সারসংক্ষেপ
মুসলিমদের পক্ষ থেকে ইসলামের সর্বোচ্চ, অভ্রান্ত ও চূড়ান্ত দলিল হিসেবে কোরআনকে ব্যাপকভাবে প্রচার এবং উপস্থাপন করা হয়। মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয় নির্মিত হয় এই বিশ্বাসের ওপর যে কোরআন আল্লাহর সরাসরি বাণী, মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ এবং সমস্ত ইসলামি বিধানের প্রধান উৎস। কিন্তু প্রচলিত ইসলাম বাস্তবে যেভাবে কাজ করে, তাতে কোরআনের এই ঘোষিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রধানত আনুষ্ঠানিক। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদা যেরকম অনেকটা সেরকম, অর্থাৎ পদমর্যাদায় উচ্চে কিন্তু তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। কারণ কোরআনের কোনো আয়াত পড়লেই তার বিধান জানা যায় না; প্রথমে জানতে হয় হাদিস ও আইনশাস্ত্র আয়াতটিকে কী অর্থ দিয়েছে। আয়াতটির ভাষা সাধারণ হলেও হাদিস তাকে বিশেষ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করতে পারে; নির্দেশ শর্তহীন হলেও হাদিস তাতে নতুন শর্ত বসাতে পারে; কোরআন কোনো কাজের অনুমতি দিলেও হাদিস সেটি নিষিদ্ধ করতে পারে; কোরআন একটি শাস্তি নির্ধারণ করলেও হাদিস সম্পূর্ণ ভিন্ন বা অধিক কঠোর শাস্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে; এমনকি আয়াতটি মুসহাফে অক্ষত অবস্থায় থাকলেও হাদিস ও পরবর্তী আইনজ্ঞদের সিদ্ধান্তে তার বিধান মৃত বা বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। নামাজ, যাকাত ও হজের মতো মৌলিক ধর্মীয় আচরণ থেকে শুরু করে খাদ্য, উত্তরাধিকার, বিবাহ, ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ ও দণ্ডবিধি পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দেশকে কার্যকর আইনে রূপান্তর করার চাবি রাখা হয়েছে হাদিসের হাতে। এখানেই শেষ নয়। কোন আয়াত নাসেখ, কোনটি মানসুখ, কোন বিধান শুধু নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য, কোন শব্দের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করা যাবে না এবং কোরআনে লিখিত না থাকা কোন বিধানকেও আল্লাহর আইন হিসেবে মানতে হবে, এসব সিদ্ধান্তও হাদিসনির্ভর শাস্ত্রীয় কাঠামো নেয়। ফলে কোরআন নিজে নিজের অর্থ, সীমা কিংবা কার্যকারিতা নির্ধারণ করতে পারে না। কোরআনের নামে ধর্মের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু ধর্মের ব্যবহারিক রূপ নির্মিত হয় হাদিসে সংরক্ষিত বর্ণনা এবং সেই বর্ণনা বাছাইকারী মানুষের সিদ্ধান্ত দিয়ে। কোরআন ইসলামের পবিত্র মুখচ্ছবি; হাদিস তার আইনপ্রণেতা, ব্যাখ্যাকারী, সংশোধক ও প্রয়োজনে বাতিলকারী। প্রচারযন্ত্র কোরআনের, কিন্তু শাসনযন্ত্র হাদিসের।
ভূমিকা: কোরআন মঞ্চে, হাদিস চালকের আসনে
একটি প্রশ্ন মুসলিম সমাজে বারবার উত্তেজনা, কোন্দল এবং কখনো সহিংস বিরোধের জন্ম দেয়: কোরআনের কোনো আয়াত এবং কোনো সহিহ হাদিস থেকে দুই ধরনের নির্দেশ পাওয়া গেলে মুসলমান কোনটি মানবেন? কোরআনের লিখিত নির্দেশ, না হাদিসে সংরক্ষিত রাসুলের কথা ও কাজ? সরাসরি প্রশ্ন করলে উত্তরটি প্রায় সব সময় প্রস্তুত থাকে, কোরআন ও হাদিসের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, উভয়টিই ওহি এবং নবী কেবল আল্লাহর নির্দেশই ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এই মুখস্থ উত্তরে আসল প্রশ্নটির সমাধান হয় না। কারণ বিতর্কটি হাদিসকে ওহি বলা হবে কি না, তা নিয়ে নয়; বিতর্কটি হলো, বাস্তবে কোন উৎস অন্য উৎসের অর্থ ও কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করছে। একটি আয়াতে যা লেখা আছে, সেটির প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণের আগে যদি হাদিসের অনুমোদন নিতে হয়; হাদিস যদি বলে দেয় আয়াতটি আসলে সবার জন্য নয়, সব পরিস্থিতির জন্য নয়, ভাষায় যা বলা হয়েছে তার অর্থও ঠিক তা নয়, অথবা আয়াতটি কোরআনে থাকলেও তার বিধান আর মানতে হবে না; তাহলে কার্যকর কর্তৃত্ব আয়াতের হাতে থাকে না। যে উৎস অন্য উৎসকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি তার প্রয়োগ সীমিত করে, ব্যতিক্রম তৈরি করে, নতুন শর্ত আরোপ করে এবং প্রয়োজনে তার বিধান রহিত করে, ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে সেই উৎসই ঊর্ধ্বতন। কোরআনের মর্যাদা তখন রাজমুকুটের মতো, দৃশ্যমান, পবিত্র ও আনুষ্ঠানিক; কিন্তু শাসনের আদেশ আসে অন্য জায়গা থেকে। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, কোরআনকে অস্বীকার না করেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কোনো আয়াতকে মিথ্যা বলতে হয় না; শুধু বলতে হয় আয়াতটি ‘সাধারণ’, হাদিস তাকে ‘বিশেষ’ করেছে। বলতে হয় আয়াতটি ‘সংক্ষিপ্ত’, হাদিস তার ‘ব্যাখ্যা’ দিয়েছে। বলতে হয় আয়াতটির পাঠ আছে, কিন্তু বিধান ‘রহিত’। বলতে হয় কোরআনে নির্দিষ্ট শাস্তি আছে, কিন্তু হাদিস আরেক শ্রেণির অপরাধীর জন্য অন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছে। পরিভাষা আলাদা হলেও প্রতিবার ফল একই: কোরআনের পাঠ অক্ষত থাকে, কিন্তু তার অর্থ ও আইনগত ক্ষমতা হাদিসের হাতে চলে যায়। আরও গুরুতর বিষয় হলো, এই হাদিস সরাসরি নবীর কণ্ঠ থেকে শোনা কোনো জীবন্ত নির্দেশ নয়। এগুলো বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ ধারায় বহন করা বিবরণ, যেগুলো গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেছেন পরবর্তী যুগের সংগ্রাহক, হাদিসবিশারদ ও আইনজ্ঞরা। তারাই নির্ধারণ করেছেন কোন বর্ণনা সহিহ, কোনটি দুর্বল, কোনটি দিয়ে কোরআনের সাধারণ বক্তব্য সংকুচিত হবে এবং কোনটি দিয়ে একটি লিখিত আয়াতের বিধান অকার্যকর গণ্য হবে। অর্থাৎ কোরআনের ওপর হাদিসের কর্তৃত্ব শেষ পর্যন্ত হাদিসের ওপর মানুষের কর্তৃত্বকেও প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহর কথার কার্যকর অর্থ নির্ধারণ করেন এমন মানুষ, যারা বর্ণনাকারীদের স্মৃতি, চরিত্র, সাক্ষাৎ এবং বর্ণনাশৃঙ্খল সম্পর্কে নিজেদের বিচার প্রয়োগ করেছেন। এরপর সেই মানবীয়ভাবে নির্বাচিত বর্ণনাই আল্লাহর লিখিত বাণীর সীমা নির্ধারণ করে। তাই “কোরআন সর্বোচ্চ” বাক্যটি প্রচলিত ইসলামে একটি অলংকারের বেশি কিছু নয়। যে কোরআন নিজের অর্থ নিজে চূড়ান্ত করতে পারে না, নিজের বিধান নিজে কার্যকর রাখতে পারে না এবং কোন অংশ মানতে হবে সেই সিদ্ধান্তও নিজে দিতে পারে না, তাকে কার্যকর অর্থে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বলা যায় না। কোরআনকে সামনে রেখে আনুগত্য আদায় করা হয়; আড়াল থেকে সেই আনুগত্যের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে হাদিস। কোরআন ঢাল, হাদিস শাসক।
প্রথম কেস স্টাডি: সর্বজ্ঞ আল্লাহ, মুসার পরামর্শ এবং নামাজের দরকষাকষি
কোরআনের আল্লাহ সর্বজ্ঞ। আকাশ ও পৃথিবীর কোনো কিছু তার জ্ঞানের বাইরে নয়; মানুষের প্রকাশ্য কথা, গোপন চিন্তা, ভবিষ্যৎ কাজ এবং সামর্থ্যও তিনি জানেন। কিন্তু মেরাজের সহিহ হাদিসে নামাজ ফরজ হওয়ার কাহিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নাট্যরূপ হাজির করে। আল্লাহ প্রথমে মুহাম্মদের উম্মতের ওপর প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। ফেরার পথে মুসা সংখ্যাটি শুনে বলেন, মুহাম্মদের উম্মত এই বোঝা বহন করতে পারবে না। তিনি নিজের বনি ইসরাইল পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথা বলে মুহাম্মদকে আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে ছাড় চাইতে বলেন। মুহাম্মদ ফিরে যান; পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়। তিনি আবার মুসার কাছে আসেন। মুসা আবারও বলেন, উম্মত পারবে না। এই যাতায়াত চলতে থাকে, যতক্ষণ না পঞ্চাশ ওয়াক্ত কমে পাঁচ ওয়াক্ত হয়। পাঁচ ওয়াক্ত হওয়ার পরও মুসা আরও কমানোর পরামর্শ দেন; মুহাম্মদ লজ্জার কারণে আর ফিরে যেতে অস্বীকার করেন। গল্পটির পৃষ্ঠতলে মানুষের সামর্থ্য সম্পর্কে কার্যকর উপলব্ধিটি প্রথমে আল্লাহর ঘোষণায় নয়, মুসার আপত্তিতে দেখা যায়। আল্লাহ পঞ্চাশ ওয়াক্ত চাপান, মুসা বোঝেন তা অসহনীয়, মুহাম্মদ তার পরামর্শে আবেদন করেন এবং আল্লাহ ধাপে ধাপে আদেশ বদলান। সর্বজ্ঞতার সরল ধারণার সঙ্গে এই ধারাবাহিক দরকষাকষি স্পষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি করে।
প্রচলিত জবাব হলো, আল্লাহ শুরু থেকেই জানতেন শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত থাকবে; পুরো ঘটনাটি ছিল পরীক্ষা, অনুগ্রহ প্রকাশ এবং পাঁচ ওয়াক্তে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব দেওয়ার পরিকল্পনা। এই জবাব সর্বজ্ঞতা রক্ষা করে, কিন্তু হাদিসের ঘটনাকে বাস্তব সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বদলে পূর্বপরিকল্পিত অভিনয়ে পরিণত করে। মুসার পরামর্শে যদি নতুন কোনো তথ্য আল্লাহর কাছে না পৌঁছায়, তবে বারবার যাওয়া, প্রতিবার পাঁচ ওয়াক্ত করে কমানো এবং মুহাম্মদের লজ্জায় থেমে যাওয়া ছিল সাজানো দৃশ্য। আর যদি মুসার আপত্তি সত্যিই সিদ্ধান্ত সংশোধনের কারণ হয়, তবে প্রাথমিক আদেশ দেওয়ার সময় আল্লাহ উম্মতের সামর্থ্য সম্পর্কে যে জ্ঞান দেখিয়েছেন, তা মুসার অভিজ্ঞতার চেয়ে দুর্বল। দুই ব্যাখ্যার কোনোটিই সমস্যাটি দূর করে না। প্রথমটিতে আল্লাহ দরকষাকষির নাটক সাজান; দ্বিতীয়টিতে মুসা মানুষের সামর্থ্য আল্লাহর চেয়ে আগে এবং নির্ভুলভাবে বোঝেন। কাহিনির নিজস্ব ঘটনাক্রমে কার্যকর জ্ঞানের আসনে আল্লাহ নন, মুসা। [1]
আরবি: قُلْتُ: خَمْسِينَ صَلَاةً. قَالَ: ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ، فَإِنَّ أُمَّتَكَ لَا يُطِيقُونَ ذَلِكَ.
বাংলা: আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। মুসা বললেন, তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গিয়ে ছাড় চাও; তোমার উম্মত এটি বহন করতে পারবে না।
কোরআন ও হাদিসের সংঘাত: পাঁচটি নমুনা
সব অমিল একই ধরনের নয়। কোথাও একই বিষয়ে দুইটি বক্তব্য সরাসরি বিপরীত; কোথাও হাদিস কোরআনের আইন বদলে দেয়; কোথাও কোরআনিক ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে হাদিসের কাহিনি টানাপোড়েন তৈরি করে। নিচের ছক এই পার্থক্য বজায় রেখেই সমস্যাগুলো দেখায়।
| বিষয় | কোরআনের বক্তব্য | হাদিসের বক্তব্য | সমস্যার ধরন ও ফল |
|---|---|---|---|
| আল্লাহর সর্বজ্ঞান ও নামাজের সংখ্যা | আল্লাহ অদৃশ্য, প্রকাশ্য, গোপন এবং মানুষের সামর্থ্যসহ সবকিছু জানেন। | প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরজ হয়। মুসা বলেন উম্মত পারবে না। তার পরামর্শে মুহাম্মদ বারবার ফিরে গেলে সংখ্যা পাঁচে নামে। | এটি ধর্মতাত্ত্বিক টানাপোড়েন। আল্লাহ আগে থেকেই জানলে দরকষাকষি সাজানো; না জানলে মুসার মূল্যায়ন প্রাথমিক ঐশী আদেশের চেয়ে নির্ভুল। |
| অন্যের পাপ বহন | কেউ অন্য কারও পাপের বোঝা বহন করবে না। একই নীতি কোরআনে একাধিকবার এসেছে। | কিয়ামতে কিছু মুসলিম পাহাড়সম পাপ নিয়ে আসবে; আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে সেই পাপ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর রাখবেন। | এটি সরাসরি ভাষাগত সংঘাত। ব্যাখ্যাকারীরা তাই “মুসলিমের পাপ স্থানান্তর” কথাটিকে আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে বলেন, অমুসলিমরা নিজেদের সমপরিমাণ পাপের শাস্তি পাবে। এই ব্যাখ্যা হাদিসের প্রকাশ্য ক্রিয়াটিই বদলে দেয়। |
| পরিবারের কান্নায় মৃতের শাস্তি | ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য দায়ী; অন্যের অপরাধ তার ওপর চাপবে না। | মৃত ব্যক্তি পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি পায়। | এখানে সংঘাত এতটাই দৃশ্যমান ছিল যে আয়েশা কোরআনের “কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না” আয়াত তুলে বর্ণনাটির প্রচলিত রূপ প্রত্যাখ্যান করেন। পরে কেউ বলেছেন মৃত ব্যক্তি আগে কান্নার নির্দেশ দিলে শাস্তি পাবে; কেউ “শাস্তি”কে কেবল কষ্ট পাওয়া বলেছেন। |
| কাজের বিনিময়ে জান্নাত | কোরআন বলে, মানুষ তার কাজের কারণে জান্নাতের উত্তরাধিকারী হবে। | হাদিস বলে, কারও কাজ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না; মুহাম্মদও কেবল আল্লাহর দয়ায় প্রবেশ করবেন। | এটি প্রকাশ্য বাক্যগত সংঘাত। সমাধানে বলা হয়, কোরআনের “কারণে” কাজকে উপলক্ষ বোঝায়, আর হাদিস কাজকে মূল্য বা পর্যাপ্ত বিনিময় হওয়া অস্বীকার করে। এই ব্যাকরণগত বিভাজন ছাড়া দুই বক্তব্য পাশাপাশি দাঁড়ায় না। |
| সৃষ্টির ছয় দিন ও সাত দিনের তালিকা | কোরআন বারবার বলে আকাশ, পৃথিবী ও মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি হয়েছে। | সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সাত দিনের সৃষ্টি তালিকা রয়েছে। | এটি সংখ্যাগত সংঘাত। বুখারি, ইবন মাঈনসহ কয়েকজন সমালোচক বর্ণনাটিকে নবীর কথা মানেননি; অন্যরা বলেছেন হাদিসটি শুধু পৃথিবীর পরবর্তী বিকাশের কথা বলে। এই উদাহরণ দেখায়, কোরআনের বিরোধ কখনো হাদিস প্রত্যাখ্যানের কারণও হয়েছে। তাই “হাদিস কোনো অবস্থাতেই কোরআন দিয়ে যাচাই হয় না” দাবি অতিরঞ্জিত; সঠিক দাবি হলো, গ্রহণযোগ্য ঘোষিত হাদিসকে সাধারণত পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমে কোরআনের ওপর কার্যকর করা হয়। |
প্রশ্নটি IslamQA ওয়েবসাইটেও প্রশ্নোত্তর বিভাগে পাওয়া যায় [2]
আরবি: وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى. يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَاسٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ بِذُنُوبٍ أَمْثَالِ الْجِبَالِ، فَيَغْفِرُهَا اللَّهُ لَهُمْ وَيَضَعُهَا عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى.
বাংলা: কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। অথচ হাদিসে বলা হয়েছে, কিয়ামতে কিছু মুসলিম পাহাড়সম পাপ নিয়ে আসবে; আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে সেই পাপ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর রাখবেন।
আয়িশা এই হাদিস সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করতেন [3]
আরবি: إِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ. وَقَالَتْ عَائِشَةُ: حَسْبُكُمُ الْقُرْآنُ، وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى.
বাংলা: মৃত ব্যক্তি তার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি পায়। আয়েশা এর জবাবে বলেন, তোমাদের জন্য কোরআনই যথেষ্ট: কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না।
আমল কী জান্নাতে প্রবেশ করাবে? এই বিষয়েও সমস্যা [4]
আরবি: ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ. لَنْ يَدْخُلَ أَحَدُكُمُ الْجَنَّةَ بِعَمَلِهِ، وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَةٍ.
বাংলা: তোমরা যে কাজ করতে তার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করো। অথচ হাদিসে বলা হয়েছে, কারও কাজ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না; আমিও আল্লাহর দয়া ছাড়া প্রবেশ করব না।
সহিহ মুসলিমের হাদিস আর কোরআনের সংঘাত [5]
আরবি: خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ. خَلَقَ اللَّهُ التُّرْبَةَ يَوْمَ السَّبْتِ … وَخَلَقَ آدَمَ بَعْدَ الْعَصْرِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ.
