মাদক, অপরাধ, ইতিহাস, ধর্ম ও সমাজ (Drugs, Crime, History, Religion and Society) খণ্ড ৩ (শেষ): পরিশিষ্ট – উদ্ভিদ্বৈজ্ঞানিক ইতিবৃত্ত, আণবিক রসায়ন, স্নায়ুশারীরবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সারণি
পরিশিষ্ট
মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ, ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তার, আন্তর্জাতিক অপরাধের ভূরাজনীতি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের যে সামগ্রিক বিশ্লেষণ পূর্ববর্তী দুই খণ্ডে উপস্থাপিত হয়েছে, তার একটি অপরিহার্য বস্তুনিষ্ঠ, প্রায়োগিক ও কাঠামোগত পরিপূরক হিসেবে এই তৃতীয় খণ্ডটির অবতারণা। মাদক সংক্রান্ত যেকোনো সমাজতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বা অপরাধবিজ্ঞানীয় পাঠ ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যেতে বাধ্য, যতক্ষণ না তার পেছনের ভৌত, জৈবরাসায়নিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আইনি পরিকাঠামোটিকে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে উন্মোচন করা যায়। একটি মনঃসক্রিয় পদার্থ কেবল একটি সামাজিক বিচ্যুতি, ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা কালোবাজারের অর্থনৈতিক পণ্য নয়; এটি একই সাথে প্রকৃতির মৃত্তিকা থেকে উদ্ভূত একটি উদ্ভিদ, নির্দিষ্ট আণবিক সজ্জাবিশিষ্ট একটি রাসায়নিক যৌগ, মানব মস্তিষ্কের স্নায়বিক রিসেপ্টরে ক্রিয়াশীল একটি সংকেতবাহক এবং আন্তর্জাতিক আইনি সনদে শৃঙ্খলিত একটি নিয়ন্ত্রিত সত্তা।
এই খণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো মাদক সংক্রান্ত বহুশাস্ত্রীয় জ্ঞানের বিচ্ছিন্ন ধারাগুলোকে একটি সুসংহত, তথ্যসমৃদ্ধ এবং পদ্ধতিগত আকর সহায়িকা হিসেবে পাঠক ও গবেষকদের সামনে উপস্থাপন করা।
প্রথম পরিশিষ্টে (পরিশিষ্ট ক) সন্নিবেশিত হয়েছে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত মনঃসক্রিয় উদ্ভিদ ও ছত্রাকসমূহের বিশদ ইতিবৃত্ত। আন্তর্জাতিক শৈবাল, ছত্রাক ও উদ্ভিদ নামকরণ কোড (ICN) অনুযায়ী উদ্ভিদের দ্বিপদ নামকরণের ব্যাকরণিক নিয়মাবলি, ধ্রুপদী লাতিন ও আধুনিক ইংরেজির দ্বৈত উচ্চারণরীতি এবং তাদের সক্রিয় ক্ষারকীয় উপাদানের বিশদ ব্যবচ্ছেদ লোকায়ত কুসংস্কার ও ধর্মীয় অন্ধত্বের কুয়াশা ভেঙে উদ্ভিদবিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি স্পষ্ট করে।
দ্বিতীয় পরিশিষ্টে (পরিশিষ্ট খ) রাসায়নিক ও ফার্মাকোলজিক্যাল স্তরে প্রবেশ করে প্রতিটি প্রধান প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম যৌগের আন্তর্জাতিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name), রূপমূলতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি এবং তাদের কার্যকরী মূলকগুলোর রসায়ন বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তৃতীয় পরিশিষ্টে (পরিশিষ্ট গ) স্নায়ুবিজ্ঞান ও শারীরস্থানের জটিল জগতকে পাঠযোগ্য করা হয়েছে—মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক ডোপামিন পথ (mesolimbic dopamine pathway), নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স (nucleus accumbens), প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (prefrontal cortex) থেকে শুরু করে ডেল্টা-ফস-বি (DeltaFosB)-এর আণবিক সুইচ পর্যন্ত প্রতিটি কাঠামো কীভাবে মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে পরাস্ত করে আসক্তি, সহনশীলতা ও চেতনার রূপান্তর ঘটায়, তা এখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সর্বশেষ পরিশিষ্টে (পরিশিষ্ট ঘ) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আধুনিক বিশ্বের আন্তর্জাতিক মাদক কূটনীতি ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণাঙ্গ চালচিত্র। জাতিসংঘের ১৯৬১ সালের একক মাদক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs, 1961), ১৯৭১ সালের মনস্তাত্ত্বিক পদার্থবিষয়ক কনভেনশন (Convention on Psychotropic Substances, 1971) এবং ১৯৮৮ সালের মাদক ও সাইকোট্রপিক পদার্থের অবৈধ পাচার বিরোধী কনভেনশন (UN Convention Against Illicit Traffic in Narcotic Drugs and Psychotropic Substances, 1988)-এর অধীন নিয়ন্ত্রিত পৌনে চার শতাধিক ড্রাগ ও প্রিকারসার রাসায়নিকের আইনি শ্রেণিবিন্যাস, তাদের হলুদ তালিকা (Yellow List), সবুজ তালিকা (Green List) ও লাল তালিকা (Red List)-এর জটিল কারিগরি রূপভেদকে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাটালগ ও সারণিকৃত রেফারেন্স হিসেবে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
এই খণ্ডটি কোনো ফাঁপা নৈতিক প্রচারণার বয়ান নয়; এটি প্রমাণভিত্তিক বিজ্ঞান, জৈব-নৃতত্ত্ব এবং বৈশ্বিক বিচারিক দলিলের এক সুসংহত মেলবন্ধন। গবেষক, চিকিৎসক, আইনপ্রণেতা, সমাজবিজ্ঞানী এবং সচেতন পাঠকের জন্য এটি এমন এক প্রামাণ্য জ্ঞানকোষ, যা মাদক নামক বৈশ্বিক সংকটের সূক্ষ্মতম আণবিক কণা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়কে বিজ্ঞানমনস্ক ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুধাবন করতে সহায়তা করবে।
পরিশিষ্ট ক: উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ইতিবৃত্ত
মানব সভ্যতার আদিম আচার-অনুষ্ঠান, মধ্যযুগীয় বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক রাজস্ব ব্যবস্থা, আধুনিক অপরাধ অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত আলোচনায় যেসব উদ্ভিদ ও ছত্রাকের উল্লেখ পূর্ববর্তী খণ্ডদ্বয়ে এসেছে, সেগুলোর উদ্ভিদ্বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ইতিবৃত্ত এই অংশে বিশদভাবে সংকলিত হলো।
আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি বা আন্তর্জাতিক শৈবাল, ছত্রাক ও উদ্ভিদ নামকরণ কোড (International Code of Nomenclature for algae, fungi, and plants – ICN) অনুযায়ী প্রতিটি উদ্ভিদের পরিচিতি নির্ধারিত হয় দ্বিপদ নামকরণ (binomial nomenclature) পদ্ধতির মাধ্যমে। এই বৈজ্ঞানিক নামকরণের প্রথম পদটি হলো গণনাম (generic name), যা ব্যাকরণগতভাবে একটি বিশেষ্য পদ (noun) এবং এর প্রারম্ভিক অক্ষরটি সর্বদা ক্যাপিটাল বা বড় হাতের হরফে লেখা হয়। দ্বিতীয় পদটি হলো প্রজাতিক নির্দেশক পদ (specific epithet), যা মূলত সংশ্লিষ্ট গণের কোনো সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, বর্ণ, ভৌগোলিক উৎস বা ব্যবহারিক গুণের পরিচায়ক একটি বিশেষণ পদ (adjective) এবং এটি ছোট হাতের হরফে লেখা হয়।
ধ্রুপদী লাতিন ভাষার ব্যাকরণিক নিয়ম অনুযায়ী, বিশেষ্য পদের নিজস্ব লিঙ্গ – পুংলিঙ্গ (masculine), স্ত্রীলিঙ্গ (feminine) অথবা ক্লীবলিঙ্গ (neuter) – এবং কারকীয় বিভক্তির ওপর ভিত্তি করে বিশেষণ পদের রূপ নির্ধারিত হয়। একে ব্যাকরণের ভাষায় বিশেষ্য-বিশেষণ সংগতি (adjectival agreement) বলা হয়। নিচে প্রতিটি ভুক্তিতে উদ্ভিদের প্রচলিত নাম, দ্বিপদ বৈজ্ঞানিক নাম, প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণ, প্রাচীন ধ্রুপদী লাতিন উচ্চারণ, বিশদ ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, রূপমূলতাত্ত্বিক ব্যাকরণিক চরিত্র, সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদের রাসায়নিক উপক্ষার এবং তাদের ঐতিহাসিক ও ফার্মাকোলজিক্যাল তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হলো।
আফিম পপি (Papaver somniferum)
আফিম পপি উদ্ভিদের স্বীকৃত দ্বিপদ বৈজ্ঞানিক নাম হলো পাপাভের সমনিফেরাম (Papaver somniferum)। প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণরীতিতে এর উচ্চারণ ‘প্যাপাভার সমনিফেরাম’ এবং প্রাচীন রোমান ধ্রুপদী লাতিন উচ্চারণরীতিতে এর বিশুদ্ধ রূপ হলো ‘পাপাউয়ের সমনিফ্যারুম’।
নামটির ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণনাম পাপাভের (Papaver) প্রাচীন লাতিন ভাষার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার থেকে আগত। ঐতিহাসিক ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, এর সম্ভাব্য উৎস প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার দ্বিত্ব অনুকার ধাতু, যা কোনো স্ফীত বা ফোলা বস্তুকে নির্দেশ করত। পরবর্তীতে প্রাচীন রোমের লোকব্যবহারে শব্দটি শিশুদের দেওয়া তরল খাবারের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। প্রাচীন রোমে কান্নারত ও দুধের শিশুকে ঘুম পাড়ানোর উদ্দেশ্যে তরল খাদ্য বা মণ্ডের সাথে পপির রস মিশিয়ে দেওয়ার যে সামাজিক প্রথা প্রচলিত ছিল, তার ভিত্তিতে লাতিন পাপ্পা (pappa) বা শিশুদের খাবার খাওয়ানোর ক্রিয়াপদ পাপারে (pappare) থেকে উদ্ভিদের এই সাধারণ নামটি লাতিন সাহিত্যে গৃহীত হয়।
প্রজাতিক নির্দেশক পদ সমনিফেরাম (somniferum) একটি সমাসবদ্ধ লাতিন যৌগিক শব্দ। এটি গঠিত হয়েছে দুটি স্বতন্ত্র লাতিন শব্দাংশের সংযোগে: প্রথম অংশ সম্নুস (somnus), যার অর্থ নিদ্রা, ঘুম বা তন্দ্রা (যা প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ক্রিয়ামূল স্বেপ (swep-) বা ঘুমানো থেকে সংস্কৃত ‘স্বপ্ন’ শব্দের সমান্তরালে উৎপন্ন); এবং দ্বিতীয় অংশ লাতিন ক্রিয়ামূল ফেরে (ferre), যার অর্থ বহন করা, প্রসব করা বা উৎপাদন করা। ফলে প্রজাতিক শব্দটির সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায় ‘যা নিদ্রা বহন করে আনে’ বা ‘নিদ্রাজনক’।
লাতিন ব্যাকরণ অনুযায়ী পাপাভের (Papaver) তৃতীয় ডিক্লেনশনের (Third Declension) অন্তর্ভুক্ত একটি ক্লীবলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ (neuter noun)। বিশেষ্য পদটি ক্লীবলিঙ্গীয় একবচন হওয়ায় এর বিশেষণ পদটিকেও ক্লীবলিঙ্গ রূপ ধারণ করতে হয়। লাতিন ত্রিলিঙ্গী বিশেষণের পুংলিঙ্গ রূপ হলো সমনিফের (somnifer), স্ত্রীলিঙ্গ রূপ সমনিফেরা (somnifera) এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ সমনিফেরাম (somniferum)। বিশেষ্যের লিঙ্গের সাথে সংগতি বজায় রাখার ব্যাকরণিক নিয়মে এখানে ক্লীবলিঙ্গীয় রূপ ‘সমনিফেরাম’ প্রযুক্ত হয়েছে।
উদ্ভিদবৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এটি পাপাভেরেসি (Papaveraceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি একবর্ষজীবী বীরুৎজাতীয় উদ্ভিদ। কাঁচা ফলের ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি করলে যে দুধের মতো কষ নির্গত হয়, তা জমাট বেঁধে কাঁচা আফিম তৈরি হয়। এর প্রধান সক্রিয় রাসায়নিক উপাদানগুলো হলো ফেনানথ্রিন গোত্রের ক্ষারক মরফিন (morphine), কোডিন (codeine), এবং থেবেইন (thebaine); এবং বেনজাইলআইসোকুইনোলিন গোত্রের ক্ষারক পাপাভেরিন (papaverine) ও নসক্যাপিন (noscapine)। এই অ্যালকালয়েডগুলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (mu-opioid receptor)-এর সাথে যুক্ত হয়ে তীব্র বেদনানাশক অনুভূতি, ইউফোরিয়া এবং শ্বাসযন্ত্রের অবদমন ঘটায়। প্রাচীন মিশরের এবার্স প্যাপিরাস (Ebers Papyrus) থেকে শুরু করে বাংলার ঔপনিবেশিক আফিম এজেন্সি এবং উনিশ শতকের ইঙ্গ-চীন আফিম যুদ্ধের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই উদ্ভিদ।
কোকা গাছ (Erythroxylum coca)
আন্দিজ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কোকা উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম ইরিথ্রোক্সিলাম কোকা (Erythroxylum coca)। প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণে এটি ‘এরিথ্রোজাইলাম কোকা’ এবং প্রাচীন ধ্রুপদী লাতিন উচ্চারণে ‘এর্যূথ্রোক্সূলুম কোকা’ (য এর উচ্চারণ য় পড়তে হবে)।
গণনাম ইরিথ্রোক্সিলাম (Erythroxylum) দুটি প্রাচীন গ্রিক শব্দমূলের সমন্বয়ে আধুনিক লাতিন পদ্ধতিতে গঠিত হয়েছে। এর প্রথম অংশ গ্রিক বিশেষণ পদ ইরিথ্রোস (erythros), যার আক্ষরিক অর্থ রক্তবর্ণ, লোহিত বা লাল। দ্বিতীয় অংশটি এসেছে গ্রিক বিশেষ্য পদ ক্সিলন (xylon) থেকে, যার অর্থ কাঠ, কাষ্ঠখণ্ড বা কাষ্ঠল কাণ্ড। সুতরাং যৌগিক গণনামটির সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায় ‘লোহিতকাষ্ঠ’ বা ‘লাল কাঠবিশিষ্ট গাছ’। এই গণের কিছু উদ্ভিদের ভেতরের কাঠে লালচে আভা থাকার কারণে এই নামকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রজাতিক নাম কোকা (coca) কোনো ইউরোপীয় ধ্রুপদী ভাষা থেকে আসেনি; এটি দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসী ভাষা আইমারা ও কেচুয়া ভাষার মূল শব্দ ককুকা (khoka) থেকে স্প্যানিশ ভাষার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক লাতিনে গৃহীত হয়েছে। আদিবাসী সংস্কৃতিতে এই শব্দের মূল অর্থ ‘বৃক্ষ’ বা ‘সর্বোৎকৃষ্ট পবিত্র গাছ’।
ব্যাকরণগতভাবে ইরিথ্রোক্সিলাম (Erythroxylum) দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের (Second Declension) অন্তর্ভুক্ত একটি ক্লীবলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ, যা গ্রিক ক্লীবলিঙ্গীয় প্রত্যয় অন (-on)-এর লাতিন রূপ উম (-um) গ্রহণ করে গঠিত হয়েছে। এখানে প্রজাতির পদ ‘কোকা’ কোনো পরিবর্তনশীল লাতিন বিশেষণ নয়; এটি লাতিন ব্যাকরণের দৃষ্টিতে একটি অব্যয়িত দেশজ বিশেষ্য, যা ব্যাকরণের ভাষায় অ্যাপোজিশন হিসেবে বিশেষ্য (noun in apposition) হিসেবে গণের পাশে অপরিবর্তিত অবস্থায় বসেছে।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ইরিথ্রোক্সিলেসি (Erythroxylaceae) পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী চিরহরিৎ গুল্ম। এর আদি আবাস পেরু, বলিভিয়া ও কলম্বিয়ার আন্দিজ পর্বতের আর্দ্র নিম্ন-উপত্যকা। এর পাতায় ট্রোপেন গোত্রের জৈব অ্যালকালয়েড কোকেন (cocaine) বা বেনজয়িলমিথাইলএকগোনিন প্রধান সক্রিয় উপাদান হিসেবে থাকে। কোকেন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে নিউরনের প্রিসিন্যাপ্টিক মেমব্রেনে থাকা ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার (dopamine transporter – DAT) প্রোটিনকে অবরুদ্ধ করে দেয়। ফলে ডোপামিনের পুনঃশোষণ বন্ধ হয়ে সিন্যাপটিক ফাঁকে ডোপামিনের তীব্র ঘনত্ব তৈরি হয়, যা চরম শারীরিক উদ্দীপনা ও ক্ষুধা নিবৃত্তি ঘটায়। স্থানীয় আদিবাসীদের উচ্চতাজনিত অবসাদ মুক্তির ভেষজ থেকে এটি আধুনিক যুগে বৈশ্বিক কার্টেল অর্থনীতির প্রধান রাসায়নিক পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে।
গাঁজা বা ক্যানাবিস (Cannabis sativa)
বিশ্বজুড়ে মাদক ও আঁশের জন্য বহুল ব্যবহৃত উদ্ভিদের আদি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম ক্যানাবিস স্যাটিভা (Cannabis sativa)। প্রচলিত ইংরেজি রীতিতে এর উচ্চারণ ‘ক্যানাবিস স্যাটিভা’ এবং প্রাচীন ক্লাসিকাল লাতিন উচ্চারণপদ্ধতিতে এর রূপ ‘কান্নাবিস সাতিউয়া’।
গণনাম ক্যানাবিস (Cannabis) শব্দটি গ্রিক শব্দ কান্নাবিস (kannabis) থেকে সরাসরি প্রাচীন লাতিনে প্রবেশ করেছে। ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শব্দটি মূলত ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের যাযাবর জাতি স্কিথিয়ানদের ভাষা থেকে গ্রিক ভাষায় গৃহীত হয়েছিল। প্রাচীন সেমিটিক ও সুমেরীয় কিউনিফর্ম লিপিতে শণজাতীয় আঁশযুক্ত গাছকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত কুনাবু (qunnabu) শব্দের সাথে এর প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। প্রজাতিক নির্দেশক পদ স্যাটিভা (sativa) এসেছে লাতিন ক্রিয়াবাচক বিশেষণ সাতিভুস (sativus) থেকে, যার মূল ক্রিয়ামূল হলো লাতিন সেরে (serere), যার অর্থ বীজ বপন করা বা চাষাবাদ করা। ফলে প্রজাতির পদটির অর্থ দাঁড়ায় ‘চাষকৃত’, ‘বপনযোগ্য’ বা ‘গৃহপালিত’, যা বুনো উদ্ভিদের বিপরীত অবস্থাকে নির্দেশ করে।
ব্যাকরণিক কাঠামোর দিক থেকে ক্যানাবিস (Cannabis) হলো লাতিন ব্যাকরণের গ্রিক উৎসজাত প্রথম ডিক্লেনশনের একটি ব্যতিক্রমী স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ (feminine noun)। বিশেষ্য-বিশেষণ সংগতির নিয়ম অনুযায়ী, প্রজাতির পদটিকেও প্রথম ও দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের ত্রিলিঙ্গী বিশেষণ থেকে স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন প্রথমা রূপ ধারণ করতে হয়েছে। লাতিন পুংলিঙ্গ রূপ সাতিভুস (sativus) এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ সাতিভুম (sativum) পরিহার করে এখানে স্ত্রীলিঙ্গবাচক রূপ ‘স্যাটিভা’ ব্যবহৃত হয়েছে।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিচারে এটি ক্যানাবেসি (Cannabaceae) পরিবারের একটি একবর্ষজীবী ও প্রধানত ভিন্নবাসী (dioecious) উদ্ভিদ, অর্থাৎ এর পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ফোটে। অপ্রস্ফুটিত স্ত্রী মঞ্জরি ও কচি পাতায় থাকা বিশেষ রেজিন গ্রন্থি বা ট্রাইকোমে প্রধান মনোদৈহিক উপাদান ডেল্টা-৯-টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (delta-9-tetrahydrocannabinol – THC) এবং ঔষধি গুণসম্পন্ন উপাদান ক্যানাবিডিওল (cannabidiol – CBD) উৎপন্ন হয়। এই রাসায়নিক যৌগগুলো মস্তিষ্কের নিজস্ব এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থা (endocannabinoid system)-এর সিবি-ওয়ান (CB1) রিসেপ্টরের ওপর আংশিক অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে আনন্দানুভূতি, স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিবিভ্রম এবং ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। ব্রিটিশ আমলে বাংলার নওগাঁর ঐতিহাসিক গাঁজা মহালের একচেটিয়া বাণিজ্যিক উৎপাদন ছিল এই প্রজাতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ভারতীয় ক্যানাবিস বা হাশিশ গুল্ম (Cannabis indica)
উচ্চ রেজিনযুক্ত গুল্মজাতীয় ক্যানাবিসের দ্বিতীয় প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম ক্যানাবিস ইন্ডিকা (Cannabis indica)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে একে বলা হয় ‘ক্যানাবিস ইন্ডিকা’ এবং ধ্রুপদী লাতিনে এর উচ্চারণ ‘কান্নাবিস ইন্দিকা’।
এর গণনাম ‘ক্যানাবিস’-এর ভাষাতাত্ত্বিক উৎস পূর্বের ভুক্তির অনুরূপ প্রাচীন স্কিথিয়ান ও গ্রিক শণ নির্দেশক শব্দভাণ্ডার থেকে আগত। তবে এর প্রজাতির পদ ইন্ডিকা (indica) একটি ভৌগোলিক নির্দেশক ধ্রুপদী লাতিন বিশেষণ পদ। প্রাচীন গ্রিক শব্দ ইন্ডিকোস (Indikos) থেকে লাতিন ভাষায় আগত ইন্ডিকুস (Indicus) শব্দের অর্থ হলো ‘ভারত সম্পর্কিত’, ‘ভারতীয়’ বা ‘ভারতবর্ষীয়’ (সিন্ধু নদ ও তৎসংলগ্ন ভূখণ্ড নির্দেশক)। ১৭৮৫ সালে ফরাসি প্রকৃতিবিদ জঁ-ব্যাপটিস্ট লামার্ক ভারতবর্ষ থেকে সংগৃহীত খাটো, ঘন শাখা-প্রশাখা এবং অত্যন্ত তীব্র নেশা সৃষ্টিকারী রেজিনযুক্ত নমুনা পরীক্ষা করে একে ইউরোপীয় সাধারণ শণ বা ক্যানাবিস স্যাটিভা থেকে পৃথক প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করতে এই নামকরণ করেন।
ব্যাকরণিক নিয়মে ‘ক্যানাবিস’ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য হওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের ভৌগোলিক বিশেষণ পদের মধ্য থেকে পুংলিঙ্গ ইন্ডিকুস (Indicus) বা ক্লীবলিঙ্গ ইন্ডিকুম (Indicum)-এর পরিবর্তে স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন রূপ ‘ইন্ডিকা‘ প্রযুক্ত হয়েছে।
এটি ক্যানাবেসি (Cannabaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি গুল্ম, যা উচ্চতায় স্যাটিভার চেয়ে খাটো কিন্তু পাতায় অধিক চওড়া এবং গাঢ় সবুজ। এতে তুলনামূলকভাবে টিএইচসি-র পাশাপাশি সিবিডি-র অনুপাত এমনভাবে বিন্যস্ত থাকে যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে গভীর পেশি শিথিলতা, শারীরিক নিস্তেজতা বা অবশকারী প্রভাব তৈরি করে। মধ্য এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মরমী সুফি দরবেশদের ব্যবহৃত ‘হাশিশ‘ বা ‘চরস‘ মূলত এই প্রজাতির নির্যাস থেকে তৈরি হতো।
আরগট ছত্রাক (Claviceps purpurea)
এলএসডি আবিষ্কারের ভিত্তি এবং প্রাচীন ধর্মীয় আচারের অনুঘটক ছত্রাকটির বৈজ্ঞানিক নাম ক্ল্যাভিসেপস পারপুরিয়া (Claviceps purpurea)। প্রচলিত ইংরেজি রীতিতে এর উচ্চারণ ‘ক্লাভিসেপস পারপুরায়া’ এবং ধ্রুপদী লাতিন উচ্চারণে এর শুদ্ধ রূপ ‘ক্লাউইকেপ্স পুরপ্যূরেআ’।
গণনাম ক্ল্যাভিসেপস (Claviceps) একটি যৌগিক লাতিন শব্দ, যা ছত্রাকের শারীরিক গঠন নির্দেশ করে। এটি গঠিত হয়েছে দুটি লাতিন শব্দাংশের সমন্বয়ে: প্রথম অংশ ক্ল্যাভা (clava), যার অর্থ গদা, লাঠি বা মুগুর; এবং দ্বিতীয় অংশটি এসেছে লাতিন বিশেষ্য ক্যাপুট (caput, যার অর্থ মাথা)-এর পরিবর্তিত রূপ সেপস (-ceps) থেকে। ফলে গণনামটির সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায় ‘গদাকৃতির মস্তকবিশিষ্ট’ বা ‘মুগুরমাথা’। অন্যদিকে প্রজাতিক নির্দেশক পদ পারপুরিয়া (purpurea) এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ পোরফুরা (porphyra) থেকে আগত লাতিন বিশেষণ পুরপুরিউস (purpureus) থেকে, যার অর্থ ‘রক্তবেগুনী’, ‘গাঢ় লালচে বেগুনি’ বা ‘পার্পল বর্ণ’। আক্রান্ত শস্যদানা এই ছত্রাকের প্রভাবে গাঢ় বেগুনি রঙ ধারণ করে বলেই এমন প্রজাতিক নাম দেওয়া হয়েছে।
ব্যাকরণিক বিচারে ‘ক্ল্যাভিসেপস’ শব্দটি তৃতীয় ডিক্লেনশনের অন্তর্ভুক্ত একটি সমাসবদ্ধ বিশেষ্য। বোটানিক্যাল লাতিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী এটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক পদ হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ্য পদের সাথে লিঙ্গগত সংগতি রাখতে গিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের রঙবাচক বিশেষণের পুংলিঙ্গ রূপ পুরপুরিউস (purpureus) কিংবা ক্লীবলিঙ্গ রূপ পুরপুরিউম (purpureum) পরিহার করে স্ত্রীলিঙ্গীয় রূপ ‘পারপুরিয়া’ ব্যবহৃত হয়েছে।
ছত্রাকবিজ্ঞানের বিচারে এটি ক্ল্যাভিসিপিটাসি (Clavicipitaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি মারাত্মক বিষাক্ত পরজীবী ছত্রাক। এটি মূলত রাই, গম, যব প্রভৃতি ঘাসজাতীয় খাদ্যশস্যের শীষে বাসা বাঁধে এবং সাধারণ বীজকে একটি শক্ত, কৃষ্ণ-বেগুনি রঙের কাঠামামুটি দণ্ডে রূপান্তর করে যাকে স্ক্লেরোশিয়াম (sclerotium) বলা হয়। এতে বিপুল পরিমাণে এরগোট অ্যালকালয়েড থাকে, যার প্রধান হলো এরগোটামিন (ergotamine), এরগোমেট্রিন (ergometrine) এবং লাইসার্জিক অ্যাসিড (lysergic acid)। এই উপাদানগুলো মসৃণ পেশির তীব্র সংকোচন ঘটায় এবং সেরোটোনিন রিসেপ্টরে কাজ করে মারাত্মক মানসিক বিভ্রান্তি ও কৃত্রিম বিভ্রম তৈরি করে। মধ্যযুগে এই ছত্রাকযুক্ত রুটি খেয়ে হাজার হাজার মানুষের হাত-পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে খসে পড়ত, যাকে ‘সেন্ট অ্যান্টনিজ ফায়ার’ বলা হতো। প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত এলেউসিনীয় রহস্যানুষ্ঠানের যবপানীয় ‘কাইকিয়ন‘-এর গোপন সাইকেডেলিক উপাদান ছিল এই ছত্রাকের ক্ষারক।
বুনো লাল মাশরুম বা ফ্লাই অ্যাগারিক (Amanita muscaria)
সাইবেরীয় যাযাবর শামানিক সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় সাইকোঅ্যাকটিভ মাশরুমের বৈজ্ঞানিক নাম আমানিতা মাসকারিয়া (Amanita muscaria)। প্রচলিত ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘অ্যামানিটা মাসকারিয়া’ এবং ক্লাসিকাল লাতিন পদ্ধতিতে এর উচ্চারণ ‘আমানীতা মুস্কারিআ’।
গণনাম আমানিতা (Amanita) প্রাচীন গ্রিক ভৌগোলিক নাম আমানোস (Amanos) থেকে গ্রিক শব্দ আমানিতাই (amanitai) হয়ে লাতিনে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রাচীন সিলিসিয়া (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্ত) অঞ্চলের আমানোস পর্বতমালার ঘন অরণ্যে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির মাশরুম জন্মাত বলেই প্রাচীন গ্রিকরা বুনো মাশরুমকে এই ভৌগোলিক নামে ডাকত। প্রজাতিক নির্দেশক পদ মাসকারিয়া (muscaria) এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ মুস্কা (musca) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘সাধারণ ঘরের মাছি’। লাতিন ভাষায় ‘মুস্কা‘-র সাথে গুণবাচক প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত বিশেষণ মুস্কারিউস (muscarius)-এর অর্থ দাঁড়ায় ‘মাছি-সম্পর্কিত’ বা ‘মাছি নিরোধক’। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় লোকায়ত সমাজে এই বিষাক্ত মাশরুমের টুপি ছিঁড়ে দুধের পাত্রে ভিজিয়ে রেখে মাছি মারার বিষাক্ত ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হতো; সেই ব্যবহারিক ইতিহাস থেকেই লিনিয়াস এর প্রজাতির নাম নির্ধারণ করেন।
ব্যাকরণগত দিক থেকে ‘আমানিতা’ হলো প্রথম ডিক্লেনশনের (First Declension) একটি সুনির্দিষ্ট স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। লাতিন ব্যাকরণের রূপমূলতাত্ত্বিক নিয়ম অনুসারে এর সাথে সংগতি রেখে প্রজাতির বিশেষণটিও স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন রূপ ‘মাসকারিয়া’ গ্রহণ করেছে; এর পুংলিঙ্গ রূপ হতো ‘মাসকারিউস’ এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ হতো ‘মাসকারিয়াম’।
এটি আমানিটাসি (Amanitaceae) পরিবারের একটি ব্যাসিডিওমাইসিটিস ছত্রাক। এর বহিরাবরণ উজ্জ্বল লাল বা স্কারলেট বর্ণের হয়ে থাকে, যার ওপর সাদা রঙের খণ্ডিত বিন্দুর মতো রিং বা আশ দেখা যায়। ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিক মাশরুমের সাথে এর ফার্মাকোলজিক্যাল কোনো মিল নেই; এর প্রধান সক্রিয় উপাদান হলো দুটি আইসোক্সাজল ডেরিভেটিভ: ইবোটেনিক অ্যাসিড (ibotenic acid) এবং মাস্কিমল (muscimol)। শুকানোর প্রক্রিয়ায় ইবোটেনিক অ্যাসিড ডিকার্বক্সিলেশনের মাধ্যমে মাস্কিমলে রূপান্তরিত হয়। মাস্কিমল মানব মস্তিষ্কের প্রধান প্রতিরোধক রাসায়নিক গাবা-এ রিসেপ্টর (GABA-A receptor)-এর শক্তিশালী ফুল অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে। ফলে এটি চেতনা হ্রাস, স্থানিক আকারের দৃষ্টিভ্রম (বস্তুকে অস্বাভাবিক বড় বা ছোট দেখা) এবং অলীক শারীরিক উড্ডয়নের তীব্র বিভ্রম সৃষ্টি করে। বৈদিক সোমরসের সম্ভাব্য উদ্ভিজ্জ প্রার্থী এবং সাইবেরিয়ার কোরিয়াক ও চুকচি শামানদের ধর্মানুষ্ঠানের মূল উপাদান ছিল এই ছত্রাক।
সাইলোসাইবিন মাশরুম (Psilocybe mexicana)
মেসোআমেরিকান মাজাতেক জনগোষ্ঠীর নিরাময় আচারে ব্যবহৃত মাশরুমের প্রধান বৈজ্ঞানিক নাম সাইলোসাইবি মেক্সিকানা (Psilocybe mexicana)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে এর রূপ ‘সাইলোসাইবি মেক্সিকানা’ এবং ক্লাসিকাল লাতিনে এর উচ্চারণ ‘প্সীলোক্যুবে মেক্সীকানা’।
গণনাম সাইলোসাইবি (Psilocybe) দুটি প্রাচীন গ্রিক শব্দাংশ জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে। প্রথম অংশ গ্রিক বিশেষণ সাইলোস (psilos), যার অর্থ নগ্ন, মসৃণ, ত্বকহীন বা উন্মুক্ত। দ্বিতীয় অংশটি এসেছে গ্রিক বিশেষ্য কুবে (kybe) থেকে, যার অর্থ মাথা বা মাথার খুলি। ফলে গণনামটির সামগ্রিক রূপমূলতাত্ত্বিক অর্থ দাঁড়ায় ‘মসৃণ মস্তক’ বা ‘নগ্নমাথা’, যা এই মাশরুমের টুপির মসৃণ উপরিভাগের ত্বকীয় চরিত্র নির্দেশ করে। প্রজাতিক নির্দেশক পদ মেক্সিকানা (mexicana) একটি আধুনিক ভৌগোলিক বিশেষণ, যা মধ্য আমেরিকার রাষ্ট্র মেক্সিকোর নাম থেকে লাতিন রীতি অনুযায়ী তৈরি হয়েছে, অর্থাৎ ‘মেক্সিকো সম্পর্কিত’ বা ‘মেক্সিকোতে প্রাপ্ত’।
ব্যাকরণিক কাঠামোয় ‘সাইলোসাইবি’ একটি গ্রিক উৎসজাত স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। এই কারণে ভৌগোলিক নির্দেশক লাতিন বিশেষণের মধ্য থেকে পুংলিঙ্গ রূপ মেক্সিকানুস (mexicanus) এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ মেক্সিকানুম (mexicanum) বর্জন করে স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন প্রথমা রূপ ‘মেক্সিকানা’ গৃহীত হয়েছে।
এটি হাইমেনোগ্যাস্ট্রাসি (Hymenogastraceae) পরিবারের অন্তর্গত একটি ছোট আকারের মাশরুম। মেসোআমেরিকার আজটেক সভ্যতায় এটি ‘তেওনানাকাতল’ বা ‘ঈশ্বরের মাংস’ নামে পরিচিত ছিল। এর মূল সাইকোঅ্যাকটিভ উপাদান হলো ট্রিপটামিন গোত্রের অ্যালকালয়েড সাইলোসাইবিন (psilocybin) এবং এর সক্রিয় রূপ সাইলোসিন (psilocin)। মানবদেহে প্রবেশের পর যকৃতের অ্যালকালাইন ফসফাটেজ এনজাইমের প্রভাবে সাইলোসাইবিনের ফসফেট গ্রুপ ভেঙে গিয়ে সাইলোসিন মুক্ত হয়। সাইলোসিন রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক ভেদ করে সরাসরি মস্তিষ্কের সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর (5-HT2A receptor)-কে সক্রিয় করে। এর ফলে মস্তিষ্কের সংযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত হয় এবং মানুষের আত্মসচেতনতা বা অহংবোধ নিয়ন্ত্রণকারী ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (Default Mode Network – DMN) সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে যায়। মেক্সিকোর ওহাকা অঞ্চলের নারী নিরাময়কারী মারিয়া সাবিনার আরোগ্য আচারের মূল উপাদান ছিল এই উদ্ভিদ।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
আয়াহুয়াস্কা লতা (Banisteriopsis caapi)
আমাজনীয় শামানবাদের মূল সাইকোঅ্যাকটিভ লতার বৈজ্ঞানিক নাম বানিস্তেরিওপসিস ক্যাপাই (Banisteriopsis caapi)। প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণে এটি ‘ব্যানিস্টেরিওপসিস ক্যাপি’ এবং ক্লাসিকাল লাতিন উচ্চারণরীতিতে ‘বানিস্তেরিওপ্সিস কাপি’।
গণনাম বানিস্তেরিওপসিস (Banisteriopsis) মূলত সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ পাদ্রি ও প্রকৃতিবিদ জন ব্যানিস্টার (John Banister)-এর নামকে স্মরণীয় করে রাখতে জীববিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ জোসেফ নিডেনজু কর্তৃক প্রস্তাবিত হয়। ব্যানিস্টারের নামের লাতিন রূপ ‘ব্যানিস্টেরিয়া’-র সাথে যুক্ত করা হয় প্রাচীন গ্রিক প্রত্যয় ওপসিস (opsis), যার অর্থ চেহারা, রূপ, সাদৃশ্য বা মতো। অর্থাৎ শব্দটির সামগ্রিক অর্থ ‘ব্যানিস্টেরিয়া গণের মতো দেখতে লতা’। প্রজাতিক পদ ক্যাপাই (caapi) কোনো ইউরোপীয় ধ্রুপদী উৎসজাত শব্দ নয়; এটি আমাজন অববাহিকার আদিবাসী টুপি-গুয়ারানি ভাষার শব্দ ‘কায়াপি’ থেকে এসেছে, যার আদিবাসী অর্থ ‘যে লতা শরীর পরিষ্কার করে’ বা সাধারণ ‘লতা’।
ব্যাকরণগতভাবে ‘বানিস্তেরিওপসিস’ তৃতীয় ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। প্রজাতির পদ ‘ক্যাপাই’ একটি অ-ইউরোপীয় অ-রূপান্তরিত দেশজ শব্দ হওয়ায় এটি লাতিন ব্যাকরণে অব্যয়িত বিশেষ্য (indeclinable noun) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে এর কোনো কারকীয় বা লিঙ্গীয় রূপান্তর ঘটে না।
এটি মালপিগিয়েসি (Malpighiaceae) পরিবারের একটি বিশাল ও দীর্ঘজীবী কাষ্ঠল আরোহী লতা। এই উদ্ভিদের কাণ্ড ও ছালে প্রচুর পরিমাণে বিটা-কার্বোলিন গোত্রের অ্যালকালয়েড থাকে, যার মধ্যে প্রধান হলো হারমিন (harmine), হারমালাইন (harmaline) এবং টেট্রাহাইড্রোহারমিন (tetrahydroharmine)। ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে এই উপাদানগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদী রিভার্সিবল ইনহিবিটর অব মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ-এ (RIMA) হিসেবে কাজ করে। আমাজনীয় আচারে এর সাথে সাইকোট্রিয়া ভিরিডিস মেশানো হয়; কারণ এককভাবে ডিএমটি মুখে খেলে তা পাকস্থলীর এনজাইমে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু এই লতার ক্ষারক সেই এনজাইমকে সাময়িকভাবে ব্লক করে দিয়ে ডিএমটি-কে অক্ষত অবস্থায় মস্তিষ্কে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। ব্রাজিলের সান্তো দাইমে এবং উনিয়াও দো ভেজেতাল গির্জার ধর্মীয় আচারের কেন্দ্রীয় ভিত্তি এই লতা।
চাকরুনা গুল্ম (Psychotria viridis)
আয়াহুয়াস্কা পানীয় তৈরিতে ব্যবহৃত প্রধান সহকারী উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম সাইকোট্রিয়া ভিরিডিস (Psychotria viridis)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে একে বলা হয় ‘সাইকোট্রিয়া ভিরিডিস’ এবং ধ্রুপদী লাতিনে এর উচ্চারণ ‘প্স্যূখোত্রিয়া উইরিডিস’।
গণনাম সাইকোট্রিয়া (Psychotria) প্রাচীন গ্রিক শব্দভাণ্ডার থেকে উদ্ভূত। এটি এসেছে গ্রিক যৌগিক বিশেষণ পদ সাইকোত্রোফোস (psychotrophos) থেকে, যা গঠিত হয়েছে দুটি গ্রিক শব্দের মিলনে: প্রথমটি সাইকে (psyche), যার আদি অর্থ জীবন, শ্বাস, আত্মা বা মন; এবং দ্বিতীয়টি গ্রিক ক্রিয়ামূল ত্রেফেইন (trephein), যার অর্থ পুষ্ট করা, রক্ষা করা বা টিকিয়ে রাখা। সুতরাং গণনামটির আক্ষরিক অর্থ ‘যা জীবনকে পুষ্ট করে’ বা ‘জীবনদায়ী ঔষধি’। প্রজাতিক নির্দেশক পদ ভিরিডিস (viridis) একটি খাঁটি লাতিন বিশেষণ, যার সহজ অর্থ ‘সবুজ’, ‘সতেজ’ বা ‘সবুজবর্ণের’। এর চকচকে ও গাঢ় সবুজ পাতার বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে লিনিয়াস এই নামকরণ করেছিলেন।
লাতিন ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী ‘সাইকোট্রিয়া’ প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য। লাতিন তৃতীয় ডিক্লেনশনের দ্বি-প্রান্তিক বিশেষণ (যাদের পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ রূপ অভিন্ন থাকে) ‘ভিরিডিস’-এর মধ্য থেকে স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন প্রথমা রূপ হিসেবে ‘ভিরিডিস’ শব্দটি অবিকৃতভাবে বসেছে (এর ক্লীবলিঙ্গ রূপটি হতো ভিরিদে [viride])।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের শ্রেণিবিভাগে এটি কফি পরিবারের অর্থাৎ রুবিয়েসি (Rubiaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি চিরহরিৎ বহুবর্ষজীবী গুল্ম। এর আদি নিবাস আমাজন অববাহিকার বৃষ্টি অরণ্য। এর পাতায় বিপুল ঘনত্বের শক্তিশালী সাইকেডেলিক উপক্ষার এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন (N,N-dimethyltryptamine – DMT) সঞ্চিত থাকে। ডিএমটি মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন রিসেপ্টরে তীব্র উদ্দীপনা তৈরি করে গভীর স্থানিক ও কালিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আমাজনীয় ভেজেতালিজমো ঐতিহ্যে এই গুল্মের পাতাকে আয়াহুয়াস্কা লতার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিদ্ধ করে পবিত্র ক্বাথ তৈরি করা হয়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
পেয়োটি ক্যাকটাস (Lophophora williamsii)
উত্তর ও মধ্য আমেরিকার মরু অঞ্চলের সনাতন সাইকেডেলিক ক্যাকটাসের বৈজ্ঞানিক নাম লোফোফোরা উইলিয়ামসি (Lophophora williamsii)। প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণে এটি ‘লোফোফোরা উইলিয়ামসিআই’ এবং ক্লাসিকাল লাতিন উচ্চারণপদ্ধতিতে ‘লোফোপহোরা উইলেলিয়াম্সিয়ী’।
গণনাম লোফোফোরা (Lophophora) দুটি গ্রিক শব্দাংশের সমাহারে গঠিত। এর প্রথম অংশ গ্রিক বিশেষ্য লোফোস (lophos), যার অর্থ পাখির ঝুঁটি, চূড়া বা চুলের স্তূপ; এবং দ্বিতীয় অংশটি এসেছে গ্রিক ক্রিয়ামূল ফোরোস (phoros) বা ফেরেয়িন (pherein) থেকে, যার অর্থ বহন করা। অর্থাৎ গণনামটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায় ‘ঝুঁটি বহনকারী’। এই ক্যাকটাসের বোতামের মতো ক্ষুদ্র স্ফীত কাঠামোর কেন্দ্রে কাঁটার পরিবর্তে নরম সাদা পশমের মতো যে রোমশ গুচ্ছ বা ঝুঁটি থাকে, তার ভিত্তিতে এই নাম দেওয়া হয়েছে। প্রজাতিক নির্দেশক পদ উইলিয়ামসি (williamsii) হলো ব্যক্তিনাম থেকে উৎপন্ন একটি লাতিন সম্বন্ধ পদ। উনিশ শতকের ইংরেজ পর্যটক ও ক্যাকটাস সংগ্রাহক থমাস উইলিয়ামস (Thomas Williams)-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই নামকরণ করা হয়।
ব্যাকরণিক বিশ্লেষণে ‘লোফোফোরা’ প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। প্রজাতিক পদটি কোনো সাধারণ বিশেষণ নয়; এটি আধুনিক ব্যক্তিনাম ‘উইলিয়ামস’-এর সাথে লাতিন পুংলিঙ্গ একবচনের জেনিটিভ বা ষষ্ঠী বিভক্তির প্রত্যয় -ই (-i) যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে। লাতিন ব্যাকরণে কারো ‘নামানুসারে’ বা ‘মালিকানা’ বোঝাতে সম্বন্ধ পদে এই প্রত্যয় যোগ করার নিয়ম রয়েছে; ফলে এর ব্যাকরণিক অর্থ ‘উইলিয়ামসের লোফোফোরা’।
এটি ক্যাকটাসি (Cactaceae) পরিবারের অন্তর্গত একটি ছোট, কাঁটাহীন এবং ধীরগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া মরু ক্যাকটাস। এর মাটির ওপরের অংশটিকে ‘পেয়োটি বাটন’ বলা হয়। এতে পঞ্চাশটিরও বেশি অ্যালকালয়েড থাকে, যার মধ্যে প্রধান এবং সর্বাধিক প্রভাবশালী উপাদান হলো ফেনিথাইলামাইন গোত্রের মেসক্যালিন (mescaline) বা ৩,৪,৫-ট্রাইমেথোক্সিফেনিথাইলামাইন। মেসক্যালিন মস্তিষ্কের কর্টিকো-স্ট্রায়াটো-থ্যালামো-কর্টিক্যাল লুপের তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে বদলে দেয় এবং সেরোটোনিন টু-এ রিসেপ্টরের মাধ্যমে চোখ জুড়ানো জ্যামিতিক নকশার চাক্ষুষ হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। উত্তর আমেরিকার নেটিভ আমেরিকান চার্চ (Native American Church)-এর ধর্মীয় আচারের আইনি স্বীকৃতি এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বহু ঐতিহাসিক মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই ক্যাকটাস।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
কৃষ্ণ হেনবেন (Hyoscyamus niger)
প্রাচীন গ্রিক ও মধ্যযুগীয় চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিষাক্ত এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম হায়োসায়ামাস নাইজার (Hyoscyamus niger)। প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণে এর রূপ ‘হায়োসাইয়ামাস নাইজার’ এবং ক্লাসিকাল লাতিনে এর উচ্চারণ ‘হ্যূওস্কুয়ামুস নিগের’।
গণনাম হায়োসায়ামাস (Hyoscyamus) একটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ হায়োসকুয়ামোস (hyoskyamos) থেকে লাতিনে অঙ্গীভূত হয়েছে। এটি গঠিত হয়েছে দুটি গ্রিক শব্দাংশ মিলিয়ে: প্রথম অংশ হিস (hys, যার সম্বন্ধ পদ hyos), যার অর্থ বুনো শূকর; এবং দ্বিতীয় অংশ কুয়ামোস (kyamos), যার অর্থ শিম বা শিমজাতীয় বীজ। প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে এই বিষাক্ত উদ্ভিদের ফল বা বীজ খেলে বুনো শূকর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও উন্মাদ হয়ে মারা যায়। সেই লোকবিশ্বাস থেকেই ডায়োস্কোরাইডিস ও থিওফ্রাস্টাসের যুগে এর নাম হয়েছিল ‘শূকরের শিমবীজ’। প্রজাতিক নির্দেশক পদ নাইজার (niger) একটি খাঁটি লাতিন বিশেষণ পদ, যার অর্থ ‘কালো’, ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ বা ‘কৃষ্ণবর্ণ’। উদ্ভিদের পাতার শিরা ও ফুলের অভ্যন্তরভাগে কালচে বেগুনি ছোপ থাকার কারণে এই বর্ণবাচক নাম দেওয়া হয়েছে।
লাতিন রূপতত্ত্ব অনুযায়ী ‘হায়োসায়ামাস’ দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের একটি পুংলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ (masculine noun)। বিশেষ্য-বিশেষণ সংগতির ব্যাকরণিক বিধানে প্রজাতির বিশেষণটিকেও পুংলিঙ্গ রূপ ধারণ করতে হয়েছে। লাতিন দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের ত্রিলিঙ্গী বিশেষণের পুংলিঙ্গ রূপ হলো নাইজার (niger), স্ত্রীলিঙ্গ রূপ নিগ্রা (nigra) এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ নিগ্রাম (nigrum)। বিশেষ্যটি পুংলিঙ্গ হওয়ায় এখানে পুংলিঙ্গীয় একবচন রূপ ‘নাইজার’ প্রযুক্ত হয়েছে।
এটি সোলানেসি (Solanaceae) পরিবারের একটি বিষাক্ত দ্বিবর্ষজীবী বীরুৎ। প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অস্ত্রোপচারের পূর্বে চেতনানাশক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। এর প্রধান বিষাক্ত উপাদানগুলো হলো অত্যন্ত শক্তিশালী ট্রোপেন অ্যালকালয়েড – স্কোপোলামিন (scopolamine), হায়োসায়ামিন (hyoscyamine) এবং অ্যাট্রোপিন (atropine)। এই রাসায়নিকগুলো কেন্দ্রীয় ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাসকারিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টর (muscarinic acetylcholine receptor)-কে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, চোখের মণি অস্বাভাবিক প্রসারিত হওয়া, দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম ভীতিকর হ্যালুসিনেশন ও দীর্ঘস্থায়ী প্রলাপ বা ডেলিরিয়াম সৃষ্টি হয়। প্রাচীন রোমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপে তথাকথিত ডাইনিদের উড্ডয়ন মলম তৈরিতে এই উদ্ভিদ ব্যবহার করা হতো।
ম্যানড্রেক (Mandragora officinarum)
প্রাচীন জাদুবিশ্বাস ও শল্যচিকিৎসার উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যানড্রাগোরা অফিসিনারাম (Mandragora officinarum)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে একে বলা হয় ‘ম্যানড্রাগোরা অফিসিনারাম’ এবং ক্লাসিকাল লাতিন রীতিতে এর উচ্চারণ ‘মান্দ্রাগোরা অফ্ফীকীনানারুম’।
গণনাম ম্যানড্রাগোরা (Mandragora) একটি অত্যন্ত প্রাচীন গ্রিক শব্দ, যার নিশ্চিত মূল উৎস ইন্দো-ইউরোপীয় নয়। অনেক ভাষাতাত্ত্বিকের মতে, এটি প্রাচীন সেমিটিক বা সংস্কৃত ‘মন্দার’ শব্দের দূরবর্তী রূপান্তর হতে পারে। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে এমন এক বিষাক্ত ভেষজকে নির্দেশ করতে এই নাম ব্যবহৃত হতো যার মূল বা শিকড় দেখতে মাটির নিচে কোনো মানবদেহের আকৃতির মতো মনে হতো। লোকবিশ্বাস ছিল এই গাছ মাটি থেকে তোলার সময় এটি তীব্র আর্তনাদ করে যা শুনলে মানুষ উন্মাদ হয়ে যায়। প্রজাতিক নির্দেশক পদ অফিসিনারাম (officinarum) একটি মধ্যযুগীয় চিকিৎসা লাতিন পরিভাষা। এটি এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ অফিসিনা (officina) থেকে, যার অর্থ ছিল মঠ বা ঔষধালয়ের চিকিৎসাগার বা ল্যাবরেটরি।
ব্যাকরণগত দিক থেকে ‘ম্যানড্রাগোরা‘ প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। তবে এখানে প্রজাতির পদটি কোনো সাধারণ বিশেষণ নয়; এটি লাতিন প্রথম ডিক্লেনশনের বিশেষ্য ‘অফিসিনা’-র বহুবচন জেনিটিভ বা ষষ্ঠী বিভক্তির রূপ। অর্থাৎ ব্যাকরণের দৃষ্টিতে ‘অফিসিনারাম’ শব্দের অর্থ হলো ‘ঔষধালয়সমূহের’ বা ‘চিকিৎসকদের ব্যবহারোপযোগী’। উদ্ভিদের ঔষধি ও ফার্মাকোলজিক্যাল উপযোগিতা বোঝাতে মধ্যযুগীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এই বিশেষ জেনিটিভ রূপটি ব্যবহার করতেন।
এটিও সোলানেসি (Solanaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ। প্রাচীন মিশরের এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস (Edwin Smith Papyrus) এবং পরবর্তীতে গ্রিক চিকিৎসক পেডানিয়াস ডায়োস্কোরাইডিসের চিকিৎসাপত্রে শল্যচিকিৎসার পূর্বে তীব্র সংজ্ঞাহীনতা তৈরির জন্য এর মূল ওয়াইনে ফুটিয়ে রোগীকে খাওয়ানোর বিধান লিপিবদ্ধ রয়েছে। হেনবেনের মতোই এতে প্রচুর পরিমাণে স্কোপোলামিন (scopolamine) এবং হায়োসায়ামিন (hyoscyamine) থাকে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কোলিনার্জিক পথগুলো অবরুদ্ধ করে এটি সংজ্ঞাহীনতা ও স্মৃতিবিলোপ ঘটায়। ডায়োস্কোরাইডিস এই উদ্ভিদের ক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়েই মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অ্যানেস্থেসিয়া (anaesthesia) বা চেতনাহীনতা শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
নীল পদ্ম (Nymphaea caerulea)
প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্রে চিত্রিত চিত্তপ্রশান্তিদায়ক জলজ উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম নিম্ফিয়া সিরুলিয়া (Nymphaea caerulea)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে এর রূপ ‘নিম্ফিয়া সিরুলিয়া’ এবং প্রাচীন ক্লাসিকাল লাতিনে এর উচ্চারণ ‘ন্যুস্ফায়া কাইরূলেআ’।
গণনাম নিম্ফিয়া (Nymphaea) প্রাচীন গ্রিক পৌরাণিক শব্দ নুম্ফে (nymphe) বা লাতিন নিম্ফা (nympha) থেকে এসেছে। গ্রিক পুরাণে নিম্ফ হলো জল, নদী, ঝর্ণা ও অরণ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বা পরীদের নাম। জলের বুকে অত্যন্ত সুন্দর ও শুদ্ধভাবে ফুটে থাকে বলেই প্রাচীন গ্রিকরা এই জলজ উদ্ভিদের নাম রেখেছিল জলপরীদের নামানুসারে। প্রজাতিক নির্দেশক পদ সিরুলিয়া (caerulea) এসেছে ধ্রুপদী লাতিন বিশেষণ কাইরুলিউস (caeruleus) থেকে, যার মূল উৎস লাতিন বিশেষ্য কায়লুম (caelum, যার অর্থ আকাশ বা স্বর্গ)। ফলে প্রজাতিক শব্দটির আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় ‘আকাশী নীল’ বা ‘স্বর্গীয় নীলবর্ণের’। নীল নদের শান্ত জলে এই নীল পাপড়ির পদ্ম ফুটত বলেই এমন প্রজাতিক নাম দেওয়া হয়েছে।
লাতিন রূপতত্ত্ব অনুযায়ী ‘নিম্ফিয়া’ প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। লাতিন ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী এর সাথে যুক্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের বিশেষণ পদটি পুংলিঙ্গ কাইরুলিউস (caeruleus) এবং ক্লীবলিঙ্গ কাইরুলিউম (caeruleum) ত্যাগ করে বিশেষ্যের সাথে সংগতি রেখে স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন রূপ ‘সিরুলিয়া’ (caerulea) ধারণ করেছে।
এটি নিম্ফিয়েসি (Nymphaeaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি জলজ উদ্ভিদ। প্রাচীন মিশরীয় অভিজাতদের উৎসব ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এই পদ্মের পাপড়ি ওয়াইনের সাথে ভিজিয়ে রেখে মাদকীয় পানীয় তৈরি করা হতো। এর প্রধান জৈব অ্যালকালয়েডগুলো হলো অ্যাপোমোরফিন (apomorphine) এবং নুসিফেরিন (nuciferine)। অ্যাপোমোরফিন হলো একটি নন-সিলেক্টিভ ডোপামিন রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (dopamine receptor agonist) এবং নুসিফেরিন মূলত ডোপামিন রিসেপ্টর ব্লকার ও সেরোটোনিন মডুলেটর হিসেবে কাজ করে। এর সম্মিলিত প্রভাব মানবদেহে এক ধরনের শান্ত, দুশ্চিন্তাহীন অথচ মৃদু আনন্দময় ঘোর তৈরি করে।
হেমলক (Conium maculatum)
দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য ব্যবহৃত প্রাণঘাতী উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম কোনিয়াম ম্যাকুলেটাম (Conium maculatum)। প্রচলিত আধুনিক ইংরেজি উচ্চারণে এটি ‘কোনাইয়াম ম্যাকুলেটাম’ এবং ধ্রুপদী লাতিনে এর উচ্চারণ ‘কোনীউম মাকুলাতুম’।
গণনাম কোনিয়াম (Conium) এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ কোনেইয়ন (koneion) থেকে, যা প্রাচীন এথেন্সে বিষপ্রয়োগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ব্যবহৃত বিষাক্ত উদ্ভিদটিকে বোঝাত। গ্রিক শব্দটি সম্ভবত ক্রিয়ামূল কোনোস (konos) বা ঘূর্ণির সাথে সম্পর্কিত, কারণ এই উদ্ভিদের বিষ পেটে গেলে মানুষের মাথা ঘোরে এবং তীব্র শারীরিক পক্ষাঘাত শুরু হয়। প্রজাতিক নির্দেশক পদ ম্যাকুলেটাম (maculatum) একটি লাতিন বিশেষণ, যা এসেছে লাতিন বিশেষ্য ম্যা কুলা (macula, যার অর্থ দাগ, বিন্দু বা কলঙ্ক) থেকে। লাতিন ক্রিয়াবাচক রূপ ‘ম্যাকুলারে’ (maculāre) (দাগযুক্ত করা) থেকে জাত বিশেষণ ‘ম্যাকুলাতুস’-এর অর্থ দাঁড়ায় ‘দাগযুক্ত’, ‘ছিটছিটে দাগবিশিষ্ট’ বা ‘চিহ্নিত’। এই উদ্ভিদের মসৃণ ফাঁপা কাণ্ডের গায়ে লালচে-বেগুনি রঙের ছিটছিট দাগ থাকে বলেই এই নাম।
ব্যাকরণগতভাবে ‘কোনিয়াম’ দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রিক-লাতিন ক্লীবলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ (neuter noun)। ব্যাকরণিক সংগতির নিয়মে প্রথম ও দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের ত্রিলিঙ্গী বিশেষণের পুংলিঙ্গ ম্যাকুলাতুস (maculatus) বা স্ত্রীলিঙ্গ ম্যাকুলাতা (maculata) বর্জন করে ক্লীবলিঙ্গীয় একবচন রূপ ‘ম্যাকুলেটাম’ প্রযুক্ত হয়েছে।
এটি এপিয়েসি (Apiaceae) বা গাজর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত অত্যন্ত বিষাক্ত একটি দ্বিবর্ষজীবী বীরুৎ। এর প্রধান সক্রিয় বিষাক্ত অ্যালকালয়েড হলো পাইপিরিডিন গোত্রের কোনিন (coniine) এবং এন-মিথাইলকোনিন (N-methylconiine)। কোনিন আণবিক গঠনের দিক থেকে নিকোটিনের সমতুল্য এবং এটি প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টর (nicotinic acetylcholine receptor)-কে অবরুদ্ধ করে নিউরোমাসকুলার জংশনের সংকেত পরিবহন চিরতরে বন্ধ করে দেয়। এর বিষক্রিয়ায় দেহের নিচের অংশ থেকে অবশতা শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ওঠে এবং সবশেষে শ্বাসযন্ত্রের ডায়াফ্রাম পেশি সম্পূর্ণ অচল হয়ে শ্বাসরোধে ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, অথচ মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক ও চেতনা সম্পূর্ণ সজাগ থাকে।
ব্ল্যাক হেলেবোর (Helleborus niger)
প্রাচীন গ্রিক হিউমোরাল চিকিৎসা শাস্ত্রে উন্মাদনা দূর করতে ব্যবহৃত উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম হেলেবোরাস নাইজার (Helleborus niger)। প্রচলিত ইংরেজি রীতিতে এর উচ্চারণ ‘হেলেবোরাস নাইজার’ এবং ধ্রুপদী লাতিন উচ্চারণে এর রূপ ‘হেল্লেবোরুস নিগের’।
গণনাম হেলেবোরাস (Helleborus) গ্রিক শব্দ হেলেবোরোস (helleboros) থেকে লাতিনে অঙ্গীভূত হয়েছে। শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত দুটি অংশ রয়েছে: প্রথম অংশ গ্রিক ক্রিয়ামূল হেলেইন (helein), যার অর্থ আহত করা, হত্যা করা বা বিনাশ করা; এবং দ্বিতীয় অংশটি এসেছে গ্রিক বিশেষ্য বোরা (bora) থেকে, যার অর্থ খাদ্য বা আহার্য। ফলে গণনামটির সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায় ‘মারাত্মক বা প্রাণঘাতী খাদ্য’। প্রজাতিক নির্দেশক পদ নাইজার (niger) একটি লাতিন বিশেষণ, যার অর্থ ‘কালো’ বা ‘কৃষ্ণবর্ণ’। যদিও এই উদ্ভিদের ফুল সাদা বা হালকা গোলাপি রঙের হয়, কিন্তু মাটির নিচে থাকা এর মূল বা রাইজোমটি সম্পূর্ণ কুচকুচে কালো রঙের হয় বলেই এই বৈপরীত্যমূলক প্রজাতিক নামকরণ।
ব্যাকরণিক বিচারে ‘হেলেবোরাস’ দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের একটি পুংলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। ফলে এর সাথে সংগতি বজায় রেখে লাতিন প্রথম ও দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের ত্রিলিঙ্গী বিশেষণের মধ্য থেকে পুংলিঙ্গ রূপ ‘নাইজার’ প্রযুক্ত হয়েছে (স্ত্রীলিঙ্গ রূপ হলো নিগ্রা এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ নিগ্রাম)।
এটি রেনানকুলাসি (Ranunculaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ। প্রাচীন গ্রিসে হিপোক্রেটিস এবং তার পরবর্তী চিকিৎসকেরা মানুষের অতিরিক্ত কালো পিত্ত বা কৃষ্ণ পিত্ত নিষ্কাশন করার জন্য এই উদ্ভিদের গুঁড়ো খেতে দিতেন। এতে থাকে অত্যন্ত বিষাক্ত কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড – হেলেবোরিন (helleborin) এবং হেলেবোরিনিন (helleborein)। এটি গ্রহণের ফলে তীব্র বমি ও মারাত্মক রেচন ঘটে শরীর সম্পূর্ণ জলশূন্য হয়ে যেত। মাত্রা সামান্য বেশি হলেই হৃদস্পন্দনের ছন্দপতন ঘটে মানুষের মৃত্যু হতো।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
এফেড্রা বা সোমলতা (Ephedra sinica)
প্রাচীন বৈদিক সোম এবং জরথুস্ত্রীয় হাওমার সম্ভাব্য উদ্ভিজ্জ বিকল্প এফেড্রার চীনা প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম এফেড্রা সিনিকা (Ephedra sinica)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে এটি ‘এফেড্রা সিনিকা’ এবং প্রাচীন ক্লাসিকাল লাতিনে এর উচ্চারণ ‘এফেদ্রা সীনিকা’।
গণনাম এফেড্রা (Ephedra) সরাসরি প্রাচীন গ্রিক শব্দভাণ্ডার থেকে এসেছে। গ্রিক এফেদ্রোস (ephedros) শব্দটি গঠিত হয়েছে দুটি গ্রিক অংশের সমন্বয়ে: প্রথমটি এপি (epi), যার অর্থ উপরে বা কাছে; এবং দ্বিতীয়টি হেদ্রা (hedra), যার অর্থ আসন, ভিত্তি বা বসার স্থান। প্রাচীনকালে পাথরের ওপর বা অন্য কোনো গাছের গায়ে লেগে থাকা ঘোড়ার লেজের মতো দেখতে পরজীবী বা পাথুরে গুল্মকে বোঝাতে এই নাম ব্যবহৃত হতো। প্রজাতিক নির্দেশক পদ সিনিকা (sinica) একটি মধ্যযুগীয় ভৌগোলিক লাতিন বিশেষণ পদ, যার অর্থ ‘চীন দেশীয়’ বা ‘চীন সম্পর্কিত’ (প্রাচীন গ্রিক শব্দ সিনাই [Sinai] বা চীন থেকে জাত)। চীনের ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসায় ‘মা হুয়াং’ নামে এটি হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল বলেই এই ভৌগোলিক প্রজাতিক নাম দেওয়া হয়।
লাতিন ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘এফেড্রা’ প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। বিশেষ্য পদের সাথে লিঙ্গগত সমতা বিধানের নিয়মে ভৌগোলিক বিশেষণের পুংলিঙ্গ সিনিকুস (sinicus) বা ক্লীবলিঙ্গ সিনিকুম (sinicum) বর্জন করে স্ত্রীলিঙ্গীয় একবচন রূপ ‘সিনিকা’ ব্যবহৃত হয়েছে।
এটি এফেড্রেসি (Ephedraceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি ব্যক্তবীজী চিরহরিৎ গুল্ম। এর সূক্ষ্ম গিঁটযুক্ত কচি ডালে প্রধান মনোদৈহিক উপাদান হিসেবে থাকে ফেনিথাইলামাইন গোত্রের শক্তিশালী অ্যালকালয়েড এফিড্রিন (ephedrine) এবং সিউডোএফিড্রিন (pseudoephedrine)। এফিড্রিন মানবদেহের প্রান্তীয় ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে নর-এড্রেনালিন হরমোনের নিঃসরণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং একই সাথে আলফা ও বিটা অ্যাড্রেনার্জিক রিসেপ্টরকে সরাসরি উদ্দীপিত করে। এর প্রভাবে ফুসফুসের ব্রঙ্কিয়াল নালী প্রসারিত হয়, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়ে এবং শারীরিক ক্লান্তি দূর হয়ে মানুষ তীব্র শারীরিক কর্মক্ষমতা ও বিনিদ্র সতর্কতা অনুভব করে। আধুনিক রসায়নে কোল্ড মেডিসিন হিসেবে ব্যবহৃত এই উপাদানটি থেকেই গোপন ল্যাবরেটরিতে ভয়াবহ সিন্থেটিক ড্রাগ মেথাম্ফেটামিন তৈরি করা হয়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
বুনো ইসফান্দ বা হারমাল (Peganum harmala)
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার প্রাচীন জরথুস্ত্রীয় হাওমার অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভেষজের বৈজ্ঞানিক নাম পেগানাম হারমালা (Peganum harmala)। প্রচলিত ইংরেজি উচ্চারণে এর রূপ ‘পেগানাম হারমালা’ এবং ধ্রুপদী লাতিনে এর উচ্চারণ ‘পেগানুম হারমালা’।
গণনাম পেগানাম (Peganum) প্রাচীন গ্রিক শব্দ পেগানন (peganon) থেকে লাতিনে রূপান্তরিত হয়েছে। গ্রিক ভাষায় ‘পেগানন’ বলতে সুগন্ধি ভেষজ রু (rue)-কে বোঝাত। এই উদ্ভিদটি দেখতে প্রাচীন গ্রিকদের পরিচিত রু গাছের মতো ছিল বলেই ডায়োস্কোরাইডিসের সময় থেকে এর এই গণনাম প্রচলিত হয়। প্রজাতিক নির্দেশক পদ হারমালা (harmala) প্রাচীন আরবি ও সিরিয়াক ভাষার শব্দভাণ্ডার থেকে বৈজ্ঞানিক লাতিনে প্রবেশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই উদ্ভিদের বীজকে ধূপ হিসেবে এবং চিকিৎসার কাজে ‘হারমাল’ নামে ডাকা হতো। অষ্টাদশ শতকে লিনিয়াস সেই প্রাচীন আরবি নামটিকে ল্যাটিনাইজেশন করে প্রজাতিক পদের মর্যাদা দেন।
ব্যাকরণগত দিক থেকে ‘পেগানাম’ দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের একটি ক্লীবলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ। প্রজাতিক পদ ‘হারমালা’ মূলত একটি প্রাচীন প্রাচ্য বিশেষ্য পদ, যা লাতিন ব্যাকরণের ভাষায় কোনো বিশেষণ নয় বরং অ্যাপোজিশন হিসেবে বিশেষ্য (noun in apposition) হিসেবে গণের সাথে লিঙ্গ পরিবর্তন ছাড়াই অপরিবর্তিত রূপ নিয়ে বসেছে।
এটি নাইট্রারিয়েসি (Nitrariaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি শক্তপোক্ত বহুবর্ষজীবী গুল্ম, যা মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং উত্তর ভারতে ব্যাপকভাবে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। এর বীজে উচ্চ ঘনত্বের বিটা-কার্বোলিন অ্যালকালয়েড থাকে, যার মধ্যে প্রধান হলো হারমিন (harmine), হারমালাইন (harmaline) এবং টেট্রাহাইড্রোহারমিন (tetrahydroharmine)। হারমিন ও হারমালাইন শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেনিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত এবং এরা মানবদেহের মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ এনজাইম (monoamine oxidase enzyme)-কে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। প্রাচীন পারস্যের জরথুস্ত্রীয় ধর্মে অশুভ শক্তি দূর করতে এবং মানসিক সংবেদনশীলতা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এই উদ্ভিদের বীজ আগুনে পুড়িয়ে ধোঁয়া নেওয়া হতো। প্রত্নতাত্ত্বিক সারিয়ানিদি মধ্য এশিয়ার ব্রোঞ্জ যুগের অগ্নি উপাসনালয়ে যে আণবিক অবশেষ পেয়েছিলেন, তার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই উদ্ভিদ।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
উদ্ভিদ, বৈজ্ঞানিক নাম ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক যৌগ
এখন এই ১৭টি উদ্ভিদ ও ছত্রাকের নাম, বৈজ্ঞানিক নাম এবং সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক যৌগের নাম নিয়ে নিচের সারণিটি তৈরি করা হলো। রাসায়নিকের তালিকায় মূলত লেখায় উল্লিখিত সক্রিয় অ্যালকালয়েড ও অন্যান্য মনোসক্রিয় উপাদান রাখা হয়েছে।
| ক্রম | উদ্ভিদ বা ছত্রাকের নাম | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) | সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক যৌগ (Chemical Compounds) |
|---|---|---|---|
| ১ | আফিম পপি (Opium Poppy) | Papaver somniferum | মরফিন (Morphine), কোডিন (Codeine), থেবেইন (Thebaine), পাপাভেরিন (Papaverine), নসক্যাপিন (Noscapine) |
| ২ | কোকা গাছ (Coca Plant) | Erythroxylum coca | কোকেন (Cocaine), বেনজয়িলমিথাইলএকগোনিন (Benzoylmethylecgonine) – একই যৌগের দুটি নাম |
| ৩ | গাঁজা বা ক্যানাবিস (Cannabis) | Cannabis sativa | ডেল্টা-৯-টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (Δ⁹-Tetrahydrocannabinol, THC), ক্যানাবিডিওল (Cannabidiol, CBD) |
| ৪ | ভারতীয় ক্যানাবিস বা হাশিশ গুল্ম (Indian Cannabis) | Cannabis indica | টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC), ক্যানাবিডিওল (CBD) |
| ৫ | আরগট ছত্রাক (Ergot Fungus) | Claviceps purpurea | এরগোটামিন (Ergotamine), এরগোমেট্রিন (Ergometrine), লাইসার্জিক অ্যাসিড (Lysergic Acid) |
| ৬ | ফ্লাই অ্যাগারিক মাশরুম (Fly Agaric) | Amanita muscaria | ইবোটেনিক অ্যাসিড (Ibotenic Acid), মাস্কিমল (Muscimol) |
| ৭ | সাইলোসাইবিন মাশরুম (Psilocybin Mushroom) | Psilocybe mexicana | সাইলোসাইবিন (Psilocybin), সাইলোসিন (Psilocin) |
| ৮ | আয়াহুয়াস্কা লতা (Ayahuasca Vine) | Banisteriopsis caapi | হারমিন (Harmine), হারমালাইন (Harmaline), টেট্রাহাইড্রোহারমিন (Tetrahydroharmine) |
| ৯ | চাকরুনা গুল্ম (Chacruna) | Psychotria viridis | এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন (N,N-Dimethyltryptamine, DMT) |
| ১০ | পেয়োটি ক্যাকটাস (Peyote Cactus) | Lophophora williamsii | মেসক্যালিন (Mescaline), ৩,৪,৫-ট্রাইমেথোক্সিফেনিথাইলামাইন (3,4,5-Trimethoxyphenethylamine) – একই যৌগের দুটি নাম |
| ১১ | কৃষ্ণ হেনবেন (Black Henbane) | Hyoscyamus niger | স্কোপোলামিন (Scopolamine), হায়োসায়ামিন (Hyoscyamine), অ্যাট্রোপিন (Atropine) |
| ১২ | ম্যানড্রেক (Mandrake) | Mandragora officinarum | স্কোপোলামিন (Scopolamine), হায়োসায়ামিন (Hyoscyamine) |
| ১৩ | নীল পদ্ম বা নীল শাপলা (Blue Lotus) | Nymphaea caerulea | অ্যাপোমরফিন (Apomorphine), নুসিফেরিন (Nuciferine) |
| ১৪ | হেমলক (Poison Hemlock) | Conium maculatum | কোনিন (Coniine), এন-মিথাইলকোনিন (N-Methylconiine) |
| ১৫ | ব্ল্যাক হেলেবোর (Black Hellebore) | Helleborus niger | হেলেবোরিন (Helleborin), হেলেবোরিনিন (Helleborein) |
| ১৬ | এফেড্রা বা সোমলতা (Ephedra) | Ephedra sinica | এফিড্রিন (Ephedrine), সিউডোএফিড্রিন (Pseudoephedrine) |
| ১৭ | বুনো ইসফান্দ বা হারমাল (Syrian Rue) | Peganum harmala | হারমিন (Harmine), হারমালাইন (Harmaline), টেট্রাহাইড্রোহারমিন (Tetrahydroharmine) |
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- Cannabis sativa ও Cannabis indica-এর প্রজাতিগত পৃথকীকরণ নিয়ে শ্রেণিবিন্যাসগত মতভেদ রয়েছে। শুধু এই নামের ভিত্তিতে THC ও CBD-এর অনুপাত নির্ধারণ করা যায় না।
- Claviceps purpurea থেকে লাইসার্জিক অ্যাসিড-সম্পর্কিত যৌগ পাওয়া যায়, কিন্তু এলএসডি (LSD) নিজে এই ছত্রাকের স্বাভাবিক প্রধান উপাদান নয়।
- Nymphaea caerulea-তে অ্যাপোমরফিন ও নুসিফেরিনের উপস্থিতি এবং পরিমাণ সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
- Banisteriopsis caapi এবং Peganum harmala-তে একই ধরনের কয়েকটি বিটা-কার্বোলিন (β-Carboline) অ্যালকালয়েড পাওয়া যায়।
পরিশিষ্ট খ: ঔষধ, মাদক ও রাসায়নিক যৌগের আণবিক ও ব্যাকরণিক ইতিবৃত্ত
গ্রন্থের বিভিন্ন খণ্ডে আলোচিত প্রাকৃতিক উপক্ষার, আধা-কৃত্রিম ডেরিভেটিভ এবং রসায়নাগারে সংশ্লেষিত সিন্থেটিক মনঃসক্রিয় রাসায়নিক উপাদানগুলোর আণবিক নামতত্ত্ব, ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, ব্যাকরণিক প্রত্যয় বিন্যাস এবং ফার্মাকোলজিক্যাল ইতিবৃত্ত নিম্নে সংকলিত হলো।
রসায়ন বিজ্ঞানের নিয়মতান্ত্রিক নামকরণের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়: একটি হলো আন্তর্জাতিক বিশুদ্ধ ও ফলিত রসায়ন ইউনিয়ন (International Union of Pure and Applied Chemistry – IUPAC)-এর সুনির্দিষ্ট আণবিক বিন্যাসভিত্তিক নাম, এবং অন্যটি হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহৃত সহজতর আন্তর্জাতিক নন-প্রোপ্রাইটারি নাম (International Nonproprietary Name – INN)।
রাসায়নিক নামতত্ত্বের ব্যাকরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ জৈব অ্যালকালয়েডের নামের শেষে একটি সুনির্দিষ্ট প্রত্যয় হিসেবে যুক্ত হয় -ইন (-ine)। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রসায়নবিদরা লক্ষ্য করেন যে উদ্ভিজ্জ উপক্ষারগুলো অম্ল বা অ্যাসিডের বিপরীতে ক্ষার বা ক্ষারকীয় বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে এবং এদের গঠনে একটি মৌলিক নাইট্রোজেন পরমাণু বিদ্যমান থাকে। ফলে প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন ভাষার বিভিন্ন অর্থপূর্ণ শব্দমূলের সাথে ক্ষারীয় বৈশিষ্ট্য নির্দেশক এই সার্বজনীন প্রত্যয় যুক্ত করে অধিকাংশ অ্যালকালয়েডের নামকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে হাইড্রোক্সিল গ্রুপের উপস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় অ্যালকোহলীয় প্রত্যয় -অল (-ol), কিটোন গ্রুপের জন্য -অন (-one) এবং ইথারের উপস্থিতিতে -অক্সি (-oxy)। নিচে প্রতিটি ভুক্তিতে যৌগের প্রমিত বাংলা ও ইংরেজি নাম, উভয় ভাষার ইউপ্যাক নাম, ব্যুৎপত্তিগত ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ এবং আণবিক কার্যপদ্ধতি লিপিবদ্ধ করা হলো।
মরফিন (Morphine)
আফিম পপি (Opium Poppy) বা প্যাপাভার সোমনিফেরাম (Papaver somniferum) উদ্ভিদের আফিমে উপস্থিত প্রধান প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড (Alkaloid) হলো মরফিন (Morphine)। এটি একটি প্রাকৃতিক ওপিয়েট (Natural Opiate), যা রাসায়নিকভাবে ফেনানথ্রিনজাত (Phenanthrene-type) মরফিনান অ্যালকালয়েড। এর একটি প্রচলিত পদ্ধতিগত রাসায়নিক নাম (Systematic Chemical Name) হলো: (5R,6S,9R,13S,14R)-7,8-didehydro-4,5-epoxy-17-methylmorphinan-3,6-diol, বাংলায় (৫আর,৬এস,৯আর,১৩এস,১৪আর)-৭,৮-ডাইডিহাইড্রো-৪,৫-ইপক্সি-১৭-মিথাইলমরফিনান-৩,৬-ডাইঅল। এখানে –
- Morphinan: মূল কাঠামো মরফিনান (Morphinan), যা নাইট্রোজেনযুক্ত বহুচক্রিক (Polycyclic) বলয়ব্যবস্থা। মরফিন, কোডিন ও ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনের কাঠামোগত ভিত্তি এই মরফিনান ব্যবস্থা।
- Epoxy: epoxy উপসর্গ এখানে একটি অক্সিজেন সেতু (Oxygen Bridge) নির্দেশ করে, যা মূল মরফিনান কাঠামোর দুটি অবস্থানকে সংযুক্ত করে।
- 4,5-Epoxy: মরফিনান কাঠামোর ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি অক্সিজেন সেতু রয়েছে। অক্সিজেন পরমাণুটি উভয় কার্বনের সঙ্গে একক বন্ধনে যুক্ত হয়ে একটি চক্রাকার ইথার (Cyclic Ether) ব্যবস্থা গঠন করেছে।
- 4,5-Epoxymorphinan: মরফিনান কাঠামোর ৪ ও ৫ নম্বর অবস্থানের মধ্যে অক্সিজেন সেতু যুক্ত হওয়ায় একটি অতিরিক্ত বলয় সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মরফিনের সম্পূর্ণ কাঠামো পাঁচটি বলয়বিশিষ্ট (Pentacyclic)।
- Methyl: মিথাইল (–CH₃) একটি এক-কার্বনবিশিষ্ট অ্যালকাইল মূলক (Alkyl Group), যা মিথেন থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 17-Methyl: মরফিনান কাঠামোর ১৭ নম্বর অবস্থানের নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। এখানে ১৭ নম্বর অবস্থানটি মরফিনান নামকরণের প্রচলিত পরমাণু-নম্বরায়নের অংশ।
- টারশিয়ারি অ্যামিন: ১৭ নম্বর নাইট্রোজেনটি দুটি বলয়-কার্বন এবং একটি মিথাইল কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই মরফিনে একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine) রয়েছে।
- Dehydro: dehydro উপসর্গ মূল কাঠামো থেকে হাইড্রোজেন অপসারণের সমতুল্য পরিবর্তন নির্দেশ করে, যার ফলে অসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়।
- 7,8-Didehydro: মরফিনান কাঠামোর ৭ ও ৮ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন (C=C) রয়েছে। মূল সম্পৃক্ত কাঠামোর তুলনায় এই দুই অবস্থানে একটি করে হাইড্রোজেন কম থাকার কারণে 7,8-didehydro ব্যবহৃত হয়েছে।
- Didehydro বনাম Dihydro: didehydro দুটি হাইড্রোজেন কম থাকা এবং dihydro দুটি হাইড্রোজেন যুক্ত হওয়া নির্দেশ করে। তাই এখানে সঠিক বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ ডাইডিহাইড্রো।
- Diol: diol প্রত্যয় নির্দেশ করে অণুতে দুটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক রয়েছে। এগুলো মূল কাঠামোর দুটি পৃথক কার্বনের সঙ্গে যুক্ত।
- 3,6-Diol: মরফিনান কাঠামোর ৩ ও ৬ নম্বর কার্বনে একটি করে হাইড্রক্সি মূলক রয়েছে। তাই নামের শেষে morphinan-3,6-diol ব্যবহৃত হয়েছে।
- ৩ নম্বর অবস্থানের হাইড্রক্সি: মরফিনের ৩ নম্বর কার্বনটি অ্যারোমেটিক বলয়ের অংশ। সেখানে সরাসরি –OH যুক্ত থাকায় এটি একটি ফেনল (Phenol) কার্যকরী মূলক।
- ৬ নম্বর অবস্থানের হাইড্রক্সি: মরফিনের ৬ নম্বর কার্বনে একটি –OH মূলক রয়েছে। এই কার্বনটি দুটি অন্য কার্বনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি একটি দ্বিতীয়িক অ্যালকোহল (Secondary Alcohol)।
- ফেনল বনাম অ্যালকোহল: মরফিনে দুটি –OH থাকলেও তাদের রাসায়নিক প্রকৃতি এক নয়। ৩ নম্বর অবস্থানের –OH ফেনলজাত এবং ৬ নম্বর অবস্থানের –OH অ্যালকোহলজাত। তাই diol প্রত্যয় দুটি হাইড্রক্সি নির্দেশ করলেও কার্যকরী মূলকের বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাসে এদের পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়।
- (5R,6S,9R,13S,14R): মরফিন অণুতে পাঁচটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre) রয়েছে। এগুলো ৫, ৬, ৯, ১৩ ও ১৪ নম্বর কার্বনে অবস্থিত। প্রদত্ত নাম অনুযায়ী এদের পরম বিন্যাস যথাক্রমে R, S, R, S ও R।
- স্টেরিওরাসায়নিক বিন্যাস: R ও S নির্দেশকগুলো কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত। এগুলো অণুর নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক বিন্যাস নির্দেশ করে, আলোকীয় ঘূর্ণনের দিক নয়।
- কোডিনের সঙ্গে সম্পর্ক: মরফিনের ৩ নম্বর অবস্থানে একটি মুক্ত ফেনলজাত হাইড্রক্সি (–OH) মূলক রয়েছে। কোডিনে এই অবস্থানের অক্সিজেনের সঙ্গে মিথাইল যুক্ত হয়ে মেথক্সি (–OCH₃) মূলক গঠন করে। তাই কোডিনকে মরফিনের ৩-ও-মিথাইল ইথার (Morphine 3-O-Methyl Ether) বলা হয়।
- ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনের সঙ্গে সম্পর্ক: মরফিনের ৩ ও ৬ নম্বর অবস্থানের দুটি হাইড্রক্সি মূলক অ্যাসিটাইলযুক্ত হয়ে দুটি অ্যাসিটেট এস্টার গঠন করলে ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন (Diacetylmorphine) কাঠামো পাওয়া যায়। তাই ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন হলো মরফিনের ৩,৬-ডাইঅ্যাসিটেট (Morphine 3,6-Diacetate)।
- কার্যকরী মূলক: মরফিনে একটি ফেনল, একটি দ্বিতীয়িক অ্যালকোহল, একটি সেতুবন্ধযুক্ত চক্রাকার ইথার, একটি টারশিয়ারি অ্যামিন এবং একটি অ্যালকিন রয়েছে। পাশাপাশি একটি অ্যারোমেটিক বলয়ও রয়েছে।
- রাসায়নিক শ্রেণি: মরফিন একটি প্রাকৃতিক আফিমজাত অ্যালকালয়েড (Natural Opium Alkaloid)। আরও নির্দিষ্টভাবে এটি ফেনানথ্রিনজাত (Phenanthrene-type) মরফিনান অ্যালকালয়েড এবং ওপিয়েট (Opiate) শ্রেণির যৌগ।
- জৈবিক কার্যকারিতা: মরফিন প্রধানত মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের (μ-Opioid Receptor) অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে এই রিসেপ্টর সক্রিয় করার মাধ্যমে এটি শক্তিশালী ব্যথানাশক (Analgesic) প্রভাব সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমন (Respiratory Depression), সহনশীলতা (Tolerance) এবং শারীরিক নির্ভরতা (Physical Dependence) সৃষ্টি করতে পারে।
- আণবিক সংকেত: C₁₇H₁₉NO₃। এর আণবিক ভর প্রায় ২৮৫.৩৪ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: মরফিন হলো আফিম পপির প্রধান প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড এবং পাঁচ-বলয়বিশিষ্ট মরফিনানজাত ওপিয়েট। এর ৩ নম্বর কার্বনে একটি ফেনলজাত হাইড্রক্সি, ৬ নম্বর কার্বনে একটি দ্বিতীয়িক অ্যালকোহলজাত হাইড্রক্সি, ১৭ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল, ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি অক্সিজেন সেতু এবং ৭ ও ৮ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন রয়েছে। এর পাঁচটি কাইরাল কেন্দ্রের পরম বিন্যাস (5R,6S,9R,13S,14R)।
ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি অনুসারে, শব্দটি কোনো প্রাচীন শাস্ত্রীয় শব্দ নয়; এটি আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনাপর্বে নির্মিত একটি গ্রিকো-রোমান রূপক নাম। ১৮০৫ সালে জার্মান ফার্মাসিস্ট ফ্রিডরিখ উইলহেম সার্টার্নার যখন প্রথম কাঁচা আফিম থেকে এই সক্রিয় যৌগটি স্ফটিকাকারে পৃথক করেন, তখন তিনি গ্রিক পুরাণের স্বপ্নের দেবতা মরফিয়াস (Morpheus)-এর নামানুসারে এর নাম রেখেছিলেন ‘মরফিয়াম’ (Morphium)। গ্রিক বিশেষ্য পদ মরফে (morphe)-এর অর্থ হলো রূপ, আকৃতি, বা মায়াময় অবয়ব। প্রাচীন গ্রিক বিশ্বাস অনুযায়ী ঘুমের ভেতর নানাবিধ রূপ ধারণ করে মানুষের কাছে স্বপ্ন হাজির করার দায়িত্ব ছিল মরফিয়াসের। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক রসায়ন সমিতি ক্ষারকীয় যৌগের নামকরণ নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে লাতিন ক্লীবলিঙ্গীয় প্রত্যয় -উম (-um) বর্জন করে নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারীয় প্রত্যয় -ইন (-ine) যুক্ত করে ‘মরফিন’ শব্দটি স্থির করে। ব্যাকরণগতভাবে শব্দটি একটি বিশেষ্য পদ।
রাসায়নিক গঠনের দিক থেকে মরফিন একটি জটিল পঞ্চবলয়বিশিষ্ট মরফিনান যৌগ (Pentacyclic Morphinan Compound)। এর গঠনে একটি অ্যারোমেটিক বেনজিন বলয় (Benzene Ring) (A), একটি সম্পৃক্ত সাইক্লোহেক্সেন বলয় (Cyclohexane Ring) (B), একটি অসম্পৃক্ত সাইক্লোহেক্সিন বলয় (Cyclohexene Ring) (C), একটি নাইট্রোজেনযুক্ত পাইপিরিডিন বলয় (Piperidine Ring) (D) এবং একটি অক্সিজেনযুক্ত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ইথার বলয় (Five-Membered Cyclic Ether Ring) (E) রয়েছে। এ ছাড়া অণুটির ৩ ও ৬ নম্বর কার্বন অবস্থানে দুটি হাইড্রক্সিল মূলক (Hydroxyl Group) বিদ্যমান। এর মধ্যে ৩ নম্বর অবস্থানেরটি ফেনলীয় এবং ৬ নম্বর অবস্থানেরটি অ্যালিলিক অ্যালকোহলীয় হাইড্রক্সিল মূলক। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশের পর এটি জি-প্রোটিন কাপল্ড রিসেপ্টর (G-protein coupled receptor) গোত্রের অন্তর্গত মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (mu-opioid receptor)-এর ফুল অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে। এর ফলে অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ এনজাইমের অবদমন ঘটে, কোষে সাইক্লিক অ্যাডেনোসিন মনোফসফেট (cyclic adenosine monophosphate – cAMP) উৎপাদন হ্রাস পায় এবং ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল বন্ধ হয়ে সাবস্ট্যান্স-পি নামক ব্যথাবাহী নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন ইনহিবিটর গাবা নিউরনকে নিষ্ক্রিয় করে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে ডোপামিনের প্লাবন ঘটায়, যা তীব্র কৃত্রিম আনন্দ এবং চরম শারীরিক নির্ভরতা তৈরি করে।
ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন বা হেরোইন (Diacetylmorphine / Heroin)
মরফিন থেকে উদ্ভূত একটি শক্তিশালী আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড (Semisynthetic Opioid) হলো ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন (Diacetylmorphine), যা ডায়ামরফিন (Diamorphine) এবং হেরোইন (Heroin) নামেও পরিচিত। রাসায়নিকভাবে এটি মরফিনের ৩,৬-ডাইঅ্যাসিটেট (Morphine 3,6-Diacetate), অর্থাৎ মরফিনের দুটি হাইড্রক্সি মূলক অ্যাসিটাইলযুক্ত হয়ে দুটি এস্টার গঠন করেছে। এর একটি প্রচলিত পদ্ধতিগত রাসায়নিক নাম (Systematic Chemical Name) হলো: (5R,6S,9R,13S,14R)-3,6-bis(acetyloxy)-17-methyl-7,8-didehydro-4,5-epoxymorphinan, বাংলায় (৫আর,৬এস,৯আর,১৩এস,১৪আর)-৩,৬-বিস(অ্যাসিটাইলক্সি)-১৭-মিথাইল-৭,৮-ডাইডিহাইড্রো-৪,৫-ইপক্সিমরফিনান। এখানে –
- Morphinan: মূল কাঠামো মরফিনান (Morphinan), যা নাইট্রোজেনযুক্ত বহুচক্রিক (Polycyclic) বলয়ব্যবস্থা। মরফিন, কোডিন ও ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনের কাঠামোগত ভিত্তি এই মরফিনান ব্যবস্থা।
- 4,5-Epoxy: মরফিনান কাঠামোর ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি অক্সিজেন সেতু (Oxygen Bridge) রয়েছে। এই অক্সিজেন উভয় কার্বনের সঙ্গে একক বন্ধনে যুক্ত হয়ে একটি চক্রাকার ইথার (Cyclic Ether) গঠন করেছে।
- 4,5-Epoxymorphinan: অক্সিজেন সেতুর কারণে মূল মরফিনান কাঠামোতে একটি অতিরিক্ত বলয় সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনের সম্পূর্ণ কাঠামো পাঁচটি বলয়বিশিষ্ট (Pentacyclic)।
- Acetyl: অ্যাসিটাইল (Acetyl) হলো CH₃–C(=O)– গঠনবিশিষ্ট একটি অ্যাসাইল মূলক (Acyl Group), যা অ্যাসিটিক অ্যাসিড (Acetic Acid) থেকে উদ্ভূত।
- Acetyloxy: অ্যাসিটাইলক্সি (Acetyloxy) মূলকের গঠন –O–C(=O)–CH₃। এতে মূল অণুর কার্বনের সঙ্গে অক্সিজেন এবং সেই অক্সিজেনের সঙ্গে অ্যাসিটাইল অংশ যুক্ত থাকে। এটি অ্যাসিটেট এস্টার (Acetate Ester) গঠনের নির্দেশ করে।
- Bis(acetyloxy): bis- নির্দেশ করে দুটি অ্যাসিটাইলক্সি প্রতিস্থাপক রয়েছে। প্রতিস্থাপকের নাম বন্ধনীর মধ্যে রেখে bis ব্যবহার করা হয়েছে। সরল বিকল্প নামকরণে diacetyloxy রূপটিও দেখা যায়।
- 3,6-Bis(acetyloxy): মরফিনান কাঠামোর ৩ ও ৬ নম্বর কার্বনে একটি করে অ্যাসিটাইলক্সি মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনে দুটি অ্যাসিটেট এস্টার রয়েছে।
- ৩ নম্বর অবস্থানের এস্টার: মরফিনের ৩ নম্বর কার্বনে একটি ফেনলজাত হাইড্রক্সি (Phenolic Hydroxy) মূলক থাকে। ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনে সেই হাইড্রক্সি মূলকের অক্সিজেন অ্যাসিটাইলযুক্ত হওয়ায় একটি ফেনলজাত এস্টার (Phenolic Ester) গঠিত হয়েছে।
- ৬ নম্বর অবস্থানের এস্টার: মরফিনের ৬ নম্বর কার্বনে একটি দ্বিতীয়িক অ্যালকোহল (Secondary Alcohol) থাকে। ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনে এই অবস্থানের হাইড্রক্সি মূলকটিও অ্যাসিটাইলযুক্ত হয়ে একটি অ্যালকোহলজাত এস্টার গঠন করেছে।
- 17-Methyl: মরফিনান কাঠামোর ১৭ নম্বর অবস্থানের নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে।
- টারশিয়ারি অ্যামিন: ১৭ নম্বর নাইট্রোজেনটি দুটি বলয়-কার্বন এবং একটি মিথাইল কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই এটি একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- Dehydro: dehydro উপসর্গ মূল কাঠামো থেকে হাইড্রোজেন অপসারণের সমতুল্য পরিবর্তন নির্দেশ করে, যার ফলে অসম্পৃক্ততা সৃষ্টি বা বৃদ্ধি পায়।
- 7,8-Didehydro: মরফিনান কাঠামোর ৭ ও ৮ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন (C=C) রয়েছে। মূল সম্পৃক্ত কাঠামোর তুলনায় এই দুই অবস্থানে একটি করে হাইড্রোজেন কম থাকার কারণে 7,8-didehydro ব্যবহৃত হয়েছে।
- Didehydro বনাম Dihydro: didehydro দুটি হাইড্রোজেন কম থাকা এবং dihydro দুটি হাইড্রোজেন যুক্ত হওয়া নির্দেশ করে। তাই এখানে বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ ডাইডিহাইড্রো।
- (5R,6S,9R,13S,14R): ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন অণুতে পাঁচটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre) রয়েছে। এগুলো ৫, ৬, ৯, ১৩ ও ১৪ নম্বর কার্বনে অবস্থিত। প্রদত্ত নাম অনুযায়ী এদের পরম বিন্যাস যথাক্রমে R, S, R, S ও R।
- স্টেরিওরাসায়নিক বিন্যাস: R ও S নির্দেশকগুলো কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত। এগুলো অণুর নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক বিন্যাস নির্দেশ করে; আলোকীয় ঘূর্ণনের দিক সরাসরি নির্দেশ করে না।
- মরফিনের সঙ্গে সম্পর্ক: ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন হলো মরফিনের ৩,৬-ডাইঅ্যাসিটেট (Morphine 3,6-Diacetate)। মরফিনের ৩ ও ৬ নম্বর অবস্থানের দুটি মুক্ত হাইড্রক্সি মূলক ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনে দুটি অ্যাসিটেট এস্টারে রূপান্তরিত অবস্থায় রয়েছে।
- কোডিনের সঙ্গে পার্থক্য: কোডিনে ৩ নম্বর অবস্থানে মেথক্সি (–OCH₃) এবং ৬ নম্বর অবস্থানে মুক্ত হাইড্রক্সি (–OH) থাকে। অন্যদিকে ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনে ৩ ও ৬ উভয় অবস্থানেই অ্যাসিটাইলক্সি (–O–C(=O)–CH₃) মূলক রয়েছে।
- কার্যকরী মূলক: ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিনে দুটি এস্টার, একটি সেতুবন্ধযুক্ত চক্রাকার ইথার, একটি টারশিয়ারি অ্যামিন, একটি অ্যালকিন এবং একটি অ্যারোমেটিক বলয় রয়েছে। এতে কোনো মুক্ত হাইড্রক্সি মূলক নেই।
- রাসায়নিক শ্রেণি: এটি একটি আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড (Semisynthetic Opioid)। প্রাকৃতিক আফিমজাত অ্যালকালয়েড মরফিনের রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাপ্ত হওয়ায় একে মরফিনজাত ওপিয়েট (Morphine-derived Opiate) হিসেবেও শ্রেণিবদ্ধ করা যায়।
- জৈবিক কার্যকারিতা: ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন দেহে দ্রুত ৬-মোনোঅ্যাসিটাইলমরফিন (6-Monoacetylmorphine বা 6-MAM) এবং পরবর্তীকালে মরফিনে বিপাকিত হয়। এই বিপাকজাত পদার্থগুলো মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের (μ-Opioid Receptor) মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ওপিওয়েড প্রভাব সৃষ্টি করে।
- আণবিক সংকেত: C₂₁H₂₃NO₅। এর আণবিক ভর প্রায় ৩৬৯.৪১ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন বা ডায়ামরফিন হলো মরফিনের ৩ ও ৬ নম্বর অবস্থানে অ্যাসিটাইলযুক্ত একটি আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড। এর পাঁচ-বলয়বিশিষ্ট মরফিনান কাঠামোতে দুটি অ্যাসিটেট এস্টার, একটি চক্রাকার ইথার, একটি টারশিয়ারি অ্যামিন এবং ৭ ও ৮ নম্বর কার্বনের মধ্যে দ্বিবন্ধন রয়েছে। প্রদত্ত পদ্ধতিগত নাম অনুযায়ী এর পাঁচটি কাইরাল কেন্দ্রের বিন্যাস (5R,6S,9R,13S,14R)।
‘ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন’ নামটির ব্যুৎপত্তি পুরোপুরি নিয়মতান্ত্রিক জৈব রসায়নের ব্যাকরণ মেনে গঠিত। গ্রিক উপসর্গ ডাই (di-)-এর অর্থ হলো দুই বা দ্বিগুণ; অ্যাসিটাইল (acetyl) শব্দটি এসেছে লাতিন অ্যাসিটাম (acetum, যার অর্থ ভিনেগার বা সিরকা) থেকে, যা অ্যাসিটিক অ্যাসিডের এস্টার মূলককে নির্দেশ করে; এবং এর সাথে মূল অণু মরফিন (morphine) যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এর আক্ষরিক অর্থ ‘দুটি অ্যাসিটাইল গ্রুপযুক্ত মরফিন’। অন্যদিকে এর বিশ্বখ্যাত বাণিজ্যিক নাম ‘হেরোইন’ (Heroin) এসেছে ১৮৯৮ সালে জার্মান ওষুধ কোম্পানি বায়ারের বাণিজ্যিক বিপণন থেকে। বায়ার তাদের এই নতুন কাশির উপশমকারী ওষুধটির ব্র্যান্ড নাম নির্ধারণ করতে গিয়ে জার্মান বিশেষণ হেরোইশ (heroisch, যার অর্থ বীরত্বপূর্ণ, মহাকাব্যিক বা নির্ভীক) শব্দটিকে বেছে নেয়, যার আদি উৎস প্রাচীন গ্রিক বিশেষ্য হেরোস (heros, যার অর্থ বীর বা যোদ্ধা)। ওষুধটি সেবনের পর মানবদেহে যে অলীক আত্মবিশ্বাস এবং সকল ভয়-যন্ত্রণা মুছে ফেলার বীরত্বপূর্ণ অনুভূতি তৈরি হতো, সেই মানসিক অবস্থার বাণিজ্যিক সুবিধা নিতেই এই প্রত্যয়যুক্ত নাম উদ্ভাবন করা হয়।
আণবিক রূপান্তরের দিক থেকে, সাধারণ মরফিনের ৩ ও ৬ নম্বর অবস্থানে থাকা দুটি পোলার হাইড্রোক্সিল গ্রুপকে যখন অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডের মাধ্যমে অ্যাসিটাইলেশন করা হয়, তখন অণুটির লিপোফিলিসিটি বা চর্বি-দ্রবণীয়তা মরফিনের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। উচ্চ চর্বি-দ্রবণীয়তার কারণে এটি ইনজেকশন বা ধূমপানের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশের পর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (blood-brain barrier – BBB) ভেদ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে অনুপ্রবেশ করে। মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা এস্টারেজ এনজাইম তাৎক্ষণিকভাবে এর অ্যাসিটাইল গ্রুপগুলোকে ভেঙে একে প্রথমে ৬-মনোঅ্যাসিটাইলমরফিন এবং পরবর্তীতে বিশুদ্ধ মরফিনে রূপান্তরিত করে। ফলে মেসোলিম্বিক ডোপামিন সার্কিটে এক চরম আণবিক বিস্ফোরণ ঘটে, যাকে আসক্তরা ‘রাশ‘ বলে থাকে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের আন্তর্জাতিক পাচার বাণিজ্যের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি এই রাসায়নিক যৌগটি।
কোডিন বা মিথাইলমরফিন (Codeine / Methylmorphine)
আফিম থেকে প্রাপ্ত অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড (Alkaloid) হলো কোডিন (Codeine)। এটি মরফিনানজাত (Morphinan) ওপিওয়েড, যা রাসায়নিকভাবে মরফিনের ৩-ও-মিথাইল ইথার (Morphine 3-O-Methyl Ether)। এর একটি প্রচলিত পদ্ধতিগত রাসায়নিক নাম (Systematic Chemical Name) হলো: (5R,6S,9R,13S,14R)-3-methoxy-17-methyl-7,8-didehydro-4,5-epoxymorphinan-6-ol, বাংলায় (৫আর,৬এস,৯আর,১৩এস,১৪আর)-৩-মেথক্সি-১৭-মিথাইল-৭,৮-ডাইডিহাইড্রো-৪,৫-ইপক্সিমরফিনান-৬-অল। এখানে –
- Morphinan: মূল কাঠামো মরফিনান, যা একটি নাইট্রোজেনযুক্ত বহুচক্রিক (Polycyclic) বলয়ব্যবস্থা। এতে একটি অ্যারোমেটিক বলয়সহ পরস্পর সংযুক্ত কার্বন ও নাইট্রোজেনযুক্ত বলয় রয়েছে। মরফিন ও কোডিনের কাঠামোগত ভিত্তি এই মরফিনান ব্যবস্থা।
- Epoxy: epoxy উপসর্গ এখানে একটি অক্সিজেন সেতু (Oxygen Bridge) নির্দেশ করে, যা মূল মরফিনান কাঠামোর দুটি অবস্থানকে সংযুক্ত করে।
- 4,5-Epoxy: মরফিনান কাঠামোর ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি অক্সিজেন সেতু রয়েছে। অক্সিজেন পরমাণুটি উভয় কার্বনের সঙ্গে একক বন্ধনে যুক্ত হয়ে একটি চক্রাকার ইথার (Cyclic Ether) ব্যবস্থা গঠন করেছে।
- 4,5-Epoxymorphinan: মরফিনান কাঠামোর ৪ ও ৫ নম্বর অবস্থানের মধ্যে অক্সিজেন সেতু যুক্ত হওয়ায় একটি অতিরিক্ত বলয় সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কোডিনের সম্পূর্ণ কাঠামো পাঁচটি বলয়বিশিষ্ট (Pentacyclic)।
- Methoxy: মেথক্সি (–OCH₃) একটি প্রতিস্থাপক, যেখানে একটি মিথাইল (–CH₃) মূলক অক্সিজেনের মাধ্যমে মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে। এটি ইথারজাত কার্যকরী মূলক।
- 3-Methoxy: মরফিনান কাঠামোর ৩ নম্বর কার্বনে একটি মেথক্সি মূলক যুক্ত রয়েছে। এই কার্বনটি অ্যারোমেটিক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে একটি অ্যারোমেটিক ইথার (Aryl Ether) গঠিত হয়েছে।
- 17-Methyl: মরফিনান কাঠামোর ১৭ নম্বর অবস্থানের নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। এখানে ১৭ নম্বর অবস্থানটি মরফিনান নামকরণের প্রচলিত পরমাণু-নম্বরায়নের অংশ।
- অ্যামিনের শ্রেণি: ১৭ নম্বর নাইট্রোজেনটি দুটি বলয়-কার্বন এবং একটি মিথাইল কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই কোডিন একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- Dehydro: dehydro উপসর্গ মূল কাঠামো থেকে হাইড্রোজেন অপসারণের সমতুল্য পরিবর্তন নির্দেশ করে, যার ফলে অসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়।
- 7,8-Didehydro: মরফিনান কাঠামোর ৭ ও ৮ নম্বর কার্বন থেকে একটি করে হাইড্রোজেন অপসারণের সমতুল্য পরিবর্তনের ফলে ওই দুটি কার্বনের মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন (C=C) রয়েছে। তাই 7,8-didehydro ব্যবহৃত হয়েছে।
- Didehydro বনাম Dihydro: didehydro দুটি হাইড্রোজেন কমে যাওয়া এবং dihydro দুটি হাইড্রোজেন যুক্ত হওয়া নির্দেশ করে। তাই এখানে সঠিক বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ ডাইডিহাইড্রো, ডাইডাইহাইড্রো নয়।
- 6-ol: মরফিনান কাঠামোর ৬ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই নামের শেষে -6-ol ব্যবহৃত হয়েছে।
- অ্যালকোহলের শ্রেণি: ৬ নম্বর কার্বনটি দুটি কার্বন ও একটি হাইড্রক্সি মূলকের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি হাইড্রোজেন বহন করে। তাই এটি একটি দ্বিতীয়িক অ্যালকোহল (Secondary Alcohol)।
- (5R,6S,9R,13S,14R): কোডিন অণুতে পাঁচটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre) রয়েছে। এগুলো ৫, ৬, ৯, ১৩ ও ১৪ নম্বর কার্বনে অবস্থিত। এদের পরম বিন্যাস যথাক্রমে R, S, R, S ও R।
- স্টেরিওরাসায়নিক বিন্যাস: এই R ও S নির্দেশকগুলো কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত। এগুলো কোডিনের নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক বিন্যাস প্রকাশ করে।
- মরফিনের সঙ্গে সম্পর্ক: মরফিনের ৩ নম্বর কার্বনে একটি ফেনলজাত হাইড্রক্সি (–OH) মূলক রয়েছে। কোডিনে সেই অবস্থানে মেথক্সি (–OCH₃) মূলক থাকে। অর্থাৎ কোডিন হলো মরফিনের ৩-ও-মিথাইল ইথার (Morphine 3-O-Methyl Ether)।
- কার্যকরী মূলক: কোডিনে একটি দ্বিতীয়িক অ্যালকোহল, একটি অ্যারোমেটিক ইথার, একটি সেতুবন্ধযুক্ত চক্রাকার ইথার, একটি টারশিয়ারি অ্যামিন এবং একটি অ্যালকিন (Alkene) অংশ রয়েছে। পাশাপাশি একটি অ্যারোমেটিক বলয়ও রয়েছে।
- রাসায়নিক শ্রেণি: কোডিন একটি প্রাকৃতিক আফিমজাত অ্যালকালয়েড (Opium Alkaloid)। আরও নির্দিষ্টভাবে এটি ফেনানথ্রিনজাত (Phenanthrene-type) মরফিনান অ্যালকালয়েড এবং ওপিওয়েড (Opioid) শ্রেণির যৌগ।
- জৈবিক কার্যকারিতা: কোডিন তুলনামূলকভাবে দুর্বল মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (μ-Opioid Receptor) অ্যাগোনিস্ট। মানবদেহে সাইটোক্রোম পি৪৫০ ২ডি৬ (CYP2D6) এনজাইমের মাধ্যমে কোডিনের একটি অংশ মরফিনে রূপান্তরিত হয়। এই বিপাকীয় পরিবর্তন কোডিনের ব্যথানাশক কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- আণবিক সংকেত: C₁₈H₂₁NO₃। এর আণবিক ভর প্রায় ২৯৯.৩৬ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: কোডিন হলো একটি পাঁচ-বলয়বিশিষ্ট মরফিনানজাত প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড, যার ৩ নম্বর কার্বনে মেথক্সি, ৬ নম্বর কার্বনে হাইড্রক্সি, ১৭ নম্বর নাইট্রোজেনে মিথাইল, ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনের মধ্যে অক্সিজেন সেতু এবং ৭ ও ৮ নম্বর কার্বনের মধ্যে দ্বিবন্ধন রয়েছে। এর পাঁচটি কাইরাল কেন্দ্রের বিন্যাস যথাক্রমে (5R,6S,9R,13S,14R)।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে ‘কোডিন’ শব্দটি খাঁটি গ্রিক শব্দভাণ্ডার থেকে এসেছে। ১৮৩২ সালে ফরাসি রসায়নবিদ পিয়েরে জঁ রবিকুয়ে কাঁচা আফিম থেকে এই যৌগটি পৃথক করার সময় এর নামকরণ করেন। শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক বিশেষ্য পদ কোদেয়া (kodeia) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘পপি ফুলের ফল’ বা ‘পপির মাথা’। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসা সাহিত্যে পপির ফল বা মাথাকে নির্দেশ করতে এই শব্দ ব্যবহৃত হতো। গ্রিক শব্দমূল ‘কোদেয়া’-র সাথে অ্যালকালয়েড নির্দেশক আধুনিক লাতিন প্রত্যয় -ইন (-ine) যুক্ত করে তৈরি হয়েছে ‘কোডিন’। বিকল্প নাম ‘মিথাইলমরফিন‘-এর রূপমূল নির্দেশ করে যে মরফিন অণুর ৩ নম্বর ফিনলিক হাইড্রোক্সিল মূলকের হাইড্রোজেনটি একটি মিথাইল গ্রুপ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
ফার্মাকোলজিক্যাল বিচারে কোডিন মূলত একটি প্রো-ড্রাগ (prodrug)। কাশির তীব্রতা কমাতে এবং মৃদু থেকে মাঝারি ব্যথা উপশমে এটি ব্যবহৃত হয়। মুখে গ্রহণের পর এটি সরাসরি মস্তিষ্কে কাজ করতে পারে না; যকৃতে পৌঁছানোর পর সাইটোক্রোম পি-৪৫০ এনজাইম সিস্টেমের সিওয়াইপি২ডি৬ (CYP2D6) আইসোএনজাইম দ্বারা ও-ডিমিথাইলেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোডিনের প্রায় দশ শতাংশ অংশ সক্রিয় মরফিনে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তরিত মরফিনই মূলত ওপিওয়েড রিসেপ্টরে আবদ্ধ হয়ে থেরাপিউটিক প্রভাব প্রদর্শন করে। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ও ভারতে পাচার হওয়া কাশির সিরাপ ফেনসিডিলের প্রধান নেশাসৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদান হলো এই কোডিন ফসফেট।
ফেন্টানিল (Fentanyl)
একবিংশ শতাব্দীর সিন্থেটিক ওপিওয়েড মহামারির (Synthetic Opioid Epidemic) অন্যতম প্রধান রাসায়নিক হলো ফেন্টানিল (Fentanyl)। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পূর্ণ কৃত্রিম ওপিওয়েড (Fully Synthetic Opioid), যার অবৈধভাবে উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত রূপগুলো ওপিওয়েডজনিত অতিমাত্রায় গ্রহণ ও মৃত্যুর সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর প্রচলিত ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: N-phenyl-N-[1-(2-phenylethyl)piperidin-4-yl]propanamide, বাংলায় এন-ফিনাইল-এন-[১-(২-ফিনাইলইথাইল)পিপারিডিন-৪-ইল]প্রোপানামাইড। এখানে –
- Propanamide: মূল কাঠামো প্রোপানামাইড, যা তিন কার্বনবিশিষ্ট প্রোপানোয়িক অ্যাসিড (Propanoic Acid) থেকে উদ্ভূত একটি কার্বক্সামাইড (Carboxamide)। এর সাধারণ গঠন CH₃–CH₂–C(=O)–NH₂।
- Propan: প্রোপানামাইডের মূল শৃঙ্খলে মোট তিনটি কার্বন রয়েছে। এর মধ্যে কার্বনিল কার্বনটিও অন্তর্ভুক্ত।
- -amide: -amide প্রত্যয় নির্দেশ করে কার্বনিল (C=O) কার্বনের সঙ্গে একটি নাইট্রোজেন যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ মূল কার্যকরী অংশটি –C(=O)–N–।
- Phenyl: ফিনাইল (–C₆H₅) একটি অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপক, যা বেনজিন বলয় থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- N-Phenyl: প্রোপানামাইডের নাইট্রোজেনে একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। এখানে N- নির্দেশ করে ফিনাইলটি প্রোপান শৃঙ্খলের কোনো কার্বনে নয়, সরাসরি অ্যামাইড নাইট্রোজেনে যুক্ত।
- Piperidine: পিপারিডিন (Piperidine) একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট সম্পৃক্ত হেটেরোসাইক্লিক (Heterocyclic) বলয়। এতে পাঁচটি কার্বন ও একটি নাইট্রোজেন রয়েছে।
- Piperidin-4-yl: পিপারিডিন বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে বলয়টি অন্য একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত। তাই piperidin-4-yl ব্যবহৃত হয়েছে। পিপারিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনকে ১ নম্বর অবস্থান ধরা হয়।
- N-[…Piperidin-4-yl]: প্রোপানামাইডের নাইট্রোজেনটি পিপারিডিন বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ অ্যামাইড নাইট্রোজেন ও পিপারিডিন বলয়ের নাইট্রোজেন দুটি পৃথক পরমাণু।
- Ethyl: ইথাইল অংশে দুটি কার্বন রয়েছে। এখানে প্রতিস্থাপক হিসেবে এটি –CH₂–CH₂– সংযোগশৃঙ্খল গঠন করেছে।
- 2-Phenylethyl: দুই কার্বনবিশিষ্ট শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে এর গঠন –CH₂–CH₂–C₆H₅। এটি ফেনেথাইল (Phenethyl) নামেও পরিচিত।
- 1-(2-Phenylethyl): পিপারিডিন বলয়ের ১ নম্বর অবস্থানে, অর্থাৎ বলয়ের নাইট্রোজেনে, একটি ২-ফিনাইলইথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 1-(2-Phenylethyl)piperidin-4-yl: পুরো অংশটি নির্দেশ করে এমন একটি পিপারিডিন বলয়, যার নাইট্রোজেনে ২-ফিনাইলইথাইল মূলক রয়েছে এবং ৪ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে বলয়টি অ্যামাইড নাইট্রোজেনের সঙ্গে যুক্ত।
- N-Phenyl-N-[1-(2-phenylethyl)piperidin-4-yl]: প্রোপানামাইডের নাইট্রোজেনে দুটি পৃথক প্রতিস্থাপক রয়েছে। একটি ফিনাইল এবং অন্যটি ১-(২-ফিনাইলইথাইল)পিপারিডিন-৪-ইল। উভয় প্রতিস্থাপক অ্যামাইড নাইট্রোজেনে যুক্ত হওয়ায় দুটির আগেই N- ব্যবহৃত হয়েছে।
- অ্যামাইডের শ্রেণি: অ্যামাইড নাইট্রোজেনটি কার্বনিল কার্বন, ফিনাইল মূলকের একটি কার্বন এবং পিপারিডিন বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। এতে কোনো নাইট্রোজেন-হাইড্রোজেন বন্ধন নেই। তাই ফেন্টানিল একটি টারশিয়ারি অ্যামাইড (Tertiary Amide)।
- অ্যামিনের শ্রেণি: পিপারিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনটি বলয়ের দুটি কার্বন এবং ২-ফিনাইলইথাইল মূলকের একটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই এটি একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)। অর্থাৎ ফেন্টানিলে একটি টারশিয়ারি অ্যামাইড ও একটি টারশিয়ারি অ্যামিন উভয়ই রয়েছে।
- নাইট্রোজেনের সংখ্যা: ফেন্টানিল অণুতে দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। একটি পিপারিডিন বলয়ের মধ্যে এবং অন্যটি প্রোপানামাইড অংশে অবস্থিত। এদের রাসায়নিক পরিবেশ ও ধর্ম ভিন্ন।
- অ্যারোমেটিক বলয়: ফেন্টানিল অণুতে দুটি পৃথক ফিনাইল বলয় রয়েছে। একটি সরাসরি অ্যামাইড নাইট্রোজেনে যুক্ত এবং অন্যটি পিপারিডিন নাইট্রোজেনের সঙ্গে যুক্ত ২-ফিনাইলইথাইল শৃঙ্খলের প্রান্তে অবস্থিত।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ফেন্টানিল একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম ওপিওয়েড (Fully Synthetic Opioid)। রাসায়নিকভাবে এটি অ্যানিলিডোপিপারিডিন (Anilidopiperidine) শ্রেণির যৌগ। এতে মরফিন বা বুপ্রেনরফিনের মতো বহুচক্রিক মরফিনান কাঠামো নেই।
- স্টেরিওরসায়ন: ফেন্টানিলের এই কাঠামোতে কোনো স্থায়ী কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre) নেই। পিপারিডিন বলয়ের ৪ নম্বর কার্বন থেকে বলয়ের দুই দিকে যাওয়া সংযোগপথ সমতুল্য হওয়ায় সেটিও কাইরাল কেন্দ্র নয়। তাই এর নামের শুরুতে (R) বা (S) নির্দেশক ব্যবহৃত হয় না।
- আণবিক সংকেত: C₂₂H₂₈N₂O। এর আণবিক ভর প্রায় ৩৩৬.৪৭ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: ফেন্টানিল হলো একটি অ্যানিলিডোপিপারিডিনজাত সম্পূর্ণ কৃত্রিম ওপিওয়েড, যার মূল প্রোপানামাইড অংশের নাইট্রোজেনে একটি ফিনাইল এবং একটি প্রতিস্থাপিত পিপারিডিন বলয় যুক্ত রয়েছে। পিপারিডিন বলয়ের ১ নম্বর নাইট্রোজেনে ২-ফিনাইলইথাইল মূলক এবং ৪ নম্বর কার্বনে অ্যামাইড নাইট্রোজেনের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। অণুটিতে দুটি ফিনাইল বলয়, একটি টারশিয়ারি অ্যামিন এবং একটি টারশিয়ারি অ্যামাইড বিদ্যমান।
নামটির ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি কোনো ঐতিহাসিক পুরাণ থেকে আসেনি; এটি সম্পূর্ণ আধুনিক জৈব রসায়নের রূপমূলতাত্ত্বিক সংক্ষেপণের ফসল। ১৯৫৯ সালে বেলজিয়ান চিকিৎসক ও ফার্মাকোলজিস্ট পল জানসেন যখন প্রথম এই শক্তিশালী বেদনানাশকটি সংশ্লেষণ করেন, তখন তিনি এর দীর্ঘ রাসায়নিক কাঠামোর প্রধান অংশগুলো জোড়া লাগিয়ে নামটি তৈরি করেন। অণুর মূল চক্রের অংশ ফিনাইল (phenyl) মূলক থেকে ‘ফেন’ (fen-), মধ্যবর্তী অ্যালকাইল চেইন ইথাইল (ethyl) থেকে ‘ট’ (-t-), এবং হেটেরোসাইক্লিক বলয় পিপারিডিন (piperidine) থেকে ‘আনিল’ (-anyl) যুক্ত করে তৈরি করা হয় ‘ফেন্টানিল’। ব্যাকরণগতভাবে এটি আধুনিক সিন্থেটিক ফার্মাকোলজির একটি কৃত্রিম বিশেষ্য পদ।
রসায়ন কাঠামোর বিচারে ফেন্টানিল প্রাকৃতিক মরফিনান কাঠামোর সম্পূর্ণ বাইরে তৈরি একটি ৪-অ্যানিলিনোপিপারিডিন গোত্রের যৌগ। এতে কোনো প্রাকৃতিক অপিয়েটের উপাদান নেই, এটি শতভাগ কৃত্রিম। এটি উচ্চমাত্রার চর্বি-দ্রবণীয় এবং মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের ওপর এর আকর্ষণ মরফিনের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে এটি মরফিনের তুলনায় প্রায় পঞ্চাশ থেকে একশত গুণ এবং হেরোইনের চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ গুণ বেশি শক্তিশালী। এটি মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেমের মেডুলায় অবস্থিত রেসপিরেটরি রেগুলেটরি সেন্টারের সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে দেয়। এর প্রভাবে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেলেও মস্তিষ্ক শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার সংকেত পাঠাতে পারে না। মাত্র দুই মিলিগ্রাম ফেন্টানিল একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শ্বাসযন্ত্রের সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। উত্তর আমেরিকার মেক্সিকান কার্টেলগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবরেটরিতে তৈরি এই রাসায়নিকটি বিশ্ব মাদক বাণিজ্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
মেথাডন (Methadone)
ওপিওয়েড ব্যবহারজনিত ব্যাধির (Opioid Use Disorder) চিকিৎসায় বিকল্প ওপিওয়েড থেরাপি (Opioid Substitution Therapy) হিসেবে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পূর্ণ কৃত্রিম ওপিওয়েড (Fully Synthetic Opioid) হলো মেথাডন (Methadone)। এর স্বীকৃত ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 6-(dimethylamino)-4,4-diphenylheptan-3-one, বাংলায় ৬-(ডাইমিথাইলঅ্যামিনো)-৪,৪-ডাইফিনাইলহেপ্টান-৩-অন। মেথাডনের দুটি এনান্টিওমার (Enantiomer) রয়েছে। এদের ইউপ্যাক নাম যথাক্রমে (6R)-6-(dimethylamino)-4,4-diphenylheptan-3-one এবং (6S)-6-(dimethylamino)-4,4-diphenylheptan-3-one। উভয় এনান্টিওমারের সমান অনুপাতের মিশ্রণকে রেসেমিক মেথাডন (Racemic Methadone) বলা হয়। এখানে –
- Heptan: উভয় এনান্টিওমারের মূল কাঠামো হেপ্টান, যা সাতটি কার্বন পরমাণু নিয়ে গঠিত একটি সম্পৃক্ত শৃঙ্খল। কার্বনগুলোর মধ্যে একক বন্ধন রয়েছে।
- 3-one: হেপ্টান শৃঙ্খলের ৩ নম্বর কার্বনে একটি কার্বনিল (C=O) মূলক রয়েছে। কার্বনিল কার্বনটি দুই পাশের দুটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি কিটোন (Ketone)। তাই heptan-3-one ব্যবহৃত হয়েছে।
- Phenyl: ফিনাইল (–C₆H₅) একটি অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপক, যা বেনজিন বলয় থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 4,4-Diphenyl: হেপ্টান শৃঙ্খলের ৪ নম্বর কার্বনে দুটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। একই কার্বনে দুটি অভিন্ন প্রতিস্থাপক থাকায় 4,4- লোক্যান্ট এবং দুটি ফিনাইল বোঝাতে di- উপসর্গ ব্যবহৃত হয়েছে।
- Dimethylamino: ডাইমিথাইলঅ্যামিনো [–N(CH₃)₂] একটি নাইট্রোজেনযুক্ত প্রতিস্থাপক, যার নাইট্রোজেনে দুটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 6-(Dimethylamino): হেপ্টান শৃঙ্খলের ৬ নম্বর কার্বনে একটি ডাইমিথাইলঅ্যামিনো মূলক যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ৬ নম্বর কার্বনটি সরাসরি অ্যামিনো নাইট্রোজেনের সঙ্গে সংযুক্ত।
- অ্যামিনের শ্রেণি: ডাইমিথাইলঅ্যামিনো নাইট্রোজেনটি দুটি মিথাইল কার্বন এবং হেপ্টান শৃঙ্খলের ৬ নম্বর কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই মেথাডন একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- 6-(Dimethylamino)-4,4-diphenylheptan-3-one: সম্পূর্ণ নামটি নির্দেশ করে যে সাত কার্বনবিশিষ্ট শৃঙ্খলের ৩ নম্বর কার্বনে কিটোন, ৪ নম্বর কার্বনে দুটি ফিনাইল এবং ৬ নম্বর কার্বনে ডাইমিথাইলঅ্যামিনো মূলক রয়েছে। উভয় এনান্টিওমারের পরমাণুগুলোর সংযোগ একই।
- কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre): হেপ্টান শৃঙ্খলের ৬ নম্বর কার্বনটি চারটি ভিন্ন পরমাণু বা মূলকের সঙ্গে যুক্ত – হাইড্রোজেন, ডাইমিথাইলঅ্যামিনো, মিথাইল এবং শৃঙ্খলের অবশিষ্ট অংশ। তাই এটি একটি কাইরাল কেন্দ্র।
- (6R)-মেথাডন: মেথাডনের ৬ নম্বর কাইরাল কার্বনের পরম বিন্যাস R হলে যৌগটির নাম (6R)-6-(dimethylamino)-4,4-diphenylheptan-3-one। এই বিন্যাস কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত।
- (6S)-মেথাডন: একই কাইরাল কার্বনের পরম বিন্যাস S হলে যৌগটির নাম (6S)-6-(dimethylamino)-4,4-diphenylheptan-3-one।
- এনান্টিওমার (Enantiomer): (6R)-মেথাডন ও (6S)-মেথাডন পরস্পরের এনান্টিওমার। অর্থাৎ তাদের পরমাণুগুলোর সংযোগ একই হলেও ৬ নম্বর কাইরাল কার্বনের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস পরস্পরের দর্পণ প্রতিবিম্ব, যা একটির ওপর অন্যটিকে সম্পূর্ণভাবে অধিস্থাপন করলে মিলে যায় না।
- রেসেমিক মিশ্রণ (Racemic Mixture): (6R)-মেথাডন ও (6S)-মেথাডন সমান মোলার অনুপাতে উপস্থিত থাকলে তাকে রেসেমিক মেথাডন (Racemic Methadone) বলা হয়। এতে উভয় এনান্টিওমারের পরিমাণ ৫০ শতাংশ করে থাকে।
- আলোকীয় সক্রিয়তা (Optical Activity): মেথাডনের (6R)-এনান্টিওমারকে লেভোমেথাডন (Levomethadone) এবং (6S)-এনান্টিওমারকে ডেক্সট্রোমেথাডন (Dextromethadone) বলা হয়। এখানে R/S দ্বারা পরম বিন্যাস এবং লেভো/ডেক্সট্রো দ্বারা আলোকীয় ঘূর্ণনের দিক বোঝানো হয়। উভয়ের সমান অনুপাতের রেসেমিক মিশ্রণের মোট আলোকীয় ঘূর্ণন শূন্য হয়।
- জৈবিক কার্যকারিতার পার্থক্য: (6R)-মেথাডন বা লেভোমেথাডন মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরে (μ-Opioid Receptor) তুলনামূলকভাবে অধিক শক্তিশালী অ্যাগোনিস্ট (Agonist) হিসেবে কাজ করে। (6S)-মেথাডন বা ডেক্সট্রোমেথাডনের মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর-নির্ভর কার্যকারিতা অপেক্ষাকৃত কম। তবে উভয় এনান্টিওমারের অন্যান্য ফার্মাকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যও রয়েছে।
- রাসায়নিক শ্রেণি: উভয় এনান্টিওমারই সম্পূর্ণ কৃত্রিম ওপিওয়েড (Fully Synthetic Opioid) এবং ডাইফিনাইলহেপ্টান (Diphenylheptane) শ্রেণির যৌগ। মরফিন বা বুপ্রেনরফিনের মতো এদের বহুচক্রিক মরফিনান কাঠামো নেই।
- চিকিৎসাগত ব্যবহার: মেথাডন ওপিওয়েড ব্যবহারজনিত ব্যাধির (Opioid Use Disorder) চিকিৎসায় ওপিওয়েড অ্যাগোনিস্ট থেরাপি (Opioid Agonist Therapy) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি ওপিওয়েড প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ (Withdrawal Symptoms) এবং মাদক গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা (Craving) নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যথার চিকিৎসাতেও মেথাডন ব্যবহৃত হয়।
- আণবিক সংকেত: উভয় এনান্টিওমারের আণবিক সংকেত C₂₁H₂₇NO। এদের আণবিক ভরও সমান, প্রায় ৩০৯.৪৫ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: মেথাডন হলো একটি ডাইফিনাইলহেপ্টানজাত কিটোন, যার সাত কার্বনবিশিষ্ট মূল শৃঙ্খলের ৩ নম্বর কার্বনে কার্বনিল, ৪ নম্বর কার্বনে দুটি ফিনাইল এবং ৬ নম্বর কার্বনে ডাইমিথাইলঅ্যামিনো মূলক রয়েছে। এর ৬ নম্বর কার্বন একটি কাইরাল কেন্দ্র। এই কার্বনের R বিন্যাসবিশিষ্ট এনান্টিওমার হলো লেভোমেথাডন এবং S বিন্যাসবিশিষ্ট এনান্টিওমার হলো ডেক্সট্রোমেথাডন। উভয়ের সমান অনুপাতের মিশ্রণকে রেসেমিক মেথাডন বলা হয়।
ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে ‘মেথাডন’ নামটি একটি দীর্ঘ রাসায়নিক কাঠামোর জার্মান সংক্ষিপ্ত রূপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানির আইজি ফারবেন কারখানার রসায়নবিদ মাক্স বকমুল এবং গুস্তাভ এহরহার্ট যখন এটি আবিষ্কার করেন, তখন তারা আফিমের সংকট মোকাবেলায় এমন এক কৃত্রিম ব্যথানাশক খুঁজছিলেন যা মরফিনের বিকল্প হতে পারে। যুদ্ধোত্তর যুগে আন্তর্জাতিক সাধারণ নাম নির্ধারণের সময় এর রাসায়নিক গঠনে থাকা ডাইমিথাইল (dimethyl) থেকে ‘মেথ’ (meth-), মধ্যবর্তী কার্বনের অবস্থান ও অ্যামাইনো মূলক থেকে ‘আ’ (-a-), এবং ৩ নম্বর কার্বনে থাকা কিটোন মূলক নির্দেশক প্রত্যয় -অন (-one) সমন্বিত করে ‘মেথাডন’ নামটি চূড়ান্ত করা হয়।
শারীরবৃত্তীয় কার্যপদ্ধতিতে এটি কোনো মরফিনান রিং ধারণ করে না; এটি একটি ডাইফিনাইলহেপ্টানোন ডেরিভেটিভ। মেথাডন মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের একটি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ফুল অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে। এর প্রধান বৈজ্ঞানিক বিশেষত্ব হলো এর দীর্ঘ প্লাজমা হাফ-লাইফ (প্রায় চব্বিশ থেকে ছত্রিশ ঘণ্টা)। হেরোইন বা মরফিন যেখানে গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শরীর থেকে অপসারিত হয়ে তীব্র প্রত্যাহার লক্ষণ তৈরি করে, মেথাডন সেখানে স্নায়ুগ্রাহক কোষে দীর্ঘ সময় ধীরে ধীরে আটকে থাকে। ফলে আসক্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো তীব্র নেশা বা ‘রাশ‘ তৈরি হয় না, অথচ ওপিওয়েড প্রত্যাহারের তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও ড্রাগ নেওয়ার ব্যাকুলতা বন্ধ থাকে। এই ফার্মাকোলজিক্যাল সুবিধার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্ষতি হ্রাস নীতির অংশ হিসেবে ওপিওয়েড সাবস্টিটিউশন থেরাপি (Opioid Substitution Therapy – OST)-র প্রধান ড্রাগ হিসেবে মেথাডন ব্যবহৃত হয়।
বুপ্রেনরফিন (Buprenorphine)
ওপিওয়েড ব্যবহারজনিত ব্যাধির (Opioid Use Disorder) চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ও প্রমাণভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড (Semisynthetic Opioid) হলো বুপ্রেনরফিন (Buprenorphine)। এর একটি প্রচলিত পদ্ধতিগত রাসায়নিক নাম (Systematic Chemical Name) হলো: (2S)-2-[(-)-(5R,6R,7R,14S)-9a-(cyclopropylmethyl)-4,5-epoxy-3-hydroxy-6-methoxy-6,14-ethanomorphinan-7-yl]-3,3-dimethylbutan-2-ol, বাংলায় (২এস)-২-[(-)-(৫আর,৬আর,৭আর,১৪এস)-৯এ-(সাইক্লোপ্রোপাইলমিথাইল)-৪,৫-ইপক্সি-৩-হাইড্রোক্সি-৬-মেথোক্সি-৬,১৪-ইথানোমরফিনান-৭-ইল]-৩,৩-ডাইমিথাইলবিউটান-২-অল। এখানে –
- Butan: মূল নামকরণে চার কার্বনবিশিষ্ট সম্পৃক্ত বিউটান শৃঙ্খল ব্যবহৃত হয়েছে। এর ২ নম্বর কার্বনে হাইড্রক্সি মূলক এবং একটি জটিল মরফিনানজাত প্রতিস্থাপক যুক্ত রয়েছে।
- 2-ol: বিউটান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক রয়েছে। তাই butan-2-ol ব্যবহৃত হয়েছে।
- 3,3-Dimethyl: বিউটান শৃঙ্খলের ৩ নম্বর কার্বনে দুটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। একই কার্বনে দুটি মিথাইল থাকায় 3,3- লোক্যান্ট ব্যবহৃত হয়েছে।
- (2S): বিউটান-২-অল অংশের ২ নম্বর কার্বন একটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre)। এর পরম বিন্যাস S, যা কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত।
- 2-[…]: বিউটান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি জটিল মরফিনানজাত প্রতিস্থাপক যুক্ত রয়েছে। বর্গবন্ধনীর মধ্যে এই সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপকের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
- Morphinan: মরফিনান হলো মরফিনজাত যৌগগুলোর একটি নাইট্রোজেনযুক্ত বহুচক্রিক মূল কাঠামো। এতে একটি অ্যারোমেটিক বলয়সহ সংযুক্ত বলয়ব্যবস্থা এবং একটি সেতুবন্ধযুক্ত নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে।
- 6,14-Ethano: মরফিনান কাঠামোর ৬ ও ১৪ নম্বর অবস্থানের মধ্যে দুটি কার্বনবিশিষ্ট একটি ইথানো সেতু (Ethano Bridge) রয়েছে। অর্থাৎ ওই দুটি অবস্থান –CH₂–CH₂– সংযোগপথের মাধ্যমে যুক্ত।
- 6,14-Ethanomorphinan: ইথানো সেতু যুক্ত হওয়ায় মূল মরফিনান কাঠামোতে অতিরিক্ত একটি বলয় সৃষ্টি হয়েছে। এটি বুপ্রেনরফিনের সেতুবন্ধযুক্ত বহুচক্রিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
- 4,5-Epoxy: মরফিনান কাঠামোর ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি অক্সিজেন সেতু রয়েছে। এখানে epoxy বলতে তিন সদস্যবিশিষ্ট সাধারণ ইপক্সাইড বলয় বোঝানো হচ্ছে না; বরং ৪ ও ৫ নম্বর অবস্থানকে সংযুক্ত করা একটি চক্রাকার ইথার সেতু বোঝানো হয়েছে।
- 3-Hydroxy: মরফিনান কাঠামোর ৩ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক যুক্ত রয়েছে। এটি অ্যারোমেটিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ফেনলজাত (Phenolic) হাইড্রক্সি মূলক।
- 6-Methoxy: মরফিনান কাঠামোর ৬ নম্বর কার্বনে একটি মেথক্সি (–OCH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। এটি একটি ইথার (Ether) কার্যকরী মূলক।
- 9a-(Cyclopropylmethyl): মরফিনান কাঠামোর নাইট্রোজেনে একটি সাইক্লোপ্রোপাইলমিথাইল (–CH₂–C₃H₅) মূলক যুক্ত রয়েছে। এখানে 9a মরফিনান কাঠামোর প্রচলিত অবস্থানসূচক; এটিকে সরাসরি ৯ নম্বর কার্বনের পরবর্তী কার্বন ধরে নেওয়া যাবে না।
- Cyclopropyl: সাইক্লোপ্রোপাইল একটি তিন কার্বনবিশিষ্ট চক্রাকার প্রতিস্থাপক, যা সাইক্লোপ্রোপেন (Cyclopropane) থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- Cyclopropylmethyl: একটি মিথিলিন (–CH₂–) অংশের সঙ্গে সাইক্লোপ্রোপাইল বলয় যুক্ত হয়ে সাইক্লোপ্রোপাইলমিথাইল মূলক গঠিত হয়েছে। এই মিথিলিন কার্বনের মাধ্যমেই মূলকটি মরফিনান কাঠামোর নাইট্রোজেনের সঙ্গে যুক্ত।
- 7-yl: মরফিনান কাঠামোর ৭ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে সেটি বিউটান-২-অল অংশের ২ নম্বর কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই -7-yl ব্যবহৃত হয়েছে।
- (5R,6R,7R,14S): মরফিনানজাত অংশের ৫, ৬, ৭ ও ১৪ নম্বর কার্বন চারটি কাইরাল কেন্দ্র। এদের পরম বিন্যাস যথাক্রমে R, R, R ও S।
- (-): নামের মধ্যে থাকা (-) যৌগটির ঋণাত্মক আলোকীয় ঘূর্ণন (Levorotation) নির্দেশ করে। অর্থাৎ এটি নির্দিষ্ট পরীক্ষাগত অবস্থায় সমতল-সমবর্তিত আলোর তল বামদিকে ঘোরায়। এই চিহ্নকে R বা S বিন্যাসের সমার্থক মনে করা যাবে না।
- হাইড্রক্সি মূলকের সংখ্যা: বুপ্রেনরফিনে দুটি হাইড্রক্সি মূলক রয়েছে। একটি মরফিনান কাঠামোর ৩ নম্বর অবস্থানে এবং অন্যটি বিউটান শৃঙ্খলের ২ নম্বর অবস্থানে। প্রথমটি ফেনলজাত এবং দ্বিতীয়টি টারশিয়ারি অ্যালকোহল (Tertiary Alcohol)।
- অ্যামিনের শ্রেণি: মরফিনান কাঠামোর নাইট্রোজেনটি তিনটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই বুপ্রেনরফিন একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: বুপ্রেনরফিন একটি আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড (Semisynthetic Opioid), যা থিবেইন (Thebaine) থেকে উদ্ভূত। এটি অরিপাভিনজাত (Oripavine-derived) ওপিওয়েড এবং মরফিনানজাত অ্যালকালয়েডের রাসায়নিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
- আণবিক সংকেত: C₂₉H₄₁NO₄।
সুতরাং: বুপ্রেনরফিন হলো একটি জটিল সেতুবন্ধযুক্ত মরফিনানজাত যৌগ, যার নাইট্রোজেনে সাইক্লোপ্রোপাইলমিথাইল, ৩ নম্বর অবস্থানে হাইড্রক্সি, ৬ নম্বর অবস্থানে মেথক্সি এবং ৭ নম্বর অবস্থানে একটি প্রতিস্থাপিত বিউটান-২-অল অংশ যুক্ত রয়েছে। এর কাঠামোতে অক্সিজেন ও ইথানো সেতু এবং একাধিক কাইরাল কেন্দ্র বিদ্যমান।
নামটির রূপমূল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি একাধিক রাসায়নিক অংশের সংকর নাম। এটি থেবেইন অ্যালকালয়েড থেকে সিন্থেসিস করা একটি থিবাইন-ডেরিভেটিভ। অণুর পাশের শিকলে থাকা বিউটাইল (butyl) গ্রুপের অংশ ‘বু’ (bu-), মূল মরফিনান কাঠামোর নাম মরফিন (morphine)-এর পরিবর্তিত রূপ ‘অরফিন’ (-rnorphine), এবং মাঝের সাইক্লোপ্রোপাইল গ্রুপের সংকেতের সমন্বয়ে ব্রিটিশ ওষুধ কোম্পানি রেকটি অ্যান্ড কোলম্যান ১৯৬৬ সালে ‘বুপ্রেনরফিন’ শব্দটি তৈরি করে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল ফার্মাকোলজিক্যাল যৌগিক বিশেষ্য পদ।
ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে বুপ্রেনরফিন একটি যুগান্তকারী অণু, কারণ এটি মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের একটি আংশিক অ্যাগোনিস্ট (partial agonist) এবং একই সাথে কাপা-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের অ্যান্টাগনিস্ট (antagonist)। আংশিক অ্যাগোনিস্ট হওয়ার কারণে এটি একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে যার পর ওষুধের মাত্রা বাড়ালেও তার প্রভাব আর বাড়ে না; বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় সিলিং ইফেক্ট (ceiling effect)। এই সিলিং ইফেক্টের কারণে অতিরিক্ত মাত্রায় বুপ্রেনরফিন গ্রহণ করলেও ফেন্টানিল বা মরফিনের মতো শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে না। ফলে নিরাপদ পুনর্বাসন চিকিৎসায় এবং ভারতের এনডিপিএস আইনের আধুনিক সংশোধনীর আওতায় এটি অন্যতম প্রধান অপরিহার্য ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
কোকেন বা বেনজয়িলমিথাইলএকগোনিন (Cocaine / Benzoylmethylecgonine)
কোকা পাতা থেকে পরিশোধিত মূল উপক্ষারটির বৈজ্ঞানিক নাম কোকেন। এর প্রাতিষ্ঠানিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: methyl (1R,2R,3S,5S)-3-(benzoyloxy)-8-methyl-8-azabicyclo[3.2.1]octane-2-carboxylate, বাংলায় মিথাইল (১-আর, ২-আর, ৩-এস, ৫-এস)-৩-(বেনজয়িলক্সি)-৮-মিথাইল-৮-অ্যাজাবাইসাইক্লো[৩.২.১]অক্টেন-২-কার্বক্সিলেট। এখানে –
- Bicyclo: মূল কাঠামো একটি দ্বিচক্রিক (Bicyclic) বলয়ব্যবস্থা, যেখানে দুটি বলয় দুটি অভিন্ন সেতুশীর্ষ পরমাণু (Bridgehead Atom) ভাগ করে এবং তাদের মধ্যে তিনটি পৃথক সংযোগপথ থাকে।
- [3.2.1]: দ্বিচক্রিক কাঠামোর দুটি সেতুশীর্ষ পরমাণুর মধ্যবর্তী তিনটি সংযোগপথে যথাক্রমে ৩টি, ২টি ও ১টি পরমাণু রয়েছে। এই সংখ্যাগুলোতে সেতুশীর্ষ পরমাণু দুটি অন্তর্ভুক্ত নয়।
- Octane: মূল দ্বিচক্রিক কাঠামোতে মোট আটটি পরমাণুর অবস্থান রয়েছে। কারণ তিনটি সংযোগপথের ৩ + ২ + ১টি পরমাণুর সঙ্গে দুটি সেতুশীর্ষ পরমাণু যোগ করলে মোট ৮টি হয়। -ane নির্দেশ করে মূল বলয়ব্যবস্থায় সব বন্ধন একক।
- Azа: aza একটি প্রতিস্থাপনমূলক নামকরণ উপসর্গ (Replacement Prefix), যা নির্দেশ করে মূল কার্বন কাঠামোর একটি কার্বন পরমাণুর পরিবর্তে নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে।
- 8-Aza: দ্বিচক্রিক কাঠামোর ৮ নম্বর অবস্থানে কার্বনের পরিবর্তে একটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে।
- 8-Azabicyclo[3.2.1]octane: এটি আট সদস্যবিশিষ্ট পরমাণুকাঠামোর একটি নাইট্রোজেনযুক্ত দ্বিচক্রিক ব্যবস্থা। এই কাঠামো ট্রোপেন (Tropane) বলয়ব্যবস্থার ভিত্তি।
- 8-Methyl: দ্বিচক্রিক কাঠামোর ৮ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে নাইট্রোজেনটি তিনটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine) গঠন করেছে।
- 2-Carboxylate: দ্বিচক্রিক কাঠামোর ২ নম্বর কার্বনে একটি কার্বক্সিলিক অ্যাসিডজাত এস্টার অংশ যুক্ত রয়েছে। এর কার্বনিল কার্বনটি মূল বলয়ের বাইরে অবস্থিত।
- Methyl: নামের শুরুতে থাকা methyl নির্দেশ করে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড অংশটির মিথাইল এস্টার (Methyl Ester) গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট এস্টার মূলকটি –C(=O)OCH₃।
- Methyl … octane-2-carboxylate: পুরো অংশটি নির্দেশ করে যে ৮-অ্যাজাবাইসাইক্লো[৩.২.১]অক্টেনের ২ নম্বর কার্বনে যুক্ত কার্বক্সিলিক অ্যাসিড অংশটি মিথানলের সঙ্গে এস্টার গঠন করেছে।
- Benzoyl: বেনজয়িল (C₆H₅–C(=O)–) একটি অ্যাসাইল মূলক (Acyl Group), যা বেনজয়িক অ্যাসিড (Benzoic Acid) থেকে উদ্ভূত।
- Benzoyloxy: বেনজয়িলক্সি (–O–C(=O)–C₆H₅) মূলকে একটি অক্সিজেন পরমাণুর মাধ্যমে বেনজয়িল অংশ মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে।
- 3-(Benzoyloxy): দ্বিচক্রিক কাঠামোর ৩ নম্বর কার্বনে একটি বেনজয়িলক্সি মূলক যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ওই অবস্থানের হাইড্রক্সি মূলক বেনজয়িক অ্যাসিডের সঙ্গে এস্টার গঠন করেছে।
- দুটি এস্টার: কোকেন অণুতে দুটি পৃথক এস্টার কার্যকরী মূলক রয়েছে। একটি ২ নম্বর কার্বনে যুক্ত মিথাইল কার্বক্সিলেট এস্টার এবং অন্যটি ৩ নম্বর কার্বনে যুক্ত বেনজয়েট এস্টার (Benzoate Ester)।
- (1R,2R,3S,5S): অণুর ১, ২, ৩ ও ৫ নম্বর কার্বন চারটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre)। এদের পরম বিন্যাস যথাক্রমে R, R, S ও S, যা কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত।
- রাসায়নিক শ্রেণি: কোকেন একটি উদ্ভিদজাত ট্রোপেন অ্যালকালয়েড (Tropane Alkaloid)। এর নাইট্রোজেনযুক্ত দ্বিচক্রিক কাঠামো এবং প্রাকৃতিক জৈবসংশ্লেষণগত উৎসের কারণে এটি অ্যালকালয়েড শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
- আণবিক সংকেত: C₁₇H₂₁NO₄।
সুতরাং: কোকেন হলো একটি ট্রোপেনজাত নাইট্রোজেনযুক্ত দ্বিচক্রিক যৌগ, যার ৮ নম্বর নাইট্রোজেনে মিথাইল, ২ নম্বর কার্বনে মিথাইল কার্বক্সিলেট এস্টার এবং ৩ নম্বর কার্বনে বেনজয়িলক্সি মূলক রয়েছে। এর চারটি কাইরাল কেন্দ্রের বিন্যাস যথাক্রমে (1R,2R,3S,5S)।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে ‘কোকেন’ নামটি আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসী কেচুয়া ও আইমারা ভাষার মূল শব্দ ককুকা (khoka, যার অর্থ গাছ বা পাতা) থেকে ধার করা হয়েছে। ১৮৫৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ আলবার্ট নিম্যান যখন গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণাকালে কোকা পাতা থেকে এই সক্রিয় রাসায়নিক স্ফটিক আকারে পৃথক করেন, তখন তিনি আদিবাসী শব্দ ‘কোকা’-র সাথে জৈব ক্ষারকীয় আন্তর্জাতিক প্রত্যয় -ইন (-ine) যুক্ত করে ‘কোকেন’ নামটি প্রণয়ন করেন। এর বিকল্প রাসায়নিক নাম ‘বেনজয়িলমিথাইলএকগোনিন’ আণবিক বিশ্লেষণ থেকে এসেছে; যেখানে ট্রোপেন চক্রযুক্ত মূল অ্যামিনো অ্যালকোহল হলো একগোনিন (ecgonine, যা গ্রিক ekgonos বা বংশধর থেকে এসেছে), যার সাথে যুক্ত হয়েছে একটি বেনজয়িল মূলক এবং একটি মিথাইল এস্টার মূলক।
আণবিক স্তরে কোকেন একটি শক্তিশালী সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম স্টিমুলেন্ট এবং লোকাল অ্যানেস্থেটিক। এটি স্নায়ুকোষের প্লাজমা মেমব্রেনে থাকা তিনটি প্রধান মনোঅ্যামিন ট্রান্সপোর্টার প্রোটিন – ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার (DAT), সেরোটোনিন ট্রান্সপোর্টার (SERT) এবং নর-এপিনেফ্রিন ট্রান্সপোর্টার (NET)-কে তীব্রভাবে প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে অবরুদ্ধ করে। ফলে প্রিসিন্যাপ্টিক নিউরনে এই নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর পুনঃশোষণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সিন্যাপটিক ফাঁকে ডোপামিন দীর্ঘস্থায়ী সংকেত পাঠাতে থাকে। এর ফলস্বরূপ ব্যক্তি নিজেকে অভাবনীয় শক্তিশালী, ক্লান্তিহীন ও আত্মবিশ্বাসী ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কোকেনের আণবিক স্থায়িত্ব অত্যন্ত কম হওয়ায় দশ থেকে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে এর প্রভাব কেটে যায়, যা ব্যবহারকারীকে পুনরায় পরবর্তী ডোজ নিতে বাধ্য করে। এর অপরিশোধিত সস্তা রূপ ‘ক্র্যাক‘ ধোঁয়ার মাধ্যমে সেবনের ফলে কয়েক সেকেন্ডে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, যা বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে মার্কিন নগরগুলোতে ঐতিহাসিক ক্র্যাক মহামারির জন্ম দিয়েছিল।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
অ্যাম্ফেটামিন (Amphetamine)
কৃত্রিম মনোউদ্দীপক যৌগগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান রাসায়নিক হলো অ্যাম্ফেটামিন (Amphetamine)। এর স্বীকৃত ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 1-phenylpropan-2-amine, বাংলায় ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামিন। অ্যাম্ফেটামিনের দুটি এনান্টিওমার (Enantiomer) রয়েছে। এদের মধ্যে ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিনের (Dextroamphetamine) ইউপ্যাক নাম (2S)-1-phenylpropan-2-amine এবং লেভোঅ্যাম্ফেটামিনের (Levoamphetamine) ইউপ্যাক নাম (2R)-1-phenylpropan-2-amine। এখানে –
- Propan: উভয় যৌগের মূল কাঠামো প্রোপান, যা তিনটি কার্বন পরমাণু নিয়ে গঠিত একটি সম্পৃক্ত শৃঙ্খল। কার্বনগুলোর মধ্যে একক বন্ধন রয়েছে।
- 2-Amine: প্রোপান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি অ্যামিনো (–NH₂) মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই উভয়ের নামেই propan-2-amine ব্যবহৃত হয়েছে।
- Phenyl: ফিনাইল (–C₆H₅) একটি অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপক, যা বেনজিন বলয় থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 1-Phenyl: প্রোপান শৃঙ্খলের ১ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে উভয় যৌগের মূল কাঠামো ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামিন।
- 1-Phenylpropan-2-amine: উভয় যৌগের সংযোগগত গঠন C₆H₅–CH₂–CH(NH₂)–CH₃। এখানে ফিনাইল মূলকটি প্রথম কার্বনে এবং অ্যামিনো মূলকটি দ্বিতীয় কার্বনে যুক্ত। তবে এই সংকেত থেকে তাদের ত্রিমাত্রিক বিন্যাসের পার্থক্য বোঝা যায় না।
- অ্যামিনের শ্রেণি: অ্যামিনো নাইট্রোজেনটি একটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত এবং দুটি হাইড্রোজেন বহন করে। তাই ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিন ও লেভোঅ্যাম্ফেটামিন উভয়ই প্রাথমিক অ্যামিন (Primary Amine)।
- কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre): প্রোপান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনটি চারটি ভিন্ন পরমাণু বা মূলকের সঙ্গে যুক্ত – হাইড্রোজেন, অ্যামিনো, মিথাইল ও বেনজাইল (–CH₂–C₆H₅)। তাই এটি একটি কাইরাল কেন্দ্র।
- (2S)-ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিন: ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিনের ২ নম্বর কাইরাল কার্বনের পরম বিন্যাস S। এটি কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত। তাই এর নামের শুরুতে (2S) ব্যবহৃত হয়েছে।
- (2R)-লেভোঅ্যাম্ফেটামিন: লেভোঅ্যাম্ফেটামিনের ২ নম্বর কাইরাল কার্বনের পরম বিন্যাস R। তাই এর নামের শুরুতে (2R) ব্যবহৃত হয়েছে।
- স্টেরিওআইসোমার: ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিন ও লেভোঅ্যাম্ফেটামিন পরস্পরের এনান্টিওমার (Enantiomer)। অর্থাৎ তাদের পরমাণুগুলোর সংযোগ একই হলেও ত্রিমাত্রিক বিন্যাস পরস্পরের দর্পণ প্রতিবিম্ব, যা একটির ওপর অন্যটিকে সম্পূর্ণভাবে অধিস্থাপন করলে মিলে যায় না।
- আলোকীয় সক্রিয়তা (Optical Activity): ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিন সমতল-সমবর্তিত আলোর তল ডানদিকে ঘোরায় এবং লেভোঅ্যাম্ফেটামিন বামদিকে ঘোরায়। তবে R/S দ্বারা পরম বিন্যাস বোঝানো হয়, আলোকীয় ঘূর্ণনের দিক নয়। অ্যাম্ফেটামিনের ক্ষেত্রে যথাক্রমে S ও R বিন্যাসের সঙ্গে ডেক্সট্রো ও লেভো রূপ মিলে গেছে।
- মেথাম্ফেটামিনের সঙ্গে সম্পর্ক: উভয় অ্যাম্ফেটামিন এনান্টিওমারের অ্যামিনো নাইট্রোজেনের একটি হাইড্রোজেনের পরিবর্তে মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট মেথাম্ফেটামিন এনান্টিওমারের কাঠামো পাওয়া যায়। ফলে অ্যাম্ফেটামিন প্রাথমিক অ্যামিন হলেও মেথাম্ফেটামিন দ্বিতীয়িক অ্যামিন (Secondary Amine)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: উভয় যৌগই প্রতিস্থাপিত ফেনেথাইলামিন (Substituted Phenethylamine)। এদের আলফা-মিথাইলফেনেথাইলামিন (α-Methylphenethylamine) শ্রেণির যৌগও বলা হয়।
- জৈবিক কার্যকারিতার পার্থক্য: উভয় এনান্টিওমারই কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজক (Central Nervous System Stimulant)। তবে ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিন সাধারণত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে অধিক শক্তিশালী উত্তেজক প্রভাব প্রদর্শন করে। লেভোঅ্যাম্ফেটামিনের তুলনামূলকভাবে বেশি পরিধীয় সিমপ্যাথোমিমেটিক (Peripheral Sympathomimetic) প্রভাব থাকতে পারে।
- আণবিক সংকেত: উভয় এনান্টিওমারের আণবিক সংকেত C₉H₁₃N। তাদের আণবিক ভরও সমান, প্রায় ১৩৫.২১ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিন ও লেভোঅ্যাম্ফেটামিন উভয়ই ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামিন, যার প্রোপান শৃঙ্খলের ১ নম্বর কার্বনে ফিনাইল এবং ২ নম্বর কার্বনে অ্যামিনো মূলক যুক্ত রয়েছে। তাদের একমাত্র গাঠনিক পার্থক্য হলো ২ নম্বর কাইরাল কার্বনের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস। ডেক্সট্রোঅ্যাম্ফেটামিনের বিন্যাস (2S) এবং লেভোঅ্যাম্ফেটামিনের বিন্যাস (2R)।
‘অ্যাম্ফেটামিন’ নামটি আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের এক নিখুঁত সংক্ষিপ্ত আদ্যক্ষরীয় সমাসবদ্ধ রূপ। ১৮৮৭ সালে রোমানিয়ান রসায়নবিদ লাজার এডিলিয়ানো বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এই যৌগ সংশ্লেষণ করেন। যৌগটির মূল নিয়মতান্ত্রিক রাসায়নিক নাম ছিল: আলফা-মিথাইল-ফেনিথাইল-অ্যামাইন (alpha-methyl-phenethyl-amine)। এই দীর্ঘ রাসায়নিক নামের ভেতর থেকে গুরুত্বপূর্ণ শব্দাংশগুলো বেছে নেওয়া হয়: ‘আলফা’ থেকে ‘অ্যা’ (a-), ‘মিথাইল’ থেকে ‘ম’ (-m-), ‘ফিনাইল’ থেকে ‘ফে’ (-phe-), এবং ‘অ্যামাইন’ থেকে ‘টামিন’ (-tamine) যুক্ত করে তৈরি হয় ‘অ্যাম্ফেটামিন’। ব্যাকরণগতভাবে এটি একটি কৃত্রিম যৌগিক বিশেষ্য পদ।
ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে অ্যাম্ফেটামিন হলো প্রাকৃতিক ক্যাটেকোলামিন নিউরোট্রান্সমিটারের একটি শক্তিশালী সিন্থেটিক অ্যানালগ। এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন ও নর-এড্রেনালিন স্নায়ুতন্ত্রের ভেতর প্রবেশ করে ভেসিকুলার মনোঅ্যামিন ট্রান্সপোর্টার-২ (vesicular monoamine transporter-2 – VMAT2) প্রোটিনের কার্যকারিতা উল্টে দেয়। সাধারণ অবস্থায় এই প্রোটিন ডোপামিনকে নিউরনের ভেতরে থলির মধ্যে জমা করে রাখে। কিন্তু অ্যাম্ফেটামিনের প্রভাবে থলিগুলো ভেঙে যায় এবং জমা ডোপামিন সরাসরি নিউরনের সাইটোপ্লাজমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর এটি ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার প্রোটিনের দিক পরিবর্তন করে ডোপামিনকে উল্টো পথে জোরপূর্বক সিন্যাপটিক ফাঁকে বের করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কে যে রাসায়নিক ঝড় বয়ে যায়, তা ক্লান্তি দূর করে, ক্ষুধা পুরোপুরি নষ্ট করে এবং হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের বিনিদ্র ও হিংস্র রাখতে লাখ লাখ অ্যাম্ফেটামিন ট্যাবলেট সরবরাহ করেছিল।
মেথাম্ফেটামিন (Methamphetamine)
অ্যাম্ফেটামিনের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী ও ক্ষতিকর হলো অ্যাম্ফেটামিনের এই এন-মিথাইলজাত সমগোত্রীয় যৌগটি (N-Methylated Analogue), যার নাম মেথাম্ফেটামিন। এর আন্তর্জাতিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: (2S)-N-methyl-1-phenylpropan-2-amine, বাংলায় (২এস)-এন-মিথাইল-১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামাইন। এখানে –
- Propan: মূল কাঠামো প্রোপান, যা তিনটি কার্বন পরমাণু নিয়ে গঠিত একটি সম্পৃক্ত শৃঙ্খল। কার্বনগুলোর মধ্যে একক বন্ধন রয়েছে।
- 2-Amine: প্রোপান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি অ্যামিনো মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই propan-2-amine ব্যবহৃত হয়েছে।
- Phenyl: ফিনাইল (–C₆H₅) একটি অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপক, যা বেনজিন বলয় থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 1-Phenyl: প্রোপান শৃঙ্খলের ১ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে মূল কাঠামোটি ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামিন।
- N-Methyl: অ্যামিনো নাইট্রোজেনের সঙ্গে একটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। N- নির্দেশ করে মিথাইলটি প্রোপান শৃঙ্খলের কোনো কার্বনে নয়, সরাসরি নাইট্রোজেনে যুক্ত।
- অ্যামিনের শ্রেণি: নাইট্রোজেনটি প্রোপান শৃঙ্খলের একটি কার্বন ও মিথাইল মূলকের একটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি হাইড্রোজেন বহন করে। ফলে মেথাম্ফেটামিন একটি দ্বিতীয়িক অ্যামিন (Secondary Amine)।
- (2S): প্রোপান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনটি একটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre)। এর পরম বিন্যাস S, যা কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত।
- অ্যাম্ফেটামিনের সঙ্গে সম্পর্ক: অ্যাম্ফেটামিনের ইউপ্যাক নাম ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামিন (1-Phenylpropan-2-amine)। এর অ্যামিনো নাইট্রোজেনের একটি হাইড্রোজেনের পরিবর্তে মিথাইল মূলক যুক্ত হলে মেথাম্ফেটামিন গঠিত হয়।
- রাসায়নিক শ্রেণি: মেথাম্ফেটামিন একটি প্রতিস্থাপিত ফেনেথাইলামিন (Substituted Phenethylamine) এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজক (Central Nervous System Stimulant)।
- আণবিক সংকেত: C₁₀H₁₅N।
সুতরাং: মেথাম্ফেটামিন হলো একটি ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-অ্যামিন, যার অ্যামিনো নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল মূলক যুক্ত এবং ২ নম্বর কাইরাল কার্বনের বিন্যাস S।
নামটির ব্যুৎপত্তি অ্যাম্ফেটামিন অণুর সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। অ্যাম্ফেটামিন অণুর অ্যামাইন প্রান্তে থাকা একটি হাইড্রোজেন পরমাণু যখন একটি মিথাইল মূলক (methyl group) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘এন-মিথাইল-অ্যাম্ফেটামিন’। এই দুটি শব্দ জোড়া লাগিয়ে তৈরি হয়েছে ‘মেথ-অ্যাম্ফেটামিন’। ১৮৯৩ সালে জাপানি রসায়নবিদ নাগাই নাগায়োশি প্রথম এফেড্রিন থেকে এটি তরল আকারে সংশ্লেষণ করেন এবং ১৯১৯ সালে আকিরা ওগাতা স্ফটিক আকারে বিশুদ্ধ মেথাম্ফেটামিন তৈরি করেন।
আণবিক স্তরে মিথাইল গ্রুপ যুক্ত হওয়ার কারণে মেথাম্ফেটামিন সাধারণ অ্যাম্ফেটামিনের চেয়ে অনেক বেশি চর্বি-দ্রবণীয় এবং এটি মস্তিষ্কের রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক ভেদ করতে অনেক কম সময় নেয়। এটি কোকেনের মতো কেবল পুনঃশোষণই আটকায় না, বরং ভিএমএটি-২ এবং ড্যাট প্রোটিনের দিক পুরোপুরি উল্টে দিয়ে কোটি কোটি ডোপামিন অণু সাইনাপ্সে ছড়িয়ে দেয়। এর ক্রিয়ার স্থায়িত্ব সাধারণ কোকেনের চেয়ে প্রায় দশ থেকে বারো গুণ বেশি, যা একটানা আট থেকে চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। দীর্ঘদিন মেথাম্ফেটামিন ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপ্টরগুলো শারীরিকভাবে ক্ষয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় নিউরোটক্সিসিটি (neurotoxicity) বলা হয়। মিয়ানমারের শান রাজ্যে তৈরি হওয়া ‘ইয়াবা‘ ট্যাবলেট এবং মেক্সিকান কার্টেলদের তৈরি ‘ক্রিস্টাল মেথ’ মূলত এই রাসায়নিক যৌগের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ডেল্টা-৯-টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল বা টিএইচসি (Delta-9-Tetrahydrocannabinol – THC)
ক্যানাবিসের প্রধান মনোদৈহিক যৌগ হলো ডেল্টা-৯-টিএইচসি। একে অনেক জায়গায় অ্যালকালয়েড বলা হলেও এটা আসলে অ্যালকালয়েড (Alkaloid) নয়। এটি একটি উদ্ভিদজাত ক্যানাবিনয়েড (Phytocannabinoid), আরও নির্দিষ্টভাবে নাইট্রোজেনবিহীন টারপেনোফেনলজাত (Terpenophenolic) যৌগ। অ্যালকালয়েড সাধারণত নাইট্রোজেনযুক্ত জৈব যৌগ। অথচ ডেল্টা-৯-টিএইচসির আণবিক সংকেত C₂₁H₃₀O₂ – এতে কোনো নাইট্রোজেনই নেই। যাই হোক, এর আন্তর্জাতিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: (6aR,10aR)-6,6,9-trimethyl-3-pentyl-6a,7,8,10a-tetrahydro-6H-benzo[c]chromen-1-ol, বাংলায় (৬এ-আর, ১০এ-আর)-৬,৬,৯-ট্রাইমিথাইল-৩-পেন্টাইল-৬এ,৭,৮,১০এ-টেট্রাহাইড্রো-৬এইচ-বেনজো[সি]ক্রোমেন-১-অল। এখানে –
- Chromene: মূল বলয়ব্যবস্থার একটি অংশ ক্রোমেন, যা একটি বেনজিন বলয় ও ছয় সদস্যবিশিষ্ট অক্সিজেনযুক্ত পাইরান (Pyran) বলয়ের ফিউশনে গঠিত।
- Benzo-: ক্রোমেন বলয়ব্যবস্থার সঙ্গে আরও একটি বেনজিন বলয় ফিউজড অবস্থায় যুক্ত রয়েছে।
- [c]: ক্রোমেনের c অক্ষর দ্বারা চিহ্নিত বলয়প্রান্তে অতিরিক্ত বেনজিন বলয়টি ফিউজড হয়েছে। এটি বলয়সংযোগের অবস্থান নির্দেশ করে।
- Benzo[c]chromene: তিনটি ফিউজড বলয়বিশিষ্ট মূল কাঠামো, যার মধ্যে দুটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট কার্বন বলয় এবং একটি অক্সিজেনযুক্ত ছয় সদস্যবিশিষ্ট বলয় রয়েছে।
- 6H-: মূল বেনজো[সি]ক্রোমেন বলয়ব্যবস্থার ৬ নম্বর অবস্থানে নির্দেশিত হাইড্রোজেন (Indicated Hydrogen) বোঝায়। এটি মূল কাঠামোর অসম্পৃক্ততা ও হাইড্রোজেনের বিন্যাস নির্দিষ্ট করে।
- Tetrahydro: মূল বেনজো[সি]ক্রোমেন বলয়ব্যবস্থার তুলনায় চারটি অতিরিক্ত হাইড্রোজেনের সমতুল্য হাইড্রোজেনেশন নির্দেশ করে। ফলে দুটি দ্বিবন্ধনের সমতুল্য অসম্পৃক্ততা হ্রাস পেয়েছে।
- 6a,7,8,10a-Tetrahydro: হাইড্রোজেনেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি অবস্থান হলো ৬এ, ৭, ৮ ও ১০এ। এগুলো মূল ফিউজড বলয়ব্যবস্থার লোক্যান্ট।
- 6a ও 10a: এগুলো দুটি বলয়সংযোগস্থলের (Ring-Junction) কার্বন। ফিউজড বলয় নামকরণে এ ধরনের অবস্থান নির্দেশ করতে সংখ্যার সঙ্গে বর্ণ ব্যবহৃত হয়।
- 6,6-Dimethyl: মূল বলয়ব্যবস্থার ৬ নম্বর কার্বনে দুটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। একই কার্বনে দুটি অভিন্ন প্রতিস্থাপক থাকায় উভয়ের লোক্যান্ট 6,6 লেখা হয়েছে।
- 9-Methyl: মূল বলয়ব্যবস্থার ৯ নম্বর কার্বনে আরও একটি মিথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 6,6,9-Trimethyl: মোট তিনটি মিথাইল মূলক রয়েছে। দুটি ৬ নম্বর কার্বনে এবং একটি ৯ নম্বর কার্বনে যুক্ত। তাই trimethyl ব্যবহৃত হয়েছে।
- 3-Pentyl: মূল বলয়ব্যবস্থার ৩ নম্বর কার্বনে পাঁচ কার্বনবিশিষ্ট একটি পেন্টাইল (–CH₂–CH₂–CH₂–CH₂–CH₃) শৃঙ্খল যুক্ত রয়েছে।
- 1-ol: মূল বলয়ব্যবস্থার ১ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই -ol প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়েছে। এটি অ্যারোমেটিক কার্বনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় যৌগটির এই অংশ ফেনলজাত (Phenolic)।
- (6aR,10aR): অণুর ৬এ ও ১০এ নম্বর কার্বন দুটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre)। উভয়ের পরম বিন্যাস R, যা কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত।
- কার্যকরী মূলকের অগ্রাধিকার: অণুতে একটি ফেনলজাত হাইড্রক্সি মূলক, একটি চক্রাকার ইথার এবং কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধন রয়েছে। নামকরণে হাইড্রক্সি মূলককে -ol প্রত্যয়ে প্রকাশ করা হয়েছে।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ডেল্টা-৯-টিএইচসি একটি ফাইটো-ক্যানাবিনয়েড (Phytocannabinoid) এবং টারপেনোফেনলজাত (Terpenophenolic) যৌগ। এতে নাইট্রোজেন না থাকায় এটি অ্যালকালয়েড নয়।
- আণবিক সংকেত: C₂₁H₃₀O₂।
সুতরাং: ডেল্টা-৯-টিএইচসি হলো আংশিক হাইড্রোজেনযুক্ত বেনজো[সি]ক্রোমেনজাত তিন-বলয়বিশিষ্ট যৌগ, যার ৬ নম্বর কার্বনে দুটি মিথাইল, ৯ নম্বর কার্বনে একটি মিথাইল, ৩ নম্বর কার্বনে একটি পেন্টাইল এবং ১ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি মূলক রয়েছে। এর ৬এ ও ১০এ নম্বর কাইরাল কেন্দ্রের বিন্যাস যথাক্রমে আর ও আর।
নামটির ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি আধুনিক জৈব রসায়নের অণুর বন্ধন বিন্যাস থেকে সরাসরি উদ্ভূত। নামটির চারটি রূপমূল রয়েছে: প্রথমটি গ্রিক বর্ণমালার চতুর্থ বর্ণ ডেল্টা (Delta), যা দ্বি-বন্ধনের অবস্থান নির্দেশ করে (৯ নম্বর অবস্থানে); দ্বিতীয়টি গ্রিক সংখ্যাবাচক উপসর্গ টেট্রা (tetra, যার অর্থ চার); তৃতীয়টি হাইড্রো (hydro), যা হাইড্রোজেন পরমাণুর সংযোজন বোঝায়; এবং চতুর্থটি ক্যানাবিস থেকে জাত রাসায়নিক বিশেষ্য ক্যানাবিনল (cannabinol), যার শেষে রয়েছে অ্যালকোহল নির্দেশক প্রত্যয় -অল (-ol)। ১৯৬৪ সালে ইসরায়েলি রসায়নবিদ রাফায়েল মেসুলাম এবং ইয়েচিয়েল গনি প্রথম এই যৌগটি বিশুদ্ধভাবে পৃথক ও গঠন উন্মোচন করেন।
ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে টিএইচসি একটি আংশিক অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সিবি-ওয়ান (CB1) রিসেপ্টর এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সিবি-টু (CB2) রিসেপ্টরের সাথে আবদ্ধ হয়। মানুষের মস্তিষ্কে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এন্ডোক্যানাবিনয়েড যৌগ অ্যানান্ডামাইড (anandamide) যে রিসেপ্টরে সংকেত পাঠায়, টিএইচসি ঠিক সেই পথটিকে ব্যবহার করে। তবে অ্যানান্ডামাইড দ্রুত এনজাইম দ্বারা ভেঙে যায়, কিন্তু টিএইচসি দীর্ঘ সময় রিসেপ্টরে সক্রিয় থাকে। এর ফলে গ্লুটামেট ও গাবার মতো প্রধান নিউরোট্রান্সমিটারের স্বাভাবিক নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হলো স্মৃতি ও মনোযোগ প্রক্রিয়াকরণের ব্যাঘাত, পেশির সমন্বয়হীনতা এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রক হাইপোথ্যালামাসের অতিরিক্ত উদ্দীপনার ফলে তীব্র খাদ্যগ্রহণের ইচ্ছা বা ‘মাঞ্চিস’।
ক্যানাবিডিওল বা সিবিডি (Cannabidiol – CBD)
ক্যানাবিসের দ্বিতীয় প্রধান অ-নেশাদায়ক চিকিৎসাগত উপাদানের নাম ক্যানাবিডিওল। এর প্রাতিষ্ঠানিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 2-[(1R,6R)-3-methyl-6-(prop-1-en-2-yl)cyclohex-2-en-1-yl]-5-pentylbenzene-1,3-diol, বাংলায় ২-[(১-আর, ৬-আর)-৩-মিথাইল-৬-(প্রোপ-১-এন-২-ইল)সাইক্লোহেক্স-২-এন-১-ইল]-৫-পেন্টাইলবেনজিন-১,৩-ডাইঅল। এখানে –
- 1. Benzene: মূল কাঠামো বেনজিন, যা ছয় কার্বনবিশিষ্ট একটি অ্যারোমেটিক বলয়।
- 2. 1,3-Diol: বেনজিন বলয়ের ১ ও ৩ নম্বর কার্বনে দুটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই
diolপ্রত্যয় ব্যবহৃত হয়েছে। - 3. 5-Pentyl: বেনজিন বলয়ের ৫ নম্বর কার্বনে একটি পেন্টাইল (–CH₂–CH₂–CH₂–CH₂–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। এটি পাঁচ কার্বনবিশিষ্ট সম্পৃক্ত শৃঙ্খল।
- 4. 2-: বেনজিন বলয়ের ২ নম্বর কার্বনে একটি জটিল সাইক্লোহেক্সিনজাত প্রতিস্থাপক যুক্ত রয়েছে।
- 5. Cyclohex: প্রতিস্থাপকটির মূল কাঠামো ছয় কার্বনবিশিষ্ট একটি সাইক্লোহেক্সেনজাত বলয়।
- 6. 2-en: সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের ২ ও ৩ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন (C=C) রয়েছে। তাই
cyclohex-2-enব্যবহৃত হয়েছে। - 7. 1-yl: সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের ১ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে সেটি বেনজিন বলয়ের ২ নম্বর কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই
-1-ylব্যবহৃত হয়েছে। - 8. 3-Methyl: সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের ৩ নম্বর কার্বনে একটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 9. 6-(Prop-1-en-2-yl): সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের ৬ নম্বর কার্বনে একটি প্রোপ-১-এন-২-ইল মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 10. Prop: প্রতিস্থাপকটিতে তিনটি কার্বন রয়েছে। তাই
prop-শব্দমূল ব্যবহৃত হয়েছে। - 11. 1-en: প্রোপিনজাত প্রতিস্থাপকটির ১ ও ২ নম্বর কার্বনের মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন রয়েছে।
- 12. 2-yl: প্রোপিনজাত প্রতিস্থাপকটি তার ২ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এর গঠন –C(CH₃)=CH₂। এই মূলকটি আইসোপ্রোপেনাইল (Isopropenyl) নামেও পরিচিত।
- 13. (1R,6R): সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের ১ ও ৬ নম্বর কার্বন দুটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre)। উভয়ের পরম বিন্যাস
R, যা কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত। - 14. কার্যকরী মূলকের অগ্রাধিকার: অণুতে দুটি হাইড্রক্সি মূলক এবং দুটি কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধন রয়েছে। এখানে বেনজিন বলয়ের হাইড্রক্সি মূলকগুলোকে প্রধান কার্যকরী মূলক হিসেবে
-diolপ্রত্যয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। - 15. রাসায়নিক শ্রেণি: ক্যানাবিডিওল একটি ফাইটো-ক্যানাবিনয়েড (Phytocannabinoid) এবং রেসরসিনলজাত (Resorcinol-derived) যৌগ। এর বেনজিন-১,৩-ডাইঅল অংশটি রেসরসিনল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত।
- 16. আণবিক সংকেত: C₂₁H₃₀O₂।
সুতরাং: ক্যানাবিডিওল হলো একটি বেনজিন-১,৩-ডাইঅল, যার ৫ নম্বর কার্বনে পেন্টাইল মূলক এবং ২ নম্বর কার্বনে একটি প্রতিস্থাপিত সাইক্লোহেক্সিন বলয় যুক্ত। সেই সাইক্লোহেক্সিন বলয়ের ৩ নম্বর কার্বনে মিথাইল এবং ৬ নম্বর কার্বনে প্রোপ-১-এন-২-ইল মূলক রয়েছে।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে নামটি তৈরি হয়েছে ‘ক্যানাবিস’ শব্দমূলের সাথে দুটি হাইড্রোক্সিল বা অ্যালকোহল গ্রুপ নির্দেশক রাসায়নিক প্রত্যয় -ডাইঅল (-diol) যুক্ত করে। গ্রিক উপসর্গ ডাই (di, অর্থ দুই) এবং অ্যালকোহলের অল (ol) মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ডিওল’। অর্থাৎ ক্যানাবিস থেকে প্রাপ্ত দুটি অ্যালকোহল মূলকযুক্ত যৌগই হলো ক্যানাবিডিওল। ১৯৪০ সালে রজার অ্যাডামস প্রথম এটি পৃথক করেন।
ফার্মাকোলজিক্যাল বিচারে সিবিডি এবং টিএইচসি-র আণবিক সংকেত একই (C21H30O2) হওয়া সত্ত্বেও পরমাণুর ত্রিমাত্রিক বিন্যাসের পার্থক্যের কারণে এদের প্রভাব সম্পূর্ণ বিপরীত। সিবিডি মস্তিষ্কের সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরের সরাসরি অ্যাগোনিস্ট নয়; বরং এটি একটি নেগেটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেটর (negative allosteric modulator)। অর্থাৎ এটি রিসেপ্টরের মূল চাবির খাঁজে না বসে পাশে অন্য একটি বিন্দুতে যুক্ত হয়, যার ফলে টিএইচসি বা অন্যান্য উপাদান সেই রিসেপ্টরে শক্তভাবে বসতে পারে না। ফলে সিবিডি মূলত টিএইচসি-র নেশা সৃষ্টিকারী উন্মাদনা ও উদ্বেগকে প্রশমিত করে। এটি মৃগীরোগের তীব্র খিঁচুনি নিরাময়ে, প্রদাহ কমাতে এবং উদ্বেগ নিরসনে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, যার কারণে আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল বাজারে এটি একটি বৈধ থেরাপিউটিক পণ্য হিসেবে সমাদৃত।
লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথাইলঅ্যামাইড বা এলএসডি (Lysergic Acid Diethylamide – LSD)
ইতিহাসের সর্বাধিক প্রভাবশালী ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিক রাসায়নিকের নাম এলএসডি। এর স্বীকৃত ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: (6aR,9R)-N,N-diethyl-7-methyl-4,6,6a,7,8,9-hexahydroindolo[4,3-fg]quinoline-9-carboxamide, বাংলায় (৬এ-আর, ৯-আর)-এন,এন-ডাইইথাইল-৭-মিথাইল-৪,৬,৬এ,৭,৮,৯-হেক্সাহাইড্রোইনডোলো[৪,৩-এফজি]কুইনোলিন-৯-কার্বক্সামাইড। এখানে –
- Quinoline: মূল ফিউজড বলয়ব্যবস্থার একটি অংশ কুইনোলিন, যা একটি বেনজিন ও একটি পিরিডিন বলয়ের ফিউশনে গঠিত। এতে একটি নাইট্রোজেন রয়েছে।
- Indolo-: কুইনোলিনের সঙ্গে একটি ইন্ডোল বলয়ব্যবস্থা ফিউজড অবস্থায় যুক্ত। ইন্ডোল নিজেই একটি বেনজিন ও একটি পাইরোল বলয়ের ফিউশনে গঠিত এবং এতে একটি নাইট্রোজেন রয়েছে।
- Indolo[4,3-fg]quinoline: ইন্ডোল ও কুইনোলিনের নির্দিষ্ট ফিউশনে গঠিত চার-বলয়বিশিষ্ট কাঠামো। এখানে 4,3 ইন্ডোলের ফিউশন-সংক্রান্ত অবস্থান এবং fg কুইনোলিনের সংশ্লিষ্ট বলয়প্রান্ত নির্দেশ করে। পুরো কাঠামোর নম্বরায়ন পৃথক ইন্ডোল বা কুইনোলিনের নম্বরায়ন থেকে আলাদা।
- Hexahydro: মূল ইন্ডোলো-কুইনোলিন বলয়ব্যবস্থার তুলনায় ছয়টি অতিরিক্ত হাইড্রোজেনের সমতুল্য হাইড্রোজেনেশন নির্দেশ করে। ফলে তিনটি দ্বিবন্ধনের সমতুল্য অসম্পৃক্ততা হ্রাস পেয়েছে।
- 4,6,6a,7,8,9-Hexahydro: হাইড্রোজেনেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়টি অবস্থান হলো ৪, ৬, ৬এ, ৭, ৮ ও ৯। এগুলো মূল ফিউজড বলয়ব্যবস্থার লোক্যান্ট।
- 6a: এটি একটি বলয়সংযোগস্থলের (Ring-Junction) কার্বন। ফিউজড বলয় নামকরণে এ ধরনের পরমাণুর অবস্থান নির্দেশ করতে সংখ্যার সঙ্গে বর্ণ ব্যবহৃত হয়।
- 7-Methyl: মূল ফিউজড বলয়ব্যবস্থার ৭ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 9-Carboxamide: ফিউজড বলয়ব্যবস্থার ৯ নম্বর কার্বনে একটি কার্বক্সামাইড (–C(=O)NH₂) কার্যকরী মূলক যুক্ত। কার্বক্সামাইডের কার্বনিল কার্বনটি মূল বলয়ের বাইরে অবস্থিত।
- N,N-Diethyl: কার্বক্সামাইডের নাইট্রোজেনে দুটি ইথাইল (–CH₂CH₃) মূলক যুক্ত। অর্থাৎ মূল –CONH₂ অংশটি –CON(CH₂CH₃)₂-তে পরিণত হয়েছে।
- N,N-: দুটি ইথাইল মূলকই কার্বক্সামাইডের নাইট্রোজেনে যুক্ত, ফিউজড বলয়ের কোনো কার্বনে নয়। তাই সংখ্যাসূচক লোক্যান্টের পরিবর্তে N,N- ব্যবহৃত হয়েছে।
- (6aR,9R): অণুর দুটি কাইরাল কেন্দ্রের (Chiral Centre) পরম বিন্যাস নির্দেশ করে। ৬এ ও ৯ নম্বর কার্বন উভয়ের বিন্যাস R, যা কান-ইনগোল্ড-প্রিলগ (Cahn–Ingold–Prelog) অগ্রাধিকারবিধি অনুসারে নির্ধারিত।
- রাসায়নিক শ্রেণি: এলএসডি একটি এরগোলিনজাত (Ergoline-derived) যৌগ এবং লাইসার্গামাইড (Lysergamide) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
- আণবিক সংকেত: C₂₀H₂₅N₃O।
সুতরাং: এলএসডি হলো আংশিক হাইড্রোজেনযুক্ত ইন্ডোলো[৪,৩-এফজি]কুইনোলিনজাত চার-বলয়বিশিষ্ট যৌগ, যার ৭ নম্বর অবস্থানে একটি মিথাইল এবং ৯ নম্বর অবস্থানে একটি এন,এন-ডাইইথাইলকার্বক্সামাইড মূলক রয়েছে। এর ৬এ ও ৯ নম্বর কাইরাল কেন্দ্রের বিন্যাস যথাক্রমে আর ও আর।
‘এলএসডি’ শব্দটি এর মূল জার্মান বৈজ্ঞানিক নামের একটি আদ্যক্ষরীয় রূপ। ১৯৩৮ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরের স্যান্ডোজ ল্যাবরেটরিতে রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান যখন এরগট ছত্রাকের লাইসার্জিক অ্যাসিডের বিভিন্ন ডেরিভেটিভ সংশ্লেষণ করছিলেন, তখন গবেষণাগারের ক্রম অনুযায়ী তিনি এর নাম রেখেছিলেন Lysersäure-diäthylamid-25। জার্মান ‘লাইসার্জয়রে’ (Lysersäure)-র ‘এল’ (L), ‘ডাইইথাইল’ (diäthyl)-এর ‘এস’ (S, জার্মান বানানে äthylamid), এবং ‘অ্যামাইড’ (amid)-এর ‘ডি’ (D) মিলিয়ে তৈরি হয় ‘এলএসডি‘। ‘লাইসার্জিক’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ক্রিয়ামূল লাইসিস (lysis, যার অর্থ ভেঙে ফেলা বা বিয়োজন) এবং এরগট শব্দের সমন্বয় থেকে; কারণ এরগোট অ্যালকালয়েডকে রাসায়নিকভাবে ভেঙে এই কেন্দ্রীয় অ্যাসিডটি প্রস্তুত করা হতো।
ফার্মাকোলজিক্যাল স্তরে এলএসডি একটি আর্গোলাইন ডেরিভেটিভ, যা মাইক্রোগ্রাম (গ্রামের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ) মাত্রায় কাজ করে। এটি মানব মস্তিষ্কের কর্টেক্সে অবস্থিত সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর (5-HT2A receptor)-এর সাথে অত্যন্ত উচ্চ শক্তিতে যুক্ত হয়। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা ক্রায়ো-ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপির মাধ্যমে দেখেছেন যে এলএসডি অণুটি যখন রিসেপ্টরের পকেটে প্রবেশ করে, তখন রিসেপ্টরের প্রোটিনের একটি লুপ ঢাকনার মতো বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে ড্রাগটি টানা কয়েক ঘণ্টা সেখান থেকে বের হতে পারে না। এর ফলে মস্তিষ্কের থ্যালামাসের সেন্সরি ফিল্টারিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সংবেদনশীল তথ্যের বন্যা সরাসরি কর্টেক্সে আঘাত হানে। মস্তিষ্কের আত্মপরিচয় নিয়ন্ত্রণকারী ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (DMN) সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তি অহং-বিলুপ্তি বা ‘ইগো ডেথ’ এবং শব্দকে দেখতে পাওয়া বা রঙকে শুনতে পাওয়ার মতো সিনেসথেসিয়া (synesthesia) অনুভব করে।
সাইলোসাইবিন ও সাইলোসিন (Psilocybin and Psilocin)
ম্যাজিক মাশরুমের প্রধান সাইকেডেলিক রাসায়নিক জুটির নাম সাইলোসাইবিন ও সাইলোসিন। সাইলোসাইবিনের ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: [3-(2-dimethylaminoethyl)-1H-indol-4-yl] dihydrogen phosphate, বাংলায় [৩-(২-ডাইমিথাইলঅ্যামিনোইথাইল)-১এইচ-ইনডোল-৪-ইল] ডাইহাইড্রোজেন ফসফেট। এবং সাইলোসিনের নাম: 4-hydroxy-N,N-dimethyltryptamine, বাংলায় ৪-হাইড্রোক্সি-এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন।
১. সাইলোসাইবিন (Psilocybin) এর ক্ষেত্রে –
ইউপ্যাক নাম: [3-(2-Dimethylaminoethyl)-1H-indol-4-yl] dihydrogen phosphate (৩-(২-ডাইমিথাইলঅ্যামিনোইথাইল)-১এইচ-ইন্ডোল-৪-ইল ডাইহাইড্রোজেন ফসফেট)। এখানে –
- 1. Indole: মূল বলয়কাঠামো ইন্ডোল, যা একটি বেনজিন বলয় ও পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পাইরোল (Pyrrole) বলয়ের ফিউশনে গঠিত। এতে একটি নাইট্রোজেন রয়েছে।
- 2. 1H-Indole: ইন্ডোলের ১ নম্বর অবস্থানে নাইট্রোজেন রয়েছে, যা একটি হাইড্রোজেন বহন করে।
1H-এই নির্দেশিত হাইড্রোজেন (Indicated Hydrogen) বোঝায়। - 3. 3-: ইন্ডোল বলয়ের ৩ নম্বর কার্বনে একটি প্রতিস্থাপক যুক্ত রয়েছে।
- 4. Ethyl: প্রতিস্থাপকটিতে দুটি কার্বনবিশিষ্ট ইথাইল (–CH₂–CH₂–) শৃঙ্খল রয়েছে। এর প্রথম কার্বন ইন্ডোলের ৩ নম্বর কার্বনের সঙ্গে যুক্ত।
- 5. 2-Dimethylamino: ইথাইল শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি ডাইমিথাইলঅ্যামিনো (–N(CH₃)₂) মূলক যুক্ত। অর্থাৎ অ্যামিনো নাইট্রোজেনে দুটি মিথাইল মূলক রয়েছে।
- 6. 3-(2-Dimethylaminoethyl): ইন্ডোলের ৩ নম্বর কার্বনে এমন একটি ইথাইল শৃঙ্খল যুক্ত, যার ২ নম্বর কার্বনে ডাইমিথাইলঅ্যামিনো মূলক রয়েছে।
- 7. Indol-4-yl: ইন্ডোল বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে ফসফেট অংশের সঙ্গে সংযোগ ঘটেছে। তাই
-4-ylব্যবহৃত হয়েছে। - 8. Dihydrogen phosphate: ফসফরিক অ্যাসিডের (Phosphoric Acid) তিনটি হাইড্রক্সি মূলকের মধ্যে একটি এস্টার বন্ধন গঠনে অংশ নিয়েছে এবং অন্য দুটি –OH অক্ষত রয়েছে। তাই
dihydrogen phosphateনাম ব্যবহৃত হয়েছে। - 9. ফসফেট এস্টার: ইন্ডোলের ৪ নম্বর কার্বন একটি অক্সিজেনের মাধ্যমে ফসফরাসের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সাইলোসাইবিন একটি ফসফেট মনোএস্টার (Phosphate Monoester)।
- 10. অ্যামিনের শ্রেণি: ডাইমিথাইলঅ্যামিনো নাইট্রোজেনটি তিনটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই এটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- 11. রাসায়নিক শ্রেণি: সাইলোসাইবিন একটি ফসফরাইলযুক্ত ট্রিপটামিনজাত যৌগ (Phosphorylated Tryptamine) এবং ইন্ডোল অ্যালকালয়েড (Indole Alkaloid)।
- 12. আণবিক সংকেত: C₁₂H₁₇N₂O₄P।
সুতরাং: সাইলোসাইবিন হলো একটি ইন্ডোলজাত যৌগ, যার ৩ নম্বর কার্বনে ডাইমিথাইলঅ্যামিনোইথাইল শৃঙ্খল এবং ৪ নম্বর কার্বনে অক্সিজেনের মাধ্যমে একটি ডাইহাইড্রোজেন ফসফেট অংশ যুক্ত রয়েছে।
২. সাইলোসিন (Psilocin) এর ক্ষেত্রে –
প্রচলিত পদ্ধতিগত নাম: 4-Hydroxy-N,N-dimethyltryptamine (৪-হাইড্রোক্সি-এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন)। প্রতিস্থাপনভিত্তিক ইউপ্যাক নাম: 3-[2-(Dimethylamino)ethyl]-1H-indol-4-ol (৩-[২-(ডাইমিথাইলঅ্যামিনো)ইথাইল]-১এইচ-ইন্ডোল-৪-অল)। এখানে –
- 1. Tryptamine: মূল কাঠামো ট্রিপটামিন, যা ইন্ডোল বলয়ের ৩ নম্বর কার্বনে একটি দুই-কার্বনবিশিষ্ট অ্যামিনোইথাইল শৃঙ্খল যুক্ত হয়ে গঠিত।
- 2. Indole: ট্রিপটামিনের ইন্ডোল অংশটি একটি বেনজিন ও একটি পাইরোল বলয়ের ফিউশনে গঠিত।
- 3. 4-Hydroxy: ইন্ডোল বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি (–OH) মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 4. N,N-Dimethyl: ট্রিপটামিনের অ্যামিনো নাইট্রোজেনে দুটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত।
N,N-নির্দেশ করে দুটি মিথাইলই একই নাইট্রোজেনে যুক্ত। - 5. Dimethyltryptamine: ট্রিপটামিনের অ্যামিনো নাইট্রোজেনের দুটি হাইড্রোজেনের পরিবর্তে দুটি মিথাইল মূলক যুক্ত হওয়ায় এটি এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিনজাত যৌগ।
- 6. 4-Hydroxy-N,N-dimethyltryptamine: এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিনের ইন্ডোল বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 7. Indol-4-ol: প্রতিস্থাপনভিত্তিক নামকরণে ইন্ডোলের ৪ নম্বর কার্বনে যুক্ত হাইড্রক্সি মূলককে প্রধান কার্যকরী মূলক হিসেবে
-olপ্রত্যয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। - 8. 3-[2-(Dimethylamino)ethyl]: ইন্ডোলের ৩ নম্বর কার্বনে একটি ইথাইল শৃঙ্খল যুক্ত, যার দ্বিতীয় কার্বনে ডাইমিথাইলঅ্যামিনো মূলক রয়েছে।
- 9. অ্যামিনের শ্রেণি: নাইট্রোজেনটি দুটি মিথাইল কার্বন এবং একটি ইথাইল কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। তাই সাইলোসিন একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- 10. রাসায়নিক শ্রেণি: সাইলোসিন একটি হাইড্রক্সিলযুক্ত ট্রিপটামিন (Hydroxylated Tryptamine) এবং ইন্ডোল অ্যালকালয়েড (Indole Alkaloid)।
- 11. আণবিক সংকেত: C₁₂H₁₆N₂O।
সুতরাং: সাইলোসিন হলো এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন, যার ইন্ডোল বলয়ের ৪ নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রক্সি মূলক রয়েছে।
দুটির মূল পার্থক্য: সাইলোসিনের ৪ নম্বর অবস্থানে –OH রয়েছে, আর সাইলোসাইবিনে সেই অক্সিজেনের সঙ্গে ফসফেট অংশ যুক্ত হয়ে –O–P(=O)(OH)₂ গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ সাইলোসাইবিন হলো সাইলোসিনের ফসফেট এস্টার।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে এই নাম দুটি এসেছে মাশরুমের গণনাম সাইলোসাইবি (Psilocybe) থেকে। পূর্বে আলোচিত গ্রিক বিশেষণ সাইলোস (psilos, অর্থ নগ্ন বা মসৃণ) এবং বিশেষ্য কুবে (kybe, অর্থ মাথা)-র সাথে রাসায়নিক মূলক নির্দেশক প্রত্যয় যুক্ত করে আলবার্ট হফম্যান ১৯৫৮ সালে প্রথম এই যৌগ দুটি পৃথক করার পর এদের নামকরণ করেন। মূল সাইকেডেলিক অণুটি হলো ‘সাইলোসিন‘, আর তার সাথে যখন একটি ফসফেট গ্রুপ যুক্ত থাকে তখন ফসফরাসের ইঙ্গিত দিতে যুক্ত হয় ‘ব’ (-b-) বর্ণটি, ফলে নাম হয় ‘সাইলোসাইবিন‘।
আণবিক কার্যপদ্ধতির দিক থেকে সাইলোসাইবিন নিজেই কোনো সক্রিয় ওষুধ নয়; এটি একটি প্রো-ড্রাগ। মুখে খাওয়ার পর অন্ত্র ও যকৃতে থাকা অ্যালকালাইন ফসফাটেজ এনজাইম এর ফসফেট গ্রুপটিকে আর্দ্রবিশ্লেষণ করে আলাদা করে দেয়। ফলে সাইলোসাইবিন রূপান্তরিত হয় সক্রিয় সাইলোসিন (psilocin) অণুতে। সাইলোসিনের রাসায়নিক গঠন মানবদেহের নিজস্ব নিউরোট্রান্সমিটার সেরোটোনিনের সাথে প্রায় হুবহু মিলে যায়। এটি রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক পার হয়ে সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরে অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে দেখা গেছে যে এই রাসায়নিকটি মস্তিষ্কের গভীরের সুপ্ত ট্রমা এবং নিউরোপ্লাস্টিসিটিকে নতুন করে বিন্যস্ত করতে সক্ষম, যার ফলে এটি জটিল বিষণ্ণতা নিরাময়ে সমকালীন চিকিৎসার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পুনর্মূল্যায়িত হচ্ছে।
মেসক্যালিন (Mescaline)
পেয়োটি ক্যাকটাস থেকে নিষ্কাশিত প্রধান অ্যালকালয়েডের বৈজ্ঞানিক নাম মেসক্যালিন। এর নিয়মতান্ত্রিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 2-(3,4,5-trimethoxyphenyl)ethanamine, বাংলায় ২-(৩,৪,৫-ট্রাইমেথোক্সিফিনাইল)ইথানামাইন। এখানে –
- Ethanamine: মূল কাঠামো ইথানামাইন, যা দুটি কার্বনবিশিষ্ট সম্পৃক্ত শৃঙ্খল এবং একটি অ্যামিনো (–NH₂) মূলক নিয়ে গঠিত। অ্যামিনো মূলকের সঙ্গে যুক্ত কার্বনটি ১ নম্বর।
- 2-: ইথানামাইন শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি প্রতিস্থাপক যুক্ত রয়েছে।
- Phenyl: প্রতিস্থাপকটি ফিনাইল (–C₆H₅) মূলক, যা বেনজিন বলয় থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 2-(Phenyl): ইথানামাইন শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনের সঙ্গে ফিনাইল বলয়ের ১ নম্বর কার্বন যুক্ত রয়েছে।
- Methoxy: মেথোক্সি (–O–CH₃) একটি অ্যালকোক্সি (Alkoxy) মূলক, যেখানে একটি মিথাইল মূলক অক্সিজেনের মাধ্যমে মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে।
- Trimethoxy: ফিনাইল বলয়ে তিনটি মেথোক্সি মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই tri- উপসর্গ ব্যবহৃত হয়েছে।
- 3,4,5-Trimethoxy: ফিনাইল বলয়ের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনে একটি করে মেথোক্সি মূলক যুক্ত রয়েছে। ফিনাইল বলয়ের যে কার্বনটি ইথানামাইনের সঙ্গে যুক্ত, সেটিই ১ নম্বর।
- 2-(3,4,5-Trimethoxyphenyl): ইথানামাইনের ২ নম্বর কার্বনে এমন একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত, যার ৩, ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনে তিনটি মেথোক্সি মূলক রয়েছে।
- কার্যকরী মূলকের অগ্রাধিকার: অণুতে একটি অ্যামিন এবং তিনটি ইথারজাত মেথোক্সি মূলক রয়েছে। এখানে অ্যামিনকে প্রধান কার্যকরী মূলক হিসেবে -amine প্রত্যয়ে এবং মেথোক্সি মূলকগুলোকে methoxy- উপসর্গে প্রকাশ করা হয়েছে।
- অ্যামিনের শ্রেণি: অ্যামিনো নাইট্রোজেনটি একটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত এবং দুটি হাইড্রোজেন বহন করে। ফলে মেসক্যালিন একটি প্রাথমিক অ্যামিন (Primary Amine)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: মেসক্যালিন একটি প্রতিস্থাপিত ফেনেথাইলামিন (Substituted Phenethylamine) এবং ফেনেথাইলামিনজাত অ্যালকালয়েড (Phenethylamine Alkaloid)।
- আণবিক সংকেত: C₁₁H₁₇NO₃।
সুতরাং: মেসক্যালিন হলো একটি ইথানামাইন, যার ২ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল বলয় যুক্ত এবং সেই ফিনাইল বলয়ের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর কার্বনে তিনটি মেথোক্সি মূলক রয়েছে।
‘মেসক্যালিন’ নামটি উত্তর আমেরিকার আদিবাসী নাওয়াটল ভাষার শব্দ মেক্সকাল্লি (mexcalli) থেকে স্প্যানিশ ভাষার মাধ্যমে এসেছে। আদিবাসী মেক্সিকোতে অগ্যাভে গাছের সেদ্ধ কাণ্ড বা তা থেকে তৈরি পানীয়কে বলা হতো ‘মেসক্যাল‘। উনিশ শতকের জার্মান রসায়নবিদ আর্থার হেফটার ১৮৯৭ সালে পেয়োটি ক্যাকটাস থেকে প্রথম এই সক্রিয় উপক্ষারটি আলাদা করেন এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের সম্মানার্থে মেসক্যাল শব্দের সাথে অ্যালকালয়েড প্রত্যয় -ইন (-ine) যুক্ত করে ‘মেসক্যালিন’ নামটি গঠন করেন। ব্যাকরণগতভাবে এটি একটি বিশেষ্য পদ।
ফার্মাকোলজিক্যাল শ্রেণিবিভাগে মেসক্যালিন কোনো ট্রিপটামিন নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক ফেনিথাইলামাইন গোত্রের অ্যালকালয়েড। এর বেনজিন রিংয়ের ৩, ৪ এবং ৫ নম্বর অবস্থানে তিনটি মেথোক্সি গ্রুপ যুক্ত থাকে। এটি মস্তিষ্কের সেরোটোনিন টু-এ এবং টু-সি রিসেপ্টরকে উদ্দীপিত করে। মেসক্যালিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর স্থায়িত্বকাল; এটি অন্যান্য সাইকেডেলিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় (প্রায় আট থেকে বারো ঘণ্টা) ধরে সক্রিয় থাকে। এটি ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের স্নায়বিক সংকেত প্রক্রিয়াকরণ বদলে দিয়ে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ছন্দময় রঙের চাক্ষুষ হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। লেখক অ্যালডাস হাক্সলি তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ডোরস অব পারসেপশনে এই রাসায়নিকটির ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাব বর্ণনা করেছিলেন।
ডাইমিথাইলট্রিপটামিন বা ডিএমটি (Dimethyltryptamine – DMT)
আমাজনীয় ঐতিহ্যের এবং মানবদেহের এন্ডোজেনাস কম্পাউন্ডের পরিচিত নাম ডিএমটি। এর সুনির্দিষ্ট ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 2-(1H-indol-3-yl)-N,N-dimethylethanamine, বাংলায় ২-(১এইচ-ইনডোল-৩-ইল)-এন,এন-ডাইমিথাইলইথানামাইন। এখানে –
- Ethanamine: মূল কাঠামো ইথানামাইন, যা দুটি কার্বনবিশিষ্ট সম্পৃক্ত শৃঙ্খল এবং একটি অ্যামিনো (–NH₂) মূলক নিয়ে গঠিত। নাইট্রোজেনের সঙ্গে যুক্ত কার্বনটি ১ নম্বর।
- 2-: ইথানামাইন শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনে একটি প্রতিস্থাপক যুক্ত রয়েছে।
- Indole: প্রতিস্থাপকটির মূল কাঠামো ইন্ডোল, যা একটি বেনজিন বলয় ও পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পাইরোল (Pyrrole) বলয়ের ফিউশনে গঠিত। এতে একটি নাইট্রোজেন রয়েছে।
- 1H-Indole: ইন্ডোলের ১ নম্বর অবস্থানে নাইট্রোজেন রয়েছে এবং সেটি একটি হাইড্রোজেন বহন করে। 1H- এই নির্দেশিত হাইড্রোজেন (Indicated Hydrogen) প্রকাশ করে।
- Indol-3-yl: ইন্ডোল বলয়ের ৩ নম্বর কার্বন থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারিত হয়ে সেই অবস্থান দিয়ে ইথানামাইন শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযোগ ঘটেছে। তাই -3-yl ব্যবহৃত হয়েছে।
- 2-(1H-Indol-3-yl): ইথানামাইনের ২ নম্বর কার্বনের সঙ্গে ইন্ডোলের ৩ নম্বর কার্বন যুক্ত। অর্থাৎ দুটি পৃথক কাঠামোর লোক্যান্ট এখানে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
- N,N-Dimethyl: ইথানামাইনের নাইট্রোজেনে দুটি মিথাইল (–CH₃) মূলক যুক্ত রয়েছে। N,N- নির্দেশ করে উভয় মিথাইল একই নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত, কার্বন শৃঙ্খলের সঙ্গে নয়।
- অ্যামিনের শ্রেণি: নাইট্রোজেনটি দুটি মিথাইল কার্বন ও একটি ইথানামাইন কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ডিএমটি একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- ট্রিপটামিনের সঙ্গে সম্পর্ক: ট্রিপটামিনের অ্যামিনো নাইট্রোজেনের দুটি হাইড্রোজেনের পরিবর্তে দুটি মিথাইল মূলক যুক্ত হয়েছে। তাই যৌগটির প্রচলিত নাম এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন (N,N-Dimethyltryptamine)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ডিএমটি একটি ইন্ডোল অ্যালকালয়েড (Indole Alkaloid) এবং ট্রিপটামিনজাত (Tryptamine) যৌগ।
- আণবিক সংকেত: C₁₂H₁₆N₂।
সুতরাং: ডিএমটি হলো একটি ইথানামাইন, যার ২ নম্বর কার্বনে ইন্ডোলের ৩ নম্বর কার্বন যুক্ত এবং অ্যামিন নাইট্রোজেনে দুটি মিথাইল মূলক রয়েছে।
নামটির ভাষাতাত্ত্বিক গঠন সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী রসায়ন ব্যাকরণের সমাসবদ্ধ রূপ। এর মূল ভিত্তি হলো ট্রিপটামিন (tryptamine), যা গঠিত হয়েছে মানবদেহের একটি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড ট্রিপটোফ্যান (tryptophan)-এর শব্দাংশের সাথে অ্যামাইন প্রত্যয় যুক্ত করে। ট্রিপটোফ্যানের ইনডোল বলয়ের সাথে থাকা ইথাইল চেইনের শেষ নাইট্রোজেন পরমাণুতে যখন দুটি মিথাইল মূলক যুক্ত হয়, তখন গ্রিক উপসর্গ ডাই (di-, অর্থ দুই) যুক্ত হয়ে নাম হয় ‘ডাইমিথাইল-ট্রিপটামিন’। ১৯৩১ সালে কানাডিয়ান রসায়নবিদ রিচার্ড মানস্কে প্রথম কৃত্রিমভাবে এটি সংশ্লেষণ করেন।
ফার্মাকোলজিক্যাল বিচারে ডিএমটি হলো অন্যতম দ্রুত এবং তীব্র প্রভাব সৃষ্টিকারী সাইকেডেলিক। ইনজেকশন বা বাষ্পীভূত ধোঁয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করলে এটি মাত্র দশ থেকে পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং পুরো বাস্তবতাকে ভেঙে দিয়ে চরম হ্যালুসিনেশন তৈরি করে, যা দশ থেকে পনেরো মিনিট স্থায়ী হয়। এর কারণ হলো মানবদেহের এনজাইম সিস্টেম অত্যন্ত দ্রুত এটিকে ভেঙে ফেলতে পারে। কিন্তু যখন মুখে আয়াহুয়াস্কা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন বানিস্তেরিওপসিস ক্যাপাই লতায় থাকা বিটা-কার্বোলিন ক্ষারকগুলো পেটের মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ-এ (MAO-A) এনজাইমকে অবরুদ্ধ করে রাখে। ফলে ডিএমটি ধ্বংস না হয়ে অন্ত্রের প্রাচীর ভেদ করে রক্তপ্রবাহে মেশে এবং দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক আবেশ তৈরি করে। এটিকে প্রায়শই রূপক অর্থে ‘স্পিরিট মলিকিউল’ বলা হলেও এটি মূলত একটি সরল ট্রিপটামিন অ্যালকালয়েড মাত্র।
কেটামিন (Ketamine)
ডিসোসিয়েটিভ চেতনানাশক এবং আধুনিক বিষণ্ণতারোধী ড্রাগটির আন্তর্জাতিক নাম কেটামিন। এর প্রাতিষ্ঠানিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 2-(2-chlorophenyl)-2-(methylamino)cyclohexan-1-one, বাংলায় ২-(২-ক্লোরোফিনাইল)-২-(মিথাইলঅ্যামিনো)সাইক্লোহেক্সান-১-অন। এখানে –
- Cyclohexan: মূল কাঠামো সাইক্লোহেক্সান, যা ছয়টি কার্বন পরমাণু নিয়ে গঠিত একটি সম্পৃক্ত বলয়। কার্বনগুলোর মধ্যে একক বন্ধন রয়েছে।
- 1-one: সাইক্লোহেক্সান বলয়ের ১ নম্বর কার্বনে একটি কার্বনিল (C=O) মূলক রয়েছে। ফলে যৌগটি কিটোন (Ketone) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাই -one প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়েছে।
- 2-(Chlorophenyl): সাইক্লোহেক্সানোন বলয়ের ২ নম্বর কার্বনে একটি ক্লোরোফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 2-Chlorophenyl: ফিনাইল বলয়ের ২ নম্বর কার্বনে একটি ক্লোরিন (Cl) পরমাণু যুক্ত। ফিনাইল বলয়ের ১ নম্বর কার্বন দিয়ে সেটি সাইক্লোহেক্সানোনের সঙ্গে সংযুক্ত। তাই ক্লোরিনটি অর্থো (Ortho) অবস্থানে রয়েছে।
- 2-(2-Chlorophenyl): প্রথম 2- সাইক্লোহেক্সানোন বলয়ের ২ নম্বর কার্বন নির্দেশ করে। বন্ধনীর ভেতরের দ্বিতীয় 2- ফিনাইল বলয়ের ২ নম্বর কার্বনে ক্লোরিনের অবস্থান নির্দেশ করে।
- Methylamino: একটি মিথাইলঅ্যামিনো (–NH–CH₃) মূলক রয়েছে। এখানে অ্যামিনো নাইট্রোজেনের সঙ্গে একটি মিথাইল (–CH₃) যুক্ত।
- 2-(Methylamino): মিথাইলঅ্যামিনো মূলকটি সাইক্লোহেক্সানোন বলয়ের ২ নম্বর কার্বনে যুক্ত। অর্থাৎ একই কার্বনে ক্লোরোফিনাইল ও মিথাইলঅ্যামিনো উভয় প্রতিস্থাপক রয়েছে।
- কার্যকরী মূলকের অগ্রাধিকার: অণুতে কিটোন ও অ্যামিন উভয়ই রয়েছে। ইউপ্যাক নামকরণে কিটোনকে প্রধান কার্যকরী মূলক হিসেবে -one প্রত্যয়ে এবং অ্যামিনকে methylamino- উপসর্গে প্রকাশ করা হয়েছে।
- অ্যামিনের শ্রেণি: মিথাইলঅ্যামিনো নাইট্রোজেনটি একটি মিথাইল কার্বন ও সাইক্লোহেক্সানোন বলয়ের একটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি হাইড্রোজেন বহন করে। তাই এটি দ্বিতীয়িক অ্যামিন (Secondary Amine)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: কেটামিন একটি অ্যারিলসাইক্লোহেক্সাইলামিন (Arylcyclohexylamine) শ্রেণির যৌগ। এর কাঠামোতে ফিনাইল বলয়, সাইক্লোহেক্সানোন বলয় ও অ্যামিন মূলক রয়েছে।
- আণবিক সংকেত: C₁₃H₁₆ClNO।
সুতরাং: কেটামিন হলো একটি সাইক্লোহেক্সান-১-অন, যার ২ নম্বর কার্বনে একই সঙ্গে একটি ২-ক্লোরোফিনাইল এবং একটি মিথাইলঅ্যামিনো মূলক যুক্ত রয়েছে।
ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে ‘কেটামিন’ নামটি এর আণবিক গঠনের দুটি কেন্দ্রীয় কার্যকরী মূলকের নাম থেকে চাতুর্যের সাথে সংক্ষিপ্ত করে তৈরি করা হয়েছে। যৌগটির আণবিক কাঠামোয় একটি সাইক্লোহেক্সানোন বা কিটোন রিং রয়েছে, যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে ‘কিট’ (ket-); এবং এর সাথে একটি মিথাইলঅ্যামিনো মূলক যুক্ত রয়েছে, যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে ‘অ্যামিন’ (-amine)। এই দুই অংশের মিশ্রণে ১৯৬২ সালে পার্ক-ডেভিস ল্যাবরেটরির রসায়নবিদ ক্যালভিন স্টিভেন্স ‘কেটামিন‘ নামটি তৈরি করেন।
ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে কেটামিন ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিকগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি সেরোটোনিন রিসেপ্টরে কাজ করে না; এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের গ্লুটামেটার্জিক ব্যবস্থার এন-মিথাইল-ডি-অ্যাসপার্টেট রিসেপ্টর (N-methyl-D-aspartate receptor – NMDA receptor)-এর একটি নন-কম্পিটিটিভ অ্যান্টাগনিস্ট বা ব্লকার। এটি এনএমডিএ রিসেপ্টরের ভেতরের চ্যানেলটিতে সরাসরি ঢুকে গিয়ে ক্যালসিয়াম আয়নের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের সাথে সংবেদনশীল ইন্দ্রিয়ের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ব্যক্তি নিজের শরীর থেকে মন বিচ্ছিন্ন হয়ে শূন্যে ভাসার অনুভূতি পায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেস্থেসিয়া (dissociative anesthesia) বলা হয়। অতিরিক্ত মাত্রায় এটি সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীনতার অতল গহ্বর বা তথাকথিত ‘কে-হোল’ তৈরি করে। সমসাময়িক চিকিৎসায় জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা নিরাময়ে এটি অত্যন্ত দ্রুত সুফলদায়ী ওষুধ হিসেবে বৈপ্লবিক সাফল্য দেখিয়েছে।
ফেনসাইক্লিডিন বা পিসিপি (Phencyclidine – PCP)
রাস্তার মাদক জগতে ‘অ্যাঞ্জেল ডাস্ট’ নামে পরিচিত বিপজ্জনক সিন্থেটিক ড্রাগটির নাম ফেনসাইক্লিডিন। এর আনুষ্ঠানিক ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 1-(1-phenylcyclohexyl)piperidine, বাংলায় ১-(১-ফিনাইলসাইক্লোহেক্সিল)পিপারিডিন। এখানে –
- Piperidine: মূল কাঠামো পিপারিডিন, যা ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি সম্পৃক্ত হেটেরোসাইক্লিক বলয়। এতে পাঁচটি কার্বন ও একটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে।
- 1-: পিপারিডিন বলয়ের ১ নম্বর অবস্থানে নাইট্রোজেন রয়েছে। এই নাইট্রোজেনের সঙ্গে একটি প্রতিস্থাপক যুক্ত হয়েছে।
- Cyclohexyl: প্রতিস্থাপকটির মূল কাঠামো সাইক্লোহেক্সিল, যা ছয় কার্বনবিশিষ্ট সম্পৃক্ত সাইক্লোহেক্সেন বলয় থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 1-Phenyl: সাইক্লোহেক্সিল বলয়ের ১ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল (–C₆H₅) মূলক যুক্ত রয়েছে।
- 1-Phenylcyclohexyl: সাইক্লোহেক্সিল বলয়ের একই ১ নম্বর কার্বনে ফিনাইল মূলক এবং পিপারিডিনের নাইট্রোজেন উভয়ই যুক্ত। তাই প্রতিস্থাপকটির নাম ১-ফিনাইলসাইক্লোহেক্সিল।
- 1-(1-Phenylcyclohexyl): প্রথম 1- পিপারিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনের অবস্থান নির্দেশ করে। বন্ধনীর ভেতরের দ্বিতীয় 1- সাইক্লোহেক্সিল বলয়ের সেই কার্বন নির্দেশ করে, যেখানে ফিনাইল মূলক যুক্ত।
- অ্যামিনের শ্রেণি: পিপারিডিনের নাইট্রোজেন দুটি বলয়-কার্বন ও একটি সাইক্লোহেক্সিল কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ফেনসাইক্লিডিন একটি টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ফেনসাইক্লিডিন একটি অ্যারিলসাইক্লোহেক্সাইলামিন (Arylcyclohexylamine), কারণ এতে অ্যারোমেটিক ফিনাইল বলয়, সাইক্লোহেক্সিল বলয় ও অ্যামিন নাইট্রোজেন পরস্পর সংযুক্ত।
- আণবিক সংকেত: C₁₇H₂₅N।
সুতরাং: পিপারিডিনের ১ নম্বর নাইট্রোজেনে এমন একটি সাইক্লোহেক্সিল মূলক যুক্ত, যার ১ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলকও রয়েছে।
নামটির ব্যুৎপত্তি এর প্রধান তিনটি রাসায়নিক বলয়ের নামের প্রথম অক্ষরগুলোর সংযোজন থেকে উদ্ভূত। অণুর মূল কাঠামোয় থাকা একটি বেনজিন বা ফিনাইল (phenyl) মূলক থেকে নেওয়া হয়েছে ‘ফেন’ (phen-); একটি সম্পৃক্ত ছয় কার্বনের অ্যালিসাইক্লিক বা সাইক্লো (cyclo-) মূলক থেকে ‘সাইক্ল’ (-cycl-); এবং নাইট্রোজেনযুক্ত ছয় সদস্যের বলয় পিপারিডিন (piperidine) থেকে ‘ইডিন’ (-idine) যুক্ত করে তৈরি হয়েছে ‘ফেনসাইক্লিডিন‘ বা সংক্ষেপে পিসিপি। ১৯২৬ সালে প্রথম সংশ্লেষিত হলেও ১৯৫০-এর দশকে এটি চেতনানাশক হিসেবে পেটেন্ট করা হয়।
ফার্মাকোলজিক্যাল স্তরে এটিও কেটামিনের মতো এনএমডিএ রিসেপ্টরের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী চ্যানেল ব্লকার। তবে কেটামিনের চেয়ে এর বিষাক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বহুগুণ বেশি। এটি একই সাথে ডোপামিন ও নর-এপিনেফ্রিনের পুনঃশোষণকে বাধা দেয় এবং সিগমা রিসেপ্টরের ওপর কাজ করে। এর তীব্র প্রভাবে ব্যক্তি কোনো শারীরিক ব্যথা অনুভব করে না এবং নিজের ভয় বা স্বাভাবিক আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চরম আক্রমণাত্মক ও উন্মাদ আচরণ করে। অনেক সময় রোগী তীব্র সাইকোসিসে আক্রান্ত হয়ে নিজের শরীরে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে বসে। চিকিৎসায় চরম বিপদের কারণে মানুষের ওপর এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আন্তর্জাতিক মাদক কনভেনশনের সবচেয়ে কঠোর তফসিলে একে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইথানল বা অ্যালকোহল (Ethanol / Ethyl Alcohol)
মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত এবং বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত মনঃসক্রিয় পদার্থগুলোর (Psychoactive Substances) অন্যতম হলো ইথানল (Ethanol)। এটি অ্যালকোহলজাত পানীয়ের প্রধান মনঃসক্রিয় উপাদান এবং রাসায়নিকভাবে একটি সরল এক-হাইড্রক্সিলবিশিষ্ট অ্যালকোহল (Monohydric Alcohol)। এর স্বীকৃত ইউপ্যাক নাম (IUPAC Name) হলো ethanol, বাংলায় ইথানল। এর গাঠনিক সংকেত: CH₃–CH₂–OH। এখানে –
- Eth-: eth- মূলাংশটি নির্দেশ করে যৌগটির প্রধান কার্বন শৃঙ্খলে দুটি কার্বন পরমাণু রয়েছে। ইউপ্যাক নামকরণে এক কার্বনের জন্য meth-, দুই কার্বনের জন্য eth-, তিন কার্বনের জন্য prop- এবং চার কার্বনের জন্য but- ব্যবহৃত হয়।
- -an-: -an- অংশ নির্দেশ করে মূল কার্বন শৃঙ্খলে কার্বন-কার্বন বন্ধনগুলো একক সমযোজী বন্ধন (Single Covalent Bond)। অর্থাৎ ইথানলের দুটি কার্বনের মধ্যে একটি C–C একক বন্ধন রয়েছে। কোনো C=C বা C≡C বন্ধন নেই।
- -ol: -ol প্রত্যয় নির্দেশ করে যৌগটিতে একটি হাইড্রক্সি (Hydroxy) মূলক, অর্থাৎ –OH রয়েছে। এই মূলকটি একটি সম্পৃক্ত কার্বনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় যৌগটি অ্যালকোহল (Alcohol) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
- Ethanol: eth-, -an- ও -ol একত্রে ইথানল নাম গঠন করেছে। অর্থাৎ দুটি কার্বনবিশিষ্ট সম্পৃক্ত শৃঙ্খলে একটি হাইড্রক্সি মূলক রয়েছে।
- কার্বন শৃঙ্খল: ইথানলের প্রধান শৃঙ্খল দুটি কার্বন নিয়ে গঠিত। প্রথম কার্বনটি CH₃ এবং দ্বিতীয় কার্বনটি CH₂–OH অংশের অন্তর্ভুক্ত।
- হাইড্রক্সি মূলকের অবস্থান: ইথানলের হাইড্রক্সি মূলকটি প্রান্তীয় কার্বনের সঙ্গে যুক্ত। দুটি কার্বনবিশিষ্ট এই শৃঙ্খলের উভয় প্রান্ত সমতুল্য হওয়ায় হাইড্রক্সি মূলকের অবস্থান আলাদাভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। তাই ethan-1-ol লেখা সম্ভব হলেও প্রচলিত পছন্দনীয় ইউপ্যাক নাম ethanol।
- মিথাইল মূলক: ইথানলের CH₃– অংশটি একটি মিথাইল (Methyl) গোষ্ঠী। এটি তিনটি হাইড্রোজেন এবং একটি কার্বন-কার্বন বন্ধন বহন করে।
- মিথিলিন মূলক: –CH₂– অংশটি একটি মিথিলিন (Methylene) গোষ্ঠী। এই কার্বনটি মিথাইল কার্বন ও হাইড্রক্সি অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত।
- হাইড্রক্সি মূলক: –OH অংশে একটি অক্সিজেন ও একটি হাইড্রোজেন রয়েছে। অক্সিজেনটি কার্বন এবং হাইড্রোজেনের সঙ্গে দুটি একক সমযোজী বন্ধন গঠন করেছে।
- অ্যালকোহলের শ্রেণি: ইথানল একটি প্রাথমিক অ্যালকোহল (Primary Alcohol)। কারণ –OH বহনকারী কার্বনটি মাত্র একটি অন্য কার্বন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত।
- এক-হাইড্রক্সিলবিশিষ্ট অ্যালকোহল: ইথানলে একটি মাত্র –OH মূলক রয়েছে। তাই এটি এক-হাইড্রক্সিলবিশিষ্ট অ্যালকোহল (Monohydric Alcohol)। অন্যদিকে ইথিলিন গ্লাইকল (Ethylene Glycol) একটি দ্বি-হাইড্রক্সিলবিশিষ্ট অ্যালকোহল (Dihydric Alcohol)।
- সম্পৃক্ত যৌগ: ইথানলের কার্বন শৃঙ্খলে কোনো কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধন বা ত্রিবন্ধন নেই। তাই এটি একটি সম্পৃক্ত (Saturated) জৈব যৌগ।
- আণবিক মেরুতা: ইথানল একটি মেরুবিশিষ্ট (Polar) অণু। এর অক্সিজেন পরমাণু কার্বন ও হাইড্রোজেনের তুলনায় অধিক তড়িৎঋণাত্মক (Electronegative), ফলে C–O ও O–H বন্ধনে আংশিক আধানের পার্থক্য সৃষ্টি হয়।
- হাইড্রোজেন বন্ধন: ইথানলের –OH মূলক অন্য ইথানল অণু এবং পানির অণুর সঙ্গে হাইড্রোজেন বন্ধন (Hydrogen Bond) গঠন করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে ইথানল পানির সঙ্গে সব অনুপাতে মিশ্রণীয় (Miscible)।
- অ্যালকাইল ও হাইড্রক্সি অংশ: ইথানলে CH₃–CH₂– অংশটি তুলনামূলকভাবে অধ্রুবীয় (Nonpolar) এবং –OH অংশটি মেরুবিশিষ্ট। এই দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে ইথানল অনেক মেরুবিশিষ্ট ও কিছু অধ্রুবীয় পদার্থের দ্রাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- ইথানল বনাম ইথেন: ইথেনের (Ethane) গঠন CH₃–CH₃ এবং আণবিক সংকেত C₂H₆। ইথেনের একটি হাইড্রোজেনের পরিবর্তে –OH মূলক যুক্ত করলে ইথানলের গঠন CH₃–CH₂–OH পাওয়া যায়।
- ইথানল বনাম মিথানল: মিথানলের (Methanol) গঠন CH₃OH এবং এতে একটি কার্বন রয়েছে। ইথানলে দুটি কার্বন রয়েছে। উভয়ই প্রাথমিক অ্যালকোহল হলেও এদের বিপাকীয় প্রভাব ও বিষক্রিয়ার ধরন ভিন্ন। মিথানল বিশেষভাবে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করা ও প্রাণঘাতী বিপাকীয় অম্লতা সৃষ্টির জন্য পরিচিত।
- ইথানল বনাম ডাইমিথাইল ইথার: ইথানল ও ডাইমিথাইল ইথারের (Dimethyl Ether) আণবিক সংকেত একই, C₂H₆O। কিন্তু ইথানলের গঠন CH₃–CH₂–OH এবং ডাইমিথাইল ইথারের গঠন CH₃–O–CH₃। তাই তারা কার্যকরী মূলক সমাণু (Functional Group Isomers)।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ইথানল একটি অ্যালিফ্যাটিক (Aliphatic), সম্পৃক্ত, প্রাথমিক ও এক-হাইড্রক্সিলবিশিষ্ট অ্যালকোহল। এটি কোনো অ্যারোমেটিক বা হেটেরোসাইক্লিক যৌগ নয়।
- স্টেরিওরসায়ন: ইথানলে কোনো কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre) নেই। তাই এর নামের সঙ্গে (R) বা (S) নির্দেশক ব্যবহৃত হয় না।
- জৈবিক কার্যকারিতা: ইথানল একটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র অবদমনকারী (Central Nervous System Depressant) মনঃসক্রিয় পদার্থ। এটি গাবা-এ রিসেপ্টর (GABA-A Receptor), এনএমডিএ রিসেপ্টর (NMDA Receptor) এবং অন্যান্য স্নায়বিক সংকেতব্যবস্থার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। এর ফলে আচরণগত সংযম হ্রাস, সমন্বয়ক্ষমতার ব্যাঘাত, বিচারক্ষমতার পরিবর্তন এবং উচ্চমাত্রায় চেতনা ও শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমন ঘটতে পারে।
- বিপাকীয় প্রক্রিয়া: মানবদেহে ইথানল প্রধানত যকৃতে অ্যালকোহল ডিহাইড্রোজিনেজ (Alcohol Dehydrogenase বা ADH) এনজাইমের মাধ্যমে অ্যাসিট্যালডিহাইডে (Acetaldehyde) রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে অ্যালডিহাইড ডিহাইড্রোজিনেজ (Aldehyde Dehydrogenase বা ALDH) এনজাইম অ্যাসিট্যালডিহাইডকে অ্যাসিটেটে (Acetate) রূপান্তরিত করে।
- রাসায়নিক জারণ: ইথানল একটি প্রাথমিক অ্যালকোহল হওয়ায় জারণের (Oxidation) মাধ্যমে প্রথমে ইথানাল (Ethanal) এবং পরে ইথানোয়িক অ্যাসিড (Ethanoic Acid) উৎপন্ন করতে পারে। ইথানাল অ্যাসিট্যালডিহাইড এবং ইথানোয়িক অ্যাসিড অ্যাসিটিক অ্যাসিড নামেও পরিচিত।
- চিকিৎসাগত ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার: ইথানল জীবাণুনাশক (Antiseptic), দ্রাবক (Solvent), রাসায়নিক কাঁচামাল (Chemical Feedstock) এবং জ্বালানি (Fuel) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে পানীয় হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি বা অতিরিক্ত গ্রহণে নির্ভরতা, যকৃতের রোগ, বিভিন্ন ক্যানসার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
- আণবিক সংকেত: C₂H₆O। এর সংক্ষিপ্ত গাঠনিক সংকেত C₂H₅OH এবং আণবিক ভর প্রায় ৪৬.০৭ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: ইথানল হলো দুটি কার্বনবিশিষ্ট একটি সম্পৃক্ত প্রাথমিক অ্যালকোহল, যার গঠন CH₃–CH₂–OH। এর ইউপ্যাক নামের eth- অংশ দুটি কার্বন, -an- অংশ কার্বন-কার্বন একক বন্ধন এবং -ol অংশ হাইড্রক্সি কার্যকরী মূলক নির্দেশ করে। ইথানলে একটি মিথাইল, একটি মিথিলিন এবং একটি হাইড্রক্সি মূলক রয়েছে। এর কোনো কাইরাল কেন্দ্র নেই। রাসায়নিকভাবে সরল কাঠামোর যৌগ হলেও এটি মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র, বিপাকীয় প্রক্রিয়া ও আচরণের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব বিস্তার করে।
‘অ্যালকোহল’ শব্দটির ভাষাতাত্ত্বিক শেকড় প্রোথিত রয়েছে মধ্যযুগীয় আরবি ভাষার শব্দভাণ্ডারে। শব্দটি এসেছে আরবি বিশেষ্য পদ আল-কুহল (al-kuhl) থেকে। প্রাচীন আরবে অ্যান্টিমনি খনিজ অত্যন্ত মিহি গুঁড়ো করে চোখের সুরমা তৈরি করা হতো, যাকে বলা হতো ‘আল-কুহল’। মধ্যযুগে পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাষ্পীভূত করে তরলকে যখন অতি বিশুদ্ধ ও সূক্ষ্ম ঘনত্বের অবস্থায় রূপান্তর করা শেখা হয়, তখন রসায়নবিদরা এই পাতিত সারবস্তু বা স্পিরিটকে আরবি সুরমার রূপক ধারণায় ‘অ্যালকোহল‘ বলে ডাকতে শুরু করেন। অন্যদিকে আধুনিক নিয়মতান্ত্রিক নাম ‘ইথানল‘-এর রূপমূলতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শব্দটি এসেছে গ্রিক বিশেষ্য আইথার (aither, যার অর্থ ঊর্ধ্বাকাশ বা প্রজ্বলিত আলো) থেকে উদ্ভূত জৈব মূলক ইথাইল (ethyl)-এর সাথে অ্যালকোহলের প্রত্যয় -অল (-ol) যুক্ত করে।
ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে ইথানল একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক দ্বি-মুখী সিএনএস ডিপ্রেসেন্ট। এর ক্ষুদ্র আণবিক আকারের কারণে এটি দেহের প্রায় প্রতিটি জলীয় ও চর্বিযুক্ত কোষে সহজে প্রবেশ করতে পারে। মস্তিষ্কে প্রবেশের পর এটি দুটি প্রধান রিসেপ্টরে যুগপৎ বিপরীত কাজ করে: এটি মস্তিষ্কের প্রধান প্রতিরোধমূলক গাবা-এ রিসেপ্টর (GABA-A receptor)-কে অতিরিক্ত সক্রিয় করে স্নায়ুর গতি কমিয়ে দেয়, এবং একই সাথে মস্তিষ্কের প্রধান উত্তেজক গ্লুটামেট এনএমডিএ রিসেপ্টর (NMDA receptor)-কে অবরুদ্ধ করে দেয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে সামাজিক জড়তা দূর হলেও মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অকেজো হয়, বাকশক্তি জড়িয়ে যায়, ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং শ্বাসযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে কোমায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘস্থায়ী মদ্যপানের ফলে যকৃতের সিরোসিস, মস্তিষ্কের করসাকফ সিন্ড্রোম এবং প্রত্যাহারের সময় প্রাণঘাতী খিঁচুনি বা ডেলিরিয়াম ট্রিমেনস (delirium tremens) ঘটে।
ফেনইথাইলিন বা ক্যাপ্টাগন (Fenethylline / Captagon)
মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন মাদকবাণিজ্য, আঞ্চলিক রাজনীতি ও সশস্ত্র সংঘাতের আলোচনায় বহুল আলোচিত একটি কৃত্রিম উদ্দীপক যৌগ হলো ফেনইথাইলিন (Fenethylline), যা ঐতিহাসিকভাবে ক্যাপটাগন (Captagon) বাণিজ্যিক নামে বাজারজাত করা হতো। এটি অ্যাম্ফেটামিন (Amphetamine) ও থিওফাইলিন (Theophylline) অংশের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাসায়নিক যৌগ। তবে বর্তমানে অবৈধ বাজারে ক্যাপটাগন নামে প্রচলিত ট্যাবলেটগুলোর রাসায়নিক উপাদান সব সময় ফেনইথাইলিন নয়। ফেনইথাইলিনের একটি প্রচলিত পদ্ধতিগত রাসায়নিক নাম (Systematic Chemical Name) হলো: 1,3-dimethyl-7-[2-[(1-phenylpropan-2-yl)amino]ethyl]purine-2,6-dione, বাংলায় ১,৩-ডাইমিথাইল-৭-[২-[(১-ফিনাইলপ্রোপান-২-ইল)অ্যামিনো]ইথাইল]পিউরিন-২,৬-ডায়ন।
- Purine: মূল কাঠামো পিউরিন (Purine), যা দুটি পরস্পর সংযুক্ত হেটেরোসাইক্লিক বলয় নিয়ে গঠিত। এর একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট পাইরিমিডিন (Pyrimidine) বলয় এবং অন্যটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ইমিডাজোল (Imidazole) বলয়।
- পিউরিনের নাইট্রোজেন: পিউরিন বলয়ব্যবস্থায় চারটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। এগুলোর অবস্থান ১, ৩, ৭ ও ৯ নম্বরে। পিউরিনের আণবিক সংকেত C₅H₄N₄।
- Purine-2,6-dione: পিউরিন বলয়ব্যবস্থার ২ ও ৬ নম্বর অবস্থানে দুটি কার্বনিল (C=O) রয়েছে। তাই নামের শেষে -2,6-dione ব্যবহৃত হয়েছে।
- Dione: di- দ্বারা দুটি এবং -one দ্বারা কার্বনিলযুক্ত অবস্থান বোঝানো হয়েছে। তবে এখানে কার্বনিলগুলো সাধারণ কিটোনের অংশ নয়; পিউরিনের নাইট্রোজেনযুক্ত বলয়ের মধ্যে ল্যাকটামজাত (Lactam-like) কার্বনিল পরিবেশে রয়েছে।
- Xanthine: ২ ও ৬ নম্বর অবস্থানে কার্বনিলযুক্ত পিউরিন কাঠামোটি জ্যান্থিন (Xanthine) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ফেনইথাইলিনের এই অংশটি থিওফাইলিনের কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
- Methyl: মিথাইল (–CH₃) একটি এক-কার্বনবিশিষ্ট অ্যালকাইল (Alkyl) মূলক।
- 1,3-Dimethyl: পিউরিন বলয়ব্যবস্থার ১ ও ৩ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি করে মিথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই 1,3-dimethyl ব্যবহৃত হয়েছে।
- Theophylline: থিওফাইলিন (Theophylline) হলো ১,৩-ডাইমিথাইলজ্যান্থিন (1,3-Dimethylxanthine)। ফেনইথাইলিনের পিউরিন-২,৬-ডায়ন অংশে এই থিওফাইলিন কাঠামোটি বিদ্যমান।
- Ethyl: ইথাইল (Ethyl) অংশে দুটি কার্বন রয়েছে। এখানে এটি একটি দুই-কার্বনবিশিষ্ট সংযোগশৃঙ্খল (Linker) হিসেবে কাজ করছে।
- 2-[(… )amino]ethyl: এই অংশের গঠন –CH₂–CH₂–NH–R, যেখানে R হলো ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-ইল মূলক। ইথাইল শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনের সঙ্গে অ্যামিনো অংশটি যুক্ত।
- 7-[…ethyl]: পিউরিন বলয়ব্যবস্থার ৭ নম্বর নাইট্রোজেনে ওই দুই-কার্বনবিশিষ্ট শৃঙ্খলটি যুক্ত রয়েছে। ফলে থিওফাইলিন অংশ এবং অ্যাম্ফেটামিনজাত অংশের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি হয়েছে।
- Propan: propan দ্বারা তিন কার্বনবিশিষ্ট একটি শৃঙ্খল বোঝানো হয়েছে। এখানে মূল তিন-কার্বন শৃঙ্খলের গঠন CH₂–CH–CH₃।
- Phenyl: ফিনাইল (–C₆H₅) হলো বেনজিন বলয় থেকে উদ্ভূত একটি অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপক।
- 1-Phenylpropan: তিন-কার্বনবিশিষ্ট প্রোপান শৃঙ্খলের ১ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কার্বন কাঠামোটি C₆H₅–CH₂–CH(CH₃)– আকার ধারণ করে।
- Propan-2-yl: প্রোপান শৃঙ্খলের ২ নম্বর কার্বনের মাধ্যমে এই অংশটি অন্য পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত। এখানে সেই সংযোগটি অ্যামিনো নাইট্রোজেনের সঙ্গে।
- 1-Phenylpropan-2-yl: সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপকটির গঠন C₆H₅–CH₂–CH(CH₃)–। এটি অ্যাম্ফেটামিনের কার্বন কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
- [(1-Phenylpropan-2-yl)amino]: এখানে একটি নাইট্রোজেনের সঙ্গে ১-ফিনাইলপ্রোপান-২-ইল মূলক যুক্ত রয়েছে। একই নাইট্রোজেন আবার ইথাইল সংযোগশৃঙ্খলের সঙ্গেও যুক্ত।
- দ্বিতীয়িক অ্যামিন: এই অ্যামিনো নাইট্রোজেনটি দুটি কার্বনের সঙ্গে এবং একটি হাইড্রোজেনের সঙ্গে যুক্ত। তাই এটি একটি দ্বিতীয়িক অ্যামিন (Secondary Amine)।
- অ্যাম্ফেটামিনের সঙ্গে সম্পর্ক: অ্যাম্ফেটামিনের পদ্ধতিগত নাম 1-phenylpropan-2-amine। ফেনইথাইলিনে এই অ্যাম্ফেটামিনজাত অংশের নাইট্রোজেন একটি দুই-কার্বনবিশিষ্ট শৃঙ্খলের মাধ্যমে থিওফাইলিন অংশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
- দুটি অংশের সংযোগ: ফেনইথাইলিনে থিওফাইলিন ও অ্যাম্ফেটামিন দুটি পৃথক অণুর সাধারণ মিশ্রণ হিসেবে উপস্থিত নয়। তারা সমযোজী বন্ধনের (Covalent Bond) মাধ্যমে একটি একক অণু গঠন করেছে।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ফেনইথাইলিন একটি কৃত্রিম কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উদ্দীপক (Synthetic Central Nervous System Stimulant)। এটি জ্যান্থিনজাত (Xanthine-derived) এবং অ্যাম্ফেটামিন-সম্পর্কিত কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত যৌগ।
- স্টেরিওরসায়ন: অ্যাম্ফেটামিনজাত অংশের ২ নম্বর কার্বনটি একটি কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre)। তবে প্রদত্ত ইউপ্যাক নামে (R) বা (S) নির্দেশক নেই। অর্থাৎ নামটি কোনো একটি নির্দিষ্ট এনান্টিওমারকে চিহ্নিত করছে না।
- জৈবিক বিপাক: মানবদেহে ফেনইথাইলিন বিপাকিত হয়ে অ্যাম্ফেটামিন ও থিওফাইলিন উৎপন্ন করতে পারে। অ্যাম্ফেটামিনজাত বিপাকীয় অংশ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে উদ্দীপক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
- কার্যকরী মূলক: ফেনইথাইলিনে একটি দ্বিতীয়িক অ্যামিন, দুটি ল্যাকটামজাত কার্বনিল, একটি ফিনাইল বলয় এবং নাইট্রোজেনযুক্ত সংযুক্ত পিউরিন বলয়ব্যবস্থা রয়েছে।
- আণবিক সংকেত: C₁₈H₂₃N₅O₂। এর আণবিক ভর প্রায় ৩৪১.৪১ গ্রাম/মোল।
- ক্যাপটাগনের সঙ্গে সম্পর্ক: ক্যাপটাগন ছিল ফেনইথাইলিনযুক্ত ওষুধের বাণিজ্যিক নাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অবৈধ বাজারে একই নামে বিক্রি হওয়া নকল ট্যাবলেটগুলোতে প্রধানত অ্যাম্ফেটামিন এবং প্রায়ই ক্যাফেইনসহ অন্যান্য উপাদান পাওয়া গেছে। ফলে রাসায়নিক বিশ্লেষণে ফেনইথাইলিন ও অবৈধ ক্যাপটাগনকে সমার্থক ধরে নেওয়া যাবে না।
সুতরাং: ফেনইথাইলিন হলো থিওফাইলিনজাত পিউরিন-২,৬-ডায়ন কাঠামোর ৭ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি দুই-কার্বনবিশিষ্ট শৃঙ্খলের মাধ্যমে অ্যাম্ফেটামিনজাত অংশ যুক্ত থাকা কৃত্রিম উদ্দীপক যৌগ। এর পিউরিন বলয়ের ১ ও ৩ নম্বর নাইট্রোজেনে মিথাইল মূলক, ২ ও ৬ নম্বর অবস্থানে কার্বনিল এবং সংযোগশৃঙ্খলে একটি দ্বিতীয়িক অ্যামিন রয়েছে। এটি ঐতিহাসিক ক্যাপটাগনের সক্রিয় রাসায়নিক হলেও সমকালীন অবৈধ ক্যাপটাগন ট্যাবলেটের রাসায়নিক গঠন প্রায়ই ভিন্ন।
এই কাঠামোতে থিওফাইলিন ও অ্যাম্ফেটামিনজাত অংশ একটি ইথাইল শৃঙ্খলের মাধ্যমে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত রয়েছে।
নামটির ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন ওষুধের নাম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি একটি রাসায়নিক কো-ড্রাগ, যা ১৯৬১ সালে জার্মানিতে প্রথম সংশ্লেষিত হয়। এর গঠনে রয়েছে অ্যাম্ফেটামিনের একটি ফেনইথাইল (phenethyl-) অংশ এবং চা-পাতায় পাওয়া জ্যান্থিন অ্যালকালয়েড থিওফাইলিন (theophylline)। এই দুটি উপাদানের মিলন নির্দেশ করতে ‘ফেন’ (phen-), ‘ইথাইল’ (-ethyl-) এবং ‘থিওফাইলিন’ থেকে ‘লিন’ (-line) মিলিয়ে বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফেনইথাইলিন’। অন্যদিকে ‘ক্যাপ্টাগন’ (Captagon) ছিল এর বাণিজ্যিক ট্রেডমার্ক নাম।
আণবিক কার্যপদ্ধতির বিচারে ফেনইথাইলিন মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশের পর এনজাইমেটিক মেটাবলিজমের মাধ্যমে সরাসরি দুটি আলাদা কার্যকরী উপাদানে ভেঙে যায়: শতকরা প্রায় পঁচিশ ভাগ অ্যাম্ফেটামিন এবং শতকরা প্রায় পনেরো ভাগ থিওফাইলিনে। মুক্ত হওয়া অ্যাম্ফেটামিন ডোপামিন ও নর-এপিনেফ্রিনের প্লাবন ঘটিয়ে মস্তিষ্ককে চরম সজাগ, ভয়হীন এবং ক্ষুধাহীন করে তোলে। অন্যদিকে থিওফাইলিন অ্যাডিনোসিন রিসেপ্টরকে ব্লক করে হৃদযন্ত্রের গতি ও রক্তপ্রবাহ সচল রাখে এবং ব্রঙ্কোডাইলেটর হিসেবে ফুসফুসের ক্ষমতা সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এই যৌথ রাসায়নিক শক্তির কারণে ব্যক্তি একটানা কয়েক রাত নির্ঘুম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে এবং তীব্র শারীরিক ক্ষতেও ব্যথা অনুভব করে না। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে আসাদ সরকার ও বিভিন্ন মিলিশিয়ার আয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠা এই মাদকটি সমকালীন বিশ্বের এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ডায়াজেপাম ও বেঞ্জোডায়াজেপাইন শ্রেণি (Diazepam / Benzodiazepine Class)
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত বেনজোডায়াজেপিন (Benzodiazepine) শ্রেণির একটি পরিচিত ওষুধ হলো ডায়াজেপাম (Diazepam)। এটি প্রধানত উদ্বেগনাশক (Anxiolytic), সেডেটিভ (Sedative), খিঁচুনিরোধী (Anticonvulsant) এবং পেশিশিথিলকারী (Muscle Relaxant) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর প্রচলিত ইউপ্যাক নাম (IUPAC name) হলো: 7-chloro-1-methyl-5-phenyl-1,3-dihydro-2H-1,4-benzodiazepin-2-one, বাংলায় ৭-ক্লোরো-১-মিথাইল-৫-ফিনাইল-১,৩-ডাইহাইড্রো-২এইচ-১,৪-বেঞ্জোডায়াজেপিন-২-অন। এখানে –
- Benzodiazepine: ডায়াজেপামের মূল কাঠামো বেঞ্জোডায়াজেপিন (Benzodiazepine)। এটি একটি সংযুক্ত দ্বিবলয়বিশিষ্ট (Fused Bicyclic) হেটেরোসাইক্লিক ব্যবস্থা, যেখানে একটি বেনজিন বলয়ের সঙ্গে একটি সাত সদস্যবিশিষ্ট ডায়াজেপিন বলয় সংযুক্ত।
- Benzo-: benzo- অংশ নির্দেশ করে মূল ডায়াজেপিন বলয়ের সঙ্গে একটি বেনজিন (Benzene) বলয় সংযুক্ত রয়েছে। এই বেনজিন বলয়টি ছয় সদস্যবিশিষ্ট এবং অ্যারোমেটিক।
- Diazepine: diazepine নামটি বিশ্লেষণ করলে di- দ্বারা দুটি, aza দ্বারা নাইট্রোজেনের উপস্থিতি এবং -epine দ্বারা সাত সদস্যবিশিষ্ট অসম্পৃক্ত হেটেরোসাইক্লিক বলয় বোঝানো হয়। অর্থাৎ ডায়াজেপিন হলো দুটি নাইট্রোজেনবিশিষ্ট সাত সদস্যের একটি অসম্পৃক্ত বলয়ব্যবস্থা।
- 1,4-Benzodiazepine: সাত সদস্যবিশিষ্ট ডায়াজেপিন বলয়ের ১ ও ৪ নম্বর অবস্থানে দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। তাই নামের মধ্যে 1,4- ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ১ ও ৪ সংখ্যাগুলো নাইট্রোজেনের অবস্থান নির্দেশ করে; কোনো প্রতিস্থাপক বা কার্যকরী মূলকের অবস্থান নয়।
- 1,4-Benzodiazepin-2-one: ডায়াজেপামের মূল বলয়ব্যবস্থায় ২ নম্বর অবস্থানে একটি কার্বনিল (C=O) রয়েছে। এই কারণে নামের শেষে -2-one ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এটি সাধারণ কিটোন নয়; কার্বনিল কার্বনটি বলয়ের নাইট্রোজেনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এটি একটি চক্রাকার অ্যামাইড (Cyclic Amide) বা ল্যাকটাম (Lactam)।
- 2-One: 2-one অংশ নির্দেশ করে ২ নম্বর অবস্থানের কার্বনে একটি কার্বনিল অক্সিজেন দ্বিবন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত রয়েছে। ডায়াজেপামের ক্ষেত্রে এই কার্বনিল কার্বনের সঙ্গে ১ নম্বর নাইট্রোজেন সরাসরি যুক্ত।
- Lactam: ল্যাকটাম হলো চক্রাকার অ্যামাইড। ডায়াজেপামের সাত সদস্যবিশিষ্ট বলয়ের মধ্যে –N–C(=O)– সংযোগ থাকায় এটি একটি ল্যাকটামজাত যৌগ। এখানে কার্বনিলটি বলয় কাঠামোরই অংশ।
- Methyl: মিথাইল (–CH₃) একটি এক-কার্বনবিশিষ্ট অ্যালকাইল (Alkyl) মূলক।
- 1-Methyl: ডায়াজেপামের ১ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। ফলে এই নাইট্রোজেনের সঙ্গে মিথাইল কার্বন, কার্বনিল কার্বন এবং বলয়ের অন্য একটি কার্বনের সংযোগ রয়েছে।
- টারশিয়ারি অ্যামাইড: ডায়াজেপামের ১ নম্বর নাইট্রোজেনটি অ্যামাইড অংশের অন্তর্ভুক্ত। এর সঙ্গে দুটি কার্বনভিত্তিক প্রতিস্থাপক এবং কার্বনিল কার্বন যুক্ত থাকায় এটি একটি টারশিয়ারি অ্যামাইড (Tertiary Amide) নাইট্রোজেন। একে সাধারণ টারশিয়ারি অ্যামিন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা ঠিক নয়।
- Phenyl: ফিনাইল (–C₆H₅) একটি অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপক, যা বেনজিন থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে গঠিত।
- 5-Phenyl: ডায়াজেপিন বলয়ের ৫ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। এটি মূল বেঞ্জোডায়াজেপিন বলয়ব্যবস্থার বেনজিন বলয় থেকে পৃথক।
- দুটি বেনজিন বলয়: ডায়াজেপামে মোট দুটি বেনজিন বলয় রয়েছে। একটি মূল বেঞ্জোডায়াজেপিন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত এবং অন্যটি ৫ নম্বর অবস্থানের ফিনাইল প্রতিস্থাপকের মধ্যে রয়েছে। তবে সম্পূর্ণ অণুটি কেবল দুটি বলয়বিশিষ্ট নয়; সাত সদস্যের ডায়াজেপিন বলয়সহ মোট তিনটি বলয় রয়েছে।
- Chloro: chloro দ্বারা একটি ক্লোরিন (Cl) পরমাণু প্রতিস্থাপক হিসেবে যুক্ত থাকার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে।
- 7-Chloro: মূল বেঞ্জোডায়াজেপিন কাঠামোর ৭ নম্বর কার্বনে একটি ক্লোরিন পরমাণু যুক্ত রয়েছে। এটি সংযুক্ত বেনজিন বলয়ের একটি অবস্থান।
- Dihydro: dihydro উপসর্গ নির্দেশ করে সংশ্লিষ্ট মূল অসম্পৃক্ত বলয়ব্যবস্থার তুলনায় দুটি অতিরিক্ত হাইড্রোজেনের সমতুল্য সম্পৃক্ততা রয়েছে। এটি বলয়ের দ্বিবন্ধন ও একক বন্ধনের বিন্যাস বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
- 1,3-Dihydro: 1,3-dihydro দ্বারা মূল বেঞ্জোডায়াজেপিন ব্যবস্থার ১ ও ৩ নম্বর অবস্থানে হাইড্রোজেন সংযোজনের সমতুল্য পরিবর্তন নির্দেশ করা হয়েছে। তবে ডায়াজেপামের চূড়ান্ত কাঠামোতে ১ নম্বর নাইট্রোজেনের সঙ্গে মিথাইল যুক্ত থাকায় সেখানে নাইট্রোজেন-হাইড্রোজেন বন্ধন থাকে না।
- 2H: 2H একটি নির্দেশিত হাইড্রোজেন অবস্থানসূচক (Indicated Hydrogen Locant)। হেটেরোসাইক্লিক নামকরণে এটি মূল বলয়ব্যবস্থার নির্দিষ্ট দ্বিবন্ধন বিন্যাস বা টটোমেরিক রূপ (Tautomeric Form) চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। এটি অণুতে অতিরিক্ত দুটি হাইড্রোজেন থাকার নির্দেশক নয়।
- 1,3-Dihydro-2H-1,4-benzodiazepin-2-one: এই সম্মিলিত অংশটি ডায়াজেপামের মূল হেটেরোসাইক্লিক কাঠামো, এর অসম্পৃক্ততার বিন্যাস এবং ২ নম্বর অবস্থানের ল্যাকটাম কার্বনিল নির্দেশ করে।
- নাইট্রোজেনের সংখ্যা: ডায়াজেপামে দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। ১ নম্বর নাইট্রোজেনটি ল্যাকটাম অংশের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ৪ নম্বর নাইট্রোজেনটি কার্বন-নাইট্রোজেন দ্বিবন্ধনবিশিষ্ট ইমিনজাত (Imine-like) পরিবেশে রয়েছে। তাই এদের রাসায়নিক ধর্ম এক নয়।
- কার্যকরী মূলক: ডায়াজেপামে একটি চক্রাকার অ্যামাইড বা ল্যাকটাম, একটি ইমিনজাত কার্বন-নাইট্রোজেন দ্বিবন্ধন, দুটি অ্যারোমেটিক বেনজিন বলয় এবং একটি অ্যারিল ক্লোরাইড (Aryl Chloride) অংশ রয়েছে।
- স্টেরিওরসায়ন: ডায়াজেপামের প্রচলিত কাঠামোতে কোনো স্থায়ী কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre) নেই। তাই এর ইউপ্যাক নামের শুরুতে (R) বা (S) নির্দেশক ব্যবহৃত হয় না।
- রাসায়নিক শ্রেণি: ডায়াজেপাম একটি ১,৪-বেঞ্জোডায়াজেপিন-২-অন (1,4-Benzodiazepin-2-one) শ্রেণির যৌগ। আরও নির্দিষ্টভাবে এটি একটি ৭-ক্লোরো, ১-মিথাইল ও ৫-ফিনাইল প্রতিস্থাপিত বেঞ্জোডায়াজেপিন।
- জৈবিক কার্যকারিতা: ডায়াজেপাম গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড টাইপ-এ রিসেপ্টরের (GABA-A Receptor) একটি পজিটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেটর (Positive Allosteric Modulator)। এটি গাবার উপস্থিতিতে রিসেপ্টরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে, ফলে ক্লোরাইড আয়ন চ্যানেলের খোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং স্নায়ুকোষের উত্তেজনাশীলতা সাধারণত কমে।
- চিকিৎসাগত ব্যবহার: ডায়াজেপাম উদ্বেগের স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসা, নির্দিষ্ট খিঁচুনিজনিত অবস্থা, পেশির খিঁচুনি, অ্যালকোহল প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ এবং কিছু চিকিৎসাপদ্ধতির আগে সেডেশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সহনশীলতা (Tolerance), শারীরিক নির্ভরতা (Physical Dependence) এবং প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ (Withdrawal Symptoms) দেখা দিতে পারে।
- আণবিক সংকেত: C₁₆H₁₃ClN₂O। এর আণবিক ভর প্রায় ২৮৪.৭৪ গ্রাম/মোল।
সুতরাং: ডায়াজেপাম একটি তিন-বলয়বিশিষ্ট বেঞ্জোডায়াজেপিনজাত যৌগ, যার মূল সাত সদস্যবিশিষ্ট ডায়াজেপিন বলয়ের ১ ও ৪ নম্বর অবস্থানে দুটি নাইট্রোজেন, ২ নম্বর অবস্থানে একটি ল্যাকটাম কার্বনিল, ১ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল এবং ৫ নম্বর কার্বনে একটি ফিনাইল মূলক রয়েছে। সংযুক্ত বেনজিন বলয়ের ৭ নম্বর অবস্থানে একটি ক্লোরিন পরমাণু যুক্ত। এর 1,3-dihydro-2H অংশটি মূল বলয়ব্যবস্থার হাইড্রোজেন ও অসম্পৃক্ততার বিন্যাস নির্দেশ করে। ডায়াজেপাম মূলত গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উদ্বেগনাশক, সেডেটিভ, খিঁচুনিরোধী ও পেশিশিথিলকারী প্রভাব সৃষ্টি করে।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে এই পুরো শ্রেণির নাম ‘বেঞ্জোডায়াজেপাইন’ এসেছে এর কেন্দ্রীয় রাসায়নিক বলয় কাঠামো থেকে। এতে একটি ছয় কার্বনের অ্যারোমেটিক বেনজিন (benzene) বলয় এবং তার সাথে পাশাপাশি দুটি নাইট্রোজেন পরমাণুযুক্ত একটি সাত সদস্যের অসম্পৃক্ত হেটেরোসাইক্লিক অ্যাজেপিন (azepine) বলয় জোড়া লাগানো থাকে। ফরাসি রসায়নবিদ ল্যাভয়সিঁয়ের দেওয়া নাইট্রোজেনের আদি নাম অ্যাজোট (azote, যা গ্রিক a- বা না এবং zoe বা জীবন থেকে এসেছে, অর্থাৎ প্রাণহীন গ্যাস) থেকে নাইট্রোজেন নির্দেশক ‘অ্যাজা’ (aza-) এবং গ্রিক উপসর্গ ডাই (di-, অর্থ দুই) যুক্ত হয়ে নাম হয়েছে ‘ডায়াজেপিন’। নির্দিষ্ট যৌগ ‘ডায়াজেপাম’-এর নামের শেষে মিথাইল গ্রুপ ও কিটোনের উপস্থিতি থেকে ‘-পাম’ (-pam) প্রত্যয়টি ফার্মাকোলজিক্যাল শ্রেণি পরিচায়ক হিসেবে স্থির করা হয়েছে। ১৯৬৩ সালে হফম্যান-লা রোশ কোম্পানির রসায়নবিদ লিও স্টার্নবাখ এটি আবিষ্কার করেন।
আণবিক স্তরে ডায়াজেপাম সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের প্রধান নিউরোট্রান্সমিটার রিসেপ্টর গাবা-এ রিসেপ্টর (GABA-A receptor)-এর আলফা এবং গামা সাব-ইউনিটের সংযোগস্থলে একটি পজিটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেটর হিসেবে শক্তভাবে বসে। এর ফলে রিসেপ্টরের কেন্দ্রীয় ক্লোরাইড আয়ন চ্যানেলের খোলার পৌনঃপুনিকতা বৃদ্ধি পায়। কোষে ঋণাত্মক ক্লোরাইড আয়ন অতিরিক্ত প্রবেশের ফলে নিউরনের বৈদ্যুতিক মেমব্রেন হাইপারপোলারাইজড হয়ে যায়, যার অর্থ হলো নিউরনটির পক্ষে নতুন কোনো উত্তেজনামূলক সংকেত তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে মানুষের অতিরিক্ত উদ্বেগ, আতঙ্ক, খিঁচুনি এবং অনিদ্রা দূর হয়ে মন শান্ত হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে শরীরে চরম সহনশীলতা ও মারাত্মক শারীরিক নির্ভরতা তৈরি হয়। হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করলে প্রাণঘাতী প্রত্যাহার সংকট দেখা দেয় এবং অ্যালকোহলের সাথে একসাথে অপব্যবহার করলে রেসপিরেটরি ডিপ্রেশনে অবধারিত মৃত্যু ঘটতে পারে। প্রেসক্রিপশন ড্রাগের এই ভয়াবহ অপব্যবহার সমকালীন সমাজের এক নীরব আসক্তি সংকট।
নিকোটিন ও পাইরিডিন-পাইরোলিডিন অ্যালকালয়েড শ্রেণি (Nicotine / Pyridine-Pyrrolidine Alkaloid Class)
তামাক উদ্ভিদ (Nicotiana tabacum) এবং নিকোটিয়ানা গণের (Nicotiana) অন্যান্য প্রজাতিতে পাওয়া প্রধান মনোসক্রিয় অ্যালকালয়েড হলো নিকোটিন (Nicotine)। এটি একটি প্রাকৃতিক নাইট্রোজেনযুক্ত হেটেরোসাইক্লিক যৌগ (Nitrogen-Containing Heterocyclic Compound), যা রাসায়নিকভাবে পাইরিডিন-পাইরোলিডিন অ্যালকালয়েড (Pyridine-Pyrrolidine Alkaloid) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। নিকোটিন প্রধানত কেন্দ্রীয় ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরের (Nicotinic Acetylcholine Receptor – nAChR) অ্যাগোনিস্ট (Agonist) হিসেবে কাজ করে। এর ফলে স্নায়ুকোষে উত্তেজনামূলক সংকেত সৃষ্টি হয় এবং ডোপামিনসহ বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ পরিবর্তিত হয়। নিকোটিনের প্রচলিত ইউপ্যাক নাম (IUPAC Name) হলো (S)-3-(1-methylpyrrolidin-2-yl)pyridine, বাংলায় (এস)-৩-(১-মিথাইলপাইরোলিডিন-২-ইল)পাইরিডিন। এখানে –
- Pyridine: পাইরিডিন (Pyridine) হলো একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট অ্যারোমেটিক হেটেরোসাইক্লিক যৌগ, যার বলয়ে পাঁচটি কার্বন এবং একটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। এর আণবিক সংকেত C₅H₅N। গঠনগতভাবে এটি বেনজিনের অনুরূপ, তবে বেনজিনের একটি –CH– অবস্থানের পরিবর্তে একটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। পাইরিডিন বলয়ের ছয়টি পরমাণুর মধ্যে ছয়টি π-ইলেকট্রন বিস্তৃত থাকায় এটি হুকেলের অ্যারোমেটিসিটি নিয়ম (Hückel’s Aromaticity Rule) অনুসরণ করে।
- Pyrrolidine: পাইরোলিডিন (Pyrrolidine) হলো পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট সম্পৃক্ত হেটেরোসাইক্লিক যৌগ, যার বলয়ে চারটি কার্বন এবং একটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। এর আণবিক সংকেত C₄H₉N। পাইরিডিনের বিপরীতে পাইরোলিডিন বলয়ে কোনো কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধন নেই। তাই এটি একটি সম্পৃক্ত চক্রাকার অ্যামিন (Saturated Cyclic Amine) এবং অ্যারোমেটিক নয়।
- Pyridine-Pyrrolidine Structure: নিকোটিনের মূল কাঠামোতে একটি পাইরিডিন বলয় এবং একটি পাইরোলিডিন বলয় রয়েছে। বলয় দুটি একটি কার্বন-কার্বন একক সমযোজী বন্ধনের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নিকোটিন একটি দ্বিবলয়বিশিষ্ট (Bicyclic) যৌগ হলেও এর বলয় দুটি পরস্পর সংযুক্ত বা ফিউজড (Fused) নয়; এরা দুটি স্বতন্ত্র বলয়।
- 3-(Pyrrolidin-2-yl)pyridine: নিকোটিনের মূল নামকরণে পাইরিডিনকে প্রধান বলয় বা প্যারেন্ট কাঠামো (Parent Structure) হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। পাইরিডিনের ৩ নম্বর কার্বনে পাইরোলিডিন বলয়ের ২ নম্বর কার্বন যুক্ত রয়েছে। এই কারণে নামের মধ্যে 3-(pyrrolidin-2-yl) অংশ ব্যবহৃত হয়েছে।
- 3-: পাইরিডিন বলয়ের নাইট্রোজেন পরমাণুকে ১ নম্বর অবস্থান ধরে গণনা শুরু হয়। এর পরবর্তী কার্বন ২ নম্বর এবং তার পরবর্তী কার্বন ৩ নম্বর। নিকোটিনে পাইরোলিডিনজাত প্রতিস্থাপকটি পাইরিডিনের ৩ নম্বর কার্বনে যুক্ত থাকায় নামের শুরুতে 3- ব্যবহৃত হয়েছে।
- Pyrrolidin-2-yl: পাইরোলিডিন বলয়ের নাইট্রোজেন পরমাণু ১ নম্বর অবস্থানে থাকে। তার সংলগ্ন কার্বনটি ২ নম্বর অবস্থান। নিকোটিনে এই ২ নম্বর কার্বন পাইরিডিন বলয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পাইরোলিডিনের ২ নম্বর কার্বন থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণ করে যে একযোজী প্রতিস্থাপক গঠন করা হয়, তার নাম পাইরোলিডিন-২-ইল (Pyrrolidin-2-yl)।
- Pyrrolidin-2-yl বনাম Pyrrolidine: পাইরোলিডিন একটি স্বতন্ত্র সম্পৃক্ত হেটেরোসাইক্লিক যৌগ। অন্যদিকে পাইরোলিডিন-২-ইল হলো পাইরোলিডিন থেকে উদ্ভূত একটি প্রতিস্থাপক গোষ্ঠী। এখানে -yl প্রত্যয়টি নির্দেশ করে যে মূল বলয়ের নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের ফলে অন্য পরমাণু বা গোষ্ঠীর সঙ্গে বন্ধন গঠনের স্থান তৈরি হয়েছে।
- Methyl: মিথাইল (Methyl) হলো একটি এক-কার্বনবিশিষ্ট অ্যালকাইল (Alkyl) মূলক, যার গাঠনিক সংকেত –CH₃। এটি মিথেন (Methane, CH₄) থেকে একটি হাইড্রোজেন অপসারণের মাধ্যমে উদ্ভূত প্রতিস্থাপক গোষ্ঠী।
- 1-Methyl: নিকোটিনের পাইরোলিডিন বলয়ের ১ নম্বর অবস্থানে থাকা নাইট্রোজেনের সঙ্গে একটি মিথাইল মূলক যুক্ত রয়েছে। তাই নামের মধ্যে 1-methyl ব্যবহৃত হয়েছে। এই মিথাইল গোষ্ঠীটি পাইরিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনে নয়, বরং পাইরোলিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনে যুক্ত।
- 1-Methylpyrrolidine: পাইরোলিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল গোষ্ঠী যুক্ত হলে ১-মিথাইলপাইরোলিডিন (1-Methylpyrrolidine) কাঠামো তৈরি হয়। নিকোটিনে এই কাঠামোর ২ নম্বর কার্বন পাইরিডিন বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিস্থাপকের নাম ১-মিথাইলপাইরোলিডিন-২-ইল (1-Methylpyrrolidin-2-yl)।
- টারশিয়ারি অ্যামিন (Tertiary Amine): নিকোটিনের পাইরোলিডিন বলয়ের নাইট্রোজেনটি তিনটি কার্বনের সঙ্গে একক বন্ধনে যুক্ত। এই তিনটি কার্বনের মধ্যে দুটি পাইরোলিডিন বলয়ের অংশ এবং তৃতীয়টি মিথাইল গোষ্ঠীর কার্বন। ফলে এটি একটি টারশিয়ারি অ্যামিন নাইট্রোজেন (Tertiary Amine Nitrogen)। এখানে নাইট্রোজেনের সঙ্গে কোনো হাইড্রোজেন সরাসরি যুক্ত নেই।
- পাইরিডিন নাইট্রোজেন (Pyridine Nitrogen): নিকোটিনের অন্য নাইট্রোজেনটি পাইরিডিন বলয়ের অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি sp²-হাইব্রিডাইজড নাইট্রোজেন, যার লোন পেয়ার (Lone Pair) অ্যারোমেটিক π-ইলেকট্রন ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করে। তাই এই লোন পেয়ার প্রোটন গ্রহণে অংশ নিতে পারে। তবে পাইরিডিন নাইট্রোজেনকে সাধারণ টারশিয়ারি অ্যামিন নাইট্রোজেন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় না।
- দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু: নিকোটিনে মোট দুটি নাইট্রোজেন রয়েছে। একটি পাইরিডিন বলয়ের অ্যারোমেটিক নাইট্রোজেন এবং অন্যটি পাইরোলিডিন বলয়ের টারশিয়ারি অ্যামিন নাইট্রোজেন। এদের রাসায়নিক পরিবেশ, ইলেকট্রন বিন্যাস এবং ক্ষারকত্ব (Basicity) ভিন্ন।
- ক্ষারকত্ব (Basicity): নিকোটিন একটি দ্বিক্ষারক প্রকৃতির যৌগ, কারণ এর দুটি নাইট্রোজেনই উপযুক্ত পরিবেশে প্রোটন গ্রহণ করতে পারে। তবে পাইরোলিডিন নাইট্রোজেন পাইরিডিন নাইট্রোজেনের তুলনায় অধিক ক্ষারক। নিকোটিনের সংশ্লিষ্ট প্রোটনযুক্ত রূপগুলোর আনুমানিক pKa মান যথাক্রমে ৮.০ এবং ৩.১-এর কাছাকাছি। ফলে শারীরবৃত্তীয় pH-এ নিকোটিনের উল্লেখযোগ্য অংশ একবার প্রোটনযুক্ত (Monoprotonated) অবস্থায় থাকে।
- অ্যারোমেটিক বলয় (Aromatic Ring): নিকোটিনের পাইরিডিন বলয়টি অ্যারোমেটিক। এতে তিনটি দ্বিবন্ধনের সমতুল্য বিস্তৃত π-ইলেকট্রন ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে পাইরোলিডিন বলয়টি সম্পৃক্ত এবং নন-অ্যারোমেটিক (Non-Aromatic)। অর্থাৎ নিকোটিনের দুটি বলয়ের মধ্যে কেবল একটি অ্যারোমেটিক।
- দুটি স্বতন্ত্র বলয়: নিকোটিনে মোট দুটি বলয় রয়েছে – একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট পাইরিডিন এবং একটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পাইরোলিডিন। ডায়াজেপামের বেঞ্জোডায়াজেপিন কাঠামোর মতো এরা পরস্পরের দুটি সংলগ্ন পরমাণু ভাগ করে না। তাই নিকোটিনকে ফিউজড বাইসাইক্লিক যৌগ বলা যায় না।
- (S)-: ইউপ্যাক নামের শুরুতে (S)- নির্দেশকটি নিকোটিনের পরম ত্রিমাত্রিক বিন্যাস (Absolute Configuration) নির্দেশ করে। এটি ক্যান-ইনগোল্ড-প্রিলগ অগ্রাধিকার নিয়ম (Cahn-Ingold-Prelog Priority Rules) অনুযায়ী নির্ধারিত স্টেরিওরসায়নিক নির্দেশক। এখানে S এসেছে লাতিন sinister শব্দ থেকে, যার অর্থ বামদিক।
- কাইরাল কেন্দ্র (Chiral Centre): নিকোটিনের পাইরোলিডিন বলয়ের ২ নম্বর কার্বনটি একটি কাইরাল কেন্দ্র। এই কার্বনের সঙ্গে একটি হাইড্রোজেন, পাইরিডিন বলয়ের কার্বন, পাইরোলিডিনের নাইট্রোজেন এবং পাইরোলিডিন বলয়ের অপর একটি কার্বন যুক্ত রয়েছে। চারটি ভিন্ন গোষ্ঠী থাকার কারণে এটি একটি স্টেরিওজেনিক কেন্দ্র (Stereogenic Centre)।
- (S)-Nicotine: তামাক উদ্ভিদে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন নিকোটিনের প্রধান এনান্টিওমার (Enantiomer) হলো (S)-নিকোটিন। এর বিপরীত ত্রিমাত্রিক বিন্যাসবিশিষ্ট রূপ হলো (R)-নিকোটিন। দুটি এনান্টিওমারের আণবিক সংকেত ও সাধারণ সংযোগবিন্যাস অভিন্ন হলেও ত্রিমাত্রিক গঠন এবং জৈবিক রিসেপ্টরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
- আলোকীয় সক্রিয়তা (Optical Activity): নিকোটিনের কাইরাল কাঠামোর কারণে এর বিশুদ্ধ এনান্টিওমার সমতল-ধ্রুবিত আলোর (Plane-Polarized Light) কম্পনতল ঘুরিয়ে দিতে পারে। প্রাকৃতিক (S)-নিকোটিন সাধারণত বামাবর্তী বা লেভোরোটেটরি (Levorotatory) হিসেবে পরিচিত। তবে (S) এবং (−) একই ধরনের নির্দেশক নয়; প্রথমটি পরম গঠন এবং দ্বিতীয়টি পরীক্ষায় পরিমাপ করা আলোকীয় ঘূর্ণনের দিক নির্দেশ করে।
- কার্যকরী মূলক (Functional Groups): নিকোটিনে একটি অ্যারোমেটিক পাইরিডিন বলয় এবং একটি সম্পৃক্ত টারশিয়ারি চক্রাকার অ্যামিন রয়েছে। এতে কোনো কার্বনিল (C=O), হাইড্রক্সিল (–OH), কার্বক্সিল (–COOH), অ্যামাইড (–CONR₂) বা এস্টার (–COOR) কার্যকরী মূলক নেই।
- অ্যালকালয়েড (Alkaloid): নিকোটিন একটি প্রকৃত অ্যালকালয়েড (True Alkaloid)। এটি উদ্ভিদের নাইট্রোজেনযুক্ত গৌণ বিপাকীয় পদার্থ (Nitrogen-Containing Specialized Metabolite)। এর নাইট্রোজেন পরমাণুগুলো হেটেরোসাইক্লিক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত এবং এর জৈবসংশ্লেষণে অ্যামিনো অ্যাসিডজাত পূর্বসূরির ভূমিকা রয়েছে।
- জৈবসংশ্লেষণ (Biosynthesis): তামাক উদ্ভিদে নিকোটিনের পাইরোলিডিন অংশের জৈবসংশ্লেষণ প্রধানত অর্নিথিন (Ornithine) ও আর্জিনিন (Arginine) থেকে উৎপন্ন পিউট্রেসিন (Putrescine) এবং এন-মিথাইলপিউট্রেসিন (N-Methylputrescine) পথের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে পাইরিডিন অংশের কার্বন কাঠামো নিকোটিনিক অ্যাসিড (Nicotinic Acid) সংশ্লিষ্ট বিপাকীয় পথ থেকে আসে। উদ্ভিদের মূল প্রধান সংশ্লেষণস্থল এবং উৎপন্ন নিকোটিন পরবর্তীতে পাতায় পরিবাহিত ও সঞ্চিত হয়।
- নিকোটিনিক অ্যাসিডের সঙ্গে সম্পর্ক: নিকোটিনিক অ্যাসিড (Nicotinic Acid) বা নিয়াসিন (Niacin) এবং নিকোটিন একই যৌগ নয়। নিকোটিনিক অ্যাসিডের গঠন হলো পাইরিডিন-৩-কার্বক্সিলিক অ্যাসিড (Pyridine-3-Carboxylic Acid)। এর পাইরিডিন বলয় নিকোটিনের গঠন ও জৈবসংশ্লেষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও নিকোটিনে কোনো কার্বক্সিলিক অ্যাসিড গোষ্ঠী নেই।
- রাসায়নিক শ্রেণি: নিকোটিনকে পাইরিডিন অ্যালকালয়েড (Pyridine Alkaloid), পাইরিডিন-পাইরোলিডিন অ্যালকালয়েড (Pyridine-Pyrrolidine Alkaloid) এবং তামাক অ্যালকালয়েড (Tobacco Alkaloid) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এর কাঠামোতে একটি অ্যারোমেটিক নাইট্রোজেনযুক্ত বলয় এবং একটি সম্পৃক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত বলয় উপস্থিত।
- আণবিক সংকেত (Molecular Formula): নিকোটিনের আণবিক সংকেত C₁₀H₁₄N₂। এর আণবিক ভর প্রায় ১৬২.২৩ গ্রাম/মোল। এতে দশটি কার্বন, চৌদ্দটি হাইড্রোজেন এবং দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু রয়েছে। এতে কোনো অক্সিজেন পরমাণু নেই।
সুতরাং: নিকোটিন একটি দুই-বলয়বিশিষ্ট প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড, যার একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট অ্যারোমেটিক পাইরিডিন বলয় এবং অন্যটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট সম্পৃক্ত পাইরোলিডিন বলয়। পাইরিডিনের ৩ নম্বর কার্বনের সঙ্গে পাইরোলিডিনের ২ নম্বর কার্বন যুক্ত এবং পাইরোলিডিনের ১ নম্বর নাইট্রোজেনে একটি মিথাইল গোষ্ঠী রয়েছে। পাইরোলিডিনের ২ নম্বর কার্বনটি কাইরাল কেন্দ্র হওয়ায় প্রাকৃতিক নিকোটিনের প্রধান রূপ (S)-নিকোটিন। অণুটির দুটি নাইট্রোজেনের একটি অ্যারোমেটিক পাইরিডিন নাইট্রোজেন এবং অন্যটি টারশিয়ারি অ্যামিন নাইট্রোজেন। নিকোটিন প্রধানত নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরের অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে স্নায়ুকোষের আয়ন চ্যানেল সক্রিয় করে এবং ডোপামিনসহ বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের সংকেত পরিবর্তন করে। এর পুরস্কারমূলক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক অভিযোজন নিকোটিননির্ভরতা ও আসক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে নিকোটিন (Nicotine) শব্দটি এসেছে তামাক উদ্ভিদের গণনাম নিকোটিয়ানা (Nicotiana) থেকে। এই গণনামের উৎস ষোড়শ শতকের ফরাসি কূটনীতিক জঁ নিকো (Jean Nicot, আনুমানিক ১৫৩০-১৬০৪)। তিনি পর্তুগালে ফরাসি রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত থাকার সময় তামাক উদ্ভিদের ঔষধি গুণের প্রচারে ভূমিকা রাখেন এবং ফ্রান্সে তামাকের পরিচিতি বিস্তারে অবদান রাখেন। তাঁর নাম অনুসারে উদ্ভিদটির গণনাম নিকোটিয়ানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে তামাক থেকে পৃথক করা প্রধান অ্যালকালয়েডটির নাম হয় নিকোটিন। ১৮২৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ ভিলহেল্ম হাইনরিখ পসেল্ট (Wilhelm Heinrich Posselt) এবং কার্ল লুডভিগ রাইমান (Karl Ludwig Reimann) তামাক থেকে নিকোটিন পৃথক করেন। এর রাসায়নিক নামের অন্য অংশগুলোরও স্বতন্ত্র ইতিহাস রয়েছে। পাইরিডিন (Pyridine) নামটি গ্রিক pyr অর্থাৎ আগুনের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ ঐতিহাসিকভাবে উত্তপ্ত জৈব পদার্থ ও হাড়ের শুষ্ক পাতন থেকে পাইরিডিনজাত যৌগ পাওয়া যেত। অন্যদিকে পাইরোলিডিন (Pyrrolidine) নামটি এসেছে পাইরোল (Pyrrole) থেকে; পাইরোল নামের উৎসও গ্রিক pyrrhos, যার অর্থ লালচে বা অগ্নিবর্ণ। পাইরোল শনাক্তকরণের প্রাথমিক রাসায়নিক পরীক্ষায় লাল বর্ণের উৎপাদ গঠনের সঙ্গে এই নামের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। পাইরোলের সম্পৃক্ত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নাইট্রোজেনযুক্ত বলয়কে পাইরোলিডিন বলা হয়। ফলে নিকোটিনের পূর্ণ ইউপ্যাক নাম তার রাসায়নিক কাঠামো, প্রতিস্থাপকের অবস্থান এবং ত্রিমাত্রিক বিন্যাসকে একত্রে প্রকাশ করে।
আণবিক স্তরে নিকোটিন কেন্দ্রীয় ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরে (Nicotinic Acetylcholine Receptor – nAChR) স্বাভাবিক নিউরোট্রান্সমিটার অ্যাসিটাইলকোলিনের (Acetylcholine) অনুকরণে যুক্ত হয়। এই রিসেপ্টরটি একটি লিগ্যান্ড-গেটেড আয়ন চ্যানেল (Ligand-Gated Ion Channel) বা আয়নোট্রপিক রিসেপ্টর (Ionotropic Receptor), যা পাঁচটি প্রোটিন সাবইউনিট নিয়ে গঠিত একটি পেন্টামেরিক কাঠামো (Pentameric Structure)। নিকোটিন এই রিসেপ্টরের স্বাভাবিক অ্যাসিটাইলকোলিন-বন্ধনস্থলে (Orthosteric Binding Site) যুক্ত হয়ে অ্যাগোনিস্ট (Agonist) হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এটি ডায়াজেপামের মতো পজিটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেটর (Positive Allosteric Modulator) নয়; বরং অ্যাসিটাইলকোলিনের অনুরূপভাবে রিসেপ্টরকে সরাসরি সক্রিয় করতে পারে। নিকোটিন রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হলে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটে এবং রিসেপ্টরের কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেল খুলে যায়। এই চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রধানত সোডিয়াম (Na⁺) ও পটাশিয়াম (K⁺) এবং নির্দিষ্ট রিসেপ্টর উপপ্রকারে ক্যালসিয়াম (Ca²⁺) আয়ন চলাচল করতে পারে। সাধারণ স্নায়ুকোষীয় পরিস্থিতিতে সোডিয়াম ও অন্যান্য ধনাত্মক আয়নের নিট অন্তঃপ্রবাহের ফলে কোষঝিল্লির ডিপোলারাইজেশন (Depolarization) ঘটে, অর্থাৎ ঝিল্লির অভ্যন্তরভাগের বৈদ্যুতিক বিভব তুলনামূলকভাবে কম ঋণাত্মক হয়ে ওঠে। এর ফলে নিউরনের উত্তেজনাশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং স্নায়বিক সংকেত পরিবহন প্রভাবিত হয়।
মস্তিষ্কে নিকোটিনের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরের বিভিন্ন উপপ্রকার (Receptor Subtypes) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের মধ্যে আলফা-৪-বিটা-২ (α4β2) এবং আলফা-৭ (α7) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলফা-৪-বিটা-২ রিসেপ্টর নিকোটিনের প্রতি উচ্চ সংবেদনশীল এবং মস্তিষ্কের পুরস্কার-সম্পর্কিত স্নায়ুপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে আলফা-৭ রিসেপ্টর তুলনামূলকভাবে অধিক ক্যালসিয়াম-ভেদ্য (Calcium-Permeable), ফলে এটি স্নায়বিক সংকেত পরিবহনের পাশাপাশি কোষের অভ্যন্তরীণ ক্যালসিয়াম-নির্ভর সংকেত ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area – VTA)-র ডোপামিন-সম্পর্কিত স্নায়ুকোষ এবং সেখান থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে (Nucleus Accumbens) বিস্তৃত মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থা (Mesolimbic Dopamine System) নিকোটিনের পুরস্কারমূলক প্রভাব ও আসক্তি বিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। নিকোটিন এই স্নায়ুপথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে ডোপামিন নিঃসরণ (Dopamine Release) বৃদ্ধি করতে পারে। এর ফলে সাময়িক পুরস্কারমূলক অনুভূতি, পুনরায় নিকোটিন গ্রহণের প্রবণতা এবং দীর্ঘমেয়াদে আসক্তির বিকাশ ঘটতে পারে। তবে নিকোটিনের প্রভাব কেবল ডোপামিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অ্যাসিটাইলকোলিন (Acetylcholine), নরঅ্যাড্রেনালিন (Noradrenaline), গ্লুটামেট (Glutamate) এবং গাবা (GABA)-সম্পর্কিত স্নায়বিক কার্যক্রমও পরিবর্তন করতে পারে। এসব নিউরোট্রান্সমিটারের সংকেত পরিবর্তনের ফলে সতর্কতা, মনোযোগ, উত্তেজনা, ক্ষুধা, মেজাজ এবং অন্যান্য জ্ঞানীয় ও শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তন দেখা যায়।
নিকোটিনের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শে রিসেপ্টর ও স্নায়বিক ব্যবস্থায় একাধিক অভিযোজনমূলক পরিবর্তন ঘটে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো রিসেপ্টর ডিসেনসিটাইজেশন (Receptor Desensitization), যেখানে নিকোটিন বা অন্য অ্যাগোনিস্ট রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও আয়ন চ্যানেল সাময়িকভাবে কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না। অর্থাৎ রিসেপ্টরটি লিগ্যান্ড-সংযুক্ত অবস্থায় থেকেও সংকেত পরিবহনের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় বা কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি নিকোটিন ব্যবহারে নির্দিষ্ট নিকোটিনিক রিসেপ্টর উপপ্রকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে পারে, যাকে রিসেপ্টর আপ-রেগুলেশন (Receptor Up-Regulation) বলা হয়। এই ডিসেনসিটাইজেশন, আপ-রেগুলেশন এবং অন্যান্য স্নায়বিক অভিযোজনের সম্মিলিত প্রভাবে নিকোটিনের কিছু কার্যকারিতার প্রতি সহনশীলতা (Tolerance) তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে শারীরিক নির্ভরতা (Physical Dependence) বিকশিত হতে পারে। ফলে নিয়মিত নিকোটিন গ্রহণকারী ব্যক্তি হঠাৎ এর ব্যবহার বন্ধ করলে প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ (Withdrawal Symptoms) অনুভব করতে পারেন। এসব উপসর্গের মধ্যে বিরক্তি, অস্থিরতা, মনোযোগের অসুবিধা, ঘুমের পরিবর্তন, মেজাজের অবনতি এবং নিকোটিন পুনরায় গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা ক্রেভিং (Craving) উল্লেখযোগ্য। এই স্নায়বিক অভিযোজন এবং মেসোলিম্বিক পুরস্কার ব্যবস্থার পরিবর্তন নিকোটিননির্ভরতা ও আসক্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অন্যতম জৈবিক ভিত্তি।
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের পাশাপাশি নিকোটিন স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের (Autonomic Nervous System) নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরেও কাজ করে। বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত গ্যাংলিয়া ও অ্যাড্রিনাল মেডুলার নিকোটিনিক রিসেপ্টর সক্রিয় করার মাধ্যমে এটি সিমপ্যাথেটিক কার্যক্রম (Sympathetic Activity) এবং ক্যাটেকোলামিন নিঃসরণ বৃদ্ধি করতে পারে। এর ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে নিকোটিন ক্ষুধা, অন্ত্রের কার্যক্রম এবং স্নায়বিক সতর্কতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অতিরিক্ত নিকোটিন গ্রহণ করলে নিকোটিন বিষক্রিয়া (Nicotine Poisoning) সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে বমিভাব, বমি, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, লালাক্ষরণ এবং হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। গুরুতর বিষক্রিয়ায় খিঁচুনি, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যাঘাত এবং জীবনসংকট তৈরি হতে পারে। তীব্র বিষক্রিয়ায় প্রাথমিক রিসেপ্টর উদ্দীপনার পর দীর্ঘস্থায়ী ডিসেনসিটাইজেশন ও স্নায়ু-পেশি সংকেত পরিবহনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশির কার্যকারিতাকেও বিপর্যস্ত করতে পারে।
নিকোটিন তামাকের প্রধান আসক্তি-সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদান (Addictive Chemical Constituent) হলেও নিকোটিনের নিজস্ব প্রভাব এবং তামাকের ধোঁয়ার সামগ্রিক বিষক্রিয়াকে এক করে দেখা যায় না। তামাকের ধোঁয়ায় নিকোটিন ছাড়াও বহু কার্সিনোজেন (Carcinogen), কার্বন মনোক্সাইড (Carbon Monoxide) এবং অন্যান্য দহনজাত বিষাক্ত পদার্থ থাকে। ধূমপানজনিত ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি বড় অংশ এসব দহনজাত রাসায়নিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে নিকোটিন নিজে প্রধানত আসক্তি, স্নায়বিক অভিযোজন এবং হৃদ্রক্তনালীয় কার্যক্রমে পরিবর্তন সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যদিও এটিও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই পার্থক্যের ভিত্তিতেই তামাকনির্ভরতা থেকে মুক্তির চিকিৎসায় নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (Nicotine Replacement Therapy – NRT) ব্যবহৃত হয়। এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নিকোটিন প্যাচ (Nicotine Patch), গাম (Nicotine Gum), লজেঞ্জ (Nicotine Lozenge) এবং অন্যান্য অনুমোদিত প্রস্তুতির মাধ্যমে নিকোটিন সরবরাহ করা হয়, যাতে তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর দহনজাত পদার্থের সংস্পর্শ ছাড়াই প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ ও নিকোটিনের আকাঙ্ক্ষা কমানো যায়। ফলে নিকোটিন একদিকে তামাকনির্ভরতা ও আসক্তির প্রধান রাসায়নিক ভিত্তি, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসাগত ব্যবহারে ধূমপান বন্ধে সহায়ক একটি ফার্মাকোলজিক্যাল উপাদান।
পরিশিষ্ট গ: স্নায়ুবিজ্ঞান, শারীরবৃত্ত ও মস্তিষ্কের জৈবকাঠামোগত পরিভাষা
মাদকাসক্তি, সাইকোঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতা, শারীরিক নির্ভরতা এবং মানসিক প্রত্যাহারের মতো ঘটনাগুলো কোনো বিমূর্ত নৈতিক ধারণা নয়; এগুলো মানব মস্তিষ্কের জটিল আণবিক নেটওয়ার্ক, সিন্যাপটিক সংযোগ এবং শারীরস্থানিক এলাকাগুলোর ভৌত রূপান্তর। স্নায়ুবিজ্ঞানের এই বিশেষ পরিভাষাগুলোর অধিকাংশই প্রাচীন গ্রিক ও ধ্রুপদী লাতিন শারীরস্থানিক ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ধ্রুপদী চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং শারীরস্থানে কোনো অঙ্গ বা স্নায়বিক অঞ্চলের নামকরণ করা হতো মূলত তার চাক্ষুষ আকৃতি (মরফোলজি), অবস্থান কিংবা কার্যকারিতার রূপক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। নিচে গ্রন্থে উল্লেখিত স্নায়ুবিজ্ঞানীয় অঞ্চল, রিসেপ্টর ব্যবস্থা, সংকেত প্রেরণকারী অণু এবং সেলুলার প্রক্রিয়াগুলোর বিশদ ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, রূপমূলতাত্ত্বিক ব্যাকরণ, শারীরবৃত্তীয় অবস্থান এবং আসক্তি ও চেতনার রূপান্তরে তাদের সুনির্দিষ্ট আণবিক মেকানিজম ব্যাখ্যা করা হলো।
মেসোলিম্বিক ডোপামিন পথ (Mesolimbic Dopamine Pathway)
আসক্তির প্রধান চালিকাশক্তি ও পুরস্কার ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় মহাসড়কটির নাম মেসোলিম্বিক ডোপামিন পথ (mesolimbic dopamine pathway)।
ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিভাষাটি দুটি প্রধান গ্রিক ও লাতিন শব্দমূলের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌগিক বিশেষণ পদ। এর প্রথম অংশ মেসো (meso-) এসেছে প্রাচীন গ্রিক বিশেষণ পদ মেসোস (mesos) থেকে, যার অর্থ মধ্যবর্তী, মধ্য বা মাঝখান; শারীরস্থানে যা মানুষের মধ্যমস্তিষ্ক বা মিডব্রেন (midbrain)-কে নির্দেশ করে। দ্বিতীয় অংশ লিম্বিক (limbic) এসেছে ধ্রুপদী লাতিন বিশেষ্য পদ লিম্বুস (limbus) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো কিনার, পাড়, প্রান্তসীমা বা বৃত্তাকার বেষ্টনী। ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি স্নায়ুচিকিৎসক পল ব্রোকা মস্তিষ্কের সেরেব্রাল কর্টেক্সের নিচে অবস্থিত বলয়াকার অঞ্চলগুলোকে সংজ্ঞায়িত করতে এই লাতিন শব্দমূল ব্যবহার করেছিলেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাসায়নিক সংকেতবাহী জৈব ক্ষারক ডোপামিন (dopamine) এবং প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত পথ নির্দেশক শব্দ পাথওয়ে (pathway)। ব্যাকরণগতভাবে ‘মেসোলিম্বিক’ একটি সম্বন্ধসূচক স্থাননির্দেশক বিশেষণ পদ।
শারীরস্থানিক দিক থেকে এই স্নায়বিক বর্তনীটি মধ্যমস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া থেকে শুরু হয়ে লিম্বিক সিস্টেমের নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স, অ্যামিগডালা এবং অলফ্যাক্টরি টিউবারকল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিবর্তনীয়ভাবে এই পথটির কাজ ছিল খাদ্যগ্রহণ, জলপান এবং বংশবৃদ্ধির মতো প্রজাতি টিকিয়ে রাখার মৌলিক জৈবিক আচরণের জন্য আনন্দ বা তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে সেই কাজের পুনরাবৃত্তিকে নিশ্চিত করা। কিন্তু মরফিন, কোকেন, নিকোটিন বা অ্যালকোহলের মতো যেকোনো মাদক যখন রক্তে মেশে, তখন তা স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার চেয়ে কয়েক গুণ থেকে শত গুণ বেশি ডোপামিন এই পথে নির্গত করে। ফলে মেসোলিম্বিক পথটি একটি মিথ্যা সংকেত পায় যে মাদক গ্রহণ করাই বেঁচে থাকার সবচেয়ে জরুরি কাজ। এই সংকেত মানুষের সমগ্র প্রেরণাদায়ী কাঠামোকে ছিনতাই করে নেয়।
ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area – VTA)
মেসোলিম্বিক পথের উৎপত্তিস্থল ও ডোপামিন উৎপাদনকারী প্রাথমিক কোষগুচ্ছের নাম ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area – VTA)।
নামটির ব্যুৎপত্তি সম্পূর্ণ লাতিন শারীরস্থানিক পরিভাষা থেকে গঠিত। প্রথম পদ ভেন্ট্রাল (ventral) এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ ভেন্টার (venter) থেকে, যার অর্থ পেট, উদর বা সামনের তলদেশ। শারীরস্থানে মেরুদণ্ড বা মস্তিষ্কের যে অংশটি ভূমির দিকে বা নিচের দিকে মুখ করে থাকে, তাকে ভেন্ট্রাল বলা হয়। দ্বিতীয় পদ টেগমেন্টাল (tegmental) এসেছে লাতিন বিশেষ্য টেগমেন্টুম (tegmentum) থেকে, যার অর্থ ছাদ, আবরণ বা ঢাকনা (লাতিন ক্রিয়ামূল টেগেরে [tegere], অর্থ আচ্ছাদন করা)। তৃতীয় পদ এরিয়া (area) একটি লাতিন বিশেষ্য, যার অর্থ উন্মুক্ত স্থান, সমতল প্রাঙ্গণ বা চত্বর। ব্যাকরণগতভাবে এটি দুটি লাতিন বিশেষণ পদ দ্বারা বিশেষিত একটি স্থানবাচক বিশেষ্য পদ, যার সামগ্রিক অর্থ ‘মস্তিষ্কের আচ্ছাদনের তলদেশীয় অঞ্চল’।
শারীরবৃত্তীয় বিচারে এটি মধ্যমস্তিষ্কের তলদেশে অবস্থিত হেটেরোজেনাস বা বিচিত্র কোষের একটি নিউক্লিয়ার সমষ্টি। এই অঞ্চলে প্রধানত এ-টেন (A10) গ্রুপের ডোপামিনার্জিক নিউরন থাকে, যা সমগ্র মস্তিষ্কের প্রায় সমস্ত পুরষ্কার সার্কিটের মূল কেন্দ্র। এর পাশাপাশি এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গাবা ইনহিবিটরি নিউরন (GABAergic inhibitory neurons) এবং গ্লুটামেটার্জিক নিউরন থাকে। সাধারণ অবস্থায় গাবা নিউরনগুলো ডোপামিন নিঃসরণের ওপর একটি জৈবিক ব্রেক চেপে রাখে। কিন্তু ওপিওয়েড বা ক্যানাবিনয়েডের মতো মাদকগুলো গাবা নিউরনের ওপর থাকা রিসেপ্টরে বসে সেই ব্রেককে অকেজো করে দেয়, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ডিসইনহিবিশন (disinhibition) বলা হয়। ব্রেক সরে যাওয়ার সাথে সাথে ভিটিএ-র ডোপামিন নিউরনগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফায়ার করতে শুরু করে এবং মেসোলিম্বিক পথে ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দেয়।
নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স (Nucleus Accumbens – NAc)
মস্তিষ্কের আনন্দ, অনুপ্রেরণা এবং আসক্তির কেন্দ্রীয় মঞ্চটির নাম নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স (Nucleus Accumbens – NAc)। শারীরস্থানে এর পূর্ণ লাতিন নাম হলো নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স সেপ্টি (nucleus accumbens septi)।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি লাতিন ব্যাকরণের একটি চমৎকার উদাহরণ। প্রথম শব্দ নিউক্লিয়াস (nucleus) এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ নুক্স (nux, যার সম্বন্ধ পদ nucis) থেকে, যার অর্থ শক্ত খোসাবিশিষ্ট বাদাম বা ছোট বীজ। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনকারী ঘন স্নায়ুকোষের গুচ্ছকে ‘নিউক্লিয়াস’ বলা হয়। দ্বিতীয় শব্দ অ্যাকাম্বেন্স (accumbens) হলো লাতিন ক্রিয়াপদ অ্যাকুম্বেরে (accumbere)-এর প্রেজেন্ট অ্যাক্টিভ পার্টিসিপল বা বর্তমান কৃদন্ত রূপ, যার অর্থ ‘পাশে হেলান দিয়ে শোয়া’ বা ‘ঘেঁষে অবস্থান করা’। তৃতীয় শব্দ সেপ্টি (septi) হলো লাতিন দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের বিশেষ্য পদ সেপ্টাম (septum, বিভাজক পর্দা বা প্রাচীর)-এর একবচন জেনিটিভ বা ষষ্ঠী বিভক্তির রূপ। ব্যাকরণগতভাবে পুরো পদবন্ধটির অর্থ দাঁড়ায় ‘মস্তিষ্কের বিভাজক পর্দার পাশে হেলান দিয়ে থাকা স্নায়ুকোষের কেন্দ্র’।
শারীরস্থানিক বিচারে এটি সাবকর্টিক্যাল অঞ্চলের ভেন্ট্রাল স্ট্রাইটামের প্রধান অংশ। এটি দুটি স্বতন্ত্র কার্যকরী অংশে বিভক্ত: ভেতরের কোর (core) এবং বাইরের শেল (shell)। শেল অংশটি লিম্বিক ব্যবস্থার সাথে সরাসরি যুক্ত এবং এটি প্রাথমিক আনন্দের অনুভূতি বা হেডোনিক ইমপ্যাক্ট (hedonic impact) তৈরি করে। কোনো রাসায়নিক মাদক গ্রহণ করার সাথে সাথে এই শেল অঞ্চলে ডোপামিনের মাত্রা বিস্ফোরক হারে বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদী আসক্তির ফলে এই অঞ্চলের মিডিয়াম স্পাইনি নিউরনগুলোতে জিনগত ও আণবিক পরিবর্তন ঘটে, যা ব্যক্তিকে মাদকের প্রতি এক বাধ্যতামূলক দাসত্বে বন্দি করে ফেলে।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex – PFC)
মানুষের বিচারবুদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex – PFC)।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে পরিভাষাটি তিনটি লাতিন শব্দাংশের সমন্বয়ে নির্মিত। প্রথম অংশ লাতিন উপসর্গ প্রি (pre-), যার অর্থ পূর্বে, সম্মুখে বা আগে। দ্বিতীয় অংশ ফ্রন্টাল (frontal) এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ ফ্রনস (frons, যার জেনিটিভ রূপ frontis) থেকে, যার অর্থ কপাল, ললাট বা সম্মুখভাগ। তৃতীয় অংশ কর্টেক্স (cortex) একটি স্বতন্ত্র লাতিন বিশেষ্য পদ, যার আদি আক্ষরিক অর্থ ছিল গাছের বাকল, ছাল বা বহিরাবরণ (লাতিন ক্রিয়ামূল কোরিয়াম [corium], চামড়া বা ছাল থেকে জাত)। শারীরস্থানে মস্তিষ্কের সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের বাইরের যে পাতলা খাঁজকাটা ধূসর স্তরে সমস্ত সংজ্ঞানাত্মক চিন্তা ঘটে, তাকে কর্টেক্স বলা হয়। সুতরাং শব্দটির সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায় ‘ললাটের সম্মুখভাগে অবস্থিত মস্তিষ্কের বহিরাবরণ’।
এটি মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে নবীন এবং বিবর্তিত অংশ। মানুষের বিচারবুদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ, পরিণামদর্শিতা এবং তাৎক্ষণিক আবেগকে আটকে রাখার মতো সমস্ত কার্যনির্বাহী নিয়ন্ত্রণ (executive control) এই অঞ্চলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। মাদকাসক্তির বিকাশ ঘটলে এই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি পঙ্গু হয়ে পড়ে। ড্রাগের অতি-উদ্দীপনার মুখে কর্টেক্সের ধূসর কোষগুলোর সাথে স্ট্রাইটামের সংযোগ শিথিল হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাইপোফ্রন্টালিটি (hypofrontality) বলা হয়। এর ফলে আসক্ত ব্যক্তি নিজের চোখ দিয়ে পরিবার ও স্বাস্থ্যের ধ্বংস দেখতে পেলেও তার প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মাদক গ্রহণের অদম্য তাড়নার বিরুদ্ধে ‘না’ বলার মতো রাসায়নিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
অ্যামিগডালা (Amygdala)
মস্তিষ্কের ভয়, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের স্মৃতি সংরক্ষণকারী কেন্দ্রটির নাম অ্যামিগডালা (Amygdala)। এর পূর্ণ লাতিন শারীরস্থানিক নাম হলো কর্পাস অ্যামিগডালয়ডিয়াম (corpus amygdaloideum)।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি একটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ থেকে সরাসরি লাতিনে স্থানান্তরিত হয়েছে। শব্দটি এসেছে গ্রিক বিশেষ্য পদ অ্যামিগদালে (amygdale) থেকে, যার অর্থ হলো ‘কাঠবাদাম’ (almond)। এর পূর্ণ নামের দ্বিতীয় পদ অ্যামিগডালয়ডিয়াম গঠিত হয়েছে ‘অ্যামিগদালে’-র সাথে গ্রিক সাদৃশ্যবাচক প্রত্যয় -ওইদেস (-oeides, যার অর্থ মতো বা সদৃশ) যুক্ত করে। মস্তিষ্কের মিডিয়াল টেম্পোরাল লোবের গভীরে অবস্থিত এই স্নায়ুকেন্দ্রটি দেখতে হুবহু একটি ছোট কাঠবাদামের মতো বলেই দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন এর এমন রূপক নামকরণ করেছিলেন। ব্যাকরণগতভাবে এটি লাতিন প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ।
এটি লিম্বিক সিস্টেমের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ, যার প্রধান কাজ হলো পরিবেশের কোনো উদ্দীপক বিপজ্জনক কি না তা দ্রুত নির্ধারণ করা এবং ভয় ও আতঙ্কের আবেগীয় স্মৃতি মস্তিষ্কে খোদাই করে রাখা। মাদকাসক্তির দ্বিতীয় পর্যায়, অর্থাৎ আসক্তির অন্ধকার দিক বা উইথড্রয়াল ফেজ (withdrawal phase)-এ অ্যামিগডালা দানবীয় রূপ ধারণ করে। মাদক সরবরাহ বন্ধ হলে এক্সটেন্ডেড অ্যামিগডালা থেকে অতিমাত্রায় কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং ফ্যাক্টর (corticotropin-releasing factor – CRF) এবং ডাইনরফিন নিঃসৃত হয়। এর ফলে আসক্ত ব্যক্তি কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই তীব্র ভয়, শূন্যতা, অস্থিরতা এবং গভীর বিষাদে আক্রান্ত হয়। এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মস্তিষ্ক পুনরায় মাদকের জন্য হাহাকার করে ওঠে।
হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)
স্মৃতি তৈরি, সংরক্ষণ এবং ভৌগোলিক পরিবেশের প্রেক্ষাপট নির্ধারণের কেন্দ্র হলো হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)।
নামটির ব্যুৎপত্তি পৌরাণিক ও রূপক চিত্রকল্পের এক চমৎকার সংমিশ্রণ। শব্দটি এসেছে দুটি প্রাচীন গ্রিক শব্দের মিলনে: প্রথম অংশ গ্রিক বিশেষ্য পদ হিপ্পোস (hippos), যার অর্থ ঘোড়া বা অশ্ব; এবং দ্বিতীয় অংশ গ্রিক বিশেষ্য কাম্পোস (kampos), যার অর্থ সামুদ্রিক দানব বা জলজ জন্তু। গ্রিক পুরাণে হিপোক্যাম্পাস ছিল সমুদ্র দেবতা পসাইডনের রথ বহনকারী পৌরাণিক জীব, যার সামনের অর্ধেক ছিল ঘোড়া এবং পেছনের অর্ধেক ছিল মাছের লেজের মতো বাঁকানো। ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীয় অ্যানাটমিস্ট জুলিয়াস সিজার আরানজি মানুষের মস্তিষ্কের এই বাঁকানো অংশটি পর্যবেক্ষণ করে জীবন্ত সামুদ্রিক ঘোড়া বা সী-হর্সের শারীরিক রূপের সাথে এর গভীর মিল খুঁজে পান এবং ১৫৮৭ সালে এই নাম দেন। ব্যাকরণগতভাবে এটি লাতিন দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের একটি পুংলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ।
শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে এটি কর্টেক্সের নিচে টেম্পোরাল লোবের মেঝের ওপর একটি বাঁকানো শৈলশিরার মতো অবস্থান করে। এটি কোনো একক ঘটনার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট এবং পারিপার্শ্বিক সংকেতের স্মৃতি বা কনটেক্সচুয়াল মেমরি (contextual memory) তৈরি করে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি অতীতে ঠিক কোন ঘরে, কোন সঙ্গীদের সাথে, কোন বিশেষ মুহূর্তে মাদক নিয়েছিল – সেই স্থান ও পরিবেশের যাবতীয় বিবরণ হিপোক্যাম্পাসে সংরক্ষিত থাকে। ফলে বছরের পর বছর মাদক ত্যাগ করার পরও একজন ব্যক্তি যখন সেই পুরনো স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় প্রবেশ করে, তখন হিপোক্যাম্পাস তাৎক্ষণিকভাবে সেই স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে বার্তা পাঠায় এবং তীব্র রিল্যাপ্স ঘটায়।
লোকাস সেরুলিয়াস (Locus Coeruleus – LC)
শারীরিক প্রত্যাহার সংকট ও অ্যালার্ম ব্যবস্থার স্নায়বিক কেন্দ্রটির নাম লোকাস সেরুলিয়াস (Locus Coeruleus – LC)।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে এটি দুটি খাঁটি ধ্রুপদী লাতিন শব্দের সমাসবদ্ধ রূপ। প্রথম শব্দ লোকাস (locus) লাতিন দ্বিতীয় ডিক্লেনশনের একটি পুংলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ, যার সাধারণ অর্থ স্থান, বিন্দু, দাগ বা অঞ্চল। দ্বিতীয় শব্দ সেরুলিয়াস (coeruleus) একটি লাতিন বর্ণবাচক বিশেষণ পদ, যার অর্থ গাঢ় আকাশী-নীল, আসমানি বা গাঢ় নীল (যা লাতিন বিশেষ্য কায়লুম [caelum, অর্থ আকাশ] থেকে আগত)। তাজা মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু ব্যবচ্ছেদ করলে এতে থাকা মেলানিন ও নিউরোমেলানিন রঞ্জক পদার্থের কারণে এই অংশটিকে স্পষ্টভাবে একটি নীলচে-কালো বিন্দুর মতো দেখায়। অষ্টাদশ শতকে জার্মান শারীরস্থানবিদ ফেলিক্স ভিক-দাজির এই নীলচে আভা প্রত্যক্ষ করে এর নামকরণ করেন। ব্যাকরণগতভাবে পুংলিঙ্গ বিশেষ্যের সাথে সংগতি রেখে পুংলিঙ্গীয় বিশেষণ ‘সেরুলিয়াস‘ যুক্ত হয়েছে।
শারীরস্থানিক দিক থেকে এটি ব্রেনস্টেমের পনস অংশের চতুর্থ ভেন্ট্রিকলের তলদেশে অবস্থিত। মানবদেহে নর-অ্যাড্রেনালিন বা নর-এপিনেফ্রিন (norepinephrine) ক্ষরণের এটিই সর্ববৃহৎ স্নায়বিক কারখানা। আফিম, মরফিন বা হেরোইনের মতো ওপিওয়েডগুলো এই লোকাস সেরুলিয়াসের নিউরনে থাকা মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরে বসে এই নীল বিন্দুটিকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও অবদমিত করে রাখে। কিন্তু দিনের পর দিন মাদক নেওয়ার ফলে লোকাস সেরুলিয়াস সেই কৃত্রিম অবদমন সহ্য করার জন্য ভেতরে ভেতরে নিজের অভ্যন্তরীণ অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিক মাত্রায় শক্তিশালী করে তোলে। যখনই ব্যক্তি হঠাৎ মাদক নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন বাহ্যিক ওপিওয়েডের বাধা সরে যায় এবং লোকাস সেরুলিয়াস উন্মত্তের মতো চারপাশের স্নায়ুতন্ত্রে নর-এপিনেফ্রিনের প্রবল বন্যা বইয়ে দেয়। এর ফলেই শুরু হয় ওপিওয়েড প্রত্যাহারের ধ্রুপদী শারীরিক নরকযন্ত্রণা – অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি, ঠান্ডা ঘাম, পেশির তীব্র খিঁচুনি, ডায়রিয়া এবং চরম শারীরিক আতঙ্ক।
স্ট্রাইটাম ও হ্যাবিট লুপ: ভেন্ট্রাল বনাম ডরসাল স্ট্রাইটাম (Ventral vs. Dorsal Striatum and Habit Loop)
মাদকাসক্তির প্রাথমিক আনন্দ থেকে বাধ্যতামূলক অভ্যাসে রূপান্তরের পথটি নিয়ন্ত্রিত হয় স্ট্রাইটাম (Striatum)-এর মাধ্যমে।
‘স্ট্রাইটাম’ শব্দটি এসেছে লাতিন ক্রিয়াবাচক বিশেষণ স্ট্রিয়াটুস (striatus) থেকে, যার মূল ক্রিয়ামূল লাতিন স্ট্রিয়ারে (striare), যার অর্থ ডোরাকাটা করা, খাঁজকাটা করা বা রেখাঙ্কিত করা (লাতিন বিশেষ্য স্ট্রিয়া [stria, অর্থ সমান্তরাল দাগ বা রেখা] থেকে জাত)। এই অঞ্চলে সাদা মায়েলিনযুক্ত স্নায়ুতন্তু এবং ধূসর কোষের স্তর পর্যায়ক্রমে সমান্তরালভাবে সাজানো থাকে বলে অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচে একে একটি ডোরাকাটা বা রেখাঙ্কিত কাঠামোর মতো দেখায়। লাতিন শারীরস্থানে এর পূর্ণ রূপ হলো কর্পাস স্ট্রিয়াটাম (corpus striatum), যার অর্থ ‘রেখাঙ্কিত দেহ’। এর দুটি ভাগ রয়েছে: ‘ভেন্ট্রাল’ (তলদেশীয়) এবং ডরসাল (dorsal), যা এসেছে লাতিন বিশেষ্য ডরসাম (dorsum, যার অর্থ পিঠ বা পেছনের ওপরের অংশ) থেকে।
আসক্তির স্নায়ুবিজ্ঞানে এই স্ট্রাইটামের বিভাজন অত্যন্ত অর্থবহ। প্রাথমিক পর্যায়ে যখন কোনো ব্যক্তি কৌতূহল বা আনন্দের জন্য মাদক নেয়, তখন নিয়ন্ত্রণ থাকে ভেন্ট্রাল স্ট্রাইটাম (যার মধ্যে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স অন্তর্ভুক্ত)-এর হাতে। এই পর্যায়ের আচরণটি লক্ষ্যনির্ভর বা গোল-ডিরেক্টেড (goal-directed)। কিন্তু আচরণটি যখন শত শত বার পুনরাবৃত্ত হয়, তখন স্নায়বিক সংকেতের কেন্দ্র ধীরে ধীরে ওপরের দিকে সরে গিয়ে ডরসাল স্ট্রাইটামে স্থানান্তরিত হয়। ডরসাল স্ট্রাইটামের কাজ হলো স্বয়ংক্রিয় অভ্যাস তৈরি করা। একবার নিয়ন্ত্রণ ডরসাল স্ট্রাইটামে চলে গেলে ড্রাগ নেওয়া আর কোনো সচেতন আনন্দ বা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি অবচেতন, যান্ত্রিক ও বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত হয়। ব্যক্তি তখন জানে যে এই ডোজে কোনো আনন্দ নেই এবং এর পরিণতি ধ্বংস, তবুও তার ডরসাল স্ট্রাইটাম রোবটের মতো হাত বাড়িয়ে মাদক গ্রহণ করিয়ে নেয়।
কডেট নিউক্লিয়াস (Caudate Nucleus) এবং পুটামেন (Putamen) – মস্তিষ্কের ডরসাল স্ট্রায়াটামের (Dorsal Striatum) অন্তর্গত এই দুটি কাঠামোর নামই লাতিন ভাষা থেকে উদ্ভূত। কডেট (Caudate) শব্দটির ইংরেজি উচ্চারণ /ˈkɔːdeɪt/, যার উৎস লাতিন কাউদাতুস (caudātus) /kau̯ˈdaː.tus/, অর্থ ‘লেজযুক্ত’। শব্দটি গঠিত হয়েছে লাতিন কাউদা (cauda) /ˈkau̯.da/, অর্থ ‘লেজ’, এবং বৈশিষ্ট্যসূচক প্রত্যয় -আতুস (-ātus) থেকে। কডেট নিউক্লিয়াসের দীর্ঘ, বাঁকানো, প্রায় সি-আকৃতির গঠন এবং এর মস্তক (Head), দেহ (Body) ও লেজ (Tail) অংশের উপস্থিতির কারণেই এমন নামকরণ করা হয়েছে। একই লাতিন মূল থেকে ইংরেজি কডাল (Caudal) /ˈkɔːdəl/ শব্দের উৎপত্তি, যা শারীরস্থানে লেজের দিক বা দেহের নিম্নপ্রান্তের দিক নির্দেশ করে। অন্যদিকে, পুটামেন (Putamen) শব্দটির ইংরেজি উচ্চারণ /pjuːˈteɪmən/, যা সরাসরি লাতিন পুটামেন (putāmen) /puˈtaː.men/ থেকে এসেছে; এর অর্থ ‘খোসা’, ‘ছাল’ বা ‘আবরণ’। শব্দটির উৎস লাতিন ক্রিয়া পুটারে (putāre) /puˈtaː.re/, যার প্রাথমিক অর্থ ছিল ‘ছাঁটা’, ‘পরিষ্কার করা’ বা ‘অপ্রয়োজনীয় অংশ কেটে ফেলা’। এই ক্রিয়ামূলের সঙ্গে নামগঠনকারী প্রত্যয় -মেন (-men) যুক্ত হয়ে পুটামেন শব্দটির উৎপত্তি। মস্তিষ্কে পুটামেন গ্লোবাস প্যালিডাসের (Globus Pallidus) পার্শ্ববর্তী দিকে অবস্থান করে এবং উভয়ে মিলে লেন্টিফর্ম নিউক্লিয়াস (Lentiform Nucleus) গঠন করে; এই কাঠামোর বাইরের অংশ হিসেবে পুটামেনের আবরণসদৃশ অবস্থান থেকেই এর নামকরণ। উল্লেখযোগ্যভাবে, লাতিন পুটারে ক্রিয়াটির অর্থ পরবর্তীকালে ‘হিসাব করা’, ‘বিবেচনা করা’ ও ‘চিন্তা করা’-তে সম্প্রসারিত হয়। ফলে একই ক্রিয়ামূল থেকে ইংরেজি কম্পিউট (Compute) /kəmˈpjuːt/, কম্পিউটার (Computer) /kəmˈpjuːtər/, ডিসপিউট (Dispute) /dɪˈspjuːt/, ইমপিউট (Impute) /ɪmˈpjuːt/ এবং রেপুটেশন (Reputation) /ˌrɛpjəˈteɪʃən/ প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তবে লাতিন কাউদা ও পুটারে শব্দের প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় (Proto-Indo-European) উৎস নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; ফলে এগুলোর সঙ্গে সংস্কৃতের কোনো শব্দের নির্ভরযোগ্য সমগোত্রীয় সম্পর্কও নির্দিষ্ট করা যায় না।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
ইনসুলার কর্টেক্স বা ইনসুলা (Insular Cortex / Insula)
মাদকের প্রতি তীব্র শারীরিক ব্যাকুলতা ও অভ্যন্তরীণ অনুভূতির অনুঘটক স্নায়ুকেন্দ্রের নাম ইনসুলার কর্টেক্স বা ইনসুলা (Insular Cortex / Insula)।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ‘ইনসুলা’ একটি খাঁটি ধ্রুপদী লাতিন বিশেষ্য পদ। লাতিন ইনসুলা (insula) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘দ্বীপ’ (island)। মানব মস্তিষ্কের ল্যাটেরাল সালকাস নামক গভীর গিরিখাতের চামড়া টেনে আলাদা করলে সেরিব্রাল কর্টেক্সের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ডিম্বাকৃতির দ্বীপের মতো ভাঁজ চোখে পড়ে। মস্তিষ্কের মূল কর্টেক্স থেকে একাকী ও বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করার কারণে ১৮০৯ সালে জার্মান শারীরস্থানবিদ জোহান ক্রিশ্চিয়ান রেইল একে এই রূপক নাম দেন। ব্যাকরণগতভাবে এটি প্রথম ডিক্লেনশনের একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিশেষ্য পদ।
শারীরবৃত্তীয় গবেষণায় দেখা গেছে, ইনসুলা মানুষের দেহের অভ্যন্তরীণ জৈবিক সংকেত বা ভিসেরাল সিগন্যাল – যেমন হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, পেটের অস্বস্তি এবং তৃষ্ণার অনুভূতিকে সচেতন অনুভূতির সাথে যুক্ত করে, যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ইন্টেরোসেপশন (interoception) বলা হয়। মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে এই ইনসুলা হলো তীব্র ক্রেভিং বা মানসিক আকুলতার কেন্দ্রবিন্দু। যখন একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি কোনো ড্রাগের ছবি দেখে বা প্রত্যাহারের মুখোমুখি হয়, তখন ইনসুলা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠে ব্যক্তির বুকে ধড়ফড়ানি, হাত কাঁপা এবং অস্থিরতার এক অসহ্য শারীরিক সংকেত তৈরি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখা গেছে, যেসব ধূমপায়ী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ইনসুলায় আঘাত পেয়েছেন, তারা পরদিন সকালে কোনো কষ্ট বা প্রত্যাহার যন্ত্রণা ছাড়াই কয়েক দশকের ধূমপানের তীব্র নেশা অলৌকিকভাবে ভুলে গেছেন।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (Default Mode Network – DMN)
সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা, অহং-বিলুপ্তি এবং গভীর ধ্যানের কেন্দ্রীয় স্নায়ুবর্তনীর নাম ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (Default Mode Network – DMN)।
পরিভাষাটির ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আধুনিক সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞানের একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। প্রথম শব্দ ডিফল্ট (default) এসেছে প্রাচীন ফরাসি বিশেষ্য পদ দেফোত (defaute) বা ক্রিয়াপদ দেফায়ির (defaillir) থেকে, যার অর্থ অনুপস্থিত থাকা, ব্যর্থ হওয়া বা কোনো বাহ্যিক নির্দেশনার অনুপস্থিতিতে পূর্বনির্ধারিত থাকা। দ্বিতীয় শব্দ মোড (mode) এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ মোদুস (modus) থেকে, যার অর্থ পরিমাপ, ধরণ, নিয়ম বা ছন্দ। তৃতীয় শব্দটি আধুনিক যৌগিক পদ নেটওয়ার্ক (network)। ২০০১ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী মার্কাস রাইখেল লক্ষ্য করেন যে একজন মানুষকে যখন কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক মনোযোগের কাজ করতে না দিয়ে এমআরআই মেশিনে চোখ বন্ধ করে অলস বসিয়ে রাখা হয়, তখন তার মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল অদ্ভুত ছন্দে একযোগে জ্বলে ওঠে। অর্থাৎ এটি হলো মস্তিষ্কের পূর্বনির্ধারিত বিশ্রামের মোড।
এই নেটওয়ার্কটি মূলত পোস্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স, মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং ইনফেরিয়র প্যারাইটাল লোবিউল নিয়ে গঠিত। মানুষের আত্মসচেতনতা, নিজের সাথে নিজের কথা বলা, অতীতের স্মৃতি রোমন্থন, সামাজিক পরিচয় এবং অহংবোধ বা ‘ইগো’-র জৈবিক কেন্দ্র হলো এই ডিএমএন। এলএসডি, সাইলোসাইবিন কিংবা ডিএমটির মতো ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিক ড্রাগগুলো যখন সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, তখন এই ডিএমএন-এর অভ্যন্তরীণ সংযোগ মুহূর্তের মধ্যে শিথিল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের কৃত্রিম অহংবোধ এবং পারিপার্শ্বিক মহাবিশ্বের মধ্যকার সীমানা মুছে যায়। ব্যক্তি তখন অনুভব করে যে তার নিজের শারীরিক অস্তিত্ব নেই এবং সে সমস্ত সৃষ্টির সাথে একাকার হয়ে গেছে। প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিক ও মরমী সাধকেরা এই স্নায়বিক বিচ্ছিন্নতাকেই পরমাত্মার সাথে মিলন বা ঈশ্বরদর্শন বলে ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (Blood-Brain Barrier – BBB)
মস্তিষ্কের সুরক্ষামূলক আণবিক দেয়ালটির বৈজ্ঞানিক নাম রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (Blood-Brain Barrier – BBB)।
জার্মান চিকিৎসক পল এরলিখ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে লক্ষ্য করেছিলেন যে ইঁদুরের রক্তে নীল রঞ্জক পদার্থ ইনজেকশন দিলে দেহের সমস্ত অঙ্গ নীল হয়ে যায়, কিন্তু মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অক্ষত ও সাদা থেকে যায়। এর ভিত্তি থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই ধারণার উৎপত্তি। শব্দটি গঠিত হয়েছে রক্ত এবং মস্তিষ্কের মধ্যকার প্রতিরক্ষামূলক ব্যারিকেড বা প্রতিবন্ধকতার ধারণা থেকে।
শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে এটি কোনো সাধারণ ঝিল্লি নয়। মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালী বা কৈশিক নালীর ভেতরের প্রাচীর তৈরিকারী এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলো একে অপরের সাথে অত্যন্ত শক্ত ও নিশ্ছিদ্র আণবিক বন্ধন বা টাইট জংশন (tight junctions) দিয়ে জোড়া লাগানো থাকে। এর সাথে বাইরে থেকে অ্যাস্ট্রোসাইট নামক গ্লিয়াল কোষের পদপ্রবর্ধক বা ‘এন্ড-ফিট’ মস্তিষ্কের কৈশিক রক্তনালীগুলোর বাইরের পৃষ্ঠের অধিকাংশ অংশ ঘিরে রাখে। এর প্রধান কাজ হলো রক্তের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং জল-দ্রবণীয় বিষাক্ত পদার্থকে মস্তিষ্কের সংবেদনশীল নিউরনে প্রবেশ করতে না দেওয়া। যেকোনো মাদক কত দ্রুত মস্তিষ্কে নেশা তৈরি করবে, তা নির্ভর করে ড্রাগটির এই বাধা অতিক্রম করার ক্ষমতার ওপর। হেরোইন বা ডায়াফিনের চর্বি-দ্রবণীয়তা মরফিনের চেয়ে বেশি হওয়ায় তা এই দেয়াল নিমেষেই পার হয়ে যায়। অন্যদিকে জল-দ্রবণীয় যৌগগুলো এই দেয়ালে আটকে যায়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল অক্ষ (Hypothalamic-Pituitary-Adrenal Axis – HPA Axis)
শৈশবের ট্রমা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং আসক্তির জৈবিক অনুঘটকটির নাম হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল অক্ষ (Hypothalamic-Pituitary-Adrenal Axis – HPA Axis)।
ব্যুৎপত্তিগতভাবে এটি তিনটি স্বতন্ত্র অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির নামের সমন্বয়। প্রথম অংশ হাইপোথ্যালামিক (hypothalamic) এসেছে গ্রিক উপসর্গ হাইপো (hypo-, যার অর্থ নিচে বা তলদেশে) এবং গ্রিক বিশেষ্য থ্যালামোস (thalamos, অর্থ অন্তঃকক্ষ বা শয়নকক্ষ) থেকে, যা মস্তিষ্কের থ্যালামাসের নিচে অবস্থিত অঞ্চলকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয় অংশ পিটুইটারি (pituitary) এসেছে লাতিন বিশেষ্য পদ পিটুইটা (pituita) থেকে, যার প্রাচীন অর্থ ছিল শ্লেষ্মা বা কফ; প্রাচীন বিশ্বাস ছিল এই ক্ষুদ্র গ্রন্থিটি মস্তিষ্ক থেকে নাকে কফ নিঃসরণ করে। তৃতীয় অংশ অ্যাড্রেনাল (adrenal) গঠিত হয়েছে লাতিন উপসর্গ অ্যাড (ad-, যার অর্থ কাছে বা উপরে) এবং লাতিন বিশেষ্য রেন (ren, যার অর্থ বৃক্ক বা কিডনি) মিলিয়ে, অর্থাৎ যা কিডনির ওপর অবস্থিত। ব্যাকরণগতভাবে এটি একটি ত্রিমুখী শারীরস্থানিক অক্ষ নির্দেশক পদবন্ধ।
এটি মানুষের শরীরের প্রধান মানসিক চাপ প্রতিক্রিয়া বা স্ট্রেস রেসপন্স (Stress Response) নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা, যার নাম হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল অক্ষ (Hypothalamic-Pituitary-Adrenal Axis, HPA Axis)। পরিবেশের কোনো ভীতি বা মানসিক আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus) থেকে কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং ফ্যাক্টর (Corticotropin-Releasing Factor, CRF) (যা কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং হরমোন (Corticotropin-Releasing Hormone, CRH) নামেও পরিচিত) নিঃসৃত হয়। এটি পিটুইটারি গ্রন্থির (Pituitary Gland) অগ্রখণ্ডকে অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিক হরমোন (Adrenocorticotropic Hormone, ACTH) নিঃসরণে উদ্দীপিত করে। এই হরমোন রক্তের মাধ্যমে কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির (Adrenal Gland) বহিঃস্তর বা অ্যাড্রেনাল কর্টেক্সে (Adrenal Cortex) পৌঁছে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল (Cortisol) নিঃসরণ বাড়ায়। শৈশবে যেসব শিশু চরম পারিবারিক নির্যাতন, যুদ্ধ বা অবহেলার শিকার হয়, তাদের এই এইচপিএ অক্ষের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে কারও ক্ষেত্রে এটি অতিসক্রিয়, আবার কারও ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় হয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিবর্তন প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মানসিক চাপের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, বিষণ্নতা ও অসহায়ত্বের অনুভূতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ অবস্থায় কিছু ব্যক্তি নিজেদের মানসিক অস্বস্তি সাময়িকভাবে প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে মাদক গ্রহণকে আত্ম-চিকিৎসা (Self-Medication) হিসেবে বেছে নিতে পারেন।
সিন্যাপস ও সিন্যাপটিক ফাঁক (Synapse and Synaptic Cleft)
স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যকার যোগাযোগ বিন্দুর নাম সিন্যাপস (Synapse) এবং তাদের মধ্যবর্তী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দূরত্বের নাম সিন্যাপটিক ফাঁক (Synaptic Cleft)।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ‘সিন্যাপস’ একটি খাঁটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ। ১৮৯৭ সালে ইংরেজ শারীরতত্ত্ববিদ স্যার চার্লস শেরিংটন এই পরিভাষাটি প্রবর্তন করেন। গ্রিক বিশেষ্য পদ সিনাপসিস (synapsis)-এর অর্থ হলো সংযোগ, মিলন বা আলিঙ্গন। এটি গঠিত হয়েছে গ্রিক উপসর্গ সিন (syn-, যার অর্থ একসাথে বা যৌথভাবে) এবং গ্রিক ক্রিয়ামূল হাপ্টেইন (haptein, যার অর্থ স্পর্শ করা, বাঁধা বা শক্ত করে ধরা) মিলিয়ে। দ্বিতীয় পদ ক্লেফট (cleft) এসেছে প্রাচীন প্রোটো-জার্মানিক ক্রিয়ামূল ক্লিভান (kleubana) থেকে, যার অর্থ চেরা, ফাটল বা সংকীর্ণ ফাঁকা স্থান। ব্যাকরণগতভাবে এটি আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের একটি ক্রিয়া-উদ্ভুত বিশেষ্য পদ।
শারীরস্থানিক বিচারে একটি নিউরনের সমাপ্তি বিন্দু বা অ্যাক্সন টার্মিনাল এবং পরবর্তী নিউরনের গ্রাহক প্রান্ত বা ডেনড্রাইট কখনো শারীরিকভাবে একে অপরকে পুরোপুরি স্পর্শ করে না। তাদের মাঝে প্রায় বিশ থেকে চল্লিশ ন্যানোমিটারের এক অতিক্ষুদ্র তরলপূর্ণ ফাঁক থাকে, যাকে সিন্যাপটিক ফাঁক বলা হয়। তথ্য যখন নিউরনের ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত বা অ্যাকশন পটেনশিয়াল হিসেবে প্রবাহিত হয়ে প্রান্তে পৌঁছায়, তখন তা সিন্যাপটিক ভেসিকল নামক ক্ষুদ্র থলিগুলোকে উদ্দীপ্ত করে রাসায়নিক বার্তাবাহক বা নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ করায়। এই রাসায়নিকগুলো সিন্যাপটিক ফাঁক সাঁতরে পার হয়ে পরবর্তী কোষের রিসেপ্টরে আবদ্ধ হয়। সমস্ত ড্রাগের মূল যুদ্ধক্ষেত্র হলো এই সিন্যাপটিক ফাঁক; কোকেন বা মেথাম্ফেটামিন এই ফাঁক থেকে সংকেত অপসারণের পথ বন্ধ করে দিয়ে রাসায়নিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (Mu-Opioid Receptor – MOR)
আফিম (Opium) থেকে প্রাপ্ত মরফিন (Morphine), মরফিন থেকে উৎপন্ন হেরোইন (Heroin) এবং সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত ফেন্টানিল (Fentanyl)-এর প্রধান ব্যথানাশক ও আসক্তি-সম্পর্কিত প্রভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আণবিক লক্ষ্য হলো মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (Mu-Opioid Receptor – MOR)। এটি মানবদেহের স্বাভাবিক অন্তর্জাত ওপিওয়েড ব্যবস্থার (Endogenous Opioid System) একটি গুরুত্বপূর্ণ রিসেপ্টর, যা ব্যথার অনুভূতি, আবেগ, পুরস্কারমূলক আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস, অন্ত্রের কার্যক্রম এবং শারীরবৃত্তীয় চাপের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। রাসায়নিক ও আণবিক শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর একটি জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (G-Protein-Coupled Receptor – GPCR), যা কোষঝিল্লির মধ্যে অবস্থান করে বাইরের রাসায়নিক বার্তাবাহকের উপস্থিতি শনাক্ত করে কোষের অভ্যন্তরে সংকেত সৃষ্টি করে। মানবদেহে এই রিসেপ্টরটি ওপিআরএম১ (OPRM1) (ওপিওয়েড রিসেপ্টর মিউ ১ (Opioid Receptor Mu 1)) জিনের মাধ্যমে সংকেতায়িত হয়।
নামটির ব্যুৎপত্তি ফার্মাকোলজির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। মিউ (Mu) শব্দটি গ্রিক বর্ণমালার দ্বাদশ বর্ণ মিউ (μ) থেকে এসেছে। ১৯৭৬ সালে ফার্মাকোলজিস্ট উইলিয়াম মার্টিন (William R. Martin) ও তার সহকর্মীরা বিভিন্ন ওপিওয়েডের ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাব বিশ্লেষণ করে একাধিক কার্যকরী রিসেপ্টর শ্রেণির ধারণা উপস্থাপন করেন। তাদের শ্রেণিবিন্যাসে মরফিনের (Morphine) বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত রিসেপ্টরকে গ্রিক বর্ণ মিউ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ মিউ নামটি মরফিনের নামের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ওপিওয়েড (Opioid) শব্দটির উৎস ওপিয়াম (Opium), যার ঐতিহাসিক উৎস লাতিন opium এবং গ্রিক ওপিয়ন (opion)। গ্রিক opion শব্দটি পপি উদ্ভিদের দুধের মতো রস বা ল্যাটেক্স নির্দেশ করত এবং এটি গ্রিক opos অর্থাৎ উদ্ভিদের রসের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর সঙ্গে সাদৃশ্যবাচক প্রত্যয় -অয়েড (-oid) যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ওপিওয়েড, যার আক্ষরিক অর্থ আফিমসদৃশ। আধুনিক ফার্মাকোলজিতে ওপিওয়েড বলতে প্রাকৃতিক, অর্ধসংশ্লেষিত, সংশ্লেষিত এবং অন্তর্জাত এমন সব যৌগকে বোঝায়, যেগুলো ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। এই শ্রেণির মধ্যে মিউ ছাড়াও ডেল্টা-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (Delta-Opioid Receptor – DOR) এবং কাপ্পা-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (Kappa-Opioid Receptor – KOR) গুরুত্বপূর্ণ।
শারীরস্থানিক দিক থেকে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর কেন্দ্রীয় ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতভাবে অবস্থান করে। মস্তিষ্কে এটি বিশেষ করে পেরিঅ্যাকুইডাক্টাল গ্রে (Periaqueductal Gray – PAG), রোস্ট্রাল ভেন্ট্রোমিডিয়াল মেডুলা (Rostral Ventromedial Medulla – RVM), থ্যালামাস (Thalamus), অ্যামিগডালা (Amygdala), ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area – VTA) এবং নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স (Nucleus Accumbens)-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। এছাড়া মেরুরজ্জুর পশ্চাৎশৃঙ্গ বা ডরসাল হর্ন (Dorsal Horn), মস্তিষ্ককাণ্ডের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক ব্যবস্থা এবং পরিপাকতন্ত্রের এন্টারিক স্নায়ুতন্ত্রেও (Enteric Nervous System) এর উপস্থিতি রয়েছে। পেরিঅ্যাকুইডাক্টাল গ্রে ও রোস্ট্রাল ভেন্ট্রোমিডিয়াল মেডুলা মস্তিষ্ক থেকে মেরুরজ্জুর ব্যথা-সংকেত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ, থ্যালামাস ব্যথাসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণে অংশগ্রহণ করে এবং ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া ও নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স পুরস্কারমূলক অনুভূতি ও প্রেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সক্রিয়তা ব্যথানাশ, আনন্দানুভূতি, শ্বাসপ্রশ্বাসের পরিবর্তন এবং অন্ত্রের গতিশীলতা হ্রাসের মতো ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
মানবদেহে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় করার জন্য স্বাভাবিকভাবেই কিছু রাসায়নিক বার্তাবাহক উৎপন্ন হয়। এদের মধ্যে বিটা-এন্ডোরফিন (Beta-Endorphin) এবং এনকেফালিন (Enkephalin) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এরা অন্তর্জাত ওপিওয়েড পেপটাইড (Endogenous Opioid Peptides) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বিটা-এন্ডোরফিন বৃহত্তর প্রো-ওপিওমেলানোকর্টিন (Proopiomelanocortin – POMC) পূর্বসূরি প্রোটিন থেকে উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে এনকেফালিনজাত পেপটাইডের উৎপত্তি প্রধানত প্রোএনকেফালিন (Proenkephalin) থেকে। এই পেপটাইডগুলো নির্দিষ্ট স্নায়বিক পরিস্থিতিতে নিঃসৃত হয়ে ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় করতে পারে এবং ব্যথা, আবেগ ও শারীরবৃত্তীয় চাপের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। এন্ডোরফিন (Endorphin) শব্দটি গঠিত হয়েছে endogenous অর্থাৎ দেহের অভ্যন্তরে উৎপন্ন এবং morphine অর্থাৎ মরফিন শব্দের সমন্বয়ে। ফলে এর আক্ষরিক ধারণাগত অর্থ হলো দেহে উৎপন্ন মরফিনসদৃশ পদার্থ। তবে এন্ডোরফিন রাসায়নিকভাবে মরফিন নয়; এন্ডোরফিন একটি পেপটাইড, আর মরফিন একটি উদ্ভিদজাত অ্যালকালয়েড।
স্নায়বিক ব্যথা-সংকেত পরিবহনের প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরের কোনো কলা আঘাতপ্রাপ্ত হলে বিশেষ সংবেদনশীল স্নায়ুপ্রান্ত বা নোসিসেপ্টর (Nociceptor) সক্রিয় হতে পারে। এসব স্নায়ুপ্রান্ত থেকে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক সংকেত প্রাথমিক সংবেদনশীল নিউরনের (Primary Sensory Neuron) মাধ্যমে মেরুরজ্জুর ডরসাল হর্নে (Dorsal Horn) পৌঁছায়। সেখানে প্রিসিন্যাপটিক স্নায়ুপ্রান্ত থেকে গ্লুটামেট (Glutamate) এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাবস্ট্যান্স পি (Substance P)-র মতো নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয়। এই রাসায়নিক বার্তাবাহকগুলো পরবর্তী নিউরনের রিসেপ্টরে যুক্ত হয়ে ব্যথা-সম্পর্কিত সংকেত মেরুরজ্জুর ঊর্ধ্বমুখী স্নায়ুপথে পরিবহনে সহায়তা করে। সংকেতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্পাইনোথ্যালামিক ট্র্যাক্ট (Spinothalamic Tract)-সহ বিভিন্ন ঊর্ধ্বমুখী পথ দিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। পরবর্তীতে থ্যালামাস, সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং আবেগ-সম্পর্কিত অন্যান্য অঞ্চল এই তথ্য প্রক্রিয়াকরণে অংশগ্রহণ করে। ফলে ব্যথা কেবল একটি সংবেদনশীল সংকেত নয়; এর সঙ্গে অপ্রীতিকর অনুভূতি, আবেগ এবং আচরণগত প্রতিক্রিয়াও যুক্ত থাকে।
মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর এই ব্যথা-সংকেত পরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কাজ করতে পারে। মেরুরজ্জুর ডরসাল হর্নে প্রিসিন্যাপটিক স্নায়ুপ্রান্তে রিসেপ্টরটি সক্রিয় হলে গ্লুটামেট ও সাবস্ট্যান্স পি নিঃসরণ কমতে পারে। অন্যদিকে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হলে কোষটির বৈদ্যুতিক উত্তেজনাশীলতা হ্রাস পেতে পারে। ফলে ব্যথা-সম্পর্কিত সংকেত পরবর্তী স্নায়ুপথে পরিবহনের সম্ভাবনা কমে যায়। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের পেরিঅ্যাকুইডাক্টাল গ্রে ও রোস্ট্রাল ভেন্ট্রোমিডিয়াল মেডুলায় ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হলে মস্তিষ্ক থেকে মেরুরজ্জুর উদ্দেশে নেমে আসা অধোমুখী ব্যথা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Descending Pain Modulatory System) প্রভাবিত হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মস্তিষ্ক মেরুরজ্জুতে প্রবেশ করা ব্যথা-সংকেতের তীব্রতা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের ব্যথানাশক প্রভাব প্রিসিন্যাপটিক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ হ্রাস, পোস্টসিন্যাপটিক উত্তেজনাশীলতা কমানো এবং অধোমুখী ব্যথা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
আণবিক স্তরে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর একটি সাতবার ঝিল্লি-অতিক্রমকারী জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (Seven-Transmembrane G-Protein-Coupled Receptor)। এর প্রোটিন শৃঙ্খল কোষঝিল্লির লিপিড দ্বিস্তরকে সাতবার অতিক্রম করে এবং কোষের অভ্যন্তরে প্রধানত জি-আই/ও প্রোটিনের (Gi/o Protein) সঙ্গে সংকেত আদান-প্রদান করে। মরফিন, ফেন্টানিল অথবা অন্তর্জাত ওপিওয়েড পেপটাইড রিসেপ্টরের উপযুক্ত বন্ধনস্থলে যুক্ত হলে রিসেপ্টরের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস পরিবর্তিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট জি-প্রোটিন সক্রিয় হয়। সক্রিয় জি-প্রোটিনের আলফা উপএকক (Gαi/o) অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ (Adenylyl Cyclase) এনজাইমের কার্যক্রম কমাতে পারে। এই এনজাইম সাধারণত অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (Adenosine Triphosphate – ATP) থেকে সাইক্লিক অ্যাডেনোসিন মনোফসফেট (Cyclic Adenosine Monophosphate – cAMP) উৎপন্ন করে। ফলে অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজের কার্যক্রম কমে গেলে কোষের অভ্যন্তরে সাইক্লিক এএমপি সংকেত হ্রাস পেতে পারে এবং এর মাধ্যমে প্রোটিন কাইনেজ এ (Protein Kinase A – PKA)-সহ বিভিন্ন সংকেতপথের কার্যক্রম পরিবর্তিত হয়।
মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেলের (Voltage-Gated Calcium Channels) কার্যক্রম দমন। সাধারণ অবস্থায় একটি অ্যাকশন পটেনশিয়াল (Action Potential) প্রিসিন্যাপটিক অ্যাক্সন টার্মিনালে পৌঁছালে কোষঝিল্লির ডিপোলারাইজেশন (Depolarization) ঘটে এবং ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল খুলে যায়। ফলে কোষের বাইরের তরল থেকে ধনাত্মক ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca²⁺) প্রিসিন্যাপটিক টার্মিনালে প্রবেশ করে। এই ক্যালসিয়াম সংকেতের প্রভাবে নিউরোট্রান্সমিটারবাহী সিন্যাপটিক ভেসিকল (Synaptic Vesicle) প্রিসিন্যাপটিক কোষঝিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং এক্সোসাইটোসিস (Exocytosis) প্রক্রিয়ায় নিউরোট্রান্সমিটার সিন্যাপটিক ফাঁকে মুক্ত হয়। কিন্তু মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হলে জি-প্রোটিনের বিটা-গামা উপএকক (Gβγ Subunits) নির্দিষ্ট ক্যালসিয়াম চ্যানেলের কার্যক্রম দমন করতে পারে। এর ফলে প্রিসিন্যাপটিক টার্মিনালে ক্যালসিয়াম প্রবেশ কমে এবং নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ব্যথা পরিবহনকারী স্নায়ুপথে এই প্রক্রিয়া গ্লুটামেট ও সাবস্ট্যান্স পি নিঃসরণ কমিয়ে ব্যথা-সংকেতের পরিবহন দুর্বল করতে পারে।
একই সঙ্গে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের জি-প্রোটিন-নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরমুখী রেক্টিফায়িং পটাশিয়াম চ্যানেল (G-Protein-Gated Inwardly Rectifying Potassium Channel – GIRK) সক্রিয় করতে পারে। এই চ্যানেল সক্রিয় হলে সাধারণ স্নায়ুকোষীয় পরিস্থিতিতে পটাশিয়াম আয়নের (K⁺) বহির্গমন বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে কোষের অভ্যন্তরভাগের বৈদ্যুতিক বিভব তুলনামূলকভাবে আরও ঋণাত্মক হয়ে যায়। এই পরিবর্তনকে হাইপারপোলারাইজেশন (Hyperpolarization) বলা হয়। হাইপারপোলারাইজেশনের ফলে নিউরনের ঝিল্লিবিভব অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টির প্রান্তিক মান (Threshold Potential) থেকে দূরে সরে যেতে পারে, যার কারণে নতুন বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। অর্থাৎ মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর একদিকে প্রিসিন্যাপটিক ক্যালসিয়াম প্রবেশ কমিয়ে নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ দমন করে এবং অন্যদিকে পোস্টসিন্যাপটিক পটাশিয়াম পরিবাহিতা বাড়িয়ে নিউরনের উত্তেজনাশীলতা কমাতে পারে। এই দুটি প্রক্রিয়া সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন স্নায়ুপথে প্রতিবন্ধক প্রভাব সৃষ্টি করে।
তবে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সক্রিয়তা সব পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুপথের সামগ্রিক কার্যক্রম কমিয়ে দেয় না। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ডিসইনহিবিশন (Disinhibition)। মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে গাবাএর্জিক নিউরন (GABAergic Neuron) অন্য নিউরনের কার্যক্রম দমন করে রাখে। মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর এই গাবাএর্জিক নিউরনের কার্যক্রম অথবা গাবা নিঃসরণ কমিয়ে দিলে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্য নিউরনের ওপর প্রতিবন্ধক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পায়। ফলে লক্ষ্য নিউরনটি তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হতে পারে। এই প্রক্রিয়া বিশেষ করে মস্তিষ্কের পুরস্কার-সম্পর্কিত স্নায়ুপথে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর কোনো প্রতিবন্ধক নিউরনকে দমন করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অন্য একটি নিউরনের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে পারে।
মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area – VTA) থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে (Nucleus Accumbens) বিস্তৃত মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থা (Mesolimbic Dopamine System) ওপিওয়েডের পুরস্কারমূলক প্রভাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়ায় নির্দিষ্ট গাবাএর্জিক নিউরনের মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হলে গাবার প্রতিবন্ধক প্রভাব কমে যেতে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ডোপামিন-উৎপাদক নিউরনগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হয় এবং নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে ডোপামিন সংকেত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিবর্তন ইউফোরিয়া (Euphoria), পুরস্কারমূলক অনুভূতি, পুনরায় মাদক গ্রহণের প্রবণতা এবং আসক্তি বিকাশে ভূমিকা পালন করে। তবে ওপিওয়েডের পুরস্কারমূলক প্রভাব কেবল ডোপামিন নিঃসরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না; মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর বিভিন্ন স্নায়বিক অঞ্চলে আনন্দানুভূতি, প্রেষণা এবং আবেগ-সম্পর্কিত কার্যক্রমও সরাসরি পরিবর্তন করতে পারে।
মরফিন (Morphine) মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাগোনিস্ট (Agonist)। এটি রিসেপ্টরের স্বাভাবিক ওপিওয়েড-বন্ধনস্থলে (Orthosteric Binding Site) যুক্ত হয়ে অন্তর্জাত ওপিওয়েড পেপটাইডের অনুরূপ সংকেত সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে হেরোইন (Heroin) বা ডায়াসিটাইলমরফিন (Diacetylmorphine) মরফিনের একটি অর্ধসংশ্লেষিত ডেরিভেটিভ (Semisynthetic Derivative)। হেরোইনের অণুতে মরফিনের দুটি হাইড্রক্সিল গোষ্ঠী অ্যাসিটাইল গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হওয়ায় এটি মরফিনের তুলনায় অধিক লিপিডদ্রবণীয়। ফলে এটি দ্রুত রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (Blood-Brain Barrier) অতিক্রম করতে পারে। মস্তিষ্ক ও অন্যান্য কলায় প্রবেশের পর হেরোইন দ্রুত ৬-মনোঅ্যাসিটাইলমরফিন (6-Monoacetylmorphine – 6-MAM) এবং পরবর্তীতে মরফিনে বিপাকিত হয়। হেরোইনের গুরুত্বপূর্ণ ওপিওয়েড প্রভাবের জন্য বিশেষত এই সক্রিয় বিপাকজাত পদার্থগুলো দায়ী। দ্রুত মস্তিষ্কে প্রবেশ এবং সক্রিয় বিপাকজাত পদার্থের মাধ্যমে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার কারণে হেরোইন তীব্র মনোসক্রিয় ও পুরস্কারমূলক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
ফেন্টানিল (Fentanyl) একটি সম্পূর্ণ সংশ্লেষিত ওপিওয়েড (Fully Synthetic Opioid), যা মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের শক্তিশালী অ্যাগোনিস্ট। ব্যথানাশক ক্ষমতার তুলনামূলক পরিমাপে ফেন্টানিল মরফিনের তুলনায় অনেক বেশি পোটেন্ট (Potent); চিকিৎসাগত পরিস্থিতি ও প্রয়োগপথের ওপর নির্ভর করে এর আনুমানিক পোটেন্সি মরফিনের কয়েক দশ থেকে প্রায় একশ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। তবে অধিক পোটেন্সি মানেই প্রতিটি রিসেপ্টরে শতগুণ বেশি সংকেত সৃষ্টি হওয়া নয়। পোটেন্সি (Potency) নির্দেশ করে নির্দিষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করতে কত কম মাত্রার ওষুধ প্রয়োজন, আর এফিকেসি (Efficacy) নির্দেশ করে একটি অ্যাগোনিস্ট সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কতটা কার্যকরী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। রিসেপ্টরের প্রতি আকর্ষণক্ষমতা (Affinity), রিসেপ্টর সক্রিয় করার ক্ষমতা, দেহে ওষুধের বণ্টন এবং বিপাকীয় বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে কোনো ওপিওয়েডের সামগ্রিক প্রভাব নির্ধারিত হয়। ফেন্টানিলের উচ্চ পোটেন্সি এবং শ্বাসপ্রশ্বাস দমনের ক্ষমতার কারণে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বা মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ বিশেষভাবে বিপজ্জনক।
মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনসংকটপূর্ণ প্রভাব হলো শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমন (Respiratory Depression)। মস্তিষ্ককাণ্ডের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক ব্যবস্থায় মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর উপস্থিত থাকে। বিশেষ করে মেডুলার প্রি-বটজিঙ্গার কমপ্লেক্স (Pre-Bötzinger Complex)-সহ শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়বিক ব্যবস্থায় ওপিওয়েডের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হলে শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী নিউরনের কার্যক্রম এবং রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির প্রতি শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দুর্বল হতে পারে। এর ফলে শ্বাসের হার ও গভীরতা কমে যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাস অত্যন্ত ধীর হয়ে যেতে পারে অথবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি, অচেতনতা, মস্তিষ্কের ক্ষতি এবং মৃত্যু ঘটতে পারে। অ্যালকোহল, বেঞ্জোডায়াজেপিন অথবা অন্যান্য কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-দমনকারী পদার্থের সঙ্গে ওপিওয়েড একসঙ্গে গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।
মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের কার্যক্রম পরিপাকতন্ত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। অন্ত্রের এন্টারিক স্নায়ুতন্ত্রে (Enteric Nervous System) এই রিসেপ্টর সক্রিয় হলে অন্ত্রের স্নায়বিক সংকেত ও নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ পরিবর্তিত হয়। এর ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক অগ্রগামী সংকোচন বা পেরিস্টালসিস (Peristalsis) কমে যেতে পারে, অন্ত্রের ভেতরে খাদ্য ও বর্জ্য পদার্থের অগ্রগতি ধীর হয় এবং জল শোষণের সময় বৃদ্ধি পায়। এর ফলেই ওপিওয়েড ব্যবহারে কোষ্ঠকাঠিন্য (Opioid-Induced Constipation) একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এছাড়া মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সক্রিয়তা চোখের মণি সংকুচিত হওয়া বা মায়োসিস (Miosis), বমিভাব, বমি এবং অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
দীর্ঘমেয়াদি ওপিওয়েড ব্যবহারে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর ও তার সংশ্লিষ্ট কোষীয় সংকেতব্যবস্থায় বিভিন্ন অভিযোজনমূলক পরিবর্তন ঘটে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো রিসেপ্টর ডিসেনসিটাইজেশন (Receptor Desensitization), যেখানে অ্যাগোনিস্ট উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও রিসেপ্টরের সংকেত উৎপাদনের কার্যকারিতা কমে যায়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সক্রিয় রিসেপ্টরকে জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর কাইনেজ (G-Protein-Coupled Receptor Kinase – GRK)-এর মাধ্যমে ফসফরাইলেশন (Phosphorylation) করা হতে পারে। এর ফলে বিটা-অ্যারেস্টিন (Beta-Arrestin) নামক প্রোটিন রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জি-প্রোটিনের মাধ্যমে সংকেত পরিবহন কমাতে এবং রিসেপ্টরের অভ্যন্তরীণীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এই অভ্যন্তরীণীকরণ প্রক্রিয়াকে রিসেপ্টর ইন্টার্নালাইজেশন (Receptor Internalization) বলা হয়। এতে কোষঝিল্লির পৃষ্ঠে থাকা রিসেপ্টর এন্ডোসাইটোসিস (Endocytosis) প্রক্রিয়ায় কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
রিসেপ্টর ইন্টার্নালাইজেশন এবং রিসেপ্টর ধ্বংস (Receptor Degradation) একই প্রক্রিয়া নয়। অভ্যন্তরীণীকরণের পর কোনো রিসেপ্টর পুনরায় কোষঝিল্লিতে ফিরে আসতে পারে, যাকে রিসেপ্টর রিসাইক্লিং (Receptor Recycling) বলা হয়। অন্যদিকে কিছু রিসেপ্টর লাইসোসোমাল (Lysosomal) বিপাকীয় পথে ভেঙে যেতে পারে। কোন প্রক্রিয়া কতটা ঘটবে, তা সংশ্লিষ্ট ওপিওয়েড অ্যাগোনিস্ট, রিসেপ্টরের সংকেতপথ এবং কোষের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। মরফিন ও ফেন্টানিলের মতো বিভিন্ন ওপিওয়েড মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের ফসফরাইলেশন, বিটা-অ্যারেস্টিন সংযুক্তি এবং ইন্টার্নালাইজেশনের ক্ষেত্রে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ওপিওয়েড ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট সহনশীলতাকে কেবল রিসেপ্টর কোষের ভেতরে প্রবেশ করা অথবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।
দীর্ঘস্থায়ী ওপিওয়েড সংস্পর্শে কোষের অভ্যন্তরীণ অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ-সাইক্লিক এএমপি সংকেতপথ (Adenylyl Cyclase-cAMP Signaling Pathway)-এও অভিযোজন ঘটে। স্বল্পমেয়াদে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হলে অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজের কার্যক্রম কমতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ওপিওয়েড সংস্পর্শে কোষ এই দমনমূলক প্রভাবের বিপরীতে ক্ষতিপূরণমূলক অভিযোজন গড়ে তুলতে পারে। এর ফলে নির্দিষ্ট কোষে অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ ও সংশ্লিষ্ট সংকেতব্যবস্থার কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে। ওপিওয়েডের উপস্থিতি হঠাৎ বন্ধ হলে পূর্বে দমিত সংকেতব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এই ঘটনাকে সাইক্লিক এএমপি রিবাউন্ড (cAMP Rebound) অথবা নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক প্রেক্ষাপটে অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ সুপারঅ্যাকটিভেশন (Adenylyl Cyclase Superactivation) বলা হয়। এই ধরনের কোষীয় অভিযোজন ওপিওয়েড প্রত্যাহারজনিত স্নায়বিক অতিসক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আণবিক ভিত্তি।
এসব অভিযোজনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি ওপিওয়েড ব্যবহারে সহনশীলতা (Tolerance) এবং শারীরিক নির্ভরতা (Physical Dependence) বিকশিত হতে পারে। সহনশীলতা বলতে বোঝায়, একই মাত্রার ওপিওয়েডে পূর্বের তুলনায় কম প্রভাব অনুভূত হওয়া। তবে ওপিওয়েডের সব প্রভাবের প্রতি একই হারে সহনশীলতা তৈরি হয় না। ব্যথানাশ, ইউফোরিয়া, সেডেশন এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমনের প্রতি সহনশীলতার মাত্রা ও বিকাশের গতি ভিন্ন হতে পারে। অন্যদিকে ওপিওয়েডজনিত কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রতি সহনশীলতা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। শারীরিক নির্ভরতা হলো এমন একটি অভিযোজিত শারীরবৃত্তীয় অবস্থা, যেখানে নিয়মিত ওপিওয়েডের উপস্থিতির সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্র অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ দেখা দেয়। শারীরিক নির্ভরতা ও আসক্তি (Addiction) সম্পর্কিত হলেও এক নয়; আসক্তির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর পরিণতি সত্ত্বেও বাধ্যতামূলকভাবে মাদক গ্রহণের প্রবণতা এবং ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো আচরণগত বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ওপিওয়েড ব্যবহারের পর হঠাৎ গ্রহণ বন্ধ করলে ওপিওয়েড প্রত্যাহারজনিত সংকট (Opioid Withdrawal Syndrome) দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অস্থিরতা, উদ্বেগ, পেশিব্যথা, ঘাম, চোখ ও নাক দিয়ে জল পড়া, হাই তোলা, পেটের খিঁচুনি, বমি, ডায়রিয়া, ঘুমের সমস্যা এবং হৃদস্পন্দন বৃদ্ধির মতো উপসর্গ দেখা যায়। এই উপসর্গগুলোর পেছনে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে স্নায়বিক অভিযোজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে লোকাস সেরুলিয়াস (Locus Coeruleus)-এর নরঅ্যাড্রেনালিন-সম্পর্কিত স্নায়ুকোষগুলো দীর্ঘমেয়াদি ওপিওয়েড ব্যবহারের সঙ্গে অভিযোজিত হতে পারে। ওপিওয়েডের উপস্থিতি হঠাৎ বন্ধ হলে এসব নিউরনের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়ে অতিরিক্ত নরঅ্যাড্রেনালিন (Noradrenaline) সংকেত সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রত্যাহারের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণ ওপিওয়েড প্রত্যাহার অত্যন্ত কষ্টকর হলেও সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তা সাধারণত সরাসরি প্রাণঘাতী নয়; তবে গুরুতর জলশূন্যতা, সহাবস্থানকারী রোগ অথবা বিশেষ শারীরিক অবস্থায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে ওপিওয়েডের মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণে শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমন সরাসরি জীবনসংকট সৃষ্টি করতে পারে।
