জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

নবী মুহাম্মদ কেন বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন?

প্রকাশিত: এপ্রিল 22, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন48 মিনিট পড়া

ভূমিকা: নবুওয়াতের সংকট

ইসলামের সূচনাকালের বর্ণনাগুলোতে ওহি কেবল নিশ্চিন্ত বিশ্বাসের অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থিত হয়নি। সেখানে রয়েছে আকস্মিক আতঙ্ক, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা, অন্যের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া, বার্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তীব্র অস্থিরতা এবং আত্মহননের সংকল্পের বিবরণ। হেরা থেকে ফিরে আসা মুহাম্মদ প্রথমেই নিজের অভিজ্ঞতার অর্থ বুঝে একটি সুসংহত ঘোষণা দেননি; তিনি খাদিজার আশ্রয় চেয়েছেন, নিজের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন এবং একজন খ্রিষ্টান ধর্মগ্রন্থজ্ঞের মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছেন। এই ঘটনাক্রমে মানুষ, সম্পর্ক, বিশ্বাস ও মানসিক অবস্থার ভূমিকা প্রত্যক্ষ। ঘটনাগুলোকে আগেই অলৌকিক বলে ঘোষণা করলে সেই মানবীয় প্রক্রিয়াটিই অনুসন্ধানের বাইরে চলে যায়।

ওয়ারাকা ইবন নওফেলের গুরুত্ব এখানেই। ইঞ্জিলপাঠে অভিজ্ঞ এই ব্যক্তি মুহাম্মদের অজানা অভিজ্ঞতাটিকে পূর্ববর্তী নবীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে ধর্মীয় পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু ও ওহিবিরতি একই বিবরণে পাশাপাশি এসেছে। এই সমাবেশ তাঁর সম্ভাব্য বৌদ্ধিক প্রভাব, ধর্মতাত্ত্বিক সহায়তা এবং মানসিক অনুমোদনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট উপলক্ষ তৈরি করে। সন্দেহটির কেন্দ্র হচ্ছে অভিজ্ঞতার উৎস ও ব্যাখ্যায় মানুষের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ। কোনো গোপন পাঠদানকক্ষের পূর্ণ ইতিহাস হাতে না থাকলেও এই প্রশ্ন অকার্যকর হয়ে যায় না; প্রশ্নটি জন্ম নিচ্ছে ইসলামি বর্ণনার নিজস্ব ঘটনাক্রম থেকে।

আত্মহননের পুনরাবৃত্ত সংকল্প ও নিজের ঐশী পরিচয়ের আশ্বাসের মধ্যে যে সম্পর্ক বর্ণিত হয়েছে, সেটিও গভীর অনুসন্ধানের বিষয়। একজন মানুষ নিজের জীবনের অর্থকে একটি বিশেষ দায়িত্বের সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে সেই দায়িত্ব সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তাঁর অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হতে পারে। নিজেকে ঈশ্বরনির্বাচিত বার্তাবাহক এবং মানুষের মুক্তির কেন্দ্রীয় মাধ্যম হিসেবে ভাবার আত্মপরিচয় কীভাবে গড়ে উঠল, খাদিজা ও ওয়ারাকার স্বীকৃতি তাতে কী কাজ করল এবং বার্তা বন্ধ হলে সেই আত্মপরিচয় কেন বিপন্ন হয়ে উঠল—এগুলোই মূল প্রশ্ন। হেরার প্রথম অভিজ্ঞতা নিয়ে হেরা গুহার ওহি এবং শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে মুহাম্মদের ওহির অভিজ্ঞতা: মৃগীরোগ ও মানসিক সুস্থতার প্রশ্ন শীর্ষক পৃথক আলোচনাও প্রাসঙ্গিক।


ওয়ারাকা ইবন নওফেল: নবুওয়াতের পরিচয় নির্ধারণে এক মানবীয় কর্তৃত্ব

মুহাম্মদের নবুওয়াতের প্রাথমিক ধাপ বিশ্লেষণে ওয়ারাকা ইবন নওফেল একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। বুখারির বিবরণ তাঁকে জাহিলিয়াতের সময় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণকারী, ইঞ্জিলের পাঠ লিখতে অভ্যস্ত, বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় করায়। তাঁর কাছে যাওয়া ছিল নিছক আত্মীয়ের সঙ্গে সৌজন্যসাক্ষাৎ নয়। খাদিজা তাঁকে অভিজ্ঞতাটি শুনতে বলেছিলেন; তিনি শুনে আগন্তুকের পরিচয় ও মুহাম্মদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। অর্থাৎ একটি অস্পষ্ট ও আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা ধর্মগ্রন্থজ্ঞের ব্যাখ্যার মাধ্যমে নবুওয়তের পরিচিত কাহিনির মধ্যে স্থান পেল। [1]

সহিহ বুখারি ৩: ওয়ারাকার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও ওহিবিরতির অনুচ্ছেদ

فَانْطَلَقَتْ بِهِ خَدِيجَةُ حَتَّى أَتَتْ بِهِ وَرَقَةَ بْنَ نَوْفَلِ بْنِ أَسَدِ بْنِ عَبْدِ الْعُزَّى ابْنَ عَمِّ خَدِيجَةَ، وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ يَكْتُبُ الْكِتَابَ الْعِبْرَانِيَّ، فَيَكْتُبُ مِنَ الإِنْجِيلِ بِالْعِبْرَانِيَّةِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكْتُبَ، وَكَانَ شَيْخًا كَبِيرًا قَدْ عَمِيَ، فَقَالَتْ لَهُ خَدِيجَةُ يَا ابْنَ عَمِّ اسْمَعْ مِنَ ابْنِ أَخِيكَ. فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ يَا ابْنَ أَخِي مَاذَا تَرَى فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَبَرَ مَا رَأَى. فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ هَذَا النَّامُوسُ الَّذِي نَزَّلَ اللَّهُ عَلَى مُوسَى صلى الله عليه وسلم يَا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا، لَيْتَنِي أَكُونُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَوَمُخْرِجِيَّ هُمْ؟ قَالَ نَعَمْ، لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَا جِئْتَ بِهِ إِلاَّ عُودِيَ، وَإِنْ يُدْرِكْنِي يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًا مُؤَزَّرًا. ثُمَّ لَمْ يَنْشَبْ وَرَقَةُ أَنْ تُوُفِّيَ وَفَتَرَ الْوَحْىُ.

বাংলা অনুবাদ:
খাদিজা তাঁকে নিয়ে নিজের চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফেল ইবন আসাদ ইবন আবদুল উযযার কাছে গেলেন। তিনি জাহিলিয়াতের সময় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিব্রু লেখা লিখতেন এবং ইঞ্জিল থেকে হিব্রু ভাষায় আল্লাহর ইচ্ছামতো লিখতেন। তিনি অতি বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন ছিলেন। খাদিজা তাঁকে বললেন, হে চাচাতো ভাই, আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, হে ভাতিজা, তুমি কী দেখেছ? আল্লাহর রাসূল তাঁকে নিজের দেখা ঘটনার বিবরণ দিলেন। ওয়ারাকা বললেন, এ সেই নামুস, যাঁকে আল্লাহ মুসার কাছে পাঠিয়েছিলেন। হায়, যদি তখন আমি শক্তসমর্থ যুবক থাকতাম! তোমার জাতি যখন তোমাকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম! আল্লাহর রাসূল বললেন, তারা কি আমাকে বের করে দেবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ; তুমি যা নিয়ে এসেছ, অনুরূপ কিছু নিয়ে আসা প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। তোমার সেই দিন পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকলে তোমাকে শক্তভাবে সাহায্য করব। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ারাকা মারা গেলেন এবং ওহি বিরতি নিল।

এই কথোপকথনের জ্ঞানগত বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ যা দেখেছেন বলে জানিয়েছেন, ওয়ারাকা নিজে তা দেখেননি। তিনি শ্রুত বিবরণকে নিজের পরিচিত ধর্মীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়েছেন এবং বলেছেন, এটি মুসার নামুস। সিদ্ধান্তটির ভিত্তি তাই আগন্তুকের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ নয়; অভিজ্ঞতার বর্ণনা ও পূর্ববর্তী ধর্মীয় কাহিনির মধ্যে সাদৃশ্য। একই বর্ণনা অন্য কোনো ধর্মের মানুষ নিজের ধর্মীয় শব্দভান্ডার দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পরিচয়টিও ভিন্ন হতে পারত—এই সম্ভাবনাই দেখায়, ব্যাখ্যাকারীর পূর্ববিশ্বাস এখানে নিষ্ক্রিয় ছিল না। অভিজ্ঞতার ওপর যে নাম বসানো হয়েছে, সেই নামই পরে অভিজ্ঞতার ঐশী উৎসের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওয়ারাকা ভবিষ্যৎ বিরোধিতার ব্যাখ্যাও আগাম দিয়েছেন। মানুষ প্রত্যাখ্যান করবে, কষ্ট দেবে এবং বের করে দেবে—এগুলো তাঁর কথায় পূর্ববর্তী নবীদের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি। এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে পরবর্তী বিরোধিতাও আত্মপরিচয় ভাঙার বদলে তাকে দৃঢ় করতে পারে: বিরোধিতা ঘটছে বলেই পূর্বঘোষিত নবীর কাহিনি পূর্ণ হচ্ছে। এখানে ধর্মীয় পরিচয় শুধু একটি অভিজ্ঞতার অর্থ দেয় না; সম্ভাব্য প্রত্যাখ্যানকে কীভাবে বোঝা হবে, তারও একটি ছক তৈরি করে। এই ছকটি আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার ও বিশেষ দায়িত্বের ধারণা গঠনে কতটা কার্যকর হয়েছিল, তা ওয়ারাকার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি।


ইঞ্জিলের ভাষা ও ধর্মীয় জ্ঞানের সম্ভাব্য প্রবাহ

ওয়ারাকার বর্ণনায় ভাষাসংক্রান্ত একটি পাঠভেদ আছে। বুখারি ৩-এ হিব্রু লেখা ও হিব্রুতে ইঞ্জিলের পাঠ লেখার কথা রয়েছে। বুখারি ৬৯৮২-তে আরবি লেখা ও আরবিতে ইঞ্জিলের পাঠ লেখার কথা রয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই মূল বিষয় একই: মুহাম্মদের অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যাকারী ছিলেন পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত একজন মানুষ। ভাষার এই পার্থক্যকে নির্ভুল একক জীবনপঞ্জি হিসেবে মুছে ফেলার বদলে সংশ্লিষ্ট পাঠের পরিচয় বজায় রাখা প্রয়োজন। [2] [3]

সহিহ বুখারি ৬৯৮২: ওয়ারাকার ধর্ম ও লেখার ভাষা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বর্ণনামূলক বাক্য

وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ يَكْتُبُ الْكِتَابَ الْعَرَبِيَّ فَيَكْتُبُ بِالْعَرَبِيَّةِ مِنَ الإِنْجِيلِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكْتُبَ، وَكَانَ شَيْخًا كَبِيرًا قَدْ عَمِيَ.

বাংলা অনুবাদ:
তিনি জাহিলিয়াতের সময় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবি লেখা লিখতেন এবং ইঞ্জিল থেকে আরবি ভাষায় আল্লাহর ইচ্ছামতো লিখতেন। তিনি অতি বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন ছিলেন।

জ্ঞান সঞ্চালনের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক শিক্ষক–শিষ্য সম্পর্ক, লিখিত পাঠসূচি বা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন হয় না। পরিচিত কারও ধর্মীয় ব্যাখ্যা, একটি কাহিনির নাম ও চরিত্রের পরিচয়, ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে প্রত্যাশা এবং সেই প্রত্যাশার পুনরাবৃত্ত অনুমোদনও চিন্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ওয়ারাকার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রভাবের সম্ভাবনা নিছক বাইরের কল্পনা থেকে তোলা হচ্ছে না; প্রথম অভিজ্ঞতাকে নবুওয়ত হিসেবে শনাক্ত করার কাজটি বর্ণনায় তাঁর ওপরই ন্যস্ত। ফলে তাঁর ধর্মগ্রন্থজ্ঞান ও মুহাম্মদের নতুন আত্মপরিচয়ের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র অনুসন্ধানের যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

ওয়ারাকার প্রভাবের সন্দেহে বৌদ্ধিক যোগাযোগ ও মানসিক অনুমোদন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম অভিজ্ঞতাকে তিনি যে ধর্মীয় ভাষা দিয়েছেন, তাতে মুসা, নামুস এবং নবীর বিরোধিতার পরিচিত ইতিহাস একসঙ্গে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ একটি ব্যক্তিগত ঘটনার ব্যাখ্যার মধ্যে পূর্ববর্তী ধর্মীয় জ্ঞানের নির্দিষ্ট উপাদান উপস্থিত। সেই ব্যাখ্যা গ্রহণের পর মুহাম্মদের স্থিরতা বাড়ার সংবাদও রয়েছে। তাঁর জ্ঞান, ব্যাখ্যা ও অনুমোদন নতুন ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের ভিত তৈরিতে অংশ নিয়েছিল কি না—এই সন্দেহ তাই বাস্তব বর্ণিত সম্পর্কের ওপর দাঁড়ায়। যোগাযোগের প্রতিটি দিনের পূর্ণ বিবরণ না থাকলেও এই সম্পর্কের তাৎপর্য বহাল থাকে।


ওয়ারাকার কথায় উদ্বেগ কমা: বর্ণনার সরাসরি সাক্ষ্য

তাবারির সংরক্ষিত ইবনে ইসহাকের বিবরণে ওয়ারাকার অনুমোদনের মানসিক প্রভাব আরও সরাসরি বলা হয়েছে। প্রথমে খাদিজা ওয়ারাকার কথা পৌঁছে দিলে মুহাম্মদের উদ্বেগ কিছুটা কমে। পরে কাবার কাছে ওয়ারাকার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর বক্তব্যের পর আত্মবিশ্বাস বাড়া এবং উদ্বেগ আরও লাঘব হওয়ার কথা এসেছে। এই বর্ণনায় মানুষের দেওয়া স্বীকৃতি কী কাজ করল, সেটি আর কেবল পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর অনুমান নয়; বর্ণনাটির নিজের বক্তব্য। [4]

তাবারি: ওয়ারাকার বক্তব্যের পর উদ্বেগ লাঘব ও স্থিরতা বৃদ্ধির সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ

فرجعت خديجة إلى رسول الله صلى الله عليه وآله فأخبرته بقول ورقة فسهل ذلك عليه بعض ما هو فيه من الهم، فلما قضى رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم جواره وانصرف صنع كما كان يصنع، بدأ بالكعبة فطاف بها، فلقيه ورقة ابن نوفل وهو يطوف بالبيت فقال: يا ابن أخي أخبرني بما رأيت أو سمعت، فأخبره رسول الله صلى الله عليه وآله، فقال له ورقة: والذي نفسي بيده إنك لنبي هذه الأمة، ولقد جاءك الناموس الأكبر الذي جاء إلى موسى، ولتكذبنه ولتؤذينه ولتخرجنه ولتقاتلنه، ولئن أنا أدركت ذلك لأنصرن الله نصرا يعلمه. ثم أدنى رأسه فقبل يافوخه، ثم انصرف رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى منزله وقد زاده ذلك من قول ورقة ثباتا وخفف عنه بعض ما كان فيه من الهم.

