জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

আল্লাহর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার উপায় কী?

প্রকাশিত: জুন 17, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন11 মিনিট পড়া

ভূমিকা

তর্কের খাতিরে ধরে নিই, “কোরআন সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার কাছ থেকে এসেছে।” মুহাম্মদের কাছে হেরা গুহায় কোনো অদৃশ্য সত্তা এসেছিল এবং কিছু বাণী দিয়ে গিয়েছিল—এই দাবিটিও আপাতত মেনে নেওয়া যাক [1]। তবু মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে: সেই সত্তাই যে মহাবিশ্বের স্রষ্টা, অন্য কোনো শক্তিমান সত্তা নয়, অথবা কোনো প্রতারক সত্তা নয়—এটি যাচাই করার উপায় কী? কোনো এলিয়েন সভ্যতা যদি উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে নিজেকে ঈশ্বর বলে পরিচয় দিত, অথবা কোনো অশুভ সত্তা যদি ধর্মীয় ভাষায় মানববিদ্বেষী বিধান প্রচার করত, কেবল অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা ঘটেছে বলে তার দাবিকে সত্য ধরে নেওয়া যেত না।

কোরআনের দাবির পক্ষে কোরআনকে নিজেই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা বৃত্তীয় যুক্তি। “এটি আল্লাহর বাণী, কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন এটি তাঁর বাণী”—এতে বাইরের কোনো যাচাই নেই। আবার “মুহাম্মদ সত্যবাদী ছিলেন, তাই তাঁর কাছে আসা সত্তাটিও সত্যবাদী”—এটিও একই ধরনের অনুমান। একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সত্য হতে পারে, ভুলও হতে পারে, প্রতারণার ফলও হতে পারে; অভিজ্ঞতার তীব্রতা তার উৎসের পরিচয় প্রমাণ করে না।

এই সমস্যাটি দেকার্তের প্রতারক সত্তার অনুমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি জ্ঞান যাচাইয়ের সীমা বোঝাতে এমন এক সর্বশক্তিমান প্রতারক সত্তার কথা কল্পনা করেছিলেন, যে মানুষের ইন্দ্রিয়, স্মৃতি ও যুক্তিকেও ভুল পথে চালাতে পারে [2]। কার্ল সাগানও অতিপ্রাকৃত দাবিকে যাচাইহীনভাবে গ্রহণ না করার সতর্কতা দিয়েছেন [3]। এই প্রসঙ্গে A Princess of Mars অবলম্বনে নির্মিত John Carter চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যও প্রাসঙ্গিক।


মুহাম্মদ কী নিজে উৎস যাচাই করেছিলেন?

যদি ধরে নেওয়া হয় মুহাম্মদ সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তবু জানতে হবে তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে সেই সত্তা সত্য বলছে। ইসলামী বর্ণনায় প্রথম অভিজ্ঞতাটি ছিল ভয়, শারীরিক চাপ, অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি এবং পরে অন্য মানুষের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরতা। ওয়ারাকা ইবন নওফেল সেই সত্তাকে জিবরাইল বলে শনাক্ত করেছিলেন—কিন্তু ওয়ারাকার শনাক্তকরণও স্বাধীন প্রমাণ নয়; সেটিও আরেক মানুষের ব্যাখ্যা। কোনো সমসাময়িক সাক্ষ্য, লিখিত নথি বা পুনরাবৃত্তিযোগ্য পরীক্ষা এই দাবির সঙ্গে যুক্ত নেই [4]।

The angel caught me (forcefully) and pressed me so hard that I could not bear it any more.
বাংলা অনুবাদ: ফেরেশতা আমাকে জোর করে ধরে এত শক্তভাবে চাপ দিলেন যে আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না।

