শয়তানের আয়াত বা স্যাটানিক ভার্সেস
সারসংক্ষেপ
এই প্রবন্ধটি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা ‘শয়তানের আয়াত’ বা ‘গারানিক কাহিনী’র ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং এর ধর্মতাত্ত্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ করবে। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো মক্কী যুগে নবী মুহাম্মদ কর্তৃক সূরা আন-নাজম পাঠকালে পৌত্তলিক দেবীদের (লাত, উজ্জা ও মানাত) প্রশংসা সম্বলিত কিছু বাক্য উচ্চারণের দাবি, যা পরবর্তীতে ওহীর বিশুদ্ধতা এবং নবীর অভ্রান্ততা (Ismah) নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। প্রবন্ধটিতে প্রদর্শিত হয়েছে যে, এই ঘটনাটি কেবল কোনো আধুনিক পশ্চিমা উদ্ভাবন নয়, বরং এটি ইসলামের প্রাচীনতম ও ধ্রুপদী উৎসগুলোতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রাথমিক যুগের প্রখ্যাত জীবনীকার ইবনে ইসহাক এবং ঐতিহাসিক ইবনে সাদ তাদের রচনায় উল্লেখ করেছেন যে, কুরাইশদের সাথে সমঝোতার আকাঙ্ক্ষায় নবী যখন ওহী পাঠ করছিলেন, তখন শয়তান তার মুখে মূর্তিপূজকদের তুষ্ট করার মতো শব্দ প্রক্ষিপ্ত করেছিল। এই বর্ণনার সূত্র ধরে তৎকালীন মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের সাথে একত্রে সিজদা প্রদান করে, যা ঐতিহাসিক দলিল অনুসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত।
বিশ্লেষণটি আরও আলোকপাত করবে যে, পরবর্তী যুগের বহু মুফাসসির সূরা হজ্জের ৫২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে পূর্ববর্তী সকল নবীর ওহী লাভের প্রক্রিয়ায় শয়তান হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে। তবে মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক ইসলামি স্কলারদের একটি বড় অংশ ‘নবুয়তের নিষ্পাপত্ব’ বা ‘আকীদা’ রক্ষার তাগিদে এই ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোকে ‘জাল’ বা ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা দেখিয়েছেন।
উপসংহারে প্রবন্ধটি ঐসকল তথ্য যাচাই করার প্রতি জোর দেবে, কারণ ঐতিহাসিক তথ্যের মানদণ্ডে এই ঘটনাটির প্রাচীন উৎসগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। ধর্মীয় অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে, প্রথাগত ধর্মতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক নথির মধ্যে বিদ্যমান এই দ্বন্দ্বটি ওহীর অলৌকিকত্ব এবং এর মানবিক সংগ্রহের প্রক্রিয়ার মধ্যবর্তী একটি জটিল সন্ধিস্থলকে উন্মোচিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, ওহীর সংকলন ও প্রচারের প্রাথমিক পর্যায়ে ঐতিহাসিক বাস্তবতার যে চিত্র পাওয়া যায়, তা পরবর্তী যুগের সুসংবদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে অধিকতর জটিল এবং বহুমাত্রিক।
ভূমিকা
সালমান রুশদীর বহুল আলোচিত উপন্যাস স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী এক তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এটি শুধু পশ্চিমা বিশ্বেই নয়, বরং মুসলিম দেশসমূহ—বিশেষত ইরান, সৌদি আরব, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী রুশদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করেন, যা আজও বহাল রয়েছে। এই প্রবন্ধে শয়তানের আয়াত সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বর্ণনার সত্যতা, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং এ নিয়ে ইসলামী বিশ্বে বিদ্যমান বিতর্ক বিশ্লেষণ করা হবে।
স্যাটানিক ভার্সেস মূলত একটি সাহিত্যকর্ম, যা ধর্মীয় বিষয়কে প্রত্যক্ষভাবে আক্রমণ না করলেও, এর নির্দিষ্ট কিছু অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বিশেষত শয়তানের আয়াত নামক ঐতিহাসিক ঘটনা এতে আলোচিত হওয়ায় বিতর্কের সূত্রপাত হয়। মূলত এর কারণ হচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কে প্রায় ৯৯% ভাগ সাধারণ মুসলিমই একদমই অজ্ঞ। তারা আরবি জানেন না, বা ইসলাম ধর্মের কোন ধর্মগ্রন্থই কোনদিন পড়ে দেখেননি। এই কারণে এই ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সূচনা হয়। অথচ ইসলাম সম্পর্কে জানা থাকলে তাদের সহজেই বোঝার কথা, ব্যাপারটি সালমান রূশদী নিজের মাথা থেকে বের করেননি, ইসলামিক ইতিহাসেই এগুলো খুব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা আছে। যদিও উপন্যাসটি কাল্পনিক, তবে এতে ব্যবহৃত কিছু উপাদান ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে মুসলিম সমাজ একে ধর্ম অবমাননা হিসেবে দেখে। শয়তানের আয়াত বলতে নবী মুহাম্মদ -এর জীবনের একটি বিতর্কিত ঘটনা বোঝানো হয়, যেখানে বলা হয় যে তিনি মক্কার মূর্তিপূজারী নেতাদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, এক সময় তাদের সন্তুষ্ট করতে কিছু আয়াত কুরআনে সংযোজন করেছিলেন, যা পরে জিব্রাঈল কর্তৃক সংশোধিত হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুসারে, ইবনে ইসহাক, আল-তাবারি, ইবনে সাদ, আল-ওয়াকিদি প্রভৃতি মুসলিম ঐতিহাসিকদের লেখায় এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যদিও পরবর্তীতে অনেক আলেম এই ঘটনাকে ভিত্তিহীন বা জাল বলে অভিহিত করেছেন, তবে এটি দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী গবেষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে আছে। শয়তানের আয়াত সংক্রান্ত বিবরণ মূলত প্রাচীন ইসলামী ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায়, যা তখনকার গবেষকগণ বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তী যুগে কিছু ইসলামী পণ্ডিত এই ঘটনাকে প্রত্যাখ্যান করলেও, তারা ঐতিহাসিক উৎসগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেননি।
অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ দাবী করেন, এটি ইসলামবিদ্বেষীদের দ্বারা সৃষ্ট একটি প্রোপাগান্ডা। তবে প্রশ্ন দেখা দেয়, যদি এটি শুধুই অপপ্রচার হয়, তবে ইসলামের প্রাচীনতম ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে এই ঘটনার বিবরণ কিভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায় যে, ইসলামের ইতিহাস রচনার সময় অনেক মতবাদ ও ব্যাখ্যার সংমিশ্রণ হয়েছে, যা পরবর্তী যুগে ব্যাখ্যাকারগণ বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমান যুগের অনেক ইসলামিক পণ্ডিত শয়তানের আয়াত সংক্রান্ত ঘটনার সত্যতা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং এটিকে কাল্পনিক কাহিনি হিসেবে অভিহিত করেন। তবে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোর গুরুত্ব এবং প্রাচীন মুসলিম ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যাকে একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না। শয়তানের আয়াত সংক্রান্ত বিতর্ক ইসলামের ইতিহাস ও নবী মুহাম্মদের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদিও এটি নিয়ে মুসলিম বিশ্বে বিশ্বাসগত বা আকীদাগত কারণে মতপার্থক্য রয়েছে, তবুও ঐতিহাসিক দলিল ও তথ্যসূত্রগুলোকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সালমান রুশদীর স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসের মাধ্যমে এই বিতর্ক পুনরায় বিশ্বমঞ্চে আলোচিত হয়েছে, যা ইতিহাস, ধর্ম এবং সাহিত্যচর্চার মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপন করেছে। পাঠকের বিবেচনার জন্য প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্যসূত্রগুলো বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে, এবং এ বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর গবেষণার দরকার রয়েছে।
শয়তানের আয়াতের মূল ঘটনা
মুহাম্মদ তখন মক্কায় ইসলামের দাওয়াত প্রচার শুরু করেছেন। তখন একদিন তিনি ক্বাবা শরীফের প্রাঙ্গণে বসে সদ্য ইসলামে দাখিল হওয়া মুসলিমদের মাঝে বক্তৃতা রাখছিলেন। সেখানে মক্কার অন্যান্য পৌত্তলিক কুরাইশরাও ছিলো। পৌত্তলিক এবং মুসলিমদের মধ্যে তখন প্রচণ্ড শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক। মুহাম্মদের মুখ থেকে সেই সময়ে কিছু আয়াত উচ্চারিত হয়, এই মাত্রই নাজিল হওয়া আয়াত হিসেবে। তিনি সেই সময়ে সূরা নাজমের কয়েকটি আয়াত নাজিল করেন। আয়াতগুলো হচ্ছে,
তোমরা কী ভেবে দেখেছো লাত ও উযযা সম্পর্কে?
এবং আরেক (দেবী) মানাত সম্পর্কে?
তাঁরা হলেন খুব-ই উঁচু পর্যায়ের (ক্ষমতাবান) দেবী
তাদের কাছে সাহায্যও চাওয়া যায়
( শয়তানের দ্বারা প্রভাবিত আয়াত )
আরেকটি অনুবাদে,
তোমরা কী ভেবে দেখেছো লাত ও উযযা সম্পর্কে?
এবং আরেক (দেবী) মানাত সম্পর্কে?
এঁঁরা হচ্ছে সেই উড়ন্ত সারস।
তাই এদের মধ্যস্ততা আশা করা যেতে পারে।
এই আয়াত উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই কোরাইশদের অত্যাচার নির্যাতন বন্ধ হয়ে যায়, নবী মুহাম্মদের সাথে তাদের আবারো সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। কারণ নবী মুহাম্মদের নতুন ধর্ম নিয়ে সেই সময়ের কুরাইশদের কোন সমস্যাই ছিল না। মুহাম্মদের সাথে সাথে কুরাইশদের মূল দ্বন্দ্ব ছিল কেন মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা কুরাইশদের দেবদেবীকে গালাগালি করছে। পরিবর্তীতে মুহাম্মদ নিজের ভুল বুঝতে পারে যে, সে পরিস্থিতির চাপে লাত মানাত উজ্জা নামক পৌত্তলিক দেবদেবীর প্রশংসা করে ফেলেছে, যা তার একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক ধর্মের নবীর নবুয়তয়ের দাবীকে খারিজ করে দেয়। নিজেই আবার এই শেষের দুই আয়াত তার অনুসারীদের বাদ দিয়ে সংশোধনমূলক আয়াত নাজিল করে। এবং সূরাটির অন্যান্য আয়াত নাজিল হয়।
তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওযযা সম্পর্কে।
এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?
পুত্র-সন্তান কি তোমাদের জন্যে এবং কন্যা-সন্তান আল্লাহর জন্য?
এমতাবস্থায় এটা তো হবে খুবই অসংগত বন্টন।
এগুলো কতগুলো নাম বৈ নয়, যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্ব-পুরুষদের রেখেছ। এর সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল নাযিল করেননি। তারা অনুমান এবং প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে। অথচ তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে পথ নির্দেশ এসেছে।
( সংশোধিত আয়াত )
কারণ হিসেবে বললেন, ওগুলো আসলে আল্লাহ প্রেরিত আয়াত ছিল না। শয়তান ধোঁকা দিয়ে তার মুখ দিয়ে এই আয়াতগুলো বলিয়ে নিয়েছে। এর পরিবর্তে তিনি অন্য আয়াত দেন, দেবীদের প্রশংসামূলক আয়াতগুলো বাতিল ঘোষণা করেন। এই পর্যন্ত বক্তব্যগুলো পরবর্তীতে ইসলামিক গ্রন্থ থেকেই প্রমাণ করা হবে।
উল্লেখ্য, সেই সময়ে আরবের পৌত্তলিকদের পূজিত সবচে বড় তিন দেবী ছিল লাত, উযযা এবং মানাত। এদের তিনজনকে আল্লাহর তিন কন্যা হিসেবেও গণ্য করা হতো। পৌত্তলিকগণ বারবার মুহাম্মদের কাছে আবদার করছিল, মুহাম্মদ তাদের দেবদেবীকে মেনে নিলে তারাও মুহাম্মদের আল্লাহকে মেনে নিবে। পৌত্তলিকগণ এই বিষয়টি খুবই অপছন্দ করছিল যে, নবী মুহাম্মদ তাদের দেবদেবী সম্পর্কে লাগাতার কটূক্তি, গালাগালি এবং সমালোচনাতে লিপ্ত ছিল। অনেকবার তাকে বোঝাবার পরেও সে ধর্মদ্রোহী কথা, কটূক্তি, দেবদেবীকে গালাগালি থেকে বিরত থাকে নি। এমনকি, মুহাম্মদের চাচা আবু তালিবের কাছে বিচার দিয়েও কোন কাজ হয় নি।
এরকম পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মুখ থেকে পৌত্তলিকদের দেবী সম্পর্কিত ঐ দুই আয়াত শুনে মক্কার মুশরিকরা খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। তারা ভাবলো, মুহাম্মদ এখন থেকে তাদের দেবদেবীদের নিয়ে আর কটূক্তি করবে না। বরঞ্চ প্রশংসা করবেন। মুহাম্মদ তাদের দেবদেবীদের মেনে নিয়েছেন, তারাও মুহাম্মদের আল্লাহকে মেনে নেবে। দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে গেছে। এখন সকল ধর্মের লোকের সহাবস্থান সম্ভব হবে। কেউ কারো উপাস্য দেবদেবী বা ঈশ্বরকে নিয়ে আর কটূক্তি করবে না। তাই, সেদিন মুহাম্মদ এবং অন্যান্য মুসলিমদের সাথে মক্কার মুশরিকরা একই সাথে সিজদা করেছিলো মক্কা প্রাঙ্গণে।
কিন্তু পরবর্তীতে মুহাম্মদ দাবী করলেন, ঐ আয়াত দুটি শয়তানের ধোঁকা। তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কোন দেবদেবীকে মানবেন না। উনি আয়াত দুটি বাদ দিতে বললেন। তখন আবারো শুরু হলো দুই দলের দ্বন্দ্ব। এবারে আসুন, রেফারেন্সগুলো যাচাই করে দেখি।
ইসলামে বহু অলৌকিক সত্তার প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি
ইসলাম নিজেকে একটি কঠোর একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে, যার মূল ভিত্তি হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ – অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই বা উপাসনা পাওয়ার যোগ্য আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। এই বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক ভিত্তি এবং এর ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু, যা এক আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা ও একমাত্র উপাস্য হওয়ার উপর জোর দেয়। তবে, কুরআনের কিছু আয়াত এবং তাদের ধ্রুপদী ব্যাখ্যার গভীর পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ইসলামের দাবী আল্লাহ ব্যতীত “উপাস্য কেউ না থাকলেও” অন্য ঐশ্বরিক সত্তার অস্তিত্বের প্রতি এক ধরনের কার্যকর (functional) বা অস্তিত্বগত (ontological) বিষয়বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো কুরআনের এমন কিছু বক্তব্য বিশ্লেষণ করা, যা একদিকে একেশ্বরবাদের কথা বললেও অন্যদিকে বহু ঐশ্বরিক সত্তার শাস্তি, বিচার এবং চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের প্রচ্ছন্ন অস্তিত্বকে মেনে নেয়। বিশেষত, সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১৪) এর মতো আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত ভাষা, যেখানে আল্লাহকে ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা একটি স্পষ্ট ধারনা তৈরি করে এবং একাধিক ঐশ্বরিক বা অলৌকিক সত্তার ধারণাকে ইঙ্গিত করে, যা ইসলামের কঠোর একত্ববাদী ভাষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই প্রবন্ধে আমরা এই আয়াতগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বৈপরীত্য, মাক্কী পর্বে মুহাম্মদের ধর্মতাত্ত্বিক বিকাশে পৌত্তলিক সমাজের প্রভাব, ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং মক্কা ও মদিনা পর্বে ‘আল্লাহ’ সত্তার চরিত্রগত রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করব। পরিশেষে, এই সমস্ত উপাদান কীভাবে ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের মৌলিকতা ও অভ্রান্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত চিত্র উপস্থাপন করা হবে।
কোরআনের পরস্পরবিরোধীতাঃ ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা’ বনাম একচ্ছত্র একত্ব
কুরআন নিজেকে একটি পরিপূর্ণ ও স্ববিরোধহীন গ্রন্থ হিসেবে দাবি করলেও, এর কিছু আয়াত একে অপরের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলির একটি হলো সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১৪) যেখানে বলা হয়েছে:
“فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ” “অতএব, বরকতময় আল্লাহ, যিনি সর্বোত্তম স্রষ্টা।” [1]
ভিন্ন অনুবাদে,
“فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ”
“সুতরাং ধন্য মহান আল্লাহ, যিনি সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।”
—সূরা মু’মিনুন ২৩:১৪ [1]
এই আয়াতে ব্যবহৃত দুটি আরবি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: “الخالقين” (al-khaliqīn) যা একটি বহুবচন রূপ এবং এর অর্থ “স্রষ্টাগণ”, এবং “أحسن” (ahsanu) যা একটি তুলনামূলক বিশেষণ এবং এর অর্থ “সবচেয়ে উত্তম” বা “সর্বশ্রেষ্ঠ”। এই বাক্যগঠন শুধুমাত্র তখনই যৌক্তিক যখন একাধিক স্রষ্টা বিদ্যমান থাকে এবং সেই প্রেক্ষাপটে একজনকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। কিন্তু এই বক্তব্য কুরআনের অন্যান্য একাধিক আয়াতের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, যেখানে আল্লাহ নিজেকে একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে দাবি করেছেন:
- “আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা।” – সূরা জুমার (৩৯ঃ৬২)
- “আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো স্রষ্টা কি আছে?” – সূরা ফাতির (৩৫ঃ৩)
- “তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং ** নিজেরাই সৃষ্ট**।” – সূরা নাহল (১৬ঃ২০)
যদি আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা হন এবং অন্য কোনো স্রষ্টা না থাকে, অন্য কোন দেবদেবী বা গডস না থাকে, তাহলে ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা’ বলার কোনো অর্থ থাকে না; সেখানে তুলনার প্রশ্নই ওঠে না। এই বৈপরীত্য ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের একত্ববাদের দাবির মৌলিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেক ইসলামি ভাষ্যকার এই আয়াতটিকে নিছক একটি ভাষাগত অলংকার বা বাগ্বিন্যাসের সৌন্দর্য হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তবে, এমন অলংকার যদি ঈশ্বরতত্ত্বে মৌলিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তবে সেটিকে ঈশ্বরপ্রদত্ত ‘সর্বশ্রেষ্ঠ, নিখুঁত ও স্বচ্ছ ভাষা’ বলা যায় না, বিশেষ করে যখন কুরআন নিজেই দাবি করে: “এই কিতাবের আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাযুক্ত এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুস্পষ্ট ভাষায় নাজিল করা হয়েছে।” [2]। যে ঈশ্বরের বাণী এমন ভাষায় রচিত, যার অর্থ বোঝাতে বহু শতকের শত শত তাফসিরকারের সাহায্য নিতে হয়, সেই ভাষাকে কি আসলেই ‘সুস্পষ্ট’ বলা যায়? এই ভাষাগত দ্ব্যর্থতা কি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে কাম্য?
মানুষ ও জ্বীনদের তুলনায় আল্লাহ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্তা?
ক্লাসিকাল তাফসিরকারকগণ, বিশেষত আল-তাবারী ও আল-করতুবি, কোরআনের “আহসানুল খালিকীন” (সর্বোত্তম স্রষ্টা) আয়াতের ব্যাখ্যায় “খালিক” শব্দটির ব্যপ্তি প্রসারিত করার চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “স্রষ্টা” কেবল আল্লাহর একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়, বরং মানুষকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যেহেতু মানুষও কিছু না কিছু সৃষ্টি বা নির্মাণ করে—যেমন ভাস্কর্য তৈরি করা, ঘর নির্মাণ করা ইত্যাদি। এইভাবে তারা দাবি করেন যে, আল্লাহ তাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টি নিখুঁত, আর মানুষের সৃষ্টি সীমাবদ্ধ। মূলত এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তারা “সর্বোত্তম স্রষ্টা” বাক্যাংশের তুলনামূলক চরিত্রকে মানুষের মত সৃষ্টিশীল সত্তার সাথে যুক্ত করে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা কোরআনের ভাষাগত শৈলী ও একেশ্বরবাদের ঈশ্বরতাত্ত্বিক ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলে। মানুষের তৈরি বস্তুকে “সৃষ্টি” বলাটি মৌলিকভাবে একটি ভুল শব্দ, একইসাথে তা আল্লাহর সৃষ্টির মত মৌলিক বা অস্তিত্বগত সৃষ্টি নয়; বরং মানুষের “নির্মাণ” হলো বিদ্যমান প্রাকৃতিক উপাদানকে নতুন রূপ দেয়া। সুতরাং, মানুষের সৃষ্টি বলতে যা বোঝানো হয় তা মৌলিকভাবে কোন সৃষ্টি নয়, বড়জোর রূপান্তর মাত্র। তার সাথে আল্লাহর সৃষ্টির তুলনা টানা একদমই অবান্তর। কোরআন হাদিস এবং ইসলামের আকীদাও হচ্ছে, আল্লাহর সাথে কোনকিছুই তুলনীয় নয়। সেটি হয়ে থাকলে, আল্লাহ নিজেই কীভাবে মানুষ বা জ্বীনদের সাথে নিজেকে তুলনা করে সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টিকর্তা বলে দাবী করছেন? এই নিয়ে আমাদের প্রশ্ন ওঠে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজেই নিজের বক্তব্যের বিরুদ্ধে গিয়ে কেন এমন তুলনার অবতারণা করবেন, যেখানে তিনি মানুষ কিংবা অন্য কোন সত্তাদের সাথে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করছেন? এটি কোরআনের একত্ববাদের দাবি ও আল্লাহর স্বয়ম্ভূ সত্তার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।
উপাস্য সত্তার শাস্তি ও বিচারঃ অস্তিত্বের প্রচ্ছন্ন স্বীকারোক্তি
কুরআনের এমন কিছু আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্য সত্তাদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা তাদের বাস্তব অস্তিত্বের প্রতি একটি ধর্মতাত্ত্বিক সংশয় সৃষ্টি করে। সূরা আম্বিয়া (২১:৯৮-১০০) এ বলা হয়েছে:
তোমরা (কাফিররা) আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো জাহান্নামের জ্বালানী। তাতে তোমরা প্রবেশ করবে।
— Taisirul Quran
তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদাত কর সেগুলিতো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের পূজা কর, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানী। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তারা যদি ইলাহ হত, তাহলে তারা তাতে প্রবেশ করত না, তাতে তারা সবাই স্থায়ী হয়ে থাকবে।
— Taisirul Quran
যদি তারা উপাস্য হত তাহলে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না; তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
যদি তারা ইলাহ হত তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না। আর তারা সবাই তাতে স্থায়ী হয়ে থাকবে।
— Rawai Al-bayan
যদি তারা ইলাহ হত তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না; আর তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সেখানে তারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে, সেখানে কিছুই শুনবে না।
— Taisirul Quran
সেখানে থাকবে তাদের আর্তনাদ এবং সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
সেখানে থাকবে তাদের আর্তনাদ, আর সেখানে তারা শুনতে পাবে না।
— Rawai Al-bayan
সেখানে থাকবে তাদের নাভিশ্বাসের শব্দ [১] এবং সেখানে তার কিছুই শুনতে পাবে না;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ঐতিহ্যবাহী তাফসিরকারকেরা এই “উপাস্য” শব্দটি দিয়ে বোঝেন সেই সকল সত্তা – যেমন লাত, মানাত, উজ্জা, হুবল – যাদের মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো: এই দেবদেবী যদি নিছক কাল্পনিক চরিত্র বা জড় মূর্তি হয়, তাহলে তাদের জাহান্নামে পাঠানো সম্ভব কিভাবে? শাস্তি প্রাপ্তি একটি সত্তার অস্তিত্ব এবং সচেতনতা নির্ধারণ করে। কোনো অস্তিত্বহীন বস্তু বা নিছক কাল্পনিক মূর্তি শাস্তির আওতাভুক্ত হয় না। [3]

এই বক্তব্য সরাসরি একটি সচেতনতা, নৈতিক দায় এবং ইচ্ছাশক্তি আরোপ করে “মিথ্যা উপাস্যদের” উপর। এর অর্থ এই উপাস্যরা সচেতন ছিল, নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ ছিল, এবং ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তা ছিল – যা তাদের নিছক কল্পনার বাইরে একটি বাস্তব অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
একই যুক্তির প্রতিফলন দেখা যায় সূরা মা’ইদাহ (৫:১১৬–১১৭) এ, যেখানে আল্লাহ ঈসা (যীশু) কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমার উপাসনা করো?’ ঈসা তখন তা অস্বীকার করে বলবে, ‘না আমি কখনোই এমনটি বলিনি!’ আসুন আয়াতগুলো পড়ি,
স্মরণ কর, যখন আল্লাহ ঈসা ইবনু মারইয়ামকে বললেন, তুমি কি লোকেদেরকে বলেছিলে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে আর আমার মাতাকে ইলাহ বানিয়ে নাও।’ (উত্তরে) সে বলেছিল, ‘পবিত্র মহান তুমি, এমন কথা বলা আমার শোভা পায় না যে কথা বলার কোন অধিকার আমার নেই, আমি যদি তা বলতাম, সেটা তো তুমি জানতেই; আমার অন্তরে কী আছে তা তুমি জান কিন্তু তোমার অন্তরে কী আছে তা আমি জানি না, তুমি অবশ্যই যাবতীয় গোপনীয় তত্ত্ব সম্পর্কে পূর্ণরূপে ওয়াকেফহাল।
— Taisirul Quran
আর যখন আল্লাহ বলবেনঃ হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলেঃ তোমরা আল্লাহর সাথে আমার ও আমার মায়েরও ইবাদাত কর? ঈসা নিবেদন করবেঃ আপনি পবিত্র! আমার পক্ষে কোনক্রমেই শোভনীয় ছিলনা যে, আমি এমন কথা বলি যা বলার আমার কোন অধিকার নেই; যদি আমি বলে থাকি তাহলে অবশ্যই আপনার জানা থাকবে; আপনিতো আমার অন্তরে যা আছে তাও জানেন, পক্ষান্তরে আপনার জ্ঞানে যা কিছু রয়েছে আমি তা জানিনা; সমস্ত গাইবের বিষয় আপনিই জ্ঞাত।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?’ সে বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য সম্ভব নয়। যদি আমি তা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, আর আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি গায়েবী বিষয়সমূহে সর্বজ্ঞাত’।
— Rawai Al-bayan
আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ্ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়াম –তনয় ‘ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া আমাকে আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর? ‘তিনি বলবেন, ‘আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তো তা জানতেন। আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি অদৃশ্য সম্বদ্ধে সবচেয়ে ভালো জানেন।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তুমি আমাকে যে ব্যাপারে নির্দেশ করেছ তা ছাড়া আমি তাদেরকে অন্য কিছুই বলিনি, (তা এই) যে, তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর যিনি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক, আর তাদের কাজ কর্মের ব্যাপারে সাক্ষী ছিলাম যদ্দিন আমি তাদের মাঝে ছিলাম, অতঃপর যখন তুমি আমাকে উঠিয়ে নিলে, তখন তুমিই ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক, আর তুমি হলে প্রত্যেক ব্যাপারে সাক্ষী।
— Taisirul Quran
আমি তাদেরকে উহা ব্যতীত কিছুই বলিনি যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, যিনি আমার রাব্ব এবং তোমাদেরও রাব্ব। আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম, অতঃপর আপনি যখন আমাকে তুলে নিলেন তখন আপনিই ছিলেন তাদের রক্ষক, বস্তুতঃ আপনিই সর্ব বিষয়ে পূর্ণ খবর রাখেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘আমি তাদেরকে কেবল তাই বলেছি, যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আললাহর ইবাদাত কর। আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী।
— Rawai Al-bayan
‘আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ছাড়া তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি, তা এই যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহ্র ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজ-কর্মের সাক্ষী, কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন [১] তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজ-কর্মের তত্ত্বাবধায়ক এবং আপনিই সব বিষয়ে সাক্ষী [২]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামিক দৃষ্টিকোণে ঈসা নির্দোষ, কারণ তিনি নিজেকে উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। অর্থাৎ, শুধুমাত্র উপাস্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া নয়, বরং সেই দাবি বা অবস্থান গ্রহণ করাটাই দায়ের উৎস। এ থেকে বিপরীত যুক্তি দাঁড়ায় – যেসব দেবদেবী উপাসনা পেতে সম্মত হয়েছিল বা নিজেরা দাবি করেছিল, কেবল তারাই দোষী। সুতরাং, ইসলাম যেসব মিথ্যা উপাস্যকে “জাহান্নামে যাওয়ার যোগ্য” বলে মনে করে, তাদের নিছক কল্পনানির্ভর মূর্তি হিসেবে নয়, বরং সচেতন ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে, যা তাদের প্রচ্ছন্ন অস্তিত্বকে স্বীকার করে।[4]