ওপিওয়েডের মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ বা ওভারডোজ (Opioid Overdose)-এর চিকিৎসায় ন্যালোক্সোন (Naloxone) একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ। এটি মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরসহ ওপিওয়েড রিসেপ্টরের একটি প্রতিযোগিতামূলক অ্যান্টাগোনিস্ট (Competitive Antagonist)। ন্যালোক্সোন রিসেপ্টরের ওপিওয়েড-বন্ধনস্থলে যুক্ত হয়ে মরফিন, হেরোইনের সক্রিয় বিপাকজাত পদার্থ অথবা ফেন্টানিলের মতো অ্যাগোনিস্টের কার্যক্রম প্রতিহত করতে পারে। এর ফলে ওপিওয়েডজনিত শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমন দ্রুত হ্রাস পেতে পারে। তবে ন্যালোক্সোনের কার্যকারিতার স্থায়িত্ব কিছু ওপিওয়েডের তুলনায় কম হওয়ায় পুনরায় শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমন দেখা দিতে পারে এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা বা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। শারীরিকভাবে ওপিওয়েডনির্ভর ব্যক্তির ক্ষেত্রে ন্যালোক্সোন দ্রুত ওপিওয়েডের কার্যক্রম প্রতিহত করলে আকস্মিক প্রত্যাহারজনিত উপসর্গও সৃষ্টি হতে পারে।
মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াকারী সব ওষুধের কার্যপ্রণালি একই নয়। মরফিন ও ফেন্টানিল সাধারণত পূর্ণ অ্যাগোনিস্ট (Full Agonist) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ, যদিও তাদের রিসেপ্টর সংকেতের বৈশিষ্ট্য ও ফার্মাকোলজিক্যাল পোটেন্সি ভিন্ন। অন্যদিকে বুপ্রেনরফিন (Buprenorphine) মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের একটি উচ্চ-আকর্ষণক্ষমতাসম্পন্ন আংশিক অ্যাগোনিস্ট (Partial Agonist)। এটি রিসেপ্টরে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট সংকেতব্যবস্থায় পূর্ণ অ্যাগোনিস্টের তুলনায় সীমিত সর্বোচ্চ কার্যকরী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে বুপ্রেনরফিন ওপিওয়েড ব্যবহারজনিত ব্যাধির (Opioid Use Disorder) চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে মেথাডোন (Methadone) একটি দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতাসম্পন্ন পূর্ণ মিউ-ওপিওয়েড অ্যাগোনিস্ট, যা নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত ব্যবস্থাপনায় ওপিওয়েডনির্ভরতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এসব ওষুধের চিকিৎসাগত ব্যবহার মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টরের ফার্মাকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য এবং নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় রিসেপ্টর সক্রিয় করার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
সুতরাং, মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর হলো মানবদেহের অন্তর্জাত ওপিওয়েড ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর, যা ব্যথা, পুরস্কারমূলক আচরণ, আবেগ, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং অন্ত্রের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। স্বাভাবিক অবস্থায় বিটা-এন্ডোরফিন ও এনকেফালিনের মতো অন্তর্জাত ওপিওয়েড পেপটাইড এই রিসেপ্টর সক্রিয় করে বিভিন্ন স্নায়বিক সংকেত নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে মরফিন, হেরোইনের সক্রিয় বিপাকজাত পদার্থ এবং ফেন্টানিলের মতো বহিরাগত ওপিওয়েড একই রিসেপ্টরে কাজ করে ব্যথানাশক ও মনোসক্রিয় প্রভাব সৃষ্টি করে। রিসেপ্টর সক্রিয় হলে প্রধানত জি-আই/ও প্রোটিনের মাধ্যমে অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজের কার্যক্রম হ্রাস, প্রিসিন্যাপটিক ক্যালসিয়াম প্রবেশ দমন এবং নির্দিষ্ট পোস্টসিন্যাপটিক পটাশিয়াম চ্যানেল সক্রিয় হওয়ার মতো পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে কিছু স্নায়ুপথে নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ ও নিউরনের উত্তেজনাশীলতা কমে যায়, আবার প্রতিবন্ধক নিউরনের কার্যক্রম হ্রাসের মাধ্যমে অন্য স্নায়ুপথে ডিসইনহিবিশন ঘটতে পারে। এই বহুমুখী সংকেতব্যবস্থার কারণেই ওপিওয়েড একদিকে শক্তিশালী ব্যথানাশক হিসেবে কার্যকর, অন্যদিকে ইউফোরিয়া, শারীরিক নির্ভরতা, আসক্তি এবং প্রাণঘাতী শ্বাসপ্রশ্বাসের অবদমনের মতো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে রিসেপ্টর ডিসেনসিটাইজেশন, ইন্টার্নালাইজেশন এবং কোষীয় সংকেতব্যবস্থার অভিযোজনের ফলে সহনশীলতা ও নির্ভরতা বিকশিত হতে পারে। ফলে মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর আধুনিক ব্যথা চিকিৎসা, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং মাদকাসক্তির জৈবিক ভিত্তি বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আণবিক লক্ষ্য।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর-১ (Cannabinoid Receptor 1 – CB1)
গাঁজা বা ক্যানাবিস উদ্ভিদের প্রধান মনোসক্রিয় রাসায়নিক ডেল্টা-৯-টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের (Delta-9-Tetrahydrocannabinol – THC) অন্যতম প্রধান স্নায়বিক লক্ষ্য হলো ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর-১ (Cannabinoid Receptor 1 – CB1)। এটি মানবদেহের স্বাভাবিক এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থার (Endocannabinoid System) একটি গুরুত্বপূর্ণ রিসেপ্টর, যা স্নায়ুকোষের মধ্যে রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদান, স্মৃতি, আবেগ, ক্ষুধা, ব্যথার অনুভূতি, পুরস্কারমূলক আচরণ এবং চলন-সমন্বয় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। রাসায়নিক শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে সিবি-ওয়ান একটি জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (G-Protein-Coupled Receptor – GPCR)। এটি কোষঝিল্লির মধ্যে অবস্থানকারী একটি প্রোটিন, যার কাজ হলো কোষের বাইরের নির্দিষ্ট রাসায়নিক বার্তাবাহকের উপস্থিতি শনাক্ত করে কোষের অভ্যন্তরে সংকেত সৃষ্টি করা।
নামটির ব্যুৎপত্তি উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক গণনাম ক্যানাবিস (Cannabis) থেকে উদ্ভূত। ক্যানাবিস শব্দের সঙ্গে সাদৃশ্য বা সম্পর্ক নির্দেশক প্রত্যয় -অয়েড (-oid) যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ক্যানাবিনয়েড (Cannabinoid), যা প্রথমে ক্যানাবিস উদ্ভিদে পাওয়া নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগগুলোর শ্রেণি নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে মানবদেহে একই ধরনের রিসেপ্টরে কাজ করা অন্তর্জাত রাসায়নিক বার্তাবাহক আবিষ্কৃত হলে সেগুলোকে এন্ডোক্যানাবিনয়েড (Endocannabinoid) বলা হয়। এখানে গ্রিক উৎসজাত এন্ডো- (endo-) উপসর্গের অর্থ অভ্যন্তরীণ বা ভেতরে উৎপন্ন। ১৯৯০ সালে বিজ্ঞানী লিসা মাতসুদা (Lisa Matsuda) ও তার সহকর্মীরা ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে প্রথম এই রিসেপ্টরের জিন ক্লোন করে এর আণবিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় প্রধান ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমটিকে সিবি-ওয়ান (CB1) এবং দ্বিতীয়টিকে সিবি-টু (CB2) নামে পৃথক করা হয়। মানবদেহে সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরটি সিএনআর১ (CNR1) (ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর ১ (Cannabinoid Receptor 1) জিনের মাধ্যমে সংকেতায়িত হয়।
শারীরস্থানিক দিক থেকে সিবি-ওয়ান মানব মস্তিষ্কে সর্বাধিক বিস্তৃতভাবে উপস্থিত জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টরগুলোর অন্যতম। এটি বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus), বেসাল গ্যাংলিয়া (Basal Ganglia), সেরেবেলাম (Cerebellum) এবং সেরিব্রাল কর্টেক্সে (Cerebral Cortex) উল্লেখযোগ্য ঘনত্বে পাওয়া যায়। হিপোক্যাম্পাস নতুন স্মৃতি গঠন ও তথ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ, বেসাল গ্যাংলিয়া চলন নির্বাচন ও অভ্যাস গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেরেবেলাম পেশির সূক্ষ্ম সমন্বয় ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেরিব্রাল কর্টেক্স উপলব্ধি, মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উচ্চতর জ্ঞানীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া অ্যামিগডালা (Amygdala), হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus) এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন পুরস্কার-সম্পর্কিত স্নায়ুপথেও সিবি-ওয়ান রিসেপ্টর রয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলে রিসেপ্টরটির কার্যক্রম পরিবর্তিত হলে স্মৃতি, সময়ের উপলব্ধি, আবেগ, ক্ষুধা, মনোযোগ এবং শারীরিক সমন্বয়ে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। সিবি-ওয়ান কেবল মস্তিষ্কেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র ও শরীরের বিভিন্ন কলাতেও এর উপস্থিতি রয়েছে।
সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরের কার্যপ্রণালি বুঝতে হলে প্রথমে স্নায়ুকোষের সাধারণ রাসায়নিক সংকেত পরিবহন ব্যবস্থা বোঝা প্রয়োজন। সাধারণত একটি প্রিসিন্যাপটিক নিউরন (Presynaptic Neuron) তার অ্যাক্সন টার্মিনালে (Axon Terminal) থাকা সিন্যাপটিক ভেসিকল (Synaptic Vesicle) থেকে গ্লুটামেট (Glutamate) বা গাবা (GABA)-র মতো নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে। এই নিউরোট্রান্সমিটারগুলো দুটি স্নায়ুকোষের মধ্যবর্তী সিন্যাপটিক ফাঁক (Synaptic Cleft) অতিক্রম করে পরবর্তী পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের (Postsynaptic Neuron) রিসেপ্টরে যুক্ত হয়। এর ফলে পোস্টসিন্যাপটিক কোষে উত্তেজনামূলক অথবা প্রতিবন্ধক বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সাধারণ রাসায়নিক সিন্যাপসে সংকেতের প্রধান দিক হলো প্রিসিন্যাপটিক নিউরন থেকে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের দিকে। কিন্তু এই যোগাযোগের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনও পূর্ববর্তী নিউরনের দিকে রাসায়নিক বার্তা পাঠাতে পারে। এই বিপরীতমুখী যোগাযোগকে পশ্চাৎমুখী সংকেতপ্রবাহ (Retrograde Signaling) বলা হয়। এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থা এই ধরনের সংকেতপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এই পশ্চাৎমুখী সংকেতপ্রবাহের প্রধান অন্তর্জাত রাসায়নিক বার্তাবাহক হলো অ্যানান্ডামাইড (Anandamide বা AEA) এবং টু-অ্যারাকিডোনয়েলগ্লিসারল (2-Arachidonoylglycerol বা 2-AG)। উভয়ই লিপিডজাত এন্ডোক্যানাবিনয়েড (Endocannabinoid)। অ্যানান্ডামাইডের রাসায়নিক নাম এন-অ্যারাকিডোনয়েলইথানোলামিন (N-Arachidonoylethanolamine)। এর নামের প্রথম অংশ সংস্কৃত শব্দ আনন্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ সুখ বা পরিতৃপ্তি। অন্যদিকে টু-এজি হলো অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড (Arachidonic Acid) ও গ্লিসারল (Glycerol) থেকে গঠিত একটি মনোঅ্যাসিলগ্লিসারল (Monoacylglycerol)। সাধারণ নিউরোট্রান্সমিটারের মতো এই লিপিডজাত বার্তাবাহকগুলো প্রধানত আগে থেকে সিন্যাপটিক ভেসিকলে সঞ্চিত থাকে না; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী কোষঝিল্লির লিপিডজাত পূর্বসূরি থেকে উৎপন্ন হতে পারে। বিশেষ করে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনে উত্তেজনার ফলে অন্তঃকোষীয় ক্যালসিয়ামের (Intracellular Calcium) ঘনত্ব বৃদ্ধি পেলে অথবা নির্দিষ্ট মেটাবোট্রপিক রিসেপ্টর (Metabotropic Receptor) সক্রিয় হলে এন্ডোক্যানাবিনয়েড উৎপাদনের সংকেত শুরু হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে চাহিদানির্ভর সংশ্লেষণ (On-Demand Synthesis) বলা হয়।
পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনে উৎপন্ন অ্যানান্ডামাইড বা টু-এজি কোষঝিল্লি থেকে সিন্যাপটিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পূর্ববর্তী প্রিসিন্যাপটিক নিউরনের ঝিল্লিতে অবস্থানকারী সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরে যুক্ত হতে পারে। এখানে রাসায়নিক বার্তাবাহকের চলাচলের দিকটি সাধারণ নিউরোট্রান্সমিটার প্রবাহের বিপরীত। সাধারণ নিউরোট্রান্সমিটার প্রিসিন্যাপটিক কোষ থেকে পোস্টসিন্যাপটিক কোষের দিকে যায়, কিন্তু এন্ডোক্যানাবিনয়েড পোস্টসিন্যাপটিক কোষ থেকে প্রিসিন্যাপটিক কোষের দিকে সংকেত পাঠায়। এর ফলে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরন কার্যত পূর্ববর্তী নিউরনকে তার নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ সাময়িকভাবে কমানোর নির্দেশ দিতে পারে। এই নিয়ন্ত্রণ স্নায়বিক যোগাযোগের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব পরিবর্তন করে এবং নির্দিষ্ট সিন্যাপসে অতিরিক্ত অথবা অপ্রয়োজনীয় সংকেত পরিবহন সীমিত রাখতে সাহায্য করতে পারে।
আণবিক স্তরে সিবি-ওয়ান হলো একটি সাতবার ঝিল্লি-অতিক্রমকারী জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (Seven-Transmembrane G-Protein-Coupled Receptor)। অর্থাৎ এর প্রোটিন শৃঙ্খল কোষঝিল্লির লিপিড দ্বিস্তরকে সাতবার অতিক্রম করে। এই রিসেপ্টর প্রধানত জি-আই/ও প্রোটিনের (Gi/o Protein) মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরে সংকেত পরিবহন করে। অ্যানান্ডামাইড বা টু-এজি রিসেপ্টরে যুক্ত হলে রিসেপ্টরের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস পরিবর্তিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট জি-প্রোটিন সক্রিয় হয়। এর ফলে কোষের অভ্যন্তরে একাধিক রাসায়নিক সংকেতপথ পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে জি-প্রোটিনের আলফা উপএকক (Gαi/o) অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ (Adenylyl Cyclase) এনজাইমের কার্যক্রম কমাতে পারে, যার ফলে সাইক্লিক অ্যাডেনোসিন মনোফসফেট (Cyclic Adenosine Monophosphate – cAMP) উৎপাদন হ্রাস পায়। অন্যদিকে জি-প্রোটিনের বিটা-গামা উপএকক (Gβγ Subunits) প্রিসিন্যাপটিক ঝিল্লির নির্দিষ্ট ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেলের (Voltage-Gated Calcium Channels) কার্যক্রম দমন করতে পারে। কিছু স্নায়ুকোষে পটাশিয়াম চ্যানেলের কার্যক্রমও পরিবর্তিত হয়। এসব প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবে প্রিসিন্যাপটিক টার্মিনালে নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
এই নিঃসরণ হ্রাসের পেছনে ক্যালসিয়াম আয়নের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ অবস্থায় একটি অ্যাকশন পটেনশিয়াল (Action Potential) প্রিসিন্যাপটিক অ্যাক্সন টার্মিনালে পৌঁছালে কোষঝিল্লির ডিপোলারাইজেশন (Depolarization) ঘটে এবং ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল খুলে যায়। ফলে কোষের বাইরের তরল থেকে ধনাত্মক ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca²⁺) প্রিসিন্যাপটিক টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করে। এই ক্যালসিয়াম সংকেতের প্রভাবে সিন্যাপটিক ভেসিকলের ঝিল্লি প্রিসিন্যাপটিক কোষঝিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায় এবং এক্সোসাইটোসিস (Exocytosis) প্রক্রিয়ায় নিউরোট্রান্সমিটার সিন্যাপটিক ফাঁকে মুক্ত হয়। কিন্তু সিবি-ওয়ান রিসেপ্টর সক্রিয় হয়ে ক্যালসিয়াম চ্যানেলের কার্যক্রম কমিয়ে দিলে একই ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত পৌঁছানোর পরও তুলনামূলকভাবে কম ক্যালসিয়াম প্রবেশ করে। ফলে ভেসিকল থেকে নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণের সম্ভাবনা কমে যায়। এই প্রক্রিয়াকে প্রিসিন্যাপটিক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ দমন (Presynaptic Inhibition of Neurotransmitter Release) বলা হয়।
সিবি-ওয়ান রিসেপ্টর গ্লুটামেটার্জিক (Glutamatergic) এবং গাবাএর্জিক (GABAergic) উভয় ধরনের প্রিসিন্যাপটিক টার্মিনালেই অবস্থান করতে পারে। গ্লুটামেট নিঃসরণকারী নিউরনে সিবি-ওয়ান সক্রিয় হলে গ্লুটামেট নিঃসরণ কমে এবং পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনে উত্তেজনামূলক সংকেত দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে গাবা নিঃসরণকারী নিউরনে সিবি-ওয়ান সক্রিয় হলে গাবার নিঃসরণ কমে যায়। যেহেতু গাবা সাধারণত প্রতিবন্ধক নিউরোট্রান্সমিটার (Inhibitory Neurotransmitter), তাই তার নিঃসরণ কমে গেলে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুকোষের ওপর প্রতিবন্ধক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেতে পারে। এই ঘটনাকে ডিসইনহিবিশন (Disinhibition) বলা হয়। ফলে সিবি-ওয়ান রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার সামগ্রিক ফল নির্ভর করে রিসেপ্টরটি কোন ধরনের সিন্যাপসে অবস্থান করছে এবং সংশ্লিষ্ট স্নায়ুপথে কোন নিউরোট্রান্সমিটার প্রধান ভূমিকা পালন করছে তার ওপর। গ্লুটামেট নিঃসরণ হ্রাস সাধারণত উত্তেজনামূলক সংকেত দুর্বল করতে পারে, অন্যদিকে গাবা নিঃসরণ হ্রাস কিছু পরিস্থিতিতে পরবর্তী নিউরনের কার্যক্রম বাড়িয়ে দিতে পারে।
এন্ডোক্যানাবিনয়েডের মাধ্যমে সৃষ্ট এই সাময়িক সিন্যাপটিক নিয়ন্ত্রণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো ডিপোলারাইজেশন-ইনডিউসড সাপ্রেশন অব ইনহিবিশন (Depolarization-Induced Suppression of Inhibition – DSI) এবং ডিপোলারাইজেশন-ইনডিউসড সাপ্রেশন অব এক্সাইটেশন (Depolarization-Induced Suppression of Excitation – DSE)। প্রথম ক্ষেত্রে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের ডিপোলারাইজেশনের ফলে উৎপন্ন এন্ডোক্যানাবিনয়েড প্রিসিন্যাপটিক গাবা নিঃসরণ সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় প্রিসিন্যাপটিক গ্লুটামেট নিঃসরণ সাময়িকভাবে কমে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই পোস্টসিন্যাপটিক কোষ থেকে উৎপন্ন এন্ডোক্যানাবিনয়েড পূর্ববর্তী নিউরনের সংকেত পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রক্রিয়াগুলো স্বল্পমেয়াদি সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটির (Short-Term Synaptic Plasticity) উদাহরণ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি সিন্যাপটিক অবদমন (Long-Term Depression – LTD) সৃষ্টিতেও অংশগ্রহণ করতে পারে, যেখানে কোনো সিন্যাপসের সংকেত পরিবহনের কার্যকারিতা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময়ের জন্য হ্রাস পায়। এভাবে এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থা মস্তিষ্কের শেখা, স্মৃতি, আবেগ এবং আচরণগত অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়বিক সংযোগগুলোর কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে।
এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেতের স্থায়িত্ব নিয়ন্ত্রণের জন্য দেহে নির্দিষ্ট এনজাইমও রয়েছে। অ্যানান্ডামাইড প্রধানত ফ্যাটি অ্যাসিড অ্যামাইড হাইড্রোলেজ (Fatty Acid Amide Hydrolase – FAAH) এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙে যায়। অন্যদিকে টু-এজি প্রধানত মনোঅ্যাসিলগ্লিসারল লাইপেজ (Monoacylglycerol Lipase – MAGL) এনজাইমের মাধ্যমে বিপাকিত হয়। এই বিপাকীয় প্রক্রিয়াগুলো এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেতের স্থায়িত্ব সীমিত করতে সাহায্য করে। ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় নির্দিষ্ট স্নায়বিক কার্যকলাপের পর উৎপন্ন এন্ডোক্যানাবিনয়েড কিছু সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সিন্যাপসের কার্যক্রম পরিবর্তন করে এবং পরে তার প্রভাব হ্রাস পায়। এই স্থানীয় ও সময়নির্ভর নিয়ন্ত্রণ এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
গাঁজার টিএইচসি (THC) এই স্বাভাবিক এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থায় বাইরে থেকে প্রবেশ করে প্রভাব সৃষ্টি করে। টিএইচসি সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরের একটি আংশিক অ্যাগোনিস্ট (Partial Agonist)। অর্থাৎ এটি রিসেপ্টরে যুক্ত হয়ে রিসেপ্টর সক্রিয় করতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে পূর্ণ অ্যাগোনিস্টের (Full Agonist) তুলনায় কম সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। স্বাভাবিক অ্যানান্ডামাইড বা টু-এজি সাধারণত নির্দিষ্ট স্নায়বিক প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে উৎপন্ন হয় এবং তাদের কার্যকারিতা সংশ্লিষ্ট বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে বাইরে থেকে গ্রহণ করা টিএইচসি রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে একাধিক অঞ্চলের সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরে কাজ করতে পারে। টিএইচসি অত্যন্ত লিপিডদ্রবণীয় (Lipid-Soluble) হওয়ায় এটি সহজে রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (Blood-Brain Barrier) অতিক্রম করতে পারে এবং দেহের বিভিন্ন লিপিডসমৃদ্ধ কলায় বণ্টিত হয়। ফলে এর প্রভাব স্বাভাবিক এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেতের তুলনায় অধিক বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
টিএইচসি সিবি-ওয়ান রিসেপ্টর সক্রিয় করে বিভিন্ন স্নায়ুপথে নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণের স্বাভাবিক বিন্যাস পরিবর্তন করে। এর ফলে এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেতের সময়গত ও স্থানিক নিয়ন্ত্রণ (Temporal and Spatial Regulation) ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে গাবা নিঃসরণকারী নির্দিষ্ট নিউরনে সিবি-ওয়ান সক্রিয় হয়ে গাবা নিঃসরণ কমিয়ে দিলে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুপথে ডিসইনহিবিশন ঘটতে পারে। মস্তিষ্কের পুরস্কার-সম্পর্কিত ব্যবস্থায় এ ধরনের প্রক্রিয়া ডোপামিন-সম্পর্কিত নিউরনের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area – VTA) থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে (Nucleus Accumbens) বিস্তৃত মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থা (Mesolimbic Dopamine System) প্রভাবিত হয় এবং কিছু পরিস্থিতিতে ডোপামিন সংকেত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিবর্তন টিএইচসি-র পুরস্কারমূলক প্রভাব, পুনরায় গ্রহণের প্রবণতা এবং ক্যানাবিস ব্যবহারজনিত আসক্তির বিকাশে ভূমিকা পালন করতে পারে।
মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে টিএইচসি-র প্রভাব ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। হিপোক্যাম্পাসে সিবি-ওয়ান সংকেতের পরিবর্তন নতুন স্মৃতি গঠন এবং সাম্প্রতিক তথ্য ধরে রাখার ক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে। সেরেবেলাম ও বেসাল গ্যাংলিয়ায় এর প্রভাব পেশির সূক্ষ্ম সমন্বয়, প্রতিক্রিয়ার সময়, ভারসাম্য এবং চলন নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। সেরিব্রাল কর্টেক্সে সংকেত পরিবহনের পরিবর্তনের ফলে মনোযোগ, সময়ের উপলব্ধি, বিচারক্ষমতা এবং চিন্তার ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে অ্যামিগডালা ও আবেগ-সম্পর্কিত স্নায়ুপথে এর প্রভাবে প্রশান্তি, আনন্দানুভূতি, উদ্বেগ অথবা আতঙ্কের মতো ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। হাইপোথ্যালামাসে এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেতের পরিবর্তন ক্ষুধা ও খাদ্যগ্রহণের প্রবণতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে টিএইচসি গ্রহণের পর কারও মধ্যে সাময়িক ইউফোরিয়া (Euphoria) ও শিথিলতা দেখা দিলেও অন্য কারও মধ্যে উদ্বেগ, বিভ্রান্তি, স্বল্পমেয়াদি স্মৃতির দুর্বলতা এবং শারীরিক সমন্বয়ের ব্যাঘাত দেখা দিতে পারে। এসব প্রভাব গ্রহণের মাত্রা, ব্যক্তির সংবেদনশীলতা, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, ব্যবহারের পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক প্রস্তুতির বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল।
দীর্ঘমেয়াদি ও ঘন ঘন টিএইচসি গ্রহণের ফলে সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরের কার্যক্রমেও অভিযোজন ঘটতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মস্তিষ্কীয় অঞ্চলে রিসেপ্টর ডিসেনসিটাইজেশন (Receptor Desensitization) এবং রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন (Receptor Down-Regulation) দেখা যেতে পারে। ডিসেনসিটাইজেশনে রিসেপ্টরের সংকেত উৎপাদনের কার্যকারিতা কমে যায়, অর্থাৎ অ্যাগোনিস্ট যুক্ত হলেও রিসেপ্টর আগের মতো কার্যকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। অন্যদিকে ডাউন-রেগুলেশনে কোষের পৃষ্ঠে অথবা সংশ্লিষ্ট কলায় উপলব্ধ কার্যকর রিসেপ্টরের সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে। এসব পরিবর্তন টিএইচসি-র কিছু প্রভাবের প্রতি সহনশীলতা (Tolerance) বিকাশে ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত ব্যবহারের পর হঠাৎ বন্ধ করলে কিছু ব্যক্তির মধ্যে বিরক্তি, অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধা হ্রাস, উদ্বেগ এবং পুনরায় গাঁজা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষার মতো প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ (Withdrawal Symptoms) দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট এসব অভিযোজনের মাত্রা ও স্থায়িত্ব ব্যক্তি, ব্যবহারের ধরন এবং মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে। ব্যবহার বন্ধের পর অনেক ক্ষেত্রে সিবি-ওয়ান রিসেপ্টরের প্রাপ্যতা ও কার্যকারিতার পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে আংশিক বা উল্লেখযোগ্যভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
সুতরাং, সিবি-ওয়ান রিসেপ্টর হলো মানব মস্তিষ্কের এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর, যার মাধ্যমে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরন প্রিসিন্যাপটিক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় অ্যানান্ডামাইড ও টু-এজি এই রিসেপ্টর সক্রিয় করে গ্লুটামেট ও গাবাসহ বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। এর ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুপথে উত্তেজনামূলক ও প্রতিবন্ধক সংকেতের কার্যকারিতা পরিবর্তিত হয় এবং স্মৃতি, আবেগ, ক্ষুধা, ব্যথা ও চলন-সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে গাঁজার টিএইচসি বাইরে থেকে এসে একই রিসেপ্টরের আংশিক অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে এই স্বাভাবিক সংকেতব্যবস্থার কার্যক্রম পরিবর্তন করে। এর ফলেই টিএইচসি-র মনোসক্রিয় প্রভাব, স্মৃতি ও চলন-সমন্বয়ের সাময়িক ব্যাঘাত, পুরস্কারমূলক অনুভূতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও নির্ভরতার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর (Serotonin 5-HT2A Receptor)
এলএসডি (LSD), সাইলোসাইবিন (Psilocybin) থেকে উৎপন্ন সাইলোসিন (Psilocin) এবং মেসক্যালিন (Mescaline)-এর মতো ধ্রুপদি সাইকেডেলিক (Classical Psychedelic) পদার্থের মনোসক্রিয় প্রভাবের প্রধান আণবিক লক্ষ্য হলো সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর (Serotonin 5-HT2A Receptor)। এটি মানবদেহের স্বাভাবিক সেরোটোনার্জিক সংকেতব্যবস্থার (Serotonergic Signaling System) একটি গুরুত্বপূর্ণ রিসেপ্টর, যা স্নায়ুকোষের উত্তেজনাশীলতা, সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, মনোযোগ, জ্ঞানীয় কার্যক্রম এবং কর্টিক্যাল স্নায়বিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। এই রিসেপ্টরের সক্রিয়তা পরিবর্তিত হলে দৃষ্টিগত উপলব্ধি, সময়ের অনুভূতি, চিন্তার ধরন, আবেগ এবং আত্মসচেতনতার অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ধ্রুপদি সাইকেডেলিক পদার্থগুলোর প্রভাবে সৃষ্ট জ্যামিতিক দৃশ্যরূপ, রঙের তীব্রতা বৃদ্ধি, সংবেদনগুলোর অস্বাভাবিক পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয়ের অনুভূতিতে পরিবর্তনের সঙ্গে এই রিসেপ্টরের কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তবে এসব অভিজ্ঞতা কেবল একটি রিসেপ্টরের সরাসরি প্রভাব নয়; রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার পর মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুপথ ও বৃহত্তর কার্যকরী নেটওয়ার্কে সৃষ্ট পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
নামটির ব্যুৎপত্তি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জৈবরসায়নের আবিষ্কারের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেরোটোনিন (Serotonin) শব্দটি গঠিত হয়েছে সেরো- (Sero-) এবং টোনিন (-tonin) অংশের সমন্বয়ে। প্রথম অংশটি লাতিন সেরাম (Serum) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ রক্ত জমাট বাঁধার পর অবশিষ্ট তরল অংশ। দ্বিতীয় অংশটি রক্তনালীর সংকোচন বা ভাসকুলার টোন (Vascular Tone)-এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। টোন (Tone) শব্দটির ঐতিহাসিক উৎস গ্রিক টোনোস (Tonos), যার অর্থ টান, প্রসারণ বা টানটান অবস্থা। ১৯৪০-এর দশকে বিজ্ঞানী মরিস র্যাপাপোর্ট (Maurice M. Rapport), আরডা গ্রিন (Arda Green) এবং আরভিন পেজ (Irvine H. Page) রক্তের সিরাম থেকে রক্তনালী সংকুচিত করতে সক্ষম একটি রাসায়নিক পদার্থ পৃথক ও শনাক্ত করার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রক্তের সিরামে উপস্থিতি এবং রক্তনালীর সংকোচনক্ষমতার ভিত্তিতে পদার্থটির নামকরণ করা হয় সেরোটোনিন। ১৯৪৮ সালে এর পৃথকীকরণ ও শনাক্তকরণ এবং পরবর্তী গবেষণায় এর রাসায়নিক পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেরোটোনিনের রাসায়নিক নাম ৫-হাইড্রোক্সিট্রিপটামিন (5-Hydroxytryptamine – 5-HT)। এই নামের ৫-হাইড্রোক্সি (5-Hydroxy) অংশটি ট্রিপটামিনের ইন্ডোল বলয়ের পঞ্চম অবস্থানে একটি হাইড্রক্সিল গোষ্ঠীর উপস্থিতি নির্দেশ করে। ফলে ৫-এইচটি (5-HT) সংক্ষিপ্ত রূপটি সরাসরি ৫-হাইড্রোক্সিট্রিপটামিন নাম থেকে গঠিত, সেরোটোনিন শব্দের আদ্যক্ষর থেকে নয়।
সেরোটোনিন রিসেপ্টরগুলোর শ্রেণিবিন্যাসে ৫-এইচটি২এ (5-HT2A) নামটির প্রতিটি অংশের নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। এখানে ৫-এইচটি (5-HT) নির্দেশ করে রিসেপ্টরটির স্বাভাবিক অন্তর্জাত লিগ্যান্ড সেরোটোনিনকে। পরবর্তী ২ (2) সংখ্যাটি সেরোটোনিন রিসেপ্টরের দ্বিতীয় প্রধান পরিবার বা ৫-এইচটি২ রিসেপ্টর পরিবার (5-HT2 Receptor Family) নির্দেশ করে। শেষের এ (A) বর্ণটি এই পরিবারের নির্দিষ্ট উপপ্রকারকে চিহ্নিত করে। এই পরিবারের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলো ৫-এইচটি২বি রিসেপ্টর (5-HT2B Receptor) এবং ৫-এইচটি২সি রিসেপ্টর (5-HT2C Receptor)। ফলে ৫-এইচটি২এ নামটির অর্থ হলো সেরোটোনিন রিসেপ্টরের দ্বিতীয় পরিবারের এ উপপ্রকার। মানবদেহে এই রিসেপ্টরটি এইচটিআর২এ (HTR2A) জিনের মাধ্যমে সংকেতায়িত হয়। আণবিক শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে এটি একটি জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (G-Protein-Coupled Receptor – GPCR), যার প্রধান সংকেত পরিবহন ব্যবস্থা জি-কিউ/ইলেভেন প্রোটিন (Gq/11 Protein)-নির্ভর।
শারীরস্থানিক দিক থেকে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর মানব মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সে (Cerebral Cortex) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex), অ্যাসোসিয়েশন কর্টেক্স (Association Cortex) এবং বিভিন্ন সংবেদন-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে পাওয়া যায়। কর্টেক্সের পঞ্চম স্তরের পিরামিডাল নিউরনগুলোতে (Layer V Pyramidal Neurons) এই রিসেপ্টরের কার্যকরী ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত, যদিও এর উপস্থিতি কেবল এই স্তর বা নিউরনশ্রেণিতে সীমাবদ্ধ নয়। কর্টেক্সের অন্যান্য স্তরের পিরামিডাল নিউরন এবং নির্দিষ্ট ইন্টারনিউরনেও (Interneuron) ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর থাকতে পারে। পিরামিডাল নিউরনগুলো প্রধানত গ্লুটামেট নিঃসরণকারী উত্তেজনামূলক নিউরন, যেগুলো কর্টেক্সের বিভিন্ন অঞ্চল এবং কর্টেক্সের বাইরের স্নায়বিক কাঠামোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। বিশেষ করে পঞ্চম স্তরের পিরামিডাল নিউরনগুলো কর্টিক্যাল সংকেতকে অন্যান্য মস্তিষ্কীয় অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই নিউরনগুলোর কার্যক্রম পরিবর্তিত হলে বৃহত্তর স্নায়বিক নেটওয়ার্কে তথ্য পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের ধরনও পরিবর্তিত হতে পারে।
মানবদেহে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের স্বাভাবিক অন্তর্জাত লিগ্যান্ড হলো সেরোটোনিন (Serotonin)। সেরোটোনিন একটি মনোঅ্যামিন নিউরোট্রান্সমিটার (Monoamine Neurotransmitter), যা অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড ট্রিপটোফ্যান (Tryptophan) থেকে সংশ্লেষিত হয়। প্রথমে ট্রিপটোফ্যান হাইড্রক্সিলেজ (Tryptophan Hydroxylase) এনজাইমের মাধ্যমে ট্রিপটোফ্যান থেকে ৫-হাইড্রোক্সিট্রিপটোফ্যান (5-Hydroxytryptophan – 5-HTP) উৎপন্ন হয়। পরবর্তীতে অ্যারোম্যাটিক এল-অ্যামিনো অ্যাসিড ডিকার্বক্সিলেজ (Aromatic L-Amino Acid Decarboxylase – AADC) এনজাইম ৫-হাইড্রোক্সিট্রিপটোফ্যানের কার্বক্সিল গোষ্ঠী অপসারণ করে সেরোটোনিন উৎপন্ন করে। মস্তিষ্কের সেরোটোনিন-উৎপাদক নিউরনগুলোর একটি প্রধান উৎস হলো মস্তিষ্ককাণ্ডের রাফে নিউক্লিয়াসসমূহ (Raphe Nuclei)। এসব নিউরনের অ্যাক্সন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে সেরোটোনিন নিঃসরণ করে এবং সেরোটোনার্জিক সংকেতব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ও জ্ঞানীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে।
সাধারণ রাসায়নিক সিন্যাপসে প্রিসিন্যাপটিক নিউরন থেকে নিঃসৃত সেরোটোনিন সিন্যাপটিক ফাঁক (Synaptic Cleft) অতিক্রম করে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের সেরোটোনিন রিসেপ্টরে যুক্ত হতে পারে। তবে সেরোটোনিনের সব রিসেপ্টর একই ধরনের সংকেত সৃষ্টি করে না। সেরোটোনিন রিসেপ্টরের অধিকাংশ পরিবার জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর হলেও ৫-এইচটি৩ রিসেপ্টর (5-HT3 Receptor) একটি লিগ্যান্ড-গেটেড আয়ন চ্যানেল (Ligand-Gated Ion Channel)। অন্যদিকে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর সরাসরি কোনো আয়ন চ্যানেল নয়; এটি কোষের অভ্যন্তরে জি-প্রোটিন ও দ্বিতীয় বার্তাবাহকের মাধ্যমে সংকেত পরিবহন করে। ফলে সেরোটোনিন এই রিসেপ্টরে যুক্ত হওয়ার পর কোষঝিল্লির আয়ন পরিবাহিতা এবং নিউরনের উত্তেজনাশীলতা বিভিন্ন পরোক্ষ আণবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়।
আণবিক গঠনের দিক থেকে ৫-এইচটি২এ একটি সাতবার ঝিল্লি-অতিক্রমকারী জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (Seven-Transmembrane G-Protein-Coupled Receptor)। অর্থাৎ এর প্রোটিন শৃঙ্খল কোষঝিল্লির লিপিড দ্বিস্তরকে সাতবার অতিক্রম করে। সেরোটোনিন অথবা উপযুক্ত সাইকেডেলিক অ্যাগোনিস্ট রিসেপ্টরের বন্ধনস্থলে যুক্ত হলে রিসেপ্টরের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস পরিবর্তিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট জি-কিউ/ইলেভেন প্রোটিন (Gq/11 Protein) সক্রিয় হয়। এই জি-প্রোটিনের আলফা উপএকক (Gαq/11) কোষঝিল্লির সঙ্গে সম্পর্কিত ফসফোলাইপেজ সি-বিটা (Phospholipase C-Beta – PLCβ) এনজাইম সক্রিয় করে। ফসফোলাইপেজ সি-বিটা কোষঝিল্লির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসফোলিপিড ফসফাটিডাইলইনোসিটল ৪,৫-বিসফসফেট (Phosphatidylinositol 4,5-Bisphosphate – PIP2)-কে ভেঙে দুটি পৃথক দ্বিতীয় বার্তাবাহক উৎপন্ন করে। এরা হলো ইনোসিটল ১,৪,৫-ট্রাইসফসফেট (Inositol 1,4,5-Trisphosphate বা IP3) এবং ডাইঅ্যাসিলগ্লিসারল (Diacylglycerol বা DAG)।
এই দুটি দ্বিতীয় বার্তাবাহক কোষের অভ্যন্তরে পৃথক কিন্তু পরস্পর-সম্পর্কিত সংকেতপথ সক্রিয় করে। আইপি৩ (IP3) কোষের সাইটোসলে (Cytosol) ছড়িয়ে পড়ে এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের (Endoplasmic Reticulum – ER) ঝিল্লিতে অবস্থিত আইপি৩ রিসেপ্টরে (IP3 Receptor) যুক্ত হয়। এই রিসেপ্টর একটি ক্যালসিয়াম-পরিবাহী চ্যানেল হিসেবে কাজ করে। আইপি৩ যুক্ত হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চ্যানেলটি খুলে যায় এবং এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের অভ্যন্তরে সঞ্চিত ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca²⁺) সাইটোসলে মুক্ত হয়। ফলে কোষের অভ্যন্তরে মুক্ত ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ক্যালসিয়াম সংকেত বিভিন্ন ক্যালসিয়াম-সংবেদনশীল প্রোটিন, এনজাইম এবং আয়ন চ্যানেলের কার্যক্রম পরিবর্তন করে। অন্যদিকে ডিএজি (DAG) প্রধানত কোষঝিল্লির সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থায় থেকে নির্দিষ্ট প্রোটিন কাইনেজ সি (Protein Kinase C বা PKC) আইসোফর্ম সক্রিয় করতে সাহায্য করে। প্রোটিন কাইনেজ সি বিভিন্ন লক্ষ্য প্রোটিনের ফসফরাইলেশন (Phosphorylation) ঘটিয়ে কোষের সংকেত পরিবহন, আয়ন চ্যানেলের কার্যক্রম এবং অন্যান্য জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে।
এই জি-কিউ/ইলেভেন-ফসফোলাইপেজ সি-আইপি৩/ডিএজি সংকেতপথ (Gq/11-PLC-IP3/DAG Signaling Pathway) ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের একটি প্রধান আণবিক কার্যপ্রণালি। তবে রিসেপ্টর সক্রিয় হলেই প্রতিটি নিউরনে একই মাত্রায় ক্যালসিয়াম বৃদ্ধি পাবে অথবা একই ধরনের বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে, এমন নয়। কোষের ধরন, রিসেপ্টরের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট আয়ন চ্যানেল, পূর্ববর্তী স্নায়বিক কার্যকলাপ এবং অন্যান্য সংকেতপথের অবস্থার ওপর নির্ভর করে প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়। নির্দিষ্ট কর্টিক্যাল পিরামিডাল নিউরনে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের সক্রিয়তা ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে নিউরনের উত্তেজনাশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। এর ফলে নিউরনটি আগত উত্তেজনামূলক সংকেতের প্রতি অধিক সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে অথবা তার অ্যাকশন পটেনশিয়াল (Action Potential) উৎপাদনের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ইন্টারনিউরন ও অন্যান্য স্নায়বিক সংযোগের ওপর প্রভাব পড়ায় কর্টিক্যাল নেটওয়ার্কে উত্তেজনামূলক ও প্রতিবন্ধক সংকেতের ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে।
এলএসডি (Lysergic Acid Diethylamide – LSD), সাইলোসিন (Psilocin) এবং মেসক্যালিন (Mescaline) ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরে অ্যাগোনিস্ট (Agonist) হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এদের রাসায়নিক গঠন, রিসেপ্টরের প্রতি আকর্ষণক্ষমতা (Affinity), কার্যকরী পোটেন্সি (Potency), সংকেতপথ সক্রিয় করার বৈশিষ্ট্য এবং দেহে অবস্থানের সময় এক নয়। এলএসডি একটি এরগোলিনজাত (Ergoline-Derived) যৌগ, সাইলোসিন একটি ট্রিপটামিনজাত (Tryptamine-Derived) যৌগ এবং মেসক্যালিন একটি ফেনেথাইলামিনজাত (Phenethylamine-Derived) যৌগ। সাইলোসাইবিন (Psilocybin) নিজে সাইলোসিনের একটি ফসফরাইলযুক্ত পূর্বসূরি বা প্রোড্রাগ (Prodrug), যা দেহে ডিফসফরাইলেশন (Dephosphorylation) প্রক্রিয়ায় সাইলোসিনে রূপান্তরিত হয়। সাইলোসিনই সাইলোসাইবিন গ্রহণের পর সৃষ্ট প্রধান সাইকেডেলিক প্রভাবের জন্য দায়ী সক্রিয় যৌগ। এই পদার্থগুলোর সাইকেডেলিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিছু যৌগ অন্যান্য সেরোটোনিন রিসেপ্টর এবং অন্যান্য আণবিক লক্ষ্যেও কাজ করতে পারে।
রিসেপ্টরের সংকেত পরিবহনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো কার্যকরী নির্বাচনী সংকেতায়ন (Functional Selectivity) বা বায়াসড অ্যাগোনিজম (Biased Agonism)। একই রিসেপ্টরে যুক্ত হওয়া দুটি ভিন্ন অ্যাগোনিস্ট রিসেপ্টরের ভিন্ন সক্রিয় ত্রিমাত্রিক বিন্যাসকে স্থিতিশীল করতে পারে। এর ফলে রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন জি-প্রোটিন, বিটা-অ্যারেস্টিন (Beta-Arrestin) অথবা অন্যান্য কোষীয় সংকেতব্যবস্থার সক্রিয়তার ধরন ভিন্ন হতে পারে। ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের ক্ষেত্রেও সেরোটোনিন এবং বিভিন্ন সাইকেডেলিক অ্যাগোনিস্টের সংকেত উৎপাদনের বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য দেখা যায়। ফলে কোনো যৌগ রিসেপ্টরে যুক্ত হচ্ছে কি না, শুধু এই তথ্য দিয়ে তার সম্পূর্ণ মনোসক্রিয় প্রভাব ব্যাখ্যা করা যায় না। রিসেপ্টরের কোন সংকেতপথ কতটা সক্রিয় হচ্ছে, কোন ধরনের নিউরনে তা ঘটছে এবং বৃহত্তর স্নায়বিক নেটওয়ার্কে তার কী প্রভাব পড়ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্টেক্সের পঞ্চম স্তরের পিরামিডাল নিউরনগুলোর ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর সক্রিয় হলে গ্লুটামেটার্জিক সংকেত পরিবহন (Glutamatergic Signaling) পরিবর্তিত হতে পারে। গ্লুটামেট হলো মস্তিষ্কের প্রধান উত্তেজনামূলক নিউরোট্রান্সমিটার (Excitatory Neurotransmitter)। নির্দিষ্ট কর্টিক্যাল স্নায়ুপথে সাইকেডেলিক পদার্থের প্রভাবে গ্লুটামেট-সম্পর্কিত কার্যক্রম ও সিন্যাপটিক সংকেত পরিবহনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এই পরিবর্তন স্থানীয় নিউরনের উত্তেজনাশীলতা, সিন্যাপটিক সংযোগের কার্যকারিতা এবং কর্টেক্সের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর অর্থ কর্টেক্সের সব পিরামিডাল নিউরন একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৈদ্যুতিক সংকেত উৎপন্ন করতে শুরু করে, এমন নয়। বরং সাইকেডেলিক পদার্থের প্রভাবে স্নায়বিক কার্যকলাপের সময়গত বিন্যাস, বিভিন্ন নিউরনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সমন্বয় এবং কর্টিক্যাল নেটওয়ার্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে।
মানব মস্তিষ্কের সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণে থ্যালামোকর্টিক্যাল যোগাযোগ (Thalamocortical Communication) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থ্যালামাস (Thalamus) বিভিন্ন সংবেদনশীল সংকেত কর্টেক্সে পরিবহন এবং কর্টিক্যাল কার্যকলাপের সঙ্গে সমন্বয়ে অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে কর্টেক্সের বিভিন্ন অঞ্চল অতীত অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা, মনোযোগ এবং বর্তমান সংবেদনশীল তথ্যের সমন্বয়ে উপলব্ধি গঠন করে। ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার ফলে এই বৃহত্তর তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটতে পারে। সাইকেডেলিক অবস্থায় থ্যালামাস ও কর্টেক্সের কার্যকরী যোগাযোগ এবং বিভিন্ন কর্টিক্যাল নেটওয়ার্কের পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় বিভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। এসব পরিবর্তন সংবেদনশীল তথ্যের গুরুত্ব নির্ধারণ, মনোযোগের বণ্টন এবং উপলব্ধির স্বাভাবিক বিন্যাসকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সাইকেডেলিক দৃষ্টিভ্রমের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা কেবল থ্যালামাসের সংকেত ছাঁকনির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; কর্টিক্যাল সংকেত প্রক্রিয়াকরণ ও বৃহত্তর নেটওয়ার্কের পরিবর্তনও এতে জড়িত।
মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যকরী নেটওয়ার্কের মধ্যে ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (Default Mode Network – DMN) বিশেষভাবে আলোচিত। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আত্মসম্পর্কিত চিন্তা (Self-Referential Processing), আত্মজৈবনিক স্মৃতি (Autobiographical Memory), মানসিকভাবে অতীত ও ভবিষ্যৎ কল্পনা এবং নিজের সম্পর্কে ধারাবাহিক ধারণা গঠনের সম্পর্ক রয়েছে। এর গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Medial Prefrontal Cortex) এবং পোস্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স (Posterior Cingulate Cortex) অন্তর্ভুক্ত। এলএসডি ও সাইলোসাইবিনজাত সাইকেডেলিক পদার্থের প্রভাবে ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ কার্যকরী সংযোগ এবং অন্যান্য মস্তিষ্কীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর সম্পর্ক পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় এই পরিবর্তনের সঙ্গে ইগো ডিসলিউশন (Ego Dissolution) বা নিজের স্বতন্ত্র সত্তার সীমানা দুর্বল হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় ব্যক্তি নিজের শরীর, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যকার স্বাভাবিক পার্থক্যকে সাময়িকভাবে পরিবর্তিতভাবে অনুভব করতে পারেন। তবে এই অভিজ্ঞতা সব সাইকেডেলিক ব্যবহারকারীর মধ্যে ঘটে না এবং ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কের পরিবর্তনই এর একমাত্র প্রতিষ্ঠিত কারণ নয়।
সাইকেডেলিক দৃষ্টিগত পরিবর্তন (Psychedelic Visual Alterations) ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর-সম্পর্কিত মনোসক্রিয় প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এসব পরিবর্তনের মধ্যে রঙের উজ্জ্বলতা বা তীব্রতা বৃদ্ধি, বস্তুর আকৃতি ও গতির অস্বাভাবিক উপলব্ধি, পৃষ্ঠতলে জ্যামিতিক নকশা দেখা, দৃশ্যমান বস্তুর চারপাশে পরিবর্তনশীল রেখা বা নকশা অনুভব করা এবং চোখ বন্ধ অবস্থায় জটিল দৃশ্যরূপ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। চোখ বন্ধ অবস্থায় সৃষ্ট দৃশ্যরূপকে ক্লোজড-আই ভিজুয়ালস (Closed-Eye Visuals) বলা হয়। এ ধরনের অভিজ্ঞতায় বাহ্যিক আলোক-উদ্দীপনা অনুপস্থিত থাকলেও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার কার্যকলাপের ফলে দৃশ্যগত অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। কর্টিক্যাল উত্তেজনাশীলতা, দৃশ্য-সম্পর্কিত স্নায়ুপথের কার্যকরী যোগাযোগ এবং উপলব্ধি গঠনে পূর্বপ্রত্যাশার ভূমিকা পরিবর্তিত হওয়া এসব অভিজ্ঞতার সম্ভাব্য স্নায়বিক ভিত্তির অন্তর্ভুক্ত। তবে সব দৃশ্যগত পরিবর্তনকে একই ধরনের হ্যালুসিনেশন (Hallucination) বলা যথাযথ নয়; কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব উদ্দীপনার উপলব্ধি বিকৃত হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে বাহ্যিক উদ্দীপনা ছাড়াই দৃশ্যগত অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়।
সাইকেডেলিক পদার্থের প্রভাবে কখনো কখনো সিনেস্থেশিয়া (Synesthesia)-সদৃশ অভিজ্ঞতাও দেখা দিতে পারে। সিনেস্থেশিয়া বলতে সাধারণভাবে এমন অভিজ্ঞতাকে বোঝায়, যেখানে একটি সংবেদনশীল বা জ্ঞানীয় উদ্দীপনা অন্য একটি সংবেদনশীল অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি সংগীত শোনার সময় নির্দিষ্ট রঙ বা দৃশ্যগত নকশার অনুভূতি পেতে পারেন। সাইকেডেলিক অবস্থায় এ ধরনের সাময়িক সংবেদন-সম্পর্কিত পরিবর্তনকে অনেক সময় ড্রাগ-ইনডিউসড সিনেস্থেশিয়া (Drug-Induced Synesthesia) বলা হয়। তবে এটি বিকাশগত সিনেস্থেশিয়ার (Developmental Synesthesia) সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। সাইকেডেলিক পদার্থের প্রভাবে বিভিন্ন সংবেদন-প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্কের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং তথ্য সমন্বয়ের ধরন পরিবর্তিত হওয়া এ ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর সক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো চেতনার পরিবর্তিত অবস্থা (Altered State of Consciousness)। এই অবস্থায় ব্যক্তি সময়ের প্রবাহকে স্বাভাবিকের তুলনায় ধীর বা দ্রুত মনে করতে পারেন, চিন্তার মধ্যে অস্বাভাবিক সংযোগ অনুভব করতে পারেন, পরিচিত পরিবেশকে অপরিচিত বা নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারেন এবং আবেগের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে পারে। কিছু ব্যক্তি গভীর ঐক্যবোধ, আত্মসীমার বিলোপ, বিস্ময় অথবা অস্তিত্বগত তাৎপর্যের অনুভূতি বর্ণনা করেন। মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে কখনো মিস্টিক্যাল-টাইপ এক্সপেরিয়েন্স (Mystical-Type Experience) বলা হয়। এখানে পরিভাষাটি অভিজ্ঞতার বিষয়গত বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে; এর মাধ্যমে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা, জগত অথবা অভিজ্ঞতার অতিপ্রাকৃত উৎসের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। ব্যক্তির পূর্ববর্তী বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পটভূমি, প্রত্যাশা, মানসিক অবস্থা এবং ব্যবহারের পরিবেশ এসব অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা ও অনুভূত তীব্রতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই প্রসঙ্গে সেট অ্যান্ড সেটিং (Set and Setting) ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সেট (Set) বলতে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, প্রত্যাশা, ব্যক্তিত্ব, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা এবং সাইকেডেলিক পদার্থ গ্রহণের সময়কার মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিকে বোঝায়। অন্যদিকে সেটিং (Setting) বলতে ভৌত পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি, আশপাশের মানুষের আচরণ এবং নিরাপত্তাবোধের মতো বাহ্যিক উপাদানকে বোঝায়। একই সাইকেডেলিক পদার্থ ও অনুরূপ মাত্রায়ও ভিন্ন ব্যক্তি অথবা একই ব্যক্তি ভিন্ন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে আনন্দ, প্রশান্তি ও বিস্ময়ের অনুভূতি দেখা দিলেও অন্য কারও ক্ষেত্রে তীব্র উদ্বেগ, আতঙ্ক, বিভ্রান্তি অথবা অস্বস্তিকর উপলব্ধি তৈরি হতে পারে। ফলে সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার প্রকৃতি কেবল রিসেপ্টরের আণবিক সক্রিয়তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ।
ধ্রুপদি সাইকেডেলিক পদার্থগুলোর মনোসক্রিয় প্রভাবের ক্ষেত্রে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় রিসেপ্টর অ্যান্টাগোনিস্ট (Receptor Antagonist) ব্যবহার করে পরিচালিত গবেষণায়। বিশেষ করে কেটানসেরিন (Ketanserin) একটি ৫-এইচটি২এ-প্রধান অ্যান্টাগোনিস্ট, যা রিসেপ্টরে অ্যাগোনিস্টের কার্যক্রম প্রতিহত করতে পারে। নিয়ন্ত্রিত মানবগবেষণায় কেটানসেরিন দিয়ে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর অবরুদ্ধ করলে সাইলোসাইবিন থেকে উৎপন্ন সাইলোসিন অথবা এলএসডি-র বিভিন্ন সাইকেডেলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে বা প্রতিহত হতে দেখা গেছে। এই ফলাফল নির্দেশ করে যে ধ্রুপদি সাইকেডেলিক পদার্থগুলোর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপলব্ধিগত ও চেতনাগত পরিবর্তনের জন্য ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের সক্রিয়তা কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করে। তবে কোনো পদার্থের সব শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব একমাত্র এই রিসেপ্টরের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না।
দীর্ঘমেয়াদি অথবা ঘন ঘন সাইকেডেলিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের কার্যক্রমে অভিযোজনমূলক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর মধ্যে রিসেপ্টর ডিসেনসিটাইজেশন (Receptor Desensitization) এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন (Receptor Down-Regulation) গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেনসিটাইজেশনে রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার পর তার সংকেত উৎপাদনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে ডাউন-রেগুলেশনে কোষের পৃষ্ঠে অথবা সংশ্লিষ্ট কলায় উপলব্ধ রিসেপ্টরের সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে। ধ্রুপদি সাইকেডেলিক পদার্থের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় গ্রহণ করলে একই মাত্রায় পূর্বের তুলনায় কম মনোসক্রিয় প্রভাব অনুভূত হতে পারে। এই ঘটনাকে দ্রুত সহনশীলতা (Rapid Tolerance) অথবা ট্যাকিফাইল্যাক্সিস (Tachyphylaxis) বলা হয়। এলএসডি, সাইলোসাইবিন ও মেসক্যালিনের মতো কিছু ধ্রুপদি সাইকেডেলিক পদার্থের মধ্যে ক্রস-টলারেন্স (Cross-Tolerance)-ও দেখা যেতে পারে, অর্থাৎ একটি পদার্থের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হলে একই রিসেপ্টর ব্যবস্থায় কাজ করা অন্য পদার্থের প্রভাবও কমে যেতে পারে। তবে এই সহনশীলতার নির্দিষ্ট কোষীয় প্রক্রিয়া পদার্থ, মাত্রা, ব্যবহারের সময়কাল এবং পরীক্ষামূলক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের সঙ্গে সম্পর্কিত সব রাসায়নিক পদার্থ সাইকেডেলিক প্রভাব সৃষ্টি করে না। স্বাভাবিক সেরোটোনিন (Serotonin) এই রিসেপ্টরের অন্তর্জাত অ্যাগোনিস্ট হলেও সাধারণ শারীরবৃত্তীয় অবস্থায় এর সংকেত সাইকেডেলিক পদার্থের মতো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চেতনাগত পরিবর্তন সৃষ্টি করে না। একইভাবে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরে কাজ করা বিভিন্ন অ্যাগোনিস্টের মধ্যে সংকেতপথের নির্বাচন, রিসেপ্টর সক্রিয় করার ক্ষমতা, মস্তিষ্কে প্রবেশক্ষমতা এবং বৃহত্তর স্নায়বিক নেটওয়ার্কে প্রভাবের পার্থক্য রয়েছে। এই কারণে রিসেপ্টরটির উপস্থিতি অথবা সক্রিয়তা সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ আণবিক ভিত্তি হলেও সাইকেডেলিক প্রভাবের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যার জন্য সংশ্লিষ্ট যৌগের ফার্মাকোলজি, কোষীয় সংকেতপথ এবং মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কগত প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুতরাং, সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর হলো মানব মস্তিষ্কের সেরোটোনার্জিক সংকেতব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর, যা বিশেষ করে কর্টিক্যাল নিউরনের উত্তেজনাশীলতা ও স্নায়বিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। স্বাভাবিক অবস্থায় সেরোটোনিন এই রিসেপ্টর সক্রিয় করে প্রধানত জি-কিউ/ইলেভেন-ফসফোলাইপেজ সি-আইপি৩/ডিএজি সংকেতপথের (Gq/11-PLC-IP3/DAG Signaling Pathway) মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরীণ ক্যালসিয়াম সংকেত, প্রোটিন কাইনেজ সি-সম্পর্কিত কার্যক্রম এবং বিভিন্ন আয়ন চ্যানেলের কার্যকারিতা পরিবর্তন করতে পারে। অন্যদিকে এলএসডি, সাইলোসিন ও মেসক্যালিনের মতো ধ্রুপদি সাইকেডেলিক পদার্থ এই রিসেপ্টরে অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে কর্টিক্যাল স্নায়বিক কার্যকলাপ, গ্লুটামেট-সম্পর্কিত সংকেত পরিবহন এবং বৃহত্তর মস্তিষ্কীয় নেটওয়ার্কের কার্যকরী যোগাযোগ পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে দৃশ্যগত উপলব্ধি, সময়ের অনুভূতি, আবেগ, চিন্তার ধরন এবং আত্মসচেতনতার অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এই পরিবর্তনগুলোর কিছু ব্যক্তি গভীর বা আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ বলে অনুভব করলেও স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলো মস্তিষ্কের রাসায়নিক সংকেতব্যবস্থা ও নেটওয়ার্কগত কার্যক্রমের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গত অভিজ্ঞতা। ফলে ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর আধুনিক সাইকেডেলিক ফার্মাকোলজি, উপলব্ধির স্নায়ুবিজ্ঞান এবং চেতনার জৈবিক ভিত্তি অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আণবিক লক্ষ্য।
গাবা-এ রিসেপ্টর ও ক্লোরাইড চ্যানেল (GABA-A Receptor and Chloride Channel)
মানব মস্তিষ্কের স্নায়বিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান আণবিক ব্যবস্থা হলো গাবা-এ রিসেপ্টর (GABA-A Receptor)। এটি একটি আয়নোট্রপিক রিসেপ্টর (Ionotropic Receptor), যা একই সঙ্গে লিগ্যান্ড-গেটেড আয়ন চ্যানেল (Ligand-Gated Ion Channel) হিসেবে কাজ করে। মস্তিষ্কের প্রধান প্রতিবন্ধক নিউরোট্রান্সমিটার গাবা (GABA) এই রিসেপ্টরে যুক্ত হলে এর কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেল খুলে যায় এবং প্রধানত ক্লোরাইড আয়ন (Chloride Ion – Cl⁻) ঝিল্লি অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে অধিকাংশ পরিণত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরনে বৈদ্যুতিক উত্তেজনা ও অ্যাকশন পটেনশিয়াল (Action Potential) উৎপাদনের সম্ভাবনা কমে যায়। উদ্বেগনাশক (Anxiolytic), ঘুম-উদ্রেককারী (Hypnotic), অবসাদক (Sedative), খিঁচুনিরোধী (Anticonvulsant) এবং চেতনানাশক (Anesthetic) ওষুধের বিভিন্ন শ্রেণি এই রিসেপ্টরের কার্যক্রম পরিবর্তন করে কাজ করে। বিশেষ করে বেঞ্জোডায়াজেপিন (Benzodiazepine), বার্বিচুরেট (Barbiturate) এবং নির্দিষ্ট সাধারণ চেতনানাশক (General Anesthetic) পদার্থের ফার্মাকোলজিতে গাবা-এ রিসেপ্টর কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করে। ইথানল (Ethanol)-এর কিছু প্রভাবের সঙ্গেও গাবা-এ সংকেতব্যবস্থা সম্পর্কিত, যদিও ইথানলের কার্যপ্রণালি অনেক বেশি বিস্তৃত এবং সব গাবা-এ রিসেপ্টরে এর সরাসরি প্রভাব একই রকম নয়।
গাবা (GABA) একটি আদ্যক্ষরীয় সংক্ষিপ্ত রূপ, যার পূর্ণ রাসায়নিক নাম গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড (Gamma-Aminobutyric Acid)। আধুনিক পদ্ধতিগত রাসায়নিক নামকরণে যৌগটির নাম ৪-অ্যামিনোবিউটানোয়িক অ্যাসিড (4-Aminobutanoic Acid)। এর আণবিক সংকেত C₄H₉NO₂ এবং সংক্ষিপ্ত গাঠনিক সংকেত NH₂-CH₂-CH₂-CH₂-COOH। নামের বিউটারিক অ্যাসিড (Butyric Acid) অংশটি চার কার্বনবিশিষ্ট কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মূল কাঠামো নির্দেশ করে। বিউটারিক (Butyric) শব্দটির উৎস লাতিন বিউটিরাম (Butyrum), যার অর্থ মাখন; ঐতিহাসিকভাবে মাখনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিউটারিক অ্যাসিডের নাম থেকেই এই রাসায়নিক নামের উৎপত্তি। অন্যদিকে অ্যামিনো (Amino) অংশটি অ্যামিন গোষ্ঠীর উপস্থিতি নির্দেশ করে। গামা (Gamma) গ্রিক বর্ণমালার তৃতীয় বর্ণ, যা এখানে কার্বক্সিল গোষ্ঠীর কার্বন থেকে গণনা করলে তৃতীয় সংলগ্ন কার্বন অবস্থানে অ্যামিনো গোষ্ঠীর উপস্থিতি বোঝায়। আধুনিক সংখ্যাভিত্তিক নামকরণে একই অবস্থানকে চার নম্বর কার্বন বলা হয়, কারণ কার্বক্সিল কার্বন নিজেই এক নম্বর অবস্থান পায়। এই কারণেই গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড ও ৪-অ্যামিনোবিউটানোয়িক অ্যাসিড একই যৌগের দুটি নাম।
গাবা একটি অপ্রোটিনোজেনিক অ্যামিনো অ্যাসিড (Non-Proteinogenic Amino Acid)। অর্থাৎ এটি অ্যামিনো ও কার্বক্সিল গোষ্ঠীযুক্ত হলেও সাধারণ প্রোটিন সংশ্লেষণের সময় রাইবোসোমের মাধ্যমে প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড শৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রচলিত বিশটি অ্যামিনো অ্যাসিডের সদস্য নয়। এর অ্যামিনো গোষ্ঠী কার্বক্সিল গোষ্ঠীর পাশের আলফা কার্বনে না থেকে গামা অবস্থানে থাকে। মানব মস্তিষ্কে এটি প্রধানত একটি নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। ১৯৫০ সালে ইউজিন রবার্টস (Eugene Roberts) এবং স্যাম ফ্রাঙ্কেল (Sam Frankel)-এর গবেষণায় মস্তিষ্কের টিস্যুতে গাবার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। একই সময়ে জর্জ অ্যাওয়াপারা (Jorge Awapara) ও তার সহকর্মীরাও মস্তিষ্কে গাবা শনাক্ত করেন। পরবর্তী গবেষণায় গাবা যে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি প্রধান প্রতিবন্ধক নিউরোট্রান্সমিটার, তা প্রতিষ্ঠিত হয়।
মস্তিষ্কের গাবার একটি প্রধান উৎস হলো গ্লুটামেট (Glutamate)। গ্লুটামেট নিজে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান উত্তেজনামূলক নিউরোট্রান্সমিটার। গ্লুটামেট ডিকার্বক্সিলেজ (Glutamate Decarboxylase – GAD) এনজাইম গ্লুটামেটের একটি কার্বক্সিল গোষ্ঠী অপসারণ করে গাবা উৎপন্ন করে। এই বিক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নির্গত হয় এবং পাইরিডক্সাল ৫-ফসফেট (Pyridoxal 5-Phosphate – PLP) সহকারক হিসেবে অংশগ্রহণ করে। পাইরিডক্সাল ৫-ফসফেট হলো ভিটামিন বি৬ (Vitamin B6)-এর সক্রিয় সহকারক রূপগুলোর একটি। মানবদেহে গ্লুটামেট ডিকার্বক্সিলেজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইসোফর্ম হলো জিএডি৬৫ (GAD65) এবং জিএডি৬৭ (GAD67), যেগুলো যথাক্রমে জিএডি২ (GAD2) এবং জিএডি১ (GAD1) জিন দ্বারা সংকেতায়িত হয়। সংশ্লেষিত গাবা ভেসিকুলার গাবা ট্রান্সপোর্টার (Vesicular GABA Transporter – VGAT)-এর মাধ্যমে সিন্যাপটিক ভেসিকলে সঞ্চিত হতে পারে। নিউরনে অ্যাকশন পটেনশিয়াল পৌঁছালে ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল (Voltage-Gated Calcium Channel) সক্রিয় হয়ে ক্যালসিয়াম প্রবেশ ঘটায় এবং সেই সংকেতের ফলে ভেসিকল কোষঝিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গাবা সিন্যাপটিক ফাঁকে নিঃসরণ করে।
গাবা নিঃসরণের পর পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের গাবা রিসেপ্টরে যুক্ত হতে পারে। মানব স্নায়ুতন্ত্রে গাবার দুটি প্রধান রিসেপ্টর শ্রেণি হলো গাবা-এ রিসেপ্টর (GABA-A Receptor) এবং গাবা-বি রিসেপ্টর (GABA-B Receptor)। গাবা-এ রিসেপ্টর একটি দ্রুত কার্যকরী আয়নোট্রপিক রিসেপ্টর, যার আয়ন চ্যানেল গাবা যুক্ত হলে সরাসরি খুলতে পারে। অন্যদিকে গাবা-বি রিসেপ্টর একটি মেটাবোট্রপিক জি-প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর (Metabotropic G-Protein-Coupled Receptor), যা প্রধানত জি-আই/ও প্রোটিন (Gi/o Protein)-নির্ভর সংকেতপথের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম চ্যানেলের কার্যক্রম পরিবর্তন করে। ঐতিহাসিকভাবে গাবা-সি রিসেপ্টর (GABA-C Receptor) নামেও একটি শ্রেণি ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে গাবা-সি নামে পরিচিত রো (ρ) উপএককযুক্ত রিসেপ্টরগুলোকে সাধারণত গাবা-এ রিসেপ্টর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে গাবা-এ নামের এ (A) বর্ণটি গাবা রিসেপ্টরের একটি নির্দিষ্ট ফার্মাকোলজিক্যাল ও আণবিক শ্রেণি নির্দেশ করে।
আণবিক গঠনের দিক থেকে গাবা-এ রিসেপ্টর হলো একটি পেন্টামেরিক লিগ্যান্ড-গেটেড আয়ন চ্যানেল (Pentameric Ligand-Gated Ion Channel)। পেন্টামেরিক (Pentameric) শব্দটির অর্থ পাঁচটি উপএকক নিয়ে গঠিত। এখানে গ্রিক পেন্তে (Pente) অর্থ পাঁচ এবং মেরোস (Meros) অর্থ অংশ। একটি কার্যকর গাবা-এ রিসেপ্টর পাঁচটি প্রোটিন উপএকক (Subunit) নিয়ে গঠিত হয়, যেগুলো কোষঝিল্লির মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় আয়ন-পরিবাহী ছিদ্র বা পোর (Pore) সৃষ্টি করে। এই রিসেপ্টর বৃহত্তর সিস-লুপ রিসেপ্টর পরিবার (Cys-Loop Receptor Family)-এর সদস্য। এই পরিবারের সদস্যদের বহিঃকোষীয় অংশে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সিস্টিন-সম্পর্কিত লুপ থাকে। একই বৃহত্তর রিসেপ্টর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে নিকোটিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টর (Nicotinic Acetylcholine Receptor), গ্লাইসিন রিসেপ্টর (Glycine Receptor) এবং ৫-এইচটি৩ রিসেপ্টর (5-HT3 Receptor) অন্তর্ভুক্ত।
গাবা-এ রিসেপ্টরের উপএককগুলোর মধ্যে আলফা (α), বিটা (β), গামা (γ), ডেল্টা (δ), এপসিলন (ε), থিটা (θ), পাই (π) এবং রো (ρ) শ্রেণির সদস্য রয়েছে। বিভিন্ন উপএককের সমন্বয়ে গঠিত রিসেপ্টরগুলোর অবস্থান, গাবার প্রতি সংবেদনশীলতা, আয়ন পরিবহন বৈশিষ্ট্য এবং ওষুধের প্রতি প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে বহুল প্রচলিত একটি বিন্যাস হলো দুটি আলফা, দুটি বিটা ও একটি গামা উপএকক (2α:2β:1γ)। উদাহরণস্বরূপ, α1β2γ2 উপএকক সমন্বয়ে একটি গাবা-এ রিসেপ্টর গঠিত হতে পারে। তবে সব গাবা-এ রিসেপ্টরের গঠন একই নয়। কিছু রিসেপ্টরে গামা উপএককের পরিবর্তে ডেল্টা উপএকক থাকতে পারে এবং এসব রিসেপ্টরের ফার্মাকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যও পৃথক হয়। প্রতিটি উপএককের কোষঝিল্লি-অতিক্রমকারী চারটি অংশ থাকে, যেগুলোকে এম১, এম২, এম৩ ও এম৪ (M1, M2, M3 and M4) বলা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি উপএককের এম২ অংশ কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেলের অভ্যন্তরীণ প্রাচীর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গাবা-এ রিসেপ্টরের বহিঃকোষীয় অংশে গাবার জন্য নির্দিষ্ট অর্থোস্টেরিক বন্ধনস্থান (Orthosteric Binding Site) থাকে। প্রচলিত αβγ-সমন্বিত রিসেপ্টরে গাবার দুটি প্রধান বন্ধনস্থান সাধারণত বিটা ও আলফা উপএককের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে অবস্থিত। গাবা এই বন্ধনস্থানে যুক্ত হলে রিসেপ্টরের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস পরিবর্তিত হয় এবং কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেল খোলার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এই প্রক্রিয়াকে লিগ্যান্ড-নির্ভর চ্যানেল গেটিং (Ligand-Dependent Channel Gating) বলা হয়। চ্যানেলটি খুললে ক্লোরাইড আয়ন কোষঝিল্লি অতিক্রম করতে পারে। গাবা-এ রিসেপ্টরের চ্যানেল দিয়ে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাইকার্বোনেট আয়ন (Bicarbonate Ion – HCO₃⁻)-ও পরিবাহিত হতে পারে। ফলে গাবা-এ রিসেপ্টরের বৈদ্যুতিক প্রভাব নির্ধারিত হয় শুধু ক্লোরাইডের উপস্থিতি দিয়ে নয়, বরং ক্লোরাইড ও বাইকার্বোনেটের তড়িৎরাসায়নিক প্রবণতা এবং কোষঝিল্লির তৎকালীন বৈদ্যুতিক বিভবের সমন্বয়ে।
ক্লোরাইড আয়ন একটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত আয়ন, যার সংকেত Cl⁻। নিরপেক্ষ ক্লোরিন পরমাণু একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করলে ক্লোরাইড আয়নে পরিণত হয়। কোষঝিল্লির দুই পাশে ক্লোরাইড আয়নের ঘনত্ব এক নয়। এই ঘনত্বের পার্থক্য এবং ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভব মিলিয়ে ক্লোরাইডের চলাচলের জন্য একটি তড়িৎরাসায়নিক প্রবণতা (Electrochemical Driving Force) তৈরি হয়। আয়ন চ্যানেল খুললে ক্লোরাইড কোন দিকে প্রবাহিত হবে, তা নির্ভর করে কোষঝিল্লির বিভব এবং ক্লোরাইডের সমতাবিভব (Equilibrium Potential)-এর পার্থক্যের ওপর। ক্লোরাইডের সমতাবিভবকে ই-সিএল (ECl) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে গাবা-এ রিসেপ্টর দিয়ে ক্লোরাইড ও বাইকার্বোনেট উভয় আয়নের পরিবহন বিবেচনা করলে রিসেপ্টরের সামগ্রিক বিপরীতমুখী বিভব (Reversal Potential)-কে ই-গাবা (EGABA) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এই দুটি বিভব সব অবস্থায় সমান হয় না।
অধিকাংশ পরিণত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরনে কোষের অভ্যন্তরে ক্লোরাইডের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এই নিম্ন অন্তঃকোষীয় ক্লোরাইড ঘনত্ব বজায় রাখতে পটাশিয়াম-ক্লোরাইড কোট্রান্সপোর্টার ২ (Potassium-Chloride Cotransporter 2 – KCC2) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কোষের অভ্যন্তর থেকে পটাশিয়াম ও ক্লোরাইড একসঙ্গে বাইরে পরিবহনে সাহায্য করে। ফলে অনেক পরিণত নিউরনে ক্লোরাইডের সমতাবিভব বিশ্রামকালীন ঝিল্লি বিভবের তুলনায় বেশি ঋণাত্মক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নিউরনের বিশ্রামকালীন ঝিল্লি বিভব যদি −৬৫ মিলিভোল্ট (−65 mV) এবং গাবা-এ রিসেপ্টরের বিপরীতমুখী বিভব যদি −৭৫ মিলিভোল্ট (−75 mV) হয়, তাহলে রিসেপ্টর সক্রিয় হলে ঝিল্লি বিভব −৭৫ মিলিভোল্টের দিকে অগ্রসর হতে পারে। অর্থাৎ ঝিল্লির অভ্যন্তর আরও ঋণাত্মক হয়ে যায়। এই ঘটনাকে হাইপারপোলারাইজেশন (Hyperpolarization) বলা হয়। তবে প্রকৃত বিভব কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করে গাবা-এ চ্যানেলের পরিবাহিতা, অন্যান্য আয়ন চ্যানেলের কার্যক্রম এবং কোষের সামগ্রিক বৈদ্যুতিক অবস্থার ওপর।
গাবা-এ রিসেপ্টরের মাধ্যমে স্নায়বিক উত্তেজনা হ্রাসের (Neuronal Inhibition) প্রক্রিয়াটি বুঝতে নিউরনের ঝিল্লিবিভব (Membrane Potential) ও প্রান্তিক বিভবের (Threshold Potential) সম্পর্ক বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি সাধারণ নিউরনের বিশ্রামকালীন ঝিল্লিবিভব (Resting Membrane Potential) প্রায় −৭০ মিলিভোল্ট (−70 mV) হতে পারে, অর্থাৎ কোষের বাইরের তুলনায় ভেতরের বৈদ্যুতিক বিভব ৭০ মিলিভোল্ট কম। উত্তেজনামূলক সংকেতের প্রভাবে এই বিভব −৭০ থেকে −৬০ এবং পরবর্তীকালে প্রায় −৫৫ মিলিভোল্টের দিকে অগ্রসর হলে তাকে ডিপোলারাইজেশন (Depolarization) বলা হয়। নিউরন তার প্রান্তিক বিভবে পৌঁছালে ভোল্টেজ-গেটেড সোডিয়াম চ্যানেল (Voltage-Gated Sodium Channel) দ্রুত সক্রিয় হয়ে অ্যাকশন পটেনশিয়াল (Action Potential) সৃষ্টি করতে পারে। বিপরীতে, গাবা-এ রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার পর যদি ক্লোরাইড আয়ন (Cl⁻) কোষের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ঝিল্লিবিভব −৭০ থেকে −৮০ মিলিভোল্টের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে কোষের অভ্যন্তর আরও ঋণাত্মক হয়ে হাইপারপোলারাইজেশন (Hyperpolarization) ঘটে। এর ফলে অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টির প্রান্তিক বিভবে পৌঁছাতে অধিকতর শক্তিশালী উত্তেজনামূলক সংকেতের প্রয়োজন হয়। তবে ক্লোরাইড চ্যানেল খুললেই সব সময় হাইপারপোলারাইজেশন ঘটে না; আয়নের প্রবাহের দিক ও বিভবের পরিবর্তন নির্ভর করে তড়িৎরাসায়নিক চালিকাশক্তি (Electrochemical Driving Force) এবং গাবা-এ রিসেপ্টরের বিপরীতমুখী বিভবের (Reversal Potential) ওপর। এমনকি ঝিল্লিবিভব উল্লেখযোগ্যভাবে ঋণাত্মক না হলেও চ্যানেল খোলার ফলে ঝিল্লির আয়নিক পরিবাহিতা (Ionic Conductance) বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ (Electrical Resistance) হ্রাস পেতে পারে। ওহমের সূত্র ΔV = I × R অনুসারে একই উত্তেজনামূলক কারেন্টের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ কমলে ঝিল্লিবিভবের পরিবর্তনও কম হয়। ফলে উত্তেজনামূলক সংকেত নিউরনকে প্রান্তিক বিভবে পৌঁছাতে কম কার্যকর হয়। এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটিই শান্টিং ইনহিবিশন (Shunting Inhibition)। অর্থাৎ গাবা-এ রিসেপ্টর নিউরনের উত্তেজনা কমাতে পারে দুটি প্রধান উপায়ে – ঝিল্লিবিভবকে আরও ঋণাত্মক করে এবং উত্তেজনামূলক কারেন্টের বিভব-পরিবর্তনকারী প্রভাব কমিয়ে।
গাবা-এ রিসেপ্টরের প্রতিবন্ধক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো শান্টিং ইনহিবিশন (Shunting Inhibition)। কোনো নিউরনের গাবা-এ রিসেপ্টরের বিপরীতমুখী বিভব যদি তার বিশ্রামকালীন বিভবের কাছাকাছি থাকে, তাহলে রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য হাইপারপোলারাইজেশন না-ও ঘটতে পারে। কিন্তু চ্যানেল খোলার ফলে কোষঝিল্লির মোট আয়ন পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায় এবং ঝিল্লি প্রতিরোধ (Membrane Resistance) কমে যায়। এর ফলে একই মাত্রার উত্তেজনামূলক সিন্যাপটিক কারেন্ট নিউরনের ঝিল্লি বিভবকে আগের তুলনায় কম পরিবর্তিত করতে পারে। অর্থাৎ উত্তেজনামূলক সংকেতের প্রভাবে ডিপোলারাইজেশন (Depolarization) সৃষ্টির ক্ষমতা কমে যায়। এইভাবে গাবা-এ রিসেপ্টর উল্লেখযোগ্য হাইপারপোলারাইজেশন ছাড়াও নিউরনের অ্যাকশন পটেনশিয়াল উৎপাদনের সম্ভাবনা কমাতে পারে। তাই গাবা-এ রিসেপ্টরের প্রতিবন্ধক কার্যক্রমকে শুধু কোষের অভ্যন্তরে ক্লোরাইড প্রবেশ এবং ঝিল্লি বিভব আরও ঋণাত্মক হওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।
স্নায়বিক বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম ভিন্ন হতে পারে। অনেক অপরিণত নিউরনে সোডিয়াম-পটাশিয়াম-ক্লোরাইড কোট্রান্সপোর্টার ১ (Sodium-Potassium-Chloride Cotransporter 1 – NKCC1)-এর কার্যক্রমের কারণে অন্তঃকোষীয় ক্লোরাইডের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ফলে গাবা-এ রিসেপ্টর সক্রিয় হলে কিছু পরিস্থিতিতে ক্লোরাইড কোষের বাইরে প্রবাহিত হতে পারে এবং ঝিল্লি বিভব কম ঋণাত্মক হয়ে ডিপোলারাইজেশন (Depolarization) ঘটতে পারে। তবে ডিপোলারাইজেশন ঘটলেই নিউরনের সামগ্রিক কার্যক্রম অবশ্যই উত্তেজনামূলক হবে, এমন নয়; ঝিল্লির পরিবাহিতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ডিপোলারাইজিং গাবা সংকেতও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। স্নায়বিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নিউরনে কেসিসি২ (KCC2)-এর কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় এবং গাবা-এ সংকেতের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনকে অনেক সময় ডেভেলপমেন্টাল গাবা শিফট (Developmental GABA Shift) বলা হয়।
গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো ফেজিক ইনহিবিশন (Phasic Inhibition) এবং টনিক ইনহিবিশন (Tonic Inhibition)। ফেজিক ইনহিবিশন সাধারণত সিন্যাপটিক গাবা-এ রিসেপ্টরের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। প্রিসিন্যাপটিক নিউরন থেকে অল্প সময়ের জন্য উচ্চ ঘনত্বে গাবা নিঃসৃত হলে পোস্টসিন্যাপটিক রিসেপ্টর দ্রুত সক্রিয় হয় এবং একটি স্বল্পস্থায়ী ইনহিবিটরি পোস্টসিন্যাপটিক কারেন্ট (Inhibitory Postsynaptic Current – IPSC) সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে টনিক ইনহিবিশন প্রধানত সিন্যাপসের বাইরে অবস্থিত এক্সট্রাসিন্যাপটিক গাবা-এ রিসেপ্টর (Extrasynaptic GABA-A Receptor)-এর মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। এসব রিসেপ্টর পরিবেশে উপস্থিত অপেক্ষাকৃত নিম্ন ঘনত্বের গাবার প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধক পরিবাহিতা সৃষ্টি করতে পারে। নির্দিষ্ট ডেল্টা উপএককযুক্ত গাবা-এ রিসেপ্টর টনিক ইনহিবিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দুই ধরনের প্রতিবন্ধক সংকেত একত্রে নিউরনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, সামগ্রিক উত্তেজনাশীলতা এবং স্নায়বিক নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে।
গাবা-এ রিসেপ্টরের ওপর কাজ করা ওষুধগুলোর মধ্যে বেঞ্জোডায়াজেপিন (Benzodiazepine) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াজেপাম (Diazepam), লোরাজেপাম (Lorazepam), আলপ্রাজোলাম (Alprazolam) এবং ক্লোনাজেপাম (Clonazepam) এই শ্রেণির পরিচিত উদাহরণ। বেঞ্জোডায়াজেপিন সাধারণত গাবার অর্থোস্টেরিক বন্ধনস্থানে যুক্ত হয় না। বরং নির্দিষ্ট গাবা-এ রিসেপ্টরের আলফা ও গামা উপএককের মধ্যবর্তী একটি পৃথক অ্যালোস্টেরিক বন্ধনস্থানে (Allosteric Binding Site) যুক্ত হয়। অ্যালোস্টেরিক (Allosteric) শব্দটি গ্রিক আল্লোস (Allos) অর্থ অন্য এবং স্টেরেওস (Stereos) অর্থ কঠিন বা স্থানিক গঠনের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যালোস্টেরিক নিয়ন্ত্রণে কোনো রাসায়নিক পদার্থ রিসেপ্টরের মূল লিগ্যান্ড-বন্ধনস্থান থেকে পৃথক স্থানে যুক্ত হয়ে রিসেপ্টরের ত্রিমাত্রিক বিন্যাস ও কার্যকারিতা পরিবর্তন করে।
বেঞ্জোডায়াজেপিনগুলো সাধারণত পজিটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেটর (Positive Allosteric Modulator – PAM) হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এগুলো গাবার উপস্থিতিতে রিসেপ্টরের প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি করে। প্রচলিত ফার্মাকোলজিক্যাল ব্যাখ্যায় বেঞ্জোডায়াজেপিন গাবা-এ চ্যানেলের খোলার পুনরাবৃত্তি বা ফ্রিকোয়েন্সি (Opening Frequency) বৃদ্ধি করে বলে বর্ণনা করা হয়। আরও নির্ভুলভাবে বললে, এগুলো গাবার উপস্থিতিতে চ্যানেল খোলার সম্ভাবনা ও গেটিংয়ের গতিবিদ্যা পরিবর্তন করে; নির্দিষ্ট প্রভাব রিসেপ্টরের উপএকক এবং পরীক্ষামূলক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। বেঞ্জোডায়াজেপিন সাধারণত গাবা অনুপস্থিত থাকলে প্রচলিত সংবেদনশীল রিসেপ্টরে উল্লেখযোগ্য চ্যানেল খোলা সৃষ্টি করে না। ফলে এই ওষুধগুলোর কার্যক্রম অন্তর্জাত গাবা সংকেতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বেঞ্জোডায়াজেপিনের প্রতি সংবেদনশীল গাবা-এ রিসেপ্টরে সাধারণত একটি উপযুক্ত গামা২ (γ2) উপএকক এবং নির্দিষ্ট আলফা উপএকক (α1, α2, α3 অথবা α5) থাকে। আলফা৪ (α4) অথবা আলফা৬ (α6) উপএককযুক্ত অনেক রিসেপ্টর প্রচলিত বেঞ্জোডায়াজেপিনের প্রতি সংবেদনশীল নয়। রিসেপ্টরের উপএককভেদে ওষুধের প্রভাবেরও পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আলফা১-যুক্ত রিসেপ্টরগুলোর সঙ্গে অবসাদন ও নির্দিষ্ট স্মৃতিসংক্রান্ত প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে আলফা২ ও আলফা৩-যুক্ত রিসেপ্টর উদ্বেগনাশক প্রভাবের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত। আলফা৫-যুক্ত রিসেপ্টর বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাস-সম্পর্কিত জ্ঞানীয় কার্যক্রমে ভূমিকা পালন করে। তবে এসব কার্যক্রম কোনো একটি উপএককের মধ্যে সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ নয়; মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুপথ ও রিসেপ্টরসমষ্টির সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ওষুধের পূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি হয়।
বেঞ্জোডায়াজেপিনের কার্যক্রম বৃদ্ধির ফলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে প্রতিবন্ধক সংকেত শক্তিশালী হয়। এর ফলে উদ্বেগ কমতে পারে, পেশির টান হ্রাস পেতে পারে, খিঁচুনির প্রবণতা কমতে পারে এবং ঘুমভাব সৃষ্টি হতে পারে। এই প্রভাবগুলোর সঙ্গে যথাক্রমে অ্যাংজিওলাইসিস (Anxiolysis), মাসল রিল্যাক্সেশন (Muscle Relaxation), অ্যান্টিকনভালস্যান্ট অ্যাকশন (Anticonvulsant Action) এবং সেডেশন (Sedation) সম্পর্কিত। নির্দিষ্ট বেঞ্জোডায়াজেপিনের ক্ষেত্রে অ্যান্টেরোগ্রেড অ্যামনেসিয়া (Anterograde Amnesia)-ও দেখা দিতে পারে, অর্থাৎ ওষুধের প্রভাব চলাকালে নতুন স্মৃতি গঠনের ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। তবে এসব ওষুধ নিউরনকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেয় না; বরং স্নায়বিক সংকেত পরিবহন ও নেটওয়ার্কের কার্যকলাপের মাত্রা এবং বিন্যাস পরিবর্তন করে।
বার্বিচুরেট (Barbiturate) শ্রেণির ওষুধও গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে পারে। ফেনোবার্বিটাল (Phenobarbital) এবং পেন্টোবার্বিটাল (Pentobarbital) এই শ্রেণির পরিচিত উদাহরণ। বার্বিচুরেটগুলো বেঞ্জোডায়াজেপিনের বন্ধনস্থান থেকে পৃথক অ্যালোস্টেরিক অঞ্চলে কাজ করে। প্রচলিত ফার্মাকোলজিক্যাল ব্যাখ্যায় বার্বিচুরেট গাবা-এ চ্যানেলের খোলা থাকার স্থায়িত্ব (Opening Duration) বৃদ্ধি করে বলে বর্ণনা করা হয়। বাস্তবে এদের প্রভাব চ্যানেল গেটিংয়ের একাধিক গতিবিদ্যাগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্দিষ্ট বার্বিচুরেট উচ্চ ঘনত্বে গাবার অনুপস্থিতিতেও কিছু গাবা-এ রিসেপ্টর সক্রিয় করতে পারে। এ কারণে বার্বিচুরেটের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বার্বিচুরেটের অন্যান্য আণবিক লক্ষ্যও থাকতে পারে। বেঞ্জোডায়াজেপিনের তুলনায় এদের নিরাপত্তার সীমা সাধারণত সংকীর্ণ এবং অতিমাত্রায় গ্রহণের ফলে গভীর অচেতনতা, শ্বাসপ্রশ্বাসের দমন ও প্রাণঘাতী বিষক্রিয়া ঘটতে পারে।
ইথানল (Ethanol) বা পানীয় অ্যালকোহলও গাবা-সম্পর্কিত সংকেত পরিবহন পরিবর্তন করতে পারে। তবে ইথানলকে বেঞ্জোডায়াজেপিনের মতো একটি নির্দিষ্ট গাবা-এ অ্যালোস্টেরিক বন্ধনস্থানের নির্বাচনী মডুলেটর হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ইথানলের প্রভাব বহু আণবিক লক্ষ্য এবং স্নায়বিক সংকেতব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এর মধ্যে গাবা-এ রিসেপ্টর, এন-মিথাইল-ডি-অ্যাসপার্টেট রিসেপ্টর (N-Methyl-D-Aspartate Receptor – NMDA Receptor), বিভিন্ন আয়ন চ্যানেল এবং অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে ইথানল কিছু গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে পারে, কিন্তু এই প্রভাব রিসেপ্টরের উপএকক, ইথানলের ঘনত্ব ও পরীক্ষার অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ইথানলের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-দমনকারী প্রভাবের সঙ্গে গাবা-সম্পর্কিত প্রতিবন্ধক সংকেত বৃদ্ধি এবং গ্লুটামেট-সম্পর্কিত উত্তেজনামূলক সংকেত হ্রাস উভয়ই সম্পর্কিত।
গাবা-এ রিসেপ্টর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চেতনানাশক ও ঘুম-উদ্রেককারী ওষুধের লক্ষ্য। উদাহরণস্বরূপ, প্রোপোফল (Propofol) একটি শিরাপথে প্রয়োগযোগ্য সাধারণ চেতনানাশক, যার প্রধান আণবিক কার্যক্রমের মধ্যে গাবা-এ রিসেপ্টরের পজিটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেশন অন্তর্ভুক্ত। নির্দিষ্ট ঘনত্বে এটি রিসেপ্টর সরাসরি সক্রিয়ও করতে পারে। অন্যদিকে জোলপিডেম (Zolpidem) একটি ঘুম-উদ্রেককারী ওষুধ, যা রাসায়নিকভাবে বেঞ্জোডায়াজেপিন না হলেও নির্দিষ্ট বেঞ্জোডায়াজেপিন-সংবেদনশীল গাবা-এ রিসেপ্টরে কাজ করে। বিশেষ করে আলফা১ উপএককযুক্ত রিসেপ্টরের প্রতি এর তুলনামূলক নির্বাচনী প্রবণতা রয়েছে। এ ধরনের ওষুধকে প্রায়ই জেড-ড্রাগ (Z-Drug) বলা হয়। ফলে একই গাবা-এ রিসেপ্টর ব্যবস্থার বিভিন্ন বন্ধনস্থান ও উপএকককে লক্ষ্য করে রাসায়নিকভাবে ভিন্ন শ্রেণির ওষুধ বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম শুধু বহিরাগত ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না; মানবদেহের নিজস্ব কিছু রাসায়নিক পদার্থও এর কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষ করে নিউরোস্টেরয়েড (Neurosteroid) শ্রেণির কিছু যৌগ গাবা-এ রিসেপ্টরের শক্তিশালী পজিটিভ অ্যালোস্টেরিক মডুলেটর হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যালোপ্রেগনানোলোন (Allopregnanolone) প্রোজেস্টেরন (Progesterone) বিপাকের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নিউরোঅ্যাকটিভ স্টেরয়েড, যা নির্দিষ্ট গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে পারে। নিউরোস্টেরয়েডের প্রভাব উদ্বেগ, আবেগ, ঘুম এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় অবস্থায় স্নায়বিক উত্তেজনাশীলতার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধরনের অন্তর্জাত মডুলেটরের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে গাবা-এ রিসেপ্টর শুধু ওষুধের লক্ষ্য নয়; এটি স্বাভাবিক স্নায়বিক ও অন্তঃস্রাবীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গাবা-এ রিসেপ্টরের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রতিবন্ধক সংকেত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। অ্যামিগডালা (Amygdala)-সম্পর্কিত স্নায়ুপথে গাবা-নির্ভর সংকেত ভয় ও উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। হিপোক্যাম্পাসে (Hippocampus) এটি স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ এবং স্নায়বিক নেটওয়ার্কের উত্তেজনাশীলতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। সেরিব্রাল কর্টেক্সে (Cerebral Cortex) গাবার্জিক ইন্টারনিউরন (GABAergic Interneuron) উত্তেজনামূলক পিরামিডাল নিউরনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্নায়বিক সংকেতের সময়গত সমন্বয়ে ভূমিকা পালন করে। থ্যালামাসে (Thalamus) গাবা-সম্পর্কিত প্রতিবন্ধক সংকেত সংবেদনশীল তথ্য পরিবহন ও ঘুম-জাগরণ-সম্পর্কিত স্নায়বিক ছন্দে অংশগ্রহণ করে। সেরিবেলামে (Cerebellum) গাবার্জিক সংকেত মোটর সমন্বয় ও চলাচলের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে একই ধরনের আণবিক প্রতিবন্ধক সংকেত মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুপথে পৃথক কার্যকরী ফলাফল সৃষ্টি করতে পারে।
গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রমের সঙ্গে স্নায়বিক দোলন (Neural Oscillation) এবং নিউরনসমূহের সমন্বিত সংকেত উৎপাদনের সম্পর্ক রয়েছে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে গাবার্জিক ইন্টারনিউরন উত্তেজনামূলক নিউরনের কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত করে স্নায়বিক নেটওয়ার্কের ছন্দবদ্ধ কার্যকলাপ গঠনে সাহায্য করে। বিশেষ করে কিছু দ্রুত কার্যকরী ইন্টারনিউরন কর্টিক্যাল গামা দোলন (Gamma Oscillation)-সম্পর্কিত কার্যক্রমে ভূমিকা পালন করে। এসব দোলনের সঙ্গে সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, মনোযোগ এবং বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের সময়গত সমন্বয়ের সম্পর্ক রয়েছে। তবে গাবা-এ রিসেপ্টর সক্রিয় হলেই সব ধরনের স্নায়বিক দোলন কমে যায়, এমন নয়। স্থানীয় স্নায়ুপথের গঠন, উত্তেজনামূলক ও প্রতিবন্ধক সংযোগের বিন্যাস এবং রিসেপ্টর সক্রিয়তার সময়গত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে স্নায়বিক ছন্দের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়।
গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলে অনেক পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সামগ্রিক উত্তেজনাশীলতা কমে যায়। এর ফলে উদ্বেগ হ্রাস, ঘুমভাব, পেশি শিথিলতা এবং খিঁচুনির প্রবণতা হ্রাসের মতো চিকিৎসাগতভাবে উপযোগী প্রভাব দেখা দিতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-দমনকারী পদার্থ গ্রহণ করলে স্বাভাবিক সতর্কতা, সমন্বিত চলাচল, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে বেঞ্জোডায়াজেপিনের সঙ্গে ওপিওয়েড (Opioid), অ্যালকোহল অথবা অন্যান্য কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-দমনকারী পদার্থ একসঙ্গে গ্রহণ করলে শ্বাসপ্রশ্বাসের দমন, গভীর অবসাদন, অচেতনতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই ঝুঁকি কেবল শ্বাসযন্ত্রের পেশি নিয়ন্ত্রণকারী নিউরন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয় না; মস্তিষ্ককাণ্ডের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক নেটওয়ার্ক, শ্বাসপ্রশ্বাসের উদ্দীপনার প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং শ্বাসপথের সুরক্ষামূলক প্রতিবর্তক্রিয়া ব্যাহত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন গাবা-এ রিসেপ্টরের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে এমন ওষুধ ব্যবহার করলে স্নায়ুতন্ত্রে অভিযোজনমূলক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর মধ্যে সহনশীলতা (Tolerance) এবং শারীরিক নির্ভরশীলতা (Physical Dependence) গুরুত্বপূর্ণ। সহনশীলতা বলতে একই মাত্রার ওষুধে পূর্বের তুলনায় কম প্রভাব সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়। অন্যদিকে শারীরিক নির্ভরশীলতা তৈরি হলে ওষুধের মাত্রা দ্রুত কমানো অথবা হঠাৎ বন্ধ করার পর প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ (Withdrawal Symptoms) দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গের মধ্যে উদ্বেগ, অনিদ্রা, অস্থিরতা, কাঁপুনি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি বেঞ্জোডায়াজেপিন ব্যবহারের পর হঠাৎ বন্ধ করা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই অভিযোজনমূলক পরিবর্তনের সঙ্গে রিসেপ্টরের কার্যকরী সংবেদনশীলতা, উপএককের প্রকাশ, স্নায়বিক নেটওয়ার্কের উত্তেজনামূলক-প্রতিবন্ধক ভারসাম্য এবং অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটার ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সহনশীলতা ও নির্ভরশীলতার সব বৈশিষ্ট্যকে এককভাবে গাবা-এ রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাওয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।
গাবা-এ রিসেপ্টর-সম্পর্কিত বিষক্রিয়া ও অতিরিক্ত অবসাদনের চিকিৎসায় ওষুধের শ্রেণিভেদে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফ্লুমাজেনিল (Flumazenil) হলো বেঞ্জোডায়াজেপিন বন্ধনস্থানের একটি প্রতিযোগিতামূলক অ্যান্টাগোনিস্ট (Competitive Antagonist), যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বেঞ্জোডায়াজেপিনের প্রভাব প্রতিহত করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বেঞ্জোডায়াজেপিন-নির্ভরশীল ব্যক্তি অথবা একাধিক ওষুধের মিশ্র বিষক্রিয়ায় ফ্লুমাজেনিল ব্যবহার করলে খিঁচুনির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এটি সব ধরনের অবসাদক বিষক্রিয়ার সাধারণ প্রতিষেধক নয় এবং এর ব্যবহার নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। একইভাবে ফ্লুমাজেনিল বার্বিচুরেট, অ্যালকোহল অথবা ওপিওয়েডের সব প্রভাব প্রতিহত করতে পারে না। ওপিওয়েডজনিত শ্বাসপ্রশ্বাসের দমনে ন্যালোক্সোন (Naloxone) গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি গাবা-এ রিসেপ্টরের অ্যান্টাগোনিস্ট নয়; এটি প্রধানত ওপিওয়েড রিসেপ্টরের কার্যক্রম প্রতিহত করে।
সুতরাং, গাবা-এ রিসেপ্টর মানব মস্তিষ্কের প্রধান দ্রুত কার্যকরী প্রতিবন্ধক সংকেতব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় আণবিক উপাদান। পাঁচটি প্রোটিন উপএকক নিয়ে গঠিত এই রিসেপ্টর গাবার উপস্থিতিতে একটি আয়ন চ্যানেল খুলে দেয়, যার মাধ্যমে প্রধানত ক্লোরাইড এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে বাইকার্বোনেট আয়ন পরিবাহিত হতে পারে। অধিকাংশ পরিণত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরনে এর ফলে হাইপারপোলারাইজেশন (Hyperpolarization), শান্টিং ইনহিবিশন (Shunting Inhibition) অথবা উভয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্নায়বিক উত্তেজনা হ্রাস পায়। বেঞ্জোডায়াজেপিন, বার্বিচুরেট, নির্দিষ্ট চেতনানাশক এবং নিউরোস্টেরয়েড এই রিসেপ্টরের বিভিন্ন অ্যালোস্টেরিক বন্ধনস্থানে কাজ করে গাবার প্রভাব পরিবর্তন করতে পারে। অন্যদিকে অ্যালকোহলের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-দমনকারী কার্যক্রমে গাবা-সম্পর্কিত সংকেতের পাশাপাশি আরও একাধিক আণবিক লক্ষ্য জড়িত। এই রিসেপ্টরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মস্তিষ্কের উত্তেজনামূলক ও প্রতিবন্ধক সংকেতের ভারসাম্য, ঘুম, উদ্বেগ, স্মৃতি, মোটর নিয়ন্ত্রণ এবং স্নায়বিক নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এর কার্যক্রম অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে অবসাদন, অচেতনতা ও শ্বাসপ্রশ্বাসের দমনের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। ফলে গাবা-এ রিসেপ্টর আধুনিক নিউরোফার্মাকোলজি, অবসাদক ও চেতনানাশক ওষুধের কার্যপ্রণালি এবং স্নায়বিক প্রতিবন্ধকতার জৈবিক ভিত্তি বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
এনএমডিএ রিসেপ্টর ও গ্লুটামেটার্জিক সংকেত (NMDA Receptor and Glutamatergic Signaling)
মানব মস্তিষ্কের প্রধান উত্তেজনামূলক নিউরোট্রান্সমিটার গ্লুটামেট (Glutamate)-এর মাধ্যমে পরিচালিত স্নায়বিক সংকেতব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আণবিক উপাদান হলো এনএমডিএ রিসেপ্টর (NMDA Receptor)। এটি একধরনের আয়নোট্রপিক গ্লুটামেট রিসেপ্টর (Ionotropic Glutamate Receptor), যা একই সঙ্গে লিগ্যান্ড-গেটেড আয়ন চ্যানেল (Ligand-Gated Ion Channel) এবং ভোল্টেজ-নির্ভর আয়ন চ্যানেল (Voltage-Dependent Ion Channel)-এর বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। এই রিসেপ্টর স্নায়ুকোষের মধ্যে উত্তেজনামূলক সংকেত পরিবহন, সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি (Synaptic Plasticity), শিক্ষা, স্মৃতি গঠন এবং স্নায়বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে কেটামিন (Ketamine), ফেনসাইক্লিডিন (Phencyclidine – PCP) এবং ডেক্সট্রোমেথরফ্যানের (Dextromethorphan) সক্রিয় বিপাকজাত পদার্থ ডেক্সট্ররফ্যান (Dextrorphan)-এর মতো ডিসোসিয়েটিভ পদার্থের গুরুত্বপূর্ণ আণবিক লক্ষ্যও এই রিসেপ্টর। ফলে এনএমডিএ রিসেপ্টর আধুনিক নিউরোফার্মাকোলজি, স্মৃতির স্নায়ুবিজ্ঞান, চেতনানাশক ওষুধের কার্যপ্রণালি এবং চেতনার পরিবর্তিত অবস্থা অনুসন্ধানের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়।
এনএমডিএ (NMDA) একটি রাসায়নিক নামের সংক্ষিপ্ত রূপ, যার পূর্ণরূপ এন-মিথাইল-ডি-অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড (N-Methyl-D-Aspartic Acid)। এই নামের এন-মিথাইল (N-Methyl) অংশটি অ্যামিনো গোষ্ঠীর নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে একটি মিথাইল গোষ্ঠী (Methyl Group – CH₃) যুক্ত থাকার বিষয়টি নির্দেশ করে। এখানে এন (N) হলো নাইট্রোজেনের রাসায়নিক প্রতীক, যা মিথাইল গোষ্ঠীর সংযুক্তির অবস্থান বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে ডি (D) অক্ষরটি যৌগটির নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক বিন্যাস বা স্টেরিওকেমিক্যাল কনফিগারেশন (Stereochemical Configuration) নির্দেশ করে। এটি অ্যাসপার্টিক অ্যাসিডের ডি-এন্যান্টিওমার (D-Enantiomer) থেকে উদ্ভূত নামকরণ। ফলে এন-মিথাইল-ডি-অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগের নাম, যার সংক্ষিপ্ত রূপ এনএমডিএ। এই যৌগটি পরীক্ষাগারে সংশ্লেষিত একটি নির্বাচনী অ্যাগোনিস্ট (Selective Agonist), যা নির্দিষ্ট ধরনের গ্লুটামেট রিসেপ্টর সক্রিয় করতে পারে। গবেষণায় এই যৌগের প্রতি বিশেষ সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রিসেপ্টরটির নামকরণ করা হয় এনএমডিএ রিসেপ্টর (NMDA Receptor)। তবে এনএমডিএ নিজে গ্লুটামেটের কোনো স্বাভাবিক রূপ নয় এবং মানব মস্তিষ্কে এই রিসেপ্টরের প্রধান অন্তর্জাত অ্যাগোনিস্টও নয়; স্বাভাবিক অবস্থায় রিসেপ্টরটির প্রধান উত্তেজনামূলক লিগ্যান্ড হলো গ্লুটামেট।
অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড (Aspartic Acid) নামটির ঐতিহাসিক উৎস অ্যাসপারাজিন (Asparagine), যা প্রথম অ্যাসপারাগাস উদ্ভিদের নির্যাস থেকে পৃথক করা হয়েছিল। অ্যাসপারাগাস (Asparagus) শব্দটি গ্রিক আসপারাগোস (Asparagos) এবং পরবর্তী লাতিন অ্যাসপারাগাস (Asparagus) শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড একটি চার কার্বনবিশিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড, যার আণবিক সংকেত C₄H₇NO₄। অন্যদিকে এন-মিথাইল-ডি-অ্যাসপার্টিক অ্যাসিডে অ্যামিনো নাইট্রোজেনের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি মিথাইল গোষ্ঠী যুক্ত থাকে। এর আণবিক সংকেত C₅H₉NO₄। রাসায়নিক গঠনের এই পরিবর্তন যৌগটির রিসেপ্টর-সংক্রান্ত কার্যকরী বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এনএমডিএ রিসেপ্টরের নামের মধ্যে অ্যাসপার্টিক অ্যাসিডের উপস্থিতি থাকলেও রিসেপ্টরটি কার্যকরী শ্রেণিবিন্যাসে একটি গ্লুটামেট রিসেপ্টর, কারণ গ্লুটামেটই এর প্রধান স্বাভাবিক উত্তেজনামূলক নিউরোট্রান্সমিটার।
গ্লুটামেট (Glutamate) শব্দটি এসেছে গ্লুটামিক অ্যাসিড (Glutamic Acid) থেকে। গ্লুটামিক অ্যাসিড নামটির ঐতিহাসিক উৎস গ্লুটেন (Gluten), যা লাতিন গ্লুটেন (Glūten) শব্দ থেকে এসেছে; এর অর্থ আঠা বা আঠালো পদার্থ। উনবিংশ শতাব্দীতে গমের গ্লুটেন নিয়ে রাসায়নিক গবেষণার সময় গ্লুটামিক অ্যাসিড শনাক্ত করা হয় এবং সেই উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে যৌগটির নামকরণ করা হয়। গ্লুটামিক অ্যাসিডের আণবিক সংকেত C₅H₉NO₄ এবং সংক্ষিপ্ত গাঠনিক সংকেত HOOC-CH(NH₂)-CH₂-CH₂-COOH। শারীরবৃত্তীয় পিএইচে (Physiological pH) এর কার্বক্সিল গোষ্ঠীগুলো প্রধানত আয়নিত অবস্থায় থাকে। এই আয়নিত রূপকে গ্লুটামেট (Glutamate) বলা হয়। মানব মস্তিষ্কে গ্লুটামেট প্রধান উত্তেজনামূলক নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে এবং অধিকাংশ দ্রুত উত্তেজনামূলক সিন্যাপটিক সংকেত পরিবহনে অংশগ্রহণ করে।
গ্লুটামেটার্জিক (Glutamatergic) শব্দটি গঠিত হয়েছে গ্লুটামেট (Glutamate) এবং -এর্জিক (-ergic) প্রত্যয়ের সমন্বয়ে। এরজিক (-ergic) প্রত্যয়টি গ্রিক এরগন (Ergon) শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ কাজ, কর্ম বা কার্যকলাপ। আধুনিক নিউরোবিজ্ঞানে কোনো নিউরন, সিন্যাপস অথবা সংকেতব্যবস্থাকে গ্লুটামেটার্জিক বলা হলে বোঝায় যে সেটি গ্লুটামেটকে নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে ব্যবহার করে অথবা গ্লুটামেট-নির্ভর সংকেত পরিবহনের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, গ্লুটামেটার্জিক নিউরন (Glutamatergic Neuron) হলো এমন নিউরন, যা প্রধানত গ্লুটামেট নিঃসরণ করে। অন্যদিকে গ্লুটামেটার্জিক সিন্যাপস (Glutamatergic Synapse) হলো এমন সিন্যাপস, যেখানে গ্লুটামেট প্রধান সংকেতবাহী রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে। এই পরিভাষার সঙ্গে গাবার্জিক (GABAergic), ডোপামিনার্জিক (Dopaminergic) এবং সেরোটোনার্জিক (Serotonergic) পরিভাষাগুলোর গঠনগত মিল রয়েছে।
গ্লুটামেটার্জিক সংকেতব্যবস্থার কার্যক্রম বোঝার জন্য প্রথমে গ্লুটামেটের সংশ্লেষণ, সঞ্চয় ও নিঃসরণ প্রক্রিয়া বিবেচনা করা প্রয়োজন। মস্তিষ্কে গ্লুটামেট বিপাকীয় বিভিন্ন পথের মাধ্যমে উৎপন্ন হতে পারে। গ্লুটামেটার্জিক নিউরনে নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে ব্যবহৃত গ্লুটামেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো গ্লুটামিন (Glutamine)। অ্যাস্ট্রোসাইট (Astrocyte) থেকে নিউরনে পরিবাহিত গ্লুটামিনকে গ্লুটামিনেজ (Glutaminase) এনজাইম গ্লুটামেটে রূপান্তরিত করতে পারে। উৎপন্ন গ্লুটামেট ভেসিকুলার গ্লুটামেট ট্রান্সপোর্টার (Vesicular Glutamate Transporter – VGLUT)-এর মাধ্যমে সিন্যাপটিক ভেসিকলে সঞ্চিত হয়। প্রিসিন্যাপটিক নিউরনে অ্যাকশন পটেনশিয়াল পৌঁছালে ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল (Voltage-Gated Calcium Channel) খুলে যায় এবং ক্যালসিয়াম প্রবেশের ফলে সিন্যাপটিক ভেসিকল কোষঝিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গ্লুটামেট নিঃসরণ করে। নিঃসৃত গ্লুটামেট সিন্যাপটিক ফাঁক অতিক্রম করে পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের গ্লুটামেট রিসেপ্টরে যুক্ত হয়।
গ্লুটামেট নিঃসরণের পর তার সংকেত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিন্যাপটিক ফাঁক ও বহিঃকোষীয় পরিবেশ থেকে গ্লুটামেট অপসারণে এক্সসাইটেটরি অ্যামিনো অ্যাসিড ট্রান্সপোর্টার (Excitatory Amino Acid Transporter – EAAT) শ্রেণির পরিবাহক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে অ্যাস্ট্রোসাইটে উপস্থিত ইএএটি১ (EAAT1) এবং ইএএটি২ (EAAT2) গ্লুটামেট অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাস্ট্রোসাইটে গ্লুটামেটকে গ্লুটামিন সিনথেটেজ (Glutamine Synthetase) এনজাইমের মাধ্যমে গ্লুটামিনে রূপান্তরিত করা যায়। পরবর্তীতে গ্লুটামিন আবার নিউরনে ফিরে এসে গ্লুটামেট উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে পারে। নিউরন ও অ্যাস্ট্রোসাইটের মধ্যে এই বিপাকীয় সহযোগিতাকে গ্লুটামেট-গ্লুটামিন চক্র (Glutamate-Glutamine Cycle) বলা হয়। এই চক্র গ্লুটামেটার্জিক সংকেতব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং বহিঃকোষীয় গ্লুটামেটের অতিরিক্ত সঞ্চয় প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে।
গ্লুটামেট রিসেপ্টরগুলোকে প্রধানত দুটি বৃহৎ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হলো আয়নোট্রপিক গ্লুটামেট রিসেপ্টর (Ionotropic Glutamate Receptor – iGluR), যা গ্লুটামেট যুক্ত হলে সরাসরি আয়ন চ্যানেলের কার্যক্রম পরিবর্তন করে। দ্বিতীয়টি হলো মেটাবোট্রপিক গ্লুটামেট রিসেপ্টর (Metabotropic Glutamate Receptor – mGluR), যা জি-প্রোটিন-নির্ভর সংকেতপথের মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিবর্তন করে। আয়নোট্রপিক গ্লুটামেট রিসেপ্টরের প্রধান তিনটি শ্রেণি হলো এএমপিএ রিসেপ্টর (AMPA Receptor), এনএমডিএ রিসেপ্টর (NMDA Receptor) এবং কাইনেট রিসেপ্টর (Kainate Receptor)। এএমপিএ রিসেপ্টরের নাম এসেছে আলফা-অ্যামিনো-৩-হাইড্রোক্সি-৫-মিথাইল-৪-আইসোক্সাজোলপ্রোপিওনিক অ্যাসিড (α-Amino-3-Hydroxy-5-Methyl-4-Isoxazolepropionic Acid – AMPA) নামক অ্যাগোনিস্ট থেকে। অন্যদিকে কাইনেট রিসেপ্টরের নাম এসেছে কাইনিক অ্যাসিড (Kainic Acid) থেকে। এসব রিসেপ্টর গ্লুটামেট-নির্ভর উত্তেজনামূলক সংকেত পরিবহনে অংশগ্রহণ করলেও এদের আয়ন পরিবাহিতা, সক্রিয়তার গতিবিদ্যা এবং স্নায়বিক কার্যক্রম পৃথক।
শারীরস্থানিক দিক থেকে এনএমডিএ রিসেপ্টর মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতভাবে উপস্থিত। বিশেষ করে সেরিব্রাল কর্টেক্স (Cerebral Cortex), হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus), থ্যালামাস (Thalamus), অ্যামিগডালা (Amygdala) এবং অন্যান্য স্নায়বিক অঞ্চলে এর গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম রয়েছে। হিপোক্যাম্পাসের নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে এনএমডিএ রিসেপ্টর শিক্ষা ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেরিব্রাল কর্টেক্সে এটি উত্তেজনামূলক সংকেত পরিবহন, সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের পারস্পরিক যোগাযোগে অংশগ্রহণ করে। এনএমডিএ রিসেপ্টর শুধু পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনে সীমাবদ্ধ নয়; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রিসিন্যাপটিক এবং সিন্যাপসের বাইরের ঝিল্লিতেও এর উপস্থিতি ও কার্যক্রম দেখা যায়।
আণবিক গঠনের দিক থেকে এনএমডিএ রিসেপ্টর একটি টেট্রামেরিক আয়ন চ্যানেল (Tetrameric Ion Channel)। টেট্রামেরিক (Tetrameric) শব্দটি গ্রিক তেত্রা (Tetra) অর্থ চার এবং মেরোস (Meros) অর্থ অংশ থেকে গঠিত। অর্থাৎ একটি কার্যকর এনএমডিএ রিসেপ্টর সাধারণত চারটি প্রোটিন উপএকক নিয়ে গঠিত। এর প্রধান উপএকক পরিবারগুলো হলো গ্লুএন১ (GluN1), গ্লুএন২ (GluN2) এবং গ্লুএন৩ (GluN3)। গ্লুএন২ পরিবারের চারটি প্রধান সদস্য হলো গ্লুএন২এ (GluN2A), গ্লুএন২বি (GluN2B), গ্লুএন২সি (GluN2C) এবং গ্লুএন২ডি (GluN2D)। অন্যদিকে গ্লুএন৩ পরিবারের সদস্য হলো গ্লুএন৩এ (GluN3A) এবং গ্লুএন৩বি (GluN3B)। প্রচলিত অনেক এনএমডিএ রিসেপ্টর দুটি গ্লুএন১ এবং দুটি গ্লুএন২ উপএকক নিয়ে গঠিত হয়। তবে সব রিসেপ্টরে গ্লুএন২ উপএকক দুটি একই ধরনের হয় না; কিছু রিসেপ্টরে দুটি ভিন্ন গ্লুএন২ উপএকক থাকতে পারে। নির্দিষ্ট রিসেপ্টরে গ্লুএন৩ উপএককও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উপএককের এই বৈচিত্র্য রিসেপ্টরের সক্রিয়তার গতিবিদ্যা, ম্যাগনেসিয়াম-সংবেদনশীলতা, ক্যালসিয়াম পরিবাহিতা এবং ওষুধের প্রতি প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের প্রতিটি উপএককে একটি বৃহৎ বহিঃকোষীয় অংশ, একটি লিগ্যান্ড-বন্ধনকারী অঞ্চল এবং ঝিল্লি-সম্পর্কিত আয়ন চ্যানেল গঠনকারী অংশ থাকে। আয়নোট্রপিক গ্লুটামেট রিসেপ্টরগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য হলো এদের প্রতিটি উপএককের তিনটি সম্পূর্ণ ঝিল্লি-অতিক্রমকারী অংশ এবং একটি পুনঃপ্রবেশকারী পোর-লুপ (Re-Entrant Pore Loop) থাকে। এই পোর-লুপ কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেলের আয়ন নির্বাচনক্ষমতা ও পরিবাহিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চারটি উপএকক একত্রে কেন্দ্রীয় আয়ন-পরিবাহী পথ গঠন করে। এই গঠন গাবা-এ রিসেপ্টরের পেন্টামেরিক গঠনের তুলনায় ভিন্ন, কারণ এনএমডিএ রিসেপ্টর চারটি উপএকক নিয়ে গঠিত হলেও গাবা-এ রিসেপ্টর পাঁচটি উপএকক নিয়ে গঠিত।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের সক্রিয়তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর জন্য সাধারণত দুটি পৃথক লিগ্যান্ড-বন্ধন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। প্রচলিত গ্লুএন১-গ্লুএন২ রিসেপ্টরে গ্লুটামেট (Glutamate) গ্লুএন২ উপএককের লিগ্যান্ড-বন্ধনকারী অঞ্চলে যুক্ত হয়। একই সঙ্গে গ্লাইসিন (Glycine) অথবা ডি-সেরিন (D-Serine) গ্লুএন১ উপএককের সহ-অ্যাগোনিস্ট বন্ধনস্থানে যুক্ত হতে পারে। এই কারণে গ্লাইসিন ও ডি-সেরিনকে এনএমডিএ রিসেপ্টরের সহ-অ্যাগোনিস্ট (Co-Agonist) বলা হয়। অর্থাৎ শুধু গ্লুটামেটের উপস্থিতি সাধারণত রিসেপ্টরটির পূর্ণ কার্যকরী সক্রিয়তার জন্য যথেষ্ট নয়; উপযুক্ত সহ-অ্যাগোনিস্টের উপস্থিতিও প্রয়োজন। গ্লাইসিন ও ডি-সেরিনের স্থানীয় প্রাপ্যতা বিভিন্ন মস্তিষ্কীয় অঞ্চলে এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করতে পারে।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ভোল্টেজ-নির্ভর ম্যাগনেসিয়াম বাধা (Voltage-Dependent Magnesium Block)। স্বাভাবিক বিশ্রামকালীন ঝিল্লি বিভবে কোষের বাইরের ম্যাগনেসিয়াম আয়ন (Magnesium Ion – Mg²⁺) এনএমডিএ রিসেপ্টরের কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেলের মধ্যে প্রবেশ করে আয়ন পরিবহনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ম্যাগনেসিয়াম আয়নের ধনাত্মক আধান এবং ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভবের কারণে এই বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে গ্লুটামেট ও সহ-অ্যাগোনিস্ট রিসেপ্টরে যুক্ত থাকলেও বিশ্রামকালীন অবস্থায় চ্যানেল দিয়ে উল্লেখযোগ্য আয়ন প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এই ম্যাগনেসিয়াম বাধা সম্পূর্ণ স্থায়ী নয়; এটি ঝিল্লি বিভবের পরিবর্তনের সঙ্গে গতিশীলভাবে পরিবর্তিত হয়।
পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের ঝিল্লি যথেষ্ট ডিপোলারাইজড (Depolarized) হলে ম্যাগনেসিয়াম বাধার প্রবণতা কমে যায়। ডিপোলারাইজেশন বলতে কোষঝিল্লির অভ্যন্তরের বৈদ্যুতিক বিভব কম ঋণাত্মক হওয়াকে বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নিউরনের বিশ্রামকালীন বিভব যদি −৭০ মিলিভোল্ট (−70 mV) হয় এবং উত্তেজনামূলক সংকেতের ফলে সেটি −৪০ মিলিভোল্ট (−40 mV)-এর দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে এনএমডিএ রিসেপ্টরের ম্যাগনেসিয়াম বাধা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হতে পারে। তবে ম্যাগনেসিয়াম বাধা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিভবে হঠাৎ সম্পূর্ণ অপসারিত হয় না; এটি ঝিল্লি বিভবের সঙ্গে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। ফলে রিসেপ্টরের আয়ন পরিবাহিতা নির্ধারিত হয় লিগ্যান্ডের উপস্থিতি এবং ঝিল্লির বৈদ্যুতিক অবস্থা উভয়ের মাধ্যমে।
এই দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কারণে এনএমডিএ রিসেপ্টরকে অনেক সময় কোইনসিডেন্স ডিটেক্টর (Coincidence Detector) বলা হয়। কোইনসিডেন্স (Coincidence) শব্দটির অর্থ একই সময়ে বা সমাপতিতভাবে সংঘটিত হওয়া। এনএমডিএ রিসেপ্টরের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো গ্লুটামেট-নির্ভর প্রিসিন্যাপটিক সংকেত এবং পোস্টসিন্যাপটিক ডিপোলারাইজেশন উপযুক্তভাবে একত্রে উপস্থিত হলে রিসেপ্টরের মাধ্যমে আয়ন প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য স্নায়বিক সংযোগের কার্যক্রম পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সিন্যাপসের প্রিসিন্যাপটিক কার্যকলাপ এবং পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের উত্তেজনাশীলতার মধ্যে সময়গত সম্পর্ক থাকলে সেই সংযোগের কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তিত হতে পারে।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের কেন্দ্রীয় আয়ন চ্যানেল দিয়ে প্রধানত সোডিয়াম আয়ন (Sodium Ion – Na⁺), পটাশিয়াম আয়ন (Potassium Ion – K⁺) এবং ক্যালসিয়াম আয়ন (Calcium Ion – Ca²⁺) পরিবাহিত হতে পারে। স্বাভাবিক স্নায়বিক পরিস্থিতিতে চ্যানেল খোলা থাকলে সোডিয়াম ও ক্যালসিয়াম সাধারণত কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং পটাশিয়াম কোষের বাইরে প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে একটি সামগ্রিক উত্তেজনামূলক বৈদ্যুতিক কারেন্ট সৃষ্টি হয়। তবে এনএমডিএ রিসেপ্টরের বিশেষ গুরুত্ব কেবল সোডিয়াম-নির্ভর ডিপোলারাইজেশনে নয়; বরং এর মাধ্যমে প্রবেশকারী ক্যালসিয়াম আয়নের সংকেতবাহী ভূমিকায়। ক্যালসিয়াম কোষের অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় বার্তাবাহক (Second Messenger) হিসেবে কাজ করে এবং বিভিন্ন এনজাইম, প্রোটিন ও জিন-নিয়ন্ত্রণকারী সংকেতপথ সক্রিয় করতে পারে।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম প্রবেশ করলে ক্যালসিয়াম-ক্যালমোডুলিন-নির্ভর প্রোটিন কাইনেজ ২ (Calcium/Calmodulin-Dependent Protein Kinase II – CaMKII)-সহ বিভিন্ন সংকেতবাহী প্রোটিন সক্রিয় হতে পারে। ক্যালমোডুলিন (Calmodulin) একটি ক্যালসিয়াম-বন্ধনকারী প্রোটিন, যা ক্যালসিয়াম যুক্ত হলে নির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রোটিনের কার্যক্রম পরিবর্তন করে। ক্যামকিনেজ ২ (CaMKII) সক্রিয় হলে সিন্যাপটিক প্রোটিনের ফসফরাইলেশন, এএমপিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম এবং পোস্টসিন্যাপটিক সংকেত পরিবহনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই পরিবর্তন সিন্যাপটিক সংযোগকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়া শিক্ষা ও স্মৃতির আণবিক ভিত্তি অনুসন্ধানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটির একটি পরিচিত রূপ হলো লং-টার্ম পোটেনশিয়েশন (Long-Term Potentiation – LTP)। এর অর্থ হলো নির্দিষ্ট কার্যকলাপের পর একটি সিন্যাপটিক সংযোগের কার্যকারিতা দীর্ঘ সময়ের জন্য বৃদ্ধি পাওয়া। হিপোক্যাম্পাসের কিছু গ্লুটামেটার্জিক সিন্যাপসে এলটিপি সৃষ্টির জন্য এনএমডিএ রিসেপ্টরের সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, প্রিসিন্যাপটিক নিউরন থেকে গ্লুটামেট নিঃসৃত হলে প্রথমে এএমপিএ রিসেপ্টর (AMPA Receptor) সক্রিয় হয়ে সোডিয়াম প্রবেশ ঘটায় এবং পোস্টসিন্যাপটিক ঝিল্লিকে ডিপোলারাইজ করে। এই ডিপোলারাইজেশনের ফলে এনএমডিএ রিসেপ্টরের ম্যাগনেসিয়াম বাধা দুর্বল হয়। একই সময়ে গ্লুটামেট ও সহ-অ্যাগোনিস্ট উপস্থিত থাকলে এনএমডিএ রিসেপ্টর দিয়ে ক্যালসিয়াম প্রবেশ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী ক্যালসিয়াম-নির্ভর সংকেতপথের মাধ্যমে পোস্টসিন্যাপটিক ঝিল্লিতে কার্যকর এএমপিএ রিসেপ্টরের সংখ্যা অথবা কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে একই পরিমাণ গ্লুটামেট নিঃসৃত হলে সংশ্লিষ্ট সিন্যাপসে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী উত্তেজনামূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটির বিপরীতধর্মী একটি প্রক্রিয়া হলো লং-টার্ম ডিপ্রেশন (Long-Term Depression – LTD)। এখানে ডিপ্রেশন (Depression) শব্দটি মানসিক বিষণ্নতা নির্দেশ করে না; বরং সিন্যাপটিক সংযোগের কার্যকারিতা দীর্ঘ সময়ের জন্য হ্রাস পাওয়াকে বোঝায়। নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে এনএমডিএ রিসেপ্টরের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্যালসিয়াম সংকেতের মাত্রা, সময়কাল এবং স্থানিক বিন্যাসের পার্থক্য এলটিপি অথবা এলটিডি-সম্পর্কিত পৃথক কোষীয় সংকেতপথ সক্রিয় করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু পরিস্থিতিতে তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী ও নিম্নমাত্রার ক্যালসিয়াম সংকেত ক্যালসিনিউরিন (Calcineurin)-এর মতো ফসফাটেজ-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া সক্রিয় করে সিন্যাপটিক কার্যকারিতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এলটিপি ও এলটিডি-র নির্দিষ্ট নিয়ম সব মস্তিষ্কীয় অঞ্চল ও সিন্যাপসে একই নয়। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্র অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংযোগের শক্তি বৃদ্ধি বা হ্রাস করতে পারে।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রমের সঙ্গে হেবিয়ান প্লাস্টিসিটি (Hebbian Plasticity) ধারণার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেব (Donald Hebb) ১৯৪৯ সালে স্নায়বিক সংযোগের শক্তি পরিবর্তনের একটি প্রভাবশালী তাত্ত্বিক ধারণা উপস্থাপন করেন। এই ধারণার জনপ্রিয় সংক্ষিপ্ত প্রকাশ হলো ফায়ার টুগেদার, ওয়্যার টুগেদার (Fire Together, Wire Together)। এর অর্থ হলো উপযুক্ত সময়গত সম্পর্কের মধ্যে দুটি নিউরনের কার্যকলাপ ঘটলে তাদের মধ্যকার সংযোগ শক্তিশালী হতে পারে। এনএমডিএ রিসেপ্টরের কোইনসিডেন্স ডিটেকশন বৈশিষ্ট্য এই ধরনের কার্যকলাপ-নির্ভর সিন্যাপটিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আণবিক প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সব ধরনের শিক্ষা ও স্মৃতি এনএমডিএ রিসেপ্টর-নির্ভর এলটিপির মাধ্যমে সংঘটিত হয় না; স্মৃতির ধরন, সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কীয় অঞ্চল এবং স্নায়বিক নেটওয়ার্কের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্ন প্লাস্টিসিটি প্রক্রিয়া অংশগ্রহণ করে।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্নায়বিক বিকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিকাশমান মস্তিষ্কে এটি নিউরনের মধ্যে কার্যকলাপ-নির্ভর সংযোগ গঠন, সিন্যাপসের পরিপক্বতা এবং স্নায়বিক নেটওয়ার্কের পুনর্বিন্যাসে অংশগ্রহণ করে। বিভিন্ন বিকাশপর্যায়ে এনএমডিএ রিসেপ্টরের উপএকক গঠনে পরিবর্তন দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক স্নায়ুপথে বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে গ্লুএন২বি-যুক্ত রিসেপ্টরের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ে গ্লুএন২এ-যুক্ত রিসেপ্টরের অনুপাত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিবর্তন রিসেপ্টরের আয়ন চ্যানেল খোলা থাকার সময়কাল, সংকেতের গতিবিদ্যা এবং সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটির বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃতি মস্তিষ্কীয় অঞ্চল ও নিউরনের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের অতিরিক্ত সক্রিয়তা স্নায়ুকোষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী বা অনিয়ন্ত্রিত গ্লুটামেটার্জিক সংকেতের ফলে কোষের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম প্রবেশ করলে বিভিন্ন ক্ষতিকর জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। এই ঘটনাকে এক্সাইটোটক্সিসিটি (Excitotoxicity) বলা হয়। শব্দটি গঠিত হয়েছে এক্সাইটেশন (Excitation) অর্থ উত্তেজনা এবং টক্সিসিটি (Toxicity) অর্থ বিষক্রিয়া থেকে। অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম সংকেত নির্দিষ্ট প্রোটিয়েজ, ফসফোলাইপেজ এবং অন্যান্য এনজাইমের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে। একই সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (Oxidative Stress) বৃদ্ধি এবং কোষীয় শক্তি উৎপাদনে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এসব পরিবর্তন গুরুতর হলে স্নায়ুকোষের ক্ষতি অথবা মৃত্যু ঘটতে পারে। স্ট্রোক, মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট স্নায়বিক আঘাতের ক্ষেত্রে এক্সাইটোটক্সিসিটি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এনএমডিএ রিসেপ্টরের স্বাভাবিক সক্রিয়তা স্নায়ুকোষের জন্য অপরিহার্য; ক্ষতিকর প্রভাব মূলত সংকেতের মাত্রা, সময়কাল, অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট কোষীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
কেটামিন (Ketamine) এনএমডিএ রিসেপ্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নন-কম্পিটিটিভ অ্যান্টাগোনিস্ট (Non-Competitive Antagonist), যাকে কার্যপ্রণালির নির্দিষ্ট বর্ণনায় আনকম্পিটিটিভ চ্যানেল ব্লকার (Uncompetitive Channel Blocker)-ও বলা হয়। কেটামিন গ্লুটামেটের স্বাভাবিক অর্থোস্টেরিক বন্ধনস্থানে প্রতিযোগিতা করে কাজ করে না। বরং রিসেপ্টরের আয়ন চ্যানেলের অভ্যন্তরে একটি পৃথক বন্ধনস্থানে যুক্ত হয়ে আয়ন পরিবহন বাধাগ্রস্ত করে। এই বন্ধনস্থানকে প্রায়ই পিসিপি বন্ধনস্থান (PCP Binding Site) বলা হয়। কেটামিনের চ্যানেল অবরোধ ব্যবহার-নির্ভর (Use-Dependent) বা অবস্থা-নির্ভর (State-Dependent) বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে, কারণ চ্যানেল খোলা থাকলে ওষুধের পোরে প্রবেশ ও বন্ধন সহজতর হয়। ফলে রিসেপ্টর সক্রিয়তার ধরন কেটামিনের অবরোধের গতিবিদ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেটামিনের চ্যানেল অবরোধকে ম্যাগনেসিয়াম আয়নের স্বাভাবিক বাধার সঙ্গে তুলনা করা গেলেও দুটি প্রক্রিয়া অভিন্ন নয়। ম্যাগনেসিয়াম আয়ন মূলত ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভবের ওপর নির্ভর করে চ্যানেলের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে কেটামিন একটি জৈব রাসায়নিক অণু, যা চ্যানেলের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট বন্ধনস্থানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে আয়ন প্রবাহ কমায়। কেটামিন চ্যানেলে স্থায়ীভাবে আটকে থাকে না; এর বন্ধন ও বিচ্ছিন্নতা গতিশীল এবং ওষুধের ঘনত্ব, রিসেপ্টরের অবস্থা ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কেটামিনের প্রভাবে এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে হ্রাস পেতে পারে এবং ওষুধের প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে রিসেপ্টরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হতে পারে।
ফেনসাইক্লিডিন (Phencyclidine – PCP)-ও এনএমডিএ রিসেপ্টরের আয়ন চ্যানেল অবরোধ করতে পারে। এটি কেটামিনের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফার্মাকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য ভাগ করে নিলেও উভয়ের পোটেন্সি, গতিবিদ্যা, অন্যান্য আণবিক লক্ষ্য এবং মনোসক্রিয় প্রভাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম হ্রাসের মাধ্যমে এসব পদার্থ স্নায়বিক নেটওয়ার্কের উত্তেজনামূলক সংকেত পরিবহন এবং বিভিন্ন মস্তিষ্কীয় অঞ্চলের কার্যকরী যোগাযোগ পরিবর্তন করতে পারে। তবে কেটামিন ও পিসিপির সব আচরণগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে শুধু একটি আয়ন চ্যানেল অবরোধের সরাসরি ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না; রিসেপ্টর অবরোধের পর সৃষ্ট বৃহত্তর স্নায়বিক নেটওয়ার্কের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
কেটামিনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেস্থেশিয়া (Dissociative Anesthesia) সৃষ্টি করার ক্ষমতা। ডিসোসিয়েশন (Dissociation) শব্দটি লাতিন ডিস- (Dis-) অর্থ পৃথক বা বিচ্ছিন্ন এবং অ্যাসোসিয়ারে (Associare) অর্থ যুক্ত করা বা সম্পর্ক স্থাপন করা থেকে উদ্ভূত। মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানে ডিসোসিয়েশন বলতে সাধারণত চেতনা, স্মৃতি, উপলব্ধি, শরীরের অনুভূতি এবং আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক সমন্বয়ে বিচ্ছিন্নতা বা পরিবর্তনকে বোঝায়। কেটামিনের প্রভাবে কিছু ব্যক্তি নিজের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতি, পরিবেশকে অবাস্তব মনে হওয়া, সময়ের উপলব্ধিতে পরিবর্তন অথবা নিজের অবস্থান সম্পর্কে অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে পারেন। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে ডিপার্সোনালাইজেশন (Depersonalization) এবং ডিরিয়ালাইজেশন (Derealization)-সদৃশ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। ডিপার্সোনালাইজেশনে ব্যক্তি নিজের শরীর, চিন্তা বা অনুভূতিকে অপরিচিত বা নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন বলে অনুভব করতে পারেন। অন্যদিকে ডিরিয়ালাইজেশনে পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে অবাস্তব, দূরবর্তী অথবা স্বপ্নের মতো মনে হতে পারে।
ডিসোসিয়েটিভ অভিজ্ঞতার স্নায়বিক ভিত্তি বোঝার ক্ষেত্রে কর্টেক্স, থ্যালামাস, লিম্বিক সিস্টেম এবং অন্যান্য মস্তিষ্কীয় নেটওয়ার্কের পারস্পরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম পরিবর্তিত হলে এসব নেটওয়ার্কের সংকেত পরিবহন ও সমন্বয় পরিবর্তিত হতে পারে। নির্দিষ্ট গবেষণায় কেটামিনের প্রভাবে কর্টিক্যাল কার্যকরী সংযোগ, সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং আত্মসম্পর্কিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কে পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তবে কেটামিনের প্রভাবে মস্তিষ্কের উচ্চতর চিন্তার কেন্দ্র ও সংবেদনশীল কেন্দ্রের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এমন কোনো সরল আণবিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ, সংযোগ এবং তথ্য সমন্বয়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে ডিসোসিয়েটিভ অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হতে পারে।
কেটামিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর চেতনানাশক (Anesthetic) ও বেদনানাশক (Analgesic) কার্যক্রম। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কেটামিন সাধারণ চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর প্রভাবে সচেতনতার স্বাভাবিক অবস্থা, পরিবেশ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া এবং ব্যথার অভিজ্ঞতা পরিবর্তিত হতে পারে। কেটামিনের চেতনানাশক কার্যক্রমের প্রধান আণবিক লক্ষ্য এনএমডিএ রিসেপ্টর হলেও এর অন্যান্য ফার্মাকোলজিক্যাল মিথস্ক্রিয়াও থাকতে পারে। কেটামিন-সৃষ্ট ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেস্থেশিয়ায় নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষামূলক শ্বাসপথ-প্রতিবর্তক্রিয়া এবং স্বতঃস্ফূর্ত শ্বাসপ্রশ্বাস তুলনামূলকভাবে বজায় থাকতে পারে। তবে এর অর্থ কেটামিন শ্বাসপ্রশ্বাসের দমন বা শ্বাসপথ-সম্পর্কিত জটিলতা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। বিশেষ করে অন্যান্য কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-দমনকারী পদার্থের সঙ্গে ব্যবহার, দ্রুত প্রয়োগ অথবা নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত পরিস্থিতিতে শ্বাসপ্রশ্বাস ও শ্বাসপথের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
কেটামিনের সঙ্গে দ্রুত কার্যকরী অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট প্রভাব (Rapid-Acting Antidepressant Effect)-এর সম্পর্কও আধুনিক নিউরোফার্মাকোলজির একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র। নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত পরিস্থিতিতে কেটামিন এবং এর এস-এন্যান্টিওমার এসকেটামিন (Esketamine) বিষণ্নতার উপসর্গ দ্রুত কমাতে সক্ষম হতে পারে। এই প্রভাবের সম্ভাব্য আণবিক ব্যাখ্যার মধ্যে এনএমডিএ রিসেপ্টর অবরোধের পর নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে গ্লুটামেটার্জিক সংকেতের পরিবর্তন, এএমপিএ রিসেপ্টর-সম্পর্কিত কার্যক্রম এবং সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটির পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত। কিছু গবেষণায় ব্রেইন-ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (Brain-Derived Neurotrophic Factor – BDNF) এবং মেকানিস্টিক টার্গেট অব র্যাপামাইসিন (Mechanistic Target of Rapamycin – mTOR)-সম্পর্কিত সংকেতপথের সম্ভাব্য ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। তবে কেটামিনের অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট কার্যক্রমের পূর্ণ আণবিক প্রক্রিয়া এখনো গবেষণাধীন এবং এর সব প্রভাবকে একটি নির্দিষ্ট সংকেতপথের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন স্নায়বিক ও মনোরোগসংক্রান্ত অবস্থার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)-র নির্দিষ্ট উপসর্গ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এনএমডিএ রিসেপ্টর হাইপোফাংশন হাইপোথিসিস (NMDA Receptor Hypofunction Hypothesis) গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণামূলক ধারণা। এই ধারণা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্নায়বিক নেটওয়ার্কে এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম কমে গেলে উত্তেজনামূলক ও প্রতিবন্ধক সংকেতের ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে এবং উপলব্ধি, চিন্তা ও জ্ঞানীয় কার্যক্রমে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হতে পারে। কেটামিন ও পিসিপির মতো এনএমডিএ রিসেপ্টর অ্যান্টাগোনিস্টের কিছু প্রভাব সিজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট উপসর্গের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় এই ধারণা গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সিজোফ্রেনিয়াকে শুধু এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম হ্রাসের ফল হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; এটি জিনগত, বিকাশগত, স্নায়বিক এবং পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল অবস্থা।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টাগোনিস্ট ও মডুলেটর রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মেমান্টিন (Memantine) একটি এনএমডিএ রিসেপ্টর চ্যানেল ব্লকার, যা নির্দিষ্ট পর্যায়ের আলঝেইমার রোগে (Alzheimer’s Disease) উপসর্গগত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। মেমান্টিনও চ্যানেলের অভ্যন্তরে কাজ করে, কিন্তু এর বন্ধনগত গতিবিদ্যা ও ভোল্টেজ-নির্ভর বৈশিষ্ট্য কেটামিনের তুলনায় ভিন্ন। অন্যদিকে কিছু পরীক্ষামূলক যৌগ গ্লুটামেট-বন্ধনস্থান, গ্লাইসিন-বন্ধনস্থান অথবা রিসেপ্টরের অন্যান্য অ্যালোস্টেরিক অঞ্চলে কাজ করতে পারে। এসব যৌগের কার্যপ্রণালির পার্থক্য এনএমডিএ রিসেপ্টরের জটিল ফার্মাকোলজিক্যাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এনএমডিএ রিসেপ্টরের কার্যক্রমে দস্তা আয়ন (Zinc Ion – Zn²⁺), প্রোটন (Proton – H⁺), পলিআমিন (Polyamine) এবং অন্যান্য অন্তর্জাত উপাদানেরও নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা থাকতে পারে। নির্দিষ্ট উপএককযুক্ত রিসেপ্টর দস্তা আয়নের প্রতি বিশেষ সংবেদনশীল হতে পারে। একইভাবে বহিঃকোষীয় পিএইচ (Extracellular pH) পরিবর্তিত হলে রিসেপ্টরের কার্যক্রমও পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে এনএমডিএ রিসেপ্টর শুধু গ্লুটামেট, গ্লাইসিন ও ম্যাগনেসিয়ামের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি সরল আয়ন চ্যানেল নয়; বরং বিভিন্ন রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক সংকেতের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি জটিল আণবিক ব্যবস্থা।
স্নায়বিক নেটওয়ার্কের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এনএমডিএ রিসেপ্টরের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে ধীর ও দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনামূলক সিন্যাপটিক কারেন্ট সৃষ্টি করতে পারে। অনেক গ্লুটামেটার্জিক সিন্যাপসে এএমপিএ রিসেপ্টরের মাধ্যমে দ্রুত উত্তেজনামূলক সংকেত সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে এনএমডিএ রিসেপ্টরের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী কারেন্ট এবং ক্যালসিয়াম-নির্ভর সংকেত পরিবহন ঘটে। এই দুই ধরনের রিসেপ্টর একত্রে কাজ করে নিউরনের তাৎক্ষণিক বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সিন্যাপটিক পরিবর্তনের মধ্যে কার্যকরী সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। তবে এনএমডিএ রিসেপ্টরের সংকেতের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য তার উপএকক গঠন, ঝিল্লি বিভব, সহ-অ্যাগোনিস্টের উপস্থিতি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক উপাদানের ওপর নির্ভর করে।
সুতরাং, এনএমডিএ রিসেপ্টর (NMDA Receptor) মানব মস্তিষ্কের গ্লুটামেটার্জিক সংকেতব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ টেট্রামেরিক আয়নোট্রপিক রিসেপ্টর, যা একই সঙ্গে রাসায়নিক লিগ্যান্ড এবং ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় গ্লুটামেট ও গ্লাইসিন অথবা ডি-সেরিনের উপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত পোস্টসিন্যাপটিক ডিপোলারাইজেশন রিসেপ্টরের মাধ্যমে আয়ন প্রবাহকে অনুকূল করে। এর ফলে সোডিয়াম ও ক্যালসিয়াম কোষে প্রবেশ করতে পারে এবং ক্যালসিয়াম-নির্ভর সংকেতপথের মাধ্যমে সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি, শিক্ষা ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন সংঘটিত হতে পারে। অন্যদিকে কেটামিন ও পিসিপির মতো ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ রিসেপ্টরের আয়ন চ্যানেলের অভ্যন্তরে অবরোধ সৃষ্টি করে গ্লুটামেটার্জিক সংকেত পরিবহন পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে স্নায়বিক নেটওয়ার্কের কার্যকরী যোগাযোগ, উপলব্ধি, শরীরের অনুভূতি এবং চেতনার স্বাভাবিক সমন্বয়ে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে এনএমডিএ রিসেপ্টরের অতিরিক্ত সক্রিয়তা এক্সাইটোটক্সিসিটি-সম্পর্কিত স্নায়ুকোষীয় ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এই কারণে এনএমডিএ রিসেপ্টর স্নায়বিক উত্তেজনা, শিক্ষা ও স্মৃতি, চেতনানাশক ওষুধের কার্যপ্রণালি, ডিসোসিয়েটিভ অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের আণবিক ভিত্তি অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
সহনশীলতা ও রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন (Tolerance and Receptor Down-Regulation)
একই মাত্রার ড্রাগে শরীর অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার আণবিক প্রক্রিয়ার নাম সহনশীলতা (Tolerance) এবং এর পেছনের জৈবিক মেকানিজম হলো রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন (receptor down-regulation)।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ‘টলারেন্স’ শব্দটি এসেছে লাতিন ক্রিয়াপদ টলেরারে (tolerare) থেকে, যার অর্থ সহ্য করা, বহন করা বা কোনো ভার বয়ে চলা। অন্যদিকে ‘ডাউন-রেগুলেশন’ আধুনিক সেলুলার বায়োলজির একটি যৌগিক পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ হলো কোষ কর্তৃক নিজের কোনো অংশের নিয়ন্ত্রণকে নিচের দিকে নামিয়ে আনা বা কমিয়ে দেওয়া।
কোষীয় স্তরে মানবদেহ সর্বদা একটি অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিস (homeostasis) বজায় রাখতে চায়। যখন কোনো ব্যক্তি প্রতিদিন বাইরে থেকে হেরোইন বা কোকেনের মতো মাদক শরীরে প্রবেশ করায়, তখন মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট রিসেপ্টরগুলো অনবরত অতি-উদ্দীপনার শিকার হতে থাকে। এই কৃত্রিম উদ্দীপনার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে স্নায়ুকোষগুলো এক আত্মরক্ষামূলক জৈবিক কৌশল গ্রহণ করে। কোষগুলো নিজেদের প্লাজমা মেমব্রেনে থাকা রিসেপ্টরগুলোকে ভেতরের দিকে টেনে নেয় এবং লাইসোজোম এনজাইম দিয়ে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে কোষের উপরিভাগে কার্যকর রিসেপ্টরের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। একেই বলা হয় রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন। এর ফলাফল হলো, শুরুতে যে পরিমাণ মাদক গ্রহণ করলে তীব্র অনুভূতি পাওয়া যেত, রিসেপ্টর কমে যাওয়ার কারণে কিছুদিন পর সেই একই মাত্রার ড্রাগে কোনো প্রভাবই অনুভূত হয় না। কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে আসক্ত ব্যক্তিকে তখন ড্রাগের ডোজ জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে যেতে হয়, যা চরম বিষক্রিয়া ও ওভারডোজের ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রত্যাহার সিন্ড্রোম ও বিপরীত-প্রক্রিয়া (Withdrawal Syndrome and Opponent-Process)
মাদক হঠাৎ বন্ধ করলে শরীরে যে নরকযন্ত্রণা শুরু হয় তার চিকিৎসাগত নাম প্রত্যাহার সিন্ড্রোম (Withdrawal Syndrome) এবং এর মনস্তাত্ত্বিক মডেলের নাম বিপরীত-প্রক্রিয়া তত্ত্ব (opponent-process theory)।
‘উইথড্রয়াল’ শব্দটি মধ্যযুগীয় ইংরেজি ক্রিয়াপদ থেকে জাত, যার অর্থ কোনো স্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া বা প্রত্যাহার করা। অন্যদিকে ‘সিন্ড্রোম’ এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ সিনড্রোমোস (syndromos) থেকে, যার মূল অংশ সিন (syn-, একসাথে) এবং দ্রোমোস (dromos, দৌড়ানো বা চলা)। অর্থাৎ যখন অনেকগুলো শারীরিক উপসর্গ একসাথে প্রকাশ পায়, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকে সিন্ড্রোম বলা হয়। ‘অপোনেন্ট-প্রসেস’ শব্দটি এসেছে লাতিন ক্রিয়াপদ অপপোনেরে (opponere, বিপরীতে স্থাপন করা) থেকে।
মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড সলোমন এই শারীরবৃত্তীয় রূপান্তর ব্যাখ্যা করেন। মানব মস্তিষ্ক যেকোনো তীব্র রাসায়নিক পরিবর্তনের বিপরীতে শরীরকে বাঁচাতে একটি বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া চালু করে। মাদক যখন মস্তিষ্কে কৃত্রিম আনন্দের জোয়ার আনে (প্রক্রিয়া-ক), শরীর তখন তার বিরুদ্ধে এক তীব্র অবসাদ ও অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া শুরু করে (প্রক্রিয়া-খ) যাতে ভারসাম্য ঠিক থাকে। শুরুতে ড্রাগের শক্তির কাছে এই নেতিবাচক প্রক্রিয়াটি ঢাকা পড়ে থাকে। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের ফলে শরীর সেই আত্মরক্ষামূলক বিপরীত প্রতিক্রিয়াটিকে স্থায়ী ও শক্তিশালী করে তোলে। এখন ব্যক্তি যদি হঠাৎ মাদক নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে ড্রাগের ইতিবাচক প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয়ে যায়, কিন্তু শরীরের ভেতরে গড়ে ওঠা সেই শক্তিশালী নেতিবাচক বিপরীত প্রক্রিয়াটি একা রাজত্ব করতে শুরু করে। এর ফলেই শুরু হয় প্রত্যাহারের তীব্র ভয়াবহতা – অসহ্য শারীরিক ব্যথা, খিঁচুনি, ঘাম, রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং আত্মহত্যার তীব্র প্রবণতা।
অ্যালোস্ট্যাসিস ও প্যাথলজিক্যাল সেট-পয়েন্ট (Allostasis and Pathological Set-Point)
আসক্তির গভীরে থাকা অসুস্থ নতুন ভারসাম্যের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালোস্ট্যাসিস (Allostasis) এবং পরিবর্তিত ভারসাম্য স্তরের নাম প্যাথলজিক্যাল সেট-পয়েন্ট (pathological set-point)।
১৯৮৮ সালে স্নায়ুবিজ্ঞানী পিটার স্টার্লিং এবং জোসেফ আইয়ার এই পরিভাষাটির জন্ম দেন। শব্দটির ব্যুৎপত্তি দুটি গ্রিক শব্দমূলের সমন্বয়ে গঠিত: প্রথম অংশ গ্রিক বিশেষণ পদ অ্যালোস (allos), যার অর্থ ভিন্ন, অপর, পরিবর্তনশীল বা রূপান্তরিত; এবং দ্বিতীয় অংশ গ্রিক বিশেষ্য পদ স্ট্যাসিস (stasis), যার অর্থ স্থিরতা, স্থিতি বা দাঁড়ানো অবস্থা। সাধারণ সুস্থ ভারসাম্যকে বলা হয় হোমিওস্ট্যাসিস (যেখানে ‘হোমো’ অর্থ একই বা অপরিবর্তিত)। সুতরাং ‘অ্যালোস্ট্যাসিস’-এর আক্ষরিক রূপমূলতাত্ত্বিক অর্থ দাঁড়ায় ‘পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্থায়িত্ব খোঁজা’ বা ‘রূপান্তরিত ভারসাম্য’।
আসক্তির দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ায় জর্জ কুব এবং মিশেল লে মোয়াল দেখিয়েছেন যে মাদকাসক্ত মস্তিষ্ক কখনোই তার পুরোনো সুস্থ হোমিওস্ট্যাটিক সেট-পয়েন্টে ফিরে যেতে পারে না। মাদকাসক্তির ফলে মস্তিষ্কের পুরষ্কার ব্যবস্থা শারীরিকভাবে নিচে নেমে যায় এবং স্ট্রেস সিস্টেম স্থায়ীভাবে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্ক তখন বেঁচে থাকার জন্য একটি নতুন, অসুস্থ এবং অস্বাভাবিক সেট-পয়েন্ট নির্ধারণ করে, যাকে প্যাথলজিক্যাল সেট-পয়েন্ট বলা হয়। এই অবস্থায় মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদক না নিলে কেবল যে আনন্দ পায় না তা নয়, সে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিকল ও অসুস্থ অনুভব করে। এই অ্যালোস্ট্যাটিক অবস্থায় মাদক গ্রহণ আর কোনো বিলাসিতা বা আনন্দের অন্বেষণ থাকে না; এটি পরিণত হয় কেবল তীব্র মানসিক নরকযন্ত্রণা এড়িয়ে নিজেকে কোনোমতে কার্যকরী রাখার এক ব্যর্থ চেষ্টা।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
নিউরোপ্লাস্টিসিটি ও দীর্ঘস্থায়ী সম্ভাবনা (Neuroplasticity and Long-Term Potentiation – LTP)
মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের ক্ষমতার নাম নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity) এবং স্মৃতিতে মাদকাসক্তি খোদাই হওয়ার সেলুলার প্রক্রিয়ার নাম দীর্ঘস্থায়ী সম্ভাবনা বা লং-টার্ম পোটেনশিয়েশন (Long-Term Potentiation – LTP)।
‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ শব্দটি গঠিত হয়েছে গ্রিক বিশেষ্য পদ নিউরন (neuron, রগ বা স্নায়ু) এবং গ্রিক বিশেষণ পদ প্লাস্টিকোস (plastikos) মিলিয়ে। ‘প্লাস্টিকোস’ এসেছে গ্রিক ক্রিয়ামূল প্লাসিন (plassein) থেকে, যার অর্থ ছাঁচে ফেলে কোনো বস্তুকে রূপ দেওয়া বা কাদামাটি দিয়ে নতুন অবয়ব তৈরি করা। এর সাথে লাতিন বিমূর্ত বিশেষ্য প্রত্যয় যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে ‘স্নায়ুতন্ত্রের রূপান্তরযোগ্যতা’। অন্যদিকে ‘লং-টার্ম পোটেনশিয়েশন’ শব্দটির ‘পোটেনশিয়েশন’ এসেছে লাতিন বিশেষ্য পোটেনশিয়া (potentia, যার অর্থ ক্ষমতা বা শক্তি) থেকে।
১৯৭৩ সালে টেরিয়ে লোমো প্রথম এলটিপি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। যখন দুটি নিউরন বারবার একই সাথে উদ্দীপিত হয়, তখন তাদের মধ্যবর্তী সিন্যাপসের গ্রাহক প্রান্তে এএমপিএ রিসেপ্টরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং সিন্যাপ্টিক সংযোগটি স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হয়ে যায়। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘যেসব নিউরন একসাথে জ্বলে ওঠে, তারা একসাথে যুক্ত হয়ে যায়’। মাদকের ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স এবং ডরসাল স্ট্রাইটামের কোষগুলোতে এই এলটিপি ঘটে। এর ফলে ড্রাগ সংক্রান্ত চেনা দৃশ্য, গন্ধ বা বন্ধুবান্ধবের স্মৃতিগুলো সাধারণ স্মৃতির চেয়ে শতগুণ বেশি শক্তিশালী ও স্থায়ী সংযোগ হিসেবে মস্তিষ্কের কোষীয় আর্কিটেকচারে শারীরিকভাবে খোদাই হয়ে যায়। ব্যক্তি মাদক ছেড়ে দেওয়ার বহু বছর পরও এই প্লাস্টিক পরিবর্তনগুলো মস্তিষ্কে সুপ্ত অবস্থায় বেঁচে থাকে।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
প্রণোদনা-সংবেদনশীলকরণ ও হেডোনিক হটস্পট (Incentive-Sensitization and Hedonic Hotspots)
আসক্তিতে আনন্দের অভাব সত্ত্বেও তীব্র চাওয়ার রহস্য উন্মোচনকারী তত্ত্বের নাম প্রণোদনা-সংবেদনশীলকরণ তত্ত্ব (Incentive-Sensitization Theory) এবং মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র আনন্দ কেন্দ্রগুলোর নাম হেডোনিক হটস্পট (hedonic hotspots)।
১৯৯৩ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মনস্তত্ত্ববিদ টেরি রবিনসন এবং কেন্ট বেরিজ এই তত্ত্বের অবতারণা করেন। ‘ইনসেনটিভ’ শব্দটি এসেছে লাতিন ক্রিয়াপদ ইনসেনদারে (incendere, আগুন জ্বালানো বা প্রজ্বলিত করা) থেকে, যা কোনো কিছু পাওয়ার তীব্র উদ্দীপনাকে বোঝায়। অন্যদিকে ‘হেডোনিক’ এসেছে প্রাচীন গ্রিক বিশেষ্য পদ হেদোনে (hedone) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো শারীরিক ইন্দ্রিয়সুখ বা আনন্দ।
এই তত্ত্বের সবচেয়ে বৈপ্লবিক সাফল্য হলো এটি মানুষের মস্তিষ্কে ‘কোনো কিছু পছন্দ করা বা আনন্দ পাওয়া’ যাকে বলা হয় লাইকিং (liking), এবং ‘কোনো কিছু তীব্রভাবে চাওয়া’ যাকে বলা হয় ওয়ান্টিং (wanting) – এই দুটিকে সম্পূর্ণ আলাদা জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রমাণ করেছে। বেরিজ দেখান যে মস্তিষ্কে আনন্দ পাওয়ার কেন্দ্র বা হেডোনিক হটস্পটগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র, যা নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স এবং ভেন্ট্রাল প্যালিয়াম জুড়ে কয়েক মিলিমিটার আয়তনে সীমাবদ্ধ এবং এগুলো ওপিওয়েড ও এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেত দিয়ে চলে। অন্যদিকে কোনো কিছু পাওয়ার তীব্র চাওয়া বা ‘ওয়ান্টিং’ পরিচালিত হয় সুবিশাল মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থার মাধ্যমে। মাদকাসক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে হেডোনিক হটস্পটগুলো ক্ষয়ে যায়, যার ফলে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি ড্রাগ থেকে কোনো আনন্দই পায় না (লাইকিং শূন্যে নেমে যায়); অথচ মেসোলিম্বিক ডোপামিন সিস্টেমটি অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা সেন্সিটাইজড হয়ে পড়ে, যার ফলে ড্রাগ পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা বা ‘ওয়ান্টিং’ আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এই তত্ত্বটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে কেন একজন চরম মাদকাসক্ত ব্যক্তি এক ফোঁটা আনন্দ না পেয়েও পাগলের মতো মাদকের পেছনে ছুটে বেড়ায়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
ডেল্টা-ফস-বি ও এপিজেনেটিক স্মৃতি সুইচ (DeltaFosB and Epigenetic Memory Switch)
আসক্তির স্থায়ী আণবিক মাস্টার সুইচটির বৈজ্ঞানিক নাম ডেল্টা-ফস-বি (DeltaFosB / ΔFosB)।
নামটির ব্যুৎপত্তি মলিকিউলার বায়োলজির ইতিহাস থেকে এসেছে। ‘ফস’ (Fos) নামটি মূলত একটি ভাইরাসঘটিত অংকোজিন এফবিজে অস্টিওসারকোমা ভাইরাস (FBJ osteosarcoma virus) থেকে সংক্ষিপ্ত করে রাখা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত গ্রিক বর্ণমালার চতুর্থ বর্ণ ডেল্টা (Δ) নির্দেশ করে যে এটি মূল ফস-বি জিনের অল্টারনেটিভ স্প্লাইসিংয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি খণ্ডিত বা ট্রাঙ্কেটেড রূপ।
আণবিক স্নায়ুবিজ্ঞানী এরিক নেসলার প্রমাণ করেছেন যে ডেল্টা-ফস-বি হলো আসক্তির সবচেয়ে স্থায়ী সেলুলার মেমরি প্রোটিন। যেকোনো সাধারণ প্রোটিন মস্তিষ্কে তৈরি হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বারবার মাদক গ্রহণ করে, তখন নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সের ডোপামিন ডি-ওয়ান নিউরনগুলোতে এই ডেল্টা-ফস-বি প্রোটিনটি জমা হতে থাকে। এর আণবিক গঠনের বিশেষ স্থিতিশীলতার কারণে এটি মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর কোনো ক্ষয় ছাড়াই নিউরনের নিউক্লিয়াসের ভেতর টিকে থাকে। সেখানে অবস্থান করে এটি একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে; এটি নিউরনের ডিএনএ-র হিস্টোন প্রোটিনের রূপান্তর ঘটায় এবং আসক্তি সৃষ্টিকারী জিনগুলোকে স্থায়ীভাবে অন বা অফ করে রাখে। কোনো আসক্ত ব্যক্তি মাসের পর মাস সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত থাকার পরও মস্তিষ্কে জমে থাকা এই ডেল্টা-ফস-বি প্রোটিনটি একটি গোপন টাইম বোমার মতো টিকটিক করতে থাকে, যা সামান্য উস্কানিতে পুনরায় ব্যক্তিকে তীব্র আসক্তির অন্ধকার চক্রে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সম্পর্কিত আরও ছবি –
