জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

বাইবেলে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগের শাস্তি: বিশ্বাস বদলালে পাথর ছুড়ে হত্যা

প্রকাশিত: জুলাই 22, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন33 মিনিট পড়া

ভূমিকা

একজন মানুষ কোন ধর্মে বিশ্বাস করবে, আদৌ কোনো ধর্মে বিশ্বাস করবে কিনা, পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করবে কিনা কিংবা নিজের বিবেক ও উপলব্ধির ভিত্তিতে নতুন কোনো বিশ্বাস গ্রহণ করবে কিনা, এসব মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর অন্তর্ভুক্ত। মানুষ জন্মের সময় কোনো ধর্মগ্রন্থ পড়ে, কোনো ধর্মতত্ত্ব যাচাই করে কিংবা কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে যুক্তিতর্ক বিচার করে ধর্ম নির্বাচন করে জন্মায় না; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে একটি পরিবার ও সমাজের ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে জন্ম নেয়। বড় হওয়ার পর যদি সে প্রশ্ন করে, প্রমাণ চায়, মত পরিবর্তন করে বা ধর্মই ত্যাগ করে, তাহলে সেটি তার চিন্তার স্বাধীনতার স্বাভাবিক প্রয়োগ। অথচ মানবসভ্যতার বহু প্রাচীন ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেই রাষ্ট্র, সম্প্রদায় ও ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাইবেলের পুরাতন নিয়মে এমন বিধান রয়েছে যেখানে ধর্মীয় আনুগত্য থেকে বিচ্যুতি কিংবা অন্যকে ভিন্ন দেবতার উপাসনায় আহ্বান করার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড, এমনকি পাথর ছুড়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানের অধিকাংশ খ্রিস্টান-অধ্যুষিত গণতান্ত্রিক দেশ এসব আইন প্রয়োগ করে না। একজন জার্মান, ব্রিটিশ, ফরাসি, কানাডীয় বা সুইডিশ নাগরিক খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে নাস্তিক, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা অন্য কিছু হলে তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয় না। কিন্তু এই আধুনিক মানবিক অবস্থাকে বাইবেলের আইনের কৃতিত্ব হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই; কারণ বাইবেলের মূল বিধানটি নিজেই বিপরীত কথা বলছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এই ধরনের ধর্মতান্ত্রিক আইন থেকে যত দূরে সরে গেছে, ব্যক্তির ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতা তত বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ সরাসরি ধর্ম বা বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতাকে মানুষের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদও নিজের পছন্দের ধর্ম বা বিশ্বাস গ্রহণের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির ব্যাখ্যায় এই স্বাধীনতার মধ্যে বর্তমান ধর্ম ত্যাগ করা, অন্য ধর্ম গ্রহণ করা এবং নাস্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। [1]


বাইবেলের নির্দেশ: আপনজন হলেও দয়া নয়, পাথর ছুড়ে হত্যা

বাইবেলে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতি এবং অন্য দেবতার উপাসনায় প্ররোচনার বিরুদ্ধে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তা শুধু কঠোর নয়; আধুনিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে তা ভয়াবহ। এখানে অপরাধের কেন্দ্রে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন বা অন্য কারও অধিকার হরণ নেই; অপরাধ হলো ভুল ঈশ্বরে বিশ্বাস করা কিংবা অন্যকে সেই বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা। আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, আইনটি পারিবারিক ভালোবাসা ও মানবিক সহানুভূতিকেও অপরাধীর প্রতি “দয়া” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছে। ভাই, সন্তান, স্ত্রী কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধু—যেই হোক, ধর্মীয় আনুগত্যের বিরুদ্ধে গেলে তাকে রক্ষা করা যাবে না; বরং আপনজনকেই প্রথমে হত্যার কাজে হাত দিতে বলা হয়েছে।

বাইবেলে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও আধুনিক খ্রিস্টান দেশগুলো এই প্রাচীন আইন মানে না। বাইবেলের একটি অংশে উল্লেখ করা হয়েছে:

দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬-১১
(নিউ কিং জেমস ভার্সন অনুযায়ী)
৬ “যদি তোমার ভাই, মাতার পুত্র, তোমার পুত্র বা কন্যা, তোমার স্ত্রী, বা তোমার আত্মার মতো প্রিয় বন্ধু গোপনে তোমাকে প্ররোচিত করে বলে, ‘চলো, আমরা অন্য দেবতাদের পূজা করি,’ যাদের তোমরা কিংবা তোমাদের পূর্বপুরুষেরা চিনত না,
৭ সেই দেবতাদের যাদের পুজা করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মানুষ,
৮ তখন তুমি তার কথা শুনবে না বা তাকে কোনোভাবেই সমর্থন করবে না; এমনকি তাকে দয়া করো না বা রক্ষা করার চেষ্টা করো না।
৯ বরং তুমি অবশ্যই তাকে হত্যা করবে; প্রথমে তোমারই হাত তাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে উঠবে, তারপর সবার হাত।
১০ তুমি তাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করবে, কারণ সে তোমাকে তোমার প্রভু, তোমার ঈশ্বরের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, যিনি তোমাকে মিশরের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন।
১১ যাতে পুরো ইসরায়েল এই ঘটনা শুনে ভয় পায় এবং ভবিষ্যতে এমন দুষ্ট কাজ করার সাহস আর না করে।”

এই বিধানের শেষ বাক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—“পুরো ইসরায়েল এই ঘটনা শুনে ভয় পায়।” অর্থাৎ শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু কথিত অপরাধীকে সরিয়ে দেওয়া নয়; প্রকাশ্য হত্যার মাধ্যমে অন্যদের মনে ভয় সৃষ্টি করাও এর ঘোষিত উদ্দেশ্য। আধুনিক ভাষায় এটি একটি ভয়ভিত্তিক ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা: একজনকে হত্যা করো, যাতে বাকিরা দেখে বিশ্বাস পরিবর্তন বা প্রচারের সাহস না পায়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মৌলিক যুক্তিও ঠিক এটাই—শাস্তি শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কিত করে আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য।

Deuteronomy 13:6-11
New King James Version
6 “If your brother, the son of your mother, your son or your daughter, the wife [a]of your bosom, or your friend who is as your own soul, secretly entices you, saying, ‘Let us go and serve other gods,’ which you have not known, neither you nor your fathers, 7 of the gods of the people which are all around you, near to you or far off from you, from one end of the earth to the other end of the earth, 8 you shall not [b]consent to him or listen to him, nor shall your eye pity him, nor shall you spare him or conceal him; 9 but you shall surely kill him; your hand shall be first against him to put him to death, and afterward the hand of all the people. 10 And you shall stone him with stones until he dies, because he sought to entice you away from the Lord your God, who brought you out of the land of Egypt, from the house of bondage. 11 So all Israel shall hear and fear, and not again do such wickedness as this among you.

বাইবেলে

শুধু অন্যকে প্ররোচনা নয়—নিজে অন্য দেবতার উপাসনা করলেও মৃত্যুদণ্ড

দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬–১১-এ অন্যকে ভিন্ন দেবতার উপাসনায় প্ররোচিত করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু বাইবেলের ধর্মীয় সহিংসতার বিধান শুধু প্ররোচনাকারীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়। একই গ্রন্থের দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:২–৭-এ কোনো ইসরায়েলীয় নারী বা পুরুষ অন্য দেবতা, সূর্য, চন্দ্র কিংবা আকাশের অন্য কোনো কিছুর উপাসনা করলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করতে হবে এবং দুই বা তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যে প্রমাণিত হলে অভিযুক্তকে শহরের ফটকের কাছে এনে পাথর ছুড়ে হত্যা করতে হবে। সাক্ষীদেরই প্রথমে হত্যার কাজে হাত দিতে বলা হয়েছে। এখানে অন্যকে প্ররোচিত করা অপরাধের অপরিহার্য শর্ত নয়; নিজের ধর্মীয় উপাসনা পরিবর্তন করাই মৃত্যুদণ্ডের কারণ। [2]

Deuteronomy 17:5, King James Version:
and shalt stone them with stones, till they die.

বাংলা অনুবাদ (১৭:২–৭):
২. তোমাদের মধ্যে, তোমাদের ঈশ্বর প্রভু তোমাদের যে নগরগুলো দিয়েছেন, সেগুলোর কোনো একটিতে যদি কোনো পুরুষ বা নারীকে পাওয়া যায়, যে তোমাদের ঈশ্বর প্রভুর দৃষ্টিতে অন্যায় করেছে এবং তাঁর চুক্তি লঙ্ঘন করেছে,
৩. এবং গিয়ে অন্য দেবতাদের সেবা ও উপাসনা করেছে—সূর্য, চন্দ্র অথবা আকাশের কোনো বাহিনীকে, যাদের উপাসনার নির্দেশ আমি দিইনি;
৪. আর তোমাকে বিষয়টি জানানো হলে তুমি শুনবে ও সতর্কভাবে তদন্ত করবে। যদি নিশ্চিত হও যে ইসরায়েলের মধ্যে এমন ঘৃণ্য কাজ ঘটেছে,
৫. তাহলে সেই পুরুষ বা নারীকে, যে এই অন্যায় করেছে, তোমার নগরের ফটকের কাছে বের করে আনবে এবং পাথর ছুড়ে হত্যা করবে।
৬. মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য ব্যক্তিকে দুই অথবা তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে; একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না।
৭. তাকে হত্যা করার জন্য প্রথমে সাক্ষীদের হাত উঠবে, তারপর সমগ্র জনগণের হাত। এভাবেই তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে অমঙ্গল দূর করবে।