ওযযা নামে বাস্তব জগতে কিছুর অস্তিত্ব আছে?
ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মক্কা বিজয়ের পর নবী মুহাম্মদ সাহাবী খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পাঠিয়েছিলেন ‘উযযা’ নামের বিখ্যাত দেবীমূর্তি ধ্বংস করতে। এটি ছিল কুরায়েশ এবং বনু কেনানাহ গোত্রের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেবী। খালিদ প্রথমবার গিয়ে ওই মূর্তিটি ভেঙে ফিরে এলে নবী মুহাম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি কিছু দেখেছ?” খালিদ উত্তর দেন, না। তখন মুহাম্মদ বলেন, “তাহলে তুমি মূর্তিটি ধ্বংস করোনি। আবার যাও।” দ্বিতীয়বার খালিদ মন্দিরের কাছে পৌঁছে দেখতে পান, এক কৃষ্ণাঙ্গ নগ্ন নারী, যার চুল বিশৃঙ্খল, তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। স্থানীয় মন্দির-প্রহরী তাকে দেখে চিৎকার শুরু করলে খালিদ সেই নারীকে এক কোপে হত্যা করেন। এরপর যখন তিনি নবীর কাছে ফিরে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বলেছিলেন—“হ্যাঁ, সেই নারীই ছিল উযযা। সে তোমাদের দেশে পূজা পাওয়ার আশা চিরতরে হারাল।”
এই বর্ণনায় ইসলামী একেশ্বরবাদের সঙ্গে একটি মৌলিক মতাদর্শিক সংকট উন্মোচিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে উযযা ছিল একটি মিথ্যা দেবী, নিছক একটি পাথরের মূর্তি মাত্র। যার ভাল বা মন্দ কিছু করারই কোন সামর্থ্য নেই। কিন্তু নবীর বক্তব্য অনুযায়ী, উযযা কেবল একটি মূর্তি ছিল না; বরং তার বাস্তব, শারীরিক এবং চেতনাসম্পন্ন এক সত্তা, যে মক্কার মানুষের পূজা পাওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে। এখানে উযযাকে কল্পিত চরিত্র না বলে একটি অলৌকিক চেতনা সম্পন্ন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে নারী-রূপে প্রকাশ পেয়েছিল।
তাহলে এই সত্তাগুলো কী নিজেদের উপাসনা চেয়েছিল? উপাসনা চাওয়ার কারনেই কী এই সত্তাগুলো জাহান্নামের জ্বালানি হবে?
সুতরাং প্রশ্ন জাগে, উযযা কি কেবল একটি মানুষের কল্পিত মূর্তি ছিল, নাকি একটি কার্যকর অস্তিত্ব? মুহাম্মদের বক্তব্য অনুযায়ী, উযযা ছিল এমন এক সত্তা, যার উপাসনা পাওয়ার বাসনা ও প্রত্যাশা ছিল, এবং হত্যা করা না হলে সেই উপাসনা চলতেই থাকত। এখানে আমরা দেখতে পাই একপ্রকার ধর্মতাত্ত্বিক সংশয়: যেখানে একদিকে ইসলাম দাবি করছে দেবদেবী কাল্পনিক, অন্যদিকে তাদের অস্তিত্ব, ইচ্ছাশক্তি ও শারীরিক রূপ থাকার কথাও বলা হচ্ছে, যা নেহাত কাল্পনিক কোনো কল্পনা নয়। মূলত উযযা দেবীর এই শারীরিক রূপ ও হত্যা-বর্ণনা ইসলামে বহু দেবতা-সংক্রান্ত চর্চার একটি গুপ্ত বাস্তবতা উন্মোচন করে, যা ইসলামিক একেশ্বরবাদের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। [5]
সেনাদল এবং প্রতিনিধি দল প্রেরণ
১. মক্কা বিজয়ের পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৮ হিজরীর রমযানের ২৫ তারিখে খালেদ ইবনে ওলীদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি ছারিয়্যা প্রেরণ করেন। ওযযা নির্মূল করতে এ অভিযান প্রেরণ করা হয়। ওযযা ছিলো নাখলায়। কোরায়শ এবং সমগ্র বনু কেনানা গোত্র এ মূর্তির পূজা করতো। এটি ছিলো তাদের সবেচেয়ে বড় মূর্তি। বনু শায়বান গোত্র এ মূর্তির তত্ত্বাবধান করতো। হযরত খালেদ ত্রিশ জন সওয়ারী সৈন্যসহ নাখলায় গিয়ে এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন। ফিরে আসার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত খালেদকে
জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছ? তিনি বলেন, কই না তো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে তো তুমি মূর্তিই ভাঙ্গতে পারোনি?
হযরত খালেদ পুনরায় নাঙ্গা তলোয়ার উঁচিয়ে গেলেন। এবার তিনি দেখলেন তাঁর দিকে এক কালো নগ্ন মাথা ন্যাড়া মহিলা এগিয়ে আসছে। হযরত খালেদ তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন।
এতে সেই মহিলা দুই টুকরো হয়ে গেলো। হযরত খালেদ এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এসে খবর দিলেন। তিনি বললেন, হাঁ, সেই ছিলো ওযযা। এবার সে তোমাদের দেশে তার পূজার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে।
২. এরপর সেই মাসেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোয়া নামক অন্য একটি মূর্তি ধ্বংস করতে আমর ইবনুল আসকে পাঠালেন। এটা ছিলো মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে। রেহাত এলাকায় বনু হোয়াইল গোত্র এর পূজা করতো। হযরত আমর সেখানে যাওয়ার পর পুরোহিত বললো, তুমি কি চাও? তিনি বললেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে এ মূর্তি

নবীগণের ওপর শয়তানের সফল প্রভাব ও ধোঁকা
একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, নবীগণ কি শয়তানের প্রভাব ও ধোঁকা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত? প্রচলিত ধর্মীয় দাবি যাই হোক না কেন, নির্ভরযোগ্য ইসলামী উৎসগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, শয়তান বারবার নবীগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে বা ধোঁকায় ফেলতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বনী ইসরাইলের নবী ইউশা-এর কথা বলা যায়, যিনি শয়তানের প্রভাবেই নিজের কর্তব্যের কথা ভুলে গিয়েছিলেন। একইভাবে ইউসুফ এবং মূসা-এর মতো ইসলামের বড় মাপের নবীগণও শয়তানের কৌশলের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন। এই বিষয়ে ‘আশ শিফা’ গ্রন্থের বর্ণনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: [6]
আশ-শিফা [২য় খণ্ড] পৃষ্ঠা (২৬৫)
وَمَا أَنْسَانِيهُ إِلَّا الشَّيْطَانُ
-আর আমাকে শয়তানই ভুলিয়ে দিয়েছে।’
অপর এক আয়াতে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
فَأَنسَنهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ .
-অতঃপর শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিলো যে, সে তার প্রভু (বাদশাহ) এর সামনে ইউসুফের কথা উল্লেখ করবে।
অথবা আমাদের নবী হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, যখন তিনি এক সফরে ঘুমিয়ে পড়েন, আর ফজরের নামায কাযা হয়ে যায়। তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, إِنَّ هَذَا وَادٍ بِهِ شَيْطَانُ এ স্থানে শয়তান রয়েছে।
অথবা যখন হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম ফিরাউন সম্প্রদায়ের এক যুবককে চপেটাঘাত করলে সে মারা যায়, তখন তিনি বললেন,
هَذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ.
-এ কাজটা শয়তানের নিকট থেকে হয়েছে।

শয়তানের এই প্রভাব কেবল পূর্ববর্তী নবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; খোদ ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদও শয়তানের ধোঁকা ও প্রভাবে পড়েছিলেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, শয়তানের উপস্থিতির কারণে তিনি ও তার সঙ্গীরা সময়মতো ইবাদত (ফজরের নামাজ) করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সহীহ হাদীসের এই বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, শয়তান মুহাম্মদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল: [7]
সুনান আন-নাসায়ী (তাহকীককৃত)
পর্ব-৬: সালাতের সময়সীমা
পরিচ্ছেদঃ ৫৫: ছুটে যাওয়া সালাত কিভাবে কাযা করা যায়?
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৬২৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬২৪
৬২৩. ইয়াকূব ইবনু ইবরাহীম (রহ.) ….. আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সাথে সারা রাত সফর করার পরে শেষ রাতে এক জায়গায় যাত্রা বিরতি করি এবং ঘুমিয়ে পড়ি। সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কারো ঘুম ভাঙলো না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের বললেন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাহনের লাগাম ধরে এ জায়গা ত্যাগ কর। কারণ এ স্থানে শয়তান আমাদের কাছে এসেছে। আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, আমরা তাই করলাম। তারপর কিছু দূর গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) পানি এনে উযু করলেন। এরপর ফজরের সুন্নাত সালাত আদায় করলেন। তারপর ইকামত হলে ফজরের ফরয সালাত আদায় করলেন।
সহীহ: মুসলিম ৬৮০, ইরওয়াউল গালীল ২৬৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
নবীর গালাগালি, কটূক্তি, সমালোচনা
নবী মুহাম্মদ পৌত্তলিকদের দেবদেবী, পূর্বপুরুষদের ধর্ম, এগুলো সম্পর্কে অবমাননাকর কটূক্তি করতো বলেই জানা যায়। তাকে ধর্মদ্রোহীতা দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। সমাজে শত শত বছর ধরে প্রচলিত ধর্মের সমালোচনা, বাপদাদার ধর্মের অবমাননা, কটূক্তি, দেবদেবী নিয়ে অপমানজনক কথা বলার কারণে বারবার তাকে সতর্ক করা হয় [8] –
ওয়াক্কাস এই সময় একটা মরা উটের চোয়ালের হাড় দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত হেনে মুশরিকদের একজনের মাথা ফাটিয়ে দেন। ইসলামের জন্য এটাই ছিল রক্তপাতের প্রথম ঘটনা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক প্রকাশ্য দাওয়াত দিলেও যতক্ষণ তাদের দেব-দেবীর নামোল্লেখ বা সমালোচনা করেননি ততক্ষণ তারা তাঁর থেকে দূরে সরে যায়নি কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখরও হয়নি। কিন্তু যখন তিনি তাদের দেব-দেবীর সমালোচনা করলেন তখনই তারা তাঁর আন্দোলনকে একটা ভয়ংকর ও মারাত্মক জিনিস বলে মনে করলো। তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে ক্ষেপে উঠলো এবং তাঁর বিরুদ্ধতা ও শত্রুতায় কোমর বেঁধে নামলো। তবে স্বল্পসংখ্যক লোক যারা তখনো আত্মপ্রকাশ করেননি- ইসলামের খাতিরে এই শত্রুতা থেকে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর চাচা আবু তালিব পূর্ণ সহানুভূতি ও অনুকম্পা দেখাতে থাকেন। তিনি কুরাইশদের আক্রমণের মুখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করতে থাকলেন এবং তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। ফলে তিনি আল্লাহর দ্বীন প্রচারের কাজ অপ্রতিহত গতিতে চালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। কিন্তু কুরাইশরা যখন দেখলো, সম্পর্কচ্ছেদ ও দেব-দেবীর সমালোচনার বিরুদ্ধে তাঁদের প্রবল আপত্তিকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিন্দুমাত্র পরোয়া করছেন না, অধিকন্তু তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁকে পুরোপুরি সহযোগিতা করে যাচ্ছেন এবং তাঁকে আশ্রয় দিয়ে চলছেন, কোন মতেই তাঁকে কুরাইশদের হাতে সমর্পণ করছেন না; তখন একদিন কুরাইশদের গণ্যমান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সদলবলে আবু তালিবের কাছে গিয়ে বললো, “হে আবু তালিব, আপনার ভাতিজা আমাদের দেব-দেবীকে গালি-গালাজ করেছে, আমাদের ধর্মের নিন্দা করেছে, আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাউরিয়েছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছে। এমতাবস্থায় হয় আপনি তাকে এসব থেকে বিরত রাখুন নতুবা তাকে শায়েস্তা করার জন্য আমাদেরকে সুযোগ দিন।” আবু তালিব তাদেরকে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় জবাব দিলেন এবং বুঝিয়ে-সুজিয়ে বিদায় করলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাজ যথারীতি চালিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি আল্লাহর দীনের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতে থাকলেন ও তাঁর প্রচার-প্রসারের কাজ অব্যাহত রাখলেন। ফলে কুরাইশদের বিদ্বেষ ও আক্রোশ দিন দিন বেড়ে যেতে লাগলো। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় মেতে উঠলো এবং পরস্পরকে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কানী দিতে আরম্ভ করলো।
তাই পুনরায় তারা আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হয়ে বললো, হে আবু তালিব, আপনি আমাদের মধ্যে প্রবীণ ও মুরুব্বী। আমরা আপনাকে গণ্যমান্য ও শ্রদ্ধেয় মনে করি।
আমরা বলেছিলাম, আপনার ভাতিজাকে নিষেধ করুন কিন্তু আপনি তা করলেন না।
আল্লাহর কসম, আমরা এভাবে আর চলতে দিতে পারি না। সে আমাদের সমালোচনা, দেব-দেবীর নিন্দা ও আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাওরানোর যে ধৃষ্টতা দেখিয়ে যাচ্ছে তা আমরা আর সহ্য করতে পারি না। এখন হয় আপনি তাকে নিবৃত্ত করবেন নচেৎ আমরা আপনাকে সহ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো এবং একপক্ষ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে আর থামবো না।”
আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে বললেন, “ভাতিজা, তোমার সম্প্রদায়ের লোকজন আমার কাছে এসে এইসব কথা বলেছে।” এই বলে তিনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যা বলেছিলো তা তাঁকে বললেন। তারপর বললেন, “অবস্থা যখন এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তখন তুমি নিজেকে ও আমাকে সামলে চলো। আমার ওপর আমার সাধ্যের বেশী কোন কিছু চাপিয়ে দিও না।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করলেন, চাচা মত পাল্টে ফেলেছেন, কুরাইশদের মুকাবিলায় তাঁকে একাকী ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন এবং তাঁর সহায়তা করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “চাচা, আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় এবং তার বিনিময়ে আমাকে এই কাজ ত্যাগ করতে বলে, তবুও আমি এটা ত্যাগ করবো না। আমি ততদিন পর্যন্ত এ কাজ করতে থাকবো, যতদিন না আল্লাহ তাঁর দীনকে বিজয়ী করেন কিংবা এই কাজ করতে করতে আমি ধ্বংস হয়ে যাই।” এই কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’ চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। অতঃপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং চলে যেতে উদ্যত হলেন। কিছুদূর অগ্রসর হলে আবু তালিব তাঁকে ডেকে বললেন, “হে ভাতিজা, কাছে এসো।” তিনি কাছে গেলেন। আবু তালিব বললেন, “ভাতিজা, ঠিক আছে। তুমি যা বলতে চাও বলতে থাক। আমি কখনো কোন কারণে তোমাকে ওদের কাছে সমর্পণ করবো না।”
কুরাইশরা যখন জানতে পারলো যে, আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবমাননাকর অবস্থার মুখে একা ছেড়ে দিতে রাজী নন এবং তাদের সম্পর্কচ্ছেদ ও শত্রুতা সত্ত্বেও তাঁকে তাদের হাতে তুলে না দিতেও অবিচল, তখন তারা উমারাহ ইবনে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নামক এক যুবককে আবু তালিবের কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, “হে আবু তালিব, এই যুবককে দেখুন, এর নাম উমারাহ ইবনে ওয়ালীদ। কুরাইশ গোত্রে এর মত সাহসী, শক্তিমান ও সুদর্শন যুবক আর নেই। একে আপনি পুত্র হিসেবে গ্রহণ করুন। এর বুদ্ধিমত্তা ও সাহায্য-সহযোগিতা দ্বারা আপনি উপকৃত হতে পারবেন। আর আপনার ঐ ভাতিজাকে আমাদের হাতে তুলে দিন, যে আপনার পূর্বপুরুষের ধর্মের বিরোধিতা করছে, আপনার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে এবং তাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাওরাচ্ছে। তাকে আমাদের হাতে তুলে দিন, আমরা তাকে হত্যা করি। একজন মানুষের বিনিময়ে একজন মানুষ আপনি পেয়ে


এবারে আসুন ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রচিত মুখতাসার যাদুল মা‘আদ গ্রন্থ থেকে একই বিষয় জেনে নিই, [9]
ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে মা’মার বলেন- যায়েদের পূর্বে অন্য কেউ ইসলাম কবুল করেছে বলে আমাদের জানা নেই। পাদ্রী ওয়ারাকা বিন নাওফালও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিরমিযীর বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, নাবী স্বপ্নে ওয়ারাকা বিন নাওফালকে সুন্দর অবস্থায় দেখেছেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি তাকে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন।
লোকেরা একের পর এক আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকল। তখনও কুরাইশরা কোন প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু পরে যখন তিনি তাদের বাতিল ও বানোয়াট ধর্মের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করতে লাগলেন এবং তাদের কল্পিত মাবুদদেরকে এইভাবে কটুক্তি করলেন যে, এগুলো কোন উপকার ও ক্ষতির মালিক নয় তখন তারা শক্তভাবে তাঁর দাওয়াতের বিরোধীতা শুরু করল এবং নাবী ও তাঁর সাহাবীদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে লাগল। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে তাঁর চাচা আবু তালেবের মাধ্যমে হেফাজত করলেন। আবু তালেব ছিল কুরাইশদের মধ্যে সম্মানিত ও ভদ্র একজন নেতা। তার
পরিবার ও মক্কাবাসীরা তাকে সম্মান করত। মক্কাবাসীরা তাকে সামান্যতম কষ্ট দেয়ার সাহসিকতা প্রদর্শন করতনা। তবে সে তার দ্বীনেই থাকবে এবং স্বীয় ভাতিজাকে সহযোগিতা করবে, এটিই ছিল মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ্ তা’আলার কৌশল। যে ব্যক্তি আবু তালেবের অবস্থার মধ্যে গভীরভাবে চিন্তা করবে, সে এ কথা অনুভব করতে সক্ষম হবে যে, আবু তালেবের কুরাইশদের ধর্মের উপর স্থির থাকাতেই ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য বিরাট উপকার ও কল্যাণ নিহিত ছিল।

এবারে সীরাতুল মুস্তফা সা. থেকে পড়ি [10] –





হিজরতকারীদের মক্কা প্রত্যাবর্তন
নবী মুহাম্মদ যখন মক্কায় কোরাইশদের প্রচলিত ধর্ম ও দেবদেবীর কঠোর সমালোচনা করছিলেন, তখন পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মক্কার সমাজ ও নেতৃত্ব তাকে ধর্ম অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করে এবং মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নবুয়তের পঞ্চম বছরে এই চরম নিপীড়ন থেকে বাঁচতে একদল মুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পরই তারা একটি চাঞ্চল্যকর খবর পেয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। খবরটি ছিল—মক্কার কোরাইশ ও মুসলিমদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান হয়েছে এবং উভয় পক্ষ এখন মিলেমিশে সহাবস্থান করছে।
যৌক্তিক প্রশ্ন জাগে, মক্কার কট্টর পৌত্তলিকরা কেন হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল? কেনই বা আবিসিনিয়ার মুসলিমরা নিশ্চিত হলো যে মক্কা এখন নিরাপদ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সেই ‘শয়তানের আয়াত”-এর মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, মুহাম্মদ নিজেই সেই সময় কোরাইশদের সাথে একটি আপস বা সমঝোতার মানসিক অবস্থায় ছিলেন। প্রচণ্ড চাপ আর সহ্য করতে না পেরে নবী সেই সময়ে লাট মানাত আর উজাড় প্রশংসা করে আয়াত নাজিল করে বসেন। ফলে কোরাইশরা উল্লাসে ফেটে পড়ে এবং মুসলিমদের সাথে একত্রে সিজদাহ দেয়। এই ‘পৌত্তলিক কোরাইশদের সাথে সমঝোতা’র খবরই আবিসিনিয়ায় পৌঁছেছিল যে, পুরো মক্কা ইসলাম কবুল করেছে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযীর বিখ্যাত গ্রন্থ যাদুল মা’আদ থেকে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সেখানে দেখা যায়, তৎকালীন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে কেবল সাধারণ মুসলিমরাই নয়, বরং খোদ নবীকেও ভালভাবেই কাবু করে ফেলেছিল। কোরাইশদের দাবি ছিল হয় মুহাম্মদকে লাত ও উজ্জার প্রশংসা করতে হবে, তাহলে তাদের সাথে মুসলিমদের আর কোন শত্রুতা থাকবে না। এই চরম চাপের মুখে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা নবীর ‘অভ্রান্ততা’র দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় [11] –
দ্বীনের পথে সাহাবাদের জুলুম-নির্যাতন সহ্যের কিছু দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরামদের অবস্থা এই ছিল যে, যার গোত্রীয় শক্তি ছিল, সে তার গোত্রের সাহায্য পেত এবং স্বীয় গোত্রের লোকেরা তাকে অন্যান্য কাফেরদের কষ্ট হতে রক্ষা করত। কিন্তু বহু সংখ্যক সাহাবীর এ রকম কোন ব্যবস্থা ছিল না। তারা দ্বীনের পথে কুরাইশদের পক্ষ হতে কঠিক যন্ত্রনা ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তারা ভোগ করেছেন নানা ধরণের শাস্তি ও জুলুম-নির্যাতন। তাদের মধ্যে ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসির, তাঁর মাতা সুমাইয়া এবং তাঁর পরিবার। তারা আল্লাহর পথে কঠোর শাস্তি ভোগ করেছেন।
যখন মরুর বালু উত্তপ্ত হয়ে উঠত তখন তাদেরকে চিৎ করে শায়িত করে শাস্তি দিত। সে অবস্থায় একদা রসূলুল্লাহ্ তাঁদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলেছিলেন- “হে ইয়াসের পরিবার ধৈর্য ধারণ করো, তোমাদের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।” অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ইয়াসের ইন্তেকাল করেন।
দুর্বৃত্ত আবু জাহল সুমাইয়া (এ) এর লজ্জাস্থানে তীর দিয়ে আঘাত হানলে তৎক্ষণাৎ তিনি শাহাদত বরণ করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। তারা আম্মারের উপরও শাস্তি কঠোর করে, কখনও তাকে তারা উত্তপ্ত রোদ্রে ফেলে শাস্তি দিত, কখনও ভারি প্রস্তর তার উপরে চাপিয়ে রাখতো, আবার কখনও আগুনে দগ্ধকরে শাস্তি দিত এবং বলতোঃ যতক্ষণ তুমি মুহাম্মাদ কে গালি না দিবে অথবা “লাত” ও “উয্যা” সম্পর্কে ভালো কথা না বলবে ততক্ষণ আমরা তোমাকে ছাড়বনা। তিনি বাধ্য হয়েই তাদের কথায় সম্মতি দেন এবং পরবর্তীতে ক্রন্দনরত অবস্থায় ও রসূল এর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার জন্য উপস্থিত হন। আল্লাহ্ তা’আলা তার প্রেক্ষিতে এই আয়াতটি নাযিল করেন-
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيمَانِ)
“যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর যদি আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় তাদের উপর পতিত হবে আল্লাহর গযব”। (সূরা নাহল-২৭:১০৬)
যেসমস্ত সাহাবী কাফেরদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বিলাল তাদের অন্যতম। তাকে আল্লাহর রাস্তায় কঠিন শাস্তি দেয়া হয়েছে। আল্লাহর জন্য নিজের জানকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন এবং স্বজাতির কাছে নিজেকে ছেড়ে রেখেছিলেন। মুশরিকরা তাঁকে দুষ্ট ছেলেদের হাতে তুলে দিয়েছিল। ওরা তাঁকে মক্কার গলিতে টেনে নিয়ে বেড়াত, আর তিনি বলতেন, আহাদ, আহাদ। ওরাকা বিন নাওফাল তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলতেন- হ্যাঁ, বিলাল। ঠিক বলছ। আহাদ, আহাদ। আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক। আল্লাহর শপথ! তোমরা যদি তাঁকে হত্যা করে ফেল আমি তাঁর হত্যায় মমতা প্রকাশ করব।
কুরাইশদের নির্যাতন কঠোর হলে আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের হিজরত
মুসলিমদের উপর যখন কুরাইশদের নির্যাতন কঠোর থেকে কঠোরতর হতে লাগল এবং তাদেরকে যখন বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি দেয়া শুরু করল তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাদের উপর দয়া করলেন এবং মুশরিকদের নির্যাতন হতে মুক্তি দান কল্পে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দিলেন। আবিসিনিয়ার বাদশাহ্ নাজাশী ছিলেন একজন ন্যায় পরায়ণ ও দয়ালু বাদশাহ। তাদের দলনেতা ছিলেন উসমান বিন আফ্ফান। তাঁর সাথে ছিলেন নাবী নন্দিনী রুকাইয়্যা। তারা ছিলেন সংখ্যায় ১২জন পুরুষ ও ৪জন মহিলা। তারা গোপনে মক্কা থেকে বের হলেন। লোহিত সাগরের তীরে গিয়ে আল্লাহর তাওফীক মোতাবেক তারা দু’টি নৌকা পেয়ে গেলেন। নৌকার মাঝিরা তাদেরকে উঠিয়ে নিলেন।
এটি ছিল নবুওয়াতের ৫ম সনের রজব মাসের ঘটনা। কুরাইশরা তাদের সন্ধানে বের হয়ে সাগরের তীর পর্যন্ত পৌঁছল। কিন্তু তারা তাদের সন্ধান পেলনা। তারা আবিসিনিয়ায় পৌঁছে উত্তমভাবে অবস্থান করতে শুরু করলেন। এদিকে আবিসিনিয়ায় মুহাজিরদের নিকট এই মর্মে খবর পৌঁছে যায় যে, কুরাইশরা মুসলিমদের উপর নির্যাতন বন্ধ করেছে এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং তারা ঐ বছরের শাওয়াল মাসে প্রত্যাবর্তন করেন। যখন তারা মক্কায় এসে পৌঁছেন তখনই আসল তথ্য অবগত হতে সক্ষম হন। তারা জানতে পারেন যে, কুরাইশরা আগের চেয়ে আরও বেশী নির্যাতন চালাচ্ছে। তখন তাদের কেউ কেউ পুনরায় আবিসিনিয়া ফেরত চলে যায় আবার কেউ কেউ গোপনে অথবা কুরাইশদের কারো নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করেন।


এই বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, তথাকথিত ‘শয়তানের আয়াত’ কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন মক্কার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুহাম্মদের একটি সচেতন কৌশলগত সিদ্ধান্ত। আবিসিনিয়া থেকে হিজরতকারীদের ফিরে আসা কোনো অলৌকিক সংকেত ছিল না, বরং তা ছিল মক্কার কুরাইশদের সাথে মুহাম্মদের একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমঝোতার প্রত্যক্ষ ফলাফল।
নিজের অনুসারীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন বন্ধ এবং কুরাইশদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে মুহাম্মদ সাময়িকভাবে হলেও মক্কার দেবদেবীদের মহিমান্বিত করে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে যখন এই রাজনৈতিক আপস ইসলামের মূল একশ্বরবাদী কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছে, তখনই সেই আয়াতগুলোকে ‘শয়তানি প্রক্ষেপণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিল (Abrogate) করা হয়। মূলত এই ‘শয়তান’ শব্দটি এখানে একটি থিওলজিক্যাল টুল বা ধর্মীয় কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে মুহাম্মদের একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ওহীর পবিত্রতা থেকে আলাদা করে আড়াল করা যায়। হিজরতকারীরা ফিরে এসে যখন দেখলেন পরিস্থিতি আগের মতোই এবং সমঝোতাটি বাতিল করা হয়েছে, তখন এটিই স্পষ্ট হয় যে ওহীর প্রকৃতি আসলে মুহাম্মদের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতো।
মুসলিম-মুশরিক সমবেত সিজদা
এই ঘটনাটির সাথে জড়িত রয়েছে সববেতভাবে কাফের মুশরিক এবং মুসলিম সকলের একসাথে সিজদা করার একটি অদ্ভুত ঘটনা। আমরা সকলেই জানি যে, সেই সময়ে কাফেরদের সাথে মুসলিমদের ধর্ম নিয়ে খুবই সংঘাতপুর্ণ সম্পর্ক। এরকম পরিস্থিতিতে কাফেররা বারবার মুহাম্মদকে অনুরোধ করেছিল, মুহাম্মদ যদি তাদের দেবদেবীকে মেনে নেয়, তাহলে কাফেররাও মুহাম্মদের আল্লাহকে মেনে নিবে। মিলেমিশে তারা যার যার ধর্ম পালন করবে। কিন্তু মুহাম্মদ তাতে প্রাথমিকভাবে রাজি ছিল না। পরবর্তীতে সূরা নজমের এই আয়াতটি নাজিল হয় এবং সেই আয়াত নাজিলের সময় কাফের এবং মুসলিম সকলে সমবেতভাবে সিজদা করে। এর অর্থ কী পাঠকগণ ভালভাবেই বুঝবেন [12] [13] [14] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছদঃ ৬৫/৫৩/৭. আল্লাহর বাণীঃ অতএব আল্লাহ্কে সাজদাহ্ কর এবং তাঁরই ‘ইবাদাত কর। (সূরাহ আন্-নাজম ৫৩/৬২)
৪৮৬২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাহ নাজমের মধ্যে সাজদাহ্ করলেন এবং তাঁর সঙ্গে মুসলিম, মুশরিক, জিন ও মানব সবাই সাজদাহ্ করল। আইয়ুব (রহ.)-এর সূত্রে ইব্রাহীম ইবনু তাহ্মান (রহ.) উপরোক্ত বর্ণনার অনুসরণ করেছেন; তবে ইবনু উলাইয়াহ (রহ.) আইয়ূব (রহ.)-এর সূত্রে ইবনু ‘আববাস (রাঃ)-এর কথা উল্লেখ করেননি। (১০৭১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ৪/ কিতাবুল জুমু’আ (জুমু’আর নামায)
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৫১. সূরা আন-নাজমের সাজদাহ
৫৭৫। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা নাজম-এ সাজদাহ করেছেন। মুসলিম, মুশরিক, জ্বিন ও মানুষ সবাই তার সাথে সাজদাহ করেছেন। -সহীহ। বুখারী, কিসসাতুল গারানীক— (১৮, ২৫, ৩১ পৃঃ), বুখারী।
আবু ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে ইবনু মাসউদ ও আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। একদল বিদ্বানের মতে সূরা নাজম-এ সাজদাহ রয়েছে। একদল সাহাবা ও তাবিঈনের মতে মুফাসসাল সূরাসমূহে কোন সাজদাহ নেই। মালিক ইবনু আনাস এই মতের সমর্থক। কিন্তু প্রথম দলের মতই বেশি সহীহ। সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারাক, শাফিঈ ও আহমাদ প্রথম মতের সমর্থক। (অর্থাৎ মুফাসসাল সূরায় সাজদাহ আছে)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

