জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

রিজিকের একমাত্র মালিক আল্লাহ: কোরআনের প্রতিশ্রুতি ও অনাহারে মৃত্যুর বাস্তবতা

প্রকাশিত: মার্চ 14, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন32 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলাম ধর্মের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাসের একটি হলো, কোন দ্বিধা বা সন্দেহ ছাড়াই এই কথাতে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা যে, রিজিক (অর্থ, খাদ্য, জীবিকা, আয়-উপার্জন) একমাত্র আল্লাহই নির্ধারণ করেন, প্রদান করেন, বান্দাদের কাছে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করেন এবং তিনি যার ইচ্ছা রিজিক বৃদ্ধি করেন এবং যার ইচ্ছা কমিয়ে দেন। এই বিশ্বাস অনুযায়ী চূড়ান্ত মালিকানা ও ফয়সালার অধিকার কেবল আল্লাহর; মানুষ পরিশ্রম, উৎপাদন ও বণ্টনের কাজে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত কে কতটুকু পাবে, সেটিও আল্লাহর ইচ্ছা ও পূর্বনির্ধারণের বাইরে নয়। অথচ ক্ষুধা, অপুষ্টি, দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবতার মুখোমুখি হলে প্রশ্ন ওঠে—যার ওপর সব জীবের রিজিকের দায়িত্ব, তার সেই দায়িত্বের বাস্তব অর্থ কী? পরে তাফসির ও আকীদার ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, কোনো প্রাণী অনাহারে মারা গেলেও আল্লাহর রিজিকদাতা হওয়ার দাবি অক্ষুণ্ণ থাকে; অর্থাৎ দাবিটির বিপরীত কোনো ফলাফলকেও আর তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। এই ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা বাস্তব জীবিকার উৎস, শ্রমের মূল্য, খাদ্যবণ্টন ও সামাজিক দায়কে ব্যাখ্যা করার বদলে প্রায়শই অলৌকিক মালিকানার একটি অযাচাইযোগ্য দাবি সামনে আনে। ধর্মীয় নির্ভরশীলতার এই ধারণা যুক্তির পরিবর্তে গ্রহণ করা হলে তা শ্রম ও অর্থনৈতিক নীতির যথাযথ মূল্যায়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, বিশেষত যখন অনাহারকে আল্লাহর ইচ্ছা বা পরীক্ষার ফল হিসেবে মেনে নিতে শেখানো হয়। আলোচনার শুরুতেই আসুন প্রখ্যাত আলেম আহমদুল্লাহর কিছু বক্তব্য শুনে নিই,


কোরআনের ভাষায় রিজিকের একচ্ছত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ

রিজিকের ক্ষেত্রে আল্লাহকে কেবল একজন সহায়ক বা আশীর্বাদদাতা বলা হয়নি; কোরআনের ভাষা আরও দৃঢ়। সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৭–৫৮-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ সৃষ্টির কাছ থেকে রিজিক চান না, তিনিই রিজিকদাতা এবং শক্তির অধিকারী। সূরা আনকাবুত ২৯:৬০-এ এমন সব প্রাণীর কথা বলা হয়েছে, যারা নিজেদের খাদ্য সঞ্চয় বা বহন করে না; সেগুলোকেও এবং মানুষকেও আল্লাহ রিজিক দেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই দাবির কেন্দ্রে মানুষের কাজ নয়, খাদ্যবণ্টনের চূড়ান্ত উৎস হিসেবে আল্লাহর নিজস্ব কর্তৃত্ব। [1] [2]

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, মহাশক্তিধর, সুদৃঢ় শক্তির অধিকারী।।

وَكَأَيِّنْ مِنْ دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

বাংলা অনুবাদ: কত প্রাণীই তো আছে, যারা নিজেদের রিজিক বহন করে না; আল্লাহই তাদের এবং তোমাদের রিজিক দেন। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।।

সূরা শুরা ৪২:১২ ও ৪২:২৭ এবং সূরা রা’দ ১৩:২৬-এ আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে কারও রিজিক বৃদ্ধি, কারও সংকোচন এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে বিতরণের কথা বলা হয়েছে। সূরা তালাক ৬৫:৩-এ আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি যথেষ্ট বলে ঘোষণা করা হয়েছে; সব কিছুর জন্য তিনি একটি পরিমাপও নির্ধারণ করেছেন। এই আয়াতগুলো একত্রে পড়লে রিজিকের পরিমাণ ও বণ্টনের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত আল্লাহর বলেই দাবি করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি কাজ করে অর্থ উপার্জন করে, কৃষক ফসল উৎপাদন করে কিংবা রাষ্ট্র খাদ্য পরিবহন করে—এসব দৃশ্যমান কার্যকারণ অস্বীকার না করেও কোরআন দাবি করছে যে এগুলোর ওপর আল্লাহর চূড়ান্ত নির্ধারণ কাজ করে। সমালোচনার কেন্দ্র সেই সর্বশেষ, অতিপ্রাকৃত মালিকানা ও সিদ্ধান্তের দাবি; শ্রম ও কৃষির অস্তিত্ব অস্বীকার করা নয়। [3] [4] [5]

وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

বাংলা অনুবাদ: যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। তিনি প্রত্যেক বিষয়ের জন্য একটি পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।।

এখানেই একটি মৌলিক যাচাইযোগ্যতার প্রশ্ন রয়েছে। বৃষ্টির অভাবে ধান নষ্ট হলে কৃষিবিজ্ঞান বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা, সেচ ও ফসলের উৎপাদন দিয়ে ফল ব্যাখ্যা করে। দুর্ভিক্ষে খাদ্য থাকলেও কেউ কিনতে না পারলে অর্থনীতি আয়, মূল্য, বাজার ও অধিকার দিয়ে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এর ওপর যখন বলা হয়, সবকিছুর চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর, তখন সেই বাড়তি দাবিটি কোন নতুন তথ্য দেয়? আল্লাহ চাইলে বেশি দিয়েছেন, কম পেলে কম দিতে চেয়েছেন, না পেলে না দিতে চেয়েছেন—এই তিনটি ব্যাখ্যার যে কোনোটি যেকোনো ফলের পরে বসানো যায়। ফলে দাবিটি বাস্তবতার পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনাই হারিয়ে ফেলে। একটি বক্তব্যকে সব সম্ভাব্য ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া আর সেটির সত্যতার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া এক জিনিস নয়।


ইসলামের বিশ্বাস ও তার বিপরীত বাস্তবতা

আসুন কোরআন ও হাদিসের কিছু বক্তব্য পড়ে নিই, [6] [7] [8] [9] [10]

আল্লাহ যদি তাঁর সকল বান্দাহদের জন্য রিযক পর্যাপ্ত করে দিতেন, তাহলে তারা অবশ্যই যমীনে বিদ্রোহ সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে যতটুকু ইচ্ছে নাযিল করেন। তিনি তাঁর বান্দাহদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল, তিনি তাদের প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখেন।
— Taisirul Quran
আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে জীবনোপকরণের প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছা মত সঠিক পরিমানেই দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে সম্যক জানেন ও দেখেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ যদি তার বান্দাদের জন্য রিয্ক প্রশস্ত করে দিতেন, তাহলে তারা যমীনে অবশ্যই বিদ্রোহ করত। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণে যা ইচ্ছা নাযিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত, সম্যক দ্রষ্টা।
— Rawai Al-bayan
আর যদি আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের রিযিক প্রশস্ত করে দিতেন, তবে তারা যমীনে অবশ্যই সীমালংঘন করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছেমত পরিমানেই নাযিল করে থাকেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত ও সর্বদ্ৰষ্টা।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আল্লাহ রিযক সম্প্রসারিত করেন যার জন্য ইচ্ছে করেন, আর যার জন্য চান সীমিত পরিমাণে দেন। তারা পার্থিব জীবনে আনন্দে মেতে আছে অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন অতি নগণ্য বস্তু।
— Taisirul Quran
আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন কিংবা সংকুচিত করেন; কিন্তু তারা পাথির্ব জীবন নিয়েই উল্লসিত, অথচ ইহজীবনতো পরজীবনের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগ মাত্র।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন রিযক বাড়িয়ে দেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে উৎফুল্লতায় আছে, অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন খুবই নগণ্য।
— Rawai Al-bayan
আল্লাহ্ যার জন্য ইচ্ছে তার জীবনোপকরণ বৃদ্ধি করেন এবং সংকুচিত করেন; কিন্তু এরা দুনিয়ার জীবন নিয়েই আনন্দিত, অথচ দুনিয়ার জীবন তো আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের পার্থিব জীবন সুশোভিত করা হয়েছে এবং তারা বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরকে উপহাস করে থাকে, এবং যারা ধর্মভীরু তাদেরকে উত্থান দিনে সমুন্নত করা হবে; এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন অপরিমিত জীবিকা দান করে থাকেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
যারা কুফরী করেছে, দুনিয়ার জীবনকে তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আর তারা মুমিনদের নিয়ে উপহাস করে। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তারা কিয়ামত দিবসে তাদের উপরে থাকবে। আর আল্লাহ যাকে চান, বেহিসাব রিয্ক দান করেন।
— Rawai Al-bayan
যারা কুফুরী করে তাদের জন্য দুনিয়ার জীবন সুশোভিত করা হয়েছে এবং তারা মুমিনদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে থাকে। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে কেয়ামতের দিন তারা তাদের উর্ধ্বে থাকবে। আর আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছে অপরিমিত রিযিক দান করেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