বাংলা অনুবাদ:
খাদিজা আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে এসে ওয়ারাকার কথা জানালেন। এতে তাঁর উদ্বেগের কিছুটা লাঘব হলো। নির্জনবাসের মেয়াদ শেষ করে ফিরে এসে তিনি আগের অভ্যাসমতো প্রথমে কাবায় গেলেন এবং তাওয়াফ করলেন। তাওয়াফের সময় ওয়ারাকা ইবন নওফেলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। ওয়ারাকা বললেন, হে ভাতিজা, তুমি যা দেখেছ বা শুনেছ তা আমাকে বলো। আল্লাহর রাসূল তাঁকে ঘটনাটি জানালেন। ওয়ারাকা বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, তুমি এই জাতির নবী। তোমার কাছে সেই মহান নামুস এসেছেন, যিনি মুসার কাছে এসেছিলেন। তোমাকে মিথ্যাবাদী বলা হবে, কষ্ট দেওয়া হবে, বের করে দেওয়া হবে এবং তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করা হবে। আমি সে সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকলে আল্লাহর এমন সাহায্য করব, যা তিনি জানবেন। এরপর তিনি মাথা কাছে এনে তাঁর মাথার ওপরের অংশে চুমু খেলেন। আল্লাহর রাসূল নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। ওয়ারাকার এই বক্তব্য তাঁর স্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর উদ্বেগের কিছুটা লাঘব করেছিল।

এখানে যে সম্পর্কটি স্পষ্ট তা হলো অভিজ্ঞতার অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অনুমোদনের সম্পর্ক। ওয়ারাকা একটি নাম দিলেন, পূর্ববর্তী ইতিহাসের সঙ্গে মিল দেখালেন, ভবিষ্যৎ ভূমিকা ঘোষণা করলেন এবং ব্যক্তিগত সমর্থন জানালেন; তার ফল হিসেবে উদ্বেগ কমল ও স্থিরতা বাড়ল। নিজের অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা গঠনে একজন ধর্মগ্রন্থজ্ঞের মূল্যায়ন কার্যকর ছিল—এই সিদ্ধান্ত বর্ণনাটি থেকেই অনুসরণ করে। সেই অনুমোদনের উৎস হারানো পরবর্তী অনিশ্চয়তাকে বাড়িয়ে থাকতে পারে—এটি এই ঘটনার ওপর দাঁড়ানো একটি মনস্তাত্ত্বিক অনুমান। ওয়ারাকাকে সম্ভাব্য বৌদ্ধিক ও মানসিক সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে দেখার সন্দেহ তাই একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া পেয়েছে।


খাদিজার পরীক্ষা: অদৃশ্য আগন্তুকের পরিচয় কে নির্ধারণ করলেন?

খাদিজার ভূমিকা কেবল ভয় পাওয়া স্বামীকে সান্ত্বনা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধভাবে বর্ণিত হয়নি। ইবনে ইসহাকের নামে সংরক্ষিত আরেক ধারায় তিনি আগন্তুকের পরিচয় পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেন। মুহাম্মদকে বিভিন্নভাবে বসিয়ে এবং নিজের মাথার আবরণ সরিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আগন্তুককে দেখা যাচ্ছে কি না। উত্তরের ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত দেন, আগন্তুকটি ফেরেশতা, শয়তান নয়। যাহাবির গ্রন্থে বর্ণনাটির দুটি রূপ পাশাপাশি সংরক্ষিত আছে। [5]

ইবনে ইসহাকের নামে সংরক্ষিত খাদিজার পরীক্ষার দুই রূপ

وقال ابن إسحاق: حدثني إسماعيل بن أبي حكيم أن خديجة قالت لرسول الله صلى الله عليه وسلم: أي ابن عم، إن استطعت أن تخبرني بصاحبك، هذا الذي يأتيك إذا جاءك. قال: نعم. قال: فلما جاءه قال: يا خديجة هذا جبريل. قال: يا ابن عم قم فاجلس على فخذي اليسرى، فقام فجلس عليها، قالت: هل تراه؟ قال: نعم، قالت: فتحول فاقعد على فخذي اليمنى. فتحول فقعد على فخذها، قالت: هل تراه؟ قال: نعم. قالت: فاجلس في حجري. ففعل، قالت: هل تراه؟ قال: نعم. فتحسرت فألقت خمارها، ثم قالت: هل تراه؟ قال: لا. قالت: اثبت وأبشر فوالله إنه لملك وما هذا بشيطان. قال: وحدثت عبد الله بن حسن هذا الحديث فقال: قد سمعت أمي فاطمة بنت حسين تحدث هذا الحديث، عن خديجة، إلا أني سمعتها تقول: أدخلت رسول الله صلى الله عليه وسلم بينها وبين درعها فذهب عند ذلك جبريل، فقالت: إن هذا لملك وما هو بشيطان.

বাংলা অনুবাদ:
ইবনে ইসহাক বলেন: ইসমাইল ইবনে আবি হাকিম আমাকে বর্ণনা করেছেন, খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে বলেছিলেন, হে চাচাতো ভাই, তোমার কাছে যে সঙ্গী আসেন, তিনি এলে তুমি কি আমাকে জানাতে পারবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি এলে মুহাম্মদ বললেন, হে খাদিজা, এই তো জিবরাইল। খাদিজা বললেন, হে চাচাতো ভাই, উঠে আমার বাঁ উরুতে বসো। তিনি উঠে সেখানে বসলেন। খাদিজা জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁকে দেখতে পাচ্ছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। খাদিজা বললেন, এবার সরে আমার ডান উরুতে বসো। তিনি সরে ডান উরুতে বসলেন। খাদিজা জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁকে দেখতে পাচ্ছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। খাদিজা বললেন, এবার আমার কোলে বসো। তিনি তা করলেন। খাদিজা জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁকে দেখতে পাচ্ছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। খাদিজা তখন মাথার আবরণ সরিয়ে ফেললেন। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁকে দেখতে পাচ্ছ? তিনি বললেন, না। খাদিজা বললেন, স্থির থাকো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো; আল্লাহর শপথ, তিনি ফেরেশতা, শয়তান নন। ইবনে ইসহাক বলেন: আমি আবদুল্লাহ ইবনে হাসানকে এই বর্ণনাটি জানালে তিনি বলেন, আমি আমার মা ফাতিমা বিনতে হুসাইনকে খাদিজার সূত্রে এই ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। তবে তাঁর বর্ণনায় শুনেছি, খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে নিজের ও পোশাকের মাঝখানে প্রবেশ করালে জিবরাইল চলে যান। তখন খাদিজা বলেন, এটি ফেরেশতা, শয়তান নয়।

পরীক্ষাটির প্রতিটি ধাপে দেখার তথ্য দিচ্ছেন মুহাম্মদ। খাদিজা আগন্তুককে নিজে দেখে তার উপস্থিতি–অনুপস্থিতি নির্ধারণ করছেন না। তিনি বসার ভঙ্গি ও আবরণ বদলাচ্ছেন, আর মুহাম্মদের উত্তর থেকে সত্তাটির প্রকৃতি নির্ণয় করছেন। ফলে একই ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই পরীক্ষার উপাদান এবং পরীক্ষার ফল। এই ব্যবস্থায় তাঁর উপলব্ধি ভুল হলে সেটি ধরার আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। মাথা খোলা দেখলে ফেরেশতা চলে যায় অথচ শয়তান যায় না—এই নিয়মটিও পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়নি; নিয়মটিকে আগেই সত্য ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিয়মের ওপর নির্ভর করা সিদ্ধান্তকে আবার সেই নিয়মের সত্যতার প্রমাণ বানালে যুক্তিটি বৃত্তাকার হয়ে পড়ে।

বর্ণনাটিতে প্রথম ধারার সূত্র ইসমাইল ইবনে আবি হাকিম এবং দ্বিতীয় ধারায় ফাতিমা বিনতে হুসাইনের মাধ্যমে খাদিজার কথা এসেছে; খাদিজা পর্যন্ত সমসাময়িক প্রত্যক্ষ বর্ণনার সংযোগ এখানে পূর্ণভাবে দেখানো হয়নি। এই পরিচয় বর্ণনাটির ঐতিহাসিক অবস্থান নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে নবুওয়তের সূচনার পরবর্তী মুসলিম বয়ানে পরিবার কীভাবে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ধর্মীয় নিশ্চয়তায় রূপ দেয়, তার একটি স্পষ্ট ছবি এখানে আছে। ওয়ারাকার ধর্মগ্রন্থভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং খাদিজার পরীক্ষাভিত্তিক অনুমোদন—দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতাটির ঐশী পরিচয় প্রতিষ্ঠায় মানুষের সিদ্ধান্ত কার্যকর। [6]


আত্মহননের আকাঙ্ক্ষা ও জিবরাইলের আশ্বাস: মূল বর্ণনা

ওহিবিরতির সময় আত্মহননের সংকল্পের বিবরণে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপস্থিত: গভীর দুঃখ, পাহাড়ে যাওয়ার পুনরাবৃত্তি, নিজের ঐশী পরিচয় সম্পর্কে আশ্বাস, সাময়িক শান্তি এবং বিরতি দীর্ঘ হলে আবার একই সংকটে ফিরে যাওয়া। মূল প্রশ্নটি শুধু কোনো অবয়ব দেখা গেল কি না, তা নয়; সেই দর্শনের অর্থ ও স্থায়িত্ব কী ছিল। একটি আশ্বাস কিছু সময়ের জন্য শান্তি আনলেও সংকটের পুনরাবৃত্তি থামায়নি—বর্ণনাটির এই ওঠানামাই মানসিক নির্ভরতা ও আত্মপরিচয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। [7] [8]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯১/ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা
তাওহীদ পাবলিকেশন
… এরপর কিছু দিনের মধ্যেই ওরাকার মৃত্যু হয়। আর কিছু দিনের জন্য ওয়াহীও বন্ধ থাকে। এমনকি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থার কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে, তিনি পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ! নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর অস্থিরতা দূর হত এবং নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওয়াহী বন্ধ অবস্থা যখন তাঁর উপর দীর্ঘ হত তখনই তিনি ঐরূপ উদ্দেশে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে আগের মত বলতেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মুহাম্মদ আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন

সহজ নসরুল বারীতে প্রথম অভিজ্ঞতা থেকে ওয়ারাকার সাক্ষাৎ ও পরবর্তী সংকট পর্যন্ত দীর্ঘ বিবরণটি একসঙ্গে রয়েছে। প্রকাশিত বাংলা পাঠে প্রথম আতঙ্ক, খাদিজার সান্ত্বনা এবং আত্মহননসংক্রান্ত অংশের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেই সেটি নিচে দেওয়া হলো। [9]

সহজ তরজমা
৬৫৩০. ইয়াহ্ইয়া ইবনে বুকাইর ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুহাম্মদ রহ. আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি
… বলেন, রাসূলুল্লাহ্র এর ওহীর সূচনা হয় ঘুমের ঘোরে ভালো স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা ভোরের আলোর মতো উদ্ভাসিত হয়ে প্রতিফলিত হত। তিনি হেরা গুহায় গমন করে সেখানে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। এজন্য খাদ্য সামগ্রীও সাথে নিয়ে যেতেন। এরপর খাদিজা রাযি.-এর কাছে ফিরে
আসতেন। তিনি তাকে অনুরূপ খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুত করে দিতেন। অবশেষে তাঁর কাছে সত্যের বাণী (ওহী) আসল। আর এ সময় তিনি হেরা গুহায় ছিলেন। সেখানে ফিরিশতা এসে তাঁকে বলল, আপনি পড়ুন, রাসূলুল্লাহ্ … বলেন, আমি বললাম আমি তো পাঠক নই। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চাপ দিলেন। এমনকি এতে আমার খুব কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, আপনি পড়ুন। আমি বললাম, আমি পাঠক নই। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে শক্ত করে চাপ দিলেন। এবারেও এতে আমার খুব কষ্ট হল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পাঠক নই। এরপর তিনি তৃতীয়বার আমাকে শক্ত করে এমন চাপ দিলেন যে, এবারেও এতে আমার খুব কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন যা সে জানত না (সূরা আলাক: ১-৫) আয়াত পর্যন্ত। এরপর তিনি তা নিয়ে খাদিজা রাযি.-এর কাছে কম্পিত হৃদয়ে ফিরে এলনে।
আর বললেন, আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। ফলে তাঁরা তাঁকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তাঁর থেকে ভীতি দূর হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, হে খাদিজা! আমার কি হল? এরপর তাকে সমূহ ঘটনা জানালেন। বললেন: আমি আমার জীবন সম্পর্কে আশঙ্কা বোধ করছি। খাদিজা রাযি. তাকে বললেন, কখনই না। আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ্ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না। কেননা আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন জুড়ে রাখেন, সত্য কথা বলেন, অনাথ অক্ষমদের বোঝা বহন
করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং হকের পথে আগত যাবতীয় বিপদে সাহায্য করেন। এরপর খাদিজা রাযি. তাঁকে নিয়ে চললেন। এরপর তাঁকে নিয়ে ওরাকা ইবনে নাওফল ইবনে আসাদ ইবনে আব্দুল উয্যা ইবনে কুসাই এর কাছে এলেন। আর তিনি খাদিজা রাযি.-এর চাচার পুত্র (চাচাত ভাই) এবং তার পিতার পক্ষ থেকে চাচাও ছিলেন। তিনি জাহিলি যুগে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবি কিতাব লিখতেন। তাই সে ইনজিল আরবিতে ভাষান্তর করেছেন। যতখানি লেখা আল্লাহর মঞ্জুর ছিল। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তিহীন ব্যক্তি। খাদিজা রাযি. তাকে বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তোমার ভাতিজার কথা শুনুন। তখন ওরাকা বললেন, হে ভাতিজা। তুমি কী দেখেছ? রাসূলুল্লাহ্ যা কিছু দেখেছিলেন, তা তাকে অবহিত করলেন। তখন ওরাকা বললেন, এ তো আল্লাহর সেই নামুস (দূত) যাঁকে মূসা আ.-এর কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। হায় আক্ষেপ! যদি সেদিন আমি জীবিত থাকতাম, যে দিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দিবে। রাসূলুল্লাহ্ বললেন: তারা কি আমাকে বের করে দিবে? ওরাকা বললেন, হাঁ! তুমি যা নিয়ে এসেছ, এমন বস্তু নিয়ে কোনো দিনই কেউ আসেনি, যার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। যদি তোমার জীবনকালে আমাকে পায় তাহলে আমি পরিপূর্ণরূপে তোমাকে সাহায্য করব। এরপর কিছু দিনের মধ্যেই ওরাকার মৃত্যু হয়। আর কিছু দিনের জন্য ওহীও বন্ধ থাকে। এমনকি রাসূলুল্লাহ এ অবস্থার প্রেক্ষিতে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি, তিনি পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখন নিজেকে নিক্ষেপ করার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছুতেন, তখনই জিবরাঈল আ. তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন: হে মুহাম্মদ। নিঃসন্দেহে আপনি তো আল্লাহর রাসূল! এতে তাঁর অস্থিরতা প্রশমিত হত এবং নিজে মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওহী বন্ধ অবস্থা যখন তাঁর উপর দীর্ঘায়িত হয়, তখন তিনি অনুরূপ উদ্দেশ্যে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরাঈল আ. তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে পূর্বের মতো বলতেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: فَالِقُ الإِصْبَاحঅর্থাৎ দিনের বেলায় সূর্যের আলো ও রাতের বেলায় চাঁদের আলো।

