জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

শিশুবিবাহ, বয়ঃসন্ধি ও প্রাপ্তবয়স্কতা: সংজ্ঞা, সম্মতি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর 18, 2026 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 30 মিনিট পড়া

ভূমিকা

শিশুবিবাহ কোনো নিরীহ সামাজিক প্রথা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত কিংবা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এমন একটি ক্ষমতাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি শিশুর শরীর, যৌনতা, প্রজননক্ষমতা, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়া হয়। বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা এই নিয়ন্ত্রণ, যৌন শোষণ ও জবরদস্তিকে বৈধতার আবরণ দিলেও শিশুটির বয়স, বিকাশগত অবস্থা কিংবা অধিকার পরিবর্তন করে না। একটি শিশুকে “স্ত্রী”, “বিবাহিতা”, “সাবালিকা” অথবা “নারী” নামে অভিহিত করলেই সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায় না; একইভাবে বিবাহের অনুমতিও তার পক্ষে সেই বিবাহ, যৌনসম্পর্ক, গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের পরিণতি বুঝে অবহিত, স্বাধীন এবং চাপমুক্ত সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা সৃষ্টি করে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১৮ বছরের কম বয়সী কারও আনুষ্ঠানিক বিবাহ অথবা অনানুষ্ঠানিক দাম্পত্য সম্পর্ক শিশুবিবাহের অন্তর্ভুক্ত [1]

শিশুবিবাহকে বৈধ ও স্বাভাবিক প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রতারণাটি হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকে প্রাপ্তবয়স্কতার সমার্থক হিসেবে হাজির করা। ঋতুস্রাব শুরু হওয়া, স্তনের বিকাশ কিংবা অন্য কোনো বাহ্যিক শারীরিক পরিবর্তন কেবল বয়ঃসন্ধির লক্ষণ; এগুলো পরিণত বিচারবুদ্ধি, মানসিক স্থিতি, পূর্ণ শারীরিক বিকাশ, ঝুঁকি মূল্যায়নের সামর্থ্য অথবা বিবাহ ও যৌনসম্পর্কে বৈধ সম্মতি দেওয়ার প্রমাণ নয়। বয়ঃসন্ধি একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার সূচনা, প্রাপ্তবয়স্কতা নয়। এই প্রবন্ধে বয়ঃসন্ধি, কৈশোর ও প্রাপ্তবয়স্কতার মধ্যকার বৈজ্ঞানিক পার্থক্য; মস্তিষ্ক, পেলভিস ও প্রজননতন্ত্রের বিকাশ; সচেতন সিদ্ধান্ত ও বৈধ সম্মতির শর্ত; এবং অল্প বয়সে যৌনসম্পর্ক, গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কৈশোরকে শৈশব ও প্রাপ্তবয়স্কতার মধ্যবর্তী স্বতন্ত্র বিকাশকাল হিসেবে চিহ্নিত করেছে [2]

আলোচনাটি শুধু শিশুবিবাহের সংজ্ঞা কিংবা স্বাস্থ্যগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, সেই আইনের “বিশেষ বিধান” নামের বিপজ্জনক ফাঁক, বিবাহিত শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা, বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি দায়মুক্তি, বয়স গোপন বা মিথ্যা প্রমাণের পক্ষে দেওয়া ফতোয়া, শিশুবিবাহকে “সুন্নতি” প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং এর বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হুমকিও এখানে পর্যালোচনা করা হবে। নূর নাহারের মতো শিশুর মৃত্যু দেখিয়ে দেয় যে শিশুবিবাহ কোনো বিমূর্ত নৈতিক বিতর্ক নয়; এর পরিণতি রক্তপাত, ধর্ষণ, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু এবং একটি শিশুর সমগ্র জীবন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বাস্তবে প্রকাশিত হয়। ধর্মীয় অনুমোদন, পুরুষতান্ত্রিক স্বার্থ, সামাজিক চাপ এবং আইনি দায়মুক্তি যখন একত্রে কাজ করে, তখন বিবাহের আড়ালে সংঘটিত শিশুর ওপর যৌন ও প্রজননমূলক সহিংসতাকেই সমাজ বৈধতা দিতে শুরু করে। এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন তাই কেবল কত বছর বয়সে বিবাহ বৈধ—তা নয়; বরং কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, পরিবার, ধর্মীয় নেতা কিংবা রাষ্ট্রের একটি শিশুর শরীর, সম্মতি ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার আদৌ আছে কি না।


শিশুবিবাহ বা বাল্যবিবাহ: সংজ্ঞায়ন ও আধুনিক আইনি মানদণ্ড

এই পরিচ্ছেদে আমরা জানবো বাল্যবিবাহের সংজ্ঞা এবং এর বহুমুখী সামাজিক, আইনি ও জৈবিক প্রভাব। এখানে বয়ঃসন্ধি ও প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার মধ্যকার বৈজ্ঞানিক পার্থক্য, বাংলাদেশের ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের কঠোর বিধিমালা, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিশুর সচেতন সিদ্ধান্তের (Informed decision) অক্ষমতার যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে। এছাড়া ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণের আলোকে বাল্যবিবাহের ফলে সৃষ্ট চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জৈবিক ভয়াবহতার বিষয়গুলোও এখানে বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মানব সভ্যতার অন্যতম ক্ষতিকর একটি পুরনো প্রথা হচ্ছে শিশু মেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সাথে বিবাহ দেওয়া। মূলত শিশুবিবাহ বা মেয়েশিশুর সাথে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিবাহ এবং যৌন সম্পর্ককেই এই প্রবন্ধে বাল্যবিবাহ বা শিশুবিবাহ বা শিশুদের সাথে বিবাহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। পারিবারিকভাবে দুইজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো সামাজিকভাবে বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ হওয়া জরুরি হলেও এই আলোচনার মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইউনিসেফের সংজ্ঞা অনুসারে, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে একজন প্রাপ্তবয়স্ক অথবা অন্য কোনো শিশুর আনুষ্ঠানিক বিবাহ বা অনানুষ্ঠানিক দাম্পত্য সম্পর্কই শিশুবিবাহ। অর্থাৎ শিশুবিবাহের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে মেয়েশিশুর বিবাহে সীমাবদ্ধ নয়; অন্তত একজন পক্ষের বয়স ১৮ বছরের কম হলেই সেটি শিশুবিবাহ। এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য হচ্ছে এই প্রথাটির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ—একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে একটি মেয়েশিশুর বিবাহ, যৌনসম্পর্ক ও গর্ভধারণ। কারণ ক্ষমতা, বয়স, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখানে মারাত্মক অসমতা বিদ্যমান [3]

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের প্রথম অনুচ্ছেদেও প্রযোজ্য আইনে তার আগেই প্রাপ্তবয়স্কতা অর্জিত না হলে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেক মানুষকে শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। শিশুকে “স্ত্রী”, “বিবাহিতা”, “সাবালিকা” অথবা “নারী” নামে ডাকা তার বয়স, বিকাশগত অবস্থা এবং অধিকার পরিবর্তন করে না। একটি বিবাহের অনুষ্ঠান কোনো শিশুর মস্তিষ্ক, পেলভিস, প্রজননতন্ত্র অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে মুহূর্তের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক করে তোলে না [4]


প্রাপ্তবয়স্ক কাকে বলে?