যমীনে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই, তিনি জানেন তাদের থাকার জায়গা কোথায় আর কোথায় তাদেরকে (মৃত্যুর পর) রাখা হয়, সব কিছুই আছে সুস্পষ্ট লিপিকায়।
— Taisirul Quran
আর ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোন প্রাণী নেই যাদের রিয্ক আল্লাহর যিম্মায় না রয়েছে, আর তিনি প্রত্যেকের দীর্ঘ অবস্থানের স্থান এবং অল্প অবস্থানের স্থানকে জানেন, সবই কিতাবে মুবীনে (লাউহে মাহফুযে) রয়েছে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিয্কের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল* । সব কিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে**। * এখানে مستقر বা আবাসস্থল বলতে মাতৃগর্ভে অবস্থান মতান্তরে মৃত্যু পর্যন্ত দুনিয়ায় অবস্থানকে বুঝানো হয়েছে। আর مستودع দ্বারা কবরস্থ করার স্থান মতান্তরে জন্মের পূর্বে পিতৃমেরুদন্ডে অবস্থান কিংবা মৃত্যুর সময় বা স্থান বুঝানো হয়েছে।
— Rawai Al-bayan
আর যমীনে বিচরণকারী সবার জীবিকার [১] দায়িত্ব আল্লাহ্‌রই [২] এবং তিনি সেসবের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি [৩] সম্বন্ধে অবহিত; সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে আছে [৪]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সূরা হুদ ১১:৬-এর আরবি মূল পাঠে عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا—‘তার রিজিক আল্লাহর ওপর’—এই গঠন ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী তাফসিরে এর ব্যাখ্যায় مِنَ اللَّهِ رِزْقُهَا—‘তার রিজিক আল্লাহর কাছ থেকে’—বলার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ; এই অর্থগত রূপান্তর পরবর্তী পরিচ্ছেদে মুজাহিদ, বাগাভি ও ইসলামওয়েবের বক্তব্যে সরাসরি পাওয়া যায়। [11]

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

বাংলা অনুবাদ: পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়। তিনি তার অবস্থান ও যেখানে তাকে রাখা হয় তা জানেন; সবই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ।

সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৪/ দুনিয়াবী ভোগবিলাসের প্রতি অনাসক্তি
পরিচ্ছেদঃ ৩৩. আল্লাহ তা’আলার উপর পুরোপরি নির্ভরশীল হওয়া
২৩৪৪। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ্ তা’আলার উপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের যেভাবে রিযিক দেয়া হয় সেভাবে তোমাদেরকেও রিযিক দেয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যা বেলায় ভরা পেটে ফিরে আসে।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (৪১৬৪)।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আমরা এই হাদীসটি শুধুমাত্র উপরোক্ত সূত্রেই জেনেছি। আবূ তামীম আল-জাইশানীর নাম আবদুল্লাহ ইবনু মালিক।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

তাহলে, অপুষ্টির শিকার এই বালকটির রিজিক কে সংকুচিত করে দিয়েছে? তার রিজিক কে সীমিত করে দিয়েছে?

অপুষ্টির শিকার বালক

কোরআন ১১:৬-এর প্রাচীন তাফসির: রিজিক না পেয়ে অনাহারে মৃত্যু

কোরআন ১১:৬-এ ঘোষণা করা হয়েছে, পৃথিবীর কোনো প্রাণী নেই যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়। এই বাক্যকে তার স্বাভাবিক অর্থে পড়লে প্রশ্ন ওঠে, খাদ্যের অভাবে মারা যাওয়া মানুষ ও প্রাণীর ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব কোথায় গেল? প্রশ্নটি আধুনিক যুগে প্রথম তৈরি হয়নি। কোরআনের প্রাচীন ব্যাখ্যাকারী মুজাহিদ ইবন জাবর সম্পর্কে তাবারির জামিউল বায়ান-এ ১৭৯৫৯ নম্বর বর্ণনায় এমন ব্যাখ্যা সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে স্বীকার করা হয়েছে—কোনো প্রাণী রিজিক না পেয়ে অনাহারেই মারা যেতে পারে। তাবারি আয়াতটির ব্যাখ্যায় রিজিক বলতে প্রাণীর খাদ্য, পুষ্টি ও বেঁচে থাকার উপকরণই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ আলোচনাটি কেবল অর্থসম্পত্তির মালিকানা নিয়ে নয়; বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় খাদ্য নিয়েও। [12]

مَا جَاءَهَا مِنْ رِزْقٍ فَمِنَ اللَّهِ، وَرُبَّمَا لَمْ يَرْزُقْهَا حَتَّى تَمُوتَ جُوعًا، وَلَكِنْ مَا كَانَ مِنْ رِزْقٍ فَمِنَ اللَّهِ

বাংলা অনুবাদ: তার কাছে যে রিজিক আসে, তা আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। কখনো আল্লাহ তাকে রিজিক দেন না, এমনকি সে অনাহারে মারা যায়; কিন্তু তার যে রিজিকই থাকে, তা আল্লাহর কাছ থেকে।।

মুজাহিদের বক্তব্যটি সাধারণ একটি মন্তব্য নয়; এটি মূল আয়াতের দাবির ব্যাখ্যা। তিনি অনাহারে মৃত্যু অস্বীকার করেননি। বরং রিজিক না পাওয়াটিও আল্লাহর সিদ্ধান্তের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নিয়ে রিজিকের উৎস হিসেবে আল্লাহর একচ্ছত্র অবস্থান রক্ষা করেছেন। ফলে ‘সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর’—এই বাক্যের কার্যকর ব্যাখ্যা দাঁড়াচ্ছে: কোনো প্রাণী যা পেয়েছে, সেটি আল্লাহ দিয়েছেন; যা পায়নি, তার জন্য আল্লাহকে দায়ী করা যাবে না। প্রশ্নটি তখন আগের চেয়েও কঠিন হয়। যদি একজন শিশু অনাহারে মারা যায় এবং সেই অনাহারও আল্লাহর রিজিক না দেওয়ার ফল হয়, তাহলে সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও দয়ালু রিজিকদাতার দাবির সঙ্গে এই ঘটনাটির নৈতিক সম্পর্ক কী? তাবারির সংকলনে অন্য কোথাও এই বর্ণনা পুনরাবৃত্ত হলেই তা স্বাধীন নতুন সাক্ষ্য হয়ে যায় না; এখানে তাবারির মাধ্যমে সংরক্ষিত মুজাহিদের ব্যাখ্যাটিই আলোচ্য।


বাগাভির আরও স্পষ্ট বক্তব্য: চাইলে দেন, না চাইলে দেন না

ইমাম বাগাভির মাআলিমুত তানজিল-এ সূরা হুদ ১১:৬-এর তাফসির আরও স্পষ্ট। তিনি প্রথমে আয়াতের ‘রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর’ বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে বলেন, আল্লাহ অনুগ্রহবশত রিজিকের ব্যবস্থাপক এবং বিষয়টি তাঁর ইচ্ছাধীন; তিনি চাইলে দেন, আর না চাইলে দেন না। তারপর মুজাহিদের সেই অনাহারে মৃত্যুর ব্যাখ্যাও উল্লেখ করেন। এটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারীর নিজের ভাষায় রিজিক পাওয়া ও না পাওয়ার সর্বশেষ ফয়সালাকে আল্লাহর হাতে রেখে দেওয়ার সাক্ষ্য। [13] [14]

هُوَ الْمُتَكَفِّلُ بِذَلِكَ فَضْلًا وَهُوَ إِلَى مَشِيئَتِهِ إِنْ شَاءَ رَزَقَ وَإِنْ شَاءَ لَمْ يَرْزُقْ

বাংলা অনুবাদ: তিনি অনুগ্রহবশত এর দায়িত্ব নিয়েছেন; আর বিষয়টি তাঁর ইচ্ছার অধীন—তিনি চাইলে রিজিক দেন, আর না চাইলে দেন না।।

এই ব্যাখ্যায় অনাহারের দায় মানুষের কর্ম বা প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে আল্লাহর কর্তৃত্ব কমানো হয়নি; বরং রিজিক দেওয়া ও না দেওয়াকে একচ্ছত্রভাবে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাহলে ‘দায়িত্ব নেওয়া’র কথাটি সাধারণ ভাষায় কী অর্থ বহন করে? কোনো মানুষের কাছে দায়িত্ব বলতে প্রত্যাশিত কাজ সম্পন্ন না হলে তার ব্যাখ্যা ও জবাবদিহির প্রয়োজন বোঝায়। বাগাভির বক্তব্য অনুযায়ী আল্লাহর ক্ষেত্রেই কেবল ‘দায়িত্ব’ বলতে কখনো খাবার দেওয়া, কখনো না দেওয়া এবং অনাহারে মৃত্যুকেও সেই ব্যবস্থার মধ্যে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে ধর্মতাত্ত্বিক দাবির অবিচ্ছিন্নতা রক্ষা হয়, কিন্তু অনাহারে মৃত্যুর নৈতিক সমস্যা মেটে না।


ইসলামওয়েবের স্বীকারোক্তি: অনাহারে মৃত্যু রিজিকের দায়িত্বের বিরোধী নয়!