ব্যক্তিগত দর্শন, শব্দ শোনা বা আলোকদ্যুতি দেখা সত্যিই ঘটতে পারে; কিন্তু তা ঘটলেই তার অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা সত্য হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্ণনায় মনোবিকারের ক্ষেত্রে মানুষ এমন শব্দ শুনতে বা এমন দৃশ্য দেখতে পারে যার বাইরের কোনো উৎস নেই। এর অর্থ এই নয় যে মুহাম্মদের অভিজ্ঞতা অবশ্যই রোগজনিত ছিল; অর্থটি সীমিত এবং গুরুত্বপূর্ণ—অভিজ্ঞতার উপস্থিতি একা তার অতিপ্রাকৃত উৎস প্রমাণ করে না [5]।

Persistent hallucinations: the person may hear, smell, see, touch, or feel things that are not there.
বাংলা অনুবাদ: স্থায়ী বিভ্রমে মানুষ এমন শব্দ শুনতে, গন্ধ পেতে, দৃশ্য দেখতে, স্পর্শ অনুভব করতে বা কিছু অনুভব করতে পারে যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।

ধরা যাক, একজন মানুষ স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায় একটি সত্তাকে দেখল। সত্তাটি বলল, “আমি মহাবিশ্বের স্রষ্টা; তাই আমার সব কথা সত্য এবং তোমাকে আমার নির্দেশ মানতে হবে।” সে যদি সত্তাটির পরিচয়, বক্তব্যের সত্যতা এবং নির্দেশের নৈতিকতা কোনো স্বাধীন পদ্ধতিতে পরীক্ষা না করেই একটি জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলে, তার বিশ্বাস ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিক হতে পারে; কিন্তু অন্য মানুষের ওপর তা বাধ্যতামূলক করার যুক্তি তৈরি হয় না। আদালতে কেউ যদি বলে, “আমি স্বপ্নে খুনিকে খুন করতে দেখেছি,” আদালত তার অভিজ্ঞতাকে খুনের প্রমাণ বলে গ্রহণ করবে না। ধর্মীয় দাবির ক্ষেত্রেও প্রমাণের এই মৌলিক নিয়ম বদলে যায় না।

কোরআনের বাণী যদি কোনো অশুভ সত্তার হয়, যে নিজেকে সর্বশক্তিমান স্রষ্টা বলে পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ, দাসত্ব, নারী-অধীনতা, ধর্মীয় বৈরিতা ও অনন্ত শাস্তির বিধান প্রচার করেছে, তাহলে সেই সম্ভাবনা বাতিল করার দায়িত্ব দাবিদারের ওপরই থাকে। “আমি আল্লাহ”—এটি পরিচয় দাবি; পরিচয়ের প্রমাণ নয়। যে সত্তা নিজের পরিচয় নিজেই ঘোষণা করে, তার ঘোষণাকে সত্য ধরে নেওয়া যায় না।


কোরআনের ভাষায় আল্লাহর প্রতারণা ও কৌশল

কোরআনে আল্লাহকে শুধু “পরম দয়ালু” বলা হয়নি; তাঁকে প্রতারণা, উপহাস ও গোপন কৌশলের কার্যকর কর্তা হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা আলে ইমরান ৩:৫৪ এবং সূরা আনফাল ৮:৩০-এ একই ক্রিয়ামূল মাকর ব্যবহার করে বলা হয়েছে—মানুষ পরিকল্পনা করেছে, আল্লাহও পরিকল্পনা করেছেন, এবং আল্লাহ পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। প্রচলিত অনুবাদে মাকর-কে অনেক সময় “পরিকল্পনা” বা “কৌশল” বলা হয়; কিন্তু আয়াতের প্রসঙ্গে এটি প্রতিপক্ষের অজ্ঞাতসারে পাল্টা চক্রান্ত বা প্রতারণামূলক কৌশল বোঝায় [6] [7]।

وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
বাংলা অনুবাদ: তারা কৌশল করছিল, আল্লাহও কৌশল করলেন; আর আল্লাহ কৌশলকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

আরও সরাসরি ভাষায় সূরা নিসা ৪:১৪২-এ বলা হয়েছে, মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, অথচ তিনিই তাদের প্রতারিত করেন। এখানে কেবল মানুষের প্রতারণার শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়নি; আল্লাহর নিজের কাজকেও খিদা‘—প্রতারণা বা ধোঁকা দেওয়া—বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা বাকারা ২:১৫-এ আবার বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের উপহাস করেন এবং তাদের অবাধ্যতায় ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দেন [8] [9]।

إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ
বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, অথচ তিনিই তাদের প্রতারিত করেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যদি বলে, আল্লাহর প্রতারণা আসলে ন্যায়সঙ্গত প্রতিফল, তবু শব্দটির নৈতিক সমস্যা অদৃশ্য হয় না। একজন মানুষ প্রতারণা করলে সেটি নিন্দনীয়, কিন্তু একই কাজ ঈশ্বর করলে সেটিকে ন্যায় বলা হবে—এটি প্রমাণ নয়; এটি ক্ষমতাবান সত্তার জন্য আলাদা নৈতিক মানদণ্ড দাবি করা। একই কাজের নৈতিক চরিত্র শুধু কর্তা বদলালেই বদলে যায় না।


শয়তানকে কে পথভ্রষ্ট করেছিল?

কোরআনের সূরা আরাফ ৭:১৬-এ ইবলীসের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে: “আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সে কারণে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে ওত পেতে বসব।” সংশয় ডট কমের বিশ্লেষণেও এই আয়াতের সরাসরি পাঠের ওপর প্রশ্নটি দাঁড় করানো হয়েছে—ইবলীসকে পথভ্রষ্ট করার কাজটি কার? [10] [11]

قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ
বাংলা অনুবাদ: সে বলল, “আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে ওত পেতে বসব।”

এটি ইবলীসের বক্তব্য—তাই শুধু এই আয়াত দিয়ে আল্লাহর বক্তব্য হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। কিন্তু কোরআনের অন্য আয়াতগুলো একই দিকের সমস্যা সরাসরি আল্লাহর দিকে যুক্ত করে। সূরা নাহল ১৬:৯৩-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান পথ দেখান। সূরা আনআম ৬:১২৫-এ বলা হয়েছে, যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন। সূরা ফাতির ৩৫:৮-এ এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যার মন্দ কাজ তার কাছে সুন্দর করে দেখানো হয়েছে, তারপর বলা হয়েছে—আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন [12] [13] [14]।

وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِنْ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে এক সম্প্রদায় বানাতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান পথ দেখান।

এখানে দায়বদ্ধতার একটি মৌলিক সংকট তৈরি হয়। যদি আল্লাহই ইবলীসের পথভ্রষ্টতার কারণ হন, যদি তিনিই ইচ্ছামতো মানুষের পথভ্রষ্টতা নির্ধারণ করেন, এবং যদি মন্দ কাজকে কারও কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার কাজও তাঁর দিকে আরোপিত হয়, তাহলে ইবলীস ও মানুষের অপরাধের দায় কতখানি স্বাধীন? এর জবাবে “তারা নিজেরাই বেছে নিয়েছে” বলা যথেষ্ট নয়, যদি একই বর্ণনায় স্রষ্টাই তাদের প্রবণতা, জ্ঞানলাভের ক্ষমতা ও পথভ্রষ্টতার পরিণতি নির্ধারণ করেন। সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ, প্রলোভন এবং শাস্তি—সব ক্ষমতা একজনের হাতে রেখে পরে ব্যর্থতার দায় কেবল সৃষ্টির ওপর চাপানো ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক ধারণার সঙ্গে মেলে না।

