ইসলাম (Ansar al-Islam) নামে আত্মপ্রকাশ করে।
নিরাপত্তা গবেষক ইফতেখারুল বাশার (Iftekharul Bashar) এই রূপান্তরকে একটি মতাদর্শিক বিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (Bashar, 2015)। বাশার দেখান যে কীভাবে সংগঠনগুলো ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের আকৃষ্ট করত। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, লেখক, প্রকাশক এবং ভিন্নমতাবলম্বীরা। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লেখক অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় এবং প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সমাজে গভীর ভীতি সঞ্চার করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) এই পর্যায়কে চিন্তার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Riaz, 2016)।
২০১৬ সালে এসে এই চতুর্থ তরঙ্গ তার সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ লাভ করে তথাকথিত নব্য জেএমবি (Neo-JMB)-এর মাধ্যমে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের অভিজাত হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ (Ali Riaz) ও সাজিদ পারভেজ (Sajid Parvez) হলি আর্টিজান হামলার ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে এই তরঙ্গের হামলাকারীদের কয়েকজন সচ্ছল পরিবার থেকে আসা এবং অভিজাত বা আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত তরুণ ছিল (Riaz & Parvez, 2018)। ক্যাফেতে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আইএস তাদের নিজস্ব প্রচারমাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে দায় স্বীকারের বার্তা দেয়। গুলশান হামলা স্পষ্ট করে দেয় যে সমকালীন চরমপন্থা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবকদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করতে সক্ষম।
পঞ্চম তরঙ্গ ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নিরাপত্তা রূপান্তর, ২০১৭–বর্তমান (Fifth Wave and Post-July Uprising Security Transformation, 2017–Present)
হলি আর্টিজান হামলার পর আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কঠোর অভিযানের মুখে চতুর্থ তরঙ্গের প্রকাশ্য সক্ষমতা ভেঙে পড়ে। ২০১৭ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত এই পঞ্চম তরঙ্গকে প্রধানত তিনটি উপপর্যায়ে বিভক্ত করে বোঝা যায়: ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দমন-পরবর্তী দুর্বলতা ও আড়ালে থাকার পর্ব; ২০২২ থেকে মধ্য-২০২৪ পর্যন্ত সমতলের চরমপন্থা ও পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদের সংকর পর্ব; এবং জুলাই ২০২৪-পরবর্তী ক্রান্তিকালীন নিরাপত্তা পরিবেশ ও পুনর্বিন্যাসের পর্ব।
প্রথম উপপর্যায়ে ধারাবাহিক নিরাপত্তা অভিযানে নব্য জেএমবি ও আনসার আল-ইসলামের প্রকাশ্য সাংগঠনিক ও হামলা পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে; এই পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম আগের তুলনায় কম দৃশ্যমান হয়ে ওঠে (International Crisis Group, 2018)। দ্বিতীয় উপপর্যায়ে এক অভূতপূর্ব সংকর রূপ দেখা দেয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইফতেখারুল বাশার (Iftekharul Bashar) দেখিয়েছেন কীভাবে সমতলের নতুন উগ্রপন্থী দল জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ (KNF)-এর সাথে আঁতাত গড়ে তুলেছিল (Bashar, 2024)। পাহাড়ি দলগুলো অর্থের বিনিময়ে সমতলের চরমপন্থীদের আস্তানা ও সামরিক প্রশিক্ষণ সরবরাহ করত, যা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ভৌগোলিক সংকট তৈরি করে (Bashar, 2024)।
তৃতীয় উপপর্যায়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিবেশে এক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন সৃষ্টি করে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ও আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ, পুলিশের সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে স্বল্প সময়ের জন্য একটি নিরাপত্তা-শূন্যতা তৈরি হয় (European Union Agency for Asylum, 2025)। এই নিরাপত্তা-শূন্যতার প্রত্যক্ষ সুযোগে কারাগার থেকে বেশ কিছু বন্দি পালিয়ে যায়, যার মধ্যে চরমপন্থী মামলার আসামিও ছিল (BSS, 2025)। একই সাথে অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের বহু সদস্য আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্তি পায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের মূল্যায়নে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে উগ্রপন্থী সংশ্লিষ্ট বন্দিদের মুক্তি এবং সম্ভাব্য সাংগঠনিক সক্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ও দাবি নথিবদ্ধ করা হয়েছে (European Union Agency for Asylum, 2025)। তবে এসব পরিবর্তনকে এখনই একটি সুসংগঠিত নতুন সন্ত্রাসী তরঙ্গের পুনরুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং বর্তমান পর্যায়কে উচ্চ অনিশ্চয়তাসম্পন্ন একটি ক্রান্তিকালীন নিরাপত্তা পরিবেশ হিসেবে দেখা অধিক সতর্ক বিশ্লেষণ। একই সাথে পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস চরমপন্থী সংগঠনগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে কি না, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতীতের সংগঠনগত পরিচয়, বর্তমান সক্রিয় সক্ষমতা এবং নিছক রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সক্রিয়তার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার মূল্যায়নে দেখা যায় যে প্রকাশ্য শারীরিক উপস্থিতি সীমিত থাকলেও সাইবার স্পেসে উগ্র মতাদর্শের প্রচার ও নেটওয়ার্কিংয়ের ঝুঁকি বহাল রয়েছে (Bertelsmann Stiftung, 2026)। ফলে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের বর্তমান রূপটি দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ি ভূরাজনীতির সংকর ঝুঁকি, ক্রান্তিকালীন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং সাইবার জগতের অদৃশ্য চরমপন্থার এক জটিল সংযোগস্থলে। এই বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবেলায় কেবল শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং বিচারিক স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য।
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ (Border Terrorism): আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ভৌগোলিক বাস্তবতা (Theoretical Foundations and Geographical Realities of Border Terrorism)
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় সীমান্তকে সাধারণত একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাস্তব নিরাপত্তা গতিশীলতায় সীমান্ত কেবল একটি স্থির বিভাজন রেখা নয়; বরং এটি নানা ধরনের বৈধ ও অবৈধ প্রবাহের মিলনস্থল। সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ বলতে এমন এক ধরনের সশস্ত্র সহিংসতাকে বোঝায়, যার পরিকল্পনা, রসদ সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ বা আশ্রয় একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানায় ঘটে, কিন্তু তার বিধ্বংসী আক্রমণ পরিচালিত হয় প্রতিবেশী বা অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সীমান্তের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির ঘাটতিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কৌশলগত সুবিধা হিসেবে কাজে লাগায়।
আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন অ্যাগনিউ (John Agnew) তার বিখ্যাত গবেষণায় টেরিটোরিয়াল ট্র্যাপ তত্ত্ব (Territorial Trap Theory) প্রস্তাব করে দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কেবল কঠোরভাবে আবদ্ধ রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতর বন্দি করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতার বহু জটিলতাকে আড়াল করে (Agnew, 1994)। অ্যাগনিউ যুক্তি দেন যে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো তাদের ভৌগোলিক সীমানার ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও বাস্তবে সীমানা কখনোই পুরোপুরি দুর্ভেদ্য হতে পারে না। সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলো এই প্রাতিষ্ঠানিক ও ভৌগোলিক ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সীমানার দুই পাশেই নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করে। ফলে যে সীমানাকে রাষ্ট্রের সুরক্ষাকবচ মনে করা হয়, সেই সীমানাই দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনিরাপত্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সীমান্ত গবেষণা ও অপরাধবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক পিটার অ্যান্ড্রেস (Peter Andreas) তার গ্রন্থ Border Games: Policing the U.S.–Mexico Divide-এ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তপারের অপরাধমূলক অর্থনীতির রাজনৈতিক সমীকরণ বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Andreas, 2000)। অ্যান্ড্রেসের মতে, রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই সীমান্তে দৃশ্যমান পাহারা, কাঁটাতারের বেড়া এবং সেনা মোতায়েন করে নিজেদের কঠোর কর্তৃত্ব প্রদর্শন করতে চায়। তবে সীমান্ত যদি দীর্ঘ, নদীমাতৃক, দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা কিংবা সামাজিক ও জাতিগতভাবে বিভক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়, তবে কেবল শারীরিক বলপ্রয়োগ দিয়ে আন্তঃসীমান্ত সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব হয় না। সীমান্ত অঞ্চলের এই জটিল ভৌগোলিক বাস্তবতা সশস্ত্র দলগুলোকে সহজেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ করে দেয়।
ভৌগোলিক সীমানা বিশ্লেষক ডেভিড নিউম্যান (David Newman) সমকালীন সীমান্ত অধ্যয়নে উল্লেখ করেছেন যে তথাকথিত সীমানাহীন বিশ্বে সীমানা তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি; বরং তা নতুন নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে (Newman, 2006)। নিউম্যান দেখান যে সীমান্ত কেবল এলাকা শেয়ার করে না, বরং সীমানার দুই পাশের আর্থসামাজিক বৈষম্য এবং আইনি কাঠামোর ভিন্নতাকে ব্যবহার করে অপরাধী ও চরমপন্থীরা নিজেদের সুবিধা আদায় করে। সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ তাই কোনো একক ভৌগোলিক ঘটনা নয়; এটি সীমানার ভৌগোলিক জটিলতা, দুর্বল রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং অরাষ্ট্রীয় সহিংস গোষ্ঠীগুলোর কৌশলগত সমীকরণের এক মিশ্র ফলাফল।
আন্তঃসীমান্ত অভয়ারণ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের ভূরাজনীতি (Cross-Border Sanctuaries and the Geopolitics of Safe Havens)
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো আন্তঃসীমান্ত নিরাপদ আশ্রয় বা অভয়ারণ্যের প্রাপ্যতা। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি তাদের আক্রমণের পর প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে অন্য একটি দেশের ভেতরে নিরাপদে আত্মগোপন করতে পারে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আক্রান্ত রাষ্ট্র সহজে অন্য দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতর ঢুকে তাৎক্ষণিক অভিযান বা হট পারস্যুট চালাতে পারে না। এই আইনি ও কৌশলগত জটিলতাকে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের টিকে থাকার প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংঘাত বিশ্লেষক আইডা ও’ব্রায়েন (Idean Salehyan) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ Rebels without Borders: Transnational Insurgencies in World Politics-এ আন্তঃসীমান্ত অভয়ারণ্যের বিস্তারিত তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন (Salehyan, 2009)। ও’ব্রায়েন দেখান যে যেসব বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সীমান্তের ওপারে নিরাপদ ঘাঁটি থাকে, তাদের গড় আয়ু সাধারণ অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর চেয়ে অনেক বেশি হয়। আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কিংবা পরোক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়ে এই গোষ্ঠীগুলো সীমান্তের অপর পারে তাদের প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনা করে, অস্ত্র মজুদ করে এবং আহত সদস্যদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। আক্রান্ত রাষ্ট্র যখনই তাদের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধি করে, তারা দ্রুত সীমানা পার হয়ে আশ্রয়স্থলে চলে যায়, যার ফলে তাদের মূল কমান্ড কাঠামো অক্ষত থেকে যায়।
নিরাপত্তা গবেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান (Daniel Byman) তার গ্রন্থ Deadly Connections: States that Sponsor Terrorism-এ নিরাপদ আশ্রয়ের সাথে রাষ্ট্রীয় ভূরাজনীতির সংযোগ ব্যাখ্যা করেছেন (Byman, 2005)। বাইম্যান উল্লেখ করেন, নিরাপদ আশ্রয় কেবল স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয় না; অনেক সময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে এই গোষ্ঠীগুলোকে গোপন আশ্রয় ও রসদ সরবরাহ করে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময় সীমান্তের দুর্গম অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়, যাতে আক্রান্ত রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বজায় রাখা যায়। তবে বাইম্যান সতর্ক করেন যে এই ধরনের প্রক্সি নীতি দীর্ঘমেয়াদে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে।
আশ্রয়স্থলের অস্তিত্ব সীমান্ত সন্ত্রাসবাদকে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেয়। সীমান্তপারের নিরাপদ ঘাঁটি থেকে পরিচালিত চোরাগোপ্তা হামলা দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায় এবং অনেক সময় তা সরাসরি আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে। সীমান্ত অঞ্চলের এই অভয়ারণ্যগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হলে হয় আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের সক্রিয় ও আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন, নয়তো আক্রমণকারী রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের জটিলতা অগ্রাহ্য করে সীমান্তের ওপারে সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে হয়। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রশ্নটি সীমান্ত নিরাপত্তার আলোচনায় একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সংযোগ (Border Crime and the Nexus of Terrorist Networks)
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ কেবল মতাদর্শিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে না; এর পেছনে কাজ করে একটি অত্যন্ত সক্রিয় এবং লাভজনক অপরাধমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো। আধুনিক সীমান্তগুলোতে মতাদর্শিক চরমপন্থী দল এবং আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধী চক্রের মধ্যে এক নিবিড় মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে। পাহাড়ি, জঙ্গলময় বা নদীপ্রধান সীমান্তের অরক্ষিত পথগুলো যেমন অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়, তেমনি মাদক, মানব পাচার এবং জাল মুদ্রার চোরাচালানও একই রুট দিয়ে পরিচালিত হয়। এই দুই পক্ষের পারস্পরিক স্বার্থের সমন্বয় সীমান্ত অঞ্চলগুলোকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চলে পরিণত করেছে।
অপরাধবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক লুইস শেলি (Louise Shelley) তার গ্রন্থ Dirty Entanglements: Corruption, Crime, and Terrorism-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধ ও সন্ত্রাস পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে (Shelley, 2014)। শেলি ব্যাখ্যা করেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের জোগান ও নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, যা তারা সীমান্ত চোরাকারবারীদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বা তাদের ওপর কর বসিয়ে সংগ্রহ করে। অন্যদিকে অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো সীমান্তের দুর্গম অঞ্চলে নিজেদের সুরক্ষার জন্য চরমপন্থীদের ভারী অস্ত্র ও আধা-সামরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। এই যৌথ সমীকরণের ফলে সীমান্ত অঞ্চলে এমন এক সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশকেও জীবিকার তাগিদে এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করে ফেলে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক ফিল উইলিয়ামস (Phil Williams) অরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্ক ও সীমান্ত অপরাধের সংযোগ আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রগুলো কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে কাজ করে না (Williams, 2008)। উইলিয়ামস দেখান যে এরা মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন কোষ বা সেলের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল জাল, যা সীমান্তের দুই পাশের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে পরিচালিত হয়। মাদক পাচার থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ অনেক সময় সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র কেনায় বিনিয়োগ করা হয়। ফলে সীমান্ত পাহারা কেবল সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সাথে জড়িত অবৈধ পণ্যের প্রবাহ বন্ধ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সীমান্তপারের এই অপরাধমূলক অর্থনীতির কারণে রাষ্ট্রীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রায়শই সাধারণ চোরাচালান এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার মধ্যকার সীমারেখা আলাদা করতে ব্যর্থ হয়। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র যখন মাদক বা চোরাই পণ্যের চালানের সাথে মিশে সীমানা অতিক্রম করে, তখন সাধারণ কাস্টমস তল্লাশির মাধ্যমে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সীমান্ত অপরাধ দমন না করে কেবল সামরিক উপায়ে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা যায় না। এই অর্থনৈতিক ও অপরাধমূলক নেটওয়ার্কটি চরমপন্থীদের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অক্সিজেন হিসেবে কাজ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা গতিশীলতা (Cross-Border Security Dynamics in South Asia)
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নটি অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল। এই অঞ্চলের সীমান্তগুলো মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের সময় তড়িঘড়ি করে টানা হয়েছিল, যার ফলে একই জাতিগোষ্ঠী, ভাষাভাষী মানুষ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সীমান্তের দুই পাশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া নদীনালা, জলাভূমি এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সীমানাগুলো পাহারা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী সীমান্ত অঞ্চলগুলো বহু দশক ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র সংঘাত ও চরমপন্থার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সুমিত গাঙ্গুলী (Sumit Ganguly) তার গ্রন্থ Conflict Unending: India-Pakistan Tensions Since 1947-এ দেখিয়েছেন কীভাবে কাশ্মীর ও ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর আন্তঃসীমান্ত অনুপ্রবেশ দীর্ঘকাল ধরে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সংকটের মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে (Ganguly, 2001)। গাঙ্গুলী তুলে ধরেন যে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ও হামলার ঘটনা কেবল স্থানীয় সংঘাতের জন্ম দেয়নি, বরং তা বারবার দ্বিপাক্ষিক শান্তি প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করেছে এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকিতে ফেলেছে। সীমান্তপারের এই সংঘাত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিকে পুরোপুরি সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্মৃতি এস পট্টনায়ক (Smruti S. Pattanaik) দেখিয়েছেন যে দীর্ঘ এই সীমান্তের প্রকৃতি মূলত নদীমাতৃক ও সমতল হলেও এর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক (Pattanaik, 2012)। পট্টনায়ক উল্লেখ করেন যে অতীতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এবং বাংলাদেশের কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী সীমান্তের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে একে অপরের ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ছিল। তবে বিগত দশকগুলোতে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং সমন্বিত সীমান্ত টহলের মাধ্যমে এই সংঘাতের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। যদিও মাদক চোরাচালান ও সীমান্তবর্তী হত্যাকাণ্ডের মতো জটিলতা এখনো দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সমকালীন সময়ে এক তীব্র মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের অস্থিরতা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা (ARSA) ও আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আন্তঃসীমান্ত তৎপরতা এই অঞ্চলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মারাত্মক মাদকের চোরাচালান এবং সমতলের চরমপন্থীদের সাথে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্রের লেনদেন দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে এক নতুন ভূকৌশলগত সংকটে ফেলেছে। ফলে এই অঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা এখন আর কোনো দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, নজরদারি ও কাঠামোগত প্রতিরোধ (Border Control Technology, Surveillance, and Structural Countermeasures)
