ভূমিকা: জন্মের ওপর আরোপিত কলঙ্ক, আইনি বঞ্চনা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন
মানুষের জন্মপরিচয় তাঁর নিজের নির্বাচন নয়। কোনো শিশু কার গর্ভে, কোন সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে কিংবা কোন আইনি স্বীকৃতির বাইরে জন্মাবে, সে বিষয়ে তার কোনো সিদ্ধান্ত থাকে না। অথচ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ফলে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিকে ইসলামি হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রের বিভিন্ন বর্ণনা ও বিধানে একটি পৃথক শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। তাঁকে কখনো ‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ বলা হয়েছে, কখনো জন্মের উৎস থেকেই মন্দ চরিত্রের সম্ভাবনা আরোপ করা হয়েছে, কখনো তাঁর জন্মদাতা পিতার বংশপরিচয়, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি কিছু ফকিহ তাঁর ধর্মীয় নেতৃত্ব ও বিচারিক সাক্ষ্যের যোগ্যতা নির্ধারণেও জন্মপরিচয়কে বিবেচনায় এনেছেন। এসব বিধানের শিকার ব্যক্তি কোনো যৌন অপরাধে অংশ নেননি; তাঁর অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে অন্য দুজন মানুষের সম্পর্কের ইতিহাস।
এই বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সামাজিক কলঙ্ক ও আইনি বঞ্চনা পরস্পরকে শক্তিশালী করে। শিশুকে ‘জারজ’ বা ‘ওলাদুজ জিনা’ বলে আলাদা করা হয়, তারপর সেই শ্রেণিবিভাগের ভিত্তিতে পিতৃত্ব, সম্পত্তি, ভরণপোষণ, বিবাহের অভিভাবকত্ব এবং পারিবারিক সম্পর্কের বিধান বদলে দেওয়া হয়। জন্মদাতা পুরুষ সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার করলেও প্রচলিত ফিকহে তা পিতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে পিতার যৌন সম্পর্কের সিদ্ধান্তের আর্থিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হয় শিশুকে এবং অনেক ক্ষেত্রে মাকে। এটি ব্যক্তির কাজের বিচারের নীতি নয়; জন্মপরিস্থিতিকে আইনি পরিণতির ভিত্তিতে পরিণত করার ব্যবস্থা।
এই বিধানগুলো বিচার করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের Universal Declaration of Human Rights-এর ২৫(২) অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ: সেখানে বিবাহের ভেতরে অথবা বাইরে জন্ম নেওয়া সব শিশুর সমান সামাজিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। Convention on the Rights of the Child-এর ২ নম্বর অনুচ্ছেদে পিতামাতার অবস্থান বা কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে শিশুর প্রতি বৈষম্য নিষিদ্ধ; ৭ ও ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কের অধিকার, আর ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুর জীবনযাত্রা ও পিতামাতার দায়িত্বের কথা রয়েছে। ধর্মীয় বিধানের নামে জন্মপরিচয় থেকে একটি শিশুর আর্থিক ও সামাজিক অধিকার কমিয়ে দেওয়ার যে উদাহরণগুলো নিচে রয়েছে, সেগুলো এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। [1] [2]
কোরআনের তাফসির, সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হাদিস, ধ্রুপদি ফিকহ এবং বর্তমান যুগের ইসলামি ফতোয়ার নির্দিষ্ট বক্তব্যগুলো একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: কোনো মানুষকে তাঁর জন্মদাতা পিতামাতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে সামাজিকভাবে হেয় করা, পিতৃসম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা বা ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত গণ্য করার নৈতিক ভিত্তি কী? জন্মগত শ্রেণিবিভাজনকে সমর্থনকারী নথিগুলো একইসঙ্গে দেখায়, ইসলামি উৎসের অভ্যন্তরেই এই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রচলিত হয়েছে।
‘জারজ সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’: মানুষের জন্মগত অবমাননা
সুনান আবু দাউদ ৩৯৬৩ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রার সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষিত আছে: «وَلَدُ الزِّنَا شَرُّ الثَّلَاثَةِ»—অর্থাৎ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্তান তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে মন্দ। এখানে তিনজন বলতে সেই সম্পর্কের নারী, পুরুষ এবং তাঁদের সন্তানকে বোঝানো হয়। একই বর্ণনায় আবু হুরায়রা আরও বলেছেন, এমন একজন দাসসন্তানকে মুক্ত করার তুলনায় আল্লাহর পথে একটি চাবুক দেওয়াই তাঁর কাছে বেশি প্রিয়। এখানে মুহাম্মদের বক্তব্য ও আবু হুরায়রার নিজস্ব মন্তব্য পৃথক হলেও উভয়ের সামাজিক তাৎপর্য এক: শিশুর পরিচয়কে অবমাননার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আলবানির মূল্যায়নে হাদিসটি সহিহ হিসেবে তালিকাভুক্ত। [3]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৪/ দাসত্বমুক্তি
পরিচ্ছেদঃ ১২. জারজ সন্তান মুক্ত করা
৩৯৬৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জারজ সন্তান তিনটি মন্দের অন্যতম। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর পথে চাবুক দ্বারা উপকৃত হওয়া আমার নিকট জারজ সন্তান আযাদ করার চেয়ে বেশী প্রিয়।
সহীহ।
আহমাদ, বায়হাক্বী, হাকিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হলো, শিশুর কোনো স্বাধীন কাজ বা অপরাধ শনাক্ত না করেই তাকে জন্মের সূত্র ধরে মন্দের তুলনামূলক শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে। পিতামাতার ব্যক্তিগত যৌন সম্পর্ককে ধর্মীয়ভাবে অপরাধ মনে করা হলে সেই মতের নৈতিক বিচার পিতামাতার আচরণের ওপরই প্রযোজ্য হতে পারে; গর্ভধারণ বা জন্ম নেওয়ার জন্য শিশুকে মন্দ ঘোষণা করার কোনো যুক্তি নেই। ‘সবচেয়ে মন্দ’ তকমাটি শিশুর প্রতি অন্য মানুষের আচরণ বদলানোর ক্ষমতা রাখে—তার সঙ্গে বন্ধুত্ব, বিবাহ, সামাজিক মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক সম্মান নিয়ে অবজ্ঞাকে বৈধতা দিতে পারে। হাদিসটি দাসমুক্তির প্রসঙ্গে বর্ণিত হওয়ায় আরও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়: একজন নিরপরাধ দাসকে মুক্ত করার মানবিক মূল্যও কি তাঁর জন্মপরিচয় অনুসারে কমে যাবে?
সিনদির ব্যাখ্যা: ‘অপবিত্র বীর্য’ থেকে মন্দ চরিত্রের জন্ম
মুহাম্মদের বলা এই বাক্যের যে ব্যাখ্যা পরবর্তী ভাষ্যকারেরা দিয়েছেন, তার কয়েকটি আরও ভয়াবহ। ইমাম আহমদের মুসনাদ-এর ভাষ্যকার মুহাম্মদ ইবনে আবদুল হাদি সিনদি লিখেছেন, সন্তানের মধ্যে পিতামাতার যৌন সম্পর্কের অপরাধের বৃহত্তর অংশ আরোপ করাই উদ্দেশ্য নয়; বরং ‘অপবিত্র বীর্য’ থেকে জন্মানোর ফলে সন্তান সাধারণত ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত মন্দ স্বভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে—এই ধারণা দিয়ে তাকে পিতামাতার চেয়ে নিকৃষ্ট বলা হচ্ছে। অর্থাৎ জন্মের আইনি ও নৈতিক শ্রেণিকে মানুষের ভবিষ্যৎ চরিত্রের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে [4]
مسند أحمد
8037 3978 – (8098) – (2 \ 311) عن أبي هريرة، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “ولد الزنى شر الثلاثة”.
الشرح
* قوله: “شر الثلاثة”: الذين هم: الزانيان، والولد، وليس المراد أنه أوفر نصيبا من ذنب زنى الوالدين، بل المراد أنه بكونه من الماء الخبيث، ينبت خبيثا من صغره إلى كبره عادة، فيكون شرا من والديه بأعماله. وقيل: إنما جاء في رجل بعينه كان مأسوما بالشر، وقد جاء هذا التأويل في “المستدرك” عن عائشة. وقيل: إنما هو من والديه؛ لأن الحد قد يقام عليهما، فتكون العقوبة تمحيصا لهما، وهذا في علم الله، لا يدري ما يصنع به، وما يفعل بذنوبه.
وقيل: كان أبو ولد الزنا يكثر أن يمر بالنبي صلى الله عليه وسلم، فيقولون: هو رجل سوء يا رسول الله، فيقول صلى الله عليه وسلم: “هو شر الثلاثة”؛ يعني: الأب، فحول الناس الولد شر الثلاثة.
[ص: 439] قال الخطابي: هذا التأويل أمر مظنون لا يدرى صحته.
وقيل: إنه شر الثلاثة أصلا وعنصرا ونسبا ومولدا، وذلك لأنه خلق من ماء خبيث، وقد روي عن بعض الصحابة والتابعين: “ولد الزنى ذرء لجهنم”، والله تعالى أعلم.
বাংলা অনুবাদ:
মুসনাদে আহমদ
হাদিস ৮০৯৮ (২/৩১১)। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মদ বলেছেন: ‘ব্যভিচারজাত সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট।’
সিনদির ব্যাখ্যা:
‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’—এখানে তিনজন বলতে বোঝানো হয়েছে ব্যভিচারে লিপ্ত নারী ও পুরুষ এবং তাদের সন্তানকে। এর অর্থ এই নয় যে সন্তানটি তার পিতামাতার ব্যভিচারের পাপের বেশি অংশ বহন করে। বরং এর অর্থ হলো, সে অপবিত্র বীর্য থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সাধারণত শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত মন্দ স্বভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে। ফলে নিজের কাজকর্মের মাধ্যমে সে তার পিতামাতার চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়।
আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই বক্তব্যটি নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির সম্পর্কে বলা হয়েছিল, যে মন্দের দ্বারা চিহ্নিত ছিল। আয়েশার সূত্রে আল-মুসতাদরাক গ্রন্থেও এই ব্যাখ্যা এসেছে।
অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সন্তানটি তার পিতামাতার তুলনায় নিকৃষ্ট। কারণ পিতামাতার ওপর ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা হতে পারে এবং সেই শাস্তি তাদের পাপমোচনের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু সন্তানটির পরিণতি আল্লাহর জ্ঞানের বিষয়। তার সঙ্গে কী করা হবে এবং তার পাপের কী পরিণতি হবে, তা জানা যায় না।
আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ব্যভিচারজাত সন্তানের পিতা প্রায়ই মুহাম্মদের সামনে দিয়ে যাতায়াত করত। লোকেরা বলত, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এই লোকটি একজন মন্দ ব্যক্তি।’ তখন মুহাম্মদ বলতেন, ‘সে তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট।’ এখানে পিতাকেই বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু লোকেরা পরে কথাটির অর্থ পরিবর্তন করে সন্তানকেই তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট বলে প্রচার করে।
পৃষ্ঠা ৪৩৯: খাত্তাবি বলেছেন, এই ব্যাখ্যাটি অনুমাননির্ভর; এর সত্যতা জানা যায় না।
আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সে তার উৎস, উপাদান, বংশপরিচয় এবং জন্মের দিক থেকে তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট। কারণ তাকে অপবিত্র বীর্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কোনো কোনো সাহাবি ও তাবেঈর সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে: ‘ব্যভিচারজাত সন্তান জাহান্নামের জন্য সৃষ্ট।’ আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
এই ব্যাখ্যায় মানুষের আচরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষা, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা সামাজিক অবস্থার জায়গায় ‘অপবিত্র বীর্য’কে বসানো হয়েছে। কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নৈতিক চরিত্র নির্ধারণে তাঁর পিতামাতার বিবাহের শরিয়তি বৈধতার ভূমিকা রয়েছে—এমন কোনো বাস্তব প্রমাণ এখানে নেই। ‘অপবিত্র’ বিশেষণটি আসলে যৌন সম্পর্কের ওপর আরোপিত ধর্মীয় মূল্যায়ন; সেটিকে বীর্যের জৈবিক বৈশিষ্ট্য বানিয়ে সন্তানের ব্যক্তিত্বের ওপর চাপানো একটি ভিত্তিহীন অনুমান। একই ভাষ্যের অন্য একটি ব্যাখ্যায় শিশুকে উৎস, বংশ ও জন্মের দিক থেকেই ‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ বলা হয়েছে। ফলে এই সূত্রে জন্মগত কলঙ্কের ধারণাটি নিছক উপমা নয়; মানুষের পরিচয়ের ওপর সরাসরি মূল্যবিচার।
‘যানীম’: কোরআনের গালিতে পিতৃপরিচয় ও বিবাহবহির্ভূত জন্ম
সূরা আল-কলমের ১৩ নম্বর আয়াতে রয়েছে: «عُتُلٍّ بَعْدَ ذَٰلِكَ زَنِيمٍ»। শব্দটির একটি প্রাচীন তাফসিরি অর্থ হলো, যে ব্যক্তি কোনো গোত্রের সঙ্গে যুক্ত কিন্তু প্রকৃত বংশগতভাবে সেই গোত্রের নয়, অথবা যার পিতৃপরিচয় অনিশ্চিত। কোরআনের এই শব্দটি একটি ব্যক্তির নিন্দাসূচক বৈশিষ্ট্যগুলোর পরপর ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটির জন্মপরিচয়-সংক্রান্ত অর্থ ইসলামের বাইরের কোনো সমালোচক তৈরি করেননি; তাবারি, রাযিসহ ইসলামি তাফসিরকারদের গ্রন্থেই তা পাওয়া যায়। [5] [6]
وَالزَّنِيمُ فِي كَلَامِ الْعَرَبِ: الْمُلْصَقُ بِالْقَوْمِ وَلَيْسَ مِنْهُمْ؛ وَمِنْهُ قَوْلُ حَسَّانَ بْنِ ثَابِتٍ.
বাংলা অনুবাদ: আরবদের ভাষায় ‘যানীম’ হলো এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো গোত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, অথচ সে প্রকৃতপক্ষে তাদের একজন নয়। তাবারি এর সমর্থনে হাসসান ইবনে সাবিতের কবিতার দৃষ্টান্ত এনেছেন।
তাবারি ইবনে আব্বাস, ইকরিমা ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের সূত্রে এই জন্ম ও বংশ-সংযুক্তির অর্থকে আলোচনা করেছেন। রাযি আরও স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, ‘যানীম’ হলো বিবাহবহির্ভূত জন্মের ব্যক্তি, যাকে অন্য বংশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি একটি ব্যাখ্যায় এ-ও বলেছেন, নোংরা বা অপবিত্র বীর্য থেকে নোংরা সন্তান জন্মানোই সাধারণ নিয়ম। ‘মন্দ মানুষ’ বলার সঙ্গে জন্মের উৎসকে হেয় করার এই যোগসূত্র তাফসিরশাস্ত্রের ভেতরেই তৈরি হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় জন্মপরিচয় সরাসরি নৈতিক নিন্দার উপকরণ হয়ে উঠেছে।
وَلِأَنَّ الْغَالِبَ أَنَّ النُّطْفَةَ إِذَا خَبُثَتْ خَبُثَ الْوَلَدُ.
বাংলা অনুবাদ: কারণ সাধারণত বীর্য অপবিত্র হলে সন্তানও অপবিত্র হয়ে যায়—রাযির উল্লিখিত যুক্তি।
এখানে ধর্মীয় অবমাননার দুটি স্তর যুক্ত হয়েছে। প্রথমে একটি সম্পর্ককে সামাজিকভাবে অবৈধ গণ্য করা হয়েছে, তারপর সেই সম্পর্কের ফলে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির পরিচয়কে অন্য কাউকে গালি দেওয়ার উপাদান বানানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর নিজস্ব আচরণ নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেই আচরণেই সমালোচনা সীমিত থাকার কথা; কিন্তু ‘যানীম’কে বংশ ও জন্ম-পরিচয়ের তকমা হিসেবে ব্যবহার করলে একজন ব্যক্তির জন্মগত অবস্থাকেই ঘৃণার ভাষায় পরিণত করা হয়। এটি শুধু একজন নির্দিষ্ট শত্রুকে অপমান করে না, একই জন্মপরিস্থিতির অন্য মানুষদেরও সামাজিক অবমাননার অভিধানে ঢুকিয়ে দেয়। কোরআনের আক্রমণাত্মক ভাষা সম্পর্কে বিদ্যমান আলোচনার সঙ্গে এই উৎসগত ব্যাখ্যাটি সরাসরি সম্পর্কিত।
আবু হুরায়রার বক্তব্যের বিরুদ্ধে আয়েশার প্রতিবাদ: একই ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য
‘জারজ সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ বর্ণনাটিকে কেন্দ্র করে প্রাচীন ইসলামি গ্রন্থেই একটি বিরোধ পাওয়া যায়। হাকিমের আল-মুসতাদরাক এবং তাহাবির শরহু মুশকিলিল আসার-এ আয়েশার নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে আবু হুরায়রার সাধারণীকরণের আপত্তি আছে। আয়েশার মতে, ঘটনাটি ছিল এমন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে যিনি মুহাম্মদকে কষ্ট দিতেন; তাঁর জন্মপরিচয় উল্লেখ করার সঙ্গে ওই ব্যক্তির নিজস্ব মন্দ আচরণের সম্পর্ক ছিল। অথচ আবু হুরায়রার বর্ণিত সংক্ষিপ্ত বাক্যটি পড়লে সব বিবাহবহির্ভূত সন্তানকে মন্দ ঘোষণার অর্থ তৈরি হয়। [7] [8]
وَقَدْ رُوِيَ عَنْ عَائِشَةَ إِنْكَارُهَا ذَلِكَ عَلَيْهِ ، وَإِخْبَارُهَا أَنَّ النَّبِيَّ عَلَيْهِ السَّلَامُ إِنَّمَا كَانَ قَصَدَ بِذَلِكَ الْقَوْلِ إِلَى إِنْسَانٍ بِعَيْنِهِ.
বাংলা অনুবাদ: আয়েশার পক্ষ থেকে আবু হুরায়রার বক্তব্যের আপত্তি এবং মুহাম্মদ এই কথা কেবল বিশেষ একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন—এমন ব্যাখ্যা সংরক্ষিত আছে।
তাহাবি নিজেই বলেন, আবু হুরায়রার বাক্যটি সবার ওপর প্রয়োগ করলে নিরপরাধ সন্তানকে তাঁর পিতামাতার তুলনায় নিকৃষ্ট ঘোষণা করতে হয়, যদিও পিতামাতার যৌন সম্পর্কের কাজে সন্তানের কোনো অংশ ছিল না। তিনি কোরআনের ‘কেউ অন্যের পাপ বহন করবে না’ নীতিকে আলোচনায় এনে আয়েশার ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য দেখিয়েছেন। এই যৌক্তিক সমস্যাটি মুসলিম হাদিসব্যাখ্যাকার নিজেই হাদিসের সাধারণ অর্থের মধ্যে অন্যায় দেখেছেন।
এই বিরোধের পরও সিনদি ও অন্য ভাষ্যকারদের কাছে জন্মগত নিকৃষ্টতার ব্যাখ্যা সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে একই ঐতিহ্যের মধ্যে একটি পক্ষ জন্মের কারণে মানুষকে নিকৃষ্ট করার যুক্তি দিয়েছে, অন্য পক্ষ সেই সাধারণীকরণকে পিতামাতার অপরাধের দায় সন্তানের ওপর চাপানো বলে চিহ্নিত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে এ দুটি ব্যাখ্যার উপস্থিতি নিজেই দেখায়, সমস্যাটি হাদিসের শব্দ ও তার সামাজিক ব্যবহারের গভীরে ছিল।
জানাজায় বর্জন: নিরপরাধ জন্মপরিচয়কে পাপীর তালিকায় স্থান দেওয়া
একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা বা শেষকৃত্য সাধারণত তাঁর জীবদ্দশার সম্পর্ক ও সামাজিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। অথচ বাংলাদেশের সালাফি আলেম আসাদুল্লাহ আল-গালিবের ছালাতুর রাসূল গ্রন্থের ২১৬ পৃষ্ঠায় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পরহেযগার আলেমদের জন্য যেসব মানুষের জানাজা পড়ানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকায় ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, চোর-দস্যু, আত্মঘাতী ও অন্যদের পাশাপাশি ‘জারজ সন্তান’কেও রাখা হয়েছে। নিজে কোনো অপরাধ না করেও জন্মগত পরিচয়ের কারণে একটি মানুষকে অপরাধী ও পাপীদের সঙ্গে একই বর্জনের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় নেতৃত্বের এই প্রত্যাখ্যান মৃত ব্যক্তির ওপর কেবল একটি আচারগত সিদ্ধান্ত নয়; জীবিত মানুষদের কাছেও তাঁর সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট অবমাননাকর সংকেত। [9]
জানাযা বিষয়ে সতর্কতা:
মহাপাপী কোন মুসলিম যেমন কোন ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, চোর-দস্যু-সন্ত্রাসী, আত্মঘাতি, জারজ সন্তান, কবর ও মূর্তি পূজারী, মুশরিক ও বিদ’আতী যতক্ষণ না সে প্রকাশ্যে কুফরী ঘোষণা করে, আমানতের খেয়ানতকারী প্রভৃতি লোকদের জানাযা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পরহেযগার আলেমগণ পড়বেন না। তবে সাধারণ লোকেরা পড়বেন। ১০১৯
ঋণগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী ও বায়তুল মাল বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীর জানাযা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে পড়েননি, বরং অন্যকে পড়তে বলেন। ১০২০ ‘এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে অন্যকে আদব শিখানোর জন্য’। ১০২১
(১) খায়বার কিংবা হোনায়েন-এর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জনৈক সাথী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে। লোকেরা তার উচ্চ প্রশংসা করলে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ঐ ব্যক্তি জাহান্নামের অধিবাসী। তখন একজন গোপনে তার পিছু নিল। দেখা গেল যে, ঐ ব্যক্তি যুদ্ধের এক পর্যায়ে আহত হ’ল। অতঃপর
১০১৭. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৬৫৪-৫৫; নাসাঈ হা/১৯৮৯, ১৯৯১।
১০১৮. মুত্তাফাকু ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৯১৩, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়-১১, ‘দেউলিয়া হওয়া এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে অবকাশ দান’ অনুচ্ছেদ-৯।
১০১৯. বুলুগুল মারাম হা/৫৪২-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

এই তালিকার নৈতিক অসংগতি অত্যন্ত স্পষ্ট। ব্যভিচারী বা দস্যুর ক্ষেত্রে অন্তত তার নিজের কাজের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ‘জারজ সন্তান’ নামে চিহ্নিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর জন্ম ছাড়া কোনো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নেই। তারপরও তাঁকে একই অশোভন শ্রেণিবিভাগের মধ্যে ঢোকানো হয়েছে। কেউ এই সিদ্ধান্ত মানুক বা না-মানুক, এ ধরনের ধর্মীয় ফতোয়া জন্মপরিচয়কে সামাজিক বর্জনের গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা। মৃত্যুর পরেও সামাজিক মর্যাদা কে পাবে, সেই প্রশ্নে শিশুর জন্মের ইতিহাসকে আচারগত বৈষম্যের ভিত্তি বানানো নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চনা: জন্মদাতা পিতার সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার অস্বীকার
জন্মের কারণে বৈষম্য কেবল অপমানসূচক ভাষা বা জানাজার ক্ষেত্রে সীমিত থাকে না। ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্তানকে প্রচলিত সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহি বিধান অনুযায়ী জন্মদাতা পিতার বংশধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। এর প্রত্যক্ষ পরিণতি হলো পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার না পাওয়া। পিতার সঙ্গে জৈবিক সম্পর্ক থাকার তথ্য, সন্তানের প্রতি তাঁর স্নেহ, এমনকি পিতার স্বীকৃতিও প্রচলিত বিধানে যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে সন্তান তাঁর মায়ের সঙ্গে আইনগত বংশসম্পর্ক ও উত্তরাধিকার বজায় রাখে। একই জন্মের জন্য বাবা-মায়ের মধ্যে অধিকার ও দায়িত্বের বিভাজন তৈরি হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয় সন্তানটি।
জামে তিরমিজি ২১১৩ নম্বর হাদিসে মুক্ত নারী বা দাসীর সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের উত্তরাধিকার সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। বর্ণনাটির পরে তিরমিজি লিখেছেন, আলেমদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী এই সন্তান জন্মদাতা পিতার উত্তরাধিকারী হয় না। নিচে মূল বাংলা সংস্করণের সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিটি সংরক্ষিত হলো। [10]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
২৭/ ফারাইয
পরিচ্ছেদঃ ২১. জারজ সন্তান উত্তরাধীকারী নয়
২১১৩। আমর ইবনু শুআইব (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন লোক যদি কোন স্বাধীন স্ত্রীলোক অথবা দাসীর সাথে যিনায় (ব্যভিচারে) লিপ্ত হয় তাহলে (জন্মগ্রহণকারী) সন্তান জারজ সন্তান’ বলে গণ্য হবে। সে কারো উত্তরাধিকারী হবে না এবং তারও কেউ উত্তরাধিকারী হবে না।
সহীহ, মিশকাত, তাহকীক ছানী (৩০৫৪)।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি আমর ইবনু শুআইবের সূত্রে ইবনু লাহীআ ছাড়াও অন্য বর্ণনাকারীগণ বর্ণনা করেছেন। বিশেষজ্ঞ আলিমগণ এ হাদীস অনুসারে আমল করেছেন। ব্যভিচারজাত সন্তান তার জন্মদাতা পিতার উত্তরাধিকারী হবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
এই হাদিসে ‘সে কারো উত্তরাধিকারী নয়’ বলে বাংলা অনুবাদে যে আপাত-সাধারণ বাক্য রয়েছে, তিরমিজি নিজেই তার কার্যকর অর্থ স্পষ্ট করেছেন: জন্মদাতা পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার নেই। আলী ইবনে আবি তালিবের নামে সুনান আদ-দারেমিতে সংরক্ষিত সিদ্ধান্তেও মাতৃকুলের সঙ্গে সম্পত্তি ও রক্তপণের হিসাবের এক বিশেষ অসম সম্পর্কের বিবরণ পাওয়া যায়। এখানে মাতৃকুলীয় সম্পর্ক ও উত্তরাধিকার নির্ধারণের বিধানও জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে পৃথক হয়ে গেছে।
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
২১. উত্তরাধিকার অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ৪৫.জারয (যিনার) সন্তানের মীরাছ
৩১৫৪. যাইদ ইবনু ওয়াহাব হতে বর্ণিত, যিনার (জারজ) সন্তানের ব্যাপারে আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার মায়ের ওলী (অভিভাবক)-দেরকে বলেন, তোমরা তোমাদের পুত্রদেরকে গ্রহণ করো, তোমরা তার মীরাছ ও দিয়াতে অংশীদার হবে কিন্তু সে তোমাদের মীরাছে অংশ পাবে না।
তাহক্বীক্ব: এর সনদ সহীহ।
তাখরীজ : ইবনু আবী শাইবা ১১/৩৪৭ নং ১১৪০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহঃ)
জৈবিক পিতৃত্বের সুনিশ্চিত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সম্পত্তির অধিকারের জন্য বিবাহের বৈধতাকে অপরিহার্য শর্ত বানানোর নৈতিক যুক্তি দুর্বল। সন্তানকে জন্ম দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ জীবিকা ও সম্পত্তিগত নিরাপত্তার সম্পর্ক বাস্তব; বিবাহবহির্ভূত জন্ম তাঁর নিজের তৈরি পরিস্থিতি নয়। এ অবস্থায় সন্তানকে পিতার উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়ার অর্থ—পিতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিণতি সন্তানের সম্পত্তিগত অধিকারের ওপর চাপানো।
ইসলামওয়েবের ফতোয়া: পিতা স্বীকার করলেও উত্তরাধিকার নয়
ইসলামওয়েবের ১৯১১৭১ নম্বর ফতোয়ায় এমন একটি প্রশ্ন এসেছে, যেখানে জন্মদাতা পুরুষ শিশুটিকে নিজের বলে স্বীকার করেছিলেন। ফতোয়ার উত্তর ছিল, সন্তান তাঁর সম্পত্তি থেকে কিছুই পাবে না—এমনকি সন্তান অনুগত ও সদাচারী হলেও, পিতা তাঁকে স্বীকার করলেও এবং পরিবার ছেড়ে না গেলেও। অর্থাৎ অধিকার অস্বীকারের ভিত্তি সন্তানের কোনো দোষ বা পিতার অস্বীকৃতি নয়; একমাত্র জন্মের পূর্ববর্তী সম্পর্কের ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ। [11]
ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে বিবাহবহির্ভূত সন্তানের প্রতি বৈষম্যের একটি প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ইসলামওয়েবের ১৯১১৭১ নম্বর ফতোয়ায়। সেখানে এমন একজন সন্তানের উত্তরাধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যার জন্মদাতা পিতা তাকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু ইসলামওয়েবের সিদ্ধান্ত হলো, পিতা সন্তানকে স্বীকার করলেও, সন্তান পিতার প্রতি সদাচরণ করলেও এবং পিতার সঙ্গে বসবাস করলেও সে জন্মদাতা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না। ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, সন্তানের আইনগত বংশপরিচয় কেবল মা ও মাতৃকুলের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ সন্তানের ব্যক্তিগত আচরণ, পিতৃত্বের স্বীকৃতি কিংবা প্রকৃত জৈবিক সম্পর্ক নয়, বরং পিতামাতার যৌন সম্পর্কের শরিয়তসম্মত বৈধতাই তার পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার নির্ধারণ করছে। যে ব্যক্তি সন্তানের জন্মদানে অংশ নিয়েছেন, তাঁকে সন্তানের পৈতৃক উত্তরাধিকারের সম্পর্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে; আর সেই সম্পর্কের পরিণতি বহন করছে এমন একজন সন্তান, যার নিজের জন্মপরিস্থিতির ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। [12]
ولد الزنا لا يرث من أبيه
فتوى رقم: 191171
الأحد 5 محرم 1434 هـ – 18-11-2012 م
السؤال
رجل له ولد من الزنا ورمته أمه, والولد كان عاصيا جدًّا لوالده وترك المنزل, وبعد ذلك توفى الله الرجل, فهل هذا الولد يرث من أبيه؟ مع العلم أنه كان معترفًا به, وعنده بنت شرعية من امرأة أخرى.
أفيدونا لوجه الله, جزاكم الله خيرًا.
الإجابــة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فإن ولد الزنا لا يرث من أبيه الزاني، ولا يرث منه أبوه؛ فقد روى الترمذي وغيره أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَيُّمَا رَجُلٍ عَاهَرَ بِحُرَّةٍ أَوْ أَمَةٍ فَالْوَلَدُ وَلَدُ زِنَا لَا يَرِثُ وَلَا يُورَثُ” صححه الألباني, وقال الترمذي: “وَالْعَمَلُ عَلَى هَذَا عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنَّ وَلَدَ الزِّنَا لَا يَرِثُ مِنْ أَبِيهِ”؛ ولذلك فإن هذا الولد لا يرث من هذا الرجل شيئًا ولو كان بَرًّا طائعًا له ومعترفًا به ولم يترك المنزل, فإن ذلك كله لا تأثير له على الحكم؛ فالزنا مانع للإرث، وابنه إنما ينسب إلى أمه وأهلها، ونسبته لهم شرعية صحيحة، يثبت بها كل ما يترتب عليها من أحكام البنوة؛ قال صاحب الكفاف: “وابن اللعان والزنا في جانب الاُم كمن هو صحيح النسب”, ولا علاقة له بأبيه, وانظري الفتاوى: 6045 67670 53386.
والذي يرث هذا الرجل هو ورثته الشرعيون إن وجدوا؛ كل حسب نصيبه المقدر له في كتاب الله تعالى، وإذا لم يكن له ورثة شرعيون غير بنته المذكورة فإنها ترث ماله كله، نصفه بالفرض, والنصف الآخر بالرد.
والله أعلم.
বাংলা অনুবাদ:
ব্যভিচারজাত সন্তান তার পিতার উত্তরাধিকারী হয় না
ফতোয়া নম্বর: ১৯১১৭১
তারিখ: রবিবার, ৫ মুহাররম ১৪৩৪ হিজরি — ১৮ নভেম্বর ২০১২
প্রশ্ন:
এক ব্যক্তির বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ফলে একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। শিশুটির মা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। সন্তানটি তার পিতার প্রতি অত্যন্ত অবাধ্য ছিল এবং বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পরবর্তীতে লোকটি মারা যান। এখন প্রশ্ন হলো, এই সন্তান কি তার পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে? উল্লেখ্য, ওই ব্যক্তি সন্তানটিকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করেছিলেন এবং অন্য এক নারীর সঙ্গে বৈধ বিবাহ থেকে তাঁর একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে।
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদের বিষয়টি জানাবেন। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহর রাসুল, তাঁর পরিবার এবং সাহাবিদের ওপর শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক। অতঃপর:
ব্যভিচারজাত সন্তান তার ব্যভিচারী জন্মদাতা পিতার উত্তরাধিকারী হবে না এবং ওই পিতাও সন্তানের উত্তরাধিকারী হবেন না। কারণ তিরমিজি এবং অন্যরা বর্ণনা করেছেন যে, মুহাম্মদ বলেছেন: ‘কোনো ব্যক্তি যদি স্বাধীন নারী অথবা দাসীর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাহলে সেই সম্পর্ক থেকে জন্মগ্রহণকারী সন্তান ব্যভিচারজাত সন্তান হিসেবে গণ্য হবে। সে উত্তরাধিকারী হবে না এবং তার থেকেও উত্তরাধিকার পাওয়া যাবে না।’
আলবানি এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন। তিরমিজি বলেছেন: ‘আলেমদের মধ্যে এই হাদিস অনুসারেই আমল প্রচলিত রয়েছে যে, ব্যভিচারজাত সন্তান তার পিতার উত্তরাধিকারী হবে না।’
সুতরাং এই সন্তান ওই ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে কিছুই উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে না। এমনকি সে যদি পিতার প্রতি সদাচরণকারী ও অনুগত হতো, পিতা তাকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করতেন এবং সে বাড়ি ছেড়েও না যেত, তাহলেও বিধান একই থাকত। এসব বিষয়ের কোনোটিই এই বিধানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।
কারণ ব্যভিচার উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধক। এই সন্তানকে কেবল তার মা ও মাতৃকুলের সঙ্গে বংশগতভাবে যুক্ত করা হবে। মা ও মাতৃকুলের সঙ্গে তার বংশসম্পর্ক শরিয়তসম্মত ও বৈধ। সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে সন্তান হওয়ার কারণে যে সমস্ত আইনগত বিধান প্রযোজ্য, সেগুলো কার্যকর হবে।
আল-কাফাফ গ্রন্থের লেখক বলেছেন: ‘লিআনের মাধ্যমে পিতৃত্ব অস্বীকৃত সন্তান এবং ব্যভিচারজাত সন্তান মাতৃকুলের দিক থেকে বৈধ বংশসম্পর্কযুক্ত সন্তানের মতোই গণ্য হবে।’
আর তার জন্মদাতা পিতার সঙ্গে কোনো শরিয়তসম্মত বংশসম্পর্ক থাকবে না।
এ বিষয়ে আরও দেখুন ফতোয়া নম্বর: ৬০৪৫, ৬৭৬৭০ এবং ৫৩৩৮৬।
এই মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন তাঁর শরিয়তসম্মত উত্তরাধিকারীরা, যদি তাঁরা উপস্থিত থাকেন। প্রত্যেকে আল্লাহর কিতাবে নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী উত্তরাধিকার পাবেন। যদি প্রশ্নে উল্লিখিত কন্যা ছাড়া মৃত ব্যক্তির অন্য কোনো শরিয়তসম্মত উত্তরাধিকারী না থাকেন, তাহলে ওই কন্যাই তাঁর সমস্ত সম্পত্তি পাবে। অর্ধেক পাবে নির্ধারিত অংশ হিসেবে এবং বাকি অর্ধেক পাবে অবশিষ্ট সম্পত্তি প্রত্যাবর্তনের বিধান অনুযায়ী।
আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
এই ফতোয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, জন্মদাতা পুরুষের স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও সম্পর্কের আইনি অস্বীকৃতি। একজন পিতা মৃত্যুর আগে সন্তানের পরিচয় মেনে নিয়েছেন—অর্থাৎ বিষয়টি শুধু অজ্ঞাত ব্যক্তির পিতৃত্ব দাবির সমস্যা নয়। তবু উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে শিশু বাদ। ব্যক্তি বেঁচে থাকার সময় সন্তানের জীবনযাত্রায় সহায়তা না করলে কিংবা মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তিতে অন্য সন্তানেরা অংশ পেলে একই জৈবিক পিতার সন্তানদের মধ্যে কেবল জন্মের পদ্ধতির ভিত্তিতে সম্পত্তিগত বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
হাদিসের ‘সন্তান বৈবাহিক শয্যার’: পিতৃত্বের আইনগত পরিচয় বনাম জৈবিক সম্পর্ক
সহিহ বুখারি ৬৭৪৯-এ উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবদ ইবনে যামআর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পিতৃত্ববিরোধের বিবরণ রয়েছে। উতবা তাঁর ভাইয়ের কাছে একটি শিশুকে নিজের সন্তান বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু শিশু যামআর দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করায় মুহাম্মদ ‘সন্তান শয্যার অধিকারীর’ নীতি অনুসারে আইনগত সম্পর্ক যামআর পরিবারের পক্ষে নির্ধারণ করেন। বর্ণনায় শিশুর সঙ্গে উতবার সুস্পষ্ট শারীরিক সাদৃশ্যও স্বীকৃত হয়েছিল; মুহাম্মদ সেই সাদৃশ্য দেখে সাওদাকে শিশুটির সামনে পর্দা করার নির্দেশ দেন। [13]
هُوَ لَكَ يَا عَبْدُ بْنَ زَمْعَةَ، الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ
বাংলা অনুবাদ: শিশুটি তোমার, হে আবদ ইবনে যামআ। সন্তান শয্যার অধিকারীর, আর অবৈধ যৌন সম্পর্ককারীর জন্য বঞ্চনা।
এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়। সম্ভাব্য জৈবিক পিতৃত্বের দৃশ্যমান লক্ষণকে ব্যক্তিগত পর্দার বিধানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ আইনগত পিতৃত্ব নির্ধারণে সেই লক্ষণকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে পিতৃত্ব সম্পর্কে ধর্মীয় আইনি সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃত জৈবিক সম্পর্ক সর্বদা একই বিষয় নয়। আধুনিক বংশপরিচয় নির্ধারণে জৈবিক তথ্যের যে গুরুত্ব, জন্মের সামাজিক বৈধতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই বিধানে তা পাওয়া যায় না।
জন্মদাতা পিতা সন্তানকে স্বীকার করলেও বংশপরিচয় অস্বীকার: ফকিহদের পরস্পরবিরোধী বিধান
ইসলামকিউএ ১৯২১৩১ নম্বর বিস্তারিত ফতোয়ায় পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি মৌলিক মতভেদ নথিবদ্ধ হয়েছে। প্রচলিত চার মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান হলো, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্তানকে জন্মদাতা পুরুষ নিজের সন্তান বলে স্বীকার করলেও তাঁর বংশধারায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। বিপরীতে উরওয়া ইবনুজ যুবাইর, সুলাইমান ইবনে ইয়াসার, হাসান বসরি, ইবনে সিরিন, ইবরাহিম নাখায়ি ও ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহের নামে এমন মত সংরক্ষিত আছে যে, অন্য কোনো স্বীকৃত শয্যার দাবি না থাকলে জন্মদাতা পুরুষের স্বীকৃতির ভিত্তিতে পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িমও এই বিকল্প অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে উক্ত ফতোয়ায় আলোচনা রয়েছে। [14]
أَنَّ الْقَوْلَ بِالْمَنْعِ وَالْجَوَازِ قَوْلَانِ مُعْتَبَرَانِ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ، وَهَذِهِ الْمَسْأَلَةُ مِنْ مَسَائِلِ الِاجْتِهَادِ.
বাংলা অনুবাদ: পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া এবং নিষিদ্ধ করা—উভয় অবস্থানই আলেমদের কাছে স্বীকৃত মত; বিষয়টি তাঁদের ইজতিহাদি মতভেদের অন্তর্ভুক্ত।
এই মতভেদের সামাজিক তাৎপর্য গভীর। এক ব্যবস্থায় শিশু একই ব্যক্তির স্বীকৃত জৈবিক সন্তান হয়েও পিতার পরিচয় ও উত্তরাধিকার হারায়, অন্য ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্তে সেগুলো পেতে পারে। শিশুর বাস্তব জন্মপরিচয়, তাঁর জীবন ও প্রয়োজন বদলায় না; বদলায় বিধান নির্ধারণকারী ফকিহের নীতি। এমন বৈষম্যের ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, জন্মদাতা পিতা নিজ দায়িত্ব স্বীকার করলে শিশুকে বঞ্চিত করার স্বতন্ত্র মানবিক প্রয়োজন কোথায়? ধর্মীয় মতভেদই দেখায়, শিশুর ওপর এই ক্ষতিকর ফল চাপানো অপরিহার্য কোনো জৈবিক নিয়ম নয়।
ইসলামকিউএর একই দীর্ঘ আলোচনায় বিকল্প পিতৃত্ব-স্বীকৃতির পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিগুলোর মধ্যে সন্তানের প্রতি অন্যায়, সমাজে অনাথসদৃশ অবস্থান তৈরি এবং পিতামাতার সম্পর্কের কারণে শিশুকে শাস্তি দেওয়ার সমস্যাও স্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ফিকহি মতভেদের ভেতরেই এই বঞ্চনার নৈতিক ক্ষতির স্বীকৃতি রয়েছে। যদি সন্তানের স্বার্থরক্ষায় জন্মদাতা পিতাকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ পাওয়া যায়, তাহলে কেবল জন্মের আইনি তকমার কারণে সেই সম্পর্ক অস্বীকার করা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
জন্মদাতা পিতার ভরণপোষণ থেকে মুক্তি: মায়ের ওপর একতরফা আর্থিক দায়
উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চনার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা শিশুর খাদ্য, পোশাক, আশ্রয়, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের দায়িত্ব। ইসলামকিউএ ৫০৬৮৮৫ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্ন ছিল: বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভরণপোষণের দায় কার ওপর পড়বে, যখন জৈবিক পিতা সন্তানটিকে আর্থিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন না? উত্তরে বলা হয়েছে, মা আর্থিকভাবে সক্ষম হলে শিশুর ব্যয়ভার তাঁর ওপর বর্তাবে; না পারলে মাতৃকুলের উত্তরাধিকারী আত্মীয়দের দিকে সেই দায় স্থানান্তরিত হবে। [15]
يَجِبُ عَلَى الْأُمِّ أَنْ تُنْفِقَ عَلَى وَلَدِهَا مِنَ الزِّنَى، إِذَا كَانَتْ مُسْتَطِيعَةً.
বাংলা অনুবাদ: মা সামর্থ্যবান হলে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভরণপোষণ তাঁর ওপর আবশ্যক।
এখানে জৈবিকভাবে শিশুর জন্মে অংশগ্রহণকারী দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজনের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগত পিতৃত্বের সূত্র ধরে স্বীকৃত হয় না, আর অন্যজনের ওপর আর্থিক দায়িত্ব বর্তায়। মা একা শিশুকে লালনপালন করলে তাঁকে একই সঙ্গে আয়, যত্ন, সময় ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। এমন একটি ব্যবস্থা শিশুর জীবিকা নিশ্চিত করার বদলে প্রথমেই জন্মদাতা পুরুষের পরিচয়কে আইনি স্বীকৃতির বাইরে সরিয়ে দেয়, তারপর মাতৃকুলের ওপর দায়িত্ব স্থানান্তর করে। এটি শুধু পারিবারিক অনুভূতির প্রশ্ন নয়; বাস্তব অর্থনৈতিক অসমতা সৃষ্টির সুযোগ।
শিশু মাতৃগর্ভে জন্মেছে বলেই মাকে অবশ্যই ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন করতে হবে, কিন্তু জৈবিক পিতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বংশপরিচয়ের বিধান সামনে আসবে—এই অসমতা ন্যায়সংগত নয়। শিশুর প্রয়োজন নির্ধারিত হয় খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা দিয়ে; জন্মদাতাদের বিবাহিত অবস্থার ওপর তার প্রয়োজন বাড়ে বা কমে না। পিতৃত্বের আইনগত স্বীকৃতি অস্বীকার করে সন্তান পালনের দায় কার্যত মায়ের দিকে ঠেলে দেওয়া নৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক।
বিয়ের অভিভাবকত্ব: কন্যার জৈবিক পিতা থাকলেও শরিয়তে ‘পিতৃহীন’
ইসলামকিউএ ১৫১৯৩২ নম্বর ফতোয়ায় একটি মেয়ের বিয়ের অভিভাবক সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মেয়েটির জৈবিক পিতা পরিচিত, সন্তানটির ভরণপোষণেও তিনি অংশ নিয়েছেন এবং মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বিয়ের বয়সে পৌঁছেছেন। কিন্তু প্রচলিত বংশপরিচয়ের বিধান অনুসারে তিনি আইনগতভাবে ওই কন্যার পিতা নন। এর ফল হিসেবে তাঁর পিতৃকুলের পুরুষ আত্মীয়দেরও বিয়ের অভিভাবক হওয়ার অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। এই ফতোয়ায় বলা হয়েছে, মেয়েটির অভিভাবক হবেন মুসলিম শাসক বা তাঁর প্রতিনিধি; সে ব্যবস্থা না থাকলে ইসলামি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা মসজিদের ইমাম। [16]
إِذَا تَقَرَّرَ أَنَّ وَلَدَ الزِّنَا لَا يُنْسَبُ إِلَى الزَّانِي، فَإِنَّهُ يَكُونُ لَا عَصَبَةَ لَهُ.
বাংলা অনুবাদ: বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্তানকে জন্মদাতা পুরুষের বংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না বলে তার পিতৃকুলীয় পুরুষ অভিভাবক থাকে না।
এতে শুধু পিতার সম্মান বা সামাজিক মর্যাদা বদলায় না; মেয়েটির নিজের বিয়ের প্রক্রিয়ায় আত্মীয়তার আইনি সম্পর্ক পাল্টে যায়। একটি পরিচিত পরিবার থাকা সত্ত্বেও তাকে ‘পিতৃকুলীয় অভিভাবকহীন’ শ্রেণিতে নেওয়া হয়। শিশুর জন্মপরিচয় আইনত অস্বীকার করার ফলে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর অপ্রাসঙ্গিক ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রভাব তৈরি হতে পারে। এই ব্যবস্থা মেয়ের নিজস্ব পছন্দ ও সামাজিক সম্পর্কের বদলে তাঁর জন্মদাতাদের যৌন সম্পর্কের আইনগত শ্রেণিকে প্রাধান্য দেয়।
জৈবিক ভাইবোন হয়েও মাহরাম নয়: পিতৃত্ব অস্বীকারের অদ্ভুত পারিবারিক পরিণতি
বিবাহবহির্ভূত সন্তানের বংশপরিচয় অস্বীকারের ফলে একই জৈবিক পিতার সন্তানদের পারিবারিক সম্পর্কেও কী ধরনের আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়, তার একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ইসলামওয়েবের ২২৪১৫ নম্বর ফতোয়ায়। সেখানে এমন একজন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যার বৈধ বিবাহ থেকে দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে আরও একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করেছে। ইসলামওয়েবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জন্মদাতা পিতা ওই ছেলের মাকে পরবর্তীতে বিয়ে করলেও প্রচলিত সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহি মতানুসারে ছেলেটির সঙ্গে পিতার শরিয়তসম্মত বংশসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে না। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই জৈবিক পিতার কন্যাদের জন্য ছেলেটিকে মাহরাম গণ্য করা হবে না; ফলে তাদের তার সামনে পর্দা করতে হবে। অথচ ছেলেটির সঙ্গে ওই কন্যাদের বিবাহও নিষিদ্ধ। অর্থাৎ জৈবিক ভাইবোনের সম্পর্ককে শরিয়তি মাহরাম হওয়ার ক্ষেত্রে অস্বীকার করা হচ্ছে, আবার বিবাহ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কের প্রভাব স্বীকার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ছেলেটিকে জন্মদাতা পিতার উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। পিতামাতার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে সন্তানের পারিবারিক পরিচয়, উত্তরাধিকার এবং আত্মীয়তার আইনগত মর্যাদায় এই বৈষম্য আরোপ করা হয়েছে, যদিও সম্পর্কটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে সন্তানটির নিজের কোনো সিদ্ধান্ত বা দায় ছিল না। [17]
أحكام تتعلق بولد الزنا
فتوى رقم: 22415
الإثنين 10 رجب 1423 هـ – 16-9-2002 م
السؤال
بسم الله الرحمن الرحيم
الإخوة الأفاضل، السلام عليكم ورحمة الله وبركاته ….. أما بعد
عندي سؤال يتعلق بأحد معارفي المتزوجين، والذي لديه من الذكور اثنان ومن الإناث ثلاثة، ولكن أزله الشيطان ووقع في الخطأ وأنجب ذكرا.
السؤال: هل يعتبر هذا الولد أخا للأولاد الباقين؟ هل يجب على البنات أن يتحجبن أمامه؟ هل للولد حق في ميراث أبيه؟
الولد يبلغ من العمر الآن 14 سنة، في حال تزوج الأب تلك المرأة التي أزله الشيطان معها، فهل يتغير أي حكم بعدها؟
أفيدونا وجزاكم الله عنا كل خير.
الإجابــة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
وهذا الولد من الزنى لا ينسب إلى الزاني ولو تزوج بالزانية عند جمهور العلماء، وقد سبق بيان ذلك في الفتوى رقم: 6012.
ولا يكون محرماً لبنات الرجل، بل هو أجنبي عنهن فيلزمهن الاحتجاب منه، ومع كونه غير محرم لهن، إلا أنه لا يجوز له أن يتزوج بواحدة منهن، وليس لهذا الولد حق في الميراث من الزاني، وإنما يرث من أمه.
وانظر مزيداً من التفصيل حول أحكام ولد الزنا في الفتاوى التالية أرقامها: 7501، 9093، 10152.
والله أعلم.
বাংলা অনুবাদ:
ব্যভিচারজাত সন্তান সম্পর্কিত বিধান
ফতোয়া নম্বর: ২২৪১৫
তারিখ: সোমবার, ১০ রজব ১৪২৩ হিজরি — ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০২
প্রশ্ন:
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
সম্মানিত ভাইয়েরা, আপনাদের ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। অতঃপর:
আমার একজন বিবাহিত পরিচিত ব্যক্তির বিষয়ে একটি প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে রয়েছে। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তিনি ভুল কাজ করে ফেলেন এবং সেই সম্পর্ক থেকে আরও একটি ছেলেসন্তানের জন্ম হয়।
আমার প্রশ্ন হলো: এই ছেলেটিকে কি তাঁর অন্য সন্তানদের ভাই হিসেবে গণ্য করা হবে? মেয়েদের কি তার সামনে পর্দা করতে হবে? ছেলেটি কি তার জন্মদাতা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাবে?
ছেলেটির বর্তমান বয়স ১৪ বছর। যদি তার পিতা পরবর্তীতে সেই নারীকে বিয়ে করেন, যার সঙ্গে তিনি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, তাহলে কি এসব বিধানের কোনো পরিবর্তন হবে?
অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহর রাসুল, তাঁর পরিবার এবং সাহাবিদের ওপর শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক। অতঃপর:
সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে জন্মগ্রহণকারী এই সন্তানকে তার জন্মদাতা ব্যভিচারী পিতার বংশের সঙ্গে যুক্ত করা হবে না; এমনকি ওই ব্যক্তি পরবর্তীতে সন্তানের মাকে বিয়ে করলেও এই বিধানের পরিবর্তন হবে না। বিষয়টি ইতিপূর্বে ৬০১২ নম্বর ফতোয়ায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই ছেলেটি ওই ব্যক্তির মেয়েদের জন্য মাহরাম হিসেবে গণ্য হবে না। বরং তাদের কাছে সে একজন গায়রে মাহরাম বা শরিয়তি অর্থে অপরিচিত পুরুষ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে মেয়েদের তার সামনে পর্দা করা বাধ্যতামূলক।
তবে সে মেয়েদের জন্য মাহরাম হিসেবে গণ্য না হলেও তাদের কাউকে বিয়ে করা তার জন্য বৈধ নয়।
একইভাবে, এই ছেলেটির জন্মদাতা ব্যভিচারী পিতার সম্পত্তিতে কোনো উত্তরাধিকারের অধিকার নেই। সে কেবল তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার লাভ করবে।
ব্যভিচারজাত সন্তান সম্পর্কিত আরও বিস্তারিত বিধান জানতে নিম্নলিখিত ফতোয়াগুলো দেখুন: ৭৫০১, ৯০৯৩ এবং ১০১৫২।
আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
এই ফতোয়ার সবচেয়ে কঠোর দিক হলো, পিতামাতার পরবর্তী বিবাহও সন্তানের জন্য জন্মগত বৈষম্য দূর করে না। চৌদ্দ বছর বয়সী ছেলেটির জন্মদাতা পিতা পরিচিত, একই পিতার অন্য ছেলেমেয়েরাও রয়েছে, অথচ শরিয়তি বিধানে তার পিতৃবংশের স্বীকৃতি এবং পৈতৃক উত্তরাধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। একই জৈবিক পিতার মেয়েদের সঙ্গে তার বিবাহ নিষিদ্ধ হলেও তাদের কাছে তাকে গায়রে মাহরাম গণ্য করে পর্দার বিধান আরোপ করা হয়েছে। এই আইনগত কাঠামোয় সন্তানের প্রকৃত জৈবিক সম্পর্ককে কখনো বিবাহ নিষিদ্ধ করার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে, আবার পিতৃত্ব, মাহরাম সম্পর্ক ও উত্তরাধিকারের অধিকার নির্ধারণে সেই সম্পর্কের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। পিতামাতার যৌন সম্পর্কের বৈধতা দিয়ে সন্তানের পারিবারিক মর্যাদা ও সম্পত্তির অধিকার নির্ধারণের এই ব্যবস্থা জন্মগত বৈষম্যের একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
এমন বিধানের সামাজিক বিপদ হলো, পরিবারে শিশুটিকে জৈবিক ভাই হিসেবে পরিচিত থাকার পরও আইনগতভাবে বহিরাগত বলা যায়। ফলে ভাইবোনের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের জায়গায় ‘বৈধ’ এবং ‘অবৈধ’ জন্মের শ্রেণিবিভাগ ঢুকে পড়ে। সন্তানের জন্মপরিচয় নিয়ে একটি ধর্মীয় নিয়ম পরিবারের অন্য সদস্যদের পারস্পরিক আচরণও বদলে দিতে পারে।
মসজিদের ইমামতি: জন্মদাতা পিতার পরিচয় না থাকলে নেতৃত্ব ‘অপছন্দনীয়’
ধ্রুপদি ফিকহে জন্মপরিচয়ের বৈষম্য ধর্মীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করেছে। ইমাম শাফেয়ি তাঁর আল-উম্ম গ্রন্থে ‘ইমামাতু ওলাদিজ জিনা’ বা বিবাহবহির্ভূত জন্মের ব্যক্তির ইমামতি নামে পৃথক আলোচনা করেছেন। সেখানে মালিকের সূত্রে উমর ইবনে আবদুল আজিজের একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে: তিনি একজন ইমামকে দায়িত্ব থেকে সরান, কারণ তার পিতার পরিচয় ছিল না। এরপর শাফেয়ি নিজেও অজ্ঞাত পিতৃপরিচয়ের ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ করা অপছন্দ করেন বলে জানিয়েছেন। [18]
وأكره أن ينصب من لا يعرف أبوه إماما؛ لأن الإمامة موضع فضل وتجزي من صلى خلفه صلاتهم
বাংলা অনুবাদ: আমি এমন ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ করা অপছন্দ করি, যার পিতা পরিচিত নয়; কারণ ইমামতি একটি মর্যাদার অবস্থান। তবে তাঁর পেছনে যারা নামাজ পড়বে, তাদের নামাজ আদায় হয়ে যাবে।
এটি নামাজ বাতিল করার বিধান নয়; কিন্তু বিষয়টি সেখানেই শেষ নয়। শাফেয়ির ভাষায় ইমামতি সম্মানের পদ, আর জন্মপরিচয় সেই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অননুকূল বিবেচ্য। অর্থাৎ ব্যক্তির কোরআনজ্ঞান, নেতৃত্বের দক্ষতা বা ব্যক্তিগত চরিত্র ছাড়াও পিতৃপরিচয়ের প্রশ্নটি তাঁর সামাজিক মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলছে। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের উপযুক্ততা যাচাইয়ে কোনো ব্যক্তির নিজের নৈতিক আচরণের বদলে তাঁর জন্মদাতা পিতামাতার সম্পর্ককে টেনে আনা সমতার নীতির সঙ্গে অসংগত।
শাফেয়ির প্রত্যক্ষ বক্তব্যে জন্মপরিচয়কে ধর্মীয় নেতৃত্বের মর্যাদা নির্ধারণের একটি শর্ত হিসেবে বিবেচনা করার প্রমাণ রয়েছে। মুসল্লিরা একজন মানুষের পেছনে নামাজ পড়লে তা বৈধ, অথচ একই মানুষকে নিয়োগ করা জন্মপরিচয়ের কারণে অপছন্দনীয়—এই পার্থক্য তাঁর নিজের কর্মদক্ষতার ওপর নয়, তাঁর ওপর আরোপিত সামাজিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে।
আদালতের সাক্ষ্যও জন্মপরিচয় দিয়ে বিচার: মালিক ও মদিনার ফকিহদের বিধান
ধর্মীয় ইমামতি ছাড়িয়ে জন্মপরিচয়ের বৈষম্য বিচারব্যবস্থার সাক্ষ্য গ্রহণেও প্রভাব ফেলেছে। মাওয়ার্দির আল-হাবিউল কবির, খণ্ড ১৭-এর ‘ব্যভিচারের মামলায় সাক্ষ্য’ আলোচনায় শাফেয়ি, মালিক এবং মদিনার কয়েকজন ফকিহের বিপরীত সিদ্ধান্ত সংরক্ষিত আছে। শাফেয়ি এমন ব্যক্তির সাক্ষ্যকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, যার জন্ম বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে হয়েছে; মাওয়ার্দি বলেন, বংশপরিচয় সত্যবাদিতা বা ন্যায়পরায়ণতার শর্ত নয়। কিন্তু মালিকের মতে, ব্যভিচারের মামলায় ওই ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না। মদিনার অন্য কয়েকজন ফকিহের মতে, কোনো মামলাতেই তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না। [19]
وَقَالَ مَالِكٌ: لَا أَقْبَلُ شَهَادَتَهُ فِي الزِّنَى وَأَقْبَلُهَا فِي غَيْرِ الزِّنَى، وَقَالَ غَيْرُهُ مِنْ فُقَهَاءِ الْمَدِينَةِ: لَا أَقْبَلُ شَهَادَتَهُ بِحَالٍ.
বাংলা অনুবাদ: মালিক বলেছেন, ব্যভিচারের মামলায় তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করব না, অন্য মামলায় গ্রহণ করব। মদিনার অন্য কয়েকজন ফকিহ বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করব না।
আদালতের সাক্ষ্য বিচার করার যৌক্তিক মানদণ্ড হলো, ব্যক্তি সত্য বলছেন কি না, ঘটনাটি জানেন কি না, তাঁর বক্তব্য অন্য প্রমাণের সঙ্গে মেলে কি না এবং তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার বিরুদ্ধে বাস্তব কারণ আছে কি না। পিতামাতার সম্পর্কের আইনগত অবস্থা এসব প্রশ্নের কোনোটিরই উত্তর দেয় না। একজন সাক্ষী সত্যবাদী ও প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও কেবল জন্মপরিচয়ের কারণে আদালতে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যেতে পারেন—এই মত বিচারিক ন্যায়বিচারের মূল শর্তের বিরোধী।
মাওয়ার্দির আলোচনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। তিনি সাক্ষ্য বাতিলের পক্ষে ব্যবহৃত ‘জারজ সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ এবং ‘জারজ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ ধরনের বর্ণনার সমালোচনা করেছেন। তাঁর আপত্তিতে কোরআনের ‘কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না’ নীতিও এসেছে। অর্থাৎ মদিনার ফকিহদের বৈষম্যমূলক বিধান নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি মাওয়ার্দির পাঠ থেকেই বোঝা যায় যে এমন বিধান মানুষের জন্মকে নৈতিক চরিত্রের বিকল্প মানদণ্ডে পরিণত করে। ধর্মীয় আইনচর্চায় একই ব্যক্তির জন্মপরিচয় এক বিচারকের কাছে সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য করার কারণ, অন্যের কাছে অপ্রাসঙ্গিক—এই বিভেদ বিচারব্যবস্থার ধারাবাহিকতারও সমস্যা।
‘জারজ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’: জন্মের ওপর পরকালের শাস্তি আরোপের বর্ণনা
ইসলামি হাদিসব্যাখ্যা ও তাফসিরে এমন একটি বক্তব্যও সংরক্ষিত আছে, যেখানে বিবাহবহির্ভূত জন্মের ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করতে না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাযি সূরা আল-কলমের ‘যানীম’ ব্যাখ্যায় এবং মাওয়ার্দি বিচারিক সাক্ষ্য নিয়ে আলোচনায় এই ধরনের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইসলামকিউএর ৩৩২৯৮৪ নম্বর ফতোয়ায় সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোর সনদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কিন্তু বর্ণনাগুলোর ঐতিহাসিক প্রচলন এবং সেগুলোকে বৈষম্যের দলিল হিসেবে ব্যবহারের ঘটনা বাস্তব। [20]
حديث (لا يدخل الجنة ولد زانية) معلول لا يصح
الإسلام سؤال وجواب
السؤال رقم: 332984
25/جمادى الثانية/1442 الموافق 07/فبراير/2021
السؤال
حديث (لا يدخل الجنة ولد زانية) أخرجه الإمام أحمد في مسنده، وحسنه العلامة الألباني في “السلسلة الصحيحة”، فما مدى صحته؟ وآمل ذكر النصوص التي دلت على ضعفه إذا كان ضعيفا؟ وإذا كان ضعيفا فكيف ذكره الإمام الألباني في السلسلة الصحيحة؟
ملخص الجواب
حديث (لا يدخل الجنة ولد زانية) معلول لا يصح، وأن كل طرقه لا تخلو من ضعف ظاهر.
ولا يصح الاحتجاج بهذا الحديث ونحوه، في مثل هذه المسألة الكبيرة، ولا يلزم لها التأويل، فإنه فرع عن التصحيح.
বাংলা অনুবাদ:
‘ব্যভিচারিণীর সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’—এই হাদিসটি ত্রুটিযুক্ত ও অপ্রমাণিত
ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর (IslamQA)
প্রশ্ন নম্বর: ৩৩২৯৮৪
তারিখ: ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২ হিজরি — ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
প্রশ্ন:
‘ব্যভিচারিণীর সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’—এই হাদিসটি ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং আল্লামা আলবানি তাঁর আস-সিলসিলাতুস সহিহা গ্রন্থে এটিকে হাসান হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাহলে হাদিসটি কতটুকু সহিহ? যদি এটি দুর্বল হয়ে থাকে, তাহলে এর দুর্বলতা প্রমাণকারী বক্তব্যগুলো উল্লেখ করার অনুরোধ করছি। আর যদি হাদিসটি দুর্বলই হয়, তাহলে ইমাম আলবানি কেন এটিকে তাঁর আস-সিলসিলাতুস সহিহা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন?
উত্তরের সারসংক্ষেপ:
‘ব্যভিচারিণীর সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’—এই হাদিসটি সনদগত ত্রুটিযুক্ত এবং সহিহ নয়। এর প্রতিটি বর্ণনাপথেই সুস্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।
এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে এই হাদিস কিংবা অনুরূপ কোনো হাদিসকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই হাদিসের কোনো ব্যাখ্যা বা অর্থ পরিবর্তন করারও প্রয়োজন নেই; কারণ ব্যাখ্যার প্রশ্ন তখনই আসে, যখন প্রথমে হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বিষয়ে মাওয়ার্দির ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ [21]
الحاوي الكبير في فقه مذهب الإمام الشافعي
الماوردي – أبو الحسن علي بن محمد بن حبيب الماوردي
الجزء السابع عشر، الصفحة 211
القول في شهادة الزنا
النص العربي:
[ القول في شهادة الزنا ].
مسألة: قال الشافعي رضي الله عنه: “ويجوز شهادة ولد الزنا في الزنا”.
قال الماوردي: وهذا صحيح، لأن الأنساب ليست من شروط العدالة، فتقبل شهادة ولد الزنا إذا كان عدلا في الزنى وغير الزنى.
وقال مالك رضي الله عنه: لا أقبل شهادته في الزنى وأقبلها في غير الزنى، وقال غيره من فقهاء المدينة: لا أقبل شهادته بحال.
استدلالا بما روي عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: “ولد الزنى شر الثلاثة”.
وبما روي عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: “لا يدخل الجنة ولد زنية”.
وإذا كان شرا من الزاني ومدفوعا من الجنة، كان من أهل الكبائر، فلم تقبل شهادته.
وهذا قول فاسد، لأن الله تعالى لا يؤاخذ أحدا بذنب غيره وهو تعالى يقول:
[ولا تزر وازرة وزر أخرى] [الأنعام: 164].
فلم يجز أن يؤاخذ ولد الزاني بذنب أبويه، لأنه ظلم، والله تعالى منزه عن الظلم، وهو تعالى يقول: [ولا يظلم ربك أحدا] [الكهف: 49].
ولأن عار النسب ربما منعه من ارتكاب العار، لئلا يصير جامعا بين عارين، فصار مزجورا بمعرة نسبه عن معرة كذبه، فلم يمنع من قبول الشهادة مع ظهور عدالته.
[ص: 211] وأما الخبر الأول وهو “ولد الزنا شر الثلاثة” فهو من مناكير الأخبار، وما رواه إلا مضعوف، غير مقبول الحديث، ونص القرآن يمنع منه، ولو سلمت الرواية لكان لاستعماله وجوها:
أحدها: أنه شر الثلاثة نسبا.
والثاني: شر الثلاثة إذا كان زانيا.
والثالث: أنه كان واحدا من ثلاثة، فأشير إليه أنه شرهم، فكان ذلك للزنى تعريفا لا تعليلا.
