জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

জ্বীন আপনার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে

প্রকাশিত: মে 10, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন24 মিনিট পড়া

ভূমিকা: সহবাসে স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে শয়তানের অংশগ্রহণ

ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে বহু অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। এমনই একটি বিশ্বাস হলো, স্বামী-স্ত্রী যৌনমিলনের আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ না করলে শয়তান তাঁদের যৌনমিলনে অংশ নিতে পারে। কয়েকজন প্রাচীন তাফসিরকারীর সংকলিত বর্ণনায় বিষয়টি শুধু শয়তানের কুমন্ত্রণা বা সন্তানের ওপর অশুভ প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে শয়তান পুরুষের যৌনাঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একই নারীর সঙ্গে সহবাস করে, এমনকি তার যোনিতে বীর্যপাত করে—এমন সরাসরি বর্ণনা রয়েছে। সহবাস তখন শুধু দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধর্মীয় কল্পকাহিনি অনুসারে তৃতীয় এক অতিপ্রাকৃত সত্তার যৌন অংশগ্রহণও ঘটে। কথ্য ভাষায় যাকে ‘থ্রিসাম’ বলা যায়, কয়েকটি তাফসিরে ঠিক সেই ধরনের ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি ইসলামি বক্তা আহমদুল্লাহর যৌনমিলনে জিন বা শয়তানের অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত বক্তব্যের ভিডিওটি নিচে রয়েছে। এই বক্তব্যের প্রাচীন উৎস, সংশ্লিষ্ট কোরআনের আয়াত, সহিহ বুখারি-মুসলিমের হাদিস, সুন্নি ও শিয়া তাফসির-হাদিসসংকলন এবং আধুনিক ইসলামি ফতোয়ায় সংরক্ষিত ব্যাখ্যা পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, এটি শুধু সমসাময়িক কোনো বক্তার উদ্ভাবিত কথা নয়। বহু শতাব্দী ধরে ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে এই যৌনসংক্রান্ত অতিপ্রাকৃত ধারণার বিভিন্ন রূপ প্রচলিত রয়েছে।


কোরআন ১৭:৬৪: মানুষের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্ব

এই বিশ্বাসের প্রধান ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কোরআনের সুরা আল-ইসরার ৬৪ নম্বর আয়াত। সেখানে আল্লাহ ইবলিসকে সম্বোধন করে বলেছেন, সে মানুষকে বিপথগামী করার চেষ্টা করতে পারে এবং তাদের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে অংশীদার হতে পারে। আয়াতটিতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ وَشَارِكْهُمْ অর্থ ‘তাদের সঙ্গে অংশীদার হও’। এই নির্দেশের ব্যাখ্যায় প্রাচীন তাফসিরকারীরা সন্তানদের অবৈধ জন্ম, ধর্মান্তর, সন্তান হত্যা, শিরকপূর্ণ নামকরণ এবং যৌনমিলনে শয়তানের অংশগ্রহণ—বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেছেন। আয়াতের মূল পাঠে শয়তানের যৌনাঙ্গ বা বীর্যপাতের কথা নেই; সেগুলো নির্দিষ্ট তাফসির-বর্ণনায় যুক্ত হয়েছে। [1]

وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِمْ بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا

বাংলা অনুবাদ: তাদের মধ্যে যাকে পারো তোমার কণ্ঠস্বর দিয়ে প্ররোচিত করো, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালাও, তাদের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে অংশীদার হও এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দাও। আর শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।

এই আয়াত থেকে কোনো শিশুর শরীরে শয়তানের বংশগত অংশ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। তাফসিরে ‘সন্তানদের মধ্যে অংশীদারিত্ব’ কথাটিকে কেউ অবৈধ যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান, কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তন, আবার কেউ শয়তানের নিজস্ব যৌন অংশগ্রহণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কয়েকটি বর্ণনায় শয়তানের সঙ্গম ও বীর্যপাতের বিবরণ এত নির্দিষ্ট যে সেগুলোকে শুধু অস্পষ্ট নৈতিক প্রলোভনের প্রতীক বলা যায় না।


সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম: সহবাসের আগে দোয়া পড়লে সন্তানকে শয়তান ক্ষতি করতে পারবে না

ইবনে আব্বাসের সূত্রে সহিহ বুখারি ৬৩৮৮ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, একজন পুরুষ স্ত্রীসঙ্গমের আগে আল্লাহর নাম নিয়ে শয়তানকে নিজেদের এবং সম্ভাব্য সন্তান থেকে দূরে রাখার দোয়া করলে সেই মিলন থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানকে শয়তান কখনো ক্ষতি করতে পারবে না। একই বক্তব্য সহিহ মুসলিম ১৪৩৪ক নম্বর হাদিসেও রয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যৌনমিলন থেকে সম্ভাব্য সন্তানের জন্ম এবং তার ওপর শয়তানের প্রভাবের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। তবে বুখারি-মুসলিমের এই নির্দিষ্ট হাদিসে শয়তান স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সহবাস বা বীর্যপাত করে—এমন কথা সরাসরি বলা হয়নি। সেই বর্ণনা অন্য তাফসির ও হাদিসের ধারায় পাওয়া যায়। [2]

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ سَالِمٍ، عَنْ كُرَيْبٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «لَوْ أَنَّ أَحَدَهُمْ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَأْتِيَ أَهْلَهُ قَالَ بِاسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ، وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا، فَإِنَّهُ إِنْ يُقَدَّرْ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ فِي ذَلِكَ، لَمْ يَضُرَّهُ شَيْطَانٌ أَبَدًا».

বাংলা অনুবাদ: উসমান ইবনে আবি শায়বা আমাদের বর্ণনা করেছেন; জারির মানসুরের সূত্রে, মানসুর সালিমের সূত্রে, সালিম কুরাইবের সূত্রে এবং কুরাইব ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন, নবী বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ যখন তার স্ত্রীর কাছে যেতে চায়, তখন যদি বলে, আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন এবং আমাদের আপনি যা দান করবেন, তা থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন; অতঃপর সেই মিলনে তাদের জন্য কোনো সন্তান নির্ধারিত হলে শয়তান সেই সন্তানকে কখনো ক্ষতি করতে পারবে না।’

সহিহ মুসলিমের ‘সহবাসের সময় কী বলা সুপারিশকৃত’ অধ্যায়েও অনুরূপ বক্তব্য সংরক্ষিত। এখানে একই শর্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে: যৌনমিলনের আগে নির্দিষ্ট ধর্মীয় বাক্য উচ্চারণ এবং তার ফলে ভবিষ্যৎ সন্তানকে শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। বাস্তব জৈবিক প্রজননে কোনো উচ্চারিত বাক্যের কারণে অদৃশ্য সত্তা মানুষের সন্তান থেকে দূরে সরে যায়—এমন কোনো পরীক্ষাযোগ্য প্রমাণ নেই। ধর্মীয় নিয়মটি আচারগত সুরক্ষা দাবি করে, কিন্তু দাবিকৃত সুরক্ষার কার্যপ্রণালি বা ফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। [3]

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، – وَاللَّفْظُ لِيَحْيَى – قَالاَ أَخْبَرَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ سَالِمٍ، عَنْ كُرَيْبٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «لَوْ أَنَّ أَحَدَهُمْ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَأْتِيَ أَهْلَهُ قَالَ بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا فَإِنَّهُ إِنْ يُقَدَّرْ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ فِي ذَلِكَ لَمْ يَضُرَّهُ شَيْطَانٌ أَبَدًا».

