ভূমিকা
ধর্মবিশ্বাস মূলত মানুষের ব্যক্তিগত মানসিকতা, অনুভূতি এবং বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গঠিত একটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া। একজন ব্যক্তি তার নিজের মনোজগৎ থেকে যা গ্রহণ করতে চান, তা-ই তার বিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এই বিশ্বাস গঠন কেবলমাত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল, এবং এটি কোনো বাহ্যিক চাপ বা প্রভাবের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে না। কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী করানো সম্ভব নয়, কারণ এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মন থেকে আসে। কিন্তু যখন একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, তখন তাকে সেই ধর্মের প্রথা ও বিশ্বাস মেনে চলতে বলা হয়, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় না তার মতামত বা ইচ্ছা সম্পর্কে। বিশেষ করে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে, ধর্ম পালনকে অনেক সময় বাধ্যতামূলক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যার ফলে তাদের ইচ্ছার বাইরে ধর্মীয় নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। সত্যিকার অর্থে, তার ইচ্ছে কখনো জিজ্ঞেসই করা হয় না। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে জেনেবুঝে বেছে নিতে বলা হয়না। ইসলামে, একজন ব্যক্তি যদি জেনেবুঝে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তবে তাকে মুরতাদ বলে চিহ্নিত করা হয়। মুরতাদের জন্য ইসলামি শরিয়তে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই শাস্তি ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপ, যা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস একটি স্বাধীন এবং ব্যক্তিগত বিষয় হওয়া সত্ত্বেও, এমন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যা মানুষের মুক্ত ইচ্ছা এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকারকে অবমাননা করে।
বিশ্বাস মানুষের জন্মগত পরিচয়ের মতো অপরিবর্তনীয় কোনো সম্পত্তি নয়। শিশু জন্মের সময় কোনো ধর্মগ্রন্থের সত্যতা যাচাই করে, কোনো নবির দাবির ঐতিহাসিক প্রমাণ পরীক্ষা করে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মগুলোর মধ্যে যৌক্তিক তুলনা করে একটি ধর্ম গ্রহণ করে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র তার জন্য একটি ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করে দেয়। বেড়ে ওঠার পর তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিচারবুদ্ধি পরিবর্তিত হলে সেই ধর্মীয় বিশ্বাসও বদলাতে পারে। একজন মানুষ আগে যে কথাকে সত্য মনে করতেন, নতুন প্রমাণের মুখে তাকে ভুল মনে করতেই পারেন। ধর্মের ক্ষেত্রেও এই সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা কার্যকর হওয়ার কথা। অথচ ইসলামি ধর্মত্যাগবিরোধী বিধানে জন্মসূত্রে বা পূর্ববর্তী ধর্মান্তরের মাধ্যমে মুসলিম পরিচয় পাওয়া ব্যক্তির সামনে ভয়াবহ শাস্তির হুমকি দাঁড় করানো হয়েছে। বিশ্বাস করার স্বাধীনতা স্বীকার করে অবিশ্বাস করার স্বাধীনতা অস্বীকার করা প্রকৃত অর্থে বিশ্বাসের স্বাধীনতা নয়; সেটি ধর্মীয় আনুগত্য বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা।
মুরতাদের বিরুদ্ধে ধ্রুপদী ইসলামি দণ্ডবিধির সমস্যা শুধু মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণায় শেষ হয় না। ধর্মত্যাগকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন, দাম্পত্য সম্পর্ক, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, সন্তানদের ধর্মীয় পরিচয়, অভিভাবকত্ব এবং মৃত্যুর পর মৃতদেহের প্রতি আচরণ পর্যন্ত নির্ধারণ করার বিধান গড়ে উঠেছে। কিছু ফিকহি অবস্থানে ধর্মত্যাগের ফলে বিবাহ ভেঙে যায়; কোথাও সম্পত্তির ওপর উত্তরাধিকারীদের বা বায়তুল মালের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়; কোথাও ধর্মত্যাগীকে মুসলিম আত্মীয়ের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। নারী মুরতাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড অথবা কারাবন্দিত্ব ও ধর্মে প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগের বিধান নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এমনকি ধর্মত্যাগীর মৃত্যু হলে তার গোসল, জানাজা ও দাফনের বিধানও তার বিশ্বাস পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নকে এভাবে ব্যক্তির সমগ্র নাগরিক ও পারিবারিক অস্তিত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণের উপকরণে পরিণত করা হয়েছে।
ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য মৃত্যুর ভয়, কারাবাস, দণ্ড বা পারিবারিক বিপর্যয়ের হুমকি ব্যবহার করলে মানুষের আন্তরিক বিশ্বাস সৃষ্টি হয় না। একজন ব্যক্তি প্রাণ বাঁচাতে মুখে ধর্মবিশ্বাসের ঘোষণা দিতে পারেন, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন কিংবা সম্পত্তি ও সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়ে নিজের অবিশ্বাস গোপন রাখতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের আনুগত্য কোনো ধর্মীয় মতবাদের সত্যতার প্রমাণ নয়; বরং ভয়ভিত্তিক বাধ্যবাধকতার ফল। যে ধর্ম নিজের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তি ও প্রমাণের পরিবর্তে ধর্মত্যাগের শাস্তির ওপর নির্ভর করে, তার দণ্ডবিধি মানুষের স্বাধীন বিচারবুদ্ধির প্রতি গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করে। কোনো বিশ্বাস সত্য কি না, তা নির্ধারিত হয় তার পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ দিয়ে—বিশ্বাস ত্যাগকারীর গর্দান কাটার হুমকি দিয়ে নয়।
বিশ্বাস ও সমালোচনার স্বাধীনতাঃ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার
আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানের আলোকে মানুষের চিন্তা, বিবেক এবং বিশ্বাসের স্বাধীনতা কেবল একটি আইনি অধিকার নয়, বরং এটি মানবসত্তার বিকাশের প্রধান শর্ত। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তার বিখ্যাত ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, কোনো মতবাদ—তা ধর্মীয় হোক বা রাজনৈতিক—যদি সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা হয়, তবে তা প্রাণহীন গোঁড়ামিতে পরিণত হয় [1]। মিলের মতে, সত্যকে খুঁজে পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো সকল মতাদর্শকে মুক্ত আলোচনা ও সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। যদি কোনো বিশ্বাস সঠিক হয়, তবে সমালোচনার মাধ্যমে তার ভিত্তি আরও মজবুত হবে; আর যদি তা ভুল হয়, তবে সমালোচনাই মানুষকে অন্ধকার থেকে মুক্তি দেবে।
মিলের যুক্তির গভীরতা শুধু এই নয় যে, প্রতিষ্ঠিত মতবাদকে প্রশ্ন করা যায়; তাঁর বক্তব্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করা মানবিক জ্ঞানচর্চার অপরিহার্য শর্ত। যে মতবাদকে সত্য ধরে নেওয়া হয়েছে, সেটির বিরুদ্ধেও আপত্তি উত্থাপনের অধিকার থাকতে হবে। কারণ নিষিদ্ধ মতামতটি সত্য হতে পারে, অথবা তার মধ্যে এমন কোনো আংশিক সত্য থাকতে পারে, যা প্রচলিত বিশ্বাসে অনুপস্থিত। প্রতিষ্ঠিত মতবাদ পুরোপুরি সত্য হলেও সমালোচনা বন্ধ করে দিলে অনুসারীরা সেই সত্যের পক্ষে যুক্তি পরীক্ষা করার অভ্যাস হারান। তখন ধর্ম বা মতাদর্শ জ্ঞানভিত্তিক উপলব্ধি নয়, কর্তৃপক্ষের কথা মেনে চলার যান্ত্রিক অভ্যাসে পরিণত হয়। নিজের ধর্মকে অব্যর্থ ঘোষণা করে ধর্মত্যাগী ও সমালোচককে ভয় দেখানোর ব্যবস্থা এই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার সরাসরি বিপরীত [2]।
যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি তাকে প্রশ্ন করার এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা দেয়। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, আধুনিক সমাজ ক্রমশ ‘যুক্তিনির্ভর’ (Rationalization) হয়ে উঠছে, যেখানে প্রথা বা ঐতিহ্যের চেয়ে ব্যক্তিগত যুক্তি ও প্রমাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় [3]। এই যুক্তিনির্ভর সমাজে কোনো মতাদর্শকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের নামান্তর। তাই কোনো আদর্শকে সমর্থন করা যেমন একজন ব্যক্তির অধিকার, তেমনি তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সেটির সমালোচনা করা বা তাকে প্রত্যাখ্যান করাও তার সমান অধিকার। এটিই আধুনিক ‘মুক্ত সমাজ’ বা ওপেন সোসাইটির ভিত্তি, যা নিয়ে দার্শনিক কার্ল পপার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পপারের মতে, যে সমাজ তার প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, সেটি শেষ পর্যন্ত একটি স্বৈরাচারী ও বদ্ধ সমাজে (Closed Society) পরিণত হয় [4]।
মতাদর্শের সমালোচনা এবং মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা এক ধরনের কাজ নয়। কোনো ধর্মগ্রন্থের ঐতিহাসিক দাবি, কোনো নবির নৈতিক আচরণ, কোনো ফিকহি বিধান অথবা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার সমালোচনা অন্যের ওপর আক্রমণ করার সমতুল্য নয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থান দিলে ধর্মীয় কর্তৃত্ব জবাবদিহির বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে ধর্মত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান অনুসারীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: বিশ্বাসের ভেতরে প্রবেশ করা গ্রহণযোগ্য, কিন্তু যুক্তি বা প্রমাণের ভিত্তিতে সেই বিশ্বাস ত্যাগ করা জীবননাশের কারণ হতে পারে। এমন আইন সত্য অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে না; মানুষকে নিজের মতামত গোপন করতে এবং প্রকাশ্যে আনুগত্যের অভিনয় করতে বাধ্য করে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রধান ভিত্তি ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ (UDHR) এর ১৮ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকের ধর্ম বা বিশ্বাস পরিবর্তন করার এবং কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নিজের মতামত প্রকাশ ও সমালোচনার অধিকার রয়েছে [5]। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন একটি সমাজ এই অধিকারগুলো কেড়ে নেয়, তখন সেখানে কয়েকটি ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়:
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে ধর্ম বা বিশ্বাস পরিবর্তনের অধিকার স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অধিকার শুধু একটি ধর্ম থেকে আরেকটি ধর্ম গ্রহণ করার অনুমতি নয়; ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা, নাস্তিক বা সংশয়বাদী হওয়া এবং কোনো ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ না করার স্বাধীনতাও এর অন্তর্ভুক্ত। একই ঘোষণাপত্রের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যক্তিকে হস্তক্ষেপ ছাড়া মতামত ধারণ এবং তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ ও প্রচারের অধিকার দিয়েছে। ফলে একজন ব্যক্তি নিজের ধর্মের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করলে কিংবা ধর্মগ্রন্থের কোনো বিধানকে ভুল, অমানবিক বা প্রমাণহীন বললে কেবল সেই সমালোচনার কারণে তার চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাতিল করা যায় না। ধর্মের সমালোচনা নিষিদ্ধ করে ধর্মের প্রতি বিশ্বাস বজায় রাখাকে বাধ্যতামূলক করা এই দুটি অধিকারের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় [6]।
১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতাকে আরও নির্দিষ্ট আইনগত ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ওই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় এমন জবরদস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা কোনো ব্যক্তির নিজের পছন্দের ধর্ম বা বিশ্বাস গ্রহণ ও ধারণ করার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির ১৯৯৩ সালের সাধারণ মন্তব্য ২২-এ এই বিধানের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা একেশ্বরবাদী, অনৈশ্বরবাদী ও নাস্তিক্যবাদী বিশ্বাস এবং কোনো ধর্ম স্বীকার না করার অধিকারকেও সুরক্ষা দেয়। একই ব্যাখ্যার পঞ্চম অনুচ্ছেদে বিদ্যমান ধর্ম পরিবর্তন, নাস্তিক্যবাদী অবস্থান গ্রহণ এবং পূর্ববর্তী বিশ্বাস বজায় রাখার অধিকারকে সমানভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ধর্মত্যাগ ঠেকাতে শারীরিক বলপ্রয়োগ, কারাদণ্ড কিংবা অন্য দণ্ডের ভয় দেখানোকে এই ব্যাখ্যায় নিষিদ্ধ জবরদস্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতার বিপরীতে ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ড কোনো অস্পষ্ট নৈতিক বিতর্ক নয়; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি স্বীকৃত অধিকারের ওপর আক্রমণ [7] [8]।
ধর্মত্যাগের শাস্তির প্রভাব শুধু চিন্তা বা ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্ম পরিবর্তনের কারণে কোনো ব্যক্তির বিবাহ ভেঙে দেওয়া, পারিবারিক অভিভাবকত্ব কেড়ে নেওয়া বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার অস্বীকার করার বিধান মানুষের অন্যান্য মৌলিক অধিকারকেও আক্রান্ত করে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছে; ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ বিবাহ ও পরিবার গঠনে সমঅধিকার এবং ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ সম্পত্তির অধিকার ও স্বেচ্ছাচারী বঞ্চনা থেকে সুরক্ষার কথা বলেছে। ফলে ধর্মত্যাগের নামে একজন মানুষকে কেবল বিশ্বাসের স্বাধীনতা থেকেই বঞ্চিত করা হয় না; নির্দিষ্ট ধ্রুপদী ফিকহি বিধানের প্রয়োগে তার দাম্পত্য, সম্পত্তি ও পারিবারিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিজের বিশ্বাস পরিবর্তন করার জন্য একজন মানুষকে পরিবার ও সম্পত্তি হারানোর হুমকির মুখে রাখা বিশ্বাসের স্বাধীনতার সঙ্গে অসংগত [9]।
এই তিনটি সামাজিক পরিণতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধর্মত্যাগের জন্য মৃত্যু, কারাবাস বা পারিবারিক ক্ষতির ভয় থাকলে মানুষ প্রকাশ্যে নিজের সংশয় ব্যক্ত করা বন্ধ করতে পারে। ফলে মতবাদের ভুলগুলো খোলামেলা আলোচনার সুযোগ পায় না; বাইরে একটি কৃত্রিম ঐকমত্য তৈরি হয়। সেই ঐকমত্যকে আবার ধর্মের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা কিংবা অনুসারীদের অকুণ্ঠ বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়, যদিও মানুষের নীরবতার পেছনে ভয় কাজ করতে পারে। অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্নমতাবলম্বীদের জীবন, সম্পত্তি ও সামাজিক অধিকার সংকুচিত হলে তাঁদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়। ধর্মের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে এই ব্যবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক প্রশ্ন করার ক্ষমতাকেই শাস্তিযোগ্য আচরণে পরিণত করা হয়।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য ৩৪-এ ধর্মীয় মতবাদ ও ধর্মীয় নেতাদের সমালোচনা রুদ্ধ করার আইন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। মন্তব্যটির ৪৮ ও ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্ম বা বিশ্বাসব্যবস্থার প্রতি অসম্মান প্রকাশকে সাধারণভাবে অপরাধ করার আইন নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের সঙ্গে অসংগত; ধর্মীয় নেতার সমালোচনা কিংবা ধর্মীয় মতবাদের আলোচনা ও সমালোচনাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এমন আইন ব্যবহার করা যায় না। ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি এবং কোনো ধর্মীয় মতবাদের যুক্তিগত সমালোচনার মধ্যে আইনগত পার্থক্য রয়েছে। ধর্মীয় দাবির কঠোর সমালোচনা, নবির কর্মকাণ্ডের নৈতিক পর্যালোচনা কিংবা ধর্মত্যাগের সিদ্ধান্ত—এসবকে সহিংস অপরাধের সমান করে দেখিয়ে শাস্তি প্রয়োগ করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত [10]।
পরিশেষে, সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম দেখিয়েছেন যে, আধুনিক সমাজে বৈচিত্র্যই হলো সংহতির মূল উৎস [11]। জোরপূর্বক ঐক্য বা বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা সমাজের স্বাভাবিক বিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই একটি প্রগতিশীল ও উন্নত সমাজের জন্য বিশ্বাসের স্বাধীনতার পাশাপাশি অবিশ্বাসের এবং যৌক্তিক সমালোচনার অধিকার থাকা অপরিহার্য। এই অধিকারহীন সমাজ মূলত একটি বিশাল কারাগারে রূপান্তরিত হয়, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা এবং সত্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা চিরতরে দমিত হয়ে যায়।
বিশ্বাসের স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা সেই মুহূর্তে হয়, যখন কেউ নিজের পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের প্রচলিত ধর্মকে আর সত্য মনে করেন না। তাঁকে প্রশ্ন করতে দেওয়া হলেও ধর্ম ত্যাগ করতে না দিলে, সমালোচনা করতে দেওয়া হলেও প্রকাশ্যে অবিশ্বাস ঘোষণা করতে না দিলে, ধর্ম গ্রহণ করতে দেওয়া হলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না দিলে সেই স্বাধীনতা অর্থহীন। কোনো মতবাদই তার অনুসারীদের জীবন ও সম্পত্তির ওপর মালিকানা দাবি করতে পারে না; ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতাও কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ধর্মীয় সত্যের দাবি যুক্তি ও প্রমাণের মুখোমুখি হতে পারে, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড, কারাবাস, সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া বা পরিবার বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে সেই দাবিকে সত্য প্রমাণ করা যায় না।
মুরতাদের শাস্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
ইসলাম ত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান কেবল একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এই বিধান তাঁর স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, প্রকাশ্যে মত পরিবর্তন করা এবং নিজের ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের অধিকারকেও অস্বীকার করে। কোনো ব্যক্তিকে তার বিশ্বাসের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে দেওয়া হলো, কিন্তু সেই সন্দেহের যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে ধর্ম ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হলো না—এমন অবস্থাকে বিশ্বাসের স্বাধীনতা বলা যায় না। এখানে ধর্মীয় আনুগত্য একটি অপরিবর্তনীয় সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। একজন মানুষ মুসলিম পরিবারে জন্মাতে পারেন নিজের কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই; পরিণত বয়সে সেই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড, বন্দিত্ব কিংবা পারিবারিক অধিকার হারানোর বিধানের মুখোমুখি হতে হয়। জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মের প্রতি আজীবন আনুগত্য দাবি করা ব্যক্তির বিবেককে ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার শামিল।
এখানে অপরাধের ধারণাটিই মৌলিকভাবে সমস্যাযুক্ত। হত্যা, সম্পত্তি লুণ্ঠন কিংবা অন্যের ওপর সহিংসতা চালানোয় সুনির্দিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি থাকে; অপরাধের বিচার সেই ক্ষতি ও দায়ের ভিত্তিতে হতে পারে। কিন্তু কোনো ধর্মকে আর সত্য বলে বিশ্বাস না করা, অন্য ধর্ম গ্রহণ করা অথবা নাস্তিক হওয়া নিজে কাউকে হত্যা বা আঘাত করার কাজ নয়। ধ্রুপদী রিদ্দাহ-বিধানে এই বিশ্বাস পরিবর্তনকেই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ব্যক্তির মনে কী বিশ্বাস আছে, সে কী ঘোষণা করছে এবং কোন ধর্মীয় পরিচয় বেছে নিচ্ছে—এসব প্রশ্নকে অপরাধের বিচারিক বিষয় করে তোলার ফলে বিশ্বাসের স্বাধীনতা কার্যত কর্তৃত্বের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ধর্মের দাবিকৃত সত্যতা পরীক্ষা করার বদলে বিশ্বাস পরিবর্তনকারীর শারীরিক অস্তিত্বকেই শাস্তির লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
মুরতাদের শাস্তি কেন এবং কীভাবে মানুষের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে, তা জানার জন্য আমাদের নিচের বিষয়গুলো বুঝতে হবেঃ
মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের ক্ষেত্রে, তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই মুসলমান হয়ে যায়। তাদের কাছে পছন্দের বিকল্প রাখা হয় না। বোধ-বিবেচনার বয়সে পৌঁছালে তাদের ওপর ধর্মীয় সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়। ৪২০০টি ধর্মের মধ্যে কোনটি যৌক্তিক তা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ, কারণ ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR) অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্ম বিশ্বাস পরিবর্তন বা বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।
ইসলামি শরীয়া আইনে মুসলমান কেউ ইসলাম ত্যাগ করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যা ‘রিদ্দাহ’ নামে পরিচিত। অনেক পণ্ডিতের মতে এটি মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সহিহ বুখারি ও মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদিসে মুহাম্মদ নির্দেশ দিয়েছেন— “যে ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে, তাকে হত্যা করতে হবে।” অনেক মুসলিম দেশ এই শরীয়া আইনের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
ধর্ম ত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানটি স্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন। UDHR এর ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিশ্বাস পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। একটি সভ্য সমাজে ধর্ম ত্যাগ বা অন্য ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার একজন ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার ওপর গুরুতর আঘাত।
ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া, কাউকে বাধ্য করা অনৈতিক। শাস্তির ভয়ে ধর্ম পালন করা মানে বিশ্বাসের অভাব, যা ধর্মের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ধর্ম পালনে বাধ্য করলেও মন থেকে বিশ্বাস পরিবর্তন সম্ভব নয়। এটি আন্তরিকতা নয়, বরং চাপের মাধ্যমে করা একটি ক্রিয়া যা ধর্মীয়ভাবে মূল্যহীন হতে পারে। সব ধর্মই এমন আইন করলে মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