আত্মহত্যা
আত্মহত্যা 1

এই বিবরণে আত্মহননের সংকল্পকে বৌদ্ধিক সাহস, যুক্তির আদেশ বা সচেতন নৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। সেখানে দুঃখ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনের প্রতি আস্থা হারানোর ছবি আছে। এই কষ্টের তীব্রতা একজন মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতাকে অবিলম্বে অতিপ্রাকৃত সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার দাবির ওপরও প্রশ্ন আনে: ভয়, অনিশ্চয়তা ও আশ্বাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া দৃঢ় বিশ্বাস নিজের উৎসের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রমাণ করে না। দৃঢ়তার মাত্রা এবং বিশ্বাসের সত্যতা আলাদা বিষয়।


যুহরির অতিরিক্ত সংবাদ ও বুখারির পাঠের গঠন

পাহাড়ে যাওয়ার অংশে থাকা “আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে” কথাটির উৎসনির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে হাজার এই অংশকে যুহরির বালাগ বা তাঁর কাছে পৌঁছানো অসংযুক্ত সংবাদ বলেছেন। তিনি মা‘মারের পাঠে অতিরিক্ত অংশটির উপস্থিতি এবং অন্য বর্ণনাপথে তার অনুপস্থিতিও আলোচনা করেছেন। আয়িশার নামে সংরক্ষিত মূল কথনের সঙ্গে এই অতিরিক্ত সংবাদের সম্পর্ক বুঝতে তাঁর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যামূলক অনুচ্ছেদটি প্রাসঙ্গিক। [10]

ইবনে হাজার: অতিরিক্ত অংশ ও “ফিমা বালাগনা”-র বক্তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ

وصنيع المؤلف يوهم أنه داخل في رواية عقيل، وقد جرى على ذلك الحميدي في جمعه فساق الحديث إلى قوله: وفتر الوحي، ثم قال: انتهى حديث عقيل المفرد عن ابن شهاب إلى حيث ذكرنا، وزاد عنه البخاري في حديثه المقترن بمعمر عن الزهري فقال: وفتر الوحي فترة حتى حزن، فساقه إلى آخره. والذي عندي أن هذه الزيادة خاصة برواية معمر، فقد أخرج طريق عقيل أبو نعيم في مستخرجه من طريق أبي زرعة الرازي عن يحيى بن بكير شيخ البخاري فيه في أول الكتاب بدونها، وأخرجه مقرونا هنا برواية معمر وبين أن اللفظ لمعمر، وكذلك صرح الإسماعيلي أن الزيادة في رواية معمر، وأخرجه أحمد ومسلم والإسماعيلي وغيرهم وأبو نعيم أيضا من طريق جمع من أصحاب الليث عن الليث بدونها، ثم إن القائل فيما بلغنا هو الزهري، ومعنى الكلام أن في جملة ما وصل إلينا من خبر رسول الله صلى الله عليه وسلم في هذه القصة هو من بلاغات الزهري وليس موصولا.

বাংলা অনুবাদ:
গ্রন্থকারের উপস্থাপনা থেকে মনে হতে পারে, অংশটি উকাইলের বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত। হুমাইদি নিজের সংকলনে সেভাবেই হাদিসটি “ওহি বিরতি নিল” পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি বলেছেন, ইবনে শিহাব থেকে উকাইলের স্বতন্ত্র বর্ণনা এখানে শেষ হয়েছে; আর যুহরি থেকে মা‘মারের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে বুখারি যে পাঠ এনেছেন, তাতে “ওহি এমন এক বিরতি নিল যে তিনি দুঃখিত হলেন” থেকে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত অংশ আছে। আমার বিবেচনায় এই অতিরিক্ত অংশটি মা‘মারের বর্ণনার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। কারণ আবু নুআইম তাঁর মুস্তাখরাজে আবু যুরআ আর-রাজি থেকে, বুখারির শিক্ষক ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইরের মাধ্যমে উকাইলের বর্ণনাপথটি গ্রন্থের শুরুতে এই অংশ ছাড়া এনেছেন। এখানে মা‘মারের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে এনে তিনি স্পষ্ট করেছেন, শব্দগুলো মা‘মারের। ইসমাইলিও স্পষ্ট করেছেন যে অতিরিক্ত অংশটি মা‘মারের বর্ণনায় রয়েছে। আহমদ, মুসলিম, ইসমাইলি ও অন্যরা এবং আবু নুআইমও লাইসের একাধিক ছাত্রের মাধ্যমে লাইস থেকে এই অতিরিক্ত অংশ ছাড়া বর্ণনাটি এনেছেন। এরপর “আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে” কথাটির বক্তা হলেন যুহরি। অর্থ হচ্ছে, এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূলের যে সংবাদ আমাদের কাছে এসেছে, তার অন্তর্ভুক্ত এটি। এটি যুহরির অসংযুক্ত সংবাদগুলোর একটি; সংযুক্ত বর্ণনা নয়।

এই পাঠগত পরিচয় অনুসারে আত্মহননের অংশকে আয়িশার সরাসরি সংযুক্ত বক্তব্যের সঙ্গে অভিন্ন ধরে নেওয়া যায়না। আবার সংযোগের ঘাটতি দেখিয়ে পরবর্তী ইসলামি সাহিত্যে এই কাহিনির উপস্থিতি মুছে ফেলাও তথ্যের সঠিক বিবরণ নয়। ঘটনাটির নির্ভরযোগ্যতা বিচার করতে হবে তার সংরক্ষণের সময়, বর্ণনাধারা এবং ভিন্ন বিবরণের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে। ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ একটি তথ্য; সেই শ্রেণিবিভাগ থেকে ঘটনাটি অবশ্যই ঘটেছে বা অবশ্যই ঘটেনি—দুই বিপরীত নিশ্চয়তার কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না।


বুখারির আগের সংকলন: মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক

একই সংকটের বিবরণ মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকেও রয়েছে। মা‘মার যুহরি থেকে বর্ণিত দীর্ঘ ঘটনার শেষভাগে ওয়ারাকার মৃত্যু, ওহিবিরতি এবং আত্মহননের পুনরাবৃত্ত সংকল্প এসেছে। আগের সংকলনে এই পাঠের উপস্থিতি সংবাদটির সংরক্ষণের ইতিহাসকে বুখারির গ্রন্থসীমার বাইরে নিয়ে যায়। এখানে সংশ্লিষ্ট ঘটনার সম্পূর্ণ শেষ অনুচ্ছেদটি দেওয়া হলো। [11]

মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ৯৭১৯: ওয়ারাকার মৃত্যু ও পরবর্তী সংকটের অনুচ্ছেদ

ثم لم ينشب ورقة أن توفي، وفتر الوحي فترة، حتى حزن رسول الله صلى الله عليه وسلم فيما بلغنا حزنا بدا منه أشد حزنا، غدا منه مرارا كي يتردى من رءوس شواهق الجبال، فلما ارتقى بذروة جبل تبدى له جبريل عليه السلام فقال: يا محمد يا رسول الله حقا، فيسكن لذلك جأشه وتقر نفسه، فرجع، فإذا طالت عليه فترة الوحي عاد لمثل ذلك، فإذا رقى بذروة جبل تبدى له جبريل عليه السلام فقال له مثل ذلك.

বাংলা অনুবাদ:
এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ারাকা মারা গেলেন। ওহি এমন এক বিরতি নিল যে আমাদের কাছে পৌঁছানো সংবাদ অনুসারে আল্লাহর রাসূল অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। সেই দুঃখের কারণে তিনি উঁচু পাহাড়গুলোর চূড়া থেকে নিজেকে নিক্ষেপ করার জন্য বারবার যেতেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে জিবরাইল তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে বলতেন, হে মুহাম্মদ, হে সত্যিকারের আল্লাহর রাসূল! এতে তাঁর অস্থিরতা প্রশমিত হতো এবং মন শান্ত হতো; তিনি ফিরে আসতেন। ওহিবিরতি দীর্ঘ হলে তিনি আবার একই কাজের দিকে ফিরে যেতেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে জিবরাইল তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে একই কথা বলতেন।

আবদুর রাজ্জাক ও বুখারির এই পাঠকে দুই স্বতন্ত্র প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য হিসেবে গণনা করলে প্রমাণের সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ে। মা‘মার–যুহরির তথ্যধারা এখানে অভিন্ন। আগের সংকলনে উপস্থিতির তাৎপর্য হলো সংবাদটির পূর্ববর্তী লিখিত সংরক্ষণ; নতুন কোনো অজ্ঞাত প্রত্যক্ষদর্শী আবিষ্কার নয়। এই পার্থক্য বজায় রাখলে বর্ণনার ঐতিহাসিক অবস্থানও স্পষ্ট হয় এবং তাকে ঘিরে অতিরিক্ত নিশ্চয়তার দাবিও পরীক্ষা করা যায়।


তাবারির ভিন্ন ঘটনাক্রম: প্রথম অভিজ্ঞতা, আত্মসন্দেহ ও আত্মহননের সংকল্প

তাবারির সংরক্ষিত ইবনে ইসহাকের আরেক বিবরণে প্রথম অভিজ্ঞতার গঠন ভিন্ন। এখানে ওয়াহব ইবনে কাইসানের মাধ্যমে উবাইদ ইবনে উমাইরের বয়ান এসেছে; তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের কাছে নবুওয়তের সূচনার কথা বলছিলেন। ঘটনাটি ঘুমন্ত অবস্থায় শুরু হয়, ঘুম ভাঙার পর নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভয় আসে এবং ওয়ারাকার সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই আত্মহননের সংকল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে ওহিবিরতির সময়কার যুহরির সংবাদের সঙ্গে এই ধারাটিকে একই সময়ের একটিমাত্র দৃশ্য হিসেবে মিশিয়ে দিলে ঘটনাক্রম বদলে যায়। [12] [13]

তাবারি: ঘুমের মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ থেকে জেগে ওঠা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনাংশ

فقال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم: فجاءني وأنا نائم بنمط من ديباج فيه كتاب، فقال: اقرأ، فقلت: ما أقرأ؟ فغتني حتى ظننت أنه الموت، ثم أرسلني فقال: اقرأ، فقلت: ماذا أقرأ؟ وما أقول ذلك إلا افتداء منه أن يعود إلى بمثل ما صنع بي. قال: اقرأ باسم ربك الذي خلق إلى قوله علم الإنسان ما لم يعلم. قال: فقرأته. قال: ثم انتهى، ثم انصرف عني، وهببت من نومي وكأنما كتب في قلبي كتابا.

বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর রাসূল বলেন: আমি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তিনি রেশমের একটি বস্ত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন; তাতে লেখা ছিল। তিনি বললেন, পড়ো। আমি বললাম, কী পড়ব? তিনি আমাকে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে আমি মনে করলাম, এবার মৃত্যু হবে। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। আমি বললাম, কী পড়ব? আমার এমন বলার উদ্দেশ্য ছিল, তিনি যেন আবার আমার সঙ্গে আগের মতো আচরণ না করেন। তিনি বললেন, “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”—থেকে “মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানত না” পর্যন্ত। আমি তা পড়লাম। এরপর তিনি শেষ করলেন এবং আমার কাছ থেকে চলে গেলেন। আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম; মনে হলো, আমার হৃদয়ে যেন একটি লেখা লিখে দেওয়া হয়েছে।

এই রূপটিতে রেশমের বস্ত্র, তাতে লেখা, চেপে ধরার সময় মৃত্যুর আশঙ্কা এবং ঘুম ভেঙে হৃদয়ে লেখা অনুভব করা—সবগুলো একই ধারায় এসেছে। অভিজ্ঞতাটির নিজের বর্ণনায় ঘুম ও জাগরণের একটি সীমানা আছে। সেই সীমানা বাদ দিয়ে ঘটনাটিকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ধরনের জাগ্রত উপলব্ধি হিসেবে বর্ণনা করলে উৎসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। স্বপ্নের জীবন্ততা, জাগরণের পর তার স্মৃতির শক্তি এবং পরে আকাশে অবয়ব দেখার বিবরণ তাই পৃথক অভিজ্ঞতা হিসেবে পরীক্ষার বিষয়। স্বপ্নকে সত্য স্বপ্ন বলা হয়েছে বলেই সেই স্বপ্নে আগত সত্তার বহির্জাগতিক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না; নামকরণটি ধর্মীয় ব্যাখ্যার অংশ।

এই ধারার পরের অংশে নিজের সম্পর্কে কবি বা উন্মাদ হওয়ার ভয় থেকে পাহাড়ে যাওয়ার সংকল্প এসেছে। খাদিজার কাছে ফিরে যাওয়া এবং তাঁর মাধ্যমে ওয়ারাকার কাছে সংবাদ পৌঁছানোও একই ধারায় বর্ণিত হয়েছে। মূল ঘটনাংশের ধারাবাহিকতা নিচে রয়েছে। [14]

তাবারি: আত্মসন্দেহ, আত্মহননের সংকল্প, খাদিজার আশ্বাস ও ওয়ারাকার প্রথম মূল্যায়নের ধারাবাহিক বিবরণ

قال: ولم يكن من خلق الله أحد أبغض إلي من شاعر أو مجنون، كنت لا أطيق أن أنظر إليهما. قال: قلت إن الأبعد يعني نفسه لشاعر أو مجنون، لا تحدث بها عني قريش أبدا! لأعمدن إلى حالق من الجبل فلأطرحن نفسي منه فلأقتلنها فلأستريحن. قال: فخرجت أريد ذلك، حتى إذا كنت في وسط من الجبل سمعت صوتا من السماء يقول: يا محمد أنت رسول الله وأنا جبريل. قال: فرفعت رأسي إلى السماء فإذا جبريل في صورة رجل صاف قدميه في أفق السماء يقول: يا محمد أنت رسول الله وأنا جبريل. قال: فوقفت أنظر إليه وشغلني ذلك عما أردت فما أتقدم وما أتأخر، وجعلت أصرف وجهي عنه في آفاق السماء فلا أنظر في ناحية منها إلا رأيته كذلك، فما زلت واقفا ما أتقدم أمامي ولا أرجع ورائي حتى بعثت خديجة رسلها في طلبي حتى بلغوا مكة ورجعوا إليها وأنا واقف في مكاني، ثم انصرف عني وانصرفت راجعا إلى أهلي حتى أتيت خديجة فجلست إلى فخذها مضيفا. فقالت: يا أبا القاسم أين كنت فوالله لقد بعثت رسلي في طلبك حتى بلغوا مكة ورجعوا إلي. قال: قلت لها إن الأبعد لشاعر أو مجنون. فقالت: أعيذك بالله من ذلك يا أبا القاسم، ما كان الله ليصنع ذلك بك، ما أعلم منك من صدق حديثك وعظم أمانتك وحسن خلقك وصلة رحمك، وما ذاك يا ابن عم لعلك رأيت شيئا. قال: فقلت لها نعم، ثم حدثتها بالذي رأيت. فقالت: أبشر يا ابن عم واثبت، فوالذي نفس خديجة بيده إني لأرجو أن تكون نبي هذه الأمة. ثم قامت فجمعت عليها ثيابها ثم انطلقت إلى ورقة بن نوفل بن أسد وهو ابن عمها، وكان ورقة قد تنصر وقرأ الكتب وسمع من أهل التوراة والإنجيل، فأخبرته بما أخبرها به رسول الله صلى الله عليه وآله أنه رأى وسمع. فقال ورقة: قدوس قدوس، والذي نفس ورقة بيده لئن كنت صدقتني يا خديجة لقد جاءه الناموس الأكبر، يعني بالناموس جبريل عليه السلام الذي كان يأتي موسى، وإنه لنبي هذه الأمة، فقولي له فليثبت.