বাংলা অনুবাদ: ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া ও ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, জারির আমাদের জানিয়েছেন, মানসুরের সূত্রে, সালিমের সূত্রে, কুরাইবের সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ স্ত্রীসঙ্গম করতে চাইলে যদি বলে, আল্লাহর নামে; হে আল্লাহ, আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন এবং আমাদের যে সন্তান দান করবেন, তাকে শয়তান থেকে দূরে রাখুন; তারপর তাদের সেই মিলন থেকে সন্তান জন্মালে শয়তান কখনো তার ক্ষতি করতে পারবে না।’

বুখারি ও মুসলিমে উদ্ধৃত হাদিস দুটির মূল বক্তব্য ও বর্ণনাপথ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একই হাদিসের দুটি সংকলিত সংস্করণকে আলাদা দুটি স্বাধীন ঘটনার সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। তবে ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের ভেতরে এই দোয়ার প্রচলিত অবস্থান এবং শয়তান থেকে সম্ভাব্য সন্তানকে রক্ষা করার বিশ্বাসের গুরুত্ব এ থেকেই স্পষ্ট হয়।


তাফসীরে মাযহারী: জাফর সাদিকের নামে সহবাস ও শয়তানের বীর্যপাতের বিবরণ

বাংলায় প্রকাশিত তাফসীরে মাযহারী-র সপ্তম খণ্ডের ১২২ পৃষ্ঠায় জাফর সাদিকের নামে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পুরুষ স্ত্রীসঙ্গম করতে গেলে শয়তান তার পুরুষাঙ্গের ওপর বসে পড়ে। পুরুষ ‘বিসমিল্লাহ’ না বললে শয়তানও একই নারীর সঙ্গে সহবাস করে এবং তার যোনিতে বীর্যপাত করে। পরের অংশে সেই মিলন থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্ব থাকার কথা বলা হয়েছে। উদ্ধৃত বাংলা পৃষ্ঠার ছবিটি নিচে দেওয়া হলো। একই মূল বিবরণ বাগাভী, সামআনী এবং রুহুল বায়ানের আরবি তাফসিরেও পাওয়া যায়। [4] [5]

ইমাম জাফর সাদেক বলেছেন, মানুষ যখন স্ত্রীসঙ্গম করতে উদ্যত হয়, তখন শয়তান বসে পড়ে তার পুরুষাঙ্গের উপর। এমতাবস্থায় ‘বিসমিল্লাহ্’ না বলে সঙ্গম শুরু করলে শয়তানও হয়ে যায় তার সঙ্গম-সঙ্গী। এভাবে শয়তানও বীর্যপাত করে তার স্ত্রীঅঙ্গে। এরকম মিলনের ফলে যে সন্তানের জন্ম হয়, সে সন্তানের মধ্যে থাকে শয়তানের অংশীদারিত্ব।

জ্বীন

এই বর্ণনায় শয়তানের ‘অংশীদারিত্ব’ একটি নির্দিষ্ট যৌন ক্রিয়া: পুরুষের যৌনাঙ্গের ওপর অবস্থান, একই নারীর সঙ্গে সহবাস এবং নারীর যৌনাঙ্গে বীর্যপাত। অতএব এই বক্তব্যকে শুধু ‘খারাপ চিন্তা মনের মধ্যে প্রবেশ করে’ অর্থে সীমাবদ্ধ করা মূল বিবরণের যৌন অর্থ বাদ দেওয়ার শামিল। তবে এখানে একটি উৎসগত সীমারেখা রয়েছে: মাযহারী এবং অন্য তাফসিরগুলোতে বক্তব্যটি জাফর সাদিকের নামে বর্ণিত; এর ফলে জাফর নিজে নিশ্চিতভাবে কথাটি বলেছিলেন বা বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটে, কোনোটিই প্রমাণিত হয় না। প্রমাণিত হয় ইসলামি ব্যাখ্যাপরম্পরায় এই নির্দিষ্ট যৌন কাহিনির প্রচলন।


তাফসীরে বাগাভী: শয়তান পুরুষের যৌনাঙ্গের ওপর বসে নারীর যোনিতে বীর্যপাত করে

তাফসীরে বাগাভীর সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪-এর ব্যাখ্যায় শয়তানের সন্তান-অংশীদারিত্ব সম্পর্কে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমে ইবনে আব্বাসের নামে কন্যাসন্তান হত্যা, মুজাহিদ ও দাহহাকের নামে ব্যভিচারজাত সন্তান, হাসান বসরি ও কাতাদার নামে শিশুদের ইহুদি-খ্রিষ্টান-মাজুসি হিসেবে গড়ে তোলা এবং অন্য বর্ণনায় ধর্মীয় নামকরণের কথা এসেছে। তার পরেই জাফর ইবনে মুহাম্মদের নামে শয়তানের সহবাস ও বীর্যপাতের নির্দিষ্ট বর্ণনা সংকলিত হয়েছে। এরপর জিনের অংশীদারিত্বে জন্ম নেওয়া সন্তান এবং নারীর সঙ্গে জিনের যৌনসম্পর্কসংক্রান্ত আরও বিবরণও রয়েছে। [6]

وأما الشركة في الأولاد : روي عن ابن عباس : أنها الموءودة . وقال مجاهد والضحاك : هم أولاد الزنا . وقال الحسن ، وقتادة : هو أنهم هودوا أولادهم ونصروهم ومجسوهم . وعن ابن عباس رواية أخرى : هو تسميتهم الأولاد عبد الحارث وعبد شمس وعبد العزى وعبد الدار ونحوها . وروي عن جعفر بن محمد أن الشيطان يقعد على ذكر الرجل فإذا لم يقل : «بسم الله» أصاب معه امرأته وأنزل في فرجها كما ينزل الرجل . وروي في بعض الأخبار : إن فيكم مغربين قيل : وما المغربون؟ قال : الذين يشارك فيهم الجن . وروي أن رجلا قال لابن عباس : إن امرأتي استيقظت وفي فرجها شعلة من نار؟ قال : ذلك من وطء الجن .

