অবশ্যপাঠ্যসম্পাদকীয়

“জইফ হাদিস”- কথাটি কতটা সহিহ আর কতটা জইফ?

সারসংক্ষেপ

অস্বস্তিকর কোনো হাদিস সামনে এলেই ধর্মীয় বিতর্কে প্রায় নিয়ম করে শোনা যায়—“এটি জইফ।” তারপর কথাটা সেখানেই থামিয়ে দেওয়া হয়, যেন দুর্বল সনদ দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এই যুক্তিতে তিনটি আলাদা বিষয় এক করে ফেলা হচ্ছে। একটি খবর কীভাবে আমাদের কাছে এসেছে, খবরের বক্তব্য সত্য কি না, আর ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল কি না—এই তিন প্রশ্নের উত্তর এক নয়। হাদিসের বর্ণনাকারীকে বলা হয় রাবী; কে কার কাছ থেকে খবরটি শুনেছেন, সেই ধারাবাহিক তালিকা হলো সনদ। এই তালিকার কোথাও নাম বাদ পড়লে বা কোনো রাবীর স্মৃতি নিয়ে সমস্যা থাকলে খবরটি ওই পথে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। কিন্তু সেই একই ঘটনা অন্য সাক্ষ্য, পুরোনো নথি বা পৃথক বর্ণনায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। নির্দিষ্ট পথের দুর্বলতা দেখিয়ে পুরো ঘটনাকে ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া তাই প্রমাণের ঘাটতিকে খণ্ডনের প্রমাণ বলে চালানো।

জইফ সনদ ও মিথ্যা বক্তব্যের পার্থক্য হাদিসতত্ত্বের অন্যতম ভিত্তিগ্রন্থ মুকাদ্দিমা ইবনুস সালাহ-তেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে—একটি দুর্বল সনদ দেখে কেবল সেই সনদকে দুর্বল বলা যায়; হাদিসের মূল বক্তব্যকেই দুর্বল ঘোষণা করা যায় না, কারণ একই বক্তব্য অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়ে থাকতে পারে। জাল হাদিস নিয়ে আল-ইরাকির আলোচনাও আরও কঠিন সত্য স্বীকার করে: সনদে সাধারণভাবে মিথ্যাবাদী বলে পরিচিত একজন রাবী থাকলেই নির্দিষ্ট হাদিসটি তার বানানো বলে প্রমাণিত হয় না। অর্থাৎ হাদিসশাস্ত্রের নিজের নিয়মেই “জইফ = মিথ্যা = ঘটনা ঘটেনি”—এই বহুল ব্যবহৃত সমীকরণটি অবৈধ।

অন্যদিকে “সহিহ” শব্দটিও অতীতের কোনো ঘটনার গায়ে খোদাই করা অপরিবর্তনীয় সত্যতার সিল নয়। একই মূল বর্ণনা একজন মুহাদ্দিসের কাছে সহিহ, অন্যজনের কাছে হাসান, তৃতীয়জনের কাছে মুনকার এবং চতুর্থজনের কাছে জাল হতে পারে। “আমি জ্ঞানের নগরী, আলী তার দরজা”—এই বর্ণনাই তার নির্মম উদাহরণ: আল-হাকিম এর একটি সনদকে সহিহ বলেছেন; আল-যাহাবি জাল বলেছেন; তিরমিযি সংশ্লিষ্ট রূপকে মুনকার বলেছেন; বুখারির নামে “এর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই”—এমন রায় সংরক্ষিত আছে; দারাকুতনি সাবিত বলেছেন; আল-আলাই ও ইবন হাজার বিভিন্ন পথের সমষ্টিতে হাসান বলেছেন। অতীতের কথিত বাক্যটি বদলায়নি; বদলেছে সনদ, রাবী ও সমর্থক বর্ণনার প্রমাণমূল্য সম্পর্কে বিচারকের সিদ্ধান্ত।

একজন রাবীকে বিশ্বাসযোগ্য বলা হলো কীভাবে? তাঁর ছাত্ররা কী বলেছেন, অন্য সমালোচকেরা তাঁর সম্পর্কে কী লিখেছেন, তাঁর বলা খবর অন্যদের খবরের সঙ্গে কতটা মেলে—এসব দেখে। এরপর সেই ছাত্র ও সমালোচকদের কথাও কারও না কারও মাধ্যমে পরবর্তী বইয়ে এসেছে। ফলে একটি হাদিস যাচাই করতে গিয়ে আরও অনেক মানুষের সংরক্ষিত কথার ওপর নির্ভর করতে হয়। একই খবর দশজন বললেও তাঁরা সবাই একজন শিক্ষকের কাছ থেকে শিখে থাকতে পারেন; সে ক্ষেত্রে দশটি বর্ণনা আছে, কিন্তু দশটি স্বাধীন সাক্ষ্য নেই। এই পার্থক্য না দেখে শুধু নামের তালিকা ও “বিশ্বস্ত” তকমা গুনলে যাচাইয়ের চেহারা তৈরি হয়, যাচাই সম্পন্ন হয় না। অস্বস্তিকর ইতিহাস বাদ দেওয়ার আগে তাই প্রশ্ন থাকে: দুর্বল বলেছেন কে, কী কারণে বলেছেন, অন্য সমালোচকের রায় কী, এবং যে তথ্যের ওপর রায়টি দাঁড়িয়েছে তার উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য? নিয়মের জটিলতা এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় সরায় না।


ভূমিকা: গ্রেডের আড়ালে ইতিহাস

ইসলামি আইন ও বিশ্বাসে হাদিসের কর্তৃত্ব বিপুল। নামাজের পদ্ধতি, অপরাধের শাস্তি, যৌন সম্পর্কের বৈধতা, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, কাফের বা মুরতাদ নির্ধারণ এবং মুহাম্মদের কথা ও কাজ সম্পর্কে জানার বড় অংশ পরবর্তী হাদিস, সাহাবীদের বক্তব্য, জীবনী ও আইনগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে এসেছে। কোরআনের অনেক আয়াতের কার্যকর অর্থ ও প্রয়োগও এসব দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। অথচ এই বড় ক্ষমতার পেছনে থাকা খবর নিয়ে বিতর্ক প্রায়ই দুই শব্দে আটকে দেওয়া হয়: সুবিধাজনক হলে “সহিহ”, অস্বস্তিকর হলে “জইফ, অতএব মিথ্যা”। যে বর্ণনা মানুষের জীবন, শাস্তি ও অধিকার নির্ধারণে এত কর্তৃত্ব পায়, তার উৎস ও গ্রহণের নিয়মও সেই গুরুত্বে পরীক্ষা করার বিষয়। কোনো আয়াতের অর্থ হাদিস দিয়ে সীমিত করা হলে কোন হাদিসকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

এ ধরনের প্রতিক্রিয়া গবেষণা নয়; এটি একটি লেবেলকে যুক্তির বদলি হিসেবে ব্যবহার করা। কোনো বর্ণনায় দাসী কেনাবেচা, যৌনদাসত্ব, সহিংস শাস্তি, কোরআনের পাঠ-ইতিহাস, সাহাবীদের পারস্পরিক বিরোধ কিংবা নবীর কোনো অস্বস্তিকর আচরণের কথা থাকলে প্রথমেই রিজাল-গ্রন্থ থেকে কোনো রাবীর নামে “দুর্বল”, “অজ্ঞাত”, “স্মৃতিশক্তি খারাপ” বা “শক্তিশালী নয়”—জাতীয় মন্তব্য তুলে আনা হয়। তারপর এমনভাবে সিদ্ধান্ত জানানো হয় যেন সপ্তম শতাব্দীর ঘটনাস্থল থেকে পরীক্ষাগারে যাচাইকৃত প্রতিবেদন উদ্ধার হয়েছে। বাস্তবে উদ্ধার হয়েছে বহু প্রজন্ম পরে সংকলিত মানুষ-সম্পর্কিত মানুষের বক্তব্য; এবং সেই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাও আবার একই বর্ণনানির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে বিচার করা হয়েছে।

“সহিহ” ও “জইফ” পরবর্তী হাদিসবিশারদদের দেওয়া শ্রেণির নাম। মুহাম্মদ কোনো কথা বলার সময় তার সঙ্গে এই সিল লাগিয়ে দেননি। সাধারণ সংজ্ঞায় সহিহ বলতে এমন বর্ণনা বোঝানো হয় যার সনদে সংযোগ আছে, বর্ণনাকারীরা সৎ ও যথেষ্ট নির্ভুল বলে গণ্য, যা আরও শক্তিশালী বর্ণনার বিরোধী নয় এবং যার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে ধরা না পড়া গুরুতর ত্রুটি নেই। প্রতিটি শর্তেই প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দুজন মানুষ একই সময়ে বেঁচে ছিলেন—এটি এক তথ্য; তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল—এটি আরেক তথ্য; একজন অন্যজনের কাছ থেকে এই নির্দিষ্ট কথাটি শুনেছিলেন—এটি আরও নির্দিষ্ট দাবি। একইভাবে কাউকে সৎ বলে চেনা এবং তাঁর স্মরণ করা প্রতিটি কথা ঠিক পাওয়া এক বিষয় নয়। সহিহ রায়টি এই প্রশ্নগুলোর ওপর সমালোচকের সিদ্ধান্ত; রায়টি কী প্রমাণে দাঁড়িয়েছে, তা পরীক্ষা করার দরজা ওই শব্দ দিয়ে বন্ধ হয় না।

হাদিস গ্রহণের জন্য রাবীর যেসব গুণ দাবি করা হয়েছে, ইবনুস সালাহ সেগুলো পরিষ্কারভাবে তালিকাভুক্ত করেছেন। তাঁর উলূমুল হাদিস—যা মুকাদ্দিমা ইবনুস সালাহ নামেও পরিচিত—পরবর্তী হাদিসতত্ত্বের অন্যতম ভিত্তিগ্রন্থ। ফলে নিচের উদ্ধৃতি কোনো প্রান্তিক আধুনিক মত নয়; এটি সুন্নি হাদিস-পদ্ধতির কেন্দ্রীয় পাঠ [1]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস:
أجمع جماهير أئمة الحديث والفقه على: أنه يشترط فيمن يحتج بروايته أن يكون عدلا، ضابطا لما يرويه، وتفصيله أن يكون مسلما، بالغا، عاقلا، سالما من أسباب الفسق وخوارم المروءة، متيقظا غير مغفل، حافظا إن حدث من حفظه، ضابطا لكتابه إن حدث من كتابه.
বাংলা অনুবাদ:
হাদিস ও ফিকহের অধিকাংশ ইমাম একমত যে, যার বর্ণনাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হবে তাকে ন্যায়পরায়ণ এবং তার বর্ণনা সংরক্ষণে নির্ভুল হতে হবে। বিস্তারিতভাবে, তাকে মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সক্ষম হতে হবে; ফিসকের কারণ এবং সামাজিক মর্যাদাবোধ ক্ষুণ্ণকারী আচরণ থেকে মুক্ত থাকতে হবে; সে হবে সতর্ক, অসাবধান নয়; স্মৃতি থেকে বর্ণনা করলে স্মরণশক্তিসম্পন্ন এবং বই থেকে বর্ণনা করলে নিজের বই যথাযথভাবে সংরক্ষণকারী। অর্থাৎ হাদিস গ্রহণের সিদ্ধান্ত শুধু একটি সনদের নামের তালিকা নয়; রাবীর ধর্ম, চরিত্র, সামাজিক আচরণ, স্মৃতি ও বই সংরক্ষণের ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের মূল্যায়নের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।

একই রাবীকে একজন সমালোচক বিশ্বস্ত বলেছেন, আরেকজন দুর্বল বলেছেন; কেউ তাঁর নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছ থেকে শোনা খবর গ্রহণ করেছেন, অন্য শিক্ষকের কাছ থেকে শোনা খবর গ্রহণ করেননি। কারও বিরুদ্ধে মতবাদ নিয়ে অভিযোগও উঠেছে। ফলে “রাবী সিকাহ”—অর্থাৎ বিশ্বস্ত—বলে থেমে গেলে সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয় অংশটিই বাদ পড়ে। কে তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন, কোন সময়ের বর্ণনা সম্পর্কে বলেছেন এবং কী ভুলের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রহণ করেছেন, তা জানতে হয়। একজন ছাত্র নিজের পরিচিত বিষয়ে ভালো লিখতে পারেন, অন্য বিষয়ে ভুল করতে পারেন; একজন রাবীর ক্ষেত্রেও বিষয়, শিক্ষক ও বয়সের পার্থক্য প্রাসঙ্গিক। তাই বিশ্বাসযোগ্যতার রায়কে ব্যক্তির আজীবন সব বক্তব্যের নিশ্চয়তা বানানো ভুল। শাস্ত্রের সংজ্ঞা আছে বলেই তার প্রতিটি প্রয়োগ নির্ভুল হয়ে যায় না।

রাবীর বিষয়ে রায়দাতাদের কথাও পরীক্ষা করার প্রয়োজন এখানেই। মুহাম্মদের নামে বলা একটি কথার জন্য প্রথমে রাবীর ওপর আস্থা রাখা হলো; রাবীর ওপর আস্থার জন্য নেওয়া হলো একজন সমালোচকের রায়; সেই রায়টি আবার পাওয়া গেল তাঁর ছাত্রের বর্ণনা বা পরবর্তী লেখকের উদ্ধৃতিতে। একই সমালোচকের নামে বিপরীত বক্তব্য থাকলে কোনটি আগে বলা, কোনটি পরে বলা, কোনটি বিশেষ প্রসঙ্গে বলা—সেটিও অন্য মানুষকে স্থির করতে হচ্ছে। একটি সাক্ষ্য যাচাইয়ের জন্য আরও কয়েকটি সাক্ষ্যের ওপর ভর করা হচ্ছে। এই তুলনা থেকে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত আসতে পারে, কিন্তু প্রতিটি স্তরে ভুল, অসম্পূর্ণ সংরক্ষণ ও ভুল ব্যাখ্যার সুযোগও থাকে। মূল ঘটনার সময়কার স্বাধীন নথি পাওয়া গেলে সেটি আলাদা সহায়তা দেয়; শুধু পরস্পরের প্রশংসা উদ্ধৃত করে সেই স্বাধীন প্রমাণের কাজ সেরে ফেলা যায় না।


উমরের আমলে হাদিস বর্ণনায় নিয়ন্ত্রণ

পরবর্তী হাদিসসংকলনের ইতিহাসকে প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন মুহাম্মদের মৃত্যুর পর সাহাবীরা নির্বিঘ্নে তাঁর সমস্ত কথা মানুষের কাছে প্রচার করতে থাকেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই বর্ণনাগুলো একইভাবে প্রবাহিত হয় এবং কয়েক শতাব্দী পরে মুহাদ্দিসেরা কেবল সেগুলো সংগ্রহ ও গ্রেড করেন। প্রাথমিক ইসলামী উৎসগুলো এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল একটি চিত্র সংরক্ষণ করেছে। সাহাবী যুগেই কোন হাদিস কত বেশি বলা উচিত, কোন বক্তব্য জনসাধারণের কাছে প্রচার করা উচিত এবং অতিরিক্ত হাদিস-বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন কি না—এসব নিয়ে সরাসরি বিরোধ ছিল। এই প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি আবু হুরায়রা; কারণ তিনিই পরবর্তী হাদিস বর্ণনাসংগ্রহের সবচেয়ে বিপুল বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে প্রধান।


আবু হুরায়রা: হাদিস বর্ণনার কেন্দ্রীয় নাম

আবু হুরায়রার গুরুত্ব কোনো পরবর্তী সমালোচকের দেওয়া পরিচয় নয়। সহিহ বুখারিতে তাঁর নিজের বক্তব্যেই এসেছে, নবীর সাহাবীদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বেশি হাদিস কেউ বর্ণনা করতেন না—শুধু আবদুল্লাহ ইবন আমরকে তিনি ব্যতিক্রম করেছেন, কারণ আবদুল্লাহ লিখে রাখতেন আর তিনি লিখতেন না। অন্য একটি সহিহ বুখারি বর্ণনায় আবু হুরায়রা বলেছেন, তিনি মুহাম্মদের সঙ্গে তিন বছর ছিলেন এবং সেই তিন বছরে হাদিস মনে রাখার জন্য তাঁর মতো আগ্রহ জীবনের আর কোনো সময়ে ছিল না। [2] [3]

মূল আরবি—সহিহ আল-বুখারি ১১৩:
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرٌو ، قَالَ أَخْبَرَنِي وَهْبُ بْنُ مُنَبِّهٍ ، عَنْ أَخِيهِ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ، يَقُولُ مَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَحَدٌ أَكْثَرَ حَدِيثًا عَنْهُ مِنِّي، إِلاَّ مَا كَانَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ وَلاَ أَكْتُبُ‏.‏ تَابَعَهُ مَعْمَرٌ عَنْ هَمَّامٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আলী ইবন আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, সুফিয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমর আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ তাঁর ভাইয়ের সূত্রে আমাকে জানিয়েছেন। তাঁর ভাই বলেন, আমি আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছি: নবীর সাহাবীদের মধ্যে আমার চেয়ে তাঁর কাছ থেকে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী কেউ ছিল না—আবদুল্লাহ ইবন আমর ছাড়া; কারণ তিনি লিখে রাখতেন, আর আমি লিখতাম না। মা‘মারও হাম্মামের সূত্রে আবু হুরায়রা থেকে একই বর্ণনা করেছেন।

এই তথ্যের কারণেই উমরের সঙ্গে আবু হুরায়রার বিরোধ কোনো প্রান্তিক ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। যদি পরবর্তী সুন্নি হাদিসভাণ্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাকারীদের একজনকেই দ্বিতীয় খলিফা অতিরিক্ত হাদিস প্রচার থেকে বিরত থাকতে বলেন, তাহলে প্রাথমিক বর্ণনা প্রচারের পরিবেশকে সম্পূর্ণ অবাধ ও যান্ত্রিক তথ্যপ্রবাহ হিসেবে কল্পনা করা যায় না।


“হাদিস বলা বন্ধ করো, নইলে দাওসে পাঠাব”

আল-যাহাবির সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা-তে সায়িব ইবন ইয়াজিদের সূত্রে একটি সরাসরি বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে সায়িব বলেন, তিনি উমরকে আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছেন—রাসুলের নামে হাদিস বর্ণনা বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় তাঁকে তাঁর নিজ গোত্র দাওসের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একই হুমকি কা‘বের প্রতিও দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক মুহাক্কিক শুয়াইব আল-আরনাউত এই বর্ণনার সনদকে সরাসরি সহিহ বলেছেন। বর্ণনাটির উৎস আবু যুর‘আ আদ-দিমাশকির আত-তারিখ এবং ইবন আসাকিরের তারিখ দিমাশক-এও সংরক্ষিত। [4] [5]

জইফ হাদিস

মূল আরবি—আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ, আল-মাওসুআ আল-হাদিসিয়্যাহ:
سمِعَ عُمَرَ يقولُ لأبي هُرَيرةَ: لتَترُكَنَّ الحَديثَ عن رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ، أو لأُلحِقَنَّكَ بأرضِ دَوسٍ. وقال لكَعبٍ: لتَترُكَنَّ الحَديثَ، أو لأُلحِقَنَّكَ بأرضِ القِرَدةِ.
বাংলা অনুবাদ:
সায়িব ইবন ইয়াজিদ উমরকে আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছেন: “তুমি অবশ্যই আল্লাহর রাসুলের নামে হাদিস বর্ণনা বন্ধ করবে, অন্যথায় আমি তোমাকে দাওস গোত্রের দেশে পাঠিয়ে দেব।” আর উমর কা’বকে বলেছিলেন: “তুমি অবশ্যই হাদিস বর্ণনা বন্ধ করবে, অন্যথায় আমি তোমাকে বানরদের দেশে পাঠিয়ে দেব।”

হাদিসবিশারদের মূল্যায়ন—মূল আরবি:
خلاصة حكم المحدث : إسناده صحيح
বাংলা অনুবাদ: হাদিসবিশারদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন: এর সনদ সহিহ।

বর্ণনাকারী ও গ্রন্থপরিচয়—মূল আরবি:
الراوي : السائب بن يزيد | المحدث : شعيب الأرناؤوط | المصدر : تخريج سير أعلام النبلاء الصفحة أو الرقم : 2/601
বাংলা অনুবাদ: বর্ণনাকারী: সায়িব ইবন ইয়াজিদ। হাদিসবিশারদ: শুয়াইব আল-আরনাউত। উৎস: তাখরিজু সিয়ার আ’লাম আন-নুবালা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০১।

মূল উৎসসমূহ—মূল আরবি:
التخريج : أخرجه أبو زرعة الدمشقي في [6] (ص: 544)، وابن عساكر في [7] (50/ 171) واللفظ لهما.
বাংলা অনুবাদ: হাদিসটির উৎস ও সংকলন: আবু যুরআ আদ-দিমাশকি তাঁর আত-তারিখ গ্রন্থের ৫৪৪ পৃষ্ঠায় এবং ইবন আসাকির তাঁর তারিখু দিমাশক গ্রন্থের ৫০তম খণ্ডের ১৭১ পৃষ্ঠায় বর্ণনাটি সংকলন করেছেন। এখানে উদ্ধৃত শব্দবিন্যাস উভয় গ্রন্থের বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস—মূল আরবি:
التصنيف الموضوعي: مناقب وفضائل – أبو هريرة؛ مناقب وفضائل – عمر بن الخطاب؛ مناقب وفضائل – فضائل أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم؛ اعتصام بالسنة – نقل السنة وروايتها؛ علم – التثبت في الحديث.
বাংলা অনুবাদ: বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস: মর্যাদা ও গুণাবলি—আবু হুরায়রা; মর্যাদা ও গুণাবলি—উমর ইবনুল খাত্তাব; মর্যাদা ও গুণাবলি—মুহাম্মদের সাহাবিদের গুণাবলি; সুন্নাহ অনুসরণ—সুন্নাহর সংরক্ষণ ও বর্ণনা; জ্ঞান—হাদিস যাচাইয়ে সতর্কতা।

মূল রেফারেন্স: [8] [9]

উমরের নির্দেশে আবু হুরায়রার হাদিস প্রচারের সঙ্গে নির্বাসনের হুমকি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। বর্ণনাকারী কী জানতেন এবং কী বলতে চেয়েছিলেন, তার ওপর খলিফার আদেশ ও শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা চাপানো হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণের একটি নির্দিষ্ট নজির হলো: পরবর্তী যুগের অন্যতম প্রধান হাদিস-বর্ণনাকারীকে খলিফা রাসুলের নামে হাদিস বর্ণনা বন্ধ করার নির্দেশ ও নির্বাসনের হুমকি দিয়েছিলেন।


যাহাবি: একাধিক সাহাবীকে হাদিস প্রচার থেকে বিরত রাখা হয়েছিল

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আল-যাহাবি ঘটনাটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঝগড়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি। আবু হুরায়রাকে দেওয়া উমরের হুমকি উদ্ধৃত করার পর যাহাবি নিজেই মন্তব্য করেছেন যে উমরের নীতি ছিল রাসুলের নামে হাদিস কম বর্ণনা করা এবং তিনি একাধিক সাহাবীকে হাদিস ব্যাপকভাবে প্রচার করা থেকে বিরত রেখেছিলেন। যাহাবির ভাষায়, উমরের শাসনামলে অতিরিক্ত হাদিস বর্ণনা থেকে মানুষকে বাধা দেওয়া হতো, যদিও সংশ্লিষ্ট সাহাবীদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। প্রশ্ন ওঠে, উমরের আমলেই যেখানে অতিরিক্ত হাদিস বর্ণনায় বাধা দেয়া হতো, পরবর্তী যুগে সেই হাদিসগুলোই এত বিপুলভাবে সংরক্ষণ করা হলো কেন? যেখানে সাহাবীদের যুগেই মানুষের মনে মুহাম্মদের স্মৃতি সবচাইতে ভাল হওয়ার কথা। [10]

মূল আরবি—আল-যাহাবি:
قلت: هكذا هو، كان عمر رضي الله عنه يقول: أقلوا الحديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم، وزجر غير واحد من الصحابة عن بث الحديث؛ وهذا مذهب لعمر ولغيره. فبالله عليك، إذا كان الإكثار من الحديث في دولة عمر كانوا يمنعون منه، مع صدقهم وعدالتهم وعدم الأسانيد، بل هو غض لم يشب؛ فما ظنك بالإكثار من رواية الغرائب والمناكير في زماننا مع طول الأسانيد، وكثرة الوهم والغلط، فبالحري أن نزجر القوم عنه؛ فيا ليتهم يقتصرون على رواية الغريب والضعيف، بل يروون والله الموضوعات والأباطيل والمستحيل في الأصول والفروع والملاحم والزهد، نسأل الله العافية.

বাংলা অনুবাদ:
আমি বলি, বিষয়টি এমনই ছিল। উমর বলতেন: “আল্লাহর রাসুলের নামে হাদিস কম বর্ণনা করো।” তিনি একাধিক সাহাবীকে হাদিস ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত রেখেছিলেন। এটি উমর এবং অন্যদেরও একটি নীতি ছিল। আল্লাহর দোহাই দিয়ে তোমাকে বলছি: উমরের শাসনামলে হাদিস বেশি বর্ণনা করা থেকে তাঁদের বাধা দেওয়া হতো, অথচ তাঁরা ছিলেন সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ; তখন দীর্ঘ সনদও ছিল না, বর্ণনাগুলো ছিল একেবারে সতেজ ও অমিশ্রিত। তাহলে আমাদের যুগে দীর্ঘ সনদ, প্রচুর ধারণাগত ভুল ও ত্রুটির মধ্যে গরিব ও মুনকার বর্ণনা বেশি বেশি প্রচার সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? এ থেকে লোকদের নিবৃত্ত করা আরও সংগত। হায়, তারা যদি কেবল গরিব ও দুর্বল বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকত! বরং আল্লাহর শপথ, তারা আকিদার মূলনীতি, শাখাগত বিধান, ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিগ্রহ ও যুহদ বিষয়ে জাল, বাতিল এবং অসম্ভব বর্ণনাও প্রচার করছে। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাই।

সুন্নি রিজাল ও হাদিস-সমালোচনার অন্যতম প্রধান কর্তৃত্ব যাহাবি সাহাবীদের সততা স্বীকার করেই তাঁদের হাদিস প্রচার নিয়ন্ত্রণের কথা লিখেছেন। সৎ সাহাবীদের বর্ণনাও প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত কারণে কমিয়ে রাখার নীতি ছিল। ফলে প্রাথমিক যুগে কোনো বক্তব্য কম প্রচারিত, অল্প পথে সংরক্ষিত অথবা পরবর্তী সময়ে বেশি দৃশ্যমান—এই তথ্যের সঙ্গে প্রচার নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসও যুক্ত; বর্ণনার সংখ্যা সেই নিয়ন্ত্রণের প্রভাব বহন করতে পারে। বর্ণনাপ্রবাহের পরিমাণ শুধু ঘটনার সত্যতার ফল নয়; সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশও কোন বর্ণনা কতটা ছড়াবে তা প্রভাবিত করতে পারে।


সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রাকে আঘাত করে সংবাদ প্রচার বন্ধ

উমর ও আবু হুরায়রার সম্পর্কিত আরেকটি ঘটনা আরও শক্তিশালী সনদে, সহিহ মুসলিমেই লিপিবদ্ধ আছে [11]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১০. যে ব্যাক্তি তাওহীদের উপর ইনতিকাল করবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে – এর প্রমান
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫৪ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩১
৫৪। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা কর্রেন যে, তিনি বলেনঃ আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসা ছিলাম। আমাদের মধ্যে আবূ বকর ও উমর (রাঃ)-ও ছিলেন। এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্য থেকে উঠে চলে গেলেন। তিনি আমাদের মাঝে আসতে বিলম্ভ করলেন। এতে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে, আমাদের অনুপস্থিতিতে তিনি কোন বিপদে পড়লেন কিনা। আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ভীত-সন্ত্রস্তদের মধ্যে আমি ছিলাম প্রথম। তাই আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। তালাশ করতে করতে বনী নাজ্জার গোত্রের আনসারদের বাগানের কাছে পৌছলাম।
আমি বাগানের চারদিকে ঘুরে কোন দরজা পেলাম না। হঠাৎ দেখতে পেলাম বাইরের কুয়া থেকে একটি ’রবি’ (ঝরনা, প্রণালী, নালা) বাগানের ভিতর প্রবেশ করেছে। আমি নিজেকে শিয়ালের মত সংকুচিত করে প্রণালীর পথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি বললেন, আবূ হুরায়রা! আমি আরয করলাম, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অবস্থা কি? আমি আরয করলাম, আপনি আমাদের মধ্যে ছিলেন। তারপর আমাদের মধ্য থেকে উঠে চলে এলেন। আপনার ফিরতে দেরি দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে আমাদের অবর্তমানে আপনি বেশি বিপদে পড়লেন কি না? এ আশঙ্কায় আমরা সকলেই তীত হয়ে পড়লাম। আমি সর্বপ্রথম বেরিয়ে গিয়ে এ বাগানে উপস্থিত হই, আমি শিয়ালের মত সংকুচিত হয়ে এ বাগানে প্রবেশ করি। আর সেসব লোক আমার পেছনে রয়েছেন।
তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হে আবূ হুরায়রা বলে তার পাদুকা জোড়া প্রদান করলেন, আর বললেন, আমার এ পাদুকা জোড়া নিয়ে যাও এবং বাগানের বাইরে যার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দাও, যে ব্যাক্তি আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই, সে জান্নাতী হবে।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, বাইরে এসে প্রথমেই উমরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হল। তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! এ জুতা জোড়া কি? আমি বললাম, এ তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পাদুকা মুবারক। তিনি আমাকে এ দুটি দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, যার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়, সে যদি আন্তরিক বিশ্বাসে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই, তাকে যেন জান্নাতের সুসংবাদ দেই। একথা শুনে উমর (রাঃ) আমার বুকে এমন জোরে আঘাত করলেন যে, আমি পেছনে পড়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন, ফিরে যাও, হে আবূ হুরায়রা!
আমি কাঁদোকাঁদো অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খেদমতে ফিরে এলাম। আর সাথে সাথে উমরও আমার পিছনে পিছনে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবূ হুরায়রা! তোমার কি হয়েছে? আরয করলাম, উমর (রাঃ)-এর সাথে আমার দেখা হয়। আপনি যা বলে আমাকে পাঠিয়েছিলেন আমি তা উমরকে জানাই। এতে তিনি আমার বুকে আঘাত করলেন যে আমি পিছনের দিকে পড়ে যাই। তিনি আমাকে ফিরে আসতে বলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উমর! কি সে তোমাকে এ কাজে উত্তেজিত করেছে?
তিনি উত্তর দিলেনঃ হে আল্লাহর রাসুল! আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক। আপনি কি আপনার পাদুকা মুবারকসহ আবূ হুরায়রাকে পাঠিয়েছেন যে, তার সাথে যদি এমন লোকের সাক্ষাৎ হয়, যে আন্তরিকতার সাথে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। উমর (রাঃ) বললেন, এরুপ করতে যাবেন না। আমি আশঙ্কা করি যে, লোকেরা এর উপরই ভরসা করে বসে থাকবে; আপনি তাদের ছেড়ে দিন, তারা আমল করুক। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আচ্ছা, তাদের ছেড়ে দাও।
باب الدليل على أن من مات على التوحيد دخل الجنة قطعا
حَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ يُونُسَ الْحَنَفِيُّ، حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ بْنُ عَمَّارٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبُو كَثِيرٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبُو هُرَيْرَةَ، قَالَ كُنَّا قُعُودًا حَوْلَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَعَنَا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ فِي نَفَرٍ فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ بَيْنِ أَظْهُرِنَا فَأَبْطَأَ عَلَيْنَا وَخَشِينَا أَنْ يُقْتَطَعَ دُونَنَا وَفَزِعْنَا فَقُمْنَا فَكُنْتُ أَوَّلَ مَنْ فَزِعَ فَخَرَجْتُ أَبْتَغِي رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى أَتَيْتُ حَائِطًا لِلأَنْصَارِ لِبَنِي النَّجَّارِ فَدُرْتُ بِهِ هَلْ أَجِدُ لَهُ بَابًا فَلَمْ أَجِدْ فَإِذَا رَبِيعٌ يَدْخُلُ فِي جَوْفِ حَائِطٍ مِنْ بِئْرٍ خَارِجَةٍ – وَالرَّبِيعُ الْجَدْوَلُ – فَاحْتَفَزْتُ كَمَا يَحْتَفِزُ الثَّعْلَبُ فَدَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏”‏ أَبُو هُرَيْرَةَ ‏”‏ ‏.‏ فَقُلْتُ نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ مَا شَأْنُكَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ كُنْتَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا فَقُمْتَ فَأَبْطَأْتَ عَلَيْنَا فَخَشِينَا أَنْ تُقْتَطَعَ دُونَنَا فَفَزِعْنَا فَكُنْتُ أَوَّلَ مَنْ فَزِعَ فَأَتَيْتُ هَذَا الْحَائِطَ فَاحْتَفَزْتُ كَمَا يَحْتَفِزُ الثَّعْلَبُ وَهَؤُلاَءِ النَّاسُ وَرَائِي فَقَالَ ‏”‏ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ‏”‏ ‏.‏ وَأَعْطَانِي نَعْلَيْهِ قَالَ ‏”‏ اذْهَبْ بِنَعْلَىَّ هَاتَيْنِ فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْحَائِطِ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ ‏”‏ فَكَانَ أَوَّلَ مَنْ لَقِيتُ عُمَرُ فَقَالَ مَا هَاتَانِ النَّعْلاَنِ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ‏.‏ فَقُلْتُ هَاتَانِ نَعْلاَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَعَثَنِي بِهِمَا مَنْ لَقِيتُ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ بَشَّرْتُهُ بِالْجَنَّةِ ‏.‏ فَضَرَبَ عُمَرُ بِيَدِهِ بَيْنَ ثَدْيَىَّ فَخَرَرْتُ لاِسْتِي فَقَالَ ارْجِعْ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ فَرَجَعْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَجْهَشْتُ بُكَاءً وَرَكِبَنِي عُمَرُ فَإِذَا هُوَ عَلَى أَثَرِي فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ مَا لَكَ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ لَقِيتُ عُمَرَ فَأَخْبَرْتُهُ بِالَّذِي بَعَثْتَنِي بِهِ فَضَرَبَ بَيْنَ ثَدْيَىَّ ضَرْبَةً خَرَرْتُ لاِسْتِي قَالَ ارْجِعْ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ يَا عُمَرُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا فَعَلْتَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي أَبَعَثْتَ أَبَا هُرَيْرَةَ بِنَعْلَيْكَ مَنْ لَقِيَ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ بَشَّرَهُ بِالْجَنَّةِ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ نَعَمْ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَلاَ تَفْعَلْ فَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَتَّكِلَ النَّاسُ عَلَيْهَا فَخَلِّهِمْ يَعْمَلُونَ ‏.‏ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فَخَلِّهِمْ ‏”‏ ‏.‏
حدثني زهير بن حرب، حدثنا عمر بن يونس الحنفي، حدثنا عكرمة بن عمار، قال حدثني ابو كثير، قال حدثني ابو هريرة، قال كنا قعودا حول رسول الله صلى الله عليه وسلم معنا ابو بكر وعمر في نفر فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم من بين اظهرنا فابطا علينا وخشينا ان يقتطع دوننا وفزعنا فقمنا فكنت اول من فزع فخرجت ابتغي رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى اتيت حاىطا للانصار لبني النجار فدرت به هل اجد له بابا فلم اجد فاذا ربيع يدخل في جوف حاىط من بىر خارجة – والربيع الجدول – فاحتفزت كما يحتفز الثعلب فدخلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال ‏”‏ ابو هريرة ‏”‏ ‏.‏ فقلت نعم يا رسول الله ‏.‏ قال ‏”‏ ما شانك ‏”‏ ‏.‏ قلت كنت بين اظهرنا فقمت فابطات علينا فخشينا ان تقتطع دوننا ففزعنا فكنت اول من فزع فاتيت هذا الحاىط فاحتفزت كما يحتفز الثعلب وهولاء الناس وراىي فقال ‏”‏ يا ابا هريرة ‏”‏ ‏.‏ واعطاني نعليه قال ‏”‏ اذهب بنعلى هاتين فمن لقيت من وراء هذا الحاىط يشهد ان لا اله الا الله مستيقنا بها قلبه فبشره بالجنة ‏”‏ فكان اول من لقيت عمر فقال ما هاتان النعلان يا ابا هريرة ‏.‏ فقلت هاتان نعلا رسول الله صلى الله عليه وسلم بعثني بهما من لقيت يشهد ان لا اله الا الله مستيقنا بها قلبه بشرته بالجنة ‏.‏ فضرب عمر بيده بين ثديى فخررت لاستي فقال ارجع يا ابا هريرة فرجعت الى رسول الله صلى الله عليه وسلم فاجهشت بكاء وركبني عمر فاذا هو على اثري فقال لي رسول الله صلى الله عليه وسلم ‏”‏ ما لك يا ابا هريرة ‏”‏ ‏.‏ قلت لقيت عمر فاخبرته بالذي بعثتني به فضرب بين ثديى ضربة خررت لاستي قال ارجع ‏.‏ فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم ‏”‏ يا عمر ما حملك على ما فعلت ‏”‏ ‏.‏ قال يا رسول الله بابي انت وامي ابعثت ابا هريرة بنعليك من لقي يشهد ان لا اله الا الله مستيقنا بها قلبه بشره بالجنة ‏.‏ قال ‏”‏ نعم ‏”‏ ‏.‏ قال فلا تفعل فاني اخشى ان يتكل الناس عليها فخلهم يعملون ‏.‏ قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فخلهم ‏”‏ ‏.‏
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মুসলিমের এই বর্ণনায় আঘাতের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল মুহাম্মদের দেওয়া জান্নাতের সুসংবাদ প্রচার। মুহাম্মদ আবু হুরায়রাকে নিজের জুতা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন এই সুসংবাদ পৌঁছে দিতে যে, যে ব্যক্তি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সাক্ষ্য দেয় তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিতে হবে। আবু হুরায়রার সঙ্গে প্রথমে উমরের দেখা হয়। সংবাদটি শুনেই উমর তাঁর বুকে এমন আঘাত করেন যে আবু হুরায়রা পড়ে যান; তারপর তাঁকে মুহাম্মদের কাছে ফিরে যেতে বলেন। আবু হুরায়রা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান। [12]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম ৩১:
فَضَرَبَ عُمَرُ بِيَدِهِ بَيْنَ ثَدْيَيَّ فَخَرَرْتُ لِاسْتِي، فَقَالَ: ارْجِعْ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ … فَرَجَعْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَجْهَشْتُ بُكَاءً.
বাংলা অনুবাদ:
উমর তাঁর হাত দিয়ে আমার বুকের মাঝখানে আঘাত করলেন, ফলে আমি পেছনের দিকে পড়ে গেলাম। তিনি বললেন, “ফিরে যাও, আবু হুরায়রা।” আমি আল্লাহর রাসুলের কাছে ফিরে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লাম।

মুহাম্মদ উমরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজের কারণ ব্যাখ্যা করেন: এই সুসংবাদ প্রচার করলে মানুষ তার ওপর নির্ভর করে আমল ছেড়ে দিতে পারে। মুহাম্মদ শেষ পর্যন্ত বলেন, “তাহলে তাদের ছেড়ে দাও”—অর্থাৎ সংবাদটি সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে প্রচার না করার উমরের প্রস্তাব কার্যত মেনে নেন।

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম:
قَالَ عُمَرُ: فَلَا تَفْعَلْ، فَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَتَّكِلَ النَّاسُ عَلَيْهَا، فَخَلِّهِمْ يَعْمَلُونَ. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَخَلِّهِمْ.
বাংলা অনুবাদ:
উমর বললেন: “এটি করবেন না। আমার আশঙ্কা, মানুষ এর ওপর নির্ভর করে বসবে; তাদের আমল করতে দিন।” তখন আল্লাহর রাসুল বললেন: “তাহলে তাদের ছেড়ে দাও।”

এই ঘটনাটি হাদিস বর্ণনাপ্রবাহের জন্য একটি গভীর সমস্যা সামনে আনে। এখানে কোনো রাবীর স্মৃতিভ্রংশ নেই, কোনো সনদ জইফ নয় এবং বক্তব্যটি নবীর কাছ থেকেই আবু হুরায়রা সরাসরি পেয়েছিলেন। তারপরও বক্তব্যটির সম্ভাব্য সামাজিক ফল বিবেচনা করে সেটি সাধারণভাবে প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। অর্থাৎ প্রাথমিক হাদিস বর্ণনাপ্রবাহ কেবল “যা শুনেছি সব পৌঁছে দিলাম”—এমন একটি নিরপেক্ষ নথি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া ছিল না। কোন বক্তব্য মানুষের কাছে বলা উপযোগী, কোনটি ভুলভাবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং কোনটি আপাতত চেপে রাখা ভালো—এই সামাজিক বিচারও বর্ণনাপ্রবাহের পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারত।


“উমরের যুগে বললে মাথা ফাটত”—বর্ণনাটি কতটা শক্ত?

আল-যাহাবি একই জীবনীতে আবু হুরায়রার নামে আরও একটি কঠোর বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন: [13]

মূল আরবি:
سعيد بن عبد العزيز، عن إسماعيل بن عبيد الله، عن السائب بن يزيد: سمع عمر يقول لأبي هريرة: لتتركن الحديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أو لألحقنك بأرض دوس! وقال لكعب: لتتركن الحديث، أو لألحقنك بأرض القردة. يحيى بن أيوب، عن ابن عجلان: أن أبا هريرة كان يقول: إني لأحدث أحاديث، لو تكلمت بها في زمن عمر، لشج رأسي.

বাংলা অনুবাদ:
সাঈদ ইবন আবদুল আজিজ, ইসমাঈল ইবন উবাইদুল্লাহর সূত্রে, সায়িব ইবন ইয়াজিদ থেকে বর্ণনা করেন: তিনি উমরকে আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছেন, “তুমি অবশ্যই আল্লাহর রাসুলের নামে হাদিস বলা বন্ধ করবে, নইলে আমি তোমাকে দাওসের দেশে পাঠিয়ে দেব।” কা‘বকে তিনি বলেন, “তুমি অবশ্যই হাদিস বলা বন্ধ করবে, নইলে আমি তোমাকে বানরদের দেশে পাঠিয়ে দেব।” ইয়াহইয়া ইবন আইয়ুব, ইবন আজলানের সূত্রে বর্ণনা করেন যে আবু হুরায়রা বলতেন: “আমি এখন এমন সব হাদিস বর্ণনা করি, যেগুলো উমরের সময়ে বললে তিনি আমার মাথা ফাটিয়ে দিতেন।”

কিন্তু এই বর্ণনাটি আগের সহিহ সনদের হুমকির মত ইসলামের মাপকাঠিতে বিশুদ্ধ সনদের নয়। এর পথটি ইয়াহইয়া ইবন আইয়ুব → মুহাম্মদ ইবন আজলান → আবু হুরায়রা; অথচ মুহাম্মদ ইবন আজলান আবু হুরায়রার যুগ পাননি। আল-মু‘আল্লিমি তাই একে মুনকাতি‘ বা বিচ্ছিন্ন এবং অসহিহ বলেছেন; শুয়াইব আল-আরনাউতও একই বিচ্ছিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন। [14]

দুটি অসততা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—জইফকে সহিহ বানানো যেমন অসৎ, জইফকে “ঘটনাটি অবশ্যই মিথ্যা” বানানোও তেমনি অসৎ। “মাথা ফাটিয়ে দিতেন” বক্তব্যটির বিচ্ছিন্ন সনদ তার আরোপের প্রমাণকে দুর্বল করেছে। এটি পরবর্তী গ্রন্থে সংরক্ষিত এমন একটি স্মৃতি, যার বিষয়বস্তু উমরের সহিহ-সনদে প্রমাণিত “হাদিস বলা বন্ধ করো” হুমকি এবং যাহাবির “হাদিস কম বলার নীতি” মন্তব্যের সঙ্গে একই ঐতিহাসিক পরিবেশের ধারণা বহন করে। বিচ্ছিন্ন সনদের আপত্তি সত্ত্বেও বর্ণনাটির বিষয়বস্তুকে অন্য সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে শাস্তির ভয়ে বর্ণনা সীমিত রাখার ব্যাখ্যাটি জোর পায়। নির্বাসনের হুমকি, প্রচারে বাধা এবং হাদিস কম বলানোর নীতি—এই সংরক্ষিত তথ্যগুলোর পাশে শারীরিক শাস্তির আশঙ্কা কোনো বিচ্ছিন্ন, পরিবেশবিরোধী কল্পনা নয়। নির্দিষ্ট উক্তিটির আরোপে দুর্বলতা আছে; বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের ঐতিহাসিক যুক্তিটি সেই দুর্বলতার সঙ্গে উধাও হয় না।

আরেকটি প্রচলিত বর্ণনায় আবু হুরায়রার নামে বলা হয়েছে, “উমর মারা যাওয়ার আগে আমরা ‘রাসুল বলেছেন’ বলতে পারতাম না; আমরা চাবুকের ভয় করতাম।” এই সনদ আরও দুর্বল: এর মধ্যে ইয়াজিদ ইবন ইউসুফ ও সালিহ ইবন আবিল আখদার রয়েছেন, যাঁদের নিয়ে জারহ আছে। এই দুই রাবীর বিরুদ্ধে জারহের কারণে বর্ণনাপথটির প্রমাণ দুর্বল। একই জীবনীতে সংরক্ষিত নির্বাসনের হুমকির বর্ণনা পৃথক সনদে এসেছে; একটি পথের দুর্বলতা সেই অন্য পথের প্রমাণ মুছে দেয় না। [15]


“প্রচার করলে এই গলা কাটা হতো”: আবু হুরায়রার অপ্রকাশিত বর্ণনা

হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা বিচার করার আগে আরও একটি প্রশ্ন আছে: বর্ণনাকারী যা জানতেন তার কতটুকু অন্যদের বলেছেন? যে তথ্য প্রচারই করা হয়নি, পরবর্তী মুহাদ্দিস তার সনদ সংগ্রহ বা মতন তুলনা করার সুযোগ পাবেন না। সহিহ বুখারির ১২০ নম্বর বর্ণনায় আবু হুরায়রা নিজেই বলেন, তিনি মুহাম্মদের কাছ থেকে দুই পাত্র জ্ঞান সংরক্ষণ করেছিলেন; একটি প্রচার করেছেন, অন্যটি প্রচার করলে তাঁর গলা কাটা হতো। এখানে তথ্য আটকে যাওয়ার কারণ স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া নয়; তাঁর নিজের ভাষায়, তা প্রকাশ করার প্রাণঘাতী পরিণতির আশঙ্কা। সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবীদের একজন নিজের জানা উপাদানের একটি অংশ অপ্রকাশিত রেখেছেন বলে ঘোষণা করছেন। ফলে তাঁর মাধ্যমে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোকে তাঁর জানা সমস্ত তথ্যের পূর্ণ তালিকা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। [16] [17]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮৪। ইলম মুখস্ত করা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১২২ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১২০
১২২। ইসমা’ঈল (রহঃ) …. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইল্‌মের দুটি পাত্র মুখস্থ করে রেখেছিলাম। তার একটি পাত্র বিতরণ করে দিয়েছি। আর অপরটি প্রকাশ করলে আমার কন্ঠনালী কেটে দেওয়া হবে। আবূ আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, হাদীসে উল্লিখিতبلعوم শব্দের অর্থ খাদ্যনালী।
باب حِفْظِ الْعِلْمِ
حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي أَخِي، عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وِعَاءَيْنِ، فَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَبَثَثْتُهُ، وَأَمَّا الآخَرُ فَلَوْ بَثَثْتُهُ قُطِعَ هَذَا الْبُلْعُومُ‏.‏
حدثنا اسماعيل، قال حدثني اخي، عن ابن ابي ذىب، عن سعيد المقبري، عن ابي هريرة، قال حفظت من رسول الله صلى الله عليه وسلم وعاءين، فاما احدهما فبثثته، واما الاخر فلو بثثته قطع هذا البلعوم‏.‏
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي أَخِي، عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وِعَاءَيْنِ، فَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَبَثَثْتُهُ، وَأَمَّا الآخَرُ فَلَوْ بَثَثْتُهُ قُطِعَ هَذَا الْبُلْعُومُ.

বাংলা অনুবাদ: ইসমাইল আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমার ভাই আমাকে বর্ণনা করেছেন, ইবন আবি যিবের সূত্রে, সাঈদ আল-মাকবুরির সূত্রে, আবু হুরায়রার সূত্রে। আবু হুরায়রা বলেন: “আমি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে দুই পাত্র জ্ঞান সংরক্ষণ করেছি। তার একটি আমি ছড়িয়ে দিয়েছি। আর অন্যটি যদি ছড়িয়ে দিতাম, তাহলে এই গলা কেটে দেওয়া হতো।”

জইফ হাদিস 1

আবু হুরায়রার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে অপ্রকাশিত উপাদানের পুরো বিষয়বস্তু দেওয়া নেই। আয়নির উমদাতুল কারি-তে তার একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সংরক্ষিত হয়েছে। ইবন বাত্তালের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সেখানে কুরাইশের নির্বোধ তরুণদের হাতে ধর্মের অবক্ষয় এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য তাদের নাম প্রকাশ না করার কথা বলা হয়েছে। একই আলোচনায় দ্বিতীয় পাত্রকে অত্যাচারী শাসকদের নাম, অবস্থা ও নিন্দাসংবলিত বর্ণনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; আবু হুরায়রা তাঁদের ভয়ে সরাসরি নাম না বলে ইঙ্গিত করতেন। এই শরহে হালাল–হারামের বিধান গোপন করা এবং শাসক-সম্পর্কিত বিপজ্জনক সংবাদ গোপন করার মধ্যে পার্থক্যও করা হয়েছে। মূল বর্ণনার প্রাণভয়কে ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যাকারীরা রাষ্ট্রক্ষমতা ও শাসকের পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। [18]

وَقَالَ ابْنُ بَطَّالٍ: الْمُرَادُ مِنَ الْوِعَاءِ الثَّانِي أَحَادِيثُ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ وَمَا عَرَّفَ بِهِ النَّبِيُّ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ مِنْ فَسَادِ الدِّينِ عَلَى أَيْدِي أُغَيْلِمَةٍ سُفَهَاءَ مِنْ قُرَيْشٍ، وَكَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يَقُولُ: لَوْ شِئْتُ أَنْ أُسَمِّيَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ، فَخَشِيَ عَلَى نَفْسِهِ فَلَمْ يُصَرِّحْ، وَكَذَلِكَ يَنْبَغِي لِكُلِّ مَنْ أَمَرَ بِمَعْرُوفٍ إِذْ خَافَ عَلَى نَفْسِهِ فِي التَّصْرِيحِ أَنْ يَعْرِضَ، وَلَوْ كَانَتِ الْأَحَادِيثُ الَّتِي لَمْ يُحَدِّثْ بِهَا فِي الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ مَا وَسِعَهُ كَتْمُهَا بِحُكْمِ الْآيَةِ، وَيُقَالُ: حَمَلَ الْوِعَاءَ الثَّانِيَ الَّذِي لَمْ يُنَبِّهْ عَلَى الْأَحَادِيثِ الَّتِي فِيهَا تَبْيِينُ أَسَامِي أُمَرَاءِ الْجَوْرِ وَأَحْوَالِهِمْ وَذَمِّهِمْ، وَقَدْ كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُكَنِّي عَنْ بَعْضِهِمْ وَلَا يُصَرِّحُ بِهِ خَوْفًا عَلَى نَفْسِهِ مِنْهُمْ; كَقَوْلِهِ: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ رَأْسِ السِّتِّينَ وَإِمَارَةِ الصِّبْيَانِ، يُشِيرُ بِذَلِكَ إِلَى خِلَافَةِ يَزِيدَ بْنِ مُعَاوِيَةَ; لِأَنَّهَا كَانَتْ سَنَةَ سِتِّينَ مِنَ الْهِجْرَةِ، فَاسْتَجَابَ اللَّهُ دُعَاءَ أَبِي هُرَيْرَةَ، فَمَاتَ قَبْلَهَا بِسَنَةٍ.

বাংলা অনুবাদ: ইবন বাত্তাল বলেন: দ্বিতীয় পাত্র বলতে কিয়ামতের নিদর্শনসংক্রান্ত বর্ণনাগুলো এবং কুরাইশের নির্বোধ তরুণদের হাতে ধর্মের যে অবক্ষয় হবে বলে নবী জানিয়েছিলেন, তা বোঝানো হয়েছে। আবু হুরায়রা বলতেন: “আমি চাইলে তাদের নাম ধরে চিহ্নিত করতে পারি।” কিন্তু তিনি নিজের প্রাণের আশঙ্কা করেছিলেন, তাই সরাসরি নাম বলেননি। একইভাবে যে ব্যক্তি সৎকাজের নির্দেশ দেয়, সরাসরি কথা বললে নিজের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে তার ইঙ্গিতে বলা উচিত। যে বর্ণনাগুলো তিনি বলেননি সেগুলো যদি হালাল–হারামসংক্রান্ত হতো, তাহলে আয়াতের বিধান অনুযায়ী তাঁর জন্য সেগুলো গোপন রাখার সুযোগ থাকত না। আরও বলা হয়, যে দ্বিতীয় পাত্রের বিষয় তিনি প্রকাশ করেননি, তাকে সেই বর্ণনাগুলোর অর্থে নেওয়া হয়েছে যাতে অত্যাচারী শাসকদের নাম, অবস্থা এবং নিন্দা পরিষ্কার করা হয়েছে। আবু হুরায়রা তাঁদের কারও কারও সম্পর্কে ইঙ্গিত করতেন; তাঁদের কাছ থেকে নিজের বিপদের আশঙ্কায় সরাসরি নাম বলতেন না। যেমন তাঁর বক্তব্য: “ষাট সালের সূচনা এবং বালকদের শাসন থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই।” এর মাধ্যমে তিনি ইয়াজিদ ইবন মুয়াবিয়ার খিলাফতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন; কারণ তা শুরু হয়েছিল ষাট হিজরিতে। আল্লাহ আবু হুরায়রার দোয়া কবুল করেছিলেন; তিনি তার এক বছর আগে মারা যান।

এই স্বীকারোক্তি সংরক্ষিত বর্ণনাসমষ্টির প্রতিনিধিত্ব নিয়েই সমস্যা তোলে। পরবর্তী গ্রন্থে যা আছে তা থেকে বোঝা যায় কোন তথ্য শেষ পর্যন্ত প্রচারের সুযোগ পেয়েছে; যা প্রচার করা বিপজ্জনক ছিল তার সম্পূর্ণ তালিকা সেখানে পাওয়া যায় না। শাসকের নাম ও নিন্দা প্রকাশ করলে প্রাণ যেতে পারে—এমন পরিবেশে নীরবতা কেবল তথ্যের অভাব নয়, তথ্য আটকে যাওয়ার পদ্ধতিও হতে পারে। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সনদও বর্ণনাকারী যে কথা নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন তা উদ্ধার করতে পারবে না। ফলে কোনো রাজনৈতিক ঘটনা বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাচীন প্রচার সীমিত হলে সেই সীমাবদ্ধতার কারণও অনুসন্ধানের বিষয়: কার বলার সুযোগ ছিল, কার ঝুঁকি ছিল, কে ইঙ্গিত করেছেন এবং কে মুখ বন্ধ রেখেছেন। একজন প্রধান বর্ণনাকারীর নিজের ঘোষিত নীরবতার পরে সংরক্ষিত গ্রন্থসমষ্টিকে প্রথম যুগের সমস্ত জানা সত্যের স্বচ্ছ প্রতিলিপি ধরে নেওয়া প্রমাণবিরোধী। সনদ যাচাই প্রচারিত বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা বিচার করতে পারে; বর্ণনা প্রচারের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ঘোষিত গোপনীয়তার ইতিহাস সেই পরীক্ষার বাইরেও থেকে যায়।


হাদিসের প্রচার কখনো নিরপেক্ষ প্রবাহ ছিল না

হাদিস প্রচারের ওপর এই নিয়ন্ত্রণে খলিফার ক্ষমতা সরাসরি কাজ করেছে। কোন সংবাদ ছড়াবে এবং কার মুখ বন্ধ থাকবে, তা নির্ধারিত হয়েছে আদেশ, শাস্তির হুমকি ও সংবাদটির অনুমিত সামাজিক প্রভাব দিয়ে। সাহাবীদের যুগে নবীর বক্তব্যের প্রচার একটি সম্পূর্ণ অবাধ, সমান ও নিরপেক্ষ তথ্যপ্রবাহ ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস-বর্ণনাকারীদের একজনকে অতিরিক্ত বর্ণনা বন্ধ করতে খলিফা সরাসরি হুমকি দিয়েছেন; যাহাবি এটিকে উমরের সাধারণ হাদিস-সংযম নীতির উদাহরণ বলেছেন; আর সহিহ মুসলিমে দেখা যায়, নবীর সরাসরি দেওয়া একটি সংবাদও সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাবের কারণে আবু হুরায়রাকে প্রচার করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য গভীর। কোনো বক্তব্য প্রথম যুগে কম সংখ্যক পথে পাওয়া যায় মানেই সেটি মিথ্যা—এমন নয়; আবার পরে বহুল প্রচলিত হয়েছে মানেই প্রথম থেকেই একই মাত্রায় প্রচারিত ছিল—এমনও নয়। বর্ণনার বিস্তার শুধু স্মৃতি ও সত্যতার ওপর নির্ভর করে না; কর্তৃত্ব, সামাজিক প্রয়োজন, প্রচারের অনুমতি, আত্মসংযম এবং কোনো বক্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাবও নির্ধারণ করতে পারে কোন সংবাদ কত দ্রুত ও কত বিস্তৃতভাবে ছড়াবে। পরবর্তী মুহাদ্দিস যখন কয়েক প্রজন্ম পর টিকে থাকা বর্ণনার ওপর সহিহ–জইফের বিচার করছেন, তিনি অতীতের সব উচ্চারিত বক্তব্য নিয়ে কাজ করছেন না; তাঁর সামনে আছে সেই বর্ণনাগুলো, যেগুলো নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক ছাঁকনি পার হয়ে শেষ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়েছে।

কোনো খবর অল্প কয়েকটি পথে টিকেছে কেন—এই প্রশ্নে প্রচারের পরিবেশও জরুরি। ঘটনাটির স্মৃতি আদৌ ছিল না, নাকি মানুষ খবরটি বলতে ভয় পেত? আবু হুরায়রার বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করতে উমরের নির্বাসনের হুমকি দ্বিতীয় সম্ভাবনাটির বাস্তব ভিত্তি দেখায়। যেখানে কথা বলার জন্য শাসকের শাস্তির ভয় আছে, সেখানে কম লোকের মুখে খবর পাওয়া মানেই ঘটনাটি ঘটেনি—এই সিদ্ধান্ত চলে না। সেই কম প্রচারের পেছনে ক্ষমতার চাপও কাজ করে থাকতে পারে। আবার অনেক পরে কোনো খবর হঠাৎ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তার নতুন করে তৈরি হওয়া, পুরোনো কথার বদলে যাওয়া বা নতুন রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ার প্রশ্ন ওঠে। নীরবতার ওজন নির্ভর করে মানুষ কেন নীরব ছিল তার ওপর। শাসকের ভয় থেকে তৈরি নীরবতাকে শাসকের নির্দোষতার প্রমাণ বানালে দমনই দমনকারীর পক্ষে সাক্ষ্য হয়ে যায়।


সনদ যাচাই ও লিখিত সংরক্ষণও শুরু থেকেই একরূপ ছিল না

ইবন সিরিন: “আগে সনদ জিজ্ঞেস করা হতো না”

পরবর্তী হাদিসশাস্ত্রে সনদকে ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হলেও সহিহ মুসলিমের ভূমিকাতেই মুহাম্মদ ইবন সিরিনের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পর্যায়ে বর্ণনাকারীদের সনদ জিজ্ঞেস করা হতো না; ফিতনা ঘটার পরে রাবীদের নাম দাবি করা শুরু হয় এবং তখন মতাদর্শিক পরিচয়ও বর্ণনা গ্রহণ-বর্জনের ছাঁকনিতে প্রবেশ করে। অর্থাৎ মুসলিমের নিজের ভূমিকায় সংরক্ষিত এই সাক্ষ্য অনুযায়ী সনদ-নিরীক্ষার কঠোরতা একটি ঐতিহাসিক বিকাশের মধ্য দিয়ে গেছে; সেটিকে মুহাম্মদের জীবদ্দশা থেকেই অপরিবর্তিত ও সমানভাবে কার্যকর পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই [19]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিমের ভূমিকা, ইবন সিরিন:
حدثنا أبو جعفر محمد بن الصباح، حدثنا إسماعيل بن زكرياء، عن عاصم الأحول، عن ابن سيرين، قال: لم يكونوا يسألون عن الإسناد، فلما وقعت الفتنة قالوا: سموا لنا رجالكم؛ فينظر إلى أهل السنة فيؤخذ حديثهم، وينظر إلى أهل البدع فلا يؤخذ حديثهم.

বাংলা অনুবাদ:
আবু জা‘ফর মুহাম্মদ ইবনুস সাব্বাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, ইসমাঈল ইবন যাকারিয়্যা আমাদের বর্ণনা করেছেন, আসিম আল-আহওয়ালের সূত্রে, ইবন সিরিন থেকে। ইবন সিরিন বলেন: তাঁরা আগে সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন না। যখন ফিতনা ঘটল, তখন বলা হলো: “আমাদের কাছে তোমাদের রাবীদের নাম বলো।” এরপর আহলুস সুন্নাহর লোকদের দেখা হতো এবং তাঁদের হাদিস গ্রহণ করা হতো; আর বিদআতের লোকদের দেখা হতো এবং তাঁদের হাদিস গ্রহণ করা হতো না।

ইবন সিরিন সনদ যাচাইয়ের রীতিতে ফিতনার পরের পরিবর্তনটি নির্দিষ্ট করেছেন: রাবীদের নাম দাবি করা এবং মতাদর্শিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বর্ণনা বাছাই করার প্রাতিষ্ঠানিক কঠোরতা একটি নির্দিষ্ট সংকটের পরে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে পরবর্তী শতাব্দীর পরিণত সনদ-সমালোচনার কাঠামোকে আগের প্রতিটি দশকে একই মাত্রায় কার্যকর ছিল বলে পেছনে বসিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিকভাবে বৈধ নয়।

সহিহ মুসলিমের ভূমিকাতেই ইবন আব্বাসের নামে আরেকটি বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে দেখা যায়, প্রথমে মানুষ মুহাম্মদের নামে কথা বললে মনোযোগ দিয়ে শোনা হতো; পরে মানুষ নির্বিচারে বিভিন্ন ধরনের বর্ণনায় প্রবেশ করলে তাঁরা কেবল পরিচিত ও যাচাইযোগ্য সংবাদ গ্রহণ করতে শুরু করেন। এখানে আবারও বর্ণনা-গ্রহণের মানদণ্ডকে পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে। [20] [21]

মূল আরবি—ইবন আব্বাসের নামে:
وَحَدَّثَنِي أَبُو أَيُّوبَ، سُلَيْمَانُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ الْغَيْلاَنِيُّ حَدَّثَنَا أَبُو عَامِرٍ، – يَعْنِي الْعَقَدِيَّ – حَدَّثَنَا رَبَاحٌ، عَنْ قَيْسِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ مُجَاهِدٍ، قَالَ جَاءَ بُشَيْرٌ الْعَدَوِيُّ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ فَجَعَلَ يُحَدِّثُ وَيَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَجَعَلَ ابْنُ عَبَّاسٍ لاَ يَأْذَنُ لِحَدِيثِهِ وَلاَ يَنْظُرُ إِلَيْهِ فَقَالَ يَا ابْنَ عَبَّاسٍ مَا لِي لاَ أَرَاكَ تَسْمَعُ لِحَدِيثِي أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَلاَ تَسْمَعُ ‏.‏ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ إِنَّا كُنَّا مَرَّةً إِذَا سَمِعْنَا رَجُلاً يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ابْتَدَرَتْهُ أَبْصَارُنَا وَأَصْغَيْنَا إِلَيْهِ بِآذَانِنَا فَلَمَّا رَكِبَ النَّاسُ الصَّعْبَ وَالذَّلُولَ لَمْ نَأْخُذْ مِنَ النَّاسِ إِلاَّ مَا نَعْرِفُ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবু আইয়ুব সুলাইমান ইবন উবাইদুল্লাহ আল-গাইলানি আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আবু আমির—অর্থাৎ আল-আকাদি—আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, রাবাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন, কায়স ইবন সা‘দের সূত্রে, মুজাহিদ থেকে। মুজাহিদ বলেন: বুশাইর আল-আদাবি ইবন আব্বাসের কাছে এসে বর্ণনা করতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন, “আল্লাহর রাসুল বলেছেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন।” ইবন আব্বাস তাঁর বর্ণনায় কান দিচ্ছিলেন না এবং তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলেনও না। তখন তিনি বললেন, “ইবন আব্বাস, কী ব্যাপার? আমি দেখছি আপনি আমার বর্ণনা শুনছেন না। আমি আপনাকে আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে বর্ণনা করছি, আর আপনি শুনছেন না!” ইবন আব্বাস বললেন: “একসময় আমরা কোনো ব্যক্তিকে ‘আল্লাহর রাসুল বলেছেন’ বলতে শুনলে সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাতাম এবং মন দিয়ে শুনতাম। কিন্তু মানুষ যখন কঠিন-সহজ সব পথেই চলতে শুরু করল, তখন আমরা মানুষের কাছ থেকে কেবল সেই বর্ণনাই গ্রহণ করতাম, যা আমরা চিনতাম।”

ইবন সিরিন ও ইবন আব্বাসের বক্তব্যে একটি পরিবর্তন ধরা পড়ে: বর্ণনা নিয়ে সমস্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কে কার কাছ থেকে শুনেছেন, তা জিজ্ঞেস করার কঠোরতাও বেড়েছে। অর্থাৎ সনদ যাচাইয়ের নিয়ম শুরু থেকেই একই রূপে চালু ছিল না। কয়েক প্রজন্ম পরে পাওয়া পূর্ণ নামের তালিকাকে তাই প্রথম দিন থেকে তৈরি ও সংরক্ষিত তালিকা বলে ধরে নেওয়া যায় না। শুরুতে উৎস জিজ্ঞেস করা না হলে পরে সেই নামগুলো কার কাছ থেকে জানা গেল? মাঝের মানুষগুলোর সংযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হলো? আগের প্রচারে ভুল ঢুকে থাকলে তা ধরার উপায় কী ছিল? সনদ শুধু খবর যাচাইয়ের উপকরণ নয়; কখন ও কীভাবে সনদটি পাওয়া গেল, সেটিও যাচাইয়ের বিষয়। পরবর্তী বইয়ে তালিকা সম্পূর্ণ দেখালেই তার আগের অজানা সময়টুকু পূরণ হয়ে যায় না।


হাদিস লেখা: নিষেধ, অনুমতি এবং পরে সংগঠিত সংগ্রহ

লিখিত সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও উৎসগুলো একরৈখিক ছবি দেয় না। সহিহ মুসলিমে আবু সাঈদ আল-খুদরির সূত্রে মুহাম্মদের নামে সরাসরি নির্দেশ আছে—কোরআন ছাড়া তাঁর কাছ থেকে কিছু লিখতে না এবং আগে লিখে থাকলে তা মুছে ফেলতে। একই বক্তব্যে আবার মৌখিকভাবে তাঁর কথা বর্ণনা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। [22] [21]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম ৩০০৪:
حَدَّثَنَا هَدَّابُ بْنُ خَالِدٍ الأَزْدِيُّ ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ لاَ تَكْتُبُوا عَنِّي وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ وَحَدِّثُوا عَنِّي وَلاَ حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَىَّ – قَالَ هَمَّامٌ أَحْسِبُهُ قَالَ – مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
হাদ্দাব ইবন খালিদ আল-আজদি আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাম্মাম আমাদের বর্ণনা করেছেন, যায়দ ইবন আসলামের সূত্রে, আতা ইবন ইয়াসারের সূত্রে, আবু সাঈদ আল-খুদরি থেকে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “আমার কাছ থেকে লিখো না। যে আমার কাছ থেকে কোরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখেছে, সে তা মুছে ফেলুক। তবে আমার কাছ থেকে বর্ণনা করো; এতে অসুবিধা নেই। আর যে আমার নামে মিথ্যা বলবে”—হাম্মাম বলেন, আমার ধারণা তিনি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ বলেছেন—“সে যেন জাহান্নামে নিজের আসন গ্রহণ করে।”

অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবন আমরের বর্ণনায় সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের অনুমতি সংরক্ষিত। তিনি যা শুনতেন লিখে রাখতেন; কুরাইশের লোকেরা আপত্তি করলে তিনি লেখা বন্ধ করেন। বিষয়টি মুহাম্মদকে জানালে মুহাম্মদ তাঁকে আবার লিখতে বলেন এবং নিজের মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তাঁর মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছু বের হয় না। অর্থাৎ প্রাথমিক উৎসেই লিখিত হাদিসের নিষেধ ও অনুমতি—দুই ধরনের বর্ণনা সংরক্ষিত। [23] [21]

মূল আরবি—সুনান আবু দাউদ:
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ ، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ قَالاَ حَدَّثَنَا يَحْيَى ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ الأَخْنَسِ ، عَنِ الْوَلِيدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُغِيثٍ ، عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو ، قَالَ كُنْتُ أَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ أَسْمَعُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيدُ حِفْظَهُ فَنَهَتْنِي قُرَيْشٌ وَقَالُوا أَتَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ تَسْمَعُهُ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَشَرٌ يَتَكَلَّمُ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَا فَأَمْسَكْتُ عَنِ الْكِتَابِ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَوْمَأَ بِأُصْبُعِهِ إِلَى فِيهِ فَقَالَ ‏”‏ اكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلاَّ حَقٌّ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
মুসাদ্দাদ ও আবু বকর ইবন আবি শাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁরা বলেন, ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন, উবাইদুল্লাহ ইবনুল আখনাসের সূত্রে, আল-ওয়ালিদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন আবি মুগিসের সূত্রে, ইউসুফ ইবন মাহাকের সূত্রে, আবদুল্লাহ ইবন আমর থেকে। আবদুল্লাহ বলেন: আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে যা শুনতাম, মনে রাখার উদ্দেশ্যে সব লিখে রাখতাম। কুরাইশ আমাকে বাধা দিল এবং বলল, “তুমি যা শোনো সবই কি লিখে রাখো? আল্লাহর রাসুল তো মানুষ; তিনি রাগ ও সন্তুষ্টি—দুই অবস্থাতেই কথা বলেন।” তখন আমি লেখা বন্ধ করলাম এবং বিষয়টি আল্লাহর রাসুলকে জানালাম। তিনি নিজের আঙুল দিয়ে মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন: “লেখো। যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ—এ মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছু বের হয় না।”

এই দুই বর্ণনার কালক্রম ও সমন্বয় নিয়ে পরবর্তী আলেমরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন; কিন্তু সেই ব্যাখ্যাগুলোর অস্তিত্বই দেখায় যে প্রাথমিক লিখিত সংরক্ষণের নীতি এক বাক্যের সরল নিয়ম ছিল না। লিখিত হাদিসের অস্তিত্ব ছিল, আবার লেখার বিরুদ্ধে বর্ণনাও ছিল; কারও ব্যক্তিগত সহিফা ছিল, কিন্তু পরবর্তী বৃহৎ সংকলনের মতো সর্বজনীন ও কেন্দ্রীয় সংগ্রহব্যবস্থা তখনও প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোও সাহাবি ও তাবিয়িদের মধ্যে হাদিস লেখা নিয়ে ব্যাপক মতভেদের কথা সংরক্ষণ করেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল আসে উমর ইবন আবদুল আজিজের যুগ থেকে। সহিহ বুখারির কিতাবুল ইলম-এর শিরোনামেই তাঁর আবু বকর ইবন হাজমকে দেওয়া নির্দেশ সংরক্ষিত: নবীর হাদিস খুঁজে লিখে রাখতে হবে, কারণ জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়া এবং আলেমদের মৃত্যু নিয়ে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। এই নির্দেশ নিজেই দেখায় যে হাদিস সংরক্ষণকে লিখিত ও সংগঠিত করার প্রয়োজন তখন একটি বাস্তব প্রশাসনিক উদ্বেগ ছিল। [24] [21]

মূল আরবি—সহিহ আল-বুখারির অধ্যায়-শিরোনামে সংরক্ষিত নির্দেশ:
وَكَتَبَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ إِلَى أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزْمٍ انْظُرْ مَا كَانَ مِنْ حَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاكْتُبْهُ، فَإِنِّي خِفْتُ دُرُوسَ الْعِلْمِ وَذَهَابَ الْعُلَمَاءِ، وَلاَ تَقْبَلْ إِلاَّ حَدِيثَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلْتُفْشُوا الْعِلْمَ، وَلْتَجْلِسُوا حَتَّى يُعَلَّمَ مَنْ لاَ يَعْلَمُ، فَإِنَّ الْعِلْمَ لاَ يَهْلِكُ حَتَّى يَكُونَ سِرًّا.

বাংলা অনুবাদ:
উমর ইবন আবদুল আজিজ আবু বকর ইবন হাজমকে লিখলেন: “আল্লাহর রাসুলের যেসব হাদিস আছে সেগুলো অনুসন্ধান করে লিখে রাখো; কারণ আমি জ্ঞানের বিলুপ্তি এবং আলেমদের চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছি। কেবল নবীর হাদিসই গ্রহণ করো। তোমরা জ্ঞান ছড়িয়ে দাও এবং এমনভাবে বসো যাতে যে জানে না তাকেও শেখানো হয়। কারণ জ্ঞান গোপন না হওয়া পর্যন্ত তা ধ্বংস হয় না।”

হাদিস সংরক্ষণের এই ইতিহাসে মুখে বলা, ব্যক্তিগতভাবে লিখে রাখা, লেখার অনুমতি নিয়ে বিরোধ এবং পরে সংগঠিতভাবে সংগ্রহ—সবই আছে। এগুলোকে একটির পর একটি সবার জন্য সমান তিনটি পর্যায় ভাবলে ভুল হবে; একই সময়ে কেউ মুখস্থ করতেন, কেউ নোট রাখতেন, কেউ লেখা নিয়ে আপত্তি করতেন। পরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বড় সংগ্রহের প্রয়োজন সামনে এসেছে। ফলে কোনো হাদিস আজ লিখিত বইয়ে পাওয়া গেলেই সেটি মুহাম্মদের জীবদ্দশায় লেখা নথি হয়ে যায় না। ব্যক্তিগত নোটটি কখন লেখা, কার কাছে ছিল, কে নকল করেছেন, নকলের সঙ্গে মূলের কী সম্পর্ক এবং অন্য বর্ণনায় কী পাঠ পাওয়া যায়—এসব তথ্য দরকার। আগে লেখালেখি ছিল—এই সাধারণ তথ্য কোনো নির্দিষ্ট হাদিসের বয়স প্রমাণ করে না; সেই হাদিসের নিজস্ব সংরক্ষণপথ দেখাতে হয়।

মৌখিক ও লিখিত সংরক্ষণের সম্পর্ক নিয়ে গ্রেগর শোলারের The Oral and the Written in Early Islam গবেষণাটি এই পার্থক্য স্পষ্ট করে। বইয়ের ভূমিকায় তিনি মনে রাখার জন্য নেওয়া ব্যক্তিগত নোট, পাঠদানের নোট এবং প্রচারের জন্য প্রস্তুত বইকে আলাদা করার প্রয়োজন ব্যাখ্যা করেছেন। একটি নোট সামনে রেখে শিক্ষক মুখে পড়াতে পারেন; ছাত্র সেই পাঠ শুনে আবার নিজের নোট নিতে পারেন। এখানে লেখা ও শ্রবণ একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে “মুখে প্রচলিত” মানেই কোথাও কিছু লেখা ছিল না, আর “লিখিত” মানেই আজকের মতো স্থির ও সম্পাদিত বই—দুটিই ভুল ধারণা। ইতিহাসের প্রশ্ন হলো কোন লেখা কার পাঠে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি কতদূর সংরক্ষিত এবং পরবর্তী বইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী। [25]

গ্রেগর শোলার, ভূমিকায় গবেষণার সূচনাপ্রশ্ন

whether in early Islam the sciences and poetry were transmitted orally or through writing.

বাংলা অনুবাদ:

প্রাথমিক ইসলামে জ্ঞানচর্চা ও কবিতা মৌখিকভাবে, নাকি লেখার মাধ্যমে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছিল।

মাইকেল কুকের “The Opponents of the Writing of Tradition in Early Islam” গবেষণায় লেখার বিরোধিতার পাশাপাশি লিখিত নথির ওপর ভরসার কথাও পাওয়া যায়। তাঁর আলোচিত সূত্রে কেউ ছাত্রদের লিখতে বলেছেন ভুলভাবে নিজের নামে কথা চালানো ঠেকাতে; কেউ স্মৃতির সঙ্গে লিখিত পাঠের অমিল হলে লিখিত পাঠকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার অন্যরা মুখে শেখার ধারাবাহিকতাকেই বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান ভিত্তি মনে করেছেন। বিতর্কটি তাই শুধু কাগজ পাওয়া যেত কি না, তা নিয়ে ছিল না। কার কাছ থেকে শেখা হলো এবং কীভাবে সেই শিক্ষার অধিকার পাওয়া গেল—এগুলোর সঙ্গেও কর্তৃত্বের প্রশ্ন জড়িত ছিল। আজ প্রাচীন কোনো লেখা পাওয়া গেলে তার বয়স ও পাঠ ইতিহাসবিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ; তৎকালীন সব হাদিসবিশারদ সেই লেখাকে একইভাবে গ্রহণ করতেন না। [26]

মাইকেল কুক, § 2

it was in the oral continuity of transmission that the very authenticity of Tradition was seen to rest

বাংলা অনুবাদ:

বর্ণনার মৌখিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই হাদিসের যথার্থতার ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করা হতো।


হাদিস গ্রহণের পদ্ধতি: শ্রুতি, পাঠ, অনুমতি ও লিখিত নথি

হাদিসের সনদ শুধু মানুষের স্মৃতি থেকে আরেক মানুষের স্মৃতিতে কথা পৌঁছানোর তালিকা ছিল না। হাদিস গ্রহণ বা তাহাম্মুল-এর মধ্যে শিক্ষকের মুখ থেকে শোনা, শিক্ষকের সামনে পাঠ করে তাঁর স্বীকৃতি নেওয়া, বর্ণনার অনুমতি পাওয়া এবং লিখিত নথি থেকে হাদিস সংগ্রহ করার পৃথক পদ্ধতি ছিল। শিক্ষক বলছেন এবং শিষ্য শুনছেন—এটি সামা‘; শিষ্য নিজে অথবা অন্য কেউ শিক্ষকের সামনে পড়ছেন এবং শ্রোতারা শুনছেন—এটি কিরাআত বা আরদ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শিক্ষককে পুরো বিষয়টি স্মৃতি থেকে বলে যেতে হচ্ছে না; তাঁর মূল নথি তিনি নিজে অথবা কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি ধরে পাঠ মিলিয়ে দেখতে পারেন। সুয়ূতীর তাদরীবুর রাবী-তে এই প্রক্রিয়া এবং তার ভাষা বিস্তারিত আছে: “অমুকের সামনে আমি পড়েছি”, “তাঁর সামনে পড়া হয়েছে এবং আমি শুনেছি”—এগুলো পাঠের সম্পর্ক প্রকাশ করে। শুধু “তিনি আমাদের বলেছেন” বা “আমাদের জানিয়েছেন” বলা যাবে কি না, সে বিষয়েও আলেমদের ভিন্ন রীতি ছিল। ফলে একটি বর্ণনাসূত্রের অর্থ নির্ধারিত হয় তার কারিগরি ব্যবহার দিয়ে; বাংলা অনুবাদে সব সূত্রকে নির্বিচারে “সরাসরি শুনেছেন” বানিয়ে দিলে তথ্য গ্রহণের প্রকৃত পদ্ধতি মুছে যায়। [27]

القسم الثاني : القراءة على الشيخ ، ويسميها أكثر المحدثين عرضا . سواء قرأت أو غيرك وأنت تسمع من كتاب أو حفظ ، حفظ الشيخ أم لا إذا أمسك أصله هو أو ثقة ، وهي رواية صحيحة بلا خلاف في جميع ذلك إلا ما حكي عن بعض من لا يعتد به . واختلفوا في مساواتها للسماع من لفظ الشيخ ورجحانه عليها ورجحانها عليه ، فحكي الأول عن مالك وأصحابه وأشياخه ومعظم علماء الحجاز والكوفة والبخاري وغيرهم ، والثاني عن جمهور أهل المشرق وهو الصحيح . والثالث عن أبي حنيفة وابن أبي ذئب وغيرهما ، ورواية عن مالك ، والأحوط في الرواية بها : قرأت على فلان أو قرئ عليه وأنا أسمع فأقر به ، ثم عبارات السماع مقيدة : كحدثنا أو أخبرنا قراءة عليه ، وأنشدنا في الشعر قراءة عليه ، ومنع إطلاق حدثنا وأخبرنا ابن المبارك ، ويحيى بن يحيى التميمي ، وأحمد بن حنبل ، والنسائي وغيرهم وجوزها طائفة . قيل : إنه مذهب الزهري ، ومالك ، وابن عيينة ، ويحيى القطان ، والبخاري ، وجماعات من المحدثين ومعظم الحجازيين والكوفيين . ومنهم من أجاز فيها سمعت ، ومنعت طائفة حدثنا وأجازت أخبرنا وهو مذهب الشافعي وأصحابه ومسلم بن الحجاج وجمهور أهل المشرق . وقيل : إنه مذهب أكثر المحدثين وروي عن ابن جريج والأوزاعي وابن وهب وروي عن النسائي أيضا وصار هو الشائع الغالب على أهل الحديث .

