ভূমিকা
নদী, হ্রদ ও সমুদ্রের মিলনস্থলে ভিন্ন রঙ, ঘনত্ব ও স্বাদের পানি পাশাপাশি বা স্তরাকারে দেখা যাওয়ার ঘটনা প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের পরিচিত ছিল। বিশেষ করে মিষ্টি পানি লোনা পানির তুলনায় হালকা হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা উপরের স্তরে অবস্থান করতে পারে এবং প্রবল নদীস্রোত সমুদ্রে প্রবেশের পরও কিছু দূর পর্যন্ত নিজস্ব দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। উপর থেকে বা জাহাজ থেকে এমন দৃশ্য দেখলে পানি দুটি আলাদা রয়েছে বলে মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান দেখায়, এই স্তরবিন্যাস কোনো অভেদ্য দেয়াল নয়। লবণাক্ততা ও ঘনত্বের পার্থক্য মিশ্রণের গতি কমাতে বা স্তরবিন্যাস বজায় রাখতে পারে, কিন্তু দুই জলরাশির মধ্যে পানি, লবণ ও ভরবিনিময় ঘটে; জোয়ার-ভাটা, স্রোত, বাতাস ও বিক্ষুব্ধতা এই মিশ্রণকে আরও ত্বরান্বিত করে। মোহনায় তাই মিষ্টি ও লোনা পানির মধ্যবর্তী বিস্তৃত আধা-লবণাক্ত বা ব্র্যাকিশ অঞ্চল তৈরি হয়।
মোহনায় যেখানে নদীর মিষ্টি হালকা পানি সমুদ্রের লবণাক্ত ভারী পানির সাথে মিশে যায় সেখানে উভয় ধরনের পানির মিশ্রণ পাওয়া যায়। জোয়ারের সময় খেয়াল করলে দেখবেন, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদীর ভেতরে ঢুকে যায়, আবার ভাটার সময় নেমে যায়। সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এই অঞ্চলে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রাও যেরকম থাকে, আবার থাকে স্বাদু পানি প্রবাহের মাত্রাও। এই বৈচিত্র্যই এই অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ গাছপালার জন্ম দেয়, যা অন্যত্র পাওয়া যায় না। অর্থাৎ সুন্দরবনের নদীতে আপনি লবণাক্ততাও পাবেন, আবার স্বাদু পানি প্রবাহও পাবেন।
প্রাচীন গ্রন্থসমূহে দুই সমুদ্রের পানি পৃথক থাকার ধারণা
কোরআনে বর্ণিত “দুই সমুদ্রের পানি মেশে না” বা তাদের মাঝে “অদৃশ্য দেয়াল” থাকার এই ধারণাটি আসলে ইসলামের নিজস্ব কোনো মৌলিক তথ্য নয়। বরং কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার বহু শত বছর পূর্ব থেকেই গ্রিক ও রোমান লেখকদের রচনায় মিষ্টি ও লোনা পানির ভিন্ন ঘনত্ব, পৃথক স্তর এবং দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রবাহের অনুরূপ পর্যবেক্ষণ ও ধারণা পাওয়া যায়।
অ্যারিস্টটল: মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বের পার্থক্য
কোরআনের বহু শতাব্দী আগে অ্যারিস্টটল মিষ্টি ও লোনা পানির ভৌত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর Meteorologica-এর দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি মিষ্টি পানিকে হালকা এবং লোনা পানিকে ভারী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর আলোচনার মূল প্রেক্ষাপট ছিল সমুদ্রের লবণাক্ততা, বাষ্পীভবন ও জলচক্র; নদীর মোহনায় কোনো অলৌকিক দেয়াল নয়। তিনি লিখেছেন:
“পানযোগ্য মিষ্টি পানি হালকা এবং তা উপরে উঠে যায়; লবণাক্ত পানি ভারী এবং নিচে থেকে যায়।”
অ্যারিস্টটল আরও জানতেন যে সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে উপরে ওঠে, ঠান্ডায় ঘনীভূত হয়ে আবার বৃষ্টি হিসেবে ফিরে আসে। অর্থাৎ মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বের পার্থক্য এবং জলচক্র—দুটিই সপ্তম শতাব্দীর বহু আগের জ্ঞান। অ্যারিস্টটলের এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট, মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বগত পার্থক্য এবং তার ফলে সৃষ্ট স্তরবিন্যাসের মৌলিক ধারণা কোরআনের বহু শতাব্দী আগেই পরিচিত ছিল। [1]
প্লিনি দ্য এল্ডার: সমুদ্রের ওপর মিষ্টি পানির স্তর
প্রথম শতাব্দীতে প্লিনি দ্য এল্ডার তাঁর Naturalis Historia-তে আরও সরাসরি এমন দৃশ্যের কথা লিখেছেন যা আধুনিক চোখে স্তরবিন্যাস বা density-driven flow হিসেবে বোঝা যায়। তিনি সমুদ্রের পৃষ্ঠে মিষ্টি পানির স্তর ভেসে থাকার কথা উল্লেখ করে এর কারণ হিসেবে মিষ্টি পানির তুলনামূলক হালকা হওয়াকে দায়ী করেন। একই আলোচনায় তিনি কয়েকটি নদীর পানি হ্রদের ওপর বহু দূর পর্যন্ত নিজস্ব প্রবাহ বজায় রাখে বলেও উল্লেখ করেন।
“সমুদ্রের পৃষ্ঠে মিষ্টি পানির স্তর ভাসে—নিঃসন্দেহে তা হালকা হওয়ার কারণে; সমুদ্রের পানি অধিক ভারী।”
এই বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোরআনের প্রায় ছয় শতাব্দী আগেই মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বগত পার্থক্য থেকে দৃশ্যমান পৃথক স্তর সৃষ্টি হওয়ার পর্যবেক্ষণ লিখিত ছিল। প্লিনি অবশ্য আধুনিক diffusion, turbulent mixing বা estuarine circulation জানতেন না; কিন্তু পানি দুটির দৃশ্যমান স্বাতন্ত্র্য ও মিষ্টি পানির উপরে অবস্থানের ঘটনাটি তাঁর কাছে মোটেই অজানা ছিল না। [2]
সেনেকা: সমুদ্র ও নদীর পানি নিয়ে প্রাচীন ধারণা
প্রথম শতকের রোমান দার্শনিক সেনেকার Naturales Quaestiones-এও নদী ও সমুদ্রের পানি নিয়ে তৎকালীন বিভিন্ন ধারণা সংরক্ষিত হয়েছে। সেনেকা নিজে সব মত সমর্থন করেননি; বরং প্রচলিত প্রাকৃতিক ব্যাখ্যাগুলো আলোচনা করেছেন। তিনি একটি মত উদ্ধৃত করেন, যার মতে সমুদ্র নদীর প্রবাহিত পানি “আত্মসাৎ” করে না; পানি গোপন ভূগর্ভস্থ পথে ফিরে গিয়ে লবণাক্ততা হারিয়ে আবার মিষ্টি পানিতে পরিণত হয়। অন্যত্র আলফিয়ুস-আরেথুসার প্রাচীন কাহিনি আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ভার্জিলের এমন পংক্তিও উদ্ধৃত করেন যেখানে “তিক্ত সমুদ্রের ঢেউ” মিষ্টি প্রবাহের সঙ্গে না-মেশার ধারণা রয়েছে।
এসব বক্তব্য আধুনিক জলবিজ্ঞানের সঠিক বিবরণ নয়; কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার করে—মিষ্টি পানি কীভাবে সমুদ্রের মধ্যে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে, সমুদ্র কেন নদীর পানিতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় না এবং দুই ধরনের পানি কীভাবে পৃথক থাকে—এসব প্রশ্ন ও ধারণা কোরআনের বহু শতাব্দী আগেই ভূমধ্যসাগরীয় জ্ঞানজগতে আলোচিত হচ্ছিল। [3]
আলেকজান্ডার অফ আফ্রোদিসিয়াস: লবণাক্ততা, ঘনত্ব ও অ্যারিস্টটলীয় ব্যাখ্যা
দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের অ্যারিস্টটলীয় ভাষ্যকার আলেকজান্ডার অফ আফ্রোদিসিয়াস সমুদ্র সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে মিষ্টি ও লোনা পানির ভৌত পার্থক্য পুনরায় ব্যাখ্যা করেন। তাঁর Quaestiones-এর “About the Sea” অংশে বলা হয়েছে, পানির সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও মিষ্টি অংশ হালকা ও বিশুদ্ধ হওয়ায় সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে উপরে উঠে যায়, আর ভারী লবণাক্ত অংশ নিচে থেকে যায়। তিনি লবণাক্ত পানির অধিক ঘনত্ব এবং পানিতে মিশ্রিত পদার্থের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন।
অতএব কোরআনের কয়েক শতাব্দী আগেই গ্রিক-রোমান প্রকৃতিবিদ্যার ধারায় মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বের পার্থক্য, তাদের পৃথক ভৌত আচরণ এবং দৃশ্যমান স্তরবিন্যাস ব্যাখ্যা করার একটি সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামো ছিল। আলেকজান্ডারের আলোচনাও দেখায়, মিষ্টি ও লোনা পানির ভিন্ন ঘনত্ব, ভিন্ন ভৌত আচরণ এবং স্তরবিন্যাসের ধারণা কোরআনের কয়েক শতাব্দী আগেই গ্রিক প্রকৃতিবিদ্যায় সুপরিচিত ছিল। [4]
কোরআনের বক্তব্য: অভেদ্য দেয়াল
সূরা ফুরকান ২৫:৫৩-এ একটি মিষ্টি-সুপেয় এবং অন্যটি লোনা-খর পানির মধ্যে “বারযাখ” ও “হিজরান মাহজুরা” বা অন্তরায় ও অনতিক্রম্য ব্যবধানের কথা বলা হয়েছে; সূরা আর-রাহমান ৫৫:১৯–২০-এ দুই জলরাশি মিলিত হলেও তাদের মধ্যে বারযাখ রয়েছে এবং তারা “লা ইয়াবগিয়ান”—সীমা অতিক্রম করে না। বাংলা অনুবাদগুলো একে “অনতিক্রম্য ব্যবধান”, “আড়াল” ও “বিভক্তি-প্রাচীর” হিসেবে অনুবাদ করেছে; আর নিচে দেখা যাবে, প্রাচীন মুফাসসিরদের বড় একটি ধারা আরও স্পষ্টভাবে এর অর্থ করেছেন—দুটি পানি পরস্পরের সঙ্গে মিশে না। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান অবশ্য দেখায়, ঘনত্ব ও লবণাক্ততার পার্থক্যে শক্ত স্তরবিন্যাস তৈরি হতে পারে, কিন্তু দুই জলরাশির মধ্যে মিশ্রণ ও ভরবিনিময় বাস্তবেই ঘটে। মোহনার ব্র্যাকিশ পানিই তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। [5] [6] [7] –
তিনিই সমুদ্রকে দু’ ধারায় প্রবাহিত করেছেন- একটি সুপেয় সুস্বাদু আরেকটি লবণাক্ত কটু, উভয়ের মাঝে টেনে দিয়েছেন এক আবরণ- এক অনতিক্রম্য বিভক্তি-প্রাচীর।
— Taisirul Quran
তিনিই দুই সমুদ্রকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন; একটি মিষ্টি, সুপেয় এবং অপরটি লবণাক্ত, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তিনিই দু’টো সাগরকে একসাথে প্রবাহিত করেছেন। একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট এবং তিনি এতদোভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় ও একটি অনতিক্রম্য সীমানা স্থাপন করেছেন।
— Rawai Al-bayan
আর তিনিই দুই সাগরকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট, সুপেয় এবং অন্যটি লোনা, খর; আর তিনি উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
দু’টি সমুদ্রকে তিনিই প্রবাহিত করেন যারা পরস্পর মিলিত হয়,
— Taisirul Quran
তিনি প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া, যারা পরস্পর মিলিত হয়,
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়।
— Rawai Al-bayan
তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্র যারা পরস্পর মিলিত হয়,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
(কিন্তু তা সত্ত্বেও) উভয়ের মাঝে আছে এক আড়াল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।
— Taisirul Quran
কিন্তু ওদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা ওরা অতিক্রম করতে পারেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক আড়াল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।
— Rawai Al-bayan
কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না [১]
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাফসীর গ্রন্থে উল্লিখিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ
আসুন এবারে তাফসীর গ্রন্থ থেকে আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পড়ে দেখি [8] [9] –
