জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

মুসলিমের জন্য কাফেরের দেশে অমুসলিমদের মাঝে বসবাস হারাম

প্রকাশিত: এপ্রিল 24, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 7 মিনিট পড়া

ভূমিকা: একবিংশ শতাব্দী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্ব একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে, যেখানে বৈচিত্র্যই হলো শক্তির উৎস। একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক ও বহুজাতিক সমাজের ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার কর্মে, তার ধর্মীয় পরিচয়ে নয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু প্রাচীন ধর্মীয় অনুশাসন ও নির্দেশনা আজও এমন এক বিচ্ছিন্নতাবাদের শিক্ষা দেয়, যা একটি ডাইভার্স বা বৈচিত্র্যময় সমাজ গঠনের পথে প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে অমুসলিম বা ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে বসবাস ও মেলামেশা নিষিদ্ধ করার মতো ইসলামি কট্টরপন্থী মনোভাব আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।


নবী মুহাম্মদের হুকুমঃ বিচ্ছিন্নতাবাদের আদর্শ ও সামাজিক বিভাজন

ধর্মীয় ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, অমুসলিমদের সাথে সহাবস্থান ও বসবাস নিষিদ্ধ করার মতো চরম সাম্প্রদায়িক নির্দেশনাগুলো আজও অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছে পবিত্র জীবনাদর্শ হিসেবে বিবেচিত। সপ্তম শতাব্দীর আরব অঞ্চলের যুদ্ধবিগ্রহের প্রেক্ষাপটে এক নেতার দেওয়া এসব ধর্মীয় বিধান বর্তমানের অসাম্প্রদায়িক, বহুজাতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) সমাজ গঠনের পথে এক গুরুতর অন্তরায়। সহীহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো মুশরিকের সাহচর্যে থাকে এবং তাদের সাথে বসবাস করে, তবে সে তাদেরই মতো বলে গণ্য হবে। [1]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৯/ জিহাদ
১৮২. মুশরিকদের এলাকায় অবস্থান সম্পর্কে
২৭৮৭। সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কেউ কোনো মুশরিকের সাহচর্যে থাকলে এবং তাদের সাথে বসবাস করলে সে তাদেরই মতো।(1)
(1). সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মানবিক ও বহুত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরণের বক্তব্য অত্যন্ত ভয়াবহ; কারণ এটি সমাজে ‘আমরা বনাম ওরা’ (Us vs Them) নামক একটি অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে। যখন একজন মানুষকে কেবল তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে বর্জন করার এবং তাকে অস্পৃশ্য ভাবার শিক্ষা দেওয়া হয়, তখন সেই সমাজে বহুত্ববাদের (Pluralism) আর কোনো স্থান থাকে না। এই মতবাদ পারস্পরিক মেলামেশাকে ‘হারাম’ ঘোষণা করে মানুষের হৃদয়ে বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। আধুনিক সভ্যতায় যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উন্নতির পথে এগোচ্ছে, সেখানে এই প্রাচীন সাম্প্রদায়িক হুকুমগুলো সামাজিক বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক মনস্তত্ত্বকে উসকে দেয়। এই ধরনের ধর্মীয় গোঁড়ামি শুধু যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করে তা-ই নয়, বরং এটি উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের জন্য একটি আদর্শিক চারণভূমি তৈরি করে দেয়। দিনশেষে, ধর্মের নামে এই বিচ্ছিন্নতাবাদ মানবিক মূল্যবোধ এবং বিশ্বজনীন একতাবোধকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।


আধুনিক আলেমদের বক্তব্য

আসুন এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের আলেমদের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,


হিন্দু বৌদ্ধ বা অমুসলিমদের সম্পর্কে এই ধরণের বক্তব্য নতুন কিছু নয়। প্রায়শই বাংলাদেশের বিভিন্ন সভা সেমিনারে আলেমগণ হুঙ্কার ছেড়ে এসব কথা প্রকাশ্যেই বলেন। আসুন একটি ভিডিও দেখি,


‘কাফির দেশে’ বসবাস: একটি আধুনিকতাবিরোধী ফতোয়া

আধুনিক যুগে মানুষ উন্নত জীবন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু কট্টরপন্থী আলেমদের ফতোয়া এই বিশ্বায়নের যুগেও মানুষকে কূপমণ্ডূক করে রাখতে চায়। আল্লামা আলবানীর মতে, বর্তমানে কোনো কাফির দেশে মুসলিমের বসবাস করা জায়েজ নয় এবং কোনো মুসলিম দেশ থেকে বের করে দেওয়া হলেও তাকে অন্য কোনো মুসলিম দেশেই আশ্রয় খুঁজতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের আলোকে এই ধরনের ফতোয়া কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং বিশ্বজনীন নাগরিকত্বের ধারণাকে অস্বীকার করে। এটি শিক্ষিত সমাজেও অজ্ঞতা ও ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রসার ঘটায়, যা শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