সর্বপ্রথম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় যে, বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ভিন্ন বিষয়। বয়ঃসন্ধি হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার একটি প্রাথমিক ধাপ, বা একটি সিঁড়ির প্রথম পদক্ষেপের মতো, যা আসলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া বোঝায় না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো মানেই ধরে নেওয়া হয় সাবালিকা বা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়া। যদিও আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুসারে কথাটি সত্য নয়। বয়ঃসন্ধি হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার লক্ষণের সূচনা। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হচ্ছেন এমন একজন মানুষ, যিনি তুলনামূলকভাবে পরিণত বয়স, শারীরিক বিকাশ, মানসিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য অর্জন করেছেন। একজন নারী বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছালেই সন্তান জন্ম দেওয়ার পূর্ণ শারীরিক পরিপক্বতা অর্জন করে না। বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছাবার পরে তার শরীর সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। এই বিকাশ সম্পন্ন হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগে। কিন্তু ইসলামী শরীয়তে মেয়েদের সাথে যৌনকাজের জন্য বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোও জরুরি কিছু নয়। এই বিষয়টি এই প্রবন্ধমালার পরবর্তী লেখাগুলোতে ইসলামি দলিল ও ফিকহের মাধ্যমে প্রমাণ করা হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যবর্তী সময়কে কৈশোর বা adolescence বলা হয়। এটি শৈশব ও প্রাপ্তবয়স্কতার মধ্যবর্তী একটি স্বতন্ত্র বিকাশগত পর্যায়। এই সময় মানুষের দ্রুত শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জ্ঞানীয়, আবেগগত ও মনোসামাজিক বিকাশ চলতে থাকে। এসব পরিবর্তন একজন কিশোর বা কিশোরী কীভাবে চিন্তা করে, ঝুঁকি বোঝে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে—তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ ঋতুস্রাব শুরু হওয়া বা বাহ্যিক যৌন বৈশিষ্ট্য দেখা দেওয়া প্রাপ্তবয়স্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার প্রমাণ নয় [5]

মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশও বয়ঃসন্ধির সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের National Institute of Mental Health-এর তথ্য অনুযায়ী, কৈশোরে মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি প্রায় সম্পন্ন হলেও তার কার্যপ্রণালির গুরুত্বপূর্ণ fine-tuning চলতে থাকে। পরিকল্পনা করা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা, সম্ভাব্য পরিণাম বিবেচনা করা এবং সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত prefrontal cortex মস্তিষ্কের সর্বশেষ পরিণত হওয়া অংশগুলোর একটি; মস্তিষ্কের এই বিকাশ মধ্য থেকে শেষ কুড়ির দশক পর্যন্ত চলতে পারে। তাই কোনো কিশোরীর ঋতুস্রাব শুরু হওয়াকে তার প্রাপ্তবয়স্ক বিচারবুদ্ধি, যৌনসম্মতি অথবা বিবাহের পরিণতি বোঝার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করা বৈজ্ঞানিক প্রতারণা [6]

বয়ঃসন্ধি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া; প্রাপ্তবয়স্কতা একটি বহুমাত্রিক অবস্থা। শারীরিক বৃদ্ধি, প্রজননক্ষমতা, পেলভিসের বিকাশ, মানসিক স্থিতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সামাজিক স্বাধীনতা, আইনগত সক্ষমতা এবং informed consent—সবগুলোকে বাদ দিয়ে শুধু ঋতুস্রাবকে প্রাপ্তবয়স্কতার মাপকাঠি বানানো যায় না। ঋতুস্রাবের প্রথম দিন কোনো শিশুকে হঠাৎ করে নারী বানিয়ে দেয় না। এটি কেবল তার প্রজননতন্ত্রের বিকাশমান প্রক্রিয়ার একটি লক্ষণ।


বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন—২০১৭

বাংলাদেশের আইনে বাল্যবিবাহ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের সংজ্ঞা এবং বাল্যবিবাহ দেওয়ার শাস্তির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। [7] [8] [9]

সংজ্ঞা
(১) “অপ্রাপ্ত বয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো নারী;
(২) “অভিভাবক” অর্থ Guardians and Wards Act, 1890 (Act No. VIII of 1890) এর অধীন নিয়োগপ্রাপ্ত বা ঘোষিত অভিভাবক এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির ভরণ-পোষণ বহনকারী ব্যক্তিও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;
(৩) “প্রাপ্ত বয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো নারী;
(৪) “বাল্যবিবাহ” অর্থ এইরূপ বিবাহ যাহার কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক;

বাল্যবিবাহ করিবার শাস্তি
৭। (১) প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।
(২) অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে তিনি অনধিক ১ (এক) মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তিযোগ্য হইবেন:
তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ৮ এর অধীন কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা দণ্ড প্রদান করা হইলে উক্তরূপ অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী বা পুরুষকে শাস্তি প্রদান করা যাইবে না।
(৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন বিচার ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে শিশু আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ২৪ নং আইন) এর বিধানাবলী প্রযোজ্য হইবে।

বাল্যবিবাহ সংশ্লিষ্ট পিতা-মাতাসহ অন্যান্য ব্যক্তির শাস্তি
৮। পিতা-মাতা, অভিভাবক অথবা অন্য কোন ব্যক্তি, আইনগতভাবে বা আইনবহির্ভূতভাবে কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির উপর কর্তৃত্ব সম্পন্ন হইয়া বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করিবার ক্ষেত্রে কোন কাজ করিলে অথবা করিবার অনুমতি বা নির্দেশ প্রদান করিলে অথবা স্বীয় অবহেলার কারণে বিবাহটি বন্ধ করিতে ব্যর্থ হইলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর ও অন্যূন ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।

কিন্তু একই আইনের ১৯ ধারায় একটি মারাত্মক “বিশেষ বিধান” রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোনো “বিশেষ প্রেক্ষাপটে”, অপ্রাপ্তবয়স্কের “সর্বোত্তম স্বার্থে”, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সম্মতিতে বিবাহ হলে সেটি এই আইনের অধীনে অপরাধ বলে গণ্য হবে না।

বিশেষ বিধান
১৯। এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোন বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।

এই ধারাটি আইনের ভেতরেই বাল্যবিবাহের একটি দরজা খোলা রেখেছে। যে পিতা-মাতা বা অভিভাবক শিশুটিকে বিয়ে দিতে চায়, তাদের সম্মতিকেই আবার ব্যতিক্রম অনুমোদনের শর্ত বানানো হয়েছে। অথচ শিশুবিবাহের অধিকাংশ ঘটনায় শিশুর ওপর পারিবারিক কর্তৃত্বই হচ্ছে জবরদস্তির প্রধান উৎস। শিশুর নিজের স্বাধীন, অবাধ ও informed consent এখানে শর্ত নয়। “সর্বোত্তম স্বার্থ” নামের অস্পষ্ট শব্দ দিয়ে একটি শিশুর শিক্ষা, শারীরিক নিরাপত্তা, যৌনস্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে তার অভিভাবকের সিদ্ধান্তের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। এটি শিশুর সুরক্ষা নয়; শিশুর অধিকারকে অভিভাবকের ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করা।


শিশুর সঙ্গে যৌন আচরণ, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন

ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে আমরা জানি যে—

সাধারণত একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। অনুমতি প্রদানে অক্ষম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের আওতাভুক্ত হতে পারে [10] [11] [12]। দুইটি পক্ষের মধ্যে সংঘাত বা যুদ্ধের সময়ও ধর্ষণ কিংবা যুদ্ধবন্দীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের মতো ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধরনের ধর্ষণ গণহত্যার একটি উপাদান হিসেবেও স্বীকৃত।

একটি শিশুর সম্মতি দানের বোধবুদ্ধি কিংবা জ্ঞান পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয় না বিধায় বিভিন্ন দেশে শিশুদের যৌনসম্মতি দেওয়ার একটি ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বয়সটিকে বলা হয় এইজ অব কনসেন্ট বা সম্মতিদানের বয়স [13]। নির্ধারিত বয়সের আগে একজন প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে শিশুটি মুখে “হ্যাঁ” বললেও সেটি আইনগত ও নৈতিকভাবে বৈধ informed consent হয়ে যায় না। কারণ শিশুটি তখনও যৌনসম্পর্কের প্রকৃতি, সম্ভাব্য শারীরিক ক্ষতি, গর্ভধারণ, মানসিক অভিঘাত, সামাজিক পরিণাম এবং ক্ষমতার অসমতা সম্পূর্ণভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় নেই।

দেশভেদে অপরাধটির আইনি নাম এক নয়। কোনো বিচারব্যবস্থায় এটি rape, কোনো বিচারব্যবস্থায় statutory rape, আবার কোথাও child sexual abuse বা sexual assault হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়। আইনি নামের এই পার্থক্যকে ব্যবহার করে কাজটির প্রকৃতি আড়াল করা যায় না। একজন প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে আইননির্ধারিত বয়সের নিচে থাকা শিশুর যৌনসম্পর্কে শিশুর কথিত সম্মতি বৈধ প্রতিরক্ষা নয়। বিবাহের কাগজও শিশুটিকে সম্মতি প্রদানে সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক মানুষে পরিণত করে না।