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে রাষ্ট্রগুলো তাদের সীমান্ত পাহারা ও নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে সনাতন টহলের বাইরে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও কাঠামোগত বাধার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে শুরু করেছে। একুশ শতকের নিরাপত্তা তত্ত্বে এই রূপান্তরকে স্মার্ট বর্ডার বা প্রযুক্তিগত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বলা হয়। সনাতন চেকপোস্ট এবং সাধারণ সেনা বা সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করে হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত পাহারা দেওয়া অসম্ভব। একারণে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নির্মাণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল নজরদারির সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক সীমান্ত প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
ভূরাজনীতি ও সীমান্ত তাত্ত্বিক রিস জোন্স (Reece Jones) তার গ্রন্থ Border Walls: Security and the War on Terror in the United States, India, and Israel-এ সীমানা প্রাচীর ও নজরদারির রাজনৈতিক দিক বিশ্লেষণ করেছেন (Jones, 2012)। জোন্স দেখান যে সন্ত্রাসবাদ ও অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় রাষ্ট্রগুলো হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া, কংক্রিটের দেয়াল এবং ফ্লাডলাইট স্থাপন করছে। তবে জোন্স যুক্তি দেন যে কেবল ভৌত প্রাচীর তৈরি করে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না; বরং এটি অনেক সময় অনুপ্রবেশকারীদের আরও বিপজ্জনক ও দুর্গম পথ বেছে নিতে বাধ্য করে এবং সীমান্ত অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় মানবিক সংকট তৈরি করে।
প্রযুক্তিগত নজরদারির আধুনিক রূপ আলোচনা করতে গিয়ে নিরাপত্তা গবেষক মার্ক সালাটার (Mark Salter) উল্লেখ করেছেন যে সমকালীন সীমান্ত আর কেবল ভৌগোলিক রেখায় সীমাবদ্ধ নেই (Salter, 2008)। সালাটার দেখান যে থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, নাইট ভিশন সেন্সর, গ্রাউন্ড রাডার এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত নজরদারিকে ত্রিমাত্রিক রূপ দেওয়া হয়েছে। অরক্ষিত নদীপথ বা পাহাড়ি জঙ্গলে যেখানে মানুষের পক্ষে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে অটোমেটেড সেন্সর ও ড্রোন তাৎক্ষণিকভাবে অনুপ্রবেশের তথ্য কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট বা আইসিপি (ICP), যেখানে বায়োমেট্রিক স্ক্যানিং এবং উন্নত এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্য ও যাত্রীদের তল্লাশি করা হয়।
তবে প্রযুক্তিগত নজরদারির কিছু অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। খারাপ আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি অনেক সময় সেন্সর ও ক্যামেরার কার্যক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে ফেলে। এছাড়া অত্যাধুনিক সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রযুক্তির পেছনে যে মানবসম্পদ কাজ করে, তাদের পেশাদারিত্ব ও সততা নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো উন্নত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাকেই দুর্নীতির মাধ্যমে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। ফলে কাঠামোগত বাধা ও আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি একটি দক্ষ ও সংবেদনশীল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও যৌথ কৌশল (Joint Border Management, Intelligence Cooperation, and Collaborative Strategies)
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ যেহেতু একক কোনো দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেহেতু কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই একতরফাভাবে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। কার্যকর সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা আবশ্যক। সীমান্ত যখন সংঘাতের বদলে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিচালিত হয়, তখন সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে ভৌগোলিক সীমানাকে অপব্যবহার করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। এই সহযোগিতা বাস্তবায়নের জন্য দ্বিপাক্ষিক আইনি কাঠামো থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের যৌথ তৎপরতা পর্যন্ত বিস্তৃত উদ্যোগ প্রয়োজন হয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সীমান্ত গবেষক ম্যালকম অ্যান্ডারসন (Malcolm Anderson) তার গ্রন্থ Frontiers: Territory and State Formation in the Modern World-এ আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Anderson, 1996)। অ্যান্ডারসন দেখান যে সীমান্ত অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বজায় রাখতে হলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা সিবিএম (CBM) পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। এই ব্যবস্থার অধীনে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চ্যানেল বা হটলাইন স্থাপন, যৌথ বা সমান্তরাল টহল পরিচালনা এবং সীমান্ত বৈঠক নিয়মিত করা হয়। এর ফলে কোনো এক প্রান্তে অনুপ্রবেশ বা গোলাগুলির ঘটনা ঘটলে তা ভুল বোঝাবুঝির কারণে বৃহত্তর সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়।
যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো গোয়েন্দা তথ্যের তাৎক্ষণিক আদান-প্রদান। কোনো চরমপন্থী দলের গতিবিধি, অস্ত্র পাচারের গোপন পথ বা নিরাপদ আস্তানার সুনির্দিষ্ট তথ্য যদি দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে শেয়ার করে, তবে সীমান্তে সহিংসতা ঘটার আগেই তা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি বন্দি বিনিময় ও অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর থাকলে সন্ত্রাসীরা সীমানা পেরিয়ে গিয়ে বিচার এড়াতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির মাধ্যমে সীমান্তের দুই পাশের সাধারণ মানুষের মানবাধিকার রক্ষা নিশ্চিত করে এই ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা রাষ্ট্রীয় সুনামের জন্যও জরুরি।
সব মিলিয়ে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের কার্যকর মোকাবেলা কোনো একক সামরিক বিজয়ের বিষয় নয়; এটি একটি টেকসই কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সীমান্তের ভৌগোলিক জটিলতাকে মেনে নিয়ে যদি রাষ্ট্রগুলো যৌথ কৌশল প্রণয়ন করে, তবেই সীমানা সংঘাতের উৎস না হয়ে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। সীমান্তের উভয় পাশের মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়ন, আইনের শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সহযোগিতাই পারে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে।
ঝুঁকি শনাক্তকরণ (Risk Identification): জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন
ঝুঁকি শনাক্তকরণের তাত্ত্বিক রূপরেখা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি (Theoretical Frameworks and Assessment Methodologies of Risk Identification)
নিরাপত্তা অধ্যয়নের জগতে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে ঘটনাটি ঘটার আগেই তার সম্ভাবনা চিহ্নিত করাকে অধিক কার্যকর কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও ঝুঁকি নিরূপণের সামগ্রিক প্রক্রিয়া। অতীতে নিরাপত্তার মূল মনোযোগ ছিল প্রত্যক্ষ ‘হুমকি’ বা থ্রেটের ওপর, যা সাধারণত দৃশ্যমান শত্রু বা নির্দিষ্ট সামরিক উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত ছিল। তবে সমকালীন যুগে অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্কভিত্তিক বিস্তারের কারণে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভাবনা কেবল তাৎক্ষণিক হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামগ্রিক ‘ঝুঁকি’ বা রিস্কের পরিমণ্ডলে সম্প্রসারিত হয়েছে। ঝুঁকি নিরূপণ হলো এমন একটি পদ্ধতিগত অনুসন্ধান, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপদ, তার মাত্রা এবং তা বাস্তবায়িত হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পূর্বে থেকেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে হিসাব করার চেষ্টা করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেক (Ulrich Beck) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Risk Society: Towards a New Modernity-তে সমকালীন বিশ্বকে একটি ঝুঁকি সমাজ (Risk Society) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Beck, 1992)। বেকের মতে, আধুনিকায়নের অগ্রগতির সাথে সাথে মানবসমাজ এমন সব নতুন ও জটিল ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে, যা কেবল ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে আটকে রাখা যায় না এবং যার প্রভাব অনুমান করা সনাতন পদ্ধতির দ্বারা প্রায় অসম্ভব। পরবর্তীতে তিনি তার World at Risk গ্রন্থে দেখান যে সন্ত্রাসবাদের মতো আধুনিক হুমকিগুলো কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান মেনে চলে না; বরং এগুলো সর্বত্র এক স্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করে (Beck, 2009)। এই তাত্ত্বিক পটভূমিতে ঝুঁকি শনাক্তকরণ কেবল একটি প্রশাসনিক রুটিন কাজ নয়; বরং এটি সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞের আগেই রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রস্তুত রাখার একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রয়াস।
নিরাপত্তা ও নীতি বিশ্লেষক হেনরি উইলিস (Henry Willis) এবং তার গবেষক দল সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি পরিমাপের জন্য একটি বহুল ব্যবহৃত কাঠামোগত পদ্ধতি প্রস্তাব করেছেন, যা হুমকি-সংবেদনশীলতা-পরিণতি মডেল (Threat-Vulnerability-Consequence Model) নামে পরিচিত (Willis et al., 2005)। এই মডেল অনুসারে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি মূলত তিনটি উপাদানের গুণফল। প্রথমটি হলো হুমকি, অর্থাৎ আক্রমণকারীর হামলার সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য; দ্বিতীয়টি হলো সংবেদনশীলতা বা দুর্বলতা, অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি; এবং তৃতীয়টি হলো পরিণতি, অর্থাৎ হামলা সফল হলে মানবজীবন, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা। এই তিনটি মাত্রাকে যখন গাণিতিক বা গুণগত মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন নীতিনির্ধারকদের পক্ষে কোন খাতটিতে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে তা নির্ধারণ করা সহজ হয়।
ঝুঁকি নিরূপণের পদ্ধতিগুলোকে প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত করা যায়: পরিমাণগত ও গুণগত মূল্যায়ন। পরিমাণগত পদ্ধতিতে অতীতের হামলার তথ্য, সম্ভাব্য আক্রমণের গাণিতিক সম্ভাবনা এবং আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে গুণগত পদ্ধতিতে গোয়েন্দা তথ্য, বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা, মতাদর্শিক গতিপ্রকৃতির বিশ্লেষণ এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে তৈরি করা ‘ঝুঁকি ম্যাট্রিক্স’ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষায় কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
জাতীয় স্তরে হুমকি ও ঝুঁকি নিরূপণ কাঠামো (National Threat and Risk Assessment Frameworks)
জাতীয় স্তরে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি শনাক্তকরণের জন্য একটি সমন্বিত ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজন হয়। একক কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর পক্ষে একটি দেশের সমগ্র অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ঝুঁকি একা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক গোয়েন্দা শাখা, পুলিশ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করার জন্য জাতীয় হুমকি নিরূপণ সেল বা ফিউশন সেন্টার গড়ে তোলে। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একত্রিত করে একটি সুসংহত সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা, যাতে কোনো সুপ্ত ষড়যন্ত্র নিরাপত্তা রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে না পারে।
গোয়েন্দা বিশ্লেষক গ্রেগরি ট্রেভারটন (Gregory Treverton) তার গ্রন্থ Reshaping National Intelligence for an Age of Information-এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জাতীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থার সংস্কার ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর আলোকপাত করেছেন (Treverton, 2001)। ট্রেভারটন দেখান যে তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে আসল চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার তথ্যের দেয়াল ভেঙে দেওয়া। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করার সনাতন সংস্কৃতি অনেক সময় জাতীয় স্তরের ঝুঁকি শনাক্তকরণকে ব্যর্থ করে দেয়। ট্রেভারটনের মতে, একটি কার্যকর জাতীয় ঝুঁকি নিরূপণ ব্যবস্থার প্রধান শর্ত হলো তথ্য ভাগাভাগির উন্মুক্ত পরিবেশ এবং বিভিন্ন সংস্থার যৌথ ডেটাবেজ বিশ্লেষণ।
জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়মিত হুমকি ম্যাট্রিক্স হালনাগাদ করা। জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনা, জনসমাগমস্থল এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস, আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা উত্তেজনাকর রাজনৈতিক নির্বাচনের সময় জাতীয় সতর্কতার মাত্রা সাধারণ সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কেবল সশস্ত্র হামলার সম্ভাবনাই দেখা হয় না; একই সাথে চরমপন্থী প্রচারণার বিস্তার, অস্ত্র ও বিস্ফোরকের চোরাচালানের গতিবিধি এবং জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া অপরাধীদের গতিবিধিও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা জাতীয় ঝুঁকি শনাক্তকরণের তৃণমূল ভিত্তি তৈরি করে। তৃণমূল পর্যায়ের পুলিশ ফাঁড়ি এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রাথমিক সংকেত সরবরাহ করে। স্থানীয় স্তরে যদি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ, অপরিচিত ব্যক্তির দীর্ঘদিনের গোপন অবস্থান বা উগ্র মতাদর্শের প্রচার নজরে আসে, তবে তা জাতীয় মূল্যায়ন কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়ে সতর্কবার্তা তৈরি করে। এর ফলে জাতীয় স্তরের ঝুঁকি মূল্যায়ন কেবল একটি শীর্ষপর্যায়ের তাত্ত্বিক দলিল না হয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তব তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক জীবন্ত নিরাপত্তা কৌশলে রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিক মানদণ্ড (International Risk Assessment Systems and Multilateral Standards)
সন্ত্রাসবাদ যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকে না, সেহেতু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের জন্য বহুপাক্ষিক মানদণ্ড অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সমকালীন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন দেশের সার্বিক ঝুঁকি পর্যালোচনা করে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক নীতি নির্ধারণের পরামর্শ দেয়। কোনো একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যদি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা সমগ্র আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করে। এই কারণে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি মূল্যায়নে অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (Financial Action Task Force) বা এফএটিএফ (FATF) বৈশ্বিক সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও অর্থপাচারের ঝুঁকি মূল্যায়নে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক আইন ও আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ নিকোলাস রাইডার (Nicholas Ryder) তার গ্রন্থ The Financial War on Terrorism: A Critical Review of the United Kingdom and United States’ Counter-Terrorist Financing Strategies-এ আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারির প্রভাব ব্যাখ্যা করেছেন (Ryder, 2015)। রাইডার দেখান যে এফএটিএফ-এর জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন বা এনআরএ (NRA) নির্দেশিকা প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের ব্যাংকিং, অ-ব্যাংকিং এবং দাতব্য খাতের ঝুঁকি নিয়মিত নিরূপণ করতে বাধ্য করে। কোনো দেশের আর্থিক চ্যানেলে যদি সন্ত্রাসী তহবিলের অপব্যবহার শনাক্ত করার মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামো না থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে সেই দেশকে ‘ধূসর’ বা ‘কালো’ তালিকাভুক্ত করা হয়, যা দেশটির সার্বিক বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আওতাধীন কাউন্টার-টেরোরিজম কমিটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরেট (CTED) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা ও ঝুঁকি পর্যালোচনার জন্য নিয়মিত মূল্যায়ন সফর পরিচালনা করে। এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিচারিক প্রক্রিয়া, পুলিশি অবকাঠামো এবং চরমপন্থা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনের কার্যকারিতা বিশদভাবে পরীক্ষা করা হয়। এই আন্তর্জাতিক পরিদর্শনগুলো বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো উন্মোচন করতে সাহায্য করে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও আইনি সংস্কারের সুপারিশ প্রদান করে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সমন্বিত চাপের মুখে রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বাধ্য হয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও স্বাধীনভাবে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস কর্তৃক প্রকাশিত গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স (GTI)। এই সূচকে বিশ্বের দেশগুলোতে সংঘটিত হামলার সংখ্যা, প্রাণহানি, আহতদের পরিসংখ্যান এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে একটি তুলনামূলক স্কোর তৈরি করা হয়। এই বৈশ্বিক পরিসংখ্যানগুলো বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও কূটনীতিকদের কাছে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির একটি সামগ্রিক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে।
উগ্রায়ন ও ব্যক্তির আচরণগত ঝুঁকি শনাক্তকরণ (Behavioral Risk Assessment and Individual Radicalization Indicators)
সন্ত্রাসবাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি ঝুঁকিমূল্যায়নের আরেকটি অত্যন্ত জটিল শাখা হলো ব্যক্তির চরমপন্থায় দীক্ষিত হওয়ার প্রক্রিয়া এবং তার আচরণগত ঝুঁকি শনাক্তকরণ। কোনো ব্যক্তি হঠাৎ করে এক রাতের মধ্যে সহিংস চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ে না; বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। অপরাধবিজ্ঞান ও ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানের গবেষকরা দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে এমন কিছু আচরণগত ও পারিপার্শ্বিক সূচক চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন, যা দেখে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি পূর্বে থেকেই আঁচ করা যায়।