ইসলামওয়েবের ২২ অক্টোবর ২০২০ সালের ফতোয়া ৪৩০৬০৯-এ কোরআন ১১:৬ এবং ইয়েমেনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত একটি শিশুর ছবি নিয়ে ঠিক এই আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, আল্লাহ যদি প্রত্যেক প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব নেন, তাহলে মানুষ ও প্রাণী অনাহারে মারা যায় কীভাবে? ফতোয়ার উত্তরে প্রথমেই ঘোষণা করা হয়েছে, আয়াতটির অর্থ এই নয় যে প্রতিটি প্রাণী অবশ্যই বেঁচে থাকার মতো পর্যাপ্ত খাবার পাবে। এরপর আয়াতের ‘দায়িত্ব’কে সব ধরনের রিজিকের একমাত্র উৎস হিসেবে আল্লাহর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; মুজাহিদ ও বাগাভির আগের ব্যাখ্যা তুলে ধরে অনাহারে মৃত্যুকেও এই বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। [15]

فليس في قوله تعالى: وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا [هود:6] وما في معناه أن كل الدواب لا بدّ أن ترزق بما يكفيها

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর উক্তিতে এমন কিছু নেই যার অর্থ হবে, প্রত্যেক প্রাণীকে অবশ্যই তার প্রয়োজন মেটানোর মতো রিজিক দেওয়া হবে, অথবা তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হবে।।

ইসলামওয়েবের এই সমাধানের যুক্তিগত সমস্যা হলো, এতে ‘আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন’ বাক্যের এমন অর্থ তৈরি করা হচ্ছে, যার সঙ্গে বাস্তব রিজিকের অভাবের কোনো সংঘাতই ঘটতে পারে না। কেউ খাবার পেলে সেটি আল্লাহর দেওয়া রিজিক; কেউ না পেলে তার প্রয়োজন মেটানো আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ছিল না; অনাহারে মারা গেলেও আল্লাহ রিজিকদাতা—প্রত্যেক সম্ভাব্য অবস্থায় একই সিদ্ধান্ত। কোরআনের মূল আরবি ‘عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا’ এবং ব্যাখ্যায় ‘আল্লাহর কাছ থেকে যা এসেছে’—এই দুই রূপের মধ্যে অর্থগত ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ। মুজাহিদের ব্যাখ্যার মতো ‘যা পেয়েছে, তা আল্লাহর কাছ থেকে’ বললে আল্লাহর সম্পূর্ণ দায়িত্বের দাবিটি বাস্তব দায়বদ্ধতার পরীক্ষার বাইরে চলে যায়। একটি দাবি ব্যাখ্যা করা আর এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করা যে বিপরীত কোনো পর্যবেক্ষণই আর তার বিরুদ্ধে যেতে না পারে—দুটো এক নয়।


ইসলামওয়েব ১৪৬৪৯: অনাহারে মৃত্যুও নাকি নির্ধারিত রিজিক পূর্ণ হওয়ার প্রমাণ

ইসলামওয়েবের ২৬ মার্চ ২০০২ সালের ফতোয়া ১৪৬৪৯-এ প্রশ্ন করা হয়েছিল, আল্লাহ একমাত্র রিজিকদাতা হলে মানুষ অনাহারে মারা যায় কেন? উত্তরে বলা হয়েছে, আল্লাহ কাউকে বেশি দেন, কাউকে কম দেন এবং কোনো ব্যক্তি অনাহারে মারা গেলেও সে তার নির্ধারিত রিজিক ও আয়ু সম্পূর্ণ করেছে। অর্থাৎ জীবিকা লাভের উদ্দেশ্য পূরণ না হলেও সেটিকেই নির্ধারিত রিজিক পূর্ণ হয়ে যাওয়া বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। [16]

وإنما هذا الإنسان قد استوفى رزقه وأجله وأن الله قد أراد قبض روحه

বাংলা অনুবাদ: এই ব্যক্তি তার রিজিক ও আয়ুর নির্ধারিত অংশ পূর্ণ করেছে এবং আল্লাহ তার প্রাণ গ্রহণ করতে চেয়েছেন।

এই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আপত্তিটি শব্দের খেলা নয়; এটি প্রত্যক্ষ কারণ ও দাবিকৃত সর্বশেষ কারণের সম্পর্ক নিয়ে। খাদ্যাভাবে মৃত্যু একটি নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর The State of Food Security and Nutrition in the World 2026 প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার সম্মুখীন হওয়ার হিসাব দেওয়া হয়েছে; একই বছরে প্রায় ২১০ কোটি মানুষ মাঝারি বা গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। এসব সংখ্যার পেছনে আয়, খাদ্যমূল্য, পুষ্টিকর খাবারের ব্যয়, অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার ও আঞ্চলিক অসমতা রয়েছে—এমন বিষয়গুলো প্রতিবেদনে বিশ্লেষিত হয়েছে। [17] সেটিকে ‘আয়ু ও রিজিক পূর্ণ হওয়া’ বলে নতুন নাম দেওয়া হলে অনাহার দূর হয় না, ব্যাখ্যাযোগ্য কোনো নতুন কার্যকারণও পাওয়া যায় না। একজন শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেয়ে মারা গেলে তার রিজিক পূর্ণ হয়েছে—এই সিদ্ধান্তটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি ধর্মতাত্ত্বিক পূর্বধারণা থেকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ফলে রিজিকের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ—এই বিশ্বাসকে বাস্তব ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করালে ফতোয়ার সমাধান মূল দাবির অর্থই সংকুচিত করে ফেলে।


নবীর প্রতারণা: অলসতার প্রশ্রয় ও প্রতারণামূলক বিশ্বাস

আসুন একটি হাদিস পড়ি এবং পড়ার পরে হাদিসটির মূল্যায়ন করি,

সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৪/ দুনিয়াবী ভোগবিলাসের প্রতি অনাসক্তি
পরিচ্ছেদঃ ৩৩. আল্লাহ তা’আলার উপর পুরোপরি নির্ভরশীল হওয়া
২৩৪৫। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে দুই ভাই ছিল। তাদের একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত থাকত এবং অন্যজন আয়-উপার্জনে লিপ্ত থাকত। কোন একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সেই উপার্জনকারী ভাই তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেনঃ হয়তো তার ওয়াসীলায় তুমি রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছ।
সহীহ, মিশকাত (৫৩০৮), সহীহাহ (২৭৬৯)।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

হাদিসের মূল ঘটনা আরবি পাঠেই স্পষ্ট: একজন ভাই يَحْتَرِفُ—অর্থাৎ পেশা বা উপার্জনের কাজে নিয়োজিত; অপর ভাই নিয়মিত মুহাম্মদের কাছে যেত। উপার্জনকারী ভাই অভিযোগ করায় মুহাম্মদ বলেন, لَعَلَّكَ تُرْزَقُ بِهِ—‘সম্ভবত তার কারণেই তোমাকে রিজিক দেওয়া হচ্ছে।’ এখানে ‘সম্ভবত’ শব্দটি একটি সম্ভাবনা নির্দেশ করে, নিশ্চিতভাবে পরীক্ষিত অর্থনৈতিক কার্যকারণ নয়। কিন্তু সম্ভাবনার বিষয়বস্তু পরিষ্কার: যে ভাই উপার্জনের কাজ করছে না, তার উপস্থিতি বা ধর্মীয় সান্নিধ্যই উপার্জনকারী ভাইয়ের রিজিক পাওয়ার পেছনে কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ অভিযোগের মুহূর্তে শ্রমজীবী ভাইয়ের শ্রমকে সামনে না এনে উপার্জনের জন্য অপর ভাইয়ের অদৃশ্য ধর্মীয় অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসের সাধারণ পাঠক এই সামাজিক বার্তাই গ্রহণ করতে পারেন; ‘সব কথা সরাসরি লেখা থাকতে হবে’ এমন কোনো দাবি ছাড়াই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অর্থ বোঝা যায়। [18]

একই কথাকে যুক্তির পরীক্ষায় আনলে দেখা যায়, এখানে রিজিকের দৃশ্যমান উৎস—কাজ, ক্রেতা, লেনদেন, উৎপাদন বা পারিশ্রমিক—সম্পর্কে কোনো তথ্য দিয়ে দ্বিতীয় ভাইয়ের কথিত অবদান যাচাই করা হয়নি। কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কাছে যাওয়ার কারণে উপার্জনকারী ভাই রিজিক পাচ্ছেন, এমন অনুমানকে শ্রমিকের সামনে উত্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তী যুগে এমন ধারণা ব্যবহার করে শ্রমজীবীর ঘাড়ে ধর্মীয়ভাবে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তির ভরণপোষণকে পবিত্র দায়িত্বে রূপ দেওয়া সম্ভব; এই সম্ভাব্য সামাজিক কার্যকারণটি সমালোচনার বিষয়। হাদিস নিজে দ্বিতীয় ভাইয়ের সমস্ত দিনের কাজের হিসাব দেয় না, কিন্তু উপার্জনকারী ও মুহাম্মদের সান্নিধ্যে থাকা ভাইয়ের স্পষ্ট বৈপরীত্য এবং অভিযোগের জবাব সেই সামাজিক অর্থটি প্রতিষ্ঠা করতে যথেষ্ট।

এই হাদিসটি নবী মুহাম্মদের বক্তব্যের মাধ্যমে একটি গভীর প্রতারণামূলক ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে, যেখানে একজন শ্রমজীবী ব্যক্তির উপার্জনের কৃতিত্ব এমন একজনকে দেওয়া হচ্ছে, যে আদতে কোনো পরিশ্রমই করছে না। এটি ইসলামের “রিজিকের মালিক আল্লাহ” ধারণার আরেকটি ব্যর্থতা প্রকাশ করে, যেখানে বাস্তবিকভাবে যে পরিশ্রম করছে, তার প্রশংসা না করে বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে কোন কাজ না করা ব্যক্তিকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই হাদিসে এক ভাই জীবিকা নির্বাহের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে, আরেক ভাই কোনো কাজ না করে নবীর দরবারে বসে থাকছে এবং ধর্ম করছে, অথচ নবী সেই শ্রমজীবী ভাইকেই বলে দিচ্ছেন যে, হয়তো তার উপার্জনের কারণ তার অলস ভাইটি!