বাংলা অনুবাদ:
তিনি বলেন: আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কবি বা উন্মাদের চেয়ে অপছন্দের কেউ আমার কাছে ছিল না; তাদের দিকে তাকানোও আমি সহ্য করতে পারতাম না। আমি ভাবলাম, এই হতভাগা—নিজেকে বোঝাচ্ছেন—নিশ্চয় কবি বা উন্মাদ। কুরাইশ যেন কখনো আমার সম্পর্কে এমন কথা বলতে না পারে! আমি পাহাড়ের উঁচু স্থানে গিয়ে নিজেকে সেখান থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করব এবং স্বস্তি পাব। সেই উদ্দেশ্যে বের হলাম। পাহাড়ের মাঝামাঝি পৌঁছালে আকাশ থেকে একটি কণ্ঠ শুনলাম: হে মুহাম্মদ, তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাইল। আকাশের দিকে মাথা তুলে দেখলাম, জিবরাইল মানুষের আকৃতিতে দিগন্তে দুই পা পাশাপাশি রেখে দাঁড়িয়ে বলছেন: হে মুহাম্মদ, তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাইল। আমি দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখতে লাগলাম। এ দৃশ্য আমাকে আমার আগের উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে রাখল; আমি সামনে বা পেছনে যেতে পারছিলাম না। দিগন্তের যেদিকেই মুখ ফেরাচ্ছিলাম, সেখানেই তাঁকে একইভাবে দেখছিলাম। আমি এভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম; সামনে এগোতে বা পেছনে ফিরতে পারলাম না। খাদিজা আমাকে খুঁজতে লোক পাঠালেন; তারা মক্কা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এল, তখনো আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। পরে তিনি সরে গেলে আমি পরিবারের কাছে ফিরলাম এবং খাদিজার পাশে গিয়ে বসলাম। তিনি বললেন, হে আবুল কাসিম, কোথায় ছিলে? আল্লাহর শপথ, তোমার খোঁজে লোক পাঠিয়েছিলাম; তারা মক্কা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছে। আমি তাঁকে বললাম, এই হতভাগা নিশ্চয় কবি বা উন্মাদ। তিনি বললেন, হে আবুল কাসিম, আমি তোমার জন্য এ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। তোমার সত্যবাদিতা, আমানতদারি, উত্তম আচরণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কথা আমি জানি; আল্লাহ তোমার সঙ্গে এমন করবেন না। কী হয়েছে, হে চাচাতো ভাই, হয়তো কিছু দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ; এরপর যা দেখেছি তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং স্থির থাকো। যাঁর হাতে খাদিজার প্রাণ তাঁর শপথ, আমি আশা করি তুমি এই জাতির নবী হবে। এরপর তিনি পোশাক গুছিয়ে নিজের চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফেলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, গ্রন্থপাঠ করেছিলেন এবং তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনুসারীদের কাছ থেকে শুনেছিলেন। মুহাম্মদ যা দেখেছেন ও শুনেছেন বলে তাঁকে জানিয়েছিলেন, খাদিজা ওয়ারাকাকে তা বললেন। ওয়ারাকা বললেন, পবিত্র, পবিত্র! যাঁর হাতে ওয়ারাকার প্রাণ তাঁর শপথ, হে খাদিজা, তুমি আমাকে সত্য বলে থাকলে তাঁর কাছে মহান নামুস এসেছেন—অর্থাৎ মুসার কাছে আসা জিবরাইল। তিনি এই জাতির নবী হবেন। তাঁকে বলো, তিনি যেন স্থির থাকেন।

এই বর্ণনার আত্মহননেচ্ছা ওয়ারাকার মৃত্যুর ফল নয়; ওয়ারাকার সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই তার অবস্থান। ফলে প্রথম অভিজ্ঞতার আতঙ্ক এবং পরবর্তী ওহিবিরতির অস্থিরতা দুই ভিন্ন পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে উপস্থিত হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ভয় হচ্ছে, অভিজ্ঞতাটির অর্থ উন্মাদনা বা কবিসুলভ আবিষ্টতা কি না। খাদিজা ও ওয়ারাকার ব্যাখ্যা সেই ভয়কে নবুওয়তের প্রত্যাশায় বদলে দেয়। পরবর্তী বিরতির বয়ানে বিপন্ন হচ্ছে সেই গড়ে ওঠা নবুওয়তের আত্মপরিচয়। দুই ধারার বিবরণে এই রূপান্তর বিশ্লেষণের বিষয়: প্রথমে অজ্ঞাত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ভয়, পরে অভিজ্ঞতার অনুপস্থিতি সম্পর্কে ভয়।

ইবনে ইসহাকের এই বয়ান উবাইদ ইবনে উমাইরের মাধ্যমে এসেছে; তিনি ঘটনাটির প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে নিজের উপস্থিতি দাবি করছেন না। যুহরির অতিরিক্ত সংবাদের সঙ্গে একে মিলিয়ে একটানা ব্যক্তিগত চিকিৎসাবৃত্তান্ত তৈরি করার উপায় নেই। যে তথ্যটি পরিষ্কার তা হলো, পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসে আত্মসন্দেহ ও আত্মহননের বিষয়টি একটিমাত্র পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়নি। নবুওয়তের আত্মপরিচয় গঠনের আগে ও পরে সংকটের আলাদা ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল। বর্ণনাগুলোর এই ভিন্নতা বাদ দিলে মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর তৈরি হওয়া ধর্মীয় জীবনীটির নির্মাণও আড়াল হয়ে যায়।


ওহিবিরতি: কত দিন, কী বন্ধ ছিল এবং ওয়ারাকার মৃত্যু কোথায়?

ওয়ারাকার মৃত্যু ও ওহিবিরতি একই বাক্যধারায় আসা সন্দেহের একটি সূত্র। কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক অনুসন্ধানে বিরতির মেয়াদ, ঠিক কী বন্ধ হয়েছিল এবং ঘটনাগুলোর পৃথক বর্ণনাক্রম গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিনের অনিশ্চয়তা, কয়েক মাসের প্রতীক্ষা এবং কয়েক বছরের স্থবিরতার মানসিক তাৎপর্য এক নয়। অথচ প্রধান সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নির্দিষ্ট দিনের সংখ্যা দেয় না; পরবর্তী গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন মেয়াদ সংরক্ষিত হয়েছে। [2] [15]

সালিহি: ওহিবিরতির মেয়াদ ও গ্রন্থের পাঠ নিয়ে সম্পূর্ণ আলোচনা

الثالث: اختلف في مقدار مدة الفترة، فقال السهيلي: جاء في بعض الأحاديث المسندة أنها كانت سنتين ونصف سنة. قال في الزهر: ويخدش فيه ما ذكره ابن عباس في تفسيره أنها كانت أربعين يوما، وفي تفسير ابن الجوزي ومعاني الزجاج والفراء: خمسة عشر يوما. وفي تفسير مقاتل: ثلاثة أيام. ولعل هذا هو الأشبه بحاله عند ربه لا ما ذكر السهيلي واحتج لصحته. وقال الحافظ فيما رأيته بخطه في الفتح: وهذا الذي اعتمده السهيلي لا يثبت وقد عارضه ما جاء عن ابن عباس: أن مدة الفترة المذكورة كانت أياما. قال: وسيأتي مزيد لذلك في كتاب التعبير، إن شاء الله تعالى. قلت: راجعت كتاب التعبير من نسخة بغير خطه فألفيته قال: قوله وفتر الوحي تقدم القول في مدة هذه الفترة في أول الكتاب. انتهى. فليراجع خطه، لعله يكون الحق ذلك في نسخته بعد.

বাংলা অনুবাদ:
তৃতীয় বিষয়: বিরতির মেয়াদ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। সুহাইলি বলেছেন, কিছু সংযুক্ত বর্ণনায় এর মেয়াদ আড়াই বছর এসেছে। “আয-যাহর”-এ বলা হয়েছে, ইবনে আব্বাসের তাফসিরে চল্লিশ দিনের উল্লেখ এই মতকে প্রশ্নের মুখে ফেলে; ইবনুল জাওযির তাফসির এবং যাজ্জাজ ও ফাররার মাআনিতে পনেরো দিন, আর মুকাতিলের তাফসিরে তিন দিনের কথা আছে। লেখক এরপর বলেছেন, সুহাইলির মতের পরিবর্তে শেষের এই সময়কালটি তাঁর প্রতিপালকের কাছে তাঁর অবস্থার সঙ্গে বেশি সঙ্গত মনে হয়। হাফিযের নিজের হাতের লেখা ফাতহে আমি দেখেছি, তিনি বলেছেন: সুহাইলি যে মতের ওপর নির্ভর করেছেন তা প্রতিষ্ঠিত নয়; ইবনে আব্বাস থেকে বিরতির মেয়াদ কয়েক দিন হওয়ার যে সংবাদ এসেছে, তা এর বিরোধী। তিনি বলেছেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যার অধ্যায়ে এ বিষয়ে আরও আলোচনা আসবে। আমি বলি: তাঁর নিজের হাতের লেখা নয়, এমন একটি কপির স্বপ্নের ব্যাখ্যার অধ্যায় দেখে পেয়েছি, সেখানে বলা আছে, “ওহি বিরতি নিল”—এই বিরতির মেয়াদ নিয়ে গ্রন্থের শুরুতে আলোচনা হয়েছে। অতএব তাঁর নিজের হাতের লেখা কপিটি দেখা প্রয়োজন; হয়তো পরে তিনি সেটিতে ওই আলোচনা যোগ করেছিলেন।

সংরক্ষিত মেয়াদ বা দাবিসালিহির আলোচনায় উৎস ও অবস্থাঘটনাক্রমের তাৎপর্য
তিন দিনমুকাতিলের তাফসিরের নামে উল্লেখস্বল্প বিরতির একটি ব্যাখ্যা; প্রধান হাদিসে নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই।
পনেরো দিনইবনুল জাওযি এবং যাজ্জাজ ও ফাররার গ্রন্থের নামে উল্লেখএকই বিষয়ে ভিন্ন সময়কাল সংরক্ষিত হয়েছে।
চল্লিশ দিনইবনে আব্বাসের তাফসিরের নামে উল্লেখদীর্ঘতর বিরতির আরেক প্রচলিত হিসাব।
আড়াই বছরসুহাইলির উল্লেখ; ইবনে হাজারের আপত্তিও উদ্ধৃতমতটির বিরুদ্ধে ধ্রুপদি সাহিত্যেই প্রশ্ন আছে।
তিন বছরপরবর্তী আলোচনায় শা‘বির অন্য সংবাদ ও তার সূত্রারোপ নিয়ে আপত্তিপ্রকাশ্য প্রচারের আগের সময়, অন্য ফেরেশতার সঙ্গ এবং ওহিবিরতি—এসব এক করে গণনা করলে কালানুক্রম বদলায়।

সালিহির আলোচনায় ধর্মীয় উপযুক্ততার একটি মানদণ্ডও দেখা যাচ্ছে: কোন সময়কাল নবীর সঙ্গে তাঁর প্রতিপালকের সম্পর্কের জন্য বেশি সঙ্গত মনে হয়, সেটিও মেয়াদ নির্বাচনের যুক্তি হয়েছে। কিন্তু কোনো মেয়াদ ধর্মীয় প্রত্যাশার সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যাওয়া সেই মেয়াদের স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য নয়। একইভাবে দীর্ঘ বিরতি শুনতে বেশি নাটকীয় বলেই তা নির্বাচন করা গবেষণার মানদণ্ড হতে পারে না। এখানে তথ্যগত ফল হলো, নির্দিষ্ট মেয়াদ বিষয়ে একাধিক মত আছে এবং তাদের পারস্পরিক সূত্রনির্ভরতা ও ব্যাখ্যাগত উদ্দেশ্যও পরীক্ষার বিষয়।


বার্তা বন্ধ থাকা ও জিবরাইলের দর্শন: দুটি আলাদা বিষয়

আত্মহননের বিবরণে জিবরাইল বারবার উপস্থিত হচ্ছেন, অথচ সময়টিকে ওহিবিরতি বলা হচ্ছে। এই পার্থক্য ধ্রুপদি ব্যাখ্যাকারীরাও লক্ষ করেছেন। সালিহি ইবনে হাজারের নামে একটি ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন: বিরতি বলতে জিবরাইলের সব আগমন বন্ধ থাকা বোঝানো হয়নি; নতুন ওহি আসার বিলম্ব বোঝানো হয়েছে। তিনি আবার সেই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন রেখেছেন। অর্থাৎ দর্শন ও নতুন বার্তার সম্পর্ক নিয়ে সমস্যাটি উৎসসাহিত্যের মধ্যেই আলোচিত। [16]

সালিহি: বিরতির অর্থ ও তার ধর্মীয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুইটি পূর্ণ মন্তব্য

الأول: قال الحافظ: فترة الوحي عبارة عن تأخره مدة من الزمان، وليس المراد بفترته بين نزول اقرأ وأيها المدثر عدم مجيء جبريل إليه بل تأخر نزول الوحي فقط. قلت: وفيه نظر، لما سبق أول الباب عن ابن عباس والزهري. الثاني: الحكمة في فترة الوحي والله أعلم ليذهب عنه ما كان يجده صلى الله عليه وسلم من الروع وليحصل له التشوق إلى العود.