বাংলা অনুবাদ:দ্বিতীয় বিভাগ হলো শিক্ষকের সামনে পাঠ করা; অধিকাংশ মুহাদ্দিস একে আরদ বলেন। তুমি নিজে পড়ো অথবা অন্য কেউ পড়ুক এবং তুমি শোনো, বই থেকে পড়া হোক অথবা স্মৃতি থেকে—শিক্ষক বিষয়টি মুখস্থ রাখুন অথবা না রাখুন, যদি তাঁর মূল নথি তিনি নিজে অথবা কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি ধরে থাকেন, তাহলে এসব অবস্থায় এই বর্ণনা শুদ্ধ। গণ্য করা হয় না এমন কিছু ব্যক্তির নামে বর্ণিত মত ছাড়া এ বিষয়ে মতভেদ নেই। এর মর্যাদা শিক্ষকের মুখ থেকে শোনার সমান, শিক্ষকের মুখ থেকে শোনা এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, নাকি এটি শিক্ষকের মুখ থেকে শোনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ—এ নিয়ে মতভেদ আছে। প্রথম মত মালিক, তাঁর অনুসারী ও শিক্ষকবৃন্দ, হিজাজ ও কুফার অধিকাংশ আলেম, বুখারি এবং অন্যদের নামে বর্ণিত। দ্বিতীয় মত পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠের; এটিই সঠিক। তৃতীয় মত আবু হানিফা, ইবন আবি যিব এবং অন্যদের নামে বর্ণিত; মালিকেরও একটি বর্ণিত মত এটি। এ পদ্ধতিতে বর্ণনার অধিক সতর্ক ভাষা হলো: “অমুকের সামনে আমি পড়েছি” অথবা “তাঁর সামনে পড়া হয়েছে, আমি শুনেছি এবং তিনি তা স্বীকার করেছেন।” এরপর আসে পাঠের শর্তযুক্ত শ্রুতির ভাষা—যেমন “তাঁর সামনে পাঠের মাধ্যমে তিনি আমাদের বলেছেন” অথবা “তাঁর সামনে পাঠের মাধ্যমে তিনি আমাদের জানিয়েছেন”; কবিতায় “তাঁর সামনে পাঠের মাধ্যমে তিনি আমাদের আবৃত্তি শুনিয়েছেন।” ইবনুল মুবারক, ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া আত-তামিমি, আহমদ ইবন হাম্বল, নাসাঈ এবং অন্যরা কোনো শর্ত না জুড়ে “তিনি আমাদের বলেছেন” ও “তিনি আমাদের জানিয়েছেন” বলা নিষিদ্ধ করেছেন; আরেক দল অনুমতি দিয়েছেন। বলা হয়েছে, যুহরি, মালিক, ইবন উয়াইনা, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, বুখারি, মুহাদ্দিসদের বহু ব্যক্তি এবং হিজাজ ও কুফার অধিকাংশ মানুষের মত এটি। তাঁদের কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে “আমি শুনেছি” বলারও অনুমতি দিয়েছেন। আরেক দল “তিনি আমাদের বলেছেন” নিষিদ্ধ করে “তিনি আমাদের জানিয়েছেন” অনুমোদন করেছেন; এটি শাফেয়ি ও তাঁর অনুসারী, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ এবং পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত। বলা হয়েছে, অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতও এটি। ইবন জুরাইজ, আওযাঈ ও ইবন ওয়াহবের নামেও তা বর্ণিত; নাসাঈর নামেও বর্ণিত। শেষ পর্যন্ত হাদিসবিদদের মধ্যে এই রীতিই ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে।

ইজাজা-তে সম্পর্কটি আরও আলাদা: শিক্ষক কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে তাঁর বই অথবা বর্ণনাসমূহ তাঁর সূত্রে বর্ণনা করার অনুমতি দেন। ইবনুস সালাহ এর উদাহরণ দিয়েছেন, “তোমাকে অমুক বই বর্ণনার অনুমতি দিলাম।” এই অনুমতি পাওয়ার ঘটনা এবং অনুমোদিত বইয়ের প্রতিটি হাদিস শিক্ষকের মুখ থেকে শোনার ঘটনা এক নয়। ইজাজা গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে হাদিসবিদ, ফকিহ ও উসুলবিদদের মধ্যে বিরোধ ছিল; ইবনুস সালাহ সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন গ্রহণ করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সব বর্ণনা বিস্তারিতভাবে উচ্চারণ না করেও অনুমতির মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জানানো সম্ভব। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তিই হলো সরাসরি প্রতিটি বক্তব্য শুনে নেওয়ার বিকল্প একটি প্রক্রিয়া। পরবর্তী কোনো গ্রন্থের বর্ণনাধারায় এ ধরনের অনুমতি যুক্ত থাকলে সেই ধারার প্রত্যেকটি নামকে একই ধরনের মুখোমুখি শ্রুতির প্রমাণ বানানো অসঙ্গত। সেখানে অনুমতি প্রদান, কোন বই অনুমোদিত হয়েছিল এবং সেই বইয়ের কোন নুসখা বর্ণনা করা হচ্ছে—এই তথ্যগুলোও প্রমাণের অংশ। [28]

ثم إن الذي استقر عليه العمل ، وقال به جماهير أهل العلم من أهل الحديث ، وغيرهم : القول بتجويز الإجازة ، وإباحة الرواية بها . وفي الاحتجاج لذلك غموض ، ويتجه أن يقول : إذا أجاز له أن يروي عنه مروياته ، وقد أخبره بها جملة ، فهو كما لو أخبره تفصيلا ، وإخباره بها غير متوقف على التصريح نطقا كما في القراءة على الشيخ كما سبق ، وإنما الغرض حصول الإفهام ، والفهم ، وذلك يحصل بالإجازة المفهمة ، والله أعلم . ثم إنه كما تجوز الرواية بالإجازة يجب العمل بالمروي بها ، خلافا لمن قال من أهل الظاهر ، ومن تابعهم : إنه لا يجب العمل به ، وإنه جار مجرى المرسل . وهذا باطل ، لأنه ليس في الإجازة ما يقدح في اتصال المنقول بها ، وفي الثقة به ، والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ:শেষ পর্যন্ত যে রীতির ওপর আমল স্থির হয়েছে এবং হাদিসবিদসহ অধিকাংশ আলেম যে মত গ্রহণ করেছেন, তা হলো ইজাজা বৈধ এবং এর মাধ্যমে বর্ণনা করা অনুমোদিত। এর পক্ষে দলিল উপস্থাপনে কিছু অস্পষ্টতা আছে। যুক্তি এভাবে দেওয়া যেতে পারে: তিনি যখন কাউকে নিজের বর্ণনাসমূহ তাঁর সূত্রে বর্ণনা করার অনুমতি দিলেন, তখন সেগুলো সামগ্রিকভাবে তাকে জানালেন; এটি বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দেওয়ার মতো। এগুলো জানানো স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণের ওপর নির্ভরশীল নয়, যেমন শিক্ষকের সামনে পাঠের ক্ষেত্রে আগে বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো বুঝিয়ে দেওয়া ও বুঝতে পারা; অর্থবোধক ইজাজার মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। আল্লাহই ভালো জানেন। ইজাজার মাধ্যমে বর্ণনা করা যেমন বৈধ, তেমনি এর মাধ্যমে বর্ণিত বিষয়ের ওপর আমল করাও আবশ্যক। যাহিরি ও তাঁদের অনুসারীদের কেউ কেউ বলেছেন, এর ওপর আমল আবশ্যক নয় এবং এটি মুরসালের মতো। এ মত বাতিল; কারণ ইজাজার মাধ্যমে পরিবেশিত বর্ণনার সংযোগ অথবা তার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ করার মতো কিছু ইজাজার মধ্যে নেই। আল্লাহই ভালো জানেন।

উইজাদা-তে কোনো ব্যক্তি রাবীর হাতের লেখা হাদিস পান, অথচ নির্দিষ্ট হাদিসগুলো তাঁর কাছ থেকে শোনেননি এবং সেগুলো বর্ণনার অনুমতিও নেননি। এখানে সৎ বর্ণনাভাষা হলো “অমুকের হাতের লেখায় পেয়েছি” অথবা “অমুকের বইয়ে পড়েছি”। তাদরীবুর রাবী-র আলোচনায় এ সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, যদিও হাতের লেখা শনাক্ত হওয়ার কারণে এতে কিছু সংযোগের ছাপ থাকে; একই জায়গায় সরাসরি “তিনি আমাদের বলেছেন” বা “আমাদের জানিয়েছেন” বলার প্রতিবাদও আছে। নুসখা আসল রচনার সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত না হলে লেখকের নামে নির্দ্বিধায় বক্তব্য আরোপ করার বিরুদ্ধেও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। ফলে নথির অস্তিত্ব, নথির লেখক শনাক্তকরণ, নুসখার নির্ভুলতা এবং নথিতে থাকা বক্তব্যের ঐতিহাসিক সত্যতা—প্রতিটি আলাদা প্রশ্ন। ইজাজা ও উইজাদার পৃথক বিধানই দেখায়, হাদিস সংগ্রহের সব পদ্ধতির সংযোগ ও প্রমাণমূল্য সমান ছিল না। একটি সনদে মানুষের নাম টিকে থাকলেই সেই নামগুলোর মধ্যবর্তী সমস্ত সম্পর্ক শ্রুতি হয়ে যায় না; কোথাও পাঠ যাচাই, কোথাও অনুমতি, কোথাও শুধু একটি লিখিত নথি পাওয়া কাজ করছে। এই পার্থক্য লুকিয়ে পুরো ধারাকে অভিন্ন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের শৃঙ্খল বলা তথ্যের বিকৃতি। [29]

وهي أن يقف على أحاديث بخط راويها لا يرويها الواجد فله أن يقول وجدت أو قرأت بخط فلان أو في كتابه بخطه حدثنا فلان ويسوق الإسناد والمتن ، أو قرأت بخط فلان عن فلان ، هذا الذي استقر عليه العمل قديما وحديثا ، وهو من باب المنقطع ، وفيه شوب اتصال ، وجازف بعضهم فأطلق فيها حدثنا وأخبرنا ، وأنكر عليه . وإذا وجد حديثا في تأليف شخص ، قال : ذكر فلان أو قال فلان أخبرنا فلان وهذا منقطع لا شوب فيه ، وهذا كله إذا وثق بأنه خطه أو كتابه ، وإلا فليقل : بلغني عن فلان ، أو وجدت عنه ونحوه ، أو قرأت في كتاب : أخبرني فلان أنه بخط فلان ، أو ظننت أنه بخط فلان ، أو ذكر كاتبه أنه فلان ، أو تصنيف فلان ، أو قيل بخط أو تصنيف فلان . وإذا نقل من تصنيف فلا يقل : قال فلان إلا إذ وثق بصحة النسخة بمقابلته أو ثقة لها فإن لم يوجد هذا ولا نحوه فليقل بلغني عن فلان أو وجدت في نسخة من كتابه ونحوه . وتسامح أكثر الناس في هذه الأعصار بالجزم في ذلك من غير تحر . والصواب ما ذكرناه ، فإن كان المطالع متقنا لا يخفى عليه غالبا الساقط أو المغير رجونا الجزم له وإلى هذا استروح كثير من المصنفين في نقلهم . أما العمل بالوجادة فنقل عن معظم المحدثين المالكيين ، وغيرهم أنه لا يجوز . وعن الشافعي ونظار أصحابه جوازه ، وقطع بعض المحققين الشافعيين بوجوب العمل بها عند حصول الثقة ، وهذا هو الصحيح الذي لا يتجه هذه الأزمان غيره .

বাংলা অনুবাদ:উইজাদা হলো রাবীর হাতের লেখায় এমন কিছু হাদিস পাওয়া, যেগুলো সন্ধানকারী তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করেন না। তখন তিনি বলতে পারেন, “অমুকের হাতের লেখায় পেয়েছি” অথবা “পড়েছি”, কিংবা “তাঁর নিজের হাতের লেখা বইয়ে পেয়েছি: অমুক আমাদের বলেছেন”—তারপর সনদ ও মতন উল্লেখ করবেন। অথবা বলবেন, “অমুকের হাতের লেখায় অমুক থেকে পড়েছি।” প্রাচীন ও সাম্প্রতিক কালে এই রীতির ওপরই আমল স্থির হয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত, যদিও এতে কিছু সংযোগের ছাপ আছে। কেউ কেউ বেপরোয়াভাবে এতে সরাসরি “তিনি আমাদের বলেছেন” ও “আমাদের জানিয়েছেন” ব্যবহার করেছেন; তাঁদের এই কাজের প্রতিবাদ করা হয়েছে। কারও রচনায় কোনো হাদিস পেলে বলতে হবে, “অমুক উল্লেখ করেছেন” অথবা “অমুক বলেছেন: অমুক আমাদের জানিয়েছেন।” এটি এমন বিচ্ছিন্ন বর্ণনা, যাতে সংযোগের সেই ছাপও নেই। এসব ভাষা তখনই প্রযোজ্য, যখন নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি তাঁর হাতের লেখা অথবা তাঁর বই। তা না হলে বলতে হবে, “অমুকের সূত্রে আমার কাছে পৌঁছেছে”, “তাঁর সূত্রে পেয়েছি” অথবা এ ধরনের ভাষা; কিংবা “একটি বইয়ে পড়েছি, অমুক আমাকে জানিয়েছেন যে এটি অমুকের হাতের লেখা”, “আমার ধারণা এটি অমুকের হাতের লেখা”, “এর লেখক নিজেকে অমুক বলেছেন”, “এটি অমুকের রচনা”, অথবা “বলা হয়েছে এটি অমুকের হাতের লেখা বা রচনা।” কোনো রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিলে নুসখা মিলিয়ে নিজে অথবা কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার নির্ভুলতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত “অমুক বলেছেন” বলা যাবে না। এ ধরনের নিশ্চয়তা না থাকলে বলতে হবে, “অমুকের সূত্রে আমার কাছে পৌঁছেছে”, “তাঁর বইয়ের একটি নুসখায় পেয়েছি” অথবা অনুরূপ ভাষা। বর্তমান কালে অধিকাংশ মানুষ যথাযথ যাচাই ছাড়াই এসব ক্ষেত্রে নিশ্চিত ভাষা ব্যবহারে শিথিলতা দেখান। সঠিক পদ্ধতি হলো আমরা যা বলেছি। পাঠক যদি এমন দক্ষ হন যে বাদ পড়া বা পরিবর্তিত অংশ সাধারণত তাঁর চোখ এড়ায় না, তাহলে তাঁর জন্য নিশ্চিত ভাষা ব্যবহারের অনুমোদন আশা করা যায়; বহু গ্রন্থকার উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে এই অবস্থান গ্রহণ করেছেন। উইজাদার ওপর আমল সম্পর্কে অধিকাংশ মালিকি মুহাদ্দিস ও অন্যদের নামে বর্ণিত হয়েছে যে তা বৈধ নয়। শাফেয়ি এবং তাঁর অনুসারী তাত্ত্বিকদের নামে এর বৈধতা বর্ণিত; কিছু শাফেয়ি গবেষক আস্থা অর্জিত হলে এর ওপর আমল আবশ্যক বলেছেন। এটিই সঠিক মত; বর্তমান সময়ে এর বিকল্প কোনো অবস্থান গ্রহণযোগ্য হয় না।


জাল হাদিস শনাক্তকরণে যুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা: সহিহ হাদিস কেন একই পরীক্ষার ঊর্ধ্বে নয়?

হাদিস-সমালোচনায় সনদের পাশাপাশি মতনের সত্যতাও বিচারের বিষয়। কোনো হাদিসকে জাল, মিথ্যা বা বানানো বলে শনাক্ত করার জন্য মুসলিম হাদিসবিশারদরা ঠিক কোন কোন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন? তাঁদের বিচার কি কেবল বর্ণনাকারীদের নাম, স্মৃতিশক্তি, ধর্মীয় চরিত্র এবং সনদের ধারাবাহিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল? নাকি হাদিসের বক্তব্য বাস্তব অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও প্রতিষ্ঠিত তথ্যের বিরুদ্ধে গেলেও সেটিকে জালিয়াতির লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে? এই বিচারের মাপকাঠি গ্রন্থের মর্যাদার ওপর নির্ভর করে না: বাস্তব অভিজ্ঞতার বিরোধিতাকে যদি কোনো হাদিস প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে স্বীকার করা হয়, তাহলে সেই একই মানদণ্ড সহিহ বুখারি কিংবা সহিহ মুসলিমের বর্ণনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে বাধ্য। কোনো বক্তব্য কোন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে কিংবা কোন মুহাদ্দিস তাকে সহিহ বলেছেন, তা বক্তব্যটির বাস্তব সত্যতা যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না।

ইচ্ছা করে মুহাম্মদের নামে বানানো কথাকে হাদিসশাস্ত্রে মাওজু বা জাল বলা হয়। জইফ, মুনকার, মাতরুক, হাসান ও সহিহ অন্য ধরনের মূল্যায়নের নাম; সবগুলো দিয়ে একই অভিযোগ করা হয় না। তিনটি প্রশ্ন আলাদা রাখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। কথাটি সত্য কি না? মুহাম্মদ সত্যিই কথাটি বলেছিলেন কি না? প্রচারকারী ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেছেন কি না? একজন মানুষ ভুল কথা সত্য মনে করে প্রচার করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বক্তব্য ভুল, কিন্তু তাঁর ইচ্ছাকৃত প্রতারণা আলাদা করে প্রমাণ করতে হবে। আবার একটি সত্য কথাও কেউ নিজের কর্তৃত্ব বাড়াতে মিথ্যা করে মুহাম্মদের নামে চালাতে পারেন। সেখানে বক্তব্য সত্য হলেও পরিচয় জাল। বক্তব্যের সত্যতা, কার কথা বলে তা প্রচারিত হয়েছে এবং প্রচারকারীর উদ্দেশ্য—প্রতিটির জন্য নিজস্ব প্রমাণ লাগে। এই পার্থক্য জালিয়াতি অনুসন্ধানকে থামায় না; অভিযোগটি ঠিক কোথায়, তা পরিষ্কার করে।

প্রাচীন মুহাদ্দিসেরা শুধু নামের তালিকা দেখতেন, বক্তব্যের ভুল দেখতেন না—এমন সার্বিক দাবি গবেষণায় টেকে না। জনাথন এ. সি. ব্রাউনের ২০০৮ সালের প্রবন্ধে তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরি শতকের সমালোচনার উদাহরণ আছে, যেখানে বক্তব্যের বিষয়বস্তু আপত্তির কারণ হয়েছে। তিনি আরও যুক্তি দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে বক্তব্য নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করা হয়েছে সনদ বা রাবীর সমালোচনার ভাষায়। ফলে শুধু রাবী-সমালোচনার বাক্য দেখলে তার পেছনে পাঠের কোন সমস্যাটি ছিল, তা আড়াল হতে পারে। আসল প্রশ্ন তাই বিষয়বস্তু বিচার করা হয়েছিল কি না-তে শেষ হয় না। কোন বক্তব্যকে অসম্ভব বলা হলো, কী প্রমাণে বলা হলো এবং সেই আপত্তির ভিত্তি বাস্তব তথ্য, নাকি আগে থেকে গৃহীত ধর্মীয় বিশ্বাস—সেটিও পরীক্ষা করতে হয়। [30]

জনাথন এ. সি. ব্রাউন, গবেষণার সারসংক্ষেপ

critics engaged in matn criticism far more often than appears to have been the case

বাংলা অনুবাদ:

সমালোচকেরা আপাতদৃষ্টিতে যতটা মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষেত্রে মতন বা বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।


হাদিস জালিয়াতি শনাক্ত করার ঐতিহাসিক পদ্ধতি

মুসলিম হাদিসবিশারদরা জাল বর্ণনা শনাক্ত করতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ব্যবহার করেছেন। কোনো বর্ণনাকারী নিজেই হাদিস বানানোর কথা স্বীকার করেছেন বলে বিবরণ পাওয়া গেলে তা জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তি এমন একজন শিক্ষকের কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শোনার দাবি করলে, যাঁর মৃত্যুর সময় সেই ব্যক্তির জন্মই হয়নি, সেখানে কালানুক্রমিক অসম্ভবতা দেখা দেয়। আবার কোনো বক্তব্য প্রথম দিকের পরিচিত বর্ণনাগুলোতে অনুপস্থিত অথচ পরবর্তী সময়ে নতুন শব্দ, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি অথবা রাজনৈতিক সুবিধাজনক অংশসহ হাজির হলে পাঠের পরিবর্তন ও উৎসের ইতিহাস পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন বর্ণনার তুলনা, বর্ণনাকারীদের পরিচিত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থ এবং বক্তব্যের অভ্যন্তরীণ অসংগতিও জালিয়াতি শনাক্তকরণের আলোচনায় এসেছে।

এসব পদ্ধতির মধ্যে কয়েকটি সাধারণ ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন, কোনো দাবির সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত সময়রেখার বিরোধ, স্বাধীন সাক্ষ্যের অনুপস্থিতি, বিভিন্ন পাঠের মধ্যে পরবর্তী সংযোজনের প্রমাণ কিংবা জালিয়াতির নির্ভরযোগ্য স্বীকারোক্তি। কিন্তু অন্য কিছু মানদণ্ড ধর্মীয় পূর্বধারণার ওপর নির্ভরশীল। কোনো বক্তব্য কোরআন বা প্রচলিত ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে মেলে না বলেই সেটি ইতিহাসে বলা হয়নি, এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয় না। একইভাবে বর্ণনাকারীকে ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ অথবা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি মনে করা হলেও তাঁর প্রতিটি বক্তব্য সত্য হয়ে যায় না। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে আসল প্রশ্ন হচ্ছে, কোন প্রমাণ থেকে কোন সিদ্ধান্ত যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে।

হাদিস জালিয়াতির একটি আলোচিত উদাহরণ আবু ইসমা নূহ ইবন আবি মারইয়ামের নামে সংরক্ষিত স্বীকারোক্তি। কোরআনের বিভিন্ন সূরার বিশেষ ফজিলত নিয়ে তাঁর বর্ণনাগুলো কোথা থেকে এসেছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিজেই সেগুলো তৈরি করার কথা বলেছেন বলে আল-হাকিমের সূত্রে একটি বিবরণ পাওয়া যায়। বিবরণ অনুযায়ী, মানুষ কোরআন ছেড়ে আবু হানিফার ফিকহ এবং ইবন ইসহাকের যুদ্ধবৃত্তান্তে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মানুষকে কোরআনের দিকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে তিনি এসব বর্ণনা বানিয়েছিলেন [31]

মূল আরবি—আবু ইসমা নূহ ইবন আবি মারইয়ামের নামে সংরক্ষিত বক্তব্য:
قيل لأبي عصمة نوح بن أبي مريم: من أين لك عن عكرمة عن ابن عباس في فضائل القرآن سورة سورة، وليس عند أصحاب عكرمة هذا؟ فقال: إني رأيت الناس قد أعرضوا عن القرآن، واشتغلوا بفقه أبي حنيفة، ومغازي ابن إسحاق، فوضعت هذا الحديث حسبة.

বাংলা অনুবাদ:
আবু ইসমা নূহ ইবন আবি মারইয়ামকে জিজ্ঞেস করা হলো: “কোরআনের প্রতিটি সুরার ফজিলত সম্পর্কে ইকরিমার সূত্রে ইবন আব্বাস থেকে তুমি এই বর্ণনাগুলো কোথায় পেলে? ইকরিমার অন্য ছাত্রদের কাছে তো এসব নেই।” তিনি বললেন: “আমি দেখলাম মানুষ কোরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং আবু হানিফার ফিকহ ও ইবন ইসহাকের যুদ্ধবিষয়ক বর্ণনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই আমি সওয়াবের উদ্দেশ্যে এই হাদিসটি বানিয়েছি।”

এই স্বীকারোক্তির বিবরণে ধর্মীয় উৎসাহ সৃষ্টি আর মুহাম্মদের নামে বক্তব্য বানানোর যোগসূত্র সরাসরি উপস্থিত। ধর্মীয় উদ্দেশ্য এখানে জালিয়াতির বিপরীত নয়; জালিয়াতির চালিকাশক্তি। একটি বর্ণনা তৈরি করার পেছনে ব্যক্তিগত অর্থলাভ, রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের উদ্দেশ্য থাকতেই হবে, এমন নয়। ধর্মীয় উৎসাহ সৃষ্টি, কোনো বিশ্বাসকে জনপ্রিয় করা অথবা নিজের সম্প্রদায়ের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেও বক্তব্য তৈরি হতে পারে। ফলে কোনো হাদিসের বক্তব্য ধর্মীয়ভাবে আকর্ষণীয়, নৈতিকভাবে প্রশংসনীয় অথবা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হওয়া তার প্রকৃত উৎসের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ নয়।


ইবনুল কাইয়িম: সনদের বাইরেও বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে জাল হাদিস শনাক্তকরণ

হাদিসের বক্তব্যকে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পাওয়া যায় ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যার আল-মানার আল-মুনিফ ফিস সহিহ ওয়াদ-দয়িফ গ্রন্থে। ইবনুল কাইয়িম ছিলেন অষ্টম হিজরি শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী হাম্বলি আলেম। তাঁর গ্রন্থে একটি প্রশ্নের আলোচনা রয়েছে: সনদ পরীক্ষা না করেও কি কোনো হাদিসের জালিয়াতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব? উত্তরে তিনি বক্তব্যের বিষয়বস্তু থেকে জালিয়াতির লক্ষণ শনাক্ত করার একাধিক পদ্ধতি আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি, অস্বাভাবিক বা হাস্যকর বক্তব্য, বাস্তব অভিজ্ঞতার বিরোধিতা এবং অন্যান্য বর্ণনার সঙ্গে অসংগতি।

ইবনুল কাইয়িম সংশ্লিষ্ট অংশের শিরোনামে সরাসরি ব্যবহার করেছেন বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বক্তব্য মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়ার ধারণা [32]

মূল আরবি—ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার আল-মুনিফ:
ومنها تكذيب الحس له
বাংলা অনুবাদ: জালিয়াতি শনাক্ত করার লক্ষণগুলোর একটি হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা দ্বারা বক্তব্যটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়া।

এই নীতির তাৎপর্য গভীর। এখানে বর্ণনাটির সনদে কার নাম আছে, কোনো মুহাদ্দিস সেই সনদ সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন কিংবা বক্তব্যটি ধর্মীয়ভাবে কতটা জনপ্রিয়—সেগুলোর বাইরে গিয়ে সরাসরি বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্পর্ক পরীক্ষা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সনদ সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক মূল্যায়ন থাকলেও বক্তব্যের বাস্তব অসংগতি হাদিসটি প্রত্যাখ্যানের কারণ হতে পারে। ইবনুল কাইয়িম কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন।


হাঁচি দিলে বক্তব্য সত্য: বাস্তব অভিজ্ঞতার পরীক্ষায় প্রত্যাখ্যান

একটি হাদিসে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যক্তি কথা বলার সময় হাঁচি দিলে সেই বক্তব্য সত্য বলে গণ্য হবে। হাঁচিকে বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণের লক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ইবনুল কাইয়িম এই বর্ণনার আলোচনা করতে গিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু মানুষ এর সনদকেও সহিহ বলেছেন; কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা হাদিসটি জাল হওয়ার সাক্ষ্য দেয়। কারণ মানুষ সত্য বলার সময় যেমন হাঁচি দেয়, মিথ্যা বলার সময়ও হাঁচি দিতে পারে। [21] [33]

মূল আরবি—ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর (IslamQA), ফতোয়া ১৯৪৭০৫: حديث : ( مَن حدّث حديثا فعُطس عنده فهو حق ) حديث باطل
বাংলা শিরোনাম: ‘কেউ কোনো কথা বলার সময় হাঁচি দিলে সেই কথাটি সত্য’—এই হাদিসটি বাতিল।
প্রকাশের তারিখ: ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি, ২৯ মার্চ ২০১৩।

প্রশ্ন—মূল আরবি:
هل هناك حديث يدل على أن من كان يتكلم ، وعطس في أثناء كلامه طفل : فهو يتكلم حقا ، أو ما شابه ذلك؟
বাংলা অনুবাদ: এমন কোনো হাদিস আছে কি, যেখানে বলা হয়েছে, কেউ কথা বলার সময় একটি শিশু হাঁচি দিলে ওই ব্যক্তির কথাটি সত্য হয়, অথবা এ ধরনের কোনো বক্তব্য রয়েছে?

উত্তর—মূল আরবি:
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
বাংলা অনুবাদ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসুলের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক। অতঃপর:

روى أبو يعلى الموصلي في “مسنده” (6352) ، وأبو القاسم الطبراني في “المعجم الأوسط” (6509) ، وتمام الرازي في “الفوائد” (1005) ، وابن عدي في “الكامل” (6/402) ، والبيهقي في “الشعب” (9365) كلهم من طريق بقية بن الوليد عن معاوية بن يحيى عن أبي الزناد عن الأعرج عن أبي هريرة قال : قال رسول الله ـ صلى الله عليه و سلم : ( من حدث حديثا فعطس عنده فهو حق ) .
বাংলা অনুবাদ: আবু ইয়ালা আল-মাওসিলি তাঁর মুসনাদ (৬৩৫২), আবুল কাসিম আত-তাবারানি তাঁর আল-মুজাম আল-আওসাত (৬৫০৯), তাম্মাম আর-রাযি তাঁর আল-ফাওয়ায়িদ (১০০৫), ইবন আদি তাঁর আল-কামিল (৬/৪০২) এবং আল-বায়হাকি তাঁর শুআবুল ঈমান (৯৩৬৫) গ্রন্থে বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদ থেকে, তিনি মুয়াবিয়া ইবন ইয়াহইয়া থেকে, তিনি আবু যিনাদ থেকে, তিনি আল-আরাজ থেকে, তিনি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “কেউ কোনো কথা বলার সময় সেখানে হাঁচি হলে সেই কথাটি সত্য।”

وقال الطبراني عقبه : ” لم يرو هذا الحديث عن أبي الزناد إلا معاوية بن يحيى ، تفرد به بقية ، ولا يروى عن رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا بهذا الإسناد ” انتهى.
বাংলা অনুবাদ: আত-তাবারানি এরপর বলেছেন: “আবু যিনাদ থেকে মুয়াবিয়া ইবন ইয়াহইয়া ছাড়া কেউ এই হাদিস বর্ণনা করেননি। বাকিয়্যাহ এককভাবে এটি বর্ণনা করেছেন। এই সনদ ছাড়া আল্লাহর রাসুল থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়নি।” উদ্ধৃতি সমাপ্ত।

وهذا إسناد واه ؛ معاوية بن يحيى ، هو الأطرابلسي ، له مناكير ، انظر : “الكامل” لابن عدي (6/402-403) ، “ميزان الاعتدال” (4/139) .
বাংলা অনুবাদ: এই সনদটি অত্যন্ত দুর্বল। মুয়াবিয়া ইবন ইয়াহইয়া হচ্ছেন আল-আত্রাবুলুসি; তাঁর কিছু অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা রয়েছে। দেখুন: ইবন আদির আল-কামিল (৬/৪০২–৪০৩) এবং মিযানুল ই‘তিদাল (৪/১৩৯)।

وبقية بن الوليد مدلس ، وربما دلس عن الكذابين والمجهولين . ينظر : “تهذيب التهذيب” (1 /417-419) .
বাংলা অনুবাদ: বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদ ছিলেন একজন মুদাল্লিস; কখনো তিনি মিথ্যাবাদী ও অজ্ঞাতপরিচয় বর্ণনাকারীদের কাছ থেকে বর্ণনা করার সময় মধ্যবর্তী সূত্র গোপন করতেন। দেখুন: তাহযিবুত তাহযিব (১/৪১৭–৪১৯)।

এই হাদিস সম্পর্কে আলেমদের মূল্যায়ন—মূল আরবি:
قال أبو حاتم الرازي : هذا حديث كذب . “علل الحديث” (2 /342) .
বাংলা অনুবাদ: আবু হাতিম আর-রাযি বলেছেন: “এটি একটি মিথ্যা হাদিস।” উৎস: ইলালুল হাদিস (২/৩৪২)।

وقال البيهقي : هو منكر عن أبي الزناد . “شعب الإيمان” (7 /33) .
বাংলা অনুবাদ: আল-বায়হাকি বলেছেন: “আবু যিনাদ থেকে বর্ণিত এটি একটি মুনকার হাদিস।” উৎস: শুআবুল ঈমান (৭/৩৩)।

وقال ابن الجوزي : هذا حديث باطل ، تفرد به معاوية بن يحيى. “الموضوعات” لابن الجوزي (3 /77) .
বাংলা অনুবাদ: ইবনুল জাওযি বলেছেন: “এটি একটি বাতিল হাদিস। মুয়াবিয়া ইবন ইয়াহইয়া এককভাবে এটি বর্ণনা করেছেন।” উৎস: আল-মাওদুআত (৩/৭৭)।

وقال البوصيري : هذا إسناد ضعيف , لتدليس بقية بن الوليد. “إتحاف الخيرة المهرة” (6 /143) .
বাংলা অনুবাদ: আল-বুসিরি বলেছেন: “বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদের তাদলিসের কারণে এই সনদটি দুর্বল।” উৎস: ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারাহ (৬/১৪৩)।

وقد رواه عبد الله بن جعفر المدينى ، عن أبى الزناد فقال فيه : ( إذا عطس أحدكم عند حديث كان حقا ) . رواه ابن الجوزي في : “الموضوعات” (3 /77) .
বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবন জাফর আল-মাদিনি আবু যিনাদ থেকে আরেকটি ভাষায় বর্ণনা করেছেন: “তোমাদের কেউ কোনো কথার সময় হাঁচি দিলে সেই কথাটি সত্য।” ইবনুল জাওযি তাঁর আল-মাওদুআত (৩/৭৭) গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন।

وهذا إسناد ضعيف جدا ، عبد الله بن جعفر ، هو والد الإمام الحافظ علي بن المديني شيخ البخاري ، وكان متروك الحديث ، قال ابن معين : ليس بشيء ، وقال عمرو بن علي : ضعيف الحديث ، وقال أبو حاتم : منكر الحديث جدا يحدث عن الثقات بالمناكير .. ” . وينظر : “تهذيب التهذيب” (5 /153) .
বাংলা অনুবাদ: এই সনদটিও অত্যন্ত দুর্বল। আবদুল্লাহ ইবন জাফর ছিলেন ইমাম ও হাদিসবিশারদ আলি ইবনুল মাদিনির পিতা; আলি ইবনুল মাদিনি ছিলেন বুখারির শিক্ষক। আবদুল্লাহ ইবন জাফরের হাদিস বর্জিত হয়েছিল। ইবন মাঈন বলেছেন: “তিনি কিছুই নন।” আমর ইবন আলি বলেছেন: “তিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল।” আবু হাতিম বলেছেন: “তাঁর হাদিস অত্যন্ত মুনকার; তিনি বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের সূত্রে অগ্রহণযোগ্য হাদিস বর্ণনা করেন।” দেখুন: তাহযিবুত তাহযিব (৫/১৫৩)।

والحديث أورده الألباني في “الضعيفة” (136) وقال : ” باطل ” .
বাংলা অনুবাদ: আলবানি তাঁর সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফাহ (১৩৬) গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করে বলেছেন: “বাতিল।”

আরেকটি বর্ণনাপথ—মূল আরবি:
وللحديث طريق أخرى ، فقال الطبراني في “الأوسط” (3360 ) حدثنا جعفر قال نا إبراهيم بن عبد العزيز بن مروان بن شجاع الحراني بالرقة قال نا الخضر بن محمد بن شجاع قال نا عفيف بن سالم عن عمارة بن زاذان عن ثابت عن أنس قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ( أصدق الحديث ما عطس عنده ) ثم قال الطبراني : ” لم يرو هذا الحديث عن ثابت إلا عمارة ، تفرد به الخضر ” انتهى .
বাংলা অনুবাদ: এই হাদিসের আরেকটি বর্ণনাপথ রয়েছে। আত-তাবারানি তাঁর আল-মুজাম আল-আওসাত (৩৩৬০) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: জাফর আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, রাক্কায় ইবরাহিম ইবন আবদুল আজিজ ইবন মারওয়ান ইবন শুজা আল-হাররানি আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, আল-খিদর ইবন মুহাম্মদ ইবন শুজা আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, আফিফ ইবন সালিম, উমারা ইবন যাযান থেকে, তিনি সাবিত থেকে, তিনি আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “সবচেয়ে সত্য বক্তব্য হলো সেটি, যার সময় হাঁচি দেওয়া হয়।” এরপর আত-তাবারানি বলেছেন: “সাবিত থেকে উমারা ছাড়া কেউ এই হাদিস বর্ণনা করেননি এবং আল-খিদর এককভাবে এটি বর্ণনা করেছেন।” উদ্ধৃতি সমাপ্ত।

وهذا إسناد ضعيف جدا ، عمارة بن زاذان قال الإمام أحمد : يروي عن ثابت عن أنس أحاديث مناكير . وضعفه الدارقطني وابن عمار والساجي وغيرهم . انظر : “تهذيب التهذيب” (7 /365) .
বাংলা অনুবাদ: এই সনদটিও অত্যন্ত দুর্বল। উমারা ইবন যাযান সম্পর্কে ইমাম আহমদ বলেছেন: “তিনি সাবিতের সূত্রে আনাস থেকে মুনকার হাদিস বর্ণনা করেন।” আদ-দারাকুতনি, ইবন আম্মার, আস-সাজি এবং অন্যরাও তাঁকে দুর্বল বলেছেন। দেখুন: তাহযিবুত তাহযিব (৭/৩৬৫)।

وأورده الألباني في “الضعيفة” (137) وقال : ” باطل ” .
বাংলা অনুবাদ: আলবানি তাঁর আদ-দয়িফাহ (১৩৭) গ্রন্থে এই বর্ণনাটিও উল্লেখ করে বলেছেন: “বাতিল।”

فهذا الحديث من جهة السند حديث ضعيف جدا .
বাংলা অনুবাদ: সুতরাং সনদের বিচারে এই হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল।

ইবনুল কাইয়িমের বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক মূল্যায়ন—মূল আরবি:
وأما من جهة المتن : فهو متن باطل منكر ، قال ابن القيم رحمه الله : ” وهذا الحديث ، وإن صحح بعض الناس سنده ، فالحس يشهد بوضعه ، لأنا نشاهد العطاسَ ، والكذبُ يعمل عمله ، ولو عطس مئة ألف رجل عند حديث يروى عن النبي صلى الله عليه وسلم : لم يحكم بصحته بالعطاس ، ولو عطسوا عنده بشهادة رجل ، لم يحكم بصدقه ” انتهى .
বাংলা অনুবাদ: আর মূল বক্তব্যের বিচারে এটি একটি বাতিল ও মুনকার বক্তব্য। ইবনুল কাইয়িম বলেছেন: “এই হাদিসটির সনদকে কিছু মানুষ সহিহ বলেছেন বটে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতাই সাক্ষ্য দেয় যে এটি জাল। কারণ আমরা দেখি, মানুষ হাঁচি দেয় অথচ মিথ্যাও তার নিজস্ব কাজ করে যায়। এমনকি এক লাখ মানুষও যদি নবীর নামে বর্ণিত কোনো হাদিসের সময় হাঁচি দেয়, শুধু সেই হাঁচির কারণে হাদিসটিকে সহিহ বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। একইভাবে কোনো ব্যক্তির সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তারা হাঁচি দিলেও শুধু সেই কারণে তার সাক্ষ্যকে সত্য বলে গণ্য করা যাবে না।”
দেখুন: সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফাহ (১/২৬৪)।

أما زيادة الطفل أو الصبي في الحديث ، فلا نعلم لها أصلا .
বাংলা অনুবাদ: আর হাদিসটিতে শিশু বা বালকের বিষয়টি অতিরিক্তভাবে যুক্ত করার কোনো ভিত্তি আমাদের জানা নেই।

والخلاصة : أن هذا الحديث لا يصح سندا ولا متنا ، بل هو حديث باطل . والله تعالى أعلم .
বাংলা অনুবাদ: সারকথা হলো, এই হাদিসটি সনদ ও মূল বক্তব্য—কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং এটি একটি বাতিল হাদিস। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।

মূল উৎস: ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর (IslamQA), ফতোয়া নম্বর ১৯৪৭০৫, প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০১৩।
[34]

হাঁচির সঙ্গে বক্তব্যের সত্যতার সম্পর্ক স্থাপন করার দাবিটি কার্যকারণের প্রমাণহীন দাবি। হাঁচি একটি শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া; কোনো বক্তব্যের সত্য-মিথ্যার সঙ্গে তার অপরিহার্য সম্পর্ক নেই। একজন সাক্ষী আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার সময় হাঁচি দিলেও তাঁর সাক্ষ্য সত্য হয়ে যায় না। একজন বর্ণনাকারী মুহাম্মদের নামে বানানো বক্তব্য বলতে গিয়ে হাঁচি দিলেও সেই বক্তব্য মুহাম্মদের প্রকৃত উক্তিতে পরিণত হয় না। এখানে সত্যতা নির্ধারিত হচ্ছে তথ্য, সাক্ষ্য ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ দিয়ে; বক্তব্য দেওয়ার সময় ঘটে যাওয়া একটি শারীরিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবনুল কাইয়িম সনদের ইতিবাচক মূল্যায়নকেও বক্তব্যের বাস্তব সত্যতার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি বাস্তব পর্যবেক্ষণকে এমন একটি স্বতন্ত্র বিচারের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যার সাহায্যে কোনো বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এই পদ্ধতি গ্রহণ করলে হাদিসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরীক্ষাযোগ্য দাবিগুলোকে সনদগত মর্যাদার ঊর্ধ্বে রাখার সুযোগ থাকে না।


বেগুন, মসুর ডাল ও আখরোট: খাদ্যদ্রব্যের অলৌকিক গুণসংক্রান্ত জাল বর্ণনা

ইবনুল কাইয়িম আরও কয়েকটি খাদ্যসংক্রান্ত বর্ণনাকে জাল বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বেগুন যে উদ্দেশ্যে খাওয়া হবে, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হবে—এমন বক্তব্য। আবার আরেকটি বর্ণনায় বেগুনকে সব রোগের নিরাময় বলা হয়েছে। ইবনুল কাইয়িম এসব দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন, দরিদ্র ব্যক্তি ধনী হওয়ার উদ্দেশ্যে বেগুন খেলে সে ধনী হয়ে যাবে না; অজ্ঞ ব্যক্তি জ্ঞানী হওয়ার উদ্দেশ্যে বেগুন খেলে তার জ্ঞান অর্জিত হবে না। একইভাবে সব রোগ সারানোর দাবি খাদ্যটির প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। [21] [35]

মূল আরবি—ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার আল-মুনিফ: বেগুনসংক্রান্ত জাল বর্ণনার সমালোচনা:
ومنها تكذيب الحس له كحديث الباذنجان لما أكل له والباذنجان شفاء من كل داء قبح الله واضعهما فإن هذا لو قاله بعض جهلة الأطباء لسخر الناس منه ولو أكل الباذنجان للحمى والسوداء الغالبة وكثير من الأمراض لم يزدها إلا شدة ولو أكله فقير ليستغني لم يفده غنى أو جاهل ليتعلم لم يفده العلم

বাংলা অনুবাদ:
জাল হওয়ার লক্ষণগুলোর একটি হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বর্ণনাটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়া। যেমন এই বর্ণনা: ‘বেগুন যে উদ্দেশ্যে খাওয়া হবে, সেই উদ্দেশ্যেই কার্যকর হবে।’ আর এই বর্ণনা: ‘বেগুন প্রত্যেক রোগের নিরাময়।’ আল্লাহ এই দুটির রচয়িতাকে লাঞ্ছিত করুন। এমন কথা কোনো অজ্ঞ চিকিৎসক বললেও মানুষ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। জ্বর, কালোপিত্তের আধিক্য এবং আরও অনেক রোগের জন্য বেগুন খেলে সেই রোগের তীব্রতাই বাড়বে। কোনো দরিদ্র ব্যক্তি ধনী হওয়ার জন্য বেগুন খেলে তা তাকে সম্পদ দেবে না; কোনো অজ্ঞ ব্যক্তি শেখার জন্য খেলে তা তাকে জ্ঞান দেবে না।

মসুর ডাল সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনায় দাবি করা হয়েছিল, এটি বরকতময়, হৃদয় কোমল করে, চোখে অশ্রু আনে এবং সত্তরজন নবী একে পবিত্র করেছেন। ইবনুল কাইয়িম এই বর্ণনাও প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের নামে সংরক্ষিত আপত্তি উল্লেখ করেছেন। একই গ্রন্থে আখরোটকে ওষুধ, পনিরকে রোগ এবং উভয়কে একত্রে খেলে নিরাময় হওয়ার অদ্ভুত দাবিও জাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব বর্ণনার বক্তব্যের মধ্যে সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের ওপর এমন নিশ্চিত চিকিৎসাগত বা অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করা হয়েছে, যার পক্ষে যথাযথ প্রমাণ নেই। [36]

ইবনুল কাইয়িমের নিজের চিকিৎসাবিষয়ক ধারণার সত্যতাও নির্ভর করে বাস্তব প্রমাণের ওপর। যেমন, মসুর ডাল শরীরে ক্ষতিকর রস সৃষ্টি করে বলে তিনি যে পুরোনো চিকিৎসাধারণা ব্যবহার করেছেন, তা আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর কোনো বক্তব্য শুধু তিনি একজন বিখ্যাত আলেম ছিলেন বলে সত্য হয়ে যায় না। তাঁর ক্ষেত্রেও প্রমাণের মাপকাঠি একই: ইবনুল কাইয়িমের যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তাঁর মর্যাদার ওপর নয়, যুক্তিটির প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে। বেগুন খেয়ে ধনী হওয়ার দাবির অসংগতি যেমন যাচাইযোগ্য, মসুর ডালের কথিত ক্ষতিকর প্রভাবের দাবিও তেমনি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইযোগ্য।

হাঁচি, বেগুন ও মসুর ডাল নিয়ে এসব দাবির বিচার করতে গিয়ে বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পরীক্ষা করা হয়েছে। কোনো খাদ্য সব রোগ সারায় বা কোনো ঘটনার সঙ্গে অলৌকিক ফল অবধারিতভাবে ঘটে—এমন দাবি শুধু বিশ্বস্ত মানুষের মুখে শোনা গেলেই সত্য হয় না; দাবিটির নিজের প্রমাণ লাগে। ভুল ধরা পড়লে তার প্রচারের ইতিহাসও প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাধারণ খাবারের সঙ্গে নবীর নাম ও অলৌকিক চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি জুড়ে দিলে খাবারটির পাশাপাশি ধর্মীয় কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করা হয়। কথাটি প্রথম কোথায় দেখা যায়, পুরোনো পাঠে এই প্রতিশ্রুতি ছিল কি না, পরে কী যোগ হয়েছে এবং প্রচারে কার বিশ্বাস বা স্বার্থ শক্তিশালী হয়েছে—এসব মিলিয়ে জালিয়াতির ব্যাখ্যা যাচাই করা যায়। জালকারী নিজে স্বীকার না করলেও তাঁর তৈরি কথার ভাষা, বয়স, অসংগতি ও প্রচারের ধরন থেকে প্রতারণা শনাক্ত হতে পারে।


একই বাস্তব পরীক্ষায় সহিহ বুখারির হাদিসগুলো

এবার একই নীতি সহিহ বুখারির কয়েকটি বর্ণনার ওপর প্রয়োগ করা যাক। এখানে প্রশ্ন কোনো মুহাদ্দিস বর্ণনাগুলোকে সহিহ বলেছেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, এসব বর্ণনার মধ্যে যে বাস্তব জগৎ সম্পর্কে নির্দিষ্ট দাবি রয়েছে, সেগুলোর পক্ষে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কী বলে। হাঁচি দিয়ে বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণের দাবি যদি বাস্তব অভিজ্ঞতার পরীক্ষায় প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে কোনো বীজ দিয়ে সব রোগ সারানো, নির্দিষ্ট সংখ্যক খেজুর দিয়ে বিষক্রিয়া প্রতিরোধ কিংবা মাছির ডানায় প্রতিষেধকের অবস্থান সম্পর্কে দাবিগুলোও একই পরীক্ষার আওতায় আসবে।


কালোজিরায় মৃত্যু ছাড়া সব রোগের নিরাময়: সহিহ বুখারি ৫৬৮৮

সহিহ বুখারির ৫৬৮৮ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রার সূত্রে মুহাম্মদের নামে কালোজিরা সম্পর্কে একটি সর্বজনীন চিকিৎসাগত দাবি সংরক্ষিত হয়েছে [37]

মূল আরবি—সহিহ বুখারি ৫৬৮৮:
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ ، عَنْ عُقَيْلٍ ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ ، وَسَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ، أَخْبَرَهُمَا أَنَّهُ، سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ فِي الْحَبَّةِ السَّوْدَاءِ شِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ إِلاَّ السَّامَ ‏” ‏‏.‏ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَالسَّامُ الْمَوْتُ، وَالْحَبَّةُ السَّوْدَاءُ الشُّونِيزُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইবন বুকাইর আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আল-লাইস আমাদের বর্ণনা করেছেন, উকাইলের সূত্রে, ইবন শিহাব থেকে। ইবন শিহাব বলেন, আবু সালামা ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব আমাকে জানিয়েছেন যে আবু হুরায়রা তাঁদের বলেছেন, তিনি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছেন: “কালোজিরার মধ্যে মৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক রোগের নিরাময় রয়েছে।” ইবন শিহাব বলেন, ‘সাম’ অর্থ মৃত্যু এবং ‘হাব্বাতুস সাওদা’ হলো শূনিজ।

এই বক্তব্যের সাধারণ অর্থে কালোজিরার নিরাময়ক্ষমতাকে সব রোগের জন্য প্রযোজ্য বলা হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কোনো খাদ্যদ্রব্য বা উদ্ভিদের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রিত গবেষণা, উপযুক্ত তুলনামূলক পরীক্ষা, রোগভিত্তিক ফলাফল এবং পুনরুৎপাদনযোগ্য প্রমাণের সাহায্যে। কালোজিরার উপাদান Nigella sativa নিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসাগত গবেষণা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকার পাওয়া গেছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু রোগে সম্ভাব্য উপকার পাওয়া আর মৃত্যু ছাড়া সব রোগের নিরাময় প্রমাণিত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি।

২০২৩ সালে Frontiers in Nutrition সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কালোজিরা নিয়ে প্রকাশিত ২০টি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও সম্মিলিত গবেষণার বিশ্লেষণ পরীক্ষা করা হয়। এতে অন্তর্ভুক্ত ১১০টি ফলাফলসূচকের মধ্যে মাত্র পাঁচটির প্রমাণের মান মাঝারি, ১৭টির নিম্ন এবং ৮৮টির অত্যন্ত নিম্ন পাওয়া যায়। গবেষকেরা উপসংহারে বলেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কালোজিরার সম্ভাব্য উপকার থাকলেও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও উন্নতমানের বৃহৎ নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন। অর্থাৎ কালোজিরার কিছু নির্দিষ্ট সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা রয়েছে, কিন্তু সব রোগ নিরাময়ের সর্বজনীন দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [38]

এখানে যুক্তিগত প্রশ্নটি স্পষ্ট। বেগুন দিয়ে সব রোগ সারানোর বক্তব্যকে বাস্তবতার বিরুদ্ধে যাওয়ার কারণে জাল বলা হলে, কালোজিরা দিয়ে মৃত্যু ছাড়া সব রোগ সারানোর দাবিকে শুধু সহিহ বুখারিতে সংকলিত হওয়ার কারণে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বলা যাবে কেন? দুটি দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একই পরীক্ষামূলক নীতি প্রযোজ্য হবে। একটির উৎস দুর্বল এবং অন্যটির সনদ সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়া দিয়ে কোনো উদ্ভিদের প্রকৃত চিকিৎসাগত ক্ষমতা নির্ধারিত হয় না।


সাতটি আজওয়া খেজুর এবং বিষক্রিয়া প্রতিরোধ: সহিহ বুখারি ৫৪৪৫

সহিহ বুখারির ৫৪৪৫ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদের নামে আরও একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত দাবি সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খেলে সেদিন বিষ অথবা জাদু ক্ষতি করতে পারবে না [39]

মূল আরবি—সহিহ বুখারি ৫৪৪৫:
حَدَّثَنَا جُمْعَةُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ، حَدَّثَنَا مَرْوَانُ ، أَخْبَرَنَا هَاشِمُ بْنُ هَاشِمٍ ، أَخْبَرَنَا عَامِرُ بْنُ سَعْدٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ مَنْ تَصَبَّحَ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعَ تَمَرَاتٍ عَجْوَةً لَمْ يَضُرُّهُ فِي ذَلِكَ الْيَوْمِ سُمٌّ وَلاَ سِحْرٌ ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
জুমআ ইবন আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, মারওয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাশিম ইবন হাশিম আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, আমির ইবন সা‘দ তাঁর পিতার সূত্রে আমাদের জানিয়েছেন। তাঁর পিতা বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন বিষ কিংবা জাদু তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”

এখানে বিষক্রিয়া প্রতিরোধের একটি পরীক্ষাযোগ্য দাবি রয়েছে। বাস্তব জগতে বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক গঠন, শরীরে প্রবেশের পথ, কার্যপ্রণালি এবং বিষক্রিয়ার মাত্রা ভিন্ন। একটি নির্দিষ্ট খাদ্য খাওয়ার ফলে এসব ভিন্নধর্মী বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে একই দিনে সর্বজনীন সুরক্ষা তৈরি হয়—এমন দাবির পক্ষে স্বতন্ত্র পরীক্ষামূলক প্রমাণ প্রয়োজন। সাতটি আজওয়া খেজুর খাওয়ার মাধ্যমে সব ধরনের বিষের ক্ষতি প্রতিরোধ করা যায়, এমন চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয়। অন্যদিকে জাদুর ক্ষতি প্রতিরোধের দাবিকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার আওতায় আনতে হলে আগে জাদুর অস্তিত্ব, কার্যপ্রণালি এবং পরিমাপযোগ্য প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এখানেও সনদের গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে বিষক্রিয়ার বাস্তব বিজ্ঞান নির্ধারিত হয় না। বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে একটি খাদ্য কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করতে প্রয়োজন রাসায়নিক, বিষবৈজ্ঞানিক এবং চিকিৎসাগত প্রমাণ। কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় গ্রন্থে এই বক্তব্য সংকলন করেছেন বলে সেটি ওষুধের কার্যকারিতার পরীক্ষার বিকল্প হতে পারে না। যে মানদণ্ডে বেগুনের অলৌকিক গুণের বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত হয়, সেই একই মানদণ্ডে আজওয়া খেজুরের বিষপ্রতিরোধী ক্ষমতার দাবিও প্রমাণের মুখোমুখি হবে।


মাছির এক ডানায় রোগ, অন্য ডানায় প্রতিষেধক: সহিহ বুখারি ৩৩২০

সহিহ বুখারির ৩৩২০ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদের নামে বলা হয়েছে, পানীয়তে মাছি পড়ে গেলে সেটিকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে তারপর তুলে ফেলতে হবে। কারণ মাছির এক ডানায় রোগ এবং অন্য ডানায় সেই রোগের প্রতিষেধক রয়েছে [40]

মূল আরবি—সহিহ বুখারি ৩৩২০:
حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ مَخْلَدٍ ، حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ بِلاَلٍ ، قَالَ حَدَّثَنِي عُتْبَةُ بْنُ مُسْلِمٍ ، قَالَ أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ بْنُ حُنَيْنٍ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي شَرَابِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْمِسْهُ، ثُمَّ لِيَنْزِعْهُ، فَإِنَّ فِي إِحْدَى جَنَاحَيْهِ دَاءً وَالأُخْرَى شِفَاءً ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
খালিদ ইবন মাখলাদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, সুলাইমান ইবন বিলাল আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, উতবা ইবন মুসলিম আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, উবাইদ ইবন হুনাইন আমাকে জানিয়েছেন; তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রাকে—আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন—বলতে শুনেছি: নবী বলেছেন, “তোমাদের কারও পানীয়তে মাছি পড়ে গেলে সে যেন মাছিটিকে ডুবিয়ে তারপর তুলে ফেলে; কারণ এর একটি ডানায় রোগ এবং অন্য ডানায় নিরাময় রয়েছে।”

মাছি বিভিন্ন রোগজীবাণু বহন করতে পারে এবং খাদ্য ও পানীয় দূষিত করতে পারে—এটি প্রতিষ্ঠিত জনস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য। মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্যে গৃহমাছির সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পরজীবী এবং ভাইরাসের উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু একটি ডানার রোগজীবাণু অন্য ডানার প্রতিষেধক দ্বারা পানীয়ের মধ্যে নির্ভরযোগ্যভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়—এমন সর্বজনীন কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোনো মাছির দেহে জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর জৈব উপাদান থাকা সম্ভব হলেও তার দ্বারা হাদিসে বর্ণিত নির্দিষ্ট ডানাভিত্তিক বিভাজন এবং পানীয়তে পুরো মাছি ডুবিয়ে দেওয়ার স্বাস্থ্যগত উপকার প্রমাণিত হয় না। [41]

এক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই। একটি খাদ্য বা প্রাণীর মধ্যে রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা আছে বলে দাবি করা হলে, সেই ক্ষমতার প্রকৃতি, কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো হাদিসের সনদ সম্পর্কে ইতিবাচক রায় মাছির শারীরবৃত্তীয় গঠন কিংবা রোগজীবাণুর কার্যপ্রণালি সম্পর্কে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।


জাল হাদিসের ক্ষেত্রে বাস্তব পরীক্ষা, সহিহ হাদিসের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কর্তৃত্ব?

এখানেই হাদিসের সত্যতা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে একটি মৌলিক অসংগতি প্রকাশ পায়। যখন কোনো বর্ণনাকে জাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন বক্তব্যের হাস্যকর প্রকৃতি, বাস্তব অভিজ্ঞতার বিরোধিতা, অস্বাভাবিক চিকিৎসাগত দাবি কিংবা প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সঙ্গে অসংগতি যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একই ধরনের প্রশ্ন সহিহ বুখারির কোনো বর্ণনা সম্পর্কে উঠলে শুধু সনদগত শ্রেণিবিভাগ দিয়ে বক্তব্যটিকে বাস্তব পরীক্ষার ঊর্ধ্বে রাখা যায় না।

হাঁচি, কালোজিরা, খেজুর ও মাছিসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোতে প্রাকৃতিক কার্যকারণের দাবি রয়েছে। হাঁচির সঙ্গে সত্য বলার কোনো নির্ভরযোগ্য কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। তাই বক্তব্যটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু কালোজিরার সঙ্গে প্রত্যেক রোগের নিরাময়, সাতটি খেজুরের সঙ্গে সব ধরনের বিষপ্রতিরোধ এবং মাছির নির্দিষ্ট ডানার সঙ্গে পানীয় জীবাণুমুক্ত হওয়ার দাবিগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকারণ সম্পর্ক স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রথম বর্ণনাটির সনদ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে এবং পরবর্তী তিনটি সহিহ বুখারিতে রয়েছে—এই পার্থক্য তাদের প্রাকৃতিক সত্যতার প্রশ্নের উত্তর নয়।

একই ধরনের বাস্তব দাবি যাচাইয়ের জন্য যদি এক ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক প্রমাণ দাবি করা হয় এবং অন্য ক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় কর্তৃত্বকে যথেষ্ট বলা হয়, তাহলে সেটি প্রমাণের দ্বৈত মানদণ্ড। কোনো বক্তব্য সত্য বলে গ্রহণ করার কারণ হতে হবে তার পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ। বক্তব্যটি পছন্দনীয়, ধর্মীয়ভাবে মর্যাদাপূর্ণ অথবা বহুল প্রচলিত হওয়া যুক্তির ঘাটতি পূরণ করে না। বাস্তব সত্যতা যাচাইয়ের নীতি বক্তব্যের উৎসভেদে পাল্টানো যায় না।


বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল দাবি এবং ঐতিহাসিকভাবে জাল বর্ণনার পার্থক্য

কোনো চিকিৎসাগত দাবি পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হলে সেই দাবি ভুল—এ সিদ্ধান্ত সরাসরি বলা যায়। এরপর আলাদা প্রশ্ন আসে: ভুল কথাটি মুহাম্মদ নিজে বলেছিলেন, নাকি তাঁর নামে প্রচারের পথে তৈরি হয়েছে? তিনি তাঁর সময়ের ভুল চিকিৎসাধারণা বিশ্বাস করে বলে থাকতে পারেন; শ্রোতা ভুল মনে রেখে থাকতে পারেন; পরে শব্দ বদলে গিয়ে থাকতে পারে; অথবা কথাটি সম্পূর্ণ বানানো হতে পারে। কোন ব্যাখ্যাটি বেশি শক্তিশালী, তা জানতে পুরোনো পাঠ, বর্ণনাকারীদের সম্পর্ক, সময়ের ব্যবধান ও স্বাধীন সাক্ষ্য তুলনা করতে হয়। ভুল কথাটি মুহাম্মদের নিজের হলে তাঁর চিকিৎসাজ্ঞানের নির্ভুলতার দাবি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর নামে পরে ঢুকলে প্রশ্ন ওঠে সংরক্ষণ ও বাছাইয়ের ক্ষমতা নিয়ে। যে দিকেই ভুলটির উৎস পাওয়া যাক, প্রমাণিত ভুলকে “সহিহ” শব্দ দিয়ে সত্য বানানো যায় না। কথাটি কার, তা নিয়ে বিতর্ক বক্তব্যের পরীক্ষিত ভুল মুছে দেয় না।

একইভাবে একটি হাদিসের সনদ দুর্বল হওয়া দিয়ে বর্ণিত ঘটনাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। কোনো বর্ণনার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ থাকা, কোনো বর্ণনার প্রকৃত উৎস অজানা থাকা এবং কোনো ঘটনা বাস্তবে ঘটেনি বলে প্রমাণিত হওয়া—এগুলো আলাদা সিদ্ধান্ত। প্রমাণের অভাবকে ঘটনার অসত্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো যেমন ভুল, তেমনি কোনো প্রাচীন গ্রন্থে একটি ঘটনা লেখা রয়েছে বলেই ঘটনাটিকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্রহণ করাও ভুল। উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণমূল্য নির্ভর করে প্রাচীনতম সাক্ষ্য, সেগুলোর স্বাধীনতা, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং বিপরীত প্রমাণের শক্তির ওপর।

এ কারণে হাদিসশাস্ত্রের সনদ-বিচারকে একটি ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও তাকে ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচারকের আসনে বসানো যায় না। কোনো বর্ণনাকারী সম্পর্কে সংরক্ষিত তথ্য মূল্যবান হতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের সত্যতা ও উৎসও পরীক্ষার বিষয়। কারও ধর্মীয় চরিত্র সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন তাঁর বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতার নিশ্চয়তা নয়। আবার কোনো বর্ণনাকারী সম্পর্কে নেতিবাচক মূল্যায়ন তাঁর প্রত্যেকটি বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা করে না।


সত্যতার মানদণ্ড ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ নয়, প্রমাণ

ইবনুল কাইয়িমের আলোচিত উদাহরণগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করে: একটি বর্ণনার বক্তব্য বাস্তব জগৎ সম্পর্কে দাবি করলে সেই দাবি বাস্তব জগতের প্রমাণ দিয়েই পরীক্ষা করা সম্ভব। হাঁচি, বেগুন, মসুর ডাল বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের বিষয়ে অস্বাভাবিক দাবিগুলোকে তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করেছেন। সেই পদ্ধতির যৌক্তিক প্রয়োগ হলো, একই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সহিহ বুখারি বা অন্য কোনো সংকলনকেও বিশেষ ছাড় না দেওয়া। কালোজিরার চিকিৎসাগত ক্ষমতা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়; খেজুরের বিষপ্রতিরোধী ক্ষমতা বিষবিজ্ঞানের বিষয়; মাছির মাধ্যমে রোগজীবাণু সংক্রমণ জীবাণুবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো রাবীর ধার্মিকতার মূল্যায়ন থেকে পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে অতীতের কোনো হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ, বন্দিত্ব, যৌনদাসত্ব, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা সামাজিক প্রথার বিবরণ সত্য কি না, সেটি নির্ধারণ করতে হবে ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে। সেখানে কোনো মুহাদ্দিস একটি সনদকে জইফ বললে তাঁর কারণ পরীক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু কেবল সেই শ্রেণিবিভাগের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না। বিশেষত কোনো অস্বস্তিকর ঘটনার বিবরণ একাধিক প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থে সংরক্ষিত থাকলে সেগুলোর উৎস, পারস্পরিক নির্ভরতা ও প্রমাণমূল্য বিশ্লেষণ করতে হবে; শুধু একটি সনদের দুর্বলতার ঘোষণা দিয়ে পুরো আলোচনা বন্ধ করা যাবে না।

সুতরাং সহিহ, হাসান, জইফ কিংবা মাওজু—কোনো শ্রেণিবিভাগই বাস্তব সত্যতার বিকল্প নয়। একটি সহিহ সনদে ভুল বক্তব্য সংরক্ষিত হতে পারে, আবার দুর্বল সনদেও ঐতিহাসিকভাবে সত্য ঘটনা সংরক্ষিত হতে পারে। জাল বলে শ্রেণিবদ্ধ কোনো বর্ণনার ক্ষেত্রেও জালিয়াতির সিদ্ধান্তের পক্ষে স্বাধীন যুক্তি ও প্রমাণ প্রয়োজন। প্রমাণকে বিচার করার জন্য তৈরি কোনো মানবিক পদ্ধতির ফলাফল সেই পদ্ধতির নিজের যাচাইয়ের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। হাদিসের বিচারককে যেমন হাদিসের প্রমাণ পরীক্ষা করতে হয়, তেমনি তাঁর নিজের রায়কেও যুক্তি, তথ্য ও স্বাধীন যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো হাদিসকে কে সহিহ বা জইফ বলেছেন, তা নয়; প্রশ্নটি হলো, যে কারণে তিনি তা বলেছেন, সেই কারণগুলো নিজেই কতটা সত্য, নির্ভরযোগ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যুক্তি দিয়ে জাল হাদিস শনাক্ত করার অধিকার স্বীকার করে সেই একই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যুক্তিকে সহিহ হাদিসের ক্ষেত্রে অকার্যকর ঘোষণা করা যায় না। সত্যতার মানদণ্ড যদি প্রমাণ হয়, তাহলে সেই মানদণ্ড সব বর্ণনার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।


জইফ মানেই মিথ্যা?

“জইফ” অর্থ দুর্বল। হাদিসশাস্ত্রে একটি বর্ণনাকে জইফ বলার অর্থ হলো, সেটি সহিহ বা হাসান হওয়ার জন্য নির্ধারিত এক বা একাধিক শর্ত পূরণ করেনি। সনদ বিচ্ছিন্ন হতে পারে; কোনো রাবী অজ্ঞাত হতে পারেন; তাঁর স্মৃতি বা নির্ভুলতা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে; বর্ণনাটি অধিক শক্তিশালী বর্ণনার বিরোধী হতে পারে; অথবা এমন কোনো গোপন ত্রুটি থাকতে পারে যার কারণে মুহাদ্দিস সেটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। এই কারণগুলো একটি সনদের প্রমাণমূল্য কমাতে পারে। কিন্তু “প্রমাণটি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়” এবং “বর্ণিত ঘটনাটি ঘটেনি বলে প্রমাণিত”—এ দুটি বিপরীত প্রকৃতির সিদ্ধান্ত। প্রথমটি প্রমাণের সীমাবদ্ধতা; দ্বিতীয়টি ঘটনার অসত্যতার দাবি।

এই মৌলিক পার্থক্যটি ইবনুস সালাহ নিজেই এমন স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন যে, এরপরও “একটি সনদ জইফ, অতএব ঘটনাটি মিথ্যা”—এমন দাবি অজ্ঞতা না হলে সরাসরি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা [42]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস:
إذا رأيت حديثا بإسناد ضعيف فلك أن تقول: هذا ضعيف، وتعني أنه بذلك الإسناد ضعيف، وليس لك أن تقول هذا ضعيف وتعني به ضعف متن الحديث بناء على مجرد ضعف ذلك الإسناد، فقد يكون مرويا بإسناد آخر صحيح يثبت بمثله الحديث.
বাংলা অনুবাদ:
তুমি যখন কোনো হাদিসকে দুর্বল সনদে দেখবে, তখন বলতে পারো—“এটি দুর্বল”; অর্থাৎ ঐ নির্দিষ্ট সনদে দুর্বল। কিন্তু কেবল সেই সনদের দুর্বলতার ভিত্তিতে হাদিসের মূল বক্তব্যকেই দুর্বল বোঝানো তোমার জন্য বৈধ নয়; কারণ সেটি অন্য কোনো সহিহ সনদে বর্ণিত হয়ে থাকতে পারে, যার দ্বারা হাদিসটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

উদ্ধৃতিটির যৌক্তিক ফল খুব নির্দিষ্ট। একটি বর্ণনাপথ ব্যর্থ হলে সেই পথ দিয়ে বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠিত হলো না। কিন্তু বক্তব্যটির বিপরীত সত্য প্রমাণিতও হলো না। ধরা যাক, রাবী R বলেছেন ঘটনা P ঘটেছিল; কিন্তু R-এর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। এখান থেকে পাওয়া যায়: R-এর সাক্ষ্য দিয়ে P প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না। এখান থেকে পাওয়া যায় না: P ঘটেনি। প্রতীকীভাবে, “R অবিশ্বস্ত” এবং “R বলেছে P”—এই দুই পূর্বধারণা থেকে “¬P” অনুসরণ করে না। স্বাধীন সাক্ষ্য, সমান্তরাল সূত্র, সমসাময়িক দলিল অথবা অন্য কোনো প্রমাণ P-কে সমর্থনও করতে পারে।

অন্য কোনো সহিহ সনদ না পাওয়া গেলেও একটি ঘটনার খোঁজ করার আরও উপায় থাকে। প্রাচীন জীবনীতে ঘটনাটির উল্লেখ আছে কি না, যুদ্ধবৃত্তান্তে একই তথ্য আছে কি না, সময় ও স্থানের বিবরণ মেলে কি না, অন্য পক্ষের কোনো সংবাদ আছে কি না—এসব দেখা যায়। দুটি বইয়ে একই কথা থাকলে বই দুটি আলাদা উৎস ব্যবহার করেছে, নাকি একটি থেকে আরেকটি নিয়েছে, তা-ও জরুরি। এর সঙ্গে প্রচারের সময়কার রাজনৈতিক বা ধর্মীয় স্বার্থ মিলিয়ে একটি ব্যাখ্যা অন্যটির চেয়ে বেশি সম্ভাব্য হতে পারে। সনদের দুর্বলতা এমন অনুসন্ধানের প্রয়োজন বাড়ায়; অনুসন্ধান বাদ দেওয়ার অধিকার দেয় না। “এই পথে ঘটনাটি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না” এবং “ঘটনাটি ঘটেনি”—দুটি আলাদা সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়টির পক্ষে প্রথমটি ছাড়া আর কিছু না থাকলে খণ্ডনের দাবি প্রমাণহীন।

জাল বা মাওদু এবং সাধারণ জইফ হাদিসশাস্ত্রের পৃথক শ্রেণি। জাল হলো বানানো বা আরোপিত বক্তব্য; জইফ হলো সহিহ বা হাসানের শর্ত পূরণ না করা বিস্তৃত শ্রেণি। মাওদু বা জাল বর্ণনা এবং সাধারণ জইফ এক জিনিস নয়; প্রত্যেক জইফ বর্ণনা জাল নয়। জাল এবং সাধারণ জইফকে এক করে ব্যবহার করা মানে “প্রমাণের ঘাটতি”কে “প্রমাণিত প্রতারণা” হিসেবে বিক্রি করা [43]।

মূল আরবি—জালালুদ্দিন সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী:
(النوع الثالث: الضعيف: وهو ما لم يجمع صفة الصحيح أو الحسن) جمعهما تبعا لابن الصلاح. وإن قيل: إن الاقتصار على الثاني أولى؛ لأن ما لم يجمع صفة الحسن فهو عن صفات الصحيح أبعد، ولذلك لم يذكره ابن دقيق العيد. قال ابن الصلاح: وقد قسمه ابن حبان إلى خمسين إلا قسما. قال شيخ الإسلام: ولم نقف عليها. ثم قسمه ابن الصلاح إلى أقسام كثيرة باعتبار فقد صفة من صفات القبول الستة، وهي الاتصال والعدالة والضبط والمتابعة في المستور وعدم الشذوذ وعدم العلة، وباعتبار فقد صفة مع صفة أخرى تليها أولا، أو مع أكثر من صفة إلى أن تفقد الستة. فبلغت فيما ذكره العراقي في شرح الألفية اثنين وأربعين قسما، ووصله غيره إلى ثلاثة وستين.

বাংলা অনুবাদ:
“তৃতীয় প্রকার হলো দুর্বল বা জইফ: যে বর্ণনার মধ্যে সহিহ অথবা হাসানের প্রয়োজনীয় গুণাবলি সমবেত হয়নি।” ইবনুস সালাহর অনুসরণে এখানে সহিহ ও হাসান—উভয়টির কথা একসঙ্গে বলা হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, কেবল দ্বিতীয়টির উল্লেখই অধিক যথাযথ; কারণ যে বর্ণনায় হাসানের গুণাবলিই নেই, সেটি সহিহের গুণাবলি থেকে আরও দূরে। এ কারণে ইবন দাকিকুল ঈদ সহিহের কথাটি উল্লেখ করেননি। ইবনুস সালাহ বলেন, ইবন হিব্বান দুর্বল হাদিসকে ঊনপঞ্চাশ প্রকারে ভাগ করেছেন। শায়খুল ইসলাম বলেন, আমরা সেই ভাগগুলো পাইনি। এরপর ইবনুস সালাহ গ্রহণযোগ্যতার ছয়টি গুণের কোনো একটি অনুপস্থিত থাকার ভিত্তিতে একে বহু প্রকারে ভাগ করেছেন। সেই গুণগুলো হলো সনদের সংযোগ, ন্যায়পরায়ণতা, নির্ভুলতা, মাস্তুর রাবীর ক্ষেত্রে সমর্থক বর্ণনা, শায না হওয়া এবং ইল্লত না থাকা। একটি গুণের সঙ্গে তার পরবর্তী বা অন্য কোনো গুণের অনুপস্থিতি, অথবা আরও একাধিক গুণের অনুপস্থিতি—এভাবে ছয়টিই অনুপস্থিত হওয়া পর্যন্ত ভাগ করা হয়েছে। আল-ইরাকি তাঁর আলফিয়ার ব্যাখ্যায় যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে প্রকারের সংখ্যা বিয়াল্লিশ; অন্যরা তা তেষট্টি পর্যন্ত বাড়িয়েছেন।

সংজ্ঞাটির ভাষা লক্ষণীয়: “মিথ্যা বলে প্রমাণিত” নয়, “সহিহ বা হাসানের গুণ পূর্ণ হয়নি”। এই পার্থক্যই জনপ্রিয় খণ্ডনের বড় অংশকে ভেঙে দেয়। কোনো অস্বস্তিকর বর্ণনা নিয়ে গবেষক যদি বলেন—এটি প্রাচীন কোনো মত, স্মৃতি বা সামাজিক চর্চার সাক্ষ্য হতে পারে—তাকে থামাতে কেবল “জইফ” বলা যথেষ্ট নয়। দেখাতে হবে বর্ণনাটি কত পুরোনো, অন্য কোনো পথ আছে কি না, একই বক্তব্য অন্য গ্রন্থে কীভাবে এসেছে, মতনের কোন অংশ স্থিতিশীল, কোন অংশ পরে যুক্ত এবং ঐতিহাসিক প্রশ্নে দুর্বল সনদটির সম্ভাব্য মূল্য কতটুকু। শরিয়তের বাধ্যতামূলক বিধান প্রতিষ্ঠার মানদণ্ড আর প্রাথমিক সমাজে কোনো কাহিনি প্রচলিত ছিল কি না—এই দুই প্রশ্নকে ইচ্ছাকৃতভাবে এক করলে গবেষণা নয়, মতাদর্শিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান তৈরি হয়।


মিথ্যাবাদী রাবী মানেই জাল নয়

মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত একজন রাবীর সাক্ষ্যে আস্থা কমে যায়। কিন্তু তাঁর মুখে পাওয়া প্রতিটি কথাই তাঁর নিজের বানানো—এ সিদ্ধান্ত শুধু ওই পরিচয় থেকে আসে না। একজন মিথ্যাবাদীও অন্যের সত্য কথা নকল করতে পারেন। নির্দিষ্ট হাদিসটি তাঁর বানানো কি না দেখতে হয় কথাটি তাঁর আগের কোনো উৎসে আছে কি না, তিনি কার কাছ থেকে নেওয়ার দাবি করেছেন, সেই সাক্ষাৎ সম্ভব ছিল কি না এবং তাঁর প্রচারিত পাঠে কী পরিবর্তন এসেছে। স্বীকারোক্তির পাশাপাশি অসম্ভব কালক্রম, অন্যের লেখা নিজের বলে চালানো, পরস্পরবিরোধী পাঠ ও প্রচারের স্বার্থও জালিয়াতির প্রমাণ হতে পারে। অভিযোগটি নির্দিষ্ট প্রমাণে দাঁড়ায়; জালকারীর মুখে স্বীকারোক্তি পাওয়া তার একমাত্র শর্ত নয়। আবার শুধু “রাবী মিথ্যাবাদী” বলে নির্দিষ্ট হাদিসের উৎপত্তির প্রশ্ন মিটে গেছে ভাবাও ভুল। আল-ইরাকি এই পার্থক্য স্বীকার করেছেন। [44]

মূল আরবি—জাইনুদ্দিন আল-ইরাকি, শারহুত তাবসিরাহ ওয়াত-তাযকিরাহ:
ومع هذا فلا يلزم من وجود كذاب في السند أن يكون الحديث موضوعا، إذ مطلق كذب الراوي لا يدل على الوضع، إلا أن يعترف بوضع هذا الحديث بعينه، أو ما يقوم مقام اعترافه.
বাংলা অনুবাদ:
সনদে একজন মিথ্যাবাদী থাকার কারণে হাদিসটি জাল হওয়া অনিবার্য নয়। কারণ রাবীর সাধারণ মিথ্যাচার নির্দিষ্ট বর্ণনাটি বানানো বলে প্রমাণ করে না—যতক্ষণ না সে এই নির্দিষ্ট হাদিসটি বানানোর কথা স্বীকার করে অথবা তার স্বীকারোক্তির সমতুল্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়।

এখানে সিদ্ধান্তটি সরাসরি: মিথ্যাবাদী রাবীর একক সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা যুক্তিসঙ্গত; কিন্তু তাঁর বক্তব্যের বিপরীত ঘটনাই ঘটেছে বলে ঘোষণা করা অতিরিক্ত। একই যুক্তি উল্টো দিকেও কাজ করে। একজন মানুষ সাধারণভাবে সত্যবাদী হলেই তাঁর প্রতিটি স্মৃতি নির্ভুল হয়ে যায় না। তিনি ভুল শুনতে, ভুল মনে রাখতে, প্রসঙ্গ গুলিয়ে ফেলতে অথবা অন্যের বক্তব্যকে নিজের প্রত্যক্ষ শ্রুতি বলে ভুল করতে পারেন। তাই “মিথ্যাবাদী” লেবেল নির্দিষ্ট বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা করে না; “সিকাহ” লেবেলও নির্দিষ্ট বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভ্রান্ত করে না। উভয় লেবেল সাক্ষ্যের সম্ভাব্য ওজন বদলায়—অতীতের বাস্তবতাকে জাদুর মতো বদলায় না।

“জইফ” বলা গবেষণার সমাপ্তি নয়; এখান থেকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু: দুর্বলতা কোথায়, কতটা গুরুতর, কোন নির্দিষ্ট সনদে, একই মতনের অন্য পথ আছে কি না, এবং এই দুর্বলতা থেকে ঠিক কোন সীমিত সিদ্ধান্তটি যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে। শুধু লেবেল ছুড়ে ইতিহাসকে গুম করা হাদিস-সমালোচনা নয়; হাদিস-পরিভাষার অপব্যবহার।


মুহাদ্দিসভেদে গ্রেড

একই মূল বক্তব্য সম্পর্কে স্বীকৃত মুহাদ্দিসদের রায় সহিহ থেকে জাল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পরস্পরবিরোধী এই রায়গুলোর ভিত্তি সনদ ও রাবী সম্পর্কে সমালোচকদের পৃথক মূল্যায়ন; গ্রেড বর্ণিত ঘটনার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং সংরক্ষিত প্রমাণের মূল্যায়ন। সনদের সংযোগ, রাবীর অবস্থা, সমর্থক পথ, বিরোধী বর্ণনা ও গোপন ত্রুটিকে কোন সমালোচক কত ওজন দিচ্ছেন, তার ওপর রায় নির্ভর করে। ফলে একই অতীত ঘটনা সম্পর্কে উপাত্ত ও তার মূল্যায়ন বদলালে গ্রেডও বদলাতে পারে।

রায়গুলোর শক্তি এক নয়; কিন্তু কোনো রায়ই নিজে থেকে ঐশী সত্য নয়: প্রতিটি রায়কে তার যুক্তি, প্রমাণ ও পদ্ধতির ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে হবে। “অমুক ইমাম বলেছেন”—এটি গবেষণার সূচনা হতে পারে, সমাপ্তি নয়। একজন আলেমের কর্তৃত্ব আর তাঁর সিদ্ধান্তের সত্যতা একই বস্তু নয়। বিষয়টি সবচেয়ে পরিষ্কার হয় যখন একই বর্ণনা সম্পর্কে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের রায় পাশাপাশি রাখা হয়।


“আমি জ্ঞানের নগরী”

বিখ্যাত বর্ণনাটি হলো—“আমি জ্ঞানের নগরী, আর আলী তার দরজা।” আল-হাকিম আল-নিশাপুরি তাঁর আল-মুস্তাদরাক আলাস-সহিহাইন-এ ইবন আব্বাসের সূত্রে একটি সনদ উল্লেখ করে সেটিকে সহিহ বলেছেন। আল-মুস্তাদরাক-এর ঘোষিত প্রকল্পই ছিল বুখারি ও মুসলিমের শর্তে বা তাঁদের মানের অথচ তাঁদের গ্রন্থে স্থান না পাওয়া বর্ণনা সংগ্রহ করা; ফলে হাকিমের “সহিহ সনদ” মন্তব্যটি হালকা কোনো প্রশংসা নয়। [45]

মূল আরবি—আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক:
أنا مدينة العلم، وعلي بابها، فمن أراد العلم فليأتها من بابها.
هذا حديث صحيح الإسناد، ولم يخرجاه.
বাংলা অনুবাদ:
“আমি জ্ঞানের নগরী, আলী তার দরজা; যে জ্ঞান চায়, সে যেন তার দরজা দিয়ে সেখানে প্রবেশ করে।”
“এই হাদিসটির সনদ সহিহ; বুখারি ও মুসলিম এটি সংকলন করেননি।”

কিন্তু এখানেই বিচার শেষ হয়নি। আলী আল-কারীর মিরকাতুল মাফাতীহ-এ একই মূল বর্ণনা সম্পর্কে পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসদের রায় একত্রে উদ্ধৃত হয়েছে। এই একটি অনুচ্ছেদ প্রায় পুরো গ্রেডিং-সমস্যাকে ক্ষুদ্র আকারে ধরে রেখেছে: হাকিমের কাছে সহিহ, যাহাবির কাছে জাল, দারাকুতনির কাছে সাবিত, তিরমিযির কাছে মুনকার, বুখারির কাছে সহিহ ভিত্তিহীন, ইবনুল জাওজির কাছে মাওদু; অথচ আল-আলাই ও ইবন হাজারের কাছে বিভিন্ন পথ বিবেচনায় হাসান [46]।

মূল আরবি—আলী আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ:
رواه الحاكم في المناقب من مستدركه من حديث ابن عباس وقال: صحيح، وتعقبه الذهبي فقال: بل هو موضوع … وقال الدارقطني: ثابت، ورواه الترمذي في المناقب من جامعه وقال: إنه منكر، وكذا قال البخاري: إنه ليس له وجه صحيح، وأورده ابن الجوزي في الموضوعات … لكن قال الحافظ أبو سعيد العلائي: الصواب أنه حسن باعتبار طرقه لا صحيح ولا ضعيف، فضلا عن أن يكون موضوعا … وسئل الحافظ العسقلاني عنه فقال: إنه حسن لا صحيح، كما قال الحاكم، ولا موضوع، كما قال ابن الجوزي.
বাংলা অনুবাদ:
হাকিম আল-মুস্তাদরাক-এর মানাকিব অধ্যায়ে ইবন আব্বাসের সূত্রে এটি বর্ণনা করে সহিহ বলেছেন। যাহাবি তাঁর প্রতিবাদ করে বলেছেন, “বরং এটি জাল।” দারাকুতনি বলেছেন, “সাবিত।” তিরমিযি তাঁর জামে গ্রন্থের মানাকিব অধ্যায়ে এটি বর্ণনা করে “মুনকার” বলেছেন। একইভাবে বুখারি বলেছেন, “এর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।” ইবনুল জাওজি এটিকে আল-মাওদুআত-এ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু হাফিজ আবু সাঈদ আল-আলাই বলেছেন, সঠিক সিদ্ধান্ত হলো—বিভিন্ন বর্ণনাপথ বিবেচনায় এটি হাসান; সহিহও নয়, দুর্বলও নয়, জাল তো আরও নয়। হাফিজ ইবন হাজারও বলেছেন, এটি হাসান—হাকিমের কথামতো সহিহ নয় এবং ইবনুল জাওজির কথামতো জালও নয়।

মুহাদ্দিস/গ্রন্থকারসংরক্ষিত মূল্যায়নরায়ের প্রকৃতি
আল-হাকিমসহিহ সনদ—صحيح الإسنادবর্ণনাটিকে নবীর বক্তব্য হিসেবে উচ্চ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছেন।
আল-যাহাবিজাল—بل هو موضوعহাকিমের রায়কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আত-তিরমিযিমুনকারসংশ্লিষ্ট “আমি হিকমতের ঘর” রূপকে প্রত্যাখ্যানমূলক গ্রেড দিয়েছেন।
আল-বুখারিসহিহ ভিত্তি নেই—ليس له وجه صحيحবর্ণনার নির্ভরযোগ্য ভিত্তিই অস্বীকার করেছেন।
আদ-দারাকুতনিসাবিত—ثابتবর্ণনাটির প্রতিষ্ঠিত ভিত্তির পক্ষে রায় দিয়েছেন।
ইবনুল জাওজিমাওদুজাল বর্ণনার সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আবু সাঈদ আল-আলাইহাসান লিগাইরিহিবিভিন্ন পথের সম্মিলিত শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইবন হাজার আল-আসকালানিহাসানহাকিমের সহিহ ও ইবনুল জাওজির জাল—দুই চরম রায়ই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

একই বর্ণনার জন্য এত দূরের বিপরীত রায় এসেছে কেন, তা এই তালিকাতেই দেখা যায়। আল-হাকিম একটি সনদকে সহিহ হওয়ার যোগ্য মনে করেছেন; যাহাবি সেই প্রমাণকে এত দুর্বল মনে করেছেন যে জাল বলেছেন। আল-আলাই ও ইবন হাজার আবার পৃথক পথগুলো একসঙ্গে বিচার করে হাসান বলেছেন। তাঁরা একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাবীর দুর্বলতা ও অন্য পথের সহায়তাকে সমান ওজন দেননি। ফলে পাঠক কোন রায়টি মানবেন, তা শুধু সমালোচকের নাম দেখে ঠিক করার সুযোগ নেই। যিনি সহিহ বলেছেন তাঁর যুক্তি এবং যিনি জাল বলেছেন তাঁর যুক্তি পাশাপাশি পরীক্ষা করতে হয়। “মতভেদ তো হয়ই” বলে থেমে গেলে মতভেদের কারণও অজানা থাকে, আর একটি পছন্দের রায়কে চূড়ান্ত সত্য করার পথও খোলা থাকে।

মুহাদ্দিসদের পরস্পরবিরোধী রায়ের মধ্যে কোনটি বেশি প্রমাণসমর্থিত, তা তাঁদের যুক্তির তুলনা দিয়েই নির্ধারিত হয়। গ্রেড কোনো স্বয়ংপ্রকাশিত ঐতিহাসিক সত্য নয়। পরস্পরবিরোধী রায়ের বিচার তাই হাদিসের সঙ্গে মুহাদ্দিসের সিদ্ধান্ত ও তার ভিত্তিকেও যাচাইয়ের আওতায় আনে। যখন একজন বিশেষজ্ঞের সহিহ অন্য বিশেষজ্ঞের জাল, তখন “সহিহ” শব্দটি শুনে চিন্তা বন্ধ করা জ্ঞানচর্চা নয়; একজন কর্তৃপক্ষকে অন্ধভাবে বেছে নেওয়া।

“আমি জ্ঞানের নগরী” বর্ণনার পরস্পরবিরোধী মূল্যায়ন মানুষের বিচার ও অতীত ঘটনার পার্থক্যটি নগ্ন করে দেয়: অতীতের কথিত ঘটনা একবারই ঘটেছে—অথবা ঘটেনি; কিন্তু তার সংরক্ষিত প্রমাণের গ্রেড সহিহ থেকে জাল পর্যন্ত বিস্তৃত। অতীত বদলায়নি। বদলেছে মানুষের বিচার।


রাবী যাচাইয়ের সীমা

কোনো বর্ণনা বাতিল করতে তার সনদের একটি নামের পাশে প্রায়ই লেখা হয়—“দুর্বল”, “পরিত্যক্ত”, “অজ্ঞাত” বা “স্মৃতিশক্তি খারাপ”। এই রায়টির পেছনের তথ্য না দিলে পাঠক জানেন না সমস্যাটি ঠিক কী। “অজ্ঞাত” মানে ব্যক্তিটির পরিচয় বা অবস্থা যথেষ্ট জানা যায়নি; সে শব্দ নিজে তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে না। “স্মৃতিশক্তি খারাপ” রায়ও জানতে হয়েছে তাঁর ভুলের উদাহরণ, অন্যদের সঙ্গে তাঁর বর্ণনার অমিল এবং তাঁকে চেনা লোকদের বক্তব্য থেকে। এর কোনোটি সরাসরি আজ পরীক্ষা করা যাচ্ছে না; সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা করা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন থাকে, তাঁর কোন খবর ভুল পাওয়া গেছে, তুলনায় কার খবরকে ঠিক ধরা হয়েছে এবং বিরোধী মূল্যায়ন আছে কি না। কারিগরি শব্দটি সমস্যার সংক্ষিপ্ত নাম; সমস্যার বিস্তারিত প্রমাণের বিকল্প নয়।

এটি কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতিপরীক্ষা নয়; এটি বর্ণিত সাক্ষ্য দিয়ে আরেক বর্ণিত সাক্ষ্য যাচাই করার একটি অভ্যন্তরীণ পদ্ধতি। রাবী A-এর নির্ভুলতা পরীক্ষা করা হলো B, C ও D-এর সঙ্গে মিলিয়ে। কিন্তু B, C ও D-কে নির্ভুল জানা গেল কীভাবে? তাঁদের সম্পর্কেও অন্য মানুষের বক্তব্য, তুলনা ও সমালোচনা ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সমালোচকদের রায়ও আমাদের কাছে পৌঁছেছে ছাত্র, উদ্ধৃতিকারী ও পরবর্তী গ্রন্থকারের মাধ্যমে। ফলে ব্যবস্থাটি তুলনা করতে পারে, অমিল শনাক্ত করতে পারে এবং গ্রহণযোগ্যতার স্তর নির্মাণ করতে পারে; কিন্তু এই শৃঙ্খলের বাইরে দাঁড়ানো স্বাধীন ঘটনাকালীন ভিত্তি নিজে থেকে তৈরি করতে পারে না।


সৎ ও বিশ্বস্ত হলেই হাদিসে নির্ভুল নন

হাদিসশাস্ত্রের নিজের প্রাথমিক আলোচনাতেই ব্যক্তিগত সততা এবং হাদিস বর্ণনার দক্ষতাকে আলাদা করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ভূমিকায় আবু যিনাদের নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, তিনি মদিনায় এমন একশ ব্যক্তিকে পেয়েছিলেন যাঁরা সবাই ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বস্ত ও নিরাপদ বলে গণ্য হতেন; তবু তাঁদের কাছ থেকে হাদিস নেওয়া হতো না, কারণ বলা হতো তাঁরা এই বিদ্যার উপযুক্ত ব্যক্তি নন। অর্থাৎ “লোকটি ভালো ও বিশ্বস্ত” থেকে “তার হাদিস নির্ভুল” সিদ্ধান্তটি মুসলিমের সংরক্ষিত পদ্ধতিতেই অনুসরণ করে না। [47]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিমের ভূমিকা:
أدركت بالمدينة مائة كلهم مأمون ما يؤخذ عنهم الحديث يقال ليس من أهله

বাংলা অনুবাদ:
আমি মদিনায় এমন একশ ব্যক্তিকে পেয়েছি, যাঁরা সবাই বিশ্বস্ত ছিলেন; কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করা হতো না। বলা হতো, তাঁরা এই বিদ্যার উপযুক্ত লোক নন।

