সারসংক্ষেপ
ইসলামি পরকালতত্ত্বে চূড়ান্ত মুক্তির প্রধান শর্ত ইসলামী মৌলিক বিশ্বাস সমূহে নিঃশর্ত ঈমান। কুফর অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী মানুষের সৎকর্ম পরকালীন মুক্তির জন্য নিষ্ফল হয়; ঈমানধারী পাপীর জন্য শাস্তির পরও জান্নাতে প্রবেশের পথ থাকে। ইবনু জুদআনের দান-খয়রাতের পরকালীন উপকার প্রত্যাখ্যান এবং আবু তালিবের উপকার সত্ত্বেও জাহান্নামের শাস্তি এই বিশ্বাসগত বৈষম্যের নির্দিষ্ট উদাহরণ। মানুষের উপকার, অপরাধের গুরুত্ব ও ব্যক্তিগত দায়ের ওপর ধর্মীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় সর্বজনীন ন্যায়বিচারের দাবি ভেঙে পড়ে।
এই বিচারকাঠামোয় জন্মপরিবেশ ও তথ্যের অসম প্রাপ্যতা বিশ্বাস অর্জনের সুযোগকে প্রভাবিত করে। দাওয়াত না পাওয়া মানুষকে কেয়ামতে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাখ্যায় আরও একটি মৌলিক অসংগতি রয়েছে: তখন মানুষ মৃত্যুর পরের জীবন প্রত্যক্ষ করেছে, ফলে অদৃশ্যে ঈমানের পরীক্ষার শর্ত শেষ। আগুনে প্রবেশের আদেশ পালন তখন প্রকাশ্য কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সসীম জীবনের অবিশ্বাসের জন্য অন্তহীন যন্ত্রণা, মৃত মুশরিক স্বজনের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার নিষেধ এবং মুসলিমের মুক্তিপণ হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীকে উপস্থাপনের বর্ণনা। এই বিধানগুলো বিশ্বাসের সীমানা দিয়ে মানুষের কাজ, মর্যাদা ও চূড়ান্ত পরিণতির অসম মূল্য নির্ধারণ করে।
ভূমিকা
ইসলাম মানুষকে এক ধরণের কাল্পনিক স্বপ্ন দেখায় যে, পৃথিবীর এই অবিচার অনাচার বা মানুষের অপ্রাপ্তিগুলো পরকালে পূরণ করা হবে। যদিও ইসলাম এসবের কোন প্রমাণ কখনো দেয় না, কিন্তু এক অদৃশ্য মুলোর মত মানুষকে ধর্মবিশ্বাসের অন্ধ আফিমে বুঁদ করে রাখে। পারলৌকিক ইনসাফমূলক ব্যবস্থার কাল্পনিক স্বপ্ন দেখিয়ে নৈতিক ও বিচারব্যবস্থার ধর্ম বলে দাবি করে, পরকালে মারাত্মক সব অবিচারের কথাও বলে। এই স্ববিরোধীতার উদাহরণ ইসলাম ধর্মে অনেক। সেই কারণে ইসলামের এই কাল্পনিক ইনসাফের জগতের কল্পনা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলোর সাথেই যে প্রবলভাবে সাংঘর্ষিক, সেটি বলাই বাহুল্য। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামে ইনসাফের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার তো নয়-ই, বরঞ্চ ন্যায় বিচারের সাথে প্রবলভাবে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, ইসলামে বিশ্বাস ও কর্মের সম্পর্ক যে অনৈতিক বৈষম্যের ভিত্তিতে গঠিত, তা এই ধর্মের বিচারব্যবস্থার গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। কারণ ইসলামি উৎসে কুফর ও শিরক অবস্থায় মৃত্যুর জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিধান রয়েছে, আর অমুসলিমের সৎকর্ম পরকালীন মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। শিশু ও বার্তা না পাওয়া ব্যক্তির পরিণতি নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা ও মত রয়েছে; সেই আলোচনাতেও বিশ্বাস, আনুগত্য ও ব্যক্তিগত দায়ের সম্পর্ক প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আর ভিন্ন দিকে, একজন মুসলিম যত বড় অন্যায় বা অপরাধী করুক না কেন, তার মনে সামান্য ইমান থাকলে সে জান্নাতী।
ইমান বনাম কর্ম: একটি গভীর অসঙ্গতি
ইসলামি পরকালতত্ত্বে সৎকর্মের মূল্য নির্ধারণে বিশ্বাস একটি চূড়ান্ত বিভাজন তৈরি করে। সারাজীবন মানুষের উপকার করেও কুফর অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিধান রয়েছে। ঈমানসহ মৃত্যুবরণকারী পাপীর জন্য রয়েছে শেষ পর্যন্ত মুক্তির পথ। একজন মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ বা অন্য গুরুতর অপরাধ করলে তার শাস্তি হতে পারে; সামান্য ঈমানও তাকে সেই শাস্তির পর জান্নাতে প্রবেশের যোগ্য করে। অবিশ্বাসী মানুষের মানবসেবার বিপরীতে পাপী বিশ্বাসীর এই চূড়ান্ত সুবিধাই নৈতিক বৈষম্য। নিচের হাদিসগুলোতে সামান্য ঈমান, শিরক থেকে মুক্ত থাকা এবং ব্যভিচার-চুরির পরও জান্নাতে প্রবেশের ঘোষণা রয়েছে। অহংকারসংক্রান্ত হাদিসটিও এই বিশ্বাসনির্ভর মুক্তির আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। [1] [2] [3] [4]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৩৯. অহংকারের বিবরণ ও তা হারাম হওয়া
১৬৮। মিনজাব ইবনু হারিস আত তামীমী ও সুয়ায়দ ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমান ঈমান থাকবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যাক্তির অন্তরে এক সরিষার দানা পরিমাণ অহমিকা থাকবে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ ঈমান
২৬৪৪৷ আবূ যার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে এই সুসংবাদ দেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার সাথে কিছু শারীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি প্রশ্ন করলাম, সে যদি ব্যভিচার করে থাকে, সে যদি চুরি করে থাকে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ (তবুও সে জান্নাতে যাবে)।
সহীহঃ সহীহাহ (৮২৬), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে আবূদ দারদা (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮৬/ জাহ্মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
৭০০১। ইউসুফ ইবনু রাশিদ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন যখন আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে তখন আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! যার অন্তরে এক সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে তুমি জান্নাতে দাখিল করো। তারপর তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করা হবে। তারপর আমি বলব, তাকেও জান্নাতে প্রবেশ করাও, যার অন্তরে সামান্য ঈমানও আছে। আনাস (রাঃ) বলেনঃ আমি যেন এখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতের আঙুলগুলো দেখছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৭/ পোশাক
পরিচ্ছদঃ ৭৭/২৪. সাদা পোশাক প্রসঙ্গে
৫৮২৭. আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তাঁর পরনে তখন সাদা পোশাক ছিল। তখন তিনি ছিলেন নিদ্রিত। কিছুক্ষণ পর আবার এলাম, তখন তিনি জেগে গেছেন। তিনি বললেনঃ যে কোন বান্দা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং এ অবস্থার উপরে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললামঃ সে যদি যিনা করে, সে যদি চুরি করে? তিনি বললেনঃ যদি সে যিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ সে যদি যিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, সে যদি যিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও। আমি বললামঃ যদি সে যিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও? তিনি বললেনঃ যদি সে যিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আবূ যারের নাক ধূলি ধুসরিত হলেও। আবূ যার যখনই এ হাদীস বর্ণনা করতেন তখন আবূ যারের নাসিকা ধূলাচ্ছন্ন হলেও বাক্যটি বলতেন। আবূ ‘আবদুল্লাহ ইমাম বুখারী) বলেনঃ এ কথা প্রযোজ্য হয় মৃত্যুর সময় বা তার পূর্বে যখন সে তাওবাহ করে ও লজ্জিত হয় এবং বলে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’, তখন তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (১২৩৭) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৯৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বুখারির আরেক বর্ণনায় ঈমানের কারণে চূড়ান্ত মুক্তির সঙ্গে পূর্ববর্তী শাস্তির সম্পর্ক স্পষ্ট। সেখানে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী নিজেদের স্থানে যাওয়ার পর জাহান্নাম থেকে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানধারীদের বের করার নির্দেশ আসে। তাদের দেহ তখন আগুনে কালো হয়ে গেছে। শাস্তির বাস্তব বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও তাদের জন্য শেষ পর্যন্ত পুনর্জীবন ও মুক্তির পথ খোলা থাকে। [5]
يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ. فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ اسْوَدُّوا، فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَا ـ أَوِ الْحَيَاةِ شَكَّ مَالِكٌ ـ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي جَانِبِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً
বাংলা অনুবাদ:
জান্নাতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ বলবেন: যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে বের করো। তখন তাদের বের করা হবে; তারা কালো হয়ে গেছে। তাদের হায়া বা হায়াতের নদীতে ফেলা হবে—মালিক শব্দটি নিয়ে সন্দেহ করেছেন। তারপর তারা এমনভাবে গজাবে, যেমন বন্যার ধারে বীজ গজায়। তুমি কি দেখনি, তা হলুদ ও পেঁচানো অবস্থায় বের হয়?
ঈমানেই জান্নাতের নিশ্চয়তা: উমর কেন সুসংবাদ প্রচার থামালেন?
সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রার বর্ণনায় ঈমানের ভিত্তিতে জান্নাতপ্রাপ্তির ঘোষণা সরাসরি এসেছে। মুহাম্মদ একটি বাগানে তাঁকে নিজের জুতা দিয়ে পাঠান, যাতে বাইরে দেখা হওয়া আন্তরিক তাওহিদবিশ্বাসীদের জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়। ঘোষণার শর্ত হিসেবে এসেছে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্য। [6]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১০. যে ব্যাক্তি তাওহীদের উপর ইনতিকাল করবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে – এর প্রমান
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫৪ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩১
৫৪। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা কর্রেন যে, তিনি বলেনঃ আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসা ছিলাম। আমাদের মধ্যে আবূ বকর ও উমর (রাঃ)-ও ছিলেন। এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্য থেকে উঠে চলে গেলেন। তিনি আমাদের মাঝে আসতে বিলম্ভ করলেন। এতে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে, আমাদের অনুপস্থিতিতে তিনি কোন বিপদে পড়লেন কিনা। আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ভীত-সন্ত্রস্তদের মধ্যে আমি ছিলাম প্রথম। তাই আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। তালাশ করতে করতে বনী নাজ্জার গোত্রের আনসারদের বাগানের কাছে পৌছলাম।
আমি বাগানের চারদিকে ঘুরে কোন দরজা পেলাম না। হঠাৎ দেখতে পেলাম বাইরের কুয়া থেকে একটি ’রবি’ (ঝরনা, প্রণালী, নালা) বাগানের ভিতর প্রবেশ করেছে। আমি নিজেকে শিয়ালের মত সংকুচিত করে প্রণালীর পথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি বললেন, আবূ হুরায়রা! আমি আরয করলাম, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অবস্থা কি? আমি আরয করলাম, আপনি আমাদের মধ্যে ছিলেন। তারপর আমাদের মধ্য থেকে উঠে চলে এলেন। আপনার ফিরতে দেরি দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে আমাদের অবর্তমানে আপনি বেশি বিপদে পড়লেন কি না? এ আশঙ্কায় আমরা সকলেই তীত হয়ে পড়লাম। আমি সর্বপ্রথম বেরিয়ে গিয়ে এ বাগানে উপস্থিত হই, আমি শিয়ালের মত সংকুচিত হয়ে এ বাগানে প্রবেশ করি। আর সেসব লোক আমার পেছনে রয়েছেন।
তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হে আবূ হুরায়রা বলে তার পাদুকা জোড়া প্রদান করলেন, আর বললেন, আমার এ পাদুকা জোড়া নিয়ে যাও এবং বাগানের বাইরে যার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দাও, যে ব্যাক্তি আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই, সে জান্নাতী হবে।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, বাইরে এসে প্রথমেই উমরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হল। তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! এ জুতা জোড়া কি? আমি বললাম, এ তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পাদুকা মুবারক। তিনি আমাকে এ দুটি দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, যার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়, সে যদি আন্তরিক বিশ্বাসে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই, তাকে যেন জান্নাতের সুসংবাদ দেই। একথা শুনে উমর (রাঃ) আমার বুকে এমন জোরে আঘাত করলেন যে, আমি পেছনে পড়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন, ফিরে যাও, হে আবূ হুরায়রা!
আমি কাঁদোকাঁদো অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খেদমতে ফিরে এলাম। আর সাথে সাথে উমরও আমার পিছনে পিছনে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবূ হুরায়রা! তোমার কি হয়েছে? আরয করলাম, উমর (রাঃ)-এর সাথে আমার দেখা হয়। আপনি যা বলে আমাকে পাঠিয়েছিলেন আমি তা উমরকে জানাই। এতে তিনি আমার বুকে আঘাত করলেন যে আমি পিছনের দিকে পড়ে যাই। তিনি আমাকে ফিরে আসতে বলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উমর! কি সে তোমাকে এ কাজে উত্তেজিত করেছে?
তিনি উত্তর দিলেনঃ হে আল্লাহর রাসুল! আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক। আপনি কি আপনার পাদুকা মুবারকসহ আবূ হুরায়রাকে পাঠিয়েছেন যে, তার সাথে যদি এমন লোকের সাক্ষাৎ হয়, যে আন্তরিকতার সাথে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। উমর (রাঃ) বললেন, এরুপ করতে যাবেন না। আমি আশঙ্কা করি যে, লোকেরা এর উপরই ভরসা করে বসে থাকবে; আপনি তাদের ছেড়ে দিন, তারা আমল করুক। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আচ্ছা, তাদের ছেড়ে দাও।
باب الدليل على أن من مات على التوحيد دخل الجنة قطعا
حَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ يُونُسَ الْحَنَفِيُّ، حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ بْنُ عَمَّارٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبُو كَثِيرٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبُو هُرَيْرَةَ، قَالَ كُنَّا قُعُودًا حَوْلَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَعَنَا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ فِي نَفَرٍ فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ بَيْنِ أَظْهُرِنَا فَأَبْطَأَ عَلَيْنَا وَخَشِينَا أَنْ يُقْتَطَعَ دُونَنَا وَفَزِعْنَا فَقُمْنَا فَكُنْتُ أَوَّلَ مَنْ فَزِعَ فَخَرَجْتُ أَبْتَغِي رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى أَتَيْتُ حَائِطًا لِلأَنْصَارِ لِبَنِي النَّجَّارِ فَدُرْتُ بِهِ هَلْ أَجِدُ لَهُ بَابًا فَلَمْ أَجِدْ فَإِذَا رَبِيعٌ يَدْخُلُ فِي جَوْفِ حَائِطٍ مِنْ بِئْرٍ خَارِجَةٍ – وَالرَّبِيعُ الْجَدْوَلُ – فَاحْتَفَزْتُ كَمَا يَحْتَفِزُ الثَّعْلَبُ فَدَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ” أَبُو هُرَيْرَةَ ” . فَقُلْتُ نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ . قَالَ ” مَا شَأْنُكَ ” . قُلْتُ كُنْتَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا فَقُمْتَ فَأَبْطَأْتَ عَلَيْنَا فَخَشِينَا أَنْ تُقْتَطَعَ دُونَنَا فَفَزِعْنَا فَكُنْتُ أَوَّلَ مَنْ فَزِعَ فَأَتَيْتُ هَذَا الْحَائِطَ فَاحْتَفَزْتُ كَمَا يَحْتَفِزُ الثَّعْلَبُ وَهَؤُلاَءِ النَّاسُ وَرَائِي فَقَالَ ” يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ” . وَأَعْطَانِي نَعْلَيْهِ قَالَ ” اذْهَبْ بِنَعْلَىَّ هَاتَيْنِ فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْحَائِطِ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ ” فَكَانَ أَوَّلَ مَنْ لَقِيتُ عُمَرُ فَقَالَ مَا هَاتَانِ النَّعْلاَنِ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ . فَقُلْتُ هَاتَانِ نَعْلاَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَعَثَنِي بِهِمَا مَنْ لَقِيتُ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ بَشَّرْتُهُ بِالْجَنَّةِ . فَضَرَبَ عُمَرُ بِيَدِهِ بَيْنَ ثَدْيَىَّ فَخَرَرْتُ لاِسْتِي فَقَالَ ارْجِعْ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ فَرَجَعْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَجْهَشْتُ بُكَاءً وَرَكِبَنِي عُمَرُ فَإِذَا هُوَ عَلَى أَثَرِي فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” مَا لَكَ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ” . قُلْتُ لَقِيتُ عُمَرَ فَأَخْبَرْتُهُ بِالَّذِي بَعَثْتَنِي بِهِ فَضَرَبَ بَيْنَ ثَدْيَىَّ ضَرْبَةً خَرَرْتُ لاِسْتِي قَالَ ارْجِعْ . فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” يَا عُمَرُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا فَعَلْتَ ” . قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي أَبَعَثْتَ أَبَا هُرَيْرَةَ بِنَعْلَيْكَ مَنْ لَقِيَ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ بَشَّرَهُ بِالْجَنَّةِ . قَالَ ” نَعَمْ ” . قَالَ فَلاَ تَفْعَلْ فَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَتَّكِلَ النَّاسُ عَلَيْهَا فَخَلِّهِمْ يَعْمَلُونَ . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” فَخَلِّهِمْ ” .