আধুনিক সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার। গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতা থাকলেও শরীয়া আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান এর সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও সংস্কারপন্থী এই পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দেন। তারা মনে করেন ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুরতাদের ওপর মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর হওয়ার আগেই তার ভয় সমাজে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। নিজের বিশ্বাস পরিবর্তনের কথা প্রকাশ করলে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া, দাম্পত্য জীবন ভেঙে যাওয়া, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হওয়া অথবা ধর্মীয়ভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কা একজন মানুষকে নিজের চিন্তা গোপন রাখতে বাধ্য করতে পারে। এই ভয় থেকে প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালন করা আন্তরিক বিশ্বাসের প্রমাণ নয়। মানুষ জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এমন কথাও বলতে পারে, যা সে মনে বিশ্বাস করে না। শাস্তির হুমকির মাধ্যমে বাহ্যিক আনুগত্য অর্জন করা সম্ভব; কিন্তু সেই আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে ধর্মীয় দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এই দণ্ডবিধির বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয় ধর্ম গ্রহণ এবং ধর্ম ত্যাগের অধিকারের তুলনায়। ইসলাম গ্রহণকে ধর্মীয়ভাবে প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত বলে গ্রহণ করা হলেও ইসলাম ছেড়ে যাওয়াকে শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচনা করার মধ্যে একই ব্যক্তির ওপর দুটি বিপরীত মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়। অন্য ধর্মের অনুসারী নিজের পূর্ববর্তী বিশ্বাস ভুল বলে ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন—কিন্তু একই ধরনের যুক্তি, অভিজ্ঞতা কিংবা সংশয়ের কারণে কোনো মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করলে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডের বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি সিদ্ধান্তকে স্বাধীন বিশ্বাসের প্রকাশ এবং বিপরীত সিদ্ধান্তকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ গণ্য করার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্যপূর্ণ মানবিক নীতি নেই। এটি সত্য অনুসন্ধানের অধিকার নয়; নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য অসম ক্ষমতা প্রয়োগ।
মুরতাদের বিষয়ে ধ্রুপদী ইসলামি আইনের আরও গুরুতর দিক হলো, ধর্মত্যাগের পরিণতি ব্যক্তির নিজের শরীর ও জীবনের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন ফিকহি বিধানে স্বামী বা স্ত্রীর ধর্মত্যাগের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়, অভিভাবকত্ব হারানো, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং সম্পত্তি বায়তুল মালে স্থানান্তরের প্রশ্ন এসেছে। নারী মুরতাদের ক্ষেত্রে কারাবন্দিত্ব ও পুনরায় ইসলাম গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগের বিধানও আলোচিত হয়েছে। এসব বিধান একটি মানুষের ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে তার পরিবার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক অস্তিত্বের ওপর শাস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও এই অধিকারহরণগুলো স্বাধীন ধর্মচর্চার নিশ্চয়তা সৃষ্টি করে না।
এই ব্যবস্থার পক্ষে ধর্মীয় গ্রন্থের কর্তৃত্ব উপস্থাপন করা হলে নৈতিক প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যায় না। কোনো বিধান কোরআন, হাদিস কিংবা প্রতিষ্ঠিত ফিকহি গ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছে—এটি সেই বিধানের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় উৎস সম্পর্কে তথ্য; কিন্তু তার মানবিক ন্যায্যতার প্রমাণ নয়। বিশ্বাস পরিবর্তনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণার কারণ হিসেবে ধর্মের সত্যতা পূর্বানুমান করা হয়, অথচ সেই সত্যতাকেই ব্যক্তি প্রশ্ন করছেন। যে সিদ্ধান্তের জন্য একজন মানুষ ধর্ম ত্যাগ করেন, সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর পূর্ববর্তী ধর্মের কর্তৃত্বকে শেষ কথা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া স্বাধীন বিবেকের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। ধর্মীয় বিধানের দাবি একজন মানুষের মৌলিক অধিকার হরণকে ন্যায়বিচারে পরিণত করতে পারে না।
আলেমদের বক্তব্য
ধর্মত্যাগীর শাস্তি নিয়ে সমকালীন ধর্মীয় বক্তাদের বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় মতামতের বিষয় নয়; এগুলোর সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড, ধর্মীয় আনুগত্য এবং ভিন্নমতের নিরাপত্তার প্রশ্ন যুক্ত। কোনো বক্তা রিদ্দাহ-বিধানকে ঐশ্বরিক আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে সেটির ফল শুধু একটি ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন ব্যক্তি নিজের বিশ্বাস পরিবর্তনের অধিকার রাখবেন কি না, প্রকাশ্যে ইসলাম ত্যাগ করতে পারবেন কি না এবং ধর্মত্যাগকে অপরাধ গণ্য করে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করা যাবে কি না—এসব বাস্তব সামাজিক ও বিচারিক প্রশ্ন সেই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্মীয় নেতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা দিয়ে কোনো দণ্ডবিধির ন্যায়সংগততা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
ধ্রুপদী ইসলামের আইনগত উৎসে মুরতাদকে হত্যা, তওবা করার জন্য সময় দেওয়া, কারাবন্দি রাখা এবং নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে পৃথক দণ্ডের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। এই বিধানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের জন্য বক্তার ব্যক্তিগত মনোভাব অনুমান করার প্রয়োজন নেই; তাঁর উপস্থাপিত দাবি এবং কোরআন, হাদিস ও ফিকহি গ্রন্থের প্রকৃত বক্তব্য তুলনা করাই যথেষ্ট। ধর্মত্যাগকে কেবল সশস্ত্র বিদ্রোহের সমার্থক করে দেখানো হলে ধ্রুপদী ফিকহে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত শাস্তির বিবরণ অস্পষ্ট হয়ে যায়। আবার কোনো শাস্তি বিচারক বা শাসক কার্যকর করবেন—এই বিধানও বিশ্বাস পরিবর্তনকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ গণ্য করার মূল সমস্যাটি দূর করে না। রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে সংঘটিত অন্যায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংঘটিত একই অন্যায়ের তুলনায় নৈতিকভাবে বৈধ হয়ে ওঠে না।
ধর্মত্যাগের শাস্তি সম্পর্কে প্রচলিত আলোচনায় দুটি ভিন্ন দাবি প্রায়ই একসঙ্গে আসে। প্রথমটি হলো, ইসলামই সত্য ধর্ম; দ্বিতীয়টি হলো, ইসলাম ত্যাগ করলে ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া বৈধ। প্রথম দাবি সত্য হলেও তা থেকে দ্বিতীয় দাবিটি যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে না। কোনো মতবাদকে সত্য বলে গ্রহণ করা এবং সেই মতবাদ প্রত্যাখ্যানকারীর জীবন কেড়ে নেওয়া সম্পূর্ণ পৃথক সিদ্ধান্ত। সত্য প্রমাণের জন্য যুক্তি, পরীক্ষা ও সমালোচনার প্রয়োজন; মতত্যাগকারীর বিরুদ্ধে দণ্ড ঘোষণা সত্যতার প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। ধর্মীয় বক্তৃতায় এই দুটি সিদ্ধান্ত এক করে উপস্থাপন করলে বিশ্বাসের সত্যতা এবং শাস্তির নৈতিক বৈধতার মধ্যে একটি ভিত্তিহীন সম্পর্ক তৈরি হয়।
প্রখ্যাত ইসলামিক আলেম মাহমুদুল হাসান গুনভীর একটি বক্তব্য শুনে নিই,
মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান সমর্থন করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত নির্দেশ, সাহাবিদের বর্ণিত প্রয়োগ এবং পরবর্তী মাজহাবভিত্তিক আইনসংকলন একত্রে এমন একটি কর্তৃত্বশৃঙ্খল তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্বাস পরিবর্তনের শাস্তি নির্ধারণে ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতার চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় রক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় বক্তার বক্তব্য সেই ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি হলে প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে: একটি মানুষ তাঁর নিজের মন ও বিশ্বাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারাবেন কেন? মানুষের নিরাপত্তা, সম্পত্তি কিংবা স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নৈতিক ভিত্তি কোনো গ্রন্থের প্রতি আনুগত্য নয়; অপরের বিরুদ্ধে বাস্তব ক্ষতি ও অপরাধের প্রতিষ্ঠিত দায়। কেবল ধর্মীয় মত পরিবর্তন সেই ধরনের ক্ষতি নয়।
ধর্মত্যাগের জন্য সহিংস শাস্তিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রচার করার সামাজিক পরিণতিও গুরুতর। কোনো অবিশ্বাসী নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে ভয় পেলে, ধর্মের সমালোচক হুমকির আশঙ্কায় আত্মগোপন করলে কিংবা পরিবার বিশ্বাসত্যাগকারী সদস্যকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য মনে করলে ধর্মীয় আনুগত্যের বাহ্যিক চিত্র বজায় থাকতে পারে; কিন্তু সেটি মুক্ত বিবেকের সমাজ নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বক্তার কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার না থাকলে জ্ঞানচর্চা এবং মতবিরোধ উভয়ই ভয়ের অধীন হয়ে পড়ে। ধর্মের সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা এবং সমালোচককে নিরাপত্তা দেওয়ার নীতিই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বাস্তব পরীক্ষা।
কোনো ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করেছেন—এই তথ্য দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা বা অন্য কোনো বাস্তব অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। অপরাধ থাকলে তার স্বাধীন বিচার হতে পারে; কিন্তু বিশ্বাস পরিবর্তনকে অপরাধের সমতুল্য করে মৃত্যুদণ্ড কিংবা বন্দিত্বের বিধান সমর্থন করা মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের অধিকার অস্বীকার করে। ইসলামি উৎসে রিদ্দাহ-বিধান কীভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেটি ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রশ্ন; সেই বিধানের নৈতিক মূল্যায়ন স্বতন্ত্র প্রশ্ন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্যকে মানুষের জীবন ও বিবেকের স্বাধীনতার ওপরে স্থান দেওয়া এই শাস্তিব্যবস্থার মৌলিক অসংগতি।
ইসলামিক দলিল প্রমাণ
ইসলাম ত্যাগের শাস্তি সম্পর্কে কোরআন, হাদিস এবং ধ্রুপদী ফিকহে একই ধরনের বক্তব্য নেই। কোরআনে ধর্মত্যাগের নিন্দা, কর্ম নিষ্ফল হওয়ার ঘোষণা এবং পরকালের শাস্তির কথা রয়েছে; অন্যদিকে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হাদিসে ধর্ম পরিবর্তনকারীকে হত্যা করার সরাসরি নির্দেশ পাওয়া যায়। পরবর্তী ফকিহরা এই নির্দেশ থেকে শুধু মৃত্যুদণ্ডের বিধানই তৈরি করেননি, মুরতাদের দাম্পত্য সম্পর্ক, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়, অভিভাবকত্ব ও মৃত্যুর পর তার দেহের প্রতি আচরণ নিয়েও পৃথক বিধান নির্ধারণ করেছেন। ফলে ধর্মত্যাগের শাস্তি একটি বিচ্ছিন্ন দণ্ড নয়; মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে শুরু করে পরিবার, সম্পদ এবং মৃত্যুর পর মর্যাদা পর্যন্ত বিস্তৃত আইনগত নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।
ধর্মের সমালোচনা করা, কোনো মতবাদকে ভুল মনে করা বা নিজের বিশ্বাস পরিবর্তন করা—এসবের সঙ্গে হত্যা, সম্পত্তি লুণ্ঠন কিংবা কারও ওপর সহিংসতা চালানোর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ধ্রুপদী রিদ্দাহ-বিধান সেই পার্থক্যকে অস্বীকার করে একজন মানুষের ধর্মীয় অবস্থানকেই বিচারিক অপরাধে পরিণত করেছে। আলেমদের নির্দিষ্ট মতপার্থক্য থাকলেও যে বিষয়টি সুস্পষ্ট, তা হলো ধর্মত্যাগের কারণে জীবন, বৈবাহিক সম্পর্ক, সম্পত্তি ও সামাজিক মর্যাদায় শাস্তিমূলক হস্তক্ষেপের অনুমোদন ইসলামের স্বীকৃত বহু আইনি গ্রন্থেই পাওয়া যায়।
কোরআনে মুরতাদের শাস্তি: মুখ ফিরিয়ে নিলে হত্যা
কোরআনে সরাসরি মুরতাদ হলে হত্যা করার কথা বলা নেই, তবে একটি আয়াতে এই বিষয়ে পরোক্ষ একটি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সূরা নিসায় বলা হয়েছে, আল্লাহর রাস্তা থেকে কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে তাদেরকে হত্যা করতে [12] –
তারা আকাঙ্ক্ষা করে যে, তারা নিজেরা যেমন কুফরী করেছে, তোমরাও তেমনি কুফরী কর, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। কাজেই তাদের মধ্য হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত তারা আল্লাহর পথে হিজরত না করে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদেরকে গ্রেফতার কর এবং যেখানেই তাদেরকে পাও, হত্যা কর। তাদের মধ্য হতে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী গ্রহণ করো না।
— Taisirul Quran
তারা ইচ্ছা করে যে, তারা যেরূপ কাফির তোমরাও যেন তদ্রুপ কাফির হয়ে যাও, যাতে তোমরাও তাদের সদৃশ হও। অতএব তাদের মধ্য হতে বন্ধু গ্রহণ করনা, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে দেশ ত্যাগ করে; অতঃপর যদি তারা প্রতিগমন করে তাহলে তাদেরকে ধর এবং যেখানে পাও তাদেরকে সংহার কর; এবং তাদের মধ্য হতে বন্ধু অথবা সাহায্যকারী গ্রহণ করনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারা কামনা করে, যদি তোমরা কুফরী করতে যেভাবে তারা কুফরী করেছে। অতঃপর তোমরা সমান হয়ে যেতে। সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে কাউকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। অতএব তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর। আর তাদের কাউকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না এবং না সাহায্যকারীরূপে।
— Rawai Al-bayan
তারা এটাই কামনা করে যে, তারা যেরূপ কুফরী করেছে তোমরাও সেরূপ কুফরী কর, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। কাজেই আল্লাহর পথে হিজরত [১] না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদেরকে যেখানে পাবে গ্রেফতার করবে এবং হত্যা করবে আর তাদের মধ্য থেকে কাউকেও বন্ধু ও সহায়রূপে গ্রহণ করবে না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা নিসা ৪:৮৯-এর এই উদ্ধৃতি উদ্ধৃত ধর্মীয় গোষ্ঠীকে গ্রেপ্তার ও হত্যার নির্দেশ দেয়; তবে আয়াতটির সঙ্গে ৪:৮৮–৯১-এর ধারাবাহিক আলোচনা জড়িত, যেখানে মুনাফিকদের একটি গোষ্ঠী, হিজরত, পক্ষ পরিবর্তন, শান্তিচুক্তির আওতাভুক্ত লোক এবং যারা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে—এসব পৃথক অবস্থার কথা এসেছে। ফলে আয়াতটিকে প্রসঙ্গহীনভাবে ‘যেকোনো যুগে প্রত্যেক ধর্মত্যাগীকে হত্যা’ করার সর্বজনীন ঘোষণা হিসেবে চিহ্নিত করা পাঠের সীমার বাইরে চলে যায়। কোরআনে এমন সর্বজনীন ও স্পষ্ট দণ্ডবিধি অনুপস্থিত থাকার বাস্তবতাই হাদিস ও পরবর্তী ফিকহে হত্যার আদেশের স্বতন্ত্র গুরুত্বকে সামনে আনে। ধর্মত্যাগের বিষয়টি কোরআনের সূরা বাকারা ২:২১৭-এও রয়েছে: সেখানে ধর্মত্যাগ করে অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণের পরিণতি হিসেবে ইহকাল ও পরকালে কর্ম নিষ্ফল এবং জাহান্নামের কথা বলা হয়েছে; পার্থিব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ সেখানে নেই [13] [14]।
এই পার্থক্য ইসলামি শরিয়তের মূল সমস্যাকে লঘু করে না। কারণ ধ্রুপদী আইনব্যবস্থায় কোরআনের বাইরে মুহাম্মদের হাদিস এবং ফকিহদের আইনগত সিদ্ধান্তও কর্তৃত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআনে সর্বজনীন মৃত্যুদণ্ডের বাক্য না থাকা সত্ত্বেও হাদিসের সাধারণ ভাষার ভিত্তিতে ধর্মত্যাগের মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন মানুষের নিজের ধর্ম সম্পর্কে মত পরিবর্তন করার কারণে তার জীবন কেড়ে নেওয়ার অনুমোদন কোনো যুক্তিসংগত অপরাধতত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বাসের পরিবর্তনকে শারীরিক অপরাধের সমতুল্য গণ্য করা এবং ব্যক্তি আবার আগের ধর্মে ফিরে না এলে তাকে হত্যা করার ব্যবস্থা ধর্মীয় পরিচয়কে বাধ্যতামূলক আনুগত্যে রূপ দেয়।
হাদিসে মুরতাদের শাস্তি: গর্দান উড়াইয়া দাও
আসুন নিচের হাদিসগুলো থেকে জেনে নিই, ইসলামে মুরতাদের শাস্তি কী [15] [16] [17] –
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ১৪. মুরতাদ সম্পর্কে বিধান
৪০৬৪. মূসা ইবন আব্দুর রহমান (রহঃ) … হাসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার দীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা কর।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ হাসান বাসরী (রহঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
৪৩০০. আহমদ ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ) — ইকরাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ ইব্ন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌছলে, তিনি বলেনঃ যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোময়া আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য আমি তাদেরকে আল্লাহ্র রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করতাম। কেননা, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ দীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে। আলী (রাঃ) ইব্ন আব্বাস (রাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে বলেনঃ ওয়াহ্! ওয়াহ্! ইব্ন আব্বাস (রাঃ) সত্য বলেহছেন। আর ইহাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
৪৩০১. আমর ইব্ন আওন (রহঃ) —- আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ মুসলমানের রক্ত হালাল নয়, যে এরূপ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল”। তবে তিনটি কারণের কোন মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত করা হালালঃ (১) যদি কোন বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করে; (২) যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তবে এর বিনিময়ে হত্যা এবং (৩) যে ব্যক্তি দীন ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলমানের জামায়াত থেকে বেরিয়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ধর্মত্যাগীকে হত্যার হাদিসে ব্যবহৃত مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ—‘যে তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো’—বাক্যে হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন বা কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র বিদ্রোহের শর্ত উল্লেখ নেই। সহিহ বুখারির ‘মুরতাদ পুরুষ ও মুরতাদ নারীর বিধান’ পরিচ্ছেদে ইকরিমার সূত্রে বর্ণিত আছে, আলী কয়েকজন জিন্দিককে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিলেন। ইবনে আব্বাস সেই পদ্ধতির বিরোধিতা করে বলেন, তিনি হলে আগুনে পোড়াতেন না; মুহাম্মদের নিষেধের কারণে তাঁদের অন্য পদ্ধতিতে হত্যা করতেন। ফলে তাঁর আপত্তি হত্যার বৈধতা নিয়ে ছিল না, বরং আগুনে পোড়ানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে ছিল। এই ঘটনার মধ্যে ধর্মীয় অবিশ্বাসের কারণে জীবনদণ্ড দেওয়ার নীতিটি প্রকাশ্যেই স্বীকৃত [18]।
وَلَقَتَلْتُهُمْ لِقَوْلِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস বলেন, রাসুলের এই নির্দেশের ভিত্তিতে তাঁদের হত্যা করতাম: যে ব্যক্তি তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো।
এখানে একটি গুরুতর নৈতিক অসংগতি রয়েছে। কাউকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার পদ্ধতি নিষিদ্ধ হলেও তার বিশ্বাস পরিবর্তনের কারণে তাকে হত্যা করা বৈধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের ন্যায্যতা নয়, কোন উপায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে—সেই প্রশ্নেই আপত্তি সীমাবদ্ধ। শাস্তি প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ ধর্মত্যাগকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ গণ্য করার মৌলিক সমস্যার কোনো সমাধান নয়। যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেননি, সহিংসতা চালাননি বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেননি, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন করাকে হত্যার কারণ হিসেবে গ্রহণ করা বিশ্বাসের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি। সহিহ বুখারীর বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ থেকে সরাসরি হাদিসগুলো দেখা যাক [19] [20] –


এবারে প্রখ্যাত হাদিস প্রনেতা ইমাম মালিকের মুয়াত্তা ইমাম মালিক গ্রন্থ থেকে মুরতাদের শাস্তি কী হতে পারে তা জেনে নিই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশ হওয়া মুয়াত্তা ইমাম মালিক দ্বিতীয় খণ্ডের ৪০৬, ৪০৭ নম্বর পৃষ্ঠায় হাদিসটি পাবেন [21] –
(۱۸) باب القضاء فيمن ارتد عن الاسلام
পরিচ্ছেদ ১৮: ইসলাম ত্যাগ করিলে তাহার ফয়সালা
10 – حدثنا يَحْيَى عَنْ مَالِكٍ ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ « مَنْ غَيْرَ دِينَهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَهُ …
وَمَعْنَى قَوْلِ النَّبِيِّ ، فِيْمَا نُرَى وَاللَّهُ أَعْلَمُ ، مَنْ غَيَّرَ دِيْنَهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَهُ. أَنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْإِسْلَامِ إِلَى غَيْرِهِ، مِثْلُ الزَّنَادِقَةِ وَأَشْبَاهِهِمْ، فَإِنَّ أُولَئِكَ، إِذَا ظُهِرَ عَلَيْهِمْ، قُتِلُوا وَلَمْ يُسْتَتَابُوا لِأَنَّهُ لا تُعْرَفُ تَوْبَتُهُمْ وَأَنَّهُمْ كَانُوا يُسِرُّونَ الْكُفْرَ وَيُعْلِنُونَ الْإِسْلامَ. فَلَا أَرَى أَنْ يُسْنَتَابَ هُؤُلاءِ. وَلَا يُقْبَلُ مِنْهُمْ قَوْلُهُمْ وَأَمَّا مَنْ خَرَجَ مِنَ الْإِسْلَامِ إِلَى غَيْرِهِ، وَأَظْهَرَ ذَلِكَ ، فَإِنَّهُ يُسْتَتَابُ، فَإِنْ تَابَ ، وَإِلَّا قُتِلَ، وَذَلِكَ ، لَوْ أنَّ قَوْمًا كَانُوا عَلَى ذَلِكَ ، رَأَيْتُ أَنْ يُدْعَوْا إِلَى الْإِسْلَامِ وَيُسْتَتَابُوا فَإِنْ تَابُوا قُبِلَ ذَلِكَ مِنْهُمْ وَإِنْ لَمْ يَتُوبُوا قُتِلُوا وَلَمْ يُعْنَ بِذلِكَ، فِيْمَا نُرَى وَاللَّهُ أَعْلَمُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْيَهُودِيَّةِ إِلَى النَّصْرَانِيَّةِ وَلَا مِنَ النَّصْرَانِيَّةِ إِلَى الْيَهُودِيَّةِ . وَلَا مَنْ يُغَيِّرُ دِيْنَهُ مِنْ أهْلِ الْأَدْيَانِ كُلَّهَا إِلَّا الْإِسْلَامَ. فَمَنْ خَرَجَ مِنَ الْإِسْلَامِ إِلَى غَيْرِهِ ، وَأَظْهَرَ ذَلِكَ ، فَذَلِكَ الَّذِي عُنِي بِهِ . وَاللَّهُ أَعْلَمَ .