বাংলা অনুবাদ: সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্ব প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত হয়েছে যে এর অর্থ জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাসন্তান। মুজাহিদ ও দাহহাক বলেছেন, এটি ব্যভিচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তানদের বোঝায়। হাসান বসরি ও কাতাদা বলেছেন, সন্তানদের ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা মাজুসি বানানোকে বোঝায়। ইবনে আব্বাসের নামে অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সন্তানদের আবদুল হারিস, আবদুশ শামস, আবদুল উজ্জা, আবদুদ দার প্রভৃতি নাম রাখা। জাফর ইবনে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হয়েছে, শয়তান পুরুষের যৌনাঙ্গের ওপর বসে থাকে। পুরুষ ‘বিসমিল্লাহ’ না বললে শয়তানও তার সঙ্গে তার স্ত্রীর সহবাস করে এবং পুরুষ যেভাবে বীর্যপাত করে, সেভাবেই নারীর যোনিতে বীর্যপাত করে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, ‘তোমাদের মধ্যে মুগাররাবুন আছে।’ প্রশ্ন করা হয়, মুগাররাবুন কারা? বলা হয়, ‘যাদের মধ্যে জিনের অংশীদারিত্ব রয়েছে।’ আরও বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসকে বলল, ‘আমার স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে তার যোনিতে যেন আগুনের শিখা অনুভব করেছে।’ তিনি বললেন, ‘এটি জিনের সহবাসের কারণে।’

বাগাভীর বর্ণনার মূল আরবি শব্দগুলো হলো أصاب معه امرأته—তার সঙ্গে তার স্ত্রীর সহবাস করল—এবং أنزل في فرجها كما ينزل الرجل—পুরুষের মতোই নারীর যোনিতে বীর্যপাত করল। এই নির্দিষ্ট বাক্যগুলো সহবাস ও বীর্যপাতকে শয়তানের নিজের শারীরিক কাজ হিসেবে বর্ণনা করে। কোরআনের ‘অংশীদারিত্ব’ শব্দটির ওপর দাঁড় করিয়ে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ অতিপ্রাকৃত যৌন ঘটনার কল্পনা গড়ে উঠেছে, এখানে তা প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায়।


তাফসীরে সামআনী: জাফর সাদিকের একই বর্ণনা এবং জিন-মানব সন্তানের ধারণা

আবুল মুযাফফর সামআনীর তাফসিরেও সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪-এর ব্যাখ্যায় একই ধরনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সামআনী জাফর ইবনে মুহাম্মদের নামে শয়তানের যৌনাঙ্গের ওপর অবস্থান, সহবাস ও বীর্যপাতের বক্তব্য সংকলন করেছেন। তিনি এ ধরনের কথা মুজাহিদের নামেও প্রচলিত ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। একই প্রসঙ্গে জিনের যৌন অংশগ্রহণে জন্ম নেওয়া সন্তানের কথা সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে জাফর সাদিকের নামে উক্তিটি শুধু একটি বাংলা অনুবাদে পাওয়া যাচ্ছে না; প্রাচীন আরবি তাফসিরের পাঠেও তার উপস্থিতি নিশ্চিত। বাগাভী ও সামআনী একই কাহিনি উদ্ধৃত করেছেন বলে তাদের বইকে স্বতন্ত্র ঘটনার দুটি সাক্ষ্য বানানো যায় না; এ থেকে প্রমাণিত হয় এই বর্ণনাটির তাফসিরসাহিত্যে বিস্তার। [7]

وقوله : ( والأولاد ) فيه أقوال : قال ابن عباس : الموءودة . قال مجاهد : أولاد الزنا ، وقال غيره : هو تهويدهم وتنصيرهم وتمجيسهم . وعن ابن عباس في رواية أخرى هو : تسميتهم الأولاد : عبد العزى ، وعبد الدار ، وعبد مناف ، وما أشبه ذلك . وفي بعض المسانيد عن ابن عباس أن رجلا أتاه ، وقال : إن امرأتي استيقظت ، وكأن في فرجها شعلة نار ، قال : ذاك من وطئ الجن . قال : فمن أولادهم ؟ قال : هؤلاء المخنثون . وعن جعفر بن محمد : إن الشيطان يقعد على ذكر الرجل ؛ فإذا لم يسم الله أصاب امرأته معه ، وأنزل في فرجها كما ينزل الرجل . وروي قريبا من هذا عن مجاهد . وفي بعض الأخبار عن النبي قال : «إن فيكم مغربين» . قيل : ومن المغربون ؟ قال : «الذين شارك فيهم الجن» .

বাংলা অনুবাদ: ‘সন্তানদের মধ্যে অংশীদার হও’—এর ব্যাখ্যায় কয়েকটি মত রয়েছে। ইবনে আব্বাস বলেছেন, এর অর্থ জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাসন্তান। মুজাহিদ বলেছেন, ব্যভিচারজাত সন্তান। অন্যরা বলেছেন, সন্তানদের ইহুদি, খ্রিষ্টান বা মাজুসি বানানো। ইবনে আব্বাসের নামে অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সন্তানদের আবদুল উজ্জা, আবদুদ দার, আবদু মানাফ ইত্যাদি নাম রাখা। কয়েকটি মুসনাদে ইবনে আব্বাসের নামে এসেছে, এক ব্যক্তি এসে বলেছিল, ‘আমার স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে তার যোনিতে আগুনের শিখার মতো কিছু অনুভব করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এটি জিনের সহবাসের কারণে।’ লোকটি প্রশ্ন করে, ‘তাদের সন্তান কারা?’ তিনি বলেন, ‘এই মুখান্নাসরা।’ জাফর ইবনে মুহাম্মদের নামে রয়েছে, শয়তান পুরুষের যৌনাঙ্গের ওপর বসে; পুরুষ আল্লাহর নাম না নিলে শয়তানও তার সঙ্গে তার স্ত্রীর সহবাস করে এবং পুরুষের মতো নারীর যোনিতে বীর্যপাত করে। মুজাহিদের নামেও কাছাকাছি বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় নবীর নামে এসেছে, ‘তোমাদের মধ্যে মুগাররাবুন রয়েছে।’ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যাদের মধ্যে জিন অংশ নিয়েছে।’

সামআনীর উদ্ধৃত ‘মুখান্নাস’ শব্দটি একটি ঐতিহাসিক সামাজিক শ্রেণিচিহ্ন; এটির সাহায্যে কোনো মানুষের যৌন বৈশিষ্ট্য বা পরিচয়ের জৈবিক উৎস ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনিতে মানুষের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জিনের যৌনসম্পর্ককে যুক্ত করার এই প্রবণতা বাস্তব মানবপ্রজনন সম্পর্কে অজ্ঞতারই উদাহরণ। একই সঙ্গে বর্ণনাটি জাফর, মুজাহিদ ও ইবনে আব্বাসের নামে প্রচলিত বক্তব্যের ভিন্ন স্তর সংরক্ষণ করেছে; সবগুলোকে মুহাম্মদের সহিহ হাদিস হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।


তাফসীরে রুহুল বায়ান: পরবর্তী যুগেও শয়তানের বীর্যপাতের বর্ণনার প্রচলন

ইসমাঈল হাক্কি বুরসাভির রুহুল বায়ান তাফসিরে সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪-এর ব্যাখ্যাতেও জাফর ইবনে মুহাম্মদের নামে একই যৌনসংক্রান্ত বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। এখানে প্রথমে সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্ব বলতে অবৈধ উপায়ে সন্তান লাভ, কন্যাসন্তান হত্যা, শিরকপূর্ণ নামকরণ এবং ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ে লালনপালনের কথা আলোচনা করা হয়েছে। তারপর সরাসরি শয়তানের যৌনসঙ্গম ও বীর্যপাতের বর্ণনাটি এসেছে। একই ধরনের বিবরণের এই দীর্ঘকালব্যাপী পুনঃসংকলন একটি অলৌকিক ঘটনার স্বাধীন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়; বরং মুসলিম ব্যাখ্যাপরম্পরায় যৌনমিলনে শয়তানের অংশগ্রহণের বিশ্বাস কীভাবে পরবর্তী যুগেও বহাল ছিল, তার দলিল। [8]