মনোবিজ্ঞানী ড্যারিল এলেইন প্রেসম্যান (D. Elaine Pressman) সহিংস চরমপন্থার ঝুঁকি নিরূপণের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ পেশাগত মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করেন, যা ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (VERA-2R) নামে পরিচিত (Pressman, 2009)। এই পদ্ধতিতে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের গভীরতা, সহিংসতার প্রতি সহানুভূতি, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সহিংস দক্ষতা অর্জনের ইচ্ছাকে নির্দিষ্ট সূচকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। প্রেসম্যান দেখান যে কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকলেই কোনো ব্যক্তি সহিংস হয়ে ওঠে না; যখন সেই বিশ্বাসের সাথে তীব্র ব্যক্তিগত হতাশা এবং সহিংস কর্মকাণ্ডকে একমাত্র মুক্তির পথ মনে করার প্রবণতা যুক্ত হয়, তখনই প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী জে রিড মেলয় (J. Reid Meloy) একক আক্রমণকারী বা লোন-অ্যাক্টরদের ঝুঁকি শনাক্তকরণের জন্য টেরোরিস্ট র্যাডিকালাইজেশন অ্যাসেসমেন্ট প্রোটোকল (TRAP-18) প্রণয়ন করেছেন (Meloy, 2018)। মেলয় তার গবেষণায় আঠারোটি সুনির্দিষ্ট আচরণগত সতর্কবার্তা বা ‘ওয়ার্নিং বিহেভিয়ার’ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যবস্তুর ওপর তীব্র মানসিক একাগ্রতা বা ফিক্সেশন, অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের হিংসাত্মক ইচ্ছার আগাম প্রকাশ বা লিকেজ এবং কাছের মানুষদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে চরমপন্থী দলের প্রতীকের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়া। এই ধরনের আচরণগত লক্ষণগুলো সময়মতো শনাক্ত করা গেলে হামলা পরিচালনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
অপরাধবিজ্ঞানী পল গিল (Paul Gill) তার গ্রন্থ Lone-Actor Terrorists: A Behavioural Analysis-এ একক হামলাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত ও আচরণের ওপর বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরেছেন (Gill, 2015)। গিলের গবেষণায় দেখা যায় যে কথিত ‘একাকী নেকড়ে’ বা লোন উলফ সন্ত্রাসীরা আসলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকে না; তাদের হামলার পূর্বে কোনো না কোনো সামাজিক বা পারিবারিক স্তরে অস্বাভাবিক আচরণের সংকেত দৃশ্যমান হয়। কিন্তু পারিপার্শ্বিক মানুষের অসচেতনতা বা প্রাতিষ্ঠানিক রিপোর্টিং ব্যবস্থার অভাবে সেই প্রাথমিক সতর্কবার্তাগুলো অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়। একইভাবে মনস্তত্ত্ববিদ জন হর্গান (John Horgan) তার গ্রন্থ The Psychology of Terrorism-এ উল্লেখ করেছেন যে উগ্রায়নের ঝুঁকি মূল্যায়নে ব্যক্তির অতীত অপরাধের ইতিহাস এবং চরমপন্থী নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগের প্রকৃতি সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন (Horgan, 2014)। আচরণগত ঝুঁকি নিরূপণের এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে আন্দাজনির্ভর তদন্তের বাইরে এনে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
সংবেদনশীল অবকাঠামো ও খাতভিত্তিক ঝুঁকি নিরূপণ (Critical Infrastructure and Sectoral Vulnerability Assessment)
আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি শনাক্তকরণের একটি অপরিহার্য দিক হলো জাতীয় সংবেদনশীল অবকাঠামো বা ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার (Critical Infrastructure)-এর দুর্বলতা নিরূপণ করা। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্ব নির্ভর করে কতগুলো পরস্পরসংযুক্ত কাঠামোর ওপর, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ গ্রিড, তেল ও গ্যাস সঞ্চালন লাইন, জল সরবরাহ ব্যবস্থা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গণপরিবহন হাব, সমুদ্রবন্দর এবং বেসামরিক বিমান চলাচল নেটওয়ার্ক। এই ধরনের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ নোড বা সংযোগস্থলে সফল সন্ত্রাসী হামলা পরিচালিত হলে তার প্রভাব কেবল সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা একটি দেশব্যাপী শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি করে সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনকে অচল করে দিতে পারে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও জটিল নেটওয়ার্ক গবেষক টেড লুইস (Ted Lewis) তার গ্রন্থ Critical Infrastructure Protection in Homeland Security: Defending a Networked Nation-এ সংবেদনশীল অবকাঠামোর নিরাপত্তা মডেল বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Lewis, 2006)। লুইস দেখান যে আধুনিক অবকাঠামোগুলো একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হওয়ায় এগুলোর একটিতে বিপর্যয় ঘটলে পুরো নেটওয়ার্ক ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যাকে ক্যাসকেডিং ফেইলিউর বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো বড় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে সাইবার বা শারীরিক আক্রমণ চালানো হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, হাসপাতাল, বিমান চলাচল এবং টেলিকমিউনিকেশন অচল হয়ে পড়বে। লুইসের মতে, অবকাঠামোগত ঝুঁকি নিরূপণের মূল লক্ষ্য হলো এই দুর্বল নোডগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোতে একাধিক ব্যাকআপ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বিমান চলাচল ও পরিবহন খাতের ঝুঁকি নিরূপণে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা বা আইসিএও (ICAO) এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার আইএসপিএস কোড (ISPS Code) অত্যন্ত কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। যাত্রীদের পরিচয় যাচাই, কার্গো স্ক্যানিং এবং বিমানবন্দরের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাগুলো নিয়মিত মক ড্রিল ও অডিটের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। কোনো বিমানবন্দরে যদি শারীরিক তল্লাশি বা বায়োমেট্রিক নজরদারিতে সামান্যতম ফাঁক থাকে, তবে তা চরমপন্থীদের জন্য বিমান অপহরণ বা নাশকতা চালানোর সুযোগ করে দিতে পারে।
সমকালীন যুগে এই অবকাঠামোগত ঝুঁকি নিরূপণে সাইবার সুরক্ষার দিকটি শীর্ষ প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব লাভ করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধের জল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা রেল চলাচলের সুইচিং সিস্টেম এখন কেন্দ্রীয়ভাবে কম্পিউটারাইজড ইন্টারফেসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সংবেদনশীল নেটওয়ার্কে ম্যালওয়্যার বা র্যানসমওয়্যার প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়, তবে দূর থেকেই ভৌত ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানো সম্ভব। ফলে সমকালীন ঝুঁকি মূল্যায়নে কেবল ভৌত প্রাচীর বা সিসিটিভি ক্যামেরা পাহারা যথেষ্ট নয়; বরং ডিজিটাল ফায়ারওয়াল, এনক্রিপশন প্রোটোকল এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল কন্ট্রোল সিস্টেমের নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা অডিট করাও জাতীয় ঝুঁকি সুরক্ষার অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঝুঁকি শনাক্তকরণের জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও পূর্বাভাস সংকট (Epistemological Limitations and Forecasting Dilemmas in Risk Identification)
ঝুঁকি শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং গোয়েন্দা কাঠামোর অভাবনীয় উন্নতি সত্ত্বেও এই প্রক্রিয়ার কিছু মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও পূর্বাভাসের সংকট রয়ে গেছে। সন্ত্রাসবাদ মূলত মানুষের মনস্তত্ত্ব, গোপন ষড়যন্ত্র এবং অপ্রত্যাশিত কৌশলের ওপর নির্ভরশীল একটি গতিশীল সামাজিক ঘটনা। কোনো গাণিতিক সমীকরণ বা আচরণগত প্রোটোকল দিয়েই শতভাগ নিশ্চিতভাবে মানুষের ভবিষ্যৎ আচরণ বা আকস্মিক আক্রমণের সময়কাল নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব নয়। ফলে ঝুঁকি নিরূপণের প্রতিটি প্রক্রিয়ার সাথে এক ধরনের অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা জড়িয়ে থাকে।
পরিসংখ্যানবিদ ও ঝুঁকি তাত্ত্বিক নাসিম নিকোলাস তালেব (Nassim Nicholas Taleb) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Black Swan: The Impact of the Highly Improbable-এ দেখিয়েছেন কীভাবে মানবজাতি চরম ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলোর ঝুঁকি অনুমানে বারবার ব্যর্থ হয় (Taleb, 2007)। তালেব একে কালো রাজহাঁস তত্ত্ব (Black Swan Theory) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একটি ‘কালো রাজহাঁস’ ঘটনার তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য থাকে: এটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও বিরল, এর পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর মানুষ অতীতের তথ্য সাজিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে এটি আগে থেকেই অনুমানযোগ্য ছিল। তালেবের মতে, আমেরিকার ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার মতো ঘটনাগুলো এই ধারার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অতীতে যা কখনো ঘটেনি, মানুষ সাধারণত তার ঝুঁকি নিরূপণ করতে পারে না; অথচ সন্ত্রাসীরা সবসময় অতীতের নিরাপত্তা নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন কৌশলে আঘাত হানে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক রিচার্ড বেটস (Richard Betts) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Surprise Attack: Lessons for Defense Planning-এ গোয়েন্দা ব্যর্থতার মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন (Betts, 1982)। বেটস তুলে ধরেন যে বেশিরভাগ গোয়েন্দা ব্যর্থতা তথ্যের অভাবের কারণে ঘটে না; বরং তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে ভুল সংকেত বা ‘নয়েজ’ এবং বিশ্লেষকদের নিজস্ব মানসিক পক্ষপাতের কারণে ঘটে। নীতিনির্ধারকরা অনেক সময় তাদের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসের সাথে মেলে না এমন সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করেন। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত সতর্কবার্তা দেওয়ার ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ক্লান্তি চলে আসে, যা প্রকৃত আক্রমণের মুহূর্তে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াকে শ্লথ করে ফেলে।
ঝুঁকি শনাক্তকরণের প্রক্রিয়ায় আরেকটি জটিল নৈতিক ও ব্যবহারিক সংকট হলো ‘ফলস পজিটিভ’ এবং ‘ফলস নেগেটিভ’-এর দ্বন্দ্ব। যদি ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মানদণ্ড অতিরিক্ত সংবেদনশীল করা হয়, তবে বহু নিরপরাধ ব্যক্তি চরমপন্থী সন্দেহে নজরদারি বা হয়রানির শিকার হতে পারেন, যা নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটায়। অন্যদিকে মানদণ্ড যদি শিথিল রাখা হয়, তবে প্রকৃত কোনো অপরাধী শনাক্তকরণের বাইরে থেকে গিয়ে বড় ধরনের নাশকতা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরূপণের এই পুরো ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মানুষের অনিশ্চিত আচরণের মধ্যকার এক চিরন্তন হিসাব-নিকাশের ওপর।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধ পরিকল্পনা (Risk Management and Preventive Planning): নীতি ও সমাধান
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার তাত্ত্বিক ভিত্তি ও রূপরেখা (Theoretical Foundations and Frameworks of Risk Management)
সন্ত্রাসবাদের সম্ভাব্য হুমকি ও সংবেদনশীলতা শনাক্ত করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি হলো সেই ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করার প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল প্রণয়ন করা। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বলতে এমন এক সুসংহত প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মাত্রা হ্রাস করা, সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার পর রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। অতীতে নিরাপত্তা কৌশলগুলো মূলত ঘটনার পর কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিত। কিন্তু সমকালীন নিরাপত্তা বিজ্ঞানে প্রতিক্রিয়াশীল নীতির চেয়ে সক্রিয় প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনাকে অনেক বেশি কার্যকর ও টেকসই বিবেচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক রবার্ট জার্ভিস (Robert Jervis) তার বিখ্যাত গ্রন্থ System Effects: Complexity in Political and Social Life-এ দেখিয়েছেন কীভাবে জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় যেকোনো একক পদক্ষেপের বহুমুখী ও অপ্রত্যাশিত ফলাফল তৈরি হতে পারে (Jervis, 1997)। জার্ভিস যুক্তি দেন যে জটিল সিস্টেমে কোনো একটি ঝুঁকি দূর করার জন্য গৃহীত কঠোর পদক্ষেপ অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রান্তে নতুন ঝুঁকির জন্ম দেয়। উদাহরণস্বরূপ, অতিরিক্ত সামরিক দমন অভিযান অনেক সময় সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে নতুন চরমপন্থী সদস্য সংগ্রহের সুযোগ করে দিতে পারে। এ কারণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো কেবল বলপ্রয়োগ নয়, বরং সার্বিক সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে একটি সংবেদনশীল নীতি প্রণয়ন করা।
সংকট ব্যবস্থাপনা গবেষক ইয়ন বোইন (Arjen Boin) এবং তার সহলেখকরা তাদের গ্রন্থ The Politics of Crisis Management: Public Leadership Under Pressure-এ প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা বা রেজিলিয়েন্সের তাত্ত্বিক রূপরেখা দিয়েছেন (Boin et al., 2005)। বোইন দেখান যে আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে যেকোনো সন্ত্রাসী ঝুঁকি শতভাগ শূন্যে নামিয়ে আনা বাস্তবসম্মত নয়। বরং একটি পরিপক্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কাজ হলো সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সর্বনিম্ন রাখা এবং সংকটকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও সমন্বয় বজায় রাখা। এই তাত্ত্বিক কাঠামো অনুসারে প্রতিরোধ পরিকল্পনাকে কেবল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে একটি সামগ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।
আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামোতে প্রধানত চারটি উপাদান কাজ করে: ঝুঁকি পরিহার, ঝুঁকি হ্রাস, ঝুঁকি স্থানান্তর এবং ঝুঁকি সহনশীলতা। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ খাত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া যদি সম্ভব না হয়, তবে প্রকৌশলগত ও নীতিগত সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করে সেই ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনা হয়। এর পাশাপাশি নিয়মিত মক ড্রিল, আপৎকালীন সমন্বয় প্রোটোকল এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এমন একটি প্রতিরক্ষামূলক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে যেকোনো আকস্মিক বিপর্যয়ের মুখেও সমাজের মৌলিক কার্যকারিতা ভেঙে না পড়ে।
প্রাথমিক প্রতিরোধ ও সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধ কৌশল (Primary Prevention and Countering Violent Extremism – CVE)
সন্ত্রাসবাদ দমনে কেবল পুলিশি ও সামরিক অভিযানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হওয়ার পর একুশ শতকের শুরু থেকে প্রতিরোধ পরিকল্পনার একটি নতুন ধারণা হিসেবে সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধ (Countering Violent Extremism – CVE) বা উগ্রপন্থা প্রতিরোধ কাঠামো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এই কৌশলের মূল কথা হলো কোনো ব্যক্তি অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আগেই যে সামাজিক, মানসিক ও মতাদর্শিক প্রক্রিয়ায় সে উগ্রপন্থী হয়ে ওঠে, সেই প্রাথমিক পর্যায়েই হস্তক্ষেপ করা। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের মডেল অনুসরণ করে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রধানত সার্বজনীন, নির্বাচিত এবং নির্দিষ্ট স্তরে ভাগ করে প্রয়োগ করা হয়।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ লুইস রিচার্ডসন (Louise Richardson) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ What Terrorists Want: Understanding the Enemy, Containing the Threat-এ চরমপন্থার মূল মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তিগুলো ব্যাখ্যা করেছেন (Richardson, 2006)। রিচার্ডসন দেখান যে চরমপন্থীরা মূলত তিনটি মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হয়: প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা, নিজেদের গুরুত্ব বা মহত্ত্ব জাহির করা এবং কোনো নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের প্রতি তীব্র আনুগত্য। রিচার্ডসনের মতে, সন্ত্রাসবাদকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে হলে কেবল সন্ত্রাসীদের হত্যা বা গ্রেপ্তার করা যথেষ্ট নয়; বরং যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়বোধ তরুণদের মনে এই প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি করে, সেই মূল কারণগুলোকে রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে প্রশমিত করতে হয়।
নিরাপত্তা গবেষক পিটার নয়মান (Peter Neumann) তার গ্রন্থ Radicalized: New Jihadists and the Threat to the West-এ সমকালীন উগ্রপন্থা প্রতিরোধ কৌশলের বাস্তবায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেছেন (Neumann, 2016)। নয়মান উল্লেখ করেন যে আধুনিক প্রতিরোধ নীতিতে সিভিল সোসাইটি, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং পারিবারিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। তরুণদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা তৈরি এবং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা উগ্র প্রচারণার বিরুদ্ধে বিকল্প ও ইতিবাচক বয়ান বা কাউন্টার-ন্যারেটিভ তুলে ধরাই হলো প্রাথমিক প্রতিরোধের প্রধান স্তম্ভ।
সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। বেকারত্ব, বৈষম্য এবং বিচারহীনতার অনুভূতি যখন চরমপন্থী প্রচারকদের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে, তখন রাষ্ট্রকে সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ও যুব ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করতে হয়। পুলিশ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধির জন্য কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা এই প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর কৌশল। ফলে সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধ কেবল কোনো গোয়েন্দা নজরদারি প্রকল্প নয়; বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও শিক্ষাগত সংস্কারের সামগ্রিক সমন্বয়।
ডির্যাডিকালাইজেশন, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ (Deradicalization, Rehabilitation, and Social Reintegration)
যেসব ব্যক্তি ইতিমধ্যে উগ্রপন্থী মতাদর্শ গ্রহণ করেছে কিংবা সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে কারাবন্দী হয়েছে, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষায়িত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত জটিল ও মানবিক শাখা। এই প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে ডির্যাডিকালাইজেশন (Deradicalization) বা মোহভঙ্গকরণ এবং পুনর্বাসন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই ক্ষেত্রে তাত্ত্বিকভাবে দুটি ধারণার পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি: একটি হলো ডিসএনগেজমেন্ট বা সশস্ত্র কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসা, এবং অন্যটি হলো ডির্যাডিকালাইজেশন বা মনস্তাত্ত্বিক ও মতাদর্শিক বিশ্বাসের পরিবর্তন।