তবে সূরা ইব্রাহিম ১৪:২২-এ শয়তান আবার বলে, মানুষের ওপর তার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না; সে শুধু ডাক দিয়েছিল, মানুষ সাড়া দিয়েছিল। ফলে কোরআনের ভেতরেই দুটি বক্তব্য পাশাপাশি থাকে: ইবলীস আল্লাহকেই নিজের পথভ্রষ্টতার কারণ বলে, কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে নিজের জবরদস্তি অস্বীকার করে; অন্যদিকে কোরআন আল্লাহর ইচ্ছায় মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কথা বলে। এই টানাপোড়েনকে “সবই পরীক্ষা” বললে প্রশ্নের উত্তর হয় না; বরং পরীক্ষার নকশা, পরীক্ষার্থীর সীমা এবং শাস্তির ন্যায্যতা ব্যাখ্যা করতে হয় [15]।

وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي
বাংলা অনুবাদ: তোমাদের ওপর আমার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না; আমি শুধু তোমাদের ডেকেছিলাম, আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে।

আরও কঠিন ভাষায় সূরা সাজদা ৩২:১৩-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ চাইলে প্রত্যেক প্রাণীকে পথ দেখাতে পারতেন; কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত হলো জিন ও মানুষ দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করা। সূরা আরাফ ৭:১৭৯-এ বলা হয়েছে, বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে স্বাধীন ইচ্ছার সঙ্গে পূর্বনির্ধারণের যে সমন্বয় দাবি করা হয়, তা শুধু শব্দের খেলায় সমাধান হয় না। সর্বজ্ঞ ও সর্বক্ষম স্রষ্টা যদি আগে থেকেই জানেন কে ব্যর্থ হবে, তাকে সেই সীমাবদ্ধতা ও সেই পরিণতি-সহ সৃষ্টি করেন, তারপর অনন্ত শাস্তি দেন—তাহলে “ন্যায়” শব্দটি কী অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় [16] [17]।


অশুভ সত্তার সম্ভাবনা: একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট

যদি মুহাম্মদের অভিজ্ঞতা সত্যিই অতিপ্রাকৃত হয়, তবু তিনটি সম্ভাবনা খোলা থাকে: সত্তাটি সত্যিকারের স্রষ্টা, স্রষ্টা নয় কিন্তু শক্তিমান কোনো সত্তা, অথবা প্রতারণাকারী কোনো সত্তা। প্রথম সম্ভাবনাকে সত্য প্রমাণ করতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সম্ভাবনাকে বাদ দিতে হবে। কিন্তু কোরআনের প্রমাণ হিসেবে সাধারণত যে বিষয়গুলো দেওয়া হয়—মুহাম্মদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, গ্রন্থের নিজস্ব দাবি, ভাষার অলৌকিকতা, ভবিষ্যদ্বাণী এবং অনুসারীদের বিশ্বাস—এসবের কোনোটিই প্রেরক সত্তার পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করে না। একই তথ্য কোনো মানবিক রচয়িতা, রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, মানসিক অভিজ্ঞতা বা প্রতারক সত্তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রমাণিত হওয়া নয়।

এই কারণে “কোরআনে মিথ্যা থাকতে পারে না, কারণ এটি আল্লাহর বাণী”—এই যুক্তি যুক্তির শুরুতেই আল্লাহর পরিচয় ধরে নেয়। আবার কোরআনে কোনো নিষ্ঠুর বিধান থাকলে “আল্লাহ যা করেন তাই ন্যায়”—বলে নৈতিক প্রশ্ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন একই সত্তা অভিযোগকারী, আইনপ্রণেতা, বিচারক, শাস্তিদাতা এবং নিজের নির্দোষিতার একমাত্র সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। এমন ব্যবস্থায় সত্যতা যাচাইয়ের স্বাধীন জায়গা থাকে না। কোনো স্বৈরশাসক যদি নিজেই আইন বানিয়ে নিজেই ঘোষণা করেন যে তিনি ন্যায়বান, তার ঘোষণাই ন্যায়ের প্রমাণ হতে পারে না।


আল্লাহর দাবির সত্যতা যাচাইযোগ্য কি?