وَالْأَوْلَادِ بالحث على التوصل إليهم بالأسباب المحرمة والوأد والإشراك كتسسينهم بعبد العزى وعبد الحارث وعبد الشمس وعبد الدار وغير ذلك . والتضليل بالحمل على الأديان الزائغة والحرف الذميمة والافعال القبيحة وقال في التأويلات النجمية بتضييع زمانهم وإفساد استعدادهم في طلب الدنيا ورياستها متغافلين عن تهذيب نفوسهم وتزكيتها وتأديبها وتوقيها عن الصفات المذمومة وتحليهم بالصفات المحمودة وتعليمهم الفرائض والسنن والعلوم الدينية وتحريضهم على طلب الآخرة والدرجات العلى والنجاة من النار والدركات انتهى وعن جعفر بن محمد ان الشيطان يقعد على ذكر الرجل فإذا لم يقل باسم اللّه أصاب معه امرأته وانزل في فرجها كما ينزل الرجل

বাংলা অনুবাদ: ‘সন্তানদের মধ্যে অংশীদার হও’—এর অর্থ সন্তান লাভে নিষিদ্ধ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত করা, সন্তান হত্যা এবং শিরকপূর্ণ নাম রাখা—যেমন আবদুল উজ্জা, আবদুল হারিস, আবদুশ শামস ও আবদুদ দার। সন্তানদের ভ্রান্ত ধর্ম, নিন্দনীয় স্বভাব ও খারাপ কাজে প্রবৃত্ত করার কথাও বলা হয়েছে। আত-তাওয়িলাতুন নাজমিয়্যা-র বক্তব্য অনুসারে, সন্তানদের সময় নষ্ট করা, দুনিয়াবি প্রতিষ্ঠার অনুসন্ধানে তাদের মনোযোগ ব্যয় করা, আত্মশুদ্ধি ও ভালো চরিত্র গঠনে অবহেলা করা এবং ধর্মীয় কর্তব্য ও আখিরাতমুখী জীবন থেকে দূরে রাখাও এই অংশীদারিত্বের অন্তর্ভুক্ত। জাফর ইবনে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হয়েছে, শয়তান পুরুষের যৌনাঙ্গের ওপর বসে থাকে। পুরুষ আল্লাহর নাম না বললে শয়তানও তার সঙ্গে তার স্ত্রীর সহবাস করে এবং পুরুষের মতোই নারীর যোনিতে বীর্যপাত করে।


তাফসীরে কুরতুবী ও সুরা আর-রহমান: পুরুষের সঙ্গে জিনের যৌনমিলন এবং নারীর সঙ্গে জিনের সহবাস

কুরতুবী সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪-এর ব্যাখ্যায় মুজাহিদের নামে বলেছেন, পুরুষ যৌনমিলনের আগে আল্লাহর নাম না নিলে জিন তার পুরুষাঙ্গের চারপাশে জড়িয়ে একই সঙ্গে সহবাস করে। তিনি এই বক্তব্যকে কোরআনের সুরা আর-রহমান ৫৫:৫৬-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ওই আয়াতে জান্নাতের নারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাঁদের আগে কোনো মানুষ বা জিন যৌনসংসর্গ করেনি। কুরতুবী এটিকে জিনের যৌনসম্পর্ক করার সক্ষমতার দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। [9]

وقول خامس – روي عن مجاهد قال : إذا جامع الرجل ولم يسم انطوى الجان على إحليله فجامع معه ، فذلك قوله – تعالى – : لم يطمثهن إنس قبلهم ولا جان وسيأتي . وروى من حديث عائشة قالت قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم – : إن فيكم مغربين قلت : يا رسول الله ، وما المغربون ؟ قال : الذين يشترك فيهم الجن . رواه الترمذي الحكيم في نوادر الأصول . قال الهروي : سموا مغربين لأنه دخل فيهم عرق غريب . قال الترمذي الحكيم : فللجن مساماة بابن آدم في الأمور والاختلاط ; فمنهم من يتزوج فيهم ، وكانت بلقيس ملكة سبأ أحد أبويها من الجن .

বাংলা অনুবাদ: পঞ্চম মত হিসেবে মুজাহিদের নামে বর্ণিত হয়েছে: যখন কোনো পুরুষ আল্লাহর নাম না নিয়ে স্ত্রীসঙ্গম করে, তখন জিন তার পুরুষাঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং তার সঙ্গে সহবাস করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বক্তব্য, ‘তাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন যৌনসংসর্গ করেনি’ উদ্ধৃত করা হয়েছে। আয়েশার সূত্রে নবীর নামে আরেকটি বর্ণনা রয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে মুগাররাবুন আছে।’ আয়েশা জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, মুগাররাবুন কারা?’ তিনি বলেন, ‘যাদের মধ্যে জিন অংশগ্রহণ করেছে।’ হাকিম তিরমিজি এটি নাওয়াদিরুল উসুল গ্রন্থে সংকলন করেছেন। হারাওয়ি বলেছেন, তাদের মুগাররাবুন বলা হয়, কারণ তাদের মধ্যে বিদেশি বা অপরিচিত বংশের উপাদান প্রবেশ করেছে। হাকিম তিরমিজি বলেছেন, জিনেরা মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মেলামেশা করে; তাদের কেউ মানুষের সঙ্গে বিয়েও করে। সাবার রানি বিলকিসের পিতা-মাতার একজন জিন ছিল—এমন কথাও এখানে এসেছে।

সুরা আর-রহমানের ৫৬ নম্বর আয়াতের নিজস্ব বক্তব্য হলো, জান্নাতের নারীদের আগে মানুষ বা জিন কেউ স্পর্শ বা যৌনসংসর্গ করেনি। ওই আয়াত সরাসরি পৃথিবীর কোনো নারীর সঙ্গে জিন যৌনসম্পর্ক করেছে বলে জানায় না। কিন্তু কুরতুবী তাঁর ব্যাখ্যায় মুজাহিদের উদ্ধৃতি টেনে মানুষের নারীর সঙ্গে জিনের সহবাসের সম্ভাবনাকে বাস্তব বলে গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই ব্যাখ্যাটি কোরআনের মূল বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি নির্দিষ্ট দাবি। [10]

فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ

বাংলা অনুবাদ: সেখানে রয়েছে দৃষ্টি সংযত রাখা নারীরা, যাঁদের আগে কোনো মানুষ কিংবা জিন যৌনসংসর্গ করেনি।

একই আয়াতের ব্যাখ্যায় কুরতুবী আরও সরাসরি বলেছেন, জিন মানুষের নারীর সঙ্গে যৌনসংসর্গ করতে পারে; মুজাহিদের বক্তব্যে নাম না নিয়ে সহবাস করলে জিনের পুরুষাঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে সহবাস করার ঘটনাই তার উদাহরণ। এই যুক্তির ভিত্তিতে তিনি জান্নাতের নারীদের যৌন-পবিত্রতার বর্ণনাকে পার্থিব নারীদের সঙ্গে জিনের সম্ভাব্য যৌনসম্পর্কের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন। [11]

الثالثة : في هذه الآية دليل على أن الجن تغشى كالإنس ، وتدخل الجنة ويكون لهم فيها جنيات . قال ضمرة : للمؤمنين منهم أزواج من الحور العين ، فالإنسيات للإنس ، والجنيات للجن . وقيل : أي لم يطمث ما وهب الله للمؤمنين من الجن في الجنة من الحور العين من الجنيات جن ، ولم يطمث ما وهب الله للمؤمنين من الإنس في الجنة من الحور العين من الإنسيات إنس ، وذلك لأن الجن لا تطأ بنات آدم في الدنيا . ذكره القشيري . قلت : قد مضى في ( النمل ) القول في هذا وفي ( الإسراء ) أيضا ، وأنه جائز أن تطأ بنات آدم . وقد قال مجاهد : إذا جامع الرجل ولم يسم انطوى الجان على إحليله فجامع معه فذلك قوله تعالى : لم يطمثهن إنس قبلهم ولا جان وذلك بأن الله تبارك وتعالى وصف الحور العين بأنه لم يطمثهن إنس قبلهم ولا جان . يعلمك أن نساء الآدميات قد يطمثهن الجان ، وأن الحور العين قد برئن من هذا العيب ونزهن ، والطمث الجماع .