উপরের হাদিসটি থেকে জানা যায়, সূরা নাজমের আয়াত আবৃত্তি করার পরে শুধু মুসলিমগণই নয়, মুশরিকরাও নবী মুহাম্মদের সাথে তার অনুসরণ করে সকলে সিজদা করলো। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সময়ে তো মুহাম্মদের সাথে মুশরিকদের চরম দ্বন্দ্ব এবং শত্রুতা চলছে। কী এমন হলো, যার ফলে নবী মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীরা, সেই সাথে মুশরিকরাও তারই সাথে একত্রে কোরআনের একটি সূরার সাথে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করলো? এমন কী ঘটে গেল? এরকম তো হওয়ার কথা নয়। এখন আসুন আরো কয়েকটি হাদিস দেখি। যেই হাদিসে দেখা যায়, মক্কায় থাকা অবস্থায় নবী যখন সূরা নজম পাঠ করে শোনান, তখন একজন বৃদ্ধ কাফের লোকও মাটি কপালে নিয়ে সিজদার কাজটি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সেই বৃদ্ধটি কাফের অবস্থায় নিহত হয়। এর অর্থ হচ্ছে, বৃদ্ধটি কাফের অবস্থাতেই সিজদা করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, সূরা নজম শুনে কাফের কেন সিজদার মত মাটি কপালে তুলবে? [15] [16]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ কুরআন তিলওয়াতে সিজদা
পরিচ্ছেদঃ ৬৮৩. কুরআন তিলাওয়াতের সিজ্দা ও এর পদ্ধতি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১০০৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬৭
১০০৬। মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় সূরা আন্-নাজম তিলওয়াত করেন। এরপর তিনি সিজদা করেন এবং একজন বৃদ্ধ লোক ছাড়া তাঁর সঙ্গে সবাই সিজদা করেন। বৃদ্ধ লোকটি এক মুঠো কংকর বা মাটি হাতে নিয়ে কপাল পর্যন্ত উঠিয়ে বলল, আমার জন্য এ যথেষ্ট। আমি পরবর্তী যামানায় দেখেছি যে, সে কাফির অবস্থায় নিহত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ কুরআন তিলওয়াতে সিজদা
পরিচ্ছেদঃ ৬৮৬. সূরা আন্ নাজ্মের- এর সিজদা।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৭০
قَالَهُ ابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ইবন আব্বাস (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ বিষয়ে বর্ণনা করেছেন।
১০০৯। হাফস ইবনু উমর (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা আন্ নাজ্ম তিলাওয়াত করেন, এরপর সিজ্দা করেন। তখন উপস্থিত লোকদের এমন কেউ বাকী ছিল না, যে তাঁর সঙ্গে সিজদা করেনি। কিন্তু এক ব্যাক্তি এক মুঠো কংকর বা মাটি হাতে নিয়ে কপাল পর্যন্ত তুলে বলল, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। (আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন) পরে আমি এ ব্যাক্তিকে দেখেছি যে, সে কাফির অবস্থায় নিহত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
ভেবে দেখুন, এত বড় আশ্চর্য ঘটনা কীভাবে ঘটে? এর জন্য আমাদের যেতে হবে অনেকগুলো সিরাত গ্রন্থ এবং তাফসীর সমূহতে।
মূল ঘটনার সারসংক্ষেপ
তাফসীরে মাযহারী থেকে
এবারে পুরো ঘটনার একটি সার সংক্ষেপ দিচ্ছি, তাফসীরে মাযহারী থেকে। প্রাসঙ্গিকভাবে, সূরা বনি ইজরাইলের ৭৩, ৭৪ নম্বর আয়াত এখানে প্রাসঙ্গিক [17] [18]
৭৩
আমি তোমার প্রতি যে ওয়াহী করেছি তাত্থেকে তোমাকে পদস্খলিত করার জন্য তারা চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে তার (অর্থাৎ নাযিলকৃত ওয়াহীর) বিপরীতে মিথ্যা রচনা কর, তাহলে তারা তোমাকে অবশ্যই বন্ধু বানিয়ে নিত।
— Taisirul Quran
আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি তা হতে তোমার পদস্খলন ঘটানোর জন্য তারা চূড়ান্ত চেষ্টা করেছে যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু মিথ্যা উদ্ভাবন কর। সফলকাম হলে তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করত।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তাদের অবস্থা এমন ছিল যে, আমি তোমাকে যে ওহী দিয়েছি, তা থেকে তারা তোমাকে প্রায় ফিতনায় ফেলে দিয়েছিল, যাতে তুমি আমার নামে এর বিপরীত মিথ্যা রটাতে পার এবং তখন তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত।
— Rawai Al-bayan
আর আমরা আপনার প্রতি যা ওহী করেছি তা থেকে ওরা আপনাকে পদস্খলন ঘটানোর চেষ্টা প্রায় চূড়ান্ত করেছিল, যাতে আপনি আমাদের উপর সেটার বিপরীত মিথ্যা রটাতে পারেন [১]; আর নিঃসন্দেহে তখন তারা আপনাকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করত।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
৭৪
আমি তোমাকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত না রাখলে তুমি তাদের দিকে কিছু না কিছু ঝুঁকেই পড়তে।
— Taisirul Quran
আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখলে তুমি তাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আমি যদি তোমাকে অবিচল না রাখতাম, তবে অবশ্যই তুমি তাদের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়তে,
— Rawai Al-bayan
আর আমরা অবিচলিত না রাখলে আপনি অবশ্যই তাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকে পড়তেন [১];
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ইবনে মারদুবিয়া ও ইবনে আবী হাতেমের বর্ণনায় এসেছে, ইবনে ইসহাক সূত্রে মোহাম্মদ বিন আবী মোহাম্মদ ইকরামা কর্তৃক উল্লেখিত হয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার উমাইয়া বিন খালফ, আবু জেহেল বিন হিশাম ও অন্যান্য কুরায়েশ নেতারা রসুল স. সকাশে হাজির হয়ে বললো, মোহাম্মদ! তুমি আমাদের দেব-দেবীদের মূর্তিগুলোতে একটি বার শ্রদ্ধার সঙ্গে হাত বুলিয়ে দাও, তাহলে আমরা সকলেই হয়ে যাবো তোমার অনুসারী। রসুল স. মনেপ্রাণে চাইতেন, তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করুক। তাই তাদের এই ছোট্ট আবদারটি শুনে কিছুটা হতচকিত হয়ে গেলেন। তখন অবতীর্ণ হলো
সূরা বানী ইসরাইল: আয়াত ৭৩, ৭৪, ৭৫
وَإِنْ كَادُوا لَيَفْتِنُونَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِيَ عَلَيْنَا غيرَةً وَإِذَا لَا تَّخَذُوكَ خَلِيلًا ، وَلَوْلَا أَنْ تَبَّتْنَكَ لَقَدْ كِدَتَ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا إِنَّ الْأَذَتُنَكَ ضِعُفَ الْحَيُوةِ وَ ضِعُفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا
আমি তোমার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিয়াছি তাহা হইতে তোমার পদস্খলন ঘটাইবার জন্য উহারা চূড়ান্ত চেষ্টা করিয়াছে, যাহাতে তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু মিথ্যা উদ্ভাবন কর; সফল হইলে উহারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিত।
আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখিলে তুমি উহাদিগের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকিয়াই পড়িতে।
তুমি ঝুঁকিয়া পড়িলে অবশ্যই তোমাকে ইহজীবনে ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাইতাম; তখন আমার বিরুদ্ধে তোমার জন্য কোন সাহায্যকারী পাইতে না।
প্রথমে বলা হয়েছে- ‘আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি, তা থেকে তোমার পদস্খলন ঘটাবার জন্য তারা চূড়ান্ত চেষ্টা করেছে।’ ‘লুবাবুন নুকুল ফী আসবাবিন্নুযুল’ প্রণেতা লিখেছেন, আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিত সম্পর্কে একটি বিশুদ্ধসূত্রসম্বলিত বিবরণ রয়েছে। বিবরণটি এই- হজরত সাঈদ ইবনে যোবায়ের থেকে ইবনে আবী হাতেম উল্লেখ করেছেন, একবার রসুল স. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করছিলেন। তখন কুরায়েশ নেতারা বললো, আমাদের মূর্তিগুলোকে সম্মান না প্রদর্শন করা পর্যন্ত আমরা তোমাকে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে দিবো না। রসুল স. ভাবলেন, প্রকাশ্যে তাদের আবদার রক্ষা করলে কী আর ক্ষতি। অন্তরে আল্লাহর প্রতি একাগ্র বিশ্বাস তো রয়েছেই। রসুল স. এর এমতো মনোভাব লক্ষ্য করেই অবতীর্ণ হয়েছে আলোচ্য আয়াত। বাগবীও এরকম বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণনাটির শব্দবিন্যাস এরকম- রসুল স. ভাবলেন,
একবার তাদের কথা রক্ষা করলে দোষ কী? আমি তো অন্তরে তাদের প্রতিমাগুলোকে ঘৃণাই করি। এ রকম করলে তারা তো কোনোদিন আর হাজরে আসওয়াদ চুম্বনে বাধা সৃষ্টি করবে না। এরপর আমি তো বরাবরের মতো এগুলোকে ঘৃণা করতেই থাকবো। জুহুরী সূত্রে ইবনে আবী হাতেমও এরকম বর্ণনা
করেছেন। যোবায়ের বিন নাফীর সূত্রে ইবনে আবী হাতেম বর্ণনা করেছেন, কুরায়েশ নেতারা একবার বললো, মোহাম্মদ! আল্লাহর পক্ষ থেকে তুমি যদি আমাদেরকে পথপ্রদর্শনের জন্য প্রেরিত হয়েই থাকো, তবে তোমার নিম্নশ্রেণীর সহচরদেরকে তাড়িয়ে দাও। ক্রীতদাস শ্রেণীর লোকদেরকে দূর করে দিলেই আমাদের পক্ষে তোমার ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব। রসুল স. তাদের এ প্রস্তাবে কিছুটা আকৃষ্ট হলেন। তখন অবতীর্ণ হলো আলোচ্য আয়াত।
মোহাম্মদ বিন কা’ব কারাজী থেকে ইবনে আবী হাতেম উল্লেখ করেছেন,
রসুল স. একবার পাঠ করলেন সুরা নজম। পড়লেন ‘আফারআইতুমুল লাতা ওয়াল উয্যা’ (তোমরা কি লাত ও উয্যা সম্পর্কে ভেবে দেখেছো)। শয়তান এর সঙ্গে যোগ করলো ‘তিলকাল গারানীকুল উ’লা ওয়া ইন্না শাফাআতা হুনা লা তুরতাজা’ (ওই সকল বড় বড় প্রতিমার শাফায়াতের আশা করা যায়)। এই ঘটনার পর অবতীর্ণ হয়েছে আলোচ্য আয়াত। এরপর রসুল স. চিন্তা করতে লাগলেন, কী থেকে কী হয়ে গেলো! শয়তান কি তবে তাঁর মুখ থেকে এরকম
শিরিকসম্ভূত বাক্য উচ্চারণ করিয়ে নিলো? তখন অবতীর্ণ হলো- ‘ওয়ামা
আরসালনা মিন্ কুবলিকা মির রসূলিন ওয়ালা নাবীয়্যিন ইল্লা ইজা তামান্না’ (আমি আপনার পূর্বে যে সকল রসুল ও নবী প্রেরণ করেছি, তাদের কেউ যখন কোনো কিছু আকাঙ্খা করেছে….)।
বর্ণিত হাদিসসমূহের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আলোচ্য আয়াতের অবতরণস্থল মক্কা। কিন্তু কেউ কেউ বলেছেন, আলোচ্য আয়াতের অবতরণস্থান মদীনা। তাঁদের মতে আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এরকম-আউফির মাধ্যমে ইবনে মারদুবিয়া কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, সাক্বীফ গোত্রের লোকেরা একবার রসুল স. এর নিকটে আবেদন জানালো, আপনি আমাদেরকে এক বছরের অবকাশ দিন। লোকেরা আমাদের পূজিত প্রতিমাগুলোর নিকটে বিভিন্ন মানত করে। হাজির করে বিভিন্ন উপঢৌকন। মানতকারীরা উপঢৌকন ইত্যাদি রেখে ফিরে গেলেই আমরা ইসলাম গ্রহণ করবো। রসুল স. তাদের প্রার্থিত অবকাশ বিবেচনা করবেন বলে মনস্থ করলেন। তখন অবতীর্ণ হলো আলোচ্য আয়াত। উল্লেখ্য যে, এই বর্ণনার সূত্র-শৃঙ্খল শিথিল। তাই তা অগ্রহণীয়।



সিরাতে রাসুলুল্লাহ – ইবনে ইসহাক
ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিরাত গ্রন্থ হচ্ছে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার ইবনে খিয়ারের সিরাত গ্রন্থটি। সত্যিকার অর্থে, এই গ্রন্থটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এই গ্রন্থটি না থাকলে নবীর সম্পর্কে কোন তথ্যই হয়তো জানা সম্ভব হতো না। এই গ্রন্থটির মধ্যে খুব সরাসরি এবং পরিষ্কারভাবেই এই বিবরণটি রয়েছে [19]
এখান থেকে তোমরা কি ভেবে দেখেছ “লাত” ও “ওজ্জা” সম্পর্কে এবং তৃতীয় বস্তু “মানাত” সম্পর্কে? আল্লাহর বাণী এ পর্যন্ত এলো, তখন শয়তান, যে তাঁর [রাসুলের (সা.)] এই ধ্যান ও স্বজনদের সঙ্গে আপসের ব্যাপারটা পছন্দ করছিল না, সে করল কি, তাঁর জিহ্বায় জুড়ে দিল, এরা হলো মহান গারানিক, যার মধ্যস্থতা অনুমোদিত।
কোরাইশরা এটা শুনে খুব আহ্লাদিত হয়ে গেল , তাদের দেবদেবী সম্পর্কে এমন প্রশংসাসূচক উক্তি শুনে তারা খুব খুশি হলো এবং তারা তাঁর কথা শুনতে মনোযোগী হয়ে উঠল। বিশ্বাসীগণ কিছুই সন্দেহ করল না, তাঁদের রাসুল (সা.) আল্লাহর কাছ থেকে যা আনেন, তা-ই সত্য। তাতে কোনো ভুল-ত্রুটি কিংবা মিথ্যা কামনা থাকতেই পারে না। সুরার শেষে সেজদার জায়গায় রাসুলে করিম (সা .) সেজদা দিলেন। তারাও দিল, কারণ রাসুলে করিমকে (সা.) মান্য করা তাদের কর্তব্য। বহু – ঈশ্বরবাদী কোরাইশ এবং অন্য যারা ছিল সেখানে, তারাও সেজদা করল। কারণ, রাসুলে করিম ( সা.) তাদের দেবদেবীর নাম নিয়েছিলেন। কাজেই দেখা গেল, মসজিদের ভেতরে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সবাই সেজদায় প্রণত হলো। আল-ওয়ালিদ ইবনে আল-মুগিরা খুব বৃদ্ধ ছিলেন। তিনি নত হতে পারতেন না, কাজেই তিনি সেজদায় যেতে পারেন না। এক মুঠো ধুলো হাতে নিয়ে তাতেই মাথা ঠেকিয়েছিলেন। তারপর সবাই যে যার পথে চলে গেল। কোরাইশরা আনন্দে আটখানা। তারা বলতে লাগল, মুহাম্মদ আমাদের দেবতা সম্পর্কে যা সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি তাঁর আবৃত্তিতে বলেছেন তাদের দেবতারা হলেন গারানিক, যার মধ্যস্থতা অনুমোদিত।
আবিসিনিয়ায় রাসুলে করিমের (সা.) সাহাবিদের কানে গেল সে কথা। তাঁরা শুনলেন কোরাইশরা সব মুসলমান হয়ে গেছে। অতএব, কিছু লোক তক্ষুনি রওনা হয়ে গেছেন, কিছু থেকে গেলেন।
তখন জিবরাইল (আ.) এলেন রাসুলে করিমের (সা.) কাছে। বললেন, ‘এ কী করলে তুমি মুহাম্মদ ? তুমি তাদের কাছে এমন কথা বলেছ, যা আমি আল্লাহর কাছ থেকে আনিনি, যা আল্লাহ কোনো সময় বলেননি।
রাসূলে করিম (সা.) ভীষণ ব্যথিত হলেন, তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হলেন। তখন আল্লাহ একটি প্রত্যাদেশ পাঠালেন, কারণ আল্লাহ তাঁর প্রতি বড় সদয় ছিলেন, তাঁকে শান্তি দিতে চাইতেন। তাঁর ভার লঘু করে দিতেন। তাঁকে বলতেন, তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত নবী ও রাসুল ঠিক তাঁরই মতো ইচ্ছা করতেন, ঠিক তাঁরই মতো চাইতেন, শয়তান কেবল মাঝেমধ্যে তাঁদের সেই চাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ইচ্ছেমতো একটা কিছু ঢুকিয়ে দিত। যেমন শয়তান এবার ঢুকিয়ে দিল তাঁর জিহ্বার মধ্যে। সুতরাং, শয়তান যা ঢুকিয়েছিল, তা খারিজ করে দিলেন আল্লাহ এবং আল্লাহ তাঁর আপন আয়াত প্রতিষ্ঠা করলেন, অর্থাৎ বলে দিলেন, ‘তুমিও অন্যান্য নবী ও রাসুলের মতো একজন!’ তখন আল্লাহ নাজিল করলেন, ‘আমি তোমার আগে যেসব রাসুল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি, তারা শয়তান তাদের আবৃত্তিতে কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে, কিন্তু শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে, আল্লাহ তা বিদূরিত করেন। তারপর আল্লাহ তাঁর নিজের আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ এমন করে আল্লাহ তাঁর রাসুলের দুঃখ মোচন করলেন, সমস্ত ভয় থেকে তাঁকে মুক্ত করলেন, তাদের দেবতা সম্পর্কে যে সমস্ত শব্দ শয়তান আল্লাহর বাণীর ভেতর প্রক্ষেপ করেছিল, তা বিদূরিত করেন। তিনি নাজিল করেন, ‘তোমরা কি ভেবেছ ছেলেসন্তান তোমাদের জন্য আর মেয়েসন্তান আল্লাহর জন্য?
১. বড় আকৃতির পাখিবিশেষ। আকাশে অনেক ওপর দিয়ে উড়ে থাকে।
২. কোরআন ২২:৫২
পৃষ্ঠা ১৯৮ ● সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)
শয়তানের এই আক্ষেপ খারিজ করে যখন আল্লাহর কাছ থেকে ওহি এল, তখন কোরাইশরা বলল, আল্লাহর সঙ্গে তোমাদের দেবদেবীদের অবস্থান সম্পর্কে মুহাম্মদ আগে যা বলেছিল, তাতে এখন সে অনুতাপ করছে, সে তা বদল করে অন্য কিছু নিয়ে এসেছে। এদিকে শয়তানের দেয়া শব্দগুলো সমস্ত পৌত্তলিকদের মুখে মুখে ঘুরে ফিরছিল। এখন তারা সবাই মুসলমানদের প্রতি, রাসুলে করিমের (সা.) প্রতি মারমুখী হয়ে উঠল।
পৃষ্ঠা ১৯৯ ● সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)



তাবাকাত আল কাবীর – ইবনে সাদ
একই বিবরণ পাওয়া যায় কিতাব আল তাবাকাত আল কাবীর গ্রন্থে [20] –
The Apostle of Allah, may Allah bless him, had seen his people departing from him. He was one day sitting alone when he expressed a desire: I wish, Allah had not revealed to me anything distasteful to them. Then the Apostle of Allah, may Allah bless him, approached them (Quraysh) and got close to them, and they also came near to him. One day he was sitting in their assembly near the Ka`bah, and he recited: “By the Star when it setteth”, (Qur’an, 53:1) till he reached, “Have ye thought upon Al-Uzza and Manat, the third, the other”. (Qur’an, 53:19 20) Satan made him repeat these two phrases: These idols are high and their intercession is expected. The Apostle of Allah, may Allah bless him, repeated them, and he went on reciting the whole surah and then fell in prostration, and the people also fell in prostration with him. Al-Walid Ibn al-Mughirah, who was an old man and could not prostrate, took a handful of dust to his forehead and prostrated on it. It is said: Abu Uhayhah Sa’id Ibn al-‘As, being an old man, took dust and prostrated on it. Some people say: It was al-Walid who took the dust; others say: It was Abu Uhayhah; while others say: Both did it. They were pleased with what the Apostle of Allah, may Allah bless him, had uttered. They said: We know that Allah gives life and causes death. He creates and gives us provisions, but our deities will intercede with Him, and in what you have assigned to them, we are with you. These words pricked the Apostle of Allah, may Allah bless him. He was sitting in his house and when it was evening, Gabriel, may peace be on him, came to him and revised the surah. Then Gabriel said: Did I bring these two phrases. The Apostle of Allah, may Allah bless him, said: I ascribed to Allah, what He had not said.

আল তাবারীর ইতিহাস থেকে
এবারে আসুন দেখি, ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তাবারীর বিবরণে কী পাওয়া যায় [21] –