বাংলা: কোরআন বলে, আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা শনিবার মাটি সৃষ্টি থেকে শুক্রবার আদম সৃষ্টি পর্যন্ত সাত দিনের তালিকা দেয়।
‘কোরআনের ঊর্ধ্বে’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে
হাদিস কোরআনের ঊর্ধ্বে। এই বক্তব্য দিয়ে কোরআন ও হাদিসের সাহিত্যিক মর্যাদা, পাঠের পবিত্রতা কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কোনটি বেশি আবৃত্তি করা হয়, তা বোঝানো হচ্ছে না। এখানে ‘ঊর্ধ্বে’ বলতে কার্যকর আইনগত কর্তৃত্ব বোঝানো হচ্ছে: কোন উৎস অন্য উৎসের অর্থ নির্ধারণ করতে পারে, তার নির্দেশের পরিসর ছোট বা বড় করতে পারে, তার প্রকাশ্য বক্তব্যে ব্যতিক্রম বসাতে পারে এবং তার বিধান কার্যকর থাকবে কি না সেই সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কোরআনকে আল্লাহর সরাসরি বাণী বলে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়, কিন্তু সম্মান আর ক্ষমতা এক জিনিস নয়। রাজাকে মুকুট পরিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে রাখা হলেও যদি তার প্রতিটি আদেশের অর্থ মন্ত্রী নির্ধারণ করে, কোন আদেশ বাস্তবায়িত হবে তা মন্ত্রী বাছাই করে এবং প্রয়োজন হলে রাজার লিখিত আদেশকে অকার্যকর ঘোষণা করে, তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা সর্বোচ্চ হলেও কার্যকর শাসক সেই মন্ত্রী। কোরআন ও হাদিসের সম্পর্কেও একই কাঠামো কাজ করে। “প্রথমে কোরআন, তারপর সুন্নাহ”। এই প্রচলিত ক্রমটিকেও ইসলামি শাস্ত্র কোরআনের কার্যকর অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকার করে না। ইসলামওয়েবের একটি গ্রন্থভিত্তিক আলোচনায় সরাসরি বলা হয়েছে, এই ক্রম কেবল উল্লেখ ও মর্যাদার ক্রম; বিধানের উৎস হিসেবে সুন্নাহ কোরআনের পরে অবস্থান করে, এমন অর্থ করা যাবে না। অর্থাৎ কোরআনকে প্রথমে রাখা হয় সম্মানের তালিকায়, ক্ষমতার তালিকায় নয়। [6]
আরবি: فَإِنَّ هَذَا التَّرْتِيبَ تَرْتِيبٌ فِي الذِّكْرِ وَالشَّرَفِ، وَلَا يُؤْخَذُ بِمَعْنَى أَنَّ السُّنَّةَ مُتَأَخِّرَةٌ فِي مَصْدَرِيَّتِهَا عَنِ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ.
বাংলা: এই ক্রমটি উল্লেখ ও মর্যাদার ক্রম; এর অর্থ এই নয় যে বিধানের উৎস হিসেবে সুন্নাহ কোরআনের পরে অবস্থান করে।
কার্যকর কর্তৃত্ব চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো নির্ভরতার দিকটি দেখা। হাদিস বাদ দিলে কোরআনের আয়াতগুলো যদি বোঝা ও প্রয়োগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, কিন্তু কোরআনের সরাসরি বক্তব্য বাদ দিয়েও হাদিস স্বতন্ত্রভাবে নিষেধাজ্ঞা, শাস্তি ও বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে, তাহলে নির্ভরশীল উৎসটি কোরআন এবং নিয়ন্ত্রক উৎসটি হাদিস। প্রচলিত ইসলামি আইনশাস্ত্রে হাদিসকে কোরআনের অস্পষ্ট অংশ ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাই শুধু দেওয়া হয়নি। হাদিস কোরআনের সাধারণ নির্দেশকে বিশেষ ক্ষেত্রে আটকে দেয়, শর্তহীন বক্তব্যকে নতুন শর্তে বেঁধে ফেলে এবং কোন আয়াত নাসেখ ও কোনটি মানসুখ তা নির্ধারণ করে। এসব ক্ষমতার প্রতিটির অর্থ হলো, কোরআনের লিখিত বাক্য দেখে কোনো মুসলমান চূড়ান্ত বিধান জানতে পারবেন না। তাকে অপেক্ষা করতে হবে হাদিস কী বলছে এবং আইনজ্ঞরা সেই হাদিসকে আয়াতটির ওপর কীভাবে প্রয়োগ করেছেন, তা জানার জন্য। ইসলামকিউএ এই সম্পর্ক লুকিয়ে রাখেনি; সেখানে একই সঙ্গে বলা হয়েছে যে সুন্নাহ কোরআনের সাধারণ বক্তব্যকে বিশেষায়িত করে, শর্তহীন বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করে এবং কোরআনের নাসেখ–মানসুখ চিহ্নিত করে। এরপর মাকহুলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে ঘোষণা করা হয়েছে, সুন্নাহর তুলনায় কোরআনেরই সুন্নাহকে বেশি প্রয়োজন। এটি সমমর্যাদার দুই উৎসের বর্ণনা নয়; এটি একমুখী নির্ভরতার স্বীকারোক্তি। যে কোরআনকে বোঝা, সীমাবদ্ধ করা এবং কার্যকর রাখার জন্য হাদিস প্রয়োজন, সেই কোরআন বাস্তব আইনব্যবস্থায় হাদিসের অধীন। সর্বোচ্চ গ্রন্থের সিংহাসন কোরআনের জন্য রাখা হয়েছে, কিন্তু সিংহাসনের সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাবি তুলে দেওয়া হয়েছে হাদিসের হাতে। [7]
আরবি: وَالسُّنَّةُ مُبَيِّنَةٌ لِمَا أُجْمِلَ فِي كِتَابِ اللهِ، تُخَصِّصُ عُمُومَهُ، وَتُقَيِّدُ مُطْلَقَهُ، وَتُبَيِّنُ النَّاسِخَ مِنَ الْمَنْسُوخِ فِيهِ؛ «الْقُرْآنُ أَحْوَجُ إِلَى السُّنَّةِ مِنَ السُّنَّةِ إِلَى الْقُرْآنِ».
বাংলা: সুন্নাহ আল্লাহর কিতাবের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা করে, তার সাধারণ নির্দেশকে বিশেষায়িত করে, শর্তহীন বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করে এবং তার নাসেখ ও মানসুখ চিহ্নিত করে; “সুন্নাহর প্রতি কোরআনের প্রয়োজন কোরআনের প্রতি সুন্নাহর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি।”
আলেমের মুখে ইসলামের কর্তৃত্বের আসল বিন্যাস
কোরআন ও হাদিসের মধ্যকার ক্ষমতার সম্পর্কটি বোঝার জন্য কোনো সংশয়বাদীর ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই; দেশের একজন পরিচিত আলেমের এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যই কাঠামোটিকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দেয়। তিনি প্রথমেই শুধু কোরআন মানার ধারণাকে “ফেতনা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার যুক্তি হলো, আল্লাহ কোরআনে “পাইকারি কথা” বলেছেন, বহু নির্দেশ দিয়েছেন “ইশারা-ইঙ্গিতে” এবং রাসুলকে পাঠিয়েছেন সেসব কথার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য। তার দাবি আরও কঠোর: হাদিস ও তাফসিরের সাহায্য ছাড়া কোরআনের “একটি আয়াতের ব্যাখ্যাও” করা সম্ভব নয়; কেউ তা করতে গেলে তার ব্যাখ্যা মনগড়া ও ভিত্তিহীন হবে। বক্তব্যটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ আসে তখন, যখন তিনি বলেন, যারা শুধু কোরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিস গ্রহণ করতে চান, তারা আসলে হাদিসে “নতুন কিছু” মানছেন না; এই অবস্থানকে তিনি “সবচেয়ে বড় শয়তানি”, “সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি” এবং ইসলাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অর্থাৎ তার কাছে হাদিসের প্রয়োজন শুধু কোরআনের বাক্য সহজ করে বোঝানোর জন্য নয়। হাদিসকে এমন নতুন বক্তব্য, বিধান ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার অধিকারও দিতে হবে, যা কোরআনে নেই এবং যার গ্রহণযোগ্যতা কোরআনের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা যাবে না। কেউ যদি বলে কোরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না, সেটিও তার চোখে হাদিস অস্বীকার। এখানেই প্রচলিত কর্তৃত্বের আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। কোরআন যদি সর্বোচ্চ মাপকাঠি হতো, তাহলে প্রতিটি ধর্মীয় দাবি কোরআনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা অপরাধ হতে পারত না। কিন্তু এখানে উল্টো নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে: হাদিসকে কোরআনের পরীক্ষায় বসানো যাবে না; বরং কোরআনকে বুঝতে হবে হাদিসের নির্দেশে। কোরআনের সঙ্গে মেলে এমন হাদিস গ্রহণ করাও যথেষ্ট নয়, কারণ হাদিসকে স্বতন্ত্রভাবে “নতুন কিছু” যোগ করার ক্ষমতা না দিলে ইসলাম নাকি তামাশায় পরিণত হবে। বক্তা নিজের অজান্তেই মূল সত্যটি স্বীকার করেছেন, কোরআন একা ইসলামের পূর্ণ বিধান নয়; প্রচলিত ইসলাম টিকিয়ে রাখতে এমন একটি দ্বিতীয় কর্তৃত্ব প্রয়োজন, যা কোরআনের পুনরুক্তি করবে না, বরং কোরআনের বাইরে গিয়ে আইন তৈরি করবে।
এই বক্তব্যের ভেতরে কয়েকটি দাবি পরস্পরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কোনোটিই পরের দাবিটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না। রাসুল কোরআন ব্যাখ্যা করেছেন। এই দাবি সত্য ধরে নিলেও তা থেকে প্রমাণিত হয় না যে পরবর্তী যুগে সংরক্ষিত প্রতিটি গ্রহণযোগ্য হাদিসই সেই ব্যাখ্যার নির্ভুল সংরক্ষণ। নবী কোনো আয়াত ব্যাখ্যা করেছেন কি না, কী ভাষায় করেছেন এবং নির্দিষ্ট বক্তব্যটি সত্যিই তার কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর কোরআন দেয় না; উত্তর দেন বর্ণনাকারী, সংগ্রাহক ও হাদিসবিশারদেরা। ফলে “রাসুলের ব্যাখ্যা মানতে হবে” বাক্যটির আড়ালে প্রকৃতপক্ষে মানতে বলা হয় পরবর্তী মানুষের যাচাই করা বর্ণনাসমষ্টিকে। আরও বড় লাফটি ঘটে ‘ব্যাখ্যা’ থেকে ‘নতুন বিধান’-এ যাওয়ার সময়। ব্যাখ্যার কাজ হলো কোনো বক্তব্যের অর্থ পরিষ্কার করা; কিন্তু মূল বক্তব্যে অনুপস্থিত নিষেধাজ্ঞা, শাস্তি বা বাধ্যবাধকতা তৈরি করা ব্যাখ্যা নয়; তা আইন প্রণয়ন। বক্তা যখন অভিযোগ করেন যে কোরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিস গ্রহণ করলে হাদিসের “নতুন কিছু” মানা হয় না, তখন তিনি স্বীকার করে ফেলেন যে হাদিসের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে হলে তাকে কোরআনের বাইরে স্বাধীন আইন দেওয়ার ক্ষমতা দিতেই হবে। এখানেই কোরআনের সর্বোচ্চতার দাবি ভেঙে পড়ে। সর্বোচ্চ দলিলের অর্থ হলো অধস্তন সব দলিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে বাধ্য থাকবে; কিন্তু কোনো বর্ণনা একবার সহিহ ও প্রযোজ্য বলে গৃহীত হলে কোরআনের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে অমিলের কারণে সাধারণত সেটি বাতিল হয় না। বরং বলা হয়, হাদিস আয়াতটিকে বিশেষ করেছে, সীমাবদ্ধ করেছে, তার প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করেছে অথবা তার বিধান রহিত করেছে। অর্থাৎ সংঘাতের প্রতিটি সম্ভাব্য ফল আগে থেকেই হাদিসের পক্ষে সাজানো। হাদিস কোরআনের সঙ্গে মিললে সেটি কোরআনের সমর্থন; না মিললে সেটিকে কোরআনের ব্যাখ্যা, ব্যতিক্রম, সংযোজন বা রহিতকারী হিসেবে স্থাপন করা হয়। গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হওয়ার পর ব্যাখ্যার এই পর্যায়ে হাদিসকে পিছু হটতে হয় না। বিপরীতে কোরআনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ দাবি করার ভাষাও বজায় থাকে, আবার একই সঙ্গে বলা হয় হাদিস ছাড়া তার একটি আয়াতও বোঝা সম্ভব নয়। যে গ্রন্থকে একদিকে পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ বলা হয়, বিপরীতে যার একটিমাত্র আয়াতও দ্বিতীয় উৎস ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না বলে ঘোষণা করা হয়, তার পূর্ণাঙ্গতা কেবল প্রচারের স্লোগান। বক্তার “পাইকারি কথা” কথাটি তাই সাধারণ উপমা নয়; এটি কোরআনের ব্যবহারিক অক্ষমতার স্বীকারোক্তি। কোরআন কাঁচামাল সরবরাহ করে, হাদিস তার অর্থ ও বিধান উৎপাদন করে, আর আলেমরা নির্ধারণ করেন কোন উৎপাদিত বিধানকে আল্লাহর আইন বলা হবে।
“সুন্নাহ কোরআনের বিচারক”: ইসলামি শাস্ত্রের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি
“সুন্নাহ কোরআনের বিচারক, কোরআন সুন্নাহর বিচারক নয়” বাক্যটি কোনো ইসলামবিরোধী লেখকের বিদ্রূপ নয়। এটি তাবেয়ি ইয়াহইয়া ইবন আবি কাছীরের একটি বহুল উদ্ধৃত শাস্ত্রীয় ঘোষণা। ইসলামওয়েবও বাক্যটির অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি; তারা লিখেছে, দারেমি তার সুনান গ্রন্থে ইয়াহইয়ার এই বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। বাক্যটির ব্যাখ্যায় ইসলামওয়েব বলেছে, এর অর্থ সুন্নাহ কোরআনকে ব্যাখ্যা করে এবং কোরআনের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। এই ব্যাখ্যাকে প্রায়ই মূল বাক্যটির তীব্রতা কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়; যেন ‘বিচারক’ বলতে কোনো ক্ষমতা বোঝানো হয়নি, কেবল নিরীহ ব্যাখ্যা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আইনগত পাঠের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা নিজেই ক্ষমতা। কোনো বাক্যের অর্থ যদি একাধিকভাবে বোঝা সম্ভব হয়, তবে যে পক্ষ তার অনুমোদিত অর্থ নির্ধারণ করে, সেই পক্ষই বাক্যটির ব্যবহারিক ফল নিয়ন্ত্রণ করে। বিচারকও সংসদের লেখা আইন নতুন করে লেখেন না; তিনি আইনের অর্থ, সীমা ও প্রয়োগ নির্ধারণ করেন। ফলে “সুন্নাহ কেবল কোরআনের ব্যাখ্যা করে” বলা “সুন্নাহ কোরআনকে নিয়ন্ত্রণ করে না” কথাটির প্রমাণ নয়; বরং নিয়ন্ত্রণটি কোন প্রক্রিয়ায় ঘটে তার বিবরণ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো বাক্যটির দ্বিতীয় অংশ: “কোরআন সুন্নাহর বিচারক নয়।” এর সরল অর্থ, সুন্নাহকে কোরআনের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহণ বা বর্জন করা যাবে না। কোনো হাদিসকে গ্রহণযোগ্য বলে স্থির করা হলে কোরআনের সঙ্গে তার আপাত সংঘর্ষ হাদিসটির বিরুদ্ধে প্রমাণ হয় না; বরং সেই হাদিস দিয়েই আয়াতের অর্থ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। আয়াত সাধারণ হলে হাদিস তাকে বিশেষ করে, আয়াত শর্তহীন হলে হাদিস শর্ত বসায়, আয়াতের ভাষা এক অর্থ প্রকাশ করলে হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরির জন্য সেই অর্থকে সংকুচিত করা হয়। এটি হাদিসের সনদ যাচাইয়ের পর্যায়ের কথা নয়। কোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর প্রয়োগের পর্যায়ে কোরআন ব্যাখ্যার বস্তু হয়ে যায় এবং হাদিস তার অনুমোদিত পাঠ নির্ধারণ করে। [8]
আরবি: السُّنَّةُ قَاضِيَةٌ عَلَى الْقُرْآنِ، وَلَيْسَ الْقُرْآنُ بِقَاضٍ عَلَى السُّنَّةِ. وَمُرَادُهُمْ أَنَّ السُّنَّةَ تُبَيِّنُ الْقُرْآنَ وَتُفَسِّرُهُ.
বাংলা: সুন্নাহ কোরআনের বিচারক; কোরআন সুন্নাহর বিচারক নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো, সুন্নাহ কোরআনকে স্পষ্ট করে এবং তার ব্যাখ্যা দেয়।
এই অগ্রাধিকার কেবল একটি বিচ্ছিন্ন উক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; উসুলে ফিকহের নিয়মই এটিকে কার্যকর কাঠামোয় পরিণত করেছে। ইসলামপোর্ট পাঠাগারে সংরক্ষিত মাআলিম উসুলিল ফিকহ গ্রন্থে সম্পর্কটি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে প্রথমে বলা হয়েছে, অনুসরণ ও বাধ্যতামূলকতার দিক থেকে কোরআন ও সুন্নাহ সমান। এরপর বলা হয়েছে, কোরআন সুন্নাহর প্রামাণ্যতার ভিত্তি হওয়ায় এক অর্থে কোরআন মূল এবং সুন্নাহ শাখা। কিন্তু ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের স্তরে গিয়ে এই ক্রম উল্টে দেওয়া হয়েছে: সুন্নাহ কোরআনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা করে, সাধারণ বক্তব্যকে বিশেষায়িত করে এবং শর্তহীন বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করে; আর আইনশাস্ত্রের নিয়মে ব্যাখ্যাত বক্তব্য, বিশেষ নির্দেশ ও শর্তযুক্ত নির্দেশ যথাক্রমে সংক্ষিপ্ত, সাধারণ ও শর্তহীন বক্তব্যের ওপর অগ্রাধিকার পায়। গ্রন্থটির সিদ্ধান্ত অস্পষ্ট নয়। এই বিবেচনায় কোরআনের ওপর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া সঠিক। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক তত্ত্বটি চতুরভাবে দুই স্তরে ভাগ করা হয়েছে। উৎসের মর্যাদা নিয়ে কথা উঠলে কোরআন মূল; বাস্তবে কোনো বিধান প্রয়োগের সময় সুন্নাহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। কোরআন সুন্নাহকে প্রামাণ্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, তারপর সেই প্রামাণ্য সুন্নাহ কোরআনের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি একটি আত্মবন্ধনী ক্ষমতার ব্যবস্থা: কোরআনের কয়েকটি আনুগত্যের নির্দেশ থেকে হাদিসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়; প্রতিষ্ঠিত হাদিস দিয়ে আবার সমগ্র কোরআনের পাঠ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে কোরআন নিজের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে এমন একটি দ্বিতীয় উৎসকে ক্ষমতা দেয়, যে উৎস পরে কোরআনের প্রতিটি সাধারণ, সংক্ষিপ্ত বা শর্তহীন বক্তব্যের ওপর বসে যায়। কোনো আয়াতের ভাষা যত স্পষ্টই মনে হোক, আইনজ্ঞ যদি তাকে ‘সাধারণ’ বলেন, একটি হাদিস তাকে সংকুচিত করবে; আয়াতের নির্দেশ যত শর্তহীনই হোক, আইনজ্ঞ যদি হাদিসকে তার সীমা নির্ধারক বলেন, কোরআনের ভাষা আর চূড়ান্ত থাকবে না। এখানে “ব্যাখ্যা” শব্দটি ক্ষমতা গোপন করার পর্দা। পর্দাটি সরিয়ে দিলে নিয়মটি অত্যন্ত সরল: কোরআন বক্তব্য দেয়, কিন্তু কোন বক্তব্যের কতটুকু কার্যকর হবে, তার ফয়সালা দেয় সুন্নাহ। [9]
আরবি: فَصَحَّ بِهَذَا النَّظَرِ تَقْدِيمُ السُّنَّةِ عَلَى الْكِتَابِ، إِلَّا أَنَّ الْإِمَامَ أَحْمَدَ كَرِهَ أَنْ يُقَالَ: السُّنَّةُ تَقْضِي عَلَى الْكِتَابِ.