এই বক্তব্য বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং কুসংস্কারকে উসকে দেয়। এটি এমন একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে যারা পরিশ্রম করে তাদের সাফল্যের কারণ হিসেবে অলস বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভূমিকা দেখানো হয়। বাস্তবে একজন পরিশ্রমী মানুষের উপার্জন তার পরিশ্রমের ফল, অন্য কোনো অলস ব্যক্তির কারণে নয়। কিন্তু এই হাদিসে নবী মুহাম্মদ পরিশ্রমী ব্যক্তিকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তার উপার্জনের পেছনে তার অলস ভাইয়ের ধর্মকর্মের ভূমিকা রয়েছে। এটি মূলত সেই অলস ব্যক্তিকে সমাজে অর্থহীনভাবে মূল্যবান করে তুলতে একটি প্রতারণামূলক চেষ্টা।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে নবী আসলে পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়নকে নস্যাৎ করছেন এবং অলসতাকে অযৌক্তিকভাবে বৈধতা দিচ্ছেন। এটি এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ তৈরি করে যেখানে পরিশ্রমী মানুষদের শ্রমের উপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, বরং অলসদের জন্য তাদের শ্রমের কৃতিত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। ইসলামের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রিজিকের মালিক আল্লাহ, তাই যে পরিশ্রম করছে, সে তার উপার্জন আসলে নিজের পরিশ্রমের জন্য নয়, বরং অন্য কোনো অলস ব্যক্তির জন্য হচ্ছে! এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং সমাজে পরিশ্রমের মূল্য কমিয়ে দেয়।

আসল বাস্তবতা হলো, একজন মানুষ তার পরিশ্রমের ফল নিজেই উপভোগ করে, অন্য কেউ নয়। যদি ধর্মীয় সান্নিধ্য বা অলস অবস্থায় বসে থাকা ব্যক্তির অদৃশ্য বরকত কোনো শ্রমজীবীর উপার্জনের কার্যকর কারণ হয়, তাহলে সেই অবদানের পক্ষে স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকার কথা। একজন মানুষ কত ঘণ্টা কাজ করেছেন, কী উৎপাদন করেছেন, কত টাকা মজুরি পেয়েছেন—এসব মাপা যায়; কিন্তু আরেকজনের ধর্মীয় উপস্থিতির কারণে সেই টাকা এসেছে, এই অতিরিক্ত দাবির পক্ষে হাদিসে কোনো পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ নেই। বাস্তবে কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকে দরিদ্র থাকেন, আবার উত্তরাধিকার বা পুঁজির সুবিধায় কেউ সামান্য শ্রমেও ধনী হন। এই বৈষম্য ব্যাখ্যা করতে শ্রম, মজুরি, সম্পদ ও সামাজিক কাঠামোর বিশ্লেষণ প্রয়োজন; অদৃশ্য বরকতের দাবি কোনো স্বাধীন ব্যাখ্যা দেয় না। এই হাদিস মূলত ইসলামী বিশ্বাসের, বিশেষ করে রিজিকের একমাত্র মালিক আল্লাহ ধারণার ব্যর্থতাগুলোর একটি উদাহরণ যেখানে বাস্তবিক শাসনব্যবস্থার এবং যুক্তিবাদের পরিবর্তে অলৌকিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। এটি এমন এক চিন্তাধারা তৈরি করে, যেখানে শ্রমিকদের শ্রমের প্রকৃত মূল্যকে অস্বীকার করা হয় এবং অলসদের জন্য অযৌক্তিক মর্যাদা তৈরির চেষ্টা করা হয়।

এই হাদিসের মাধ্যমে নবী আসলে অলস ও ধর্মীয় উপাসনায় ব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য সমাজে এক প্রকার অযৌক্তিক সম্মান তৈরির চেষ্টা করেছেন, যেখানে তারা কোনো কাজ না করেও সমাজের উপার্জনশীল অংশের কৃতিত্বের অংশীদার হয়ে যায়। ধরুন একজন বিজ্ঞানী ৪০ বছর গবেষণা করে একটি ঔষধ আবিষ্কার করেছে। তার ভাইটি সেই ৪০ বছর ধরে আল্লাহু আল্লাহু জিকির করে কাটিয়েছে। এই দুইজনার মধ্যে তাহলে কাকে নোবেল পুরষ্কার দেয়া উচিত? আল্লাহু বলে জিকির করা লোকটিও কী সেই নোবেলের অর্ধেক দাবীদার হবে? এটি ধর্মীয় প্রতারণার একটি উদাহরণ যেখানে মানুষের শ্রমের প্রকৃত মূল্য উপেক্ষা করে অকার্যকর বিশ্বাস ও অলসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এভাবে ইসলাম শুধু অলসতাকে উৎসাহিত করে না, বরং প্রকৃত পরিশ্রমী মানুষদের শ্রমের উপযুক্ত মূল্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়।


আকীদা ও সহিহ হাদিসে জন্মের আগেই রিজিক নির্ধারণ

কোরআনের একচ্ছত্র রিজিকদাতা আল্লাহর ধারণা শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আয়াতের বক্তব্য নয়। ইসলামের আকীদাগত সাহিত্যে সৃষ্টিজগতের ঘটনাবলি আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ ও ইচ্ছার অধীন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ-তে বলা হয়েছে, আল্লাহ সৃষ্টির জন্য ভাগ্য ও আয়ু নির্ধারণ করেছেন এবং সবকিছু তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ অনুযায়ী চলে। এই ভাষায় মানুষের পরিশ্রমও স্বাধীন কোনো সর্বশেষ নিয়ামক নয়; সেটিও পূর্বনির্ধারিত জগতের একটি ঘটনা। ফলে কোরআনের সঙ্গে পরবর্তী আকীদার কোনো বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে রিজিকের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—আকীদার নিজস্ব বক্তব্যেও সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অধিকার আল্লাহরই। [19]

خَلَقَ الْخَلْقَ بِعِلْمِهِ، وَقَدَّرَ لَهُمْ أَقْدَارًا، وَضَرَبَ لَهُمْ آجَالًا

বাংলা অনুবাদ: তিনি নিজ জ্ঞান অনুযায়ী সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের জন্য ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং তাদের আয়ু নির্দিষ্ট করেছেন।।

وَكُلُّ شَيْءٍ يَجْرِي بِتَقْدِيرِهِ وَمَشِيئَتِهِ، وَمَشِيئَتُهُ تَنْفُذُ

বাংলা অনুবাদ: সবকিছু তাঁর নির্ধারণ ও ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটে, আর তাঁর ইচ্ছাই কার্যকর হয়।।

সহিহ বুখারি ৩২০৮-এ ইবন মাসউদের বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, মাতৃগর্ভে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লিখতে নির্দেশ দেওয়া হয়: ব্যক্তির কাজ, রিজিক, আয়ু এবং সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের পরিণতি। অর্থাৎ শিশুটির নিজের কোনো অর্থনৈতিক কাজ শুরু হওয়ার আগেই তার রিজিক লিখিত হওয়ার বক্তব্য রয়েছে। এখানে দারিদ্র্যকে শুধু ব্যক্তির পরিশ্রমের অভাব বলে ব্যাখ্যা করা যায় না; তার কী পাওয়া নির্ধারিত হয়েছে, এই ধর্মীয় কাঠামোয় সেই চূড়ান্ত রায় আল্লাহর। [20]

فَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ، وَيُقَالُ لَهُ اكْتُبْ عَمَلَهُ وَرِزْقَهُ وَأَجَلَهُ وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ

বাংলা অনুবাদ: ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়: তার রিজিক, আয়ু, কর্ম এবং সে দুর্ভাগা না সৌভাগ্যবান হবে।।

সহিহ মুসলিম ২৬৬৩-এ উম্মে হাবিবা তাঁর স্বজনদের দীর্ঘায়ুর জন্য প্রার্থনা করলে মুহাম্মদ বলেন, তিনি ইতিমধ্যেই নির্ধারিত আয়ু, গণনাকৃত দিন এবং বণ্টিত রিজিকের ব্যাপারে প্রার্থনা করেছেন; নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে তা ঘটবে না। হাদিসটি মুসলিমের ‘তাকদিরের নির্ধারিত আয়ু ও রিজিক বাড়ে বা কমে না’ শিরোনামের পরিচ্ছেদে রয়েছে। এখানে রিজিক কেবল আল্লাহর সাধারণ দান নয়, নির্দিষ্টভাবে বণ্টিত বিষয়। [21]

قَدْ سَأَلْتِ اللَّهَ لِآجَالٍ مَضْرُوبَةٍ وَأَيَّامٍ مَعْدُودَةٍ وَأَرْزَاقٍ مَقْسُومَةٍ

বাংলা অনুবাদ: তুমি আল্লাহর কাছে ইতিমধ্যে নির্ধারিত আয়ু, গণনা করা দিন এবং বণ্টিত রিজিকের বিষয়ে প্রার্থনা করেছ।।