আরও সরাসরি বক্তব্য এসেছে ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তানের নামে। তিনি বলেন, নেককার লোকদের হাদিসের ক্ষেত্রে যত বেশি ভুল বা অসত্য বর্ণনা করতে দেখা গেছে, অন্য কোনো বিষয়ে তত দেখা যায়নি। মুসলিম এই অসত্য বর্ণনার কারণ হিসেবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা বলেছেন: তাঁর ব্যাখ্যা, ভুল কথা তাঁদের জিহ্বায় চলে আসত, কিন্তু তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলতেন না। অর্থাৎ নৈতিক সততা অক্ষুণ্ণ রেখেও একজন মানুষ হাদিসে গুরুতর ভুলের উৎস হতে পারেন—সহিহ মুসলিমের ভূমিকায় নৈতিক সততা ও বর্ণনার নির্ভুলতার এই ব্যবধান সংরক্ষিত আছে। [48]

মূল আরবি—ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তান ও মুসলিম:
وحدثني محمد بن أبي عتاب قال حدثني عفان عن محمد بن يحيى بن سعيد القطان عن أبيه قال لم نر الصالحين في شيء أكذب منهم في الحديث قال ابن أبي عتاب فلقيت أنا محمد بن يحيى بن سعيد القطان فسألته عنه فقال عن أبيه لم تر أهل الخير في شيء أكذب منهم في الحديث قال مسلم يقول يجري الكذب على لسانهم ولا يتعمدون الكذب

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন আবি আত্তাব আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আফফান আমাকে বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তানের সূত্রে, তাঁর পিতা থেকে। তাঁর পিতা বলেন: “নেককার লোকদের হাদিসের ক্ষেত্রে যত বেশি অসত্য বলতে দেখেছি, অন্য কোনো বিষয়ে তত দেখিনি।” ইবন আবি আত্তাব বলেন, পরে আমি মুহাম্মদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তানের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। তিনি তাঁর পিতার সূত্রে বলেন: “ভালো লোকদের হাদিসের ক্ষেত্রে যত বেশি অসত্য বলতে দেখেছি, অন্য কোনো বিষয়ে তত দেখিনি।” মুসলিম বলেন: তাঁর কথার অর্থ, অসত্য তাঁদের জিহ্বায় চলে আসে; তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলেন না।

এই দুই বক্তব্য রাবী-সমালোচনার একটি মৌলিক সীমা স্পষ্ট করে। ব্যক্তিগত ধর্মপরায়ণতা, সততা বা সামাজিক সুনাম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগত তথ্য; কিন্তু এগুলো স্মৃতির নির্ভুলতা, উৎস শনাক্তকরণ, শব্দ সংরক্ষণ বা নির্দিষ্ট বর্ণনার সত্যতার বিকল্প নয়। একজন মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে একবারও মিথ্যা না বলেও ভুল হাদিস বর্ণনা করতে পারেন। তাই “তিনি নেককার”, “তিনি সত্যবাদী” অথবা “তিনি সিকাহ”—এ ধরনের সাধারণ মূল্যায়ন থেকে নির্দিষ্ট মতনের ঐতিহাসিক সত্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয় না। নির্দিষ্ট বর্ণনার জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণই প্রয়োজন।


রাবীর স্মৃতি কীভাবে যাচাই হয়

ইবনুস সালাহ রাবীর দাবত—অর্থাৎ শোনা বা লিখিত বর্ণনা যথাযথভাবে সংরক্ষণের ক্ষমতা—কীভাবে নির্ধারণ করা হয়, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। পদ্ধতিটি হলো সংশ্লিষ্ট রাবীর বর্ণনাকে আগে থেকেই নির্ভরযোগ্য ও নির্ভুল বলে গণ্য রাবীদের বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করা। বেশি সামঞ্জস্য পাওয়া গেলে তাঁকে নির্ভুল বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়; ঘন ঘন বিরোধ পাওয়া গেলে তাঁর দাবত ক্ষতিগ্রস্ত বলে গণ্য হয় [49]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস:
يعرف كون الراوي ضابطا بأن نعتبر رواياته بروايات الثقاة المعروفين بالضبط والإتقان، فإن وجدنا رواياته موافقة – ولو من حيث المعنى – لرواياتهم، أو موافقة لها في الأغلب والمخالفة نادرة، عرفنا حينئذ كونه ضابطا ثبتا، وإن وجدناه كثير المخالفة لهم، عرفنا اختلال ضبطه، ولم نحتج بحديثه.
বাংলা অনুবাদ:
একজন রাবী নির্ভুল কি না জানা হবে তাঁর বর্ণনাগুলোকে সেইসব নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করে, যারা নির্ভুলতা ও যথার্থতার জন্য পরিচিত। তাঁর বর্ণনাগুলো যদি তাঁদের বর্ণনার সঙ্গে—অন্তত অর্থের দিক থেকে—মিলে যায়, অথবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেলে এবং বিরোধ খুব বিরল হয়, তাহলে তাঁকে নির্ভুল ও দৃঢ় হিসেবে জানা যাবে। আর যদি দেখা যায় তিনি তাঁদের সঙ্গে ঘন ঘন বিরোধ করছেন, তাহলে তাঁর নির্ভুলতায় ত্রুটি আছে বলে জানা যাবে এবং তাঁর হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।

একজন রাবীর কথা বারবার অন্যদের সঙ্গে মিলে গেলে তাঁর সংরক্ষণক্ষমতার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু মিলটি কেন হচ্ছে, তা না দেখলে ভুলও বারবার গুনে সত্য বানানো সম্ভব। একই শিক্ষকের ভুল কথা তাঁর দশজন ছাত্র ঠিকভাবে মুখস্থ করতে পারেন। তখন ছাত্রদের মধ্যে মিল আছে, অথচ মূল তথ্যটি ভুল। আবার দশজন সত্যিই আলাদা উৎস থেকে একই ঘটনা জানলে মিলটি অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণ হয়। যাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে তাঁদের নির্ভরযোগ্যতার রায়ও একই ধরনের সংরক্ষিত তথ্য থেকে এসেছে। সংখ্যার পাশাপাশি তাই দেখতে হয় সাক্ষীরা একে অন্যের ওপর নির্ভর করেছেন কি না, একই লেখা ব্যবহার করেছেন কি না এবং তাঁদের মিল স্বাধীন অভিজ্ঞতার, নাকি একই শেখানো কথার পুনরাবৃত্তি। এই পরীক্ষা বাদ দিয়ে “সবাই একই কথা বলেছেন” মানেই নিশ্চিত সত্য বলা যায় না।

আরও বড় সমস্যা হলো, কোন অমিল রাবীকে সত্যিই অগ্রহণযোগ্য করবে—সেই প্রশ্নেও সমালোচকদের ঐকমত্য ছিল না। ইবনুস সালাহ নিজেই বলেছেন, মানুষ এমন বিষয়েও ভিন্নমত পোষণ করে যে কোন আচরণ বা ত্রুটি প্রকৃত জারহ এবং কোনটি নয়। এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় “অমুক রাবী দুর্বল” কোনো কাঁচা ঐতিহাসিক তথ্য নয়; এটি নির্দিষ্ট সমালোচকের মানদণ্ডে তৈরি সিদ্ধান্ত [50]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস:
وأما الجرح فإنه لا يقبل إلا مفسرا مبين السبب؛ لأن الناس يختلفون فيما يجرح وما لا يجرح، فيطلق أحدهم الجرح بناء على أمر اعتقده جرحا وليس بجرح في نفس الأمر، فلا بد من بيان سببه، لينظر فيه أهو جرح أم لا.
বাংলা অনুবাদ:
জারহ তার কারণ ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট না করা পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে না। কারণ কোন বিষয় জারহ এবং কোন বিষয় জারহ নয়—তা নিয়ে মানুষের মতভেদ রয়েছে। একজন ব্যক্তি এমন কোনো বিষয়ের ভিত্তিতে জারহ প্রয়োগ করতে পারেন, যেটিকে তিনি জারহ মনে করেছেন অথচ বাস্তবে সেটি জারহ নয়। তাই কারণটি উল্লেখ করা আবশ্যক, যাতে পরীক্ষা করা যায়—সেটি প্রকৃত জারহ কি না।

অতএব রিজাল-গ্রন্থ থেকে কেবল “দুর্বল” শব্দটি তুলে আনা যথেষ্ট নয়। কে বলেছেন, কেন বলেছেন, কারণটি হাদিসে ভুল করা নাকি সামাজিক আচরণ, একই ব্যক্তির অন্য কোনো বক্তব্য আছে কি না এবং পরবর্তী মুহাদ্দিসেরা সেই জারহকে কীভাবে বিচার করেছেন—এসব বাদ দিলে উদ্ধৃতিটি গবেষণা নয়; প্রসঙ্গ কেটে কর্তৃত্ব প্রদর্শন।


একক সমালোচকের রায়

একজন রাবীকে গ্রহণ বা বর্জন করতে কতজন স্বাধীন সমালোচকের সাক্ষ্য দরকার—এ প্রশ্নের উত্তরও এক ছিল না। একটি প্রভাবশালী মত অনুযায়ী একজন যোগ্য সমালোচকের জারহ বা তাদিলই যথেষ্ট। ইবনুস সালাহ আল-খতিব আল-বাগদাদির নির্বাচিত মত হিসেবে এটি উল্লেখ করেছেন; সুয়ূতী আরও সরাসরি একে “সঠিক মত” বলেছেন। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন মানুষের মূল্যায়ন আরেক মৃত মানুষের বর্ণনাগত ভাগ্য নির্ধারণে যথেষ্ট হয়ে যায় [51] [52]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ ও সুয়ূতী:
ومنهم من قال – وهو الصحيح الذي اختاره الحافظ أبو بكر الخطيب وغيره – أنه يثبت بواحد، لأن العدد لم يشترط في قبول الخبر، فلم يشترط في جرح راويه وتعديله.
الصحيح أن الجرح والتعديل يثبتان بواحد، وقيل: لا بد من اثنين.
বাংলা অনুবাদ:
কেউ কেউ বলেছেন—এবং হাফিজ আবু বকর আল-খতিবসহ অন্যদের নির্বাচিত সঠিক মত হলো—একজনের বক্তব্যেই জারহ ও তাদিল প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; কারণ সংবাদ গ্রহণের জন্য যখন নির্দিষ্ট সংখ্যা শর্ত করা হয়নি, তখন সংবাদবাহকের জারহ ও তাদিলের ক্ষেত্রেও সংখ্যা শর্ত করা হবে না। সুয়ূতীর ভাষায়: “সঠিক মত হলো, জারহ ও তাদিল একজনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়; তবে কেউ দুজনকে আবশ্যক বলেছেন।”

রাবী সম্পর্কে সমালোচকের রায় নেওয়ার পর সেই রায়ের উৎসও জানতে হয়। সমালোচক কি মানুষটিকে নিজে চিনতেন, নাকি অন্যের কথা শুনেছিলেন? তাঁর রায়টি কোন ছাত্র সংরক্ষণ করেছেন? একই সমালোচকের নামে বিপরীত কথা পাওয়া গেলে কোনটি কোন পরিস্থিতিতে বলা? আপত্তিটি কি নির্দিষ্ট বর্ণনায় ধরা পড়া ভুল নিয়ে, নাকি রাবীর মতবাদ বা সামাজিক আচরণ নিয়ে? এগুলো বাদ দিলে যাচাই এক ধাপ পেছনে গিয়ে থেমে যায়। আগে রাবীর নাম বিশ্বাস করা হচ্ছিল, এখন সমালোচকের নাম বিশ্বাস করা হচ্ছে। সমালোচককে বিশ্বাস করার কারণটি প্রকাশ না করলে তাঁর সিদ্ধান্তই প্রমাণের জায়গা দখল করে। তাঁর রায় শক্তিশালী হতে পারে, আবার অসম্পূর্ণ তথ্য, ব্যক্তিগত বিরোধ বা ধর্মীয় অপছন্দে প্রভাবিতও হতে পারে; কোনটি ঘটেছে তা তাঁর পরিচয়ের মর্যাদা দিয়ে স্থির হয় না।


সমালোচকের ব্যক্তিগত বিরোধও জারহকে প্রভাবিত করেছে

রাবীর গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণকারী সমালোচকও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অপমানবোধ ও বিরোধের বাইরে ছিলেন না। নাসাঈ ও আহমদ ইবন সালিহ আল-মিসরির ঘটনা এর একটি সরাসরি নজির। বুখারি যাঁর বর্ণনা গ্রহণ করেছেন এবং আবু হাতিমসহ একাধিক সমালোচক যাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন, সেই আহমদ সম্পর্কে নাসাঈ বলেছেন—তিনি বিশ্বস্ত নন, আস্থাভাজনও নন। আল-ইরাকি এই রায়কে সমালোচকের ভুলের উদাহরণ হিসেবে আলোচনা করেছেন। সেখানে আল-খালিলির নামে নাসাঈর মূল্যায়নকে পক্ষপাতপূর্ণ বলার সিদ্ধান্ত এবং ইবন আদির সূত্রে তার ব্যক্তিগত কারণও সংরক্ষিত আছে: আহমদ নাসাঈকে নিজের সভা থেকে বের করে দিয়েছিলেন; এই ঘটনার পরে নাসাঈ তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলেন। এখানে বিরোধটি শুধু কোনো রাবীর স্মৃতি নিয়ে দুই বিশেষজ্ঞের ভিন্ন হিসাব নয়; রাবী ও সমালোচকের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নেতিবাচক মূল্যায়নের কারণ হিসেবে প্রাচীন গ্রন্থেই চিহ্নিত করা হয়েছে। [53]

ثم إن الجارح وإن كان إماما معتمدا في ذلك، فربما أخطأ فيه، كما جرح النسائي أحمد بن صالح المصري، بقوله غير ثقة ولا مأمون، وهو ثقة إمام حافظ، احتج به البخاري في صحيحه، وقال ثقة، ما رأيت أحدا يتكلم فيه بحجة، وكذا وثقه أبو حاتم الرازي، والعجلي، وآخرون وقد قال أبو يعلى الخليلي اتفق الحفاظ على أن كلام النسائي فيه تحامل، ولا يقدح كلام أمثاله فيه، وقد بين ابن عدي سبب كلام النسائي فيه، فقال سمعت محمد بن هارون البرقي يقول حضرت مجلس أحمد، فطرده من مجلسه، فحمله ذلك على أن تكلم فيه قال الذهبي في الميزان آذى النسائي نفسه بكلامه فيه، وقال ابن يونس لم يكن أحمد عندنا، كما قال النسائي لم يكن له آفة غير الكبر.

বাংলা অনুবাদ:
জারহকারী এই বিষয়ে স্বীকৃত ইমাম হলেও কখনো ভুল করতে পারেন। যেমন নাসাঈ আহমদ ইবন সালিহ আল-মিসরির সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি বিশ্বস্ত নন, আস্থাভাজনও নন। অথচ তিনি একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম ও হাফিজ; বুখারি তাঁর সহিহ গ্রন্থে তাঁকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন, তিনি নির্ভরযোগ্য; তাঁর বিরুদ্ধে কাউকে প্রমাণসহ কথা বলতে দেখিনি। আবু হাতিম আর-রাযি, আল-ইজলি এবং অন্যরাও তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আবু ইয়ালা আল-খালিলি বলেছেন, হাফিজেরা একমত যে তাঁর সম্পর্কে নাসাঈর বক্তব্য পক্ষপাতপূর্ণ; নাসাঈর মতো ব্যক্তির এমন বক্তব্য তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে না। ইবন আদি নাসাঈর এই বক্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি মুহাম্মদ ইবন হারুন আল-বারকিকে বলতে শুনেছি: আমি আহমদের সভায় উপস্থিত ছিলাম; তিনি নাসাঈকে তাঁর সভা থেকে বের করে দেন। এই ঘটনাই তাঁকে আহমদের বিরুদ্ধে কথা বলতে প্ররোচিত করে। যাহাবি আল-মিযান গ্রন্থে বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলে নাসাঈ নিজেরই ক্ষতি করেছেন। ইবন ইউনুস বলেছেন, আমাদের কাছে আহমদের অবস্থা নাসাঈর বক্তব্যের মতো ছিল না; অহংকার ছাড়া তাঁর আর কোনো দোষ ছিল না।

একই জীবনীতে ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাদিস পাওয়ার সুযোগকেও কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তার আরও কঠোর বিবরণ আছে। যাহাবি ইবন আদির সূত্রে লিখেছেন, হারমালা আহমদ ইবন সালিহকে নিজের বইয়ের কেবল অর্ধেক দিয়েছিলেন। এরপর মিশরে এসে কোনো ছাত্র প্রথমে হারমালার কাছে গেলে আহমদ তাকে হাদিস শোনাতেন না। আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন সালম আল-মাকদিসি প্রথমে হারমালার কাছ থেকে লিখেছিলেন বলে আহমদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হন। আহমদকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি তাঁর সামনে ইউনুসের বর্ণনার বই ছিঁড়ে ফেলেন; তবু আহমদ সন্তুষ্ট হননি এবং তাঁকে হাদিসও শোনাননি। এখানে কোন ছাত্র কোন শিক্ষকের কাছ থেকে কী উপাদান সংগ্রহ করতে পারবে, তা নির্ধারিত হচ্ছে পূর্ববর্তী শিক্ষকের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে; সেই চাপের মুখে সংগৃহীত লিখিত উপাদানও নষ্ট হচ্ছে। এই ঘটনার ক্ষেত্রে বর্ণনা সংগ্রহের সুযোগ ও সংগৃহীত বইয়ের সংরক্ষণ—দুটিই ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। [54]

قال ابن عدي: كان أحمد بن صالح قد سمع في كتب حرملة، فمنعه حرملة من الكتب، ولم يدفع إليه إلا نصف الكتب. فكان أحمد بن صالح بعد، كل من سمع من حرملة، وبدأ به إذا وافى مصر، لم يحدثه أحمد وقال ابن عدي: سمعت عبد الله بن محمد بن سلم المقدسي يقول: قدمت مصر، فبدأت بحرملة، فكتبت عنه كتاب عمرو بن الحارث، ويونس بن يزيد والفوائد، ثم ذهبت إلى أحمد بن صالح فلم يحدثني، فحملت كتاب يونس، فخرقته بين يديه، أرضيه بذلك وليتني لم أخرقه – فلم يرض، ولم يحدثني.

বাংলা অনুবাদ:
ইবন আদি বলেন, আহমদ ইবন সালিহ হারমালার বইয়ের বর্ণনা শুনেছিলেন; কিন্তু হারমালা তাঁকে বইগুলো দিতে বাধা দেন এবং কেবল অর্ধেক বই দেন। এরপর মিশরে এসে যে ব্যক্তি প্রথমে হারমালার কাছে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে শুনত, আহমদ ইবন সালিহ তাকে হাদিস শোনাতেন না। ইবন আদি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন সালম আল-মাকদিসিকে বলতে শুনেছি: আমি মিশরে এসে প্রথমে হারমালার কাছে গেলাম। তাঁর কাছ থেকে আমর ইবনুল হারিস ও ইউনুস ইবন ইয়াজিদের বর্ণনার বই এবং অন্যান্য উপকারী বর্ণনা লিখলাম। তারপর আহমদ ইবন সালিহের কাছে গেলাম; তিনি আমাকে হাদিস শোনালেন না। তখন আমি ইউনুসের বইটি নিয়ে এসে তাঁর সামনে ছিঁড়ে ফেললাম, এভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলাম। আহা, আমি যদি বইটি না ছিঁড়তাম! তিনি সন্তুষ্টও হলেন না, আমাকে হাদিসও শোনালেন না।

এই ঘটনাগুলোতে হাদিস সংগ্রহ ও রাবী বিচার—দুটি সম্পর্কিত প্রক্রিয়াতেই ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের প্রভাব দেখা যায়। শিক্ষক তাঁর জ্ঞান বিতরণের সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করছেন; সমালোচক সেই শিক্ষকের সামাজিক আচরণ ও নিজের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব নিয়ে মূল্যায়ন দিচ্ছেন; পরবর্তী গ্রন্থকার আবার স্থির করছেন কোন সমালোচনা গ্রহণ করবেন এবং কোনটিকে পক্ষপাত বলে বাদ দেবেন। ফলে রিজাল-গ্রন্থ থেকে কেবল “নাসাঈ তাঁকে অবিশ্বস্ত বলেছেন” তুলে আনা তথ্যের একটি অংশকে পুরো বিচার হিসেবে চালানো। একই উৎসে সংরক্ষিত বিরোধের কারণ, বিপরীত মূল্যায়ন এবং নির্দিষ্ট বর্ণনা সম্পর্কে আপত্তি বাদ দিলে রাবীর গ্রেডের পেছনের প্রমাণই গোপন থাকে। যে সাক্ষ্য দিয়ে রাবীকে বিচার করা হচ্ছে, সেই সাক্ষ্যের উৎস, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যুক্তিও পরীক্ষার বস্তু। সমালোচকের খ্যাতি তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধকে নিরপেক্ষ প্রমাণে রূপান্তর করে না; আর তাঁর দেওয়া একটি নেতিবাচক বিশেষণ অতীতের ঘটনার স্বতন্ত্র খণ্ডনও তৈরি করে না।


চরিত্র বনাম নির্দিষ্ট বর্ণনা

রাবী-সমালোচনার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত জায়গা হলো ব্যক্তির সামগ্রিক চরিত্র থেকে নির্দিষ্ট বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণ। একজন মানুষকে সিকাহ, সদুক, ফাসিক, বিদআতী, মাতরুক বা মিথ্যাবাদী বলা হলো। কিন্তু এই সামগ্রিক লেবেল থেকে তাঁর নির্দিষ্ট একটি বাক্য সত্য বা মিথ্যা—তা অনিবার্যভাবে বের হয় না। মিথ্যাবাদীর নির্দিষ্ট বাক্য সত্য হতে পারে; সত্যবাদী মানুষ ভুল শুনতে বা ভুল মনে রাখতে পারেন। চরিত্র সাক্ষ্যের প্রাথমিক ওজন বদলায়, নির্দিষ্ট ঘটনার সত্য-মিথ্যা যান্ত্রিকভাবে নির্ধারণ করে না।

এই সীমাটি প্রথম পর্বে আল-ইরাকির বক্তব্যে দেখা গেছে: সনদে মিথ্যাবাদী থাকলেই নির্দিষ্ট হাদিস জাল হয় না। কিন্তু রাবী-শ্রেণিবিন্যাসের বাস্তব প্রয়োগে হাদিসের বাইরের আচরণও বর্ণনা গ্রহণে প্রভাব ফেলেছে। সুয়ূতী, ইবন হাজারের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন—কেউ সাধারণ কথায় মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিত হলে, হাদিসে তাঁর মিথ্যা ধরা না পড়লেও তিনি মাতরুক পর্যায়ে যেতে পারেন [55]।

মূল আরবি—সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী:
المتروك … بأن يرويه من يتهم بالكذب، ولا يعرف ذلك الحديث إلا من جهته، ويكون مخالفا للقواعد المعلومة. قال: وكذا من عرف بالكذب في كلامه، وإن لم يظهر منه وقوعه في الحديث، وهو دون الأول.
বাংলা অনুবাদ:
মাতরুক বর্ণনা হলো এমন বর্ণনা, যা মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি এককভাবে বর্ণনা করে এবং যা প্রতিষ্ঠিত নীতির বিরোধী। ইবন হাজার আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি সাধারণ কথাবার্তায় মিথ্যা বলার জন্য পরিচিত—হাদিসে তার মিথ্যাচার প্রকাশ না পেলেও—তার অবস্থাও অনুরূপ, যদিও সে প্রথম শ্রেণির নিচে।

এই নীতিতে নিয়মিত মিথ্যাবাদীর একক সংবাদকে দলিল হিসেবে অগ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। কিন্তু এই নীতি নির্দিষ্ট মতনকে মিথ্যা প্রমাণ করছে না; ব্যক্তির অতীত আচরণের কারণে তার সাক্ষ্যকে অপর্যাপ্ত বলছে। “তার কথা দলিল হিসেবে নিচ্ছি না” থেকে “তার বর্ণিত ঘটনা ঘটেনি”—এই লাফটি তারপরও অবৈধ।


মুরুআহ ও সামাজিক রীতি

দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা, দাবা খেলা বা স্থানীয় রীতিতে অশোভন বলে গণ্য কাজের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট খবর সত্য কি না, তার সরাসরি সম্পর্ক নেই। এসব দিয়ে বিচার করা হচ্ছে মানুষটি সমাজের চোখে কতটা গ্রহণযোগ্য। সাক্ষীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে; কিন্তু সমাজে অপছন্দের কাজ করেছেন বলে তাঁর বলা এই ঘটনাটি মিথ্যা—এ সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা প্রমাণ লাগে। সামাজিক শালীনতার নিয়ম এবং তথ্য ঠিকভাবে সংরক্ষণের ক্ষমতা এক জিনিস নয়। এই দুই বিচার এক করলে অপ্রিয় মানুষকে বাদ দেওয়াই কখনো সত্য যাচাই বলে চালু হয়ে যেতে পারে।

মূল আরবি—আল-সাখাওয়ি, ফাতহুল মুগিস:
وكذا البول قائما، يعني في الطريق، وبحيث يراه الناس … والتحدث بمساوئ الناس.
المروءة يرجع في معرفتها إلى العرف، فلا تتعلق بمجرد الشرع … بل هي تختلف باختلاف الأشخاص والبلدان، فكم من بلد جرت عادة أهله بمباشرة أمور لو باشرها غيرهم لعد خرما للمروءة.
বাংলা অনুবাদ:
দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা—অর্থাৎ রাস্তায় এবং এমনভাবে যাতে মানুষ দেখে—এবং মানুষের দোষত্রুটি আলোচনা করাও মুরুআহ ক্ষুণ্ণকারী আচরণের মধ্যে ধরা হয়েছে। অথচ মুরুআহ কী, তা জানতে সামাজিক রীতির দিকে ফিরে যেতে হয়; এটি কেবল শরিয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। মুরুআহ ব্যক্তি ও দেশভেদে বদলায়; কোনো দেশের মানুষের স্বাভাবিক আচরণ অন্য দেশের কেউ করলে তা তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী বলে গণ্য হতে পারে।

কারও প্রকাশ্য অশোভন আচরণ তার সামাজিক ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে। কিন্তু দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা বা স্থানীয় রীতিতে অসম্মানজনক কোনো কাজ থেকে তাঁর নির্দিষ্ট হাদিসের মতন মিথ্যা—এ সিদ্ধান্ত বের হয় না। স্মৃতিশক্তি, তথ্যসূত্র ও নির্দিষ্ট বক্তব্যের সত্যতার বদলে সাংস্কৃতিক শিষ্টাচারকে ব্যবহার করলে রাবী-গ্রেড আংশিকভাবে সমাজের রুচির গ্রেডে পরিণত হয়।


দাবা খেলার কারণে বর্জন

আল-খতিব আল-বাগদাদির আল-কিফায়াহ ফি ইলমির রিওয়ায়াহ-তে শু‘বার নামে নাজিয়া সম্পর্কে একটি বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। শু‘বা তাঁকে দাবা খেলতে দেখে প্রথমে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি হাদিস লেখা ত্যাগ করেছিলেন; পরে আবার অন্য একজনের মাধ্যমে তাঁর হাদিস লিখেছেন। ঘটনাটি একই সঙ্গে নৈতিক রুচির প্রভাব এবং সেই রায়ের অস্থিরতা—দুটিই দেখায় [56]।

মূল আরবি—আল-খতিব আল-বাগদাদি, আল-কিফায়াহ:
قال شعبة: لقيت ناجية الذي روى عنه أبو إسحاق، فرأيته يلعب بالشطرنج، فتركته فلم أكتب عنه، ثم كتبت عن رجل عنه.
বাংলা অনুবাদ:
শু‘বা বলেন: আমি আবু ইসহাকের রাবী নাজিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাকে দাবা খেলতে দেখলাম। তাই তাকে ছেড়ে দিলাম এবং তার কাছ থেকে লিখলাম না; পরে অবশ্য অন্য একজনের মাধ্যমে তার বর্ণনা লিখেছি।

দাবা খেলা থেকে কোনো নির্দিষ্ট হাদিস ভুল বা বানানো—এমন সম্পর্ক নেই। এখানে সমালোচকের ফিকহি বা নৈতিক মূল্যায়ন প্রথমে ব্যক্তির ওপর পড়েছে, তারপর তাঁর বর্ণনা গ্রহণের ওপর। পরে পরোক্ষভাবে একই ব্যক্তির হাদিস লেখা আরও দেখায়, সিদ্ধান্তটি সত্য-মিথ্যার কোনো কঠোর পরীক্ষার ফল ছিল না; সামাজিক ও নৈতিক আস্থার পরিবর্তনশীল প্রয়োগ ছিল।


পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হাদিস

হাদিস বর্ণনার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই দ্বৈততা দেখা যায়। ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ ও আবু হাতিম এমন ব্যক্তির কাছ থেকে না লেখার কথা বলেছেন; আহমদ ইবন হাম্বলকে “যে হাদিস বিক্রি করে” তার কাছ থেকে লেখা হবে কি না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কঠোরভাবে না বলেছেন। অথচ সাখাওয়ি একই অধ্যায়ে অর্থগ্রহণকারী বহু স্বীকৃত রাবীর নাম এবং দরিদ্রতার কারণে পারিশ্রমিক বৈধ বলার মতও সংরক্ষণ করেছেন [57]।

মূল আরবি—আল-সাখাওয়ি, ফাতহুল মুগিস:
أما إسحاق؛ فإنه حين سئل عن المحدث يحدث بالأجر، قال: لا يكتب عنه، وكذا قال أبو حاتم حين سئل عمن يأخذ على الحديث، وأما أحمد فإنه قيل له: أيكتب عمن يبيع الحديث؟ فقال: لا، ولا كرامة.
বাংলা অনুবাদ:
ইসহাককে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হাদিস বর্ণনাকারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তার কাছ থেকে লেখা হবে না। আবু হাতিমও একই উত্তর দেন। আর আহমদকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো—যে ব্যক্তি হাদিস বিক্রি করে তার কাছ থেকে কি লেখা হবে? তিনি বললেন, “না; তার কোনো সম্মানও নেই।”

অর্থ নেওয়াকে কখনো বর্ণনা বর্জনের কারণ ধরা হয়েছে, আবার কখনো বৈধ পারিশ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; একই আচরণে এই বিপরীত রায় দেখায় যে মানদণ্ডটি স্থির নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ, একই ঐতিহ্য অর্থগ্রহণকে কখনো মুরুআহ নষ্টকারী বলে বর্জন করেছে, আবার দরিদ্রতা ও সময়ের বিনিময়ের যুক্তিতে অনুমতি দিয়েছে এবং অর্থগ্রহণকারী স্বীকৃত রাবীর বর্ণনাও ব্যবহার করেছে। ফলে আচরণটির প্রমাণমূল্য কোনো সর্বসম্মত, স্থির সূত্রে নির্ধারিত হয়নি।


মতবাদের কারণে বর্জন

রাবীর আকিদাগত অবস্থানও কখনো বর্জনের কারণ হিসেবে এসেছে। আমর ইবন উবাইদ সম্পর্কে ইবনুল মুবারকের নামে সরাসরি বলা হয়েছে, মানুষ তাঁকে ত্যাগ করেছে কারণ তিনি কদরিয়া মতের দিকে আহ্বান করতেন। আমরের বিরুদ্ধে হাদিসে মিথ্যার অভিযোগ এবং কদরিয়া মত প্রচারের কারণে তাঁকে বর্জনের ব্যাখ্যা—দুই ধরনের তথ্যই রিজাল-সাহিত্যে সংরক্ষিত। সংরক্ষিত এই ব্যাখ্যায় আকিদাগত প্রচারই বর্জনের ঘোষিত কারণ [58]।

মূল আরবি—আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল:
قال نعيم بن حماد: قلت لابن المبارك: لأي شيء تركوا عمرو بن عبيد؟ قال: إن عمرا كان يدعو إلى القدر.
বাংলা অনুবাদ:
নু‘আইম ইবন হাম্মাদ বলেন: আমি ইবনুল মুবারককে জিজ্ঞেস করলাম, “মানুষ আমর ইবন উবাইদকে কেন ত্যাগ করেছিল?” তিনি বললেন, “আমর মানুষকে কদরিয়া মতের দিকে আহ্বান করত।”

এখানে আকিদাগত বিরোধ সরাসরি রাবী-বর্জনের যন্ত্রে ঢুকে পড়েছে; ফলে গ্রেডিংকে নিছক নিরপেক্ষ স্মৃতি-পরীক্ষা হিসেবে বিক্রি করা যায় না। মতাদর্শিক পরিচয় পক্ষপাতের বিচার্য উপাদান; মতনের অসত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য বক্তব্যটির বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রয়োজন। আকিদাগত আনুগত্য যখন রাবীর গ্রহণযোগ্যতার উপাদান হয়, তখন গ্রেডিংকে নিছক নিরপেক্ষ স্মৃতি-পরীক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করা মিথ্যা।


একই রাবী, বিপরীত রায়

তাত্ত্বিক সমস্যার সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ রিজাল-গ্রন্থ নিজেই। একই রাবী সম্পর্কে স্বীকৃত সমালোচকেরা কখনো সরাসরি বিপরীত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কোথাও একজন বলেছেন “মিথ্যাবাদী”, অন্যজন বলেছেন “মিথ্যাবাদী নয়”; কোথাও একই সমালোচকের নামেই “সিকাহ” ও “দুর্বল”—দুই রায় সংরক্ষিত; কোথাও একজন ব্যক্তি হাদিসে পরিত্যক্ত অথচ কোরআনের পাঠে নির্ভরযোগ্য। এই বিপরীত তথ্যের মধ্যে পরবর্তী মুহাদ্দিস একটি সিদ্ধান্ত বেছে নেন। অতএব রাবীর গ্রেড ঐতিহাসিক ব্যক্তিটির শরীরে লেখা ছিল না; গ্রন্থকার ও সমালোচকের নির্বাচনে তৈরি হয়েছে।


ইকরিমা: মিথ্যাবাদী না সিকাহ?

ইকরিমা ছিলেন ইবন আব্বাসের মুক্তদাস ও বিখ্যাত শিষ্য; তাফসির ও হাদিসের বিপুল বর্ণনা তাঁর মাধ্যমে এসেছে। ঠিক এই কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণেই তাঁকে নিয়ে বিপরীত মূল্যায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল-মিযযির তাহযীবুল কামাল-এ ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-আনসারি ও আইয়ুব আল-সাখতিয়ানির প্রায় একই আসরে দেওয়া সম্পূর্ণ বিপরীত রায় সংরক্ষিত। একই জীবনীতে ইবন আবি যি’বের নামেও একবার “অবিশ্বস্ত”, অন্য বর্ণনায় “বিশ্বস্ত” এসেছে; মালিক তাঁকে সিকাহ মনে করতেন না, অথচ আবু হাতিম, নাসাঈ ও অন্যরা তাঁকে সিকাহ বলেছেন [59]।

মূল আরবি—আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল:
سمعت يحيى بن سعيد الأنصاري وأيوب ذكرا عكرمة، فقال يحيى: كان كذابا، وقال أيوب: لم يكن بكذاب.
عن ابن أبي ذئب يقول: رأيت عكرمة مولى ابن عباس، وكان غير ثقة.
كان مالك لا يرى عكرمة ثقة، ويأمر أن لا يؤخذ عنه.
سألت أبي عن عكرمة مولى ابن عباس: كيف هو؟ قال: ثقة، قلت: يحتج بحديثه؟ قال: نعم إذا روى عنه الثقات.
বাংলা অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-আনসারি ও আইয়ুব ইকরিমাকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ইয়াহইয়া বললেন, “সে মিথ্যাবাদী ছিল”; আইয়ুব বললেন, “সে মিথ্যাবাদী ছিল না।” ইবন আবি যি’বের নামে এসেছে: “আমি ইকরিমাকে দেখেছি; সে বিশ্বস্ত ছিল না।” মালিকও তাঁকে বিশ্বস্ত মনে করতেন না এবং তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা না নিতে বলতেন। অথচ আবু হাতিম তাঁকে “সিকাহ” বলেছেন এবং বিশ্বস্ত রাবীরা তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করলে তা দলিল হিসেবে গ্রহণের অনুমোদন দিয়েছেন।

ইবন হিব্বানের আস-সিকাত-এ ইকরিমার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উদ্ধৃত হয়েছে—তিনি নাকি ইবন আব্বাসের নামে মিথ্যা বলতেন। কিন্তু ইবন হিব্বান অভিযোগ বহনকারী রাবীদের দুর্বলতা দেখিয়ে পাল্টা বলেন, একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে দুর্বল ব্যক্তির বক্তব্যে আহত করা যায় না। এখানে ইকরিমার বিচার করতে গিয়ে আবার তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদাতাদের বিচার করতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রশ্নের সমাধান নয়; রাবী-নির্ভরতার আরেক স্তর তৈরি হচ্ছে [60]।

মূল আরবি—ইবন হিব্বান, আস-সিকাত:
إن هذا يكذب على أبي … ومن أمحل المحال أن يجرح العدل بكلام المجروح … أما عكرمة، فحمل أهل العلم عنه الحديث والفقه في الأقاليم كلها.
বাংলা অনুবাদ:
ইকরিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে: “এই ব্যক্তি আমার পিতার নামে মিথ্যা বলে।” কিন্তু ইবন হিব্বানের জবাব: আহত বা দুর্বল ব্যক্তির বক্তব্য দিয়ে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে জারহ করা চরম অসম্ভব; আর বিভিন্ন অঞ্চলের আলেমরা ইকরিমার কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহ গ্রহণ করেছেন।

ফলে “ইকরিমা সিকাহ”—এটি কোনো প্রত্যক্ষ, বিরোধহীন ঐতিহাসিক তথ্য নয়। এটি বিপরীত প্রাচীন সাক্ষ্যের মধ্যে একটি নির্বাচিত সমালোচনামূলক সিদ্ধান্ত। একজন পরবর্তী পাঠক ইকরিমাকে নিজে পরীক্ষা করছেন না; তিনি ইয়াহইয়া, আইয়ুব, মালিক, আবু হাতিম ও ইবন হিব্বানের মধ্যে কাকে কতটা বিশ্বাস করবেন, সেটি বেছে নিচ্ছেন।


ইবন ইসহাক: সিকাহ না দুর্বল?

প্রথম দিকের সবচেয়ে প্রভাবশালী সীরাতকার মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের নামেই পরস্পরবিরোধী রায় সংরক্ষিত। কখনো তিনি “সমস্যা নেই” ও “সিকাহ”; কখনো “দুর্বল”, “অসুস্থ” এবং “শক্তিশালী নয়”; আবার কখনো “সিকাহ, কিন্তু চূড়ান্ত দলিলের স্তরের নয়”। এই ভিন্নতার পেছনে সময়, প্রসঙ্গ, নির্দিষ্ট শিক্ষক বা মত পরিবর্তন থাকতে পারে। কিন্তু কারণগুলো অনুমান করে একটি সুবিধাজনক রায়কে “চূড়ান্ত” বানানো যায় না [61]।

মূল আরবি—আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল:
سمعت يحيى بن معين يقول: محمد بن إسحاق ليس به بأس.
وسئل يحيى بن معين عنه مرة أخرى فقال: ليس بذاك، ضعيف.
وسمعت يحيى بن معين مرة أخرى يقول: محمد بن إسحاق عندي سقيم، ليس بالقوي.
قلت ليحيى بن معين: محمد بن إسحاق منهم؟ فقال: كان ثقة، إنما الحجة: عبيد الله بن عمر، ومالك بن أنس.
বাংলা অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের নামে একবার এসেছে: “মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের মধ্যে সমস্যা নেই।” আরেকবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন: “সে তেমন নয়; দুর্বল।” অন্য বর্ণনায়: “আমার কাছে মুহাম্মদ ইবন ইসহাক দুর্বল; শক্তিশালী নয়।” আবার তাঁকেই জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “সে সিকাহ; তবে চূড়ান্ত দলিলের স্তরে উবাইদুল্লাহ ইবন উমর ও মালিক ইবন আনাস।”

রিজাল-গ্রন্থ থেকে ইয়াহইয়ার নামে শুধু “দুর্বল” বা শুধু “সিকাহ” তুলে এনে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা তাই তথ্য গোপন করা। একই সমালোচকের নামে যখন বিপরীত রায় আছে, তখন কোন ছাত্র বর্ণনা করেছেন, কোন সময়ে, কোন প্রসঙ্গে এবং “সিকাহ কিন্তু হুজ্জত নয়” কথার ক্ষেত্র কী—এসব বিশ্লেষণ ছাড়া এক শব্দের ফতোয়া কোনো গবেষণা নয়।


ওয়াকিদী: হাদিসে দুর্বল, ইতিহাসে অপরিহার্য

মুহাম্মদ ইবন উমর আল-ওয়াকিদীর ঘটনা “হাদিসে দুর্বল” এবং “ইতিহাসে মূল্যহীন”—এই মিথ্যা সমীকরণকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। শাফেয়ীর নামে তাঁর বইগুলোকে মিথ্যা বলা হয়েছে; আহমদ তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছেন; ইবন মাঈন বলেছেন তিনি কিছুই নন; নাসাঈ তাঁকে মুহাম্মদের নামে হাদিস জালকারীদের তালিকায় রেখেছেন। তবুও যাহাবি একই জীবনীতে বলেছেন—মাগাজি, সাহাবিদের যুদ্ধ ও সংবাদে তাঁকে বাদ দিয়ে চলা যায় না [62]।

মূল আরবি—আল-যাহাবি, সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা:
محمد بن عمر بن واقد … صاحب التصانيف والمغازي، العلامة الإمام … أحد أوعية العلم على ضعفه المتفق عليه.
خلط الغث بالسمين … فاطرحوه لذلك، ومع هذا فلا يستغنى عنه في المغازي، وأيام الصحابة وأخبارهم.
قال الشافعي: كتب الواقدي كذب.
عن ابن معين قال: ليس الواقدي بشيء.
قال لي أحمد بن حنبل: الواقدي كذاب.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন উমর আল-ওয়াকিদী ছিলেন বহু রচনা ও মাগাজির গ্রন্থকার, আল্লামা ও ইমাম, জ্ঞানের অন্যতম ভাণ্ডার—যদিও তাঁর দুর্বলতা স্বীকৃত। তিনি ভালো-মন্দ ও মূল্যহীন-মূল্যবান বর্ণনা মিশিয়েছেন, তাই তাঁকে পরিত্যাগ করা হয়েছে। “তবুও মাগাজি, সাহাবিদের যুদ্ধ ও তাঁদের সংবাদে তাঁকে বাদ দিয়ে চলা যায় না।” শাফেয়ী বলেছেন, “ওয়াকিদীর বইগুলো মিথ্যা।” ইবন মাঈন বলেছেন, “ওয়াকিদী কিছুই নয়।” আহমদ ইবন হাম্বল বলেছেন, “ওয়াকিদী মিথ্যাবাদী।”

একই পৃষ্ঠায় আবার মুসআব আল-যুবাইরির নামে “সিকাহ ও বিশ্বস্ত”, ইয়াজিদ ইবন হারুনের নামে “সিকাহ” এবং অন্যদের প্রশংসা সংরক্ষিত। ইবন সাদ তাঁকে মাগাজি, সীরাত, বিজয়, বিধান ও মতভেদের জ্ঞানী বলেছেন। এমনকি আহমদ ইবন হাম্বল—যাঁর নামে “ওয়াকিদী মিথ্যাবাদী” বক্তব্য এসেছে—তাঁর কাছেই প্রতি সপ্তাহে ওয়াকিদীর হাদিসের অংশ পৌঁছানো হতো এবং তিনি সেগুলো দেখতেন [63]।

মূল আরবি—আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল, মুহাম্মদ ইবন সাদের জীবনী:
كان أحمد بن حنبل يوجه في كل جمعة بحنبل بن إسحاق إلى ابن سعد، يأخذ منه جزأين من حديث الواقدي، ينظر فيهما إلى الجمعة الأخرى، ثم يردهما ويأخذ غيرهما.
বাংলা অনুবাদ:
আহমদ ইবন হাম্বল প্রতি শুক্রবার হাম্বল ইবন ইসহাককে ইবন সাদের কাছে পাঠাতেন। তিনি ওয়াকিদীর হাদিসের দুটি অংশ নিয়ে আসতেন; আহমদ পরের শুক্রবার পর্যন্ত সেগুলো দেখতেন, তারপর ফেরত দিয়ে অন্য দুটি অংশ নিতেন।

ওয়াকিদীর ঘটনা প্রমাণ করে, ফিকহি হাদিসের মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য হওয়া আর ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে অকার্যকর হওয়া এক নয়। তাঁর উপাদান ছাড়া প্রাথমিক ইসলামের যুদ্ধ, বিজয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বিরাট অংশ পুনর্গঠন কঠিন; যাহাবি সেটিই সরাসরি স্বীকার করেছেন। অতএব কোনো সীরাত-বর্ণনায় ওয়াকিদীর নাম দেখিয়ে “জইফ, আলোচনা শেষ” বলা হাদিসশাস্ত্রের নিয়ম প্রয়োগ নয়; ইতিহাসের উৎস-ব্যবহারের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা।


হাফস: কিরাআতে সিকাহ, হাদিসে মাতরুক

হাফস ইবন সুলাইমানের উদাহরণ আরও বিধ্বংসী। বর্তমানে পৃথিবীর বৃহৎ অংশে প্রচলিত কোরআন-পাঠ “হাফস আন আসিম” ধারায় বর্ণিত। কিন্তু রিজাল-গ্রন্থে সেই হাফসই হাদিসে দুর্বল, মাতরুক, অবিশ্বস্ত এবং মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। যাহাবি মীযানুল ইতিদাল-এ হাফস সম্পর্কে বলেছেন—তিনি কোরআনের পাঠে নির্ভুল, হাদিসে অত্যন্ত দুর্বল [64]

মূল আরবি—যাহাবির বক্তব্য, ইসলামওয়েবে উদ্ধৃত:
كان ثبتا في القراءة، واهيا في الحديث؛ لأنه كان لا يتقن الحديث ويتقن القرآن ويجوده، وإلا فهو في نفسه صادق.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি কিরাআতে দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য, কিন্তু হাদিসে অত্যন্ত দুর্বল; কারণ তিনি হাদিসে নির্ভুল ছিলেন না, অথচ কোরআন আয়ত্ত করেছিলেন এবং সুন্দরভাবে পাঠ করতেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সত্যবাদী ছিলেন।

আল-মিযযির তাহযীবুল কামাল-এ তাঁর বিরুদ্ধে রায় আরও কঠোর: আহমদের নামে “মাতরুকুল হাদিস”, ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের নামে “সিকাহ নয়”, আলী ইবনুল মাদিনির নামে “হাদিসে দুর্বল”, মুসলিম ও নাসাঈর নামে “মাতরুক”; ইবন খিরাশের নামে “মিথ্যাবাদী, পরিত্যক্ত, হাদিস বানাত”—এমন বক্তব্যও আছে। ব্যক্তিগত আচরণের নথিতে শু‘বার বই নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগও সংরক্ষিত [65]।

মূল আরবি—আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল:
عن أبيه: متروك الحديث.
عن يحيى بن معين: ليس بثقة.
وقال علي ابن المديني: ضعيف الحديث، وتركته على عمد.
وقال مسلم: متروك.
وقال عبد الرحمن بن يوسف بن خراش: كذاب متروك يضع الحديث.
قال شعبة: أخذ مني حفص بن سليمان كتابا فلم يرده، وكان يأخذ كتب الناس فينسخها.
বাংলা অনুবাদ:
আহমদের নামে: “হাদিসে পরিত্যক্ত।” ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের নামে: “সিকাহ নয়।” আলী ইবনুল মাদিনি বলেন: “হাদিসে দুর্বল; আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে ত্যাগ করেছি।” মুসলিম বলেন: “মাতরুক।” ইবন খিরাশ বলেন: “মিথ্যাবাদী, পরিত্যক্ত; সে হাদিস বানাত।” শু‘বা বলেন: “হাফস আমার কাছ থেকে একটি বই নিয়েছিল, কিন্তু ফেরত দেয়নি; সে মানুষের বই নিয়ে নকল করত।”

হাফসের উদাহরণে একই ব্যক্তির দুই ধরনের কাজের জন্য দুই রকম রায় পাওয়া যাচ্ছে: কোরআন-পাঠে তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকৃত, হাদিসে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ আছে। একটি কাজের দক্ষতা অন্য কাজের দক্ষতার নিশ্চয়তা নয়—এই পার্থক্য সত্যিই যাচাইয়ের বিষয়। কিন্তু তখন কোরআন-পাঠে তাঁর ওপর আস্থা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই পৃথক প্রমাণ দেখাতে হবে। শুধু ব্যক্তিটির ভালো বা মন্দ পরিচয় দিয়ে দুই ক্ষেত্রের সিদ্ধান্ত চলে না। কোরআনের ক্ষেত্রে তাঁর কাজের নিজস্ব সংরক্ষণপথ বিচার করা হলে ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রতিটি সংবাদের নিজস্ব পথ বিচার করার দাবি থাকে। হাদিসে তাঁর সাধারণ দুর্বলতা জানানো প্রাসঙ্গিক; তার পরও কোনো ঐতিহাসিক সংবাদ অন্য উৎসে আছে কি না, সেই প্রশ্ন বাদ পড়ে না। এক জায়গায় কাজভেদে যাচাই মেনে অন্য জায়গায় ব্যক্তির পরিচয় দিয়েই সব কথা বাতিল করা সুবিধামতো বিচার।


সময়ভেদে রাবীর গ্রেড

একই মানুষের সংরক্ষণক্ষমতা সারা জীবন সমান নাও থাকতে পারে। হাদিসশাস্ত্রে ইখতিলাত বলতে এমন অবস্থাকে বোঝানো হয়, যখন আগে ঠিকভাবে বর্ণনা করা রাবী পরে স্মৃতির সমস্যা বা অন্য পরিবর্তনের কারণে ভুল করতে শুরু করেন। বয়সজনিত স্মৃতিভ্রংশ, দৃষ্টিশক্তি হারানো, বই নষ্ট হওয়া বা অন্যের বলা ভুল কথা গ্রহণ করার মতো কারণ আলোচনায় এসেছে। তখন শুধু মানুষটির নাম জানলে যথেষ্ট হয় না; ছাত্রটি কখন তাঁর কাছ থেকে শুনেছিলেন, তা জানতে হয়। আগে শোনা খবর গ্রহণযোগ্য হলেও পরে শোনা খবর একই মানের নাও হতে পারে। ফলে “অমুক বিশ্বস্ত” কথাটির সঙ্গে সময়ের প্রশ্ন যুক্ত হয়। ব্যক্তি সম্পর্কে সাধারণ পরিচয় দিয়ে তাঁর জীবনের সব সময়ের সব বর্ণনার রায় দেওয়া যায় না।

সুয়ূতী তাদরীবুর রাবী-তে এ বিষয়ে আলাদা অধ্যায় রেখেছেন—“বিশ্বস্তদের মধ্যে যারা পরে ইখতিলাতে আক্রান্ত হয়েছেন”। সেখানে নিয়মটি সরাসরি: যে বর্ণনা ইখতিলাতের আগে নেওয়া হয়েছে তা গ্রহণ করা হবে; পরে নেওয়া বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না; আর কখন নেওয়া হয়েছে জানা না গেলে সেটিও গ্রহণ করা হবে না। কারণ রাবীর নৈতিক চরিত্র বদলানো প্রয়োজন নেই—তাঁর দাবত বা নির্ভুল সংরক্ষণক্ষমতা নষ্ট হলেই পূর্বের “সিকাহ” পরিচয় নির্দিষ্ট পরবর্তী হাদিসকে রক্ষা করতে পারে না। [66]

মূল আরবি—তাদরীবুর রাবী:
فمنهم من خلط لخرفه، أو لذهاب بصره، أو لغيره … فيقبل ما روي عنهم قبل الاختلاط، ولا يقبل ما بعده، أو شك فيه.
বাংলা অনুবাদ:
তাঁদের মধ্যে কেউ বার্ধক্যজনিত বিভ্রান্তি, কেউ দৃষ্টিশক্তি হারানো অথবা অন্য কারণে ইখতিলাতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে ইখতিলাতের আগে যা বর্ণিত হয়েছে তা গ্রহণ করা হবে; পরে যা বর্ণিত হয়েছে অথবা কখন নেওয়া হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে গ্রহণ করা হবে না।


আতা ইবনুস সায়িব: আগে ও পরে

আতা ইবনুস সায়িব এর পরিচিত উদাহরণ। তিনি জীবনের শেষ দিকে ইখতিলাতে আক্রান্ত হন। ফলে তাঁর সব হাদিসকে একসঙ্গে “সহিহ” বা “জইফ” বলা হয়নি; বরং কোন ছাত্র কখন তাঁর কাছ থেকে শুনেছেন তা বিচার করা হয়েছে। ইয়াহইয়া ইবন মাঈন, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান এবং নাসাঈর নামে সংরক্ষিত মূল্যায়নে শু‘বা, সুফিয়ান আস-সাওরি এবং হাম্মাদ ইবন যায়দের মতো কিছু ছাত্রের বর্ণনাকে তাঁর পরিবর্তনের আগের হওয়ায় ভালো বলা হয়েছে। আবার অন্য ছাত্র যদি পরবর্তী পর্যায়ে শুনে থাকেন, একই আতার কাছ থেকে পাওয়া একই ধরনের বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা বদলে যেতে পারে। [67]

আল-ইরাকির সংরক্ষিত নিয়ম:
وما حدث به قبل الاختلاط قبل، وإنما يتميز ذلك باعتبار الرواة عنهم؛ فمنهم من سمع منهم قبل الاختلاط فقط، ومنهم من سمع بعده فقط، ومنهم من سمع في الحالين، ولم يتميز.
বাংলা অনুবাদ:
ইখতিলাতের আগে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা গ্রহণ করা হবে। আর সেটি নির্ধারণ করতে হবে তাঁর কাছ থেকে বর্ণনাকারী ছাত্রদের দেখে: কেউ কেবল ইখতিলাতের আগে শুনেছেন, কেউ পরে, আবার কেউ দুই সময়েই শুনেছেন—যেখানে কোনটি কখন শোনা তা আলাদা করা যায় না।

এখানে শুধু রাবীর পরিচিতি দিয়ে কোনো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা যায় না। প্রশ্ন দাঁড়ায়: এই নির্দিষ্ট ছাত্র আতার কাছে কখন পড়েছেন? অর্থাৎ সনদের নামের পাশাপাশি একটি সময়সংক্রান্ত তথ্য দরকার। “আতা ইবনুস সায়িব সিকাহ ছিলেন”—এটি সত্য হলেও কোনো পরবর্তী ছাত্রের সব বর্ণনা সহিহ প্রমাণ করে না। আবার “আতা শেষ জীবনে ইখতিলাতে আক্রান্ত”—এটিও তাঁর আগের সব বর্ণনা দুর্বল করে না। একই মানুষের দুটো অবস্থাই সত্য।


আবদুর রাজ্জাক: অন্ধত্বের পর

আরও শক্ত উদাহরণ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুসান্নাফ-এর সংকলক আবদুর রাজ্জাক ইবন হাম্মাম আস-সানআনি। বুখারি ও মুসলিম উভয়েই তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আহমদ ইবন হাম্বলের নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে তাঁর জীবনের সময়ভেদ স্পষ্টভাবে আলাদা করা হয়েছে: আহমদরা যখন দুইশ হিজরির আগে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি ঠিক ছিল; চোখ হারানোর পরে যারা তাঁর কাছ থেকে শুনেছেন, তাদের শ্রুতি দুর্বল। আহমদ আরও বলেন, অন্ধ হওয়ার পরে তাঁকে অন্যের বলা কথা ধরিয়ে দেওয়া হতো এবং তিনি তা গ্রহণ করতেন। নাসাঈও শেষ জীবনে তাঁর কাছ থেকে লিখেছেন এমন ব্যক্তিদের বর্ণনার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন। [68]

মূল আরবি—আহমদ ইবন হাম্বলের নামে:
أتيناه قبل المائتين وهو صحيح البصر، ومن سمع منه بعد ما ذهب بصره فهو ضعيف السماع.
وكان يلقن بعدما عمي.
বাংলা অনুবাদ:
“আমরা দুইশ হিজরির আগে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম, তখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি ঠিক ছিল। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরে যে তাঁর কাছ থেকে শুনেছে, তার সেই শ্রুতি দুর্বল।”
আরও বলা হয়েছে: “অন্ধ হওয়ার পরে তাঁকে বলে দেওয়া হতো এবং তিনি তা গ্রহণ করতেন।”

এখানে আরও একটি জটিলতা দেখা যায়। কেউ তাঁর পরবর্তী সময়ে সরাসরি স্মৃতি থেকে নয়, তাঁর লিখিত বই থেকে বর্ণনা করলে সেই উপাদানের মূল্য আবার ভিন্নভাবে বিচার করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু রাবী কে এবং কখন—এ দুটিও যথেষ্ট নয়; তিনি স্মৃতি থেকে বলছেন, না পুরোনো বই থেকে পড়ছেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই ব্যক্তি, একই ছাত্র, একই সময় হলেও বর্ণনা হস্তান্তরের মাধ্যম বদলালে নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।

ইখতিলাত হাদিসের গ্রেড সম্পর্কে একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে: রাবীর নির্ভরযোগ্যতা ব্যক্তির স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য নয়। একজন মানুষ চল্লিশ বছর বয়সে অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হতে পারেন এবং আশি বছরে গুরুতর স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত হতে পারেন। তাঁর জীবনের প্রথম দিকের বর্ণনাগুলো অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং শেষ দিকেরগুলো দুর্বল—দুটি একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। তাই “এই সনদের সব রাবী সিকাহ”—এই বাক্যটিও অসম্পূর্ণ, যদি কোনো রাবীর ইখতিলাতের ইতিহাস থাকে। জানতে হবে নির্দিষ্ট ছাত্রের নির্দিষ্ট শ্রুতিটি তাঁর জীবনের কোন পর্যায়ের।

শতাব্দী পরে এই বিচার করতে গিয়ে শুধু একজন মৃত রাবীর চরিত্র জানা যথেষ্ট হয় না। কখন তাঁর স্মৃতি বদলেছিল, কোন ছাত্র কোন সময়ে তাঁর কাছে শুনেছেন, কে পরিবর্তনের আগে ও পরে দুই সময়েই শুনেছেন এবং আলোচ্য হাদিসটি কোন পর্যায়ের—এসবও পুনর্গঠন করতে হয়। কোথাও তথ্য স্পষ্ট হলে শক্ত সিদ্ধান্ত সম্ভব; কোথাও “আগে না পরে জানা যায় না” বলেই বর্ণনা বাদ পড়ে। অর্থাৎ একটি হাদিস দুর্বল হওয়ার কারণ ঘটনাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া নাও হতে পারে; দুর্বলতার কারণ শুধু এটুকুও হতে পারে যে বর্ণনাকারী একসময় নির্ভরযোগ্য ছিলেন, কিন্তু তাঁর এই নির্দিষ্ট কথাটি স্মৃতি দুর্বল হওয়ার আগে না পরে শোনা হয়েছিল তা নিশ্চিত নয়।

বয়সের সঙ্গে স্মৃতি বদলে যাওয়া রাবীর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি খুব নির্দিষ্ট: ছাত্রটি তাঁর ভালো স্মৃতির সময়ে শুনেছিলেন, নাকি স্মৃতিভ্রংশের পরে? সময় জানা না গেলে ওই পথের খবর নিয়ে সংশয় থাকে। এতে ঘটনাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। অন্য কোনো ছাত্র আগে শুনেছিলেন কি না, আগের লিখিত নোট আছে কি না এবং পৃথক উৎস একই সংবাদ দেয় কি না—এসব দেখে আরও এগোনো যায়। আবার ছাত্রটি আগে শুনেছেন বলে গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য প্রশ্নগুলো শেষ হয় না: তিনি কথাটি ঠিকভাবে বুঝেছিলেন কি না, নিজের ভাষায় বলেছেন কি না, মাঝের কোনো নাম বাদ গেছে কি না, পাঠে বাড়তি অংশ আছে কি না। একটি দুর্বলতার কারণ দূর হওয়া মানে সম্ভাব্য সব ভুল দূর হয়ে যাওয়া নয়; আর একটি দুর্বলতা থাকা মানে পুরো ঘটনা ঘটেনি, তাও নয়।

অতএব “সিকাহ” এবং “জইফ”—দুটিই প্রসঙ্গ ছাড়া বিভ্রান্তিকর হতে পারে। একই রাবীর একটি বর্ণনা গ্রহণযোগ্য, আরেকটি দুর্বল; পার্থক্যের কারণ কখনো নৈতিক সততা নয়, একই মানুষের জীবনের দুই ভিন্ন সময়। একটি বর্ণনা জইফ হওয়ার অর্থ কখনো শুধু এই যে আমরা জানি না সেটি রাবীর সুস্থ স্মৃতির সময় থেকে এসেছে, না তাঁর পরবর্তী দুর্বল সময় থেকে। প্রমাণের এই অনিশ্চয়তাকে “বর্ণিত ঘটনা মিথ্যা” বলে অনুবাদ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অপ্রমাণিত দাবি।


সহিহ সনদের সীমা

প্রচলিত ধর্মীয় বিতর্কে “সনদ সহিহ” কথাটি প্রায়ই এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন অতীতের ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি ধারণ করা কোনো অপরিবর্তনীয় রেকর্ড পাওয়া গেছে। সব রাবী সিকাহ, বর্ণনাপথ সংযুক্ত—অতএব ঘটনাটি অবশ্যই ঠিক এভাবেই ঘটেছে। কিন্তু হাদিসশাস্ত্রের নিজের পরিভাষা, মুহাদ্দিসদের পারস্পরিক বিরোধ এবং একই বর্ণনার পরিবর্তিত গ্রেড এই নিশ্চয়তাকে সমর্থন করে না। বরং শাস্ত্রটি নিজেই স্বীকার করে: বাহ্যিকভাবে নিখুঁত সনদের ভেতরেও গোপন ত্রুটি থাকতে পারে; সংযোগের শর্ত নিয়ে বড় সংকলকদের মানদণ্ড আলাদা হতে পারে; সহিহ মুসলিমের বর্ণনাকেও বুখারি ও অন্য সমালোচকেরা ভুল বলতে পারেন; আর “সহিহ” খবরুল ওয়াহিদ নিশ্চিত জ্ঞান দেয় কি না, সে প্রশ্নেও আলেমদের ঐকমত্য নেই।

“সহিহ” রায়কে অভ্রান্ত বলতে হলে রাবীদের সম্পর্কে তথ্য, তাঁদের সংযোগ এবং পাঠের ত্রুটি নিয়ে সমালোচকের সিদ্ধান্তও অভ্রান্ত বলতে হয়। অথচ একই বর্ণনা নিয়ে বিপরীত রায় এবং পরে ধরা পড়া ত্রুটি সেই দাবির সঙ্গে মেলে না। বাহ্যিকভাবে নির্ভরযোগ্য নামের তালিকা দেখালেও ভেতরে এমন সমস্যা থাকতে পারে যা আরও অনেক বর্ণনা তুলনা না করলে বোঝা যায় না। হাদিসশাস্ত্রে এ ধরনের গোপন ত্রুটিকে বলা হয় ইল্লত। সহিহ বলার নিয়মেই গোপন ত্রুটি না থাকার শর্ত আছে; সুতরাং শুধু বিশ্বস্ত রাবীদের নাম দেখানো ওই শর্ত পূরণের প্রমাণ নয়। কোন তুলনা করে ত্রুটিমুক্ত বলা হলো, সেটিও রায়ের অংশ।


গোপন ইল্লত

হাদিসশাস্ত্রে ইলালুল হাদিস বা বর্ণনার গোপন ত্রুটি শনাক্ত করার একটি স্বতন্ত্র ও অত্যন্ত সূক্ষ্ম শাখা আছে। এর প্রয়োজনই তৈরি হয়েছে এই কারণে যে সাধারণ সহিহ-শর্ত পূরণ করেও একটি বর্ণনা বাস্তবে ভুল হতে পারে। ইবনুস সালাহ এই শাস্ত্রকে হাদিসবিদ্যার সবচেয়ে মহৎ, সূক্ষ্ম ও মর্যাদাপূর্ণ অংশগুলোর একটি বলেছেন। তাঁর সংজ্ঞায় মুআল্লাল হাদিস এমন বর্ণনা, যার বাহ্যিক রূপ নিরাপদ ও ত্রুটিমুক্ত মনে হলেও বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানে তার সত্যতা ক্ষুণ্ণকারী গোপন কারণ ধরা পড়ে [69]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ, মুকাদ্দিমাহ ফি উলূমিল হাদিস:
اعلم أن معرفة علل الحديث من أجل علوم الحديث وأدقها وأشرفها، وإنما يضطلع بذلك أهل الحفظ والخبرة والفهم الثاقب، وهي عبارة عن أسباب خفية غامضة قادحة فيه.
فالحديث المعلل هو الحديث الذي اطلع فيه على علة تقدح في صحته، مع أن ظاهره السلامة منها.
ثم قد تقع العلة في إسناد الحديث، وهو الأكثر، وقد تقع في متنه.
বাংলা অনুবাদ:
জেনে রাখো, হাদিসের গোপন ত্রুটি শনাক্তকরণ হাদিসশাস্ত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, সূক্ষ্ম ও মহৎ বিদ্যাগুলোর একটি। কেবল প্রবল স্মৃতিশক্তি, অভিজ্ঞতা ও তীক্ষ্ণ বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরাই এর দায়িত্ব বহন করতে পারেন। এসব ত্রুটি হলো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণকারী গোপন ও দুর্বোধ্য কারণ। মুআল্লাল হাদিস হলো সেই হাদিস, যার মধ্যে সত্যতা ক্ষুণ্ণকারী ত্রুটি আবিষ্কৃত হয়েছে—যদিও বাহ্যিকভাবে সেটি সেই ত্রুটি থেকে নিরাপদ বলে মনে হয়। ত্রুটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সনদে ঘটে; আবার মতনেও ঘটতে পারে।

এই সংজ্ঞায় বাহ্যিক গ্রহণযোগ্যতার আড়ালে গোপন ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা স্বীকৃত। বাহ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হওয়া সনদেও অদৃশ্য ত্রুটি থাকতে পারে। একজন বিশ্বস্ত রাবী নাম ভুল বলতে পারেন, এক ব্যক্তির বদলে আরেক ব্যক্তিকে সনদে বসাতে পারেন, মওকুফ বক্তব্যকে নবীর নামে মারফু করতে পারেন, বিচ্ছিন্ন সনদকে সংযুক্ত করে ফেলতে পারেন কিংবা একটি হাদিসের অংশ অন্য হাদিসে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিটি সৎ হলেই এসব স্মৃতি ও পরিবেশনগত ভুল অসম্ভব হয়ে যায় না।

ইবনুস সালাহ নিজেই এমন একটি উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে সনদটি বাহ্যিকভাবে সম্পূর্ণ সংযুক্ত এবং ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে ন্যায়পরায়ণ রাবীর বর্ণনা; তবু সেটি সঠিক নয়। ইয়ালা ইবন উবাইদ “আবদুল্লাহ ইবন দিনার”-এর জায়গায় ভুল করে “আমর ইবন দিনার” বলেছিলেন। দুজনই বিশ্বস্ত হওয়ায় রাবীদের সাধারণ গ্রেড দেখে ভুলটি ধরা পড়ে না; একই হাদিসের অন্য পথগুলোর সঙ্গে তুলনা করেই তা ধরা পড়ে [70]।

মূল আরবি—ইবনুস সালাহর ইল্লতের উদাহরণ:
فهذا إسناد متصل بنقل العدل عن العدل، وهو معلل غير صحيح، والمتن على كل حال صحيح، والعلة في قوله: عن عمرو بن دينار، وإنما هو عن عبد الله بن دينار، هكذا رواه الأئمة من أصحاب سفيان عنه، فوهم يعلى بن عبيد وعدل عن عبد الله بن دينار إلى عمرو بن دينار، وكلاهما ثقة.
বাংলা অনুবাদ:
এটি ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে ন্যায়পরায়ণ রাবীর একটি সংযুক্ত সনদ; তবু এটি ত্রুটিযুক্ত ও সহিহ নয়। অবশ্য মতনটি অন্য দিক থেকে সহিহ। ত্রুটি হলো “আমর ইবন দিনার থেকে” কথাটিতে; সঠিকটি “আবদুল্লাহ ইবন দিনার থেকে”। সুফিয়ানের প্রধান শিষ্যরা এভাবেই বর্ণনা করেছেন। ইয়ালা ইবন উবাইদ ভুল করে আবদুল্লাহ ইবন দিনারের বদলে আমর ইবন দিনার বলেছেন—যদিও দুজনই সিকাহ।

ইবনুস সালাহর এই উদাহরণে বক্তব্যটি অন্য পথ থেকে সহিহ, কিন্তু সামনে থাকা সনদটি ত্রুটিপূর্ণ। একই খবরের দুটি পথের অবস্থা তাই আলাদা। শুধু বিশ্বস্ত মানুষদের নাম পরপর দেখিয়ে প্রথম পথের ত্রুটি দূর করা যাচ্ছে না। গোপন ত্রুটি ধরতে আরও বর্ণনা, শিক্ষকদের কাছ থেকে কে কী শুনেছেন তার তথ্য এবং পাঠের সূক্ষ্ম পার্থক্য একসঙ্গে জানতে হয়েছে। শাস্ত্রের সংজ্ঞাতেও এই কাজের জন্য বিশেষ স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বিচারক্ষমতার কথা আছে; সব মুহাদ্দিসকে সমান যোগ্য বলা হয়নি। কোনো ওয়েবসাইটে পাঁচজন রাবীর পাশে পাঁচটি “সিকাহ” লিখে দিলে শুধু তাঁদের সম্পর্কে একটি সাধারণ মূল্যায়ন জানা যায়। ওই পাঁচজনের মাধ্যমে এই নির্দিষ্ট খবরটি ঠিকভাবে এসেছে কি না, তা প্রমাণ করতে আরও পরীক্ষা লাগে। নামের গ্রহণযোগ্যতা ও বর্ণনার ত্রুটিমুক্ততা এক পরীক্ষা নয়।


সংযোগের মানদণ্ড

সহিহ হাদিসের বহুল পরিচিত শর্তের একটি হলো সনদের সংযোগ: প্রত্যেক রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবীর কাছ থেকে বর্ণনাটি পেয়েছেন। কিন্তু “অমুক অমুকের কাছ থেকে” বললেই সেই শ্রবণ প্রমাণিত হয় না। দুই ব্যক্তি একই সময়ে জীবিত থাকতে পারেন, একই অঞ্চলে যেতে পারেন, এমনকি সাক্ষাৎও করতে পারেন—তবু নির্দিষ্ট হাদিসটি একজন অন্যজনের কাছ থেকে শুনেছেন কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। এই জায়গায় সহিহ মুসলিমের ভূমিকা একটি মৌলিক পদ্ধতিগত বিরোধ সংরক্ষণ করেছে [71]।

মূল আরবি—ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিমের ভূমিকা:
وزعم القائل الذي افتتحنا الكلام على الحكاية عن قوله والإخبار عن سوء رويته أن كل إسناد لحديث فيه فلان عن فلان، وقد أحاط العلم بأنهما قد كانا في عصر واحد، وجائز أن يكون الحديث الذي روى الراوي عمن روى عنه قد سمعه منه وشافهه به، غير أنه لا نعلم له منه سماعا، ولم نجد في شيء من الروايات أنهما التقيا قط أو تشافها بحديث، أن الحجة لا تقوم عنده بكل خبر جاء هذا المجيء حتى يكون عنده العلم بأنهما قد اجتمعا من دهرهما مرة فصاعدا أو تشافها بالحديث بينهما.
বাংলা অনুবাদ:
যাঁর মত নিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করেছি, তিনি দাবি করেন: কোনো সনদে “অমুক অমুক থেকে” বলা হলে এবং জানা যায় যে দুজন একই যুগে জীবিত ছিলেন ও একজনের পক্ষে অন্যজনের কাছ থেকে হাদিসটি সরাসরি শোনা সম্ভব ছিল, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে শোনার প্রমাণ আমাদের জানা নেই এবং কোনো বর্ণনায় তাঁদের সাক্ষাৎ বা হাদিস নিয়ে সরাসরি আলাপের তথ্যও পাওয়া যায় না—তাহলে তাঁর মতে এমন সংবাদ দলিল হবে না, যতক্ষণ না অন্তত একবার তাঁদের সাক্ষাৎ বা পরস্পরের মধ্যে হাদিসের সরাসরি আদান-প্রদান প্রমাণিত হয়।

মুসলিম এই কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করতে উদ্ধৃত করেননি; বরং তীব্র ভাষায় খণ্ডন করেছেন। তাঁর নির্বাচিত নীতিতে সমসাময়িকতা ও সাক্ষাতের বাস্তব সম্ভাবনা থাকলে, এবং বর্ণনাটি মুরসাল হওয়ার ইতিবাচক প্রমাণ না থাকলে, কেবল প্রত্যেক জোড়ার সাক্ষাতের আলাদা নথি না পাওয়ার কারণে সনদ বাতিল হবে না। এর বিপরীতে কঠোর মানদণ্ডে অন্তত সাক্ষাতের প্রমাণ প্রয়োজন। ফলে একই “অমুক থেকে অমুক” সনদ একটি নিয়মে সংযুক্ত, অন্য নিয়মে অপ্রমাণিত হতে পারে।

দুজন রাবী সত্যিই দেখা করেছিলেন কি না, অতীতে তার একটি নির্দিষ্ট উত্তর ছিল। কিন্তু আজ কতটুকু তথ্য পেলে তাঁদের সংযোগ মেনে নেওয়া হবে, সেই নিয়মে সমালোচকদের পার্থক্য আছে। একই সময়ে বেঁচে থাকা ও দেখা করার সুযোগ থাকা এক ধরনের প্রমাণ; সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে নির্দিষ্ট সংবাদ পাওয়া আরও জোরালো প্রমাণ। প্রথমটিকে যথেষ্ট ধরা এবং দ্বিতীয়টি চাওয়া একই সিদ্ধান্তপদ্ধতি নয়। ফলে একই তথ্য দেখে একজন সনদকে সংযুক্ত বলবেন, অন্যজন আরও প্রমাণ চাইবেন। “সংযুক্ত সনদ” কথাটির সঙ্গে তাই সংযোগ মেনে নেওয়ার ভিত্তিটিও জানাতে হয়। সাক্ষাতের সরাসরি প্রমাণ এবং সাক্ষাতের সম্ভাবনাকে এক করে “শতভাগ সংযুক্ত” বললে প্রমাণের ফাঁকটি চাপা পড়ে।


অদৃশ্য মধ্যবর্তী রাবী

একটি হাদিসের লিখিত সনদে পরপর বর্ণনাকারীর নাম সাজানো থাকে: অমুক অমুকের সূত্রে, তিনি তাঁর আগের ব্যক্তির সূত্রে, এভাবে সাহাবী হয়ে মুহাম্মদ পর্যন্ত। কিন্তু হাদিসশাস্ত্রের নিজের বিভিন্ন শ্রেণি দেখায়, লিখিত সনদে পাশাপাশি দুটি নাম থাকা এবং ঐ নির্দিষ্ট বক্তব্যটি একজন অন্যজনের মুখ থেকে সরাসরি শুনেছেন—দুটি সবসময় একই দাবি নয়। মুরসালুস সাহাবি, তাদলিস এবং `عن`-এর মতো অস্পষ্ট বর্ণনাসম্পর্ক বোঝানোর ভাষা এই ব্যবধানকে সরাসরি প্রকাশ করে।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সহিহ সনদের অন্যতম শর্ত হলো ইত্তিসালুস সনদ—বর্ণনাশৃঙ্খলের সংযুক্তি। কিন্তু “সংযুক্ত” বলার পেছনেও বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ ও অনুমান রয়েছে। কোথাও রাবী বলেন “سمعت”—“আমি শুনেছি”; কোথাও বলেন “حدثني”—“তিনি আমাকে বলেছেন”; আবার কোথাও শুধু “عن فلان”—“অমুক থেকে”। শেষের ভাষাটি নিজে সরাসরি শ্রুতি ঘোষণা করে না। ফলে সনদ অবিচ্ছিন্ন দেখালেই প্রতিটি সংযোগ একই মাত্রায় প্রমাণিত সরাসরি শ্রুতিসংযোগ হয়ে যায় না।


মুরসালুস সাহাবি

এই সমস্যাটি সবচেয়ে প্রাচীন স্তরেই ছিল। আল-বারা ইবন আজিবের নামে ক্লাসিক্যাল উসুলগ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে: “আমরা তোমাদের যা বর্ণনা করি তার সবকিছু আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে সরাসরি শুনিনি।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, কিছু তাঁরা নিজেরা শুনেছেন এবং কিছু অন্য সাহাবীরা তাঁদের বলেছেন। [72]

মূল আরবি—আল-বারা ইবন আজিবের নামে:
مَا كُلُّ مَا نُحَدِّثُكُمْ بِهِ سَمِعْنَاهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، لَكِنْ سَمِعْنَا بَعْضَهُ وَحَدَّثَنَا أَصْحَابُهُ بِبَعْضِهِ.
বাংলা অনুবাদ:
“আমরা তোমাদের যা বর্ণনা করি তার সবকিছু আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে শুনিনি; কিছু আমরা নিজেরা শুনেছি এবং কিছু তাঁর সাহাবীরা আমাদের বলেছেন।”

সাহাবী অন্য সাহাবীর কাছ থেকে নবীর বক্তব্য শুনে সেটি বর্ণনা করছেন, অথচ তাঁর প্রকাশ্য সনদে সেই মধ্যবর্তী সাহাবীর নাম উহ্য থাকছে। এতে লিখিত সনদ ও বাস্তব বর্ণনাপ্রবাহের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ফাঁক তৈরি হয়: সনদের দৃশ্যমান শেষ সংযোগ যদি হয় “সাহাবী → নবী”, বাস্তব বর্ণনাপ্রবাহ কখনো “সাহাবী A → সাহাবী B → নবী” হতে পারে, অথচ B-এর নাম বর্তমান সনদে নেই। অর্থাৎ দৃশ্যমান সনদ এবং পূর্ণ ঐতিহাসিক বর্ণনাপরম্পরা এক জিনিস নয়।

এই ধরনের বর্ণনাকেই বলা হয় মুরসালুস সাহাবি। সংখ্যাগরিষ্ঠ উসুলবিদ তা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, বাদ পড়া ব্যক্তি সাধারণত আরেক সাহাবী অথবা এমন কোনো ব্যক্তি যাঁর গ্রহণযোগ্যতা জানা; সাহাবীরা ইচ্ছাকৃতভাবে অবিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে দ্বীনের বিধান বর্ণনা করবেন না। কিন্তু অন্যরা আপত্তি করেছেন—সাহাবী কোনো অ-সাহাবীর কাছ থেকেও শুনে থাকতে পারেন; বাদ পড়া ব্যক্তিকে চিহ্নিত না করলে তাঁর অবস্থা সরাসরি যাচাই করা সম্ভব নয়। ক্লাসিক্যাল গ্রন্থেই তাই মুরসালুস সাহাবি গ্রহণ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের পাশাপাশি বিরোধী মতও সংরক্ষিত। [73]

সাহাবীর বাদ দেওয়া উৎসকে গ্রহণ করার নিয়মে একটি বড় অজানা জায়গা থেকে যায়। মধ্যবর্তী মানুষটিকে খুঁজে তাঁর নাম, স্মৃতি ও সাক্ষাতের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে না; ধরে নেওয়া হচ্ছে সাহাবী আরেক বিশ্বস্ত সাহাবীর কাছ থেকেই নিয়েছেন। এখানে অজ্ঞাত ব্যক্তির ওপর আস্থা এসেছে তাঁর সম্ভাব্য শ্রেণিপরিচয় থেকে। কিন্তু নাম না জানলে তিনি ঠিক কে ছিলেন, নিজে ঘটনাটি দেখেছিলেন কি না, কাকে শুনেছিলেন এবং কোনো ভুল করেছিলেন কি না—এসব পরীক্ষা করা যায় না। “সব সাহাবী গ্রহণযোগ্য” বিশ্বাসটি বাদ পড়া ব্যক্তির পরিচয়ের বদলে কাজ করছে। অজ্ঞাত উৎস সৎও হতে পারেন, ভুলও করে থাকতে পারেন; তাঁর পরিচয় ও বক্তব্যের পথ না পাওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সম্ভাবনাগুলো আলাদা করার সুযোগ নেই। সনদ গ্রহণের ধর্মীয় নিয়ম সেই অনুপস্থিত তথ্য উদ্ধার করে দেয় না।

আবু হুরায়রার রোজাসংক্রান্ত বর্ণনায় মধ্যবর্তী উৎস উহ্য থাকার একটি বাস্তব নজির সংরক্ষিত আছে। তিনি প্রথমে একটি রোজার বিধান বর্ণনা করছিলেন; আয়িশা ও উম্মে সালামার বিপরীত প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের পরে জানা গেল, সংশ্লিষ্ট বক্তব্যটি তিনি মুহাম্মদের কাছ থেকে সরাসরি শোনেননি—আল-ফাদল ইবন আব্বাসের কাছ থেকে শুনেছিলেন। অর্থাৎ একটি বক্তব্য সাহাবীর নামে নববী বিধান হিসেবে প্রচলিত থাকলেও পরে তার মধ্যবর্তী উৎস প্রকাশিত হতে পারে। এই ঘটনা বর্ণনা হস্তান্তরের বাস্তব প্রক্রিয়ায় মুরসালুস সাহাবির তাত্ত্বিক নিয়মটির প্রয়োগ দেখায়।


`عن` মানেই সরাসরি শ্রুতি নয়

সমস্যাটি সাহাবী স্তরেই থামে না। হাদিসের সনদে সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলোর একটি عن—“অমুক থেকে”। যেমন: A → عن B → عن C। সাধারণ পাঠক এটিকে স্বাভাবিকভাবেই “A সরাসরি B-এর কাছ থেকে শুনেছেন” বলে পড়েন। কিন্তু হাদিসতত্ত্বে মু‘আন‘আন বর্ণনার সংযোগই আলাদা আলোচনার বিষয়। খতিব আল-বাগদাদির নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “حدثنا فلان”—“অমুক আমাদের বলেছেন”—এর মর্যাদা “عن فلان”-এর চেয়ে উঁচু; কারণ `عن` এমন বর্ণনাতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যা সরাসরি শ্রুতি নয়। [74]

আল-খতিব আল-বাগদাদির বক্তব্য:
وقول المحدث: ثنا فلان قال ثنا فلان أعلى منزلة من قوله ثنا فلان عن فلان، إذ كانت “عن” مستعملة كثيرة في تدليس ما ليس بسماع.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাদ্দিসের “অমুক আমাদের বলেছেন, তিনি বলেছেন অমুক আমাদের বলেছেন”—এই ভাষা “অমুক আমাদের বলেছেন, অমুক থেকে”—এর চেয়ে উচ্চতর; কারণ `عن` এমন বর্ণনায়ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যেখানে সরাসরি শ্রুতি ছিল না।

অ-মুদাল্লিস রাবীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে এই `عن`-কে সংযুক্ত ধরা হয়েছে। কিন্তু সেই শর্ত নিয়েই বুখারি ও মুসলিমের মানদণ্ডের পার্থক্য আগের অংশে দেখানো হয়েছে: একই যুগে থাকা ও সাক্ষাতের সম্ভাবনা যথেষ্ট, না বাস্তব সাক্ষাতের প্রমাণ প্রয়োজন? ইবন হাজারের আলোচনায় আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—বুখারির কঠোরতার কারণগুলোর একটি হলো, প্রথম যুগে ইরসাল প্রচলিত ছিল; দুই ব্যক্তি সমসাময়িক হলেই একজনের `عن` অপরজনের কাছ থেকে ঐ নির্দিষ্ট বর্ণনা সরাসরি শোনার প্রমাণ নয়। [75]


তাদলিস ও অদৃশ্য রাবী

এর সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ তাদলিসুল ইসনাদ। একজন রাবী এমন কোনো শিক্ষক বা সমসাময়িক ব্যক্তির নামে `عن فلان` বলতে পারেন, যার কাছ থেকে তিনি অন্য হাদিস শুনেছেন বা যার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু আলোচ্য নির্দিষ্ট হাদিসটি তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শোনেননি। মাঝের প্রকৃত উৎসকে উল্লেখ না করে বর্ণনাসম্পর্ক বোঝানোর অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করলে বাইরের পাঠকের কাছে সনদটি সরাসরি সংযুক্ত মনে হতে পারে। এজন্যই পরিচিত মুদাল্লিস রাবী `سمعت`, `حدثنا`, `أخبرنا` ইত্যাদি স্পষ্ট শ্রুতি ঘোষণা করলে তার বর্ণনা গ্রহণ করা হয়; কিন্তু শুধু `عن` ব্যবহার করলে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও উসুলবিদের মতে সেটিকে সরাসরি সংযুক্ত হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করা যায় না। [76]

মূল আরবি—আল-ইরাকি:
فإن صرح بالاتصال كقوله: سمعت، وحدثنا، وأخبرنا، فهو مقبول محتج به، وإن أتى بلفظ محتمل فحكمه حكم المرسل، وإلى هذا ذهب الأكثرون.
বাংলা অনুবাদ:
যদি সে স্পষ্টভাবে সংযোগ ঘোষণা করে—যেমন “আমি শুনেছি”, “তিনি আমাদের বলেছেন”, “তিনি আমাদের সংবাদ দিয়েছেন”—তাহলে তা গ্রহণযোগ্য ও দলিল। আর যদি দ্ব্যর্থক ভাষা ব্যবহার করে, তবে তার বিধান মুরসালের মতো; অধিকাংশের অবস্থান এটিই।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমেও পরিচিত মুদাল্লিস রাবী আছেন—আ‘মাশ, কাতাদা, সুফিয়ানদের মতো নাম ক্লাসিক্যাল আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী আলেমদের ব্যাখ্যা হলো, সহিহাইনে তাঁদের `عن`-যুক্ত মূল বর্ণনাগুলো অন্য প্রমাণের ভিত্তিতে সরাসরি শ্রুতিপ্রমাণিত ছিল অথবা সংকলকের কাছে সেই সংযোগ প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই ব্যাখ্যায় সংকলকের কাছে সংযোগ প্রতিষ্ঠিত থাকার দাবিটিই যাচাইয়ের বিষয় হয়ে ওঠে: সংকলক ঠিক কোন প্রমাণে ওই নির্দিষ্ট শ্রুতিসংযোগ মেনেছিলেন? অন্য বর্ণনাপথে সেই প্রমাণ থাকলে তা তুলনাযোগ্য; শুধু তাঁর কাছে ছিল বলে দাবি করা হলে সংযোগের জায়গায় সংকলকের প্রতি আস্থাই বসে। বর্তমান লিখিত সনদের ফাঁক বইয়ের মর্যাদা দিয়ে পূরণ করা প্রত্যক্ষ শ্রুতির প্রমাণ নয়। [77]

