জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামী শরীয়তে যাদু হারাম ও যাদুকরের শিরচ্ছেদের বিধান

প্রকাশিত: মে 3, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন22 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তে যাদুকরদের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা অত্যন্ত নৃশংস, বর্বর এবং অমানবিক এক ব্যবস্থা। ইসলামের বিভিন্ন হাদিস এবং ফিকাহ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, যারা জাদু বা তুকতাক করে, ইসলামী বিধান অনুসারে তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। ইসলামিক আইনের এই ধরনের শাস্তি শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যাদু বা তুকতাক হলো একটি অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন ধারণা, যার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই। মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য করা যেই সকল জাদু আমরা দেখি, সেগুলো আমাদের অনেক আনন্দ দেয়। শুধুমাত্র কাউকে আনন্দ দেয়ার জন্য বা মানুষকে অবাক করে দেয়ার জন্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া একটি বর্বর এবং অসভ্য আইনের উদাহরণ। এইসব পুরনো অসভ্য আইন যে মূলত মানুষের ভয় ও অজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, এই ধরণের আইনগুলো সেগুলোই বারবার প্রমাণ করে। একইসাথে, এই ধরণের আইন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

উল্লেখ্য, এই প্রবন্ধে আধুনিক ‘সুগারকোটেড’ বা অ্যাপোলোজেটিক এড হক ব্যাখ্যাসমূহকে সম্পূর্ণ সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র নবি মুহাম্মদ, সাহাবী ও তাবেয়ীগণের আমল এবং চার মাজহাবের প্রতিষ্ঠিত ধ্রুপদী ফিকহী নীতিমালাকে ইসলামের মূল ভিত্তি ধরে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্রীয় আদর্শ অনুযায়ী, আধুনিক কোনো ব্যাখ্যা যদি মুহাম্মদ, সাহাবী, তাবে তাবেইন ও পূর্বসূরি আলেমদের জীবন এবং ধ্রুপদী ফিকহের বর্ণনার সাথে সংগতিপূর্ণ না হয়, তবে সেখানে ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে, যা এই আলোচনার মূল ভিত্তি। এর মূল ভিত্তি হলো নবি মুহাম্মদের সেই বিখ্যাত বাণী— “সবচাইতে উত্তম মানুষ হচ্ছে আমার যুগের লোক, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী হবে, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী হবে” [1] [2]। ইসলামের সেই বিশুদ্ধতম যুগগুলোর আমল ও ব্যাখ্যাকেই এখানে আলোচনার মানদণ্ড ধরা হয়েছে।

ইসলামে যাদুকর এবং শরীয়তের বিধান

যাদুর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এই আইনের মাধ্যমে ইসলামী শরীয়ত কেবল অমানবিকতা ও বর্বরতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়ায় না, বরং এটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশের পথে একটি বড় বাধা হয়ে ওঠে। এ ধরনের আইন সমাজে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারনাকে আরও বদ্ধমূল করে এবং যুক্তিবাদী চিন্তাকে স্তব্ধ করে দেয়। আধুনিক যুগে, যেখানে বিজ্ঞানের মাধ্যমে পৃথিবীর অজানা রহস্য উদঘাটিত হচ্ছে এবং মানুষ যুক্তিনির্ভরভাবে সবকিছু বিশ্লেষণ করছে, সেখানে সামান্য জাদু দেখিয়ে মানুষকে আনন্দ দেয়ার হজন্য এ ধরনের শাস্তি মূলত সমাজকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শামিল। এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তাধারা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণকে পদদলিত করে। ছোটবেলা আমার প্রিয় যাদুশিল্পী ছিলেন জুয়েল আইচ। সদা হাস্যমুখের এই মানুষটিকে নিঃসন্দেহে সকলেই পছন্দ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিসি সরকারের নাম অনেক শুনেছি, সেইসাথে ডেভিড কপারফিল্ডের যাদু তো মনোমুগ্ধকর। ধ্রুপদী ইসলামী উৎসে জনসমক্ষে ‘খেলা’ বা চমকপ্রদ কৌশল দেখানো ব্যক্তিকেও ‘সাহির’ হিসেবে গণ্য করে হত্যা করার নজির পাওয়া যায়; নিচে জুন্দুবের ঘটনাটি বুখারির আত-তারীখুল কাবীর থেকে সরাসরি দেয়া হয়েছে। আসুন তথ্যসূত্রগুলো যাচাই করে দেখি।

জুয়েল আইচ

ইসলামী বিশ্বাসে যাদুকররা কাফের

হাদিসে খুব স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে জাদুকরেরা কাফির। আর ইসলামের বিধান অনুসারে চুক্তিহীন বা জিজিয়াদানকারী না হলে সেই কাফের হত্যাযোগ্য [3]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – জ্যোতিষীর গণনা
৪৬০৪-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নক্ষত্র বিদ্যা বিষয়ে আল্লাহর বাতলানো উদ্দেশ্য ব্যতীত কিছু শিক্ষাও গ্রহণ করেছে, সে বস্তুতঃ জাদুবিদ্যার এক অংশ হাসিল করেছে। আর জ্যোতিষী প্রকৃতপক্ষ গণক, আর গণক জাদুকর। আর জাদুকর কাফির। (রযীন)[1]
[1] সহীহ : আল ইসতিযকার (৩৭৯৪২)-(৯৫৬), আত্ব ত্বিববু লি আবী দাঊদ (৪/১৫), ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১৬৯৫৫, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ১১১১, শু‘আবুল ঈমান ৫১৯৭, আহমাদ ২০০০, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৬৪, আবূ দাঊদ ৩৮০৫, ইবনু মাজাহ ৩৭২৬, সহীহুল জামি‘ ৬০৭৪, আল জামি‘উস্ সগীর ১০১৯, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০৫১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৯৩।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اقْتَبَسَ بَابًا مِنْ عِلْمِ النُّجُومِ لِغَيْرِ مَا ذَكَرَ اللَّهُ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ السِّحْرِ الْمُنَجِّمُ كَاهِنٌ والكاهنُ ساحرٌ والساحرُ كافرٌ» . رَوَاهُ رزين
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)


যাদু ও যাদুকর সম্পর্কে উসাইমীনের ফতোয়া

এবারে আসুন শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীনের বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ের বিধানটি জেনে নিই, [4]

প্রশ্নঃ (৭৩) যাদু কাকে বলে? যাদু শিক্ষার হুকুম কি?
উত্তরঃ আলেমগণ বলেন, যাদু বলা হয় প্রত্যেক এমন ক্রিয়া-কলাপকে, যার কারণ অস্পষ্ট ও গোপন থাকে, কিন্তু বাইরে তার প্রভাব দেখা যায়। গণক এবং জ্যোতিষের কার্যকলাপও যাদূর অন্তর্ভূক্ত। চাকচিক্যময় বক্তব্য ও ভাষার প্রভাবকেও যাদু বলা হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, )إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِخرًا ( “নিশ্চয়ই কিছু কিছু বক্তৃতার মধ্যে যাদু রয়েছে।”। সুতরং প্রতিটি বস্তুর গোপন প্রভাবকে যাদু বলা হয়। আর পরিভাষায় এমন কিছু গিরা এবং ঝাড়ফুঁকের নাম, যা মানুষের অন্তর, মস্তিস্ক এবং শরীরের ভিতরে প্রভাব বিস্তার করতঃ কখনো জ্ঞান শুণ্য করে ফেলে, কখনো ভালবাসা বা ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়। কখনো শরীর অসুস্থ করে দেয়। যাদু শিক্ষা করা হারাম। শুধু তাই নয়, বরং তা কখনো কুফরী এবং শির্কের দিকে নিয়ে
যায়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنْ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ)
“সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা আবৃত্তি করতো, তারা তারই অনুসরণ করছে এবং সুলায়মান (আঃ) অবিশ্বাসী হননি, কিন্তু শয়তানরাই অবিশ্বাস করছিল, তারা লোকদেরকে যাদু বিদ্যা এবং যা বাবেল শহরে হারূত-মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিতো এবং উভয়ে কাউকে ওটা শিক্ষা দেয়ার পূর্বে তারা বলতো যে, আমরা পরীক্ষা ছাড়া কিছুই নই, অতএব তোমরা কুফরী করো না, অনন্তর যাতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়, তারা উভয়ের নিকট তাই শিক্ষা করতো এবং তারা আল্লাহর আদেশ ব্যতীত তদ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারতো না এবং তারা ওটাই শিক্ষা করতযাতে তাদের ক্ষতি হয় এবং তাদের কোন উপকার সাধিত না হয়। নিশ্চয় তারা জ্ঞাত আছে যে, যে কেউ ওটা ক্রয় করবে, তার জন্যে পরকালে কোন অংশ
নেই।” (সূরা বাকারাঃ ১০২) সুতরাং শয়তানকে শরীক বানানোর মাধ্যমে এ ধরণের যাদু শিক্ষা এবং ব্যবহার করা কুফরী এবং সীমা লংঘনের অন্তর্ভুক্ত। এই জন্যেই যাদুকরের শাস্তি হল মৃত্যু দন্ড। তার যাদুর সীমা যদি কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে তাকে কাফের এবং মুরতাদ হিসাবে হত্যা করতে হবে। আর তার যাদু যদি কুফরী পর্যন্ত না পৌঁছে, তাহলে মুসলমানদেরকে তার ক্ষতি হতে হেফাজত করার জন্য তাকে দন্ড প্রয়োগ করে করে হত্যা করতে হবে।
যারা নিজে এবং খলীফা উপাধীধারীদের মাধ্যমে মুরীদ সংগ্রহ করে তারা কস্মিনকালেও আল্লাহর ওলী নয় বরং তারা শয়তানের ওলী। পীর-মুরীদীর সম্পর্ক ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কের কথা আছে। শিক্ষকের যেমন হাজার হাজার ছাত্র হতে পারে তেমন একজন ছাত্রের শত শত শিক্ষক থাকতে পারে। কিন্তু তথাকথিত পীর-মুরীদীর প্রথায় একজন মুরীদের একাধিক পীর ধরার কোন সুযোগ নেই। (সম্পাদক)
বুখারী, অধ্যায়ঃ বিবাহ।

যাদু হারাম
যাদু হারাম 2

যাদু ও যাদুকর সম্পর্কে ইসলামী শরীয়ত

আসুন জুয়েল আইচ, পিসি সরকার এবং ডেভিড কপারফিল্ড সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের বিধান জেনে নিই। উনারা তো অমুসলিম, তাহলে উনাদের ওপর ইসলামী শরীয়তের বিধান প্রযোজ্য হবে কিনা, দেখা যাক। যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম গ্রন্থের ৫০, ৫১ পৃষ্ঠায় বলা আছে, [5] –

আহলে কিতাব অমুসলিম যাদুকরের বিষয়ে শরীয়তের নির্দেশ
ইমাম আবু হানীফা (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ যেহেতু হাদীসে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণী উল্লেখ নেই সেজন্যে অমুসলিম যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। এই জন্য যে, যাদু এক এমন অপরাধ যা মুসলিমকে হত্যা করে। অনুরূপ এক অপরাধও অমুসলিমকে হত্যা করা জরুরী করে দেয়। (আল-মুগনীঃ ১০/১১৫)
ইমাম মালেক (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন যে, আহলে কিতাবের যাদুকরকে হত্যা করা যাবে না। তবে যদি তার যাদু দ্বারা কেউ হত্যা হয় তবে তাকে হত্যা করা হবে। আরও বলেনঃ তার যদি দ্বারা যদি কোন মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার ব্যাপারে ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগ নেই তাকেও হত্যা করা বৈধ।
নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লাবীদ বিন আসেমকে হত্যা এজন্য করেননি যে, তিনি নিজের জন্যে কারো প্রতিশোধ নিতেন না। লাবীদ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে যাদু করেছিল। দ্বিতীয়তঃ এজন্যে হত্যা করেননি যে, কোথাও আবার ইয়াহুদী ও মুসলিমদের মাঝে রক্তাক্তরূপ ধারণ না করে। (ফতহুল বারীঃ ১০/২৩৬)
ইমাম ইবনে কুদামা (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাদুকর সে ইয়াহুদী অথবা খ্রিস্টান যেই হোক না কেন কেবলমাত্র যাদুর জন্যে তাকে হত্যা করা হবে না। যতক্ষণ না সে তার যাদুর মাধ্যমে অন্যকে হত্যা করে। এর প্রমাণ হল যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লাবীদকে হত্যা করেন নি অথচ শিরক যাদু থেকেও বড় পাপ।
তিনি আরো বলেনঃ যত দলীল এসব ব্যাপারে এসেছে সব মুসলিম যাদুকরের ব্যাপারে। কেননা সে তার যাদুর কারণে কাফের হয়ে যায়। (ফতহুল বারীঃ ১০/২৩৬)

যাদু হারাম 4

খিলাফত আমলে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ: উমরের চিঠি

যাদুকর হত্যার বিধানকে শুধু পরবর্তী যুগের ফকিহদের তাত্ত্বিক মতামত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উমরের খিলাফতকালেই কেন্দ্রীয় শাসকের পক্ষ থেকে অধস্তন প্রশাসনের কাছে যাদুকর হত্যার লিখিত নির্দেশ পাঠানোর বর্ণনা পাওয়া যায়। সুনান আবু দাউদের ৩০৪৩ নম্বর বর্ণনায় বাজালা বলেন, উমরের মৃত্যুর এক বছর আগে তাদের কাছে তার চিঠি আসে, যাতে প্রত্যেক যাদুকরকে হত্যা করার নির্দেশ ছিল। একই বর্ণনায় বাজালা জানান, এই নির্দেশ কার্যকর করে তারা একদিনেই তিনজন যাদুকরকে হত্যা করেন। Sunnah.com-এ বর্ণনাটিকে আলবানির বিচারে সহিহ হিসেবে দেখানো হয়েছে। [6]

Reference : Sunan Abi Dawud 3043
In-book reference : Book 20, Hadith 116
English translation : Book 19, Hadith 3037
Tribute, Spoils, and Rulership (Kitab Al-Kharaj, Wal-Fai’ Wal-Imarah)
(1119)Chapter: Levying Jizyah On The Zoroastrians(31)باب فِي أَخْذِ الْجِزْيَةِ مِنَ الْمَجُوسِ
Narrated Umar ibn al-Khattab:
Amr ibn Aws and AbulSha’tha’ reported that Bujalah said: I was secretary to Jaz’ ibn Mu’awiyah, the uncle of Ahnaf ibn Qays.
A letter came to us from Umar one year before his death, saying: Kill every magician, separate the relatives of prohibited degrees from the Magians, and forbid them to murmur (before eating). So we killed three magicians in one day, and separated from a Magian husband his wife of a prohibited degree according to the Book of Allah.
He prepared abundant food and called them, and placed the sword on his thigh. They ate (the food) but did not murmur. They threw (on the ground) one or two mule-loads of silver. Umar did not take jizyah from Magians until AbdurRahman ibn Awf witnessed that the Messenger of Allah (ﷺ) had taken jizyah from the Magians of Hajar.
حَدَّثَنَا مُسَدَّدُ بْنُ مُسَرْهَدٍ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، سَمِعَ بَجَالَةَ، يُحَدِّثُ عَمْرَو بْنَ أَوْسٍ وَأَبَا الشَّعْثَاءِ قَالَ كُنْتُ كَاتِبًا لِجَزْءِ بْنِ مُعَاوِيَةَ عَمِّ الأَحْنَفِ بْنِ قَيْسٍ إِذْ جَاءَنَا كِتَابُ عُمَرَ قَبْلَ مَوْتِهِ بِسَنَةٍ اقْتُلُوا كُلَّ سَاحِرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَ كُلِّ ذِي مَحْرَمٍ مِنَ الْمَجُوسِ وَانْهَوْهُمْ عَنِ الزَّمْزَمَةِ فَقَتَلْنَا فِي يَوْمٍ ثَلاَثَةَ سَوَاحِرَ وَفَرَّقْنَا بَيْنَ كُلِّ رَجُلٍ مِنَ الْمَجُوسِ وَحَرِيمِهِ فِي كِتَابِ اللَّهِ وَصَنَعَ طَعَامًا كَثِيرًا فَدَعَاهُمْ فَعَرَضَ السَّيْفَ عَلَى فَخِذِهِ فَأَكَلُوا وَلَمْ يُزَمْزِمُوا وَأَلْقَوْا وِقْرَ بَغْلٍ أَوْ بَغْلَيْنِ مِنَ الْوَرِقِ وَلَمْ يَكُنْ عُمَرُ أَخَذَ الْجِزْيَةَ مِنَ الْمَجُوسِ حَتَّى شَهِدَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَخَذَهَا مِنْ مَجُوسِ هَجَرَ ‏.‏
صحيح خ بعضه مجوس هجر (الألباني) حكم :

এখানে বিষয়টি নিছক একটি ধর্মীয় মতামত নয়; খলিফার লিখিত প্রশাসনিক আদেশ এবং সেই আদেশ অনুসারে বাস্তব হত্যাকাণ্ড—দুটিই একই বর্ণনায় রয়েছে। অর্থাৎ যাদুকর হত্যার বিধান ইসলামের প্রথম যুগেই রাষ্ট্রীয় প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছেছিল।


হাফসার ক্রীতদাসী হত্যা

মুয়াত্তা মালিকে সরাসরি বর্ণিত হয়েছে যে, হাফসা তার এক ক্রীতদাসীকে হত্যা করিয়েছিলেন, কারণ তার বিরুদ্ধে হাফসাকে যাদু করার অভিযোগ ছিল। একই বর্ণনার পর মালিক নিজেও বলেন, যে ব্যক্তি নিজে যাদু করে তার মতে তাকে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ ঘটনাটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবেই সংরক্ষিত হয়নি; মালিক এটিকে যাদুকরের মৃত্যুদণ্ডের ফিকহি অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। [7]

