সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে বাল্যবিবাহ এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম সমাজে বিপুলসংখ্যক মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহিত হচ্ছে; অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকেই বিবাহযোগ্যতার যথেষ্ট শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে আধুনিক শিশু-অধিকার, সম্মতির বয়স এবং ন্যূনতম বিবাহবয়সের ধারণার সঙ্গে শরিয়াভিত্তিক বিবাহব্যবস্থার সরাসরি সংঘাত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইয়েমেন, ইরাকসহ একাধিক দেশে ইসলামি সংগঠন, আলেম, ধর্মীয় পরিষদ ও রাজনৈতিক দল বাল্যবিবাহবিরোধী আইন বা ন্যূনতম বিবাহবয়সের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে নবীর সুন্নত, শরিয়া, ফিকহ এবং বয়ঃসন্ধিভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার ধারণা। কোথাও আইনকে ‘কুফরি’ বা ‘অনৈসলামিক’ বলা হয়েছে, কোথাও আইন বাতিলের আন্দোলন হয়েছে, কোথাও আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, আবার কোথাও ধর্মীয় পারিবারিক আইন ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এই প্রবন্ধে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে বাল্যবিবাহের বাস্তব প্রাদুর্ভাব, এর পক্ষে ধর্মীয় প্রচারণা, শরিয়াভিত্তিক আইনগত যুক্তি এবং ন্যূনতম বিবাহবয়সের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনের দলিল তুলে ধরা হয়েছে।
ভূমিকা
একজন শিশুর শারীরিক বয়ঃসন্ধি এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সক্ষমতা এক বিষয় নয়। একটি কিশোরী ঋতুমতী হয়েছে বলেই সে বৈবাহিক জীবন, যৌন সম্পর্ক, গর্ভধারণ, সন্তান পালন কিংবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর সঙ্গে অসম ক্ষমতার সম্পর্ক মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় না। প্রজননক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্কতার সমার্থক নয়। একজন শিশুর নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, শিক্ষা, আর্থিক নির্ভরতা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং যৌন সম্পর্কে অর্থপূর্ণ সম্মতির প্রশ্নকে বাদ দিয়ে শুধু বয়ঃসন্ধিকে বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা আধুনিক শিশু-অধিকারের ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
কিন্তু মুসলিম বিশ্বের বহু অঞ্চলে এই বয়ঃসন্ধিভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার ধারণা এখনো ধর্মীয় বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন ইসলামি ফিকহে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিবাহের ধারণা স্বীকৃত ছিল এবং মেয়ের অভিভাবক তার পক্ষে বিবাহের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। একই সঙ্গে নবী মুহাম্মদের সঙ্গে আয়িশার অল্প বয়সে বিবাহ ও দাম্পত্য শুরু হওয়ার প্রচলিত ইসলামি বর্ণনা পরবর্তী যুগে বাল্যবিবাহের পক্ষে একটি শক্তিশালী ধর্মীয় নজিরে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই সমসাময়িক ইসলামপন্থী বক্তা ও সংগঠনগুলোর প্রচারণায় বাল্যবিবাহকে প্রায়ই শুধু সামাজিক প্রথা নয়, বরং ‘সুন্নত’, ‘শরিয়তসম্মত’ এবং ধর্মীয় অধিকারের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
সমস্যাটি বিশেষভাবে গুরুতর হয়ে ওঠে যখন এই ধর্মীয় ধারণাকে আধুনিক রাষ্ট্রের আইন পরিবর্তনের দাবিতে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনকে ‘কুফরি আইন’ আখ্যা দিয়ে বাতিলের দাবি উঠেছে; পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ন্যূনতম বিবাহবয়স নির্ধারণকে ‘অনৈসলামিক’ বলা হয়েছে; ইয়েমেনে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের উদ্যোগ ধর্মীয় বিরোধিতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে; ইরাকে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের মাধ্যমে আবার বয়ঃসন্ধিভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার বিধান সামনে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে ‘সুন্নত’, ‘শরিয়া’, ‘ফিকহ’ ও ‘বুলুগ’ বা বয়ঃসন্ধির ধারণা সরাসরি শিশুদের জন্য নির্ধারিত আইনগত সুরক্ষার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলে বাল্যবিবাহের বাস্তব প্রাদুর্ভাবও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। লক্ষ লক্ষ মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহিত হচ্ছে; একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছরেরও আগে। এই বিয়ের সঙ্গে দ্রুত গর্ভধারণ, শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যাওয়া, আর্থিক নির্ভরতা, বৈবাহিক সম্পর্কে ক্ষমতার বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি যুক্ত হয়। অথচ এই বাস্তবতার মধ্যেই ধর্মীয় বক্তাদের একটি অংশ অল্প বয়সে বিয়েকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে সেটিকে নবীর আদর্শ অনুসরণের বিষয় হিসেবে প্রচার করে এবং রাষ্ট্রীয় বয়সসীমাকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে।
এই প্রবন্ধে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে মুসলিম-অধ্যুষিত বিভিন্ন দেশে বাল্যবিবাহের প্রাদুর্ভাব, বাল্যবিবাহের পক্ষে ধর্মীয় প্রচারণা, ‘সুন্নতী বাল্যবিবাহ’-এর ধারণা, শরিয়াভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার দাবি এবং ন্যূনতম বিবাহবয়সের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের দলিল পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে দেখা হবে, আধুনিক শিশু-অধিকার ও আইনগত প্রাপ্তবয়স্কতার ধারণার বিপরীতে কীভাবে প্রাক-আধুনিক ধর্মীয় বিধানকে বর্তমান সমাজে কার্যকর রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাল্যবিবাহ বলতে কী বোঝায় এবং বৈশ্বিক চিত্র
আন্তর্জাতিকভাবে ১৮ বছরের আগে সংঘটিত যেকোনো আনুষ্ঠানিক বিবাহ অথবা এমন অনানুষ্ঠানিক দাম্পত্য সম্পর্ক, যেখানে ১৮ বছরের কম বয়সী কেউ একজন সঙ্গীর সঙ্গে বিবাহিত দম্পতির মতো বসবাস করে, তাকে child marriage বা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার SDG 5.3.1 সূচকেও ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে কত শতাংশ ১৫ এবং ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিবাহিত বা দাম্পত্য সম্পর্কে প্রবেশ করেছিলেন, তা পরিমাপ করা হয়। এই সংজ্ঞার কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত সাধারণ নীতি—শিশুর শরীরে বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়া এবং আইনগত ও সামাজিক অর্থে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে কোনো ধর্মীয় বিধান, পারিবারিক সম্মতি বা সামাজিক রীতির মাধ্যমে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বিবাহকে বৈধ বলে দাবি করা হলেও আন্তর্জাতিক শিশু-অধিকারের মানদণ্ডে সেটি বাল্যবিবাহই থাকে [1]।
সমস্যাটির ব্যাপ্তি বিপুল। UNICEF-এর ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে জীবিত প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহিত হয়েছিল এবং বর্তমান বিশ্বেও আনুমানিক প্রতি পাঁচজন মেয়ের একজন শিশুকালেই বিয়ে করছে। গত এক দশকে বৈশ্বিক হার ২৩ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমেছে, কিন্তু এই গড় সংখ্যার আড়ালে অঞ্চলভেদে ভয়াবহ বৈষম্য রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও সেখানে সমস্যাটি বিলুপ্ত হয়নি; সাব-সাহারান আফ্রিকায় এখনও প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি তরুণী শিশুকালে বিবাহিত হচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের prevalence ছেলেদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি—অর্থাৎ এটি মূলত মেয়েশিশুর ওপর আরোপিত একটি লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা [2]।
বাল্যবিবাহের ভয়াবহতা শুধু এই কারণে নয় যে একটি মেয়ে আইনগত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে করছে। এই বিয়ের অর্থ প্রায়ই হচ্ছে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এমন বয়সে অন্যরা নিয়ে দিচ্ছে, যখন সে এখনো পরিবারনির্ভর, শিক্ষাজীবনে অবস্থান করছে এবং স্বামীর তুলনায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায় দুর্বল। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী বাল্যবিবাহের সঙ্গে দ্রুত গর্ভধারণ, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ এবং পারিবারিক সহিংসতার বাড়তি ঝুঁকি যুক্ত। বয়সে অনেক বড় পুরুষের সঙ্গে কিশোরীর বিবাহ এই ক্ষমতার অসমতাকে আরও তীব্র করে। ফলে ‘বিয়ে হয়ে গেছে’ কথাটির আড়ালে আসলে একটি শিশুর শিক্ষা, যৌন স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা একযোগে সংকুচিত হতে পারে [2]।
বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র: প্রায় অর্ধেক নারী ১৮ বছরের আগেই বিবাহিত
বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল Multiple Indicator Cluster Survey বা MICS 2025 দেশের বাল্যবিবাহ পরিস্থিতির একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরে। ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার বিবাহিত হয়েছেন এবং ১৩.৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর হওয়ার আগেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রজন্মের প্রায় প্রতি দুইজন তরুণীর একজনের বিয়ে হয়েছে শিশুকালে, আর প্রায় প্রতি সাতজনের একজনের বিয়ে হয়েছে এমন বয়সে যখন তারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়েরও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকার কথা। এই সংখ্যা কোনো বিচ্ছিন্ন গ্রাম, বিশেষ জনগোষ্ঠী বা পুরনো প্রজন্মের তথ্য নয়; এটি বাংলাদেশের সব ৬৪ জেলা অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ফল [3] [4]।