নামের মাঝখানে তীরচিহ্ন বসালেই প্রত্যেকে আগের ব্যক্তির মুখে এই খবর শুনেছিলেন বলে প্রমাণ হয় না। তাঁরা একই সময়ে ছিলেন কি না, দেখা হয়েছিল কি না এবং এই নির্দিষ্ট হাদিসটি সরাসরি শোনা হয়েছিল কি না—প্রতিটি আলাদা প্রশ্ন। আরবি “عن” সাধারণভাবে “অমুকের কাছ থেকে” বোঝায়; “سمعت” মানে “আমি শুনেছি”—দুটির তথ্য এক নয়। যে রাবী কখনো মাঝের উৎস আড়াল করে বলতেন, তাঁর অস্পষ্ট ভাষায় বলা খবরের জন্য সরাসরি শোনার বাড়তি প্রমাণ জরুরি হতে পারে। অন্য সনদে সেই তথ্য আছে কি না, তা খুঁজতে হয়। সনদ বলে দেয় বর্ণনাটি কোন পথ দিয়ে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই দাবি ঠিক কি না, তা জানতে পথের প্রতিটি সংযোগ পরীক্ষা করতে হয়। সুন্দর করে আঁকা তালিকা এই পরীক্ষার কাজ নিজে করে না।

ফলে “সনদ সহিহ” কথাটিকে বোঝার সময় দৃশ্যমান নামের তালিকা আর বাস্তব বর্ণনা সংরক্ষণ ও প্রচারের ইতিহাসকে এক করে দেখা যায় না। সাহাবী মধ্যবর্তী সাহাবীর নাম বাদ দিতে পারেন এবং তা সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে; `عن` সরাসরি শ্রুতির চেয়ে দুর্বল সূত্র; মুদাল্লিস রাবী উহ্য মধ্যবর্তী বর্ণনাকারী রেখে একই সূত্র ব্যবহার করতে পারেন; আবার সংকলকের কাছে অন্য প্রমাণ থাকায় সেই সংযোগ শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যও হতে পারে। এই পুরো ব্যবস্থা দেখায়, সনদের সংযুক্তি নিজেও পুনর্গঠিত ও বিচারকৃত—স্রেফ লেখা নামগুলো থেকে স্বয়ংপ্রমাণিত নয়।


শনিবারের সৃষ্টি: মুসলিম বনাম বুখারি

গোপন ত্রুটি কেবল পাঠ্যবইয়ের কাল্পনিক সম্ভাবনা নয়। সহিহ মুসলিমের সৃষ্টি-বিষয়ক একটি বিখ্যাত বর্ণনা দেখায়, সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্ত সংকলনের একটি সনদকেও অন্য প্রধান মুহাদ্দিসেরা ভুল বলতে পারেন। আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণনাটিতে মুহাম্মদ নাকি তাঁর হাত ধরে সৃষ্টি-পর্বের দিনগুলো বলেছেন: শনিবার মাটি, রবিবার পাহাড়, সোমবার বৃক্ষ, মঙ্গলবার অপছন্দনীয় বস্তু, বুধবার আলো, বৃহস্পতিবার জীবজন্তু এবং শুক্রবার আদম [78]।

মূল আরবি—সহিহ মুসলিমে সংকলিত সৃষ্টি-বর্ণনা:
عن أبي هريرة قال: أخذ رسول الله صلى الله عليه وسلم بيدي، فقال: خلق الله عز وجل التربة يوم السبت، وخلق فيها الجبال يوم الأحد، وخلق الشجر يوم الاثنين، وخلق المكروه يوم الثلاثاء، وخلق النور يوم الأربعاء، وبث فيها الدواب يوم الخميس، وخلق آدم عليه السلام بعد العصر من يوم الجمعة في آخر الخلق، في آخر ساعة من ساعات الجمعة فيما بين العصر إلى الليل.
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরায়রা বলেন, আল্লাহর রাসুল আমার হাত ধরে বললেন: আল্লাহ শনিবার মাটি সৃষ্টি করেছেন, রবিবার তাতে পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, সোমবার বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন, মঙ্গলবার অপছন্দনীয় বিষয় সৃষ্টি করেছেন, বুধবার আলো সৃষ্টি করেছেন, বৃহস্পতিবার তাতে জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং শুক্রবার আসরের পর সৃষ্টির সর্বশেষ পর্যায়ে—আসর থেকে রাতের মধ্যবর্তী শুক্রবারের শেষ ঘণ্টায়—আদমকে সৃষ্টি করেছেন। বর্ণনাটির ধারাবাহিকতায় শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সাতটি দিনের নাম এসেছে।

সমস্যাটি দ্বিমুখী। প্রথমত, শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ক্রমটি সাত দিনের; অথচ কোরআনে আসমান ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টির কথা বারবার এসেছে। দ্বিতীয়ত, প্রধান হাদিস-সমালোচকদের মতে সনদের বাহ্যিক রূপই বিভ্রান্তিকর: কথাটি নবীর নয়, আবু হুরায়রা কা‘ব আল-আহবারের কাছ থেকে শুনেছিলেন; কোনো রাবী ভুল করে সেটিকে নবীর বক্তব্য বানিয়ে দিয়েছেন। ইবন কাসির বুখারি, আলী ইবনুল মাদিনি ও বায়হাকির সমালোচনা উল্লেখ করে বলেন, কা‘বের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত রূপটিই অধিক সঠিক [79]।

মূল আরবি—ইবন কাসির, বুখারি ও অন্য হাফিজদের সমালোচনা উদ্ধৃত করে:
اختلف فيه على ابن جريج، وقد تكلم في هذا الحديث علي بن المديني، والبخاري، والبيهقي وغيرهم من الحفاظ، قال البخاري في التاريخ: وقال بعضهم عن كعب وهو أصح. يعني أن هذا الحديث مما سمعه أبو هريرة وتلقاه من كعب الأحبار … فوهم بعض الرواة فجعله مرفوعا إلى النبي صلى الله عليه وسلم.
ثم في متنه غرابة شديدة … وفيه ذكر خلق الأرض وما فيها في سبعة أيام، وهذا خلاف القرآن.
বাংলা অনুবাদ:
ইবন জুরাইজ থেকে বর্ণনার রূপে মতভেদ হয়েছে। আলী ইবনুল মাদিনি, বুখারি, বায়হাকি এবং অন্য হাফিজরা এই হাদিসের সমালোচনা করেছেন। বুখারি আত-তারিখ-এ বলেন: “কেউ কেউ এটি কা‘ব থেকে বর্ণনা করেছেন, আর সেটিই অধিক সঠিক।” অর্থাৎ আবু হুরায়রা হাদিসটি কা‘ব আল-আহবারের কাছ থেকে শুনেছিলেন; কোনো রাবী ভুল করে সেটিকে নবীর নামে মারফু করে দিয়েছেন। মতনের মধ্যেও তীব্র অস্বাভাবিকতা আছে: এতে পৃথিবী ও তার অন্তর্ভুক্ত বস্তু সাত দিনে সৃষ্টির কথা এসেছে, যা কোরআনের বিরোধী।

ইবন তাইমিয়ার মূল্যায়ন আরও প্রত্যক্ষ। তিনি প্রথমে একটি সাধারণ নীতি বলেছেন: কোনো হাদিসকে একদল আলেম সহিহ বললেও অন্যরা দুর্বল বলতে পারেন; তখন অতিরিক্ত প্রমাণ ছাড়া তার সত্যতা নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা যাবে না। এরপর সহিহ মুসলিমের এই হাদিসকেই উদাহরণ বানিয়ে বলেন, মুসলিমের চেয়ে এই বিদ্যায় অধিক জ্ঞানী ইয়াহইয়া ইবন মাঈন ও বুখারির মতো মুহাদ্দিসেরা এতে আপত্তি করেছেন। তাঁর মতে দুর্বলকারীদের সিদ্ধান্তই সঠিক [80] [81]।

মূল আরবি—ইবন তাইমিয়া, মাজমূউল ফাতাওয়া:
ومما قد يسمى صحيحا ما يصححه بعض علماء الحديث وآخرون يخالفونهم في تصحيحه فيقولون: هو ضعيف ليس بصحيح … فهذا لا يجزم بصدقه إلا بدليل.
ومثله حديث: إن الله خلق التربة يوم السبت … فإن هذا طعن فيه من هو أعلم من مسلم، مثل يحيى بن معين ومثل البخاري وغيرهما، وذكر البخاري أن هذا من كلام كعب الأحبار … والبيهقي وغيره وافقوا الذين ضعفوه، وهذا هو الصواب.
ولو كان أول الخلق يوم السبت وآخره يوم الجمعة لكان قد خلق في الأيام السبعة، وهو خلاف ما أخبر به القرآن، مع أن حذاق أهل الحديث يثبتون علة هذا الحديث من غير هذه الجهة.
বাংলা অনুবাদ:
কোনো কোনো বর্ণনাকে “সহিহ” বলা হয়—একদল হাদিসবিশারদ সেটিকে সহিহ বলেন, অন্যরা তাঁদের বিরোধিতা করে বলেন এটি দুর্বল, সহিহ নয়। এমন বর্ণনার সত্যতা অতিরিক্ত প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা যায় না। এর উদাহরণ “আল্লাহ শনিবার মাটি সৃষ্টি করেছেন” হাদিস। মুসলিমের চেয়ে এ বিষয়ে অধিক জ্ঞানী ইয়াহইয়া ইবন মাঈন, বুখারি এবং অন্যরা এতে আপত্তি করেছেন। বুখারি উল্লেখ করেন, এটি কা‘ব আল-আহবারের বক্তব্য। বায়হাকি এবং অন্যরা দুর্বলকারীদের সঙ্গে একমত হয়েছেন; আর এটিই সঠিক। কারণ সৃষ্টির শুরু শনিবার ও শেষ শুক্রবার হলে সাত দিন হয়, যা কোরআনের বক্তব্যের বিরোধী। দক্ষ হাদিসবিশারদেরা এই দিকটি ছাড়াও বর্ণনাটির গোপন ত্রুটি প্রমাণ করেছেন।

শনিবার থেকে সৃষ্টি শুরু হওয়ার বর্ণনাটি সহিহ মুসলিমে সংকলিত হওয়ার পরও তার আরোপ ও গোপন ত্রুটি নিয়ে মুহাদ্দিসেরা সরাসরি আপত্তি তুলেছেন। গ্রন্থটির মর্যাদা এই নির্দিষ্ট বর্ণনার ভুল আরোপের অভিযোগ ঠেকাতে পারেনি। মুসলিম তাঁর নির্বাচিত মানদণ্ডে বর্ণনাটি গ্রহণ করেছেন; বুখারি, ইয়াহইয়া ইবন মাঈন, আলী ইবনুল মাদিনি, বায়হাকি ও ইবন তাইমিয়ার মতো কর্তৃত্বরা সেটিকে ভুল বা মুআল্লাল বলেছেন; অন্য কয়েকজন আবার রক্ষা করেছেন। অর্থাৎ “সহিহ মুসলিমে আছে” একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক তথ্য, কিন্তু সেটি নিজে কোনো আলোচনা-সমাপ্তকারী যুক্তি নয়।

আরও নির্মম সত্য হলো, এখানে দুর্বলতার অভিযোগ কোনো অজ্ঞাত বা নিন্দিত রাবীর সাধারণ চরিত্র নিয়ে নয়। বাহ্যিকভাবে ভালো সনদকে তুলনামূলক বিশ্লেষণে ভুল বলে শনাক্ত করা হয়েছে: নবীর বক্তব্য বলে পৌঁছানো কথাটি আসলে কা‘বের বক্তব্য। ঠিক এই সম্ভাবনার কথাই ইলালশাস্ত্র বলে—সনদের চেহারা ভালো, কিন্তু অন্য পথ ও মতনের সঙ্গে তুলনায় বোঝা যায় কোনো রাবী মওকুফ বক্তব্যকে মারফু করেছেন। সুতরাং “সবাই সিকাহ” বলে নিশ্চিন্ত হওয়া হাদিসশাস্ত্রের গভীর নিয়ম জানা নয়; তার প্রাথমিক স্তরে আটকে থাকা।


সহিহ মানেই নিশ্চিত জ্ঞান নয়

হাদিসের ব্যবহারিক গ্রহণযোগ্যতা এবং তার দ্বারা নিশ্চিত জ্ঞান লাভ—দুটি পৃথক প্রশ্ন। কোনো সংবাদ শরিয়তের বিধানে আমলযোগ্য হতে পারে, অথচ তার সত্যতা গাণিতিক বা প্রত্যক্ষ জ্ঞানের মতো সন্দেহাতীত না-ও হতে পারে। ক্লাসিক্যাল উসুল ও হাদিসশাস্ত্রে মুতাওয়াতির সংবাদকে এমন বহু স্বাধীন পথের সংবাদ বলা হয়, যেখানে সম্মিলিত মিথ্যার সম্ভাবনা সাধারণত অসম্ভব ধরা হয়; এর নিচে থাকা সংবাদ খবরুল ওয়াহিদ। “ওয়াহিদ” মানেই কেবল একজন রাবী নয়—মুতাওয়াতিরের শর্ত পূরণ না করা এক বা একাধিক পথও এর অন্তর্ভুক্ত।

ইমাম নববী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম আলেম, সাহাবি-তাবিয়ি, পরবর্তী মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসুলবিদদের অবস্থান হিসেবে স্পষ্টভাবে বলেছেন: বিশ্বস্ত ব্যক্তির খবরুল ওয়াহিদ শরিয়তের দলিল এবং তার ওপর আমল আবশ্যক; কিন্তু এটি যান্ন বা প্রবল ধারণা দেয়, ইলম বা নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না [82]।

মূল আরবি—ইমাম নববী, শরহ সহিহ মুসলিম:
وأما خبر الواحد: فهو ما لم يوجد فيه شروط المتواتر، سواء كان الراوي له واحدا أو أكثر.
والذي عليه جماهير المسلمين من الصحابة والتابعين فمن بعدهم من المحدثين والفقهاء وأصحاب الأصول أن خبر الواحد الثقة حجة من حجج الشرع، يلزم العمل بها، ويفيد الظن ولا يفيد العلم، وأن وجوب العمل به عرفناه بالشرع لا بالعقل.
বাংলা অনুবাদ:
খবরুল ওয়াহিদ হলো সেই সংবাদ, যাতে মুতাওয়াতিরের শর্ত পাওয়া যায় না—তার রাবী একজন হোক বা একাধিক। সাহাবি, তাবিয়ি এবং তাঁদের পরবর্তী মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসুলবিদদের মধ্যকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের মত হলো: বিশ্বস্ত রাবীর খবরুল ওয়াহিদ শরিয়তের একটি দলিল এবং তার ওপর আমল করা আবশ্যক। কিন্তু এটি প্রবল ধারণা দেয়, নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না; এর ওপর আমলের আবশ্যকতা শরিয়তের মাধ্যমে জানা গেছে, বুদ্ধির অনিবার্য সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।

নববীর বক্তব্যে সহিহ একক বর্ণনার ওপর আমল করার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা ভুল হওয়ার সব সম্ভাবনা দূর করে নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না। এখানে “একক” বলতে শুধু একজন মানুষ বোঝায় না; নিশ্চিত বহুসাক্ষ্যের স্তরে না পৌঁছানো বর্ণনার শ্রেণিও বোঝানো হয়। মানুষ অনেক কাজই সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করে, যদিও ভুলের সম্ভাবনা পুরোপুরি দূর হয় না। ধর্মীয় বিধানে এই খবর গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে—এটি এক সিদ্ধান্ত। খবরের ঘটনাটি কোনো ভুলের সম্ভাবনা ছাড়াই প্রমাণিত—এটি আরও শক্ত দাবি। নববীর ব্যাখ্যায় প্রথমটি মেনে দ্বিতীয়টি না মানার জায়গা আছে। ফলে আমল করার অনুমতি বা বাধ্যবাধকতাকে শতভাগ ঐতিহাসিক সত্যতার প্রমাণ বলা তাঁর বক্তব্যের অর্থ বদলে দেওয়া।

অবশ্য বিপরীত মতও ছিল। নববী উল্লেখ করেন, একদল মুহাদ্দিস খবরুল ওয়াহিদকে নিশ্চিত জ্ঞানদায়ক বলেছেন; কেউ শুধু বুখারি ও মুসলিমের একক বর্ণনাকে সেই মর্যাদা দিয়েছেন। ইবনুস সালাহ সহিহাইনের ব্যাপারে বিশেষভাবে শক্তিশালী অবস্থান নেন। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তও সর্বসম্মত হয়নি। আল-ইরাকি আলোচনাটি সংরক্ষণ করে বলেন, নববীর মতে “মুহাক্কিক ও অধিকাংশ” আলেম ইবনুস সালাহর বিরোধিতা করে বলেছেন—মুতাওয়াতির না হলে তা প্রবল ধারণাই দেয় [83]।

মূল আরবি—আল-ইরাকি, আত-তাকয়ীদ ওয়াল ঈদাহ:
ما أسنده البخاري ومسلم … فهو مقطوع بصحته، كذا قال ابن الصلاح … والعلم اليقيني النظري واقع به.
قال النووي: وخالف ابن الصلاح المحققون والأكثرون، فقالوا: يفيد الظن ما لم يتواتر.
سوى أحرف يسيرة، تكلم عليها بعض أهل النقد، كالدارقطني وغيره.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনুস সালাহ বলেছেন, বুখারি ও মুসলিম যে বর্ণনাগুলো সনদসহ এনেছেন, সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত এবং সেগুলো দ্বারা বিচারভিত্তিক নিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হয়। কিন্তু নববী বলেন: “মুহাক্কিক ও অধিকাংশ আলেম ইবনুস সালাহর বিরোধিতা করে বলেছেন—মুতাওয়াতির না হলে তা প্রবল ধারণা দেয়।” উপরন্তু অল্প কয়েকটি বর্ণনা আছে, যেগুলো নিয়ে দারাকুতনি প্রমুখ সমালোচক আলোচনা করেছেন।

এই বিরোধ হাদিসশাস্ত্রের বাইরের কারও তৈরি নয়। ইবনুস সালাহ বিশেষ ধরনের নিশ্চয়তার কথা বলেছেন; নববী সেই দাবির বিরোধিতা করে অধিকাংশের অবস্থান হিসেবে প্রবল ধারণার কথা জানিয়েছেন। “প্রবল ধারণা” মানে খবরটি গ্রহণের পক্ষে যথেষ্ট জোর আছে, তবু ভুল অসম্ভব হয়ে যায়নি। সেই পার্থক্য স্বীকার করে কোনো ইতিহাসবিদ সহিহ একক বর্ণনাকে শক্তিশালী কিন্তু অভ্রান্ত নয় বললে তাঁকে শুধু “হাদিস বোঝেন না” বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। সংশয়টি শাস্ত্রের নিজের সংরক্ষিত মতভেদের মধ্যেই আছে। কোন মতটি বেশি যুক্তিসংগত, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে; কিন্তু একটি মতকে গোপন করে নিশ্চয়তার প্রশ্নে সব বিশেষজ্ঞ একমত ছিলেন বলা ভুল। ধর্মীয় আনুগত্যের কারণে খবর মেনে চলা এবং ঘটনাটি শতভাগ সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা আলাদা দাবি।

আর সহিহাইনের ভেতরেও সমালোচিত “অল্প কয়েকটি” বর্ণনার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। “একটিও সমালোচনার যোগ্য নয়”—এই সর্বাত্মক দাবিকে একটি প্রতিষ্ঠিত আপত্তিই মিথ্যা করে দেয়। সংখ্যার স্বল্পতা দিয়ে সেই আপত্তি বাতিল করলে গ্রন্থের মর্যাদাই নির্দিষ্ট বর্ণনার ভুল ঢাকার যুক্তি হয়ে ওঠে। সৃষ্টি-বর্ণনাটি সেই নীতির বাস্তব উদাহরণ: একজন বড় সংকলক গ্রহণ করেছেন, অন্য বড় সমালোচকেরা ইল্লত শনাক্ত করেছেন।


মুতাওয়াতিরের সীমা

নিশ্চিত জ্ঞানের দাবিতে হাদিসশাস্ত্রের প্রধান শ্রেণি হলো মুতাওয়াতির। এর ধারণা এমন: প্রতিটি প্রয়োজনীয় স্তরে এতজনের মাধ্যমে খবর এসেছে যে তাঁদের মিথ্যায় একমত হওয়া স্বাভাবিকভাবে অসম্ভব। এখানে শুধু শেষের অনেক বর্ণনাকারী নয়, আগের স্তরগুলোতেও প্রয়োজনীয় বহুসাক্ষ্যের প্রশ্ন আছে। কিন্তু কতজনকে যথেষ্ট ধরা হবে, কোথা থেকে এই নিশ্চয়তা শুরু হবে এবং কোন কোন হাদিস শর্ত পূরণ করে—এসব নিয়ে প্রাচীন আলেমদের সিদ্ধান্ত এক হয়নি। ফলে শুধু “মুতাওয়াতির” বললে নিশ্চয়তার দাবি জানা যায়; কী তথ্য দিয়ে শর্তগুলো পূরণ দেখানো হলো, তা জানা যায় না। সংখ্যার নিয়ম, বর্ণনাকারীদের স্বাধীনতা ও বাস্তব উদাহরণের বিরোধই সেই দাবির ভিত্তি পরীক্ষার প্রয়োজন তৈরি করে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ মুতাওয়াতিরকে সাধারণত হাদিসের এমন এক শ্রেণি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা সবচেয়ে শক্তিশালী জ্ঞানগত নিশ্চয়তা দেয়। আহাদ সংবাদ নিয়ে যদি “যান্ন” বা প্রবল ধারণা বনাম নিশ্চিত জ্ঞানের বিতর্ক থাকে, মুতাওয়াতির সেই অনিশ্চয়তার বাইরে যাওয়ার পথ। কিন্তু যে শ্রেণির ওপর “নিশ্চিত জ্ঞান” দাঁড় করানো হবে, সেই শ্রেণির গ্রহণযোগ্যতার সীমাই যদি একক ও যান্ত্রিক না হয়, তাহলে আবারও দেখা যায়—গ্রেড অতীতের গায়ে লাগানো স্বয়ংপ্রকাশিত চিহ্ন নয়; কতজন বর্ণনাকারী, কী ধরনের স্বাধীনতা এবং কোন মাত্রার বহুত্ব মানুষের মনে মিথ্যার যৌথ সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তোলে—সেটিও একটি বিচার।


কতজন হলে মুতাওয়াতির?

উসুলশাস্ত্রের গ্রন্থগুলোতে মুতাওয়াতিরের ন্যূনতম সংখ্যা নিয়ে বিস্তৃত মতভেদ সংরক্ষিত হয়েছে। আমিদীর আল-ইহকাম-এ পাঁচজন, বারোজন এবং অন্যান্য সংখ্যার মত উল্লেখ রয়েছে; যারকাশির আল-বাহরুল মুহীত-এ আবার দশ, বারোসহ বিভিন্ন প্রস্তাবকে “অনেক মতভেদ ও অস্থিরতা” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে পরবর্তী মুহাদ্দিসদের আলোচনায় নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বাধ্যতামূলক নয়—এ অবস্থানই শক্তিশালী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল মাপকাঠি সংখ্যা নিজে নয়; এতসংখ্যক স্বাধীন সংবাদদাতা থাকতে হবে যাতে তাঁদের সম্মিলিত মিথ্যাচার অসম্ভব বলে নিশ্চিত জ্ঞান জন্মায়। [84] [85] [86]

মূল আরবি—আল-যারকাশি:
والمشترطون للعدد اختلفوا واضطربوا اضطرابا كثيرا، فقيل: يشترط عشرة … وقال قوم … أقل ما يتواتر به الخبر اثنا عشر.
বাংলা অনুবাদ:
যাঁরা নির্দিষ্ট সংখ্যা শর্ত করেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন দশজন প্রয়োজন; আবার অন্যদের মতে কোনো সংবাদ মুতাওয়াতির হওয়ার ন্যূনতম সংখ্যা বারোজন। অর্থাৎ “কতজন মানুষের সাক্ষ্যে নিশ্চিত জ্ঞান তৈরি হবে”—সেই সংখ্যাটিই এককভাবে নির্ধারিত ছিল না।

কতজনের বর্ণনায় নিশ্চিত জ্ঞান তৈরি হয়, তা নিয়ে মতভেদ ফলও বদলে দেয়। পাঁচজনকে যথেষ্ট ধরলে যে বর্ণনা প্রয়োজনীয় সীমায় পৌঁছাবে, দশজন চাইলে সেটিই পৌঁছাবে না। আবার শুধু সংখ্যা ঠিক না করে বলা হয়—যতজন হলে মিথ্যায় একমত হওয়া অসম্ভব মনে হয়। তখন সংখ্যার পাশাপাশি তাঁদের সম্পর্কও বিচার করতে হয়। দশজন একই মানুষের কথা নকল করলে দশটি স্বাধীন সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। তাঁরা একই গোষ্ঠীর চাপ, একই ভুল সংবাদ বা একই লিখিত উৎসের প্রভাবেও মিলতে পারেন। অন্যদিকে সত্যিই স্বাধীন পথ থেকে মিল এলে খবর অনেক শক্তিশালী হয়। কতজন বলেছেন তার সঙ্গে কে কাকে শুনেছেন এবং একই ভুল সবার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল কি না, তা না দেখলে সংখ্যা নিশ্চিত জ্ঞানের মাপকাঠি হতে পারে না।


মুতাওয়াতির কত বিরল?

ইবনুস সালাহ মুতাওয়াতিরকে হাদিসবিদদের সাধারণ ব্যবহারিক শ্রেণি হিসেবে দেখেননি; তাঁর মতে এটি তাঁদের বর্ণনায় এত বিরল যে কেউ উদাহরণ চাইলে তা খুঁজে বের করাই কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বিখ্যাত “কাজ নিয়তের ওপর” হাদিসকে মুতাওয়াতির বলেননি, কারণ তার প্রথম দিকে বর্ণনাপ্রবাহ বহুজনের ছিল না; পরে গিয়ে বহু পথ তৈরি হয়েছে। মুতাওয়াতিরের প্রধান উদাহরণ হিসেবে তিনি এনেছেন: “যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে জাহান্নামে নিজের স্থান প্রস্তুত করুক।” পরবর্তী হাদিসগ্রন্থেও ইবনুস সালাহর নামে সংরক্ষিত হয়েছে—মুতাওয়াতিরের মধ্যে এই বর্ণনার সমপর্যায়ের আর কিছু নেই। [87] [88]

ইবনুস সালাহর অবস্থান সম্পর্কে সংরক্ষিত বক্তব্য:
ومن سئل عن إبراز مثال لذلك فيما يروى من الحديث، أعياه تطلبه … نعم، حديث: من كذب علي نراه مثالا لذلك.
বাংলা অনুবাদ:
হাদিসের বর্ণনাগুলোর মধ্যে কেউ মুতাওয়াতিরের একটি উদাহরণ হাজির করতে চাইলে তা খুঁজে পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে… তবে “যে আমার নামে মিথ্যা বলে” হাদিসটিকে আমরা এর উদাহরণ মনে করি।

কিন্তু এখানেও পরবর্তী মুহাদ্দিসেরা একমত থাকেননি। ইবন হাজার ইবনুস সালাহর “মুতাওয়াতির অত্যন্ত বিরল” ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন; তাঁর মতে বহু বর্ণনার পথ ও রাবীদের অবস্থা যথেষ্ট বিস্তৃতভাবে জানা থাকলে মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা অনেক বলে দেখা যায়। সুয়ূতী এ বিষয়ে আলাদা গ্রন্থ রচনা করে বহু হাদিসকে মুতাওয়াতির বলেছেন। অর্থাৎ একজন প্রধান পদ্ধতিবিদের কাছে যে শ্রেণি প্রায় উদাহরণহীন, পরবর্তী আরেক প্রধান ধারায় সেই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত বহু বর্ণনার তালিকা তৈরি হয়েছে। [89]


“শুনে পৌঁছে দাও” হাদিস

এখানেই সেই বর্ণনাটি আসে যা প্রায়ই হাদিস সংরক্ষণের পক্ষে শক্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়: “আল্লাহ সেই ব্যক্তির মুখ উজ্জ্বল করুন, যে আমার কথা শুনে তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়।” এর একটি রূপে স্পষ্ট ভাষা আছে—“সে যেন যেভাবে শুনেছে সেভাবেই পৌঁছে দেয়”। তিরমিযি ইবন মাসউদের সূত্রের একটি রূপকে হাসান সহিহ বলেছেন। সুয়ূতী আবার প্রায় ত্রিশ সাহাবীর বর্ণনাপথ উল্লেখ করে এই মূল বক্তব্যকে তাঁর মুতাওয়াতির হাদিসের তালিকায় রেখেছেন। [90] [91]

মূল আরবি—জামে আত-তিরমিযি:
نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহ সেই ব্যক্তির মুখ উজ্জ্বল করুন, যে আমাদের কাছ থেকে কোনো কথা শুনে যেভাবে শুনেছে সেভাবেই তা পৌঁছে দেয়; কারণ যাকে পৌঁছে দেওয়া হয়, সে কখনো শ্রোতার চেয়েও ভালোভাবে তা বুঝতে পারে।”

কিন্তু এই হাদিসটি মুতাওয়াতির হিসেবে গ্রহণ করলেও তা পুরো হাদিস বর্ণনাসংগ্রহকে মুতাওয়াতির বানায় না। বরং উল্টো একটি সীমা পরিষ্কার হয়: কয়েকটি বিশেষ বক্তব্য অত্যন্ত বহু পথে এসেছে—এই তথ্য থেকে বহুসংখ্যক পৃথক মতন, আইন, যুদ্ধের ঘটনা, ব্যক্তিগত কথোপকথন, যৌন বিধান অথবা জীবনীমূলক সংবাদ একই মাত্রার নিশ্চয়তায় পৌঁছায় না। “হাদিস পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে” এবং “পরবর্তীকালে নবীর নামে সংরক্ষিত প্রতিটি নির্দিষ্ট হাদিস নির্ভুলভাবে পৌঁছেছে”—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা দাবি। প্রথমটির শক্ত বর্ণনাপ্রবাহ দ্বিতীয়টির সত্যতা নিজে থেকে প্রমাণ করে না।


ইবন হিব্বান: সবই আহাদ

তাওয়াতুরের সংজ্ঞাগত অস্থিরতার সবচেয়ে চরম উদাহরণ ইবন হিব্বানের নামে সংরক্ষিত অবস্থান। আল-বাহরুল মুহীত-এ তাঁর সহিহ-এর ভূমিকা থেকে উদ্ধৃত হয়েছে যে নবী থেকে আসা সব সংবাদই তাঁর ব্যবহৃত কাঠামোয় আহাদ; কারণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক স্তরে দুইজন করে নির্ভরযোগ্য রাবী আবার দুইজনের কাছ থেকে বর্ণনা করছেন—এমন অবিচ্ছিন্ন বিন্যাস পাওয়া যায় না। অন্য আলেমরা অবশ্য তাঁর এই কঠোর ধারণা গ্রহণ করেননি। কিন্তু এই মতের অস্তিত্বই দেখায়—“মুতাওয়াতির” এমন কোনো শ্রেণি ছিল না যার সীমানা সব মুহাদ্দিস একইভাবে দেখেছেন। [92]

মুতাওয়াতির বলা হয় এমন বর্ণনাকে, যার প্রতিটি প্রয়োজনীয় স্তরে এত স্বাধীন বর্ণনাকারী আছেন যে তাঁদের সম্মিলিত মিথ্যা বা ভুলকে অসম্ভব বলে ধরা হয়। কিন্তু কতজন প্রয়োজন, কোন স্তরে কতজন আছেন, তাঁরা কতটা স্বাধীন এবং কোন হাদিস সত্যিই এই শর্ত পূরণ করে—এসব স্থির করতে হয় সংরক্ষিত তথ্য দেখে। তাই সংখ্যাটি শুধু গুনলেই কাজ শেষ হয় না। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে একশ ছাত্র শিখলে সেই শিক্ষকের আগের অংশে একশ সাক্ষী তৈরি হয় না। একই ভুল খবর বহু মানুষ আন্তরিকভাবে বললেও ভুলটি সত্য হয়ে যায় না। মুতাওয়াতিরের নিশ্চয়তার দাবি দাঁড়ায় সংখ্যা ও স্বাধীনতা সম্পর্কে বিচার ঠিক হওয়ার ওপর। সেই বিচারটি বাদ দিয়ে শুধু শ্রেণির নাম বললে নিশ্চয়তা কীভাবে পাওয়া গেল, তার প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাই অনুপস্থিত থাকে।


“লক্ষ হাদিস” বলতে কতটি স্বতন্ত্র বক্তব্য?

কোনো মুহাদ্দিস এক লাখ, কয়েক লাখ বা দশ লাখ হাদিস জানতেন—এ ধরনের সংখ্যা শুনে সমসংখ্যক স্বতন্ত্র নববী বক্তব্য অথবা স্বাধীন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ধারণা তৈরি হওয়া সহজ। কিন্তু প্রাচীন গণনায় “হাদিস” শব্দের একক আজকের একটি আলাদা ঘটনা বা একটি স্বতন্ত্র মতনের সমান ছিল না। ইবনুস সালাহ বুখারির নামে এক লাখ সহিহ ও দুই লাখ অসহিহ হাদিস মুখস্থ থাকার বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংখ্যার ব্যবহার ব্যাখ্যা করেছেন: সাহাবি ও তাবিয়িদের আছারও এই গণনায় ঢুকতে পারে; একই হাদিস দুটি সনদে বর্ণিত হলে সেটিকেও দুটি হাদিস গণনা করা হতো। একই অনুচ্ছেদে তিনি বুখারির গ্রন্থের পুনরাবৃত্তিসহ গণনা এবং পুনরাবৃত্তি বাদ দেওয়া গণনা আলাদা করেছেন। অর্থাৎ মোট সংখ্যা জানতে শুধু অঙ্কটি পড়লেই চলে না; কী গণনা হয়েছে, একই বক্তব্য কতবার এসেছে এবং নববী বর্ণনার সঙ্গে সাহাবি–তাবিয়ির বক্তব্যও যোগ হয়েছে কি না—এসব না জানলে সংখ্যাটির অর্থই বদলে যায়। [93]

وقد قال البخاري : ” أحفظ مائة ألف حديث صحيح ، ومائتي ألف حديث غير صحيح ” ، وجملة ما في كتابه الصحيح سبعة آلاف ومائتان وخمسة وسبعون حديثا بالأحاديث المتكررة . وقد قيل : إنها بإسقاط المكررة أربعة آلاف حديث ، إلا أن هذه العبارة قد يندرج تحتها عندهم آثار الصحابة والتابعين ، وربما عد الحديث الواحد المروي بإسنادين حديثين .

বাংলা অনুবাদ:বুখারি বলেছেন, “আমি এক লাখ সহিহ হাদিস এবং দুই লাখ অসহিহ হাদিস মুখস্থ রাখি।” তাঁর সহিহ গ্রন্থে পুনরাবৃত্ত হাদিসসহ মোট সাত হাজার দুইশ পঁচাত্তরটি হাদিস আছে। বলা হয়েছে, পুনরাবৃত্তিগুলো বাদ দিলে চার হাজার হাদিস থাকে। তবে তাঁদের ব্যবহারে এই কথার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে সাহাবি ও তাবিয়িদের আছারও; কখনো একই হাদিস দুটি সনদে বর্ণিত হলে সেটিকে দুটি হাদিস গণনা করা হয়েছে।

আহমদ ইবন হাম্বলের দশ লাখ হাদিস মুখস্থ থাকার বর্ণনা নিয়ে যাহাবির মন্তব্য আরও স্পষ্ট। তিনি সংখ্যাটিকে দশ লাখ স্বতন্ত্র নববী উক্তি বলেননি; বলেছেন, পুনরাবৃত্ত বর্ণনা, আছার, তাবিয়ির ফতোয়া ও তাফসিরজাতীয় তথ্যও এই হিসাবে গণনা করা হতো। শক্তিশালী মারফু মতন সেই পরিমাণের একশ ভাগের এক ভাগও হবে না—এ কথাও তিনি সরাসরি লিখেছেন। একই প্রসঙ্গে আহমদের নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে একটি হাদিস ছয়-সাত পথে লিখে নেওয়ার কথা এসেছে। একটি বক্তব্য বিভিন্ন পথ থেকে সংগ্রহ করা তুলনার উপকরণ বাড়ায়; প্রতিটি পথকে আলাদা নববী বক্তব্য বানায় না। যাহাবির ব্যাখ্যায় এই পার্থক্যটি সংখ্যার ভিতরেই স্বীকৃত। ফলে “দশ লাখ হাদিস” বলে সেই দশ লাখকে পৃথক মতন, পৃথক ঘটনা অথবা পৃথক স্বাধীন সাক্ষ্যে রূপান্তর করা মূল উৎসের গণনাপদ্ধতির বিরোধী। [94]

وعن أحمد الدورقي ، عن أبي عبد الله قال : نحن كتبنا الحديث من ستة وجوه وسبعة لم نضبطه ، فكيف يضبطه من كتبه من وجه واحد ؟! قال عبد الله بن أحمد : قال لي أبو زرعة : أبوك يحفظ ألف ألف حديث ، فقيل له : وما يدريك ؟ قال : ذاكرته فأخذت عليه الأبواب . فهذه حكاية صحيحة في سعة علم أبي عبد الله ، وكانوا يعدون في ذلك المكرر ، والأثر ، وفتوى التابعي ، وما فسر ، ونحو ذلك وإلا فالمتون المرفوعة القوية لا تبلغ عشر معشار ذلك .

বাংলা অনুবাদ:আহমদ আদ-দাওরাকি আবু আবদুল্লাহর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: “আমরা একটি হাদিস ছয়-সাতটি পথে লিখেও তা যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারিনি; যে শুধু একটি পথে লিখেছে, সে কীভাবে তা আয়ত্ত করবে?” আবদুল্লাহ ইবন আহমদ বলেন: আবু যুরআ আমাকে বলেছেন, “তোমার বাবা দশ লাখ হাদিস মুখস্থ রাখেন।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কীভাবে জানেন?” তিনি বললেন, “আমি তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে অধ্যায়গুলো যাচাই করেছি।” আবু আবদুল্লাহর জ্ঞানের ব্যাপকতা সম্পর্কে এটি একটি সঠিক বর্ণনা। তাঁরা এই গণনায় পুনরাবৃত্ত বর্ণনা, আছার, তাবিয়ির ফতোয়া, তাফসির এবং অনুরূপ বিষয়ও ধরতেন; তা না হলে শক্তিশালী মারফু মতন সেই সংখ্যার একশ ভাগের এক ভাগও হবে না।

একজন শিক্ষক একটি কথা দশজন ছাত্রকে বললেন; তাঁরা দশটি শহরে গিয়ে বললেন; পরে দশটি বইয়ে সেটি লেখা হলো। এখানে দশটি বই ও দশটি পথ পাওয়া গেল, কিন্তু শিক্ষকের আগের খবরের জন্য দশজন স্বাধীন সংবাদদাতা পাওয়া গেল না। এই কারণে হাদিসের বিপুল সংখ্যা শুনে সেটিকে একই সংখ্যক আলাদা ঘটনার প্রমাণ ভাবা ভুল। একটি বক্তব্য পুনরাবৃত্ত হয়ে বহু সনদে গুনতে পারে। কোন কোন পথ একই মানুষের কাছে মিলে গেছে, কোন বই অন্য বই বা একই নোট ব্যবহার করেছে এবং শব্দের মিল কোথা থেকে এসেছে—এসব দেখতে হয়। একই সংবাদ দশবার গুনলে তার প্রাচীনতা বা সত্যতার পক্ষে দশটি নতুন প্রমাণ তৈরি হয় না। সংগ্রহের মোট আয়তন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট হাদিসের বয়স, উৎস ও স্বাধীন সমর্থন তার নিজস্ব ইতিহাস থেকেই প্রতিষ্ঠা করতে হয়।


সহিহ মতনও হুবহু শব্দ নয়

আজ বইয়ে একটি সহিহ হাদিসের যে আরবি বাক্য পড়া যায়, মুহাম্মদ কি ঠিক সেই শব্দ ও বাক্যবিন্যাসে কথাটি বলেছিলেন? হাদিসশাস্ত্রে বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং হুবহু শব্দ সংরক্ষিত হওয়াকে এক করে দেখা হয়নি। রিওয়ায়াত বিল-মা‘না বলতে বোঝায় অর্থ ঠিক রেখে নিজের ভাষায় বলা; নির্দিষ্ট শর্তে অধিকাংশ আলেম এই অনুমতি দিয়েছেন। অর্থাৎ কোনো রাবী ইচ্ছা করে মিথ্যা না বলেও শব্দ বদলে বলতে পারতেন। একজন “তিনি নিষেধ করেছেন” বললেন, আরেকজন নিষেধের মূল বাক্য উদ্ধৃত করলেন—দুটির বক্তব্য কাছাকাছি হতে পারে, কিন্তু শব্দ হুবহু এক নয়। সহিহ রায় থেকে বক্তব্যটি মুহাম্মদের বলে গ্রহণের ভিত্তি পাওয়া যেতে পারে; বর্তমান বাক্যের প্রতিটি শব্দ তাঁর মুখের শব্দ, তা আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।


রিওয়ায়াত বিল-মা‘না

ইবনুস সালাহ উলূমুল হাদিস-এ এই প্রশ্ন সরাসরি তুলেছেন। যে ব্যক্তি শব্দের অর্থ, উদ্দেশ্য এবং সামান্য শব্দবদলে অর্থ কোথায় পাল্টে যেতে পারে—এসব বোঝেন না, তাঁর জন্য অর্থের ভিত্তিতে শব্দ পরিবর্তন করে হাদিস বর্ণনা করা সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ। কিন্তু ভাষা ও অর্থে দক্ষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সালাফ, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসুলবিদদের মধ্যে মতভেদ ছিল; অধিকাংশই তা অনুমোদন করেছেন। ইবনুস সালাহ নিজেও শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনকেই শক্তিশালী মত বলেছেন। তাঁর যুক্তি আরও তাৎপর্যপূর্ণ: সাহাবী ও প্রথম যুগের লোকেরা একই ঘটনা ও একই অর্থকে প্রায়ই বিভিন্ন শব্দে বর্ণনা করেছেন, কারণ তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থ—একই শব্দের যান্ত্রিক প্রতিলিপি নয়। [95]

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ:
فأما إذا كان عالما عارفا بذلك، فهذا مما اختلف فيه السلف، وأصحاب الحديث، وأرباب الفقه، والأصول، فجوزه أكثرهم … والأصح: جواز ذلك في الجميع … لأن ذلك هو الذي تشهد به أحوال الصحابة، والسلف الأولين، وكثيرا ما كانوا ينقلون معنى واحدا في أمر واحد بألفاظ مختلفة، وما ذلك إلا لأن معولهم كان على المعنى دون اللفظ.
বাংলা অনুবাদ:
যদি বর্ণনাকারী শব্দ ও অর্থের পার্থক্য সম্পর্কে জ্ঞানী হন, এ বিষয়ে সালাফ, হাদিসবিদ, ফকিহ ও উসুলবিদদের মতভেদ রয়েছে; অধিকাংশই অর্থ ঠিক রেখে বর্ণনা করার অনুমতি দিয়েছেন। সঠিক মত হলো শর্তসাপেক্ষে তা বৈধ। সাহাবী ও প্রথম যুগের মানুষের অবস্থাও এর সাক্ষ্য দেয়; তাঁরা প্রায়ই একই বিষয়ের একই অর্থ বিভিন্ন শব্দে বর্ণনা করতেন—কারণ তাঁদের নির্ভরতা ছিল অর্থের ওপর, হুবহু শব্দের ওপর নয়।

ইবনুস সালাহ লিখিত বইয়ের জন্য আলাদা সীমা টেনেছেন: বইয়ে সংরক্ষিত হাদিস নকল করার সময় নিজের পছন্দে সমার্থক শব্দ বসিয়ে মূল পাঠ বদলানো যাবে না। আগে অর্থ ঠিক রেখে মুখে বলার অনুমতি এবং পরে বইয়ের লেখা বদলানোর অনুমতি এক নয়। কিন্তু বই তৈরি হওয়ার আগে যারা নিজের ভাষায় বলেছেন, তাঁদের শব্দবদল পরে স্থির পাঠের অংশ হয়ে থাকতে পারে। একবার বইয়ের ভাষা স্থির হওয়ার পর সেটি যত নিখুঁতভাবেই নকল করা হোক, তার আগের কথাবলার পর্যায়ে কোন শব্দ বদলেছিল, তা ওই নিখুঁত নকল থেকে জানা যায় না। সেই প্রশ্নের জন্য একই বক্তব্যের পুরোনো ও পৃথক পাঠ পাশাপাশি দরকার। বর্তমান লেখা অপরিবর্তিত আছে—এই প্রমাণ কথাটি প্রথম উচ্চারণের দিন থেকেই একই শব্দে ছিল, তার সমান প্রমাণ নয়।


শব্দভ্রান্তির আশঙ্কা

রিওয়ায়াত বিল-মা‘নার ঝুঁকিটিও ক্লাসিক্যাল পদ্ধতিবিদরা গোপন করেননি। ইবনুস সালাহ উল্লেখ করেন, অর্থ অনুযায়ী বর্ণনা করলে শেষে “অথবা তিনি যেভাবে বলেছেন”, “এর কাছাকাছি”—জাতীয় সতর্কতা যোগ করা উত্তম। ইবন মাসউদ, আবু দারদা ও আনাসের মতো সাহাবীদের কাছ থেকেও এমন ব্যবহার বর্ণিত হয়েছে। খতিব আল-বাগদাদির ব্যাখ্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ: সাহাবীরা আরবি ভাষায় সর্বাধিক দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও এমন সতর্ক বাক্য বলতেন, কারণ অর্থভিত্তিক বর্ণনায় ভুলের ঝুঁকি আছে—তাঁরা সেটি জানতেন। [96]

মূল আরবি—আল-খতিবের বক্তব্য, ইবনুস সালাহর উদ্ধৃতিতে:
والصحابة أرباب اللسان، وأعلم الخلق بمعاني الكلام، ولم يكونوا يقولون ذلك إلا تخوفا من الزلل، لمعرفتهم بما في الرواية على المعنى من الخطر.
বাংলা অনুবাদ:
সাহাবীরা ভাষার অধিকারী এবং বক্তব্যের অর্থ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন। তবুও তাঁরা এ ধরনের সতর্ক বাক্য বলতেন শুধু ভুলের আশঙ্কায়—কারণ অর্থভিত্তিক বর্ণনার মধ্যে যে ঝুঁকি রয়েছে, তাঁরা তা জানতেন।

শব্দ বদলানোর গুরুত্ব শুধু ভাষার সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদেশ, অনুরোধ ও পরামর্শ কাছাকাছি পরিস্থিতিতে বলা হলেও আইন তৈরির সময় তাদের ওজন আলাদা হতে পারে। একজন রাবী মূল বক্তব্যের অর্থ ঠিক রেখেছেন বলে বিশ্বাস করেও এমন শব্দ বেছে নিতে পারেন, যাতে পরে বাধ্যবাধকতা বা ব্যতিক্রমের অর্থ বদলে যায়। তাঁর সততার রায় এতে মিথ্যা হয়ে যায় না; সমস্যা হয় স্মৃতি ও ব্যাখ্যায়। পরে তাঁর ছাত্ররা সেই বাক্য নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করলে রাবীর বলা কথাটি ঠিক পাওয়া যায়। তাতে প্রমাণ হয় না যে তিনি যে শব্দ বেছে নিয়েছিলেন, মুহাম্মদও ঠিক সেই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। ধর্মীয় বা আইনগত সিদ্ধান্ত একটি শব্দের ওপর নির্ভর করলে তাই পাঠগুলোর পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ; শুধু বিশ্বস্ততার সাধারণ রায় সেই পার্থক্য মেটায় না।


আংশিক বর্ণনা

শব্দ পরিবর্তনের পাশাপাশি একটি দীর্ঘ হাদিসের শুধু অংশবিশেষ বর্ণনা করা যাবে কি না—এ নিয়েও মতভেদ ছিল। ইবনুস সালাহ তিন ধরনের অবস্থান উল্লেখ করে শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনকে সঠিক বলেছেন: বাদ দেওয়া অংশটি যদি সংরক্ষিত অংশের অর্থের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত না থাকে যে তা বাদ দিলে অর্থ বদলে যায়, একজন জ্ঞানী রাবী হাদিসের একটি অংশ বাদ দিয়ে অন্য অংশ বর্ণনা করতে পারেন। মুজাহিদের নামে এমনকি সংরক্ষিত হয়েছে: “হাদিস থেকে যত ইচ্ছা কমাও, কিন্তু কিছু যোগ করো না।” [97]

একটি দীর্ঘ বক্তব্যের প্রয়োজনীয় অংশটুকু বলার অনুমতি থাকলে রাবী ঠিক করেন কোন অংশ রাখবেন, কোনটি বাদ দেবেন। তাঁর প্রয়োজন ও বোঝাপড়া এখানে সরাসরি কাজ করে। ফলে একই কথার ছোট ও বড় পাঠ পাওয়া গেলে সব ক্ষেত্রে একজন ভুল করেছেন বলা চলে না; কেউ হয়তো সচেতনভাবে সংক্ষেপ করেছেন। কিন্তু সংক্ষেপের ফলে যে প্রশ্নের উত্তরে কথা বলা হয়েছিল, সেই প্রশ্নটি হারাতে পারে; বিশেষ ঘটনার নিয়ম পরে সবার জন্য সাধারণ নির্দেশ বলে মনে হতে পারে; ব্যতিক্রমটি বাদ পড়তে পারে। শব্দ ঠিক রেখে প্রসঙ্গ বাদ দিলেও অর্থ বদলে বোঝা সম্ভব। তাই দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত পাঠ তুলনা করে দেখতে হয় বাদ পড়া অংশ ব্যাখ্যা ও বিধানে কী পরিবর্তন আনে। পরে শুধু ছোট পাঠ ব্যবহার করে গড়া আইনেও রাবীর সেই নির্বাচন প্রভাব ফেলতে পারে।


যিয়াদাতুস সিকাহ

আরও সূক্ষ্ম সমস্যা হলো যিয়াদাতুস সিকাহ—একজন নির্ভরযোগ্য রাবী এমন একটি অতিরিক্ত শব্দ বা বাক্যাংশ বর্ণনা করেছেন যা একই হাদিসের অন্য নির্ভরযোগ্য রাবীরা বলেননি। একই ঘটনার অন্য বর্ণনাগুলোর সঙ্গে বাড়তি অংশটির সম্পর্কও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে প্রবেশ করে। ইবন হাজারের বিশদ আলোচনায় স্পষ্ট: সিকাহ রাবীর অতিরিক্ত অংশ সব অবস্থায় গ্রহণ করা হয় না। অন্য রাবীরা সংখ্যায় বেশি, স্মৃতিতে শক্তিশালী অথবা এমন পরিস্থিতিতে ছিলেন যেখানে ওই গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁদের সবার বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা কম—এমন হলে বাড়তি অংশ প্রত্যাখ্যাতও হতে পারে। [98]

মূল আরবি—ইবন হাজার:
والحق في هذا أن زيادة الثقة لا تقبل دائما … وإنما يقبلون ذلك إذا استووا في الوصف ولم يتعرض بعضهم لنفيها لفظا ولا معنى.
বাংলা অনুবাদ:
“সত্য হলো, সিকাহ রাবীর অতিরিক্ত বর্ণনা সবসময় গ্রহণ করা হয় না।” নির্দিষ্ট অবস্থায় তা গ্রহণ করা হয়—যখন বর্ণনাকারীদের মান সমতুল্য এবং অন্যদের বর্ণনা সেই অতিরিক্ত অংশকে শব্দে বা অর্থে অস্বীকার করছে না।

একই বক্তব্যের একাধিক পাঠে একটি বাড়তি শব্দ বা বাক্য পাওয়া গেলে তার উৎস খুঁজতে হয়। সবাই যে অংশ বলেছেন তার সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত রাবীর বাড়তি তথ্য মেনে নেওয়ার আলোচনাকে বলা হয় যিয়াদাতুস সিকাহ। বাড়তি অংশটি সত্যিই মুহাম্মদের বলা হতে পারে; আবার রাবীর ব্যাখ্যা বা ভুলও হতে পারে। কোনটি ঘটেছে তা জানতে দেখা হয় অন্যরা একই সময়ে শুনেছিলেন কি না, কার সংরক্ষণ বেশি নির্ভুল, কার পাঠ বেশি পুরোনো এবং সংযোজনটি মূল বক্তব্য বদলে দেয় কি না। একটি শব্দে আইন, আকিদা বা কারও চরিত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত বদলে গেলে এই পরীক্ষা বিশেষ জরুরি। রাবীকে বিশ্বস্ত বলা তাঁর বাড়তি প্রতিটি শব্দকে পরীক্ষা ছাড়াই মূল বক্তব্যের অংশ করে না। অন্যদের নীরবতাও কতটা অর্থবহ, তা তাঁদের বর্ণনার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।


মুদরাজ মতন

হাদিসশাস্ত্রের মুদরাজ বিভাগ আরও সরাসরি বর্ণনা হস্তান্তরে মানুষের ভুল স্বীকার করে। ইবনুস সালাহর সংজ্ঞায়, কোনো সাহাবী বা পরবর্তী রাবী নবীর হাদিস বর্ণনা করার পরে নিজের একটি ব্যাখ্যা বা বক্তব্য যোগ করলেন; তাঁর পরের রাবী যদি সীমারেখাটি না বুঝে পুরো অংশটিই একসঙ্গে নবীর হাদিস হিসেবে বর্ণনা করেন, তাহলে এমন বিভ্রান্তি তৈরি হয় যে পাঠক মনে করতে পারেন সব শব্দই মুহাম্মদের। এই সমস্যার জন্য স্বতন্ত্র হাদিসশাস্ত্রীয় শ্রেণি তৈরি হয়েছে—মুদরাজ। [99]

মূল আরবি—ইবনুস সালাহ:
ما أدرج في حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم من كلام بعض رواته … فيرويه من بعده موصولا بالحديث غير فاصل بينهما بذكر قائله، فيلتبس الأمر فيه على من لا يعلم حقيقة الحال، ويتوهم أن الجميع عن رسول الله صلى الله عليه وسلم.
বাংলা অনুবাদ:
কখনো আল্লাহর রাসুলের হাদিসের মধ্যে কোনো রাবীর নিজের কথা ঢুকে যায়। পরবর্তী ব্যক্তি যদি বক্তার পরিচয় আলাদা না করে সেটিকে হাদিসের সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় বর্ণনা করেন, তাহলে প্রকৃত অবস্থা না জানা ব্যক্তি মনে করতে পারে পুরো বক্তব্যটিই আল্লাহর রাসুলের।

রাবীর নিজের ব্যাখ্যা মূল বক্তব্যের সঙ্গে মিশে যাওয়াকে হাদিসশাস্ত্রে ইদরাজ বলা হয়; এমন মিশ্রিত অংশযুক্ত বর্ণনা মুদরাজ। এই নাম ও তা শনাক্ত করার নিয়ম থাকার অর্থ, সংরক্ষণের পথে দুই ব্যক্তির কথা এক হয়ে যাওয়ার সমস্যা শাস্ত্রের ভেতরেই চিহ্নিত হয়েছে। একজন শিক্ষক ব্যাখ্যা জুড়ে বললেন, পরের শ্রোতা কোথায় উদ্ধৃতি শেষ আর ব্যাখ্যা শুরু বুঝতে পারলেন না—এভাবেও মিশ্রণ ঘটতে পারে। এরপর পরের সবাই ঠিকভাবে নকল করলেও মিশ্রণটি টিকে থাকবে। তাই একটি পূর্ণ পাঠ গ্রহণযোগ্য পথে এসেছে বলেই তার প্রতিটি বাক্য একই বক্তার, তা নিশ্চিত হয় না। পৃথক পাঠে কোথায় উদ্ধৃতির সীমা স্পষ্ট আছে এবং কোথায় ব্যাখ্যাটি আলাদা পাওয়া যায়, তা মিলিয়ে মূল বক্তার কথা শনাক্ত করতে হয়।

সংরক্ষণের দুটি কাজ এখানে আলাদা। কেউ তাঁর শিক্ষকের কথা ঠিকভাবে পৌঁছে দিয়েছেন কি না—এটি এক পরীক্ষা। শিক্ষক যে কথাটি বলেছেন তা সত্যিই মুহাম্মদের হুবহু বক্তব্য ছিল কি না—এটি আরেক পরীক্ষা। শিক্ষকের আগেই নিজের ভাষায় বলা, সংক্ষেপ করা, বাড়তি অংশ জোড়া বা ব্যাখ্যা মিশে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকলে পরের নিখুঁত সংরক্ষণ আগের বদল দূর করতে পারে না। উল্টো, বদলে যাওয়া পাঠটিই নিখুঁতভাবে টিকতে পারে। একটি পুরোনো ভুলের ভালো নকলও ভুলটিকে ভালোভাবে সংরক্ষণ করে। এ কারণে সনদের পরের অংশে নির্ভুলতা প্রতিষ্ঠা হলেও পাঠের আগের ইতিহাস আলাদা করে খুঁজতে হয়। কোন অংশ কত পুরোনো এবং কোন বক্তার—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পরের রাবীদের বিশ্বস্ততা থেকে আসে না।

কোনো বক্তব্য সহিহ সূত্রে নবীর নামে বর্ণিত হওয়া এবং তার প্রতিটি শব্দ হুবহু নবীর বলা হওয়া পৃথক দাবি। হুবহু শব্দের ওপর আইন, আকিদা বা ইতিহাসের সিদ্ধান্ত দাঁড়ালে তার প্রমাণ নির্ভর করে কয়েকটি নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর—বিভিন্ন সনদে শব্দরূপ একই কি না, কোনো রাবীর বাড়তি অংশ আছে কি না, কোনো অংশ মুদরাজ কি না এবং প্রাথমিক রাবীরা অর্থভিত্তিক বর্ণনা করেছেন কি না। সহিহ সনদ আরোপের ওজন বাড়ায়; তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুই শতাব্দী আগের একটি হুবহু শব্দ-রেকর্ড তৈরি করে না।


“এটি আবু হুরায়রার নিজের থলি থেকে”: বুখারিতে রাবীর ব্যাখ্যা

সহিহ বুখারির ৫৩৫৫ নম্বর বর্ণনায় নবীর নামে বলা কথা এবং আবু হুরায়রার নিজের ব্যাখ্যার সীমারেখা বর্ণনার ভেতরেই পাওয়া যায়। প্রথমে নবীর নামে বলা হয়েছে, সর্বোত্তম দান হলো যা দাতার সচ্ছলতা অবশিষ্ট রাখে; ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম; এবং যার ভরণপোষণের দায়িত্ব আছে, খরচ তার থেকেই শুরু করতে হবে। এর পরে স্ত্রী, দাস ও পুত্রের মুখে তিনটি দাবি বসানো হয়েছে: স্ত্রী খাওয়াতে অথবা তালাক দিতে বলে; দাস খাওয়াতে ও কাজে লাগাতে বলে; পুত্র খাওয়াতে বলে এবং জানতে চায় তাকে কার কাছে ছেড়ে দেওয়া হবে। শ্রোতারা প্রশ্ন করলে আবু হুরায়রা এই শেষের বক্তব্যগুলো সম্পর্কে বলেন, “না, এটি আবু হুরায়রার নিজের থলি থেকে।” একই বর্ণনার শুরুতে নবীর বক্তব্য রয়েছে, শেষে সাহাবীর নিজের ব্যাখ্যা; শেষের প্রশ্ন ও উত্তরটিই বক্তার এই পরিবর্তন শনাক্ত করে। পুরো বর্ণনাকে এক বক্তার অবিচ্ছিন্ন উক্তি হিসেবে উদ্ধৃত করলে আবু হুরায়রার নিজের সিদ্ধান্ত মুহাম্মদের কথায় পরিণত হয়। [100]

حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ حَفْصٍ، حَدَّثَنَا أَبِي، حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ، حَدَّثَنَا أَبُو صَالِحٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبُو هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ مَا تَرَكَ غِنًى، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى، وَابْدَأْ بِمَنْ تَعُولُ ‏”‏‏.‏ تَقُولُ الْمَرْأَةُ إِمَّا أَنْ تُطْعِمَنِي وَإِمَّا أَنْ تُطَلِّقَنِي‏.‏ وَيَقُولُ الْعَبْدُ أَطْعِمْنِي وَاسْتَعْمِلْنِي‏.‏ وَيَقُولُ الاِبْنُ أَطْعِمْنِي، إِلَى مَنْ تَدَعُنِي فَقَالُوا يَا أَبَا هُرَيْرَةَ سَمِعْتَ هَذَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏.‏ قَالَ لاَ هَذَا مِنْ كِيسِ أَبِي هُرَيْرَةَ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
উমর ইবন হাফস আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমার পিতা আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আল-আ‘মাশ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আবু সালিহ আমাদের বর্ণনা করেছেন। আবু সালিহ বলেন, আবু হুরায়রা—আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন—আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী বলেছেন: “সর্বোত্তম দান হলো যা দাতার সচ্ছলতা অবশিষ্ট রাখে। ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। আর যার ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমার ওপর, তাকে দিয়েই শুরু করো।” স্ত্রী বলে, “হয় আমাকে খাওয়াবে, নয়তো আমাকে তালাক দেবে।” দাস বলে, “আমাকে খাওয়াও এবং কাজে লাগাও।” পুত্র বলে, “আমাকে খাওয়াও; আমাকে কার কাছে ছেড়ে দিচ্ছ?” তখন তাঁরা বললেন, “আবু হুরায়রা, আপনি কি এটি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে শুনেছেন?” তিনি বললেন, “না, এটি আবু হুরায়রার নিজের থলি থেকে।”

মুসনাদ আহমদের অন্য বর্ণনায় এই সীমারেখা আরও স্পষ্ট। সেখানে নবীর নামে বর্ণিত বাক্য শেষ হওয়ার পরে আবু হুরায়রাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, “যার ভরণপোষণের দায়িত্ব”—এই কথায় কাদের বোঝানো হয়েছে? তারপর আবু হুরায়রা নিজের উত্তর হিসেবে স্ত্রী, খাদেম ও কন্যার উদাহরণ দিয়েছেন। ফলে বুখারির শেষের প্রশ্ন কোন কথাগুলোর প্রতি নির্দেশ করছে, তা সমান্তরাল পাঠেই নির্ধারণ করা যায়: স্ত্রী ও অধীনস্থদের দাবিগুলো আবু হুরায়রার ব্যাখ্যা। এই অংশটি মুদরাজ—নবীর নামে বর্ণিত বাক্যের সঙ্গে রাবীর নিজের ব্যাখ্যা যুক্ত হয়েছে। হাদিসের কোন অংশ কার বক্তব্য, তা শনাক্ত করতে এখানে শুধু সনদের নাম বা গ্রন্থের মর্যাদা যথেষ্ট হচ্ছে না; একই বর্ণনার ভিন্ন পাঠে প্রশ্ন, উত্তর এবং বক্তা বদলের অবস্থান তুলনা করতে হচ্ছে। একটি পাঠে ব্যাখ্যা মূল বক্তব্যের সঙ্গে পরপর এসে গেছে; অন্য পাঠে ব্যাখ্যা শুরুর আগেই পৃথক প্রশ্ন রাখা হয়েছে। এই পার্থক্য মুছে দিলে সাহাবীর ব্যাখ্যার ওপর সরাসরি নবীর কর্তৃত্ব চাপানো হয়। [101]

حَدَّثَنَا عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ عَمْرٍو، حَدَّثَنَا هِشَامٌ، عَنْ زَيْدٍ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: (خَيْرُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنًى، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى، وَابْدَأْ بِمَنْ تَعُولُ) قَالَ: سُئِلَ أَبُو هُرَيْرَةَ مَا “مَنْ تَعُولُ؟” قَالَ: “امْرَأَتُكَ، تَقُولُ: أَطْعِمْنِي أَوْ أَنْفِقْ عَلَيَّ أَوْ طَلِّقْنِي، وَخَادِمُكَ يَقُولُ: أَطْعِمْنِي وَاسْتَعْمِلْنِي، وَابْنَتُكَ تَقُولُ: إِلَى مَنْ تَذَرُنِي؟”

বাংলা অনুবাদ:
আবদুল মালিক ইবন আমর আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হিশাম আমাদের বর্ণনা করেছেন, যায়দের সূত্রে, আবু সালিহের সূত্রে, আবু হুরায়রার সূত্রে, নবীর কাছ থেকে। নবী বলেছেন: “সর্বোত্তম দান হলো যা সচ্ছল অবস্থায় করা হয়। ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। আর যার ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমার ওপর, তাকে দিয়েই শুরু করো।” বর্ণনাকারী বলেন, আবু হুরায়রাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “‘যার ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমার ওপর’—এর অর্থ কী?” তিনি বললেন, “তোমার স্ত্রী, যে বলে: আমাকে খাওয়াও, অথবা আমার খরচ দাও, অথবা আমাকে তালাক দাও। তোমার খাদেম, যে বলে: আমাকে খাওয়াও এবং কাজে লাগাও। আর তোমার কন্যা, যে বলে: আমাকে কার কাছে ছেড়ে দিচ্ছ?”

ইবন হাজার ফাতহুল বারি-তে “আমার থলি থেকে” কথাটির ব্যাখ্যা করেছেন আবু হুরায়রার নিজের উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত হিসেবে: নবীর নামে বর্ণিত হাদিস এবং বাস্তব অবস্থা থেকে তিনি যে অর্থ বুঝেছেন, তার ভিত্তিতে এই কথাগুলো বলেছেন। অর্থাৎ নিজের ব্যাখ্যা দেওয়ার স্বীকৃতি এখানে শব্দের অলংকার নয়; বক্তব্যের উৎস নির্ধারণকারী তথ্য। বুখারিতে সংকলিত হওয়া এবং নবীর মুখের কথা হওয়া একই পরিচয় নয়। একই সংকলিত নথির মধ্যে নবীর নামে বর্ণিত বাক্য, সাহাবীর ব্যাখ্যা ও শ্রোতার প্রশ্ন পৃথক উৎসস্তর হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারে। কোনো আইন, সামাজিক দাবি বা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পক্ষে স্ত্রী, দাস কিংবা সন্তানের এই নির্দিষ্ট বাক্যগুলো ব্যবহার করলে সেগুলোর প্রকৃত পরিচয় আবু হুরায়রার ব্যাখ্যাই থাকবে। সহিহ গ্রন্থের নাম দিয়ে বক্তার পরিচয় বদলে দেওয়া ভুল আরোপ; বর্ণনার নিজের সাক্ষ্যই সেই আরোপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। [102]

قَوْلُهُ “مِنْ كِيسِي” هُوَ بِكَسْرِ الْكَافِ، أَيْ مِنْ حَاصِلِهِ؛ إِشَارَةٌ إِلَى أَنَّهُ مِنَ اسْتِنْبَاطِهِ مِمَّا فَهِمَهُ مِنَ الْحَدِيثِ الْمَرْفُوعِ مَعَ الْوَاقِعِ، وَوَقَعَ فِي رِوَايَةِ الْأَصِيلِيِّ بِفَتْحِ الْكَافِ أَيْ: مِنْ فِطْنَتِهِ.

বাংলা অনুবাদ:
তাঁর “আমার থলি থেকে” কথাটিতে ‘কাফ’ অক্ষরটি যের দিয়ে পড়া হয়; অর্থাৎ তাঁর সঞ্চিত ভাণ্ডার থেকে। এটি ইঙ্গিত করে যে নবীর নামে বর্ণিত হাদিস ও বাস্তব অবস্থা থেকে তিনি যা বুঝেছেন, তা থেকে নিজের সিদ্ধান্তে এই কথাগুলো বলেছেন। আল-আসিলির বর্ণনায় ‘কাফ’ অক্ষরটি যবর দিয়ে এসেছে; তখন অর্থ হয় তাঁর বুদ্ধিমত্তা থেকে।


সহিহ গ্রন্থের সব বাক্য সমান নয়

“সহিহ বুখারিতে আছে”—ধর্মীয় বিতর্কে এই বাক্যটি প্রায়ই আলোচনা শেষ করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সহিহ আল-বুখারি-র মলাটের মধ্যে থাকা প্রতিটি বাক্য একই ধরনের সনদে, একই উদ্দেশ্যে এবং একই প্রমাণমূল্যে সংকলিত হয়নি। মূল মুসনাদ হাদিসের পাশাপাশি সেখানে মুয়াল্লাক বর্ণনা, সাহাবি–তাবিয়িদের আছার, অধ্যায়ের শিরোনামে উদ্ধৃত বক্তব্য এবং এমন অতিরিক্ত সংবাদও রয়েছে যেগুলো বুখারির প্রধান সহিহ-শর্তে নবী পর্যন্ত সংযুক্ত নয়। অতএব কোনো বাক্য একটি “সহিহ” নামের গ্রন্থের মধ্যে আছে এবং সেই বাক্যটি নবী পর্যন্ত সহিহ সনদে প্রমাণিত—দুটি আলাদা দাবি।


বুখারিতে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার বর্ণনা

এর সবচেয়ে বিস্ফোরক উদাহরণ পাওয়া যায় সহিহ বুখারির ৬৯৮২ নম্বর বর্ণনায়। আয়িশার সূত্রে ওহির সূচনার দীর্ঘ বিবরণের পরে বলা হয়েছে, কিছু সময় ওহি বন্ধ থাকায় মুহাম্মদ এত গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন যে তিনি বারবার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে নিজেকে নিচে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন; প্রতিবার জিবরাইল তাঁকে দেখা দিয়ে বলতেন, “হে মুহাম্মদ, আপনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল”, তখন তিনি শান্ত হয়ে ফিরে আসতেন। [103]

মূল আরবি—সহিহ আল-বুখারি:
وَفَتَرَ الْوَحْيُ فَتْرَةً حَتَّى حَزِنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيمَا بَلَغَنَا حُزْنًا غَدَا مِنْهُ مِرَارًا كَيْ يَتَرَدَّى مِنْ رُءُوسِ شَوَاهِقِ الْجِبَالِ، فَكُلَّمَا أَوْفَى بِذِرْوَةِ جَبَلٍ لِكَيْ يُلْقِيَ مِنْهُ نَفْسَهُ تَبَدَّى لَهُ جِبْرِيلُ…
বাংলা অনুবাদ:
ওহি কিছু সময় বন্ধ থাকল। আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে সে অনুযায়ী, নবী এতে এত দুঃখিত হন যে তিনি বারবার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় যেতেন নিজেকে সেখান থেকে নিক্ষেপ করার জন্য। যখনই তিনি কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নিজেকে ফেলে দিতে চাইতেন, জিবরাইল তাঁর সামনে উপস্থিত হতেন…

একজন সাধারণ পাঠক পুরো অনুচ্ছেদটিকে আয়িশা → উরওয়া → যুহরি ধারার সহিহ বর্ণনার অংশ মনে করতেই পারেন। কিন্তু ইবন হাজার আল-আসকালানি ফাতহুল বারি-তে হাদিসটির বর্ণনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে বলেন, “ওহি বন্ধ থাকার পরে নবীর দুঃখ” থেকে শুরু হওয়া এই অতিরিক্ত অংশটি মূল সংযুক্ত বর্ণনার সমমানের নয়। এটি মা‘মারের বর্ণনায় যুক্ত একটি অতিরিক্ত অংশ; আকিল ও ইউনুসের রূপে তা নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ, “فيما بلغنا”—“আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে” কথাটির বক্তা আয়িশা নন—আল-যুহরি। [104]

মূল আরবি—ইবন হাজার:
ثُمَّ إِنَّ الْقَائِلَ فِيمَا بَلَغَنَا هُوَ الزُّهْرِيُّ … وَهُوَ مِنْ بَلَاغَاتِ الزُّهْرِيِّ وَلَيْسَ مَوْصُولًا.
বাংলা অনুবাদ:
“فيما بلغنا—‘আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে’—কথাটির বক্তা যুহরি … এটি যুহরির বালাগসমূহের একটি; এটি সংযুক্ত সনদের বর্ণনা নয়।”

পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওঠার সংবাদটির উৎস এখানে আয়িশা পর্যন্ত পৌঁছানো মূল সনদের মতো নয়। যুহরি বলেছেন, “আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে”; কে তাঁকে বলেছেন, সেই ব্যক্তি কোথা থেকে জেনেছেন এবং মাঝখানে কতজন ছিলেন, তা এই অংশে উল্লেখ নেই। ইবন হাজার এ কারণেই একে যুহরির কাছে পৌঁছানো সংবাদ এবং অসংযুক্ত বর্ণনা বলেছেন। এই ঘাটতি খবরটির পক্ষে প্রমাণ কমায়। একই সঙ্গে যুহরির নামে এমন একটি সংবাদ সংরক্ষিত আছে—এটিও অনুসন্ধানের তথ্য। মুহাম্মদের গভীর হতাশা নিয়ে এই স্মৃতি কখন ও কোথায় প্রচলিত ছিল, অন্য জীবনীতে কীভাবে এসেছে, তার ভাষায় কী পার্থক্য—এসব পরীক্ষা করা যায়। বুখারির বইয়ের একই দীর্ঘ বর্ণনার মধ্যে থাকা মানেই প্রতিটি অংশ একই উৎস থেকে এসেছে নয়। আবার একটি অংশের উৎস অসম্পূর্ণ মানেই তার খবর ইতিহাসের অনুসন্ধান থেকে মুছে গেছে, তাও নয়।

আর এখানেই জনপ্রিয় “বুখারিতে আছে = সহিহ” শর্টকাট ভেঙে পড়ে। যদি ইবন হাজারের মতো বুখারির সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকারের প্রয়োজন হয় একই অনুচ্ছেদের কোন অংশ আয়িশার সংযুক্ত সনদের বর্ণনা এবং কোন অংশ যুহরির অসনদযুক্ত সংযোজন—তা আলাদা করতে, তাহলে শুধু বইয়ের নাম দেখে একটি বাক্যের ঐতিহাসিক সত্যতা ঘোষণা করা গবেষণা নয়। বাক্যটির প্রমাণমূল্য নির্ধারিত হয় বুখারি সেটিকে কোন রূপে এনেছেন, সনদটি কোথায় শেষ হয়েছে এবং পরে কোনো রাবী বা সম্পাদকের সংযোজন ঢুকেছে কি না—এই তথ্যগুলো দিয়ে।


মুসনাদ, মুয়াল্লাক, বালাগ ও আছার

এই পার্থক্য আত্মহত্যার বর্ণনার ব্যতিক্রমী দুর্ঘটনা নয়। সহিহ বুখারির ভেতরেই বিভিন্ন ধরনের উপাদান আছে। মুসনাদ হাদিসে বুখারি নিজের শিক্ষক থেকে শুরু করে নবী পর্যন্ত সনদ দেন। কিন্তু মুয়াল্লাক বর্ণনায় সনদের শুরু থেকে একজন বা একাধিক রাবী বাদ থাকে; আছার-এ সাহাবি বা তাবিয়ির বক্তব্য থাকতে পারে; আর বালাগ-এ কোনো গ্রন্থকার বা রাবী বলেন তাঁর কাছে একটি সংবাদ পৌঁছেছে, কিন্তু পূর্ণ উৎসপরম্পরা দেন না। ইসলামওয়েবের ফতোয়া বিভাগের ৪৮৩১৭ নম্বর উত্তরে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—বুখারির মুয়াল্লাক ও আছারগুলো তাঁর মূল মুসনাদ হাদিসের সমান বিধানের অধীন নয়; কিছু তাঁর শর্তে সহিহ, কিছু অন্য মানদণ্ডে সহিহ, আবার কিছু নিয়ে সমালোচনা আছে [105]

মূল আরবি—ইসলামওয়েবের ফতোয়া বিভাগের ৪৮৩১৭ নম্বর উত্তর:
وأما معلقات البخاري … وكذا ما فيه من الآثار، فليس له حكم الأحاديث المسندة … بل من تلك الآثار ما هو صحيح على شرط البخاري، ومنها ما هو صحيح على غير شرطه، ومنها ما هو متكلم فيه.
বাংলা অনুবাদ:
বুখারির মুয়াল্লাক বর্ণনা এবং তাঁর গ্রন্থের আছারগুলো মুসনাদ হাদিসের একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। এসবের কোনোটি বুখারির শর্তে সহিহ, কোনোটি অন্য মানদণ্ডে সহিহ, আবার কোনোটি সমালোচিত।

এই শ্রেণিবিভাগ নিজেই গুরুত্বপূর্ণ। একটি বইকে “সহিহ বুখারি” বলা থেকে বইয়ের প্রতিটি উদ্ধৃত বাক্যের জন্য একই জ্ঞানের নিশ্চয়তার স্তর বের হয় না। বইটি একটি ধারক; ধারকের ভেতরের উপাদানগুলোর ধরন আলাদা। কেউ যদি একটি অধ্যায়ের শিরোনামের আছার, মুয়াল্লাক উদ্ধৃতি অথবা যুহরির বালাগ দেখিয়ে শুধু “বুখারিতে আছে” বলেন, তিনি গুরুত্বপূর্ণ উৎস-সমালোচনামূলক তথ্য বাদ দিচ্ছেন। উদ্ধৃতির প্রমাণমূল্য নির্ভর করে নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর: বুখারি বাক্যটি কোথায় রেখেছেন, কীভাবে বর্ণনা করেছেন এবং তার সনদ কোথায় শেষ হয়েছে।


বইয়ের মর্যাদা বাক্যের সনদ নয়

এই পার্থক্য আরও একটি বড় ভুল থেকে রক্ষা করে। সহিহ বুখারির সামগ্রিক মর্যাদা নিয়ে আলোচনা এক বিষয়; নির্দিষ্ট একটি বাক্যের আরোপ আরেক বিষয়। বুখারি অসাধারণ সমালোচনামূলক দক্ষতার সংকলক হতে পারেন এবং তাঁর মুসনাদ বর্ণনাসংগ্রহের বিপুল অংশ অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে; তবুও গ্রন্থে উদ্ধৃত প্রতিটি অধীনস্থ বক্তব্য সেই একই শর্তে নবী পর্যন্ত প্রমাণিত হয় না। একটি গ্রন্থের স্বীকৃত ধর্মীয় মর্যাদা তার পাঠের প্রতিটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য নতুন সনদ তৈরি করে না।

মুহাম্মদের পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সংবাদটির সনদগত পরিচয় আয়িশার বর্ণনা থেকে আলাদা। ঘটনাটি বইয়ের ভেতরে আছে, কিন্তু নবীর নামে বর্ণিত সংযুক্ত সনদের খবর হিসেবে নেই। একই অনুচ্ছেদের একটি অংশ আয়িশার সনদে, আরেকটি যুহরির “আমাদের কাছে পৌঁছেছে” হিসেবে। একই গ্রন্থের একই অনুচ্ছেদে দুই ধরনের উৎস সংরক্ষিত হয়েছে। বইয়ের নাম দিয়ে এই দুই উৎসের পার্থক্য মুছে ফেলা তথ্যের বিকৃতি; প্রতিটি উদ্ধৃতির প্রমাণমূল্য তার বর্ণনার ধরনের সঙ্গে যুক্ত।

“বুখারিতে আছে” শুনে পরের প্রশ্নটি হয়—বইটির কোন ধরনের অংশে আছে? মুহাম্মদ পর্যন্ত পূর্ণ সনদে বর্ণিত হাদিস, শুরুতে এক বা একাধিক নাম বাদ দেওয়া বর্ণনা, সাহাবী বা পরের কারও বক্তব্য, অথবা উৎসের পূর্ণ পরিচয় ছাড়া পৌঁছানো সংবাদ—সব এক ধরনের উপাদান নয়। এগুলোর জন্য মুসনাদ, মুয়াল্লাক, আছার ও বালাগের মতো পৃথক নাম আছে। কোনো দীর্ঘ পাঠে পরে জুড়ে থাকা অংশও আলাদা পরীক্ষা চাইতে পারে। বইয়ের মর্যাদা জানানো এবং নির্দিষ্ট বাক্যটি কার কাছ থেকে কী পথে এসেছে তা দেখানো দুই কাজ। শুধু সংকলনের নাম বললে দ্বিতীয় কাজটি হয়ে যায় না; বইয়ের নিজের বিভিন্ন ধরনের বর্ণনাকেও তখন ভুল করে একই পাল্লায় ফেলা হয়।


হাদিসের সনদ এবং গ্রন্থের সংরক্ষণ-ইতিহাস

মুহাম্মদ থেকে বুখারি পর্যন্ত একটি খবরের পথ এবং বুখারির বই থেকে বর্তমান মুদ্রিত সংস্করণ পর্যন্ত লেখার পথ আলাদা। প্রথমটির সনদ ভালো পেলেই দ্বিতীয়টির প্রতিটি নকল ও বিন্যাস পরীক্ষা হয়ে যায় না। বইটিও ছাত্র, নকলকারী, পাণ্ডুলিপি ও সম্পাদকের হাত পেরিয়েছে। মুস্তামলির নামে সংরক্ষিত সাক্ষ্যে এই পার্থক্য সরাসরি দেখা যায়। ফিরাবরির কাছে থাকা মূল কপি থেকে নকল করতে গিয়ে তিনি অসম্পূর্ণ জায়গা, হাদিসবিহীন শিরোনাম এবং শিরোনামবিহীন হাদিস পেয়েছিলেন; তাঁর ভাষায়, তাঁরা কিছু অংশ অন্য অংশের সঙ্গে মিলিয়েছিলেন। আবু ওয়ালিদ আল-বাজি একই মূল থেকে নেওয়া মুস্তামলি, সারাখসি, কুশমিহানি ও মারওয়াজির সংস্করণে আগে–পরে পার্থক্যের কথাও বলেছেন। প্রান্তে লেখা বা আলাদা সংযুক্ত পাতায় থাকা অংশ কোথায় বসবে, তা নকলকারীরা নিজেদের বোঝাপড়া দিয়ে স্থির করেছিলেন। তাই কোনো অধ্যায়ের নিচে একটি বর্ণনা পাওয়া গেলে কখনো সেই বিন্যাসের পেছনেও পরবর্তী মানুষের সিদ্ধান্ত থাকে। অধ্যায় ও হাদিসের সম্পর্ক থেকে অর্থ বের করার সময় এই সংরক্ষণ-ইতিহাস প্রাসঙ্গিক। [106]

انتَسختُ «كتاب البخاريِّ» مِنْ أصله الَّذي كان عند صاحبه محمَّد بن يوسف الفَرَبْريِّ، فرأيتُ فيه أشياءَ لم تتمَّ، وأشياءَ مبيَّضة، منها تراجمُ لم يُثبِت بعدها شيئًا، ومنها أحاديثُ لم يترجمْ لها، فأضفنا بعضَ ذلك إلى بعضٍ. قال الباجيُّ: وممَّا يدلُّ على صحَّة هذا القولِ أنَّ رواية أبي إسحاق المُسْتَمْلي ورواية أبي محمَّد السَّرَخْسيِّ، ورواية أبي الهيثم الكُشْمِيهَنيِّ، ورواية أبي زيد المَرْوزيِّ، مختلفةٌ بالتَّقديم والتَّأخير، مع أنَّهم انتَسخوا مِنْ أصلٍ واحد، وإنَّما ذلك بحسب ما قدَّر كلُّ واحدٍ منهم فيما كان في طُرَّةٍ أو رقعةٍ مضافةٍ أنَّه مِنْ موضعٍ ما فأضافه إليه، ويبيِّنُ ذلك أنَّك تجد ترجمتين وأكثرَ مِنْ ذلك متَّصلةً ليس بينها أحاديثُ، قال الباجيُّ: وإنَّما أوردتُ هذه هاهنا لِمَا عُنِيَ به أهلُ بلدنا مِنْ طلب معنًى يجمعُ بين التَّرجمة والحديثِ الَّذي يليها، وتكلُّفِهم مِنْ ذلك مِنْ تعسُّف التَّأويل ما لا يَسوغ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বুখারির বইটি তাঁর সেই মূল কপি থেকে নকল করেছি, যা তাঁর সঙ্গী মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ আল-ফিরাবরির কাছে ছিল। তাতে এমন কিছু বিষয় দেখেছি যা সম্পূর্ণ হয়নি এবং কিছু জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে এমন অধ্যায়-শিরোনাম ছিল যার পরে কিছু লেখা হয়নি; আবার এমন হাদিস ছিল যার জন্য কোনো শিরোনাম দেওয়া হয়নি। ফলে আমরা সেসবের কিছু অংশ অন্য কিছু অংশের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছি। আল-বাজি বলেন: এই বক্তব্যের সত্যতার একটি লক্ষণ হলো, আবু ইসহাক আল-মুস্তামলি, আবু মুহাম্মদ আস-সারাখসি, আবুল হাইসাম আল-কুশমিহানি এবং আবু জায়দ আল-মারওয়াজির বর্ণিত সংস্করণগুলোতে আগে–পরে বিন্যাসের পার্থক্য রয়েছে, যদিও তাঁরা একই মূল থেকে নকল করেছেন। এর কারণ, প্রান্তে বা সংযুক্ত কোনো পাতায় যা ছিল, তাঁদের প্রত্যেকে সেটিকে যে জায়গার অংশ বলে অনুমান করেছেন, সেখানে যুক্ত করেছেন। এর নিদর্শন হলো, কখনো পরপর দুই বা তারও বেশি অধ্যায়-শিরোনাম পাওয়া যায়, অথচ মাঝখানে কোনো হাদিস নেই। আল-বাজি বলেন: এখানে বিষয়টি এনেছি এ কারণে যে আমাদের অঞ্চলের লোকেরা অধ্যায়-শিরোনাম এবং তার পরবর্তী হাদিসের মধ্যে একটি অর্থগত সম্পর্ক খুঁজতে সচেষ্ট হয়েছেন এবং এ জন্য এমন অসংগত ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন যা গ্রহণযোগ্য নয়।

সংস্করণভেদে শুধু অধ্যায়ের অবস্থান বদলায়নি; নির্দিষ্ট বর্ণনার উপস্থিতি নিয়েও পার্থক্য পাওয়া যায়। বর্তমান প্রচলিত বুখারির ৩৮৪৯ নম্বর বর্ণনায় আমর ইবন মাইমুন বলেন, জাহিলি যুগে তিনি একটি বানরীকে অন্য বানরদের পাথর ছুড়ে মারতে দেখেছিলেন; তাঁর ভাষায়, বানরীটি ব্যভিচার করেছিল এবং তিনিও তাদের সঙ্গে পাথর ছুড়েছিলেন। এটি তাবিয়ি আমর ইবন মাইমুনের নিজের অভিজ্ঞতার আছার; মুহাম্মদের কোনো বক্তব্য নয়। গ্রন্থটির পাঠ-ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই আছার বুখারির সব বর্ণিত সংস্করণে ছিল না। ফলে একটি গ্রন্থের নাম এবং বর্তমান হাদিস নম্বর জানলেই তার প্রতিটি পূর্ববর্তী সংস্করণে একই বিষয় ছিল—এ সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। [107]

حَدَّثَنَا نُعَيْمُ بْنُ حَمَّادٍ، حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، عَنْ حُصَيْنٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، قَالَ رَأَيْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ قِرْدَةً اجْتَمَعَ عَلَيْهَا قِرَدَةٌ قَدْ زَنَتْ، فَرَجَمُوهَا فَرَجَمْتُهَا مَعَهُمْ.