কোরআনে আল্লাহ নিজেকে পরম করুণাময়, ক্ষমাশীল ও ন্যায়পরায়ণ বলেছেন; একই গ্রন্থে তাঁকে প্রতারণাকারী, উপহাসকারী, প্রতিশোধপরায়ণ, যুদ্ধের নির্দেশদাতা এবং অবিশ্বাসীদের জন্য অনন্ত আগুনের বিধানদাতা হিসেবেও দেখানো হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে একত্রে “ঈশ্বরের রহস্যময় প্রজ্ঞা” বলে ছেড়ে দিলে কোনো নৈতিক মানদণ্ড অবশিষ্ট থাকে না। যে কোনো নিষ্ঠুর কাজকে তখন একইভাবে ন্যায় বলে ঘোষণা করা যায়। কিন্তু ন্যায়পরায়ণতার দাবি কাজের ফল, বিধানের চরিত্র এবং ভুক্তভোগীর অবস্থার বিশ্লেষণে যাচাই করতে হয়; দাবিকারীর আত্মপরিচয়ে নয়।

গনিমতের সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দাবি, যুদ্ধবন্দি ও দাসীদের বিষয়ে বিধান, নবীর ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বিশেষ অনুমতি, ঋণ দেওয়ার আহ্বান এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিশাপ—এসবকে “সর্বশক্তিমান সত্তার মহত্ত্ব” বললে প্রশ্ন মুছে যায়, উত্তর পাওয়া যায় না। একটি মহাজাগতিক সত্তা কেন যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অংশ দাবি করবে, কেন মানুষের যৌন ও সামাজিক অধিকারকে মালিকানার কাঠামোয় রাখবে, কেন নিজের প্রেরিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রয়োজন নিয়ে আইন জারি করবে—এসব ঐশ্বরিকতার প্রমাণ নয়; বরং বিধানগুলোর মানবিক ও ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে [18] [19] [20]।

এখানে “ইসলাম দাসত্ব নিষিদ্ধ করেছে” বা “যুদ্ধ ছাড়া কাউকে অধিকার করা যায় না”—জাতীয় প্রতিরক্ষা দিয়ে মূল কাঠামো বদলে যায় না। বিধান কোনো কাজকে বৈধ করে কি না, তা নির্ধারিত হয় সেই বিধানের ভাষা ও ঐতিহাসিক প্রয়োগে; আধুনিক নৈতিক অস্বস্তি কমানোর জন্য বিধানের অর্থ বদলে দিলে সেটি ব্যাখ্যা নয়, পুনর্লিখন। একইভাবে “আল্লাহর প্রতারণা আসলে ন্যায়সঙ্গত কৌশল”—বললে প্রতারণা শব্দটির সমস্যা সমাধান হয় না; শুধু ক্ষমতাবান কর্তার জন্য শব্দটির নৈতিক অর্থ বদলে দেওয়া হয়।


দার্শনিক আপত্তি: ঈশ্বর বললেই নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না

প্লেটোর Euthyphro-তে সক্রেটিস একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন: কোনো কাজ দেবতারা আদেশ করেন বলে ভালো, নাকি কাজটি ভালো বলেই দেবতারা তা আদেশ করেন? প্রথমটি সত্য হলে নৈতিকতা ক্ষমতাবান সত্তার ইচ্ছায় ইচ্ছাধীন হয়ে যায়—দেবতা চাইলে নিষ্ঠুরতাও ন্যায় হতে পারে। দ্বিতীয়টি সত্য হলে ভালো-মন্দের মানদণ্ড দেবতার আদেশের বাইরে থাকে। কোরআনে আল্লাহ নিজেই ন্যায়পরায়ণ বলে ঘোষণা করেছেন—এটি এই দ্বিধা দূর করে না; বরং স্বাধীন নৈতিক মানদণ্ডের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট করে [21]।

Is the holy holy because it is loved by the gods, or do they love it because it is holy?
বাংলা অনুবাদ: পবিত্র বিষয়টি দেবতারা ভালোবাসেন বলে পবিত্র, নাকি পবিত্র বলেই দেবতারা সেটিকে ভালোবাসেন?

