জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

অমুসলিমদের রাস্তার কিনারায় ঠেলে লাঞ্ছিত করার ইসলামিক বিধান

প্রকাশিত: এপ্রিল 28, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন18 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনি কাঠামোর একটি অত্যন্ত আপত্তিকর এবং সাম্প্রদায়িক দিক হলো অমুসলিম, বিশেষত ইসলামী শাসনের অধীন ‘জিম্মি’দের সামাজিক অবস্থান ও তাদের সঙ্গে আচরণের নীতিমালা। সহিহ হাদিস, ধ্রুপদী হাদিস-ব্যাখ্যা, তাফসীর এবং ফিকহের বহু গ্রন্থে মুসলিম ও অমুসলিমকে সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে বিবেচনার পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পৃথক সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের বিধান পাওয়া যায়। অমুসলিমকে আগে সালাম না দেওয়া, রাস্তায় মুসলিমকে অগ্রাধিকার দেওয়া, জিম্মিকে সম্মানের আসনে না বসানো, মুসলিমের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া, পোশাক ও বাহ্যিক পরিচয়ে আলাদা করে রাখা এবং ‘সাগির’ বা অবনত অবস্থায় জিজিয়া প্রদানের ধারণা একই বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর বিভিন্ন প্রকাশ। ধ্রুপদী আলেমদের কেউ কেউ এসব বিধানের ব্যাখ্যায় সরাসরি অমুসলিমকে সম্মান না দেওয়া, ছোট করা, তুচ্ছ করা এবং লাঞ্ছিত করার ভাষাও ব্যবহার করেছেন। ফলে বিষয়টি কেবল একটি হাদিসের কঠোর বাংলা অনুবাদ বা বিচ্ছিন্ন কোনো আলেমের ব্যক্তিগত বক্তব্যের প্রশ্ন নয়; এটি ধ্রুপদী ইসলামী আইনি সাহিত্যে ধর্মভিত্তিক সামাজিক মর্যাদার একটি সুস্পষ্ট কাঠামোর প্রশ্ন। আধুনিক সমমর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে এই কাঠামোর মৌলিক সংঘাত রয়েছে।


ব্রিটেনে আরব ইসলাম প্রচারক

আসুন শুরুতেই আরবের একজন আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,


বাংলা টিভি চ্যানেলে অমুসলিমদের সম্পর্কে

এবারে আসুন বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে একটি ইসলামিক প্রশ্নোত্তর শুনে নেয়া যাক,


অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধঃ দেশের আলেমগণ

আসুন আরও কিছু বক্তব্য শুনি,


অমুসলিমদের ঘৃণা করতে হবে


অমুসলিমদের রাস্তার সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করার নির্দেশ

এবারে আসুন এই তথ্যগুলোর দলিল যাচাই করে দেখি। বাদবাকি দলিল অন্য পাতাগুলোতে দেয়া আছে [1]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
‏পরিচ্ছদঃ ৪১. আহলে কিতাবদের সালাম প্রদান প্রসঙ্গে
১৬০২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের প্রথমে সালাম প্রদান করো না। তোমরা রাস্তায় চলাচলের সময় তাদের কারো সাথে দেখা হলে তাকে রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিও।
সহীহ, সহীহা (৭০৪), ইরওয়া (১২৭১), মুসলিম, বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ২৮৫৫ নং হাদীসটির আলোচনা আসবে।
ইবনু উমার, আনাস ও আবূ বাসরা আল-গিফারী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত সূনান তিরমিজীর বাংলা সংস্করণে এই হাদিসের পরবর্তী ব্যাখ্যাংশে আগে সালাম না দেওয়া এবং রাস্তায় পথ না ছেড়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে অমুসলিমকে সম্মান প্রদর্শন না করা ও তাদের লাঞ্ছিত করার নির্দেশের কথা বলা হয়েছে। এটি হাদিসের মূল বর্ণনার অংশ নয়; বাংলা সংস্করণে সংযুক্ত ব্যাখ্যা [2] [3]

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৪/ অভিযান
পরিচ্ছেদঃ কিতাবীদের সালাম দেওয়া।
১৬০৮। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়াহূদী খ্রিষ্টানকে প্রথমেই সালাম দিবে না। এদের কাউকে যদি পথে পাও তবে এর কিনারায় তাদের ঠেলে দেবে। সহীহ, সহীহাহ ৭০৪, ইরওয়া ১২৭১, মুসলিম, আদাবুল মুফরাদ, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৬০২ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে ইবনু উমার, আনাস, সাহাবী আবূ বাসরা গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, এই হাদীসটি হাসান-সহীহ। হাদীসটির তাৎপর্য হলো, ইয়াহূদী খৃষ্টানকে প্রথমেই তুমি সালাম দিবে না। কতক আলিম বলেন, এটা অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ হলো এতে এদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়, অথচ মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ হল এদেরকে লাঞ্ছিত করার। এমনিভাবে পথে এদের কারো পাওয়া গেলে তার জন্য পথ ছাড়া হবে না কেননা, এতে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

অমুসলিম

ইবনে কাসীর সূরা তাওবার ২৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় জিজিয়া, ‘সাগিরুন’ এবং আহলে কিতাবের অধস্তন অবস্থানের আলোচনার সঙ্গে এই হাদিসটিকেও যুক্ত করেছেন। [4] [5]

حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَّدٍ وَهُمْ صَاغَرُونَ অর্থাৎ যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে
তাহারা যতক্ষণ না মুসলমানদের বিজয়ী অবস্থায় এবং নিজেদের লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অবদমিত অবস্থায় স্বহস্তে জিযিয়া প্রদান করিবে …। উক্ত কারণেই কোন যিম্মীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা বা তাহাকে কোন ভাবে মুসলমানের ঊর্ধ্বে রাখা মুসলমানের জন্যে নিষিদ্ধ ও নাজায়েয। তাহারা সর্বদা লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় থাকিবে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে মুসলিম শরীফে বর্ণিত রহিয়াছে যে, আবূ হুরায়রা (রা) বলেন: নবী করীম (সা) বলিয়াছেন: তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারা জাতিদ্বয়ের লোকদিগকে আগ বাড়িয়া সালাম দিও না; আর তাহাদের কাহারো সহিত রাস্তায় তোমাদের সাক্ষাৎ হইলে তাহাকে রাস্তার সংকীর্ণতম অংশ দিয়া চলিতে বাধ্য করিও।

অমুসলিম 1

ইমাম নববীর ব্যাখ্যা: দেয়ালে আঘাত নয়, কিন্তু রাস্তার অগ্রাধিকারও নয়

সহিহ মুসলিমের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকার ইমাম নববী হাদিসটির অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শাফেয়ি আলেমদের অবস্থান উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পরিষ্কার: জিম্মিকে এমনভাবে সংকীর্ণ স্থানে ