জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

কোরআন অনুসারে মিঠা-লবণাক্ত পানি বা দুই সমুদ্রের পানি মেশে না

প্রকাশিত: এপ্রিল 30, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন52 মিনিট পড়া

ভূমিকা

নদী, হ্রদ ও সমুদ্রের মিলনস্থলে ভিন্ন রঙ, ঘনত্ব ও স্বাদের পানি পাশাপাশি বা স্তরাকারে দেখা যাওয়ার ঘটনা প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের পরিচিত ছিল। বিশেষ করে মিষ্টি পানি লোনা পানির তুলনায় হালকা হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা উপরের স্তরে অবস্থান করতে পারে এবং প্রবল নদীস্রোত সমুদ্রে প্রবেশের পরও কিছু দূর পর্যন্ত নিজস্ব দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। উপর থেকে বা জাহাজ থেকে এমন দৃশ্য দেখলে পানি দুটি আলাদা রয়েছে বলে মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান দেখায়, এই স্তরবিন্যাস কোনো অভেদ্য দেয়াল নয়। লবণাক্ততা ও ঘনত্বের পার্থক্য মিশ্রণের গতি কমাতে বা স্তরবিন্যাস বজায় রাখতে পারে, কিন্তু দুই জলরাশির মধ্যে পানি, লবণ ও ভরবিনিময় ঘটে; জোয়ার-ভাটা, স্রোত, বাতাস ও বিক্ষুব্ধতা এই মিশ্রণকে আরও ত্বরান্বিত করে। মোহনায় তাই মিষ্টি ও লোনা পানির মধ্যবর্তী বিস্তৃত আধা-লবণাক্ত অঞ্চল তৈরি হয়।

মোহনায় যেখানে নদীর মিষ্টি হালকা পানি সমুদ্রের লবণাক্ত ভারী পানির সাথে মিশে যায় সেখানে উভয় ধরনের পানির মিশ্রণ পাওয়া যায়। জোয়ারের সময় খেয়াল করলে দেখবেন, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদীর ভেতরে ঢুকে যায়, আবার ভাটার সময় নেমে যায়। সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এই অঞ্চলে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রাও যেরকম থাকে, আবার থাকে স্বাদু পানি প্রবাহের মাত্রাও। এই বৈচিত্র্যই এই অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ গাছপালার জন্ম দেয়, যা অন্যত্র পাওয়া যায় না। অর্থাৎ সুন্দরবনের নদীতে আপনি লবণাক্ততাও পাবেন, আবার স্বাদু পানি প্রবাহও পাবেন।


প্রাচীন গ্রন্থসমূহে দুই সমুদ্রের পানি পৃথক থাকার ধারণা

কোরআনে বর্ণিত “দুই সমুদ্রের পানি মেশে না” বা তাদের মাঝে “অদৃশ্য দেয়াল” থাকার এই ধারণাটি আসলে ইসলামের নিজস্ব কোনো মৌলিক তথ্য নয়। বরং কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার বহু শত বছর পূর্ব থেকেই গ্রিক ও রোমান লেখকদের রচনায় মিষ্টি ও লোনা পানির ভিন্ন ঘনত্ব, পৃথক স্তর এবং দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রবাহের অনুরূপ পর্যবেক্ষণ ও ধারণা পাওয়া যায়।


অ্যারিস্টটল: মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বের পার্থক্য

কোরআনের বহু শতাব্দী আগে অ্যারিস্টটল মিষ্টি ও লোনা পানির ভৌত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর Meteorologica-এর দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি মিষ্টি পানিকে হালকা এবং লোনা পানিকে ভারী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর আলোচনার মূল প্রেক্ষাপট ছিল সমুদ্রের লবণাক্ততা, বাষ্পীভবন ও জলচক্র; নদীর মোহনায় কোনো অলৌকিক দেয়াল নয়। তাঁর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদে পাওয়া যায়: [1]

“পানযোগ্য মিষ্টি পানি হালকা এবং তা উপরে উঠে যায়; লবণাক্ত পানি ভারী এবং নিচে থেকে যায়।”

অ্যারিস্টটল আরও জানতেন যে সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে উপরে ওঠে, ঠান্ডায় ঘনীভূত হয়ে আবার বৃষ্টি হিসেবে ফিরে আসে। অর্থাৎ মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বের পার্থক্য এবং জলচক্র—দুটিই সপ্তম শতাব্দীর বহু আগের জ্ঞান। তবে এই যুগের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যায় আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের নির্ভুলতা ছিল না; প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক তথ্য হলো, লোনা ও মিষ্টি পানির ভিন্ন আচরণের পর্যবেক্ষণ কোরআনের আগেই লিখিত হয়েছিল।


প্লিনি দ্য এল্ডার: সমুদ্রের ওপর মিষ্টি পানির স্তর

প্রথম শতাব্দীতে প্লিনি দ্য এল্ডার তাঁর Naturalis Historia-তে আরও সরাসরি এমন দৃশ্যের কথা লিখেছেন যা আধুনিক চোখে স্তরবিন্যাস বা ঘনত্বনির্ভর প্রবাহ হিসেবে বোঝা যায়। তিনি সমুদ্রের পৃষ্ঠে মিষ্টি পানির স্তর ভেসে থাকার কথা উল্লেখ করে এর কারণ হিসেবে মিষ্টি পানির তুলনামূলক হালকা হওয়াকে দায়ী করেন। একই আলোচনায় তিনি কয়েকটি নদীর পানি হ্রদের ওপর বহু দূর পর্যন্ত নিজস্ব প্রবাহ বজায় রাখে বলেও উল্লেখ করেন। [2]

“সমুদ্রের পৃষ্ঠে মিষ্টি পানির স্তর ভাসে—নিঃসন্দেহে তা হালকা হওয়ার কারণে; সমুদ্রের পানি অধিক ভারী।”

এই বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোরআনের প্রায় ছয় শতাব্দী আগেই মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বগত পার্থক্য থেকে দৃশ্যমান পৃথক স্তর সৃষ্টি হওয়ার পর্যবেক্ষণ লিখিত ছিল। প্লিনি অবশ্য আধুনিক ব্যাপন, বিক্ষুব্ধ মিশ্রণ কিংবা মোহনার পানি-সঞ্চালন জানতেন না; কিন্তু পানি দুটির দৃশ্যমান স্বাতন্ত্র্য ও মিষ্টি পানির উপরে অবস্থানের ঘটনাটি তাঁর কাছে মোটেই অজানা ছিল না।


সেনেকা: সমুদ্র ও নদীর পানি নিয়ে প্রাচীন ধারণা

প্রথম শতকের রোমান দার্শনিক সেনেকার Naturales Quaestiones-এও নদী ও সমুদ্রের পানি নিয়ে তৎকালীন বিভিন্ন ধারণা সংরক্ষিত হয়েছে। সেনেকা নিজে সব মত সমর্থন করেননি; বরং প্রচলিত প্রাকৃতিক ব্যাখ্যাগুলো আলোচনা করেছেন। তিনি একটি মত উদ্ধৃত করেন, যার মতে সমুদ্র নদীর প্রবাহিত পানি “আত্মসাৎ” করে না; পানি গোপন ভূগর্ভস্থ পথে ফিরে গিয়ে লবণাক্ততা হারিয়ে আবার মিষ্টি পানিতে পরিণত হয়। অন্যত্র আলফিয়ুস-আরেথুসার প্রাচীন কাহিনি আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ভার্জিলের এমন পংক্তিও উদ্ধৃত করেন যেখানে “তিক্ত সমুদ্রের ঢেউ” মিষ্টি প্রবাহের সঙ্গে না-মেশার ধারণা রয়েছে।

এসব বক্তব্য আধুনিক জলবিজ্ঞানের সঠিক বিবরণ নয়; কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার করে—মিষ্টি পানি কীভাবে সমুদ্রের মধ্যে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে, সমুদ্র কেন নদীর পানিতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় না এবং দুই ধরনের পানি কীভাবে পৃথক থাকে—এসব প্রশ্ন ও ধারণা কোরআনের বহু শতাব্দী আগেই ভূমধ্যসাগরীয় জ্ঞানজগতে আলোচিত হচ্ছিল। [3]


আলেকজান্ডার অফ আফ্রোদিসিয়াস: লবণাক্ততা, ঘনত্ব ও অ্যারিস্টটলীয় ব্যাখ্যা

দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের অ্যারিস্টটলীয় ভাষ্যকার আলেকজান্ডার অফ আফ্রোদিসিয়াস সমুদ্র সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে মিষ্টি ও লোনা পানির ভৌত পার্থক্য পুনরায় ব্যাখ্যা করেন। তাঁর Quaestiones-এর “About the Sea” অংশে বলা হয়েছে, পানির সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও মিষ্টি অংশ হালকা ও বিশুদ্ধ হওয়ায় সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে উপরে উঠে যায়, আর ভারী লবণাক্ত অংশ নিচে থেকে যায়। তিনি লবণাক্ত পানির অধিক ঘনত্ব এবং পানিতে মিশ্রিত পদার্থের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন।

অতএব কোরআনের কয়েক শতাব্দী আগেই গ্রিক-রোমান প্রকৃতিবিদ্যার ধারায় মিষ্টি ও লোনা পানির ঘনত্বের পার্থক্য, তাদের পৃথক ভৌত আচরণ এবং দৃশ্যমান স্তরবিন্যাস ব্যাখ্যা করার একটি সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামো ছিল। এই তত্ত্বগুলো আধুনিক ব্যাপন ও সঞ্চালনের ব্যাখ্যা নয়; কিন্তু ভিন্ন পানির ভৌত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্বপরিচিতির স্পষ্ট সাক্ষ্য। [4]


কোরআনের ‘বারযাখ’: মিশ্রণ রোধের ধর্মীয় ব্যাখ্যা

সূরা ফুরকান ২৫:৫৩-এ একটি মিষ্টি-সুপেয় এবং অন্যটি লোনা-খর পানির মধ্যে “বারযাখ” ও “হিজরান মাহজুরা” বা অন্তরায় ও অনতিক্রম্য ব্যবধানের কথা বলা হয়েছে; সূরা আর-রাহমান ৫৫:১৯–২০-এ দুই জলরাশি মিলিত হলেও তাদের মধ্যে বারযাখ রয়েছে এবং তারা “লা ইয়াবগিয়ান”—সীমা অতিক্রম করে না। বাংলা অনুবাদগুলো একে “অনতিক্রম্য ব্যবধান”, “আড়াল” ও “বিভক্তি-প্রাচীর” হিসেবে অনুবাদ করেছে; আর নিচে দেখা যাবে, প্রাচীন মুফাসসিরদের বড় একটি ধারা আরও স্পষ্টভাবে এর অর্থ করেছেন—দুটি পানি পরস্পরের সঙ্গে মিশে না। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান অবশ্য দেখায়, ঘনত্ব ও লবণাক্ততার পার্থক্যে শক্ত স্তরবিন্যাস তৈরি হতে পারে, কিন্তু দুই জলরাশির মধ্যে মিশ্রণ ও ভরবিনিময় বাস্তবেই ঘটে। মোহনার আধা-লবণাক্ত পানিই তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। [5] [6] [7]

তিনিই সমুদ্রকে দু’ ধারায় প্রবাহিত করেছেন- একটি সুপেয় সুস্বাদু আরেকটি লবণাক্ত কটু, উভয়ের মাঝে টেনে দিয়েছেন এক আবরণ- এক অনতিক্রম্য বিভক্তি-প্রাচীর।
— Taisirul Quran
তিনিই দুই সমুদ্রকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন; একটি মিষ্টি, সুপেয় এবং অপরটি লবণাক্ত, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তিনিই দু’টো সাগরকে একসাথে প্রবাহিত করেছেন। একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট এবং তিনি এতদোভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় ও একটি অনতিক্রম্য সীমানা স্থাপন করেছেন।
— Rawai Al-bayan
আর তিনিই দুই সাগরকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট, সুপেয় এবং অন্যটি লোনা, খর; আর তিনি উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সূরা আর-রাহমানের ১৯–২০ আয়াতে দুটি জলরাশির মিলিত হওয়ার কথা বলার পর তাদের মধ্যে এমন একটি অন্তরায় থাকার কথা এসেছে, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে এই ভাষা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। [8]

দু’টি সমুদ্রকে তিনিই প্রবাহিত করেন যারা পরস্পর মিলিত হয়,
— Taisirul Quran
তিনি প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া, যারা পরস্পর মিলিত হয়,
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়।
— Rawai Al-bayan
তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্র যারা পরস্পর মিলিত হয়,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

(কিন্তু তা সত্ত্বেও) উভয়ের মাঝে আছে এক আড়াল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।
— Taisirul Quran
কিন্তু ওদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা ওরা অতিক্রম করতে পারেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক আড়াল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।
— Rawai Al-bayan
কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না [১]
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


তাফসীর গ্রন্থে উল্লিখিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ

আসুন এবারে তাফসীর গ্রন্থ থেকে আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পড়ে দেখি [9] [10] –

আর তিনি উহাদের মাঝে অর্থাৎ লবণাক্ত ও সুমিষ্ট সাগর ও নদী যাত্রার মাঝে আবরন ও মযবুত অন্তরায় সৃষ্টি করিয়াছেন । যেন একটির পানি অপরটির সহিত মিশ্রিত না হইতে পারে। যেমন অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে
“আল্লাহ তা’আলা দুইটি সম্মিলিত সাগরকে প্রবাহিত করিয়াছেন উহাদের মাঝে রহিয়াছে একটি প্রতিবন্ধক, যেন উহারা পরস্পরে তাহাদের স্বীয় সীমা অতিক্রম না করে। অতএব তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করিবে”? (সূরা রাহমান: ১৯-২০)।
আরো ইরশাদ হইয়াছে, – “না কি, সেই মহান সত্তা যিনি যমীনকে আবাসস্থল করিয়াছেন এবং উহার মাঝে নদী নালা সৃষ্টি করিয়াছেন, উহার উপর পাহাড় ও প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন আর দুই সমুদ্রের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করিয়াছেন। বলতো দেখি আল্লাহর সহিত কি অন্য উপাস্য আছে? বরং তাহাদের অধিকাংশই হইল মূর্খ” । (সূরা নামল : ৬১)
…ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন: আয়াতে অর্থ …,। অর্থাৎ প্রবাহিত করিয়াছেন । … এর ব্যাখ্যায় ইব্‌ন যায়দ (র) বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা দুই দরিয়ার মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করিয়া একটির সহিত আরেকটির মিলিত হওয়ার পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছেন । সূরা রাহমান ৫৮৯
দুই সমুদ্র দ্বারা উদ্দেশ্য হইল; মিঠা পানির সমুদ্র ও লবণাক্ত পানির সমুদ্র । এই দুই সমুদ্র পাশাপাশি প্রবহমান হওয়া সত্ত্বেও একটির লবণাক্ত পানি অপরটির মিঠা পানির সহিত মিশিয়া বা মিঠা পানি লবণাক্ত পানির সহিত মিশিয়া একটি অপরটির স্বাদ বিনষ্ট করিতে পারে না। দুইয়ের মধ্যে রহিয়াছে এমন একটি অন্তরাল যাহা কেহই অতিক্রম করিতে পারে না । প্রত্যেকেই আপন আপন সীমানায় প্রবাহিত । সূরা ফুরকানের নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় এই প্রসংগে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে ।
কিন্তু ইব্‌ন জারীর (র) যেই যুক্তি পেশ করিয়াছে উহা সঠিক হইলেও তিনি দুই সমুদ্র এবং যে ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন উহা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এই আয়াতের পরেই আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ অর্থাৎ দুই দরিয়ার মাঝে আল্লাহ্ তা’আলা এমন একটি অন্তরাল ও অনতিক্রম্য ব্যবধান সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহার ফলে একটির পানি অপরটির পানির সহিত মিশিয়া কেহ কাহারো গুণাগুণ নষ্ট করিতে না পারে । কিন্তু আকাশ ও যমীনের মাঝে যেই ব্যবধান রহিয়াছে উহাকে (অন্তরাল) বা …(অনতিক্রম্য ব্যবধান) বলা হয় না। অতএব বাধ্য হইয়াই বলিতে হয় যে, দুই সমুদ্র দ্বারা আকাশ ও যমীনের দুই সমুদ্র নয়- বরং পৃথিবীর সুমিষ্ট ও লোনা পানি যুক্ত দুই পাশাপাশি প্রবহমান দুই সমুদ্র উদ্দেশ্য।

দুই
দুই 1
দুই 3

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে দেখে নেয়া যাক, এই আয়াতটি সম্পর্কে কী বলা আছে, [11] –

→ তিনিই দুই দরিয়াকে প্রবাহিত করিয়াছেন, একটির পানি মিষ্ট, সুপেয় এবং অপরটির পানি লোনা, খর, উভয়ের মধ্যে তিনি রাখিয়া দিয়াছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান ।
→ এবং তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন পানি হইতে; অতঃপর তিনি মানব জাতির মধ্যে রক্তগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছেন। তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান ।
প্রথমে বলা হয়েছে— “তিনিই দুই দরিয়াকে প্রবাহিত করেছেন, একটির পানি মিষ্ট, সুপেয় এবং অপরটির পানি লোনা, খর, উভয়ের মধ্যে তিনি রেখেছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান’। এখানে ‘মারাজ্বাল বাহরাইনি’ বলে বুঝানো হয়েছে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দুই সমুদ্রের সম্মিলিত প্রবহমানতাকে। এরকম সম্মিলনের কারণে দুই সমুদ্রের একাকার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয় না । কারণ পাশাপাশি প্রবাহিত হওয়া সত্ত্বেও দুই সমুদ্রের স্রোতের আপনাপন বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখাই আল্লাহ্তায়ালার অভিপ্রায়। আর তাঁর চিরঅমুখাপেক্ষী অভিপ্রায়ের ব্যত্যয় কদাচ ঘটে না।

দুই 5

ইবন কাসীরের মূল আরবি পাঠে স্থলভাগের ব্যাখ্যা

উপরে উদ্ধৃত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা তাফসীরে ইবন কাসীর-এর বক্তব্য এবং তার মুদ্রিত পাতার স্ক্রিনশটের পাশাপাশি ইবন কাসীরের মূল আরবি তাফসীরের একটি নির্দিষ্ট পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সূরা ফুরকান ২৫:৫৩-এর ব্যাখ্যায় আরবি গ্রন্থে তিনি “বারযাখ” বলতে পৃথিবীর শুষ্ক স্থলভাগ বোঝানোর কথা বলেছেন; সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০-এর ব্যাখ্যাতেও স্থলভাগের বাধার কথা এসেছে। বাংলা বইয়ের সংরক্ষিত বক্তব্যের পাশাপাশি মূল আরবি পাঠে স্থলভাগের এই ব্যাখ্যাও বিদ্যমান। একই নামে প্রচলিত অনুবাদ-সংস্করণ ও মূল পাঠকে তুলনা না করে কোনো একটিকে অন্যটির হুবহু প্রতিরূপ ধরে নেওয়া যায় না। [12] [13]

﴿وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا وَحِجْرًا﴾ أَيْ: بَيْنَ الْعَذْبِ وَالْمَالِحِ ﴿بَرْزَخًا﴾ أَيْ: حَاجِزًا، وَهُوَ اليَبَس مِنَ الْأَرْضِ

বাংলা অনুবাদ: “তিনি তাদের মধ্যে বারযাখ ও অন্তরায় রেখেছেন”—অর্থাৎ মিষ্টি ও লোনা পানির মাঝখানে বারযাখ বা বাধা; আর সেটি পৃথিবীর শুষ্ক স্থলভাগ।

এই আরবি পাঠের সমস্যা বৈজ্ঞানিক মিশ্রণের প্রশ্নের চেয়ে কিছুটা আলাদা। স্থলভাগের বাধার অস্তিত্ব নিজে কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়: অনেক নদী ও জলাশয়ের পথ ভূমি দ্বারা আলাদা থাকে, আবার নদী যেখানে সমুদ্রে এসে পড়ে সেখানে দুই পানির সংযোগ এবং মিশ্রণ বাস্তবেই ঘটে। ইবন কাসীরের স্থলভাগ-ব্যাখ্যা দিয়ে মোহনায় একটি অদৃশ্য, অভেদ্য মিশ্রণ-প্রতিরোধী পর্দার বৈজ্ঞানিক অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। উল্টোদিকে বাংলা উদ্ধৃতিতে থাকা মিশ্রণ-রোধের বক্তব্যকে তাঁর মূল আরবি রচনার একটি বাক্য হিসেবে উপস্থাপন করাও ঠিক নয়। এই পার্থক্যটি প্রাচীন ব্যাখ্যাধারার ভেতরে থাকা বিভিন্ন রূপই প্রকাশ করে।


প্রাচীন তাফসীরসমূহে ‘বারযাখ’: মিশ্রণ রোধকারী অন্তরায়

কোরআনের “বারযাখ” বা দুই ধরনের পানির মধ্যবর্তী অন্তরায়কে আধুনিক কালে অনেকেই হ্যালোক্লাইন, লবণাক্ততার ঢাল বা সাময়িক ট্রানজিশন জোন হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রাচীন ও ধ্রুপদী তাফসীরগুলো পড়লে দেখা যায়, মুফাসসিরদের একটি বড় অংশ বিষয়টিকে এভাবে বোঝেননি। তাদের ভাষায় বারবার এসেছে, দুটি পানি মিলিত হলেও একটির সঙ্গে অন্যটি “মিশে যায় না”, আল্লাহ তাদের মাঝে এমন এক অদৃশ্য বাধা সৃষ্টি করেছেন যা এক পানিকে অন্যটির সঙ্গে মিশতে দেয় না, কিংবা একটির স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য অন্যটির দ্বারা নষ্ট হতে দেয় না। এই ব্যাখ্যা কোনো আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়; বরং ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দীর তাফসীর-ঐতিহ্যের মধ্যেই স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত। [14]

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বক্তব্যগুলোর একটি মুজাহিদ ইবন জাবরের নামে সংরক্ষিত। তাবারী তাঁর সূত্রে লিখেছেন, “لا يختلط البحر بالعذب”—“সমুদ্রের লোনা পানি মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশে যায় না।” আরেক বর্ণনায় মুজাহিদ বলেন, “حاجزًا لا يراه أحد، لا يختلط العذب في البحر”—“এমন একটি বাধা যা কেউ দেখতে পায় না; মিষ্টি পানি সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশে যায় না।” আরও সরাসরি আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, “البرزخ أنهما يلتقيان فلا يختلطان”—“বারযাখ হলো এমন অবস্থা যেখানে দুটি পানি মিলিত হয়, কিন্তু মিশে যায় না।” [15] মুজাহিদের একই ব্যাখ্যা ইবন আবি হাতিমের তাফসীরুল কোরআনিল আযীম-এও সংরক্ষিত; সেখানে প্রথমে শব্দের অর্থ ও পরে পানির প্রতিবন্ধক সম্পর্কে তাঁর বর্ণনাগুলো আলাদাভাবে এসেছে। একই বক্তার বক্তব্য একাধিক গ্রন্থে পুনরাবৃত্তি হওয়া অবশ্য একাধিক স্বাধীন প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ নয়। [16]

قال: الْبَرْزَخُ أَنَّهُمَا يَلْتَقِيَانِ فَلَا يَخْتَلِطَانِ، وَقَوْلُهُ ﴿حِجْرًا مَحْجُورًا﴾: أَيْ لَا تَخْتَلِطُ مُلُوحَةُ هَذَا بِعُذُوبَةِ هَذَا، لَا يَبْغِي أَحَدُهُمَا عَلَى الْآخَرِ.

বাংলা অনুবাদ: মুজাহিদের সূত্রে বলা হয়েছে: বারযাখের অর্থ, দুটি জলরাশি পরস্পর মিলিত হয় কিন্তু মিশ্রিত হয় না। “অনতিক্রম্য নিষেধ” বলতে বোঝানো হয়েছে, এক জলরাশির লবণাক্ততা অন্যটির মিষ্টতার সঙ্গে মিশে যায় না; কোনোটি অন্যটির ওপর সীমালঙ্ঘন করে না।

তাবারীর সংকলনে বিষয়টি একটি একক বিচ্ছিন্ন বাক্য নয়। মুজাহিদের নামে সংরক্ষিত বিভিন্ন বর্ণনায় প্রথমে “মারাজাল বাহরাইন”-এর অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে—এক জলরাশিকে অন্যটির দিকে প্রবাহিত করা। এরপর “বারযাখ”-এর অর্থ এসেছে বাধা বা আটকানোর ব্যবস্থা; শেষ পর্যায়ে “হিজরান মাহজুরা”-কে লবণাক্ত ও মিষ্টি পানির পরস্পর মিশ্রিত হতে না-পারার বিধান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই তিনটি অংশ একত্রে পড়লে বক্তব্যের নির্দিষ্ট প্রকৃতি পরিষ্কার হয়: পানি দুটি একে অপরের কাছে আসে, কিন্তু মিলনস্থলে একটির লবণাক্ততা অন্যটির মিষ্টতার সঙ্গে মিশতে পারে না। কোনো প্রবাহের উপরিভাগ ও নিম্নভাগে ঘনত্বের সাময়িক পার্থক্যকে এখানে অন্তরায় বলা হয়নি; বাস্তব মিশ্রণ অস্বীকার করা হয়েছে।

মুজাহিদের নামে তাবারীর আরও বর্ণনায় বাধাটিকে চোখে না-দেখা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অদৃশ্যতার দাবি সমস্যাটিকে আরও সরাসরি পরীক্ষাযোগ্য করে: চোখে না দেখা গেলেও যদি কোনো বাস্তব প্রতিবন্ধক দুটি তরলের পারস্পরিক মিশ্রণ রোধ করে, তবে সংযোগস্থলে এক জলরাশি থেকে অন্য জলরাশিতে লবণ পরিবাহিত হওয়ার কথা নয়। নদীর মোহনায় পরিমাপ করলে ঠিক বিপরীত ফল পাওয়া যায়। স্রোতের দিক, প্রবাহের বেগ, গভীরতা ও জোয়ারের অবস্থান অনুযায়ী লবণাক্ততার ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে মুজাহিদের এই ব্যাখ্যাটি একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ঘটনার ভুল বর্ণনা; কেবল ধর্মীয় বা অলঙ্কারমূলক বাক্য বলে এর পরীক্ষাযোগ্য অংশ অদৃশ্য হয়ে যায় না।

ইবন আবি হাতিমের সংকলনেও মুজাহিদের অদৃশ্য বাধার বিবরণ বিশেষভাবে স্পষ্ট। এটি মুজাহিদের নামে প্রচলিত একই ব্যাখ্যার পৃথক সংকলন, সমুদ্র সম্পর্কে স্বাধীন কোনো নতুন পরীক্ষা নয়। ইবন আবি হাতিম প্রথমে মুজাহিদের নামে “মারাজা” শব্দের অর্থ এক জলরাশিকে অন্যটির দিকে প্রবাহিত করা বলেছেন; পরে “বারযাখ” ব্যাখ্যায় এমন বাধার কথা সংরক্ষণ করেছেন, যা চোখে দেখা যায় না এবং মিষ্টি পানি সমুদ্রে মিশতে দেয় না। অর্থাৎ একই ব্যাখ্যাধারার মধ্যে সংযোগ ও অমিশ্রণ উভয় দাবিই পাশাপাশি উপস্থিত। [17]

عَنْ مُجَاهِدٍ: ﴿بَرْزَخًا﴾ حَاجِزًا لَا يَرَاهُ أَحَدٌ، لَا يَخْتَلِطُ الْعَذْبُ بِالْبَحْرِ، وَلَا يَخْتَلِطُ بَحْرُ الرُّومِ وَفَارِسَ، وَبَحْرُ الرُّومِ مِلْحٌ.

বাংলা অনুবাদ: মুজাহিদের নামে বর্ণিত: “বারযাখ” হলো এমন এক প্রতিবন্ধক যা কেউ দেখতে পায় না; মিষ্টি পানি সমুদ্রের পানির সঙ্গে মেশে না, এবং রোমের সমুদ্র ও পারস্যের সমুদ্রও পরস্পর মেশে না; রোমের সমুদ্র লোনা।

আরও প্রাচীন মুফাসসির মুকাতিল ইবন সুলাইমানের বক্তব্যও একই অর্থ বহন করে। তাঁর ব্যাখ্যায় “حجابًا محجوبًا فلا يختلطان”—অর্থাৎ তাদের মধ্যে এমন এক আড়াল বা পর্দা রয়েছে যার ফলে দুটি পানি পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় না। সূরা রাহমানের ব্যাখ্যায়ও তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় একটিকে অন্যটি থেকে আটকে রেখেছেন—“فلا يختلطان، ولا يتغير طعمهما”—“তারা মিশে যায় না এবং তাদের স্বাদও পরিবর্তিত হয় না।” [18] [19]

﴿بَيْنَهُما بَرْزَخٌ﴾ يَعْنِي: حَاجِزًا، حَجَزَ اللَّهُ أَحَدَهُمَا عَنِ الْآخَرِ بِقُدْرَتِهِ، ﴿لَا يَبْغِيَانِ﴾ يَعْنِي: لَا يَبْغِي أَحَدُهُمَا عَلَى الْآخَرِ، فَلَا يَخْتَلِطَانِ، وَلَا يَتَغَيَّرُ طَعْمُهُمَا.

বাংলা অনুবাদ: মুকাতিল বলেন, “তাদের মাঝখানে বারযাখ”—অর্থাৎ এমন অন্তরায়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় একটি জলরাশিকে অন্যটি থেকে আটকেছেন। “তারা সীমালঙ্ঘন করে না” অর্থ, একটি অন্যটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে না; ফলে দুটি পানি মিশে যায় না এবং তাদের স্বাদও পরিবর্তিত হয় না।

মুকাতিলের ব্যাখ্যায় দুটি দাবি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, পানি দুটি মিশে যায় না—এটি মিশ্রণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে দাবি। দ্বিতীয়ত, তাদের স্বাদও পরিবর্তিত হয় না—এটি মিশ্রণের দৃশ্যমান বা স্বাদগ্রাহ্য ফলাফল সম্পর্কে দাবি। প্রথম দাবিটি ভুল হলে দ্বিতীয় দাবিকে সীমিত অর্থে সত্য দেখিয়ে পুরো ব্যাখ্যা বাঁচানো যায় না। কোনো নদীর বহু দূরের উজানের পানি মিষ্টি অবস্থায় থেকে যাওয়া আর সমুদ্রে তার প্রবেশস্থলে একেবারেই না-মেশা দুটি স্বতন্ত্র ঘটনা। একইভাবে সমুদ্রের বিপুল জলরাশি লবণাক্ত থেকে যাওয়ার অর্থও এই নয় যে, সমুদ্রে নদীর পানি মেশেনি। একটি বৃহৎ জলরাশির গড় বৈশিষ্ট্য বজায় থেকেও স্থানীয় অঞ্চলে ব্যাপক মিশ্রণ ঘটতে পারে।

মুকাতিলের বক্তব্যে এই বাধা প্রাকৃতিক ঘনত্বের স্বাভাবিক ফল হিসেবে চিহ্নিত হয়নি; তিনি এটিকে আল্লাহর ক্ষমতায় এক জলরাশিকে অন্যটি থেকে আটকানোর ঘটনা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুসারে পানি দুটি পাশাপাশি অবস্থান করলেও একটির অংশ অন্যটির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। অথচ বাস্তবে মিষ্টি পানি সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে, সমুদ্রের লবণ নদীর মোহনার বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে এবং উভয়ের সংমিশ্রণে নতুন লবণাক্ততার পানি তৈরি হয়। এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর কোনোটি মুকাতিলের কঠোর অমিশ্রণ-বর্ণনার সঙ্গে খাপ খায় না। তাঁর ব্যাখ্যাটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোরআনের আয়াত থেকে মিশ্রণ নিষিদ্ধ থাকার পাঠ অত্যন্ত প্রাথমিক যুগেই প্রচলিত হয়েছিল।

চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর আবুল লায়স আস-সামারকান্দী তাঁর বাহরুল উলূম-এ আরও নির্দিষ্ট ভাষায় বলেছেন, আল্লাহ মিষ্টি পানিকে লোনা হতে এবং লোনা পানিকে মিষ্টি হতে নিষিদ্ধ করেছেন, এবং “وحرم على كل واحد منهما أن يختلط بصاحبه”—“প্রত্যেকটির জন্য অন্যটির সঙ্গে মিশে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন।” অর্থাৎ এখানে বক্তব্যটি শুধু স্বাদ অক্ষুণ্ণ থাকার নয়; সরাসরি পারস্পরিক মিশ্রণ নিষিদ্ধ থাকার ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। [20] [21]

وَحِجْرًا مَحْجُورًا أَيْ حُرِّمَ عَلَى الْعَذْبِ أَنْ يَمْلُحَ، وَحُرِّمَ عَلَى الْمَالِحِ أَنْ يَعْذُبَ، وَحُرِّمَ عَلَى كُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا أَنْ يَخْتَلِطَ بِصَاحِبِهِ، وَأَنْ يُغَيِّرَ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا طَعْمَ صَاحِبِهِ.

বাংলা অনুবাদ: সামারকান্দীর ব্যাখ্যায় “অনতিক্রম্য নিষেধ” অর্থ, মিষ্টি পানি যেন লোনা হয়ে না যায়, লোনা পানি যেন মিষ্টি হয়ে না যায়, কোনোটি যেন অপরটির সঙ্গে মিশতে না পারে এবং এক পানির স্বাদ অন্য পানি যেন পরিবর্তন করতে না পারে—এই নিষেধাজ্ঞা তাদের ওপর কার্যকর।

সামারকান্দী একই বাক্যের পরবর্তী অংশে এক পানির দ্বারা অন্য পানির স্বাদ পরিবর্তিত হওয়ার ওপরও নিষেধের কথা বলেছেন। সুতরাং তাঁর ব্যাখ্যায় মিশতে না পারা এবং স্বাদ পরিবর্তিত না হওয়া একই ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থার দুটি ফল। এখানে “হারাম” বা নিষিদ্ধ করার ভাষাটি মানুষের নৈতিক আচরণের বিধান নয়; পানির ওপর আরোপিত এক ধরনের অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক বিধান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বক্তব্যের সরাসরি পরীক্ষাযোগ্য রূপ হলো—মিষ্টি ও লোনা পানির পরস্পর সংস্পর্শে মিশ্রণ ঘটবে না এবং তাদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও পরস্পরের প্রভাবে বদলাবে না।

বাস্তব পানিতে এই দুই দাবিই ভ্রান্ত। সমুদ্রের পানিতে মিশে যাওয়া নদীর জলরাশি তার আগের মিষ্টতা বজায় রাখে না; আবার নদীর মিষ্টি পানির সংস্পর্শে সমুদ্রের পানি স্থানীয়ভাবে লবণাক্ততা হারায়। অনেক মোহনায় উপরের পানির লবণাক্ততা কম এবং নিচের পানির বেশি—এই পার্থক্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কোনো একটি নমুনায় লবণাক্ততার মধ্যবর্তী মান পাওয়া যাওয়াই দেখায়, দুই প্রান্তের বৈশিষ্ট্য একে অন্যকে প্রভাবিত করেছে। সামারকান্দীর বক্তব্যের শক্তি হলো এর স্পষ্টতা; একই স্পষ্টতার কারণেই তা বিজ্ঞানের পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হয়।

ইমাম বাগাভীর মাআলিমুত তানযীল-এ ভাষাটি আরও দ্ব্যর্থহীন: “حاجزًا بقدرته لئلا يختلط العذب بالملح ولا الملح بالعذب”—“নিজ ক্ষমতায় তিনি তাদের মধ্যে একটি বাধা সৃষ্টি করেছেন, যাতে মিষ্টি পানি লোনা পানির সঙ্গে এবং লোনা পানি মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশে না যায়।” [22]

﴿وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا﴾ أَيْ: حَاجِزًا بِقُدْرَتِهِ لِئَلَّا يَخْتَلِطَ الْعَذْبُ بِالْمِلْحِ وَلَا الْمِلْحُ بِالْعَذْبِ، ﴿وَحِجْرًا مَحْجُورًا﴾ أَيْ: سِتْرًا مَمْنُوعًا فَلَا يَبْغِيَانِ.

বাংলা অনুবাদ: “তিনি তাদের মাঝে বারযাখ স্থাপন করেছেন”—অর্থাৎ আল্লাহ নিজের ক্ষমতায় এমন অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন, যাতে মিষ্টি পানি লোনা পানির সঙ্গে এবং লোনা পানি মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশতে না পারে। “অনতিক্রম্য নিষেধ” বলতে এমন এক প্রতিবন্ধক বোঝানো হয়েছে, যার ফলে তারা একে অপরকে অতিক্রম করতে পারে না।

বাগাভীর মূল আলোচনায় প্রথমেই “মারাজা” শব্দের অর্থ হিসেবে মিশ্রিত করা এবং একটি জলরাশিকে অন্যটিতে প্রবাহিত করার অর্থ আলোচনা করা হয়েছে। এই কথাটিই তাঁর পরবর্তী ব্যাখ্যাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে। তিনি প্রথমে জলরাশি দুটি একে অপরের দিকে প্রবাহিত হওয়ার কথা মেনে নিচ্ছেন, কিন্তু পরেই এমন একটি ঈশ্বরীয় বাধার কথা বলছেন যার কারণে মিষ্টি পানি লোনার সঙ্গে এবং লোনা পানি মিষ্টির সঙ্গে মিশতে পারে না। অর্থাৎ সংযোগ আছে, কিন্তু মিশ্রণ নেই—এই আপাতবিরোধকে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার ফল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি প্রকৃতিতে কী ঘটে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দাবি; কোনো মৌসুমি স্তরবিন্যাসের নিরপেক্ষ বর্ণনা নয়।

উদ্ধৃতির পর বাগাভী আরও বলেছেন, লোনা পানি মিষ্টি পানিকে নষ্ট করতে পারে না। কিন্তু এক জলরাশি অন্যটির স্বাদ একেবারে নষ্ট করতে না-পারা এবং তাদের কোনো অংশই মিশ্রিত না-হওয়া এক বিষয় নয়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের বিপুল মিষ্টি প্রবাহ সমুদ্রে পড়লেও গোটা বঙ্গোপসাগর মিষ্টি হয়ে যায় না; তাতে মিশ্রণ বন্ধ থাকার কোনো প্রমাণ নেই। মিশ্রণের পরিমাণ ও লবণাক্ততা পানির পরিমাণ, জোয়ার ও প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। বাগাভীর ব্যাখ্যা তাই একটি ভুল ভৌত ব্যাখ্যাকে আল্লাহর ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করেছে; ধর্মীয় কারণ আরোপ করলে ওই ভৌত দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

কুরতুবীর আল-জামি‘ লি আহকামিল কোরআন-এ একই বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি “বারযাখ”-কে আল্লাহর ক্ষমতায় সৃষ্ট বাধা এবং “হিজরান মাহজুরা”-কে এমন এক প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন “يمنع أحدهما من الاختلاط بالآخر”—“যা একটিকে অন্যটির সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়।” [23]

﴿وَحِجْرًا مَحْجُورًا﴾ أَيْ سِتْرًا مَسْتُورًا يَمْنَعُ أَحَدَهُمَا مِنَ الِاخْتِلَاطِ بِالْآخَرِ، فَالْبَرْزَخُ الْحَاجِزُ وَالْحِجْرُ الْمَانِعُ.

বাংলা অনুবাদ: “অনতিক্রম্য নিষেধ”—অর্থাৎ এমন আড়াল বা পর্দা, যা এক জলরাশিকে অপর জলরাশির সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়। ফলে “বারযাখ” হলো অন্তরায় আর “হিজর” হলো নিষেধ বা প্রতিরোধকারী ব্যবস্থা।

কুরতুবীর আলোচনার শুরুতে “মারাজা”-এর একাধিক আরবি অর্থ রয়েছে—ছেড়ে দেওয়া, মিশ্রিত করা, প্রবাহিত করা। তিনি মুজাহিদের নামে এক জলরাশি অন্যটিতে প্রবেশ করার বর্ণনাও দিয়েছেন। এই পটভূমিতে কুরতুবীর “বারযাখ” ব্যাখ্যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বাক্য অনুযায়ী, একটি ক্ষমতাগত বাধা এক জলরাশিকে অন্যটির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেয় না; “হিজরান মাহজুরা” ব্যাখ্যায় সরাসরি মিশ্রণ প্রতিরোধের কথা এসেছে। অর্থাৎ পানির দুটি দৃশ্যমান প্রবাহ সম্পর্কে কেবল বিস্ময় প্রকাশ করা হয়নি, সেগুলো কেন ভিন্ন থাকে তার কারণও নির্ধারণ করা হয়েছে: এক ধরনের ঐশ্বরিক নিষেধাজ্ঞা।

কুরতুবী একই তাফসীরে অন্যদের নামে আকাশের সমুদ্র ও পৃথিবীর সমুদ্রের কথাও উল্লেখ করেছেন; তাঁর গ্রন্থে একাধিক ব্যাখ্যার উপস্থিতি ঐতিহাসিক তথ্য। কিন্তু মিষ্টি-লোনা পানির বিষয়ে এখানে উদ্ধৃত নির্দিষ্ট বক্তব্যের অর্থ একেবারেই পরিষ্কার। একটি জলরাশি অন্যটির সঙ্গে মিশতে না-পারা এই ব্যাখ্যার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান মোহনার লবণাক্ততার মানচিত্র, স্রোত এবং দুই জলের বিনিময়ের পরিমাণ নির্ণয় করে; এসব তথ্য কুরতুবীর ওই অমিশ্রণ-দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কোনো পদার্থবৈজ্ঞানিক বাধা থাকলে তার কার্যকারিতা পরিমাপে ধরা পড়ার কথা; বাস্তব পরিমাপ বরং নিরবচ্ছিন্ন বিনিময় দেখায়।

ফখরুদ্দীন রাযীর ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, “وأنه سبحانه بقدرته يفصل بينهما ويمنعهما التمازج”—“আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় দুটিকে পৃথক করেন এবং তাদের পারস্পরিক মিশ্রণ প্রতিরোধ করেন।” একই আলোচনায় সূরা রাহমানের “لا يبغيان” বাক্যের অর্থ হিসেবে একটি জলরাশির অন্যটির ওপর মিশ্রণের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন না-করার কথা বলেছেন। এরপর তাঁর প্রশ্নোত্তরের শেষ অংশে স্থলভাগকে বারযাখ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। পুরো আলোচনা একত্রে না পড়লে তাঁর চূড়ান্ত অবস্থান বিকৃত হয়। [24]

وَأَنَّهُ سُبْحَانَهُ بِقُدْرَتِهِ يَفْصِلُ بَيْنَهُمَا وَيَمْنَعُهُمَا التَّمَازُجَ، وَجَعَلَ مِنْ عَظِيمِ اقْتِدَارِهِ بَرْزَخًا حَائِلًا مِنْ قُدْرَتِهِ.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ নিজের ক্ষমতায় জলরাশি দুটিকে আলাদা রাখেন এবং তাদের পরস্পরের সঙ্গে মিশ্রণ প্রতিরোধ করেন; তাঁর ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে তাদের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধক স্থাপন করেছেন।

রাযী এখানেই আলোচনা শেষ করেননি। তিনি একটি প্রশ্ন তুলেছেন: পৃথিবীতে মিষ্টি পানির আলাদা “সমুদ্র” কোথায়? এর সম্ভাব্য উত্তরে নীলনদসহ বড় নদীগুলোর কথা এবং একই সমুদ্রের কোনো একটি অংশ মিষ্টি, অন্য অংশ লোনা হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছেন। প্রথমটির ক্ষেত্রে তিনি প্রশ্ন করেছেন, নদী আর সমুদ্রের আলাদা পানিকে পাশাপাশি রেখে ব্যতিক্রম দেখানোর তাৎপর্য কোথায়; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বলেছেন, প্রমাণহীন সম্ভাবনার ওপর ঈশ্বরের নিদর্শনের যুক্তি দাঁড়ায় না। তাঁর শেষে দেওয়া ব্যাখ্যায় মিষ্টি পানির নদী ও লোনা সমুদ্রের মাঝে স্থলভাগকে প্রতিবন্ধক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে রাযীর তাফসীরের প্রথম অংশ থেকে শুধু “মিশ্রণ প্রতিরোধ” বাক্য উদ্ধৃত করে তাঁকে সর্বাবস্থায় অদৃশ্য অমিশ্রণ-দেয়ালের সমর্থক হিসেবে দেখানো সঠিক হবে না।

এই দীর্ঘ আলোচনা থেকেই মূল সমস্যা আরও পরিষ্কার হয়। রাযীর মতো বিশ্লেষণপ্রবণ মুফাসসিরকে একই আয়াতের জন্য কখনো ঐশ্বরিক মিশ্রণ-নিষেধ, কখনো নদী ও সমুদ্রের মধ্যে স্থলভাগের মতো ভিন্ন ব্যাখ্যা বিবেচনা করতে হয়েছে। স্থলভাগ নদী ও সমুদ্রের মাঝে কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে; কিন্তু যে নদী বাস্তবে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে, তার মোহনায় দুই পানির মিশ্রণ অস্বীকার করা যায় না। আবার স্থলভাগকে যদি বারযাখের অর্থ ধরা হয়, সেখানে কোরআন আধুনিক সমুদ্রের অদৃশ্য মিশ্রণ-সীমার বৈজ্ঞানিক কথা আগাম জানিয়েছিল—এই দাবির ভিত্তিও থাকে না। অর্থাৎ প্রাচীন তাফসীরের এই ব্যাখ্যাগত বিচ্যুতিই পরবর্তী বিজ্ঞান-দাবির অনিশ্চিত ভিত্তি প্রকাশ করে।

এখানে তাবারীর নিজস্ব নির্বাচিত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাবারী مرج শব্দের মূল অর্থ “মিশ্রিত করা” ধরে বলেন যে দুটি পানি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বা মিশ্র অবস্থায় থাকলেও আল্লাহ লোনা পানিকে মিষ্টি পানির স্বাদ নষ্ট করতে দেন না। তাঁর ভাষায়, এই বাধা কার্যকর থাকে “مع اختلاط كل واحد منهما بصاحبه”—একটির সঙ্গে অন্যটির মিশ্রতা থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু এটিও আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের মিশ্রণ ও লবণাক্ততার পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের বিবরণ নয়; তাবারীর কেন্দ্রীয় দাবি হলো, ঐশ্বরিক বাধা একটির বৈশিষ্ট্যকে অন্যটির দ্বারা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। একই তাফসীরে সংরক্ষিত মুজাহিদের ব্যাখ্যা আবার সরাসরি “মিলিত হয় কিন্তু মিশে না” বলেছে। ফলে প্রাচীন তাফসীরের ভেতরে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও আধুনিক “কোরআন আসলে estuarine mixing বা লবণাক্ততার স্তরবিন্যাসের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দিয়েছিল” ধারণাটি সেখানে পাওয়া যায় না। নিচে প্রধান তাফসীরগুলোর বক্তব্য একসঙ্গে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়:

তাবারীর জামি‘ আল-বায়ান-এর আলোচনায় একই আয়াতে ব্যাখ্যার একাধিক ধারার পাশাপাশি অবস্থান বিশেষভাবে স্পষ্ট। তাঁর সংকলিত ইবন আব্বাসের একটি বর্ণনায় স্থলভাগকে প্রতিবন্ধক বলা হয়েছে; মুজাহিদের বর্ণনায় মিশ্রণরোধী অদৃশ্য বাধা; হাসান বসরীর বর্ণনায় শুষ্ক ভূমি; আর ইবন যায়দের বর্ণনায় দুটি জলরাশির মিলনই বন্ধ থাকার কথা এসেছে। এত ভিন্ন ব্যাখ্যার পর তাবারী নিজের সিদ্ধান্তে স্থলভাগকে একমাত্র প্রতিবন্ধক মানতে অস্বীকার করেছেন, কারণ তাঁর কাছে “মারাজা” শব্দে বাস্তব মিশ্রণের অর্থ উপস্থিত। তিনি তাই মিশ্রণ ঘটলেও একটির দ্বারা অন্যটির উপযোগিতা বিনষ্ট না হওয়ার কথা বলেছেন। এই সিদ্ধান্ত মুজাহিদের অমিশ্রণ-বক্তব্যের অনুরূপ নয়; ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরে পানির বাস্তব আচরণ নিয়ে একাধিক পরস্পর-অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা থাকারই সাক্ষ্য। [25]

তাবারীর এই বক্তব্য দুই কারণে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, প্রাথমিক মুফাসসিররা এক কণ্ঠে পানির অমিশ্রণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন—এমন দাবি করা যায় না। দ্বিতীয়ত, মিশ্রণ মেনে নেওয়া মানেই যে তাঁরা আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের ব্যাপন, জোয়ারজনিত লবণপ্রবেশ বা পরিমাপযোগ্য লবণাক্ততার ঢালের বিষয়ে জানতেন, তাও নয়। তাবারী পানি মেশার পরও কেন নির্দিষ্ট জলরাশির ব্যবহারযোগ্য স্বাদ নষ্ট হয় না—সেই প্রশ্নে অতিপ্রাকৃত নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ কোনো সমুদ্রবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ-প্রতিবেদন নয়। আর মুজাহিদ, বাগাভী, সামারকান্দী ও কুরতুবীর নির্দিষ্ট অমিশ্রণ-দাবি বিজ্ঞানের পরীক্ষায় মিথ্যা। তাবারীর তুলনামূলক ভিন্ন অবস্থান সেই অমিশ্রণ-দাবিগুলোর ভুল দূর করে না; বরং আয়াত থেকে একক, নির্দিষ্ট ও আগাম বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া গেছে—এমন দাবির ভিত্তিই দুর্বল করে।

মুফাসসির / উৎসসময়মূল বক্তব্যঅর্থ ও তাৎপর্যরেফারেন্স
মুজাহিদ ইবন জাবরমৃত্যু ১০৪ হি.«يلتقيان فلا يختلطان»দুটি পানি মিলিত হয়, কিন্তু মিশে যায় না; অন্য বর্ণনায় অদৃশ্য বাধার কথাও আছে[26]
মুকাতিল ইবন সুলাইমানমৃত্যু ১৫০ হি.«فلا يختلطان، ولا يتغير طعمهما»তারা মিশে যায় না এবং একটির স্বাদ অন্যটির দ্বারা পরিবর্তিত হয় না[27]
ইবন আবি হাতিমমৃত্যু ৩২৭ হি.«حاجزًا لا يراه أحد، لا يختلط العذب بالبحر»অদৃশ্য বাধা মিষ্টি ও লোনা পানিকে মিশতে দেয় না[28]
ইমাম তাবারীমৃত্যু ৩১০ হি.মুজাহিদের “মিশে না” মত সংরক্ষণ; নিজের নির্বাচিত ব্যাখ্যায় স্বাদ নষ্ট না হওয়ার ওপর জোরপ্রাথমিক তাফসীরেই একাধিক ব্যাখ্যা ছিল; কিন্তু “বারযাখ”কে ঐশ্বরিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবেই দেখা হয়েছে[29]
আবুল লায়স সামারকান্দীমৃত্যু ৩৭৩ হি.«حرم على كل واحد منهما أن يختلط بصاحبه»প্রত্যেক পানির জন্য অন্যটির সঙ্গে মিশে যাওয়া নিষিদ্ধ[30]
ইমাম বাগাভীমৃত্যু ৫১৬ হি.«لئلا يختلط العذب بالملح ولا الملح بالعذب»মিষ্টি ও লোনা পানি যাতে পরস্পরের সঙ্গে মিশতে না পারে, সেই জন্য বাধা[31]
ফখরুদ্দীন রাযীমৃত্যু ৬০৬ হি.«يفصل بينهما ويمنعهما التمازج»প্রথমে পারস্পরিক মিশ্রণ প্রতিরোধের কথা বলেন; পরে প্রশ্নোত্তরের শেষে স্থলভাগকে প্রতিবন্ধক হিসেবে গ্রহণ করেন[32]
ইমাম কুরতুবীমৃত্যু ৬৭১ হি.«يمنع أحدهما من الاختلاط بالآخر»বাধাটি এক পানিকে অন্য পানির সঙ্গে মিশতে দেয় না[33]
ইবন কাসীরমৃত্যু ৭৭৪ হি.বাংলা বইয়ের উদ্ধৃতিতে স্বাদ ও মিশ্রণ-রোধের বক্তব্য; মূল আরবিতে বারযাখ বলতে স্থলভাগউপরের বাংলা উদ্ধৃতি ও স্ক্রিনশট সংরক্ষিত; আরবি পাঠ পৃথক পরিচ্ছেদে উদ্ধৃত[34]
তাফসীরে মাযহারী১২শ হিজরিপাশাপাশি প্রবাহিত হলেও দুই পানির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকে, কারণ আল্লাহ তাদের মধ্যে অন্তরায় রেখেছেনউপরে বর্ণিত[35]

এই তাফসীরগুলো কালানুক্রমিকভাবে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। “দুই পানি আসলে স্বাভাবিকভাবেই মিশে যায়; বারযাখ বলতে কেবল সেই মিশ্রণ অঞ্চলের লবণাক্ততার পরিবর্তনঢাল বোঝানো হয়েছে”, এটি ধ্রুপদী তাফসীর এবং ইসলামের শুরুর দিকের ব্যাখ্যাকারদের প্রচলিত ব্যাখ্যা ছিল না। বরং প্রথম যুগের মুজাহিদ ও মুকাতিল থেকে শুরু করে সামারকান্দী, বাগাভী, রাযী ও কুরতুবী পর্যন্ত বারবার যে ভাষা এসেছে তা হলো—“মিশে না”, “মিশতে বাধা দেওয়া হয়”, “অদৃশ্য বাধা”, “দেয়াল”, “মিশ্রণ প্রতিরোধ”। এমনকি যেখানে তাবারী কোনো মাত্রায় مرج-কে মিশ্রণ হিসেবে নিয়েছেন, সেখানেও তিনি এমন একটি ঐশ্বরিক বাধার কথা বলেছেন যা এক পানিকে অন্যটির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে দেয় না। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মোহনা কিন্তু এমন কোনো স্থায়ীভাবে পৃথক রাখা ব্যবস্থা নয়; সেখানে মিষ্টি ও লোনা পানি বাস্তবেই মিশে আধা-লবণাক্ত পানি সৃষ্টি করে। ফলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পুনর্ব্যাখ্যা এবং প্রাচীন মুসলিম মুফাসসিরদের বোঝাপড়ার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক ব্যবধান রয়েছে।


নাসাফী ও বদরুদ্দীন আইনী: চোখে মিলিত, কিন্তু মিশ্রণ নিষিদ্ধ

আবুল বারাকাত আন-নাসাফীর মাদারিকুত তানযীল-এর সূরা রাহমানের ব্যাখ্যা বদরুদ্দীন আইনী তাঁর উমদাতুল কারী-তে উদ্ধৃত করেছেন। নাসাফীর বর্ণনায় দুটি জলরাশি দৃশ্যত পাশাপাশি মিলিত হয় এবং চোখে তাদের মাঝে কোনো পৃথককারী রেখা দেখা যায় না। কিন্তু সেই দৃশ্যমান সংযোগের মাঝেও আল্লাহর ক্ষমতায় স্থাপিত একটি বাধা থাকার কথা বলা হয়। এই বক্তব্যের শেষাংশে মিশ্রণ ও স্বাদের বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়া দুই-ই অস্বীকার করা হয়েছে। [36]

بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ حَاجِزٌ وَحَائِلٌ مِنْ قُدْرَةِ اللَّهِ تَعَالَى وَحِكْمَتِهِ لَا يَبْغِيَانِ لَا يَتَجَاوَزَانِ حَدَّيْهِمَا وَلَا يَبْغِي أَحَدُهُمَا عَلَى الْآخَرِ بِالْمُمَازَجَةِ وَلَا يَخْتَلِطَانِ وَلَا يَتَغَيَّرَانِ.

বাংলা অনুবাদ: তাদের মাঝে আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রজ্ঞায় সৃষ্ট একটি অন্তরায় আছে। “তারা সীমা অতিক্রম করে না” অর্থ, তারা নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে অন্যটির ওপর মিশ্রণের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে না; তারা পরস্পর মিশে যায় না এবং তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও বদলায় না।

আইনীর উদ্ধৃত নাসাফীর বক্তব্যের মধ্যেই “লা ইয়াবগিয়ান”-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দুটি জলরাশি নিজেদের নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে না, মিশ্রণের মাধ্যমে একটি অন্যটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে না, পরস্পর মিশ্রিত হয় না এবং পরিবর্তিতও হয় না। ফলে নাসাফীর ব্যাখ্যার দুটি ধাপ রয়েছে: প্রথম ধাপে চোখে তাদের মিলিত অবস্থান দেখা যায়, দ্বিতীয় ধাপে সেই বাস্তব মিলনকে অদৃশ্য প্রতিবন্ধক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে দাবি করা হয়। এই দ্বিতীয় ধাপটিই বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। কোনো জলরাশির সীমা মানুষের চোখে আলাদা দেখায় কি না, তা দিয়ে আণবিক বা স্রোতজনিত মিশ্রণ ঘটে কি না নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

বদরুদ্দীন আইনী উমদাতুল কারী-তে একাধিক পুরোনো তাফসীর-মত উল্লেখ করেছেন। নাসাফীর বক্তব্যের পাশেই সমুদ্র বলতে পারস্য ও রোমের সমুদ্র, বা আকাশ ও পৃথিবীর সমুদ্র বোঝানোর মতও পাওয়া যায়। তাই নাসাফীর নির্দিষ্ট মিষ্টি-লোনা পানির ব্যাখ্যা এবং অন্যদের ভিন্ন পরিচয়-সংক্রান্ত মত এক করে দেখানো যায় না। কিন্তু নাসাফীর নিজের বক্তব্যে যে চোখে মিলিত অথচ বাস্তবে না-মেশার দাবি রয়েছে, সেটি সুস্পষ্ট। তাঁর এই বক্তব্যকে লবণাক্ততার স্বাভাবিক স্তরবিন্যাসের সঙ্গে এক করে দেওয়া হলে মুফাসসিরের মূল দাবি—“মেশে না”—বাদ পড়ে যায়।

নাসাফীর ব্যাখ্যায় “বারযাখ” এমন কোনো আধা-লবণাক্ত মিশ্রণস্তর নয় যার মধ্যে দুই দিকের পানি ও লবণ প্রবেশ করে। মিশ্রণই তিনি অস্বীকার করেছেন। জলরাশি দুটি পাশাপাশি থাকলেও মেশে না—এই দাবির সঙ্গে বাস্তব মোহনার পানিতে পরিমাপযোগ্য লবণবিনিময়ের বিরোধ সুস্পষ্ট।


সূরা নামল ২৭:৬১: কুরতুবীর বক্তব্যের বিস্তৃত প্রাসঙ্গিকতা

একই ধারণা কেবল সূরা ফুরকান বা সূরা রাহমানের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। সূরা নামল ২৭:৬১-এর “দুই সমুদ্রের মাঝে বাধা” বাক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুরতুবী মিষ্টি ও লোনা পানি যাতে মিশে না যায়, সে উদ্দেশ্যে ঈশ্বরীয় বাধা থাকার কথা বলেছেন। তিনি ইবন আব্বাসের নামে এমন ব্যাখ্যাও উল্লেখ করেছেন যেখানে এক পানি অন্যটির গুণ পরিবর্তন করতে পারে না। এভাবে তিনটি আয়াতকে একত্রে পড়লে প্রাচীন ব্যাখ্যা-ঐতিহ্যের নির্দিষ্ট দাবিটি দাঁড়ায়: বাধাটি শুধু দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য নয়, প্রকৃত সংমিশ্রণও রোধ করে। [37] [38]

﴿وَجَعَلَ بَيْنَ الْبَحْرَيْنِ حَاجِزًا﴾ مَانِعًا مِنْ قُدْرَتِهِ لِئَلَّا يَخْتَلِطَ الْأُجَاجُ بِالْعَذْبِ. وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: سُلْطَانًا مِنْ قُدْرَتِهِ فَلَا هَذَا يُغَيِّرُ ذَاكَ.

বাংলা অনুবাদ: “তিনি দুই সমুদ্রের মাঝখানে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করেছেন”—কুরতুবীর ব্যাখ্যায় এটি ঈশ্বরীয় ক্ষমতায় সৃষ্ট এমন বাধা, যাতে লোনা পানি মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশতে না পারে। এর পর তিনি ইবন আব্বাসের নামে বলেন, ঈশ্বরীয় ক্ষমতা এক পানির দ্বারা অন্য পানির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে দেয় না।

সূরা নামলের আয়াতে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করা, তার মধ্যে নদী সৃষ্টি, পাহাড় স্থাপন এবং দুই জলরাশির মাঝখানে বাধা রাখাকে ঈশ্বরের ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কুরতুবী সেই বাক্যের ব্যাখ্যায় বাধার একটি নির্দিষ্ট কাজ উল্লেখ করেছেন: লোনা ও মিষ্টি পানির মিশ্রণ বন্ধ করা। তাঁর বক্তব্যে “হাজিজ” শব্দের অর্থ কেবল দুই জলরাশির কোনো কল্পিত সীমারেখা নয়; একটি জলরাশিকে অন্যটিতে প্রবেশ করতে না-দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিবন্ধক। ফলে সূরা ফুরকান, সূরা রাহমান ও সূরা নামলের পৃথক আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে একই ধরনের অমিশ্রণ ধারণা গড়ে উঠেছে।

এই দাবির ভৌত পরিণতি খুব সরল। লোনা ও মিষ্টি পানি যদি কোনো সংযোগস্থলে মেশাই না পারে, তাহলে সেখানে লবণাক্ততার মধ্যবর্তী মানযুক্ত পানিও সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মোহনার বৈশিষ্ট্যই হলো এমন মধ্যবর্তী লবণাক্ততা; ওই অঞ্চলের প্রাণীবৈচিত্র্য ও জলবায়বীয় পরিবর্তন তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কুরতুবীর আয়াতভিত্তিক ব্যাখ্যাকে যদি প্রকৃতির পরীক্ষাযোগ্য বর্ণনা ধরা হয়, তবে তা ভুল। আর একে বাস্তব অমিশ্রণের দাবি থেকে সরিয়ে কেবল “প্রকৃতিতে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পানি আছে” বলা হলে মুফাসসিরের নিজের ব্যবহৃত “যাতে না মেশে” অর্থটাই হারিয়ে যায়।


প্রথম যুগের ব্যাখ্যার পুনরাবৃত্তি: সুয়ূতীর সংকলন

জালালুদ্দীন সুয়ূতী আদ-দুররুল মানসূর-এ সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০ ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস ও মুজাহিদের নামে সংরক্ষিত প্রতিবেদনগুলো একত্র করেছেন। সেখানে “লা ইয়াবগিয়ান”-এর ব্যাখ্যায় “লা ইয়াখতালিতান”—মিশে যায় না—বাক্য রয়েছে। সুয়ূতী পুরোনো ব্যাখ্যাগুলো তাঁর সংকলনে পুনরায় সংরক্ষণ করেছেন; এটি প্রাচীন তাফসীরধারায় “পানি মেশে না” ধারণাটির বিস্তারের সাক্ষ্য। [39]

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ ﴿مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ﴾ قَالَ: أَرْسَلَ الْبَحْرَيْنِ، ﴿بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ﴾ قَالَ: حَاجِزٌ، ﴿لَا يَبْغِيَانِ﴾ قَالَ: لَا يَخْتَلِطَانِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যায় “দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন” অর্থ জলরাশি দুটিকে ছেড়ে দিয়েছেন বা প্রবাহিত করেছেন; “তাদের মাঝে বারযাখ” অর্থ বাধা; “তারা সীমা অতিক্রম করে না” অর্থ তারা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় না।

সুয়ূতীর আদ-দুররুল মানসূর-এর মতো সংকলনের গুরুত্ব এই যে, তাতে কয়েক শতাব্দী ধরে প্রচলিত বর্ণনার ধারাগুলো পরবর্তী সময়ে একত্রে পাওয়া যায়। এখানে “বারযাখ” এবং “লা ইয়াবগিয়ান”-এর অর্থ নির্ধারণে বর্ণনাকারীর বক্তব্য সরাসরি “লা ইয়াখতালিতান”, অর্থাৎ “মেশে না”। এই শব্দকে “মেশে, কিন্তু মাঝখানে ঘনত্বের পার্থক্য দেখা যায়” হিসেবে অনুবাদ করলে মূল বক্তব্যের বিপরীত অর্থ দাঁড়ায়। সুয়ূতী একই বিষয় নিয়ে অন্যদের ভিন্ন বর্ণনাও সংগ্রহ করেছেন; তাই তাঁর সংকলনকে একটিমাত্র সর্বসম্মত মতের প্রমাণ ধরা যায় না। তবে “মিশে না” ব্যাখ্যা মুসলিম তাফসীরধারায় প্রচলিত ছিল—এ তথ্যটি অস্বীকারের সুযোগ নেই।

এই বর্ণনাটিকে ইবন আব্বাস নিজে সমুদ্রের পানি পরীক্ষা করে যা দেখেছেন, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায় না। এটি প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ-ব্যাখ্যার সাক্ষ্য। এর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অন্য প্রশ্ন: লোনা ও মিষ্টি পানি মেশে কি না, তা নদীর মোহনায় নমুনা সংগ্রহ ও লবণাক্ততার পরিবর্তন মাপলেই জানা যায়। প্রাচীন ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক উপস্থিতি এবং সেই ব্যাখ্যার বৈজ্ঞানিক সত্যতা সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। প্রথমটি এই তাফসীর-সংকলন প্রতিষ্ঠা করে; দ্বিতীয়টি বাস্তব পর্যবেক্ষণে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।


ইবন আতিয়্যা ও আবু হাইয়ান: প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণেই ‘মিশে না’ দাবি প্রশ্নবিদ্ধ

অমিশ্রণ-দাবির অসংগতি মধ্যযুগের মুসলিম ব্যাখ্যাকারদের কাছেও ধরা পড়েছিল। আবু হাইয়ান আন্দালুসী আল-বাহরুল মুহীত-এ একটি মত উল্লেখ করেছেন: নদীর মিষ্টি পানি লোনা পানিতে পড়লেও নিজস্ব অস্তিত্বে অমিশ্রিত থাকে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইবন আতিয়্যার পর্যবেক্ষণভিত্তিক আপত্তি তুলে ধরেন। মিষ্টি পানি সমুদ্রের লোনা পানির সঙ্গে মেশে; মেশার পরে সেই পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। এখানে সমালোচনা আধুনিক বিজ্ঞান আবির্ভূত হওয়ার পরে তৈরি হয়নি—মধ্যযুগীয় মুসলিম ভাষ্যকারদের মধ্যেই দেখা গিয়েছে। [40]

وَقِيلَ: مَاءُ الْأَنْهَارِ لَا يَخْتَلِطُ بِالْمَاءِ الْمِلْحِ، بَلْ هُوَ بِذَاتِهِ بَاقٍ فِيهِ. وَقَالَ ابْنُ عَطِيَّةَ: وَالْعِيَانُ لَا يَقْتَضِيهِ.

বাংলা অনুবাদ: একটি মত হলো, নদীর পানি লোনা পানির সঙ্গে মেশে না; সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করলেও তার নিজস্ব অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে। ইবন আতিয়্যা এই বক্তব্য সম্পর্কে বলেন: প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ এমন সিদ্ধান্ত সমর্থন করে না।

ইবন আতিয়্যার মূল আল-মুহাররারুল ওয়াজীয-এ বক্তব্যটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ: “নদীর পানি সমুদ্রের লোনা পানির সঙ্গে মেশে না, সমুদ্রের মধ্যেও নিজস্ব অবস্থায় থাকে”—এমন একটি প্রচলিত মত উল্লেখ করার পর তিনি বলেন, দাবির পক্ষে প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন প্রয়োজন; বাস্তব চোখে দেখা ঘটনা সেটিকে সমর্থন করে না। আবু হাইয়ান পরবর্তী সময়ে এই আপত্তি উদ্ধৃত করে ব্যাখ্যা করেন, মিষ্টি পানি লোনা পানির সঙ্গে মেশার ফলে মিশ্রণটি লবণাক্তই থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ মিষ্টি পানি মিশেছে কি না তা নির্ধারণের জন্য পুরো সমুদ্রের পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নদীর পানির নির্দিষ্ট পরিমাণ সমুদ্রে মিশলেও সমুদ্রের বিপুল লবণাক্ততা প্রাধান্য বজায় রাখতে পারে।

এই পর্যবেক্ষণ অমিশ্রণ-দাবির বিরুদ্ধে এক মৌলিক যৌক্তিক আপত্তি। সমুদ্রের লবণাক্ত স্বাদ বজায় থাকাকে কেউ যদি “নদীর পানি মেশেনি” বলে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে তিনি মিশ্রণ ও চূড়ান্ত গড় স্বাদকে এক জিনিস ধরে নিচ্ছেন। একটি পাত্রের লবণাক্ত পানিতে সামান্য মিষ্টি পানি ঢাললে পানি মিশবে; তবু স্বাদ লবণাক্তই থাকতে পারে। নদী ও সমুদ্রের ক্ষেত্রেও পরিমাণগত অনুপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবন আতিয়্যার বক্তব্য দেখায়, এই ভুল অনুমানের সমালোচনা আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের বহু শতাব্দী আগে মুসলিম জ্ঞানজগতের ভেতরেই উপস্থিত ছিল।

আবু হাইয়ান তাঁর তাফসীরে মিশ্রণের পর পানির সূক্ষ্ম অংশ ছড়িয়ে পড়ার একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাঁর যুগের পদার্থতত্ত্ব আধুনিক অণুবিজ্ঞান ছিল না; তবু তিনি মিশ্রণকে অস্বীকার না করে কীভাবে মিষ্টি পানির স্বতন্ত্র স্বাদ হারিয়ে যায়, সেই সমস্যাটি বুঝতে চেষ্টা করেছেন। এই আলোচনার ফলে ঐতিহাসিকভাবে দুটি বক্তব্য আলাদা করা যায়: প্রথমটি হলো ধর্মতাত্ত্বিক অমিশ্রণ, দ্বিতীয়টি হলো পর্যবেক্ষণভিত্তিক বাস্তব মিশ্রণ। কোনটি প্রকৃতির বর্ণনার সঙ্গে মেলে, তা এখন আর অনুমাননির্ভর প্রশ্ন নয়।

ইবন আতিয়্যার আল-মুহাররারুল ওয়াজীয-এ আপত্তিটির তাৎপর্য আরও নির্দিষ্ট: একটি প্রচলিত ব্যাখ্যার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য দলিল দাবি করা এবং নদী-সমুদ্রের প্রকৃত সংযোগ সম্পর্কে চোখে দেখা ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে ধরা। পরবর্তী শতাব্দীর আবু হাইয়ান তাঁর আলোচনা উদ্ধৃত করেছেন। ফলে পরের গ্রন্থে এই বক্তব্য উপস্থিত থাকাকে নতুন, স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ হিসেবে গণনা করা চলে না; মধ্যযুগীয় তাফসীর-ঐতিহ্যের ভেতরেই এই প্রশ্নের ধারাবাহিক উপস্থিতি বোঝায়। দাবি যে প্রাচীন যুগে সর্বসম্মত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি, সেটাই এখানে প্রাসঙ্গিক। [41]

وَقَدْ قَالَ بَعْضُ النَّاسِ: إِنَّ مَاءَ الْأَنْهَارِ لَا يَخْتَلِطُ بِالْمَاءِ الْمِلْحِ، بَلْ هُوَ بِذَاتِهِ بَاقٍ فِيهِ، وَهَذَا يَحْتَاجُ إِلَى دَلِيلٍ أَوْ حَدِيثٍ صَحِيحٍ.

বাংলা অনুবাদ: কেউ কেউ বলেছেন, নদীর পানি সমুদ্রের লোনা পানির সঙ্গে মেশে না; বরং লোনা পানির মধ্যে প্রবেশ করেও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। এই দাবির জন্য প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য বর্ণনা প্রয়োজন।


ইবন হাজর: নদীর পানি সমুদ্রে মেশে—তাহলে অমিশ্রণের দাবি কীভাবে সম্ভব?

ইবন হাজর আসকালানী ফাতহুল বারী-তে সূরা রাহমানের ব্যাখ্যা আলোচনা করতে গিয়ে মুজাহিদের নামে “তারা মেশে না” ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেন। এরপরই তিনি একটি পরীক্ষাযোগ্য প্রশ্ন তোলেন: নীলনদ ও ফোরাতের মতো মিঠাপানির নদী তো লোনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় দুটি পানির মিশ্রণ অস্বীকার করা কীভাবে সম্ভব? ইবন হাজর আরেক ব্যাখ্যায় “দুই সমুদ্র” বলতে ভিন্ন দুই সমুদ্রকে বোঝানোর সম্ভাবনা আলোচনা করেন। তাঁর প্রশ্নের তাৎপর্য এই যে, নদী ও সমুদ্রের পানি মিশে যাওয়ার ঘটনা তখনই পরিচিত ছিল। [42]

وَالْحُلْوُ وَهُوَ بَحْرُ النِّيلِ أَوِ الْفُرَاتِ مَثَلًا يَصُبُّ فِي الْمِلْحِ، فَكَيْفَ يَسُوغُ نَفْيُ اخْتِلَاطِهِمَا أَوْ يُقَالُ بَيْنَهُمَا بُعْدٌ؟

বাংলা অনুবাদ: মিষ্টি জলরাশি—যেমন নীলনদ বা ফোরাত—লোনা সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে পড়ে। তা হলে তাদের মধ্যে মিশ্রণ নেই বলে দাবি করা, কিংবা বলা যে তাদের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে—কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

ইবন হাজর ফাতহুল বারী-তে আলোচনাটি শুরু করেছেন বুখারীর তাফসীর-সংক্রান্ত শব্দব্যাখ্যা থেকে, যেখানে “লা ইয়াবগিয়ান” অর্থ “মিশে না” হিসেবে সংরক্ষিত আছে। এরপর তিনি ইবন আব্বাসের নামে এমন একটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেন যাতে জলরাশি দুটির মাঝখানে দূরত্ব থাকার কারণে পরস্পরকে অতিক্রম করতে না-পারার কথা বলা হয়েছে। নদীর বাস্তব গতিপথ বিবেচনা করেই তিনি আপত্তি তোলেন: নীলনদ ও ফোরাত তো সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে মিশ্রণ অস্বীকার করা বা তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকার কথা বলা কীভাবে সম্ভব? এটি নিছক শব্দার্থের বিতর্ক নয়; নদী ও সমুদ্রের প্রকৃত সংযোগকে সামনে এনে ব্যাখ্যার বাস্তব ভিত্তি পরীক্ষা করা।

ইবন হাজর এরপর সূরা ফুরকানের মিষ্টি-লোনা পানির কথা এবং সূরা রাহমানের মুক্তা ও প্রবাল সম্পর্কিত পরবর্তী আয়াতের ভিত্তিতে দুই জায়গায় “দুই সমুদ্র” ভিন্ন অর্থে ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা আলোচনা করেছেন। তাঁর এই পরবর্তী আলোচনার ফলে শুরুর প্রশ্নটির গুরুত্ব কমে না। বরং এটি দেখায়, প্রচলিত অমিশ্রণ-ব্যাখ্যার সঙ্গে নদীর বাস্তব সংযোগের অসংগতি স্বীকার করার পর আয়াত দুটির অর্থ এক রাখবেন, নাকি আলাদা করবেন—এ প্রশ্ন তখনই দেখা দিয়েছিল। দুই নদী সমুদ্রে ঢোকে এবং মিশে—এই সুপরিচিত সত্য উপলব্ধি করতে আধুনিক উপগ্রহ, গবেষণাগার বা কৃত্রিম উপগ্রহচিত্রের প্রয়োজন হয়নি।

এমন একটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য আধুনিক “কোরআনের পানির বাধা ছিল অজানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার” দাবিকে আরও দুর্বল করে। অন্তত কয়েকজন মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যাকার জানতেন, নদীর মোহনায় মিষ্টি ও লোনা পানির সংস্পর্শের পরে অপরিবর্তিত বিচ্ছেদ দাবি করা যায় না। ফলে প্রাচীন সমাজে এ বিষয়ে সবাই অন্ধকারে ছিল, আর আধুনিক বিজ্ঞানই প্রথম ধর্মগ্রন্থের গোপন সত্য উদ্ধার করেছে—এই গল্প ঐতিহাসিক উৎসের সঙ্গেই মেলে না।


আলুসী: ‘পানি মেশে না’ ব্যাখ্যা প্রত্যক্ষ বাস্তবতার বিরোধী

উনিশ শতকের মুফাসসির শিহাবুদ্দীন আলুসীর রূহুল মাআনী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রথমে প্রচলিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন: আল্লাহর ক্ষমতায় সৃষ্ট অদৃশ্য বাধার কারণে মিষ্টি ও লোনা পানির কোনো মিশ্রণই ঘটে না, একটির স্বাদও অন্যটি পরিবর্তন করে না। এরপর জানান, ব্যাখ্যাটি বহু ভাষ্যকারের নামে প্রচলিত থাকলেও বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলে না। দজলা ও নীলনদের মতো বড় নদী সমুদ্রে গিয়ে মিশলে সংযোগস্থলে নদীর পানির স্বাদ যেমন পরিবর্তিত হয়, তেমনি কাছাকাছি সমুদ্রের পানির স্বাদও পরিবর্তিত হয়; পরিবর্তনের মাত্রা প্রবাহ ও অন্যান্য অবস্থার ওপর নির্ভর করে। আলুসী আরও বলেন, একটি মিষ্টি ও অন্যটি লোনা—এমন দুটি জলরাশি মিলিত হওয়ার পরও কারও স্বাদ একেবারেই না বদলানোর বাস্তব উদাহরণ কেউ দেখায়নি। তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত: ওই কঠোর অমিশ্রণ-ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। আলুসী পানির বাস্তব আচরণের ভিত্তিতেই অমিশ্রণ-ব্যাখ্যাকে ভুল শনাক্ত করেছেন। [43]

وَلَمْ يُخْبِرْ أَحَدٌ أَنَّهُ شَاهَدَ فِي الْأَرْضِ بَحْرَيْنِ أَحَدُهُمَا عَذْبٌ وَالْآخَرُ مِلْحٌ، وَقَدِ اتَّصَلَ أَحَدُهُمَا بِالْآخَرِ مِنْ غَيْرِ تَغَيُّرٍ لِطَعْمِ شَيْءٍ مِنْهُمَا أَصْلًا.

বাংলা অনুবাদ: কেউ এমন দুটি জলরাশি দেখার কথা জানাননি, যার একটি মিষ্টি এবং অন্যটি লোনা, অথচ তারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পরও উভয়ের কোনো অংশের স্বাদ একেবারেই অপরিবর্তিত থেকেছে।

আলুসীর রূহুল মাআনী-তে এই বক্তব্যের আগে বেশ বিস্তারিত আলোচনা আছে। প্রথমে তিনি অদৃশ্য বাধার প্রচলিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন: মানুষের চোখে জলরাশি দুটি মিশ্রিত বলে মনে হলেও বাস্তবে আল্লাহর ক্ষমতায় তারা সম্পূর্ণ পৃথক থাকে এবং কোনো জলরাশির স্বাদ অন্যটির প্রভাবে বদলায় না। আলুসীর নিজের আপত্তি হলো, এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে যায়। দজলা, নীলনদ এবং অন্যান্য নদী সমুদ্রে প্রবেশ করলে সংযোগস্থলে নদীর পানি পরিবর্তিত হয়, আবার নদীর প্রবাহের প্রভাবে কাছাকাছি সমুদ্রের পানিও বদলায়। এই পরিবর্তন বাতাস, পানির পরিমাণ এবং প্রবাহের তারতম্যে কমবেশি হতে পারে। অর্থাৎ তিনি শুধু তাত্ত্বিক সম্ভাবনার কথা বলেননি; বাস্তব নদী ও সমুদ্রের পানিতে উভমুখী পরিবর্তনের কথাই বলেছেন।

আলুসী আরও কঠোর ভাষায় বলেন, কেউ পৃথিবীতে এমন দুটি বাস্তব সংযুক্ত জলরাশি দেখাতে পারেনি যাদের মিষ্টতা বা লবণাক্ততা বিন্দুমাত্র বদলায় না। তিনি অদৃশ্য অমিশ্রণ-দেয়ালের ব্যাখ্যাকে এমন অযৌক্তিক জটিলতা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন যা কোরআন সম্পর্কে অনর্থক আপত্তি তৈরির সুযোগ দেয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি: ইসলামের একজন প্রভাবশালী মুফাসসির নিজেই জানাচ্ছেন, “মিশে না” ব্যাখ্যাটি পর্যবেক্ষণের বিপরীত। তাঁর এই আপত্তির জন্য কোনো আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি শত্রুতা বা আনুগত্য ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; নিজের সময়ের নদী-সমুদ্রের বাস্তব অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট ছিল।

এর পর আলুসী আরও একটি ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করেন: মিষ্টি ও লোনা পানির সংযোগস্থলে মধ্যবর্তী স্বাদের পানি থাকতে পারে; মিষ্টি পানির কিছু অংশে লোনা পানি এবং লোনা পানির কিছু অংশে মিষ্টি পানি মিশে তাদের তীব্রতা কমিয়ে দেয়। এই আলোচনাটি আধুনিক মোহনা-বিজ্ঞানের সঙ্গে অন্তত মিশ্রণের বাস্তবতা স্বীকার করার জায়গায় সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু আলুসী নিজে এটিকে কোরআনের কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখাননি। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল আরও সরল: পর্যবেক্ষণের সঙ্গে না-মেলা অমিশ্রণ-ব্যাখ্যার পেছনে অনর্থক জটিলতা দাঁড় করানো গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তব পানির আচরণের সঙ্গে অসংগত ধর্মতাত্ত্বিক বক্তব্য রক্ষা করতে গিয়ে শব্দের ব্যাখ্যা পাল্টানো সমস্যাটির সমাধান নয়।

আলুসীর পর্যবেক্ষণ থেকে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট: “দুই পানি কখনো মেশে না” কথাটি ভুল বোঝাতে আধুনিক পরীক্ষাগারের জন্মের অপেক্ষাও করতে হয়নি। নদীর মোহনায় গিয়ে পানির স্বাদ পরিবর্তন হতে দেখা এবং তার কারণ অনুসন্ধান করাই যথেষ্ট ছিল। পরবর্তীকালের সমুদ্রবিজ্ঞান এই পর্যবেক্ষণকে আরও নিখুঁত লবণাক্ততা পরিমাপ, স্রোতবিশ্লেষণ ও ভরবিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছে।


ইসলামকিউএ-র সংকলিত মত: অদৃশ্য বাধা ও আধুনিক ঘনত্ব-ব্যাখ্যার সমন্বয়

ইসলামকিউএ-র ১৬৫০৯৪ নম্বর উত্তরে প্রাচীন ব্যাখ্যাগুলো সংকলন করে দুটি মত আলাদা করা হয়েছে: একটিতে নদী ও সমুদ্রের মাঝখানে স্থলভাগকে অন্তরায় ধরা হয়েছে, অন্যটিতে নদীর মোহনায় পানি দুটি মেলার পরও একটি অদৃশ্য বাধা তাদের মিশতে দেয় না। একই উত্তরে ইবন কাসীর, কুরতুবী, শানকীতী, ইবন আশূর, ইবন উসাইমীন ও সালিহ আল-ফাওযানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে শেষ পর্যন্ত ঘনত্বের পার্থক্যকেও একই আয়াতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ঘনত্বের পার্থক্যে পানির স্তরবিন্যাস আর মিশ্রণ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি পরীক্ষায় সত্য; দ্বিতীয়টি পরীক্ষায় মিথ্যা। এই দুই ভিন্ন দাবিকে একই নামে সত্য ঘোষণা করে অমিশ্রণের ভুল পূর্বাভাস রক্ষা করা যায় না। [44]

أن بين البحرين، العذب والفرات، حاجزا لا يظهر للعيان، خلقه الله بقدرته، يمنع به اختلاط الماء العذب بالماء المالح رغم التقاء الماءين في نهاية مصب الأنهار

বাংলা অনুবাদ: এমন এক বাধা রয়েছে যা চোখে দেখা যায় না। আল্লাহ নিজ ক্ষমতায় এটি সৃষ্টি করেছেন; নদীর শেষপ্রান্তে মিষ্টি ও লোনা পানি মিলিত হওয়া সত্ত্বেও বাধাটি মিষ্টি পানিকে লোনা পানির সঙ্গে মিশতে দেয় না।

ইসলামকিউএ-র আলোচনায় দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটির বাকি অংশে স্পষ্ট করা হয়েছে, নদীর মোহনায় দুই পানি মিলিত হলেও অদৃশ্য বাধা তাদের মিশ্রিত হতে দেয় না। একই উত্তরে প্রথম ব্যাখ্যাটি হলো, নদী ও সমুদ্রের মধ্যে বিস্তৃত স্থলভাগ বিচ্ছেদ তৈরি করে। এভাবে একটি ব্যাখ্যা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কথা বলে, অন্যটি সংযোগস্থলে অদৃশ্য মিশ্রণ-প্রতিবন্ধকের কথা বলে। এ দুটি একই ভৌত ঘটনা নয়: স্থলভাগ দুটি বিচ্ছিন্ন জলাশয় আলাদা রাখতে পারে; কিন্তু নদী যেখানে সমুদ্রে প্রবেশ করেছে সেখানে স্থলভাগের অবিচ্ছিন্ন প্রাচীর নেই। সেখানে পানির প্রবাহ এবং মিশ্রণ স্বাভাবিকভাবেই চলে।

উত্তরটিতে ইবন কাসীরের উদ্ধৃতিতে স্থলভাগকে প্রতিবন্ধক বলা হয়েছে; সা‘দীর বক্তব্যে মিষ্টি ও লোনা পানির বাস্তব মিশ্রণ স্বীকার করা হয়েছে। এরপর কুরতুবীর উদ্ধৃতিতে মিশ্রণ বন্ধ রাখার প্রতিবন্ধক এসেছে। ইবন আশূর ঘনত্বের পার্থক্যকে “অদৃশ্য প্রতিবন্ধক”-এর ব্যাখ্যায় ব্যবহার করেছেন এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে সব ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু “মিশে” এবং “মিশে না” একই পরীক্ষা বা একই বাস্তব ঘটনার জন্য সমার্থক সিদ্ধান্ত নয়। একটির সত্যতা দিয়ে অন্যটির ভুল দূর হয় না।