Muwatta Malik
Blood-Money
Yahya related to me from Malik from Muhammad ibn Abd ar-Rahman ibn Sad ibn Zurara that he had heard that Hafsa, the wife of the Prophet, may Allah bless him and grant him peace, killed one of her slave-girls who had used sorcery against her. She was a mudabbara. Hafsa gave the order, and she was killed.
Malik said, “The sorcerer is the one who uses sorcery for himself and no one else uses that for him. It is like the one about whom Allah, the Blessed, the Exalted, said in His Book, ‘They know the one who devotes himself to it will have no share in the Next World.’ (Sura 2 ayat 102) I think that that person is killed if he does that himself.”
وَحَدَّثَنِي يَحْيَى، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَعْدِ بْنِ زُرَارَةَ، أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ حَفْصَةَ، زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَتَلَتْ جَارِيَةً لَهَا سَحَرَتْهَا وَقَدْ كَانَتْ دَبَّرَتْهَا فَأَمَرَتْ بِهَا فَقُتِلَتْ ‏.‏ قَالَ مَالِكٌ السَّاحِرُ الَّذِي يَعْمَلُ السِّحْرَ وَلَمْ يَعْمَلْ ذَلِكَ لَهُ غَيْرُهُ هُوَ مَثَلُ الَّذِي قَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى فِي كِتَابِهِ ‏{‏وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مِنْ خَلاَقٍ‏}‏ فَأَرَى أَنْ يُقْتَلَ ذَلِكَ إِذَا عَمِلَ ذَلِكَ هُوَ نَفْسُهُ ‏.‏
USC-MSA web (English) reference : Book 43, Hadith 14
Arabic reference : Book 43, Hadith 1594

ইবন আবি শাইবার আল-মুসান্নাফ-এ একই ঘটনার আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ঘটনাটি উসমানের কাছে পৌঁছালে তিনি আপত্তি করেন; কিন্তু বর্ণনাকারী স্পষ্ট করেন যে তার আপত্তির কারণ ছিল নারীটিকে খলিফার অনুমতি ছাড়া হত্যা করা। অর্থাৎ এই বর্ণনার ভাষ্য অনুসারে আপত্তিটি যাদুর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের নীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অনুমতি ছাড়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিরুদ্ধে। [8]

ما قالوا في الساحر ، ما يصنع به ؟
( 1 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا معاذ بن معاذ قال أخبرنا أشعث عن الحسن أنه قال : يقتل السحار ولا يستتابوا .
( 2 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا يحيى بن سعيد عن سفيان عن أبي إسحاق عن حارثة بن مضرب أن جندبا قتل ساحرا أو أراد أن يقتله .
( 3 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا ابن عيينة عن عمرو عن سالم عن قيس بن سعد أنه قتل ساحرا .
( 4 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا أبو داود الطيالسي عن همام عن يحيى أن عامل عمان كتب إلى عمر بن عبد العزيز في ساحرة أخذها ، فكتب إليه عمر : إن اعترفت أو قامت عليها البينة فاقتلها .
( 5 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا عبدة بن سليمان عن عبيد الله عن نافع عن ابن عمر أن جارية لحفصة سحرتها ، ووجدوا سحرها ، واعترفت به ، فأمر عبد الرحمن بن زيد فقتلها فبلغ ذلك عثمان فأنكره واشتد عليه ، فأتاه ابن عمر فأخبره أنها سحرتها واعترفت به ووجدوا سحرها فكان عثمان إنما أنكر ذلك لأنها قتلت بغير إذنه .
( 6 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا معتمر بن سليمان عن زيد أبي المعلى قال : حدثني شرطي لسنان بن سلمة أن سنانا أتي بساحرة ، فأمر بها أن تلقى في البحر .
( 7 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا ابن عيينة عن عمرو وسمع بجالة يقول : كنت كاتبا لجزء بن معاوية ، فأتانا كتاب عمر بن الخطاب أن اقتلوا كل ساحر وساحرة ، قال : فقتلنا ثلاث سواحر .
( 8 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا الثقفي عن المثنى عن عمرو بن شعيب عن سعيد بن المسيب في الساحر إذا اعترف يقتل .
( 9 ) حدثنا أبو بكر قال حدثنا يحيى بن سعيد عن عمرو عن الحسن في الساحر قال : يقتل .
বাংলা অনুবাদ:
যাদুকরের ব্যাপারে তারা কী বলেছেন—তার সঙ্গে কী করা হবে?
(১) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মু‘আয ইবন মু‘আয আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আশ‘আস আমাদের হাসান থেকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন: যাদুকরদের হত্যা করা হবে এবং তাদেরকে তওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
(২) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আমাদের সুফিয়ান থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি হারিসা ইবন মুদাররিব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জুন্দুব একজন যাদুকরকে হত্যা করেছিলেন অথবা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।
(৩) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইবন উয়াইনা আমাদের আমর থেকে, তিনি সালিম থেকে, তিনি কায়েস ইবন সাদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন যাদুকরকে হত্যা করেছিলেন।
(৪) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আবু দাউদ আত-তায়ালিসি আমাদের হাম্মাম থেকে, তিনি ইয়াহইয়া থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওমানের প্রশাসক আটক করা এক নারী যাদুকরের ব্যাপারে উমর ইবন আবদুল আজিজের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। উমর তাকে লিখে পাঠান: “সে যদি স্বীকার করে অথবা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাকে হত্যা করো।”
(৫) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আবদা ইবন সুলাইমান আমাদের উবাইদুল্লাহ থেকে, তিনি নাফি থেকে, তিনি ইবন উমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হাফসার এক ক্রীতদাসী তাকে যাদু করেছিল। তারা তার যাদুর বস্তু খুঁজে পায় এবং ক্রীতদাসীটি তা স্বীকারও করে। এরপর হাফসা আবদুর রহমান ইবন যায়েদকে নির্দেশ দিলে তিনি তাকে হত্যা করেন। বিষয়টি উসমানের কাছে পৌঁছালে তিনি এর প্রতিবাদ করেন এবং এতে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। এরপর ইবন উমর তার কাছে এসে জানান যে, ক্রীতদাসীটি হাফসাকে যাদু করেছিল, সে তা স্বীকার করেছিল এবং তার যাদুর বস্তু পাওয়া গিয়েছিল। উসমান মূলত এ কারণেই আপত্তি করেছিলেন যে, নারীটিকে তার অনুমতি ছাড়াই হত্যা করা হয়েছিল।
(৬) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মু‘তামির ইবন সুলাইমান আমাদের যায়েদ আবু আল-মু‘আল্লা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: সিনান ইবন সালামার একজন প্রহরী আমাকে জানিয়েছেন যে, সিনানের কাছে এক নারী যাদুকরকে আনা হলে তিনি তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন।
(৭) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইবন উয়াইনা আমাদের আমর থেকে বর্ণনা করেছেন, এবং তিনি বাজালাকে বলতে শুনেছেন: আমি জায্‌ ইবন মু‘আবিয়ার লেখক ছিলাম। তখন আমাদের কাছে উমর ইবন আল-খাত্তাবের চিঠি আসে: “প্রত্যেক পুরুষ ও নারী যাদুকরকে হত্যা করো।” বাজালা বলেন: এরপর আমরা তিনজন নারী যাদুকরকে হত্যা করি।
(৮) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আস-সাকাফি আমাদের মুসান্না থেকে, তিনি আমর ইবন শু‘আইব থেকে, তিনি সাঈদ ইবন আল-মুসাইয়্যাব থেকে যাদুকরের ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন যে, যাদুকর যদি স্বীকার করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।
(৯) আবু বকর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আমাদের আমর থেকে, তিনি হাসান থেকে যাদুকরের ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: তাকে হত্যা করা হবে।


