জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

নবী মুহাম্মদের যৌন নির্যাতন: জাওনিয়া ও উমাইমার সম্মতি লঙ্ঘন এবং নারী অবমাননা

প্রকাশিত: এপ্রিল 28, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 61 মিনিট পড়া

সারসংক্ষেপ

এই প্রবন্ধে সহীহ বুখারী এবং একাধিক প্রাচীন ইসলামি ব্যাখ্যা ও ইতিহাসগ্রন্থের আলোকে মুহাম্মদের সঙ্গে জাওনিয়া ও উমাইমা নামে পরিচিত নারীদের ঘটনাগুলো সম্মতি, যৌন স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতার সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় দেখা যায়, একজন নারীকে মুহাম্মদের কাছে আনা হলে তিনি তাকে বলেন, “তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো।” নারীটি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে রাজকুমারী এবং মুহাম্মদকে “বাজারিয়া” ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর মুহাম্মদ তার শরীরের দিকে হাত বাড়ালে তিনি বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” অন্য একটি সহিহ বর্ণনায় উমাইমা বিনতে শারাহিলকে মুহাম্মদের স্ত্রী বলা হলেও একই সঙ্গে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ তার দিকে হাত বাড়ালে নারীটি তা অপছন্দ করেন। ফলে বর্ণনাগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন শুধু সংশ্লিষ্ট নারীদের সঙ্গে কোনো ধরনের বিবাহ বা আকদ হয়েছিল কি না, তা নয়, বরং তারা নিজেরা সেই সম্পর্ক এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় স্বাধীনভাবে সম্মতি দিয়েছিলেন কি না।

প্রবন্ধে জাওনিয়া ও উমাইমা একই নারী নাকি ভিন্ন নারী, সেই বিতর্কও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বুখারীর বিভিন্ন বর্ণনার ভাষাগত পার্থক্যের পাশাপাশি ইবন হাজার আল-আসকালানির ফাতহুল বারী থেকে দেখানো হয়েছে যে, তিনিও একাধিক ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী বলে বিবেচনা করেছেন এবং একটি সংশ্লিষ্ট নারীর ক্ষেত্রে সরাসরি বলেছেন, তার সঙ্গে আকদই হয়নি, মুহাম্মদ কেবল তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিতে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে হাদিসের কোনো বর্ণনা “তালাক” বিষয়ক পরিচ্ছেদের অধীনে থাকার অর্থ এই নয় যে, সেই পরিচ্ছেদের শিরোনাম থেকেই সংশ্লিষ্ট নারীর বিবাহিত অবস্থান চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যাবে। সহীহ বুখারীর “ঘুমন্ত মুশরিককে হত্যা” পরিচ্ছেদের অধীনে ইহুদি আবু রাফেকে হত্যার বর্ণনা থাকার উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, হাদিসগ্রন্থের পরিচ্ছেদের শিরোনাম অনেক সময় সংকলকের ফিকহি শ্রেণিবিন্যাস, সেটি বর্ণনার প্রতিটি ব্যক্তির আক্ষরিক ঐতিহাসিক পরিচয় নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, প্রবন্ধটি ক্লাসিক্যাল ইসলামি ফিকহের আলোকে মুহাম্মদের বিশেষ বৈবাহিক অধিকার বা খাসায়িস বিশ্লেষণ করেছে। ইবন হাজারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মুহাম্মদের জন্য কোনো নারীর এবং তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজেকে সেই নারীর সঙ্গে বিবাহিত করা সম্ভব ছিল, এমনকি সংশ্লিষ্ট নারীকে ডেকে পাঠানো, তাকে উপস্থিত করা এবং মুহাম্মদের তার প্রতি আগ্রহই এই বিশেষ ব্যবস্থায় যথেষ্ট বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইমাম নববীর রওদাতুত তালিবীন, ইবন কুদামার আল-মুগনি এবং ইবন কাসিরের তাফসির থেকেও দেখানো হয়েছে যে, মুহাম্মদের নিকাহের ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানের জন্য প্রযোজ্য ওলি, সাক্ষী, মোহর এবং এমনকি নারীর অনুমতির মতো শর্তগুলোর ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যতিক্রম স্বীকৃত ছিল। ফলে “নারীটি তাঁর স্ত্রী ছিলেন” এই দাবি দিয়ে সম্মতির প্রশ্নের সমাধান হয় না, কারণ ক্লাসিক্যাল ফিকহের সেই একই কাঠামোতেই বিবাহ এবং নারীর স্বাধীন সম্মতি দুটি পৃথক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

প্রবন্ধে আরও দেখানো হয়েছে, জাওনিয়ার প্রত্যাখ্যানের পরবর্তী কিছু ইসলামি ব্যাখ্যায় আয়েশা ও হাফসার কথিত ষড়যন্ত্র, নারীর মানসিক অবস্থা কিংবা “বাজারিয়া” শব্দের অর্থ পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, অথচ মূল বুখারী বর্ণনায় নারীটির বক্তব্য ও আচরণ সরাসরি প্রত্যাখ্যানের একটি ধারাবাহিক চিত্র উপস্থাপন করে। পাশাপাশি আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-র একটি বর্ণনায় দেখা যায়, ঐ নারী মুহাম্মদের কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় নেওয়ার পর মুহাম্মদ রুষ্ট হয়ে বেরিয়ে এলে আশ‘আছ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে নিজের আরও সুন্দরী বোন কাতীলাকে বিবাহের জন্য প্রস্তাব করেন। এই ঘটনাটিও প্রবন্ধে ক্ষমতার চারপাশে নারীকে পুরুষের ইচ্ছা, মর্যাদা ও আবেগের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের বৃহত্তর সামাজিক মানসিকতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সবশেষে প্রবন্ধটির মূল হচ্ছে, কোনো সম্পর্ককে ধর্মীয় বা ফিকহি ভাষায় “বিবাহ” বলা হয়েছে কি না, সেটিই কি সেই সম্পর্কের নৈতিক বৈধতার জন্য যথেষ্ট, নাকি সংশ্লিষ্ট নারীর নিজের স্বাধীন, সচেতন এবং প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতিই আসল নির্ণায়ক? জাওনিয়া ও উমাইমার বর্ণনা, তাদের প্রত্যাখ্যান, মুহাম্মদের বিশেষ বৈবাহিক অধিকার সম্পর্কে ক্লাসিক্যাল ফিকহের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণগুলো পাশাপাশি রাখলে প্রবন্ধটি দেখায় যে, ক্ষমতা ও ধর্মীয় বিশেষাধিকারের সামনে নারীর ব্যক্তিগত সম্মতি কত সহজে গৌণ হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই ঘটনাগুলো শুধু সপ্তম শতাব্দীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাস নয়, বরং আজও মুহাম্মদকে সর্বকালের নৈতিক আদর্শ হিসেবে উপস্থাপনের দাবির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন।

প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ও প্রমাণের সারসংক্ষেপ

বিষয়মূল তথ্য ও প্রমাণপ্রধান উৎসবিশ্লেষণগত গুরুত্ব
জাওনিয়ার প্রত্যাখ্যানমুহাম্মদ নারীটিকে বলেন, “নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো”। নারীটি নিজেকে উচ্চবংশীয় বা রাজকীয় অবস্থানের বলে উল্লেখ করে মুহাম্মদকে সুকা/সাধারণ প্রজা হিসেবে তুচ্ছ করেন। মুহাম্মদ তার দিকে শারীরিকভাবে অগ্রসর হলে তিনি বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।”[1]নারীর নিজের বক্তব্য ও আচরণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় অসম্মতির প্রমাণ দেয়।
নিকটবর্তী হওয়াআয়েশার সূত্রে আরেক সহিহ বর্ণনায় বলা হয়েছে, জাওনের কন্যাকে মুহাম্মদের কাছে আনা হলে তিনি وَدَنَا مِنْهَا, অর্থাৎ তার নিকটবর্তী হন। তখনই নারীটি তাঁর কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান।[2]প্রত্যাখ্যানটি মুহাম্মদের নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল।
চুম্বন করার জন্য এগিয়ে যাওয়াপ্রাচীন কিছু বর্ণনায় মুহাম্মদের অগ্রসরতাকে আরও নির্দিষ্টভাবে فَأَهْوَى إِلَيْهَا لِيُقَبِّلَهَا, অর্থাৎ “তিনি তাকে চুম্বন করার জন্য তার দিকে এগিয়ে গেলেন” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।[3] [4]বুখারীর “হাত বাড়ানো” বর্ণনাটিকে কেবল নিরীহ সান্ত্বনামূলক অঙ্গভঙ্গি হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ সংকুচিত করে।
ইবন হাজারের ব্যাখ্যাইবন হাজার বুখারীর فأهوى بيده বাক্য ব্যাখ্যা করতে ইবন সা‘দের variant উদ্ধৃত করেন, যেখানে স্পষ্টভাবে ليقبلها, অর্থাৎ “তাকে চুম্বন করার জন্য” বলা হয়েছে।[5]চুম্বনের ব্যাখ্যাটি আধুনিক সমালোচকের অনুমান নয়; ক্লাসিক্যাল বুখারী-শরহের মধ্যেই এটি সংরক্ষিত।
উমাইমার ঘটনাঅন্য সহিহ বর্ণনায় বলা হয়েছে, মুহাম্মদ উমাইমা বিনতে শারাহিলকে বিবাহ করেছিলেন। তাকে মুহাম্মদের কাছে আনা হলে তিনি তার দিকে হাত বাড়ান এবং নারীটি সেই আচরণ অপছন্দ করেন। এরপর তাকে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।[6]বিবাহিত বলে বর্ণিত হওয়ার পরও নারীর শারীরিক অসম্মতি আলাদাভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে।
একজন নারী নাকি একাধিক নারীইবন হাজার বিভিন্ন বর্ণনার অসামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করে বলেন, فَيَقْوَى التَّعَدُّدُ, অর্থাৎ ঘটনা একাধিক হওয়ার সম্ভাবনা শক্তিশালী। তিনি একটি নারীর ক্ষেত্রে বলেন, আকদ হয়েছিল; অন্যটির ক্ষেত্রে لَمْ يُعْقَدْ عَلَيْهَا, অর্থাৎ আকদই হয়নি।[7]সব বর্ণনাকে জোর করে একই নারীর একটি মাত্র বিবাহ-বিচ্ছেদের কাহিনিতে একীভূত করা যায় না।
নারীর অনুমতি ছাড়াই নবীর বিবাহাধিকারইবন হাজারের উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মুহাম্মদ কোনো নারীকে তার নিজের এবং তার ওলির অনুমতি ছাড়াই নিজের সঙ্গে বিবাহিত করতে পারতেন; তাকে ডেকে পাঠানো, হাজির করা এবং মুহাম্মদের আগ্রহই যথেষ্ট হতে পারত।[8]“তিনি তার স্ত্রী ছিলেন” দাবি নারীর স্বাধীন সম্মতি প্রমাণ করে না; বরং ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যার মধ্যেই সম্মতিহীন বিবাহের সম্ভাবনা স্বীকৃত।
নববীর খাসায়িসইমাম নববী বলেন, মুহাম্মদ কোনো অবিবাহিত নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হলে সঠিক মত অনুযায়ী তার জন্য ইতিবাচক সাড়া দেওয়া আবশ্যক ছিল। তিনি নারী ও তার ওলির অনুমতি ছাড়াই নিজেকে সেই নারীর সঙ্গে বিবাহিত করতে পারতেন।[9]এই বিশেষাধিকার শুধু জাওনিয়ার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার ad hoc ধারণা নয়; এটি ক্লাসিক্যাল ফিকহে নবীর বিশেষ বৈবাহিক বিধানের অংশ।
ওলি, সাক্ষী ও মোহর থেকে ব্যতিক্রমইবন কুদামা মুহাম্মদের জন্য ওলি ও সাক্ষী ছাড়াই বিবাহকে বিশেষাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবন কাসির আরও বলেন, তাঁর জন্য মোহর, ওলি ও সাক্ষী ছাড়াই বিবাহ সম্ভব ছিল।[10] [11]নবীর নিকাহকে সাধারণ মুসলমানের বিবাহের নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
হিবা বা নিজেকে নবীর কাছে দানকুরআন ৩৩:৫০ এবং ক্লাসিক্যাল তাফসিরে এমন নারীকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যিনি নিজেকে নবীর কাছে হিবা করেন। এই ব্যবস্থা সাধারণ মুসলমানের বিবাহ থেকে আলাদা।[12] [13]জাওনিয়ার কাছে هبي نفسك لي বলা একটি নির্দিষ্ট নববী বৈবাহিক বিশেষাধিকারের ভাষা; সাধারণ দাম্পত্য কথোপকথন নয়।
আয়েশার প্রতিক্রিয়ানিজেদের নবীর কাছে হিবা করা নারীদের প্রসঙ্গে আয়েশা আপত্তি প্রকাশ করেছিলেন। ৩৩:৫১ নাজিল হওয়ার পর তিনি মুহাম্মদকে বলেন, ما أرى ربك إلا يسارع في هواك, অর্থাৎ তাঁর রব তাঁর ইচ্ছা পূরণে দ্রুততা দেখাচ্ছেন বলে তাঁর মনে হচ্ছে।[14]নবীর বিশেষ বৈবাহিক সুবিধা তাঁর নিজের গৃহপরিসরেও দৃশ্যমান ও আলোচিত ছিল।
অধ্যায়ের শিরোনাম বনাম ঐতিহাসিক তথ্যবুখারীতে আবু রাফে নামে একজন ইহুদিকে হত্যার ঘটনা “ঘুমন্ত মুশরিককে হত্যা” পরিচ্ছেদের অধীনে রাখা হয়েছে।[15]কোনো হাদিস তালাক অধ্যায়ে থাকার অর্থ এই নয় যে অধ্যায়ের শিরোনাম থেকেই সংশ্লিষ্ট নারীর বিবাহিত অবস্থান নিশ্চিত করা যাবে।
প্রত্যাখ্যানের পর সাহাবীর বোনের প্রস্তাবঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, নারীটি আল্লাহর আশ্রয় চাইলে মুহাম্মদ রুষ্ট বা দুঃখিত হয়ে বেরিয়ে আসেন। আশ‘আছ তখন নিজের আরও সুন্দরী বোন কাতীলাকে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহের জন্য প্রস্তাব করেন।[16]নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিবর্তে পুরুষদের মধ্যে নারীকে বিবাহযোগ্য সম্পদ হিসেবে স্থানান্তরের সামাজিক কাঠামোটি দৃশ্যমান হয়।
পরবর্তী ব্যাখ্যাগত পুনর্গঠনকিছু পরবর্তী বর্ণনায় আয়েশা ও হাফসা নারীটিকে বিশেষ বাক্য বলতে শিখিয়েছিলেন, আবার কোথাও তার মানসিক অবস্থা বা পরিচয় নিয়ে অতিরিক্ত কাহিনি যুক্ত হয়েছে।[17] [18]মূল বর্ণনার সরাসরি প্রত্যাখ্যানকে ব্যাখ্যা করতে পরবর্তী ঐতিহ্যে বিভিন্ন rescue narrative গড়ে উঠেছে।
প্রাথমিক সীরাহর নির্বাচনী সংরক্ষণইবন হিশাম নিজেই জানান, ইবন ইসহাকের কিছু উপাদান তিনি বাদ দিয়েছেন, যার কিছু বর্ণনা আপত্তিকর মনে হতো এবং কিছু উল্লেখ মানুষের কাছে অসন্তোষজনক ছিল।[19]প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহাসিক tradition-ও সম্পূর্ণ যান্ত্রিক বা নিরপেক্ষ preservation process ছিল না।
প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তআকদ হয়েছিল কি না, সেটি একমাত্র প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো সংশ্লিষ্ট নারী নিজে সেই সম্পর্ক ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা স্বাধীনভাবে চেয়েছিলেন কি না। উপলব্ধ বর্ণনায় প্রত্যাখ্যান, শারীরিক অস্বস্তি এবং “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই” বক্তব্য বারবার সামনে আসে।সহীহ বুখারী, ইবন সা‘দ, ইবন হাজার, নববী, ইবন কুদামা, ইবন কাসির ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক উৎসসমূহ“বিবাহ” শব্দটি নিজে সম্মতির প্রমাণ নয়। ক্লাসিক্যাল ইসলামি উৎসগুলোতেই এমন বৈবাহিক বিশেষাধিকার স্বীকৃত হয়েছে যেখানে নারীর স্বাধীন অনুমতি সাধারণ নিকাহের মতো অপরিহার্য ছিল না।

ভূমিকা

ঐতিহাসিক কোনো ব্যক্তির জীবন বিশ্লেষণ করার সময় তার রাজনৈতিক সাফল্য, সামরিক বিজয়, ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা অনুসারীদের ওপর প্রভাবের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আচরণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেই ব্যক্তিকে যদি কেবল একজন ঐতিহাসিক নেতা হিসেবে নয়, বরং সর্বকালের জন্য অনুকরণীয় নৈতিক আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে সমালোচনার বাইরে রাখার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে না। মুহাম্মদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিবাহ, যৌন সম্পর্ক এবং নারীদের সঙ্গে আচরণের বহু ঘটনা পরবর্তী সময়ে ইসলামি আইন, নৈতিকতা এবং সামাজিক বিধানের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আজও বিশ্বের বহু সমাজে তাঁর জীবনাচরণকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণের দাবি করা হয়। ফলে তাঁর জীবনের এসব ঘটনা শুধু সপ্তম শতাব্দীর ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়, এগুলোর নৈতিক তাৎপর্য বর্তমান সময়েও বিদ্যমান।

এই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে সম্মতি, অর্থাৎ একজন নারী কোনো সম্পর্ক, বিবাহ বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় সম্মত ছিলেন কি না। আধুনিক সময়ে যৌন ও বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতিকে একটি মৌলিক নৈতিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন মানুষকে কোনো সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করানোর জন্য তার পরিবারের সম্মতি, সামাজিক রীতি, ধর্মীয় বিধান কিংবা ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা তার নিজের ব্যক্তিগত সম্মতির বিকল্প হতে পারে না। সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজ অবশ্য বর্তমান বিশ্বের মতো ছিল না। সেই সময় নারীর সামাজিক অবস্থান, বিবাহের কাঠামো, দাসপ্রথা, যুদ্ধবন্দিনী নারী এবং পুরুষের পারিবারিক কর্তৃত্ব সবই ছিল ভিন্ন [20] [21]। এমনকি খুব সাম্প্রতিক অতীতেও পৃথিবীর বহু সমাজে বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন মতামতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা কোনো আচরণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিক করে তোলে না, বিশেষ করে যখন সেই আচরণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে সময় ও সমাজের ঊর্ধ্বে একটি সর্বজনীন নৈতিক আদর্শ হিসেবে দাবি করা হয়।

এই প্রবন্ধে বিশেষভাবে জাওনিয়া এবং উমাইমা নামে পরিচিত এক বা একাধিক নারীর সঙ্গে মুহাম্মদের আচরণ বিশ্লেষণ করা হবে। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় দেখা যায়, একজন নারীকে মুহাম্মদের কাছে আনা হয় এবং তিনি তাকে বলেন, “তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো।” নারীটি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন, নিজেকে রাজকুমারী হিসেবে উল্লেখ করে মুহাম্মদকে “বাজারিয়া” ব্যক্তি বলেন। এরপর মুহাম্মদ তার দিকে হাত বাড়ালে তিনি বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” অন্য একটি সহিহ বর্ণনায় উমাইমা বিনতে শারাহিলকে মুহাম্মদের স্ত্রী বলা হয়েছে, কিন্তু সেখানেও মুহাম্মদ তার দিকে হাত বাড়ালে নারীটি তা অপছন্দ করেন। এই বর্ণনাগুলো পড়লে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়। নারীটি যদি আগে থেকেই তাঁর স্ত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর নিজের সম্মতি কোথায়? “নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো” বলার প্রয়োজন কেন হলো? তিনি কেন মুহাম্মদকে প্রত্যাখ্যান করলেন? কেন তাঁর কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইলেন? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কোনো ফিকহি ব্যবস্থায় একজন নারীকে “স্ত্রী” হিসেবে গণ্য করা হলেই কি সেটি প্রমাণ করে যে নারীটি স্বাধীনভাবে সেই সম্পর্ক গ্রহণ করেছিলেন?