বাংলা অনুবাদ: তৃতীয় আলোচনা: এই আয়াতকে জিনের মানুষের মতো যৌনসংসর্গ করার এবং জান্নাতে প্রবেশ করে জিন-নারী পাওয়ার দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। দামরা বলেছেন, তাদের মুমিনদের জন্য হুর থাকবে; মানুষের নারীরা মানুষের জন্য এবং জিন-নারীরা জিনের জন্য। আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জান্নাতে জিনদের জন্য নির্ধারিত নারীদের আগে কোনো জিন এবং মানুষের জন্য নির্ধারিত নারীদের আগে কোনো মানুষ যৌনসংসর্গ করেনি; কারণ পৃথিবীতে জিন আদমসন্তানের নারীদের সঙ্গে সহবাস করে না—এই মতটি কুশাইরি উল্লেখ করেছেন। কুরতুবী বলেছেন, তিনি পূর্বে সুরা আন-নামল ও আল-ইসরার আলোচনায় মানুষের নারীদের সঙ্গে জিনের সহবাস সম্ভব বলে আলোচনা করেছেন। মুজাহিদ বলেছেন, পুরুষ নাম না নিয়ে স্ত্রীসঙ্গম করলে জিন তার পুরুষাঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে তার সঙ্গে সহবাস করে। কুরআনের ‘তাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন যৌনসংসর্গ করেনি’ বক্তব্যের সঙ্গে এটি যুক্ত করে কুরতুবী বলেছেন, আদমসন্তানের নারীদের সঙ্গে জিনের সহবাস হতে পারে; আর জান্নাতের নারীরা এমন যৌনসংসর্গ থেকে মুক্ত বলে বর্ণিত। এখানে ‘তামস’ শব্দের অর্থ যৌনসংসর্গ।


শিয়া হাদিসসংকলন: শয়তানের বীর্য, সন্তানের অংশীদারিত্ব এবং ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে সন্তানের উৎস নির্ধারণ

শয়তানের যৌন অংশগ্রহণের ধারণা শুধু সুন্নি তাফসিরে সীমাবদ্ধ নয়। শিয়া হাদিসসাহিত্যে জাফর সাদিকের নামে আরও নির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়। আল-কাফি থেকে উদ্ধৃত একাধিক বর্ণনা ওয়াসাইলুশ শিয়া-র বিবাহের প্রাথমিক আদবসংক্রান্ত অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে। সেখানে পুরুষের যৌনমিলনের সময় শয়তানের উপস্থিতি, মানুষের মতো বীর্যপাত, সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে শয়তানের অংশ এবং সেই অংশ শনাক্ত করার জন্য আহলুল বাইতের প্রতি ভালোবাসা বা বিদ্বেষকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের কথা এসেছে। [12]

و عنهم عن أحمد عن أبيه عن حمزة بن عبد اللّه عن جميل بن درّاج عن أبي الوليد عن أبي بصير قال قال لي أبو عبد اللّه ع يا أبا محمّد إذا أتيت أهلك فأيّ شي‏ء تقول قال قلت جعلت فداك و أطيق أن أقول شيئا قال بلى قل اللّهمّ بكلماتك استحللت فرجها و بأمانتك أخذتها فإن قضيت في رحمها شيئا فاجعله تقيّا زكيّا و لا تجعل فيه شركا للشّيطان قال قلت جعلت فداك و يكون فيه شرك الشّيطان قال نعم أ ما تسمع قول اللّه عزّ و جلّ في كتابه و شاركهم في الأموال و الأولاد إنّ الشّيطان يجي‏ء فيقعد كما يقعد الرّجل و ينزل كما ينزل الرّجل قلت فبأيّ شي‏ء يعرف ذلك قال بحبّنا و بغضنا

বাংলা অনুবাদ: আহমদের সূত্রে, তাঁর পিতার সূত্রে, হামজা ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে, জামিল ইবনে দাররাজের সূত্রে, আবুল ওয়ালিদের সূত্রে, আবু বাসির বর্ণনা করেছেন: জাফর সাদিক আমাকে বললেন, ‘হে আবু মুহাম্মদ, তুমি যখন স্ত্রীর কাছে যাও, তখন কী বলো?’ আমি বললাম, ‘আপনার জন্য উৎসর্গ হই, সে অবস্থায় আমি কী বলতে পারব?’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই। বলবে, হে আল্লাহ, আপনার কথার মাধ্যমে আমি তার যৌনসঙ্গম বৈধ করেছি এবং আপনার আমানতে তাকে গ্রহণ করেছি; তার গর্ভে কিছু নির্ধারণ করলে তাকে ধর্মপরায়ণ ও পবিত্র করুন এবং তাতে শয়তানের অংশ রাখবেন না।’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সন্তানের মধ্যে কি শয়তানের অংশ থাকতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। তুমি কি আল্লাহর কিতাবে পড়োনি, “তাদের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে অংশীদার হও”?’ শয়তান আসে, পুরুষ যেমন বসে সেভাবে বসে এবং পুরুষ যেমন বীর্যপাত করে সেভাবে বীর্যপাত করে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সেই অংশ কীভাবে শনাক্ত করা যায়?’ তিনি বললেন, ‘আমাদের প্রতি ভালোবাসা ও বিদ্বেষ দিয়ে।’

আরেকটি বর্ণনায় শয়তানের অংশগ্রহণ সম্পর্কে জাফর সাদিক এত গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন যে শ্রোতা ভয় পেয়ে যান। এরপর সহবাসের আগে পাঠের জন্য একটি দীর্ঘ দোয়া শেখানো হয়, যেখানে সম্ভাব্য সন্তানের মধ্যে শয়তানের কোনো অংশ, ভাগ বা অধিকার না থাকার প্রার্থনা রয়েছে। এটি দেখায়, শয়তানের অংশীদারিত্ব এখানে শুধু পরবর্তী জীবনে সন্তানের খারাপ আচরণের প্রতীক নয়; যৌনমিলন ও সন্তান উৎপাদনের মুহূর্তেই তার উপস্থিতি ধরে নিয়ে প্রতিরোধমূলক ধর্মীয় আচার নির্ধারিত হয়েছে। [13]