দর্শকের সামনে ‘খেলা’ দেখানো ব্যক্তিকে জুন্দুবের হত্যা

এই ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে কোনো গোপন তুকতাকের অভিযোগ নয়, বরং একজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে লোকজনের সামনে এমন একটি ‘খেলা’ দেখাচ্ছিল যাতে মনে হচ্ছিল সে একজন মানুষের মাথা বিচ্ছিন্ন করে আবার তা জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছে। বুখারির আত-তারীখুল কাবীর-এ তাকে সরাসরি “রজুলুন ইয়ালআব”—এক ব্যক্তি খেলা দেখাচ্ছিল—এই ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর জুন্দুব এসে তাকে হত্যা করেন। অর্থাৎ জনসমক্ষে বিস্ময়কর কৌশল বা প্রদর্শনীকে ‘সিহর’ হিসেবে ধরে প্রদর্শনকারীকে হত্যা করার বাস্তব নজিরও প্রাথমিক মুসলিম উৎসে সংরক্ষিত রয়েছে। [9]

كَانَ عِنْدَ الْوَلِيدِ رَجُلٌ يَلْعَبُ فَذَبَحَ إِنْسَانًا وَأَبَانَ رَأْسَهُ فَعَجِبْنَا فَأَعَادَ رَأْسَهُ فَجَاءَ جُنْدُبٌ الْأَزْدِيُّ فَقَتَلَهُ

বাংলা অনুবাদ: ওয়ালিদের কাছে এক ব্যক্তি খেলা দেখাচ্ছিল। সে একজন মানুষের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল, পরে তা ফিরিয়ে দিল। এরপর জুন্দুব আল-আজদি এসে তাকে হত্যা করেন।


উমর ইবন আবদুল আজিজের খিলাফতে নারী যাদুকর হত্যার নির্দেশ

এই নীতি রাশিদুন যুগের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইবন আবি শাইবার আল-মুসান্নাফ-এ বর্ণিত হয়েছে, ওমানের প্রশাসক একজন অভিযুক্ত নারী যাদুকর সম্পর্কে খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজকে লিখলে তিনি নির্দেশ দেন—নারীটি স্বীকার করলে অথবা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে হত্যা করতে হবে। এটি উমাইয়া খিলাফতের প্রশাসনিক পর্যায়ে একই মৃত্যুদণ্ডের নীতির আরেকটি সরাসরি উদাহরণ। [8]

إِنْ اعْتَرَفَتْ أَوْ قَامَتْ عَلَيْهَا الْبَيِّنَةُ فَاقْتُلْهَا

বাংলা অনুবাদ: সে স্বীকার করলে অথবা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে হত্যা করো।


হানাফি ফিকহ: যাদুতে কেউ মারা না গেলেও মৃত্যুদণ্ড

যাদুকরের মৃত্যুদণ্ডকে কেবল তখনই প্রযোজ্য মনে করা হতো যখন তার কাজের ফলে বাস্তবে কেউ মারা গেছে—এমন ধারণাও হানাফি ফিকহের ক্ষেত্রে সঠিক নয়। হানাফি ফকিহ আবু বকর আল-জাসসাস আহকামুল কুরআন-এ আবু হানিফার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছেন, যাদুকর তার যাদুর কারণে কুফরি করেছে; সে তার যাদু দিয়ে কাউকে হত্যা করুক বা না-ই করুক, কুফরির কারণেই সে হত্যার যোগ্য হয়। একই আলোচনায় তিনি আবু হানিফার নামে যাদুকরকে হত্যা এবং তার তাওবা গ্রহণ না করার মতও উল্লেখ করেন। [10]

وَأَمَّا السَّاحِرُ فَقَدْ كَفَرَ بِسِحْرِهِ قَتَلَ بِهِ أَوْ لَمْ يَقْتُلْ فَاسْتَحَقَّ الْقَتْلَ بِكُفْرِهِ

বাংলা অনুবাদ: আর যাদুকর তার যাদুর মাধ্যমে কুফরি করেছে; সে এর মাধ্যমে হত্যা করুক বা না করুক, তার কুফরির কারণে সে হত্যার যোগ্য হয়েছে।


এবারে আসুন মোস্তাফিজুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-মাদানী রচিত হারাম ও কবিরা গুনাহ গ্রন্থ থেকে একটি অংশ পড়ে নিই, [11]