অপরাধবিজ্ঞানী টোর বিয়োরগো (Tore Bjørgo) এবং মনস্তত্ত্ববিদ জন হর্গান (John Horgan) সম্পাদিত গ্রন্থ Leaving Terrorism Behind: Individual and Collective Disengagement-এ চরমপন্থা ত্যাগের প্রক্রিয়া বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে (Bjørgo & Horgan, 2009)। গবেষকরা দেখান যে কোনো ব্যক্তিকে সহিংস পথ থেকে সরিয়ে আনার জন্য সবসময় তার গভীর মতাদর্শিক বিশ্বাস পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না; বরং সে যদি বাস্তবিক কারণে অস্ত্র পরিত্যাগ করে সাধারণ সামাজিক জীবনে ফিরে আসতে চায়, তবে সেটাই প্রাথমিক সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে জন হর্গান তার একক গ্রন্থ Walking Away from Terrorism: Accounts of Disengagement from Radical and Extremist Movements-এ উল্লেখ করেছেন যে চরমপন্থীদের দলত্যাগের পেছনে প্রায়শই সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, নেতৃত্বের ভণ্ডামি এবং অতিরিক্ত সহিংসতার প্রতি ব্যক্তিগত মোহভঙ্গ কাজ করে (Horgan, 2009)। পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজ হলো ব্যক্তির এই মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো।
মনোবিজ্ঞানী আরি ক্রুগলানস্কি (Arie Kruglanski) এবং তার সহলেখকরা তাদের গ্রন্থ The Three Pillars of Radicalization: Needs, Narratives, and Networks-এ দেখিয়েছেন যে উগ্রপন্থা থেকে মুক্তির প্রক্রিয়াটি তিনটি মৌলিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে (Kruglanski et al., 2019)। তাদের তত্ত্বে এগুলোকে প্রয়োজন, বয়ান এবং নেটওয়ার্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুনর্বাসন সফল করতে হলে ব্যক্তিকে সম্মানজনক আত্মমর্যাদা বা নতুন জীবনের অর্থ দিতে হয়, চরমপন্থী বয়ানের অসারতা যুক্তিযুক্তভাবে তুলে ধরতে হয় এবং তাকে পুরোনো উগ্রপন্থী বন্ধুচক্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি নতুন ইতিবাচক সামাজিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করতে হয়।
কারাগারভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচিতে ধর্মীয় বা মতাদর্শিক কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি এবং কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যাতে পুনরায় অপরাধে না জড়ায়, সেজন্য তাকে পারিবারিক সহযোগিতা ও সমাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া আবশ্যক। সমাজ যদি ফিরে আসা ব্যক্তিদের স্থায়ীভাবে অপরাধী হিসেবে বর্জন করে, তবে তারা পুনরায় পুরোনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। ফলে সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণের সাফল্য কেবল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করে না; এতে সামগ্রিক সমাজের সহানুভূতিশীল ও সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন হয়।
পরিস্থিতিগত অপরাধ প্রতিরোধ ও অবকাঠামোগত সহনশীলতা (Situational Crime Prevention and Infrastructure Resilience)
সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো সমাধানের পাশাপাশি হামলার বাস্তব সুযোগ বন্ধ করার জন্য শারীরিক ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আরেকটি অপরিহার্য দিক। অপরাধবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে পরিস্থিতিগত অপরাধ প্রতিরোধ (Situational Crime Prevention) বলা হয়। এই ধারণার মূল কথা হলো চরমপন্থীদের আক্রমণ করার ইচ্ছা থাকলেও যদি লক্ষ্যবস্তুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই দুর্ভেদ্য করা যায় যে হামলার ঝুঁকি ও ব্যয় অনেক বেড়ে যায় এবং সফল হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসে, তবে হামলাকারীরা আক্রমণ চালানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।
অপরাধবিজ্ঞানী রোনাল্ড ভি ক্লার্ক (Ronald V. Clarke) এবং জেরাল্ড নিউম্যান (Graeme R. Newman) তাদের যৌথ গবেষণা গ্রন্থ Outsmarting the Terrorists-এ পরিস্থিতিগত অপরাধ প্রতিরোধের নীতিগুলোকে সন্ত্রাস দমনে প্রয়োগের কাঠামো দেখিয়েছেন (Clarke & Newman, 2006)। ক্লার্ক ও নিউম্যান ব্যাখ্যা করেন যে সন্ত্রাসীরাও যুক্তিশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী; তারা তুলনামূলকভাবে কম সুরক্ষিত এবং সহজ লক্ষ্যবস্তু বা সফট টার্গেট বেছে নেয়। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়াতে হবে, যাকে পরিভাষায় টার্গেট হার্ডেনিং বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কংক্রিটের ব্যারিকেড স্থাপন, প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর ও এক্স-রে স্ক্যানার ব্যবহার, সিসিটিভি ক্যামেরার সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণাটি সমকালীন সংবেদনশীল স্থাপনা সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। একে বলা হয় পরিবেশগত নকশার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ বা সিপিটিইডি (CPTED)। জনাকীর্ণ এলাকা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন বা সরকারি ভবনের চারপাশের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বিস্ফোরকবাহী গাড়ি সহজে ভবনের কাছে পৌঁছাতে না পারে এবং যেকোনো অস্বাভাবিক গতিবিধি নিরাপত্তা কর্মীদের চোখে দ্রুত ধরা পড়ে। এর সাথে যুক্ত থাকে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম বাধা, যা শহরের সৌন্দর্য নষ্ট না করেও সর্বোচ্চ ভৌত সুরক্ষা প্রদান করে।
ভৌত সুরক্ষার বাইরে যেকোনো অপ্রত্যাশিত হামলার মুখে সংবেদনশীল অবকাঠামোর সচলতা বজায় রাখার জন্য কন্টিনুইটি অব অপারেশনস প্ল্যান বা আপৎকালীন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জল শোধনাগার, হাসপাতাল ও সাইবার ডেটা সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বিকল্প বিদ্যুৎ জেনারেটর, ব্যাকআপ সার্ভার এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখা হয়। ফলে যদি কোনো একটি অংশে আক্রমণ বা নাশকতা ঘটে, তবুও পুরো রাষ্ট্রীয় পরিষেবা একযোগে অচল হয়ে পড়ে না। এই কাঠামোগত সহনশীলতা সন্ত্রাসীদের মূল উদ্দেশ্য – জনজীবনে আতঙ্ক ও দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা তৈরি করা – নস্যাৎ করে দেয়।
আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও বহুপাক্ষিক প্রতিরোধ পরিকল্পনা (Legal, Institutional, and Multilateral Preventive Planning)
একটি কার্যকর ও টেকসই প্রতিরোধ কাঠামোর জন্য সুদৃঢ় আইনি ভিত্তি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় অপরিহার্য। রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এমনভাবে প্রণয়ন করতে হয় যাতে তা অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে পারে এবং একই সাথে সাধারণ নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখে। আইনের শাসনের সঠিক প্রয়োগ ছাড়া কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না।
আইনবিজ্ঞানী ডেভিড কোল (David Cole) এবং জুলস লোবেল (Jules Lobel) তাদের গবেষণা গ্রন্থ Less Safe, Less Free: Why America Is Losing the War on Terror-এ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন (Cole & Lobel, 2007)। কোল ও লোবেল যুক্তি দেন যে জাতীয় নিরাপত্তার নামে যদি বিচারবহির্ভূত আটক, নির্যাতন বা নির্বিচার নজরদারির মতো চরম অগণতান্ত্রিক পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় বৈধতাকে ধ্বংস করে এবং নতুন চরমপন্থার জন্ম দেয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সন্ত্রাস প্রতিরোধ পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা এবং আইনি প্রক্রিয়ার বিশুদ্ধতা। আইনের শাসন লঙ্ঘন করে সাময়িক নিরাপত্তা পাওয়া গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে আরও বেশি অনিরাপদ করে তোলে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিরোধ পরিকল্পনা সমন্বয় করার জন্য জাতিসংঘ ২০০৬ সালে তার ঐতিহাসিক জাতিসংঘ বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল (UN Global Counter-Terrorism Strategy) গ্রহণ করে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স পি স্মিড (Alex P. Schmid) সম্পাদিত The Routledge Handbook of Terrorism Research-এ আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের এই বহুপাক্ষিক কাঠামোর বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় (Schmid, 2011)। জাতিসংঘের এই কৌশলে চারটি প্রধান স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে: সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের সহায়ক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ ও দমন করা, রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সর্বোপরি আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি সার্বজনীন শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা।
জাতীয় স্তরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ বা সমগ্র সরকার ব্যবস্থা এবং ‘হোল-অব-সোসাইটি’ বা সমগ্র সমাজ ব্যবস্থার সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা হয়। এতে কেবল পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা নয়, বরং শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী সমন্বয় সেল কাজ করে। ফলে রাষ্ট্রীয় যেকোনো সিদ্ধান্ত একটি একক জাতীয় কৌশলের আওতায় বাস্তবায়িত হয়, যা তথ্যের বিচ্ছিন্নতা দূর করে এবং জাতীয় প্রতিরোধ সক্ষমতাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
সংকট প্রতিক্রিয়া, রেজিলিয়েন্স ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সমাধান (Crisis Response, Resilience, and Long-Term Strategic Solutions)
যেকোনো কার্যকর প্রতিরোধ পরিকল্পনার একটি চূড়ান্ত ধাপ হলো কোনো সন্ত্রাসী হামলা ঘটে যাওয়ার পর দ্রুত সংকট মোকাবেলা করা এবং সমাজের মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে পুনর্গঠিত করা। চরমপন্থীদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে সমাজে আতঙ্ক, অবিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করা। আক্রান্ত রাষ্ট্র ও সমাজ যদি দ্রুত এই প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে, তবে সন্ত্রাসীদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যর্থ হয়ে যায়। এই সক্ষমতাকেই নিরাপত্তা বিজ্ঞানে কৌশলগত রেজিলিয়েন্স বা সামাজিক সহনশীলতা বলা হয়।
ব্রিটিশ নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল উইলকিনসন (Paul Wilkinson) তার বিখ্যাত গ্রন্থ Terrorism Versus Democracy: The Liberal State Response-এ দেখিয়েছেন কীভাবে গণতান্ত্রিক সমাজগুলো নিজেদের মৌলিক মূল্যবোধ বিসর্জন না দিয়েও সন্ত্রাসবাদের দীর্ঘমেয়াদী হুমকি মোকাবেলা করতে পারে (Wilkinson, 2011)। উইলকিনসন উল্লেখ করেন যে সংকটকালে সরকারের কৌশলগত যোগাযোগ বা স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। হামলার পর বিভ্রান্তিকর তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সেজন্য রাষ্ট্রকে দ্রুত, বস্তুনিষ্ঠ ও স্বচ্ছ তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সকল নাগরিকের পাশে দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিতে হয়, যা সন্ত্রাসীদের বিভাজনের কৌশলকে রুখে দেয়।
সংকট ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জুলিয়েট কায়েম (Juliette Kayyem) তার সাম্প্রতিক গ্রন্থ The Devil Never Sleeps: Learning to Live in an Age of Disasters-এ বিপর্যয়-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের আধুনিক কৌশল ব্যাখ্যা করেছেন (Kayyem, 2022)। কায়েম দেখান যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাই সব ধরনের আক্রমণ চিরতরে ঠেকিয়ে দেওয়ার গ্যারান্টি দিতে পারে না। এ কারণে সফল নেতৃত্বের লক্ষণ হলো কোনো ঘটনা ঘটলে তার বিস্তার কত দ্রুত সীমিত করা যায় এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ ও মানসিক সহায়তা কত দ্রুত নিশ্চিত করা যায়। জরুরি উদ্ধারকারী দল, ফায়ার সার্ভিস, প্যারামেডিক এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মধ্যে সমন্বিত রেসপন্স প্রোটোকল আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হয়।
দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সমাধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণ। সন্ত্রাসবাদ কোনো শূন্যস্থানের মধ্যে জন্ম নেয় না; এটি জন্ম নেয় যখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের গণতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ পরিকল্পনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে আইনের সমতা থাকবে, শিক্ষার আলো সবার কাছে পৌঁছাবে এবং কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ সহিংসতাকে পরিবর্তনের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। জ্ঞানভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমন্বয়ই একটি রাষ্ট্রকে যেকোনো চরমপন্থী ঝুঁকির বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।
সন্ত্রাসবাদের ভবিষ্যৎ (Future of Terrorism): প্রযুক্তি, ভূরাজনীতি ও পরিবর্তন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ হুমকি (Artificial Intelligence, Autonomous Systems, and Future Threats)
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানবসমাজের সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে, ঠিক একইভাবে তা ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদের কৌশলগত চরিত্রকেও রূপান্তর করছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রযুক্তির লভ্যতা এখন অনেক বেশি উন্মুক্ত ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। নিরাপত্তা বিজ্ঞানের গবেষকরা লক্ষ্য করছেন যে আধুনিক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো সনাতন অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে ডিজিটাল অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এবং স্বায়ত্তশাসিত যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকছে। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর সন্ত্রাসবাদকে কেবল আরও বেশি ধ্বংসাত্মক করে তুলছে না, বরং রাষ্ট্রের নজরদারি এড়ানোর সুযোগও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অড্রে কার্থ ক্রনিন (Audrey Kurth Cronin) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ Power to the People: How Open Technological Innovation is Arming Tomorrow’s Terrorists-এ উন্মুক্ত প্রযুক্তির বিপজ্জনক বিস্তার ব্যাখ্যা করেছেন (Cronin, 2019)। ক্রনিনের মতে, অতীতে সামরিক প্রযুক্তির ওপর কেবল পরাশক্তি ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু সমকালীন যুগে বাণিজ্যিক ড্রোন, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদ্ভাবনগুলো বাজারে উন্মুক্তভাবে বিক্রি হচ্ছে। ফলে অরাষ্ট্রীয় সহিংস গোষ্ঠীগুলো খুব কম খরচে এসব প্রযুক্তি সংগ্রহ করে সেগুলোকে প্রাণঘাতী অস্ত্রে রূপান্তর করতে পারছে। ক্রনিন দেখান যে বাণিজ্যিক প্রযুক্তির এই গণতন্ত্রীকরণ রাষ্ট্র এবং চরমপন্থীদের মধ্যকার কৌশলগত ক্ষমতার ব্যবধানকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক পল শার (Paul Scharre) স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার গ্রন্থ Army of None: Autonomous Weapons and the Future of War-এ উল্লেখ করেছেন যে যন্ত্র যখন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, তখন তা এক অভাবনীয় নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দেয় (Scharre, 2018)। বাণিজ্যিক ড্রোনগুলোকে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সফটওয়্যারের সাথে যুক্ত করা হয়, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে আঘাত হানতে পারে। একাধিক ড্রোন একত্রিত হয়ে যখন একটি সুসংহত ড্রোন ঝাঁক বা ড্রোন সোয়ার্ম হিসেবে আক্রমণ চালায়, তখন প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে শত শত ক্ষুদ্র লক্ষ্যবস্তুকে একসাথে প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ভবিষ্যতে এই ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংবেদনশীল অবকাঠামো বা রাজনৈতিক সমাবেশ লক্ষ্য করে নিখুঁত দূরনিয়ন্ত্রিত আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার কেবল ভৌত অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সাইবার পরিসরেও সন্ত্রাসীদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্বয়ংক্রিয় কোডিং টুলের মাধ্যমে উগ্রপন্থীরা এখন জটিল সাইবার ম্যালওয়্যার তৈরি করতে পারে, যা বিদ্যুৎ গ্রিড বা আর্থিক ব্যবস্থার মতো জাতীয় অবকাঠামোকে দূর থেকে অচল করে দিতে সক্ষম। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ডিপফেক ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া সংবাদ, যার মাধ্যমে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়া সম্ভব। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তির মেলবন্ধন ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদকে এক অদৃশ্য, গতিশীল এবং অতি-নির্ভুল হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
জৈবপ্রযুক্তি, সিন্থেটিক বায়োলজি ও নতুন প্রজন্মের গণবিধ্বংসী ঝুঁকি (Biotechnology, Synthetic Biology, and Next-Generation WMD Risks)
ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদের আরেকটি মারাত্মক ও অপ্রচলিত হুমকি লুকিয়ে আছে জৈবপ্রযুক্তি ও সিন্থেটিক বায়োলজির অভাবনীয় অগ্রগতির ভেতরে। অতীতে কোনো মারাত্মক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু সংগ্রহ করে তা দিয়ে কার্যকর জৈব অস্ত্র তৈরি করা ছিল অত্যন্ত জটিল, বিপজ্জনক এবং কেবল রাষ্ট্রীয় গবেষণাগারের সক্ষমতার অধীন। কিন্তু জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি যেমন ক্রিসপার-ক্যাসনাইন এবং জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে জীববিজ্ঞানের জটিল প্রক্রিয়াগুলো এখন অনেকটাই কম্পিউটার কোডিংয়ের মতো সহজলভ্য হয়ে উঠছে। ল্যাবরেটরি সরঞ্জামের দাম কমে যাওয়া এবং অনলাইন নির্দেশিকার সহজলভ্যতা জৈব সন্ত্রাসের সম্ভাবনাকে এক নতুন বাস্তবতায় নিয়ে এসেছে।
বায়োডিফেন্স বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি কোবলেন্টজ (Gregory Koblentz) তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ Living Weapons: Biological Warfare and International Security-এ দেখিয়েছেন কীভাবে জীববিজ্ঞানের বিপ্লব নিরাপত্তা ঝুঁকিকে জটিল করে তুলেছে (Koblentz, 2009)। কোবলেন্টজের মতে, সিন্থেটিক বায়োলজির মূল সংকট হলো এর দ্বৈত ব্যবহারের প্রকৃতি বা ডুয়াল-ইউজ ডিলেমা। যে প্রযুক্তি দিয়ে ক্যান্সারের নতুন ওষুধ তৈরি করা হয় বা মানব জিন সংশোধন করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো হয়, ঠিক একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো সাধারণ ভাইরাসকে মারাত্মক প্রাণঘাতী কিংবা প্রচলিত ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তোলা সম্ভব। কোবলেন্টজ সতর্ক করেন যে উগ্র মতাদর্শে বিশ্বাসী ক্ষুদ্র কোনো গবেষক দলও যদি এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে, তবে তা একটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক জৈব নিরাপত্তা গবেষক ম্যালকম ডান্ডো (Malcolm Dando) তার গ্রন্থ Bioterrorism and Biocrimes: The Illicit Use of Biological Agents in the 21st Century-এ অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা জৈব অস্ত্রের অপব্যবহারের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছেন (Dando, 2005)। ডান্ডো তুলে ধরেন যে চরমপন্থীরা কোনো বড় সামরিক কারখানা ছাড়াই সাধারণ বেসমেন্ট ল্যাবরেটরিতে মারাত্মক টক্সিন বা সিন্থেটিক প্যাথোজেন তৈরি করতে পারে। এই ধরনের জীবাণু কোনো গন্ধ বা দৃশ্যমান সংকেত ছাড়াই শহরের জল সরবরাহ ব্যবস্থা বা গণপরিবহন নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণের উৎস শনাক্ত করা যায় না বলে আক্রান্ত রাষ্ট্র প্রাথমিক অবস্থায় বুঝতেই পারে না এটি কোনো প্রাকৃতিক মহামারী নাকি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী আক্রমণ।
সিন্থেটিক বায়োলজির ভবিষ্যৎ বিস্তার এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে যেখানে ভৌগোলিক দূরত্বের কোনো ভূমিকা থাকে না। একটি পরিবর্তিত ভাইরাস সীমান্ত পার হয়ে খুব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় এবং সমাজে স্থায়ী মানসিক ভীতি তৈরি করে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো যদি এই প্রযুক্তিকে তাদের মতাদর্শিক লক্ষ্যের সাথে যুক্ত করে, তবে তা প্রচলিত পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কম খরচে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানোর হাতিয়ার হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা মূল্যায়নে জৈব প্রযুক্তির কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার নৈতিক তদারকি শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক রূপান্তর, বহুমেরু বিশ্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রক্সি সন্ত্রাসবাদের পুনরুত্থান (Geopolitical Transformations, Multipolarity, and the Resurgence of State-Proxy Terrorism)