এই তিনটি দলিল একত্রে আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করে। মানুষ উপার্জনের চেষ্টা করে—এটি বাস্তব। কিন্তু তাকদিরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী চেষ্টা, সুযোগ, সফলতা, ক্ষতি এবং শেষ পর্যন্ত পাওয়া খাদ্যও আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো শিশু অনাহারে মরলে তাকে ‘মানুষের ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে’ বলে বর্ণনা করলেও আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালার প্রশ্নটি বিলুপ্ত হয় না। বরং আকীদার ভাষায় সেই ব্যর্থতার ঘটনারও সর্বশেষ অনুমোদিত পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়। এ কারণেই অনাহারকে আল্লাহর দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে মূল আকীদার সর্বব্যাপী সিদ্ধান্তক্ষমতার দাবির সঙ্গেই টানাপোড়েন তৈরি হয়।


ইসলামকিউএ ও ইবন তাইমিয়্যার সমন্বয়: অপরিবর্তনীয় রিজিক, পরিবর্তনশীল রিজিক

ইবন তাইমিয়্যার মাজমুউল ফাতাওয়া (৮/৫৪০–৫৪১) উদ্ধৃত করে ইসলামকিউএ জানিয়েছে, রিজিক দুই রকম: আল্লাহ যা চূড়ান্তভাবে জানেন তা অপরিবর্তনীয়, আর ফেরেশতাদের নথিতে লেখা রিজিক প্রার্থনা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও অন্যান্য উপায়ের কারণে বাড়তে বা কমতে পারে। ইসলামকিউএর ফতোয়া ৫৮৭৯০২-তেও এই ব্যাখ্যা পুনরায় ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী মানুষের সব উদ্যোগও আল্লাহ আগে থেকেই জানেন এবং নির্ধারণ করেছেন। এর ফলে ব্যক্তির পরিশ্রমকে বাস্তব মাধ্যম বলা হলেও কার হাতে রিজিকের সর্বশেষ ফয়সালা—সেই প্রশ্নে একচ্ছত্র আল্লাহর কর্তৃত্বই অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। [22] [23]

الرزق نوعان: أحدهما ما علمه الله أنه يرزقه فهذا لا يتغير، والثاني ما كتبه وأعلم به الملائكة، فهذا يزيد وينقص بحسب الأسباب

বাংলা অনুবাদ: রিজিক দুই ধরনের: এক ধরনের রিজিক আল্লাহ জানেন যে তিনি দেবেন—তা পরিবর্তিত হয় না; আরেক ধরনের রিজিক তিনি লিখে ফেরেশতাদের জানিয়েছেন—তা বিভিন্ন কারণের ভিত্তিতে বাড়ে ও কমে।।

এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, ইসলামকিউএ শ্রম বা ব্যবসার প্রয়োজন অস্বীকার করেনি; তারা বলেছে, রিজিক পেতে চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু সমন্বয়ের আসল প্রক্রিয়া হলো, এই চেষ্টাকেও আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার ভেতরে বসিয়ে দেওয়া। কেউ শ্রম করে সফল হলে আল্লাহ সেই শ্রম ও সফলতা দুটোই নির্ধারণ করেছেন; কেউ শ্রম করেও ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতাও আল্লাহর জ্ঞাত পরিকল্পনার অংশ; কেউ অনাহারে মারা গেলে সেটিও নির্ধারিত পরিণতি। এই ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো কোনো নতুন তথ্য পাওয়া যায় না। চেষ্টা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা কৃষিবিজ্ঞান ও অর্থনীতি নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করে। সেই সঙ্গে সব ফলের নেপথ্যে অতিপ্রাকৃত পূর্বনির্ধারণ আছে—এই অতিরিক্ত দাবি পরীক্ষাযোগ্য না হলে সমন্বয়টি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক সামঞ্জস্যের প্রচেষ্টা, বাস্তব ব্যাখ্যার বিকল্প নয়।


হারাম উপার্জনও রিজিক: ‘সব পাওয়া জিনিস আল্লাহর’ ব্যাখ্যার বিস্তৃতি

আকীদার ব্যাখ্যায় রিজিকের সংজ্ঞা কখনো এত বিস্তৃত করা হয়েছে যে অবৈধভাবে পাওয়া খাদ্যও আল্লাহর রিজিক হিসেবে গণ্য হয়। ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন-এর ‘আল-হারামু রিজক’ পরিচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হারামও রিজিক; কারণ প্রাণী যা পায়, খায় এবং যার দ্বারা উপকৃত হয়, সেটিকে আল্লাহর দেওয়া রিজিকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই অবস্থানের বিপরীতে মুতাজিলাদের অন্য সংজ্ঞাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আকীদাগত মতভেদের বিষয়টি রিজিকের প্রকৃতির ভাষাগত ও ধর্মতাত্ত্বিক সংজ্ঞা—কিন্তু কোরআনে আল্লাহর একচ্ছত্র রিজিকদাতার দাবি উভয় পক্ষের আলোচনার কেন্দ্রে। [24]

الْحَرَامُ رِزْقٌ؛ لِأَنَّ الرِّزْقَ اسْمٌ لِمَا يَسُوقُهُ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى الْحَيَوَانِ فَيَتَنَاوَلُهُ وَيَنْتَفِعُ بِهِ

বাংলা অনুবাদ: হারামও রিজিক; কারণ রিজিক হলো সেই বস্তু, যা আল্লাহ কোনো প্রাণীর কাছে পৌঁছান এবং প্রাণী তা গ্রহণ করে উপকার পায়।।

এই ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, বাস্তবে যে পদ্ধতিতেই খাদ্য বা সম্পদ অর্জিত হোক, প্রাপ্ত বস্তুকে আল্লাহর রিজিক বলার সুযোগ তৈরি হয়। এতে অবৈধ কাজ ধর্মীয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না; কিন্তু রিজিকের সর্বশেষ উৎসের দাবি নৈতিকভাবে বিপরীত ফলাফলেও অপরিবর্তিত থাকে। চুরি করে কেউ সম্পদ পেলে সেটিও রিজিক, সৎ শ্রমে পেলে সেটিও রিজিক, না পেলে বলা হয় তার নির্ধারিত অংশ আসেনি। এই সর্বব্যাপী সংজ্ঞা প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যকারণকে নির্দিষ্ট করে না; বরং যে ফলই ঘটুক, পরে তাকে আল্লাহর রিজিকের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে।


খলিফাদের আমলের দুর্ভিক্ষ: আল্লাহর ব্যর্থতা

খলিফা উমরের শাসনকালে ১৮ হিজরি, আনুমানিক ৬৩৮–৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে, আরব উপদ্বীপে ভয়াবহ খরা ও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে এটি ‘আমুর রামাদাহ’ বা রামাদাহ দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত। ইবনুল আসিরের আল-কামিল ফিত তারিখ-এ ১৮ হিজরির ঘটনাবলিতে দুর্ভিক্ষ, প্রবল শুষ্কতা ও মানুষের তীব্র ক্ষুধার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত সালওয়া হামিদ আল-মোল্লার গবেষণায় সংকটের সময়কাল ১৭ হিজরির শেষাংশ থেকে ১৮ হিজরির শুরু এবং প্রায় নয় মাস হিসেবে বর্ণিত। এই দুর্ভিক্ষ খলিফা উমরের মতো ইসলামের প্রথম প্রজন্মের শাসকের সময়েই ঘটেছিল—যেখানে রিজিকের একমাত্র মালিক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস সামাজিকভাবে কেন্দ্রীয় ছিল। সেই সমাজেও প্রবল খাদ্যাভাব ও প্রাণহানি ঘটেছে; ফলে রিজিক ও খাদ্যপ্রাপ্তির সম্পর্ককে কেবল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বা নির্ভরতার মাত্রা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। [25] [26]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০৯০. আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এর আলোচনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৪৪৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৭১০
৩৪৪৫। হাসান ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর (রাঃ) (এর খিলাফত কালে) অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ) এর ওয়াসিলা নিয়ে বৃষ্টি বর্ষণের দু’আ করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আমরা অনাবৃষ্টি দেখা দিলে আমাদের নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াসিলা নিয়ে দু’আ করতাম তুমি (আমাদের দু’আ কবূল করে) বৃষ্টি বর্ষণ করতে, এখন আমরা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আব্বাস (রাঃ) এর ওয়াসিলায় বৃষ্টি বর্ষণের দু’আ করছি। তুমি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ কর। তখন বৃষ্টি হত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ইবনুল আসির তাঁর আল-কামিল ফিত তারিখ-এ ১৮ হিজরির দুর্ভিক্ষ বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, তীব্র ক্ষুধায় বন্যপ্রাণী পর্যন্ত মানুষের আশ্রয়ের কাছাকাছি চলে আসত। এটি ইতিহাসগ্রন্থের বর্ণনা, যার প্রতিটি সংখ্যাতাত্ত্বিক বিবরণ স্বাধীন সমসাময়িক নথিতে যাচাই করা সম্ভব নয়; কিন্তু প্রারম্ভিক মুসলিম ইতিহাসের ধারায় এই ভয়াবহ খাদ্যসংকট স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। [27]

فِي سَنَةِ ثَمَانِي عَشْرَةَ أَصَابَ النَّاسَ مَجَاعَةٌ شَدِيدَةٌ وَجَدْبٌ وَقَحْطٌ، وَهُوَ عَامُ الرَّمَادَةِ

বাংলা অনুবাদ: আঠারো হিজরিতে মানুষের ওপর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, শুষ্কতা ও অনাবৃষ্টি নেমে আসে। এটিই ছিল রামাদাহর বছর।।