والرابع: ما ذكر أن أبا عزة الجمحي كان يهجو رسول الله صلى الله عليه وسلم ويقدح فيه بالعظائم، فذكر عند النبي صلى الله عليه وسلم ما يقوله، وقيل له: إنه ولد زنية، فقال عليه السلام: “ولد الزنى شر الثلاثة” يعني به أبا عزة.
وأما الخبر الثاني: فهو أوهى من الأول، وأضعف وأبعد أن يكون له في الاحتمال وجه، لأنه لا يجوز أن يحبط طاعته معصية غيره، والكفر أعظم من الزنى، ولا يحبط عمل المؤمن بكفر أبويه، فكان أولى أن لا يحبط عمله بزنى والديه والله أعلم.
বাংলা অনুবাদ:
আল-হাবিউল কবির ফি ফিকহি মাযহাবিল ইমাম আশ-শাফেয়ি
লেখক: আবুল হাসান আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাবিব আল-মাওয়ার্দি
খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২১১
অধ্যায়: ব্যভিচারের মামলায় সাক্ষ্য প্রদান
মাসআলা: ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: ‘ব্যভিচারজাত সন্তানের সাক্ষ্য ব্যভিচারের মামলাতেও গ্রহণ করা বৈধ।’
ইমাম মাওয়ার্দি বলেছেন: এই বক্তব্য সঠিক। কারণ বংশপরিচয় কোনো ব্যক্তির ন্যায়পরায়ণতা বা সাক্ষ্য দেওয়ার যোগ্যতার শর্ত নয়। সুতরাং ব্যভিচারজাত সন্তান যদি ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি হয়, তাহলে ব্যভিচারের মামলা এবং অন্যান্য মামলা—উভয় ক্ষেত্রেই তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।
ইমাম মালিক বলেছেন: ‘আমি ব্যভিচারের মামলায় তার সাক্ষ্য গ্রহণ করব না, তবে অন্য মামলায় তার সাক্ষ্য গ্রহণ করব।’
মদিনার অন্যান্য কয়েকজন ফকিহ বলেছেন: ‘আমি কোনো অবস্থাতেই তার সাক্ষ্য গ্রহণ করব না।’
তাঁরা মুহাম্মদের নামে বর্ণিত নিম্নোক্ত বক্তব্যকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন: ‘ব্যভিচারজাত সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট।’
এবং মুহাম্মদের নামে বর্ণিত আরেকটি বক্তব্য: ‘ব্যভিচারিণীর সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
তাঁদের যুক্তি হলো, যদি ব্যভিচারজাত সন্তান ব্যভিচারী ব্যক্তির চেয়েও নিকৃষ্ট হয় এবং তাকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
কিন্তু এই অভিমত ভুল ও অগ্রহণযোগ্য। কারণ আল্লাহ একজন মানুষকে অন্য মানুষের পাপের জন্য দায়ী করেন না। আল্লাহ বলেছেন:
‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্য কারও পাপের বোঝা বহন করবে না।’ [সূরা আল-আনআম, ৬:১৬৪]
সুতরাং ব্যভিচারী পিতামাতার পাপের জন্য তাদের সন্তানকে দায়ী করা বৈধ নয়। কারণ সেটি জুলুম বা অন্যায়। আর আল্লাহ সব ধরনের জুলুম থেকে পবিত্র। আল্লাহ আরও বলেছেন: ‘তোমার প্রতিপালক কারও প্রতি জুলুম করেন না।’ [সূরা আল-কাহফ, ১৮:৪৯]
এ ছাড়া বংশপরিচয়ের কলঙ্ক একজন ব্যক্তিকে অন্য কোনো কলঙ্কজনক কাজ থেকে বিরতও রাখতে পারে, যাতে তাকে একই সঙ্গে দুটি কলঙ্ক বহন করতে না হয়। এভাবে বংশপরিচয়ের কারণে যে অসম্মান তার ওপর রয়েছে, সেটি তাকে মিথ্যা বলার অসম্মান থেকে বিরত রাখতে পারে। সুতরাং তার ন্যায়পরায়ণতা প্রকাশিত হলে শুধু জন্মপরিচয়ের কারণে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা যাবে না।
পৃষ্ঠা ২১১:
প্রথম হাদিসটি, অর্থাৎ ‘ব্যভিচারজাত সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’—এ প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এটি এমন একজন দুর্বল বর্ণনাকারী ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেননি, যার হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যও এই হাদিসের অর্থ গ্রহণে বাধা দেয়।
তারপরও যদি বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে এর অর্থ নির্ধারণের কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে:
প্রথম ব্যাখ্যা: বংশপরিচয়ের দিক থেকে সে তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: সে নিজেও ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট হবে।
তৃতীয় ব্যাখ্যা: সে তিনজন ব্যক্তির একজন ছিল এবং তাকে অন্য দুজনের তুলনায় নিকৃষ্ট বলা হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ব্যভিচারজাত হওয়ার বিষয়টি কেবল তাকে শনাক্ত করার জন্য উল্লেখ করা হয়েছিল, তার নিকৃষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে নয়।
চতুর্থ ব্যাখ্যা: বর্ণিত আছে, আবু আযযা আল-জুমাহি মুহাম্মদকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করত এবং তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অপমানজনক বক্তব্য দিত। তার এসব বক্তব্য মুহাম্মদের কাছে উল্লেখ করা হয় এবং তাঁকে জানানো হয় যে, লোকটি ব্যভিচারজাত সন্তান। তখন মুহাম্মদ বলেন, ‘ব্যভিচারজাত সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আবু আযযাকেই বুঝিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় হাদিসটি, অর্থাৎ ‘ব্যভিচারিণীর সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’—এর অবস্থা প্রথম হাদিসটির চেয়েও বেশি দুর্বল। এটি আরও বেশি অগ্রহণযোগ্য এবং এর অর্থ গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ অন্য একজন মানুষের পাপের কারণে কারও নিজের আনুগত্য ও সৎকর্ম নিষ্ফল হয়ে যাওয়া বৈধ নয়।
অবিশ্বাস ব্যভিচারের চেয়েও বড় পাপ। কিন্তু পিতামাতা অবিশ্বাসী হওয়ার কারণে কোনো বিশ্বাসী সন্তানের সৎকর্ম বাতিল হয়ে যায় না। সুতরাং পিতামাতার ব্যভিচারের কারণেও সন্তানের সৎকর্ম নিষ্ফল না হওয়াই আরও অধিক যুক্তিসংগত।
আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
একজন মানুষ কেবল জন্মের কারণে ধর্মীয় মুক্তি বা পরকালীন পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবে—এমন ধারণা ব্যক্তিগত নৈতিক দায়, ন্যায়বিচার এবং মানুষের সমান মর্যাদার মৌলিক নীতির পরিপন্থী। ‘ব্যভিচারিণীর সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ এবং ‘ব্যভিচারজাত সন্তান তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’—এ ধরনের বর্ণনায় সন্তানের নিজের কর্ম, চরিত্র বা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে পিতামাতার যৌন সম্পর্ককে তার নৈতিক ও পরকালীন পরিণতির নির্ধারক বানানো হয়েছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব বর্ণনা কেবল ধর্মীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; মাওয়ার্দির বিবরণ অনুসারে, কোনো কোনো ফকিহ আদালতে ব্যভিচারজাত সন্তানের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করার যুক্তি হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ জন্মগত কলঙ্ক এবং পরকালীন শাস্তির ধারণাকে বাস্তব জীবনে মানুষের আইনগত অধিকার ও বিশ্বাসযোগ্যতা অস্বীকার করার ভিত্তি বানানো হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো হাদিসকে জইফ বা দুর্বল বলা মানেই সেটি মিথ্যা, জাল কিংবা বর্ণিত ঘটনা কখনো ঘটেনি—এমন সিদ্ধান্ত নয়। জইফ হলো ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের নিজস্ব সনদগত মূল্যায়ন; এটি কোনো ঘটনার ঐতিহাসিক অসত্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। একইভাবে কোনো হাদিসকে সহিহ বলা হলেও তাতে তার বক্তব্যের ঐতিহাসিক সত্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। আলোচ্য বর্ণনাগুলো মুহাম্মদ সত্যিই উচ্চারণ করেছিলেন কি না, সেটি একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক প্রশ্ন। কিন্তু এসব বর্ণনা ইসলামি গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে, ধর্মীয় ভাষ্যকারেরা সেগুলোর ব্যাখ্যা করেছেন এবং কোনো কোনো ফকিহ মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের বিধানে সেগুলো ব্যবহার করেছেন—এগুলো নিজেই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সুতরাং কেবল দুর্বল সনদের কথা উল্লেখ করে এসব বর্ণনার সামাজিক প্রভাব, ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার ইতিহাস এবং বৈষম্যমূলক আইনি প্রয়োগ অস্বীকার করা যায় না। একজন নিরপরাধ মানুষের জন্মপরিচয়কে তার নৈতিক চরিত্র ও নাগরিক অধিকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার এই প্রবণতাই এখানে সমালোচনার মূল বিষয়। সহিহ ও জইফ হাদিসের শ্রেণিবিভাগ, ঐতিহাসিক সত্যতা এবং দুর্বল বর্ণনার বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য পড়ুন: ‘জইফ হাদিস’—কথাটি কতটা সহিহ আর কতটা জইফ?
‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মায়’ এবং ‘কেউ অন্যের পাপ বহন করবে না’: নৈতিক স্ববিরোধিতা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে বহুল উদ্ধৃত দুটি নীতি হলো—প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে এবং কোনো মানুষ অন্য ব্যক্তির পাপের দায় বহন করবে না। কোরআন ৬:১৬৪-এ বলা হয়েছে, «وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ»—‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ হাদিসসাহিত্যেও নবজাতকের সহজাত অবস্থার আলোচনা রয়েছে। এই নীতিগুলোর বিপরীতে ‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ তকমা, ‘অপবিত্র বীর্য থেকে অপবিত্র সন্তান’ ব্যাখ্যা এবং পিতামাতার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে সন্তানের পিতৃসম্পত্তি অস্বীকার করার বিধান এক গভীর নৈতিক অসংগতি তৈরি করে। [22] [23]
প্রথম অসংগতি নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে। যদি শিশু নিজের কোনো কাজের আগেই নিকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত দায়িত্বের নীতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় অসংগতি সম্পত্তিগত: শিশুকে পিতামাতার যৌন সম্পর্কের দায়ে অপরাধী বলা হচ্ছে না, কিন্তু তাদের সম্পর্কের আইনগত বৈধতার ভিত্তিতে তার অর্থনৈতিক অধিকার কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয় অসংগতি সামাজিক: একজন মানুষ কোনো অপরাধ না করেও জানাজায় নেতৃস্থানীয় আলেমের অংশগ্রহণ, মসজিদের ইমামতি কিংবা আদালতের সাক্ষ্যে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে পারেন। ‘কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না’ বাক্যটি এই বাস্তব বঞ্চনার প্রশ্নের জবাব দেয় না।
যৌক্তিকভাবে একজন মানুষের পরিচয়, উত্তরাধিকার ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে দুটি তথ্য পৃথক: তিনি কাদের জৈবিক সন্তান এবং তাঁর পিতামাতার সম্পর্ক কোন ধর্মীয় বিধানে বৈধ ছিল। প্রথমটি তাঁর জন্মসংক্রান্ত বাস্তব তথ্য; দ্বিতীয়টি সম্পর্কের ওপর আরোপিত আইনগত বা নৈতিক মূল্যায়ন। দ্বিতীয় তথ্যের মাধ্যমে প্রথম সম্পর্কের আর্থিক ও সামাজিক পরিণতি অস্বীকার করা হলে শিশুর ওপর এমন একটি দায় চাপানো হয় যা তাঁর জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েছিল। এই দায় ব্যক্তি নিজের আচরণ বদলে দূর করতে পারেন না।
একটি জন্মপরিচয় থেকে কতগুলো বৈষম্য: হাদিস, ফিকহ ও আধুনিক ফতোয়ার তুলনামূলক সারণি
ধর্মীয় উৎসের পৃথক বক্তব্যগুলো পাশাপাশি রাখলে জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন সামাজিক ও আইনি পরিণতি স্পষ্ট হয়। একই ব্যক্তি কোনো অপরাধ করেননি, তবু তাঁর জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে জন্মদাতা পিতামাতার সম্পর্ক একটি স্থায়ী শ্রেণিবিভাগ হিসেবে কাজ করছে।
| ক্ষেত্র | ধর্মীয় উৎসে বর্ণিত অবস্থান | মানুষটির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব | মূল সূত্র |
|---|---|---|---|
| ব্যক্তিগত মর্যাদা | ‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ | জন্মের ভিত্তিতে অবমাননাকর পরিচয় | আবু দাউদ ৩৯৬৩ |
| জন্মগত চরিত্র | অপবিত্র বীর্য থেকে মন্দ স্বভাবের দাবি | নিজের কাজের আগেই চরিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক অনুমান | সিনদি, মুসনাদ আহমদের ভাষ্য |
| পিতার উত্তরাধিকার | জন্মদাতা পিতার সম্পত্তিতে অধিকার নেই | সম্পত্তিগত বঞ্চনা | ইসলামওয়েব ১৯১১৭১ |
| ভরণপোষণ | সামর্থ্যবান মা ও মাতৃকুলের ওপর দায় | আর্থিক দায়িত্বে অসমতা | ইসলামকিউএ ৫০৬৮৮৫ |
| বিবাহের অভিভাবক | পিতৃকুলের আইনগত অভিভাবক নেই | নিজ পরিবারের বদলে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অভিভাবকত্ব | ইসলামকিউএ ১৫১৯৩২ |
| পিতৃকুলের ভাইবোন | জৈবিক ভাইবোনের সঙ্গে মাহরাম সম্পর্ক অস্বীকার | পারিবারিক সম্পর্ক ও পর্দার বিধান পাল্টে যাওয়া | ইসলামওয়েব ২২৪১৫ |
| ধর্মীয় নেতৃত্ব | পিতৃপরিচয়হীন ব্যক্তিকে ইমাম নিয়োগ অপছন্দনীয় | জন্মের ভিত্তিতে নেতৃত্বে বৈষম্য | শাফেয়ি, আল-উম্ম |
| আদালতে সাক্ষ্য | কিছু ফকিহ ব্যভিচারের মামলায় বা সব মামলায় সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন | সত্যবাদিতা নয়, জন্মপরিচয় দিয়ে সাক্ষীর যোগ্যতা বিচার | মাওয়ার্দি, আল-হাবিউল কবির |
| জানাজা | সালাফি গ্রন্থে নেতৃস্থানীয় আলেমদের বিরত থাকার নির্দেশ | মৃত্যুর পরেও সামাজিক অবমাননা | ছালাতুর রাসূল, পৃষ্ঠা ২১৬ |
সারণিতে সব সিদ্ধান্তকে একটি সর্বসম্মত বিধান হিসেবে দেখানো হয়নি: আলেমদের যেখানে মতভেদ রয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট উৎসের অবস্থান উল্লেখ আছে। কিন্তু তাতেই মূল সমালোচনা দুর্বল হয় না। এই বক্তব্য ও বিধানগুলো ইসলামি গ্রন্থের বাস্তব অংশ, এবং এগুলো জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে অবমাননা ও বৈষম্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। ইসলামি ফিকহের কোনো একটি স্কুলে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেই অন্য স্কুল বা গ্রন্থে প্রচারিত বৈষম্য মুছে যায় না।
উপসংহার: অন্যের সম্পর্কের দায়ে নিরপরাধ মানুষের মর্যাদা ও অধিকার হরণ
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্মগ্রহণকারী কোনো মানুষ তাঁর জন্মের জন্য দায়ী নন। অথচ আলোচিত ইসলামি হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ফতোয়ার একাধিক ধারায় তাঁর জন্মপরিচয়কে সামাজিক অপমান এবং আইনি বঞ্চনার কারণ বানানো হয়েছে। আবু দাউদের হাদিসে ‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ বক্তব্য, সিনদির ব্যাখ্যায় ‘অপবিত্র বীর্য’ থেকে মন্দ চরিত্রের অনুমান, তাবারি ও রাযির তাফসিরে ‘যানীম’ শব্দের বংশগত অপমানসূচক প্রয়োগ—সবই শিশুর নিজস্ব কাজের বদলে তাঁর জন্মের ইতিহাসকে মূল্যায়নের উপাদান বানিয়েছে। এ ধরনের চিন্তায় ব্যক্তির নৈতিক মর্যাদা অর্জিত হয় চরিত্র দিয়ে নয়, অনুমোদিত যৌন সম্পর্কের মধ্যে জন্মানোর মাধ্যমে।
এই ধারণার সবচেয়ে স্থায়ী ক্ষতি অর্থনৈতিক ও পারিবারিক অধিকারগুলোতে। জন্মদাতা পিতা পরিচিত হলেও, সন্তানের পরিচয় স্বীকার করলেও প্রচলিত বিধানে উত্তরাধিকার বন্ধ থাকে। ভরণপোষণের ভার মায়ের ও মাতৃকুলের ওপর পড়তে পারে। কন্যার বিয়ের অভিভাবকত্বে জন্মদাতা পিতাকে বাদ দেওয়া হয়; একই জৈবিক পিতার সন্তানেরাও আইনি দিক থেকে পরস্পরের কাছে অপরিচিত হয়ে যেতে পারে। জন্মের সময় শিশু কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি; কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও এই আইনগত শ্রেণি তাঁর সম্পত্তি, পরিবার ও আত্মপরিচয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
শাফেয়ির গ্রন্থে ইমামতির ক্ষেত্রে অজ্ঞাত পিতৃপরিচয়কে অননুকূল বিবেচনা করা হয়েছে; মাওয়ার্দির নথিতে আদালতের সাক্ষ্য বাতিলের মত রয়েছে; বাংলাদেশের একটি সালাফি গ্রন্থে নিরপরাধ জন্মপরিচয়ের মানুষকে পাপীদের সঙ্গে একই জানাজা-বর্জনের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে দেখা যায়, বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট হাদিসের বিচ্ছিন্ন বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়। জন্মপরিচয়কে মানুষের সামাজিক যোগ্যতার সূচক বানানোর প্রবণতা বিভিন্ন বিধানের মধ্যে প্রবেশ করেছে।
আয়েশার প্রতিবাদ এবং তাহাবির বিশ্লেষণ দেখায়, ‘তিনজনের মধ্যে নিকৃষ্ট’ বাক্যকে সব সন্তানের ওপর প্রয়োগ করলে অন্যের অপরাধের দায় সন্তানের ওপর পড়ে—এই অসংগতি প্রাচীন মুসলিম ব্যাখ্যাকাররাও শনাক্ত করেছিলেন। আবার ইসলামকিউএর পিতৃত্বসংক্রান্ত আলোচনায় জন্মদাতা পিতার স্বীকৃতির ভিত্তিতে সন্তানকে বংশে যুক্ত করার বিকল্প অবস্থান সংরক্ষিত আছে। এগুলো প্রমাণ করে, সবচেয়ে কঠোর বিধানগুলো কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক সত্য নয়; মানুষের নির্মিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আইনগত সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্ত একটি শিশুকে সম্পত্তি ও পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে, তার নৈতিক বৈধতাও সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ।
মানবিক ন্যায়বিচারের নীতি সরল: কোনো মানুষের নিজের কাজের জন্য তাঁকে জবাবদিহি করতে বলা যায়; কিন্তু তাঁর জন্মদাতা পিতামাতার সম্পর্কের জন্য তাঁকে নিকৃষ্ট বলা, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সাক্ষ্য বা নেতৃত্বে অপমানিত করা কিংবা শেষ বিদায়ে বৈষম্যের শিকার করা অন্যায়। সন্তানের জন্মের পেছনে তাঁর কোনো অপরাধ নেই। জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার কমিয়ে দেওয়ার এসব ধর্মীয় বিধান ও ব্যাখ্যা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
তথ্যসূত্রঃ
- Universal Declaration of Human Rights, অনুচ্ছেদ ২৫(২) ↩︎
- জাতিসংঘ, শিশু অধিকার সনদ, অনুচ্ছেদ ২, ৭, ৮ ও ২৭ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৩৯৬৩: মূল আরবি, ইংরেজি অনুবাদ ও মান ↩︎
- সিনদি, হাশিয়াতু মুসনাদিল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৩৮–৪৩৯, মুসনাদ আহমদ, হাদিস ৮০৯৮ ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা আল-কলম ৬৮:১৩ ↩︎
- রাযি, মাফাতিহুল গায়ব, সূরা আল-কলম ৬৮:১৩ ↩︎
- তাহাবি, শরহু মুশকিলিল আসার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৬৫–৩৬৯ ↩︎
- হাকিম, আল-মুসতাদরাক, হাদিস ২৯১০ ↩︎
- আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ছালাতুর রাসূল, পৃষ্ঠা ২১৬; সংযুক্ত গ্রন্থের ছবি ↩︎
- জামে তিরমিজি ২১১৩: আরবি বর্ণনা ও তিরমিজির মন্তব্য ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৯১১৭১: ولد الزنا لا يرث من أبيه ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৯১১৭১, ولد الزنا لا يرث من أبيه — ব্যভিচারজাত সন্তান তার পিতার উত্তরাধিকারী হয় না, ১৮ নভেম্বর ২০১২ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৬৭৪৯, সন্তান শয্যার অধিকারীর বর্ণনা ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৯২১৩১: تفصيل خلاف العلماء في حكم استلحاق ابن الزنا ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৫০৬৮৮৫: من تلزمه نفقة ولد الزنا؟ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৫১৯৩২: بنت الزنا من وليها في النكاح؟ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২২৪১৫, أحكام تتعلق بولد الزنا — ব্যভিচারজাত সন্তান সম্পর্কিত বিধান, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ ↩︎
- শাফেয়ি, আল-উম্ম, কিতাবুস সালাত, ‘إمامة ولد الزنا’ ↩︎
- মাওয়ার্দি, আল-হাবিউল কবির, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২১০–২১১ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৩৩২৯৮৪: ‘জারজ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ বর্ণনার মূল্যায়ন ↩︎
- মাওয়ার্দি, আল-হাবিউল কবির, সাক্ষ্য গ্রহণের আলোচনা ↩︎
- সূরা আল-আনআম ৬:১৬৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৩৫৮, শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মায় ↩︎