আসুন শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিস আল্লামা আলবানীর একটি ফতোয়াটি পড়ে নিই [2]

প্রশ্ন ৪৮৬: কাফির দেশে বসবাস করার বিধান কী?
জবাব: আমাদের এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমানে কোনো কাফির দেশে মুসলিমের বসবাস করা জায়েয নয়। কাউকে যদি কোনো মুসলিম দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে সে অন্য কোনো মুসলিম দেশে চলে যাবে।

অমুসলিম

‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’: ঘৃণার ধর্মীয়করণ

ইসলামী আকীদার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত দিক হলো ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ বা আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা পোষণ করা। শায়েখ সালিহ আল-ফাওযানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মুসলিমের ওপর আবশ্যক হলো মুশরিকদের ঘৃণা করা এবং তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা, এমনকি তারা যদি নিজের পিতাও হয় [3]। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর একটি ধারণা। যে আদর্শ রক্ত সম্পর্কের ভাই বা পিতাকে কেবল বিশ্বাসের কারণে শত্রু হিসেবে গণ্য করতে শেখায়, তা কোনোভাবেই শান্তি বা সহমর্মিতার বার্তা হতে পারে না। এই ধরনের উগ্র মতবাদ অমুসলিমদের প্রতি চিরস্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষকে ধর্মের আবরণে বৈধতা দেয়, যা প্রকারান্তরে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের চারণভূমি তৈরি করে।

একইসাথে, ইসলামের আকীদা হচ্ছে অমুসলিমদের সম্পর্কে সর্বদাই বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করতে হবে। আসুন সারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ইসলামিক আলেম শায়েখ সালিহ আল-ফাওযান কী বলেছেন সেটি দেখে নিই –

আল ইরশাদ-ছহীহ আক্বীদার দিশারী
পৃষ্ঠা ৪৩৩
আল ওয়ালা ওয়াল বারা
বন্ধুত্ব রাখা এবং শত্রুতা পোষণ করার নীতিমালা
“সংক্ষিপ্তভাবে ইসলামী আক্বীদার মৌলিক বিষয়গুলো বর্ণনা করার পর একটি আবশ্যিক
বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করছি। তা হলো ইসলামী আকীদার এসব বিষয়কে দীন হিসাবে
গ্রহণকারী প্রত্যেক মুসলিমের উপর আবশ্যক হলো, যারা উপরোক্ত বিষয়গুলোকে তাদের
আক্বীদা হিসাবে গ্রহণ করে তাদেরকে বন্ধু বানাবে এবং যারা এগুলোর প্রতি শত্রুতা পোষণ
করে তাদেরকে শত্রু বানাবে। সুতরাং সে তাওহীদ ও ইখলাস ওয়ালাদেরকে ভালোবাসবে
এবং তাদেরকে বন্ধু বানাবে। সেই সঙ্গে মুশরিকদেরকে ঘৃণা করবে এবং তাদের প্রতি শত্রুতা
পোষণ করবে। এটি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তার সাথীদের দীনের অন্তর্ভুক্ত।
আমাদেরকে তাদের অনুসরণ করার আদেশ দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা সূরা মুমতাহানার
৪নং আয়াতে বলেন,
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا
تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُم وبدا بيننا وبينكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحدَهُ
“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীগণের মধ্যে চমৎকার নমুনা রয়েছে। যখন তারা
তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত
করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করছি।
তোমরা এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করা পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চির
শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত হয়েছে”।

মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীনের কথাও তাই। আল্লাহ তা’আলা আরো
বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ
فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
“হে ঈমানদারগণ! ইয়াহুদী ও খৃস্টানদেরকে নিজেদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা
পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর যদি তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তাদেরকে বন্ধু হিসাবে
পরিগণিত করে তাহলে সেও তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। অবশ্যই আল্লাহ যালেমদেরকে সঠিক
পথ প্রদর্শন করেন না”। (সূরা মায়েদা: ৫১) এ আয়াতে খাস করে আহলে কিতাবদেরকে বন্ধু
বানানো হারাম করা হয়েছে। সমস্ত কাফেরদেরকে বন্ধু বানানো হারাম ঘোষণা করে আল্লাহ
তা’আলা বলেন,