এই বিধানে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও তদন্তের শর্ত রয়েছে, কিন্তু সেই বিচারপ্রক্রিয়া যে কাজটিকে অপরাধ ঘোষণা করেছে, সেটি অন্য কারও জীবন বা সম্পত্তি হরণ নয়। অপরাধ হলো অন্য দেবতার উপাসনা। কেউ সূর্য বা চন্দ্রকে উপাসনার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করলে তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করতে হবে। প্রাচীন ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধর্মীয় আনুগত্যকে রাষ্ট্রীয় শাস্তির মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করার এটি সরাসরি উদাহরণ। পঞ্চম শতাব্দীর খ্রিস্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক সিরিল অব আলেকজান্দ্রিয়াও তাঁর প্রাথমিক রচনা De adoratione-এর ষষ্ঠ খণ্ডে দ্বিতীয় বিবরণ ১৭-এর এই বিধানকে ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। ফলে পরবর্তী খ্রিস্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক গ্রহণের সঙ্গেও এই নির্দিষ্ট বিধানের সম্পর্ক রয়েছে।


যাত্রাপুস্তক ২২:২০: অন্য দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদানের শাস্তি ধ্বংস

দ্বিতীয় বিবরণের বাইরে যাত্রাপুস্তকেও অন্য দেবতার উপাসনার বিরুদ্ধে সরাসরি ধ্বংসাত্মক শাস্তির বিধান রয়েছে। যাত্রাপুস্তক ২২:২০ অনুযায়ী, প্রভু ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদান করলে সেই ব্যক্তিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের জন্য নির্ধারিত করতে হবে। অর্থাৎ অন্য ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়াকেই মৃত্যুদণ্ডমূলক শাস্তির ভিত্তিতে পরিণত করা হয়েছে। এই নির্দেশে পাথর ছুড়ে হত্যার নির্দিষ্ট পদ্ধতি বলা হয়নি; কিন্তু অন্য দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদানকারীর ধ্বংসের নির্দেশটি স্পষ্ট। [3]

He that sacrificeth unto any god, save unto the Lord only, he shall be utterly destroyed.

বাংলা অনুবাদ: যে ব্যক্তি একমাত্র প্রভু ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদান করবে, তাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হবে।

এই বিধানটিও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ম্যাসাচুসেটস উপনিবেশের মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত আইনসংকলনে অন্য দেবতার উপাসনার জন্য শাস্তির ভিত্তি হিসেবে দ্বিতীয় বিবরণ ১৩ ও ১৭-এর পাশাপাশি যাত্রাপুস্তক ২২:২০ উদ্ধৃত করা হয়েছিল। ফলে বাইবেলের এই নির্দেশ কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বক্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী খ্রিস্টীয় শাসনব্যবস্থায় ধর্মীয় অপরাধ ও মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি হিসেবেও গ্রহণ করা হয়েছিল।


দ্বিতীয় বংশাবলি ১৫:১২–১৩: ঈশ্বরের অনুসরণ না করলেও মৃত্যুদণ্ড

বাইবেলের দ্বিতীয় বংশাবলি গ্রন্থে ধর্মীয় আনুগত্য প্রতিষ্ঠার আরও সরাসরি একটি বিবরণ রয়েছে। রাজা আসার শাসনামলে যিহূদার জনগণ তাদের পূর্বপুরুষদের ঈশ্বরকে সর্বান্তকরণে অনুসরণ করার জন্য একটি শপথ গ্রহণ করে। এই শপথে ঘোষণা করা হয়, ইসরায়েলের প্রভু ঈশ্বরকে যে অনুসরণ করবে না, তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। বয়স বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। এটি দ্বিতীয় বিবরণের মতো মোশির নামে ঘোষিত নতুন আইনি অনুচ্ছেদ নয়; একটি নির্দিষ্ট শাসনামলে গৃহীত ধর্মীয় চুক্তি ও মৃত্যুদণ্ডের শপথের বিবরণ। কিন্তু এই বিবরণে ধর্মীয় আনুগত্য প্রত্যাখ্যানকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি উপস্থিত। [4]

2 Chronicles 15:13, King James Version:
That whosoever would not seek the Lord God of Israel should be put to death

বাংলা অনুবাদ (১৫:১২–১৩):
১২. তারা তাদের পূর্বপুরুষদের প্রভু ঈশ্বরকে সমস্ত হৃদয় ও সমস্ত প্রাণ দিয়ে অনুসরণ করার জন্য একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হলো।
১৩. আর যে-ই ইসরায়েলের প্রভু ঈশ্বরকে অনুসরণ করবে না, তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে—সে ছোট হোক বা বড়, পুরুষ হোক বা নারী।

দ্বিতীয় বংশাবলির এই ঘটনাটি দ্বিতীয় বিবরণের বিধানগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের পরিসর আরও স্পষ্ট হয়। দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬–১১-এ অন্যকে ভিন্ন দেবতার উপাসনায় আহ্বান করার জন্য হত্যা, দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:২–৭-এ নিজে অন্য দেবতার উপাসনা করার জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা এবং যাত্রাপুস্তক ২২:২০-এ অন্য দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্য ধ্বংসের নির্দেশ রয়েছে। দ্বিতীয় বংশাবলি ১৫:১২–১৩-এ একটি রাজকীয় ধর্মীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে ঈশ্বরের অনুসরণ না করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের শপথ গ্রহণের বিবরণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ধর্মীয় আনুগত্যকে মানুষের স্বেচ্ছাধীন বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে ছেড়ে না দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের ভয় দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার নীতি বাইবেলের একাধিক গ্রন্থে উপস্থিত।

এখানে অপরাধের প্রকৃতি হত্যা, ধর্ষণ, চুরি বা অন্যের স্বাধীনতা হরণ নয়; অপরাধ হলো ধর্মীয় কর্তৃত্বের নির্ধারিত উপাসনা ও আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করা। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার পদ্ধতি অন্যের থেকে আলাদা হওয়া তাকে হত্যা করার নৈতিক অধিকার সৃষ্টি করে না। বাইবেলের এসব বিধান ও বিবরণে সেই মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করে ধর্মীয় আনুগত্যকে জীবনের শর্তে পরিণত করা হয়েছে। আধুনিক চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার সঙ্গে এই ব্যবস্থার সংঘাত সরাসরি।


একজন নয়, পুরো শহর ধ্বংসের বিধান

দ্বিতীয় বিবরণ ১৩-এর ধর্মীয় সহিংসতা ব্যক্তিগত মৃত্যুদণ্ডেই শেষ হয়নি। একই অধ্যায়ের ১২–১৮ নম্বর পদে একটি সম্পূর্ণ শহর ধ্বংস করার বিধান রয়েছে। কোনো ইসরায়েলীয় শহরে কয়েকজন ব্যক্তি অন্য দেবতার উপাসনার প্রচার করলে এবং তদন্তের মাধ্যমে সেই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে শহরের অধিবাসীদের তরবারি দিয়ে হত্যা, শহরের গবাদিপশু নিধন, সমস্ত সম্পদ একত্র করে পুড়িয়ে ফেলা এবং শহরটিকে স্থায়ী ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয় উপাসনার পরিবর্তনকে শুধু ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে নয়, সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো, শহরের সমস্ত অধিবাসী ও গবাদিপশু ধ্বংস করার নির্দেশ। এখানে শুধু অন্য দেবতার উপাসনা প্রচারকারী ব্যক্তিদের হত্যার কথা বলা হয়নি; শাস্তির লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে সম্পূর্ণ নগরকে। [5]

Deuteronomy 13:15, King James Version:
Thou shalt surely smite the inhabitants of that city with the edge of the sword

বাংলা অনুবাদ (১৩:১২–১৮):
১২. তোমাদের ঈশ্বর প্রভু তোমাদের বসবাসের জন্য যে নগরগুলো দিয়েছেন, তার কোনো একটি সম্পর্কে যদি তোমরা শোনো,
১৩. তোমাদের মধ্য থেকে কিছু দুষ্ট লোক বেরিয়ে এসে তাদের নগরের অধিবাসীদের বিপথে নিয়ে গেছে এবং বলেছে, ‘চলো, আমরা অন্য দেবতাদের উপাসনা করি’, যাদের তোমরা আগে জানতে না;
১৪. তাহলে তোমরা বিষয়টি অনুসন্ধান করবে, খোঁজ নেবে এবং সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করবে। যদি সত্যিই নিশ্চিত হও যে তোমাদের মধ্যে এমন ঘৃণ্য কাজ ঘটেছে,
১৫. তাহলে অবশ্যই সেই নগরের অধিবাসীদের তরবারির ধার দিয়ে আঘাত করবে। নগরটি এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে, সব সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে; এমনকি তার গবাদিপশুকেও তরবারি দিয়ে হত্যা করবে।
১৬. তারপর নগরের সমস্ত লুণ্ঠিত সম্পদ তার রাস্তার মাঝখানে একত্র করবে এবং নগরসহ তার সমস্ত সম্পদ তোমাদের ঈশ্বর প্রভুর উদ্দেশ্যে আগুনে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেবে। নগরটি চিরকালের জন্য ধ্বংসস্তূপ হয়ে থাকবে; সেটি আর কখনো নির্মাণ করা যাবে না।
১৭. ধ্বংসের জন্য নির্ধারিত জিনিসগুলোর কোনো কিছু তোমাদের হাতে রাখবে না। তাহলে প্রভু তাঁর প্রচণ্ড ক্রোধ থেকে ফিরে আসবেন, তোমাদের প্রতি দয়া ও করুণা দেখাবেন এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে করা শপথ অনুযায়ী তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করবেন।
১৮. যখন তোমরা তোমাদের ঈশ্বর প্রভুর কথা শুনবে, আজ আমি তোমাদের যে সমস্ত আদেশ দিচ্ছি তা পালন করবে এবং প্রভুর দৃষ্টিতে যা সঠিক তা করবে, তখনই এই ফল লাভ করবে।