আর তিনি উহাদের মাঝে অর্থাৎ লবণাক্ত ও সুমিষ্ট সাগর ও নদী যাত্রার মাঝে আবরন ও মযবুত অন্তরায় সৃষ্টি করিয়াছেন । যেন একটির পানি অপরটির সহিত মিশ্রিত না হইতে পারে। যেমন অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে
“আল্লাহ তা’আলা দুইটি সম্মিলিত সাগরকে প্রবাহিত করিয়াছেন উহাদের মাঝে রহিয়াছে একটি প্রতিবন্ধক, যেন উহারা পরস্পরে তাহাদের স্বীয় সীমা অতিক্রম না করে। অতএব তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করিবে”? (সূরা রাহমান: ১৯-২০)।
আরো ইরশাদ হইয়াছে, – “না কি, সেই মহান সত্তা যিনি যমীনকে আবাসস্থল করিয়াছেন এবং উহার মাঝে নদী নালা সৃষ্টি করিয়াছেন, উহার উপর পাহাড় ও প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন আর দুই সমুদ্রের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করিয়াছেন। বলতো দেখি আল্লাহর সহিত কি অন্য উপাস্য আছে? বরং তাহাদের অধিকাংশই হইল মূর্খ” । (সূরা নামল : ৬১)
…ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন: আয়াতে অর্থ …,। অর্থাৎ প্রবাহিত করিয়াছেন । … এর ব্যাখ্যায় ইব্ন যায়দ (র) বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা দুই দরিয়ার মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করিয়া একটির সহিত আরেকটির মিলিত হওয়ার পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছেন । সূরা রাহমান ৫৮৯
দুই সমুদ্র দ্বারা উদ্দেশ্য হইল; মিঠা পানির সমুদ্র ও লবণাক্ত পানির সমুদ্র । এই দুই সমুদ্র পাশাপাশি প্রবহমান হওয়া সত্ত্বেও একটির লবণাক্ত পানি অপরটির মিঠা পানির সহিত মিশিয়া বা মিঠা পানি লবণাক্ত পানির সহিত মিশিয়া একটি অপরটির স্বাদ বিনষ্ট করিতে পারে না। দুইয়ের মধ্যে রহিয়াছে এমন একটি অন্তরাল যাহা কেহই অতিক্রম করিতে পারে না । প্রত্যেকেই আপন আপন সীমানায় প্রবাহিত । সূরা ফুরকানের নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় এই প্রসংগে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে ।
কিন্তু ইব্ন জারীর (র) যেই যুক্তি পেশ করিয়াছে উহা সঠিক হইলেও তিনি দুই সমুদ্র এবং যে ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন উহা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এই আয়াতের পরেই আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ অর্থাৎ দুই দরিয়ার মাঝে আল্লাহ্ তা’আলা এমন একটি অন্তরাল ও অনতিক্রম্য ব্যবধান সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহার ফলে একটির পানি অপরটির পানির সহিত মিশিয়া কেহ কাহারো গুণাগুণ নষ্ট করিতে না পারে । কিন্তু আকাশ ও যমীনের মাঝে যেই ব্যবধান রহিয়াছে উহাকে (অন্তরাল) বা …(অনতিক্রম্য ব্যবধান) বলা হয় না। অতএব বাধ্য হইয়াই বলিতে হয় যে, দুই সমুদ্র দ্বারা আকাশ ও যমীনের দুই সমুদ্র নয়- বরং পৃথিবীর সুমিষ্ট ও লোনা পানি যুক্ত দুই পাশাপাশি প্রবহমান দুই সমুদ্র উদ্দেশ্য।



এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে দেখে নেয়া যাক, এই আয়াতটি সম্পর্কে কী বলা আছে, [10] –
→ তিনিই দুই দরিয়াকে প্রবাহিত করিয়াছেন, একটির পানি মিষ্ট, সুপেয় এবং অপরটির পানি লোনা, খর, উভয়ের মধ্যে তিনি রাখিয়া দিয়াছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান ।
→ এবং তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন পানি হইতে; অতঃপর তিনি মানব জাতির মধ্যে রক্তগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছেন। তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান ।
প্রথমে বলা হয়েছে— “তিনিই দুই দরিয়াকে প্রবাহিত করেছেন, একটির পানি মিষ্ট, সুপেয় এবং অপরটির পানি লোনা, খর, উভয়ের মধ্যে তিনি রেখেছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান’। এখানে ‘মারাজ্বাল বাহরাইনি’ বলে বুঝানো হয়েছে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দুই সমুদ্রের সম্মিলিত প্রবহমানতাকে। এরকম সম্মিলনের কারণে দুই সমুদ্রের একাকার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয় না । কারণ পাশাপাশি প্রবাহিত হওয়া সত্ত্বেও দুই সমুদ্রের স্রোতের আপনাপন বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখাই আল্লাহ্তায়ালার অভিপ্রায়। আর তাঁর চিরঅমুখাপেক্ষী অভিপ্রায়ের ব্যত্যয় কদাচ ঘটে না।

প্রাচীন তাফসীরসমূহে ‘বারযাখ’: মিশ্রণ রোধকারী অন্তরায়
কোরআনের “বারযাখ” বা দুই ধরনের পানির মধ্যবর্তী অন্তরায়কে আধুনিক কালে অনেকেই হ্যালোক্লাইন, লবণাক্ততার ঢাল বা সাময়িক ট্রানজিশন জোন হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রাচীন ও ধ্রুপদী তাফসীরগুলো পড়লে দেখা যায়, মুফাসসিরদের একটি বড় অংশ বিষয়টিকে এভাবে বোঝেননি। তাদের ভাষায় বারবার এসেছে, দুটি পানি মিলিত হলেও একটির সঙ্গে অন্যটি “মিশে যায় না”, আল্লাহ তাদের মাঝে এমন এক অদৃশ্য বাধা সৃষ্টি করেছেন যা এক পানিকে অন্যটির সঙ্গে মিশতে দেয় না, কিংবা একটির স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য অন্যটির দ্বারা নষ্ট হতে দেয় না। এই ব্যাখ্যা কোনো আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়; বরং ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দীর তাফসীর-ঐতিহ্যের মধ্যেই স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত। [11]