দেকার্তের “অশুভ প্রতিভা” বা প্রতারক সত্তার অনুমানও এখানে সরাসরি প্রাসঙ্গিক। তাঁর উদ্দেশ্য কোনো ধর্মকে খণ্ডন করা ছিল না; তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, অভিজ্ঞতা ও বোধের ওপর যে জ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে তা সর্বশক্তিমান প্রতারকের সম্ভাবনা দিয়ে সাময়িকভাবে সন্দেহের মুখে পড়তে পারে। ফলে “আমি দেখেছি”, “আমি শুনেছি”, “আমার কাছে ওহি এসেছে”—এই ব্যক্তিগত নিশ্চয়তা থেকে “উৎসটি সত্যিকারের ঈশ্বর”—এই সিদ্ধান্তে যাওয়া বৈধ নয় [2]।

An evil genius, supremely powerful and clever, who has directed his entire effort at deceiving me.
বাংলা অনুবাদ: এমন এক অশুভ প্রতিভা, যে অত্যন্ত শক্তিমান ও চতুর এবং আমাকে প্রতারিত করতেই তার সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছে।

ডেভিড হিউম ঈশ্বরের ক্ষমতা ও মঙ্গলময়তার দাবিকে জগতের অশুভের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে বলেন। তাঁর প্রশ্নটি কোরআনের করুণা, পূর্বনির্ধারণ, পথভ্রষ্টতা ও অনন্ত শাস্তির ধারণার ওপরও প্রযোজ্য: যে সত্তা সব করতে পারে এবং মানুষের পরিণতি জানে, সে অকারণ যন্ত্রণা ও ব্যর্থতা কেন সৃষ্টি করে? “এটি পরীক্ষা”—বললে পরীক্ষাটি কেন এমনভাবে নকশা করা হলো, যেখানে পরীক্ষকই ফল জানেন এবং ব্যর্থতার শর্তও নিয়ন্ত্রণ করেন—এই প্রশ্ন থেকে যায় [22]।

Is he able, but not willing? then is he malevolent. Is he both able and willing? whence then is evil?
বাংলা অনুবাদ: তিনি কি সক্ষম কিন্তু চান না? তাহলে তিনি অমঙ্গলকারী। তিনি যদি সক্ষমও হন এবং চানও, তাহলে অশুভের অস্তিত্ব কেন?

কান্টের নৈতিক দর্শনে নৈতিক বিধানের উৎস মানুষের যুক্তিসম্মত স্বায়ত্তশাসন; কোনো বাহ্যিক ক্ষমতাবান সত্তা আদেশ করেছে বলেই কোনো কাজ নৈতিক হয়ে যায় না। তাঁর মতে নৈতিক আইন অভিজ্ঞতার খেয়াল বা শাসকের ইচ্ছার ওপর নয়, যুক্তির সর্বজনীনতার ওপর দাঁড়ায় [23]। ফলে কোনো সত্তা নিজেকে ঈশ্বর বলে পরিচয় দিলেই তার আদেশ নৈতিক সত্যে পরিণত হয় না; আদেশটি স্বাধীন নৈতিক পরীক্ষায় টিকতে হবে।

Reason ought to be the source of laws.
বাংলা অনুবাদ: আইনের উৎস হওয়া উচিত যুক্তি।

এই দার্শনিক আপত্তিগুলো একত্রে একটি সাধারণ নীতি দেখায়: সত্যতা ও নৈতিকতা কোনো সত্তার আত্মঘোষণা, ক্ষমতা বা ভয় দেখানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রমাণ ছাড়া অতিপ্রাকৃত পরিচয় গ্রহণ করা জ্ঞানতাত্ত্বিক ভুল; স্বাধীন নৈতিক মানদণ্ড ছাড়া সেই সত্তার বিধানকে ন্যায় বলা নৈতিক ভুল।