و عنهم عن أحمد بن محمّد بن خالد عن عليّ بن حسّان عن عبد الرّحمن بن كثير قال كنت عند أبي عبد اللّه ع جالسا فذكر شرك الشّيطان فعظّمه حتّى أفزعني قلت جعلت فداك فما المخرج من ذلك فقال إذا أردت الجماع فقل بسم اللّه الرّحمن الرّحيم الّذي لا إله إلّا هو بديع السّماوات و الأرض اللهم إن قضيت منّي في هذه اللّيلة خليفة فلا تجعل للشّيطان فيه شركا و لا نصيبا و لا حظّا و اجعله مؤمنا مخلصا مصفّى من الشّيطان و رجزه جلّ ثناؤك

বাংলা অনুবাদ: আবদুর রহমান ইবনে কাসির বলেছেন, আমি জাফর সাদিকের কাছে বসেছিলাম। তিনি শয়তানের অংশীদারিত্বের কথা এত গুরুতরভাবে বললেন যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এ থেকে মুক্তির উপায় কী?’ তিনি বললেন, ‘তুমি সহবাস করতে চাইলে বলবে: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আসমান ও পৃথিবীর স্রষ্টা। হে আল্লাহ, আপনি যদি এই রাতে আমার থেকে কোনো উত্তরসূরি নির্ধারণ করেন, তাহলে তার মধ্যে শয়তানের কোনো অংশীদারিত্ব, ভাগ বা অধিকার রাখবেন না। তাকে মুমিন, একনিষ্ঠ ও শয়তানের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করুন। আপনার মহিমা মহান।’

এই শিয়া বর্ণনাগুলোর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক শয়তানের অংশীদারিত্ব শনাক্ত করার পদ্ধতি। শিশুর জৈবিক বৈশিষ্ট্য বা জন্মের চিকিৎসাগত তথ্য নয়, বরং পরবর্তী জীবনে আহলুল বাইতের প্রতি তার ভালোবাসা বা বিদ্বেষকে শয়তানের অংশগ্রহণের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক আনুগত্যকে এভাবে প্রজননের অতিপ্রাকৃত উৎস নির্ধারণের মানদণ্ড বানানো বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মানুষের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতামত কোনো অদৃশ্য সত্তার বীর্য থেকে জন্ম নেওয়ার প্রমাণ নয়।


তাবারি ও ইবনে কাসীর: ‘অংশীদারিত্ব’ শব্দের বিস্তৃত ব্যাখ্যা এবং যৌন কাহিনির অবস্থান

তাফসীরে তাবারি ও ইবনে কাসীর সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪-এর ‘সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্ব’ কথাটি আরও বিস্তৃত অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। তাবারির বিবরণে ইবনে আব্বাসের নামে ব্যভিচারজাত সন্তান ও শিশুহত্যা, কাতাদা ও হাসান বসরির নামে সন্তানদের বিভিন্ন অমুসলিম ধর্মে দীক্ষিত করা এবং অন্য সূত্রে ধর্মীয় নামকরণের কথা এসেছে। তাবারি এগুলোর মধ্যে একটিকে একমাত্র অর্থ না ধরে যে সন্তানের জন্ম, পরিচর্যা, নামকরণ বা অন্য কোনো বিষয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করা হয়, সেখানে শয়তানের অংশগ্রহণের সাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ তাবারির নিজের নির্বাচিত ব্যাখ্যা মূলত নৈতিক ও ধর্মীয় আনুগত্যের পরিসরে। এটি শয়তানের সরাসরি বীর্যপাতের বিবরণ নয়। [14]

وأولى الأقوال في ذلك بالصواب أن يقال: كل ولد ولدته أنثى عصى الله بتسميته ما يكرهه الله، أو بإدخاله في غير الدين الذي ارتضاه الله، أو بالزنا بأمه، أو قتله ووأده، أو غير ذلك من الأمور التي يخصص بقوله ( وَشَارِكْهُمْ فِي الأَمْوَالِ وَالأولادِ ) معنى الشركة فيه بمعنى دون معنى، فكلّ ما عصى الله فيه أو به، وأطيع به الشيطان أو فيه، فهو مشاركة من عصى الله فيه أو به إبليس فيه.

বাংলা অনুবাদ: এ বিষয়ে অধিকতর সঠিক বক্তব্য হলো: কোনো নারী যে সন্তান জন্ম দিয়েছে, সেই সন্তানকে আল্লাহর অপছন্দনীয় নামে নামকরণ করা, তাকে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে প্রবেশ করানো, তার মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করা, তাকে হত্যা করা বা জীবন্ত কবর দেওয়া কিংবা সন্তানসংক্রান্ত অন্য কোনো কাজে আল্লাহর অবাধ্য হওয়া—এসবই শয়তানের অংশীদারিত্বের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ‘তাদের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে অংশীদার হও’ কথাটিকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের অংশীদারিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। সন্তানের বিষয়ে যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা এবং শয়তানের আনুগত্য করা হয়, সেখানে অবাধ্য ব্যক্তি শয়তানকে অংশীদার করেছে।

ইবনে কাসীরও এই বিস্তৃত ব্যাখ্যা সংকলন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সহবাসের আগে আল্লাহর নাম এবং শয়তান থেকে সন্তানকে রক্ষার হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। ফলে দুটি স্তর স্পষ্ট: তাবারির সাধারণ ব্যাখ্যায় শয়তানের অংশীদারিত্ব ধর্মীয় অপরাধের একটি শ্রেণি; বাগাভী, সামআনী, কুরতুবী এবং শিয়া বর্ণনার নির্দিষ্ট অংশে তা যৌনসংসর্গ ও বীর্যপাতের কাহিনি। একটি পাঠের বিস্তৃত নৈতিক ব্যাখ্যা আছে বলে অন্য পাঠে প্রকাশ্যে বর্ণিত যৌনক্রিয়াটি মুছে যায় না। আবার যৌনক্রিয়ার বিবরণ পাওয়া গেছে বলে সেটিকে সমগ্র ইসলামি ব্যাখ্যাপরম্পরার একমাত্র অর্থ বলাও ভুল। [15]


আধুনিক ইসলামি ফতোয়া: যৌনমিলনে শয়তানের অংশগ্রহণের বিশ্বাস এখনও প্রচলিত

আধুনিক ইসলামি প্রশ্নোত্তর সাইটগুলোতেও একই বিশ্বাস আলোচিত হয়েছে। ২০০১ সালের ৮ আগস্ট IslamQA-তে প্রকাশিত ২১৯৪৬ নম্বর প্রশ্নে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়, সহবাসের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ না বললে শয়তান কি তাতে অংশ নেয়? উত্তরে কুরতুবী, মুজাহিদ, ইবনে কাসীর, তাবারি ও সাদির ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে সহবাসে শয়তানের অংশগ্রহণকে কোরআনের ১৭:৬৪ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু শত শত বছরের পুরোনো তাফসিরের পাতায় পড়ে নেই; আধুনিক ধর্মীয় প্রশ্নোত্তরেও তা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। [16]

ইসলামওয়েবের ২০০২ সালের ১৫৯৭৯ নম্বর ফতোয়ায় এক নারীর ঘুমের সময়ে যৌনক্রিয়ার অনুভূতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে সাইটটি শয়তানের সঙ্গে মানুষের যৌনসম্পর্ককে ধর্মীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং মুজাহিদের নামে প্রচলিত পুরুষাঙ্গে শয়তানের জড়িয়ে সহবাস করার ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছে। এই ফতোয়ায় বুখারি-মুসলিমের সহবাসপূর্ব দোয়ার হাদিসও উদ্ধৃত হয়েছে। তবে এমন ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করার মতো কোনো স্বতন্ত্র চিকিৎসাগত পরীক্ষা বা যাচাই ওই উত্তরে উপস্থাপিত হয়নি। [17]