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বক্তব্যগুলোর একটি মুজাহিদ ইবন জাবরের নামে সংরক্ষিত। তাবারী তাঁর সূত্রে লিখেছেন, “لا يختلط البحر بالعذب”—“সমুদ্রের লোনা পানি মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশে যায় না।” আরেক বর্ণনায় মুজাহিদ বলেন, “حاجزًا لا يراه أحد، لا يختلط العذب في البحر”—“এমন একটি বাধা যা কেউ দেখতে পায় না; মিষ্টি পানি সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশে যায় না।” আরও সরাসরি আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, “البرزخ أنهما يلتقيان فلا يختلطان”—“বারযাখ হলো এমন অবস্থা যেখানে দুটি পানি মিলিত হয়, কিন্তু মিশে যায় না।” [12] একই বক্তব্য ইবন আবি হাতিমও মুজাহিদের সূত্রে সংরক্ষণ করেছেন। [13]
আরও প্রাচীন মুফাসসির মুকাতিল ইবন সুলাইমানের বক্তব্যও একই অর্থ বহন করে। তাঁর ব্যাখ্যায় “حجابًا محجوبًا فلا يختلطان”—অর্থাৎ তাদের মধ্যে এমন এক আড়াল বা পর্দা রয়েছে যার ফলে দুটি পানি পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় না। সূরা রাহমানের ব্যাখ্যায়ও তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় একটিকে অন্যটি থেকে আটকে রেখেছেন—“فلا يختلطان، ولا يتغير طعمهما”—“তারা মিশে যায় না এবং তাদের স্বাদও পরিবর্তিত হয় না।” [14] [15]
চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর আবুল লায়স আস-সামারকান্দী তাঁর বাহরুল উলূম-এ আরও নির্দিষ্ট ভাষায় বলেছেন, আল্লাহ মিষ্টি পানিকে লোনা হতে এবং লোনা পানিকে মিষ্টি হতে নিষিদ্ধ করেছেন, এবং “وحرم على كل واحد منهما أن يختلط بصاحبه”—“প্রত্যেকটির জন্য অন্যটির সঙ্গে মিশে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন।” অর্থাৎ এখানে বক্তব্যটি শুধু স্বাদ অক্ষুণ্ণ থাকার নয়; সরাসরি পারস্পরিক মিশ্রণ নিষিদ্ধ থাকার ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। [16]
ইমাম বাগাভীর মাআলিমুত তানযীল-এ ভাষাটি আরও দ্ব্যর্থহীন: “حاجزًا بقدرته لئلا يختلط العذب بالملح ولا الملح بالعذب”—“নিজ ক্ষমতায় তিনি তাদের মধ্যে একটি বাধা সৃষ্টি করেছেন, যাতে মিষ্টি পানি লোনা পানির সঙ্গে এবং লোনা পানি মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশে না যায়।” [17]
কুরতুবীর আল-জামি‘ লি আহকামিল কোরআন-এ একই বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি “বারযাখ”-কে আল্লাহর ক্ষমতায় সৃষ্ট বাধা এবং “হিজরান মাহজুরা”-কে এমন এক প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন “يمنع أحدهما من الاختلاط بالآخر”—“যা একটিকে অন্যটির সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়।” [18]
ফখরুদ্দীন রাযীর ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, “وأنه سبحانه بقدرته يفصل بينهما ويمنعهما التمازج”—“আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় দুটিকে পৃথক করেন এবং তাদের পারস্পরিক মিশ্রণ প্রতিরোধ করেন।” এরপর সূরা রাহমানের “لا يبغيان” ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এর অর্থ হলো একটি অন্যটির ওপর মিশ্রণের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে না। [19]
এখানে তাবারীর নিজস্ব নির্বাচিত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাবারী مرج শব্দের মূল অর্থ “মিশ্রিত করা” ধরে বলেন যে দুটি পানি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বা মিশ্র অবস্থায় থাকলেও আল্লাহ লোনা পানিকে মিষ্টি পানির স্বাদ নষ্ট করতে দেন না। তাঁর ভাষায়, এই বাধা কার্যকর থাকে “مع اختلاط كل واحد منهما بصاحبه”—একটির সঙ্গে অন্যটির মিশ্রতা থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু এটিও আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের “পূর্ণ মিশ্রণ ঘটে এবং একটি ক্রমাগত salinity gradient তৈরি হয়” বক্তব্য নয়; তাবারীর কেন্দ্রীয় দাবি হলো, ঐশ্বরিক বাধা একটির বৈশিষ্ট্যকে অন্যটির দ্বারা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। একই তাফসীরে সংরক্ষিত মুজাহিদের ব্যাখ্যা আবার সরাসরি “মিলিত হয় কিন্তু মিশে না” বলেছে। ফলে প্রাচীন তাফসীরের ভেতরে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও আধুনিক “কোরআন আসলে estuarine mixing বা halocline-এর বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দিয়েছিল” ধারণাটি সেখানে পাওয়া যায় না। নিচে প্রধান তাফসীরগুলোর বক্তব্য একসঙ্গে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়:
| মুফাসসির / উৎস | সময় | মূল বক্তব্য | অর্থ ও তাৎপর্য | রেফারেন্স |
|---|---|---|---|---|
| মুজাহিদ ইবন জাবর | মৃত্যু ১০৪ হি. | «يلتقيان فلا يختلطان» | দুটি পানি মিলিত হয়, কিন্তু মিশে যায় না; অন্য বর্ণনায় অদৃশ্য বাধার কথাও আছে | [20] |
| মুকাতিল ইবন সুলাইমান | মৃত্যু ১৫০ হি. | «فلا يختلطان، ولا يتغير طعمهما» | তারা মিশে যায় না এবং একটির স্বাদ অন্যটির দ্বারা পরিবর্তিত হয় না | [21] |