বাংলা: এই বিবেচনায় কিতাবের ওপর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া সঠিক; তবে ইমাম আহমদ “সুন্নাহ কিতাবের বিচার করে”, এভাবে বলতে অপছন্দ করতেন।
কোরআনকে একা অকার্যকর করে রাখার ব্যবস্থা
কোরআন বারবার নামাজ প্রতিষ্ঠা, যাকাত প্রদান এবং হজ সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু এসব নির্দেশের পূর্ণ ব্যবহারিক কাঠামো কোরআনে নেই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতিটির রাকাতসংখ্যা, নামাজের ধারাবাহিক অঙ্গভঙ্গি, কোন পর্যায়ে কী পড়তে হবে, কোন ঘটনায় নামাজ ভেঙে যাবে, এসব জানতে কোরআনের বাইরে যেতে হয়। একইভাবে কোরআন যাকাতের নির্দেশ দিলেও অধিকাংশ সম্পদের নেসাব, প্রদেয় হারের বিস্তারিত হিসাব এবং আদায়ের বহু শর্ত হাদিস ও পরবর্তী আইনশাস্ত্র থেকে আসে। কোরআন হজের নির্দেশ ও কিছু আচার উল্লেখ করলেও তাওয়াফের চক্করসংখ্যা, বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার বিন্যাস এবং বহু ব্যবহারিক বিধান হাদিসনির্ভর। ইসলামি শাস্ত্র নিজেই এই ঘাটতিকে কোরআনের ওপর হাদিসের নির্ভরতা প্রতিষ্ঠার প্রধান যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইমরান ইবন হুসাইন কোরআনমাত্র অনুসরণের দাবির জবাবে প্রশ্ন করেন, কোরআনে কি জোহর ও আসরের চার রাকাত, মাগরিবের তিন রাকাত কিংবা কাবাঘরের চারদিকে সাতবার তাওয়াফের নির্দেশ পাওয়া যাবে? উত্তরের অনুপস্থিতিই এখানে হাদিসের কর্তৃত্বের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে। এই যুক্তির তাৎপর্য গুরুতর। কোরআনের আদেশকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে আদেশটি মানার ইচ্ছা থাকলেও হাদিস ছাড়া তা নির্দিষ্ট রূপে পালন করা যাবে না। কোরআন বলে নামাজ পড়তে, কিন্তু প্রচলিত নামাজটি কী, তার নিয়ন্ত্রণ কোরআনের হাতে নেই। কোরআন বলে যাকাত দিতে, কিন্তু সম্পদের নেসাব ও প্রদেয় হারের বড় অংশ কোরআন নির্ধারণ করে না। কোরআন হজের আদেশ দেয়, কিন্তু গ্রহণযোগ্য হজের পূর্ণ পদ্ধতি অন্য উৎস নির্ধারণ করে। ফলে হাদিসকে বাদ দিলে শুধু কিছু অতিরিক্ত ধর্মীয় তথ্য হারিয়ে যায় না; ইসলামের প্রধান স্তম্ভগুলোর স্বীকৃত রূপই ভেঙে পড়ে। কোরআনের নির্দেশ তখন বাস্তব কর্মপদ্ধতি নয়, অসম্পূর্ণ শিরোনামমাত্র। হাদিস সেই শিরোনামের নিচে বিষয়বস্তু লিখে দেয়। যে উৎস ছাড়া অন্য উৎসের মৌলিক আদেশ পালনই সম্ভব নয়, ব্যবহারিক ধর্মে ক্ষমতা সেই অপরিহার্য উৎসের হাতেই জমা হয়। [10]
আরবি: أَكُنْتَ تَجِدُ فِيهِ صَلَاةَ الظُّهْرِ أَرْبَعًا، وَصَلَاةَ الْعَصْرِ أَرْبَعًا، وَالْمَغْرِبِ ثَلَاثًا؟ أَتَجِدُ الطَّوَافَ بِالْبَيْتِ سَبْعًا، وَالطَّوَافَ بِالصَّفَا وَالْمَرْوَةِ؟
বাংলা: তুমি কি কোরআনে পেতে যে জোহরের নামাজ চার রাকাত, আসরের নামাজ চার রাকাত এবং মাগরিবের নামাজ তিন রাকাত? তুমি কি তাতে পেতে যে কাবাঘরের চারদিকে সাতবার এবং সাফা-মারওয়ার মধ্যে তাওয়াফ করতে হবে?
নামাজের রাকাতসংখ্যা বা হজের আচার কোরআনে বিস্তারিত না থাকার বিষয়টি সর্বপ্রকার হাদিসের সমান কর্তৃত্ব প্রমাণ করে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমষ্টিগতভাবে পালিত নামাজের পদ্ধতি এবং কোনো একক বর্ণনাশৃঙ্খলে সংরক্ষিত শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞা একই ধরনের প্রমাণ নয়। প্রথমটি একটি সম্প্রদায়ের প্রকাশ্য ও ধারাবাহিক অনুশীলন; দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট কয়েকজন বর্ণনাকারীর স্মৃতি, বিশ্বস্ততা এবং পরবর্তী হাদিসবিশারদের রায়ের ওপর নির্ভরশীল। নামাজ কীভাবে পড়তে হবে তা নবী ও প্রথম মুসলিমদের অনুশীলন থেকে শেখা হয়েছে, এ তথ্য থেকে যৌক্তিকভাবে এই সিদ্ধান্ত আসে না যে প্রতিটি গ্রহণযোগ্য আহাদ হাদিসও কোরআনের বক্তব্য সীমাবদ্ধ বা অকার্যকর করতে পারবে। কিন্তু প্রচলিত শাস্ত্রীয় যুক্তি এই পার্থক্যটি মুছে দেয়। নামাজের পদ্ধতিগত নির্ভরতা দেখিয়ে প্রথমে সুন্নাহর প্রয়োজন প্রমাণ করা হয়; তারপর সেই প্রয়োজনকে ব্যবহার করে হাদিসকে স্বতন্ত্র ও সমান্তরাল আইনপ্রণেতার মর্যাদা দেওয়া হয়। ইসলামকিউএ স্পষ্টভাবে বলেছে, আইনগত নির্দেশনা ও ধর্মীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কোরআনে থাকা বিধান এবং সুন্নাহয় প্রতিষ্ঠিত বিধানের মধ্যে ইসলামি শরিয়ত কোনো পার্থক্য করে না। এর অর্থ, কোরআনে কোনো বিধান সরাসরি লেখা আছে কি না, তা সেই বিধানের আইনগত ওজন নির্ধারণ করে না। একটি হাদিসকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হলে তার বিধানও কোরআনের বিধানের মতোই বাধ্যতামূলক। এখানেই ব্যবহারিক প্রয়োজনকে ক্ষমতার সমতায় এবং পরে কার্যকর অগ্রাধিকারে রূপান্তর করা হয়। কোরআনের অসম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক নির্দেশ প্রমাণ করে যে ধর্মীয় আচারের জন্য অতিরিক্ত ঐতিহ্য প্রয়োজন; কিন্তু শাস্ত্রীয় ব্যবস্থা সেখানেই থামে না। সেই অতিরিক্ত ঐতিহ্যকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার সাহায্যে কোরআনে অনুল্লিখিত অপরাধের শাস্তি তৈরি করা যায়, কোরআনের অনুমোদিত ক্ষেত্র সংকুচিত করা যায় এবং আয়াতের বিধানকে মৃত ঘোষণা করা যায়। নামাজের রাকাতসংখ্যাকে সামনে রেখে তাই শুধু নামাজের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা হয় না; একই দরজা দিয়ে হাদিসের পূর্ণ আইনগত সার্বভৌমত্ব প্রবেশ করানো হয়। কোরআনের ঘাটতিকে হাদিস পূরণ করে। এই সীমিত দাবি ধীরে ধীরে বদলে যায়: হাদিস যা বলবে, সেটিও কোরআনের মতোই আল্লাহর বাধ্যতামূলক আইন। [11]
আরবি: الشَّرِيعَةُ الْإِسْلَامِيَّةُ لَا تُفَرِّقُ فِي الدَّلَالَاتِ التَّشْرِيعِيَّةِ وَالْأَوْلَوِيَّاتِ الدِّينِيَّةِ بَيْنَ مَا وَرَدَ فِي الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ، وَمَا ثَبَتَ فِي السُّنَّةِ النَّبَوِيَّةِ.
বাংলা: আইনগত নির্দেশনা ও ধর্মীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে যা এসেছে এবং নবীর সুন্নাহয় যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইসলামি শরিয়ত এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করে না।
ব্যাখ্যার নামে কোরআনের ওপর নিয়ন্ত্রণ
উসুলে ফিকহের তিনটি নিরীহ শোনানো পরিভাষা, ব্যাখ্যা, বিশেষায়ন ও শর্তারোপ, কোরআনের ওপর হাদিসের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের প্রধান অস্ত্র। কোরআনের কোনো নির্দেশ সংক্ষিপ্ত বা অনির্দিষ্ট হলে তাকে বলা হয় মুজমাল; হাদিস এসে তার বিস্তারিত রূপ নির্ধারণ করে। কোনো আয়াতের ভাষা একটি শ্রেণির সব সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে সেটি আম বা সাধারণ; হাদিস সেই শ্রেণির কিছু সদস্যকে আয়াতের বিধান থেকে বের করে দিলে তাকে বলা হয় তাখসিস বা বিশেষায়ন। কোনো নির্দেশে আলাদা শর্ত বা সীমা উল্লেখ না থাকলে সেটি মুতলাক বা শর্তহীন; হাদিস তাতে নতুন শর্ত বসালে তাকে বলা হয় তাকয়িদ বা সীমাবদ্ধকরণ। পরিভাষাগুলো এমনভাবে তৈরি যে এগুলো শুনলে মনে হয় আয়াতের বক্তব্য অক্ষত রেখেই কেবল তার অর্থ পরিষ্কার করা হচ্ছে। বাস্তবে প্রতিটি পদ্ধতি আয়াতের আইনগত ফল বদলে দেয়। একটি আয়াতের ভাষা একশ্রেণির দশজনকেই অন্তর্ভুক্ত করল, হাদিস তার মধ্য থেকে ছয়জনকে বাদ দিল; তাহলে আয়াতটি কাগজে দশজনের জন্য থাকলেও আইনে কার্যকর হলো চারজনের জন্য। একটি আয়াত কোনো কাজকে শর্তহীনভাবে বৈধ বলল, হাদিস তাতে পাঁচটি শর্ত যোগ করল; তাহলে বাস্তবে বৈধতা নির্ধারণ করছে আয়াত নয়, হাদিসের শর্তগুলো। ইসলামপোর্ট পাঠাগারে সংরক্ষিত উসুলে ফিকহের আলোচনায় নিয়মটি পরিষ্কারভাবে লেখা হয়েছে: সুন্নাহ কোরআনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা করে, সাধারণ বক্তব্যকে বিশেষায়িত করে এবং শর্তহীন বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করে; এরপর বিশেষ ও সীমাবদ্ধ বক্তব্যকে কোরআনের সাধারণ ও শর্তহীন ভাষার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থায় হাদিসকে আয়াত বাতিল করার ঘোষণা দিতে হয় না। আয়াতের শব্দ মুসহাফে রেখে তার আওতা ছোট করে দিলেই একই কাজ সম্পন্ন হয়। তাই ‘হাদিস কোরআন পরিবর্তন করেনি, শুধু ব্যাখ্যা করেছে’। এই দাবি ফলাফলের দিক থেকে অর্থহীন। কোনো বক্তব্যের আওতায় কে থাকবে, কে বাদ যাবে এবং কোন শর্তে বক্তব্যটি কার্যকর হবে, এসব নির্ধারণ করাই সেই বক্তব্যের আইনগত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা। কোরআন বাক্য সরবরাহ করে; হাদিস সেই বাক্যের বৈধ পাঠ, লক্ষ্যব্যক্তি এবং প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ করে। [12]
আরবি: السُّنَّةُ مُبَيِّنَةٌ لِمَا أُجْمِلَ فِي الْقُرْآنِ، وَهِيَ مُخَصِّصَةٌ لِعُمُومِهِ، مُقَيِّدَةٌ لِمُطْلَقِهِ، وَالْبَيَانُ وَالْخَاصُّ وَالْمُقَيَّدُ مُقَدَّمٌ عَلَى الْمُجْمَلِ وَالْعَامِّ وَالْمُطْلَقِ.
বাংলা: সুন্নাহ কোরআনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যাকারী, তার সাধারণ বক্তব্যের বিশেষায়নকারী এবং তার শর্তহীন বক্তব্যের সীমা নির্ধারক; আর ব্যাখ্যাত, বিশেষ ও সীমাবদ্ধ বক্তব্য সংক্ষিপ্ত, সাধারণ ও শর্তহীন বক্তব্যের ওপর অগ্রাধিকার পায়।
এই নিয়ন্ত্রণ শুধু বহু মানুষের ধারাবাহিক বর্ণনায় প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ উসুলবিদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য খবরে আহাদ, অর্থাৎ যে হাদিস প্রতিটি স্তরে অসংখ্য স্বাধীন সূত্রে বর্ণিত নয়, দিয়েও কোরআনের সাধারণ বক্তব্যকে সংকুচিত করা যায়। ইসলামকিউএ ইবন নাজ্জার আল-ফুতুহির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, কিতাবকে সুন্নাহ দিয়ে নিঃশর্তভাবে বিশেষায়িত করা যাবে, সেই সুন্নাহ মুতাওয়াতির হোক কিংবা আহাদ। উদাহরণ হিসেবে কোরআনের “এদের বাইরে অন্য নারীরা তোমাদের জন্য বৈধ” বক্তব্যকে সেই হাদিস দিয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে কোনো নারী ও তার ফুফু অথবা খালাকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। একই নিয়মে চুরির আয়াতকে নির্দিষ্ট নেসাবের নিচের চুরি থেকে সীমাবদ্ধ করা এবং মুশরিকদের বিষয়ে সাধারণ নির্দেশ থেকে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বের করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদ্ধতির পেছনের যুক্তি হলো, কোরআনের সাধারণ শব্দ তার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়; বিপরীতে হাদিসটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলায় সেই নির্দিষ্ট বক্তব্যকে সাধারণ ভাষার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। ফলে কোরআনের পাঠ যে ব্যাপক ও নিশ্চিত সংরক্ষণে এসেছে, সেটি এখানে তাকে রক্ষা করে না। পাঠের অস্তিত্ব নিশ্চিত হলেও তার সাধারণ প্রয়োগকে ‘অনিশ্চিত’ ঘোষণা করা হয়; তারপর তুলনামূলকভাবে সীমিত বর্ণনাসূত্রে আসা একটি হাদিস দিয়ে তার কার্যক্ষেত্র কেটে দেওয়া হয়। এভাবে প্রমাণের শক্তির বদলে বক্তব্যের সাধারণতা ও বিশেষত্ব ক্ষমতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। একজন পাঠক কোরআনের সাধারণ ভাষা দেখে যে বিধান বুঝবেন, একটি একক সূত্রের হাদিস সেই বোঝাপড়াকে আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য করে দিতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই প্রক্রিয়াকে বিরোধ বা সংশোধন বলা হয় না; বলা হয় ‘সমন্বয়’। কোরআন সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং হাদিস তাদের কিছু অংশকে বাদ দিয়েছে, তবু বলা হয় দুটি বক্তব্যের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ নেই, কারণ হাদিস নাকি কোরআনের ‘প্রকৃত সীমা’ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেই প্রকৃত সীমা কোরআনের ভাষায় দৃশ্যমান নয়; সেটি জানা যাচ্ছে কেবল হাদিস থেকে। অর্থাৎ হাদিস প্রথমে আয়াতের একটি অংশকে কার্যত অকার্যকর করছে, তারপর সেই অকার্যকর করাকেই আয়াতের আসল অর্থ বলে ঘোষণা করছে। নাম দেওয়া হয়েছে বিশেষায়ন; ফল হলো কোরআনের প্রকাশ্য পরিসরের ওপর হাদিসের কর্তৃত্ব। [13]
আরবি: يُخَصَّصُ الْكِتَابُ بِبَعْضِهِ، وَبِالسُّنَّةِ مُطْلَقًا، سَوَاءٌ كَانَتْ مُتَوَاتِرَةً أَوْ آحَادًا. وَخَبَرُ الْوَاحِدِ أَخَصُّ مِنَ الْعُمُومِ، فَوَجَبَ تَقْدِيمُهُ عَلَى الْعُمُومِ.