এই প্রশ্নগুলো শুধু আধুনিক সমালোচকদের তৈরি নয়। ক্লাসিক্যাল ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থেও এই ঘটনার বিবাহ এবং তালাক নিয়ে জটিলতা দেখা যায়। ইবন হাজার আল-আসকালানি ফাতহুল বারী-তে সরাসরি সেই আপত্তি উল্লেখ করেছেন যে, যদি বিবাহের আকদের কোনো বর্ণনাই না থাকে এবং নারী নিজেকে মুহাম্মদের কাছে দান করতে অস্বীকার করেন, তাহলে তাকে তালাক দেওয়ার প্রশ্ন আসে কীভাবে? এর উত্তরে তিনি এমন একটি বিশেষ বৈবাহিক অধিকারের কথা উল্লেখ করেন, যার ভিত্তিতে মুহাম্মদের জন্য নারীর অনুমতি এবং তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজেকে সেই নারীর সঙ্গে বিবাহিত করা সম্ভব ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ধারণা শুধু ইবন হাজারের একটি বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। ইমাম নববীর রওদাতুত তালিবীন, ইবন কুদামার আল-মুগনি, ইবন কাসিরের তাফসির এবং অন্যান্য ক্লাসিক্যাল ইসলামি গ্রন্থে মুহাম্মদের বিবাহসংক্রান্ত খাসায়িস বা বিশেষাধিকারের অধীনে সাধারণ মুসলমানের নিকাহে প্রযোজ্য একাধিক শর্ত থেকে তাঁর ব্যতিক্রমের আলোচনা পাওয়া যায়। ফলে “তিনি তো তাকে বিয়ে করেছিলেন” এই বক্তব্য দিয়ে সম্মতির সমস্যাটিকে শেষ করে দেওয়া যায় না, কারণ ক্লাসিক্যাল ফিকহের মধ্যেই “বিবাহ সংঘটিত হওয়া” এবং “নারী নিজে সেই বিবাহে স্বাধীনভাবে সম্মত হওয়া” একই বিষয় ছিল না।

এর পাশাপাশি প্রবন্ধে আরও কয়েকটি সম্পর্কিত প্রশ্ন বিশ্লেষণ করা হবে। জাওনিয়া ও উমাইমা একই নারী ছিলেন নাকি দুইজন ভিন্ন নারী, বুখারীর বিভিন্ন বর্ণনার ভাষা আসলে কী নির্দেশ করে, হাদিসের পরিচ্ছেদের শিরোনামকে কতটা ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, “হিবা” বা নিজেকে নবীর কাছে দান করার ধারণাটি ক্লাসিক্যাল ফিকহে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা এই ঘটনার অস্বস্তিকর দিকগুলো ব্যাখ্যা করতে কী ধরনের অতিরিক্ত আখ্যান ব্যবহার করেছেন, এসব বিষয়ও মূল উৎসের আলোকে পরীক্ষা করা হবে। হাদিসের পরিচ্ছেদের শিরোনাম যে সবসময় ভেতরের ঘটনার প্রতিটি পরিচয়কে আক্ষরিকভাবে নির্দেশ করে না, সেটিও সহীহ বুখারীর অন্য উদাহরণ দিয়ে দেখানো হবে। একইভাবে জাওনিয়া বা উমাইমার পরিচয়ের প্রশ্নে পরবর্তী সমন্বয়বাদী ব্যাখ্যার পাশাপাশি ইবন হাজারের নিজের বক্তব্যও দেখা হবে, যেখানে তিনি একাধিক ঘটনার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেছেন।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য তাই কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি করা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট নৈতিক প্রশ্নকে দালিলিকভাবে পরীক্ষা করা। মুহাম্মদের সঙ্গে এই নারীদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীদের নিজেদের ইচ্ছা, প্রত্যাখ্যান এবং সম্মতি আসলে কতটা কার্যকর ছিল? কোনো ধর্মীয় বিশেষাধিকার, পিতার সিদ্ধান্ত, বিবাহের ফিকহি বৈধতা কিংবা একজন ক্ষমতাবান পুরুষের আগ্রহ কি নারীর ব্যক্তিগত সম্মতির বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে? সহীহ হাদিস, ক্লাসিক্যাল শরহ, ফিকহ, তাফসির এবং ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলো পাশাপাশি রেখে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করাই এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।


ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন কাকে বলে?

শুরুতেই জেনে নেয়া প্রয়োজন, ধর্ষন শব্দটি দ্বারা আসলে কী বোঝায় এবং ধর্ষনের সংজ্ঞা কী। ধর্ষণ হচ্ছে, শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্য যেকোনভাবে চাপ প্রদান, ব্ল্যাকমেইল কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে কারোর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যেকোন ভাবেই হোক, যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। অর্থাৎ, একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে সম্মতি না দিলে, তার সাথে যেকোন ধরণের যৌনমিলনই ধর্ষনের আওতাভুক্ত। আবার, একজনের উপর অন্যজনের চাপিয়ে দেওয়া অনিচ্ছাকৃত যৌন আচরণকে যৌন নির্যাতন বা উৎপীড়ন বলা হয়। যখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌনকাজে জোর করা হয় যখন এক পক্ষের কোন সম্মতি থাকে না, তখন তাকে যৌন লাঞ্ছনা বলা হয়। যৌন লাঞ্ছনার মধ্যে অযাচিত স্পর্শ, ক্ষমতার দ্বারা যৌন কাজে সম্মত হওয়ার জন্য চাপ প্রদান ইত্যাদিও অন্তর্ভূক্ত। এ ধরণের ঘটনায় অপরাধীকে যৌন নির্যাতক বা উৎপীড়ক বলে অভিহিত করা হয়। আবার, যদি কোন প্রাপ্তবয়ষ্ক লোক বা তরুণ কোন শিশুকে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্যে অনুপ্রেরণা দেয় তাকেও যৌন নির্যাতন বলা হবে। শিশু বা নাবালকের সাথে অনুপ্রেরণা দিয়ে যৌন কাজে লিপ্ত হলে তাকে শিশু যৌন নির্যাতন বা বিশেষ আইনের আওতায় ধর্ষন বলা হয়।

আসুন, নবী মুহাম্মদ একজন যৌন নির্যাতক ব্যক্তি ছিলেন কিনা যাচাই করে দেখা যাক।


হাদিসের সরল পাঠ: জাওনিয়াকে নবীর যৌন নির্যাতন

বুখারী শরীফে বর্ণিত রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তার সঙ্গীদের নিয়ে শাওত নামক একটি বাগানবাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে নবীর জন্য একজন মেয়েকে বিশেষভাবে নিয়ে আসা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মেয়েটিকে নবীর নিজস্ব বাসস্থানে বা তার পিত্রালয়ে নয়, বরং একটি নির্জন বাগানবাড়িতে আনা হয়েছিল। তৎকালীন আরবে এ ধরনের প্রাচীরবেষ্টিত বাগানবাড়িগুলো সাধারণত ব্যক্তিগত বিনোদন বা নিভৃত যৌনসঙ্গমের জন্য ব্যবহৃত হতো—যা কেন এবং কোন ক্ষেত্রে, তা বিবেকবান যেকোনো পাঠকের কাছে স্পষ্ট।

সেখানে পৌঁছানোর পর নবী মেয়েটিকে সরাসরি বলেন, তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো (হেবা)। বাইরে তিনি তাঁর সঙ্গীদের বসিয়ে রেখে একা ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন, যাতে তারা নবীর ‘কাজ’ সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারেন। মেয়েটি এই প্রস্তাবটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেকে একজন রাজকুমারী (মালিকা) হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন যে, কোনো রাজকুমারী কখনো একজন নিচু শ্রেণির বাজারি লোকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে না। হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মেয়েটি সেই মুহূর্তে অত্যন্ত রাগান্বিত ও ক্ষিপ্ত ছিলেন।

এরপর নবী তাঁর দিকে হাত প্রসারিত করেন এবং শরীরে হাত রাখার চেষ্টা করেন। বুদ্ধিমতী মেয়েটি তখন নিজেকে রক্ষার শেষ অস্ত্র হিসেবে বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” আল্লাহর দোহাই দেওয়ার পর নবী আর অগ্রসর হতে পারেননি এবং তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা উঠে আসে। হাদিসে উল্লেখ আছে যে, মেয়েটির খিদমতের জন্য একজন ধাত্রী (নার্স/দাই) উপস্থিত ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে ধাত্রী সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা মেয়েদের সঙ্গেই থাকতেন। ইসলামী বিধান অনুসারে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্ষেত্রে পিতার সম্মতিই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়, মেয়ের নিজস্ব সম্মতির প্রয়োজন পড়ে না। তাই এই মেয়েটি খুব সম্ভবত একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা ছিলেন, যাকে হয়তো পিতার সম্মতিতে (অথবা জোরপূর্বক) নবীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল।

অথবা আরেকটি সম্ভাবনাও থাকতে পারে যে, মেয়েটিকে ঐ বাগানবাড়িতেই আনা হয়েছিল এবং নবী তাকে সরাসরি ‘হিবা’ (নিজেকে দান) করতে বলেছিলেন। সে যাই হোক, মেয়েটি আসলেই নবীর বৈধ স্ত্রী ছিলেন কি না, বা হিবা কীভাবে কাজ করে—সেসব বিষয় আপাতত বাদ দিয়ে আসুন সরাসরি হাদিসটি পড়ি। [22]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছেদঃ ৬৮/৩. ত্বলাক্ব দেয়ার সময় স্বামী কি তার স্ত্রীর সম্মুখে ত্বলাক্ব দেবে?
৫২৫৫. আবূ উসায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বের হয়ে শাওত নামক বাগানের নিকট দিয়ে চলতে চলতে দু’টি বাগান পর্যন্ত পৌছলাম এবং এ দু’টির মাঝে বসলাম। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা এখানে বসে থাক। তিনি ভিতরে) প্রবেশ করলেন। তখন নু’মান ইব্ন শারাহীলের কন্যা উমাইমার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে জাওনিয়াকে আনা হয়। আর তাঁর খিদমতের জন্য ধাত্রীও ছিল। নাবী যখন তার কাছে গিয়ে বললেন, তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ কর। তখন সে বললঃ কোন রাজকুমারী কি কোন বাজারিয়া ব্যক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে? রাবী বলেনঃ এরপর তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করলেন তার শরীরে রাখার জন্য, যাতে সে শান্ত হয়। সে বললঃ আমি আপনার থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। তিনি বললেনঃ তুমি উপযুক্ত সত্তারই আশ্রয় নিয়েছ। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেনঃ হে আবূ উসায়দ! তাকে দু’খানা কাতান কাপড় পরিয়ে দাও এবং তাকে তার পরিবারের নিকট পৌঁছিয়ে দাও।(৫২৫৭) আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৭১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উসাইদ (রাঃ)


শুধু হাত বাড়ানো নয়: প্রাচীন বর্ণনায় চুম্বন করার জন্য এগিয়ে যাওয়ার বিবরণ

সহীহ বুখারীর ৫২৫৫ নম্বর হাদিসের বাংলা অনুবাদে মুহাম্মদের আচরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি নারীর দিকে হাত প্রসারিত করেছিলেন, “তার শরীরে রাখার জন্য, যাতে সে শান্ত হয়।” কিন্তু ঘটনাটির অন্যান্য প্রাচীন বর্ণনা এবং বুখারীর ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যা পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, এই শারীরিক অগ্রসরতার আরও স্পষ্ট একটি বিবরণ ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেই সংরক্ষিত হয়েছে। এমনকি সহীহ বুখারীর ঠিক আগের হাদিস ৫২৫৪-তেও আয়েশার সূত্রে বলা হয়েছে, জাওনের কন্যাকে মুহাম্মদের কাছে প্রবেশ করানো হলে তিনি وَدَنَا مِنْهَا, অর্থাৎ “তার নিকটবর্তী হলেন”, আর সেই মুহূর্তেই নারীটি বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।” মুহাম্মদ তখন তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে বলেন [23]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছেদঃ ৬৮/৩. ত্বলাক্ব দেয়ার সময় স্বামী কি তার স্ত্রীর সম্মুখে ত্বলাক্ব দেবে?
৫২৫৪. আওযা’ঈ (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যুহরী (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন্ সহধর্মিণী তাঁর থেকে মুক্তি প্রার্থনা করেছিল? উত্তরে তিন বললেনঃ ’উরওয়াহ (রহ.) ’আয়িশাহ (রাঃ) থেকে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, জাওনের কন্যাকে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর নিকট একটি ঘরে) পাঠানো হল আর তিনি তার নিকটবর্তী হলেন, তখন সে বলল, আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তো এক মহামহিমের কাছে পানাহ চেয়েছ। তুমি তোমার পরিবারের কাছে গিয়ে মিলিত হও।
আবূ ’আবদুল্লাহ ইমাম বুখারী) (রহ.) বলেনঃ হাদীসটি হাজ্জাজ ইব্ন আবূ মানী’ও তাঁর পিতামহ থেকে, তিনি যুহরী থেকে, তিনি ’উরওয়াহ থেকে এবং তিনি ’আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৪)
بَاب مَنْ طَلَّقَ وَهَلْ يُوَاجِهُ الرَّجُلُ امْرَأَتَه“ بِالطَّلاَقِ
الْحُمَيْدِيُّ حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ حَدَّثَنَا الأَوْزَاعِيُّ قَالَ سَأَلْتُ الزُّهْرِيَّ أَيُّ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم اسْتَعَاذَتْ مِنْه“ قَالَ أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ ابْنَةَ الْجَوْنِ لَمَّا أُدْخِلَتْ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَدَنَا مِنْهَا قَالَتْ أَعُوذُ بِاللهِ مِنْكَ فَقَالَ لَهَا لَقَدْ عُذْتِ بِعَظِيمٍ الْحَقِي بِأَهْلِكِ.
قَالَ أَبُو عَبْد اللهِ رَوَاه“ حَجَّاجُ بْنُ أَبِي مَنِيعٍ عَنْ جَدِّه„ عَنْ الزُّهْرِيِّ أَنَّ عُرْوَةَ أَخْبَرَه“ أَنَّ عَائِشَةَ قَالَتْ
الحميدي حدثنا الوليد حدثنا الاوزاعي قال سالت الزهري اي ازواج النبي صلى الله عليه وسلم استعاذت منه“ قال اخبرني عروة عن عاىشة ان ابنة الجون لما ادخلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم ودنا منها قالت اعوذ بالله منك فقال لها لقد عذت بعظيم الحقي باهلك. قال ابو عبد الله رواه“ حجاج بن ابي منيع عن جده„ عن الزهري ان عروة اخبره“ ان عاىشة قالت
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আওযায়ী (রহঃ)

বুখারীর ৫২৫৫ নম্বর বর্ণনায় এই অগ্রসরতাকে فَأَهْوَى بِيَدِهِ عَلَيْهَا, অর্থাৎ তার দিকে হাত বাড়ানোর ভাষায় বলা হয়েছে। কিন্তু ইবন সা‘দের আত-তাবাকাত আল-কুবরা-য় আবু উসাইদের সূত্রে সংরক্ষিত একই ঘটনাধারার একটি বর্ণনা আরও নির্দিষ্ট। সেখানে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ ঐ নারীর কাছে পৌঁছে হাঁটু গেড়ে বা নিচু হয়ে বসলেন এবং তাকে চুম্বন করার জন্য তার দিকে এগিয়ে গেলেন। নারীটি সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।” এরপর মুহাম্মদ তার কাছ থেকে সরে যান এবং আবু উসাইদকে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন [24]

فَلَمَّا أَتَاهَا أَقْعَى وَأَهْوَى لِيُقَبِّلَهَا
বাংলা অর্থ: তিনি যখন তার কাছে পৌঁছালেন, নিচু হয়ে বসলেন এবং তাকে চুম্বন করার জন্য তার দিকে এগিয়ে গেলেন।

এই শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কোনো আধুনিক সমালোচকের অনুমান বা বুখারীর অস্পষ্ট বাক্যকে ইচ্ছামতো যৌন অর্থ দেওয়ার ঘটনা নয়। ইবন হাজার আল-আসকালানি নিজেই ফাতহুল বারী-তে বুখারীর فأهوى بيده, অর্থাৎ “তিনি তার হাত এগিয়ে দিলেন”, বাক্যটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবন সা‘দের এই বর্ণনাটি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন। ইবন হাজার প্রথমে বলেন, এর অর্থ তিনি তাকে নিজের দিকে টানতে বা তার দিকে হাত বাড়াতে চেয়েছিলেন; এরপর সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখ করেন যে ইবন সা‘দের বর্ণনায় ঘটনাটি এসেছে, فأهوى إليها ليقبلها, অর্থাৎ “তিনি তাকে চুম্বন করার জন্য তার দিকে এগিয়ে গেলেন।” [25]

وَوَقَعَ فِي رِوَايَةِ ابْنِ سَعْدٍ: فَأَهْوَى إِلَيْهَا لِيُقَبِّلَهَا
বাংলা অর্থ: ইবন সা‘দের বর্ণনায় এসেছে, “তিনি তাকে চুম্বন করার জন্য তার দিকে এগিয়ে গেলেন।”

এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পাঠ শুধু ইবন সা‘দের একটি গ্রন্থেই বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায় না। আবু নু‘আইম আল-ইসফাহানির মা‘রিফাতুস সাহাবা-তেও আবু উসাইদের সূত্রে একই ঘটনাটি সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানেও মুহাম্মদ নারীর কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেন এবং فأهوى إليها ليقبلها, অর্থাৎ তাকে চুম্বন করার জন্য তার দিকে এগিয়ে যান; নারীটি তখন “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই” বললে তিনি তার কাছ থেকে সরে যান এবং তাকে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয় [26] [27]। একই ধরনের শব্দ আল-বালাধুরীর আনসাব আল-আশরাফ-এও সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে জাওন গোত্রের নারীকে আনার পর মুহাম্মদের তার দিকে চুম্বনের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়ার কথা বলা হয়েছে [28]

এই বর্ণনাগুলো পাশাপাশি রাখলে বুখারীর “তিনি তার দিকে হাত বাড়ালেন” বাক্যটিকে শুধু নিরীহভাবে “নারীকে শান্ত করার জন্য হাত বাড়ানো” হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বুখারীর আরেকটি সহিহ বর্ণনায় মুহাম্মদ নারীর নিকটবর্তী হন; ইবন সা‘দের বর্ণনায় সেই অগ্রসরতা সরাসরি চুম্বন করার চেষ্টা হিসেবে বর্ণিত; আবু নু‘আইম এবং বালাধুরীর গ্রন্থেও একই পাঠ সংরক্ষিত; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ইবন হাজার নিজেই বুখারীর সংশ্লিষ্ট বাক্যের ব্যাখ্যায় এই variant উদ্ধৃত করেছেন। অর্থাৎ ইসলামি ঐতিহ্যের একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাগত ধারা মুহাম্মদের হাত বাড়ানোর ঘটনাকে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, বিশেষভাবে চুম্বনের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়া হিসেবেই বুঝেছে।

এখানে জাওনিয়া, উমাইমা, আসমা কিংবা বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখিত নারীরা প্রত্যেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি ছিলেন কি না, সেই বিতর্ক এই তথ্যটির গুরুত্ব নষ্ট করে না। ইবন হাজার নিজেই বিভিন্ন বর্ণনার পার্থক্যের কারণে একাধিক ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী বলেছেন। ফলে সবচেয়ে সতর্কভাবে যা বলা যায় তা হলো, মুহাম্মদ এবং এই নারী বা নারীদের ঘটনাসমূহের প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাগুলোর অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় মুহাম্মদের শারীরিক অগ্রসরতা শুধু “হাত বাড়ানো” নয়, সরাসরি “চুম্বন করার জন্য এগিয়ে যাওয়া” হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। এই অগ্রসরতার পরপরই নারীর প্রতিক্রিয়া ছিল أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْكَ, অর্থাৎ “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।”

সম্মতির দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটির গুরুত্ব এখানেই। নারীটি যদি মুহাম্মদের শারীরিক ঘনিষ্ঠতা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতেন, তাহলে তাঁর কাছে আসা বা চুম্বনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আল্লাহর কাছে তাঁর থেকেই আশ্রয় চাওয়ার কোনো অর্থ থাকে না। বরং প্রাচীন বর্ণনাগুলোর ধারাবাহিকতায় একই প্যাটার্ন দেখা যায়: মুহাম্মদ নারীর নিকটবর্তী হন বা শারীরিকভাবে এগিয়ে যান, নারীটি অবিলম্বে তাঁর কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান, এবং এরপর মুহাম্মদ অগ্রসর হওয়া বন্ধ করে তাকে ফেরত পাঠান। ফলে এই ঘটনাকে একটি স্বাভাবিক, পারস্পরিকভাবে আগ্রহী দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামি উৎসগুলোর সংরক্ষিত বর্ণনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


ইসলামি টেক্সটে বাজারিয়া ব্যক্তি বলতে কী বোঝায়?