বাংলা অনুবাদ: নুআইম ইবন হাম্মাদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; হুশাইম তাঁকে বর্ণনা করেছেন, হুসাইনের সূত্রে, আমর ইবন মাইমুনের সূত্রে। আমর বলেন: জাহিলি যুগে আমি একটি বানরী দেখেছিলাম, যার চারপাশে অন্য বানরেরা জমা হয়েছিল। সেটি ব্যভিচার করেছিল। তারা তাকে পাথর মারল এবং আমিও তাদের সঙ্গে তাকে পাথর মারলাম।

হামিদির সন্দেহ ছিল, বানরীর এই আছার বুখারির বইয়ে পরে ঢুকেছে কি না। ইবন হাজার সন্দেহটি প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁর দেখা অধিকাংশ মূল কপি ও অন্য সংকলনে বর্ণনাটির উপস্থিতি দেখিয়ে। তিনি একই সঙ্গে জানিয়েছেন, নাসাফির বর্ণিত সংস্করণে এই আছার ও পরের বর্ণনাটি নেই; ফিরাবরির সংস্করণে নাসাফির তুলনায় কয়েকটি বাড়তি বর্ণনা আছে। তাঁর যুক্তি, একটি সংস্করণে না থাকলেই অন্য সংস্করণে থাকা বর্ণনা বাতিল হয় না। এখানে কোন বক্তব্য মূল বইয়ের অংশ, তা স্থির করতেও বিভিন্ন কপি ও বর্ণনাপথ তুলনা করতে হয়েছে। বর্তমান ছাপা বই সেই তুলনা ও সংরক্ষণের ইতিহাসের একটি ফল। শুধু “বুখারিতে আছে” বললে তাই বর্ণনাটির উৎস, সেটি কার বক্তব্য এবং কোন সংস্করণে কীভাবে আছে—এই পৃথক প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায় না। [108]

وَأَغْرَبَ الْحُمَيْدِيُّ فِي الْجَمْعِ بَيْنَ الصَّحِيحَيْنِ فَزَعَمَ أَنَّ هَذَا الْحَدِيثَ وَقَعَ فِي بَعْضِ نُسَخِ الْبُخَارِيِّ، وَأَنَّ أَبَا مَسْعُودٍ وَحْدَهُ ذَكَرَهُ فِي «الْأَطْرَافِ» قَالَ: وَلَيْسَ فِي نُسَخِ الْبُخَارِيِّ أَصْلًا فَلَعَلَّهُ مِنَ الْأَحَادِيثِ الْمُقْحَمَةِ فِي كِتَابِ الْبُخَارِيِّ. وَمَا قَالَهُ مَرْدُودٌ، فَإِنَّ الْحَدِيثَ مَذْكُورٌ فِي مُعْظَمِ الْأُصُولِ الَّتِي وَقَفْنَا عَلَيْهَا، وَكَفَى بِإِيرَادِ أَبِي ذَرٍّ الْحَافِظِ لَهُ عَنْ شُيُوخِهِ الثَّلَاثَةِ الْأَئِمَّةِ الْمُتْقِنِينَ عَنِ الْفَرَبْرِيِّ حُجَّةً، وَكَذَا إِيرَادُ الْإِسْمَاعِيلِيِّ وَأَبِي نُعَيْمٍ فِي مُسْتَخْرَجَيْهِمَا وَأَبِي مَسْعُودٍ لَهُ فِي أَطْرَافِهِ، نَعَمْ سَقَطَ مِنْ رِوَايَةِ النَّسَفِيِّ وَكَذَا الْحَدِيثُ الَّذِي بَعْدَهُ، وَلَا يَلْزَمُ مِنْ ذَلِكَ أَنْ لَا يَكُونَ فِي رِوَايَةِ الْفَرَبْرِيِّ، فَإِنَّ رِوَايَتَهُ تَزِيدُ عَلَى رِوَايَةِ النَّسَفِيِّ عِدَّةَ أَحَادِيثَ قَدْ نَبَّهْتُ عَلَى كَثِيرٍ مِنْهَا فِيمَا مَضَى وَفِيمَا سَيَأْتِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى.

বাংলা অনুবাদ: হামিদি আল-জামউ বাইনাস সহিহাইন-এ একটি অদ্ভুত দাবি করেছেন: এই বর্ণনাটি বুখারির কিছু কপিতে রয়েছে এবং আবু মাসউদ একাই এটিকে আল-আতরাফ-এ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন: “বুখারির কপিগুলোতে এটি আদৌ নেই; সম্ভবত এটি বুখারির বইয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া বর্ণনাগুলোর একটি।” তাঁর এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যাত; কারণ আমরা যে মূল কপিগুলো দেখেছি তার অধিকাংশেই বর্ণনাটি রয়েছে। আবু যার আল-হাফিজ তাঁর তিনজন নিপুণ ইমাম-শিক্ষকের সূত্রে ফিরাবরি থেকে এটি বর্ণনা করেছেন—দলিল হিসেবে সেটিই যথেষ্ট। একইভাবে ইসমাইলি ও আবু নুআইম তাঁদের মুস্তাখরাজ গ্রন্থে এবং আবু মাসউদ তাঁর আতরাফে এটি উল্লেখ করেছেন। হ্যাঁ, নাসাফির বর্ণিত সংস্করণে এটি নেই এবং এর পরবর্তী বর্ণনাটিও নেই। কিন্তু এ থেকে ফিরাবরির বর্ণিত সংস্করণেও এটি না থাকার সিদ্ধান্ত আসে না। কারণ তাঁর সংস্করণে নাসাফির সংস্করণের তুলনায় কয়েকটি অতিরিক্ত বর্ণনা রয়েছে; সেগুলোর অনেকটির বিষয়ে আমি আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি এবং আল্লাহ চাইলে পরেও করব।


সমর্থক সনদে গ্রেড বদলায়

হাসান লিগাইরিহি কথাটির সহজ অর্থ হলো, নিজের পথে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, কিন্তু অন্য উপযুক্ত পথের সমর্থনে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। একই ঘটনার আরও সাক্ষ্য পেলে আমাদের আস্থা বাড়তে পারে—এই সাধারণ যুক্তি এখানে কাজ করে। তাতে প্রথম রাবীর খারাপ স্মৃতি ভালো হয়ে যায়নি, বাদ পড়া নামও মূল তালিকায় ফিরে আসেনি। বদলেছে মোট প্রমাণ: আগে একটি দুর্বল পথ জানা ছিল, এখন তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মতো অন্য পথ পাওয়া গেছে। ঘটনা বদলায়নি; ঘটনা সম্পর্কে সমালোচকের হাতে থাকা তথ্য বদলেছে বলে রায় বদলেছে। ফলে গ্রেডকে বর্ণনার চিরস্থায়ী পরিচয় ভাবলে এই উন্নতি বোঝা যায় না। অন্য পথটি কতটা স্বাধীন এবং আগের দুর্বলতা পূরণের মতো কি না, সেটিই পরের পরীক্ষার বিষয়।

তবে “দশটি দুর্বল সনদ জড়ো করলেই সহিহ” এমন কোনো সরল অঙ্কও নেই। সুয়ূতী স্পষ্ট করেছেন, দুর্বলতার কারণ হালকা হলে—যেমন মোটামুটি সত্যবাদী রাবীর স্মৃতির দুর্বলতা বা সনদের ইরসাল—অন্য পথ তা পূরণ করতে পারে। কিন্তু রাবীর ফাসিকতা বা মিথ্যার মতো গুরুতর দুর্বলতা একই মানের আরেকটি পথ দিয়ে সহজে দূর হয় না। অর্থাৎ কতটি পথ আছে তার চেয়ে পথগুলোর প্রকৃতি, স্বাধীনতা এবং দুর্বলতার মাত্রা বিচারকের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে [109]।

মূল আরবি—সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী:
إذا روي الحديث من وجوه ضعيفة لا يلزم أن يحصل من مجموعها حسن، بل ما كان ضعفه لضعف حفظ راويه الصدوق الأمين زال بمجيئه من وجه آخر وصار حسنا، وكذا إذا كان ضعفها لإرسال زال بمجيئه من وجه آخر، وأما الضعف لفسق الراوي فلا يؤثر فيه موافقة غيره.
وأما الضعف لفسق الراوي، أو كذبه، فلا يؤثر فيه موافقة غيره له، إذا كان الآخر مثله؛ لقوة الضعف وتقاعد هذا الجابر.
বাংলা অনুবাদ:
কোনো হাদিস একাধিক দুর্বল পথে বর্ণিত হলেই সেগুলোর সমষ্টি অবশ্যই হাসান হবে—এমন নয়। বরং যে বর্ণনার দুর্বলতা কোনো সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত রাবীর দুর্বল স্মৃতির কারণে, অন্য পথে এলে সেই দুর্বলতা দূর হয়ে সেটি হাসান হতে পারে। ইরসালের কারণে দুর্বল হলেও অন্য পথে তা দূর হতে পারে। কিন্তু রাবীর ফাসিকতা বা মিথ্যার কারণে দুর্বল হলে, একই ধরনের অন্য রাবীর সমর্থন তাতে কার্যকর হয় না; কারণ দুর্বলতা গুরুতর এবং এমন সমর্থন তা পূরণ করার অযোগ্য।

দুটি দুর্বল পথ একসঙ্গে পেলেই শক্তিশালী প্রমাণ হয় না। একজন সত্যবাদী কিন্তু ভুলে যান—এমন রাবীর খবর এবং জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ থাকা রাবীর খবর একই অবস্থার নয়। আবার দুটি সনদ আলাদা নাম দেখালেও একই শিক্ষক বা একই নোট থেকে বেরিয়ে থাকতে পারে। কতটুকু মিলকে সমর্থন ধরা হবে, বাড়তি কথাগুলো মানা হবে কি না এবং দুটি পথের দুর্বলতা একই জায়গায় কি না—এসব দেখতে হয়। বিশেষজ্ঞরা তথ্য ও নিজেদের গ্রহণ করা নিয়ম দিয়ে এই সিদ্ধান্ত দেন। বিপরীত রায় পাওয়া গেলে তাই শুধু দুজনের পছন্দ আলাদা বলা যথেষ্ট নয়; কার যুক্তিতে কী ঘাটতি আছে, তা নির্দিষ্ট করে পরীক্ষা করা যায়। বিচার করতে হয় বলেই বিচারকের পক্ষপাত, ভুল তুলনা বা একই নিয়ম অসমভাবে প্রয়োগের প্রশ্নও ওঠে।

একই কাঠামোয় দুর্বলতার উল্টো দিকও দেখা যায়: একজন রাবী সত্যবাদী হলেও তাঁর নির্ভুলতা পূর্ণ নয়, তাই তাঁর একক পথ হাসান; অন্য পথ এসে সমর্থন করলে পুরো বর্ণনাটি সহিহ লিগাইরিহি হতে পারে। সুয়ূতী “প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াকের নির্দেশ” সম্পর্কিত হাদিসকে এর উদাহরণ করেছেন। মুহাম্মদ ইবন আমর ইবন আলকামাহ সত্যবাদী ও সম্মানিত, কিন্তু হাদিস সংরক্ষণে নিখুঁত নন; তাই তাঁর পথ একা হাসান। অন্য পথ যুক্ত হওয়ায় সেটির গ্রেড সহিহ হয়েছে [110]।

মূল আরবি—সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী:
إذا كان راوي الحديث متأخرا عن درجة الحافظ الضابط، مشهورا بالصدق والستر، فروي حديثه من غير وجه قوي وارتفع من الحسن إلى الصحيح.
مثاله حديث محمد بن عمرو عن أبي سلمة عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لولا أن أشق على أمتي لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة.
فمحمد بن عمرو بن علقمة من المشهورين بالصدق والصيانة، لكن لم يكن من أهل الإتقان، حتى ضعفه بعضهم من جهة سوء حفظه، ووثقه بعضهم لصدقه وجلالته، فحديثه من هذه الجهة حسن، فلما انضم إلى ذلك كونه روي من أوجه أخر حكمنا بصحته.
বাংলা অনুবাদ:
কোনো হাদিসের রাবী যদি পূর্ণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন হাফিজের স্তরের নিচে হন, কিন্তু সত্যবাদিতা ও শালীনতার জন্য পরিচিত হন, আর তাঁর হাদিস অন্য শক্তিশালী পথেও বর্ণিত হয়—তখন সেটি হাসান থেকে সহিহ পর্যায়ে উঠতে পারে। উদাহরণ হলো আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণিত: “আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম।” মুহাম্মদ ইবন আমর সত্যবাদিতা ও সততার জন্য পরিচিত ছিলেন, কিন্তু পূর্ণ নির্ভুল ছিলেন না; দুর্বল স্মৃতির কারণে কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন, সত্যবাদিতা ও মর্যাদার কারণে অন্যরা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। এই দিক থেকে তাঁর হাদিস হাসান; অন্য পথগুলো যুক্ত হওয়ায় আমরা সেটিকে সহিহ বলে রায় দিয়েছি।

এখানে একই রাবীকে কেউ দুর্বল বলেছেন, কেউ তাঁর সত্যবাদিতার কারণে নির্ভরযোগ্য বলেছেন; একক পথটির গ্রেড হাসান, সম্মিলিত বর্ণনাটির গ্রেড সহিহ। তাই “হাদিসটি সহিহ”—এই বাক্য শুনলেই পরের প্রশ্ন হওয়া উচিত: কোন অর্থে সহিহ—নিজ সনদে, না অন্য পথের সমর্থনে? কোন সংস্করণ বা শব্দরূপ? কোন মুহাদ্দিসের মানদণ্ডে? বিরোধী গ্রেড আছে কি? সহায়ক পথগুলো স্বাধীন ও কতটা শক্তিশালী? এই প্রশ্ন বাদ দিয়ে শুধু লেবেল উচ্চারণ করা বিশ্লেষণ নয়; প্যাকেটের গায়ে ব্র্যান্ড দেখে ভেতরের প্রমাণ না পড়া।

একই ঘটনা তিনজন নিজের চোখে দেখেছেন—এটি এক অবস্থা। একজন দেখেছেন, অন্য দুজন তাঁর কাছ থেকে শুনেছেন—এটি আরেক অবস্থা। তিনটি বই একই হারানো বই থেকে নকল করেছে—এটি আরও ভিন্ন অবস্থা। সব ক্ষেত্রেই তিন জায়গায় খবর পাওয়া যায়, কিন্তু স্বাধীন সাক্ষ্যের সংখ্যা সমান নয়। হাদিসের একাধিক সনদেও এই পার্থক্য পরীক্ষা করা দরকার। একই শিক্ষক, প্রচলিত কাহিনি, রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা লিখিত উৎসের ওপর নির্ভর করলে পথের সংখ্যা বাড়লেও মূল তথ্যের স্বাধীন সমর্থন বাড়ে না। কোন সূত্র আগে, কার লেখা কার সঙ্গে মেলে, কোথায় একই ভুল আছে এবং বাইরে থেকে কোনো নথি বা বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া যায় কি না—এসব মিলিয়ে সম্পর্ক বোঝা যায়। স্বাধীন পথ সত্যিই থাকলে সমর্থন বাড়ে; স্বাধীনতা ধরে নিয়ে শুধু সংখ্যা গুনলে প্রমাণের ওজন বাড়িয়ে দেখানো হয়।


গাদিরে খুমের গ্রেড

“আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা”—গাদিরে খুমের এই বিখ্যাত বক্তব্য হাদিসের গ্রেডিং যে কোনো ঘটনার একক ও অপরিবর্তনীয় পরিচয় নয়, তার একটি পরিষ্কার উদাহরণ। একই মূল বাক্যের একাধিক সনদ ও মতনরূপ রয়েছে; কোনো সংকলক নির্দিষ্ট পথকে হাসান বলেছেন, কোনো গ্রন্থকার আরেক পথকে সহিহ সনদ বলেছেন, আবার বুখারি ও ইবরাহিম আল-হারবির নামে এর দুর্বলকরণের বক্তব্যও সংরক্ষিত। তাই “গাদিরের হাদিস সহিহ” বা “জইফ”—এই একশব্দী স্লোগান দুটোই প্রতারণামূলক; নির্দিষ্ট সনদ, মতন ও বিচারকের রায় না বললে কথাটি অর্থহীন। প্রশ্নটি হওয়া দরকার: কোন সনদ, কোন মতনরূপ, কোন সমালোচকের মানদণ্ড এবং সব পথ একত্রে নাকি আলাদাভাবে?

তিরমিযির বর্ণনায় আবু তুফাইল আবু সারিহা অথবা যায়দ ইবন আরকাম থেকে বক্তব্যটি বর্ণনা করেছেন; শু‘বা সংশয়ে ছিলেন, দুজনের ঠিক কার কাছ থেকে। তিরমিযি এই নির্দিষ্ট বর্ণনাকে “হাসান গরিব” বলেছেন—অর্থাৎ তাঁর বিচারে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু পথটির মধ্যে এককত্ব বা অপরিচিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে [111]।

মূল আরবি—সুনান আত-তিরমিযি:
عن أبي الطفيل يحدث عن أبي سريحة أو زيد بن أرقم، شك شعبة، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من كنت مولاه فعلي مولاه.
قال أبو عيسى: هذا حديث حسن غريب.
বাংলা অনুবাদ:
আবু তুফাইল আবু সারিহা অথবা যায়দ ইবন আরকাম থেকে বর্ণনা করেন—শু‘বা এ বিষয়ে সংশয় করেছেন—নবী বলেছেন: “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।” আবু ঈসা তিরমিযি বলেন: “এটি হাসান গরিব হাদিস।”

কিন্তু তিরমিযির “হাসান” রায় কোনো সর্বসম্মত নিষ্পত্তি তৈরি করেনি। ইবন তাইমিয়া নিজেই লিখেছেন, বুখারি, ইবরাহিম আল-হারবি এবং একদল হাদিসবিশারদের নামে হাদিসটির সমালোচনা ও দুর্বলকরণের কথা বর্ণিত; বিপরীতে আহমদ ইবন হাম্বল এবং তিরমিযির নামে হাসান বলার রায় রয়েছে। অর্থাৎ সুন্নি ঐতিহ্যের একজন কঠোর শিয়া-বিরোধী লেখকও মতভেদটি গোপন করতে পারেননি [112]।

মূল আরবি—ইবন তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ:
وأما قوله: من كنت مولاه فعلي مولاه، فليس هو في الصحاح، لكن هو مما رواه العلماء، وتنازع الناس في صحته، فنقل عن البخاري وإبراهيم الحربي وطائفة من أهل العلم بالحديث أنهم طعنوا فيه وضعفوه، ونقل عن أحمد بن حنبل أنه حسنه كما حسنه الترمذي، وقد صنف أبو العباس بن عقدة مصنفا في جميع طرقه.
বাংলা অনুবাদ:
“আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা”—এটি সহিহ গ্রন্থগুলোতে নেই, তবে আলেমরা এটি বর্ণনা করেছেন। এর সত্যতা নিয়ে মানুষের মতভেদ হয়েছে। বুখারি, ইবরাহিম আল-হারবি এবং হাদিসবিশারদদের একটি দলের নামে বর্ণিত হয়েছে যে তাঁরা এতে আপত্তি করেছেন ও দুর্বল বলেছেন; আবার আহমদ ইবন হাম্বলের নামে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি এটিকে হাসান বলেছেন, যেমন তিরমিযিও হাসান বলেছেন। আবুল আব্বাস ইবন উকদাহ এর সব বর্ণনাপথ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

এখানে একজনের রায় সঠিক এবং অন্যজনের ভুল—এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায়, কিন্তু তার ভিত্তি সমালোচকদের যুক্তি ও উপাত্তের তুলনা। কেবল পছন্দের নাম বেছে নিলে বিরোধের বিচার হয় না; কর্তৃপক্ষের নির্বাচন হয়। যে বিশেষজ্ঞের রায় অনুসরণ করা হবে, তার ওপর পাঠকের সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে। বুখারির নাম তুললে দুর্বল; তিরমিযি বা আহমদের নাম তুললে হাসান। অথচ ঐতিহাসিক ঘটনাটি একবারই ঘটেছিল—অথবা ঘটেনি। অতীত বদলায়নি; বদলেছে কোন সনদ ও কোন সমালোচককে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

আরেকটি বর্ণনাপথে বুরাইদা বলেন, মুহাম্মদ একটি অভিযানে আলীকে নেতা করেছিলেন। ফিরে এসে আলী সম্পর্কে অভিযোগ করা হলে নবীর মুখ লাল হয়ে যায় এবং তিনি বলেন, “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।” ইতহাফুল খিয়ারাহ-তে আবু বকর ইবন আবি শাইবা, বাযযার ও নাসাঈর সূত্র উল্লেখ করে এই পথকে সরাসরি “সহিহ সনদ” বলা হয়েছে [113]।

মূল আরবি—আল-বুসিরি, ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারাহ:
عن بريدة رضي الله عنه قال: بعثنا رسول الله صلى الله عليه وسلم في سرية، واستعمل علينا عليا، فلما جئناه قال: كيف رأيتم صاحبكم؟ قال: فإما شكوته وإما شكاه غيري. قال: فرفعت رأسي وكنت رجلا مكبابا، فإذا النبي صلى الله عليه وسلم قد احمر وجهه وهو يقول: من كنت مولاه فعلي مولاه.
رواه أبو بكر بن أبي شيبة والبزار والنسائي في الكبرى بسند صحيح.
বাংলা অনুবাদ:
বুরাইদা বলেন: আল্লাহর রাসুল আমাদের একটি সামরিক অভিযানে পাঠিয়ে আলীকে আমাদের নেতা নিযুক্ত করেন। ফিরে এলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা তোমাদের সঙ্গীকে কেমন পেয়েছ?” আমি অথবা অন্য কেউ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। আমি মাথা তুললাম; আমি মাথা নিচু করে থাকা মানুষ ছিলাম। দেখলাম নবীর মুখ লাল হয়ে গেছে এবং তিনি বলছেন, “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।” এটি আবু বকর ইবন আবি শাইবা, বাযযার এবং নাসাঈ আল-কুবরা-য় সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন।

এখন একই বক্তব্যের সামনে অন্তত তিনটি মূল্যায়ন দাঁড়াল: তিরমিযির নির্দিষ্ট পথ “হাসান গরিব”; আরেক পথকে “সহিহ সনদ” বলা হয়েছে; বুখারি ও অন্যদের নামে আপত্তি ও দুর্বলকরণ সংরক্ষিত। এগুলোকে এক লাইনের গ্রেডে চেপে দিলে তথ্য নষ্ট হয়। হাদিসটির মূল বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে কতটা প্রতিষ্ঠিত, “মাওলা” শব্দের অর্থ বন্ধু, সাহায্যপ্রাপ্ত, অভিভাবক নাকি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী—এসব আরও পৃথক প্রশ্ন। সনদ গ্রহণ করলেও শিয়া–সুন্নি ব্যাখ্যার বিরোধ শেষ হয় না। অর্থাৎ গ্রেডের পরেও মতনের অর্থ নিয়ে আরেকটি মানবিক আদালত বসে।

গাদিরের উদাহরণে দেখা যায়, “জইফ” বলে মুছে ফেলা এবং “সহিহ” বলে একমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ চাপানো—দুটিই একই কর্তৃত্ববাদী শর্টকাট। প্রথমটি বহু পথ ও ইতিবাচক গ্রেড অস্বীকার করে; দ্বিতীয়টি শব্দের অর্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিতর্ক লুকায়। গ্রেড নির্দিষ্ট বর্ণনাপথ ও নির্দিষ্ট বিচারকের রায়; বর্ণনা, তার অর্থ এবং তার ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবহার পৃথক প্রশ্ন।


জইফ হাদিসের বাস্তব ব্যবহার

অস্বস্তিকর কোনো সীরাত বা ইতিহাসের বর্ণনা সামনে এলে বহুল ব্যবহৃত প্রতিক্রিয়া হলো: “সনদ জইফ, তাই ইসলামের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি।” – এটি সম্পূর্ণ ভুল বক্তব্য। কোনো বর্ণনা দিয়ে হালাল-হারাম, শাস্তি বা বাধ্যতামূলক শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না—এ সিদ্ধান্ত থেকে বর্ণনাটি অতীত সম্পর্কে কোনো তথ্যই বহন করে না—এ সিদ্ধান্ত বের হয় না। আইনগত প্রমাণের মান এবং ইতিহাসের উৎস-মূল্য এক নয়। প্রাচীন মুহাদ্দিসেরা নিজেরাই ব্যবহারের ক্ষেত্র অনুযায়ী কঠোরতার মাত্রা বদলেছেন।

আবদুর রহমান ইবন মাহদির বক্তব্যে নিয়মটি সরাসরি বলা হয়েছে: হালাল-হারাম ও বিধানে সনদ ও রাবী যাচাইয়ে কঠোরতা; ফজিলত, সওয়াব ও শাস্তিতে শিথিলতা। আহমদ ইবন হাম্বল ইবন ইসহাক সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট করে বলেন, মাগাজি ও অনুরূপ ইতিহাস তাঁর কাছ থেকে লেখা যাবে; কিন্তু হালাল-হারামের ক্ষেত্রে অধিক শক্তিশালী মানুষ প্রয়োজন [114]।

মূল আরবি—আল-সাখাওয়ি, ফাতহুল মুগিস:
إذا روينا عن النبي صلى الله عليه وسلم في الحلال والحرام والأحكام، شددنا في الأسانيد وانتقدنا في الرجال، وإذا روينا في الفضائل والثواب والعقاب، سهلنا في الأسانيد وتسامحنا في الرجال.
وقال أحمد في رواية عباس الدوري عنه: ابن إسحاق رجل تكتب عنه هذه الأحاديث – يعني: المغازي – ونحوها، وإذا جاء الحلال والحرام أردنا قوما هكذا، وقبض أصابع يديه الأربع.
বাংলা অনুবাদ:
নবীর কাছ থেকে হালাল-হারাম ও বিধান বর্ণনা করলে আমরা সনদে কঠোরতা করতাম এবং রাবীদের সূক্ষ্মভাবে যাচাই করতাম; আর ফজিলত, সওয়াব ও শাস্তি বর্ণনা করলে সনদে শিথিলতা ও রাবীদের ক্ষেত্রে ছাড় দিতাম। আহমদ ইবন হাম্বল ইবন ইসহাক সম্পর্কে বলেন: “তিনি এমন ব্যক্তি, যার কাছ থেকে এসব হাদিস—অর্থাৎ মাগাজি ও অনুরূপ ইতিহাস—লেখা যায়। কিন্তু হালাল-হারামের প্রশ্ন এলে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী মানুষ চাই।” এ কথা বলে তিনি হাতের চার আঙুল মুঠো করেছিলেন।

মাগাজি বা যুদ্ধবৃত্তান্তে কোনো রাবীর সংবাদ লেখা হবে, কিন্তু সেই একই শক্তিতে হালাল–হারাম স্থির করা হবে না—উদ্ধৃত বক্তব্যে এই পার্থক্য আছে। আইন দিয়ে মানুষকে বাধ্য করা বা শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি শক্ত প্রমাণ চাওয়ার যুক্তি আছে; শুধু এই পার্থক্যকে দ্বৈত মানদণ্ড বলা ভুল। ইতিহাসে প্রশ্নের ধরনও একাধিক। ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল কি না—এটি এক প্রশ্ন। কোনো সময়ের মানুষ ঘটনাটির গল্প বলত কি না, গল্পের ভাষা পরে বদলেছে কি না, কোনো গোষ্ঠী কী বিশ্বাস করত—এগুলো অন্য প্রশ্ন। দুর্বল উৎস প্রথম প্রশ্নের যথেষ্ট প্রমাণ না হলেও পরের প্রশ্নগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হতে পারে। দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হয় যখন ইতিহাসের জন্যও স্বীকৃত এই ব্যবহার সুবিধাজনক ঘটনায় মানা হয়, অথচ অস্বস্তিকর ঘটনায় শুধু “জইফ” বলে অনুসন্ধান বন্ধ করা হয়। উৎসের দাবিটি মিথ্যা হলেও সেই দাবি কখন, কোথায় ও কেন ছড়িয়েছিল—তা ইতিহাসের তথ্য।

আল-সাখাওয়ির একই আলোচনায় আরও কঠিন স্বীকারোক্তি আছে। আহমদ দুর্বল হাদিসকে ব্যবহার করেছেন যখন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্য কিছু ছিল না; আবু দাউদ তাঁকে অনুসরণ করেছেন এবং দুর্বল হাদিসকে ব্যক্তিগত মত ও কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আরও বলা হয়েছে, উম্মাহ কোনো দুর্বল বর্ণনাকে গ্রহণ করলে সঠিক মত অনুযায়ী তার ওপর আমল করা যায়; এমনকি সেটি মুতাওয়াতিরের মর্যাদায় নেমে এসে নিশ্চিত পাঠকে নাসখ করতে পারে—“ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই” বর্ণনাকে কোরআনের ওসিয়তের আয়াত নাসখকারী হিসেবে ব্যবহার করার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে [115]।

মূল আরবি—আল-সাখাওয়ি, ফাতহুল মুগিস:
لكنه احتج رحمه الله بالضعيف حيث لم يكن في الباب غيره، وتبعه أبو داود وقدماه على الرأي والقياس، ويقال عن أبي حنيفة أيضا ذلك، وأن الشافعي يحتج بالمرسل إذا لم يجد غيره.
وكذا إذا تلقت الأمة الضعيف بالقبول يعمل به على الصحيح، حتى إنه ينزل منزلة المتواتر في أنه ينسخ المقطوع به؛ ولهذا قال الشافعي رحمه الله في حديث: لا وصية لوارث: إنه لا يثبته أهل الحديث، ولكن العامة تلقته بالقبول، وعملوا به حتى جعلوه ناسخا لآية الوصية له.
বাংলা অনুবাদ:
আহমদ দুর্বল হাদিসকে দলিল করেছেন যখন সেই বিষয়ে অন্য কিছু ছিল না। আবু দাউদ তাঁকে অনুসরণ করেছেন এবং তাঁরা দুর্বল হাদিসকে ব্যক্তিগত মত ও কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আবু হানিফার নামেও এমন মত বলা হয়; শাফেয়ি অন্য কিছু না পেলে মুরসাল বর্ণনা দিয়ে দলিল নিতেন। উম্মাহ কোনো দুর্বল বর্ণনাকে গ্রহণ করলে সঠিক মত অনুযায়ী তার ওপর আমল করা হবে; এমনকি নিশ্চিত দলিল নাসখের ক্ষেত্রে সেটি মুতাওয়াতিরের মর্যাদায় গণ্য হতে পারে। এ কারণেই শাফেয়ি “ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই” হাদিস সম্পর্কে বলেন: হাদিসবিশারদেরা এটিকে প্রতিষ্ঠিত বলেননি, কিন্তু সাধারণভাবে মানুষ তা গ্রহণ ও অনুসরণ করেছে—এমনকি ওয়ারিশের জন্য ওসিয়তের আয়াত নাসখকারী বানিয়েছে।

এর পরে “জইফ মানেই কোনো প্রমাণ নয়” বলা ঐতিহ্যের ইতিহাস সম্পর্কে মিথ্যা বলা। দুর্বল হাদিস ব্যক্তিগত মত ও কিয়াসের আগে স্থান পেয়েছে; মুরসাল দিয়ে বিধান হয়েছে; সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে হাদিসবিদদের কাছে অপ্রতিষ্ঠিত বর্ণনাও কোরআনের আয়াতের কার্যকারিতা বদলেছে। ফলে কোনো অস্বস্তিকর ইতিহাসকে কেবল “জইফ” বলে বিলুপ্ত করা দ্বৈত মানদণ্ড। সুবিধাজনক হলে দুর্বল বর্ণনা ফিকহে কাজ করবে, অসুবিধাজনক হলে ইতিহাসেও তার অস্তিত্ব থাকবে না—এটি পদ্ধতি নয়, ফল বাছাই।

দুর্বল সনদের একটি খবরের ওজন বুঝতে দুর্বলতার কারণ জানার পর তার বাইরের তথ্যও দেখতে হয়। পুরোনো কোন বইয়ে খবরটি আছে? বইগুলো একই উৎস থেকে নিয়েছে কি না? সময়ের সঙ্গে ভাষা বদলেছে কি? কার রাজনৈতিক বা ধর্মীয় স্বার্থ এতে জড়িত? অন্য সাহিত্য, নথি বা বস্তুগত প্রমাণের সঙ্গে মেলে কি? এসব মিলিয়ে ঘটনাটি বেশি সম্ভাব্য, কম সম্ভাব্য বা পরে তৈরি কাহিনি বলে সিদ্ধান্ত হতে পারে। অন্য প্রমাণে সমর্থিত হলে দুর্বল সনদের তথ্যও শক্তিশালী ব্যাখ্যার অংশ হয়। আইন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয় বলে ইতিহাসেও কোনো কাজে আসে না—এই সিদ্ধান্ত চলে না। আবার ইতিহাসে কাজে আসে বলেই খবরটির সব কথা সত্য ধরে নিতে হয় না; কোন প্রশ্নে কী তথ্য দিচ্ছে, সেটিই তার ব্যবহার নির্ধারণ করে।


আকিদায় দুর্বল হাদিস

সাধারণ প্রচারে বলা হয়, আকিদা নিশ্চিত প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়; দুর্বল হাদিস সেখানে গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তব প্রয়োগে এই কঠোর বাক্য ভেঙে পড়ে। আগে থেকে গৃহীত আকিদার সঙ্গে কোনো দুর্বল বর্ণনার অর্থ মিলে গেলে সেটি “সনদ দুর্বল, কিন্তু অর্থ সঠিক” বলে ব্যাখ্যা ও প্রমাণসমষ্টির মধ্যে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেডটি তখন বক্তব্যকে বাতিল করে না; কেবল বলা হয় অন্য সহিহ দলিল একই অর্থ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু একই জইফ বর্ণনা যদি প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের জন্য অস্বস্তিকর হয়, তখন গ্রেডটি ঘটনা মুছে দেওয়ার অস্ত্র হয়।


“আমাদের রব আসমানে”

ইবন তাইমিয়ার আল-আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ-এর ব্যাখ্যায় আবদুল আজিজ ইবন বায আল্লাহর ঊর্ধ্বস্থিতি প্রমাণে “আমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানে”—এই বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। গ্রন্থকার এটিকে হাসান বলেছিলেন। প্রশ্নোত্তর অংশে ইবন বায জানান, তিনি সনদ পরীক্ষা করে দুর্বল পেয়েছেন। তারপরও তাঁর সিদ্ধান্ত: অন্য পথ থাকলে হয়তো হাসান লিগাইরিহি; না থাকলেও অর্থ সঠিক এবং সহিহ হাদিসগুলো এর জন্য যথেষ্ট [116]।

মূল আরবি—ইবন বায, শারহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যাহ:
س: الحديث الذي أورده المؤلف: ربنا الله الذي في السماء تبارك اسمك؟
ج: المؤلف قال إنه حديث حسن، ولما راجعته حديث ضعيف، سنده ضعيف، إلا أن يوجد له طرق أخرى لعل المؤلف اطلع على طرق أخرى.
يقول: حديث حسن، لكن لعله اطلع على طرق أخرى يكون من باب الحسن لغيره، وإلا سنده عند أبي داود ضعيف. لكن معناه صحيح حتى ولو ما ثبت، الأحاديث الصحيحة تكفي عنه.
বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন: লেখক যে “আমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানে; আপনার নাম পবিত্র”—হাদিসটি এনেছেন?
উত্তর: লেখক বলেছেন এটি হাসান হাদিস। আমি যাচাই করে দেখেছি, হাদিসটি দুর্বল; এর সনদ দুর্বল—যদি না এর অন্য পথ থাকে, যা হয়তো লেখক দেখেছেন। তিনি হাসান বলেছেন; সম্ভবত অন্য পথের কারণে এটি হাসান লিগাইরিহি হতে পারে। তা না হলে আবু দাউদের সনদটি দুর্বল। কিন্তু হাদিসটি প্রতিষ্ঠিত না হলেও এর অর্থ সঠিক; সহিহ হাদিসগুলোই এর অর্থের জন্য যথেষ্ট।

এই বক্তব্যে নির্বাচনী ব্যবহারের সম্পূর্ণ কাঠামো ধরা পড়ে। দুর্বল সনদ থেকে বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি; বক্তব্যটি আগে থেকেই অন্য ধর্মতাত্ত্বিক দলিলের মাধ্যমে সত্য ধরে নেওয়া হয়েছে। তারপর দুর্বল হাদিসটিকে বাদ না দিয়ে সেই বিশ্বাসের ব্যাখ্যায় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সনদ-গ্রেড এখানে মতনের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না; মতনটি প্রতিষ্ঠিত আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় দুর্বলতা অতিক্রম করে আলোচনায় টিকে যাচ্ছে।


সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায়?

আবু রাযীনের বর্ণনায় প্রশ্ন করা হয়, আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন। উত্তর হিসেবে “‘আমা”-তে থাকার কথা এসেছে—যার নিচে ও ওপরে বায়ু ছিল না—তারপর আরশ পানির ওপর সৃষ্টি করা হয়। এটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য ও পরীক্ষাতীত আকিদাগত দাবি। তিরমিযি বর্ণনাটিকে হাসান বলেছেন; কিন্তু আলবানী একই সনদকে দুর্বল, এমনকি অন্য মূল্যায়নে “সহিহ নয়” বলেছেন। ইবন বায তবু তাঁর আকিদার ব্যাখ্যায় বর্ণনাটি এনে “‘আমা”র অর্থ আলোচনা করেছেন [117] [118]।

মূল আরবি—আবু রাযীনের বর্ণনা এবং বিপরীত গ্রেড:
قلت: يا رسول الله، أين كان ربنا قبل أن يخلق خلقه؟ قال: كان في عماء ما تحته هواء وما فوقه هواء، وخلق عرشه على الماء.
قال الترمذي: وهذا حديث حسن.
خلاصة حكم المحدث: إسناده ضعيف. المحدث: الألباني.
বাংলা অনুবাদ:
আমি বললাম: “হে আল্লাহর রাসুল, সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার আগে আমাদের রব কোথায় ছিলেন?” তিনি বললেন: “তিনি ‘আমা’-তে ছিলেন—তার নিচে বায়ু ছিল না, ওপরে বায়ু ছিল না; এবং তিনি তাঁর আরশ পানির ওপর সৃষ্টি করেন।” তিরমিযি বলেন: “এটি হাসান হাদিস।” অথচ আলবানীর রায়: “এর সনদ দুর্বল।”

একই অদৃশ্য দাবি এক মুহাদ্দিসের কাছে হাসান, অন্যের কাছে দুর্বল। পরীক্ষাগার, পর্যবেক্ষণ বা স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ এখানে কোনোটিই নেই; শেষ ভরসা সনদের মানবিক মূল্যায়ন। তারপর যে আকিদাবিদ বর্ণনাটি ব্যবহার করছেন, তিনি পছন্দসই গ্রেড বা “অর্থ সঠিক” নীতি নিয়ে মতনটিকে ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় রাখছেন। অথচ এই ধরনের পদ্ধতিতে প্রাপ্ত বক্তব্যকে “নিশ্চিত অদৃশ্য জ্ঞান” বলা প্রমাণের প্রকৃত শক্তির চেয়ে বহুগুণ বড় দাবি।

এখানে দুর্বল হাদিসের ব্যবহার কেবল নৈতিক উৎসাহ বা আমলের ফজিলতে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ কোথায়, সৃষ্টির আগে তাঁর অবস্থা কী, আসমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন—এসব আকিদার কেন্দ্রীয় ও সম্পূর্ণ অধরা প্রশ্ন। এই জায়গাতেও হাদিসের গ্রেডে মতভেদ এবং দুর্বল সনদের অর্থ গ্রহণ দেখা গেলে “আকিদা শুধু নিশ্চিত প্রমাণে দাঁড়ায়”—এই স্লোগান বাস্তব পাঠের সামনে টেকে না।


ফিকহে দুর্বল হাদিস

দুর্বল হাদিসের ব্যবহারকে কেবল নফল ইবাদতের ফজিলত, নৈতিক উপদেশ বা ভয় দেখানো গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে যে পরিচ্ছন্ন ছবি প্রচার করা হয়, সেটি মিথ্যা। বাস্তব ফিকহে দুর্বল বর্ণনা এমন সব বিধানের প্রমাণসমষ্টিতে ঢুকেছে, যেগুলো মানুষের শরীর, বিবাহ, সম্পদ, উপাসনা এবং প্রাণদণ্ডের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। নামাজে হাসলে ওজু ভাঙবে কি না, বিয়ের সর্বনিম্ন মোহর কত, কত মূল্য চুরি করলে হাত কাটা হবে, শরীর থেকে রক্ত বের হলে ওজু ভাঙবে কি না, দাসী নারীর তালাক ও ইদ্দত কত, হত্যার প্রতিশোধ কোন অস্ত্রে কার্যকর হবে—এসব কোনো “ফজিলতের” নিরীহ আলোচনা নয়।

আল-সাখাওয়ি লিখেছেন, আহমদ ইবন হাম্বল সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে অন্য কিছু না থাকলে দুর্বল হাদিসকে দলিল করেছেন; আবু দাউদ তাঁকে অনুসরণ করে দুর্বল হাদিসকে ব্যক্তিগত মত ও কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নামাজ, চুরি ও অন্যান্য বিধানের দলিলে এই অগ্রাধিকার বাস্তবে প্রয়োগ হয়েছে: দুর্বলতা জানা সত্ত্বেও বর্ণনাগুলো আইনগত যুক্তির অংশ হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিধানের সমর্থনে ব্যবহৃত হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি “আমল এর ওপর” বলা হয়েছে।


অট্টহাসি ও ওজু

নামাজে উচ্চস্বরে হাসলে নামাজ নষ্ট হয়—এ নিয়ে সাধারণ ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই হাসি ওজুও ভেঙে দেয় কি না, সেখানে আবু হানিফার অবস্থান অন্যদের থেকে আলাদা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে নামাজ বাতিল হলেও ওজু অক্ষুণ্ণ থাকে; হানাফি বিধানে নামাজ ও ওজু দুটিই বাতিল। প্রমাণ হিসেবে এমন একটি বর্ণনা ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে নামাজে কয়েকজন হাসলে নবী নাকি তাঁদের ওজু ও নামাজ উভয়ই পুনরায় করতে বলেন। আবদুল হাই ইউসুফ তাঁর ফিকহুস সালাহ—মুবতিলাতুস সালাহ বক্তৃতায় হাদিসটিকে দুর্বল ও অপ্রতিষ্ঠিত বলেছেন [119]।

মূল আরবি—আবদুল হাই ইউসুফ, ফিকহুস সালাহ—মুবতিলাতুস সালাহ:
وجمهور العلماء على أن صلاة من ضحك فيها باطلة والوضوء صحيح، وانفرد الإمام أبو حنيفة رحمه الله فقال: تبطل الصلاة والوضوء، واستدل على ذلك بحديث ضعيف فيه: أن قوما ضحكوا في الصلاة، فأمرهم النبي صلى الله عليه وسلم أن يعيدوا الوضوء والصلاة.
ورد عليه العلماء فقالوا: أولا: الحديث لا يثبت، ثانيا: أنه مناقض للأصول.
বাংলা অনুবাদ:
সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে নামাজে হাসলে নামাজ বাতিল হবে, কিন্তু ওজু সঠিক থাকবে। ইমাম আবু হানিফা এককভাবে বলেছেন, নামাজ ও ওজু দুটিই বাতিল হবে। এর পক্ষে তিনি একটি দুর্বল হাদিস দিয়ে দলিল দিয়েছেন: কয়েকজন ব্যক্তি নামাজে হেসেছিল; নবী তাঁদের ওজু ও নামাজ পুনরায় করার নির্দেশ দেন। অন্য আলেমরা এর জবাবে বলেছেন: প্রথমত, হাদিসটি প্রতিষ্ঠিত নয়; দ্বিতীয়ত, এটি মূলনীতির বিরোধী।

হাসি নামাজের বাইরে ওজু ভাঙে না, কিন্তু নামাজের ভেতরে একই শারীরিক কাজ ওজু ভাঙবে—এ বিধান কেবল যুক্তিগতভাবে অস্বাভাবিক নয়; যে বর্ণনা দিয়ে ব্যতিক্রমটি তৈরি করা হয়েছে, সেটিও অপ্রতিষ্ঠিত। তবু বিধানটি হানাফি ফিকহে টিকে গেছে। অতএব বাস্তব নিয়ম “দুর্বল হাদিসে শরিয়তের বিধান হয় না” নয়। বাস্তব নিয়ম হলো, মাযহাবি উসুল, প্রাচীন আমল ও নির্বাচিত বর্ণনার সমন্বয়ে বিধান গঠিত হয়; সনদের গ্রেড সেই প্রক্রিয়ার একটি উপাদান, শেষ বিচারক নয়।


দশ দিরহাম মোহর

বিয়েতে মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ আছে কি না—এ বিষয়ে ফকিহদের বিরোধ রয়েছে। আবু হানিফার মতে দশ দিরহামের কম মোহর গ্রহণযোগ্য নয়। এই সীমার পক্ষে জাবিরের নামে নবীর বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে: “দশ দিরহামের কম মোহর নেই।” কিন্তু বর্ণনাটির কেন্দ্রীয় রাবী মুবাশশির ইবন উবাইদ সম্পর্কে দারাকুতনি বলেছেন, তিনি মাতরুক; আহমদের নামে তাঁর হাদিসগুলো জাল বলার বক্তব্য এসেছে; ইবন হিব্বান বলেছেন, তিনি বিশ্বস্তদের নামে জাল বর্ণনা করতেন [120] [121]।

মূল আরবি—তুহফাতুল আহওয়াযি ও বিদায়াতুল মুজতাহিদ:
وهو قول أبي حنيفة وأصحابه، واحتجوا بحديث جابر مرفوعا: لا تنكحوا النساء إلا الأكفاء، ولا يزوجهن إلا الأولياء، ولا مهر دون عشرة دراهم.
وفي سنده مبشر بن عبيد، قال الدارقطني بعد أن أخرج هذا الحديث: هو متروك الحديث، أحاديثه لا يتابع عليها. وأسند البيهقي عن أحمد أنه قال: أحاديث مبشر بن عبيد موضوعة. وقال ابن حبان: مبشر بن عبيد يروي عن الثقات الموضوعات، لا يحل كتب حديثه إلا على جهة التعجب.
وقد احتجت الحنفية لكون الصداق محددا بهذا القدر بحديث يروونه عن جابر عن النبي عليه الصلاة والسلام أنه قال: لا مهر بأقل من عشرة دراهم. ولو كان هذا ثابتا لكان رافعا لموضع الخلاف.
বাংলা অনুবাদ:
এটি আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীদের মত। তাঁরা জাবিরের মারফু হাদিস দিয়ে দলিল দিয়েছেন: “সমকক্ষ ছাড়া নারীদের বিয়ে দিও না, অভিভাবক ছাড়া তাদের বিয়ে দিও না এবং দশ দিরহামের কম মোহর নেই।” এর সনদে মুবাশশির ইবন উবাইদ আছেন। দারাকুতনি বলেন: “তিনি মাতরুকুল হাদিস; তাঁর বর্ণনার কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না।” বায়হাকি আহমদের নামে বর্ণনা করেন: “মুবাশশির ইবন উবাইদের হাদিসগুলো জাল।” ইবন হিব্বান বলেন: “তিনি বিশ্বস্ত রাবীদের নামে জাল বর্ণনা করতেন; বিস্ময়ের নমুনা ছাড়া তাঁর হাদিস লেখা বৈধ নয়।” ইবন রুশদ বলেন, হানাফিরা এই হাদিস দিয়ে মোহর দশ দিরহামে সীমাবদ্ধ করার দলিল দিয়েছেন; হাদিসটি প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই এটি মতভেদ শেষ করে দিত।

এখানে দুর্বলতা সামান্য স্মৃতিভ্রমের পর্যায়ের নয়; মাতরুক ও জাল বর্ণনার অভিযোগ পর্যন্ত আছে। তারপরও হাদিসটি একটি প্রভাবশালী মাযহাবের বৈবাহিক বিধানের ঐতিহাসিক যুক্তিতে উপস্থিত। অন্য কিয়াস ও ফিকহি যুক্তি থাকলেও এই উপস্থিতি মুছে যায় না। “দুর্বল হাদিস আইন থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত”—এই দাবি তাই তথ্যগতভাবে ভুল।


চুরির দশ দিরহাম

মোহরের প্রশ্ন অর্থনৈতিক; চুরির হদে একই দশ দিরহামের সীমা শারীরিক অঙ্গচ্ছেদের সঙ্গে যুক্ত। কত মূল্যের সম্পদ চুরি করলে মানুষের হাত কাটা হবে—এটি ইসলামী দণ্ডবিধির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি। সহিহ বর্ণনায় এক-চতুর্থাংশ দিনারের সীমা এসেছে। কিন্তু আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীরা দশ দিরহাম বা সমমূল্যের সীমা নিয়েছেন। হাসান আবুল আশবাল আয-যুহাইরি তাঁর সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তাঁরা এর পক্ষে একটি দুর্বল বর্ণনার ওপর নির্ভর করেছেন [122]।

মূল আরবি—হাসান আবুল আশবাল আয-যুহাইরির সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যা; শেষাংশে নববীর বক্তব্য উদ্ধৃত:
وقال الحسن في رواية عنه: لا تقطع إلا في خمسة دراهم، واستندوا إلى حديث ضعيف، وهو مروي عن عمر بن الخطاب.
وقال أبو حنيفة وأصحابه: لا تقطع إلا في عشرة دراهم أو ما قيمته ذلك، واستندوا كذلك إلى حديث ضعيف.
وأما ما يحتج به بعض الحنفية وغيرهم من رواية جاءت: قطع في مجن قيمته عشرة دراهم، وفي رواية خمسة، فهي ضعيفة لا يعمل بها لو انفردت، فكيف وهي مخالفة لصريح الأحاديث الصحيحة.
বাংলা অনুবাদ:
হাসানের একটি বর্ণিত মতে পাঁচ দিরহামের কমে হাত কাটা হবে না; তাঁরা উমর ইবনুল খাত্তাবের নামে বর্ণিত একটি দুর্বল হাদিসের ওপর নির্ভর করেছেন। আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীরা বলেন, দশ দিরহাম বা তার সমমূল্যের কমে হাত কাটা হবে না; তাঁরাও একটি দুর্বল হাদিসের ওপর নির্ভর করেছেন। কিছু হানাফি যে দশ দিরহাম—অন্য বর্ণনায় পাঁচ দিরহাম—মূল্যের ঢাল চুরিতে হাত কাটার বর্ণনা দিয়ে দলিল দেন, তা দুর্বল; একা থাকলেও তার ওপর আমল করা যেত না, অথচ এটি স্পষ্ট সহিহ হাদিসগুলোরও বিরোধী।

চুরির দণ্ড নির্ধারণে দুর্বল হাদিসের এই ব্যবহার মানুষের অঙ্গচ্ছেদের সিদ্ধান্তে প্রবেশ করেছে। সীমাটি কারও হাত অক্ষত থাকবে নাকি কেটে ফেলা হবে, তা বদলে দিতে পারে। এমন গুরুতর বিধানেও দুর্বল বর্ণনা মাযহাবি যুক্তির অংশ হলে জইফ হাদিসকে কেবল গল্প ও ফজিলতের নিরাপদ বাক্সে বন্দি দেখানো প্রতারণা।


রক্তপাত ও ওজু

শরীরের স্বাভাবিক দুই নির্গমনপথ ছাড়া অন্য স্থান থেকে রক্ত বের হলে ওজু ভাঙে কি না—এ বিষয়ে হানাফি ও শাফেয়ি অবস্থান ভিন্ন। ফাতহুল কাদির-এ হানাফি যুক্তির অংশ হিসেবে সরাসরি “প্রত্যেক প্রবাহিত রক্তের কারণে ওজু” হাদিসটি আনা হয়েছে। কিন্তু নসবুর রায়াহ-র তাখরিজে তামিম আদ-দারির পথ সম্পর্কে দারাকুতনির রায়: উমর ইবন আবদুল আজিজ তামিমকে দেখেননি বা তাঁর কাছ থেকে শোনেননি, আর সনদের দুই ইয়াজিদই অজ্ঞাত [123] [124]।

মূল আরবি—ফাতহুল কাদির ও নসবুর রায়াহ:
وقال الشافعي رحمه الله: الخارج من غير السبيلين لا ينقض الوضوء … ولنا قوله صلى الله عليه وسلم: الوضوء من كل دم سائل.
روي عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: الوضوء من كل دم سائل.
قال الدارقطني: وعمر بن عبد العزيز لم يسمع من تميم ولا رآه، واليزيدان مجهولان.
বাংলা অনুবাদ:
শাফেয়ি বলেন, দুই নির্গমনপথ ছাড়া অন্য স্থান থেকে কিছু বের হলে ওজু ভাঙে না। হানাফি লেখকের বক্তব্য: “আমাদের দলিল নবীর বাণী—প্রত্যেক প্রবাহিত রক্তের কারণে ওজু করতে হবে।” কিন্তু এই বর্ণনার তামিম আদ-দারি-সূত্র সম্পর্কে দারাকুতনি বলেন: “উমর ইবন আবদুল আজিজ তামিমের কাছ থেকে শোনেননি, এমনকি তাঁকে দেখেনওনি; আর সনদের দুই ইয়াজিদই অজ্ঞাত।”

একই বিধানের পক্ষে অন্য আছার ও কিয়াস থাকতে পারে; তাতে আলোচ্য বাস্তবতা বদলায় না। দুর্বল সনদটি ফিকহি গ্রন্থে “আমাদের দলিল” ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছে। তাই “জইফ হলে কেউ দলিল হিসেবে নেয়নি” বলা পাঠের সরাসরি বিরোধিতা।


দাসীর তালাক

দাসী নারীর বিবাহও স্বাধীন নারীর সমান আইনি মর্যাদা পায়নি। “দাসীর তালাক দুই এবং ইদ্দত দুই হায়েজ”—এই বর্ণনা দিয়ে তার বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা ও অপেক্ষাকাল কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। তিরমিযি নিজেই বলেছেন, আয়িশার মারফু বর্ণনাটি শুধু মাজাহির ইবন আসলামের পথেই জানা যায় এবং তাঁর অন্য কোনো হাদিস পরিচিত নয়। পরবর্তী ব্যাখ্যায় মাজাহিরকে দুর্বল বলা হয়েছে। ইবন উমরের আরেক মারফু পথেও আমর ইবন শাবিব ও আতিয়্যা আল-আওফি—দুজন দুর্বল রাবী রয়েছেন; দারাকুতনি ও বায়হাকির মতে সঠিক রূপটি মওকুফ। তবু তিরমিযি একই সঙ্গে বলেন, সাহাবি ও পরবর্তী আলেমদের আমল এর ওপর [125]।

মূল আরবি—সুনান আত-তিরমিযি ও তুহফাতুল আহওয়াযি:
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: طلاق الأمة تطليقتان وعدتها حيضتان.
قال أبو عيسى: حديث عائشة حديث غريب لا نعرفه مرفوعا إلا من حديث مظاهر بن أسلم، ومظاهر لا نعرف له في العلم غير هذا الحديث، والعمل على هذا عند أهل العلم من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم وغيرهم، وهو قول سفيان الثوري والشافعي وأحمد وإسحاق.
مظاهر بن أسلم … قال في التقريب: ضعيف.
طلاق الأمة اثنتان، وعدتها حيضتان، وفي إسناده عمرو بن شبيب وعطية العوفي وهما ضعيفان، وقال الدارقطني والبيهقي: الصحيح أنه موقوف.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “দাসীর তালাক দুই এবং তার ইদ্দত দুই হায়েজ।” আবু ঈসা তিরমিযি বলেন: আয়িশার হাদিসটি গরিব; মাজাহির ইবন আসলামের পথ ছাড়া মারফু হিসেবে আমরা এটি জানি না, আর মাজাহিরের অন্য কোনো হাদিসও আমাদের জানা নেই। তবু নবীর সাহাবি ও পরবর্তী আলেমদের আমল এর ওপর; এটি সুফিয়ান সাওরি, শাফেয়ি, আহমদ ও ইসহাকের মত। অথচ তাকরিব-এ মাজাহিরকে দুর্বল বলা হয়েছে। ইবন উমরের অন্য মারফু পথেও আমর ইবন শাবিব ও আতিয়্যা আল-আওফি—দুজনই দুর্বল; দারাকুতনি ও বায়হাকির মতে সঠিক রূপটি মওকুফ।

এই একটি উদাহরণই গ্রেড ও প্রয়োগের দূরত্ব নগ্ন করে দেয়। বর্ণনাটি মারফু হিসেবে গরিব; কেন্দ্রীয় রাবী দুর্বল; অন্য মারফু পথেও দুই দুর্বল রাবী; বড় সমালোচকদের মতে সঠিকটি সাহাবির বক্তব্য। তবু বিধানটি আলেমদের আমল ও একাধিক ইমামের মত হিসেবে বহাল। “জইফ হলে শরিয়তে ঢুকতে পারে না”—এই স্লোগান এখানে সরাসরি ভেঙে পড়ে।


তরবারিতে কিসাস

“কিসাস কেবল তরবারি দিয়ে”—এই হাদিসের বিষয় কোনো ছোটখাটো আদব নয়; রাষ্ট্রীয়ভাবে একজন মানুষকে কীভাবে হত্যা করা হবে। ইবন বাযের জবাবের ভাষা অস্পষ্ট নয়: হাদিসটি দুর্বল, কিন্তু আমল এর ওপর; তরবারি দ্রুত হত্যা সম্পন্ন করে এবং নিহত ব্যক্তির জন্য তুলনামূলক আরামদায়ক। অর্থাৎ দুর্বলতার রায় দেওয়ার পরও বর্ণনার বিধানগত দিকটি বহাল রাখা হয়েছে [126]।

মূল আরবি—ইবন বায:
السؤال: أيضا يقول حديث: لا قود إلا بالسيف؟
الجواب: كذلك حديث ضعيف لكن العمل عليه، القود بالسيف أولى؛ لأنه أنجز للقتل، والنبي صلى الله عليه وسلم قال: إذا قتلتم فأحسنوا القتلة، والقتل بالسيف إذا كان بيد رجل عارف والسيف جيد أنجز في القتل وأريح للمقتول.
বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন: “কিসাস কেবল তরবারি দিয়ে”—এই হাদিসটি?
উত্তর: এটিও দুর্বল হাদিস, কিন্তু আমল এর ওপর। তরবারি দিয়ে কিসাস উত্তম, কারণ এতে হত্যা দ্রুত সম্পন্ন হয়। নবী বলেছেন: “হত্যা করলে উত্তমভাবে হত্যা করো।” দক্ষ ব্যক্তির হাতে ভালো তরবারি দ্রুত হত্যা সম্পন্ন করে এবং নিহত ব্যক্তির জন্য বেশি আরামদায়ক।

এখানে দুর্বল হাদিসের অর্থ অন্য সাধারণ নীতি দিয়ে সমর্থিত বলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটিই তো মূল কথা: গ্রেড চূড়ান্ত নয়; পরবর্তী ফিকহি বিচার বলে দেয় দুর্বল বর্ণনার বক্তব্য রাখা হবে কি না। একই পদ্ধতি অস্বস্তিকর ইতিহাসে প্রয়োগ না করে সেখানে কেবল “জইফ” বলে দরজা বন্ধ করা দ্বৈত মানদণ্ড।


পাপী ইমামের পেছনে নামাজ

“প্রত্যেক নেককার ও পাপীর পেছনে নামাজ পড়ো”—এই বর্ণনা আহলুস সুন্নাহর ইমামত-সংক্রান্ত আলোচনায় উদ্ধৃত হয়েছে। ইবন বাযের গ্রন্থে তাহাবির আকিদার ব্যাখ্যায় বর্ণনাটি উপস্থিত; অথচ উকাইলির মূল্যায়নে এই মতনের কোনো প্রতিষ্ঠিত সনদ নেই। মাকহুল আবু হুরায়রার কাছ থেকে শোনেননি—সনদ বিচ্ছিন্ন। তবু পাপী মুসলিম ইমামের পেছনে নামাজের নীতি অন্য দলিল, সাহাবিদের আমল ও রাজনৈতিক–ফিকহি বিবেচনায় বহাল থেকেছে [127] [128]।

মূল আরবি—ইবন বাযের উদ্ধৃতি ও হাদিস-সমালোচকদের রায়:
إن إقامة صلاة الجمعة واجبة خلف كل إمام بر أو فاجر … قال الإمام أبو جعفر الطحاوي رحمه الله: ونرى الصلاة خلف كل بر وفاجر من أهل القبلة.
قال صلى الله عليه وسلم: صلوا خلف كل بر وفاجر. رواه مكحول.
صلوا خلف كل بر وفاجر، وصلوا على كل بر وفاجر، وجاهدوا مع كل بر وفاجر.
خلاصة حكم المحدث: ليس لهذا المتن إسناد يثبت. مكحول لم يسمع من أبي هريرة.
বাংলা অনুবাদ:
প্রত্যেক নেককার বা পাপী ইমামের পেছনে জুমার নামাজ প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবি বলেন: “আমরা কিবলাপন্থী প্রত্যেক নেককার ও পাপীর পেছনে নামাজ বৈধ মনে করি।” নবীর নামে বর্ণিত: “প্রত্যেক নেককার ও পাপীর পেছনে নামাজ পড়ো।” পূর্ণ রূপে: “প্রত্যেক নেককার ও পাপীর পেছনে নামাজ পড়ো, প্রত্যেক নেককার ও পাপীর জানাজা পড়ো এবং প্রত্যেক নেককার ও পাপীর সঙ্গে জিহাদ করো।” কিন্তু মুহাদ্দিসের রায়: “এই মতনের কোনো প্রতিষ্ঠিত সনদ নেই; মাকহুল আবু হুরায়রার কাছ থেকে শোনেননি।”

বিধানটি অন্য দলিলেও টেকানো হোক—তবু এই দুর্বল বর্ণনাটি আকিদা ও ফিকহের ব্যাখ্যায় সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য প্রমাণ থাকলে দুর্বল হাদিসের অর্থ রাখা যাবে—এই নীতি যদি বৈধ হয়, তবে জইফ গ্রেড কোনো মতনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা বানায় না।


ঋণ ও সুবিধা

“যে ঋণ কোনো সুবিধা আনে, তা সুদ”—বাক্যটি জনপ্রিয়ভাবে নবীর হাদিস হিসেবে উদ্ধৃত হয় এবং ঋণের শর্তে ঋণদাতার বাড়তি সুবিধা নিষিদ্ধ করার ফিকহি সূত্রে পরিণত হয়েছে। অথচ বর্ণনাটি দুর্বল। ফিকহুত তাজিরিল মুসলিম-এ ইবন হাজার ও আলবানীর দুর্বলকরণ উল্লেখ করার পরই বলা হয়েছে, হাদিস দুর্বল হলেও তার অর্থ সঠিক—যদিও সর্বাবস্থায় নয়; ঋণদাতা নিজের জন্য আগাম শর্ত করা সুবিধা নিলে তা নিষিদ্ধ [129]।

মূল আরবি—ফিকহুত তাজিরিল মুসলিম:
كل قرض جر نفعا فهو ربا.
والحديث ضعيف، ضعفه الحافظ ابن حجر، وضعفه أيضا العلامة الألباني في إرواء الغليل.
ومع ضعف الحديث إلا أن معناه صحيح ولكن ليس على إطلاقه، فالقرض الذي يجر نفعا ويكون ربا أو وجها من وجوه الربا هو القرض الذي يشترط فيه المقرض منفعة لنفسه، فهو ممنوع شرعا.
বাংলা অনুবাদ:
“যে ঋণ কোনো সুবিধা আনে, তা সুদ।” হাদিসটি দুর্বল; হাফিজ ইবন হাজার এটিকে দুর্বল বলেছেন এবং আলবানীও ইরওয়াউল গালিল-এ দুর্বল বলেছেন। হাদিসটি দুর্বল হলেও এর অর্থ সঠিক, তবে সর্বাবস্থায় নয়: যে ঋণে ঋণদাতা নিজের জন্য কোনো সুবিধা শর্ত করে, সেই ঋণ সুদ বা সুদের একটি রূপ এবং শরিয়তে নিষিদ্ধ।

এই সূত্রে বিধানের অন্য ভিত্তি ও ইজমার দাবি থাকতে পারে। কিন্তু আবারও দেখা গেল, জইফ গ্রেডের পরে মতনটি মরে যায়নি; “অর্থ সঠিক” বলে ফিকহি ভাষায় জীবিত রয়েছে। ফলে গ্রেড ও ব্যবহার দুটি আলাদা ধাপ।


মসজিদের প্রতিবেশী

“মসজিদের প্রতিবেশীর নামাজ মসজিদ ছাড়া হয় না”—বর্ণনাটি জামাতে নামাজের বাধ্যবাধকতার আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত। ইবন বায বলেন, আহমদ, দারাকুতনি, হাকিম, তাবারানি ও দায়লামির সব মারফু সনদই দুর্বল; ইবন হাজারের ভাষায় এর কোনো প্রতিষ্ঠিত সনদ নেই। তারপর তিনি বর্ণনাটির সম্ভাব্য অর্থ নির্ধারণ করেন এবং অন্য সহিহ হাদিস দিয়ে একই বিধান সমর্থন করেন [130]।

মূল আরবি—ইবন বায:
لا صلاة لجار المسجد إلا في المسجد، هذا اللفظ رواه الإمام أحمد والدارقطني والحاكم والطبراني والديلمي، كلهم بأسانيد ضعيفة عن النبي صلى الله عليه وسلم.
قال الحافظ ابن حجر رحمه الله: ليس له إسناد ثابت وإن اشتهر بين الناس، فهو حديث ضعيف عند أهل العلم.
وعلى فرض صحته فمعناه محمول على أنه لا صلاة كاملة لجار المسجد إلا في المسجد؛ لأن الأحاديث الصحيحة قد دلت على صحة صلاة المنفرد، لكن مع الإثم إن لم يكن له عذر شرعي.
বাংলা অনুবাদ:
“মসজিদের প্রতিবেশীর নামাজ মসজিদ ছাড়া হয় না”—এই বাক্যটি আহমদ, দারাকুতনি, হাকিম, তাবারানি ও দায়লামি নবীর নামে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাঁদের সব সনদই দুর্বল। হাফিজ ইবন হাজার বলেন: “মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধ হলেও এর কোনো প্রতিষ্ঠিত সনদ নেই।” তাই আলেমদের কাছে এটি দুর্বল হাদিস। এটি সহিহ ধরে নিলেও অর্থ হবে—মসজিদের প্রতিবেশীর পূর্ণাঙ্গ নামাজ মসজিদ ছাড়া হয় না; কারণ সহিহ হাদিসগুলো দেখায়, একা পড়া ব্যক্তির নামাজ শুদ্ধ, যদিও শরিয়তি অজুহাত না থাকলে সে গুনাহগার।

এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল দেখায়: দুর্বল বর্ণনার প্রকাশ্য “নামাজ নেই” কথাকে “পূর্ণাঙ্গ নামাজ নেই” হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তারপর অন্য সহিহ দলিলে মূল বিধান প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এখানে জইফ হাদিসটি মিথ্যা বলে বাতিল হয়নি; তার অর্থকে গ্রহণযোগ্য ধর্মতত্ত্ব ও ফিকহের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে রাখা হয়েছে।


শেষ সিদ্ধান্ত ফকিহের

এসব উদাহরণে দুর্বল বর্ণনা একইভাবে ব্যবহার করা হয়নি। কোথাও তা একটি মাযহাবের বিধানের সরাসরি দলিল হয়েছে। কোথাও মুহাম্মদের নামে বলা অংশ দুর্বল হলেও সাহাবী ও আলেমদের চর্চার কারণে বিধানটি গ্রহণ করা হয়েছে। কোথাও অন্য সহিহ দলিল একই অর্থ সমর্থন করেছে বলে দুর্বল সনদের বাক্যটি ব্যবহার হয়েছে। কোথাও সেটি প্রতিষ্ঠিত সনদের হাদিস হিসেবে নয়, পরিচিত আইনগত সূত্র হিসেবে চলেছে। এই পার্থক্যগুলো দেখায়, “জইফ” বলার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়—এমন একক নিয়ম বাস্তবে নেই। কোন সমর্থন, কোন আমল বা কোন ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ব্যবহার চলেছে, তা দেখতে হয়। সুতরাং কোনো অস্বস্তিকর ঐতিহাসিক খবরের সামনে একই শব্দকে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা বানাতে চাইলে এই স্বীকৃত ব্যবহারগুলোর সঙ্গে তার সামঞ্জস্য দেখানোর দায় থাকে।

অট্টহাসিতে ওজু, দশ দিরহাম মোহর, দশ দিরহামের চুরিতে হাত কাটার সীমা, প্রবাহিত রক্তে ওজু, দাসীর তালাক ও ইদ্দত, তরবারিতে কিসাস—এসব বাস্তব বিধানের আলোচনায় দুর্বল বর্ণনাও প্রমাণসমষ্টির অংশ হয়েছে। ফলে কোনো ঐতিহাসিক অত্যাচার, যৌন দাসত্ব, যুদ্ধ, হত্যা বা রাজনৈতিক ঘটনার বর্ণনার ক্ষেত্রে শুধু “জইফ” শব্দটি উচ্চারণ করেই আলোচনা শেষ করা সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতি নয়। প্রথমে দেখাতে হবে দুর্বলতা কতটা গুরুতর, অন্য পথ আছে কি না এবং ঐতিহাসিক প্রশ্নে বর্ণনাটি আদৌ কোনো প্রমাণমূল্য বহন করে কি না।

বাস্তব সিদ্ধান্ত আরও নির্দিষ্ট: দুর্বলতা মানে ঐ সনদ বা বর্ণনাপথে বক্তব্যটি যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; দুর্বলতার প্রকৃতি অনুসারে তার প্রমাণমূল্য খুব সামান্যও হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “ঘটনাটি ঘটেনি” সিদ্ধান্ত আসে না। দুর্বলতার কারণ, অন্য বর্ণনাপথ, প্রাচীনত্ব, পারস্পরিক নির্ভরতা, মতনের সামঞ্জস্য, বিরোধী প্রমাণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।

জইফ হাদিসকে কখনো ওজু, বিবাহ, সম্পদ, অঙ্গচ্ছেদ ও প্রাণদণ্ডের আলোচনায় ব্যবহার করে আবার সমালোচনার মুখে বলা—“জইফ মানেই মিথ্যা, আলোচনা শেষ”—এটি হাদিসশাস্ত্র নয়; সুবিধামতো প্রমাণের মান বদলানো। বাস্তবে গ্রেডের পরে ফকিহের আরেক আদালত বসে, এবং সেই আদালতই ঠিক করে কোন দুর্বল বক্তব্যকে অর্থ, আমল, কিয়াস বা অন্য দলিলের নামে জীবিত রাখা হবে।


সহিহ হাদিসও শেষ কথা নয়

আকিদা ও ফিকহে দুর্বল হাদিসের নথিবদ্ধ ব্যবহার একটি কঠিন সত্য প্রতিষ্ঠা করে: “জইফ” গ্রেড কোনো বর্ণনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আকিদা, ফিকহ বা ঐতিহাসিক আলোচনা থেকে বহিষ্কার করেনি। কিন্তু সমস্যার বিপরীত দিকটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো বর্ণনা “সহিহ” হলেই তার প্রকাশ্য বক্তব্য শরিয়তের অপরিবর্তনীয় চূড়ান্ত বিধান হয়ে যায়নি। সহিহ হওয়ার পরেও ফকিহকে অন্তত আরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে: হাদিসটি মানসুখ কি না, তার শব্দের প্রকাশ্য অর্থই উদ্দেশ্য কি না, বিধানটি সাধারণ নাকি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য, অন্য কোনো হাদিস বা সাহাবির আমল এর সঙ্গে সংঘর্ষ করছে কি না, এবং বাস্তব প্রয়োগে কোন দলিলকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অর্থাৎ সনদ-গ্রেডিং বর্ণনার বিচার শেষ করে না; কেবল ব্যাখ্যা ও আইনগত প্রয়োগের নতুন স্তর শুরু করে।

কথাটি মুহাম্মদের বলে গ্রহণ করা এবং সেই কথা থেকে আজকের আইন নির্ধারণ করা আলাদা কাজ। একটি হাদিস সহিহ হলেও জানতে হয় কখন বলা হয়েছিল, পরে অন্য নির্দেশে বদলেছে কি না, কাদের জন্য বলা এবং একই বিষয়ে অন্য দলিল কী বলে। আগের বিধান পরে রহিত হওয়াকে বলা হয় নাসখ। আবার ভাষায় ব্যবহৃত একটি শব্দ কখনো সাধারণ নির্দেশ, কখনো বিশেষ পরিস্থিতির কথা বোঝাতে পারে। এই প্রশ্নে ফকিহরা সাহাবীদের চর্চা ও নিজেদের আইন ব্যাখ্যার নিয়মও ব্যবহার করেন। তাই দুর্বল বর্ণনার অর্থ অন্য দলিলে সমর্থিত বলে গ্রহণের নজির যেমন আছে, সহিহ বর্ণনার প্রকাশ্য নির্দেশ থেকে ভিন্ন বিধান নেওয়ার নজিরও আছে। সহিহ বললেই অর্থ ও আইন তৈরি হয়ে যায় না; জইফ বললেই কথাটির সব ব্যবহার শেষ হয় না। দুই সিদ্ধান্তের মাঝখানে ব্যাখ্যা ও প্রমাণ বেছে নেওয়ার বড় কাজ রয়েছে।


তাযিরে দশ চাবুকের সীমা

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আবু বুরদা আল-আনসারির সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য এসেছে: “আল্লাহর হদসমূহের কোনো হদ ছাড়া দশ চাবুকের বেশি মারা যাবে না।” প্রকাশ্য অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট—নির্ধারিত হদ ছাড়া বিচারকের বিবেচনাধীন তাযির শাস্তিতে দশ বেত্রাঘাতের সীমা অতিক্রম করা যাবে না। কিন্তু বাস্তব ফিকহে এই দশের সীমা সর্বজনীনভাবে বহাল থাকেনি। ইবন হাজার ফাতহুল বারি-তে একাধিক মত উল্লেখ করেছেন; ফকিহদের একটি বড় অংশ তাযিরে দশের বেশি প্রহার অনুমোদন করেছেন এবং হাদিসের “আল্লাহর হদ” কথাটির অর্থ নিয়েই পুনর্ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। কেউ “হদ”কে নির্ধারিত দণ্ডের সংকীর্ণ অর্থে না নিয়ে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞার বৃহত্তর অর্থে পড়েছেন, ফলে বাক্যটির প্রকাশ্য সীমা বদলে গেছে। [131]

মূল আরবি:
لا يجلد فوق عشرة أسواط إلا في حد من حدود الله.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহর হদসমূহের কোনো হদ ছাড়া দশ চাবুকের বেশি মারা যাবে না।”

এখানে হাদিসের সনদ দুর্বল বলে বিধান সরানো হয়নি। বর্ণনাটি সহিহ; সমস্যা তৈরি হয়েছে তার আইনগত অর্থে। প্রকাশ্য পাঠে দশ একটি সংখ্যাগত সীমা, কিন্তু ফিকহি ব্যাখ্যায় সেই সীমা আর সরল সংখ্যা হিসেবে স্থির থাকেনি। অর্থাৎ সহিহ গ্রেড একটি বাক্যকে আমাদের সামনে পৌঁছে দিলেও তার আইনগত শক্তি, শব্দের পরিসর এবং বাস্তব প্রয়োগ আলাদা বিচারাধীন। সনদ সহিহ হওয়ার পরেও ফকিহের ব্যাখ্যা বাক্যটির কার্যকর অর্থ পাল্টে দিতে পারে।


জুমার গোসল

আরও পরিষ্কার উদাহরণ জুমার গোসল। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে ভাষা এসেছে: “غسل يوم الجمعة واجب على كل محتلم”—“প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য জুমার দিনের গোসল ওয়াজিব।” সাধারণ আরবি ও ফিকহি ভাষায় “ওয়াজিব” শব্দটি বাধ্যতামূলকতার সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দগুলোর একটি। কিন্তু শাফেয়ি ফিকহের ব্যাখ্যায় নববী সরাসরি বলেন, এখানে “ওয়াজিব” বলতে এমন বাধ্যতামূলক ওয়াজিব বোঝানো হয়নি যা ত্যাগ করলে ব্যক্তি গুনাহগার হবে; বরং এটি জোরালো পছন্দনীয়তা ও গুরুত্বের অর্থে। তাঁর স্পষ্ট সিদ্ধান্ত—জুমার গোসল সুন্নত, বাধ্যতামূলক নয়। [132]

মূল আরবি:
غسل يوم الجمعة واجب على كل محتلم.

