জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

নবী মুহাম্মদের পেশা: হিজরত উত্তর পেশা ছিল ডাকাতি

প্রকাশিত: মার্চ 23, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন46 মিনিট পড়া

ভূমিকা: মুহাম্মদের জীবিকা, সম্পদ ও সামরিক অর্থনীতির প্রশ্ন

মুহাম্মদের অর্থনৈতিক জীবনের প্রশ্নটি শুধু তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন কাজ করতেন, সেই তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মক্কায় তার উপার্জনের উৎস ছিল কী, খাদিজার ব্যবসায় তিনি কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, মদিনায় গিয়ে তার পরিবারের ব্যয় কীভাবে নির্বাহ হতো এবং যুদ্ধের মাধ্যমে অধিগৃহীত সম্পদের ওপর তার কর্তৃত্ব কতটা ছিল—এই প্রশ্নগুলো একই ইতিহাসের অংশ। একজন ধর্মপ্রচারক যখন সামরিক অভিযানের নির্দেশদাতা, সম্পদ বণ্টনকারী এবং রাজনৈতিক শাসকে পরিণত হন, তখন তার অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনও সেই ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়। মদিনা-পর্বের কোরআন, হাদিস, সীরাত ও মাগাযি-সাহিত্যে গণিমত, ফাই, খুমুস, বন্দি মানুষ, অস্ত্র, গবাদিপশু, জমি, খেজুরবাগান এবং বন্দিদের মুক্তিপণের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা সেই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য।

কোরআনের একদিকে মুহাম্মদের মুখ দিয়ে ধর্মীয় বার্তা প্রচারের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক দাবি না করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যুদ্ধ ছাড়া অধিগৃহীত সম্পদের ওপর তার কর্তৃত্ব, খুমুসের বিধান এবং বণ্টনের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে। এই দুই ধরনের বক্তব্যের মধ্যকার বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য প্রথমে মক্কার উপার্জন ও পারিবারিক পরিস্থিতি, তারপর মদিনার সম্পদ অধিগ্রহণ ও বণ্টনব্যবস্থা, এরপর পৃথক যুদ্ধ ও অভিযানের পরিমাণগত তথ্য পাশাপাশি বিবেচনা করতে হয়। বদর থেকে হুনাইন পর্যন্ত কয়েকটি অভিযানের হিসাবই দেখায়, সামরিক বিজয় কীভাবে বিপুল পশুসম্পদ, নগদ সম্পদ, জমি, অস্ত্র এবং বন্দি মানুষের ওপর নতুন কর্তৃত্ব তৈরি করেছিল।

একজন রাখাল, কৃষক, বণিক বা কারিগরের জীবিকার ভিত্তি সাধারণত তার শ্রম, পণ্য কিংবা সেবার বিনিময়। মুহাম্মদের জীবনে মক্কা-পর্বের রাখালি ও খাদিজার বাণিজ্যে অংশগ্রহণের বর্ণনা পাওয়া গেলেও মদিনা-পর্বের সম্পদপ্রবাহের বড় এবং সুস্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ অংশ এসেছে সামরিক অভিযান, বাণিজ্য কাফেলা দখল, শত্রুপক্ষের পশু ও অস্ত্র অধিগ্রহণ এবং পরাজিত জনগোষ্ঠীর ভূমি ও সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব থেকে। বহু বিবাহ, বৃহৎ পরিবার, গৃহপরিচারক-দাসদাসী, সামরিক বাহিনী এবং প্রশাসনিক অনুসারীদের ব্যয় নির্বাহের পেছনে এই প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের ভূমিকা ছিল। কোরআনে নির্ধারিত এক-পঞ্চমাংশ এবং ফাইয়ের ওপর বিশেষ অধিকার ওই সম্পদপ্রবাহকে ব্যক্তিগত দান-অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। ফলে মুহাম্মদের জীবিকা বিশ্লেষণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের হিসাব বাদ দিলে মদিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎসগুলোর একটি আড়াল হয়ে যায়।


হিজরতের আগে: রাখালি, বাণিজ্য এবং খাদিজার সম্পদ

মুহাম্মদের মক্কা-জীবনে মজুরির বিনিময়ে পশু চরানোর সরাসরি উল্লেখ রয়েছে। বুখারীর বর্ণনায় তিনি বলেছেন, মক্কার লোকদের ছাগল-ভেড়া চরিয়ে তিনি কয়েক কিরাত গ্রহণ করতেন। এটি তার শ্রমভিত্তিক আয় সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিবরণ; একই সঙ্গে বোঝায়, অন্তত জীবনের একটি পর্যায়ে তাকে অন্যের পশু দেখাশোনার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করতে হতো। [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৭/ ইজারা
পরিচ্ছেদঃ ৩৭/২. কয়েক কিরাআতের বদলে ছাগল-ভেড়া চরানো।
২২৬২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি, যিনি বকরী না চরিয়েছেন। তখন তাঁর সাহাবীগণ বলেন, আপনিও? তিনি বলেন, হ্যাঁ; আমি কয়েক কীরাতের (মুদ্রা) বিনিময়ে মক্কা্বাসীদের ছাগল চরাতাম। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১০২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২১১৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

খাদিজার সঙ্গে বিবাহের আগে মুহাম্মদের বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনা এবং খাদিজার ব্যবসার কাজে অংশগ্রহণের বিবরণ সীরাত-সাহিত্যে পাওয়া যায়। খাদিজা ছিলেন অর্থসম্পদ ও ব্যবসায়িক যোগাযোগসম্পন্ন নারী; তার সঙ্গে বিবাহের পর মুহাম্মদের ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাওয়ার ভিত্তি তৈরি হয়। কোরআনের সূরা দোহা ৯৩:৮ আয়াতে মুহাম্মদের অভাবগ্রস্ত অবস্থার পর অভাবমুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আয়াতটি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক বা সম্পত্তির তালিকা দেয় না, কিন্তু প্রাথমিক আর্থিক অভাবের বর্ণনার সঙ্গে খাদিজার সম্পদনির্ভর পরবর্তী অবস্থার মিল রয়েছে। [2]

তিনি তোমাকে পেলেন নিঃস্ব, অতঃপর করলেন অভাবমুক্ত।
— Taisirul Quran
তিনি তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাবমুক্ত করলেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব। অতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন।
— Rawai Al-bayan
আর তিনি আপনাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাব মুক্ত করলেন [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


খাদিজার পুঁজিতে বাণিজ্য: নিয়োগ, পারিশ্রমিক ও ব্যবসায়িক দায়িত্ব

খাদিজার ব্যবসায় মুহাম্মদের অংশগ্রহণের বিবরণে পুঁজির মালিক এবং ব্যবসা পরিচালনাকারীর ভূমিকা পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়েছে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুসারে খাদিজা নিজের অর্থে ব্যবসা করার জন্য লোক নিয়োগ করতেন এবং তাদের সঙ্গে মুদারাবা বা লাভের অংশভিত্তিক চুক্তিও করতেন। মুহাম্মদকে তিনি নিজের পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং অন্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলেন। মুহাম্মদ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন; খাদিজার দাস মাইসারাও তার সঙ্গে যায়। অর্থাৎ এই বিবরণে বাণিজ্যের পুঁজি খাদিজার, আর মুহাম্মদের ভূমিকা সেই পুঁজিতে বাণিজ্য পরিচালনা করা। চুক্তির সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বা লাভের শতকরা হার এখানে দেওয়া হয়নি। [3] [4] [5]

قال ابن إسحاق: وكانت خديجة بنت خويلد امرأة تاجرة ذات شرف ومال. تستأجر الرجال في مالها وتضاربهم إياه، بشيء تجعله لهم، وكانت قريش قوما تجارا؛ فلما بلغها عن رسول الله صلى الله عليه وسلم ما بلغها، من صدق حديثه، وعظم أمانته، وكرم أخلاقه، بعثت إليه فعرضت عليه أن يخرج في مال لها إلى الشام تاجرا، وتعطيه أفضل ما كانت تعطي غيره من التجار، مع غلام لها يقال له ميسرة، فقبله رسول الله صلى الله عليه وسلم منها، وخرج في مالها ذلك، وخرج معه غلامها ميسرة حتى قدم الشام.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে ইসহাক বলেন: খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন মর্যাদা ও সম্পদের অধিকারী একজন ব্যবসায়ী নারী। তিনি নিজের অর্থে ব্যবসা করার জন্য পুরুষদের নিয়োগ করতেন এবং তাদের জন্য নির্ধারিত কোনো অংশের বিনিময়ে নিজের পুঁজি দিয়ে মুদারাবা করতেন। কুরাইশরা ছিল ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। রাসুলুল্লাহর সত্যবাদিতা, গভীর বিশ্বস্ততা ও উত্তম চরিত্রের কথা তার কাছে পৌঁছালে তিনি তার কাছে লোক পাঠান। তিনি প্রস্তাব দেন, রাসুলুল্লাহ যেন তার কিছু সম্পদ নিয়ে ব্যবসায়ী হিসেবে সিরিয়ায় যান; বিনিময়ে তিনি অন্য ব্যবসায়ীদের যা দিতেন, তার চেয়ে বেশি তাকে দেবেন। তার সঙ্গে যাবে মাইসারা নামের তার এক দাস। রাসুলুল্লাহ তার এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তার সেই সম্পদ নিয়ে রওনা হন। খাদিজার দাস মাইসারাও তার সঙ্গে বের হয়; এভাবে তারা সিরিয়ায় পৌঁছায়।

মক্কায় মুহাম্মদের উপার্জনের যে দুটো বাস্তব ভিত্তি চিহ্নিত করা যায়, সেগুলো হলো ব্যক্তিগত শ্রমের মজুরি এবং অন্যের ব্যবসায় কাজ করার মাধ্যমে অর্জিত অর্থনৈতিক সুযোগ। খাদিজার সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানও তার জীবনের এই অংশে গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরবর্তী মদিনা-পর্বে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সম্পদপ্রবাহ: সেখানে আর কয়েক কিরাত রাখালি-মজুরির প্রশ্ন নয়, একেকটি অভিযানে শত শত কিংবা হাজার হাজার উট, হাজার হাজার ভেড়া-ছাগল, রৌপ্য, অস্ত্র, জমি এবং বন্দি মানুষ অধিগৃহীত হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। এই অর্থনৈতিক পার্থক্যই মুহাম্মদের নেতৃত্বের সামাজিক রূপান্তরকে পরিমাপযোগ্য করে তোলে।

মুহাম্মদের জীবিকার প্রাথমিক পর্যায়ে রাখাল ও বাণিজ্যকর্মীর পরিচয় সুস্পষ্ট। খাদিজার ব্যবসায় কাজ করা এবং তাকে বিবাহ করা তার আর্থিক অবস্থান বদলে দেয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব অর্জনের পর সম্পদ অর্জনের নিয়ম, উৎস এবং পরিমাণ আবার আমূল পরিবর্তিত হয়। মক্কার শ্রমভিত্তিক আয় দিয়ে মদিনায় অর্জিত শত শত বা হাজার হাজার পশু, বাণিজ্য কাফেলার বিপুল সম্পদ কিংবা ভূসম্পত্তির অধিকার ব্যাখ্যা করা যায় না; মদিনার ওই সম্পদের উৎস ছিল সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা।

কোরআন ৬:৯০-এ মুহাম্মদকে বলতে বলা হয়েছে, তিনি ধর্মীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে কারও কাছে পারিশ্রমিক চান না। এই ঘোষণা মক্কা-পর্বের ধর্মপ্রচারের নৈতিক দাবির অংশ। অথচ মদিনায় রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এবং তার এক-পঞ্চমাংশের বিধান আসে; একই সঙ্গে যুদ্ধ ছাড়াই অধিগৃহীত সম্পদের ওপর বিশেষ অধিকার তৈরি হয়। এই দুটি বিধান পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মপ্রচারের কোনো মজুরি দাবি না করেও ধর্মীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতানির্ভর সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছিল। [6]

ওরা হল তারা যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেছিলেন, তুমি তাদের পথ অনুসরণ কর; বল, এর জন্য (অর্থাৎ বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য) আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। এটা সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য উপদেশ বাণী।
— Taisirul Quran
এরা হচ্ছে ওরাই, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন। সুতরাং তুমি তাদের পথ অনুসরণ করে চল। তুমি বলে দাওঃ আমি কুরআন ও দীনের তাবলীগের বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাইনা। এই কুরআন সমগ্র জগতবাসীর জন্য উপদেশের ভান্ডার ছাড়া কিছুই নয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত করেছেন। অতএব তাদের হিদায়াত তুমি অনুসরণ কর। বল, ‘আমি তোমাদের কাছে এর উপর কোন বিনিময় চাই না। এটা তো সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশমাত্র।
— Rawai Al-bayan
এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ্‌ হিদায়াত করেছেন, কাজেই আপনি তাদের পথের অনুসরণ করুন [১]। বলুন, ‘এর জন্য আমি তোমাদের কাছে পারিশ্রমিক চাই না, এ তো শুধু সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশ [২]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


হিজরতের পরে: সামরিক অভিযান, গণিমত ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিস্তার

হিজরতের পর মুহাম্মদের ভূমিকা বদলে যায়। মদিনায় তিনি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন, বাহিনী পাঠান, যুদ্ধের পরে সম্পদ সংগ্রহের নির্দেশ দেন, বন্দিদের মুক্তিপণ বা বণ্টন নির্ধারণ করেন এবং পরাজিত সম্প্রদায়ের জমি ও কৃষিসম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। সূরা আনফাল ৮:১-এ যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে আল্লাহ ও রাসুলের অধীন ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে গণিমত নিয়ে যোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধের নিষ্পত্তি এবং সম্পদ বণ্টনের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়। [7]

