জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামে জিন ও শয়তানের শারীরবৃত্তি: খাদ্যগ্রহণ, প্রস্রাব, ডিম পাড়া ও মানুষের শরীরে প্রবেশ

প্রকাশিত: এপ্রিল 24, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন41 মিনিট পড়া

ভূমিকা

কোরআন, হাদিস ও ধ্রুপদি ইসলামি তাফসিরে জিন এবং শয়তানকে অদৃশ্য অতিপ্রাকৃত সত্তা বলা হলেও তাদের কর্মকাণ্ডের বিবরণে মানুষের পরিচিত প্রাণিজগতের বহু শারীরিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। তারা খাদ্য গ্রহণ করে, পানীয় পান করে, পাদ দেয়, প্রস্রাব করে, ঘুমন্ত মানুষের নাকের মধ্যে রাত কাটায়, হাই তোলার সময় মানুষের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে, বাজারে ডিম পাড়ে এবং সন্তান উৎপাদন করে। আবার নবজাতক শিশুকে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেওয়া এবং মানুষের মাথায় গিঁট দেওয়ার মতো স্পর্শ ও শারীরিক বলের ঘটনাও তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব বক্তব্য শুধু লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি নয়; সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, অন্যান্য হাদিসসংকলন এবং প্রতিষ্ঠিত তাফসিরে সেগুলো বিভিন্ন রূপে সংরক্ষিত। মানুষের স্বাভাবিক দেহগত কার্যক্রমকে একটি অদৃশ্য শত্রুর কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করার এই প্রবণতার মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস, শরীর সম্পর্কে পুরোনো ধারণা এবং বাস্তব জগতের কার্যকারণ সম্পর্ক পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।

জিন ও ইবলিসের পরিচয় সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। সূরা কাহফের ৫০ নম্বর আয়াতে ইবলিসকে জিন বলা হয়েছে এবং একই সঙ্গে তার বংশধরদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই বংশধরের উল্লেখ পরবর্তী তাফসিরে ইবলিসের স্ত্রী, প্রজনন অঙ্গ, ডিম পাড়া এবং ছানা উৎপাদনের বিচিত্র কাহিনির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআনের আয়াতটি ইবলিসের সন্তানদের কথা বললেও তাদের জন্মের পদ্ধতি, জীবকোষ বা দেহের গঠন সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয় না। ফলে ধর্মীয় পাঠে বংশধরের ঘোষণা এবং সেই বংশধরদের বাস্তব জীববৈজ্ঞানিক অস্তিত্ব দুটি পৃথক দাবি। [1]

إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ ۗ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ

বাংলা অনুবাদ: ইবলিস ছাড়া; সে ছিল জিনদের একজন এবং তার প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করেছিল। তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে তাকে এবং তার বংশধরদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু?

সূরা কাহফ, ১৮:৫০, প্রাসঙ্গিক অংশ।

কোরআনের সূরা আর-রহমানের ১৫ নম্বর আয়াতে জিনকে আগুনের শিখা থেকে সৃষ্ট বলা হয়েছে। পরিচিত জীবের ক্ষেত্রে জন্ম, বৃদ্ধি ও প্রজনন জৈব পদার্থ, কোষীয় প্রক্রিয়া এবং শক্তির রূপান্তরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আগুনের শিখা নিজে জীবকোষ কিংবা বংশগত তথ্যসমৃদ্ধ কোনো প্রাণী নয়। আগুন থেকে বুদ্ধিসম্পন্ন, খাদ্যগ্রহণকারী ও বংশবিস্তারক্ষম সত্তা উৎপন্ন হয়েছে—এই দাবির কোনো পরীক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়া কোরআনে বর্ণিত হয়নি। অতিপ্রাকৃত সৃষ্টির বিবরণ বাস্তব আগুন ও জীবদেহের ভৌত বৈশিষ্ট্যের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। [2]

وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ

বাংলা অনুবাদ: আর তিনি জিনকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা থেকে।

সূরা আর-রহমান, ৫৫:১৫।

সূরা আরাফের ২৭ নম্বর আয়াতে শয়তান ও তার অনুসারীরা মানুষকে এমন জায়গা থেকে দেখতে পারে যেখান থেকে মানুষ তাদের দেখতে পায় না—এমন বক্তব্য রয়েছে। এই অদৃশ্যতার দাবি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, কারণ এর সাহায্যে বহু অপ্রমাণিত শারীরিক কর্মকাণ্ডকে সরাসরি পর্যবেক্ষণের বাইরে রাখা হয়। তবে অদৃশ্য হওয়া এবং ভৌত অস্তিত্ব থাকা যুক্তিগতভাবে পরস্পরবিরোধী নয়। বহু অণুজীব, অণু, গ্যাস ও স্বচ্ছ বস্তু সাধারণ চোখে দেখা যায় না, তবু উপযুক্ত যন্ত্রে শনাক্তযোগ্য। সমস্যা অদৃশ্যতা নয়; সমস্যা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সত্তার বাস্তব অস্তিত্ব, পদার্থের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের স্বাধীন প্রমাণের অনুপস্থিতি। [3]

إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয়ই সে এবং তার দল তোমাদের এমন স্থান থেকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না।

সূরা আরাফ, ৭:২৭, প্রাসঙ্গিক অংশ।

কোনো ধর্মীয় লেখায় একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে—এটি পাঠগত তথ্য। সেই ঘটনা বাস্তব পৃথিবীতে সত্যিই সংঘটিত হয়েছে—এটি পৃথক ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক দাবি। হাদিসশাস্ত্রের সহিহ, হাসান কিংবা দুর্বল শ্রেণিবিভাগ সংবহনধারার অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন; তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটনার প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। আবার কোনো হাদিস দুর্বল হলে সেই শ্রেণিবিভাগ একাই ঘটনার অসম্ভবতা প্রমাণ করে না। বর্ণনার উৎস, সংবহনধারার পারস্পরিক নির্ভরতা, বক্তব্যের প্রকৃতি, ঘটনাটির যাচাইযোগ্যতা এবং পরিচিত বাস্তব প্রমাণ—সবকিছু পৃথকভাবে বিচার করতে হয়। একই গল্প দশটি গ্রন্থে উদ্ধৃত হলেও যদি সেগুলো একটি প্রাচীন বর্ণনার পুনরাবৃত্তি হয়, তাকে দশটি স্বাধীন সাক্ষ্য বলা যায় না।

মানুষের কান, নাক, মুখ, ঘুম, খাদ্যগ্রহণ, বংশবিস্তার, নবজাতকের কান্না ও হাই তোলা সম্পর্কে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে অতিপ্রাকৃত সত্তার ভূমিকা দাবি করলে সেই অতিরিক্ত কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দাবিকারীর। ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত একটি অদৃশ্য সত্তার বিরুদ্ধে কোনো পরীক্ষায় সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তার সমস্ত সম্ভাব্য রূপকে গাণিতিকভাবে অসম্ভব ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রমাণের অনুপস্থিতিতে তাকে বাস্তব কারণ হিসেবে গ্রহণ করারও যুক্তিসংগত ভিত্তি নেই। ধর্মীয় বর্ণনায় যে শারীরিক কর্মকাণ্ডগুলো নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গেই মূল প্রশ্নটি যুক্ত।


আজান শুনে শয়তানের পাদ দেওয়া ও পালিয়ে যাওয়া

সহিহ বুখারির ৬০৮ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, আজান শুরু হলে শয়তান সশব্দে পাদ দিতে দিতে পালিয়ে যায়, যাতে সে আজানের শব্দ শুনতে না পায়। আজান শেষ হলে সে ফিরে আসে; ইকামতের সময় আবার পালায়; এরপর ফিরে এসে নামাজরত মানুষের মনে বিভিন্ন চিন্তা প্রবেশ করায়, ফলে মানুষ কত রাকাত পড়েছে তা ভুলে যেতে পারে। এই বিবরণে শব্দ শোনা, পালানো, বায়ুত্যাগ, ফিরে আসা এবং মানুষের স্মৃতিকে প্রভাবিত করার পূর্ণ ঘটনাক্রম উপস্থিত। বুখারি ১২৩১ ও ৩২৮৫ নম্বর হাদিসেও ঘটনাটি পুনরুল্লেখিত হয়েছে। এখানে শয়তানকে কেবল মন্দ চিন্তার নাম বলা হয়নি; তার দেহগত প্রতিক্রিয়া ও স্থান পরিবর্তনের আচরণও নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। [4]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «إِذَا نُودِيَ لِلصَّلاَةِ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لَا يَسْمَعَ التَّأْذِينَ، فَإِذَا قَضَى النِّدَاءَ أَقْبَلَ، حَتَّى إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلاَةِ أَدْبَرَ، حَتَّى إِذَا قَضَى التَّثْوِيبَ أَقْبَلَ حَتَّى يَخْطُرَ بَيْنَ الْمَرْءِ وَنَفْسِهِ، يَقُولُ اذْكُرْ كَذَا، اذْكُرْ كَذَا، لِمَا لَمْ يَكُنْ يَذْكُرُ، حَتَّى يَظَلَّ الرَّجُلُ لَا يَدْرِي كَمْ صَلَّى»

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ, মালিক, আবু যিনাদ ও আরাজের সূত্রে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছেন: যখন নামাজের আজান দেওয়া হয়, তখন শয়তান সশব্দে পাদ দিতে দিতে পালিয়ে যায়, যাতে আজান শুনতে না পায়। আজান শেষ হলে সে ফিরে আসে। নামাজের জন্য ইকামত শুরু হলে আবার পালিয়ে যায়; ইকামত শেষ হলে ফিরে এসে মানুষের মনে বিভিন্ন চিন্তা প্রবেশ করায়। সে বলে অমুক বিষয় মনে করো, অমুক বিষয় মনে করো—যা ওই ব্যক্তি আগে ভাবছিল না। এভাবে মানুষ নিজের নামাজের রাকাতসংখ্যা পর্যন্ত ভুলে যায়।

সহিহ বুখারি, ৬০৮, প্রাসঙ্গিক অংশ।

আরবিতে ضُرَاطٌ শব্দটি সশব্দে বায়ুত্যাগের অর্থ বহন করে। এখানে সাধারণ ভয় পাওয়া বা দূরে চলে যাওয়াকে অনুবাদে পাদ দেওয়া বানানো হয়নি; শব্দটি হাদিসের মূল আরবিতেই রয়েছে। সহিহ মুসলিমে একই ঘটনার বর্ণনা আছে এবং শয়তানের পলায়নসংক্রান্ত অন্যান্য পাঠও সংরক্ষিত। বুখারি ও মুসলিমের বহু বর্ণনা অভিন্ন প্রাচীন বর্ণনাপথে ফিরে যায়; সেগুলোর সংখ্যা বাড়লেই ঘটনা স্বাধীনভাবে বহুবার প্রত্যক্ষ করা হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্ত আসে না। ধর্মীয় পাঠের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা না থাকলেও পাঠের ঘটনা হিসেবে উল্লিখিত কাজটি বাস্তবে ঘটেছিল কি না, সেটি অপ্রমাণিত। [5]


শয়তানের পালিয়ে যাওয়ার দূরত্ব

সহিহ মুসলিমের ৩৮৮ক নম্বর হাদিসে আজান শুনে শয়তানের রাওহা নামক স্থানের দূরত্ব পর্যন্ত চলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্ণনায় রাওহাকে মদিনা থেকে ছত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত স্থান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। ফলে শয়তানের পলায়ন কেবল অস্পষ্ট কোনো আধ্যাত্মিক অনুভূতি নয়; বাস্তব ভূগোলের দূরত্ব দিয়ে তার কর্মকাণ্ডের তুলনাও করা হয়েছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দূরত্বের উল্লেখ ঘটনাটিকে যাচাইযোগ্য প্রমাণে পরিণত করে না। শয়তানের বাস্তব অবস্থান, গতিবেগ কিংবা আজানের শব্দের সঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ নেই। [6]

إِنَّ الشَّيْطَانَ إِذَا سَمِعَ النِّدَاءَ بِالصَّلاَةِ ذَهَبَ حَتَّى يَكُونَ مَكَانَ الرَّوْحَاءِ

বাংলা অনুবাদ: শয়তান যখন নামাজের আজান শোনে, তখন সে রাওহা নামক স্থানের দূরত্ব পর্যন্ত পালিয়ে যায়। বর্ণনার ব্যাখ্যায় রাওহা মদিনা থেকে ছত্রিশ মাইল দূরে বলে উল্লেখিত।

সহিহ মুসলিম, ৩৮৮ক।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন অসংখ্যবার আজান দেওয়া হয়। একই শহরের মসজিদগুলোতে আজানের সময় সবসময় অভিন্ন নয়; পাশাপাশি এলাকাতেও কখনো একটির আজান শেষ হওয়ার আগে অন্যটির শুরু হয়। হাদিসের ঘটনাকে আক্ষরিক ধরে নিলে শয়তান কোন আজানের শব্দ থেকে কত দূরে যায়, পরবর্তী আজান শুরু হলে কোথায় অবস্থান করে, আর ইকামত শেষের পরে কোন ব্যক্তির কাছে ফিরে আসে—এসব প্রশ্ন দেখা দেয়। ধর্মীয় বিবরণ এই পরস্পরসংলগ্ন শব্দঘটনার বাস্তব স্থানিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে না। এটি একটি অলৌকিক সত্তার নড়াচড়া সম্পর্কে দাবি; শব্দের বিস্তার ও শয়তানের অবস্থান নিয়ে কোনো পরীক্ষিত তথ্য নয়।