এই বিধানে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রথমত, অন্য দেবতার উপাসনার দিকে মানুষকে আহ্বান করার অভিযোগকে একটি সম্পূর্ণ শহরের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণের কারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তদন্তের কথা বলা হলেও অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ার পরে শাস্তি কেবল প্ররোচনাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; নগরের অধিবাসীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, মানুষের মৃত্যুতেও শাস্তির সমাপ্তি হয়নি। গবাদিপশু হত্যা, সম্পত্তি পুড়িয়ে ফেলা এবং শহরকে স্থায়ীভাবে নিশ্চিহ্ন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। চতুর্থত, এই ধ্বংসযজ্ঞকে ঈশ্বরের ক্রোধ প্রশমিত করা এবং পরবর্তী করুণা লাভের শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ধর্মীয় আনুগত্য রক্ষার জন্য গণহত্যা ও সম্পূর্ণ নগর ধ্বংসকে ধর্মীয় কর্তব্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

এখানে অপরাধের ভিত্তি অন্য দেবতার উপাসনা। শহরের অধিবাসীরা কোনো প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সামরিক আক্রমণ চালিয়েছে কিংবা অন্যের জীবন ও সম্পত্তি ধ্বংস করেছে—এমন কোনো শর্ত দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:১২–১৮-এ নেই। শাস্তির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মীয় আনুগত্য থেকে বিচ্যুতি। আধুনিক নৈতিক ভাষায় একটি শহরের অধিবাসীদের সমষ্টিগতভাবে হত্যা এবং তাদের বসতি সম্পূর্ণ ধ্বংস করার নির্দেশ গণহত্যামূলক ধর্মীয় সহিংসতার বিধান। এখানে সামরিক শক্তিকে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার পরিবর্তে ধর্মীয় একচেটিয়াবাদ প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।


তালমুদের আলোচনা: ধ্বংসের বিধান সীমিত করার পরবর্তী প্রচেষ্টা

পরবর্তী রাব্বিনিক সাহিত্যে দ্বিতীয় বিবরণ ১৩-এর এই শহর ধ্বংসের বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। মিশনা সানহেদ্রিন ১০:৪-এ কোনো নগরকে বিপথগামী শহর হিসেবে গণ্য করার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপথগামী করার কাজে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ওই শহর ও গোত্রের সদস্য হতে হবে, শহরের অধিকাংশ মানুষকে প্রভাবিত করতে হবে এবং প্ররোচনাকারীদের পুরুষ হতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ও পূর্বসতর্কতার শর্তও যুক্ত হয়েছে। এসব শর্ত মূল বিধানের প্রয়োগকে সীমিত করেছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতার আলোচনার মধ্যেও বিপথগামী শহরের অধিবাসীদের মৃত্যুদণ্ড এবং তাদের সম্পত্তি ধ্বংসের বিধানটি আলোচনার কেন্দ্রে রয়ে গেছে। [6]

ব্যাবিলনীয় তালমুদের সানহেদ্রিন ৭১এ-তে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি মত সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এমন কোনো বিপথগামী শহর অতীতে কখনো ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। রাব্বি এলিয়েজারের ব্যাখ্যায় কোনো শহরে অন্তত একটি মেজুজা থাকলেও শহরটিকে এই আইনে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যাবে না। কারণ দ্বিতীয় বিবরণের নির্দেশ অনুযায়ী শহরের সমস্ত সম্পদ পুড়িয়ে দিতে হবে, অথচ ঈশ্বরের নামসংবলিত পবিত্র বস্তু ধ্বংস করা নিষিদ্ধ। ফলে এই বিধানের সম্পূর্ণ প্রয়োগ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই আলোচনায় রাব্বি ইয়োনাতান বিপরীত দাবি করেন: তিনি এমন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর দেখেছিলেন এবং তার ধ্বংসস্তূপে বসেছিলেন। এখানে একটি মত বিধানটির বাস্তব প্রয়োগ অস্বীকার করেছে, অন্য মত অতীতে প্রয়োগের দাবি করেছে। কিন্তু রাব্বি ইয়োনাতানের উক্তি কোনো নির্দিষ্ট নগরের ধ্বংসের স্বাধীন প্রত্নতাত্ত্বিক বা সমসাময়িক ঐতিহাসিক প্রমাণ নয়। [7]

עיר הנדחת לא היתה ולא עתידה להיות

বাংলা অনুবাদ: বিপথগামী শহর কখনো ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হবে না।

তালমুদের এই আলোচনা প্রাচীন বিধানটির পরবর্তী গ্রহণ ও ব্যাখ্যার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। মূল বাইবেলীয় পাঠে নগরের অধিবাসী, গবাদিপশু, সম্পদ ও বসতি ধ্বংসের নির্দেশ রয়েছে। পরবর্তী রাব্বিনিক ব্যাখ্যায় সেই বিধান কার্যকর করার জন্য এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে কোনো কোনো ব্যাখ্যায় তা কার্যত অপ্রয়োগযোগ্য হয়ে পড়েছে। এই পার্থক্য দেখায়, ধর্মগ্রন্থের সহিংস নির্দেশ এবং পরবর্তী ধর্মীয় আইনব্যবস্থায় তার প্রয়োগের সীমা একই বিষয় নয়। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের সীমাবদ্ধতা মূল গ্রন্থের হত্যার নির্দেশকে বাতিল করে না; সেটির প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।

দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:১২–১৮-এর নৈতিক সমস্যাটি তাই অপরিবর্তিত। একটি শহরের বাসিন্দারা ধর্মীয় আনুগত্য পরিবর্তন করেছে বলে তাদের হত্যা, সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়া এবং বসতি ধ্বংস করার নির্দেশ কোনো ন্যায়সংগত বিচারব্যবস্থার পরিচয় নয়। কোনো ধর্মীয় মত সত্য কি না, সেই প্রশ্ন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। যে আইন অন্য দেবতার উপাসনাকে গণহত্যামূলক ধ্বংসযজ্ঞের বৈধ কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, সেটি ধর্মীয় স্বাধীনতার বিপরীত এবং মানুষের জীবন ও বিবেকের স্বাধীনতার ওপর প্রত্যক্ষ আক্রমণ।


ধর্মত্যাগ নাকি রাষ্ট্রদ্রোহ? এপোলোজেটিক যুক্তির সমস্যা

এই আইনকে রক্ষা করতে একটি প্রচলিত যুক্তি হলো—প্রাচীন ইসরায়েল ছিল একটি ধর্মতান্ত্রিক চুক্তিভিত্তিক রাষ্ট্র, তাই অন্য দেবতার উপাসনা নিছক ব্যক্তিগত ধর্ম পরিবর্তন ছিল না; এটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য ছিল। প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের রাজনৈতিক চুক্তি ও আনুগত্যের আইনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবরণ ১৩-এর ভাষাগত ও কাঠামোগত মিল নিয়ে গবেষণাও হয়েছে; বিশেষ করে কিছু গবেষক দেখিয়েছেন যে এর ধর্মত্যাগ-বিরোধী বিধানগুলো প্রাচীন সাম্রাজ্যিক আনুগত্য ও রাষ্ট্রদ্রোহবিরোধী আইনের কাঠামোর সঙ্গে তুলনীয়। [8]

কিন্তু এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আইনটির নৈতিক সমস্যা দূর করে না; বরং সমস্যাটি আরও পরিষ্কার করে। একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন বলে, “আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ”, তখন সেটিই তো ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের সংজ্ঞা। উত্তর কোরিয়া যদি রাষ্ট্রনেতার মতাদর্শ প্রত্যাখ্যান করাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে, তাহলে শুধু “সেই রাষ্ট্রের কাঠামোয় এটি রাষ্ট্রদ্রোহ ছিল” বললে সেই আইন নৈতিক হয়ে যায় না। রাষ্ট্র নিজেই যদি মানুষের বিবেক, বিশ্বাস ও ধর্মকে নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত করে, তাহলে রাষ্ট্রদ্রোহের সংজ্ঞাটিই অন্যায়। কোনো মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেনি, হত্যা করেনি, গুপ্তচরবৃত্তি করেনি; সে শুধু অন্য দেবতায় বিশ্বাস করেছে বা অন্যকে সেই বিশ্বাসে আহ্বান করেছে। এটিকে রাষ্ট্রদ্রোহে পরিণত করা ধর্ম ও রাজনৈতিক ক্ষমতার এক ভয়ঙ্কর একীভবন।


ইতিহাসে এই আইন কি হুবহু প্রয়োগ করা হয়েছিল?

ঐতিহাসিক সততার জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা স্বীকার করতে হবে। দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬–১১-এর বিধান অনুযায়ী প্রাচীন ইসরায়েলে ঠিক কতজন মানুষকে বিচার করে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়েছিল—এমন নির্ভরযোগ্য স্বাধীন ঐতিহাসিক নথি আমাদের হাতে নেই। বাইবেলের নিজস্ব কাহিনীকে সরাসরি স্বাধীন ঐতিহাসিক দলিল ধরে নিয়ে “এই আইন এতবার প্রয়োগ হয়েছিল” বলা দায়িত্বশীল হবে না। তাই মূল বিধানটির বাস্তব প্রয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত দাবি করার প্রয়োজন নেই। একটি আইন নৈতিকভাবে ভয়াবহ প্রমাণ করতে সেটির হাজারবার প্রয়োগ হওয়া দরকারও নেই; কোনো সংবিধানে যদি লেখা থাকে “ধর্ম পরিবর্তন করলে নাগরিককে পাথর ছুড়ে হত্যা করতে হবে”, আইনটি একবারও প্রয়োগ না হলেও সেটি একটি বর্বর আইন।

তবে এই আইনের চিন্তাগত উত্তরাধিকার ইতিহাসে হারিয়ে যায়নি। হিব্রু বাইবেলের আইনগুলো পরবর্তী ইহুদি ব্যাখ্যা, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্মীয় রাষ্ট্রক্ষমতার আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরবর্তী যুগে কেউ কেউ এই বিধানগুলোকে সীমিত বা রূপক করে মানবিক করার চেষ্টা করেছেন, আবার অন্যরা এগুলোকে ধর্মীয় বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সহিংসতার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় ধারাটিই খ্রিস্টীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করেছে।


প্রাচীন আইন থেকে খ্রিস্টীয় ধর্মতন্ত্র: সিরিলের কাছে ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ড “পবিত্র”