তাবারীর তাফসিরে গারানিক: ইতিহাসের বর্ণনা থেকে আয়াতের ব্যাখ্যা
আল-তাবারীর ইতিহাসগ্রন্থে শয়তানের আয়াতের বর্ণনা থাকার কথা আগেই দেখা হয়েছে। কিন্তু তাঁর অবস্থান বুঝতে শুধু ইতিহাসগ্রন্থের দিকে তাকালে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একই ঘটনা তিনি তাঁর বিখ্যাত তাফসির জামিউল বায়ান-এ সূরা হজ্জের ৫২ ও ৫৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যাতেও ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসগ্রন্থে কোনো বর্ণনা সংকলন করা এবং কোরআনের একটি আয়াত বোঝাতে সেই ঘটনাকে ব্যাখ্যার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাচীন মুসলিম মুফাসসিররা এই ঘটনাকে কীভাবে জানতেন এবং কোরআনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করেছিলেন। তাবারীর নিজের ব্যাখ্যা পড়লে দেখা যায়, গারানিক কাহিনি তাঁর কাছে কেবল এমন একটি গল্প ছিল না, যা তিনি অন্যের মুখে শুনে কোনো মন্তব্য ছাড়াই লিখে রেখেছেন।
সূরা হজ্জের ৫২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবারী প্রথমে আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথিত কারণ উল্লেখ করেন, তারপর মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী ও মুহাম্মদ ইবনে কায়সের সূত্রে একটি সম্পূর্ণ ঘটনাবিবরণ দেন। এতে কুরাইশদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর আকাঙ্ক্ষা, দেবীদের প্রশংসা, সম্মিলিত সিজদা, জিব্রাঈলের আপত্তি এবং হাবশার মুসলমানদের ফিরে আসা—সবগুলো বিষয় একই বর্ণনার মধ্যে রয়েছে [22]।
আরবি মূলপাঠ
قيل: إن السبب الذي من أجله أنـزلت هذه الآية على رسول الله صلى الله عليه وسلم, أن الشيطان كان ألقي على لسانه في بعض ما يتلوه مما أنـزل الله عليه من القرآن ما لم ينـزله الله عليه, فاشتدّ ذلك على رسول الله صلى الله عليه وسلم واغتمَّ به, فسلاه الله مما به من ذلك بهذه الآيات.
*ذكر من قال ذلك:حدثنا القاسم, قال: ثنا الحسين, قال: ثنا حجاج, عن أبي معشر, عن محمد بن كعب القرظي ومحمد بن قيس قالا جلس رسول الله صلى الله عليه وسلم في ناد من أندية قريش كثير أهله, فتمنى يومئذ أن لا يأتيه من الله شيء فينفروا عنه, فأنـزل الله عليه: وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى * مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى فقرأها رسول الله صلى الله عليه وسلم, حتى إذا بلغ: أَفَرَأَيْتُمُ اللاتَ وَالْعُزَّى * وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الأُخْرَى ألقى عليه الشيطان كلمتين: تلك الغرانقة العلى, وإن شفاعتهنّ لترجى, فتكلم بها.
ثم مضى فقرأ السورة كلها. فسجد في آخر السورة, وسجد القوم جميعا معه, ورفع الوليد بن المغيرة ترابا إلى جبهته فسجد عليه, وكان شيخا كبيرا لا يقدر على السجود.
فرضوا بما تكلم به وقالوا: قد عرفنا أن الله يحيي ويميت، وهو الذي يخلق ويرزق, ولكن آلهتنا هذه تشفع لنا عنده, إذ جعلت لها نصيبا, فنحن معك، قالا فلما أمسى أتاه جبرائيل عليه السلام، فعرض عليه السورة; فلما بلغ الكلمتين اللتين ألقى الشيطان عليه قال: ما جئتك بهاتين، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: افْتَرَيْتُ عَلى الله، وَقُلْتُ عَلى الله ما لَمْ يَقُلْ، فأوحى الله إليه: وَإِنْ كَادُوا لَيَفْتِنُونَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِيَ عَلَيْنَا غَيْرَهُ …
إلى قوله: ثُمَّ لا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا . فما زال مغموما مهموما حتى نـزلت عليه: ( وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ وَلا نَبِيٍّ إِلا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللَّهُ آيَاتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ). قال: فسمع من كان من المهاجرين بأرض الحبشة أن أهل مكة قد أسلموا كلهم, فرجعوا إلى عشائرهم وقالوا: هم أحبّ إلينا، فوجدوا القوم قد ارتكسوا حين نسخ الله ما ألقى الشيطان.
বাংলা অনুবাদ
বলা হয়েছে: যে কারণে এই আয়াতটি রাসূলুল্লাহর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল, তা হলো—আল্লাহ তাঁর ওপর কোরআনের যে অংশ অবতীর্ণ করেছিলেন, সেটি পাঠ করার সময় শয়তান তাঁর জিহ্বায় এমন কিছু নিক্ষেপ করেছিল, যা আল্লাহ তাঁর ওপর অবতীর্ণ করেননি। এতে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত কষ্ট পান ও দুঃখিত হন। তখন আল্লাহ এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে তাঁর সেই দুঃখের সান্ত্বনা দেন।
যাঁরা এ কথা বলেছেন, তাঁদের বর্ণনা: কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হুসাইন আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু মাশারের সূত্রে, মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী ও মুহাম্মদ ইবনে কায়স থেকে। তাঁরা দুজন বলেন: রাসূলুল্লাহ কুরাইশদের একটি জনসমাগমে বসেছিলেন, যেখানে অনেক মানুষ ছিল। সেদিন তিনি কামনা করেছিলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে এমন কিছু না আসুক, যা তাদের তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তখন আল্লাহ তাঁর ওপর অবতীর্ণ করলেন: “নক্ষত্রের শপথ, যখন তা অস্ত যায়; তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি।” রাসূলুল্লাহ তা পাঠ করতে থাকলেন। যখন তিনি “তোমরা কি লাত ও উযযা সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?” পর্যন্ত পৌঁছালেন, তখন শয়তান তাঁর ওপর দুটি বাক্য নিক্ষেপ করল: “তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তাঁদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত।” তখন তিনি সেই কথাগুলো উচ্চারণ করলেন।
এরপর তিনি এগিয়ে গিয়ে পুরো সূরাটি পাঠ করলেন। সূরার শেষে তিনি সিজদা করলেন এবং উপস্থিত সবাই তাঁর সঙ্গে সিজদা করল। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা মাটি তুলে কপালে লাগিয়ে তার ওপর সিজদা করল; কারণ সে ছিল অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং সিজদা করতে অক্ষম।
তাঁর উচ্চারিত কথায় তারা সন্তুষ্ট হলো এবং বলল: “আমরা জানি, আল্লাহ জীবন দেন ও মৃত্যু দেন, তিনিই সৃষ্টি করেন ও জীবিকা দেন। কিন্তু আমাদের এই দেবতারা তাঁর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করেন। তুমি যেহেতু তাঁদের জন্য একটি অংশ স্বীকার করেছ, তাই আমরা তোমার সঙ্গে আছি।” তাঁরা দুজন বলেন: সন্ধ্যা হলে জিব্রাঈল তাঁর কাছে এলেন। তিনি জিব্রাঈলের কাছে সূরাটি পাঠ করলেন। শয়তান তাঁর ওপর যে দুটি বাক্য নিক্ষেপ করেছিল, তিনি সেখানে পৌঁছালে জিব্রাঈল বললেন: “আমি এই দুটি বাক্য তোমার কাছে আনিনি।” তখন রাসূলুল্লাহ বললেন: “আমি আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করেছি এবং আল্লাহ যা বলেননি, তাঁর নামে তা বলেছি।” তখন আল্লাহ তাঁর কাছে ওহী পাঠালেন: “তারা তোমাকে প্রায় বিচ্যুত করেই ফেলেছিল, আমি তোমার কাছে যা ওহী করেছি তা থেকে, যাতে তুমি আমার নামে অন্য কিছু রচনা কর”—এই অংশ থেকে “তখন তুমি আমার বিরুদ্ধে কোনো সাহায্যকারী পাবে না” পর্যন্ত।
তিনি দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন অবস্থায় থাকলেন, যতক্ষণ না তাঁর ওপর অবতীর্ণ হলো: “আমি তোমার আগে এমন কোনো রাসূল বা নবী পাঠাইনি, যিনি যখনই তামান্না করেছেন, শয়তান তাঁর তামান্নায় কিছু নিক্ষেপ করেনি। অতঃপর আল্লাহ শয়তান যা নিক্ষেপ করে তা মুছে দেন; তারপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” বর্ণনাকারী বলেন: হাবশায় অবস্থানরত মুহাজিররা শুনলেন, মক্কার অধিবাসীরা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন তাঁরা নিজেদের স্বজনদের কাছে ফিরে এলেন এবং বললেন: “তারাই আমাদের কাছে অধিক প্রিয়।” কিন্তু তাঁরা এসে দেখলেন, আল্লাহ শয়তানের নিক্ষিপ্ত বিষয় মুছে দেওয়ার পর লোকেরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।
এই বর্ণনার ভাষা লক্ষ্য করা প্রয়োজন। এখানে শুধু মুশরিকরা কোনো কথা ভুল শুনেছিল—এমন বিবরণ নেই; বরং “তিনি সেই কথাগুলো উচ্চারণ করলেন” বলা হয়েছে। আবার জিব্রাঈলের আপত্তির পরে মুহাম্মদের মুখে আল্লাহর নামে এমন কথা বলার স্বীকারোক্তিও রাখা হয়েছে, যা আল্লাহ বলেননি। এগুলো তাবারীর সংকলিত এই নির্দিষ্ট বর্ণনার বক্তব্য। পরবর্তী ব্যাখ্যায় যদি উচ্চারণের দায় সম্পূর্ণ শ্রোতাদের কানে বা শয়তানের কণ্ঠে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যাখ্যা এই বর্ণনার ভাষা থেকে আলাদা। এই পার্থক্যটি আড়াল করলে পাঠক বুঝতেই পারবেন না, প্রাচীন সূত্রে আসলে কী লেখা আছে এবং পরে সেটি কীভাবে বদলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো পরের আয়াতের ব্যাখ্যা। সূরা হজ্জের ৫৩ নম্বর আয়াতে তাবারী তাঁর নিজের ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যে “তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তাঁদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত”—বাক্যটি নবীর উচ্চারিত কথার উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। তারপর কাতাদার বর্ণনা এবং অন্য ব্যাখ্যাকারদের বক্তব্য উল্লেখ করেন। আয়াতটির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো [23]।
আরবি মূলপাঠ
يقول تعالى ذكره: فينسخ الله ما يلقي الشيطان, ثُم يُحكم الله آياته, كي يجعل ما يلقي الشيطان في أمنية نبيه من الباطل, كقول النبيّ صلى الله عليه وسلم: تلك الغرانيق العلى, وإن شفاعتهن لترتجى فتنة يقول: اختبارا يختبر به الذين في قلوبهم مرض من النفاق، وذلك الشكّ في صدق رسول الله صلى الله عليه وسلم وحقيقة ما يخبرهم به.
وبنحو الذي قلنا في ذلك قال أهل التأويل.
*ذكر من قال ذلك:حدثنا ابن عبد الأعلى, قال: ثنا ابن ثور, عن معمر, عن قَتادة: أن النبيّ صلى الله عليه وسلم كان يتمنى أن لا يعيب الله آلهة المشركين, فألقى الشيطان في أمنيته, فقال: إن الآلهة التي تدعي أن شفاعتها لترتجى وإنها للغرانيق العلى. فنسخ الله ذلك, وأحكم الله آياته: أَفَرَأَيْتُمُ اللاتَ وَالْعُزَّى حتى بلغ مِنْ سُلْطَانٍ قال قتادة: لما ألقى الشيطان ما ألقى, قال المشركون: قد ذكر الله آلهتهم بخير، ففرحوا بذلك, فذكر قوله: ( لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ فِتْنَةً لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ ).
حدثنا الحسن, قال: أخبرنا عبد الرزاق, قال: أخبرنا معمر, عن قتادة, بنحوه.
حدثنا القاسم, قال: ثنا الحسين, قال: ثني حجاج, عن ابن جُرَيج, في قوله: ( لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ فِتْنَةً لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ ) يقول: وللذين قست (1) قلوبهم عن الإيمان بالله, فلا تلين ولا ترعوي, وهم المشركون بالله.
وبنحو الذي قلنا في ذلك قال أهل التأويل.
*ذكر من قال ذلك: حدثنا القاسم, قال: ثنا الحسين, قال: ثني حجاج, عن ابن جُرَيج: ( وَالْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ ) قال: المشركون.
وقوله: ( وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَفِي شِقَاقٍ بَعِيدٍ ) يقول تعالى ذكره: وإن مشركي قومك يا محمد لفي خلاف الله في أمره, بعيد من الحق.
الهوامش: (1) قوله: “وللذين قست”: عطف على مفهوم من السياق، أي للذين في قلوبهم مرض، والذين قست قلوبهم.
বাংলা অনুবাদ
মহান আল্লাহর বক্তব্যের অর্থ হলো: আল্লাহ শয়তান যা নিক্ষেপ করে তা মুছে দেন, তারপর তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন, যাতে শয়তান তাঁর নবীর তামান্নায় যে অসত্য নিক্ষেপ করে—যেমন নবীর এই কথা, “তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তাঁদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত”—সেটিকে একটি পরীক্ষা বানাতে পারেন। অর্থাৎ, এর মাধ্যমে তিনি তাদের পরীক্ষা করেন, যাদের অন্তরে মুনাফিকির রোগ রয়েছে; আর তা হলো রাসূলুল্লাহর সত্যবাদিতা এবং তিনি তাদের যা জানাচ্ছেন, তার সত্যতা সম্পর্কে সংশয়।
এই বিষয়ে আমরা যা বলেছি, ব্যাখ্যাকাররাও অনুরূপ কথা বলেছেন।
যাঁরা এ কথা বলেছেন, তাঁদের বর্ণনা: ইবনে আবদুল আ‘লা আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, ইবনে সাওর আমাদের বর্ণনা করেছেন, মামারের সূত্রে, কাতাদা থেকে: নবী কামনা করছিলেন, আল্লাহ যেন মুশরিকদের দেবতাদের নিন্দা না করেন। তখন শয়তান তাঁর তামান্নায় কিছু নিক্ষেপ করল। তিনি বললেন: “যে দেবতাদের সুপারিশ প্রত্যাশিত বলে তুমি দাবি কর, তারাই উচ্চমর্যাদার গারানিক।” তখন আল্লাহ তা মুছে দিলেন এবং তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করলেন—“তোমরা কি লাত ও উযযা সম্পর্কে ভেবে দেখেছ” থেকে “কোনো প্রমাণ” পর্যন্ত। কাতাদা বলেন: শয়তান যখন যা নিক্ষেপ করার তা নিক্ষেপ করল, মুশরিকরা বলল, “আল্লাহ তাদের দেবতাদের ভালোভাবে উল্লেখ করেছেন।” তারা এতে আনন্দিত হলো। তারপর তিনি এই বক্তব্য উল্লেখ করেন: “যাতে শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তা তাদের জন্য পরীক্ষা হয়, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে।”
হাসান আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাক আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, মামার আমাদের জানিয়েছেন, কাতাদা থেকে অনুরূপ বর্ণনা।
কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হুসাইন আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাজ্জাজ আমাকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে জুরাইজ থেকে। “যাতে শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তা তাদের জন্য পরীক্ষা হয়, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে”—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: এবং তাদের জন্যও, যাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ঈমানের ব্যাপারে কঠোর হয়ে গেছে, যা কোমল হয় না এবং বিরত হয় না। তারা হলো আল্লাহর সঙ্গে শরিককারী।
এই বিষয়ে আমরা যা বলেছি, ব্যাখ্যাকাররাও অনুরূপ কথা বলেছেন।
যাঁরা এ কথা বলেছেন, তাঁদের বর্ণনা: কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হুসাইন আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাজ্জাজ আমাকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে জুরাইজ থেকে। “যাদের হৃদয় কঠোর”—এর অর্থ তিনি বলেছেন: মুশরিকরা।
“নিশ্চয়ই যালিমরা সুদূর বিরোধিতায় রয়েছে”—এই বক্তব্যের অর্থ: হে মুহাম্মদ, তোমার জাতির মুশরিকরা আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতায় রয়েছে এবং সত্য থেকে দূরে অবস্থান করছে।
সম্পাদকের টীকা: “এবং যাদের হৃদয় কঠোর হয়েছে”—কথাটি প্রসঙ্গ থেকে বোঝা অর্থের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; অর্থাৎ, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে এবং যাদের হৃদয় কঠোর হয়েছে।
এখানে তাবারী নিজেই শয়তানের নিক্ষিপ্ত “অসত্য”-এর উদাহরণ হিসেবে নবীর গারানিক-বাক্য উল্লেখ করছেন। ফলে তাঁর তাফসিরে ঘটনাটি নিছক উদ্ধৃতির তালিকায় পড়ে নেই; সূরা হজ্জের আয়াত কী বোঝাচ্ছে, সেই ব্যাখ্যার ভেতরেও প্রবেশ করেছে। তাবারীর ইতিহাস ও তাফসিরকে পাশাপাশি পড়লে বোঝা যায়, গারানিকের বর্ণনা প্রাচীন মুসলিম ইতিহাসচর্চা ও কোরআন ব্যাখ্যা—উভয় ধারাতেই স্থান পেয়েছিল। সূরা হজ্জের আয়াতে শয়তানের হস্তক্ষেপ ও তার অপসারণের কথা কেন বলা হয়েছে, তাবারী এই ঘটনাবিবরণ দিয়েই তার ব্যাখ্যা করেছেন। ধর্মীয় বার্তার মধ্যে শয়তানের কথা প্রবেশ করার প্রশ্নটি তাই তাঁর তাফসিরের বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো আধুনিক প্রশ্ন নয়; আয়াতের ব্যাখ্যার মধ্যেই সেই সমস্যার স্বীকৃতি রয়েছে।
নবীর মুখে শয়তান আয়াত প্রক্ষিপ্ত করে?
প্রথমেই আসুন বর্তমান সময়ে প্রাপ্ত কোরআনে সূরা নজমের ১৯, ২০ এবং ২১ নম্বর আয়াতগুলো পড়ে নিই, [24] [25]
তোমরা কি লাত ও উযযা সম্পর্কে ভেবে দেখেছ?
— Taisirul Quran
তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উযযা সম্বন্ধে?
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমরা লাত ও ‘উযযা সম্পর্কে আমাকে বল’?
— Rawai Al-bayan
অতএব, তোমরা আমাকে জানাও ‘লাত’ ও ‘উযযা’ সম্পর্কে
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আর তৃতীয় আরেকটি মানাৎ সম্পর্কে? (এ সব অক্ষম, বাকশক্তিহীন, নড়া-চড়ার শক্তিহীন মূর্তিগুলোর পূজা করা কতটা যুক্তিযুক্ত)
— Taisirul Quran
এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত’ সম্বন্ধে?
— Sheikh Mujibur Rahman
আর মানাত সম্পর্কে, যা তৃতীয় আরেকটি?
— Rawai Al-bayan
এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত’ সম্পর্কে [১]?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এরপরে আরো একটি আয়াত আছে, যেখানে ঐ আয়াতে নাজিল হওয়া বিষয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলা হলো। বলা হলো, কাফেররা লাত মানাত উজ্জা নামক দেবীদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে মনে করে, আল্লাহ নিজের জন্য কন্যা সন্তান নেবেন না। সেই সময়ে পুত্র সন্তান হওয়া ছিল গৌরবের বিষয়, আর কন্যা সন্তান হওয়া ছিল লজ্জার বিষয়। আল্লাহ পাকও সেই সময়ের মানুষের মতই, খুব গর্ব করে এই আয়াতে বলছেন, আল্লাহ কী কাফেরদেরকে পুত্র সন্তান দেবেন, আর নিজের জন্য নেবেন কন্যা সন্তান? এই আয়াতটি পড়লে স্পষ্টতই বোঝা যায়, আল্লাহও কন্যা সন্তান হওয়াকে অমর্যাদাকর এবং পুত্র সন্তান হওয়াকে মর্যাদাকর বলে মনে করেন। আসুন আয়াতটি দেখি, যা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ কন্যা সন্তান আর পুত্র সন্তান হওয়ার মাঝে মর্যাদার তারতম্য করেছেন কিনা [26]
কী! তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান আর আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান?
— Taisirul Quran
তাহলে কি পুত্র-সন্তান তোমাদের জন্য এবং কন্যা-সন্তান আল্লাহর জন্য?
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমাদের জন্য কি পুত্র আর আল্লাহর জন্য কন্যা?
— Rawai Al-bayan
তবে কি তোমাদের জন্য পুত্ৰ সন্তান এবং আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
একদম একই আয়াত আবার বলা হয়েছে সূরা জুখরুফের ১৬ নম্বরে [27] –
কি!তিনি তাঁরই সৃষ্টি হতে কন্যা সন্তান গ্রহণ করেছেন আর তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন পুত্র সন্তান?
— Taisirul Quran
তিনি কি তাঁর সৃষ্টি হতে নিজের জন্য কন্যা সন্তান গ্রহণ করেছেন এবং তোমাদেরকে বিশিষ্ট করেছেন পুত্র সন্তান দ্বারা?
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি কি যা সৃষ্টি করেছেন তা থেকে কন্যা সন্তান গ্রহণ করেছেন, আর তোমাদেরকে বিশিষ্ট করেছেন পুত্র সন্তান দ্বারা?
— Rawai Al-bayan
নাকি তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা হতে কন্যা সন্তান গ্ৰহণ করেছেন এবং তোমাদেরকে বিশিষ্ট করেছেন পুত্ৰ সন্তান দ্বারা?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআনের সূরা হজ্বে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, নবী রাসুলদের ওহীর মধ্যে শয়তান কিছু বাক্য ঢুকিয়ে দিতে পারে। এরপরে বলা হয়েছে, এগুলো আসলে ইমানদারদের ইমান পরীক্ষা করার জন্য। আসুন আয়াতগুলো আগে পড়ে নিই [28] –
৫২
আমি তোমার পূর্বে যে সব রসূল কিংবা নবী পাঠিয়েছি তাদের কেউ যখনই কোন আকাঙ্ক্ষা করেছে তখনই শয়ত্বান তার আকাঙ্ক্ষায় (প্রতিবন্ধকতা, সন্দেহ-সংশয়) নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু শয়ত্বান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ তা মুছে দেন, অতঃপর আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। কারণ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রেষ্ঠ হিকমতওয়ালা।
— Taisirul Quran
আমি তোমার পূর্বে যে সব রাসূল কিংবা নাবী প্রেরণ করেছি তাদের কেহ যখনই কিছু আকাংখা করেছে তখনই শাইতান তার আকাংখায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে। কিন্তু শাইতান যা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ তা বিদূরিত করেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আমি তোমার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী পাঠিয়েছি, সে যখনই (ওহীকৃত বাণী) পাঠ করেছে, শয়তান তার পাঠে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ তা মুছে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুদৃঢ় করে দেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়।
— Rawai Al-bayan
আর আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি [১], তাদের কেউ যখনই (ওহীর কিছু) তিলাওয়াত করেছে [২], তখনই শয়তান তাদের তিলাওয়াতে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ্ তা বিদূরিত করেন [৩]। তারপর আল্লাহ্ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
৫৩
(তিনি এটা হতে দেন এজন্য) যাতে তিনি শয়ত্বান যা মিশিয়ে দিয়েছে তা দ্বারা পরীক্ষা করতে পারেন তাদেরকে যাদের অন্তরে (মুনাফিকীর) ব্যাধি আছে, যারা শক্ত হৃদয়ের। অন্যায়কারীরা চরম মতভেদে লিপ্ত আছে।
— Taisirul Quran
এটা এ জন্য যে, শাইতান যা প্রক্ষিপ্ত করে তিনি ওকে পরীক্ষা স্বরূপ করেন তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, যাদের হৃদয় পাষাণ। নিশ্চয়ই যালিমরা দুস্তর মতভেদে রয়েছে।
— Sheikh Mujibur Rahman
এটা এজন্য যে, শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তা যাতে তিনি তাদের জন্য পরীক্ষার বস্ত্ত বানিয়ে দেন, যাদের অন্তরসমূহে ব্যাধি রয়েছে এবং যাদের হৃদয়সমূহ পাষাণ। আর নিশ্চয় যালিমরা দুস্তর মতভেদে লিপ্ত রয়েছে।
— Rawai Al-bayan
এটা এ জন্য যে, শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে তিনি সেটাকে পরীক্ষাস্বরূপ করেন তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে আর যারা পাষণহৃদয় [১]। আর নিশ্চয় যালেমরা দুস্তর বিরোধিতায় লিপ্ত রয়েছে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাফসীরে জালালাইন থেকে
বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে জালালাইনে এই শয়তানের আয়াতের বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। সেখান থেকে সূরা হাজ্জ এর ৫২ এবং ৫৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর পড়ে নিই [29] –
৫২.
আমি আপনার পূর্বে যে সকল রাসূল তিনি হলেন এমন নবী যাকে তাবলীগ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কিংবা নবী যাকে তাবলীগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি প্রেরণ করেছি, তাদের কেউ যখনই কিছু আকাঙ্ক্ষা করেছে পড়েছে/ পড়তে চেয়েছে, তখনই শয়তান তার আকাঙ্ক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে। তার পাঠে যা কুরআন নয় এমন কিছু। যাতে যাদের নিকট তাকে প্রেরণ করা হয়েছে তারা আনন্দিত হয়। একদা রাসূল কুরাইশদের কোনো এক মজলিসে সূরা নাজমের أفرام اللات والعزى ومناة – RTS الثَّالِئَةَ الأخرى পাঠ করার পর শয়তানের প্রক্ষেপণে পবিত্র রসনা থেকে একথা বেরিয়ে পড়ে। تلك الْغَرَانِينُ الْعُلَى * وَإِنَّ شَفَاعَتَهُنَّ -لترتجى )এ সকল উচ্চ মর্যাদাবান দেবতা অবশ্যই এদের সুপারিশের আশা করা যায়।। এতদ শ্রবণে কাফেররা খবুই আনন্দিত হয়।
অতঃপর হযরত জিবরীল (আ.) তাঁকে এ ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন যে, শয়তান আপনার অজান্তে মুখে একথা উচ্চারিত করে দিয়েছে। ফলে তিনি খবুই বিষণ্ণ হলেন। তখন তাঁকে পরবর্তী এই আয়াত দ্বারা সান্ত্বনা প্রদান করা হয়।, যেন তিনি শান্ত হন। আল্লাহ তা বিদূরিত করেন রহিত করেন শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। সুদৃঢ় করেন। আল্লাহ তা’আলা সর্বজ্ঞ শয়তানের প্রক্ষিপ্ত বিষয়ে যা উল্লেখ করা হলো। প্রজ্ঞাময় নিজের পক্ষ থেকে শয়তানকে ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই করেন।