সম্মতি তখনই অর্থবহ, যখন সিদ্ধান্তটি স্বাধীনভাবে, সজ্ঞানে, নির্দিষ্ট কাজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জেনে এবং কোনো ভয়, প্রতারণা, চাপ, কর্তৃত্বের অপব্যবহার বা নির্ভরতার সুযোগ গ্রহণ ছাড়াই দেওয়া হয়। সম্মতি একটি স্থায়ী চুক্তিও নয়; যেকোনো সময় তা প্রত্যাহার করা যায়। একটি শিশু যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিটির ওপর অর্থনৈতিক, পারিবারিক, ধর্মীয় বা সামাজিকভাবে নির্ভরশীল, সেই ব্যক্তির যৌন দাবির সামনে শিশুটির নীরবতা, বাধ্যতা অথবা আপাত সহযোগিতাকে সম্মতি বলা যায় না। ক্ষমতার অসমতার ভেতরে আদায় করা আনুগত্য সম্মতি নয়।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে একটি শিশুকে বোকা বানানো সহজ। একটি শিশুর যেহেতু পরিপক্ব চেতনা নেই, সবদিক বিবেচনা করার সামর্থ্য নেই, যৌনকর্ম করা, যৌনসঙ্গী বাছাই করা বা তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সে তাই একজন প্রাপ্তবয়স্কের সমান সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে না। শিশুটির “হ্যাঁ” বলাকে বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা আসলে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিটির ক্ষমতা ও শিশুটির অক্ষমতার সুযোগ গ্রহণ।

An informed decision is a choice made based on a thorough understanding of all relevant facts, data, and possible outcomes. It involves gathering accurate information, considering different perspectives, analyzing potential risks and benefits, and then making a well-reasoned judgment. For example, if someone is deciding whether to buy a house, an informed decision would involve researching market prices, mortgage rates, neighborhood conditions, and future resale value before making a final choice.

ধরা যাক, একটি শিশু মেয়েকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিলো। কিংবা স্কুলের শিক্ষক পরীক্ষায় ভালো নম্বরের লোভ দেখিয়ে তাকে নিজের রুমে ডেকে নিলো। শিশু মেয়েটি ভয়ে কিংবা চকলেটের লোভে অথবা অন্য কোনো কারণে কাউকে এই বিষয়ে কিছুই বললো না। বরঞ্চ সে আপাতদৃষ্টিতে স্বেচ্ছায় কাজটি করলো বলে মনে হতে পারে। এরকম অবস্থাতেও ধরে নিতে হবে, এই মেয়েটির এই কাজে বৈধ সম্মতি ছিল না। কারণ মেয়েটি এখনো শিশু, তাই সে সম্মতি দেওয়ার মতো পরিণত বোধবুদ্ধিসম্পন্ন নয়। এরকম ঘটনায় সেই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে শিশু যৌন নির্যাতনকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রযোজ্য আইন অনুসারে শাস্তি দিতে হবে। কারণ শিশু মেয়েটি বিপদটি সম্পূর্ণভাবে না বুঝলেও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিটি বুঝতে সক্ষম। দায় শিশুর নয়; দায় সেই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির, যে শিশুর বয়স, নির্ভরতা ও অপরিপক্বতাকে নিজের যৌন স্বার্থে ব্যবহার করেছে।

বিয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। চকলেট, নম্বর, উপহার বা ভয় দেখিয়ে শিশুর ওপর যৌন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যেমন নির্যাতন, তেমনি পরিবার, ধর্ম, সামাজিক সম্মান, অর্থনৈতিক নির্ভরতা অথবা “স্বামীর অধিকার” ব্যবহার করে শিশুকে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করাও নির্যাতন। একটি আনুষ্ঠানিক বিবাহ অনুষ্ঠান সেই নির্যাতনকে নৈতিক সম্পর্কে পরিণত করে না। বরং বিবাহ নির্যাতনকারী প্রাপ্তবয়স্ককে শিশুটির ওপর নিয়মিত, সামাজিকভাবে অনুমোদিত এবং প্রায়শই আইনগতভাবে সুরক্ষিত যৌন কর্তৃত্ব প্রদান করে।


বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য ‘মৃত্যুদণ্ড’

ইউনিসেফ শিশুবিবাহকে মেয়েদের জন্য এক প্রকারের মৃত্যুদণ্ড বলে ঘোষণা দিয়েছে [14]। কেন এরকম ঘোষণা তারা দিলেন? এর কারণ বিশ্লেষণের জন্য কয়েকটি বিষয় ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার।

আমাদের অনেকের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ভুল ধারণা রয়েছে যে, গরম দেশে মেয়েরা দ্রুত বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে যায়! অনেক মোল্লাকেও ওয়াজ মাহফিলে বলতে দেখা যায়, গরম দেশে যেমন আম-কাঁঠাল তাড়াতাড়ি পাকে, মেয়েরাও গরম দেশে অল্প বয়সে “পেকে যায়”। কিন্তু বিষয়টি পুরোই ভুল ধারণা। প্রথমত, মেয়েরা আম-কাঁঠাল নয়। দ্বিতীয়ত, গ্রীষ্মপ্রধান দেশে মেয়েরা আগে এবং শীতপ্রধান দেশে পরে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়—এমন কোনো সাধারণ বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। বয়ঃসন্ধির সময় নির্ধারণে বংশগতি, পুষ্টি, শরীরের চর্বির পরিমাণ, সামগ্রিক স্বাস্থ্য, পরিবেশগত প্রভাব এবং বিভিন্ন শারীরিক ও হরমোনগত অবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো দেশের তাপমাত্রা দেখে সেখানকার একটি শিশুকে যৌনসম্পর্ক বা সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নয়; এটি শিশুর শরীর সম্পর্কে অজ্ঞতা।

প্রথমেই আমাদের যা জানা প্রয়োজন, তা হচ্ছে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি কীভাবে হয়। বয়ঃসন্ধি বা পিউবার্টি কী তা আমরা সকলেই কমবেশি জানি এবং বুঝি। আমরা অনেকে এটিও জানি যে, পিউবার্টির সময়ে নানাবিধ হরমোনগত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে একজন মানুষ যায় এবং এই সব পরিবর্তনের কারণে তার শরীর ও মনে নানা ধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। মনে রাখা দরকার, পিউবার্টি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে কয়েকটি ধাপ রয়েছে; একটি ধাপ শুরু হওয়ার অর্থ সবগুলো ধাপ সম্পন্ন হয়ে যাওয়া নয়।

বয়ঃসন্ধির প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের hypothalamus থেকে gonadotropin-releasing hormone বা GnRH নিঃসরণ শুরু হয়। এর প্রভাবে pituitary gland থেকে luteinizing hormone বা LH এবং follicle-stimulating hormone বা FSH নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো ডিম্বাশয়কে সক্রিয় করে এবং ডিম্বাশয় estrogen উৎপাদন করতে শুরু করে। এর ফলে স্তনের বিকাশ, শরীরের গঠন পরিবর্তন, হাড়ের বৃদ্ধি, প্রজননতন্ত্রের বিকাশ এবং পরবর্তীকালে ঋতুস্রাবসহ বয়ঃসন্ধির বিভিন্ন লক্ষণ ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়।

এই সময়ে শুরু হয় শরীরের প্রজননগত বিকাশের প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে আরও কিছু হরমোন নিঃসরণ হতে থাকে, যা মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটায়। অনেক সময় স্বাভাবিক বয়সের আগেই এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে আট বছরের আগে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা দিলে সাধারণভাবে তাকে precocious puberty বলা হয়। এমনটি ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মস্তিষ্ক বা central nervous system-এর কিছু সমস্যা, ডিম্বাশয় বা adrenal gland-এর অস্বাভাবিকতা, কিছু বিরল genetic condition, নির্দিষ্ট tumor, radiation exposure অথবা বাইরের estrogen-জাতীয় হরমোনের সংস্পর্শ precocious puberty-এর কারণ হতে পারে। অনেক মেয়ের ক্ষেত্রে আবার নির্দিষ্ট কোনো কারণও শনাক্ত করা যায় না [15] [16]