পরিশিষ্ট ঘ: আন্তর্জাতিক কনভেনশনের আওতায় মাদকের তফসিল, শ্রেণিবিভাগ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
বিশ্বজুড়ে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধ, বৈশ্বিক পাচার দমন এবং একই সাথে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রয়োজনীয় ঔষধের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা জাতিসংঘ তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক কনভেনশন প্রণয়ন করেছে। এই কনভেনশনগুলোর মূল ভিত্তি হলো একটি সুনির্দিষ্ট আইনি শ্রেণিবিন্যাস বা তফসিল ব্যবস্থা (scheduling system)। কোনো রাসায়নিক যৌগ বা ভেষজ উপাদান ঠিক কোন তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নির্ধারণের পেছনে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।
এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাদক নির্ভরতা বিশেষজ্ঞ কমিটি (WHO Expert Committee on Drug Dependence – ECDD)-র ওপর। এই বিশেষজ্ঞ কমিটি কোনো পদার্থের অপব্যবহারের ঝুঁকি, শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতা তৈরির ক্ষমতা এবং তার চিকিৎসাগত উপযোগিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে জাতিসংঘের কাছে সুপারিশ পাঠায়। সেই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে ভিয়েনাকেন্দ্রিক মাদকদ্রব্য কমিশন (Commission on Narcotic Drugs – CND)-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ভোটাভুটির মাধ্যমে পদার্থটিকে নির্দিষ্ট তফসিলে যুক্ত, স্থানান্তর বা বাতিল করে। আর এই সামগ্রিক আন্তর্জাতিক সনদের আইনি তদারকি ও বার্ষিক কোটা পরিবীক্ষণের কাজটি পরিচালনা করে আধা-বিচারবিভাগীয় সংস্থা আন্তর্জাতিক নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ড (International Narcotics Control Board – INCB)।
আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণের এই সুবিশাল ও জটিল তালিকাটিকে সহজে আয়ত্ত করার জন্য তিনটি ভিন্ন কনভেনশনের তফসিলগুলোর প্রকৃতি, নিয়ন্ত্রণের মাত্রা, অন্তর্ভুক্ত প্রধান রাসায়নিক পদার্থসমূহ এবং তাদের ব্যবহারিক বৈপরীত্য নিচে বিশদ বর্ণনামূলক আকারে সংকলিত হলো।
১৯৬১ সালের একক মাদক কনভেনশনের আইনি কাঠামো ও মূলনীতি
১৯৬১ সালে গৃহীত একক মাদক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs, 1961) মূলত প্রাকৃতিক বা উদ্ভিজ্জ মাদক – যেমন আফিম পপি, কোকা পাতা ও ক্যানাবিস – এবং ওপিওয়েড গোত্রীয় কৃত্রিম বা আধা-কৃত্রিম ব্যথানাশকগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়। এই কনভেনশনে মোট চারটি তফসিল রয়েছে, যা রোমান সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়: তফসিল এক, তফসিল দুই, তফসিল তিন এবং তফসিল চার।
এই কনভেনশনের একটি বিশেষ কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য মনে রাখা প্রয়োজন: এখানে তফসিলের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ক্রমানুসারে বাড়ে না। বরং তফসিল এক হলো কনভেনশনের মূল নিয়ন্ত্রণ স্তর, তফসিল দুই হলো অপেক্ষাকৃত শিথিল স্তর, তফসিল তিন হলো ছাড়প্রাপ্ত ওষুধের মিশ্রণ, এবং তফসিল চার হলো সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার স্তর যা আসলে তফসিল একেরই একটি অতি-বিপজ্জনক উপসেট। নিচে এই চারটি তফসিলের বিশদ বিবরণ দেওয়া হলো:
১৯৬১ কনভেনশনের তফসিল এক: উচ্চ ঝুঁকি ও কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ (Schedule I)
এই তফসিলে এমন সমস্ত নারকোটিক বা চেতনানাশক পদার্থকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেগুলোর অপব্যবহারের সম্ভাবনা অত্যন্ত মারাত্মক, যা মানবদেহে তীব্র শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতা তৈরি করে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই পদার্থগুলোর বৈধ চিকিৎসাগত উপযোগিতা রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ফলে এই তফসিলে থাকা পদার্থগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় না, বরং সেগুলোকে একটি কঠোর রাষ্ট্রীয় হিসাবরক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার অধীন রাখা হয়।
এই তফসিলে অন্তর্ভুক্ত প্রধান মাদকগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক ওপিওয়েড অ্যালকালয়েড যেমন মরফিন (morphine), থেবেইন (thebaine) এবং কাঁচা আফিম (opium)। আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েডের মধ্যে রয়েছে অক্সিকোডোন (oxycodone), হাইড্রোমরফোন (hydromorphone) এবং নিকোমোরফিন (nicomorphine)। সম্পূর্ণ সিন্থেটিক ওপিওয়েডের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যথানাশক ফেন্টানিল (fentanyl) এবং এর বহু সক্রিয় অ্যানালগ (যেমন আলফেন্টানিল ও সুফেন্টানিল), আসক্তি চিকিৎসার দীর্ঘস্থায়ী ড্রাগ মেথাডন (methadone), কৃত্রিম ব্যথানাশক পেথিডিন বা মেপেরিডিন (pethidine / meperidine) এবং লেভোরফ্যানল (levorphanol)। কোকা উদ্ভিদের প্রধান ক্ষারক কোকেন (cocaine) এবং অপরিশোধিত কোকা পাতা (coca leaf) এই তফসিলেরই অংশ। এছাড়া ২০২০ সালের ঐতিহাসিক সংশোধনীর পূর্ব পর্যন্ত উদ্ভিজ্জ ক্যানাবিস ও ক্যানাবিস রেজিন (cannabis and cannabis resin) এই স্তরেই নিয়ন্ত্রিত ছিল।
আইনি বাধ্যবাধকতার দিক থেকে, তফসিল একের অন্তর্ভুক্ত পদার্থগুলোর ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোকে প্রতি বছর আইএনসিবির কাছে বার্ষিক চাহিদার প্রাক্কলন বা উৎপাদন কোটা (production quota) জমা দিতে হয়। প্রতিটি আন্তর্জাতিক চালানের জন্য রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক উভয় দেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনপত্র বা আমদানি-রপ্তানি সনদ ব্যবস্থা (import-export certificate system) বাধ্যতামূলক। চিকিৎসাক্ষেত্রে কেবল নিবন্ধিত চিকিৎসকের বিশেষ ব্যবস্থাপত্র বা মেডিকেল প্রেসক্রিপশন (medical prescription) ছাড়া সাধারণ জনগণের জন্য এই ঔষধগুলোর বিতরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
১৯৬১ কনভেনশনের তফসিল দুই: মৃদু ঝুঁকি ও চিকিৎসাগত নমনীয়তা (Schedule II)
এই তফসিলে এমন কিছু মাদকদ্রব্যকে স্থান দেওয়া হয়, যেগুলোর কার্যক্ষমতা বা ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাব তফসিল একের ওষুধের মতোই ওপিওয়েড চরিত্রের, কিন্তু এদের অপব্যবহারের ঝুঁকি এবং নির্ভরতা তৈরির মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। এই পদার্থগুলো বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় – বিশেষ করে সর্দি-কাশি উপশম এবং মাঝারি ধরনের শারীরিক ব্যথা নিয়ন্ত্রণে – অত্যন্ত ব্যাপকভাবে এবং অপরিহার্যভাবে ব্যবহৃত হয়।
তফসিল দুই-এর প্রধান রাসায়নিক উদাহরণগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হলো কাশির ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক উপক্ষার কোডিন (codeine)। এর পাশাপাশি রয়েছে কোডিনের সমগোত্রীয় আধা-কৃত্রিম উপাদান ডাইহাইড্রোএক্টিভ কোডিন (dihydrocodeine), কাশির চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরেক উপাদান ফলকোডিন (pholcodine), মৃদু ব্যথানাশক ডেক্সট্রোপ্রোপোক্সিফেন (dextropropoxyphene), এবং তুলনামূলক কম পরিচিত ওপিওয়েড যেমন ইথাইলমরফিন (ethylmorphine) ও নিকোকোডিন (nicocodine)।
আইনি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তফসিল দুই-এর ওষুধগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পাইকারি বিতরণের ওপর সরকারি লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর থাকে বটে, তবে খুচরা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এদের নিয়ন্ত্রণ তফসিল একের চেয়ে অনেক বেশি শিথিল। রাষ্ট্রগুলো চাইলে নির্দিষ্ট পরিমাণের কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ বা ট্যাবলেট সাধারণ চিকিৎসকের সাধারণ ব্যবস্থাপত্রেই ফার্মেসি থেকে রোগীদের সংগ্রহের অনুমতি দিতে পারে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো অনেক দেশ নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আইনের মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক শিথিলতাকে কঠোর করে কোডিনকে সর্বোচ্চ সাজার আওতায় এনেছে।
১৯৬১ কনভেনশনের তফসিল তিন: নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঔষধি মিশ্রণ (Schedule III)
তফসিল তিন কোনো একক নতুন ড্রাগ বা রাসায়নিক পদার্থের তালিকা নয়; এটি মূলত নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত ফার্মাসিউটিক্যাল ফর্মুলেশন বা মিশ্রণ ওষুধের তালিকা (preparations list)। যখন তফসিল এক বা তফসিল দুই-এর কোনো ওপিওয়েড মাদককে অন্য কোনো অ-মাদকীয় ঔষধি উপাদানের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে ট্যাবলেট বা সিরাপ তৈরি করা হয় যে তা থেকে সহজে মাদকটি আলাদা করা যায় না এবং যার ফলে সেই মিশ্রণটির অপব্যবহার বা আসক্তি তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসে, তখন সেই ফর্মুলেশনটিকে তফসিল তিনে রাখা হয়।
এর সবচেয়ে ধ্রুপদী উদাহরণ হলো এমন কোনো কাশির সিরাপ বা ব্যথানাশক বড়ি, যাতে প্রতি ডোজে বা প্রতি একশত মিলিলিটারে ১০০ মিলিগ্রামের কম কোডিন বা ডাইহাইড্রোএক্টিভ কোডিন বিদ্যমান এবং তার সাথে প্যারাসিটামল বা গুয়াইফেনেসিনের মতো অন্য কোনো সক্রিয় ওষুধ মেশানো রয়েছে। ডাইফেনোক্সিলেট মিশ্রিত ডায়রিয়ার ওষুধ (যেখানে প্রতি ট্যাবলেটে ২.৫ মিলিগ্রামের কম ডাইফেনোক্সিলেট এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় এট্রোপিন সালফেট থাকে) এই তফসিলের অন্তর্ভুক্ত।
তফসিল তিনে অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে বড় আইনি সুবিধা হলো, এই ওষুধগুলোর আন্তর্জাতিক চালানের ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ দ্বিমুখী আমদানি ও রপ্তানি সনদপত্র গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকে না। হাসপাতাল ও ফার্মেসিগুলোতে এই ওষুধগুলো তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য মজুত রাখা যায়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ধারা, যা নিশ্চিত করে যে মাদক নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি যেন সাধারণ ডায়রিয়া বা সাধারণ ব্যথার চিকিৎসা প্রাপ্তির পথকে রুদ্ধ করে না দেয়।
১৯৬১ কনভেনশনের তফসিল চার: চরম নিষেধাজ্ঞা ও গবেষণায় সীমাবদ্ধ স্তর (Schedule IV)
তফসিল চার হলো ১৯৬১ সালের কনভেনশনের সবচেয়ে কুখ্যাত ও চরম দমনমূলক স্তর। এই স্তরের গঠন প্রকৃতি অন্যান্য তফসিরের চেয়ে একেবারেই ব্যতিক্রমী। কোনো পদার্থ এককভাবে কেবল তফসিল চারে থাকতে পারে না; তফসিল চারে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে সংশ্লিষ্ট পদার্থটিকে পূর্বশর্ত হিসেবে অবশ্যই প্রথমে তফসিল একের তালিকাভুক্ত হতে হয়। অর্থাৎ, তফসিল চার হলো তফসিল একের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও মারাত্মক অংশ। যে সমস্ত মাদকের অপব্যবহার ও আসক্তি তৈরির ক্ষমতা ভয়াবহ এবং যার বিপরীতে কোনো উল্লেখযোগ্য বা স্বীকৃত চিকিৎসাগত মূল্য নেই বলে তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রায় দিয়েছিল, তাদের এই স্তরে ফেলে প্রায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
এই চরম নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ঐতিহাসিকভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল কাঁচা আফিম থেকে প্রক্রিয়াজাত তীব্র মাদক হেরোইন (heroin) বা ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন। এছাড়া রয়েছে শক্তিশালী কিন্তু বিপজ্জনক কৃত্রিম অপিয়েট ডেসোমোরফিন (desomorphine) যা রাশিয়ার অন্ধকার বাজারে ‘ক্রোকোডিল‘ নামে পরিচিত, অ্যানেস্থেসিয়ার অতি-মারাত্মক উপাদান অ্যাসিটোরফিন (acetorphine) এবং বিষাক্ত রাসায়নিক কিটোপেমিডোন (ketobemidone)। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক ধরে কাঁচা ক্যানাবিস এবং ক্যানাবিস রেজিনও এই তফসিল চারে হেরোইনের পাশাপাশি অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈজ্ঞানিক সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য কমিশন ঐতিহাসিক ভোটাভুটিতে ক্যানাবিসকে এই চরম নিষেধাজ্ঞার তফসিল চার থেকে অপসারিত করে কেবল তফসিল একে বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
আইনি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তফসিল চারে থাকা পদার্থগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি এবং সাধারণ প্রেসক্রিপশনে ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি। রাষ্ট্রগুলো কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট সরকারি ল্যাবরেটরিতে ক্ষুদ্র মাত্রায় চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ও জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে এই রাসায়নিকগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ড্রাগগুলোকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার নীতি গ্রহণ করেছে।
১৯৬১ সালের একক মাদক কনভেনশনের আওতাভুক্ত সকল নারকোটিক ও ওপিওয়েড (The Complete Yellow List)
১৯৬১ সালের একক মাদক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs, 1961)-এর অধীনে প্রাকৃতিক অপিয়েট, আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড এবং কৃত্রিম ব্যথানাশক মিলিয়ে মোট ১৩০টিরও বেশি মৌলিক রাসায়নিক যৌগ নিয়ন্ত্রিত। নিচে এদের রাসায়নিক পরিবারভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংকলিত হলো:
প্রাকৃতিক আফিম অ্যালকালয়েড ও উদ্ভিজ্জ পদার্থ
- কাঁচা আফিম (Opium): পাপাভের সমনিফেরাম উদ্ভিদের জমাটবদ্ধ দুধের মতো আঠা (তফসিল ১)।
- ঔষধি আফিম (Medicinal Opium): নির্দিষ্ট মাত্রায় (সাধারণত ১০% মরফিন) প্রক্রিয়াজাত আফিম গুঁড়ো (তফসিল ১)।
- পপি খড় ও পপি খড়ের ঘন নির্যাস (Poppy Straw & Concentrate of Poppy Straw): পপি গাছের বীজ ব্যতীত সম্পূর্ণ শুকনো অংশ এবং এর নিষ্কাশিত ক্ষারকীয় নির্যাস (তফসিল ১)।
- মরফিন (Morphine): আফিমের প্রধান বেদনানাশক উপক্ষার (তফসিল ১)।
- কোডিন (Codeine): ৩-মিথাইলমরফিন; কাশির উপশমকারী প্রাকৃতিক উপক্ষার (তফসিল ২)।
- থেবেইন (Thebaine): প্যারামরফিন; আধা-কৃত্রিম ওপিওয়েড তৈরির প্রধান প্রাকৃতিক ক্ষারক (তফসিল ১)।
- অরপ্যাভাইন (Oripavine): পাপাভের ব্র্যাকটিয়েটাম থেকে প্রাপ্ত থেবেইনের সমগোত্রীয় প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড (তফসিল ১)।
- কোকা পাতা (Coca Leaf): ইরিথ্রোক্সিলাম কোকা উদ্ভিদের পাতা (তফসিল ১)।
- কোকেন (Cocaine): মিথাইলবেনজয়িলএকগোনিন; কোকা পাতার প্রধান সক্রিয় অ্যালকালয়েড (তফসিল ১)।
- একগোনিন (Ecgonine): কোকেন অণুর মূল অ্যামিনো-অ্যালকোহল কঙ্কাল এবং এর সমস্ত এস্টার ও উপজাত (তফসিল ১)।
- ক্যানাবিস, ক্যানাবিস রেজিন ও ক্যানাবিসের নির্যাস (Cannabis, Resin, Extracts & Tinctures): ক্যানাবিস উদ্ভিদের সমস্ত পুষ্পমঞ্জরি ও রেজিন (তফসিল ১; ২০২০ সালে সিএনডি কর্তৃক তফসিল ৪ থেকে অপসারিত)।
আধা-কৃত্রিম মরফিনান ও ওপিওয়েড জাতকসমূহ
- হেরোইন বা ডায়ামরফিন (Heroin / Diamorphine): ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন (তফসিল ১ এবং তফসিল ৪)।
- ডেসোমোরফিন (Desomorphine): ডাইহাইড্রোডিঅক্সিমরফিন (তফসিল ১ এবং তফসিল ৪)।
- অ্যাসিটোরফিন (Acetorphine): ৩-ও-অ্যাসিটাইলটেট্রাহাইড্রোঅরপ্যাভাইন ডেরিভেটিভ (তফসিল ১ এবং তফসিল ৪)।
- ইটরফিন (Etorphine): অত্যন্ত শক্তিশালী ভেটেরিনারি ওপিওয়েড (তফসিল ১ এবং তফসিল ৪)।
- অক্সিকোডোন (Oxycodone): ১৪-হাইড্রোক্সিডাইহাইড্রোকোডিনোন (তফসিল ১)।
- হাইড্রোমরফোন (Hydromorphone): ডাইহাইড্রোকোডিনোন (তফসিল ১)।
- অক্সিমরফোন (Oxymorphone): ১৪-হাইড্রোক্সিডাইহাইড্রোকোডিনোন ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- হাইড্রোকোডোন (Hydrocodone): ডাইহাইড্রোActive কোডিনোন (তফসিল ১)।
- ডাইহাইড্রোকোডিন (Dihydrocodeine): কোডিনের হাইড্রোজেনযুক্ত রূপ (তফসিল ২)।
- ইথাইলমরফিন (Ethylmorphine): ৩-ইথাইলমরফিন বা ডায়নিন (তফসিল ২)।
- ফলকোডিন (Pholcodine): মরফোলিনাইলইথাইলমরফিন (তফসিল ২)।
- নিকোমোরফিন (Nicomorphine): ৩,৬-ডাইনিকোটিনয়িলমরফিন (তফসিল ১)।
- নিকোকোডিন (Nicocodine): ৬-নিকোটিনয়িলকোডিন (তফসিল ২)।
- নিকোডাইকোডিন (Nicodicodine): ৬-নিকোটিনয়িলডাইহাইড্রোকোডিন (তফসিল ২)।
- বেনজিলমরফিন (Benzylmorphine): ৩-বেনজিলমরফিন (তফসিল ১)।
- হাইড্রোমরফিনল (Hydromorphinol): ১৪-হাইড্রোক্সিডাইহাইড্রোকোডিনোন ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- মেটোপন (Metopon): ৫-মিথাইলডাইহাইড্রোকোডিনোন (তফসিল ১)।
- মাইরোফিন (Myrophine): মিরিস্টিলবেনজিলমরফিন (তফসিল ১)।
- নরকোডিন (Norcodeine): এন-ডিমিথিলেটেড কোডিন (তফসিল ২)।
- নরমরফিন (Normorphine): ডিমিথিলেটেড মরফিন (তফসিল ১)।
- অ্যাসিটাইলডাইহাইড্রোকোডিন (Acetyldihydrocodeine): অ্যাসিটাইলেটেড ডাইহাইড্রোকোডিন (তফসিল ২)।
- থেবাকন (Thebacon): অ্যাসিটাইলডাইহাইড্রোActive কোডিনোন (তফসিল ১)।
- ড্রোটেবানল (Drotebanol): ৩,৪-ডাইমেথোক্সি-১৭-মিথাইলমরফিনান-৬-বিটা,১৪-ডাইঅল (তফসিল ১)।
সিন্থেটিক ফেন্টানিল শ্রেণি (Fentanyl Series)
- ফেন্টানিল (Fentanyl): এন-(১-ফেনিথাইল-৪-পিপারিডিল)প্রোপিওনঅ্যানিলাইড (তফসিল ১)।
- আলফেন্টানিল (Alfentanil): অতি-স্বল্পমেয়াদী অ্যানেস্থেটিক ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- সুফেন্টানিল (Sufentanil): ফেন্টানিলের চেয়ে ৫-১০ গুণ শক্তিশালী অ্যানেস্থেটিক (তফসিল ১)।
- রেমিফেন্টানিল (Remifentanil): রক্তরসে দ্রুত এনজাইমে ভেঙে যাওয়া ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- কারফেন্টানিল (Carfentanil): সাধারণ মরফিনের চেয়ে ১০,০০০ গুণ শক্তিশালী হাতি ও বন্যপ্রাণীর ট্রাঙ্কুলাইজার (তফসিল ১)।
- অ্যাসিটাইলফেন্টানিল (Acetylfentanyl): আলফা-মিথাইল অ্যানালগ (তফসিল ১)।
- বিউটায়ারফেন্টানিল (Butyrylfentanyl): বিউটায়ারামাইড ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ফুরানাইলফেন্টানিল (Furanylfentanyl): ফিউরান-২-কার্বক্সামাইড ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- অ্যাক্রিলফেন্টানিল (Acrylfentanyl): অ্যাক্রিলামাইড ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- অকফেন্টানিল (Ocfentanil): ফ্লুরো-মেথোক্সি ফেন্টানিল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- সাইক্লোপ্রোপাইলফেন্টানিল (Cyclopropylfentanyl): সাইক্লোপ্রোপেন ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- মিথোক্সিঅ্যাসিটাইলফেন্টানিল (Methoxyacetylfentanyl): ইথার অ্যানালগ (তফসিল ১)।
- টেট্রোহাইড্রোফুরানাইলফেন্টানিল (Tetrahydrofuranylfentanyl – THF-F): টিএইচএফ ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ক্রোটোনাইলফেন্টানিল (Crotonylfentanyl): বুটেনয়িল অ্যানালগ (তফসিল ১)।
- ভ্যালেরিলফেন্টানিল (Valerylfentanyl): পেন্টানয়িল অ্যানালগ (তফসিল ১)।
- প্যারা-ফ্লুরোফেন্টানিল (para-Fluorofentanyl): হ্যালোজেনেটেড অ্যানালগ (তফসিল ১)।
- অর্থো-ফ্লুরোফেন্টানিল (ortho-Fluorofentanyl): আইসোমার অ্যানালগ (তফসিল ১)।
মেথাডন ও ডাইফিনাইলপ্রোপাইলঅ্যামাইন শ্রেণি (Methadone & Congeners)
- মেথাডন (Methadone): ৬-(ডাইমিথাইলঅ্যামিনো)-৪,৪-ডাইফিনাইলহেপ্টান-৩-অন (তফসিল ১)।
- মেথাডন ইন্টারমিডিয়েট (Methadone Intermediate): ৪-সায়ানো-২-ডাইমিথাইলঅ্যামিনো-৪,৪-ডাইফিনাইলবিউটেন (তফসিল ১)।
- আইসোমেথাডন (Isomethadone): মেথাডনের শাখা-আইসোমার (তফসিল ১)।
- নরমেথাডন (Normethadone): ১,১-ডাইফিনাইল-১-ডাইমিথাইলঅ্যামিনোইথাইলবিউটানোন (তফসিল ১)।
- ডেক্সট্রোমোরমাইড (Dextromoramide): ডি-মরফোলিনো ডাইফিনাইলবিউটাইরিক অ্যাসিড ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- লেভোমোরমাইড (Levomoramide): এল-আইসোমার (তফসিল ১)।
- রেসিমোরমাইড (Racemoramide): রেসিমিক মিশ্রণ (তফসিল ১)।
- মোরমাইড ইন্টারমিডিয়েট (Moramide Intermediate): প্রি-কার্সর যৌগ (তফসিল ১)।
- ডাইমেফেপ্টানল বা মিথাদল (Dimepheptanol / Methadol): মেথাডনের অ্যালকোহল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- লেভোঅ্যাসিটাইলমিথাডল বা ল্যাম (Levacetylmethadol / LAAM): দীর্ঘস্থায়ী ওএসটি ড্রাগ (তফসিল ১)।
- নরঅ্যাসাইমিথাডল (Noracymethadol): আলফা-অ্যাসিটক্সি ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ফেনাডোক্সোন (Phenadoxone): মরফোলিনো-হেপ্টানোন ড্রাগ (তফসিল ১)।
- ডাইপ্রোপ্যানয়িলমরফিন (Dipipanone): পিপারিডিনো ডাইফিনাইলহেপ্টানোন (তফসিল ১)।
- আইসোঅ্যামিনাইল (Isoaminile): অ্যান্টি-টাসিভ ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
পেথিডিন ও ফিনাইলপিপারিডিন শ্রেণি (Pethidine & Piperidine Series)
- পেথিডিন বা মেপেরিডিন (Pethidine / Meperidine): ইথাইল ১-মিথাইল-৪-ফিনাইলপিপারিডিন-৪-কার্বক্সিলেট (তফসিল ১)।
- পেথিডিন ইন্টারমিডিয়েট এ (Pethidine Intermediate A): ৪-সায়ানো-১-মিথাইল-৪-ফিনাইলপিপারিডিন (তফসিল ১)।
- পেথিডিন ইন্টারমিডিয়েট বি (Pethidine Intermediate B): ইথাইল ৪-ফিনাইলপিপারিডিন-৪-কার্বক্সিলেট (তফসিল ১)।
- পেথিডিন ইন্টারমিডিয়েট সি (Pethidine Intermediate C): ১-মিথাইল-৪-ফিনাইলপিপারিডিন-৪-কার্বক্সিলিক অ্যাসিড (তফসিল ১)।
- প্রোপারাইডিন (Properidine): আইসোপ্রোপাইল এস্টার ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- অ্যানিলেরিডিন (Anileridine): অ্যামিনোফেনিথাইল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- পিমিলোডিন (Piminodine): ফিনাইলঅ্যামিনোপ্রোপাইল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- বেনজেথিডিন (Benzethidine): বেনজিলোক্সিইথাইল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ফিউরেথিডিন (Furethidine): টেট্রাহাইড্রোফিউরফিউরিলোক্সি ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- হাইড্রোক্সিপেথিডিন (Hydroxypethidine): এম-হাইড্রোক্সিফিনাইল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- কিটোপেমিডোন (Ketobemidone): ৪-(৩-হাইড্রোক্সিফিনাইল)-১-মিথাইল-৪-পিপারিডিল ইথাইল কিটোন (তফসিল ১ এবং তফসিল ৪)।
- অ্যালাইলপ্রোডিন (Allylprodine): ৩-অ্যালাইল-১-মিথাইল-৪-ফিনাইল-৪-প্রোপিওনোক্সিপিপারিডিন (তফসিল ১)।
- আলফামেপ্রোডিন (Alphameprodine): আলফা আইসোমার (তফসিল ১)।
- বিটামেপ্রোডিন (Betameprodine): বিটা আইসোমার (তফসিল ১)।
- আলফাপ্রোডিন (Alphaprodine): দ্রুত কার্যকর ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- বিটাপ্রোডিন (Betaprodine): বিটা ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ট্রাইমেপেরিডিন বা প্রোমেডল (Trimeperidine / Promedol): ১,২,৫-ট্রাইমিথাইল ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ফেনোপেরিডিন (Phenoperidine): ১-(৩-হাইড্রোক্সি-৩-ফিনাইলপ্রোপাইল) ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ডাইফেনোক্সিলেট (Diphenoxylate): ইথাইল এস্টার ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- ডাইফেনোক্সিন (Difenoxin): ডাইফেনোক্সিলেটের সক্রিয় মেটাবোলাইট (তফসিল ১)।
মরফিনান শ্রেণি (Morphinan Series)
- লেভোরফ্যানল (Levorphanol): (-)-৩-হাইড্রোক্সি-এন-মিথাইলমরফিনান (তফসিল ১)।
- লেভোমিথোরফান (Levomethorphan): (-)-৩-মেথোক্সি-এন-মিথাইলমরফিনান (তফসিল ১)।
- রেসিমোরফান (Racemorphan): রেসিমিক ৩-হাইড্রোক্সি-এন-মিথাইলমরফিনান (তফসিল ১)।
- রেসিমিথোরফান (Racemethorphan): রেসিমিক ৩-মেথোক্সি-এন-মিথাইলমরফিনান (তফসিল ১)।
- ফেনোমোরফান (Phenomorphan): ৩-হাইড্রোক্সি-এন-ফেনিথাইলমরফিনান (তফসিল ১)।
- দ্রষ্টব্য: ডেক্সট্রোমেথোরফান (Dextromethorphan) এবং ডেক্সট্রোরফান (Dextrorphan) এদের অপটিক্যাল আইসোমার হওয়া সত্ত্বেও আসক্তিহীনতার কারণে ১৯৬১ সালের কনভেনশনের নিয়ন্ত্রণ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত।
বেনজিমিডাজোল বা সিন্থেটিক নাইটাটাজিন শ্রেণি (Benzimidazoles / Nitazenes)
- ক্লোনিটাজিন (Clonitazene): ২-(৪-ক্লোরোবেনজিল)-১-ডাইইথাইলঅ্যামিনোইথাইল-৫-নাইট্রোবেনজিমিডাজোল (তফসিল ১)।
- ইটোনটাজিন (Etonitazene): মরফিনের চেয়ে ৬০ গুণ শক্তিশালী বেনজিমিডাজোল ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- আইসোটোনাইটাজিন (Isotonitazene): অতি-সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রিত সিন্থেটিক ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- মেটোনাইটাজিন (Metonitazene): ২০২০-এর দশকে যুক্ত মারাত্মক সিন্থেটিক ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- প্রোটোনাইটাজিন (Protonitazene): সাম্প্রতিক উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সিন্থেটিক ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- ইটোনাইটাজেপাইন (Etonitazepyne): পাইরোলিডিন অ্যানালগ (তফসিল ১)।
অন্যান্য বিবিধ সিন্থেটিক ওপিওয়েডসমূহ
- টিলিডিন (Tilidine): ইথাইল ২-(ডাইমিথাইলঅ্যামিনো)-১-ফিনাইলসাইক্লোহেক্স-৩-ইন-১-কার্বক্সিলেট (তফসিল ১)।
- বেজিট্রমাইড (Bezitramide): ৪-[৪-(২-অক্সো-৩-প্রোপায়নিলবেনজিমিডাজোলিন-১-ইল)পিপারিডিনো]-২,২-ডাইফিনাইলবিউটাইরোনাইট্রাইল (তফসিল ১)।
- পাইরিট্রামাইড (Piritramide): ৪-(৪-কার্বামোয়িল-৪-পিপারিডিনোপিপারিডিনো)-২,২-ডাইফিনাইলবিউটাইরোনাইট্রাইল (তফসিল ১)।
- প্রোপিরাম (Propiram): এন-(১-মিথাইল-২-পিপারিডিনোইথাইল)-এন-২-পাইরিডিলপ্রোপায়োনামাইড (তফসিল ২)।
- ডেক্সট্রোপ্রোপোক্সিফেন (Dextropropoxyphene): আলফা-৪-ডাইমিথাইলঅ্যামিনো-১,২-ডাইফিনাইল-৩-মিথাইল-২-বিউটানল প্রোপিওনেট (তফসিল ২)।
- ইউ-৪৭৭০০ (U-47700): সিন্থেটিক ‘পিঙ্ক ড্রাগ’; বেনজামাইড ওপিওয়েড (তফসিল ১)।
- এএইচ-৭৯২১ (AH-7921): সাইক্লোহেক্সিলবেনজামাইড ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- এমটি-৪৫ (MT-45): পাইপরাজিন ওপিওয়েড ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- ব্রোরফিন (Brorphine): বেনজিমিডাজোলিনোন ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- প্রোহেপ্টাজিন (Proheptazine): হেক্সামেথিলিনইমিন ডেরিভেটিভ (তফসিল ১)।
- মেটাজোসিন ও ফেনাজোসিন (Metazocine & Phenazocine): বেনজোমোরফান ডেরিভেটিভস (তফসিল ১)।
১৯৭১ সালের সাইকোট্রপিক কনভেনশনের আইনি কাঠামো ও উল্টো স্তরবিন্যাস
বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে যখন পশ্চিমা বিশ্বে কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত হ্যালুসিনোজেনিক, স্টিমুলেন্ট এবং সিডেটিভ ওষুধের অপব্যবহার মহামারি রূপ নেয়, তখন ১৯৬১ সালের কনভেনশন সেই সংকট সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। কারণ আগের কনভেনশনটি তৈরি হয়েছিল মূলত আফিম ও কোকার মতো কৃষিজাত মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য। এই ঐতিহাসিক শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে জাতিসংঘ গ্রহণ করে মনস্তাত্ত্বিক পদার্থবিষয়ক কনভেনশন (Convention on Psychotropic Substances, 1971)।
এই কনভেনশনটি আয়ত্ত করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সূত্র মনে রাখতে হয়: ১৯৭১ সালের কনভেনশনের তফসিলবিন্যাস ১৯৬১ সালের কনভেনশনের সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে মোট চারটি তফসিল রয়েছে (তফসিল ১, ২, ৩ এবং ৪)। ১৯৭১ সালের কনভেনশনে তফসিল এক হলো সবচেয়ে কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত স্তর, এবং তফসিল চার হলো সবচেয়ে নমনীয় বা শিথিল স্তর। অর্থাৎ, রোমান সংখ্যা যত বাড়বে (১ থেকে ৪-এর দিকে যাবে), নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি তত কমবে এবং ওষুধের চিকিৎসাগত গ্রহণযোগ্যতা তত বাড়বে। নিচে এই চারটি বিপরীতমুখী তফসিলের আণবিক ও আইনি চরিত্র আলোচনা করা হলো:
১৯৭১ কনভেনশনের তফসিল এক: চিকিৎসাগত মূল্যহীন চরম সাইকেডেলিক ড্রাগ (Schedule I)
১৯৭১ সালের কনভেনশনের তফসিল এক হলো আন্তর্জাতিক সাইকোট্রপিক আইনের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এই তফসিলে এমন সমস্ত সিন্থেটিক ও মনস্তাত্ত্বিক রাসায়নিক উপাদানকে রাখা হয়েছে, যেগুলোর চেতনা রূপান্তরের ক্ষমতা অত্যন্ত তীব্র এবং যাদের অপব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। আন্তর্জাতিক আইনপ্রণেতাদের তৎকালীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই পদার্থগুলোর কোনো প্রতিষ্ঠিত বা স্বীকৃত চিকিৎসাগত উপযোগিতা নেই বলে ঘোষণা করা হয়।
এই তফসিলে স্থান পেয়েছে ইতিহাসের সমস্ত প্রধান ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিক ও এন্ট্যাক্টোজেনিক রাসায়নিক যৌগ। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এরগট ছত্রাক থেকে জাত কৃত্রিম যৌগ লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথাইলঅ্যামাইড বা এলএসডি (LSD)। মেসোআমেরিকান ম্যাজিক মাশরুমের প্রধান সক্রিয় অ্যালকালয়েড সাইলোসাইবিন (psilocybin) এবং তার সক্রিয় রূপ সাইলোসিন (psilocin) এই তফসিলে অন্তর্ভুক্ত। পেয়োটি ক্যাকটাসের সক্রিয় উপাদান মেসক্যালিন (mescaline), আমাজনীয় ভেষজের উপাদান ডাইমিথাইলট্রিপটামিন বা ডিএমটি (DMT) এবং পার্টি ড্রাগ হিসেবে পরিচিত এমডিএমএ বা এক্সট্যাসি (MDMA / Ecstasy) এই স্তরে স্থান পেয়েছে। এছাড়া রয়েছে শক্তিশালী সিন্থেটিক অ্যানালগ যেমন ডোম (DOM), ডিওবি (DOB) এবং মেথাকুয়ালোন।
আইনি বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে এই তফসিলটি ১৯৬১ সালের তফসিল চারের মতোই চরম অনমনীয়। এই রাসায়নিকগুলোর সমস্ত ধরনের উৎপাদন, বিপণন, অধিকার ও পরিবহন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সনদের অনুচ্ছেদ সাত অনুযায়ী, কেবলমাত্র সরকারি নজরদারিতে থাকা বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর লাইসেন্সের অধীনে গবেষণার জন্য অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রায় এই পদার্থগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। চিকিৎসকের সাধারণ প্রেসক্রিপশনে এদের বিতরণ আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি। তবে সমকালীন বিশ্বে ‘সাইকেডেলিক রেনেসাঁ’-র হাত ধরে জনস হপকিন্স বা ইম্পেরিয়াল কলেজের মতো শীর্ষ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করছে যে সাইলোসাইবিন বা এমডিএমএ তীব্র বিষণ্ণতা ও ট্রমা নিরাময়ে যুগান্তকারী কার্যকর, যার ফলে ১৯৭১-এর এই অনমনীয় তফসিলটি আজ তীব্র বৈজ্ঞানিক পুনর্বিবেচনার মুখে পড়েছে।
১৯৭১ কনভেনশন: তফসিল এক-এর সম্পূর্ণ তালিকা (Schedule I – হ্যালুসিনোজেন, এনট্যাক্টোজেন ও নিষিদ্ধ সাইকোট্রপিকস)
- ক্লাসিক্যাল ও এরগট সাইকেডেলিকস:
- এলএসডি বা এলএসডি-২৫ (LSD / LSD-25): (+)-লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথাইলঅ্যামাইড।
- ট্রিপটামিন ও প্রাকৃতিক হ্যালুসিনোজেনস:
- সাইলোসাইবিন (Psilocybin): ৪-ফসফোরিলোক্সি-এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন।
- সাইলোসিন (Psilocin): ৪-হাইড্রোক্সি-এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন।
- ডিএমটি (DMT): এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন।
- ৫-মেথোক্সি-ডিএমটি (5-MeO-DMT): ৫-মেথোক্সি-এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন।
- ডিইটি (DET): ৩-[২-(ডাইইথাইলঅ্যামিনো)ইথাইল]ইনডোল।
- ইট্রিপটামিন (Etryptamine): ৩-(২-অ্যামিনোবিউটাইল)ইনডোল।
- বফোতেনিন (Bufotenine): ৫-হাইড্রোক্সি-এন,এন-ডাইমিথাইলট্রিপটামিন।
- ফেনিথাইলামাইন ও রিং-সাবস্টিটিউটেড অ্যাম্ফেটামিনস:
- মেসক্যালিন (Mescaline): ৩,৪,৫-ট্রাইমেথোক্সিফেনিথাইলামাইন।
- এমডিএমএ (MDMA): (±)-৩,৪-মিথাইলিনডাইঅক্সিমেথঅ্যাম্ফেটামিন (এক্সট্যাসি)।
- এমডিএ (MDA): ৩,৪-মিথাইলিনডাইঅক্সিঅ্যাম্ফেটামিন।
- এমডিইএ বা এমডিই (MDEA / MDE): (±)-এন-ইথাইল-আলফা-মিথাইল-৩,৪-(মিথাইলিনডাইঅক্সি)ফেনিথাইলামাইন।
- ডোম বা এসটিপি (DOM / STP): ২,৫-ডাইমেথোক্সি-আলফা,৪-ডাইমিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- ডিওবি (DOB): (±)-৪-ব্রোমো-২,৫-ডাইমেথোক্সি-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন (ব্রোলাম্ফেটামিন)।
- ডিওসি (DOC): ২,৫-ডাইমেথোক্সি-৪-ক্লোরোঅ্যাম্ফেটামিন।
- ডিওআই (DOI): ২,৫-ডাইমেথোক্সি-৪-আয়োডোঅ্যাম্ফেটামিন।
- ডিওইটি (DOET): (±)-৪-ইথাইল-২,৫-ডাইমেথোক্সি-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- ২সি-বি (2C-B): ৪-ব্রোমো-২,৫-ডাইমেথোক্সিফেনিথাইলামাইন।
- ২সি-আই (2C-I): ৪-আয়োডো-২,৫-ডাইমেথোক্সিফেনিথাইলামাইন।
- ২সি-টি-২ (2C-T-2): ২,৫-ডাইমেথোক্সি-৪-ইথাইলথিওফেনিথাইলামাইন।
- ২সি-টি-৭ (2C-T-7): ২,৫-ডাইমেথোক্সি-৪-প্রোপাইলথিওফেনিথাইলামাইন।
- ২সি-এইচ (2C-H): ২,৫-ডাইমেথোক্সিফেনিথাইলামাইন।
- টিএমএ (TMA): (±)-৩,৪,৫-ট্রাইমেথোক্সি-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- টিএমএ-২ (TMA-2): ২,৪,৫-ট্রাইমেথোক্সিঅ্যাম্ফেটামিন।
- পিএমএ (PMA): প্যারা-মেথোক্সিঅ্যাম্ফেটামিন।
- পিএমএমএ (PMMA): প্যারা-মেথোক্সিমেথঅ্যাম্ফেটামিন।
- ৪-এমটিএ (4-MTA): ৪-মিথাইলথিওঅ্যাম্ফেটামিন।
- ৪-মিথাইলঅ্যামিনোরেক্স (4-Methylaminorex): (±)-সিস-২-অ্যামিনো-৪-মিথাইল-৫-ফিনাইল-২-অক্সাজোলিন।
- এমএমডিএ (MMDA): ৫-মেথোক্সি-৩,৪-মিথাইলিনডাইঅক্সিঅ্যাম্ফেটামিন।
- ডিএমএ (DMA): (±)-২,৫-ডাইমেথোক্সি-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- ক্যাথিনোন ও ডিজাইনার স্টিমুলেন্টস:
- ক্যাথিনোন (Cathinone): (-)-(এস)-২-অ্যামিনোপ্রোপিওফেনন।
- মেথক্যাথিনোন (Methcathinone): ২-(মিথাইলঅ্যামিনো)-১-ফিনাইলপ্রোপান-১-অন।
- মেফেড্রোন বা ৪-এমএমসি (Mephedrone / 4-MMC): ৪-মিথাইলমেথক্যাথিনোন।
- এমডিপিউভি (MDPV): ৩,৪-মিথাইলিনডাইঅক্সিপাইরোভ্যালেরোন।
- আলফা-পিভিপি (alpha-PVP): আলফা-পাইরোলিডিনোভ্যালেরোফেনন (‘ফ্লাকা’)।
- মিথাইলন (Methylone): বিটা-কিটো-এমডিএমএ।
- ইথাইলন (Ethylone): বিটা-কিটো-এমডিইএ।
- পেন্টাইলন (Pentylone): বিটা-কিটো-পেন্টাইল-এমডিএ।
- ৪-এফএমসি (4-FMC): ৪-ফ্লুরোমেথক্যাথিনোন।
- ডিসোসিয়েটিভ ও সিএনএস ডিপ্রেসেন্টস:
- মেথাকুয়ালোন (Methaqualone): ২-মিথাইল-৩-ও-টোলিল-৪(৩এইচ)-কুইনাজোলিনোন (কুখ্যাত ‘কোয়ালুডস’)।
- মেক্লোকুয়ালোন (Mecloqualone): ৩-(ও-ক্লোরোফিনাইল)-২-মিথাইল-৪(৩এইচ)-কুইনাজোলিনোন।
- এটিসাইক্লিডিন বা পিসিই (Eticyclidine / PCE): এন-ইথাইল-১-ফিনাইলসাইক্লোহেক্সিলামাইন।
- রোলিসাইক্লিডিন বা পিএইচপি (Rolicyclidine / PHP): ১-(১-ফিনাইলসাইক্লোহেক্সিল)পাইরোলিডিন।
- টিনোসাইক্লিডিন বা টিসিপি (Tenocyclidine / TCP): ১-[১-(২-থিয়েনিল)সাইক্লোহেক্সিল]পিপারিডিন।
- সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্টস (Synthetic Cannabinoids):
- টিএইচসি-র সমস্ত সিন্থেটিক আইসোমার (THC Isomers): ডেল্টা-৬এ,১০এ; ডেল্টা-৭; ডেল্টা-৮; ডেল্টা-১০; ডেল্টা-৯(১১) টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল।
- ডিএমএইচপি (DMHP): ৩-(১,২-ডাইমিথাইলহেপ্টাইল)-৭,৮,৯,১০-টেট্রাহাইড্রো-৬,৬,৯-ট্রাইমিথাইল-৬এইচ-ডাইবেনজো পাইরান-১-অল।
- প্যারাহেক্সিল (Parahexyl): ৩-হেক্সিল-৭,৮,৯,১০-টেট্রাহাইড্রো-৬,৬,৯-ট্রাইমিথাইল-৬এইচ-ডাইবেনজো পাইরান-১-অল।
- জেডব্লিউএইচ-০১৮ (JWH-018): ১-পেন্টাইল-৩-(১-ন্যাফথয়িল)ইনডোল।
- এএম-২২০১ (AM-2201): ১-(৫-ফ্লুরোপেন্টাইল)-৩-(১-ন্যাফথয়িল)ইনডোল।
- ইউআর-১৪৪ (UR-144): টেট্রামিথাইলসাইক্লোপ্রোপাইল ইনডোল।
- এক্সএলআর-১১ (XLR-11): ৫-ফ্লুরো ইউআর-১৪৪।
- পিবি-২২ ও ৫এফ-পিবি-২২ (PB-22 & 5F-PB-22): কুইনোলিনাইল কার্বক্সিলেট সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডস।
- এমডিএমবি-সিএইচএমআইসিএ (MDMB-CHMICA): অত্যন্ত মারাত্মক সাইক্লোহেক্সিলমিথাইল সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড।
- ৫এফ-এমডিএমবি-পিনাকা (5F-MDMB-PINACA / 5F-ADB): অতি-বিষাক্ত ইন্ডাজোল সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড।
১৯৭১ কনভেনশনের তফসিল দুই: উচ্চ অপব্যবহার ঝুঁকিযুক্ত প্রয়োজনীয় উদ্দীপক (Schedule II)
এই তফসিলে এমন কিছু সাইকোট্রপিক পদার্থ অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর অপব্যবহারের সম্ভাবনা এবং আসক্তি তৈরির ঝুঁকি তফসিল একের মতোই অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু তফসিল একের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য হলো – এই পদার্থগুলোর সুনির্দিষ্ট, প্রমাণিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাগত উপযোগিতা রয়েছে। ফলে এগুলোকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে কঠোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপত্র ও নিয়ন্ত্রিত শিল্প উৎপাদনের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এই স্তরের প্রধান রাসায়নিকগুলো হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের শক্তিশালী উত্তেজক বা সাইকোস্টিমুলেন্ট। এর মধ্যে প্রধান হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ড্রাগ অ্যাম্ফেটামিন (amphetamine) এবং তার মারাত্মক রূপ মেথাম্ফেটামিন (methamphetamine)। শিশুদের মনোযোগ ঘাটতিজনিত সমস্যা বা এডিএইচডি-র চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ওষুধ মিথাইলফেনিডেট বা রিটালিন (methylphenidate / Ritalin) এই তফসিলের অন্তর্ভুক্ত। ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেস্থেটিক ফেনসাইক্লিডিন বা পিসিপি (PCP), তীব্র অবসাদক ড্রাগ সেকোবার্বিটাল (secobarbital) এবং উদ্ভিজ্জ ক্যানাবিসের ডেল্টা-৯-টিএইচসি-র সিন্থেটিক রূপ ড্রোনাবিনল (dronabinol) এই তফসিলে অবস্থান করছে।
এই তফসিলের ওষুধগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর কোটা নিয়ন্ত্রণ, সরকারি লাইসেন্সিং এবং বিস্তারিত হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। এই ওষুধগুলোর প্রেসক্রিপশন কোনোভাবেই নবায়নযোগ্য বা রিফিলযোগ্য হতে পারে না; প্রতিবার ওষুধ সংগ্রহের জন্য রোগীকে নতুন প্রেসক্রিপশন জমা দিতে হয়। কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রতিটি গ্রাম কাঁচামাল আমদানির জন্য সরকারের কাছ থেকে পৃথক অনুমতিপত্র গ্রহণ করতে হয়।
১৯৭১ কনভেনশন: তফসিল দুই-এর সম্পূর্ণ তালিকা (Schedule II – উচ্চ আসক্তিকর চিকিৎসাগত ড্রাগস)
- অ্যাম্ফেটামিন (Amphetamine): (±)-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- ডেক্সঅ্যাম্ফেটামিন (Dexamfetamine): (+)-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- মেথঅ্যাম্ফেটামিন (Methamphetamine): (+)-(এস)-এন,আলফা-ডাইমিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- মেথঅ্যাম্ফেটামিন রেসিমেট (Methamphetamine Racemate): (±)-এন,আলফা-ডাইমিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- মিথাইলফেনিডেট (Methylphenidate): মিথাইল আলফা-ফিনাইল-২-পিপারিডিনঅ্যাসিটেট (রিটালিন)।
- ফেনসাইক্লিডিন বা পিসিপি (Phencyclidine / PCP): ১-(১-ফিনাইলসাইক্লোহেক্সিল)পিপারিডিন।
- ড্রোনাবিনল (Dronabinol): কৃত্রিম বিশুদ্ধ (-)-ট্রান্স-ডেল্টা-৯-টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল।
- সেকোবার্বিটাল (Secobarbital): ৫-অ্যালাইল-৫-(১-মিথাইলবিউটাইল)বার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- ফেনমেট্রাজিন (Phenmetrazine): ৩-মিথাইল-২-ফিনাইলমরফোলিন।
- ফেনইথাইলিন বা ক্যাপ্টাগন (Fenethylline / Captagon): ৭-[২-[(আলফা-মিথাইলফেনিথাইল)অ্যামিনো]ইথাইল]থিওফাইলিন।
- লেভঅ্যাম্ফেটামিন (Levamfetamine): (-)-(আর)-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- লেভোমেথঅ্যাম্ফেটামিন (Levomethamphetamine): (-)-এন,আলফা-ডাইমিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- জাইপেপ্রোল (Zipeprol): আলফা-(আলফা-মেথোক্সিবেনজিল)-৪-(বিটা-মেথোক্সিফেনিথাইল)-১-পাইপরাজিনইথানল।
- অ্যামিনেপ্টিন (Amineptine): ৭-[(১০,১১-ডাইডাইহাইড্রো-৫এইচ-ডাইবেনজো সাইক্লোহেপ্টেন-৫-ইল)অ্যামিনো]হেপ্টানোয়িক অ্যাসিড।
১৯৭১ কনভেনশনের তফসিল তিন: মাঝারি ঝুঁকিসম্পন্ন সিডেটিভ ও বার্বিচুরেটস (Schedule III)
এই তফসিলে রাখা হয়েছে এমন সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক রাসায়নিক যৌগকে, যেগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি তফসিল দুই-এর চেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম, কিন্তু যাদের অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মৃদু থেকে মাঝারি শারীরিক বা মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই ওষুধগুলোর প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত ব্যাপক ও বহুমুখী।
এই স্তরের মূল প্রতিনিধি হলো মাঝারি ক্ষমতার বার্বিচুরেট গোত্রের ঘুমের ওষুধ এবং কিছু নির্দিষ্ট সিডেটিভ। উদাহরণস্বরূপ, তীব্র অনিদ্রা ও অস্ত্রোপচারের পূর্বপ্রস্তুতিতে ব্যবহৃত অ্যামোবার্বিটাল (amobarbital), পেন্টোবার্বিটাল (pentobarbital) এবং সাইক্লোবার্বিটাল (cyclobarbital)। খিঁচুনি নিরোধক ড্রাগ থিওপেন্টাল (thiopental) এবং ডেট-রেপ ড্রাগ হিসেবে কুখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও জটিল নিদ্রাহীনতার শক্তিশালী ওষুধ ফ্লুনিট্রাজেপাম বা রোহিপনল (flunitrazepam / Rohypnol)-কে অপব্যবহারের ঝুঁকির কারণে পরবর্তীতে এই তফসিলে উন্নীত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ব্যথানাশক যৌগ বুপ্রেনরফিন (buprenorphine), যা অপিয়েট আসক্তি নিরাময়েও ব্যবহৃত হয়।
আইনি ক্ষেত্রে এই তফসিলের ওষুধগুলো উৎপাদনের জন্য সাধারণ বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। প্রতিটি বাণিজ্যিক লেনদেনের বিস্তারিত খতিয়ান কোম্পানি ও পাইকারদের বহিতে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে আন্তর্জাতিক চালানের ক্ষেত্রে প্রতিটি পৃথক চালানের জন্য আগাম আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি তফসিল দুই-এর মতো ততটা জটিল নয়; এখানে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক মোট পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বোর্ডের কাছে দাখিল করাই যথেষ্ট হিসেবে গণ্য হয়।
১৯৭১ কনভেনশন: তফসিল তিন-এর সম্পূর্ণ তালিকা (Schedule III – মাঝারি ক্ষমতার বার্বিচুরেটস ও সিডেটিভস)
- অ্যামোবার্বিটাল (Amobarbital): ৫-ইথাইল-৫-আইসোঅ্যামাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- পেন্টোবার্বিটাল (Pentobarbital): ৫-ইথাইল-৫-(১-মিথাইলবিউটাইল)বার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- সাইক্লোবার্বিটাল (Cyclobarbital): ৫-(১-সাইক্লোহেক্সেন-১-ইল)-৫-ইথাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- বিউটালবিটাল (Butalbital): ৫-অ্যালাইল-৫-আইসোবিউটাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- সেকবিউটাবার্বিটাল (Secbutabarbital): ৫-সেক-বিউটাইল-৫-ইথাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- ফ্লুনিট্রাজেপাম বা রোহিপনল (Flunitrazepam / Rohypnol): ৫-(ও-ফ্লুরোফিনাইল)-১,৩-ডাইডাইহাইড্রো-১-মিথাইল-৭-নাইট্রো-২এইচ-১,৪-বেঞ্জোডায়াজেপিন-২-অন।
- বুপ্রেনরফিন (Buprenorphine): ২১-সাইক্লোপ্রোপাইল-৭-আলফা-[(এস)-১-হাইড্রোক্সি-১,২,২-ট্রাইমিথাইলপ্রোপাইল]-৬,১৪-এন্ডো-ইথানো-৬,৭,৮,১৪-টেট্রাহাইড্রোঅরপ্যাভাইন।
- পেন্টাজোসিন (Pentazocine): (২আর,৬আর,১১আর)-৬,১১-ডাইমিথাইল-৩-(৩-মিথাইলবিউট-২-এন-১-ইল)-১,২,৩,৪,৫,৬-হেক্সাহাইড্রো-২,৬-মিথানো-৩-বেনজাজোসিন-৮-অল।
- গ্লুটেথিমিড (Glutethimide): ২-ইথাইল-২-ফিনাইলগ্লুটারিমাইড।
- ক্যাথিন বা ডি-নরসিউডোএফিড্রিন (Cathine / d-norpseudoephedrine): (+)-(আর)-আলফা-[(আর)-১-অ্যামিনোইথাইল]বেনজিল অ্যালকোহল।
১৯৭১ কনভেনশনের তফসিল চার: স্বল্প ঝুঁকি ও বিশ্বজনীন প্রেসক্রিপশন ওষুধ (Schedule IV)
তফসিল চার হলো ১৯৭১ সালের কনভেনশনের সবচেয়ে শিথিল এবং চিকিৎসাগতভাবে সর্বাধিক ব্যবহৃত স্তর। এই তফসিলে স্থান পাওয়া সাইকোট্রপিক পদার্থগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি অন্যান্য সমস্ত তফসিলের চেয়ে সর্বনিম্ন। তবে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে এদের প্রতিও মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাস গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। মানসিক স্বাস্থ্য, স্নায়ুরোগ এবং সাধারণ চিকিৎসায় এই ওষুধগুলো প্রতিদিন সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ গ্রহণ করে থাকেন।
এই সুবিশাল তালিকার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের অত্যন্ত জনপ্রিয় ড্রাগ শ্রেণি বেঞ্জোডায়াজেপাইন (benzodiazepines)। এর মধ্যে রয়েছে বহুল পরিচিত দুশ্চিন্তানাশক ডায়াজেপাম (diazepam), প্যানিক অ্যাটাক ও অনিদ্রার ওষুধ আলপ্রাজোলাম (alprazolam), খিঁচুনি নিরোধক ক্লোনাজিপাম (clonazepam), শিথিলকারী লোরাজিপাম (lorazepam), মিডাজোলাম (midazolam), অক্সাজেপাম (oxazepam) এবং কর্ডিয়াজেপক্সাইড (chlordiazepoxide)। এর বাইরে মৃগীরোগের মৌলিক জীবনরক্ষাকারী প্রাচীন ওষুধ ফেনোবার্বিটাল (phenobarbital) এবং মৃদু ক্ষুধা নিবৃত্তিকারী ও সজাগকারক উপাদান যেমন মোডাফিনিল (modafinil) বা মেফেনোরেক্স এই তফসিলে অন্তর্ভুক্ত।
তফসিল চার-এর মূল আইনি দর্শন হলো এই অপরিহার্য ওষুধগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শৃঙ্খলিত না করা। এর জন্য কোনো কঠিন পূর্ব-অনুমোদনপত্রের আন্তর্জাতিক জাল তৈরি করা হয়নি। সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে বৈধ প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে এদের বিক্রি অনুমোদিত। তবে কালোবাজারে পাচার রোধ করতে প্রতিটি রাষ্ট্রকে তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদক ও পাইকারি পরিবেশকদের ওপর নজরদারি রাখতে হয় এবং জাতীয় ব্যবহারের সার্বিক হিসাব আইএনসিবির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদনে উপস্থাপন করতে হয়।
১৯৭১ কনভেনশন: তফসিল চার-এর সম্পূর্ণ তালিকা (Schedule IV – বেঞ্জোডায়াজেপাইন ও প্রেসক্রিপশন ড্রাগস)
- বেঞ্জোডায়াজেপাইন এনজিওলাইটিক ও হিপনোটিকস (সমগ্র শ্রেণি):
- ডায়াজেপাম (Diazepam)
- আলপ্রাজোলাম (Alprazolam)
- ক্লোনাজিপাম (Clonazepam)
- লোরাজিপাম (Lorazepam)
- মিডাজোলাম (Midazolam)
- কর্ডিয়াজেপক্সাইড (Chlordiazepoxide)
- অক্সাজেপাম (Oxazepam)
- টেমাজেপাম (Temazepam)
- ট্রায়াজোলাম (Triazolam)
- নাইট্রাজেপাম (Nitrazepam)
- ব্রোমাজেপাম (Bromazepam)
- ক্লোবাজাম (Clobazam)
- ক্লোরাজিপেট (Clorazepate)
- ফ্লুরাজেপাম (Flurazepam)
- এস্তাজোলাম (Estazolam)
- মেদাজেপাম (Medazepam)
- প্রাজিপাম (Prazepam)
- পিনাজেপাম (Pinazepam)
- হ্যামাজেপাম (Halazepam)
- ক্যামাজেপাম (Camazepam)
- টেট্রিজেপাম (Tetrazepam)
- লোফ্লাজেপেট (Ethyl loflazepate)
- ব্রোটিজোলাম (Brotizolam)
- ক্লথিয়াজেপাম (Clotiazepam)
- ক্লোক্সাজোলাম (Cloxazolam)
- ডেলোরাজিপাম (Delorazepam)
- ফ্লুদিয়াজেপাম (Fludiazepam)
- হ্যালোক্সাজোলাম (Haloxazolam)
- কিটাজোলাম (Ketazolam)
- লোপ্রাজোলাম (Loprazolam)
- লরমেটাজেপাম (Lormetazepam)
- নিমেটাজেপাম (Nimetazepam)
- নরডাজেপাম (Nordazepam)
- অক্সাজোলাম (Oxazolam)
- ফেনাজেপাম (Phenazepam)
- বার্বিচুরেটস ও অন্যান্য অ্যান্টিকনভালস্যান্টস:
- ফেনোবার্বিটাল (Phenobarbital): ৫-ইথাইল-৫-ফিনাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- বার্বিটাল (Barbital): ৫,৫-ডাইইথাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- মিথাইলফেনোবার্বিটাল (Methylphenobarbital): ৫-ইথাইল-১-মিথাইল-৫-ফিনাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- অ্যালোবার্বিটাল (Allobarbital): ৫,৫-ডাইঅ্যালাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- বিউটোবার্বিটাল (Butobarbital): ৫-বিউটাইল-৫-ইথাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- ভিনাইলবিটাল (Vinylbital): ৫-(১-মিথাইলবিউটাইল)-৫-ভিনাইলবার্বিচুরিক অ্যাসিড।
- নন-বেঞ্জোডায়াজেপাইন সিডেটিভ ও হিপনোটিকস:
- জোলপিডেম (Zolpidem): ইমিডাজোপাইরিডিন স্লিপিং এইড।
- মেপ্রোবামেট (Meprobamate): ২-মিথাইল-২-প্রোপাইল-১,৩-প্রোপেনডাইঅল ডাইকার্বামেট।
- এথক্লোরভিনল (Ethchlorvynol): ১-ক্লোরো-৩-ইথাইলপেন্ট-১-ইন-৪-অল।
- এথিনামেট (Ethinamate): ১-ইথিনাইলসাইক্লোহেক্সানল কার্বামেট।
- মিথাইপ্রাইলোন (Methyprylon): ৩,৩-ডাইইথাইল-৫-মিথাইলপাইপারিডিন-২,৪-ডায়ন।
- জিএইচবি বা সোডিয়াম অক্সিবেট (GHB / Gamma-hydroxybutyrate): গামা-হাইড্রোক্সিবিউটাইরিক অ্যাসিড (ডেট-রেপ ও নারকোলেপ্সি ড্রাগ)।
- মৃদু সাইকোস্টিমুলেন্ট ও ক্ষুধা নিবৃত্তিকারক:
- অ্যাম্ফেপ্রামোন (Amfepramone): ২-(ডাইইথাইলঅ্যামিনো)প্রোপিওফেনন।
- ফেনটারমিন (Phentermine): আলফা,আলফা-ডাইমিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- ম্যাজিনডল (Mazindol): ৫-(৪-ক্লোরোফিনাইল)-২,৫-ডাইডাইহাইড্রো-৩এইচ-ইমিডাজো আইসোইনডোল-৫-অল।
- মেফেনোরেক্স (Mefenorex): এন-(৩-ক্লোরোপ্রোপাইল)-আলফা-মিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- ফেনক্যামফামিন (Fencamfamin): এন-ইথাইল-৩-ফিনাইলবাইসাইক্লো হেপ্টান-২-অ্যামাইন।
- ফেনপ্রোপোরেক্স (Fenproporex): (±)-৩-[(আলফা-মিথাইলফেনিথাইল)অ্যামিনো]প্রোপায়োনাইট্রাইল।
- পেনড্রাইমেট্রেজিন (Phendimetrazine): (+)-(২এস,৩এস)-৩,৪-ডাইমিথাইল-২-ফিনাইলমরফোলিন।
- পিপরাড্রল (Pipradrol): ১,১-ডাইফিনাইল-১-(২-পিপারিডিল)মিথানল।
- পাইরোভ্যালেরোন (Pyrovalerone): ৪-মিথাইল-বিটা-পাইরোলিডিনোভ্যালেরোফেনন।
- স্পা বা লেফেফামিন (SPA / Lefetamine): (-)-এন,এন-ডাইমিথাইল-১,২-ডাইফিনাইলইথাইলামাইন।
- বেনজফেটামিন (Benzfetamine): (+)-এন-বেনজিল-এন,আলফা-ডাইমিথাইলফেনিথাইলামাইন।
- মেসোকার্ব (Mesocarb): ৩-(আলফা-মিথাইলফেনিথাইল)-এন-(ফিনাইলকার্বামোয়িল)সিডনোন ইমাইন।
১৯৮৮ সালের কনভেনশন: প্রিকারসার ও প্রক্রিয়াকরণ রাসায়নিকের সারণি
মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে সবচেয়ে আধুনিক ও কৌশলী রূপান্তরটি ঘটে যখন জাতিসংঘ অনুধাবন করে যে কেবল উৎপাদিত চূড়ান্ত ড্রাগ আটক করে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক মাদক তৈরি করতে ল্যাবরেটরিতে কিছু নির্দিষ্ট বৈধ বাণিজ্যিক রাসায়নিক এবং দ্রাবকের প্রয়োজন হয়। এই কাঁচামালগুলোকে বলা হয় প্রিকারসার কেমিক্যালস (precursor chemicals)। এই কাঁচামালের আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয় মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক পদার্থের অবৈধ পাচার বিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশন (UN Convention Against Illicit Traffic in Narcotic Drugs and Psychotropic Substances, 1988)।
এই ১৯৮৮ সালের সনদে পূর্বের মতো ‘তফসিল’ শব্দটি ব্যবহার না করে ব্যবহার করা হয়েছে সারণি (Table) পরিভাষাটি। এতে দুটি সুনির্দিষ্ট সারণি রয়েছে: সারণি এক এবং সারণি দুই। কোন রাসায়নিকটি ড্রাগ তৈরির জন্য কতটা সরাসরি অপরিহার্য এবং সাধারণ শিল্প-কারখানায় তার বৈধ ব্যবহারের পরিধি কতটা – তার ওপর ভিত্তি করে এই দুই সারণির বিভাজন নির্ধারিত হয়েছে। নিচে এই রাসায়নিকগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১৯৮৮ কনভেনশনের সারণি এক: প্রত্যক্ষ মূল কাঁচামাল ও রূপান্তরকারী রাসায়নিক (Table I)
সারণি এক-এ এমন সমস্ত রাসায়নিক উপাদানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো মূলত কোনো চূড়ান্ত মাদক অণুর সরাসরি পূর্বসূরি। অর্থাৎ এই রাসায়নিকগুলোর আণবিক কাঠামোয় সামান্য রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়েই সরাসরি অবৈধ মাদকটি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়। এই রাসায়নিকগুলোর বৈধ শিল্প ব্যবহার থাকলেও অপরাধ জগতে এদের সংবেদনশীলতা ও অপরিহার্যতা অত্যন্ত বেশি।
এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে সর্দি ও কাশির ওষুধে ব্যবহৃত দুটি সাধারণ উপাদান – এফিড্রিন (ephedrine) এবং সিউডোএফিড্রিন (pseudoephedrine)। এই দুটি রাসায়নিক হলো আধুনিক মেথাম্ফেটামিন এবং ক্রিস্টাল মেথ তৈরির প্রধানতম কাঁচামাল। অ্যাম্ফেটামিন তৈরির কেন্দ্রীয় উপাদান ফিনাইল-২-প্রোপানোন বা পি-টু-পি (1-phenyl-2-propanone / P2P) এবং এর বিকল্প বিএমকে (BMK) এই সারণির অন্তর্ভুক্ত। কাঁচা মরফিন থেকে ডাইঅ্যাসিটাইলেশন প্রক্রিয়ায় হেরোইন তৈরি করতে যে অম্লীয় তরলটি অপরিহার্য, সেই অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড (acetic anhydride) এই স্তরের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রিত উপাদান। কোকা পাতা থেকে নিষ্কাশিত পেস্টকে জারিত করে স্ফটিক কোকেনে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত তীব্র জারক পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (potassium permanganate) এই সারণিতে স্থান পেয়েছে। এছাড়া এমডিএমএ বা এক্সট্যাসি তৈরির কাঁচামাল আইসোস্যাফরোল (isosafrole), স্যাফরোল (safrole) এবং পিপারোনাল (piperonal); এবং লাইসার্জিক অ্যাসিডের পূর্বসূরি এরগোটামিন (ergotamine) ও এরগোমেট্রিন (ergometrine) সারণি এক-এর আওতাধীন। অতি সম্প্রতি ফেন্টানিল তৈরির কাঁচামাল এন-ফেনিথাইল-৪-পিপারিডোন বা এনপিপিপি (NPP / 4-ANPP)-কেও এই সর্বোচ্চ নজরদারির সারণিতে যুক্ত করা হয়েছে।
সারণি এক-এর অন্তর্ভুক্ত রাসায়নিকগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর প্রাক-রপ্তানি বিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থা (Pre-Export Notification – PEN) প্রয়োগ করা হয়। এর অধীনে কোনো দেশ থেকে যদি এই রাসায়নিকগুলোর একটি ড্রামও রপ্তানি হতে হয়, তবে রপ্তানিকারক দেশকে অনলাইনের মাধ্যমে আমদানিকারক দেশের সরকারের কাছে চালানের সত্যতা ও বৈধ ক্রেতার পরিচয় যাচাই করতে হয়। আমদানিকারক দেশ আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন না দেওয়া পর্যন্ত বন্দর থেকে কোনো জাহাজ ছাড়পত্র পায় না।
সারণি এক: প্রত্যক্ষ ড্রাগ প্রিকারসার (Table I)
- এফিড্রিন (Ephedrine): মেথাম্ফেটামিন তৈরির প্রধান কাঁচামাল।
- সিউডোএফিড্রিন (Pseudoephedrine): মেথাম্ফেটামিন ও ক্রিস্টাল মেথ তৈরির ওটিসি সর্দি-কাশির উপাদান।
- নরএফিড্রিন (Norephedrine): অ্যাম্ফেটামিন তৈরির কাঁচামাল।
- ১-ফিনাইল-২-প্রোপানোন বা পি-টু-পি / বিএমকে (1-Phenyl-2-propanone / P2P / BMK): অ্যাম্ফেটামিন ও মেথাম্ফেটামিনের সরাসরি সিন্থেটিক ভিত্তি।
- অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড (Acetic Anhydride): মরফিন থেকে হেরোইন তৈরির বাধ্যতামূলক অ্যাসিটাইলেশন কেমিক্যাল।
- পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (Potassium Permanganate): কোকেন পেস্ট পরিশোধনের জন্য জারক পদার্থ।
- এরগোটামিন (Ergotamine): এলএসডি তৈরির প্রাথমিক ক্ষারক।
- এরগোমেট্রিন (Ergometrine): এলএসডি তৈরির দ্বিতীয় ক্ষারক।
- লাইসার্জিক অ্যাসিড (Lysergic Acid): এলএসডির সরাসরি আণবিক কাঠামো।
- আইসোস্যাফরোল (Isosafrole): এমডিএমএ ও এমডিএ তৈরির মধ্যবর্তী যৌগ।
- স্যাফরোল (Safrole): স্যাসাফ্রাস তেলের প্রধান উপাদান; এমডিএমএ-র প্রধান কাঁচামাল।
- পিপারোনাল বা হেলিওট্রপিন (Piperonal / Heliotropin): এমডিএমএ ও এক্সট্যাসি সংশ্লেষণের প্রিকারসার।
- ৩,৪-এমডিপি-২-পি (3,4-MDP-2-P): ৩,৪-মিথাইলিনডাইঅক্সিফিনাইল-২-প্রোপানোন; এমডিএমএ-র সরাসরি পূর্বসূরি।
- এন-অ্যাসিটাইলঅ্যানথ্রানিলিক অ্যাসিড (N-Acetylanthranilic Acid): মেথাকুয়ালোন ড্রাগের মূল পূর্বসূরি।
- এনপিপি (NPP): এন-ফেনিথাইল-৪-পিপারিডোন; ফেন্টানিল তৈরির প্রধান উপাদান।
- ৪-এএনপিপি (4-ANPP): ৪-অ্যানিলিনো-এন-ফেনিথাইলপিপারিডিন; ফেন্টানিল তৈরির সরাসরি পূর্বসূরি।
- এপিএএএন (APAAN): আলফা-ফিনাইলঅ্যাসিটোঅ্যাসিটোনাইট্রাইল; ডিজাইনার পি-টু-পি তৈরির উপাদান।
- এপিএএ (APAA): আলফা-ফিনাইলঅ্যাসিটোঅ্যাসিটামাইড; মেথাম্ফেটামিনের বিকল্প প্রিকারসার।
- মাপা বা এমএপিএ (MAPA): মিথাইল আলফা-ফিনাইলঅ্যাসিটোঅ্যাসিটেট।
- পিএমকে মিথাইল গ্লাইসিডেট (PMK Methyl Glycidate): এমডিএমএ তৈরির বিকল্প ডিজাইনার প্রিকারসার।
- বিএমকে মিথাইল গ্লাইসিডেট (BMK Methyl Glycidate): পি-টু-পি তৈরির ডিজাইনার এস্টার।
- ১-বক-৪-এপি (1-boc-4-AP): ফেন্টানিল তৈরির নবীনতম নিয়ন্ত্রিত ডিজাইনার কেমিক্যাল।
১৯৮৮ কনভেনশনের সারণি দুই: সাধারণ শিল্প দ্রাবক ও বিকারক এসিড (Table II)
সারণি দুই-এ অন্তর্ভুক্ত রাসায়নিকগুলো সরাসরি ড্রাগের আণবিক অংশে রূপান্তরিত হয় না; বরং মাদক নিষ্কাশন, পরিশোধন, ফিল্টারিং এবং দ্রবীভূত করার কাজে শিল্প দ্রাবক বা রিএজেন্ট অ্যাসিড হিসেবে কাজ করে। এই রাসায়নিকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো – বিশ্বের বৈধ রাসায়নিক, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও পেইন্ট শিল্পে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টন পরিমাণে এই উপাদানগুলো ব্যবহৃত হয়। ফলে এদের ওপর সারণি এক-এর মতো কঠোর কোটা বা চালান-ভিত্তিক পূর্ব-অনুমোদন চাপানো হলে তা বৈশ্বিক বৈধ বাণিজ্যকে স্থবির করে দেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই সারণির প্রধান দ্রাবক উপাদানগুলো হলো অত্যন্ত উদ্বায়ী জৈব তরল – যেমন রঙ বা পেইন্ট শিল্পে ব্যবহৃত অ্যাসিটোন (acetone) এবং ইথাইল ইথার (ethyl ether), যা কোকেন ও হেরোইন স্ফটিকীকরণে বেআইনি ল্যাবরেটরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। হাইড্রোকার্বন দ্রাবক টলুইন (toluene) এবং মিথাইল ইথাইল কিটোন (methyl ethyl ketone – MEK) এই সারণির অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া রাসায়নিক লবণ তৈরির কাজে ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী অজৈব অ্যাসিড যেমন সালফিউরিক অ্যাসিড (sulphuric acid) এবং হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (hydrochloric acid) এই স্তরে অন্তর্ভুক্ত; কারণ অধিকাংশ মাদককে পাচারের সুবিধার্থে পানিতে দ্রবণীয় লবণে রূপান্তর করতে এই অ্যাসিড দুটি অপরিহার্য।
আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী এই রাসায়নিকগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোকে এমন অভ্যন্তরীণ নজরদারি বজায় রাখতে হয় যাতে কোনো সন্দেহজনক বাল্ক কেনাবেচা বা অস্বাভাবিক নগদ লেনদেন শনাক্ত করা যায়। কোনো অনুমোদিত পেইন্ট কারখানার নামে যদি হঠাৎ করে হাজার হাজার লিটার অ্যাসিটোন বা ইথার কেনা হয় এবং সেই কারখানার উৎপাদন সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে অবিলম্বে জাতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রিপোর্ট করতে হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এই রাসায়নিকগুলোর কোনো সার্বজনীন কোটা না থাকলেও এদের অভ্যন্তরীণ চলাচল ও পাইকারি বিতরণের হিসাব সংরক্ষণ করা প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব।
সারণি দুই: শিল্প দ্রাবক ও বিকারক অ্যাসিড (Table II)
- অ্যাসিটোন (Acetone): কোকেন ও হেরোইন বিশুদ্ধকরণ এবং ক্রিস্টালাইজেশনের প্রধান দ্রাবক।
- ইথাইল ইথার (Ethyl Ether): কোকেন পেস্ট থেকে ফ্রি-বেস নিষ্কাশনের অপরিহার্য জৈব দ্রাবক।
- মিথাইল ইথাইল কিটোন বা এমইকে (Methyl Ethyl Ketone – MEK): কোকেন রিফাইনারিতে ব্যবহৃত দ্রাবক।
- টলিউইন (Toluene): মিথাইলবেনজিন; কৃত্রিম মাদক ল্যাবরেটরির নিষ্কাশন দ্রাবক।
- সালফিউরিক অ্যাসিড (Sulphuric Acid): ওপিওয়েড ও কোকেন সালফেট সল্ট তৈরির অ্যাসিড।
- হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (Hydrochloric Acid): কোকেন হাইড্রোক্লোরাইড ও হেরোইন লবণ তৈরির অম্লীয় উপাদান।
- পাইপিরিডিন (Piperidine): হেক্সাহাইড্রোআইরিডিন; ফেনসাইক্লিডিন (পিসিপি) তৈরির কেন্দ্রীয় উপাদান।
- অ্যানথ্রানিলিক অ্যাসিড (Anthranilic Acid): ২-অ্যামিনোবেনজয়িক অ্যাসিড; মেথাকুয়ালোন তৈরির ভিত্তি।
- ফিনাইলঅ্যাসিটিক অ্যাসিড (Phenylacetic Acid): পি-টু-পি ও অ্যাম্ফেটামিন তৈরির কাঁচামাল।
সহজে মনে রাখার তুলনামূলক ছক ও স্মৃতিসহায়ক কৌশল
আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোর এই বিশাল আইনি গোলকধাঁধাকে সহজে মনে রাখার জন্য গবেষক ও অপরাধবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা একটি চমৎকার তাত্ত্বিক বৈপরীত্যের নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন। নিচে এই তুলনামূলক পার্থক্যগুলো পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করা হলো:
প্রথমত, সনদের মূল দর্শনের বৈপরীত্য লক্ষ্য করুন। ১৯৬১ সালের কনভেনশন তৈরি হয়েছিল মূলত ‘মাটির ফসল’ বা কৃষিজাত আফিম ও কোকা এবং তাদের প্রাকৃতিক উপজাতকে কেন্দ্র করে। ফলে সেখানে উদ্ভিজ্জ কাঁচামালের ওপর আক্রমণই প্রধান ছিল। অন্যদিকে ১৯৭১ সালের কনভেনশন তৈরি হয়েছে ‘কারখানার ফসল’ বা পরীক্ষাগারে তৈরি সিন্থেটিক সাইকোট্রপিক অণুকে কেন্দ্র করে। আর ১৯৮৮ সালের কনভেনশন কোনো ড্রাগের নয়, বরং ড্রাগ তৈরির ‘পূর্ববর্তী কেমিক্যালের’ সাপ্লাই চেইনকে লক্ষ্যবস্তু করে।
দ্বিতীয়ত, সংখ্যাক্রমের প্যারাডক্স বা উল্টো যুক্তির নিয়মটি মনে রাখা সবচেয়ে জরুরি। ১৯৬১ সালের কনভেনশনে তফসিল এক থেকে তফসিল চার-এর দিকে যাওয়ার অর্থ হলো আপনি সাধারণ নিয়ন্ত্রণ থেকে চরম নিষেধাজ্ঞার দিকে যাচ্ছেন (যেখানে তফসিল চার হলো সবচেয়ে নিষিদ্ধ)। কিন্তু ১৯৭১ সালের কনভেনশনে এটি ঠিক বিপরীত! ১৯৭১ সালের কনভেনশনে এক নম্বর তফসিলটিই হলো সবচেয়ে কঠোর এবং সেখানে কোনো চিকিৎসাগত মূল্য নেই এমন ড্রাগ রাখা হয়েছে (যেমন এলএসডি ও এমডিএমএ)। এরপর যত সংখ্যা বাড়বে – দুই, তিন হয়ে চারের দিকে যাবে – তত নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি কমবে এবং সাধারণ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঘুমের ওষুধ বা ট্রাঙ্কুলাইজার আসবে (যেমন ডায়াজেপাম বা আলপ্রাজোলাম)। সংক্ষেপে মনে রাখার সূত্র: ১৯৬১-তে ‘চার’ সবচেয়ে মারাত্মক, আর ১৯৭১-এ ‘এক’ সবচেয়ে মারাত্মক।
তৃতীয়ত, ১৯৮৮ সালের সারণি মনে রাখার সহজ উপায় হলো ‘উপাদান বনাম মাধ্যম’ নীতি। সারণি এক-এর কেমিক্যালগুলো মূলত ড্রাগের দেহের সাথে সরাসরি মিশে গিয়ে নিজেই ড্রাগের অঙ্গ হয়ে যায় (যেমন এফিড্রিন সরাসরি রূপান্তরিত হয় মেথাম্ফেটামিনে)। পক্ষান্তরে সারণি দুই-এর কেমিক্যালগুলো কেবল ধোয়া-মোছা বা দ্রবীভূত করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিন্তু নিজে ড্রাগের ভেতরে থাকে না (যেমন অ্যাসিড, অ্যাসিটোন বা ইথার)।
চতুর্থত, ফার্মাকোলজিক্যাল শ্রেণির সাথে আন্তর্জাতিক তফসিলের একটি প্রাকৃতিক মিল রয়েছে। আপনি যদি কোনো যৌগের ফার্মাকোলজিক্যাল চরিত্র জানেন, তবে খুব সহজেই তার আন্তর্জাতিক তফসিল অনুমান করতে পারবেন। সমস্ত শক্তিশালী ওপিওয়েড বা ব্যথানাশক (মরফিন, ফেন্টানিল, মেথাডন) প্রায় নিশ্চিতভাবেই ১৯৬১-র তফসিল এক-এ থাকবে। সমস্ত ক্লাসিক্যাল হ্যালুসিনোজেন (এলএসডি, সাইলোসাইবিন, ডিএমটি, মেসক্যালিন) ১৯৭১-এর তফসিল এক-এ থাকবে। সমস্ত শক্তিশালী উত্তেজক বা এডিএইচডি ড্রাগ (অ্যাম্ফেটামিন, রিটালিন) ১৯৭১-এর তফসিল দুই-এ থাকবে। সমস্ত বার্বিচুরেট জাতীয় কড়া ঘুমের ওষুধ ১৯৭১-এর তফসিল তিন-এ থাকবে। এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত সমস্ত বেঞ্জোডায়াজেপাইন জাতীয় প্রশান্তিদায়ক ট্যাবলেট (ভ্যালিয়াম, জ্যানাক্স) ১৯৭১-এর তফসিল চার-এ থাকবে।
এই বিজ্ঞানসম্মত ও কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে আন্তর্জাতিক আইনের জটিল ধারাগুলোকে মুখস্থ করার প্রয়োজন হয় না; যৌগের আণবিক চরিত্র এবং সনদের নীতিগত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করলেই পুরো আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট অবস্থানটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এক নজরে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পদার্থের পূর্ণ শ্রেণিবিন্যাস
তিন কনভেনশনের ৩৭৮টি মূল এন্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট পরিশিষ্ট
যাচাইয়ের নির্ধারিত তারিখ ২২ অক্টোবর ২০২৬
এই অধ্যয়ন সারণিতে তিনটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বর্তমান নামভিত্তিক মূল এন্ট্রিগুলো বিভাগ, রাসায়নিক বা ওষুধের পরিবার এবং তফসিল অনুসারে সাজানো হয়েছে। সব চিকিৎসাগত ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়; ওষুধের পাশাপাশি উদ্ভিজ্জ উপাদান, রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান ও সহায়ক রাসায়নিকও অন্তর্ভুক্ত।
| কনভেনশন | মূল এন্ট্রি | তালিকার পরিচয় |
|---|---|---|
| ১৯৬১ | ১৫১ | হলুদ তালিকা |
| ১৯৭১ | ১৭৬ | সবুজ তালিকা |
| ১৯৮৮ | ৫১ | লাল তালিকা |
| মোট | ৩৭৮ | দ্বৈত সদস্যপদ একবার গণনা |
তালিকার পরিধি ও পড়ার নিয়ম
এই সারণিতে বর্তমান সরকারি তালিকার কোনো নামভিত্তিক মূল এন্ট্রি বাদ দেওয়া হয়নি। একই পদার্থ প্রথম ও চতুর্থ তফসিলে থাকলে এক সারিতে দুই সদস্যপদ দেখানো হয়েছে। একটি সরকারি এন্ট্রি কখনো একাধিক আইসোমার বা ডেরিভেটিভের গোষ্ঠীকে বোঝায়; তাই ৩৭৮ সংখ্যাটি সম্ভাব্য সব পৃথক অণু, লবণ বা বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের সংখ্যা নয়।
সব পদার্থ চিকিৎসার ওষুধ নয় এবং সব চিকিৎসাগত ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়। এখানে সক্রিয় পদার্থ বা আইনগত গোষ্ঠী গণনা করা হয়েছে। একই উপাদানের হাজারো ব্র্যান্ডকে আলাদা পদার্থ হিসেবে পুনরাবৃত্তি করা হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে তালিকা থেকে অপসারিত পদার্থের পৃথক ইতিহাস এই বর্তমান তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়।
আইনি শ্রেণিবিন্যাস হলো কনভেনশন ও তফসিল। বাংলা বিভাগ ও পরিবার শেখার সুবিধায় রাসায়নিক গঠন ও প্রধান কার্যগত পরিচয় মিলিয়ে করা শিক্ষামূলক শ্রেণিবিন্যাস; এটি জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক উপবিভাগ নয়। কোনো পরিবারের সব সদস্যের প্রভাব, চিকিৎসাগত ব্যবহার বা ক্ষতি এক রকম নয়। মূল নামের বানান অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকারি নাম বন্ধনীর মধ্যে রাখা হয়েছে; পরিচিত কিছু নামের বাংলা উচ্চারণও যুক্ত আছে।
তফসিল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ক্যাথিনোন ১৯৭১ সালের প্রথম তফসিলে এবং মেথাকোয়ালোন দ্বিতীয় তফসিলে। এমডিএমবি-ফুবিনাকার সংযোজন কার্যকর হবে ২৫ নভেম্বর ২০২৬; তাই সেটি মূল ৩৭৮টি কার্যকর এন্ট্রির মধ্যে গণনা করা হয়নি এবং আলাদা সারণিতে আছে।
কনভেনশন ও তফসিলের পার্থক্য
১৯৬১ সালের চতুর্থ তফসিল প্রথম তফসিলের নির্বাচিত পদার্থের ওপর অতিরিক্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ বোঝায়। তৃতীয় তফসিল নির্দিষ্ট শর্তপূরণকারী প্রস্তুতির ছাড়ের তালিকা।
১৯৭১ সালের প্রথম তফসিলে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা; দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থে ক্রমান্বয়ে তুলনামূলক কম কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ১৯৮৮ সালের ক্ষেত্রে ‘তফসিল’ নয়, প্রথম ও দ্বিতীয় ‘সারণি’।
| কনভেনশন | মূল বিষয় | তালিকা |
|---|---|---|
| ১৯৬১ | আফিম, ওপিওয়েড, কোকা-কোকেন ও ক্যানাবিস | হলুদ |
| ১৯৭১ | সাইকোট্রপিক পদার্থ | সবুজ |
| ১৯৮৮ | পাচার ও প্রিকার্সর; এখানে রাসায়নিক তালিকা | লাল |
বিভাগ অনুসারে এন্ট্রির সংখ্যা
| বিভাগ | এন্ট্রি |
|---|---|
| অন্যান্য মনঃসক্রিয় পদার্থ | ২ |
| আফিম ও কাঁচামাল | ২ |
| আফিমজাত অ্যালকালয়েড | ২ |
| উত্তেজক পদার্থ | ৪৮ |
| এমপ্যাথোজেন ও সেরোটোনার্জিক উত্তেজক | ৫ |
| ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ | ১৪০ |
| কোকা-সম্পর্কিত পদার্থ | ৩ |
| ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস | ২৮ |
| ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ | ৮ |
| প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ | ৬৪ |
| প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক | ৫১ |
| রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান | ৫ |
| সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ | ২০ |
১৯৬১ সালের কনভেনশনের পূর্ণ তালিকা
মোট ১৫১টি মূল এন্ট্রি। এখানে স্তর বলতে তফসিল বোঝানো হয়েছে। উৎসের পরিচিতি ও মূল তালিকার পৃষ্ঠা শেষ কলামে দেওয়া আছে।
| ক্রম | পদার্থ ও বিশেষ টীকা | বিভাগ ও পরিবার | স্তর | উৎসের পরিচিতি |
|---|---|---|---|---|
| ১ | পপি স্ট্র-এর কনসেনট্রেট (CONCENTRATE OF POPPY STRAW) পাঁচ প্রকার কনসেনট্রেট: CPS(M), CPS(T), CPS(O), CPS(C), CPS(N)। এগুলোর পরিসংখ্যানগত অ্যালকালয়েড-ভাঙন আলাদা নতুন ওষুধ নয়। | আফিম ও কাঁচামাল আফিম ও পপি স্ট্র-এর ঘনীভূত উপাদান (Opium/Poppy-straw concentrate) | প্রথম | (NC020) পৃষ্ঠা ৪ |
| ২ | আফিম (OPIUM) | আফিম ও কাঁচামাল আফিম ও পপি স্ট্র-এর ঘনীভূত উপাদান (Opium/Poppy-straw concentrate) | প্রথম | (NO001) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৩ | অরিপাভিন (ORIPAVINE) | আফিমজাত অ্যালকালয়েড থিবেইন ও অরিপাভিন (Thebaine/Oripavine) | প্রথম | (NO010) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৪ | থিবেইন (THEBAINE) | আফিমজাত অ্যালকালয়েড থিবেইন ও অরিপাভিন (Thebaine/Oripavine) | প্রথম | (NT002) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৫ | (BEZITRAMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (NB007) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৬ | (BRORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (NB013) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৭ | (DIAMPROMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (ND005) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৮ | (DIMENOXADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (ND011) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯ | (DIOXAPHETYL BUTYRATE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (ND015) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১০ | (PHENAMPROMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (NP019) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১১ | (PIRITRAMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (NP013) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১২ | (PROHEPTAZINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (NP014) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৩ | (PROPIRAM) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | দ্বিতীয় | (NP016) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১৪ | (TILIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ অন্যান্য গঠনের ওপিওয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Other opioid-related structures) | প্রথম | (NT003) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৫ | (DEXTROPROPOXYPHENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ডাইফেনাইলপ্রোপাইলঅ্যামিন পরিবার (Diphenylpropylamine-related) | দ্বিতীয় | (ND004) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১৬ | (DIETHYLTHIAMBUTENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ থিয়ামবিউটিন পরিবার (Thiambutene-related) | প্রথম | (ND006) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৭ | (DIMETHYLTHIAMBUTENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ থিয়ামবিউটিন পরিবার (Thiambutene-related) | প্রথম | (ND014) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৮ | (ETHYLMETHYLTHIAMBUTENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ থিয়ামবিউটিন পরিবার (Thiambutene-related) | প্রথম | (NE004) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৯ | (2-METHYL-AP-237) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ পাইপেরাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Piperazine-related) | প্রথম | (NB014) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২০ | (MT-45) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ পাইপেরাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Piperazine-related) | প্রথম | (NM045) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২১ | (ALLYLPRODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NA007) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২২ | (ALPHAMEPRODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NA009) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২৩ | (ALPHAPRODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NA011) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২৪ | (ANILERIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NA012) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২৫ | (BENZETHIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NB001) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২৬ | (BETAMEPRODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NB004) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২৭ | (BETAPRODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NB006) পৃষ্ঠা ৩ |