একমাত্র ভক্তিরসে পরিপূর্ণ ধর্মীয় আবেগপ্রবণ মানুষ না হলে স্বাভাবিকভাবেই যেকোন সুস্থ মাথার মানুষই বুঝবে, এই হাদিসে মেয়েটি নবীকে গালাগাল করে অত্যন্ত বাজেভাবে অপমান করেছে। এখানে বাজারিয়া লোক বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সেই সময়ে বাজারিয়া লোক বলতে আসলে ঠিক কেমন মানুষকে নির্দেশ করা হতো, সেটি আসুন আরেকটি সহিহ হাদিস থেকে বোঝার চেষ্টা করি, [29]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৬/ সাহাবী (রাঃ) গণের ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ১৬. উম্মুল মউ’মিনীন উম্মু সালামাহ (রাঃ) এর ফযীলত
৬০৯৩। আবদুল আলা ইবনু হাম্মাদ ও মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল আ’লা কায়সী (রহঃ) … সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তবে বাজারে প্রবেশকারীদের মধ্যে তুমি প্রথম হয়ো না এবং তথা হতে বহির্গমণকারীদের মধ্যে তুমি শেষ ব্যক্তি হয়ো না। বাজার হলো শয়তানের আড্ডাখানা। আর তথায়ই সে তার ঝান্ডা উত্তোলন করে রাখে। সালমান (রাঃ) বলেন, আমাকে এ খবরও দেওয়া হয়েছে যে, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। তখন তাঁর পাশে উম্মু সালামা (রাঃ) ছিলেন। রাবী বলেন, অতঃপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কথা বলতে লাগলেন এবং পরে চলে গেলেন।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে ছিলেন? বা এরূপ কথা বললেন। উম্মে সালামা (রাঃ) উত্তর দিলেন, দাহইয়া কালবী। তিনি বলেন, উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি তো তাকে দাহইয়া কালবী বলেই ধারণা করেছিলাম। যতক্ষন না রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণ শুনলাম। তিনি আমাদের কথা বলছিলেন অথবা এরূপ বলেছিলেন। অর্থাৎ জিবরীলের আগমনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাবী আবূ উসমানকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আপনি এ হাদীস কার মাধ্যমে শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) থেকে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সালমান ফারসী (রাঃ)

এই সম্পর্কে আরও একটি হাদিস পড়ে নেয়া জরুরি, [30]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫। মাসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৫২. ফজরের সালাতের পর বসে থাকার এবং মসজিদসমূহের ফযীলত
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ১৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৭১
১৪১৪-(২৮৮/৬৭১) হারূন ইবনু মা’রূফ ও ইসহাক ইবনু মূসা আল আনসারী (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার কাছে সব চাইতে প্রিয় জায়গা হলো মাসজিদসমূহ আর সব চাইতে খারাপ জায়গা হলো বাজারসমূহ। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৪০০, ইসলামীক সেন্টার ১৪১২)
* এই হাদীস হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১। পৃথিবীর মধ্যে মাসজিদগুলি হলো আল্লাহর জিকির, ইবাদত বা উপাসনা প্রতিষ্ঠিত করার স্থান। আল্লাহর জিকির, ইবাদত বা উপাসনার মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ বিষয় হলো পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ নামাজ।
২। মসজিদসমূহের সম্মান করা অপরিহার্য; তাই সমস্ত মসজিদ পরিষ্কার এবং সুবাসিত করে রাখা ওয়াজিব। এবং অপ্রীতিকর গন্ধ ও ময়লা পোশাক পরিধান করে মসজিদে প্রবেশ করা জায়েজ নয়।
৩। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত স্থান হলো সাধারণতঃ বাজার; কেননা সচরাচর বাজার হলো প্রতারণা, ঠকবাজি, মিথ্যা শপথ ইত্যাদির জায়গা এবং আল্লাহর জিকির থেকে বিরত থাকারও স্থান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


জাওনিয়াকে কী নবী আসলেই বিয়ে করেছিল?

ইসলামপন্থীরা সহীহ বুখারীর হাদিসের একটি পরিচ্ছেদের শিরোনামের ভিত্তিতে দাবি করে থাকেন যে, ‘জাওনিয়া’ নামের ঐ নারী নাকি নবীর বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এই দাবীটি সঠিক হতে পারে না। কারণ, হাদিস গ্রন্থগুলোর এইসব পরিচ্ছেদ বা শিরোনাম মূল হাদিসের অংশ নয়— এগুলো হাদিস সংকলকগণ অনেক পরে সংযুক্ত করেন এবং এগুলো অনেক সময়ই হাদিসকে নির্দিষ্ট একটি বিধানের আওতায় ফেলার উদ্দেশ্যে সন্নিবেশিত হয়। হাদিসের বর্ণনার ভেতরেও এমন কিছু নেই যা এই নারীর সম্মতির কথা নিশ্চিত করে। বরং হাদিস পাঠে স্পষ্ট বোঝা যায়, তাকে কোনো পূর্বসংবাদ না দিয়ে, এমনকি সম্ভবত জোর করেই আনা হয়েছিল। যদি বিবাহিতা স্ত্রীই হতো, সেই বিয়েতে নিশ্চিতভাবেই মেয়েটির সম্মতির প্রয়োজন হতো। মেয়েটি যে কোনভাবেই সম্মত ছিলেন না, সেটি হাদিস থেকে স্পষ্ট। তাহলে দুইটি সম্ভাবনা বাকি থাকেঃ

মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল, যার কারণে তার সম্মতি ছাড়াই ইসলামের বিধান অনুসারে তার পিতা তাকে বিবাহ দিতে পেরেছে।
মেয়েটির সাথে বিয়ে হয়নি, নবী মেয়েটিকে ঐ বাগানবাড়িতেই নিজেকে হিবা করতে বলে।

তাছাড়া, হাদিসের পরিচ্ছদে “তালাক” শব্দটির আক্ষরিক অর্থ একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি আরবি “ṭ-l-q” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ “মুক্ত করা”, “বিচ্ছিন্ন করা” বা “বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া”। এই শব্দটির অর্থ নির্ভর করে প্রেক্ষাপটের ওপর। কেবলমাত্র “তালাক” শব্দ ব্যবহার থেকেই ধরে নেওয়া যায় না যে, সম্পর্কটি ছিল বৈবাহিক। যেমন ইসলামী শরিয়তে দাসীদের ক্ষেত্রেও “তালাক” প্রযোজ্য হয়, অর্থাৎ দাসীর সাথে বৈধ বিবাহের সম্পর্ক না থাকলেও তাকে ‘তালাক’ দেওয়া হতে পারে। ফলে পরিচ্ছেদে কেবলমাত্র ‘তালাক’ শব্দ থাকার ভিত্তিতে নবী ও জাওনিয়ার মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল এমন দাবি করা যুক্তিসংগত নয়।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আরেকটি হাদিসে একজন আয়িশার কাছে প্রশ্ন করে, কোন সহধর্মিনীর সাথে নবী সঙ্গম না করেই তালাক দিয়েছিলেন? এখানে রাবী কীভাবে প্রশ্নটি করেছেন, আয়িশা কীভাবে উত্তর দিয়েছেন, সব খুব ভালভাবে বিশ্লেষণ করলে সেখান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে, জওনিয়া নামক ঐ মেয়েটিকে নবী বিয়েই করেছিলেন। নবী আসলে ঐ মেয়েকে “নিজেকে হিবা” করে দেয়ার জন্য বলেছিলেন। হিবা করে দেয়া কী সেটি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু সেদিকে না গিয়েই, বিখ্যাত ইসলামিক আলেম ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম এর যাদুল মাআদ গ্রন্থ থেকে একটি দলিল দেখে নিই [31]

তা ছাড়া এটা মশহর কথা যে, হযরত (সঃ) জওনিয়ার কাছে বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। তার বাড়ীতে তিনি তাশরীফও নিয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি ওজর পেশ করলেন। হযরত (সঃ) তার ওজর কবুল করলেন। তেমনি ঘটেছিল কালবিয়ার ও যে মহিলার দেহে হযরত (সঃ) শ্বেত রোগ দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর ঘটনাটি। তা ছাড়া এক মহিল। হযরতের (সঃ) কাছে বিয়ে বসার…

যৌন

নারীর সম্মতি ছাড়াই নবীর বিশেষ বিবাহাধিকার: ইবন হাজারের ব্যাখ্যা

জাওনিয়া নবী মুহাম্মদের বৈধ স্ত্রী ছিলেন, এই দাবির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হচ্ছে মেয়েটির নিজের আচরণ। হাদিসের বর্ণনায় তিনি মুহাম্মদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে অস্বীকার করছেন, মুহাম্মদ তার দিকে হাত বাড়ালে বিরক্তি প্রকাশ করছেন এবং শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাইছেন। অর্থাৎ, অন্তত হাদিসে দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহে এই নারীর পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় বিবাহে সম্মতি প্রদানের কোনো দৃশ্যই নেই। এই সমস্যা আধুনিক সমালোচকদের আবিষ্কার নয়। ক্লাসিক্যাল ইসলামি ব্যাখ্যাকারদের কাছেও ঠিক এই প্রশ্নটি উঠেছিল।

সহীহ বুখারীর এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবন হাজার আল-আসকালানি তাঁর বিখ্যাত ফাতহুল বারী-তে একটি আপত্তি সরাসরি উল্লেখ করেন। আপত্তিটি ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক: যদি মুহাম্মদ ঐ নারীকে বিয়েই না করে থাকেন, যেহেতু কোনো বিবাহ-চুক্তির বিবরণ নেই এবং নারীটি নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করতেও অস্বীকার করেছিলেন, তাহলে মুহাম্মদ তাকে তালাক দেবেন কীভাবে? ইবন হাজার এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি। বরং এর যে উত্তর তিনি উদ্ধৃত করেছেন, সেটি সম্মতির প্রশ্নে আরও গুরুতর একটি বিষয় সামনে আনে। তাঁর ভাষায়, মুহাম্মদের জন্য “নারীর অনুমতি ছাড়াই এবং তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই” নিজেকে কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহিত করা সম্ভব ছিল। শুধু সেই নারীকে ডেকে পাঠানো, তাকে হাজির করানো এবং মুহাম্মদের তার প্রতি আগ্রহই এর জন্য যথেষ্ট বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এমনকি “নিজেকে আমার কাছে দান করো” কথাটিকেও বিবাহের জন্য সম্মতি চাওয়া নয়, বরং নারীর মন ভালো করা বা তাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [32]

এই ব্যাখ্যার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ, এখানে কোনো আধুনিক সমালোচক অনুমান করে বলছেন না যে, মেয়েটির সম্মতি অপ্রয়োজনীয় ছিল। বরং সহীহ বুখারীর অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যাগ্রন্থে সমস্যাটির সমাধানই করা হচ্ছে নারীর সম্মতিকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে। অর্থাৎ, “সে তো তার স্ত্রী ছিল” বলে ঘটনাটিকে সম্মতিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করলে সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ যে ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই ব্যাখ্যাই বলছে যে স্ত্রী বানানোর জন্য ঐ নারীর অনুমতিই মুহাম্মদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল না।

আরও লক্ষণীয়, ইবন হাজারের আলোচনায় ইবন সাদের সূত্রে আরেকটি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে মুহাম্মদ নারীর পিতার সঙ্গে মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করেছিলেন এবং তার পিতা দাবি করেছিলেন যে মেয়েটি মুহাম্মদের প্রতি আগ্রহী। কিন্তু এই দ্বিতীয়-হাতের দাবির বিপরীতে ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনায় যে নারীকে দেখা যায়, তিনি মুহাম্মদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন, তার স্পর্শ অপছন্দ করছেন এবং তার কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইছেন। ফলে পিতার কথিত বক্তব্যকে নারীর নিজের প্রত্যক্ষ আচরণের উপরে বসিয়ে তার সম্মতি প্রমাণ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং পুরো সমস্যাটিই দেখিয়ে দেয়, এই বিবাহ-ধারণায় নারীর নিজস্ব সম্মতি এবং পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করা হয়েছে। ফাতহুল বারীর সংশ্লিষ্ট অংশটি সম্পূর্ণভাবে নিচে দেওয়া হলো, [33]