ঘনত্বের পার্থক্য পানিকে স্তরবিন্যস্ত করে, কিন্তু পানি ও দ্রবীভূত লবণের বিনিময় বন্ধ করে না। ঘনত্বজনিত স্তরবিন্যাসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে যদি “মিশ্রণ-অযোগ্য অভেদ্য অন্তরায়” বলে দাবি করা হয়, তাহলে বৈজ্ঞানিক ঘটনার প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার বলা হয়—পানি বাস্তবে মিশেই যায়, তবু ওই স্তরবিন্যাসই বারযাখ—তাহলে আগের “মিশতে দেয় না” বক্তব্যটিই পরিত্যক্ত হয়। কোনো একটি আয়াতের সম্ভাব্য অর্থ নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক ফলাফলের সঙ্গে পরে মিলিয়ে নেওয়া এক বিষয়; নির্দিষ্ট পরীক্ষাযোগ্য সত্য আগেই ঘোষণা করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। এই দুটি পদ্ধতিকে এক করে বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয় না।


সালাফদের অমিশ্রণ-বর্ণনা থেকে আধুনিক ঘনত্ব-ব্যাখ্যা: ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক রূপান্তর

প্রথম দিকের ব্যাখ্যায় “বারযাখ” কী, সেই প্রশ্নে একটি অভিন্ন উত্তর ছিল না। মুজাহিদ ও ইবন আব্বাসের নামে প্রচলিত একাধিক বর্ণনায় “لا يختلطان”—দুটি পানি মেশে না—বলা হয়েছে। মুকাতিলের ব্যাখ্যায় একটি পানি অন্যটির স্বাদ বদলায় না; সামারকান্দী আরও স্পষ্টভাবে পরস্পরের সঙ্গে মেশাকে নিষিদ্ধ বলেছেন। বাগাভী ও কুরতুবী একই ধরনের মিশ্রণ-রোধকারী অন্তরায় বর্ণনা করেছেন। এই নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাগুলোকে পরবর্তীকালে কেবল “ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে পানি ধীরে মেশে” বলে উপস্থাপন করলে তাঁদের ব্যবহৃত মেশে না কথাটির অর্থ বদলে যায়। এটি সাধারণ শব্দার্থের পার্থক্য নয়; পরীক্ষাযোগ্য ঘটনার বিপরীত দুটি বিবরণ। [45] [46]

তবে শুরু থেকেই অন্য ব্যাখ্যাও ছিল: হাসান বসরীর নামে স্থলভাগকে বাধা বলা হয়েছে; তাবারী পানির বাস্তব মিশ্রণ স্বীকার করেও স্বাদ নষ্ট না হওয়ার আলাদা ধারণা গ্রহণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাযী প্রথমে অমিশ্রণের কথা বললেও নিজের প্রশ্নোত্তরে স্থলভাগের ব্যাখ্যায় পৌঁছান; ইবন কাসীরের মূল আরবিতে স্থলভাগকে সরাসরি বারযাখ বলা হয়েছে। তাই পরিবর্তনের ইতিহাসকে “আগে সবাই একমত ছিলেন, পরে সবাই মত পাল্টালেন” এমন সরল সময়রেখায় ফেলা যায় না। প্রকৃত ইতিহাস আরও নির্দিষ্ট: প্রথম থেকেই একাধিক ব্যাখ্যা ছিল, যেগুলোর মধ্যে কঠোর অমিশ্রণ-দাবি খুব প্রভাবশালী; পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী বিজ্ঞানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময়ে সেই অমিশ্রণ-বর্ণনাগুলোর পরিবর্তে পুরোনো বিকল্প অর্থ কিংবা নতুন ভৌত ব্যাখ্যা নির্বাচিত হতে থাকে। এই নির্বাচনটিকেই অতীতের সর্বজনস্বীকৃত অর্থ বলে চালানো হলে মূল ঐতিহাসিক দলিল উপেক্ষিত হয়। [47] [48] [49]

মধ্যযুগীয় ভাষ্যকার ইবন আতিয়্যা কঠোর অমিশ্রণ-মতের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের আপত্তি তুলেছিলেন; আবু হাইয়ান সেটি উদ্ধৃত করেন। উনিশ শতকের আলুসী আরও নির্দিষ্টভাবে জানান, দজলা ও নীলনদের মতো নদী সমুদ্রে মেশার স্থানে উভয় পানির স্বাদ বদলায়। তিনি সংযোগস্থলে মধ্যবর্তী স্বাদের পানির ধারণাও উল্লেখ করেন। অর্থাৎ পানির মিশ্রণ অস্বীকারের ভুল চিহ্নিত করার কাজ শুধু আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের যুগে শুরু হয়নি; ইসলামী তাফসীরের ভেতরেও তা হয়েছিল। এতে মুজাহিদ-মুকাতিলের নামে সংরক্ষিত অমিশ্রণ-ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক উপস্থিতি মুছে যায় না। বরং নির্দিষ্টভাবে বোঝা যায়, একই ধর্মীয় গ্রন্থকে কেন্দ্র করে পর্যবেক্ষণ-সমর্থিত এবং পর্যবেক্ষণ-বিরোধী দাবি একসঙ্গে প্রচলিত ছিল। [50]

বিশ শতকে আবদুর রহমান আস-সা‘দীর তাইসীরুল কারীমির রাহমান-এ সূরা রাহমানের ব্যাখ্যা এই পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট দলিল। তিনি নদীর মিষ্টি পানি সমুদ্রে প্রবেশ করে মিশে যায় বলে স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে বারযাখকে স্থলভাগের বাধা বলেছেন এবং মিষ্টি পানির ব্যবহারযোগ্যতা ও সমুদ্রের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এখানে “দুটি পানির কোনো মিশ্রণই হয় না” এমন প্রাচীন বক্তব্য আর অবিকল রাখা হয়নি। অর্থাৎ বাস্তব মিশ্রণ মেনে নিয়ে আয়াতের ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্যকে অন্য স্তরে স্থানান্তর করা হয়েছে। সা‘দীর ব্যাখ্যা প্রাথমিক যুগের মুজাহিদ বা মুকাতিলের কঠোর অমিশ্রণ-বক্তব্যের সঙ্গে এক নয়। [51]

فَيَصُبُّ الْعَذْبُ فِي الْبَحْرِ الْمَالِحِ، وَيَخْتَلِطَانِ وَيَمْتَزِجَانِ، وَلَكِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا مِنَ الْأَرْضِ

বাংলা অনুবাদ: মিষ্টি পানি লোনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, দুটি পানি পরস্পর মিশে যায় এবং সংমিশ্রিত হয়; কিন্তু আল্লাহ তাদের মাঝে স্থলভাগের এক অন্তরায় রেখেছেন।

এই উদ্ধৃতির “يختلطان ويمتزجان” এবং মুজাহিদের নামে সংরক্ষিত “لا يختلطان” তুলনা করলেই পরিবর্তনটি ধরা পড়ে। একটির অর্থ মিশে, অন্যটির অর্থ মেশে না। একই স্থানে একই জলের আচরণ বোঝাতে এই দুই বাক্যকে একসঙ্গে আক্ষরিক সত্য বলা যায় না। সা‘দী বাস্তব সংযোগ ও মিশ্রণের কথা মেনে নিয়েছেন; সালাফদের কঠোর অমিশ্রণ-বর্ণনাকে তাঁর ব্যাখ্যার অপরিহার্য শর্ত করেননি। এই পরিবর্তনকে প্রাচীন ব্যাখ্যারই অবিকল পুনরাবৃত্তি বলা ইতিহাসের বিকৃতি। অন্যদিকে তাঁর বলা স্থলভাগের বাধাও মোহনার মধ্যে কোনো অদৃশ্য মিশ্রণরোধী দেয়ালের প্রমাণ নয়।

মুহাম্মদ তাহির ইবন আশূরের আত-তাহরীর ওয়াত তানবীর-এ আরও একটি নতুন ব্যাখ্যার উপাদান এসেছে। তিনি পানি দুটির আপেক্ষিক ভার বা ঘনত্বের পার্থক্য থেকে একটি অদৃশ্য, স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকের কথা বলেছেন—এটি আর স্থলভাগ নয়, বরং পানির নিজস্ব ভৌত বৈশিষ্ট্য। এভাবে ধ্রুপদী “অদৃশ্য অন্তরায়” ধারণার সঙ্গে পরবর্তী যুগের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের শব্দ ও ব্যাখ্যা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ঘনত্বের পার্থক্যে পানি স্তরে স্তরে অবস্থান করা এবং সেই পার্থক্যে মিশ্রণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। নদী ও সমুদ্রের সংযোগস্থলে লবণাক্ততার পরিবর্তন, লবণপ্রবেশ ও আধা-লবণাক্ত পানি সৃষ্টিই এই পার্থক্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। [52]

فَالْحَاجِزُ حَاجِزٌ مِنْ طَبْعِهِمَا، وَلَيْسَ جِسْمًا آخَرَ فَاصِلًا بَيْنَهُمَا

বাংলা অনুবাদ: এই বাধা দুটি পানির স্বভাবজাত বাধা; তাদের মাঝখানে পৃথক করে রাখা অন্য কোনো বস্তু নয়।

ইবন আশূরের বক্তব্যের আগের প্রাসঙ্গিক অংশে পানির আপেক্ষিক ভারের তারতম্যের কথা আছে। এটিই পরবর্তী পুনর্ব্যাখ্যার কেন্দ্রীয় পরিবর্তন: ঐশ্বরিক শক্তিতে তৈরি অদৃশ্য মিশ্রণ-নিষেধ থেকে ঘনত্বের পার্থক্যজনিত স্তরবিন্যাস—দুটি ধারণা একই বৈজ্ঞানিক দাবি নয়। জলরাশির আপেক্ষিক ঘনত্ব ভিন্ন হলে স্তরবিন্যাস তৈরি হতে পারে, কিন্তু স্রোত, জোয়ার ও ব্যাপন সেই স্তরগুলোর মধ্যে অবিরাম পদার্থবিনিময় ঘটায়। যে ভৌত প্রক্রিয়া মিশ্রণকে ধীর করতে পারে, তাকে মিশ্রণকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলে আসল বৈজ্ঞানিক তথ্যই বিকৃত হয়। এই ব্যাখ্যা একটি পরবর্তী যুগের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা; মুজাহিদ, মুকাতিল বা সামারকান্দীর মূল পাঠে ঘনত্ব-ঢাল বা মোহনার মিশ্রণ-অঞ্চলের কোনো নির্দিষ্ট বিবরণ নেই।

২০১১ সালের ইসলামকিউএ-র উত্তরটি বিভিন্ন যুগের এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যকে একসঙ্গে সত্য বলার একটি নথিভুক্ত উদাহরণ। সেখানে ইবন কাসীর ও সা‘দীর স্থলভাগের ব্যাখ্যা, কুরতুবীর অমিশ্রণ-দাবি, ইবন আশূরের ঘনত্বনির্ভর বাধা, ইবন উসাইমীনের সমুদ্রের ভেতরের মিষ্টি পানির উৎস সম্পর্কে মন্তব্য এবং সালিহ আল-ফাওযানের স্বাদ অপরিবর্তিত থাকার মত পাশাপাশি সংকলিত হয়েছে। সবশেষে বলা হয়েছে—স্থলভাগের বাধা এবং ঘনত্বের পার্থক্যজনিত অদৃশ্য বাধা, দুটিই গ্রহণযোগ্য; এগুলো বিরোধ নয়, বরং ব্যাখ্যার বৈচিত্র্য। এই উপসংহারের সমস্যাটি উৎসের নিজেদের কথাতেই স্পষ্ট: পানি মেশে এবং পানি মেশে না—দুটি বিপরীত বক্তব্যকে একই পরীক্ষাযোগ্য বাস্তবতার সমান বর্ণনা বলা সম্ভব নয়। [53]

وَلَا مَانِعَ مِنِ اخْتِيَارِ كِلَا الْقَوْلَيْنِ فِي تَفْسِيرِ الْآيَةِ، إِذْ يَصْدُقُ كُلٌّ مِنْهُمَا وَلَا تَعَارُضَ بَيْنَهُمَا

বাংলা অনুবাদ: আয়াতের ব্যাখ্যায় উভয় মত গ্রহণ করতে বাধা নেই; উভয়টিই সত্য এবং তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রাথমিক যুগের কোন বক্তব্যটি বাদ পড়ছে, সেটি নির্দিষ্ট করে বলা যায়। মুজাহিদের “মেশে না”, সামারকান্দীর “মেশা নিষিদ্ধ” এবং বাগাভীর “মিষ্টি ও লোনা পানি পরস্পরের সঙ্গে মিশতে পারে না”—এসব স্পষ্ট বক্তব্যকে ঘনত্বের পার্থক্যের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হলে তাদের আক্ষরিক অমিশ্রণ-অর্থ ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু সেই অর্থ পরিত্যাগের কথা স্বীকার না করে বলা হচ্ছে, প্রাচীন ও নতুন উভয় ব্যাখ্যাই শুরু থেকে সত্য। এটি প্রাচীন বর্ণনার স্বাভাবিক অনুসরণ নয়; পূর্বের পরীক্ষাযোগ্য দাবির স্থান দখল করে নেওয়া পরবর্তী ব্যাখ্যা। ঘনত্ব, স্তরবিন্যাস ও মোহনার মিশ্রণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কার হওয়ার পর সে তথ্য আয়াতের শব্দে ফিরিয়ে বসিয়ে দেওয়া অগ্রিম বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রমাণ নয়। বারযাখের ব্যাখ্যার এই পরিবর্তনই দেখায়, আধুনিক দাবির বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তু এসেছে আধুনিক পর্যবেক্ষণ থেকে, ধ্রুপদী অমিশ্রণ-বর্ণনা থেকে নয়।


ইসলামওয়েবের ২০১৬ সালের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার দাবি: একই লেখায় মিশ্রণ স্বীকার, আবার মিশ্রণ নিষিদ্ধ

৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ইসলামওয়েবের “ওয়া জা‘আলা বাইনাহুমা বারযাখা” শিরোনামের একটি লেখায় পরবর্তী যুগের এই অর্থ-সমন্বয় আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কোরআন চৌদ্দশ বছর আগে মিষ্টি ও লোনা পানির এমন একটি অদৃশ্য সীমার কথা জানিয়েছিল, যা বিজ্ঞানীরা উনিশ শতকের শেষদিকে আবিষ্কার করেছেন। লেখাটি প্রাচীন তাফসীরের দুই ব্যাখ্যা—স্থলভাগের বাধা ও অদৃশ্য বাধা—উল্লেখ করে স্থলভাগের ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপর গাইবেন–হার্জবার্গ সম্পর্ক নামে পরিচিত উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানির একটি গাণিতিক সম্পর্ককে ‘বারযাখ’-এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এখানে আয়াতের যে বিষয়টি আগাম বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, সেটি কোরআনের শব্দ থেকেই স্বতন্ত্রভাবে নির্ণীত নয়; অনেক পরে প্রতিষ্ঠিত জলভূতাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে আয়াতটির অর্থ মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। [54]

লেখাটি আরও একটি ঐতিহাসিক বিকৃতি করেছে। সেখানে মুজাহিদের ‘মেশে না’ ব্যাখ্যার সঙ্গে তাবারীর নির্বাচিত ব্যাখ্যাকে একই অদৃশ্য অমিশ্রণ-বাধার পক্ষে রাখা হয়েছে। অথচ তাবারীর নিজের মূল পাঠে “مع اختلاط كل واحد منهما بصاحبه”—একটির সঙ্গে অন্যটি মিশে থাকা অবস্থাতেই বাধার কার্যকারিতার কথা—স্পষ্টভাবে এসেছে। ফলে তাবারীর ব্যাখ্যায় মিশ্রণের স্বীকৃতিকে উপেক্ষা করে তাঁকে নিছক ‘পানি কোনোভাবেই মেশে না’ মতের সরল সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করা ভুল। এই ভুলে আধুনিক অলৌকিকতার লেখায় প্রাচীন তাফসীরের অন্তর্নিহিত মতভেদ গোপন হয়ে যায়। [55] [56]

প্রবন্ধটির সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অসংগতি গাইবেন–হার্জবার্গ সম্পর্কের ব্যবহার। উপকূলের ভূগর্ভস্থ পানিতে মিষ্টি পানির ঘনত্ব লোনা পানির চেয়ে কম হওয়ায় মিষ্টি পানি উপরের দিকে অবস্থান করে এবং তার উচ্চতা ও নিচের গভীরতার মধ্যে একটি আনুমানিক সম্পর্ক পাওয়া যায়। এই সম্পর্ক ব্যবহার করে লোনা ও মিষ্টি ভূগর্ভস্থ পানির সীমার অবস্থান সম্পর্কে প্রাথমিক হিসাব করা যায়। কিন্তু এটি অভেদ্য ঝিল্লি কিংবা লবণের অণু কোনোভাবেই ছড়িয়ে পড়তে পারে না—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নয়। তা সত্ত্বেও ইসলামওয়েবের নিবন্ধে এই সম্পর্ককে এমন এক বাধা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা লবণের অণুর বিস্তার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। [57]

وُجُودَ مِثْلِ (الْحَاجِزِ) بَيْنَ الْمَاءِ الْمِلْحِ وَالْمَاءِ الْعَذْبِ يَمْنَعُ مَنْعًا بَاتًّا انْتِشَارَ جُزَيْئَاتِ الْمِلْحِ

বাংলা অনুবাদ: এই ধরনের ‘বাধা’ লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝখানে লবণের অণুগুলোর বিস্তার সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করে।