| ইবন আবি হাতিম | মৃত্যু ৩২৭ হি. | «حاجزًا لا يراه أحد، لا يختلط العذب بالبحر» | অদৃশ্য বাধা মিষ্টি ও লোনা পানিকে মিশতে দেয় না | [22] |
| ইমাম তাবারী | মৃত্যু ৩১০ হি. | মুজাহিদের “মিশে না” মত সংরক্ষণ; নিজের নির্বাচিত ব্যাখ্যায় স্বাদ নষ্ট না হওয়ার ওপর জোর | প্রাথমিক তাফসীরেই একাধিক ব্যাখ্যা ছিল; কিন্তু “বারযাখ”কে ঐশ্বরিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবেই দেখা হয়েছে | [23] |
| আবুল লায়স সামারকান্দী | মৃত্যু ৩৭৩ হি. | «حرم على كل واحد منهما أن يختلط بصاحبه» | প্রত্যেক পানির জন্য অন্যটির সঙ্গে মিশে যাওয়া নিষিদ্ধ | [24] |
| ইমাম বাগাভী | মৃত্যু ৫১৬ হি. | «لئلا يختلط العذب بالملح ولا الملح بالعذب» | মিষ্টি ও লোনা পানি যাতে পরস্পরের সঙ্গে মিশতে না পারে, সেই জন্য বাধা | [25] |
| ফখরুদ্দীন রাযী | মৃত্যু ৬০৬ হি. | «يفصل بينهما ويمنعهما التمازج» | আল্লাহ দুটিকে পৃথক রাখেন এবং তাদের পারস্পরিক মিশ্রণ প্রতিরোধ করেন | [26] |
| ইমাম কুরতুবী | মৃত্যু ৬৭১ হি. | «يمنع أحدهما من الاختلاط بالآخر» | বাধাটি এক পানিকে অন্য পানির সঙ্গে মিশতে দেয় না | [27] |
| ইবন কাসীর | মৃত্যু ৭৭৪ হি. | লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝে এমন অন্তরায় যা একটির বৈশিষ্ট্য অন্যটিকে নষ্ট করতে দেয় না | উপরে বর্ণিত | [28] |
| তাফসীরে মাযহারী | ১২শ হিজরি | পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও দুই পানির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকে, কারণ আল্লাহ তাদের মধ্যে অন্তরায় রেখেছেন | উপরে বর্ণিত | [29] |
এই তাফসীরগুলো কালানুক্রমিকভাবে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। “দুই পানি আসলে স্বাভাবিকভাবেই মিশে যায়; বারযাখ বলতে কেবল সেই মিশ্রণ অঞ্চলের salinity gradient বোঝানো হয়েছে”, এটি ধ্রুপদী তাফসীর এবং ইসলামের শুরুর দিকের স্কলারদের প্রচলিত ব্যাখ্যা ছিল না। বরং প্রথম যুগের মুজাহিদ ও মুকাতিল থেকে শুরু করে সামারকান্দী, বাগাভী, রাযী ও কুরতুবী পর্যন্ত বারবার যে ভাষা এসেছে তা হলো—“মিশে না”, “মিশতে বাধা দেওয়া হয়”, “অদৃশ্য বাধা”, “দেয়াল”, “মিশ্রণ প্রতিরোধ”। এমনকি যেখানে তাবারী কোনো মাত্রায় مرج-কে মিশ্রণ হিসেবে নিয়েছেন, সেখানেও তিনি এমন একটি ঐশ্বরিক বাধার কথা বলেছেন যা এক পানিকে অন্যটির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে দেয় না। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মোহনা কিন্তু এমন কোনো স্থায়ীভাবে পৃথক রাখা ব্যবস্থা নয়; সেখানে মিষ্টি ও লোনা পানি বাস্তবেই মিশে ব্র্যাকিশ পানি সৃষ্টি করে। ফলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পুনর্ব্যাখ্যা এবং প্রাচীন মুসলিম মুফাসসিরদের বোঝাপড়ার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক ব্যবধান রয়েছে।
আলেম-ওলামাদের বক্তব্য
এবারে আসুন আধুনিক সময়ের বাংলাদেশি আলেম মিজানুর রহমান আযহারীর কিছু বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
সমুদ্র বদলায়নি, বদলেছে কোরআনের ব্যাখ্যা
এই বিতর্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কোরআনের ভাষা বদলায়নি, কিন্তু কোরআনের ব্যাখ্যা বারবার বদলানো হয়েছে। প্রাচীন মুফাসসিরদের কাছে “বারযাখ” ছিল এমন এক বাধা, যার কারণে মিষ্টি ও লোনা পানি একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারে না, একটির স্বাদ অন্যটি নষ্ট করতে পারে না, এমনকি অনেক ব্যাখ্যায় সরাসরি বলা হয়েছে—“তাদের মাঝে আছে অদৃশ্য দেয়াল।” তখন এই ব্যাখ্যাই ছিল স্বাভাবিক, কারণ দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণেও অনেক ক্ষেত্রে দুটি জলরাশিকে পাশাপাশি পৃথক অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান যখন পরিমাপ, salinity profile, estuarine circulation, diffusion, turbulence এবং brackish water-এর মাধ্যমে দেখিয়ে দিল যে পানি বাস্তবেই মিশে যায়, তখন সেই পুরনো ব্যাখ্যা হঠাৎ অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। তখন শুরু হলো শব্দের নতুন অর্থ আবিষ্কার—বারযাখ আর পানি মেশার বাধা নয়; সেটি নাকি কেবল density gradient, halocline, transition zone, কিংবা এমন একটি সীমা যার মধ্য দিয়েই পানি দিব্যি মিশে যাচ্ছে।
এখানে পদ্ধতিটা লক্ষ্য করার মতো। প্রথমে বলা হয়, কোরআন এমন একটি বৈজ্ঞানিক সত্য জানিয়েছিল যা মানুষ জানত না। এরপর বিজ্ঞান যখন সেই দাবির বিপরীত ফল দেখায়, তখন কোরআনের বক্তব্যকে বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন করে অর্থ দেওয়া হয়। তারপর সেই নতুন অর্থকেই আবার “কোরআনের বৈজ্ঞানিক মিরাকল” হিসেবে বাজারজাত করা হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞান এখানে যাচাইয়ের বিষয় নয়, বরং চূড়ান্ত মানদণ্ড; কোরআনকে সেই মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ক্রমাগত অর্থ এদিক-সেদিক করা হয়। বিজ্ঞান যদি বলে পানি মেশে না—তাহলে কোরআন নাকি আগেই বলেছে পানি মেশে না। বিজ্ঞান যদি বলে পানি মেশে—তাহলে কোরআন নাকি আসলে “মেশে, কিন্তু বৈশিষ্ট্যগত সীমা থাকে” বলেছে। বিজ্ঞান যদি halocline বলে—কোরআনের “বারযাখ” তখন halocline হয়ে যায়। অর্থাৎ ফলাফল আগে বিজ্ঞান থেকে নেওয়া হয়, এরপর সেই ফলাফল কোরআনের শব্দের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বলা হয়—দেখুন, কোরআন চৌদ্দশ বছর আগেই সব জানত।