শিশু যৌন নির্যাতন অথবা শিশুবিবাহকে precocious puberty-এর সরাসরি ও নিশ্চিত জৈবিক কারণ হিসেবে দেখানো সঠিক নয়। গবেষণায় কিছু ধরনের শৈশবকালীন নির্যাতন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং তুলনামূলক আগাম pubertal timing-এর মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু সম্পর্ক পাওয়া এবং সরাসরি causation প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। “মস্তিষ্ক যৌন নির্যাতনকে যৌনতা মনে করে শরীরকে দ্রুত যৌনতার জন্য প্রস্তুত করে”—এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নেই। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও abuse, neglect, socioeconomic condition, body mass index এবং puberty-এর সম্পর্ক জটিল বলে পাওয়া গেছে; সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ভেরিয়েবল নিয়ন্ত্রণের পরে অনেক association আর তাৎপর্যপূর্ণ থাকে না [17]

এই সংশোধন শিশুবিবাহের বিরুদ্ধে যুক্তিকে দুর্বল করে না। কারণ শিশুবিবাহের ক্ষতি প্রমাণ করার জন্য এমন অপ্রমাণিত হরমোনগত ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজনই নেই। শিশুবিবাহ শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌন কর্তৃত্বের অধীন করে, অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ায়, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায় এবং নিজের স্বাস্থ্য ও প্রজনন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয়—এসব ক্ষতি সরাসরি প্রমাণিত।

একটি মেয়ে যখন বড় হতে থাকে, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের হাড় ও skeletal structure বিকশিত হতে থাকে। ছোটবেলায় থাকা অনেক পৃথক অস্থি ও growth plate পরবর্তী বিকাশে যুক্ত ও পরিণত হয়। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে সাধারণত ২০৬টি হাড় গণনা করা হয়। কিন্তু ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার দিনেই এই অস্থিগুলো হঠাৎ করে সম্পূর্ণ পরিণত হয়ে যায় না। বয়ঃসন্ধির পুরো সময় ধরে হাড়ের বৃদ্ধি, ঘনত্ব, আকৃতি ও সংযুক্তির পরিবর্তন চলতে থাকে।

একটি মেয়ের pelvis এবং birth canal-ও জন্মের সময় থেকেই উপস্থিত থাকে, কিন্তু কৈশোরে সেগুলোর আকার ও গঠনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। Pelvic floor-ও আগে থেকেই বিদ্যমান; এটি বয়ঃসন্ধিতে প্রথমবার তৈরি হয় না। কিন্তু শরীরের অন্যান্য অংশের মতো pelvic structure এবং সংশ্লিষ্ট পেশি, connective tissue ও অস্থির পরিণতিও সময়ের সঙ্গে ঘটে। ঋতুস্রাব শুরু হওয়া pelvic maturity সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা নয়। একটি শিশুর ডিম্বস্ফোটন বা গর্ভধারণের জৈবিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়া এবং তার শরীরের নিরাপদে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

বিষয়টি এমন নয় যে, একদিন একটি মেয়ের পিরিয়ড হওয়া শুরু হলো, আর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি যৌনসম্পর্ক এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য উপযুক্ত হয়ে গেল। পুরো বিষয়টি ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া এবং এর একাধিক ধাপ রয়েছে। একটি ধাপ পরের ধাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও প্রথম ঋতুস্রাবকে পূর্ণ শারীরিক, মানসিক অথবা প্রজননগত পরিপক্বতা বলা যায় না। মাসিক শুরু হওয়া কেবল প্রজননতন্ত্রের একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা; এটি নিরাপদ যৌনতা, নিরাপদ গর্ভধারণ বা নিরাপদ সন্তান জন্মদানের নিশ্চয়তা নয়।

বয়ঃসন্ধির সময় estrogen প্রথমে growth spurt-কে ত্বরান্বিত করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে growth plate-এর পরিণতি ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিয়ে অথবা যৌনসম্পর্ক নিজে থেকে মস্তিষ্ককে “মেয়েটি যথেষ্ট বড় হয়েছে” এমন নির্দেশ দিয়ে growth hormone বন্ধ করে দেয়—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য নয়। শিশুবিবাহের ক্ষতি বোঝাতে এই ভুল ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আসল সমস্যা হচ্ছে, বিকাশমান শরীরের ওপর যৌন অনুপ্রবেশ, গর্ভধারণ, প্রসব, অপুষ্টি, সহিংসতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ চাপিয়ে দেওয়া।

ভারতের অনেক পতিতালয়ে অল্পবয়সী মেয়েদের নানা ওষুধ ও হরমোনজাতীয় পদার্থ খাইয়ে অথবা ইনজেকশন দিয়ে শরীরে দ্রুত বাহ্যিক যৌন বৈশিষ্ট্য আনার চেষ্টা করা হয়—এমন প্রতিবেদন বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। নির্দিষ্ট যাচাইযোগ্য গবেষণা ছাড়া প্রতিটি ঘটনার ধরন বা ব্যবহৃত ওষুধ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। তবে exogenous estrogen বা অন্য হরমোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শরীরের স্বাভাবিক hormonal axis, bone maturation এবং growth plate-এর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুকে দেখতে প্রাপ্তবয়স্ক বানানোর চেষ্টা তার শরীরকে প্রাপ্তবয়স্ক করে না; বরং শরীরের স্বাভাবিক বিকাশকে নষ্ট করে।

আরও বড় সমস্যা অপেক্ষা করে এদের জন্য গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের সময়। একটি কিশোরীর শরীর তখনও বিকাশমান থাকে। এই অবস্থায় গর্ভধারণ হলে তার নিজের শরীরের পুষ্টির চাহিদা এবং গর্ভের শিশুর পুষ্টির চাহিদার মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। অল্পবয়সী গর্ভবতীদের চিকিৎসাসেবা, পুষ্টি, গর্ভনিরোধক ব্যবহার এবং সন্তান নেওয়ার সময় নির্ধারণের ওপর নিয়ন্ত্রণও সাধারণত কম থাকে। বাল্যবিবাহে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির ক্ষমতা এই অসহায়তা আরও বাড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরী মায়েরা ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের তুলনায় eclampsia, puerperal endometritis এবং systemic infection-এর বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কিশোরী মায়েদের সন্তানদের low birth weight, preterm birth এবং severe neonatal condition-এর ঝুঁকিও বেশি। WHO আরও বলছে, শিশুবিবাহ ও শিশু যৌন নির্যাতন মেয়েদের অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ায়। খুব অল্পবয়সে বিবাহিত মেয়েদের সন্তান নেওয়া বিলম্বিত করা অথবা গর্ভনিরোধক ব্যবহারের সিদ্ধান্তে সাধারণত সীমিত স্বাধীনতা থাকে [18]

WHO-এর হিসাবে ২০১৯ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ গর্ভধারণ ঘটেছিল। এর প্রায় অর্ধেক ছিল অনিচ্ছাকৃত এবং এসব গর্ভধারণ থেকে আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ সন্তান জন্ম নিয়েছিল। এই সংখ্যার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেই; শিশুবিবাহ, শিক্ষা থেকে বঞ্চনা, দারিদ্র্য, গর্ভনিরোধকে বাধা, পারিবারিক চাপ এবং স্বামীর সিদ্ধান্তের অধীনতা কাজ করে। একটি শিশুকে বিয়ে দিয়ে তারপর তার গর্ভধারণকে “স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবন” বলা প্রকৃতপক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক যৌন ও প্রজনন নিপীড়ন।

অল্পবয়সে গর্ভধারণ ও obstructed labour-এর কারণে obstetric fistula-ও সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে বাধাগ্রস্ত প্রসবে শিশুর মাথা মায়ের পেলভিসের ভেতরের নরম টিস্যুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে টিস্যুতে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু নষ্ট হয়ে মূত্রাশয় ও যোনিপথ অথবা মলাশয় ও যোনিপথের মধ্যে অস্বাভাবিক ছিদ্র তৈরি করতে পারে। এর ফলে মেয়েটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে প্রস্রাব বা মল নিঃসরণ, সংক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, সামাজিক বর্জন এবং বৈবাহিক পরিত্যাগের শিকার হতে পারে। অল্পবয়সী এবং শারীরিকভাবে অপরিণত মেয়েরা এই বিপদের বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে।