এই দাবিটি সরাসরি ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানির বিশদ গবেষণায় জানিয়েছে, লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝে তথাকথিত বিভাজনরেখা বাস্তবে একটি মিশ্রণ-অঞ্চল। সেখানে পানির প্রবাহ, ছড়িয়ে পড়া ও আণবিক ব্যাপন চলতে থাকে; মিষ্টি পানির দিকে লবণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ে। গাইবেন–হার্জবার্গের সরলীকৃত হিসাবে দুটি পানির মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ সীমারেখা কল্পনা করা হয় হিসাব সহজ করার জন্য; বাস্তব সীমা যে তীক্ষ্ণ নয় এবং মিশ্রণ হয়, তা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার ২০০৩ সালের বিশদ প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখিত। ফলে বিজ্ঞান যে মিশ্রণ-অঞ্চলের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই একই অঞ্চলকে ইসলামওয়েব মিশ্রণ নিষিদ্ধ করার প্রাচীর হিসেবে ব্যবহার করেছে। এটি শব্দের সামান্য পার্থক্য নয়; বৈজ্ঞানিক ফলের বিপরীত অর্থ। [58] [59]

একই ইসলামওয়েব নিবন্ধের মধ্যেই দ্বন্দ্বটি দেখা যায়। একদিকে সেখানে বলা হয়েছে মিষ্টি ও লোনা পানি একেবারেই মিশতে পারে না; অন্যদিকে মধ্যবর্তী অঞ্চল সম্পর্কে স্বীকার করা হয়েছে, সেটি নির্দিষ্ট পুরুত্ববিশিষ্ট এমন স্থান যেখানে লবণের ঘনত্ব ধীরে ধীরে বদলায় এবং মিষ্টি ও লোনা পানির সংমিশ্রণ থাকে। যেখানে লবণাক্ততার মধ্যবর্তী মান সৃষ্টি হয়েছে, সেখানেই মিশ্রণের প্রমাণ উপস্থিত। সেই মিশ্রণ-অঞ্চলকে একইসঙ্গে ‘মিশ্রণ একেবারেই বন্ধ করে’ বলে বর্ণনা করা স্ববিরোধিতা। মুজাহিদের ‘মিশে না’ বক্তব্যকে নির্ভুল দেখানোর জন্য বৈজ্ঞানিক মিশ্রণ-অঞ্চলের বাস্তব বৈশিষ্ট্যই এখানে উল্টো করে উপস্থাপন করা হয়েছে। [60]

এই উদাহরণটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে ব্যাখ্যা পরিবর্তনের তিনটি স্তর একই লেখায় দেখা যায়: প্রথমে সালাফদের নামে সংরক্ষিত অদৃশ্য বাধার বর্ণনা গ্রহণ; তারপর আধুনিক ভূগর্ভস্থ পানির গাণিতিক সম্পর্ককে ‘প্রমাণ’ হিসেবে হাজির; সবশেষে যে গবেষণা প্রকৃত মিশ্রণ ও লবণ বিস্তার দেখায়, তাকে অমিশ্রণের প্রমাণ বলে ঘোষণা। সালাফদের শব্দ অপরিবর্তিত রাখা হলেও তার ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে অনেক পরের ভৌত ধারণা, এবং বৈজ্ঞানিক ফলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সেই ফলের প্রকৃত অর্থ বিকৃত হচ্ছে। এভাবে তৈরি ‘বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা’ বাস্তবের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; তা বাছাই করা ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও ভুল বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনার সমন্বয়।


আরবি “বারযাখ” শব্দের আভিধানিক অর্থ ও ব্যাখ্যাকারদের দেওয়া নির্দিষ্ট ভৌত দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো অন্তরায় বা পৃথকতার ধারণা নিজে থেকেই আধুনিক বিজ্ঞানের সব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে না। সংঘর্ষটি সৃষ্টি হয় তখনই, যখন মুফাসসিরের বর্ণনায় বলা হয় মিষ্টি ও লোনা পানি সংস্পর্শে এলেও মিশবে না, বা একটির স্বাদ অন্যটির দ্বারা বদলাবে না। এই দাবিকে সত্য বা মিথ্যা করার মানদণ্ড হলো পানির বাস্তব আচরণ। নমুনায় যদি দুই উৎসের পানির উপাদান মিলে যায়, এবং সংযোগস্থলে মধ্যবর্তী লবণাক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে ওই কঠোর অমিশ্রণ দাবিটি মিথ্যা। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে কোনো কৃত্রিম বিবাদ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই; নির্দিষ্ট দাবি আর নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের তুলনাই যথেষ্ট।


পরীক্ষায় কোন দাবিটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়?

“মিষ্টি ও লোনা পানি কখনো মিশে না”—এটি সরাসরি পরীক্ষাযোগ্য দাবি। মিষ্টি ও লোনা পানির সংযোগস্থলে বিভিন্ন স্থান ও গভীরতা থেকে নমুনা নিয়ে লবণাক্ততা পরীক্ষা করলেই ফল পাওয়া যায়। পৃথক দুই জলরাশির মাঝখানে যদি সত্যিই মিশ্রণ-নিষিদ্ধ অভেদ্য বাধা থাকত, তাহলে সেই সংযোগস্থলে মিশ্র লবণাক্ততার পানি এবং উভয় দিকের লবণের বিনিময় পাওয়া যেত না। অথচ বাস্তবে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মোহনার পানি মিষ্টি ও লোনা পানির সংমিশ্রণে তৈরি; এই আধা-লবণাক্ত পানির লবণাক্ততা সাধারণত প্রতি হাজার ভাগে প্রায় ০.৫ থেকে ৩৫ ভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। স্থানের গভীরতা, জোয়ার-ভাটা, বাতাস ও নদীর প্রবাহ অনুসারে এই পরিমাণ বদলায়। [61]

মোহনায় পানির স্তর আলাদা দেখা যাওয়া এবং পানির না-মেশা এক নয়। একই স্থানে ওপরের স্তরে অপেক্ষাকৃত মিষ্টি ও নিচে বেশি লবণাক্ত পানি থাকতে পারে, তবু দুই স্তরের সীমানা দিয়ে লবণ ও পানির বিনিময় চলে। নিউইয়র্কের হাডসন নদীতে জোয়ারের স্রোতে লোনা পানি ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি উজানে যেতে পারে বলে NOAA উল্লেখ করেছে। নদী ও সমুদ্রের পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকার দাবি এই বাস্তব লবণপ্রবেশ, প্রবাহ ও মিশ্রণের সঙ্গে সরাসরি অসংগত। [62]

একটি উদাহরণে সমস্যাটি পরিষ্কার হয়। কোনো মোহনার ওপরের স্তরে পানির লবণাক্ততা খুব কম, মাঝের স্তরে মাঝারি এবং নিচের স্তরে সমুদ্রের মতো বেশি হলে তিনটি স্তরই দেখায় যে সেখানে ভিন্ন পরিমাণে মিষ্টি ও লোনা পানির প্রভাব রয়েছে। যদি দুটি জলরাশি কোনোভাবেই মিশতে না পারত, তাহলে মাঝের স্তরে এ ধরনের পরিবর্তিত লবণাক্ততা তৈরি হওয়ার কথা নয়। জলরাশির প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য সব জায়গায় একই মাত্রায় থাকবে—এমনটিও বিজ্ঞান বলে না। জোয়ার, নদীপ্রবাহ, ভূপৃষ্ঠের আকৃতি, বাতাস ও জলরাশির ঘনত্ব অনুসারে মিশ্রণের মাত্রা বদলায়। কম মেশা, দেরিতে মেশা, স্তরবিন্যাস বজায় রেখে মেশা এবং একেবারেই না-মেশা—চারটি আলাদা দাবি। প্রাচীন ব্যাখ্যায় যে চূড়ান্ত অমিশ্রণের কথা বলা হয়েছে, তা প্রথম তিনটির কোনোটির সঙ্গে এক নয়। [63]

বৈজ্ঞানিক তথ্যের আরেকটি শক্ত দিক হলো, এখানে কেবল “দুটি রঙ পাশাপাশি দেখা যায়” ধরনের চোখের বিভ্রমের ওপর নির্ভর করতে হয় না। একটি নদীর নিম্নপ্রবাহ ও মোহনার বিভিন্ন স্থানে পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে পানির তড়িৎ পরিবাহিতা, লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্ব মাপা যায়। একই স্থান থেকে বিভিন্ন গভীরতায় নমুনা নিয়ে পরিমাণগত ফল তুলনা করা যায়। জোয়ারের সময়ে লবণাক্ত পানির উজানের দিকে অগ্রগতি এবং ভাটায় তার অবস্থান বদলানো নথিবদ্ধ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের সংকলনে ১৪৭টি মোহনার দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার তথ্যের ভিত্তিতে মিষ্টি, মিশ্র এবং সমুদ্রপানির অঞ্চল পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিমাপযোগ্য বাস্তবতাই অভেদ্য অমিশ্রণ-প্রতিবন্ধকের দাবিকে বাতিল করে। [64]


আলেম-ওলামাদের বক্তব্য

এবারে আসুন আধুনিক সময়ের বাংলাদেশি আলেম মিজানুর রহমান আযহারীর কিছু বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,



সমুদ্র বদলায়নি, বদলেছে কোরআনের ব্যাখ্যা

এই বিতর্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কোরআনের ভাষা বদলায়নি, কিন্তু কোরআনের ব্যাখ্যা বারবার বদলানো হয়েছে। প্রাচীন মুফাসসিরদের একটি প্রভাবশালী ধারায় “বারযাখ” ছিল এমন এক বাধা, যার কারণে মিষ্টি ও লোনা পানি একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারে না, একটির স্বাদ অন্যটি নষ্ট করতে পারে না, এমনকি অনেক ব্যাখ্যায় সরাসরি বলা হয়েছে—“তাদের মাঝে আছে অদৃশ্য দেয়াল।” তখন এই ব্যাখ্যাই ছিল স্বাভাবিক, কারণ দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণেও অনেক ক্ষেত্রে দুটি জলরাশিকে পাশাপাশি পৃথক অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান যখন যন্ত্রনির্ভর পর্যবেক্ষণ, গভীরতাভিত্তিক লবণাক্ততা পরিমাপ, মোহনার পানি-সঞ্চালন, ব্যাপন, প্রবাহের বিক্ষুব্ধতা এবং আধা-লবণাক্ত পানির উপস্থিতির মাধ্যমে দেখিয়ে দিল যে পানি বাস্তবেই মিশে যায়, তখন সেই পুরনো ব্যাখ্যা হঠাৎ অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। পরবর্তী ব্যাখ্যার একটি ধারায় প্রাচীন কঠোর অমিশ্রণ-অর্থকে পাশ কাটিয়ে বলা হলো—বারযাখ আর পানি মেশার বাধা নয়; সেটি নাকি কেবল ঘনত্বের পরিবর্তনঢাল, হ্যালোক্লাইন, মিশ্রণ অঞ্চল, কিংবা এমন একটি সীমা যার মধ্য দিয়েই পানি দিব্যি মিশে যাচ্ছে।

এখানে পদ্ধতিটা লক্ষ্য করার মতো। প্রথমে বলা হয়, কোরআন এমন একটি বৈজ্ঞানিক সত্য জানিয়েছিল যা মানুষ জানত না। এরপর বিজ্ঞান যখন সেই দাবির বিপরীত ফল দেখায়, তখন কোরআনের বক্তব্যকে বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন করে অর্থ দেওয়া হয়। তারপর সেই নতুন অর্থকেই আবার “কোরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিক নিদর্শন” হিসেবে বাজারজাত করা হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞান এখানে যাচাইয়ের বিষয় নয়, বরং চূড়ান্ত মানদণ্ড; কোরআনকে সেই মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ক্রমাগত অর্থ এদিক-সেদিক করা হয়। বিজ্ঞান যদি বলে পানি মেশে না—তাহলে কোরআন নাকি আগেই বলেছে পানি মেশে না। বিজ্ঞান যদি বলে পানি মেশে—তাহলে কোরআন নাকি আসলে “মেশে, কিন্তু বৈশিষ্ট্যগত সীমা থাকে” বলেছে। বিজ্ঞান যদি হ্যালোক্লাইন বলে—কোরআনের “বারযাখ” তখন হ্যালোক্লাইন হয়ে যায়। অর্থাৎ ফলাফল আগে বিজ্ঞান থেকে নেওয়া হয়, এরপর সেই ফলাফল কোরআনের শব্দের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বলা হয়—দেখুন, কোরআন চৌদ্দশ বছর আগেই সব জানত।

এটি বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এটি পশ্চাৎমুখী অর্থ-সমন্বয়। কোনো বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক পূর্বজ্ঞান বলতে হলে বক্তব্যটি এমন হতে হবে যার অর্থ ফলাফল জানার আগেই নির্দিষ্ট ছিল, সুস্পষ্ট (দ্ব্যর্থহীন) এবং পরে পরীক্ষায় সেটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এ ধরনের আধুনিক অলৌকিকতার দাবিতে ঘটেছে উল্টোটা। পানির ঘনত্ব ও মিশ্রণের বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রতিষ্ঠার পর পুরনো ধর্মীয় বাক্যের অর্থ সেই ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। আরও বিস্ময়কর হলো, প্রাচীন তাফসীরগুলোতে যখন “لا يختلطان”, “لا يختلط العذب بالملح”, “يمنعهما التمازج”—অর্থাৎ “মিশে না”, “মিশতে দেয় না”, “মিশ্রণ প্রতিরোধ করে”—এরকম দ্ব্যর্থহীন ভাষা ছড়িয়ে আছে, তখন আধুনিক ধর্মীয় আত্মপক্ষসমর্থনমূলক ব্যাখ্যায় সেগুলো কার্যত পাশ কাটিয়ে কোরআনের মধ্যে এমন একটি oceanography ঢোকানো হচ্ছে, যা সেই মুফাসসিরদের কেউই চিনতেন না। তারা কোরআনকে বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি; আধুনিক ধর্মীয় আত্মপক্ষসমর্থকেরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার পরে কোরআনকে বিজ্ঞানের ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যা করছেন।

দুই 7

এই কারণে “কোরআনে বিজ্ঞান” দাবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোরআনের কোনো একটি শব্দ নয়, বরং ব্যাখ্যার এই চলমান স্থানান্তর। দাবিটি পরীক্ষাযোগ্য থাকে না, কারণ বিজ্ঞান যেদিকেই যাক, কোরআনের অর্থকেও সেদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। আগে “মেশে না” ছিল অলৌকিক নিদর্শন, পরে “মিশে কিন্তু পুরোপুরি একাকার হয় না” হলো অলৌকিক নিদর্শন, এরপর “মিশ্রণ অঞ্চলে পরিবর্তনঢাল থাকে” সেটিও অলৌকিক নিদর্শন। এই পদ্ধতিতে কোনো ধর্মগ্রন্থকেই কখনো ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয়, কারণ প্রতিটি নতুন বৈজ্ঞানিক ফলাফলের পরে পুরনো বাক্যের নতুন অর্থ বানানো যায়। বাস্তবে তাই বিজ্ঞান কোরআনকে সত্য প্রমাণ করছে না; বিজ্ঞান আবিষ্কার করছে, আর ধর্মীয় আত্মপক্ষসমর্থনমূলক ব্যাখ্যা তার পেছনে দৌড়ে কোরআনের অর্থ বদলে সেই আবিষ্কারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে।


ইবন বাযের দুই বিপরীত ব্যাখ্যা: পানি মেশে, আবার মেশেও না

এই আয়াতকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানোর সমস্যাটি কতটা প্রকট, তার একটি চমৎকার উদাহরণ সৌদি আরবের প্রভাবশালী সালাফি আলেম শাইখ আবদুল আজিজ ইবন বাযের বক্তব্যেই পাওয়া যায়। একই আয়াত—সূরা আর-রাহমান ১৯–২০—ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত একটি উত্তরে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, সমুদ্রের পানি মিশে যায়। তাঁর বক্তব্য: «فالبحار تختلط»—“সমুদ্রগুলো মিশে।” এরপর তিনি বলেন, আল্লাহ যখন সেগুলোকে পৃথক করতে চান তখন নদীর পানি আলাদা এবং সমুদ্রের পানি আলাদা হয়ে যায়; নদী মিষ্টি এবং সমুদ্র লবণাক্ত অবস্থায় থাকে। [65]

فالبحار تختلط، ثم إذا أراد الله تمييزها، تميز هذا من هذا
বাংলা অনুবাদ: “সমুদ্রগুলো মিশে যায়; এরপর আল্লাহ যখন সেগুলোকে পৃথক করতে চান, তখন এটি ওটি থেকে পৃথক হয়ে যায়।”

কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, একই ইবন বায একই আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যায় ঠিক বিপরীত কথা বলেছেন। সেখানে প্রশ্ন ছিল, “মারাজাল বাহরাইনি ইয়ালতাকিয়ান, বাইনাহুমা বারযাখুন লা ইয়াবগিয়ান” আয়াতটির অর্থ কী। এবার ইবন বায বলেন, আয়াতটি তার “ظاهرها”—অর্থাৎ প্রকাশ্য বা সরল অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তাঁর ক্ষমতায় মিষ্টি ও লোনা পানির মধ্যে বাধা রেখেছেন; একটি একদিকে, অন্যটি অন্যদিকে এবং তাঁর স্পষ্ট ভাষায়: «لا يختلطان»—“দুটি মিশে না।” [66]

هذا على حدة وهذا على حدة، لا يختلطان
বাংলা অনুবাদ: “এটি আলাদা এবং ওটি আলাদা; তারা পরস্পর মিশে না।”

অর্থাৎ একই আলেম, একই আয়াত এবং একই মিষ্টি ও লোনা পানির প্রসঙ্গে এক জায়গায় বলছেন “সমুদ্রগুলো মিশে”, আর অন্য জায়গায় বলছেন “তারা মিশে না”। দুটি বক্তব্য একই অর্থ বহন করে না; এগুলো সরাসরি বিপরীত। প্রথম বক্তব্যটি বাস্তব পর্যবেক্ষণের সামনে আয়াতকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ দেয়—পানি মিশে, কিন্তু পরে কোনোভাবে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। দ্বিতীয় বক্তব্যটি আবার সেই পুরনো আক্ষরিক তাফসীরের সাথেই মিলে যায়—আল্লাহর স্থাপিত বাধার কারণে পানি আদৌ মিশে না। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো “মিশে”, কখনো “মিশে না” বললে আয়াতটিকে যে কোনো বৈজ্ঞানিক ফলাফলের সাথেই খাপ খাওয়ানো সম্ভব; কিন্তু সেটি আয়াতের বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার প্রমাণ নয়, বরং ব্যাখ্যার অসঙ্গতির প্রমাণ।


বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি: ‘অভেদ্য অন্তরায়’ কেন একটি ভুল প্রাকৃতিক ধারণা?