রেওয়ায়ত ১৫
যায়দ ইব্ন আসলাম (র) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি নিজ দীন (ধর্ম)-কে পরিবর্তন করে তাহার গর্দান উড়াইয়া দাও। মালিক (র) বলেন যে, আমার নিকট রাসূলুল্লাহ্-এর কথা-যে দীন পরিবর্তন করিয়া ফেলে তাহার গর্দান উড়াইয়া দাও”- এর অর্থ এই যে, কোন মুসলমান ইসলাম ধর্ম ছাড়িয়া দেয় ও ধর্মত্যাগী (যিনদীক) বা এই ধরনের কিছু হইয়া যায় তবে তাহাদের উপর মুসলমানগণ বিজয়ী হইলে তাহাদিগকে কতল করিয়া দেওয়ার হুকুম। তাহাদিগকে তওবা করারও সময় দেওয়া হইবে না কারণ তাহাদের তওবার কোন মূল্য নাই। যেহেতু তাহাদের অন্তরে কুফরী অংকিত হইয়া গিয়াছে, ফলে তাহারা প্রকাশ্যে ইসলাম প্রকাশ করিবে এবং অন্তরে কুফরী করিতে থাকিবে। আর যে ব্যক্তি কোন কারণে ইসলাম হইতে বাহির হইয়া যায় তবে তাহাকে তওবা করাইবে। আর যদি তওবা করিতে
অস্বীকার করে তবে হত্যা করিয়া দিবে। আর যদি কোন কাফের অন্য কোন কুফরী ধর্ম গ্রহণ করে যেমন ইহুদী হইতে নাসারা হইয়া গেল তৰে সে তাহার দীন পরিবর্তন করিয়াছে বলিয়া এই হাদীস বোঝা যায় না। এই হাদীস দ্বারা একমাত্র ইসলাম হইতে বহিষ্কার হওয়ার হুকুম প্রকাশ পায়।
١٦ – وحدثني مَالِكَ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدُ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الْقَارِيِّ ، عَنْ أبِيهِ : أَنَّهُ قَالَ : قَدِم عَلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ رَجُلٌ مِنْ قِبَلِ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِي فَسَأَلُهَ عَنِ النَّاسِ فَأَخْبَرَهُ، ثُمَّ قَالَ لَهُ عُمَرُ : هَلْ كَانَ فِيكُمْ مِنْ مُغَرِّبَةِ خَبَرٍ ؟ فَقَالَ : نَعَمْ. رَجُلُ كَفَرَ بَعْدَ إِسْلَامِهِ. قَالَ : فَمَا فَعَلْتُمْ بِهِ ؟ قَالَ : قَرَّبْنَاهُ، فَضَرَبْنَا عُنُقَهُ، فَقَالَ عُمَرُ : أَفَلاَ حَبَسْتُمُوهَ ثَلاثًا وَأَطْعَمْتُمُوهُ كُلَّ يَوْمٍ رَغِيفًا، وَاسْتَتَبْتُمُوهُ لَعَلَّهُ يَتُوبُ وَيُرَاجِعُ أمر الله ؟ ثُمَّ قَالَ عُمَرُ : اللَّهُمَّ إِنِّي لَمْ أَحْضُرُ، وَلَمْ أَمْرُ وَلَمْ أَرْضِ إِذْ بَلَغَنِي.
রেওয়ায়ত ১৬
মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ (র) তাহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, আবূ মূসা আশ’আরী (রা)-এর নিকট হইতে এক ব্যক্তি উমর (রা)-এর নিকট আসিল। উমর (রা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন সেখানের লোকের কি অবস্থা? সে সেখানের অবস্থা বর্ণনা করিল। অতঃপর উমর (রা) বলিলেন, সেখানে কোন নূতন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর আবার কাফের হইয়া গেলে তোমরা তাহাকে কি করিয়াছ? সে বলিল, তাহাকে বন্দী করিয়া শিরোচ্ছেদ করিয়াছি। উমর (রা) বলিলেন, তোমরা যদি তাহাকে তিন দিন পর্যন্ত বন্দী করিয়া রাখিতে আর খাইতে শুধু ১টি রুটি দিতে এবং তওবা করাইতে তবে হয়ত সে তওবা করিত এবং আল্লাহর দীনের দিকে আসিয়া যাইত। অতঃপর হযরত উমর (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্ আমি ঐ কাজে শামিল ছিলাম না, মারার হুকুমও দেই নাই, কিংবা তাহার খবর শুনিয়াও খুশী হই নাই।


ইসলামী শরীয়তে মুরতাদের শাস্তি
এবারে আসুন দেখা যাক ইসলামী শরীয়তে মুরতাদের শাস্তি কী। ফয়যুল হাদী শরহে তিরমিযী (ছানী) গ্রন্থটি হচ্ছে তিরমীযী শরীফের একটি ব্যাখ্যা গ্রন্থ। এখান থেকে দেখি [22] –
মুরতাদের শাস্তিঃ ‘ইরতিদাদ’ অর্থ কোনো মুসলমান ইসলাম ধর্ম থেকে বের হয়ে যাওয়া। ইসলাম ধর্ম যে ত্যাগ করে তাকে মুরতাদ’ বলে। আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেনঃ “ইসলামের পরিভাষায় ইরতিদাদ অর্থ হলো, ইসলাম ধর্মের স্থানে অন্য ধর্ম, ইসলামী আকীদার স্থানে অন্য আকীদা গ্রহণ করা। রাসূলুল্লাহ সা যে শিক্ষা নিয়ে আগমন করেছিলেন, যা কিছু তথা অকাট্য সত্যরূপে বর্ণনা পরম্পরায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং যা কিছু ইসলামে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত তাকে অস্বীকার করা’। যেমন ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম কিংবা কাদিয়ানী মতবাদ গ্রহণ করা অথবা নামায-রোজা, হজ্ব ইসলামের দণ্ডবিধি ইত্যাদিকে অস্বীকার করা। কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে- فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُم ثُمَّ يَجِدُوا فِى أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
মুরতাদের শাস্তিঃ ইমাম কুদুরী বলেন ঃ إِذَا ارْتَدَّ الْمُسْلِمُ عَنِ الْإِسْلَامِ عُرِضَ عَلَيْهِ الْإِسْلَامُ فَإِن كَانَتْ لَهُ شُبْهَةٌ كُشِفَ لَهُ وَيُحْبَسَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَإِن أَسْلَمَ وَالإقتل . অর্থাৎ মুসলমান যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে তার সামনে ইসলাম পেশ করা হবে । যদি তার মনে সন্দেহ থাকে তাহলে তার সন্দেহ দূর করা হবে। তাকে তিন দিন আটকে রাখা হবে। যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তো ভালো, অন্যাথায় তাকে হত্যা করা হবে। মুরতাদ পুরুষ হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এটা সকল ইমামের অভিমত। আর যদি মুরতাদ মহিলা হয় তাহলে এ ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ আছে। ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, মুরতাদ নারীকেও হত্যা করতে হবে। কারণ, ইরতিদাদ সম্পর্কে হাদীসের মূল ভাষ্য হলো- অর্থাৎ ‘যে ধর্ম ত্যাগ করেছে, তাকে হত্যা কর।’ এত নারী পুরুষের প্রার্থক্য করা হয়নি। পক্ষান্তরে আহনাফের অভিমত হলো কোন মহিলাকে ধর্ম ত্যাগের অপরাধে হত্যা করা বৈধ নয়। কারণ হাদীসে এসেছে- অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ নারীদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে, “যদি কোনো নারী ধর্ম ত্যাগ করে তবে তাকে ইসলামের দিকে আহবান করাবে। যদি সে ফিরে আসে তবে তাকে গ্রহণ করবে । যদি অস্বীকার করে তাকে বন্দী করে রাখবে।

এবারে আসুন ইযাহুল মুসলিম গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পড়ি [23] –
মুরতাদের হুকুম
মুরতাদের হুকুম হলো তাকে হত্যা করা। চার ইমাম এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায় তাকে হত্যা করা ওয়াজিব এবং তার রক্ত মূল্যহীন হয়ে যায়। মুরতাদকে হত্যা করার ব্যাপারে অনেক হাদীস বর্ণিত
হয়েছে। যথা:
۱. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ مَرْفُوعًا مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
“যে ব্যক্তি দ্বীন-ইসলামকে ত্যাগ করলো তাকে হত্যা করো।”
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ حَيْدَةَ : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ .
আবূ হুরাইরা (রা.) ইসমা (রা.) প্রমুখ সাহাবা থেকে এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে।
مَنْ غَيَّرَ دِينَهُ فَاضْرِبُوا عُنَقَهُ . :
(۳) عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِءٍ مُّسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَانِّي رَسُولُ اللهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلاثٍ ، الطَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ وَالْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ – بخاري ومسلم
হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন,
” মুসলমান যে কালিমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেয় তাকে তিন কারণের কোন এক কারণ ছাড়া হত্যা করা জায়িয নেই। যথা: (১) বিবাহিত ব্যভিচারী, (২)
অন্যায়ভাবে হত্যাকারী এবং (৩) দ্বীন পরিত্যাগকারী (মুরতাদ)।
(٤) عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفِ بْنِ عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ أشْرَفَ يَومَ الدَّارَ فَقَالَ أَنْشُدُكُمْ بِاللهِ، أَتَعْلَمُونَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِءٍ مُّسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى تَلْتَ زِنَا
بَعْدَ احْصَانٍ أَوْ كُفْرٍ بَعْدَ إِسْلامِ أَوْ قَتْلِ نَفْسٍ بِغَيْرِ حَةٍ فَيُقْتَلُ بِهِ فَوَاللَّهِ مَا زَنَيْتُ فِي جَاهِلِيَّةٍ وَلَا فِي إِسْلامِ وَلَا ارْتَدَّدْتُ مُنْذُ بَا بَعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا قَتَلْتُ النَّفْتَنَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ .
ترمذی نسانی ابوداود
আবূ উমামা থেকে বর্ণিত, হযরত ওসমান (রা.) কে যে সময় অবরোধ করে রাখা হয় সে সময় একদিন তিনি মাথা উঁচু করে বিদ্রোহীদের প্রতি সম্বোধন করে বলেন, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তোমরা কি জানো না যে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, তিন কারণ ছাড়া মুসলমানকে হত্যা করা জায়িয নেই? কারণ তিনটি হলো, বিবাহিত হয়ে ব্যভিচার করা, ইসলাম গ্রহণ করার পর কুফরী করা এবং অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। আল্লাহর কসম! আমি জাহেলী যুগেও ব্যভিচার করিনি, ইসলাম গ্রহণ করেও নয়। আমি মুরতাদ হয়ে যাইনি এবং কাউকে হত্যাও করিনি। -তিরমিযী, নাসায়ী, আবূ দাউদ
(٥) عَنْ جَرِيرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : إِذَا أَبْقَ الْعَبْدُ إِلَى الشِّرْكِ فَقَدْ حَلَّ دَمُهُ . ابوداود
“যে ব্যক্তি শিরকে লিপ্ত হয় তার রক্ত হালাল হয়ে যায়।”
٦) عَنْ عِكْرَمَةَ قَالَ : أَتِي عَلَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ بِزَنَادِقَةٍ
( فَأَحَرَّفَهُمْ، فَبَلَغَ ذَلِكَ ابْنَ عَبَّاسٍ فَقَالَ : لَوْ كُنْتُ أَنَا لَمْ أَحْرِقْهُمْ لِنَهْي رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : قَالَ : لَا تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ وَلَقَتَلْتُهُمْ لِقَوْلِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ – (بخاری ، ترمذی، ابوداؤد) وغير ذلك من الاحاديث الكثيرة .
ইকরামা (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.)-এর কাছে কয়েকজন যিন্দীককে গ্রেফতার করে আনা হলে তিনি সবাইকে পুড়িয়ে মারেন। ইবনে আব্বাসের কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেন, “আমি হলে পুড়িয়ে মারতাম
না। কেননা রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা আল্লাহর শাস্তি দিয়ে কাউকে শাস্তি দিও না।”
বরং আমি তাদের হত্যা করতাম। কেননা রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দ্বীন (ইসলাম) পরিত্যাগ করে তাকে হত্যা করো।”
মুরতাদের তওবা গ্রহণ করা
১। ইমাম আবূ হানীফার (রহ.) মতে মুরতাদকে কিছুটা অবকাশ দেয়া উচিত যাতে এ সময়ে পুনরায় তার কাছে ইসলাম পেশ করা যায়। কাজী ইচ্ছা করলে তিন দিন জেলখানায় আবদ্ধ রাখবে। এ সময় সে ইসলাম কবুল করলে ভালো অন্যথায় তাকে হত্যা করতে হবে। এই অবকাশ দেয়াটা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। কেননা তার কাছে তো ইসলামের দাওয়াত আগেই পৌঁছেছে। আর যার কাছে আগে থেকেই দাওয়াত পৌঁছেছে তাকে নতুন করে দাওয়াত দেয়া ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব। কুরআনের আয়াত فاقتلوا المشركين এবং হাদীস من بدل دینه فاقتلوه-এ অবকাশ দেয়ার কথা উল্লেখ নেই। তাছাড়া মুরতাদ হলো হরবী কাফিরের মত যাকে অবকাশ দেয়া জরুরী নয়। আর সে যিম্মিত নয় কেননা তার থেকে জিযিয়া (কর) আদায় করা হয় না। সুতরাং অবকাশ না দিয়েই তাকে হত্যা করা যাবে।
-আল ফিকহু আলা মাযাহিবিল আরবা’আ খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪২৪
২। ইমাম শাফেঈর (রহ.) মতে তিনদিন পর্যন্ত অবকাশ দেয়া ওয়াজিব। তিনি বলেন, মুসলমান কোন সন্দেহের কারণেই মুরতাদ হয়ে থাকে। সুতরাং এতটুকু সময় দেয়া উচিত যাতে করে সে সন্দেহ দূর করতে পারে। আর এই সময়ের পরিমাণ তিনদিন। তিনদিন সময়ের একটি বৈশিষ্ট্য আছে। মূসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে-
وَلَمَّا كَانَتِ الثَّالِثَةُ قَالَ لَهُ قَدْ بَلَغْتُ مِن لَّدُنِي عُدْرًا . এটি মালেকী মাযহাব এবং আহমদ (রহ.)-এর একমত এরূপ।
মহিলা মুরতাদের হুকুম
১। ইমাম শাফেঈ, আহমদ ও মালেকের মতে মহিলা মুরতাদকেও পুরুষের মত হত্যা করা হবে। কেননা উভয়ের অপরাধ সমান। তাঁরা বলেন, মহিলা মুরতাদের হুকুম পুরুষ মুরতাদের মতো। সুতরাং কতল করার আগে তাকেও তিনদিন অবকাশ দিতে হবে।
عَنْ جَابِرٍ : أَنَّ امْرَأَةً يُقَالُ أَمُّ رُومَانَ ارْتَدَّتْ فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُعْرَضَ عَلَيْهَا الْإِسْلامُ فَإِنْ تَابَتْ وَإِلَّا قُتِلَتْ – دار قطني
“উম্মে রূমান নামী এক মহিলা মুরতাদ হয়ে গেলে রাসূল (সা.) তাকে তিনদিনের অবকাশ দেয়ার নির্দেশ দেন। এ সময়ে ইসলাম কবুল না করলে হত্যা করার আদেশ দেন। এমনিভাবে من بدل دینه فاقتلوه হাদীসে ব্যাপকভাবে নারী-পুরুষ সকল মুরতাদকে হত্যা করতে বলা হয়েছে।
২। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর মতে মহিলা মুরতাদকে হত্যা করা যাবে
না। বরং বন্দী করে রেখে ইসলাম পেশ করতে হবে। প্রত্যেক দিন ৩৯টি দোররা লাগাতে হবে। এভাবে হয় ইসলাম কবুল করবে না হয় জেলখানাতেই মারা যাবে। হ্যাঁ, কোন ব্যক্তি যদি হত্যা করেই ফেলে তাহলে তার জন্য তাকে কেসাস বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।
কতল না করার স্বপক্ষে দলীলসমূহ:
(۱) عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ امْرَأَةٌ وُجِدَتْ فِي بَعْضٍ مَغَازِي النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقْتُولَةٌ فَأَنْكَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَتْلَ النِّسَاءِ وَالصَّبْيَانِ .
রাসূল (সা.)-এর যুগে কোন এক যুদ্ধে একজন মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। এতে রাসূল (সা.) অসন্তুষ্ট হন এবং মহিলা ও শিশু বাচ্চা হত্যা করতে বারণ করেন।
(۲) رُوِيَ عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَهُ حِيْنَ بَعَثَ إِلَى الْيَمَنِ : أَيَّمَا رَجُلٍ ارْتَدَّ عَنِ الْإِسْلَامِ فَادْعُهُ فَإِنْ تَابَ فَاقْبَلْ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَتُبْ فَاضْرِبْ عُنُقَهُ، وَأَنَّمَا امْرَأَةٍ ارْتَدَّتْ عَنِ الَّا سُلَامِ فَادْعُهَا فَإِنْ تَابَتْ فَاقْبَلَ مِنْهَا وَإِنْ أَبَتْ فَاسْتَتِبْهَا الخ .
মু’আয ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেনে প্রেরণ করার সময় রাসূল (সা.) নসীহত করেন-যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করবে তাকে পুনরায় দাওয়াত দাও,
যদি সে তওবা করে তাহলে ভালো আর তওবা না করলে গর্দান উড়িয়ে দাও। আর যে মহিলা মুরতাদ হয়ে যায় তাকে দ্বীনের দিকে আহবান কর। যদি তওবা করে তাহলে তা কবুল করে নাও। অস্বীকৃতি জানালে বারবার তওবা করার আহবান জানাও।
(۳) روى أَبو يُوسُفَ عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ عَنْ عَاصِمِ بْنِ أَبِي النُّجُودِ عَنْ أَبِي رُزَيْنِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : لَا تُقْتَلُ النِّسَاءُ إِذَا هُنَّ ارْتَدْنَ عَنِ الْإِسْلَامِ وَلَكِنْ يُحْبَسْنَ وَيُدْعَيْنَ إِلَى الْإِسْلَامِ وَيُجْبَرْنَ عَلَيْهِ .
“ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, মহিলা
মুরতাদ হয়ে গেলে তাকে হত্যা করা যাবে না বরং বন্দী করে রাখতে হবে এবং ইসলামের প্রতি বারবার আহবান করতে হবে।”
) عَنْ مُحَمَّدٍ قَالَ بَلَغَنَا عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ قَالَ : إِذَا ارْتَدَّتِ السَّواةُ عَنِ الْإِسْلامِ حُبِسَتْ ، وَمِثْلُ هَذَا لَا يُقَالُ عَنِ اجْتِهَادٍ .
হমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আমাদের কাছে এই রেওয়ায়াত এসেছে, যে মহিলা মুরতাদ হয়ে যাবে তাকে আটকে রাখতে হবে। আর এ ধরনের ফতওয়া কেউ ইজতেহাদ করে দেয় না।”
(٥) عَنْ عَلِيِّ قَالَ : الْمُرْتَدَّةُ تُسْتَبَانُ وَلَا تُقْتَلُ – دار قطني
“আলী (রা.) বলেন, মুরতাদ মহিলাকে হত্যা করা যাবে না, তাওবা করতে সলা হবে।” দারা কুতনী
৬। মহিলার বুদ্ধি কম হওয়ায় তার অপরাধ কম বলে বিবেচিত হবে।
৭। মহিলার যুদ্ধাংদেহী মনোভাব কম হয়ে থাকে। এ কারণে রাসূল (সা.) মহিলাদেরকে কতল করতে নিষেধ করেছেন এবং এর কারণ স্বরূপ বলেছেন, এরা যুদ্ধ করে না।
ইমামগণের দলীলের জওয়াব
ইমামগণ উম্মে রূমান নামী মহিলার ঘটনা দ্বারা যে দলীল পেশ করেছেন এর জওয়াব হলো, তাকে শুধু মুরতাদ হওয়ার কারণেই হত্যা করা হয়নি বরং সে ছিল একাধারে যাদুকারিণী এবং কবি। সে রাসূল (সা.)-এর শানে অপমানজনক





ইদানিংকালে জাকির নায়েক সহ অনেক দাইয়ী দাবী করেন যে, আমভাবে মুরতাদদের কতল করার বিধান ইসলামে নেই, বরঞ্চ শুধুমাত্র বিদ্রোহী মুরতাদদের হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছে। অথচ হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, এইসব দাবী একেবারেই মিথ্যা। মুরতাদ সে বিদ্রোহী হোক কিংবা না হোক, তাকে হত্যা করতে হবে [24] –
মুরতাদের সাজা মৃত্যুদণ্ড
বর্তমান যুগে অনেক আধুনিক লোক মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডকে অস্বীকার করেছে। বলেছে যে, মুরতাদকে কতল করার আদেশ শরিয়তে নেই। তাঁরা কোরআনে কারিমের নিম্নেযুক্ত আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করে- لَا إِكْرَاهَ فِي
الدِّينِ )সূরা বাকারা, আয়াত-২৫৬(
‘দীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই।’
সুতরাং যদি কেউ মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে তাকে কতল করা হবে না। তারা এ অনুচ্ছেদের হাদিস দ্বারাও দলিল পেশ করতে গিয়ে বলে যে, এই হাদিসে শব্দটি الثَّارِكُ لِینِ এর কয়েদ। হাদিসের অর্থ শুধু মুরতাদ হয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডের কারণ না, যতোক্ষণ পর্যন্ত এর সঙ্গে جماعة বা দল হতে বিচ্ছেদ তথা বিদ্রোহ না পাওয়া যাবে। সুতরাং যখন কেউ মুরতাদ হয়ে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়, তখন সেটা মৃত্যুদণ্ডের কারণ হবে। শুধু মুরতাদ হওয়া মৃত্যুদণ্ডের কারণ না।
তাহলে এই দলিল সঠিক না। কেনোনা, অন্যান্য বর্ণনায় ব্যাপক আকারে বলা হয়েছে-من بذل دينه فاقتلوه তথা যে তার দীন পরিবর্তন করবে তাকে কতল করো। তাছাড়া প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগের অনেক ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে যেগুলোতে বিদ্রোহ না হওয়া সত্ত্বেও মুরতাদকে কতল করা হয়েছে। বস্তুত التَّارِكُ لِدِيْنِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ এর বিশদ বিবরণ দাতা, স্বতন্ত্র কয়েদ না। সুতরাং এ হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা ঠিক না।

শুধু তাই নয়, মুরতাদের স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে ইসলামি শরীয়তে কী করা হবে, সেটি জেনে নিই, [25]
আবদুর রাজ্জাক ও জুহুরীর বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. আরবের পৌত্তলিকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু জিযিয়া গ্রহণ করেননি।
ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, আরবের পৌত্তলিকেরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ও প্রভাবশালী। কোরআন মজীদও নাজিল হয়েছিলো তাদের স্বভাষায়। তাই তারা ছিলো দুর্বিনীত ও প্রকাশ্য মোজেজা অস্বীকারকারী। সেকারণেই তাদের নিকট থেকে ইসলামের স্বীকৃতি ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণ করা হবে না। ইসলাম গ্রহণ না করলে তারা হবে হত্যার উপযুক্ত। মুরতাদদের (ধর্ম পরিত্যাগকারীদের) বিধানও এ রকম। তারা স্বেচ্ছায় জেনে শুনে ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম সম্পর্কে সবকিছু জেনে শুনে বুঝে ধর্মত্যাগ করে। সুতরাং তাদের অজ্ঞতা ক্ষমার্হ নয়। তাদের সঙ্গে কেবল যুদ্ধ। জিযিয়া নয়।
হজরত ইবনে আব্বাস থেকে মুসলিমের মাধ্যমে ইমাম মোহাম্মদ বিন হাসান বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, আরবের অংশীবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল
দু’টি ইসলাম অথবা যুদ্ধ। মূর্তিপূজক ও মুরতাদেরা বন্দী হয়ে গেলে তাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীতে পরিণত করা যাবে। রসুল স. আওতাস ও হাওয়াজেনদের পরিবার পরিজনদেরকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীতে পরিণত করেছিলেন। তারা ছিলো আরবী ও অংশীবাদী। বনী মুস্তালিকের পরিবার পরিজনদেরকেও এ রকম করা হয়েছিলো। আবু বনী হানিফা মুরতাদ হয়ে গেলে হজরত আবু বকর তাদের পরিবার পরিজনকে বানিয়েছিলেন গোলাম ও বাঁদী। আর ওই গোলাম বাঁদীদেরকে বণ্টন করে দিয়েছিলেন মুজাহিদদের মধ্যে। মোহাম্মদ বিন আলী বিন আবু তালেবের আম্মা এবং জায়েদ বিন আবদুল্লাহ্ বিন ওমরের আম্মাও ছিলো তাদের মধ্যে।
বন্দী করে পূর্ণ কর্তৃত্বে নিয়ে আসার পর মুরতাদদের স্ত্রী-পুত্রকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু অংশীবাদীদের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে ইসলামের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো যাবে না। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, অংশীবাদী আরবীদের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে বন্দী করে ক্রীতদাস বানানো যাবে।
ইমাম আবু ইউসুফ লিখেছেন, উকাইদা সম্পর্কিত হাদিসে দেখা যায়-
আরববাসী কাফেরদের নিকট থেকেও জিযিয়া গ্রহণ করা হতো। তারা আহলে কিতাব, মূর্তিপূজক বা অগ্নিপূজক- যাই হোক না কেনো। অন্য হাদিসে এসেছে জাজিরাতুল আরব থেকে ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। সুতরাং উকাইদা সম্পর্কিত হাদিসের বিধানটি রহিত হয়েছে বলে স্বীকার করতে হবে। কারণ আরব এলাকায় বসবাসও ছিলো জিযিয়া প্রদানের উপযোগী হওয়ার একটি শর্ত। অতএব, বসবাসের অস্তিত্বই যখন নেই, তখন জিযিয়া ধার্য করার প্রেক্ষা-পটটি আর রইলো কোথায়?