حدثني زهير بن حرب، حدثنا عمر بن يونس الحنفي، حدثنا عكرمة بن عمار، قال حدثني ابو كثير، قال حدثني ابو هريرة، قال كنا قعودا حول رسول الله صلى الله عليه وسلم معنا ابو بكر وعمر في نفر فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم من بين اظهرنا فابطا علينا وخشينا ان يقتطع دوننا وفزعنا فقمنا فكنت اول من فزع فخرجت ابتغي رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى اتيت حاىطا للانصار لبني النجار فدرت به هل اجد له بابا فلم اجد فاذا ربيع يدخل في جوف حاىط من بىر خارجة – والربيع الجدول – فاحتفزت كما يحتفز الثعلب فدخلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال ” ابو هريرة ” . فقلت نعم يا رسول الله . قال ” ما شانك ” . قلت كنت بين اظهرنا فقمت فابطات علينا فخشينا ان تقتطع دوننا ففزعنا فكنت اول من فزع فاتيت هذا الحاىط فاحتفزت كما يحتفز الثعلب وهولاء الناس وراىي فقال ” يا ابا هريرة ” . واعطاني نعليه قال ” اذهب بنعلى هاتين فمن لقيت من وراء هذا الحاىط يشهد ان لا اله الا الله مستيقنا بها قلبه فبشره بالجنة ” فكان اول من لقيت عمر فقال ما هاتان النعلان يا ابا هريرة . فقلت هاتان نعلا رسول الله صلى الله عليه وسلم بعثني بهما من لقيت يشهد ان لا اله الا الله مستيقنا بها قلبه بشرته بالجنة . فضرب عمر بيده بين ثديى فخررت لاستي فقال ارجع يا ابا هريرة فرجعت الى رسول الله صلى الله عليه وسلم فاجهشت بكاء وركبني عمر فاذا هو على اثري فقال لي رسول الله صلى الله عليه وسلم ” ما لك يا ابا هريرة ” . قلت لقيت عمر فاخبرته بالذي بعثتني به فضرب بين ثديى ضربة خررت لاستي قال ارجع . فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم ” يا عمر ما حملك على ما فعلت ” . قال يا رسول الله بابي انت وامي ابعثت ابا هريرة بنعليك من لقي يشهد ان لا اله الا الله مستيقنا بها قلبه بشره بالجنة . قال ” نعم ” . قال فلا تفعل فاني اخشى ان يتكل الناس عليها فخلهم يعملون . قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ” فخلهم ” .
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই হাদিসে বাইরে প্রথমেই উমরের সঙ্গে আবু হুরায়রার দেখা হয়। সুসংবাদের কথা শুনে উমর তাঁর বুকে এমন আঘাত করেন যে তিনি পড়ে যান। আবু হুরায়রা কাঁদোকাঁদো অবস্থায় মুহাম্মদের কাছে ফিরলে উমরও সেখানে আসেন। উমর আশঙ্কা জানান, মানুষ এই আশ্বাসে ভরসা করে বসবে; তাদের আমল করতে দেওয়া হোক। মুহাম্মদ সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেন। সুসংবাদ প্রচার থামানোর ঘোষিত কারণ ছিল মানুষের আচরণে তার সম্ভাব্য প্রভাব [7]
فَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَتَّكِلَ النَّاسُ عَلَيْهَا
বাংলা অনুবাদ: কারণ আমি আশঙ্কা করি, মানুষ এর ওপরই নির্ভর করে বসবে।
উমরের এই আশঙ্কা ঈমান ও কর্মের সম্পর্কের সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। জান্নাতের আশ্বাস মানুষকে আমলের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করে দিতে পারে—এই সম্ভাবনা হাদিসের সংলাপেই উচ্চারিত হয়েছে। মুহাম্মদ সুসংবাদ দেওয়ার নির্দেশটি নিজের বলে স্বীকার করার পরে তার প্রচার বন্ধের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ফলে বর্ণনার মধ্যে ঈমানের ভিত্তিতে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি এবং আমল চালু রাখার জন্য সেই প্রতিশ্রুতির প্রচার সীমিত করা পাশাপাশি উপস্থিত। ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে অনুসারীর জ্ঞান এখানে কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের হিসাবের অধীন। মানুষ কোন তথ্য জানলে কী করবে, সেই বিবেচনায় তার কাছে পৌঁছানো ধর্মীয় বক্তব্য বাছাই করা হচ্ছে। যে সংবাদ মুহাম্মদ নিজেই পৌঁছে দিতে বলেছিলেন, উমরের হস্তক্ষেপে তার প্রচার থেমে যায়।
একজন অনুসারীর কাছে নিজের মুক্তির শর্ত জানার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই শর্তের ভিত্তিতেই তিনি ধর্মীয় দাবি বিচার করবেন, নিজের কাজের পরিণতি বুঝবেন এবং জীবনের সিদ্ধান্ত নেবেন। অথচ এখানে অনুসারীর সিদ্ধান্তের জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রচারের ওপর বাধা এসেছে, কারণ তথ্যটি জানলে তিনি কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশিত আচরণ থেকে সরে যেতে পারেন। নৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়ার কথা সত্য জানিয়ে দায়িত্ব বোঝানো এবং অন্যকে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এই ঘটনায় মানুষকে আমলে সক্রিয় রাখার স্বার্থে তার কাছে সুসংবাদ পৌঁছানো বন্ধ করা হয়েছে। উপরন্তু, মুহাম্মদের সরাসরি নির্দেশ পালন করতে যাওয়া সংবাদবাহককে বুকে আঘাত করে ফেরানো হয়েছে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের এই প্রয়োগে মানুষের জানার অধিকার ও শারীরিক মর্যাদা অধীনস্থ হয়ে পড়ে অনুসারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যের কাছে।
পরকালীন বিচারের নৈতিক প্রশ্নটি আরও গভীর হয় ঈমানধারীর এই নিশ্চয়তার সঙ্গে অবিশ্বাসীর সৎকর্মের পরিণতি তুলনা করলে। ঈমানসহ মৃত্যুবরণকারী অপরাধীর জন্য শাস্তির পরেও জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা থাকে; কুফর অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী মানবসেবীর জন্য তাঁর সৎকর্ম সেই চূড়ান্ত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না। একজনের ক্ষেত্রে অপরাধের পরেও মুক্তির নিশ্চয়তা সংরক্ষিত, আরেকজনের ক্ষেত্রে মানুষের উপকার করার পরেও মুক্তির জন্য বিশ্বাসের শর্ত বহাল। উমরের আশঙ্কায় এই নিশ্চয়তার আচরণগত সমস্যাও ধরা পড়েছে: মানুষ তার ওপর নির্ভর করে আমলে শিথিল হতে পারে। ঘটনাটির নৈতিক তাৎপর্য তাই দ্বিমুখী—চূড়ান্ত পরিণতিতে বিশ্বাসের বিশেষ সুবিধা এবং সেই সুবিধার সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিয়ন্ত্রণ করা।
ইবনু জুদআন: মানবসেবার পরকালীন মূল্য বাতিল
ইসলাম-পূর্ব যুগের ইবনু জুদআন আত্মীয়স্বজনের হক আদায় করতেন এবং দরিদ্রদের খাবার দিতেন। তাঁর এসব সৎকর্ম পরকালে কোনো উপকার করবে কি না, আয়িশা সরাসরি মুহাম্মদকে সেই প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে মুহাম্মদ বলেন, কোনো উপকার করবে না; কারণ তিনি কখনো কিয়ামতের দিনে নিজের অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন ও দরিদ্রের উপকার করার পরও তাঁর সৎকর্মের পরকালীন গ্রহণযোগ্যতা ধর্মীয় বিশ্বাসের শর্তে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। [8]
حَدَّثَنِي أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ غِيَاثٍ، عَنْ دَاوُدَ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ ابْنُ جُدْعَانَ كَانَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ يَصِلُ الرَّحِمَ وَيُطْعِمُ الْمِسْكِينَ فَهَلْ ذَاكَ نَافِعُهُ قَالَ ” لاَ يَنْفَعُهُ إِنَّهُ لَمْ يَقُلْ يَوْمًا رَبِّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ ” .
বাংলা অনুবাদ:
৪১১। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইবনু জুদআন জাহেলী যুগে আত্নীয়-স্বজনদের হক আদায় করত এবং দরিদ্রদের আহার দিত। আখিরাতে এসব কর্ম তার উপকারে আসবে কি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন উপকারে আসবে না। সে তো কোনদিন এ কথা বলেনি যে হে আমার রব! কিয়ামতের দিন আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিও।
ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়ার মূল্য তার ক্ষুধা মেটানোয়; আত্মীয়স্বজনের অধিকার রক্ষার মূল্য তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনে। এই বাস্তব উপকার সাহায্যকারীর ধর্মবিশ্বাসের বাইরেও অর্থবহ। ইবনু জুদআনের ক্ষেত্রে সেই মানবিক মূল্যকে পরকালীন বিচারে বিশ্বাসের অধীন করা হয়েছে। দরিদ্রের উপকার করার পরও মুক্তির জন্য তাঁকে ধর্মীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। ফলে সৎকর্মের মূল্য নির্ধারণে মানুষের কল্যাণের ওপরে স্থান পেয়েছে আল্লাহ ও বিচারদিবস সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিশ্বাস।
সহিহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে এই পার্থক্যকে সাধারণ বিধান হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে মুমিনের সৎকর্মের প্রতিদান দুনিয়া ও পরকাল—উভয় জায়গায় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কাফিরের সৎকর্মের প্রতিদান দুনিয়াতেই দেওয়া হয়; পরকালে পৌঁছালে পুরস্কার পাওয়ার মতো কোনো সৎকর্ম তার জন্য অবশিষ্ট থাকে না। হাদিসটি কাফিরের কাজকেও সৎকর্ম হিসেবে উল্লেখ করছে, অথচ সেই সৎকর্মের পরকালীন প্রতিদান থেকে তাকে বঞ্চিত করছে। [9]
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّ اللَّهَ لاَ يَظْلِمُ مُؤْمِنًا حَسَنَةً يُعْطَى بِهَا فِي الدُّنْيَا وَيُجْزَى بِهَا فِي الآخِرَةِ وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُطْعَمُ بِحَسَنَاتِ مَا عَمِلَ بِهَا لِلَّهِ فِي الدُّنْيَا حَتَّى إِذَا أَفْضَى إِلَى الآخِرَةِ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَةٌ يُجْزَى بِهَا ” .
বাংলা অনুবাদ:
আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, আল্লাহ কোনো মুমিনের একটি সৎকর্মের ব্যাপারেও অবিচার করেন না। সেই কাজের জন্য তাকে দুনিয়ায় দেওয়া হয় এবং পরকালেও প্রতিদান দেওয়া হয়। আর কাফির আল্লাহর উদ্দেশ্যে যেসব সৎকর্ম করে, সেগুলোর বিনিময়ে তাকে দুনিয়াতেই ভোগ করতে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন সে পরকালে পৌঁছায়, তখন প্রতিদান পাওয়ার মতো কোনো সৎকর্ম তার অবশিষ্ট থাকে না।
অমুসলিমের সৎকর্মের প্রতিদান দুনিয়াতেই শেষ করে দেওয়ার এই বিধানে বিশ্বাসভেদে পুরস্কারের মৌলিক বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মুমিনের জন্য দুনিয়ার প্রাপ্তির পাশাপাশি পরকালীন প্রতিদান সংরক্ষিত থাকে; কাফিরের জন্য সেই পথ বন্ধ থাকে। কোরআনের সূরা ফুরকানের ২৩ নম্বর আয়াতেও কর্ম নিষ্ফল করে দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। [10]
وَقَدِمْنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُوا۟ مِنْ عَمَلٍۢ فَجَعَلْنَـٰهُ هَبَآءًۭ مَّنثُورًا
বাংলা অনুবাদ:
আর তারা যেসব কাজ করেছে, সেগুলোর দিকে আমরা অগ্রসর হব এবং সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন কাসির স্পষ্টভাবে মুশরিকদের সেই কাজগুলোর কথা বলেছেন, যেগুলোকে তারা নিজেদের মুক্তির উপায় মনে করত। তাঁর ব্যাখ্যায় এসব কাজ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হলো শরিয়তের শর্ত পূরণ না করা—ইখলাস অথবা আল্লাহর শরিয়তের অনুসরণের অভাব। অর্থাৎ কাজের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা এখানে ধর্মীয় বিধানের হাতে কেন্দ্রীভূত। [11]
فأخبر أنه لا يتحصل لهؤلاء المشركين من الأعمال – التي ظنوا أنها منجاة لهم – شيء; وذلك لأنها فقدت الشرط الشرعي ، إما الإخلاص فيها ، وإما المتابعة لشرع الله . فكل عمل لا يكون خالصا وعلى الشريعة المرضية ، فهو باطل .
বাংলা অনুবাদ:
তিনি জানিয়েছেন, এই মুশরিকরা যেসব কাজকে নিজেদের মুক্তির উপায় মনে করত, সেসব কাজ থেকে তারা কিছুই লাভ করবে না; কারণ সেগুলো শরিয়তের শর্ত পূরণ করেনি—হয় সেগুলোতে একনিষ্ঠতা ছিল না, অথবা আল্লাহর শরিয়তের অনুসরণ ছিল না। সুতরাং যে কাজ একনিষ্ঠভাবে এবং অনুমোদিত শরিয়ত অনুযায়ী করা হয় না, তা বাতিল।
ইবনু জুদআনের ঘটনায় নির্দিষ্ট একজন মানুষের দান ও দায়িত্ব পালনের পরকালীন উপকার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে; অন্য হাদিসে কাফিরের সৎকর্মের প্রতিদান দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে; ইবন কাসিরের ব্যাখ্যায় কর্ম গ্রহণের শর্ত হিসেবে ধর্মীয় বিধান অনুসরণকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই কাঠামোয় মানুষের উপকার করার নৈতিক মূল্য বিশ্বাসের অধীন। একজন মানুষের দান ক্ষুধার্তের ক্ষুধা মেটালেও, তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য না হলে সেই কাজ তাঁকে পরকালীন মুক্তি দিতে পারে না। মানবকল্যাণকে ধর্মীয় আনুগত্যের শর্তে এভাবে মূল্যহীন করে দেওয়া নৈতিক বিচারের ওপর বিশ্বাসগত বৈষম্য চাপিয়ে দেয়।
মুশরিকদের ‘নাপাক’ ঘোষণা: মানবমর্যাদার সরাসরি অবমাননা
ইসলামি শাস্ত্রে মুশরিকদের শুধু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে দেখা হয়নি; তাদেরকে সরাসরি “নাপাক” বা “অপবিত্র” হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সূরা তওবার ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মুশরিকরা অপবিত্র, তাই তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকটবর্তী না হয়। এই বক্তব্য কেবল কোনো আচারগত পবিত্রতা-অপবিত্রতার প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, পরিচয় ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাকে নৈতিকভাবে নিচু, অশুচি ও সামাজিকভাবে বর্জনযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার একটি ধর্মীয় ঘোষণা।
কোনো মানুষকে তার বিশ্বাসের কারণে “অপবিত্র” বলা শুধু ধর্মতাত্ত্বিক মতামত নয়; এটি মানবমর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। আধুনিক মানবাধিকার-চিন্তার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো—মানুষ তার জন্মগত মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের অধিকারী। সেই অর্থে একজন মানুষ ভুল বিশ্বাস করতে পারে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হতে পারে, অযৌক্তিক মতবাদে বিশ্বাস করতে পারে—এসবের সমালোচনা যুক্তি দিয়ে করা যায়। কিন্তু তাকে মানুষ হিসেবে ‘নাপাক’, ‘অশুচি’ বা ‘অস্পৃশ্য’ শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা নয়; এটি ব্যক্তির বিশ্বাসের সমালোচনা ছাড়িয়ে তার মানবিক অস্তিত্বকেই অবমাননা করে।
এই ধারণার ভয়াবহতা এখানেই যে, “মুশরিকরা নাপাক”—এই ঘোষণা শুধু একটি বিমূর্ত ধর্মীয় বাক্য হয়ে থাকে না; এর সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলও তৈরি হয়। যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে পবিত্র-অপবিত্রতার ভাষায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, তখন তাদের সঙ্গে সমান নাগরিক হিসেবে আচরণ করার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা, সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে রাখা, জিজিয়া দিয়ে অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করা, কিংবা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ মনে করা—এসবের পেছনে এই অপমানজনক ধর্মতাত্ত্বিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে। অর্থাৎ “নাপাক” শব্দটি কেবল ভাষাগত গালি নয়; এটি অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, বর্জন ও অধীনতার একটি শাস্ত্রীয় মানসিক ভিত্তি। আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে বিষয়টি জেনে নিই, [12]
আলোচ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিক ব্যক্তি অপবিত্র। সহীহ্ হাদীসে বর্ণিত রহিয়াছে, নবী করীম (সা) বলিয়াছেন: মু’মিন ব্যক্তি অপবিত্র হয় না। মুশরিক ব্যক্তির আত্মা যে অপবিত্র, উহা স্পষ্ট; কারণ, সে বাতিল ও অপবিত্র দীনের অনুসারী। মুশরিক ব্যক্তির দেহ অপবিত্র কিনা সে বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। অধিকাংশ ফকীহ্ বলেন :
মুশরিক ব্যক্তির দেহ অপবিত্র নহে। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা আহলে কিতাব জাতিসমূহের খাদ্যকে মুসলমানদের জন্যে হালাল করিয়াছেন। জাহিরী সম্প্রদায়ের কেহ কেহ বলেন : মুশরিক ব্যক্তির দেহও অপবিত্র। হাসান বসরী হইতে আশআস বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন: মুশরিক ব্যক্তির সহিত কেহ করমর্দন করিলে সে যেন অযু করে।

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকেও দেখে নেয়া যাক, [13]
বীর্য, রক্ত ইত্যাদি। এগুলো প্রকৃত অর্থেই নাপাক। শরিয়তও এগুলোকে নাপাক বলেছে। এগুলোর নাপাকি অবশ্যই বাহ্যিক। এগুলোকে মুমিন, মুশরিক সকলেই নাপাক বলে থাকে। কিন্তু এখানে মুশরিকদেরকে অপবিত্র বলা হয়েছে এ সকল কারণে নয়। তাদের নাপাকি অস্তিত্বজ ও অভ্যন্তরীণ। বাহ্যিক নাপাকি থেকে যেমন মুক্ত থাকা আবশ্যক, তেমনি অভ্যন্তরীণ নাপাকী থেকেও মুক্ত থাকা অপরিহার্য। অতএব, অংশীবাদীদের স্পর্শ থেকেও মুক্ত থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে একত্রবাস বৈধ নয়। বসতবাটিও নির্মাণ করা সমীচীন নয় তাদের বসতবাটির সঙ্গে।
হজরত আবু উবায়দা এবং জুহাক বলেছেন, এখানে নাজাসাত অর্থ নাজাসাতে গলিজা (গুরু অপবিত্রতা), নাজাসাতে খফিফা (লঘু অপবিত্রতা) নয়। ইমাম বাগবী লিখেছেন, এখানে শারীরিক অপবিত্রতার কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে বিধানগত (হুকুমী) অপবিত্রতার কথা। কোনো প্রকার ব্যাখ্যা বা কারণ উল্লেখ ব্যতিরেকেই এখানে অংশীবাদীদেরকে কেবল হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে ‘অপবিত্র’।
কাতাদা বলেছেন, কাফেরেরা এ কারণে অপবিত্র যে, তারা ওজু ও রতিকর্ম পরবর্তী গোসল কিংবা বীর্যস্খলন পরবর্তী গোসল করে না। অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকে না।
হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মুশরিকেরা কুকুরের মতো অপবিত্র। কুকুরের দেহ যেমন নাপাক, তেমনি মুশরিকদের শরীরও নাপাক। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে আবু শায়েখ ও ইবনে মারদুবিয়া লিখেছেন, রসুল স. নির্দেশ করেছেন, তোমরা অংশীবাদীদের সঙ্গে করমর্দন করলে ওজু করে নিয়ো। অথবা নির্দেশ করেছেন, হাত ধুয়ে নিয়ো। এই বিবরণটি আলেমগণের ঐকমত্যবিরোধী- তাই অগ্রহণীয়।
এরপর বলা হয়েছে- ‘সুতরাং এ বছরের পর তারা যেনো মসজিদুল হারামের নিকটে না আসে।’ হানাফী মতাবলম্বীগণ বলেছেন, এ কথার অর্থ এ বছরের পর থেকে মুশরিকেরা যেনো হজ ও ওমরা না করে। এই নির্দেশনাটির মাধ্যমে মসজিদুল হারামে তাদের প্রবেশকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তাই অন্যান্য মসজিদে তাদের প্রবেশ অসিদ্ধ নয়। ‘নিকটে না আসে’ কথাটির অর্থ এখানে-তারা যেনো মসজিদুল হারামের সন্নিকটে এসে হজ ও ওমরা না করে।

আধুনিক এপোলোজিস্টরা অনেক সময় বলেন, এখানে “নাপাক” বলতে শারীরিক অপবিত্রতা বোঝানো হয়নি, বরং আকিদাগত বা আধ্যাত্মিক অপবিত্রতা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও সমস্যাকে দূর করে না। বরং প্রশ্নটিকে আরও নগ্ন করে। কারণ শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তির আচরণের বিষয়; কিন্তু আকিদাগত অপবিত্রতা ব্যক্তির বিশ্বাস-পরিচয়ের ওপর আরোপিত স্থায়ী অবমাননা। অর্থাৎ একজন মানুষ কেবল মুসলিম নয় বলে, অথবা আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করে বলে, তাকে আধ্যাত্মিকভাবে নিকৃষ্ট ও অপবিত্র ঘোষণা করা হচ্ছে। এই ঘোষণাই মানবমর্যাদার পরিপন্থী।
মানবমর্যাদা বলতে বোঝায়—মানুষকে প্রথমে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে; তার মতবাদ, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সংস্কৃতি বা পরিচয়ের কারণে তাকে অস্তিত্বগতভাবে নীচু, অশুচি বা বর্জনযোগ্য সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না। ইসলামি শাস্ত্রে মুশরিকদের “নাপাক” ঘোষণা সেই মৌলিক নীতির বিরোধী। এটি ভিন্নমতের সমালোচনা নয়; এটি ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের মর্যাদাকেই অস্বীকার করে। তাই মুশরিকদের “নাপাক” ঘোষণাকে শুধু ধর্মীয় ভাষা বলে পাশ কাটানো যায় না; এটি ধর্মীয় বৈষম্য, সামাজিক বর্জন এবং মানবমর্যাদা লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
অমুসলিমরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী
সূরা তওবায় মুনাফিক নারী-পুরুষ এবং কাফিরদের জন্য জাহান্নামের আগুন, অভিশাপ ও স্থায়ী শাস্তির ঘোষণা রয়েছে। আয়াতে “চিরদিন থাকবে” এবং “স্থায়ী শাস্তি”—দুই ভাষাতেই দণ্ডের স্থায়িত্ব স্পষ্ট করা হয়েছে। এখানে বিশ্বাসগত অবস্থানকে এমন এক অপরাধের শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে, যার শাস্তি মানুষের সসীম জীবন পেরিয়ে অনন্তকাল চলবে। ধর্মীয় অবিশ্বাস ও অন্তহীন নির্যাতনের এই সম্পর্ক ন্যায়বিচারের অনুপাতিকতার নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। [14]
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফিরদের জন্য জাহান্নামের আগুনের ওয়া‘দা দিয়েছেন, তাতে তারা চিরদিন থাকবে, তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের উপর আছে আল্লাহর অভিশাপ, আর আছে তাদের জন্য স্থায়ী ‘আযাব।
— Taisirul Quran
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও নারীদের এবং কাফিরদের সাথে জাহান্নামের আগুনের অঙ্গীকার করেছেন, তাতে তারা চিরকাল থাকবে,ওটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শাস্তি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ওকাফিরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে, এটি তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের লা‘নত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।
— Rawai Al-bayan
মুনাফেক পুরুষ, মুনাফেক নারী ওকাফেরদেরকে আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাহান্নামের আগুনের, যেখানে তারা স্থায়ী হবে, এটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট।আর আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Allah has promised the hypocrite men and hypocrite women andthe disbelievers the fire of Hell, wherein they will abide eternally. It is sufficient for them. And Allah has cursed them, andfor them is an enduring punishment.
— Saheeh International
মিশকাতে উদ্ধৃত বর্ণনায় মুহাম্মদকে মুমিন ও মুশরিকদের নাবালেগ সন্তানদের পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই উত্তর এসেছে, তারা পিতামাতার অনুসারী হবে। আয়িশা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেছেন, নিজেদের কোনো কাজ ছাড়াই? উত্তরে মুহাম্মদ সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞানের কথা বলেছেন। প্রশ্নোত্তরের কেন্দ্রেই রয়েছে শিশুর নিজের কর্মের অনুপস্থিতি এবং পিতামাতার পরিচয়ের প্রভাব। শিশুর অপরাধ সংঘটনের আগেই তার পরিণতির সঙ্গে পারিবারিক পরিচয় জুড়ে দেওয়ার নৈতিক সংকট এখানেই। [15]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১১-(৩৩) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মু’মিনদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের (জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত ব্যাপারে) কী হুকুম? তিনি উত্তরে বললেন, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আমি বললাম, কোন (নেক) ‘আমল ছাড়াই? তিনি বললেন, আল্লাহ অনেক ভালো জানেন, তারা জীবিত থাকলে কী ‘আমল করতো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা মুশরিকদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের কী হুকুম? তিনি বললেন, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। (অবাক দৃষ্টিতে) আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন (বদ) ‘আমল ছাড়াই? উত্তরে তিনি বললেন, সে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকলে কী ‘আমল করত, আল্লাহ খুব ভালো জানেন। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৮৯। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন : হাদীসটি দু’টি সানাদে বর্ণিত যার একটি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এবারে আসুন আরেকটি হাদিস পড়ি এবং বোঝার চেষ্টা করি যে, ইসলামের এই বিষয়গুলো কেমন [16]
১১০। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার (পূর্ব-স্বামীর ঔরষজাত) দুইটি সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, যারা জাহিলিয়াতের যুগে মারা যায় (তারা জান্নাতী কি জাহান্নামী)। হুযুর জবাবে বললেন, তারা জাহান্নামে। হযরত আলী বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খাদিজার (বাচ্চাদের ব্যাপার শুনার পর) চেহারায় বিষন্ন ভাব দেখে বললেন, তুমি যদি তাদের অবস্থান দেখতে, তাহলে তুমি ওদের (বাচ্চাদের) থেকে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়তে। এরপর হযরত খাদিজা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ঔরসে আমার যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করে মারা গেছে (কাসেম ও আবদুল্লাহ, ওদের অবস্থা কি)? হুযুর বললেন, তারা জান্নাতে আছে। তারপর হুযুর বললেন, মু’মিন ও তাদের সন্তানরা জান্নাতে এবং মুশরিক ও তাদের সন্তানরা জাহান্নামে। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন (অনুবাদ): “যারা ঈমান এনেছে আর তাদের সন্তানরা তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকে (জান্নাতে) ওদের সাথে রাখবো” (সূরা তুর: ১২) (আহমাদ)।

আরও একটি হাদিস পড়ি, [17]
৪৬৩৯। মুহাম্মদ ইব্ন কাছীর (র) উম্মুল মু’মিনীন আইশা (রা) থেকে বর্ণিত। তারা বলেন: একবার নবী করীম-এর নিকট একজন আনসার বলকের লাশ আনা যায়, তার জানাযার নামায পড়ানোর জন্য। তিনি বলেন: তখন আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ। এ বালকের জন্য খোশ-খবর, যে কোন গুনাহ্-ই করেনি, আর গুনাহ্ কি, তা-ও সে জানেনা। তখন নবী বলেনঃ হে আইশা! তুমি যা বুঝেছ, আসল ব্যাপার তা নয়। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মহান আল্লাহ্ জান্নাত তৈরী করেছেন এবং তার জন্য কিছু লোকও তখন সৃষ্টি করেছেন, যখন তারা তাদের মাতা-পিতার ঔরসে ছিল। আর মহান আল্লাহ্ জাহান্নামও তৈরী করেছেন এবং তার জন্য কিছু লোকও তখন পয়দা করেছেন, যখন তারা তাদের মাতা-পিতার ঔরসে ছিল।

অমুসলিম শিশুদের পরিণতি: হাদিসের ভিন্ন বক্তব্য
শিশু জন্মের পর পরিবারের ধর্মীয় পরিচয় পায়। সেই পরিচয় নির্ধারণে তার নিজের অনুসন্ধান বা স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ তখনও তৈরি হয়নি। পিতামাতার ধর্মের কারণে শিশুকে শাস্তি দেওয়ার ধারণা তাই ব্যক্তিগত দায়ের জায়গায় জন্মগত পরিচয় বসিয়ে দেয়। অমুসলিম শিশুদের পরিণতি নিয়ে ইসলামি উৎসে একাধিক বক্তব্য রয়েছে: কোথাও তারা পিতামাতার অনুসারী, কোথাও ইবরাহিমের কাছে, আবার কোথাও তাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কাজের প্রসঙ্গ আল্লাহর জ্ঞানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একই প্রশ্নের এই ভিন্ন উত্তরগুলো শিশুর দায় ও বিচারের নীতি নিয়ে সংকট প্রকাশ করে।
সমুরা ইবনু জুনদুবের বর্ণিত দীর্ঘ স্বপ্নবিবরণে মুহাম্মদ একটি সবুজ উদ্যান, সেখানে একজন দীর্ঘকায় মানুষ এবং তাঁকে ঘিরে অসংখ্য শিশুকে দেখার কথা বলেন। পরে সেই মানুষকে ইবরাহিম হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। শিশুরা কারা, তার ব্যাখ্যার সময় মুশরিকদের সন্তানদের কথাও সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয় এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচের অংশটি সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও প্রশ্নোত্তরের ধারাবাহিক উদ্ধৃতি। [18]
وَأَمَّا الرَّجُلُ الطَّوِيلُ الَّذِي فِي الرَّوْضَةِ فَإِنَّهُ إِبْرَاهِيمُ صلى الله عليه وسلم وَأَمَّا الْوِلْدَانُ الَّذِينَ حَوْلَهُ فَكُلُّ مَوْلُودٍ مَاتَ عَلَى الْفِطْرَةِ ”. قَالَ فَقَالَ بَعْضُ الْمُسْلِمِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَوْلاَدُ الْمُشْرِكِينَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” وَأَوْلاَدُ الْمُشْرِكِينَ.