আরবি মূল:
أَبِي أُمَيَّةَ تَزَوَّجَهَا، فَأَرَادَ عُمَرَ مُعَاقَبَتَهَا فَقَالَتْ: مَا ضُرِبَ عَلَيَّ الْحِجَابُ، وَلَا سُمِّيتُ أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ. فَكَفَّ عَنْهَا وَعَنِ الْوَاقِدِيِّ: سَمِعْتُ مَنْ يَقُولُ إِنَّ عِكْرِمَةَ بْنَ أَبِي جَهْلٍ خَلَفَ عَلَيْهَا، قَالَ: وَلَيْسَ ذَلِكَ بِثَبْتٍ. وَلَعَلَّ ابْنَ بَطَّالٍ أَرَادَ أَنَّهُ لَمْ يُوَاجِهْهَا بِلَفْظِ الطَّلَاقِ. وَقَدْ أَخْرَجَ ابْنُ سَعْدٍ مِنْ طَرِيقِ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ الْوَلِيدَ بْنَ عَبْدِ الْمَلِكِ كَتَبَ إِلَيْهِ يَسْأَلُهُ، فَكَتَبَ إِلَيْهِ: مَا تَزَوَّجَ النَّبِيُّ ﷺ كِنْدِيَّةً إِلَّا أُخْتَ بَنِي الْجَوْنِ فَمَلَكَهَا. فَلَمَّا قَدِمَتِ الْمَدِينَةَ نَظَرَ إِلَيْهَا فَطَلَّقَهَا وَلَمْ يَبْنِ بِهَا. فَقَوْلُهُ فَطَلَّقَهَا يَحْتَمِلُ أَنْ يَكُونَ بِاللَّفْظِ الْمَذْكُورِ قَبْلُ، وَيَحْتَمِلُ أَنْ يَكُونَ وَاجَهَهَا بِلَفْظِ الطَّلَاقِ، وَلَعَلَّ هَذَا هُوَ السِّرُّ فِي إِيرَادِ التَّرْجَمَةِ بِلَفْظِ الِاسْتِفْهَامِ دُونَ بَتِّ الْحُكْمِ.
وَاعْتَرَضَ بَعْضُهُمْ بِأَنَّهُ لَمْ يَتَزَوَّجْهَا إِذْ لَمْ يَجْرِ ذِكْرُ صُورَةِ الْعَقْدِ، وَامْتَنَعَتْ أَنْ تَهَبَ لَهُ نَفْسَهَا فَكَيْفَ يُطَلِّقُهَا؟ وَالْجَوَابُ أَنَّهُ ﷺ كَانَ لَهُ أَنْ يُزَوِّجَ مِنْ نَفْسِهِ بِغَيْرِ إِذْنِ الْمَرْأَةِ وَبِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا، فَكَانَ مُجَرَّدُ إِرْسَالِهِ إِلَيْهَا وَإِحْضَارِهَا وَرَغْبَتِهِ فِيهَا كَافِيًا فِي ذَلِكَ، وَيَكُونُ قَوْلُهُ هَبِي لِي نَفْسَكِ تَطْيِيبًا لِخَاطِرِهَا وَاسْتِمَالَةً لِقَلْبِهَا، وَيُؤَيِّدُهُ قَوْلُهُ فِي رِوَايَةٍ لِابْنِ سَعْدٍ إِنَّهُ اتَّفَقَ مَعَ أَبِيهَا عَلَى مِقْدَارِ صَدَاقِهَا، وَأَنَّ أَبَاهَا قَالَ لَهُ: إِنَّهَا رَغِبَتْ فِيكَ وَخُطِبَتْ إِلَيْكَ.
٥٢٥٦، ٥٢٥٧ – وَقَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ الْوَلِيدِ النَّيْسَابُورِيُّ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلٍ، عَنْ أَبِيهِ، وَأَبِي أُسَيْدٍ، قَالَا: تَزَوَّجَ النَّبِيُّ ﷺ أُمَيْمَةَ بِنْتَ شَرَاحِيلَ، فَلَمَّا أُدْخِلَتْ عَلَيْهِ بَسَطَ يَدَهُ إِلَيْهَا، فَكَأَنَّهَا كَرِهَتْ ذَلِكَ، فَأَمَرَ أَبَا أُسَيْدٍ أَنْ يُجَهِّزَهَا وَيَكْسُوَهَا ثَوْبَيْنِ رَازِقِيَّيْنِ.
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ أَبِي الْوَزِيرِ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، عَنْ حَمْزَةَ، عَنْ أَبِيهِ، وَعَنْ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ أَبِيهِ بِهَذَا.
قَوْلُهُ (وَقَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ الْوَلِيدِ النَّيْسَابُورِيُّ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ) هُوَ ابْنُ الْغَسِيلِ (عَنْ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلٍ عَنْ أَبِيهِ وَأَبِي أُسَيْدٍ) هَذَا التَّعْلِيقُ وَصَلَهُ أَبُو نُعَيْمٍ فِي الْمُسْتَخْرَجِ مِنْ طَرِيقِ أَبِي أَحْمَدَ الْفَرَّاءِ، عَنِ الْحُسَيْنِ، وَمُرَادُ الْبُخَارِيِّ مِنْهُ أَنَّ الْحُسَيْنَ بْنَ الْوَلِيدِ شَارَكَ أَبَا نُعَيْمٍ فِي رِوَايَتِهِ لِهَذَا الْحَدِيثِ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْغَسِيلِ، لَكِنِ اخْتَلَفَا فِي شَيْخِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ فَقَالَ أَبُو نُعَيْمٍ: حَمْزَةُ، وَقَالَ الْحُسَيْنُ: عَبَّاسُ بْنُ سَهْلٍ، ثُمَّ سَاقَهُ مِنْ طَرِيقٍ ثَالِثَةٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ فَبَيَّنَ أَنَّهُ عِنْدَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بِالْإِسْنَادَيْنِ، لَكِنْ طَرِيقُ أَبِي أُسَيْدٍ، عَنْ حَمْزَةَ ابْنِهِ عَنْهُ، وَطَرِيقُ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ عَبَّاسٍ ابْنِهِ عَنْهُ، وَكَأَنَّ حَمْزَةَ حُذِفَ فِي رِوَايَةِ الْحُسَيْنِ بْنِ الْوَلِيدِ فَصَارَ الْحَدِيثُ مِنْ رِوَايَةِ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلٍ، عَنْ أَبِي أُسَيْدٍ وَلَيْسَ كَذَلِكَ، وَالتَّحْرِيرُ مَا وَقَعَ فِي الرِّوَايَةِ الثَّالِثَةِ وَهِيَ رِوَايَةُ إِبْرَاهِيمَ بْنِ أَبِي الْوَزِيرِ وَاسْمُ أَبِي الْوَزِيرِ عُمَرُ بْنُ مُطَرِّفٍ، وَهُوَ حِجَازِيٌّ نَزَلَ الْبَصْرَةَ، وَقَدْ أَدْرَكَهُ الْبُخَارِيُّ وَلَمْ يَلْقَهُ فَحَدَّثَ عَنْهُ بِوَاسِطَةٍ، وَذَكَرَهُ فِي تَارِيخِهِ فَقَالَ: مَاتَ بَعْدَ أَبِي عَاصِمٍ سَنَةَ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ، وَلَيْسَ لَهُ فِي الْبُخَارِيِّ سِوَى هَذَا الْمَوْضِعِ، وَقَدْ وَافَقَهُ عَلَى إِقَامَةِ إِسْنَادِهِ أَبُو أَحْمَدَ الزُّبَيْرِيُّ. أَخْرَجَهُ أَحْمَدُ فِي مُسْنَدِهِ عَنْهُ.
تَنْبِيهَانِ:
الْأَوَّلُ: قَالَ الْقَاضِي عِيَاضٌ فِي أَوَائِلِ كِتَابِ الْجِهَادِ مِنْ شَرْحِ مُسْلِمٍ: قَالَ الْبُخَارِيُّ فِي تَارِيخِهِ: الْحُسَيْنُ بْنُ الْوَلِيدِ بْنِ عَلِيِّ النَّيْسَابُورِيُّ الْقُرَشِيُّ مَاتَ سَنَةَ ثَلَاثٍ وَمِائَتَيْنِ، وَلَمْ يَذْكُرْ فِي بَابِ الْحَسَنِ مُكَبَّرًا مِنِ اسْمِهِ الْحَسَنَ بْنَ الْوَلِيدِ، وَذَكَرَ فِي صَحِيحِهِ فِي كِتَابِ الطَّلَاقِ الْحَسَنَ بْنَ الْوَلِيدِ النَّيْسَابُورِيَّ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلٍ عَنْ أَبِيهِ وَأَبِي أُسَيْدٍ تَزَوَّجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أُمَيْمَةَ بِنْتَ شَرَاحِيلَ كَذَا ذَكَرَهُ مُكَبَّرًا. قُلْتُ: لَمْ أَرَهُ فِي شَيْءٍ مِنَ النُّسَخِ الْمُعْتَمَدَةِ مِنَ الْبُخَارِيِّ إِلَّا مُصَغَّرًا، وَيُؤَيِّدُهُ اقْتِصَارُهُ عَلَيْهِ فِي تَارِيخِهِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
الثَّانِي: وَقَعَ فِي رِوَايَةِ أَبِي أَحْمَدَ الْجُرْجَانِيِّ فِي السَّنَدِ الْأَوَّلِ عَنْ حَمْزَةَ بْنِ أَبِي أُسَيْدٍ، عَنْ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلٍ عَنْ أَبِيهِ وَهُوَ خَطَأٌ سَقَطَتِ الْوَاوُ مِنْ قَوْلِهِ وَعَنْ عَبَّاسٍ وَقَدْ ثَبَتَتْ عِنْدَ جَمِيعِ الرُّوَاةِ.
وَفِي الْحَدِيثِ أَنَّ مَنْ قَالَ لِامْرَأَتِهِ الْحَقِي بِأَهْلِكِ وَأَرَادَ الطَّلَاقَ طَلُقَتْ، فَإِنْ لَمْ يُرِدِ الطَّلَاقَ لَمْ تَطْلُقْ عَلَى مَا وَقَعَ فِي حَدِيثِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ الطَّوِيلِ فِي قِصَّةِ تَوْبَتِهِ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ لَمَّا أَرْسَلَ إِلَيْهِ أَنْ يَعْتَزِلَ امْرَأَتَهُ قَالَ لَهَا: الْحَقِي بِأَهْلِكِ، فَكُونِي فِيهِمْ حَتَّى يَقْضِيَ اللَّهُ هَذَا الْأَمْرَ. وَقَدْ مَضَى الْكَلَامُ عَلَيْهِ مُسْتَوْفًى فِي شَرْحِهِ.
الْحَدِيثُ الثَّالِثُ: حَدِيثُ ابْنِ عُمَرَ فِي طَلَاقِ امْرَأَتِهِ، وَقَدْ مَضَى شَرْحُهُ مُسْتَوْفًى قَبْلُ، وَقَوْلُهُ فِي هَذِهِ الرِّوَايَةِ أَتَعْرِفُ ابْنَ عُمَرَ إِنَّمَا قَالَ لَهُ ذَلِكَ مَعَ أَنَّهُ يَعْرِفُ أَنَّهُ يَعْرِفُهُ وَهُوَ الَّذِي يُخَاطِبُهُ؛ لِيُقَرِّرَهُ عَلَى اتِّبَاعِ السُّنَّةِ، وَعَلَى الْقَبُولِ مِنْ نَاقِلِهَا، وَأَنَّهُ يَلْزَمُ الْعَامَّةَ الِاقْتِدَاءُ بِمَشَاهِيرِ الْعُلَمَاءِ، فَقَرَّرَهُ عَلَى
বাংলা অনুবাদ:
…আবু উমাইয়া তাকে বিয়ে করেছিলেন। উমর তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন। তখন সে বলল, “আমার ওপর তো পর্দার বিধান আরোপ করা হয়নি এবং আমাকে ‘উম্মুল মুমিনীন’ও বলা হয়নি।” ফলে উমর তার ব্যাপারে আর ব্যবস্থা নেননি।
ওয়াকিদি থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: আমি এমন ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি যে, ইকরিমা ইবন আবি জাহল তার পরে তাকে বিবাহ করেছিলেন। তবে তিনি বলেন, “এ তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।”
সম্ভবত ইবন বাত্তাল বলতে চেয়েছেন, নবী ﷺ তাকে সরাসরি ‘তালাক’ শব্দটি ব্যবহার করে তালাক দেননি।
ইবন সাদ হিশাম ইবন উরওয়া, তার পিতা উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিক এ বিষয়ে জানতে চেয়ে তাকে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি উত্তরে লিখলেন:
“নবী ﷺ বনু জাওনের বোন ছাড়া কিন্দা গোত্রের আর কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। তিনি তাকে বিবাহের অধিকারে গ্রহণ করেছিলেন। সে মদিনায় এলে তিনি তাকে দেখলেন, এরপর তাকে তালাক দিলেন এবং তার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেননি।”
এখানে “তিনি তাকে তালাক দিলেন”, এই কথাটির অর্থ হতে পারে, পূর্বে উল্লেখিত বাক্যটিই তিনি বলেছেন; আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি তাকে সরাসরি ‘তালাক’ শব্দ ব্যবহার করে তালাক দিয়েছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই অধ্যায়ের শিরোনামটি নিশ্চিত সিদ্ধান্তের ভাষায় না দিয়ে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে দেওয়া হয়েছে।
কেউ কেউ আপত্তি তুলেছেন যে, নবী ﷺ আসলে তাকে বিবাহই করেননি; কারণ এখানে বিবাহ-চুক্তির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার কোনো উল্লেখ নেই। আর নারীটি নিজেকে তাঁর কাছে সমর্পণ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তাহলে তিনি তাকে তালাক দেবেন কীভাবে?
এর উত্তর হলো: নবী ﷺ-এর জন্য নারীর অনুমতি ছাড়াই এবং তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজেকে তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার বিশেষ অধিকার ছিল। অতএব, তাঁর পক্ষ থেকে তাকে আনতে লোক পাঠানো, তাকে উপস্থিত করা এবং তার প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রকাশ, এগুলোই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল।
আর তিনি তাকে যে বলেছিলেন, “নিজেকে আমার জন্য দান করো”, এর উদ্দেশ্য ছিল তার মনকে সন্তুষ্ট করা ও তার হৃদয়কে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা।
ইবন সাদের একটি বর্ণনাও এ বক্তব্যকে সমর্থন করে। সেখানে বলা হয়েছে, নবী ﷺ তার পিতার সঙ্গে তার মোহরের পরিমাণ সম্পর্কে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন এবং তার পিতা নবীকে বলেছিলেন:
“সে আপনার প্রতি আগ্রহী হয়েছে এবং আপনার জন্যই তার বিবাহের প্রস্তাব করা হয়েছে।”
৫২৫৬, ৫২৫৭, হুসাইন ইবন আল-ওয়ালিদ আন-নাইসাবুরি আবদুর রহমান থেকে, তিনি আব্বাস ইবন সাহল থেকে, তিনি তার পিতা ও আবু উসাইদ থেকে বর্ণনা করেন। তারা দুজন বলেন:
“নবী ﷺ উমাইমা বিনতে শারাহিলকে বিয়ে করেছিলেন। তাকে তাঁর কাছে প্রবেশ করানো হলে তিনি তার দিকে হাত বাড়ালেন। কিন্তু মনে হলো, সে বিষয়টি অপছন্দ করল। তখন নবী ﷺ আবু উসাইদকে নির্দেশ দিলেন, যেন তাকে বিদায়ের ব্যবস্থা করে এবং তাকে দুটি ‘রাজেকি’ কাপড় পরিয়ে দেয়।”
আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, ইবরাহিম ইবন আবি আল-ওয়াজির আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আবদুর রহমান আমাদের বর্ণনা করেছেন হামজা থেকে, তিনি তার পিতা থেকে; এবং আব্বাস ইবন সাহল ইবন সাদ থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, একই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
“হুসাইন ইবন আল-ওয়ালিদ আন-নাইসাবুরি আবদুর রহমান থেকে”, এখানে আবদুর রহমান হলেন ইবন আল-গাসিল।
“আব্বাস ইবন সাহল থেকে, তিনি তার পিতা ও আবু উসাইদ থেকে”, বুখারির এই মু‘আল্লাক বর্ণনাটিকে আবু নু‘আইম তাঁর ‘মুস্তাখরাজ’-এ আবু আহমদ আল-ফাররা → হুসাইন সূত্রে পূর্ণ সনদে বর্ণনা করেছেন।
এখানে বুখারির উদ্দেশ্য হলো দেখানো যে, হুসাইন ইবন আল-ওয়ালিদ ও আবু নু‘আইম উভয়েই আবদুর রহমান ইবন আল-গাসিল থেকে এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

তবে আবদুর রহমানের শায়খ কে ছিলেন, এ বিষয়ে তাদের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। আবু নু‘আইম বলেছেন: হামজা। আর হুসাইন বলেছেন: আব্বাস ইবন সাহল।
এরপর বুখারি আবদুর রহমান থেকে তৃতীয় আরেকটি সূত্রে বর্ণনাটি পেশ করেছেন, যাতে স্পষ্ট হয়েছে যে আবদুর রহমানের কাছে হাদিসটি দুইটি সনদেই ছিল।
আবু উসাইদের সূত্রটি হলো: তার ছেলে হামজা → আবু উসাইদ।
আর সাহল ইবন সাদের সূত্রটি হলো: তার ছেলে আব্বাস → সাহল ইবন সাদ।
মনে হচ্ছে, হুসাইন ইবন আল-ওয়ালিদের বর্ণনায় ‘হামজা’ নামটি বাদ পড়ে গিয়েছিল। ফলে বর্ণনাটি এমন মনে হয়েছে যেন আব্বাস ইবন সাহল সরাসরি আবু উসাইদ থেকে বর্ণনা করেছেন; অথচ প্রকৃত বিষয় তা নয়।
সঠিক বিন্যাসটি তৃতীয় বর্ণনাতেই পাওয়া যায়। সেটি ইবরাহিম ইবন আবি আল-ওয়াজিরের বর্ণনা।
আবু আল-ওয়াজিরের নাম উমর ইবন মুতাররিফ। তিনি হিজাজের লোক ছিলেন, পরে বসরায় বসবাস শুরু করেন। বুখারি তাঁর যুগ পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। তাই বুখারি একজন মধ্যবর্তী বর্ণনাকারীর মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
বুখারি তাঁর ‘তারিখ’-এ তাঁর কথা উল্লেখ করে বলেছেন:
“তিনি আবু আসিমের পরে ২১২ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।”
সহিহ বুখারিতে এই স্থান ছাড়া তাঁর আর কোনো বর্ণনা নেই।
আবু আহমদ আয-যুবাইরিও এই সনদ সঠিকভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন। আহমদ তাঁর ‘মুসনাদ’-এ তাঁর সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
দুটি লক্ষণীয় বিষয়:
প্রথমত: কাজি ইয়াদ ‘শরহ মুসলিম’-এর কিতাবুল জিহাদের শুরুতে বলেছেন:
“বুখারি তাঁর ‘তারিখ’-এ বলেছেন: হুসাইন ইবন আল-ওয়ালিদ ইবন আলি আন-নাইসাবুরি আল-কুরাশি ২০৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু ‘হাসান’ নামের অধ্যায়ে তিনি ‘হাসান ইবন আল-ওয়ালিদ’-এর কোনো উল্লেখ করেননি। অথচ তাঁর ‘সহিহ’-এর কিতাবুত তালাকে তিনি ‘হাসান ইবন আল-ওয়ালিদ আন-নাইসাবুরি’ থেকে, আবদুর রহমান → আব্বাস ইবন সাহল → তার পিতা ও আবু উসাইদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ উমাইমা বিনতে শারাহিলকে বিয়ে করেছিলেন। এভাবেই তিনি নামটি ‘হাসান’ হিসেবে বড় রূপে উল্লেখ করেছেন।”
আমি [ইবন হাজার] বলি: বুখারির নির্ভরযোগ্য কোনো পাণ্ডুলিপিতেই আমি নামটি ‘হুসাইন’ ছাড়া অন্যভাবে দেখিনি। বুখারির ‘তারিখ’-এও শুধু ‘হুসাইন’ নামটিই পাওয়া যায়। এটিই এ পাঠকে সমর্থন করে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
দ্বিতীয়ত: আবু আহমদ আল-জুরজানির বর্ণনায় প্রথম সনদটি এসেছে এভাবে:
“হামজা ইবন আবি উসাইদ → আব্বাস ইবন সাহল → তার পিতা।”
এটি ভুল। এখানে “ওয়া আন আব্বাস”, অর্থাৎ “এবং আব্বাস থেকে”, এর ‘ওয়া’ অক্ষরটি বাদ পড়ে গেছে। অন্য সকল বর্ণনাকারীর বর্ণনায় এই ‘ওয়া’ বিদ্যমান।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে বলে, “তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও” এবং এ কথার মাধ্যমে তালাকের উদ্দেশ্য করে, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে। আর যদি তালাকের উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে তালাক হবে না।
কা‘ব ইবন মালিকের তওবার দীর্ঘ হাদিসেও এমন ঘটনা রয়েছে। নবী ﷺ যখন তার কাছে নির্দেশ পাঠালেন যে সে যেন তার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকে, তখন কা‘ব তার স্ত্রীকে বলেছিলেন:
“তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও এবং তাদের সঙ্গেই থাকো, যতক্ষণ না আল্লাহ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।”
এর ব্যাখ্যায় এ বিষয়ে পূর্ণ আলোচনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে।
তৃতীয় হাদিস:
ইবন উমরের তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ঘটনা। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা আগেই দেওয়া হয়েছে।
এই বর্ণনায় রয়েছে, “তুমি কি ইবন উমরকে চেনো?”
যদিও বক্তা জানতেন যে, যার সঙ্গে তিনি কথা বলছেন সে ইবন উমরকে চেনে, এবং ইবন উমরই তখন তার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তবুও এভাবে প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য ছিল তাকে সুন্নাহ অনুসরণের বিষয়ে দৃঢ়ভাবে স্বীকার করানো এবং সুন্নাহর বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বক্তব্য গ্রহণে বাধ্য করা।
এর মাধ্যমে এটাও বোঝানো হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের জন্য প্রসিদ্ধ আলেমদের অনুসরণ করা আবশ্যক।
তাই তিনি তাকে এ বিষয়ে স্বীকার করানোর জন্য…

যৌন 1

এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে ঘটনাটি আরও সমস্যাজনক হয়ে ওঠে। কারণ তখন যুক্তিটি আর “নারীটি স্বেচ্ছায় মুহাম্মদকে বিয়ে করেছিলেন, পরে মত পরিবর্তন করেছেন” এমন থাকে না। বরং ব্যাখ্যাটি দাঁড়ায়, নারীটির সম্মতি ছাড়াই মুহাম্মদ তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গণ্য করতে পারতেন; এরপর তার স্পর্শে নারীটি বিরক্তি প্রকাশ করলে এবং আল্লাহর আশ্রয় চাইলে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। অর্থাৎ, “বিবাহ হয়েছিল” দাবি দিয়ে সম্মতির সমস্যাটি দূর করা যায় না; বরং ফাতহুল বারী-র এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী সেই বিবাহ নিজেই নারীর সম্মতি ছাড়াই কার্যকর বলে বিবেচিত হতে পারে।

আধুনিক নৈতিকতার বিচারে এই ধারণা সরাসরি ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং যৌন ও বৈবাহিক সম্মতির মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে। কোনো পুরুষের আগ্রহ, কোনো নারীর পিতার সম্মতি কিংবা ধর্মীয় বিশেষাধিকার একজন নারীর ব্যক্তিগত সম্মতির বিকল্প হতে পারে না। ফলে এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো না শুধু “বিয়ে হয়েছিল কি হয়নি”; বরং নারীটি নিজে সেই সম্পর্ক চেয়েছিলেন কি না। উপলব্ধ বর্ণনায় তার নিজের আচরণ সেই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেয়।


এটি কি শুধু ইবন হাজারের একটি বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা?