২০১৯ সালে ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা ৪৭.২ শতাংশে নেমেছে। ১৫ বছরের আগে বিয়ের হার একই সময়ে ১৫.৫ শতাংশ থেকে ১৩.৪ শতাংশে নেমেছে। এই পতন বাস্তব, কিন্তু এর আকার দেখে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। ছয় বছর পরও প্রায় অর্ধেক তরুণী ১৮ বছরের আগে বিয়ে করছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ১৫–১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে জরিপের সময় বিবাহিত থাকার হার ২০১৯ সালের ৩২.৯ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৩৮.৯ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ একটি সূচকে ধীরগতির উন্নতি দেখা গেলেও কিশোরীদের বর্তমান বৈবাহিক অবস্থার আরেকটি সূচক উল্টো দিকে গেছে। বাংলাদেশের বাল্যবিবাহকে দ্রুত বিলুপ্তির পথে থাকা সমস্যা হিসেবে দেখানোর কোনো পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই [5]।
এই সংকট সমাজের দরিদ্র ও কম শিক্ষিত অংশে আরও ভয়াবহ। MICS 2025-এ ১৮–৪৯ বছর বয়সী নারীদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রামীণ নারীদের প্রায় ৫৯ শতাংশ ১৮ বছরের আগে বিয়ে করেছিলেন; শহরে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ। কোনো শিক্ষা নেই বা কেবল প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে এমন নারীদের মধ্যে হার প্রায় ৬৯ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় পৌঁছানো নারীদের ক্ষেত্রে তা নেমে আসে প্রায় ২৭–২৮ শতাংশে এবং উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে আরও নিচে। দরিদ্রতম পরিবারে হার প্রায় ৬৫ শতাংশ, সর্বোচ্চ সম্পদশালী পরিবারে প্রায় ৪১–৪২ শতাংশ। অর্থাৎ যে মেয়েটির শিক্ষা যত দ্রুত বন্ধ হয় এবং যার পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষমতা যত কম, তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার ঝুঁকি তত বেশি। এই বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ শুধু একটি বিয়ের অনুষ্ঠান নয়; এটি মেয়েদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাহীনতার সঙ্গে যুক্ত এমন একটি ব্যবস্থা, যা এক প্রজন্মের নির্ভরশীলতাকে পরবর্তী প্রজন্মেও বহন করতে পারে [6]।
বাংলাদেশের অবস্থান আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যখন এই বিপুল prevalence-এর পাশে বাল্যবিবাহকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ রাখার প্রচারণাকে রাখা হয়। প্রায় অর্ধেক তরুণীর ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাওয়া এমন একটি সমাজে যখন প্রভাবশালী ওয়াজ বক্তা, আলেম বা ইসলামপন্থী সংগঠন আবার বয়ঃসন্ধিকে বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ড বলে প্রচার করে, বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’ বলে মহিমান্বিত করে অথবা এর বিরুদ্ধে আইনকে ধর্মবিরোধী বলে আক্রমণ করে, তখন তারা কোনো অদৃশ্য বা বিলুপ্ত ঐতিহাসিক প্রথাকে সমর্থন করছে না; তারা এমন একটি প্রথার ধর্মীয় বৈধতা রক্ষা করছে যা এখনও বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মেয়ের বাস্তব জীবনকে প্রভাবিত করছে। পরবর্তী ঘটনাগুলোতে এই ধর্মীয় প্রচারণার প্রকাশ্য রূপই দেখা যাবে।
বাংলাদেশের আইন: বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ, আবার একই আইনেই বাল্যবিবাহের বৈধ পথ
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ২ ধারায় বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষ এবং ১৮ বছরের কম বয়সী নারীকে ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক’ বলা হয়েছে। আইনের কাঠামো অনুযায়ী এই বয়সের নিচে বিয়ে বাল্যবিবাহ এবং এমন বিয়ে আয়োজন, সম্পাদন ও নিবন্ধনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কাগজে এটি একটি পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা বলেই মনে হয়। কিন্তু একই আইনের ১৯ ধারা সেই নিষেধাজ্ঞার ভেতরেই একটি বড় ব্যতিক্রম তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ অপ্রাপ্তবয়স্কের ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সম্মতিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিয়ে সম্পন্ন হলে সেটি এই আইনের অধীনে অপরাধ বলে গণ্য হবে না। অর্থাৎ যে আইন অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়েকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, সেই আইনই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেই একই কাজকে অপরাধের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার রাস্তা রেখেছে [7]।
ধারা ১৯-এর সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, সেখানে কোনো absolute minimum age নির্ধারণ করা হয়নি। আইনের ভাষা এমন নয় যে ১৬ বা ১৭ বছরের নিচে কোনো অবস্থাতেই বিয়ে হবে না; বরং ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক’ ব্যক্তির ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমটি প্রযোজ্য। ফলে আইনের ঘোষিত ১৮ বছরের সুরক্ষা একটি অনড় সীমা নয়। আদালতের নির্দেশ, অভিভাবকের সম্মতি এবং ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট’-এর শর্ত পূরণ করা গেলে তার নিচে বিয়েও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ শব্দটিও এখানে সমস্যাজনক, কারণ একটি শিশুর শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া, নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বৈবাহিক ও যৌন দায়িত্ব থেকে সুরক্ষিত থাকার পরিবর্তে তার বিয়েকেই কীভাবে ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ হিসেবে ঘোষণা করা যায়—আইন সেই মৌলিক দ্বন্দ্বটি দূর করেনি [8]।
২০১৮ সালের বিধিমালায় এই ব্যতিক্রম বাস্তবায়নের জন্য Assessment Committee বা মূল্যায়ন কমিটির ব্যবস্থা করা হয়; অর্থাৎ ধারা ১৯ কেবল কাগজে থাকা অলঙ্কারিক ব্যতিক্রম নয়, তাকে কার্যকর করার প্রশাসনিক পদ্ধতিও তৈরি করা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্কের পক্ষ, পিতা-মাতা বা অভিভাবক কারণ দেখিয়ে আবেদন করতে পারে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিয়ের অনুমতির প্রশ্ন বিবেচিত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের আইন একই সঙ্গে দুটি বিপরীত বার্তা দেয়: একদিকে বলে ১৮ বছরের নিচে মেয়ের বিয়ে বাল্যবিবাহ, অন্যদিকে সেই মেয়েকেই বিশেষ পরিস্থিতিতে বিয়ে দেয়ার বৈধ পথ তৈরি করে। একটি দেশে যেখানে সর্বশেষ জরিপেও প্রায় ৪৭ শতাংশ তরুণী ১৮ বছরের আগেই বিবাহিত হয়েছে, সেখানে এমন ব্যতিক্রম কোনো নিরীহ আইনগত সূক্ষ্মতা নয়; এটি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ঘোষিত বয়সসীমাকে নীতিগতভাবেই দুর্বল করে [9]।
এখানেই বাংলাদেশের আইনের মৌলিক অসঙ্গতি স্পষ্ট। রাষ্ট্র একদিকে একটি মেয়েকে ১৮ বছর পর্যন্ত বিবাহের উদ্দেশ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে স্বীকার করছে, আবার অন্যদিকে তার নিজের বা স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক সম্মতির পরিবর্তে আদালত ও অভিভাবকের অনুমোদনকে ব্যবহার করে সেই সুরক্ষা প্রত্যাহারের সুযোগ রাখছে। অথচ বাল্যবিবাহের সমস্যার কেন্দ্রেই রয়েছে এই অভিভাবকনির্ভর সিদ্ধান্ত—শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি শিশুর পরিবর্তে প্রাপ্তবয়স্করা নেয়। ফলে ১৯ ধারার কাঠামো বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইনের মূল নীতির ভেতরেই সেই পুরনো কর্তৃত্ববাদী ধারণাটিকে টিকিয়ে রেখেছে: নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরিবার ও কর্তৃপক্ষ একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের জন্য বিয়েকে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে। যে দেশে বাল্যবিবাহ ইতিমধ্যেই মহামারিসদৃশ মাত্রায় বিদ্যমান, সেখানে এই আইনি দরজাটি বন্ধ না রেখে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ’-এর ঘোষণা নিজেই অসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশে ‘সুন্নতী বাল্যবিবাহের’ পক্ষে সংগঠিত দাবি
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের পক্ষে ইসলামি যুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন আলেমের ব্যক্তিগত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক দাবি, মিছিল, সমাবেশ এবং সংগঠিত প্রচারণার ভাষায় হাজির হয়েছে। ‘আওয়ামী ওলামা লীগ’ নামের সংগঠনটি একাধিকবার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এবং এই আইনকে সরাসরি ‘কুফরি আইন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ২০১৭ সালের ৪ মার্চ তারা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন বাতিলের দাবি তোলে। ২০১৯ সালেও একই সংগঠন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা এনজিও ও প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করা এবং আইন প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তাদের বক্তব্যে বাল্যবিবাহকে ‘বৈধ ও শরিয়তসম্মত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ তাদের আপত্তি আইনটির প্রয়োগপদ্ধতি, শাস্তির মাত্রা বা কোনো কারিগরি ত্রুটি নিয়ে ছিল না; আপত্তিটি ছিল এই জায়গায় যে রাষ্ট্র শরিয়া-স্বীকৃত একটি বিবাহপ্রথার ওপর বয়সসীমা আরোপ করছে [10]।