বায়ুত্যাগের শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া

মানুষসহ পরিচিত বহু প্রাণীর ক্ষেত্রে পায়ুপথ দিয়ে গ্যাস নির্গত হওয়ার সঙ্গে পরিপাকনালির বাস্তব প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য গ্রহণের সময় গিলে ফেলা বাতাস এবং অন্ত্রের অণুজীবীয় বিপাক থেকে বিভিন্ন গ্যাস তৈরি হতে পারে। গ্যাসের প্রবাহ, পেশির টান এবং টিস্যুর কম্পনের ফলে বায়ুত্যাগের সময় শব্দও হতে পারে। শয়তানের ক্ষেত্রে খাদ্যগ্রহণ, পরিপাকনালি, গ্যাস উৎপাদন কিংবা নির্গমনের কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। সে পাদ দেয়—এই দাবি সত্য হলে তার দেহগত অবস্থা পরীক্ষা করার মতো বৈশিষ্ট্য থাকার কথা, কিন্তু সংশ্লিষ্ট সত্তার অস্তিত্বই প্রতিষ্ঠিত নয়। [7]

ইবনে হাজার আসকালানির ফাতহুল বারি গ্রন্থে কাজি ইয়াজের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে যে শয়তানের বায়ুত্যাগ আক্ষরিক অর্থেও গ্রহণ করা যায়, কারণ শয়তান খাদ্যগ্রহণকারী দেহবিশিষ্ট সত্তা, যার শরীর থেকে বায়ু বের হতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুপদি ব্যাখ্যা: এখানে শয়তানের পাদ দেওয়া সমর্থন করতে তার খাদ্যগ্রহণ ও দেহকে পূর্বস্বীকৃত বাস্তবতা ধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তানের খাদ্যগ্রহণ ও দেহের দাবি নিজেই ধর্মীয় বিবরণনির্ভর। একটি অপ্রমাণিত দেহের অনুমান দিয়ে আরেকটি অপ্রমাণিত শারীরিক ঘটনাকে প্রমাণ করা যায় না। [8]

قَالَ عِيَاضٌ: يُمْكِنُ حَمْلُهُ عَلَى ظَاهِرِهِ لِأَنَّهُ جِسْمٌ مُتَغَذٍّ يَصِحُّ مِنْهُ خُرُوجُ الرِّيحِ

বাংলা অনুবাদ: কাজি ইয়াজ বলেছেন: এর আক্ষরিক অর্থও গ্রহণ করা সম্ভব, কারণ শয়তান খাদ্যগ্রহণকারী দেহবিশিষ্ট সত্তা, যার শরীর থেকে বায়ু নির্গত হওয়া সম্ভব।

ফাতহুল বারিতে উদ্ধৃত কাজি ইয়াজের বক্তব্য।


নামাজে মনোযোগ হারানো এবং প্রমাণহীন অতিপ্রাকৃত কারণ

হাদিসটির দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, শয়তান নামাজরত মানুষের মনে এমন বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেয় যা সে আগে ভাবেনি। মানুষের মনোযোগ মূল কাজ থেকে অন্য চিন্তায় চলে যাওয়া মনোবিজ্ঞানের পরিচিত ঘটনা, যাকে মাইন্ড ওয়ান্ডারিং বলা হয়। এতে অতীতের স্মৃতি, অসম্পূর্ণ কাজ, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও উদ্বেগ অনিচ্ছাকৃতভাবে মনে আসতে পারে। পুনরাবৃত্তিমূলক কোনো কাজের মধ্যে পর্যাপ্ত মনোযোগ না থাকলে তার সংখ্যা বা ক্রমও ভুল হওয়া সম্ভব। এসব ঘটনার সঙ্গে স্মৃতি ও মনোযোগের স্নায়বিক কার্যক্রমের সম্পর্ক অনুসন্ধান করা হয়েছে। নামাজের রাকাত ভুলে যাওয়া বাস্তব, কিন্তু এর কারণ শয়তান—এই পৃথক দাবির পক্ষে কোনো পরীক্ষা বা স্বাধীন সাক্ষ্য নেই। [9]

একটি পরীক্ষণযোগ্য ঘটনার সঙ্গে অদৃশ্য কারণ জুড়ে দিলেই সেই কারণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। নামাজে মনোযোগ বিচ্যুত হওয়া পর্যবেক্ষণ করা যায়; শয়তান সেই চিন্তা সৃষ্টি করেছে কি না, তা এই পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় না। একইভাবে আজানের শব্দ বাস্তব, কিন্তু আজান শুনে শয়তানের সশব্দে বায়ুত্যাগের ঘটনা স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষিত নয়। হাদিসের বিবরণটির মধ্যে ধর্মীয় শাস্তি, শুদ্ধ আচরণ এবং অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা একত্র হলেও শয়তানের শরীর ও কর্মকাণ্ডের বাস্তব প্রমাণ অনুপস্থিত।


ঘুমন্ত মানুষের কানে শয়তানের প্রস্রাব এবং মাথায় গিঁট দেওয়া

সহিহ বুখারির ১১৪৪ নম্বর হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন, মুহাম্মদের সামনে এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল যে রাতভর ঘুমিয়ে সকাল পর্যন্ত নামাজের জন্য জাগেনি। মুহাম্মদ তখন বলেন, শয়তান তার কানে প্রস্রাব করেছে। বুখারি ৩২৭০ এবং সহিহ মুসলিম ৭৭৪ নম্বর হাদিসেও বক্তব্যটি রয়েছে। মুসলিমের একটি পাঠে এক কানে না দুই কানে প্রস্রাব করেছে, এ বিষয়ে বর্ণনার অনিশ্চয়তা সংরক্ষিত। ধর্মীয় সাহিত্য এখানে মানুষের সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে না পারাকে অদৃশ্য সত্তার বর্জ্যত্যাগের ফল হিসেবে উপস্থাপন করেছে। [10]

حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو الْأَحْوَصِ، قَالَ حَدَّثَنَا مَنْصُورٌ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ ذُكِرَ عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم رَجُلٌ فَقِيلَ مَا زَالَ نَائِمًا حَتَّى أَصْبَحَ مَا قَامَ إِلَى الصَّلَاةِ، فَقَالَ «بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنِهِ»

বাংলা অনুবাদ: নবীর সামনে এমন এক ব্যক্তির কথা বলা হলো, যে সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়েছিল এবং নামাজের জন্য ওঠেনি। তখন তিনি বললেন, শয়তান তার কানে প্রস্রাব করেছে।

সহিহ বুখারি, ১১৪৪।

আরবি بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنِهِ বাক্যের সাধারণ অর্থ শয়তান তার কানে প্রস্রাব করেছে। এটিকে বাংলা অনুবাদের ভুল বা অনুবাদকের অতিরঞ্জন বলা যায় না। মুসলিমের বর্ণনায়ও প্রস্রাবের শব্দ রয়েছে। তবে একাধিক গ্রন্থে একই বক্তব্যের উপস্থিতি সবসময় একাধিক স্বাধীন পর্যবেক্ষণ বোঝায় না; প্রধান বর্ণনাধারায় ইবনে মাসউদ, আবু ওয়াইল এবং মানসুরের নাম রয়েছে। বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতার অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং প্রস্রাবের বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা দুটি পৃথক বিষয়। [11]

ذَاكَ رَجُلٌ بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنَيْهِ أَوْ قَالَ فِي أُذُنِهِ

বাংলা অনুবাদ: ওই ব্যক্তির দুই কানে শয়তান প্রস্রাব করেছে—অথবা তিনি বলেছেন, তার এক কানে প্রস্রাব করেছে।

সহিহ মুসলিম, ৭৭৪, প্রাসঙ্গিক অংশ।


ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় শয়তানের বাস্তব প্রস্রাব

ইবনে হাজার তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে কুরতুবির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: শয়তানের প্রস্রাব আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার পথে বাধা নেই, কারণ ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী শয়তান খায়, পান করে এবং যৌনমিলন করে; সুতরাং তার প্রস্রাব করাও সম্ভব। এই ব্যাখ্যায় শয়তানকে খাদ্যগ্রহণকারী, পানীয়গ্রহণকারী ও প্রজননক্ষম দেহবিশিষ্ট সত্তা ধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তানের এসব বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রস্রাবের সম্ভাবনা সম্পর্কে এই যুক্তি কোনো বাস্তব প্রমাণ দেয় না। কোনো ধর্মীয় দাবি আরেক ধর্মীয় দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া তার সত্যতার নিশ্চয়তা নয়। [12]

قَالَ الْقُرْطُبِيُّ وَغَيْرُهُ: لَا مَانِعَ مِنْ ذَلِكَ، إِذْ لَا إِحَالَةَ فِيهِ؛ لِأَنَّهُ ثَبَتَ أَنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ وَيَشْرَبُ، وَيَنْكِحُ، فَلَا مَانِعَ مِنْ أَنْ يَبُولَ

বাংলা অনুবাদ: কুরতুবি ও অন্যরা বলেছেন: এতে কোনো বাধা নেই; কারণ শয়তান খাদ্য গ্রহণ, পানীয় গ্রহণ ও যৌনমিলন করে বলে বর্ণিত হয়েছে; তাই তার প্রস্রাব করাও অসম্ভব নয়।

ফাতহুল বারিতে উদ্ধৃত ব্যাখ্যা।

শারীরতত্ত্বে মূত্র উৎপন্ন হয় কিডনির ছাঁকনপ্রক্রিয়ায়; মূত্রনালি দিয়ে তা মূত্রথলিতে জমা হয় এবং পরে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়। প্রস্রাব জৈব বিপাক, তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য এবং বর্জ্য অপসারণের একটি বাস্তব প্রক্রিয়া। অদৃশ্য শয়তানের দেহে কিডনি, মূত্র উৎপাদনব্যবস্থা কিংবা নির্গত তরলের কোনো শনাক্তযোগ্য প্রমাণ নেই। সে কানে প্রস্রাব করেছে বলা হলে সেই তরল কোথায় গেছে, কানের কোন অংশে লেগেছে এবং তার কোনো ভৌত চিহ্ন আছে কি না—এসব প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ঘুমের পরে মানুষের কানে শয়তানের প্রস্রাবের কোনো পরীক্ষণযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায়নি। [13]

মধ্যকর্ণ, বহিঃকর্ণ ও অন্তঃকর্ণ আলাদা শারীরিক কাঠামো। কারও কানে বাস্তব তরল প্রবেশ করলে তার অবস্থান ও প্রভাব পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু রাতভর ঘুমানো বা নামাজের জন্য দেরিতে ওঠার সঙ্গে কানের মধ্যে কোনো বহিরাগত প্রস্রাবের উপস্থিতির কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়। একটি প্রচলিত ভাষাগত অপমান হিসেবে কাউকে কানে প্রস্রাব করা হয়েছে বলা যেতে পারে; আর সেটি বাস্তব শারীরিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করলে ভিন্ন ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন। হাদিসের বর্ণনা এবং পরবর্তী ব্যাখ্যায় দুটি অর্থই আলোচিত হলেও কোনো ব্যাখ্যায় ঘুম থেকে দেরিতে ওঠার পেছনে শয়তানের বাস্তব উপস্থিতি প্রমাণিত হয় না।


ঘুমন্ত মানুষের মাথার পেছনে শয়তানের তিন গিঁট

সহিহ বুখারির ১১৪২ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিঁট দিয়ে রাখে। প্রতিটি গিঁটের সঙ্গে দীর্ঘ রাতের কথা স্মরণ করিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে বলা হয়। ব্যক্তি জেগে আল্লাহকে স্মরণ করলে প্রথম গিঁট, অজু করলে দ্বিতীয় গিঁট এবং নামাজ পড়লে তৃতীয় গিঁট খুলে যায়। এরপরে ব্যক্তি সতেজ মনে সকাল শুরু করে; অন্যথায় অলস থাকে। মানুষের ঘুম, জাগরণ, সকালের ক্লান্তি ও ধর্মীয় আচরণকে এখানে অদৃশ্য গিঁটের এক ক্রমবদ্ধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [14]

يَعْقِدُ الشَّيْطَانُ عَلَى قَافِيَةِ رَأْسِ أَحَدِكُمْ إِذَا هُوَ نَامَ ثَلاَثَ عُقَدٍ، يَضْرِبُ كُلَّ عُقْدَةٍ عَلَيْكَ لَيْلٌ طَوِيلٌ فَارْقُدْ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ ঘুমালে শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিঁট বেঁধে দেয়। প্রত্যেক গিঁটে সে বলে: তোমার সামনে দীর্ঘ রাত আছে, ঘুমিয়ে থাকো। জেগে আল্লাহকে স্মরণ, অজু ও নামাজের মাধ্যমে গিঁটগুলো ক্রমান্বয়ে খুলে যায়।

সহিহ বুখারি, ১১৪২, প্রাসঙ্গিক অংশ ও অবশিষ্ট বক্তব্যের সার।

ঘুমের নিয়ন্ত্রণে দৈনিক জৈবিক ছন্দ, ঘুমের চাপ, আলো-অন্ধকারের প্রভাব এবং মস্তিষ্কের স্নায়বিক প্রক্রিয়া কাজ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা গভীর ঘুম থেকে ওঠার পরে কিছুক্ষণ মন্থর ও ক্লান্ত লাগতে পারে; একে স্লিপ ইনারশিয়া বলা হয়। এই অবস্থার সঙ্গে ঘুমের গভীরতা, সময় ও পূর্ববর্তী ঘুমের ঘাটতির সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের মাথার পেছনে তিনটি অদৃশ্য গিঁট তৈরি বা খুলে যাওয়ার কোনো শারীরস্থানগত অথবা স্নায়ুবৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য নেই। ধর্মীয় আচার পালন করার সঙ্গে কারও মন ভালো লাগার মানসিক সম্পর্ক থাকতে পারে; সেই অনুভূতি শয়তানের তিনটি গিঁটের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। [15]