এটি বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এটি পশ্চাৎমুখী অর্থ-সমন্বয়। কোনো বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক পূর্বজ্ঞান বলতে হলে বক্তব্যটি এমন হতে হবে যার অর্থ ফলাফল জানার আগেই নির্দিষ্ট ছিল, সুস্পষ্ট (Unambiguous) এবং পরে পরীক্ষায় সেটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এখানে ঘটেছে উল্টোটা। ফলাফল আগে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে; তারপর পুরনো ধর্মীয় বাক্যের অর্থ সেই ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। আরও বিস্ময়কর হলো, প্রাচীন তাফসীরগুলোতে যখন “لا يختلطان”, “لا يختلط العذب بالملح”, “يمنعهما التمازج”—অর্থাৎ “মিশে না”, “মিশতে দেয় না”, “মিশ্রণ প্রতিরোধ করে”—এরকম দ্ব্যর্থহীন ভাষা ছড়িয়ে আছে, তখন আধুনিক এপোলোজেটিক ব্যাখ্যায় সেগুলো কার্যত পাশ কাটিয়ে কোরআনের মধ্যে এমন একটি oceanography ঢোকানো হচ্ছে, যা সেই মুফাসসিরদের কেউই চিনতেন না। তারা কোরআনকে বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি; আধুনিক এপোলোজিস্টরা বিজ্ঞান আবিষ্কার হওয়ার পরে কোরআনকে বিজ্ঞানের ভাষায় পুনর্লিখন করছেন।

এই কারণে “কোরআনে বিজ্ঞান” দাবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোরআনের কোনো একটি শব্দ নয়, বরং ব্যাখ্যার এই চলমান স্থানান্তর। দাবিটি পরীক্ষাযোগ্য থাকে না, কারণ বিজ্ঞান যেদিকেই যাক, কোরআনের অর্থকেও সেদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। আগে “মেশে না” ছিল মিরাকল, পরে “মিশে কিন্তু পুরোপুরি একাকার হয় না” হলো মিরাকল, এরপর “মিশ্রণ অঞ্চলে gradient থাকে” সেটিও মিরাকল। এই পদ্ধতিতে কোনো ধর্মগ্রন্থকেই কখনো ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয়, কারণ প্রতিটি নতুন বৈজ্ঞানিক ফলাফলের পরে পুরনো বাক্যের নতুন অর্থ বানানো যায়। বাস্তবে তাই বিজ্ঞান কোরআনকে সত্য প্রমাণ করছে না; বিজ্ঞান আবিষ্কার করছে, আর এপোলোজেটিক ব্যাখ্যা তার পেছনে দৌড়ে কোরআনের অর্থ বদলে সেই আবিষ্কারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে।
ইবন বাযের দুই বিপরীত ব্যাখ্যা: পানি মেশে, আবার মেশেও না
এই আয়াতকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানোর সমস্যাটি কতটা প্রকট, তার একটি চমৎকার উদাহরণ সৌদি আরবের প্রভাবশালী সালাফি আলেম শাইখ আবদুল আজিজ ইবন বাযের বক্তব্যেই পাওয়া যায়। একই আয়াত—সূরা আর-রাহমান ১৯–২০—ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত একটি উত্তরে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, সমুদ্রের পানি মিশে যায়। তাঁর বক্তব্য: «فالبحار تختلط»—“সমুদ্রগুলো মিশে।” এরপর তিনি বলেন, আল্লাহ যখন সেগুলোকে পৃথক করতে চান তখন নদীর পানি আলাদা এবং সমুদ্রের পানি আলাদা হয়ে যায়; নদী মিষ্টি এবং সমুদ্র লবণাক্ত অবস্থায় থাকে। [30]
فالبحار تختلط، ثم إذا أراد الله تمييزها، تميز هذا من هذا
বাংলা অনুবাদ: “সমুদ্রগুলো মিশে যায়; এরপর আল্লাহ যখন সেগুলোকে পৃথক করতে চান, তখন এটি ওটি থেকে পৃথক হয়ে যায়।”
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, একই ইবন বায একই আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যায় ঠিক বিপরীত কথা বলেছেন। সেখানে প্রশ্ন ছিল, “মারাজাল বাহরাইনি ইয়ালতাকিয়ান, বাইনাহুমা বারযাখুন লা ইয়াবগিয়ান” আয়াতটির অর্থ কী। এবার ইবন বায বলেন, আয়াতটি তার “ظاهرها”—অর্থাৎ প্রকাশ্য বা সরল অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় মিষ্টি ও লোনা পানির মধ্যে বাধা রেখেছেন; একটি একদিকে, অন্যটি অন্যদিকে এবং তাঁর স্পষ্ট ভাষায়: «لا يختلطان»—“দুটি মিশে না।” [31]
هذا على حدة وهذا على حدة، لا يختلطان
বাংলা অনুবাদ: “এটি আলাদা এবং ওটি আলাদা; তারা পরস্পর মিশে না।”
অর্থাৎ একই আলেম, একই আয়াত এবং একই মিষ্টি ও লোনা পানির প্রসঙ্গে এক জায়গায় বলছেন “সমুদ্রগুলো মিশে”, আর অন্য জায়গায় বলছেন “তারা মিশে না”। দুটি বক্তব্য একই অর্থ বহন করে না; এগুলো সরাসরি বিপরীত। প্রথম বক্তব্যটি বাস্তব পর্যবেক্ষণের সামনে আয়াতকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ দেয়—পানি মিশে, কিন্তু পরে কোনোভাবে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। দ্বিতীয় বক্তব্যটি আবার সেই পুরনো আক্ষরিক তাফসীরের সাথেই মিলে যায়—আল্লাহর স্থাপিত বাধার কারণে পানি আদৌ মিশে না। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো “মিশে”, কখনো “মিশে না” বললে আয়াতটিকে যে কোনো বৈজ্ঞানিক ফলাফলের সাথেই খাপ খাওয়ানো সম্ভব; কিন্তু সেটি আয়াতের বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার প্রমাণ নয়, বরং ব্যাখ্যার অসঙ্গতির প্রমাণ।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি: ‘অভেদ্য অন্তরায়’ কেন একটি প্রাকৃতিক বিভ্রম?