বাংলা অনুবাদ:
আর উদ্যানের সেই দীর্ঘকায় মানুষটি হলেন ইবরাহিম। তাঁর চারপাশের শিশুরা হলো ফিতরাতের ওপর মৃত্যুবরণকারী প্রত্যেক শিশু। বর্ণনাকারী বলেন, তখন কিছু মুসলিম জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল, মুশরিকদের সন্তানরাও কি? আল্লাহর রাসুল বললেন, মুশরিকদের সন্তানরাও।
বুখারির অন্য বর্ণনায় মুশরিকদের শিশুদের সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর হলো, তারা বেঁচে থাকলে কী কাজ করত, আল্লাহ তা ভালো জানেন। শিশুর নিজের সম্পাদিত কাজের প্রশ্ন এখানে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞানের দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। [19]
أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ يَقُولُ سُئِلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْ ذَرَارِيِّ الْمُشْرِكِينَ فَقَالَ ” اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا عَامِلِينَ ”.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছেন: নবীকে মুশরিকদের শিশুদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তারা কী কাজ করত, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
এই উত্তর শিশুর পরিণতির প্রশ্নকে আল্লাহর অদৃশ্য জ্ঞানের কাছে সমর্পণ করে। উদ্যানের বর্ণনায় শিশুরা ইবরাহিমের কাছে আছে; অন্য বর্ণনায় তারা পিতামাতার অনুসারী। এই উত্তরগুলোকে কেন্দ্র করে জান্নাতপ্রাপ্তি, জাহান্নামপ্রাপ্তি, সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা এবং নতুন পরীক্ষার পৃথক মত তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক মতের ভিত্তিতে রয়েছে একই ধর্মীয় সাহিত্যের ভিন্ন বর্ণনা। শিশুর নিজস্ব কাজ, তার জন্মপরিচয় এবং তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণ—এই তিনটির মধ্যে কোনটি বিচারের ভিত্তি হবে, সেই প্রশ্নে উৎসগুলোর বক্তব্য বিভক্ত।
ইবন কাসির শিশুদের পরিণতি নিয়ে এই মতভেদ নথিবদ্ধ করেছেন। খাদিজার পূর্ববর্তী দুই সন্তানকে জাহান্নামী বলার বর্ণনাটির ক্ষেত্রেও তিনি বর্ণনাকারীর পরিচয় ও সাক্ষাতের বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। তাঁর আলোচনায় বর্ণনাটির শেষ বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতের পরেই সেই মূল্যায়ন এসেছে। [20]
” إن المؤمنين وأولادهم في الجنة ، وإن المشركين وأولادهم في النار ” ثم قرأ : ( والذين آمنوا واتبعتهم ذريتهم بإيمان ألحقنا بهم ذريتهم ) [ الطور : 21 ] .
وهذا حديث غريب ؛ فإن محمد بن عثمان هذا مجهول الحال ، وشيخه زاذان لم يدرك عليا ، والله أعلم .
বাংলা অনুবাদ:
“মুমিন ও তাদের সন্তানরা জান্নাতে এবং মুশরিক ও তাদের সন্তানরা জাহান্নামে।” তারপর তিনি পড়লেন: “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদের তাদের সঙ্গে যুক্ত করব”—সূরা তুর: ২১।
এটি একটি গরিব বর্ণনা; কারণ এই মুহাম্মদ ইবনু উসমানের অবস্থা অজ্ঞাত, আর তাঁর শিক্ষক যাযান আলীকে পাননি। আল্লাহই ভালো জানেন।
সনদসংক্রান্ত আপত্তিটি বর্ণনাটি পৌঁছানোর পথের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে। ঐতিহাসিক মূল্যায়নে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বর্ণনার প্রাচীন উপস্থিতি, পাঠের সম্পর্ক, কালক্রম ও অন্য সাক্ষ্যের প্রশ্ন। এই ধর্মীয় সাহিত্যে শিশুদের পিতামাতার পরিচয় এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণের ভিত্তিতে বিচার করার ধারণা উপস্থিত রয়েছে। তার নৈতিক ফল সরাসরি: যে শিশুর নিজের কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি, তার জন্মপরিচয় বা সম্ভাব্য আচরণকে দণ্ডের ভিত্তি করা হচ্ছে। শিশুদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিণতি এবং সেগুলো মেলাতে তৈরি পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলো দায় নির্ধারণের এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। [21]
দাওয়াত না পাওয়া অমুসলিমদের কেয়ামতে পুনরায় পরীক্ষা?
ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক ও দাঈদের একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি বা যাদের শোনা-বোঝার সক্ষমতা ছিল না, তাদের কেয়ামতে পরীক্ষা নেওয়া হবে। পরীক্ষার নির্দেশ হবে আগুনে প্রবেশ করা; আদেশ মানলে সেই আগুন নিরাপদ হয়ে যাবে। মুসনাদে আহমদে এই ধারণার বর্ণনা রয়েছে, আর ইবন কাসির তা গ্রহণ করে বিভিন্ন বর্ণনা মেলানোর চেষ্টা করেছেন। এই ব্যাখ্যার মৌলিক সমস্যা পরীক্ষার সময় ও শর্তে। কেয়ামতের ময়দানে উপস্থিত মানুষ ইতিমধ্যে মৃত্যুর পরের জীবন প্রত্যক্ষ করেছে। দুনিয়ায় যে পরকাল তাদের কাছে অদৃশ্য ছিল, তখন তা সরাসরি অভিজ্ঞতা। এমন অবস্থায় আগুনে প্রবেশের আদেশ মানা হলো প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য; একে দুনিয়ায় অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনার পরীক্ষার বিকল্প করা হচ্ছে।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের সাক্ষ্য: পরীক্ষা নাকি পূর্বজ্ঞান?
ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস সংকলনগুলোতে যখন অমুসলিম শিশুদের (যারা দাওয়াত না পাওয়া মানুষের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ) পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখন নবী মুহাম্মদ কোনো ‘পুনরায় পরীক্ষা’র কথা উল্লেখ করেননি। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলকে মুশরিকদের শিশুদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন— “আল্লাহ ভালো জানেন তারা (বেঁচে থাকলে) কী আমল করত” [22]।
“আল্লাহ ভালো জানেন তারা কী কাজ করত”—এই উত্তরে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আচরণ সামনে আসে। শিশুটির জীবন সেখানেই শেষ হয়েছে; কথিত ভবিষ্যৎ কাজগুলো বাস্তবে সংঘটিত হয়নি। সেই সম্ভাব্য কাজকে দণ্ডের ভিত্তি করলে শাস্তি চলে আসে অপরাধের আগে। ব্যক্তিগত দায়ের ভিত্তি হলো ব্যক্তির সম্পাদিত কাজ ও সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যতে সে কী করতে পারত, সেই প্রশ্নে তার জীবনে বেছে নেওয়া, সংশোধন করা কিংবা কাজটি থেকে বিরত থাকার সুযোগও জড়িয়ে থাকে। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে স্থির অপরাধ ধরে বিচার করলে সেই সমস্ত সুযোগ মুছে যায়। আল্লাহর সর্বজ্ঞতার দাবি তখন বাস্তব অপরাধের হিসাবের জায়গা দখল করে।
‘চার ব্যক্তির হাদিস’ ও বর্ণনার দুর্বলতা
পুনরায় পরীক্ষার দাবির অন্যতম ভিত্তি মুসনাদে আহমদের “চার ব্যক্তির হাদিস”। আল-আসওয়াদ ইবনু সারির বর্ণনায় বধির, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অক্ষম, অতিবৃদ্ধ এবং রাসুলের বার্তাবিহীন সময়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি নিজেদের অজুহাত জানায়। তাদের কাছ থেকে আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়ে আগুনে প্রবেশের নির্দেশ দেওয়া হয়। মুসনাদের প্রচলিত ১৬৩০১ নম্বর বর্ণনাটি ইবন কাসির সূরা ইসরার ১৫ নম্বর আয়াতের তাফসিরেও এনেছেন। পরীক্ষার চূড়ান্ত শর্ত এখানে স্পষ্ট: আগুনে প্রবেশের আদেশ পালন। দুনিয়ায় ইসলাম সম্পর্কে তথ্য না পাওয়া বা বুঝতে অক্ষম হওয়ার সমস্যার সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে মৃত্যুর পরে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার আনুগত্য।
ইবন আবদিল বার এই বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোকে দুর্বল বলেছেন এবং আপত্তি তুলেছেন, পরকাল প্রতিদানের জায়গা; সেখানে নতুন কাজ ও পরীক্ষা চাপানোর অর্থ কী? ইবন কাসির তাঁর জবাবে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোর কিছু সহিহ, কিছু হাসান এবং কিছু পরস্পরের সমর্থনে শক্তিশালী বলে দাবি করেছেন। বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এই দ্বিমতের পাশাপাশি পরীক্ষার ধারণাতেই একটি স্পষ্ট পরিবর্তন রয়েছে। কেয়ামতে উপস্থিত মানুষ মৃত্যুর পরের জীবন জেনে গেছে। তখন তার কাছে পরকাল একটি প্রত্যক্ষ সত্য। তার সামনে প্রশ্ন হলো আগুনে প্রবেশের আদেশ মানবে কি না। দুনিয়ায় পরকালের অস্তিত্ব বিশ্বাস করা এবং পরকাল প্রত্যক্ষ করার পরে একটি আদেশ পালন করা—এ দুটি ভিন্ন বিষয়। “পুনরায় পরীক্ষা”র নামে ঈমানের প্রশ্নকে আসলে আনুগত্যের প্রশ্নে বদলে দেওয়া হবে।
ইবন কাসিরের তাফসিরে আহমদের সূত্রে উদ্ধৃত আল-আসওয়াদ ইবনু সারির বর্ণনায় চার ব্যক্তির প্রত্যেকের অজুহাত এবং পরীক্ষার নির্দেশ একসঙ্গে রয়েছে। [23]
أربعة يحتجون يوم القيامة : رجل أصم لا يسمع شيئا ، ورجل أحمق ، ورجل هرم ، ورجل مات في فترة ، فأما الأصم فيقول : رب ، قد جاء الإسلام وما أسمع شيئا ، وأما الأحمق فيقول : رب ، قد جاء الإسلام والصبيان يحذفوني بالبعر ، وأما الهرم فيقول : رب ، لقد جاء الإسلام وما أعقل شيئا ، وأما الذي مات في الفترة فيقول : رب ، ما أتاني لك رسول .
فيأخذ مواثيقهم ليطعنه فيرسل إليهم أن ادخلوا النار ، فوالذي نفس محمد بيده لو دخلوها لكانت عليهم بردا وسلاما
বাংলা অনুবাদ:
কিয়ামতের দিন চার ব্যক্তি অজুহাত পেশ করবে: এমন এক বধির ব্যক্তি যে কিছুই শুনতে পেত না, এক বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, এক অতিবৃদ্ধ ব্যক্তি এবং রাসুলের বার্তাবিহীন সময়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি। বধির বলবে: হে রব, ইসলাম এসেছিল, কিন্তু আমি কিছু শুনতাম না। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি বলবে: হে রব, ইসলাম এসেছিল, আর শিশুরা আমাকে গোবর ছুড়ে মারত। অতিবৃদ্ধ বলবে: হে রব, ইসলাম এসেছিল, কিন্তু আমি কিছুই বুঝতাম না। আর বার্তাবিহীন সময়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি বলবে: হে রব, আপনার কোনো রাসুল আমার কাছে আসেনি।
তখন তাদের কাছ থেকে তাঁর আনুগত্য করার অঙ্গীকার নেওয়া হবে এবং তাদের কাছে আগুনে প্রবেশের নির্দেশ পাঠানো হবে। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর শপথ, তারা তাতে প্রবেশ করলে তা তাদের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যেত।
“ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে”—এই কথার ভেতরেই একটি বড় সমস্যা চাপা পড়ে আছে: কোন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে? আবু দাউদের একটি বর্ণনায় মুহাম্মদের অনুসারীদের তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হওয়ার এবং তার মধ্যে বাহাত্তরটি জাহান্নামে ও একটি জান্নাতে যাওয়ার কথা রয়েছে। ধরা যাক, একজন অমুসলিমের কাছে এমন একটি ফেরকার প্রচারক পৌঁছালেন, যে ফেরকা এই বর্ণনার হিসাবে ভ্রান্ত। লোকটি আন্তরিকভাবে সেই প্রচারকের কথা শুনলেন, তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেন, এমনকি নিজের পুরোনো ধর্ম ছেড়ে ইসলামও গ্রহণ করলেন। তাঁর কাছে পৌঁছানো ধর্মীয় শিক্ষাকেই তিনি সত্য ইসলাম বলে চিনেছেন। এখন তাঁর বিরুদ্ধে ভুল ফেরকা অনুসরণের অভিযোগ উঠলে দায়টি কোথায় পড়বে? তিনি তো তাঁর সামনে উপস্থিত ইসলামকেই গ্রহণ করেছেন। সঠিক ধর্ম খুঁজে পাওয়ার পরে তাঁর সামনে এবার সঠিক ফেরকা খুঁজে পাওয়ার আরেকটি বাধা দাঁড়াল। একই কোরআন ও হাদিসের ভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে দুই প্রচারক যদি পরস্পরকে ভ্রান্ত বলেন, একজন নবাগতকে তখন সেই বিরোধের বিচারক হতে হবে। অথচ তাঁর ভাষাজ্ঞান, ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা ও উৎস যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এমন ব্যক্তিকে শুধু “ইসলামের দাওয়াত পেয়েছে” বলে দায়ী করলে প্রচারকের ভুল ব্যাখ্যার বোঝা শ্রোতার ওপর চাপানো হয়। আর ভুল ব্যাখ্যা পাওয়ার কারণে তাঁকেও পুনরায় পরীক্ষার যোগ্য ধরলে বিচার নির্ভর করবে বার্তার যথার্থতা ও বোঝার সুযোগের ওপর। তখন “দাওয়াত পৌঁছেছে” কথাটির সঙ্গে ঠিক কী পৌঁছেছে এবং মানুষটি তা কতটা বুঝতে পেরেছে—সেই হিসাবও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। [24]
أَلاَ إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوا عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَهِيَ الْجَمَاعَةُ
বাংলা অনুবাদ: সাবধান! তোমাদের আগের আহলে কিতাব বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। এই ধর্মীয় সম্প্রদায় তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে; বাহাত্তরটি জাহান্নামে এবং একটি জান্নাতে; সেটি হলো জামাআত।