বাংলা অনুবাদ:
প্রথম বিষয়: হাফিয বলেছেন, ওহিবিরতি বলতে কিছু সময়ের জন্য ওহি আসতে দেরি হওয়াকে বোঝায়। “পড়ো” এবং “হে বস্ত্রাবৃত” অবতরণের মধ্যবর্তী বিরতি বলতে তাঁর কাছে জিবরাইলের না আসা বোঝানো হয়নি; কেবল ওহি অবতরণে বিলম্ব বোঝানো হয়েছে। আমি বলি: অধ্যায়ের শুরুতে ইবনে আব্বাস ও যুহরির সূত্রে যা এসেছে, তার কারণে এই বক্তব্য প্রশ্নসাপেক্ষ। দ্বিতীয় বিষয়: ওহিবিরতির হিকমত—আল্লাহই ভালো জানেন—হলো, তাঁর প্রথম আতঙ্ক দূর হওয়া এবং পুনরায় ওহি আসার জন্য আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হওয়া।

এই পার্থক্যটি ধরে প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট করা যায়। কেবল আগন্তুকের উপস্থিতি নয়, নতুন বার্তা আসার ধারাবাহিকতাও নবুওয়তের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের বিষয়। বর্ণনায় যে বাক্যটি শান্তি দিচ্ছে সেটি নতুন কোনো বিধান নয়; “তুমি সত্যিই আল্লাহর রাসূল”—নিজের পরিচয়ের পুনর্নিশ্চয়তা। এরপর বার্তা আসার বিরতি দীর্ঘ হলে আবার সংকট ফেরে। বিশেষ দায়িত্বের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য বারবার নিশ্চিত হওয়ার এই প্রয়োজন মানসিক নির্ভরতার একটি সম্ভাব্য ধরন হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। “আসক্তির প্রত্যাহারজনিত রোগ” বলে ঘোষণা করার চেয়ে এই নির্দিষ্ট সম্পর্কের ব্যাখ্যা বেশি তথ্যনির্ভর।

ওয়ারাকার মৃত্যু সেই আশ্বাস ও ব্যাখ্যার পার্থিব কেন্দ্রটিকে সরিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে তুলনা করে যিনি প্রথম অভিজ্ঞতাকে অর্থ দিয়েছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে নিজের পরিচয় বিষয়ে প্রশ্ন বাড়ার অনুমানটি বোধগম্য। আবার প্রথম অভিজ্ঞতা নিয়ে আতঙ্কের আলাদা ধারাও আছে। তাই সম্ভাব্য কারণগুলো হলো পূর্ববর্তী ভয়, নতুন দায়িত্বের অনিশ্চয়তা, প্রত্যাশিত বার্তা না পাওয়া এবং সহায়ক সম্পর্ক হারানো। এই কারণগুলো পরস্পর যুক্ত হতে পারে; একটি কারণকে বেছে অন্য সব অভিজ্ঞতা তার মধ্যে গুঁজে দিলে মানসিক সংকটের প্রকৃত জটিলতা হারায়।


ওয়ারাকার মৃত্যুকাল: বিলালের প্রসঙ্গ ও ভিন্ন স্মৃতিধারা

ওয়ারাকার মৃত্যুর সময় নিয়েও পরবর্তী ইসলামি বর্ণনায় একটি ভিন্ন ধারা পাওয়া যায়। উরওয়ার নামে সংরক্ষিত বিবরণে তাঁকে বিলালের নির্যাতনের সময় উপস্থিত দেখানো হয়েছে। যাহাবি সেই সংবাদ উদ্ধৃত করে তার বর্ণনাপথ ও মৃত্যুকাল নিয়ে আপত্তি করেছেন। সংবাদ ও আপত্তি একসঙ্গে রাখলে বোঝা যায়, নবুওয়তের প্রথম সাক্ষাতের পর মৃত্যু এবং মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের সময় পর্যন্ত জীবিত থাকা—এই দুই ধরনের ছবি কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। [17] [18]

ওয়ারাকা ও বিলালের সংবাদ এবং যাহাবির আপত্তি

عن عروة أنه قال: مر ورقة بن نوفل على بلال وهو يعذب، يلصق ظهره بالرمضاء وهو يقول: أحد أحد، فقال ورقة: أحِّد أحِّد يا بلال، صبرا يا بلال، لم تعذبونه؟ فو الذي نفسي بيده لئن قتلتموه لأتخذنه حنانا. هذا مرسل، وورقة لو أدرك هذا لعد من الصحابة، وإنما مات الرجل في فترة الوحي بعد النبوة وقبل الرسالة كما في الصحيح.

বাংলা অনুবাদ:
উরওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ওয়ারাকা ইবন নওফেল বিলালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছিল, উত্তপ্ত বালুর ওপর তাঁর পিঠ লাগানো হচ্ছিল, আর তিনি বলছিলেন, এক, এক। ওয়ারাকা বললেন, হে বিলাল, এক বলো, এক বলো; ধৈর্য ধরো, হে বিলাল। তোমরা তাঁকে কেন নির্যাতন করছ? যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, তোমরা তাঁকে হত্যা করলে আমি তাঁর স্থানটিকে শ্রদ্ধার আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করব। যাহাবির মন্তব্য: এটি অসংযুক্ত সংবাদ। ওয়ারাকা এই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তাঁকে সাহাবিদের মধ্যে গণনা করা হতো। সহিহ বর্ণনা অনুসারে তিনি নবুওয়তের পর, রিসালাতের আগে ওহিবিরতির সময়েই মারা গিয়েছিলেন।

এই মতবিরোধ থেকে ওয়ারাকার মৃত্যুর নতুন কোনো নিশ্চিত দিন-তারিখ পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় তাঁর জীবন ও নবুওয়তের সূচনার সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন সংরক্ষিত স্মৃতি। তাঁকে সাহাবি বলা হবে কি না, প্রথম পুরুষ বিশ্বাসী হিসেবে গণনা করা হবে কি না কিংবা প্রকাশ্য আহ্বানের আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কি না—এসব নিয়েও ইসলামি আলেমদের ভিন্ন অবস্থান আছে। ফলে তাঁর বৌদ্ধিক ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের আলোচনা একটি অনুমিত নিখুঁত সময়পঞ্জির ওপর দাঁড় করানোর বদলে এই ভিন্ন বর্ণনাধারাগুলোসহ করা প্রয়োজন।


ওহির প্রত্যাবর্তন: আতঙ্ক, শরীর ঢেকে দেওয়া ও ঠান্ডা পানি

বিরতির পর নতুন অভিজ্ঞতার বর্ণনায় আবার শারীরিক আতঙ্ক ফিরে আসে। আকাশ থেকে কণ্ঠ শোনা, চারদিকে তাকানো, ওপরে কিছু দেখা, ঘরে ফিরে আবৃত হতে চাওয়া এবং ঠান্ডা পানি ঢালার অনুরোধ—এগুলো অভিজ্ঞতার শরীরী দিক। বুখারি ৪৯২২-তে আবু সালামা ও জাবিরের কথোপকথনে প্রথম অবতীর্ণ অংশ হিসেবে মুদ্দাসসিরের কথা এসেছে; প্রশ্নকারী ইকরা প্রথম হওয়ার কথাও তুলেছেন। সম্পূর্ণ বর্ণনায় দুটি স্মৃতিধারার সম্পর্ক এবং শরীরী প্রতিক্রিয়া পাশাপাশি পাওয়া যায়। [19]

সহিহ বুখারি ৪৯২২: প্রথম অবতরণসংক্রান্ত প্রশ্ন এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়ার পূর্ণ বর্ণনা

سألت أبا سلمة بن عبد الرحمن عن أول ما نزل من القرآن. قال: يا أيها المدثر. قلت: يقولون اقرأ باسم ربك الذي خلق. فقال أبو سلمة: سألت جابر بن عبد الله رضي الله عنهما عن ذلك وقلت له مثل الذي قلت، فقال جابر: لا أحدثك إلا ما حدثنا رسول الله صلى الله عليه وسلم، قال: جاورت بحراء فلما قضيت جواري هبطت فنوديت، فنظرت عن يميني فلم أر شيئا، ونظرت عن شمالي فلم أر شيئا، ونظرت أمامي فلم أر شيئا، ونظرت خلفي فلم أر شيئا، فرفعت رأسي فرأيت شيئا، فأتيت خديجة فقلت: دثروني وصبوا علي ماء باردا. قال: فدثروني وصبوا علي ماء باردا. قال: فنزلت يا أيها المدثر قم فأنذر وربك فكبر.

বাংলা অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসির বলেন: আমি আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমানকে কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ অংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, “হে বস্ত্রাবৃত”। আমি বললাম, লোকেরা তো বলে, “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”। আবু সালামা বললেন, আমি জাবির ইবনে আবদুল্লাহকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এবং তুমি যা বলেছ, আমিও তাঁকে তা বলেছিলাম। জাবির বললেন, আল্লাহর রাসূল আমাদের যা বলেছেন, আমি শুধু সেটিই বলব। তিনি বলেছেন: আমি হেরায় নির্জনবাস করেছিলাম। নির্জনবাসের মেয়াদ শেষ করে নেমে এলে আমাকে ডাকা হলো। আমি ডান দিকে তাকিয়ে কিছু দেখলাম না; বাঁ দিকে তাকিয়ে কিছু দেখলাম না; সামনে তাকিয়ে কিছু দেখলাম না; পেছনে তাকিয়ে কিছু দেখলাম না। এরপর মাথা তুলে কিছু দেখলাম। খাদিজার কাছে এসে বললাম, আমাকে আবৃত করো এবং আমার গায়ে ঠান্ডা পানি ঢালো। তাঁরা আমাকে আবৃত করলেন এবং গায়ে ঠান্ডা পানি ঢাললেন। এরপর অবতীর্ণ হলো, “হে বস্ত্রাবৃত, উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা করুন।”

জাবিরের আরেক বর্ণনায় আগন্তুককে হেরায় আসা সেই ফেরেশতা বলা হয়েছে এবং আসমান ও জমিনের মাঝখানে একটি আসনে বসার কথা রয়েছে। এখানে আরবি শব্দ কুরসি—আসন বা চেয়ার। তাকে বিশাল সিংহাসন বলে আরও অলংকৃত করা মূল বক্তব্যের প্রয়োজন নয়; পরিচিত আগন্তুককে পুনরায় দেখেও প্রবল আতঙ্কের উল্লেখটাই বিশ্লেষণের যথেষ্ট বিষয়। বর্তমান বাংলা সূত্রের পূর্ণ উদ্ধৃতিটি নিচে রয়েছে। [20] [21]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌র বাণীঃ وثيابك فطهر “তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ” (৭৪ঃ ৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৫৬৪ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯২৫
৪৫৬৪। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ওহী বন্ধ থাকা সময়কাল সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছি। তিনি তাঁর আলোচনার মাঝে বলেন, একদা আমি চলছিলাম, এমতাবস্থায় আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। মাথা উপরে তুলেই আমি দেখলাম, যে ফেরেশতা হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিল সে আসমান ও জমিনের মাঝে রক্ষিত একটি আসনে বসে আছে। আমি তাঁর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে এসে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারা আমাকে বস্ত্রাবৃত করল। এরপর আল্লাহ নাযিল করলেন, “হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন … অপবিত্রতা হতে দূরে থাকুন” এই আয়াতগুলো সালাত (নামায/নামাজ) ফরয হওয়ার আগে নাযিল হয়েছিল। الرِّجْزَ অর্থ হল মূর্তিসমূহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

আবৃত করা, ঠান্ডা পানি ঢালা এবং ভয় কমার পর নতুন নির্দেশ শোনার ক্রম থেকে শরীর, আবেগ ও অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাওয়া যায়। মুহাম্মদ যে অভিজ্ঞতাকে পরে ঐশী দায়িত্বের অংশ হিসেবে বুঝেছেন, প্রথম মুহূর্তে সেটি তাঁর জন্য নিরাপদ ও স্বচ্ছ কোনো জ্ঞান হিসেবে অনুভূত হয়নি। তাঁর আশপাশের মানুষ শারীরিক সেবা ও আশ্বাস দিয়েছেন। ধর্মীয় জীবনী সেই প্রতিক্রিয়ার ওপর পরবর্তী নবুওয়তের পরিচয় বসিয়েছে। মানুষের এমন অভিজ্ঞতা কীভাবে একটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের সূচনা হতে পারে, সেই প্রশ্নের জন্য শরীরী আতঙ্কের এই বিবরণগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

মুদ্দাসসিরের প্রথম আয়াতগুলোর সম্বোধন ঘটনাটির তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত: যিনি নিজেকে আবৃত করতে বলছেন, তাঁকেই “হে বস্ত্রাবৃত” বলে ওঠা ও সতর্ক করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত অবস্থার সঙ্গে প্রত্যাদেশের শব্দচয়নের এই যোগসূত্র মানবীয় অভিজ্ঞতা ও বাণীর সম্পর্ক অনুসন্ধানের সরাসরি উপাদান। [22] [23]

ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! ওঠ, সতর্ক কর।
— Taisirul Quran
হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, সতর্ক বাণী প্রচার কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
হে বস্ত্রাবৃত! উঠ, অতঃপর সতর্ক কর।
— Rawai Al-bayan
হে বস্ত্ৰাচ্ছাদিত! উঠুন, অতঃপর সতর্ক করুন,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


সূরা দুহা: পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা ও সামাজিক বিদ্রূপ

সূরা দুহার সান্ত্বনাবাণীকে ওয়ারাকার মৃত্যুর পরের প্রথম বিরতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দিলে বর্ণনাগুলোর পৃথক পরিস্থিতি হারিয়ে যায়। বুখারি ৪৯৫০-তে অসুস্থতার কারণে দুই–তিন রাত না ওঠা এবং এক নারীর বিদ্রূপের বিবরণ আছে। ৪৯৫১-তে একই বর্ণনাকারীর মাধ্যমে আগন্তুকের আসতে দেরি হওয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ এসেছে। এখানে দুঃখ ও আশ্বাসের সঙ্গে বাইরের মানুষের প্রতিক্রিয়াও যুক্ত হয়েছে। [24] [25]

সহিহ বুখারি ৪৯৫০: অসুস্থতা, বিদ্রূপ ও দুহা অবতরণের পূর্ণ বর্ণনা

عن جندب بن سفيان رضي الله عنه قال: اشتكى رسول الله صلى الله عليه وسلم فلم يقم ليلتين أو ثلاثا، فجاءت امرأة فقالت: يا محمد إني لأرجو أن يكون شيطانك قد تركك، لم أره قربك منذ ليلتين أو ثلاثا. فأنزل الله عز وجل: والضحى والليل إذا سجى ما ودعك ربك وما قلى.

বাংলা অনুবাদ:
জুন্দুব ইবনে সুফিয়ান থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রাসূল অসুস্থ হয়ে দুই বা তিন রাত উঠতে পারেননি। তখন এক নারী এসে বলল, হে মুহাম্মদ, আমি আশা করি তোমার শয়তান তোমাকে ছেড়ে গেছে; দুই বা তিন রাত ধরে তাকে তোমার কাছে আসতে দেখিনি। এরপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, “শপথ পূর্বাহ্ণের এবং রাতের যখন তা নিস্তব্ধ হয়; তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি।”

সহিহ বুখারি ৪৯৫১: বিলম্ব সম্পর্কে নারীর বক্তব্যের সম্পূর্ণ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

عن جندب البجلي: قالت امرأة يا رسول الله ما أرى صاحبك إلا أبطأك. فنزلت: ما ودعك ربك وما قلى.