আগের পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, ইবন হাজার আল-আসকালানি জাওনিয়া বা উমাইমার ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, নবী মুহাম্মদের জন্য কোনো নারীকে নিজের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার ক্ষেত্রে সেই নারীর অনুমতি কিংবা তার অভিভাবকের অনুমতি অপরিহার্য ছিল না। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এটি কি শুধু ইবন হাজারের এই বিশেষ ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তৈরি করা কোনো বিচ্ছিন্ন মত, নাকি নবীর বিবাহসংক্রান্ত বিশেষ অধিকারের ধারণাটি ক্লাসিক্যাল ইসলামি ফিকহে আরও বিস্তৃতভাবে স্বীকৃত ছিল? ক্লাসিক্যাল গ্রন্থগুলো পরীক্ষা করলে দেখা যায়, বিষয়টি শুধু ইবন হাজারের একটি বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নবীর বিবাহসংক্রান্ত খাসায়িস, অর্থাৎ সাধারণ মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এমন বিশেষ অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একাধিক প্রভাবশালী ইসলামি ফকিহ একই ধরনের বিধান স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন।

প্রথমেই আরেকবার ইবন হাজারের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেখা প্রয়োজন। কারণ এই অংশটি জাওনিয়া ও উমাইমাকে একই নারী ধরে পুরো ঘটনাকে একটি সাধারণ বিবাহ ও বিচ্ছেদের কাহিনিতে পরিণত করার প্রচেষ্টাকেও সরাসরি জটিল করে তোলে। ফাতহুল বারী-তে বিভিন্ন বর্ণনার পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইবন হাজার নিজেই বলেন, আবু উসাইদের বর্ণনা এবং সাহল ইবন সাদের বর্ণনায় এমন কিছু পার্থক্য রয়েছে যার কারণে একাধিক ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা শক্তিশালী হয়। শুধু তাই নয়, তিনি এক পর্যায়ে সরাসরি বলেন, উমাইমার সঙ্গে আকদ হয়েছিল, কিন্তু অন্য নারীর সঙ্গে আকদই হয়নি; মুহাম্মদ শুধু তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিতে গিয়েছিলেন। [34]

وَالْقِصَّةُ الَّتِي فِي حَدِيثِ أَبِي أُسَيْدٍ فِيهَا أَشْيَاءُ مُغَايِرَةٌ لِهَذِهِ الْقِصَّةِ، فَيَقْوَى التَّعَدُّدُ، وَيَقْوَى أَنَّ الَّتِي فِي حَدِيثِ أَبِي أُسَيْدٍ اسْمُهَا أُمَيْمَةُ وَالَّتِي فِي حَدِيثِ سَهْلٍ اسْمُهَا أَسْمَاءُ وَاللَّهُ أَعْلَمُ. وَأُمَيْمَةُ كَانَ قَدْ عَقَدَ عَلَيْهَا ثُمَّ فَارَقَهَا وَهَذِهِ لَمْ يُعْقَدْ عَلَيْهَا بَلْ جَاءَ لِيَخْطُبَهَا فَقَطْ.
বাংলা অর্থ: আবু উসাইদের হাদিসে বর্ণিত ঘটনাটির মধ্যে অন্য ঘটনাটির তুলনায় কিছু ভিন্ন বিষয় রয়েছে। ফলে ঘটনা একাধিক হওয়ার সম্ভাবনা শক্তিশালী হয় এবং আবু উসাইদের হাদিসে বর্ণিত নারীর নাম উমাইমা, আর সাহল-এর হাদিসে বর্ণিত নারীর নাম আসমা হওয়ার সম্ভাবনাও শক্তিশালী হয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। উমাইমার সঙ্গে আকদ হয়েছিল, এরপর তিনি তাকে পৃথক করেন; কিন্তু এই নারীর সঙ্গে আকদই হয়নি, বরং তিনি কেবল তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিতে এসেছিলেন।

এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ দুইটি কারণে। প্রথমত, পরবর্তীকালের একটি harmonized narrative ধরে জাওনিয়া, আসমা ও উমাইমাকে অনিবার্যভাবে একই নারী হিসেবে ঘোষণা করা যায় না। ইবন হাজার নিজেই فَيَقْوَى التَّعَدُّدُ, অর্থাৎ “একাধিক হওয়ার সম্ভাবনা শক্তিশালী” বলেছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর নিজের বিশ্লেষণেই একটি ঘটনার নারী সম্পর্কে সরাসরি لَمْ يُعْقَدْ عَلَيْهَا, অর্থাৎ “তার সঙ্গে আকদ হয়নি” বলা হয়েছে। ফলে “হাদিসটি তালাকের অধ্যায়ে আছে, তাই সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক নারী অবশ্যই পূর্ব থেকেই মুহাম্মদের বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন”, এমন সরল সিদ্ধান্ত ইবন হাজারের নিজের বিশ্লেষণের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যেই নারীর ক্ষেত্রে বিবাহ সংঘটিত হয়েছে বলে কোনো ব্যাখ্যাকার দাবি করেন, সেখানে নারীর সম্মতি কীভাবে বিবেচিত হয়েছিল? এখানেই ইমাম নববীর রওদাতুত তালিবীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রন্থটির শুরুতেই নবী মুহাম্মদের খাসায়িস, অর্থাৎ তাঁর জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য বিধানগুলো আলোচনা করা হয়েছে। বিবাহসংক্রান্ত বিশেষাধিকারের আলোচনায় নববী প্রথমে বলেন, নবীর বিবাহ হিবা বা নিজেকে দান করার অর্থেও সম্পন্ন হতে পারত। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তিনি বলেন, মুহাম্মদ যদি কোনো অবিবাহিত নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহ প্রকাশ করতেন, তবে “সঠিক মত অনুসারে” সেই নারীর জন্য ইতিবাচক সাড়া দেওয়া আবশ্যক ছিল। এরপর তিনি আরও সরাসরি ভাষায় নারীর এবং তার ওলির অনুমতি ছাড়াই বিবাহের বিশেষাধিকারের কথা উল্লেখ করেন। [35]

قَالَ الْأَصْحَابُ: وَيَنْعَقِدُ نِكَاحُهُ ﷺ بِمَعْنَى الْهِبَةِ… وَمِنْهُ أَنَّهُ ﷺ لَوْ رَغِبَ فِي نِكَاحِ امْرَأَةٍ، فَإِنْ كَانَتْ خَلِيَّةً، لَزِمَهَا الْإِجَابَةُ عَلَى الصَّحِيحِ… وَكَانَ لَهُ ﷺ تَزْوِيجُ الْمَرْأَةِ مِمَّنْ شَاءَ بِغَيْرِ إِذْنِهَا وَلَا إِذْنِ وَلِيِّهَا، وَتَزَوَّجَهَا لِنَفْسِهِ، وَتَوَلَّى الطَّرَفَيْنِ بِغَيْرِ إِذْنِهَا وَلَا إِذْنِ وَلِيِّهَا.
বাংলা অর্থ: আলেমগণ বলেছেন, নবী ﷺ-এর বিবাহ হিবা-র অর্থেও সংঘটিত হতে পারত… এবং এর অন্তর্ভুক্ত হলো, তিনি যদি কোনো নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হতেন এবং সে অবিবাহিত হতো, তাহলে সঠিক মত অনুযায়ী সেই নারীর জন্য তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া আবশ্যক ছিল। … এবং নবী ﷺ-এর জন্য নারীটির নিজের অনুমতি এবং তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই তাকে বিবাহ দেওয়া সম্ভব ছিল; তিনি নিজেও সেই নারীকে বিবাহ করতে পারতেন এবং বিবাহের উভয় পক্ষের কার্যক্রম নিজেই সম্পন্ন করতে পারতেন, নারী কিংবা তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই।

এই অংশটি জাওনিয়ার ঘটনার আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে আর কোনো একটি নির্দিষ্ট হাদিসকে রক্ষা করার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না; নববী আলাদা একটি অধ্যায়ে নবীর বিবাহসংক্রান্ত বিশেষ অধিকার বা খাসায়িস তালিকাভুক্ত করছেন। সেখানে একদিকে বলা হচ্ছে, তাঁর বিবাহ হিবার অর্থে সংঘটিত হতে পারে, অন্যদিকে অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া “সঠিক মত অনুযায়ী” আবশ্যক, এবং আরও সরাসরি বলা হচ্ছে যে নারী ও ওলির অনুমতি ছাড়াই তিনি নিজেকে সেই নারীর সঙ্গে বিবাহিত করতে পারতেন। অর্থাৎ, ক্লাসিক্যাল ফিকহের এই কাঠামোতে “নারীটি তাঁর স্ত্রী ছিলেন” এবং “নারীটি স্বেচ্ছায় তাঁকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন”, এই দুইটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। প্রথমটি যদি ফিকহি অর্থে সত্যও হয়, দ্বিতীয়টি সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।

এই বিশেষাধিকার শুধু শাফেয়ি ফিকহের নববীর গ্রন্থেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হাম্বলি মাজহাবের অন্যতম প্রধান ফকিহ ইবন কুদামা আল-মুগনি-তে সাধারণ মুসলমানদের বিবাহে ওলি ও সাক্ষীর প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করতে গিয়ে নবী মুহাম্মদকে সরাসরি ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করেন। [36]

فَأَمَّا نِكَاحُ النَّبِيِّ ﷺ بِغَيْرِ وَلِيٍّ وَغَيْرِ شُهُودٍ، فَمِنْ خَصَائِصِهِ فِي النِّكَاحِ، فَلَا يَلْحَقُ بِهِ غَيْرُهُ.
বাংলা অর্থ: কিন্তু নবী ﷺ-এর ওলি এবং সাক্ষী ছাড়াই বিবাহ করা তাঁর বিবাহসংক্রান্ত বিশেষাধিকারের অন্তর্ভুক্ত; অন্য কেউ এ বিষয়ে তাঁর সমতুল্য নয়।

ইবন কুদামার বক্তব্যের তাৎপর্যও পরিষ্কার। সাধারণ মানুষের জন্য যে প্রক্রিয়াগত শর্তকে বিবাহ বৈধ হওয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে, নবীর ক্ষেত্রে সেই একই শর্তের ব্যতিক্রম স্বীকার করা হয়েছে। ফলে মুহাম্মদের বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানের বিবাহের নিয়ম সরাসরি বসিয়ে, “ওলি নিশ্চয়ই ছিল, স্বাভাবিক আকদ নিশ্চয়ই হয়েছিল, তাই নারীও নিশ্চয়ই সম্মত ছিল”, এই ধারাবাহিক অনুমান করা যায় না। ক্লাসিক্যাল ফিকহ নিজেই নবীর নিকাহকে সাধারণ মানুষের নিকাহ থেকে আইনগতভাবে আলাদা category হিসেবে আলোচনা করেছে।

ইবন কাসিরও সূরা আহযাবের ৫০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় একই বিশেষত্ব আরও পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন। “নিজেকে নবীর কাছে দান করা” নারী এবং সাধারণ মুসলিম পুরুষের সঙ্গে বিবাহের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ পুরুষের ক্ষেত্রে এমন নারীর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক হলে তার সমপরিমাণ মোহর আবশ্যক হবে; কিন্তু নবীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা, কারণ তিনি মোহর, ওলি ও সাক্ষী ছাড়াই বিবাহ করতে পারতেন। [37]

فَأَمَّا هُوَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، فَإِنَّهُ لَا يَجِبُ عَلَيْهِ لِلْمُفَوِّضَةِ شَيْءٌ وَلَوْ دَخَلَ بِهَا؛ لِأَنَّ لَهُ أَنْ يَتَزَوَّجَ بِغَيْرِ صَدَاقٍ وَلَا وَلِيٍّ وَلَا شُهُودٍ.
বাংলা অর্থ: কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে নিজেকে সমর্পণকারী নারীর জন্য কিছুই আবশ্যক হতো না, এমনকি তিনি তার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করলেও; কারণ তাঁর জন্য মোহর, ওলি এবং সাক্ষী ছাড়াই বিবাহ করা সম্ভব ছিল।

এখানে হিবা শব্দটিকেও তাই সাধারণ বিবাহের ভাষা ধরে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। ক্লাসিক্যাল তাফসির ও ফিকহে এটি নবীর জন্য একটি বিশেষ বৈবাহিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে সাধারণ নিকাহের একাধিক শর্ত প্রযোজ্য ছিল না। জাওনিয়ার কাছে মুহাম্মদের هبي نفسك لي, অর্থাৎ “নিজেকে আমার কাছে দান করো” বলা সেই কারণেই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কোনো আধুনিক সমালোচকের উদ্ভাবিত sexualized translation নয়; ইসলামের নিজস্ব ক্লাসিক্যাল ফিকহে هبة-কে নবীর বিবাহসংক্রান্ত একটি বিশেষ পদ্ধতি হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।

বিষয়টির বৈপরীত্য আরও পরিষ্কার হয় যখন সাধারণ মুসলমানের বিবাহের নিয়মের সঙ্গে এটি তুলনা করা হয়। বর্তমান ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠান IslamQA সাধারণ বৈধ নিকাহের শর্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতি, নারীর ওলি এবং সাক্ষীকে সরাসরি শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। [38]

وَمِنْ شُرُوطِ النِّكَاحِ: تَعْيِينُ الزَّوْجَيْنِ، وَرِضَاهُمَا، وَأَنْ يَعْقِدَهُ الْوَلِيُّ أَوْ وَكِيلُهُ، وَوُجُودُ شَاهِدَيْ عَدْلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ.
বাংলা অর্থ: বিবাহের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বামী ও স্ত্রীকে নির্দিষ্ট করা, উভয়ের সম্মতি, নারীর ওলি অথবা তার প্রতিনিধি কর্তৃক আকদ সম্পন্ন করা এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতি।

এখানেই মূল বৈপরীত্যটি সবচেয়ে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সাধারণ মুসলমানের বিবাহের ক্ষেত্রে একই ইসলামি আইনব্যবস্থা নারীর সম্মতি, ওলি, সাক্ষী ইত্যাদিকে নিকাহের বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আলোচনা করে। অথচ মুহাম্মদের বিশেষাধিকারের আলোচনায় ক্লাসিক্যাল ফকিহগণ বলছেন, তাঁর নিকাহ হিবার মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে, ওলি ও সাক্ষী ছাড়াই সংঘটিত হতে পারে, এমনকি নববীর উদ্ধৃত ফিকহি মত অনুসারে নারী ও তার ওলির অনুমতি ছাড়াই তিনি নিজেকে সেই নারীর সঙ্গে বিবাহিত করতে পারতেন। আরও এক ধাপ এগিয়ে রওদাতুত তালিবীন বলছে, তিনি কোনো অবিবাহিত নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হলে “সঠিক মত অনুসারে” সেই নারীর জন্য সাড়া দেওয়া আবশ্যক ছিল।

অতএব জাওনিয়া বা উমাইমার ঘটনাকে বিচার করতে গিয়ে “তিনি তো তাকে বিয়ে করেছিলেন, সুতরাং সম্মতির প্রশ্নই ওঠে না”, এই যুক্তি মূল প্রশ্নটির উত্তর দেয় না। বরং ক্লাসিক্যাল ফিকহের এই দলিলগুলো সামনে রাখলে ঠিক উল্টো প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে: সেই বিবাহে নারীটি নিজে স্বাধীনভাবে সম্মতি দিয়েছিলেন কি না? কারণ যে আইনব্যবস্থা দিয়ে তাকে মুহাম্মদের স্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেই একই ফিকহি ঐতিহ্যের ভেতরেই নবীর জন্য এমন বিবাহাধিকার স্বীকৃত হয়েছে যেখানে নারীর সম্মতি, ওলির অনুমতি, সাক্ষী কিংবা সাধারণ নিকাহের অন্যান্য শর্ত একে একে ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে যেতে পারে।

জাওনিয়ার নিজের আচরণ তাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। তিনি মুহাম্মদের হিবা-র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তাকে “বাজারিয়া” বলে তুচ্ছ করেন, মুহাম্মদ তার দিকে হাত বাড়ালে শেষ পর্যন্ত أعوذ بالله منك, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই”, বলে স্পষ্টভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করেন। এর বিপরীতে পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যা যদি বলে যে মুহাম্মদের আগ্রহই বিবাহ কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে, তাহলে সেটি জাওনিয়ার সম্মতি প্রমাণ করে না; বরং কীভাবে একজন নারীর প্রত্যক্ষ অসম্মতি সত্ত্বেও তাকে আইনি ভাষায় ‘স্ত্রী’ হিসেবে গণ্য করা সম্ভব হয়েছিল, সেই কাঠামোটিই ব্যাখ্যা করে।

এই কারণেই ঘটনাটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন “আকদ হয়েছিল কি না” নয়। আকদ হয়ে থাকলেও ক্লাসিক্যাল বিশেষাধিকার অনুযায়ী সেটি নারীর স্বাধীন সম্মতির প্রমাণ নয়; আর ইবন হাজারের অন্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী অন্তত একটি সংশ্লিষ্ট নারীর ক্ষেত্রে আকদই হয়নি। ফলে দুই সম্ভাবনার যেটিই গ্রহণ করা হোক, জাওনিয়ার নিজের প্রত্যাখ্যানের গুরুত্ব অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং প্রাচীন হাদিসের মাতন, ইবন হাজারের ব্যাখ্যা, নববীর ফিকহ, ইবন কুদামার বিধান এবং ইবন কাসিরের তাফসির পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে আসে: মুহাম্মদের বিবাহসংক্রান্ত বিশেষাধিকারের ইসলামি ধারণাটি সাধারণ বিবাহে প্রযোজ্য সম্মতি ও প্রক্রিয়াগত শর্তের সঙ্গে এক ছিল না। তাই “বিবাহ” শব্দটি ব্যবহার করেই কোনো সম্পর্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বেচ্ছাসম্মত সম্পর্ক প্রমাণ করা ঐতিহাসিক এবং ফিকহি উভয় দিক থেকেই অসঙ্গত।


হাদিসের পরিচ্ছেদের শিরোনাম কি সবসময় আক্ষরিক অর্থে প্রযোজ্য?