বাংলা: কিতাবের এক অংশ দিয়ে অন্য অংশকে এবং সুন্নাহ দিয়ে নিঃশর্তভাবে কিতাবকে বিশেষায়িত করা যায়, সুন্নাহটি মুতাওয়াতির হোক বা আহাদ। একক সূত্রের বর্ণনা সাধারণ বক্তব্যের চেয়ে বিশেষ; তাই সাধারণ বক্তব্যের ওপর সেটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নাসেখ–মানসুখ: কোন আল্লাহর কথা এখন আর মানতে হবে না
নাসখ সাধারণ ব্যাখ্যা বা বিশেষায়নের চেয়েও সরাসরি ক্ষমতার প্রয়োগ। এর অর্থ হলো, একটি শরিয়তি দলিলের বিধান অথবা তার পাঠকে পরবর্তী শরিয়তি দলিল দিয়ে তুলে দেওয়া। ইসলামকিউএ নাসখের সংজ্ঞাতেই বলেছে, কোরআন বা সুন্নাহর দলিল দিয়ে কোনো শরিয়তি বিধান কিংবা তার শব্দাবলি অপসারণ করাই নাসখ। প্রচলিত শ্রেণিবিভাগে এর অন্তত তিনটি ভয়াবহ রূপ রয়েছে: পাঠ ও বিধান উভয়ই রহিত; পাঠ রহিত কিন্তু বিধান বহাল; এবং পাঠ বহাল কিন্তু বিধান রহিত। তৃতীয় অবস্থায় আয়াত কোরআনে থাকে, মুসলমান সেটি তিলাওয়াত করেন, নামাজে পড়েন এবং প্রতিটি অক্ষরকে আল্লাহর সংরক্ষিত বাণী বলে বিশ্বাস করেন, কিন্তু আয়াতটির নির্দেশ আর পালন করেন না। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থায় পরিস্থিতি আরও বিচিত্র: এমন কথাকে একসময় কোরআন হিসেবে পাঠ করা হয়েছে বলে হাদিসে দাবি করা হয়, অথচ বর্তমান মুসহাফে তার অস্তিত্ব নেই। কখনো সেই অনুপস্থিত পাঠের বিধানও বিলুপ্ত, আবার কখনো শব্দগুলো কোরআন থেকে হারিয়ে গেলেও তার আইন এখনো কার্যকর। ফলে মুসহাফ হাতে নিয়ে একজন পাঠক জানতেই পারবেন না ইসলামের পূর্ণ আইন কী। দৃশ্যমান আয়াতগুলোর মধ্যে কোনটি জীবিত আর কোনটির বিধান মৃত, তা মুসহাফ নিজে চিহ্নিত করে না। একইভাবে মুসহাফে অনুপস্থিত কোনো কথার বিধান এখনো মানতে হবে কি না, সেটিও কোরআনের বর্তমান পাঠ জানায় না। এই জ্ঞান আসে হাদিস, সাহাবিদের বর্ণিত স্মৃতি, অবতরণের কালক্রম এবং পরবর্তী আইনজ্ঞদের সিদ্ধান্ত থেকে। অর্থাৎ কোরআনের সীমানা ও কার্যকারিতা, দুইটিই কোরআনের বাইরের বর্ণনার হাতে বন্দী। সংরক্ষিত গ্রন্থের দাবি এখানে অদ্ভুত দ্বৈত রূপ নেয়: শব্দ সংরক্ষিত থাকলেও আইন সংরক্ষিত নাও থাকতে পারে; আবার শব্দ সংরক্ষিত না থাকলেও আইন বহাল থাকতে পারে। কোন ক্ষেত্রে কোন নিয়ম চলবে, তা নির্ধারণ করে হাদিসনির্ভর শাস্ত্র। কোরআনের কোনো আয়াত পড়া তাই আয়াতটির বর্তমান আইন জানার জন্য যথেষ্ট নয়; প্রথমে জানতে হয় শাস্ত্রকারেরা সেটিকে মানসুখ ঘোষণা করেছেন কি না। কোরআন নিজের মৃত আয়াতের কবরফলকও নিজে বহন করে না। [14]
আরবি: النَّسْخُ فِي الِاصْطِلَاحِ: رَفْعُ حُكْمِ دَلِيلٍ شَرْعِيٍّ، أَوْ لَفْظِهِ، بِدَلِيلٍ مِنَ الْكِتَابِ أَوِ السُّنَّةِ.
বাংলা: পরিভাষায় নাসখ হলো কোরআন বা সুন্নাহর কোনো দলিল দিয়ে একটি শরিয়তি দলিলের বিধান অথবা তার শব্দাবলি তুলে দেওয়া।
হাদিস কোরআনের আয়াত রহিত করতে পারে কি না? এই প্রশ্নে মুসলিম আইনজ্ঞরা একমত নন; কিন্তু মতভেদটি কোরআনের কর্তৃত্ব রক্ষা করে না, বরং তার আইনগত অনিশ্চয়তাকে আরও স্পষ্ট করে। আল-বাহরুল মুহিত-এর আলোচনায় বলা হয়েছে, মুতাওয়াতির সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার বিষয়ে মতভেদ থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান হলো: এটি বৈধ এবং বাস্তবে ঘটেছেও। হানাফি, আশআরি এবং বহু কালামশাস্ত্রবিদ এই অবস্থান অনুমোদন করেছেন বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে শাফেয়ির প্রসিদ্ধ অবস্থান এবং আহমদের একটি অবস্থান হলো, সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করা যাবে না। একক সূত্রের হাদিসের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ উসুলবিদ নিষেধের পক্ষে; কিন্তু এখানেও সর্বসম্মতি নেই। ইসলামকিউএ একই আলোচনায় স্বীকার করেছে, কিছু হানাফি উসুলবিদ এবং অন্য কয়েকজন আলেম একক সূত্রের হাদিস দিয়েও কোরআনের পাঠের বিধান রহিত করা বৈধ বলেছেন। শানকিতি আরও সরাসরি মত দিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে এসেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেলে গ্রহণযোগ্য একক সূত্রের হাদিস দিয়েও মুতাওয়াতির দলিল রহিত হতে পারে। অর্থাৎ বিরোধটি কোরআনের কোনো স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে মীমাংসিত নয়; আইনজ্ঞরা নিজেদের প্রমাণতত্ত্ব অনুযায়ী ঠিক করছেন একটি হাদিস আল্লাহর লিখিত বাণীর বিধান সরিয়ে দিতে পারবে কি না। যারা আনুষ্ঠানিক নাসখ প্রত্যাখ্যান করেন, তারাও বিশেষায়ন, শর্তারোপ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে বহু ক্ষেত্রে একই ব্যবহারিক ফল গ্রহণ করেন। আয়াতের বিধান সম্পূর্ণ তুলে দিলে নাম ‘নাসখ’; আয়াতের আওতা এমনভাবে সংকুচিত করা হলো যে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আর তা প্রয়োগ করা গেল না, তখন নাম ‘তাখসিস’। পরিভাষা বদলেছে, কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য ফল বদলায়নি, কোরআনের প্রকাশ্য নির্দেশ কার্যকর হয়নি, হাদিসের নির্দেশই আইন হয়েছে। এই কারণেই “সব আলেম হাদিস দিয়ে কোরআন রহিত করা মানেন না” বক্তব্যটি কোরআনের স্বাধীন কর্তৃত্ব প্রমাণ করতে পারে না। একদল সরাসরি রহিতকরণের অনুমতি দিয়েছে; অন্য দল এমন ব্যাখ্যাগত পদ্ধতি গ্রহণ করেছে যার সাহায্যে আয়াতের আইনগত পরিসর কেটে দেওয়া যায়। দুই পথের শেষেই কোরআনের কার্যকর অর্থ নির্ধারণ করছে বাইরের বর্ণনা। আল্লাহর কোন কথা এখনো আইন, কোনটি শুধু তিলাওয়াতের উপাদান এবং কোন অনুপস্থিত কথার আইন এখনো বহাল, এই চূড়ান্ত তালিকা কোরআন দেয় না; দেয় হাদিস ও মানুষের নির্মিত আইনশাস্ত্র। [15] [16]
আরবি: وَإِنْ كَانَتِ السُّنَّةُ مُتَوَاتِرَةً فَاخْتَلَفُوا فِيهِ، فَالْجُمْهُورُ عَلَى جَوَازِهِ وَوُقُوعِهِ.
বাংলা: সুন্নাহ মুতাওয়াতির হলে এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে; সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে তা বৈধ এবং বাস্তবে ঘটেছে।
আরবি: لَا يَجُوزُ نَسْخُ السُّنَّةِ الْآحَادِيَّةِ لِنُصُوصِ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ؛ وَهُوَ قَوْلُ جَمَاهِيرِ الْأُصُولِيِّينَ. وَقِيلَ: يَجُوزُ نَسْخُ الْمُتَوَاتِرِ بِالْآحَادِ الصَّحِيحَةِ الثَّابِتِ تَأَخُّرُهَا عَنْهُ.
বাংলা: সংখ্যাগরিষ্ঠ উসুলবিদের মতে একক সূত্রের সুন্নাহ দিয়ে কোরআনের পাঠ রহিত করা বৈধ নয়। আরেক মতে, পরবর্তী হওয়া প্রমাণিত হলে গ্রহণযোগ্য একক সূত্রের বর্ণনা দিয়েও মুতাওয়াতির দলিল রহিত করা বৈধ।
আহকামুল কোরআনের স্বীকারোক্তি: সুন্নাহ দিয়েও আয়াতের বিধান বাতিল
হানাফি আইনজ্ঞ আবু বকর আল-জাসসাস তার আহকামুল কোরআন গ্রন্থে বাকারা ২:১০৬ আয়াতের “আমি তার চেয়ে উত্তম অথবা তার সমতুল্য কিছু নিয়ে আসি” অংশটিকে সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেননি; উল্টো তিনি আয়াতটিকে এর বৈধতার পক্ষে অধিক শক্তিশালী প্রমাণ বলেছেন। তার যুক্তি হলো, “উত্তম” বলতে পাঠ, ভাষা বা অলৌকিকতার বিচারে একটি বাণীর চেয়ে আরেকটি বাণী উত্তম বোঝানো হয়নি। এখানে মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর অথবা তুলনামূলক সহজ বিধান বোঝানো হয়েছে। আর সেই সহজ বা কল্যাণকর বিকল্প কোরআনের আয়াতের মাধ্যমেই আসতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তিনি মানেননি; তা সুন্নাহর পথেও আসতে পারে। জাসসাস আরও বলেন, আয়াতে মূলত তিলাওয়াত রহিত করার কথা রয়েছে; অথচ কোনো আয়াতের পাঠ তুলে নেওয়া হলেই তার বিধানও উঠে যাবে, এমন অনিবার্য সম্পর্ক নেই। এখান থেকে একই সঙ্গে দুইটি দরজা খোলা হয়। প্রথমত, কোরআনের একটি বিধানের স্থানে অ-কোরআনিক সুন্নাহ কার্যকর বিধান হিসেবে বসতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোরআনের পাঠ বিলুপ্ত হলেও তার আইন হাদিসের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে। বাংলা সংস্করণের ছবিতে বন্ধনীর মধ্যে নাসখকে “কোরআনের বিপরীত কথা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হলে হাদিসকে অগ্রাধিকার দেওয়া” বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই বাক্যটি জাসসাসের মূল আরবির চেয়ে বিস্তৃত; জাসসাস যেকোনো বিরোধী হাদিসকে কোরআনের ওপর বসানোর কথা বলেননি, বরং শরিয়তসম্মতভাবে পরবর্তী ও প্রামাণ্য সুন্নাহ দিয়ে আগের কোরআনিক বিধান রহিত হওয়ার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু নির্ভুলভাবে সীমিত করেও তার বক্তব্যের ফল সামান্য নয়। তিনি এমন একটি আইনতত্ত্ব মেনে নিচ্ছেন যেখানে আল্লাহর লিখিত আয়াতের বিধান সরিয়ে তার স্থানে এমন নির্দেশ কার্যকর হতে পারে, যার শব্দ কোরআনের অংশ নয়। মুসহাফ তখন সর্বোচ্চ দৃশ্যমান দলিল, কিন্তু শেষ কার্যকর আদেশের একচ্ছত্র উৎস নয়। [17]
… হয় বোঝা হালকাকরণ কিংবা কল্যাণময়তা। আর তা সুন্নাত দ্বারাও হতে পারে। যেমন হতে পারে কুরআন দ্বারা। তাদের কেউ বলেন নি যে, পাঠের কথাই বুঝিয়েছেন। কাজেই উপরোদ্ধৃত আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সুন্নাত দ্বারা কুরআনের আয়াত মনসূখ হওয়া (অর্থাৎ কুরআনের বিপরীত কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলে হাদীসকে অগ্রাধিকার দেয়া) জায়েয। একথা অধিক সুস্পষ্ট ও প্রকাশমান তা জায়েয না হওয়ার কথার তুলনায়। উপরন্তু একথার নিগূঢ় অর্থ হল পাঠ মনসূখ হওয়া। আয়াতে এর কোন হুকুম নেই। আল্লাহ কথা مَا نَنْسَخُ مِنْ آيَةَ আয়াত থেকে যা মনসূখ করি। আর আয়াত হল তা যা পাঠ করা হয়। আর পাঠ মনসূখ হলে হুকুমটাও মনসূখ হবে- এমন কথা নেই। অবস্থা যখন এই, তখন এই অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আয়াতের পাঠ যদি মনসূখ করি কিংবা ভুলিয়ে দিই, তাহলে তোমাদের জন্যে তদপেক্ষা উত্তম জিনিস নিয়ে আসি সুন্নাতের পথে, যা মুহকাম-সুদৃঢ় ও মজবুত। এই বিষয়ে ব্যাপক কথা ‘উসুলিল ফিকাহ’ কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছি, যা খুবই যথেষ্ট। তা পাঠ করলেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সব জানা যাবে।
আল্লাহ্র কথা:
فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ –
অতএব তোমরা ক্ষমা করে দাও, ঝঞ্ঝাট দূর কর, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তার ফরমান নিয়ে আসবেন।
মূ’মার এ আয়াতের তাফসীরে কাতাদাহ্র এই কথা বর্ণনা করেছেন: উক্ত আয়াতটিকে মনসূখ করেছে আল্লাহর এই কথাটি:
فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ –
অতএব তোমরা মুশরিকদের হত্যা কর, যেখানে যেভাবেই তাদেরকে তোমরা পাবে।
আবু মুহাম্মাদ জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আল-ওয়াসেতী আবুল ফজল জাফর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল ইয়ামন আবু উবায়দ আবদুল্লাহ্ ইবনে সালিহ মুআবিয়াত ইবনে সালিহ আলী ইবনে আবু তালহা ইবনে আব্বাস থেকে لَسْتَ عَلَيْهِم بمصيطر ‘তুমি তাদের উপর দারোগা নও’ এবং আল্লাহর কথা : وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِجَبَّارٍ ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তিকারী নও’ فَأَعْفُ عَنْهُمْ وَأَصْفَحْع তাদের দিক থেকে তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও এবং সাফ সাফাই করে নাও। আয়াত:
قُلْ لِلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللهِ .
ঈমানদার লোকদেরকে বল, তারা যেন ক্ষমা করে দেয় আল্লাহ্ শাসনামলকে যারা আশা করে না, তাদেরকে।
বলেছেন যে, এই সব কয়টি আয়াতকেই মনসুখ করে দিয়েছে আল্লাহ্র এই কথা: ‘মুশরিকদের হত্যা কর যেখানেই যেভাবেই তোমরা পাবে।’ …

একই পৃষ্ঠার পরবর্তী আলোচনা তাত্ত্বিক অনুমতিকে সরাসরি রাজনৈতিক ও নৈতিক বিধানের ক্ষেত্রে নিয়ে যায়। জাসসাস কাতাদাহর মত উদ্ধৃত করে বলেন, বাকারা ২:১০৯-এর “তোমরা ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তার নির্দেশ নিয়ে আসেন” নির্দেশকে তাওবা ৯:৫-এর “মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো” আয়াত রহিত করেছে। এরপর ইবন আব্বাসের আরও বিস্তৃত একটি মত উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে “তুমি তাদের ওপর নিয়ন্ত্রক নও”, “তুমি তাদের ওপর জবরদস্তিকারী নও”, “তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও ও ক্ষমা করো” এবং “যারা আল্লাহর দিনগুলোর প্রত্যাশা করে না, মুমিনরা যেন তাদের ক্ষমা করে”, এ ধরনের নির্দেশগুলোকে পরবর্তী যুদ্ধসংক্রান্ত আয়াত দ্বারা রহিত বলা হয়েছে। এগুলো জাসসাসের নিজের তৈরি তালিকা নয়; তিনি কাতাদাহ ও ইবন আব্বাসের নাসখের মত উদ্ধৃত করছেন। কিন্তু সেই পার্থক্য মূল সমস্যাকে দূর করে না। কোরআনের পাঠক মুসহাফ খুলে দেখবেন ক্ষমা, উপেক্ষা, বিতর্কে উত্তম পন্থা এবং জবরদস্তি পরিহারের নির্দেশ; পাঠের কোথাও লেখা নেই যে এসব বাক্য এখন শুধু তিলাওয়াতের জন্য, আইন হিসেবে আর কার্যকর নয়। আয়াতগুলোর বর্তমান আইনগত অবস্থা নির্ধারণ করতে তাকে বর্ণিত কালক্রম ও তাফসিরকারের রায়ের কাছে যেতে হবে। জাসসাসের ব্যাখ্যায় আগের আয়াতগুলো যুদ্ধের বাধ্যবাধকতা আসার পূর্ববর্তী পর্যায়ের নির্দেশ; মদিনায় যুদ্ধের বিধান আসার পর সম্পর্কের আইন বদলে গেছে। এর অর্থ সব অমুসলিমকে সব পরিস্থিতিতে হত্যা করার অবাধ নির্দেশ নয়; তাওবা ৯:৫ ও ৯:২৯-এর নিজস্ব ঐতিহাসিক এবং আইনগত প্রয়োগক্ষেত্র রয়েছে। কিন্তু উদ্ধৃত নাসখ-মতের দাবি তবু পরিষ্কার: আগের অহিংস নির্দেশগুলোর স্বাধীন ও স্থায়ী আইনগত শক্তি নেই; পরবর্তী যুদ্ধবিধান তাদের স্থান দখল করেছে। পাঠ রয়ে গেছে সহিষ্ণুতার, চূড়ান্ত আইন নির্ধারিত হয়েছে অন্য আয়াতের কালক্রম সম্পর্কে বর্ণনার মাধ্যমে। ফলে কোরআনের নৈতিক বক্তব্যগুলোর মধ্যেও পাঠক কেবল মুসহাফ দেখে ঠিক করতে পারেন না কোনটি স্থায়ী নীতি আর কোনটি বাতিল পর্যায়ের স্মৃতি। সেই ক্ষমতা আবারও চলে যায় হাদিস, আসার ও আইনজ্ঞের হাতে। [18]
আরবি: فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ. قَالَ قَتَادَةُ: نَسَخَتْهَا: فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ.