এর চেয়েও মৌলিক প্রশ্ন হলো, কোনো দাবির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে সেই দাবি বিশ্বাস করার নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় কীভাবে? ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ইসলামের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, প্রশ্ন করলেন, প্রচারকের দেওয়া যুক্তি পরীক্ষা করলেন; কিন্তু সেই যুক্তিতে মুহাম্মদের নবুয়ত কিংবা কোরআনের ঐশ্বরিক উৎস বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ পেলেন না। প্রচারক এখানে একটি দাবি জানিয়েছেন; দাবিটির সত্যতা প্রতিষ্ঠার দায়ও তাঁর। শ্রোতার সংশয় দূর করার মতো প্রমাণ হাজির করার জায়গায় শাস্তির ঘোষণা বসালে বিশ্বাস আদায়ের উপায় হয় ভয়। একই ব্যক্তির কাছে অন্য ধর্মের প্রচারকও নিজের ধর্মকে সত্য এবং প্রত্যাখ্যানকে ভয়াবহ পরিণতির কারণ বলে হাজির করতে পারেন। তখন মানুষটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিগুলোর মধ্যে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যথেষ্ট কারণ খোঁজার এই সততাকেই যদি অবিশ্বাসের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, বিচারব্যবস্থা মানুষকে সত্য অনুসন্ধানের জন্য দণ্ডিত করছে। কোরআন ৪:১৬৫-এ রাসুল পাঠানোর উদ্দেশ্যের সঙ্গে মানুষের অজুহাত দূর করার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। সেই দাবির নৈতিক ভার বহন করতে হলে বার্তার সত্যতা বোঝার বাস্তব সুযোগ, উপস্থাপিত প্রমাণের মান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপলব্ধি বিবেচনায় আসবে। কেবল একটি ধর্মীয় দাবি কানে পৌঁছানোর ঘটনাকে চূড়ান্ত দায়ের ভিত্তি বানালে সত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সরে গিয়ে বিশ্বাস আদায়ের চাপটি শ্রোতার ওপর পড়ে। [25]
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
বাংলা অনুবাদ: সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে রাসুলদের [পাঠিয়েছি], যাতে রাসুলদের পরে আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
পুনরায় পরীক্ষার তত্ত্বকে তাই সম্পূর্ণ বার্তাবঞ্চিত ব্যক্তির উদাহরণ ছাড়িয়ে আংশিক তথ্য পাওয়া, বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা পাওয়া এবং আন্তরিক অনুসন্ধানের পরেও সংশয়ী থাকা মানুষের অবস্থার জবাব দিতে হবে। একজন জীবনে ইসলাম সম্পর্কে কিছুই শুনলেন না বলে মৃত্যুর পরে বিশেষ সুযোগ পাবেন; আরেকজন শুনলেন, প্রশ্ন করলেন, সময় ব্যয় করে অনুসন্ধান করলেন, কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ পেলেন না—শুধু পরিচিতি ঘটেছে বলে দ্বিতীয় ব্যক্তির সেই সুযোগ বন্ধ হলে অনুসন্ধানই তাঁর জন্য বাড়তি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে ভুল ফেরকার শিক্ষা গ্রহণকারী মুসলিম এবং ভুল ধর্মের শিক্ষা গ্রহণকারী অমুসলিমের বিশ্বাস গঠনের প্রক্রিয়ায় পরিবার, শিক্ষক ও সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা তুলনীয় হতে পারে। তাঁদের দায় নির্ধারণে আসবে ব্যক্তিগত সততা, উপলব্ধি, স্বাধীনতা এবং বাস্তবে পাওয়া তথ্য। “কে শুনেছে” ও “কে শোনেনি”—এই দুই ঘরে সবাইকে ভাগ করলে মানুষের অবস্থার এই পার্থক্যগুলো মুছে যায়। আবার যথার্থভাবে বোঝার সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিকেই দায়ী ধরলে সেই সুযোগের স্পষ্ট মানদণ্ড প্রয়োজন হয়: কতটুকু জ্ঞান, কেমন প্রমাণ, কতখানি স্বাধীনতা এবং কোন ব্যাখ্যার পরিচয় একটি মানুষকে শাস্তির যোগ্য করে? এই প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি ছাড়া মৃত্যুর পর আরেকটি পরীক্ষার ঘোষণা দুনিয়ার অসম সুযোগের হিসাব অমীমাংসিত রেখেই নতুন একটি আনুগত্যের শর্ত যোগ করে।
নিচের কাল্পনিক ঘটনাগুলোতে মানুষের কাছে ধর্মীয় বার্তা পৌঁছেছে বিভিন্নভাবে। প্রতিটি ঘটনায় ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের জন্য আলাদা বাস্তবতা বিবেচনা করতে হয়:
| কাল্পনিক ঘটনা | ব্যক্তির অবস্থান | পুনরায় পরীক্ষার তত্ত্বের সামনে প্রশ্ন |
|---|---|---|
| জন্মসূত্রে ভুল ফেরকার শিক্ষা | একজন মুসলিম ছোটবেলা থেকে পরিবার ও শিক্ষকের কাছে যে ইসলাম শিখেছেন, আন্তরিকভাবে সেটিই অনুসরণ করেছেন; বিচারে সেই ফেরকা ভ্রান্ত বলে গণ্য হলো। | তাঁর সামনে সঠিক ব্যাখ্যা বোঝার সুযোগ কতটুকু ছিল? উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভুলের কতখানি দায় তাঁর নিজের? |
| ধর্মান্তরের পরেও ভুল ফেরকায় যোগদান | একজন অমুসলিম সত্যের সন্ধানে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু যাঁদের মাধ্যমে ইসলাম শিখেছেন তাঁদের ফেরকাই ভ্রান্ত বলে গণ্য হলো। | নিজের পরিচিত ধর্ম ছেড়ে নতুন ধর্ম গ্রহণের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরেও তিনি কেন ভুল প্রচারকের কারণে শাস্তির মুখে পড়বেন? |
| পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় নির্দেশনা | দুই প্রচারক একই কোরআন ও হাদিস থেকে বিপরীত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন; ব্যক্তি নিজের সীমিত জ্ঞান দিয়ে একজনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। | সাধারণ শ্রোতার ওপর বিশেষজ্ঞদের বিরোধ নিষ্পত্তির কতখানি দায়িত্ব চাপানো ন্যায়সংগত? |
| দাওয়াত শোনা, যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়া | ব্যক্তি বক্তব্য বুঝেছেন ও যুক্তি পরীক্ষা করেছেন, কিন্তু দাবিটির পক্ষে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ পাননি। | তাঁর সংশয়ের দায় নির্ধারণে প্রচারকের উপস্থাপিত প্রমাণের মান কীভাবে বিচার করা হবে? |
| শুধু নাম ও শাস্তির ঘোষণা শোনা | ব্যক্তি শুনেছেন, “ইসলাম সত্য; গ্রহণ করো, নইলে জাহান্নাম”—কিন্তু ধর্মটির দাবির পক্ষে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাননি। | একটি দাবির নাম ও হুমকি শোনার ঘটনাকে পূর্ণাঙ্গ বার্তা পাওয়ার সমতুল্য ধরার ভিত্তি কী? |
| ভাষা ও অনুবাদের বাধা | ব্যক্তি মূল ভাষা জানেন না; তাঁর নাগালে থাকা অনুবাদে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের অর্থ বিকৃত হয়েছে। সেই পাঠ বিচার করেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। | অনুবাদকের ভুলের দায় শ্রোতা বা পাঠকের ওপর চাপলে ব্যক্তিগত দায়ের নীতি কোথায় থাকে? |
| অনুসন্ধানের স্বাধীনতা সীমিত | ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে শুনেছেন, কিন্তু পরিবার বা রাষ্ট্রের বাধা, হুমকি কিংবা তথ্যের নিয়ন্ত্রণে স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ অতি সীমিত। | বার্তার পরিচিতি এবং তা যাচাইয়ের কার্যকর সুযোগের এই ফারাক বিচারে কীভাবে গণনা হবে? |
| পাঠ ও অনুসন্ধান থেকে নৈতিক আপত্তি | ব্যক্তি ধর্মীয় উৎস পড়েছেন; কিছু বিধানকে অন্যায় মনে হওয়ায় সেগুলোকে ন্যায়বান ঈশ্বরের নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি। | তাঁর বিবেকনির্ভর আপত্তির সঙ্গে বিদ্বেষ বা প্রতারণার পার্থক্য কীভাবে নির্ধারিত হবে? নৈতিক আপত্তির জবাবে শাস্তি দেওয়া হলে বিচারব্যবস্থার নিজের নৈতিক ভিত্তি কী? |
তাত্ত্বিক অসঙ্গতি ও ‘অ্যাড-হক’ ব্যাখ্যার স্বরূপ
কোরআন মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে অদৃশ্যে বিশ্বাসের কথা বলেছে। পরকাল সম্পর্কে দুনিয়ার ঈমানের পরীক্ষায় মানুষ সেই অদৃশ্য অবস্থার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়। [26]
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ
বাংলা অনুবাদ:
যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
কেয়ামতে মানুষের জ্ঞানগত অবস্থা কেমন হবে, সূরা সাজদায় তা সরাসরি বলা হয়েছে। সেখানে অপরাধীরা নিজেরাই বলছে, তারা দেখেছে, শুনেছে এবং নিশ্চিত হয়েছে। দুনিয়ার অদৃশ্য পরকাল তখন তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। [27]
وَلَوْ تَرَىٰ إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ
বাংলা অনুবাদ:
তুমি যদি দেখতে, যখন অপরাধীরা তাদের রবের সামনে মাথা নত করে বলবে: হে আমাদের রব, আমরা দেখেছি ও শুনেছি; তাই আমাদের ফিরিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। নিশ্চয়ই আমরা এখন নিশ্চিত।
পুনরায় পরীক্ষার তত্ত্বে দুনিয়ার ঈমানের পরীক্ষার জায়গায় বসেছে কেয়ামতের আনুগত্যের পরীক্ষা। দুনিয়ায় মানুষকে পরকাল সম্পর্কে অদৃশ্য অবস্থায় বিশ্বাস করতে বলা হয়। কেয়ামতে সেই পরকাল তার সামনে উপস্থিত। এই দুই পরিস্থিতিতে মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তের শর্ত সম্পূর্ণ বদলে যায়। দাওয়াত না পাওয়ার সমস্যার সমাধান হিসেবে এমন একটি পরীক্ষা চাপানোয় দুটি মৌলিক অসংগতি তৈরি হয়:
কেয়ামতের ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন জানছে যে মৃত্যুর পর জীবন আছে, তখন তার কাছে পরকালের অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ জ্ঞান। সে ইতিমধ্যে সেই বাস্তবতার মধ্যে উপস্থিত। সেখানে আবার পরকাল বিশ্বাস করার পরীক্ষা নেওয়া অর্থহীন। “চার ব্যক্তির হাদিসে” তাই কার্যত অন্য একটি শর্ত বসানো হয়েছে: আগুনে প্রবেশের আদেশ পালন। যে মানুষ দুনিয়ায় বার্তা পায়নি বা তা বুঝতে সক্ষম ছিল না, তার মুক্তির শর্ত হচ্ছে পরকালে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার নির্দেশ মানা। সত্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের প্রশ্ন এখানে কর্তৃত্বের প্রতি আত্মসমর্পণের প্রশ্নে বদলে গেছে। ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার নিচের বক্তব্যে না দেখে বিশ্বাস করাকে ঈমানের পরীক্ষার বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কেয়ামতে পরকাল প্রত্যক্ষ করার পর সেই বৈশিষ্ট্যটির অবসান ঘটে; তখন অবশিষ্ট থাকে প্রকাশ্য আদেশের আনুগত্য।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভৌগোলিক সুবিধাঃ কিছু নৈতিক প্যারাডক্স
মানুষ কোন পরিবারে জন্মাবে, কোন ভাষা শিখবে এবং কোন ধর্মের কর্তৃত্বের মধ্যে বড় হবে, তা তার জীবনের প্রথম বিশ্বাসগুলোকে গড়ে তোলে। মুসলিম পরিবারে জন্মানো একজনের কাছে ইসলাম গ্রহণ স্বাভাবিক সামাজিক শিক্ষা; অন্য ধর্মের পরিবারে জন্মানো আরেকজন একই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করে। অথচ পরকালীন পুরস্কার ও দণ্ডে সেই বিশ্বাসের পার্থক্য নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। জন্মপরিবেশের এই সুবিধা ও বঞ্চনা নিচের পরিস্থিতিগুলোতে স্পষ্ট:
বিশ্বাস অর্জনের শুরুতেই মানুষ অসম অবস্থানে থাকে। কারও কাছে একটি ধর্ম সত্য হিসেবে শেখানো হয়, তার পক্ষে ভাষা ও কর্তৃত্ব সহজলভ্য থাকে; আরেকজনের কাছে সেই ধর্ম অপরিচিত, দুর্বোধ্য বা নেতিবাচক তথ্যের মাধ্যমে পরিচিত হয়। পিতামাতার প্রভাবের হাদিসও বিশ্বাসের এই সামাজিক গঠন স্বীকার করে। এমন অবস্থায় অবিশ্বাসের জন্য ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ দায়ী করা মানে তার প্রাপ্ত শিক্ষা, তথ্য ও অনুসন্ধানের সুযোগ উপেক্ষা করা। পুনরায় পরীক্ষার তত্ত্বে এই জীবনের অসমতা মেটানোর শর্ত হয় পরকালে আগুনে প্রবেশের নির্দেশ পালন। তখন মানুষের জ্ঞানগত বঞ্চনা ও সৎকর্মের মূল্যায়নের জায়গায় আরেকটি আনুগত্যের শর্ত এসে দাঁড়ায়।
পরিবারের প্রভাব: ধর্মীয় পরিচয়ের অসম সূচনা
ধর্মীয় বিশ্বাসে পারিবারিক প্রভাবের বিষয়টি হাদিসেও স্বীকৃত। আবু হুরায়রার বর্ণনায় শিশুর ফিতরাতের সঙ্গে তার পিতামাতার দেওয়া ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য করা হয়েছে। পিতামাতাই তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা মজুসি বানায়—এই বক্তব্য বিশ্বাস গঠনের সামাজিক প্রক্রিয়ার একটি সরাসরি স্বীকৃতি। [29]
أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، كَمَا تُنْتَجُ الْبَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ، هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ ”.
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরায়রা বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের ওপর জন্মায়। তারপর তার পিতামাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা মজুসি বানায়; যেমন একটি পশু পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়—তোমরা কি তাতে কোনো অঙ্গচ্ছেদ দেখতে পাও?