সেইসাথে, আরো অমানবিক ব্যাপার হলো, মুরতাদকে কেউ হত্যা করলে তার জন্য হত্যাকারীর ওপর মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ হবে না। বিষয়টি সন্নিবেশিত আছে বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন খণ্ড ১ এ [26] –
ধারা-৭২
মুরতাদকে হত্যা করিলে
কোন ব্যক্তি মুরতাদকে হত্যা করিলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হইবে না, তবে সে তাযীরের আওতায় দণ্ডযোগ্য হইবে।
ব্যাখ্যা
কোন মুসলিম ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করিলে তাহাকে ‘মুরতাদ’ (ধর্মত্যাগী) বলে।
বিশ্লেষণ
যে কোন ধরনের অপরাধীর উপর শাস্তি কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। কোন ব্যক্তিকে বিচারের সম্মুখীন না করিয়া শাস্তি দেওয়া বৈধ নহে। মুরতাদ যদিও ইসলাম ত্যাগ করিয়া মৃত্যুদণ্ডের অপরাধী হইয়াছে এবং নিজের জীবনের নিরাপত্তা হারাইয়া ফেলিয়াছে, তবুও বিনা বিচারে তাহাকে হত্যা করা যাইবে না। অতএব যে ব্যক্তি মুরতাদকে হত্যা করিল সে সরকারের কর্তৃত্বের অবমাননা করিল। এইজন্য সে তাযীরের আওতায় দণ্ডযোগ্য হইবে। এই বিষয়ে ফকীহগণ একমত।”

একই সাথে, মুরতাদের বিষয় সম্পত্তিও জবরদখল করা হবে, তেমনটিই বলা আছে ইসলামিক আইনে [27] –
ধারা-৪৪৪
মুরতাদের (ইসলাম ধর্মত্যাগীর) মীরাস
(ক) মুরতাদ তাহার মুসলিম আত্মীয়দের ওয়ারিশ হইতে পারে না।
(খ) মুরতাদ মুসলমান অবস্থায় যে সম্পদ উপার্জন করিয়াছে উহা তাহার মুসলিম ওয়ারিশগণ পাইবে এবং ধর্মত্যাগের পরে অর্জিত মাল “বাইতুল মাল”-এ জমা হইবে; কিন্তু
(গ) মুরতাদ নারীর সমস্ত সম্পত্তি তাহার মুসলিম ওয়ারিশগণ লাভ করিবে।
বিশ্লেষণ
কোন মুসলমান দীন ইসলাম ত্যাগ করিলে তাহাকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলে।
পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُوْنَ .
“তোমাদের মধ্যে যে কেহ স্বীয় দীন হইতে ফিরিয়া যায় এবং কাফিররূপে মৃত্যুমুখে পতিত হয় দুনিয়া ও আখিরাতে তাহাদের কর্ম নিষ্ফল হইয়া যায়। ইহারাই দোযখবাসী, সেথায় তাহারা স্থায়ী হইবে” (সূরা বাকারা: ২১৭)।
ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে মুরতাদের পূর্বাপর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হইবে তাহার মুসলিম ওয়ারিশগণ।

মুরতাদের সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং বায়তুল মালে সম্পদ হস্তান্তর
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন-এর ৪৪৪ ধারায় মুরতাদের সম্পত্তির বণ্টন সম্পর্কে যে বিধান উদ্ধৃত হয়েছে, তা শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকারের নিয়ম নয়; ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনকারীর ওপর অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি ব্যবস্থা। একজন মানুষ ইসলাম ধর্ম পালনকালে যে সম্পত্তি উপার্জন করেছেন, তা তাঁর শ্রম, ব্যবসা বা বৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত। অথচ ধর্মত্যাগের পর সেই সম্পত্তি কার হাতে যাবে—এমন প্রশ্নে তাঁর নিজের পছন্দের পরিবর্তে উত্তরাধিকারীদের ধর্মীয় পরিচয়, শাসকের কোষাগার এবং মাজহাবভিত্তিক বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ধর্মত্যাগকে মৃত্যু কিংবা আইনগত মালিকানা-সীমাবদ্ধতার সঙ্গে তুলনা করার ফলে জীবিত ব্যক্তির আর্থিক স্বাধীনতাও আক্রান্ত হতে পারে।
সহিহ বুখারির উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, মুসলমান অমুসলমানের উত্তরাধিকারী হয় না এবং অমুসলমানও মুসলমানের উত্তরাধিকারী হয় না। এই ধর্মভিত্তিক উত্তরাধিকার-বাধা পরবর্তী ফকিহদের জন্য একটি মৌলিক ভিত্তি হয়েছে। একজন পিতা ইসলাম ত্যাগ করলে তাঁর সন্তান মুসলমান হলেও, অথবা সন্তান ইসলাম ত্যাগ করলে পিতা মুসলমান থাকলেও, পারস্পরিক সম্পত্তি-অধিকার সাধারণ আত্মীয়তার ভিত্তিতে আর নির্ধারিত হয় না। পারিবারিক সম্পর্কের উপরে ধর্মীয় পরিচয়কে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে [28]।
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لاَ يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ، وَلاَ الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ
বাংলা অনুবাদ: উসামা ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন: মুসলমান অমুসলমানের উত্তরাধিকারী হতে পারে না এবং অমুসলমানও মুসলমানের উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
ইমাম মাওয়ার্দি তাঁর আল-হাবি আল-কবির-এর ‘মুরতাদের উত্তরাধিকার’ পরিচ্ছেদে ছয়টি পৃথক ফিকহি অবস্থান সংরক্ষণ করেছেন। শাফেয়ি ও হাম্বলি মতের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারায় মুরতাদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে স্বাভাবিক মিরাস হিসেবে বণ্টিত না হয়ে মুসলমানদের বায়তুল মালে ফাই হিসেবে জমা হয়। মালিকি ধারায়ও মূল নিয়ম বায়তুল মাল, যদিও জিন্দিক বা উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুশয্যায় ধর্মত্যাগের মতো কিছু ব্যতিক্রম নিয়ে আলোচনা আছে। আবু হানিফার মতে ধর্মত্যাগের আগে অর্জিত সম্পত্তি মুসলিম উত্তরাধিকারীদের, আর পরে অর্জিত সম্পত্তি বায়তুল মালের; মুরতাদ নারীর ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থা। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মতে পূর্বাপর সমস্ত সম্পত্তি মুসলিম উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য। এ ছাড়া অন্য কিছু মতেও ধর্মত্যাগীর নতুন ধর্মের উত্তরাধিকারীদের কথা এসেছে। এই বিভাজনগুলো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অধিকারের হস্তান্তর কতটা প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে, তা স্পষ্ট করে [29]।
قال الماوردي : وهذا كما قال : لا اختلاف بينهم أن المرتد لا يرث ، واختلفوا هل يورث أم لا ؟ على ستة مذاهب
বাংলা অনুবাদ: মাওয়ার্দি বলেন, মুরতাদ ব্যক্তি অন্যের উত্তরাধিকারী হতে পারে না—এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ নেই। তবে মুরতাদের সম্পত্তি অন্যেরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে কি না, সে সম্পর্কে ছয়টি মাজহাবি অবস্থান রয়েছে।
সব মতেই সম্পত্তি শেষ পর্যন্ত বায়তুল মালে যাবে—এমন দাবি ভুল। আবার সব মতেই কেবল আত্মীয়স্বজন সম্পত্তি পাবে—সেটিও ভুল। কিন্তু এই পার্থক্যগুলো যে বৃহত্তর সমস্যাটি দেখায় তা অভিন্ন: ধর্ম ত্যাগ করা ব্যক্তির সম্পত্তিগত অধিকার তাঁর ধর্মীয় অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি কী ধর্মে বিশ্বাস করবেন, তা বদলানোর সঙ্গে তাঁর বৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বা আত্মীয়দের পারস্পরিক উত্তরাধিকার লেনদেনের নৈতিক কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই। বিশ্বাসের পরিবর্তনের কারণে অর্থনৈতিক অধিকার সংকুচিত করা ধর্মীয় আনুগত্য বজায় রাখার জন্য গুরুতর আর্থিক চাপের উপায় হয়ে উঠতে পারে।
ধর্মত্যাগে স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ, ইদ্দত এবং দেনমোহরের বিধান
ধ্রুপদী ইসলামি ফিকহে একজন স্বামী বা স্ত্রী ইসলাম ত্যাগ করলে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের আইনগত অবস্থান পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের জন্য অপরের সঙ্গে সহিংসতা, দাম্পত্য নির্যাতন বা বিবাহের প্রতি অবিশ্বস্ততা প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই; একজনের ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনই যথেষ্ট হতে পারে। বিবাহে থাকা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসেন এবং একসঙ্গে থাকতে চান—এই সম্মতির ওপর ধর্মীয় বিধান অতিরিক্ত একটি শর্ত চাপিয়ে দেয়। শাস্তির পরিণতি শুধু ধর্মত্যাগকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং পারিবারিক জীবনও সরাসরি আক্রান্ত হয়।
ইমাম শাফেয়ির আল-উম্ম গ্রন্থের ‘স্বামী-স্ত্রীর একজন বা উভয়ের ধর্মত্যাগ’ পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্বামী বা স্ত্রী একজন কিংবা উভয়ে ধর্মত্যাগ করলে দাম্পত্য সহবাস বন্ধ থাকবে। দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের পরে ধর্মত্যাগ হলে ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত পূর্ববর্তী বিবাহের অবস্থান স্থগিত থাকতে পারে; এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করলে বিবাহ বহাল থাকবে, অন্যথায় তা ভেঙে যাবে। দাম্পত্য সহবাসের আগের ধর্মত্যাগে বিবাহ তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যাওয়ার আলোচনাও রয়েছে। দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা অর্ধেক প্রাপ্যতা নির্ভর করতে পারে কে ধর্মত্যাগ করেছেন এবং বিবাহে সহবাস হয়েছিল কি না, তার ওপর। শাফেয়ির বক্তব্যে এটি প্রচলিত স্বেচ্ছা তালাক নয়; ফাসখ—আইনগতভাবে বিবাহের বন্ধন ছিন্ন হওয়া [30]।
وَإِذَا ارْتَدَّا أَوْ أَحَدُهُمَا مُنِعَا الْوَطْءَ فَإِنْ انْقَضَتِ الْعِدَّةُ قَبْلَ اجْتِمَاعِ إِسْلَامِهِمَا انْفَسَخَ النِّكَاحُ
বাংলা অনুবাদ: স্বামী-স্ত্রী উভয়ে কিংবা তাঁদের একজন ধর্মত্যাগ করলে তাঁদের সহবাস নিষিদ্ধ হবে। উভয়ের ইসলাম গ্রহণের আগে ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে বিবাহ ভেঙে যাবে।
মাওয়ার্দি একই বিষয়ের ব্যাখ্যায় মাজহাবগুলোর মধ্যকার পার্থক্যও সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে শাফেয়ি মতে সহবাসের পরে সংঘটিত ধর্মত্যাগের ক্ষেত্রে ইদ্দত পর্যন্ত বিবাহ স্থগিত থাকে; আবু হানিফার মতে ধর্মত্যাগ ঘটামাত্র বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে; মালিকের ব্যাখ্যায় ধর্মত্যাগী ফিরে না এলে বিবাহ ভেঙে যায়। ফলে বিবাহ কখন শেষ হবে, সে বিষয়ে মতভেদ থাকলেও ধর্মত্যাগকে বিবাহ বিচ্ছেদের একটি আইনগত কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে [31]।
ধর্মত্যাগের কারণে বিবাহ ভাঙার এই বিধান ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং পারিবারিক স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে মৌলিক সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। একজন ব্যক্তির মত পরিবর্তন অপর ব্যক্তির সম্মতিকে বাতিল করে দেয় না। অথচ এই ব্যবস্থায় দাম্পত্য সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে ইসলামের সঙ্গে ধর্মত্যাগকারীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে কি না, তার ওপর। যখন একজন মানুষকে ধর্মে ফিরে যাওয়ার জন্য জীবনদণ্ডের হুমকির পাশাপাশি বিবাহ ও পরিবার হারানোর ভয়ও মোকাবিলা করতে হয়, তখন ধর্মীয় আনুগত্যের দাবি কেবল আধ্যাত্মিক থাকে না; তা ঘনিষ্ঠ মানবিক সম্পর্কের ওপর জোরপূর্বক কর্তৃত্বে পরিণত হয়।
মুরতাদের সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়, বন্দিত্ব ও দাসত্বের বিধান
ধর্মত্যাগজনিত শাস্তির আরেকটি গুরুতর ক্ষেত্র হলো সন্তানদের ধর্মীয় পরিচয়। একজন শিশু কোনো ধর্মের দর্শন, সত্যতার দাবি কিংবা মতবাদ যাচাই করে জন্মগ্রহণ করে না। তবু ধ্রুপদী ফিকহে পিতা-মাতার ধর্মীয় অবস্থানের ভিত্তিতে শিশুকে মুসলমান অথবা অন্য শ্রেণির বলে গণ্য করার নিয়ম রয়েছে। পিতা-মাতা ইসলামে থাকা অবস্থায় সন্তান জন্মেছে কি না, পরে দুজন ধর্মত্যাগ করেছেন কি না, পরিবার কোন ভূখণ্ডে অবস্থান করছে এবং সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে শিশুর পরবর্তী অধিকার ও স্বাধীনতার বিধান নির্ধারিত হয়েছে।
ইমাম কাসানির হানাফি ফিকহগ্রন্থ বাদায়িউস সানায়ি-এর সপ্তম খণ্ডে ‘মুরতাদের সন্তানের বিধান’ নামে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রয়েছে। সেখানে মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে জন্মানো সন্তান তাঁদের ধর্মত্যাগের পরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনগতভাবে মুসলিম থাকে। এমন সন্তান বড় হয়ে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করলে তাকে পুনরায় ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে; সংশ্লিষ্ট বিধানে প্রকৃত ব্যক্তিগত ধর্মত্যাগ ও পিতা-মাতার সূত্রে আরোপিত ধর্মত্যাগের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বদলে বন্দিত্বের মাধ্যমে বাধ্য করার ব্যবস্থার কথা এসেছে। অর্থাৎ শিশু নিজে স্বাধীনভাবে ইসলাম গ্রহণ না করলেও তার ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রীয় আইন ও পারিবারিক অনুসরণের ভিত্তিতে স্থির করা হচ্ছে [32]।
وَأَمَّا حُكْمُ الِاسْتِرْقَاقِ فَذُكِرَ فِي السِّيَرِ أَنَّهُ يُسْتَرَقُّ الْإِنَاثُ وَالذُّكُورُ الصِّغَارُ مِنْ أَوْلَادِهِ
বাংলা অনুবাদ: দাসত্বে পরিণত করার বিধান সম্পর্কে ‘সিয়ার’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্মত্যাগীর অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা ও পুত্রসন্তানদের দাসত্বে পরিণত করা যায়।
কাসানির আলোচনায় এই দাসত্বসংক্রান্ত বিধান বিশেষভাবে যুদ্ধ, দারুল হারবে গমন, বন্দিত্ব এবং পিতা-মাতার পূর্ববর্তী ধর্মীয় অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত; সব মুরতাদের সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাস হয়ে যাবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম সেখানে নেই। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ধর্মত্যাগী পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের দাসত্বে পরিণত করার আইনগত সম্ভাবনাই ভয়াবহ। যে শিশু কোনো অপরাধ করেনি, নিজের ধর্মীয় পরিচয়ও স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করেনি, তাকে পিতা-মাতার ধর্মীয় অবস্থানের কারণে বন্দিত্ব বা দাসত্বের অধীন করা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার সরাসরি অস্বীকৃতি।
তাফসিরে মাযহারীতে আবু বকর কর্তৃক বনি হানিফার ধর্মত্যাগীদের পরিবারের সদস্যদের বন্দী ও দাস-দাসীতে পরিণত করার বিবরণ রয়েছে। কাসানির বিধানের সঙ্গে এই বিবরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: একটি হলো পরবর্তী তাফসিরে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক বর্ণনা, অন্যটি নির্দিষ্ট শর্তে বন্দিত্ব ও দাসত্বের আইনগত অনুমোদন। দুটি এক নয়; কিন্তু একত্রে এগুলো দেখায়, ধর্মত্যাগের পরিণতি কেবল ধর্মত্যাগী ব্যক্তির ওপর নয়, তাঁর স্ত্রী-সন্তানের শারীরিক স্বাধীনতার ওপরও বিস্তৃত হতে পারে।
সৌদি আরবের ফতোয়া: শাস্তির ব্যাখ্যা
শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ হচ্ছেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ইসলামিক আলেম। তার বিখ্যাত ওয়েবসাইট islamqa.info তে এই সম্পর্কিত যেই ফতোয়াটি দেয়া আছে, সেটি দেখে নেয়া যাক, [33]
ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেন
প্রশ্ন 20327
আমি একজন অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও আপনাদের বিশ্বাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। কিন্তু এ বিষয়টি বুঝা কঠিন যে, এক ব্যক্তি একটা কথা বলল, আর সে কথাটার কারণে তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হবে- আমি সালমান রুশদির কথা বুঝাতে চাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যেহেতু মানুষ তাই এ ধরনের কোন রায় প্রকাশ করার অধিকার আমাদের নেই। এ ধরনের বিষয়ের ফয়সালা আল্লাহই করবেন।
উত্তর
আলহামদু লিল্লাহ।.