বাংলা অনুবাদ:
জুন্দুব আল-বাজালি থেকে বর্ণিত: এক নারী বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার সঙ্গী আপনার কাছে আসতে দেরি করছেন বলেই মনে হচ্ছে। তখন অবতীর্ণ হলো, “তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি।”

সূরা দুহার আয়াতটির প্রচলিত বাংলা অনুবাদগুলো হলো: [26]

তোমার প্রতিপালক তোমাকে কক্ষনো পরিত্যাগ করেননি, আর তিনি অসন্তুষ্টও নন।
— Taisirul Quran
তোমার রাব্ব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি।
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং অসন্তুষ্টও হননি।
— Rawai Al-bayan
আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেন নি [১] এবং শক্ৰতাও করেন নি।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ওহির নিয়মিত আগমন এখানে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় ছিল না; মুহাম্মদের দাবির সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেও তা যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। বার্তা না এলে অন্যেরা মন্তব্য করার সুযোগ পাচ্ছে, আর প্রত্যাবর্তিত বাণী সেই মন্তব্যের উত্তর হিসেবে নিজের পরিত্যক্ত না হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। যে অনিশ্চয়তা মানুষকে আঘাত করছে, বাণীর বিষয়বস্তু ঠিক সেই অনিশ্চয়তাকেই সম্বোধন করছে। এই ঘনিষ্ঠতা একটি মানবীয় ব্যাখ্যার পক্ষে অনুসন্ধানযোগ্য উপাদান: ব্যক্তিগত ভয় ও সামাজিক চাপ ধর্মীয় আশ্বাসের ভাষা নির্ধারণে কাজ করছে কি না। আয়াতকে আগে থেকেই ঐশী ধরে নিলে এই সম্পর্কটি আর ব্যাখ্যার বিষয় থাকে না; সেই অনুমান সরিয়ে রাখলে সম্পর্কটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।


মিসিয়াহ কমপ্লেক্সের প্রশ্ন: বিশেষ দায়িত্বের আত্মপরিচয় কীভাবে গড়ে ওঠে?

মিসিয়াহ কমপ্লেক্স বা উদ্ধারকর্তা-আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটির কেন্দ্র হলো নিজের জীবনের ওপর বিশেষ, অসাধারণ এবং অন্য মানুষের পরিত্রাণের জন্য অপরিহার্য একটি দায়িত্ব আরোপ করা। এই আত্মপরিচয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটি সর্বজনীন মিশনের সাক্ষ্যে পরিণত হয়; নিজের পরিচয়ের প্রতি আস্থা এবং অন্য মানুষের কল্যাণের ভবিষ্যৎ যেন একই দাবির ওপর নির্ভর করে। মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনুসন্ধানটি তাই কেবল তিনি কোনো অবয়ব দেখেছিলেন কি না, তাতেই শেষ হয় না। সেই অভিজ্ঞতা থেকে “আমি নির্বাচিত”, “আমার মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক হতে হবে” এবং “আমাকে অনুসরণ করলে তারা সঠিক পথ পাবে”—এই কর্তৃত্বপূর্ণ আত্মপরিচয়ে পৌঁছানোর পথটি কী ছিল, সেটিই বড় প্রশ্ন।

প্রাথমিক বর্ণনাগুলোর মধ্যে সেই পথের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। প্রথমে নিজের অবস্থা নিয়ে আতঙ্ক; পরে খাদিজার নৈতিক আশ্বাস; এরপর ধর্মগ্রন্থজ্ঞ ওয়ারাকার মাধ্যমে নবুওয়তের স্বীকৃতি; তারপর নতুন অভিজ্ঞতার প্রতীক্ষা এবং প্রতীক্ষা দীর্ঘ হলে আত্মবিশ্বাসের সংকট। ইবনে ইসহাকের নামে সংরক্ষিত ধারায় ওয়ারাকার কথায় স্থিরতা বাড়ার উল্লেখ এই সংযোগকে আরও স্পষ্ট করেছে। অন্যের বিশ্বাসযোগ্য স্বীকৃতি নিজের সম্পর্কে একটি ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে। সেই ধারণা ব্যক্তির জীবনের কেন্দ্র হয়ে গেলে তার বিপন্নতা শুধু কোনো মত পরিবর্তনের সমস্যা থাকে না; ব্যক্তি নিজের জীবনের অর্থ হারানোর আশঙ্কাও অনুভব করতে পারেন। এই সম্ভাব্য গঠনটিই মিসিয়াহ কমপ্লেক্সের প্রশ্নকে প্রাসঙ্গিক করে।


আত্মসন্দেহ থেকে সর্বজনীন আহ্বান

পরবর্তী কোরআনিক আত্মপরিচয়ে আহ্বানের পরিসর শুধু ঘনিষ্ঠ পরিবার বা একটি স্থানীয় গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নেই। সূরা আরাফের বক্তব্যে সমগ্র মানুষের উদ্দেশে নিজেকে আল্লাহর রাসূল ঘোষণা করা হয়েছে এবং অনুসরণের সঙ্গে সঠিক পথ পাওয়াকে যুক্ত করা হয়েছে। এই বক্তব্য আত্মপরিচয়ের বিস্তার দেখায়: এক ব্যক্তির অভিজ্ঞতার দাবি সকল মানুষের কর্তব্য নির্ধারণের দাবিতে পৌঁছেছে। [27]

সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৮: সম্পূর্ণ আয়াত

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
বলুন, হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহর রাসূল। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব তাঁরই। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনিই জীবন দেন ও মৃত্যু দেন। অতএব আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, উম্মি নবীর ওপর বিশ্বাস করো, যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীর ওপর বিশ্বাস করেন। তাঁকে অনুসরণ করো, যাতে তোমরা সঠিক পথ পাও।

এই কর্তৃত্বের মানবীয় নির্মাণপ্রক্রিয়া অনুসন্ধানে মূল সমস্যা হচ্ছে দাবি ও প্রমাণের ক্রম। একজন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে ঐশী মনে করছেন এবং সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে সবার বিশ্বাস ও আনুগত্য চাইছেন। কিন্তু তাঁর পরিচিতদের অনুমোদন কিংবা তাঁর নিজের দৃঢ়তা মানবসমাজের ওপর এমন সর্বজনীন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বাধীন প্রমাণ নয়। অন্য মানুষকে বাঁচানোর বিশেষ দায়িত্ব নিজের ওপর আরোপ করা এবং বাস্তবে সেই দায়িত্ব কোনো অতিপ্রাকৃত উৎস থেকে পাওয়া—দুইটির মধ্যে প্রমাণের ব্যবধান রয়েছে। দ্বিতীয়টির প্রমাণ হিসেবে প্রথমটির তীব্রতা ব্যবহার করলে আত্মবিশ্বাসই নিজের সত্যতার বিচারক হয়ে যায়।

প্রথম অভিজ্ঞতার আতঙ্ক ও পরবর্তী সর্বজনীন আহ্বান একই মুহূর্তের বয়ান নয়। আত্মপরিচয়ের বিকাশের প্রশ্নটি এই সময়গত ব্যবধানের মধ্যেই থাকে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি, ঘনিষ্ঠদের স্বীকৃতি, অনুসারীর বৃদ্ধি এবং একটি ধর্মীয় দায়িত্বের ভাষা পরস্পরকে কীভাবে শক্তিশালী করতে পারে, তা বিশ্লেষণের উপযুক্ত বিষয়। পরের আত্মপ্রত্যয়কে শুরুতেই অবিকল উপস্থিত ধরে নিলে শুরুর ভয় ও অন্যের ব্যাখ্যার প্রয়োজন অদৃশ্য হয়। আবার শুরুর ভয়কে শেষপর্যন্ত অপরিবর্তিত ধরে নিলেও আত্মপরিচয়ের বাস্তব রূপান্তর ধরা পড়ে না।


মানুষের অবিশ্বাসে নিজেকে নিঃশেষ করা: কোরআনিক ভাষা

বিশেষ দায়িত্বের আত্মপরিচয় ব্যক্তিকে অন্যের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে কতটা বেঁধে ফেলতে পারে, তার আলোচনায় সূরা শুয়ারার একটি আয়াত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের বিশ্বাস না করার কারণে নিজেকে নিঃশেষ করার ভাষা সেখানে রয়েছে। ইবনে কাসির তা উদ্বেগ ও দুঃখের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন। আয়াত এবং তাঁর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাটি নিচে দেওয়া হলো। [28]

সূরা আশ-শুআরা ২৬:৩: সম্পূর্ণ আয়াত

لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ.

বাংলা অনুবাদ:
তারা বিশ্বাস করছে না বলে আপনি সম্ভবত নিজেকেই নিঃশেষ করে ফেলবেন।

ইবনে কাসির: সূরা শুআরা ২৬:৩-এর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা

وقوله: لعلك باخع أي مهلك نفسك أي مما تحرص عليهم وتحزن عليهم ألا يكونوا مؤمنين، وهذه تسلية من الله لرسوله صلوات الله وسلامه عليه في عدم إيمان من لم يؤمن به من الكفار، كما قال تعالى: فلا تذهب نفسك عليهم حسرات، وقال تعالى: فلعلك باخع نفسك على آثارهم إن لم يؤمنوا بهذا الحديث أسفا. قال مجاهد وعكرمة والحسن وقتادة وعطية والضحاك: لعلك باخع نفسك أي قاتل نفسك. قال الشاعر: ألا أيهذا الباخع الحزن نفسه لشيء نحته عن يديه المقادر.

বাংলা অনুবাদ:
“সম্ভবত আপনি নিজেকে নিঃশেষ করবেন”—এখানে বাখি‘ অর্থ ধ্বংসকারী। অর্থাৎ তাদের নিয়ে আপনার প্রবল উদ্বেগ ও দুঃখের কারণে, যেহেতু তারা বিশ্বাস করছে না। যারা বিশ্বাস করেনি, সেই অবিশ্বাসীদের বিশ্বাস না করার বিষয়ে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূলকে সান্ত্বনা দেওয়া। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, “তাদের জন্য আক্ষেপে আপনার প্রাণ যেন শেষ হয়ে না যায়”; আরও বলা হয়েছে, “তারা এই বাণীতে বিশ্বাস না করলে তাদের পেছনে দুঃখ করে সম্ভবত আপনি নিজেকেই নিঃশেষ করবেন”। মুজাহিদ, ইকরিমা, হাসান, কাতাদা, আতিয়্যা ও দাহহাক বলেছেন, “সম্ভবত আপনি নিজেকে নিঃশেষ করবেন”—অর্থাৎ নিজেকে হত্যা করবেন। কবি বলেছেন: হে সেই ব্যক্তি, যে এমন কিছুর জন্য দুঃখে নিজেকে নিঃশেষ করছে, যা নিয়তি তার হাত থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

এখানে মানুষের বিশ্বাস না করাকে গভীর দুঃখ ও আত্মবিনাশী চাপের ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই ভাষা থেকে পাহাড়ে যাওয়ার আলাদা ঘটনাটির তারিখ বা সংখ্যা পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় অন্যের বিশ্বাসলাভ ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মধ্যে বয়ানের সম্পর্ক। একজন মানুষ নিজেকে পরিত্রাণের বিশেষ মাধ্যম মনে করলে অন্যের প্রত্যাখ্যানকে কেবল মতভেদ হিসেবে না দেখে নিজের দায়িত্বের ব্যর্থতা হিসেবে অনুভব করতে পারেন। তাঁর পরিচয়, উদ্দেশ্য ও আত্মমূল্যায়ন তখন অন্য মানুষ তাঁর দাবিকে মানছে কি না, তার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। মুহাম্মদের আত্মপরিচয় নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের জন্য এই সম্পর্কটি নির্দিষ্ট ও প্রাসঙ্গিক।


আশ্বাসের পুনরাবৃত্তি ও আত্মপরিচয়ের চক্র

পাহাড়ে যাওয়ার বর্ণনায় প্রতিবার ফিরে আসা আশ্বাসটি একই: তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসূল। বর্ণিত শান্তির উৎস তাই নিজের বিশেষ পরিচয় পুনরুদ্ধার। আবার বার্তা না এলে সেই পরিচয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই ক্রমটি একটি সম্ভাব্য আত্মপরিচয়চক্র দেখায়: অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষ পরিচয়, পরিচয় থেকে নতুন অভিজ্ঞতার প্রত্যাশা, প্রত্যাশা পূরণ না হলে সংকট, এবং সংকট থেকে একই পরিচয়ের পুনর্নিশ্চয়তা চাওয়া। এখানে নতুন প্রমাণ সংগ্রহের বদলে পুরোনো পরিচয়ের পুনরাবৃত্ত ঘোষণাই শান্তি এনে দিচ্ছে।

জিবরাইলের উপস্থিতিকে নিষ্ক্রিয় বলা মূল বর্ণনার সঙ্গে মেলে না; সেখানে আশ্বাসের সাময়িক কার্যকারিতা স্পষ্ট। বিশ্লেষণের সমস্যা হচ্ছে তার সীমিত স্থায়িত্ব। একবার আস্থা ফিরে পেলেও পরের বিরতিতে আবার তা ভেঙে পড়ছে। নিজের অভিজ্ঞতার অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার পক্ষে এই পুনরাবৃত্তিকে স্বাধীন সাক্ষ্য বানানো যায় না, কারণ প্রতিবার অভিজ্ঞতার সত্যতা নিশ্চিত করছে একই অভিজ্ঞতাপ্রবাহের আরেক অংশ। মুহাম্মদের মনে সেই নিশ্চয়তা কতটা প্রবল ছিল এবং বাইরের পর্যবেক্ষকের জন্য তা কতটা প্রমাণ বহন করে—এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক নয়।

ওয়ারাকার স্বীকৃতি, খাদিজার অনুমোদন এবং আগন্তুকের আত্মপরিচয়নিশ্চিতকরণ একই মানসিক প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মগ্রন্থজ্ঞ একটি ব্যাখ্যা দেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সেটি সমর্থন করে এবং পরবর্তী অনুভূতি সেই ব্যাখ্যার ভাষাতেই ফিরে আসে। এভাবে উদ্ধারকর্তা-আত্মপরিচয় ধীরে ধীরে দৃঢ় হয়েছিল কি না, তার অনুসন্ধান ধর্মীয় দাবির মর্যাদা রক্ষার জন্য বন্ধ করা যায় না। এই প্রশ্নের শক্তি মানুষের গোপন মনের প্রস্তুত রোগনাম ঘোষণায় নয়; বর্ণিত অভিজ্ঞতা, আশ্বাস, প্রত্যাশা ও সংকটের সম্পর্ক দেখানোর মধ্যে।


আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোকে উপসর্গ ও অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা

ধ্রুপদি বর্ণনাগুলোতে যে লক্ষণগুলো এসেছে সেগুলো আলাদা করে দেখলে আলোচনাটি বেশি নির্দিষ্ট হয়: প্রবল ভয়, কাঁপুনি, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা, অদৃশ্য উৎসের কণ্ঠ, আকাশে অবয়ব দেখা, বার্তা না পেয়ে দুঃখ এবং আত্মহননের পুনরাবৃত্ত সংকল্প। এগুলো একই ধরনের ঘটনা নয়। কিছু তাৎক্ষণিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া, কিছু অনুভূতির বিবরণ, কিছু নিজের অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা এবং কিছু পরিকল্পিত আচরণের সংবাদ। একটি মাত্র রোগের নাম দিয়ে সবগুলোকে এক করে ফেললে প্রতিটি অভিজ্ঞতার সময়, প্রকৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের অনুসন্ধান থেমে যায়।

উৎসে বর্ণিত বিষয়বিশ্লেষণের নির্দিষ্ট প্রশ্নপ্রাসঙ্গিক সূত্র
প্রথম অভিজ্ঞতার পর ভয়, কাঁপুনি ও আবৃত হতে চাওয়াঅপরিচিত অভিজ্ঞতার তাৎক্ষণিক আবেগ ও শরীরী প্রতিক্রিয়া কী ছিল?বুখারি ৩ ও ৬৯৮২
খাদিজার আশ্বাস ও ওয়ারাকার কথায় স্থিরতা বাড়াঅন্যের মূল্যায়ন নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় নির্ধারণে কতটা কাজ করেছে?বুখারি ৩; তাবারির ইবনে ইসহাক-ধারা
কণ্ঠ শোনা ও অবয়ব দেখাঅভিজ্ঞতাটি ঘুমে, জাগরণে না দুইয়ের ধারাবাহিকতায় বর্ণিত?তাবারি; বুখারি ৪৯২২ ও ৪৯২৫
ওহিবিরতিতে দুঃখ ও আত্মহননের সংকল্পপ্রত্যাশা, পরিচয়ের অনিশ্চয়তা ও সহায়ক সম্পর্কের ভূমিকা কী?যুহরির অতিরিক্ত সংবাদ; মুসান্নাফ ৯৭১৯
ঐশী পরিচয়ের পুনর্নিশ্চয়তায় সাময়িক শান্তিনিজের নির্বাচিত হওয়ার বিশ্বাসটি মানসিক স্থিতির শর্ত হয়ে উঠেছিল কি না?বুখারি ৬৯৮২-এ সংরক্ষিত অতিরিক্ত সংবাদ
মানুষের বিশ্বাস না করায় গভীর দুঃখের ভাষাবিশেষ দায়িত্বের আত্মপরিচয় ও প্রত্যাখ্যানের চাপ কীভাবে যুক্ত?সূরা শুআরা ২৬:৩ ও ইবনে কাসিরের ব্যাখ্যা

বিষণ্ণতা, আত্মহননের সংকল্প ও রোগনির্ণয়ের তথ্য

পুনরাবৃত্ত আত্মহননের সংকল্প ও গভীর দুঃখ গুরুতর মানসিক কষ্টের বর্ণনা। এগুলোকে শুধু আধ্যাত্মিক আকুলতা বলে বর্ণনা করলে কষ্টটির প্রকৃতি ও তীব্রতা আড়াল হয়। পরিচয় ও জীবনের লক্ষ্য হারানোর আশঙ্কা মানুষকে বিপন্ন করতে পারে; বারবার আশ্বাস চাওয়ার সঙ্গে সে বিপন্নতার সম্পর্কও থাকতে পারে। ওয়ারাকার মৃত্যু সহায়ক সম্পর্ক হারানোর সম্ভাবনা, আর ওহিবিরতি নির্বাচিত পরিচয়ের নিশ্চয়তা হারানোর সম্ভাবনা উত্থাপন করে। এই দুই অভিজ্ঞতা একত্র হলে গভীর হতাশা তৈরি হতে পারে—এটি অনুসন্ধানের একটি বোধগম্য মনস্তাত্ত্বিক অনুমান।

মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার নির্ধারণে নির্দিষ্ট সময় ধরে উপসর্গ থাকা, দৈনন্দিন কাজের ওপর প্রভাব, বিষণ্ণ মেজাজ বা আগ্রহ হারানো এবং অন্য কারণের মূল্যায়ন প্রয়োজন। ঐতিহাসিক বিবরণে এসবের পূর্ণ ধারাবাহিক তথ্য নেই। শুধু দুঃখ ও দর্শনের কথা পাশাপাশি পাওয়া থেকে “সাইকোটিক বিষণ্ণতা”র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তৈরি হয় না। এখানে সরাসরি সমর্থিত বিষয় হলো বর্ণিত মানসিক যন্ত্রণা, পরিচয়ের অনিশ্চয়তা ও আত্মহননের সংকল্প। এই তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিষণ্ণতার সম্ভাবনা আলোচনা করা যায়; অনুপস্থিত লক্ষণগুলো নিজের থেকে যোগ করে রোগের পূর্ণ তালিকা তৈরি করলে বিশ্লেষণ তথ্যের বদলে নির্মিত কাহিনিতে দাঁড়ায়। [29]


“নিজের জন্য আশঙ্কা”: ধ্রুপদি ব্যাখ্যার বারোটি মত

প্রথম অভিজ্ঞতার পর “আমি নিজের জন্য আশঙ্কা করছি” কথাটির অর্থ নিয়েও ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় একক সিদ্ধান্ত ছিল না। ইবনে হাজার বারোটি মত উল্লেখ করেছেন। উন্মাদনা বা গণকের অভিজ্ঞতার আশঙ্কার ব্যাখ্যাও তিনি সংরক্ষণ করেছেন, যদিও নিজে সেটি প্রত্যাখ্যান করে মৃত্যু ও অসুস্থতার আশঙ্কাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর পুরো ব্যাখ্যা থেকে ভয়টির উপস্থিতি এবং তার ব্যাখ্যা নিয়ে পরবর্তী মতভেদ—দুটিই পাওয়া যায়। [30]

ইবনে হাজার: প্রথম অভিজ্ঞতার আশঙ্কা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যামূলক অনুচ্ছেদ

قوله: لقد خشيت على نفسي، دل هذا مع قوله يرجف فؤاده على انفعال حصل له من مجيء الملك، ومن ثم قال زملوني. والخشية المذكورة اختلف العلماء في المراد بها على اثني عشر قولا: أولها الجنون وأن يكون ما رآه من جنس الكهانة، جاء مصرحا به في عدة طرق، وأبطله أبو بكر بن العربي وحق له أن يبطل، لكن حمله الإسماعيلي على أن ذلك حصل له قبل حصول العلم الضروري له أن الذي جاءه ملك وأنه من عند الله تعالى. ثانيها الهاجس، وهو باطل أيضا لأنه لا يستقر وهذا استقر وحصلت بينهما المراجعة. ثالثها الموت من شدة الرعب. رابعها المرض، وقد جزم به ابن أبي جمرة. خامسها دوام المرض. سادسها العجز عن حمل أعباء النبوة. سابعها العجز عن النظر إلى الملك من الرعب. ثامنها عدم الصبر على أذى قومه. تاسعها أن يقتلوه. عاشرها مفارقة الوطن. حادي عشرها تكذيبهم إياه. ثاني عشرها تعييرهم إياه. وأولى هذه الأقوال بالصواب وأسلمها من الارتياب الثالث واللذان بعده، وما عداها فهو معترض. والله الموفق.

বাংলা অনুবাদ:
“আমি নিজের জন্য আশঙ্কা করছি”—এই কথা এবং “তাঁর হৃদয় কাঁপছিল” বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ফেরেশতার আগমনে তাঁর মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়েছিল; এ কারণেই তিনি বলেছিলেন, আমাকে আবৃত করো। এই আশঙ্কার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলেমরা বারোটি মত দিয়েছেন। প্রথম: উন্মাদনা অথবা দেখা বিষয়টি গণকদের অভিজ্ঞতার ধরনের হওয়ার আশঙ্কা। একাধিক বর্ণনাপথে এটি স্পষ্টভাবে এসেছে। আবু বকর ইবনুল আরাবি তা বাতিল করেছেন; ইবনে হাজার বলেন, তাঁর বাতিল করা যথার্থ। তবে ইসমাইলি ব্যাখ্যা করেছেন, আগন্তুক ফেরেশতা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছেন—এ বিষয়ে অনিবার্য নিশ্চিত জ্ঞান লাভের আগে তাঁর এমন হয়েছিল। দ্বিতীয়: মনের উদিত চিন্তা; এটিও বাতিল, কারণ তা স্থায়ী হয় না, অথচ এই ঘটনা স্থায়ী হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে কথোপকথন হয়েছিল। তৃতীয়: প্রবল আতঙ্কে মৃত্যুর আশঙ্কা। চতুর্থ: অসুস্থতা; ইবনে আবি জামরা এ বিষয়ে নিশ্চিত মত দিয়েছেন। পঞ্চম: অসুস্থতা স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা। ষষ্ঠ: নবুওয়তের দায়িত্ব বহনে অক্ষমতা। সপ্তম: আতঙ্কে ফেরেশতার দিকে তাকাতে অক্ষমতা। অষ্টম: নিজের জাতির নির্যাতন সহ্য করতে না পারা। নবম: তারা তাঁকে হত্যা করবে। দশম: জন্মভূমি ছাড়তে হবে। একাদশ: তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলবে। দ্বাদশ: তারা তাঁকে উপহাস করবে। ইবনে হাজারের মতে, তৃতীয় ও তার পরের দুটি মত সবচেয়ে যথার্থ ও সংশয়মুক্ত; অন্যগুলো আপত্তিসাপেক্ষ। আল্লাহই তাওফিকদাতা।

একই আতঙ্কের বাক্যকে ঘিরে এতগুলো ব্যাখ্যা সংরক্ষিত হওয়া দেখায়, পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা ঘটনাটির অর্থ নির্ধারণে সক্রিয় ছিলেন। কারও ব্যাখ্যায় অজ্ঞাত অভিজ্ঞতা নিয়ে সংশয়, কারও ব্যাখ্যায় মৃত্যুভয়, আবার কারও ব্যাখ্যায় ভবিষ্যৎ দায়িত্ব বা সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা প্রধান হয়েছে। প্রথম বর্ণনায় ভয় পাওয়া ব্যক্তির কথার সঙ্গে এই পরবর্তী অর্থনির্ধারণ এক করে ফেললে ব্যাখ্যাকারীর সিদ্ধান্তই ঘটনার নিজের ভাষা হয়ে যায়। মুহাম্মদের নিজের অনিশ্চয়তার কথা ও পরবর্তী ধর্মীয় নিশ্চয়তার মধ্যে এই ব্যবধানটি নবুওয়তের আত্মপরিচয় গঠনের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ।


টেম্পোরাল লোব ও ধর্মীয় অভিজ্ঞতা: পারসিঙ্গারের প্রকৃত গবেষণা

স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় মাইকেল এ. পারসিঙ্গারের ১৯৮৩ সালের গবেষণাপত্রটির সঠিক নাম Religious and Mystical Experiences as Artifacts of Temporal Lobe Function: A General Hypothesis। এতে টেম্পোরাল লোবের সাময়িক স্নায়বিক ক্রিয়াকে ধর্মীয় ও মরমি অভিজ্ঞতার একটি সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে; প্রত্যাশা, স্মৃতি, পূর্বশিক্ষা ও ব্যক্তিগত সংকট অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন অনুমানও সেখানে রয়েছে। এটি ধর্মীয় অনুভূতির প্রাকৃতিক উৎস নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গবেষণাধারা। ব্যক্তির কাছে অত্যন্ত অর্থপূর্ণ মনে হওয়া কোনো অভিজ্ঞতা যে তার বহির্জাগতিক ব্যাখ্যাকেও সত্য করে না, সেই প্রশ্নে এই ধারা প্রাসঙ্গিক। [31] [32]

এই স্নায়ুবৈজ্ঞানিক অনুমানের সঙ্গে মুহাম্মদের কণ্ঠ শোনা, অবয়ব দেখা কিংবা অস্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা তুলনা করে সম্ভাব্য সাদৃশ্য অনুসন্ধান করা যায়। কিন্তু তাঁর দৃশ্যমান অভিজ্ঞতাকে “স্কিজোফ্রেনিয়ার ধ্রুপদি উদাহরণ” বা অন্য একটি রোগের নিশ্চিত লক্ষণ বলা সেই তুলনার ফল নয়। একটি অনুভূতির ধরন একাধিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় দেখা যেতে পারে। কেবল দৃশ্যের বিষয়বস্তু—যেমন ফেরেশতা বা আকাশের আসন—জেনে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না। ধর্মীয় বয়ানে অতিপ্রাকৃত কারণ ধরে নেওয়া এবং সন্দেহবাদী বয়ানে একটি নির্দিষ্ট রোগ ধরে নেওয়া, দুই ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে যে ধাপটি তা হলো কারণ নির্ধারণের প্রয়োজনীয় তথ্য।

মুহাম্মদের ওহির সময়ে ঘাম, ভারবোধ ও অন্যান্য শারীরিক অভিজ্ঞতা নিয়ে পৃথক আলোচনার বিষয় হলো একই ধরনের স্নায়বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা যাচাই। বর্তমান সংকটের বর্ণনায় সবচেয়ে স্পষ্ট উপাদান হলো অভিজ্ঞতার প্রত্যাশা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং সেই অভাবের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক। টেম্পোরাল লোবসংক্রান্ত অনুমান সম্ভাব্য প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার একটি ধারা; খাদিজা ও ওয়ারাকার ভূমিকার সামাজিক ব্যাখ্যা আরেক ধারা। শরীরী অভিজ্ঞতা ও তার ধর্মীয় ব্যাখ্যার এই পৃথক উপাদানগুলো একত্রে অনুসন্ধান করলে প্রাকৃতিক কারণের প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়।


সংস্কৃতি, প্রত্যাশা ও অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি অনুভব করা

তানিয়া মেরি লুরমান ও সহকর্মীদের ২০২১ সালের Sensing the Presence of Gods and Spirits across Cultures and Faiths গবেষণায় পাঁচ দেশের দুই হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী নিয়ে চারটি গবেষণা উপস্থাপিত হয়েছে। মানুষের মন ও বাইরের জগতের সীমানা সম্পর্কে সাংস্কৃতিক ধারণা এবং অন্তর্জগতের অভিজ্ঞতায় গভীর নিমগ্নতার সঙ্গে দেবতা বা আত্মার উপস্থিতি অনুভব করার প্রতিবেদনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সংস্কৃতি কেবল ঘটনার পরে একটি নাম বসায় না; কোন অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে এবং কোন অনুভূতি বাইরের সত্তার উপস্থিতি বলে বাস্তব মনে হবে, তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। [33]

ওয়ারাকার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের সঙ্গে এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট যোগ রয়েছে। অজানা অভিজ্ঞতাকে মুসার নামুস বলা হলে পরবর্তী অভিজ্ঞতার জন্য একটি পরিচিত ধর্মীয় প্রত্যাশা তৈরি হয়। খাদিজা একই পরিচয় অনুমোদন করলে তা নিকট সম্পর্কের সমর্থনও পায়। ব্যক্তির স্মৃতি, মনোযোগ ও নিজের অবস্থার ব্যাখ্যা তখন নতুন পরিচয়ের ভাষায় সংগঠিত হতে পারে। বাইরে থেকে একটি ধর্মীয় ধারণা পাওয়া এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে সেই ধারণার মাধ্যমে বুঝতে শেখা—এ দুটি পথেই মানবীয় জ্ঞানের প্রভাব ঘটতে পারে। পরোক্ষ বৌদ্ধিক প্রভাব এভাবেও নতুন অভিজ্ঞতার অর্থ ও প্রত্যাশার ধরন বদলে দিতে পারে।