জন্মের পর ধর্মের ভাষা, পবিত্র গ্রন্থের মর্যাদা, আলেম বা পুরোহিতের কর্তৃত্ব এবং পুরস্কার-শাস্তির ধারণা শিশু পরিবার ও সমাজ থেকেই শেখে। মুসলিম পরিবারের শিশু যেমন সেই শিক্ষাকে সত্য বলে গ্রহণ করে, হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মের পরিবারের শিশুও নিজের প্রাপ্ত শিক্ষাকে সত্য মনে করে। হাদিসে অমুসলিম পরিচয়ের পেছনে পিতামাতার ভূমিকা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সামাজিক প্রক্রিয়ায় মুসলিম শিশুর পরিচয়ও গড়ে ওঠে। এই সমান্তরাল প্রক্রিয়ার ফলকে ধর্মীয় পরিচয় অনুসারে জান্নাত ও জাহান্নামের বিপরীত মূল্য দিলে জন্মগত সুবিধাই নৈতিক বিচারে প্রবেশ করে।
সবার হেদায়েত সম্ভব, তবু জাহান্নাম পূর্ণ করার ঘোষণা
কোরআন হেদায়েতের প্রশ্নকে মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার বাইরেও আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সূরা সাজদায় অপরাধীদের প্রত্যাবর্তনের আবেদন বর্ণনার পর প্রত্যেক ব্যক্তিকে হেদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা এবং জাহান্নাম পূর্ণ করার ঘোষণা পাশাপাশি এসেছে। [30]
وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
বাংলা অনুবাদ:
আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হেদায়েত দিতাম। কিন্তু আমার এই ঘোষণা অবধারিত হয়েছে যে, আমি অবশ্যই জিন ও মানুষ উভয় দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করব।
আয়াতটি প্রত্যেক ব্যক্তিকে হেদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহর আছে বলে ঘোষণা করছে। একই সঙ্গে এসেছে মানুষ ও জিন দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করার ঘোষণা। ফলে বিশ্বাস অর্জনের অসমতা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার অংশ। যিনি প্রত্যেককে হেদায়েত দিতে সক্ষম, তিনিই সবার ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করছেন না; পরে অবিশ্বাসের জন্য রয়েছে অন্তহীন দণ্ড। বিশ্বাসের সুযোগ, তথ্য ও উপলব্ধির শর্তের ওপর এমন ক্ষমতা থাকার ফলে এই অসমতার দায় বিচারব্যবস্থার নির্মাতার ওপরও বর্তায়। তাঁর তৈরি অসম পরিস্থিতির ফলকে মানুষের একক অপরাধ গণ্য করা ব্যক্তিগত দায়ের ধারণাকে বিকৃত করে।
সীমিত সময়ের অপরাধের জন্য অনন্ত শাস্তি
সীমিত সময়ে সংঘটিত কোনো কাজ বা “অপরাধ”-এর জন্য অনন্তকালব্যাপী শাস্তি (eternal punishment) ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ন্যায়বিচারের একটি ন্যূনতম শর্ত হলো অনুপাতিকতা (proportionality): অপরাধ যতটা গুরুতর, শাস্তিও ততটাই—অন্তত একই “মাত্রার” ভেতরে থাকতে হবে। কিন্তু মানুষের যে কোনো কাজই জীবনের সীমিত সময়ের মধ্যে সংঘটিত; তার প্রভাব, উদ্দেশ্য, ক্ষতি—সবই সীমাবদ্ধ। সেই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে অসীম (infinite) শাস্তি বসালে গাণিতিকভাবেই অনুপাত ভেঙে পড়ে: সীমিত/সসীম কিছুর বিপরীতে অসীম প্রতিদান মানে শাস্তির “মাত্রা” অপরাধের “মাত্রা”-কে চিরকাল ছাড়িয়ে যাবে। ফলে শাস্তি এখানে বিচার নয়, চিরস্থায়ী প্রতিশোধ বা প্রতিরোধহীন নিষ্ঠুরতা হয়ে দাঁড়ায়।
আরও গভীর সমস্যাটি হলো দণ্ডনীতির লক্ষ্য (purpose of punishment)। সাধারণভাবে শাস্তির ন্যায্যতা দাঁড়ায় কয়েকটি ভিত্তিতে—(ক) সংশোধন/পুনর্বাসন (rehabilitation), (খ) প্রতিরোধ (deterrence), (গ) জনসুরক্ষা/অক্ষমকরণ (incapacitation), এবং (ঘ) প্রতিদানমূলক ন্যায় (retribution)। অনন্ত শাস্তি এই চারটিরই সাথে অসঙ্গত। সংশোধনের লক্ষ্য থাকলে শাস্তির একটি “শেষ” দরকার—শাস্তি এমন হতে হবে যাতে মানুষ শিক্ষা নিয়ে বদলাতে পারে। কিন্তু অনন্ত শাস্তিতে সংশোধনের কোনো সুযোগই বাস্তবে অর্থহীন, কারণ শাস্তির শেষ নেই। প্রতিরোধের যুক্তিও দুর্বল—কারণ প্রতিরোধ যুক্তিসঙ্গত হতে হলে শাস্তির মাত্রা সমাজ-মানবমনস্তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত; “অনন্ত আগুন” ধরনের শাস্তি মানুষের কাছে বাস্তবসম্ভব শাস্তির চেয়ে ভয়ের অলৌকিক অতিরঞ্জন হয়ে দাঁড়ায়, যা যুক্তিবোধের বদলে আতঙ্ক, গুজব, এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা জন্ম দেয়। জনসুরক্ষার যুক্তিতেও অনন্তকাল অপ্রয়োজনীয়—যদি কেউ সংশোধন-অযোগ্যও হয়, তবু “অসীম শাস্তি” ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ন্যূনতম পথ কল্পনা করা সম্ভব। আর প্রতিদানমূলক ন্যায় (retribution) যদি বলা হয়, তাতেও অনুপাতিকতার শর্ত ভাঙে—কারণ সীমিত অপরাধের জন্য অসীম প্রতিদান কোনো “ন্যায়সঙ্গত বদলা” হতে পারে না; এটি নীতিগতভাবে অপরিমেয় অতিরিক্ত শাস্তি।
এখানে আরেকটি নৈতিক সমস্যা হলো দায় ও সক্ষমতার সীমা। মানুষ জ্ঞানগতভাবে সীমাবদ্ধ: সে ভুল করে, আবেগে সিদ্ধান্ত নেয়, পরিবেশ-সংস্কৃতি-শিক্ষা দ্বারা গঠিত হয়, এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার উপলব্ধি বদলায়। এমন সীমাবদ্ধ সত্তার ওপর “চিরন্তন” শাস্তি আরোপ মানে—তার সীমাবদ্ধতার ভেতরেই তাকে অসীমভাবে দায়ী করা। এটি এমন এক মানদণ্ড যেখানে মানুষ কখনোই “পর্যাপ্ত” হতে পারে না, কারণ ভুলের খেসারত কোনোদিন শেষ হবে না। আধুনিক নৈতিক দর্শনে এটিকে অনেক সময় ক্রুয়েলটি/নিষ্ঠুরতার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়: শাস্তি যদি শেষই না হয়, তবে শাস্তির যেকোনো মুহূর্তেই প্রশ্ন ওঠে—এখনও এই কষ্ট দেওয়ার ন্যায়সঙ্গত কারণ কী? একশ বছর, এক লক্ষ বছর, এক ট্রিলিয়ন বছর পরেও যদি শাস্তি অব্যাহত থাকে, তবে তা “ন্যায়” নয়—শুধু কষ্টকে চিরস্থায়ী করে রাখার একটি নিষ্ঠুর স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত।
সবশেষে, অনন্ত শাস্তির ধারণা ন্যায়বিচারের “নৈতিক সর্বোচ্চতা”র দাবিকেও দুর্বল করে। ন্যায়বিচার সাধারণত সংযমী—তার লক্ষ্য ক্ষতি কমানো, সঠিক মাপ বজায় রাখা, এবং অকারণ নিষ্ঠুরতা এড়ানো। কিন্তু অনন্ত শাস্তি এমন একটি শাস্তি-ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমা, সংশোধন, অনুপাত, করুণা—কোনোটিই শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে না। তাই সীমিত সময়ের ভুল/অপরাধের জন্য অনন্তকাল শাস্তির ধারণা নৈতিকভাবে অমানবিক এবং দার্শনিকভাবে অসংগত: এটি বিচারকে উন্নীত করে না, বরং বিচারকে ভেঙে চিরস্থায়ী নিষ্ঠুরতার রূপ দেয়।
চামড়া প্রতিস্থাপন: যন্ত্রণা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা
জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনায় দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে সচেতনভাবে যন্ত্রণা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। সূরা নিসায় চামড়া পুড়ে যাওয়ার পর নতুন চামড়া দেওয়ার উদ্দেশ্য সরাসরি বলা হয়েছে—যাতে শাস্তির স্বাদ পাওয়া অব্যাহত থাকে। [31]
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا
বাংলা অনুবাদ:
যারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছে, তাদের আমি আগুনে প্রবেশ করাব। যখনই তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, আমি তার বদলে অন্য চামড়া দেব, যাতে তারা শাস্তির স্বাদ পায়। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
পুড়ে যাওয়া চামড়া প্রতিস্থাপন করে শাস্তি ভোগের সামর্থ্য ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। “যাতে তারা শাস্তির স্বাদ পায়”—এই উদ্দেশ্য আয়াতেই স্পষ্ট। দেহ পুনর্গঠনের লক্ষ্য যন্ত্রণা অব্যাহত রাখা। সংশোধনমূলক শাস্তিতে আচরণ বদলানোর পর মুক্তির সুযোগ থাকে; এখানে পুনর্গঠিত দেহ আবার যন্ত্রণার বাহন হয়। একই মানুষকে বারবার কষ্ট পাওয়ার উপযোগী করে তোলা নির্যাতনকে ব্যবস্থাটির স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত করে।
সূরা ফাতিরের পরপর দুটি আয়াতে মৃত্যুর মাধ্যমে মুক্তি, শাস্তি লঘু হওয়া এবং ফিরে গিয়ে ভালো কাজ করার আবেদন—তিনটির পরিণতি বর্ণিত হয়েছে। প্রথমটিতে মৃত্যু ও শাস্তি কমানো অস্বীকার করা হয়েছে; পরেরটিতে সৎকর্মে ফিরে যাওয়ার আর্তির জবাবে আগের জীবন ও সতর্কবার্তার কথা বলে শাস্তি ভোগ করতে বলা হয়েছে। [32]
وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ
বাংলা অনুবাদ:
আর যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের শেষ করে দেওয়া হবে না যে তারা মরে যাবে, আর তাদের শাস্তিও কমানো হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অবিশ্বাসীকে প্রতিদান দিই।
সেখানে তারা চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব, আমাদের বের করুন; আমরা আগে যা করতাম তার বদলে সৎকর্ম করব। আমি কি তোমাদের এতটা জীবন দিইনি, যাতে উপদেশ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি উপদেশ গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করো; জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।
সূরা যুখরুফে জাহান্নামবাসীরা মালিককে সম্বোধন করে নিজেদের শেষ করে দেওয়ার আবেদন জানায়। তার জবাবেও অবস্থান অব্যাহত থাকার ঘোষণা আসে। [33]
وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ قَالَ إِنَّكُمْ مَاكِثُونَ
বাংলা অনুবাদ:
তারা ডেকে বলবে, হে মালিক, তোমার রব আমাদের শেষ করে দিন। সে বলবে, তোমরা এখানেই অবস্থান করবে।
শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষ যন্ত্রণা থেকে রেহাই চেয়ে মৃত্যু চাইছে, আর জবাবে তাকে সেখানে থেকে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হচ্ছে। চামড়া পুড়বে, নতুন চামড়া আসবে, কষ্ট চলবে—মৃত্যুর পথও বন্ধ থাকবে। সসীম জীবনের বিশ্বাসগত ভুলের শাস্তি এভাবে অন্তহীন নির্যাতনে পরিণত হয়। শাস্তির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে অপরাধ, দায় ও অনুপাতের ওপর। সেই সমস্ত সীমা ভেঙে একজনকে অনন্তকাল কষ্ট দেওয়ার বিধান চরম নিষ্ঠুরতা।
মৃত মুশরিক স্বজনের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও নিষিদ্ধ
পরকালীন শাস্তির ধর্মীয় বিভাজন জীবিত মানুষের প্রার্থনার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করে। মৃত স্বজনের প্রতি ভালোবাসা, তাঁর জীবনের উপকার কিংবা শোকাহত মানুষের ক্ষমা কামনার আকাঙ্ক্ষার ওপর ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা বসানো হয়। কোনো প্রিয়জনকে জাহান্নামী শ্রেণিতে স্থাপন করার পর তাঁর মুক্তির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে একজন বিশ্বাসীকে নিজের স্বজনের প্রতি মমতা ও ধর্মীয় আনুগত্যের মধ্যে সংঘাতের মুখে দাঁড় করানো হয়।
সূরা তওবার ১১৩ নম্বর আয়াতে নিষেধের শর্তও স্পষ্ট: সংশ্লিষ্ট মুশরিকরা জাহান্নামের অধিবাসী বলে পরিষ্কার হওয়ার পর তাদের জন্য ক্ষমা চাওয়া যাবে না, তারা নিকটাত্মীয় হলেও। পরবর্তী আয়াতে ইবরাহিমের পিতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার ঘটনাকে পূর্বপ্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত করে পরে সম্পর্কচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে। [34]
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهٌ حَلِيمٌ
বাংলা অনুবাদ:
নবী ও মুমিনদের জন্য মুশরিকদের ক্ষমা প্রার্থনা করা সংগত নয়, তারা নিকটাত্মীয় হলেও, যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী।
ইবরাহিমের নিজের পিতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা ছিল কেবল তাঁকে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতির কারণে। যখন তাঁর কাছে স্পষ্ট হলো যে সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করলেন। নিশ্চয়ই ইবরাহিম ছিলেন অত্যন্ত কাতরপ্রাণ, সহনশীল।
সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদের নিজের মায়ের কবর জিয়ারতের ঘটনায় এই সীমাটি ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও কার্যকর হতে দেখা যায়। তিনি কেঁদেছেন, তাঁর আশপাশের মানুষও কেঁদেছে; কবর জিয়ারতের অনুমতি পেয়েছেন। মায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার অনুমতি পাননি। হাদিসটি এই পৃথক অনুমতি ও নিষেধ একই ঘটনার মধ্যে বর্ণনা করে। [35]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ زَارَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم قَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ ” اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأُذِنَ لِي فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ ” .
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরায়রা বলেন, নবী তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করলেন। তিনি কাঁদলেন এবং তাঁর চারপাশের মানুষকেও কাঁদালেন। তারপর বললেন: আমি আমার রবের কাছে তাঁর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার অনুমতি চেয়েছিলাম, আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আর তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চেয়েছিলাম, আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মৃত স্বজনের চূড়ান্ত কল্যাণ কামনার ওপরও ধর্মীয় সীমানা বসানো হয়েছে। একজন মানুষ নিজের মায়ের জন্য কাঁদতে পারে, তাঁর কবর জিয়ারত করতে পারে, অথচ তাঁর ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি পায় না। ব্যক্তিগত মমতার সঙ্গে ধর্মীয় আনুগত্যের সংঘাত এই ঘটনাতেই স্পষ্ট। নিকটাত্মীয়ের পরিচিত জীবন, উপকার ও সম্পর্কের ওপর প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর বিশ্বাসের শ্রেণি। সর্বোচ্চ করুণা ও ইনসাফের দাবিদার এই ব্যবস্থায় ধর্মীয় পরিচয় ক্ষমার আবেদনকেও নিষিদ্ধ করে।
অফুরন্ত ঘৃণা বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা
ইদানীংকালের মুমিনগণ কোরআনের আরেকটি আয়াত নিয়ে এসে দাবী করে থাকেন যে, ইসলাম নাকি সকল ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থান এবং বন্ধুত্বপুর্ণ ভালবাসার সম্পর্কের ওপর খুব জোর দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে বলে! কিন্রু আসলেই কি এইসব তথ্য সত্য? ইসলাম কী অমুসলিমদের সাথে সহাবস্থান বা বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক রাখতে বলে? আসুন শুরুতেই কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক। বাংলাদেশের সবচাইতে প্রখ্যাত কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনি,
হিন্দু বৌদ্ধ বা অমুসলিমদের সম্পর্কে এই ধরণের বক্তব্য নতুন কিছু নয়। প্রায়শই বাংলাদেশের বিভিন্ন সভা সেমিনারে আলেমগণ হুঙ্কার ছেড়ে এসব কথা প্রকাশ্যেই বলেন। আসুন একটি ভিডিও দেখি,
এবারে আসুন আরও দুইটি ওয়াজ শুনে নিই,
আবু তালিব: মুহাম্মদকে রক্ষা করার পরও জাহান্নাম
আবু তালিবের ঘটনা উপকারের স্বীকৃতি এবং বিশ্বাসের কারণে শাস্তি দেওয়ার সরাসরি উদাহরণ। আব্বাস মুহাম্মদকে স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁর চাচা তাঁকে রক্ষা করতেন ও তাঁর পক্ষে দাঁড়াতেন। মুহাম্মদের জবাব হলো, আবু তালিব জাহান্নামের অগভীর আগুনে আছে; তাঁর কারণে আরও গভীর আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছে। উপকারের স্বীকৃত ফল এখানে যন্ত্রণার মাত্রা কমা, আর চূড়ান্ত অবস্থান জাহান্নাম। [36]
عَنِ الْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مَا أَغْنَيْتَ عَنْ عَمِّكَ فَإِنَّهُ كَانَ يَحُوطُكَ وَيَغْضَبُ لَكَ. قَالَ ” هُوَ فِي ضَحْضَاحٍ مِنْ نَارٍ، وَلَوْلاَ أَنَا لَكَانَ فِي الدَّرَكِ الأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ ”.