প্রযুক্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদের গতিপথ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী একমেরু বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে বিশ্ব এখন একটি বহুমেরু ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামোয় প্রবেশ করেছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই প্রতিযোগিতা – বিশেষ করে আমেরিকা, চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যকার ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব – আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসবিরোধী বহুত্ববাদী সহযোগিতাকে দুর্বল করে ফেলছে। বৃহৎ শক্তিগুলো যখন সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে ভয় পায়, তখন তারা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধের আশ্রয় নেয়, যা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দেয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তাত্ত্বিক জন মারশাইমার (John Mearsheimer) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Tragedy of Great Power Politics-এ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যবাদী কাঠামো বৃহৎ শক্তিগুলোকে ক্রমাগত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে বাধ্য করে (Mearsheimer, 2001)। মারশাইমারের আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং আঞ্চলিক প্রাধান্য বিস্তারের জন্য নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে যেকোনো কৌশলগত হাতিয়ার ব্যবহারে প্রস্তুত থাকে। যখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস চরমে পৌঁছায়, তখন বিভিন্ন চরমপন্থী অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকে অর্থ, উন্নত অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়ে দেওয়া একটি সাশ্রয়ী পররাষ্ট্রনীতিতে পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক কলিন পি ক্লার্ক (Colin P. Clarke) তার গ্রন্থ After the Caliphate: The Islamic State and the Future Terrorist Diaspora-এ দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে (Clarke, 2019)। ক্লার্কের মতে, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় স্থানীয় সশস্ত্র মিলিশিয়াদের পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। চরমপন্থীরাও এই ভূরাজনৈতিক ফাটলগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রসদ সংগ্রহ করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েও বহু সন্ত্রাসী সংগঠন নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী ঐকমত্যের ভাঙন। অতীতে জাতিসংঘ বা বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে সন্ত্রাস দমনে যে ধরনের যৌথ সিদ্ধান্ত বা আর্থিক গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান দেখা যেত, বর্তমানের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। এক রাষ্ট্রের চোখে যে সন্ত্রাসী, অন্য রাষ্ট্রের চোখে সে অনেক সময় স্বাধীনতা সংগ্রামী বা মিত্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতির সুযোগে চরমপন্থী সংগঠনগুলো আঞ্চলিক সীমান্ত পেরিয়ে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে পারছে। ফলে ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন অরাষ্ট্রীয় ঘটনা থাকবে না; বরং তা বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে আরও বেশি সংকর ও জটিল রূপ ধারণ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত সংকট ও ইকো-চরমপন্থার রূপান্তর (Climate Change, Environmental Crises, and the Mutation of Eco-Extremism)
একুশ শতকের নিরাপত্তা আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল কোনো পরিবেশগত ইস্যু হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভবিষ্যতের সংঘাত ও চরমপন্থার এক প্রধান অনুঘটক বা ‘থ্রেট মাল্টিপ্লায়ার‘ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম খরা, বন্যা এবং মরুভূমির বিস্তারের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সুপেয় জল, কৃষিজমি এবং খাদ্যের তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংকট যখন দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সাথে যুক্ত হয়, তখন তা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সদস্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।
পরিবেশ ও সংঘাত গবেষক ক্রিশ্চিয়ান প্যারেন্টি (Christian Parenti) তার গ্রন্থ Tropic of Chaos: Climate Change and the New Geography of Violence-এ দেখিয়েছেন কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক দক্ষিণ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সহিংসতার এক দুষ্টচক্র তৈরি করছে (Parenti, 2011)। প্যারেন্টির মতে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যখন কৃষকদের জীবিকা ধ্বংস হয় এবং মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে বা অন্য অঞ্চলে পাড়ি জমায়, তখন সেখানে জাতিগত সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। স্থানীয় সরকার যখন এই বাস্তুচ্যুত মানুষকে মৌলিক সেবা ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সশস্ত্র চরমপন্থী দলগুলো সেই শূন্যতায় প্রবেশ করে খাদ্য ও অর্থের বিনিময়ে তরুণদের নিজেদের দলে ভেড়ায়।
পরিবেশগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ থমাস হোমার-ডিক্সন (Thomas Homer-Dixon) তার গ্রন্থ Environment, Scarcity, and Violence-এ পরিবেশগত দুর্লভতা এবং সামাজিক সহিংসতার কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন (Homer-Dixon, 1999)। হোমার-ডিক্সন দেখান যে প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা সমাজের বিদ্যমান বিভাজনগুলোকে উসকে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। মধ্যপ্রাচ্যের টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস অববাহিকা কিংবা আফ্রিকার লেক চাদ অঞ্চলে এই পরিবেশগত পতনের সুযোগ নিয়ে চরমপন্থীরা সেচ ব্যবস্থা এবং জল সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় মানুষের ওপর নিজেদের মতাদর্শিক কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যতের এই পরিবেশগত সংকটের আরেকটি দিক হলো চরম দক্ষিণপন্থী বা বর্ণবাদী মতাদর্শের সাথে পরিবেশবাদের সংমিশ্রণ, যাকে বলা হয় ইকো-ফ্যাসিবাদ (Eco-Fascism)। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী চরমপন্থীরা মনে করে যে বৈশ্বিক সম্পদ সীমিত এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যা পরিবেশ ধ্বংসের মূল কারণ। ফলে তারা সম্পদ রক্ষার নামে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস আক্রমণকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ হামলাসহ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এই ইকো-ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের প্রকাশ দেখা গেছে। জলবায়ু সংকট যত ঘনীভূত হবে, ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদে এই ধরনের পরিবেশকেন্দ্রিক সহিংস মতাদর্শের বিস্তার ততটাই বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজিটাল মেটাভার্স, অ্যালগরিদমিক র্যাডিক্যালাইজেশন ও একক হামলাকারী (Digital Metaverse, Algorithmic Radicalization, and Lone-Actor Dynamics)
ভবিষ্যতের চরমপন্থার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রটি ভৌগোলিক বাস্তবতার চেয়েও বেশি উন্মোচিত হচ্ছে ভার্চুয়াল স্পেসে। ইন্টারনেটের সামাজিক মাধ্যমগুলো এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার প্রধান ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির পরবর্তী রূপান্তর হিসেবে যখন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা মেটাভার্স এবং অত্যন্ত শক্তিশালী রিকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, তখন চরমপন্থার দীক্ষা ও সংগঠন পরিচালনার প্রক্রিয়াতেও এক নীরব রূপান্তর ঘটছে। ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তিকে উগ্র মতাদর্শে দীক্ষিত করতে কোনো শারীরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না; মেটাভার্সের নিমগ্ন ভার্চুয়াল পরিবেশেই সে তার সহিংস দীক্ষা সম্পন্ন করতে পারবে।
প্রযুক্তি ও যুদ্ধ গবেষক পিটার ডব্লিউ সিঙ্গার (Peter W. Singer) এবং এমারসন ব্রুকিং (Emerson T. Brooking) তাদের বিখ্যাত যৌথ গ্রন্থ LikeWar: The Weaponization of Social Media-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোকে যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে (Singer & Brooking, 2018)। সিঙ্গার ও ব্রুকিং ব্যাখ্যা করেন যে বাণিজ্যিক সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা ব্যবহারকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাখার জন্য ক্রমাগত উগ্র ও বিতর্কিত কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি যদি একবার চরমপন্থী চিন্তার প্রতি সামান্যতম আগ্রহ দেখায়, তবে অ্যালগরিদম তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও কট্টর কনটেন্টের দিকে ঠেলে দেয়। এই অ্যালগরিদমিক বুদ্বুদ বা ইকো-চেম্বার ব্যক্তির মনস্তত্ত্বে এক কৃত্রিম ও চরমপন্থী বাস্তবতা তৈরি করে।
সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক গোয়েন্দা বিশ্লেষক মার্ক সেগম্যান (Marc Sageman) তার গ্রন্থ Leaderless Jihad: Terror Networks in the Twenty-First Century-এ ইন্টারনেটভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত চরমপন্থার কাঠামো তুলে ধরেছেন (Sageman, 2008)। সেগম্যান দেখান যে ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদ কোনো একক নেতা বা কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশে পরিচালিত হবে না; বরং এটি পরিচালিত হবে সমমনা ব্যক্তিদের উন্মুক্ত ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। একে বলা হয় নেতৃত্বহীন প্রতিরোধ তত্ত্ব (Leaderless Resistance Theory)। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শ গ্রহণ করে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক সংগঠনের সদস্য না হয়েও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজ উদ্যোগে হামলা পরিকল্পনা করে। এই একক হামলাকারী বা লোন-অ্যাক্টরদের শনাক্ত করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য একটি দুঃসাধ্য কাজ, কারণ তাদের কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগ থাকে না।
এছাড়া অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চরমপন্থার প্রচার বা গ্যামিফিকেশন অফ টেরর ভবিষ্যতের আরেকটি ক্রমবর্ধমান হুমকি। চরমপন্থীরা জনপ্রিয় ভিডিও গেমগুলোর ভার্চুয়াল স্পেস ব্যবহার করে কিশোর ও তরুণদের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করে এবং খেলার ছলে তাদের মধ্যে উগ্র মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেয়। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে হামলার সিমুলেশন তৈরি করে দূর থেকেই সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের সহিংস চরমপন্থা কোনো ভৌগোলিক সীমানার ভেতর আবদ্ধ না থেকে ইন্টারনেটের উন্মুক্ত ও বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল পরিসরে আত্মনিয়ন্ত্রিত এক মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের রূপরেখা ও বৈশ্বিক গভর্নেন্সের সংকট (Future Counterterrorism Architecture and the Crisis of Global Governance)
ভবিষ্যতের এই বহুমুখী, প্রযুক্তিভিত্তিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে জটিল সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করতে হলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেও বৈপ্লবিক রূপান্তর প্রয়োজন। বর্তমান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলগুলো প্রধানত বিশ শতকের রাষ্ট্রীয় মডেল এবং একুশ শতকের গোড়ার দিকের আল-কায়েদা ও আইএস-কেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু আগামী দিনের হুমকি যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, জলবায়ু সংকট এবং ভার্চুয়াল মেটাভার্সের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হবে, তখন সনাতন সামরিক অভিযান বা আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তা ঠেকানো সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি নমনীয়, প্রযুক্তি-সচেতন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রতিরোধ রূপরেখা।
আইন ও নিরাপত্তা তাত্ত্বিক ফিলিপ ববিট (Philip Bobbitt) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ Terror and Consent: The Wars for the Twenty-First Century-এ দেখিয়েছেন যে বিশ শতকের শিল্পভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রগুলো যখন একুশ শতকের তথ্যভিত্তিক ‘মার্কেট স্টেট‘-এ রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন সন্ত্রাসবাদের চরিত্রও রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করেছে (Bobbitt, 2008)। ববিট যুক্তি দেন যে বাজার-রাষ্ট্রের উন্মুক্ততা এবং অবাধ প্রযুক্তি প্রবাহকে সন্ত্রাসীরা নিজেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এ কারণে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কেবল গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান করলেই চলবে না; বরং আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক গভর্নেন্সের এমন এক নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরি করতে হবে, যা নাগরিকদের গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষা করেই বিপজ্জনক প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্লেষক রবার্ট রোজবার্গ (Robert Rotberg) তার সম্পাদিত গ্রন্থ When States Fail: Causes and Consequences-এ ভঙ্গুর রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন (Rotberg, 2004)। রোজবার্গ দেখান যে যেসব রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে থাকে। কোনো একটি দুর্বল রাষ্ট্রে চরমপন্থার বিস্তার ঘটলে তার প্রভাব উন্নত বিশ্বে গিয়েও আঘাত হানে। ফলে ভবিষ্যতের প্রতিরোধ পরিকল্পনাকে কেবল উন্নত বিশ্বের সীমানা পাহারা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
সব মিলিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভবিষ্যতের রূপটি কোনো একক প্রযুক্তির উদ্ভাবন বা কোনো একক মতাদর্শের জয়-পরাজয়ের ওপর নির্ভর করছে না; বরং এটি প্রযুক্তিগত সুবিধা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পরিবেশগত সংকটের এক সম্মিলিত মিথস্ক্রিয়া। এই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে হলে প্রয়োজন আন্তঃরাষ্ট্রীয় আস্থা পুনর্গঠন, বাণিজ্যিক প্রযুক্তির কার্যকর নৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সমাজের অভ্যন্তরীণ সহনশীলতা বৃদ্ধি করা। অন্ধকার শক্তির মোকাবিলার আসল শক্তি কোনো ধ্বংসাত্মক সমরাস্ত্রের মধ্যে থাকে না; তা থাকে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, বিজ্ঞানের গঠনমূলক ব্যবহার এবং একটি বৈষম্যহীন মানবিক বিশ্ব গড়ার যৌথ প্রতিশ্রুতির মধ্যে।
উপসংহার
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদের ভবিষ্যৎ গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সংকটটি প্রযুক্তি এবং ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণে প্রতিনিয়ত নিজের রূপ বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন প্রযুক্তি এবং ডার্ক ওয়েবের মতো উদীয়মান প্রযুক্তিগুলো সহিংস রাষ্ট্রবহির্ভূত দলগুলোকে এমন এক বিধ্বংসী সক্ষমতা এনে দিচ্ছে, যা অতীতে কেবল শক্তিশালী পরাশক্তিগুলোর হাতেই সংরক্ষিত ছিল। ভবিষ্যৎ বিশ্বে কোনো সন্ত্রাসী হামলার জন্য হয়তো আর বিশাল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বা সুনির্দিষ্ট সামরিক কাঠামোর প্রয়োজন পড়বে না; অ্যালগরিদমের সহায়তায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত সেলগুলো যেকোনো উন্মুক্ত সমাজে আকস্মিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারবে। এই ধরনের অদৃশ্য ও দ্রুত পরিবর্তনশীল হুমকি মোকাবেলা করতে হলে প্রথাগত সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি মানবজাতি অর্জন করেছে তা হলো, কেবল অস্ত্রের ভাষায় অস্ত্রের জবাব দিয়ে কখনোই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যে রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কেবল শারীরিক দমননীতির ওপর নির্ভর করে, তারা প্রকারান্তরে সমস্যার লক্ষণটির চিকিৎসা করে কিন্তু তার অন্তর্নিহিত ব্যাধিটিকে অবহেলা করে। অর্থনৈতিক বঞ্চনা, কাঠামোগত অবিচার, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা এবং গভীর সামাজিক ক্ষোভের যে জমিতে উগ্রবাদের বিষবাষ্প ডালপালা মেলে, সেই কারণগুলোকে সমূলে দূর করাই হলো টেকসই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (Risk Management)-এর মূল চাবিকাঠি। সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া যেকোনো কাউন্টার-টেররিজম কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য।
একই সাথে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বটি তৈরি হতে যাচ্ছে নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতার সীমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে যদি একটি নজরদারি রাষ্ট্র (Surveillance State) গড়ে তোলা হয় এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে চিরতরে সংকুচিত করা হয়, তবে মানবসমাজ এক নতুন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক পরাধীনতার মুখে পড়বে। একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের উন্মুক্ততা বজায় রেখেই কীভাবে অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা (Social Resilience) গড়ে তোলা যায়, সেটাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের চিরতরে অবসান কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অন্ধ ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্থাপত্য (International Security Architecture) গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্য, তথ্যের স্বচ্ছ আদান-প্রদান এবং যৌথ বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক বিশ্বব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। ভয়ের সংস্কৃতিকে জয় করে যুক্তিবাদী ও সংহতিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের এই দীর্ঘ অভিযাত্রাই হবে সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা।
তথ্যসূত্র
- Aas, K. F. (2013). Globalization and crime (2nd ed.). SAGE Publications.
- Acharya, A. (2009). Targeting terrorist financing: International cooperation and new regimes. Routledge.
- Ackerman, G. (2003). WMD terrorism research: Whereto from here? International Institute for Counter-Terrorism.
- Aebi, M. F. (2011). Measuring transnational crime: Methodological challenges and police cooperation. European Journal on Criminal Policy and Research, 17(3), 165–179.
- Agamben, G. (2005). State of exception (K. Attell, Trans.). University of Chicago Press.
- Agnew, J. (1994). The territorial trap: The geographical assumptions of international relations theory. Review of International Political Economy, 1(1), 53–80.
- Albright, D. (2010). Peddling peril: How the secret nuclear trade armed our enemies. Free Press.
- Aldrich, R. J. (2009). Global intelligence co-operation versus accountability: New hooks to catch Old Leviathan? International Affairs, 85(5), 1005–1026.
- Ali, T. (2002). The clash of fundamentalisms: Crusades, jreads and modernity. Verso.
- Allison, A. (2006). Millennial monsters: Japanese toys and the global imagination. University of California Press.
- Allison, G. (2004). Nuclear terrorism: The ultimate preventable catastrophe. Times Books.
- Altheide, D. L. (2002). Creating fear: News and the construction of crisis. Aldine de Gruyter.
- Althusser, L. (1971). Ideology and ideological state apparatuses (Notes towards an investigation). Monthly Review Press.
- Alvarez, J. E. (2005). International organizations as law-makers. Oxford University Press.