তারা তোমাকে যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের; কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর নিজেদের সম্পর্ককে সুষ্ঠু সুন্দর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কর। তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর।’
— Taisirul Quran
হে নাবী! লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তুমি বলঃ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। অতএব তোমরা এ ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সঠিক রূপে গড়ে নাও, আর যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
লোকেরা তোমাকে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বল, গনীমতের মাল আল্লাহ ও রাসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।
— Rawai Al-bayan
লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে [১] আনফাল [২] (যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ) সম্বদ্ধে। বলুন, ‘যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ্‌ এবং রাসূলের [৩]; সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর আর আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এরপর সূরা আনফাল ৮:৪১-এ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, রাসুল, তার আত্মীয়স্বজন এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ফল বণ্টনের একটি নিয়মও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিধানের অধীনে খুমুসের সম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যয়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে থাকে। নবীর ব্যক্তিগত পরিবারের ব্যয়, সামরিক ব্যয় এবং অন্য খাতে বণ্টনের বিবরণগুলো এই প্রতিষ্ঠিত সম্পদব্যবস্থার বিভিন্ন ব্যবহার প্রকাশ করে। [8]

তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসূল, রসূলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য যদি তোমরা আল্লাহর উপর আর চূড়ান্ত ফায়সালার দিন অর্থাৎ দু’পক্ষের (মুসলমান ও কাফের বাহিনীর) মিলিত হওয়ার দিন আমি যা আমার বান্দাহর উপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার উপর বিশ্বাস করে থাক। আর আল্লাহ হলেন সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আর তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে তোমরা যা কিছু গাণীমাতের মাল লাভ করেছ ওর এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল, (রাসূলের) নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মূসাফিরের জন্য – যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং যা আমি অবতীর্ণ করেছি আমার বান্দার উপর সেই চুড়ান্ত ফাইসালার দিন, যেদিন দু‘দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা জেনে রাখ, তোমরা যা কিছু গনীমতরূপে পেয়েছ, নিশ্চয় আল্লাহর জন্যই তার এক পঞ্চমাংশ ও রাসূলের জন্য, নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরের জন্য, যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং হক ও বাতিলের ফয়সালার দিন আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন* দু’টি দল মুখোমুখি হয়েছে, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। * অর্থাৎ বদর যুদ্ধের দিন।
— Rawai Al-bayan
আর জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চামাংশ আল্লাহ্‌র [১], রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং সফরকারীদের [২] যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহ্‌তে এবং তাতে যা মীমাংসার দিন আমরা আমাদের বান্দার প্রতি নাযিল করেছিলাম [৩], যে দিন দু দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর আল্লাহ্‌ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

মুহাম্মদের নামে প্রচলিত একটি হাদিসে সরাসরি বলা হয়েছে, তার জীবিকা রাখা হয়েছে বর্শার ছায়াতলে। একই বক্তব্যে তরবারিসহ প্রেরণ এবং তার আদেশের বিরোধীদের জন্য অপমানের কথা রয়েছে। এই বর্ণনার সামাজিক অর্থ সুস্পষ্ট: সামরিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং অর্থনৈতিক প্রাপ্তিকে একই ধারণাগত কাঠামোয় স্থাপন করা হয়েছে। যুদ্ধের মাধ্যমে সম্পদ আহরণের হিসাবও এই বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। [9]

হাদীস সম্ভার
২০/ (আল্লাহর পথে) জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ জিহাদ ওয়াজেব এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যার মাহাত্ম্য
(১৯০০) ইবনে উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি (কিয়ামতের পূর্বে) তরবারি-সহ প্রেরিত হয়েছি, যাতে শরীকবিহীনভাবে আল্লাহর ইবাদত হয়। আমার জীবিকা রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে। অপমান ও লাঞ্ছনা রাখা হয়েছে আমার আদেশের বিরোধীদের জন্য। আর যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত।
(আহমাদ ৫১১৪-৫১১৫, ৫৬৬৭, শুআবুল ঈমান ৯৮, সহীহুল জামে’ ২৮৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)


বর্শার ছায়ায় জীবিকা: ইবনে হাজরের ব্যাখ্যায় গণিমত ও জিজিয়া

“আমার জীবিকা রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে”—বক্তব্যটির সঙ্গে গণিমতের সম্পর্ক ইবনে হাজর সরাসরি ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষ্যে মুহাম্মদের জীবিকা গণিমতের মধ্যে রাখা হয়েছে, অন্য উপার্জনের মধ্যে নয়; আর আদেশের বিরোধীদের ওপর “সাগার” বা অধীনতার অর্থ তিনি জিজিয়া প্রদান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। একই আলোচনায় বর্শার ছায়ায় জীবিকা এবং তরবারির ছায়ায় জান্নাতের বক্তব্যের ব্যাখ্যাও পাশাপাশি এসেছে। এখানে সামরিক বিজয় থেকে সম্পদপ্রাপ্তি, পরাজিত পক্ষের আর্থিক অধীনতা এবং যুদ্ধে মৃত্যুর ধর্মীয় পুরস্কার একই ভাষ্যগত কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে। IslamQA মুহাম্মদের জীবিকার বিষয়ে ১২৮১২১ নম্বর উত্তরে এই আলোচনার গণিমত-সংক্রান্ত অংশ উদ্ধৃত করেছে; বিস্তৃত ব্যাখ্যাটি মূল ফাতহুল বারি-তে রয়েছে। [10] [11]

وفي الإسناد عبد الرحمن بن ثابت بن ثوبان مختلف في توثيقه، وله شاهد مرسل بإسناد حسن أخرجه ابن أبي شيبة من طريق الأوزاعي عن سعيد بن جبلة عن النبي صلى الله عليه وسلم بتمامه، وفي الحديث إشارة إلى فضل الرمح، وإلى حل الغنائم لهذه الأمة، وإلى أن رزق النبي صلى الله عليه وسلم جعل فيها لا في غيرها من المكاسب، ولهذا قال بعض العلماء إنها أفضل المكاسب، والمراد بالصغار وهو بفتح المهملة وبالمعجمة بذل الجزية، وفي قوله: تحت ظل رمحي إشارة إلى أن ظله ممدود إلى أبد الآباد، والحكمة في الاقتصار على ذكر الرمح دون غيره من آلات الحرب كالسيف أن عادتهم جرت بجعل الرايات في أطراف الرمح، فلما كان ظل الرمح أسبغ كان نسبة الرزق إليه أليق. وقد تعرض في الحديث الآخر لظل السيف كما سيأتي قريبا من قوله صلى الله عليه وسلم الجنة تحت ظلال السيوف فنسب الرزق إلى ظل الرمح لما ذكرته أن المقصود بذكر الرمح الراية، ونسبت الجنة إلى ظل السيف لأن الشهادة تقع به غالبا ولأن ظل السيف يكثر ظهوره بكثرة حركة السيف في يد المقاتل؛ ولأن ظل السيف لا يظهر إلا بعد الضرب به لأنه قبل ذلك يكون مغمودا معلقا.

বাংলা অনুবাদ: এই সনদে আবদুর রহমান ইবনে সাবিত ইবনে সাওবান রয়েছেন; তাকে নির্ভরযোগ্য গণ্য করা নিয়ে মতভেদ আছে। এর একটি সমর্থক মুরসাল বর্ণনাও রয়েছে, যার সনদ হাসান; ইবনে আবি শাইবা আওযায়ি থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে জাবালা থেকে, তিনি নবীর সূত্রে পূর্ণ বর্ণনাটি সংকলন করেছেন। এই হাদিসে বর্শার মর্যাদার প্রতি, এই উম্মতের জন্য গণিমত বৈধ হওয়ার প্রতি এবং নবীর জীবিকা গণিমতের মধ্যেই রাখা হয়েছে, অন্য উপার্জনের মধ্যে নয়—এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। এ কারণেই কিছু আলেম বলেছেন, এটি উপার্জনের সর্বোত্তম পন্থা। “সাগার”—যার প্রথম অক্ষরে যবর এবং পরের অক্ষরটি বিন্দুযুক্ত—দিয়ে জিজিয়া প্রদান বোঝানো হয়েছে। “আমার বর্শার ছায়াতলে” কথাটিতে তার ছায়া অনন্তকাল প্রসারিত থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। তরবারির মতো যুদ্ধের অন্য অস্ত্র বাদ দিয়ে শুধু বর্শার উল্লেখ করার কারণ হলো, তাদের রীতি ছিল বর্শার অগ্রভাগে পতাকা স্থাপন করা। বর্শার ছায়া অধিক বিস্তৃত হওয়ায় জীবিকাকে তার সঙ্গে সম্পর্কিত করা অধিক সংগত। অন্য হাদিসে তরবারির ছায়ার উল্লেখও এসেছে, যেমন অল্প পরেই তার “জান্নাত তরবারিসমূহের ছায়াতলে” বক্তব্য আসবে। আমি যে কারণ উল্লেখ করেছি—বর্শার উল্লেখ দিয়ে পতাকা বোঝানো হয়েছে—সে কারণেই জীবিকাকে বর্শার ছায়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আর জান্নাতকে তরবারির ছায়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, কারণ সাধারণত এর আঘাতেই শাহাদাত ঘটে; যোদ্ধার হাতে তরবারির বেশি নড়াচড়ার ফলে তার ছায়াও বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া তরবারি দিয়ে আঘাত করার পরই তার ছায়া প্রকাশ পায়; তার আগে তা খাপে ঢোকানো ও ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।

সহিহ বুখারীতে সংরক্ষিত “জান্নাত তরবারির ছায়াতলে” বক্তব্যটি সামরিক লড়াইকে পরকালীন পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে যুদ্ধ পরিচালনার ব্যবস্থায় একসঙ্গে দুটি প্রণোদনা বিদ্যমান: একদিকে ধর্মীয় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে যুদ্ধের পরে মালে গনিমত হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদ ও বন্দিদের বণ্টন। মাগাযি-বর্ণনায় অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের প্রাপ্য অংশ এবং নেতার খুমুস নির্ধারণের নিয়ম এই দুটি প্রণোদনার বাস্তব আর্থিক কাঠামো দেখায়। [12]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছদঃ ৫৬/২২. জান্নাত হল তলোয়ারের ঝলকানির তলে।
মুগীরাহ ইবনু শু‘বা (রাঃ) বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জানিয়েছেন, আমাদের ও প্রতিপালকের পয়গাম। আমাদের মধ্যে যে শহীদ হলো সে জান্নাতে পৌঁছে গেল।
‘উমার (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলেন, আমাদের শহীদগণ জান্নাতবাসী আর তাদের নিহতরা কি জাহান্নামবাসী নয়? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হ্যাঁ।
২৮১৮. ‘উমার ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ্ (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূন নাযর (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) তাঁকে লিখেছিলেন যে,আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা জেনে রাখ, তরবারির ছায়া-তলেই জান্নাত।
উয়াইসী (রহ.) ইবনু আবূ যিনাদ (রহ.)-এর মাধ্যমে মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রহ.) থেকে হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে মু‘আবিয়াহ ইবনু ‘আমর (রহ.) আবূ ইসহাক (রহ.)-এর মাধ্যমে মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসের অনুসরণ করেছেন। (২৮৩৩, ২৯৬৬, ৩০২৪, ৭২৩৭) (মুসলিম ৩২/৬ হাঃ ১৭৪২, আহমাদ ১৯১৩৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৬০৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৬২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আনফাল শব্দটির অর্থ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা লুটের মাল; সূরাটির শুরুতেই যুদ্ধের গণিমতের ওপর কর্তৃত্বের প্রশ্ন এসেছে। বুখারীর খুমুস অধ্যায়ে মুহাম্মদের “আমি তো বণ্টনকারী” বক্তব্য অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের এই বাস্তব রূপটি প্রকাশ করে। যুদ্ধে প্রাপ্ত মালামাল সংগ্রহ, এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করা এবং অবশিষ্ট সম্পদ নির্দিষ্ট অংশ অনুযায়ী ভাগ করা ছিল কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক-সামরিক প্রশাসনের একটি প্রধান কাজ। [13]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৭/ খুমুস (এক পঞ্চমাংশ)
পরিচ্ছেদঃ ৫৭/৭. আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘নিশ্চয় এক পঞ্চমাংশ আল্লাহর ও রসূলের’’ (আনফাল ৪১)। তা বণ্টনের অধিকার রসূলেরই। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি বণ্টনকারী ও সংরক্ষণকারী আর আল্লাহ তা‘আলাই প্রদান করেন।
৩১১৭. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি তোমাদের দানও করি না এবং তোমাদের বঞ্চিতও করি না। আমি তো মাত্র বণ্টনকারী, যেভাবে নির্দেশিত হই, সেভাবে ব্যয় করি।’ (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৮৯৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

গণিমতের পাশাপাশি ফাই ছিল সম্পদ অধিগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। সূরা হাশর ৫৯:৬–৭ অনুসারে যে সম্পদ অধিগ্রহণ করতে মুসলমানদের ঘোড়া বা উটে চড়ে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করতে হয়নি, সেটিও মুহাম্মদের কর্তৃত্বে আসে। বনু নাদিরের জমি ও খেজুরবাগান এবং ফদকের সঙ্গে সম্পত্তি-সমঝোতার ঘটনাগুলো এই পদ্ধতির উদাহরণ। যুদ্ধ ছাড়াই অর্জিত হলেও এসব সম্পদ সামরিক শক্তির ভয়, অবরোধ, রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ এবং জমির অধিকার হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। [14]

আল্লাহ তাঁর রসূলকে তাদের কাছ থেকে যে ফায় (বিনা যুদ্ধে পাওয়া সম্পদ) দিয়েছেন তার জন্য তোমরা ঘোড়াও দৌড়াওনি, আর উটেও চড়নি, বরং আল্লাহ তাঁর রসূলগণকে যার উপর ইচ্ছে আধিপত্য দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে যে ‘ফাই’ তাঁর রাসূলকে দিয়েছেন, উহার জন্য তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি; আল্লাহতো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদের কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ ইয়াহুদীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায়* হিসেবে যা দিয়েছেন তোমরা তার জন্য কোন ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে অভিযান পরিচালনা করনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যাদের ওপর ইচ্ছা কতৃত্ব প্রদান করেন। আল্লাহ সকল কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। *যুদ্ধ ছাড়াই যে ধন-সম্পদ অর্জিত হয় তাকে في বলে। এটি সাধারণত বায়তুল মালে জমা রাখা হয় এবং রাসূল স্বীয় তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতেন। আর যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জিত হয় তাকে গনিমত غنيمت বলা হয়।
— Rawai Al-bayan
আর আল্লাহ ইয়াহুদীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যে “ফায়” দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি [১]; বরং আল্লাহ যার উপর ইচ্ছে তাঁর রাসূলগণকে কর্তৃত্ব দান করেন; আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

যে ধন-সম্পদ আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে নিয়ে তাঁর রসূলকে দিলেন তা আল্লাহর জন্য তাঁর রসূলের জন্য আর রসূলের আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও পথিকদের জন্য যাতে তা তোমাদের মধ্যকার সম্পদশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যাত্থেকে নিষেধ করে তাত্থেকে বিরত থাক, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।
— Taisirul Quran
আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূলকে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, তাঁর রাসূলের, রাসূলের স্বজনগণের এবং ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। অতএব রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায় হিসেবে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসূলের, আত্মীয়-স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও মুসাফিরদের এটি এ জন্য যে, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে। রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।
— Rawai Al-bayan
আল্লাহ্‌ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে ‘ফায়’ হিসেবে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহ্‌র, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও পথচারীদের [১], যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ কর তা থেকে বিরত থাক [২] এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্‌ শাস্তি দানে কঠোর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


মুহাম্মদের সামরিক অভিযানে গণিমত: যুদ্ধভিত্তিক পরিসংখ্যান ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ

মদিনা-পর্বের একাধিক সামরিক অভিযানে কত পশু, রৌপ্য, অস্ত্র ও জমি অধিগৃহীত হয়েছিল, তার বিস্তারিত তথ্য ইবনে সাদ, ওয়াকিদি, ইবনে সাইয়্যিদিন্নাস, হালাবি, সালিহি এবং হাদিস-সংকলনে পাওয়া যায়। প্রতিটি যুদ্ধের আর্থিক ফল এক রকম ছিল না। কোথাও কাফেলার নগদ-বাণিজ্যিক সম্পদ, কোথাও হাজার হাজার পশু, কোথাও সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাঙার পরে সম্পত্তি ও বন্দি, আবার কোথাও জমি ও খেজুরবাগানের দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদনের অধিকার অর্জিত হয়। এসব পরিমাণই মদিনার নেতৃত্বের অর্থনৈতিক বিস্তারকে পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দৃশ্যমান করে।


বদর যুদ্ধ: পশুসম্পদ, বাণিজ্যিক পণ্য এবং বন্দিদের মুক্তিপণ (২ হিজরি)

৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের বদর যুদ্ধের আগে মুহাম্মদের বাহিনী কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা আটক করার উদ্দেশ্যে বের হয়। কাফেলাটি অন্য পথে সরে গেলেও কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। মুসলমানদের বিজয়ের পরে কুরাইশ বাহিনীর পশু, অস্ত্র, পোশাক, চামড়া ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়। হালাবির আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ-তে বদরের গণিমত হিসেবে ১৫০টি উট, ১০টি ঘোড়া এবং বিভিন্ন সামগ্রীর কথা পাওয়া যায়। পশুর বাইরেও চামড়া ও বাণিজ্যের জন্য বহন করা পণ্যের মূল্য ছিল। [15]

وكانت مائة وخمسين من الإبل، وعشرة أفراس ومتاعا وسلاحا وأنطاعا وثيابا وأدما كثيرا حمله المشركون للتجارة
বাংলা অনুবাদ: গণিমতের মধ্যে ছিল ১৫০টি উট, ১০টি ঘোড়া, গৃহস্থালি ও যুদ্ধের সরঞ্জাম, অস্ত্র, চামড়ার বিছানা, পোশাক এবং বিপুল চামড়াজাত সামগ্রী, যা মুশরিকরা ব্যবসার জন্য বহন করেছিল।

বদরের পরে কুরাইশদের প্রায় ৭০ জন বন্দি হয়। এই বন্দিদের মুক্তির জন্য অর্থ আদায় যুদ্ধের আর্থিক ফলের অংশ হয়ে ওঠে। আস-সালিহি সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ-এ উল্লেখ করেন, ব্যক্তিভেদে চার হাজার, দুই হাজার বা এক হাজার দিরহাম পর্যন্ত মুক্তিপণ নির্ধারিত হয়েছিল; কারও মুক্তি অর্থ ছাড়াও হয়েছিল। ফলে ৭০ জনের সবাই একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক দিয়েছেন ধরে মোট আয় বের করা সম্ভব নয়; কিন্তু মুক্তিপণ যে গণিমতের বাইরেও অর্থপ্রাপ্তির মাধ্যম ছিল, সেটি স্পষ্ট। [16]

وجعل رسول الله صلى الله عليه وسلم فداء الرجل أربعة آلاف إلى ألفين إلى ألف ، ومنهم من من عليه؛ لأنه لا مال له .
বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ বন্দিপ্রতি মুক্তিপণ চার হাজার, দুই হাজার কিংবা এক হাজার দিরহাম নির্ধারণ করেন। তাদের মধ্যে যাদের অর্থ ছিল না, তাদের কাউকে কাউকে বিনা মুক্তিপণেও ছেড়ে দেন।

বদরের পশুসম্পদের হিসাব সরল: ১৫০ উট এবং ১০ ঘোড়া। কিন্তু এর সঙ্গে অস্ত্র, চামড়া, পোশাক, অন্যান্য বহনযোগ্য সম্পদ এবং বন্দিদের মুক্তিপণের পরিমাণ একত্র করলে মোট মূল্য আরও বাড়ত। দ্বিতীয় শ্রেণির সম্পদের সম্পূর্ণ সংখ্যা সংরক্ষিত হয়নি। বদরের পরপরই গণিমত নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিরোধ এবং আনফাল-সংক্রান্ত বিধান দেখায়, সামরিক অভিযানের অর্থনৈতিক ফল কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটি নতুন নেতৃত্বের জন্য একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।


কারাদাহ অভিযান: কুরাইশ কাফেলার এক লাখ দিরহাম মূল্যের সম্পদ (৩ হিজরি)

বদরের পর কুরাইশ ব্যবসায়ীরা সিরিয়ার দিকে প্রচলিত পথ ছেড়ে অন্য পথে কাফেলা নিয়ে যেতে শুরু করে। তৃতীয় হিজরিতে মুহাম্মদ যায়েদ ইবনে হারিসার নেতৃত্বে একশ আরোহী পাঠান। কারাদাহ এলাকায় বাহিনীটি কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার পথরোধ করে; প্রধান ব্যবসায়ীরা পালালেও মালামাল দখল হয়। আস-সালিহির সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ অনুসারে, সম্পদ মদিনায় নিয়ে এসে খুমুস পৃথক করা হলে তার মূল্য দাঁড়ায় ২০,০০০ দিরহাম। ফলে পাঁচ ভাগের এক ভাগ থেকে মোট কাফেলা-সম্পদের বর্ণিত মূল্য দাঁড়ায় ১,০০,০০০ দিরহাম। [17]

فخمسها ، فبلغ الخمس قيمة عشرين ألف درهم ، وقسم الباقي على أهل السرية .
বাংলা অনুবাদ: তিনি কাফেলার সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করেন। সেই এক-পঞ্চমাংশের মূল্য হয় বিশ হাজার দিরহাম। অবশিষ্ট সম্পদ অভিযানের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

সম্পূর্ণ বর্ণিত সম্পদ ১,০০,০০০ দিরহাম হলে খুমুস ২০,০০০ এবং অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য অবশিষ্ট অংশ ৮০,০০০ দিরহাম। এই কাফেলায় মূল্যবান রৌপ্যপাত্র, রৌপ্যখণ্ড, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্য বহন করা হচ্ছিল। স্বর্ণ ও রৌপ্যের যে বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো মোট কাফেলা-সম্পদের ভেতরের অংশ; আলাদাভাবে যোগ করলে একই সম্পদ দুবার গণনা হবে। শুধু একটি কাফেলা দখলের মাধ্যমে এই পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হওয়ার ঘটনা মদিনার বাহিনীর জন্য বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের অর্থনৈতিক গুরুত্বও প্রকাশ করে।

অভিযানটি বৃহৎ সম্মুখযুদ্ধের মাধ্যমে নয়; বাণিজ্যপথে সশস্ত্র বাধা সৃষ্টি করে সম্পদ দখলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে মুহাম্মদের সম্পদ অর্জনের ব্যবস্থা কেবল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। ক্ষুদ্র ও দ্রুতগামী বাহিনী পাঠিয়ে কাফেলার বাণিজ্যিক পণ্য অধিগ্রহণও সেই ব্যবস্থার অংশ ছিল। ইসলামের সামরিক ইতিহাসে “সারিয়া” হিসেবে চিহ্নিত এ ধরনের অভিযান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় উদ্দেশ্য পূরণ করত।


বনু নাদির: জমি ও খেজুরবাগান থেকে পরিবারের এক বছরের ভরণপোষণ (৪ হিজরি)

বনু নাদির সম্প্রদায়কে মদিনা থেকে বিতাড়নের পর তাদের জমি, খেজুরবাগান ও সম্পত্তি মুহাম্মদের অধীনে আসে। এই সম্পদকে কোরআনের ভাষায় ফাইয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়; অর্থাৎ সাধারণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মতো প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে ভাগ করার বদলে তা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বে আসে। সহিহ বুখারীতে উমরের বর্ণনা অনুযায়ী বনু নাদিরের সম্পত্তি বিশেষভাবে মুহাম্মদের অধীন ছিল এবং তিনি সেখান থেকে তার পরিবারের এক বছরের ব্যয় নির্বাহ করতেন; অবশিষ্ট অংশ সামরিক প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত হতো। [18]

فكانت لرسول الله صلى الله عليه وسلم خاصة ينفق على أهله منها نفقة سنته ثم يجعل ما بقي في السلاح والكراع عدة في سبيل الله
বাংলা অনুবাদ: তা বিশেষভাবে মুহাম্মদের অধিকারে ছিল। তিনি তা থেকে নিজের পরিবারের এক বছরের ভরণপোষণ দিতেন; তারপর অবশিষ্ট সম্পদ অস্ত্র ও বাহনের প্রস্তুতিতে ব্যয় করতেন।

এই বর্ণনাটি সরাসরি মুহাম্মদের পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ের উৎসের সন্ধান দেয়। এখানে নগদ রৌপ্য বা উটের এককালীন ভাগ নয়; উৎপাদনক্ষম জমি ও খেজুরবাগান থেকে বারবার সম্পদ আসার অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়। পরিবারকে এক বছরের খাবার দেওয়ার পরে অবশিষ্ট অংশ অস্ত্র এবং বাহনের জন্য ব্যয় করা হতো—এই ব্যবস্থায় পারিবারিক অর্থনীতি ও সামরিক ব্যয় একই অধিগৃহীত ভূসম্পত্তির ফলনের সঙ্গে যুক্ত। সুনির্দিষ্ট আয়তন ও উৎপাদনের পরিমাণ ছাড়া এই জমির আধুনিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না, কিন্তু নিয়মিত পরিবারের ব্যয় নির্বাহের তথ্যটি তার অর্থনৈতিক কার্যকারিতা স্পষ্ট করে।


বনু কুরায়জা: অস্ত্রভান্ডার, জমি এবং নারী-শিশু বন্দি (৫ হিজরি)

বনু কুরায়জার অবরোধ ও আত্মসমর্পণের পর তাদের সামরিক সরঞ্জাম, গৃহস্থালি সম্পদ, পশুসম্পদ ও জমি মুসলমানদের অধিকারে আসে। হালাবির আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ-এর বিবরণ অনুসারে দুর্গগুলোতে পাওয়া যায় ১,৫০০ তলোয়ার, ৩০০ বর্ম, ২,০০০ বর্শা ও ৫০০ ঢাল—মোট ৪,৩০০টি গণনাযোগ্য অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী। এর বাইরে ছিল অন্যান্য সরঞ্জাম, পাত্র, গবাদিপশু ও ঘরবাড়ির সম্পত্তি। [19]

فوجد فيها ألف وخمسائمة سيف وثلثمائة درع وألفى رمح وخمسمائة ترس وحجفة ووجد أثاثا كثيرا وآنية كثيرة
বাংলা অনুবাদ: সেখানে পাওয়া যায় এক হাজার পাঁচশ তলোয়ার, তিনশ বর্ম, দুই হাজার বর্শা, পাঁচশ ঢাল ও অন্যান্য প্রতিরক্ষাসামগ্রী; আরও পাওয়া যায় প্রচুর আসবাবপত্র ও পাত্র।

বনু কুরায়জার পুরুষদের একটি বড় অংশকে হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়; সম্পত্তি ও বন্দিদের গণিমত হিসেবে বণ্টনের বিবরণ সীরাত-সাহিত্যে রয়েছে। কোরআনের সূরা আহজাব ৩৩:২৬–২৭-এ তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে আনা, একদলকে হত্যা, অন্যদলকে বন্দি করা এবং তাদের জমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদের উত্তরাধিকার লাভের কথা বলা হয়েছে। ফলে এই অভিযানের অর্থনৈতিক ফল শুধু অস্ত্র সংগ্রহ নয়; একটি সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ জীবনযাত্রা ও সম্পত্তির ওপর অধিকার পরিবর্তন। বন্দিদের আধুনিক মুদ্রায় কোনো বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে না; বন্দি হওয়ার ঘটনাটি নিজেই অধিকারহরণ ও দাসত্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। [20]

বনু কুরায়জার বন্দি মানুষ: বণ্টন, বিক্রি এবং ঘোড়া-অস্ত্র সংগ্রহ

বনু কুরায়জার নারী ও শিশুদের বন্দি করার পরে তাদের অর্থনৈতিক ব্যবহার সম্পর্কেও সীরাতের বিবরণ রয়েছে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় সম্পত্তি, নারী ও সন্তানদের মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন, খুমুস পৃথক করা এবং অশ্বারোহী ও পদাতিকের অংশ নির্ধারণের কথা একসঙ্গে এসেছে। এরপর মুহাম্মদ সাদ ইবনে যায়েদ আনসারিকে কিছু বন্দি নিয়ে নজদে পাঠান; তাদের বিনিময়ে ঘোড়া ও অস্ত্র কেনা হয়। এই লেনদেনে পরাজিত মানুষের দাসত্ব সরাসরি বিজয়ী বাহিনীর সামরিক সামর্থ্য বৃদ্ধির উপায়ে পরিণত হয়। একই ধারাবাহিকতায় রায়হানাকে মুহাম্মদের নিজের জন্য বেছে নেওয়ার বিবরণও রয়েছে। ইবনে ইসহাকের এই বর্ণনা অনুসারে তিনি মুহাম্মদের মালিকানাধীন অবস্থায় ছিলেন। [21] [22] [23]

قال ابن إسحاق: ثم إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قسم أموال بني قريظة ونساءهم وأبناءهم على المسلمين، وأعلم في ذلك اليوم سهمان الخيل وسهمان الرجال، وأخرج منها الخمس، فكان للفارس ثلاثة أسهم، للفرس سهمان ولفارسه سهم، وللراجل، من ليس له فرس، سهم. وكانت الخيل يوم بني قريظة ستة وثلاثين فرسا، وكان أول فيء وقعت فيه السهمان، وأخرج منها الخمس، فعلى سنتها وما مضى من رسول الله صلى الله عليه وسلم فيها وقعت المقاسم، ومضت السنة في المغازي. ثم بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم سعد بن زيد الأنصاري أخا بني عبد الأشهل بسبايا من سبايا بني قريظة إلى نجد، فابتاع لهم بها خيلا وسلاحا. (شأن ريحانة): قال: وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم قد اصطفى لنفسه من نسائهم ريحانة بنت عمرو بن خنافة، إحدى نساء بني عمرو بن قريظة، فكانت عند رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى توفي عنها وهي في ملكه، وقد كان رسول الله صلى الله عليه وسلم عرض عليها أن يتزوجها، ويضرب عليها الحجاب، فقالت: يا رسول الله، بل تتركني في ملكك، فهو أخف علي وعليك، فتركها. وقد كانت حين سباها قد تعصت بالإسلام، وأبت إلا اليهودية، فعزلها رسول الله صلى الله عليه وسلم، ووجد في نفسه لذلك من أمرها. فبينا هو مع أصحابه، إذ سمع وقع نعلين خلفه، فقال: إن هذا لثعلبة بن سعية يبشرني بإسلام ريحانة، فجاءه فقال يا رسول الله، قد أسلمت ريحانة، فسره ذلك من أمرها.
বাংলা অনুবাদ: ইবনে ইসহাক বলেন: এরপর রাসুলুল্লাহ বনু কুরায়জার সম্পত্তি, নারী ও সন্তানদের মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করেন। সেদিন তিনি ঘোড়া ও মানুষের জন্য নির্ধারিত অংশ স্পষ্ট করেন এবং সেখান থেকে খুমুস পৃথক করেন। অশ্বারোহীর জন্য ছিল তিন অংশ—ঘোড়ার জন্য দুই অংশ এবং তার আরোহীর জন্য এক অংশ। পদাতিক, অর্থাৎ যার ঘোড়া নেই, তার জন্য এক অংশ। বনু কুরায়জার অভিযানে ঘোড়া ছিল ছত্রিশটি। এটিই ছিল প্রথম ফাই, যাতে এভাবে অংশ নির্ধারিত হয় এবং খুমুস পৃথক করা হয়। এর নিয়ম ও এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহর পূর্ববর্তী কার্যক্রম অনুসারে সম্পদের বণ্টন সম্পন্ন হয় এবং সামরিক অভিযানগুলোতে এই রীতি চলতে থাকে। এরপর রাসুলুল্লাহ বনু আবদুল আশহালের সাদ ইবনে যায়েদ আনসারিকে বনু কুরায়জার কিছু বন্দি নিয়ে নজদে পাঠান; তিনি তাদের বিনিময়ে মুসলমানদের জন্য ঘোড়া ও অস্ত্র কেনেন। রায়হানার প্রসঙ্গ: তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ তাদের নারীদের মধ্য থেকে রায়হানা বিনতে আমর ইবনে খুনাফাকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন; তিনি ছিলেন বনু আমর ইবনে কুরায়জার নারীদের একজন। রাসুলুল্লাহর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তার কাছে ছিলেন এবং তার মালিকানাধীন ছিলেন। রাসুলুল্লাহ তাকে বিবাহ করা ও তার জন্য পর্দার বিধান কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেন: “হে আল্লাহর রাসুল, বরং আমাকে আপনার মালিকানাতেই রেখে দিন; এটি আমার ও আপনার জন্য সহজতর।” তখন তিনি তাকে সেভাবেই রাখেন। তাকে বন্দি করার সময় তিনি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং ইহুদিধর্ম ছাড়া অন্য কিছু মানতে অস্বীকার করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ তাকে পৃথক করে রাখেন এবং তার এই অবস্থায় মনে কষ্ট পান। একসময় তিনি সঙ্গীদের সঙ্গে থাকা অবস্থায় পেছনে দুই জুতার শব্দ শুনে বলেন: “এ নিশ্চয়ই সালাবা ইবনে সাঈয়া, আমাকে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিতে আসছে।” সে এসে বলে: “হে আল্লাহর রাসুল, রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছেন।” তার এই সংবাদে তিনি আনন্দিত হন।

এই অভিযানের হিসাবের মধ্যে মোট ৪,৩০০টি অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী সংখ্যাগতভাবে চিহ্নিত করা যায়। গৃহস্থালি দ্রব্য, পশুসম্পদ, জমি ও খেজুরবাগানের পরিমাণ অনির্দিষ্ট। খায়বার বা হুনাইনের পশুসম্পদের সঙ্গে এ অস্ত্রগুলোর সংখ্যা সরাসরি যোগ করা হয় না; কারণ তলোয়ার, বর্ম, উট ও রৌপ্য ভিন্ন ধরনের সম্পদ। আধুনিক অস্ত্রের দাম দিয়ে সপ্তম শতাব্দীর তলোয়ারের যথার্থ তুলনামূলক মূল্যও পাওয়া যায় না।


বনু মুস্তালিক বা মুরাইসিয় যুদ্ধ: ২,০০০ উট, ৫,০০০ ভেড়া-ছাগল ও বন্দি পরিবার (৫/৬ হিজরি)

মুরাইসিয় বা বনু মুস্তালিক অভিযানে মুসলমানেরা বিপুল গবাদিপশু ও বহু বন্দি মানুষ অধিগ্রহণ করে। ইবনে সাইয়্যিদিন্নাসের উয়ুনুল আসার-এ ইবনে সাদের সূত্রে ২,০০০ উট, ৫,০০০ ভেড়া-ছাগল এবং ২০০ পরিবারভুক্ত বন্দির বিবরণ আছে। বন্দি পরিবারের সংখ্যা এখানে পৃথক ব্যক্তির সংখ্যা নয়; প্রতিটি পরিবারের সদস্য একাধিক হতে পারত। এই অভিযানের বন্দিদের মধ্যে জুয়াইরিয়া বিনতে হারিসও ছিলেন, যিনি পরে মুহাম্মদের স্ত্রী হন। [24]

وكانت الإبل ألفي بعير، والشاء خمسة آلاف شاة، وكان السبي مائتي بيت
বাংলা অনুবাদ: উট ছিল দুই হাজার, ভেড়া-ছাগল ছিল পাঁচ হাজার; আর বন্দি করা হয়েছিল দুইশ পরিবারকে।

গণিমত সংগ্রহ ও বণ্টনের জন্য মুহাম্মদ পৃথক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিযুক্ত করেছিলেন। বন্দি মানুষ, উট ও ভেড়া-ছাগলের হিসাব রাখা, খুমুস পৃথক করা এবং অবশিষ্ট সম্পদ অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন—এসব ছিল সামরিক সংগঠনের আর্থিক কাজ। এই যুদ্ধে শুধু পশুসম্পদের সংখ্যাই গুরুত্বপূর্ণ নয়: একটি সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের বন্দি করা এবং তাদের বণ্টনও অভিযানের ফলের অংশ ছিল। জুয়াইরিয়ার বন্দিদশা থেকে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহের ঘটনাটিও সেই ব্যবস্থার ভেতরে ঘটে।

এই অভিযানের ২,০০০ উট এবং ৫,০০০ ভেড়া-ছাগল পরবর্তী মোটের সারণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বন্দি পরিবারের সংখ্যা মানুষের ওপর সামরিক কর্তৃত্বের হিসাব হিসেবে পৃথক রাখা হয়েছে। কোনো স্বাধীন গণনা ছাড়া “২০০ পরিবার” থেকে ২০০ ব্যক্তি কিংবা একটি ইচ্ছামতো বড় সংখ্যা বানানো হয়নি।


খায়বার: দুর্গ, কৃষিজমি ও উৎপাদনের অর্ধাংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ (৭ হিজরি)

খায়বারের যুদ্ধের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কয়েক হাজার পশু বা একবারের নগদ সম্পদের চেয়েও বেশি। এখানে একাধিক দুর্গ, বিস্তৃত কৃষিজমি, খেজুরবাগান এবং সেখানকার উৎপাদনব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বায়হাকির দালাইলুন নুবুওয়াহ-এর বর্ণনায় খায়বারের সম্পত্তিকে ৩৬ ভাগে বিন্যস্ত করার কথা আছে: ১৮ ভাগ মুসলমান যোদ্ধাদের অংশ এবং অন্য ১৮ ভাগ মুহাম্মদের অধীনে বিভিন্ন প্রয়োজন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য সংরক্ষিত। এই অংশগুলোর সংখ্যা জমির পরিমাপের একক নয়; অধিগৃহীত সম্পত্তির বণ্টনগত ভাগ। [25]

قسمها ستة وثلاثين سهما جمع فعزل للمسلمين الشطر ثمانية عشر سهما
বাংলা অনুবাদ: তিনি খায়বারকে মোট ছত্রিশ ভাগে ভাগ করেন এবং মুসলমানদের জন্য তার অর্ধেক, অর্থাৎ আঠারো ভাগ পৃথক করেন।

খায়বারের অধিগৃহীত সম্পদের উৎপাদন পরিচালনার জন্য স্থানীয় ইহুদি কৃষকদের জমিতে কাজ করতে দেওয়া হয় এবং উৎপাদনের অংশ গ্রহণের ব্যবস্থা তৈরি হয়। হাদিসের বর্ণনায় খায়বারের জমি ও খেজুরবাগান চাষের বিনিময়ে ফলন ভাগ করে দেওয়ার কথা আছে। ফলে খায়বারের সম্পদ স্থায়ী বা পুনরাবৃত্ত কৃষি-উৎপাদনের ওপর অর্থনৈতিক অধিকার সৃষ্টি করে। জমির সুনির্দিষ্ট আয়তন, ফলনের ওজন ও বছরভিত্তিক উৎপাদনের বিবরণ ছাড়া এই সম্পদের আজকের মোট মূল্য বের করা যায় না; কিন্তু যুদ্ধবিজয়ের পর কৃষি অর্থনীতি দখল করার বাস্তবতাটি স্পষ্ট। [26]


খায়বারের কৃষি উৎপাদন থেকে স্ত্রীদের বার্ষিক খাদ্যবরাদ্দ

খায়বারের উৎপাদন থেকে মুহাম্মদের পরিবারের জন্য নিয়মিত খাদ্যবরাদ্দের পরিমাণও হাদিসে সংরক্ষিত আছে। ইবনে উমরের বর্ণনায় খায়বারের ফল ও শস্যের অর্ধাংশের চুক্তির পাশাপাশি মুহাম্মদের স্ত্রীদের জন্য বছরে একশ ওয়াসাক—আশি ওয়াসাক খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক যব—দেওয়ার কথা রয়েছে। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর উমরের শাসনামলেও এই বরাদ্দের প্রশ্ন বহাল থাকে: স্ত্রীদের জমি ও পানির অধিকার গ্রহণ অথবা প্রতিবছরের শস্যবরাদ্দ বজায় রাখার মধ্যে নির্বাচন করতে দেওয়া হয়। আয়েশা ও হাফসা জমি ও পানি গ্রহণ করেন। ফলে খায়বারের অর্থনৈতিক ফল পরিবারের ক্ষেত্রে নিয়মিত খাদ্যপ্রাপ্তি এবং পরবর্তী সময়ে উৎপাদনক্ষম সম্পদের অধিকার—উভয় রূপেই দেখা যায়। [27] [28]

وحدثني علي بن حجر السعدي، حدثنا علي، وهو ابن مسهر، أخبرنا عبيد الله، عن نافع، عن ابن عمر، قال: أعطى رسول الله صلى الله عليه وسلم خيبر بشطر ما يخرج من ثمر أو زرع، فكان يعطي أزواجه كل سنة مائة وسق ثمانين وسقا من تمر وعشرين وسقا من شعير، فلما ولي عمر قسم خيبر خير أزواج النبي صلى الله عليه وسلم أن يقطع لهن الأرض والماء أو يضمن لهن الأوساق كل عام، فاختلفن فمنهن من اختار الأرض والماء ومنهن من اختار الأوساق كل عام، فكانت عائشة وحفصة ممن اختارتا الأرض والماء.

বাংলা অনুবাদ: আলি ইবনে হুজর আস-সাদি আমাকে বর্ণনা করেছেন; আলি, অর্থাৎ ইবনে মুসহির, আমাদের বর্ণনা করেছেন; উবাইদুল্লাহ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন নাফি থেকে, তিনি ইবনে উমর থেকে। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ খায়বারের ফল বা শস্য থেকে যা উৎপন্ন হবে, তার অর্ধাংশের বিনিময়ে তা চাষের জন্য দেন। তিনি তার স্ত্রীদের প্রতিবছর একশ ওয়াসাক দিতেন—আশি ওয়াসাক খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক যব। উমর শাসনভার গ্রহণ করে খায়বার বণ্টন করার সময় নবীর স্ত্রীদের দুটি বিকল্প দেন: তাদের জন্য জমি ও পানি বরাদ্দ করা হবে, অথবা প্রতিবছর নির্ধারিত পরিমাণ শস্য দেওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে। তাদের নির্বাচন এক ছিল না। কেউ জমি ও পানি বেছে নেন, কেউ প্রতিবছরের শস্যবরাদ্দ বেছে নেন। আয়েশা ও হাফসা ছিলেন জমি ও পানি বেছে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে।

খায়বারকে যুদ্ধলব্ধ গবাদিপশুর মোটের সঙ্গে কোনো কল্পিত অঙ্ক যোগ না করেও তার অর্থনৈতিক পরিণতি বোঝা যায়। দুর্গ দখল ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন; কৃষিজমি ও খেজুরবাগানের অধিকার ছিল উৎপাদনের উৎসের ওপর ক্ষমতার পরিবর্তন। যোদ্ধাদের বণ্টিত অংশের পাশাপাশি মুহাম্মদের অধীনে সংরক্ষিত সম্পদ ভবিষ্যতের সামরিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা তৈরি করে।


ফদক: যুদ্ধ ছাড়াই জমির অর্ধাংশ অধিগ্রহণ (৭ হিজরি)

খায়বার অভিযানের পর ফদকের ইহুদিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জমি ও উৎপাদনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বদর বা কারাদাহর মতো এখানে সম্পদের মূল ধরন নগদ ও পশু নয়; কৃষিজমির ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ। বদরুদ্দিন আইনি তার উমদাতুল কারি-তে উল্লেখ করেন, খায়বার দখলের পর ফদকের অধিবাসীরা জমির অর্ধাংশের ভিত্তিতে সমঝোতা করেন এবং সেই অংশ মুহাম্মদের বিশেষ অধিকারে আসে। [29]

وكذا نصف أرض فدك صالح أهلها بعد فتح خيبر على نصف أرضها، فكانت خالصة له
বাংলা অনুবাদ: একইভাবে ফদকের অর্ধেক জমি; খায়বার বিজয়ের পরে সেখানকার অধিবাসীরা অর্ধেক জমির ভিত্তিতে সন্ধি করে, ফলে তা তার বিশেষ অধিকারে আসে।

ফদকের কৃষিজমি এবং খেজুরবাগান থেকে উৎপাদিত সম্পদ ছিল নগদ গণিমত থেকে ভিন্ন ধরনের সম্পত্তি। এখানে একবারের লুণ্ঠন নয়, জমির মালিকানা ও উৎপাদনের ওপর পরবর্তী সময়েও দাবি করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর ফদকের সম্পত্তি নিয়ে ফাতিমা, আবু বকর এবং পরবর্তী শাসকদের মধ্যে যে বিতর্কের বর্ণনা পাওয়া যায়, তা-ও এই ভূসম্পত্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব নির্দেশ করে। আধুনিক বাজারমূল্যের সারণিতে ফদকের জমি অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণ জমির পরিমাণ ও বর্তমান তুলনাযোগ্য উৎপাদনমূল্যের নির্ভরযোগ্য হিসাব অনুপস্থিত থাকা।


আবু কাতাদার নজদ অভিযান: ২০০ উট, ২,০০০ ভেড়া-ছাগল ও বন্দি মানুষ (৮ হিজরি)

অষ্টম হিজরিতে মুহাম্মদ আবু কাতাদার নেতৃত্বে নজদের খাদিরা এলাকায় গাতাফানদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী পাঠান। ইবনে সাইয়্যিদিন্নাসের উয়ুনুল আসার-এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ১৫ বলা হয়েছে। বর্ণনায় রয়েছে, তারা রাতের বেলা চলত, দিনের বেলা আড়ালে থাকত এবং বসতির ওপর অতর্কিত আক্রমণ করত। অভিযানের শেষে ২০০টি উট ও ২,০০০ ভেড়া-ছাগল দখল এবং বহু মানুষকে বন্দি করার কথা উল্লেখিত হয়েছে। [30]

واستاقوا النعم فكانت الإبل مائتي بعير والغنم ألفي شاة، وسبوا سبيا كثيرا
বাংলা অনুবাদ: তারা গবাদিপশু নিয়ে যায়; উটের সংখ্যা ছিল দুইশ এবং ভেড়া-ছাগল দুই হাজার। তারা বহু মানুষকেও বন্দি করে।

একটি ছোট বাহিনীর অভিযানে দখল করা ২০০ উট ও ২,০০০ ভেড়া-ছাগলই উল্লেখযোগ্য সম্পদ। ইবনে সাইয়্যিদিন্নাস আরও জানান, খুমুস পৃথক করার পরে যোদ্ধাদের ভাগ দেওয়া হয় এবং আবু কাতাদার প্রাপ্য ভাগে একটি বন্দি তরুণী আসে। মুহাম্মদ তাকে আবু কাতাদার কাছ থেকে চেয়ে নেন; পরে সেই নারীকে অন্য একজনকে দান করেন। এই বর্ণনায় মানুষকে সামরিক সম্পদের মতো ভাগ করা ও হস্তান্তর করার ঘটনা সরাসরি দেখা যায়। বন্দি নারীর কোনো আধুনিক আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি; তার বন্দিত্ব ও বণ্টন পৃথক মানবাধিকারসংক্রান্ত বাস্তবতা।

এই অভিযানের ভেড়া-ছাগলের সংখ্যা সম্পর্কে অন্য একটি বর্ণনায় এক হাজারের উল্লেখ পাওয়া যায়। [31] উয়ুনুল আসার-এ দুই হাজার থাকায় সামগ্রিক সারণির নির্বাচিত হিসাবে দুই হাজার ব্যবহৃত হয়েছে; বিকল্প বর্ণনার ভিত্তিতে সংখ্যা এক হাজার কম হলে মোট বাজারমূল্যও সংশ্লিষ্ট পরিমাণে কমবে। এই পার্থক্য পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের পরিমাণগত অনিশ্চয়তার একটি বাস্তব উদাহরণ।


হুনাইন যুদ্ধ: ২৪,০০০ উট, ৪০,০০০-এর বেশি ভেড়া-ছাগল, ৪,০০০ উকিয়া রৌপ্য ও ৬,০০০ বন্দি (৮ হিজরি)

হুনাইনের যুদ্ধ মুহাম্মদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সবচেয়ে বড় সংখ্যায় নথিবদ্ধ গণিমত-অধিগ্রহণগুলোর একটি। হাওয়াজিনদের পরাজয়ের পরে সংগৃহীত সম্পদ জিরানায় নিয়ে জমা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সালিহির সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ-এ ইবনে সাদের সূত্রে উল্লেখ আছে, ২৪,০০০ উট, ৪০,০০০-এর বেশি ভেড়া-ছাগল, ৪,০০০ উকিয়া রৌপ্য এবং ৬,০০০ নারী ও শিশু বন্দি করা হয়েছিল। মূল বাংলা গ্রন্থের উদ্ধৃতিতেও একই পরিমাণের উল্লেখ আছে। এই সংখ্যাগুলো একটি যুদ্ধের অর্জিত সম্পদের বিস্তারকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। [32]

كان السبي ستة آلاف رأس ، والإبل أربعة وعشرين ألف بعير ، والغنم أكثر من أربعين ألف شاة ، وأربعة آلاف أوقية فضة .
বাংলা অনুবাদ: বন্দি মানুষের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার; উট ছিল চব্বিশ হাজার; ভেড়া-ছাগল চল্লিশ হাজারের বেশি; আর রৌপ্য ছিল চার হাজার উকিয়া।

একেকটি যুদ্ধে সংগৃহীত গণিমতের পরিমাণ যে কত বড় হতে পারত, তার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হুনাইন। সেখানে পশুসম্পদ, রৌপ্য ও বন্দি মানুষের বিপুল সংখ্যার বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। মূল বাংলা গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরি, চার হাজার উকিয়া রৌপ্য এবং ছয় হাজার নারী ও শিশুর বন্দিদশার কথা রয়েছে। নিচে এই তথ্যের আরবি সীরাত-উৎস এবং অন্য অভিযানের সংখ্যাগুলোর সঙ্গে তুলনা দেখানো হয়েছে। [33]

এমন কোন লোক বাকি ছিল না যাদের চোখে এ মাটির মুষ্টি থেকে ধূলো পৌঁছেনি। তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের রং পাল্টে যায়। শত্রুদের পা উপড়ে যায়, তারা রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। দুশমনদের ৭০ জন নিহত হয়। বহু গ্রেফতার হয়। অগণিত গনিমতের সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়।
৬ হাজার মহিলা ও শিশু বন্দী। ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরী, ৪ হাজার উকিয়া রূপা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দেন যেন সমস্ত গনিমতের সম্পদ জি’রানায় জমা করা হয় এবং স্বয়ং তিনি তায়েফে তাশরীফ নেন।

পেশা

এই এক যুদ্ধের পশুসম্পদের পরিমাণ বনু মুস্তালিক ও আবু কাতাদার অভিযানের তুলনায় বহুগুণ বেশি। শুধু উট ও ভেড়া-ছাগলের সংখ্যাই ৬৪ হাজারের বেশি; এর বাইরে প্রায় ৪৭৬ কিলোগ্রাম রৌপ্য-সমতুল্য ৪,০০০ উকিয়ার হিসাব রয়েছে। প্রচলিত পরিমাপে এক উকিয়া ৪০ দিরহাম এবং এক দিরহাম প্রায় ২.৯৭৫ গ্রাম ধরা হলে ৪,০০০ × ৪০ × ২.৯৭৫ গ্রাম = ৪৭৬ কেজি। এখানে রৌপ্যের সরাসরি ওজন পাওয়া যায় বলে আধুনিক বাজারে কেবল ধাতবমূল্য নির্ণয় করা সম্ভব।

হুনাইনের গণিমতের একটি অংশ থেকে মুহাম্মদ বিভিন্ন গোত্রপ্রধানকে একশ উট কিংবা অন্য পরিমাণে বিশেষ বরাদ্দ দেন। আবু সুফিয়ান, হাকিম ইবনে হিজামসহ কয়েকজনের নাম মাগাযি-সাহিত্যে রয়েছে। এই দানগুলো সংগৃহীত মোট ২৪ হাজার উটের বাইরে আলাদা সম্পদ নয়; গণিমতের ভেতর থেকে ব্যক্তিবিশেষকে বণ্টনের দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক আনুগত্য, যুদ্ধোত্তর সম্পর্ক ও সম্পদ বণ্টন একসঙ্গে কাজ করেছে। [34]


হুনাইনের গণিমত বণ্টন: সম্পদ দিয়ে নতুন অনুসারীদের আকৃষ্ট করা

হুনাইনের গণিমত থেকে কুরাইশের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের একশ করে উট দেওয়ার উদ্দেশ্য হাদিসে মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য হিসেবেই এসেছে। আনসারদের একাংশ এই বণ্টনে আপত্তি জানালে তিনি বলেন, সদ্য কুফর ছেড়ে আসা লোকদের আকৃষ্ট করার জন্য তিনি তাদের সম্পদ দিচ্ছেন। অর্থাৎ নতুন অনুসারীদের আকৃষ্ট করা এবং ধর্মীয় আনুগত্য সুদৃঢ় করার কাজে গণিমত ব্যবহৃত হতো। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সামরিক ভূমিকা এবং বণ্টনে বিশেষ সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিদের অবস্থান এক ছিল না; এই পার্থক্য আনসারদের অভিযোগেই প্রকাশ পেয়েছে। ফলে হুনাইনের গণিমতের রাজনৈতিক ব্যবহার শুধু পরবর্তী ব্যাখ্যা থেকে অনুমান করা বিষয় নয়—বর্ণিত সংলাপেই সম্পদ দিয়ে মানুষকে কাছে টানার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উপস্থিত। [35]

حدثني حرملة بن يحيى التجيبي، أخبرنا عبد الله بن وهب، أخبرني يونس، عن ابن شهاب، أخبرني أنس بن مالك، أن أناسا من الأنصار قالوا يوم حنين حين أفاء الله على رسوله من أموال هوازن ما أفاء فطفق رسول الله صلى الله عليه وسلم يعطي رجالا من قريش المائة من الإبل فقالوا: يغفر الله لرسول الله يعطي قريشا ويتركنا وسيوفنا تقطر من دمائهم. قال أنس بن مالك: فحدث ذلك رسول الله صلى الله عليه وسلم من قولهم فأرسل إلى الأنصار فجمعهم في قبة من أدم فلما اجتمعوا جاءهم رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: «ما حديث بلغني عنكم». فقال له فقهاء الأنصار: أما ذوو رأينا يا رسول الله فلم يقولوا شيئا وأما أناس منا حديثة أسنانهم قالوا يغفر الله لرسوله يعطي قريشا ويتركنا وسيوفنا تقطر من دمائهم. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «فإني أعطي رجالا حديثي عهد بكفر أتألفهم أفلا ترضون أن يذهب الناس بالأموال وترجعون إلى رحالكم برسول الله فوالله لما تنقلبون به خير مما ينقلبون به». فقالوا: بلى يا رسول الله قد رضينا. قال: «فإنكم ستجدون أثرة شديدة فاصبروا حتى تلقوا الله ورسوله فإني على الحوض». قالوا: سنصبر.

বাংলা অনুবাদ: হারমালা ইবনে ইয়াহইয়া আত-তুজিবি আমাকে বর্ণনা করেছেন; আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব আমাদের সংবাদ দিয়েছেন; ইউনুস আমাকে সংবাদ দিয়েছেন ইবনে শিহাব থেকে; তিনি বলেন, আনাস ইবনে মালিক আমাকে জানিয়েছেন যে, হুনাইনের দিন আল্লাহ হাওয়াজিনের যে সম্পদ তার রাসুলকে দেন, তা থেকে রাসুলুল্লাহ কুরাইশের কিছু লোককে একশ করে উট দিতে শুরু করেন। তখন আনসারদের কয়েকজন বলেন: “আল্লাহ তার রাসুলকে ক্ষমা করুন। তিনি কুরাইশকে দিচ্ছেন আর আমাদের বাদ দিচ্ছেন, অথচ আমাদের তরবারি থেকে তাদের রক্ত ঝরছে।” আনাস ইবনে মালিক বলেন: তাদের এই বক্তব্য রাসুলুল্লাহকে জানানো হয়। তিনি আনসারদের ডেকে পাঠান এবং একটি চামড়ার তাঁবুতে সমবেত করেন। তারা সমবেত হলে রাসুলুল্লাহ এসে বলেন: “তোমাদের সম্পর্কে আমার কাছে কী কথা পৌঁছেছে?” আনসারদের জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেন: “হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের বিবেচক ব্যক্তিরা কিছু বলেননি। আমাদের অল্পবয়সী কিছু লোক বলেছে, আল্লাহ তার রাসুলকে ক্ষমা করুন; তিনি কুরাইশকে দিচ্ছেন আর আমাদের বাদ দিচ্ছেন, অথচ আমাদের তরবারি থেকে তাদের রক্ত ঝরছে।” রাসুলুল্লাহ বলেন: “আমি এমন লোকদের দিচ্ছি, যারা অল্পদিন আগেও কুফরে ছিল; আমি তাদের আকৃষ্ট করছি। তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, অন্যরা সম্পদ নিয়ে যাবে আর তোমরা আল্লাহর রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আবাসে ফিরবে? আল্লাহর শপথ, তোমরা যা নিয়ে ফিরবে, তা তারা যা নিয়ে ফিরবে তার চেয়ে উত্তম।” তারা বলেন: “হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা সন্তুষ্ট।” তিনি বলেন: “তোমরা ভবিষ্যতে অন্যদের প্রবল অগ্রাধিকার দেওয়া হতে দেখবে। তখন ধৈর্য ধরবে, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তার রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করো; আমি হাউজের কাছে থাকব।” তারা বলেন: “আমরা ধৈর্য ধরব।”

হুনাইনে বন্দি করা নারী ও শিশুদের সংখ্যা ছয় হাজার হলেও পরবর্তী সময়ে হাওয়াজিন প্রতিনিধিদলের আবেদনের পর বহু বন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার বর্ণনা রয়েছে। ফলে ৬,০০০ বন্দিকে স্থায়ীভাবে বিক্রি করে নগদ আয় হয়েছে, এমন কোনো হিসাব এ বিবরণ থেকে পাওয়া যায় না। কিন্তু নারী ও শিশুদের সামরিক বিজয়ের পরে বন্দি করে গণিমতের অংশ হিসেবে রাখার ঘটনাটি সেই সময়কার যুদ্ধনীতি এবং পরাজিত মানুষের ওপর বিজয়ীদের ক্ষমতা প্রকাশ করে। [36]

হুনাইনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ফল ছিল বিপুল পরিমাণ পশুসম্পদ ও রৌপ্য একত্রে অধিগ্রহণ এবং সেগুলোর বণ্টনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া। এটি দেখায়, মদিনার সামরিক নেতৃত্বের অধীনে একেকটি অভিযানে কয়েক দশ হাজার পশু এবং শত শত কিলোগ্রাম রৌপ্য-সমমূল্যের সম্পদ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। এই পরিমাণকে খায়বার ও বনু নাদিরের মতো নিয়মিত কৃষি-উৎপাদনের উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করলে অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের পরিসর আরও প্রসারিত হয়।


সামরিক অভিযানে অধিগৃহীত সম্পদের সমন্বিত হিসাব

প্রাচীন বর্ণনায় পাওয়া সংখ্যাগুলো অভিযানভিত্তিকভাবে সাজালে যে হিসাব পাওয়া যায়, তা নিচে দেওয়া হলো। যেসব সম্পদের সংখ্যা পাওয়া যায়নি, সেগুলো অজানা বলে চিহ্নিত হয়েছে; একই সম্পদ পুনরায় যোগ করা হয়নি। হুনাইনের ভেড়া-ছাগল চল্লিশ হাজারের বেশি হওয়ায় গণনায় চল্লিশ হাজারকে ন্যূনতম ভিত্তি ধরা হয়েছে। উকিয়াকে দিরহামে রূপান্তরের হিসাব ও বন্দিদের সংখ্যা তাদের নিজ নিজ এককে রাখা হয়েছে।

অভিযানউটভেড়া-ছাগলঘোড়ানগদ/রৌপ্যবন্দি মানুষঅন্যান্য সম্পদউৎস
বদর (২ হি.)১৫০—১০—৭০ বন্দি; মুক্তিপণচামড়া, অস্ত্র, পোশাকহালাবি; সালিহি
কারাদাহ (৩ হি.)———এক লাখ দিরহাম মূল্যের সম্পদকয়েকজন বন্দিকাফেলার ব্যবসায়িক পণ্যসুবুলুল হুদা
বনু নাদির (৪ হি.)অজানাঅজানা———জমি ও খেজুরবাগান; পারিবারিক ভরণপোষণের উৎসবুখারী
বনু কুরায়জা (৫ হি.)অজানাঅজানা——নারী-শিশু বন্দি১,৫০০ তলোয়ার; ২,০০০ বর্শা; ৩০০ বর্ম; ৫০০ ঢালহালাবি; কোরআন ৩৩:২৬–২৭
বনু মুস্তালিক (৫/৬ হি.)২,০০০৫,০০০——২০০ পরিবারভুক্ত বন্দিঅন্যান্য সম্পদউয়ুনুল আসার
খায়বার (৭ হি.)অজানাঅজানা——বন্দি মানুষজমি, দুর্গ, বাগান; ৩৬ ভাগে বণ্টনের বিবরণবায়হাকি
ফদক (৭ হি.)—————জমির অর্ধাংশ ও কৃষি উৎপাদনের অধিকারউমদাতুল কারি
আবু কাতাদার নজদ অভিযান (৮ হি.)২০০২,০০০——বহু বন্দিঅন্যান্য সম্পদউয়ুনুল আসার
হুনাইন (৮ হি.)২৪,০০০৪০,০০০-এর বেশি—৪,০০০ উকিয়া রৌপ্য৬,০০০ বন্দিঅন্যান্য পণ্য ও অস্ত্রসুবুলুল হুদা
সংখ্যাগত যোগফল২৬,৩৫০কমপক্ষে ৪৭,০০০১০৪,০০০ উকিয়া রৌপ্য ও পৃথক কারাদাহ মূল্যঅভিযানভেদে পৃথকজমি ও অস্ত্রের পূর্ণ মূল্য অজানানির্বাচিত বিবরণ

উপরের সংখ্যাগত যোগফলে মোট ২৬,৩৫০টি উট, অন্তত ৪৭,০০০টি ভেড়া-ছাগল এবং বদরের বর্ণিত ১০টি ঘোড়া পাওয়া যায়। বনু কুরায়জার গণনাযোগ্য ৪,৩০০টি অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী এর বাইরে আলাদা শ্রেণি। হুনাইনের চার হাজার উকিয়া রৌপ্য, কারাদাহর প্রায় এক লাখ দিরহাম মূল্যের কাফেলা, খায়বার ও বনু নাদিরের কৃষিজমি এবং ফদকের অর্ধেক ভূসম্পত্তিও স্বতন্ত্র। এগুলো নয়টি নির্বাচিত যুদ্ধ ও অভিযানের আংশিক হিসাব; মুহাম্মদের জীবদ্দশার সমস্ত সামরিক অভিযানের পূর্ণ সম্পদ-নিবন্ধন নয়।


বর্তমান বাজারদরে গণিমতের আনুমানিক অর্থনৈতিক মূল্য (৮ অক্টোবর ২০২৬)

বর্তমান আরবের পশুবাজারে সাধারণ উট ও ভেড়া-ছাগলের মূল্য ধরে ঐতিহাসিক সংখ্যাগুলোর একটি তুলনামূলক হিসাব করা যায়। এখানে একটি সাধারণ উটের দাম ৫,০০০–১০,০০০ সৌদি রিয়াল এবং ভেড়া-ছাগলের দাম ৭০০–১,৯০০ রিয়াল পরিসরে ধরা হয়েছে। মাঝারি হিসাবের জন্য যথাক্রমে ৭,৫০০ এবং ১,৩০০ রিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে। বাজারভিত্তিক তুলনার উৎস সৌদি সংবাদ সংস্থা ও পশুবাজারের প্রকাশিত মূল্যতথ্য; বিভিন্ন জাত, বয়স, ওজন ও মরসুমে একক দাম ভিন্ন হয়। [37] [38] [39]

রৌপ্যের ক্ষেত্রে কিটকোর ৮ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রতি ট্রয় আউন্স ৫৯.০১ মার্কিন ডলার বাজারমূল্য ব্যবহার করা হয়েছে। এক ট্রয় আউন্স ৩১.১০৩৫ গ্রাম। আর এক সৌদি রিয়াল প্রায় ৩২.৮৪১৫ বাংলাদেশি টাকা এবং এক মার্কিন ডলার প্রায় ১২৩.৩০ টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে। এর ফলে উট ও ভেড়া-ছাগলের দাম সরাসরি রিয়াল থেকে এবং রৌপ্যের মূল্য ডলার থেকে বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তরিত হয়। [40] [41] [42]

অভিযানমূল্য নির্ধারিত সম্পদনিম্ন দর (কোটি টাকা)মধ্যবর্তী দর (কোটি টাকা)উচ্চ দর (কোটি টাকা)
বদর১৫০ উট২.৪৬৩.৬৯৪.৯৩
বনু মুস্তালিক২,০০০ উট; ৫,০০০ ভেড়া-ছাগল৪৪.৩৪৭০.৬১৯৬.৮৮
আবু কাতাদার অভিযান২০০ উট; ২,০০০ ভেড়া-ছাগল৭.৮৮১৩.৪৭১৯.০৫
হুনাইন২৪,০০০ উট; ৪০,০০০ ভেড়া-ছাগল; ৪,০০০ উকিয়া রৌপ্য৪৯৭.১৯৭৭৩.০৬১,০৪৮.৯৩
নির্বাচিত মোট২৬,৩৫০ উট; কমপক্ষে ৪৭,০০০ ভেড়া-ছাগল; ৪,০০০ উকিয়া রৌপ্য৫৫১.৮৭৮৬০.৮৩১,১৬৯.৭৮

এই নির্বাচিত হিসাবের মধ্যবর্তী বাজারমূল্য প্রায় ৮৬০.৮৩ কোটি বাংলাদেশি টাকা; নিম্ন বাজারদরে প্রায় ৫৫১.৮৭ কোটি এবং উচ্চ বাজারদরে প্রায় ১,১৬৯.৭৮ কোটি টাকা। একক পশুর আজকের বাজারদর সপ্তম শতাব্দীর পশুর প্রকৃত মূল্য, জাত ও উৎপাদনক্ষমতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে না; এখানে সংখ্যার অর্থনৈতিক আকার তুলনা করা হয়েছে। যেসব পশুর পরিমাণ নথিবদ্ধ হয়েছে, শুধু সেগুলোর মূল্যই এই অঙ্কে আছে।

কারাদাহ অভিযানের কাফেলার মোট সম্পদ প্রাচীন বর্ণনায় এক লাখ দিরহাম মূল্যের বলা হয়েছে। রৌপ্যের ওজনের একটি প্রচলিত মুদ্রাগত মান অনুযায়ী এক দিরহাম ২.৯৭৫ গ্রাম ধরলে এক লাখ দিরহামের রৌপ্য-সমতুল্য ওজন ২৯৭.৫ কিলোগ্রাম। ৮ অক্টোবর ২০২৬-এর রৌপ্যমূল্যে এর সমতুল্য মূল্য প্রায় ৬.৯৬ কোটি টাকা। এটি কাফেলায় সত্যিকার অর্থে ২৯৭.৫ কেজি রৌপ্য পাওয়া গিয়েছিল এমন দাবি নয়; প্রাচীন মুদ্রামূল্যের সঙ্গে আধুনিক ধাতবমূল্যের তুলনা। এই মূল্যকে আলাদা শ্রেণি হিসেবে ধরলে সংখ্যাগতভাবে মূল্যায়িত নির্বাচিত সম্পদের মোট আনুমানিক মধ্যবর্তী পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬৭.৭৯ কোটি টাকা।

অতিরিক্ত সম্পদ বা অধিকারঐতিহাসিক বিবরণআধুনিক অর্থমূল্য
কারাদাহ কাফেলাপ্রায় ১,০০,০০০ দিরহাম মূল্যের পণ্য৬.৯৬ কোটি টাকা (রৌপ্য-সমতুল্য)
বদরের বন্দিদের মুক্তিপণব্যক্তিভেদে ১,০০০–৪,০০০ দিরহাম; কারও বিনা মূল্যে মুক্তিসম্পূর্ণ মোট অজানা
বনু কুরায়জার অস্ত্রমোট ৪,৩০০ গণনাযোগ্য অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাসামগ্রীতুলনাযোগ্য নির্ভরযোগ্য একক মূল্য নেই
বনু নাদিরজমি, খেজুরবাগান ও পরিবারের এক বছরের ব্যয়জমির আয়তন ও ফলন অজানা
খায়বার৩৬ ভাগে বিন্যস্ত কৃষিসম্পদ ও উৎপাদনের অধিকারজমির আয়তন ও উৎপাদনমূল্য অজানা
ফদকজমির অর্ধাংশের অধিকারজমির আয়তন ও উৎপাদনমূল্য অজানা
বিভিন্ন অভিযানের বন্দি মানুষনারী, পুরুষ ও শিশু; বন্দিত্ব, মুক্তিপণ, বণ্টনমানুষের কোনো আধুনিক বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়নি

এই আর্থিক তুলনার মোট মূল্য মুহাম্মদের একক ব্যক্তিগত নগদ সম্পদ নয়। গণিমতের একটি অংশ সৈনিকদের মধ্যে বণ্টিত হতো, খুমুসের বিভিন্ন খাত ছিল এবং ফাইয়ের কিছু সম্পদ পরিবার ও প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যবহৃত হতো। সম্পদ সংগ্রহ ও বণ্টনের কেন্দ্রে মুহাম্মদের অবস্থান ছিল—এটি এসব ব্যবস্থার প্রধান ঐতিহাসিক তাৎপর্য। জমি, খেজুরবাগান, অস্ত্র, অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্য এবং সংখ্যাগতভাবে অনির্ধারিত অভিযানের সম্পদকে মোটের মধ্যে যুক্ত করা হয়নি। ফলে এই পরিমাণ নির্বাচিত কয়েকটি অভিযানের নির্ধারণযোগ্য সম্পদের হিসাব, মদিনা-পর্বের সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পদের পূর্ণ মূল্য নয়।


গণিমত, পরিবারের ব্যয় এবং সামরিক ক্ষমতার যোগসূত্র

বনু নাদিরের সম্পদ থেকে পরিবারের এক বছরের ভরণপোষণ রাখা, কারাদাহর কাফেলার খুমুস পৃথক করা, খায়বারের অধিগৃহীত সম্পদের অর্ধেক প্রশাসনিক প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষণ করা এবং হুনাইনে বিভিন্ন নেতাকে বিপুল উট প্রদান—এই ঘটনাগুলো একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলাদা আলাদা প্রকাশ। মুহাম্মদের অধীনে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সম্পদ আসত; এরপর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা পরিবার, বাহিনী, অনুসারী, প্রশাসনিক কাজ ও অন্য নির্ধারিত শ্রেণিতে বণ্টিত হতো। এই কাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সম্পদ অধিগ্রহণের সামরিক ক্ষমতা এবং সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত একই নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া।

মানুষকে যুদ্ধের গণিমত হিসেবে বন্দি করা ও বণ্টনের বর্ণনাগুলো এই ব্যবস্থার নৈতিক চরিত্রও প্রকাশ করে। বদরে বন্দিদের মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করা হয়; বনু কুরায়জায় নারী ও শিশুরা বন্দি হয়; বনু মুস্তালিকে পরিবারভিত্তিক বন্দিত্বের বিবরণ পাওয়া যায়; আবু কাতাদার অভিযানে একটি বন্দি নারীকে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়; হুনাইনে ছয় হাজার বন্দিকে একত্রে রাখা হয় এবং পরে তাদের অনেককে ফিরিয়ে দেওয়ার বর্ণনা রয়েছে। সম্পদ অর্জনের ইতিহাসে এসব মানুষের পরিচয়কে শুধু “গণিমত” শব্দে আড়াল করা যায় না: তারা ছিল পরাজিত সম্প্রদায়ের সদস্য, যাদের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর বিজয়ী বাহিনী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।

অর্থনৈতিক পরিমাণ এবং আইনি-রাজনৈতিক অধিকার পরস্পর সম্পর্কিত। কোরআনে এক-পঞ্চমাংশের বিধান, হাদিসে ফাই থেকে পরিবারের ব্যয়, সীরাতের বর্ণনায় বাণিজ্য কাফেলার সম্পদ দখল এবং মাগাযি-গ্রন্থে হাজার হাজার গবাদিপশুর হিসাব একত্র করলে মদিনার রাষ্ট্রক্ষমতার অর্থনৈতিক ভিত্তি দৃশ্যমান হয়। রাখাল হিসেবে কয়েক কিরাত মজুরি অর্জনের বর্ণনা থেকে যে জীবনের সূচনা দেখা যায়, মদিনার সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই জীবনের আয় ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের পরিধিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরে নিয়ে যায়।


গণিমত, ফাই ও খুমুস: সম্পদ অধিগ্রহণ ও বণ্টনের কাঠামো

মদিনায় সম্পদ অধিগ্রহণের পদ্ধতি তিনটি প্রধান রূপে দেখা যায়: (১) যুদ্ধ বা সশস্ত্র অভিযানে সংগৃহীত গণিমত; (২) প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ছাড়াই রাজনৈতিক-সামরিক আধিপত্যের ফলে সংগৃহীত ফাই; (৩) এসব সম্পদের খুমুস, সৈনিকদের অংশ, পরিবারের ভরণপোষণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ে বণ্টন। এই কাঠামোর অর্থনৈতিক ফল শুধু সম্পদ পাওয়া নয়, বরং অধিগৃহীত সম্পদের ওপর নিয়ম নির্ধারণ এবং তা অন্যদের মধ্যে বণ্টনের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা।

(১) গণিমত: সশস্ত্র সংঘর্ষ, অভিযান, অবরোধ কিংবা শত্রুসম্পত্তি দখলের মাধ্যমে অর্জিত পশু, অস্ত্র, পণ্য ও অন্যান্য সম্পদ গণিমত হিসেবে বণ্টিত হতো। সূরা আনফাল ৮:১ এবং ৮:৪১ যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অধীন করে এবং এক-পঞ্চমাংশের নিয়ম নির্ধারণ করে।

(২) ফাই: যে সম্পদ অধিগ্রহণের জন্য মুসলিম বাহিনীকে সরাসরি যুদ্ধ করতে হয়নি, তা ফাইয়ের অধীনে আসতে পারত। বনু নাদির ও ফদকের জমি এবং খেজুরবাগানের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল দীর্ঘস্থায়ী: সেগুলো থেকে কৃষিপণ্য, ভাড়া কিংবা উৎপাদনের অংশ হিসেবে বারবার সম্পদ আসার সুযোগ তৈরি হয়। [14]

(৩) বণ্টন ও নিয়ন্ত্রণ: মুহাম্মদ অভিযানের নির্দেশদাতা ও বণ্টনের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ ছিলেন। বন্দি মানুষের ভাগ্য, মুক্তিপণের পরিমাণ, গণিমতের অংশ, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষ বরাদ্দ এবং সেনাবাহিনীর অস্ত্র-ঘোড়ার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত এই কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের মধ্যে পড়ত। সহিহ বুখারীর “আমি বণ্টনকারী” বক্তব্য ওই ব্যবস্থারই সংক্ষিপ্ত প্রকাশ। [13]

এই তিনটি ব্যবস্থা একত্রে যুদ্ধ-অভিযাননির্ভর একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি তৈরি করেছিল। পশুসম্পদ ও রৌপ্য এককালীন বণ্টিত হলেও ভূসম্পত্তি ও খেজুরবাগানের উৎপাদন থেকে দীর্ঘকাল সম্পদ আসতে পারত। খুমুস ছিল বণ্টনযোগ্য সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ; ফাইয়ের ওপর অধিকারের কাঠামো ছিল পৃথক। ফলে মুহাম্মদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি শুধু কোনো একটি ব্যক্তিগত অংশের অঙ্ক নয়: তার অধীনে সম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিচালনা এবং নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টনের রাজনৈতিক অধিকারও ছিল।


‘সাফি’: গণিমত বণ্টনের আগে মুহাম্মদের জন্য বিশেষ সম্পদ নির্বাচন

যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওপর মুহাম্মদের অধিকার বর্ণনা করতে খুমুসের পাশাপাশি “সাফি” নামের বিশেষ নির্বাচিত অংশের বিধানও প্রাসঙ্গিক। ইবনে কুদামা আল-মুগনি-তে সাফিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন গণিমত বণ্টনের আগে মুহাম্মদের বেছে নেওয়া কোনো বস্তু হিসেবে; উদাহরণে তিনি দাসী, পুরুষ দাস, পোশাক ও তরবারি উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় সাফিয়্যাকে সাফির অন্তর্ভুক্ত বলে আয়েশার বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। এই বিধান মানুষ ও বস্তুকে একই নির্বাচিত সম্পদের তালিকায় স্থান দেয়। এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফল ছিল, সাধারণ বণ্টনের আগে নির্দিষ্ট সম্পদ এবং বন্দি মানুষের ওপর মুহাম্মদের বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠা। ইবনে কুদামা বিধানটির পক্ষে-বিপক্ষে উল্লেখিত দলিল এবং মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে তার ধারাবাহিকতা নিয়ে মতভেদও নথিবদ্ধ করেছেন। [43]

وكان لرسول الله صلى الله عليه وسلم من المغنم الصفي، وهو شيء يختاره من المغنم قبل القسمة، كالجارية والعبد والثوب والسيف ونحوه. وهذا قول محمد بن سيرين، والشعبي، وقتادة، وغيرهم من أهل العلم. وقال أكثرهم: إن ذلك انقطع بموت النبي صلى الله عليه وسلم. قال أحمد: الصفي إنما كان للنبي صلى الله عليه وسلم خاصة، لم يبق بعده. ولا نعلم مخالفا لهذا إلا أبا ثور، فإنه قال: إن كان الصفي ثابتا للنبي صلى الله عليه وسلم فللإمام أن يأخذه على نحو ما كان يأخذه النبي صلى الله عليه وسلم ويجعله مجعل سهم النبي من خمس الخمس. فجمع بين الشك فيه في حياة النبي صلى الله عليه وسلم ومخالفة الإجماع في إبقائه بعد موته. قال ابن المنذر: لا أعلم أحدا سبق أبا ثور إلى هذا القول وقد أنكر قوم كون الصفي للنبي صلى الله عليه وسلم واحتجوا بما روى عمرو بن شعيب، عن أبيه، عن جده، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم رفع وبرة من ظهر بعيره، فقال: «ما يحل لي مما أفاء الله عليكم ولا مثل هذه، إلا الخمس»، وهو مردود عليكم رواه سعيد. ورواه أبو داود، بإسناده عن أبي أمامة، عن النبي صلى الله عليه وسلم. ولأن الله تعالى قال: «واعلموا أنما غنمتم من شيء فأن لله خمسه». فمفهومه أن باقيها للغانمين. ولنا، ما روى أبو داود، بإسناده، أن النبي صلى الله عليه وسلم كتب إلى بني زهير بن أقيش: «إنكم إن شهدتم أن لا إله إلا الله، وأن محمدا رسول الله، وأديتم الزكاة، وأديتم الخمس من المغنم، وسهم الصفي، إنكم آمنون بأمان الله ورسوله». وفي حديث وفد عبد القيس، الذي رواه ابن عباس: «وأن يعطوا سهم النبي صلى الله عليه وسلم والصفي». وقالت عائشة: كانت صفية من الصفي. رواه أبو داود. وأما انقطاعه بعد النبي صلى الله عليه وسلم فثابت بإجماع الأمة قبل أبي ثور وبعده عليه، وكون أبي بكر وعمر وعثمان ومن بعدهم لم يأخذوه، ولا ذكره أحد منهم، ولا يجمعون على ترك سنة النبي صلى الله عليه وسلم.