‘কুফরি আইন’ শব্দটি এখানে নিছক ধর্মীয় অলংকার নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। কোনো নাগরিক আইনকে ‘কুফরি’ ঘোষণা করার অর্থ সেই আইনকে শুধু ভুল বা অকার্যকর বলা নয়, বরং তাকে ইসলামের বিরোধী অবস্থানে ঠেলে দেয়া। একইভাবে বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’ বলা হলে তার বিরোধিতাকারীকে আর শিশু-অধিকার বা জনস্বাস্থ্যের পক্ষে অবস্থানকারী হিসেবে দেখা হয় না; তাকে নবীর সুন্নতের বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এভাবে একটি আধুনিক শিশু-সুরক্ষা আইনকে ধর্মীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা হয়। ফলাফল হচ্ছে, বাল্যবিবাহের মতো ক্ষতিকর প্রথার পক্ষে যুক্তি দিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সম্মতি বা শিশুর স্বার্থ নিয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে না; ‘সুন্নত’ শব্দটিই নৈতিক ও রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এই প্রচারণার ভাষা নিচের পোস্টার ও প্রচারসামগ্রীতে আরও নগ্নভাবে দেখা যায়। কোথাও লেখা হয়েছে ‘বাল্যবিবাহ খাস সুন্নত’, কোথাও ‘সুন্নতী বাল্যবিবাহের বিরোধিতা নবীর বিরোধিতা’, আবার কোথাও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলাকেই ধর্মবিরোধী অবস্থান হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যুক্তির কাঠামোটি সরল: মুহাম্মদের জীবনে অল্পবয়সী আয়িশার সঙ্গে বিবাহ ও দাম্পত্যের বর্ণনা আছে; অতএব অল্পবয়সী মেয়ের বিয়ে সুন্নত; এবং যেহেতু সুন্নত অনুসরণ ধর্মীয়ভাবে মর্যাদাপূর্ণ, তাই রাষ্ট্রের বয়সসীমা সেই সুন্নতের পথে বাধা। এই যুক্তির ভয়াবহতা এখানেই যে শিশুর বয়স, মানসিক সক্ষমতা, যৌন সম্মতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি বা শিক্ষার প্রশ্নকে এক আঘাতে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়া হয়। একটি শিশুর বাস্তব ক্ষতির বিপরীতে দাঁড় করানো হয় নবীর ধর্মীয় কর্তৃত্ব।



ওয়াজের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের পক্ষে ধর্মীয় বৈধতা নির্মাণ
বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’ বা ‘শরিয়তসম্মত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচারণা কেবল রাজনৈতিক সংগঠনের পোস্টার ও বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিলের বিশাল জনপরিসরেও একই ধারণা প্রচারিত হয়। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া, বয়ঃসন্ধিকে বিবাহযোগ্যতার যথেষ্ট শর্ত হিসেবে দেখা, ছয় বা নয় বছরের মেয়ের বিবাহের ঐতিহাসিক নজির তুলে ধরা এবং আধুনিক বয়সসীমাকে ইসলামবিরোধী বা অপ্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন—এই বক্তব্যগুলো ধর্মীয় বক্তৃতার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে বাল্যবিবাহের পক্ষে মতামত আর কোনো বইয়ের পুরনো ফিকহি বিধান হয়ে থাকে না; তা জীবন্ত সামাজিক প্রচারণায় রূপ নেয়।
ওয়াজের বিশেষ প্রভাব এখানেই যে বক্তা নিজেকে সাধারণত ধর্মীয় জ্ঞানের কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং শ্রোতারা বক্তব্যটিকে নিছক ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে গ্রহণ করেন না। যখন একজন জনপ্রিয় আলেম বলেন যে অল্প বয়সে বিয়ে করা নবীর সুন্নত, কিংবা মেয়ের বয়ঃসন্ধি হলেই তাকে বিবাহযোগ্য ধরা যায়, তখন সেই বক্তব্য সরাসরি পারিবারিক সিদ্ধান্তে ধর্মীয় অনুমোদন যোগ করে। বাবা-মা তখন মেয়ের শিক্ষা, মানসিক প্রস্তুতি বা স্বাধীন ইচ্ছার পরিবর্তে ‘গুনাহ’, ‘ফিতনা’, ‘পর্দা’, ‘ইজ্জত’ কিংবা ‘সুন্নত’-এর ভাষায় সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হতে পারে। এই ধর্মীয় ভাষা শিশুর ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্নকে পরিবার ও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কর্তব্যের নিচে চাপা দেয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ কোনো বিলুপ্ত ঐতিহাসিক প্রথা নয়; সর্বশেষ জাতীয় জরিপেই প্রায় অর্ধেক তরুণীর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হওয়ার চিত্র পাওয়া যায়। সেই সমাজে যদি ধর্মীয় মঞ্চ থেকে অল্প বয়সে বিয়েকে প্রশংসিত, বৈধ বা সুন্নত হিসেবে প্রচার করা হয়, তাহলে সেই প্রচারণার বাস্তব সামাজিক ফল রয়েছে। এটি বিদ্যমান প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিবর্তে তাকে নৈতিক বৈধতা দেয়, অভিভাবকদের সামাজিক বাধা কমায় এবং আইনকে ধর্মীয় প্রতিপক্ষ হিসেবে চিত্রিত করে। নিচের ভিডিওগুলোতে সেই প্রচারণার ভাষা সরাসরি দেখা যায়।
বাল্যবিবাহের পক্ষে একই ধরনের আরও একটি ওয়াজ নিচে সংরক্ষিত রয়েছে।
বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করায় শিরশ্ছেদের হুমকি
বাল্যবিবাহের ধর্মীয় বৈধতা শুধু প্রচারণার মাধ্যমে রক্ষা করা হয়েছে এমন নয়; এর বিরোধিতা করাও কখনো সরাসরি ভয়ভীতি ও সহিংসতার হুমকির কারণ হয়েছে। ২০১৮ সালে পাবনার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের ধানবিলা গ্রামের সমাজকর্মী আবু সালেহ মো. আব্দুল মাজেদ একটি হুমকিপত্র পাওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। bdnews24-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে পাঠানো চিঠিটিতে জঙ্গিবাদ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় এবং তাকে এসব বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করতে বলা হয়। নির্দেশ অমান্য করলে তাকে শিরশ্ছেদের হুমকিও দেয়া হয় [11]।
ঘटनাটির তাৎপর্য কেবল একজন সমাজকর্মীকে ভয় দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে বাল্যবিবাহের বিরোধিতা এমন একটি অপরাধ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে যার শাস্তি হিসেবে হত্যার হুমকি দেয়া যায়। অর্থাৎ ধর্মীয় মৌলবাদী চিন্তায় একটি শিশুর অল্প বয়সে বিয়ে ঠেকানোর প্রচেষ্টাও ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখন একটি সামাজিক প্রথা ধর্মের পবিত্রতার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়, তখন তার সমালোচককে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার প্রয়োজন পড়ে না; তাকে ‘ইসলামবিরোধী’, ‘নাস্তিক’, ‘কাফের’ বা ধর্মের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে চুপ করিয়ে দেয়ার পথ তৈরি হয়। এই মনস্তত্ত্ব বাল্যবিবাহের মতো প্রথাকে শুধু সামাজিক সমর্থনই দেয় না, তার চারপাশে ভয় ও নীরবতার বলয়ও তৈরি করে।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের পক্ষে ধর্মীয় অবস্থানের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের বক্তব্যও উল্লেখযোগ্য। নিচের ভিডিওতে বাল্যবিবাহ সম্পর্কে তার বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে।
পাকিস্তান: বয়ঃসন্ধিকেই বিবাহযোগ্যতা বানানোর রাষ্ট্রীয় ইসলামি প্রচেষ্টা
পাকিস্তানে বাল্যবিবাহের ন্যূনতম বয়সের বিরুদ্ধে শরিয়াভিত্তিক অবস্থান কোনো প্রান্তিক আলেমের মতামত নয়; দেশটির সংবিধানস্বীকৃত ইসলামি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান Council of Islamic Ideology বা CII নিজেই বহু বছর ধরে এই অবস্থান নিয়েছে। ২০১৪ সালের মার্চে CII ঘোষণা করে যে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণকারী আইন ‘অনৈসলামিক’। তৎকালীন চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ খান শেরানি বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরও অভিভাবকের মাধ্যমে নিকাহ হতে পারে এবং রুখসতি বা দাম্পত্য জীবন শুরু হতে পারে বয়ঃসন্ধির পর। তার বক্তব্য ছিল, puberty ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়, ফলে বিয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট chronological age বেঁধে দেয়া উচিত নয়। অর্থাৎ একটি শিশুর আইনগত প্রাপ্তবয়স্কতা, মানসিক সক্ষমতা বা স্বাধীন সম্মতিকে নয়, শরীরের যৌন পরিপক্বতার লক্ষণকেই বিবাহযোগ্যতার প্রধান সীমা হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল [12]।
এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয় ২০১৪ সালের মে মাসে। সমালোচনার মুখেও CII আগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেনি; বরং ঘোষণা করে যে মেয়ের শরীরে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা গেলে নয় বছর বয়সেও সে বিবাহযোগ্য হতে পারে। এই দাবির ভেতরের যুক্তিগত সমস্যা অত্যন্ত সরল: প্রজননক্ষমতার সূচনা থেকে সরাসরি বিবাহ ও যৌন সম্পর্কের সক্ষমতা অনুমান করা হয়েছে। একটি নয় বা দশ বছরের শিশুর শরীরে puberty শুরু হওয়া তাকে স্বাধীনভাবে জীবনসঙ্গী নির্বাচন, বিবাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বোঝা, একজন প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক মোকাবেলা করা কিংবা গর্ভধারণের ঝুঁকি বহন করার মতো প্রাপ্তবয়স্ক সক্ষমতা দেয় না। অথচ CII-র যুক্তিতে এই সমস্ত বিষয়কে অতিক্রম করে বয়ঃসন্ধিই মূল সীমারেখায় পরিণত হয় [13]।
এক দশকের বেশি সময় পরও এই অবস্থান বিলুপ্ত হয়নি। ২০২৫ সালে ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরিতে নতুন Child Marriage Restraint Act গৃহীত হয়, যেখানে ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে নিকাহ নিষিদ্ধ করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে CII আবার একে শরিয়ার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের আপত্তির কেন্দ্রেও ছিল একই পুরনো যুক্তি—ইসলামি ফিকহে বয়ঃসন্ধির পর মেয়ের বিয়ে বৈধ, তাই রাষ্ট্র ১৮ বছরকে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম সীমা করতে পারে না। Jamiat Ulema-e-Islam-Fazl বা JUI-F আইনটির বিরোধিতা করে, পার্লামেন্টে আপত্তি জানায় এবং আইনটি কার্যকর হওয়ার পর দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন ধারার আলেমও রাষ্ট্রপতিকে আইনটিতে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানান। অর্থাৎ ১৩ বা ১৪ বছরের মেয়েকে বিয়ে থেকে সুরক্ষিত করার আইনকেই ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল [14] [15] [16]।
বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত আদালতেও গড়ায়। ২০২৬ সালে JUI-F Federal Shariat Court-এ আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে। আবেদনে সরাসরি বলা হয়, ১৮ বছরের কম প্রত্যেক ব্যক্তিকে ‘child’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ইসলামি bulugh বা বয়ঃসন্ধিভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আরও স্পষ্টভাবে তারা দাবি করে, যে ব্যক্তি বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেছে তাকে বিবাহের ক্ষেত্রে শিশু হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়; দৃশ্যমান বয়ঃসন্ধির লক্ষণ না থাকলে হানাফি মত অনুযায়ী ১৫ বছরকে সীমা ধরা যেতে পারে। এমনকি ১৮ বছরের নিচে বিয়ের জন্য বিচারিক ব্যতিক্রম রাখার দাবিও করা হয়। এখানে বিতর্কের প্রকৃতি নিয়ে কোনো অনুমান প্রয়োজন নেই: একটি ইসলামি রাজনৈতিক দল সরাসরি আদালতের কাছে দাবি করেছে যে শরিয়াভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ড রাষ্ট্রের ১৮ বছরের শিশু-সুরক্ষা সীমার ওপর প্রাধান্য পাওয়া উচিত [17]।
পাকিস্তানের এই ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে একই যুক্তি ২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পুনরাবৃত্ত হয়েছে: শিশু বলতে কাকে বোঝাবে তা আধুনিক নাগরিক আইন নয়, বয়ঃসন্ধিভিত্তিক ইসলামি ফিকহ নির্ধারণ করবে। এর ফলে ‘শিশু’ শব্দটির অর্থই বদলে যায়। ১৩ বছরের একটি মেয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ও শিশু-অধিকারের দৃষ্টিতে শিশু; কিন্তু বয়ঃসন্ধিভিত্তিক ফিকহি কাঠামোয় তাকে যৌন ও বৈবাহিক সম্পর্কের উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করার পথ তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্ব কোনো ভাষাগত বিভ্রান্তি নয়; এটি সরাসরি প্রশ্ন তোলে—একটি মেয়ের সুরক্ষার সীমা তার বয়স নির্ধারণ করবে, নাকি তার শরীরে puberty-এর লক্ষণ দেখা যাওয়ার মুহূর্তটি।
ইয়েমেন: ধর্মীয় আপত্তিতে ন্যূনতম বিবাহবয়স বিলোপ
ইয়েমেনে বাল্যবিবাহের আইনগত ইতিহাস আরও ভয়াবহ। দেশটিতে একসময় ছেলে ও মেয়ের জন্য ১৫ বছর ন্যূনতম বিবাহবয়স নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ইয়েমেনের পার্লামেন্ট ধর্মীয় যুক্তি দেখিয়ে সেই ন্যূনতম বয়সের বিধানই বাতিল করে দেয়। অর্থাৎ আইন সংস্কারের মাধ্যমে শিশুবিবাহের সুরক্ষা বাড়ানো হয়নি; উল্টো বিদ্যমান একটি বয়সসীমা সরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী Personal Status Law-এ নির্দিষ্ট numerical minimum age-এর পরিবর্তে মেয়েটি যৌন সম্পর্কের জন্য ‘ready’ কি না—এই ধরনের মানদণ্ড জায়গা করে নেয়। এর মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কতার প্রশ্নটি আবারও বয়স থেকে সরিয়ে শারীরিক যৌন সক্ষমতার দিকে ঠেলে দেয়া হয় [18]।
২০০৯ সালে এই অবস্থার পরিবর্তনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ইয়েমেনি পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য মেয়েদের ন্যূনতম বিবাহবয়স ১৭ করার পক্ষে ভোট দেন। কিন্তু ২৩ জন সংসদ সদস্য—যাদের মধ্যে বিরোধী ইসলামপন্থী Islah এবং ক্ষমতাসীন General People’s Congress-এর সদস্যও ছিলেন—এই বিধানের বিরোধিতা করেন এই যুক্তিতে যে নির্দিষ্ট ন্যূনতম বয়স ইসলামি নীতির বিরোধী। Human Rights Watch-এর নথি অনুযায়ী রক্ষণশীল বিরোধীরা সংসদীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে আইনটিকে আটকে দেয়। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্য বয়সসীমা ফিরিয়ে আনতে রাজি হওয়ার পরও শরিয়াভিত্তিক আপত্তি শিশুদের আইনি সুরক্ষা কার্যকর হতে দেয়নি [19]।
এই আইনগত ব্যর্থতার বাস্তব পটভূমি ভয়াবহ। UNICEF-এর ২০২৪ country profile অনুযায়ী ২০২৩ সালের MICS-এ ইয়েমেনের ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ৩০ শতাংশ ১৮ বছরের আগেই এবং ৭ শতাংশ ১৫ বছরের আগেই বিয়ে করেছিলেন। বর্তমানে দেশটিতে এমন প্রায় ৩৮ লাখ নারী ও মেয়ে রয়েছেন যারা ১৮ বছরের আগেই বিবাহিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক ধস, শিক্ষাব্যবস্থার ভাঙন এবং পরিবারের বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের মধ্যে রাষ্ট্র যদি একটি absolute minimum age-ই নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে শিশুদের সুরক্ষার সবচেয়ে মৌলিক আইনি প্রতিরোধটিও অনুপস্থিত থাকে [20]।
ইয়েমেনের ঘটনা ধর্মীয় আইনের রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি অত্যন্ত পরিষ্কার উদাহরণ। এখানে শরিয়াভিত্তিক আপত্তি শুধু একটি ধর্মতাত্ত্বিক মতামত হিসেবে বইয়ের পাতায় থাকেনি; সেটি প্রথমে ১৫ বছরের বিদ্যমান আইনি সীমা বাতিল করতে এবং পরে ১৭ বছরের নতুন সীমা কার্যকর হওয়া ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর বাস্তব ফল বহন করেছে শিশুরা। আইন যদি বলে কোনো নির্দিষ্ট বয়সের নিচে বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, আর ধর্মীয় কর্তৃত্ব যদি সেই বয়সসীমা স্থাপনের বিরোধিতা করে, তাহলে পরিবারকে একটি কিশোরী—এমনকি আরও কম বয়সী মেয়েকেও—বিয়ে দেয়ার পথে রাষ্ট্র নিজেই কার্যকর বাধা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
ইরাক: জাফারি শরিয়া আইনে আবারও নয়-দশ বছরের মেয়ের বিয়ের দরজা
ইরাকের ১৯৫৯ সালের Personal Status Law দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক বিচ্ছিন্ন পারিবারিক আইনের পরিবর্তে একটি তুলনামূলকভাবে একীভূত নাগরিক কাঠামো দিয়েছিল। এই আইনে সাধারণ বিবাহযোগ্য বয়স ১৮ বছর, যদিও বিচারকের অনুমতিতে ১৫ বছর বয়সেও ‘maturity and physical capacity’-এর ভিত্তিতে বিয়ের সুযোগ ছিল। এই সীমাটিও ১৮ বছরের পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে যে পরিবর্তনের উদ্যোগ শুরু হয় এবং ২০২৫ সালে আইনে পরিণত হয়, তা আরও গভীর সমস্যা তৈরি করে: বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ও সন্তানের অভিভাবকত্বের মতো বিষয়ে শিয়া জাফারি ফিকহের ওপর ভিত্তি করে একটি পৃথক personal-status regime তৈরির পথ খুলে দেয়া হয় [21]।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংশোধনী কার্যকর হওয়ার পর ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ জাফারি Personal Status Code প্রস্তুত করে এবং একই বছরের ২৭ আগস্ট ইরাকি পার্লামেন্ট সেটি অনুমোদন করে। প্রথম দিকের বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল নয় বছর বয়সী মেয়ের বিয়ের সম্ভাবনা। প্রবল প্রতিবাদের পর সংশোধিত আইনের ভাষায় আপাতভাবে ১৯৫৯ সালের আইনের ১৮ বছর—অথবা বিচারকের অনুমতিতে ১৫ বছর—সীমা অক্ষুণ্ণ রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই অনুমোদিত জাফারি কোডে বিবাহযোগ্যতাকে আবার puberty বা বয়ঃসন্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। Human Rights Watch-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই ধর্মীয় মানদণ্ডের অধীনে মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি নয় বা দশ বছর বয়স হিসেবেও গণ্য হতে পারে [22]।
এর অর্থ অত্যন্ত সরল এবং ভয়াবহ: একই রাষ্ট্রে একটি মেয়ে নাগরিক আইনে শিশু, কিন্তু ধর্মীয় personal-status code-এর অধীনে তার শরীরে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা দিলে তাকে বিয়ের উপযুক্ত বলে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হয়। নয় বা দশ বছরের একটি মেয়েকে বৈবাহিক সম্পর্কের উপযুক্ত ঘোষণা করতে হলে প্রথমেই তার শিশুত্বকে কার্যত অস্বীকার করতে হয়। সে স্কুলে কোন শ্রেণিতে পড়ে, নিজের জীবনের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত বোঝার সক্ষমতা আছে কি না, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার বাস্তব ক্ষমতা আছে কি না—এসব প্রশ্নকে সরিয়ে একটি biological event-কে যথেষ্ট শর্ত বানানো হয়। এখানেই বয়ঃসন্ধিভিত্তিক ধর্মীয় বিবাহযোগ্যতার ধারণার নির্মমতা সবচেয়ে স্পষ্ট।
ইরাকের বাস্তব পরিসংখ্যানও এই আইনগত পশ্চাদপসরণকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। ২০১৮ সালের জাতীয় MICS অনুযায়ী ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৭.৯ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ—১৮ বছরের আগেই বিবাহিত হয়েছিল এবং ৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৫ বছরের আগেই। Human Rights Watch, UNAMI-এর তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে আদালতে নিবন্ধিত নয় এমন বিবাহগুলোর ২২ শতাংশে ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়ে জড়িত ছিল। অর্থাৎ অত্যন্ত অল্পবয়সী মেয়েদের ধর্মীয় বা অনিবন্ধিত বিয়ে কোনো কাল্পনিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নয়; এর বাস্তব উপস্থিতি ইতিমধ্যেই নথিবদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে জাফারি কোডের মাধ্যমে puberty-কে বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ড করা সেই বিদ্যমান সমস্যার ওপর আরও একটি ধর্মীয়-আইনি বৈধতার স্তর যোগ করে [23] [24]।
ইরাকের ঘটনাটি তাই বাল্যবিবাহের প্রশ্নে শরিয়াভিত্তিক personal law-এর সমস্যাকে অত্যন্ত নগ্নভাবে সামনে আনে। এখানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে শুধু প্রার্থনা, পোশাক বা ব্যক্তিগত আচার পালনের সুযোগ চাওয়া হয়নি; দাবি করা হয়েছে এমন একটি পৃথক আইনি ব্যবস্থার, যেখানে একটি মেয়ের বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার এবং সন্তানের ওপর অধিকার তার নাগরিক পরিচয়ের বদলে ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ফিকহি বিধানের দ্বারা নির্ধারিত হবে। সেই ব্যবস্থায় যদি বয়ঃসন্ধি নয় বা দশ বছর বয়সেই বিবাহযোগ্যতার দরজা খুলে দেয়, তাহলে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন সরাসরি শিশুর নাগরিক সুরক্ষাকে খর্ব করছে।
ইরান: ইসলামি আইনের অধীনে ১৩ বছরের মেয়ের বিয়ে বৈধ, এর চেয়েও কম বয়সে আদালতের অনুমতি