শুরুতেই আমরা আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি- আমাদের প্রতি আস্থা রেখে এ প্রশ্নটি আমাদের নিকট পাঠানোর জন্য, আমাদের বিশ্বাসের প্রতি আপনার অনুরক্ততার জন্য এবং প্রশ্নটির উত্তর জানার ব্যাপারে আপনার আগ্রহের জন্য। এ ওয়েব সাইটের একজন অতিথি হিসেবে, পাঠক হিসেবে ও জ্ঞানপিপাসু হিসেবে আপনাকে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম। সুপ্রিয় পাঠক, আমরা আপনার চিঠিতে লক্ষ্য করেছি- আপনি যে, ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন সেটি আপনি খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করেছেন। এটি আমাদের জন্য ও আপনার জন্য শুভসংবাদ। আমাদের জন্য এ বিবেচনা থেকে খুশির সংবাদ যে, আমাদের ধর্ম আপনার মত সত্যান্বেষীদের কাছেও পৌঁছতে পেরেছে। আমাদের নবী তো আমাদেরকে জানিয়ে গিয়েছিলেন- এই ধর্ম ভূপৃষ্ঠের সর্বস্তরে পৌঁছে যাবে। তামিম আদ-দারি (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন: রাত ও দিন যতদূর পৌঁছেছে এ ধর্মও ততদূর পৌঁছে যাবে। কোন পশমনির্মিত তাবু (শহুরে বাড়ী) অথবা মাটির ঘর (গ্রাম্য ঘর) কোনটাই বাদ থাকবে না; আল্লাহ তাআলা সর্বগৃহে এই ধর্মকে প্রবেশ করাবেন। সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে, অসম্মানীর ঘরে অসম্মানের সাথে। যে সম্মানের মাধ্যমে আল্লাহ ইসলামকে গৌরবময় করবেন এবং যে অপমানের মাধ্যমে আল্লাহ কুফরকে অপমানিত করবেন।[মুসনাদে আহমাদ (১৬৩৪৪), সিলসিলা সহিহা গ্রন্থে আলবানী হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন] এটি আপনার জন্য শুভকর এ দিক থেকে যে, এই ধর্মের প্রতি আপনার যে আগ্রহ এই আগ্রহ আপনাকে এই মহান ধর্ম সম্পর্কে আরো বেশি জানতে অনুপ্রাণিত করবে। যেমন- এই ধর্ম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যশীল। তাই আমরা আপনাকে পরামর্শ দিব আপনি সব ধরনের প্রভাব মুক্ত হয়ে ধীরস্থিরভাবে ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করবেন। আপনি এই ওয়েব সাইটের (219) (21613) (20756) (10590) নং প্রশ্নোত্তরগুলো পড়তে পারেন। পক্ষান্তরে আপনার প্রশ্ন- “এই বিষয়টি বুঝা কঠিন যে, এক ব্যক্তি একটা কথা বলল, আর সে কথাটার কারণে তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হবে…।আমি বিশ্বাস করি, আমরা যেহেতু মানুষ তাই এ ধরনের কোন রায় প্রকাশ করার অধিকার আমাদের নেই।”আপনার কথা সঠিক- কুরআন-হাদিসের দলিল ছাড়া কারো বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার অধিকার কোন মানুষের নেই। যে কথার কারণে কারো বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয় সেটাকে মুসলিম স্কলারগণ ‘রিদ্দা’ (ইসলাম-ত্যাগ) হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। কখন ব্যক্তির ‘রিদ্দা’ সাব্যস্ত হয়? এবং মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) ব্যক্তির বিধান কী? এক: রিদ্দা মানে- ইসলাম গ্রহণ করার পর কুফরিতে ফিরে যাওয়া।
দুই: কখন ব্যক্তির ‘রিদ্দা’ সাব্যস্ত হয়?
যে বিষয়গুলোতে লিপ্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কোন ব্যক্তির ‘রিদ্দা’ সাব্যস্ত হয়-তা চার প্রকার। ১. বিশ্বাসগতভাবে ইসলাম ত্যাগ করা। যেমন- আল্লাহর সাথে শিরক তথা অংশীদার স্থাপন করা, অথবা আল্লাহকে অস্বীকার করা অথবা আল্লাহ তাআলার সাব্যস্ত কোন গুণকে অস্বীকার করা।
২. কোন কথা উচ্চারণ করার মাধ্যমে ইসলাম ত্যাগ। যেমন- আল্লাহ তাআলাকে গালি দেয়া অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয়া।
৩. কর্মের মাধ্যমে ধর্মত্যাগ। যেমন-কোন নোংরা স্থানে কুরআন শরিফ নিক্ষেপ করা। এ কাজ আল্লাহর বাণীকে অবমূল্যায়নের নামান্তর। তাই এটি অন্তরে বিশ্বাস না থাকার আলামত। অনুরূপভাবে কোন প্রতিমাকে অথবা সূর্যকে অথবা চন্দ্রকে সিজদা করা।
৪. কোন কর্ম বর্জন করার মাধ্যমে ইসলাম ত্যাগ। যেমন- ইসলামের সকল অনুশাসনকে বর্জন করা এবং এর উপর আমল করা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নেয়া।
তিন: মুরতাদের হুকুম কী?
যদি কোন মুসলিম মুরতাদ হয়ে যায় এবং মুরতাদের সকল শর্ত তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় (সুস্থ- মস্তিস্ক, বালেগ, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হওয়া) তাহলে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হবে এবং ইমাম তথা মুসলমানদের শাসক অথবা তাঁর প্রতিনিধি যেমন বিচারক তাকে হত্যা করবে। তাকে গোসল করানো হবে না, তার জানাযা-নামায পড়ানো হবে না এবং তাকে মুসলমানদের গোরস্থানে দাফন করা হবে না।
মুরতাদকে হত্যা করার দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী “যে ব্যক্তি ধর্ম ত্যাগ করে তাকে হত্যা কর।” [সহিহ বুখারী (২৭৯৪)]। হাদিসে ধর্ম দ্বারা উদ্দেশ্য ইসলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী- “যে মুসলিম ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল’ নিম্নোক্ত তিনটি কারণের কোন একটি ছাড়া তার রক্তপাত করা হারাম: হত্যার বদলে হত্যা, বিবাহিত ব্যভিচারী, দল থেকে বিচ্ছিন্ন-ধর্মত্যাগী।”[সহিহ বুখারি (৬৮৭৮) সহিহ মুসলিম (১৬৭৬)]। দেখুন: মাওসুআ ফিকহিয়্যা (ফিকহি বিশ্বকোষ), খণ্ড-২২, পৃষ্ঠা- ১৮০ প্রিয় প্রশ্নকারী, এর মাধ্যমে আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মুরতাদকে হত্যা করার বিষয়টি আল্লাহর আদেশেই সংঘটিত হয়ে থাকে। যেহেতু আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। “তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদের আনুগত্য কর” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুরতাদকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমনটি ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে- “যে ব্যক্তি তার ধর্ম পরিবর্তন করেছে তাকে হত্যা কর।” এ মাসয়ালার প্রতি সন্তুষ্ট হতে আপনার হয়তো কিছু সময় লাগতে পারে, কিছু চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হতে পারে। আপনি এ দিকটি একটু ভেবে দেখেন তো, একজন মানুষ সত্যকে অনুসরণ করল, সত্যপথে প্রবেশ করল এবং আল্লাহ তার উপর যে ধর্ম গ্রহণ করা আবশ্যক (ফরয) করে দিয়েছেন একমাত্র সে সত্য ধর্ম গ্রহণ করল। এরপর আমরা তাকে এই অবকাশ দিব যে, সে যখন ইচ্ছা অতি সহজে এই ধর্ম ত্যাগ করে চলে যাবে এবং কুফরি কথা উচ্চারণ করবে -যে কথা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয়- এভাবে সে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, তাঁর কিতাব, তাঁর ধর্মকে অস্বীকার করবে কিন্তু কোন শাস্তির সম্মুখীন হবে না। এই যদি হয় তাহলে তার নিজের উপর এবং অন্য যারা এই ধর্মে প্রবেশ করতে চায় তাদের উপর এর প্রভাব কেমন হবে? আপনার কি মনে হয় না, এ রকম সুযোগ দিলে এই মহান ধর্ম -যা গ্রহণ করা অনিবার্য- একটি উন্মুক্ত দোকানে পরিণত হবে। যে যখন ইচ্ছা এতে প্রবেশ করবে এবং যখন ইচ্ছা বের হয়ে যাবে। হতে পারে সে অন্যকেও ইসলাম ত্যাগে অনুপ্রাণিত করবে। তাছাড়া এই ব্যক্তি তো এমন কেউ নয় যে সত্যকে জানেনি, ধর্মকর্ম, ইবাদত-বন্দেগি কিছুই করেনি। বরঞ্চ এই ব্যক্তি সত্যকে জেনেছে, ধর্মকর্ম করেছে, ইবাদত-অনুষ্ঠান আদায় করেছে। সুতরাং সে যতটুকু শাস্তি প্রাপ্য এটি তার চেয়ে বেশি নয়। এ ধরনের শাস্তি শুধু এমন এক ব্যক্তির জন্য রাখা হয়েছে যে ব্যক্তির জীবনের কোন মূল্য নেই। কারণ সে ব্যক্তি সত্যকে জেনেছে, ইসলামের অনুসরণ করেছে এরপর তা ছেড়ে দিয়েছে। অতএব এ ব্যক্তির আত্মার চেয়ে মন্দ কোন আত্মা আছে কি? সারকথা হচ্ছে- আল্লাহ তাআলা এই ধর্ম নাযিল করেছেন এবং তিনি এই ধর্ম গ্রহণ করা অপরিহার্য করেছেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলাম ত্যাগকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন। এই শাস্তি মুসলমানদের চিন্তাপ্রসূত নয়, পরামর্শভিত্তিক নয়, ইজতিহাদনির্ভর নয়। বিষয়টি যেহেতু এমনু তাই আমরা যাঁকে রব্ব হিসেবে, ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছি তাঁর হুকুমের অনুসরণ করতেই হবে। আল্লাহ আমাদেরকে ও আপনাকে তাঁর পছন্দীয় ও সন্তোষজনক আমল করার তাওফিক দিন। আমরা পুনরায় আপনার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
যে ব্যক্তি হেদায়েত গ্রহণ করেছে তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।
এবারে আসুন দেখে নিই, সৌদি সরকার নাস্তিকদের কীভাবে দেখে, [34]

মুরতাদের মৃতদেহের অসম্মান: জানাজা-দাফন থেকে বঞ্চিত করা এবং কুকুরের সামনে ফেলে দেওয়ার অনুমতি
ইসলামকিউএর দীর্ঘ ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর মুসলিমদের মতো গোসল করানো হবে না, তাঁর জানাজা পড়া হবে না এবং মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হবে না। মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে জীবন কেড়ে নেওয়ার পরও মৃত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় তাঁর প্রতি আচরণের মাপকাঠি হয়ে থাকে। মানুষের মৃত্যুর পর মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য কোনো বিশ্বাসের সত্যতা স্বীকার করার বিষয় নয়; এটি জীবিত স্বজনদের শোক প্রকাশ, মৃতদেহের প্রতি সম্মান এবং ন্যূনতম সামাজিক মানবিকতার বিষয়। অথচ ধর্মত্যাগকে এমন একটি অপরাধে পরিণত করা হয়েছে, যার শাস্তিমূলক প্রভাব মৃত্যুর পরও শেষ হয় না।
শাফেয়ি ফিকহের প্রভাবশালী আলেম ইমাম নববীর আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, পঞ্চম খণ্ডে মৃতদেহের কাফন ও দাফনের বিধান আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, হারবি কাফির অথবা মুরতাদ হলে কাফন দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়; শাফেয়ি মাজহাবের গৃহীত অবস্থান অনুযায়ী দাফন করাও বাধ্যতামূলক নয়। এরপর আরও ভয়াবহ একটি অনুমতির কথা এসেছে: মৃতদেহের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া জায়েজ। নববী এই বক্তব্যের সঙ্গে বাগাভি, রাফেয়ি ও অন্যান্য আলেমের নামও উল্লেখ করেছেন। মানুষের দুর্গন্ধে অসুবিধা হলে মৃতদেহ দাফন করা যেতে পারে—এটিও একই আলোচনায় এসেছে [35]।
وَإِنْ كَانَ حَرْبِيًّا أَوْ مُرْتَدًّا لَمْ يَجِبْ تَكْفِينُهُ بِلَا خِلَافٍ وَلَا يَجِبْ دَفْنُهُ عَلَى الْمَذْهَبِ وَبِهِ قَطَعَ الْأَكْثَرُونَ ، بَلْ يَجُوزُ إغْرَاءُ الْكِلَابِ عَلَيْهِ
বাংলা অনুবাদ: মৃত ব্যক্তি হারবি কাফির বা মুরতাদ হলে তাঁকে কাফন দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। মাজহাবের গৃহীত অবস্থান অনুযায়ী দাফনও বাধ্যতামূলক নয়; অধিকাংশ আলেম এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বরং তাঁর মৃতদেহের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া জায়েজ।
নববীর বক্তব্যে কুকুর লেলিয়ে দেওয়াকে ফরজ, ওয়াজিব বা সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক কাজ বলা হয়নি; জায়েজ বলা হয়েছে। এটিকে বাধ্যতামূলক বিধান বললে মূল পাঠ বিকৃত হবে। কিন্তু ‘জায়েজ’ বলার মধ্যেই একটি গভীর নৈতিক সমস্যা রয়েছে: মৃতদেহের ওপর পশু লেলিয়ে দিয়ে অপমান করার মতো কাজকে আইনগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর পর একজন ব্যক্তি নিজের দেহ রক্ষা করতে পারেন না, প্রতিবাদ করতে পারেন না; আর তাঁর পরিবারও এমন আচরণের বিরুদ্ধে এক প্রাথমিক মানবিক স্বার্থ বহন করে। ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাসের জন্য মৃতদেহের মর্যাদা অস্বীকার করা ন্যায়বিচারের কোনো প্রয়োজনীয় অংশ নয়।
ইবনে হাজার আল-হাইতামির তুহফাতুল মুহতাজ ফি শরহিল মিনহাজ-এও একই অবস্থান সরাসরি উল্লেখিত। সেখানে হারবি কাফিরের মৃতদেহের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার অনুমতি উল্লেখ করে মুরতাদ ও জিন্দিকের ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য বলা হয়েছে। এভাবে মতটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আধুনিক ফতোয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; ধ্রুপদী শাফেয়ি ফিকহের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে [36]।
أَمَّا الْحَرْبِيُّ فَيَجُوزُ إغْرَاءُ الْكِلَابِ عَلَى جِيفَتِهِ وَكَذَا الْمُرْتَدُّ وَالزِّنْدِيقُ
বাংলা অনুবাদ: হারবি কাফিরের মৃতদেহের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া জায়েজ। মুরতাদ ও জিন্দিকের ক্ষেত্রেও একই বিধান।
একজন মানুষ ইসলাম ত্যাগ করলেন—এই একটিমাত্র কারণেই তাঁর জানাজা, দাফন, মৃতদেহের প্রতি আচরণ এবং তাঁর পরিবারের শেষকৃত্যের সুযোগ নিয়ে পৃথক ধর্মীয় বিধান তৈরি হয়েছে। ধর্মত্যাগীর প্রতি শাস্তিমূলক ঘৃণা মৃত্যুর পরও বহাল রাখার এই ধারণা মানবিক মর্যাদার নীতির সরাসরি বিরোধী। ধর্মীয় আনুগত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাউকে হত্যা করার বিধান যেমন নিষ্ঠুর, তেমনি মৃত্যুর পর তাঁর দেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণকে অনুমোদন দেওয়াও অমানবিক। রাষ্ট্র বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কোনো মৃত ব্যক্তির বিশ্বাসের পরিচয় দিয়ে তাঁর দেহের প্রতি মৌলিক সম্মানের অধিকার বাতিল করার নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে না।
মুরতাদদের শাস্তির পদ্ধতি: ভয়াবহতার সীমা অতিক্রম
এবারে আসুন মুরতাদদের কীভাবে হত্যা করা হতো তা জেনে নিই একটি ঘটনা থেকে। উকল গোত্রের কিছু লোক নবীর কাছে এসে ইসলাম কবুল করেছিল। পরে তারা এক রাখালকে হত্যা করে এবং উট নিয়ে পালিয়ে যায়। তাদের নবী মুহাম্মদ অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড কেন করা হয়েছিল, রাখালকে হত্যার জন্য নাকি উট চুরির জন্য, নাকি ইসলাম ত্যাগের শাস্তি হিসেবে সেটি এই আলোচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ [37]। এসেইসাথে গুরুত্বপূর্ণ শাস্তি প্রদানের পদ্ধতিটি [38] [39] [40]
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ পবিত্রতা
পরিচ্ছেদঃ ১৯১/ হালাল পশুর প্রস্রাব প্রসঙ্গে
৩০৭। মুহাম্মদ ইবনু ওহাব (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ উরায়নাহ গোত্রের কয়েকজন বেদুঈন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম কবুল করল। মদিনায় বসবাস তাঁদের জন্য উপযোগী হল না। এমনকি তাঁদের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেল এবং পেট ফুলে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের স্বীয় দুগ্ধবতী উটের পালের দিকে পালিয়ে দিলেন। আর তাঁদেরকে উহা (দুধ ও প্রস্রাব) পান করার আদেশ দিলেন। এতে তারা সুস্থ হয়ে পড়ল এবং উটের রাখালকে মেরে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। এর পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের খুঁজে আনার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁদের ধরে আনা হল তাঁদের হাত পা কেটে দেয়া হল এবং তাঁদের চোখে গরম শলকা ঢুকিয়ে দেয়া হল।
আমিরুল মু’মিনীন আব্দুল মালিক আনাস (রাঃ) এর কাছে এ হাদিস শুনে তার কাছে প্রশ্ন করলেন, এ শাস্তি কি কুফুরের জন্য না পাপের জন্য? তিনি বললেন কুফুরের জন্য। আবূ আবদুর রহমান (ইমাম নাসারী) বলেন, তালহাহ ব্যতীত অন্য কেউ এ হাদিসের সানাদে ইয়াহিয়া আনাস হতে এ কথা উল্লেখ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। সঠিক কথা হল, আল্লাহই ভাল জানেন- ইয়াহইয়া সা’ইদ ইবনুল মুসাইয়্যাব হতে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৬ঃ কিসাস (প্রতিশোধ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ – মুরতাদ এবং গোলযোগ সৃষ্টিকারীকে হত্যা করা প্রসঙ্গে
৩৫৩৯-(৭) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ‘উকল সম্প্রদায়ের কিছু লোক উপস্থিত হলো। অতঃপর তারা ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু মাদীনার আবহাওয়া তাদের জন্য অনুপযোগী হলো। অতএব তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সাদাকার উটনীর নিকট গিয়ে তার দুধ ও প্রস্রাব পানের নির্দেশ দিলেন। ফলে তারা নির্দেশ পালনার্থে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে মুরতাদ হয়ে গেল এবং তারা রাখালদেরকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিল। তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ সংবাদ শুনে) তাদের পেছনে লোক পাঠালেন। অতঃপর তাদেরকে ধরে আনা হলে তাদের দু’ হাত ও দু’ পা কেটে ফেললেন এবং তাদের চোখ ফুঁড়ে দিলেন, তারপর তাদের রক্তক্ষরণস্থলে দাগালেন না, যাতে তারা মৃত্যুবরণ করে।
অপর বর্ণনাতে রয়েছে, লোকেরা তাদের চোখে লৌহ শলাকা দিয়ে মুছে দিল। অন্য বর্ণনাতে আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লৌহ শলাকা আনার হুকুম করলেন, যাকে গরম করা হলো এবং তাদের চোখের উপর মুছে দেয়া হলো। অতঃপর তাদেরকে উত্তপ্ত মাটিতে ফেলে রাখলেন। তারা পানি চাইল কিন্তু তাদেরকে পানি পান করানো হয়নি। পরিশেষে তারা এ করুণ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৩০১৮, ৬৮০২, মুসলিম ১৬৭১, আবূ দাঊদ ৪৩৬৪, নাসায়ী ৪০২৫, ইবনু মাজাহ ২৫৭৮, আহমাদ ১২৬৩৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৯/ ‘কাসামা’-(খুনের ব্যাপারে বিশেষ ধরনের হলফ করা), ‘মুহারিবীন’ (শত্রু সৈন্য), ‘কিসাস’ (খুনের বদলা) এবং ‘দিয়াত’ (খুনের শাস্তি স্বরূপ অর্থদন্ড)
পরিচ্ছেদঃ ২. শত্রু সৈন্য এবং মুরতাদের বিচার
৪২০৭। আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আট জনের একটি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করল। অতঃপর তারা ইসলামের ওপর বাইআত গ্রহণ করল। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া তাদের অনুকুলে না হওয়ায় তাদের শরীর অসুস্থ হায় গেল। তখন তারা এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে-গমন করে উটের মূত্র ব্যবহার এবং দুধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী হ্যাঁ। এরপর বের হয়ে গেল এবং তার মূত্র ব্যবহার ও দুধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল।
অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তাঁরা ধরা পড়ল এবং তাদেরকে নিয়ে আসা হল। তাদের প্রতি আদেশ জারি করা হল এবং তাদের হাত-পা কর্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলো। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবন সাব্বাহ (রহঃ) … এর বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِل এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে এবং তার বর্ণনায় وَسُمِّرَتْ أَعْيُنُهُمْ রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