যাদু শিক্ষা দেয়া বা শিক্ষা নেয়া শুধু কবীরা গুনাহ্ই নয়। বরং তা শির্ক এবং কুফর ও বটে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
«وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَاْنُ وَلَكِنَّ الشَّيَاْطِيْنَ كَفَرُوْا يُعَلِّمُوْنَ النَّاْسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزَلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَاْبِلَ هَاْرُوْتَ وَمَاْرُوْتَ وَمَا يُعَلِّمَاْنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُوْلَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ»
‘‘সুলাইমান (আঃ) কুফরি করেননি, তবে শয়তানরাই কুফরি করেছে, তারা লোকদেরকে যাদু শেখাতো বাবেল শহরে বিশেষ করে হারূত-মারূত ব্যক্তিদ্বয়কে। (জিব্রীল ও মীকাঈল) ফিরিশ্তাদ্বয়ের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি (যা ইহুদিরা ধারণা করতো)। তবে উক্ত ব্যক্তিদ্বয় কাউকে যাদু শিক্ষা দিতো না যতক্ষণ না তারা বলতো, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ মাত্র, অতএব তোমরা (যাদু শিখে) কুফরী করো না।
(সূরাহ বাকারাহ : ১০২)
যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে, কারো ব্যাপারে তা সত্যিকারভাবে প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা। এ ব্যাপারে সাহাবাদের ঐকমত্য রয়েছে।
জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
حَدُّ السَّاْحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ.
‘‘যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের কোপ তথা শিরশ্ছেদ’’।
(তিরমিযী ১৪৬০)
জুনদুব (রাঃ) শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং তিনি তা বাস্তবে কার্যকরী করেও দেখিয়েছেন।
আবূ ’উসমান নাহ্দী (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كَانَ عِنْدَ الْوَلِيْدِ رَجُلٌ يَلْعَبُ، فَذَبَحَ إِنْسَانًا وَأَبَانَ رَأْسَهُ، فَعَجِبْنَا فَأَعَادَ رَأْسَهُ، فَجَاءَ جُنْدُبٌ الْأَزْدِيْ فَقَتَلَهُ.
‘‘ইরাকে ওয়ালীদ্ বিন্ ’উক্ববার সম্মুখে জনৈক ব্যক্তি খেলা দেখাচ্ছিলো। সে জনৈক ব্যক্তির মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। এতে আমরা খুব বিস্মিত হলে লোকটি কর্তিত মাথা খানি যথাস্থানে ফিরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে জুনদুব (রাঃ) এসে তাকে হত্যা করেন’’। (বুখারী/আত্তা’রীখুল্ কাবীর : ২/২২২ বায়হাক্বী : ৮/১৩৬)
তেমনিভাবে উম্মুল্ মু’মিনীন ’হাফ্সা (রাঃ) ও নিজ ক্রীতদাসীকে জাদুকরী প্রমাণিত হওয়ার পর হত্যা করেন।
‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
سَحَرَتْ حَفْصَةَ بِنْتَ عُمَرَ ـ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ـ جَارِيَةٌ لَهَا، فَأَقَرَّتْ بِالسِّحْرِ وَأَخْرَجَتْهُ، فَقَتَلَتْهَا، فَبَلَغَ ذَلِكَ عُثْمَانُ فَغَضِبَ، فَأَتَاهُ اِبْنُ عُمَرَ ـ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ـ فَقَالَ: جَارِيَتُهَا سَحَرَتْهَا، أَقَرَّتْ بِالسِّحْرِ وَأَخْرَجَتْهُ، قَالَ: فَكَفَّ عُثْمَانُ قَالَ الرَّاوِيْ: وَكَأَنَّهُ إِنَّمَا كَانَ غَضَبُهُ لِقَتْلِهَا إِيَّاهَا بِغَيْرِ أَمْرِهِ.
‘‘হাফ্সা বিন্ত ’উমর (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) কে তাঁর এক ক্রীতদাসী যাদু করে। এমনকি সে ব্যাপারটির স্বীকারোক্তিও করে এবং যাদুর বস্ত্তটি উঠিয়ে ফেলে দেয়। এতদ্ কারণে ’হাফ্সা (রাঃ) ক্রীতদাসীটিকে হত্যা করেন। সংবাদটি ’উস্মান (রাঃ) এর নিকট পৌঁছুলে তিনি খুব রাগান্বিত হন। অতঃপর ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রাঃ) তাঁকে ব্যাপারটি বুঝিয়ে বললে তিনি এ ব্যাপারে চুপ হয়ে যান তথা তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বর্ণনাকারী বলেন: ’উসমান (রাঃ) এর অনুমতি না নিয়ে ক্রীতদাসীটিকে হত্যা করার কারণেই তিনি এতো রাগান্বিত হন’’।
(‘আব্দুর রায্যাক, হাদীস ১৮৭৪৭ বায়হাক্বী : ৮/১৩৬)
অনুরূপভাবে ’উমর (রাঃ) ও তাঁর খিলাফতকালে সকল যাদুকর পুরুষ ও মহিলাকে হত্যা করার আদেশ জারি করেন।
বাজালা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كَتَبَ عُمَرُ بْنُ الْـخَطَّابِ أَنِ اقْتُلُوْا كُلَّ سَاحِرٍ وَسَاحِرَةٍ، قَالَ الرَّاوِيْ: فَقَتَلْنَا ثَلَاثَ سَوَاحِرَ.
’উমর (রাঃ) নিজ খিলাফতকালে এ আদেশ জারি করে চিঠি পাঠান যে, তোমরা সকল যাদুকর পুরুষ ও মহিলাকে হত্যা করো। বর্ণনাকারী বলেন: অতঃপর আমরা তিনজন মহিলা যাদুকরকে হত্যা করি’’।
(আবূ দাউদ ৩০৪৩ বায়হাকী : ৮/১৩৬ ইব্নু আবী শাইবাহ্, হাদীস ২৮৯৮২, ৩২৬৫২ আব্দুর রায্যাক, হাদীস ৯৯৭২; আহমাদ ১৬৫৭; আবূ ইয়া’লা ৮৬০, ৮৬১)
’উমর (রাঃ) এর খিলাফতকালে উক্ত আদেশের ব্যাপারে কেউ কোন বিরোধিতা দেখাননি বিধায় উক্ত ব্যাপারে সবার ঐকমত্য রয়েছে বলে প্রমাণিত হলো।

যাদু হারাম 6
যাদু হারাম 8
যাদু হারাম 10

এবারে আবার আসুন যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম গ্রন্থ থেকে পড়ি, ৪৮, ৪৯ পৃষ্ঠায় বলা আছে, [12] –