এবারে তাফসীরে জালালাইন থেকেই পড়ি সূরা নজমের শানে নুজুল। শানে নুজুলে আবার খুব কৌশলে শয়তানের প্ররোচনায় আয়াত নাজিলের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে [30]
নাজিল হওয়ার সময়কাল: বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ী প্রভৃতি গ্রন্থসমূহে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে- أُولُ سُورَة أُنْزِلَتْ فِيهَا سُوْرَةُ النجم সিজদার আয়াত রয়েছে এমন সূরার মধ্যে সূরা নাজমই সর্বপ্রথম
অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) হতেই এ হাদীসের যেসব অংশ ও টুকরা আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ, আবু ইসহাক ও যুহাইর ইবনে মুআবিয়ার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা হতে জানা যায় যে, এটা কুরআন মাজীদের এমন একটা সূরা যা নবী করীম কুরাইশদের একটা সাধারণ সভায় (আর ইবনে মারদুইয়ার বর্ণনানুযায়ী হেরেম শরীফে। সর্বপ্রথম পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। সভায় কাফের ও মুমিন উভয় শ্রেণির লোকই উপস্থিত ছিল। শেষের দিকে তিনি যখন সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদা করলেন, তখন উপস্থিত সমস্ত জনতাও তাঁর সঙ্গে সিজদা করল। মুশরিকদের বড় বড় সরদাররা পর্যন্ত যারা সকলের অপেক্ষা বেশি বিরোধী ছিল সেজদা না করে পারল না। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি কাফেরদের মধ্যে মাত্র একজন উমাইয়া ইবনে খালকে দেখলাম, সে সিজদা করার পরিবর্তে কিছুটা মাটি তুলে কপালে লাগিয়ে নিল এবং বলল, আমার জন্য এটাই যথেষ্ট। উত্তরকালে আমার এ চক্ষুদ্বয় এ দৃশ্যও দেখতে পেয়েছে যে, লোকটি কুফরি অবস্থায়ই নিহত হলো।
এ ঘটনার দ্বিতীয় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হচ্ছেন হযরত মুত্তালিব ইবনে আবু অদায়া। তিনি তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি।
নাসায়ী ও মুসনাদে আহমদে তাঁর নিজের দেওয়া বিবরণ উদ্ধৃত হয়েছে যে, নবী করীম হয় যখন সূরা নাজম পাঠপূর্বক সিজদা করলেন এবং উপস্থিত সমস্ত জনতাও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় চলে গেল, তখন আমি সিজদা করলাম না। বর্তমানে তার ক্ষতিপূরণ আমি এভাবে করি যে, এ সূরাটি পাঠকালে আমি কখনোই সিজদা না করে ছাড়ি না।
ইবনে সা’আদ বলেছেন, ইতঃপূর্বে নবুয়তের পঞ্চম বর্ষের রজব মাসে সাহাবায়ে কেরামের একটি ছোট দল আবিসিনিয়ার
দিকে হিজরত করেছিলেন। এ বৎসরই রমজান মাসে রাসূলে কারীম এর কুরাইশদের সাধারণ সম্মেলনে সূরা নাজম তেলাওয়াত করলেন এবং মুমিন ও কাফের সকলেই তাঁর সাথে সেজদায় পড়ে গেল। আবিসিনিয়ায় হিজরত করে যাওয়া লোকদের নিকট এ খবর পৌঁছল ভিন্ন একরূপ নিয়ে। তাতে বলা হলো যে, মক্কার কাফেররা সব মুসলমান হয়ে গেছে। এরূপ সংবাদ পেয়ে হিজরতকারীদের মধ্যে কিছুলোক নবুয়তের ৫ম বর্ষে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলেন। কিন্তু তাঁরা এখানে এসে দেখতে পেলেন, জুলুমের চাকা পূর্বানুরূপই সবকিছু নিষ্পিষ্ট করে চলছে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা পুনরায় হিজরত করে আবিসিনিয়ায় চলে যান। এ প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, এ সূরাটি নবুয়তের ৫ম বর্ষে অবতীর্ণ হয়েছিল।
সূরার ঐতিহাসিক পটভূমি: নাজিল হওয়ার সময়কাল সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা হতে যে অবস্থার মধ্যে এ সূরাটি নাজিল হয়েছিল তা জানা যায় যে, নবুয়ত লাভের পর দীর্ঘ পাঁচটি বৎসর পর্যন্ত রাসূলে কারীম কেবলমাত্র অপ্রকাশ্য মজলিসে ও বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে আল্লাহর কালাম শুনিয়ে শুনিয়ে লোকদেরকে আল্লাহর দীনের দিকে আহ্বান জানাতেছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোনো সাধারণ জনসমাবেশে কুরআন মাজীদ পড়ে শুনাবার কোনো সুযোগই তাঁর হয়নি। কাফেরদের কঠিন প্রতিরোধই ছিল তাঁর পথের প্রতিবন্ধক। রাসূলে কারীম-এর ব্যক্তিত্বে তাঁর তাবলীগী কার্যাবলি ও তৎপরতায় কি তীব্র আকর্ষণ ছিল এবং কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহে কি সাংঘাতিক রকমের প্রভাব ছিল, সে বিষয়ে তারা সবিশেষ অবহিত ছিল। এ কারণেই তারা নিজেরাও এংকালাম না শুনবার এবং অন্যরাও যাতে শুনতে না পারে সেজন্য চেষ্টা ও যত্নের কোনো ত্রুটি করত না। রাসূলে কারীম-এর বিরুদ্ধে নানা প্রকারে ভুল ধারণা প্রচার করে কেবলমাত্র নিজেদের মিথ্যা প্রচারণার বলে তাঁর এ দীনি মিশনের দাওয়াতকে অবরুদ্ধ ও দমন করে দিতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে এক দিকে তারা নানা স্থানে এ কথা রটিয়ে বেড়াচ্ছিল যে, ‘মুহাম্মদ বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং এক্ষণে অন্য লোকদের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করতে চেষ্টা করছে।’ অপরদিকে তিনি যেখানেই কুরআন শুনানোর চেষ্টা করতেন, সেখানে হট্টগোল, কোলাহল ও চিৎকার করা তাদের একটা স্থায়ী নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁকে কি কারণে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত বলা হচ্ছে, লোকেরা যাতে তা জানতে না পারে, এরূপ করার মূলে তাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
এরূপ অবস্থায় একদিন রাসূলে কারীম হেরেম শরীফের মধ্যে আকস্মিকভাবে ভাষণ দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। এখানে কুরাইশ বংশের লোকদের একটা বিরাট সমাবেশ হয়েছিল। এ সময় আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে রাসূলে কারীম
-এর মুখে ভাষণটি বিঘোষিত হয়, আর তা-ই আমাদের সামনে রয়েছে সুসূরা নাজম রূপে। এরূপ কালামের প্রভাব এত তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, তিনি যখন এটা শুনাতে শুরু করলেন, তখন তাঁর বিপরীত চিৎকার ও কোলাহল করার কোনো হুঁশ-ই বিরুদ্ধবাদীদের ছিল না। ভাষণ শেষে নবী করীম যখন সিজদায় পড়ে গেলেন, তখন তারাও সিজদায় পড়ে গেল। এটা ছিল তাদের একটা বড় দুর্বলতা, এ দুর্বলতা যখন তারা দেখে ফেলল, তখন তারা বিশেষভাবে বিব্রত হয়ে পড়ল। সাধারণ লোকেরাও তাদের এ বলে ভর্ৎসনা করতে লাগল যে, যে কালাম শুনতে তারা অন্য লোকদেরকে নিষেধ করে বেড়াচ্ছে অথচ তারা নিজেরাই সেই কালাম শুধু যে মনোযোগ সহকারে শুনছে তাই নয়; বরং হযরত মুহাম্মদ-এর সাথে তারা সিজদাও করেছে। লোকদের এ ভর্ৎসনা হতে বাঁচার জন্য তখন তারা একটা মিথ্যা কথাও বলতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, দেখুন, আমরা তো শুনতে পাচ্ছিলাম যে, মুহাম্মদ এন أَفَرَأَيْتُمُ اللَّتَ وَالْعُزَّى وَمَنُوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخرى পড়ার পর যেন পড়ছেন – كَ الْغَرَائِيقُ الْعُلَى وَإِنَّ شَفَاعْتَهُمْ لَتُرْحِى ‘এ উচ্চ সম্মানিত দেবী। আর তাদের শাফাআত পাওয়ার খুবই আশা করা যায়।’ এ কারণে আমরা মনে করেছিলাম, মুহাম্মদ আমাদের আকিদা-বিশ্বাসের পথে ফিরে এসেছে। এ কারণেই আমরা তাঁর সঙ্গে একত্র হয়ে সিজদা করতে কোনো দোষ মনে করিনি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে
এবারে তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে সূরা হাজ্জ এর ৫২, ৫৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর পড়ে নিই [31] –
সাঈদ ইব্ ইব্ন আবু হাতিম (র) বলেন, ইউনুস ইব্ন হাবীব (র) যুবাইর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা নগরীতে অবস্থান কালে একবার সূরা নাজ পাঠ করিলেন, তিনি যখন (সূরা নাজম: ১৯-২০)
أَفَرَأَيْتُمُ اللتَ وَالْعُزَّى وَمَنُوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى
পর্যন্ত পৌছিলেন, তখন শয়তান তাহার মুখ দ্বারা ইহা উচ্চারিত করাইল:
تِلْكَ الْغَرَائِيقَ الْأُولَى وَإِنَّ شَفَاعَتُهُنَّ لَتُرْجِى
মুশরিকরা ইহা শ্রবণ করিয়া বলিতে লাগিল মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে আমাদের উপাস্য কোন প্রশংসা করেন নাই, কিন্তু আজ তিনি আমাদের প্রশংসা করিয়াছেন। অতএব রাসূলুল্লাহ (সা) যখন সিজদা করিলেন তাহারা সেই সাথে সিজদা করিল। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করেনঃ
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيَّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَنُ فِي أَمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنَ ثُمَّ يُحْكُمُ اللَّهُ أَيْتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حكيم.
শু’বা (র) হইতে রিওয়ায়েতটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে
ইন্ন জরীর (র) ইহা ‘মুরসাল’। বায্যার (র) তাঁহার ‘মুসনাদ গ্রন্থে’ ইউসুফ ইবন হাম্মাদ (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (সা) মক্কায় একবার সূরা ‘নাজম’ পাঠ করিলেন এবং أفَرَأَيْتُمُ اللتَ وَالْعُزَّى الخ বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর বায্যার (র) বলেন, এই সনদ ব্যতিত অন্য কোন সনদে ইহা মুত্তাসিলরূপে বর্ণিত আছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। শুধু উমাইয়া ইব্ন খালিদ (র) ইহাকে মুত্তাসিলরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তিনি একজন প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য রাবী। তিনি কালবী (র)-এর সূত্রে আবূ সালিহ্ (র)-এর মাধ্যমে হযরত ইব্ন আব্বাস * (রা)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করিয়াছেন।
অতঃপর আবূ হাতিম (র) হাদীসটিকে আবুল আলীয়াহ ও সুদ্দী (র) হইতে মুরসালরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। অনুরূপ ইন্ন জরীর (র) মুহাম্মদ ইব্ন্ন কা’ব কুরাযী ও মুহাম্মদ ইব্ন কায়িস (র) হইতে মুরসালরূপে বর্ণনা করিয়াছেন।
কাতাদাহ (র) বলেন, নবী করীম (সা) মাকামে ইব্রাহীমের নিকট সালাত পড়িতেছিলেন, সালাতে তিনি তন্দ্রাগ্রস্থ হইলেন এবং এই সময় শয়তান তাঁহার মুখ দ্বারা وان شفاعتهن لترجى উচ্চারিত করাইল। মুশরিকরা উহা শ্রবণ করিল এবং মুখস্থ করিল। এবং ইহা প্রচার করিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখে ইহা উচ্চারিত হইয়াছে। অতঃপর এই আয়াত অবতীর্ণ হইল:
201 وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ وَلَا نَبِيِّ الخ ইব্ন শিহাব ইব্ন আবূ হাতিম (র) বলেন, মূসা ইব্ন আবূ মূসা কৃষ্ণী (র) (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূরা ‘নাজম’ যখন অবতীর্ণ হইল, তখন মুশরিকরা বলিতে লাগিল যদি এই লোকটি (মুহাম্মদ (সা)) আমাদের উপাস্যদের আলোচনা একটু ভালভাবে করিত, তবে আমরা তাঁহাকে ও তাঁহার সাথী সঙ্গীকে গ্রহন করিয়া লইতাম। কিন্তু ইয়াহুদী ও নাসারা এবং যাহারা তাহার ধর্মের বিরোধিতা করে তাহাদের সকলের তুলনায় সে আমাদের উপাস্যদের বেশী গালমন্দ বলে। রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁহার সাহাবীগণের প্রতি মুশরিকরা চরম অত্যাচার অবিচার চালাইতেছিল। এবং তাহাদের কুফর ও শিরকের কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) চরমভাবে ব্যথিত হইতে ছিলেন। এবং তাহারা হিদায়েত লাভ করুক তিনি এই কামনা করিতেছিলেন। অতঃপর ‘সূরা নাজম’ অবতীর্ণ হইল এবং তিনি
أفرأيتُمُ الله وَالْعُزَّى وَمَنْوة الثالثة الأُخْرَى أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى
পাঠ করিলেন, তখন মুশরিকদের দেব দেবতাদের উল্লেখকালে শয়তান কয়টি কথা ঢুকাইয়া দিল। এবং উচ্চারিত হইল,
وَأَنَّهُنَّ لَهُنَّ الْفَرَانِيقُ الْعُلَى وَإِنَّ شَفَاعَتْهُنَّ لَتُرْجَى
ইহা ছিল শয়তানের মুখের ছন্দবদ্ধ কালাম। কিন্তু মক্কার প্রত্যেক মুশরিকদের অন্তরে বদ্ধমূল হইল এবং প্রত্যেকে ইহা মুখস্ত করিয়া ফেলিল। তাহারা বলিতে লাগিল মুহাম্মদ (সা) তাঁহার সাবেক ধর্মে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) সূরা ‘নাজম’-এর শেষে সিজদা করিলেন, তখন তাহার নিকট উপস্থিত মুসলমাগণ ও মুশরিক সকলেই সিজদা অবনত হইল। কিন্তু অলীদ ইব্ন মুগীরা যেহেতু অত্যধিক বৃদ্ধ ছিল, এ কারণে সে সিজদা করিতে পারিল না। বরং এক মুষ্টি মাটি হাতে লইয়া উহা স্বীয় মাথায় লাগাইল। মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহিত মুশরিকদের সিজদায় অবনত হইবার কারণে আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিল। মুশরিকরা যেহেতু ইসলাম গ্রহন করেন নাই, অতএব রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সহিত সিজদা করিবার কারণে মুসলমানদের আর বিস্ময়ের শেষ ছিল না। শয়তান মুশরিকদের কানে যে কথাটি ভরিয়া দিয়াছিল। বস্তুত মু’মিনগণ একবার শুনিতে পারেন নাই। কিন্তু মুশরিকরা উহা শুনিতে পাইয়া বড়ই খুশী হইয়াছিল, শয়তান তাহাদিগকে ইহাও বলিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই কালামে সূরার সহিত পাঠ করিয়াছেন, অতএব তাহারা সকলেই তাহাদের দেবতার সন্মানার্থে সিজদায় অবনত হইল। এই কথা অন্যান্য লোকের মধ্যেও ছড়াইয়া পড়িল, এমন কি সুদূর হাবশায় পৌছিয়া গেল এবং তথায় অবস্থিত মুসলমানগণও জানিতে পারিলেন। উসমান ইব্র মাজউন (রা) ও তাঁহার সাথী সঙ্গীগণ যখন এই সংবাদ জানিতে পারিলেন যে, মক্কার মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, তাঁহারা সকলেই রাসুলুল্লাহ (সা) এর সহিত সালাত পড়িয়াছে। অলীদ ইব্ন মুগীরা হাতে মাটি উঠাইয়া মাথায় লাগাইয়াছে। তাঁহারা এই কথা জানিতে পারিল যে, মক্কার মুসলমানগণ এখন নিরাপদে। তাঁহার। বড়ই আনন্দের উৎফুল্লের সাথে মক্কা প্রত্যাবর্তন করিলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়াছিল। শয়তান হকের সহিত যাহা কিছু বাতিল মিশ্রিত করিয়াছিল আল্লাহ্ উহা দূরীভূত করিয়াছিলেন এবং স্বীয় আয়াতকে অধিকতর মযবুত করিয়াছিলেন।
ইরশাদ হইল:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيَّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى الْقَى الشَّيْطَنُ فِي أَمْنِيَّتِهِ فَيَنْسِخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللَّهُ أَيْتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ، ليَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنُ فِتْنَةً لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ والْقَاسِيَةَ قُلُوبُهُمْ وَإِنْ يَظْلِمِينَ لَفِي شِقَاقَ بَعِيدٍ .
উল্লেখিত আয়াত অবতীর্ণ হইবার পর যখন ইহা স্পষ্ট হইয়া গেল যেই ছন্দযুক্ত
কালাম আসলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কালাম নহে বরং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন পাঠের মাঝে শয়তান উহা ঢুকাইয়া দিয়াছিল। তখন মুশরিকরা আরো অধিক শক্তি লইয়া মুসলমানদের বিরোধিতা করিতে লাগিল। তাহারা মুসলমানদের সহিত আরো কঠোর আচরণ করিতে লাগিল। এই রিওয়ায়েতটি মুরসাল। ইব্ন জরীর যুহরী (র) আবু বকর ইব্ন আবদুর রহমান হারিস ইব্ন হিশাম (র) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। হাফিয আবু বকর বায়হাকী (র) ‘দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে রিওয়ায়েতটি বর্ণনা করিয়াছেন। ঘটনাটি আবু ইসহাক (র) হইতে বর্ণিত। আমি (ইবন কাসীর) বলি মুহাম্মদ ইন্ন ইসহাকও অনুরূপ রিওয়ায়েত তাঁহার সীরাত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্ত সকল রিওয়ায়েতে মুরসাল ও মুনকাতী’, আল্লামা বাগাভী (র) তাঁহার তাফসীরে সব কয়টি রিওয়ায়েতকেই হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) ও মুহাম্মদ ইব্ন কা’ব কুরাজীর কালাম হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর আল্লামা বাগাভী (র) নিজেই এই প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন যে, আল্লাহ্ নিজেই যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুহাফিয ও সংরক্ষণকারী সে ক্ষেত্রে এই রূপ ঘটনা ঘটিল কিভাবে? অতঃপর তিনি একাধিক উত্তর উদ্ধৃত্ত করিয়াছেন। কিন্তু সর্বাপেক্ষা উত্তম উত্তর হইল, প্রকৃতপক্ষে تِلْكَ الْغُرَائِيقَ الْعُلَى الخ এই কথা শয়তান উচ্চারণ করিয়া মুশরিকদের কর্ণকুহরে ঢুকাইয়া ছিল। ফলে তাহারা ধারণা করিয়াছিল যে, ইহা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখে উচ্চারিত হইয়াছে। অথচ ইহা বাস্তবের বিপরীত ছিল। বস্তুত শয়তানের পক্ষ হইতে ছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ হইতে নহে।
ঘটনাটিকে সত্য মানিয়া মুতাকাল্লীমীনগণ উল্লেখিত প্রশ্নের একাধিক উত্তর দিয়াছেন। কাযী আয়ায (র) তাঁহার ‘শিফা’ নামক গন্থে এই বিষয়ে আলোচনা করিয়াছেন।
মহান আল্লাহর বাণী: A RICOR AT الا اذا تَمَنَّى الْقَى الشَّيْطَنُ فِي أَمْنِيَّتِهِ (সা) কে সান্ত্বনা দেওয়া হইয়াছে। আপনার পূর্বে এই ঘটনা ঘটিয়াছে যখনই কোন নবী আশা আকাঙক্ষা করিয়াছেন এবং কোন কথা বলিয়াছেন, শয়তান উহার সহিত কিছু মিশ্রিত করিয়াছে। কিন্তু আল্লাহ্ শয়তানের নিক্ষিপ্ত ও মিশ্রিত বিষয়কে দূরে নিক্ষেপ করিয়াছেন। অতএব হে নবী! আপনি অস্থির হইবেন না, বিচলিত হইবেন না। ইমাম বুখারী (র) বলেন, হযরত ইব্ন আব্বাস (রা( الثَّ إِذَا تَمَنِّى أَلْقَى الشَّيْطَنُ في أمنيته এর অর্থ করিয়াছেন, যখনই কোন নবীর কথা বলিতেন শয়তান তাহার মধ্যে কোন বাতিল কথা ঢুকাইয়া দিত। কিন্ত আল্লাহ্ তাহার সেই বাতিলকে দূরীভূত করিয়া দিতেন। ثُمَّ يُحْكُمُ اللَّهِ أَيْتِهِ অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁহার আয়াত সমূহকে অধিকতর দৃঢ় করিয়া দিতেন। আলী ইব্ন আবূ তালহা (র( إِذَا تَمَنِّى أَلْقِيَ الشَّيْطَنُ فِي أُمْنِيَّتِهِ এর অর্থ করেন, যখন কোন নবী কথা বলিতেন, শয়তান তাহার কথায় কোন বাতিল ঢুকাইয়া দিত। মুজাহিদ (র) বলেন, تمنى এর قال অর্থ امنيته অর্থ قراته ও বলা হয়। আল্লামা বাগাভী (র) বলেন, অধিকাংশ মুফাসসিরগণ, আলোচ্য আয়াতের অর্থ করিয়াছেন। “যখন কোন নবী-রাসূল কিতাবুল্লাহ্ পাঠ করিয়াছেন শয়তান তাঁহার পাঠের মধ্যে অন্য কিছু মিলাইয়া দিয়াছে।”
হযরত উসমান (রা) কে হত্যা করা হইলে কবি তাঁহার প্রশংসায় বলেন: تمنى كتاب الله اول ليلة . واخرها لاقي حمام المقادر
তিনি প্রথম রাত্রে আল্লাহর কিতাব পাঠ করিলেন, কিন্তু শেষ রাত্রে তিনি নির্ধারিত মৃত্যুর সম্মুখীন হইলেন। অত্র কবিতায় ও تمنى এর অর্থ رিق লওয়া হইয়াছে। যাহ্হাক )র) বলেন, اذا تمنى এর অর্থ হইল, ذا تلا। ইব্ন জরীর (র) বলেন, কালামের ব্যাখ্যার জন্য تمنى এই অর্থ গ্রহণ করাই সর্বাপেক্ষা শ্রেয়।
মহান আল্লাহর বাণী:
فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنُ
অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা শয়তানের মিশ্রিত বিষয়কে দূরীভূত করে। ن النسخ অর্থ হইল, দূরীভূত করা, রহিত করা। আলী ইব্ন আবূ তালহা (র) ইবন আব্বাস (রা) হইতে ইহার অর্থ করিয়াছেন, অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা শয়তানের মিশ্রিত বস্তুকে বাতিল করিয়াছেন। যাহহাক (র) বলেন, জিব্রীল (আ) আল্লাহর নির্দেশে শয়তানের মিশ্রিত বস্তুকে রহিত করিয়া দিলেন এবং আল্লাহর আয়াতকে মযবুত করেন।
وَاللَّهُ عَلَيْمٍ حَكِيمٌ আল্লাহ্ তা’আলা সংঘটিত যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত, কোনই বস্তুই তাঁহার নিকট অজ্ঞাত নহে। এবং প্রত্যেক বস্তুর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে তিনি ওয়াকিফহাল এবং কোন বস্তুর সৃষ্টির রহস্যই তাঁহার অজ্ঞাত নহে। এই কারণে ইরশাদ হইয়াছে:
لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنَ فِتْنَةٌ لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ
যাহাদের অন্তরে রোগ ব্যধি আছে, সন্দেহ আছে কুফর ও শিরক আছে ও নিফাক আছে শয়তানের মিশ্রিত বস্তুকে যেন তাহাদের পরীক্ষার বস্তু বানাইতে পারেন। মুশরিকরা প্রথম যখন تلك الْفَرَائِيق বাক্যটি শ্রবণ করিয়াছিল তখন তাহারা অত্যধিক আনন্দিত হইয়াছিল এবং ইহা ধারণা করিয়া বসিয়াছিল যে বাক্যটি সত্য, আল্লাহর পক্ষ হইতে অবতারিত অথচ, উহা ছিল শয়তানের পক্ষ হইতে মিশ্রিত।
ইন জুরাইজ (র) বলেনالذينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ দ্বারা মুনাফিক বুঝান হইয়াছে। এবং وَالْقَاسِيةُ قُلُوبهمْ দ্বারা মুশরিক বুঝান হইয়াছে। মুকাতিল ইন্ন হাইয়ান (র) বলেন, ইয়াহুদী বুঝান হইয়াছে। وَإِنَّ الظَّلِمِينَ لَّفِي شَقَاق بعيد যাহারা যালিম তাহারা. হক ও সত্য হইতে বহু দূরে গুমরাহির মধ্যে নিমজ্জিত।
মহান আল্লাহর বাণী:
وَلَيَعْلَمَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَيُؤْمِنُوا بِهِ আর যাহাদিগের জ্ঞান দান করা হইয়াছে, তাহারা যেই কথা বিশ্বাস করে আপনার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে পবিত্র বস্তু মহাসত্য, অতঃপর তাহারা যেন উহার প্রতি বিশ্বাস করে।
ইরশাদ হইয়াছে: لا يَأْتِيهِ الْبَاطِلَ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ الخ উহার সম্মুখ দিয়া ও পশ্চাত দিয়া উহার নিকট বাতিল আসিতে পারে না। মহা হিম্মতওয়ালা ও প্রশংসিত সত্তার নিকট হইতে অবতারিত।
মহান আল্লাহর বাণী: فَيُؤْمِنُوا بِهِ
এর অর্থ তাহারা অধিক বিশ্বাস করিবে। نتخْبِتَ لَهُ قُلُوبُهُمْ অতঃপর তাহাদের অন্তর উহাদের প্রতি অধিক ঝুঁকিয়া পড়িবে।
আরও ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِنَّ اللَّهَ لِهَادِ الَّذِينَ آمَنُوا إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
আর অবশ্যই আল্লাহ্ মু’মিনদিগকে দুনিয়া আখিরাতে সঠিক পথে পরিচালিত করিবেন। দুনিয়ায় তাহাদিগকে সত্যপথ দেখাইবেন ও অনুসরণ করিবার এবং বাতিলের বিরোধিতা করিবার তাওফীক দিবেন। আর পরকালে বেহেশতের বিভিন্ন স্তরে পৌছাইবেন এবং জাহান্নামের আযাব হইতে দূরে রাখিবেন।






তাফসীরে মাযহারী থেকে
এবারে আসুন এই আয়াতের তাফসীরটি তাফসীরে মাজহারী থেকে পড়ি [32] –
সূরা হাজ্জঃ আয়াত ৫২
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ وَلَا نَبِي إِلَّا إِذَا تَمَنَّى الْقَى الشَّيْطَنُ فِي أُمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللهُ ايْتِهِ وَ اللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
আমি তোমার পূর্বে যে সমস্ত রসূল কিংবা নবী প্রেরণ করিয়াছি তাহারা যখনই কিছু আবৃত্তি করিয়াছে তখনই শয়তান তাহাদিগের আবৃত্তিতে কিছু প্রক্ষিপ্ত করিয়াছে, কিন্তু শয়তান যাহা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ্ তাহা বিদূরিত করেন। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁহার আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়;
আলোচ্য আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে- ‘আমি তোমার পূর্বে যে সকল রসুল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি, তারা যখনই কিছু আবৃত্তি করেছে, তখনই শয়তান তাদের আবৃত্তিতে কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে’। একথার অর্থ- হে আমার প্রিয় রসুল! চিন্তিত হবেন না। এরকম ঘটনা নতুন নয়। আপনার পূর্ববর্তী রসুলগণের ক্ষেত্রেও এরূপ ঘটেছিলো। তাঁরা যখন তাঁদের উম্মতের পথপ্রাপ্তির অত্যুগ্র আগ্রহবশতঃ আল্লাহর বাণী থেকে কোনো আয়াত পাঠ করতেন, তখন শয়তান তার সঙ্গে তার নিজস্ব কথা প্রক্ষেপ করতো। কোনো কোনো তাফসীরকার বলেছেন, এখনকার ‘ইজা তামান্না’ অর্থ যখনই আন্তরিক আকাংখা করতেন। কিন্তু কথাটির মর্মার্থ হবে এখানে ‘যখনই কিছু আবৃত্তি করতেন’ (বঙ্গানুবাদে সেকথাই লেখা হয়েছে)। উল্লেখ্য, অধিকাংশ তাফসীরবিদ বলেন, ‘তামান্না’ অর্থ পাঠ করা বা আবৃত্তি করা। আর ‘আমনিয়াতুন’ অর্থও পাঠ। যেমন হজরত ওসমানের শাহাদত বরণের পর জনৈক কবি পদ বেঁধেছিলেন-
‘আলক্বাশ্ শাইত্বনু’ অর্থ শয়তান কুমন্ত্রণা প্রক্ষেপ করেছে। অর্থাৎ নবীগণ যখন তাঁদের উম্মতের হেদায়েত প্রাপ্তির উদগ্র কামনা নিয়ে আল্লাহ্র কালাম তেলাওয়াত করেন, তখন শয়তান কর্তৃক কোনো কিছু প্রক্ষিপ্ত হয়। বায়যাবী লিখেছেন, শয়তান নবীগণের কামনার অনুকূলে অতি সূক্ষ্ম ভ্রান্তি প্রক্ষেপ করে, ফলে তাঁরা নিপতিত হন সাময়িক ভ্রান্তিতে।
এরপর বলা হয়েছে- ‘কিন্তু শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে, আল্লাহ্ তা বিদূরিত করেন’। একথার অর্থ শয়তানের কুমন্ত্রণাজাত প্রক্ষেপণকে আল্লাহতায়ালা অপসারণ করেন। নিষ্ফল করে দেন তার অপপ্রচেষ্টা। এভাবে নির্দোষ ও নিরাপদ রাখেন তাঁর প্রিয় নবীগণকে।
শেষে বলা হয়েছে- ‘অতঃপর আল্লাহ্ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন’। একথার অর্থ এভাবে নবীগণকে হেফাজতের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর বাণীকে রাখেন নিষ্কলুষ ও সুদৃঢ়। ফলে নবীগণও মুক্ত থাকেন সাময়িক ভ্রম থেকে। নির্বিঘ্ন ও নিশ্চিত থাকে তাঁদের নবীত্ব ও নিষ্পাপত্ব।
একটি চরম জটিলতাঃ অন্যান্য নবীর মতো রসুল স.ও নিষ্পাপ ছিলেন। আর ধর্মীয় নির্দেশনার মূল ভিত্তি হচ্ছে কোরআন। সুতরাং তাঁর কোরআন আবৃত্তিতে ভুল হওয়ার কথা কীভাবে মেনে নেয়া যায়? তাছাড়া এ সম্পর্কে রয়েছে আল্লাহ্পাকের সুস্পষ্ট নিরাপত্তা। যেমন ‘লা ইয়াতিহিল বাত্বিলু মিম্বাইনি ইয়াদাইহি ওয়ালা মিন খলফিহী’ (শয়তান তার কাছে আসতে পারে না, সামনে থেকেও নয়, পিছন থেকেও নয়)। তাই আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিত সম্পর্কে বর্ণিত বিবরণ উপেক্ষা করেছেন ভাষ্যকার বায়যাবী। তদুপরি তত্ত্বজ্ঞগণের দৃষ্টিতে আলোচ্য আয়াত অবতরণের পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কিত বিবরণটি (শানে নুজুল) যথার্থ নয়। কিন্তু জালালউদ্দিন সুয়্যুতি বলেন, বিবরণটি বায্যার, ইবনে মারদুবিয়া ও তিবরানী উপস্থাপন করেছেন সাঈদ ইবনে যোবায়ের সূত্রে হজরত ইবনে আব্বাস থেকে।
আমি বলি, বাযযার কর্তৃক বিবরণটি এসেছে একটি অকর্তিত সূত্রপ্রবাহের মাধ্যমে। এর অন্য কোনো সূত্রপ্রবাহ এরকম অকর্তিত নয়। আর অকর্তিত এই সূত্রপরম্পরাভূত উমাইয়া ইবনে খালেদ একজন সুপ্রসিদ্ধ ও বলিষ্ঠ বর্ণনাকারী।
ইবনে আবী হাতেম, ইবনে জারীর ও ইবনে মুনজির অপরিণতসূত্রে সাঈদ ইবনে যোবায়ের থেকে বর্ণনা করেন, রসুল স. তখন মক্কায়। অবতীর্ণ হলো সুরা আনজম। তিনি এক সমাবেশে তা আবৃত্তি করে শোনালেন। যখন পাঠ করলেন ‘আফারাআইতুমুল্ লাতা ওয়াল উ’জ্জা ওয়া মানাতা ছছালিছাতাল উখরা’, তখন শয়তান তাঁর উচ্চারণের সঙ্গে সংযুক্ত করলো ‘তিলকাল গারামীকু উ’লা ওয়া ইননা
শাফায়াতা হুন্না লা তুতাজ্বা’। মুশরিকেরা একথা শুনতে পেয়ে আনন্দিত হয়ে বললো, মোহাম্মদ ইতোপূর্বে এভাবে আমাদের উপাস্যগুলো সম্পর্কে উত্তম আলোচনা করেনি। তেলাওয়াত শেষ হলে রসুল স. আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করলেন। মুশরিকেরাও সেজদা করলো তাঁর সঙ্গে। তখন অবতীর্ণ হলো আলোচ্য আয়াত। নুহাশ এই বিবরণটিকে অকর্তিত সূত্রে সম্পৃক্ত করেছেন হজরত ইবনে আব্বাসের সঙ্গে। কিন্তু এই সূত্রপরম্পরাভূত ওয়াকেদী বর্ণনাকারীরূপে অগ্রাহ্য। আবু সালেহের মাধ্যমে কালাবী সূত্রে ইবনে মারদুবিয়াও বিবরণটিকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন হজরত ইবনে আব্বাসের সঙ্গে। কিন্তু কালাবীও অগ্রহণীয়।
বিবরণটি আরো উল্লেখ করেছেন হজরত ইবনে আব্বাস থেকে আউফী সূত্রে ইবনে জারীর, মোহাম্মদ ইবনে কা’ব থেকে মোহাম্মদ ইবনে ইসহাক, ইবনে শিহাব মাগাজী গ্রন্থে, মোহাম্মদ ইবনে কা’ব ও মোহাম্মদ ইবনে কায়েসের মাধ্যমে ইবনে জারীর এবং সুদ্দীর বরাত দিয়ে ইবনে আবী হাতেম। এসকল বিবরণের উদ্দেশ্য এক এবং এগুলোর সকল সূত্রপরম্পরাই হয় শিথিল, নয়তো কর্তিত। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে সাঈদ ইবনে যোবায়েরের মাধ্যমে বায্যার, ইবনে মারদুবিয়া ও তিবরানীর বর্ণনাটি অবশ্য অকর্তিত ও শক্তিশালী, যা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এই আলোচনার শুরুতে।
হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন, বহুসূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে অন্ততঃ এতটুকু আন্দাজ করা যায় যে, বিবরণটি অবশ্যই ভিত্তিবিবর্জিত নয়। এর মধ্যে আগেকার দু’টো অপরিণত সূত্রপরম্পরা বোখারী এবং মুসলিমের শর্তানুসারেও গ্রাহ্য। তন্মধ্যে তিবরানীর একটি সূত্র এরকমঃ ইউনুস ইবনে ইয়াজিদ ইবনে শিহাব জুহুরী হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর। তাঁর অপর একটি সূত্র এসেছে ইবনে হারেছ ইবনে হিশাম, এভাবে। এরকম আরো একটি সূত্রে তিবরানী ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ মুকীম ইবনে সুলায়মান হাম্মাদ বিন সালমান দাউদ আবুহিন্দ আবুল আলীয়া।
উল্লেখ্য, আলেমগণ বিভিন্নভাবে উদ্ভূত সন্দেহভাজনতাকে দূর করতে চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, রসুল স. তখন শয়তান কর্তৃক প্রক্ষিপ্ত বক্তব্যটি উচ্চারণ করেননি। উপস্থিত সাহাবীগণও তাঁর মুখ থেকে এরকম শোনেননি। শয়তানই তাঁর তেলাওয়াতের সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত কথাগুলো সংযোজন করে মুশরিকদের কানে পৌঁছে দিয়েছিলো। আর তারা মনে করেছিলো কথাগুলো রসুল স. এর মুখ থেকেই উচ্চারিত হয়েছে।
কাতাদা বলেছেন, ওই সময় রসুল স. ছিলেন অর্ধচেতন অবস্থায়, ওই সুযোগে শয়তান তাঁর রসনা থেকে তার কথা গুলো তাঁর অনিচ্ছাকৃত অবস্থায় বের করে
দিতে পেরেছিলো। কিন্তু পরক্ষণেই আল্লাহ্পাক তাঁর প্রিয়তম রসুলকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এক বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, আবইয়াদ (শাদা শয়তান) নামক এক শয়তান তখন এক কূটচাল চেলেছিলো, ক্ষণিকের জন্য হলেও সফলও হয়েছিলো। আর এটা ছিলো আল্লাহ্ কর্তৃক তাঁর বান্দাদের প্রতি একটি পরীক্ষাও। এতে করে কেউ কেউ যেনো এ সন্দেহ না করেন যে, কোরআনে শয়তানের প্রক্ষেপণজাত কোনো কথা নেইতো! কিন্তু এমতো সন্দেহের অপনোদন ঘটিয়েছেন আল্লাহ্ নিজে পরবর্তী বাক্যে এভাবে ‘কিন্তু শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে, আল্লাহ্ তা বিদূরিত করেন’। অর্থাৎ আল্লাহ্ শয়তানের কুমন্ত্রণাজাত এমতো সন্দেহ দূর করে দেন। প্রকাশ করে দেন যে, প্রক্ষিপ্ত কথাগুলো শয়তানের। এভাবে কোরআনের প্রকৃত বাণীকে তিনি রাখেন অমলিন, নিঃসন্দিগ্ধ ও সুপ্রতিষ্ঠিত। অতএব সম্পূর্ণ কোরআন বিশ্বাসযোগ্য। যদি না হয় তবে ‘কিন্তু শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ্ তা বিদূরিত করেন’- এই আয়াত আবার বিশ্বাসযোগ্য হবে কীভাবে? এমতো সন্দেহের প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে জ্ঞান ও প্রমাণের দাবি এই যে, আল্লাহ্পাক যখন কাউকে পয়গম্বর বানিয়ে প্রেরণ করেন, তখন দ্বীনের ভিত্তি কোরআন ও অন্যান্য কিতাব প্রচারের ক্ষেত্রেও তাঁকে ভুল-ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেন। সুতরাং একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, পয়গম্বরগণ মাসুম ও মাহফুজ (নিষ্পাপ ও সুরক্ষিত)। তাই বিশুদ্ধচিত্ত জ্ঞানীগণ তাঁদের প্রচারিত কিতাবকে সত্য বলেই জানেন। সর্বান্তকরণে মানেন, এই কিতাব অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ মহাসত্য। সন্দিগ্ধতা থেকে তাঁদের হৃদয় সতত মুক্ত ও পবিত্র।
জ্ঞাতব্যঃ কাযী আয়াজ তাঁর ‘আশৃশিফা’ গ্রন্থে লিখেছেন, আলেমগণ কোনো অকর্তিত বিশুদ্ধ বর্ণনায় এঘটনার উল্লেখ করেননি। আর কোনো অকর্তিত ও বিশুদ্ধ সূত্রেও ঘটনাটি প্রমাণিত নয়। কেবল ঐতিহাসিকগণ ও তাফসীরকারেরা তাঁদের গ্রন্থে সত্য ও অসত্য ভালোভাবে যাচাই না করে বিভিন্ন বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে সেকারণেই। কাযী আবুবকর আলা মালেকী বলেছেন, কিছুসংখ্যক প্রবৃত্তি-প্রভাবিত বেদাতী তাফসীরকারের দিকে কোনো কোনো লোক ধাবিত হয়। তাদের সামনে বর্ণনাকারীরাও হয়ে যায় অপ্রস্তুত। ফলে ছিন্ন হয়ে যায় তাদের বর্ণনাসূত্র। শব্দ ব্যবহারে ঘটে বিশৃঙ্খলা। ধর্মদ্রোহীরা আবার এসকল কথাকেই জোরে-শোরে প্রচার করে। আবার তাদের মধ্যে রয়েছে বর্ণনা বৈষম্যও। যেমন কেউ বলেছে ঘটনাটি ঘটেছিলো নামাজের মধ্যে। কেউ
বলেছে সুরা আনজম তেলাওয়াতের প্রাক্কালে। কেউ কেউ আবার বলে, রসুল স. এর অন্তরে আপনা থেকেই প্রক্ষিপ্ত কথাগুলো উদিত হয়েছিলো। পুরো ব্যাপারটি ছিলো অনবধানতাজনিত। আবার কেউ বলে, রসুল স. এর উচ্চারণের অনুকরণে
শয়তানই ওই কথাগুলো বলেছিলো। রসুল স. সে কথা শোনার সাথে সাথে বলেছিলেন, আল্লাহর শপথ। এরকম আয়াত আল্লাহ্ অবতীর্ণ করেননি। কেউ কেউ বলে, শয়তান তাঁর স. মুখ দিয়ে ওই অপবচন উচ্চারণ করিয়েছিলো। হজরত জিবরাইল একথা শুনতে পেয়ে বলেছিলেন, আমি তো এগুলো আপনাকে পাঠ করে শোনাইনি। আবার ঘটনাটি সম্পৃক্ত করা হয় কেবল তাবেয়ীগণের সঙ্গে। কোনো সাহাবীর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পৃক্তি নেই। আর বিবরণটির অধিকাংশ সূত্র শিথিল ও অযথার্থ। এর একটি সূত্রপরম্পরাই কেবল সুপরিণত স্তরে পৌঁছেছে সাঈদ ইবনে যোবায়েরের মাধ্যমে হজরত ইবনে আব্বাস পর্যন্ত। কিন্তু এই সূত্র পরম্পরাটিও সন্দেহাতীত নয় এ কারণে যে, তিনি স. তখন কোথায় ছিলেন তা স্পষ্ট নয়- কাবা গৃহের চত্বরে, কুরায়েশদের অন্য স্থানের সমাবেশে, না মিনায়।
আবু বকর বায্যার বলেছেন, আমি জানিনা এই বিষয়টির এমন কোনো অকর্তিত সূত্র রসুল স. পর্যন্ত উপনীত হয়েছে, যার বর্ণনা করা জায়েয। কিন্তু উমাইয়া ইবনে খালেদ প্রমুখ একে অপরিণতরূপে প্রত্যয়ন করেছেন কেবল সাঈদ ইবনে যোবায়েরের সঙ্গে, হজরত ইবনে আব্বাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রত্যয়িত * নয়। কেবল কালাবী আবু সালেহের বরাত দিয়ে একে হজরত ইবনে আব্বাস পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন। বায্যার আরো বলেন, এই একটি সূত্র ব্যতীত অন্য কোনো সূত্রেই এটি বর্ণনাযোগ্য নয়। আর প্রকাশ থাকে যে, কালাবীর বর্ণনা উপস্থাপন করা জায়েযই নয়। কারণ তা অত্যন্ত শিথিল ও পরিত্যাজ্য।
শেষে বলা হয়েছে, ‘এবং আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ একথার অর্থ-আল্লাহ্ যেহেতু সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়, সেহেতু তিনি একথা ভালোভাবেই জানেন যে, কে বিশুদ্ধচিত্ত ও হেদায়েত প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে এরকম নয়। তাই তিনি হেদায়েতের যোগ্যকে দান করেন হেদায়েত এবং পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্যকে করেন পথভ্রষ্ট। তাঁর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞাজাত এমতো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা রচনার অধিকার ও সাধ্য কারোরই নেই। আলোচ্য বাক্যের অর্থ এরকমও হতে পারে যে, আল্লাহ্ যে প্রত্যাদেশ তাঁর বার্তাবাহকগণের প্রতি অবতীর্ণ করেন এবং যা কিছু তিনি করতে ইচ্ছা করেন, সে সম্পর্কে তিনি অবশ্যই অবগত, কারণ তিনি সর্বজ্ঞ। আর শয়তান তাঁর অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে কোনো কিছু প্রক্ষিপ্ত করলে, তা-ও তিনি বিদূরিত ও ব্যর্থ করে দেন। এভাবেই তিনি তাঁর আদিঅন্তহীন বাণীকে করেন চির প্রতিষ্ঠিত। কারণ তাঁর প্রজ্ঞা অসীম, অনন্ত।