উকল-উরাইনাহর ঘটনাটি একটি বিশেষ কারণে স্বাধীন বিশ্বাস পরিবর্তনের সাধারণ ঘটনার সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ওই বর্ণনায় ধর্মত্যাগের পাশাপাশি রাখাল হত্যা, উট লুণ্ঠন এবং সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল। এসব অপরাধের পৃথক বিচার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ধর্মত্যাগীদের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ দণ্ডবিধির প্রমাণ কেবল এই ঘটনাটির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বুখারির ধর্ম পরিবর্তনকারীকে হত্যা করার হাদিস, সাহাবিদের প্রয়োগ এবং পরবর্তী ফিকহে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের স্বতন্ত্র শাস্তির আলোচনা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ধর্মত্যাগ সংঘটিত হয়েছে বলে ধর্মত্যাগকে নিজে হত্যাকাণ্ডের সমান অপরাধ গণ্য করা যায় না। একইভাবে ধর্মত্যাগের সাধারণ মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেখিয়ে সহিংস অপরাধের জন্য যেকোনো মাত্রার নির্যাতনকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করা যায় না।
এই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দিক হলো, গ্রেপ্তারের পরে অঙ্গচ্ছেদ, উত্তপ্ত লোহা দিয়ে চোখ অন্ধ করা, রক্তপাত বন্ধ না করা এবং পানি না দিয়ে মৃত্যুবরণ করতে দেওয়ার বিবরণ। ব্যক্তি অপরাধী হলেও তাঁর ওপর অসহনীয় যন্ত্রণা সৃষ্টি করা অপরাধের ক্ষতি প্রতিকার করার সমার্থক নয়। অপরদিকে সাধারণ ধর্মত্যাগীর ওপর মৃত্যুদণ্ডের বিধানে এমনকি একজন নিরপরাধ বিশ্বাস পরিবর্তনকারীকেও জীবনদণ্ডযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একদিকে অপরাধের শাস্তিতে অতিরিক্ত নিষ্ঠুরতা এবং অন্যদিকে বিশ্বাস পরিবর্তনকে নিজেই অপরাধে পরিণত করা—দুটি আলাদা কিন্তু গুরুতর নৈতিক সমস্যা।
ইসলাম: একটি ইঁদুর ধরার ফাঁদ
একজন মানুষ কোনো ধর্ম গ্রহণ করবেন কি না, সেটি তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় একবার গ্রহণ করার পরে তা আর পরিবর্তন করার অধিকার না থাকলে সেই ধর্মে প্রবেশের স্বাধীনতাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন ব্যক্তি ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন, জন্মসূত্রে মুসলিম বলে গণ্য হয়েছেন অথবা বলপ্রয়োগের মুখে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন—ধ্রুপদী ফিকহে এই অবস্থাগুলোর মধ্যে বহু সূক্ষ্ম শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। তবু কিছু প্রতিষ্ঠিত বিধানে একবার মুসলিম হিসেবে গণ্য হওয়া ব্যক্তিকে পুনরায় সেই পরিচয় ছেড়ে দিতে বাধা দেওয়া হয়। এখানেই ধর্ম গ্রহণের আপাত স্বাধীনতা এবং ধর্মত্যাগের শাস্তির মধ্যে একমুখী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে: ভেতরে প্রবেশ করা যায়, কিন্তু বেরিয়ে আসা বিপজ্জনক কিংবা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।
এই একমুখী ব্যবস্থা কেবল তাত্ত্বিক সমস্যা নয়; ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের বাস্তব আইনগত প্রশ্নেও উপস্থিত। মুসলিম পরিবারে জন্মানো শিশুকে শৈশব থেকেই মুসলিম হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুদ্ধাবস্থা ও ধর্মীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের মুখে ইসলাম গ্রহণকে আইনগতভাবে বৈধ গণ্য করার মতও পাওয়া যায়। ব্যক্তির অন্তরের বিশ্বাস ও প্রকাশ্য পরিচয় এখানে এক নয়: শাসকের কাছে ইসলামের ঘোষণা কার্যকর পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও ঘোষণা দেওয়া ব্যক্তির সত্যিকার বিশ্বাস ভিন্ন হতে পারে। পরে সেই পরিচয় ত্যাগ করলে রিদ্দাহ-বিধান কার্যকর হতে পারে—এমন কাঠামোয় ধর্মীয় পরিচয় বাস্তবে ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্তৃত্বের বিষয় হয়ে ওঠে।
এবারে আমরা একটি বিখ্যাত আকিদা গ্রন্থ থেকে দেখে নিবো, এই বিষয়ে ইসলামের হুকুমত এবং বিধান আসলে কী [41]
.. এর দিকে তারপর আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে বোঝালো আপনি আল্লাহর রসুল। রসুলুল্লাহ (১১) বললেন, তুমি একে মুক্ত করতে পারো।
সুতরাং যেসব কথা ও কাজ কেবল একজন মুসলিমই বলতে বা করতে পারে এবং সেগুলো বলা বা করার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায় যে উক্ত ব্যক্তি দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করেছে সেসব কথা ও কাজ ইসলাম গ্রহণ হিসাবে গণ্য হবে। যেমন মুসলিমদের মতো সলাত আদায় করা, হজ্জ পালন করা ইত্যাদি। তবে যদি প্রমাণিত হয় উক্ত ব্যক্তি এসকল কথা ও কাজের মাধ্যমে ভ্রান্ত বিশ্বাস পরিত্যাগ করে নির্ভেজাল ইসলামে প্রবেশ করেনি বরং তার ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী কাফির অবস্থায়ই এসকল আমল করে থাকে (যেমন বর্তমানে কাদিয়ানীরা) বা সে তামাশার ছলে এটা করছে তবে তার ক্ষেত্রে এগুলো ইসলাম গ্রহণ হিসাবে গণ্য হবে না যতক্ষণ না সে এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করে যাতে বোঝা যায় সে নিজ বিশ্বাস পরিত্যাগ করে রসুলুল্লাহ কর্তৃক প্রচারিত ও সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক অনুসৃত সঠিক ধর্ম বিশ্বাসে প্রত্যাবর্তন করছে।
⇒ কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা।
এ বিষয়টি উপরোক্ত আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমস্ত ওলামায়ে কিরাম একমত হয়েছেন যে, যেসকল কাফিরের সাথে আমাদের কোনো চুক্তি নেই বা তারা জিজিয়া প্রদানকারী জিম্মী কাফিরও নয় তাদের হত্যার ভয় দেখিয়ে বা অন্য কোনোভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হলে এটা গ্রহণযোগ্য হবে। অর্থাৎ এই প্রকারে ইসলামের অনুপ্রবেশের পর পুনরায় বের হয়ে যেতে চাইলে তাকে মুরতাদ সাব্যস্ত করা হবে এবং হত্যা করা হবে। এ বিষয়ে দলীল হলো রসুলুল্লাহ এর কথা যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। যেখানে বলা হয়েছে, أمرت أن أقاتل النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لا إله إلا الله، فَمَنْ قال: لا إله إلا اللهُ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ، وَنَفْسَهُ আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’
(১১) হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদকে দূর্বল বলেন নি অর্থাৎ তিনি হাদীসটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। যেহেতু তিনি বলেছেন, এই গ্রন্থের যে হাদীসের ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করবো না সেটা আমার নিকট গ্রহণযোগ্য। আল-হাইছামী মাজমুয়ায়ে যাওয়ায়েদে বলেছেন )رجاله موثوقون( “এই হাদীসের রাবীরা বিশ্বস্ত”। তবে শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে দূর্বল বলেছেন।
এই বর্ণনাটি হতে বোঝা যায় ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমেও একজন ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ প্রকাশিত হতে পারে। সলাত, বা অন্যান্য ইবাদতও কখনও কখনও এর স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। যখন নিশ্চিত ধারণা হয় যে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্য ছাড়া উক্ত ব্যক্তি এ কাজ করতো না। আর আল্লাহই ভাল জানেন।
যখন তারা এটা বলবে তাদের রক্ত ও সম্পদ সংরক্ষিত বলে গণ্য হবে। [বুখারী ও মুসলিম]
সহীহ মুসলিমের একটি লম্বা হাদীসে এসেছে, রসুলুল্লাহ কোনো অভিযান প্রেরণ করলে তার আমীরকে উপদেশ দিয়ে বলতেন,
فَادْعُهُمْ إلى ثلاث خِصَالٍ فَأَيتُهُنَّ مَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ
তাদের তিনটি বিষয়ের দিকে ডাকো। তার মধ্যে যেটিই তারা গ্রহণ করুক তুমিও সেটি গ্রহণ করো।
এই তিনটি বিষয় হলো, (ক) ইসলাম গ্রহণ (খ) জিজিয়া কর আদায় করা (গ) যুদ্ধ করা। সুতরাং যুদ্ধের মাধ্যমে যাদের ইসলাম কবুলে বাধ্য করা হয় তারা মুসলিম বলেই গণ্য হবে।
ওসামা বিন যায়েদের ঘটনাতেও একই বিষয় প্রমাণিত হয়। তিনি যাকে হত্যা করতে উদ্দ্যত হয়েছিলেন সেই কাফির হঠাৎ কালেমা পাঠ করে বসে। ওসামা মনে করেছিলেন তরবারীর ভয়ে মুসলিম হওয়ার
কারণে এই ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু রসুলুল্লাহ একারণে তাকে কঠোর তিরষ্কার করেন। এর স্পষ্ট অর্থ হলো, যাকে হত্যা করা ও আক্রমন করা বৈধ (১৩) তাকে যদি হত্যার ভয় দেখানো হয় এবং সে ভীত হয়ে ইসলামে প্রবেশ করে তবে তার এই ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে। পরবর্তীতে সে ইসলাম পরিত্যাগ করলে তাকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করা হবে। (১২)
কানযুদ্দাকাইকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ولو أكره الحربي على الإسلام فأسلم صح إسلامُهُ بِالإجْمَاعِ
যদি চুক্তিবিহীন কাফিরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় তবে তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে ইজমা সম্পাদিত হয়েছে। [তাবঈনুল হাকাইক্ব]
(১২) সহীহ বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
(১৩) ইবনুল আরবী বলেন, أن المسلم إذا لقي الكافر لا عهد له جازله قتله( “একজন মুসলিম যখন এমন কোনো কাফিরের সাক্ষাত পায় যার সাথে কোনো চুক্তি নেই তবে তার জন্য তাকে হত্যা করা বৈধ”। [আহকুমুল কুরআন] মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী ইমাম আল খাত্তাবী থেকে বর্ণনা করেন )أن الأصلَ فِي دِمَاءِ الْكُفَّارِ الْإِبَاحَةُ( “কাফিরদের রক্তের ব্যাপারে মুলনীতি হলো তা বৈধ” [মিরকাতুল মাফাতিহ] অর্থাৎ চুক্তি বা অন্য কোনো কারণে একজন কাফিরের রক্ত নিষিদ্ধ হয় চুক্তি না থাকলে তা বৈধ। অপর দিকে মুসলিমের রক্তের ব্যাপারে মূল নীতি হলো তা নিষিদ্ধ কোনো কারণে (যেমন বিবাহিত অবস্থায় জেনা ইত্যাদি) তা বৈধ হয়। চুক্তি তিন প্রকার হতে পারে [ক] জিজিয়ার চুক্তি [খ] যুদ্ধ বিরতি বা সন্ধিচুক্তি [গ] ইসলামী রাষ্ট্রে অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় গ্রহণের চুক্তি। এই সকল চুক্তির কোনোটিই যে কাফিরের সঙ্গে মুসলিমদের নেই তাকে আক্রমণ করা এবং মুসলিম হতে বাধ্য করা বৈধ। এরা বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণের পর দুনিয়ার বিচারে মুসলিম হিসাবেই গণ্য হবে। আর তাদের অন্তারের বিষয় আল্লাহর নিকট।
এটা সেই সকল কাফিরের ক্ষেত্রে যাদের সাথে মুসলিমদের কোনো চুক্তি নেই। পরিভাষায় তাদের হারবী )حربي( বা আহলুল হারব )أهل الحرب( বলা হয়। এদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এভাবে ইসলাম গ্রহণ করলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে। পরবর্তীতে তারা ইসলাম থেকে ফিরে যেতে পারবে না। কিন্তু যাদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি রয়েছে যেমন, জিম্মী )نمي(, )১৪( মুস্তা’মান )مستأمن( )১৫( ও মুয়াহিদ )معاهد(। (১৬( কোনো মুসলিম এই শ্রেণীর কাফিরদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করলে যেটা বৈধ না হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা সম্পাদিত হয়েছে কিন্তু এভাবে ইসলাম গ্রহণ করলে তা ধার্তব্য হবে কিনা সে বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের মধ্যে দ্বিমত আছে। হাম্বালী ও শাফেঈ মাজহাবের ওলামায়ে কিরামের মতে এটা ইসলাম গ্রহণ হিসাবে গণ্য হবে না। (১৭) হানাফী মাযহাবের গ্রহণযোগ্য মতে এটা ইসলাম গ্রহণ হিসাবে গণ্য করা হবে এবং এভাবে মুসলিম হওয়ার পর উক্ত কাফিরকে ইসলাম থেকে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। তাবঈনুল হাক্কাইকে বলা হয়েছে,
أكره الدمي على الإسلام فأسلم يَصِحُ إِسْلَامُهُ
জিম্মী কাফিরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হলো ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করলো তবে তার এ ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে।
এখানে প্রথম মতটিই সঠিক। আর আল্লাহই ভাল জানেন।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো যাকে বাধ্য করা হয় তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য বলতে ওলামায়ে কিরামের উদ্দেশ্য দুনিয়ার বিধানে তাকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা হবে। তার রক্ত ও সম্পদ সংরক্ষিত বিবেচিত হবে। সে যদি পুনরায় কুফরীতে ফিরে যায় তবে তাকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করা হবে এবং পুনরায় ইসলাম গ্রহণ না করলে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হবে। আর তার অন্তরের অবস্থা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া
(১৪) ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত কর দিয়ে বসবাস কারী কাফিররা।
(১৫) ইসলাম সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে অল্প সময়ের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রে আশ্রয়গ্রহণকারী কাফিররা।
(১৬) নিজেদের ভূখন্ডে অবস্থান করেই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ বিরতির চুক্তি করে যেসব কাফিররা।
واذا أكره على الإسلام من لا يجوز إكراهه كالأمي والمستأمن فأسلم لم يثبت له حكم الاسلام حتى ( 21 2409 (29) PACO يوجد منه ما يدل على إسلامه طوعا مثل أن يثبت على الإسلام بعد زوال الاكراه عنه নয় যেমন যিম্মী বা মুস্তা’মান যদি এমন কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয় ফলে সে মুসলিম হয় তবে তার এই ইসলাম ধার্তব্য হবে না। যতক্ষণ না তার মধ্যে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সে বাধ্যবাধকতা দূর হওয়ার পরও স্বেচ্ছায় ইসলামের উপর টিকে ছিলো। [আল মুগনী] তিনি বলেছেন ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফেঈর মতও একই। তবে আমরা পরে উল্লেখ করেছি যে হানাফী মাযহাবের ওলামায়ে কিরামের নিকট গ্রহণযোগ্য মত হলো এটা ইসলাম গ্রহণ বলে গণ্য হবে।
হবে। রসুলুল্লাহ এর হাদীসে এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন,
أمِرْتُ أَنْ أَقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لا إله إلا الله، فَمَنْ قَالَ: لا إله إلا اللهُ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ، وَنَفْسَهُ وحسابه علي
الله
আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। যখন তারা এটা বলবে তাদের রক্ত ও সম্পদ সংরক্ষিত বলে গণ্য হবে। আর তার হিসাব আল্লাহর কাছে।
[বুখারী ও মুসলিম]
অর্থাৎ এভাবে যুদ্ধের মাধ্যমে যাদের কালেমা পাঠ করতে বাধ্য করা হয় তাদের দুনিয়ার বিধানে মুসলিম মনে করা হবে কিন্তু তাদের অন্তরের হিসাব আল্লাহর নিকট। যদি সে প্রকৃতই ইসলাম গ্রহণ করে থাকে তবে আখিরাতে মুক্তি পাবে। অন্যথায় আল্লাহর দরবারে কাফির হিসাবে গণ্য হবে এবং জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। আমরা আল্লাহর নিকট এ ধরণের পরিনতি হতে আশ্রয় চাই। আমীন।
১.খ. (২) মুসলিম পিতা-মাতার ঔরসে জন্ম নেওয়ার মাধ্যমে।
সমস্ত ওলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে একমত যে, মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে ভূমিষ্ট শিশু মুসলিম হিসাবেই গণ্য হবে। একইভাবে কোনো কাফির দম্পতি মুসলিম হলে তাদের না-বালেগ পুত্র-কন্যারা মুসলিম হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু পিতা মাতার মধ্যে একজন মুসলিম হলে তার বিধান কি হবে সে বিষয়ে দ্বিমত আছে। ইমাম বুখারী কাজী শুরাইহ ও অন্যান্য তাবেঈ থেকে বর্ণনা করেন, তারা বলেছেন,
إذا أسلم أَحَدُهُمَا فَالْوَلَدُ مَعَ الْمُسْلِمِ
যদি পিতা মাতার যে কোনো একজন মুসলিম হয় তবে সন্তান মুসলিম বলে গণ্য হবে। [সহীহ বুখারী]
এবিষয়ে তাদের দলীল হলো, রসুলুল্লাহ এর বাণী ) الاسلام يعلو ولا يُعلي( “ইসলাম সবার উপরে, ইসলামের উপরে কিছু বিজয়ী হতে পারে না।” (১৮)অর্থাৎ যখন পিতা মাতার মধ্যে একজন কাফির হয় আর অন্যজন মুসলিম হয় তখন যে মুসলিম সেই বিজয়ী হবে এবং সন্তানের উপর তার বিধান প্রয়োগ করা হবে। এটা ইমাম শাফেঈ ও আহমদ ইবনে হাম্বালের মত। ইমাম আবু হানীফার মতও অনুরুপ
তবে তিনি বলেছেন পিতা মাতার মুসলিম হওয়ার কারণে যে সন্তানকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা হয় সে
(১৮) দারে কুতনী, বুলুগুল মারাম; ইমাম বুখারী হাদীসটিকে মাওকুফভাবে সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন [ফাতহুল বারী-৩/২২০]। শায়েখ আলবানীও হাদিসটিকে হাসান বলেছেন [ইরওয়াউল গালীল-১২৬৮]
করে থাকে যেখানে বলা হয়েছে )من قال لا اله الا الله دخل الجنة( “যে কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” কিন্তু উপরের আলোচনায় আমরা দেখেছি, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” মুখে বলা বা আল্লাহকে এক ইলাহ হিসাবে মেনে নেওয়া ও মুহাম্মাদ কে রসুল হিসাবে বিশ্বাস করার পরও একজন ব্যক্তি কাফির হিসাবে গণ্য হতে পারে। যদি সে কোনো হারামকে হালাল মনে করে বা হালালকে হারাম মনে করে বা অন্য কোনো কুফরী কাজ করে (২৮) উক্ত ব্যক্তি কাফির হিসাবে গণ্য হবে। এই ধরণের ব্যক্তির ক্ষেত্রে ওলামায়ে কিরামের মতামত হলো তারা কালেমা পাঠ করলেও মুসলিম হিসাবে গণ্য হবে না যতক্ষণ না যে কারণে তারা কাফির হয়েছে তা হতে ফিরে আসে। যেমনটি আমরা পূর্বে ইমাম বাগাবী ইমাম নব্বী, ইবনে কুদামা ইত্যাদি বরেণ্য ওলামায়ে কিরাম হতে বর্ণনা করেছি। আর যেসব হাদীসে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করলে জান্নাতে প্রবেশের ওয়াদা করা হয়েছে সেখানে শর্ত সাপেক্ষেই একথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে এবং সকল প্রকারের শিরক ও কুফর হতে বেঁচে থাকে তার ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য। যেমন অন্য একটি হাদীসে এসেছে )من صلي البردين دخل الجنة ” কেউ ফরজ ও আসরের সলাত পড়ে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” কোনো সন্দেহ নেই যে, এই হাদীসে কেবল এই দুটি সলাত আদায় করে এবং অন্যান্য সলাতগুলো পরিত্যাগ করে জান্নাতে প্রবেশের ওয়াদা করা হচ্ছে না। বরং শিরক কুফর, অন্যান্য সলাত ও যাবতীয় ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকার শর্তেই এই ওয়াদা করা হচ্ছে। সুতরাং একটি আয়াত বা হাদীসকে বিচ্ছিন্নভাবে নয় বরং অন্যান্য আয়াত ও হাদীসের সমন্বয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষের দিকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
২. (খ) কাফিরদের মুসলিম হতে বাধ্য করা যায় কি?
