ভূমিকা
মানুষ খায়, হজম করে, ঢেকুর তোলে, ঘামে, প্রস্রাব-মলত্যাগ করে এবং পাদ দেয়। এগুলোর কোনোটিই মানুষের নৈতিক চরিত্রের পরিচয় নয়; এগুলো জীবন্ত মানবদেহের স্বাভাবিক জৈবিক কার্যক্রম। মানুষের অন্ত্রে খাদ্য হজম, গিলে ফেলা বাতাস এবং বিশেষ করে বৃহদন্ত্রের জীবাণুদের গাঁজনপ্রক্রিয়ায় গ্যাস তৈরি হয়, যা শরীর থেকে বেরিয়ে আসাই স্বাভাবিক। গবেষণায় সুস্থ মানুষের মধ্যেও দৈনিক বহুবার বায়ু নির্গমনের ঘটনা পাওয়া গেছে এবং খাদ্যাভ্যাস, বিশেষত আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণের সঙ্গে এর হার পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ পাদ কোনো অস্বাভাবিক, নোংরা বা নৈতিকভাবে সন্দেহজনক আচরণ নয়; এটি মানুষের পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক ফল। [1] [2] কিন্তু শরীরের এই অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিকেও সামাজিক লজ্জা, অশ্লীলতা ও ধর্মীয় শিষ্টাচারের এমন আবরণে ঢেকে ফেলা হয়েছে যে এটি নিয়ে কথা বলা বা হাসাও অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বা অশোভন বলে বিবেচিত হয়।
হাদিসে পাদ নিয়ে হাসাহাসির নিষেধাজ্ঞা
নবী মুহাম্মদ পাদ নিয়ে হাসাহাসি করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। আসুন হাদিসটি পড়ি,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৮/ আচার-ব্যবহার
৭৮/৪৩. আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ হে মু’মিনগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম ….. এ সব হতে)যারা তাওবাহ না করে তারাই যালিম। সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯/১১)
৬০৪২. ‘আবদুল্লাহ ইবনু যাম্‘আহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের বায়ু নির্গমনে কাউকে হাসতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরও বলেছেনঃ তোমাদের কেউ কেন তার স্ত্রীকে ষাঁড় পিটানোর মত পিটাবে? পরে হয়ত, সে আবার তার সাথে গলাগলিও করবে।
সাওরী, ওহায়ব ও আবূ মু‘আবিয়াহ (রহ.) হিশাম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘ষাঁড় পিটানোর’ স্থলে ‘দাসকে বেত্রাঘাত করার ন্যায়’। (৩৩৭৭) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পাদ, হাস্যরস এবং সামাজিক স্বাভাবিকতা
পাদ নিয়ে মানুষ হাসে মূলত এই কারণে যে ঘটনাটি একই সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সামাজিকভাবে অপ্রত্যাশিত। একটি গম্ভীর সভা, প্রেমের মুহূর্ত, অফিসের বৈঠক কিংবা নিস্তব্ধ ঘরে হঠাৎ একটি অপ্রত্যাশিত শব্দ পরিস্থিতির গাম্ভীর্য এবং শরীরের অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতার মধ্যে একটি অসামঞ্জস্য তৈরি করে, আর সেখান থেকেই হাস্যরসের জন্ম হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে হাস্যরস ব্যাখ্যার একটি পরিচিত ধারণা হলো “নিরীহ নিয়মভঙ্গ” (Benign Violation)—অর্থাৎ কোনো ঘটনা সামাজিক নিয়ম কিছুটা ভাঙলেও যদি সেটিকে বিপজ্জনক বা গুরুতর মনে না হয়, তাহলে সেটি হাসির কারণ হতে পারে। পাদ নিয়ে হাস্যরস এর একটি প্রায় আদর্শ উদাহরণ। সামাজিক শিষ্টাচারের সামান্য ব্যত্যয় ঘটেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো প্রকৃত ক্ষতি হয়নি। [3]
এখানে অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। কোনো ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে পাদ দেওয়ার কারণে তাকে প্রকাশ্যে অপমান করা, বিব্রত করা বা দলবদ্ধভাবে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা এক বিষয়; আর পাদ নামের স্বাভাবিক মানবিক ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ হাস্যরস করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। প্রথমটির বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত নৈতিক আপত্তি আছে, কারণ কারও অনিচ্ছাকৃত শারীরিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তাকে হেয় করা নিষ্ঠুরতা হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে “পাদ নিয়ে হাস্যরসই করা যাবে না”—এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। কেউ নিজের পাদ নিয়ে নিজেই হাসতে পারে, বন্ধুরা নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কৌতুক করতে পারে, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে এটিকে হাসির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কোনো ব্যক্তিকে অপমান করা না হলে শুধু ধর্মীয় শিষ্টাচার বা সামাজিক গাম্ভীর্যের নামে এটিকে নিষিদ্ধ করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
বরং শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলো নিয়ে সুস্থ হাস্যরস সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা নিজেদের শরীর নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলী এবং পাদ, ঢেকুর বা অন্য শারীরিক শব্দ নিয়ে হাসে। পরে সমাজ তাদের শেখায় কোন বিষয় “ভদ্র”, কোনটি “অভদ্র”, কোনটি প্রকাশ্যে বলা যাবে এবং কোনটি লজ্জার। সামাজিক শিষ্টাচারের প্রয়োজন অবশ্যই আছে—ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যকে দুর্গন্ধের মধ্যে ফেলা অসৌজন্য হতে পারে—কিন্তু শিষ্টাচার আর শরীর নিয়ে অপরাধবোধ এক বিষয় নয়। মানুষকে শেখানো যেতে পারে অন্যের অসুবিধার প্রতি সংবেদনশীল হতে; তার জন্য তাকে নিজের স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রম নিয়ে লজ্জিত করার প্রয়োজন নেই। কোনো সামাজিক নিয়ম দীর্ঘদিন প্রচলিত হলেই সেটি যুক্তিসঙ্গত বা নৈতিক সত্য হয়ে যায় না।
হাস্যরস এই অপ্রয়োজনীয় লজ্জা ভাঙতে সাহায্য করে। পাদ একটি চমৎকার সমতাসৃষ্টিকারী বাস্তবতাও বটে—রাজা পাদ দেন, ধর্মগুরু পাদ দেন, বিজ্ঞানী পাদ দেন, ধনী-গরিব সবাই পাদ দেন। মানুষের সমস্ত সামাজিক মর্যাদা, ধর্মীয় পবিত্রতা, অহংকার ও পদমর্যাদার নিচে একই জীববিজ্ঞান কাজ করে। এই বাস্তবতা নিয়ে হাসা মানুষকে অপমান করা নয়; বরং অনেক সময় মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে অযথা তৈরি করা গাম্ভীর্য ও কৃত্রিমতাকে ভেঙে দেওয়া। যে সমাজ শরীরের স্বাভাবিক বিষয় নিয়ে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে ও হাসতে পারে, সেখানে মানুষ নিজের শরীরকে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে।
উপসংহার
পাদ কোনো পাপ নয়, চরিত্রের ত্রুটি নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও নয়; এটি মানুষের পরিপাকতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। তাই এটিকে ঘিরে সাধারণ সামাজিক শিষ্টাচার থাকতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় ভয়, অপরাধবোধ বা হাস্যরসের ওপর অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রয়োজন নেই। কারও অনিচ্ছাকৃত পাদকে কেন্দ্র করে তাকে অপমান করা অবশ্যই নিন্দনীয় হতে পারে, কিন্তু সেই নীতিকে পাদ নিয়ে সব ধরনের হাসি-তামাশার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় পরিণত করা যুক্তিসঙ্গত নয়। মানুষকে অপমান না করে মানবিক বাস্তবতা নিয়ে হাসতে পারা একটি সুস্থ সংস্কৃতির অংশ। কখনো কখনো নিজের তথাকথিত গাম্ভীর্য থেকে নেমে এসে স্বীকার করা—আমরা সবাই শরীরধারী প্রাণী, আমাদের সবারই পাদ হয়—মানবজীবনকে আরও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করারই একটি উপায়।
তথ্যসূত্রঃ
- Furne, J. K. & Levitt, M. D., “Factors influencing frequency of flatus emission by healthy subjects,” Digestive Diseases and Sciences, 1996 ↩︎
- Bolin, T. D. & Stanton, R. A., “Flatus emission patterns and fibre intake,” European Journal of Surgery, 1998 ↩︎
- McGraw, A. P. & Warren, C., “Benign Violations: Making Immoral Behavior Funny,” Psychological Science, 2010 ↩︎