হাদিসগ্রন্থের কোনো বর্ণনা নির্দিষ্ট একটি পরিচ্ছেদের অধীনে রাখা হয়েছে বলেই সেই পরিচ্ছেদের শিরোনামের প্রতিটি শব্দকে সংশ্লিষ্ট ঘটনার আক্ষরিক ঐতিহাসিক পরিচয় হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। হাদিস সংকলকেরা অনেক সময় কোনো নির্দিষ্ট ফিকহি বিধান, সাদৃশ্য, আইনি প্রশ্ন বা নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কোনো বর্ণনাকে একটি নির্দিষ্ট অধ্যায় বা পরিচ্ছেদের অধীনে রেখেছেন। ফলে পরিচ্ছেদের শিরোনাম এবং হাদিসের মাতনে বর্ণিত ঐতিহাসিক তথ্য এক জিনিস নয়।

সহীহ বুখারীর একটি উদাহরণেই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে হাদিস নং ২৮১৩, আন্তর্জাতিক নং ৩০২২ যে পরিচ্ছেদের অধীনে এসেছে, তার নাম: [39]

باب قَتْلِ النَّائِمِ الْمُشْرِكِ
“ঘুমন্ত মুশরিককে হত্যা করা”

কিন্তু এই পরিচ্ছেদের অধীনে বর্ণিত ঘটনাটি কোনো আরব মুশরিককে হত্যার ঘটনা নয়। এখানে নিহত ব্যক্তি হলেন আবু রাফে, এবং হাদিসের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ আনসারদের একটি দলকে তাকে হত্যা করার জন্য পাঠান। রাতের বেলায় একজন সাহাবী তার দুর্গে প্রবেশ করেন, সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে চাবি নিয়ে দরজা খোলেন এবং ঘুমন্ত অবস্থায় আবু রাফের কাছে গিয়ে তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন। সংশ্লিষ্ট HadithBD অনুবাদেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে দলটি পাঠানো হয়েছিল “আবূ রাফে ইয়াহুদীদের হত্যা করার জন্য”

অর্থাৎ, পরিচ্ছেদের শিরোনামে তাকে “মুশরিক”-সংক্রান্ত বিধানের মধ্যে রাখা হলেও বর্ণিত ব্যক্তি ছিলেন একজন ইহুদি। একজন ইহুদি এবং একজন আরব মুশরিক একই ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষ নন। তাই শুধু কোনো বর্ণনা “মুশরিক হত্যা” পরিচ্ছেদের অধীনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ঐতিহাসিকভাবে মুশরিক ঘোষণা করা যাবে না। এখানে পরিচ্ছেদের শিরোনাম সংকলকের একটি ফিকহি শ্রেণিবিন্যাস, ব্যক্তিটির ধর্মীয় পরিচয়ের আক্ষরিক বর্ণনা নয়।

এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত বিষয় পরিষ্কার হয়। হাদিস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হয়:

১. হাদিসের মাতন আসলে কী বলছে,
২. সমান্তরাল বা অন্যান্য বর্ণনায় ঘটনাটি কীভাবে চিহ্নিত হয়েছে,
৩. সংকলক কোন ফিকহি উদ্দেশ্যে হাদিসটিকে একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছেদের অধীনে রেখেছেন।

এই তিনটিকে এক করে ফেললে সহজেই ভুল সিদ্ধান্ত তৈরি হয়।

জাওনিয়া বা উমাইমার ঘটনার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ঘটনাটি কিতাবুত তালাক-এর এমন একটি পরিচ্ছেদের অধীনে এসেছে যেখানে স্বামী স্ত্রীকে কীভাবে তালাক দেবে, সেই প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে। কিন্তু কেবল সেই পরিচ্ছেদের শিরোনাম দেখিয়ে বলা যায় না যে, অতএব সংশ্লিষ্ট নারী অবশ্যই মুহাম্মদের বৈধ ও সম্মত স্ত্রী ছিলেন। এই সিদ্ধান্তের জন্য হাদিসের মূল বর্ণনার মধ্যেই বিবাহ ও সম্মতির প্রমাণ থাকতে হবে।

বরং সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় নারী নিজেকে মুহাম্মদের কাছে হিবা করতে অস্বীকার করছেন, তার স্পর্শ অপছন্দ করছেন এবং তার কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইবন হাজার নিজেই উল্লেখ করেছেন যে কিছু আলেম প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি বিবাহ-চুক্তির কোনো বিবরণই না থাকে এবং নারী নিজেকে মুহাম্মদের কাছে সমর্পণ করতেও অস্বীকার করেন, তাহলে তাকে তালাক দেওয়ার প্রশ্ন আসে কীভাবে? অর্থাৎ, পরিচ্ছেদের শিরোনাম থেকে বিবাহকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া এমনকি ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যাকারদের কাছেও সমস্যা তৈরি করেছিল।

তাই “হাদিসটি তালাকের পরিচ্ছেদের অধীনে এসেছে, অতএব নারীটি অবশ্যই তার স্ত্রী ছিলেন” এই যুক্তি টেকে না। একই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে “ঘুমন্ত মুশরিক হত্যা” পরিচ্ছেদের আবু রাফেকেও মুশরিক বলতে হবে, অথচ বর্ণনাতেই তিনি ইহুদি হিসেবে চিহ্নিত। সুতরাং পরিচ্ছেদের নাম কোনো ঘটনার ঐতিহাসিক পরিচয় নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; মূল প্রমাণ হলো হাদিসের মাতন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্ণনা।


এরপরে উমাইমার প্রতিও একই আচরণ

পরের হাদিসগুলো থেকে জানা যায়, জাওনিয়ার সঙ্গে যৌনকর্মে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর নবী মুহাম্মদ একই ঘটনাস্থলে উমাইমার সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করতে চেষ্টা করেন। আসুন এরপরের হাদিসটি পড়ে নিই, [40]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছেদঃ ৬৮/৩. ত্বলাক্ব দেয়ার সময় স্বামী কি তার স্ত্রীর সম্মুখে ত্বলাক্ব দেবে?
৫২৫৬-৫২৫৭. (ভিন্ন সনদে) সাহল ইবন সা’দ ও আবূ উসায়দ (রাঃ) বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমাইমা বিনতু শারাহীলকে বিবাহ করেন। পরে তাকে তাঁর কাছে আনা হলে তিনি তার দিকে হাত বাড়ালেন। সে এটি অপছন্দ করল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ উসাইদকে তার জিনিসপত্র গুটিয়ে এবং দুখানা কাতান বস্ত্র প্রদান করে তার পরিবারের নিকট পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিলেন।[৫২৫৫] আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৭১ শেষাংশ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৫)
আবূ উসায়দ ও সাহল ইবন সা’দ (রাঃ) থেকে একই রকম বর্ণিত আছে।[৫২৩৭] আধুনিক প্রকাশনী- নাই, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাহল বিন সা’দ (রাঃ)


জাওনিয়া আর উমাইমা কি একই ব্যক্তি নাকি ভিন্ন?

এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে হাদিসের মূল ভাষা দেখে নেওয়া জরুরি। সহীহ বুখারী শরীফের হাদিস নং ৫২৫৫-এ আবূ উসাইদ বর্ণনা করেছেন:

“…তখন নু’মান ইব্ন শারাহীলের কন্যা উমাইমার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে জাওনিয়াকে আনা হয়। আর তার খিদমতের জন্য ধাত্রীও ছিল। নবী (সা.) যখন তার কাছে গিয়ে বললেন, ‘তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো’…”

এই বর্ণনায় স্পষ্টভাবে দুটি আলাদা নাম এবং দুটি আলাদা পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে — জাওনিয়া (যাকে বাগানের ঘরে আনা হয়েছে) এবং উমাইমা বিনতে নু’মান ইব্ন শারাহীল (যার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে এই ঘটনা ঘটছে)। হাদিসের আক্ষরিক ভাষায় জাওনিয়াকে “উমাইমার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে আনা হয়েছে” বলা হয়েছে। এই বাক্যগঠন আক্ষরিকভাবে দুইজন ভিন্ন নারীর ধারণা জাগায় — একজনকে অন্যজনের ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানে দ্বিতীয়জনের নাম আগে থেকেই উল্লেখিত।

পরবর্তীকালের ইসলামি আলেম ও ব্যাখ্যাকারকগণ (ইসলামকিউএ, সিকার্স গাইডেন্স, আল-ইকরা ইত্যাদি) এই দুই নামকে একই ব্যক্তি বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, “জাওনিয়া” শুধু গোত্রীয় উপাধি এবং উমাইমাই সেই জাওন গোত্রের মেয়ে। কিন্তু বুখারী শরীফের মূল আরবি ভাষা (“فَأُنْزِلَتْ فِي بَيْتٍ فِي نَخْلٍ فِي بَيْتِ أُمَيْمَةَ بِنْتِ النُّعْمَانِ بْنِ شَرَاحِيلَ”) এবং তার বাংলা অনুবাদ এই একীভূত ব্যাখ্যাকে সরাসরি সমর্থন করে না। কারণ যদি সত্যিই একই ব্যক্তি হতো, তাহলে “উমাইমার ঘরে উমাইমাকেই আনা হয়েছে” বলার কোনো যৌক্তিকতা থাকত না। হাদিসের এই ভাষাগত বিভাজন স্পষ্টতই দুইজন নারীর ধারণা তৈরি করে।

এরপরের ঘটনা কী ঘটেছিল, তা হাদিস থেকেই দেখা যাক। নবী জাওনিয়ার কাছে গিয়ে বলেন, “নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো” (هبي نفسك لي)। জাওনিয়া উত্তর দেন, “কোনো রাজকন্যা কি কোনো বাজারিয়া (সাধারণ/নিম্নশ্রেণির) লোকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে?” নবী তার শান্ত করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। তখন সে বলে, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই।” নবী বলেন, “তুমি তো মহান আশ্রয়দাতার নিকট আশ্রয় চেয়েছ।” তারপর তিনি বেরিয়ে এসে আবূ উসাইদকে বলেন, দুটি সাদা কাতান কাপড় পরিয়ে তাকে তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতে।

কাছাকাছি ঘটনার আরেকটি বর্ণনা সহীহ বুখারী ৫২৫৬ ও ৫২৫৭-এ পাওয়া যায়, যেখানে “উমাইমা বিনতে শারাহীল”-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আগের হাদিস ৫২৫৫-এর স্পষ্ট ভাষাগত বিভাজন (জাওনিয়া + উমাইমার ঘর) এবং তিনটি আলাদা হাদিস নম্বরে তিনটি আলাদা বর্ণনা থাকায় এটিকে দুইটি ভিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। পরবর্তী আলেমগণ যদিও একীভূত করার চেষ্টা করেছেন, তবু হাদিসের আক্ষরিক পাঠ্য এবং বর্ণনার কাঠামো সেই একীভূতকরণকে পুরোপুরি ও অনস্বীকার্যভাবে সমর্থন করে না। সেটি মূলত পরবর্তী যুগের স্কলারদের সমন্বয়বাদী ব্যাখ্যা (Harmonization)। কিন্তু এই দুইজন একজন হোক কিংবা দুইজন ভিন্ন নারী, সেটি আমাদের আলোচনার মূল বিষয়কে প্রভাবিত করে না।

আরও পরিষ্কার হওয়ার জন্য এই হাদিস দুইটি খুব ভালভাবে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। একটু মন দিয়ে নামগুলো পড়বেন। ছবিগুলো নেয়া হয়েছে সরাসরি বই থেকে [41]

যৌন 3

এবারে আসুন পরের হাদিসটি পড়ি [41]হাদিসের বর্ণনা লক্ষ্য করুন,নু’মান ইবনে শারাহীলের কন্যা উমাইমা এবং জাওনের কন্যা জাওনিয়া কিন্তু দুইজন আলাদা ব্যক্তি বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে উমাইমাকে নবী বিয়ে করেছিল বলে একটি তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু জাওনিয়াকে বিয়ে করার কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরঞ্চ ঘটনা পরম্পরা দেখে বলা যায়, ঐ বাগানবাড়িতে তাকে আনা হয়েছিল ভোগ করার উদ্দেশ্যে, মেয়েটির বিরক্তিভাব থেকেই তা অনেকটা পরিষ্কার। সে নিজ সম্মতিতে মুহাম্মদকে বিয়ে করে থাকলে এমনটি হওয়া কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটু মন দিয়ে পড়ুন [42]

যৌন 5

যৌনকর্ম করতে ব্যর্থ নবীকে সাহাবীর প্রস্তাব

জাওনিয়ার প্রত্যাখ্যানের পরবর্তী ঘটনাটি শুধু আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তেই নয়, আরও পুরনো ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থ আত-তাবাকাত আল-কুবরা-তেও সংরক্ষিত হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে আশ‘আছ ইবন কায়েস মুহাম্মদকে শুধু নিজের বোনের কথা জানাননি; প্রত্যাখ্যানকারী নারীর বিকল্প হিসেবে নিজের বোনের সৌন্দর্য এবং বংশমর্যাদাকেই সরাসরি সামনে এনেছেন। ইবন সা‘দের বর্ণনায় জাওনিয়ার ঘটনার পরে আশ‘আছ মুহাম্মদকে বলেন, أَلَا أُزَوِّجُكَ مَنْ لَيْسَ دُونَهَا فِي الْجَمَالِ وَالْحَسَبِ؟, অর্থাৎ, “আমি কি আপনাকে এমন একজনকে বিয়ে দেব না, যে সৌন্দর্য ও বংশমর্যাদায় তার চেয়ে কম নয়?” মুহাম্মদ জিজ্ঞেস করেন, “কে?” আশ‘আছ উত্তর দেন, “আমার বোন কাতীলা।” বর্ণনা অনুযায়ী মুহাম্মদ বলেন, “আমি তাকে বিবাহ করলাম।” [43] [44]

فَقَالَ لَهُ الْأَشْعَثُ بْنُ قَيْسٍ: لَا يَسُؤْكَ اللَّهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَا أُزَوِّجُكَ مَنْ لَيْسَ دُونَهَا فِي الْجَمَالِ وَالْحَسَبِ؟ قَالَ: مَنْ؟ قَالَ: أُخْتِي قُتَيْلَةُ. قَالَ: قَدْ تَزَوَّجْتُهَا.বাংলা অর্থ: আশ‘আছ ইবন কায়েস বললেন, “আল্লাহ যেন আপনাকে এতে কষ্ট না দেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমি কি আপনাকে এমন একজনকে বিয়ে দেব না, যে সৌন্দর্য ও বংশমর্যাদায় তার চেয়ে কম নয়?” তিনি বললেন, “কে?” আশ‘আছ বললেন, “আমার বোন কাতীলা।” তিনি বললেন, “আমি তাকে বিবাহ করলাম।”

ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-য় একই ঘটনাটি আরও সরাসরি জাওনিয়ার প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে যুক্ত করে সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে ইবন আব্বাসের নামে বর্ণিত হয়েছে, নারীটি মুহাম্মদের কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইলে মুহাম্মদ مُغْضَبًا, অর্থাৎ রাগান্বিত অবস্থায় তার কাছ থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন আশ‘আছ তাকে বলেন, لَا يَسُؤْكَ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَعِنْدِي أَجْمَلُ مِنْهَا, অর্থাৎ “এতে আপনি কষ্ট পাবেন না, হে আল্লাহর রাসূল; আমার কাছে তার চেয়েও সুন্দরী একজন আছে।” এরপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি নিজের বোন কাতীলাকে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহ দেন [45]

قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: لَمَّا اسْتَعَاذَتْ مِنْهُ خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا مُغْضَبًا، فَقَالَ لَهُ الْأَشْعَثُ: لَا يَسُؤْكَ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَعِنْدِي أَجْمَلُ مِنْهَا، فَزَوَّجَهُ أُخْتَهُ قُتَيْلَةَ.বাংলা অর্থ: ইবন আব্বাস বলেন, নারীটি তাঁর কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইলে তিনি রাগান্বিত হয়ে তার কাছ থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন আশ‘আছ তাঁকে বললেন, “এতে আপনি কষ্ট পাবেন না, হে আল্লাহর রাসূল। আমার কাছে তার চেয়েও সুন্দরী একজন আছে।” এরপর তিনি নিজের বোন কাতীলাকে তাঁর সঙ্গে বিবাহ দেন।

এই দুই বর্ণনায় ঘটনাটির অস্বস্তিকর দিকটি অত্যন্ত সরাসরি। একজন নারী মুহাম্মদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তাঁর কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন। এর অব্যবহিত পরে একজন পুরুষ অনুসারী নেতার মন খারাপ বা রাগ প্রশমিত করার জন্য নিজের বোনকে সামনে আনছেন, এবং বোনটিকে পরিচয় করানোর প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বলছেন যে তিনি প্রত্যাখ্যানকারী নারীর তুলনায় “সৌন্দর্য ও বংশমর্যাদায় কম নন”, অথবা আরও সরাসরি, “আমার কাছে তার চেয়েও সুন্দরী আছে।” কাতীলার নিজের ইচ্ছা, মতামত বা সম্মতির কোনো উল্লেখ এই প্রস্তাবের বর্ণনায় নেই। এখানে নারী একজন স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তি হিসেবে নয়, একজন পুরুষ আত্মীয়ের হাতে থাকা বিবাহযোগ্য সুন্দরী বিকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছেন। জাওনিয়ার প্রত্যাখ্যানের পর মুহাম্মদের জন্য “আরও সুন্দরী” নারী হাজির করার এই বর্ণনা তাই পরবর্তী লৈঙ্গিক রাজনীতির বিশ্লেষণের জন্য কোনো আধুনিক অনুমান নয়; ভাষাটি ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোর নিজের [46]

বর্ণনাকারী বলেন, নবী করীম (সা) তাকে বিয়ে করেছিলেন আট হিজরীর যিলকদ মাসে, আর তার মৃত্যু হয়েছিল ষাট হিজরীতে। নবী করীম (সা) যাদের বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু তাদের সংগে সহবাস করেননি, এ তালিকায় ইব্‌ন ইসহাক (র) হতে ইউনুস (র) উল্লেখ করেছেন, আসমা বিনত কা’ব জাওনী ও ‘আমরা বিনত ইয়াযীদ কিলাবীকে। তবে ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও কাতাদা (র) বলেছেন, আসমা বিনতুন নু’মান ইব্‌ন আবুল জাওন।-আল্লাহই সর্বাধিক অবগত ।
ইবন আব্বাস (রা) বলেন, সে নবী করীম (সা) হতে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করলে তিনি রুষ্ট হয়ে তাঁর নিকট থেকে বেরিয়ে আসলে আশ’আছ (রা) তাকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এতে দুঃখিত হবেন না। আমার কাছে তার চেয়ে সুন্দরী গুণবতী রয়েছে। পরে তিনি নিজের বোন কাতীলাকে তার সংগে বিয়ে দিলেন। অন্যান্য বর্ণনা মতে এটি ছিল নবম হিজরীর রাবী (আউয়াল/ছানী) মাসের ঘটনা।

যৌন 7

প্রখ্যাত ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থ “আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”-এর পঞ্চম খণ্ড থেকে এই পুরো ঘটনাটি আবারো জানা যায়। নবী একজন নারীর সাথে যৌনকর্ম করার উদ্দেশ্য নিয়ে তাকে নিজের কাছে সমর্পন করতে বলেছিল। কিন্তু ঐ মহিলা রীতিমত হযরত মুহাম্মদকে এই বলে গালি দেন যে, নবী মুহাম্মদ একজন নিম্নমানের বাজারী লোক। তার সাথে সেই মহিলা যৌনকর্ম করতে ইচ্ছুক নন। নবী মুহাম্মদ তখন তার গায়ে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই নারী আল্লাহর দোহাই দিয়ে নবীকে থামতে বলেন। আল্লাহর দোহাই দেয়ার পরে নবী আর তাকে যৌনকাজে বাধ্য করেন নি [47]

নবী মুহাম্মদ একজন নিম্নমানের বাজারী লোক
নবী মুহাম্মদ একজন বেগানা নারীর গায়ে হাত দেন