পৃষ্ঠা ৪৩৪
আল ইরশাদ-দ্বহীহ আক্বীদার দিশারী
إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخفيتم ومَا أَعْلَتُم ومن يفعلهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيل
“হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।
তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য আগমন
করেছে, তারা তা অস্বীকার করছে।
তারা রসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করে, এই
অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি
লাভের জন্য এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি
গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি
খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যায়”। (সূরা
মুমতাহানাহ: ১)
আল্লাহ মুমিনদের উপর কাফেরদেরকে বন্ধু বানানো হারাম করেছেন। যদিও তারা তার
বংশের সর্বাধিক নিকটবর্তী লোক হয়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, আল্লাহ তা’আলা আরো
বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنْ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الإِيمَانِ وَمَن يَتَولَّهُم
مِّنكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি
তারা কুফরকে ঈমানের উপর প্রাধান্য দেয়। তোমাদের মধ্য হতে যারা তাদেরকে
অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, তারাই হবে যালেম”। (সূরা তাওবা: ২৩) আল্লাহ তা’আলা
আরো বলেন,
ولَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادٌ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ
أبناء هُما أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشيرتهم
“যারা আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদেরকে তুমি আল্লাহ ও তার
রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে না। হোক না এই বিরুদ্ধাচরণকারীরা
তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জাতি-গোত্র”। (সূরা মুজাদালা: ২২)
এ বিরাট মূলনীতিটি সম্পর্কে অনেক মানুষ অজ্ঞ রয়েছে। আমি আরবী ভাষায় প্রচারিত
একটি রেডিও অনুষ্ঠানে একজন আলেম ও দাঈকে খৃষ্টানদের সম্পর্কে বলতে শুনেছি, তিনি
বলেছেন, খৃষ্টানরা আমাদের ভাই। এ রকম ভয়ঙ্কর কথা খুবই দুঃখজনক।
আল্লাহ তা’আলা যেমন ইসলামী আক্বীদা বিশ্বাসের দুশমন কাফেরদেরকে অভিভাবক
রূপে গ্রহণ করা হারাম করেছেন, ঠিক তেমনি তিনি মুমিনদেরকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ
করা ও তাদেরকে বন্ধু বানানো ওয়াজিব করেছেন।
আল্লাহ্ তা’আলা আরও বলেন:
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ * وَمَنْ
يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ
“আল্লাহ, তার রসূল এবং মুমিনগণই হচ্ছেন তোমাদের বন্ধু। যারা জ্বলাত কায়েম করে,
যাকাত দেয় এবং রুকু করে। আর যে আল্লাহ্ তার রসূল এবং মুমিনদেরকে বন্ধু বানায়,

মুশরিক 6
মুশরিক 8

সাম্প্রদায়িকতা বনাম ধর্মনিরপেক্ষ মানববাদ

ধর্মনিরপেক্ষ মানববাদ (Secular Humanism) শেখায় যে, প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু যখন ধর্মীয় টেক্সট থেকে শেখানো হয় যে ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হারাম [4], তখন তা সামাজিক সংহতিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। আল-ফাওযান এমনকি একজন আলেমকে এজন্য তিরস্কার করেছেন যে তিনি খ্রিষ্টানদের ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেছিলেন [5]। এই ধরনের কট্টরতা সমাজে ডেমোক্রেটিক ভ্যালু বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের টুঁটি চেপে ধরে। একটি আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে সকল ধর্মের মানুষ কর প্রদান করে এবং নাগরিক সুবিধা ভোগ করে, সেখানে এমন বিভাজনমূলক দর্শন রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।


উপসংহার: মানবিকতার জয়গান

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যযুগীয় আরব অঞ্চলের যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে দেওয়া সাম্প্রদায়িক নির্দেশনাগুলো বর্তমান যুগের গণতান্ত্রিক ও মানবিক মানদণ্ডে সম্পূর্ণ অনুপযোগী। ধর্ম যখন ঘৃণা আর বিভাজন শেখায়, তখন তা আর আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ থাকে না, বরং সহিংসতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল সমাজ গড়তে হলে আমাদের এই সব কট্টরপন্থী ও বর্জনমূলক মতবাদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধর্মের নামে মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন না দিয়ে, যুক্তি ও হিউম্যানিজমের ভিত্তিতে সকল মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। অন্যথায়, এই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাধারা সমাজকে কেবল ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যাবে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ২৭৮৭ ↩︎
  2. ফাতাওয়ায়ে আলবানী, আল্লামা মুহাম্মদ নাসীরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) , মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী (অনুবাদক) , শাইখ আব্দুল্লাহ মাহমুদ (অনুবাদক) , শাইখ ড. আব্দুল্লাহ ফারুক সালাফী (অনুবাদক), পৃষ্ঠা ৩৬৬ ↩︎
  3. আল ইরশাদ-ছ্বহীহ আক্বীদার দিশারী, পৃষ্ঠা ৪৩৩-৪৩৪ ↩︎
  4. সূরা মায়েদা: ৫১ ↩︎
  5. আল ইরশাদ-ছ্বহীহ আক্বীদার দিশারী, পৃষ্ঠা ৪৩৪ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.