কানে প্রস্রাব এবং মাথায় গিঁট দেওয়ার বক্তব্য দুটি একসঙ্গে মানুষের নিদ্রাজনিত সমস্যাকে শয়তানের কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে। একজন মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে, জাগতে পারেনি বা সকালে ক্লান্ত—এসব পর্যবেক্ষণ বাস্তব; কিন্তু তার কানে অতিপ্রাকৃত প্রস্রাব কিংবা মাথায় গিঁট থাকার কথা সেই পর্যবেক্ষণ থেকে অনুসরণ করে না। নির্দিষ্ট ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করার ঘটনাকে এমন এক অপমানজনক বা ভয়প্রদর্শনমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যার কার্যকারণগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত নয়।


মানুষের নাসারন্ধ্রে শয়তানের রাত্রিযাপন

শয়তান মানুষের দেহের কোথায় রাত কাটায়, সে সম্পর্কেও হাদিসে নির্দিষ্ট স্থান উল্লেখিত হয়েছে। সহিহ বুখারি ৩২৯৫ এবং সহিহ মুসলিম ২৩৮ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, ঘুম থেকে উঠে অজু করার সময় তিনবার নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হবে, কারণ শয়তান মানুষের নাকের ওপরের অংশে বা নাসাপথে রাত কাটায়। আরবি خَيْشُوم শব্দটি নাকের অভ্যন্তর বা ওপরের অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে নাক পরিষ্কার করার একটি বাস্তব অভ্যাসের কারণ হিসেবে অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি ঘোষণা করা হয়েছে। [16]

إِذَا اسْتَيْقَظَ أَحَدُكُمْ مِنْ مَنَامِهِ فَتَوَضَّأَ فَلْيَسْتَنْثِرْ ثَلاَثًا، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَبِيتُ عَلَى خَيْشُومِهِ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ ঘুম থেকে উঠে অজু করলে সে যেন তিনবার নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করে; কারণ শয়তান তার নাকের ওপরের অংশে রাত কাটায়।

সহিহ বুখারি, ৩২৯৫।

সহিহ মুসলিমের পাঠে নাসাপথ বোঝাতে একই শব্দের বহুবচনরূপ ব্যবহৃত হয়েছে। দুই পাঠেই শয়তানের রাত কাটানোকে নাক পরিষ্কারের নির্দিষ্ট ধর্মীয় নির্দেশের কারণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এর দ্বারা মানুষের নাকের মতো সীমিত শারীরিক অংশে অদৃশ্য সত্তার অবস্থান এবং সেই অবস্থানের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতার কাজের সম্পর্ক দাবি করা হয়েছে। কোনো নিয়ম স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে, কিন্তু তার পেছনে দেওয়া অদৃশ্য সত্তার ব্যাখ্যাটি সত্য হয়ে যায় না। [17]

إِذَا اسْتَيْقَظَ أَحَدُكُمْ مِنْ مَنَامِهِ فَلْيَسْتَنْثِرْ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَبِيتُ عَلَى خَيَاشِيمِهِ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ ঘুম থেকে উঠলে সে যেন তিনবার নাক ঝেড়ে নেয়; কারণ শয়তান তার নাসাপথে রাত কাটায়।

সহিহ মুসলিম, ২৩৮।


ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় নাক ও শরীরের প্রবেশপথ

ইমাম নববীর শরহু সহিহ মুসলিম গ্রন্থে খাইশুমের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাকের গভীর অংশ, ওপরের অংশ এবং সংশ্লিষ্ট শারীরিক কাঠামোর আলোচনা পাওয়া যায়। সেখানে কাজি ইয়াজের বক্তব্য অনুসারে নাককে এমন একটি প্রবেশপথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখান দিয়ে হৃদয়ের কাছে পৌঁছানোর ধারণা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব শারীরস্থানে নাক শ্বাসতন্ত্রের প্রবেশপথ; তার মাধ্যমে কোনো উন্মুক্ত নালি দিয়ে সরাসরি হৃদপিণ্ডের ভেতরে পৌঁছানো যায় না। নাসাগহ্বরের পেছনে গলবিল ও শ্বাসতন্ত্রের অংশ আছে, আর হৃদপিণ্ড রক্তসঞ্চালনের পৃথক অঙ্গ। নাকের উন্মুক্ততা থেকে শয়তানের অবস্থান প্রমাণ করা যায় না। [18]

ইবনে কাইয়্যিমের একটি ব্যাখ্যায় শয়তান অপবিত্র স্থান পছন্দ করে বলে মানুষের নাককে রাত কাটানোর উপযুক্ত জায়গা মনে করে—এমন বক্তব্য রয়েছে। এই ব্যাখ্যায় নাকের স্বাভাবিক শ্লেষ্মা ও ময়লাকে শয়তানের কথিত পছন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু নাসাগহ্বরে শ্লেষ্মা থাকার কারণ হলো শ্বাসতন্ত্রকে রক্ষা করার স্বাভাবিক ব্যবস্থা। শ্লেষ্মা বাতাসের ক্ষুদ্র কণা আটকে রাখে, আর সিলিয়া নামক সূক্ষ্ম কোষীয় গঠন সেগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয়। নাকের ভেতরের এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অণুজীব ও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। শ্লেষ্মা জমা হওয়ার বাস্তবতা শয়তানের আবাসস্থলের কোনো প্রমাণ নয়। [19]

নাকের গহ্বরের আয়তন সীমিত। শয়তান সেখানে বাস্তব দেহ নিয়ে থাকে বললে তার আকার, অবস্থান, শ্বাসের বাতাসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং অবস্থানের চিহ্ন কী—এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু কোনো পরীক্ষায় শয়তানের দেহ বা তার অবস্থানের ভৌত চিহ্ন শনাক্ত করা হয়নি। অদৃশ্যতা নিজে অসম্ভব নয়; অদৃশ্য অণুজীবও পর্যবেক্ষণযোগ্য যন্ত্রে ধরা পড়ে। কিন্তু অদৃশ্য প্রাণীর নামে নাকের মধ্যে রাত কাটানোর একটি নির্দিষ্ট ঘটনা দাবি করতে হলে তার উপস্থিতির প্রমাণ লাগবে। নাকে ধুলাবালি বা শ্লেষ্মা পাওয়া সেই প্রমাণ নয়।

ডিম
নাসারন্ধ্রে শয়তানের রাত্রিযাপনসংক্রান্ত ধর্মীয় বর্ণনা

নাক পরিষ্কার করা একটি পরিচ্ছন্নতামূলক আচরণ। পরিচ্ছন্নতার উপযোগিতা ও অদৃশ্য সত্তার অবস্থানকে এক করে দেখার কোনো যুক্তি নেই। ধর্মীয় বক্তব্যে নাক পরিষ্কারের কারণ হিসেবে শয়তানের রাত কাটানোর কথা বলা হলেও সেই অতিপ্রাকৃত কারণের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়। প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া দিয়ে যে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করা যায়, তার সঙ্গে আরও একটি অপ্রমাণিত সত্তার কার্যকলাপ যুক্ত করলে নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সৃষ্টি হয় না।


জিনদের খাদ্য হিসেবে হাড় ও গোবর এবং শয়তানের খাদ্যগ্রহণ

হাদিসে জিনদের খাদ্যের জন্য নির্দিষ্ট বস্তু এবং খাদ্য সংগ্রহের বিস্ময়কর ব্যবস্থার বিবরণ রয়েছে। সহিহ বুখারি ৩৮৬০ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা বলেছেন, মুহাম্মদ শৌচকার্যের পরে পরিষ্কার হওয়ার জন্য পাথর আনতে বলেছিলেন, কিন্তু হাড় ও গোবর আনতে নিষেধ করেছিলেন। নিষেধের কারণ জানতে চাইলে বলেন, সেগুলো জিনদের খাদ্য। তাঁর দাবি অনুযায়ী নাসিবীন থেকে জিনদের একটি প্রতিনিধি দল তাঁর কাছে এসে খাবার চেয়েছিল; তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যাতে জিনেরা কোনো হাড় বা গোবরের কাছে গেলে সেখানে খাদ্য পায়। এখানে খাদ্যগ্রহণের দাবির পাশাপাশি অদৃশ্য জিনদের সংগঠিত প্রতিনিধি দল, খাদ্যপ্রার্থনা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের খাদ্য পাওয়ার ঘটনা রয়েছে। [20]

حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي جَدِّي، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ كَانَ يَحْمِلُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم إِدَاوَةً لِوُضُوئِهِ وَحَاجَتِهِ، فَبَيْنَمَا هُوَ يَتْبَعُهُ بِهَا فَقَالَ «مَنْ هَذَا» فَقَالَ أَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ. فَقَالَ «ابْغِنِي أَحْجَارًا أَسْتَنْفِضْ بِهَا، وَلَا تَأْتِنِي بِعَظْمٍ وَلَا بِرَوْثَةٍ» فَأَتَيْتُهُ بِأَحْجَارٍ أَحْمِلُهَا فِي طَرَفِ ثَوْبِي حَتَّى وَضَعْتُ إِلَى جَنْبِهِ ثُمَّ انْصَرَفْتُ، حَتَّى إِذَا فَرَغَ مَشَيْتُ فَقُلْتُ مَا بَالُ الْعَظْمِ وَالرَّوْثَةِ قَالَ «هُمَا مِنْ طَعَامِ الْجِنِّ، وَإِنَّهُ أَتَانِي وَفْدُ جِنِّ نَصِيبِينَ وَنِعْمَ الْجِنُّ، فَسَأَلُونِي الزَّادَ، فَدَعَوْتُ اللَّهَ لَهُمْ أَنْ لَا يَمُرُّوا بِعَظْمٍ وَلَا بِرَوْثَةٍ إِلَّا وَجَدُوا عَلَيْهَا طَعَامًا»

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন, তিনি মুহাম্মদের অজু ও শৌচকার্যের জন্য পানির পাত্র বহন করছিলেন। মুহাম্মদ তাঁকে কয়েকটি পাথর আনতে বলেন, কিন্তু হাড় বা গোবর আনতে নিষেধ করেন। আবু হুরায়রা পাথর এনে দেওয়ার পরে হাড় ও গোবর নিষেধ করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। মুহাম্মদ বলেন: হাড় ও গোবর জিনদের খাদ্য। নাসিবীনের জিনদের একটি প্রতিনিধি দল আমার কাছে এসেছিল; তারা ভালো জিন ছিল। তারা আমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল। তখন আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যাতে তারা কোনো হাড় বা গোবরের কাছে গেলেই সেখানে খাদ্য পায়।

সহিহ বুখারি, ৩৮৬০, প্রাসঙ্গিক অংশ।

সহিহ মুসলিম ৪৫০ নম্বর হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে বলা হয়েছে, জিনদের একজন আহ্বানকারী মুহাম্মদকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল এবং তিনি তাদের কোরআন পাঠ করে শোনান। জিনেরা খাদ্য চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে এমন হাড় তাদের হাতে পৌঁছালে তা প্রচুর মাংসযুক্ত অবস্থায় পাওয়া যাবে। গোবরকে জিনদের পশুর খাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এই বর্ণনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: হাড় জিনদের নিজেদের খাদ্য, আর গোবর তাদের গৃহপালিত বা বাহন হিসেবে ব্যবহৃত প্রাণীদের খাদ্য। বুখারির সংক্ষিপ্ত বক্তব্যকে এমনভাবে পড়া অনুচিত, যাতে এই বিস্তারিত বিভাজন মুছে যায়। [21]

لَكُمْ كُلُّ عَظْمٍ ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ يَقَعُ فِي أَيْدِيكُمْ أَوْفَرَ مَا يَكُونُ لَحْمًا وَكُلُّ بَعَرَةٍ عَلَفٌ لِدَوَابِّكُمْ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের জন্য এমন প্রতিটি হাড় রয়েছে, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়েছে; তা তোমাদের হাতে পৌঁছালে মাংসে পূর্ণ থাকবে। আর প্রতিটি গোবরের টুকরা তোমাদের পশুদের খাদ্য।

সহিহ মুসলিম, ৪৫০ক, প্রাসঙ্গিক অংশ।

ফেলে দেওয়া হাড়ে প্রচুর মাংসের উপস্থিতির দাবি বাস্তব জৈব পদার্থের উৎপত্তি সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলে। হাড়ের মূল কাঠামোয় খনিজ ও কোলাজেন থাকে; হাড়ের গায়ে অবশিষ্ট মাংস থাকতে পারে। কিন্তু একটি মাংসহীন হাড়ে হঠাৎ নতুন মাংস পাওয়া গেলে সেই মাংসের জৈব উপাদান কোথা থেকে এলো, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ইসলামের এই বর্ণনায় কোন প্রাকৃতিক পরিবর্তনে হাড়ে খাদ্য আসে তা বলা হয়নি। একটি অলৌকিক প্রার্থনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে; বাস্তবে হাড়ের এমন রূপান্তরের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ নেই।