ক্ষমতা, অসম্মতি এবং লৈঙ্গিক রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ

জাওনিয়ার সাথে মুহাম্মদের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঘাত-প্রতিঘাতপূর্ণ ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ বিচ্ছেদের গল্প নয়, বরং এটি তৎকালীন আরব সমাজে ক্ষমতার বিন্যাস, নারীর ‘সম্মতি’ (consent) লঙ্ঘন এবং লৈঙ্গিক রাজনীতির একটি জীবন্ত প্রামাণ্য দলিল। এ ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একতরফা হয়ে উঠতে পারে এবং নারীর স্বায়ত্তশাসনকে কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। নিচে পয়েন্ট আকারে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো, যেখানে প্রতিটি পয়েন্ট হাদিসের বর্ণনার সাথে যুক্ত করে ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছেঃ

স্থান নির্বাচন (বাগানবাড়ি)
হাদিসের বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ তার সঙ্গীদের নিয়ে ‘শাওত’ (Ash-Shaut) নামক একটি বাগানবাড়িতে গিয়েছিলেন, যা আরবিতে ‘হায়েত’ বা প্রাচীরবেষ্টিত বাগান হিসেবে পরিচিত [48]। তৎকালীন আরবে এ ধরনের বাগানবাড়িগুলো সাধারণত ব্যক্তিগত বিনোদন, নিভৃত আলাপ বা যৌনসঙ্গমের জন্য ব্যবহৃত হতো—কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক বিবাহের স্থান ছিল না। এই স্থান নির্বাচন নিজেই ক্ষমতার একটি প্রকাশ: মুহাম্মদ একটি নিয়ন্ত্রিত, নির্জন পরিবেশ বেছে নিয়েছিলেন যেখানে বাইরের হস্তক্ষেপ কম এবং তার নিজস্ব কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ঘটনাটি কোনো সম্মানজনক বিবাহের আয়োজন ছিল না, বরং একটি একতরফা নিয়ন্ত্রিত মিলনের পরিকল্পনা।
গৃহের পরিবর্তে বাগান
যদি জাওনিয়া মুহাম্মদের বৈধ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা হতো, তাহলে নবীর স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত হুজরা বা কক্ষে তাকে স্থান দেওয়া হতো। কিন্তু তাকে নিজের ঘরে না এনে দূরবর্তী একটি বাগানবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মিলনের উদ্দেশ্য ছিল সাময়িক ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি, কোনো দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক বন্ধন নয়। এখানে ক্ষমতার অসমতা প্রকট: নবীর স্ত্রী হিসেবে তার অধিকার সুরক্ষিত করার পরিবর্তে তাকে একটি ‘অস্থায়ী স্থানে’ রাখা হয়েছে, যা নারীকে বস্তুর মতো ব্যবহারের একটি উদাহরণ।
সঙ্গীদের অবস্থান ও সাক্ষ্য
মুহাম্মদ সঙ্গীদের (সাহাবীদের) বাগানের বাইরে বসিয়ে রেখে একা ভেতরে প্রবেশ করেন। বর্ণনাকারী আবু উসাইদ জানিয়েছেন, তারা দুই বাগানের মাঝখানে বসেছিলেন [48]। এই নিকটবর্তী অবস্থান নিশ্চিত করে যে, তারা ভেতরের কথোপকথন ও উচ্চবাচ্য শুনতে পাচ্ছিলেন এবং পরবর্তীতে তা হাদিস হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এটি কেবল সাক্ষ্যের প্রমাণ নয়, বরং ক্ষমতার একটি প্রদর্শনী—সাহাবীরা বাইরে ‘পাহারা’ দিচ্ছিলেন, যা ঘটনাটিকে একটি নিয়ন্ত্রিত ‘প্রাইভেট’ অভিযানে পরিণত করেছে এবং জাওনিয়ার কোনো বাইরের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে।
জাওনিয়ার অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতি
হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জাওনিয়াকে সেখানে ‘আনা হয়েছিল’ (আরবিতে ‘উতিয়া’ বা ‘জিআ বিহা’ শব্দ ব্যবহৃত)। অর্থাৎ তিনি নিজের ইচ্ছায় বা অভিসারে আসেননি, বরং অন্যদের মাধ্যমে ‘জোরপূর্বক’ উপস্থিত করা হয়েছে, যা পরের কথোপকথন থেকে বোধগম্য। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, তার সম্মতি ছিল না; তাকে একটি ‘বস্তু’ হিসেবে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা তৎকালীন নারীদের প্রতি ক্ষমতাশালী পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আরও উল্লেখযোগ্য যে, হাদিসে বলা হয়েছে মেয়েটির খিদমতের জন্য একজন ধাত্রী (নার্স/দাই) উপস্থিত ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে ধাত্রী সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা মেয়েদের সঙ্গেই থাকতেন। ইসলামী বিধান অনুসারে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্ষেত্রে পিতার সম্মতিই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়, মেয়ের নিজস্ব সম্মতির প্রয়োজন পড়ে না। এই ধাত্রীর উপস্থিতি তাই জাওনিয়াকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা হওয়ার একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা তুলে ধরে এবং ঘটনাটিকে আরও বেশি অসম্মতিপূর্ণ করে তোলে।
‘হিবা’ বা নিজেকে সমর্পণের দাবি
ঘরে প্রবেশ করেই মুহাম্মদ সরাসরি প্রস্তাব দেন— “হাবি লী নাফসাকি” (هبي لي نفسك), অর্থাৎ “তুমি নিজেকে আমার কাছে দান করো (হেবা করো)” [48]। এটি কুরআনের সূরা আহযাবের ৫০ নম্বর আয়াতের বিশেষ অধিকারের প্রয়োগ, যেখানে কোনো নারী মোহর বা সাক্ষী ছাড়াই নিজেকে নবীর কাছে নিবেদন করতে পারতেন। এখানে কোনো বিবাহের প্রথাগত দায়বদ্ধতা বা দেনমোহরের উল্লেখ নেই—শুধুমাত্র যৌন সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি লৈঙ্গিক রাজনীতির চরম উদাহরণ: ধর্মীয় কর্তৃত্বকে ব্যবহার করে নারীর শরীরকে ‘দান’ হিসেবে দাবি করা।
সম্মতির অভাব ও প্রত্যাখ্যান
জাওনিয়া এই প্রস্তাব কেবল প্রত্যাখ্যান করেননি, বরং তীব্র ঘৃণা ও অবজ্ঞা সহকারে বলেন— “কোনো রাজকুমারী কি কোনো বাজারিয়া ব্যক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে?” এখানে তিনি নিজেকে ‘মালিকা’ (রাজকুমারী) হিসেবে উচ্চবংশীয় দাবি করেছেন এবং মুহাম্মদকে সাধারণ স্তরের বলে অভিহিত করেছেন। এই প্রত্যাখ্যান সম্মতির স্পষ্ট অভাব প্রমাণ করে এবং দেখায় যে, পুরো ঘটনাটি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলছিল।
‘বাজারিয়া’ (সুক্বী) গালি
জাওনিয়া মুহাম্মদকে ‘সুক্বী’ (سوقي) বা বাজারিয়া বলে অভিহিত করেন। তৎকালীন আরব সমাজে এই শব্দটি অত্যন্ত অপমানজনক ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ছিল, যা নিচু শ্রেণির বা সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রতি ব্যবহৃত হতো। এই গালি তার সামাজিক অবস্থানের প্রতি তীব্র প্রতিবাদ এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ।
ক্রোধ ও উত্তেজনা
হাদিসের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, জাওনিয়া সেই মুহূর্তে অত্যন্ত রাগান্বিত ও উত্তেজিত ছিলেন। তার উগ্র প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, পরিস্থিতিটি কোনো রোমান্টিক বা সম্মতিপূর্ণ ছিল না—বরং জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া একটি অপমানজনক পরিস্থিতি।
শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে সম্মতি লঙ্ঘন
জাওনিয়ার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান শোনার পরেও মুহাম্মদ তার দিকে হাত প্রসারিত করেন এবং শরীরে হাত রাখার চেষ্টা করেন। হাদিসের ভাষায়— “আহওয়া বিয়াদিহি আলাইহা” (أَهْوَى بِيَدِهِ عَلَيْهَا), অর্থাৎ তিনি হাত দিয়ে তাকে স্পর্শ করতে চাইলেন [48]। আধুনিক যেকোনো সংজ্ঞায় একজন নারীর ‘না’ শোনার পর তার শরীরে হাত দেওয়া সম্মতির চরম লঙ্ঘন এবং শারীরিক নির্যাতনের একটি ধাপ। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা কীভাবে ‘সম্মতি’কে অগ্রাহ্য করে এগোয়।
১০
শেষ রক্ষা হিসেবে আল্লাহর দোহাই
মুহাম্মদ যখন তাকে স্পর্শ করতে উদ্যত হন, তখন জাওনিয়া উপায়ান্তর না দেখে বলেন— “আউজু বিল্লাহি মিনকা” (أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْكَ), অর্থাৎ “আমি তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই” [48]। এটি ছিল তার নিষ্কৃতির চূড়ান্ত আর্তনাদ এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার।
১১
সাহাবীদের উপস্থিতি ও নবীর বাধ্যবাধকতা
সাহাবীরা বাইরে থেকে সব শুনছিলেন। জাওনিয়া যখন ‘আল্লাহর দোহাই’ দিলেন, তখন মুহাম্মদের পক্ষে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ তার নিজের প্রচারিত ধর্মে আল্লাহর নামে আশ্রয় চাওয়ার পর জোর করা জনসমক্ষে কুৎসিত ও নৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতো। তাই তিনি বলতে বাধ্য হলেন, “তুমি এক মহান সত্তার আশ্রয় নিয়েছ।” এটি ক্ষমতার সীমা দেখিয়ে দেয়—জনমত ও ধর্মীয় চাপ ছাড়া হয়তো ঘটনা অন্যদিকে যেত।
১২
‘ইকসুহা’ বা কাপড় পরিয়ে দেওয়া
ঘটনার শেষে মুহাম্মদ নির্দেশ দেন— “ইকসুহা রাযিকিয়্যাতাইন” (اکْسُهَا رَازِقِيَّتَيْنِ), অর্থাৎ “তাকে দুটি রাযিকী কাপড় পরিয়ে দাও এবং পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাও” [48]। সাধারণ উপহারের ক্ষেত্রে ‘আতিহা’ (তাকে দাও) শব্দ ব্যবহৃত হতে পারত, কিন্তু ‘ইকসুহা’ (তাকে পরিয়ে দাও) শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ, যা আরও একটি সম্ভাবনাকে সামনে আনে। পুরো ঘটনাটি কল্পনা করলে বোঝা যায়, এইরকম পরিস্থিতিত্তে সাধারণত ধস্তাধস্তি এবং জোরাজুরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এরপরে এই শব্দ থাকা, এটি তখনই ব্যবহৃত হতে পারে যখন কারো শরীর থেকে কাপড় সরে গেছে বা ধস্তাধস্তিতে বস্ত্রহানি হয়েছে। জাওনিয়ার প্রতিরোধ এবং মুহাম্মদের হাত বাড়ানোর পর এই নির্দেশটি শারীরিক সংঘর্ষ ও সম্ভাব্য বস্ত্রহানির জোরালো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বহন করে। এটি ঘটনার শেষে নারীকে ‘আগের মত’ করে ফেরত পাঠানোর একটি প্রক্রিয়া, যা ক্ষমতার অপব্যবহারের চূড়ান্ত প্রমাণ।
১৩
সাহাবীর বোনকে ‘উপহার’ হিসেবে প্রস্তাব: নবীর মন খারাপ না করার জন্য নিজের সুন্দরী বোনকে দান করার মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব এবং কর্তৃত্বের মনোবিজ্ঞান
জাওনিয়ার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান ও আল্লাহর দোহাইয়ের পর মুহাম্মদ যখন সামান্য হলেও মানসিক অস্বস্তি বা অপমানবোধে ভুগছিলেন বলে ধারণা করা হয়, তখন একজন সাহাবী তাৎক্ষণিকভাবে নিজের সুন্দরী বোনকে ‘অফার’ করেন—যাতে নবীর মন খারাপ না হয়, তার আত্মসম্মান পুনরুদ্ধার হয় এবং তিনি যেন কোনোভাবে অসন্তুষ্ট না হন। এই প্রস্তাবটি কেবল একটি সাধারণ সান্ত্বনা বা সহানুভূতির প্রকাশ নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব, কর্তৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং নারীকে বস্তুর মতো ব্যবহারের এক চরম উদাহরণ।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি প্রথমত ‘charismatic authority’-এর ফ্যানাটিক্যাল অনুসরণের প্রকাশ: সাহাবী নবীর মেজাজকে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যে, তাঁর সামান্য অস্বস্তি পুরো সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্বাস করেন। এটি একধরনের ‘anticipatory obedience’ বা আগাম আনুগত্য—যেখানে অনুসারী নেতার মানসিক অবস্থা পড়ে নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন, যাতে নিজের অবস্থান নিরাপদ রাখা যায়। ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ‘father complex’-এর চরম রূপ: মুহাম্মদকে পিতৃসমকক্ষ মনে করে তাঁর ‘অপমান’কে নিজের পরিবারের সদস্যকে বলি দিয়ে পূরণ করা।

দ্বিতীয়ত, এই কাজে নারীর সম্পূর্ণ ভোগ্যকরণ (sexual Objectification) ঘটেছে। সাহাবী তাঁর নিজের বোনকে ‘সুন্দরী’ হিসেবে বর্ণনা করে তাকে একটি পণ্য বা ‘মানসিক সান্ত্বনার উপহার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে বোনের সম্মতি, ইচ্ছা বা আত্মসম্মানের কোনো স্থান নেই—তাকে শুধু নবীর মেজাজ ঠিক রাখার যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। এটি তৎকালীন লৈঙ্গিক রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রকাশ করে: নারীকে পুরুষের (বিশেষ করে ক্ষমতাশালী পুরুষের) আবেগীয় চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা। সাহাবীর এই প্রস্তাব তাঁর নিজের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাতেরও ইঙ্গিত দেয়—ধর্মীয় আনুগত্য পরিবারীয় বন্ধন ও নৈতিকতাকে ছাপিয়ে গেছে।

তৃতীয়ত, এটি ‘groupthink’ ও ‘cult psychology’-এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। সাহাবী জানতেন যে, নবীর প্রত্যাখ্যানের ঘটনা যদি তাঁর মনে দাগ কাটে, তাহলে তাঁর নিজের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এমনকি পরকালীন মুক্তির সম্ভাবনাও প্রভাবিত হতে পারে। ফলে তিনি সক্রিয়ভাবে ‘damage control’ করেছেন—নিজের বোনকে বলি দিয়ে নবীর আত্মপ্রত্যয় পুনরুদ্ধার করেছেন। এই আচরণ মানসিকভাবে এতটাই বিকৃত যে, একজন পুরুষ তাঁর রক্তের সম্পর্ককে ক্ষমতার সামনে তুচ্ছ মনে করেন এবং নারীকে ‘সুন্দরী বোন’ হিসেবে শুধু শারীরিক আকর্ষণের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করেন।

সার্বিকভাবে এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ কীভাবে অনুসারীদের মধ্যে স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি (পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, নারীর প্রতি সম্মান) ধ্বংস করে দেয়। সাহাবীর এই প্রস্তাব জাওনিয়া ঘটনার পরিপূরক—যেখানে এক নারী নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন, আরেক নারীকে (সাহাবীর বোন) সেই একই ক্ষমতার সামনে নিঃশর্তভাবে উৎসর্গ করা হয়েছে শুধুমাত্র নেতার মন খুশি রাখার জন্য। এটি লৈঙ্গিক রাজনীতির চূড়ান্ত মনোবিজ্ঞান: নারী শুধুমাত্র পুরুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, জাওনিয়া ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অস্বস্তিকর মুহূর্ত নয়, বরং ক্ষমতা, সম্মতি ও লৈঙ্গিক নিয়ন্ত্রণের একটি জটিল রাজনৈতিক দলিল।


প্রাথমিক সীরাহ থেকেই অস্বস্তিকর বর্ণনার নির্বাচনী সংরক্ষণ

ইসলামি ঐতিহাসিক বর্ণনার ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর তথ্যকে পরবর্তী যুগে ব্যাখ্যা বা সমন্বয় করার প্রবণতাকে একেবারে আধুনিক ঘটনা ভাবারও কারণ নেই। প্রাথমিক সীরাহ সংরক্ষণ ও সম্পাদনার পর্যায়েই কোন তথ্য সংরক্ষিত হবে এবং কোনটি বাদ যাবে, সেই নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামাজিক ও ধর্মীয় অস্বস্তি একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল বলে ইবন হিশামের নিজের বক্তব্য থেকেই জানা যায়। ইবন ইসহাকের সীরাহ সম্পাদনা করতে গিয়ে ইবন হিশাম স্পষ্টভাবে জানান যে, তিনি এমন কিছু বিষয় বাদ দিচ্ছেন بَعْضُهَا يَشْنُعُ الْحَدِيثُ بِهِ، وَبَعْضٌ يَسُوءُ بَعْضَ النَّاسِ ذِكْرُهُ, অর্থাৎ যার কিছু বর্ণনা করলে তা অশোভন বা আপত্তিকর হয়ে উঠত এবং কিছু বিষয়ের উল্লেখ কিছু মানুষকে অসন্তুষ্ট করত। এর পাশাপাশি তিনি আলাদাভাবে এমন কিছু বর্ণনার কথাও বলেছেন, যেগুলো আল-বাক্কাঈ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য বলে অনুমোদন করেননি। অর্থাৎ অবিশ্বস্ততার কারণে কোনো বর্ণনা বাদ দেওয়া এবং কোনো বর্ণনা অস্বস্তিকর বা মানুষের কাছে অপ্রীতিকর হওয়ার কারণে বাদ দেওয়া, ইবন হিশাম নিজেই দুইটি পৃথক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন [49]