রামাদাহ দুর্ভিক্ষের সময় উমর কেবল প্রার্থনার ওপর নির্ভর করেননি। খাদ্যশস্য ও সম্পদ সংগ্রহ, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে মদিনায় আশ্রয় দেওয়া, রান্না করা খাদ্য বিতরণ, স্থানীয় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাওয়ার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে রয়েছে। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত দুরুল কিয়াদাহ ফি ইদারাতিল আযমাহ-এর রামাদাহ-সংক্রান্ত অধ্যায়ে খাদ্যবণ্টন, ব্যয়ভার ভাগাভাগি ও সংকট মোকাবিলার এসব প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। মিসর ও সিরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ এবং খাদ্য সাহায্যের বর্ণনাগুলোতে নির্দিষ্ট ঘটনা ও কালানুক্রমের পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বাস্তব সংগঠন ও বণ্টনব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল—এটি ঐতিহাসিক বিবরণ থেকেই পরিষ্কার। [28]

উমর আল্লাহর ওপর বিশ্বাস হারিয়েছিলেন—এমন প্রমাণ নেই, এবং সেই দাবি প্রয়োজনও নেই। আসল বিষয় হলো, আল্লাহর ওপর গভীর বিশ্বাস বজায় রেখেও তাঁকে খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণে মানুষের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। যদি খাদ্যাভাব নিরসনের জন্য সেচ, পরিবহন, মজুত, সরবরাহ ও বণ্টন কার্যকর না হয়, তাহলে ‘রিজিকের একমাত্র মালিক আল্লাহ’ উচ্চারণে ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরে না। ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এই সমস্ত উপায়কে আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের অংশ বলা যেতে পারে, কিন্তু তাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং খাদ্যের প্রবেশাধিকারের বাস্তব কার্যকারণ সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য যুক্ত হয় না।

কোরআনে বলা হয়েছে, “পৃথিবীর সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর।” (কোরআন ১১:৬)। কিন্তু যদি আল্লাহ সত্যিই প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব নিতেন, তাহলে উমরের শাসনামলে এত মানুষের অনাহারে মৃত্যুবরণ করার কারণ কী? নবী মুহাম্মদ বলেছেন: “তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের মতো রিজিক দেয়া হতো। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।” (সুনান আত-তিরমিজি, ২৩৪৪, সহিহ)। তাহলে উমরের সময় এত লোক না খেয়ে মারা গেল কেন? তারা কি যথেষ্ট আল্লাহর উপর নির্ভরশীল ছিল না?

উমরের শাসনের পরেও বিভিন্ন মুসলিম-শাসিত অঞ্চলে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ ঘটেছে। কেবল শাসকের ধর্মবিশ্বাস বা জনগণের ধর্মীয় আনুগত্য দিয়ে ফসল উৎপাদন, খরা, যুদ্ধ, করব্যবস্থা ও বাজারে খাদ্যের প্রবেশাধিকার বোঝা যায় না। ১৭৬৯–১৭৭০ সালের বাংলার মহাদুর্ভিক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ: তখন আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সার্বভৌমত্বের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থাকলেও ১৭৬৫ সাল থেকে বাংলার দেওয়ানি অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ছিল। জন আর. ম্যাকলেনের গবেষণা অনুযায়ী দুর্ভিক্ষে বাংলার জনসংখ্যার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়; কোম্পানির রাজস্বনীতি ও ত্রাণব্যবস্থার ব্যর্থতাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা। তাই একে কেবল ‘মুঘল আমলের দুর্ভিক্ষ’ বলা যথেষ্ট নয় এবং দুর্ভিক্ষের শিকার সবাই একই ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। দুর্ভিক্ষের কারণ খুঁজতে বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি শাসনব্যবস্থা, আয়, খাদ্যমূল্য, সম্পদ ও বণ্টন যাচাই করতে হয়। [29]

উমর নিজেও দুর্ভিক্ষের সময় আল্লাহর উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে, এসব প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দেয় যে, “রিজিকের মালিক আল্লাহ” – এই ধারণাটি বাস্তবে কার্যকর নয়। যদি শুধুমাত্র ঈমান ও আল্লাহর উপর নির্ভরতা যথেষ্ট হতো, তাহলে ইসলামের ইতিহাসে এত দুর্ভিক্ষ ঘটতো না। খাদ্য ও অর্থনীতি পরিচালনার জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা দরকার, শুধু আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হলে মানুষ অনাহারে মারা যাবে। উমর ইবন খাত্তাব-এর শাসনামলের দুর্ভিক্ষ ইসলামের রিজিক সংক্রান্ত বিশ্বাসের ব্যর্থতাকে প্রকাশ করে। ইতিহাস দেখিয়েছে যে, প্রকৃতপক্ষে, মানুষের জীবনযাত্রা নির্ভর করে অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রযুক্তি, এবং মানুষের পরিশ্রমের উপর – কোনো অদৃশ্য সত্তার ইচ্ছার উপর নয়। অতএব, আধুনিক সমাজে রিজিকের ব্যাপারে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত চিন্তাধারাই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। বিজ্ঞান ও বাস্তবতা বলে, রিজিক নির্ভর করে ব্যক্তিগত পরিশ্রম, অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং রাজনৈতিক নীতির উপর।


খিলাফত আমলে আরও দুর্ভিক্ষ

আসুন আরও কিছু দুর্ভিক্ষের বর্ণনা পড়ি,

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৭/ আহার সংক্রান্ত
পরিচ্ছেদঃ ২১৪৮. একসঙ্গে মিলিয়ে একাধিক খেজুর খাওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫০৫২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৪৪৬
৫০৫২। আদম (রহঃ) … জাবালা ইবনু সুহায়ম (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু যুবায়র এর আমলে আমাদের উপর দুর্ভিক্ষ পতিত হল। তখন তিনি খাদ্য হিসাবে আমাদের কিছু খেজুর দিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে সময় আমরা খাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ একত্রে একাধিক খেজুর খেয়ো না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একত্রে একাধিক খেজুর খেতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, তবে কেউ যদি তার ভাইকে অনুমতি দেয় তাহলে এতে কোন দোষ নেই। শুবা বলেন, অনুমতির বিষয়টি ইবনু উমরের নিজের কথা।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবালাহ (রহঃ)


ধর্মীয় আনুগত্যে সম্পদ ও বৃষ্টি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি: বাস্তব পরীক্ষার প্রশ্ন

কোরআনে রিজিকের একচ্ছত্র মালিকানার পাশাপাশি ধর্মীয় আনুগত্যের সঙ্গে বস্তুগত সমৃদ্ধিরও সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। সূরা আরাফ ৭:৯৬-এ বলা হয়েছে, জনপদের মানুষ ঈমান আনলে ও তাকওয়া অবলম্বন করলে আকাশ ও পৃথিবীর বরকত তাদের জন্য খুলে দেওয়া হতো। সূরা নূহ ৭১:১০–১২-এ ক্ষমাপ্রার্থনার ফলে প্রচুর বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান, উদ্যান ও নদী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বর্ণিত হয়েছে। বাগাভির তাফসিরে আরাফ ৭:৯৬-এর ‘বরকত’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে বৃষ্টি ও গাছপালার বৃদ্ধি এবং খরা দূর হওয়ার মাধ্যমে। এটি নিছক পরকালের পুরস্কারের দাবি নয়; বাস্তব পানি, কৃষি ও সম্পদের সঙ্গেও ধর্মীয় আনুগত্যের সম্পর্ক স্থাপন। [30] [31] [32]

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ

বাংলা অনুবাদ: জনপদের অধিবাসীরা যদি ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকত খুলে দিতাম।।

يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا

বাংলা অনুবাদ: তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন; সম্পদ ও সন্তান দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন; তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন এবং নদীনালা প্রবাহিত করবেন।।

এই বক্তব্যগুলোর কার্যকারণ দাবি পরীক্ষা করতে হলে ধর্মীয় আনুগত্যের সঙ্গে বৃষ্টি, খাদ্য উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির সম্পর্ক আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বৃষ্টিপাত জলবায়ু, বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ, সমুদ্রের তাপমাত্রা ও মৌসুমি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত; উৎপাদন নির্ভর করে মাটি, সেচ, শ্রম, প্রযুক্তি ও বাজারের ওপর। ধর্মীয় আনুগত্যকে এগুলোর চূড়ান্ত কারণ বলে গ্রহণ করতে হলে সেই অতিরিক্ত দাবির স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। তদুপরি কোনো ধার্মিক সমাজ দুর্ভিক্ষে পড়লে বলা যায়, আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করছেন; সমৃদ্ধ হলে বলা যায়, আল্লাহ বরকত দিয়েছেন। বিপরীত ফলের জন্য বিপরীত অলৌকিক ব্যাখ্যা তৈরি করা গেলে মূল প্রতিশ্রুতির সত্য-মিথ্যা পরীক্ষাই অনির্ধারিত হয়ে পড়ে।


অভাবকে ‘পরীক্ষা’ বলার সীমা কোথায়?