২০১৪ সালের আরেকটি Islamweb ফতোয়ায় মানুষের সঙ্গে জিনের যৌনসংসর্গ ও সম্ভাব্য সন্তান জন্ম সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে বাগাভীর জাফর সাদিক-সংক্রান্ত বিবরণ এবং কুরতুবীর বক্তব্য আবার উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে ইবনে তাইমিয়ার নামে মানুষ ও জিনের মিলনে সন্তান জন্মের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ফতোয়া নিজেও বিষয়টিতে চূড়ান্ত প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছে। কিন্তু তবুও জিনের যৌন অংশগ্রহণকে সম্ভাব্য বাস্তব ঘটনা হিসেবে আলোচনা করেছে। ধর্মীয় সাহিত্যে বর্ণিত সম্ভাবনাকে বাস্তব ঘটনার প্রমাণ হিসেবে চালানোর এই পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষার কোনো ভূমিকা নেই। [18]

সহবাসপূর্ব দোয়া ইসলামের প্রচলিত ধর্মীয় শিষ্টাচারের অংশ হিসেবেও রয়ে গেছে। ইসলামওয়েবের ৫৮৬৯১ নম্বর ফতোয়ায় ইবনে কুদামা ও নববীর বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই দোয়া সুপারিশকৃত, বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ কেউ দোয়া ছাড়া সহবাস করলে তা শুধু ওই কারণে হারাম হয়ে যায় না। কিন্তু সহবাসে শয়তানের অংশগ্রহণ এবং সন্তানকে শয়তান থেকে রক্ষার ব্যাখ্যা ধর্মীয় সাহিত্যের অন্যত্র বহাল রয়েছে। বিধানটি বাধ্যতামূলক কি না, তা অতিপ্রাকৃত ঘটনা বাস্তব কি না—এই প্রশ্নের উত্তর নয়। [19]


শয়তানের বীর্যপাত ও সন্তান: প্রজননবিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত

জাফর সাদিকের নামে বর্ণিত কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ শয়তানের বীর্যপাত। বাগাভী ও সামআনীর আরবি পাঠে শয়তান পুরুষের মতো নারীর যোনিতে বীর্যপাত করে বলে উল্লেখ রয়েছে। শিয়া বর্ণনায় সন্তানের মধ্যে শয়তানের ‘অংশ’ থাকার কথাও এসেছে। মানুষের সন্তান জন্মের পর্যবেক্ষণভিত্তিক ব্যাখ্যা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মানবপ্রজননে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের মাধ্যমে নিষেক ঘটে; নতুন ভ্রূণের বংশগত উপাদান আসে জৈবিক পিতা-মাতার জিনগত অবদান থেকে। মানুষের প্রজননব্যবস্থায় শয়তান নামে কোনো সত্তার শুক্রাণু, বীর্য বা পৃথক বংশগত অবদান শনাক্ত হয়নি। কোনো ধর্মীয় বাক্য উচ্চারণ করা বা না-করা জিনগত পিতৃত্বের এই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে—এমন প্রমাণও নেই। [20]

এই কাহিনিতে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। কোন পর্যবেক্ষণ দিয়ে শয়তানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হবে? শয়তান যদি একই সঙ্গে যৌনমিলনে অংশ নেয় ও বীর্যপাত করে, তাহলে তার শরীর, যৌনাঙ্গ, বীর্যের কোষীয় গঠন, নিষেকে ভূমিকা অথবা সন্তানের মধ্যে সেই অবদানের কোনো নির্ভরযোগ্য শনাক্তকরণপদ্ধতি থাকার কথা। উদ্ধৃত ধর্মীয় বর্ণনাগুলোর কোনোটিতেই এমন পরিমাপযোগ্য তথ্য নেই। শিয়া বর্ণনায় আহলুল বাইতের প্রতি ভালোবাসা বা বিদ্বেষ দিয়ে শয়তানের অংশ নির্ধারণের কথা পাওয়া যায়; এটি জিনগত পরীক্ষার বিকল্প তো নয়ই, বরং ধর্মীয় পরিচয়কে মানুষের জন্মের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার একটি ভিত্তিহীন কুসংস্কার।

অতিপ্রাকৃত কাহিনির এই বৈজ্ঞানিক সমস্যাটি সনদের শ্রেণিবিন্যাস দিয়ে সমাধান হয় না। কোনো বর্ণনাকে ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে সহিহ, হাসান, গরিব বা দুর্বল বলা তার ভৌত সত্যতার পরীক্ষা নয়। বুখারি-মুসলিমের সহবাসপূর্ব দোয়ার বক্তব্য ইসলামি হাদিসসংকলনে প্রতিষ্ঠিত; বাগাভী ও সামআনীর জাফর সাদিক-সংক্রান্ত যৌন কাহিনির বর্ণনাগত মর্যাদা পৃথক প্রশ্ন। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃত জীববিজ্ঞান সম্পর্কে দাবির সত্যতা জানতে প্রয়োজন যাচাইযোগ্য তথ্য। সেই তথ্য অনুপস্থিত।


মুহাম্মদের পিতা-মাতা এবং শয়তানের অংশীদারিত্ব: ধর্মীয় নিয়মটির অস্বস্তিকর পরিণতি

এই বিশ্বাস থেকে মুহাম্মদের নিজের জন্ম সম্পর্কেও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ওঠে। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনা ইসলামের নবুয়ত-প্রচারের আগের মানুষ ছিলেন। তাঁদের ধর্মীয় অবস্থান ও পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে ইসলামি সাহিত্যে পৃথক বিতর্ক রয়েছে; সংশ্লিষ্ট আলোচনা এখানে রয়েছে। তাঁরা সহবাসের সময় পরবর্তী ইসলামি হাদিসে শেখানো নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করেছিলেন—এমন কোনো ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। আবার তাঁরা কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেননি, এমন প্রত্যক্ষ দলিলও নেই। ফলে তাঁদের যৌনমিলনে কী বলা হয়েছিল, তা নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দাবি করা যায় না।

তবু বাগাভী ও সামআনীর বর্ণনাকে যদি সমস্ত মানুষের ওপর প্রযোজ্য একটি বাস্তব প্রাকৃতিক নিয়ম ধরা হয়—অর্থাৎ পুরুষ আল্লাহর নাম না নিলেই শয়তান একই নারীর সঙ্গে সহবাস করে এবং বীর্যপাত করে—তাহলে নিয়মটি মুহাম্মদের জন্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার প্রশ্ন এড়ানো যায় না। আবদুল্লাহ যদি সহবাসের সময় আল্লাহর নাম না নিয়ে থাকেন, তাহলে এই বর্ণনার নিজের শর্ত অনুসারেই আমিনার সঙ্গে শয়তানের যৌনসম্পর্ক ও বীর্যপাত ঘটার কথা। এখানেই প্রশ্ন ওঠে: সেই বর্ণনা অনুসরণ করলে মুহাম্মদের জন্মের ক্ষেত্রেও কি শয়তানের অংশীদারিত্ব স্বীকার করতে হবে? জাফর সাদিকের নামে প্রচলিত কাহিনিকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে ধরে নিলে এই প্রশ্নের জন্য কোনো পৃথক কল্পিত ঘটনা বানানোর প্রয়োজন হয় না; কাহিনির সাধারণ নিয়ম থেকেই প্রশ্নটি উঠে আসে।