খ্রিস্টধর্মের প্রথম কয়েক শতাব্দীতে খ্রিস্টানরা নিজেরাই রোমান রাষ্ট্রের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। কিন্তু খ্রিস্টধর্ম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পঞ্চম শতাব্দীর বিশপ ও ধর্মতাত্ত্বিক সিরিল অব আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাথমিক রচনা De adoratione-এর ষষ্ঠ খণ্ডে দ্বিতীয় বিবরণের সহিংস বিধানের সরাসরি ইতিবাচক গ্রহণ পাওয়া যায়। তিনি প্রথমে দ্বিতীয় বিবরণ ১২:১–৩-এর ভিত্তিতে অন্য দেবতার উপাসনাস্থল ধ্বংসের বিধান আলোচনা করেন এবং ঈশ্বরের শাস্তির ভয়কে ধর্মীয় আনুগত্য রক্ষার উপায় হিসেবে প্রশংসা করেন। এরপর দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:১–৫ উদ্ধৃত করেন, যেখানে অন্য দেবতার উপাসনার দিকে মানুষকে প্ররোচিত করা মিথ্যা নবীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এই বিধান উদ্ধৃত করে সিরিল আইনটির পবিত্রতা ও যথার্থতার প্রশংসা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মানুষের শরীর হত্যার জন্য যদি মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হয়, তাহলে মানুষের আত্মাকে ধ্বংসাত্মক ধর্মীয় ভুলের দিকে নিয়ে যাওয়ার অপরাধও মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ ধর্মীয় মতবাদকে ভুল প্রমাণ করার পরিবর্তে ভুল মতের প্রচারককে হত্যার নৈতিক ভিত্তি তিনি মানুষের আত্মার কথিত ক্ষতির মধ্যে খুঁজেছেন। [9]

সিরিল এখানেই থামেননি। তিনি দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:২–৭ উদ্ধৃত করে অন্য দেবতার উপাসনাকারী ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ডেরও প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্মত্যাগী নিজের ইচ্ছায় ভুল পথ বেছে নিয়েছে, তাই তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর কোনো বিশেষ কারণ নেই। ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্নে মানবিক ভালোবাসাকেও সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। ধর্মীয় কঠোরতাকে তিনি ঈশ্বরের প্রতি যথাযথ আনুগত্যের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর ব্যাখ্যায় মৃত্যুদণ্ড কেবল প্রাচীন ইসরায়েলীয় আইনের একটি অতীত বিবরণ নয়; ধর্মীয় সত্য রক্ষার জন্য এমন শাস্তি ন্যায়সংগত হতে পারে—এই নীতির ইতিবাচক গ্রহণও রয়েছে।

এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক পরিসরও নির্দিষ্ট। সিরিল ধর্মত্যাগী এবং ধর্মত্যাগে প্ররোচনাকারীর মৃত্যুদণ্ডের নৈতিক প্রশংসা করেছেন, কিন্তু তাঁর ওই আলোচনায় সমসাময়িক খ্রিস্টানদের নিজেদের হাতে মোজাইক আইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার স্পষ্ট নির্দেশ নেই। তিনি শাস্তিদাতা হিসেবে ঈশ্বরের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং শাস্তির ভয়কে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের আনুগত্য রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ম্যাথিউ আর. ক্রফোর্ডের গবেষণায় এই পার্থক্যটি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে সিরিলের ভাষায় ধর্মত্যাগীর হত্যাকে ন্যায়সংগত গণ্য করার যে ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান রয়েছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরাসরি বাস্তবায়নের নির্দেশ না দিয়েও কোনো শাস্তিকে পবিত্র ও ন্যায়সংগত ঘোষণা করা সেই শাস্তির পক্ষে একটি নৈতিক অনুমোদন। ধর্মীয় ক্ষমতার অধিকারীরা এমন অনুমোদনকে সহিংসতার বৈধতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

সিরিলের পরবর্তী রচনায় ধর্মীয় সহিংসতা সম্পর্কে ভিন্ন ভাষা পাওয়া যায়। তাঁর Glaphyra, যোহনের সুসমাচারের ব্যাখ্যা এবং করিন্থীয়দের প্রতি দ্বিতীয় পত্রের ব্যাখ্যায় ধর্মীয় উদ্দেশ্যে মানুষের শরীরের ওপর আক্রমণ ও বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। বিশেষ করে Glaphyra-তে তিনি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিজেদের বিশ্বাস রক্ষার নামে অন্যের শারীরিক ক্ষতি করতে নিষেধ করেছেন। ক্রফোর্ডের গবেষণায় প্রাথমিক রচনার সহিংসতাসমর্থক ভাষা এবং পরবর্তী রচনার সহিংসতাবিরোধী নির্দেশের এই পার্থক্য বিস্তারিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন তাঁর ব্যক্তিগত নৈতিক বিশ্বাস সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ নয়; নিশ্চিতভাবে যা প্রতিষ্ঠিত, তা হলো তাঁর রচনার ভাষা ও নির্দেশনার পরিবর্তন। প্রাথমিক রচনার দ্ব্যর্থপূর্ণ সহিংসতাসমর্থক ভাষার পরিবর্তে পরবর্তী রচনায় ধর্মীয় উদ্দেশ্যে শারীরিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এসেছে। [10]

সিরিলের প্রাথমিক যুক্তির নৈতিক সমস্যাটি স্পষ্ট। একটি ধর্মীয় মতবাদকে মানুষের আত্মার জন্য ক্ষতিকর ঘোষণা করলেই তার প্রচারকারীকে হত্যা করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বাসকে ভুল এবং আত্মার জন্য বিপজ্জনক বলে গণ্য করতে পারে। এই যুক্তিতে হত্যার নৈতিক অনুমোদন দেওয়া হলে ধর্মীয় সত্যের দাবি মানুষের জীবন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে স্থান পায়। যার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকবে, তার বিশ্বাসকে আইনগত সত্যে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয় এবং ভিন্নমতাবলম্বীরা শাস্তির ঝুঁকিতে পড়ে। সিরিলের প্রাথমিক রচনায় ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ডের প্রশংসা এবং পরবর্তী রচনায় সহিংসতার বিরুদ্ধে নির্দেশ—এই পার্থক্য একই সঙ্গে দেখায়, ধর্মীয় সহিংসতার নৈতিক অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেছে। বাইবেলের কোনো বিধানকে পবিত্র ঘোষণা করলেই সেই বিধানের নৈতিক যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।


খ্রিস্টীয় রোমান সাম্রাজ্য: ধর্মত্যাগের জন্য রাষ্ট্রীয় শাস্তির আইন

খ্রিস্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর ধর্মীয় পরিচয় ক্রমে রাষ্ট্রীয় আইনের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই পরিবর্তনের সরাসরি সাক্ষ্য রয়েছে Codex Theodosianus বা থিওডোসীয় আইনসংকলনের ষোড়শ খণ্ডে। এর ১৬.৭ অধ্যায়ের শিরোনামই De apostatis—অর্থাৎ ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কে। ৩৮১ সালের ২ মে জারি করা ১৬.৭.১ নম্বর আইনে খ্রিস্টধর্ম থেকে পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের উইল করার অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং তাঁদের মৃত্যুর পরে সংশ্লিষ্ট উইল বাতিল করার বিধান দেওয়া হয়েছিল। ৩৮৩ সালের ২০ মে জারি করা ১৬.৭.২ নম্বর আইনেও পৌত্তলিক উপাসনায় প্রত্যাবর্তনকারী খ্রিস্টানদের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার সীমিত করা হয়। ধর্মত্যাগ এখানে কোনো ব্যক্তিগত বিবেকগত সিদ্ধান্ত নয়; রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তিযোগ্য আচরণ। [11]

His, qui ex christianis pagani facti sunt, eripiatur facultas iusque testandi et omne defuncti, si quod est testamentum submota conditione rescindatur.

বাংলা অনুবাদ: যারা খ্রিস্টান থেকে পৌত্তলিক হয়েছে, তাদের উইল করার ক্ষমতা ও অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে; আর মৃত ব্যক্তির কোনো উইল থেকে থাকলে সেটি বাতিল করা হবে।

এই আইনটির বিশেষ তাৎপর্য হলো, এখানে ধর্মত্যাগকে সরাসরি আইনি অপরাধের ভিত্তি করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, চুরি কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের অভিযোগের প্রয়োজন নেই। খ্রিস্টধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ করাই তাঁর নাগরিক অধিকার হরণের কারণ। পরবর্তী জাস্টিনীয় আইনসংকলনের ১.৭ অধ্যায়েও ধর্মত্যাগসংক্রান্ত বিধান স্থান পায়। যদিও এসব আইনে প্রতিটি ধর্মীয় বিচ্যুতির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছিল না, ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রীয় শাস্তির নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীন বাইবেলীয় বিধানে যেখানে অন্য দেবতার উপাসনার জন্য মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ রয়েছে, খ্রিস্টীয় রোমান রাষ্ট্র সেখানে ধর্মীয় আনুগত্যকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত করে।

রাষ্ট্র যখন নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়কে সম্পত্তি, উত্তরাধিকার ও নাগরিক অধিকারের শর্তে পরিণত করে, তখন বিশ্বাসের স্বাধীনতা বাস্তবে রাষ্ট্রীয় অনুমতির অধীন হয়ে যায়। একজন মানুষ খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে পৌত্তলিক ধর্ম গ্রহণ করলে তার মাধ্যমে অন্যের জীবন, শরীর বা সম্পত্তির কোনো ক্ষতি অপরিহার্যভাবে ঘটে না। অথচ রাষ্ট্র সেই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর নিজের সম্পত্তির ওপর অধিকার পর্যন্ত সীমিত করতে পারে। এটি অপরাধের বাস্তব ক্ষতির ভিত্তিতে শাস্তি নয়; ধর্মীয় আনুগত্য রক্ষার জন্য আইনের ব্যবহার। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই নীতি আরও কঠোর ও সহিংস রূপ পেয়েছে, যার প্রমাণ খ্রিস্টীয় শাসিত অঞ্চলে ধর্মদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের নথিতে পাওয়া যায়।