১। ইমাম মালেক (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, যে ব্যক্তি যাদু করে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার এই বাণী প্রযোজ্যঃ
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
অর্থঃ “নিশ্চয় তারা জানে যে, যা তারা ক্রয় করেছে আখেরাতে এর জন্য কোন অংশ নেই।” (সূরা বাকারাঃ ১০২) অতঃপর বলেনঃ আমার অভিমত হল, যাদুকরকে হত্যা করা, যদি সে যাদু কর্ম করে থাকে।
২। ইবনে কুদামা (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হত্যা। আর এই অভিমত পোষণ করেছেন, উমর, উসমান বিন আফফান, ইবনে আমর বিন আব্দুল আযীয, আবু হানীফা এবং ইমাম মালেক।
৩। ইমাম কুরতুবী (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, মুসলিম মনিষীদের মাঝে মুসলিম যাদুকর ও (অমুসলিম) যিম্মী যাদুকরের শাস্তির ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে।
ইমাম মালেক (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন যে, যখন মুসলমান যাদুকর কুফুরি কালামের মাধ্যমে যাদু করে তবে তাকে হত্যা করা হবে। আর তার তাওবা ও গ্রহণীয় হবে না। আর না তাকে তাওবা করতে বলা হবে। কেননা এটা এমন বিষয় যার দ্বারা আল্লাহর নির্দেশকে লঙ্ঘন করা হয়। এজন্য আল্লাহ তায়ালা যাদুকে কুফুরি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
অর্থঃ “তারা যাকেই যাদু বিদ্যা শিখাতো তাকে বলে দিত যে তোমরা (যাদু শিখে) কুফুরি করো না, নিশ্চয়, আমরা তোমাদের জন্য পরীক্ষা।” (সূরা বাকারাঃ ১০২)
আর এই অভিমত পোষণ করেছেন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, আবু সাওর, ইসহাক এবং আবু হানীফা (রাহেমাহুমুল্লাহ)।
৪ । ইমাম ইবনে মুনযির বলেন যখন কোন ব্যক্তি স্বীকার করে যে, সে কুফুরি কালামা দিয়ে যাদু করেছে, তখন তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। যদি সে তাওবা না করে থাকে। এমনিভাবে কারো কুফুরীর যদি প্রমাণ ও বর্ণনা সাব্যস্ত হয়ে যায়, তবুও তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। আর যদি তার কথা কুফুরি না হয় তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। আর যদি যাদুকর তার যাদু দ্বারা কাউকে হত্যা করে তবে তাকেও হত্যা করা হবে আর যদি ভুলক্রমে হত্যা করে তবে তাতে দিয়াত দিতে হবে।
৫। হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ মনীষীগণ আল্লাহ তায়ালার নিম্নোল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রমাণ করেছেন যাতে যাদুকর সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا
অর্থাৎ “যদি তারা ঈমান আনয়ন করত এবং আল্লাহকে ভয় করত।” সুতরাং এই আয়াত দ্বারা অনেকেই যাদুকরকে কাফের বলে মত পোষণ করেছেন। আবার অনেকেই অভিমত পোষণ করেছেন যে, সে কাফের তো নয় তবে তার শাস্তি শিরচ্ছেদ কেননা ইমাম শাফেয়ী (রাহেমাহুল্লাহ), আহমদ বিন হাম্বল (রাহেমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, তারা উভয়ে বলেনঃ বলেছেন যে, তিনি বাজলা বিন আব্দকে বলতে শুনেছেন যে, উমর বিন খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ মর্মে নির্দেশ জারি করেছেন যে, প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ ও মহিলার শিরচ্ছেদ করে দাও। তিনি বলেন যে, তিনি তিনটি যাদুকর মহিলাকে হত্যা করেছেন। ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন যে, ইমাম বুখারী (রাহেমাহুল্লাহ) এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। (বুখারীঃ ২/২৫৭)
ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ সহীহ বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে যা হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তাকে তার এক বান্ধবী যাদু করেছেন। অতঃপর তার নির্দেশে যাদুকরকে হত্যা করা হয়েছে।
ইমাম আহমদ থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর তিন সাহাবা থেকে যাদুকরকে হত্যার ফতোয়া রয়েছে। (তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ১/১৪৪)
মূলকথাঃ পূর্বের আলোচনা হতে বুঝা যায় যে, ইমাম শাফেয়ী (রাহেমাহুল্লাহ) ছাড়া জমহুর উলামা যাদুকরকে হত্যার মত পোষণ করেন, তিনি বলেনঃ যাদুকরের যাদু দ্বারা যদি কেউ মারা যায়, তবে তার (কিসাসের) পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হবে।

যাদু হারাম 12

আধুনিক কেস স্টাডি: ‘যাদু’র অভিযোগে রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ড

যাদুর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কোনো বিলুপ্ত মধ্যযুগীয় বিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর সৌদি আরবের আল-জাওফ অঞ্চলে আমিনা বিনতে আবদুল হালিম বিন সালেম নাসেরকে ‘সিহর ও শাওয়াযা’ বা যাদু ও তুকতাকের অভিযোগে হত্যা করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, শরিয়তি আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে তাজির হিসেবে হত্যার রায় দেয়া হয়েছিল, উচ্চতর বিচারিক পর্যায়ে সেই রায় অনুমোদিত হয় এবং পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। [13]

صَدَرَ بِحَقِّهَا صَكٌّ شَرْعِيٌّ يَقْضِي بِثُبُوتِ مَا نُسِبَ إِلَيْهَا شَرْعًا وَالْحُكْمِ عَلَيْهَا بِقَتْلِهَا تَعْزِيرًا

বাংলা অনুবাদ: তার বিরুদ্ধে শরিয়তি দলিল জারি হয়, যাতে তার বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগ শরিয়ত অনুযায়ী প্রমাণিত বলে গণ্য করে তাকে তাজির হিসেবে হত্যার রায় দেয়া হয়।

এর পরের বছর, ২০১২ সালের ১৯ জুন, সৌদি আরবের নাজরানে মুরি বিন আলি বিন ঈসা আল-আসিরিকে শিরশ্ছেদ করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১২ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ‘witchcraft and sorcery’ চর্চা এবং লিখিত তাবিজ রাখার অভিযোগ ছিল; সর্বোচ্চ বিচারিক পর্যায়ে দণ্ড বহাল থাকার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ যাদুকে বাস্তব অপরাধ হিসেবে ধরে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ধ্রুপদী শরিয়তি ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থায়ও বাস্তবে প্রয়োগের নজির রেখেছে। [14]

On June 19, Muree bin Ali bin Issa al-Asiri was beheaded … for “practicing witchcraft and sorcery” and for owning “written talismans.”