এই ধরনের মেয়েদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শিশুবিবাহের ফলে প্রত্যেক মেয়ের মেরুদণ্ড, হাঁটু বা জয়েন্ট অবশ্যই নষ্ট হবে—এমন সার্বজনীন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। প্রতিষ্ঠিত ঝুঁকিগুলোই যথেষ্ট ভয়াবহ: maternal morbidity, pregnancy complications, অপুষ্টি, anemia, obstetric fistula, যৌনবাহিত সংক্রমণ, intimate partner violence, depression, anxiety, শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়া এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা।

এদের সন্তানদেরও low birth weight, premature birth, neonatal complications এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি হতে পারে। এর কারণ শিশুটি “হাবাগোবা” হয়ে জন্মায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক বক্তব্য নয়। সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে: অল্পবয়সী মায়ের অপুষ্টি, অসম্পূর্ণ শারীরিক বিকাশ, গর্ভকালীন জটিলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং অকাল প্রসব নবজাতকের স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করে। বাল্যবিবাহের স্বাস্থ্যগত ক্ষতিকে ভুল ও অবমাননাকর ভাষায় নয়, সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে হবে [19]

ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, ১৮ বছরের আগে বিবাহিত মেয়েরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ার অধিক ঝুঁকিতে থাকে এবং তাদের বিদ্যালয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। তাদের অবিবাহিত সমবয়সীদের তুলনায় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ফলাফল খারাপ হয় এবং সেই ক্ষতির প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে। শিশুবিবাহ মেয়েদের পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে [3]

তাই বাল্যবিবাহ এবং শিশু বয়সেই নিয়মিত যৌন সম্পর্ক একটি শিশু মেয়ের পরবর্তী জীবনকে শুধু ধ্বংসই করে না, একটি পুরো প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একটি ৫–৬ বছরের মেয়ের জীবন হবে সুন্দর, রঙিন। সে হাসবে, খেলবে, পড়ালেখা করবে। সে মাঠে-ময়দানে দৌড়াবে, সাঁতার কাটবে, লাফাবে-ঝাঁপাবে। ধীরে ধীরে তার শরীর গঠিত হতে থাকবে। সে পুষ্টিকর খাবার খাবে, তার শরীরের হাড়গুলো ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে তার শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দেবে এবং এই পরিবর্তনগুলো ঘটবে ধাপে ধাপে। একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের এই সময়টিকে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌন চাহিদা পূরণ, গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদানের দায়ে রূপান্তর করা সরাসরি নিষ্ঠুরতা।

বয়ঃসন্ধির সময় একটি মেয়ের উচ্চতা দ্রুত বাড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে growth plate ধীরে ধীরে পরিণত ও বন্ধ হওয়ার সঙ্গে উচ্চতা বৃদ্ধির হার কমে আসে। এই সময়ে শরীর নতুন হরমোনগত অবস্থার সঙ্গে খাপ খায়, হাড়ের ঘনত্ব বাড়ে, মস্তিষ্কের বিকাশ চলতে থাকে এবং মানসিক ও সামাজিক সক্ষমতা গড়ে ওঠে। এই বিকাশ সবার ক্ষেত্রে একই বয়সে শেষ হয় না। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণ দেখে শিশুটিকে যৌনসম্পর্ক অথবা গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত ঘোষণা করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

একজন কিশোরী জৈবিকভাবে গর্ভধারণ করতে সক্ষম হলেই সেই গর্ভধারণ তার জন্য নিরাপদ হয়ে যায় না। গর্ভধারণের ক্ষমতা এবং নিরাপদ মাতৃত্ব এক বিষয় নয়। ঠিক যেমন একটি শিশু ভারী বোঝা তুলতে পারলেই প্রতিদিন তাকে সেই বোঝা বহন করানো বৈধ হয়ে যায় না, তেমনি একটি শিশু গর্ভধারণ করতে সক্ষম হলেই তার ওপর গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের ঝুঁকি চাপিয়ে দেওয়া ন্যায্য হয় না [20]

বাল্যবিবাহ বন্ধ হোক

শিশুবিবাহের কিছু বৈশ্বিক উদাহরণ

শিশুবিবাহের পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য বাস্তব শিশু, যাদের শৈশব, শিক্ষা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নিচের ভিডিওগুলোতে শিশুবিবাহের শিকার মেয়েদের বাস্তব অবস্থা, অল্পবয়সে গর্ভধারণ, দাম্পত্য সহিংসতা এবং সামাজিক বন্দিত্বের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।





বাংলাদেশে লুকিয়ে শিশুবিবাহের ঘটনাবলি

বাংলাদেশের রক্ষণশীল ধর্মীয় সমাজে শিশুমেয়েদের বিবাহ দেওয়ার ঘটনা এখনো গোপনে প্রচলিত রয়েছে। সামাজিক চাপ, দারিদ্র্য, অতিরিক্ত ধর্মপরায়ণতা এবং কুসংস্কারের কারণে অনেক পরিবার অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়া শুধু তাদের শৈশব কেড়ে নেয় না, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি বিয়ের প্রথম রাত থেকেই শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য হওয়ার ফলে অনেক মেয়ে ভয়াবহ শারীরিক জটিলতার শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যা চিকিৎসার অভাবে আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

শিশুবিবাহ শুধু মেয়েটির জীবনের একটি মুহূর্তকে নয়, বরং তার সমগ্র ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। একবার বিবাহিত হলে অধিকাংশ মেয়েকেই পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়, যা তাদের আত্মনির্ভরশীলতার পথ রুদ্ধ করে দেয়। স্বামীর ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে তারা নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ হারায়, যা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত হানে। এর ফলে তারা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারে না এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও এটি একটি অভিশাপ হিসেবে রয়ে যায়।

ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণেও দেখা যায়, ১৮ বছরের আগে বিবাহিত মেয়েরা বিদ্যালয়ে টিকে থাকার কম সুযোগ পায়, পারিবারিক সহিংসতার অধিক ঝুঁকিতে থাকে এবং অবিবাহিত সমবয়সীদের তুলনায় তাদের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল খারাপ হয়। শিশুবিবাহ মেয়েদের পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে [1]

সমাজের এ ধরনের বৈষম্যমূলক প্রথা বন্ধ করতে হলে শিক্ষার প্রসার, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে প্রতিটি শিশুর শৈশব সুরক্ষিত থাকে এবং তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা গড়ে তুলতে পারে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; শিশুবিবাহকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য অথবা পারিবারিক সম্মান রক্ষার উপায় হিসেবে প্রচার করার সামাজিক কাঠামোটিকেও ভাঙতে হবে।


মোল্লাতান্ত্রিক ধর্মান্ধ সমাজের চাপ

একাধিক ইসলামি ফতোয়া গ্রন্থে শিশু মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার জন্য বয়স সম্পর্কে মিথ্যা বলা এবং সরকারি কাগজপত্রে প্রতারণা করাকেও বৈধ বলে প্রচার করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের আইন লঙ্ঘন করে ১৪ বছরের একটি মেয়েকে কাগজে ১৮ বছর দেখিয়ে বিয়ে দেওয়াকে “শরিয়তের বিধান রক্ষার উপায়” হিসেবে অনুমোদন করা হয়েছে। এটি নিছক ধর্মীয় মতামত নয়; এটি একটি শিশুর সুরক্ষার জন্য প্রণীত আইন ভাঙার সরাসরি নির্দেশনা [21]

আইনি ঝামেলা এড়ানোর জন্য বয়স বাড়িয়ে লেখা
প্রশ্ন : বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের কমে কোনো মেয়েকে বিবাহ দেওয়া নিষিদ্ধ। অথচ শরয়ী আইন অনুযায়ী বিবাহে আবদ্ধ করানো জায়েয আছে। শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহ দিলে অনেক সময় সরকারিভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে সরকারি খাতায় ১৮ বছর লিখিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা জায়েয হবে কি না?
উত্তর : ইসলামী শরীয়ত মেয়ের অভিভাবকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে যে মেয়ে বিবাহের উপযুক্ত হওয়ামাত্রই যেন তাড়াতাড়ি বিবাহ দেওয়া হয়। এর বিপরীতে কেউ যদি চাপ সৃষ্টি করে তাহলে জুলুম বা অন্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। শরীয়তের বিধান মানতে গিয়ে জুলুম বা অন্যায় থেকে বাঁচার যেকোনো পদ্ধতি অবলম্বন করার অবকাশ আছে। (১৬/৪৭৯/৬৬১৮)

ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাতে শিশুবিবাহের জন্য সরকারি নথিতে বয়স বাড়িয়ে লেখার অনুমতি
শিশুবিবাহের জন্য সরকারি নথিতে বয়স বাড়িয়ে লেখার অনুমতি

এই ফতোয়ার বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। বাংলাদেশের আইনকে এখানে ন্যায়সংগত শিশু সুরক্ষা আইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি; একে শরিয়তের পথে “জুলুম” ও “সরকারি হয়রানি” হিসেবে দেখানো হয়েছে। আইন ভাঙা, শিশুর প্রকৃত বয়স গোপন করা এবং সরকারি নথিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়াকে বৈধ উপায় হিসেবে অনুমোদন করা হয়েছে। এই ধর্মীয় অনুমোদন শুধু নৈতিকভাবে অসৎ নয়; এটি শিশুবিবাহ শনাক্ত ও প্রতিরোধের পুরো আইনগত ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে।


শিশুবিবাহের মারাত্মক ভয়াবহতা

বাংলাদেশে শিশুবিবাহ এবং বিবাহের আড়ালে শিশু ধর্ষণের বাস্তব পরিণতি বোঝার জন্য নূরনাহারের ঘটনাটি পড়া জরুরি [22] [23]

বৈবাহিক ধর্ষণে কিশোরীর মৃত্যু: এরপরও কেন এটি বৈধ?
ছবি: নূরনাহার ও তার স্বামী রাজিব খান।

গত ২৫ অক্টোবর টাঙ্গাইল থেকে আসা ১৪ বছরের এক কিশোরী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য মতে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল যোনিপথে অত্যধিক রক্তক্ষরণ।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর নাম নূরনাহার। টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কাউলজানি ইউনিয়নের কালিয়া গ্রামের মেয়ে নূরনাহার কালিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। নূরনাহারের পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন লেগেই ছিল। তার বাবা-মা দুজনেই দিনমজুর হিসেবে সারাদিন কাজ করেন। দিনমজুরির কাজে দিনের বড় একটা সময় তারা বাসার বাইরে থাকতেন। বাড়িতে থাকার সময়টুকু কাটত কলহে। এমন পরিবেশ থেকে নূরনাহারকে দূরে রাখার জন্য মাত্র চার বছর বয়সে তার নানা লাল খান তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। নূরনাহার তার নানার কাছেই মানুষ হচ্ছিল। লাল খানই নূরনাহারকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। দিনমজুর হিসেবে পাওয়া সামান্য উপার্জন থেকে নাতনির লেখাপড়া ও অন্যান্য খরচ চালাতেন। মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নূরনাহারের সুনাম ছিল। বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সে এ বছর অষ্টম শ্রেণিতে পড়া শুরু করেছিল।

কিন্তু বিধি বাম। করোনার আঘাতে লাল খানের ছোট্ট সংসার পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় গত ২০ সেপ্টেম্বর পার্শ্ববর্তী গ্রামের ৩৪/৩৫ বছরের রাজিব খানের সঙ্গে নূরনাহারের বাল্যবিয়ে হয়। অভিবাসী শ্রমিক রাজিব আরব আমিরাতে কাজ করেন। ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। রাজিব ভালো উপার্জন করেন, এমন কথার ভিত্তিতে নূরনাহারের পরিবার রাজিবের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিতে আগ্রহী হয়। লাল খান ৩০ হাজার টাকা খরচ করে নাতনির বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’র বিধান অনুযায়ী, নূরনাহারের বয়স বিবাহযোগ্য না হওয়ায় উভয় পরিবার বিয়ে নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের পর নূরনাহার বাসাইল উপজেলার ফুলকি পশ্চিমপাড়া গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়।

একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাল খান বলেন, ‘আমার নাতনি আমাকে খবর দেয় যে, বিয়ের প্রথম রাত থেকেই তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।’ রাজিব তার নববধূর উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা তো করেননি, বরং মেয়েটির গভীর ক্ষতকে উপেক্ষা করে তিনি সহবাস চালিয়ে যান। রক্তপাত না থামায় নূরনাহারের শাশুড়ি তাকে স্থানীয় কবিরাজি দাওয়াই এনে খাওয়ান। পরবর্তীতে নূরনাহারের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ২২ অক্টোবর টাঙ্গাইলের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে তাকে নেওয়া হয় এবং সুকৌশলে পুত্রবধূর যাবতীয় দায়দায়িত্ব বাপের বাড়ির লোকের ওপর বুঝিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা চলে যান।

অবস্থার অবনতিতে মেয়েটিকে তারপর মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসার খরচ মেটাতে নূরনাহারের পরিবার হিমশিম খাচ্ছিল। তখন পাড়া-প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে ৬০ হাজার টাকা জোগাড় করে পরিবারের হাতে তুলে দেয়। শেষ পর্যন্ত নূরনাহারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে ২৫ অক্টোবর নূরনাহার মারা যায়। পরের দিন ময়নাতদন্ত শেষে নানাবাড়ির নিকটবর্তী স্থানীয় গোরস্থানে তার দাফনকার্য সম্পাদিত হয়। লাল খান তার নাতনির মৃত্যুর জন্য রাজিবকে দায়ী করেছেন। রাজিব তার সদ্যমৃত স্ত্রীর জানাজায় পর্যন্ত যাননি।

নূরনাহারের শাশুড়ি বিলকিস বেগমের বক্তব্য, ‘নূরনাহারকে জিনে ধরেছিল। তাই তার যোনিপথে এত রক্তক্ষরণ হয়েছে।’ বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফিরোজুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মেয়েদের প্রথম মিলনের ক্ষেত্রে ভয় ও আতঙ্ক বোধ করা খুবই স্বাভাবিক। তা ছাড়া, অপরিণত বয়সে বিয়ে হলে যোনিপথে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য বিলম্ব না করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো জরুরি।

গ্রাম্য সালিশে নূরনাহারের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা টাকা দিয়ে বিষয়টি ‘মিটমাট’ করে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে জানা গেছে, নূরনাহারের পরিবার বাসাইল থানায় শ্বশুরবাড়ির নামে অভিযোগ দাখিল করেছেন। প্রসঙ্গত, বাল্যবিবাহ সংঘটনের মাধ্যমে নূরনাহারের পরিবারের লোকেরাও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’র ৮ ধারা অনুযায়ী অপরাধী। যার জন্য তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত করা যায়।

নূরনাহারের পরিবারের একটিবারও মনে হয়নি যে, নূরনাহারের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থী একদিন তাদের দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি এনে দেবে। তাদের কাছে মোটা টাকা কামানো প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়াটাই বড় ছিল। অথচ নূরনাহারের নানা নিজ উদ্যোগে নাতনিকে স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। আজও এ সমাজে মেয়ের বিয়ের কাছে তাদের লেখাপড়া, স্বনির্ভরতা এবং দক্ষতা অর্জন হেরে যাচ্ছে।

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি যে, নূরনাহার মারা গেছে তার বরের জবরদস্তিমূলক উপর্যুপরি সঙ্গমের কারণে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের আইনে ১৩ বছরের বেশি বয়সের স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস ধর্ষণ বলে বিবেচিত নয়। রাজিবের এই পাশবিকতা আমাদের দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৫ ধারায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। উপরন্তু, দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী বৈবাহিক ধর্ষণের শাস্তি কেবল তখনই দেওয়া যেতে পারে, যখন স্ত্রীর বয়স ১২ বছরের কম হবে এবং সেই শাস্তির পরিমাণ মাত্র অনূর্ধ্ব দুই বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা।