কোরআনের “বারযাখ” বা অন্তরায়কে যেসব ধ্রুপদী তাফসীরে মিষ্টি ও লোনা পানির মিশ্রণ সম্পূর্ণ রোধকারী বাধা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেই দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। নদী ও সমুদ্রের সংযোগস্থলে দৃশ্যমান সীমারেখা কিংবা ঘনত্বের কারণে স্তরবিন্যাস তৈরি হতে পারে; এগুলো অভেদ্য প্রাচীর নয়। বাস্তব মোহনায় লবণাক্ততা পরিমাপ, জোয়ারের স্রোত এবং মিশ্র পানির উপস্থিতি দেখায়, দুই জলরাশির মধ্যে নিয়মিত মিশ্রণ ঘটে। তাই “মিলিত হয় কিন্তু মিশে না”—এমন আক্ষরিক দাবি পর্যবেক্ষণ ও পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে অসংগত।

প্রথমত, আণবিক ব্যাপন এবং প্রবাহের বিক্ষুব্ধতার কারণে সংযুক্ত জলরাশির মধ্যে পানি ও দ্রবীভূত পদার্থের আদান-প্রদান ঘটে। পানির অণু এবং দ্রবীভূত লবণ সর্বদা আণবিক গতিতে থাকে। লোনা ও মিষ্টি পানি সংস্পর্শে এলে লবণের ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে আণবিক ব্যাপন ঘটে; একই সঙ্গে স্রোত, জোয়ার এবং বিক্ষুব্ধ প্রবাহ দুই জলরাশির মধ্যে পানি ও লবণের ভরবিনিময় ঘটায়। এমনকি যদি সমুদ্র শান্তও থাকে, তবুও আণবিক পর্যায়ে এই মিশ্রণ প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে [67]।

দ্বিতীয়ত, লবণাক্ততা গভীরতার সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হলে সেই স্তরকে হ্যালোক্লাইন (Halocline) বলা হয়। এটি কোনো অভেদ্য দেয়াল নয়; এটি একটি লবণাক্ততার পরিবর্তনঢাল বা লবণাক্ততার পরিবর্তনশীল স্তর। NOAA-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মোহনায় নদীর মিষ্টি পানি কম ঘন হওয়ায় অধিক ঘন সমুদ্রের পানির ওপর অবস্থান করতে পারে এবং কখনো শক্ত স্তরবিন্যাস তৈরি করতে পারে। কিন্তু মিশ্রণের পরিমাণ বাতাস, জোয়ার-ভাটা, নদীর প্রবাহ ও মোহনার আকৃতির ওপর নির্ভর করে; কোনো মোহনায় মিশ্রণ কম, আবার কোনো মোহনায় ব্যাপক। এই কারণেই সমুদ্রবিজ্ঞানে লোনা পানির কীলকাকৃতি স্তর, আংশিক মিশ্রিত এবং উপর-নিচে সম্পূর্ণ মিশ্রিত মোহনার মতো বিভিন্ন অবস্থা স্বীকৃত। অর্থাৎ দৃশ্যমান স্তর বা সীমারেখা পানির অমিশ্রণ প্রমাণ করে না। [68]

তৃতীয়ত, মোহনার পানির আচরণ ব্যাখ্যা করতে কোনো স্থায়ী বা অভেদ্য বাধার প্রয়োজন হয় না। নদীর প্রবাহ, জোয়ার-ভাটা, বাতাস, ঘনত্বজনিত স্রোত এবং বিক্ষুব্ধ মিশ্রণ ক্রমাগত দুই জলরাশির মধ্যে পানি ও দ্রবীভূত লবণ পরিবহন করে। কোনো কোনো মোহনায় স্তরবিন্যাস এত শক্ত হতে পারে যে উপরে অপেক্ষাকৃত মিষ্টি পানি এবং নিচে অধিক লবণাক্ত পানি দীর্ঘ সময় পৃথক স্তরের মতো দেখা যায়; আবার জোয়ার, ঝড় বা প্রবল বাতাস সেই স্তরবিন্যাস ভেঙে ব্যাপক মিশ্রণ ঘটাতে পারে। অর্থাৎ বাস্তব সমুদ্রবিজ্ঞানের চিত্র হলো স্তরবিন্যাস ও মিশ্রণ একই সঙ্গে চলতে পারে—কোনো অনতিক্রম্য দেয়াল দুই পানিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে না। [69]

দুই 9

পরিশেষে, জিব্রাল্টার প্রণালী, নদীর মোহনা কিংবা আলাস্কা উপসাগর বলে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওতে জলরাশির দৃশ্যমান রঙের সীমারেখা দেখানো হয়। এমন রেখার কারণ স্থানভেদে পলি, শৈবাল, তাপমাত্রা, ঘনত্ব, লবণাক্ততা কিংবা পানির ভিন্ন উৎস হতে পারে; নির্দিষ্ট ভিডিওর উৎস ও পরিমাপ ছাড়া একই কারণ সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা যায় না। এই রেখাটি স্থির নয় এবং এটি কোনোভাবেই পানির আণবিক বিনিময় রোধ করতে পারে না। সুতরাং, কোরআনে যে ‘অনতিক্রম্য ব্যবধানে’র কথা বলা হয়েছে, তা ছিল প্রাচীন মানুষের স্থূল পর্যবেক্ষণের একটি ভুল ব্যাখ্যা, যা বাস্তব পানির আচরণ সম্পর্কে পরীক্ষাযোগ্য হলে আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের তথ্যের সঙ্গে মেলে না।


সমুদ্রের গতিপথ পর্যবেক্ষণ: নাসা

নাসার এই দৃশ্যায়ন সমুদ্রে ক্ষুদ্র কণা ছেড়ে সেগুলোর উপগ্রহ-সংকেত অনুসরণ করে তৈরি হয়নি। এটি ইকো-২ (ECCO2) নামে পরিচিত এমআইটি ও নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির সমুদ্রসঞ্চালনের গাণিতিক মডেলের ফলাফল থেকে তৈরি। মডেলটি উপগ্রহ ও সরাসরি পরিমাপের তথ্য একত্র করে ভূমধ্যসাগর এবং পূর্ব আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোত প্রদর্শন করে। দৃশ্যায়নে সাদা রেখাগুলো পৃষ্ঠের কাছাকাছি এবং নীল রেখাগুলো গভীর স্রোতের প্রতিনিধিত্ব করে। ভিডিওটি জলপ্রবাহের জটিল আন্তঃসংযোগ দেখায়; মিষ্টি ও লোনা পানির মিশ্রণ সরাসরি যাচাইয়ের প্রধান প্রমাণ আসে মোহনার লবণাক্ততার পরিমাপ ও আধা-লবণাক্ত পানির বিস্তার থেকে। [70]

Ocean current flows in the Mediterranean


উপসংহার

প্রাচীন মানুষ নদী, হ্রদ ও সমুদ্রের পানির ভিন্ন স্বাদ, রঙ, ঘনত্ব এবং প্রবাহের আচরণ বহু আগেই পর্যবেক্ষণ করেছিল। অ্যারিস্টটল মিষ্টি পানিকে হালকা ও লোনা পানিকে ভারী বলেছেন এবং বাষ্পীভবন-ঘনীভবন-বৃষ্টির জলচক্রও ব্যাখ্যা করেছেন; প্লিনি সমুদ্রের ওপর মিষ্টি পানির স্তর ভাসার কথা লিখেছেন; পরবর্তী গ্রিক-রোমান লেখকরাও একই ধরনের জলবৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। কোরআনের পর ধ্রুপদী মুসলিম মুফাসসিরদের একটি দীর্ঘ ধারা আবার ‘বারযাখ’-এর অর্থ করেছে এমন বাধা, যার কারণে দুই পানি “মিশে না”। আজকের সমুদ্রবিজ্ঞান পরিষ্কারভাবে দেখায়, মিষ্টি ও লোনা পানির মধ্যে শক্ত স্তরবিন্যাস, লোনা পানির কীলকাকৃতি স্তর বা হ্যালোক্লাইন থাকতে পারে, কিন্তু এগুলো কোনো অভেদ্য দেয়াল নয়; দুই জলরাশির মধ্যে মিশ্রণ ও ভরবিনিময় বাস্তবেই ঘটে এবং তার ফলেই আধা-লবণাক্ত পানি সৃষ্টি হয়। ফলে এই আয়াতকে আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের কোনো অগ্রিম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই। ধ্রুপদী তাফসীরের একটি প্রভাবশালী ধারা পানির বাস্তব অমিশ্রণ দাবি করেছে, যা পরীক্ষায় ভুল; অন্য প্রাচীন ব্যাখ্যায় স্থলভাগ অথবা কিছু মাত্রায় মিশ্রণও স্বীকার করা হয়েছে। পরবর্তী যুগের ঘনত্ব-নির্ভর ব্যাখ্যা এই প্রাচীন মতগুলোর কোনোটিকেই গোপনে আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের নিখুঁত পূর্বাভাসে পরিণত করে না। পানি অবশ্য শেষ পর্যন্ত ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা মানে না; পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই চলে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. অ্যারিস্টটল, মেটিওরোলজিকা, দ্বিতীয় খণ্ড ↩︎
  2. প্লিনি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি, দ্বিতীয় খণ্ড, অনুচ্ছেদ ১০৬ ↩︎
  3. Seneca, Naturales Quaestiones, Book III, §§4–5, 26 ↩︎
  4. Alexander of Aphrodisias, Quaestiones 3.10, “About the Sea”; R. W. Sharples, Alexander of Aphrodisias: Quaestiones 2.16–3.15 ↩︎
  5. সূরা ফুরকান, আয়াত ৫৩ ↩︎
  6. সূরা আর রাহমান, আয়াত ১৯ ↩︎
  7. সূরা আর রাহমান, আয়াত ২০ ↩︎
  8. সূরা আর-রাহমান ৫৫:১৯–২০ ↩︎
  9. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২২৭ ↩︎
  10. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৫৮৮-৫৮৯ ↩︎
  11. তাফসীরে মাযহারী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৩, ৫৬৪ ↩︎
  12. ইবন কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল আযীম, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩, মূল আরবি ↩︎
  13. ইবন কাসীর, সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০ ↩︎
  14. তাফসীরে তাবারী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  15. তাফসীরে তাবারী: মুজাহিদের বক্তব্যসমূহ ↩︎
  16. তাফসীরে ইবন আবি হাতিম, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  17. ইবন আবি হাতিম, তাফসীরুল কোরআনিল আযীম, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩, বর্ণনা ১৫২৬৭ ↩︎
  18. তাফসীরুল মা’ছূর: সূরা ফুরকান ২৫:৫৩, মুকাতিল ইবন সুলাইমানের বক্তব্য ↩︎
  19. তাফসীরুল মা’ছূর: সূরা রাহমান ৫৫:২০, মুকাতিল ইবন সুলাইমানের বক্তব্য ↩︎
  20. বাহরুল উলূম, সামারকান্দী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  21. শামেলা: বাহরুল উলূম, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৪২ ↩︎
  22. মাআলিমুত তানযীল, বাগাভী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  23. তাফসীরে কুরতুবী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  24. মাফাতীহুল গায়ব, ফখরুদ্দীন রাযী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  25. তাবারী, জামি‘ আল-বায়ান, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩, সংকলিত বর্ণনা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত ↩︎
  26. তাবারী ২৫:৫৩ — মুজাহিদের বর্ণনা ↩︎
  27. তাফসীরুল মা’ছূর — মুকাতিলের বক্তব্য ↩︎
  28. তাফসীরে ইবন আবি হাতিম ২৫:৫৩ ↩︎
  29. জামি‘ আল-বায়ান, তাবারী ২৫:৫৩ ↩︎
  30. বাহরুল উলূম ২৫:৫৩ ↩︎
  31. মাআলিমুত তানযীল ২৫:৫৩ ↩︎
  32. মাফাতীহুল গায়ব ২৫:৫৩ ↩︎
  33. আল-জামি‘ লি আহকামিল কোরআন ২৫:৫৩ ↩︎
  34. তাফসীরে ইবন কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৮, পৃ. ২২৭; খণ্ড ১০, পৃ. ৫৮৮–৫৮৯; উপরের মুদ্রিত পাতার ছবি ↩︎
  35. তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ৮, পৃ. ৫৬৩–৫৬৪; উপরের মুদ্রিত পাতার ছবি ↩︎
  36. বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ১৬৩; নাসাফীর তাফসীরের উদ্ধৃতি ↩︎
  37. কুরতুবী, সূরা নামল ২৭:৬১ — তাফসীরের প্রাসঙ্গিক পাঠ ↩︎
  38. তাবারী, সূরা নামল ২৭:৬১ ↩︎
  39. জালালুদ্দীন সুয়ূতী, আদ-দুররুল মানসূর, সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১১২–১১৩ ↩︎
  40. আবু হাইয়ান, আল-বাহরুল মুহীত, সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০ ↩︎
  41. ইবন আতিয়্যা, আল-মুহাররারুল ওয়াজীয, সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০ ↩︎
  42. ইবন হাজর আসকালানী, ফাতহুল বারী, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৯০; সূরা রাহমানের ব্যাখ্যা ↩︎
  43. শিহাবুদ্দীন আলুসী, রূহুল মাআনী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩, খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ৩৫ ↩︎
  44. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৬৫০৯৪, ২১ মে ২০১১ ↩︎
  45. প্রথম যুগের বর্ণনাসমূহ, তাফসীরুল মা’ছূর, সূরা রাহমান ৫৫:২০ ↩︎
  46. সামারকান্দী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  47. তাবারী, সংকলিত ভিন্নমত ও নির্বাচিত ব্যাখ্যা ↩︎
  48. রাযী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  49. ইবন কাসীরের মূল আরবি ব্যাখ্যা ↩︎
  50. আলুসী, রূহুল মাআনী, সূরা ফুরকান ২৫:৫৩ ↩︎
  51. আবদুর রহমান আস-সা‘দী, তাইসীরুল কারীমির রাহমান, সূরা রাহমান ৫৫:১৯–২০; ইসলামওয়েব ↩︎
  52. ইবন আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত তানবীর, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ১৩; ইসলামকিউএ-তে মূল উদ্ধৃতি ↩︎
  53. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৬৫০৯৪, ২১ মে ২০১১, বিভিন্ন ব্যাখ্যার সংকলন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ↩︎
  54. ইসলামওয়েব, ‘وجعل بينهما برزخاً’, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ↩︎
  55. ইসলামওয়েব, ২০১৬ সালের অলৌকিকতার নিবন্ধ ↩︎
  56. তাবারী, মূল আরবি পাঠ ও নিজের নির্বাচিত ব্যাখ্যা ↩︎
  57. ইসলামওয়েবের গাইবেন–হার্জবার্গ সম্পর্কের ব্যাখ্যা, ২০১৬ ↩︎
  58. যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS), Ground Water in Freshwater-Saltwater Environments of the Atlantic Coast, ২০০৩: গাইবেন–হার্জবার্গ সম্পর্ক ও মিশ্রণ-অঞ্চল ↩︎
  59. USGS: লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও মিশ্রণ-অঞ্চল ↩︎
  60. ইসলামওয়েব, ২০১৬: মিশ্রণ-অঞ্চল ও অমিশ্রণ সম্পর্কে একই নিবন্ধের বক্তব্য ↩︎
  61. NOAA, মোহনার পরিচয় ও লবণাক্ততার পরিমাপ ↩︎
  62. NOAA, মোহনায় পানির চলাচল ও মিশ্রণের বিভিন্ন ধরন ↩︎
  63. NOAA: মোহনায় জলসঞ্চালন ও বিভিন্ন মাত্রার মিশ্রণ ↩︎
  64. NOAA: ১৪৭টি মোহনার লবণাক্ততা-অঞ্চল সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার ↩︎
  65. সংশয় ইসলাম আর্কাইভ: মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ২৮৬–২৯০; প্রাসঙ্গিক বক্তব্য পৃষ্ঠা ২৮৮ ↩︎
  66. ইবন বায: تفسير قول الله تعالى: مرج البحرين يلتقيان ↩︎
  67. NOAA, মোহনায় পানি চলাচল ও মিশ্রণ ↩︎
  68. NOAA National Ocean Service: Estuaries — Water Circulation and Mixing ↩︎
  69. NOAA National Ocean Service: Estuarine Circulation ↩︎
  70. NASA Scientific Visualization Studio: Ocean Current Flows around the Mediterranean Sea for UNESCO ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.