উপসংহার

কোরআন যদি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত উৎস থেকে এসে থাকে, তবু তার উৎস যে মহাবিশ্বের ন্যায়পরায়ণ স্রষ্টা—এটি প্রমাণিত হয় না। কোরআনের নিজস্ব ভাষায় আল্লাহ প্রতারণা করেন, উপহাস করেন, কৌশলে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেন, যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন; ইবলীস আল্লাহকেই নিজের পথভ্রষ্টতার কারণ বলে; আবার একই বয়ানে মানুষকে সেই ব্যবস্থার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। এই বর্ণনা সর্বশক্তিমান ও সর্বমঙ্গলময় সত্তার সঙ্গে অসঙ্গত—অথবা অন্তত এমন এক গুরুতর নৈতিক ও যুক্তিগত সমস্যা তৈরি করে যার সমাধান কেবল “ঈশ্বর যা করেন তাই ন্যায়” বলে সম্ভব নয়।

অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা সত্য হতে পারে, কিন্তু তার ব্যাখ্যা ভুল হতে পারে। কোনো শক্তিমান সত্তা সত্যিকারের স্রষ্টা নাও হতে পারে; কোনো গ্রন্থ ধর্মীয় দাবি বহন করলেই তা সত্যের প্রমাণ হয় না; কোনো বিধান ঈশ্বরের নামে প্রচারিত হলেই তা নৈতিক হয়ে যায় না। তাই কোরআনের দাবিকে বিচার করার ন্যূনতম শর্ত হলো উৎসের স্বাধীন যাচাই, বক্তব্যের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য, নৈতিক বিধানের নিরপেক্ষ পরীক্ষা এবং প্রমাণের সঙ্গে দাবির শক্তির সামঞ্জস্য। এই পরীক্ষায় “আল্লাহ বলেছেন”—নিজে কোনো উত্তর নয়; সেটিই যাচাইয়ের বিষয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. হেরা গুহার ওহিঃ ইসলামের ভিত্তিমূলের বাস্তবতা ↩︎
  2. রেনে দেকার্তে, Meditations on First Philosophy, প্রথম ধ্যান 1 2
  3. Carl Sagan, The Demon-Haunted World, 1995 ↩︎
  4. সহিহ বুখারি ৩, প্রথম ওহির বর্ণনা ↩︎
  5. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্কিজোফ্রেনিয়া ↩︎
  6. সূরা আনফাল ৮:৩০ ↩︎
  7. তাফসীর আল-কুরতুবী: মাকর শব্দের ব্যাখ্যা ↩︎
  8. সূরা নিসা ৪:১৪২ ↩︎
  9. সূরা বাকারা ২:১৫ ↩︎
  10. শয়তানকে কে পথভ্রষ্ট করেছিল? ↩︎
  11. সূরা আরাফ ৭:১৬ ↩︎
  12. সূরা নাহল ১৬:৯৩ ↩︎
  13. সূরা আনআম ৬:১২৫ ↩︎
  14. সূরা ফাতির ৩৫:৮ ↩︎
  15. সূরা ইব্রাহিম ১৪:২২ ↩︎
  16. সূরা সাজদা ৩২:১৩ ↩︎
  17. সূরা আরাফ ৭:১৭৯ ↩︎
  18. সূরা আনফাল ৮:৪১ ↩︎
  19. সূরা বাকারা ২:২৪৫ ↩︎
  20. সূরা আহযাব ৩৩:৫০ ↩︎
  21. প্লেটো, Euthyphro, ১০a ↩︎
  22. ডেভিড হিউম, Dialogues Concerning Natural Religion, দশম অংশ ↩︎
  23. ইমানুয়েল কান্ট, Groundwork of the Metaphysics of Morals, দ্বিতীয় অধ্যায় ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.