মধ্যযুগ: ধর্মীয় মতভেদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক দমন

দ্বিতীয় বিবরণের আইনটি নিজে মধ্যযুগীয় নয়; এটি মধ্যযুগের বহু শতাব্দী আগের। তাই ইতিহাসগতভাবে একে সরাসরি “মধ্যযুগীয় আইন” বলা ভুল হবে। আরও সঠিক কথা হলো—এটি মধ্যযুগীয় ধর্মতান্ত্রিক বর্বরতারও পূর্ববর্তী এক প্রাচীন কালাকানুন, যার মৌলিক নীতি—সঠিক ধর্ম থেকে বিচ্যুতি রাষ্ট্রীয় শাস্তির বিষয়—পরবর্তী মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় দমননীতির সঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। ১২১৫ সালের চতুর্থ ল্যাটেরান কাউন্সিলের তৃতীয় ক্যানন ধর্মদ্রোহীদের নিন্দা করে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের হাতে “যথাযথ শাস্তির” জন্য তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান করে এবং শাসকদের নিজ নিজ এলাকা থেকে ধর্মদ্রোহীদের নির্মূল করতে চাপ প্রয়োগ করে। এমনকি যে শাসক চার্চের নির্দেশমতো এলাকা “পরিষ্কার” করতে ব্যর্থ হতেন, তাঁর বিরুদ্ধেও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ রাখা হয়েছিল। [12]

এই ব্যবস্থার একটি কুৎসিত কৌশল ছিল দায়িত্বের বিভাজন। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ কাউকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করবে, তারপর তাকে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হবে শাস্তির জন্য। ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বলতে পারত, “আমরা তো হত্যা করিনি; রাষ্ট্র শাস্তি দিয়েছে।” কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান একজন মানুষকে তার বিশ্বাসের জন্য অপরাধী ঘোষণা করে, রাষ্ট্রকে তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য করে এবং শাসকদের ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয়, সে নৈতিক দায় থেকে পালাতে পারে না। জল্লাদের হাতে কুঠারটি অন্য প্রতিষ্ঠান তুলে দিলেই হত্যার নৈতিক দায় মুছে যায় না। চতুর্থ ল্যাটেরান কাউন্সিলের নথিতেই ধর্মদ্রোহীদের ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং শাসকদের ধর্মদ্রোহী উৎখাতে বাধ্য করার কাঠামো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

পরবর্তী ইনকুইজিশনগুলোতে ধর্মীয় মত, ধর্মান্তর, গোপনে পূর্বধর্ম পালন, ধর্মদ্রোহিতা ও মতবাদগত বিচ্যুতি নিয়ে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ, সামাজিক বর্জন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, কারাবাস এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাস গড়ে ওঠে। সব ইনকুইজিশন একই ছিল না, সব অভিযুক্তকে হত্যা করা হয়নি এবং “ধর্মত্যাগ”, “ধর্মদ্রোহিতা” ও “ব্লাসফেমি” আইনগতভাবে এক জিনিসও ছিল না। কিন্তু এগুলোর পেছনে অভিন্ন কর্তৃত্ববাদী নীতি ছিল: মানুষের বিশ্বাসকে স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে ধর্মীয় ক্ষমতার অধীন একটি শাস্তিযোগ্য বিষয় হিসেবে গণ্য করা।


ক্যাথলিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট: ক্ষমতা বদলেছে, ধর্মীয় নিপীড়ন টিকে ছিল

ধর্মীয় নিপীড়নকে শুধু মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক চার্চের সমস্যা ভাবলে খ্রিস্টীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালে থেকে যায়। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের পরও ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রভাবশালী সংস্কারক জন ক্যালভিন তাঁর Harmony of the Law গ্রন্থে দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬–১১ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ধর্মত্যাগে প্ররোচনাকারীর মৃত্যুদণ্ডের বিধান সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মের মৌলিক ভিত্তি উৎপাটনকারী ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে এই কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ বিধানটি শুধু প্রাচীন ইসরায়েলের একটি পরিত্যক্ত আইন হিসেবে তাঁর আলোচনায় আসেনি; তিনি নির্দিষ্ট শর্তে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের নৈতিক যথার্থতাও স্বীকার করেছেন। পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসার কারণে ধর্মীয় আনুগত্যবিরোধী অপরাধকে প্রশ্রয় না দেওয়ার নীতিও তাঁর ব্যাখ্যায় রয়েছে। [13]

this severity is only to be exercised against apostates, who pluck up religion by the roots

বাংলা অনুবাদ: এই কঠোরতা কেবল সেই ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করতে হবে, যারা ধর্মকে শিকড়সমেত উৎপাটন করে।

ক্যালভিনের এই ব্যাখ্যার সময়েই প্রোটেস্ট্যান্টশাসিত জেনেভায় ধর্মদ্রোহিতার জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। ১৫৫৩ সালের ২৭ অক্টোবর মাইকেল সার্ভেটাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ত্রিত্ববাদ প্রত্যাখ্যান এবং শিশুবাপ্তিস্মের বিরোধিতা তাঁর বিরুদ্ধে আনা ধর্মতাত্ত্বিক অভিযোগগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। জেনেভার নগর পরিষদ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সার্ভেটাসকে দ্বিতীয় বিবরণ ১৩ অনুসারে অন্য দেবতার উপাসনায় প্ররোচনার অভিযোগে বিচার করা হয়নি; তিনি ধর্মদ্রোহিতার জন্য দণ্ডিত হন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি দেখায়, প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় শাসনেও মতবাদগত ভিন্নতাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়েছিল। [14]

ধর্মীয় নিপীড়নের এই কাঠামোয় সত্য নির্ধারণের অধিকার এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা একই কর্তৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। ক্যাথলিক কর্তৃপক্ষ ধর্মদ্রোহিতার জন্য মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, প্রোটেস্ট্যান্ট নগররাষ্ট্রও ধর্মতাত্ত্বিক মতভেদের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। একজন মানুষের বিশ্বাসকে ভুল ঘোষণা করা এবং সেই ভুলের জন্য তাঁর জীবন কেড়ে নেওয়ার মধ্যে কোনো ন্যায়সঙ্গত সম্পর্ক নেই। ধর্মীয় সত্যের দাবিকে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করলে মতবাদগত বিরোধ আর যুক্তি ও আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আদালত, কারাগার ও জল্লাদের হাতে চলে যায়।


ধর্মত্যাগ, ধর্মদ্রোহিতা ও ধর্মীয় মতভেদের জন্য শাস্তির ঐতিহাসিক নজির

খ্রিস্টানশাসিত বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত প্রত্যাখ্যান এবং নিষিদ্ধ ধর্মীয় মত প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় শাস্তি প্রয়োগের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নথি রয়েছে। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনোটি ধর্মত্যাগের আইন, কোনোটি ধর্মদ্রোহিতার বিচার, কোনোটি ধর্মীয় মতপ্রচারের নিষেধাজ্ঞা এবং কোনোটি সরাসরি বাইবেলের মৃত্যুদণ্ডের বিধান গ্রহণের উদাহরণ। সব ঘটনাকে দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬–১১-এর হুবহু বিচারিক প্রয়োগ বলা যায় না। কিন্তু এদের প্রত্যেকটিতে ধর্মীয় আনুগত্য বা অনুমোদিত বিশ্বাসের সীমানা রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। নিচের ঘটনাগুলো আইন প্রণয়ন, আইনি শাস্তি এবং বাস্তব মৃত্যুদণ্ডের পৃথক প্রমাণ বহন করে।

সময় ও অঞ্চলধর্মীয় অভিযোগ বা বিধানরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও বাস্তব ফলাফলঐতিহাসিক উৎস
৩৮১–৩৮৩ খ্রিস্টাব্দ
খ্রিস্টীয় রোমান সাম্রাজ্য
খ্রিস্টধর্ম থেকে পৌত্তলিক উপাসনায় প্রত্যাবর্তনধর্মত্যাগীদের উইল, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার সীমিত করার আইন। এটি মৃত্যুদণ্ড নয়; ধর্মত্যাগের জন্য প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় শাস্তি।Codex Theodosianus 16.7.1–16.7.3
১৪১৫
কনস্টান্স, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য
জান হুসের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগকনস্টান্স কাউন্সিল তাঁকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করে ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের হাতে সমর্পণ করে। ৬ জুলাই ১৪১৫ তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।Council of Constance: Trial and Execution of Jan Hus; Thomas A. Fudge, 2017
১৫৫৩
প্রোটেস্ট্যান্ট জেনেভা
মাইকেল সার্ভেটাসের ত্রিত্ববাদবিরোধী ধর্মতত্ত্ব ও শিশুবাপ্তিস্মের বিরোধিতাজেনেভার নগর পরিষদ ধর্মদ্রোহিতার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২৭ অক্টোবর তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।Meeter Center, Servetus Trial and Execution
১৬১২
ইংল্যান্ড
এডওয়ার্ড ওয়াইটম্যানের ত্রিত্ববাদ অস্বীকারসহ ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগধর্মীয় আদালতের বিচারের পরে রাজা প্রথম জেমসের কর্তৃত্বে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর হয়। এপ্রিল ১৬১২-তে লিচফিল্ডে তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।Atherton and Como, The English Historical Review, 2005
১৬৩৯
লিমা, স্পেনশাসিত পেরু
ক্যাথলিক হিসেবে বাপ্তিস্মপ্রাপ্ত ফ্রান্সিসকো মালদোনাদো দে সিলভার ইহুদিধর্ম গ্রহণ ও প্রচারইনকুইজিশনের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে ২৩ জানুয়ারি ১৬৩৯ তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এটি খ্রিস্টধর্ম থেকে ইহুদিধর্ম গ্রহণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি নথিভুক্ত উদাহরণ।Jewish Encyclopedia, Francisco Maldonado de Silva
১৬৪১ ও ১৬৪৮
ম্যাসাচুসেটস বে উপনিবেশ
প্রভু ঈশ্বর ছাড়া অন্য দেবতার উপাসনাদ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬, ১৩:১০ এবং ১৭:২–৬ সরাসরি উদ্ধৃত করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আইনসংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখানে আইনি বিধান প্রতিষ্ঠিত; এই নির্দিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা প্রতিষ্ঠিত নয়।Body of Liberties, Article 94; Laws and Liberties, 1648
১৬৬০
বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস
কোয়েকার ধর্মীয় মত প্রচার ও নির্বাসনের নির্দেশ অমান্যকোয়েকার মেরি ডায়ারকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্বাসনের পরে ফিরে আসার কারণে ১ জুন ১৬৬০ ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মতপ্রচারের জন্য বাস্তব মৃত্যুদণ্ডের উদাহরণ।Library of Congress, Execution of Quakers
১৬৭২
ম্যাসাচুসেটস উপনিবেশ
অন্য দেবতার উপাসনার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী মৃত্যুদণ্ডের বিধানপুনর্মুদ্রিত ও সংশোধিত আইনসংকলনেও একই মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল থাকে এবং দ্বিতীয় বিবরণের নির্দিষ্ট আয়াতগুলো আবার উদ্ধৃত হয়।General Laws and Liberties, 1672, Capital Laws