ইসলামওয়েব ৪৩০৬০৯-এর ফতোয়ায় অনাহারের ক্ষেত্রে সূরা বাকারা ২:১৫৫–১৫৭ উদ্ধৃত করে ভয়, ক্ষুধা ও সম্পদের ক্ষতিকে পরীক্ষা বলা হয়েছে। এর নৈতিক সমস্যা হলো, এখানে ক্ষুধার্ত মানুষের বাস্তব দুর্দশার কারণ বিশ্লেষণের বদলে দুর্দশাটিকেই পূর্বনির্ধারিত ধর্মীয় পরীক্ষার অংশ করা হয়। দুর্ভিক্ষে মানুষ খাদ্য না পেয়ে মারা গেলে সেটি পানির অভাব, খাদ্য সরবরাহ ভেঙে পড়া, আয় হারানো কিংবা সাহায্য না পৌঁছানোর মতো প্রত্যক্ষ ঘটনার ফল। ‘পরীক্ষা’ বললে ঐ বাস্তব কারণ বদলায় না, আবার কে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সেই প্রশ্নও মুছে যায় না। একটি সর্বশক্তিমান সত্তা যদি প্রতিটি মানুষের রিজিকের চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হন, তবে অনাহারকে পরীক্ষা বলাও তাঁর সিদ্ধান্তের নৈতিক দায়ের প্রশ্নের উত্তর নয়। [33]


অধিক সন্তান জন্ম দেয়া এবং রিজিক

বহুসন্তান জন্মদানের প্রতি ইসলামের হাদিসসাহিত্যে বিশেষ উৎসাহ রয়েছে। মুহাম্মদের বক্তব্যে অধিক সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম স্ত্রীকে বিয়ের নির্দেশ এবং কিয়ামতের দিন মুসলিম উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করার কথা পাওয়া যায়। এই নির্দেশের সঙ্গে খাদ্য ও পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্পর্কে কোরআনের রিজিকের দাবির সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। অধিক সন্তান নেওয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি নির্ভর করে পরিবারের আয়, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পুষ্টি, শিক্ষা, বাসস্থান এবং রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থার ওপর। তাই শুধু ‘আল্লাহ রিজিক দেবেন’ বিশ্বাস দিয়ে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার বাস্তব প্রয়োজন পূরণ হয় না। উল্লিখিত হাদিসে সংখ্যাধিক্যের উদ্দেশ্য হিসেবে কিয়ামতের দিন উম্মতের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করার কথা বলা হয়েছে; সেটিকে সরাসরি পৃথিবীতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করার প্রমাণ ঐ হাদিসে নেই। [34]

সূরা বনি ইসরাইল ১৭:৩১-এ দারিদ্র্যের আশঙ্কায় সন্তান হত্যা করতে নিষেধ করে বলা হয়েছে, আল্লাহ সন্তানদের এবং তাদের পিতামাতাকেও রিজিক দেন। আয়াতটি সন্তান হত্যার বিরুদ্ধে একটি বিধান; এটিকে জন্মনিয়ন্ত্রণের সব পদ্ধতির বিরুদ্ধে নির্দেশ বলে চালানো যায় না। কিন্তু খাদ্যপ্রাপ্তির সর্বশেষ নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ‘আমরাই তাদের এবং তোমাদের রিজিক দেব’—এই ভাষাটি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব জগতে অসংখ্য শিশুর অপুষ্টি, দারিদ্র্য এবং অনাহারে মৃত্যু ঘটলে সেই রিজিকদানের ঘোষণার অর্থ কী দাঁড়ায়, সেই প্রশ্ন আরও সরাসরি সামনে আসে। [35]

وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئًا كَبِيرًا

বাংলা অনুবাদ: দারিদ্র্যের আশঙ্কায় তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমরাই তাদের এবং তোমাদের রিজিক দিই। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মহাপাপ।

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯২-[১৩] ’আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কুমারী রমণী বিয়ে কর, কেননা কুমারী রমণীর মুখের মধুময়তা বেশি, অধিক গর্ভধারণযোগ্য এবং অল্পতুষ্টের অধিকারী। (ইবনু মাজাহ মুরসালসূত্রে)[1]
[1] সহীহ : ইবনু মাজাহ ১৮৬১, সহীহাহ্ ৬২৩, সহীহ আল জামি‘ ৪০৫৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯১-[১২] মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা বিবাহ কর স্বামীভক্তি ও অধিক সন্তান প্রসবকারিণীকে। কেননা, (কিয়ামত দিবসে) তোমাদের সংখ্যাধিক্যের গর্ব অন্যান্য উম্মাতের উপর বিজয় প্রকাশ করতে চাই। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
[1] হাসান : আবূ দাঊদ ২০৫০, নাসায়ী ৩২২৭।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ)


ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণরাষ্ট্রগুলোর অবস্থা কী?

উত্তর ইউরোপের নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মতো দেশগুলোকে প্রায়ই উচ্চ জীবনমান, সামাজিক সুরক্ষা, কার্যকর প্রশাসন ও তুলনামূলক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব দেশে ধর্মীয় অনুশীলন ও সামাজিক নীতির মধ্যে ঐতিহাসিক পার্থক্য রয়েছে, এবং এগুলোর সব নাগরিক নাস্তিক—এমন নয়। তবে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বাস্তব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে: কার্যকর করব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য, শিল্প ও সেবাখাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি এবং জরুরি সহায়তার কাঠামোতে। এগুলোর কোনোটি কাজ করতে আল্লাহর রিজিকের একচ্ছত্র ফয়সালার ধারণা যাচাই বা গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না।

শীতপ্রধান দেশে কৃষি উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও খাদ্যনিরাপত্তা নির্ধারণ করে শুধু স্থানীয় আবহাওয়া নয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহ, খাদ্য আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, উৎপাদনক্ষমতা, ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক সহায়তা একত্রে কাজ করে। কোনো দেশে খাদ্য পর্যাপ্ত থাকলেও দরিদ্র মানুষ তা কিনতে না পারলে ক্ষুধা দেখা দিতে পারে; আবার তুলনামূলক অনুর্বর দেশও বাণিজ্য ও উন্নত অবকাঠামোর মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখতে পারে। তাই সম্পদ বা রিজিকের বাস্তব প্রাপ্তি বুঝতে কে বণ্টন করছে, কোন প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা দিচ্ছে, বেকার ও অসুস্থদের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আয়ের নিরাপত্তার জন্য সরকারি ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এসব সেবার অর্থায়ন কর এবং সামাজিক বীমার মাধ্যমে হয়; সব সেবা সর্বত্র বিনামূল্যে নয়, অনেক দেশে রোগীকে নির্দিষ্ট ফি বা সহ-অর্থায়ন দিতে হয়। তবুও মানুষের প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। এটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অধিকারভিত্তিক নীতি। নর্ডিক দেশগুলোর সামাজিক ব্যয়ের সরকারি পরিসংখ্যানের সংগঠন NOSOSCO-র তথ্যে কর, সামাজিক বীমা ও সরকারি অর্থায়নের কাঠামো বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। [36] রাষ্ট্রের কর থেকে সংগৃহীত অর্থ, হাসপাতালের কর্মী, কৃষকের উৎপাদন এবং শ্রমিকের উপার্জন কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, তার নির্দিষ্ট বর্ণনা সম্ভব—‘আল্লাহ যার ইচ্ছা রিজিক বাড়ান’ বক্তব্যের মতো ফলাফলের পর অলৌকিক সিদ্ধান্ত অনুমান করতে হয় না।

উত্তর ইউরোপের সমাজগুলোকে নিখুঁত, সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত কিংবা বৈষম্যহীন বলা যাবে না। তাদের মধ্যেও বেকারত্ব, অভিবাসীদের সামাজিক বঞ্চনা, ব্যয়বহুল আবাসন এবং জনসেবার চাপের মতো সমস্যা আছে। আবার ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তিরাও বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও আধুনিক প্রশাসনের পক্ষে কাজ করতে পারেন। তাই বিষয়টি ‘নাস্তিক মানুষ সফল, ধার্মিক মানুষ ব্যর্থ’ এমন সরল সমীকরণ নয়। প্রশ্ন হলো, যে ব্যবস্থা বাস্তবে ক্ষুধা কমায় এবং মানুষের জীবন রক্ষা করে, তার কার্যকারণ কোথায়? পর্যবেক্ষণযোগ্য উত্তর হলো প্রতিষ্ঠান, সম্পদ, শ্রম, প্রযুক্তি ও জবাবদিহিমূলক নীতি। এতে ঈশ্বরের অদৃশ্য ফয়সালার দাবিটি প্রমাণিত হয় না।

ধর্মীয় নির্ভরশীলতাকে যদি সব অর্থনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত কারণ বলা হয়, তাহলে সমৃদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ, ধর্মপরায়ণ দরিদ্র সমাজ, ধনী অবিশ্বাসী, দরিদ্র বিশ্বাসী—সব অবস্থাকেই আল্লাহর ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত বলে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা কোন দেশ কতটা আয় করবে, কত মানুষ খাদ্য পাবে কিংবা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি কোথায় বাড়বে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে পরীক্ষণযোগ্য পূর্বাভাস দেয় না। বাস্তব পরিকল্পনায় আবহাওয়া, বাজার, কৃষি, স্বাস্থ্য ও জননীতির ওপর নির্ভর করেই খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে হয়। এই পর্যবেক্ষণই রিজিকের অলৌকিক একচ্ছত্র মালিকানার দাবিকে একটি অব্যাখ্যাত অতিরিক্ত ধারণা হিসেবে চিহ্নিত করে।

দৃষ্টিভঙ্গিঅভিগমনফলাফল
রিজিকের সর্বশেষ উৎস সম্পর্কে ধর্মতাত্ত্বিক দাবিআল্লাহ যার ইচ্ছা রিজিক দেন বা কমান; প্রার্থনা, বরকত ও তাকদির দিয়ে ফলাফল ব্যাখ্যা করা হয়। কাজ ও উপার্জনও এই মত অনুযায়ী আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত।যে ফলই ঘটুক—সম্পদ, দারিদ্র্য, অনাহার—পরে তাকে আল্লাহর ইচ্ছা বা পরীক্ষার ফল বলা সম্ভব; দাবিটির স্বতন্ত্র যাচাইযোগ্যতা দুর্বল।
বাস্তব অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণফসল, বৃষ্টিপাত, শ্রম, মজুরি, বাজার, আমদানি, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রীয় বণ্টনব্যবস্থা যাচাই করা হয়।খাদ্যপ্রাপ্যতা ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির পরিমাপ, কারণ শনাক্তকরণ এবং নির্দিষ্ট নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।

রিজিকের একচ্ছত্র ফয়সালা: কোন পর্যবেক্ষণ এই বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করতে পারবে?