জিনদের পশু, গোবর ও কয়লা

সুনান আবু দাউদের ৩৯ নম্বর হাদিসে জিনদের একটি দল মুহাম্মদকে হাড়, গোবর এবং কয়লা দিয়ে শৌচকার্যের পরে পরিষ্কার না হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী আল্লাহ এসব বস্তুর মধ্যে জিনদের জীবিকা নির্ধারণ করেছেন। এর ফলে মানুষের পরিচ্ছন্নতার একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে অদৃশ্য সত্তার কথিত খাদ্যের প্রয়োজন যুক্ত হয়। গোবর ও কয়লার ভৌত বৈশিষ্ট্য পরিচিত খাদ্যের থেকে আলাদা; এদের থেকে কোনো সত্তা কীভাবে পুষ্টি আহরণ করে তা বোঝাতে শনাক্তযোগ্য বিপাকপ্রক্রিয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই খাদ্যগ্রহণের কোনো কোষীয় বা রাসায়নিক প্রক্রিয়া বর্ণিত হয়নি। [22]

يَا مُحَمَّدُ انْهَ أُمَّتَكَ أَنْ يَسْتَنْجُوا بِعَظْمٍ أَوْ رَوْثَةٍ أَوْ حُمَمَةٍ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَعَلَ لَنَا فِيهَا رِزْقًا

বাংলা অনুবাদ: হে মুহাম্মদ, আপনার অনুসারীদের হাড়, গোবর বা কয়লা দিয়ে শৌচকার্যের পরে পরিষ্কার হতে নিষেধ করুন; কারণ আল্লাহ এসবের মধ্যে আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন।

সুনান আবু দাউদ, ৩৯, প্রাসঙ্গিক অংশ।

কিছু প্রাণী মল বা অন্যান্য অস্বাভাবিক জৈব পদার্থ থেকে পুষ্টি আহরণ করে; আবার অণুজীবের খাদ্যগ্রহণের পদ্ধতিও মানুষের থেকে ভিন্ন। সুতরাং কোনো প্রাণী মানুষের অখাদ্য কোনো বস্তু গ্রহণ করে—এই ধারণা নিজে যুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ না করে তার নামে গোবর, কয়লা ও হাড় থেকে খাদ্যগ্রহণের একটি বাস্তব ব্যবস্থা দাবি করা যায় না। পরিচিত জীবদের খাদ্যগ্রহণ শনাক্তযোগ্য বিপাক, পদার্থের আদান-প্রদান ও জীবকোষের কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। জিনদের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো প্রমাণ নেই।


বাম হাতে শয়তানের পানাহার

সহিহ মুসলিম ২০২০ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, মানুষ যেন ডান হাতে খায় এবং পান করে, কারণ শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে। ধর্মীয় শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে শয়তানের মানবসদৃশ দেহ ও হাতের ব্যবহার উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষ হাত দিয়ে খাদ্য মুখে পৌঁছায়; খাদ্যগ্রহণের পরপরই পরিপাক ও শোষণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। শয়তানের হাত, মুখ, খাদ্যনালি কিংবা খাদ্যশোষণের কোনো বাস্তব তথ্য এই হাদিসে নেই। কিন্তু মানুষের পরিচিত শারীরিক অভ্যাসের অনুরূপ তার একটি নির্দিষ্ট পানাহারপদ্ধতি ঘোষণা করা হয়েছে। [23]

إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ وَإِذَا شَرِبَ فَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ খাবার খেলে ডান হাতে খাবে এবং পান করলে ডান হাতে পান করবে; কারণ শয়তান বাম হাতে খায় এবং বাম হাতে পান করে।

সহিহ মুসলিম, ২০২০ক।

সহিহ মুসলিম ২০১৮ নম্বর হাদিসে আবার বলা হয়েছে, ঘরে ঢোকা ও খাবারের সময় আল্লাহর নাম নিলে শয়তান সেখানে রাত কাটানোর জায়গা কিংবা খাবার পায় না। নাম না নিলে সে বাসস্থান এবং রাতের খাবার পেয়ে যায়। এতে ধর্মীয় বাক্য উচ্চারণের সঙ্গে খাবারের ওপর অদৃশ্য সত্তার অধিকার তৈরি বা বাতিল হওয়ার কার্যকারণ সম্পর্ক দাবি করা হয়েছে। খাবারের রাসায়নিক গঠন নাম উচ্চারণের কারণে বদলে যায়—এমন কোনো পর্যবেক্ষণ নেই; আর শয়তান বাস্তবে সেই খাবার থেকে কোন পদার্থ গ্রহণ করে তারও প্রমাণ নেই। [24]

إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ لَا مَبِيتَ لَكُمْ وَلَا عَشَاءَ

বাংলা অনুবাদ: কেউ ঘরে প্রবেশ এবং খাবারের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করলে শয়তান বলে, তোমাদের এখানে রাত কাটানোর জায়গা নেই, খাবারও নেই। নাম স্মরণ না করলে শয়তান থাকার জায়গা ও রাতের খাবার লাভের কথা বলে।

সহিহ মুসলিম, ২০১৮ক।


পরিপাক, শক্তি এবং অদৃশ্য খাদ্যগ্রহণকারীর দাবি

মানুষের পরিপাকতন্ত্রে খাদ্য মুখ থেকে খাদ্যনালির মাধ্যমে পাকস্থলীতে যায়; পরে ক্ষুদ্রান্ত্রে এনজাইম ও বিভিন্ন রসের সাহায্যে ভেঙে শোষিত হয়। খাদ্যের উপাদান রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে দেহের কাজে লাগে এবং বিপাকজাত বর্জ্য পৃথক পথে বের হয়। পরিচিত সব প্রাণীর পরিপাকতন্ত্র একই রকম নয়, তবে তাদের পুষ্টি আহরণে বাস্তব ভৌত ও রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া থাকে। জিন ও শয়তানের খাদ্যগ্রহণ সম্পর্কে যে দাবি করা হয়েছে তা যাচাই করতে তাদের দেহগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যের পরিমাণ, শক্তির উৎস এবং বর্জ্য নির্গমন সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন। শুধু তারা খায়—এমন ধর্মীয় ঘোষণা কোনো বিপাকীয় প্রক্রিয়ার পর্যবেক্ষণ নয়। [25]

আগের হাদিসগুলোতে শয়তানের পাদ দেওয়া এবং প্রস্রাবের কথা ছিল; এই হাদিসগুলোতে তার খাবার ও পানীয় গ্রহণের কথা রয়েছে। সব একসঙ্গে রাখলে খাদ্যগ্রহণ থেকে বর্জ্য নির্গমন পর্যন্ত একটি প্রাণীর পরিচিত কার্যক্রমের চিত্র তৈরি হয়। কিন্তু শয়তানের দেহ ও বিপাকব্যবস্থার কোনো স্বাধীন তথ্য নেই। বাস্তব খাদ্যের সঙ্গে কোনো সত্তা মিথস্ক্রিয়া করলে পদার্থ ও শক্তির প্রবাহ সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে; অদৃশ্যতার দাবি সেই প্রশ্ন বাতিল করে না। এসব দাবির মধ্যে ধর্মীয় অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণের সামাজিক ভূমিকা স্পষ্ট, কিন্তু বর্ণিত অদৃশ্য খাদ্যভোক্তার বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত নয়।


বাজারে শয়তানের ডিম পাড়া, ছানা ফোটানো এবং বংশবিস্তারের কাহিনি

ইসলামি সাহিত্যে শয়তানের ডিম পাড়া ও ছানা ফোটানোর কাহিনি সালমান ফারসির বর্ণনার সঙ্গে সম্পর্কিত। সহিহ মুসলিমের ২৪৫১ নম্বর হাদিসে সালমান বলেছেন, পারলে বাজারে প্রথম প্রবেশকারী বা সর্বশেষ প্রস্থানকারী হয়ো না; বাজার শয়তানের যুদ্ধক্ষেত্র, সেখানে সে পতাকা স্থাপন করে। ডিম পাড়ার বাক্যটি মুসলিমের এই মূল পাঠে নেই। ইমাম নববীর রিয়াযুস সালিহীন-এ মুসলিমের উক্তি এবং বারকানির সংকলনের একটি পৃথক পাঠ পাশাপাশি উদ্ধৃত হয়েছে। বারকানির পাঠে সালমানের সূত্রে মুহাম্মদের নামে বাজারে শয়তানের ডিম পাড়া ও ছানা ফোটানোর কথা রয়েছে। এই দুই বর্ণনার উৎসগত পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা যাবে না। [26]

لَا تَكُنْ أَوَّلَ مَنْ يَدْخُلُ السُّوقَ وَلَا آخِرَ مَنْ يَخْرُجُ مِنْهَا، فِيهَا بَاضَ الشَّيْطَانُ وَفَرَّخَ

বাংলা অনুবাদ: তুমি বাজারে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী কিংবা সেখান থেকে সর্বশেষ বের হওয়া ব্যক্তি হবে না; কারণ সেখানে শয়তান ডিম পাড়ে এবং ছানা ফোটায়।

রিয়াযুস সালিহীনে উদ্ধৃত বারকানির বর্ণনা; মুসলিম ২৪৫১-এর মূল পাঠ নয়।

ডিম 1
শয়তানের ডিম

তাবারানির আল-মুজামুল কাবির গ্রন্থের ৬১১৮ নম্বর বর্ণনাতেও সালমান ফারসির সূত্রে ডিম পাড়া ও ছানা ফোটানোর বাক্য পাওয়া যায়। এখানে ডিম পাড়ার আরবি ক্রিয়া بَاضَ এবং ছানা ফোটানোর ক্রিয়া فَرَّخَ ব্যবহৃত হয়েছে। পরিচিত প্রাণিজগতের প্রজননসংক্রান্ত দুটি ক্রিয়া ব্যবহার করে অদৃশ্য সত্তার বংশবিস্তারের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। তবে বারকানি ও তাবারানির উদ্ধৃত পাঠগুলোর প্রধান প্রাচীন সংবহনধারার কিছু অংশ অভিন্ন; দুটি বইয়ে উপস্থিতি দুটি স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর প্রমাণ নয়। এগুলো একটি ধর্মীয় কাহিনির লিখিত প্রচলনের দলিল। [27]

لَا تَكُنْ أَوَّلَ مَنْ يَدْخُلُ السُّوقَ، وَلَا آخِرَ مَنْ يَخْرُجُ مِنْهَا، فَفِيهَا بَاضَ الشَّيْطَانُ وَفَرَّخَ

বাংলা অনুবাদ: তুমি বাজারে সবার আগে প্রবেশ করো না এবং সবার শেষে বের হয়ো না; কারণ সেখানে শয়তান ডিম পেড়ে ছানা উৎপন্ন করে।

তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, ৬১১৮।


কুরতুবির তাফসিরে ইবলিসের পাঁচ ডিম ও বিশেষ প্রজনন অঙ্গ

সূরা কাহফের ৫০ নম্বর আয়াতে ইবলিসের বংশধরের উল্লেখের ব্যাখ্যায় কুরতুবি একাধিক প্রচলিত মত উদ্ধৃত করেছেন। মুজাহিদের নামে সংরক্ষিত একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইবলিস নিজের যৌনাঙ্গ নিজের অন্য যৌনাঙ্গের সঙ্গে মিলিয়ে পাঁচটি ডিম পেড়েছিল; তার বংশধরের উৎপত্তি ওই পাঁচ ডিম থেকে। কুরতুবির আরেকটি উদ্ধৃত মতে ইবলিসের ডান উরুতে পুরুষ এবং বাম উরুতে স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ রয়েছে; এই দুই অঙ্গের মাধ্যমে সে প্রতিদিন দশটি ডিম পাড়ে এবং প্রতিটি ডিম থেকে বহু শয়তান উৎপন্ন হয়। এগুলো একই পাঠে সমর্থিত একটি একক জীববৈজ্ঞানিক বিবরণ নয়; পৃথক মত হিসেবে সংরক্ষিত গল্প। কোনো গল্পের প্রচলন তার বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। [28]

وَقَالَ مُجَاهِدٌ: إِنَّ إِبْلِيسَ أَدْخَلَ فَرْجَهُ فِي فَرْجِ نَفْسِهِ فَبَاضَ خَمْسَ بَيْضَاتٍ؛ فَهَذَا أَصْلُ ذُرِّيَّتِهِ

বাংলা অনুবাদ: মুজাহিদ বলেছেন: ইবলিস নিজের যৌনাঙ্গ নিজের অন্য যৌনাঙ্গে প্রবেশ করিয়ে পাঁচটি ডিম পেড়েছিল; এটিই তার বংশধরের উৎপত্তি।

কুরতুবির তাফসিরে উদ্ধৃত মুজাহিদের বক্তব্য।

কুরতুবির আরেক বিবরণে ইবলিসের দুই উরুতে পৃথক যৌনাঙ্গ এবং প্রতিদিন দশটি ডিম পাড়ার দাবি রয়েছে। প্রতিটি ডিম থেকে সত্তরটি সন্তান উৎপন্ন হওয়ার মতটিও সংরক্ষিত। এভাবে দৈনিক সাতশো নতুন শয়তান উৎপন্ন হওয়ার একটি গাণিতিক চিত্র দাঁড়ায়। এই নির্দিষ্ট সংখ্যা ও অঙ্গের অবস্থান শুনতে তথ্যের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু তার পক্ষে কোনো দেহ, ডিম, জননকোষ বা ভ্রূণের পর্যবেক্ষণ উপস্থাপিত হয়নি। সংখ্যা যত নির্দিষ্টই হোক, তার স্বাধীন প্রমাণ না থাকলে সেটি পরিমাপভিত্তিক জীববিজ্ঞান নয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যা সম্প্রসারিত করতে মানুষের পরিচিত যৌনক্রিয়া ও ডিমপাড়া প্রাণীর বৈশিষ্ট্যকে এক অদৃশ্য চরিত্রের ওপর আরোপ করা হয়েছে।