والمراد … وجوب اختيار لا وجوب التزام … وغسل الجمعة سنة، وليس بواجب وجوبا يعصى بتركه.
বাংলা অনুবাদ:
“প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য জুমার গোসল ওয়াজিব।” কিন্তু নববীর ব্যাখ্যায় এখানে ওয়াজিব বলতে আইনগত বাধ্যতামূলকতা বোঝানো হয়নি; জুমার গোসল সুন্নত, এমন ওয়াজিব নয় যা ত্যাগ করলে গুনাহ হবে।

এখানে বিষয়টি আরও তীক্ষ্ণ। বর্ণনাটি দুর্বল নয়, “ওয়াজিব” শব্দটিও অস্পষ্ট কোনো রাবীর ব্যাখ্যা নয়; সহিহ হাদিসের মতনের মধ্যেই শব্দটি আছে। তারপরও ফকিহের ব্যাখ্যা ঠিক করছে “ওয়াজিব” আসলে বাধ্যতামূলক ওয়াজিব নয়। অর্থাৎ গ্রেড তো দূরের কথা, সহিহ হাদিসের প্রকাশ্য শব্দও আইনগত সিদ্ধান্তের শেষ বিচারক নয়। যে পদ্ধতিতে “ওয়াজিব” শব্দকেও প্রসঙ্গ, অন্য হাদিস ও ফিকহি সমন্বয়ের কারণে অ-বাধ্যতামূলক করা যায়, সেই পদ্ধতিতে “সহিহ” শব্দকে নিজেই সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর বানানো অসঙ্গত।


উটের মাংস ও ওজু

সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়—উটের মাংস খাওয়ার পরে ওজু করতে হবে কি না। উত্তর: “হ্যাঁ, উটের মাংস খাওয়ার পরে ওজু করো।” ভেড়ার মাংস সম্পর্কে একই প্রশ্নে তিনি ওজুকে ঐচ্ছিক বলেছেন। এখানে ভাষাগত অস্পষ্টতাও খুব কম; একই আলোচনায় দুই ধরনের মাংসকে আলাদা বিধান দেওয়া হয়েছে। আহমদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ এবং একদল মুহাদ্দিস এই প্রকাশ্য নির্দেশ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ি মাযহাবসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ বলেছেন, উটের মাংস খেলে ওজু ভাঙে না। নববী বলেছেন: ওজু ভাঙার মতটি দলিলের দিক থেকে শক্তিশালী, যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ তার বিপরীতে [133]

মূল আরবি:
سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن لحوم الإبل؟ فقال: توضؤوا منها. وسئل عن لحوم الغنم؟ فقال: لا توضؤوا منها.
বাংলা অনুবাদ:
রাসুলকে উটের মাংস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “তা খেলে ওজু করো।” ভেড়ার মাংস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন: “তা খেলে ওজু করতে হবে না।”

উটের মাংস খাওয়ার পরে অজুর এই উদাহরণে সহিহ বর্ণনার সরাসরি নির্দেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের সিদ্ধান্ত আলাদা হয়েছে। নববী নিজে শাফিয়ি হলেও দলিলের বিচারে অজু করার মত শক্তিশালী বলেছেন; তাঁর মাযহাবসহ সংখ্যাগরিষ্ঠের বিধান অন্যদিকে গেছে। তাই কোন হাদিস সহিহ, তা জানা গেলেই বাস্তব আইনের শেষ উত্তর পাওয়া যায় না। অন্য বর্ণনা, আগের চর্চা, বিধান রহিত হওয়ার দাবি ও মাযহাবের ব্যাখ্যার নিয়মও সিদ্ধান্তে আসে। একটি নির্দেশ গ্রহণ করা এবং তাকে বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে প্রয়োগ করার মাঝখানে যে বিচার আছে, এখানে সেই বিচার ফল বদলেছে। কোন মতের পক্ষে দলিল বেশি, তা পরীক্ষা করা সম্ভব; সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিচয় একাই প্রকাশ্য নির্দেশ থেকে সরে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে না।


তিন তালাক

একসঙ্গে তিন তালাকের ঘটনা এই সমস্যাকে ধর্মীয় আচার থেকে সরাসরি পরিবার ও আইনের কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সহিহ মুসলিমে ইবন আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের যুগে এবং উমরের খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসঙ্গে উচ্চারিত তিন তালাককে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো। এরপর উমর বলেন, মানুষ এমন একটি বিষয়ে তাড়াহুড়া শুরু করেছে যেখানে তাদের অবকাশ ছিল; তাই তিনি তাদের ওপর তিনটিই কার্যকর করেন। অর্থাৎ সহিহ মুসলিমের বর্ণনাটি শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা বলছে না; এটি সরাসরি মুহাম্মদের যুগের একটি চলমান বিধান এবং উমরের প্রশাসনিক পরিবর্তনের কথা বলছে। [134] [21]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম:
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ ، وَمُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ ، – وَاللَّفْظُ لاِبْنِ رَافِعٍ – قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ ابْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ ، أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ ، عَنِ ابْنِ طَاوُسٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِي أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏ فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
ইসহাক ইবন ইবরাহিম ও মুহাম্মদ ইবন রাফি আমাদের বর্ণনা করেছেন; এখানে ইবন রাফির শব্দবিন্যাস দেওয়া হয়েছে। ইসহাক বলেন, আমাদের জানিয়েছেন; আর ইবন রাফি বলেন, আবদুর রাজ্জাক আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মা‘মার আমাদের জানিয়েছেন, ইবন তাউসের সূত্রে, তাঁর পিতার সূত্রে, ইবন আব্বাস থেকে। ইবন আব্বাস বলেন: আল্লাহর রাসুলের যুগে, আবু বকরের যুগে এবং উমরের খিলাফতের প্রথম দুই বছরে তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো। তারপর উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, “মানুষ এমন একটি বিষয়ে তাড়াহুড়া শুরু করেছে, যাতে তাদের ধীরে চলার সুযোগ ছিল। আমরা যদি তা তাদের ওপর কার্যকর করে দিই!” এরপর তিনি তা তাদের ওপর কার্যকর করে দিলেন।

কিন্তু পরবর্তী সুন্নি ফিকহের প্রধান ধারায় একসঙ্গে “তিন তালাক” বললে তিনটিই কার্যকর হওয়ার বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অবস্থান রক্ষার জন্য সহিহ মুসলিমের বর্ণনাটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—কেউ বলেছেন তখন মানুষ মূলত একটি তালাকই উচ্চারণ করত; কেউ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ করেছেন; কেউ ইবন আব্বাসের অন্য ফতোয়া ও সাহাবিদের পরবর্তী আমলকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইবন হাজার নিজেও স্বীকার করেছেন যে এক তালাক হওয়ার মতটি বাস্তবে বিভিন্ন প্রাচীন আলেমের কাছ থেকে বর্ণিত এবং সহিহ মুসলিমের বর্ণনা সেই অবস্থানকে শক্তি দেয়। [135]

এখানে সহিহ হাদিসের প্রকাশ্য ঐতিহাসিক বক্তব্য এবং পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহের ব্যবধান এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মুহাম্মদের যুগে একটি কাজ এক হিসেবে গণ্য হয়েছে—এমন সহিহ বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী আইন তিন হিসেবে কার্যকর করেছে। যে ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হোক, মূল পদ্ধতিগত সত্য একই: “সহিহ মুসলিমে আছে” বলেই ফিকহের দরজা বন্ধ হয়নি। বরং সেই বর্ণনাকে পরবর্তী আইনগত কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে আরও মানবিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়েছে।


চতুর্থবার মদপান

আরও কঠিন উদাহরণ মদপানের শাস্তি। মুয়াবিয়ার সূত্রে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হয়েছে: মদ পান করলে তাকে প্রহার করো; আবার করলে প্রহার করো; এবং চতুর্থবার করলে হত্যা করো। বর্ণনাটির বিভিন্ন পথ রয়েছে এবং এর শক্তিশালী মূল্যায়নও সংরক্ষিত। কিন্তু বাস্তব সুন্নি ফিকহে চতুর্থবার মদ পানকারীকে হত্যা করা সাধারণ কার্যকর বিধান হয়নি। তিরমিযির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের বিধান ছিল, পরে নাসখ হয়েছে; আর হাদিসশাস্ত্রের নাসিখ–মানসুখ আলোচনায় এমনকি এর ওপর আমল পরিত্যাগে ইজমা নাসখ জানার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। [136] [137]

মূল আরবি:
من شرب الخمر فاجلدوه، فإن عاد في الرابعة فاقتلوه.
বাংলা অনুবাদ:
“যে মদ পান করে তাকে প্রহার করো; চতুর্থবার আবার করলে তাকে হত্যা করো।”

চতুর্থবার মদপানের শাস্তি নিয়ে গ্রেড ও কার্যকর বিধান পৃথক জায়গায় দাঁড়িয়েছে। বর্ণনাটিকে “জইফ” বলে সরিয়ে দিতে হয়নি; বরং বক্তব্যটি মুহাম্মদের হলেও পরবর্তী মুহাম্মদীয় নির্দেশ বা পরবর্তী আমলের কারণে আইনগত ক্ষমতা হারিয়েছে—এমন ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ঐতিহাসিক সত্যতা এবং বর্তমান বিধান এক নয়। কোনো বাক্য সত্যিই মুহাম্মদ বলে থাকলেও সেটি বর্তমানে মানতে হবে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আবার কালক্রম বা কোন বক্তব্য আগে–পরে, নাসখ, অন্য বর্ণনা এবং আলেমদের আমল বিচার করতে হচ্ছে। সহিহত্ব এখানে আইনগত কার্যকারিতার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।


কুরাইশি খিলাফত

খিলাফত কুরাইশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রশ্নটি আরও বড় পরিসরে একই সমস্যা দেখায়। সহিহ মুসলিমে কুরাইশের নেতৃত্ব নিয়ে একাধিক বর্ণনা আছে। নববী এগুলোকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে পড়েননি; তিনি সরাসরি আইনগত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন—ইমাম বা খলিফা কুরাইশি হতে হবে, অ-কুরাইশিকে খলিফা নিযুক্ত করা বৈধ নয়, এবং সাহাবিদের যুগে এ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ এখানে “কুরাইশি” পরিচয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাস্তব শর্তে পরিণত হয়েছে। [138]

কিন্তু ইবন হাজার ফাতহুল বারি-তে এমন একটি তথ্য এনেছেন যা এই কথিত সরল ঐকমত্যকে জটিল করে। আহমদ ইবন হাম্বলের মাধ্যমে উমরের একটি বক্তব্য নির্ভরযোগ্য রাবীদের সনদে সংরক্ষিত—আবু উবাইদা মারা গেলে উমর মুয়ায ইবন জাবালকে নিজের উত্তরসূরি করার কথা বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু মুয়ায ছিলেন আনসারি; তাঁর কুরাইশি বংশপরিচয় ছিল না। ইবন হাজার তাই সরাসরি বলেন, যারা কুরাইশি শর্তে ঐকমত্যের দাবি করেন তাঁদের এই বর্ণনাটির ব্যাখ্যা দিতে হবে। সম্ভাবনা হিসেবে তিনি বলেন—হয়তো উমরের পরে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, অথবা উমর পরে নিজের মত বদলেছিলেন। [139]

মূল আরবি—ইবন হাজার:
ويحتاج من نقل الإجماع إلى تأويل ما جاء عن عمر … استخلفت معاذ بن جبل … ومعاذ بن جبل أنصاري لا نسب له في قريش.
বাংলা অনুবাদ:
“যিনি এ বিষয়ে ঐকমত্যের দাবি করেন, তাঁকে উমরের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হবে … উমর মুয়ায ইবন জাবালকে উত্তরসূরি করার কথা বলেছেন; অথচ মুয়ায আনসারি, কুরাইশের সঙ্গে তাঁর কোনো বংশসম্পর্ক নেই।”

পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে। মুসলিম ইতিহাসে অ-কুরাইশি শাসন বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার পর ফিকহে আলাদা সমাধান তৈরি হয়েছে: আদর্শভাবে নির্বাচন করতে হলে কুরাইশ থেকে নির্বাচন করা হবে, কিন্তু কোনো অ-কুরাইশি ব্যক্তি শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে ফেললে ফিতনা এড়াতে তার আনুগত্যও বৈধ বা আবশ্যক হতে পারে। ফলে যে শর্ত নববীর ভাষায় অ-কুরাইশিকে খলিফা বানানোই অবৈধ করেছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তবতায় সেই শর্ত আর শাসকের আনুগত্য বাতিল করার জন্য যথেষ্ট থাকেনি।

এখানে সনদ দুর্বল নয়, হাদিসের মর্যাদাও নিচু নয়। তবু বাস্তব রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতার স্থিতি, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা এবং পরবর্তী ফিকহি প্রয়োজন সহিহ বর্ণনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক কাঠামোর পাশে নতুন আইন তৈরি করেছে। অর্থাৎ সহিহ হাদিসের গ্রেড অপরিবর্তিত থেকেছে, কিন্তু তার বাস্তব প্রয়োগের সীমা বদলেছে। এটি দেখায় যে ইসলামী আইন বাস্তবে কোনো হাদিস-ডেটাবেসের গ্রেড ফিল্টার নয়; এটি গ্রেডের পরে আরও বহু মানবিক সিদ্ধান্তের ফল।


সত্যতা, অর্থ ও আইন

একটি হাদিস নিয়ে তিন ধাপে বিরোধ হতে পারে। প্রথমে, কথাটি মুহাম্মদ বলেছিলেন বলে গ্রহণের মতো প্রমাণ আছে কি? এখানে বর্ণনাকারী, সংযোগ, অন্য বর্ণনার বিরোধ ও গোপন ত্রুটি দেখে সহিহ–হাসান–জইফ বলা হয়। এরপর, কথাটির অর্থ কী? জুমার গোসলের উদাহরণে “ওয়াজিব” শব্দটি কতটা বাধ্যতামূলক, তা নিয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছে। শেষে, সেই অর্থ থেকে আজ কী বিধান হবে? মদপানে চতুর্থবার হত্যার নির্দেশের উদাহরণে বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হলেও পরে বিধান বহাল আছে কি না, তা আলাদা প্রশ্ন হয়েছে। অন্য হাদিস, রহিতকরণ, সাহাবীদের চর্চা, ঐকমত্য, তুলনাভিত্তিক বিচার ও মাযহাবের নিয়ম এখানে কাজ করে। ফলে প্রথম ধাপে সহিহ বলার পরও পরের দুই ধাপে মতভেদ থেকে যায়। গ্রেডের একটি শব্দ দিয়ে এই তিন কাজ একসঙ্গে সেরে ফেললে বিরোধের প্রকৃত জায়গা আড়াল হয়।

হাদিস থেকে বিধান তৈরির এই ব্যবধানের একটি ঐতিহাসিক দিক আহমদ এল শামসির শাফিয়ি মাযহাবের উদ্ভবসংক্রান্ত গবেষণায় পাওয়া যায়। নবম শতকের মিশরের রাজনৈতিক–সামাজিক অবস্থা, পাণ্ডিত্যচর্চা ও লেখার ইতিহাস মিলিয়ে তিনি দেখেছেন শাফিয়ির মত কীভাবে প্রচারিত, পুনর্ব্যাখ্যাত ও কর্তৃত্বপূর্ণ হয়েছিল। গবেষণার সারসংক্ষেপে তিনি প্রচলিত মৌখিক চর্চা থেকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় পাঠের ব্যাখ্যানির্ভর লিখিত আইনশাস্ত্রে পরিবর্তনের কথা বলেছেন। ফলে আইন শুধু একটি বর্ণনা উদ্ধার করে তার পাশে সহিহ লেখা থেকে তৈরি হয়নি। কোন পাঠ কর্তৃত্ব পাবে, তার কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হবে এবং সেই ব্যাখ্যা কারা শেখাবেন—এসবেরও ইতিহাস আছে। এই ইতিহাস একই বর্ণনা মেনে ভিন্ন আইন হওয়ার বাস্তব প্রক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করে। [140]

আহমদ এল শামসি, গবেষণার সারসংক্ষেপ

the transformation of Islamic law from a diffuse oral tradition into a written legal science

বাংলা অনুবাদ:

বিচ্ছিন্নভাবে প্রচলিত মৌখিক ঐতিহ্য থেকে লিখিত আইনশাস্ত্রে ইসলামি আইনের রূপান্তর।

এই তিন স্তর আলাদা না করলেই “সহিহ হাদিসে আছে” কথাটি অযৌক্তিকভাবে সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠে। তাযিরের হাদিস সহিহ—তবু দশের সীমা পুনর্ব্যাখ্যাত; জুমার গোসলের হাদিস সহিহ—তবু “ওয়াজিব” বাধ্যতামূলক নয়; উটের মাংসে ওজুর নির্দেশ সহিহ—তবু সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ তা গ্রহণ করেননি; তিন তালাকের বর্ণনা সহিহ—তবু পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠ আইন ভিন্ন; চতুর্থবার মদপানে হত্যার নির্দেশ গ্রহণযোগ্য—তবু নাসখ; কুরাইশি নেতৃত্বের হাদিস সহিহ—তবু বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য আলাদা বিধান। ফলে “সহিহ” একটি প্রমাণমূল্যায়ন; এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মতনের একমাত্র অর্থ, বর্তমান আইন এবং ঐতিহাসিক নিশ্চয়তা—সবকিছুর সম্মিলিত সিল নয়।

আইনে একটি বর্ণনার অর্থ, সমর্থক দলিল ও প্রয়োগ আলাদা করে বিচার করা হয়। দুর্বল বর্ণনার পক্ষে অন্য প্রমাণ এলে তা দেখা হয়; সহিহ বর্ণনার ক্ষেত্রেও রহিতকরণ বা বিশেষ অর্থের প্রশ্ন ওঠে। ইতিহাসের অস্বস্তিকর খবরে এসে এই সব পরীক্ষা বাদ দিয়ে “জইফ, অতএব ঘটেনি” বলা অসংগত। খবরটির অন্য উৎস, পুরোনো পাঠ ও স্বতন্ত্র সমর্থন দেখার প্রয়োজন তখনও থাকে। একইভাবে “মানসুখ” বা “বিশেষ অর্থে” বলা মাত্র কোনো ব্যাখ্যা সত্য হয়ে যায় না; তার পক্ষে নির্দিষ্ট দলিল লাগে। সুবিধাজনক ফলের জন্য বিস্তারিত বিচার গ্রহণ করে অস্বস্তিকর ফলে শুধু গ্রেডের শব্দ দিয়ে দরজা বন্ধ করাই নির্বাচনী ব্যবহার। কোন নিয়ম কখন প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং একই সমস্যাযুক্ত অন্য খবরে সেটি মানা হচ্ছে কি না, তা তুলনা করলেই এই অসামঞ্জস্য ধরা যায়।

হাদিসের গ্রেড বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু; শেষ নয়। জইফ হলে তার প্রমাণমূল্য কেন কম তা বিচার করতে হয়, সহিহ হলেও তার অর্থ ও কার্যকারিতা আলাদাভাবে বিচার করতে হয়। যে ঐতিহ্যের নিজের ফিকহ এই নিয়মে চলে, সেই ঐতিহ্যের নাম করেই “জইফ = মিথ্যা” এবং “সহিহ = চূড়ান্ত সত্য”—এই দুই স্লোগান চালানো হাদিসশাস্ত্রকে সরল করা নয়; বিকৃত করা।


কোরআন ও হাদিসের সংঘাত

হাদিসের গ্রেড নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুতর স্তরটি শুরু হয় তখন, যখন একটি গ্রহণযোগ্য হাদিসের বক্তব্য কোরআনের লিখিত বিধান, সাধারণ নীতি অথবা স্বাভাবিক অর্থের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে কোরআনকে সর্বোচ্চ, সংরক্ষিত ও চূড়ান্ত ঐশী বাণী বলা হয় এবং সুন্নাহকে সাধারণত তার ব্যাখ্যাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু শরিয়তের বাস্তব ইতিহাসে সম্পর্কটি এত সরল নয়। হাদিস কেবল অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা করেনি; কোরআনের সাধারণ বিধানের পরিধি সংকুচিত করেছে, নতুন শর্ত ও ব্যতিক্রম বসিয়েছে, আয়াতে অনুল্লিখিত শাস্তি যোগ করেছে এবং কোনো কোনো উসুলবিদের মতে কোরআনিক বিধান সরাসরি নাসখও করেছে।

ইসলামী উসুলশাস্ত্রে এই পরিবর্তনগুলোর জন্য বায়ান, তাখসিস, তাকয়িদ ও নাসখ—বিভিন্ন কারিগরি নাম আছে। এই নামগুলো পৃথক আইনগত প্রক্রিয়া বোঝায়। কার্যকর বিধানে তাদের ফলও নির্দিষ্ট: কোরআনের লিখিত পাঠ একা পড়ে যে বিধান বা অর্থ পাওয়া যায়, কার্যকর শরিয়তি সিদ্ধান্ত বহু ক্ষেত্রে সেটি নয়। কোন আয়াত সাধারণ, কোনটি বিশেষ; কোন বিধান বহাল, কোনটি মানসুখ; কোন শব্দের প্রকাশ্য অর্থ নিতে হবে এবং কোথায় হাদিসের কারণে তার পরিধি বদলাতে হবে—এসব নির্ধারণ করতে আবার মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা ও মানুষের উসুলি বিচার প্রয়োজন হয়েছে। ফলে “কোরআন সর্বোচ্চ”—এই ধর্মতাত্ত্বিক বাক্য এবং বাস্তবে আইন নির্ধারণে কোরআনের স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতা এক বিষয় নয়।

বিষয়টি বাইরের সমালোচকের আরোপ নয়। আল-যারকাশি আল-বাহরুল মুহীত-এ সরাসরি আলোচনা করেছেন—সুন্নাহ দিয়ে কোরআন নাসখ করা যায় কি না। তাঁর সংরক্ষিত আলোচনায় মুতাওয়াতির সুন্নাহ দ্বারা কোরআন নাসখের বৈধতা নিয়ে মতভেদ আছে; সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে এর বৈধতা ও বাস্তব সংঘটন উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে শাফেয়ির নামে কোরআনকে সুন্নাহ দিয়ে নাসখ অস্বীকারের অবস্থান এসেছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি কেবল কোন হাদিস সহিহ—সেটি নয়; একটি হাদিসকে কোরআনের কার্যকর বিধান পরিবর্তনের কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হবে, সেই ক্ষমতার নিয়ম নিয়েও বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য নেই। [141]

মূল আরবি—আল-যারকাশি, আল-বাহরুল মুহীত:
وأما نسخ القرآن بالسنة، فإن كانت السنة آحادا فقد سبق المنع… وإن كانت متواترة فاختلفوا فيه، فالجمهور على جوازه ووقوعه.
وكان يقول: إن ذلك وجد في قوله تعالى: كتب عليكم إذا حضر أحدكم الموت إن ترك خيرا الوصية، فإن هذه الآية منسوخة بالسنة، وهو قوله: لا وصية لوارث.
وذهب الشافعي في عامة كتبه… إلى أنه لا يجوز نسخ القرآن بالسنة بحال، وإن كانت متواترة.
বাংলা অনুবাদ:
কোরআনকে সুন্নাহ দিয়ে নাসখ করার ক্ষেত্রে সুন্নাহ আহাদ হলে তার নিষেধের কথা আগে এসেছে। আর সুন্নাহ মুতাওয়াতির হলে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে; সংখ্যাগরিষ্ঠ এর বৈধতা এবং বাস্তবে সংঘটিত হওয়া স্বীকার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের জন্য ওসিয়তের আয়াতকে “ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই” সুন্নাহ দ্বারা মানসুখ বলার মত উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে শাফেয়ির অধিকাংশ গ্রন্থের অবস্থান হলো, সুন্নাহ মুতাওয়াতির হলেও কোনো অবস্থাতেই কোরআনকে নাসখ করতে পারে না।

এই মতভেদের গুরুত্ব বিশাল। যদি সুন্নাহ কোরআনকে নাসখ করতে পারে, তাহলে আইনগত ফলের ক্ষেত্রে একটি পরবর্তী সংরক্ষিত বর্ণনা বর্তমান মুসহাফের সরাসরি নির্দেশের কার্যকারিতা তুলে দিতে পারে। আর যদি তা না পারে, তাহলে যেসব প্রতিষ্ঠিত বিধানকে হাদিস দিয়ে কোরআনের সাধারণ নির্দেশ থেকে আলাদা করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যার জন্য অন্য উসুলি কাঠামো দরকার। দুই অবস্থাতেই পাঠক কেবল কোরআন পড়ে আইন নির্ধারণ করতে পারছেন না; তাঁকে প্রথমে ঠিক করতে হচ্ছে কোন উসুলবিদের নাসখতত্ত্ব গ্রহণ করবেন।


রজম

সূরা নূরের দ্বিতীয় আয়াতে ব্যভিচারের শাস্তি এমন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়কেই একই বাক্যে আনা হয়েছে: প্রত্যেককে একশ চাবুক মারতে হবে। আয়াতের পাঠে বিবাহিত ও অবিবাহিতের কোনো পৃথক শ্রেণি নেই; এক বছরের নির্বাসনের কথা নেই; পাথর ছুড়ে হত্যা করার কথাও নেই। বর্তমান মুসহাফকে একমাত্র পাঠ ধরে একজন পাঠক ব্যভিচারের দণ্ড জানতে চাইলে তিনি একশ চাবুকের বিধানই পাবেন। [142]

মূল আরবি—কোরআন ২৪:২:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
বাংলা অনুবাদ:
ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ চাবুক মারো। আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী হলে আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের গ্রাস না করে; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। বর্তমান কোরআনের লিখিত শাস্তি: নারী ও পুরুষ—প্রত্যেকের জন্য একশ চাবুক।

কিন্তু সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় আইনটি অন্য রূপ নেয়। সেখানে অবিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য একশ চাবুকের সঙ্গে এক বছরের নির্বাসন এবং বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য একশ চাবুকের সঙ্গে রজম—পাথর মেরে হত্যা—ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে হাদিস কোরআনের একই শাস্তির কেবল বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছে না; অবিবাহিতের জন্য নতুন শাস্তি যোগ করছে এবং বিবাহিতের ক্ষেত্রে চাবুকের সঙ্গে প্রাণদণ্ড যুক্ত করছে। [143]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম:
خذوا عني، خذوا عني، قد جعل الله لهن سبيلا؛ البكر بالبكر جلد مائة ونفي سنة، والثيب بالثيب جلد مائة والرجم.
বাংলা অনুবাদ:
“আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো, আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো। আল্লাহ তাদের জন্য পথ নির্ধারণ করেছেন: অবিবাহিতের সঙ্গে অবিবাহিতের ক্ষেত্রে একশ চাবুক এবং এক বছরের নির্বাসন; আর বিবাহিতের সঙ্গে বিবাহিতের ক্ষেত্রে একশ চাবুক এবং রজম।” বর্তমান কোরআনে অনুল্লিখিত পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড হাদিসে সরাসরি প্রবেশ করেছে।

বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। এই হাদিসের প্রকাশ্য পাঠে বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য একশ চাবুক এবং রজম—দুই শাস্তিই আছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি ফিকহে বিবাহিত ব্যক্তির জন্য শুধু রজম কার্যকর বলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ আইনটি তিনটি স্তর পেরিয়েছে: বর্তমান কোরআনে নারী–পুরুষের জন্য একশ চাবুক; সহিহ হাদিসে বিবাহিতের জন্য চাবুকের সঙ্গে রজম; সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহে সেই বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোরআনিক চাবুক বাদ দিয়ে শুধু রজম। আলীর নামে সংরক্ষিত একটি বক্তব্য এই দ্বৈত উৎসকে প্রায় নগ্ন ভাষায় প্রকাশ করে—তিনি এক নারীকে চাবুক দেওয়ার ব্যাপারে বলেন, “কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী চাবুক”, আর রজমের ক্ষেত্রে “রাসুলের সুন্নাহ অনুযায়ী”। [144]

আরও কঠিন সমস্যা হলো তথাকথিত “রজমের আয়াত”। সহিহ বুখারিতে উমরের বক্তব্য অনুযায়ী আল্লাহ রজমের আয়াত নাজিল করেছিলেন; সাহাবিরা সেটি পড়েছিলেন, বুঝেছিলেন এবং স্মরণ করেছিলেন; মুহাম্মদ রজম করেছেন এবং তাঁর পরেও সাহাবিরা করেছেন। উমর ভবিষ্যৎ আশঙ্কাও প্রকাশ করেন—একদিন মানুষ বলবে, “আল্লাহর কিতাবে রজমের আয়াত পাই না”, এবং এ কারণে আল্লাহর নাজিল করা একটি ফরজ ত্যাগ করবে। অর্থাৎ বর্তমান মুসহাফে যে মৃত্যুদণ্ডের আয়াত নেই, সেই অনুপস্থিত পাঠের আইন হাদিসের স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে মানুষের প্রাণ নেওয়ার বিধান হিসেবে বহাল থাকে। [145]

মূল আরবি—উমরের বক্তব্য:
فكان مما أنزل الله آية الرجم، فقرأناها وعقلناها ووعيناها، رجم رسول الله صلى الله عليه وسلم ورجمنا بعده، فأخشى إن طال بالناس زمان أن يقول قائل: والله ما نجد آية الرجم في كتاب الله، فيضلوا بترك فريضة أنزلها الله.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহ যা নাজিল করেছিলেন তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিল। আমরা তা পড়েছি, বুঝেছি এবং স্মরণ করেছি। আল্লাহর রাসুল রজম করেছেন এবং তাঁর পরে আমরাও রজম করেছি। আমার আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় পরে কেউ বলবে, “আল্লাহর কিতাবে আমরা রজমের আয়াত পাই না”; ফলে আল্লাহর নাজিল করা একটি ফরজ ত্যাগ করে তারা পথভ্রষ্ট হবে।

এখানে “তাখসিস”, “নাসখুত তিলাওয়াহ”, “সুন্নাহর ব্যাখ্যা”—যে ধর্মতাত্ত্বিক নামই ব্যবহার করা হোক, তথ্যগত কাঠামো বদলায় না: বর্তমান কোরআনের প্রকাশ্য দণ্ড একশ চাবুক; ইসলামী আইনের সবচেয়ে কঠোর ব্যভিচার-দণ্ড হলো রজম; এবং সেই প্রাণদণ্ডের লিখিত আয়াত বর্তমান কোরআনে নেই। কার্যকর আইন জানতে তাই মুসহাফ যথেষ্ট নয়—হাদিস, অনুপস্থিত আয়াতের স্মৃতি, নাসখতত্ত্ব ও ফকিহের সিদ্ধান্ত আবশ্যক।


মৃতের কান্না

এবার সমস্যা আইন নয়, বর্ণনার সত্যতা। কোরআন একাধিক স্থানে নৈতিক দায়ের একটি সাধারণ নীতি ঘোষণা করেছে: কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না। অথচ উমর ও ইবন উমরের সূত্রে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হয়েছে, মৃত ব্যক্তি তার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি পায়। এই সংঘাত কোনো আধুনিক সংশয়বাদী আবিষ্কার করেনি। মুহাম্মদের স্ত্রী আয়িশা নিজেই কোরআনের আয়াত সামনে রেখে বর্ণনাটির প্রচলিত রূপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। [146] [147]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিমে ইবন উমর ও আয়িশার বক্তব্য:
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: إن الميت ليعذب ببكاء أهله.
فقالت: لا والله ما قاله رسول الله صلى الله عليه وسلم قط إن الميت يعذب ببكاء أحد، ولكنه قال: إن الكافر يزيده الله ببكاء أهله عذابا… ولا تزر وازرة وزر أخرى.
قالت: إنكم لتحدثوني عن غير كاذبين ولا مكذبين، ولكن السمع يخطئ.
বাংলা অনুবাদ:
ইবন উমর বলেন: “আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি—মৃত ব্যক্তি তার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি পায়।” আয়িশা বলেন: “আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসুল কখনো বলেননি যে কোনো মৃত ব্যক্তি অন্য কারও কান্নার কারণে শাস্তি পায়। বরং তিনি বলেছেন, পরিবারের কান্নার কারণে আল্লাহ কাফিরের শাস্তি আরও বাড়িয়ে দেন।” এরপর তিনি পাঠ করেন: “কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না।” আয়িশা আরও বলেন: “তোমরা মিথ্যাবাদী বা মিথ্যা-আরোপিত লোকদের থেকে বর্ণনা করছ না; কিন্তু শ্রবণে ভুল হয়।”

এই একটি বক্তব্য হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে জনপ্রিয় সরলীকরণকে ভেঙে দেয়। আয়িশা উমর ও ইবন উমরকে মিথ্যাবাদী বলেননি; তাঁদের নৈতিক চরিত্রও আক্রমণ করেননি। তিনি আরও সাধারণ এবং অনেক বেশি বিপজ্জনক একটি সম্ভাবনা স্বীকার করেছেন: সৎ মানুষও ভুল শুনতে পারে। অর্থাৎ একজন সাহাবী রাসুলের কথা সরাসরি শুনেছেন বলে দাবি করলেও সেই শ্রুতি নিজে অভ্রান্ত নয়। পরবর্তী মুহাদ্দিস হয়তো উভয় বর্ণনাই সহিহ সনদে সংরক্ষণ করবেন, কিন্তু দুই পরস্পরবিরোধী অর্থ একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সনদের বাইরে মতন, কোরআনিক নীতি এবং ব্যাখ্যা বিচার করতে হয়।

পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা এই বিরোধ সমাধানে বিভিন্ন পথ নিয়েছেন: মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় মাতমের নির্দেশ দিয়ে গেলে তার দায় আছে; “শাস্তি” বলতে প্রকৃত শাস্তি নয়, মৃতের কষ্ট বোঝানো হয়েছে; অথবা আয়িশার ব্যাখ্যাটি নির্দিষ্ট কাফিরের ঘটনার জন্য। এসব সমন্বয় বিরোধ মেটানোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা; তার আগে আয়িশার সংশোধনের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট তথ্য স্পষ্ট: একজন প্রধান সাহাবিয়ার পদ্ধতিতে কোরআনের নীতির সঙ্গে সংঘর্ষ দেখা দিলে সম্মানিত সাহাবীর শ্রুতিকেও সংশোধনযোগ্য ধরা হয়েছে। ফলে “সাহাবী শুনেছেন + সনদ সহিহ = বক্তব্যের অর্থ চূড়ান্ত”—এমন কোনো যান্ত্রিক সূত্র প্রথম প্রজন্মেই ছিল না।


ওসিয়ত

সূরা বাকারার ১৮০ নম্বর আয়াতে সম্পদ রেখে মৃত্যু আসন্ন হলে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ওসিয়ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ কুতিবা আলাইকুম—“তোমাদের ওপর নির্ধারিত হয়েছে”; শেষে আবার একে মুত্তাকিদের ওপর হাক্কান বা কর্তব্য বলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে কোনো ব্যক্তি শরিয়তি ওয়ারিশ হলে তার জন্য আলাদা ওসিয়ত করার সাধারণ অধিকার নেই। এই বিধানের সবচেয়ে পরিচিত সূত্র: “ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই।” [148] [149]

মূল আরবি—কোরআন ২:১৮০:
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
বাংলা অনুবাদ:
তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে এবং সে সম্পদ রেখে গেলে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে ওসিয়ত করা তোমাদের ওপর নির্ধারিত হয়েছে—এটি মুত্তাকিদের ওপর একটি কর্তব্য।

মূল আরবি—হাদিস:
إن الله قد أعطى كل ذي حق حقه، فلا وصية لوارث.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার দিয়ে দিয়েছেন; অতএব কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই।”

এই ব্যবধান কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেখানেই আবার একাধিক মানবিক আদালত বসেছে। একটি ব্যাখ্যায় উত্তরাধিকারের পরবর্তী আয়াতগুলো ২:১৮০ের ওয়ারিশসংক্রান্ত অংশ নাসখ করেছে; অন্য ব্যাখ্যায় “ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই” সুন্নাহ আয়াতটিকে নাসখ বা বিশেষায়িত করেছে। আল-যারকাশি সুন্নাহ দিয়ে কোরআন নাসখের আলোচনায় এই ওসিয়তের ঘটনাকেই উদাহরণ করেছেন। অন্যদিকে শাফেয়ির নীতিতে সুন্নাহ সরাসরি কোরআন নাসখ করতে পারে না। ফলে “ওসিয়তের আয়াত মানসুখ”—এই একটি বাক্যের পেছনেও প্রশ্ন থেকে যায়: কিসে মানসুখ—কোরআনে, সুন্নাহয়, না তাখসিসের মাধ্যমে? কার্যকর আইন একই হতে পারে, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর প্রমাণতত্ত্ব এক নয়।

“ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই” বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা দেখায়, সামাজিক ও ফিকহি স্বীকৃতি একটি বর্ণনার স্বতন্ত্র সনদগত শক্তিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আগেই আল-সাখাওয়ির উদ্ধৃতিতে দেখা গেছে, শাফেয়ির নামে সংরক্ষিত বক্তব্য অনুযায়ী “ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই” বর্ণনাটি হাদিসবিশারদদের কাছে নিজ শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না; কিন্তু সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা ও আমলের কারণে সেটিকে এমন মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যে ওসিয়তের আয়াত নাসখকারী হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে একটি বর্ণনার স্বতন্ত্র হাদিসগত শক্তি নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে সামাজিক–ফিকহি গ্রহণযোগ্যতার কারণে বর্তমান কোরআনের একটি সরাসরি নির্দেশের কার্যকর ক্ষেত্র বদলে দেওয়া—এই দুই স্তর একই সঙ্গে উপস্থিত। “জইফ বা অপ্রতিষ্ঠিত হলে কোনো মূল্য নেই”—এই স্লোগানের বিপরীতে এর চেয়ে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উদাহরণ খুব কম।


নবীদের উত্তরাধিকার

মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে সম্পত্তির বিরোধে কোরআন ও হাদিসের সম্পর্ক আরও রাজনৈতিক এবং বাস্তব রূপ নেয়। কোরআনে সুলাইমান সম্পর্কে সরাসরি বলা হয়েছে, “সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল।” অন্যদিকে যাকারিয়া আল্লাহর কাছে এমন একজন উত্তরসূরি চান যে তাঁর এবং ইয়াকুবের পরিবারের উত্তরাধিকারী হবে। আয়াতগুলোর সাধারণ আরবি শব্দ ইরস বা উত্তরাধিকার; কিন্তু মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে আবু বকর তাঁর মেয়ে ফাতিমার সম্পত্তির দাবি প্রত্যাখ্যান করতে মুহাম্মদের নামে একটি হাদিস উদ্ধৃত করেন: “আমরা উত্তরাধিকার রেখে যাই না; আমরা যা রেখে যাই তা সদকা।” [150] [151] [152]

মূল আরবি—কোরআন:
وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ
فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا ۝ يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ
বাংলা অনুবাদ:
“সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল।”
যাকারিয়া বলেন: “আমাকে আপনার পক্ষ থেকে একজন উত্তরসূরি দিন, যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়াকুবের পরিবারেরও উত্তরাধিকারী হবে।”

মূল আরবি—মুহাম্মদের সম্পত্তি নিয়ে হাদিস:
أن فاطمة سألت أبا بكر بعد وفاة رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يقسم لها ميراثها مما ترك رسول الله صلى الله عليه وسلم… فقال لها أبو بكر: إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لا نورث، ما تركنا صدقة.
বাংলা অনুবাদ:
ফাতিমা আল্লাহর রাসুলের মৃত্যুর পরে আবু বকরের কাছে তাঁর পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকার চেয়েছিলেন। আবু বকর তাঁকে বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: “আমরা উত্তরাধিকার রেখে যাই না; আমরা যা রেখে যাই তা সদকা।”

বিতর্কটি নিছক ভাষাতাত্ত্বিক ছিল না; এর সরাসরি সম্পত্তিগত ফল হয়েছিল। সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী ফাতিমা আবু বকরের কাছে তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ফদক, খায়বারের অংশ এবং অন্যান্য সম্পদের দাবি করেছিলেন; আবু বকর “নবীরা উত্তরাধিকার রেখে যান না” বর্ণনার ভিত্তিতে তা প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ একটি হাদিস সাধারণ উত্তরাধিকার আইন থেকে মুহাম্মদের সম্পত্তিকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম করেছে। এর পরে কোরআনের দাউদ–সুলাইমান ও যাকারিয়ার আয়াতগুলোর “উত্তরাধিকার”কে সম্পত্তিগত উত্তরাধিকার হিসেবে পড়লে হাদিসটির সঙ্গে সরাসরি সমস্যা তৈরি হয়।

সুন্নি তাফসিরে সমস্যাটির পরিচিত সমাধান হলো—নবীদের ওই “উত্তরাধিকার” সম্পদ নয়; জ্ঞান, নবুয়ত, ধর্মীয় নেতৃত্ব বা রাজত্ব। শানকিতি আদওয়াউল বায়ান-এ পরিষ্কারভাবে বলেন, যাকারিয়ার “আমার উত্তরাধিকারী হবে” অর্থ জ্ঞান ও নবুয়তের উত্তরাধিকার, সম্পদের নয়; একইভাবে “সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল” অর্থও জ্ঞান ও ধর্মের উত্তরাধিকার। [153]

মূল আরবি—শানকিতি, আদওয়াউল বায়ান:
وبهذا التفسير تعلم أن معنى قوله “يرثني” أنه إرث علم ونبوة، ودعوة إلى الله والقيام بدينه، لا إرث مال.
وبهذا الذي قررنا تعلم أن قوله هنا: يرثني ويرث من آل يعقوب، يعني وراثة العلم والدين لا المال، وكذلك قوله: وورث سليمان داود، فتلك الوراثة أيضا وراثة علم ودين.
বাংলা অনুবাদ:
এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, “সে আমার উত্তরাধিকারী হবে” বলতে জ্ঞান, নবুয়ত, আল্লাহর দিকে আহ্বান এবং তাঁর ধর্ম প্রতিষ্ঠার উত্তরাধিকার বোঝানো হয়েছে—সম্পদের উত্তরাধিকার নয়। একইভাবে “সে আমার এবং ইয়াকুবের পরিবারের উত্তরাধিকারী হবে” বলতে জ্ঞান ও ধর্মের উত্তরাধিকার বোঝানো হয়েছে; এবং “সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল”—এখানেও জ্ঞান ও ধর্মের উত্তরাধিকারই উদ্দেশ্য।

এই ব্যাখ্যায় “ইরস” বা উত্তরাধিকারকে সম্পত্তির বদলে জ্ঞান ও নবুয়তের উত্তরাধিকার হিসেবে নেওয়া হয়েছে। শব্দের এই অর্থ গ্রহণের পক্ষে কী প্রমাণ আছে, সেটিই প্রশ্ন। আয়াতের উদ্ধৃত ভাষায় সরাসরি “সম্পত্তি নয়, কেবল জ্ঞান” বলা নেই। “নবীরা সম্পদ রেখে যান না” হাদিসটিকে আগে গ্রহণ করলে সম্পত্তিগত অর্থের সঙ্গে বিরোধ হয়; সেই বিরোধ মেটাতে রূপক অর্থ নেওয়া হয়। ফলে হাদিসটি এখানে শুধু আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে না; আয়াতের কোন অর্থ গ্রহণ করা যাবে, তা নির্ধারণেও ব্যবহার হচ্ছে। ব্যাখ্যাটি সঠিক কি না বিচার করতে হলে হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা ও আয়াতের ভাষা—দুই দিকের প্রমাণ লাগবে। শুধু আগে থেকে গ্রহণ করা হাদিসের সঙ্গে মিললেই রূপক অর্থ অবধারিত হয়ে যায় না।

কোরআন দিয়ে হাদিস যাচাইয়ের নিয়মটি এই ঘটনায় একমুখী থাকছে না। আয়িশার আলোচিত আপত্তিতে কোরআনের বক্তব্য দিয়ে সাহাবীর স্মৃতি সংশোধন করা হয়েছে। উত্তরাধিকারের ঘটনায় আবার হাদিসটি সত্য ধরে কোরআনের “উত্তরাধিকার” শব্দকে সম্পত্তির বাইরের অর্থে নেওয়া হয়েছে। প্রথমটিতে আয়াত বর্ণনার অর্থ সীমিত করেছে; দ্বিতীয়টিতে বর্ণনা আয়াতের গ্রহণযোগ্য অর্থ সীমিত করেছে। কোনটিকে আগে ধরা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিজেই ফল বদলে দেয়। বর্তমান মুসহাফের প্রকাশ্য পাঠ এবং বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে আসা খবরের সংঘর্ষ মেটাতে পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যাকারীরা একটি নির্দিষ্ট পথ বেছে নিয়েছেন। সেই পথের পক্ষে প্রমাণ পরীক্ষা করা যায়। “কোরআনই চূড়ান্ত মানদণ্ড” ঘোষণা করলেই বাস্তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআনকে একইভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত হয় না।


মানদণ্ড কোনটি?

উপরের উদাহরণগুলো এক ধরনের সংঘাত দেখায় না; বরং পরস্পরবিরোধী কয়েকটি পদ্ধতি একসঙ্গে দেখায়। মৃতের কান্নার ঘটনায় আয়িশা কোরআনের নীতি সামনে রেখে সাহাবীর শ্রুতিতে ভুল ধরেছেন—অর্থাৎ কোরআন মানদণ্ড, বর্ণনা সংশোধনযোগ্য। রজমের ক্ষেত্রে বর্তমান কোরআনের লিখিত চাবুক-দণ্ডের পাশাপাশি হাদিসের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নতুন প্রাণদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—অর্থাৎ সুন্নাহ কোরআনের প্রকাশ্য আইনকে বিশেষায়িত বা অতিক্রম করছে। ওসিয়তের ক্ষেত্রে হাদিস বা পরবর্তী উত্তরাধিকার বিধান কোরআনের “তোমাদের ওপর নির্ধারিত” নির্দেশের কার্যকর পরিধি সরিয়ে দিয়েছে। নবীদের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে আবার হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে কোরআনিক “উত্তরাধিকার” শব্দের সম্ভাব্য সম্পত্তিগত অর্থ বাদ দিয়ে জ্ঞান ও নবুয়তের অর্থ অগ্রাধিকার পেয়েছে।

এখানে কোনো একটি পদ্ধতি বেছে নিয়ে অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য নির্মাণ করা যায়; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উসুলবিদ ও ফকিহরা সেটিই করেছেন। কিন্তু সেই সামঞ্জস্যকে প্রমাণের যান্ত্রিক ফল হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। প্রথমে ঠিক করতে হচ্ছে কোন উৎস অন্য উৎসকে তাখসিস করতে পারে, কোনটি নাসখ করতে পারে, সহিহ খবরুল ওয়াহিদ কোরআনের সাধারণ বিধান কতদূর সীমাবদ্ধ করতে পারে, সাহাবীর স্মৃতি কখন কোরআনের কারণে সংশোধিত হবে এবং কখন হাদিসের কারণে কোরআনের শব্দ পুনর্ব্যাখ্যাত হবে। এগুলো গ্রেডিং সফটওয়্যারের আউটপুট নয়; এগুলো মানুষের নির্মিত উসুলের সিদ্ধান্ত।

ফলে “এই হাদিস সহিহ”—এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাতেও আলোচনার শেষ হয় না। সহিহ হওয়ার পরে দেখতে হয় মতন কোরআনের সঙ্গে কী সম্পর্ক তৈরি করছে, অন্য সহিহ বর্ণনার সঙ্গে সংঘর্ষ আছে কি না, সাহাবীদের মধ্যে কে কীভাবে বুঝেছেন, নাসখের দাবি কী, এবং পরবর্তী ফকিহ কোন উৎসকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। একইভাবে “জইফ”—এই একটি শব্দ দিয়েও কোনো ইতিহাস শূন্য করা যায় না। হাদিসের পুরো ঐতিহ্য নিজেই দেখায়, গ্রেডের পরে আরও একটি আদালত বসে—মতন, কোরআন, উসুল, ইতিহাস এবং ফকিহের আদালত।

তাই সমস্যাটি শুধু দুর্বল হাদিসের নয়। দুর্বল বর্ণনাকে কখনো বিধানে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, সহিহ বর্ণনাকে কখনো নাসখ বা তাওয়িলে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, কোরআন দিয়ে কখনো হাদিস সংশোধন করা হয়েছে, আবার হাদিস দিয়ে কখনো কোরআনের প্রকাশ্য অর্থ ও বিধান সংকুচিত করা হয়েছে। এই বহুমুখী পদ্ধতির বাস্তব ইতিহাসের পরে “জইফ মানেই মিথ্যা” অথবা “সহিহ মানেই চূড়ান্ত সত্য”—দুটিই পাঠ্যবইয়ের লেবেলকে বাস্তব জ্ঞানতত্ত্বের জায়গায় বসানো।


সাহাবীদের স্মৃতি ও ব্যাখ্যার বিরোধ

সুন্নি হাদিসতত্ত্বে সাহাবীদের সামগ্রিকভাবে আদিল বা ন্যায়পরায়ণ গণ্য করা হয়। ফলে পরবর্তী রাবীদের মতো প্রত্যেক সাহাবীর নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আলাদাভাবে জারহ–তাদিলের পরীক্ষায় তোলা হয় না। কিন্তু আদালাহ আর দাবত এক জিনিস নয়; সত্যবাদিতা আর নির্ভুল স্মৃতিও এক জিনিস নয়। একজন মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে একটি শব্দও মিথ্যা না বলে ভুল শুনতে পারেন, বক্তার বাক্যের কেবল অংশ শুনতে পারেন, অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে শোনা বক্তব্যকে পরে মূল উৎসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারেন, ঘটনার প্রেক্ষাপট ভুল বুঝতে পারেন অথবা একই সত্য ঘটনা থেকে ভিন্ন আইনগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। ইসলামের প্রথম প্রজন্মের উৎসগুলোতেই এসবের বাস্তব উদাহরণ সংরক্ষিত রয়েছে। [154]

সাহাবীর শোনা বা বোঝায় ভুল হলে তাঁর পরের রাবীরা সবাই বিশ্বস্ত হলেও ভুলটি থেকেই যেতে পারে। একজন সাহাবী একটি কথা ভুল শুনলেন; তাঁর ছাত্র সেটি ঠিকভাবে মনে রাখলেন; পরের ছাত্রও ঠিকভাবে লিখলেন। পরে আমাদের হাতে ভালোভাবে সংরক্ষিত সেই ভুল শোনাটিই আসবে। একই ঘটনা ঘটতে পারে অন্যের কাছ থেকে শোনা কথাকে নিজের শ্রুতি বলে মনে করা বা মূল প্রসঙ্গ ভুল বোঝার কারণে। পরের মানুষের নির্ভুলতা প্রমাণ করে তাঁরা আগের মানুষটির কথা ঠিকভাবে পৌঁছিয়েছেন; আগের মানুষটি নিজেই ঠিক শুনেছিলেন কি না, তা আলাদা প্রশ্ন। সাহাবীদের পরস্পরের বক্তব্য সংশোধনের ঘটনাগুলোতে এই পার্থক্য সরাসরি দেখা যায়। তাই সনদ সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছালেই তাঁর স্মৃতি ও ব্যাখ্যাকে পরীক্ষার বাইরে রেখে দেওয়ার ভিত্তি তৈরি হয় না।


আয়িশার সংশোধন

সাহাবীরা একে অপরের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সংশোধন করতেন—এটি বিচ্ছিন্ন দুই-একটি ঘটনা নয়। বিষয়টি এত বিস্তৃত ছিল যে বদরুদ্দিন আল-যারকাশি এ নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখেছেন—আল-ইজাবাহ লি-ইরাদি মা ইস্তাদরাকাতহু আয়িশা আলাস-সাহাবাহ, অর্থাৎ সাহাবীদের ওপর আয়িশার সংশোধনসমূহ। সেখানে উমর, আলী, ইবন আব্বাস, ইবন উমর, আবদুল্লাহ ইবন আমর, আবু হুরায়রা এবং অন্য সাহাবীদের বর্ণনা বা সিদ্ধান্তের ওপর আয়িশার আপত্তি ও সংশোধন সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তী সুয়ূতিও একই বিষয়ে স্বতন্ত্র রচনা করেছেন। [155]

আল-যারকাশির সংগ্রহে সাহাবীদের পারস্পরিক সংশোধনের বহু ঘটনা নথিভুক্ত; পরবর্তী মুহাদ্দিসদের রায়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ব্যাখ্যা ও সাক্ষ্যের তুলনা রয়েছে। এই সংশোধনের ঐতিহ্যে পাওয়া যায়, প্রথম মুসলিম প্রজন্মের বর্ণনাগুলোকে তারা নিজেরাই এমন অভ্রান্ত স্মৃতি হিসেবে দেখতেন না যার সংশোধন অসম্ভব। একজন সাহাবী নবীর নামে একটি বক্তব্য বর্ণনা করছেন, আরেকজন বলছেন তিনি ভুল শুনেছেন, প্রেক্ষাপট ভুল ধরেছেন, কথার একটি অংশ বাদ দিয়েছেন অথবা তাঁর ব্যাখ্যা সঠিক নয়। এই বাস্তব ঐতিহ্যের পরে “সাহাবী বর্ণনা করেছেন” কথাটিকে স্মৃতির অভ্রান্ততার সনদে পরিণত করা পরবর্তী ধর্মীয় অতিরঞ্জন।


আবু হুরায়রার প্রত্যাহার

সহিহ মুসলিমের একটি ঘটনা সাহাবী-স্মৃতির সীমাবদ্ধতা প্রায় পরীক্ষাগারের উদাহরণের মতো দেখায়। আবু হুরায়রা প্রচার করছিলেন—যে ব্যক্তি যৌন অপবিত্র বা জুনুব অবস্থায় ভোরে পৌঁছাবে, সে রোজা রাখবে না। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে আয়িশা ও উম্মে সালামার কাছে যাচাই করা হয়। তাঁরা দুজনই মুহাম্মদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, যৌনমিলনের কারণে মুহাম্মদ জুনুব অবস্থায় ভোরে পৌঁছাতেন এবং তারপরও রোজা রাখতেন। বিষয়টি আবু হুরায়রার সামনে ফেরত নেওয়া হলে তিনি তাঁদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং বলেন, “هما أعلم”—“তাঁরা দুজন বেশি জানেন।” এরপর আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে: আবু হুরায়রা এই বক্তব্য সরাসরি মুহাম্মদের কাছ থেকে শোনেননি; আল-ফাদল ইবন আব্বাসের কাছ থেকে শুনেছিলেন। শেষে তিনি নিজের আগের অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। [156]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম:
سمعت أبا هريرة رضي الله عنه يقص يقول في قصصه: من أدركه الفجر جنبا فلا يصم … فكلتاهما قالت: كان النبي صلى الله عليه وسلم يصبح جنبا من غير حلم ثم يصوم … فقال أبو هريرة: أهما قالتاه لك؟ قال: نعم. قال: هما أعلم … فقال أبو هريرة: سمعت ذلك من الفضل ولم أسمعه من النبي صلى الله عليه وسلم … فرجع أبو هريرة عما كان يقول في ذلك.
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরায়রা বলছিলেন: “যে ব্যক্তি জুনুব অবস্থায় ভোরে পৌঁছায়, সে রোজা রাখবে না।” আয়িশা ও উম্মে সালামা দুজনই বলেন, নবী স্বপ্নদোষ নয় বরং যৌনমিলনের কারণে জুনুব অবস্থায় ভোরে পৌঁছাতেন, তারপরও রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রাকে তা জানানো হলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তাঁরা দুজনই কি তোমাকে এ কথা বলেছেন?” উত্তর দেওয়া হলো, “হ্যাঁ।” তখন তিনি বলেন, “তাঁরা দুজন বেশি জানেন।” এরপর আবু হুরায়রা বলেন: “আমি এটি আল-ফাদলের কাছ থেকে শুনেছি; নবীর কাছ থেকে শুনিনি।” তারপর তিনি নিজের আগের বক্তব্য থেকে ফিরে আসেন।

আবু হুরায়রার এই ফতোয়ার বিপরীতে আয়িশা ও উম্মে সালামা নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁদের সাক্ষ্যের পরে বোঝা গেছে, মুহাম্মদের আচরণ নিয়ে প্রচারিত বিধানটি ঠিক ছিল না। আরও বোঝা গেছে, আবু হুরায়রা কথাটি নিজে মুহাম্মদের কাছ থেকে শুনে বলেননি; আরেক সাহাবীর কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এই দুই তথ্য মিলিয়ে ভুলটি কোথায় হতে পারে, তা খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়। সাহাবীর মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তাঁর দেওয়া বিধান প্রত্যক্ষতর তথ্য দিয়ে সংশোধিত হয়েছে। আয়িশা ও উম্মে সালামার সাক্ষ্য যাচাই না হলে ভুলটিই চলতে পারত। যেসব বর্ণনায় এমন পাল্টা সাক্ষ্য আর টেকেনি বা পাওয়া যায় না, সেখানে একই ধরনের ভুল অসম্ভব ধরে নেওয়ার ভিত্তি কী? সততার সাধারণ আস্থা সঠিক উৎস ও স্মৃতি যাচাইয়ের প্রয়োজন দূর করে না।

শাফেয়ির আলোচনাও বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। আয়িশা ও উম্মে সালামার বর্ণনাকে আবু হুরায়রার সূত্রের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—তাঁরা নবীর স্ত্রী হওয়ায় এই ব্যক্তিগত ঘটনার বিষয়ে বেশি জানতেন; দুজনের সাক্ষ্য একজনের তুলনায় অধিক; এবং আয়িশা ও উম্মে সালামা উভয়েই স্মৃতিশক্তির জন্য স্বীকৃত। অর্থাৎ “সবাই সাহাবী” বলেই সব বর্ণনার ওজন সমান হয়নি; ঘটনার নৈকট্য, প্রত্যক্ষতা, সংখ্যা ও স্মৃতির তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রথম যুগেই প্রয়োজন হয়েছে। [157]


উমরের সাক্ষ্য দাবি

সাহাবীর বক্তব্য মাত্রই যদি নবীর বক্তব্যের নিশ্চয়তা হতো, তাহলে উমর ইবনুল খাত্তাবের আবু মুসা আল-আশআরির সঙ্গে আচরণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। আবু মুসা উমরের দরজায় তিনবার অনুমতি চান; অনুমতি না পেয়ে ফিরে যান। পরে উমর কারণ জানতে চাইলে আবু মুসা বলেন, তিনি মুহাম্মদকে বলতে শুনেছেন—তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর অনুমতি না মিললে ফিরে যেতে হবে। উমর উত্তর দেন: এই বক্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য আনতে হবে। এমনকি কিছু বর্ণনায় তিনি কঠোর হুমকিও দেন। আবু মুসা আনসারদের কাছে গিয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য সাহাবীর সাক্ষ্য এনে নিজের নবী-বর্ণনা সমর্থন করেন। [158]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম:
الاستئذان ثلاث فإن أذن لك وإلا فارجع. قال: لتأتيني على هذا ببينة وإلا فعلت وفعلت … فقال عمر: سبحان الله، إنما سمعت شيئا فأحببت أن أتثبت.
বাংলা অনুবাদ:
আবু মুসা বলেন: “অনুমতি চাওয়া তিনবার; অনুমতি দেওয়া হলে প্রবেশ করবে, অন্যথায় ফিরে যাবে।” উমর বলেন: “এর পক্ষে তোমাকে অবশ্যই সাক্ষ্য আনতে হবে।” অন্য সাহাবীর সাক্ষ্য পাওয়ার পরে উমর বলেন: “আমি একটি কথা শুনেছিলাম; আমি শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম।”

উমর নিজের বাড়তি সাক্ষী চাওয়াকে যাচাইয়ের প্রয়োজন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ একজন সাহাবীর মুখে নবীর কথা শোনার পরও তিনি অতিরিক্ত সমর্থন চেয়েছেন। এতে ব্যক্তির সততা সম্পর্কে আস্থা এবং নির্দিষ্ট সংবাদ ঠিকভাবে পৌঁছেছে কি না—এই পার্থক্য দেখা যায়। কাউকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যার অভিযোগ না করেও তিনি কী শুনেছিলেন, ঠিক মনে রেখেছেন কি না এবং কথার প্রসঙ্গ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা সম্ভব। সাহাবীর পরিচয় উমরের নিজের চর্চাতেও প্রতিটি খবরের জন্য বাড়তি যাচাই অপ্রয়োজনীয় করে দেয়নি। এই নজিরের পরে শুধু নৈতিক মর্যাদা দেখিয়ে কোনো নবী-উদ্ধৃতির স্মৃতি বা উৎসের প্রশ্ন বন্ধ করা যায় না।

আবু মুসার এই ঘটনায় একক সাহাবী-বর্ণনা গ্রহণের আগে উমরের বাড়তি সাক্ষ্য দাবির নজির রয়েছে। পরবর্তী হাদিসশাস্ত্র একটি নির্ভরযোগ্য একক বর্ণনাকে বহু ক্ষেত্রে শরিয়তি দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছে; অথচ প্রথম যুগের অন্যতম প্রধান খলিফা একটি নির্দিষ্ট সাহাবী-বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজে অতিরিক্ত সাক্ষ্য দাবি করছেন। এই নির্দিষ্ট ঘটনায় উমর আবু মুসার সাহাবী পরিচয় ও তাঁর নিজের বর্ণনায় সন্তুষ্ট হননি; অন্য সাহাবীর সমর্থন চেয়েছেন। সাহাবী-উৎস নিজে এমন কোনো স্বয়ংপ্রমাণিত সত্যতার সিল ছিল না যা যাচাইয়ের প্রশ্নকেই নিষিদ্ধ করে।


ফাতিমা বিনতে কায়স

ফাতিমা বিনতে কায়সের ঘটনা আরও সরাসরি। তিনি বর্ণনা করেছিলেন যে তাঁর স্বামী তাঁকে চূড়ান্ত তালাক দেওয়ার পরে মুহাম্মদ তাঁর জন্য স্বামীর ওপর বাসস্থান ও ভরণপোষণের অধিকার রাখেননি। এই বর্ণনা পরবর্তী ফিকহে গুরুত্বপূর্ণ মতভেদের জন্ম দেয়। কিন্তু উমরের নামে সহিহ মুসলিমে সংরক্ষিত প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উমর তাঁর সিদ্ধান্তে ফাতিমার স্মৃতির সম্ভাব্য ভুলকে কারণ হিসেবে তুলেছেন: “আমরা আমাদের রবের কিতাব ও নবীর সুন্নাহ একজন নারীর কথার কারণে ত্যাগ করব না; আমরা জানি না, তিনি মনে রেখেছেন নাকি ভুলে গেছেন।” [159]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম:
قال عمر: لا نترك كتاب الله وسنة نبينا صلى الله عليه وسلم لقول امرأة لا ندري لعلها حفظت أو نسيت، لها السكنى والنفقة.
বাংলা অনুবাদ:
উমর বলেন: “আমরা আল্লাহর কিতাব ও আমাদের নবীর সুন্নাহ একজন নারীর কথার কারণে ত্যাগ করব না; আমরা জানি না, সে মনে রেখেছে নাকি ভুলে গেছে।” তাঁর জন্য বাসস্থান ও ভরণপোষণ রয়েছে।

পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে এই ঘটনায় উমর নাকি ফাতিমা—কার ফিকহি সিদ্ধান্ত শক্তিশালী, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। উমরের প্রতিক্রিয়ায় বর্ণনাটি প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে রাবীর স্মৃতির ওপর সন্দেহ স্পষ্ট: একজন সাহাবিয়া সরাসরি মুহাম্মদের কাছ থেকে একটি আইনগত সিদ্ধান্ত বর্ণনা করছেন, কিন্তু অন্য সাহাবী তাঁর স্মৃতি ভুল হতে পারে বলে সেই সংবাদ অগ্রাহ্য করছেন। অর্থাৎ সাহাবীদের নিজেদের জ্ঞানতত্ত্বেই “আদিল” শব্দের অর্থ কখনো “ভুলতে অক্ষম” ছিল না।

পরবর্তী উসুলবিদরা বলেছেন, উমর ফাতিমার সংবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিশেষ স্মৃতিসংশয়ের কারণে, তিনি নারী বলে নয়। এটি তাঁদের ব্যাখ্যা। উমরের নামে সংরক্ষিত “একজন নারীর কথা” ভাষাটিও উপস্থিত তথ্যের অংশ। স্মৃতিসংশয়টি কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ থেকে তৈরি হয়েছিল এবং একই অবস্থায় কোনো পুরুষ সাহাবীর খবরে একই পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা তুলনা করতে হয়। শুধু পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর ঘোষণা দিয়ে লিঙ্গের প্রশ্ন শেষ হয় না। কারও স্মৃতি নিয়ে আপত্তি উঠলে আপত্তির কারণ পরীক্ষা করা যায়, আপত্তিটি নিজেও পক্ষপাতদুষ্ট কি না তাও পরীক্ষা করা যায়। সাহাবীদের নিজেদের মধ্যে সংবাদ গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের এই চর্চা থাকার পরও আজ কোনো সাহাবীর বর্ণনার অর্থ বা স্মৃতি নিয়ে প্রশ্নকে শুধু “অপমান” বলে বন্ধ করা সেই প্রাচীন চর্চার সঙ্গেও মেলে না।


প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান

সাহাবীদের সমস্যা শুধু স্মৃতির ছিল না; একই নবী-নির্দেশের আইনগত পরিসর কী—সেখানেও সরাসরি বিরোধ ছিল। সাহলা বিনতে সুহাইলের ঘরে সালিম নামে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যাতায়াত করতেন। পালকপুত্রের পুরোনো সামাজিক সম্পর্ক বিলুপ্ত হওয়ার পরে তাঁর প্রবেশ নিয়ে সমস্যা হলে মুহাম্মদ সাহলাকে সালিমকে দুধপান করাতে বলেন, যাতে দুধ-সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সহিহ মুসলিমে সাহলা তাঁর প্রাপ্তবয়স্কতা নিয়ে আপত্তি করলে মুহাম্মদের হাসি এবং “আমি জানি সে প্রাপ্তবয়স্ক” বক্তব্যও সংরক্ষিত। এই ঘটনার অস্তিত্ব নিয়ে আয়িশা এবং মুহাম্মদের অন্য স্ত্রীদের বিরোধ ছিল না; বিরোধ ছিল আইনটির পরিসর নিয়ে। [160]

আয়িশা সালিমের ঘটনাকে কেবল সালিমের ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম মনে করেননি। সুনান আবু দাউদ ও মুআত্তা মালিকে সংরক্ষিত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তাঁর বোন ও ভাইয়ের মেয়েদের নির্দেশ দিতেন—যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে তিনি নিজের কাছে প্রবেশের অনুমতি দিতে চান, তাকে পাঁচবার দুধপান করাতে; এরপর সেই ব্যক্তি তাঁর কাছে প্রবেশ করতেন। অন্যদিকে উম্মে সালামা এবং মুহাম্মদের অন্য স্ত্রীগণ এই ব্যাখ্যা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের বক্তব্য: “আল্লাহর কসম, আমরা মনে করি এটি কেবল সালিমের জন্য রাসুলের বিশেষ অনুমতি ছিল; এই দুধপানের কারণে কাউকে আমাদের কাছে প্রবেশ করতে দেব না।” [161] [162]

মূল আরবি—সুনান আবু দাউদ:
فبذلك كانت عائشة رضي الله عنها تأمر بنات أخواتها وبنات إخوتها أن يرضعن من أحبت عائشة أن يراها ويدخل عليها وإن كان كبيرا خمس رضعات ثم يدخل عليها، وأبت أم سلمة وسائر أزواج النبي صلى الله عليه وسلم أن يدخلن عليهن بتلك الرضاعة أحدا من الناس حتى يرضع في المهد، وقلن لعائشة: والله ما ندري لعلها كانت رخصة من النبي صلى الله عليه وسلم لسالم دون الناس.
বাংলা অনুবাদ:
এই ঘটনার ভিত্তিতে আয়িশা তাঁর বোনদের মেয়ে ও ভাইদের মেয়েদের নির্দেশ দিতেন—যে পুরুষকে তিনি নিজের কাছে দেখতে ও প্রবেশ করতে চান, সে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও তাকে পাঁচবার দুধপান করাতে; এরপর সে তাঁর কাছে প্রবেশ করত। কিন্তু উম্মে সালামা এবং নবীর অন্য স্ত্রীগণ এমন দুধপানের কারণে কাউকে নিজেদের কাছে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকার করেন এবং আয়িশাকে বলেন: “আল্লাহর কসম, আমরা জানি না—সম্ভবত এটি কেবল সালিমের জন্য নবীর বিশেষ অনুমতি ছিল।”

এখানে কোনো দুর্বল সনদের পেছনে লুকানোর সুযোগ নেই। একই ঘটনা, একই নবী এবং একই নির্দেশ সম্পর্কে তাঁর নিজের স্ত্রীদের মধ্যে আইনগত অর্থে বিপরীত সিদ্ধান্ত। আয়িশার পাঠ: নবী একটি সাধারণভাবে প্রয়োগযোগ্য নীতি দিয়েছেন—প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মাহরাম সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। অন্য স্ত্রীদের পাঠ: ঘটনাটি সাধারণ আইন নয়; সালিমের জন্য ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম। দুই পক্ষই ঘটনাটি জানে; বিরোধটি ঘটনার অর্থে। ফলে “হাদিসটি সহিহ” বলেও আইন নির্ধারিত হচ্ছে না। এরপরও ঠিক করতে হবে নবীর একটি নির্দিষ্ট নির্দেশ সাধারণ বিধান, না ব্যক্তিগত বিশেষ ছাড়।

নববী এই মতভেদ সরাসরি সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় আয়িশা ও দাউদ জাহিরির মতে প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানেও দুধ-সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি হতে পারে; অন্য সাহাবী, তাবিয়ি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম তা মানেননি। পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহ শেষ পর্যন্ত সালিমের ঘটনাকে বিশেষ ব্যতিক্রম বা শিশুকালের দুধপানের সাধারণ নীতির বাইরে একটি সীমিত ঘটনা হিসেবে নিয়েছে। [163]

অতএব এখানে সমস্যা হাদিস “পৌঁছেছে কি না” নয়; পৌঁছানোর পর তার অর্থ কে ঠিক করবে—সেটি। আয়িশা নবীর ঘরের অন্যতম প্রধান হাদিস-বর্ণনাকারী এবং ঘটনার বর্ণনাকারী; অন্য নবীপত্নীরাও একই পরিবারের সদস্য এবং নবীর সামাজিক জীবন প্রত্যক্ষ করেছেন। তবু তাঁদের মধ্যেই একটি নির্দেশের সার্বজনীনতা নিয়ে বিপরীত আইন তৈরি হয়েছে। পরবর্তী ফিকহ সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যাখ্যাকে মানক করেছে। পরবর্তী বিজয়ী ব্যাখ্যা তাই নবীর বাক্যের ভেতর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসা কোনো বস্তুগত গ্রেড নয়; এটি বিপরীত প্রাথমিক ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে একটি নির্বাচিত আইনগত সিদ্ধান্ত।


ছাগলে খাওয়া আয়াত: বিপরীত গ্রেড, অনুপস্থিত পাঠ ও রহিতকরণের দাবি

রজম ও দুধপানের বিধান নিয়ে সংরক্ষিত বিরোধের সঙ্গে কোরআনের পাঠসংরক্ষণের সরাসরি যোগ রয়েছে। সুনান ইবন মাজাহর ১৯৪৪ নম্বর বর্ণনায় আয়িশা বলেছেন, রজম এবং প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপানসংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়েছিল; সেগুলোর লেখা একটি সহিফায় তাঁর খাটের নিচে ছিল। মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে তাঁরা সেই মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে একটি গৃহপালিত পশু এসে সহিফাটি খেয়ে ফেলে। ছাগলে আয়াত খাওয়ার নামে পরিচিত এই বর্ণনায় ব্যবহৃত আরবি শব্দটি দাজিন—ঘরে পোষা পশু। এখানে দাবি করা হয়েছে নাজিল হওয়া পাঠের একটি লিখিত নথি নবীর মৃত্যুর ব্যস্ততার মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। সনদসহ ইবন মাজাহর পূর্ণ বর্ণনাটি এমন: [164]

মূল আরবি—সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ১৯৪৪:
حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ، يَحْيَى بْنُ خَلَفٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الأَعْلَى ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ ، عَنْ عَمْرَةَ ، عَنْ عَائِشَةَ ، ‏.‏ وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ لَقَدْ نَزَلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا وَلَقَدْ كَانَ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবু সালামা ইয়াহইয়া ইবন খালাফ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আবদুল আ‘লা আমাদের বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের সূত্রে, আবদুল্লাহ ইবন আবি বকরের সূত্রে, আমরার সূত্রে, আয়িশা থেকে। এবং আবদুর রহমান ইবনুল কাসিমের সূত্রে, তাঁর পিতার সূত্রে, আয়িশা থেকে। আয়িশা বলেন: “অবশ্যই রজমের আয়াত এবং প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপানসংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়েছিল। তা একটি সহিফায় আমার খাটের নিচে ছিল। আল্লাহর রাসুল মারা গেলে এবং আমরা তাঁর মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে একটি গৃহপালিত পশু ঢুকে সেটি খেয়ে ফেলে।”

বর্ণনাটির মান নিয়ে হাদিসবিশারদদের রায় পরস্পরবিরোধী। আলবানী একে হাসান বলেছেন; দারুসসালামের মাননির্ণয়েও একই রায় রয়েছে। ইবন হাজম আল-মুহাল্লা-তে বর্ণনাটিকে “সহিহ হাদিস” বলেছেন এবং সহিফা খাওয়ার ঘটনাটিকে তিলাওয়াত আগেই রহিত হওয়ার ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলিয়েছেন। তাঁর রায় ও ব্যাখ্যা ইসলামওয়েবের ১২৯০৫ নম্বর ফতোয়ায় উদ্ধৃত হয়েছে। মুসনাদ আহমদের মুআসসাসাতুর রিসালাহ সংস্করণের তাহকিককারীরা পশুর উল্লেখযুক্ত বর্ণনাটির সনদ দুর্বল বলেছেন: তাঁদের মন্তব্য, ইবন ইসহাক এই বর্ণনায় একক হয়েছেন এবং এর মতনে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। ইবন কুতায়বা তাবিলু মুখতালিফিল হাদিস-এ বলেছেন, মালিকের বর্ণনার শব্দ ইবন ইসহাকের বর্ণনার শব্দ থেকে ভিন্ন এবং হাদিসবিশারদদের কাছে মালিক ইবন ইসহাকের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য। মালিক ও ইয়াহইয়া ইবন সাঈদের বর্ণনায় পশুর প্রসঙ্গ নেই; ইবন ইসহাকের বর্ণনায় সেই বাড়তি অংশ আছে। ইসলামকিউএর ১৭৫৩৫৫ নম্বর উত্তরে এই পাঠভেদ বিশ্লেষণ করে প্রত্যাখ্যানের পক্ষে তাঁদের মূল্যায়নগুলো উদ্ধৃত হয়েছে। একই ঐতিহ্যে তাই ঘটনাটির গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান এবং ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা—তিনটিই নথিভুক্ত। ইবন হাজমের ব্যাখ্যায় সহিফা খাওয়ার ঘটনাটি বহাল আছে; তিনি বর্তমান কোরআনে পাঠটির অনুপস্থিতিকে আগেই তিলাওয়াত রহিত হওয়ার ফল বলেছেন। তাঁর বক্তব্য ইসলামকিউএও উদ্ধৃত করেছে: [165] [166] [167]

মূল আরবি—ইবন হাজম, আল-মুহাল্লা; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত:
صح نسخ لفظها ، وبقيت الصحيفة التي كتبت فيها – كما قالت عائشة – رضي الله عنها فأكلها الداجن ، ولا حاجة بأحد إليها ، وهكذا القول في آية الرضاعة ولا فرق ، وبرهان هذا : أنهم قد حفظوها كما أوردنا ، فلو كانت مثبتة في القرآن لما منع أكل الداجن للصحيفة من إثباتها في القرآن من حفظهم .

বাংলা অনুবাদ:
আয়াতটির শব্দগত পাঠ রহিত হওয়া প্রতিষ্ঠিত হলো। আর যে সহিফায় সেটি লেখা হয়েছিল, তা থেকে গিয়েছিল; আয়িশা—আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন—যেমন বলেছেন, গৃহপালিত পশু সেটি খেয়ে ফেলে। কারও আর সেই সহিফার প্রয়োজন ছিল না। দুধপানের আয়াত সম্পর্কেও একই কথা; কোনো পার্থক্য নেই। এর প্রমাণ হলো, আমরা যেমন উল্লেখ করেছি, তাঁরা সেই পাঠ মুখস্থ রেখেছিলেন। সেটি যদি কোরআনে বহাল থাকত, তাহলে সহিফাটি পশু খেয়ে ফেলা তাঁদের স্মৃতি থেকে সেটিকে কোরআনে লিপিবদ্ধ করতে বাধা দিত না।

ছাগলে বা গৃহপালিত পশুতে সহিফা খাওয়ার অংশটি কোনো পাঠে আছে, কোনো পাঠে নেই। এই পার্থক্যের ওজন নিয়েই সমালোচকদের বিরোধ। মালিকের পাঠে না থাকার অর্থ কী—তিনি সংক্ষেপ করেছেন, অন্যভাবে শুনেছেন, নাকি বাড়তি অংশটি অন্য পথে ঢুকেছে? ইবন ইসহাকের তথ্য গ্রহণের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন তুলনা আছে? আলবানী হাসান বলেছেন, ইবন হাজম সহিহ বলেছেন, মুসনাদ আহমদের তাহকিককারীরা দুর্বল বলেছেন। এই বিপরীত রায়গুলো দেখিয়ে দেয়, গ্রহণ বা বর্জন এখানে একটি সমালোচনামূলক সিদ্ধান্ত; একটিমাত্র অবিতর্কিত ফল নয়। যে রায় নেওয়া হবে তার পক্ষে যুক্তি দিতে হবে। পছন্দের একটি নাম তুলে বাকি রায় ও পাঠভেদ গোপন করলে ঘটনার ইতিহাস পরিষ্কার হয় না, বিরোধটিই আড়াল হয়।

দুধপানের আয়াত বর্তমান কোরআনে না থাকার সমস্যা সহিহ মুসলিমের একটি পৃথক বর্ণনাতেও রয়েছে। সেখানে আয়িশা বলেছেন, প্রথমে দশবার দুধপান বিয়ে নিষিদ্ধ করার বিধান হিসেবে নাজিল হয়েছিল; পরে পাঁচবার দিয়ে তা রহিত করা হয়। এরপর মুহাম্মদ মারা যান, অথচ ওই পাঠগুলো তখনও কোরআন হিসেবে পড়া হচ্ছিল। ইবন মাজাহর পাঠে “প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপান” কথাটি আছে; মুসলিমের এই পাঠে দশবার থেকে পাঁচবারে পরিবর্তন এবং মৃত্যুকালীন তিলাওয়াতের কথা আছে। বর্তমান মুসহাফে দশবার কিংবা পাঁচবার দুধপানের এই পাঠ নেই। মুসলিমের পূর্ণ বর্ণনা: [168]

মূল আরবি—সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫২ক:
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى ، قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ ، عَنْ عَمْرَةَ ، عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ ‏.‏ ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُنَّ فِيمَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমি মালিকের কাছে পাঠ করেছি, আবদুল্লাহ ইবন আবি বকরের সূত্রে, আমরার সূত্রে, আয়িশা থেকে। আয়িশা বলেন: “কোরআনে যা নাজিল হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট দশবার দুধপান, যা বিবাহের নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি করে। তারপর সেগুলো নির্দিষ্ট পাঁচবার দিয়ে রহিত করা হয়। এরপর আল্লাহর রাসুল মারা যান, অথচ সেগুলো তখনও কোরআনের অংশ হিসেবে পড়া হচ্ছিল।”

আয়িশার উদ্ধৃত বাক্যে পাঁচবারের পাঠ তিলাওয়াত থেকে রহিত করার কোনো পৃথক ঘোষণা নেই; সেখানে মৃত্যুর সময়ও তা পড়ার কথা আছে। নববী এই বক্তব্যকে বর্তমান মুসহাফের সঙ্গে মেলাতে বলেছেন, রহিতকরণ একেবারে শেষ পর্যায়ে ঘটেছিল। কিছু মানুষ সেই সংবাদ না জানায় নবীর মৃত্যুর সময়ও পাঁচবার দুধপানের পাঠকে কোরআন হিসেবে পড়ছিল; পরে সংবাদ পেয়ে তারা তা ছেড়ে দেয়। এই দাবি সত্য ধরে নিলে, সেই নির্দেশনাটি নবির সূত্র ধরে ঠিক কোন হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে? নববী পাঁচবার দুধপান ও রজমের পাঠকে এমন শ্রেণিতে রেখেছেন, যার তিলাওয়াত রহিত হয়েছে কিন্তু বিধান বহাল। অর্থাৎ তাঁর ব্যাখ্যার মধ্যেই স্বীকৃত হয়েছে, নবীর মৃত্যুর মুহূর্তেও কোন পাঠ আর কোরআন হিসেবে পড়া হবে না, সে বিষয়ে সমস্ত পাঠকের জ্ঞান এক অবস্থায় ছিল না। তাঁর পূর্ণ ব্যাখ্যা ও রহিতকরণের শ্রেণিবিভাগ: [169]

মূল আরবি—নববী, শারহ সহিহ মুসলিম:
وقولها : ( فتوفي رسول الله صلى الله عليه وسلم وهن فيما يقرأ ) هو بضم الياء من ( يقرأ ) ومعناه أن النسخ بخمس رضعات تأخر إنزاله جدا حتى إنه صلى الله عليه وسلم توفي وبعض الناس يقرأ : خمس رضعات ويجعلها قرآنا متلوا لكونه لم يبلغه النسخ لقرب عهده فلما بلغهم النسخ بعد ذلك رجعوا عن ذلك وأجمعوا على أن هذا لا يتلى . والنسخ ثلاثة أنواع : أحدها : ما نسخ حكمه وتلاوته كعشر رضعات ، والثاني : ما نسخت تلاوته دون حكمه كخمس رضعات والشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما ، والثالث : ما نسخ حكمه وبقيت تلاوته وهذا هو الأكثر ، ومنه قوله تعالى : والذين يتوفون منكم ويذرون أزواجا وصية لأزواجهم الآية ، والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য, “আল্লাহর রাসুল মারা যান, অথচ সেগুলো তখনও পড়া হচ্ছিল”—এখানে ‘ইউকরা’ শব্দের ইয়া-তে পেশ রয়েছে। এর অর্থ, পাঁচবার দুধপানসংক্রান্ত রহিতকরণের নাজিল হওয়া এত দেরিতে ঘটেছিল যে নবী মারা যাওয়ার সময়ও কিছু মানুষ পাঁচবার দুধপানের পাঠ পড়ছিল এবং তাকে তিলাওয়াতযোগ্য কোরআন গণ্য করছিল। কারণ রহিতকরণ অল্প আগে ঘটায় সেই সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছেনি। পরে তাদের কাছে রহিতকরণের সংবাদ পৌঁছালে তারা তা থেকে ফিরে আসে এবং সবাই একমত হয় যে এই পাঠ আর তিলাওয়াত করা হবে না। রহিতকরণ তিন প্রকার। প্রথমত, যার বিধান ও তিলাওয়াত—দুটিই রহিত হয়েছে; যেমন দশবার দুধপান। দ্বিতীয়ত, যার তিলাওয়াত রহিত হয়েছে কিন্তু বিধান রহিত হয়নি; যেমন পাঁচবার দুধপান এবং “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা নারী ব্যভিচার করলে তাদের রজম করো।” তৃতীয়ত, যার বিধান রহিত হয়েছে কিন্তু তিলাওয়াত বহাল আছে; এই প্রকারই বেশি। এর উদাহরণ আল্লাহর বক্তব্য, “তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং স্ত্রীদের রেখে যায়, তারা যেন স্ত্রীদের জন্য অসিয়ত করে”—এই আয়াত। আল্লাহই ভালো জানেন।

পাঁচবার দুধপানের বাক্য বর্তমান কোরআনে নেই, অথচ তার বিধান বহাল বলা হচ্ছে। আয়িশার বর্ণনায় মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও পড়া হচ্ছিল বলে যে কথা আছে, নববী তার ব্যাখ্যা করেছেন রহিত হওয়ার খবর সবার কাছে একই সময়ে না পৌঁছানো দিয়ে। ফলে তিনটি আলাদা অবস্থাকে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে: পাঠটি পড়া হচ্ছিল, এখন মুসহাফে নেই, কিন্তু বিধান রয়ে গেছে। এই মিলটি তৈরি হয়েছে তিলাওয়াত রহিত হওয়া ও বিধান বহাল থাকার ব্যাখ্যা দিয়ে। তখন প্রশ্ন ওঠে, কখন এবং কোন ঘোষণায় পাঠ রহিত হয়েছিল, সেই সংবাদ কীভাবে পৌঁছেছিল, আর মৃত্যুকালীন পাঠের সাক্ষ্য তার সঙ্গে কীভাবে মেলে? ব্যাখ্যার পক্ষে এই যোগসূত্রের প্রমাণ দরকার। শুধু বর্তমান অনুপস্থিতি থেকেই আগের রহিতকরণ ধরে নিলে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার কথা, সেটিই আগে সত্য ধরা হয়। একই তথ্য থেকে পাঠ হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্নও ওঠে; সংরক্ষণে ঘাটতি অসম্ভব বলে সেই প্রশ্ন বাদ দেওয়া প্রমাণ নয়।

ইবনুল হুমাম এই সমাধানকেও সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। মিরকাতুল মাফাতীহে উদ্ধৃত তাঁর আপত্তি হলো, অরহিত কোরআনের কোনো অংশ হারিয়ে যাওয়ার অর্থ তৈরি হলে বর্ণনাটির সনদ সহিহ হলেও তা গ্রহণ করা যাবে না। আবার পাঠ রহিত হওয়ার পরে বিধান বহাল রাখার জন্যও পৃথক দলিল প্রয়োজন; শুধু “তিলাওয়াত রহিত, বিধান বহাল” বললেই সেই বিধান প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাঁর বক্তব্যে সনদের সহিহত্ব স্বীকার করার পরও ধর্মতাত্ত্বিক ফলের কারণে বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ রয়েছে: [170]

মূল আরবি—মিরকাতুল মাফাতীহে উদ্ধৃত ইবনুল হুমাম:
هذا لا يستقيم إلا على إرادة الكل وإلا لزم ضياع بعض القرآن الذي لم ينسخ فيثبت قول الروافض ذهب كثير من القرآن بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم – لم يثبته الصحابة فلا تمسك بالحديث ، وإن كان إسناده صحيحا لانقطاعه باطنا وما قيل ليكن نسخ الكل ويكون نسخ التلاوة مع بقاء الحكم وأن هذا مما لا جواب له فليس بشيء ; لأن ادعاء بقاء حكم الدال بعد نسخه يحتاج إلى دليل وإلا فالأصل أن نسخ الدال يرفع حكمه وما نظر به الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما فلولا ما علم بالسنة والإجماع لم يثبت به .

বাংলা অনুবাদ:
সমস্তটাই রহিত করা হয়েছে—এই অর্থ ছাড়া এই ব্যাখ্যা সঙ্গত হয় না। অন্যথায় রহিত হয়নি এমন কিছু কোরআনিক পাঠ হারিয়ে যাওয়া স্বীকার করতে হয়। তখন রাফিজিদের এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে আল্লাহর রাসুলের পরে অনেক কোরআন হারিয়ে গেছে, সাহাবীরা তা লিপিবদ্ধ করেননি। সুতরাং এই হাদিসকে অবলম্বন করা যাবে না, যদিও এর সনদ সহিহ; কারণ এর ভেতরগত বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। আর যে কথা বলা হয়েছে—সবটুকুর রহিতকরণ ধরা হোক, তা তিলাওয়াতের রহিতকরণ হবে কিন্তু বিধান বহাল থাকবে, এবং এর কোনো জবাব নেই—সেই কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ নির্দেশক পাঠ রহিত হওয়ার পরে তার বিধান বহাল আছে দাবি করতে দলিল প্রয়োজন। অন্যথায় মূলনীতি হলো, নির্দেশক পাঠের রহিতকরণ তার বিধানও তুলে দেয়। এর তুলনায় “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা নারী ব্যভিচার করলে তাদের রজম করো”—এই বর্ণনা দেখানো হয়েছে; সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে যা জানা গেছে, তা না থাকলে শুধু ওই পাঠ দিয়ে বিধানটি প্রতিষ্ঠিত হতো না।

ইবনুল হুমামের আপত্তিতে সহিফা খাওয়ার ঘটনার নতুন কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বর্ণনার অর্থকে কোরআন সংরক্ষণের গৃহীত বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহণ বা বর্জনের কথা বলছেন। সনদ ভালো হলেও যদি সেই অর্থ বিশ্বাসটির বিরোধী হয়, বর্ণনা বাদ যাবে; বিধান বহাল রাখতে হলে অন্য দলিল লাগবে। এখানে চারটি আলাদা সিদ্ধান্ত আছে: ঘটনাটি গ্রহণ করা হবে কি না, হারানো পাঠ কোরআন ছিল কি না, তার পাঠ রহিত হয়েছিল কি না এবং তার বিধান এখনো থাকবে কি না। একটি ধাপে সহিহ বললেই পরের সব ধাপের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি সিদ্ধান্তে আলাদা প্রমাণ, ব্যাখ্যাকারীর অগ্রাধিকার ও ধর্মতাত্ত্বিক শর্ত কাজ করছে। সংরক্ষণ সম্পর্কে আগে গৃহীত বিশ্বাস তখন শুধু পরীক্ষার বিষয় থাকছে না; কোন ইতিহাস গ্রহণযোগ্য হবে তার সীমাও নির্ধারণ করছে।

সহিফা খাওয়ার অংশকে দুর্বল বললে সেই নির্দিষ্ট খবরের বিরুদ্ধে একটি আপত্তি পাওয়া যায়। তাতে মুসলিমের পৃথক সনদে থাকা মৃত্যুকালীন তিলাওয়াতের সংবাদ দূর হয়ে যায় না। আবার পশুতে খাওয়ার অংশ গ্রহণ করলেও বর্তমান মুসহাফে পাঠ না থাকা, রহিত হওয়ার সময় এবং বিধান বহাল থাকার ব্যাখ্যা আলাদা করে দিতে হয়। তাই শুধু “খবরটি জইফ” বা “খবরটি সহিহ”—দুই উত্তরের কোনোটিই পুরো সমস্যার সমাধান নয়। একটি হারানো লিখিত পাতার ঘটনা, কোরআন হিসেবে পাঠ চলার সংবাদ এবং আইন বহাল রাখার সিদ্ধান্ত ভিন্ন উৎস ও যুক্তিতে দাঁড়িয়েছে। বিরোধগুলোর অবস্থান ইসলামের স্বীকৃত গ্রন্থের মধ্যেই। গ্রেডের এক শব্দ দিয়ে সেগুলো মুছে দিলে পাঠসংরক্ষণ ও আইন তৈরির মূল প্রশ্নগুলো উত্তরহীন থাকে।


সাহাবী পর্যন্ত সহিহ সনদ—তারপর?

এই ঘটনাগুলো হাদিসের সনদ-যুক্তির একটি সীমা প্রকাশ করে, যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে রাখা হয়। একটি সনদ সাহাবী পর্যন্ত নিখুঁতভাবে সংযুক্ত হতে পারে। কিন্তু সাহাবী নবীর বক্তব্যটি সঠিকভাবে শুনেছেন কি না, সম্পূর্ণ শুনেছেন কি না, অন্যের কাছ থেকে শুনে উৎসটি ঠিক মনে রেখেছেন কি না, এবং শুনলেও তার আইনগত অর্থ ঠিক ধরেছেন কি না—এসব প্রশ্ন শুধু পরবর্তী সনদের নির্ভুলতা দিয়ে সমাধান হয় না। আবু হুরায়রার ঘটনায় পরবর্তী বর্ণনা নির্ভুলভাবেই সংরক্ষণ করেছে যে তিনি একসময় একটি ভুল ফতোয়া দিচ্ছিলেন; আয়িশা ও উম্মে সালামার সাক্ষ্যে তিনি তা প্রত্যাহার করেন। ফাতিমা বিনতে কায়সের ঘটনায় উমর সরাসরি স্মৃতিভ্রান্তির সম্ভাবনা তুলেছেন। আবু মুসার ঘটনায় তাঁর নবী-বর্ণনার জন্য দ্বিতীয় সাহাবীর সাক্ষ্য চাওয়া হয়েছে। সালিমের ঘটনায় একই নবী-নির্দেশ থেকে নবীপত্নীরাই বিপরীত আইন বুঝেছেন।

“সব সাহাবী আদিল”—এই সুন্নি নীতিতে তাঁদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়। প্রত্যেকের প্রতিটি বক্তব্য আলাদা করে যাচাই করে এই ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে না। আর সৎ হওয়ার আস্থা থেকে স্মৃতি ও ব্যাখ্যা কখনো ভুল হবে না—এ সিদ্ধান্ত আসে না। আলোচিত ঘটনাগুলোতে সাহাবীরা পরস্পরের স্মৃতি সংশোধন করেছেন, একজনের সংবাদে আরেকজন বাড়তি সাক্ষী চেয়েছেন এবং একই বক্তব্য ভিন্নভাবে বুঝেছেন। একটি শ্রেণির সম্মান তার সদস্যদের প্রতিটি খবরকে নির্ভুল করে না। নির্দিষ্ট ঘটনায় ভুল, স্বার্থ বা ইচ্ছাকৃত বিকৃতির অভিযোগ উঠলে তার পক্ষে বা বিপক্ষে তথ্য দেখতে হয়; মর্যাদা দেখিয়ে প্রশ্নটি নিষিদ্ধ করা চলে না। সততা, স্মৃতি ও অর্থ বোঝার ক্ষমতা আলাদা বলেই সাহাবী-পর্যায়ের বর্ণনাও অন্য সাক্ষ্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন থাকে।

সাহাবীদের সম্মিলিত নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে সুন্নি কর্তৃত্বের ভিত্তি হয়েছে, তা স্কট সি. লুকাসের Constructive Critics, Ḥadīth Literature, and the Articulation of Sunnī Islam গ্রন্থের গবেষণাবিষয়। প্রকাশকের পরিচিতিতে গবেষণার তিনটি প্রধান বিষয় হিসেবে সাহাবীদের এই মর্যাদা, রাবী-সমালোচনার বিদ্যা এবং মুহাম্মদ থেকে বড় সংকলনগুলোর মধ্যবর্তী বর্ণনাপথের সুন্নি ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পাওয়া যায়: কোন ব্যক্তিদের সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হবে—এই নিয়ম নিজেও ধর্মীয় কর্তৃত্ব গড়ার ইতিহাসের অংশ। নিয়মটি জানা এবং প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেক সংবাদ সত্য প্রতিষ্ঠা করা আলাদা কাজ। সাধারণ গ্রহণযোগ্যতার নীতির আড়ালে কোনো নির্দিষ্ট ভুল বা বিরোধ ঢেকে রাখলে ব্যক্তির বক্তব্যের প্রমাণের জায়গায় শ্রেণির মর্যাদা বসে যায়। [171]

স্কট সি. লুকাসের গ্রন্থের প্রকাশক-প্রদত্ত পরিচিতি, দ্বিতীয় অংশের আলোচ্য নীতি

the collective probity of the ṣaḥāba

বাংলা অনুবাদ:

সাহাবীদের সম্মিলিত নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।

কোনো সংবাদ সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছালে তাঁর নিজের জানার উৎসও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ঘটনাটি দেখেছিলেন, নাকি আরেকজনের কাছে শুনেছিলেন? বিশেষ পরিস্থিতির বিষয়ে অন্য সাহাবীর বেশি প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছিল কি? বিপরীত বর্ণনা আগে থেকে আছে কি? কোনো সংশোধনের পরে তাঁর মত বদলেছিল কি? এসব তথ্য একই পরিচয়ের দুই সাক্ষীর মধ্যে অগ্রাধিকার বদলে দিতে পারে। “তিনি সাহাবী”—এই উত্তর এসব নির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনোটি মেটায় না। তাই পছন্দের একটি সনদ দেখিয়ে বিপরীত স্মৃতি সরিয়ে দেওয়ার বদলে কেন একটির প্রমাণ বেশি শক্তিশালী, তা দেখাতে হয়। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারী যে রূপ বেছে নিয়েছেন, তাঁর নির্বাচনের কারণও একই পরীক্ষার অংশ।

একজন সাহাবীর ভুল কথা পরের দশজন ঠিকভাবে পৌঁছে দিলে আমাদের হাতে তাঁর সেই ভুল কথাটিই আসবে। পরের বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা তখন সংরক্ষণের পক্ষে প্রমাণ, সাহাবীর মূল স্মৃতি সঠিক হওয়ার স্বাধীন প্রমাণ নয়। আবার তিনি ঠিক শব্দ শুনেও অর্থ আলাদাভাবে বুঝে থাকতে পারেন। একই নবী-নির্দেশ সম্পর্কে সাহাবীদের মতভেদ থাকলে সহিহ সনদ দিয়ে দুজনের বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে জানা যায়; কোন ব্যাখ্যা ঠিক, তা স্থির করতে আরও বিচার লাগে। সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছানো তাই মানুষের স্মৃতি ও ব্যাখ্যার সবচেয়ে পুরোনো দৃশ্যমান স্তরে পৌঁছানো; মানুষের ভুলের সম্ভাবনা পার হয়ে যাওয়া নয়। অন্য সাক্ষ্য দিয়ে তাঁদের ভুল ধরা পড়ার বাস্তব ঘটনাই এই প্রয়োজন প্রতিষ্ঠা করে।


হজের তামাত্তু

সাহাবীদের স্মৃতি ও ব্যাখ্যার পার্থক্য কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সরাসরি নবীর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আচার কী—সেই প্রশ্নেও একজন সাহাবী আরেক সাহাবীর অবস্থানের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের আমলকে দাঁড় করিয়েছেন। হজের তামাত্তু তার শক্তিশালী উদাহরণ। এখানে বিতর্ক এমন কোনো জটিল ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা নিয়ে নয় যার অর্থ শতভাবে করা যায়; প্রশ্ন ছিল বাস্তবে একজন হাজি হজের মাসে উমরা করে ইহরাম থেকে বের হয়ে পরে নতুন করে হজের ইহরাম বাঁধতে পারবেন কি না। কোরআনে তামাত্তুর উল্লেখ আছে, মুহাম্মদের যুগে এর চর্চার বর্ণনাও আছে; তারপরও উমর ও উসমানের মতো প্রধান সাহাবীর নিষেধ বা নিরুৎসাহের বিপরীতে তাঁদেরই সমসাময়িক অন্য সাহাবীরা সরাসরি নবীর সুন্নাহকে সামনে এনেছেন।


ইবন উমর বনাম উমর

তিরমিযির ৮২৪ নম্বর হাদিসে শামের এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবন উমরকে হজের তামাত্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। ইবন উমর বলেন, এটি বৈধ। লোকটি তখন আপত্তি তোলে—“কিন্তু আপনার বাবা তো এটি নিষেধ করেছিলেন।” ইবন উমরের জবাব ছিল কোনো কূটনৈতিক সমন্বয় নয়; তিনি সরাসরি কর্তৃত্বের সংঘাতটি সামনে আনেন: আমার বাবা নিষেধ করে থাকলেও রাসুল যদি এটি করে থাকেন, তাহলে অনুসরণ করা হবে আমার বাবার নির্দেশ, নাকি রাসুলের নির্দেশ? তিরমিযি এই বর্ণনাকে হাসান সহিহ বলেছেন। [172]

মূল আরবি—জামে আত-তিরমিযি:
أَنَّهُ سَمِعَ رَجُلاً مِنْ أَهْلِ الشَّامِ وَهُوَ يَسْأَلُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ عَنِ التَّمَتُّعِ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ هِيَ حَلاَلٌ. فَقَالَ الشَّامِيُّ إِنَّ أَبَاكَ قَدْ نَهَى عَنْهَا. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ أَبِي نَهَى عَنْهَا وَصَنَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَأَمْرَ أَبِي نَتَّبِعُ أَمْ أَمْرَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم … فَقَالَ لَقَدْ صَنَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم. قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ.
বাংলা অনুবাদ:
শামের এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবন উমরকে উমরা থেকে হজ পর্যন্ত তামাত্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: “এটি হালাল।” লোকটি বলে: “কিন্তু আপনার বাবা তো এটি নিষেধ করেছিলেন।” ইবন উমর বলেন: “আমার বাবা যদি এটি নিষেধ করে থাকেন, অথচ আল্লাহর রাসুল তা করে থাকেন, তাহলে অনুসরণ করা হবে আমার বাবার নির্দেশ, নাকি আল্লাহর রাসুলের নির্দেশ?” লোকটি বলে: “বরং আল্লাহর রাসুলের নির্দেশ।” ইবন উমর বলেন: “আল্লাহর রাসুল অবশ্যই এটি করেছেন।” তিরমিযি বলেন: “এটি হাসান সহিহ হাদিস।”

এখানে “সাহাবীদের মধ্যে সামান্য ফিকহি মতভেদ ছিল” বলে বিষয়টি ছোট করার সুযোগ নেই। একজন খলিফার বাস্তব নীতির বিপরীতে তাঁর নিজের ছেলে নবীর আমলকে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে প্রায় প্রশ্ন করছেন—কর্তৃত্বের উৎস কে? যদি কোনো পরবর্তী মুসলিম শুধু “উমর বলেছেন” উদ্ধৃত করেন, ইবন উমরের কাছে সেটি যথেষ্ট নয়; আবার কেউ শুধু “সাহাবীরা সবাই সুন্নাহ সবচেয়ে ভালো জানতেন” বললেও একই সাহাবীদের এই বিরোধ ব্যাখ্যা করতে হবে। নবীর একটি কাজ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা এবং সেই কাজ থেকে বর্তমান আইন কী হবে—দুটি আলাদা স্তর ছিল।


আলী বনাম উসমান

সহিহ বুখারিতে বিরোধটি আরও প্রকাশ্য। মারওয়ান ইবন হাকামের বর্ণনায় উসমান হজের তামাত্তু এবং হজ–উমরা একত্র করার বিরুদ্ধে নিষেধ দিচ্ছিলেন। আলী তা দেখে ইচ্ছাকৃতভাবে হজ ও উমরা উভয়ের তালবিয়া উচ্চারণ করেন এবং বলেন: “আমি কোনো ব্যক্তির কথার কারণে নবীর সুন্নাহ ছেড়ে দেব না।” অন্য সহিহ বুখারি বর্ণনায় আলী উসমানকে আরও সরাসরি বলেন—“আপনি এমন একটি কাজ নিষেধ করতে চাইছেন, যা নবী করেছেন।” [173] [174]

মূল আরবি—সহিহ বুখারি:
وَعُثْمَانُ يَنْهَى عَنِ الْمُتْعَةِ وَأَنْ يُجْمَعَ بَيْنَهُمَا، فَلَمَّا رَأَى عَلِيٌّ أَهَلَّ بِهِمَا: لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ، قَالَ: مَا كُنْتُ لأَدَعَ سُنَّةَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم لِقَوْلِ أَحَدٍ.