| ২৮ | (DIFENOXIN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (ND007) পৃষ্ঠা ৪ |
| ২৯ | (DIPHENOXYLATE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (ND016) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৩০ | (ETOXERIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NE008) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩১ | (FURETHIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NF002) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩২ | (HYDROXYPETHIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NH005) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩৩ | (KETOBEMIDONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NK001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩৪ | (MORPHERIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NM008) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩৫ | (MPPP) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NM018) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৩৬ | (PEPAP) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NP026) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৩৭ | পেথিডিন (PETHIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NP001) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৩৮ | (PHENOPERIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NP010) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৩৯ | (PIMINODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NP012) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৪০ | (PROPERIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NP015) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৪১ | (TRIMEPERIDINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেনাইলপাইপেরিডিন পরিবার (Phenylpiperidine-related) | প্রথম | (NT004) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৪২ | (3-METHYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NM017) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৪৩ | (3-METHYLTHIOFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NM024) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৪৪ | (4-FLUOROISOBUTYRFENTANYL (4-FIBF, pFIBF)) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NB012) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৪৫ | (ACETYL-ALPHA-METHYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NA015) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৪৬ | (ACETYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NA019) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৪৭ | (ACRYLOYLFENTANYL (ACRYLFENTANYL)) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NA020) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৪৮ | আলফেন্টানিল (ALFENTANIL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NA014) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৪৯ | (ALPHA-METHYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NA016) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৫০ | (ALPHA-METHYLTHIOFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NA017) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৫১ | (BETA-HYDROXY-3-METHYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NB010) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৫২ | (BETA-HYDROXYFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NB009) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৫৩ | (BUTYRFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NB011) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৫৪ | কারফেন্টানিল (CARFENTANIL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NC090) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৫৫ | (CROTONYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NC092) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৫৬ | (CYCLOPROPYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NC091) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৫৭ | ফেন্টানিল (FENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NF001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৫৮ | (FURANYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NF004) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৫৯ | (METHOXYACETYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NM044) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৬০ | (OCFENTANIL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NO011) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৬১ | (ORTHOFLUOROFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NO012) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৬২ | (para-FLUOROFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NF003) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৬৩ | (PARAFLUOROBUTYRYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NP029) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৬৪ | রেমিফেন্টানিল (REMIFENTANIL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NR005) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৬৫ | সুফেন্টানিল (SUFENTANIL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NS001) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৬৬ | (TETRAHYDROFURANYLFENTANYL (THF-F)) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NT006) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৬৭ | (THIOFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NT005) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৬৮ | (VALERYLFENTANYL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ ফেন্টানিল পরিবার (Fentanyl-related) | প্রথম | (NV001) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৬৯ | (AH-7921) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজামাইড পরিবার (Benzamide-related) | প্রথম | (NA018) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৭০ | (U-47700) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজামাইড পরিবার (Benzamide-related) | প্রথম | (NU001) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৭১ | (BUTONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NB015) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৭২ | (CLONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NC002) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৭৩ | (ETAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NE009) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৭৪ | (ETONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NE006) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৭৫ | (ETONITAZEPIPNE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NE011) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৭৬ | (ETONITAZEPYNE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NE010) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৭৭ | আইসোটোনিটাজিন (ISOTONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NI003) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৭৮ | মেটোনিটাজিন (METONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NM026) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৭৯ | (N-DESETHYL ETONITAZENE) ২০২৬ সালের সংযোজন; কার্যকর ২৯ মে ২০২৬। | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NE012) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৮০ | (N-DESETHYL ISOTONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NI004) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৮১ | (N-PYRROLIDINO ISOTONITAZENE) ২০২৬ সালের সংযোজন; কার্যকর ২৯ মে ২০২৬। | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NI005) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৮২ | (N-PYRROLIDINO METONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NM028) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৮৩ | (N-PYRROLIDINO PROTONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NP036) পৃষ্ঠা ৬ |
| ৮৪ | প্রোটোনিটাজিন (PROTONITAZENE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজিমিডাজোল ও নাইটাজিন-সম্পর্কিত পরিবার (Benzimidazole/Nitazene-related) | প্রথম | (NP035) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৮৫ | (METAZOCINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজোমরফান পরিবার (Benzomorphan-related) | প্রথম | (NM001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ৮৬ | (PHENAZOCINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজোমরফান পরিবার (Benzomorphan-related) | প্রথম | (NP008) পৃষ্ঠা ৭ |
| ৮৭ | (ACETORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NA001) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৮৮ | (ACETYLDIHYDROCODEINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NA002) পৃষ্ঠা ৯ |
| ৮৯ | (BENZYLMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NB002) পৃষ্ঠা ৩ |
| ৯০ | কোডিন (CODEINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NC005) পৃষ্ঠা ৯ |
| ৯১ | (CODOXIME) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NC006) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯২ | ডেসোমরফিন (DESOMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (ND002) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯৩ | ডাইহাইড্রোকোডিন (DIHYDROCODEINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (ND008) পৃষ্ঠা ৯ |
| ৯৪ | (DIHYDROETORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (ND025) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯৫ | (DIHYDROMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (ND009) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯৬ | (DROTEBANOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (ND018) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯৭ | (ETHYLMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NE005) পৃষ্ঠা ৯ |
| ৯৮ | ইটরফিন (ETORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NE007) পৃষ্ঠা ৪ |
| ৯৯ | হেরোইন (HEROIN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম ও চতুর্থ | (NH001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০০ | হাইড্রোকোডোন (HYDROCODONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NH002) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০১ | (HYDROMORPHINOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NH003) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০২ | হাইড্রোমরফোন (HYDROMORPHONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NH004) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৩ | (LEVOMETHORPHAN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NL004) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৪ | (LEVOPHENACYLMORPHAN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NL006) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৫ | (LEVORPHANOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NL007) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৬ | (METHYLDESORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM004) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৭ | (METHYLDIHYDROMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM005) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৮ | (METOPON) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM006) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১০৯ | মরফিন (MORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM009) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১১০ | (MORPHINE METHOBROMIDE and other pentavalent nitrogen morphine derivatives) মরফিনের পেন্টাভ্যালেন্ট নাইট্রোজেন ডেরিভেটিভ; মূল তালিকার গোষ্ঠীভুক্ত এন্ট্রি। | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM009METH) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১১১ | (MORPHINE-N-OXIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM012) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১১২ | (MYROPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NM013) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১১৩ | (NICOCODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NN001) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১১৪ | (NICODICODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NN002) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১১৫ | (NICOMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NN003) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১১৬ | (NORCODEINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NN005) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১১৭ | (NORLEVORPHANOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NN006) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১১৮ | (NORMORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NN008) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১১৯ | অক্সিকোডোন (OXYCODONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NO002) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১২০ | অক্সিমরফোন (OXYMORPHONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NO003) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১২১ | (PHENOMORPHAN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NP009) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১২২ | (PHOLCODINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | দ্বিতীয় | (NP011) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১২৩ | (RACEMETHORPHAN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NR001) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১২৪ | (RACEMORPHAN) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NR003) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১২৫ | (THEBACON) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মরফিনান ও মরফিন-থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Morphinan/Morphine-Thebaine-related) | প্রথম | (NT001) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১২৬ | (ACETYLMETHADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NA004) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১২৭ | (ALPHACETYLMETHADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NA008) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১২৮ | (ALPHAMETHADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NA010) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১২৯ | (BETACETYLMETHADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NB003) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১৩০ | (BETAMETHADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NB005) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১৩১ | (DIMEPHEPTANOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (ND012) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৩২ | (DIPIPANONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (ND017) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৩৩ | (ISOMETHADONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NI001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৩৪ | মেথাডোন (METHADONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NM002) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৩৫ | (NORACYMETHADOL) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NN004) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৩৬ | (NORMETHADONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NN007) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৩৭ | (NORPIPANONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NN009) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৩৮ | (PHENADOXONE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মেথাডোন ও ডাইফেনাইলহেপ্টেন-সম্পর্কিত পরিবার (Methadone/Diphenylheptane-related) | প্রথম | (NP005) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৩৯ | (DEXTROMORAMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মোরামাইড পরিবার (Moramide-related) | প্রথম | (ND003) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৪০ | (LEVOMORAMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মোরামাইড পরিবার (Moramide-related) | প্রথম | (NL005) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৪১ | (RACEMORAMIDE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ মোরামাইড পরিবার (Moramide-related) | প্রথম | (NR002) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৪২ | কোকা পাতা (Coca leaf) | কোকা-সম্পর্কিত পদার্থ কোকা পাতা ও ট্রোপেন অ্যালকালয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Coca/Tropane-related) | প্রথম | (NC003) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৪৩ | কোকেন (COCAINE) | কোকা-সম্পর্কিত পদার্থ কোকা পাতা ও ট্রোপেন অ্যালকালয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Coca/Tropane-related) | প্রথম | (NC004) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৪৪ | একগোনিন (ECGONINE) | কোকা-সম্পর্কিত পদার্থ কোকা পাতা ও ট্রোপেন অ্যালকালয়েড-সম্পর্কিত পদার্থ (Coca/Tropane-related) | প্রথম | (NE001) পৃষ্ঠা ৪ |
| ১৪৫ | ক্যানাবিস (CANNABIS) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্যানাবিসের উদ্ভিজ্জ উপাদান (Cannabis plant materials) | প্রথম | (NC001) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১৪৬ | ক্যানাবিস রেজিন, এক্সট্র্যাক্ট ও টিংচার (CANNABIS RESIN, EXTRACTS and TINCTURES) মূল তালিকায় রেজিন, এক্সট্র্যাক্ট ও টিংচার একসঙ্গে মুদ্রিত; এগুলোর কোনোটিই বাদ দেওয়া হয়নি। | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্যানাবিসের উদ্ভিজ্জ উপাদান (Cannabis plant materials) | প্রথম | (NC008) পৃষ্ঠা ৩ |
| ১৪৭ | (METHADONE INTERMEDIATE) | রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান ওপিওয়েড-সম্পর্কিত মধ্যবর্তী রাসায়নিক (Opioid intermediates) | প্রথম | (NM003) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৪৮ | (MORAMIDE INTERMEDIATE) | রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান ওপিওয়েড-সম্পর্কিত মধ্যবর্তী রাসায়নিক (Opioid intermediates) | প্রথম | (NM007) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৪৯ | (PETHIDINE INTERMEDIATE A) | রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান ওপিওয়েড-সম্পর্কিত মধ্যবর্তী রাসায়নিক (Opioid intermediates) | প্রথম | (NP002) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৫০ | (PETHIDINE INTERMEDIATE B) | রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান ওপিওয়েড-সম্পর্কিত মধ্যবর্তী রাসায়নিক (Opioid intermediates) | প্রথম | (NP003) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৫১ | (PETHIDINE INTERMEDIATE C) | রাসায়নিক মধ্যবর্তী উপাদান ওপিওয়েড-সম্পর্কিত মধ্যবর্তী রাসায়নিক (Opioid intermediates) | প্রথম | (NP004) পৃষ্ঠা ৭ |
১৯৭১ সালের কনভেনশনের পূর্ণ তালিকা
মোট ১৭৬টি মূল এন্ট্রি। এখানে স্তর বলতে তফসিল বোঝানো হয়েছে। উৎসের পরিচিতি ও মূল তালিকার পৃষ্ঠা শেষ কলামে দেওয়া আছে।
| ক্রম | পদার্থ ও বিশেষ টীকা | বিভাগ ও পরিবার | স্তর | উৎসের পরিচিতি |
|---|---|---|---|---|
| ১৫২ | অ্যামিনেপটিন (AMINEPTINE) | অন্যান্য মনঃসক্রিয় পদার্থ অ্যামিনেপটিন; ট্রাইসাইক্লিক অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট (Amineptine) | দ্বিতীয় | (PA007) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৫৩ | (ZIPEPROL) | অন্যান্য মনঃসক্রিয় পদার্থ পাইপেরাজিন-গঠনের কাশির ওষুধ (Zipeprol) | দ্বিতীয় | (PZ001) পৃষ্ঠা ৮ |
| ১৫৪ | (FENCAMFAMIN) | উত্তেজক পদার্থ অন্যান্য গঠনের উত্তেজক (Other stimulant structures) | চতুর্থ | (PF004) পৃষ্ঠা ১০ |
| ১৫৫ | (MAZINDOL) | উত্তেজক পদার্থ অন্যান্য গঠনের উত্তেজক (Other stimulant structures) | চতুর্থ | (PM001) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৫৬ | (PEMOLINE) | উত্তেজক পদার্থ অন্যান্য গঠনের উত্তেজক (Other stimulant structures) | চতুর্থ | (PP020) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৫৭ | (4-methylaminorex) | উত্তেজক পদার্থ অ্যামিনোরেক্স পরিবার (Aminorex-related) | প্রথম | (PM017) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৫৮ | (AMINOREX) | উত্তেজক পদার্থ অ্যামিনোরেক্স পরিবার (Aminorex-related) | চতুর্থ | (PA006) পৃষ্ঠা ১০ |
| ১৫৯ | (para-Methyl-4-methylaminorex / 4,4′-DMAR) | উত্তেজক পদার্থ অ্যামিনোরেক্স পরিবার (Aminorex-related) | দ্বিতীয় | (PP023) পৃষ্ঠা ৮ |
| ১৬০ | (4-fluoroamphetamine, 4-FA) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PF007) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৬১ | অ্যাম্ফেটামিন (AMFETAMINE amphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PA003) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৬২ | (BENZFETAMINE benzphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | চতুর্থ | (PB002) পৃষ্ঠা ১০ |
| ১৬৩ | ডেক্সঅ্যাম্ফেটামিন (DEXAMFETAMINE dexamphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PD002) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৬৪ | (ETILAMFETAMINE N-ethylamphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | চতুর্থ | (PE005) পৃষ্ঠা ১০ |
| ১৬৫ | (FENETYLLINE) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PF005) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৬৬ | (FENPROPOREX) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | চতুর্থ | (PF006) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৬৭ | লেভোঅ্যাম্ফেটামিন (LEVAMFETAMINE levamphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PL006) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৬৮ | (LEVMETAMFETAMINE levomethamphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PL007) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৬৯ | (MEFENOREX) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | চতুর্থ | (PM012) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৭০ | (MESOCARB) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | চতুর্থ | (PM018) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৭১ | মেথাম্ফেটামিন (METAMFETAMINE methamphetamine) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PM005) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৭২ | (METAMFETAMINE RACEMATE) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | দ্বিতীয় | (PM015) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৭৩ | (PHENTERMINE) | উত্তেজক পদার্থ অ্যাম্ফেটামিন ও সংশ্লিষ্ট পরিবার (Amphetamine-related) | চতুর্থ | (PP009) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৭৪ | ক্যাথিন (CATHINE (+)-norpseudoephedrine) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিন বা নরসিউডোএফেড্রিন (Cathine/Norpseudoephedrine) | তৃতীয় | (PC009) পৃষ্ঠা ৯ |
| ১৭৫ | (3-chloromethcathinone (3-CMC)) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PC017) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৭৬ | (3-MMC) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PM032) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৭৭ | (4-CMC / 4-chloromethcathinone / clephedrone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PC014) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৭৮ | (4-methylethcathinone / 4-MEC) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PM027) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৭৯ | (alpha-PHP) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PP027) পৃষ্ঠা ৮ |
| ১৮০ | (alpha-PiHP) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PP028) পৃষ্ঠা ৮ |
| ১৮১ | (alpha-PVP) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PP022) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৮২ | (AMFEPRAMONE diethylpropion) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | চতুর্থ | (PA001) পৃষ্ঠা ১০ |
| ১৮৩ | ক্যাথিনোন (CATHINONE) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | প্রথম | (PC010) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৮৪ | (dipentylone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PD014) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৮৫ | (ethylone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PE007) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৮৬ | (eutylone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PE010) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৮৭ | (MDPV / 3,4-methylenedioxypyrovalerone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PM021) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৮৮ | (mephedrone, 4-methylmethcathinone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PM022) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৮৯ | (methcathinone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | প্রথম | (PM019) পৃষ্ঠা ৫ |
| ১৯০ | (methylone, beta-keto-MDMA) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PM023) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৯১ | (N-ethylhexedrone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PN011) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৯২ | (N-ethylnorpentylone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PN010) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৯৩ | (pentedrone) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | দ্বিতীয় | (PP025) পৃষ্ঠা ৮ |
| ১৯৪ | (PYROVALERONE) | উত্তেজক পদার্থ ক্যাথিনোন পরিবার (Cathinone-related) | চতুর্থ | (PP019) পৃষ্ঠা ১১ |
| ১৯৫ | (methiopropamine, MPA) | উত্তেজক পদার্থ থিয়োফিন-সম্পর্কিত পদার্থ (Thiophene-related) | দ্বিতীয় | (PM026) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৯৬ | (N-benzylpiperazine / benzylpiperazine / BZP) | উত্তেজক পদার্থ পাইপেরাজিন পরিবার (Piperazine-related) | দ্বিতীয় | (PN009) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৯৭ | (ethylphenidate) | উত্তেজক পদার্থ ফেনিডেট ও অন্যান্য পাইপেরিডিন পরিবার (Phenidate/Piperidine-related) | দ্বিতীয় | (PE008) পৃষ্ঠা ৬ |
| ১৯৮ | মিথাইলফেনিডেট (METHYLPHENIDATE) | উত্তেজক পদার্থ ফেনিডেট ও অন্যান্য পাইপেরিডিন পরিবার (Phenidate/Piperidine-related) | দ্বিতীয় | (PM007) পৃষ্ঠা ৭ |
| ১৯৯ | (PIPRADROL) | উত্তেজক পদার্থ ফেনিডেট ও অন্যান্য পাইপেরিডিন পরিবার (Phenidate/Piperidine-related) | চতুর্থ | (PP010) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২০০ | (PHENDIMETRAZINE) | উত্তেজক পদার্থ মরফোলিন পরিবার (Morpholine-related) | চতুর্থ | (PP004) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২০১ | (PHENMETRAZINE) | উত্তেজক পদার্থ মরফোলিন পরিবার (Morpholine-related) | দ্বিতীয় | (PP006) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২০২ | (4-MTA) | এমপ্যাথোজেন ও সেরোটোনার্জিক উত্তেজক অ্যাম্ফেটামিন-সম্পর্কিত পরিবার (Amphetamine-related) | প্রথম | (PM020) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২০৩ | এমডিএমএ (MDMA) | এমপ্যাথোজেন ও সেরোটোনার্জিক উত্তেজক অ্যাম্ফেটামিন-সম্পর্কিত পরিবার (Amphetamine-related) | প্রথম | (PM011) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২০৪ | (N-ethyl MDA, MDEA) | এমপ্যাথোজেন ও সেরোটোনার্জিক উত্তেজক অ্যাম্ফেটামিন-সম্পর্কিত পরিবার (Amphetamine-related) | প্রথম | (PN004) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২০৫ | (N-hydroxy MDA) | এমপ্যাথোজেন ও সেরোটোনার্জিক উত্তেজক অ্যাম্ফেটামিন-সম্পর্কিত পরিবার (Amphetamine-related) | প্রথম | (PN005) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২০৬ | (TENAMFETAMINE MDA) | এমপ্যাথোজেন ও সেরোটোনার্জিক উত্তেজক অ্যাম্ফেটামিন-সম্পর্কিত পরিবার (Amphetamine-related) | প্রথম | (PM014) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২০৭ | বুপ্রেনরফিন (BUPRENORPHINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বুপ্রেনরফিন; থিবেইন-সম্পর্কিত পরিবার (Buprenorphine) | তৃতীয় | (PB006) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২০৮ | পেন্টাজোসিন (PENTAZOCINE) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ বেনজোমরফান পরিবার (Benzomorphan-related) | তৃতীয় | (PP014) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২০৯ | (LEFETAMINE SPA) | ওপিওয়েড ও সংশ্লিষ্ট ডেরিভেটিভ লেফেটামিন; ডাইফেনাইলইথাইলঅ্যামিন পরিবার (Lefetamine) | চতুর্থ | (PL001) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২১০ | (4F-MDMB-BINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PM029) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২১১ | (5F-ADB / 5F-MDMB-PINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PP011) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২১২ | (5F-AMB / 5F-AMB-PINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PA010) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২১৩ | (5F-APINACA / 5F-AKB-48) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PA009) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২১৪ | (5F-MDMB-PICA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PM028) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২১৫ | (5F-PB-22) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PP026) পৃষ্ঠা ৮ |
| ২১৬ | (AB-CHMINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PC011) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২১৭ | (AB-FUBINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PF010) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২১৮ | (AB-PINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PP018) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২১৯ | (ADB-BUTINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PA011) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২০ | (ADB-CHMINACA, MAB-CHMINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PC013) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২১ | (ADB-FUBINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PF009) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২২ | (AM-2201, JWH-2201) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PA008) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২৩ | (CUMYL-4CN-BINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PC012) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২৪ | (CUMYL-PEGACLONE) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PC015) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২৫ | (FUB-AMB / MMB-FUBINACA / AMB-FUBINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PF008) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২২৬ | (JWH-018, AM-678) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PJ001) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২২৭ | (MDMB-4en-PINACA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PM030) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২২৮ | (MDMB-CHMICA) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PM025) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২২৯ | (UR-144) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PU001) পৃষ্ঠা ৮ |
| ২৩০ | (XLR-11) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (Synthetic cannabinoid receptor agonists) | দ্বিতীয় | (PX001) পৃষ্ঠা ৮ |
| ২৩১ | (delta-9-tetrahydrocannabinol (dronabinol) and stereochemical variants) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্ল্যাসিক ক্যানাবিনয়েড ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ (Classical cannabinoid-related) | দ্বিতীয় | (PD010) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২৩২ | (DMHP) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্ল্যাসিক ক্যানাবিনয়েড ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ (Classical cannabinoid-related) | প্রথম | (PD003) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২৩৩ | (HEXAHYDROCANNABINOL / HHC) ২০২৫ সালের সংযোজন; কার্যকর ৬ ডিসেম্বর ২০২৫। | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্ল্যাসিক ক্যানাবিনয়েড ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ (Classical cannabinoid-related) | দ্বিতীয় | (PH003) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৩৪ | (parahexyl) | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্ল্যাসিক ক্যানাবিনয়েড ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ (Classical cannabinoid-related) | প্রথম | (PP001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২৩৫ | (TETRAHYDROCANNABINOL: six listed isomers and stereochemical variants) প্রথম তফসিলের ছয় আইসোমার: delta-6a(10a)-THC; delta-6a(7)-THC; delta-7-THC; delta-8-THC; delta-10-THC; delta-9(11)-THC। প্রতিটির প্রযোজ্য স্টেরিওকেমিক্যাল রূপও অন্তর্ভুক্ত। | ক্যানাবিনয়েড ও ক্যানাবিস ক্ল্যাসিক ক্যানাবিনয়েড ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ (Classical cannabinoid-related) | প্রথম | (PT002) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২৩৬ | (2-fluorodeschloroketamine / 2-FDCK) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | দ্বিতীয় | (PF013) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২৩৭ | (3-Methoxyphencyclidine / 3-MeO-PCP) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | দ্বিতীয় | (PM031) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৩৮ | (ETICYCLIDINE PCE) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | প্রথম | (PP003) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২৩৯ | (methoxetamine, MXE) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | দ্বিতীয় | (PM024) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৪০ | (PHENCYCLIDINE PCP) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | দ্বিতীয় | (PP005) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৪১ | (ROLICYCLIDINE PHP, PCPY) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | প্রথম | (PP007) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২৪২ | (TENOCYCLIDINE TCP) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ অ্যারাইলসাইক্লোহেক্সাইলঅ্যামিন পরিবার (Arylcyclohexylamine-related) | প্রথম | (PT001) পৃষ্ঠা ৫ |
| ২৪৩ | (diphenidine) | ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ ডাইঅ্যারাইলইথাইলঅ্যামিন পরিবার (Diarylethylamine-related) | দ্বিতীয় | (PD012) পৃষ্ঠা ৬ |
| ২৪৪ | (ETHCHLORVYNOL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ অ্যালকোহল-গঠনের প্রশমনকারী (Ethchlorvynol) | চতুর্থ | (PE001) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৪৫ | জোলপিডেম (ZOLPIDEM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ ইমিডাজোপাইরিডিন ঘুমের ওষুধ (Zolpidem) | চতুর্থ | (PZ002) পৃষ্ঠা ১২ |
| ২৪৬ | ক্যারিসোপ্রোডল (CARISOPRODOL) ২০২৫ সালের সংযোজন; কার্যকর ৬ ডিসেম্বর ২০২৫। | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ কার্বামেট পরিবার (Carbamates) | চতুর্থ | (PC018) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৪৭ | (ETHINAMATE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ কার্বামেট পরিবার (Carbamates) | চতুর্থ | (PE002) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৪৮ | মেপ্রোবামেট (MEPROBAMATE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ কার্বামেট পরিবার (Carbamates) | চতুর্থ | (PM003) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৪৯ | মেক্লোকোয়ালোন (MECLOQUALONE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ কুইনাজোলিনোন পরিবার (Quinazolinone-related) | দ্বিতীয় | (PM002) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৫০ | মেথাকোয়ালোন (METHAQUALONE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ কুইনাজোলিনোন পরিবার (Quinazolinone-related) | দ্বিতীয় | (PM006) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৫১ | (gamma-HYDROXYBUTYRIC ACID / GHB) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ গামা-হাইড্রক্সি অ্যাসিড (GHB) | দ্বিতীয় | (PG002) পৃষ্ঠা ৭ |
| ২৫২ | (GLUTETHIMIDE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ গ্লুটারিমাইড পরিবার (Glutarimide-related) | তৃতীয় | (PG001) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২৫৩ | (METHYPRYLON) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ পাইপেরিডিনডায়োন পরিবার (Piperidinedione-related) | চতুর্থ | (PM009) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৫৪ | (ALLOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PA005) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৫৫ | অ্যামোবারবিটাল (AMOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | তৃতীয় | (PA002) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২৫৬ | (BARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PB001) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৫৭ | (BUTALBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | তৃতীয় | (PB004) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২৫৮ | (butobarbital) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PB005) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৫৯ | (CYCLOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | তৃতীয় | (PC001) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২৬০ | (METHYLPHENOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PM008) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৬১ | পেন্টোবারবিটাল (PENTOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | তৃতীয় | (PP002) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২৬২ | ফেনোবারবিটাল (PHENOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PP008) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৬৩ | (SECBUTABARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PS003) পৃষ্ঠা ১২ |
| ২৬৪ | সেকোবারবিটাল (SECOBARBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | দ্বিতীয় | (PS001) পৃষ্ঠা ৮ |
| ২৬৫ | (VINYLBITAL) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বারবিচুরেট পরিবার (Barbiturates) | চতুর্থ | (PV001) পৃষ্ঠা ১২ |
| ২৬৬ | আলপ্রাজোলাম (ALPRAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PA004) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৬৭ | ব্রোমাজেপাম (BROMAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PB003) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৬৮ | (bromazolam) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PB009) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৬৯ | (BROTIZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PB007) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭০ | (CAMAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC002) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭১ | (CHLORDIAZEPOXIDE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC003) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭২ | (CLOBAZAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC004) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৩ | ক্লোনাজেপাম (CLONAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC005) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৪ | (clonazolam) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC016) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৫ | (CLORAZEPATE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC006) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৬ | (CLOTIAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC007) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৭ | (CLOXAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PC008) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৮ | (DELORAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PD005) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৭৯ | ডায়াজেপাম (DIAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PD006) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮০ | (diclazepam, chlorodiazepam) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PD013) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮১ | (ESTAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PE003) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮২ | (ETHYL LOFLAZEPATE) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PE004) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮৩ | (ETIZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PE009) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮৪ | (flualprazolam) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PF011) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৮৫ | (flubromazolam) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PF012) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৮৬ | (FLUDIAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PF001) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮৭ | ফ্লুনিট্রাজেপাম (FLUNITRAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | তৃতীয় | (PF002) পৃষ্ঠা ৯ |
| ২৮৮ | (FLURAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PF003) পৃষ্ঠা ১০ |
| ২৮৯ | (HALAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PH001) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯০ | (HALOXAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PH002) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯১ | (KETAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PK001) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯২ | (LOPRAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PL003) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৩ | লোরাজেপাম (LORAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PL004) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৪ | (LORMETAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PL005) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৫ | (MEDAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PM010) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৬ | মিডাজোলাম (MIDAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PM016) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৭ | (NIMETAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PN001) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৮ | নাইট্রাজেপাম (NITRAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PN002) পৃষ্ঠা ১১ |
| ২৯৯ | (NORDAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PN003) পৃষ্ঠা ১১ |
| ৩০০ | অক্সাজেপাম (OXAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PO001) পৃষ্ঠা ১১ |
| ৩০১ | (OXAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PO002) পৃষ্ঠা ১১ |
| ৩০২ | (phenazepam, fenazepam) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PP024) পৃষ্ঠা ১২ |
| ৩০৩ | (PINAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PP015) পৃষ্ঠা ১১ |
| ৩০৪ | (PRAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PP016) পৃষ্ঠা ১১ |
| ৩০৫ | টেমাজেপাম (TEMAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PT003) পৃষ্ঠা ১২ |
| ৩০৬ | (TETRAZEPAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PT004) পৃষ্ঠা ১২ |
| ৩০৭ | ট্রায়াজোলাম (TRIAZOLAM) | প্রশমনকারী ও ঘুমের পদার্থ বেঞ্জোডায়াজেপিন ও থিয়েনোডায়াজেপিন পরিবার (Benzodiazepine/Thienodiazepine-related) | চতুর্থ | (PT005) পৃষ্ঠা ১২ |
| ৩০৮ | [1] | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক পাইপেরিডিন-অ্যামিন | প্রথম | পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩৬৮ | (tert-Butyl 4-(phenylamino)piperidine-1-carboxylate (1-boc-4-AP)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক পাইপেরিডিন-কার্বামেট | প্রথম | পৃষ্ঠা ৩ |
| ৩৬৯ | (4-Anilino-N-phenethylpiperidine (ANPP)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক পাইপেরিডিন-সম্পর্কিত মধ্যবর্তী উপাদান | প্রথম | পৃষ্ঠা ৩ |
| ৩৭০ | (4-Piperidone) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক পাইপেরিডোন | প্রথম | পৃষ্ঠা ৬ |
| ৩৭১ | (N-Phenethyl-4-piperidone (NPP)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক পাইপেরিডোন | প্রথম | পৃষ্ঠা ৪ |
| ৩৭২ | (tert-Butyl 4-oxopiperidine-1-carboxylate (1-boc-4-piperidone)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক পাইপেরিডোন-কার্বামেট | প্রথম | পৃষ্ঠা ৩ |
| ৩৭৩ | (alpha-Phenylacetoacetamide (APAA)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক বিটা-কিটো অ্যামাইড | প্রথম | পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩৭৪ | (Methyl alpha-phenylacetoacetate (MAPA)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক বিটা-কিটো এস্টার | প্রথম | পৃষ্ঠা ৪ |
| ৩৭৫ | (alpha-Phenylacetoacetonitrile (APAAN)) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক বিটা-কিটো নাইট্রাইল | প্রথম | পৃষ্ঠা ৫ |
| ৩৭৬ | আইসোস্যাফ্রোল (Isosafrole) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক বেনজোডাইঅক্সোল-সম্পর্কিত পদার্থ | প্রথম | পৃষ্ঠা ৩ |
| ৩৭৭ | স্যাফ্রোল (Safrole) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক বেনজোডাইঅক্সোল-সম্পর্কিত পদার্থ | প্রথম | পৃষ্ঠা ৬ |
| ৩৭৮ | পাইপেরিডিন (Piperidine) | প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক হেটারোসাইক্লিক অ্যামিন | দ্বিতীয় | পৃষ্ঠা ৭ |
তৃতীয় তফসিলের আটটি প্রস্তুতি গোষ্ঠী
এগুলো মূল পদার্থের নতুন তফসিল নয়। নির্ধারিত প্রস্তুতিগুলো কিছু নিয়ন্ত্রণ থেকে ছাড় পায়। কেবল নাম মিলে গেলেই ছাড় প্রযোজ্য হয় না; সব প্রাসঙ্গিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
| প্রস্তুতি ও অন্তর্ভুক্ত পদার্থ | প্রযোজ্য শর্ত |
|---|---|
| কোডিন-পরিবারের আটটি পদার্থের নির্দিষ্ট প্রস্তুতি (ACETYLDIHYDROCODEINE; CODEINE; DIHYDROCODEINE; ETHYLMORPHINE; NICOCODINE; NICODICODINE; NORCODEINE; PHOLCODINE) | অন্য এক বা একাধিক উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত। প্রতি ডোজ-এককে সংশ্লিষ্ট পদার্থ সর্বোচ্চ ১০০ মিলিগ্রাম; অবিভক্ত প্রস্তুতিতে ঘনত্ব সর্বোচ্চ ২.৫ শতাংশ। |
| প্রোপিরামের নির্দিষ্ট প্রস্তুতি (PROPIRAM) | প্রতি ডোজ-এককে সর্বোচ্চ ১০০ মিলিগ্রাম প্রোপিরাম; অন্তত সমপরিমাণ মিথাইলসেলুলোজের সঙ্গে মিশ্রিত। |
| ডেক্সট্রোপ্রোপক্সিফিনের নির্দিষ্ট প্রস্তুতি (DEXTROPROPOXYPHENE) | মুখে গ্রহণের জন্য: প্রতি ডোজ-এককে সর্বোচ্চ ১৩৫ মিলিগ্রাম বেস অথবা অবিভক্ত প্রস্তুতিতে সর্বোচ্চ ২.৫ শতাংশ। ১৯৭১ সালের কনভেনশনে নিয়ন্ত্রিত কোনো পদার্থ থাকা চলবে না। |
| কোকেন, আফিম বা মরফিনের নির্দিষ্ট প্রস্তুতি (COCAINE; OPIUM; MORPHINE) | কোকেনের ক্ষেত্রে বেস হিসেবে সর্বোচ্চ ০.১ শতাংশ; আফিম বা মরফিনের ক্ষেত্রে অ্যানহাইড্রাস মরফিন হিসেবে সর্বোচ্চ ০.২ শতাংশ। অন্য উপাদানের সঙ্গে এমনভাবে মিশ্রিত হতে হবে যাতে সহজ পদ্ধতিতে বা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন পরিমাণে নিয়ন্ত্রিত পদার্থ উদ্ধার করা না যায়। |
| ডিফেনক্সিনের নির্দিষ্ট প্রস্তুতি (DIFENOXIN) | প্রতি ডোজ-এককে সর্বোচ্চ ০.৫ মিলিগ্রাম ডিফেনক্সিন; ডিফেনক্সিনের ডোজের অন্তত ৫ শতাংশের সমতুল্য অ্যাট্রোপিন সালফেট। |
| ডাইফেনক্সিলেটের নির্দিষ্ট প্রস্তুতি (DIPHENOXYLATE) | প্রতি ডোজ-এককে বেস হিসেবে সর্বোচ্চ ২.৫ মিলিগ্রাম ডাইফেনক্সিলেট; এর ডোজের অন্তত ১ শতাংশের সমতুল্য অ্যাট্রোপিন সালফেট। |
| ইপেকাকুয়ানহা ও আফিমের যৌগিক গুঁড়া (Pulvis ipecacuanhae et opii compositus) | আফিমের গুঁড়া ১০ শতাংশ; ইপেকাকুয়ানহা মূলের গুঁড়া ১০ শতাংশ; নিয়ন্ত্রিত ড্রাগবিহীন অন্য গুঁড়া উপাদান ৮০ শতাংশ। |
| উপরের শর্তপূরণকারী প্রস্তুতির অন্যান্য মিশ্রণ (Preparations conforming to Schedule III formulas) | এই তফসিলের যেকোনো ফর্মুলার শর্তপূরণকারী প্রস্তুতি এবং সেগুলোর সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত ড্রাগবিহীন উপাদানের মিশ্রণ। |
উৎস: হলুদ তালিকা, পৃষ্ঠা ১০। এই প্রস্তুতির আটটি গোষ্ঠী ৩৭৮টি মূল এন্ট্রির সংখ্যার অতিরিক্ত সারণি; উপাদানগুলো আগে থেকেই মূল টেবিলে আছে।
গোষ্ঠীভুক্ত এন্ট্রির বিস্তৃতি
| গোষ্ঠী ও পৃথক পরিচিতি | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| টিএইচসি: প্রথম তফসিলের পৃথক আইসোমার (delta-6a(10a)-THC; delta-6a(7)-THC; delta-7-THC; delta-8-THC; delta-10-THC; delta-9(11)-THC) | ছয়টি রূপ; প্রতিটির প্রযোজ্য স্টেরিওকেমিক্যাল রূপও অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় তফসিলের ডেল্টা-নাইন-টিএইচসি এদের থেকে আলাদা। |
| মরফিনসমৃদ্ধ পপি স্ট্র কনসেনট্রেট (CPS(M); NC020) | মরফিন, কোডিন, থিবেইন ও অরিপাভিনের পরিসংখ্যানগত উপবিভাগ। |
| থিবেইনসমৃদ্ধ পপি স্ট্র কনসেনট্রেট (CPS(T); NC030) | থিবেইন, মরফিন, অরিপাভিন ও কোডিনের পরিসংখ্যানগত উপবিভাগ। |
| অরিপাভিনসমৃদ্ধ পপি স্ট্র কনসেনট্রেট (CPS(O); NC040) | অরিপাভিন, মরফিন, থিবেইন ও কোডিনের পরিসংখ্যানগত উপবিভাগ। |
| কোডিনসমৃদ্ধ পপি স্ট্র কনসেনট্রেট (CPS(C); NC050) | কোডিন, মরফিন, থিবেইন ও অরিপাভিনের পরিসংখ্যানগত উপবিভাগ। |
| নসক্যাপিনসমৃদ্ধ পপি স্ট্র কনসেনট্রেট (CPS(N); NC060) | মরফিন, থিবেইন, কোডিন ও অরিপাভিনের পরিসংখ্যানগত উপবিভাগ। নসক্যাপিন নিজে নারকোটিক অ্যালকালয়েড নয়; কাঁচামালের এই রিপোর্টিং শ্রেণি থেকে নসক্যাপিন ওষুধকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকাভুক্ত বলা যাবে না। |
উৎস: সবুজ তালিকা, পৃষ্ঠা ৫; হলুদ তালিকা, পৃষ্ঠা ৮। পপি স্ট্র-এর মোট ওজন ও অ্যানহাইড্রাস অ্যালকালয়েডের রিপোর্টিং কোড আলাদা অণু বা আলাদা ওষুধ নয়।
লবণ আইসোমার ও সংশ্লিষ্ট রূপের বিধান
এই বিধানগুলো ছাড়া শুধু নামের টেবিল পূর্ণ আইনগত পরিধি প্রকাশ করে না। সম্ভাব্য প্রতিটি লবণ বা আইসোমারের আলাদা সারি দেওয়া সম্ভব নয়; নিচের বিধান প্রযোজ্য সব রূপকে অন্তর্ভুক্ত করে। নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিচয় ও বিশেষ ব্যতিক্রম সাধারণ নামের চেয়ে অগ্রাধিকার পায়।
১৯৬১ প্রথম তফসিল: নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিচয়ের মধ্যে সম্ভব হলে আইসোমার অন্তর্ভুক্ত, যদি বিশেষভাবে বাদ না দেওয়া থাকে। অন্য তফসিলে না থাকলে প্রযোজ্য এস্টার ও ইথারও অন্তর্ভুক্ত। মূল পদার্থ, এস্টার, ইথার ও আইসোমারের সম্ভবপর লবণও অন্তর্ভুক্ত।
১৯৬১ দ্বিতীয় তফসিল: নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিচয়ের মধ্যে সম্ভবপর আইসোমার, যদি বিশেষভাবে বাদ না দেওয়া থাকে; মূল পদার্থ ও প্রযোজ্য আইসোমারের সম্ভবপর লবণ অন্তর্ভুক্ত। প্রথম তফসিলের এস্টার-ইথার বিধান এখানে হুবহু প্রয়োগ করা যাবে না।
১৯৬১ চতুর্থ তফসিল: এই পদার্থগুলো প্রথম তফসিলেও রয়েছে। তালিকাভুক্ত পদার্থের সম্ভবপর লবণ অন্তর্ভুক্ত। একই পদার্থকে মোট সংখ্যায় দুবার গণনা করা হয়নি।
১৯৬১ বিশেষ গোষ্ঠী ও ব্যতিক্রম: একগোনিনের ক্ষেত্রে একগোনিন ও কোকেনে রূপান্তরযোগ্য এস্টার ও ডেরিভেটিভও অন্তর্ভুক্ত। মরফিন মেথোব্রোমাইডের গোষ্ঠীতে অন্যান্য পেন্টাভ্যালেন্ট নাইট্রোজেন মরফিন ডেরিভেটিভ এবং উল্লেখিত এন-অক্সাইডসমূহ অন্তর্ভুক্ত। ডেক্সট্রোমেথরফান ও ডেক্সট্ররফান এই কনভেনশনে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নয়। কোকা পাতার সংজ্ঞায় সব একগোনিন, কোকেন ও সংশ্লিষ্ট একগোনিন অ্যালকালয়েড অপসারিত পাতা ব্যতিক্রম।
১৯৭১ চার তফসিলের লবণ: চার তফসিলের সব পদার্থের সম্ভবপর লবণও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের আওতায়। একটি লবণের আলাদা নাম বা পরিচিতি নম্বর থাকলেই তা নতুন অনিয়ন্ত্রিত পদার্থ হয় না।
১৯৭১ স্টেরিওআইসোমার: প্রথম তফসিলে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিচয়ের মধ্যে সম্ভবপর স্টেরিওআইসোমারও নিয়ন্ত্রিত, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া। অন্য তফসিলে রাসায়নিক পরিচয়ে স্টেরিওবর্ণনা না থাকলে বা রেসেমেট উল্লেখ থাকলে প্রযোজ্য এনান্টিওমার, ডায়াস্টেরিওআইসোমার ও রেসেমিক জোড়া অন্তর্ভুক্ত। নির্দিষ্ট একক এনান্টিওমার উল্লেখ থাকলে সংশ্লিষ্ট রেসেমেটও অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু অন্য এনান্টিওমার নিজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়; একাধিক কাইরাল কেন্দ্রসহ নির্দিষ্ট ডায়াস্টেরিওআইসোমার উল্লেখ থাকলে সেই নির্দিষ্ট রূপ প্রযোজ্য। নিয়ন্ত্রিত এনান্টিওমারসহ মিশ্রণ নিয়ন্ত্রিত। সুনির্দিষ্ট প্রয়োগে সরকারি রাসায়নিক পরিচয় দেখতে হবে।
১৯৮৮ প্রথম ও দ্বিতীয় সারণি: সম্ভবপর লবণ এবং তালিকাভুক্ত নামের আওতাভুক্ত আইসোমারিক রূপ অন্তর্ভুক্ত। তবে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও সালফিউরিক অ্যাসিডের লবণ দ্বিতীয় সারণি থেকে বিশেষভাবে বাদ।
সিদ্ধান্ত হয়েছে কিন্তু এখনো কার্যকর হয়নি
| পদার্থ | বিভাগ | কনভেনশন ও স্তর | কার্যকর হওয়ার তারিখ |
|---|---|---|---|
| (MDMB-FUBINACA; PM033) | কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট | ১৯৭১; দ্বিতীয় তফসিল | ২৫ নভেম্বর ২০২৬ |
দুটি নাইটাজিন-সম্পর্কিত পদার্থের ২০২৬ সালের সংযোজন ২৯ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে এবং মূল টেবিলে অন্তর্ভুক্ত: (N-pyrrolidino isotonitazene) ও (N-desethyl etonitazene)।
উৎস সংস্করণ ও গণনার মিল
| মূল উৎস | সংস্করণ | গণনার মিল | এন্ট্রি |
|---|---|---|---|
| হলুদ তালিকা | ৬৫তম সংস্করণ, জুলাই ২০২৬ | প্রথম তফসিল ১৪১; দ্বিতীয় ১০। প্রথমের ১৮টি চতুর্থেও রয়েছে; দ্বিতীয়বার গণনা করা হয়নি। | ১৫১ |
| সবুজ তালিকা | ৩৬তম সংস্করণ, ২০২৫; সরকারি সাইটের ২০২৬ ডিরেক্টরিতে প্রকাশিত | প্রথম ৩৩; দ্বিতীয় ৬৫; তৃতীয় ৯; চতুর্থ ৬৯। | ১৭৬ |
| লাল তালিকা | ২৩তম সংস্করণ, জুলাই ২০২৫ | প্রথম সারণি ৪৩; দ্বিতীয় সারণি ৮। | ৫১ |
২০২৬ সালের সিদ্ধান্তের কার্যকর হওয়ার তারিখ: জাতিসংঘের বিজ্ঞপ্তি। এমডিএমবি-ফুবিনাকার সরকারি সংযোজনপত্র।
গণনার একক হলো সরকারি তালিকার নামভিত্তিক এন্ট্রি বা গোষ্ঠী। প্রথম ও চতুর্থ তফসিলের দ্বৈত সদস্যপদ, ছয় আইসোমারবিশিষ্ট একক টিএইচসি এন্ট্রি, মরফিনের নাইট্রোজেন-ডেরিভেটিভ গোষ্ঠী এবং পপি স্ট্র-এর কনসেনট্রেটের গোষ্ঠী এই গণনা-পদ্ধতিতে স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক তফসিল ও কোনো দেশের নিজস্ব তফসিল এক নয়। এখানে জাতীয় অতিরিক্ত তালিকা, প্রেসক্রিপশন-বিধি বা সব বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের তালিকা সংযোজন করা হয়নি। কোনো পদার্থের প্রথম তালিকাভুক্তির সাল যাচাই ছাড়া লেখা হয়নি; কনভেনশনের সালকে তার প্রথম নিয়ন্ত্রণের সাল বলা হয়নি।
সরকারি মূল উৎসের লিংক
- হলুদ তালিকা: https://www.incb.org/incb/uploads/documents/Narcotic-Drugs/Yellow_List/65th_Edition/YL_65th_EN_unedited.pdf
- সবুজ তালিকা: https://www.incb.org/incb/uploads/documents/Psychotropics/forms/greenlist/2026/2510307E.pdf
- লাল তালিকা: https://www.incb.org/documents/PRECURSORS/RED_LIST/RED_LIST_E.pdf
- ২০২৬ সালের সিদ্ধান্তের কার্যকর হওয়ার তারিখ: জাতিসংঘের বিজ্ঞপ্তি: https://www.unodc.org/LSS/Announcement/Details/3db07226-3a0e-4471-bcd7-319c487b8f34
- এমডিএমবি-ফুবিনাকার সরকারি সংযোজনপত্র: https://www.incb.org/incb/uploads/documents/Psychotropics/New_Substances_2026.pdf
তথ্যসূত্রঃ
- +)-LYSERGIDE LSD, LSD-25)
সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
এরগোলিন পরিবার (Ergoline-related)প্রথম (PL002)
পৃষ্ঠা ৫৩০৯ (DET) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ট্রিপ্টামিন পরিবার (Tryptamine-related)প্রথম (PD001)
পৃষ্ঠা ৫৩১০ ডিএমটি
(DMT)সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ট্রিপ্টামিন পরিবার (Tryptamine-related)প্রথম (PD004)
পৃষ্ঠা ৫৩১১ (ETRYPTAMINE) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ট্রিপ্টামিন পরিবার (Tryptamine-related)প্রথম (PE006)
পৃষ্ঠা ৫৩১২ সাইলোসিন
(psilocine, psilotsin)সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ট্রিপ্টামিন পরিবার (Tryptamine-related)প্রথম (PP012)
পৃষ্ঠা ৫৩১৩ সাইলোসাইবিন
(PSILOCYBINE)সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ট্রিপ্টামিন পরিবার (Tryptamine-related)প্রথম (PP013)
পৃষ্ঠা ৫৩১৪ (25B-NBOMe) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PN006)
পৃষ্ঠা ৫৩১৫ (25C-NBOMe) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PN007)
পৃষ্ঠা ৫৩১৬ (25I-NBOMe) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PN008)
পৃষ্ঠা ৫৩১৭ (2C-B) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)দ্বিতীয় (PB008)
পৃষ্ঠা ৬৩১৮ (BROLAMFETAMINE DOB) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PD009)
পৃষ্ঠা ৫৩১৯ (DMA) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PD007)
পৃষ্ঠা ৫৩২০ (DOC) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PD011)
পৃষ্ঠা ৫৩২১ (DOET) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PD008)
পৃষ্ঠা ৫৩২২ মেসকালিন
(mescaline)সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PM004)
পৃষ্ঠা ৫৩২৩ (MMDA) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PM013)
পৃষ্ঠা ৫৩২৪ (PMA) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PP017)
পৃষ্ঠা ৫৩২৫ (PMMA) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PP021)
পৃষ্ঠা ৫৩২৬ (STP, DOM) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PS002)
পৃষ্ঠা ৫৩২৭ (TMA) সাইকেডেলিক ও সংশ্লিষ্ট পদার্থ
ফেনইথাইলঅ্যামিন ও প্রতিস্থাপিত অ্যাম্ফেটামিন পরিবার (Phenethylamine/Substituted amphetamine)প্রথম (PT006)
পৃষ্ঠা ৫১৯৮৮ সালের কনভেনশনের পূর্ণ তালিকা
মোট ৫১টি মূল এন্ট্রি। এখানে স্তর বলতে প্রথম বা দ্বিতীয় সারণি বোঝানো হয়েছে। উৎসের পরিচিতি ও মূল তালিকার পৃষ্ঠা শেষ কলামে দেওয়া আছে।
ক্রম পদার্থ ও বিশেষ টীকা বিভাগ ও পরিবার স্তর উৎসের পরিচিতি ৩২৮ হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড
(Hydrochloric acid)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অজৈব অ্যাসিডদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩২৯ সালফিউরিক অ্যাসিড
(Sulphuric acid)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অজৈব অ্যাসিডদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩৩০ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট
(Potassium permanganate)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অজৈব জারকপ্রথম পৃষ্ঠা ৬ ৩৩১ অ্যানথ্রানিলিক অ্যাসিড
(Anthranilic acid)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যামিনো-অ্যারোম্যাটিক অ্যাসিডদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩৩২ এফেড্রিন
(Ephedrine)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যামিনো-অ্যালকোহলপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৩৩ নরএফেড্রিন
(Norephedrine)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যামিনো-অ্যালকোহলপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৩৪ সিউডোএফেড্রিন
(Pseudoephedrine)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যামিনো-অ্যালকোহলপ্রথম পৃষ্ঠা ৬ ৩৩৫ (N-Acetylanthranilic acid) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যারোম্যাটিক অ্যামাইড-অ্যাসিডপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৩৬ পাইপেরোনাল
(Piperonal)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যারোম্যাটিক অ্যালডিহাইডপ্রথম পৃষ্ঠা ৬ ৩৩৭ (Phenylacetic acid) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যারোম্যাটিক কার্বক্সিলিক অ্যাসিডপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৩৮ (1-Phenyl-2-propanone) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যারোম্যাটিক কিটোনপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৩৯ (3,4-Methylenedioxyphenyl-2-propanone) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যারোম্যাটিক কিটোনপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৪০ টলুইন
(Toluene)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যারোম্যাটিক দ্রাবকদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩৪১ অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড
(Acetic anhydride)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
অ্যাসিড অ্যানহাইড্রাইডপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৪২ ইথাইল ইথার
(Ethyl ether)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
ইথার দ্রাবকদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩৪৩ এরগোমেট্রিন
(Ergometrine)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
এরগট অ্যালকালয়েডপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৪৪ এরগোটামিন
(Ergotamine)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
এরগট অ্যালকালয়েডপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৪৫ লাইসার্জিক অ্যাসিড
(Lysergic acid)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
এরগোলিন-কার্বক্সিলিক অ্যাসিডপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৪৬ অ্যাসিটোন
(Acetone)প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
কিটোন দ্রাবকদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩৪৭ (Methyl ethyl ketone) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
কিটোন দ্রাবকদ্বিতীয় পৃষ্ঠা ৭ ৩৪৮ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৪৯ (P-2-P methyl glycidic acid) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৫০ (3,4-MDP-2-P methyl glycidate) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৩ ৩৫১ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, butyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫২ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, ethyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫৩ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, isobutyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫৪ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, isopropyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫৫ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, propyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫৬ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, sec-butyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫৭ (3,4-MDP-2-P methyl glycidic acid, tert-butyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৫৮ (P-2-P methyl glycidic acid, butyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৫৯ (P-2-P methyl glycidic acid, ethyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬০ (P-2-P methyl glycidic acid, isobutyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬১ (P-2-P methyl glycidic acid, isopropyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬২ (P-2-P methyl glycidic acid, methyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬৩ (P-2-P methyl glycidic acid, propyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬৪ (P-2-P methyl glycidic acid, sec-butyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬৫ (P-2-P methyl glycidic acid, tert-butyl ester) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
গ্লাইসিডিক অ্যাসিডের এস্টারপ্রথম পৃষ্ঠা ৫ ৩৬৬ (Norfentanyl) প্রিকার্সর ও সহায়ক রাসায়নিক
পাইপেরিডিন-অ্যামাইডপ্রথম পৃষ্ঠা ৪ ৩৬৭ (N-Phenyl-4-piperidinamine (4-AP ↩︎ About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.