ইবলিসের সন্তানদের নাম, কাজ এবং বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক

আবু শায়খের আল-আজামাহ এবং পরবর্তী তাফসিরসংকলনে মুজাহিদের নামে ইবলিসের পাঁচ সন্তানের নাম ও কাজ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে: জালানবুর, দাসিম, সাবর, মাসওয়াত ও আওয়ার। বাজার, ঘরবাড়ির অশান্তি, শোক, মিথ্যা প্রচার এবং যৌনব্যভিচারের মতো পৃথক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এই নাম ও দায়িত্বের কাহিনি একটি অতিপ্রাকৃত সমাজের ধারণা তৈরি করে, যেখানে মানুষের সামাজিক সমস্যাগুলো অদৃশ্য সত্তাদের কাজের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু মিথ্যা প্রচার বা পারিবারিক বিবাদ বাস্তব হওয়া সংশ্লিষ্ট নামধারী শয়তানের উপস্থিতি প্রমাণ করে না। [28]

বাজারকে শয়তানের যুদ্ধক্ষেত্র বলা এবং বাজারে শয়তানের ডিম পাড়ার দাবি পৃথক স্তরের। সহিহ মুসলিম ২৪৫১-এ প্রথম বক্তব্য সালমানের উক্তি হিসেবে পাওয়া যায়; বারকানির অতিরিক্ত পাঠে দ্বিতীয় বক্তব্য মুহাম্মদের নামে এসেছে। বাজারে দরদাম, প্রতারণা, বিতর্ক ও সামাজিক প্রতিযোগিতা মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। এসব ঘটনার পেছনে মানবিক উদ্দেশ্য ও সামাজিক কাঠামো পরীক্ষা করা যায়। সেখানে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা পতাকা গাড়ে বা ডিম পাড়ে—এমন শনাক্তযোগ্য প্রমাণ নেই। ধর্মীয় কাহিনিতে বাজারের নৈতিক সমালোচনা ও প্রাণীর প্রজনন একই কাঠামোয় মিশেছে। [29]

لَا تَكُونَنَّ إِنِ اسْتَطَعْتَ أَوَّلَ مَنْ يَدْخُلُ السُّوقَ وَلَا آخِرَ مَنْ يَخْرُجُ مِنْهَا فَإِنَّهَا مَعْرَكَةُ الشَّيْطَانِ وَبِهَا يَنْصِبُ رَايَتَهُ

বাংলা অনুবাদ: সম্ভব হলে বাজারে প্রথম প্রবেশকারী এবং সর্বশেষ বের হওয়া ব্যক্তি হয়ো না; কারণ বাজার শয়তানের যুদ্ধক্ষেত্র এবং সেখানে সে নিজের পতাকা স্থাপন করে।

সালমান ফারসির বক্তব্য, সহিহ মুসলিম ২৪৫১।


ডিম ও প্রজননের বাস্তব জীববিজ্ঞান

ডিম পাড়া প্রাণীদের ক্ষেত্রে ডিম্বকোষ উৎপাদন, বংশগত তথ্য, পুষ্টির উপাদান, প্রয়োজনীয় আবরণ এবং ভ্রূণের বিকাশের শনাক্তযোগ্য ব্যবস্থা থাকে। ডিম সব প্রাণীর ক্ষেত্রে একরকম নয়; পাখির শক্ত খোলসযুক্ত ডিম, উভচরের জেলির মতো আবরণযুক্ত ডিম কিংবা বিভিন্ন অমেরুদণ্ডীর ডিমের কাঠামো আলাদা। আবার সব প্রজননের জন্য শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন অপরিহার্য নয়; কিছু প্রাণীতে পার্থেনোজেনেসিসের মাধ্যমে নিষেক ছাড়াও সন্তান উৎপন্ন হতে পারে। ফলে শয়তান ডিম পাড়তে পারে না, কারণ তার শরীরে জরায়ু বা মানুষের মতো কোনো অঙ্গ নেই—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। যথার্থ কথা হচ্ছে: তার দেহ বা ডিমের কোনো স্বাধীন প্রমাণই নেই, ফলে তার নামে নির্দিষ্ট প্রজননপদ্ধতি দাবি করার ভিত্তিও নেই।

জিনকে আগুন থেকে সৃষ্ট বলা হয়েছে এবং ইবলিসকে জিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগুনের পরিচিত ভৌত প্রক্রিয়া ও জীবদের কোষীয় প্রজননের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় বর্ণনাটি অলৌকিক সৃষ্টির কথা বলছে বলে আধুনিক জীববিজ্ঞানের নিয়ম দিয়ে তার সকল কল্পনাযোগ্য সম্ভাবনাকে গাণিতিকভাবে অসম্ভব প্রমাণ করার দাবিও যথার্থ নয়। মূল প্রশ্ন আরও সরাসরি: আগুন থেকে এমন সত্তার সৃষ্টি হয়েছে—তার প্রমাণ কোথায়? সে বাজারে ডিম পেড়েছে—ডিম কোথায়? ডিম থেকে ছানা উৎপন্ন হয়েছে—কোনো ভ্রূণ, নতুন প্রাণী বা বংশগত প্রক্রিয়া কি শনাক্ত হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো প্রমাণভিত্তিক উত্তর ধর্মীয় সংকলনগুলো দেয় না।

১
ডিম পাড়া প্রাণী (Oviparous): বাহ্যিক বিকাশ

এ ধরনের প্রাণীরা ভ্রূণের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিসহ ডিম পাড়ে। পাখি, অধিকাংশ সরীসৃপ (যেমন সাপ, কচ্ছপ), মাছ এবং পতঙ্গ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ভ্রূণটি মাতৃদেহের বাইরে নানা ধরনের খোলস বা আবরণের মধ্যে বিকাশ লাভ করে এবং নির্দিষ্ট সময় পর ডিম ফুটে স্বাধীনভাবে জন্ম নেয়। এটি প্রজননের একটি আদি ও বিবর্তনীয়ভাবে সফল পদ্ধতি।

বিশ্লেষণ: ডিম পাড়া প্রাণীদের ক্ষেত্রে ভ্রূণের বিকাশে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পুষ্টি ও প্রজাতিভেদে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় শর্ত প্রভাব ফেলে।
২
বাচ্চা জন্ম দেয়া প্রাণী (Viviparous): অভ্যন্তরীণ বিকাশ

এই প্রাণীরা জীবন্ত সন্তান প্রসব করে। মানুষসহ অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে ভ্রূণ মাতৃদেহে বিকাশ লাভ করে এবং অমরার মাধ্যমে পুষ্টি পায়। তবে সব জীবন্ত সন্তান প্রসবকারী প্রাণীর জরায়ু বা অমরার গঠন একরকম নয়; বিভিন্ন মাছ ও সরীসৃপের মধ্যেও ভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।

বিশ্লেষণ: জীবন্ত সন্তান জন্মদান একটি প্রজনন কৌশল; এটি সব ক্ষেত্রে অধিকতর উন্নত কিংবা সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার নিশ্চয়তা নয়।

ডিমপাড়া ও জীবন্ত সন্তান প্রসব—এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে জৈবিক বৈচিত্র্য রয়েছে। প্লাটিপাস ও একিডনার মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীও ডিম পাড়ে; আবার কিছু হাঙরের ক্ষেত্রে ডিম মাতৃদেহের ভেতরে বিকশিত হয়। ফলে প্রাণীদের প্রজননকে দুটি অনড় ছকে ফেলে বিশ্লেষণ করা ভুল। কিন্তু বাস্তব জীবের প্রজনন যে বৈচিত্র্যময়, তা শয়তানের ডিম পাড়ার সত্যতা প্রমাণ করে না। প্রকৃত প্রাণীর মধ্যে পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে ধর্মীয় কাহিনিতে অদৃশ্য শত্রুর নামে বলা ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলা যায় না।


হাই তোলা শয়তানের কাজ, শয়তানের হাসি এবং মানুষের মুখ দিয়ে প্রবেশ

সহিহ বুখারির ৩২৮৯ ও ৬২২৬ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়; তাই তা যথাসম্ভব প্রতিহত করতে হবে। হাই তোলার সময় মুখ থেকে ‘‘হা’’ শব্দ বের হলে শয়তান হাসে। এখানে মানুষের পরিচিত একটি স্বতঃস্ফূর্ত আচরণকে অদৃশ্য সত্তার কর্মকাণ্ড এবং হাসির উপলক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শ্বাসগ্রহণের সঙ্গে চোয়ালের প্রসারণ এবং বিভিন্ন পেশির সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করা যায়; কিন্তু সেই সময় শয়তানের উপস্থিতি বা হাসির কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। [30]

التَّثَاؤُبُ مِنَ الشَّيْطَانِ فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا قَالَ هَا ضَحِكَ الشَّيْطَانُ

বাংলা অনুবাদ: হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই তোমাদের কারও হাই এলে যথাসম্ভব তা দমন করবে; কারণ কেউ হাই তোলার সময় ‘‘হা’’ বললে শয়তান হাসে।

সহিহ বুখারি, ৩২৮৯।

বুখারি ৬২২৩ নম্বর হাদিসে আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ হাঁচি পছন্দ করেন এবং হাই তোলা অপছন্দ করেন। হাঁচি ও হাই—উভয়ই সাধারণ শরীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। হাঁচি নাকের সংবেদনশীল স্নায়ু উদ্দীপিত হলে সক্রিয় প্রতিরক্ষামূলক ক্রিয়া; হাই তোলা অন্য ধরনের স্নায়বিক ও পেশিগত আচরণ। একটি আল্লাহর পছন্দের এবং অন্যটি শয়তানের কাজ—এমন ধর্মীয় মূল্যায়নের কার্যকারণগত সম্পর্ক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [31]

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ وَيَكْرَهُ التَّثَاؤُبَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ হাঁচি পছন্দ করেন এবং হাই তোলা অপছন্দ করেন।

সহিহ বুখারি, ৬২২৩, প্রাসঙ্গিক অংশ।


হাই তোলার সময় মুখ দিয়ে শয়তানের প্রবেশ

সহিহ মুসলিম ২৯৯৫ নম্বর হাদিসে আবু সাঈদ খুদরির সূত্রে মুহাম্মদ বলেছেন, কারও হাই এলে হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করতে হবে, কারণ শয়তান প্রবেশ করে। অন্য একটি পাঠে নামাজের সময় হাই তোলার সঙ্গে একই সতর্কতা যুক্ত হয়েছে। এটি আর শুধু হাই তুললে শয়তান হাসে—এমন দাবি নয়; মুখকে একটি অতিপ্রাকৃত সত্তার প্রবেশপথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মুখের ভেতর দিয়ে প্রকৃতপক্ষে খাদ্য, পানীয় ও বাতাস প্রবেশ করে। অদৃশ্য শয়তানের প্রবেশের কোনো শনাক্তযোগ্য চিহ্ন কিংবা দেহের সঙ্গে তার মিথস্ক্রিয়ার প্রমাণ নেই। [32]

إِذَا تَثَاوَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيُمْسِكْ بِيَدِهِ عَلَى فِيهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ হাই তুললে সে যেন নিজের হাত দিয়ে মুখ বন্ধ রাখে, কারণ শয়তান প্রবেশ করে।

সহিহ মুসলিম, ২৯৯৫ক।

ইবনে হাজারের ফাতহুল বারি গ্রন্থে মুসলিমের এই বর্ণনার আলোচনায় বাস্তব প্রবেশের অর্থ গ্রহণের সম্ভাবনা উল্লেখিত হয়েছে। অন্য কিছু ব্যাখ্যায় হাই তোলাকে শয়তানের পছন্দের আচরণ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই পাঠ ও ব্যাখ্যাগুলোর পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: ধর্মীয় গ্রন্থে ‘‘শয়তান প্রবেশ করে’’ কথাটি রয়েছে; পরবর্তী ব্যাখ্যায় তা আক্ষরিক বা রূপক—উভয়ভাবে বোঝার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাতেই মুখের ভেতরে অদৃশ্য সত্তা শনাক্ত করার স্বাধীন তথ্য নেই।


হাই তোলার বিজ্ঞান: অক্সিজেনের অভাবের পুরোনো ভুল ব্যাখ্যা

হাই তোলার সঙ্গে ঘুমঘুম ভাব, সজাগতার পরিবর্তন, সামাজিক উদ্দীপনা এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ ও অন্য অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে আচরণটি দেখা যায়। হাই তোলার সম্পূর্ণ কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে; মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সজাগতার পরিবর্তন ও সামাজিক সংকেতের নানা তত্ত্ব পরীক্ষা করা হয়েছে। একটি পরিচিত ভুল ধারণা হচ্ছে, রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি অথবা অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডই হাই তোলার প্রধান কারণ। ১৯৮৭ সালের পরীক্ষায় শতভাগ অক্সিজেন এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত গ্যাস শ্বাসগ্রহণ করিয়েও হাই তোলার হারে প্রত্যাশিত পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। ব্যায়াম করে শ্বাসগ্রহণের হার বাড়ালেও হাই তোলার হার অপরিবর্তিত ছিল। ফলে হাই তোলা সাধারণভাবে অক্সিজেনঘাটতি পূরণের প্রতিক্রিয়া—এমন ব্যাখ্যা সমর্থিত হয়নি। [33]