বিষয়টি নিয়ে লুকোছাপা
শয়তানের এই আয়াতটি নিয়ে যে মুসলিম স্কলারগণ বিব্রত ছিলেন, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় একটি হাদিস থেকে। দেখুন, একটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, ইবনু আব্বাস কোরআনের আয়াতের লাত শব্দের অর্থ বানিয়েছিলেন, একজন ব্যক্তি। দাবী করা হয়েছে, সেই ব্যক্তি যিনি হাজীদের জন্য ছাতু গুলাতো, এখানে দেবী লাত নয়- তার কথা বলা হয়েছে। অথচ, সহজেই বোঝা যায়, এখানে লাত এবং উজ্জা বলতে কী বোঝানো হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছদঃ ৬৫/৫৩/৫. আল্লাহর বাণীঃ তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উয্যা সম্বন্ধে। (সূরাহ আন্-নাজম ৫৩/১৯)
৪৮৫৯. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর বাণী اللَّاتَ وَالْعُزَّى এর ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে ‘লাত’ বলে এ ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে হাজীদের জন্য ছাতু গুলত। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৯২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ধ্রুপদী আলেমদের বক্তব্য
শুরুতেই পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামিক আলেম শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ শয়তানের আয়াত সম্পর্কে কী বলেছেন তা জেনে নিই [33] –
প্রাথমিক যুগের সালাফগণ সম্মিলিতভাবে সারসের আয়াতগুলোকে কোরআনের সাথে সম্পৃক্ত হিসেবে মেনে নিতেন। পরবর্তী সময়ে আগত আলেমদের (খালাফ) থেকে যারা প্রথম পণ্ডিতদের মতামত অনুসরণ করেছিল, তারা বলে যে এই ঐতিহাসিক বিবরণগুলো বিশুদ্ধ বর্ণনার সাথে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এগুলি অস্বীকার করা অসম্ভব এবং কোরআন নিজেই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে।
মুহাম্মদের সবচেয়ে প্রথম জীবনী, ইবনে ইসহাক এর সিরাত গ্রন্থটি অনেকাংশে হারিয়ে গেলেও তার সংগ্রহকৃত তথ্যাবলি মূলতঃ দুই উৎসে টিকে আছে। ইবনে হিশাম এবং আল-তাবারি। শয়তানের আয়াতসমূহ প্রবর্তনের এই ঘটনাটি আল-তাবারিতে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা উপরে দেয়া হয়েছে। তিনি ইবনে ইসহাক থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে ইবনে হিশামের সিরাত গ্রন্থে এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করা হয়নি। এই বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন, এই ঘটনা “কিছু মানুষকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে” বলেই এরূপ করা হয়েছে [34] –
Things which it is disgraceful to discuss; matters which would distress certain people; and such reports as I have been told are not to be accepted as trustworthy all these things have I omitted.
যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা লজ্জাজনক; যে বিষয়গুলো কিছু লোককে কষ্ট দেয়; আমাকে বলা হয়েছে এই ধরনের বিবরণগুলো বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে গ্রহণ করা হবে না, সেই সমস্ত জিনিস আমি বাদ দিয়েছি।