বাংলা: “অতএব তোমরা ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তার নির্দেশ নিয়ে আসেন।” কাতাদাহ বলেছেন, “মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো”। এই আয়াতটি আগের নির্দেশকে রহিত করেছে।
উত্তরাধিকারের অসিয়ত: আয়াত আছে, হাদিস বলেছে মানা যাবে না
বাকারা ২:১৮০ আয়াতে সম্পদ রেখে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তির ওপর পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সংগত অসিয়ত করাকে কর্তব্য করা হয়েছে। আয়াতটির ভাষা পরামর্শমূলক নয়, “তোমাদের ওপর লিখে দেওয়া হয়েছে” এবং “মুত্তাকিদের ওপর এটি অবশ্যপালনীয়” ধরনের বাধ্যতামূলক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু প্রচলিত সুন্নি আইনে কোনো উত্তরাধিকারীর নামে অসিয়ত করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না; অন্য উত্তরাধিকারীরা সম্মতি না দিলে সেটি বাতিল বলে গণ্য হয়। এই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি বাক্য কোরআনে নেই। কোরআনের উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আয়াতগুলো স্ত্রী, স্বামী, সন্তান ও পিতা-মাতার নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করেছে, কিন্তু কোথাও বলেনি যে নির্ধারিত অংশ পাওয়া ব্যক্তি অসিয়তের সুবিধাভোগী হতে পারবেন না। বরং নিসা ৪:১১–১২ আয়াতে উত্তরাধিকার বণ্টনের নির্দেশ একাধিকবার “কৃত অসিয়ত ও ঋণ পরিশোধের পর” কার্যকর করতে বলা হয়েছে। কোরআনের পাঠকে একা বিচার করলে উত্তরাধিকার এবং অসিয়ত পাশাপাশি চলতে পারে, প্রথমটি মৃত্যুর পর বাধ্যতামূলক অংশ, দ্বিতীয়টি মৃত ব্যক্তির পূর্বঘোষিত ইচ্ছা। এই দুই ব্যবস্থাকে পরস্পর-বিরোধী ঘোষণা করে উত্তরাধিকারীকে অসিয়ত থেকে বাদ দেওয়ার ভিত্তি হলো এই হাদিস: “আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার দিয়েছেন; অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।” ইসলামকিউএ স্বীকার করেছে, পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য অসিয়ত আগে বাধ্যতামূলক ছিল; উত্তরাধিকারের আয়াত নাজিল হওয়ার পর উত্তরাধিকারী পিতা-মাতা ও আত্মীয়ের জন্য সেই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয় এবং হাদিসটি এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। লক্ষণীয় হলো, চূড়ান্ত আইনের ভাষাটি আয়াত থেকে নয়, হাদিস থেকে এসেছে। কোরআনে একজন ব্যক্তি দেখবেন পিতা-মাতার জন্য অসিয়তের নির্দেশ; একই কোরআনে দেখবেন অসিয়ত সম্পন্ন করার পর উত্তরাধিকার বণ্টনের কথা। কিন্তু আইনজ্ঞ তাকে বলবেন, পিতা-মাতা উত্তরাধিকারী হলে অসিয়তের প্রথম নির্দেশ আর তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। কেন নয়, তার একবাক্যের উত্তর মুসহাফে নেই; উত্তরটি হাদিসে। কোরআন সম্পদের দুটি ব্যবস্থার কথা বলেছে, হাদিস এসে একটি শ্রেণিকে একটি ব্যবস্থা থেকে বহিষ্কার করেছে। [19]
আরবি: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ.
বাংলা: আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়েছেন; অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।
এই ফলটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়েই আলেমদের মধ্যে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে, এবং প্রতিটি ব্যাখ্যা একই নিষেধাজ্ঞায় পৌঁছায়। সংখ্যাগরিষ্ঠের একটি প্রচলিত মত হলো, নিসা সুরার উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আয়াতগুলো বাকারা ২:১৮০-এর উত্তরাধিকারী-সংক্রান্ত অংশ রহিত করেছে; হাদিস শুধু সেই রহিতকরণ ব্যাখ্যা করেছে। অন্য একদল বলেছেন, “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” হাদিসটিই আয়াতের ওই অংশ রহিত করেছে। আবার কিছু আলেমের মতে এটি পূর্ণ নাসখ নয়; হাদিস আয়াতের সাধারণ নির্দেশ থেকে উত্তরাধিকারী আত্মীয়দের বাদ দিয়েছে, অথচ উত্তরাধিকারী নয় এমন নিকটাত্মীয়দের জন্য নির্দেশটি বহাল রয়েছে। কোন পরিভাষাটি ব্যবহার করা হবে, নাসখ, বিশেষায়ন না ব্যাখ্যা, তা নিয়ে বিরোধ থাকলেও আদালত ও উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় ফল একই: কোরআনের অসিয়তের নির্দেশ দেখিয়ে কোনো উত্তরাধিকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসিয়ত দাবি করতে পারবেন না। ইসলামকিউএ নিজেই সংক্ষেপে স্বীকার করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে অসিয়তের আয়াত উত্তরাধিকারের আয়াত দ্বারা রহিত, আর কিছু আলেমের মতে “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” হাদিস দ্বারা রহিত। এই মতভেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উন্মোচন করে। কোরআনের পাঠ থেকে রহিতকারী দলিলটি এমনভাবে স্পষ্ট নয় যে সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। যদি উত্তরাধিকারের আয়াত সরাসরি আগের অসিয়ত বাতিল করত, তাহলে হাদিসকে চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞার বাক্য সরবরাহ করতে হতো না এবং আলেমদের নাসখ ও বিশেষায়নের মধ্যে বিভক্ত হতে হতো না। উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট অংশ এবং অতিরিক্ত অসিয়ত একসঙ্গে চলতে পারবে না, এটি কোরআনের অনিবার্য বক্তব্য নয়; এটি হাদিস ও আইনজ্ঞদের নির্মিত সিদ্ধান্ত। আরও স্পষ্ট প্রমাণ হলো, অন্য উত্তরাধিকারীরা মৃত্যুর পর সম্মতি দিলে বহু আইনজ্ঞ সেই অসিয়ত কার্যকর বলে মানেন। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞাটি আল্লাহর নির্ধারিত অংশের সঙ্গে কোনো স্বভাবগত অসম্ভবতার কারণে নয়; অন্য উত্তরাধিকারীদের আর্থিক অধিকার রক্ষার শাস্ত্রীয় নীতি থেকে এসেছে। সেই নীতির বৈধতা নিয়ে আলাদা আলোচনা সম্ভব, কিন্তু তাকে কোরআনের সরাসরি বক্তব্য বলে চালানো যাবে না। এখানে কার্যকর আইনটি হলো হাদিসের বাক্য; কোরআনের আয়াতগুলোকে পরে সেই বাক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [20]
আরবি: الْوَصِيَّةُ لِلْوَارِثِ نُسِخَتْ بِآيَاتِ الْمَوَارِيثِ عِنْدَ الْجُمْهُورِ، أَوْ نُسِخَتْ بِحَدِيثِ: «لَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ» عِنْدَ بَعْضِ الْعُلَمَاءِ.
বাংলা: সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত উত্তরাধিকারের আয়াতগুলো দ্বারা রহিত হয়েছে; আর কিছু আলেমের মতে “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” হাদিস দ্বারা রহিত হয়েছে।
খাদ্যের বিধান: কোরআনের সীমিত নিষেধতালিকা হাদিসে সম্প্রসারিত
আনআম ৬:১৪৫ আয়াতে মুহাম্মদকে বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: তার প্রতি যা ওহি হয়েছে, তাতে ভক্ষণকারীর জন্য মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে উৎসর্গ করা অপবিত্র খাদ্য ছাড়া আর কিছু নিষিদ্ধ পাওয়া যায় না। আরবি বাক্যটি সাধারণভাবে কয়েকটি নিষিদ্ধ বস্তুর উদাহরণ দিয়ে থেমে যায়নি; প্রথমে “আমি কিছুই পাই না” বলে অস্বীকার এবং পরে “এগুলো ছাড়া” বলে ব্যতিক্রম নির্ধারণের মাধ্যমে একটি সীমাবদ্ধ তালিকা তৈরি করেছে। এই ভাষার স্বাভাবিক অর্থ হলো, ঘোষণার সময় তালিকার বাইরের খাদ্যগুলো নিষিদ্ধ ছিল না। ইসলামকিউএ শানকিতির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে: আয়াতটির নাকচ ও ব্যতিক্রমের ভাষা সরাসরি গৃহপালিত গাধার মাংস বৈধ হওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর খাইবারের দিনের সহিহ হাদিসে গৃহপালিত গাধার মাংস নিষিদ্ধ করা হয়। একইভাবে শিকারি দাঁতযুক্ত পশু এবং নখরযুক্ত পাখির মাংসও হাদিসে নিষিদ্ধ হয়েছে, যদিও সেগুলো কোরআনের ওই সীমাবদ্ধ তালিকায় নেই। এখানে হাদিস কোনো অস্পষ্ট খাদ্যের পরিচয় ব্যাখ্যা করছে না। “শূকর” বলতে কী বোঝানো হয়েছে অথবা “প্রবাহিত রক্তের” সীমা কোথায়, সেই ধরনের ভাষাগত ব্যাখ্যাও দিচ্ছে না। হাদিস এমন একটি খাদ্যকে নিষিদ্ধ করছে, যা আয়াতটির ঘোষণাকালে তালিকার বাইরে থাকার কারণে বৈধ ছিল। অর্থাৎ কোরআনের “এগুলো ছাড়া আর কোনো নিষিদ্ধ খাদ্য পাই না” বক্তব্যের পর আইনগত তালিকায় নতুন নিষেধাজ্ঞা যোগ হয়েছে। নতুন বিধানটি সত্যিই নবীর পরবর্তী নির্দেশ হলে কালক্রমের ভিত্তিতে পরিবর্তনটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব; কিন্তু সেই সম্ভাবনা কোরআনের সর্বশেষ কার্যকর তালিকা হওয়ার দাবিকে রক্ষা করে না। বরং প্রমাণ করে, কোরআনের স্পষ্ট সীমারেখাও চূড়ান্ত নয়। কোনো খাদ্য আয়াতের ব্যতিক্রম-তালিকায় নেই বলে বৈধ ধরে নেওয়া যাবে না; প্রথমে জানতে হবে হাদিস পরে সেটিকে নিষিদ্ধ করেছে কি না। কোরআন প্রাথমিক তালিকা দেয়, হাদিস তালিকার বর্তমান সংস্করণ নিয়ন্ত্রণ করে। [21]
আরবি: تَدُلُّ بِدَلَالَةِ الْمُطَابَقَةِ دَلَالَةً صَرِيحَةً عَلَى إِبَاحَةِ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ؛ لِصَرَاحَةِ الْحَصْرِ بِالنَّفْيِ وَالْإِثْبَاتِ فِي الْآيَةِ.
বাংলা: আয়াতটির নাকচ ও ব্যতিক্রমের সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধ ভাষা সরাসরি গৃহপালিত গাধার মাংস বৈধ হওয়ার নির্দেশ দেয়।
এই সমস্যার প্রচলিত সমাধান হলো, আয়াত ও হাদিসের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, কারণ আয়াতটি যে সময়ে নাজিল হয়েছিল তখন গৃহপালিত গাধার মাংস বৈধ ছিল; পরবর্তী সময়ে হাদিস একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ইসলামকিউএও ঠিক এই উত্তর দিয়েছে: আয়াতটি ভবিষ্যতে নতুন কিছু নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করেনি, তাই পরবর্তী হাদিস আগের তালিকার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে না। এই উত্তর বিরোধের ভাষাগত অভিযোগ এড়িয়ে যায়, কিন্তু হাদিসের আইনগত শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেয়। যদি একটি সীমাবদ্ধ তালিকাকে ভবিষ্যতের অঘোষিত সংযোজনের জন্য সর্বদা খোলা ধরা হয়, তাহলে তালিকাটি বর্তমান আইন জানার জন্য যথেষ্ট নয়। একজন পাঠক আয়াতটি পড়ে ভাববেন চার ধরনের খাদ্য ছাড়া আর কিছু নিষিদ্ধ নয়; শাস্ত্রকার তাকে জানাবেন, আয়াতটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের অবস্থা জানিয়েছিল এবং পরবর্তী বিধান জানতে হাদিস দেখতে হবে। কিন্তু কোরআনের আয়াতের পাশে কোনো তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার চিহ্ন বা সংশোধিত তালিকা নেই। হাদিসের কালক্রম ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ না করা পর্যন্ত পাঠক বুঝতেই পারবেন না আয়াতটির সীমাবদ্ধ ঘোষণা এখন কতটুকু সত্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, “পরে নতুন বিধান এসেছে” বলা কোনো ব্যাখ্যামূলক কাজ নয়। ব্যাখ্যা আগের বাক্যের অর্থ প্রকাশ করে; নতুন বিধান আগের আইনি অবস্থাকে বদলে দেয়। ইসলামকিউএ অন্য একটি আলোচনায় সরাসরি লিখেছে, সুন্নাহ এসে এমন কিছু বস্তু নিষিদ্ধ করেছে যেগুলোর উল্লেখ ওই আয়াতে নেই; এরপর সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সুন্নাহ ছাড়া কোরআন বোঝার কোনো পথ নেই। বক্তব্যটি আসলে বোঝার সমস্যার চেয়ে আইনের হালনাগাদ জানার সমস্যাকে প্রকাশ করে। কোরআনের বাক্য বোঝা কঠিন নয়; তালিকাটি ব্যাকরণগতভাবে স্পষ্ট। সমস্যা হলো, সেই স্পষ্ট তালিকা আর পূর্ণ কার্যকর আইন নয়। হাদিসে সংযোজিত নিষেধাজ্ঞা জানার পরই একজন মুসলমান বর্তমান হালাল-হারামের সীমা জানতে পারেন। ফলে খাদ্যবিধানে কোরআন চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়; এটি এমন একটি পুরোনো তালিকা, যার বাধ্যতামূলক সংশোধনী আলাদা বর্ণনাসমষ্টিতে সংরক্ষিত। [22]
আরবি: ثُمَّ جَاءَتِ السُّنَّةُ فَحَرَّمَتْ أَشْيَاءَ لَمْ تُذْكَرْ فِي هَذِهِ الْآيَةِ. لَا سَبِيلَ إِلَى فَهْمِ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ فَهْمًا إِلَّا مَقْرُونًا بِالسُّنَّةِ.
বাংলা: এরপর সুন্নাহ এসে এমন কিছু বস্তু নিষিদ্ধ করেছে, যেগুলোর উল্লেখ এই আয়াতে নেই। সুন্নাহকে সঙ্গে না নিয়ে কোরআন বোঝার কোনো পথ নেই।
ব্যভিচারের শাস্তি: কোরআনে বেত্রাঘাত, হাদিসে পাথর মেরে হত্যা
নুর ২৪:২ আয়াতে ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী, উভয়ের প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতটির ভাষায় বিবাহিত ও অবিবাহিতের কোনো বিভাজন নেই; নারী ও পুরুষের মতো অপরাধের দুই পক্ষকে উল্লেখ করা হলেও তাদের বৈবাহিক অবস্থার ভিত্তিতে আলাদা শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু প্রচলিত সুন্নি আইনে আয়াতটির দৃশ্যমান সাধারণ অর্থ গ্রহণ করা হয় না। অবিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য একশ বেত্রাঘাত রাখা হয়েছে, আর বৈধ বিবাহে যৌনসম্পর্কের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে মুহসান ধরে তার জন্য পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই বিভাজনের নির্ধারক বাক্য কোরআনের বর্তমান পাঠে নেই; তা এসেছে হাদিস, নবীর রজম কার্যকরের হাদিসগুলো এবং রজমের বিলুপ্ত আয়াতসংক্রান্ত বর্ণনা থেকে। ইসলামকিউএ সমস্যাটির দুইটি শাস্ত্রীয় সমাধান দিয়েছে: হয় নুরের আয়াতকে শুরু থেকেই শুধু অবিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য বিশেষ বলে ধরতে হবে, অথবা আয়াতটিকে বিবাহিত–অবিবাহিত সবার জন্য সাধারণ মেনে পরে বিবাহিতদের ক্ষেত্রে সেটি রহিত বা বিশেষায়িত হয়েছে বলতে হবে। দুই ব্যাখ্যার আইনগত ফল অভিন্ন। কোরআনের আয়াত দেখে যে শ্রেণিবিভাগ পাওয়া যায় না, হাদিস সেই শ্রেণিবিভাগ বসিয়ে একই অপরাধের শাস্তিকে একশ বেত্রাঘাত থেকে মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তর করেছে। এটিকে নিছক ‘ব্যাখ্যা’ বললে শাস্তির মৌলিক পরিবর্তন আড়াল করা হয়। কোনো শব্দের অর্থ পরিষ্কার করা আর একটি অনুল্লিখিত শ্রেণি তৈরি করে তার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার শাস্তি নির্ধারণ করা একই কাজ নয়। ইসলামকিউএ নুর ২৪:২-এ বিবাহিত ব্যক্তির উল্লেখ বা ইঙ্গিত নেই বলে দাবি করেছে, অথচ আয়াতটির সাধারণ “ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী” শব্দ থেকে বিবাহিতদের বাদ দেওয়ার কারণও আয়াতটির ভেতর থেকে দেখাতে পারেনি। কারণটি বাইরে: হাদিসে বিবাহিত ব্যভিচারীর রজম এসেছে। তারপর সেই হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য আয়াতের সাধারণ ভাষাকে শুধু অবিবাহিতদের মধ্যে বন্দী করা হয়েছে। কোরআনের লেখা শাস্তি নয়, হাদিসে তৈরি শ্রেণিবিভাগই ঠিক করছে কার শরীরে একশ আঘাত পড়বে আর কাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। [23]
আরবি: فَإِمَّا أَنْ تُجْعَلَ آيَةُ النُّورِ خَاصَّةً فِي الزَّانِي غَيْرِ الْمُحْصَنِ، أَوْ يُقَالَ إِنَّهَا عَامَّةٌ لَكِنَّهَا مَنْسُوخَةٌ فِي حَقِّ الْمُحْصَنِ وَحْدَهُ.
বাংলা: হয় নুরের আয়াতকে শুধু অবিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য বিশেষ বলতে হবে, অথবা বলতে হবে আয়াতটি সাধারণ ছিল, কিন্তু বিবাহিত ব্যভিচারীর ক্ষেত্রে তা রহিত হয়েছে।
রজমের বিধানকে কোরআনিক প্রমাণ দেওয়ার জন্য আরও অস্বাভাবিক একটি তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়েছে: রজমের আয়াত একসময় কোরআনের অংশ ছিল, পরে তার তিলাওয়াত রহিত হয়েছে, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রয়েছে। বর্তমান মুসহাফে আয়াতটি নেই; তবু হাদিসে সংরক্ষিত উমরের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাকে অবতীর্ণ কোরআন এবং তার আইনকে স্থায়ী শরিয়ত হিসেবে মানা হয়। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত ভাষণে উমর বলেন, আল্লাহ রজমের আয়াত নাজিল করেছিলেন, তারা তা পড়েছেন, বুঝেছেন ও মনে রেখেছেন; নবী রজম করেছেন এবং তারাও নবীর পরে রজম করেছেন। উমর আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দীর্ঘ সময় পরে মানুষ বলবে, আল্লাহর কিতাবে রজমের আয়াত পাওয়া যায় না, এবং এ কারণে তারা আল্লাহর নাজিল করা একটি ফরজ ছেড়ে দেবে। এই বক্তব্যের ভেতরের সমস্যাটি নির্মমভাবে সরল: মানুষ বর্তমান কোরআনে রজমের আয়াত সত্যিই পায় না। যে শাস্তির জন্য একজন মানুষের জীবন নেওয়া হবে, মুসহাফ থেকে বিলুপ্ত বলে বিবেচিত কোরআনিক বাক্য মুসহাফে অনুপস্থিত; বাক্যটি একসময় কোরআন ছিল এবং তার আইন এখনো বহাল, এই তথ্য জানা যায় হাদিস থেকে। ফলে হাদিস এখানে কোরআনের ব্যাখ্যাকারীও নয়, কোরআনের হারানো অংশের সাক্ষ্যদাতা। বর্তমান কোরআন বলছে একশ বেত্রাঘাত; হাদিস বলছে ওই দৃশ্যমান আয়াত শুধু অবিবাহিতদের জন্য এবং বিবাহিতদের মৃত্যুদণ্ডের আরেকটি আয়াত ছিল, যার পাঠ আল্লাহ তুলে নিয়েছেন। এই কাঠামোকে সরলভাবে “কোরআনের সঙ্গে হাদিসের বিরোধ” বললে শাস্ত্রীয় যুক্তির একটি অংশ বাদ পড়ে, কারণ আইনজ্ঞরা হারানো আয়াত ও শ্রেণিভিত্তিক প্রয়োগ দিয়ে বিরোধ মেলান। কিন্তু সেই মেলানোর পদ্ধতিই হাদিসের ক্ষমতার সবচেয়ে কঠোর প্রমাণ। হাদিস প্রথমে বর্তমান আয়াতের আওতা সংকুচিত করে, তারপর বর্তমান কোরআনে না থাকা একটি আয়াতের স্মৃতি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। মুসহাফে যা আছে তার পূর্ণ অর্থ জানতে হাদিস প্রয়োজন, আবার মুসহাফে যা নেই তার আইন মানতেও হাদিস প্রয়োজন। লিখিত কোরআন এখানে একই সঙ্গে অসম্পূর্ণ দলিল এবং অধস্তন দলিল। [24]
আরবি: فَكَانَ مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ آيَةُ الرَّجْمِ، فَقَرَأْنَاهَا وَعَقَلْنَاهَا وَوَعَيْنَاهَا، رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ.