ইরানে বাল্যবিবাহের সমস্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় বক্তার দাবি বা সামাজিক রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশটির আইন নিজেই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়েকে বৈধতা দেয়। ইরানের Civil Code-এর Article 1041 অনুযায়ী মেয়েদের সাধারণ বিবাহযোগ্য বয়স ১৩ এবং ছেলেদের ১৫ বছর। কিন্তু এটিও কোনো absolute minimum age নয়। মেয়ের বয়স ১৩ বছরের নিচে হলেও তার পিতা বা পিতামহের অনুমতি এবং আদালতের সম্মতি থাকলে বিয়ে আইনগতভাবে সম্পন্ন হতে পারে। ফলে রাষ্ট্র নিজেই স্বীকার করছে যে ১৩ বছরের একটি মেয়ে বিবাহযোগ্য, এবং নির্দিষ্ট শর্তে তার চেয়েও কম বয়সী শিশুকে বিয়ে দেয়া যেতে পারে। ২০২৬ সালের Human Rights Watch World Report-ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে বিচারকের অনুমতি থাকলে ইরানে বিয়ের কোনো absolute minimum age নেই [25]।
এই আইনের পেছনের কাঠামো সরাসরি ইসলামি বয়ঃসন্ধিভিত্তিক প্রাপ্তবয়স্কতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত। ইরানের আইনসংক্রান্ত গবেষণায় দেখা যায়, ইসলামি আইনের ভিত্তিতে মেয়েদের ধর্মীয় প্রাপ্তবয়স্কতার বয়স ৯ চান্দ্র বছর, অর্থাৎ আনুমানিক আট বছর নয় মাস, হিসেবে গণ্য করা হয়েছে; পরবর্তী আইনি সংস্কারে সাধারণ বিবাহযোগ্য বয়স ১৩ করা হলেও অভিভাবক ও বিচারকের অনুমতির মাধ্যমে তারও নিচে বিয়ের পথ বন্ধ করা হয়নি। অর্থাৎ আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনের ভাষায় কিছু বয়সসীমা যোগ করা হলেও মূল ফিকহি ধারণাটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত হয়নি—একটি শিশুর শরীর ও অভিভাবকের সিদ্ধান্তকে তার নিজের প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীনতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে [26]।
এই আইনি অনুমোদন কাগজে-কলমে থাকা কোনো অব্যবহৃত বিধানও নয়। সরকারি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে Human Rights Watch জানিয়েছে, শুধু মার্চ ২০১৭ থেকে মার্চ ২০১৮-এর মধ্যেই ইরানে ১০ বছরের কম বয়সী মেয়েদের ২১৭টি বিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিবন্ধিত হয়েছিল; ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের নিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। অর্থাৎ রাষ্ট্র এমন শিশুবিবাহকে শুধু সহ্য করেনি, আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধনও করেছে। ২০১৮ সালে সংসদের কিছু সদস্য মেয়েদের ন্যূনতম বিবাহবয়স বাড়িয়ে ১৬ করার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন; সংসদের বিচারবিষয়ক কমিশন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। শিশুবিবাহ নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে ইসলামি পারিবারিক আইনের অধীনে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ের বৈধ কাঠামো বহাল থাকে [27]।
UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী ইরানে প্রায় ১৭ শতাংশ মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করে। এই পরিসংখ্যানের পাশে দেশের আইন রাখলে সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয়: রাষ্ট্র যে প্রথা কমানোর কথা বলবে, সেই রাষ্ট্রীয় আইনই ১৩ বছরের মেয়েকে বিয়ের উপযুক্ত বলে স্বীকৃতি দেয় এবং তার চেয়েও ছোট শিশুর বিয়ের অনুমতি দেয়। একটি ১৩ বছরের মেয়েকে ‘স্ত্রী’ হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেয়ার মুহূর্তে তার শিশুত্বের সুরক্ষা কার্যত দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়; তার বদলে পিতা, বিচারক এবং ধর্মীয় personal-status ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়। এটি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা নয় মাত্র—এটি আইনের মাধ্যমেই শিশুবিবাহের বৈধতা সংরক্ষণ [28]।
সৌদি আরব: ১৮ বছরের সীমা ঘোষণা করেও বয়ঃসন্ধির পর শিশুবিবাহের বৈধ পথ
সৌদি আরবে দীর্ঘ সময় বিয়ের কোনো statutory minimum age-ই ছিল না। ২০১৯ সালে Shura Council ১৮ বছরকে ন্যূনতম বয়স করার প্রস্তাব গ্রহণ করে, কিন্তু ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের আদালতের অনুমতিতে বিয়ের ব্যতিক্রম রাখা হয়। ২০২২ সালে দেশটির প্রথম codified Personal Status Law কার্যকর হওয়ার পরও শিশুবিবাহ পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়নি। আইনের Article 9-এ সাধারণ বিবাহযোগ্য বয়স ১৮ বলা হলেও আদালত ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিয়ে অনুমোদন করতে পারে যদি সে ‘puberty’-তে পৌঁছেছে এবং বিচারকের কাছে বিয়েটি তার জন্য ‘established benefit’ বহন করে বলে মনে হয়। Human Rights Watch স্পষ্ট করেছে, মেয়েদের ক্ষেত্রে এই puberty প্রথম ঋতুস্রাব হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে এবং বয়স ১৫ বছরেরও কম হতে পারে [29]।
এখানেও একই মৌলিক ফিকহি ধারণা ফিরে আসে: শিশুটির chronological age নয়, তার যৌন বয়ঃসন্ধি বিবাহের দরজা খুলে দিতে পারে। একটি মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাবকে প্রাপ্তবয়স্ক দাম্পত্যের যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিকভাবে অর্থহীন। ঋতুস্রাবের অর্থ তার reproductive system সক্রিয় হতে শুরু করেছে; এর অর্থ সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক, গর্ভধারণ, বিবাহের আইনগত পরিণতি কিংবা পারিবারিক ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝার এবং স্বাধীনভাবে মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে—এমন নয়। অথচ সৌদি আইন ঠিক এই biological event-কে ১৮ বছরের আইনি সীমা অতিক্রম করার অন্যতম চাবিকাঠি বানিয়েছে।
আরও গুরুতর হলো, শিশুটির বিয়ের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তার নিজের হাতে নেই। সৌদি Personal Status Law নারীর বিবাহের জন্য পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ক্ষেত্রে একদিকে তার বয়ঃসন্ধিকে বিবাহযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, অন্যদিকে তার পুরুষ অভিভাবক এবং আদালত সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিয়েটি তার ‘স্বার্থে’ কি না। এই কাঠামোয় শিশুর স্বাধীন সম্মতি নয়, পিতৃতান্ত্রিক অভিভাবকত্ব ও বিচারিক অনুমোদন নির্ধারক হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালের সৌদি সরকারি population survey-এ ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজারের বেশি শিশুর বিয়ের তথ্য পাওয়া যায়, যাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিল মেয়ে [30]।
সৌদি ধর্মীয় পরিসরে শিশু মেয়েদের যৌন দৃষ্টিতে দেখার একটি চরম উদাহরণ ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সৌদি ধর্মীয় বক্তা শেখ আবদুল্লাহ দাউদ দাবি করেছিলেন, অত্যন্ত অল্পবয়সী মেয়েদেরও পূর্ণ মুখঢাকা পর্দা পরানো উচিত। শিশুদের ওপর যৌন আক্রমণের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি এমন পর্দাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেন। বক্তব্যটির ভয়াবহ দিক হলো, সম্ভাব্য যৌন নিপীড়নকারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে একটি শিশু মেয়ের শরীরকেই ঢেকে রাখার বস্তু হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে চিন্তাধারা একটি শিশু মেয়েকেও সম্ভাব্য যৌন আকর্ষণের বস্তু হিসেবে কল্পনা করতে পারে, বয়ঃসন্ধির পর তাকেই বিবাহযোগ্য ভাবার ফিকহি কাঠামোর সঙ্গে তার মানসিক দূরত্ব খুব বেশি নয় [31] [32]।
সৌদি আরবের বর্তমান আইন তাই ১৮ বছরকে একটি দৃঢ় শিশু-সুরক্ষা সীমা বানায়নি। বাইরে থেকে ১৮ বছরের সীমা ঘোষণা করা হলেও ভেতরে puberty এবং ‘established benefit’-এর ব্যতিক্রম রেখে একই পুরনো ধর্মীয় ধারণাকে আইনি অস্তিত্ব দেয়া হয়েছে। একটি বয়সসীমা যদি বয়ঃসন্ধি শুরু হলেই বিচারকের অনুমতিতে অতিক্রম করা যায়, তাহলে সেটি প্রকৃত absolute minimum age নয়। ১৮ বছরের দেয়াল তৈরি করে তার মাঝখানেই একটি শরিয়াভিত্তিক দরজা রাখা হয়েছে।
মুসলিম ও অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বাল্যবিবাহ: তুলনামূলক পরিসংখ্যান
বাল্যবিবাহের বিস্তার কতটা ভয়াবহ, তা বোঝার জন্য বিভিন্ন দেশের একই আন্তর্জাতিক সূচক তুলনা করা প্রয়োজন। নিচের টেবিলে ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে কত শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে বা দাম্পত্য সম্পর্কে প্রবেশ করেছিলেন, সেই SDG 5.3.1 সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্যের বছর সব দেশে এক নয়, তাই সংখ্যাগুলোকে একই সময়ের league table হিসেবে নয়, প্রতিটি দেশের সর্বশেষ বা বহুল ব্যবহৃত জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল prevalence হিসেবে পড়তে হবে [1]।
| দেশ | ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা | ১৮ বছরের আগে বিয়ে | তথ্যের সময় | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| নাইজার | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৭৬% | ২০১২ | UNICEF |
| বাংলাদেশ | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৪৭.২% | ২০২৫ | UNICEF/BBS MICS |
| ইয়েমেন | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৩০% | ২০২৩ | UNICEF |
| ইরাক | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ২৮% | ২০১৮ | UNICEF |
| পাকিস্তান | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ১৮% | ২০১৭–১৮ | UNICEF |
| ইরান | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | প্রায় ১৭% | সর্বশেষ UNICEF country data | UNICEF |
| আলজেরিয়া | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৪% | ২০১৯ | UNICEF |