বর্তমানে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ (!!) খুব বড় গলায় প্রচার করেন, কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় না। কিন্তু উপরের আলোচনায় যারা মনোযোগ নিবদ্ধ করেছেন তারা দেখেছেন ইসলাম গ্রহণের যে তিনটি পথ ও পন্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার শেষের দুটিতে ব্যক্তির ইচ্ছার কোনোরূপ গুরুত্ব নেই। কেননা কেউ স্বেচ্ছায় মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে জন্মলাভ করেনা অথচ পিতা-মাতা মুসলিম হলেই সবেমাত্র ভূমিষ্ট বাচ্চাকেও মুসলিম হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে এবং বালেগ হওয়ার পরও এই বিধান সে মেনে নিতে বাধ্য থাকছে। এটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ তাকে দেওয়া হবে না। সেটা করতে চাইলে তাকে নিহত হতে হবে। একইভাবে শিশু অবস্থায় যুদ্ধে বন্দি হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম হিসাবে গণ্য হওয়ায় ব্যাপারে উক্ত শিশুর ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো গুরুত্ব নেই। ইসলাম গ্রহণের প্রথম পদ্ধতিটি
(২৮) এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশা-আল্লাহ।
যদিও মূলত ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল কিন্তু চুক্তিবিহীন কাফিরকে আক্রমন করে মুসলিম হতে বাধ্য করা হলে যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে এটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে সকল ওলামায়ে কিরাম একমত। এ বিষয়ে বিস্তারিত দলীল-প্রমাণও রয়েছে যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এটাও এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ যেভাবে স্বেচ্ছায় হয় একইভাবে বাধ্য-বাধকতার মাধ্যমেও হয়। যারা এটা অস্বীকার করে তারা দলীল প্রমাণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এবং কাফির-মুশরিকদের কর্তৃক প্রচারিত ভ্রান্ত মতাদর্শে প্রভাবিত ও প্রতারিত একদল নির্বোধ গবেষক। এরা কোরআনের কিছু আয়াতকে প্রসঙ্গ ছাড়া উপস্থাপণ করে মানুষকে বোকা বানিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহর বাণী ) لا اكراه في الدين( “দ্বীনের মধ্যে কোনো জবরদস্তী নেই।” [বাকারা/২৫৬] বা )لست عليهم بمصيطر( “আপনি তো তাদের উপর প্রভাব বিস্তারকারী নহেন”। [গাশিয়া/২২] বা আল্লাহর বাণী ) أفأنت تكره النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ( “আপনি কি মানুষকে মুমিন হতে বাধ্য করবেন!” [ইউনূস/৯৯] এ সমস্ত আয়াত থেকে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন ইসলাম গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা হবে না। অথচ অন্যান্য আয়াত ও হাদীসে কাফিরদের নিকট হতে অপমানিত অবস্থায় জিজিয়া গ্রহণ করতে আদেশ দেওয়া হয়েছে [তাওবা/২৯], যে ইসলাম ত্যাগ করে তাকে হত্যা করতে বলা হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রে কাফিরদের ধর্ম প্রকাশ্যে পালন (২৯) করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। এভাবে কুফরীর কারণে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকার বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনকি রসুলুল্লাহ বলেছেন আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এই সকল আয়াত ও হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে সাহাবায়ে কিরাম ও তৎপরবর্তী বরেণ্য ওলামায়ে দ্বীনের মতামত ও তাদের অনুসৃত পন্থার দিকে। উপরে আমরা যা কিছু বর্ণনা করেছি সেগুলোতে ওলামায়ে দ্বীন ঐক্যমত পোষণ করেছেন আর এগুলোর স্বপক্ষে সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ রয়েছে সুতরাং কোনো একটি আয়াত বা হাদীসকে প্রসঙ্গ ছাড়া উপস্থাপণ করে সকল দলীল প্রমাণ ও ওলামায়ে কিরামের ঐক্যমতকে
بَلْ قَدْ شَرَطَ عَلَيْهِمْ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ وَالصَّحَابَةُ وَسَائِرُ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ أَنْ لَا يُظْهِرُوا ( 1 ا 2011 (20) أغيادَهُمْ فِي دَارِ الْمُسْلِمِينَ وَإِنَّمَا يَعْمَلُونَهَا سِرًّا فِي مَسَاكِنِهِمْ( “অমুসলিম যিম্মিদের উপর উমর ইবনুল খাত্তাব, অন্যান্য সাহাবারা এবং মুসলিমদের সমস্ত খলীফারা এই শর্ত করতেন যে, তারা ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের ধর্মীয় উৎসব সমুহ প্রকাশ্যে পালন করতে পারবে না বরং তাদের বাড়িতে গোপনে পালন করবে।” [মাজমুউল ফাতাওয়া] ইবনে কাছির তার তাফসীরে লেখেন, ) ،ولا نظهر شركا ولا ندعو إليه أحدا؛ ولا تمنع أحدا من ذوي قرابتنا الدخول في الإسلام إن أرادوه، وأن نوقر المسلمين، وأن نقوم لهم من مجالسنا إن أرادوا الجلوس( “)ইয়াহুদীরা চুক্তিতে লিখেছিল) আমরা আমাদের ধর্ম প্রকাশ্যে পালন করবো না, শিরক কুফরের দিকে কাউকে ডাকব না, আমাদের আত্মিয় স্বজনের মধ্যে যে কেউ মুসলিম হতে চায় আমরা তাকে বাধা দেব না। আর এও যে, আমরা মুসলিমদের সম্মান করবো। যদি তারা আমাদের মসলিসে বসতে চায় আমরা উঠে যেয়ে তাদের স্থান করে দেব।” [তাফসীরে ইবনে কাছির; তাওবা/২৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আরোও আলোচনা এসেছে।
দূরে নিক্ষেপ করা যাবে না। বরং প্রতিটি আয়াতকে তার সঠিক স্থানে প্রয়োগ করতে হবে। “দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তী নেই” আয়াতটি যেসব কাফিরদের নিকট হতে জিজিয়া গ্রহণ করা হবে এবং তারা জিজিয়া দিতে সম্মত হবে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিন্তু যারা জিজিয়া দিতে নারাজ হয় বা জিজিয়ার শর্তসমূহ যেমন নিজের ধর্মকে প্রকাশ্যে পালন ও প্রচার না করা, নতুন কোনো উপাসনালয় নির্মাণ না করা ইত্যাদি মেনে নিতে অস্বীকার করে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একইভাবে যে শিশু মুসলিম ঘরে জন্ম নেওয়া বা মুসলিমদের হাতে বন্দি হওয়ার কারণে মুসলিম হিসাবে গণ্য হয় কিন্তু পরবর্তীতে প্রাপ্ত বয়সে উপনিত হয়ে সে কুফরীতে ফিরে যেতে চায় জবরদস্তী না করা সংক্রান্ত আয়াতটি তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়। কারণ তাকে এ কাজে বাধা দেওয়া হবে প্রয়োজনে তাকে হত্যা করা হবে। যেহেতু রসুলুল্লাহ বলেছেন, )من بدل دينه فاقتلوه “যে তার দ্বীন পরিবর্তন করে তাকে হত্যা করো”। [সহীহ বুখারী] এই সকল স্থানে বাধ্য-বাধকতা নিষিদ্ধ হওয়ার আয়াত প্রযোজ্য হবে না বরং এখানে বাধ্য করার বিধানই প্রযোজ্য হবে।
কিভাবে একজন ব্যক্তি মুসলিম হিসাবে গণ্য হয় সে সংক্রান্ত আলোচনা আমরা এখানেই শেষ করতে চাই। পরবর্তী অধ্যায়ে কি ধরণের কথা ও কাজের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কাফির হিসাবে গণ্য হয় তথা কুফরী কথা ও কাজ সমূহ কি কি সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ।







আল-ইতকান ফি তাওহীদ আর-রহমান আকিদার গ্রন্থে চুক্তিবিহীন হারবি কাফির, চুক্তিবদ্ধ জিম্মি, মুস্তামান এবং মুসলিম পরিবারে জন্মানো শিশুর মধ্যে যে শ্রেণিগত পার্থক্য করা হয়েছে, তার সঙ্গে হানাফি ও শাফেয়ি ফিকহের আরও কিছু মূল আলোচনার মিল পাওয়া যায়। হানাফি গ্রন্থ আল-ইখতিয়ার লি-তা’লিলিল মুখতার-এর ‘অমুসলিম কীভাবে মুসলিম গণ্য হয়’ পরিচ্ছেদে এমন বক্তব্য রয়েছে যে, কোনো জিম্মিকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করলে তার ইসলাম গ্রহণ গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; পরে সে ইসলাম ত্যাগ করলে তাকে হত্যা না করে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করা পর্যন্ত বন্দী রাখার বিধানও সেখানে রয়েছে। এই নির্দিষ্ট হানাফি অবস্থান শাফেয়ি ফিকহের সব মতের সঙ্গে অভিন্ন নয়; কিন্তু মানুষের অন্তরের প্রকৃত বিশ্বাসের পরিবর্তে বলপ্রয়োগে উচ্চারিত ধর্মীয় ঘোষণাকে আইনগত পরিচয়ের ভিত্তি করার সমস্যাটি এখানে সুস্পষ্ট [42]।
أُكْرِهَ الذِّمِّيُّ عَلَى الْإِسْلَامِ فَأَسْلَمَ يَصِحُّ إِسْلَامُهُ ، وَلَوْ رَجَعَ لَا يُقْتَلُ ، وَلَكِنْ يُحْبَسُ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَى الْإِسْلَامِ
বাংলা অনুবাদ: জিম্মিকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার পরে সে ইসলাম গ্রহণ করলে সেই গ্রহণকে বৈধ গণ্য করা হয়। পরে সে ফিরে গেলে তাকে হত্যা করা হবে না; কিন্তু পুনরায় ইসলামে ফিরে আসা পর্যন্ত বন্দী রাখা হবে।
ইমাম নববীর আল-মাজমু-তে শাফেয়ি ফিকহের ব্যাখ্যায় চুক্তিবিহীন হারবি ব্যক্তিকে ইসলামে বাধ্য করা হলে সেই ঘোষণাকে কার্যকর ইসলাম গণ্য করার মত উদ্ধৃত হয়েছে; অথচ জিম্মি বা নিরাপত্তা-প্রাপ্ত অমুসলিমকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার ক্ষেত্রে পৃথক নিয়ম রয়েছে। এই বিভাজনে একটি দ্বৈত নীতি প্রকাশ পায়: একই ধরনের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রশ্নে একজন মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা তাঁর সঙ্গে মুসলিম কর্তৃপক্ষের চুক্তি এবং আইনগত শ্রেণির ওপর নির্ভর করতে পারে। স্বাধীন বিবেকের অধিকার কোনো ব্যক্তিকে হারবি, জিম্মি অথবা মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার পরে জন্মায় না; মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস পরিবর্তনের ক্ষমতা তাঁর ব্যক্তি-অধিকারের অংশ [43]।
এখানে সবচেয়ে বড় যৌক্তিক অসংগতি হলো, কাউকে ভয় দেখিয়ে ধর্মীয় আনুগত্যের ঘোষণা আদায় করলে তার মুখের উচ্চারণকে আইনগতভাবে বিশ্বাসের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে, অথচ সেই ব্যক্তি পরে স্বাধীনভাবে ঘোষণা দিতে চাইলে যে তিনি ওই ধর্মে বিশ্বাস করেন না, তখন তাঁকে শাস্তির অধীন করা হতে পারে। বলপ্রয়োগে করা ধর্মীয় ঘোষণা ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাসের প্রমাণ নয়। একবার সেই ঘোষণাকে স্থায়ী আইনগত পরিচয়ে পরিণত করে বিপরীত ঘোষণা নিষিদ্ধ করার অর্থ, ধর্মগ্রহণের ক্ষমতা ব্যক্তির নিজের হাতে নেই; কর্তৃপক্ষের হাতে। ধর্মীয় সত্য প্রতিষ্ঠার বদলে এটি ব্যক্তির প্রকাশ্য পরিচয়কে একদিকে আটকে রাখার ব্যবস্থা।
জন্মসূত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। কোনো শিশু মুসলিম পরিবারে জন্মানোর জন্য নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে ইসলাম গ্রহণ করেনি। অথচ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে সে ধর্ম সম্পর্কে সমালোচনামূলক চিন্তা করে ইসলাম ত্যাগ করলে তাকে ধর্মত্যাগী হিসেবে গণ্য করার বিধান তার জীবনের একেবারে প্রথম পর্যায়ে অন্যেরা নির্ধারণ করে দেওয়া পরিচয়কেই অপরিবর্তনীয় করে তোলে। যে পরিচয় গ্রহণে তার সম্মতি প্রয়োজন হয়নি, সেটি ত্যাগে তাকে শাস্তির ভয় দেখানো বিশ্বাসের স্বাধীনতা নয়। ধর্মের সত্যতা যদি যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তবে ধর্মত্যাগীকে হত্যা, বন্দিত্ব, পারিবারিক বিচ্ছেদ কিংবা সম্পত্তি হরণের ভয় দেখানোর কোনো নৈতিক প্রয়োজন নেই।
কোরআনের ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই’ ঘোষণার সঙ্গে বলপ্রয়োগে ধর্মগ্রহণকে গ্রহণযোগ্য গণ্য করা এবং ধর্মত্যাগের জন্য শাস্তি নির্ধারণের বিধানগুলোর সংঘর্ষ তাই কেবল শব্দের বিরোধ নয়; এটি নীতিগত স্ববিরোধ। একদিকে ধর্মকে ব্যক্তির বিশ্বাসের বিষয় বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁর বিশ্বাস বদলের প্রকাশ্য অধিকারে শাস্তি আরোপ করা হচ্ছে। কোন ব্যক্তি কোন ধর্মে বিশ্বাস করবেন, সে সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে কোনো শাসক, ফকিহ, আত্মীয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। একমুখী ধর্মান্তর এবং বাধ্যতামূলক আনুগত্যের এই আইন মানুষের বিবেককে কর্তৃত্বের অধীন করে; স্বাধীন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে না।
মুরতাদ হত্যা না করলে ইসলাম বলে কিছুর অস্তিত্বই থাকতো না
ধর্মত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে ইসলামি আলেমদের একটি প্রভাবশালী ধারা শুধু ধর্মীয় অপরাধের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেনি; বরং ইসলামকে টিকিয়ে রাখা, মুসলমানদের ধর্মত্যাগ ঠেকানো এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ভিন্নমতের বিস্তার প্রতিরোধের উপায় হিসেবেও উপস্থাপন করেছে। এই অবস্থানের সবচেয়ে নগ্ন প্রকাশ হলো, মুরতাদদের বিরুদ্ধে সহিংস ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরই ইসলামের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যেত—এমন বক্তব্য। এই দাবি ইতিহাসের প্রমাণিত বিকল্প পরিণতি নয়; এটি ধর্মীয় নেতৃত্বের নিজের মুখে স্বীকার করা একটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় প্রয়োজনের ধারণা। একটি ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তার অনুসারীদের ধর্মত্যাগের পথ বন্ধ রাখা এবং প্রয়োজনে তাদের হত্যা করা প্রয়োজন—এমন যুক্তিতে বিশ্বাসের সত্যতা নয়, আনুগত্য রক্ষার জন্য শাস্তির ক্ষমতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। মানুষ অন্তরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেও মৃত্যুর ভয়ে বাইরে সেই বিশ্বাসের পরিচয় বহন করতে পারে; ফলে বাহ্যিক সদস্যসংখ্যাকে স্বাধীন সম্মতির প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না।
ধর্মত্যাগের কঠোর শাস্তি না থাকলে ইসলাম টিকে থাকত না—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও নিচে সংযুক্ত রয়েছে। একই দাবির সরাসরি আরবি বক্তব্য ইউসুফ আল-কারজাভির ২০১৩ সালের একটি অনুষ্ঠানের পূর্ণ প্রতিলিপিতেও পাওয়া যায়।
২০১৩ সালের ২৩ জানুয়ারি আল-জাজিরার আশ-শারিয়াহ ওয়াল হায়াত অনুষ্ঠানে একজন দর্শক প্রশ্ন করেন, ধর্মত্যাগীদের জন্য কোরআনে পরকালীন শাস্তির কথা থাকলেও দুনিয়ায় তাদের কী শাস্তি হবে। জবাবে ইউসুফ আল-কারজাভি সূরা মায়িদা ৫:৫৪-এর উল্লেখ করে আবু বকরের রিদ্দাহ-যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন এবং দাবি করেন, ওই ধর্মত্যাগী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ না হলে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরই ইসলাম শেষ হয়ে যেত। তিনি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের সামরিক ফলাফল বর্ণনা করেননি; ইসলাম টিকে থাকার কৃতিত্বই ধর্মত্যাগ প্রতিরোধের ওপর আরোপ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় অস্তিত্ব ও ধর্মত্যাগ দমনের মধ্যে সরাসরি কারণগত সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে [44]।
لو تركوا الردة ما كان هناك إسلام كان انتهى الإسلام منذ وفاة الرسول علية الصلاة والسلام، فالوقوف أمام الردة هو الذي أبقى الإسلام
বাংলা অনুবাদ: যদি তাঁরা ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতেন, তাহলে ইসলাম বলে কিছু থাকত না; রাসুলের মৃত্যুর পর থেকেই ইসলাম শেষ হয়ে যেত। ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই ইসলামকে টিকিয়ে রেখেছে।
কারজাভির এই বক্তব্য ইসলাম টিকে থাকার প্রকৃত ঐতিহাসিক কারণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়। একই ইতিহাসে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়নি—এমন কোনো বিকল্প বাস্তব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই: বিশ্বাস হারানো মানুষকে চলে যেতে দেওয়া নয়, ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অক্ষত রাখতে ধর্মত্যাগ প্রতিরোধ করাই তাঁর ব্যাখ্যায় ইসলামের রক্ষাকবচ। এই ধারণায় ধর্মীয় আনুগত্যকে আর ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না। ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে গোটা ব্যবস্থার অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হয়। ফলে ধর্মত্যাগীর জীবন রক্ষা এবং তার বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সত্যের শক্তি যদি যুক্তি ও প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতাকে মৃত্যুভয়ের দ্বারা আটকানোর প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।
কারজাভি ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই তাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খুতুরাতুর রিদ্দাহ ওয়া উকুবাতুল মুরতাদ শীর্ষক ফতোয়াতেও একই নিয়ন্ত্রণমূলক যুক্তি দিয়েছেন। ফতোয়ার প্রশ্নটি ছিল, ইসলাম ত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা না করা এক ব্যক্তিকে অন্য একজন হত্যা করলে হত্যাকারীর বিচার কী হবে। উত্তরে কারজাভি মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নকে সামনে আনেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ধর্মত্যাগ যেখান থেকেই দেখা দিক তা প্রতিরোধ করতে হবে; ব্যক্তিগত ধর্মত্যাগকেও ছড়িয়ে পড়ার আগেই দমন করতে হবে, যাতে তা সামষ্টিক ধর্মত্যাগে পরিণত না হয়। এখানে একজন ব্যক্তির চিন্তা বা বিশ্বাস বদলানোর অধিকারকে সমাজের জন্য বিপজ্জনক সংক্রমণের মতো বিবেচনা করা হয়েছে। ধর্মত্যাগীর বক্তব্য অন্যদেরও ধর্মত্যাগে উৎসাহিত করতে পারে—এই আশঙ্কাই ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তিতে পরিণত হয়েছে [45]।
وواجب المجتمع المسلم – لكي يحافظ على بقائه – أن يقاوم الردة من أي مصدر جاءت، وبأي صورة ظهرت
বাংলা অনুবাদ: মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য তার দায়িত্ব হলো, ধর্মত্যাগ যেখান থেকেই আসুক এবং যে রূপেই প্রকাশ পাক, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
এই ফতোয়ায় কারজাভির ব্যবহৃত ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মত্যাগকে তিনি শুধু একটি মতবাদের সঙ্গে দ্বিমত হিসেবে দেখেননি; মুসলিম সমাজের অস্তিত্বের জন্য বিপদ হিসেবে দেখেছেন। যে ব্যক্তি মনে করেন ধর্মীয় দাবিগুলো সত্য নয়, তাঁর অন্যদের কাছে সেই মত প্রকাশ করার স্বাধীনতাও এই ব্যবস্থার কাছে শঙ্কার কারণ। কারণ মতপ্রকাশের মাধ্যমে অন্যরাও বিশ্বাস বদলাতে পারেন। অথচ কোনো চিন্তা যুক্তিসংগত কি না, তা নির্ধারণের স্বাভাবিক পথ হলো উন্মুক্ত প্রশ্ন, বিরোধিতা, সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যানের সুযোগ। রাষ্ট্রীয় শাস্তি দিয়ে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করার অর্থ হলো বিশ্বাসের স্বাধীন প্রতিযোগিতাকে কর্তৃত্বের জোরে নিয়ন্ত্রণ করা। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তার সদস্যদের বেরিয়ে যাওয়ার অধিকার সীমিত করে নিজেকে স্থায়ী রাখতে পারলেও তাতে সেই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসগত দাবিগুলো সত্য প্রমাণিত হয় না।
ধর্মত্যাগীদের মৃত্যুদণ্ড কেন প্রয়োজন, তার আরও স্পষ্ট ফিকহি যুক্তি পাওয়া যায় ইবনে তাইমিয়্যার মাজমুউল ফাতাওয়া, ২০তম খণ্ডের ১০২ নম্বর পৃষ্ঠায়। বিভিন্ন মাজহাবের মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত অবস্থান তুলনা করতে গিয়ে তিনি ইমাম আহমদের যুক্তি ব্যাখ্যা করেছেন: ইসলাম গ্রহণের পর কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে এমন পৃথক অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে, যার শাস্তি না থাকলে ধর্মে প্রবেশকারীরা আবার বেরিয়ে যেতে পারে। এখানে হত্যার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষা এবং ধর্মত্যাগের মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা কমে যাওয়া প্রতিরোধ হিসেবে। এটি শুধু অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার বক্তব্য নয়; ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে মানুষের প্রস্থান রোধ করার একটি ঘোষিত দণ্ডনৈতিক যুক্তি [46]।
فإنه لو لم يقتل ذلك لكان الداخل في الدين يخرج منه فقتله حفظ لأهل الدين وللدين
বাংলা অনুবাদ: কেননা তাকে হত্যা করা না হলে যে ব্যক্তি ধর্মে প্রবেশ করেছে, সে আবার ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাবে। তাই তাকে হত্যা করা ধর্মাবলম্বী ও ধর্মকে রক্ষা করার উপায়।
এই যুক্তির অভ্যন্তরীণ কাঠামো সরল: মানুষ ইসলাম ত্যাগ করতে পারে; এই সম্ভাবনা ঠেকাতে মৃত্যুদণ্ডের ভয় কার্যকর; অতএব মৃত্যুদণ্ড ধর্ম রক্ষার উপায়। একজন মানুষ ইসলামকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন কি না, সেটি এখানে মূল বিবেচনা নয়। বিবেচনা হলো, তিনি বিশ্বাস না করলেও ইসলামি পরিচয়ের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন কি না। বিশ্বাসকে ধরে রাখার জন্য এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন হলে তার মাধ্যমে মানুষকে প্রকাশ্যে মুসলমান পরিচয়ে আটকে রাখা সম্ভব, কিন্তু অন্তরের অবিশ্বাস দূর করা সম্ভব নয়। হত্যার ভয় একজন ব্যক্তিকে তাঁর মতামত গোপন করতে বাধ্য করতে পারে; সেই ভয় কোনো অলৌকিক দাবি, ধর্মগ্রন্থ বা মতবাদকে সত্যে পরিণত করে না।
মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হিফজুদ্দিন শীর্ষক খুতবায় ধর্ম রক্ষার এই যুক্তি আরও খোলামেলাভাবে এসেছে। তিনি ধর্মত্যাগের শাস্তিকে ইসলামকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার উপায় বলে উল্লেখ করেন। একই বক্তব্যে তিনি বলেন, এই শাস্তি না থাকলে মানুষ সহজেই ইসলাম ছেড়ে চলে যেত; ধর্মত্যাগের শাস্তি কার্যকর হলে অবিশ্বাসী মতবাদ প্রচার, মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় সমালোচনা এবং ধর্মত্যাগ প্রচারের পথ বন্ধ করা যায়। তাঁর আলোচনা শুধু ধর্মীয় পরিচয় বদলানোর অপরাধে সীমাবদ্ধ নয়; বই, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন-বিতর্ক এবং প্রকাশ্য সমালোচনার মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে বিরুদ্ধমত প্রচারের বিরুদ্ধেও শাস্তির যুক্তি প্রয়োগ করেছে। এর ফলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিশ্বাস পরিবর্তন দমনের পাশাপাশি মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবেও উপস্থিত হয়েছে [47]।
لقد شرع الله من الحدود ما يكفل حفظ الدين، وهو حد الردة الذي يُحفظ به جانب الإسلام من الهدم
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ এমন দণ্ডবিধান প্রবর্তন করেছেন, যা ধর্মের সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মত্যাগের দণ্ড, যার মাধ্যমে ইসলামকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়।
আল-মুনাজ্জিদের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা। কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে নাস্তিকতা গ্রহণ করেন, ধর্মের সমালোচনামূলক বই লেখেন কিংবা টেলিভিশনে ইসলামের দাবিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন—এসব কাজ অন্য কাউকে হত্যা, লুণ্ঠন বা শারীরিক আক্রমণ করার সমার্থক নয়। তবু তাঁর খুতবায় এই ধরনের মতপ্রকাশকে ধর্মত্যাগের শাস্তি কার্যকরের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একটি ধর্মের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য পাল্টা যুক্তি, দলিল ও প্রমাণ উপস্থাপনের পরিবর্তে সমালোচকের অস্তিত্বকেই শাস্তিযোগ্য করে তোলার এই দৃষ্টিভঙ্গি মুক্তবুদ্ধি ও অনুসন্ধানের সরাসরি প্রতিপক্ষ। এখানে হত্যা যে ধর্মকে রক্ষা করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা যুক্তির পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত সত্যকে নয়; ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকা একটি ধর্মীয়-সামাজিক কাঠামোকে।
সৌদি আলেম সালেহ আল-ফাওজানের একটি ফতোয়াতেও একই মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই’—কোরআনের এই ঘোষণার সঙ্গে ‘যে ধর্ম পরিবর্তন করে তাকে হত্যা করো’ হাদিসকে কীভাবে মিলিয়ে দেখা হবে। জবাবে ফাওজান মুরতাদকে সমাজের একটি পচে যাওয়া অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেন, যাকে কেটে ফেলে সমাজকে তার প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। তাঁর যুক্তি হলো, ওই ব্যক্তি নিজে ইসলাম ত্যাগ করেছেন এবং অন্যদের বিশ্বাসও পরিবর্তন করতে পারেন। অর্থাৎ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে শুধু নিজের বিশ্বাস বদলানো নয়; অন্যের বিশ্বাস বদলানোর সম্ভাবনাকেও। এই যুক্তিতে ভিন্নমত পোষণকারী মানুষ আর নিজস্ব চিন্তা ও অধিকারের অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে থাকেন না; তাঁকে নির্মূলযোগ্য সামাজিক বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় [48]।
فهذا عضو فاسد يجب بتره وإراحة المجتمع منه؛ لأنه فاسد العقيدة، ويخشى أن يفسد عقائد الباقين
বাংলা অনুবাদ: সে একটি পচে যাওয়া অঙ্গ, যাকে কেটে ফেলা আবশ্যক এবং সমাজকে তার থেকে মুক্ত করতে হবে। কারণ তার বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে এবং আশঙ্কা রয়েছে, সে অন্যদের বিশ্বাসও নষ্ট করবে।
একজন মানুষকে ‘পচে যাওয়া অঙ্গ’ হিসেবে বর্ণনা করে তাকে সমাজ থেকে নির্মূল করার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করা সরাসরি অমানবিকীকরণ। এখানে হত্যার পক্ষে এমন কোনো নির্দিষ্ট সহিংস অপরাধের প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, যার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্যের জীবন বা শারীরিক নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে উঠেছেন। মূল আশঙ্কা হলো, তিনি অন্যদের বিশ্বাস পরিবর্তনে প্রভাবিত করতে পারেন। অথচ যুক্তি দিয়ে অন্যের বিশ্বাস পরিবর্তন করার চেষ্টা ধর্মীয় প্রচারকেরাও করেন। নিজের বিশ্বাসকে প্রচারের অধিকার সংরক্ষণ করে অন্যের বিশ্বাস ত্যাগ বা অন্যকে সে বিষয়ে বোঝানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া একটি স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড। বিশ্বাসের স্বাধীনতা যদি শুধু কোনো ধর্মে প্রবেশের জন্য থাকে, কিন্তু সেই ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য না থাকে, তাহলে সেটি স্বাধীনতা নয়; একমুখী আনুগত্যের বিধান।
এই নিয়ন্ত্রণমূলক যুক্তির আরেকটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ ইসলামকিউএর ২০৩২৭ নম্বর ফতোয়ায় রয়েছে, যার পূর্ণ বাংলা পাঠ পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে ইসলামকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যাতে যে কেউ ইচ্ছামতো প্রবেশ করে আবার বেরিয়ে যেতে পারে—এমন স্বাধীনতাকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্মত্যাগী ব্যক্তি অন্যদেরও ইসলাম ত্যাগে প্রভাবিত করতে পারে, এই আশঙ্কাকে শাস্তির পক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে। আরও কঠোরভাবে, ইসলাম ত্যাগকারী মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই বলে দাবি করা হয়েছে। এই বক্তব্যে অন্যের বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতাকেই ধর্মীয় কর্তৃত্বের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ শাস্তির লক্ষ্য কেবল নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার নয়; ধর্মীয় পরিচয় থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত অন্যদের কাছে প্রকাশ বা প্রচারের পথও বন্ধ রাখা। কোনো মতবাদের সত্যতা তার অনুসারীদের চলে যাওয়ার অধিকার অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠিত হয় না [49]।
আবু বকরের রিদ্দাহ-যুদ্ধ: ধর্মীয় আনুগত্য ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব
মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে আবু বকরের শাসনামলে সংঘটিত রিদ্দাহ-যুদ্ধের বিবরণ ধর্মীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের সম্পর্ক বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ বুখারির ১৩৯৯–১৪০০ নম্বর বর্ণনায় আবু হুরাইরা জানিয়েছেন, মুহাম্মদের মৃত্যুর পর আরবদের একাংশ ইসলাম থেকে ফিরে গেলে আবু বকর তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। উমর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রশ্ন করলে আবু বকর স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি নামাজ ও জাকাতকে পৃথককারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন; আগে যে জাকাত আদায় করা হতো, তার সামান্য অংশও অস্বীকার করা হলে তিনি যুদ্ধ করবেন। এই বক্তব্যে ধর্মীয় অনুশাসন, অর্থনৈতিক কর্তব্য এবং শাসকের আনুগত্যের প্রশ্ন একই সংঘাতের মধ্যে যুক্ত হয়েছে। এখানে জাকাত প্রদান প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটি স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। ধর্মত্যাগ ও রাষ্ট্রীয় কর-আনুগত্যের প্রশ্ন এই ঘটনাগুলোয় একত্রে উপস্থিত হলেও প্রত্যেক ব্যক্তিগত বিশ্বাস পরিবর্তনকে এই যুদ্ধের সমার্থক হিসেবে ধরার ভিত্তি নেই [50]।
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ الْحَكَمُ بْنُ نَافِعٍ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبُ بْنُ أَبِي حَمْزَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ مَسْعُودٍ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ لَمَّا تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ أَبُو بَكْرٍ ـ رضى الله عنه ـ وَكَفَرَ مَنْ كَفَرَ مِنَ الْعَرَبِ فَقَالَ عُمَرُ ـ رضى الله عنه كَيْفَ تُقَاتِلُ النَّاسَ، وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ. فَمَنْ قَالَهَا فَقَدْ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ إِلاَّ بِحَقِّهِ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ ”. فَقَالَ وَاللَّهِ لأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلاَةِ وَالزَّكَاةِ، فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ الْمَالِ، وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُونِي عَنَاقًا كَانُوا يُؤَدُّونَهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهَا. قَالَ عُمَرُ ـ رضى الله عنه ـ فَوَاللَّهِ مَا هُوَ إِلاَّ أَنْ قَدْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَ أَبِي بَكْرٍ ـ رضى الله عنه ـ فَعَرَفْتُ أَنَّهُ الْحَقُّ.