বাংলা অনুবাদ: ১৯ জুন মুরি বিন আলি বিন ঈসা আল-আসিরিকে ‘যাদুবিদ্যা ও তুকতাক চর্চা’ এবং ‘লিখিত তাবিজ’ রাখার অভিযোগে শিরশ্ছেদ করা হয়।


উপসংহার

ইসলামী শরীয়তে যাদুকরদের হত্যার বিধান শুধু একটি ধর্মীয় আইন নয়, এটি মানব সভ্যতার বিবেক ও নৈতিকতার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এমন একটি বিধান, যা কোনো ব্যক্তির চিন্তা, বিশ্বাস বা তথাকথিত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে নির্দেশ দেয় — তা সভ্যতার পরিভাষায় ন্যায়বিচার নয়, বরং বর্বরতা। এটি সেই যুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে অজ্ঞতা, ভয় এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ব মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিচার করত, প্রমাণ নয়; যুক্তি নয়; মানবিকতা নয়।

ইসলামী ফিকহের বহু ব্যাখ্যা, বিশেষ করে হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মতবাদে “সাহির” বা “যাদুকর”কে কাফির ঘোষণা করে হত্যা বৈধ বলা হয়েছে — অথচ “যাদু” নামের এই ধারণাটিই আজ বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকে এক প্রমাণহীন কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। প্রমাণহীন এক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন, যুক্তির আদালতে একে ন্যায়বিচার বলা যায় না — এটি নৃশংসতা। আর যারা মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য যাদু দেখায়, তারা তো আসলে কোন অন্যায় করছে না, কারো ক্ষতিও করছে না। তাহলে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য তাদের হত্যা করা কীভাবে কোন সভ্য বিধান হতে পারে?

আরও ভয়ঙ্কর হলো, এই বিধান কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়; অনেক ইসলামি সমাজে এটি এখনো মানুষ হত্যার ধর্মীয় বৈধতা হিসেবে ব্যবহার হয়। ইতিহাসে যেমন মিথ্যা অভিযোগে বহু নারীকে “যাদুকরী” আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তেমনি আজও ধর্মীয় উন্মাদনা ও শরীয়ত-নামক আইনি সন্ত্রাসের আড়ালে এই বর্বরতা চলমান। মানবাধিকারের আধুনিক ধারণা — জীবন, মতপ্রকাশ, চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা — ইসলামী শরীয়তের এই বিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি সভ্য সমাজে রাষ্ট্র ও আইন কখনোই কুসংস্কার, গুজব বা ধর্মীয় ভয়কে ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে না। একইসাথে জাদু সম্পর্কিত একটি ইসলামি বিশ্বাস পুরো ইসলাম ধর্মেরই ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে, যা এই প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

যে ধর্মীয় ব্যবস্থা যুক্তি নয়, বরং অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে হত্যার আদেশ দেয়, তা নৈতিকভাবে টেকসই নয়; বরং এটি মানবতার বিবর্তন প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। ইসলামী শরীয়তের যাদুকর হত্যার এই বিধান তাই শুধু একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি সভ্যতা বনাম অন্ধবিশ্বাসের সংঘর্ষের প্রতীক।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
  3. ইসলামি জিহাদের লক্ষ্যঃ শিরক নিশ্চিহ্ন না হওয়া অবধি কিয়ামত পর্যন্ত আক্রমণাত্মক জিহাদ-কিতাল চালাতে হবে ↩︎
  4. ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন, পৃষ্ঠা ১৩৫-১৩৬ ↩︎
  5. যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম, বায়তুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব, ওয়াহীদ বিন আব্দুস সালাম বালী, পৃষ্ঠা ৫০, ৫১ ↩︎
  6. Sunan Abi Dawud 3043 ↩︎
  7. Muwatta Malik, Book 43, Hadith 14 ↩︎
  8. মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবা, কিতাবুল হুদুদ 1 2
  9. সহিহ বুখারি নয়—ইমাম বুখারি, আত-তারীখুল কাবীর, জন্দুব ইবন কাবের জীবনী ↩︎
  10. আল-জাসসাস, আহকামুল কুরআন—বাব আল-ইখতিলাফ ফি হুকমিস সাহির ↩︎
  11. হারাম ও কবিরা গুনাহ, মোস্তাফিজুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-মাদানী, পৃষ্ঠা ১১৬, ১১৭, ১১৮ ↩︎
  12. যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম, বায়তুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব, ওয়াহীদ বিন আব্দুস সালাম বালী, পৃষ্ঠা ৪৮, ৪৯ ↩︎
  13. সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, আল-রিয়াদ ↩︎
  14. U.S. Department of State, 2012 International Religious Freedom Report: Saudi Arabia ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Fiqh-Critical, Hadith-Based, Human-Rights, and Anti-Superstition Analysis of the Punishment for Sorcery in Islam

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Secular Humanism, Classical Fiqh Critique, Anti-Superstition Reasoning, and Evidence-Based Criticism of Religious Penal Law

This article examines Islamic rulings on sorcery, the classification of magicians as unbelievers, and the death penalty prescribed or supported in several classical Islamic sources.

The central argument is that killing people for “magic” is not justice; it is superstition enforced through law. A claim with no scientific evidence cannot rationally become the basis for execution.

The article also distinguishes harmless performance magic from the religious fear of sorcery, showing how a pre-scientific worldview can turn entertainment, accusation, or superstition into a capital offense.

This article should be evaluated through hadith evidence, classical fiqh, scientific skepticism, human dignity, legal proportionality, and human-rights ethics—not through fear of magic, inherited superstition, clerical authority, or apologetic minimization.

Leave a comment

Your email will not be published.