ধর্মীয় মতের জন্য হত্যার রাষ্ট্রীয় নির্দেশ: এডওয়ার্ড ওয়াইটম্যানের মৃত্যুদণ্ড

ইংল্যান্ডে এডওয়ার্ড ওয়াইটম্যানের বিচার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রাজকীয় আদেশের লিখিত পাঠ সংরক্ষিত রয়েছে। ১৬১২ সালে ত্রিত্ববাদ ও যিশুর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে প্রচলিত মতবাদ প্রত্যাখ্যানের অভিযোগে তাঁকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করা হয়। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের বিচারের পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে সমর্পণ করা হয়। প্রথম জেমসের নামে জারি করা আদেশে তাঁকে প্রকাশ্য স্থানে আগুনে পোড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশটির ভাষায় অন্য খ্রিস্টানরা যেন একই অপরাধে না জড়ায়, সেজন্য শাস্তিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও সরাসরি উপস্থিত। অর্থাৎ ধর্মীয় মতবাদগত বিচ্যুতিকে মৃত্যুদণ্ডের কারণ করা এবং প্রকাশ্য শাস্তির মাধ্যমে অন্যদের ভয় দেখানো—দুটি বিষয়ই সরকারি দলিলে পাওয়া যায়। [15] [16]

দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:১১-তে একজনকে হত্যা করে সমগ্র ইসরায়েলকে ভয় দেখানোর নির্দেশ রয়েছে। ওয়াইটম্যানের রাজকীয় আদেশেও একজন ধর্মদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ডকে অন্যদের জন্য সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুটি বিধান সরাসরি একই আইনের অধীনে কার্যকর হয়েছিল, এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই। প্রমাণিত বিষয় হলো, ধর্মীয় অপরাধের জন্য প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড এবং সেই মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে অন্যদের আনুগত্য নিশ্চিত করার নীতি পরবর্তী খ্রিস্টীয় শাসনেও বাস্তবভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।


খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে ইহুদিধর্ম গ্রহণ: ফ্রান্সিসকো মালদোনাদো দে সিলভার মৃত্যু

ফ্রান্সিসকো মালদোনাদো দে সিলভার ঘটনাটি আরও সরাসরি ধর্মত্যাগের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ক্যাথলিক পরিবারে বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং যৌবনের প্রথমদিকে ক্যাথলিক ধর্মীয় জীবন পালন করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইহুদিধর্ম গ্রহণ করেন। নিজের বিশ্বাস গোপন না রেখে ইহুদি ধর্মীয় মতের পক্ষে যুক্তি প্রচার করায় ইনকুইজিশনের নজরে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরে ১৬২৭ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাস, ধর্মীয় জিজ্ঞাসাবাদ ও ধর্মবিশ্বাস পরিত্যাগের চাপ সত্ত্বেও তিনি ইহুদিধর্মে অবিচল ছিলেন। অবশেষে ১৬৩৯ সালের ২৩ জানুয়ারি স্পেনশাসিত পেরুর লিমায় তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা খ্রিস্টধর্ম থেকে অন্য ধর্মে বিশ্বাস পরিবর্তন করার জন্য রাষ্ট্রসমর্থিত ধর্মীয় বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক উদাহরণ। [17]

এই ঘটনাটিকে দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:২–৭-এর সঙ্গে তুলনা করলে মূল নৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়। প্রাচীন ইসরায়েলীয় বিধানে অন্য দেবতার উপাসনার জন্য মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। খ্রিস্টীয় ইনকুইজিশনের এই ঘটনায় একজন বাপ্তিস্মপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাঁর পূর্বধর্ম ত্যাগ করে ইহুদিধর্ম গ্রহণ এবং সেই বিশ্বাসের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ধর্মদ্রোহী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হন। পদ্ধতি ও আইনি কাঠামো আলাদা—একটিতে পাথর ছুড়ে হত্যা, অন্যটিতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। কিন্তু উভয় ব্যবস্থায় ধর্মীয় আনুগত্য থেকে বিচ্যুতিকে এমন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার জন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া যায়।


বাইবেলীয় আইন থেকে উপনিবেশিক আইন: ঐতিহাসিক প্রমাণের তাৎপর্য

ম্যাসাচুসেটসের আইনসংকলন ধর্মীয় সহিংসতার ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে খ্রিস্টান শাসকেরা সরাসরি দ্বিতীয় বিবরণ ১৩ ও ১৭ উদ্ধৃত করে অন্য দেবতার উপাসনার জন্য মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। ফলে এই বিধান খ্রিস্টীয় শাসনে কখনো রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি—এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে মিথ্যা। ১৬৪১ সালের প্রাথমিক আইনপাঠ, ১৬৪৮ সালের মুদ্রিত আইন এবং ১৬৭২ সালের পুনর্মুদ্রিত আইনসংকলনের সাক্ষ্য দেখায়, পুরাতন নিয়মের মৃত্যুদণ্ডের বিধান আধুনিক যুগের সূচনাপর্বেও খ্রিস্টান উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় আইনগত কর্তৃত্ব লাভ করেছিল।

একই সময়ে জান হুস, মাইকেল সার্ভেটাস, এডওয়ার্ড ওয়াইটম্যান, ফ্রান্সিসকো মালদোনাদো দে সিলভা এবং মেরি ডায়ারের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাগুলো ধর্মীয় মতবাদ ও উপাসনার স্বাধীনতার ওপর বাস্তব রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দলিল। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একই আইনে বিচার হয়নি। কেউ ধর্মদ্রোহিতার দায়ে, কেউ ধর্মান্তর ও নিষিদ্ধ ধর্মচর্চার কারণে, কেউ নিষিদ্ধ ধর্মীয় মতপ্রচার ও নির্বাসনের আদেশ অমান্য করার কারণে নিহত হয়েছেন। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তিতে সাধারণ হত্যা, চুরি বা অন্যের শরীর ও সম্পত্তির ওপর আক্রমণের অপরাধ প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ধর্মীয় সত্যের দাবিকে রাষ্ট্রীয় শাস্তির ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করার ফলেই এই মৃত্যুদণ্ডগুলো সম্ভব হয়েছিল।

ফলে বাইবেলের ধর্মত্যাগবিরোধী সহিংস বিধানকে কেবল সুদূর অতীতের একটি অকার্যকর ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ। প্রাচীন ইসরায়েলীয় আইন থেকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব, সাম্রাজ্যিক ধর্মত্যাগবিরোধী আইন, মধ্যযুগীয় ধর্মদ্রোহিতার বিচার এবং প্রোটেস্ট্যান্ট উপনিবেশের আইনসংকলন পর্যন্ত ধর্মীয় আনুগত্যকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে রক্ষা করার ইতিহাস রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন বা ভিন্নমত প্রচারের জন্য মানুষকে হত্যা করার নীতি কেবল ধর্মগ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী খ্রিস্টীয় ইতিহাসে তা আইনি বিধান এবং বাস্তব মৃত্যুদণ্ড—উভয় রূপেই উপস্থিত হয়েছে।


বিশ্বাসের জন্য শাস্তি কেন মৌলিক মানবাধিকার হরণ?