অন্যকে হাই তুলতে দেখে নিজেরও হাই আসার ঘটনা সংক্রামক হাই নামে পরিচিত। বিভিন্ন পরীক্ষায় মানুষের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে; কিছু সামাজিক প্রাণীর মধ্যেও অনুরূপ আচরণ দেখা যায়। স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া, সামাজিক মনোযোগ ও পরিবেশগত উদ্দীপনা নিয়ে গবেষণা এই আচরণের বাস্তব কারণ অনুসন্ধান করে। অন্যের হাই দেখার সময় অদৃশ্য শয়তান একজনের দেহ থেকে অন্যের দেহে প্রবেশ করে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। প্রাকৃতিক ঘটনার কিছু দিক এখনো গবেষণাধীন থাকা ধর্মীয় কারণটির পক্ষে সাক্ষ্য নয়। [34]

হাই তোলার সময় মুখ ঢেকে রাখা সামাজিক শিষ্টাচার হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু একটি আচরণ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া আর তার ধর্মীয় ব্যাখ্যা সত্য হওয়া এক বিষয় নয়। মুখ না ঢাকলে শয়তান শরীরে প্রবেশ করে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ওই অদৃশ্য সত্তার বাস্তব অস্তিত্ব এবং তার মুখ দিয়ে অনুপ্রবেশের কার্যকারণগত প্রমাণ প্রয়োজন। স্বাভাবিক স্নায়বিক প্রতিক্রিয়াকে শয়তানের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা সেই প্রমাণের বিকল্প নয়।


নবজাতক শিশুকে শয়তানের আঘাত এবং জন্মের সময় কান্নার কারণ

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষিত আছে, জন্মের সময় আদমের প্রত্যেক সন্তানকে শয়তান স্পর্শ বা খোঁচা দেয় এবং সেই আঘাতের কারণেই নবজাতক চিৎকার করে কান্না শুরু করে। মরিয়ম ও যিশুকে এ আক্রমণের ব্যতিক্রম বলা হয়েছে। জন্মের একটি সাধারণ শরীরবৃত্তীয় ঘটনাকে এখানে অদৃশ্য শত্রুর সরাসরি শারীরিক হামলার ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই দাবিটি নবজাতকের কান্নার বাস্তব কারণ সম্পর্কে একটি অতিরিক্ত, পরীক্ষণযোগ্য কার্যকারণ সম্পর্ক দাবি করে; কিন্তু সেই সম্পর্কের কোনো স্বাধীন সাক্ষ্য নেই। [35]

مَا مِنْ بَنِي آدَمَ مَوْلُودٌ إِلَّا يَمَسُّهُ الشَّيْطَانُ حِينَ يُولَدُ فَيَسْتَهِلُّ صَارِخًا مِنْ مَسِّ الشَّيْطَانِ غَيْرَ مَرْيَمَ وَابْنِهَا

বাংলা অনুবাদ: আদমের প্রত্যেক সন্তান জন্মের সময় শয়তানের স্পর্শ পায় এবং সেই স্পর্শের কারণে চিৎকার করে কান্না শুরু করে; তবে মরিয়ম ও তাঁর পুত্র এর ব্যতিক্রম।

সহিহ বুখারি, ৩৪৩১, প্রাসঙ্গিক অংশ।

সহিহ মুসলিমের ২৩৬৬ক নম্বর হাদিসে نَخَسَهُ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ খোঁচা দেওয়া। সহিহ বুখারি ৩২৮৬ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, শয়তান নিজের আঙুল দিয়ে নবজাতকের শরীরের দুই পাশে খোঁচা দেয়। যিশুকে খোঁচা দিতে গিয়ে সে একটি আবরণে আঘাত করে। এই বর্ণনা মানুষের পরিচিত শারীরিক আক্রমণের ভাষা ব্যবহার করেছে—আঙুল, শরীরের দুই পাশ, আঘাত এবং আঘাত ঠেকানো আবরণ। কিন্তু এসবের কোনোটির ভৌত অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি। [36]

كُلُّ بَنِي آدَمَ يَطْعُنُ الشَّيْطَانُ فِي جَنْبَيْهِ بِإِصْبَعِهِ حِينَ يُولَدُ غَيْرَ عِيسَى بْنِ مَرْيَمَ ذَهَبَ يَطْعُنُ فَطَعَنَ فِي الْحِجَابِ

বাংলা অনুবাদ: আদমের প্রত্যেক সন্তান জন্মের সময় শয়তানের আঙুলের খোঁচা পায়; কিন্তু মরিয়মের পুত্র যিশুর ক্ষেত্রে শয়তান আঘাত করতে গিয়ে একটি আবরণে আঘাত করে।

সহিহ বুখারি, ৩২৮৬।


মরিয়মের মায়ের প্রার্থনা এবং তাফসিরে প্রতিরোধকারী আবরণ

কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ৩৬ নম্বর আয়াতে মরিয়মের মা তাঁর সন্তান ও বংশধরদের অভিশপ্ত শয়তান থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। মূল আয়াতে নবজাতকের কান্নার কারণ শয়তানের আঘাত—এমন বিবরণ নেই। সেই অতিরিক্ত দাবি হাদিসে পাওয়া যায় এবং তাবারির তাফসিরে মরিয়ম ও যিশুকে শয়তানের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য একটি আবরণ তৈরির কথাও আছে। প্রার্থনার উপস্থিতি একটি ধর্মীয় পাঠগত তথ্য; তার ফলে কোনো বাস্তব শারীরিক আক্রমণ প্রতিহত হয়েছে—এটি পৃথক অতিপ্রাকৃত দাবি। [37]

وَإِنِّي سَمَّيْتُهَا مَرْيَمَ وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

বাংলা অনুবাদ: আমি তার নাম রেখেছি মরিয়ম এবং তাকে ও তার বংশধরদের অভিশপ্ত শয়তান থেকে তোমার আশ্রয়ে দিচ্ছি।

সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৬, প্রাসঙ্গিক অংশ।

হাদিসের সময়গত বিন্যাসেও একটি প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে শয়তানের আক্রমণের সময় বলা হয়েছে শিশুর জন্মমুহূর্ত, আর কোরআনের আয়াতে শিশুটি জন্মগ্রহণ করার পর মায়ের প্রার্থনার কথা রয়েছে। পরবর্তী তাফসিরে বিশেষ আবরণের গল্প যুক্ত হয়েছে, কিন্তু আঘাতের সময় ও প্রার্থনার সময়ের সম্পর্কের কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক বা শারীরবৃত্তীয় তথ্য নেই। যিশু ও মরিয়ম জন্মের সময় কেঁদেছিলেন কি না, সেই বিষয়ে প্রত্যক্ষ চিকিৎসা-নথি নেই। ফলে তাদের জন্মকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করে সাধারণ নবজাতকের কান্নার কারণ সম্পর্কে যে সর্বজনীন দাবি করা হয়েছে, তার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না।


জন্মের পরে শ্বাসপ্রশ্বাস এবং শিশুর কান্না

মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ফুসফুস বায়ু দিয়ে ভর্তি থাকে না; সেখানে তরল থাকে এবং ভ্রূণ অমরার মাধ্যমে অক্সিজেন পায়। জন্মের পরে ফুসফুসে প্রথম শ্বাসগ্রহণ শুরু হয়, ফুসফুসে রক্তপ্রবাহ ও চাপের সম্পর্ক বদলে যায় এবং দেহের রক্তসঞ্চালন নতুন পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত হয়। নবজাতকের কান্না শ্বাসপ্রশ্বাসের সূচনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে প্রত্যেক শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কাঁদে না; কেউ কেউ নীরবে শ্বাস নিতে পারে। চিকিৎসকেরা তাই কান্নার পাশাপাশি হৃদস্পন্দন, শ্বাসের গতি, পেশির সক্রিয়তা এবং অন্যান্য লক্ষণ পরীক্ষা করেন। [38]

২০২০ সালে Pediatrics সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নেপালের চারটি হাসপাতালে ১৯,৯৭৭ নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে ১১.১ শতাংশ শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কাঁদেনি এবং ৫.২ শতাংশ শিশু কান্না বা শ্বাসগ্রহণ—কোনোটিই করেনি। কিছু শিশু কান্না না করেও শ্বাস নিচ্ছিল। এই ফল জন্মের মুহূর্তে প্রত্যেক শিশুর অবধারিতভাবে কান্না শুরু করার সাধারণ ধারণা ভুল প্রমাণ করে। গবেষণাটি নবজাতকের কান্না না করার স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিশ্লেষণ করেছে; কান্না না করা মানেই শিশুটি সুস্থ—এমন দাবি করেনি। কোনোক্রমেই সেখানে শয়তানের আঘাত শনাক্ত করা হয়নি। [39]

শিশুর কান্না একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনা; তার সঙ্গে শয়তানের আঘাতের সম্পর্ক আলাদা দাবি। আঙুলের খোঁচা বা আঘাত শারীরিক প্রক্রিয়া হলে তার বল, অবস্থান, ত্বকের প্রতিক্রিয়া অথবা অন্য কোনো চিহ্ন অনুসন্ধানের প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু কোনো ধর্মীয় কাহিনিতে এই আঘাত বর্ণিত হলেই বাস্তব জন্মঘটনার কারণ হিসেবে তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। শিশুর জন্মের মতো মৌলিক জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য শত্রুকে প্রয়োজনীয় কারণ হিসেবে ঢুকিয়ে দেওয়া একটি অপ্রমাণিত অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা।


জিন ও শয়তানের শারীরিক অস্তিত্ব: জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রমাণের সংকট

জিন ও শয়তান সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোকে একত্রে বিবেচনা করলে একটি অদ্ভুত দ্বৈত বৈশিষ্ট্য সামনে আসে। একদিকে তারা মানুষের সাধারণ পর্যবেক্ষণের বাইরে থাকা অদৃশ্য সত্তা; অন্যদিকে তাদের সঙ্গে এমন সব কর্মকাণ্ড যুক্ত করা হয়েছে যা পরিচিত প্রাণিজগতের নির্দিষ্ট শারীরিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। শয়তান সশব্দে বায়ুত্যাগ করে, মানুষের কানে প্রস্রাব করে, নাসাগহ্বরে রাত কাটায়, খাবার খায়, বাম হাত ব্যবহার করে, মুখ দিয়ে মানুষের দেহে প্রবেশ করে, নবজাতকের গায়ে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেয় এবং ডিম পাড়ে। এই বিবরণগুলোর প্রতিটি আলাদা ধর্মীয় দাবি, আর সব একত্র করলে খাদ্য, বিপাক, বর্জ্য, প্রজনন, চলাচল ও শারীরিক স্পর্শসম্পন্ন একটি বিস্তৃত দেহগত কাঠামোর ধারণা তৈরি হয়। অথচ সেই দেহের বাস্তব অস্তিত্ব, গঠন কিংবা পদার্থের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে কোনো পরীক্ষণযোগ্য তথ্য নেই।

ইবলিস ও শয়তানের দেহ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কিছু ধ্রুপদি পণ্ডিত বাস্তব দেহের ধারণা গ্রহণ করেছেন। আজানের হাদিসে পাদ দেওয়ার ব্যাখ্যায় কাজি ইয়াজের খাদ্যগ্রহণকারী দেহবিশিষ্ট শয়তানের কথা, ঘুমন্ত মানুষের কানে প্রস্রাবের ব্যাখ্যায় কুরতুবির খাদ্য, পানীয় ও যৌনক্রিয়া থেকে মূত্রত্যাগের সম্ভাবনা নির্ণয় এবং হাই তোলার সময় মুখে প্রবেশের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজারের আক্ষরিক প্রবেশের সম্ভাবনা—এসব উদাহরণ একই প্রবণতা প্রকাশ করে। এখানে ধর্মীয় বর্ণনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরও কিছু ধর্মীয় অনুমানকে সত্য ধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই জ্ঞানগত উৎসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক অনুমানকে পরস্পরের সমর্থন হিসেবে ব্যবহার করলে স্বাধীন বাস্তব প্রমাণ উৎপন্ন হয় না।


শয়তান মানুষের রক্তপ্রবাহের মতো চলাচল করে

মানুষের দেহের ভেতরে শয়তানের চলাচল সম্পর্কে সহিহ বুখারি ৩২৮১ নম্বর হাদিসে একটি অতিরিক্ত বিবরণ রয়েছে। মুহাম্মদের স্ত্রী সাফিয়্যা তাঁর সঙ্গে রাতে কথা বলে ফিরে যাওয়ার সময় দুই ব্যক্তি তাঁদের দেখে চলে যেতে উদ্যত হলে মুহাম্মদ পরিচয় স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, শয়তান মানুষের রক্তপ্রবাহের মতো চলাচল করে; তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে শয়তান তাদের মনে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। এই বক্তব্যে মানুষের মনে সন্দেহ জন্মানোর সঙ্গে একটি অদৃশ্য সত্তার চলাচলের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। আরবির ভাষ্য রক্তের প্রবাহপথের সঙ্গে তুলনা করেছে; সরাসরি শয়তানকে লোহিত রক্তকণিকা বলার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু এই তুলনাকে বাস্তব দেহের প্রবেশ ও চলাচলের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করাও যৌক্তিক নয়। [40]

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ وَإِنِّي خَشِيتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا سُوءًا

বাংলা অনুবাদ: শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের প্রবাহের মতো চলাচল করে। আমি আশঙ্কা করেছিলাম, সে তোমাদের মনে কোনো খারাপ ধারণা প্রবেশ করাতে পারে।