কোরআনের দাবি অনুযায়ী, দুই সমুদ্র বা লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝে একটি ‘বারজাখ’ বা ‘অভেদ্য অন্তরায়’ রয়েছে যা পানিকে মিশতে বাধা দেয়। কিন্তু আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) এবং পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবিটি কেবল ভুলই নয়, বরং এটি একটি চাক্ষুষ বিভ্রম মাত্র। প্রকৃতিতে লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝে কোনো স্থায়ী বা অভেদ্য দেয়াল থাকা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
প্রথমত, ব্যাপন প্রক্রিয়া (Diffusion) এবং অস্থিরতা বা বিক্ষুব্ধতা (Turbulence) এর কারণে দুই ধরণের পানি সবসময়ই একে অপরের সাথে মিশে যায়। পানির অণু এবং দ্রবীভূত লবণ সর্বদা আণবিক গতিতে থাকে। লোনা ও মিষ্টি পানি সংস্পর্শে এলে লবণের ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে আণবিক ব্যাপন ঘটে; একই সঙ্গে স্রোত, জোয়ার এবং বিক্ষুব্ধ প্রবাহ দুই জলরাশির মধ্যে পানি ও লবণের ভরবিনিময় ঘটায়। এমনকি যদি সমুদ্র শান্তও থাকে, তবুও আণবিক পর্যায়ে এই মিশ্রণ প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে [32]।
দ্বিতীয়ত, লবণাক্ততা গভীরতার সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হলে সেই স্তরকে হ্যালোক্লাইন (Halocline) বলা হয়। এটি কোনো অভেদ্য দেয়াল নয়; এটি একটি salinity gradient বা লবণাক্ততার পরিবর্তনশীল স্তর। NOAA-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মোহনায় নদীর মিষ্টি পানি কম ঘন হওয়ায় অধিক ঘন সমুদ্রের পানির ওপর অবস্থান করতে পারে এবং কখনো শক্ত স্তরবিন্যাস তৈরি করতে পারে। কিন্তু মিশ্রণের পরিমাণ বাতাস, জোয়ার-ভাটা, নদীর প্রবাহ ও মোহনার আকৃতির ওপর নির্ভর করে; কোনো মোহনায় মিশ্রণ কম, আবার কোনো মোহনায় ব্যাপক। এই কারণেই সমুদ্রবিজ্ঞানে salt-wedge, partially mixed এবং vertically mixed estuary-র মতো বিভিন্ন অবস্থা স্বীকৃত। অর্থাৎ দৃশ্যমান স্তর বা সীমারেখা পানির অমিশ্রণ প্রমাণ করে না। [33]
তৃতীয়ত, মোহনার পানির আচরণ ব্যাখ্যা করতে কোনো স্থায়ী বা অভেদ্য বাধার প্রয়োজন হয় না। নদীর প্রবাহ, জোয়ার-ভাটা, বাতাস, ঘনত্বজনিত স্রোত এবং turbulent mixing ক্রমাগত দুই জলরাশির মধ্যে পানি ও দ্রবীভূত লবণ পরিবহন করে। কোনো কোনো মোহনায় স্তরবিন্যাস এত শক্ত হতে পারে যে উপরে অপেক্ষাকৃত মিষ্টি পানি এবং নিচে অধিক লবণাক্ত পানি দীর্ঘ সময় পৃথক স্তরের মতো দেখা যায়; আবার জোয়ার, ঝড় বা প্রবল বাতাস সেই stratification ভেঙে ব্যাপক মিশ্রণ ঘটাতে পারে। অর্থাৎ বাস্তব সমুদ্রবিজ্ঞানের চিত্র হলো স্তরবিন্যাস ও মিশ্রণ একই সঙ্গে চলতে পারে—কোনো অনতিক্রম্য দেয়াল দুই পানিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে না। [34]
.webp)
পরিশেষে, বর্তমান সময়ে ভাইরাল হওয়া জিব্রাল্টার প্রণালী বা আলাস্কা উপসাগরের ভিডিওগুলোতে যে রেখা দেখা যায়, তা মূলত সমুদ্রের বিশাল পলি (Sediment) এবং হিমবাহ থেকে আসা মিষ্টি পানির ক্ষণস্থায়ী পার্থক্যের বহিঃপ্রকাশ। এই রেখাটি স্থির নয় এবং এটি কোনোভাবেই পানির আণবিক বিনিময় রোধ করতে পারে না। সুতরাং, কোরআনে যে ‘অনতিক্রম্য ব্যবধানে’র কথা বলা হয়েছে, তা ছিল প্রাচীন মানুষের স্থূল পর্যবেক্ষণের একটি ভুল ব্যাখ্যা, যা আধুনিক বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে একেবারেই টিকে থাকে না।
সমুদ্রের গতিপথ পর্যবেক্ষণ: নাসা
NASA-র এই visualization-টিকেও সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। এখানে NASA সমুদ্রে ক্ষুদ্র কণা ছেড়ে সেগুলোর স্যাটেলাইট সিগন্যাল অনুসরণ করেনি। এটি ECCO2 নামের MIT/JPL ocean-circulation model-এর output থেকে তৈরি একটি visualization; মডেলটি satellite ও in-situ পর্যবেক্ষণ একত্র করে Mediterranean Sea ও Eastern Atlantic-এর স্রোত প্রদর্শন করে। সাদা flow-গুলো পৃষ্ঠের কাছাকাছি এবং নীল flow-গুলো গভীর স্রোত নির্দেশ করে। ভিডিওটি Mediterranean Sea ও Eastern Atlantic-এর জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত ocean circulation দেখায়। মিষ্টি ও লোনা পানির বাস্তব mixing সরাসরি দেখা যায় মোহনার salinity measurements এবং brackish-water distribution-এ। [35]