বাংলা অনুবাদ: রাসুলুল্লাহর জন্য গণিমতের মধ্যে সাফি ছিল। এটি এমন কোনো সম্পদ, যা তিনি বণ্টনের আগে গণিমত থেকে বেছে নিতেন; যেমন দাসী, পুরুষ দাস, পোশাক, তরবারি বা অনুরূপ কিছু। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন, শাবি, কাতাদা ও অন্য আলেমদের বক্তব্যও এটি। তাদের অধিকাংশ বলেছেন, নবীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই অধিকার শেষ হয়েছে। আহমদ বলেন: সাফি শুধু নবীর জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত ছিল; তার পরে তা অবশিষ্ট থাকেনি। আবু সাওর ছাড়া এ বিষয়ে কারও ভিন্নমত আমাদের জানা নেই। তিনি বলেছেন: নবীর জন্য সাফির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে ইমামও নবী যেভাবে নিতেন সেভাবে তা নিতে পারেন এবং খুমুসের এক-পঞ্চমাংশে নবীর অংশ যে খাতে রাখা হয়, সেই খাতে রাখতে পারেন। এভাবে তিনি নবীর জীবদ্দশায় এই অধিকারের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় এবং তার মৃত্যুর পরে তা বহাল রেখে ঐকমত্যের বিরোধিতা—দুটোকে একত্র করেছেন। ইবনুল মুনযির বলেন: আবু সাওরের আগে কেউ এই বক্তব্য দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কিছু লোক নবীর জন্য সাফির অধিকার অস্বীকার করেছেন। তারা আমর ইবনে শুআইবের বর্ণনাকে দলিল হিসেবে নিয়েছেন; তিনি তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ নিজের উটের পিঠ থেকে একগাছি পশম তুলে বলেন: “আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন, তার মধ্যে এই পরিমাণও আমার জন্য বৈধ নয়, খুমুস ছাড়া”; আর সেটিও তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সাঈদ এটি বর্ণনা করেছেন। আবু দাউদও নিজ সনদে আবু উমামার সূত্রে নবী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তারা আরও দলিল দেন যে, আল্লাহ বলেছেন: “জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু গণিমত লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য।” এর তাৎপর্য হলো, অবশিষ্ট অংশ গণিমত অর্জনকারীদের। আমাদের পক্ষে দলিল হলো আবু দাউদের নিজ সনদে বর্ণিত সেই পত্র, যা নবী বনু যুহাইর ইবনে উকাইশকে লিখেছিলেন: “তোমরা যদি সাক্ষ্য দাও যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, যাকাত প্রদান করো এবং গণিমতের খুমুস ও সাফির অংশ আদায় করো, তাহলে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের নিরাপত্তায় নিরাপদ।” ইবনে আব্বাসের বর্ণিত আবদুল কায়েসের প্রতিনিধিদলের হাদিসেও রয়েছে: “তারা নবীর অংশ ও সাফি প্রদান করবে।” আয়েশা বলেছেন: সাফিয়্যা সাফির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন। আর নবীর পরে এই অধিকার শেষ হওয়ার বিষয়টি আবু সাওরের আগে ও পরে উম্মতের ঐকমত্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত; আবু বকর, উমর, উসমান এবং তাদের পরবর্তী শাসকেরা এটি গ্রহণ করেননি, তাদের কেউ এর উল্লেখও করেননি। নবীর কোনো সুন্নত ত্যাগ করার ব্যাপারে তারা সবাই একমত হতে পারেন না।

গনিমত, ফাই, খুমুস: আয়ের ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ মডেল
মদিনা পর্বে সম্পদের উৎসকে তিন ভাগে দেখানো হয়েছে—যুদ্ধের গনিমত, যুদ্ধ ছাড়াই ফাই, এবং কেন্দ্রীয় বণ্টন-ক্ষমতা। এগুলো মিলিয়ে “সম্পদ প্রবাহ → কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান → বণ্টন” কাঠামো দাঁড়ায়।
গনিমত ফাই বণ্টন ক্ষমতা
(১) গনিমত — যুদ্ধলব্ধ সম্পদ
উৎস: সামরিক সংঘর্ষ/যুদ্ধ

আনফাল ৮:১ ও ৮:৪১-এর কাঠামোতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সিদ্ধান্ত ও বণ্টন “আল্লাহ/রসূলের অধীন” দেখানো হয়, এবং বণ্টনে খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) নির্ধারিত।

আনফাল ৮:১ আনফাল ৮:৪১ খুমুস
(২) ফাই — যুদ্ধ ছাড়াই অর্জিত সম্পদ
উৎস: সরাসরি সংঘর্ষ ছাড়াই অধিগ্রহণ

হাশর অধ্যায়ের ৫৯:৬–৭-এ “ঘোড়া/উট দৌড়াতে হয়নি”—এভাবে বোঝানো হয় যে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই সম্পদ এসেছে; তবুও তা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বে আসে এবং নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়ের নির্দেশনা থাকে।

কোরআন ৫৯:৬–৭ ফাই বণ্টন খাত
(৩) প্রশাসনিক বণ্টন-ক্ষমতা
উৎস: কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও তত্ত্বাবধান

সহীহ বুখারী ৩১১৭-এ “আমি দানও করি না, বঞ্চিতও করি না; আমি তো বণ্টনকারী”—এই বক্তব্য কার্যত “সম্পদ আসে → কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান হয় → তারপর বণ্টন”—ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোর ভাষ্য।

সহীহ বুখারী ৩১১৭ কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান বণ্টন কর্তৃত্ব
নেতৃত্ব-কেন্দ্র: বণ্টনের কর্তৃত্ব
নিয়ম/নীতিমালা নির্ধারণ
“প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি” কীভাবে দাঁড়ায়
সম্পদের বড় অংশ যুদ্ধ/রাজনৈতিক আধিপত্য-সম্পর্কিত ঘটনা থেকে আসে, এরপর নেতৃত্ব-কেন্দ্র বণ্টনের নীতি ও নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে। সম্পদ অধিগ্রহণ এবং তা পরিবার, যোদ্ধা ও প্রশাসনিক খাতে বণ্টনের ক্ষমতা একই নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।
অধিগৃহীত সম্পদের বণ্টন
  • অধিগৃহীত সম্পদ কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বে আসে
  • নীতিমালা অনুযায়ী খাতভিত্তিক ব্যয়
  • পরিবার, বাহিনী ও নির্ধারিত শ্রেণিতে বরাদ্দ
অধিগ্রহণের সামরিক উৎস
  • সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস যুদ্ধ ও রাজনৈতিক আধিপত্য
  • বণ্টনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কেন্দ্রীভূত
  • অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হয়

গণিমতের অর্থনৈতিক কাঠামো: অভিযান ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে সম্পদ আসে; কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেই সম্পদের অংশ, ব্যবহার এবং প্রাপকদের নির্ধারণ করে।

অধিগ্রহণ → কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ → বণ্টন আনফাল ৮:১ আনফাল ৮:৪১ হাশর ৫৯:৬–৭ বুখারী ৩১১৭

“পারিশ্রমিক চাই না” ঘোষণা এবং সম্পদের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব

কোরআন ৬:৯০-এ ধর্মীয় বার্তা প্রচারের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দাবি না করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মদিনা-পর্বে একই নেতৃত্বের অধীনে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বণ্টিত সম্পদ এবং ফাইয়ের বিশেষ ব্যবস্থা চালু হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় বার্তা প্রচারকে ব্যক্তিগত মজুরিবিহীন কাজ হিসেবে বর্ণনা করলেও সেই ধর্মীয় নেতৃত্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের বৃহৎ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা কোরআনের বিধান এবং মাগাযি-সাহিত্যের পরিমাণগত তথ্যেই প্রতিফলিত। [6] [8]

ধর্মপ্রচারের পারিশ্রমিক ও যুদ্ধবিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ আইনগতভাবে একই নামে চিহ্নিত না হলেও উভয়ের সামাজিক ফলকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। মদিনায় নবুয়ত ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল; সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত, ধর্মীয় অনুমোদন, বন্দি ও সম্পদের বণ্টন এবং সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ নিজের পরিবার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাজে লাগানোর ক্ষমতাও একই কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হতো। সুতরাং “পারিশ্রমিক চাই না” ঘোষণা যুদ্ধনির্ভর সম্পদপ্রবাহের অস্তিত্ব বা অর্থনৈতিক গুরুত্ব খণ্ডন করে না।


উপসংহার: রাখাল ও বাণিজ্যকর্মী থেকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের নিয়ন্ত্রক

মুহাম্মদের মক্কা ও মদিনা-জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্তির মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। মক্কায় রাখালি, বাণিজ্যকাজ ও খাদিজার সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবিকা; মদিনায় সামরিক অভিযান, কাফেলা দখল, পশুসম্পদ ও রৌপ্য সংগ্রহ, বন্দিদের মুক্তিপণ, ভূসম্পত্তি, খেজুরবাগান এবং এগুলোর বণ্টনের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। বদর থেকে হুনাইন পর্যন্ত নির্বাচিত কয়েকটি অভিযানের সংখ্যাগত বিবরণই হাজার হাজার উট ও ভেড়া-ছাগল এবং বিপুল রৌপ্য অর্জনের সাক্ষ্য দেয়। বনু নাদির, খায়বার ও ফদকের ভূসম্পত্তি-ভিত্তিক সম্পদপ্রবাহ এই হিসাবকে আরও প্রসারিত করে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সামরিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের সংযোগ। মুহাম্মদ শুধু অন্যের দানগ্রহীতা ছিলেন না; তিনি অভিযান অনুমোদন, সম্পদ সংগ্রহ, খুমুস পৃথক করা, ভূমি নিয়ন্ত্রণ এবং গণিমত বণ্টনের সিদ্ধান্তদাতা ছিলেন। বর্তমান বাজারদর দিয়ে কেবল পরিমাণ জানা পশু ও রৌপ্যের যে তুলনামূলক মূল্য নির্ণয় করা যায়, সেটিই বহু শত কোটি বাংলাদেশি টাকার সমান। জমি, অস্ত্র, অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্য ও নিয়মিত কৃষি উৎপাদনের সম্পূর্ণ মূল্য এই অঙ্কের বাইরে। এভাবেই মক্কার ব্যক্তিগত উপার্জন থেকে মদিনার যুদ্ধ, সম্পদ অধিগ্রহণ ও বণ্টননির্ভর রাজনৈতিক অর্থনীতিতে মুহাম্মদের অবস্থান রূপান্তরিত হয়েছিল।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহিহ বুখারী ২২৬২ ↩︎
  2. কোরআন ৯৩:৮ ↩︎
  3. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, খাদিজার বাণিজ্যে সিরিয়া যাত্রা; Islamweb ↩︎
  4. একই গ্রন্থ, আস-সাক্কা প্রমুখের সম্পাদনা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৭; Shamela ↩︎
  5. ধারাবাহিক পাঠ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮; Shamela ↩︎
  6. কোরআন ৬:৯০ 1 2
  7. কোরআন ৮:১ ↩︎
  8. কোরআন ৮:৪১ 1 2
  9. হাদীস সম্ভার ১৯০০ ↩︎
  10. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, ‘বর্শা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে’ অধ্যায়; Islamweb ↩︎
  11. IslamQA, উত্তর ১২৮১২১: মুহাম্মদ কীভাবে জীবিকা অর্জন করতেন ↩︎
  12. সহিহ বুখারী ২৮১৮ ↩︎
  13. সহিহ বুখারী ৩১১৭ 1 2
  14. কোরআন ৫৯:৬–৭ 1 2
  15. হালাবি, আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ, বদর যুদ্ধ ↩︎
  16. আস-সালিহি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, বদরের বন্দিদের মুক্তিপণ ↩︎
  17. আস-সালিহি, কারাদাহে কাফেলা দখল ও খুমুস ↩︎
  18. সহিহ বুখারী, বনু নাদিরের ফাইয়ের ব্যবহার ↩︎
  19. আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ, বনু কুরায়জার সম্পদ দখল ↩︎
  20. কোরআন ৩৩:২৬–২৭ ↩︎
  21. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, আস-সাক্কা প্রমুখের সম্পাদনা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৪: বনু কুরায়জার সম্পদ বণ্টন; Shamela ↩︎
  22. একই গ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৫: বন্দি দিয়ে ঘোড়া-অস্ত্র কেনা ও রায়হানা; Shamela ↩︎
  23. সম্পদ বণ্টন ও বন্দিদের নজদে পাঠানোর একই বিবরণ; Islamweb ↩︎
  24. ইবনে সাইয়্যিদিন্নাস, উয়ুনুল আসার, বনু মুস্তালিক ↩︎
  25. বায়হাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, খায়বারের সম্পদ বণ্টন ↩︎
  26. ইবনে সাইয়্যিদিন্নাস, উয়ুনুল আসার, খায়বারের বণ্টন ↩︎
  27. সহিহ মুসলিম ১৫৫১, কিতাবুল মুসাকাত, ফল ও শস্যের অংশের বিনিময়ে চাষাবাদ অধ্যায়; Islamweb ↩︎
  28. সহিহ মুসলিম ১৫৫১বি, একই পূর্ণ বর্ণনা; Sunnah.com ↩︎
  29. বদরুদ্দিন আইনি, উমদাতুল কারি, ফদকের সম্পত্তি ↩︎
  30. ইবনে সাইয়্যিদিন্নাস, উয়ুনুল আসার, আবু কাতাদার অভিযান ↩︎
  31. আবু কাতাদার অভিযান সম্পর্কে বিকল্প মাগাযি-বর্ণনা ↩︎
  32. আস-সালিহি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, হুনাইনের গণিমত ↩︎
  33. সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ৮ম খণ্ড, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪১১ ↩︎
  34. ইবনুল জাওজি, আল-মুনতাজাম, হুনাইনের বণ্টন ↩︎
  35. সহিহ মুসলিম ১০৫৯এ, কিতাবুয যাকাত, ইসলাম গ্রহণে আকৃষ্ট করার জন্য সম্পদ দেওয়া এবং দৃঢ় বিশ্বাসীদের ধৈর্য ধারণ অধ্যায়; Sunnah.com ↩︎
  36. বদরুদ্দিন আইনি, উমদাতুল কারি, হাওয়াজিনের বন্দিদের প্রত্যর্পণ ↩︎
  37. সৌদি সংবাদ সংস্থা, সাধারণ উটের নিলামমূল্য, ডিসেম্বর ২০২৫ ↩︎
  38. রিয়াদের পশুবাজার, ২০২৬ সালের তুলনামূলক মূল্যতথ্য ↩︎
  39. সৌদি গবাদিপশুর মার্চ ২০২৬ গড় মূল্য ↩︎
  40. কিটকো, ৮ অক্টোবর ২০২৬ রৌপ্যের বাজারমূল্য ↩︎
  41. সৌদি রিয়াল–বাংলাদেশি টাকা, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ↩︎
  42. মার্কিন ডলার–বাংলাদেশি টাকা, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ↩︎
  43. ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৬, অনুচ্ছেদ ৫০৮১: গণিমতে রাসুলের সাফি; Islamweb ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.