সহিহ বুখারি, ৩২৮১, প্রাসঙ্গিক অংশ।

মানুষের রক্তসঞ্চালনব্যবস্থায় হৃদপিণ্ড, ধমনি, শিরা, কৈশিক রক্তনালি এবং রক্তের বিভিন্ন উপাদান কাজ করে। মস্তিষ্কে সন্দেহ কিংবা কোনো চিন্তার উদ্ভবও স্নায়বিক কার্যকলাপ, পূর্বঅভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তির ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। দুজন ব্যক্তি কোনো দৃশ্য দেখে ভুল ধারণা করতে পারেন—এটি মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া। সে ভুল ধারণার পেছনে শয়তানের আলাদা উপস্থিতি রয়েছে, এমন দাবি করতে হলে স্নায়বিক ঘটনাটির বাইরে একটি অতিরিক্ত কারণের প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু রক্তপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করার ফলে অদৃশ্য সত্তার শারীরিক গতিবিধি প্রতিষ্ঠিত হয় না।


ইবলিসের পানির ওপর সিংহাসন এবং কর্মীবাহিনীর ধারণা

সহিহ মুসলিম ২৮১৩খ নম্বর হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ইবলিস পানির ওপর নিজের সিংহাসন স্থাপন করে এবং মানুষকে বিপথে নেওয়ার জন্য বাহিনী প্রেরণ করে। যে শয়তান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে, ইবলিস তাকে বিশেষভাবে কাছে টানে। এই বর্ণনাটি শয়তানের পরিবারের কাহিনি নয়, কিন্তু তার সংগঠিত বাহিনী, অবস্থান ও মানুষের সামাজিক সম্পর্কে হস্তক্ষেপের ধারণাকে সম্প্রসারিত করে। কোনো পানির ওপর ইবলিসের সিংহাসনের উপস্থিতি, সেই বাহিনীর অবস্থান কিংবা পারিবারিক বিচ্ছেদের সঙ্গে অদৃশ্য শয়তানের কার্যকারণ সম্পর্কের কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। বাস্তব দাম্পত্য সংকটের কারণ মানুষের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায় অনুসন্ধান করা যায়। [41]

إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً

বাংলা অনুবাদ: ইবলিস পানির ওপর নিজের সিংহাসন স্থাপন করে, তারপর নিজের দলগুলোকে পাঠায়। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় সৃষ্টি করে, সে ইবলিসের সবচেয়ে নিকটবর্তী মর্যাদা পায়।

সহিহ মুসলিম, ২৮১৩খ, প্রাসঙ্গিক অংশ।


অদৃশ্যতা কি শারীরিক অঙ্গ থাকার সম্ভাবনা বাতিল করে?

কোনো সত্তা অদৃশ্য হলে তার পক্ষে দেহ বা অঙ্গ থাকা একেবারেই অসম্ভব—এমন দাবি বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত নয়। সাধারণ মানুষের চোখে অদৃশ্য বহু বস্তুর বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে। অণুজীব, ক্ষুদ্র পরজীবী, বায়বীয় অণু এবং চোখে ধরা না পড়া স্বচ্ছ পদার্থ ভৌত জগতের অংশ। কিছু প্রাণী আংশিক বা প্রায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হতে পারে। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় কোষীয় গঠন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, চলাচলের প্রভাব, প্রতিফলন, শোষণ কিংবা অন্য শনাক্তযোগ্য মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। ফলে অদৃশ্যতা নিয়ে যথার্থ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হলো, সেই সত্তাকে কোন পরীক্ষণযোগ্য চিহ্ন দিয়ে শনাক্ত করা যাবে। অদৃশ্যতার একটি ধর্মীয় ঘোষণা নিজে দেহের অস্তিত্বের প্রমাণও নয়, দেহের অনস্তিত্বের প্রমাণও নয়।

একই সতর্কতা খাদ্যগ্রহণ ও প্রজননের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। মানুষের মতো কিডনি নেই বলে কোনো সত্তার বর্জ্য নিষ্কাশন অসম্ভব—এমন সিদ্ধান্ত ভুল; পরিচিত প্রাণীদের বর্জ্য অপসারণের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। মানুষের মতো জরায়ু নেই বলে ডিমপাড়া অসম্ভব—এমন সিদ্ধান্তও ভুল; বহু প্রাণী জরায়ু ছাড়াই ডিম উৎপাদন করে। নিষেক ছাড়াও পার্থেনোজেনেসিসের মাধ্যমে কিছু প্রাণীতে বংশবিস্তার ঘটে। তাই সংশয়বাদী সমালোচনার ভিত্তি অদৃশ্য সত্তাকে কাল্পনিক শারীরিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করে অসম্ভব প্রমাণ করা নয়। ভিত্তি হচ্ছে, নির্দিষ্ট প্রাণী, নির্দিষ্ট অঙ্গ এবং নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ বা প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞান পরিচিত প্রাকৃতিক জীবদের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করে এবং নতুন সত্তার অস্তিত্বের দাবিকেও পরীক্ষণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। কোনো ধর্মীয় বর্ণনা পরিচিত জৈবিক প্রক্রিয়ার বাইরে সম্পূর্ণ অলৌকিক পদ্ধতির কথা বললে শুধু পরিচিত জীববিজ্ঞানের সঙ্গে তার অমিল দেখিয়ে যুক্তিগত অসম্ভবতা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু সেই অমিলটি একটি সমস্যার দিকে নির্দেশ করে: দাবিকারীকে ব্যাখ্যা করতে হবে বাস্তব জগতে দাবি করা সত্তা এবং তার কার্যকলাপ কীভাবে শনাক্তযোগ্য। পরীক্ষণযোগ্য প্রমাণ ছাড়া অলৌকিক ব্যাখ্যাকে সত্য ধরে নেওয়া কোনো যুক্তিসিদ্ধ পদ্ধতি নয়।


প্রজনন ও দেহগত কর্মকাণ্ডের বাস্তব শর্ত: তথ্যকার্ড

ধর্মীয় বর্ণনাগুলোতে শয়তানের যৌনক্রিয়া, ডিম পাড়া ও সন্তান উৎপাদনের যে ধারণা এসেছে, তা যাচাই করতে পরিচিত প্রাণীদের প্রজননের মৌলিক প্রক্রিয়া আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। ডিমের ধরন ও জননপদ্ধতিতে বৈচিত্র্য থাকলেও বাস্তব প্রাণীর ক্ষেত্রে বংশগত তথ্য ও কোষীয় বিকাশ শনাক্ত করা যায়। ধর্মীয় গল্পে ডিমের সংখ্যা বলা হয়েছে, কিন্তু ডিমের কোনো নমুনা বা জননপ্রক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

১
ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর সংযোগ: প্রাণের সূচনা

যৌন প্রজননে সাধারণত দুটি জননকোষের মিলন থেকে নতুন জিনগত সমন্বয় তৈরি হয়। তবে বিভিন্ন প্রজাতিতে নিষেক দেহের ভেতরে বা বাইরে ঘটতে পারে। নিষেক ছাড়াও কিছু প্রাণীতে পার্থেনোজেনেসিস দেখা যায়। বাস্তব প্রজননপ্রক্রিয়ায় কোষীয় বিভাজন, বংশগত তথ্য ও ভ্রূণের বিকাশ শনাক্ত করা যায়।

বিশ্লেষণ: এটি পরিচিত জীবজগতের প্রজননপদ্ধতির পর্যবেক্ষণ; এর দ্বারা সব কল্পনাযোগ্য অতিপ্রাকৃত ঘটনার যুক্তিগত অসম্ভবতা প্রমাণিত হয় না।
২
প্রজনন অঙ্গের আবশ্যকতা ও বিবর্তন

প্রজাতিভেদে ডিম উৎপাদন, ভ্রূণের বিকাশ ও সন্তান জন্মের জন্য বিভিন্ন কোষীয় এবং শারীরস্থানগত ব্যবস্থা থাকে। পাখির ডিম্বাশয় ও ডিম্বনালি, অনেক স্তন্যপায়ীর জরায়ু ও অমরা কিংবা অন্যান্য প্রাণীর ভিন্ন ব্যবস্থা তার উদাহরণ। সব ডিমের খোলস শক্ত নয় এবং সব জীবন্ত সন্তান প্রসবকারী প্রাণীর অমরা নেই।

বিশ্লেষণ: পরিচিত প্রজাতির প্রজননপদ্ধতি পর্যবেক্ষণযোগ্য; ইবলিসের কথিত ডিম বা জননাঙ্গের কোনো স্বাধীন নমুনা পাওয়া যায়নি।
১. অদৃশ্যতা ও ভৌত অস্তিত্ব

চোখে দেখা না গেলেও কোনো সত্তা বাস্তব হতে পারে। বাস্তব অস্তিত্ব নির্ধারণের জন্য শনাক্তযোগ্য মিথস্ক্রিয়া ও প্রমাণ দরকার। জিন বা শয়তানের ক্ষেত্রে এমন প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত নয়।

২. খাদ্য ও বর্জ্য

পাদ দেওয়া, প্রস্রাব করা এবং খাদ্যগ্রহণ পরিচিত জীবদের মধ্যে নির্দিষ্ট শারীরিক প্রক্রিয়ার অংশ। শয়তানের এসব কর্মের দাবি রয়েছে; কিন্তু দেহ, বিপাক বা নির্গত পদার্থ শনাক্ত হয়নি।

৩. প্রজনন ও বংশধর

প্রাণীদের প্রজননপদ্ধতি বৈচিত্র্যময়। ইবলিসের ডিম বা প্রজনন অঙ্গের দাবি যাচাই করতে ডিম, জীবকোষ, বংশগত তথ্য বা সন্তানের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন—যার কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই।

৪. কার্যকারণ ও মনস্তত্ত্ব

হাই তোলা, কান্না, ঘুম ও মনোযোগ বিচ্যুতি বাস্তব ঘটনা। এগুলোর সঙ্গে অদৃশ্য শয়তানের সম্পর্ক ঘোষণা করলেই কার্যকারণগত প্রমাণ তৈরি হয় না।


শারীরিক ঘটনাগুলোর দাবির প্রকৃতি ও প্রমাণের অবস্থা

বিভিন্ন হাদিসে শয়তানের কর্মকাণ্ডের যে নির্দিষ্ট বিবরণ আছে, সেগুলো একই ধরনের নয়। কিছু ক্ষেত্রে বর্জ্য নির্গমন, কিছু ক্ষেত্রে খাদ্য ও প্রজনন, কিছু ক্ষেত্রে মানুষের দেহে প্রবেশ এবং অন্য ক্ষেত্রে মানসিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের পরীক্ষণযোগ্য দিকও আলাদা। একটি বাস্তব তরল বা গ্যাসের দাবি হলে তার উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করা যায়; কোনো প্রাণীর প্রজননের দাবি হলে সন্তান ও কোষীয় বিকাশের প্রমাণ প্রয়োজন; মানুষের মনোযোগ বা আবেগের পেছনে অদৃশ্য কারণ দাবি করলে পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক কারণের বাইরে ওই কারণের স্বতন্ত্র প্রভাব দেখাতে হবে। এই পার্থক্যগুলো অগ্রাহ্য করে সব দাবিকে একটি সাধারণ ‘‘অদৃশ্য’’ পরিচয়ের আড়ালে রাখা প্রমাণের সমস্যা দূর করে না।

ধর্মীয় দাবিমূল সূত্রপরীক্ষণযোগ্য প্রশ্ন
আজান শুনে শয়তানের সশব্দে পাদ দেওয়াবুখারি ৬০৮উৎস, গ্যাস, শব্দ ও অবস্থানের স্বতন্ত্র প্রমাণ কোথায়?
ঘুমন্ত মানুষের কানে প্রস্রাববুখারি ১১৪৪; মুসলিম ৭৭৪তরল ও তার শারীরিক চিহ্ন শনাক্ত হয়েছে কি?
মাথার পেছনে তিন গিঁটবুখারি ১১৪২গিঁট বা তার স্নায়বিক প্রভাবের প্রমাণ কী?
নাসারন্ধ্রে রাত কাটানোবুখারি ৩২৯৫; মুসলিম ২৩৮নাসাগহ্বরে অদৃশ্য সত্তার অবস্থান শনাক্ত হয়েছে কি?
হাড়, গোবর ও মানুষের খাদ্যে অংশগ্রহণবুখারি ৩৮৬০; মুসলিম ৪৫০, ২০১৮খাদ্য আহরণ ও পদার্থের পরিবর্তনের প্রমাণ কী?
বাজারে ডিম পাড়া ও ছানা ফোটানোবারকানি, তাবারানি ৬১১৮ডিম, ভ্রূণ বা সন্তান কোথায়?
হাই তুললে শয়তানের হাসি ও মুখে প্রবেশবুখারি ৩২৮৯; মুসলিম ২৯৯৫হাসি বা অনুপ্রবেশের স্বাধীন চিহ্ন কী?
নবজাতককে আঙুল দিয়ে খোঁচাবুখারি ৩২৮৬, ৩৪৩১আঘাত ও কান্নার কার্যকারণগত সম্পর্কের প্রমাণ কী?