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুলের মৃত্যুর পর আবু বকর শাসনভার গ্রহণ করলে আরবদের মধ্যে যারা কুফরিতে ফিরে গিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উমর আবু বকরকে বললেন, আপনি কীভাবে এই লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন? অথচ আল্লাহর রাসুল বলেছেন, ‘আমাকে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা বলে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যে ব্যক্তি তা বলবে, সে নিজের জীবন ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ রাখবে, তবে সেই ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকার বা আইনগত দায় ব্যতীত; আর তার হিসাব আল্লাহর কাছে।’ আবু বকর বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, যারা নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। জাকাত সম্পদের ওপর নির্ধারিত অধিকার। আল্লাহর শপথ, তারা যদি রাসুলের সময়ে যে ছাগলছানাটি জাকাত হিসেবে দিত, সেটিও আমাকে দিতে অস্বীকার করে, তবে তা অস্বীকার করার কারণে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’ উমর বলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি বুঝতে পারলাম, আল্লাহ আবু বকরের অন্তর এই সিদ্ধান্তের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন; ফলে আমি উপলব্ধি করলাম যে তাঁর সিদ্ধান্তই সঠিক।’
আবু বকরের এই বক্তব্য থেকে সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয়, ইসলামি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের কাছে জাকাত দেওয়া অস্বীকার করাকে যুদ্ধের কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। অর্থনৈতিক আনুগত্য এবং ধর্মীয় আনুগত্য এখানে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। এই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী ইসলামি চিন্তায় রিদ্দাহ-যুদ্ধকে ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষার ঐতিহাসিক মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কারজাভির বক্তব্যে সেই ব্যবহার প্রকাশ্য: তিনি আবু বকরের ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে ইসলাম বেঁচে থাকার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ইবনে তাইমিয়্যার আলোচনায় ব্যক্তিগত ধর্মত্যাগের শাস্তি ব্যবহার করা হয়েছে মানুষকে ধর্মের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করার যুক্তি হিসেবে। একটি ক্ষেত্রে সামরিক-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অন্য ক্ষেত্রে ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়—উভয়কে নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ধর্ম রক্ষার ধারণা যুক্ত করা হয়েছে।
এই নিয়ন্ত্রণ শুধু মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধ্রুপদী ফিকহে ধর্মত্যাগের কারণে বিবাহ ভেঙে যাওয়া, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের অধিকার পরিবর্তিত হওয়া, পারিবারিক অভিভাবকত্ব হারানো এবং নারী মুরতাদের বন্দিত্বের বিধানও রয়েছে। ফলে ইসলাম ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত ব্যক্তির জীবন, পরিবার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানের ওপর বহুমুখী শাস্তিমূলক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের জন্য এমন মূল্য নির্ধারণ করলে মানুষ ভেতরে বিশ্বাস হারিয়েও বাইরে ধর্ম পালন করতে বাধ্য হতে পারে। এতে অনুসারীদের সংখ্যা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পরিমাণ বজায় থাকতে পারে, কিন্তু তাদের বিশ্বাসের আন্তরিকতা কিংবা মতবাদের সত্যতা সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। বাহ্যিক আনুগত্য এবং স্বাধীন বিশ্বাস দুটি স্বতন্ত্র বিষয়।
কোরআনের সূরা নিসা ৪:১৩৭-এ এমন ব্যক্তিদের কথা বলা হয়েছে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, পরে অবিশ্বাস করেছে, আবার বিশ্বাস করেছে এবং পুনরায় অবিশ্বাস করেছে। ওই আয়াতে তাঁদের জন্য পরকালীন ও ধর্মীয় পরিণতির কথা রয়েছে; ব্যক্তিগত ধর্মত্যাগের জন্য সেখানে পার্থিব মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি নির্দেশ নেই [51]। অথচ ধ্রুপদী ফিকহ ও পরবর্তী ফতোয়ার একটি প্রভাবশালী ধারায় ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগকে হত্যার মাধ্যমে প্রতিরোধ করার বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে, ধর্মত্যাগের স্বাধীনতা দেওয়া হলে অনুসারীরা চলে যাবে এবং ধর্মীয় ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে, তাহলে সেই আশঙ্কা ধর্মের সত্যতার পক্ষে প্রমাণ নয়; বরং ধর্মীয় আনুগত্য বজায় রাখার জন্য শাস্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব স্বীকারোক্তি।
যে ধর্মকে টিকিয়ে রাখার যুক্তি হিসেবে মানুষের ধর্মত্যাগের অধিকার কেড়ে নেওয়া, মতপ্রকাশ দমন এবং হত্যার ভয় দেখানোর প্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করা হয়, সেই যুক্তি ধর্মটির সত্যতা নয়—তার কর্তৃত্ব রক্ষায় বলপ্রয়োগের ভূমিকা প্রকাশ করে। স্বাধীনভাবে ধর্ম গ্রহণ করা যেমন মানুষের অধিকার, তেমনি ভুল মনে হলে সেটি ত্যাগ করা, তার সমালোচনা করা এবং অন্যদের সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ আলোচনা করাও সমান অধিকার। কোনো ব্যক্তিকে ধর্মত্যাগের কারণে হত্যা করা কিংবা তার জীবন, পরিবার ও সম্পত্তির ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া চিন্তার স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা। একটি মতবাদকে অনুসরণযোগ্য করে তোলার একমাত্র যুক্তিসংগত ভিত্তি তার দাবির সত্যতা ও প্রমাণ; সেই মতবাদ ত্যাগ করার পথ মৃত্যুভয়ে বন্ধ করে দেওয়া নয়।
উপসংহার
ধর্ম ত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান শুধু ইসলামী শরীয়া আইনেই নয়, বরং নৈতিক এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি অমানবিক বর্বর বিষয়। মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্ম পরিবর্তন বা ত্যাগ করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। ইসলামের শাস্তির বিধান এই অধিকারকে খর্ব করে এবং ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ধর্মের প্রতি সৎ বিশ্বাস এবং আন্তরিকতা থাকা প্রয়োজন, যা চাপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। মানবাধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে, প্রত্যেক মানুষ তার নিজের বিশ্বাস এবং ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকার রাখে। কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া বা জোরপূর্বক অনুসরণ করানো নৈতিকভাবে অন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
মুরতাদসংক্রান্ত ধ্রুপদী ফিকহের বিধানগুলো একত্রে বিবেচনা করলে এই দমননীতির পরিধি আরও স্পষ্ট হয়। পুরুষ ধর্মত্যাগীর জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং নারী ধর্মত্যাগীর বিষয়ে হত্যা অথবা বন্দিত্বের বিধান শুধু একটি ব্যক্তির ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধে পরিণত করে না; তাঁর বিবাহ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি, সন্তান এবং মৃত্যুর পর মৃতদেহের ওপরও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক বিধান আরোপ করে। শাফেয়ি ফিকহে ধর্মত্যাগের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান, বিভিন্ন মাজহাবে সম্পত্তি বায়তুল মালে হস্তান্তর কিংবা মুসলিম উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন, সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর পরিবার ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এবং মৃতদেহের প্রতি অসম্মানজনক আচরণের অনুমতি—এসব পৃথক আইনগত আলোচনার একটি অভিন্ন ভিত্তি রয়েছে: ইসলাম ত্যাগকারী ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সমান মর্যাদার অধিকার হিসেবে স্বীকার না করা। এতে ধর্মীয় আনুগত্যকে ব্যক্তির জীবন ও সামাজিক অধিকারের শর্তে পরিণত করা হয়।
বিশেষভাবে ভয়াবহ হলো, ধর্মত্যাগীর মৃত্যুর পরও এই বৈষম্য শেষ হয় না। জানাজা ও মুসলিম কবরস্থানে দাফন থেকে বঞ্চিত করার বিধানের পাশাপাশি ইমাম নববী ও ইবনে হাজার আল-হাইতামির শাফেয়ি ফিকহি আলোচনায় মুরতাদের মৃতদেহ কুকুরের সামনে ফেলে দেওয়াকেও অনুমোদিত বলা হয়েছে। এই নির্দিষ্ট অনুমতিকে সমস্ত মাজহাবের বাধ্যতামূলক বিধান বলা যায় না; কিন্তু এমন অনুমোদনের অস্তিত্বই দেখায়, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির মর্যাদাও কীভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। একজন মৃত মানুষের শরীর কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে না, অন্য কাউকে ধর্মত্যাগে প্ররোচিতও করতে পারে না। তা সত্ত্বেও মৃতদেহের প্রতি এমন আচরণকে বৈধ বলে গণ্য করা বিশ্বাসভিত্তিক বিভাজনকে মৃত্যুর পরও বহাল রাখার একটি নিষ্ঠুর উদাহরণ। মানুষের মর্যাদা ধর্মবিশ্বাসের অনুমোদনসাপেক্ষ কোনো বিশেষ সুবিধা নয়।
একজন মানুষ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে নিজের কোনো সম্মতি ছাড়াই তাকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করা হয়; বড় হয়ে সেই পরিচয় প্রত্যাখ্যান করলে মৃত্যুদণ্ড ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়ার বিধান নির্ধারিত রয়েছে। একইভাবে কাউকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করিয়ে পরে সেই পরিচয় ত্যাগে বাধা দেওয়ার ফিকহি অবস্থানও সংরক্ষিত হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণে স্বাধীন সম্মতি অনুপস্থিত অথচ ত্যাগের ক্ষেত্রে শাস্তি বাধ্যতামূলক—এটি বিশ্বাসের স্বাধীনতা নয়, একমুখী নিয়ন্ত্রণ। মানুষের বিবেক, চিন্তা ও পরিচয় কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের স্থায়ী সম্পত্তি হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি ধর্মের পক্ষে যুক্তি শুনে বিশ্বাসী থাকতে পারেন, আবার সেই যুক্তিকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে ধর্ম ত্যাগও করতে পারেন। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে হত্যা করা বা তাঁর পরিবার-সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ করা মুক্তচিন্তা ও মানবিক মর্যাদার সরাসরি অস্বীকার।
যে ধর্মীয় আইন বিশ্বাস ত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় মৃত্যু, বন্দিত্ব, সম্পত্তির অধিকার হরণ, পারিবারিক বিচ্ছেদ এবং মৃতদেহের অসম্মানকে অনুমোদন করে, তা মানুষের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার সঙ্গে মৌলিকভাবে অসংগত। একটি মতবাদ যুক্তি, তথ্য ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে টিকে থাকলে তার গ্রহণযোগ্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়; কিন্তু হত্যার ভয় দেখিয়ে অনুসারী ধরে রাখা সত্য প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নয়। ধর্ম গ্রহণ, পালন, সমালোচনা এবং ত্যাগ করার সমান স্বাধীনতা ছাড়া ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতার দাবি অর্থহীন। মানুষের জীবন ও মর্যাদা কোনো ধর্মের সদস্যপদ বজায় রাখার পুরস্কার হতে পারে না।
তথ্যসূত্রঃ
- John Stuart Mill, “On Liberty”, 1859 ↩︎
- John Stuart Mill, On Liberty, Chapter II: Of the Liberty of Thought and Discussion, 1859 ↩︎
- Max Weber, “The Protestant Ethic and the Spirit of Capitalism”, 1905 ↩︎
- Karl Popper, “The Open Society and Its Enemies”, 1945 ↩︎
- UN General Assembly, “Universal Declaration of Human Rights”, Article 18 & 19, 1948 ↩︎
- জাতিসংঘ, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮, অনুচ্ছেদ ১৮ ও ১৯ ↩︎
- International Covenant on Civil and Political Rights, Article 18(1)–(2) ↩︎
- জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি, সাধারণ মন্তব্য ২২, অনুচ্ছেদ ২ ও ৫, ১৯৯৩ ↩︎
- সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, অনুচ্ছেদ ১২, ১৬, ১৭ ও ১৮ ↩︎
- জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি, সাধারণ মন্তব্য ৩৪, অনুচ্ছেদ ৪৮ ও ৫১, ২০১১ ↩︎
- Émile Durkheim, “The Division of Labour in Society”, 1893 ↩︎
- সূরা নিসা, আয়াত ৮৯ ↩︎
- কোরআন, সূরা নিসা ৪:৮৮–৯১ ↩︎
- কোরআন, সূরা বাকারা ২:২১৭ ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪০৬৪ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩০০ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩০১ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯২২, মুরতাদ পুরুষ ও নারীর বিধান ↩︎
- সহিহ বুখারী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৩৬ ↩︎
- সহিহ বুখারী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৬১ ↩︎
- মুয়াত্তা ইমাম মালিক, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৬-৪০৭ ↩︎
- ফয়যুল হাদী শরহে তিরমিযী (ছানী), প্রথম খণ্ড, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪১৫ ↩︎
- ইযাহুল মুসলিম, মুসলিম জিলদে সানীর অদ্বিতীয় বাংলা শরাহ, দারুল উলুম লাইব্রেরি, পৃষ্ঠা ৪০৩-৪০৭ ↩︎
- দরসে তিরমিযী, আল্লামা মুফতি তাকী উসমানী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৬ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০০ ↩︎
- বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭ ↩︎
- বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬ ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৭৬৪, উত্তরাধিকার অধ্যায় ↩︎
- আল-মাওয়ার্দি, আল-হাবি আল-কবির, অষ্টম খণ্ড, বাব মিরাসিল মুরতাদ ↩︎
- ইমাম শাফেয়ি, আল-উম্ম, অষ্টম খণ্ড, বাব ইরতিদাদি আহাদিয যাওজাইন আও হুমা ↩︎
- আল-মাওয়ার্দি, আল-হাবি আল-কবির, নবম খণ্ড, স্বামী বা স্ত্রীর ধর্মত্যাগ-সংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
- আল-কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি, সপ্তম খণ্ড, ফাসল ফি বায়ানি হুকমি ওয়ালাদিল মুরতাদ ↩︎
- ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেন ↩︎
- নাস্তিকদের সন্ত্রাসী ঘোষণা করল সৌদি আরব ↩︎
- ইমাম নববী, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, পঞ্চম খণ্ড, মৃতদেহের কাফন ও দাফনের বিধান ↩︎
- ইবনে হাজার আল-হাইতামি, তুহফাতুল মুহতাজ, মৃতদেহ কাফন ও দাফনসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
- মুহাম্মদের নিষ্ঠুর শাস্তি: বন্দীদের হাত-পা কর্তন, চোখ অন্ধ করা ও মৃত্যুযন্ত্রণা ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৭ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩৫৩৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪২০৭ ↩︎
- আল-ইতকান ফি তাওহীদ আর-রহমান, শাইখ আব্দল্লাহ আল মুনির, পৃষ্ঠা ১৪-১৭, ২৫-২৭ ↩︎
- আল-মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার লি-তা’লিলিল মুখতার, চতুর্থ খণ্ড, ফাসল ফিমা ইয়াসিরু বিহিল কাফিরু মুসলিমা ↩︎
- ইমাম নববী, আল-মাজমু, বলপ্রয়োগে ইসলাম গ্রহণের আইনগত কার্যকারিতা-সংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
- আল-জাজিরা, আশ-শারিয়াহ ওয়াল হায়াত, ইউসুফ আল-কারজাভির বক্তব্য, ২৩ জানুয়ারি ২০১৩ ↩︎
- ইউসুফ আল-কারজাভি, খুতুরাতুর রিদ্দাহ ওয়া উকুবাতুল মুরতাদ, ২৪ জুলাই ২০০৭ ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ১০২, ইমাম আহমদের অবস্থানের ব্যাখ্যা ↩︎
- মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ, হিফজুদ্দিন, দ্বিতীয় খুতবা, ধর্মত্যাগের দণ্ড প্রতিষ্ঠার আলোচনা ↩︎
- সালেহ আল-ফাওজান, আয়াহ ওয়া হাদিস, ধর্মত্যাগের শাস্তি ও সূরা বাকারা ২:২৫৬ সম্পর্কিত ফতোয়া ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২০৩২৭, ইসলাম ত্যাগকারীর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে উত্থাপিত যুক্তি ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৯৯–১৪০০, কিতাবুয জাকাত, জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আবু বকরের যুদ্ধ ↩︎
- কোরআন, সূরা নিসা, আয়াত ১৩৭ ↩︎