ধর্মত্যাগের শাস্তি মৌলিকভাবে মানবাধিকারবিরোধী, কারণ মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস তার ব্যক্তিসত্তার অন্তর্গত। কোনো মানুষকে জোর করে সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসী বানানো যায় না। বন্দুকের মুখে কাউকে “আমি বিশ্বাস করি” বলানো যায়, কিন্তু তার মস্তিষ্কে বিশ্বাস সৃষ্টি করা যায় না। ফলে ধর্মত্যাগের শাস্তি বাস্তবে বিশ্বাস সৃষ্টি করে না; এটি সৃষ্টি করে ভণ্ডামি। মানুষ মনে মনে অবিশ্বাসী থাকবে, কিন্তু জীবন, পরিবার, সম্পত্তি বা সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বাইরে বিশ্বাসীর অভিনয় করবে। যে ধর্মীয় ব্যবস্থা মৃত্যুভয়ের মাধ্যমে বিশ্বাস ধরে রাখে, সে নিজের সত্যতার শক্তি নয়, নিজের জবরদস্তির শক্তি প্রদর্শন করে।

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্ম পরিবর্তনের অধিকার স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতা এবং নিজের পছন্দের ধর্ম বা বিশ্বাস গ্রহণের অধিকার স্বীকার করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি আরও পরিষ্কারভাবে বলেছে—এর মধ্যে বর্তমান ধর্মের পরিবর্তে অন্য ধর্ম গ্রহণ, ধর্ম ত্যাগ এবং নাস্তিক মত গ্রহণের স্বাধীনতাও রয়েছে। কাউকে এমন কোনো জবরদস্তির মুখে ফেলা যাবে না যা তার নিজের পছন্দের ধর্ম বা বিশ্বাস গ্রহণের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মৃত্যুদণ্ড তো সেই জবরদস্তির চূড়ান্ত রূপ। [18]

একটি সভ্য আইনব্যবস্থায় অপরাধ নির্ধারণের কেন্দ্রে থাকা উচিত বাস্তব ক্ষতি ও অন্যের অধিকার লঙ্ঘন। আপনি অন্য ধর্ম গ্রহণ করলেন—কাকে হত্যা করলেন? আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস হারালেন—কার সম্পত্তি চুরি করলেন? আপনি বললেন “আমার পূর্বের ধর্ম সত্য নয়”—কার শারীরিক নিরাপত্তা ধ্বংস করলেন? যদি উত্তর হয় “কাউকে নয়”, তাহলে রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। “ঈশ্বর অপমানিত হয়েছেন” বা “ধর্মীয় সমাজ কষ্ট পেয়েছে” কোনো মানুষকে পাথর মেরে হত্যার বৈধ কারণ হতে পারে না। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সম্মান রক্ষার জন্য যদি দুর্বল মানুষকে পাথর হাতে দাঁড়াতে হয়, তাহলে এখানে রক্ষা করা হচ্ছে ঈশ্বরকে নয়—ধর্মীয় ক্ষমতাকে।


পরিবারকে জল্লাদে পরিণত করা: বিধানটির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক

দ্বিতীয় বিবরণ ১৩:৬–১১-এর সবচেয়ে নৃশংস দিকগুলোর একটি হলো, এটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে পরিবারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। ভাই, সন্তান, স্ত্রী বা “নিজের প্রাণের মতো প্রিয় বন্ধু” যদি অন্য দেবতার দিকে আহ্বান করে, তাহলে তাকে দয়া করা যাবে না, লুকানো যাবে না; বরং হত্যার জন্য প্রথম হাত আপনজনেরই উঠবে। এটি শুধু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নয়, এটি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক সামাজিক সম্পর্কের ওপর ধর্মীয় আনুগত্যকে বসিয়ে দেওয়া। বার্তাটি পরিষ্কার: তোমার সন্তান নয়, তোমার ভাই নয়, তোমার জীবনসঙ্গী নয়—ধর্মীয় কর্তৃত্ব সবার আগে। প্রয়োজন হলে ধর্মের জন্য আপনজনের মৃত্যুতেও অংশ নাও।

এই ধরনের আইন একটি সমাজে বিশ্বাস নয়, সন্দেহ ও নজরদারির সংস্কৃতি তৈরি করে। মানুষ নিজের পরিবারের কাছেও মনের কথা বলতে ভয় পাবে। কেউ প্রশ্ন করলে, সন্দেহ প্রকাশ করলে কিংবা ভিন্ন বিশ্বাসের কথা বললে তার নিকটতম মানুষই সম্ভাব্য অভিযোগকারী হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোও ঠিক এই কৌশল ব্যবহার করেছে—পরিবারের সদস্যকে পরিবারের বিরুদ্ধে, প্রতিবেশীকে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে, বন্ধুকে বন্ধুর বিরুদ্ধে তথ্যদাতা বানানো। দ্বিতীয় বিবরণের বিধানে ধর্মীয় আনুগত্যকে এমন পর্যায়ে তোলা হয়েছে যেখানে মানবিক মমতাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়: “দয়া করো না।” এটি কোনো উচ্চতর নৈতিকতার ভাষা নয়; এটি মতাদর্শিক নিষ্ঠুরতার ভাষা।


এটি পুরাতন নিয়ম, এখন আর প্রযোজ্য নয়?

বাইবেলের এসব বর্বর বিধানের সমালোচনা উঠলে আধুনিক খ্রিস্টান এপোলোজেটিক্সে একটি বহুল ব্যবহৃত উত্তর হলো, এগুলো পুরাতন নিয়মের মোজাইক আইন, এগুলো শুধু প্রাচীন ইসরায়েলের জন্য ছিল; যীশুর আগমনের পরে এসব আইন আর খ্রিস্টানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এই উত্তরটি যতটা সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়, নতুন নিয়মের বক্তব্য ততটা সহজ নয়। কারণ মথির সুসমাচারে যীশু নিজেই স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি মুসার বিধান ও নবীদের শিক্ষা ধ্বংস বা বিলোপ করতে আসেননি, বরং তা পূর্ণ করতে এসেছেন। শুধু এটুকুই নয়, তিনি আরও বলেছেন—আকাশ ও পৃথিবী বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং সবকিছু পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিধানের ক্ষুদ্রতম অংশও লোপ পাবে না; যে ব্যক্তি ক্ষুদ্রতম আদেশও অমান্য করে এবং অন্যকে তা করতে শেখায়, সে স্বর্গরাজ্যে ক্ষুদ্র বলে গণ্য হবে, আর যে তা পালন করে এবং অন্যকে পালন করতে শেখায়, সে মহান বলে গণ্য হবে [19] [20]। অর্থাৎ মথির বর্ণনায় যীশুর অবস্থান “মুসার বিধান ভুল ছিল, তাই আমি তা বাতিল করতে এসেছি”, এমন নয়; বরং ঠিক উল্টোভাবে তিনি সেই বিধান ধ্বংস করতে আসার ধারণা প্রত্যাখ্যান করছেন এবং তার পূর্ণতা, স্থায়িত্ব ও পালনের গুরুত্ব ঘোষণা করছেন।

এখানেই “ওগুলো তো পুরাতন নিয়ম” অজুহাতটি বড় সমস্যায় পড়ে। কারণ একই পুরাতন নিয়মে যদি অন্য দেবতার উপাসনা কিংবা অন্যকে সেই উপাসনার দিকে আহ্বান করার জন্য পাথর ছুড়ে হত্যার মতো বর্বর বিধান থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসে—যীশু কোথায় স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এই আইনগুলো নৈতিকভাবে অন্যায় ছিল এবং তাই তিনি সেগুলো বাতিল করছেন? মথি ৫:১৭–২০-এ আমরা তার বিপরীত ভাষাই দেখি: বিধান বিলোপ নয়, পূর্ণ করা; ক্ষুদ্রতম বিধানও অগ্রাহ্য না করা; বিধান পালন করা এবং অন্যকে পালন করতে শেখানোর প্রশংসা। পরবর্তী খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে মোজাইক আইনকে “নৈতিক”, “আনুষ্ঠানিক” ও “নাগরিক” ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করে কোনটি এখন কার্যকর আর কোনটি নয়—এ নিয়ে জটিল ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগকে সরাসরি যীশুর মুখের কথা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায় না। মথির এই বক্তব্যে যীশু বলেননি, “মুসার কিছু আইন আসলে বর্বর ও অন্যায় ছিল, সেগুলো এখন বাতিল।” বরং তিনি মুসার বিধান বিলোপ করতে আসার ধারণাটিই সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধরে নিলাম পরবর্তী কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বলা হলো যে ধর্মত্যাগীকে পাথর ছুড়ে হত্যার আইন এখন আর খ্রিস্টানদের জন্য কার্যকর নয়। তাতেও মূল নৈতিক সমস্যার বিন্দুমাত্র সমাধান হয় না। প্রশ্ন শুধু এই নয় যে আজকের একজন খ্রিস্টান আইনটি পালন করেন কিনা; আসল প্রশ্ন হলো, সর্বজ্ঞ, সর্বকালীন এবং পরম ন্যায়বান বলে দাবি করা ঈশ্বর প্রথম অবস্থাতেই কেন এমন আইন দেবেন যেখানে একজন মানুষের বিশ্বাস পরিবর্তন, অন্য দেবতার উপাসনা কিংবা অন্যকে সেই বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করার শাস্তি মৃত্যু? একটি আইন পরে অকার্যকর হয়ে গেলেই তার অতীতের বর্বরতা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। কোনো ঈশ্বর যদি একসময় দাস রাখা, ধর্মত্যাগী হত্যা বা ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে পাথর মেরে মারাকে বৈধ করেন এবং পরে সেই আইন আর কার্যকর না থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—পরম ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কি যুগে যুগে এমনভাবে বদলায় যে এক যুগে যা ন্যায়সঙ্গত হত্যাকাণ্ড, অন্য যুগে সেটিই মানবাধিকার লঙ্ঘন?