মজূল আরবিঃ
[ نهج ابن هشام في هذا الكتاب ] قال ابن هشام : وأنا إن شاء الله مبتدئ هذا الكتاب بذكر إسماعيل بن إبراهيم ، ومن ولد رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم من ولده ، وأولادهم لأصلابهم الأول فالأول ، من إسماعيل إلى رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم ، وما يعرض من حديثهم ، وتارك ذكر غيرهم من ولد إسماعيل ، على هذه الجهة للاختصار ، إلى حديث سيرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وتارك بعض ما ذكره ابن إسحاق في هذا الكتاب ، مما ليس لرسول الله صلى الله عليه وآله وسلم فيه ذكر ، ولا نزل فيه من القرآن شيء ، وليس سببا لشيء من هذا الكتاب ، ولا تفسيرا له ، ولا شاهدا عليه ، لما ذكرت من الاختصار ، وأشعارا ذكرها لم أر أحدا من أهل العلم بالشعر يعرفها ، وأشياء بعضها ، يشنع الحديث به ، وبعض يسوء بعض الناس ذكره ، وبعض لم يقر لنا البكائي بروايته ومستقص إن شاء الله تعالى ما سوى ذلك منه بمبلغ الرواية له ، والعلم به .
বাংলা অনুবাদঃ
ইবন হিশাম বলেন:
আল্লাহ চাইলে আমি এই গ্রন্থটি শুরু করব ইবরাহিমের পুত্র ইসমাঈলের আলোচনা দিয়ে। এরপর ইসমাঈলের বংশধরদের মধ্যে যাদের বংশধারা থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এসেছেন, তাদের এবং তাদের ঔরসজাত সন্তানদের ধারাবাহিকভাবে, একজনের পর একজন, ইসমাঈল থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত উল্লেখ করব। সেই সঙ্গে তাদের সম্পর্কে যেসব ঘটনা ও বিবরণ এসেছে, সেগুলোও উল্লেখ করব।
সংক্ষিপ্ত রাখার উদ্দেশ্যে ইসমাঈলের অন্যান্য বংশধরদের আলোচনা আমি বাদ দেব এবং এভাবেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনীর বিবরণ পর্যন্ত পৌঁছব।
এছাড়াও ইবন ইসহাক এই গ্রন্থে যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর মধ্য থেকে কিছু বিষয় আমি বাদ দেব। যেমন, যেসব বিষয়ের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো উল্লেখ নেই, যেসব বিষয়ে কুরআনের কোনো আয়াত নাজিল হয়নি, যেগুলো এই গ্রন্থের আলোচ্য কোনো ঘটনার কারণ নয়, তার ব্যাখ্যাও নয় এবং তার পক্ষে কোনো সাক্ষ্য বা প্রমাণও নয়, সেগুলো আমি বাদ দেব, পূর্বে উল্লেখ করা সংক্ষিপ্ততার উদ্দেশ্যেই।
ইবন ইসহাক এমন কিছু কবিতাও উল্লেখ করেছেন, যেগুলোকে কবিতা সম্পর্কে জ্ঞানী কোনো ব্যক্তিকে আমি চিনতে দেখিনি।
এছাড়াও এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যার কিছু বর্ণনা করলে তা আপত্তিকর বা অশোভন বলে বিবেচিত হয়, কিছু বিষয়ের উল্লেখ কিছু মানুষকে কষ্ট দেয় বা অসন্তুষ্ট করে, এবং কিছু বর্ণনা আল-বাক্কাঈ আমাদের কাছে বর্ণনা করার অনুমোদন দেননি।
আল্লাহ চাইলে এগুলো ছাড়া ইবন ইসহাকের বাকি সমস্ত বিষয় আমি যথাসম্ভব পূর্ণভাবে তুলে ধরব, তাঁর কাছ থেকে যতটুকু বর্ণনা আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং সে সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে, তার ভিত্তিতে।

এই বক্তব্য থেকে জাওনিয়া বা উমাইমার নির্দিষ্ট কোনো বর্ণনা ইবন হিশাম গোপন করেছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু এটি অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা দেখায়: ইসলামের প্রাথমিক সীরাহ-সংরক্ষণ পর্যায় থেকেই অস্বস্তিকর উপাদানকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেই প্রশ্নে নিরপেক্ষ যান্ত্রিক সংরক্ষণ সবসময় একমাত্র নীতি ছিল না। কখনো এমন উপাদান বাদ দেওয়া হয়েছে; পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আবার অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের অস্বস্তিকর বর্ণনাকে বাদ না দিয়ে অতিরিক্ত কাহিনি, সমন্বয়বাদী ব্যাখ্যা, ফিকহি বিশেষাধিকার কিংবা চরিত্রগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে পুনর্গঠন করার প্রবণতা দেখা যায়। জাওনিয়া ও উমাইমার ঘটনাকে ঘিরে পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলোকে তাই বৃহত্তর ইসলামি ব্যাখ্যাগত ঐতিহ্যের এই পটভূমির মধ্যেও দেখা যেতে পারে।


এড হক ব্যাখ্যা ও ‘উদ্ধার হাইপোথিসিস’: একটি ব্যবচ্ছেদ

ইসলামিক স্কলার এবং আধুনিক এপোলোজিস্টরা যখন এই হাদিসের মুখোমুখি হন, তখন তারা ঘটনার মধ্যে নিহিত অস্বস্তিকে—একজন নারীর স্পষ্ট, দৃঢ় ও যুক্তিসম্পন্ন প্রত্যাখ্যান এবং নবীর অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক অগ্রসরতাকে—সম্পূর্ণরূপে আড়াল করার জন্য নানাবিধ ‘উদ্ধার হাইপোথিসিস’ (Rescue Hypothesis) বা এড হক ব্যাখ্যার আশ্রয় নেন। এই ব্যাখ্যাগুলো মূল ঘটনার কয়েকশ বছর পরবর্তী সময়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল হিসেবে নির্মিত হয়েছে এবং এগুলোর কোনো সমসাময়িক প্রামাণ্য ভিত্তি বা হাদিসের মূল বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্য নেই। যার অর্থ হচ্ছে, ইসলামের বিশুদ্ধতার নীতিমালা(চেইন অফ ন্যারেশন) অনুসারেই সেইসব ড্যামেজ কন্ট্রোল ব্যাখ্যার কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই। নিচে পয়েন্ট আকারে এই ব্যাখ্যাগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা হলো, যেখানে প্রতিটি পয়েন্ট হাদিসের আক্ষরিক বর্ণনা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা এবং যুক্তিগত দুর্বলতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

⚖️
বিয়ের দাবি ও স্ববিরোধিতাঃ
অনেক স্কলার দাবি করেন যে জাওনিয়া বা উমাইমার সাথে নবীর আগে থেকেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এটি ছিল কেবল বাসর রাতের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মূল হাদিসে নবীর প্রথম উচ্চারিত বাক্যটি ছিল “হাবি লী নাফসাকি” (هبي لي نفسك)—অর্থাৎ “তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো” [48]। যদি বিবাহ ইতোমধ্যে আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে একজন স্ত্রীর কাছে ‘নিজেকে দান করো’ বলে হিবা-জাতীয় সমর্পণের প্রস্তাব দেওয়ার কোনো ফিকহী, আইনি বা সামাজিক প্রয়োজনীয়তা থাকে না। ইসলামী ফিকহে ‘হিবা’ পরিভাষাটি সাধারণত দাসী, যুদ্ধবন্দিনী, নবীর কাছে নিজেকে সমর্পন করতে আসা নারী বা সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক নারীর ক্ষেত্রেই প্রয়োগ হয়, যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে সেখানে কোনো পূর্ববর্তী দাম্পত্য সম্পর্ক বা বৈধ বিবাহের স্বীকৃতি বিদ্যমান ছিল না। এই দাবিটি তাই হাদিসের আক্ষরিক ভাষার সাথে সরাসরি স্ববিরোধী এবং ঘটনাটিকে একটি সাধারণ ‘স্বামী-স্ত্রীর অসুবিধা’ হিসেবে পুনর্নির্মাণ করার একটি অসার প্রয়াস মাত্র।
🎭
‘সতীনদের ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বঃ
একটি ক্লিশে অজুহাত পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যাকাররা (যেমন ইবনে হাজার আসকালানী) একটি বিস্তারিত আখ্যান তৈরি করেছেন যে, নবীর দুই স্ত্রী আয়েশা ও হাফসা নাকি ঈর্ষান্বিত হয়ে মেয়েটিকে আগে থেকেই শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নবী তার কাছে গেলে তিনি যেন তৎক্ষণাৎ ‘আউজু বিল্লাহি মিনকা’ বলে আল্লাহর দোহাই দেন [50]। এই তত্ত্বটি একটি ধ্রুপদী এড হক ব্যাখ্যা। মূল সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বা ইসলামের কোন বিশুদ্ধ চেইন অফ ন্যারেশন থেকে এ ধরনের কোনো পূর্বপরিকল্পনা, শিক্ষা বা অন্য নারীদের জড়িত থাকার সামান্যতম ইঙ্গিতও নেই। এই আখ্যানটি মূলত নবীর আচরণের অস্বস্তিকর দিকটিকে আড়াল করে দায়ভার অন্য নারীদের ওপর স্থানান্তর করার একটি পিতৃতান্ত্রিক কৌশল। যুক্তিবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি এক ধরনের “ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নির্মান”—যেখানে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই একটি ষড়যন্ত্রমূলক কারণ উদ্ভাবন করে মূল ঘটনার দায়িত্বকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। এই তত্ত্বটি শুধু হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং নারীদের মধ্যে স্বাভাবিক ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্রের একটি নেতিবাচক সাংস্কৃতিক স্টিরিওটাইপকেও পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে।
🗣️
‘বাজারিয়া’ শব্দের অপব্যাখ্যাঃ
কিছু এপোলোজিস্ট যুক্তি দেন যে ‘বাজারিয়া’ বা ‘সুক্বী’ (سوقي) শব্দটি কোনো গালি নয়, বরং এটি দ্বারা সাধারণ প্রজা বা সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু হাদিসের প্রেক্ষাপটটি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘটনাটি কোন সরল স্বাভাবিক প্রেক্ষাপটের বিবরণ নয়। স্পষ্টতই হাদিসে বর্ণিত নারী নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় লিপ্ত, এবং যেভাবেই হোক এই পরিস্থিতিত থেকে সে নিজের শরীর রক্ষা করতে ইচ্ছুক। এরকম অবস্থায় একজন নারী যখন নিজেকে ‘রাজকুমারী’ (মালিকাহ) হিসেবে উচ্চবংশীয় পরিচয় দিয়ে অন্য পুরুষকে ‘বাজারিয়া’ বলে সম্বোধন করেন, তখন সেখানে তীব্র ঘৃণা, অবজ্ঞা এবং স্পষ্ট অপমানের স্তর প্রকাশ পায়। তৎকালীন আরব সমাজে ‘সুক্বী’ শব্দটি নিচু শ্রেণির ব্যবসায়ী বা বাজারের সাধারণ লোকদের প্রতি ব্যবহৃত হতো এবং এটি অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ গালি হিসেবেই প্রচলিত ছিল। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, এই শব্দটি দ্বারা সাধারণ মানুষ বোঝানো হয়েছিল, তাতেও ড্যামেজ কন্ট্রোল হয় না। যদি মেয়েটি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করতেন, তাহলে তিনি তার স্বামীকে ‘নিচু শ্রেণির সাধারণ লোক’ বলে অভিহিত করতেন না। এই শব্দ-চয়নের সূক্ষ্মতাই প্রমাণ করে যে মেয়েটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা কোনো চাপের মুখে সেখানে আনা হয়েছিল এবং তিনি মানসিকভাবে তীব্র প্রতিরোধে ছিলেন। এপোলোজিস্টদের এই অপব্যাখ্যা ভাষাতাত্ত্বিক ও সামাজিক সত্যকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র নবীর ইমেজ রক্ষার জন্য নির্মিত হয়েছে।
🧠
মানসিক ভারসাম্যহীনতার অভিযোগঃ
যখন উপরের কোনো যুক্তি আর টেকে না, তখন কিছু ব্যাখ্যাকার শেষ অস্ত্র হিসেবে দাবি করেন যে সেই মেয়েটি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না, অথবা তিনি ‘নির্বোধ’ বা ‘অস্থিরচিত্ত’ ছিলেন। এই অভিযোগটি ইতিহাসজুড়ে একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং বিপজ্জনক পিতৃতান্ত্রিক কৌশল। ক্ষমতাশালী পুরুষের প্রতি যখন কোনো নারী স্পষ্ট ও যুক্তিসম্পন্ন প্রত্যাখ্যান জানান, তখন তাকে ‘পাগল’, ‘অসুস্থ’ বা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে চিহ্নিত করা হয়। হাদিসে মেয়েটির প্রত্যাখ্যানের ভাষা ও যুক্তি (রাজকুমারী বনাম বাজারিয়া) অত্যন্ত সচেতন, সাহসী এবং সামাজিকভাবে সুসংগত। যদি তিনি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থই হতেন, তাহলে তাকে বিয়ে করার জন্য আনা বা তার কাছে যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যাওয়া নৈতিকভাবে আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। এই অভিযোগটি মূলত নারীর প্রতিরোধকে অস্বীকার করার এবং তার স্বাধীন সিদ্ধান্তকে ‘অসুস্থতা’র পর্যায়ে নামিয়ে আনার একটি ক্লাসিক পদ্ধতি।

উপসংহার

মুহাম্মদের যৌন জীবন এবং নারী সম্পর্কের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট ও অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে: অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি বা স্বাধীন পছন্দ ছিল গৌণ, আর ক্ষমতা ও বিজয়ের রাজনীতি ছিল প্রধান। জাওনিয়ার মতো যে নারীরা সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করতে পেরেছিলেন, আল্লাহর দোহাই দিয়ে তারা সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাফিয়্যা বা রায়হানার মতো যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগও ছিল না—তাদের সম্মতির প্রশ্নটি উঠেইনি।

ইতিহাসের এই খণ্ডচিত্রগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবের সামাজিক কাঠামো এবং মুহাম্মদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তসমূহ আধুনিক মানবাধিকার, সম্মতির নীতি এবং লিঙ্গ সমতার মানদণ্ডে কোনোভাবেই উত্তীর্ণ হয় না।

আদর্শিক শ্রদ্ধাবোধের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য ও যুক্তির আলোকে এই বিষয়গুলো মূল্যায়ন করাই একজন নিরপেক্ষ গবেষকের প্রধান দায়িত্ব। এই ঘটনাগুলো শুধু অতীতের পাতায় আটকে নেই; আজও যারা মুহাম্মদকে নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য এগুলো একটি গুরুতর প্রশ্ন রেখে যায়—ক্ষমতা কখনো সম্মতির ঊর্ধ্বে যেতে পারে কি?


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী ৫২৫৫ ↩︎
  2. সহীহ বুখারী ৫২৫৪ ↩︎
  3. ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, খণ্ড ৮, অনলাইন সংস্করণ ↩︎
  4. আল-বালাধুরী, আনসাব আল-আশরাফ, খণ্ড ১, Internet Archive PDF ↩︎
  5. ইবন হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারী, IslamWeb ↩︎
  6. সহীহ বুখারী ৫২৫৬–৫২৫৭ ↩︎
  7. ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, IslamWeb ↩︎
  8. ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, খণ্ড ৯, মাকতাবা শামেলা ↩︎
  9. ইমাম নববী, রওদাতুত তালিবীন, IslamWeb ↩︎
  10. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, IslamWeb ↩︎
  11. ইবন কাসির, সূরা আহযাব ৩৩:৫০-এর তাফসির, IslamWeb ↩︎
  12. কুরআন ৩৩:৫০ ↩︎
  13. ইবন কাসির, তাফসির ৩৩:৫০ ↩︎
  14. সহীহ বুখারী ৪৭৮৮ ↩︎
  15. সহীহ বুখারী, আন্তর্জাতিক ৩০২২ ↩︎
  16. ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৯ ↩︎
  17. ইবন হাজার, ফাতহুল বারী ↩︎
  18. ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাত ↩︎
  19. ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নববিয়্যাহ, IslamWeb ↩︎
  20. ইসলামে বৈবাহিক ধর্ষণের অনুমোদন ↩︎
  21. ইসলামে যুদ্ধবন্দি নারী বা দাসী ধর্ষণের বৈধতা প্রসঙ্গে: দাসীর সম্মতি কি জরুরি? ↩︎
  22. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫২৫৫ ↩︎
  23. সহীহ বুখারী, হাদিস ৫২৫৪ ↩︎
  24. ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৪৬, অনলাইন সংস্করণ ↩︎
  25. ইবন হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারী শরহ সহীহ আল-বুখারী, খণ্ড ৯, IslamWeb ↩︎
  26. আবু নু‘আইম আল-ইসফাহানি, মা‘রিফাতুস সাহাবা, হাদিস ৭৪৬১, অনলাইন সংস্করণ ↩︎
  27. Maʿrifat al-Ṣaḥāba, 6/3238 ↩︎
  28. আল-বালাধুরী, আনসাব আল-আশরাফ, মাকতাবা শামেলা PDF ↩︎
  29. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬০৯৩ ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ১৪১৪ ↩︎
  31. যাদুল মাআদ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম, প্রথম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৭৩ ↩︎
  32. ইবন হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারী বি-শারহ সহীহ আল-বুখারী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৩৬০, মাকতাবা শামেলা ↩︎
  33. فهرس الكتاب  ٦٨ – كتاب الطلاق  ٣ – باب من طلق وهل يواجه الرجل امرأته بالطلاق ↩︎
  34. ইবন হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারী শরহ সহীহ আল-বুখারী, কিতাবুত তালাক, বাব: من طلق وهل يواجه الرجل امرأته بالطلاق, IslamWeb ↩︎
  35. ইমাম ইয়াহইয়া ইবন শরফ আন-নববী, রওদাতুত তালিবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন, খণ্ড ৭, কিতাবুন নিকাহ, বাব: خصائص رسول الله ﷺ, IslamWeb ↩︎
  36. ইবন কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, কিতাবুন নিকাহ, فصل: النكاح لا ينعقد إلا بشاهدين, IslamWeb ↩︎
  37. ইবন কাসির, তাফসির আল-কুরআন আল-আজিম, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫০-এর তাফসির, IslamWeb ↩︎
  38. ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর, প্রশ্ন নং ১৫৪৩৫৬, “هل يجوز الزواج بدون شهود أو ولي”, IslamQA ↩︎
  39. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২৮১৩, আন্তর্জাতিক নং ৩০২২, HadithBD ↩︎
  40. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫২৫৬-৫২৫৭ ↩︎
  41. সহীহুল বুখারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮ 1 2
  42. সহীহুল বুখারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৯ ↩︎
  43. Ibn Saʿd, al-Tabaqat al-Kubra, vol. 8, p. 147, Hadith Portal; Masaha ↩︎
  44. ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, অনলাইন সংস্করণ ↩︎
  45. ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, বাব: ذكر زوجاته ﷺ وأولاده, IslamWeb ↩︎
  46. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৯ ↩︎
  47. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৭ ↩︎
  48. সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫২৫৫ 1 2 3 4 5 6 7
  49. السيرة النبوية (ابن هشام) ↩︎
  50. ফাতহুল বারী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৮ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Critical textual analysis; Islamic history, hadith, jurisprudence, gender and consent.

Epistemic Position: Source-critical, evidence-led and non-theological. Primary and classical Islamic texts are examined as textual and historical evidence; later harmonizations or doctrinal explanations are distinguished from what the earlier reports themselves state.

This article examines the reports concerning al-Jawniyya, Umayma bint Sharahil and related women through the questions of consent, sexual autonomy and power. Its central argument is that the fiqhi classification of a woman as Muhammad’s “wife” does not by itself establish her independent consent, particularly when classical discussions of Muhammad’s marital khaṣāʾiṣ explicitly describe exemptions from rules applied to ordinary Muslim marriages.

The analysis compares Sahih al-Bukhari with Ibn Hajar’s Fath al-Bari, al-Nawawi’s Rawdat al-Talibin, Ibn Qudama’s al-Mughni, Ibn Kathir’s tafsir and other classical historical materials. It also examines competing identifications of the women, the evidentiary status of chapter headings, later harmonizing narratives, and Ibn Hisham’s own statement that some material from Ibn Ishaq was omitted because its narration was objectionable or its mention would distress some people.

The article evaluates these materials primarily by the women’s recorded words and conduct, the distinction between legal status and voluntary consent, and modern standards of bodily autonomy and sexual ethics. It does not assume that later apologetic or harmonizing interpretations override the wording of the underlying reports.

One thought on

Leave a comment

Your email will not be published.