ধর্মীয় অভিজ্ঞতার স্নায়ুমনস্তাত্ত্বিক গবেষণা নিয়ে ইসমায়েল আপুদ ও ইশ্তভান চাচেসের ২০১৯ সালের পর্যালোচনাতেও অভিজ্ঞতাকে ধর্মীয় হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। একই অনুভূতির বর্ণনা এক জায়গায় দেবতা, অন্য জায়গায় আত্মা এবং আরেক জায়গায় নিজের মনের ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যাত হতে পারে। মুহাম্মদের সূচনাকালের বর্ণনায় “এটি কী” প্রশ্নের উত্তর মানুষ কীভাবে দিয়েছে, সেই আলোচনার জন্য অভিজ্ঞতা ও তার ব্যাখ্যার এই পার্থক্য বিশেষভাবে কার্যকর। [34]


পরীক্ষা, চিকিৎসা ও কষ্টের বাস্তবতা

MRI দিয়ে মস্তিষ্কের গঠন দেখা হয় এবং EEG দিয়ে বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়। এগুলো পরীক্ষা, চিকিৎসা নয়। টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি নির্ধারণে অভিজ্ঞতার ইতিহাস, সাক্ষীর বিবরণ এবং পরীক্ষার ফল মিলিয়ে মূল্যায়ন করা হয়; একটি মাত্র অনুভূতি বা একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয় না। ফলে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির মস্তিষ্ক পরীক্ষা করলে কী পাওয়া যেত কিংবা কোন চিকিৎসায় তাঁর ধর্মীয় অভিজ্ঞতা বন্ধ হয়ে যেত—এমন প্রস্তুত ফলের দাবি তথ্য দেয় না। [35]

বর্ণিত আত্মহননের সংকল্পের সঙ্গে যুক্ত ভয় ও যন্ত্রণা মানসিক বিপন্নতার প্রশ্ন তৈরি করে। সংকটটিকে ঐশী পরীক্ষার সাফল্য হিসেবে নামকরণ করলে কারণের চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। যে কষ্টকে ধর্মীয় জীবনী মহিমান্বিত করে, তার মানবীয় কারণও অনুসন্ধানযোগ্য। বিশেষ ঐশী মর্যাদার দাবি ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে পরীক্ষার বাইরে রাখার অধিকার দেয় না। বরং সেই অভিজ্ঞতার ওপর অন্য মানুষের বিশ্বাস ও কর্তব্য নির্ধারণের দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে তার কারণ ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব আরও বাড়ে।


ওয়ারাকার প্রভাবের সন্দেহ: তথ্যগুলো একসঙ্গে কী নির্দেশ করে?

ওয়ারাকাকে নিয়ে সন্দেহটি কয়েকটি সম্পর্কের ওপর দাঁড়ায়। তিনি পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের জ্ঞানধারী; মুহাম্মদের পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের পথ ছিল; প্রথম অভিজ্ঞতার ধর্মীয় পরিচয় তিনি নির্ধারণ করেন; তাঁর কথায় উদ্বেগ কমা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ার বিবরণ আছে; এবং প্রধান একটি ধারায় তাঁর মৃত্যু ও ওহিবিরতি পাশাপাশি এসেছে। এই সবকিছুকে আলাদা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ধরে ফেললে সম্পর্কের প্রশ্ন হারিয়ে যায়। একত্রে রাখলে বৌদ্ধিক প্রভাব, অনুমোদনের ওপর নির্ভরতা এবং পরিচয় গঠনের একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া দেখা যায়। [36] [37]

সন্দেহের নির্দিষ্ট ভিত্তিসরাসরি সংরক্ষিত তথ্যযে অনুসন্ধানটি যৌক্তিকভাবে তৈরি হয়
ধর্মীয় জ্ঞানের সহজলভ্যতাওয়ারাকার ইঞ্জিলপাঠ ও লেখার পরিচয়পূর্ববর্তী ধর্মীয় ধারণা মুহাম্মদের অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যায় প্রবেশ করেছিল কি না।
পরিচয় নির্ধারণআগন্তুককে মুসার নামুস বলাঅজানা অভিজ্ঞতা একটি পূর্বপরিচিত নবুওয়তের ছকে স্থাপিত হয়েছে কি না।
মানসিক অনুমোদনওয়ারাকার কথায় উদ্বেগ কমা ও স্থিরতা বাড়ার বিবরণনিজের ঐশী পরিচয়ের আস্থা অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করেছিল কি না।
সহায়ক ব্যক্তির মৃত্যু ও বিরতিবুখারির ধারায় দুটি বিষয় পাশাপাশি উল্লেখমানসিক সহায়তা হারানো বা বৌদ্ধিক প্রভাবের পরিবর্তন বিরতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না।
আত্মপরিচয়ের পুনর্নিশ্চয়তাবারবার “তুমি আল্লাহর রাসূল” আশ্বাসে সাময়িক শান্তিবিশেষ দায়িত্বের আত্মপরিচয় মানসিক স্থিতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল কি না।
ভিন্ন কালানুক্রমইবনে ইসহাকের ধারায় ওয়ারাকার সাক্ষাতের আগেই সংকটপ্রাথমিক আতঙ্ক ও পরবর্তী পরিচয়সংকটকে পৃথক পর্যায় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় কি না।

মানবীয় প্রভাবের সন্দেহকে অগ্রাহ্য করার জন্য “ওহি আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে” বলা হলে অনুসন্ধানের বিষয়টিকেই আগাম উত্তর হিসেবে বসানো হয়। কোনো অভিজ্ঞতা ঐশী কি না, সেটিই যখন প্রশ্ন, তখন তার ঐশী পরিচয় ধরে পার্থিব প্রভাবের সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যুক্তিগতভাবে বৃত্তাকার। একইভাবে ওয়ারাকার মৃত্যু ও বিরতির সহাবস্থানকে একমাত্র নির্ণায়ক প্রমাণ বানালে তথ্যের বাইরে কার্যকারণ যোগ করা হয়। বর্ণিত সম্পর্কগুলোকে প্রশ্নের উপাদান হিসেবে ধরে তাদের সময়, প্রভাব ও বিকল্প ঘটনাক্রম পরীক্ষা করাই সন্দেহটির বাস্তব ভিত্তি প্রকাশ করে।

মিসিয়াহ কমপ্লেক্সের সম্ভাবনাও একই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট হয়। বিশেষ পরিচয়ের প্রাথমিক স্বীকৃতি, পরিচয়ের সঙ্গে জীবনের উদ্দেশ্য মিশে যাওয়া, অভিজ্ঞতা না পেলে গভীর অনিশ্চয়তা এবং নিজের পরিচয়ের পুনরাবৃত্ত আশ্বাসে শান্তি—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে মুহাম্মদের মধ্যে উদ্ধারকর্তা-আত্মপরিচয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা যায়। তাঁর বিশ্বাসের তীব্রতা সেই বিশ্বাসের অতিপ্রাকৃত সত্যতা প্রমাণ করে না; বরং বিশ্বাসটি কীভাবে তৈরি, শক্তিশালী ও সংকটাপন্ন হচ্ছিল, তার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ করে।


উপসংহার

মুহাম্মদের নবুওয়তের সূচনার বর্ণনাগুলো একটি সুসংহত, শুরু থেকেই প্রশ্নহীন আত্মবিশ্বাসের ছবি দেয় না। সেখানে রয়েছে আতঙ্কিত মানুষ, তাঁর অভিজ্ঞতার অর্থ নির্ধারণে সক্রিয় পরিবার ও ধর্মগ্রন্থজ্ঞ, স্বীকৃতির পর স্থিরতা বৃদ্ধি এবং প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা না এলে ফিরে আসা অনিশ্চয়তা। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে ওয়ারাকার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে সম্ভাব্য বৌদ্ধিক প্রভাব ও মানসিক অনুমোদনের উৎস হিসেবে সন্দেহ করার ভিত্তি রয়েছে। সেই সন্দেহকে অবৈধ করতে গোপন পাঠদানের সম্পূর্ণ দলিল দাবি করা হলে অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা ও আত্মপরিচয় গঠনে মানুষের ইতিমধ্যে বর্ণিত ভূমিকা উপেক্ষিত হয়।

আত্মহননের বিবরণগুলোও গভীর মানবিক বিপন্নতার ভাষা বহন করে। প্রথম অভিজ্ঞতায় নিজের অবস্থা নিয়ে ভয় এবং পরবর্তী বিরতিতে নিজের নির্বাচিত পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা আলাদা পর্যায় হিসেবে পাওয়া যায়। সাময়িক আশ্বাস ও পুনরাবৃত্ত সংকটের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, তা বিশেষ দায়িত্বের আত্মপরিচয় ও তার ওপর মানসিক নির্ভরতার প্রশ্ন উত্থাপন করে। মিসিয়াহ কমপ্লেক্সের সম্ভাবনা এই সম্পর্কের অনুসন্ধান হিসেবে অর্থপূর্ণ। নির্দিষ্ট রোগের প্রস্তুত নাম বসিয়ে দেওয়ার চেয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্বীকৃতি ও জীবনের উদ্দেশ্য কীভাবে একত্র হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা বেশি কার্যকর।

ওহির ঐশী উৎসের দাবি মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি ও অন্যের ব্যাখ্যার বাইরে স্বাধীন প্রমাণ চায়। নিজের অভিজ্ঞতায় নিশ্চিত হওয়া, পরিবারের সান্ত্বনা পাওয়া কিংবা ধর্মগ্রন্থজ্ঞের কাছ থেকে নবুওয়তের স্বীকৃতি পাওয়া—এসব একটি বিশ্বাস গড়ে ওঠার ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে পারে। একই উপাদানকে সেই বিশ্বাসের অতিপ্রাকৃত সত্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ বানানো যায় না। ব্যক্তিগত সংকটের উত্তর হিসেবে যে বাণী ফিরে আসে এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের আশ্বাস দিয়ে যে অভিজ্ঞতা স্থিরতা আনে, তার মানবীয় উৎস ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ অনুসন্ধানের প্রশ্ন তাই বহাল থাকে। ধর্মীয় মর্যাদা সেই প্রশ্নের উত্তর নয়।



তথ্যসূত্রঃ
  1. সহিহ বুখারি ৩: ওয়ারাকার পরিচয় ও সাক্ষাৎ ↩︎
  2. সহিহ বুখারি ৩ 1 2
  3. সহিহ বুখারি ৬৯৮২ ↩︎
  4. তাবারি, দ্বিতীয় খণ্ড, অনলাইন সংস্করণ পৃষ্ঠা ৫০ ↩︎
  5. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ইবনে ইসহাকের নামে খাদিজার পরীক্ষার বিবরণ ↩︎
  6. খাদিজার পরীক্ষার সূত্র ও সমান্তরাল পাঠ ↩︎
  7. সহিহ বুখারি ৬৯৮২: মূল আরবি ও ইংরেজি পাঠ ↩︎
  8. সহিহ বুখারি, তাওহীদ প্রকাশনীর বাংলা পাঠ ↩︎
  9. সহজ নসরুল বারী, শরহে সহিহ বুখারি, দ্বাদশ খণ্ড, মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৯৭–২৯৮ ↩︎
  10. ফাতহুল বারি: বুখারি ৬৯৮২-এর বর্ণনাপথের আলোচনা ↩︎
  11. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, ৯৭১৯, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২১; মূল পাঠ ↩︎
  12. তাবারি: ইবনে ইসহাকের নামে প্রথম অভিজ্ঞতার বর্ণনা, পৃষ্ঠা ৪৮ ↩︎
  13. একই বর্ণনার ধারাবাহিকতা, পৃষ্ঠা ৪৯ ↩︎
  14. তাবারি, দ্বিতীয় খণ্ড, অনলাইন সংস্করণ পৃষ্ঠা ৪৯ ↩︎
  15. সুবুলুল হুদা ওয়াল রাশাদ: বিরতির মেয়াদ ও পাঠসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
  16. সুবুলুল হুদা: ওহিবিরতির অর্থ নিয়ে উদ্ধৃতি ও আপত্তি ↩︎
  17. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/১২৯ থেকে ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদ ↩︎
  18. ইসলামওয়েবে একই সূত্রের উদ্ধৃতি ↩︎
  19. সহিহ বুখারি ৪৯২২ ↩︎
  20. সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৬৪; আন্তর্জাতিক নম্বর ৪৯২৫ ↩︎
  21. সহিহ বুখারি ৪৯২৫: মূল আরবি পাঠ ↩︎
  22. সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:১ ↩︎
  23. সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:২ ↩︎
  24. সহিহ বুখারি ৪৯৫০ ↩︎
  25. সহিহ বুখারি ৪৯৫১ ↩︎
  26. সূরা আদ-দুহা ৯৩:৩ ↩︎
  27. সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৮: মূল পাঠ ↩︎
  28. সূরা আশ-শুআরা ২৬:৩ ও ইবনে কাসিরের ব্যাখ্যা ↩︎
  29. যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ: বিষণ্ণতার লক্ষণ ও রোগনির্ণয় ↩︎
  30. ফাতহুল বারি: “লাকাদ খাশিতু আলা নাফসি”-র পূর্ণ ব্যাখ্যা ↩︎
  31. মাইকেল এ. পারসিঙ্গার, ১৯৮৩, Perceptual and Motor Skills 57:1255–1262; মূল গবেষণাপত্র ↩︎
  32. প্রকাশনার পরিচয় ও DOI ↩︎
  33. লুরমান ও সহকর্মী, ২০২১, PNAS 118(5):e2016649118; মূল গবেষণা ↩︎
  34. আপুদ ও চাচেস, ২০১৯, The Neuropsychology of Religious Experience, Studies in Psychology 40(2):338–362; প্রকাশকের সারসংক্ষেপ ও গ্রন্থপরিচয় ↩︎
  35. এপিলেপসি ফাউন্ডেশন: টেম্পোরাল লোব এপিলেপসির রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা ↩︎
  36. ওয়ারাকার সাক্ষাৎ ও মৃত্যু: বুখারি ৩ ↩︎
  37. তাঁর কথায় স্থিরতা বৃদ্ধি: তাবারি ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

One thought on

  1. বায়পোলার ডিজ অর্ডার বা পাগল বা উন্মাদ। এরা খুন করেও যা খুশি করতে পারে। এই অন্ধ ব্যক্তির নামে মিথ্যা কথা বসিয়ে মানবসভ্যতার বিপন্নতা। সব সম্প্রদায়ের সমস্যা আছে। বিশ্বের আতঙ্কের নাম ইসলাম। গণহিস্টেরিয়া ও হিংস্র ও সন্ত্রাসীতে পরিণত করেছে নিজৈদের।

Leave a comment

Your email will not be published.