ইবনে হাজর: ঘটনাটির ভিত্তি স্বীকার, তারপর অভ্রান্ততার কারণে পুনর্ব্যাখ্যা
ইবনে হাজর আল-আসকালানীর ফাতহুল বারী সহীহ বুখারীর অন্যতম প্রধান ব্যাখ্যাগ্রন্থ। গারানিক কাহিনি সম্পর্কে তাঁর আলোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি ঘটনাটিকে এক কথায় “ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দেননি। বরং ইবনে আরাবী ও কাযী আয়াযের প্রত্যাখ্যানের যুক্তি পর্যালোচনা করে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন পথে বর্ণিত হওয়ার কারণে কাহিনিটির একটি ভিত্তি আছে। তাঁর সিদ্ধান্তের পরে আবার একটি ভিন্ন বিষয় আসে: নবীর অভ্রান্ততা আগে থেকেই গ্রহণ করার ফলে বর্ণনায় থাকা সরাসরি উচ্চারণের কথাটিকে তিনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন। নিচের দীর্ঘ উদ্ধৃতিতে বর্ণনার ভিত্তি এবং সেই ভিত্তি স্বীকার করার পর ধর্মতাত্ত্বিক পুনর্ব্যাখ্যা—দুটিই একসঙ্গে দেখা যাবে [35]।
আরবি মূলপাঠ
وعلى تأويل ابن عباس هذا يحمل ما جاء عن سعيد بن جبير ، وقد أخرج ابن أبي حاتم والطبري وابن المنذر من طرق عن شعبة عن أبي بشر عنه قال : ” قرأ رسول الله – صلى الله عليه وسلم – بمكة والنجم ، فلما بلغ أفرأيتم اللات والعزى ومناة الثالثة الأخرى ألقى الشيطان على لسانه : تلك الغرانيق العلى وإن شفاعتهن لترتجى ، فقال المشركون : ما ذكر آلهتنا بخير قبل اليوم ، فسجد وسجدوا ، فنزلت هذه الآية ” وأخرجه البزار وابن مردويه من طريق أمية بن خالد عن شعبة فقال في إسناده : ” عن سعيد بن جبير عن ابن عباس ” فيما أحسب ، ثم ساق الحديث ، وقال البزار : لا يروى متصلا إلا بهذا الإسناد ، تفرد بوصله أمية بن خالد وهو ثقة مشهور ، قال : وإنما يروى هذا من طريق الكلبي عن أبي صالح عن ابن عباس انتهى .
والكلبي متروك ولا يعتمد عليه ، وكذا أخرجه النحاس بسند آخر فيه الواقدي ، وذكره ابن إسحاق في السيرة مطولا وأسندها عن محمد بن كعب ، وكذلك موسى بن عقبة في المغازي عن ابن شهاب الزهري ، وكذا ذكره أبو معشر في السيرة له عن محمد بن كعب القرظي ومحمد بن قيس وأورده من طريقه الطبري ، وأورده ابن أبي حاتم من طريق أسباط عن السدي ; ورواه ابن مردويه من طريق عباد بن صهيب عن يحيى بن كثير عن الكلبي عن أبي صالح وعن أبي بكر الهذلي وأيوب عن عكرمة وسليمان التيمي عمن حدثه ثلاثتهم عن ابن عباس ، وأوردها الطبري أيضا من طريق العوفي عن ابن عباس ، ومعناهم كلهم في ذلك واحد ، وكلها سوى طريق سعيد بن جبير إما ضعيف وإلا منقطع ، لكن كثرة الطرق تدل على أن للقصة أصلا ، مع أن لها طريقين آخرين مرسلين رجالهما على شرط الصحيحين أحدهما ما أخرجه الطبري من طريق يونس بن يزيد عن ابن شهاب حدثني أبو بكر بن عبد الرحمن بن الحارث بن هشام فذكر نحوه ، والثاني ما أخرجه أيضا من طريق المعتمر بن سليمان وحماد بن سلمة فرقهما عن داود بن أبي هند عن أبي العالية ، وقد تجرأ أبو بكر بن العربي كعادته فقال : ذكر الطبري في ذلك روايات كثيرة باطلة لا أصل لها ، وهو إطلاق مردود عليه .
وكذا قول عياض هذا الحديث لم يخرجه أحد من أهل الصحة ولا رواه ثقة بسند سليم متصل مع ضعف نقلته واضطراب رواياته وانقطاع إسناده ، وكذا قوله : ومن حملت عنه هذه القصة من التابعين والمفسرين لم يسندها أحد منهم ولا رفعها إلى صاحب ، وأكثر الطرق عنهم في ذلك ضعيفة واهية ، قال وقد بين البزار أنه لا يعرف من طريق يجوز ذكره إلا طريق أبي بشر عن سعيد بن جبير مع الشك الذي وقع في وصله ، وأما الكلبي فلا تجوز الرواية عنه لقوة ضعفه .
ثم رده من طريق النظر بأن ذلك لو وقع لارتد كثير ممن أسلم ، قال : ولم ينقل ذلك انتهى ، وجميع ذلك لا يتمشى على القواعد ، فإن الطرق إذا كثرت وتباينت مخارجها دل ذلك على أن لها أصلا ، وقد ذكرت أن ثلاثة أسانيد منها على شرط الصحيح وهي مراسيل يحتج بمثلها من يحتج بالمرسل وكذا من لا يحتج به لاعتضاد بعضها ببعض ، وإذا تقرر ذلك تعين تأويل ما وقع فيها مما يستنكر وهو قوله : ” ألقى الشيطان على لسانه : تلك الغرانيق العلى وإن شفاعتهن لترتجى ” فإن ذلك لا يجوز حمله على ظاهره لأنه يستحيل عليه – صلى الله عليه وسلم – أن يزيد في القرآن عمدا ما ليس منه ، وكذا سهوا إذا كان مغايرا لما جاء به من التوحيد لمكان عصمته – وقد سلك العلماء في ذلك مسالك ، فقيل جرى ذلك على لسانه حين أصابته سنة وهو لا يشعر ، فلما علم بذلك أحكم الله آياته .
وهذا أخرجه الطبري عن قتادة ، ورده عياض بأنه لا يصح لكونه لا يجوز على النبي – صلى الله عليه وسلم – ذلك ولا ولاية للشيطان عليه في النوم ، وقيل إن الشيطان ألجأه إلى أن قال ذلك بغير اختياره ، ورده ابن العربي بقوله تعالى حكاية عن الشيطان : وما كان لي عليكم من سلطان الآية قال : فلو كان للشيطان قوة على ذلك لما بقي لأحد قوة في طاعة .
وقيل : إن المشركين كانوا إذا ذكروا آلهتهم وصفوهم بذلك ، فعلق ذلك بحفظه – صلى الله عليه وسلم – فجرى على لسانه لما ذكرهم سهوا . وقد رد ذلك عياض فأجاد . وقيل لعله قالها توبيخا للكفار ، قال عياض . وهذا جائز إذا كانت هناك قرينة تدل على المراد . ولا سيما وقد كان الكلام في ذلك الوقت في الصلاة جائزا – وإلى هذا نحا الباقلاني .
وقيل إنه لما وصل إلى قوله : ومناة الثالثة الأخرى خشي المشركون أن يأتي بعدها بشيء يذم آلهتهم به فبادروا إلى ذلك الكلام فخلطوه في تلاوة النبي – صلى الله عليه وسلم – على عادتهم في قولهم .
لا تسمعوا لهذا القرآن والغوا فيه ونسب ذلك للشيطان لكونه الحامل لهم على ذلك ، أو المراد بالشيطان شيطان الإنس ، وقيل : المراد بالغرانيق العلى الملائكة وكان الكفار يقولون : الملائكة بنات الله ويعبدونها ، فسيق ذكر الكل ليرد عليهم بقوله تعالى : ألكم الذكر وله الأنثى فلما سمعه المشركون حملوه على الجميع وقالوا : قد عظم آلهتنا ، ورضوا بذلك ، فنسخ الله تلك الكلمتين وأحكم آياته .
وقيل : كان النبي – صلى الله عليه وسلم – يرتل القرآن فارتصده الشيطان في سكتة من السكتات ونطق بتلك الكلمات محاكيا نغمته بحيث سمعه من دنا إليه فظنها من قوله وأشاعها . قال : وهذا أحسن الوجوه . ويؤيده ما تقدم في صدر الكلام عن ابن عباس من تفسير ( تمنى ) بتلا .
وكذا استحسن ابن العربي هذا التأويل وقال قبله : إن هذه الآية نص في مذهبنا في ، براءة النبي – صلى الله عليه وسلم – مما نسب إليه – قال : ومعنى قوله : في أمنيته أي في تلاوته ، فأخبر تعالى في هذه الآية أن سنته في رسله إذا قالوا قولا زاد الشيطان فيه من قبل نفسه ، فهذا نص في أن الشيطان زاده في قول النبي – صلى الله عليه وسلم – لا أن النبي – صلى الله عليه وسلم – قاله قال : وقد سبق إلى ذلك الطبري لجلالة قدره وسعة علمه وشدة ساعده في النظر فصوب على هذا المعنى وحوم عليه .
( تنبيه ) : هذه القصة وقعت بمكة قبل الهجرة اتفاقا فتمسك بذلك من قال إن سورة الحج مكية ، لكن تعقب بأن فيها أيضا ما يدل على أنها مدنية كما في حديث علي وأبي ذر في هذان خصمان فإنها نزلت في أهل بدر ، وكذا قوله أذن للذين يقاتلون الآية وبعدها الذين أخرجوا من ديارهم بغير حق فإنها نزلت في الذين هاجروا من مكة إلى المدينة فالذي يظهر أن أصلها مكي ونزل منها آيات بالمدينة ولها نظائر ، والله أعلم .
বাংলা অনুবাদ
ইবনে আব্বাসের এই ব্যাখ্যার আলোকে সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণিত কথাটি বুঝতে হবে। ইবনে আবু হাতিম, তাবারী ও ইবনুল মুনযির বিভিন্ন সূত্রে শুবার মাধ্যমে আবু বিশর থেকে, তাঁর মাধ্যমে সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ মক্কায় সূরা নাজম পাঠ করলেন। যখন তিনি ‘তোমরা কি লাত ও উযযা এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে ভেবে দেখেছ’ পর্যন্ত পৌঁছালেন, তখন শয়তান তাঁর জিহ্বায় নিক্ষেপ করল: ‘তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তাঁদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত।’ মুশরিকরা বলল: ‘আজকের আগে তিনি আমাদের দেবতাদের ভালোভাবে উল্লেখ করেননি।’ তখন তিনি সিজদা করলেন এবং তারাও সিজদা করল। এরপর এই আয়াত অবতীর্ণ হলো।” বাযযার ও ইবনে মারদাওয়াইহ উমাইয়া ইবনে খালিদের মাধ্যমে শুবা থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদে বলা হয়েছে: “সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে, ইবনে আব্বাস থেকে”—আমার ধারণামতে। তারপর তিনি হাদীসটি উল্লেখ করেন। বাযযার বলেন: “এই সনদ ছাড়া এটি সংযুক্ত সনদে বর্ণিত হয়নি। উমাইয়া ইবনে খালিদ একাই এটিকে সংযুক্ত করেছেন; তিনি প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য।” তিনি আরও বলেন: “অন্যথায় এটি কালবীর মাধ্যমে আবু সালিহ থেকে, তাঁর মাধ্যমে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়।” তাঁর বক্তব্য শেষ।
কালবী পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী; তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। নাহহাস আরেকটি সনদে এটি বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে ওয়াকিদী রয়েছেন। ইবনে ইসহাক তাঁর সীরাতে ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন এবং মুহাম্মদ ইবনে কাবের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। মূসা ইবনে উকবাও তাঁর মাগাযীতে ইবনে শিহাব আয-যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আবু মাশার তাঁর সীরাতে মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী ও মুহাম্মদ ইবনে কায়স থেকে উল্লেখ করেছেন; তাবারীও তাঁর সূত্রে সেটি এনেছেন। ইবনে আবু হাতিম আসবাতের মাধ্যমে সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে মারদাওয়াইহ আব্বাদ ইবনে সুহাইবের মাধ্যমে ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর থেকে, তাঁর মাধ্যমে কালবী থেকে আবু সালিহের সূত্রে; এবং আবু বকর আল-হুযালী ও আইয়ুবের মাধ্যমে ইকরিমা থেকে; আর সুলায়মান আত-তাইমীর মাধ্যমে তাঁর কাছে বর্ণনাকারী এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন—এই তিনজনই ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তাবারী আউফীর সূত্রেও ইবনে আব্বাস থেকে এটি এনেছেন। তাঁদের সবার বর্ণনার মূল অর্থ একই। সাঈদ ইবনে জুবাইরের সূত্র ছাড়া অন্যগুলো হয় দুর্বল, নয়তো বিচ্ছিন্ন। কিন্তু বর্ণনার পথগুলোর বহুলতা নির্দেশ করে যে, কাহিনিটির একটি ভিত্তি আছে। এর আরও দুটি মুরসাল সূত্র রয়েছে, যেগুলোর বর্ণনাকারীরা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্ত পূরণ করেন। একটি হলো তাবারীর বর্ণনা: ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ থেকে, ইবনে শিহাবের মাধ্যমে; তিনি বলেন, আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান ইবনুল হারিস ইবনে হিশাম আমাকে বর্ণনা করেছেন—তারপর তিনি অনুরূপ ঘটনা উল্লেখ করেন। দ্বিতীয়টি তাবারীরই পৃথক বর্ণনা: মু‘তামির ইবনে সুলায়মান ও হাম্মাদ ইবনে সালামার মাধ্যমে দাউদ ইবনে আবু হিন্দ থেকে, তাঁর মাধ্যমে আবুল আলিয়া থেকে। আবু বকর ইবনে আরাবী তাঁর অভ্যাসমতো সাহস করে বলেছেন: “তাবারী এ বিষয়ে বহু অসত্য বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।” তাঁর এই নির্বিচার মন্তব্য প্রত্যাখ্যাত।
কাযী আয়াযের বক্তব্যও অনুরূপ: “নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থের কোনো সংকলক এই হাদীসটি আনেননি; কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ত্রুটিমুক্ত সংযুক্ত সনদে এটি বর্ণনা করেননি। এর বর্ণনাকারীরা দুর্বল, বর্ণনাগুলোতে অসংগতি রয়েছে এবং সনদ বিচ্ছিন্ন।” তাঁর আরও বক্তব্য: “তাবেঈ ও মুফাসসিরদের যাঁদের থেকে এই কাহিনি নেওয়া হয়েছে, তাঁদের কেউ এটি কোনো সাহাবী পর্যন্ত সনদযুক্ত করেননি। তাঁদের অধিকাংশ সূত্র দুর্বল ও নাজুক।” তিনি বলেন: “বাযযার দেখিয়েছেন, আবু বিশর থেকে সাঈদ ইবনে জুবাইরের সূত্রটি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সূত্র জানা যায় না; সেখানেও সনদ সংযুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। আর কালবীর প্রবল দুর্বলতার কারণে তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করা যায় না।”
তারপর তিনি যুক্তির দিক থেকেও এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন: ঘটনা ঘটলে ইসলাম গ্রহণকারীদের অনেকেই ধর্মত্যাগ করত। তিনি বলেন, “এমন কিছু বর্ণিত হয়নি।” তাঁর বক্তব্য শেষ। কিন্তু এসব কথা নিয়মের সঙ্গে মেলে না। বর্ণনার পথগুলো বহু হলে এবং উৎস ভিন্ন হলে, তা নির্দেশ করে যে ঘটনাটির একটি ভিত্তি আছে। আমি উল্লেখ করেছি, এর তিনটি সনদ সহীহের শর্ত পূরণ করে। এগুলো মুরসাল; যাঁরা মুরসালকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন, তাঁরা এ ধরনের বর্ণনা গ্রহণ করেন। যাঁরা সাধারণভাবে মুরসাল গ্রহণ করেন না, তাঁরাও এগুলো একে অন্যকে শক্তিশালী করার কারণে গ্রহণ করেন। এটি প্রতিষ্ঠিত হলে বর্ণনার যে অংশ আপত্তিকর, সেটির ব্যাখ্যা করা আবশ্যক হয়। সেটি হলো: “শয়তান তাঁর জিহ্বায় নিক্ষেপ করল—তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তাঁদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত।” এই কথাকে তার বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করা যায় না। কারণ নবীর পক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআনে এমন কিছু বাড়ানো অসম্ভব, যা তার অংশ নয়; ভুলক্রমেও যদি তা তাঁর আনীত একত্ববাদের বিপরীত হয়, তাহলে তাঁর অভ্রান্ততার কারণে তা অসম্ভব। আলেমরা এ বিষয়ে বিভিন্ন পথ গ্রহণ করেছেন। বলা হয়েছে: তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে অজান্তে কথাটি তাঁর জিহ্বায় চলে এসেছিল। পরে বিষয়টি জানার পর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন।
তাবারী কাতাদার সূত্রে এই ব্যাখ্যাটি বর্ণনা করেছেন। আয়ায এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এই বলে যে, এটি সঠিক নয়; কারণ নবীর ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে না এবং ঘুমের মধ্যেও তাঁর ওপর শয়তানের কর্তৃত্ব নেই। বলা হয়েছে: শয়তান তাঁকে বাধ্য করেছিল, ফলে তিনি নিজের ইচ্ছার বাইরে কথাটি বলেন। ইবনে আরাবী শয়তানের বক্তব্য সম্পর্কে আল্লাহর এই আয়াতের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন: “তোমাদের ওপর আমার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না।” তিনি বলেন: “শয়তানের যদি এমন ক্ষমতা থাকত, তাহলে আনুগত্য করার ক্ষমতা কারও অবশিষ্ট থাকত না।”
বলা হয়েছে: মুশরিকরা তাদের দেবতাদের উল্লেখ করার সময় এভাবেই বর্ণনা করত। কথাটি নবীর স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছিল এবং তাদের উল্লেখ করার সময় ভুলক্রমে তাঁর জিহ্বায় চলে আসে। আয়ায এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ভালোভাবেই করেছেন। আরও বলা হয়েছে: হয়তো কাফিরদের ভর্ৎসনা করার জন্য তিনি কথাটি বলেছিলেন। আয়ায বলেন: “উদ্দেশ্য বোঝায় এমন কোনো লক্ষণ থাকলে এটি গ্রহণযোগ্য; বিশেষ করে সে সময়ে নামাযের মধ্যে কথাবার্তা বলা অনুমোদিত ছিল।” বাকিল্লানী এই ব্যাখ্যার দিকে গিয়েছেন।
আরও বলা হয়েছে: তিনি যখন “এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত” পর্যন্ত পৌঁছালেন, তখন মুশরিকরা আশঙ্কা করল, এর পরে তাদের দেবতাদের নিন্দা করা হবে। তাই তারা তাড়াতাড়ি সেই কথাটি বলে নবীর পাঠের মধ্যে মিশিয়ে দিল; তাদের সেই অভ্যাস অনুযায়ী, যার কথা এই আয়াতে আছে: “এই কোরআন শুনো না এবং এর পাঠের মধ্যে গোলমাল কর।” কথাটি শয়তানের দিকে আরোপ করা হয়েছে, কারণ সেই তাদের এ কাজে প্ররোচিত করেছিল; অথবা শয়তান বলতে মানবশয়তান বোঝানো হয়েছে। আবার বলা হয়েছে: উচ্চমর্যাদার গারানিক বলতে ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছিল। কাফিররা বলত, ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা এবং তারা তাঁদের উপাসনা করত। তাই সবগুলোর উল্লেখ করা হয়েছিল, যেন এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের জবাব দেওয়া যায়: “তোমাদের জন্য পুত্রসন্তান, আর তাঁর জন্য কন্যাসন্তান?” কিন্তু মুশরিকরা কথাটি শুনে সবার জন্য প্রযোজ্য ধরে নিল এবং বলল: “তিনি আমাদের দেবতাদের মর্যাদা দিয়েছেন।” তারা এতে সন্তুষ্ট হলো। তখন আল্লাহ সেই দুটি বাক্য মুছে দিলেন এবং তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করলেন।
আরও বলা হয়েছে: নবী ধীরে ধীরে কোরআন পাঠ করছিলেন। শয়তান তাঁর কোনো একটি বিরতির সুযোগের অপেক্ষায় থাকল এবং তাঁর কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে সেই বাক্যগুলো উচ্চারণ করল। তাঁর কাছাকাছি থাকা লোকেরা তা শুনে তাঁর কথা মনে করল এবং প্রচার করল। তিনি বলেন: “ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভালো।” আলোচনার শুরুতে ইবনে আব্বাসের সূত্রে “তামান্না”-র অর্থ পাঠ করা হিসেবে যে ব্যাখ্যা এসেছে, তা এই মতকে সমর্থন করে।
ইবনে আরাবীও এই ব্যাখ্যা পছন্দ করেছেন। এর আগে তিনি বলেছেন: “এই আয়াত আমাদের মতের স্পষ্ট প্রমাণ—নবীর প্রতি যা আরোপ করা হয়েছে, তিনি তা থেকে মুক্ত।” তিনি বলেন: “‘তাঁর উমনিয়্যায়’-এর অর্থ তাঁর পাঠে। এই আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁর রাসূলদের ব্যাপারে তাঁর নিয়ম হলো: তাঁরা কোনো কথা বললে শয়তান নিজের পক্ষ থেকে তাতে কিছু যোগ করে। এটি স্পষ্ট প্রমাণ যে, শয়তান নবীর কথার মধ্যে তা বাড়িয়েছে; নবী নিজে তা বলেননি।” তিনি আরও বলেন: “তাবারী তাঁর উচ্চ মর্যাদা, বিস্তৃত জ্ঞান ও বিচারক্ষমতার দৃঢ়তার কারণে আগেই এই অর্থের দিকে গিয়েছেন এবং এর চারপাশেই তাঁর ব্যাখ্যা আবর্তিত হয়েছে।”
সতর্কীকরণ: এই ঘটনা মক্কায় হিজরতের আগে ঘটেছে—এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। যাঁরা সূরা হজ্জকে মক্কায় অবতীর্ণ বলেন, তাঁরা এটিকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আপত্তি করা হয়েছে যে, সূরাটিতে এমন অংশও রয়েছে, যা মদীনায় অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ করে; যেমন “এই দুই পক্ষ প্রতিপালক সম্পর্কে বিরোধ করেছে”—এই আয়াত বিষয়ে আলী ও আবু যরের হাদীস। এটি বদরের যোদ্ধাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে “যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদের অনুমতি দেওয়া হলো” এবং পরের আয়াত “যাদের অন্যায়ভাবে নিজেদের ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে”—এগুলো মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকারীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং যা প্রতীয়মান হয়, তা হলো: সূরাটির মূল অংশ মক্কায় অবতীর্ণ এবং এর কিছু আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর আরও উদাহরণ রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
এই আলোচনায় ইবনে হাজরের দুটি সিদ্ধান্ত আলাদা করে দেখা দরকার। প্রথমত, “ঘটনার কোনো ভিত্তি নেই”—এই নির্বিচার প্রত্যাখ্যান তিনি মানেননি। দ্বিতীয়ত, সেই ভিত্তি স্বীকার করার পরও তিনি মুহাম্মদের মুখে দেবীদের প্রশংসার বাক্য উচ্চারিত হওয়ার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেননি। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে তিনি নবীর অভ্রান্ততার বিশ্বাস উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, তাঁর ব্যাখ্যায় আগে থেকেই স্থির করা হয়েছে, নবী একত্ববাদের বিপরীত কোনো কথা কোরআনের অংশ হিসেবে বলতে পারেন না; তারপর বর্ণনাটিকে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে অর্থ দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস যাচাইয়ের জায়গায় এই পদ্ধতিটিই প্রশ্নের বিষয়। নবী ভুল করতে পারেন না—এই বিশ্বাসকে আগে থেকেই সত্য ধরে নিলে, নবীর ভুলের বর্ণনা যাচাই করার স্বাধীনতা শুরুতেই সংকুচিত হয়ে যায়।
তাঁর উল্লেখ করা বিকল্পগুলোর সংখ্যাও তাৎপর্যপূর্ণ: তন্দ্রা, অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ, স্মৃতিতে থেকে যাওয়া পৌত্তলিক বাক্য, কাফিরদের ভর্ৎসনা, মুশরিকদের কণ্ঠ, মানবশয়তান, ফেরেশতাদের উল্লেখ কিংবা নবীর কণ্ঠস্বরের অনুকরণ। এগুলো একই বিবরণের সমার্থক পুনরুক্তি নয়; কে বলেছিল, কীভাবে বলা হয়েছিল এবং শ্রোতারা কী শুনেছিল—এই প্রশ্নগুলোর ভিন্ন ভিন্ন উত্তর। বর্ণনাটি স্বীকার করার পর তার ধর্মতাত্ত্বিক অস্বস্তি দূর করতে কতগুলো ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছিল, এই দীর্ঘ আলোচনা তার সরাসরি দলিল। “ইবনে হাজর পুরো ঘটনাকে ভিত্তিহীন বলেছেন”—এমন দাবি তাঁর নিজের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না; আবার “তিনি নবীর মুখে উচ্চারণের প্রতিটি বিবরণ আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করেছেন”—এ কথাও তাঁর লেখা থেকে বলা যায় না। তাঁর প্রকৃত অবস্থান বুঝতে পুরো যুক্তিটিই পড়তে হবে।
ইবনে তাইমিয়্যা: শয়তানের সংযোজন মেনে নিয়েও অভ্রান্ততা রক্ষার যুক্তি
ইবনে তাইমিয়্যার আলোচনায় প্রশ্নটি আরও সরাসরি হয়ে ওঠে। তিনি অভ্রান্ততার অর্থ শুধু “কোনো ভুলই ঘটবে না” হিসেবে স্থির করেননি; বরং ওহী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভুল শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে না—এই অর্থ সামনে এনেছেন। এই পার্থক্য ধরেই তিনি গারানিকের বর্ণনা এবং সূরা হজ্জের আয়াতের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। এতে শয়তানের নিক্ষিপ্ত কথা সাময়িকভাবে মানুষের সামনে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা হয় না; বরং পরে আল্লাহ তা সরিয়ে দিয়েছেন—এই দাবির মাধ্যমে নবুয়তের নির্ভরযোগ্যতা রক্ষা করা হয়। মাজমূউল ফাতাওয়া-তে অভ্রান্ততার আলোচনা থেকে গারানিকের যুক্তির শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ অংশটি নিচে দেওয়া হলো [36]। একই মূল বক্তব্যের দীর্ঘ প্রতিলিপি ইসলামকিউএ-র ১০৩৩০৪ নম্বর আলোচনাতেও রয়েছে [37]।
আরবি মূলপাঠ
وهذه العصمة الثابتة للأنبياء هي التي يحصل بها مقصود النبوة والرسالة، فإن النبي هو المنبئ عن الله، والرسول هو الذي أرسله الله تعالى، وكل رسول نبي، وليس كل نبي رسولا، والعصمة فيما يبلغونه عن الله ثابتة، فلا يستقر في ذلك خطأ باتفاق المسلمين.
ولكن هل يصدر ما يستدركه الله، فينسخ ما يلقي الشيطان، ويحكم الله آياته؟ هذا فيه قولان، والمأثور عن السلف يوافق القرآن بذلك، والذين منعوا ذلك من المتأخرين طعنوا فيما ينقل من الزيادة في سورة النجم بقوله: (تلك الغرانيق العلى، وإن شفاعتهن لترتجى) وقالوا: إن هذا لم يثبت، ومن علم أنه ثبت قال: هذا ألقاه الشيطان في مسامعهم ولم يلفظ به الرسول صلى الله عليه وسلم، ولكن السؤال وارد على هذا التقدير أيضا، وقالوا في قوله: (إلا إذا تمنى ألقى الشيطان في أمنيته) هو حديث النفس.
وأما الذين قرروا ما نقل عن السلف، فقالوا: هذا منقول نقلا ثابتا لا يمكن القدح فيه، والقرآن يدل عليه بقوله: (وما أرسلنا من قبلك من رسول ولا نبي إلا إذا تمنى ألقى الشيطان في أمنيته فينسخ الله ما يلقي الشيطان ثم يحكم الله آياته والله عليم حكيم. ليجعل ما يلقي الشيطان فتنة للذين في قلوبهم مرض والقاسية قلوبهم وإن الظالمين لفي شقاق بعيد. وليعلم الذين أوتوا العلم أنه الحق من ربك فيؤمنوا به فتخبت له قلوبهم وإن الله لهاد الذين آمنوا إلى صراط مستقيم) [الحج: 52–54]، فقالوا: الآثار في تفسير هذه الآية معروفة ثابتة في كتب التفسير والحديث، والقرآن يوافق ذلك، فإن نسخ الله لما يلقي الشيطان، وإحكامه آياته، إنما يكون لرفع ما وقع في آياته، وتمييز الحق من الباطل، حتى لا تختلط آياته بغيرها. وجعل ما ألقى الشيطان فتنة للذين في قلوبهم مرض، والقاسية قلوبهم، إنما يكون إذا كان ذلك ظاهرا يسمعه الناس، لا باطنا في النفس. والفتنة التي تحصل بهذا النوع من النسخ من جنس الفتنة التي تحصل بالنوع الآخر من النسخ.
وهذا النوع أدل على صدق الرسول صلى الله عليه وسلم، وبعده عن الهوى من ذلك النوع، فإنه إذا كان يأمر بأمر ثم يأمر بخلافه وكلاهما من عند الله، وهو مصدق في ذلك، فإذا قال عن نفسه إن الثاني هو الذي من عند الله، وهو الناسخ، وإن ذلك المرفوع الذي نسخه الله، ليس كذلك كان أدل على اعتماده للصدق، وقوله الحق، وهذا كما قالت عائشة رضي الله عنها: لو كان محمد كاتما شيئا من الوحي لكتم هذه الآية: (وتخفي في نفسك ما الله مبديه وتخشى الناس والله أحق أن تخشاه) [الأحزاب: 37]، ألا ترى أن الذي يعظم نفسه بالباطل يريد أن ينصر كل ما قاله، ولو كان خطأ، فبيان الرسول صلى الله عليه وسلم أن الله أحكم آياته، ونسخ ما ألقاه الشيطان، هو أدل على تحريه للصدق وبراءته من الكذب، وهذا هو المقصود بالرسالة فإنه الصادق المصدوق صلى الله عليه وسلم تسليما؛ ولهذا كان تكذيبه كفرا محضا بلا ريب.
বাংলা অনুবাদ
নবীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই অভ্রান্ততার মাধ্যমেই নবুয়ত ও রিসালাতের উদ্দেশ্য পূরণ হয়। কারণ নবী হলেন যিনি আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দেন; আর রাসূল হলেন যাঁকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক রাসূল নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁরা যা পৌঁছে দেন, সে বিষয়ে অভ্রান্ততা প্রতিষ্ঠিত। তাই মুসলমানদের ঐকমত্য অনুযায়ী, সেখানে কোনো ভুল স্থায়ীভাবে বহাল থাকে না।
কিন্তু এমন কিছু কি তাঁদের থেকে প্রকাশ পেতে পারে, যা আল্লাহ পরে সংশোধন করেন—অর্থাৎ, শয়তান যা নিক্ষেপ করে তা মুছে দেন এবং নিজের আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন? এ বিষয়ে দুটি মত আছে। পূর্ববর্তী আলেমদের থেকে বর্ণিত মত এ বিষয়ে কোরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরবর্তী আলেমদের মধ্যে যাঁরা এটি অস্বীকার করেছেন, তাঁরা সূরা নাজমে বাড়তি হিসেবে বর্ণিত “তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তাঁদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত”—এই কথার বর্ণনায় আপত্তি করেছেন এবং বলেছেন: এটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যাঁরা জানতেন যে এটি প্রতিষ্ঠিত, তাঁরা বলেছেন: শয়তান কথাটি তাদের কানে নিক্ষেপ করেছিল; রাসূল নিজে তা উচ্চারণ করেননি। কিন্তু এই ব্যাখ্যাতেও প্রশ্নটি থেকে যায়। তাঁরা “যখনই তিনি তামান্না করেন, শয়তান তাঁর তামান্নায় কিছু নিক্ষেপ করে”—এর অর্থ বলেছেন: মনের মধ্যে কথোপকথন।
আর যাঁরা পূর্ববর্তী আলেমদের থেকে বর্ণিত বক্তব্য গ্রহণ করেছেন, তাঁরা বলেছেন: এটি প্রতিষ্ঠিত বর্ণনায় এসেছে; এতে আপত্তি করা যায় না। কোরআনও এই কথার নির্দেশ করে: “আমি তোমার আগে এমন কোনো রাসূল বা নবী পাঠাইনি, যিনি যখনই তামান্না করেছেন, শয়তান তাঁর তামান্নায় কিছু নিক্ষেপ করেনি। অতঃপর আল্লাহ শয়তান যা নিক্ষেপ করে তা মুছে দেন; তারপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যাতে শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তা তাদের জন্য পরীক্ষা হয়, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে এবং যাদের হৃদয় কঠোর। নিশ্চয়ই যালিমরা সুদূর বিরোধিতায় রয়েছে। আর যাতে যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তারা জানতে পারে যে এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্য; ফলে তারা এতে বিশ্বাস করে এবং তাদের অন্তর এর প্রতি বিনত হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাসীদের সোজা পথে পরিচালিত করেন।” তাঁরা বলেন: এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণিত বিবরণগুলো তাফসির ও হাদীসের গ্রন্থসমূহে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত; কোরআনও এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ শয়তানের নিক্ষিপ্ত বিষয় আল্লাহর মুছে দেওয়া এবং তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করা—এর অর্থই হলো আয়াতের মধ্যে যা ঢুকেছে তা সরিয়ে দেওয়া এবং সত্যকে অসত্য থেকে পৃথক করা, যাতে তাঁর আয়াতের সঙ্গে অন্য কিছু মিশে না থাকে। শয়তান যা নিক্ষেপ করেছে, তা অন্তরে রোগ থাকা ও কঠোর হৃদয়ের লোকদের জন্য পরীক্ষা হওয়ার বিষয়টি তখনই সম্ভব, যখন তা প্রকাশ্য হয় এবং মানুষ তা শুনতে পায়; শুধু মনের ভেতরে গোপন থাকলে নয়। এই ধরনের রহিতকরণ থেকে যে পরীক্ষা সৃষ্টি হয়, তা অন্য ধরনের রহিতকরণ থেকে সৃষ্টি হওয়া পরীক্ষারই অনুরূপ।
এ ধরনের রহিতকরণ রাসূলের সত্যবাদিতা এবং প্রবৃত্তি থেকে তাঁর দূরত্বের আরও বেশি প্রমাণ বহন করে। কারণ তিনি যখন কোনো নির্দেশ দেন এবং পরে তার বিপরীত নির্দেশ দেন, আর দুটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে জানান, তখন তাঁকে সে বিষয়ে সত্যবাদী বলে মানা হয়। কিন্তু তিনি নিজের সম্পর্কে যখন বলেন যে দ্বিতীয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং সেটিই রহিতকারী, আর আল্লাহ যে আগের বিষয়টি তুলে দিয়েছেন, সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল না—তখন এটি তাঁর সত্যের ওপর নির্ভর করা ও সত্য বলার আরও বেশি প্রমাণ হয়। এটি আয়েশার বক্তব্যের মতো: “মুহাম্মদ যদি ওহীর কোনো কিছু গোপন করতেন, তাহলে এই আয়াতটি গোপন করতেন: ‘তুমি নিজের মনে এমন কিছু গোপন করছ, যা আল্লাহ প্রকাশ করবেন; তুমি মানুষকে ভয় করছ, অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিক উপযুক্ত।’” তুমি কি দেখছ না, যে ব্যক্তি অসত্যের মাধ্যমে নিজেকে বড় করতে চায়, সে তার বলা সব কথা সমর্থন করতে চায়, এমনকি তা ভুল হলেও? সুতরাং রাসূলের এই ব্যাখ্যা যে আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেছেন এবং শয়তানের নিক্ষিপ্ত বিষয় মুছে দিয়েছেন, তা তাঁর সত্য অনুসন্ধান এবং মিথ্যা থেকে মুক্ত থাকার আরও বেশি প্রমাণ। রিসালাতের উদ্দেশ্য এটাই; কারণ তিনি সত্যবাদী এবং যাঁকে সত্য সংবাদ দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা নিঃসন্দেহে খাঁটি কুফর।
এই বক্তব্যে ইবনে তাইমিয়্যা প্রকাশ্য উচ্চারণ এবং শুধু মনের ভেতরে কোনো চিন্তা আসার মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন। তাঁর উল্লেখ করা যুক্তি অনুযায়ী, বিষয়টি মানুষের জন্য পরীক্ষা হতে হলে মানুষ সেটি শুনবে; মনের গোপন চিন্তা হলে সেই জনসমক্ষে পরীক্ষা সৃষ্টি হবে না। এখানেই “শয়তান শুধু মনে কিছু ঢুকিয়েছিল, বাইরে কিছু ঘটেনি”—এই ব্যাখ্যা সমস্যায় পড়ে। আবার তিনি ভুল সংশোধনকে সত্যবাদিতার প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু একজন মানুষের সংশোধিত বক্তব্য এবং সর্বজ্ঞ সত্তার কাছ থেকে আসা অভ্রান্ত বার্তার দাবি একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। একজন মানুষ ভুল স্বীকার করলে তার সততার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে; তাতে সে আগে যে বক্তব্য দিয়েছিল, সেটি অলৌকিকভাবে সুরক্ষিত ছিল—এ কথা প্রমাণিত হয় না।
একই অবস্থান তাঁর মিনহাজুস সুন্নাহ-তেও আরও স্পষ্ট ভাষায় পাওয়া যায়। সেখানে তিনি গারানিক-বাক্য নবীর জিহ্বায় উচ্চারিত হওয়ার কথাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমদের মধ্যে প্রচলিত মত হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর তিনি বোঝান, তাঁর মতে অভ্রান্ততার অর্থ হলো বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুলকে বহাল থাকতে না দেওয়া। সংশ্লিষ্ট যুক্তির ধারাবাহিক অংশটি নিচে দেওয়া হলো [38]।
আরবি মূলপাঠ
وما جرى في سورة ” النجم ” من قوله : تلك الغرانيق العلى ، وإن شفاعتها لترتجى ، على المشهور عند السلف والخلف من أن ذلك جرى على لسانه ، ثم نسخه الله وأبطله ، هو من أعظم المفتريات على قول هؤلاء ، ولهذا كان كثير من الناس يكذب هذا وإن كان مجوزا عليهم غيره : إما قبل النبوة وإما بعدها ، لظنه أن في ذلك خطأ في التبليغ ، وهو معصوم في التبليغ بالاتفاق .
والعصمة المتفق عليها أنه لا يقر على خطأ في التبليغ بالإجماع ، ومن هذا فلم يعلم أحد من المشركين نفر برجوعه عن هذا ، وقوله : إن هذا مما ألقاه الشيطان ، ولكن روى أنهم نفروا لما رجع إلى ذم آلهتهم بعد ظنهم أنه مدحها ، فكان رجوعهم لدوامه على ذمها ، لا لأنه قال شيئا ثم قال : إن الشيطان ألقاه . وإذا كان هذا لم ينفر فغيره أولى أن لا ينفر .
وأيضا ، فقد ثبت أن النسخ نفر طائفة كما قال : ( سيقول السفهاء من الناس ما ولاهم عن قبلتهم التي كانوا عليها ) [ سورة البقرة : 142 ] ، وقوله : ( وإذا بدلنا آية مكان آية والله أعلم بما ينزل قالوا إنما أنت مفتر بل أكثرهم لا يعلمون قل نزله روح القدس من ربك بالحق ليثبت الذين آمنوا ) [ سورة النحل : 101 – 102 ] ، فالتبديل الذي صرحوا بأنه منفر ونفروا به عنه لم يكن مما يجب نفيه عنه ، فكيف بالرجوع إلى الحق الذي لم يعلم أنهم نفروا منه ، وهو أقل تنفيرا ؟ ! لأن النسخ فيه رجوع عن الحق إلى حق ، وهذا رجوع إلى حق من غير حق .
ومعلوم أن الإنسان يحمد على ترك الباطل إلى الحق ما لا يحمد على ترك ما لم يزل يقول إنه حق . . وإذا كان جائزا فهذا أولى ، وإذا كان في ذلك مصلحة ففي هذا أيضا مصالح عظيمة ، ولولا أن فيها وفي العلم بها مصالح لعباده لم يقصها في غير موضع من كتابه .
وهو سبحانه – وله الحمد – لم يذكر عن نبي من الأنبياء ذنبا إلا ذكر معه توبته لينزهه عن النقص والعيب ، ويبين أنه ارتفعت منزلته وعظمت درجته وعظمت حسناته وقربه إليه بما أنعم الله عليه من التوبة والاستغفار والأعمال الصالحة التي فعلها بعد ذلك ، وليكون ذلك أسوة لمن يتبع الأنبياء ويقتدي بهم إلى يوم القيامة .
বাংলা অনুবাদ
সূরা নাজমে তাঁর এই কথা নিয়ে যা ঘটেছিল—“তাঁরাই উচ্চমর্যাদার গারানিক, আর তার সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত”—পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমদের মধ্যে প্রচলিত মত অনুসারে কথাটি তাঁর জিহ্বায় উচ্চারিত হয়েছিল; তারপর আল্লাহ তা রহিত ও বাতিল করেন। এঁদের মত অনুযায়ী এটি সবচেয়ে বড় মিথ্যা আরোপগুলোর একটি। এ কারণেই বহু মানুষ এই ঘটনাকে অস্বীকার করে, যদিও তারা নবীদের ক্ষেত্রে অন্য কিছু ঘটার সম্ভাবনা মেনে নেয়—নবুয়তের আগে হোক কিংবা পরে। কারণ তারা মনে করে, এতে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল ঘটেছে; আর এ ক্ষেত্রে তিনি সবার ঐকমত্য অনুযায়ী অভ্রান্ত।
কিন্তু যে অভ্রান্ততার বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, তা হলো: বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে ভুলের ওপর বহাল রাখা হয় না। এই ঘটনায়ও জানা যায় না যে, কোনো মুশরিক তাঁর সেই বক্তব্য থেকে ফিরে আসা এবং “এটি শয়তানের নিক্ষিপ্ত কথা” বলার কারণে তাঁর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। বরং বর্ণিত হয়েছে, তারা দূরে সরে গিয়েছিল যখন তিনি আবার তাদের দেবতাদের নিন্দা করতে শুরু করেন—যদিও আগে তারা ভেবেছিল, তিনি তাদের প্রশংসা করেছেন। সুতরাং তাদের ফিরে যাওয়ার কারণ ছিল তাদের দেবতাদের নিন্দায় তাঁর অবিচল থাকা; তিনি কোনো কথা বলার পর সেটিকে শয়তানের নিক্ষিপ্ত কথা বলেছেন—এটি কারণ ছিল না। এটি যদি মানুষকে দূরে না সরিয়ে থাকে, তাহলে অন্য বিষয় আরও কম দূরে সরাবে।
আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রহিতকরণের কারণে একদল মানুষ দূরে সরে গিয়েছিল। যেমন বলা হয়েছে: “মানুষের মধ্যে নির্বোধরা বলবে, যে কিবলার দিকে তারা ছিল, তা থেকে কী তাদের ফিরিয়ে দিল?” এবং: “আমি যখন একটি আয়াতের জায়গায় আরেকটি আয়াত স্থাপন করি—আল্লাহ ভালো জানেন তিনি কী অবতীর্ণ করেন—তখন তারা বলে: তুমি তো মিথ্যা রচনাকারী। বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। বলো: রূহুল কুদুস তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ তা অবতীর্ণ করেছেন, যাতে বিশ্বাসীদের দৃঢ় করেন।” যে পরিবর্তনকে তারা মানুষকে দূরে সরানোর কারণ বলেছিল এবং যার কারণে দূরে সরেছিল, সেটিও তাঁর ক্ষেত্রে অস্বীকার করা আবশ্যক হয়নি। তাহলে সত্যের দিকে ফিরে আসা, যার কারণে তারা দূরে সরে গিয়েছিল বলে জানা যায় না, কীভাবে অস্বীকার করতে হবে? এতে তো দূরে সরে যাওয়ার কারণ আরও কম। কারণ রহিতকরণে এক সত্য থেকে আরেক সত্যে ফিরে আসা হয়; আর এখানে সত্য নয় এমন বিষয় থেকে সত্যের দিকে ফিরে আসা হয়।
জানা কথা হলো, অসত্য ছেড়ে সত্যের দিকে ফিরে আসার জন্য মানুষ যে প্রশংসা পায়, কোনো বিষয়কে বরাবর সত্য বলে আসার পর তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য সেই প্রশংসা পায় না। যদি পরেরটি সম্ভব হয়, তাহলে প্রথমটি আরও বেশি সম্ভব। পরেরটিতে যদি কল্যাণ থাকে, তাহলে এতেও বহু বড় কল্যাণ রয়েছে। এসব ঘটনা এবং এসব সম্পর্কে জানার মধ্যে তাঁর বান্দাদের জন্য কল্যাণ না থাকলে, তিনি নিজের কিতাবের বিভিন্ন স্থানে সেগুলো বর্ণনা করতেন না।
আল্লাহ—সমস্ত প্রশংসা তাঁর—কোনো নবীর কোনো পাপ উল্লেখ করলে সঙ্গে তাঁর তওবাও উল্লেখ করেছেন; যাতে তাঁকে ত্রুটি ও দোষ থেকে মুক্ত করেন এবং দেখান যে, তওবা, ক্ষমাপ্রার্থনা ও তার পরের সৎকর্মের অনুগ্রহের মাধ্যমে তাঁর মর্যাদা বেড়েছে, অবস্থান উন্নত হয়েছে, সৎকর্ম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আল্লাহর নৈকট্য বেড়েছে। আর যাতে কিয়ামত পর্যন্ত যাঁরা নবীদের অনুসরণ করবেন ও তাঁদের অনুকরণ করবেন, তাঁদের জন্য এটি আদর্শ হয়।
এই উদ্ধৃতির প্রথম অনুচ্ছেদের “এঁদের মত অনুযায়ী” কথাটি তাঁর আলোচনায় উত্থাপিত বিরুদ্ধমতের দিকে নির্দেশ করে; সেটিকে বিচ্ছিন্ন করে ইবনে তাইমিয়্যার নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বানানো যাবে না। তাঁর পরের যুক্তি পরিষ্কার: ভুল ঘটার সম্ভাবনা এবং ভুল বহাল থাকার সম্ভাবনা এক নয়। তিনি পরেরটি অস্বীকার করে আগেরটির সঙ্গে ধর্মীয় অভ্রান্ততার ধারণা মিলিয়েছেন। কিন্তু এই মিলানোর ফলে সাধারণ অনুসারীর সামনে একটি গুরুতর প্রশ্ন রয়ে যায়: যে বক্তব্য প্রথমে নবীর কাছ থেকে ধর্মীয় বার্তা হিসেবে শোনা গেল, সেটি পরে শয়তানের নিক্ষিপ্ত কথা বলে সরিয়ে দেওয়া হলে, প্রথমবার শোনার মুহূর্তে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল? “পরে সংশোধন হবে” কোনো বক্তব্যের প্রাথমিক অলৌকিক নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করে না। আর সংশোধনের দাবিও যদি একই ব্যক্তির পরবর্তী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে, তাহলে শ্রোতা স্বাধীনভাবে কোনটি আল্লাহর এবং কোনটি শয়তানের কথা—তা নির্ধারণ করবেন কী দিয়ে?
ইবনে হিশামের সম্পাদনা-নীতি: অস্বস্তিকর বিবরণ বাদ দেওয়ার ঘোষণা
ইবনে ইসহাকের রচনার সঙ্গে ইবনে হিশামের সীরাতের সম্পর্ক বুঝতে তাঁর নিজের সম্পাদনা-নীতি পড়া প্রয়োজন। ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের সমস্ত বিবরণ হুবহু সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং গ্রন্থের শুরুতেই তিনি কোন ধরনের বিষয় বাদ দেবেন, তা স্পষ্ট করেছেন। সেই তালিকায় সংক্ষিপ্ত করার জন্য বাদ দেওয়া বিষয় যেমন আছে, তেমনি এমন বিষয়ও আছে, যার আলোচনা কুৎসিত বা আপত্তিকর বলে বিবেচিত, অথবা যার উল্লেখ কিছু মানুষকে কষ্ট দেয়। এই ঘোষণা ইতিহাস সংরক্ষণের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ: আমাদের হাতে থাকা গ্রন্থটি পূর্ববর্তী রচনার নির্বাচিত ও সম্পাদিত রূপ। তাঁর ভূমিকার এই সম্পূর্ণ বক্তব্য নিচে দেওয়া হলো [39]।
আরবি মূলপাঠ
[ نهج ابن هشام في هذا الكتاب ] قال ابن هشام : وأنا إن شاء الله مبتدئ هذا الكتاب بذكر إسماعيل بن إبراهيم ، ومن ولد رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم من ولده ، وأولادهم لأصلابهم الأول فالأول ، من إسماعيل إلى رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم ، وما يعرض من حديثهم ، وتارك ذكر غيرهم من ولد إسماعيل ، على هذه الجهة للاختصار ، إلى حديث سيرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وتارك بعض ما ذكره ابن إسحاق في هذا الكتاب ، مما ليس لرسول الله صلى الله عليه وآله وسلم فيه ذكر ، ولا نزل فيه من القرآن شيء ، وليس سببا لشيء من هذا الكتاب ، ولا تفسيرا له ، ولا شاهدا عليه ، لما ذكرت من الاختصار ، وأشعارا ذكرها لم أر أحدا من أهل العلم بالشعر يعرفها ، وأشياء بعضها ، يشنع الحديث به ، وبعض يسوء بعض الناس ذكره ، وبعض لم يقر لنا البكائي بروايته ومستقص إن شاء الله تعالى ما سوى ذلك منه بمبلغ الرواية له ، والعلم به .
বাংলা অনুবাদ
এই গ্রন্থে ইবনে হিশামের অনুসৃত পদ্ধতি। ইবনে হিশাম বলেন: আল্লাহ চাইলে আমি এই গ্রন্থ শুরু করব ইবরাহীমের পুত্র ইসমাঈলের আলোচনা দিয়ে। তাঁর বংশধরদের মধ্যে যাঁদের বংশে রাসূলুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের এবং তাঁদের প্রত্যক্ষ সন্তানদের ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করব—ইসমাঈল থেকে রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত—এবং তাঁদের সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক যে বিবরণ আসে, তা উল্লেখ করব। এই ধারার বাইরে ইসমাঈলের অন্যান্য বংশধরের আলোচনা আমি বাদ দেব, যাতে সংক্ষিপ্তভাবে রাসূলুল্লাহর জীবনী পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। ইবনে ইসহাক এই গ্রন্থে এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন, যেগুলোতে রাসূলুল্লাহর উল্লেখ নেই, যার বিষয়ে কোরআনের কিছু অবতীর্ণ হয়নি, যা এই গ্রন্থের কোনো ঘটনার কারণ নয়, তার ব্যাখ্যা নয় এবং তার সাক্ষ্যও নয়—সংক্ষিপ্ত করার যে কথা বলেছি, সেই কারণে আমি সেসবের কিছু বাদ দেব। তিনি এমন কিছু কবিতাও উল্লেখ করেছেন, যেগুলো কবিতা সম্পর্কে জ্ঞানী কাউকে আমি চিনতে দেখিনি; সেগুলোও বাদ দেব। আর এমন কিছু বিষয়ও বাদ দেব, যার কিছু নিয়ে আলোচনা করা আপত্তিকর, যার কিছু উল্লেখ করলে কিছু মানুষ কষ্ট পায়, এবং যার কিছু আল-বাক্কাঈ আমাদের কাছে বর্ণনা করার কথা স্বীকার করেননি। আল্লাহ চাইলে, এগুলো ছাড়া তাঁর রচনার বাকি অংশ আমার কাছে পৌঁছানো বর্ণনা ও জ্ঞানের সীমা পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরব।
এই বক্তব্যে “কিছু মানুষের কষ্ট পাওয়া” একটি সম্পাদনাগত কারণ হিসেবে সরাসরি উপস্থিত।
ঘণ্টা শয়তানের বাঁশি
নবী মুহাম্মদের হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি বলেছিলেন, ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় তার কাছে ওহী আসতো [40] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ ওহীর সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১/ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি কিভাবে ওহী শুরু হয়েছিল
২। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন,ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার প্রতি ওহী কিভাবে আসে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন সময় তা ঘন্টাধ্বনির ন্যায় আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচাইতে কষ্টদায়ক হয় এবং তা সমাপ্ত হতেই ফিরিশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নিই, আবার কখনো ফিরিশতা মানুষের আকৃতিতে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে ফেলি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি প্রচন্ড শীতের দিনে ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।
তাহক্বীক: মারফু হাদিস।
তাখরীজ: ( বুখারীঃ তা.পা ২, ৩২১৫; তিরমিযীঃ ৩৯৯৪; নাসাঈঃ ৯৪২; আহমাদঃ ২৬৯৫২; মুয়াত্তাঃ ৪৭৯। মুসলিম ৪৩/২৩, হা: ২৩৩৩ , আহমাদ ২৫৩০৭ ( আধুনিক প্রকাশনী. ২ , ই.ফা. ২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