| মালদ্বীপ | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ২% | ২০১৭ | UNICEF |
| তিউনিসিয়া | মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ২% | ২০১৮ | UNICEF |
| মোজাম্বিক | অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৪৮% | সর্বশেষ UNICEF country data | UNICEF |
| ইথিওপিয়া | অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৪০% | সর্বশেষ UNICEF country data | UNICEF |
| নেপাল | অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ৩৫% | সর্বশেষ UNICEF country data | UNICEF |
| ভারত | অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ | ২৩% | ২০১৯–২১ | UNICEF |
মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য বিপুল। নাইজারে চারজন তরুণীর তিনজনেরও বেশি ১৮ বছরের আগে বিবাহিত হয়েছে; বাংলাদেশে প্রায় প্রতি দুইজনের একজন; ইয়েমেন ও ইরাকে প্রায় প্রতি তিন থেকে চারজনের একজন। আবার পাকিস্তান ও ইরানে হার তুলনামূলকভাবে নিচে হলেও এখনও লক্ষ লক্ষ মেয়েকে প্রভাবিত করার মতো বড়। বিপরীতে তিউনিসিয়া ও মালদ্বীপে হার মাত্র ২ শতাংশ এবং আলজেরিয়ায় ৪ শতাংশ। এই বৈপরীত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখায়: কোনো ধর্মীয় বিধান কোনো আচরণকে অনুমোদন করলেই প্রত্যেক মুসলিম সমাজে সেই আচরণ একই মাত্রায় ঘটবে এমন নয়। কঠোর নাগরিক আইন, মেয়েদের শিক্ষা, নগরায়ণ, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক রীতির পরিবর্তন একটি ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত প্রথাকেও বাস্তবে সংকুচিত করতে পারে।
এই নিম্ন হারগুলো ইসলামি বাল্যবিবাহের বিধানের পক্ষে কোনো প্রতিরক্ষা তৈরি করে না; বরং উল্টো একটি বিষয় দেখায়। তিউনিসিয়ার মতো সমাজে বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে যখন আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রাক-আধুনিক বিবাহপ্রথার ওপর কার্যকর সীমা আরোপ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান ও সৌদি আরবের আলোচিত উদাহরণে দেখা যায়, যখন শরিয়া, বয়ঃসন্ধি বা ধর্মীয় personal-status law-কে রাষ্ট্রীয় বয়সসীমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তখন শিশুদের জন্য absolute legal protection তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পার্থক্য ধর্মীয় বিধানের প্রাসঙ্গিকতা মুছে দেয় না; বরং দেখায় সেই বিধানকে রাষ্ট্র কতটা নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটিও ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর তথ্যও দেখায় যে বাল্যবিবাহের জন্য ইসলাম কোনো আবশ্যিক শর্ত নয়। মোজাম্বিকে হার ৪৮ শতাংশ, ইথিওপিয়ায় ৪০ শতাংশ, নেপালে ৩৫ শতাংশ এবং ভারতে ২৩ শতাংশ। দরিদ্রতা, মেয়েদের শিক্ষার ঘাটতি, পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থা, গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতা এবং customary marriage-এর মতো কারণ সেখানে শিশুবিবাহকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু এই তথ্য থেকে ইসলামি বাল্যবিবাহের ধর্মীয় বৈধতা অদৃশ্য হয়ে যায় না। কোনো অপরাধ বা ক্ষতিকর প্রথা অন্য সমাজেও বিদ্যমান—এটি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের সেই প্রথাকে সমর্থন করার দায় খণ্ডন করে না।
এই প্রবন্ধে ধর্মীয় ভূমিকার প্রমাণ তাই শুধু prevalence table নয়। পরিসংখ্যান দেখায় সমস্যাটির বাস্তব মাত্রা; আর ধর্মীয় ভূমিকার প্রমাণ আসে অন্য জায়গা থেকে—বাংলাদেশে বাল্যবিবাহবিরোধী আইনকে ‘কুফরি’ ঘোষণা, পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় ইসলামি পরিষদের minimum age-কে ‘অনৈসলামিক’ বলা, JUI-F-এর Federal Shariat Court-এ মামলা, ইয়েমেনে শরিয়াভিত্তিক আপত্তিতে বয়সসীমা বাতিল ও নতুন সীমা আটকে দেয়া, ইরাকে জাফারি কোডে puberty-কে বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ড বানানো, ইরানে ১৩ বছরের মেয়ের বৈধ বিয়ে এবং সৌদি আরবে puberty-ভিত্তিক judicial exception। এই দলিলগুলো দেখায়, মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশে ইসলামি আইন শুধু শিশুবিবাহের ঐতিহাসিক পটভূমি নয়; বর্তমানেও বাল্যবিবাহের আইনি বৈধতা রক্ষা এবং এর বিরুদ্ধে বয়সসীমা দুর্বল করার সক্রিয় ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশভেদে বাল্যবিবাহের হার কেন এত ভিন্ন?
একই ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেশগুলোর মধ্যেই বাল্যবিবাহের হারে বিশাল পার্থক্য আছে। নাইজারে হার ৭৬ শতাংশ, বাংলাদেশে ৪৭.২ শতাংশ, ইয়েমেনে ৩০ শতাংশ; আবার তিউনিসিয়া ও মালদ্বীপে মাত্র ২ শতাংশ। এই পার্থক্য দেখায় যে কোনো ধর্মীয় অনুমোদন বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করে আইন, শিক্ষা, অর্থনীতি, নারীর সামাজিক অবস্থান, নগরায়ণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং পরিবারে মেয়েদের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাত্রার ওপর। ধর্মীয় বিধান একটি প্রথাকে বৈধতা দিতে পারে, কিন্তু সেই বৈধতা কতটা সামাজিক আচরণে রূপ নেবে, তা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শক্তির ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান খসড়াতেও দেখা যায়, একই দেশের মধ্যে শিক্ষা, সম্পদ এবং গ্রাম-শহরভেদে বাল্যবিবাহের হার ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয় ।
UNICEF বাল্যবিবাহের সঙ্গে দারিদ্র্য, মেয়েদের সীমিত শিক্ষার সুযোগ, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, পরিবার ও সম্প্রদায়ের লিঙ্গভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সম্মান রক্ষার ধারণা, দুর্বল আইন, জন্মনিবন্ধনের ঘাটতি, যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতিকে যুক্ত করেছে। কিন্তু এসব কারণ তালিকাভুক্ত করলেই ধর্মীয় ভূমিকা অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং অনেক সমাজে ধর্মীয় বৈধতা এই কারণগুলোর ওপর একটি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। একটি দরিদ্র পরিবার যখন মনে করে মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিলে অর্থনৈতিক দায় কমবে, এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় বক্তা বলে অল্প বয়সে বিয়ে সুন্নত বা শরিয়তসম্মত, তখন অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও ধর্মীয় বৈধতা একে অপরকে শক্তিশালী করে। একইভাবে একটি রাষ্ট্র যখন ১৮ বছরের নিচে বিয়ে নিষিদ্ধ করতে চায়, কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সেটিকে ‘অনৈসলামিক’ বলে, তখন আইন প্রয়োগের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও দুর্বল হয় [33]।
তাই বাল্যবিবাহের বাস্তব বিস্তার বুঝতে হলে দুটি স্তর আলাদা করে দেখতে হয়। প্রথম স্তর হলো material conditions—দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি, যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা। দ্বিতীয় স্তর হলো legitimizing ideology—যে বিশ্বাসব্যবস্থা একটি শিশুর বিয়েকে শুধু সম্ভব নয়, নৈতিক বা ধর্মীয়ভাবে সঠিক বলেও প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম-অধ্যুষিত বহু অঞ্চলে এই দ্বিতীয় স্তরে ইসলামি ফিকহ, সুন্নাহ, অভিভাবকত্ব এবং বয়ঃসন্ধিভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার ধারণা কাজ করেছে। এর ফলে বাল্যবিবাহ শুধু অভাবের ফল নয়; তা একটি ধর্মীয়ভাবে বৈধ সামাজিক সিদ্ধান্ত হিসেবেও টিকে থাকে।
বয়ঃসন্ধি প্রাপ্তবয়স্কতার সমার্থক নয়
পাকিস্তান, ইরাক, সৌদি আরব, ইরান ও ইয়েমেনের আইনগত ও ধর্মীয় বিতর্কে একটি ধারণা বারবার ফিরে আসে—একটি মেয়ে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছালে তাকে বিবাহযোগ্য ধরা যেতে পারে। এই ধারণাটি মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। বয়ঃসন্ধি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া; এটি শরীরে যৌন ও প্রজনন-সংক্রান্ত পরিবর্তনের সূচনা নির্দেশ করে। এর সঙ্গে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতা, আর্থিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক ক্ষমতা, বৈবাহিক দায়িত্ব বহনের সামর্থ্য অথবা যৌন সম্পর্কে অর্থপূর্ণ ও স্বাধীন সম্মতির কোনো সরাসরি সমতা নেই। একটি ১০, ১২ বা ১৩ বছরের শিশুর শরীরে reproductive function শুরু হতে পারে; সেখান থেকে তাকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে বিবাহ ও যৌন সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত ঘোষণা করা একটি অবৈধ লাফ—জৈবিক সক্ষমতা থেকে সামাজিক ও নৈতিক প্রাপ্তবয়স্কতা অনুমান করা। বর্তমান খসড়াতেও এই সমস্যাটিকে biological fact এবং normative claim-এর বিভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।
এই ফিকহি ধারণার সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি হলো, শিশুত্বের সীমানা বয়স দিয়ে নয়, শরীরের যৌন পরিপক্বতা দিয়ে নির্ধারণ করা। কোনো মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাব শুরু হলেই যদি তাকে ‘বিবাহযোগ্য’ বলা হয়, তাহলে তাকে মানুষ হিসেবে নয়, প্রজননক্ষম শরীর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার শিক্ষা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী বোঝে, যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার বাস্তব ক্ষমতা আছে কি না, একজন বয়সে বড় স্বামীর সঙ্গে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক সামলাতে পারবে কি না—এসব প্রশ্ন গৌণ হয়ে যায়। মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়: তার শরীর সন্তান ধারণ করতে পারে কি না। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশুর ব্যক্তিসত্তাকে সংকুচিত করে তার প্রজননক্ষমতায় নামিয়ে আনে।