“তখনকার সময়ের জন্য ঠিক ছিল”—এই অজুহাতও একই কারণে ব্যর্থ। একজন মানুষ খ্রিস্টপূর্ব যুগে জন্মেছে বলে কি তার বিবেক, বিশ্বাস ও ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতার কোনো মূল্য ছিল না? আর আধুনিক যুগে জন্মেছে বলে হঠাৎ সেই একই স্বাধীনতা মৌলিক মানবাধিকার হয়ে গেল? মানুষের জীবন ও বিবেকের মূল্য ক্যালেন্ডারের তারিখের ওপর নির্ভর করে না। হত্যা, নির্যাতন বা অন্যের অধিকার হরণ না করে কেবল অন্য ধর্মে বিশ্বাস করার কারণে কাউকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা আজ যদি বর্বরতা হয়, তবে তিন হাজার বছর আগেও সেটি বর্বরতাই ছিল। সময়ের ব্যবধান কোনো অন্যায়কে ন্যায়বিচারে রূপান্তরিত করে না।

বরং ইতিহাসের বাস্তবতা অনেক সহজ একটি ব্যাখ্যা দেয়। প্রাচীন ধর্মতান্ত্রিক সমাজগুলো তাদের সময়ের গোত্রীয় আনুগত্য, ধর্মীয় একচেটিয়াবাদ, প্রতিশোধমূলক শাস্তি এবং কর্তৃত্ববাদী আইনকে ঈশ্বরের নামে পবিত্র করেছে। পরে মানবসভ্যতায় ব্যক্তিস্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ধারণা বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সেই বর্বর বিধানগুলো কার্যত পরিত্যাগ করেছে। আধুনিক খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলো ধর্মত্যাগীকে পাথর মেরে হত্যা করে না—এটি অবশ্যই সভ্যতার অগ্রগতি। কিন্তু এই অগ্রগতি দ্বিতীয় বিবরণের সেই আইন অনুসরণ করে আসেনি; এসেছে সেই আইনকে আর প্রয়োগ না করার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ বহু ক্ষেত্রে মানুষ বাইবেলের প্রাচীন কালাকানুন অনুসরণ করে মানবিক হয়নি, বরং সেগুলো অতিক্রম ও পরিত্যাগ করেই অধিক মানবিক হয়েছে।


মানুষ বাইবেলকে অনুসরণ করে মানবিক হয়নি

এখানে আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির একটি অস্বস্তিকর সত্য রয়েছে। আজ অধিকাংশ খ্রিস্টান সমাজ ধর্মত্যাগীকে হত্যা করে না, ধর্মদ্রোহীকে আগুনে পোড়ায় না, অন্য দেবতার উপাসককে পাথর মারে না। এটি নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু এই মানবিক অবস্থান দ্বিতীয় বিবরণ ১৩-এর নির্দেশ অনুসরণের ফল নয়; বরং সেই নির্দেশ কার্যত প্রত্যাখ্যান করার ফল। আধুনিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই নীতির ওপর যে রাষ্ট্র নাগরিকের আত্মার মালিক নয়, কোনো চার্চ মানুষের বিবেকের মালিক নয়, এবং একজন মানুষের বিশ্বাসের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের জন্য কারাগার, পাথর, আগুন বা জল্লাদ ব্যবহার করা যাবে না।

আজ একজন খ্রিস্টান তার ধর্ম ত্যাগ করলে তাকে বাঁচিয়ে রাখা যদি ন্যায়সঙ্গত হয়, তাহলে প্রাচীন ইসরায়েলীয়কে অন্য দেবতার জন্য হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত ছিল না। নৈতিক সত্য একই ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু যুগ বদলানোর কারণে উল্টো হয়ে যায় না। নিরপরাধ মানুষের জীবন, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা প্রাচীন মানুষদের জন্যও মূল্যবান ছিল, যেমন আজকের মানুষের জন্য। তাই এই বিধানকে “ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট” দিয়ে বোঝা যায়, কিন্তু নৈতিকভাবে বৈধ করা যায় না। দাসপ্রথাকেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়; তাই বলে দাসপ্রথা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না।


উপসংহার

দ্বিতীয় বিবরণের ধর্মীয় বিচ্যুতি-বিরোধী আইনগুলো আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের বিচারে স্পষ্টতই বর্বর, কর্তৃত্ববাদী এবং মানবাধিকারবিরোধী। একজন মানুষকে তার বিশ্বাস, উপাসনা বা অন্যকে ভিন্ন ধর্মীয় মতের দিকে আহ্বান করার জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা করা ন্যায়বিচার নয়; এটি ধর্মতান্ত্রিক সন্ত্রাস। আপনজনকে দয়া না করতে বলা, পরিবারের সদস্যকে হত্যায় প্রথম হাত তুলতে বলা এবং একজনের মৃত্যুকে অন্যদের ভয় দেখানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা কোনো সর্বজনীন মানবিক নীতির পরিচয় বহন করে না। এগুলো এমন এক প্রাচীন সমাজের আইনগত মানসিকতা প্রতিফলিত করে যেখানে ধর্ম, রাষ্ট্র, গোত্রীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্য একাকার ছিল এবং ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতার স্বতন্ত্র মূল্য স্বীকৃত ছিল না।

ঐতিহাসিকভাবে এই নির্দিষ্ট বিধান প্রাচীন ইসরায়েলে ঠিক কতবার হুবহু প্রয়োগ করা হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত—এটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করা উচিত। কিন্তু তাই বলে এর নৈতিক ভয়াবহতা কমে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধর্মীয় বিচ্যুতিকে অপরাধ হিসেবে দেখার এই বৃহত্তর মানসিকতা পরবর্তী খ্রিস্টীয় ইতিহাসে বাস্তব রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে—প্রাচীন খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ডের সমর্থন, খ্রিস্টীয় রোমান আইনে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নাগরিক অধিকার নির্ধারণ, মধ্যযুগে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চার্চ ও রাষ্ট্রের যৌথ দমন এবং সংস্কারযুগেও ভিন্নমতের জন্য মৃত্যুদণ্ড তার প্রমাণ।

বাইবেলের এই বিধানকে “মধ্যযুগীয় কালাকানুন” বলা কালানুক্রমিকভাবে পুরোপুরি সঠিক নয়—এটি মধ্যযুগেরও বহু আগের। আরও কঠিন সত্য হলো, এটি মধ্যযুগীয় বর্বরতারও পূর্ববর্তী এক প্রাচীন ধর্মতান্ত্রিক কালাকানুন, যার মৌলিক দর্শন পরবর্তী বহু শতাব্দীর ধর্মীয় নিপীড়নের সঙ্গে একই বিপজ্জনক নীতি ভাগ করে নেয়: সত্য নির্ধারণ করবে ক্ষমতাবান ধর্ম, আর ভিন্নমতের মূল্য দিতে হবে স্বাধীনতা, সম্পত্তি কিংবা জীবন দিয়ে। মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় নৈতিক অগ্রগতিগুলোর একটি ঘটেছে তখনই, যখন আমরা এই ধারণাকে উল্টে দিয়েছি—মানুষ ধর্মের জন্য নয়; ধর্ম মানুষের জন্য। কোনো ধর্মগ্রন্থ, নবী, পুরোহিত, চার্চ বা রাষ্ট্র মানুষের বিবেকের মালিক নয়। বিশ্বাস করার অধিকার যেমন মানুষের, তেমনি অবিশ্বাস করার, প্রশ্ন করার, ধর্ম বদলানোর এবং ধর্ম ত্যাগ করার অধিকারও মানুষের। যে আইন এই অধিকারের বিনিময়ে মৃত্যু দাবি করে, তাকে পবিত্র আইন নয়—বর্বর কালাকানুন বলাই নৈতিকভাবে সঠিক।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Universal Declaration of Human Rights, Article 18; International Covenant on Civil and Political Rights, Article 18; UN Human Rights Committee, General Comment No. 22 ↩︎
  2. Deuteronomy 17:2–7, King James Version ↩︎
  3. Exodus 22:20, King James Version ↩︎
  4. 2 Chronicles 15:12–13, King James Version ↩︎
  5. Deuteronomy 13:12–18, King James Version ↩︎
  6. Mishnah Sanhedrin 10:4, Laws of the Idolatrous City ↩︎
  7. Babylonian Talmud, Sanhedrin 71a, The Idolatrous City ↩︎
  8. Joshua Berman, “CTH 133 and the Hittite Provenance of Deuteronomy 13,” Journal of Biblical Literature, 2011; Bernard M. Levinson, studies on Deuteronomy and ancient Near Eastern treaty traditions ↩︎
  9. Matthew R. Crawford, “Cyril of Alexandria’s Renunciation of Religious Violence,” Church History, Vol. 92, Issue 1, 2023, pp. 1–21; Cyril, De adoratione, Book VI, Patrologia Graeca 68, cols. 417–421 ↩︎
  10. Matthew R. Crawford, “Cyril of Alexandria’s Renunciation of Religious Violence,” Sections I–V; Cyril, De adoratione, Glaphyra, Commentary on John এবং Commentary on 2 Corinthians-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ ↩︎
  11. Codex Theodosianus, 16.7.1–16.7.3, De apostatis; Université Grenoble Alpes, Roman Law Collection ↩︎
  12. Fourth Lateran Council, 1215, Canon 3: On Heretics ↩︎
  13. John Calvin, Harmony of the Law, Commentary on Deuteronomy 13:6–11; Christian Classics Ethereal Library ↩︎
  14. H. Henry Meeter Center for Calvin Studies, The Controversy of Michael Servetus’ Execution; 1553 সালের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের কালপঞ্জি ↩︎
  15. A True Relation of the Commissions and Warrants for the Condemnation and Burning of Bartholomew Legatt and Edward Wightman; সপ্তদশ শতাব্দীর রাজকীয় আদেশের প্রকাশিত পাঠ, Oxford Text Archive ↩︎
  16. Ian Atherton and David Como, “The Burning of Edward Wightman,” The English Historical Review, Vol. 120, 2005, pp. 1215–1250 ↩︎
  17. Jewish Encyclopedia, “Silva, Francisco Maldonado de”; Cyrus Adler and George Alexander Kohut; trial records and historical bibliography ↩︎
  18. Universal Declaration of Human Rights, Article 18; ICCPR, Article 18; Human Rights Committee General Comment No. 22 ↩︎
  19. নতুন নিয়ম, মথি ৫:১৭–২০ ↩︎
  20. মুসার বিধান পূর্ণ করতে এসেছে যীশু ↩︎

About This Article

Genre: Biblical, Historical, Human-Rights, and Religious-Law Critique of Apostasy Punishment

Epistemic Position: Secular Humanism, Biblical Criticism, Historical Criticism, Freedom of Conscience, Human Rights Ethics, and Anti-Theocratic Reasoning

This article examines biblical laws on apostasy, the worship of other gods, religious persuasion, stoning, family-based enforcement, and collective punishment for religious deviation.

The central argument is that punishing belief, disbelief, or religious change with death is not justice; it is theocratic terror against freedom of conscience.

The article also rejects the apologetic shortcut that these were merely “Old Testament laws,” showing that later Christian history repeatedly preserved the same authoritarian logic against heretics, apostates, and dissenters.

This article should be evaluated through human rights, freedom of belief, historical evidence, biblical law, moral consistency, and secular ethics—not through inherited reverence, theological excuses, religious authority, or the demand that ancient cruelty be called divine justice.

Leave a comment

Your email will not be published.