اخْتَلَفَ عَلِيٌّ وَعُثْمَانُ … فِي الْمُتْعَةِ، فَقَالَ عَلِيٌّ: مَا تُرِيدُ إِلاَّ أَنْ تَنْهَى عَنْ أَمْرٍ فَعَلَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم.
বাংলা অনুবাদ:
উসমান তামাত্তু এবং হজ–উমরা একত্র করার বিষয়ে নিষেধ করছিলেন। আলী তা দেখে হজ ও উমরা উভয়ের তালবিয়া দিলেন এবং বললেন: “আমি কোনো ব্যক্তির কথার কারণে নবীর সুন্নাহ ছেড়ে দেব না।” অন্য বর্ণনায় আলী উসমানকে বলেন: “আপনি এমন একটি কাজ নিষেধ করতে চাইছেন, যা নবী করেছেন।”

এখানে বিপরীত পক্ষ কোনো অখ্যাত রাবী নন—তৃতীয় খলিফা উসমান এবং চতুর্থ খলিফা আলী। একজনের বাস্তব নীতি অন্যজনের কাছে নবীর সুন্নাহর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। আলী কেবল ভিন্ন মত পোষণ করেননি; প্রকাশ্যে বিপরীত কাজ করে তাঁর অবস্থান প্রদর্শন করেছেন। পরবর্তী যুগে উভয় সাহাবীকেই সর্বোচ্চ মর্যাদার ব্যক্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করা হলেও একই মুহূর্তে তাঁদের দুই বিপরীত সিদ্ধান্ত একসঙ্গে নবীর একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। ফলে “সাহাবীর আমল” নিজেই একটি একক ও অভিন্ন প্রমাণশ্রেণি নয়; প্রথমে জানতে হয় কোন সাহাবী, কোন সময়, কোন তথ্যের ভিত্তিতে এবং অন্য সাহাবী কী বলেছিলেন।


ইমরান ইবন হুসাইন

সহিহ বুখারির আরেক বর্ণনায় ইমরান ইবন হুসাইন বলেন, তাঁরা মুহাম্মদের যুগে তামাত্তু করেছেন, এ বিষয়ে কোরআনও নাজিল হয়েছে; এরপর “এক ব্যক্তি নিজের মত অনুযায়ী যা ইচ্ছা বলেছে।” বুখারির এই পাঠে নামহীন ব্যক্তির মত নবীর যুগের আমলের বিপরীতে এসেছে: একজন সাহাবী তাঁর স্মৃতিতে নবীর যুগের আমল ও কোরআনিক অনুমোদনকে একদিকে রাখছেন, আর পরবর্তী নিষেধ বা আপত্তিকে “এক ব্যক্তির মত” হিসেবে অন্যদিকে রাখছেন। [175]

মূল আরবি—সহিহ বুখারি:
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ ، عَنْ قَتَادَةَ ، قَالَ حَدَّثَنِي مُطَرِّفٌ ، عَنْ عِمْرَانَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ تَمَتَّعْنَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَنَزَلَ الْقُرْآنُ قَالَ رَجُلٌ بِرَأْيِهِ مَا شَاءَ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
মুসা ইবন ইসমাঈল আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাম্মাম আমাদের বর্ণনা করেছেন, কাতাদার সূত্রে। কাতাদা বলেন, মুতাররিফ আমাকে বর্ণনা করেছেন, ইমরান থেকে—আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। ইমরান বলেন: “আমরা আল্লাহর রাসুলের যুগে তামাত্তু করেছি, এরপর কোরআন নাজিল হয়েছে। একজন ব্যক্তি নিজের মত অনুযায়ী যা ইচ্ছা বলেছে।”

এই ঘটনাগুলো সাহাবীদের মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে না; বরং আরও মৌলিক একটি বিষয় প্রমাণ করে। একই নবী, একই ধর্মীয় আচার এবং একই প্রথম প্রজন্ম থাকা সত্ত্বেও আইনগত স্মৃতি ও প্রয়োগ একরূপ ছিল না। একজন সাহাবী নিষেধ করেছেন; অন্যজন বলেছেন নবী এটি করেছেন। একজন খলিফার নীতির বিরুদ্ধে তাঁর নিজের ছেলে রাসুলের আমল দাঁড় করিয়েছেন; আরেক খলিফার নিষেধের বিরুদ্ধে আলী বলেছেন তিনি “কারও কথায়” নবীর সুন্নাহ ছাড়বেন না। এই বাস্তবতার পরে সাহাবীদের একটি অভিন্ন, ভুলহীন সমষ্টিগত স্মৃতি হিসেবে ব্যবহার করা ইতিহাস নয়।

তামাত্তু নিয়ে এই বিরোধ সাহাবীদের মধ্যেই নবীর কাজের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সংঘর্ষ। পরবর্তী সনদ যত শক্তিশালীই হোক, সেটি আমাদের কাছে এসব বিপরীত সাহাবী-অবস্থানই নিখুঁতভাবে পৌঁছে দিচ্ছে। সহিহ বুখারি নিজেই আমাদের হাতে এমন দুটি অবস্থান তুলে দিচ্ছে, যেখানে এক সাহাবী আরেক সাহাবীর নীতিকে নবীর কাজের বিপরীতে দাঁড় করাচ্ছেন। “সহিহ” গ্রেড তাই এখানে মতভেদ শেষ করছে না; বরং মতভেদটি নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ করছে। এরপর কোন অবস্থানকে নবীর প্রকৃত সুন্নাহর সঠিক প্রয়োগ বলা হবে, সেই বিচার আবার পাঠক, মুহাদ্দিস ও ফকিহের ওপর ফিরে আসে।


ইসরা-মিরাজ: দেহ, রূহ না দর্শন?

মুহাম্মদের ইসরা-মিরাজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি। পরবর্তী সুন্নি আকিদায় প্রাধান্য পাওয়া অবস্থান হলো, মুহাম্মদ জাগ্রত অবস্থায় শরীর ও আত্মাসহ মক্কা থেকে বায়তুল মাকদিসে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে আসমানে আরোহণ করেছিলেন। এই অবস্থান এতটাই মানক হয়ে গেছে যে আধুনিক ধর্মীয় আলোচনায় প্রায়ই মনে হয়, ঘটনাটির প্রকৃতি নিয়ে প্রাথমিক মুসলিমদের মধ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মতভেদই ছিল না। কিন্তু ক্লাসিক্যাল সীরাত, তাফসির ও হাদিস-ব্যাখ্যার গ্রন্থ খুললে ভিন্ন ছবি দেখা যায়। মুহাম্মদের দেহ সত্যিই মক্কা ছেড়েছিল, তাঁর রূহ একা যাত্রা করেছিল, নাকি ঘটনাটি কোনো নববী দর্শন বা স্বপ্নসদৃশ অভিজ্ঞতা ছিল—এই মৌলিক প্রশ্নেই প্রাথমিক মুসলিম ঐতিহ্যের মধ্যে একাধিক উত্তর সংরক্ষিত হয়েছে।

এটি কোনো আধুনিক সংশয়বাদীর পুনর্গঠন নয়। কুরতুবি সূরা আল-ইসরার প্রথম আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরাসরি লিখেছেন: “এ বিষয়ে সালাফ ও খালাফ মতভেদ করেছেন।” এরপর তিনি অন্তত তিন ধরনের অবস্থান উল্লেখ করেন। একটি দল বলেছে, ইসরা হয়েছিল রূহের মাধ্যমে এবং মুহাম্মদের দেহ শয্যা ছাড়েনি; মুয়াবিয়া ও আয়িশার নামে এই মত বর্ণিত, হাসান বসরি ও ইবন ইসহাকের কাছেও অনুরূপ অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে। আরেক দল বলেছে, বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত শরীরসহ যাত্রা হয়েছিল, কিন্তু আসমানে আরোহণ হয়েছিল রূহের মাধ্যমে। অন্যদিকে যে মতটি পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি অবস্থানে পরিণত হয়, সেটি পুরো ঘটনাকেই শরীর ও রূহসহ জাগ্রত অবস্থার যাত্রা হিসেবে গ্রহণ করে। [176]

মূল আরবি—তাফসির আল-কুরতুবি:
فأما المسألة الأولى وهي هل كان إسراء بروحه أو جسده؛ اختلف في ذلك السلف والخلف، فذهبت طائفة إلى أنه إسراء بالروح، ولم يفارق شخصه مضجعه، وأنها كانت رؤيا رأى فيها الحقائق، ورؤيا الأنبياء حق. ذهب إلى هذا معاوية وعائشة، وحكي عن الحسن وابن إسحاق. وقالت طائفة: كان الإسراء بالجسد يقظة إلى بيت المقدس، وإلى السماء بالروح.
বাংলা অনুবাদ:
প্রথম প্রশ্ন হলো—ইসরা কি তাঁর রূহের মাধ্যমে হয়েছিল, নাকি শরীরের মাধ্যমে? এ বিষয়ে সালাফ ও খালাফ মতভেদ করেছেন। একটি দল বলেছে, ইসরা হয়েছিল রূহের মাধ্যমে; তাঁর দেহ শয্যা ছাড়েনি এবং এটি ছিল এমন একটি দর্শন যাতে তিনি বাস্তব সত্যসমূহ দেখেছিলেন—নবীদের দর্শন সত্য। মুয়াবিয়া ও আয়িশা এই মত পোষণ করেছেন বলে বর্ণিত; হাসান ও ইবন ইসহাকের কাছ থেকেও অনুরূপ মত উল্লেখ করা হয়েছে। আরেক দল বলেছে, বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত জাগ্রত অবস্থায় শরীরসহ ইসরা হয়েছিল, কিন্তু আসমানে আরোহণ হয়েছিল রূহের মাধ্যমে।

এই স্বীকারোক্তির গুরুত্ব বিশাল। বিরোধটি কোনো তুচ্ছ খুঁটিনাটি নিয়ে নয়—কোন আসমানে কোন নবীকে দেখা হয়েছিল, বুরাকের রং কী ছিল বা যাত্রার তারিখ কোন মাসে ছিল—এমন প্রশ্ন নয়। বিরোধটি ঘটনাটির বাস্তব প্রকৃতি নিয়েই: সপ্তম শতাব্দীর এক রাতে একজন মানুষের শরীর বাস্তব ভৌগোলিক স্থান অতিক্রম করে আসমানে গিয়েছিল, নাকি তাঁর শরীর মক্কাতেই ছিল এবং অভিজ্ঞতাটি রূহের স্তরে ঘটেছিল? অথবা “রু’য়া” বলতে কোনো নববী দর্শন বোঝানো হয়েছিল? এগুলো একই ঐতিহাসিক দাবির সামান্য ভিন্ন শব্দ নয়; এগুলো বাস্তবতার সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি বিবরণ।


আয়িশার রূহানী ইসরা

ইবন হিশামের সংরক্ষিত ইবন ইসহাকের সীরাতে আয়িশার নামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্তব্য রয়েছে। ইবন ইসহাক বলেন, আবু বকরের পরিবারের একজনের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন যে আয়িশা বলতেন: “আল্লাহর রাসুলের দেহ হারিয়ে যায়নি; বরং আল্লাহ তাঁর রূহকে নিয়ে গিয়েছিলেন।” বর্ণনাটির সনদে “আবু বকরের পরিবারের একজন” নামহীন; তাই এটিকে সহিহ বুখারি বা সহিহ মুসলিমের মানের সনদ হিসেবে চালানো যাবে না। এর ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হলো: ইসলামের প্রাচীনতম সীরাত-ঐতিহ্যের মধ্যেই আয়িশার নামে পরবর্তী মানক সশরীর-যাত্রার বিপরীত একটি ব্যাখ্যা প্রচলিত ও সংরক্ষিত ছিল। [177]

মূল আরবি—ইবন ইসহাকের সূত্রে আয়িশার বক্তব্য:
ما فقدت جسد رسول الله صلى الله عليه وسلم، ولكن الله أسرى بروحه.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহর রাসুলের দেহ হারিয়ে যায়নি; বরং আল্লাহ তাঁর রূহকে নিয়ে ইসরা করিয়েছিলেন।”

আয়িশার নামে এই ব্যাখ্যা আকিদার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না এবং ব্যাখ্যাটি প্রাচীন মুসলিম সাহিত্যে প্রচলিত ছিল কি না—দুটি আলাদা প্রশ্ন। সনদের দুর্বলতার আপত্তি প্রথম প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইবন ইসহাকের জীবনীধারায় ব্যাখ্যাটি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পরে কুরতুবি ও ইবন কাসিরের মতো লেখকেরা আলোচনা করেছেন—এটি তার লিখিত উপস্থিতির প্রমাণ। তখন আরও জানতে হয় সবচেয়ে পুরোনো কোন পাঠে কথাটি আছে, আয়িশার কাছে তার উৎস কতটা যাচাই করা যায় এবং অন্য ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্ক কী। আয়িশা কথাটি বলেছেন বলে নিশ্চিত না হলেও তাঁর নামে এমন একটি ব্যাখ্যা প্রচলিত থাকার ইতিহাস থেকে যায়। পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত মতের সঙ্গে না মেলায় সেই উপস্থিতিকেও “জইফ” বলে মুছে দিলে বিশ্বাসের উপযোগিতা দিয়ে ইতিহাসের উপাদান বেছে নেওয়া হয়।


মুয়াবিয়ার “সত্য রু’য়া”

একই প্রাচীন ধারায় মুয়াবিয়ার নামে বলা হয়েছে, ইসরা ছিল “আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সত্য রু’য়া”। আরবি রু’য়া শব্দে স্বপ্ন বা দর্শনের প্রশ্ন আসে; এই ছোট বাক্যে দেহের ভৌত স্থানান্তরের বিস্তারিত নেই। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা রূহের বাস্তব যাত্রা ও ঘুমের স্বপ্নকে আলাদা করেছেন। কিন্তু তাঁদের ব্যাখ্যার সব বিবরণ মুয়াবিয়ার সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যে আগে থেকেই আছে বলে ধরা যায় না। বাক্যটির সম্ভাব্য অর্থ দেখতে অন্য ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট পাঠ ও প্রাচীন মতভেদ তুলনা করতে হয়। সশরীর যাত্রা আগে সত্য ধরে এমন অর্থই শুধু গ্রহণ করা, যাতে তার সঙ্গে বিরোধ না হয়—এটি ধর্মতাত্ত্বিক বাছাই। স্বপ্ন বা দর্শনের স্মৃতি হিসেবে পড়ার সম্ভাবনাও একই ভাষা ও উৎসের পরীক্ষার বিষয়। [178]

মূল আরবি—মুয়াবিয়ার নামে বর্ণিত:
كانت رؤيا من الله صادقة.
বাংলা অনুবাদ:
“এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সত্য দর্শন।”

পরবর্তী আকিদাগত ব্যাখ্যায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যাহ-তে আয়িশা ও মুয়াবিয়ার নামে এই রূহানী অবস্থান উদ্ধৃত করার পর স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: “রূহের মাধ্যমে ইসরা” আর “স্বপ্নে ইসরা”—দুটি এক নয়। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়, তাঁদের বক্তব্যের অর্থ হতে পারে মুহাম্মদের রূহ বাস্তবেই দেহ থেকে পৃথক হয়ে আসমানে গিয়েছিল এবং ফিরে এসেছিল—নিছক স্বপ্নের প্রতীকী দৃশ্য নয়। [179]

এই ব্যাখ্যা পরবর্তী সুন্নি অবস্থানকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষণ করে দিয়েছে: বিরোধটিকে পরবর্তী আলেমরাও এত গুরুতর মনে করেছেন যে “স্বপ্ন”, “রূহের বাস্তব যাত্রা” এবং “শরীর-রূহের যৌথ যাত্রা”—এই তিনটির বাস্তব প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য করতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক বর্ণনাগত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং পরবর্তী ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।


ইবন ইসহাকের অনিশ্চয়তা

এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যক্তি আয়িশা বা মুয়াবিয়া নন; ইবন ইসহাক নিজে। কারণ তিনি বিপরীত বর্ণনাগুলো সংরক্ষণ করার পরে সেগুলোকে বাতিল করে এককভাবে “শরীরসহ জাগ্রত যাত্রাই নিশ্চিত”—এমন সিদ্ধান্ত দেননি। বরং তিনি কোরআনের ১৭:৬০ আয়াতে ব্যবহৃত রু’য়া শব্দের কথা তোলেন, ইবরাহিমের পুত্র জবাইয়ের নববী স্বপ্নের উদাহরণ দেন এবং নবীদের ঘুমের মধ্যেও সত্য দর্শন আসতে পারে—এই ধারণা সামনে আনেন। তাঁর কাছে স্বপ্ন বা রূহানী অভিজ্ঞতা বললেই ঘটনাটি “মিথ্যা” হয়ে যায় না; নববী অভিজ্ঞতার ধরন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রেখেও তার ধর্মীয় সত্যতা স্বীকার করা সম্ভব। [180]

মূল আরবি—ইবন ইসহাক:
فالله أعلم أي ذلك كان قد جاءه … على أي حالاته كان نائما أو يقظان كل ذلك حق وصدق.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহই ভালো জানেন বিষয়টি কোনভাবে তাঁর কাছে এসেছিল… তিনি ঘুমন্ত ছিলেন বা জাগ্রত—যে অবস্থাতেই হোক, সবই সত্য ও বাস্তব।”

ইবন ইসহাক বিভিন্ন বর্ণনা সংরক্ষণ করেও ঘুম না জাগরণ—কোন অবস্থায় ঘটনাটি ঘটেছিল, তা নির্দিষ্ট করেননি; শেষ সিদ্ধান্ত আল্লাহ জানেন বলেছেন। মুহাম্মদের জীবন নিয়ে প্রাথমিক প্রভাবশালী একটি উৎসে এই অনিশ্চয়তা আছে। এর গুরুত্ব এখানেই যে পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত সশরীর মতটি তাঁর কাছে ইতিমধ্যে মীমাংসিত একমাত্র বিবরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। একাধিক প্রাথমিক স্মৃতি সংরক্ষণ করা এবং ঘটনাটির ভৌত ধরন নিশ্চিত করে বলা আলাদা কাজ। পরে কোনো ধর্মীয় বিবরণে শুধু বিজয়ী মতটি রেখে বাকি মত ও অনিশ্চয়তা বাদ দিলে পাঠকের সামনে শুরুর বিরোধের চিত্র থাকে না। তখন পরবর্তী সিদ্ধান্তকেই শুরু থেকে সবার জানা ইতিহাস বলে মনে হয়।

ইবন ইসহাক ঘুমের বা জাগরণের উভয় অবস্থার সংবাদকে ধর্মীয়ভাবে সত্য বলেছেন, কিন্তু কোনটি ঘটেছিল তা স্থির করেননি। ইতিহাসে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ শয্যায় থেকে জেরুজালেমে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন—এটি এক ঘটনা। তাঁর শরীর সত্যিই এক রাতে সেখানে গেছে—এটি আরেক ঘটনা। কোনো দর্শনকে সত্য বা আল্লাহপ্রদত্ত বললেও দ্বিতীয় ঘটনাটি প্রমাণ হয় না। “স্বপ্ন হলেও সত্য” বাক্যটি অভিজ্ঞতার ধর্মীয় মর্যাদা জানাতে পারে; শরীর কোথায় ছিল তার উত্তর দেয় না। ফলে মুহাম্মদের দেহ মক্কা ছেড়েছিল কি না, সেই নির্দিষ্ট প্রশ্নে স্বপ্ন, রূহের যাত্রা ও দেহের যাত্রার বিবরণগুলো আলাদা করে পরীক্ষা করতে হয়।


ইবন আব্বাসের “চোখের দর্শন”

অন্যদিকে সহিহ বুখারিতে ইবন আব্বাসের নামে এমন বক্তব্য পাওয়া যায় যা পরবর্তী সশরীর-জাগ্রত ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। সূরা আল-ইসরার “যে রু’য়া আমি তোমাকে দেখিয়েছি” কথার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: “هي رؤيا عين أريها رسول الله”—“এটি ছিল চোখের দর্শন, যা আল্লাহর রাসুলকে দেখানো হয়েছিল।” তিনি এটিকে ইসরার রাতে বায়তুল মাকদিসের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করেন। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা রু’য়া আইন বা “চোখের দেখা”কে নিছক ঘুমের স্বপ্নের বিপরীতে ব্যবহার করেছেন। [181] [182]

মূল আরবি—ইবন আব্বাস:
هي رؤيا عين أريها رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلة أسري به إلى بيت المقدس.
বাংলা অনুবাদ:
“এটি ছিল চোখের দর্শন, যা আল্লাহর রাসুলকে সেই রাতে দেখানো হয়েছিল যখন তাঁকে বায়তুল মাকদিসে নিয়ে যাওয়া হয়।”

ইবন আব্বাসের “চোখের দর্শন” ব্যাখ্যা শক্তিশালী সহিহ সনদে আছে। তার পাশাপাশি আয়িশার নামে দেহ না যাওয়ার কথা, মুয়াবিয়ার নামে সত্য রু’য়ার কথা এবং ইবন ইসহাকের অনিশ্চয়তাও প্রাচীন সূত্রে সংরক্ষিত। এগুলোর প্রমাণশক্তি সমান ধরে নিতে হয় না, কিন্তু একটি শক্তিশালী বলে বাকি ব্যাখ্যার প্রচলন ইতিহাস থেকে মুছে যায় না। কোনটির উৎস কত পুরোনো, কার নাম পর্যন্ত ভালোভাবে যাচাই হয় এবং কোন শব্দে কী অর্থ আসে—এসব তুলনা করতে হয়। একটি মত বেছে নেওয়ার পরে অন্য মতগুলোকে কখনো ছিল না বলে দেখানো সেই তুলনার ফল নয়। পরবর্তী ধর্মতত্ত্ব কোনটিকে গ্রহণ করেছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য; প্রাথমিক সময়ে কোন কোন ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল, তা আরেক তথ্য।


বুখারিতে ঘুম ও জাগরণ

বিতর্ককে আরও জটিল করে সহিহ বুখারির কিছু বর্ণনার ভাষা। সেখানে মুহাম্মদের নামে এসেছে: “আমি যখন মসজিদুল হারামে ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম…” অন্য একটি রূপে যাত্রার সূচনায় তাঁকে ঘুমন্ত বলা হয়েছে এবং শেষাংশে “তিনি জেগে উঠলেন, তখন তিনি মসজিদুল হারামে”—এমন ভাষাও রয়েছে। এই শব্দগুলো স্বপ্ন-ব্যাখ্যার পক্ষে ব্যবহার করা যেতে পারে—এ সম্ভাবনা পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যাকারীরাই স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁরা তারপর বিভিন্ন তাওয়িল দিয়ে সশরীর-জাগ্রত মতের সঙ্গে এগুলো সমন্বয় করেছেন। [183]

সহিহ বর্ণনায় ব্যবহৃত ভাষা:
بين النائم واليقظان
“ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি।”

وهو نائم في المسجد الحرام … فاستيقظ وهو في المسجد الحرام
“তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন … পরে তিনি জেগে উঠলেন, তখনও তিনি মসজিদুল হারামে।”

কাজী ইয়াজ সরাসরি স্বীকার করেছেন—“ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি”, “তিনি ঘুমন্ত ছিলেন” এবং “তারপর আমি জেগে উঠলাম”—এই ভাষাগুলোকে যারা স্বপ্নের পক্ষে ব্যবহার করেন তাদের একটি আপাত ভিত্তি আছে; এরপর তিনি তা খণ্ডন করতে একাধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, হয়তো ফেরেশতা প্রথম আসার সময় মুহাম্মদ ঘুমিয়ে ছিলেন কিন্তু পরে জেগেছিলেন; হয়তো ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন; হয়তো “জেগে ওঠা” বলতে বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক অবস্থার পর স্বাভাবিক মানবীয় চেতনায় ফিরে আসা বোঝানো হয়েছে; এমনকি আরেক সম্ভাবনায় ঘুম বাস্তব হলেও শরীরসহ ইসরা ঘটতে পারে, কারণ নবীদের হৃদয় ঘুমায় না। [184]

সহিহ বর্ণনায় থাকা “ঘুমন্ত” ও “জেগে ওঠা” শব্দগুলোকে সশরীর জাগ্রত যাত্রার সঙ্গে মেলাতে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা ভিন্ন অর্থ দিয়েছেন। কেউ শুরুতে ঘুমের কথা নিয়েছেন; কেউ জাগাকে ঘুম ভাঙা না বলে বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা বলেছেন; কেউ ফিরে এসে আবার ঘুমানোর সম্ভাবনা ধরেছেন। এই ব্যাখ্যাগুলোর প্রতিটির পক্ষে নিজস্ব প্রমাণ দরকার। সহিহ সনদে শব্দ পাওয়া গেলেও সেই শব্দ থেকে একটিমাত্র স্বচ্ছ বিবরণ বেরিয়ে আসেনি বলেই এত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছে। তাই শব্দ সংরক্ষিত থাকা এবং পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত আকিদার অর্থ সেই শব্দে অবধারিত থাকা এক দাবি নয়। ব্যাখ্যার লক্ষ্য যদি আগের আকিদাকে অক্ষত রাখা হয়, তবে সেই লক্ষ্যও অর্থ বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কাজ করছে।


একই কোরআন, ভিন্ন ব্যাখ্যা

কোরআনও এই বিরোধ এক লাইনে নিষ্পত্তি করেনি; বরং বিপরীত পক্ষগুলো ভিন্ন আয়াতকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছে। সূরা আল-ইসরার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর “আবদ” বা বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে গেছেন। পরবর্তী সশরীর মতের সমর্থকেরা বলেন, আবদ শব্দ মানুষের শরীর ও রূহের সমষ্টিকে বোঝায়; কেবল রূহ বোঝালে আল্লাহ তা বলতেন। একইভাবে “সুবহান” দিয়ে বাক্য শুরু হওয়াকে তাঁরা অসাধারণ ভৌত মুজিযার ইঙ্গিত হিসেবে পড়েন। তাবারি, কাজী ইয়াজ, ইবন হাজার এবং পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠের যুক্তিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সূরা আল-ইসরা ১৭:৬০ে একই ঘটনাসংশ্লিষ্ট বলে ব্যাখ্যাত আরেক স্থানে এসেছে: “আমি তোমাকে যে রু’য়া দেখিয়েছি…” ইবন ইসহাক এই রু’য়া শব্দকে তাঁর অনির্ধারিত অবস্থানের পক্ষে ব্যবহার করেছেন; ইবন আব্বাস আবার একই শব্দকে “চোখের দর্শন” বলেছেন। ফলে একটি পক্ষের কাছে রু’য়া দর্শনমূলক অভিজ্ঞতার সম্ভাবনা খোলা রাখছে; অন্য পক্ষের কাছে সেটি জাগ্রত চোখে দেখা। একই পাঠ নিজে একটি নিরপেক্ষ লেবেল দিয়ে বলে দিচ্ছে না—“শরীর মক্কা ছেড়েছিল”। সেই সিদ্ধান্তও ভাষা ও অন্য বর্ণনার সমন্বয়ে তৈরি ব্যাখ্যা।


মানক মতের উত্থান

তাবারি শেষ পর্যন্ত রূহানী মত প্রত্যাখ্যান করে সশরীর যাত্রার পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর বক্তব্য—কোরআনে “আবদ” বলা হয়েছে, শুধু “রূহ” নয়; বুরাকের প্রয়োজন শরীরের যাত্রার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ; আর ঘটনাটি নিছক স্বপ্ন হলে মক্কার বিরোধীদের বিস্ময় ও অস্বীকার এত তীব্র হওয়ার কথা নয়। ইবন কাসিরও আয়িশা ও মুয়াবিয়ার বিকল্প বক্তব্য সংরক্ষণ করে শেষ পর্যন্ত শরীরসহ জাগ্রত যাত্রাকে অগ্রাধিকার দেন। পরে কাজী ইয়াজ, নববী, ইবন হাজার ও অন্যান্য সুন্নি কর্তৃত্বের কাছে এই মতই প্রধান অবস্থানে পরিণত হয়। [185] [186]

কুরতুবি আগের ও পরের আলেমদের মতভেদ জানিয়েছেন। ইবন ইসহাক বিপরীত বর্ণনা রেখে ঘটনাটির ধরন অনির্ধারিত রেখেছেন। বুখারির পাঠে ঘুম ও জাগরণের কথা আছে, যেগুলোর জন্য পরে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই তথ্যগুলো একসঙ্গে দেখায়, প্রাথমিক মুসলিম ঐতিহ্যে ইসরা-মিরাজের প্রকৃতি নিয়ে একাধিক ধারণা ছিল। পরে সুন্নি ধর্মতত্ত্ব দেহ ও রূহসহ জাগ্রত যাত্রাকে প্রধান মত করেছে। পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত আর ঘটনার সময় থেকে একমাত্র প্রচলিত স্মৃতি একই জিনিস নয়। কোন প্রমাণে প্রধান মতটি বেছে নেওয়া হলো, তার বিচার সম্ভব; কিন্তু প্রধান মতের মর্যাদা আগের মতভেদের দলিল মুছে দেয় না।

এই পার্থক্যটি অস্বস্তিকর হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সশরীর যাত্রা একটি অসাধারণ ভৌত দাবি: একজন মানুষ রাতের মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং সেখান থেকে বহু আসমান অতিক্রম করেছেন। রূহানী অভিজ্ঞতা বা সত্য দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দাবি। প্রথমটির জন্য শরীরের ভৌত স্থানান্তর সত্য হতে হবে; দ্বিতীয়টির জন্য তা প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় বিশ্বাসে দুটিকেই অলৌকিক সত্য বলা সম্ভব, কিন্তু ইতিহাসে একটি অন্যটির বিকল্প নয়। একই ঘটনাকে নিয়ে প্রাথমিক উৎস যদি এই স্তরেই দ্বিধাবিভক্ত থাকে, পরবর্তী আকিদার বিজয় সেই প্রাথমিক প্রমাণগত অনিশ্চয়তাকে পেছনের সময়ের ওপর পরবর্তী রায় চাপিয়ে মুছে দিতে পারে না।

ইসরা-মিরাজের এই বিরোধে প্রশ্ন শুধু কোন সনদ সহিহ তা নিয়ে নয়। গ্রহণ করা বর্ণনায় ঠিক কী ঘটেছে বলা হচ্ছে—দেহের যাত্রা, রূহের যাত্রা, নাকি দর্শন—সেটিও স্থির করতে হয়। প্রাথমিক মুসলিম সূত্রগুলো একটিমাত্র উত্তর দেয়নি, আর পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা সেই বিরোধ মেটাতে ভাষার ভিন্ন অর্থ ও আকিদার অগ্রাধিকার ব্যবহার করেছেন। তাই বর্তমান প্রতিষ্ঠিত মতকে সপ্তম শতকের একমাত্র অবিতর্কিত স্মৃতি হিসেবে দেখালে মতটির প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইতিহাস আড়াল হয়। একটি ব্যাখ্যা ধর্মীয় কর্তৃত্ব পেয়েছে—এটি সত্য হলেও তার সব ঐতিহাসিক দাবি একই সঙ্গে প্রমাণিত হয়ে যায় না।


ধর্মতত্ত্ব যখন বর্ণনার বিচারক

গারানিকের কাহিনি

গারানিক বা তথাকথিত “শয়তানি আয়াত”-এর কাহিনি আরও গভীর একটি সমস্যা প্রকাশ করে। এখানে কেবল সনদের শক্তি নিয়ে বিরোধ নেই; সংরক্ষিত প্রমাণের সম্ভাব্য অর্থকে আগে থেকে স্থির ধর্মতত্ত্ব দিয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কাহিনিটির বিভিন্ন রূপে বলা হয়, মুহাম্মদ সূরা নাজম পাঠের সময় লাত, উজ্জা ও মানাতের নামের পরে তাদের প্রশংসাসূচক বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন—“এরা উচ্চ মর্যাদার গারানিক, তাদের সুপারিশ কাম্য।” মক্কার মুশরিকেরা এতে সন্তুষ্ট হয়ে মুসলিমদের সঙ্গে সিজদা করে; পরে বক্তব্যটি শয়তানের প্রক্ষেপণ বলে বাতিল হয়।

কাহিনিটি নবীর ওহি-প্রদানে অভ্রান্ততা বা ইসমাহর মতবাদের জন্য সরাসরি বিপজ্জনক। যদি নবীর মুখ দিয়ে পৌত্তলিক দেবীদের প্রশংসা কোরআনের অংশ হিসেবে উচ্চারিত হয়ে থাকে, তাহলে শ্রোতারা কোন মুহূর্তে ওহি এবং কোন মুহূর্তে শয়তানি সংযোজন শুনছেন—তার কোনো তাৎক্ষণিক নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড থাকে না। পরে সংশোধন হয়েছে বলা প্রথম প্রচারের বিভ্রান্তি দূর করে না; বরং ওহির সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। তাই কাহিনিটির বিচার শুরু থেকেই ধর্মতাত্ত্বিক বিস্ফোরক বহন করে [187]।

মূল আরবি—ইবন হাজার, ফাতহুল বারি-তে গারানিক-বর্ণনার একটি রূপ:
أفرأيتم اللات والعزى ومناة الثالثة الأخرى، ألقى الشيطان على لسانه: تلك الغرانيق العلى وإن شفاعتهن لترتجى، فقال المشركون: ما ذكر آلهتنا بخير قبل اليوم، فسجد وسجدوا.
বাংলা অনুবাদ:
“তোমরা কি লাত ও উজ্জা এবং তৃতীয় মানাতকে দেখেছ?”—এরপর শয়তান তাঁর জিহ্বায় নিক্ষেপ করল: “এরা উচ্চ মর্যাদার গারানিক; নিশ্চয়ই তাদের সুপারিশ কাম্য।” মুশরিকেরা বলল, “আজকের আগে তিনি কখনো আমাদের দেবতাদের ভালোভাবে উল্লেখ করেননি।” এরপর তিনি সিজদা করলেন এবং তারাও সিজদা করল।

কাহিনিটির অধিকাংশ পথ দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন—ইবন হাজার সেটি লুকাননি। কিন্তু তিনি এখানেই থামেননি। তাঁর সিদ্ধান্ত হলো, পথগুলো বহু এবং তাদের উৎস বিচিত্র হওয়ায় কাহিনিটির একটি ভিত্তি আছে। আরও বলেছেন, তিনটি সনদ সহিহাইনের শর্তে থাকা রাবীদের মুরসাল বর্ণনা; যারা মুরসালকে একা দলিল মানেন না, তারাও পারস্পরিক সমর্থনের কারণে এগুলো বিবেচনা করেন। অর্থাৎ “সব পথের কোনো না কোনো সমস্যা আছে, তাই ঘটনাটি শূন্য”—এই সরল বর্জন তিনি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছেন [188]।

মূল আরবি—ইবন হাজার, বিভিন্ন পথের সম্মিলিত মূল্যায়ন:
وكلها سوى طريق سعيد بن جبير إما ضعيف وإلا منقطع، لكن كثرة الطرق تدل على أن للقصة أصلا، مع أن لها طريقين آخرين مرسلين رجالهما على شرط الصحيحين.
فإن الطرق إذا كثرت وتباينت مخارجها دل ذلك على أن لها أصلا، وقد ذكرت أن ثلاثة أسانيد منها على شرط الصحيح، وهي مراسيل يحتج بمثلها من يحتج بالمرسل، وكذا من لا يحتج به لاعتضاد بعضها ببعض.
বাংলা অনুবাদ:
সাঈদ ইবন জুবাইরের পথ ছাড়া অন্য সব পথ হয় দুর্বল, নয়তো বিচ্ছিন্ন। কিন্তু পথের আধিক্য নির্দেশ করে যে কাহিনিটির একটি ভিত্তি আছে; উপরন্তু আরও দুটি মুরসাল পথ রয়েছে, যেগুলোর রাবীরা সহিহাইনের শর্ত অনুযায়ী। কারণ বর্ণনাপথ বহু হলে এবং তাদের উৎস বিচিত্র হলে তা কাহিনিটির একটি ভিত্তি থাকার নির্দেশ দেয়। তিনটি সনদ সহিহের শর্ত অনুযায়ী, যদিও মুরসাল; যারা মুরসালকে দলিল মানেন তারা তো গ্রহণ করবেনই, এমনকি যারা এককভাবে মুরসাল গ্রহণ করেন না তারাও পথগুলো পরস্পরকে শক্তিশালী করার কারণে বিবেচনা করবেন।

বহু সনদের সমর্থনে কাহিনির একটি ভিত্তি মেনে নেওয়ার পরে ইবন হাজার তার অর্থ নির্ধারণে ধর্মতত্ত্বকে সরাসরি বিচারকের আসনে বসান। ইবন হাজার বলেন, কাহিনির অস্বস্তিকর বাক্যটির প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করা যাবে না; কারণ নবী ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআনে বাইরের কথা ঢোকাবেন—এটি অসম্ভব, এমনকি তাওহিদের বিরোধী কিছু ভুলক্রমে ঢোকানোও তাঁর ইসমাহর কারণে অসম্ভব। তাই ঘটনাটির “একটি ভিত্তি” স্বীকার করার পর সেই ভিত্তির অর্থকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে পূর্বস্থির নবীতত্ত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে [189]।

মূল আরবি—ইবন হাজার, ইসমাহর ভিত্তিতে সরল অর্থ প্রত্যাখ্যান:
وإذا تقرر ذلك تعين تأويل ما وقع فيها مما يستنكر، وهو قوله: ألقى الشيطان على لسانه: تلك الغرانيق العلى وإن شفاعتهن لترتجى، فإن ذلك لا يجوز حمله على ظاهره؛ لأنه يستحيل عليه صلى الله عليه وسلم أن يزيد في القرآن عمدا ما ليس منه، وكذا سهوا إذا كان مغايرا لما جاء به من التوحيد لمكان عصمته، وقد سلك العلماء في ذلك مسالك.
বাংলা অনুবাদ:
যখন এটি প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন কাহিনির আপত্তিকর অংশের ব্যাখ্যা করা আবশ্যক—অর্থাৎ “শয়তান তাঁর জিহ্বায় নিক্ষেপ করল: এরা উচ্চ মর্যাদার গারানিক এবং তাদের সুপারিশ কাম্য।” এটিকে প্রকাশ্য অর্থে গ্রহণ করা বৈধ নয়; কারণ নবীর পক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআনে এমন কিছু যোগ করা অসম্ভব যা কোরআনের অংশ নয়; তাঁর ইসমাহর কারণে তাওহিদের বিরোধী কিছু ভুলক্রমে যোগ করাও অসম্ভব। আলেমরা এর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন পথ নিয়েছেন।

যুক্তির ধাপগুলো এখানে লক্ষ্য করার মতো। প্রথমে বিচিত্র বর্ণনাপথ দেখে কাহিনিটির কোনো ভিত্তি আছে বলা হলো। এরপর তার সরল অর্থ নবীতত্ত্বের সঙ্গে না মেলায় সেই অর্থ অসম্ভব ঘোষণা করে অন্য ব্যাখ্যা নেওয়া হলো। প্রমাণ থেকে নবী সম্পর্কে ধারণা পরীক্ষা করার বদলে আগে স্থির ধারণার সঙ্গে প্রমাণের অর্থ মেলানো হচ্ছে। যে তথ্য বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে, সেই তথ্যের অর্থই বিশ্বাস রক্ষার শর্তে সীমিত করা হয়েছে। বর্ণনাটি কীভাবে এসেছে তার বিচার এবং তার অর্থ গ্রহণের এই ধর্মীয় সীমা আলাদা করে না দেখলে ঘটনাটির ঐতিহাসিক অনুসন্ধান কোথায় থামিয়ে দেওয়া হলো, তা বোঝা যায় না।

নবী ওহির বিষয়ে এমন ভুল করতে পারেন না—এই বিশ্বাস আগে সত্য ধরা হলে বিপরীত সংবাদ শুরুতেই অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। তারপর বাছাই করা অবশিষ্ট বর্ণনা দেখিয়ে নবীর অভ্রান্ততা প্রমাণ করতে গেলে একই সিদ্ধান্ত ঘুরে ফিরে নিজের প্রমাণ হয়। ভুলের সংবাদ বাদ পড়ল অভ্রান্ততার বিশ্বাসে; সেই সংবাদ বাদ দেওয়ার ফল দেখিয়েই আবার অভ্রান্ততা প্রতিষ্ঠা করা হলো। যে বিশ্বাসের সত্যতা পরীক্ষা করার কথা, সেটিই যদি বিপরীত প্রমাণ বাদ দেওয়ার নিয়ম হয়, পরীক্ষায় ওই বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। এটি নতুন তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়; শুরুতে ধরে নেওয়া সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি।


হাদিসের গ্রেড নির্ধারণে সনদের নামের তালিকার বাইরেও বহু ধরনের মূল্যায়ন কাজ করে। রাবীর চরিত্র, স্মৃতি, মতবাদ, সমর্থক পথ, বিরোধী বর্ণনা, মতনের অস্বাভাবিকতা এবং ফকিহের প্রয়োগ—সবই কোনো না কোনো স্তরে সিদ্ধান্তে প্রবেশ করে। কিন্তু এর চেয়েও গভীর সমস্যা দেখা দেয় যখন কোনো বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতার আগে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে ঠিক করে রাখা হয়—কোন ঘটনা সত্য হলেও সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না, কারণ সেটি প্রতিষ্ঠিত আকিদার সঙ্গে খাপ খায় না। তখন সনদ আর একমাত্র বিচারক নয়; মতনের অনুমোদিত সীমাও আগে থেকেই নির্ধারিত।

কোনো বক্তব্য বাস্তব তথ্যের বিরোধী হলে সেই তথ্য দেখিয়ে আপত্তি করা যায়। যুক্তিগতভাবে অসম্ভব হলে সাক্ষীর সংখ্যা বাড়িয়েও তা সত্য করা যায় না। একই সময়ে একই অর্থে একটি বস্তু আছে এবং নেই—এমন দাবি একশ বিশ্বস্ত মানুষ করলেও বিরোধ দূর হয় না। কিন্তু “অসম্ভব” বলার ভিত্তিটিও পরীক্ষা করতে হয়। প্রতিষ্ঠিত সময়ের পরে জন্মানো ব্যক্তিকে কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলা এক ধরনের অসংগতি। নবী এমন কাজ করতে পারেন না বলে সংবাদ বাতিল করা আরেক ধরনের আপত্তি, যার ভিত্তি ধর্মীয় বিশ্বাস। স্বাধীনভাবে জানা তথ্যের সঙ্গে অমিল এবং নিজের আকিদার সঙ্গে অমিল এক মানদণ্ড নয়। দুটিকে এক করে দিলে ইতিহাসের প্রমাণ দিয়ে বিশ্বাস যাচাইয়ের বদলে বিশ্বাস দিয়েই ইতিহাসের সম্ভাব্য উত্তর আগেই বেঁধে দেওয়া হয়।


মতন দিয়েই “জাল”

ইবনুল জাওজির নামে হাদিসশাস্ত্রে একটি বিখ্যাত নীতি সংরক্ষিত হয়েছে: কোনো বর্ণনা সুস্পষ্ট যুক্তির বিরোধী, প্রতিষ্ঠিত বর্ণিত উৎসের বিরোধী অথবা মৌলিক নীতির বিরোধী হলে সেটি জাল বলে জানা যাবে। সুয়ূতী তাদরীবুর রাবী-তে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। আরও কঠোর ভাষায় ইবনুল জাওজি এমন অসম্ভব বর্ণনার ক্ষেত্রে বলেছেন—রাবীদের অবস্থাও পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই; বিশ্বস্ত লোকেরাও অসম্ভব কোনো ঘটনা বর্ণনা করলে তাদের বিশ্বস্ততা সেই অসম্ভবতাকে সম্ভব করে না। [190]

মূল আরবি—ইবনুল জাওজির নামে সংরক্ষিত নীতি:
إذا رأيت الحديث يباين المعقول أو يخالف المنقول أو يناقض الأصول فاعلم أنه موضوع.
বাংলা অনুবাদ:
“যখন তুমি কোনো হাদিসকে যুক্তিবোধের বিরোধী, প্রতিষ্ঠিত বর্ণিত উৎসের বিপরীত অথবা মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক দেখবে, তখন জেনে রাখো সেটি জাল।”

আরেক আলোচনায় ইবনুল জাওজির যুক্তি আরও স্পষ্ট: বহু সিকাহ ব্যক্তি মিলেও যদি এমন কিছুর সংবাদ দেন যা সত্যিই অসম্ভব, তাঁদের সিকাহ হওয়া সেই সংবাদকে রক্ষা করতে পারে না; বরং তাঁদের ভুল হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ সনদের বিশ্বাসযোগ্যতা মতনের ওপর কোনো সর্বময় ভেটো নয়। মতন স্বাধীনভাবে অসম্ভব প্রমাণিত হলে সিকাহ রাবীর দীর্ঘ শৃঙ্খলও বর্ণনাটিকে সত্য করতে পারে না। [191]

কোনো বর্ণনাকে জাল বলার পেছনে সবসময় জালকারীর স্বীকারোক্তি থাকে না। কখনো বক্তব্যে এমন সময়গত ভুল, অসম্ভবতা বা অন্য গুরুতর সমস্যা ধরা হয়েছে যে সমালোচক সেটিকে তৈরি কথা বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আল-ইরাকির আগের বক্তব্যেও শুধু সনদে মিথ্যাবাদী পাওয়া এবং নির্দিষ্ট কথাটি তাঁর বানানো প্রমাণ করার পার্থক্য আছে। “জাল” রায়টিও তাই কী প্রমাণে দেওয়া হয়েছে, তা জানতে হয়। হাতে পাওয়া সরাসরি প্রতারণার প্রমাণ, অন্য পাঠ থেকে নকলের চিহ্ন এবং কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে অমিল—এসব একই শক্তির কারণ নয়। যেখানে রায়টি বক্তব্য দেখে করা অনুমান, সেখানে তার যুক্তি পরীক্ষা করা যায়; শব্দটির কঠোরতা অনুমানকে সরাসরি প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যে বদলে দেয় না।


মতাদর্শ ও ক্ষমতার স্বার্থে হাদিস বানানোর স্বীকৃত নজির

হাদিসের বিকৃতি শুধু ভুল স্মৃতি, বিচ্ছিন্ন সনদ বা অসাবধান বর্ণনাকারীর সমস্যা ছিল না। ক্লাসিক্যাল হাদিসশাস্ত্র নিজেই ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির বিভিন্ন উদ্দেশ্য তালিকাভুক্ত করেছে। আল-সাখাওয়ির ফাতহুল মুগিস-এ ইবন আবি হাতিমের আল-জারহ ওয়াত-তাদিল-এর ভূমিকা থেকে একজন তওবাকারী খারিজি শায়খের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে: তাঁরা কোনো মত পছন্দ করলে সেটিকেই হাদিসে পরিণত করতেন। একই আলোচনায় মতবাদকে শক্তিশালী করা, মানুষকে নির্দিষ্ট আকিদায় টেনে নেওয়া এবং শাসক-আমিরদের কাজ ও মতের পক্ষে বর্ণনা বানানো—এসবকে হাদিস জাল করার পরিচিত উদ্দেশ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। [192]

মূল আরবি—আল-সাখাওয়ি, ফাতহুল মুগিস:
وقد روى ابن أبي حاتم في مقدمة كتاب ( الجرح والتعديل ) عن شيخ من الخوارج أنه كان يقول بعدما تاب : انظروا عمن تأخذون دينكم ، فإنا كنا إذا هوينا أمرا صيرناه حديثا ، زاد غيره في رواية : ونحتسب الخير في إضلالكم . وكذا قال محرز أبو رجاء ، وكان يرى القدر فتاب منه : لا ترووا عن أحد من أهل القدر شيئا ، فوالله لقد كنا نضع الأحاديث ، ندخل بها الناس في القدر ، نحتسب بها إلى غير ذلك . بل قال الشافعي – كما سيأتي في معرفة من تقبل روايته – : ما في أهل الأهواء أشهد بالزور من الرافضة . وصنف يتقربون لبعض الخلفاء والأمراء بوضع ما يوافق فعلهم وآراءهم ; ليكون كالعذر لهم فيما أتوه وأرادوه ; كغياث بن إبراهيم النخعي ; حيث وضع للمهدي محمد بن المنصور عبد الله العباسي والد هارون الرشيد في حديث : لا سبق إلا في نصل أو خف ، فزاد فيه : ” أو جناح ” . وكان المهدي إذ ذاك يلعب بالحمام ، فأمر له ببدرة يعني عشرة آلاف درهم ، فلما قفى قال : أشهد على قفاك أنه قفا كذاب ، ثم ترك الحمام ، وأمر بذبحها وقال : أنا حملته على ذلك ، ذكرها أبو خيثمة .

বাংলা অনুবাদ:
ইবন আবি হাতিম তাঁর আল-জারহ ওয়াত-তাদিল গ্রন্থের ভূমিকায় খারিজিদের এক প্রবীণ ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তওবা করার পরে সেই ব্যক্তি বলত: “কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করছ, তা দেখো। আমরা কোনো বিষয় কামনা করলেই সেটিকে হাদিস বানিয়ে ফেলতাম।” অন্য একটি বর্ণনায় অতিরিক্ত এসেছে: “তোমাদের পথভ্রষ্ট করার মধ্যেই আমরা সওয়াব আশা করতাম।” মুহরিজ আবু রাজাও একই কথা বলেছেন। তিনি আগে কদরিয়া মত পোষণ করতেন, পরে তা থেকে তওবা করেন। তিনি বলেন: “কদরিয়াদের কারও কাছ থেকে কোনো কিছু বর্ণনা করো না। আল্লাহর শপথ, আমরা হাদিস বানাতাম; সেগুলো দিয়ে মানুষকে কদরিয়া মতে প্রবেশ করাতাম এবং এর মধ্যে সওয়াব আশা করতাম।” এ ধরনের আরও বক্তব্য আছে। বরং শাফেয়ি বলেছেন—কার বর্ণনা গ্রহণ করা হবে, সে আলোচনায় যা পরে আসবে—“প্রবৃত্তিনির্ভর মতাবলম্বীদের মধ্যে রাফিজিদের চেয়ে বেশি মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা আর নেই।” আরেক শ্রেণি কিছু খলিফা ও আমিরের নৈকট্য লাভের জন্য তাঁদের কাজ ও মতের সঙ্গে মিলিয়ে হাদিস বানাত, যাতে তাঁদের কৃতকর্ম ও অভিপ্রায়ের পক্ষে অজুহাত তৈরি হয়। যেমন গিয়াস ইবন ইবরাহিম আন-নাখাঈ, যিনি হারুন আর-রশিদের পিতা, আব্বাসি খলিফা আল-মাহদি মুহাম্মদ ইবনুল মানসুর আবদুল্লাহর জন্য “তীর, উট ছাড়া বাজির পুরস্কার নেই” বর্ণনাটিতে “অথবা ডানা” কথাটি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আল-মাহদি তখন কবুতর নিয়ে খেলছিলেন। তিনি গিয়াসকে এক থলি—অর্থাৎ দশ হাজার দিরহাম—দেওয়ার নির্দেশ দেন। গিয়াস ফিরে গেলে তিনি বলেন, “আমি তোমার ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি, এটি একজন মিথ্যাবাদীর ঘাড়।” তারপর তিনি কবুতর ছেড়ে দেন, সেগুলো জবাই করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, “আমিই তাকে এই কাজে প্ররোচিত করেছি।” আবু খাইসামা ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।

নিজেদের মতকে নবীর কথা বানানো এবং শাসকের আচরণে ধর্মীয় বৈধতা দিতে হাদিস তৈরি করার নজির প্রাচীন হাদিসবিশারদদের গ্রন্থেই আছে। এই তথ্যের পরে কোনো বর্ণনার প্রচারে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক স্বার্থ ছিল কি না, তা জিজ্ঞেস করা প্রাসঙ্গিক। প্রথম কোথায় কথাটি দেখা যায়, কোন গোষ্ঠী বেশি প্রচার করেছে, ভাষা পরে কীভাবে বদলেছে এবং অন্য স্বাধীন ধারায় একই মূল খবর আছে কি না—এসব মিলিয়ে অনুসন্ধান এগোয়। কাহিনির বয়স, পাঠে পরিবর্তন এবং উৎসগুলোর সম্পর্কের সঙ্গে কার উপকার হয়েছে, সেই তথ্য মিলিয়ে উৎপত্তি ও প্রচারের স্বার্থ সম্পর্কে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত পাওয়া যেতে পারে। উদ্দেশ্য নির্ণয়ের জন্য জালকারীর নিজের মুখে স্বার্থের ঘোষণা পাওয়া একমাত্র উপায় নয়।


মাযহাবি পক্ষপাত

মানবিক বিচার যে শুধু তাত্ত্বিকভাবে পক্ষপাতের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল তা নয়; ক্লাসিক্যাল হাদিসবিশারদ ইবনুল জাওজি নিজেই এর বাস্তব অপব্যবহার নিয়ে কঠোর অভিযোগ করেছেন। তাঁর আত-তাহকীক ফি আহাদিসিল খিলাফ-এর ভূমিকায় তিনি একদল বড় মুহাদ্দিসকে সরাসরি অভিযুক্ত করেন: তাঁরা সহিহ ও দুর্বল বর্ণনা চিনতেন, এ বিষয়ে গ্রন্থও লিখেছেন; কিন্তু কোনো দুর্বল হাদিস তাঁদের মাযহাবের বিরোধী হলে তার দুর্বলতা প্রকাশ করতেন, আর একই ধরনের দুর্বল হাদিস নিজেদের মাযহাবের পক্ষে গেলে তার ত্রুটি নিয়ে নীরব থাকতেন। [193]

মূল আরবি—ইবনুল জাওজি:
وألوم عندي ممن قد لمته من الفقهاء: جماعة من كبار المحدثين عرفوا صحيح النقل وسقيمه، وصنفوا في ذلك، فإذا جاء حديث ضعيف يخالف مذهبهم بينوا وجه الطعن فيه، وإن كان موافقا لمذهبهم سكتوا عن الطعن فيه، وهذا ينبئ عن قلة دين، وغلبة هوى.
বাংলা অনুবাদ:
আমি যেসব ফকিহকে সমালোচনা করেছি, তাদের চেয়েও আমার কাছে অধিক নিন্দনীয় হলেন বড় মুহাদ্দিসদের একটি দল। তাঁরা সহিহ ও দুর্বল বর্ণনা চিনতেন এবং এ বিষয়ে গ্রন্থও রচনা করেছেন। কিন্তু কোনো দুর্বল হাদিস তাঁদের মাযহাবের বিরোধী হলে তার ত্রুটি প্রকাশ করতেন; আর তা তাঁদের মাযহাবের অনুকূলে হলে তার ত্রুটি সম্পর্কে নীরব থাকতেন। এটি ধর্মীয় সততার ঘাটতি ও প্রবৃত্তির আধিপত্য নির্দেশ করে।

অভিযোগকারী নিজেই একজন সুন্নি হাদিসবিশারদ এবং জাল হাদিস নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত ক্লাসিক্যাল রচনাগুলোর একজন লেখক। তাঁর অভিযোগের বিষয়ও অস্পষ্ট নয়: একই দুর্বলতার তথ্য মাযহাবের বিরুদ্ধে গেলে প্রকাশ করা হচ্ছে, পক্ষে গেলে চেপে যাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ উৎস-সমালোচনার সরঞ্জাম একই থাকলেও কোন ক্ষেত্রে সেই সরঞ্জাম প্রয়োগ করা হবে, তা ফলাফলের সুবিধা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।

ইবনুল জাওজির অভিযোগটি নির্দিষ্ট: নিজের মাযহাবের কাজে লাগলে কেউ কেউ জানা দুর্বলতাও চেপে গেছেন। এখানে সমালোচনার বিষয় মতভেদ থাকা নয়, একই ধরনের ত্রুটি সুবিধামতো প্রকাশ বা গোপন করা। একটি বর্ণনায় যে কারণে আপত্তি উঠেছে, পছন্দের অন্য বর্ণনায় একই কারণ থাকলে তা-ও আপত্তি হওয়ার কথা। না হলে ফল আগে ঠিক করে নিয়ম পরে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অসামঞ্জস্য পরীক্ষা করতে সমালোচকের একাধিক রায় পাশাপাশি দেখা দরকার। কোন ত্রুটি, কোন বর্ণনায়, কী যুক্তিতে সিদ্ধান্তমূলক হলো এবং কোথায় উপেক্ষিত হলো—এসব নির্দিষ্ট করলে পক্ষপাতের অভিযোগও প্রমাণে দাঁড়ায়। শুধু সমালোচকের খ্যাতি দেখিয়ে সেই তুলনা বন্ধ করলে তাঁর রায়ের ভুল ধরার পথই বন্ধ হয়।


ইবন আশুর ও দাউদ

মাযহাবি সুবিধাবাদ যেখানে বর্ণনার দুর্বলতা প্রকাশ বা গোপন করার নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে, ইবন আশুরের একটি বক্তব্য তার চেয়েও গভীর স্তর দেখায়। সূরা সাদের ২১–২৫ আয়াতে দাউদ, দুই বিবাদী, বিচার এবং তাঁর তওবার একটি সংক্ষিপ্ত ঘটনা এসেছে। এই আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তাফসির-ঐতিহ্যে দাউদ সম্পর্কে বিভিন্ন কাহিনি প্রচলিত হয়েছে; বাইবেলের দ্বিতীয় শমূয়েলেও দাউদকে ঘিরে গুরুতর নৈতিক অপরাধের একটি কাহিনি আছে। ইবন আশুর সেই কাহিনিকে কোরআনের বক্তব্য এবং নবীদের ইসমাহর সঙ্গে বিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্দিষ্ট বাইবেলীয় কাহিনি নয়; তিনি এরপর একটি সাধারণ নীতি ঘোষণা করেন। [194]

মূল আরবি—ইবন আশুর:
والذي في القرآن هو الحق، والمنتظم مع المعتاد وهو المهيمن عليه، ولو حكي ذلك بخبر آحاد في المسلمين لوجب رده والجزم بوضعه لمعارضته المقطوع به من عصمة الأنبياء من الكبائر عند جميع أهل السنة ومن الصغائر عند المحققين منهم وهو المختار.
বাংলা অনুবাদ:
কোরআনে যা আছে সেটিই সত্য এবং স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; কোরআনই এর ওপর কর্তৃত্বশীল। এমন কাহিনি মুসলিমদের মধ্যেই যদি খবরুল ওয়াহিদ হিসেবে বর্ণিত হতো, তবুও তা প্রত্যাখ্যান করা এবং নিশ্চিতভাবে জাল বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া আবশ্যক হতো; কারণ সেটি নবীদের কবিরা গুনাহ থেকে নিষ্পাপ হওয়ার নিশ্চিত নীতির বিরোধী—যে বিষয়ে সকল আহলুস সুন্নাহ একমত। আর মুহাক্কিকদের মতে তাঁরা সগিরা গুনাহ থেকেও নিষ্পাপ; এটিই নির্বাচিত মত।

ইবন আশুর এখানে কোনো নির্দিষ্ট মুসলিম সনদের ভুল ধরেছেন—এমন দাবি করছেন না। তিনি আরও শক্ত একটি কাল্পনিক অবস্থাও গ্রহণ করে দেখাচ্ছেন: দাউদের এই কাহিনি মুসলিমদের মধ্যে একক বর্ণনা হিসেবে এলেও জাল বলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। কারণ কথাটির অর্থ নবীদের ইসমাহ, অর্থাৎ গৃহীত ভুল বা অপরাধমুক্ততার ধারণার বিরোধী। এখানে সনদের দুর্বলতা ঘোষণার আগেই বিষয়বস্তু কী হতে পারবে না, তার ধর্মীয় সীমা বসানো হয়েছে। ফলে কাহিনিটি কোন প্রাচীন উৎসে আছে এবং কীভাবে প্রচলিত হয়েছে—সেই প্রশ্নের পাশাপাশি দেখতে হয় প্রত্যাখ্যানের কারণ ঘটনার বিরুদ্ধে স্বাধীন প্রমাণ, নাকি নবী সম্পর্কে আগে সত্য ধরে নেওয়া আদর্শচিত্র।

এখানে “জাল” শব্দের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি শুধু বলছেন না—“আমি এর ওপর আকিদা নির্মাণ করব না”, “এটি খবরুল ওয়াহিদ, তাই নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না” অথবা “আমি কোরআনের ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেব।” তাঁর ভাষা الجزم بوضعه—“এর জাল হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত।” অর্থাৎ একটি বর্ণনা বাস্তবে কে বানিয়েছে তার প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়াই, মতনের সঙ্গে একটি ধর্মতাত্ত্বিক নীতির সংঘর্ষ থেকে জালিয়াতির চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত যাওয়া হচ্ছে।


ধর্মতাত্ত্বিক ছাঁকনি

এখানে ইবনুল জাওজির সাধারণ নীতি এবং ইবন আশুরের প্রয়োগ পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি পরিষ্কার হয়। যুক্তিগত অসম্ভবতা সত্যিই স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সনদ দিয়ে তাকে সম্ভব করা যায় না। কয়েকশ সিকাহ রাবীও যদি বলে একই সময়ে একটি জিনিস একই অর্থে অস্তিত্বশীল এবং অনস্তিত্বশীল ছিল, প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু “নবী এমন বড় গুনাহ করতেই পারেন না” যুক্তিগত স্ববিরোধ নয়; এটি নবুয়ত সম্পর্কে একটি ধর্মতাত্ত্বিক নীতি। ইবন আশুর সেই নীতিকে এতটাই নিশ্চিত ধরে নিচ্ছেন যে তার বিপরীত সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সংবাদকে সনদের সম্ভাব্য শক্তি বিবেচনার আগেই জাল বলে দিতে প্রস্তুত।

দাউদ সম্পর্কে প্রাথমিক বিবরণগুলোর বয়স, পারস্পরিক সম্পর্ক, পাঠের পরিবর্তন ও প্রচারের কারণ পরীক্ষা করে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে। ইবন আশুরের ঘোষিত নিয়মে তার আগেই একটি দরজা বন্ধ: নবী ওই ধরনের নৈতিক অপরাধ করতে পারেন না, তাই এমন সংবাদ সত্য হতে পারবে না। এরপর যত সূত্রই পাওয়া যাক, সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ওই বিশ্বাসের সঙ্গে মিলেই স্থির হবে। তখন নবীর অভ্রান্ততা প্রমাণ দিয়ে পরীক্ষার বিষয় থাকছে না; কোন প্রমাণ গ্রহণ করা যাবে তার নিয়ম হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাসটি সত্য কি না, সেই প্রশ্নে বিপরীত খবরের কোনো ভূমিকা না থাকলে এই বাছাইকে স্বাধীন ঐতিহাসিক যাচাই বলা যায় না।

এই কাঠামো গারানিকের আলোচনায় দেখা পদ্ধতির আরও পরিষ্কার রূপ। সেখানে ইবন হাজার বহু ও বিচিত্র বর্ণনাপথ দেখে বলেছিলেন কাহিনিটির একটি ভিত্তি আছে; তারপর ইসমাহর কারণে আপত্তিকর অংশের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ অসম্ভব বলেছেন। ইবন আশুর তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে নীতিটি নগ্ন করে দিয়েছেন: ইসমাহর নিশ্চিত বিশ্বাসের বিপরীত খবর এলে সেটি শুধু তাওয়িল নয়, প্রত্যাখ্যান এবং জাল ঘোষণারও যোগ্য। ফলে ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস শুধু মতনের অর্থ বদলাতে পারে না; কোন বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী থাকবে, সেটিও নির্ধারণ করতে পারে।


“নিশ্চিত” ইসমাহ

ইবন আশুর যে নীতিকে “নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত” বলেছেন, তার পরিধিও মতভেদমুক্ত নয়। নবীরা কোন ভুল থেকে মুক্ত, নবুয়তের আগে বা পরে ছোট গুনাহ করতে পারেন কি না, সিদ্ধান্তে ভুল বা বিস্মৃতি হতে পারে কি না—এসব নিয়ে কালাম ও তাফসিরে আলোচনা আছে। তাঁর নিজের ভাষাতেও পার্থক্যটি ধরা পড়ে: বড় গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার মতকে তিনি সব আহলুস সুন্নাহর মত বলেছেন, কিন্তু ছোট গুনাহ থেকেও মুক্ত থাকার অবস্থানকে বিশেষজ্ঞদের মত ও নিজের নির্বাচিত মত বলেছেন। ফলে কোন ধরনের সংবাদ নবীতত্ত্বের বিরোধী বলে বাদ যাবে, সেই সীমাও ব্যাখ্যাকারীর নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে। এই নির্বাচিত সীমাকে সব ঐতিহাসিক খবরের অবিতর্কিত পরীক্ষাপাথর হিসেবে ব্যবহার করলে নীতিটির নিজের মতভেদের ইতিহাস ঢাকা পড়ে।

এর ফল সরাসরি। এক আলেম যদি মনে করেন নবী নির্দিষ্ট ধরনের ছোট ভুল করতে পারেন, সংশ্লিষ্ট বর্ণনা তাঁর কাছে মতনগতভাবে সম্ভব থেকে যাবে; অন্য আলেম যদি মনে করেন এমন ভুলও ইসমাহর বিরোধী, একই বর্ণনার সামনে তাঁর প্রাথমিক অবস্থানই বদলে যাবে। সনদ তখনও একই। অতীতও একই। বদলেছে কোন ধরনের ঘটনা ধর্মতাত্ত্বিকভাবে অনুমোদিত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ রাবীর আগে কখনো আকিদাই সম্ভাব্যতা বাছাইয়ের ছাঁকনি হিসেবে কাজ করছে।

আর যদি ইসমাহর সেই “নিশ্চিত” ধারণার ঐতিহাসিক ছবি নির্মাণে আবার একই বাছাই করা হাদিস ও তাফসির-ঐতিহ্য ব্যবহার করা হয়, তখন বিপরীত প্রমাণ থেকেও নিজের পূর্বধারণাকে সুরক্ষিত রাখার একটি ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি স্পষ্ট। প্রথমে বলা হয় নবী এমন কাজ করতে পারেন না; তাই এমন কাজের বর্ণনা জাল বা তাওয়িলযোগ্য। এরপর সেই বর্ণনাগুলো সরিয়ে রেখে অবশিষ্ট বর্ণনাসংগ্রহ দেখিয়ে বলা হয়—দেখো, নবী তো এমন কাজ করেননি। যে প্রমাণ বিপরীত সিদ্ধান্ত দিতে পারত তাকে পূর্বধারণার বিরোধী বলে আগে বাদ দিলে, পরে ছেঁকে রাখা বর্ণনাসংগ্রহ দিয়ে পূর্বধারণা প্রমাণ করা স্বাধীন নিশ্চিতকরণ নয়।


বিচারকের বিশ্বাস

সনদ যাচাইয়ের মতো বক্তব্য যাচাইয়ের নিয়মও প্রমাণসাপেক্ষ। একটি কথার সময়-স্থান প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সঙ্গে মেলে না, সরাসরি পর্যবেক্ষণে ভুল ধরা পড়ে বা বক্তব্যটি নিজের মধ্যেই পরস্পরবিরোধী—এসব আপত্তি নির্দিষ্ট করে দেখানো যায়। “আমার মাযহাব বা নবী সম্পর্কে গৃহীত ধারণার সঙ্গে মেলে না”—এ আপত্তির ভিত্তি অন্য। দ্বিতীয়টিকে প্রথমটির মতো স্বাধীন সত্যযাচাই বলে উপস্থাপন করলে ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে ইতিহাসের প্রমাণের জায়গায় বসানো হয়। কথাটি বাতিল করার কারণ এবং সেই কারণটি নিজে কতটা প্রতিষ্ঠিত—দুটিই পরীক্ষা করতে হয়। সনদ ভালো বলে সব বক্তব্য সত্য হয় না; বক্তব্য অস্বস্তিকর বলে তা মিথ্যাও হয় না।

ইবনুল জাওজির অভিযোগে মাযহাবের সুবিধার জন্য জানা দুর্বলতা গোপন করার কথা আছে। ইবন আশুরের আলোচনায় নবীতত্ত্বের সঙ্গে না মিললে সম্ভাব্য মুসলিম একক বর্ণনাকেও জাল বলার নিয়ম আছে। প্রথমটিতে তথ্য চেপে যাওয়ার অভিযোগ, দ্বিতীয়টিতে গ্রহণের প্রকাশ্য ধর্মীয় শর্ত; দুটি ঘটনা আলাদা। তবু উভয় ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যায়, সিদ্ধান্তে প্রমাণের পাশাপাশি বিচারকের মাযহাব ও আকিদা কীভাবে কাজ করতে পারে। বিচারককে শুধু ভুলহীন শ্রেণিবিন্যাসকারী ধরে নিলে এই প্রভাব অদৃশ্য থাকে। কোন তথ্য তিনি প্রকাশ করেছেন, কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং কোন অর্থ আগেই অসম্ভব বলেছেন—এসব তাঁর রায় বোঝার প্রয়োজনীয় অংশ।

কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনাকে মুহাদ্দিসেরা জাল বলার কারণেই সেই রায়ের প্রমাণমূল্য নির্ধারিত হয়: কেন জাল বলেছেন? রাবী স্বীকার করেছে? কালগত অসম্ভবতা আছে? সনদের উৎসচুরি প্রমাণিত? অধিক প্রাচীন স্বাধীন বর্ণনা তার বিপরীত? নাকি মতনটি একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়? এই কারণগুলো একই প্রমাণশক্তির নয়। শুধু শেষ লেবেলটি তুলে ধরে কারণ গোপন করলে “মাওদু” শব্দটিও “জইফ”-এর মতো কর্তৃত্বের শর্টকাটে পরিণত হয়।

এই পর্যায়ে হাদিস-গ্রেডিংয়ের সমস্যাটি সম্পূর্ণ বৃত্তে ফিরে আসে। জইফ সবসময় মিথ্যা নয়; সহিহ সবসময় নিশ্চিত ইতিহাস নয়; সিকাহ রাবী ভুল করতে পারেন; সাহাবীর স্মৃতিও সংশোধিত হয়েছে; একই সনদ আধুনিক গ্রেডারের কাছে সহিহ ও জইফ হতে পারে; দুর্বল হাদিস আইন ও আকিদায় ব্যবহার হয়েছে; সহিহ হাদিসের প্রকাশ্য অর্থ ফিকহে পরিত্যক্ত হয়েছে; আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ধর্মতত্ত্বই ঠিক করেছে কোন বর্ণনা সত্য হওয়ার অনুমতি পাবে। অতএব গ্রেড ইতিহাসের বিকল্প নয়। গ্রেড নিজেই ইতিহাস-সমালোচনার একটি বস্তু—যার বিচারক, তথ্য, মানদণ্ড, মতবাদ এবং সম্ভাব্য পক্ষপাত সবই পরীক্ষা করতে হয়।


আধুনিক গ্রেডও স্থির নয়

আগের সমালোচকদের কাছে সব বই বা সব বর্ণনাপথ সমানভাবে পৌঁছায়নি; কোথাও মতভেদের কারণ এটি হতে পারে। কিন্তু আধুনিক গবেষকদের একই সনদ ও একই পূর্ববর্তী রায় দেখেও বিপরীত সিদ্ধান্ত দেওয়ার উদাহরণ আছে। আলবানী ও শুয়াইব আল-আরনাউতের আলোচিত তাহকিকে সেই বিরোধ দেখা যায়। তখন শুধু বই না পাওয়ার ব্যাখ্যা যথেষ্ট হয় না। কোন রাবী সম্পর্কে অল্প তথ্যকে যথেষ্ট ধরা হবে, কোন সমালোচকের আপত্তি বেশি গুরুত্ব পাবে এবং অন্য পথ কতটা সাহায্য করবে—এসবেও পার্থক্য থাকে। তথ্য হাতে পাওয়া এবং সেই তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া আলাদা ধাপ। একই তথ্য দিয়ে এক পক্ষ সহিহ আর অন্য পক্ষ দুর্বল বললে ঠিক কোন ধাপে যুক্তি আলাদা হয়েছে, সেটি দেখাতে হয়।


আবু দাউদ ২৪: হাসান-সহিহ না জইফ?

সুনান আবু দাউদের ২৪ নম্বর হাদিসে উমাইমা বিনতে রুকাইকার নামে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদের খাটের নিচে কাঠের একটি পাত্র থাকত এবং তিনি রাতে তাতে প্রস্রাব করতেন। সনদটি হলো: মুহাম্মদ ইবন ঈসা → হাজ্জাজ → ইবন জুরাইজ → হাকিমা বিনতে উমাইমা → তাঁর মা উমাইমা বিনতে রুকাইকা। এই একই বর্ণনাকে আলবানী “হাসান সহিহ” বলেছেন। [195]

মূল আরবি—সুনান আবু দাউদ:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عِيسَى، حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ حُكَيْمَةَ بِنْتِ أُمَيْمَةَ بِنْتِ رُقَيْقَةَ، عَنْ أُمِّهَا، أَنَّهَا قَالَتْ: كَانَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَدَحٌ مِنْ عَيْدَانٍ تَحْتَ سَرِيرِهِ يَبُولُ فِيهِ بِاللَّيْلِ.
বাংলা অনুবাদ:
উমাইমা বিনতে রুকাইকা বলেন: নবীর খাটের নিচে কাঠের একটি পাত্র ছিল; তিনি রাতে তাতে প্রস্রাব করতেন।
আলবানীর রায়: حسن صحيح — হাসান সহিহ।

কিন্তু শুয়াইব আল-আরনাউত একই আবু দাউদের একই সনদ পরীক্ষা করে রায় দেন: “إسناده ضعيف”—“এর সনদ দুর্বল।” তাঁর আপত্তির কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হাকিমা বিনতে উমাইমা। আরনাউতের বক্তব্য অনুযায়ী হাকিমা থেকে ইবন জুরাইজ ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেননি; ইবন হিব্বান ছাড়া তাঁকে নির্ভরযোগ্য ঘোষণা করার শক্ত ভিত্তি নেই; যাহাবি ও ইবন হাজার তাঁকে অজ্ঞাত বা অপরিচিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সনদের অন্য রাবীরা নির্ভরযোগ্য হলেও হাকিমার অবস্থাই তাঁর কাছে পুরো সনদকে দুর্বল করেছে। পুরনো রিজাল-তথ্যেও এই সমস্যাটি স্পষ্ট। [196] [197]

এখানে আলবানী ও আরনাউতের সামনে দুইটি আলাদা অতীত ছিল না। বর্ণিত ঘটনাও একই, সনদও একই, কেন্দ্রীয় রাবীও একই। বিরোধটি হলো হাকিমাকে কতটা গ্রহণযোগ্য ধরা হবে। ইবন হিব্বান তাঁকে বিশ্বস্তদের তালিকায় রেখেছেন; ইবন হাজারের সংক্ষিপ্ত রায় “তাঁকে চেনা যায় না”; ইবনুল কাত্তান বলেছেন, হাদিসটির সহিহত্ব হাকিমার অবস্থা জানা থাকার ওপর নির্ভর করে, অথচ তাঁর অবস্থা প্রতিষ্ঠিত নয়। [198]

উম্মে হাকিমের পরিচয় সম্পর্কে পাওয়া তথ্যকে একজন সমালোচক গ্রহণের জন্য যথেষ্ট মনে করেছেন, অন্যজন করেননি। এই বিচার থেকেই একই বর্ণনা এক তাহকিকে গ্রহণযোগ্য, অন্য তাহকিকে দুর্বল হয়েছে। রাবীর পরিচয় বা রাতের ঘটনার জন্য এখানে নতুন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হাজির করা হয়নি; পুরোনো তথ্যের যথেষ্টতা নিয়ে বিরোধ আছে। আলবানীর রায় দেখানো অ্যাপে গ্রহণযোগ্য লেখা থাকবে, আর আরনাউতের সম্পাদনা দেখলে একই পাঠক দুর্বল রায় পাবেন। তখন শুধু দুই শ্রেণির একটি বেছে নিলেই যুক্তি পাওয়া যায় না। রাবীর পরিচয় সম্পর্কে কী জানা আছে এবং সেই তথ্য কেন যথেষ্ট বা অপর্যাপ্ত—সেই প্রশ্নে ফিরতে হয়। অর্থাৎ রাবীদের বিচার গ্রহণ করার আগে কখনো বিচারকদের যুক্তিও বিচার করতে হয়।


কোরবানির হাদিস: নবীর না সাহাবীর?

আরও জটিল উদাহরণ আবু হুরায়রার নামে বর্ণিত: “যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।” এখানে মতভেদ শুধু সহিহ–জইফের মাঝখানে থামেনি; বর্ণনাটি আদৌ মুহাম্মদের বক্তব্য কি না, সেটিই বিতর্কিত হয়েছে। হাকিম মারফু—অর্থাৎ মুহাম্মদের বক্তব্য—রূপকে সহিহ বলেছেন এবং যাহাবি তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন। আলবানী সহিহ আল-জামি-তে এটিকে সহিহ বলেছেন এবং অন্যত্র হাসান বলেছেন। অন্যদিকে আহমদ ইবন হাম্বল বর্ণনাটিকে মুনকার বলেছেন; আরনাউত সনদ দুর্বল বলেছেন; বাইহাকি, তাহাবি, ইবন আবদুল বার এবং ইবন হাজার মওকুফ—অর্থাৎ আবু হুরায়রার নিজের বক্তব্য হিসেবে থেমে যাওয়া—রূপকে অধিক শক্তিশালী মনে করেছেন। [199]

বর্ণনার মূল বক্তব্য:
مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا.
বাংলা অনুবাদ:
“যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।”

এই বর্ণনায় বিরোধটি শুধু সহিহ না দুর্বল তা নিয়ে নয়; কথাটি কার, তা নিয়েও। হাকিম ও যাহাবির গ্রহণ করা রূপে তা মুহাম্মদের বক্তব্য। মওকুফ রূপকে শক্তিশালী বললে তা আবু হুরায়রার নিজের কথা। মওকুফ বলতে সাহাবীর কাছে থেমে যাওয়া বক্তব্য বোঝায়; মারফু বলতে মুহাম্মদের নামে উত্থাপিত বক্তব্য। নবী একটি নির্দেশ দিয়েছেন এবং একজন সাহাবী নিজের মত দিয়েছেন—দুটি আলাদা ঘটনা, আইনগত কর্তৃত্বও আলাদা। একই বাক্যের শব্দ মোটামুটি টিকে থাকলেও বক্তার পরিচয় বদলে গেলে ইতিহাস বদলে যায়। এখানে তাই পছন্দের গ্রেড দেখানোর আগে কোন উৎসে কোন রূপ আছে এবং কেন একটিকে অন্যটির চেয়ে শক্তিশালী বলা হচ্ছে, তা পরীক্ষা করতে হয়।

এই বিরোধ মেটানোর জন্য হাকিমের সহিহ, আহমদের মুনকার এবং আধুনিক দুই গবেষকের বিপরীত রায়ের কারণ পাশাপাশি দেখতে হয়। কার কাছে কোন পথ বেশি নির্ভরযোগ্য, কোথায় কথাটি মুহাম্মদের নামে এসেছে এবং কোথায় আবু হুরায়রার কাছে থেমেছে—এসব তথ্য সিদ্ধান্ত বদলায়। তুলনায় কোনো রায়ের ভুল বা পক্ষপাত ধরা পড়লে সমালোচকের মর্যাদা সেই রায়কে রক্ষা করে না। শ্রেণির নামটি সিদ্ধান্তের সংক্ষিপ্ত ফল; কোন যুক্তিতে সেই ফল এসেছে, তা তার সঙ্গে দিতে হয়। মারফু না মওকুফ—এ প্রশ্নের উত্তর স্থির হওয়ার আগে বাক্যটির ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ঐতিহাসিক উৎসও অনির্ধারিত থাকে।


মুনযিরি–আলবানী–আরনাউত

“আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর কাছ থেকে তওবা আড়াল করে রেখেছেন”—এই বর্ণনাতেও আধুনিক গ্রেডের একই পরিবর্তন দেখা যায়। বর্ণনাটি ইসহাকের মুসনাদ, তাবারানির আল-আওসাত এবং বাইহাকির শুআবুল ঈমান-এ এসেছে। হাইসামি সংশ্লিষ্ট সনদের রাবীদের ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন; মুনযিরি বর্ণনাটিকে হাসান বলেছেন; আলবানী সহিহ বলেছেন; আর শুয়াইব আল-আরনাউত জইফ বলেছেন। [200]

মূল আরবি:
إِنَّ اللَّهَ حَجَبَ التَّوْبَةَ عَنْ صَاحِبِ كُلِّ بِدْعَةٍ.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর কাছ থেকে তওবা আড়াল করে রেখেছেন।”

সংরক্ষিত মূল্যায়ন:
মুনযিরি — হাসান
আলবানী — সহিহ
শুয়াইব আল-আরনাউত — জইফ

আলবানী ও আরনাউতের মতো আধুনিক গবেষকদের হাতে পুরোনো রিজালগ্রন্থ, বিভিন্ন সনদ ও বিস্তৃত অনুসন্ধানসাহিত্য ছিল। সব উপকরণ একরকম ছিল ধরে নিতে হয় না; কিন্তু আলোচিত একই সনদ ও মূল্যায়নের তথ্য নিয়ে তাঁদের বিরোধ তথ্য সংগ্রহের পরও বিচার বাকি থাকার উদাহরণ। একজন পুরোনো সমালোচকের আপত্তিকে কতটা গুরুত্ব দেবেন, কার প্রশংসা যথেষ্ট মনে করবেন এবং অন্য দুর্বল পথকে সহায়তা হিসেবে নেবেন কি না—এই নির্বাচন রায় বদলাতে পারে। বইয়ের সংখ্যা বাড়লেই বিচার এক হয়ে যায় না। তাই আধুনিক গবেষকের নাম বা বিপুল কাজের পরিমাণ তাঁর নির্দিষ্ট রায় ঠিক হওয়ার প্রমাণ নয়; বিরোধের জায়গাটিতে তাঁর যুক্তি ও ব্যবহৃত তথ্যই পরীক্ষা করতে হয়।


আধুনিক গ্রেডও ইজতিহাদ

ওয়েবসাইটে কোনো হাদিসের পাশে “সহিহ আলবানী” লেখা থাকলে সেটি মূল সংকলকের লেখা বলে ভুল বোঝা সহজ। বাস্তবে আলবানী বহু শতাব্দী পরে পুরোনো বই ও রাবীদের তথ্য পরীক্ষা করে রায় দিয়েছেন। আরনাউতের “সনদ দুর্বল” কথাটিও একইভাবে তাঁর সম্পাদনা ও মূল্যায়নের অংশ; আবু দাউদের নিজের বসানো লেবেল নয়। ফলে মূল বর্ণনা, পুরোনো সংকলকের মন্তব্য এবং আধুনিক সম্পাদকের রায় আলাদা করে চেনা দরকার। বর্তমান পাতায় পাশাপাশি ছাপা হওয়া মানেই সব লেখা একই সময়ের বা একই লেখকের নয়। আধুনিক রায়ের উৎস ও সময় জানলে বোঝা যায়, সেটি ঘটনার সময়কার সাক্ষ্য নয়; আগে সংরক্ষিত তথ্যের ওপর পরে করা বিচার।

এ কারণেই একই ডিজিটাল যুগে একই হাদিস এক ওয়েবসাইটে “সহিহ”, অন্য তাহকিক-সংস্করণে “জইফ” দেখা যায়। একই বর্ণনার বিপরীত গ্রেড এসেছে রাবীর পরিচয় ও বর্ণনার আরোপ সম্পর্কে পৃথক সিদ্ধান্ত থেকে। গ্রেডের নামটি সিদ্ধান্তের কারণ নয়; কারণগুলোই সিদ্ধান্তের আসল ভিত্তি। আলবানী কেন হাকিমাকে গ্রহণ করেছেন, আরনাউত কেন তাঁকে যথেষ্ট পরিচিত মনে করেননি; হাকিম কেন মারফু কোরবানির হাদিস সহিহ বলেছেন, আর বাইহাকি কেন মওকুফকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন—এই যুক্তিগুলো না দেখে শুধু শেষ লেবেল উদ্ধৃত করা গবেষণা নয়।

কোনো হাদিসে শুধু “আলবানী জইফ বলেছেন” বা “আলবানী সহিহ বলেছেন” শুনলে জানা যায় তাঁর সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্তের কারণ নয়। অন্য গবেষকের রায়, আগের সমালোচকদের বক্তব্য, দুর্বলতার ধরন ও সমর্থক পথ জানতে হয়। কথাটি মুহাম্মদের, নাকি সাহাবীর—এমন বিরোধ থাকলে সেটিও আলাদা করে দেখা দরকার। প্রতিটি হাদিসে একই দীর্ঘ তর্ক প্রয়োজন হয় না; যেখানে বিপরীত রায় আছে, সেখানে বিরোধের সিদ্ধান্তমূলক কারণটি এড়িয়ে যাওয়া চলে না। সমালোচকের নাম প্রমাণ বিচার করার দরজা খুলতে পারে; তাঁর নামই প্রমাণের জায়গা নিতে পারে না। আধুনিক তাহকিকের সংরক্ষিত মতভেদ দেখায়, নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর মানুষের বিচার এখনো রায় বদলায়।

প্রাচীন মুহাদ্দিসদের মতভেদকে সময়ের দূরত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়; আধুনিক মুহাদ্দিসদের একই সনদে বিপরীত রায় সেই অজুহাতও কেড়ে নেয়। একই আবু দাউদ ২৪ আলবানীর কাছে হাসান-সহিহ, আরনাউতের কাছে জইফ; একই বিদআতের বর্ণনা মুনযিরির কাছে হাসান, আলবানীর কাছে সহিহ, আরনাউতের কাছে জইফ; কোরবানির একই বক্তব্য কারও কাছে নবীর সহিহ হাদিস, কারও কাছে মুনকার বা দুর্বল, আবার কারও কাছে আবু হুরায়রার নিজের কথা। অতীত একটিই ছিল; গ্রেড তার সরাসরি প্রতিলিপি নয়—গ্রেড হলো সেই অতীত সম্পর্কে সংরক্ষিত অসম্পূর্ণ প্রমাণের ওপর একজন সমালোচকের রায়।


আধুনিক ইতিহাসচর্চায় “সহিহ”

একজন মুহাদ্দিস সহিহ বলেছেন শুনে ইতিহাসবিদ জানতে চান, তিনি কোন তথ্য ও কোন নিয়ম ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন থাকে: যে সনদ দিয়ে খবরটি যাচাই করা হলো, সেই সনদটি নিজে কত পুরোনো ও কতটা যাচাইযোগ্য? আজ একটি বইয়ে দীর্ঘ নামের তালিকা আছে বলে প্রতিটি সংযোগ প্রথম দিন থেকেই একইভাবে সংরক্ষিত ছিল ধরে নেওয়া যায় না। পুরোনো বইয়ে তালিকাটি কী রূপে আছে, কোথায় প্রথম দেখা যায়, কোন নাম পরে পাওয়া যায় এবং ভাষার পরিবর্তনের সঙ্গে নামের পরিবর্তন মেলে কি না—এসব তুলনা করা হয়। রায়টি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু রায় তৈরির উপকরণগুলোও ইতিহাসের পরীক্ষার বিষয়। প্রাচীন মুহাদ্দিসেরাও সংযোগ ও পাঠের ত্রুটি বিচার করেছেন; আধুনিক গবেষণায় নির্দিষ্ট বর্ণনা ও তার সনদের সময়কাল নির্ণয় একটি প্রধান প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

আধুনিক গবেষকদের মধ্যেও একমত অবস্থান নেই। গোল্ডৎসিহার, শাখ্‌ট ও জুইনবোলের গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের সংশয়বাদী ব্যাখ্যা আছে; তাঁদের পদ্ধতিও সব ক্ষেত্রে এক নয়। মোটস্কি, শোলার ও গ্যোরকের মতো গবেষকেরা আবার বর্ণনাপথ ও পাঠ তুলনা করে কিছু উপাদান অনেক পুরোনো স্তর পর্যন্ত শনাক্ত করেছেন। এখানে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের কারণ শুধু গ্রন্থের নাম বা সহিহ রায় নয়। কোন কোন পাঠ একই পুরোনো উৎসে পৌঁছায়, কোন শাখা অন্যটির ওপর নির্ভর করে এবং কতদূর আগে যাওয়া যায়—সেটি দেখানোর চেষ্টা থাকে। পুরোনো উপাদান শনাক্ত করা এবং সেই উপাদানে বর্ণিত ঘটনা সত্য প্রতিষ্ঠা করা আলাদা ফল। একটি বর্ণনা উরওয়া বা যুহরির সময়ে প্রচলিত ছিল বলে প্রতিষ্ঠিত হলে তার বয়স সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়; মুহাম্মদ পর্যন্ত প্রতিটি দাবি সত্য কি না, তা আরও পরীক্ষা চাইতে পারে। [201]


গ্রেড নয়, সনদটিও পরীক্ষার বস্তু

একটি সনদে মুহাম্মদ, সাহাবী, তাবিয়ি ও পরের রাবীদের নাম পরপর থাকতে পারে। আধুনিক উৎস-সমালোচনায় এই পুরো তালিকাকে একসঙ্গে একই সময়ের নথি ধরে নেওয়া হয় না। পুরোনো ও পরের বইয়ে কোথায় একই তালিকা পাওয়া যায়, কোথায় ছোট, কোথায় বড় এবং একই খবরের অন্য পাঠে নাম কীভাবে বদলেছে—এসব দেখা হয়। পুরোনো কোনো পাঠে নামটি অনুপস্থিত অথচ পরের পাঠে উপস্থিত হলে সেই পরিবর্তনটির কারণ খোঁজা হয়। একই শাখার অন্য পাঠ ও সময়ের তথ্য মিলিয়ে সংযোজনের ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা যায়। তালিকায় লেখা সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের পক্ষে স্বাধীনভাবে পাওয়া তথ্য আলাদা করে দেখা হয়। পাঠের ভাষা যদি সনদের দাবিকৃত শাখার সঙ্গে মেলে, তা পক্ষে তথ্য; না মিললে তার কারণ অনুসন্ধান করা হয়।

সনদ ও মতন একসঙ্গে বিশ্লেষণে প্রথমে একই খবরের যতটা সম্ভব পাঠ সংগ্রহ করা হয়। মতন হলো বর্ণনার বক্তব্যের অংশ। এরপর কে কার কাছ থেকে বলেছেন তার শাখাগুলো সাজিয়ে প্রতিটি শাখার ভাষা তুলনা করা হয়। ধরুন, একটি শিক্ষকের ছাত্রদের কাছে একটি বিশেষ বাক্য আছে, অন্য শিক্ষকের ছাত্রদের কাছে নেই। এই মিল থেকে বাক্যটির কোন ধারায় প্রচলন ছিল তা খোঁজার ভিত্তি পাওয়া যায়; কথাটি ঠিক কবে যোগ বা বাদ হয়েছে, তা জানতে আরও তুলনা লাগে। মোটস্কির আলোচিত পদ্ধতিতে এভাবেই নামের পথ ও ভাষার পথ মিলিয়ে পরীক্ষা করা হয়। একটি মূল কথা পুরোনো হলেও বর্তমান দীর্ঘ পাঠের সব অংশ একই বয়সের হবে, তা আগে থেকে ধরে নেওয়া হয় না। কোথায় কতদূর প্রতিষ্ঠা সম্ভব, সিদ্ধান্তে সেই সীমাও নির্দিষ্ট করা হয়। [202]


কমন লিংক: বর্ণনার ইতিহাস কোথা থেকে শক্তভাবে দৃশ্যমান?