- Amin, S. (1976). Unequal development: An essay on the social formations of peripheral capitalism (B. Pearce, Trans.). Monthly Review Press.
- Anderson, M. (1989). Policing the world: Interpol and the politics of international police co-operation. Clarendon Press.
- Anderson, M. (1996). Frontiers: Territory and state formation in the modern world. Polity Press.
- Andreas, P. (2000). Border games: Policing the U.S.–Mexico divide. Cornell University Press.
- Andreas, P., & Nadelmann, E. (2006). Policing the globe: Criminalization and crime control in world politics. Oxford University Press.
- Appadurai, A. (2006). Fear of small numbers: An essay on the geography of anger. Duke University Press.
- Arendt, H. (1951). The origins of totalitarianism. Harcourt, Brace & World.
- Arendt, H. (1958). The human condition. University of Chicago Press.
- Arenlind, I. (2021). Cyber-enabled terrorist financing: The nexus between illicit financial flows and digital extortion. Journal of Financial Crime, 28(4), 1012–1025.
- Aronowitz, A. A. (2009). Human trafficking, human smuggling, and illegal immigration: Global perspectives. Praeger.
- Arquilla, J., & Ronfeldt, D. (2001). Networks and netwars: The future of terror, crime, and militancy. RAND Corporation.
- Arrighi, G. (1994). The long twentieth century: Money, power, and the origins of our times. Verso.
- Asch, S. E. (1956). Studies of independence and conformity: I. A minority of one against a unanimous majority. Psychological Monographs: General and Applied, 70(9), 1–70.
- Asia/Pacific Group on Money Laundering. (2016). Anti-money laundering and counter-terrorist financing measures – Bangladesh, Third Round Mutual Evaluation Report. Asia/Pacific Group on Money Laundering.
- Atlas, R. M. (2002). Bioterrorism: From threat to reality. Annual Review of Microbiology, 56(1), 167–185.
- Azuma, H. (2009). Otaku: Japan’s database animals. University of Minnesota Press.
- Bakhtin, M. (1984). Rabelais and his world. Indiana University Press.
- Bal, M. (1997). Narratology: Introduction to the theory of narrative. University of Toronto Press.
- Balko, R. (2013). Rise of the warrior cop: The militarization of America’s police forces. PublicAffairs.
- Bandura, A. (1999). Moral disengagement in the perpetration of inhumanities. Personality and Social Psychology Review, 3(3), 193–209.
- Bangladesh Financial Intelligence Unit. (2020). Annual report 2019–2020. Bangladesh Financial Intelligence Unit, Bangladesh Bank.
- Bangladesh Financial Intelligence Unit. (2021). Annual report 2020–2021. Bangladesh Financial Intelligence Unit, Bangladesh Bank.
- Barber, B. R. (1995). Jihad vs. McWorld: How globalism and tribalism are reshaping the world. Crown.
- Barker, M. (2012). Comics: Ideology, power and the critics. Manchester University Press.
- Barletta, M. (Ed.). (2002). Aftershocks: The chemical, biological, radiological, and nuclear threat to the homeland. Monterey Institute of International Studies.
- Barnett, M. (2011). Empire of humanity: A history of humanitarianism. Cornell University Press.
- Barthes, R. (1977). Image, music, text. Hill and Wang.
- Bartlett, J. (2015). The dark net: Inside the digital underworld. Melville House.
- Bashar, I. (2015). The ideological mutation of Islamist militancy in Bangladesh. Counter Terrorist Trends and Analyses, 7(10), 17–22.
- Bashar, I. (2017). The evolving terrorist threat in Bangladesh: Profile of the new JMB. Counter Terrorist Trends and Analyses, 9(7), 1–6.
- Bashar, I. (2024). Situating Jama’atul Ansar Fil Hindal Sharqiya’s emergence in Bangladesh’s threat landscape. Counter Terrorist Trends and Analyses, 16(4), 16–22.
- Bassiouni, M. C. (2014). International extradition: United States law and practice (6th ed.). Oxford University Press.
- Basra, R., & Neumann, P. R. (2016). Criminal pasts, terrorist futures: European jihadists and the new crime-terror nexus. Perspectives on Terrorism, 10(6), 25–40.
- Baudrillard, J. (1995). The Gulf War did not take place (P. Patton, Trans.). Indiana University Press.
- Bayley, D. H. (1985). Patterns of policing: A comparative international analysis. Rutgers University Press.
- Bayley, D. H., & Weisburd, D. (2009). Cops and spooks: The role of the police in counterterrorism. In D. Weisburd, T. E. Feucht, I. Hakimi, L. F. Mock, & S. Perry (Eds.), To protect and to serve: Policing in an age of terrorism (pp. 81–99). Springer.
- Beck, U. (1992). Risk society: Towards a new modernity. Sage Publications.
- Beck, U. (2009). World at risk. Polity Press.
- Becker, G. S. (1968). Crime and punishment: An economic approach. Journal of Political Economy, 76(2), 169–217.
- Becker, H. S. (1963). Outsiders: Studies in the sociology of deviance. Free Press.
- Bellamy, A. J. (2009). Responsibility to protect: The global effort to end mass atrocities. Polity Press.
- Benjamin, W. (1968). Illuminations: Essays and reflections. Schocken Books.
- Bergesen, A. J., & Lizardo, O. (2004). International terrorism and the world-system. Sociological Theory, 22(1), 38–52.
- Berndt, J. (2012). Intersections: Gender, history and culture in the Asian context. Routledge.
- Bertelsmann Stiftung. (2026). BTI 2026 country report: Bangladesh. Bertelsmann Stiftung.
- Betts, R. K. (1982). Surprise attack: Lessons for defense planning. Brookings Institution Press.
- Biersteker, T. J., & Eckert, S. E. (Eds.). (2008). Countering the financing of terrorism. Routledge.
- Bigo, D. (2006). Globalized (in)security: The field and the ban-opticon. Traces: A Multilingual Series of Cultural Theory and Translation, 4, 109–157.
- Bjørgo, T., & Horgan, J. (Eds.). (2009). Leaving terrorism behind: Individual and collective disengagement. Routledge.
- Blakeley, R. (2009). State terrorism and neoliberalism: The north in the south. Routledge.
- Blitzer, R. (1999). Domestic preparedness for terrorism involving weapons of mass destruction. In Terrorism and weapons of mass destruction (pp. 12–28). United States Government Printing Office.
- Bloom, M. (2005). Dying to kill: The allure of suicide terror. Columbia University Press.
- Bloom, M. (2011). Bombshell: Women and terrorism. University of Pennsylvania Press.
- Bobbitt, P. (2002). The shield of Achilles: War, peace, and the course of history. Alfred A. Knopf.
- Bobbitt, P. (2008). Terror and consent: The wars for the twenty-first century. Alfred A. Knopf.
- Boin, A., ‘t Hart, P., Stern, E., & Sundelius, B. (2005). The politics of crisis management: Public leadership under pressure. Cambridge University Press.
- Booth, P. (2010). Digital fandom: New media studies. Peter Lang Publishing.
- Boraine, A. L. (2000). A country unmasked: Inside South Africa’s Truth and Reconciliation Commission. Oxford University Press.
- Borum, R. (2011). Radicalization into violent extremism I: A review of social science theories. Journal of Strategic Security, 4(4), 7–36.
- Bowling, B., & Sheptycki, J. (2012). Global policing. SAGE Publications.
- Bradshaw, S., & Howard, P. N. (2018). Challenging truth and trust: A global inventory of organized social media manipulation. Computational Propaganda Research Project, University of Oxford.
- Bremmer, I. (2012). Every nation for itself: What happens when no one leads the world. Portfolio/Penguin.
- Bresler, F. (1992). Interpol. Sinclair-Stevenson.
- Brienza, C. (2016). Manga in America: Transnational book publishing and the transformation of a global market. Bloomsbury Academic.
- Brodeur, J.-P. (2010). The policing web. Oxford University Press.
- Browder, B. (2015). Red notice: A true story of high finance, murder, and one man’s fight for justice. Simon & Schuster.
- BSS. (2025, August 27). Over 2,200 escaped from jails during July Uprising, 700 still fugitive: IG Prisons. Bangladesh Sangbad Sangstha.
- Buergenthal, T. (2006). International human rights in a nutshell (3rd ed.). West Academic Publishing.
- Bukatman, S. (2003). Matters of gravity: Special effects and supermen in the 20th century. Duke University Press.
- Bunn, M. (2010). Securing the bomb 2010: Securing all vulnerable nuclear material in four years. Project on Managing the Atom, Harvard University.
- Burke, J. (2004). Al-Qaeda: The true story of radical Islam. I.B. Tauris.
- Byman, D. (2005). Deadly connections: States that sponsor terrorism. Cambridge University Press.
- Byman, D. (2011). A high price: The triumphs and failures of Israeli counterterrorism. Oxford University Press.
- Campbell, J. (1949). The hero with a thousand faces. Pantheon Books.
- Cardoso, F. H., & Faletto, E. (1979). Dependency and development in Latin America (M. M. Urquidi, Trans.). University of California Press.
- Carlin, D. (2022). Decentralized finance and national security: Evaluating the illicit finance risks of DeFi and crypto assets. Stanford Journal of International Law, 58(2), 245–282.
- Carruthers, S. L. (2000). The media at war: Communication and conflict in the twentieth century. Palgrave Macmillan.
- Cassese, A. (2005). International criminal law (2nd ed.). Oxford University Press.
- Castells, M. (1996). The information age: Economy, society and culture: Vol. 1. The rise of the network society. Blackwell Publishers.
- Chase-Dunn, C. (1998). Global formation: Structures of the world-economy (Updated ed.). Rowman & Littlefield.
- Chatman, S. (1978). Story and discourse: Narrative structure in fiction and film. Cornell University Press.
- Chertoff, M. (2018). Exploding the phone: Our digital world and the future of cybersecurity. Atlantic Books.
- Chomsky, N. (1988). Manufacturing consent: The political economy of the mass media. Pantheon Books.
- Chomsky, N., & Herman, E. S. (1979). The Washington connection and Third World fascism: The political economy of human rights (Vol. 1). South End Press.
- Christians, C. G., Glasser, T. L., McQuail, D., Nordenstreng, K., & White, R. A. (2009). Normative theories of the media: Journalism in democratic societies. University of Illinois Press.
- Claridge, D. (1996). State terrorism? Applying a definitional model. Terrorism and Political Violence, 8(3), 47–63.
- Clarke, C. P. (2015). Terrorism, Inc.: Financing terrorism and insurgencies. Praeger.
- Clarke, C. P. (2019). After the caliphate: The Islamic State and the future terrorist diaspora. Polity Press.
- Clarke, R. A., & Knake, R. K. (2010). Cyber war: The next threat to national security and what to do about it. Ecco.
- Clarke, R. V., & Newman, G. R. (2006). Outsmarting the terrorists. Praeger.
- Clifford, J. (1988). The predicament of culture: Twentieth-century ethnography, literature, and art. Harvard University Press.
- Cohen, S. (1972). Folk devils and moral panics: The creation of the Mods and Rockers. MacGibbon & Kee.
- Cohen, S. P. (2004). The idea of Pakistan. Brookings Institution Press.
- Cohn, N. (2013). The visual language of comics: Introduction to the structure and cognition of sequential images. Bloomsbury.
- Colarik, A. M. (2006). Cyber terrorism: Political and economic implications. Idea Group Publishing.
- Cole, D. (2003). Enemy aliens: Double standards and constitutional freedoms in the war on terrorism. The New Press.
- Cole, D., & Dempsey, J. X. (2002). Terrorism and the Constitution: Sacrificing civil liberties in the name of national security. The New Press.
- Cole, D., & Lobel, J. (2007). Less safe, less free: Why America is losing the war on terror. The New Press.
- Condry, I. (2013). The soul of anime: Collaborative creativity and Japan’s media success story. Duke University Press.
- Cordesman, A. H. (2005). The challenge of biological terrorism. Center for Strategic and International Studies.
- Cordingly, D. (1996). Under the black flag: The romance and the reality of life among the pirates. Random House.
- Costa, A. M. (2008). The illicit drug trade and its links to organized crime and terrorism. United Nations Office on Drugs and Crime.
- Cox, R. W. (1981). Social forces, states and world orders: Beyond international relations theory. Millennium: Journal of International Studies, 10(2), 126–155.
- Crelinsten, R. (2009). Counterterrorism. Polity Press.
- Crenshaw, M. (1981). The causes of terrorism. Comparative Politics, 13(4), 379–399.
- Crenshaw, M. (Ed.). (2020). The evolving dynamic of terrorism: Global perspectives on violent extremism. Columbia University Press.
- Cronin, A. K. (2009). How terrorism ends: Understanding the decline and demise of terrorist campaigns. Princeton University Press.
- Cronin, A. K. (2019). Power to the people: How open technological innovation is arming tomorrow’s terrorists. Oxford University Press.
- Cronin, A. K. (2020). Power to the people: How open technological innovation is arming tomorrow’s terrorists. Oxford University Press.
- Cushman, T. (Ed.). (2005). A matter of principle: Humanitarian arguments for war in Iraq. University of California Press.
- D’Amato, A. (1995). International law: Process and prospect (2nd ed.). Transnational Publishers.
- Dando, M. (2005). Bioterrorism and biocrimes: The illicit use of biological agents in the 21st century. Palgrave Macmillan.
- Dando, M. (2006). Bioterror and biowarfare: A beginner’s guide. Oneworld Publications.
- Davis, M. (2015). The evolution of EU internal security: Europol and operational coordination. European Security, 24(4), 512–530.
- Dawson, L. L. (2010). The study of new religious movements and the radicalization of home-grown terrorists: Opening a new forum for research. Terrorism and Political Violence, 22(1), 1–21.
- Deci, E. L., & Ryan, R. M. (2000). The “what” and “why” of goal pursuits: Human needs and the self-determination of behavior. Psychological Inquiry, 11(4), 227–268.
- Deflem, M. (2002). Policing world society: Historical foundations of international police cooperation. Oxford University Press.
- Del Vecchio, R. (2019). The reform of Interpol’s red notice system: Striking a balance between human rights and transnational law enforcement. International Criminal Law Review, 19(2), 241–268.
- den Boer, M. (2008). Fusing security, policing and intelligence: New partitions and cross-border borders in the EU. Journal of Borderlands Studies, 23(1), 71–86.
- den Boer, M. (2010). Towards a governance model of police cooperation in Europe: The vision of the Hague Programme. Policy Studies, 31(3), 329–343.
- Denison, R. (2015). Anime: A critical introduction. Bloomsbury Academic.
- Denning, D. E. (1999). Information warfare and security. Addison-Wesley.
- Dershowitz, A. M. (2002). Why terrorism works: Understanding the threat, responding to the challenge. Yale University Press.
- Dion-Schwarz, C., Manheim, D., & Johnston, P. B. (2019). Terrorist use of cryptocurrencies: Technical and political barriers and future threats. RAND Corporation.
- Dolnik, A. (2007). Understanding terrorist innovation: Technology, tactics and global trends. Routledge.
- Donohue, L. K. (2008a). The cost of counterterrorism: The power of the state in the early twenty-first century. Cambridge University Press.
- Donohue, L. K. (2008b). The cost of security: A strategy for the future. Cambridge University Press.
- Drazen, P. (2003). Anime explosion! The what? Why? & wow! of Japanese animation. Stone Bridge Press.
- Drezner, D. W. (1999). The sanctions paradox: Economic statecraft and international relations. Cambridge University Press.
- Dugard, J., & van den Wyngaert, C. (1998). Reconciling extradition with human rights. American Journal of International Law, 92(2), 187–212.
- Dunlap, C. J., Jr. (2001). The thick green line: The role of the American military in domestic law enforcement. Air Force Law Review, 51, 147–198.
- Durkheim, É. (1897). Suicide: A study in sociology (J. A. Spaulding & G. Simpson, Trans., 1951). Free Press.
- Durkheim, É. (1997). The division of labour in society (W. D. Halls, Trans.). Free Press. (Original work published 1893)
- Duyvesteyn, I. (2004). How new is the new terrorism? Studies in Conflict & Terrorism, 27(5), 439–454.
- Dworkin, R. (2006). Is democracy possible here? Principles for a new political debate. Princeton University Press.
- Eagleton, T. (1991). Ideology: An introduction. Verso.
- Eco, U. (1979). The role of the reader: Explorations in the semiotics of texts. Indiana University Press.
- Ehrenfeld, R. (2003). Funding evil: How terrorism is financed – and how to stop it. Bonus Books.
- Entman, R. M. (1993). Framing: Toward clarification of a fractured paradigm. Journal of Communication, 43(4), 51–58.
- Eriksen, T. H. (2007). Globalization: The key concepts. Berg.
- Esposito, J. L. (1992). The Islamic threat: Myth or reality? Oxford University Press.
- Etzioni, A. (2004). How patriotic is the Patriot Act? Freedom versus security in the age of terrorism. Routledge.
- European Union Agency for Asylum. (2025). Bangladesh: Country focus – Security situation and key socio-economic indicators. European Union Agency for Asylum.
- Evans, G. (2008). The responsibility to protect: Ending mass atrocity crimes once and for all. Brookings Institution Press.
- Fair, C. C. (2014). Fighting to the end: The Pakistan Army’s way of war. Oxford University Press.
- Falk, R. (1988). Revolutionaries and functionaries: The dual face of terrorism. E. P. Dutton.
- Falkenrath, R. A., Newman, R. D., & Thayer, B. A. (1998). America’s Achilles’ heel: Nuclear, biological, and chemical terrorism and covert attack. MIT Press.
- Fanon, F. (1961). The wretched of the earth (C. Farrington, Trans.). Grove Press.
- FATF. (2014). Risk of terrorist abuse in non-profit organisations. Financial Action Task Force.
- Felbab-Brown, V. (2010). Shooting up: Counterinsurgency and the illicit economy. Brookings Institution Press.
- Felshtinsky, Y. (2010). The KGB plays chess: The secret police and the fight for the world chess crown. Russell Enterprises.
- Ferguson, C. D., & Potter, W. C. (2005). The four faces of nuclear terrorism. Routledge.