ঠিক একইসাথে, তিনি এটিও বলেছেন [41] –
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ পোশাক ও সাজসজ্জা
পরিচ্ছদঃ ২২. সফরে কুকুর ও ঘণ্টা রাখা মাকরূহ
৫৩৬৬। ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুব, কুতায়বা ও ইবনু হুজর (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঘন্টা শয়তানের বাঁশি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তারমানে দেখা যাচ্ছে, নবীর কাছে যখন ওহী আসতো, তখন ঘণ্টাধ্বনির শব্দ হতো। আবার ঘণ্টা হচ্ছে শয়তানের বাঁশি, এটিও নবীরই বক্তব্য। এখন আপনি নিজেই বিবেচনা করুন আসল সত্য কী!
তারপরেও তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি, নবীর কাছে আল্লাহর ওহীই আসতো। কিন্তু মহাবিশ্বের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ পাকের ওহী সামান্য এক সৃষ্টি শয়তান উল্টেপাল্টে দিচ্ছে, ভুলভাল ঢুকিয়ে দিচ্ছে, এই কথা কী মেনে নেয়া যায়? আল্লাহ পাকের সিকিউরিটি সিস্টেম কী এতটাই দুর্বল ছিল?
উপসংহার
শয়তানের প্ররোচনায় আয়াত নাজিল হয়ে থাকলে, সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি যেটি ওঠে, তা হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ কি কে আল্লাহর ফেরেশতা আর কে শয়তান, তার পার্থক্য বুঝতেন না? এমনও তো হতে পারে, সেই প্রথম যেদিন জিব্রাইলের আবির্ভাব হয়েছিল, সেই আসলে শয়তান ছিল। পুরো কোরআনই আসলে শয়তানের আয়াত। মাঝখানে সত্যিকারের আল্লাহ দুইটি সঠিক সূরা নাজিল করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে শয়তান আবার সেই আয়াত দুটি সংশোধন করে দিয়েছিলেন।
অর্থাৎ, আমি বোঝাতে চাচ্ছি, আমরা কীভাবে শতভাগ নিশ্চিত হবো যে, যেই আল্লাহকে মুসলমানগণ সাড়ে ১৪০০ বছর ধরে উপাসনা করছে, সে আসলে শয়তান আর যাকে তারা শয়তান ভাবছে, সেই আসলে আল্লাহ কিনা। এরকম হয়নি তা নিশ্চিতভাবে বোঝার উপায় কী? যেখানে খোদ নবী মুহাম্মদই ধোঁকা খেয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে ধোঁকাটি আরো বড় কিনা, রিভার্স ধোঁকা কিনা, আমাদের নিশ্চিত হওয়ার উপায় কী?
একইসাথে আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। কারণ অধিকাংশ মুমিন ভাইদের বুদ্ধিমত্তার মান নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ থাকায়, তারা অনেকেই এই লেখা পড়ে মনে করতে পারেন যে, নাস্তিকরা বুঝি আল্লাহ আর শয়তানের অস্তিত্বকে মেনে নিলো। মোটেও তা নয়। এই লেখাটির মূল বিষয়টি তাদের মাথায় প্রবেশ করতে যেই আইকিউ প্রয়োজন, তা তাদের অনেকেরই নেই বলেই তারা এরকম ভাবতে পারে। মুমিন ভাইদের বুদ্ধির আসলেই জুড়ি মেলা ভার। নাস্তিকরা আল্লাহ বা শয়তান কারোর অস্তিত্বেরই প্রমাণ পায়নি, তাই মানেও না। এই লেখাটির মূল বিষয়টি হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ যে ক্ষণে ক্ষণে পরিস্থিতি বুঝে নিজের সুবিধামত আয়াত নাজিল করতেন, তা ঘটনাটি থেকে একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। যখন তার দরকার হয়েছিল, মুশরিকদের সাথে সংঘাত অনিবার্য, তখন লাত মানাত উজ্জার প্রশংসা করে আয়াত নাজিল করলেন। আবার যখন দেখলেন, তার অনুসারীদের মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তার মূল উদ্দেশ্যও ব্যহত হচ্ছে, তখন তিনি আবার আয়াত বদলে ফেললেন। আয়াত বদলে সব দোষ ফেললেন বেচারা শয়তানের ঘাড়ে। কারণ কেউ তো আর বিষয়টি যাচাই করে দেখতে পারবে না, আসলেই শয়তান এরকম কিছু করেছিল কিনা। আমাদের দেশে মাদ্রাসার হুজুরেরা ছাত্রদের ধর্ষণ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খেলেও দেখবেন, তারা সব দোষ শয়তানের ঘাড়ে চাপিয়ে সটকে পড়তে চায়। বলে শয়তান নাকি তাকে দিয়ে এগুলো করিয়েছে। আবার অনেক সময় দেখবেন, যেসব মেয়েদের স্বামীরা বিদেশে দীর্ঘদিন ধরে থাকে, সেইসব মেয়ে গর্ভবতী হয়ে গেলে সব দোষ ফেলে বেচারা জ্বীনদের ওপর। জ্বীনেরা নাকি রাতের বেলা কাজ করে চলে গেছে। কেউ তো আর জ্বীনদের গিয়ে জিজ্ঞেস করবে না, আসলেই তাদের কেউ এরকম কাজ ঘটিয়েছে কিনা। তাই তাদের ওপর দায় চাপানো খুবই নিরাপদ, এবং অন্ধবিশ্বাসী অশিক্ষিত মূর্খ লোকদের এগুলো দিয়ে বোকা বানানোও সহজ। এই প্রসঙ্গে আয়িশার একটি হাদিস উল্লেখ না করলেই নয় [42] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্ তা’আলার বাণীঃ ترجئ من تشاء منهن وتؤوي إليك من تشاء ومن ابتغيت ممن عزلت فلا جناح عليك “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার কাছে স্থান দিতে পার। আর তুমি যাকে দূরে রেখেছ, তাকে কামনা করলে তোমার কোন অপরাধ নেই। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন ترجئ দূরে রাখতে পার। أرجئه তাকে দূরে সরিয়ে দাও, অবকাশ দাও।
৪৪২৫। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত।তিনি বলেন, যেসব মহিলা নিজকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হেবাস্বরূপ ন্যাস্ত করে দেন, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি (মনে মনে) বলতাম, মহিলারা কি নিজেকে অর্পণ করতে পারে? এরপর যখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেনঃ “আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন। আর আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে আপনার কোন অপরাধ নেই।” তখন আমি বললাম, আমি দেখছি যে, আপনার রব আপনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই পূরণ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
তথ্যসূত্রঃ
- কোরআন ২৩ঃ১৪ 1 2
- সূরা হুদ ১১:১ ↩︎
- কুরআনুল কারীম ২য় খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ১৭৩১ ↩︎
- কুরআনুল কারীম ১ম খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ৬১২ ↩︎
- আর রাহীকুল মাখতুম, আল কোরআন একাডেমী, পৃষ্ঠা ৪২৬ ↩︎
- আশ শিফা, ইমাম কাযী আয়ায আন্দুলুসী, সনজরী পাবলিকেশন্স, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৫ ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ৬২৩ ↩︎
- সীরাতে ইবনে হিশাম : হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর জীবনীগ্রন্থ, আকরাম ফারুক পৃষ্ঠা ৬১-৬২ ↩︎
- মুখতাসার যাদুল মা‘আদ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরি, পৃষ্ঠা ২০২ ↩︎
- সীরাতুল মুস্তফা সা., আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী (রহ.), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩, ১৪৪, ১৪৯, ১৫৪, ১৫৫ ↩︎
- মুখতাসার যাদুল মা’আদ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযী, ওয়াহিদীয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, পৃষ্ঠা ২০২-২০৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী (তাওহীদ), হাদিস নম্বরঃ ৪৮৬২ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ৫৭৫ ↩︎
- সহিহ আত-তিরমিযী, প্রথম খণ্ড, হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৬৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১০০৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১০০৯ ↩︎
- সূরা বনি ইজরাইল, ৭৩, ৭৪ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৪ ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ, মহানবীর প্রথম বিশদ জীবনী, ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠাঃ ১৯৭-১৯৯ ডাউনলোড লিঙ্ক ↩︎
- KITAB AL-TABAQAT AL-KABIR – Ibn Sa’d, Page- 232 ↩︎
- The History of al-Tabari, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১০৭-১১২ ↩︎
- আল-তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা হজ্জ ২২:৫২-এর তাফসির; মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী ও মুহাম্মদ ইবনে কায়সের বর্ণনা ↩︎
- আল-তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা হজ্জ ২২:৫৩-এর সম্পূর্ণ তাফসির ↩︎
- সূরা নজম, আয়াত ১৯ ↩︎
- সূরা নজম, আয়াত ২০ ↩︎
- সূরা নজম, আয়াত ২১ ↩︎
- সূরা ৪৩, আয়াত ১৬ ↩︎
- সূরা হজ্ব, আয়াত ৫২, ৫৩ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, চতুর্থ খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ৩৯২-৩৯৩ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ষষ্ঠ খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সপ্তম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৪৮০-৪৮৫ ↩︎
- তাফসীরে মাজহারী, অষ্টম খণ্ড ↩︎
- Ibn Taymiyyah। Majmu’ al-Fatawa। ১৩ জুন ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২০ ↩︎
- Holland, Tom (২০১২), In the Shadow of the Sword। Doubleday, পৃষ্ঠা ৪২ ↩︎
- ইবনে হাজর আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, কিতাবুত তাফসির, সূরা হজ্জের আলোচনা; প্রচলিত খণ্ড-পৃষ্ঠা নির্দেশ ৮/৪৩৯; সংযুক্ত অনলাইন সংস্করণে পৃ. ২৯৩–২৯৪ ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যা, মাজমূউল ফাতাওয়া, খণ্ড ১০, পৃ. ২৮৯–২৯২-এর সংশ্লিষ্ট আলোচনা; সংযুক্ত পূর্ণ খণ্ডের পিডিএফে পৃষ্ঠা-সূচক ১০৬–১০৭ ↩︎
- ইসলামকিউএ, উত্তর ১০৩৩০৪; মাজমূউল ফাতাওয়া ১০/২৯০-এর উদ্ধৃতি ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যা, মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ, “এটি বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং মানুষকে দূরে সরায়”—এই আপত্তির আলোচনা; সংযুক্ত সংস্করণে খণ্ড ২, পৃ. ৪০৯–৪১১ ↩︎
- ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, “নাহজু ইবনি হিশাম ফী হাযাল কিতাব”—এই গ্রন্থে ইবনে হিশামের অনুসৃত পদ্ধতি ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৩৬৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪২৫ ↩︎
About This Article
Genre: Historical, textual and philosophical criticism of Islamic revelation and prophetic infallibility.
Epistemic Position: Secular rationalism and historical inquiry. Claims of divine authorship, supernatural protection and prophetic authority are examined through evidence and logical consistency.
This article investigates the Satanic Verses, also known as the Gharaniq episode, through early Islamic biographies, historical narratives, hadith collections and classical Qur’anic commentaries. It examines the reported praise of al-Lat, al-Uzza and Manat during Muhammad’s recitation of Surah al-Najm, the ensuing prostration of Muslims and polytheists, and the news that prompted some Muslim migrants to return from Abyssinia.
The discussion draws on Ibn Ishaq, Ibn Sa‘d, al-Tabari, Ibn Kathir and other commentators, alongside the arguments of Ibn Hajar and Ibn Taymiyya. Their accounts and interpretations are presented through extended quotations, with Arabic passages and translations where provided. Ibn Hisham’s stated editorial policy is also examined as evidence of the selection and omission involved in transmitting early Islamic biography.
The central question concerns the reliability of revelation: if a message initially presented as divine could subsequently be identified as Satan’s insertion, what means did its first listeners possess to distinguish the two? The article examines whether later correction establishes earlier reliability, and whether interpreting historical reports through a prior commitment to prophetic infallibility allows those reports to be independently assessed.


জবাবঃ
https://islamqa.info/en/answers/4135/satanic-verses
মিনার ভাই,
এখানে তো ঠিকই কমেন্ট করলেন।
আপনাদের response to anti islam এ কমেন্ট করা যায় না কেন?
নাস্তিকরা কমেন্ট করলে গোমর ফাঁস করে ফেলবে এই ভয় পান???
M.E.F. Prottoy
৩ নাম্বার পয়েন্টা টা (স্কলার রা দাবি করেন আয়াতটি শয়তান কাফেরদের কানে পৌছে দিয়েছে, মুহাম্মাদ(স) এর মুখ হতে উচ্চারিত হয়নি) এর প্রমাণ টা কি? যেখানে তাফসীরে জালালাইন আর ইবনে কাসিরে পরিষ্কার ভাবেই দেখা যাচ্ছে তা মুহাম্মদ(স) এর মুখ হতে উচ্চারিত হয়েছিলো।
Khub valo laglo Vai,, Egiye Jan Vai..
“””স্যাটানিক ভার্সেস””””
স্যাটানিক ভার্স অর্থাৎ কুরআনে শয়তানের বানী।সালমান রুশদি থেকে শুরু করে বর্তমানের অনেক নাস্তিকের দাবি শয়তান সুকৌশলে নিজের বানী আল্লাহর ওহি বলে ডুকিয়ে দিয়েছেন আল কুরআনে।এটা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই না এবং নাস্তিকদের দ্বীমুখি আচরন।????
যেহেতু নাস্তিকদের দাবি শয়তান তার কথা কুরআনে ডুকিয়ে দিয়েছে তারমানে শয়তান আছে।এবং শয়তানের অস্তিত্বের জোড়দাবিও করে থাকে!!!!
এখানে আমার প্রশ্নে হলো। শয়তান আসলো কোথা থেকে???শয়তানের স্রষ্টা কে??? শয়তান আছে তবে শয়তানের স্রষ্টা নেই কেন??? যদি, নাস্তিকদের কথা মেনেও নেই তারপরেও কথা থাকে।কুরআনের বাকি আয়াত গুলো কার বানী??? নাস্তিকরা আবার এটাও দাবি করে কুরআন হযরত মুহম্মদ সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রচনা করেছেন, যদি কুরআন মানব রচিত হয়ে থাকে তাহলে শয়তান আবার আয়াত ডুকায় কি করে??? নাস্তিকদের এই সকল আলতু ফালতু কথাই প্রমান করে কুরআন আল্লাহর বানী।✌নাস্তিকদের বিশ্বাস আল্লাহ নাই, শয়তান আছে। ক্যামনে কি! শয়তান আসলো কোথা থেকে? শয়তান কি বৈজ্ঞানীকভাবে প্রমাণীত সত্বা??? সকল নাস্তিক আল্লাহ,আল্লাহর রাসূল এবং ধর্মের নামে কুৎসা রটনার সময় শয়তানকে ব্যবহার করে!!!HOW FUNNY!!!
নাস্তিক মানেই হাইস্যকর, চরম বিনোদন। ????????????????????????
আরে নাস্তিকের বাচ্চা ঘন্টা ধনির মত আর ঘন্টা ধনির মাঝে যে প্রার্থক্য আছে সেটা তুই না বুঝলেও একটা পাগল ও বুঝবে।।ভালো করে ওহী নাযিলের পদ্ধতি গুলি ভালো করে পড়।।।ওহী নাযিলের পদ্ধতি ছিল ৯ টি
১.সপ্ন
২..ঘন্টা ধনির মত গুন গুন করে।।সেটা হতে পারে অন্য রকম যেরকম এখনকার ঘন্টা বাজে।।
৩.মানুষের আকৃতিতে
৪.অন্তর্লোকে ফুকে দেয়া
৫.পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি
৬..তন্দ্রাবস্থায় সরাসরি অহী
৭.অন্তর্লোক ছাড়া সরাসরি
৮..জীব্রাইল (আ) এর নিজ আকৃতিতে
৯..ইস্রাফিল আ কখনো ওহী আনত
নাস্তিকের বাচ্চা ইসলাম সম্পর্কে জানতে হলে ভালো করে জানবি।।অল্প জেনে কমেন্ট করবিনা
আকাশে থুথু ছুড়ে নিজের মুখে ফেলা !!
আচ্ছা, ধর্মানুরাগীরা ভাইরা একটু বুঝিয়ে বলবেন শয়তান এলো কোথা থেকে? আল্লা একা এই বিশ্ব, সমস্ত প্রাণী, সমস্ত উদ্ভিদ, সমস্ত পাহাড়, সমস্ত নদী, সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র সব কিছু শূন্য থেকে বানিয়েছেন | তার মানে তিনি শয়তানও নিজেই বানিয়েছেন | অর্থাৎ এমন কিছু বানিয়েছেন যা তার বিরোধিতা করছে | তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বগামী, সব সর্ব, তবু শায়েস্তা করতে পারছেন না ? শুধু তাই নয়, নাস্তিকদের মতো মাত্র 50 বা 60 বছর জ্বালানোর পর মরে ভূত হয়ে নরকের আগুনে পুড়ে চাই হয়ে যাচ্ছে না | দিব্বি যুগ যুগ ধরে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে মনের আনন্দে ! আর যদি তিনি শয়তান সৃষ্টি না করে থাকেন তবে বলতে হবে যে তিনি সব কিছুর স্রষ্টা না | অন্য কেউ বানিয়েছে | তবে কি আরো স্রষ্টা আছে?
ফেসবুক কমেন্টে দেখলাম Nur Mohammad নামে এক ব্যক্তি মরিস বুকাইলি আর কিথ মুরের বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে অমুসলিম ও নাস্তিকদের সাথে ইচ্ছেমতো বাজে আচরণ করছে। তার উদ্দেশ্যে কিছু লিংক দিলাম এখানে
https://dharma-bad.blogspot.com/2017/10/mushfique-imtiaz-chowdhury.html
https://durmor.com/%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%B8-%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF/
“http://dawahganda.blogspot.com/2013/01/western-scientists-testify-to-qurans.html”
https://durmor.com/%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%B8-%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF/#:~:text=http%3A//dawahganda.blogspot.com/2013/01/western-scientists-testify-to-qurans.html
https://youtube.com/user/ThisIsTheTruthUncut
মুশফিক মিনার ভাই এখানে কমেন্ট করেছেন ঠিকই কিন্তু ওনাদের সাইটে কমেন্ট করার সুযোগ নেই।
আপনি হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নামের ক্ষেত্রে কোনো সম্মান সূচক শব্দ ব্যবহার করেননি, এর জন্য আমি আপনাকে ভর্ৎসনা করতে পারি; কিন্তু আমার নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) শিকার কারণ আপনার সাথে সম্মানের সাথেই কথা বলব।
আপনি পবিত্র কোরআনকে হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) এর বানানো বলে অভিহিত করেছেন। আপনার এই ভিত্তিহীন উক্তির প্রেক্ষিতে আমার বক্তব্য হচ্ছে-
প্রথমত: যদি পবিত্র কোরআন হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নিজের বানানো হবে, তবে কেন তিনি এটিকে মহান আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করবেন, যে সময়কার লোকজন আল্লাহকে অস্বীকার করত? হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) কোরআনকে নিজেদের সাথে সম্পৃক্ত করে কৃতিত্ব নিতে পারতেন এবং সবাই এটা করে। হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) এমনটি করেননি; কারণ কোরআন তাঁর বানানো নয়; সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
দ্বিতীয়ত: আপনি নিশ্চয়ই পবিত্র কোরআনের তাঁর অস্বীকারকারীদের প্রতি ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অবগত নন। পবিত্র কোরআন তাঁর অস্বীকারকারীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছে, যদি পার কোরআনের অনুরূপ একটি সুরা বানিয়ে নিয়ে আস, যদি না পার অন্ততঃ একটি আয়াত বানিয়ে নিয়ে আস। কারোও পক্ষে তা সম্ভব হয়নি; তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি বলেছিল, ‘এটা কোনো মানুষের কথা নয়”। পবিত্র কোরআনের এই চ্যালেঞ্জ আজ অব্দি আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
আপনি আপনার আলোচিত আয়াতের ব্যাপারে মুসলিম মনীষীদের কিতাব থেকে রেফারেন্স দিয়েছেন; তবে আমি আপনাকে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য শীয়া মাযহাবের বিশিষ্ট গবেষক আল্লামা আসকারীর “নাকশে আইম্মা দার ইহয়ায়ে দ্বীন” বা نقشه ائمه در احیای دین বইটি পড়ার অনুরোধ করব।
শুধু এইটুকু বলতেছি যে, পবিত্র কোরআন ইহুদি জাতিকে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরন্তন শত্রু বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু অনেক ইহুদি ছদ্মবেশে ইসলামে ইসলাম ও এর মহান প্রচারক হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নামে নানা ভিত্তিহীন অপবাদ ছড়িয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের কিছু মনীষীও সেই সব ভিত্তিহীন অপবাদকে কোনোরূপ যাচা-বাচাই ছাড়া গ্রহণ করেছেন।
আমি ইসলাম ধর্মের পরিবারে জন্মগ্রহন করা একজন মানুষ। এখন কিছি হাদিস আর কুরানের আয়াত পড়ে সংশয়ে পতিত হয়েছি। এই লেখাটি মোটামুটি পড়লাম, তার মধ্যে একটি অংশ পড়ে খুবি হতাশ হয়েছি , কোটেশন এর মাঝে অংশটি কপি করে দিলাম। “ক্লাসিকাল তাফসিরকারকগণ, বিশেষত আল-তাবারী ও আল-করতুবি, কোরআনের “আহসানুল খালিকীন” (সর্বোত্তম স্রষ্টা) আয়াতের ব্যাখ্যায় “খালিক” শব্দটির ব্যপ্তি প্রসারিত করার চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “স্রষ্টা” কেবল আল্লাহর একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়, বরং মানুষকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যেহেতু মানুষও কিছু না কিছু সৃষ্টি বা নির্মাণ করে—যেমন ভাস্কর্য তৈরি করা, ঘর নির্মাণ করা ইত্যাদি। এইভাবে তারা দাবি করেন যে, আল্লাহ তাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টি নিখুঁত, আর মানুষের সৃষ্টি সীমাবদ্ধ। মূলত এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তারা “সর্বোত্তম স্রষ্টা” বাক্যাংশের তুলনামূলক চরিত্রকে মানুষের মত সৃষ্টিশীল সত্তার সাথে যুক্ত করে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।” অতপর হুজুর সমাজের এমন উদ্ভট যুক্তি দেখে আমি আরো বেশি করে শংশয়বাদী হয়ে পড়েছি
Devil does not give right command. So how can you suspect that the Quran can be come from Devil?
Devil shows the wrong path such as do the dishonest work, Not to believe on only Allah, Drink Alcohol, Do harm. etc. But you can not find anything in the the holy Quran. Mr.Asif, You were a student of Physics. So, Research and write something on physics. Please do not waste your time unnecessary illogical matter on religion. Is there any benefit to discuss on the topic? If you are really talent, please do work on your subject.