বাংলা অনুবাদ:
আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব নবীকে বললেন: আপনি আপনার চাচার কী উপকার করলেন? তিনি তো আপনাকে রক্ষা করতেন এবং আপনার পক্ষে ক্রুদ্ধ হতেন। তিনি বললেন: সে আগুনের অগভীর অংশে আছে। আমি না হলে সে আগুনের সর্বনিম্ন স্তরে থাকত।
আব্বাস আবু তালিবের রক্ষাকর্তার ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েই তাঁর পরিণতি জানতে চেয়েছেন। উত্তরে সেই উপকারীর জন্য বহাল থাকে আগুনের শাস্তি। মুহাম্মদের সঙ্গে সম্পর্ক ও সুপারিশ শাস্তির মাত্রা কমিয়েছে; আবু তালিবের নিজের মানবিক ভূমিকা তাঁকে যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করার জন্য যথেষ্ট গণ্য হয়নি। একই বিচারবর্ণনায় তাই রয়েছে উপকারের স্বীকৃতি, ব্যক্তিগত সুপারিশের সুবিধা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে দণ্ড। একজন রক্ষাকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতার এমন পরিণতি মানবিক দায়িত্ব ও ধর্মীয় আনুগত্যের মূল্যের বৈষম্য স্পষ্ট করে।
বুখারির পরবর্তী হাদিসে আবু তালিবের মৃত্যুশয্যার বিশ্বাসগত অবস্থান বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মদ তাঁকে একেশ্বরবাদের ঘোষণা দিতে বলেন, আর উপস্থিত অন্যরা পৈতৃক ধর্ম ত্যাগের প্রশ্ন তোলে। বর্ণনামতে, আবু তালিবের শেষ অবস্থান ছিল আবদুল মুত্তালিবের ধর্মে থাকা। মুহাম্মদের ক্ষমাপ্রার্থনার প্রতিশ্রুতির পর নিষেধাজ্ঞার আয়াতের উল্লেখও একই বর্ণনায় রয়েছে। [37]
أَنَّ أَبَا طَالِبٍ، لَمَّا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ دَخَلَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَعِنْدَهُ أَبُو جَهْلٍ فَقَالَ ” أَىْ عَمِّ، قُلْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ. كَلِمَةً أُحَاجُّ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ ”. فَقَالَ أَبُو جَهْلٍ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ يَا أَبَا طَالِبٍ، تَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَمْ يَزَالاَ يُكَلِّمَانِهِ حَتَّى قَالَ آخِرَ شَىْءٍ كَلَّمَهُمْ بِهِ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ” لأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أُنْهَ عَنْهُ ”. فَنَزَلَتْ {مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ} وَنَزَلَتْ {إِنَّكَ لاَ تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ}
বাংলা অনুবাদ:
আবু তালিবের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে নবী তাঁর কাছে এলেন। সেখানে আবু জাহলও ছিল। তিনি বললেন: হে চাচা, “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই” বলুন; এমন একটি কথা, যা দিয়ে আল্লাহর কাছে আপনার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে পারব। আবু জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া বলল: হে আবু তালিব, আপনি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন? তারা তাঁকে বলতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে তাঁর শেষ কথা ছিল, তিনি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের ওপর আছেন। নবী বললেন: আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্ত আমি অবশ্যই আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তখন নাজিল হলো: “নবী ও মুমিনদের জন্য মুশরিকদের ক্ষমাপ্রার্থনা করা সংগত নয়, তারা নিকটাত্মীয় হলেও, যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী।” আরও নাজিল হলো: “তুমি যাকে ভালোবাস, তাকে হেদায়েত দিতে পারো না।”
আবু তালিবের সবচেয়ে হালকা শাস্তির বিবরণও ভয়াবহ: তাঁর পায়ের দুই জুতার উত্তাপে মস্তিষ্ক ফুটতে থাকবে। সহিহ মুসলিম এই যন্ত্রণাকেই জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। [38]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” أَهْوَنُ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا أَبُو طَالِبٍ وَهُوَ مُنْتَعِلٌ بِنَعْلَيْنِ يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ ” .
বাংলা অনুবাদ:
ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: জাহান্নামবাসীদের মধ্যে আবু তালিবের শাস্তি সবচেয়ে হালকা। তার পায়ে থাকবে দুই জুতা, যার কারণে তার মস্তিষ্ক ফুটতে থাকবে।
নিজের জীবন ও নিরাপত্তায় উপকার করা একজন মানুষের জন্যও এই বর্ণনায় চূড়ান্ত ফল শাস্তি। পৈতৃক বিশ্বাস ত্যাগ না করার সঙ্গে মস্তিষ্ক ফুটতে থাকার মতো নির্যাতনের সম্পর্ক অপরাধ ও শাস্তির অনুপাতের প্রশ্নকে প্রকট করে। একটি ধর্মের সত্যতা মেনে না নেওয়া এবং মানুষের প্রতি বাস্তব দায়িত্ব পালন—এই দুইয়ের মূল্যায়নে বিশ্বাস এমন প্রাধান্য পেয়েছে যে, স্বীকৃত রক্ষাকর্তাকেও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। মানবিক উপকারের এই সীমাবদ্ধ গ্রহণযোগ্যতা ধর্মীয় আনুগত্যের বাইরে সৎকর্মের অবস্থান স্পষ্ট করে।
ম্যান্ডেলা আর লাদেন, কে জান্নাতে যাবে?
ধরা যাক, নেলসন ম্যান্ডেলা, যিনি কালো মানুষের অধিকারের জন্য সারা জীবন লড়াই করেছেন, তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল অমুসলিম হওয়ার কারণে চিরস্থায়ী শাস্তির যোগ্য। অপরদিকে, ওসামা বিন লাদেন, যিনি হাজার হাজার নিরীহ মানুষের হত্যার জন্য দায়ী, ইসলামী দৃষ্টিতে তওবা করলে বা কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলে জান্নাত লাভ করবে। এই ধরনের মূল্যবোধ কীভাবে ন্যায়বিচারের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারে? নিচের মানুষ দুইজনার দিকে তাকিয়ে বলুন তো, এদের মধ্যে কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী?
হিটলার ও গান্ধীর উদাহরণ ব্যবহার করে চিন্তা করলে দেখা যায়, বিশ্বাস বনাম কর্মের মধ্য কোনটি আসলে জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে জরুরি, সে সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে: এক ব্যক্তির পুরো জীবনের নৈতিকতা, মানবতার প্রতি তার অবদান, এবং তার কর্মের প্রভাব কী শুধুমাত্র তার সঠিক অন্ধবিশ্বাসের কারণে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে? ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ যদি মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, বা মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি মনে তওবা করে এবং ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তার পূর্ববর্তী সমস্ত পাপ ক্ষমা হয়ে যায়। অন্যদিকে, একজন নীতিবান ও মানবতাবাদী ব্যক্তি, যিনি সারা জীবন ন্যায়, সততা ও মানবসেবার জন্য কাজ করেছেন, যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ না করেন, তবে তাকে চিরস্থায়ী শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

হলি আর্টিজানের নৃশংস হত্যাকারীরা কোথায় যাবে?
২০১৬ সালের ১ জুলাই, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সেদিন ঢাকার গুলশানের অভিজাত এলাকা হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটেছিল এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড, যা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যা আনুমানিক পৌনে নয়টা। পাঁচজন সশস্ত্র জঙ্গি ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে রেস্তোরাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো চাপাতি এবং বিস্ফোরক দ্রব্য। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দমুখর পরিবেশ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। আগত অতিথিদের জিম্মি করে তারা শুরু করে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।
জঙ্গিরা রেস্তোরাঁর অতিথি ও কর্মীদের জিম্মি করে। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের বিবরণে কোরআন পাঠ করিয়ে ধর্মীয় পরিচয় যাচাই এবং সেই পরিচয় অনুসারে পৃথক আচরণের কথা এসেছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয় ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র। ইতালিতে নিহতদের ময়নাতদন্তে নির্যাতন, অঙ্গহানি, ধারালো অস্ত্রের আঘাত, গুলি ও বিস্ফোরকের চিহ্ন পাওয়া যায়। ভুক্তভোগীরা একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বাছাই ও নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মানুষের জীবন ও মর্যাদার ওপর বিশ্বাসের পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার বাস্তব পরিণতি এই হত্যাকাণ্ডে দৃশ্যমান।
কোরআন পাঠ করিয়ে ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের বিবরণ হাসনাত করিমের পিতা রেজাউল করিম তাঁর ছেলের অভিজ্ঞতার সূত্রে ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন। ২ জুলাই ২০১৬-এর প্রতিবেদনে সেই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। [39]
Those who could recite a verse or two were spared. The others were tortured.
বাংলা অনুবাদ:
যারা এক-দুটি আয়াত পাঠ করতে পেরেছিল, তাদের রেহাই দেওয়া হয়েছিল। অন্যদের নির্যাতন করা হয়েছিল।
জিম্মিদশা চলতে থাকে রাতভর। পরদিন সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো দলের “অপারেশন থান্ডারবোল্ট”-এর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। অভিযানের শেষে ২০ জন জিম্মির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়; নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় ও ৩ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। হামলা মোকাবিলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করে জিম্মিদের পৃথক করা এবং ভুক্তভোগীদের ওপর নির্যাতন এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ভয়াবহ উদাহরণে পরিণত করে। ইতালীয় নিহতদের ময়নাতদন্তের সংবাদে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু এবং অঙ্গহানির কথা রয়েছে। পরকালীন বিচারে এই ঘটনার নৈতিক প্রশ্ন হলো, বিশ্বাসী হত্যাকারীর অপরাধ এবং অবিশ্বাসী ভুক্তভোগীর জীবন একই মানদণ্ডে মূল্য পাবে কি না। ঈমানধারী অপরাধীর জন্য শেষ পর্যন্ত মুক্তির পথ রাখা হয়েছে, আর কুফর অবস্থায় মৃত্যুর জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী দণ্ডের ঘোষণা। সেই বিধানে ভুক্তভোগীর নৈতিক জীবনের ওপর তার বিশ্বাসের পরিচয় প্রাধান্য পায়। হত্যাকারী সাময়িক শাস্তির পর মুক্ত হতে পারে, অথচ অবিশ্বাসী মানুষের জন্য ঘোষিত দণ্ড অন্তহীন। [40]
ইতালীয় সংবাদ সংস্থা আনসা ময়নাতদন্তকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিহত নয় ইতালীয় নাগরিকের ধীর ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। সংবাদে নির্যাতন, ধারালো অস্ত্রের আঘাত, অঙ্গহানি এবং গুলি ও বিস্ফোরকের চিহ্নের বিবরণও রয়েছে। [41]
The nine suffered a slow, agonising death and were not given a coup de grace, pathologists said.
বাংলা অনুবাদ:
ময়নাতদন্তকারীরা বলেছেন, ওই নয়জনের মৃত্যু হয়েছে ধীরে ও যন্ত্রণার মধ্যে; তাঁদের মৃত্যু দ্রুত ঘটিয়ে যন্ত্রণা শেষ করার মতো চূড়ান্ত আঘাত দেওয়া হয়নি।


এই অমুসলিমরাও চিরস্থায়ী জাহান্নামী
ওষুধ ও চিকিৎসাজগতে মানুষের গবেষণা কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। নিচের বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের আবিষ্কার হিন্দু, মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও অবিশ্বাসী—সবার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অসুখ সারানো ও জীবনরক্ষার এই বাস্তব সাফল্য মানবকল্যাণের প্রত্যক্ষ অবদান। অথচ ইসলামি পরকালতত্ত্বে কুফর অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর এমন সৎকর্মও চূড়ান্ত মুক্তির জন্য যথেষ্ট গণ্য হয় না। মানবকল্যাণের ওপর ধর্মীয় আনুগত্যের এই প্রাধান্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের উদাহরণে বিশেষভাবে স্পষ্ট: একজন মানুষের শ্রমে অসংখ্য প্রাণ বাঁচলেও তার পরকালীন মুক্তির জন্য আলাদা বিশ্বাসগত শর্ত বসানো হচ্ছে।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং: স্কটিশ ব্যাকটেরিয়োলজিস্ট, ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন, যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রথম কার্যকরী অ্যান্টিবায়োটিক। অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে একটি জীবন রক্ষাকারী ঔষধ। এর গুরুত্ব কতটা, তা সারা পৃথিবীতে শুধু একদিন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন ও সরবরাহ না হলেই বোঝা যাবে। সারা পৃথিবী জুড়ে সেদিন এক ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দেবে।
হারমোন নর্থ্রপ মর্স: আমেরিকান রসায়নবিদ, ১৮৭৭ সালে প্যারাসিটামল (অ্যাসিটামিনোফেন) প্রথম সংশ্লেষণ করেন, যা ব্যথা ও জ্বর উপশমে ব্যবহৃত হয়। প্যারাসিটামল উৎপাদনের মাত্রা জানলেই আপনি বুঝতে পারবেন, এটি নিঃসন্দেহে সারা পৃথিবীতে সবচাইতে জরুরি ঔষধের একটি।


ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং এবং চার্লস বেস্ট: কানাডীয় বিজ্ঞানী, ১৯২০-এর দশকে ইনসুলিন আবিষ্কার করেন, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা। ডায়াবেটিকসের রোগী মাত্রই জানেন, এটি আসলে কী জিনিস।
এডওয়ার্ড জেনার: ইংরেজ চিকিৎসক, ১৭৯৬ সালে গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে এই সারা পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে, এই মারণব্যাধির নির্মূলে সহায়তা করে।


জোনাস সাল্ক: আমেরিকান ভাইরোলজিস্ট, ১৯৫৫ সালে পোলিও টিকা উন্নয়ন করেন, যা পোলিও রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। পোলিও কি এবং এটি কতটা মারাত্মক, তা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না। এই জীবনরক্ষাকারী অবদানও ঈমানের শর্ত পূরণ না হলে পরকালীন মুক্তির জন্য যথেষ্ট গণ্য হয় না—ধর্মীয় বিচারনীতির নৈতিক সংকট এখানেই।
অপরাধ, ক্ষমা, এবং জান্নাতের বৈষম্য
ধরুন, পাঁচজন মুসলিম পুরুষ মিলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক হিন্দু নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করল। নারীটি সৎ জীবন যাপন করতেন, অন্য মানুষের উপকার করতেন এবং ইসলাম সম্পর্কে জেনেও নিজের বিশ্বাসে থাকতেন। অপরাধীরা শেষ বয়সে ধর্মীয় আচার পালন করে ঈমানসহ মৃত্যুবরণ করল। এখানে নারীটির ওপর সংঘটিত অপরাধ স্পষ্ট, অপরাধীদের দায়ও স্পষ্ট। অথচ পরকালীন মুক্তির বিধানে প্রবেশ করে আরেকটি মানদণ্ড: ভুক্তভোগীর অবিশ্বাস এবং অপরাধীদের ঈমান। কুফর অবস্থায় মৃত্যুর জন্য নারীটির ওপর চিরস্থায়ী দণ্ডের বিধান প্রযোজ্য করা হয়; অপরাধীদের জন্য শাস্তির পরও শেষ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশের পথ থাকে। ফলে চূড়ান্ত পরিণতিতে ভুক্তভোগীর সৎ জীবন ও তাঁর ওপর সংঘটিত অন্যায়ের চেয়ে বিশ্বাসগত পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়ায়। যে বিশ্বাস অপরাধীর মুক্তির পথ সংরক্ষণ করে, তার অনুপস্থিতিই অবিশ্বাসী ভুক্তভোগীর অন্তহীন শাস্তির ভিত্তি হয়। ব্যক্তিগত দায়, মানুষের উপকার এবং অপরাধের ভয়াবহতার ওপর এভাবে ধর্মীয় আনুগত্যকে বসানো ন্যায়বিচারের মৌলিক বৈষম্য।
ন্যায়বিচারের ভিত্তি ব্যক্তিগত দায়, অপরাধের গুরুত্ব, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার এবং সমান মানদণ্ডে বিচার। শাস্তি, ক্ষমা ও পুনর্বাসনের মূল্যায়নও এই নীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্মীয় পরিচয় অনুসারে একজনের জন্য অন্তহীন দণ্ড এবং আরেকজনের জন্য চূড়ান্ত মুক্তির পথ নির্ধারণ করলে একই নৈতিক মানদণ্ড ভেঙে যায়। বিশ্বাসী অপরাধী ও অবিশ্বাসী মানবতাবাদীর ক্ষেত্রে ভিন্ন চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ সেই ভাঙনেরই প্রকাশ। ধর্মীয় আনুগত্য এখানে মানুষের কাজ ও দায়ের ওপর বিশেষ সুবিধা তৈরি করছে।
মুসলিমের মুক্তিপণ হিসেবে ইহুদি ও খ্রিস্টান
ইসলামি পরকালবর্ণনার কিছু হাদিসে মুসলিমের মুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের জাহান্নামে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করে। এখানে ব্যবহার করা হয়েছে মুক্তি, মুক্তিপণ ও স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ভাষা। একজন মানুষের চূড়ান্ত পরিণতির বর্ণনায় অন্য ধর্মের মানুষকে তার মুক্তির উপায় হিসেবে উপস্থাপন করাই একটি স্বতন্ত্র নৈতিক সমস্যা: ধর্মীয় গোষ্ঠী অনুসারে মানুষের ভূমিকা নির্ধারিত হচ্ছে—একজন মুক্তিপ্রাপ্ত, আর অন্যজন সেই মুক্তির প্রতিস্থাপক।
আবু মুসার বর্ণিত হাদিসে প্রত্যেক মুসলিমের কাছে একজন ইহুদি বা খ্রিস্টানকে দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তির কথা বলার বিবরণ রয়েছে। মূল আরবিতে ব্যবহৃত শব্দ “ফিকাক”—মুক্তি বা মুক্তিপণের ধারণা। [42]
عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ دَفَعَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا فَيَقُولُ هَذَا فَكَاكُكَ مِنَ النَّارِ ” .