একটি খবরের বহু সনদ আঁকলে কখনো দেখা যায়, সব পথ একটি নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে এসে মিলেছে। তাঁর আগে একটি সরু ধারা, তাঁর পরে অনেক ছাত্রের মাধ্যমে বিস্তার। এই শিক্ষককে সাধারণ সংযোগবিন্দু বলা হয়। শাখ্‌ট ও জুইনবোলের ব্যাখ্যায় অনেক ক্ষেত্রে এই জায়গাটি কথার উৎপত্তি বা আগের কর্তৃপক্ষের নামে চালানোর কেন্দ্র হয়েছে। মোটস্কি বলেন, এখান থেকেই বেশি ছড়িয়েছে বলে এখানেই বানানো হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তিনি পুরোনো কথা প্রথম বড় পরিসরে সংগ্রহ ও শেখানোর ব্যক্তিও হতে পারেন। প্রথম বড় প্রচারক আর প্রথম রচয়িতা একই ব্যক্তি কি না, তা প্রমাণের প্রশ্ন। শিক্ষকের নামে থাকা পাঠসমষ্টি ও তাঁর দাবিকৃত উৎস পরীক্ষা করেই দুই ব্যাখ্যার মধ্যে বিচার করতে হয়।

একজন শিক্ষকের পাঁচজন ছাত্রের আলাদা পাঠ পাওয়া গেলে অন্তত তাঁর শিক্ষার বিস্তার তুলনা করার সুযোগ থাকে। কিন্তু ওই শিক্ষক আগের কারও কাছ থেকে নিয়েছেন বলে যে একটিমাত্র পথ আছে, সেটি একইভাবে পাঁচটি স্বাধীন ধারায় সমর্থিত হয়ে যায় না। পরের ছাত্ররা প্রত্যেকেই শিক্ষকের কাছ থেকেই পেয়েছেন। তাই তাঁর আগে থাকা নামগুলোর সংযোগের জন্য আলাদা তথ্য দরকার। যেখান থেকে বেশি স্বাধীন শাখা দেখা যাচ্ছে, তার প্রমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও আগের সরু পথের প্রমাণ হয়ে যায় না। শিক্ষক কথাটি তৈরি করেছেন—এ সিদ্ধান্তও শুধু এই চিত্র থেকে আসে না। চিত্রটি দেখায় কোন অংশ বেশি তুলনা করা যাচ্ছে এবং কোন অংশে প্রমাণ কম।

ফলে সনদের প্রথম নাম এবং গবেষণায় শনাক্ত করা সবচেয়ে পুরোনো স্তর আলাদা হতে পারে। তালিকা মুহাম্মদ পর্যন্ত গেলেও হাতে থাকা পাঠ, বর্ণনাকারীদের সম্পর্ক ও বিভিন্ন শহরে প্রচারের তথ্য হয়তো যুহরি বা অন্য কোনো পরের শিক্ষকের স্তর পর্যন্ত জোরালোভাবে পৌঁছায়। তাঁর আগের অংশের জন্য তখন আরও প্রমাণ প্রয়োজন থাকে। বইয়ে লেখা সবচেয়ে পুরোনো দাবি এবং তুলনা করে প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে পুরোনো তথ্য এক জিনিস নয়। এই পার্থক্য প্রকাশ করলে ঠিক কোন অংশ গ্রহণযোগ্য ভিত্তিতে দাঁড়াচ্ছে তা বোঝা যায়। প্রমাণ না পৌঁছানোকে মিথ্যা প্রমাণিত বলা যেমন ভুল, তেমনি পরের স্তরের শক্তি দিয়ে আগের সব সংযোগ নিশ্চিত বলা ভুল।


সনদ নবী পর্যন্ত গেলেও বর্ণনার প্রমাণযোগ্য বয়স কম হতে পারে

জোশুয়া লিটলের ২০২৪ সালের গবেষণায় আরবি লেখা শেখার উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি বর্ণনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব বর্ণনায় হিজাজের আরবি লেখার বিদ্যা ইরাকের হিরা থেকে এবং হিরার বিদ্যা আনবার থেকে আসার কথা আছে। সনদ, ভাষা, কাহিনির গঠন ও প্রচারের অঞ্চল তুলনা করে লিটল আলোচিত উপাদানের প্রাচীনতম শনাক্তযোগ্য রূপ অষ্টম শতকের মাঝামাঝির কুফায় স্থাপন করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে গল্পগুলোর গঠনে ইরাককে আরব ইতিহাসের কেন্দ্রে দেখানোর প্রবণতাও ধরা পড়ে। এখানে শুধু রাবী ভালো না খারাপ বলা হচ্ছে না; কার সমাজে, কোন সময়ে এবং কী ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে গল্পটি গড়ে উঠেছে, তা খোঁজা হচ্ছে। সনদ আরও পেছনের দাবি করলেও গবেষণায় শনাক্ত বয়স ও সেই দাবিকে আলাদা করতে হয়েছে। [203]

জোশুয়া লিটল, গবেষণার সারসংক্ষেপ

the creation and elaboration of an Iraq-focused Arabian folk history in eighth-century ce Iraq.

বাংলা অনুবাদ:

অষ্টম শতকের ইরাকে ইরাককে কেন্দ্র করে আরবের লোক-ইতিহাস তৈরি ও বিস্তৃত করা।

এই গবেষণায় আরবি লিপির উৎপত্তিসংক্রান্ত নির্দিষ্ট বর্ণনাগুলোর বয়স ও গঠনের ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। সনদে পুরোনো ব্যক্তির নাম থাকলেও কথাটির কোন রূপ কত আগে পাওয়া যায়, তা আলাদা করে দেখাতে হয়েছে। একইভাবে কাহিনি কোনো অঞ্চলের মর্যাদা বাড়ালে শুধু লাভবান হওয়ার তথ্য নয়, তার সঙ্গে সময় ও ভাষার প্রমাণ মিলিয়ে উৎপত্তির ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উৎসের নিজের দাবিকে প্রশ্ন করা মানে খেয়ালমতো বাতিল করা নয়; দাবিটিকে অন্যান্য উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা। কারও স্পষ্ট স্বীকারোক্তি ছাড়াও গল্পের গঠন ও প্রচারের ইতিহাস থেকে তার সামাজিক কাজ সম্পর্কে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।


মতনেরও বংশতালিকা আছে

একই হাদিসের বিভিন্ন পাঠে কোন অংশ সর্বত্র আছে এবং কোনটি শুধু একটি শাখায় আছে, তা খুঁজলে বক্তব্যের পরিবর্তনের ইতিহাস পাওয়া যেতে পারে। একটি ছোট মূল কথা পরে ব্যাখ্যা, ঘটনার বিবরণ বা নির্দিষ্ট বিধানের ভাষা পেয়ে বড় হতে পারে। আবার একটি দীর্ঘ কথাও কেউ সংক্ষেপ করে বলতে পারেন। তাই বড় পাঠ মানেই পরে যোগ করা বা ছোট পাঠ মানেই আগে বলা—এমন নিয়ম চলে না। কার কাছে কোন পাঠ আছে, তার বয়স কত এবং অন্য শাখার সঙ্গে সম্পর্ক কী—এসব মিলিয়ে বিচার করতে হয়। বক্তব্যেরও ইতিহাস আছে: আজ পাশাপাশি থাকা দুটি বাক্য একই সময়ে ও একই বক্তার কাছ থেকে এসেছে কি না, তা পরীক্ষা করা সম্ভব।

প্রাচীন হাদিসবিশারদেরাও বিভিন্ন পাঠ তুলনা করে নিজের ভাষায় বলা, বিশ্বস্ত রাবীর বাড়তি অংশ ও ব্যাখ্যা মিশে যাওয়ার সমস্যা শনাক্ত করেছেন। রাবীর নির্ভুলতার পাশাপাশি বক্তব্যের কোন অংশ কার কথা, সেটিও তাঁদের পরীক্ষার বিষয় ছিল। এখানে আধুনিক গবেষণার বিশেষ প্রশ্ন হলো, পাঠের পার্থক্য ও সনদের শাখা মিলিয়ে কোন পরিবর্তন কোন সময় ও কোন ধারায় ঘটেছে তা যতদূর সম্ভব শনাক্ত করা। কার বক্তব্য বলে পাঠটি এসেছে এবং তার প্রতিটি অংশ কত পুরোনো—দুটি সম্পর্কিত কিন্তু আলাদা প্রশ্ন। একটি অংশের উৎস ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাশের বাড়তি অংশটির জন্য আলাদা তুলনা দরকার হতে পারে।


বুখারি-মুসলিমের ক্যাননও ইতিহাসের ফল

বুখারি ও মুসলিমের সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদারও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইতিহাস আছে। জনাথন এ. সি. ব্রাউনের ২০০৪ সালের গবেষণায় দারাকুতনির সমালোচনা তার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। দারাকুতনি বই দুটিকে সম্মান করতেন, তবু কিছু বর্ণনার সনদ ও বাড়তি অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তাঁর মানদণ্ড কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই সংকলকের মানদণ্ডের চেয়েও কঠোর ছিল। ব্রাউনের বিশ্লেষণে এই সমালোচনায় দারাকুতনির নিজস্ব আইনগত বা ধর্মতাত্ত্বিক মতের দৃশ্যমান প্রভাব পাওয়া যায়নি; প্রধান বিরোধ ছিল বর্ণনাপদ্ধতি নিয়ে। সম্মান করা এবং নির্দিষ্ট ভুল সংশোধন করা তাঁর কাজে একসঙ্গে ছিল। ফলে আজকের “বইতে আছে, আর প্রশ্ন নয়” মনোভাবকে সব প্রাথমিক বিশেষজ্ঞের অবস্থান বলে ধরে নেওয়া যায় না। [204]

জনাথন এ. সি. ব্রাউন, গবেষণার সারসংক্ষেপ

sought to correct any imperfections he found in them.

বাংলা অনুবাদ:

বই দুটিতে যে ত্রুটি তিনি পেয়েছিলেন, তা সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন।

ব্রাউন আরও জানিয়েছেন, বুখারি ও মুসলিমের ব্যাপারে উম্মাহর অভ্রান্ত ঐকমত্যের সূত্র যখন প্রথম ঘোষণা করা হয়, তখন দারাকুতনির আপত্তিকৃত উপাদান সেই ঘোষণার বাইরে রাখা হয়েছিল। ফলে ঐকমত্যের কথাটিরও নির্দিষ্ট সীমা ছিল; তা সব সংরক্ষিত আপত্তি অদৃশ্য করেনি। পরে একটি বই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব পেলেও আগে তার নির্দিষ্ট বর্ণনা নিয়ে কী বিরোধ ছিল, সেই ইতিহাস থেকে যায়। শুধু বর্তমান মর্যাদা অতীতের ওপর চাপিয়ে দিলে বইটির গ্রহণ, সংশোধন ও ব্যাখ্যার প্রক্রিয়া বোঝা যায় না। প্রাচীন সমালোচকের যুক্তি ঠিক কি না, তা পরীক্ষা করা যাবে; তাঁর আপত্তি ছিলই না বা সম্মান করলে আপত্তি সম্ভব নয়—এমন অবস্থান দলিলের সঙ্গে মেলে না।


জইফও ইতিহাসে শূন্য নয়

একটি বর্ণনা মুহাম্মদ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত না হলেও তার পুরোনো প্রচলন অন্য প্রশ্নে তথ্য দিতে পারে। কোনো কাহিনি নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া গেলে অন্তত সেই সময়ের মানুষ কী বলত, কোন ধারণাকে নবীর নামে কর্তৃত্ব দিতে চাইত এবং গল্পের কোন রূপ তখন ছিল—এসব অনুসন্ধান করা যায়। এর জন্য পুরোনো পাঠ, স্বাধীন শাখা, প্রচারের অঞ্চল ও পরে যোগ হওয়া অংশ দেখতে হয়। ঘটনাটি সত্য কি না এবং কাহিনিটি কখন থেকে বলা হচ্ছে—এই দুই ইতিহাস এক নয়। দুর্বল সনদের উপাদান দ্বিতীয়টির প্রমাণ হতে পারে, কখনো অন্য স্বাধীন তথ্যের সঙ্গে মিলে প্রথমটির বিচারেও সাহায্য করে। তাই খবরটি আইন বা আকিদার দলিল হিসেবে গৃহীত হয়নি বলেই ইতিহাসের সব প্রশ্নে অকেজো হয় না।

আন্দ্রেয়াস গ্যোরকে ও গ্রেগর শোলারের ২০২৪ সালের The Earliest Writings on the Life of Muḥammad গ্রন্থে প্রাথমিক সূত্র ব্যবহার করার একটি নির্দিষ্ট চেষ্টা আছে। তাঁরা মুহাম্মদের জীবনের আটটি ঘটনা নিয়ে উরওয়া ইবনুয যুবাইরের নামে পাওয়া বর্ণনা পরীক্ষা করেছেন। সিদ্ধান্ত-অধ্যায়ের সারসংক্ষেপে কিছু উপাদান নিশ্চিতভাবে বা উচ্চ সম্ভাবনায় উরওয়া পর্যন্ত শনাক্ত করার কথা আছে। হালনাগাদ গবেষণা-পর্যালোচনায় তাঁরা গবেষণাক্ষেত্রের পরিবর্তনও বর্ণনা করেছেন: সামগ্রিক সংশয়বাদী ধারার অনুসারীর সংখ্যা কমেছে। এখানে পুরোনো উপাদান গ্রহণের ভিত্তি হলো নির্দিষ্ট বর্ণনাপথ ও পাঠের তুলনা। উরওয়া পর্যন্ত কোনো অংশ প্রতিষ্ঠিত হওয়া তার বয়স সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ফল; সেই অংশের প্রতিটি বিবরণ ঘটনার সময়কার সরাসরি সাক্ষ্য, তা আলাদা প্রশ্ন। [205]

গ্রন্থের সিদ্ধান্ত-অধ্যায়ে লেখকেরা কোন উপাদান উরওয়া পর্যন্ত নেওয়া যায় তার পাশাপাশি বর্ণনাপথের নির্ভরযোগ্যতা এবং পরে মুসা ইবন উকবা, ইবন ইসহাক, মা‘মার ও ওয়াকিদির রচনায় জীবনীধারার বিকাশ পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছেন। ফলে “প্রাচীন জীবনী আছে” বলার বদলে কোন অংশ কত পুরোনো এবং পরে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা নির্দিষ্ট করার চেষ্টা থাকে। এই নির্দিষ্টতা একটি শক্তিশালী উৎসের সঙ্গে দেরিতে যোগ হওয়া বিবরণকে একই বয়সের বলে গুনে ফেলার ভুল ঠেকায়। [206]

গ্যোরকে ও শোলার, সিদ্ধান্ত-অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

go back to ʿUrwa with certainty or with a high degree of probability.

বাংলা অনুবাদ:

নিশ্চিতভাবে অথবা উচ্চ মাত্রার সম্ভাবনায় উরওয়া পর্যন্ত পৌঁছায়।

এই ধরনের গবেষণায় ফল এক শব্দে সহিহ বা জইফ বলার চেয়ে বেশি নির্দিষ্ট হতে পারে। একটি পুরোনো মূল কথা শনাক্ত হলো, কিন্তু বাড়তি বিবরণ পরের শাখায় পাওয়া গেল; অথবা কথাটি একজন প্রাচীন শিক্ষকের কাছে পৌঁছাল, কিন্তু তাঁর আগের উৎসের জন্য যথেষ্ট তুলনা পাওয়া গেল না। তখন কোন অংশ প্রতিষ্ঠিত এবং কোন অংশ অনির্ধারিত, তা আলাদা করে বলা যায়। একটি জইফ খবরের পুরোনো প্রচলন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; একটি সহিহ খবরের বর্তমান পূর্ণ পাঠও বয়সের পরীক্ষায় একাধিক স্তর দেখাতে পারে। দুটিই নির্দিষ্ট প্রমাণের ফল হতে হবে। পুরোনো হওয়া মাত্র সত্য হওয়া নয়, আবার প্রচলিত গ্রেড দুর্বল হওয়া মাত্র সেই পুরোনো উপস্থিতিও অস্বীকার করা যায় না।


দুটি পদ্ধতির প্রশ্নই আলাদা

দুটি পদ্ধতির অনেক প্রশ্নে মিল আছে: রাবীর তথ্য, সংযোগ, পাঠভেদ ও শক্তিশালী বিরোধী বর্ণনা উভয় ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। পার্থক্য আসে অনুসন্ধানের লক্ষ্য ও গ্রহণের নিয়মে। ধর্মীয় বিধানের জন্য বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে কি না—এই প্রশ্নের সঙ্গে ইতিহাসবিদ জুড়ে দেন, বর্ণনাটি কোন সময়ের, কোন জায়গায় প্রচলিত, কোন অংশের পুরোনো সাক্ষ্য আছে এবং উৎসগুলো কতটা স্বাধীন। তিনি সনদের নামের তালিকাকেও সময়ের সঙ্গে তৈরি ও সংরক্ষিত তথ্য হিসেবে পরীক্ষা করেন। তাই একই উপাদান থেকে ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার রায় এবং ঐতিহাসিক বয়সের সিদ্ধান্ত আলাদা হতে পারে। যেখানে দুটির ফল মেলে, মিলের কারণ দেখানো যায়; যেখানে মেলে না, শুধু এক পদ্ধতির মর্যাদা দিয়ে অন্যটির প্রমাণের প্রশ্ন মেটানো যায় না।

ফলে একই বর্ণনা সম্পর্কে চারটি আলাদা সিদ্ধান্ত সম্ভব:

  • প্রচলিত হাদিসশাস্ত্রের মানদণ্ডে সহিহ, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে বর্ণনাটি মুহাম্মদের বক্তব্য কি না, তা অনিশ্চিত;
  • প্রচলিত হাদিসশাস্ত্রের মানদণ্ডে জইফ, কিন্তু বর্ণনার মূল অংশ যথেষ্ট প্রাচীন;
  • নবীর বক্তব্য হিসেবে অপ্রমাণিত, কিন্তু প্রথম যুগের কোনো গোষ্ঠীর বিশ্বাসের শক্ত ঐতিহাসিক সাক্ষ্য;
  • অথবা বর্ণনাপ্রবাহ ও মতন পরীক্ষা করে দেখা যায়, বর্ণনার উৎস এত পরবর্তী কালের এবং পাঠ এত অস্থির যে ঐতিহাসিক মূল্য প্রায় শূন্য।

এই চারটি অবস্থাকে “সহিহ” এবং “জইফ”—মাত্র দুটি বাক্সে আটকে দিলে ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হারিয়ে যায়। শরিয়তে প্রমাণ গ্রহণের ন্যূনতম শর্ত, প্রচলিত হাদিসশাস্ত্রে বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই এবং আধুনিক পদ্ধতিতে ইতিহাসের পুনর্গঠন একই কাজ করে না।

একটি খবর কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা বুঝতে তার বর্ণনাকারী, শব্দের ইতিহাস, প্রাচীন উপস্থিতি ও স্বাধীন সমর্থন একসঙ্গে দেখতে হয়। সহিহ রায় সেই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে; রায়টি নিজে ঘটনাকালের প্রত্যক্ষ নথি নয়। জইফ রায় কোন পথে প্রমাণ কম আছে তা জানাতে পারে; পুরো ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে না। একইভাবে কোনো বর্ণনা পরে তৈরি বলে শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু পুরোনো ব্যক্তির নাম সনদে আছে বলে তা রক্ষা করা যায় না। গ্রেডের মর্যাদা নয়, তার পেছনের প্রমাণ এবং বাইরে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলই গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি। বয়স, উৎস ও সত্যতার প্রশ্নে প্রত্যেকটির জন্য যতটা প্রমাণ আছে, সিদ্ধান্তের শক্তিও ততটাই।


উপসংহার

“জইফ” বলার অর্থ নির্দিষ্ট হাদিসি পরীক্ষায় বর্ণনাটি দুর্বল হয়েছে। কেন দুর্বল, তা জানলে তার প্রমাণের ঘাটতি বোঝা যায়। সেখান থেকে ঘটনাটি ঘটেনি বলতে হলে আরও ভিত্তি লাগে। “সহিহ” বলার অর্থ সেই পরীক্ষায় বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে; সেখান থেকেও প্রতিটি শব্দ হুবহু সংরক্ষিত, প্রতিটি ব্যাখ্যা ঠিক এবং প্রতিটি আইনগত প্রয়োগ চূড়ান্ত—সব একসঙ্গে আসে না। রায়টি যতটুকু বিচার করে, তার চেয়ে বেশি কাজ তার ওপর চাপালে যুক্তি ভেঙে পড়ে। সনদ, রাবী, অন্য পথের সমর্থন, বিরোধী পাঠ ও গোপন ত্রুটি নিয়ে প্রাচীন সূত্রের মতভেদেই এই সীমা দেখা যায়। অস্বস্তিকর ঘটনায় দুর্বলতাকে সর্বাত্মক অস্বীকার এবং সুবিধাজনক ঘটনায় গ্রহণযোগ্যতাকে অভ্রান্ত সত্য বানানো একই অতিরঞ্জনের দুই ব্যবহার।

সমস্যাটি শুরু হয় যখন এই কারিগরি গ্রেডগুলো গবেষণার উপকরণ না থেকে মতাদর্শিক অস্ত্রে পরিণত হয়। সুবিধাজনক কোনো বর্ণনা হলে শুধু “সহিহ” বলেই তার ওপর ধর্মতত্ত্ব, আইন ও ইতিহাস নির্মাণ করা হয়; অস্বস্তিকর কোনো বর্ণনা হলে “জইফ” শব্দটি উচ্চারণ করেই ধরে নেওয়া হয় ঘটনা কখনো ঘটেনি, কাহিনিটি কোনো প্রাথমিক মুসলিম সমাজে প্রচলিত ছিল না এবং এর আর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই। অথচ একই ঐতিহ্যে দুর্বল হাদিস ফিকহের যুক্তিতে প্রবেশ করেছে, দুর্বল মারফু বর্ণনার ওপর সাহাবি ও আলেমদের আমল টিকে আছে, দুর্বল হাদিস সম্পর্কে বলা হয়েছে “অর্থ সঠিক”, আবার সহিহ হাদিসের প্রকাশ্য নির্দেশকে নাসখ, তাওয়িল, তাখসিস অথবা মাযহাবি উসুলের কারণে অকার্যকর করা হয়েছে। যে পদ্ধতি নিজের সুবিধাজনক বর্ণনার ক্ষেত্রে এত নমনীয়, সেই পদ্ধতিকে শুধু অস্বস্তিকর ইতিহাসের সামনে হঠাৎ পরম ও যান্ত্রিক বানানো সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা নয়।

রাবীর নির্ভরযোগ্যতার ইতিহাসে একমাত্রিক পরিচয় কাজ করে না। স্মৃতি যাচাই হয়েছে অন্য বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে ও মানুষটির বিষয়ে সংরক্ষিত সাক্ষ্য দেখে। একই ব্যক্তির বিপরীত মূল্যায়ন আছে; একই সমালোচকের নামেও বিপরীত কথা আছে। হাফসের ক্ষেত্রে কোরআন-পাঠ ও হাদিসে পৃথক রায়, ইতিহাসে ব্যবহৃত রাবীর ক্ষেত্রে হাদিসি আপত্তি এবং আলবানী–আরনাউতের আধুনিক বিরোধ দেখায় নির্দিষ্ট কাজ ও নির্দিষ্ট তথ্যের বিচার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। “এই ব্যক্তি বিশ্বস্ত” বা “এই ব্যক্তি দুর্বল” বললে পরের প্রশ্ন থাকে—কোন ক্ষেত্রে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে? সে প্রশ্নের উত্তর বাদ দিলে একটি সাধারণ পরিচয় দিয়ে ব্যক্তির সব বক্তব্যের ভাগ্য স্থির করা হয়। সংরক্ষিত মূল্যায়নের কারণ পরীক্ষা করলেই কোথাও আস্থা বাড়ে, কোথাও তা ভাঙে।

সাহাবী স্তরে পৌঁছেও অনিশ্চয়তা শেষ হয় না। সহিহ সূত্রেই দেখা যায়, আবু হুরায়রা নিজের একটি ফতোয়া আয়িশা ও উম্মে সালামার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের পরে প্রত্যাহার করেছেন; তিনি স্বীকার করেছেন যে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যটি নবীর কাছ থেকে সরাসরি শোনেননি। উমর আবু মুসার নবী-বর্ণনার জন্য অতিরিক্ত সাক্ষ্য চেয়েছেন। ফাতিমা বিনতে কায়স সম্পর্কে উমর বলেছেন—তিনি মনে রেখেছেন না ভুলেছেন, তা জানা নেই। আয়িশা অন্য সাহাবীর বর্ণনাকে কোরআনের নীতি দিয়ে সংশোধন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান নিয়ে নবীর স্ত্রীগণ একই ঘটনা থেকে বিপরীত আইন বুঝেছেন; তামাত্তু নিয়ে উমর–ইবন উমর এবং উসমান–আলীর অবস্থান সরাসরি সংঘর্ষে গেছে। ফলে “সাহাবীরা আদিল” থেকে “সাহাবীদের প্রতিটি স্মৃতি ও ব্যাখ্যা অভ্রান্ত”—এই সিদ্ধান্ত বের করা হাদিসশাস্ত্র নয়; হাদিসশাস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত ধর্মতাত্ত্বিক দাবি চাপানো।

মতনের প্রশ্নে সমস্যাটি আরও গভীর। একই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য বর্ণনার অর্থ নিয়ে আলেমরা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; একই নবী-নির্দেশকে কেউ সাধারণ আইন, কেউ বিশেষ ব্যতিক্রম বলেছেন। ইসরা-মিরাজের মতো ইসলামের কেন্দ্রীয় অলৌকিক ঘটনার প্রকৃতি নিয়েও প্রাথমিক ঐতিহ্যে শরীরসহ যাত্রা, রূহের যাত্রা এবং দর্শনমূলক অভিজ্ঞতার ভিন্ন ব্যাখ্যা সংরক্ষিত হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের সম্পর্কেও একরৈখিক নিয়ম নেই: কখনো কোরআনের নীতি দিয়ে সাহাবীর হাদিস সংশোধন করা হয়েছে; কখনো হাদিস দিয়ে কোরআনের সাধারণ বিধান বিশেষায়িত, পুনর্ব্যাখ্যাত বা কার্যত প্রতিস্থাপিত হয়েছে। রজম, ওসিয়ত এবং নবীদের উত্তরাধিকারের মতো উদাহরণ দেখায়, কোন উৎস অন্য উৎসের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবে—সেটিও আবার মানুষের নির্মিত উসুলের প্রশ্ন।

এর পরে ধর্মতাত্ত্বিক ছাঁকনির বিষয়টি উপেক্ষা করা আরও কঠিন। গারানিকের কাহিনিতে বহু পথের কারণে একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি স্বীকার করার পরও ইসমাহর কারণে তার প্রকাশ্য অর্থ অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ইবন আশুর আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, নবীদের নিষ্পাপতার নিশ্চিত বিশ্বাসের বিরোধী কোনো খবরুল ওয়াহিদ এলে সেটিকে প্রত্যাখ্যান করে জাল বলেও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত। অন্যদিকে ইবনুল জাওজি নিজেই অভিযোগ করেছেন—কিছু বড় মুহাদ্দিস দুর্বল হাদিস নিজেদের মাযহাবের বিরুদ্ধে গেলে ত্রুটি প্রকাশ করেছেন, পক্ষে গেলে নীরব থেকেছেন। এই দলিলগুলোর পরে হাদিস-গ্রেডিংকে ধর্মতত্ত্ব, মাযহাব ও মানবিক পক্ষপাত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো নিরপেক্ষ যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিকভাবে অসত্য।

প্রমাণের পার্থক্য আছে বলেই কোনো বর্ণনা গ্রহণ, কোনোটি প্রত্যাখ্যান এবং কোনোটির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রাখা যায়। পুরোনো কয়েকটি সত্যিই স্বাধীন উৎসে একই মূল তথ্য পাওয়া এবং অনেক পরে একটিমাত্র দুর্বল সূত্রে খবর পাওয়া সমান ওজনের নয়। একইভাবে ভুলের নির্দিষ্ট ইতিহাস থাকা রাবী ও ভালো সংরক্ষণের পক্ষে বহু তথ্য থাকা রাবীর সাক্ষ্য এক নয়। এসব পার্থক্য জানা থাকলে “সব হাদিস একরকম” বলা ভুল। আবার বহু ঘটনায় একই ধরনের সুবিধাজনক বাছাই বা একই মতাদর্শের পক্ষে পাঠ বদলের প্রমাণ মিললে পক্ষপাতকে বিচ্ছিন্ন ভুল বলে পাশ কাটানোও চলে না। নির্দিষ্ট বর্ণনার বিচার এবং কয়েকটি বিচারের মধ্যে ধারাবাহিক অসামঞ্জস্য শনাক্ত করা একসঙ্গে সম্ভব। তার ভিত্তি সমালোচকের খ্যাতি বা লেখকের পছন্দ নয়, তুলনায় ধরা পড়া তথ্য।

কোনো খবরের ঐতিহাসিক মূল্য বুঝতে আগে দেখতে হয় সেটি সবচেয়ে পুরোনো কোথায় পাওয়া যাচ্ছে এবং বর্তমান কথার সঙ্গে সেই পাঠের কতটা মিল। তারপর তার পথগুলো সত্যিই স্বাধীন কি না, রাবীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আপত্তি কী, বিপরীত মূল্যায়নের কারণ আছে কি না এবং বক্তব্যটি মুহাম্মদের না অন্য কারও—এসব প্রশ্ন আসে। বই, নথি বা বস্তুগত অন্য প্রমাণ থাকলে তা-ও তুলনায় ঢোকে। মূল্যায়নে মাযহাব ও আকিদা কখন সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে, সেটিও জানা তথ্য দিয়ে পরীক্ষা করা যায়। এই কাজের বদলে শুধু পছন্দের আরবি শ্রেণিনাম উচ্চারণ করলে সিদ্ধান্ত জানানো হয়, প্রমাণ দেখানো হয় না। তখন কর্তৃত্বের ভাষা যাচাইয়ের জায়গা নেয়।

ইতিহাসের অস্বস্তিকর অধ্যায়েও প্রমাণের এই মাপকাঠি একই থাকে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক হত্যা, দাসত্ব, যৌনদাসত্ব, নারী, ধর্মত্যাগী, প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র অথবা মুহাম্মদের কোনো সমস্যাজনক আচরণের বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় অন্য সব ঐতিহাসিক উৎসের মতোই নির্দিষ্ট প্রমাণ দিয়ে। দুর্বলতার মাত্রা, অত্যন্ত দুর্বল হওয়ার কারণ এবং জাল হওয়ার নির্দিষ্ট প্রমাণ—প্রতিটি আলাদা তথ্য, প্রতিটির ভিত্তিও প্রকাশযোগ্য। “জইফ” শব্দকে “ঘটেনি”র প্রতিশব্দ বানানো এই পার্থক্য মুছে ফেলার অসততা। একইভাবে সমর্থনকারী বর্ণনা সহিহ হলেই তার প্রতিটি অতিরঞ্জিত ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে ইতিহাস হিসেবে চাপানো সেই একই অসততার আরেক রূপ। ইতিহাসের প্রতি আনুগত্যের অর্থ হলো ফলাফল আগে ঠিক না করে প্রমাণকে তার প্রকৃত শক্তিতে দাঁড়াতে দেওয়া।

হাদিসশাস্ত্রের রায় মানুষ দিয়েছেন, মানুষের সংরক্ষিত তথ্য ও বিচার ব্যবহার করে। কোথাও সেই রায়ের পক্ষে শক্ত প্রমাণ আছে, কোথাও বিরোধ আছে, কোথাও মাযহাব বা আকিদার প্রভাব নির্দিষ্টভাবে দেখা যায়। তাই সমালোচকের সিদ্ধান্তও গ্রহণ, পরীক্ষা ও খণ্ডনের বিষয়। অস্বস্তিকর খবরের জন্য “জইফ” বলে অনুসন্ধান বন্ধ করা এবং সুবিধাজনক খবরের জন্য “সহিহ” বলে সব প্রশ্ন নিষিদ্ধ করা—দুই ক্ষেত্রেই প্রমাণের জায়গায় কর্তৃত্ব বসে। কোনো ঘটনা মিথ্যা হলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ লাগে; সত্য বা সম্ভাব্য হলে তার পক্ষে প্রমাণ লাগে। একটি বক্তব্য গ্রহণযোগ্য পথে এসেছে বলেই তার সব অর্থ, শব্দ ও প্রয়োগ ভুলের ঊর্ধ্বে যায় না; একটি পথে ঘাটতি আছে বলেই অতীতের ঘটনাটি মুছে যায় না। এই সীমা উপেক্ষা করে হাদিসের শ্রেণিবিভাগকে সত্য–মিথ্যার অব্যর্থ যন্ত্র হিসেবে চালানো বিভ্রান্তিকর।


আলোচনায় উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ

হাদিস, রিজাল, ইলাল, ফিকহ, তাফসির ও আধুনিক তাহকিকের এই ব্যক্তিরা ভিন্ন যুগ ও পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের সময়কাল, প্রধান পরিচয় এবং উদ্ধৃত মূল্যায়নের বিষয় একসঙ্গে থাকলে কোন রায় কোন যুগের কার দেওয়া, তা নির্দিষ্টভাবে বোঝা যায়। নিচের তালিকায় পূর্ণ জীবনীমূলক বিবরণের পরিবর্তে সেই সময়কাল, পরিচয় ও নির্দিষ্ট বক্তব্যের গুরুত্ব সংরক্ষিত রয়েছে।

ব্যক্তিসময়কালসংক্ষিপ্ত পরিচয় ও এই প্রবন্ধে গুরুত্ব
আবু হুরায়রামৃ. ৫৭/৫৮ হি.সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবীদের একজন। তাঁর একটি রোজা-সংক্রান্ত ফতোয়া আয়িশা ও উম্মে সালামার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের পরে প্রত্যাহারের ঘটনা সাহাবীর সততা ও সাহাবীর স্মৃতির নির্ভুলতা যে একই বিষয় নয়, তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
আয়িশা বিনতে আবু বকরমৃ. ৫৮ হি.মুহাম্মদের স্ত্রী এবং অন্যতম প্রধান হাদিস-বর্ণনাকারী। অন্য সাহাবীদের বহু বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সংশোধন করেছেন; মৃতের ওপর পরিবারের কান্নার শাস্তি, প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান এবং ইসরা নিয়ে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য এই প্রবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ।
উমর ইবনুল খাত্তাবমৃ. ২৩ হি.দ্বিতীয় খলিফা। আবু মুসার নবী-বর্ণনার জন্য অতিরিক্ত সাক্ষ্য দাবি, ফাতিমা বিনতে কায়সের সম্ভাব্য স্মৃতিভ্রান্তির প্রশ্ন এবং হজের তামাত্তু নিয়ে তাঁর অবস্থান সাহাবী-যুগের যাচাই ও মতভেদের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
আলী ইবন আবি তালিবমৃ. ৪০ হি.চতুর্থ খলিফা ও মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাতা। উসমানের তামাত্তু-নিষেধের বিপরীতে “কারও কথার কারণে নবীর সুন্নাহ ছাড়ব না” অবস্থানটি সাহাবীদের মধ্যকার প্রত্যক্ষ ফিকহি বিরোধ দেখায়।
ইমাম আবু হানিফা৮০–১৫০ হি.হানাফি মাযহাবের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। নামাজে অট্টহাসিতে ওজু, দশ দিরহামের মোহর, চুরির ন্যূনতম সীমা এবং প্রবাহিত রক্তে ওজুর মতো বিধানে দুর্বল বর্ণনা ব্যবহারের আলোচনা তাঁর মাযহাবের মাধ্যমে এসেছে।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাকপ্রায় ৮৫–১৫০ হি.প্রাথমিক ইসলামী সীরাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগ্রাহকদের একজন। তাঁকে একই সমালোচকের নামে সিকাহ ও দুর্বল—উভয়ভাবে মূল্যায়নের উদাহরণ রিজাল-গ্রেডের পরিবর্তনশীলতা দেখায়। ইসরা-মিরাজের প্রকৃতি নিয়েও তিনি বিকল্প প্রাথমিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছেন।
আল-ওয়াকিদী১৩০–২০৭ হি.মাগাজি ও প্রাথমিক ইসলামী ইতিহাসের বিখ্যাত গ্রন্থকার। হাদিসে তাঁকে অত্যন্ত দুর্বল, এমনকি মিথ্যাবাদী বলা হলেও যাহাবি স্বীকার করেছেন যে মাগাজি ও সাহাবীদের ইতিহাসে তাঁকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে চলা যায় না। “হাদিসে দুর্বল” এবং “ইতিহাসে মূল্যহীন” যে সমার্থক নয়, তার প্রধান উদাহরণ।
হাফস ইবন সুলাইমানমৃ. প্রায় ১৮০ হি.প্রচলিত “হাফস আন আসিম” কোরআন-পাঠের প্রধান বর্ণনাকারী। কিরাআতে নির্ভরযোগ্য হলেও হাদিসে মাতরুক ও কঠোরভাবে সমালোচিত। একই ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা ক্ষেত্রভেদে পরিবর্তিত হতে পারে—এই যুক্তিতে তাঁর উদাহরণ ব্যবহৃত হয়েছে।
ইমাম বুখারি১৯৪–২৫৬ হি.সহিহ আল-বুখারি-র সংকলক এবং ইলাল ও রিজাল-সমালোচনার প্রধান প্রাচীন মুহাদ্দিসদের একজন। সহিহ মুসলিমের সৃষ্টি-বর্ণনাকে কা‘ব আল-আহবারের বক্তব্য হিসেবে অধিক সঠিক মনে করা এবং অন্যান্য হাদিসের কঠোর সমালোচনার কারণে এই প্রবন্ধে তাঁর অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম মুসলিম২০৬–২৬১ হি.সহিহ মুসলিম-এর সংকলক। সনদের সংযোগে সাক্ষাৎ প্রমাণের কঠোর শর্তের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকার আলোচনা এবং তাঁর গ্রন্থে থাকা সৃষ্টি-বর্ণনা নিয়ে অন্য মুহাদ্দিসদের আপত্তি দেখায় যে সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্ত সংকলনও সমালোচনার বাইরে ছিল না।
ইমাম আত-তিরমিযি২০৯–২৭৯ হি.জামে আত-তিরমিযি-র সংকলক। একই বর্ণনার ক্ষেত্রে হাসান, হাসান গরিব বা মুনকারের মতো মূল্যায়ন এবং দাসীর তালাকের দুর্বল বর্ণনার পাশেই “আলেমদের আমল এর ওপর” উল্লেখ করার কারণে গ্রেড ও ফিকহি ব্যবহারের সম্পর্ক বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ।
ইবন হিব্বানপ্রায় ২৭০–৩৫৪ হি.মুহাদ্দিস ও রিজাল-গ্রন্থকার; আস-সিকাত-এর লেখক। রাবীদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে তাঁর তুলনামূলক উদার পদ্ধতি এবং ইকরিমার প্রতিরক্ষা রিজাল-সমালোচকের নিজস্ব মানদণ্ডের গুরুত্ব দেখায়।
আদ-দারাকুতনি৩০৬–৩৮৫ হি.ইলাল ও হাদিস-সমালোচনার অন্যতম প্রধান কর্তৃত্ব। বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনাসহ উচ্চ মর্যাদার হাদিসেরও সমালোচনা করেছেন। একই বর্ণনায় অন্য মুহাদ্দিসদের বিপরীত গ্রেডের উদাহরণে তাঁর রায় বারবার এসেছে।
আল-হাকিম আন-নিশাপুরি৩২১–৪০৫ হি.আল-মুস্তাদরাক-এর লেখক। “আমি জ্ঞানের নগরী” বর্ণনার একটি সনদকে সহিহ বলার বিপরীতে যাহাবির “বরং জাল” রায় গ্রেডিংয়ে বিশেষজ্ঞদের চরম মতভেদের অন্যতম প্রধান উদাহরণ।
আল-বায়হাকি৩৮৪–৪৫৮ হি.শাফেয়ি মুহাদ্দিস ও ফকিহ। বিভিন্ন বর্ণনার মারফু–মওকুফ রূপ, ইল্লত এবং আইনগত ব্যবহার নিয়ে তাঁর সমালোচনা এই প্রবন্ধে একাধিক স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইবনুল জাওজি৫১০–৫৯৭ হি.আল-মাওদুআত এবং আত-তাহকীক ফি আহাদিসিল খিলাফ-এর লেখক। মতনের মৌলিক নীতির বিরোধ থেকেও জালিয়াতির সিদ্ধান্তের নীতি এবং নিজের মাযহাবের পক্ষে দুর্বল হাদিসের ত্রুটি গোপনকারী মুহাদ্দিসদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অভিযোগ—দুটিই এই প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
ইবনুস সালাহ৫৭৭–৬৪৩ হি.শাফেয়ি ফকিহ ও হাদিসতত্ত্ববিদ। তাঁর উলূমুল হাদিস বা মুকাদ্দিমা ইবনুস সালাহ পরবর্তী সুন্নি হাদিস-পদ্ধতিবিদ্যার অন্যতম ভিত্তিগ্রন্থ। দুর্বল সনদ থেকে মতনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বল না বলা, রাবীর দাবত নির্ধারণ এবং জারহের কারণ ব্যাখ্যার মতো কেন্দ্রীয় নিয়ম এই গ্রন্থ থেকে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইমাম নববী৬৩১–৬৭৬ হি.শাফেয়ি ফকিহ ও মুহাদ্দিস; সহিহ মুসলিম-এর অন্যতম প্রভাবশালী ভাষ্যকার। বিশ্বস্ত রাবীর খবরুল ওয়াহিদ আমলযোগ্য হলেও নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না—এটি সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান হিসেবে তাঁর বক্তব্য এই প্রবন্ধের জ্ঞানতাত্ত্বিক যুক্তিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
আল-মিযযি৬৫৪–৭৪২ হি.তাহযীবুল কামাল-এর লেখক এবং রিজালশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান পরবর্তী কর্তৃত্ব। ইকরিমা, ইবন ইসহাক, হাফস ও অন্য বহু রাবী সম্পর্কে বিপরীত জারহ–তাদিল তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।
আল-যাহাবি৬৭৩–৭৪৮ হি.মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ ও রিজাল-সমালোচক; সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা ও মিযানুল ই‘তিদাল-এর লেখক। হাকিমের সহিহ রায়ের বিরোধিতা, ওয়াকিদীর কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি ইতিহাসে তাঁর অপরিহার্যতা স্বীকার এবং বহু রাবীর মূল্যায়নের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যক্তি।
আবু সাঈদ আল-আলাই৬৯৪–৭৬১ হি.মুহাদ্দিস ও উসুলবিদ। “আমি জ্ঞানের নগরী” বর্ণনাকে পৃথক দুর্বল পথের সমষ্টিতে হাসান বলার কারণে বহু সনদে গ্রেড উন্নীত হওয়ার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তাঁর রায় ব্যবহৃত হয়েছে।
জাইনুদ্দিন আল-ইরাকি৭২৫–৮০৬ হি.হাদিসতত্ত্বের প্রধান পরবর্তী বিশেষজ্ঞদের একজন। সনদে মিথ্যাবাদী থাকলেই নির্দিষ্ট হাদিসটি জাল হওয়া অনিবার্য নয়—এই গুরুত্বপূর্ণ সীমাটি তাঁর বক্তব্য থেকে নেওয়া হয়েছে।
ইবন হাজার আল-আসকালানি৭৭৩–৮৫২ হি.ফাতহুল বারি, তাহযীবুত তাহযীব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ হাদিস-রিজাল গ্রন্থের লেখক। গারানিকের বহু পথের একটি ভিত্তি স্বীকার করে ইসমাহর কারণে প্রকাশ্য অর্থ পুনর্ব্যাখ্যা, “আমি জ্ঞানের নগরী” বর্ণনার হাসান মূল্যায়ন এবং বহু হাদিসের ইল্লত ও মতভেদ বিশ্লেষণের কারণে এই প্রবন্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
আল-সাখাওয়ি৮৩১–৯০২ হি.ইবন হাজারের ছাত্র এবং ফাতহুল মুগিস-এর লেখক। মুরুআহর সামাজিক পরিবর্তনশীলতা, হাদিস বর্ণনার পারিশ্রমিক, দুর্বল হাদিসের ব্যবহার এবং হালাল-হারাম বনাম অন্যান্য ক্ষেত্রে সনদে কঠোরতার পার্থক্য তাঁর আলোচনার মাধ্যমে এসেছে।
জালালুদ্দিন সুয়ূতী৮৪৯–৯১১ হি.তাদরীবুর রাবী-র লেখক। জইফের সংজ্ঞা, হাসান লিগাইরিহি, একক সমালোচকের জারহ–তাদিল এবং মতনের বৈশিষ্ট্য থেকে জাল হাদিস শনাক্তের নীতির আলোচনায় তাঁর গ্রন্থ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে।
ইবন তাইমিয়া৬৬১–৭২৮ হি.হানবলি ধর্মতাত্ত্বিক ও ফকিহ। সহিহ মুসলিমের সৃষ্টি-বর্ণনাকে দুর্বলকারীদের অবস্থান সমর্থন, গাদিরে খুমের হাদিস নিয়ে মুহাদ্দিসদের বিরোধ সংরক্ষণ এবং সহিহ বলে মতভেদ হওয়া সংবাদে অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর বক্তব্য ব্যবহৃত হয়েছে।
ইবন আশুর১২৯৬–১৩৯৩ হি.
১৮৭৯–১৯৭৩
তিউনিসীয় মালিকি আলেম ও আত-তাহরির ওয়াত-তানওয়ির-এর লেখক। নবীদের ইসমাহর নিশ্চিত ধর্মতাত্ত্বিক নীতির বিরোধী কোনো খবরুল ওয়াহিদ এলে সেটিকে প্রত্যাখ্যান করে জাল বলে সিদ্ধান্ত দেওয়ার তাঁর বক্তব্য ধর্মতত্ত্ব কীভাবে ঐতিহাসিক বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ।
আবদুল আজিজ ইবন বায১৯১০–১৯৯৯আধুনিক সৌদি সালাফি আলেম ও সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি। “সনদ দুর্বল, কিন্তু অর্থ সঠিক”, দুর্বল হাদিসের ওপর আমল এবং আকিদাগত আলোচনায় দুর্বল বর্ণনা ব্যবহারের একাধিক প্রত্যক্ষ উদাহরণ তাঁর ফতোয়া ও ব্যাখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে।
নাসিরুদ্দিন আলবানী১৯১৪–১৯৯৯আধুনিক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী হাদিস-গ্রেডারদের একজন। হাজার হাজার বর্ণনাকে পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর সহিহ বা হাসান রায়ের বিপরীতে শুয়াইব আল-আরনাউতের জইফ রায় আধুনিক যুগেও গ্রেড যে একক ও যান্ত্রিক ফল নয়, তা দেখাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
শুয়াইব আল-আরনাউত১৯২৮–২০১৬আধুনিক আরবি হাদিসগ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদক ও তাহকিককারী; বিশেষত মুসনাদ আহমদ-এর বৃহৎ সমালোচনামূলক সংস্করণের সঙ্গে যুক্ত। একই সনদে আলবানীর বিপরীত গ্রেডের কারণে আধুনিক হাদিস-তাহকিকের বিচারনির্ভর চরিত্র দেখাতে তাঁর মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

তালিকায় “সহিহকারী”, “দুর্বলকারী” বা কোনো নির্দিষ্ট মতের সমর্থক পরিচয় সংশ্লিষ্ট বর্ণনার ওপর দেওয়া নির্দিষ্ট রায়ের পরিচয়। প্রত্যেকের সামগ্রিক হাদিস-পদ্ধতি বহু বর্ণনা, গ্রন্থ ও আলোচনায় বিস্তৃত। তালিকার পরিচিতিগুলো নির্দিষ্ট রায়টির দাতা, তাঁর সময়কাল ও সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের পরিচয় সংরক্ষণ করে।


তথ্যসূত্রঃ
  1.  ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস—কোন রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করা হবে  ↩︎
  2. সহিহ আল-বুখারি ১১৩—আবু হুরায়রার বিপুল হাদিস-বর্ণনা ↩︎
  3. সহিহ আল-বুখারি ৩৫৯১—মুহাম্মদের সঙ্গে তিন বছর এবং হাদিস সংরক্ষণের আগ্রহ ↩︎
  4. আল-যাহাবি, সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা—উমরের আবু হুরায়রাকে হাদিস বর্ণনা বন্ধ করার নির্দেশ ↩︎
  5. আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ—শুয়াইব আল-আরনাউত: “إسناده صحيح” ↩︎
  6. التاريخ ↩︎
  7. تاريخ دمشق ↩︎
  8. আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ, আল-মাওসুআ আল-হাদিসিয়্যাহ—উমর কর্তৃক আবু হুরায়রা ও কা’বকে হাদিস বর্ণনা বন্ধ করার নির্দেশ; শুয়াইব আল-আরনাউতের সনদ মূল্যায়ন এবং মূল উৎসসমূহ ↩︎
  9. আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ—বর্ণনাটির মূল উৎসসমূহ (أصول الحديث) ↩︎
  10. আল-যাহাবি—উমরের যুগে অতিরিক্ত হাদিস বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের মন্তব্য ↩︎
  11. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৫৪ ↩︎
  12. সহিহ মুসলিম ৩১—উমরের আঘাতে আবু হুরায়রা পড়ে যান ↩︎
  13. আল-যাহাবি, সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা—আবু হুরায়রার নামে “মাথা ফাটিয়ে দিতেন” বর্ণনা ↩︎
  14. আল-মু‘আল্লিমি—ইবন আজলান আবু হুরায়রাকে পাননি; বর্ণনাটি বিচ্ছিন্ন ↩︎
  15. সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা—“চাবুকের ভয়” বর্ণনাটিও একই জীবনীতে সংরক্ষিত ↩︎
  16. সহিহ বুখারি ১২০—আবু হুরায়রার দুই পাত্র জ্ঞান এবং একটি প্রকাশ করলে গলা কেটে দেওয়ার আশঙ্কা ↩︎
  17. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খোণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৩ ↩︎
  18. আল-আয়নি, উমদাতুল কারি—ইবন বাত্তালের ব্যাখ্যা, অত্যাচারী শাসকদের পরিচয় এবং প্রাণভয়ে সরাসরি নাম না বলা ↩︎
  19. সহিহ মুসলিমের ভূমিকা—ইবন সিরিন: ফিতনার পরে সনদ জিজ্ঞেস করা শুরু ↩︎
  20. সহিহ মুসলিমের ভূমিকা—ইবন আব্বাস: পরে কেবল পরিচিত বর্ণনা গ্রহণ ↩︎
  21. উদ্ধৃতির পূর্ণ প্রসঙ্গসহ মূল পাঠ 1 2 3 4 5 6 7
  22. সহিহ মুসলিম ৩০০৪—“কোরআন ছাড়া আমার কাছ থেকে কিছু লিখো না” ↩︎
  23. সুনান আবু দাউদ ৩৬৪৬—আবদুল্লাহ ইবন আমরকে হাদিস লেখার অনুমতি ↩︎
  24. সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুল ইলম—উমর ইবন আবদুল আজিজের হাদিস লিখে রাখার নির্দেশ ↩︎
  25. Gregor Schoeler, The Oral and the Written in Early Islam, Routledge, 2006, Preface, p. vii ↩︎
  26. Michael Cook, “The Opponents of the Writing of Tradition in Early Islam”, Arabica 44 (1997), pp. 437–530, §§ 2–4 ↩︎
  27. সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—শিক্ষকের সামনে পাঠ, মূল নথি যাচাই এবং বর্ণনার ভাষা ↩︎
  28. ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস—ইজাজার অনুমোদন, তার যুক্তি ও প্রয়োগ ↩︎
  29. সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—উইজাদা, নুসখা যাচাই, বর্ণনার ভাষা ও আমলের মতভেদ ↩︎
  30. Jonathan A. C. Brown, “How We Know Early Ḥadīth Critics Did Matn Criticism and Why It’s So Hard to Find”, Islamic Law and Society 15 (2008), pp. 143–184, abstract and introduction ↩︎
  31. আল-হাকিমের সূত্রে আবু ইসমার স্বীকারোক্তির বিবরণ; ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৮২৮০০ ↩︎
  32. ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার আল-মুনিফ ফিস সহিহ ওয়াদ-দয়িফ—বাস্তব অভিজ্ঞতার বিরোধিতার আলোচনা ↩︎
  33. ইবনুল কাইয়িমের বক্তব্যসহ হাঁচিসংক্রান্ত বর্ণনার সনদ ও মতন বিশ্লেষণ, ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৯৪৭০৫ ↩︎
  34. IslamQA—হাঁচি দিলে বক্তব্য সত্য হয়: সনদ, মতন ও ইবনুল কাইয়িমের বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক মূল্যায়ন ↩︎
  35. ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার আল-মুনিফ—বেগুনসংক্রান্ত জাল বর্ণনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রত্যাখ্যান ↩︎
  36. ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার আল-মুনিফ—মসুর ডাল, আখরোট, পনির ও অন্যান্য জাল বর্ণনার আলোচনা ↩︎
  37. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৮৮—কালোজিরায় মৃত্যু ছাড়া সব রোগের নিরাময় ↩︎
  38. Li et al., 2023, Nigella sativa and health outcomes: An overview of systematic reviews and meta-analyses, Frontiers in Nutrition ↩︎
  39. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৪৪৫—সাতটি আজওয়া খেজুরের মাধ্যমে বিষ ও জাদুর ক্ষতি প্রতিরোধ ↩︎
  40. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩২০—মাছির এক ডানায় রোগ এবং অন্য ডানায় প্রতিষেধক ↩︎
  41. CDC—স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গৃহমাছির দেহে শনাক্ত অণুজীবসমূহ ↩︎
  42.  ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস—দুর্বল সনদ ও হাদিসের মূল বক্তব্যের পার্থক্য  ↩︎
  43.  সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—জইফ হাদিসের সংজ্ঞা  ↩︎
  44.  আল-ইরাকি, শারহুত তাবসিরাহ ওয়াত-তাযকিরাহ—সনদে মিথ্যাবাদী থাকলেই হাদিস জাল হয় না  ↩︎
  45.  আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক—“আমি জ্ঞানের নগরী”; সনদকে সহিহ ঘোষণা  ↩︎
  46.  আলী আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ—একই বর্ণনা সম্পর্কে বিপরীত গ্রেডসমূহ  ↩︎
  47. সহিহ মুসলিমের ভূমিকা—মদিনার একশ বিশ্বস্ত ব্যক্তি, তবু তাঁদের হাদিস গ্রহণ করা হতো না ↩︎
  48. সহিহ মুসলিমের ভূমিকা—ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ ও মুসলিম: নেককার মানুষও অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল বর্ণনা করেন ↩︎
  49.  ইবনুস সালাহ—রাবীর দাবত নির্ধারণের পদ্ধতি  ↩︎
  50.  ইবনুস সালাহ—জারহের কারণ ব্যাখ্যা করা এবং জারহের মানদণ্ডে মতভেদ  ↩︎
  51.  ইবনুস সালাহ—একজনের বক্তব্যে জারহ–তাদিল প্রতিষ্ঠা  ↩︎
  52.  সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—একক সমালোচকের জারহ–তাদিল  ↩︎
  53. আল-ইরাকি, শারহুত তাবসিরাহ ওয়াত-তাযকিরাহ, ২:৩২৬–৩২৭—নাসাঈ ও আহমদ ইবন সালিহ ↩︎
  54. আল-যাহাবি, সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা, ১২:১৭৩–১৭৪—হারমালার ছাত্রদের বর্জন ও বই ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ↩︎
  55.  সুয়ূতী—হাদিসে মিথ্যা প্রমাণিত না হলেও সাধারণ মিথ্যাচারের কারণে মাতরুক  ↩︎
  56.  আল-খতিব, আল-কিফায়াহ—নাজিয়াকে দাবা খেলতে দেখে শু‘বার হাদিস না লেখা  ↩︎
  57.  আল-সাখাওয়ি—হাদিস বর্ণনার পারিশ্রমিক ও বর্ণনা বর্জন  ↩︎
  58.  আল-মিযযি—আমর ইবন উবাইদ ও কদরিয়া মত প্রচারের কারণে বর্জন  ↩︎
  59.  আল-মিযযি—ইকরিমা সম্পর্কে বিপরীত জারহ ও তাদিল  ↩︎
  60.  ইবন হিব্বান—ইকরিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তার প্রতিরক্ষা  ↩︎
  61.  আল-মিযযি—ইবন ইসহাক সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের বিপরীত রায়  ↩︎
  62.  আল-যাহাবি—ওয়াকিদীর দুর্বলতা, কঠোর জারহ এবং ইতিহাসে অপরিহার্যতা  ↩︎
  63.  আল-মিযযি—আহমদ ইবন হাম্বলের ওয়াকিদীর উপাদান পাঠ  ↩︎
  64.  ইসলামওয়েব—হাফস কিরাআতে দৃঢ়, হাদিসে দুর্বল  ↩︎
  65.  আল-মিযযি—হাফস সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের জারহ ও বই ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ  ↩︎
  66. সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—ইখতিলাতে আক্রান্ত বিশ্বস্ত রাবী ↩︎
  67. আল-ইরাকি—আতা ইবনুস সায়িবের ইখতিলাত এবং কোন ছাত্র আগে শুনেছেন ↩︎
  68. আল-ইরাকি—আবদুর রাজ্জাকের দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরকার বর্ণনা ↩︎
  69.  ইবনুস সালাহ—বাহ্যিকভাবে ত্রুটিমুক্ত হাদিসে গোপন ইল্লত  ↩︎
  70.  ইবনুস সালাহ—সিকাহ রাবীদের সংযুক্ত সনদও ইল্লতের কারণে অসহিহ  ↩︎
  71.  সহিহ মুসলিমের ভূমিকা—সাক্ষাৎ প্রমাণের কঠোর শর্ত নিয়ে বিতর্ক  ↩︎
  72. শারহ মুখতাসার আর-রাওদাহ—আল-বারা ইবন আজিব এবং মুরসালুস সাহাবি ↩︎
  73. শারহ মুখতাসার আর-রাওদাহ—মুরসালুস সাহাবি গ্রহণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত ও বিরোধ ↩︎
  74. IslamWeb—`عن` এবং সরাসরি শ্রুতির পার্থক্য ↩︎
  75. ইবন হাজার, আন-নুকাত—সমসাময়িকতা থাকলেও সরাসরি শ্রুতি নিশ্চিত নয় ↩︎
  76. আল-ইরাকি—মুদাল্লিসের স্পষ্ট শ্রুতি ও `عن`-এর ভিন্ন বিধান ↩︎
  77. আল-ইরাকি—সহিহ গ্রন্থে মুদাল্লিস রাবী এবং তাঁদের `عن` বর্ণনা ↩︎
  78.  সহিহ মুসলিম—“আল্লাহ শনিবার মাটি সৃষ্টি করেছেন” বর্ণনা  ↩︎
  79.  ইসলামওয়েব—ইবন কাসিরের উদ্ধৃতিতে বুখারি, আলী ইবনুল মাদিনি ও বায়হাকির আপত্তি  ↩︎
  80.  ইসলামওয়েব—ইবন তাইমিয়ার উদ্ধৃতিতে সহিহ মুসলিমের হাদিসের সমালোচনা  ↩︎
  81.  মাজমূউল ফাতাওয়া—সহিহ বলে মতভেদ হওয়া বর্ণনা ও সৃষ্টি-হাদিসের ইল্লত  ↩︎
  82.  নববী—বিশ্বস্ত রাবীর খবরুল ওয়াহিদ আমলযোগ্য, কিন্তু নিশ্চিত জ্ঞান নয়  ↩︎
  83.  আল-ইরাকি—সহিহাইন নিশ্চিত জ্ঞান দেয় কি না, সে বিষয়ে ইবনুস সালাহ ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতভেদ  ↩︎
  84. আল-আমিদি, আল-ইহকাম—মুতাওয়াতিরের ন্যূনতম সংখ্যা নিয়ে মতভেদ ↩︎
  85. আল-যারকাশি, আল-বাহরুল মুহীত—মুতাওয়াতিরের সংখ্যা নিয়ে বহু মত ↩︎
  86. সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—নির্দিষ্ট সংখ্যা শর্ত নয় ↩︎
  87. ফাতহুল মুগিস—ইবনুস সালাহ এবং মুতাওয়াতিরের বিরলতা ↩︎
  88. তুহফাতুল আহওয়াযি—“আমার নামে মিথ্যা” হাদিসের তাওয়াতুরের বিশেষ মর্যাদা ↩︎
  89. সুয়ূতী—ইবন হাজারের পক্ষ থেকে মুতাওয়াতিরের বিরলতার দাবি প্রত্যাখ্যান ↩︎
  90. জামে আত-তিরমিযি ২৬৫৭—“যেভাবে শুনেছে সেভাবে পৌঁছে দিক” ↩︎
  91. সুয়ূতী—প্রায় ত্রিশ সাহাবীর সূত্রে “নাদ্দারাল্লাহু ইমরাআন” বর্ণনা ↩︎
  92. আল-বাহরুল মুহীত—ইবন হিব্বানের মতে নববী সংবাদগুলো আহাদ ↩︎
  93. ইবনুস সালাহ, উলূমুল হাদিস—বুখারির মুখস্থ হাদিসের সংখ্যা, পুনরাবৃত্তি ও আছার ↩︎
  94. যাহাবি, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ১৮৭—আহমদের দশ লাখ হাদিসের গণনায় কী অন্তর্ভুক্ত ↩︎
  95. ইবনুস সালাহ—রিওয়ায়াত বিল-মা‘না, এর বৈধতা ও শর্ত ↩︎
  96. ইবনুস সালাহ—“অথবা তিনি যেভাবে বলেছেন” এবং রিওয়ায়াত বিল-মা‘নার ঝুঁকি ↩︎
  97. ইবনুস সালাহ—একটি হাদিসের অংশ বাদ দিয়ে বর্ণনা করার মতভেদ ও শর্ত ↩︎
  98. ইবন হাজার, আন-নুকাত—সিকাহ রাবীর অতিরিক্ত অংশ সবসময় গ্রহণযোগ্য নয় ↩︎
  99. ইবনুস সালাহ—মুদরাজ হাদিসের সংজ্ঞা ও উদাহরণ ↩︎
  100. সহিহ আল-বুখারি ৫৩৫৫—ভরণপোষণের ব্যাখ্যা আবু হুরায়রার নিজের বক্তব্য ↩︎
  101. মুসনাদ আহমদ ১০৭৮৫-এর পূর্ণ উদ্ধৃতি—ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৯৮৩৪৮ ↩︎
  102. ইবন হাজার, ফাতহুল বারি, ৯:৫০১—ইসলামকিউএ-তে মূল বক্তব্য উদ্ধৃত ↩︎
  103. সহিহ আল-বুখারি ৬৯৮২—ওহি বন্ধ হওয়ার পর পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার বর্ণনা ↩︎
  104. ইবন হাজার, ফাতহুল বারি—বুখারি ৬৯৮২-এর “فيما بلغنا” অংশের বিশ্লেষণ ↩︎
  105. ইসলামওয়েব—সহিহাইনের মুয়াল্লাক ও আছারের status ↩︎
  106. ইবন হাজারের হাদিউস সারি থেকে উদ্ধৃত মুস্তামলি ও আল-বাজির বক্তব্য—বুখারির কপিতে অসম্পূর্ণ স্থান এবং সংস্করণভেদে বিন্যাস ↩︎
  107. সহিহ বুখারি ৩৮৪৯—আমর ইবন মাইমুনের বানরীকে পাথর মারার আছার ↩︎
  108. ইবন হাজার, ফাতহুল বারি—বানরীর আছার নিয়ে হামিদির সন্দেহ, তার প্রত্যাখ্যান এবং নাসাফি–ফিরাবরি সংস্করণের পার্থক্য ↩︎
  109.  সুয়ূতী—সব দুর্বল পথের সমষ্টি হাসান নয়; দুর্বলতার ধরনই নির্ধারক  ↩︎
  110.  সুয়ূতী—অন্য পথ যুক্ত হয়ে হাসান হাদিস সহিহ হওয়ার উদাহরণ  ↩︎
  111. সুনান আত-তিরমিযি—“আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা”; হাসান গরিব ↩︎
  112. ইবন তাইমিয়া—গাদিরের হাদিস নিয়ে বুখারি–ইবরাহিম আল-হারবির দুর্বলকরণ এবং আহমদ–তিরমিযির হাসান রায় ↩︎
  113. ইতহাফুল খিয়ারাহ—বুরাইদার পথে গাদিরের বক্তব্য; সহিহ সনদ ↩︎
  114. আল-সাখাওয়ি—হালাল-হারামে কঠোরতা, ফজিলতে শিথিলতা এবং মাগাজিতে ইবন ইসহাকের ব্যবহার ↩︎
  115. আল-সাখাওয়ি—অন্য দলিল না থাকলে দুর্বল হাদিস; গ্রহণযোগ্য দুর্বল বর্ণনা দিয়ে কোরআনিক বিধান নাসখ ↩︎
  116. ইবন বায—“সনদ দুর্বল, কিন্তু হাদিস প্রতিষ্ঠিত না হলেও অর্থ সঠিক” ↩︎
  117. দোরার—তিরমিযির হাসান এবং যাহাবির হাসান সনদ মূল্যায়ন ↩︎
  118. দোরার—একই বর্ণনায় আলবানীর “সনদ দুর্বল” রায় ↩︎
  119. ইসলামওয়েব—নামাজে অট্টহাসিতে ওজু ভাঙার হানাফি বিধান ও দুর্বল হাদিস ↩︎
  120. তুহফাতুল আহওয়াযি—দশ দিরহাম মোহরের হাদিসে মাতরুক রাবী ও জালিয়াতির অভিযোগ ↩︎
  121. ইবন রুশদ—হানাফিদের দশ দিরহাম মোহর নির্ধারণে এই হাদিসের ব্যবহার ↩︎
  122. ইসলামওয়েব—চুরির হদে দশ দিরহামের সীমা ও দুর্বল হাদিস ↩︎
  123. ফাতহুল কাদির—প্রবাহিত রক্তে ওজুর হাদিস দিয়ে হানাফি দলিল ↩︎
  124. নসবুর রায়াহ—বিচ্ছিন্নতা ও অজ্ঞাত রাবীর কারণে সনদের সমস্যা ↩︎
  125. তুহফাতুল আহওয়াযি—দাসীর তালাক ও ইদ্দতের হাদিসে দুর্বল রাবী, তবু আলেমদের আমল ↩︎
  126. ইবন বায—“কিসাস কেবল তরবারিতে” হাদিস দুর্বল, কিন্তু আমল এর ওপর ↩︎
  127. শামেলা—ইবন বাযের গ্রন্থে পাপী ইমামের পেছনে নামাজ ও সংশ্লিষ্ট হাদিস ↩︎
  128. দোরার—“এই মতনের কোনো প্রতিষ্ঠিত সনদ নেই” ↩︎
  129. শামেলা—“যে ঋণ সুবিধা আনে তা সুদ”: হাদিস দুর্বল, কিন্তু অর্থ সঠিক ↩︎
  130. ইবন বায—সব সনদ দুর্বল; তবু বর্ণনার অর্থ নির্ধারণ ও বিধান সমর্থন ↩︎
  131. ফাতহুল বারি—সহিহ হাদিসে তাযিরের দশ চাবুকের সীমা এবং ফকিহদের ভিন্ন ব্যাখ্যা ↩︎
  132. আন-নববী, আল-মাজমূ—“জুমার গোসল ওয়াজিব” সহিহ হাদিসের “ওয়াজিব” শব্দের পুনর্ব্যাখ্যা ↩︎
  133. উটের মাংস ও ওজু—সহিহ মুসলিমের সরাসরি নির্দেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহের বিপরীত অবস্থান ↩︎
  134. সহিহ মুসলিম—মুহাম্মদ ও আবু বকরের যুগে তিন তালাক এক এবং উমরের সময়ে তিন কার্যকর ↩︎
  135. ফাতহুল বারি—তিন তালাকের সহিহ বর্ণনা, বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও প্রাচীন মতভেদ ↩︎
  136. তুহফাতুল আহওয়াযি—চতুর্থবার মদপানে হত্যার বর্ণনা এবং পরে নাসখ ↩︎
  137. আত-তাকয়ীদ ওয়াল ঈদাহ—চতুর্থবার মদপানে হত্যার হাদিস পরিত্যাগ ও নাসখের আলোচনা ↩︎
  138. শারহ সহিহ মুসলিম—খিলাফত কুরাইশের জন্য নির্দিষ্ট এবং ঐকমত্যের দাবি ↩︎
  139. ফাতহুল বারি—উমরের মুয়ায ইবন জাবালকে উত্তরসূরি করার বক্তব্য এবং কুরাইশি শর্তের ঐকমত্যের সমস্যা ↩︎
  140. Ahmed El Shamsy, From Tradition to Law: The Origins and Early Development of the Shāfi‘ī School of Law in Ninth-Century Egypt, Harvard doctoral research, abstract ↩︎
  141. আল-যারকাশি, আল-বাহরুল মুহীত—কোরআনকে সুন্নাহ দিয়ে নাসখ করার বিতর্ক ↩︎
  142. কোরআন ২৪:২—ব্যভিচারের শাস্তি ↩︎
  143. সহিহ মুসলিম—অবিবাহিতের চাবুক ও নির্বাসন, বিবাহিতের চাবুক ও রজম ↩︎
  144. ফাতহুল বারি—কোরআন অনুযায়ী চাবুক এবং সুন্নাহ অনুযায়ী রজম ↩︎
  145. রজমের আয়াত নাজিল ও পঠিত হয়েছিল—উমরের বর্ণনা ↩︎
  146. কোরআন ৬:১৬৪—কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না ↩︎
  147. সহিহ মুসলিম—মৃতের শাস্তির বর্ণনা এবং আয়িশার আপত্তি ↩︎
  148. কোরআন ২:১৮০—পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের জন্য ওসিয়ত ↩︎
  149. “ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই”—প্রচলিত ফিকহি বিধান ↩︎
  150. কোরআন ২৭:১৬—সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী ↩︎
  151. কোরআন ১৯:৫–৬—যাকারিয়ার উত্তরসূরির প্রার্থনা ↩︎
  152. সহিহ মুসলিম—ফাতিমার উত্তরাধিকার দাবি এবং “আমরা উত্তরাধিকার রেখে যাই না” হাদিস ↩︎
  153. আদওয়াউল বায়ান—নবীদের উত্তরাধিকারকে জ্ঞান ও ধর্মের উত্তরাধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা ↩︎
  154. ইবনুস সালাহ—সাহাবীদের সামগ্রিকভাবে আদিল গণ্য করা ↩︎
  155. ইসলামওয়েব—আয়িশার সাহাবীদের ওপর সংশোধন এবং আল-যারকাশির স্বতন্ত্র গ্রন্থ ↩︎
  156. সহিহ মুসলিম—আয়িশা ও উম্মে সালামার সাক্ষ্যের পরে আবু হুরায়রার বক্তব্য প্রত্যাহার ↩︎
  157. তাহযীব সুনান আবি দাউদ—আয়িশা ও উম্মে সালামার বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ ↩︎
  158. সহিহ মুসলিম—আবু মুসার হাদিসে উমরের অতিরিক্ত সাক্ষ্য দাবি ↩︎
  159. সহিহ মুসলিম—ফাতিমা বিনতে কায়সের বর্ণনা সম্পর্কে উমরের “মনে রেখেছে না ভুলেছে” মন্তব্য ↩︎
  160. সহিহ মুসলিম—সালিমের প্রাপ্তবয়স্ক দুধপান এবং নবীপত্নীদের মতভেদ ↩︎
  161. সুনান আবু দাউদ—আয়িশার সাধারণ প্রয়োগ বনাম অন্য নবীপত্নীদের বিশেষ-অনুমতির ব্যাখ্যা ↩︎
  162. মুআত্তা মালিক—প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান নিয়ে আয়িশা ও অন্য নবীপত্নীদের বিপরীত অবস্থান ↩︎
  163. শারহ সহিহ মুসলিম—প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান নিয়ে আয়িশা, অন্য নবীপত্নী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতভেদ ↩︎
  164. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ১৯৪৪—রজম, প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপান এবং সহিফা খাওয়ার বর্ণনা ↩︎
  165. আলবানী, সহিহ ইবন মাজাহ, নং ১৫৯৩—মূল সুনানের ১৯৪৪ নম্বর বর্ণনার মান: হাসান ↩︎
  166. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১২৯০৫—ইবন হাজমের সহিহ রায় ও রহিতকরণের ব্যাখ্যা ↩︎
  167. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৭৫৩৫৫—পাঠভেদভিত্তিক প্রত্যাখ্যান এবং আল-মুহাল্লা থেকে ইবন হাজমের ব্যাখ্যা ↩︎
  168. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫২ক—দশবার থেকে পাঁচবার দুধপান এবং নবীর মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠ ↩︎
  169. নববী, শারহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৪–২৫—মৃত্যুকালীন পাঠ ও দেরিতে রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা ↩︎
  170. মোল্লা আলী আল-কারি, মিরকাতুল মাফাতীহ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২০৭৯, হাদিস ৩১৬৭—ইবনুল হুমামের আপত্তি ↩︎
  171. Scott C. Lucas, Constructive Critics, Ḥadīth Literature, and the Articulation of Sunnī Islam, Brill, 2004, publisher’s description of Part II ↩︎
  172. জামে আত-তিরমিযি ৮২৪—ইবন উমর বনাম উমরের তামাত্তু-সংক্রান্ত অবস্থান ↩︎
  173. সহিহ বুখারি ১৫৬৩—উসমানের নিষেধের বিপরীতে আলীর নবীর সুন্নাহ অনুসরণ ↩︎
  174. সহিহ বুখারি ১৫৬৯—আলী ও উসমানের তামাত্তু নিয়ে মতভেদ ↩︎
  175. সহিহ বুখারি ১৫৭১—নবীর যুগে তামাত্তু এবং পরবর্তী ব্যক্তিগত মত ↩︎
  176. তাফসির আল-কুরতুবি—ইসরা শরীর না রূহে হয়েছিল, এ বিষয়ে সালাফ ও খালাফের মতভেদ ↩︎
  177. ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ—আয়িশার নামে রূহানী ইসরার বক্তব্য ↩︎
  178. তাফসির আত-তাবারি—মুয়াবিয়া ও আয়িশার নামে ইসরা সম্পর্কে প্রাথমিক ভিন্ন ব্যাখ্যা ↩︎
  179. শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যাহ—রূহানী ইসরা এবং স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য ↩︎
  180. ইবন ইসহাক—ইসরা ঘুমে না জাগরণে হয়েছিল, তা নিয়ে অনির্ধারিত অবস্থান ↩︎
  181. সহিহ বুখারি—ইবন আব্বাসের “রু’য়া আইন” বক্তব্য ↩︎
  182. ফাতহুল বারি—“চোখের দর্শন” এবং স্বপ্নের পার্থক্য ↩︎
  183. ফাতহুল বারি—ইসরা-বর্ণনায় “ঘুমন্ত” ও “জেগে উঠলেন” ভাষা এবং তার সমন্বয় ↩︎
  184. কাজী ইয়াজ, আশ-শিফা—“ঘুম”, “জাগরণ” ও সশরীর ইসরার সমন্বয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ↩︎
  185. তাফসির আত-তাবারি—বিকল্প মত উদ্ধৃত করে সশরীর মতকে অগ্রাধিকার ↩︎
  186. তাফসির ইবন কাসির—আয়িশা ও মুয়াবিয়ার মত উদ্ধৃত করার পর সশরীর ব্যাখ্যা ↩︎
  187. ইবন হাজার, ফাতহুল বারি—গারানিক কাহিনির বর্ণিত বক্তব্য ↩︎
  188. ইবন হাজার—বহু ও বিচিত্র পথ গারানিক কাহিনির একটি ভিত্তি নির্দেশ করে ↩︎
  189. ইবন হাজার—ইসমাহর কারণে গারানিক কাহিনির প্রকাশ্য অর্থ অসম্ভব ঘোষণা ↩︎
  190. সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী—মতনের বিরোধ থেকেই জাল বর্ণনা শনাক্ত করার নীতি ↩︎
  191. ইসলামওয়েব—ইবনুল জাওজির অসম্ভব মতন সম্পর্কে রাবী পরীক্ষা অপ্রয়োজনীয় হওয়ার বক্তব্য ↩︎
  192. আল-সাখাওয়ি, ফাতহুল মুগিস—মতাদর্শ ও শাসকের স্বার্থে হাদিস জাল করার শ্রেণি ↩︎
  193. ইবনুল জাওজি, আত-তাহকীক ফি আহাদিসিল খিলাফ—মাযহাবের পক্ষে দুর্বল হাদিসে নীরবতার অভিযোগ ↩︎
  194. ইবন আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানওয়ির—সূরা সাদ ৩৮:২১–২৫ এবং নবীদের ইসমাহ ↩︎
  195. সুনান আবু দাউদ ২৪—আলবানীর “হাসান সহিহ” মূল্যায়ন ↩︎
  196. আল-মিযযি—হাকিমা বিনতে উমাইমার সীমিত রাবী-তথ্য ↩︎
  197. ইবন হাজার—হাকিমা “لا تعرف”; ইবন হিব্বানের সিকাতের উল্লেখ ↩︎
  198. ইবনুল কাত্তান—হাকিমার অবস্থা অজানা হওয়ায় হাদিসের সহিহত্বের সমস্যা ↩︎
  199. IslamWeb—কোরবানির হাদিসে সহিহ, দুর্বল ও মারফু–মওকুফ বিরোধ ↩︎
  200. IslamWeb—একই বর্ণনায় মুনযিরির হাসান, আলবানীর সহিহ ও আরনাউতের জইফ রায় ↩︎
  201. Harald Motzki et al., Analysing Muslim Traditions, Brill ↩︎
  202. Harald Motzki, Analysing Muslim Traditions—isnād-cum-matn ও common-link analysis ↩︎
  203. Joshua J. Little, “‘Where did you learn to write Arabic?’”, Journal of Islamic Studies 35/2 (2024) ↩︎
  204. Jonathan A. C. Brown, “Criticism of the Proto-Hadith Canon: al-Dāraquṭnī’s Adjustment of the Ṣaḥīḥayn”, Journal of Islamic Studies 15/1 (2004) ↩︎
  205. Andreas Görke & Gregor Schoeler, “The Current State of Research on the Authenticity of the Early Islamic Tradition” ↩︎
  206. Andreas Görke & Gregor Schoeler, The Earliest Writings on the Life of Muḥammad, Gerlach Press, 2024, ch. 10, “Results and Conclusion”, pp. 193–218, chapter summary ↩︎

About This Article

Genre: Hadith Criticism, Rijal Studies, Isnād and Matn Analysis, and Islamic Historiography

Epistemic Position: Historical Criticism, Textual Criticism, Source Comparison, Anti-Apologetic Reasoning, and Evidence-Based Analysis of Religious Authority

This article examines the use of hadith classifications—sahih, hasan, da‘if, and mawdu‘—as claims about historical truth. It investigates how assessments of narrators, transmission chains, textual variants, and hidden defects produce these classifications, and why scholars reach conflicting judgments about the same reports.

The central argument is that a weak transmission chain does not by itself disprove the reported event, while a sahih classification does not by itself establish historical certainty, verbatim preservation, an uncontested interpretation, or a binding legal ruling. Treating these classifications as automatic verdicts on the past conceals the evidence and human judgments behind them.

The article discusses Umar’s restrictions on narration, Abu Hurayra’s reports, contradictory narrator assessments, Companion memory and disagreement, transmission by meaning, textual additions, interpolations, and the use of weak reports in history and law. It also examines reports about missing Quranic passages, the sheet eaten by a domestic animal, competing interpretations of the Isra and Mi‘raj, and the influence of theological commitments on accepting or rejecting evidence.

Classical hadith and rijal literature is examined alongside academic research on oral and written transmission, report dating, source dependence, isnād–matn comparison, and the formation of canonical authority.

This article should be evaluated through citation accuracy, chronology, source independence, textual comparison, evidentiary strength, and logical consistency—not through inherited reverence, preservation dogma, selective apologetics, or the assumption that religious classifications are exempt from historical scrutiny.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

Leave a comment

Your email will not be published.