আধুনিক শিশু-অধিকার আইন chronological age ব্যবহার করে কারণ puberty কোনো স্থিতিশীল বা ন্যায়সঙ্গত আইনি মানদণ্ড নয়। বয়ঃসন্ধি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন সময়ে শুরু হয়; একই বয়সের দুই শিশুর শারীরিক বিকাশ আলাদা হতে পারে। যদি আইন puberty-কে বিবাহযোগ্যতার ভিত্তি করে, তাহলে নয়, দশ বা এগারো বছরের একটি মেয়েকেও তার শরীরের বিকাশের কারণে প্রাপ্তবয়স্ক বৈবাহিক সম্পর্কে ঠেলে দেয়া সম্ভব হয়। এই কারণেই ‘বয়ঃসন্ধি হয়েছে, অতএব বিয়ে বৈধ’ যুক্তি শুধু পুরনো নয়; এটি শিশু-সুরক্ষার ধারণার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে থাকা একটি বিপজ্জনক মানদণ্ড।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়া গর্ভধারণকে নিরাপদও করে না। reproductive capacity মানেই reproductive safety নয়। কিশোরী শরীর গর্ভধারণ করতে সক্ষম হতে পারে, কিন্তু সেই গর্ভধারণের ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর তুলনায় বেশি হতে পারে। ফলে puberty-কে বিবাহযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার শুধু সামাজিকভাবে নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকেও বিভ্রান্তিকর। একটি শরীর কোনো কাজ করতে সক্ষম হলেই সেই কাজ তার জন্য নিরাপদ, নৈতিক বা উপযুক্ত হয়ে যায় না।
বাল্যবিবাহের স্বাস্থ্যগত, শিক্ষাগত ও সামাজিক মূল্য
বাল্যবিবাহের ক্ষতি কোনো বিমূর্ত নৈতিক বিতর্ক নয়; এর ফল মাপা যায় কিশোরী গর্ভধারণ, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং পারিবারিক ক্ষমতার বৈষম্যে। WHO-এর ২০২৫ সালের adolescent pregnancy guideline অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে adolescent births-এর প্রায় ১০টির মধ্যে ৯টিই এমন মেয়েদের মধ্যে ঘটে যারা ১৮ বছরের আগেই বিয়ে করেছে। এই একটি পরিসংখ্যানই দেখায় বাল্যবিবাহ এবং অল্প বয়সে মাতৃত্ব কত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিয়ে যত তাড়াতাড়ি হয়, যৌন সম্পর্ক ও গর্ভধারণের সামাজিক চাপও তত দ্রুত শুরু হয় [34]।
কিশোরী মাতৃত্বের চিকিৎসাগত ঝুঁকিও প্রতিষ্ঠিত। WHO অনুযায়ী ১০–১৯ বছর বয়সী মায়েদের eclampsia, puerperal endometritis এবং systemic infection-এর ঝুঁকি ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের তুলনায় বেশি। তাদের শিশুদের low birth weight, preterm birth এবং গুরুতর neonatal complications-এর ঝুঁকিও বেশি। ফলে ‘মেয়ে ঋতুমতী হয়েছে, তাই সন্তান ধারণে সক্ষম’—এই বক্তব্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই গোপন করে: সক্ষমতা আছে মানেই নিরাপত্তা নেই। একটি শিশুর শরীর গর্ভধারণ করতে পারা এবং সেই গর্ভধারণ তার শরীরের জন্য উপযুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
শিক্ষার ওপর প্রভাবও একইভাবে ধ্বংসাত্মক। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েদের ওপর সংসার, যৌন সম্পর্ক, গর্ভধারণ এবং সন্তান পালনের দায়িত্ব দ্রুত চাপতে পারে। এর সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, পরীক্ষা দেয়া, উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া প্রায়ই সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের নিজস্ব MICS তথ্যেই দেখা যায়, শিক্ষার স্তর যত বাড়ে বাল্যবিবাহের হার তত কমে। শিক্ষা ও বাল্যবিবাহের সম্পর্ক দ্বিমুখী—শিক্ষা থেকে বাদ পড়া বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার বাল্যবিবাহও শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ফলাফল একই: একটি মেয়ে যত তাড়াতাড়ি বিয়েতে প্রবেশ করে, তার নিজের জীবনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ তত সংকুচিত হয়।
বাল্যবিবাহের আরেকটি মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার অসমতা। একজন কিশোরী যখন বয়সে বড়, অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন এবং সামাজিকভাবে কর্তৃত্বশালী একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত হয়, তখন সম্পর্কটি কাগজে ‘বিবাহ’ হলেও ক্ষমতার ভারসাম্য সমান থাকে না। মেয়েটি যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান, গর্ভধারণ বিলম্বিত করা, শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া, আলাদা থাকা বা বিবাহ ভাঙার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা স্বাধীনভাবে নিতে পারবে—এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বা পারিবারিক ব্যবস্থায় যদি একই সঙ্গে স্বামীর আনুগত্য, পুরুষ অভিভাবকত্ব এবং পরিবারের সম্মান রক্ষার চাপ থাকে, তাহলে কিশোরীর স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়।
এই কারণেই বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’, ‘শরিয়তসম্মত’ বা ‘পারিবারিক অধিকার’ বলে রক্ষা করা শুধু একটি ধর্মীয় মত প্রকাশ নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেয়া, যার বাস্তব মূল্য দেয় মেয়েশিশুর শরীর, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ। ধর্মীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষার জন্য কোনো শিশুকে উচ্চতর মাতৃস্বাস্থ্যঝুঁকি, অল্প বয়সে মাতৃত্ব, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা এবং বৈবাহিক ক্ষমতার অসমতার মধ্যে ঠেলে দেয়া নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেখানে প্রমাণ ক্ষতি দেখায়, সেখানে ঐতিহ্যের বয়স বা ধর্মীয় মর্যাদা সেই ক্ষতিকে মুছে দেয় না।
‘সুন্নতী বাল্যবিবাহ’ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হলে
বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’ বলা নিছক ধর্মীয় স্মৃতিচারণ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও আইনগত দাবি। ‘সুন্নতী বাল্যবিবাহ’ কথাটির ভেতরে এমন একটি যুক্তি লুকিয়ে থাকে, যার উদ্দেশ্য অল্পবয়সী মেয়ের বিয়েকে সাধারণ সামাজিক আচরণ থেকে তুলে ধর্মীয়ভাবে সুরক্ষিত আচরণে পরিণত করা। কোনো প্রথাকে নবীর সুন্নত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে তার সমালোচনা শুধু একটি সামাজিক প্রথার সমালোচনা থাকে না; সেটিকে নবীর আদর্শ, ইসলামি বিধান এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে চিত্রিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনকে ‘কুফরি আইন’ বলা, বাল্যবিবাহকে ‘খাস সুন্নত’ ঘোষণা করা এবং এর বিরোধিতাকে ‘নবীর বিরোধিতা’ হিসেবে প্রচার করা ঠিক এই রাজনৈতিক কৌশলের উদাহরণ।
এই কৌশল শুধু বাংলাদেশে দেখা যায়নি। পাকিস্তানের Council of Islamic Ideology বলেছে নির্দিষ্ট ন্যূনতম বিবাহবয়স ‘অনৈসলামিক’; JUI-F আদালতে গিয়ে বলেছে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো ব্যক্তিকে ১৮ বছরের নিচে হলেও ‘child’ হিসেবে গণ্য করা শরিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইয়েমেনে ধর্মীয় আপত্তিতে ১৫ বছরের ন্যূনতম বয়স বাতিল হয়েছে এবং ১৭ বছরের সীমা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আটকে গেছে। ইরাকে জাফারি personal-status code বয়ঃসন্ধিকে আবার বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ডে পরিণত করেছে। ইরানে ১৩ বছরের মেয়ের বিয়ে আইনত বৈধ এবং তারও নিচে বিচারিক অনুমতির সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরবে ১৮ বছরের ঘোষিত সীমার নিচে puberty ও বিচারিক অনুমতির মাধ্যমে বিয়ের পথ খোলা। দেশভেদে আইনের ভাষা আলাদা, কিন্তু যুক্তির মূল কাঠামো একই: একটি মেয়ের chronological age-এর ওপর শরিয়াভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার ধারণাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
এই জায়গায় ধর্মীয় ভূমিকা অস্বীকার করা তথ্যের সরাসরি বিরোধিতা। যখন সংগঠন নিজেই ‘সুন্নত’ বলছে, ইসলামি পরিষদ নিজেই আইনকে ‘অনৈসলামিক’ বলছে, রাজনৈতিক দল নিজেই শরিয়া আদালতে যাচ্ছে, সংসদীয় ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেই ন্যূনতম বয়সের বিরোধিতা করছে এবং ধর্মীয় personal-status code নিজেই puberty-কে বিবাহযোগ্যতার মানদণ্ড করছে—তখন এটিকে শুধু ‘সংস্কৃতি’, ‘দারিদ্র্য’ বা ‘স্থানীয় প্রথা’ বলে ব্যাখ্যা করা সত্য গোপন করা। দারিদ্র্য ও অশিক্ষা বাল্যবিবাহের বিস্তার বাড়াতে পারে; কিন্তু একটি শিশুর বিয়েকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ ঘোষণা করা, তার বিরুদ্ধে আইনকে অনৈসলামিক বলা এবং সেই আইন বাতিলের আন্দোলন করা সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ideological intervention।
‘সুন্নতী বাল্যবিবাহ’ ধারণার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি শিশুর ক্ষতির প্রশ্নকে ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্ন দিয়ে প্রতিস্থাপন করে। একটি ১২ বা ১৩ বছরের মেয়ের শিক্ষা বন্ধ হবে কি না, গর্ভধারণ তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে স্বাধীনভাবে যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করতে পারবে কি না, বয়সে বড় স্বামীর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার বদলে বলা হয়, নবীর জীবনে এমন বিবাহের নজির আছে অথবা শরিয়ায় এটি বৈধ। কিন্তু কোনো আচরণের ধর্মীয় বৈধতা তার ক্ষতি বাতিল করে না। যদি কোনো ধর্মীয় বিধান শিশুকে এমন বৈবাহিক ও যৌন সম্পর্কে প্রবেশের অনুমতি দেয়, যার জন্য সে মানসিক, সামাজিক ও আইনগতভাবে প্রস্তুত নয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু সেই আচরণে নয়; সমস্যাটি সেই বিধানেও।