- Ferrero, M. (2006). Pioneers of suicide terrorism: An economic analysis of the Palestinian case. Rationality and Society, 18(3), 323–353.
- Financial Action Task Force. (2014). Risk of terrorist abuse in non-profit organisations. Financial Action Task Force.
- Finer, S. E. (2002). The man on horseback: The role of the military in politics. Transaction Publishers. (Original work published 1962)
- Fooner, M. (1989). Interpol: Issues in world crime and international criminal justice. Plenum Press.
- Forsythe, D. P. (2017). Human rights in international relations (4th ed.). Cambridge University Press.
- Foucault, M. (1977). Discipline and punish: The birth of the prison. Pantheon Books.
- Franca, M. (1982). Bangladesh: The first decade. South Asian Publishers.
- Frank, A. G. (1966). The development of underdevelopment. Monthly Review, 18(4), 17–31.
- Franklin, B. (1907). The writings of Benjamin Franklin (A. H. Smyth, Ed., Vol. 3). Macmillan. (Original work published 1755)
- Franz, D. R. (2004). Preparedness for an anthrax attack. Molecular Aspects of Medicine, 25(5–6), 493–510.
- Freedman, L. (2004). Deterrence. Polity Press.
- Freeman, M. (2012). Financing terrorism: Case studies. Ashgate Publishing.
- Freeman, M. (Ed.). (2012). Financing terrorism: Case studies. Ashgate Publishing.
- Fukuyama, F. (1992). The end of history and the last man. Free Press.
- Galtung, J. (1998). High road, low road: Charting the course for peace journalism. Track Two: Constructive Approaches to Community and Political Conflict, 7(4), 7–10.
- Ganguly, S. (2001). Conflict unending: India-Pakistan tensions since 1947. Columbia University Press.
- Ganguly, S. (2008). Nuclear stability in South Asia. International Security, 33(2), 45–70.
- Ganor, B. (2005). The counter-terrorism puzzle: A guide for decision makers. Transaction Publishers.
- Gartenstein-Ross, D., & Grossman, L. G. (2009). Homegrown terrorists in the U.S. and U.K.: An empirical examination of the radicalization process. Center for Terrorism Research.
- Gavron, J. (2005). Amnesties in the light of developments in international law and the establishment of the International Criminal Court. International and Comparative Law Quarterly, 51(1), 91–117.
- Gearty, C. (2006). Can human rights survive? Cambridge University Press.
- Gearty, C. (2007). Terrorism and the rule of law. London School of Economics and Political Science.
- Genette, G. (1980). Narrative discourse: An essay in method. Cornell University Press.
- George, A. (Ed.). (1991). Western state terrorism. Polity Press.
- Geraghty, L. (2014). Cult collectors: Nostalgia, fandom and collecting popular culture. Routledge.
- Gerges, F. A. (2005). The far enemy: Why jihad went global. Cambridge University Press.
- Gerrig, R. J. (1993). Experiencing narrative worlds: On the psychological activities of reading. Yale University Press.
- Gilbert, G. (1998). Transnational fugitive offenders in international law: Extradition and other mechanisms. Martinus Nijhoff Publishers.
- Gilbert, P. (2003). New terror, new wars. Georgetown University Press.
- Gill, P. (2015). Lone-actor terrorists: A behavioural analysis. Routledge.
- Go, J. (2011). Patterns of empire: The British and American empires, 1688 to the present. Cambridge University Press.
- Goode, E., & Ben-Yehuda, N. (1994). Moral panics: The social construction of deviance. Blackwell.
- Goodhand, J. (2005). Frontiers and wars: The opium economy in Afghanistan. Journal of Agrarian Change, 5(2), 191–216.
- Graham, S. (2011). Cities under siege: The new military urbanism. Verso Books.
- Gramsci, A. (1971). Selections from the prison notebooks of Antonio Gramsci. International Publishers.
- Gray, J. (2010). Show sold separately: Promos, spoilers, and other media paratexts. New York University Press.
- Griswold, W. (2012). Cultures and societies in a changing world. SAGE Publications.
- Groensteen, T. (2007). The system of comics. University Press of Mississippi.
- Groombridge, N. (2008). The colour of law enforcement: Visual and textual codes in Interpol notices. Crime, Media, Culture, 4(1), 89–95.
- Gross, O., & Ní Aoláin, F. (2006). Law in times of crisis: Emergency powers in theory and practice. Cambridge University Press.
- Gunaratna, R. (2002). Inside Al Qaeda: Global network of terror. Columbia University Press.
- Gunaratna, R., & Ali, M. (2015). Terrorist rehabilitation: A new frontier in counter-terrorism. Imperial College Press.
- Gurr, T. R. (1970). Why men rebel. Princeton University Press.
- Habermas, J. (1989). The structural transformation of the public sphere. MIT Press.
- Hafez, M. M. (2006). Manufacturing human bombs: The making of Palestinian suicide bombers. United States Institute of Peace Press.
- Haggerty, B. C. (2017). Ransomware and critical infrastructure: A growing cybersecurity crisis. Georgetown University Press.
- Halliday, F. (1996). Islam and the myth of confrontation: Religion and politics in the Middle East. I.B. Tauris.
- Halliday, F. (2002). Two hours that shook the world: September 11, 2001: Causes and consequences. Saqi Books.
- Hamm, M. S. (2013). The spectacular few: Prisoner radicalization and the evolving terrorist threat. New York University Press.
- Harris, D. (2005). Good cops, bad cops: Race, police, and the world of undercover operations. New York University Press.
- Harvey, D. (2003). The new imperialism. Oxford University Press.
- Hayden, M. V. (2016). Playing to the edge: American intelligence in the age of terror. Penguin Press.
- Hayner, P. B. (2011). Unspeakable truths: Transitional justice and the challenge of truth commissions (2nd ed.). Routledge.
- Hegghammer, T. (2010). Jihad in Saudi Arabia: Violence and pan-Islamism since 1979. Cambridge University Press.
- Held, D., McGrew, A., Goldblatt, D., & Perraton, J. (1999). Global transformations: Politics, economics and culture. Stanford University Press.
- Helfer, L. R. (1993). Finding a consensus on United States v. Alvarez-Machain: Express treaty terms and the problem of foreign abductions. American Journal of International Law, 87(3), 439–445.
- Herman, D. (2002). Story logic: Problems and possibilities of narrative. University of Nebraska Press.
- Hills, A. (2009). Policing post-conflict cities. Routledge.
- Hills, A. (2014). The future of transnational policing: Networks, hybridity and cyber-frontiers. Policing and Society, 24(3), 335–351.
- Hills, M. (2002). Fan cultures. Routledge.
- Hinnebusch, R. (2019). The battle for Syria: International rivalry in the new Middle East. Routledge.
- Hirschi, T. (1969). Causes of delinquency. University of California Press.
- Hobsbawm, E. (1959). Primitive rebels: Studies in archaic forms of social movement in the 19th and 20th centuries. Manchester University Press.
- Hoffman, B. (2006). Inside terrorism (Rev. ed.). Columbia University Press.
- Homer-Dixon, T. F. (1999). Environment, scarcity, and violence. Princeton University Press.
- Horgan, J. (2005). The psychology of terrorism. Routledge.
- Horgan, J. (2009). Walking away from terrorism: Accounts of disengagement from radical and extremist movements. Routledge.
- Horgan, J. (2014). The psychology of terrorism (2nd ed.). Routledge.
- Horowitz, M. C. (2010). The diffusion of military power: Causes and consequences for international politics. Princeton University Press.
- Hufbauer, G. C., Schott, J. J., Elliott, K. A., & Oegg, B. (2007). Economic sanctions reconsidered (3rd ed.). Peterson Institute for International Economics.
- Hunter, R. (2021). Cryptocurrency and the dark web: The new frontier of illicit finance. Routledge.
- Huntington, S. P. (1996). The clash of civilizations and the remaking of world order. Simon & Schuster.
- Ignatieff, M. (2004). The lesser evil: Political ethics in an age of terror. Princeton University Press.
- Innes, M. (2014). Signal crimes: Social reactions to crime, disorder and control. Oxford University Press.
- International Crisis Group. (2018). Countering jihadist militancy in Bangladesh (Asia Report No. 295). International Crisis Group.
- Iwabuchi, K. (2002). Recentering globalization: Popular culture and Japanese transnationalism. Duke University Press.
- Jackson, R. (2008). The ghosts of state terror: Knowledge, politics and terrorism studies. Critical Studies on Terrorism, 1(3), 377–392.
- Jamieson, K. H. (2018). Cyberwar: How Russian hackers and trolls helped elect a president: What we don’t, can’t, and do know. Oxford University Press.
- Janis, I. L. (1972). Victims of groupthink: A psychological study of foreign-policy decisions and fiascoes. Houghton Mifflin.
- Jenkins, B. M. (1975). International terrorism: A new mode of conflict. Crescent Publications.
- Jensen, R. B. (2014). The battle against anarchist terrorism: An international history, 1878–1934. Cambridge University Press.
- Jervis, R. (1997). System effects: Complexity in political and social life. Princeton University Press.
- Johnson, C. (2000). Blowback: The costs and consequences of American empire. Metropolitan Books.
- Jones, R. (2012). Border walls: Security and the war on terror in the United States, India, and Israel. Zed Books.
- Jones, T., & Newburn, T. (2006). Plural policing: The North American experience. Routledge.
- Jordan, D. C. (1999). Drug politics: Dirty money and democracies. University of Oklahoma Press.
- Jordan, J. (2019). Leadership decapitation: Strategic targeting of terrorist organizations. Stanford University Press.
- Joshi, M. (2006). The new face of Islamist terrorism in Bangladesh. Strategic Analysis, 30(3), 643–654.
- Juergensmeyer, M. (2000). Terror in the mind of God: The global rise of religious violence. University of California Press.
- Juergensmeyer, M. (2003). Terror in the mind of God: The global rise of religious violence (3rd ed.). University of California Press.
- Kadlec, R. P. (2003). Biological weapons for wargamers. Military Review, 83(6), 16–25.
- Kaldor, M. (1999). New and old wars: Organized violence in a global era. Polity Press.
- Kaldor, M. (2007). Human security: Reflections on globalization and intervention. Polity Press.
- Kaplan, J., Lööw, H., & Malkki, L. (2014). Introduction to the special issue on lone wolf terrorism. Terrorism and Political Violence, 26(1), 1–5.
- Kasher, A., & Yadlin, A. (2005). Military ethics of fighting terror: An Israeli perspective. Journal of Military Ethics, 4(1), 3–32.
- Kaunert, C., & Léonard, S. (2012). Europol and the politics of EU police cooperation. Routledge.
- Kayyem, J. (2022). The devil never sleeps: Learning to live in an age of disasters. PublicAffairs.
- Keck, M. E., & Sikkink, K. (1998). Activists beyond borders: Advocacy networks in international politics. Cornell University Press.
- Keene, D. (1999). World within walls: Japanese literature of the pre-modern era, 1600–1867. Columbia University Press.
- Kelts, R. (2006). Japanamerica: How Japanese pop culture has invaded the U.S. Palgrave Macmillan.
- Khosrokhavar, F. (2009). Inside Jihadism: Understanding social movements and sociological motivations. Paradigm Publishers.
- Kilcullen, D. (2009). The accidental guerrilla: Fighting small wars in the midst of a big one. Oxford University Press.
- Kinsella, S. (2000). Adult manga: Culture and power in contemporary Japanese society. University of Hawaii Press.
- Knightley, P. (1975). The first casualty: From the Crimea to Vietnam: The war correspondent as hero, propagandist, and myth maker. Harcourt Brace Jovanovich.
- Koblentz, G. D. (2009). Living weapons: Biological warfare and international security. Cornell University Press.
- Köhler, D. (2016). Understanding deradicalization: Methods, tools and programs for countering violent extremism. Routledge.
- Kohn, R. H. (1997). How democracies control the military. Journal of Democracy, 8(4), 140–153.
- Kramer, M. (1990). The moral logic of Hizballah. In W. Reich (Ed.), Origins of terrorism: Psychologies, ideologies, theologies, states of mind (pp. 131–157). Cambridge University Press.
- Kraska, P. B. (Ed.). (2001). Militarizing the American criminal justice system: The changing roles of the military and the police. Northeastern University Press.
- Kristeva, J. (1980). Desire in language: A semiotic approach to literature and art. Columbia University Press.
- Kroenig, M. (2020). The return of great power rivalry: Democracy versus autocracy from the ancient world to the U.S. and China. Oxford University Press.
- Kruglanski, A. W., Bélanger, J. J., & Gunaratna, R. (2019). The three Ns of radicalization: Needs, networks, and narratives. Oxford University Press.
- Kruglanski, A. W., Chen, X., Dechesne, M., Fishman, S., & Orehek, E. (2009). Fully committed: Suicide bombers’ motivation and the quest for personal significance. Political Psychology, 30(3), 331–357.
- Lamarre, T. (2009). The anime machine: A media theory of animation. University of Minnesota Press.
- Laqueur, W. (1999). The new terrorism: Fanaticism and the arms of mass destruction. Oxford University Press.
- Laqueur, W. (2001). A history of terrorism. Transaction Publishers.
- Leeming, D. (2005). The Oxford companion to world mythology. Oxford University Press.
- Lefebvre, H. (1991). The production of space. Blackwell.
- Lesser, I. O., Hoffman, B., Arquilla, J., Ronfeldt, D., Zanini, M., & Jenkins, B. M. (1999). Countering the new terrorism. RAND Corporation.
- Lester, A. (2005). The overseas territory of human rights: The limits of emergency powers. Public Law, 2005(4), 743–762.
- Levi, M. A. (2007). On nuclear terrorism. Harvard University Press.
- Levitt, M. (2006). Hamas: Politics, charity, and terrorism in the service of jihad. Yale University Press.
- Levitt, M. (2007). Hamas: Politics, charity, and terrorism in the service of jihad. Yale University Press.
- Lewis, B. (1990). The roots of Muslim rage. The Atlantic Monthly, 266(3), 47–60.
- Lewis, T. G. (2006). Critical infrastructure protection in homeland security: Defending a networked nation. Wiley-Interscience.
- Libicki, M. C. (2007). Conquest in cyberspace: National security and information warfare. Cambridge University Press.
- Lifschultz, L. (1979). Bangladesh: The unfinished revolution. Zed Press.
- Linebaugh, P., & Rediker, M. (2000). The many-headed hydra: Sailors, slaves, commoners, and the hidden history of the revolutionary Atlantic. Beacon Press.
- Linz, J. J. (2000). Totalitarian and authoritarian regimes. Lynne Rienner Publishers.
- Livingston, S. (1997). Clarifying the CNN effect: An examination of media effects on American foreign policy (Research Paper R-18). The Joan Shorenstein Center on the Press, Politics and Public Policy, Harvard University.
- Lofland, J., & Stark, R. (1965). Becoming a world-saver: A theory of conversion to a deviant perspective. American Sociological Review, 30(6), 862–875.
- Luban, D. (2007). Legal ethics and human dignity. Cambridge University Press.
- Luck, E. C. (2010). Building a norm: The Responsibility to Protect, experiential and conceptual origins. In R. H. Cooper & J. V. Kohler (Eds.), Responsibility to protect: The global moral compact for the 21st century (pp. 9–24). Palgrave Macmillan.
- Lynch, J., & McGoldrick, A. (2005). Peace journalism. Hawthorn Press.
- Mackarel, M. (2007). The European Arrest Warrant: The way forward. Journal of Contemporary European Research, 3(2), 116–134.
- Makarenko, T. (2004). The crime-terror continuum: Tracing the interplay between transnational organised crime and terrorism. Global Crime, 6(1), 129–145.
- Mamdani, M. (1996). Citizen and subject: Contemporary Africa and the legacy of late colonialism. Princeton University Press.
- Maniruzzaman, T. (1980). The Bangladesh revolution and its aftermath. Bangladesh Books International.
- Mbembe, A. (2003). Necropolitics. Public Culture, 15(1), 11–40.
- McAdam, D. (1982). Political process and the development of Black insurgency, 1930–1970. University of Chicago Press.
- McCauley, C., & Moskalenko, S. (2011). Friction: How radicalization happens to them and us. Oxford University Press.
- McCloud, S. (1993). Understanding comics: The invisible art. Kitchen Sink Press.
- McCombs, M. (2004). Setting the agenda: The mass media and public opinion. Polity Press.
- Mearsheimer, J. J. (2001). The tragedy of great power politics. W. W. Norton & Company.
- Meloy, J. R. (2018). The operational development and empirical testing of the Terrorist Radicalization Assessment Protocol (TRAP-18). Journal of Threat Assessment and Management, 5(4), 262–278.
- Merari, A. (2010). Driven to death: Psychological and social aspects of suicide terrorism. Oxford University Press.
- Merton, R. K. (1938). Social structure and anomie. American Sociological Review, 3(5), 672–682.
- Milgram, S. (1974). Obedience to authority: An experimental view. Harper & Row.
- Mittell, J. (2015). Complex TV: The poetics of contemporary television storytelling. New York University Press.
- Moghadam, A. (2008). The globalization of suicide terrorism. Johns Hopkins University Press.
- Moghaddam, F. M. (2005). The staircase to terrorism: A psychological exploration. American Psychologist, 60(2), 161–169.
- Moyn, S. (2010). The last utopia: Human rights in history. Harvard University Press.
- Murphy, S. D. (2004). Protections for civilians in foreign military operations. American Journal of International Law, 98(3), 606–612.
- Mærli, M. B. (2001). Atomic bomb surprises? Assessing the threat of nuclear terrorism. Cooperation and Conflict, 36(3), 329–351.
- Nacos, B. L. (2002). Mass-mediated terrorism: The central role of the media in terrorism and counterterrorism. Rowman & Littlefield.
- Nadelmann, E. (1993). Cops across borders: The internationalization of U.S. criminal law enforcement. Pennsylvania State University Press.
- Naím, M. (2005). Illicit: How smugglers, traffickers, and copycats are hijacking the global economy. Doubleday.
- Napier, S. J. (2005). Anime from Akira to Howl’s Moving Castle: Experiencing contemporary Japanese animation. Palgrave Macmillan.