বাংলা: আল্লাহ যা নাজিল করেছিলেন তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিল; আমরা তা পড়েছি, বুঝেছি ও স্মরণে রেখেছি। আল্লাহর রাসুল রজম করেছেন এবং তার পরে আমরাও রজম করেছি।
ধর্মত্যাগ: কোরআনের বিচার পরকালে, হাদিসের বিচার মৃত্যুদণ্ড
কোরআন ধর্মত্যাগের কথা একাধিকবার বলেছে, কিন্তু কোনো আয়াতেই শুধু ইসলাম ত্যাগ করার অপরাধে মানুষকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়নি। বাকারা ২:২১৭ বলেছে, যে ব্যক্তি ধর্মত্যাগ করে অবিশ্বাসী অবস্থায় মারা যাবে, তার কাজ দুনিয়া ও আখিরাতে ব্যর্থ হবে এবং সে জাহান্নামের অধিবাসী হবে। আয়াতটি ধর্মত্যাগীর মৃত্যু পর্যন্ত অবিশ্বাসী থাকার কথা বলছে; রাষ্ট্র তাকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করবে, এমন কোনো শাস্তি সেখানে নেই। নিসা ৪:১৩৭ আরও তাৎপর্যপূর্ণ: সেখানে এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে যারা বিশ্বাস করেছে, পরে অবিশ্বাস করেছে, আবার বিশ্বাস করেছে, আবার অবিশ্বাস করেছে এবং অবিশ্বাসে আরও অগ্রসর হয়েছে। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এই পুনরাবৃত্ত ধারাটি অন্তত আয়াতটির প্রকাশ্য ভাষায় প্রথম ধর্মত্যাগের পর বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের ধারণা বহন করে না। মায়িদা ৫:৫৪-তে বলা হয়েছে, মুসলমানদের কেউ ধর্মত্যাগ করলে আল্লাহ তাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায় নিয়ে আসবেন; সেখানেও ধর্মত্যাগীকে হত্যা করার আদেশ নেই। কোরআনের এসব বক্তব্যে ধর্মত্যাগ একটি বিশ্বাসগত অপরাধ, যার ফল কর্মের ব্যর্থতা, আল্লাহর অনুগ্রহ হারানো এবং পরকালীন শাস্তি। প্রচলিত আইন এই নীরবতাকে অর্থবহ বলে গ্রহণ করেনি। ইসলামকিউএ সরাসরি বলেছে, কোনো দণ্ড কোরআনে উল্লেখিত হওয়া আবশ্যক নয়; ওহির অন্য পাঠ, অর্থাৎ হাদিস, দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট। একই সঙ্গে “ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই” আয়াতকে ধর্মত্যাগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে কোরআনের নীতি এমনভাবে ভাগ করা হয় যে ইসলাম গ্রহণের আগে ব্যক্তিকে জোর করা যাবে না, কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তা ত্যাগ করলে তাকে বিশ্বাসে ফেরানোর জন্য চাপ এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে। এই ব্যতিক্রম কোরআনের আয়াতে লেখা নেই; আইনজ্ঞরা হাদিসের মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে আয়াতটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ব্যতিক্রমটি তৈরি করেছেন। কোরআন ধর্মত্যাগীর বিশ্বাসের বিচার আল্লাহর হাতে রেখেছে; হাদিসনির্ভর আইন সেই বিচারকে পার্থিব আদালত ও মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তর করেছে। [25]
আরবি: وَلَا يُشْتَرَطُ لِلْحَدِّ أَنْ يُذْكَرَ فِي الْقُرْآنِ، بَلْ يَكْفِي أَنْ يَثْبُتَ بِنَصٍّ مِنْ نُصُوصِ الْوَحْيِ، وَلَا فَرْقَ بَيْنَ نَصٍّ قُرْآنِيٍّ وَنَصٍّ حَدِيثِيٍّ.
বাংলা: কোনো দণ্ড কোরআনে উল্লেখিত হওয়া শর্ত নয়; ওহির কোনো পাঠে তা প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে কোরআনের পাঠ ও হাদিসের পাঠের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
পার্থিব মৃত্যুদণ্ডের মূল ভিত্তি হলো বুখারিতে সংরক্ষিত সংক্ষিপ্ত নির্দেশ: “যে তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো।” প্রচলিত সুন্নি আইনশাস্ত্র এই বাক্যকে শুধু যুদ্ধরত বিশ্বাসঘাতক বা সশস্ত্র বিদ্রোহীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইসলামকিউএ স্পষ্টভাবে বলেছে, সাধারণ ধর্মত্যাগ এবং যুদ্ধ-সহ গুরুতর ধর্মত্যাগ, উভয়ের ক্ষেত্রেই হত্যার বিধান প্রযোজ্য; পার্থক্য করা হয়েছে অনুতাপ গ্রহণ এবং প্রক্রিয়ার কিছু অংশে। সাধারণ ধর্মত্যাগীকে সন্দেহ বা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ইসলামে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ার কথা বহু আইনজ্ঞ বলেছেন; সে ফিরে এলে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়, অস্বীকারে অটল থাকলে তাকে হত্যা করা হয়। এটি ব্যক্তিগতভাবে যে কাউকে হত্যা করার অনুমতি নয়; প্রচলিত আইনেও তদন্ত, ধর্মত্যাগ প্রমাণ এবং শাস্তি কার্যকর করাকে শাসক বা বিচারব্যবস্থার এখতিয়ার বলা হয়েছে। মাজহাবগুলোর মধ্যে নারী ধর্মত্যাগী নিয়েও পার্থক্য রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড মেনেছে; হানাফি অবস্থানে নারীকে ধর্মত্যাগের কারণে হত্যা না করে ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত বন্দী ও বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে। এই পার্থক্য কোনো ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে না; মৃত্যুদণ্ডের স্থানে অনির্দিষ্ট বন্দিত্ব ও ধর্মে ফেরানোর বলপ্রয়োগ বসায়। এসব নিয়মের কোনোটিই কোরআনের ধর্মত্যাগ-সংক্রান্ত আয়াত থেকে সরাসরি পাওয়া যায় না। হাদিস প্রথমে পার্থিব মৃত্যুদণ্ড তৈরি করেছে; আইনজ্ঞরা পরে নির্ধারণ করেছেন কার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য, কত দিন অনুতাপের সুযোগ থাকবে, নারীর ক্ষেত্রে হত্যা না বন্দিত্ব হবে এবং কে শাস্তি কার্যকর করবে। অর্থাৎ অপরাধের সংজ্ঞা, শাস্তির ধরন, ব্যতিক্রম ও বিচারপদ্ধতি, পুরো ব্যবহারিক কাঠামোটি কোরআনের বাইরে নির্মিত। “কোরআনে নিষেধ নেই” এখানে হাদিসের বিধান প্রত্যাখ্যানের কারণ নয়; বরং ইসলামি উৎসগুলো প্রকাশ্যেই বলছে, কোরআনে দণ্ড না থাকলেও হাদিস তা সৃষ্টি করতে পারে। ধর্মত্যাগের ঘটনায় তাই কোরআন সর্বোচ্চ আইনগ্রন্থ নয়। কোরআন পরকালের আগুনের হুমকি দেয়; হাদিস দুনিয়ায় তরবারির শাস্তি যোগ করে; আইনজ্ঞরা কোরআনকে সেই সংযোজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পড়েন। [26] [27]
আরবি: مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ.
বাংলা: যে তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো।
আরবি: وَأَمَّا الْمُرْتَدَّةُ فَلَا تُقْتَلُ، وَلَكِنْ تُحْبَسُ أَبَدًا حَتَّى تُسْلِمَ أَوْ تَمُوتَ.
বাংলা: নারী ধর্মত্যাগীকে হত্যা করা হবে না; বরং সে ইসলাম গ্রহণ করা অথবা মারা যাওয়া পর্যন্ত তাকে বন্দী রাখা হবে।
হাদিস যখন অনুপস্থিত কোরআনের একমাত্র ভাণ্ডার
রজমের বিলুপ্ত আয়াতসংক্রান্ত বর্ণনাই বর্তমান মুসহাফে অনুপস্থিত কোরআনিক বিধানের একমাত্র উদাহরণ নয়। দুধপানের মাধ্যমে বৈবাহিক নিষেধাজ্ঞা তৈরির ক্ষেত্রেও এমন একটি বিলুপ্ত পাঠের ওপর আইন দাঁড় করানো হয়েছে। বর্তমান কোরআনের নিসা ৪:২৩ দুধমাতা ও দুধবোনকে বিয়ের জন্য নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু কতবার দুধ পান করলে এই সম্পর্ক তৈরি হবে তা নির্ধারণ করেনি। সহিহ মুসলিমে আয়েশা বলেন, প্রথমে কোরআনে দশবার নিশ্চিত দুধপানে বিবাহ হারাম হওয়ার কথা নাজিল হয়েছিল; পরে সেটি পাঁচবার দুধপানের বিধান দিয়ে রহিত হয়। বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, নবীর মৃত্যু পর্যন্ত ওই কথাগুলো কোরআন হিসেবে পড়া হচ্ছিল। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুসারে শেষ পর্যায়ের পাঠ-রহিতকরণের সংবাদ সবার কাছে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল; পরে মুসলমানরা একমত হন যে বাক্যটি আর কোরআন হিসেবে পড়া যাবে না। কিন্তু আইনগত ফল নিয়ে মাজহাবগুলো একমত হয়নি। শাফেয়ি ও হাম্বলি আইনের প্রসিদ্ধ অবস্থানে পাঁচবার পৃথক দুধপান ছাড়া বৈবাহিক নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয় না; হানাফি ও মালিকি অবস্থানে অল্প পরিমাণ দুধপানও সম্পর্ক তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ একই অনুপস্থিত পাঠের হাদিস একদিকে “একসময় কোরআন ছিল” দাবির প্রমাণ, বিপরীতে বর্তমান পারিবারিক আইনের একটি মতের ভিত্তি; তবু সব আইনজ্ঞ সেই বহাল বিধান একইভাবে গ্রহণ করেননি। বর্তমান মুসহাফ থেকে পাঠক শুধু দুধসম্পর্কের সাধারণ নিষেধাজ্ঞা জানতে পারবেন। পাঁচবার, দশবার অথবা পরিমাণ নির্বিশেষে দুধপান, কোন নিয়ম কার্যকর হবে, তা জানতে তাকে হাদিস ও মাজহাবের কাছে যেতে হবে। এখানে হাদিস দৃশ্যমান আয়াতের ব্যাখ্যা করছে না; এমন একটি আয়াতের সংবাদ দিচ্ছে যার কোনো শব্দ বর্তমান কোরআনে নেই। সেই সংবাদের ভিত্তিতে বৈধ ও অবৈধ বিবাহ, মাহরাম সম্পর্ক এবং পর্দার বিধান নির্ধারিত হচ্ছে। লিখিত কোরআন পারিবারিক সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি হওয়ার পরিমাপটি বহন করছে কোরআনের বাইরে সংরক্ষিত একটি সাবেক আয়াত। [28]
আরবি: كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ، ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ، فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ وَهُنَّ فِيمَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ.
বাংলা: কোরআনে নাজিল হওয়া কথার মধ্যে ছিল, দশবার নিশ্চিত দুধপান বিবাহ নিষিদ্ধ করে; পরে তা পাঁচবার নিশ্চিত দুধপানের বিধান দিয়ে রহিত হয়। আল্লাহর রাসুল মারা যাওয়ার সময়ও এগুলো কোরআনের অংশ হিসেবে পড়া হচ্ছিল।
বীরে মাউনার হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত বর্ণনা হাদিসের আরেক ধরনের ক্ষমতা দেখায়। বুখারি ও মুসলিমে আনাস বলেন, নিহত কোরআন-পাঠকদের সম্পর্কে মুসলমানরা একসময় একটি বাক্য কোরআন হিসেবে পড়তেন: “আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের সম্প্রদায়কে জানিয়ে দাও, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি; তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরও সন্তুষ্ট করেছেন।” পরে সেই পাঠ তুলে নেওয়া হয়। এই কথাটির কোনো বহাল পারিবারিক বা দণ্ডবিধি নেই; তাই এর গুরুত্ব কোনো বর্তমান আইনের মধ্যে নয়। এর গুরুত্ব কোরআনের ঐতিহাসিক সীমানায়। বর্তমান মুসহাফ দেখে জানার কোনো উপায় নেই যে এই বাক্য কখনো কোরআন ছিল, কোথায় ছিল, কত দিন পড়া হয়েছিল অথবা কখন তুলে নেওয়া হয়েছিল। একমাত্র প্রমাণ হলো হাদিসের বর্ণনা। প্রচলিত সুন্নি অবস্থান এটিকে কোরআন হারিয়ে যাওয়া বা মানুষের ব্যর্থতা বলে না; নবীর জীবদ্দশায় আল্লাহর নির্দেশে তিলাওয়াত রহিত হওয়া বলে ব্যাখ্যা করে। এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেও জ্ঞানের কাঠামো বদলায় না। আল্লাহ সত্যিই পাঠটি তুলে নিয়েছেন। এই দাবিটিও হাদিস থেকেই জানতে হয়। বর্তমান কোরআন নিজে বলে না যে তার বাইরে অমুক বাক্যটি একসময় তার অংশ ছিল কিন্তু পরে বৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে হাদিস শুধু কোরআনের অর্থ বা আইন নিয়ন্ত্রণ করে না; কোন বিলুপ্ত বাক্যকে সাবেক কোরআন বলে বিশ্বাস করতে হবে, সেটিও নির্ধারণ করে। সাধারণত বলা হয় হাদিসকে কোরআনের মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে; কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষা অসম্ভব, কারণ হাদিস যে কোরআনিক পাঠের দাবি করছে, মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের জন্য সেই পাঠই আর উপস্থিত নেই। বর্ণনাটি গ্রহণ করলে বাক্যটি একসময় আল্লাহর বাণী ছিল; বর্ণনাটি প্রত্যাখ্যান করলে তার কোরআনিক অস্তিত্বের আর কোনো প্রমাণ থাকে না। অর্থাৎ একটি হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে কোরআনের অতীত সংস্করণে কোন বাক্য ছিল, এই বিশ্বাস। মুসহাফ বর্তমান পাঠের সীমানা দেখায়; হাদিস দাবি করে সে কোরআনের মুছে দেওয়া ইতিহাসও জানে। [29]
আরবি: أَلَا بَلِّغُوا عَنَّا قَوْمَنَا بِأَنَّا قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا وَأَرْضَانَا، ثُمَّ رُفِعَ ذَلِكَ بَعْدُ.
বাংলা: আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের সম্প্রদায়কে জানিয়ে দাও, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি; তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরও সন্তুষ্ট করেছেন। পরে এই পাঠ তুলে নেওয়া হয়।
হাদিস যাচাইকারীদের হাতে আল্লাহর অভিপ্রায়
কোরআনের বর্তমান পাঠকে মুসলিম শাস্ত্র মুতাওয়াতির ও নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে; কিন্তু হাদিসের প্রতিটি বক্তব্য একই মাত্রার বর্ণনাসমর্থন বহন করে না। হাদিসের একটি বড় আইনগত অংশ খবরে আহাদ শ্রেণির, যার বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোনো না কোনো স্তরে তাওয়াতুরের শর্ত পূরণ করে না। আহাদ মানেই দুর্বল বা মিথ্যা নয়; নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ও গ্রহণযোগ্য বর্ণনাশৃঙ্খল থাকলে সেটি সহিহ বা হাসান হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ উসুলবিদের ভাষায় এমন বর্ণনা নিজ শক্তিতে নিশ্চিত জ্ঞান নয়, প্রবল সম্ভাবনা তৈরি করে। ইসলামওয়েব ইবন উসাইমিনের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে বলেছে, সহিহ বা হাসান আহাদ বর্ণনা “ধারণা” দেয়, অর্থাৎ বর্ণনাটি যার প্রতি আরোপিত, সত্যিই তার কথা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল; কিন্তু বর্ণনাকারীর ভুল, বিস্মৃতি বা বিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকায় তা মুতাওয়াতিরের মতো চূড়ান্ত নিশ্চয়তায় পৌঁছায় না। তবু একই আলোচনায় বলা হয়েছে, এমন বর্ণনায় বিধান থাকলে তা পালন এবং সংবাদ থাকলে তা বিশ্বাস করা বাধ্যতামূলক। এই নীতি একটি তীব্র প্রমাণগত বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। একদিকে কোরআনের শব্দকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত বলা হচ্ছে; বিপরীতে অপেক্ষাকৃত সম্ভাবনানির্ভর একটি গ্রহণযোগ্য বর্ণনা সেই নিশ্চিত পাঠের সাধারণ অর্থ সংকুচিত করতে, ব্যতিক্রম তৈরি করতে এবং কিছু মত অনুযায়ী তার বিধান রহিত করতেও পারে। উসুলবিদেরা এর উত্তর দেন এই বলে যে কোরআনের শব্দের অস্তিত্ব নিশ্চিত হলেও সাধারণ ভাষার প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ নিশ্চিত নয়; বিশেষ হাদিস সেই অনিশ্চিত প্রয়োগ নির্ধারণ করে। কিন্তু এই কারিগরি উত্তর ক্ষমতার ফল বদলায় না। সাধারণ মুসলমানের হাতে নিশ্চিত পাঠ থাকে, অথচ সেই পাঠের কার্যকর অর্থ জানার জন্য তাকে এমন বর্ণনার কাছে যেতে হয় যার নবীর সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে সম্ভাবনামূলক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাদিসবিশারদেরা। কোরআনের নিশ্চয়তা তখন হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার মানবীয় রায় অতিক্রম করতে পারে না। একটি আহাদ বর্ণনা সহিহ ঘোষিত হলে সেটি আয়াতের পরিসর কাটতে পারে; একই বর্ণনা দুর্বল ঘোষিত হলে সেই কাটছাঁটের ভিত্তি থাকে না। ফলে আয়াতের আইনগত সীমানা শুধু আল্লাহর বাক্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে বর্ণনাকারীর স্মৃতি এবং তাকে মূল্যায়নকারী মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর। [30]
আরবি: تُفِيدُ أَخْبَارُ الْآحَادِ الصَّحِيحَةُ أَوِ الْحَسَنَةُ الظَّنَّ، فَلَمْ تَصِلْ إِلَى حَدِّ الْيَقِينِ الْجَازِمِ؛ لِاحْتِمَالِ وُقُوعِ الْخَطَإِ أَوِ النِّسْيَانِ أَوِ الْغَلَطِ.