গ্রন্থে সংরক্ষিত বক্তব্য ও বাস্তব সত্যতার পার্থক্য

হাদিসে সংরক্ষিত একটি ঘটনার বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত ছিল—এই সিদ্ধান্তকে তার বাস্তব সত্যতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যুক্তিগত ভুল। বুখারি ও মুসলিম একই দাবি পুনরুল্লেখ করলে সেই পাঠগুলোর সংবহনধারা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু দুটি নামী সংকলনের উপস্থিতিই বাস্তব ঘটনা নিশ্চিত করে না। একইভাবে তাবারানি, কুরতুবি, সুয়ূতি বা পরবর্তী লেখকের উদ্ধৃতির মধ্যে উৎসনির্ভরতা থাকতে পারে। এক ঐতিহ্য বহু বইয়ে পুনর্লিখিত হলে ঐতিহ্যের বিস্তার প্রতিষ্ঠিত হয়, স্বাধীন সাক্ষ্যের সংখ্যা অপরিহার্যভাবে বাড়ে না। সূত্রের বক্তব্য, ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে লেখকের সমালোচনামূলক সিদ্ধান্ত—এই তিন স্তর আলাদা থাকা প্রয়োজন।

হাদিসশাস্ত্রের সহিহ শ্রেণিবিভাগকে সর্বজনীন ঐতিহাসিক সত্যের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আবার যে বর্ণনাটি হাদিসশাস্ত্রে দুর্বল, সেটি বাস্তবে কখনো ঘটতেই পারে না—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। নির্দিষ্ট বর্ণনাটি কখন এবং কোন পাঠে পাওয়া যাচ্ছে, তার অভিন্ন উৎস আছে কি না, বক্তব্যের সঙ্গে অন্য প্রাচীন পাঠের সম্পর্ক কী, এবং ঘটনাটিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করার কোনো উপায় আছে কি না—এসব প্রশ্ন আলাদা। বাজারে ডিম পাড়ার বক্তব্য নিয়ে মুসলিমের মওকুফ পাঠ এবং বারকানির মারফু পাঠের পার্থক্য তাই মূল্যবান। এই পার্থক্য বর্ণনার যথার্থ পরিচয় নির্ধারণ করে; কিন্তু কোনো পাঠই শয়তানের ডিমের বাস্তব নমুনা সরবরাহ করে না।


প্রমাণের ভার এবং অজানা বিষয়কে অলৌকিকতার প্রমাণ বানানোর ভুল

কোনো দাবি পরীক্ষণযোগ্য প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা হলে তার বিপরীতে অতিপ্রাকৃত সত্তার অসম্ভবতা নিখুঁতভাবে প্রমাণ করার দায়িত্ব সমালোচকের ওপর পড়ে না। ‘‘শয়তান প্রস্রাব করে’’—এই দাবির সত্যতা দেখানোর জন্য শয়তানের বাস্তব অস্তিত্ব এবং প্রস্রাবের ঘটনার প্রমাণ দরকার। ‘‘শয়তান ডিম পাড়ে’’—এই দাবির জন্য ডিম বা সন্তান উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য তথ্য দরকার। এমন প্রমাণ না থাকলে যথার্থ মূল্যায়ন হবে, দাবিগুলো অপ্রমাণিত। প্রত্যেক কল্পনাযোগ্য অদৃশ্য সত্তার অনস্তিত্ব প্রমাণ করা প্রয়োজন নেই। প্রমাণের অভাবকে সত্তাটির নিশ্চিত অনস্তিত্বের গাণিতিক প্রমাণ বলার প্রয়োজনও নেই।

এই পার্থক্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সঙ্গে জড়িত। কোনো ঘটনার প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা এখনো পুরোপুরি জানা না থাকলে সেই অজানা অংশকে অদৃশ্য সত্তার কাজ ঘোষণা করা যায় না। হাই তোলার সব কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে, কিন্তু তাই বলে শয়তানের হাসি প্রতিষ্ঠিত নয়। ঘুম ও মনোযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য আছে, কিন্তু তাই বলে মানুষের মাথার গিঁট বা কানে প্রস্রাবের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি দাবিকে অন্য দাবির ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করলে একই প্রমাণগত সংকট নতুন নামে ফিরে আসে। ধর্মীয় কাহিনির বিস্তৃতি, ধ্রুপদি ভাষ্যকারের গ্রহণযোগ্যতা অথবা কোনো আচরণের সামাজিক প্রচলন—কোনোটিই স্বাধীন বাস্তব পরীক্ষার বিকল্প নয়।

অতিপ্রাকৃত কারণের উপস্থিতি না দেখিয়ে মানুষের শারীরিক ও সামাজিক ঘটনাকে তার প্রভাবে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রভাব আছে: এতে রোগ, ক্লান্তি, মানসিক বিভ্রান্তি, আচরণগত ভুল ও সামাজিক সংঘাতের প্রাকৃতিক কারণ আড়াল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে ঘুমের পরিমাণ ও দৈনিক জৈবিক ছন্দ, নবজাতকের কান্নায় শ্বাসপ্রশ্বাস, হাই তোলায় স্নায়বিক অবস্থা, বাজারের প্রতারণায় মানবিক প্রণোদনা—এসব অনুসন্ধানযোগ্য ক্ষেত্র। অদৃশ্য শত্রুর নাম দিয়ে সেগুলোর কারণ নির্ধারণ করলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার বাস্তব কার্যকারণ সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না।


উপসংহার

কোরআন ও হাদিস সাহিত্যে জিন, ইবলিস ও শয়তান সম্পর্কে সংরক্ষিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের বিবরণগুলো একটি বিস্তৃত অতিপ্রাকৃত প্রাণিজগতের ধারণা তৈরি করেছে। সেখানে শয়তান আগুন থেকে সৃষ্ট অদৃশ্য সত্তা, অথচ খাবার ও পানীয় গ্রহণ করে, বাম হাত ব্যবহার করে, সশব্দে পাদ দেয় এবং ঘুমন্ত মানুষের কানে প্রস্রাব করে। সে মানুষের নাসাপথে রাত কাটায়, মাথার পেছনে গিঁট দেয়, হাই তোলার সময় মুখ দিয়ে দেহে প্রবেশ করে এবং নবজাতক শিশুকে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেয়। আবার তার বংশধর রয়েছে, বাজারে ডিম পাড়া ও ছানা ফোটানোর কাহিনি প্রচলিত, এবং ধ্রুপদি তাফসিরে তার প্রজনন অঙ্গ ও সন্তানসংখ্যা পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো এসব বিবরণ সংরক্ষণ করেছে—এটি প্রতিষ্ঠিত পাঠগত তথ্য। কিন্তু বর্ণিত সত্তা ও ঘটনাগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব পৃথক প্রমাণ দাবি করে।

এই দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেহের সঙ্গে অদৃশ্যতার কোনো অনুমিত অসংগতি নয়। অদৃশ্য বস্তু বাস্তব হতে পারে; বহু ক্ষুদ্র জীব খালি চোখে দেখা যায় না; জীবদের খাদ্যগ্রহণ, বর্জ্য অপসারণ ও প্রজননের পদ্ধতিও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ফলে কেবল অদৃশ্য হওয়ার কারণে শয়তানের হাত, পেট বা প্রজননতন্ত্র থাকা অসম্ভব—এমন সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। অথচ জিন ও শয়তানের নামে যে নির্দিষ্ট শারীরিক ঘটনা দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো স্বাধীন পরীক্ষণযোগ্য প্রমাণও নেই। ডিমের কোনো নমুনা নেই, প্রজননের কোনো পর্যবেক্ষণ নেই, কথিত প্রস্রাব বা গ্যাসের কোনো শনাক্তযোগ্য নিদর্শন নেই, নাসাগহ্বরের কথিত আবাসের চিহ্ন নেই এবং মানুষের মনোযোগ বা নবজাতকের কান্নার সঙ্গে শয়তানের কার্যকারণগত সম্পর্কের কোনো নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য নেই।

ধ্রুপদি ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থ এই বর্ণনাগুলোর অর্থ নির্ধারণে নানা পথ নিয়েছে। কোথাও শয়তানকে বাস্তব খাদ্যগ্রহণকারী দেহবিশিষ্ট সত্তা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, কোথাও পাদ বা প্রস্রাবের রূপক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও ডিম ও প্রজননের গল্পকে নির্দিষ্ট অঙ্গ ও সংখ্যার মাধ্যমে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এই পৃথক ব্যাখ্যাগুলো ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিকাশের সাক্ষ্য। কিন্তু এগুলো ঘটনার স্বাধীন সত্যতার প্রমাণ নয়। এক অপ্রমাণিত ধর্মীয় বক্তব্যকে আরেক অপ্রমাণিত বক্তব্য দিয়ে সমর্থন করলে বাস্তব তথ্যের ঘাটতি পূরণ হয় না। একই উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া গল্প বহু সংকলনে পুনরাবৃত্ত হওয়াও স্বাধীন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নয়।

আধুনিক জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস, পরিপাক, মূত্রত্যাগ, ঘুম, হাই তোলা, মনোযোগ বিচ্যুতি এবং নবজাতকের জন্মপরবর্তী অভিযোজন নিয়ে পরীক্ষণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছে। সব প্রশ্নের সমাধান শেষ হয়ে গেছে—এমন দাবি বিজ্ঞানের নয়; বরং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা সংশোধন করাই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বৈশিষ্ট্য। প্রোভাইন ও সহকর্মীদের গবেষণায় অক্সিজেনঘাটতি দিয়ে হাই তোলা ব্যাখ্যার জনপ্রিয় অনুমান সমর্থিত হয়নি; প্রায় বিশ হাজার নবজাতকের গবেষণায় দেখা গেছে, সব শিশু জন্মমুহূর্তে কাঁদে না। এই ধরনের তথ্য ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে বাস্তব পর্যবেক্ষণের পার্থক্য স্পষ্ট করে। শয়তানের ভূমিকা সম্পর্কে সমতুল্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইসলামি সাহিত্যে স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক স্থাপন শুধু কাহিনি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের কারণ হিসেবেও কাজ করেছে। শৌচকার্যের পরে কী ব্যবহার করা যাবে, কোন হাতে খাবার খেতে হবে, ঘরে প্রবেশ ও খাবারের সময় কী বলতে হবে, ঘুম থেকে উঠে নাক কতবার পরিষ্কার করতে হবে কিংবা হাই তোলার সময় মুখ কীভাবে রাখতে হবে—এসব নিয়মের পেছনে জিন ও শয়তানের কথিত আচরণ উল্লেখিত হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা বা শিষ্টাচারের কোনো ব্যবহারিক মূল্য থাকলেও তা সংশ্লিষ্ট অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। একটি নিয়মের বাস্তব উপযোগিতা এবং তার জন্য দেওয়া অতিপ্রাকৃত যুক্তি পৃথকভাবে বিচার্য।

শয়তানের ডিম পাড়া, কানে প্রস্রাব, নাকে রাত্রিযাপন, আজানে পাদ দেওয়া কিংবা নবজাতককে খোঁচা দেওয়ার মতো দাবিগুলোর বাস্তব সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়। এগুলো ধর্মীয় সাহিত্যে সংরক্ষিত অতিপ্রাকৃত কাহিনি এবং অপ্রমাণিত কার্যকারণ ব্যাখ্যা। দাবি যত বিস্ময়কর বা বহুবার উদ্ধৃত হোক, তা পরীক্ষণযোগ্য প্রমাণের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। মানুষের শরীর, প্রকৃতি ও সামাজিক আচরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয় পর্যবেক্ষণ, যুক্তিসংগত বিশ্লেষণ এবং স্বাধীন যাচাইয়ের মাধ্যমে—ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে অদৃশ্য শত্রুর নামে জৈবিক কর্মকাণ্ড আরোপ করে নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. আল-কোরআন, সূরা কাহফ, ১৮:৫০ ↩︎
  2. আল-কোরআন, সূরা আর-রহমান, ৫৫:১৫ ↩︎
  3. আল-কোরআন, সূরা আরাফ, ৭:২৭ ↩︎
  4. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০৮ ↩︎
  5. সহিহ মুসলিম, ৩৮৯ক ↩︎
  6. সহিহ মুসলিম, ৩৮৮ক ↩︎
  7. NIDDK, পরিপাকনালির গ্যাসের কারণ ↩︎
  8. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, আজানের মর্যাদা অধ্যায় ↩︎
  9. Smallwood ও Schooler, The Restless Mind, ২০০৬ ↩︎
  10. সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৪৪ ↩︎
  11. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৭৪ ↩︎
  12. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, তাহাজ্জুদ অধ্যায় ↩︎
  13. NIDDK, The Urinary Tract & How It Works ↩︎
  14. সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৪২ ↩︎
  15. CDC/NIOSH, Sleep Inertia ↩︎
  16. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৯৫ ↩︎
  17. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৮ ↩︎
  18. নববী, শরহু সহিহ মুসলিম, পবিত্রতা অধ্যায় ↩︎
  19. NCBI Bookshelf, Nasal Cavity Anatomy ↩︎
  20. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮৬০ ↩︎
  21. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৫০ক ↩︎
  22. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৯ ↩︎
  23. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২০ক ↩︎
  24. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০১৮ক ↩︎
  25. NIDDK, Your Digestive System & How It Works ↩︎
  26. রিয়াযুস সালিহীন, বাংলা সংস্করণ, হাদিস ১৮৫১ ↩︎
  27. তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস ৬১১৮ ↩︎
  28. কুরতুবি, সূরা কাহফ ১৮:৫০-এর তাফসির 1 2
  29. সহিহ মুসলিম, ২৪৫১ ↩︎
  30. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৮৯ ↩︎
  31. সহিহ বুখারি, ৬২২৩ ↩︎
  32. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৫ক ↩︎
  33. Provine, Tate ও Geldmacher, ১৯৮৭ ↩︎
  34. Guggisberg ও সহকর্মীরা, Why Do We Yawn?, ২০১০ ↩︎
  35. সহিহ বুখারি, ৩৪৩১ ↩︎
  36. সহিহ বুখারি, ৩২৮৬ ↩︎
  37. আল-কোরআন, সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৬ ↩︎
  38. MedlinePlus, Changes in the Newborn at Birth ↩︎
  39. Kc ও সহকর্মীরা, Not Crying After Birth as a Predictor of Not Breathing, ২০২০ ↩︎
  40. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৮১ ↩︎
  41. সহিহ মুসলিম, ২৮১৩খ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.