এই আইনগুলো আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা। ঔপনিবেশিক শাসনকালে যখন ভিক্টোরীয় নৈতিকতা সমাজের সর্বস্তরে বিরাজমান, তখন এই আইনের সৃষ্টি। ভিক্টোরীয় নৈতিকতায় স্ত্রীকে তার ‘স্বামী’ অর্থাৎ মালিকের সহধর্মিণী নয়, বরং সম্পত্তি ভাবা হতো। সেই সমাজে নিজের স্ত্রীকে যথেচ্ছ ভোগ করার জন্য পুরুষকে দায়বদ্ধ করা ছিল অকল্পনীয়। এমন একটি রক্ষণশীল ধর্ষণের সংজ্ঞা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির মতো আজও আগলে রেখেছি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা নিরোধের জন্য এই পর্যন্ত তিনবার বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে। প্রথমে ১৯৮৩ সালে, এরপর ১৯৯৫ এবং সর্বশেষ ২০০০ সালে। কিন্তু প্রতিবারই আমাদের আইনপ্রণেতারা সজ্ঞানে দণ্ডবিধি থেকে বৈবাহিক ধর্ষণের দায়মুক্তি দেওয়া ওই ব্যতিক্রম ধারা বাতিলের পরিবর্তে বহাল রেখেছেন। এই আইনের হোতা যেই ব্রিটিশ, তারা ১৯৯১ সালেই বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি পাকিস্তান ২০০৬ সালে বৈবাহিক ধর্ষণের ওই ব্যতিক্রম ধারা বাতিল করেছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত জাতীয় জরিপের ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিবাহিত নারীদের ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ তাদের বৈবাহিক জীবনে স্বামীর কাছে জবরদস্তিমূলক সহবাসের পাশাপাশি অন্যান্য যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাছে সাক্ষাৎকার দেওয়া ১৯ হাজার ৯৮৭ জন নারীর মধ্যে পাঁচ হাজার ৩৯০ জন নারী বলেছেন, তাদের স্বামী তাদের ধর্ষণ করেছেন। ধর্ষণের ব্যতিক্রম ধারা বহাল রেখে আমরা এই নারীদের কী বার্তা দিচ্ছি?

আমরা বলছি যে, হাজারো নারী ও কিশোরী যারা নিঃসন্দেহে বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ও হচ্ছেন, তাদের বিচার চাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আমাদের আইন আমাদের শেখাচ্ছে যে নারী আসলে তার স্বামীর সম্পত্তি। আমরা বলছি যে, কাবিননামায় সই করে বা কবুল বলে বা মন্ত্রপাঠে সাত পাকে বাঁধা পড়ে একজন নারী অনন্তকালের জন্য যৌন সম্পর্কের সম্মতি দিয়ে দিচ্ছেন। এ সম্মতি কখনো ফেরত নেওয়া যাবে না। নারীর শরীর খারাপ থাকুক, ইচ্ছা না থাকুক, পরিবেশ না থাকুক, বর ‘চাহিবামাত্র’ নারীকে সহবাস করতেই হবে। তাকে রাজি হতে হবে না। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিয়ে আইন চিন্তিত নয়। আমরা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি যে, নূরনাহারের মতো বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া কিশোরীরা যখন জবরদস্তিমূলক যৌনসঙ্গমে মারা যাচ্ছে, সেই জবরদস্তিমূলক সহবাস ধর্ষণ নয়, কেবল এ কারণে যে ওই পুরুষটি মেয়েটির ‘স্বামী’। জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে। তারপর জোর করে সহবাস করা হবে। কিন্তু নারী ‘না’ বলতে পারবে না।

রাজিব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের এখন যেই এক অপরাধের জন্য দায়ী করা যাবে, তা হলো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ৭ নম্বর ধারার অধীনে বাল্যবিবাহ করার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা। তবে শাস্তি শুধু জরিমানাও হতে পারে। কাজেই, কোনো পুরুষ যদি মনে করে যে, বাল্যবিবাহের মাধ্যমে তিনি বৈধ উপায়ে প্রতি রাতে একটি বাচ্চা মেয়েকে সবরকম দায়মুক্তভাবে ভোগ বা ধর্ষণ করবেন, তাহলে অন্তত আইনত তার সিদ্ধান্ত সঠিক। আমাদের সমাজে বিয়ে দিয়ে ঘাড় থেকে নামানোর মতো মেয়ের সংখ্যা তো কম নয়। কোনো থানা বা আদালতও বৈবাহিক ধর্ষণের অভিযোগ নিতে পারবে না, ইচ্ছা থাকলেও।

এটাই আমাদের আইন। এটাই আমাদের বাস্তবতা। আমাদের জানতে হবে। আমাদের ঘৃণা করতে হবে। আমাদের আপত্তি জানাতে হবে।

তাকবির হুদা, বাংলাদেশ লিগ্যাল অ্যাইড ও সার্ভিসেস ট্রাস্টের গবেষণা বিশেষজ্ঞ

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরও বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারার বৈবাহিক ধর্ষণের ব্যতিক্রম বাতিল করা হয়নি। এখনো সেখানে বলা আছে, নিজের স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমের ক্ষেত্রে স্ত্রীর বয়স ১৩ বছরের কম না হলে সেটি ধর্ষণ নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েকে শিশু হিসেবে স্বীকার করলেও দণ্ডবিধি ১৩ বছর বা তার বেশি বয়সী স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ষণ থেকে সুরক্ষা দেয় না। একই রাষ্ট্রের দুই আইনের মধ্যে এই নৈতিক ও আইনগত বিরোধ একটি ধর্ষক স্বামীকে দায়মুক্তি দেয় [24]

শিশুবিবাহের পর যৌন নির্যাতনে কিশোরীর মৃত্যুর সংবাদ

এবারে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য দেখা যাক। উল্লেখ্য, এরকম বক্তব্যের সংখ্যা অগণিত।

শিশুবিবাহের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা

আরও একটি বক্তব্য দেখা যাক।

ধর্মীয় যুক্তিতে শিশুবিবাহের পক্ষে প্রচারণা

সুন্নতী বাল্যবিবাহের পক্ষে আন্দোলন

বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা বাল্যবিবাহের পক্ষে আন্দোলন করে যাচ্ছে। এই আন্দোলনের স্লোগানে তারা দাবি করছে, যেহেতু এটি নবীর সুন্নত, তাই একে নিষিদ্ধ করা যাবে না। মুমিন পুরুষদের নাকি বাল্যবিবাহ করার এবং নিজেদের শিশুকন্যাদের বিয়ে দেওয়ার ধর্মীয় অধিকার রয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন হিসেবে পরিচিত ওলামা লীগও এই নিয়ে মাঠে আন্দোলন করেছে। তাদের দাবি ছিল, “সুন্নতী” বাল্যবিবাহকে আইনগত বৈধতা দিতে হবে এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রত্যাহার করতে হবে [25]

এটি শিশুবিবাহের সঙ্গে ধর্মীয় মতবাদের সম্পর্কের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। আন্দোলনকারীরা দারিদ্র্য, অশিক্ষা বা বিচ্ছিন্ন সামাজিক প্রথার অজুহাত দেয়নি; তারা স্পষ্টভাবে নবীর সুন্নত ও শরিয়তের অধিকার দেখিয়ে শিশুবিবাহের বৈধতা দাবি করেছে। ফলে “শিশুবিবাহের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই” কথাটি বাস্তব আন্দোলনকারীদের নিজেদের বক্তব্যেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

সৌদি আরবের ধর্মীয় বক্তা শেখ আবদুল্লাহ দাউদ শিশু মেয়েদেরও বোরকা পরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, যৌন আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য শিশুকন্যাদের মুখ ঢেকে রাখা দরকার। এখানে যৌন অপরাধীর দায়ের পরিবর্তে শিশুর শরীর ও পোশাকের ওপর দায় চাপানো হয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিশুকে যৌন দৃষ্টিতে দেখবে—এই বিকৃতিকে মোকাবিলা না করে শিশুকেই আবৃত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [26] [27]

বাল্যবিবাহকে খাস সুন্নত দাবি করে প্রচারণা
সুন্নতী বাল্যবিবাহের বিরোধিতাকে নবীর বিরোধিতা দাবি
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলাকে ধর্মবিরোধিতা দাবি

বাল্যবিবাহ, অধিক সন্তান জন্মদান এবং নারীর জীবনকে স্বামী ও সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন ওয়াজ চলে। এই প্রচারণা বিচ্ছিন্ন কোনো বক্তব্য নয়; ধর্মীয় মঞ্চ ব্যবহার করে শিশুদের অধিকারবিরোধী একটি সামাজিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। নিচের বক্তব্যগুলো সেই প্রচারণার নমুনা।





বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করায় জঙ্গি হুমকি

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলায় ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের ধানবিলা গ্রামের মৃত ফয়েজ উদ্দিন সরকারের ছেলে সমাজকর্মী আবু সালেহ মো. আব্দুল মাজেদকে হুমকি দিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। ভীত আব্দুল মাজেদ এই নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন। উগ্রপন্থী ইসলামপন্থীরা কেন তাকে হুমকি দিয়েছিল, তা তাদের চিঠিতেই স্পষ্ট [28]

০৩ এপ্রিল, ২০১৮
বিষয়ঃ আপনাকে শিরঃচ্ছেদ করা প্রসঙ্গে।

সালেহ্ মাজেদ সাহেব,
বেশ কিছুদিন থেকে আপনি এলাকায় নতুন ফিতনা কায়েম করতে চেষ্টা করছেন। আশেপাশের ছেলে-মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষা না দিয়ে তাদেরকে নাচ-গানের অনুষ্ঠান করে বেলেল্লাপনা শিখাচ্ছেন। পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে! কথাটা আপনার বেলায় যথার্থভাবে প্রযোজ্য। আপনি এলাকায় বিধর্মীয় রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আপনাকে এখন আমাদের ইহুদি-নাসারাদের এজেন্ট বলে মনে হয়। আপনি বাল্যবিবাহ, জঙ্গিবাদ—এ সমস্ত ব্যাপারগুলো নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন। আপনার উদার শয়তানি চিন্তাচেতনা এবং অনৈসলামিক সমাজভাবনা আপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেই আপনার মঙ্গল হবে।

দেখুন মাজেদ সাহেব, বাল্যবিবাহ নিয়ে কথা বলা ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক অথচ আপনি দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন স্কুলে, আপনার ফাউন্ডেশনে গিয়ে বাল্যবিবাহ নিয়ে প্রচার-প্রচারণায় মেতেছেন। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, বাল্যবিবাহ নিয়ে আর কথা বলতে আসবেন না।

জঙ্গিবাদ নিয়েও আপনার অনেক মাথাব্যথা দেখছি। আমাদের মনে হয় আপনি একজন নাস্তিক টাইপের মানুষ। পৃথিবীতে খেলাফত প্রতিষ্ঠা হোক তা আপনাদের মতো নাদান, কুলাঙ্গার, ইসলামবিদ্বেষী লোকজন চায় না বলেই পশ্চিমা বিশ্বের তালে তালে আপনারা আমাদের জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন যুগে যুগে। তবে আপনাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, জঙ্গিবাদ নিয়ে পুনরায় এলাকায় কোনো সভা-সমাবেশ বা প্রচার-প্রচারণা করলে আপনার ভাগ্য হবে ওইসব মুরতাদের মতো, যাদের কতল করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনার জন্য জাহান্নামের একটা কক্ষ বুকিং দিয়ে রেখেছি আমরা। আপনাকে সতর্ক করছি, জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ নিয়ে আর কথা বলবেন না, প্রচার-প্রচারণা চালাবেন না, নইলে এর ফল হবে ভয়াবহ।

সাবধানকারী,
সদস্য,
আনসারুল্লাহ বাংলা টিম
পাবনা

বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শিরশ্ছেদের হুমকি

এই চিঠিতে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচারণাকে সরাসরি “ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক” বলা হয়েছে। অর্থাৎ শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনের পক্ষে কথা বলাকে ধর্মবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ এখানে নিছক গ্রামীণ কুসংস্কার নয়; এটি ধর্মীয় পরিচয়, শরিয়তের দাবি এবং সহিংস রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত একটি মতাদর্শে পরিণত হয়েছে।

এবার আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের একটি বক্তব্য শোনা যাক।


উপসংহার

বয়ঃসন্ধি প্রাপ্তবয়স্কতা নয়। ঋতুস্রাব সম্মতির সক্ষমতা নয়। গর্ভধারণের জৈবিক সম্ভাবনা নিরাপদ মাতৃত্বের প্রমাণ নয়। আর একটি বিবাহের অনুষ্ঠান কোনো শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীতে পরিণত করে না। শিশুবিবাহ একটি শিশুর শরীর, শিক্ষা, স্বাধীনতা, যৌনসম্মতি এবং ভবিষ্যতের ওপর প্রাপ্তবয়স্কদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের আইন শিশুবিবাহকে অপরাধ ঘোষণা করলেও একই আইনের বিশেষ বিধান ব্যতিক্রমের দরজা খুলে রেখেছে। দণ্ডবিধি আবার ১৩ বছর বা তার বেশি বয়সী স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ষণ থেকে সুরক্ষা দেয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বয়স জাল করার ধর্মীয় ফতোয়া, শিশুবিবাহকে সুন্নত দাবি করে আন্দোলন, আইনের বিরোধিতা এবং শিশুবিবাহবিরোধী কর্মীদের হত্যার হুমকি। ফলে সমস্যাটি শুধু দারিদ্র্য বা অশিক্ষা নয়। ধর্মীয় বৈধতা, পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা এবং আইনি দায়মুক্তি একে টিকিয়ে রেখেছে।

নূরনাহারের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। একটি শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের হাতে তুলে দিয়ে, তার প্রথম রাতের রক্তক্ষরণ উপেক্ষা করে, তাকে বারবার যৌনসঙ্গমে বাধ্য করে এবং পরে সেই অপরাধকে বিবাহের আড়ালে ঢেকে রাখার ব্যবস্থার অনিবার্য ফল এটি। শিশুর কথিত সম্মতি, পরিবারের সম্মতি, আদালতের অনুমতি, ধর্মীয় ফতোয়া অথবা কাবিননামা—কোনোটিই শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনকে নৈতিক করে না। শিশুবিবাহ বন্ধ করার অর্থ শুধু বিয়ের বয়স নির্ধারণ নয়; শিশুর শরীরের ওপর পরিবার, স্বামী, ধর্মীয় নেতা এবং রাষ্ট্রের অবৈধ কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করা।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইউনিসেফ: শিশুবিবাহ 1 2
  2. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য ↩︎
  3. UNICEF: Child marriage 1 2
  4. Convention on the Rights of the Child, Article 1 ↩︎
  5. World Health Organization: Adolescent health ↩︎
  6. National Institute of Mental Health: The Teen Brain—7 Things to Know ↩︎
  7. সংজ্ঞা ↩︎
  8. বাল্যবিবাহ করিবার শাস্তি ↩︎
  9. বাল্যবিবাহ সংশ্লিষ্ট পিতা-মাতাসহ অন্যান্য ব্যক্তির শাস্তি ↩︎
  10. “Sexual violence chapter 6” (PDF)। World Health Organization। ২০০২। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ↩︎
  11. “Rape”। dictionary.reference.com। এপ্রিল ১৫, ২০১১ ↩︎
  12. “Rape”। legal-dictionary.thefreedictionary.com। এপ্রিল ১৫, ২০১১ ↩︎
  13. Age of consent ↩︎
  14. Child Marriage is a Death Sentence for Many Young Girls ↩︎
  15. Mayo Clinic: Precocious puberty ↩︎
  16. NCBI Bookshelf: Precocious Puberty ↩︎
  17. Child abuse and pubertal timing: what is the role of child sex and type of abuse? ↩︎
  18. World Health Organization: Adolescent pregnancy ↩︎
  19. Health Consequences of Child Marriage in Africa ↩︎
  20. ইউনিসেফ থেকে প্রকাশিত একটি পিডিএফ বই ↩︎
  21. ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত, ষষ্ঠ খণ্ড, ফকীহুল মিল্লাত ফাউন্ডেশন, ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান, পৃষ্ঠা ৪২ ↩︎
  22. বৈবাহিক ধর্ষণে কিশোরীর মৃত্যু: এরপরও কেন এটি বৈধ? ↩︎
  23. ওয়েব আর্কাইভ: বৈবাহিক ধর্ষণে কিশোরীর মৃত্যু ↩︎
  24. বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০: ধারা ৩৭৫–৩৭৬ ↩︎
  25. ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ নামক কুফরি আইন প্রত্যাহার করে…এসব এনজিও নিষিদ্ধ করতে হবে’ ↩︎
  26. Saudi Arabian cleric declares babies should wear burkas ↩︎
  27. Saudi cleric says newborn girls should have their faces veiled ↩︎
  28. পাবনায় এক ব্যক্তিকে ‘শিরশ্ছেদের হুমকি আনসারুল্লাহর’ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.