বাংলা: সহিহ বা হাসান একক সূত্রের বর্ণনা প্রবল ধারণা দেয়, কিন্তু ভুল, বিস্মৃতি বা বিভ্রান্তির সম্ভাবনার কারণে তা চূড়ান্ত নিশ্চয়তার পর্যায়ে পৌঁছায় না।
কোনো হাদিস সহিহ, হাসান না দুর্বল? এই শ্রেণিবিভাগও আকাশ থেকে নেমে আসা অপরিবর্তনীয় তালিকা নয়। হাদিসবিশারদকে নির্ধারণ করতে হয় বর্ণনাকারীরা সত্যিই পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন কি না, প্রত্যেকের স্মৃতিশক্তি ও সততা কতটা নির্ভরযোগ্য, জীবনের কোন পর্যায়ে কার স্মৃতি দুর্বল হয়েছিল, একই ঘটনার অন্য বর্ণনাগুলোর সঙ্গে পাঠটি সাংঘর্ষিক কি না এবং বর্ণনার মধ্যে গোপন কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না। এই পদ্ধতি নিয়মবিহীন অনুমান নয়; শতাব্দীব্যাপী গড়ে ওঠা বিস্তৃত সমালোচনাশাস্ত্র। কিন্তু নিয়ম থাকা মানেই রায় যান্ত্রিক বা অভিন্ন নয়। একজন সমালোচক কোনো বর্ণনাকারীকে নির্ভরযোগ্য মনে করতে পারেন, অন্যজন তার বিরুদ্ধে আনা সমালোচনাকে গ্রহণ করতে পারেন; একজন বিচ্ছিন্নতাকে মারাত্মক ত্রুটি ধরতে পারেন, অন্যজন ভিন্ন সূত্রের সমর্থনে সেটি কাটিয়ে উঠেছে বলতে পারেন; একজন পাঠের অস্বাভাবিকতাকে গোপন ত্রুটি হিসেবে দেখেন, অন্যজন সেটিকে গ্রহণযোগ্য অতিরিক্ত তথ্য হিসেবে নেন। ইসলামকিউএ প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে, হাদিস সহিহ বা দুর্বল ঘোষণা করা ইজতিহাদনির্ভর এবং বর্ণনাকারীর অবস্থা, বর্ণনাপথ, অস্বাভাবিকতা ও গোপন ত্রুটি মূল্যায়নের পার্থক্যের কারণে একই হাদিস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের রায় আলাদা হয়। সাধারণ মুসলমানকে বলা হয়েছে, তিনি নিজে সিদ্ধান্ত দেওয়ার যোগ্য না হলে যাকে অধিক জ্ঞানী ও ধর্মনিষ্ঠ মনে করেন তার রায় অনুসরণ করবেন। এখানেই দ্বাররক্ষকের পূর্ণ ক্ষমতা দেখা যায়। একজন বিশেষজ্ঞ হাদিসটিকে সহিহ বললে সেটির বিধান মানা বাধ্যতামূলক, এমনকি সেটি কোরআনের সাধারণ নির্দেশ সীমাবদ্ধ করলেও; আরেক বিশেষজ্ঞ দুর্বল বললে একই বক্তব্য নবীর বক্তব্য হিসেবে আইন তৈরির যোগ্য নয়। ফলে বিরোধটি শুধু হাদিসের ব্যাখ্যায় নয়, নবী আদৌ কথাটি বলেছেন কি না, সেই মৌলিক স্তরেই। কোরআনের কার্যকর অর্থ তখন বর্ণনাকারীদের অতীত জীবন নিয়ে পরবর্তী মানুষের রায়ের সঙ্গে ওঠানামা করে। আল্লাহর আয়াত একই থাকে, কিন্তু কোন হাদিস তার প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করবে তা মাজহাব, মুহাদ্দিস ও অনুসৃত সমালোচকের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ বিশ্বাসী কোরআনের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করেন না; তিনি আত্মসমর্পণ করেন সেই মানুষের নির্বাচিত হাদিসের কাছে, যাকে তিনি হাদিস যাচাইয়ের যোগ্য কর্তৃপক্ষ বলে মেনে নিয়েছেন। [31]
আরবি: تَصْحِيحُ الْحَدِيثِ وَتَضْعِيفُهُ خَاضِعٌ لِلِاجْتِهَادِ، فَيَخْتَلِفُ حُكْمُهُمْ عَلَى الْحَدِيثِ الْوَاحِدِ تَبَعًا لِذَلِكَ.
বাংলা: হাদিসকে সহিহ বা দুর্বল ঘোষণা করা ইজতিহাদনির্ভর; এ কারণেই একই হাদিস সম্পর্কে আলেমদের রায় ভিন্ন হয়।
চক্রাকার কর্তৃত্বের নির্মাণ
হাদিসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপে কোরআনের সেই আয়াতগুলো হাজির করা হয়, যেখানে মুসলিমদের আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করতে এবং বিরোধ দেখা দিলে আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয়: রাসুলের আনুগত্য করা এবং কয়েক প্রজন্ম পরে সংগৃহীত কোনো বর্ণনাকে রাসুলের বক্তব্য বলে মেনে নেওয়া একই কাজ নয়। জীবিত মুহাম্মদের কাছ থেকে সরাসরি শোনা নির্দেশ মানার সঙ্গে বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি কিংবা অন্য কোনো সংকলকের নির্বাচিত বর্ণনা মানার মধ্যে একটি বিশাল প্রামাণিকতার ব্যবধান রয়েছে। কোরআনের নির্দেশ সর্বোচ্চ যা প্রমাণ করতে পারে তা হলো, মুহাম্মদের প্রকৃত নির্দেশ মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোন কথাটি প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ বলেছেন, কোনটি ভুল স্মৃতি, কোনটি অর্থানুগ বর্ণনা, কোনটি পরবর্তী সংযোজন এবং কোন বর্ণনাকারী বিশ্বাসযোগ্য, এসব প্রশ্নের উত্তর কোরআন দেয় না। কোরআনে বুখারি বা মুসলিমের নাম নেই; কোনো হাদিসগ্রন্থের তালিকা নেই; সহিহ, হাসান ও দুর্বল বর্ণনা নির্ণয়ের নিয়মও নেই। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন পরবর্তী যুগের মানুষ, বর্ণনাকারী, জীবনীকার, হাদিস-সমালোচক ও ফকিহ। অথচ তাদের যাচাই করা প্রতিবেদনকেই পরে কোরআনের “রাসুলের দিকে ফিরে যাও” নির্দেশের সরাসরি বাস্তবায়ন বলে চালানো হয়েছে। ইসলামকিউএর আলোচনায় ইবন হাজমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে “রাসুলের দিকে প্রত্যাবর্তন”-কে সরাসরি রাসুল সম্পর্কে প্রচলিত খবরের দিকে প্রত্যাবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ আয়াতের “রাসুল” শব্দটির স্থানে ব্যাখ্যার মাধ্যমে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে পরবর্তী হাদিসভাণ্ডার। এখানেই কর্তৃত্বের প্রথম লাফ: কোরআন আনুগত্য দাবি করেছে ঐতিহাসিক রাসুলের প্রতি, কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সেই আনুগত্য হস্তান্তর করেছে নিজেদের বাছাই করা বর্ণনার প্রতি। বর্ণনাটি সত্যিই রাসুলের কি না; যে সিদ্ধান্তের ওপর গোটা দাবিটি নির্ভর করছে, সেই সিদ্ধান্ত আবার আল্লাহর সংরক্ষিত কিতাব থেকে নয়, মানুষের নির্মিত সনদতত্ত্ব ও গ্রহণ-বর্জনের নিয়ম থেকে আসে। [32]
আরবি: وَالْبُرْهَانُ عَلَى أَنَّ الْمُرَادَ بِهَذَا الرَّدِّ إِنَّمَا هُوَ إِلَى الْقُرْآنِ وَالْخَبَرِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ.
বাংলা: এর প্রমাণ হলো, এখানে প্রত্যাবর্তন বলতে কোরআন এবং আল্লাহর রাসুল সম্পর্কে বর্ণিত খবরের দিকে প্রত্যাবর্তনই বোঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে এই মানবীয় যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হাদিসকে আর সাধারণ ঐতিহাসিক প্রতিবেদন হিসেবে রাখা হয় না; তাকে ঘোষণা করা হয় কোরআনের পাশাপাশি অবতীর্ণ দ্বিতীয় ওহি। ইসলামকিউএ স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, সুন্নাহ ঐশী ওহির দুই বিভাগের একটি এবং অপর বিভাগটি কোরআন। প্রমাণ হিসেবে এমন হাদিসই হাজির করা হয়েছে যেখানে হাদিসে মুহাম্মদ বলেন, তাঁকে কোরআন ও তার অনুরূপ আরেকটি বস্তু দেওয়া হয়েছে এবং রাসুল যা নিষিদ্ধ করেন তা আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তুর মতোই। ফলে যে হাদিসের কর্তৃত্ব প্রমাণ করাই আলোচ্য, সেই হাদিসের নিজের দাবিকেই তার ঐশী কর্তৃত্বের প্রমাণ বানানো হয়েছে। কাঠামোটি দাঁড়ায় এভাবে: কোরআন রাসুলের আনুগত্য করতে বলেছে; পরবর্তী হাদিসবিশারদেরা নির্ধারণ করেছেন কোন বর্ণনাটি রাসুলের; নির্বাচিত বর্ণনা আবার নিজেকে কোরআনের সমান্তরাল ওহি বলে ঘোষণা করেছে; এরপর সেই বর্ণনাই কোরআনের আয়াতের অর্থ, সীমা, ব্যতিক্রম, প্রয়োগ এবং কখনো কার্যকারিতা নির্ধারণ করেছে। এটি কোরআনের সত্যতা প্রমাণের কোনো সরল যুক্তিচক্র নয়; এটি ধর্মীয় কর্তৃত্ব বণ্টনের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক চক্র। কোরআন দিয়ে হাদিসভাণ্ডারের দরজা খোলা হয়, তারপর হাদিস দিয়ে কোরআনের ভেতরে প্রবেশের বৈধ পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়। হাদিসকে প্রশ্ন করলে বলা হয় কোরআন রাসুলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে; আর কোরআনের সরল বক্তব্য দেখালে বলা হয় তার প্রকৃত অর্থ জানতে হাদিসের কাছে যেতে হবে। ফলে কোরআন এখানে সর্বশেষ বিচারক নয়, সে হাদিসের বৈধতার ঘোষণাপত্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি প্রাথমিক অনুমোদনপত্র। শেষ বিচারের ক্ষমতা চলে যায় সেই মানুষদের হাতে, যারা নির্ধারণ করেন কোন খবর রাসুলের বক্তব্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং সেই খবরের আলোকে কোরআনের কোন বক্তব্য সাধারণ, কোনটি বিশেষ, কোনটি শর্তযুক্ত এবং কোনটির প্রয়োগ রহিত। মুখে কর্তৃত্ব আল্লাহর; কার্যক্ষেত্রে আল্লাহর বক্তব্যের বৈধ অর্থ নির্ধারণ করছেন বর্ণনাকারী, মুহাদ্দিস ও ফকিহ। এই ব্যবস্থায় কোরআন সিংহাসনে প্রদর্শিত হয়, কিন্তু শাসন করে হাদিস। [33]
আরবি: أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ … أَلَا وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ.
বাংলা: জেনে রাখো, আমাকে কোরআন এবং তার সঙ্গে তার অনুরূপ আরেকটি বিষয় দেওয়া হয়েছে। জেনে রাখো, আল্লাহর রাসুল যা নিষিদ্ধ করেছেন তা আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তার মতোই।
প্রচলিত আত্মরক্ষার যুক্তি ও তার পতন
হাদিসের কার্যকর শ্রেষ্ঠত্ব আড়াল করার সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল হলো বলা, সুন্নাহ কোরআনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সেটি কেবল কোরআনের “ব্যাখ্যা”। এখানে “ব্যাখ্যা” শব্দটি একটি নিরীহ আবরণ মাত্র। কোনো অস্পষ্ট বাক্যের অর্থ পরিষ্কার করা এক বিষয়; একটি সাধারণ বিধানের আওতা সংকুচিত করা, শর্তহীন বক্তব্যের ওপর নতুন শর্ত চাপানো, কোরআনের নীরবতার জায়গায় স্বতন্ত্র নিষেধাজ্ঞা তৈরি করা এবং কোনো আয়াতের কার্যকারিতা রহিত ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সুন্নি আইনতত্ত্ব নিজেই স্বীকার করে যে সুন্নাহ কেবল অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা দেয় না; এটি কোরআনের সাধারণ বিধানকে বিশেষায়িত করে, শর্তহীন বিধানকে শর্তযুক্ত করে এবং কোরআনে অনুল্লিখিত স্বতন্ত্র বিধানও প্রতিষ্ঠা করে। ইসলামওয়েব একই আলোচনায় প্রথমে সুন্নাহকে কোরআনের ব্যাখ্যাকারী বলেছে, তারপর স্বীকার করেছে যে সুন্নাহ কোরআনের সাধারণ বক্তব্যের পরিসর কমায়, তার নিঃশর্ত বক্তব্যে সীমা বসায় এবং কোরআন যে বিষয়ে নীরব সেখানে নতুন আইন তৈরি করে। ফলে “সুন্নাহ শুধু ব্যাখ্যা করে” দাবিটি তাদের নিজেদের বর্ণনাতেই মিথ্যা। এখানে ব্যাখ্যার নামে আসলে বিধান নির্মাণের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই ক্ষমতা একমুখী: কোরআনকে হাদিসের সাহায্যে সীমিত করা যায়, কিন্তু কোনো সহিহ হাদিসের সরল অর্থ কোরআনের সাধারণ বক্তব্য দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না। সে ক্ষেত্রে বলা হয়, হাদিসটি কোরআনের বক্তব্যকে বিশেষায়িত করেছে। অর্থাৎ কোরআন কোনো সর্বজনীন নিয়ম দিলে হাদিস তার ব্যতিক্রম তৈরি করতে পারে; কোরআন কোনো সীমা উল্লেখ না করলে হাদিস সেই সীমা বসাতে পারে; কোরআন নীরব থাকলে হাদিস নতুন অপরাধ ও শাস্তি তৈরি করতে পারে। এতসব আইনগত ক্ষমতাকে “ব্যাখ্যা” নাম দিলে ক্ষমতার প্রকৃতি বদলায় না। সংসদ কোনো পুরোনো আইনের ব্যাখ্যার অজুহাতে তার আওতা বদলে, নতুন নিষেধাজ্ঞা যোগ করে এবং পূর্ববর্তী বিধান অকার্যকর করলে সেটি নতুন আইন প্রণয়নই হয়। হাদিসের ক্ষেত্রে একই কাজকে ব্যাখ্যা বলা হয় শুধু কোরআনের আনুষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্বের ভাষাটি অক্ষত রাখার জন্য। [34]
আরবি: تَأْتِي مُبَيِّنَةً لِمُجْمَلِ الْقُرْآنِ، وَمُخَصِّصَةً لِعَامِّهِ، وَمُقَيِّدَةً لِمُطْلَقِهِ … كَمَا تَأْتِي فِيهَا أَحْكَامٌ مُسْتَقِلَّةٌ سَكَتَ الْقُرْآنُ عَنْهَا.
বাংলা: সুন্নাহ কোরআনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা করে, তার সাধারণ বিধানকে বিশেষায়িত করে, শর্তহীন বিধানকে সীমাবদ্ধ করে এবং এমন স্বতন্ত্র বিধানও নিয়ে আসে যেগুলো সম্পর্কে কোরআন নীরব।
দ্বিতীয় আত্মরক্ষামূলক দাবি হলো, সহিহ হাদিস ও কোরআনের মধ্যে প্রকৃত বিরোধ ঘটতেই পারে না, কারণ উভয়ই আল্লাহর ওহি। এটি কোনো বিরোধ পরীক্ষা করে পাওয়া সিদ্ধান্ত নয়; পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস। ইসলামকিউএর নির্দেশনা অনুসারে, পাঠকের সামনে আয়াত ও হাদিসের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী মনে হলে তাকে প্রথমেই বিশ্বাস করতে হবে যে বিরোধ নেই; সমস্যাটি তার জ্ঞানের ঘাটতি, বোঝার অক্ষমতা অথবা তাড়াহুড়োর ফল। তারপর তাকে যেকোনো উপায়ে সমন্বয় খুঁজতে হবে, আর সমন্বয় না বুঝলে আপত্তিহীনভাবে মেনে নিতে হবে। এই পদ্ধতিতে হাদিসের সঙ্গে কোরআনের বিরোধ আবিষ্কার করা সংজ্ঞাগতভাবেই অসম্ভব। কারণ সম্ভাব্য প্রতিটি ফল আগেই নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে: সরাসরি বিরোধ দেখা গেলে সেটি “আপাত বিরোধ”; একটি বক্তব্য অন্যটিকে সংকুচিত করলে সেটি “বিশেষায়ন”; শর্ত যোগ করলে সেটি “সীমাবদ্ধকরণ”; কালক্রমের দাবি তোলা গেলে সেটি “রহিতকরণ”; কোনো সমাধান না মিললে সেটি পাঠকের অজ্ঞতা। অর্থাৎ প্রমাণ যেদিকেই যাক, সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত, সহিহ হাদিস ভুল হতে পারে না। এটি যুক্তি নয়, মতবাদকে খণ্ডন-অযোগ্য করার ব্যবস্থা। কোনো দাবিকে সত্য হিসেবে যাচাই করতে হলে অন্তত এমন একটি সম্ভাব্য প্রমাণ থাকতে হয় যা পাওয়া গেলে দাবিটি ভুল বলে গণ্য হবে। কিন্তু এখানে এমন কোনো প্রমাণের অনুমতি নেই। কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্যও কোনো হাদিসের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না, কারণ বিরোধ দেখা দেওয়ামাত্র কোরআনের অর্থ পুনর্নির্ধারণ করা হবে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, “সহিহ” পরিচয়টিও স্বয়ং আল্লাহর দেওয়া নয়; সেটি মুহাদ্দিসদের ঐতিহাসিক বিচার। অতএব মানুষের যাচাই করা একটি বর্ণনাকে প্রথমে ওহি ঘোষণা করা হচ্ছে, তারপর ওহির মধ্যে বিরোধ অসম্ভব, এই পূর্বধারণা দিয়ে সেই বর্ণনাকে কোরআনের সমালোচনা থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। ফলাফল পরিষ্কার: কিছু ক্ষেত্রে কোরআনের বিরোধ হাদিসের প্রামাণিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, কিন্তু কোনো হাদিস সহিহ ও প্রযোজ্য ঘোষিত হওয়ার পর মূল পদ্ধতি হলো কোরআনকে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পড়া। [35]
আরবি: فَوَاجِبٌ عَلَيْهِ أَنْ يَعْتَقِدَ انْتِفَاءَ الِاخْتِلَافِ … أَوِ الْمُسَلِّمِ مِنْ غَيْرِ اعْتِرَاضٍ.