- Nash, S., Furse, M., & Mackarel, M. (2004). Extradition law and practice (2nd ed.). Sweet & Maxwell.
- Napoleoni, L. (2005). Terror incorporated: Tracking the money behind global terrorism. Seven Stories Press.
- Nasr, V. (2006). The Shia revival: How conflicts within Islam will shape the future. W. W. Norton & Company.
- Neumann, D. (2006). The lines that continue to separate us: Borders in our ‘borderless’ world. Progress in Human Geography, 30(2), 143–161.
- Neumann, P. R. (2009). Old and new terrorism: Late modernity, globalization, and the transformation of political violence. Polity Press.
- Neumann, P. R. (2016). Radicalized: New jihadists and the threat to the West. I.B. Tauris.
- Neumann, P. R. (2017). Bluster: Donald Trump’s war on terror. Oxford University Press.
- Ngal, I. (2012). Multilateral counter-terrorist financing regimes: The role of FATF. Journal of Financial Crime, 19(2), 180–195.
- Nietzsche, F. (1968). The will to power. Vintage Books.
- Nossal, K. R. (1989). International sanctions as international punishment. International Organization, 43(2), 301–322.
- Nowak, M., & McArthur, E. (2008). The United Nations Convention Against Torture: A commentary. Oxford University Press.
- Oeter, S. (1995). Extraterritorial jurisdiction, state sovereignty and the rule of law. German Yearbook of International Law, 38, 239–275.
- Orentlicher, D. F. (1991). Settling accounts: The duty to prosecute human rights violations of a prior regime. Yale Law Journal, 100(8), 2537–2615.
- Paige, J. M. (1975). Agrarian revolution: Social movements and export agriculture in the underdeveloped world. Free Press.
- Pape, R. A. (2003). The strategic logic of suicide terrorism. American Political Science Review, 97(3), 343–361.
- Pape, R. A. (2005). Dying to win: The strategic logic of suicide terrorism. Random House.
- Parenti, C. (2011). Tropic of chaos: Climate change and the new geography of violence. Nation Books.
- Passas, N. (2003). Informal value transfer systems, terrorism and money laundering. Report to the National Institute of Justice, U.S. Department of Justice.
- Pattanaik, S. S. (2008). Islamist militancy in Bangladesh: The threat within. Strategic Analysis, 32(4), 585–607.
- Pattanaik, S. S. (2012). Cross-border movements, security and cooperation: The case of India and Bangladesh. Strategic Analysis, 36(1), 60–73.
- Pedahzur, A. (2005). Suicide terrorism. Polity Press.
- Piazza, J. A. (2006). Rooted in poverty? Terrorism, poor economic development, and social cleavages. Terrorism and Political Violence, 18(1), 159–177.
- Pollack, K. M. (2002). Arabs at war: Military effectiveness, 1948–1991. University of Nebraska Press.
- Posner, R. A. (2005). Preventing surprise attacks: Intelligence reform in the wake of 9/11. Rowman & Littlefield.
- Post, J. M. (2007). The mind of the terrorist: The psychology of terrorism from the IRA to al-Qaeda. Palgrave Macmillan.
- Pressman, D. E. (2009). Risk assessment decisions for violent political extremism. Public Safety Canada.
- Rapoport, D. C. (2002). The four waves of rebel terror and September 11. Anthropology & Medicine, 8(1), 47–65.
- Rapoport, D. C. (2004). The four waves of modern terrorism. In A. K. Cronin & J. M. Ludes (Eds.), Attacking terrorism: Elements of a grand strategy (pp. 46–73). Georgetown University Press.
- Ratcliffe, J. H. (2008). Intelligence-led policing. Willan Publishing.
- Rediker, M. (2004). Villains of all nations: Atlantic pirates in the golden age. Beacon Press.
- Reichard, M. (2006). The EU-NATO relationship: A legal and political perspective. Ashgate Publishing.
- Reinhold, M. (2018). Trade-based money laundering and terrorist financing: Identifying systemic vulnerabilities in global supply chains. Journal of Money Laundering Control, 21(3), 365–379.
- Reydams, L. (2003). Universal jurisdiction: International and municipal legal perspectives. Oxford University Press.
- Riaz, A. (2008). Islamist militancy in Bangladesh: A complex web. Routledge.
- Riaz, A. (2016). Bangladesh: A political history since independence. I.B. Tauris.
- Riaz, A., & Parvez, S. (2018). Anatomy of Dhaka attack: A homegrown or globalized phenomenon? Terrorism and Political Violence, 30(5), 785–802.
- Richardson, L. (2006). What terrorists want: Understanding the enemy, containing the threat. Random House.
- Rid, T. (2013). Cyber war will not take place. Oxford University Press.
- Rid, T. (2020). Active measures: The secret history of disinformation and political warfare. Farrar, Straus and Giroux.
- Risse, T., Ropp, S. C., & Sikkink, K. (Eds.). (1999). The power of human rights: International norms and domestic change. Cambridge University Press.
- Robinson, M. (2008). Connecting human rights, rules, and counter-terrorism. Human Rights Quarterly, 30(2), 223–236.
- Robinson, P. (2002). The CNN effect: The myth of news, foreign policy and intervention. Routledge.
- Romaniuk, P. (2010). Multilateral counter-terrorism: The global politics of coalition building. Routledge.
- Rosand, E., Millar, A., & Ipe, J. (2008). Civil society and the UN Global Counter-Terrorism Strategy: Opportunities and challenges. Center on Global Counterterrorism Cooperation.
- Rotberg, R. I. (Ed.). (2004). When states fail: Causes and consequences. Princeton University Press.
- Roy, O. (2004). Globalized Islam: The search for a new Ummah. Columbia University Press.
- Rummel, R. J. (1994). Death by government: Genocide and mass murder since 1900. Transaction Publishers.
- Russell, S. (2019). Human compatible: Artificial intelligence and the problem of control. Viking.
- Ryan, M. L. (2001). Narrative as virtual reality: Immersion and interactivity in literature and electronic media. Johns Hopkins University Press.
- Ryder, N. (2015). The financial war on terrorism: A critical review of the United Kingdom and United States’ counter-terrorist financing strategies. Routledge.
- Sachs, A. (2009). The strange alchemy of life and law. Oxford University Press.
- Sadat, L. N. (2006). Ghost prisoners and black sites: Extraordinary rendition under international law. Case Western Reserve Journal of International Law, 37(2), 309–342.
- Sagan, S. D. (1993). The limits of safety: Organizations, onsite nuclear power and the risks of accident. Princeton University Press.
- Sageman, M. (2004). Understanding terror networks. University of Pennsylvania Press.
- Sageman, M. (2008). Leaderless jihad: Terror networks in the twenty-first century. University of Pennsylvania Press.
- Said, E. W. (1978). Orientalism. Pantheon Books.
- Said, E. W. (2001). The clash of ignorance. The Nation, 273(12), 11–13.
- Salehyan, I. (2009). Rebels without borders: Transnational insurgencies in world politics. Cornell University Press.
- Salter, M. B. (2008). When the exception becomes the rule: The border as fixed exception. Review of International Studies, 34(2), 365–383.
- Sands, P. (2008). Torture team: Rumsfeld’s memo and the betrayal of American values. Palgrave Macmillan.
- Sartre, J.-P. (1943). Being and nothingness. Washington Square Press.
- Sassen, S. (2006). Territory, authority, rights: From medieval to global assemblages. Princeton University Press.
- Sassen, S. (2014). Expulsions: Brutality and complexity in the global economy. Harvard University Press.
- Satterthwaite, M. L. (2007). Rendered meaningless: Extraordinary rendition and the rule of law. George Washington International Law Review, 39(3), 529–611.
- Saxenian, A. (2006). The new Argonauts: Regional advantage in a global economy. Harvard University Press.
- Schabas, W. A. (2020). An introduction to the International Criminal Court (6th ed.). Cambridge University Press.
- Scharf, M. P. (1993). Have ground rules changed? Extraterritorial abductions and international law. Chicago Journal of International Law, 15(2), 341–362.
- Scharre, P. (2018). Army of none: Autonomous weapons and the future of war. W. W. Norton & Company.
- Schelling, T. C. (1960). The strategy of conflict. Harvard University Press.
- Schmid, A. P. (1989). Terrorism and the media: The ethics of publicity. Terrorism and Political Violence, 1(4), 539–565.
- Schmid, A. P. (2018). Revisiting the crime-terror nexus in the European Union. International Centre for Counter-Terrorism.
- Schmid, A. P. (Ed.). (2011). The Routledge handbook of terrorism research. Routledge.
- Schmitt, C. (1985). Political theology: Four chapters on the concept of sovereignty (G. Schwab, Trans.). MIT Press. (Original work published 1922)
- Schroeder, M., Stohl, R., & Smith, D. (2007). The small arms trade: A beginner’s guide. Oneworld Publications.
- Schultz, S. (2017). Regional police cooperation in the global south: Ameripol, Afripol, and Aseanapol in comparative perspective. Journal of Transnational Security, 9(1), 45–68.
- Scott, J. C. (1990). Domination and the arts of resistance: Hidden transcripts. Yale University Press.
- Sen, A. (2006). Identity and violence: The illusion of destiny. W. W. Norton & Company.
- Shaw, M. (2000). Theory of the global state: Globality as an unfinished revolution. Cambridge University Press.
- Shearer, I. A. (1971). Extradition in international law. Manchester University Press.
- Shelley, L. (2014). Dirty entanglements: Corruption, crime, and terrorism. Cambridge University Press.
- Sheptycki, J. (Ed.). (2000). Issues in transnational policing. Routledge.
- Sheptycki, J. (Ed.). (2002). Transnational crime and public security. Oxford University Press.
- Silke, A. (2003). Becoming a terrorist. In A. Silke (Ed.), Terrorists, victims and society: Psychological perspectives on terrorism and its consequences (pp. 29–53). John Wiley & Sons.
- Simpson, G. (2004). Great powers and outlaw states: Unequal sovereigns in the international legal order. Cambridge University Press.
- Singer, P. W., & Brooking, E. T. (2018). LikeWar: The weaponization of social media. Eamon Dolan/Houghton Mifflin Harcourt.
- Sjoberg, L., & Gentry, C. E. (2007). Mothers, monsters, whores: Thinking about women’s violence in global politics. Zed Books.
- Sloan, S. (2006). Terrorism: The present threat in context. Berg.
- Smith, P. J. (2008). The terrorism ahead: Confronting transnational violence in the twenty-first century. M. E. Sharpe.
- Smithson, A. E. (2000). At any cost: How Aum Shinrikyo produced and deployed chemical weapons. Stimson Center.
- Smithson, A. E., & Levy, L. (2000). Ataxia: The chemical and biological terrorism threat and the US response (Report No. 35). Henry L. Stimson Center.
- Snow, D. A., & Benford, R. D. (1988). Ideology, frame resonance, and participant mobilization. International Social Movement Research, 1(1), 197–217.
- Spaaij, R. (2012). Understanding lone wolf terrorism: Global patterns, motivations and prevention. Springer.
- Spalek, B. (2012). Counter-terrorism: Community-based approaches to preventing terrorism. Palgrave Macmillan.
- Speckhard, A. (2012). Talking to terrorists: Understanding the psycho-social motivations of militant Jihadi terrorists, mass hostage takers, suicide bombers & “martyrs”. Advances Press.
- Spivak, G. C. (1988). Can the subaltern speak? Macmillan.
- Steinberg, G. M. (2008). The central role of state sponsors of terrorism. Israel Journal of Foreign Affairs, 2(1), 55–68.
- Steiner, G. (2018). Digital forensics and secure communications in European police cooperation: The SIENA network. Security and Defense Analysis, 34(2), 112–129.
- Stern, J. (1999). The ultimate terrorists. Harvard University Press.
- Stern, J. (2003). Terror in the name of God: Why religious militants kill. HarperCollins.
- Stohl, M. (2006). The state as terrorist: Insights and implications. Democracy and Security, 2(1), 1–25.
- Stohl, M., & Lopez, G. A. (Eds.). (1984). The state as terrorist: The dynamics of governmental violence and repression. Greenwood Press.
- Strange, S. (1996). The retreat of the state: The diffusion of power in the world economy. Cambridge University Press.
- Sumner, W. G. (1906). Folkways: A study of the sociological importance of usages, manners, customs, mores, and morals. Ginn and Company.
- Tajfel, H., & Turner, J. C. (1979). An integrative theory of intergroup conflict. In W. G. Austin & S. Worchel (Eds.), The social psychology of intergroup relations (pp. 33–47). Brooks/Cole.
- Taleb, N. N. (2007). The black swan: The impact of the highly improbable. Random House.
- Tarrow, S. (1998). Power in movement: Social movements and contentious politics (2nd ed.). Cambridge University Press.
- Taylor, P. M. (2003). Munitions of the mind: A history of propaganda from the ancient world to the present day (3rd ed.). Manchester University Press.
- Tegmark, M. (2017). Life 3.0: Being human in the age of artificial intelligence. Alfred A. Knopf.
- Teitel, R. G. (2000). Transitional justice. Oxford University Press.
- Tilly, C. (2003). The politics of collective violence. Cambridge University Press.
- Treverton, G. F. (2001). Reshaping national intelligence for an age of information. Cambridge University Press.
- Treverton, G. F. (2009). Remaking domestic intelligence. RAND Corporation.
- Trojanowicz, R., Kappeler, V. E., & Gaines, L. K. (1998). Community policing: A contemporary perspective (2nd ed.). Anderson Publishing.
- Tucker, D. (2001). What’s new about the new terrorism and how dangerous is it? Terrorism and Political Violence, 13(3), 1–14.
- Tucker, J. B. (2010). The future of chemical weapons conventions. Arms Control Today, 40(6), 8–14.
- Tucker, J. B. (Ed.). (2000). Toxic terror: Assessing terrorist use of chemical and biological weapons. MIT Press.
- Turk, A. T. (1982). Political criminality: The defiance and defense of authority. SAGE Publications.
- Tyler, T. R. (2006). Why people obey the law. Princeton University Press.
- United Nations Security Council. (2004). Resolution 1540 (2004) (S/RES/1540). United Nations.
- U.S. Department of State. (2017). Country reports on terrorism 2016. Bureau of Counterterrorism, United States Department of State.
- Van den Wyngaert, C. (1980). The political offence exception to extradition: The delicate problem of balancing the rights of the individual and the international public order. Kluwer Law and Taxation Publishers.
- Victoroff, J. (2005). The mind of the terrorist: A review and critique of psychological approaches. Journal of Conflict Resolution, 49(1), 3–42.
- Von Behr, I., Reding, A., Edwards, C., & Gribbon, L. (2013). Radicalisation in the digital era: The use of the internet in 15 cases of terrorism and extremism. RAND Corporation.
- Waldron, J. (2010). Torture, terror, and trade-offs: Philosophy for the White House. Oxford University Press.
- Wallerstein, I. (1974). The modern world-system I: Capitalist agriculture and the origins of the European world-economy in the sixteenth century. Academic Press.
- Walzer, M. (1977). Just and unjust wars: A moral argument with historical illustrations. Basic Books.
- Wardle, C., & Derakhshan, H. (2017). Information disorder: Toward an interdisciplinary framework for research and policy making (Council of Europe Report DGI(2017)09). Council of Europe.
- Warner, M. (1994). From the beast to the blonde: On fairy tales and their tellers. Chatto & Windus.
- Wasmeier, M. (2001). The European Arrest Warrant: A revolutionary instrument of judicial cooperation. European Law Review, 26(6), 551–568.
- Weber, M. (1946). Politics as a vocation. In H. H. Gerth & C. W. Mills (Eds. & Trans.), From Max Weber: Essays in sociology (pp. 77–128). Oxford University Press. (Original work published 1919)
- Weimann, G. (2006a). Terror on the internet: The new arena, the new challenges. United States Institute of Peace Press.
- Weimann, G. (2006b). Terror on the internet: The new arena, the new frontiers. United States Institute of Peace Press.
- Weiss, M. A. (2005). Terrorist financing: The 9/11 Commission recommendation and the Federal response (CRS Report for Congress RL32538). Congressional Research Service.
- Weissbrodt, D., & Bergquist, A. (2006). Extraordinary rendition and the torture convention. Virginia Journal of International Law, 46(4), 585–650.
- Westad, O. A. (2005). The global Cold War: Third World interventions and the making of our times. Cambridge University Press.
- Wheeler, N. J. (2000). Saving strangers: Humanitarian intervention in international society. Oxford University Press.
- Wiktorowicz, Q. (2005). Radical Islam rising: Muslim extremism in the West. Rowman & Littlefield.
- Wilkinson, P. (2006). Terrorism versus democracy: The liberal state response (2nd ed.). Routledge.
- Wilkinson, P. (2011). Terrorism versus democracy: The liberal state response (3rd ed.). Routledge.
- Williams, P. (2008a). Terrorist financing and organized crime: Nexus, appropriation, or coexistence? In T. J. Biersteker & S. E. Eckert (Eds.), Countering the financing of terrorism (pp. 126–149). Routledge.
- Williams, P. (2008b). Transnational crime and corruption. In P. D. Williams (Ed.), Security studies: An introduction (pp. 396–412). Routledge.
- Willis, H. H., Morral, A. R., Kelly, T. K., & Hickman, L. J. (2005). Estimating terrorism risk. RAND Corporation.
- Wise, E. M. (1993). The political crime exception in international extradition: A survey of the law in the United States and selected foreign jurisdictions. Emory International Law Review, 7(1), 1–62.
- Wolf, M. J. P. (2012). Building imaginary worlds: The theory and history of subcreation. Routledge.
- Zarate, J. C. (2013). Treasury’s war: The unleashing of a new era of financial warfare. PublicAffairs.
- Zedner, L. (2009). Security. Routledge.
- Zegart, A. B. (2007). Spying blind: The CIA, the FBI, and the origins of 9/11. Princeton University Press.
- Zimbardo, P. (2007). The Lucifer effect: Understanding how good people turn evil. Random House.
- Zipes, J. (2006). Why fairy tales stick: The evolution and relevance of a genre. Routledge.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.