কিন্তু এখান থেকে মুহাম্মদ সত্যিই ‘শয়তানের সন্তান’ কিংবা ‘শয়তানের অর্ধেক পুত্র’ ছিলেন—এমন ঐতিহাসিক বা জৈবিক সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয় না। প্রথমত, আবদুল্লাহ ও আমিনার সেই মিলনের নির্দিষ্ট ধর্মীয় উচ্চারণ সম্পর্কে তথ্য নেই। দ্বিতীয়ত, মানুষের সন্তান উৎপাদনে শয়তানের বীর্য বা জিনগত অংশগ্রহণের বাস্তব অস্তিত্বই প্রমাণিত নয়। তৃতীয়ত, ‘অংশীদারিত্ব’ শব্দটি নিজে অর্ধেক জৈবিক পিতৃত্বের সমার্থক নয়। এই প্রশ্নের গুরুত্ব অন্য জায়গায়: **যে অতিপ্রাকৃত যৌন কাহিনিকে সত্য বলে প্রচার করা হয়, সেটিকে সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে নিলে তার অস্বস্তিকর পরিণতি থেকে বিশেষ কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে যুক্তির বাইরে রাখা যায় না।** নিয়মটির পক্ষেই প্রমাণ নেই—সমস্যার মূল সেখানেই।


উপসংহার

কোরআনের সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪-এ মানুষের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্বের কথা রয়েছে। এই বাক্যটির প্রাচীন ব্যাখ্যাগুলো এক রকম নয়। তাবারি ও ইবনে কাসীরের সংকলনে ধর্মীয় অবাধ্যতা, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা ও নামকরণের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অন্যদিকে বাগাভী, সামআনী ও রুহুল বায়ানের তাফসিরে জাফর সাদিকের নামে শয়তানের সহবাস ও বীর্যপাতের নির্দিষ্ট বিবরণ রয়েছে। কুরতুবীর আলোচনায় মুজাহিদের নামে একই ধরনের শারীরিক অংশগ্রহণ বর্ণিত হয়েছে। শিয়া হাদিসসংকলনে শয়তানের বীর্যপাত, সন্তান জন্মে অংশ এবং সন্তানের ধর্মীয় আনুগত্য দিয়ে সেই অংশ চিহ্নিত করার কাহিনিও পাওয়া যায়।

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে মুহাম্মদের নামে সহবাসের আগে নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করে সম্ভাব্য সন্তানকে শয়তান থেকে রক্ষার নির্দেশ সংরক্ষিত হয়েছে। আধুনিক IslamQA ও Islamweb-এও যৌনমিলনে শয়তানের অংশগ্রহণের পুরোনো বর্ণনাগুলো আলোচনা ও প্রচারিত হয়েছে। অর্থাৎ শয়তানের যৌন অংশীদারিত্ব কোনো সমালোচকের তৈরি গল্প নয়; ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় সংরক্ষিত একটি বিস্তৃত অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস। তবে সব উৎস একই মাত্রায় দাবি করেনি: কোরআনের সাধারণ ‘অংশীদারিত্ব’, বুখারি-মুসলিমের দোয়া এবং কিছু তাফসিরে বর্ণিত সরাসরি সহবাস ও বীর্যপাত—এই পাঠগত পার্থক্যগুলো বাস্তব।

প্রকৃত মানবপ্রজননে শিশুর জন্ম ঘটে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেকের মাধ্যমে। মানুষের যৌনমিলনে অদৃশ্য শয়তানের অংশগ্রহণ, তার বীর্যপাত কিংবা শিশুর মধ্যে তার বংশগত অংশ শনাক্ত করার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ধর্মীয় মন্ত্র উচ্চারণ করা বা না-করার ওপর সন্তানের জৈবিক পিতৃত্ব নির্ভর করে না। সহবাস, গর্ভধারণ এবং জন্মের বাস্তব প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই কাহিনিগুলোর কোনো পরীক্ষাযোগ্য সম্পর্ক নেই। প্রাচীন ইসলামি যৌন-সংক্রান্ত কুসংস্কার কীভাবে তাফসির, হাদিস ও আধুনিক ধর্মীয় ব্যাখ্যায় জ্ঞানের মর্যাদা পেয়েছে, এই বর্ণনাগুলো তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ।


তথ্যসূত্রঃ
  1. আল-কোরআন, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  2. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৮৮, সহবাসের আগে পাঠযোগ্য দোয়া ↩︎
  3. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৩৪ক, কিতাবুন নিকাহ, সহবাসের সময় পাঠযোগ্য দোয়া ↩︎
  4. তাফসীরে মাযহারী, বাংলা সংস্করণ, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২ ↩︎
  5. তাফসীরে বাগাভী, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  6. তাফসীরে বাগাভী, মাআলিমুত তানজিল, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  7. তাফসীরে সামআনী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫৯, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  8. ইসমাঈল হাক্কি বুরসাভি, তাফসীরে রুহুল বায়ান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৮১, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  9. তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  10. আল-কোরআন, সুরা আর-রহমান ৫৫:৫৬ ↩︎
  11. তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আর-রহমান ৫৫:৫৬, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসআলা ↩︎
  12. ওয়াসাইলুশ শিয়া, আবওয়াব মুকাদ্দিমাতিন নিকাহ ও আদাবিহি, বর্ণনা ২৫২৩৩–২৫২৩৭; আল-কাফি থেকে উদ্ধৃত ↩︎
  13. ওয়াসাইলুশ শিয়া, বর্ণনা ২৫২৩৫ ↩︎
  14. তাফসীরে তাবারি, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪, সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্বের ব্যাখ্যা ↩︎
  15. তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ ↩︎
  16. IslamQA, প্রশ্ন ২১৯৪৬, ‘মানুষের সন্তানদের মধ্যে শয়তানের অংশীদারিত্ব’, ৮ আগস্ট ২০০১ ↩︎
  17. Islamweb, ফতোয়া ১৫৯৭৯, ‘শয়তানেরা পুরুষদের সঙ্গে নারীদের মধ্যে অংশ নেয়’, ২৮ এপ্রিল ২০০২ ↩︎
  18. Islamweb, ফতোয়া ২৬২৩১৮, মানুষ ও জিনের যৌনসম্পর্ক এবং স্পর্শসংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর, ২২ জুলাই ২০১৪ ↩︎
  19. Islamweb, ফতোয়া ৫৮৬৯১, সহবাসের আগে দোয়ার বিধান, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ ↩︎
  20. NCBI Bookshelf, The Cell, ‘Meiosis and Fertilization’: শুক্রাণু, ডিম্বাণু এবং উভয় পিতা-মাতার জিনগত অবদান ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

2 thoughts on

  1. খানকির পোলা, তোর মায়ের ভোদায় শয়তান বীর্য দিয়ে ছিল্। বাইনচোদ, বিসমিল্লাহ যদি তোর মা বাপ বলতো তোর মতো এক কুলাঙ্গার জন্ম নিতো না।

Leave a comment

Your email will not be published.