এখানেই আধুনিক শিশু-অধিকার এবং প্রাক-আধুনিক ইসলামি বিবাহযোগ্যতার ধারণার সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। আধুনিক শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা বলে, একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে শিশুকে বৈবাহিক ও যৌন সম্পর্কের দায়িত্ব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। বয়ঃসন্ধিভিত্তিক ফিকহ বলে, শারীরিক পরিপক্বতা বা অভিভাবকের সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিবাহের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দুটো কাঠামো একই সঙ্গে পূর্ণভাবে কার্যকর হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি ১৮ বছরের নিচে মেয়েকে শিশু হিসেবে সুরক্ষা দিতে চায়, আর ধর্মীয় বিধান যদি তাকে বয়ঃসন্ধির পর বিবাহযোগ্য বলে, তাহলে একটির সীমা অন্যটিকে অতিক্রম করবেই। এই সংঘাতকে অস্পষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।
সুতরাং ‘সুন্নতী বাল্যবিবাহ’ কোনো নিরীহ ধর্মীয় শব্দবন্ধ নয়। এটি এমন একটি মতাদর্শিক অস্ত্র, যার মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়েকে ধর্মীয় মর্যাদা দেয়া, তার বিরুদ্ধে আইনকে ধর্মবিরোধী ঘোষণা করা এবং শিশুর অধিকারের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান ও সৌদি আরব পর্যন্ত আলোচিত ঘটনাগুলো দেখায় যে এই ধারণা শুধু ইতিহাসের পাতায় নেই; এটি বর্তমানেও আইন, আদালত, রাজনৈতিক আন্দোলন, ওয়াজ এবং ধর্মীয় প্রচারণার মাধ্যমে শিশুদের বিবাহযোগ্যতা নির্ধারণের প্রশ্নে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপসংহার
বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে বাল্যবিবাহ এখনো একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা। বিপুলসংখ্যক মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হচ্ছে, এবং তাদের একটি অংশের বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছরেরও আগে। এই প্রথা শুধু দরিদ্রতা, অশিক্ষা বা গ্রামীণ পশ্চাৎপদতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বহু ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ধর্মীয় অনুমোদন, সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক দায়িত্বের ধারণা জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে যখন অল্প বয়সে বিয়েকে নবীর সুন্নত, শরিয়তসম্মত আচরণ বা ধর্মীয় অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক প্রথা থেকে ধর্মীয়ভাবে সুরক্ষিত দাবিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের উদাহরণ এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে দেখায়। এখানে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন থাকার পরও ধর্মীয় সংগঠন ও বক্তাদের একটি অংশ সেই আইনকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করেছে। আইনকে ‘কুফরি’ বলা হয়েছে, বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’ বলে প্রচার করা হয়েছে, এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওয়াজ, পোস্টার, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে এই বক্তব্য জনসমাজে ছড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এখানে বাল্যবিবাহের পক্ষে ধর্মীয় সমর্থন কোনো অনুমান নয়; তা প্রকাশ্য বক্তব্য ও আন্দোলনের মাধ্যমে নথিবদ্ধ।
একই ধারা বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তানে বয়ঃসন্ধিকে বিবাহযোগ্যতার ইসলামি মানদণ্ড হিসেবে সামনে এনে ন্যূনতম বিবাহবয়সের আইনকে ‘অনৈসলামিক’ বলা হয়েছে এবং সেই আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ইয়েমেনে ধর্মীয় বিরোধিতার কারণে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের প্রচেষ্টা দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইরাকে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের মাধ্যমে বয়ঃসন্ধিভিত্তিক বিবাহযোগ্যতার বিধান পুনরায় সামনে এসেছে। সৌদি আরব ও ইরানের আইনেও অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এসব উদাহরণ দেখায় যে মুসলিম বিশ্বের একটি অংশে বাল্যবিবাহের প্রশ্নটি শুধু সামাজিক অভ্যাসের বিষয় নয়; এটি শরিয়া, ফিকহ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যকার সংঘাতের অংশ।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রাক-আধুনিক ধারণা—বয়ঃসন্ধি মানেই বিবাহযোগ্যতা। এই ধারণা আধুনিক জ্ঞান ও শিশু-অধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি মেয়ের ঋতুস্রাব শুরু হওয়া শুধু তার শরীরে প্রজননক্ষমতার সূচনা নির্দেশ করে; এটি তাকে মানসিকভাবে পরিণত, অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান বা যৌন ও বৈবাহিক সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে না। একটি শিশুর শরীর সন্তান ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে, কিন্তু সেই সক্ষমতা তাকে গর্ভধারণ, মাতৃত্ব, সংসার, যৌন সম্পর্ক এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর সঙ্গে অসম ক্ষমতার সম্পর্কের দায়িত্ব বহনের উপযুক্ত করে না। বয়ঃসন্ধিকে প্রাপ্তবয়স্কতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা তাই একটি জৈবিক ঘটনাকে সামাজিক ও আইনগত প্রাপ্তবয়স্কতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা।
নবীর সুন্নত বা ধর্মীয় ঐতিহ্যের দোহাই দিয়েও এই সমস্যার সমাধান হয় না। কোনো আচরণ অতীতে সংঘটিত হয়েছে বা ধর্মীয় ঐতিহ্যে বৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে—এটি সেই আচরণকে বর্তমান সমাজে নৈতিক, নিরাপদ বা শিশুদের জন্য গ্রহণযোগ্য করে তোলে না। ইতিহাসের কোনো নজির শিশুর শারীরিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাধীনতা, মানসিক বিকাশ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের চেয়ে বড় হতে পারে না। যখন কোনো ধর্মীয় বিধান বা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত এই অধিকারগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন শিশুদের অধিকারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান তাই সেই ধর্মীয় মতবাদ ও বিধানেরও বিরুদ্ধে অবস্থান, যেগুলো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়েকে বৈধ, সুন্নতসম্মত বা শরিয়তসম্মত বলে স্বীকৃতি দেয়। কোনো ধর্মীয় বিধান যদি শিশুর স্বাধীন সম্মতি, শিক্ষা, শারীরিক নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশের অধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে সেই বিধান সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। অভিভাবক, আলেম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাস শিশুর ওপর বৈবাহিক ও যৌন সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়ার নৈতিক অধিকার সৃষ্টি করে না। শিশুবিবাহকে ধর্মীয় অধিকারের নামে রক্ষা করার অর্থ হলো শিশুর অধিকারের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বকে অগ্রাধিকার দেয়া।
সুতরাং মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বাল্যবিবাহকে ‘সুন্নত’, ‘শরিয়তসম্মত’ বা ‘ধর্মীয় অধিকার’ হিসেবে বৈধতা দেয়ার প্রচারণাকেও সরাসরি মোকাবেলা করতে হবে। কারণ আইন একদিকে ১৮ বছরের সীমা নির্ধারণ করলেও সমাজে যদি একই সঙ্গে প্রচার করা হয় যে বয়ঃসন্ধির পর একটি মেয়ে বিয়ের জন্য প্রস্তুত এবং এই বিয়ের বিরোধিতা ধর্মের বিরোধিতা, তাহলে সেই আইন বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন এমন একটি স্পষ্ট নীতি যেখানে ধর্মীয় ঐতিহ্য, পারিবারিক সম্মতি বা সামাজিক চাপ—কোনোটিই অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বাধীনতা ও অধিকারের ওপর স্থান পাবে না।
তথ্যসূত্রঃ
- UNICEF Data: Child marriage 1 2
- UNICEF Data: Gender equality — Child marriage 1 2
- UNICEF Bangladesh: Data on the situation of children in Bangladesh ↩︎
- Bangladesh Multiple Indicator Cluster Survey 2025 ↩︎
- Bangladesh MICS 2025: Survey Findings Report ↩︎
- Bangladesh MICS 2025: Child Marriage — Levels & Disaggregates ↩︎
- বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ — বাংলাদেশ আইন ↩︎
- বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭, ধারা ১৯ ↩︎
- United Nations: Bangladesh follow-up information on the Child Marriage Restraint Act and Rules ↩︎
- ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ নামক কুফরি আইন প্রত্যাহার করে…এসব এনজিও নিষিদ্ধ করতে হবে’ ↩︎
- পাবনায় এক ব্যক্তিকে ‘শিরশ্ছেদের হুমকি আনসারুল্লাহর’ ↩︎
- ‘Marriage age’ laws un-Islamic: CII ↩︎
- CII endorses underage marriage ↩︎
- Library of Congress: Pakistan — President Grants Assent to Islamabad Child Marriage Law ↩︎
- Clerics warn president against signing child marriage bill ↩︎
- JUI-F’s Fazl assails child marriage law, announces protest rallies across country ↩︎
- JUI-F challenges Islamabad’s child marriage law in Shariat court ↩︎
- Yemen: End Child Marriage ↩︎
- Human Rights Watch: “How Come You Allow Little Girls to Get Married?” ↩︎
- UNICEF: 2024 Country Profile — Yemen ↩︎
- Human Rights Watch: World Report 2026 — Iraq ↩︎
- Marriage Without Safeguards: The Consequences of Iraq’s Personal Status Code ↩︎
- UNICEF Iraq: MICS6 2018 — Child Marriage ↩︎
- Human Rights Watch: World Report 2025 — Iraq ↩︎
- Human Rights Watch: World Report 2026 — Iran ↩︎
- ACCORD: Iran — Child marriage and Article 1041 of the Civil Code ↩︎
- Iran: Child Protection Law Positive, but Insufficient ↩︎
- UNICEF Data: Iran ↩︎
- Saudi Arabia: Law Enshrines Male Guardianship ↩︎
- Human Rights Watch: Child Marriage under Saudi Arabia’s Personal Status Law ↩︎
- Saudi Arabian cleric declares babies should wear burkas ↩︎
- ‘Even BABIES must wear the burka’ ↩︎
- UNICEF: Child marriage ↩︎
- WHO releases new guideline to prevent adolescent pregnancies and improve girls’ health ↩︎