বাংলা অনুবাদ:
আবু মুসা বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের কাছে একজন ইহুদি বা খ্রিস্টানকে দেবেন এবং বলবেন, এই হলো জাহান্নাম থেকে তোমার মুক্তিপণ।
আবু বুরদা তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত এই হাদিসে মুসলিমের “স্থলে” ইহুদি বা খ্রিস্টানকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর কথা বলেছেন। উমর ইবনু আবদুল আজিজ বর্ণনাটি শুনে তার নববী সূত্র সম্পর্কে শপথ করিয়ে নিশ্চিত হয়েছিলেন—এমন বিবরণও এর সঙ্গে রয়েছে। [43]
عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ يَمُوتُ رَجُلٌ مُسْلِمٌ إِلاَّ أَدْخَلَ اللَّهُ مَكَانَهُ النَّارَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا ” . قَالَ فَاسْتَحْلَفَهُ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ بِاللَّهِ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ أَنَّ أَبَاهُ حَدَّثَهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَحَلَفَ لَهُ – قَالَ – فَلَمْ يُحَدِّثْنِي سَعِيدٌ أَنَّهُ اسْتَحْلَفَهُ وَلَمْ يُنْكِرْ عَلَى عَوْنٍ قَوْلَهُ .
বাংলা অনুবাদ:
তাঁর পিতার সূত্রে নবী থেকে বর্ণিত: কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে না, যার স্থলে আল্লাহ একজন ইহুদি বা খ্রিস্টানকে জাহান্নামে প্রবেশ করান না। বর্ণনাকারী বলেন, উমর ইবনু আবদুল আজিজ তাঁকে সেই আল্লাহর নামে তিনবার শপথ করতে বললেন, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—তাঁর পিতা আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন কি না। তিনি শপথ করলেন। বর্ণনাকারী আরও বলেন, সাঈদ আমাকে শপথ করানোর বিষয়টি বলেননি, তবে আওনের বক্তব্য অস্বীকারও করেননি।
ব্যক্তিগত দায় সম্পর্কে কোরআনের ঘোষণায় প্রত্যেকের কর্মের দায় তার নিজের এবং কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না বলা হয়েছে। মানুষের মুক্তি ও দণ্ডের সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতিস্থাপনের ভাষা এই ব্যক্তিগত দায়ের নীতির সম্পর্ক নিয়ে ব্যাখ্যার প্রশ্ন তৈরি করে। [44]
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ مَرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ
বাংলা অনুবাদ:
বলো, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য রব খুঁজব, অথচ তিনিই সবকিছুর রব? প্রত্যেক ব্যক্তি যা অর্জন করে তার দায় তার নিজের ওপরই বর্তায়। কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। তারপর তোমাদের রবের কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন; যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে, তিনি তা তোমাদের জানিয়ে দেবেন।
নববীর ব্যাখ্যায় অমুসলিমদের নিজেদের কুফর ও পাপের শাস্তিই মুসলিমের মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য হয়েছে। তিনি জাহান্নামের নির্ধারিত সংখ্যা পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে মুসলিমের মুক্তির সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। কাফিরদের জাহান্নামে প্রবেশের মাধ্যমে সেই সংখ্যা পূর্ণ হয় এবং তারা মুসলিমদের মুক্তিপণের ভূমিকায় আসে। [45]
معنى ( فكاكك من النار ) أنك كنت معرضا لدخول النار ، وهذا فكاكك ; لأن الله تعالى قدر لها عددا يملؤها ، فإذا دخلها الكفار بكفرهم وذنوبهم صاروا في معنى الفكاك للمسلمين .
বাংলা অনুবাদ:
“জাহান্নাম থেকে তোমার মুক্তিপণ”—এর অর্থ হলো, তুমি জাহান্নামে প্রবেশের আশঙ্কায় ছিলে, আর এটি তোমার মুক্তির উপায়। কারণ আল্লাহ জাহান্নাম পূর্ণ করার জন্য একটি সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন। কাফিররা নিজেদের কুফর ও পাপের কারণে সেখানে প্রবেশ করলে তারা মুসলিমদের মুক্তিপণের অর্থে পরিণত হয়।
নববীর ব্যাখ্যা ধর্মীয় গোষ্ঠীভিত্তিক দুটি ভূমিকা নির্ধারণ করে: মুসলিম মুক্তি পায়, আর অমুসলিমের শাস্তি সেই মুক্তির উপায় হিসেবে গণ্য হয়। একজন মানুষের নির্যাতন এখানে আরেকজনের মুক্তির সুসংবাদ। ব্যক্তির নিজের কাজের দায়ের নীতির পাশে অন্য ধর্মের মানুষকে প্রতিস্থাপক হিসেবে হাজির করা হয়েছে। এই বিন্যাসে বিশ্বাসীর দিক থেকে অমুসলিমের যন্ত্রণা লাভজনক ঘটনায় পরিণত হয়। মানুষের সমান মর্যাদার পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয় বিচারবর্ণনার কেন্দ্রীয় বিভাজন হয়ে দাঁড়ায়।
ঐশ্বরিক মালিকানা দিয়ে অন্যায়ের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া
কোনো বিচারব্যবস্থাকে ন্যায়সঙ্গত বলার অর্থ তার সিদ্ধান্তকে অপরাধ, দায়, ক্ষতি ও শাস্তির অনুপাতের মানদণ্ডে পরীক্ষা করা। বিচারকের যেকোনো সিদ্ধান্তকেই সংজ্ঞাগতভাবে ন্যায় বলে ধরে নিলে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য যাচাইয়ের স্বাধীন ভিত্তি বিলুপ্ত হয়। আশআরী ধর্মতত্ত্বের একটি প্রভাবশালী উপস্থাপনায় গাজালি এই সমস্যাকে সৃষ্টির ওপর আল্লাহর মালিকানার ভিত্তিতে সমাধান করতে চেয়েছেন: সৃষ্টিকে পূর্বাপর অপরাধ বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই যন্ত্রণা দেওয়াও তাঁর জন্য সম্ভব ও বৈধ, কারণ তিনি নিজের মালিকানার মধ্যে কাজ করছেন।
গাজালির ইহইয়াউ উলুমিদ্দিনের “কাওয়াইদুল আকাইদ” অংশের ষষ্ঠ মূলনীতিতে পূর্ববর্তী অপরাধ ও পরবর্তী প্রতিদান ছাড়াই সৃষ্টিকে যন্ত্রণা দেওয়ার অধিকার আল্লাহর আছে বলা হয়েছে। মুরতাদা যুবাইদির শরহে সংরক্ষিত মূল পাঠে এই অধিকারের ভিত্তি হিসেবে আল্লাহর মালিকানা এবং অন্যায়ের একটি বিশেষ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। [46]
أن لله عز وجل إيلام الخلق وتعذيبهم من غير جرم سابق ومن غير ثواب لاحق خلافا للمعتزلة لأنه متصرف في ملكه ولا يتصور أن يعدو تصرفه ملكه والظلم هو عبارة عن التصرف في ملك الغير بغير إذنه وهو محال على الله تعالى ; فإنه لا يصادف لغيره ملكا حتى يكون تصرفه فيه ظلما
বাংলা অনুবাদ:
মুতাজিলাদের মতের বিপরীতে, পূর্ববর্তী কোনো অপরাধ এবং পরবর্তী কোনো প্রতিদান ছাড়াই সৃষ্টিকে যন্ত্রণা ও শাস্তি দেওয়ার অধিকার আল্লাহর রয়েছে। কারণ তিনি নিজের মালিকানার মধ্যে কার্য পরিচালনা করেন; তাঁর কার্য তাঁর মালিকানার বাইরে যাবে, তা কল্পনাও করা যায় না। অন্যায় হলো অন্যের মালিকানায় তার অনুমতি ছাড়া হস্তক্ষেপ করা, আর আল্লাহর ক্ষেত্রে তা অসম্ভব; কারণ তিনি এমন কিছু পান না যা অন্য কারও মালিকানায় রয়েছে, যাতে তাঁর হস্তক্ষেপ অন্যায় হতে পারে।
গাজালির সংজ্ঞায় ন্যায়ের নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায় মালিকানা। ভুক্তভোগীর যন্ত্রণা, অপরাধহীনতা, শাস্তির অনুপাত এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্নগুলো সেই সংজ্ঞার বাইরে পড়ে। ফলে একই নির্যাতন মালিকানার দাবি দিয়ে বৈধ হয়ে যায়। কোনো সচেতন সত্তাকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা এবং তাকে যন্ত্রণা দেওয়ার নৈতিক অধিকারকে এক করে ফেলা হয়েছে। এই যুক্তিতে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারীর কাজ আগেই ন্যায় হিসেবে অনুমোদিত; তারপর সেই কাজের ফল হিসেবে সৃষ্টির যত কষ্টই হোক, তা সংজ্ঞার সুরক্ষা পায়। বিচারকের ক্ষমতাকেই ন্যায়ের মানদণ্ড বানানো স্বেচ্ছাচারিতাকে ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা দেয়।
উপসংহার: বিশ্বাসের একাধিপত্য ও ইনসাফের নৈতিক সংকট
ইসলামি পরকালতত্ত্বে চূড়ান্ত মুক্তির নির্ধারক শর্ত ঈমান। কুফর অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর সৎকর্ম পরকালীন মুক্তির জন্য বাতিল হয়, আর ঈমানধারী পাপীর জন্য শাস্তির পরও জান্নাতের পথ খোলা থাকে। এই বিভাজন ব্যক্তিগত দায়, মানুষের বাস্তব উপকার এবং সমান মানদণ্ডে বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জন্মপরিবেশ ও তথ্যের অসম প্রাপ্যতা বিশ্বাস অর্জনের সুযোগেও বৈষম্য তৈরি করে। শিশুদের পরিণতি নিয়ে ভিন্ন বর্ণনা এবং বার্তাবঞ্চিত মানুষের জন্য আগুনের পরীক্ষার মত সেই বিচারিক সংকটের আরও প্রকাশ। কেয়ামতে পরকাল প্রত্যক্ষ করার পর ঈমানের পরীক্ষার জায়গায় বসে কর্তৃত্বের আনুগত্যের পরীক্ষা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: ইসলামি পরকালীন বিচারে বিশ্বাসের সীমানা মানুষের কাজ ও চূড়ান্ত পরিণতির অসম মূল্য নির্ধারণ করে। অবিশ্বাসী মানবতাবাদীর সৎকর্মের ওপর বসে ঈমানের শর্ত, আর পাপী বিশ্বাসীর জন্য থাকে শেষ পর্যন্ত মুক্তির সুযোগ। জন্মগত পরিবেশ ও তথ্যের বৈষম্য বিশ্বাস অর্জনের সুযোগকে আরও অসম করে। কেয়ামতের আগুনের পরীক্ষায় সেই বঞ্চনার সমাধান হিসেবে চাপানো হয় প্রকাশ্য কর্তৃত্বের আনুগত্য। সসীম জীবনের অবিশ্বাসের জন্য অন্তহীন যন্ত্রণা অপরাধ ও শাস্তির অনুপাত ভেঙে দেয়। গাজালির মালিকানাভিত্তিক ন্যায়ের সংজ্ঞা বিচারকের ক্ষমতাকে ন্যায়ের বিকল্প করে তোলে। এই ব্যবস্থায় মানুষের সমান মর্যাদা, ব্যক্তিগত দায় এবং মানবিক কাজের স্বাধীন মূল্য ধর্মীয় আনুগত্যের অধীন হয়ে পড়ে।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৬৮ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬৪৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০০১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫৮২৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ২২; ঈমানের কারণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ↩︎
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, আন্তর্জাতিক নম্বর ৩১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন নম্বর ৫৪ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ৩১; উমরের আপত্তির কারণ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক নম্বর ২১৪; ইসলামিক ফাউন্ডেশন নম্বর ৪১১ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮০৮ক ↩︎
- সূরা আল-ফুরকান ২৫:২৩ ↩︎
- তাফসির ইবন কাসির, সূরা আল-ফুরকান ২৫:২৩-এর ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৫৬৩, ৫৬৪ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৮ ↩︎
- সূরা তওবা, আয়াত ৬৮ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস: ১১১ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৪ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৭০৪৭; স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ইবরাহিম ও শিশুদের প্রসঙ্গ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৪ ↩︎
- তাফসির ইবন কাসির, সূরা আল-ইসরা ১৭:১৫; খাদিজার দুই সন্তানসংক্রান্ত বর্ণনার আলোচনা ↩︎
- “জইফ হাদিস”- কথাটি কতটা সহিহ আর কতটা জইফ? ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিসঃ ১৩৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৬৫৯ ↩︎
- তাফসির ইবন কাসির, সূরা আল-ইসরা ১৭:১৫; আহমদের সূত্রে আল-আসওয়াদ ইবনু সারির বর্ণনা ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৫৯৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১৬৫ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আস-সাজদা ৩২:১২ ↩︎
- কোরআন ১৭:১৫ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৫৯; আবু হুরায়রার বর্ণিত ফিতরাতের হাদিস ↩︎
- কোরআন, সূরা আস-সাজদা ৩২:১৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৫৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা ফাতির ৩৫:৩৬–৩৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৭৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা আত-তওবা ৯:১১৩–১১৪ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৭৬খ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮৮৩; আবু তালিবের প্রসঙ্গ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮৮৪; মৃত্যুশয্যার কথোপকথন ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১২ ↩︎
- The Daily Star, ২ জুলাই ২০১৬: Those who could cite Quran were spared ↩︎
- Autopsy finds Italian victims of Dhaka attack were tortured ↩︎
- ANSA, ৬ জুলাই ২০১৬: Dhaka victims mutilated, no coup de grace ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৬৭ক ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৬৭খ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-আনআম ৬:১৬৪ ↩︎
- শরহ নববী আলা মুসলিম, কিতাবুত তওবা; হাদিস ২৭৬৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
- ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, কিতাবু কাওয়াইদিল আকাইদ; গাজালির ষষ্ঠ মূলনীতির মূল পাঠ ↩︎
- কোরআন ৩:৮৫; ১৮:১০৫ ↩︎