উপসংহার
প্রাচীন মানুষ নদী, হ্রদ ও সমুদ্রের পানির ভিন্ন স্বাদ, রঙ, ঘনত্ব এবং প্রবাহের আচরণ বহু আগেই পর্যবেক্ষণ করেছিল। অ্যারিস্টটল মিষ্টি পানিকে হালকা ও লোনা পানিকে ভারী বলেছেন এবং বাষ্পীভবন-ঘনীভবন-বৃষ্টির জলচক্রও ব্যাখ্যা করেছেন; প্লিনি সমুদ্রের ওপর মিষ্টি পানির স্তর ভাসার কথা লিখেছেন; পরবর্তী গ্রিক-রোমান লেখকরাও একই ধরনের জলবৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। কোরআনের পর ধ্রুপদী মুসলিম মুফাসসিরদের একটি দীর্ঘ ধারা আবার ‘বারযাখ’-এর অর্থ করেছে এমন বাধা, যার কারণে দুই পানি “মিশে না”। আজকের সমুদ্রবিজ্ঞান পরিষ্কারভাবে দেখায়, মিষ্টি ও লোনা পানির মধ্যে শক্ত stratification, salt wedge বা halocline থাকতে পারে, কিন্তু এগুলো কোনো অভেদ্য দেয়াল নয়; দুই জলরাশির মধ্যে মিশ্রণ ও ভরবিনিময় বাস্তবেই ঘটে এবং তার ফলেই ব্র্যাকিশ পানি সৃষ্টি হয়। ফলে এই আয়াতকে আধুনিক oceanography-র কোনো অগ্রিম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই। বরং আয়াতটির ধ্রুপদী ব্যাখ্যা সেই প্রাচীন দৃশ্যমান ধারণার সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ—পানি পাশাপাশি আছে, কিন্তু একটিকে অন্যটির সঙ্গে মিশতে দেওয়া হচ্ছে না। পানি অবশ্য শেষ পর্যন্ত ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা মানে না; পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই চলে।
তথ্যসূত্রঃ
- Aristotle, Meteorologica, Book II ↩︎
- Pliny the Elder, Natural History, Book II, §106 ↩︎
- Seneca, Naturales Quaestiones, Book III, §§4–5, 26 ↩︎
- Alexander of Aphrodisias, Quaestiones 3.10, “About the Sea”; R. W. Sharples, Alexander of Aphrodisias: Quaestiones 2.16–3.15 ↩︎
- সূরা ফুরকান, আয়াত ৫৩ ↩︎
- সূরা আর রাহমান, আয়াত ১৯ ↩︎
- সূরা আর রাহমান, আয়াত ২০ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২২৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৫৮৮-৫৮৯ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৩, ৫৬৪ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী: মুজাহিদের বক্তব্যসমূহ ↩︎
- তাফসীরে ইবন আবি হাতিম, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
- তাফসীরুল মা’ছূর: সূরা ফুরকান ২৫:৫৩, মুকাতিল ইবন সুলাইমানের বক্তব্য ↩︎
- তাফসীরুল মা’ছূর: সূরা রাহমান ৫৫:২০, মুকাতিল ইবন সুলাইমানের বক্তব্য ↩︎
- বাহরুল উলূম, সামারকান্দী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
- মাআলিমুত তানযীল, বাগাভী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
- মাফাতীহুল গায়ব, ফখরুদ্দীন রাযী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
- তাবারী ২৫:৫৩ — মুজাহিদের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরুল মা’ছূর — মুকাতিলের বক্তব্য ↩︎
- তাফসীরে ইবন আবি হাতিম ২৫:৫৩ ↩︎
- জামি‘ আল-বায়ান, তাবারী ২৫:৫৩ ↩︎
- বাহরুল উলূম ২৫:৫৩ ↩︎
- মাআলিমুত তানযীল ২৫:৫৩ ↩︎
- মাফাতীহুল গায়ব ২৫:৫৩ ↩︎
- আল-জামি‘ লি আহকামিল কোরআন ২৫:৫৩ ↩︎
- আপনার ব্যবহৃত তাফসীরে ইবন কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৮, পৃ. ২২৭; খণ্ড ১০, পৃ. ৫৮৮–৫৮৯ ↩︎
- আপনার ব্যবহৃত তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ৮, পৃ. ৫৬৩–৫৬৪ ↩︎
- সংশয় ইসলাম আর্কাইভ: মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ২৮৬–২৯০; প্রাসঙ্গিক বক্তব্য পৃষ্ঠা ২৮৮ ↩︎
- ইবন বায: تفسير قول الله تعالى: مرج البحرين يلتقيان ↩︎
- Introduction to Physical Oceanography, Robert H. Stewart, Chapter 13 ↩︎
- NOAA National Ocean Service: Estuaries — Water Circulation and Mixing ↩︎
- NOAA National Ocean Service: Estuarine Circulation ↩︎
- NASA Scientific Visualization Studio: Ocean Current Flows around the Mediterranean Sea for UNESCO ↩︎