কোনো দাবি বাস্তব জগত সম্পর্কে তথ্য দেয় কিনা তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: কী ঘটলে দাবিটিকে ভুল বলা যাবে? ‘পর্যাপ্ত খাদ্য পেলে মানুষ অপুষ্টিতে মরবে না’—এটি পরীক্ষা করা যায়। ‘সেচ বাড়লে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফসল উৎপাদন বাড়বে’—এটিও পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু ‘সব রিজিক আল্লাহর’ দাবিটি যদি এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে বেশি পেলেও আল্লাহ দিয়েছেন, কম পেলেও আল্লাহ ঠিক করেছেন, কিছু না পেয়ে মারা গেলেও নির্ধারিত রিজিক শেষ হয়েছে, তাহলে কোনো পর্যবেক্ষণই দাবিটির বিপরীত হতে পারে না। এটি তখন খাদ্য উৎপাদন বা বণ্টনের কারণ সম্পর্কে কার্যকর তথ্য নয়; যে-কোনো ঘটনার ওপর প্রয়োগযোগ্য এক ধর্মীয় ঘোষণা।

মুজাহিদের ব্যাখ্যায় অনাহারে মৃত্যু আল্লাহর রিজিক না দেওয়ার ঘটনা; বাগাভির ব্যাখ্যায় রিজিক দেওয়া ও না দেওয়া তাঁর ইচ্ছা; ইসলামওয়েবের ব্যাখ্যায় রিজিকের দায়িত্ব মানে প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানোর নিশ্চয়তা নয়; ইবন তাইমিয়্যার সমন্বয়ে শ্রমসহ সব ফলও আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের অংশ। বক্তব্যগুলো শব্দে ভিন্ন হলেও বাস্তব ফলাফলের ক্ষেত্রে একই রক্ষাকবচ তৈরি করে। মানুষ খাদ্য পেলেও দাবি অক্ষুণ্ণ, না পেলেও অক্ষুণ্ণ। এতে কোরআনের ‘আল্লাহর ওপর রিজিকের দায়িত্ব’ উক্তির সাধারণ অর্থকে বাস্তব দায়ের পরীক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে একটি দাবি ভুল হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাই বন্ধ করে দেওয়া গেলে সেই দাবি সত্য প্রমাণিত হয় না; কেবল সেটিকে পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়।

অনাহারকে মানুষের অন্যায় বণ্টনের ফল বলা বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে। কিন্তু কোরআনের ভাষায় আল্লাহ যদি একমাত্র রিজিকদাতা, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান হন এবং আকীদার ভাষায় সবকিছু তাঁর চূড়ান্ত ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটে, তাহলে সেই মানবিক ব্যর্থতা তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরের স্বতন্ত্র ঘটনা হতে পারে না। অতএব শুধু ‘মানুষই দায়ী’ বলে সর্বশেষ ফয়সালাকারীর অবস্থানকে আলোচনার বাইরে রাখা যুক্তিগতভাবে অসম্পূর্ণ। কারও জীবন রক্ষায় খাদ্য, টাকা, চিকিৎসা ও পরিবহন প্রয়োজন হয়; এগুলোর বাস্তব সরবরাহের দায় মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু একই ফলের শেষ ফয়সালা আল্লাহর হাতে—এই অতিপ্রাকৃত দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ ছাড়া তাকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বলা যায় না।


উপসংহার

“রিজিকের একমাত্র মালিক ও ফয়সালাকারী আল্লাহ”—এই বিশ্বাসে সব প্রাপ্তি, সব অপ্রাপ্তি এবং অনাহারে মৃত্যুকেও একই ঈশ্বরীয় সিদ্ধান্তের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা হয়। কোরআন ১১:৬-এ প্রত্যেক প্রাণীর রিজিকের দায়িত্বের ঘোষণা, মুজাহিদ ও বাগাভির অনাহারে মৃত্যুর স্বীকারোক্তি এবং ইসলামওয়েবের পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয়, বাস্তব ঘটনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিজিকের দায়িত্বের অর্থ এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে যে কোনো ফলাফল আর দাবিটিকে ভুল প্রমাণ করতে পারে না। আকীদার গ্রন্থ এবং সহিহ হাদিসে জন্মের আগেই রিজিক নির্ধারণের বক্তব্য এই সর্বশেষ সিদ্ধান্তের দায় আরও স্পষ্টভাবে আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করে। কিন্তু ক্ষুধা দূর করার বাস্তব পথ পাওয়া যায় খাদ্য উৎপাদন, বণ্টন, শ্রমের ন্যায্য মূল্য, সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ও কার্যকর প্রশাসনিক নীতিতে; অদৃশ্য ফয়সালাকারীর দাবির পক্ষে স্বাধীন পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ নেই। যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা সব ফলাফলকেই নিজের পক্ষে সাক্ষ্য বানায়, সেটি বাস্তবতার ব্যাখ্যা নয়—ভুল হওয়ার সম্ভাবনাহীন বিশ্বাসকে যুক্তির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।


তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন ৫১:৫৭–৫৮ ↩︎
  2. কোরআন ২৯:৬০ ↩︎
  3. কোরআন ৪২:১২ ↩︎
  4. কোরআন ৪২:২৭ ↩︎
  5. কোরআন ৬৫:৩ ↩︎
  6. কোরআন ৪২:২৭ ↩︎
  7. কোরআন ১৩:২৬ ↩︎
  8. কোরআন ২:২১২ ↩︎
  9. কোরআন ১১:৬ ↩︎
  10. সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৩৪৪ ↩︎
  11. কোরআন ১১:৬, মূল আরবি পাঠ ↩︎
  12. তাফসির তাবারি, হুদ ১১:৬, বর্ণনা ১৭৯৫৯ ↩︎
  13. তাফসির বাগাভি, মাআলিমুত তানজিল, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬২; হুদ ১১:৬ ↩︎
  14. তাফসির বাগাভি, মূল আরবি পাঠ ↩︎
  15. Islamweb, ফতোয়া ৪৩০৬০৯, ‘الجمع بين رزق الله لجميع الدواب وموت بعضها جوعًا’, ২২ অক্টোবর ২০২০ ↩︎
  16. Islamweb, ফতোয়া ১৪৬৪৯, ‘رد شبهة حول من يموت جوعاً مع أن الله هو الرزاق’, ২৬ মার্চ ২০০২ ↩︎
  17. FAO, IFAD, UNICEF, WFP and WHO, The State of Food Security and Nutrition in the World 2026 ↩︎
  18. জামে আত-তিরমিজি ২৩৪৫, আরবি মূল ও ইংরেজি অনুবাদ ↩︎
  19. ইমাম তাহাবি, মাতন আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ ↩︎
  20. সহিহ বুখারি ৩২০৮ ↩︎
  21. সহিহ মুসলিম ২৬৬৩খ ↩︎
  22. ইসলামকিউএ ৪৩০২১; ইবন তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া ৮/৫৪০–৫৪১ ↩︎
  23. ইসলামকিউএ ৫৮৭৯০২, ৬ আগস্ট ২০২৬ ↩︎
  24. ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, খণ্ড ২, ‘فصل الحرام رزق’ ↩︎
  25. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ১৮ হিজরি, ‘ذكر القحط وعام الرمادة’ ↩︎
  26. সালওয়া হামিদ আল-মোল্লা, দুরুল কিয়াদাহ ফি ইদারাতিল আযমাহ, রামাদাহ দুর্ভিক্ষ ↩︎
  27. আল-কামিল ফিত তারিখ, ১৮ হিজরি, রামাদাহ ↩︎
  28. দুরুল কিয়াদাহ ফি ইদারাতিল আযমাহ, ‘سياسات عمر في إدارة الأزمة’, ইসলামওয়েব ↩︎
  29. John R. McLane, Land and Local Kingship in Eighteenth-Century Bengal, Chapter 10, ‘The Famine of 1770’, Cambridge University Press ↩︎
  30. কোরআন ৭:৯৬ ↩︎
  31. কোরআন ৭১:১০–১২ ↩︎
  32. তাফসির বাগাভি, আরাফ ৭:৯৬ ↩︎
  33. Islamweb, ফতোয়া ৪৩০৬০৯; বাকারা ২:১৫৫–১৫৭-এর প্রয়োগ ↩︎
  34. সুনান আবু দাউদ ২০৫০, অধিক সন্তান প্রসবকারিণীকে বিয়ে ↩︎
  35. কোরআন ১৭:৩১, মূল আরবি ও অনুবাদ ↩︎
  36. Nordic Health and Welfare Statistics, How Social Expenditure Is Financed ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.