বাংলা: তার কর্তব্য হলো বিরোধের অস্তিত্ব নেই বলে বিশ্বাস করা এবং আপত্তি না তুলে আত্মসমর্পণ করা।
ঘোষিত শ্রেষ্ঠত্ব বনাম কার্যকর কর্তৃত্ব
এখন পুরো ব্যবস্থার ক্ষমতার হিসাব করলে একটি দ্বিস্তরীয় চিত্র পাওয়া যায়। আনুষ্ঠানিক ও ধর্মীয় ভাষায় কোরআনকে আল্লাহর সরাসরি বাণী, অলৌকিক গ্রন্থ, তিলাওয়াতযোগ্য ও সন্দেহাতীতভাবে সংরক্ষিত সর্বোচ্চ কিতাব বলা হয়। কিন্তু আইনগত বাধ্যবাধকতার প্রশ্নে এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ইসলামওয়েব সরাসরি বলেছে, সুন্নাহকে শরিয়তের “দ্বিতীয় উৎস” বলার অর্থ মর্যাদায় দ্বিতীয় নয়; এটি শুধু গণনার ক্রমে দ্বিতীয়। সনদের দিক থেকে কোনো হাদিসকে সত্য বলে মেনে নেওয়া হলে বিধানের ক্ষেত্রে তার অবস্থান কোরআনের সমান। এই স্বীকারোক্তির পর “কোরআন সর্বোচ্চ, হাদিস দ্বিতীয়” কথাটি আইনগতভাবে অর্থহীন হয়ে যায়। যে দ্বিতীয় উৎসের আদেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই, যার নিষেধাজ্ঞা কোরআনের নিষেধাজ্ঞার মতো বাধ্যতামূলক এবং যার বিধান কোরআনে না থাকলেও কার্যকর, তাকে অধস্তন উৎস বলা শব্দের কারসাজি। উপরন্তু এই ঘোষিত সমতার মধ্যেও ক্ষমতার সম্পর্ক সমান নয়। কোরআনের কোনো বক্তব্যকে হাদিসের আলোকে বিশেষ, সীমিত, ব্যতিক্রমযুক্ত বা রহিত ঘোষণা করা যায়; কিন্তু স্বীকৃত হাদিসকে কোরআনের সাধারণ বক্তব্যের ভিত্তিতে বাতিল করতে গেলে বলা হয় হাদিসই আয়াতটির প্রকৃত সীমা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ বিধানের বাধ্যতামূলকতায় হাদিস কোরআনের সমান, আবার কোরআনের অর্থ ও প্রয়োগ নির্ধারণে হাদিস বিচারকের আসনে। সমমর্যাদার দুই উৎসের একটির হাতে যদি অন্যটির ভাষা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে, অথচ বিপরীত ক্ষমতা স্বীকৃত না হয়, তবে সেটি প্রকৃত সমতা নয়। কোরআনের শ্রেষ্ঠত্ব তখন তিলাওয়াত, শব্দরূপ, পবিত্রতা ও প্রতীকের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে; আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শেষ সিদ্ধান্ত দেয় হাদিস। এই ব্যবস্থায় কোরআন রাজকীয় উপাধি ধরে রাখে, কিন্তু হাদিস পায় শাসনক্ষমতা। [36]
আরবি: الْمَصْدَرُ الثَّانِي فِي التَّشْرِيعِ، وَمَعْنَى ذَلِكَ فِي الْعَدَدِ، وَلَيْسَ فِي التَّرْتِيبِ … تَكُونُ بِمَنْزِلَةِ الْقُرْآنِ مِنْ حَيْثُ الْحُكْمِ.
বাংলা: সুন্নাহ শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস; এর অর্থ শুধু সংখ্যার হিসাবে দ্বিতীয়, মর্যাদাক্রমে নয়। বিধানের দিক থেকে তা কোরআনের সমপর্যায়ের।
কার্যকর কর্তৃত্ব নির্ণয়ের মানদণ্ড হলো কোন গ্রন্থকে সম্মানের সঙ্গে উঁচু তাকে রাখা হয় তা নয়; বরং বিরোধ, অস্পষ্টতা ও আইন প্রয়োগের মুহূর্তে কার বক্তব্য শেষ কথা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই মানদণ্ডে সুন্নি ইসলামের কাঠামোতে হাদিসই প্রাধান্যশীল। ইসলামকিউএ স্পষ্ট ঘোষণা করেছে, আইনগত নির্দেশনা ও ধর্মীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কোরআনে বর্ণিত বিষয় এবং প্রমাণিত সুন্নাহর বিষয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না। একই আলোচনায় আরও বলা হয়েছে, কোরআনে উল্লিখিত বহু বিষয়ের তুলনায় নামাজের পদ্ধতি, জাকাতের পরিমাণ ও হজের নিয়মসংক্রান্ত সুন্নাহ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোরআনে স্থান পাওয়া নিজেই কোনো বিধানের উচ্চতর গুরুত্ব বা অগ্রাধিকারের নিশ্চয়তা নয়। এরপর ক্ষমতার ধারাটি দাঁড়ায় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে: কোরআন কোনো নির্দেশের মূল শব্দ ঘোষণা করে, হাদিস সেই নির্দেশের প্রকৃত রূপ নির্ধারণ করে; কোরআন সাধারণ নীতি দেয়, হাদিস তার আওতা কমায়; কোরআন নীরব থাকে, হাদিস নতুন বিধান সৃষ্টি করে; কোরআন কোনো শাস্তি উল্লেখ করে না, হাদিস শাস্তি যোগ করে; কোরআনের কোনো আয়াত কার্যকর কি না, হাদিস ও হাদিসনির্ভর আইনতত্ত্ব তা নির্ধারণ করে। এমনকি কোরআনের কোনো পাঠ আর গ্রন্থে নেই বলে স্বীকার করার পরও হাদিসের মাধ্যমে সেই হারানো পাঠের বিধান টিকিয়ে রাখা যায়। এই সমস্ত স্তরে কোরআন সিদ্ধান্তদাতা নয়, সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু। আর হাদিস শুধু সহায়ক ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়, কোরআনকে ব্যবহারযোগ্য আইন হিসেবে রূপ দেওয়ার অনুমোদিত যন্ত্র। এরও নিচে রয়েছে আরও কঠিন বাস্তবতা: কোন বর্ণনাটি হাদিস, কোনটি সহিহ, কোনটি দুর্বল, কোনটি রহিতকারী এবং কোন ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য, এসব নির্ধারণ করেন আলেমরা। ফলে দৃশ্যমান কাঠামোতে হাদিস কোরআনের কার্যকর নিয়ন্ত্রক, আর বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে হাদিসের নামে আলেমসমাজ ধর্মীয় আইনের প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণ করে। কোরআনকে অস্বীকার না করেই তার বক্তব্যের পরিসর বদলে দেওয়া, ব্যতিক্রম তৈরি করা এবং তাকে অকার্যকর করে রাখা সম্ভব; শুধু একটি গ্রহণযোগ্য হাদিস ও অনুমোদিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এখানেই প্রচারিত ইসলাম ও কার্যকর ইসলামের ফারাক: প্রচারে কোরআন সর্বোচ্চ; বিধান নির্মাণের যন্ত্রে কোরআনের ওপর শেষ কথা বলে হাদিস। [37]
আরবি: لَا تُفَرِّقُ فِي الدَّلَالَاتِ التَّشْرِيعِيَّةِ وَالْأَوْلَوِيَّاتِ الدِّينِيَّةِ بَيْنَ مَا وَرَدَ فِي الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ، وَمَا ثَبَتَ فِي السُّنَّةِ النَّبَوِيَّةِ.
বাংলা: শরিয়তের আইনগত নির্দেশনা ও ধর্মীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কোরআনে যা এসেছে এবং নবির সুন্নাহয় যা প্রমাণিত হয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করা হয় না।
উপসংহার
এই দীর্ঘ পর্যালোচনার ফল একেবারেই পরিষ্কার: প্রচারিত ইসলামে কোরআন সর্বোচ্চ, কিন্তু কার্যকর ইসলামে কোরআনের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃত্ব হলো হাদিস। কোরআনকে আল্লাহর সরাসরি, অপরিবর্তিত ও চূড়ান্ত বাণী বলা হয়; অথচ সেই বাণীর কোন অর্থ গ্রহণ করতে হবে, কোন সাধারণ নির্দেশকে সংকুচিত করতে হবে, কোন শর্তহীন বিধানে শর্ত বসবে, কোন আয়াত অন্য আয়াতকে রহিত করেছে এবং কোথায় কোরআনের নীরবতা ভেঙে নতুন আইন তৈরি হবে, এসবের শেষ সিদ্ধান্ত কোরআন নিজে দেয় না। সিদ্ধান্ত আসে হাদিস ও হাদিসনির্ভর আইনতত্ত্ব থেকে। নামাজ, জাকাত ও হজের মৌলিক রূপ থেকে শুরু করে খাদ্যনিষেধ, উত্তরাধিকার, ব্যভিচারের শাস্তি, ধর্মত্যাগের দণ্ড এবং হারিয়ে যাওয়া পাঠের বিধান, প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই কাঠামো কাজ করেছে। কোরআন মূল ঘোষণা দেয়, কিন্তু বাস্তব বিধান নির্ধারণ করে হাদিস। কোরআনের বক্তব্যের সঙ্গে হাদিসের বক্তব্যের টানাপোড়েন দেখা দিলে কোরআনকে চূড়ান্ত মানদণ্ড বানিয়ে হাদিস বাতিল করা হয় না; বরং হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য কোরআনের অর্থ, পরিসর অথবা কার্যকারিতা বদলানো হয়। কখনো এর নাম ব্যাখ্যা, কখনো বিশেষায়ন, কখনো সীমাবদ্ধকরণ, কখনো রহিতকরণ। পরিভাষা বদলালেও ক্ষমতার ফল একই থাকে: কোরআনকে হাদিসের নির্দেশিত অর্থে পড়তে হয়। তাই “কোরআনের ঊর্ধ্বে হাদিস” কথাটি গ্রন্থের পবিত্রতা বা তিলাওয়াতের মর্যাদা সম্পর্কে নয়; এটি আইন নির্ধারণের বাস্তব ক্ষমতা সম্পর্কে। যে উৎস অন্য উৎসের গ্রহণযোগ্য অর্থ ও কার্যকারিতা নির্ধারণ করে, কার্যক্ষেত্রে কর্তৃত্ব তার হাতেই থাকে। সেই হিসাবে হাদিস কোরআনের অধীন সহায়ক গ্রন্থ নয়; কোরআনের ওপর বসানো কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো, মানুষের নির্মিত কর্তৃত্বকে আল্লাহর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা। মুহাম্মদের মৃত্যুর বহু পরে সংগৃহীত বর্ণনা থেকে মুহাদ্দিসেরা কিছু প্রতিবেদন গ্রহণ করেছেন, কিছু বর্জন করেছেন এবং কিছু নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন। পরে ফকিহরা সেই নির্বাচিত প্রতিবেদন দিয়ে কোরআনের ভাষা, সীমা ও বিধান নির্ধারণ করেছেন। ফলে মুসলিমের সামনে যে “আল্লাহর আইন” হাজির করা হয়, তা শুধু কোরআনের বক্তব্য নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বর্ণনাকারীর স্মৃতি, সংকলকের নির্বাচন, হাদিসবিশারদের সত্যায়ন এবং ফকিহের ব্যাখ্যা। এই মানবীয় স্তরগুলো আড়াল করার জন্য প্রতিবার কোরআনের আনুগত্যসংক্রান্ত আয়াত সামনে আনা হয়। কোরআনকে ঢাল বানিয়ে হাদিসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়, তারপর সেই হাদিস দিয়েই কোরআনের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রশ্ন তুললে বলা হয় কোরআনই রাসুলকে মানতে বলেছে; কোরআনের সরল বক্তব্য দেখালে বলা হয় হাদিস ছাড়া কোরআন বোঝা যাবে না; বিরোধ দেখালে বলা হয় প্রকৃত বিরোধ অসম্ভব; সমাধান না মিললে প্রশ্নকারীর জ্ঞান ও বিশ্বাসকে অভিযুক্ত করা হয়। এটি এমন এক বদ্ধ ব্যবস্থা, যেখানে কোনো বর্ণনা সহিহ ও প্রযোজ্য বলে স্থির হওয়ার পর কোরআনের আপাত বিরোধও সাধারণত তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সাক্ষ্য হয় না। তাই কোরআনের শ্রেষ্ঠত্ব এখানে বহুলাংশে ঘোষণামূলক, আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী। ধর্মীয় আইন কী হবে, আয়াত কীভাবে পড়তে হবে এবং কোন নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর থাকবে, এই নির্ণায়ক ক্ষমতা হাদিসের। কোরআন ইসলামের মুখ, পতাকা ও পবিত্র প্রতীক; কিন্তু শরিয়তের চলমান যন্ত্র, নিয়ন্ত্রণকক্ষ এবং শেষ নির্দেশদাতা হলো হাদিস। আল্লাহর কিতাবকে সামনে রেখে যে ধর্মীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, তার প্রকৃত পরিচালনবিধি লেখা হয়েছে মানুষের বাছাই করা বর্ণনার ভাণ্ডারে।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামকিউএ: মেরাজে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ পাঁচ ওয়াক্তে নামানোর বর্ণনা ↩︎
- ইসলামকিউএ: মুসলিমদের পাপ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর রাখার হাদিস ↩︎
- ইসলামকিউএ: পরিবারের কান্নায় মৃতের শাস্তি এবং আয়েশার কোরআনিক আপত্তি ↩︎
- ইসলামকিউএ: কাজের কারণে জান্নাত এবং কাজ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ না করার সমন্বয় ↩︎
- ইসলামকিউএ: সহিহ মুসলিমের সাত দিনের সৃষ্টি-বর্ণনা ও কোরআনের ছয় দিনের বক্তব্য ↩︎
- ইসলামওয়েব: বিধানের উৎস হিসেবে সুন্নাহ এবং তার প্রামাণ্যতা ↩︎
- ইসলামকিউএ: হাদিস কি কোরআনকে রহিত বা বিশেষায়িত করতে পারে? ↩︎
- ইসলামওয়েব: “সুন্নাহ কোরআনের বিচারক” বাক্যটির অর্থ ↩︎
- ইসলামপোর্ট: মাআলিম উসুলিল ফিকহ, কোরআনের ওপর সুন্নাহর অগ্রাধিকার ↩︎
- ইসলামওয়েব: কোরআননির্ভর নামাজ ও হজের অসম্পূর্ণতা ↩︎
- ইসলামকিউএ: কোরআনে নামাজের রাকাতসংখ্যা না থাকার ব্যাখ্যা ↩︎
- ইসলামপোর্ট: ব্যাখ্যা, বিশেষায়ন ও শর্তারোপে সুন্নাহর অগ্রাধিকার ↩︎
- ইসলামকিউএ: একক সূত্রের হাদিস দিয়ে কোরআনের সাধারণ বিধান বিশেষায়ন ↩︎
- ইসলামকিউএ: কোরআনে নাসখের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ ↩︎
- ইসলামওয়েব: আল-বাহরুল মুহিত, সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার মতভেদ ↩︎
- ইসলামকিউএ: একক সূত্রের হাদিস দিয়ে কোরআন রহিত করার মত ↩︎
- আহকামুল কোরআন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪: কোরআনকে সুন্নাহ দিয়ে রহিত করার আলোচনা ↩︎
- আহকামুল কোরআন: ক্ষমা ও উপেক্ষার আয়াতগুলো রহিত হওয়ার বর্ণনা ↩︎
- ইসলামকিউএ: “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” হাদিস ও কোরআনের নির্দেশের সমন্বয় ↩︎
- ইসলামকিউএ: অসিয়তের আয়াত রহিত বা বিশেষায়িত হওয়ার মতগুলো ↩︎
- ইসলামকিউএ: আনআম ৬:১৪৫ এবং গৃহপালিত গাধার মাংস নিষিদ্ধকারী হাদিস ↩︎
- ইসলামকিউএ: কোরআনের পূর্ণতার পরও সুন্নাহর প্রয়োজন ↩︎
- ইসলামকিউএ: বিবাহিত ব্যভিচারীর রজম এবং নুরের আয়াত ↩︎
- ইসলামকিউএ: রজমের আয়াতের পাঠ রহিত রেখে বিধান বহাল ↩︎
- ইসলামকিউএ: ধর্মত্যাগের দণ্ড কোরআনে উল্লেখ থাকা আবশ্যক নয় ↩︎
- ইসলামকিউএ: ধর্ম পরিবর্তনকারীর মৃত্যুদণ্ডের হাদিস ↩︎
- ইসলামওয়েব: হানাফি আইনে নারী ধর্মত্যাগীর শাস্তি ↩︎
- ইসলামকিউএ: দশ ও পাঁচ দুধপানের রহিত কোরআনিক পাঠ ↩︎
- ইসলামকিউএ: বীরে মাউনার ঘটনায় পাঠ করা এবং পরে তুলে নেওয়া আয়াত ↩︎
- ইসলামওয়েব: একক সূত্রের হাদিসের সম্ভাবনামূলক প্রমাণ ও বাধ্যতামূলক প্রয়োগ ↩︎
- ইসলামকিউএ: একই হাদিস সহিহ ও দুর্বল ঘোষণায় আলেমদের মতভেদের কারণ ↩︎
- ইসলামকিউএ: কোরআনের নির্দেশ থেকে হাদিসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ↩︎
- ইসলামকিউএ: সুন্নাহকে দ্বিতীয় ওহি এবং কোরআনের সমতুল্য বাধ্যতামূলক উৎস ঘোষণা ↩︎
- ইসলামওয়েব: সুন্নাহ কোরআনকে বিশেষায়িত ও সীমাবদ্ধ করে এবং স্বতন্ত্র বিধানও প্রতিষ্ঠা করে ↩︎
- ইসলামকিউএ: বিরোধ দেখা দিলেও বিরোধের অস্তিত্ব অস্বীকার করে সমন্বয় অথবা নিঃশর্ত সমর্পণের নির্দেশ ↩︎
- ইসলামওয়েব: সুন্নাহ সংখ্যায় দ্বিতীয়, মর্যাদাক্রমে নয়; বিধানে কোরআনের সমপর্যায়ের ↩︎
- ইসলামকিউএ: আইনগত নির্দেশনা ও ধর্মীয় অগ্রাধিকারে কোরআন ও প্রমাণিত সুন্নাহর মধ্যে পার্থক্য নেই ↩︎

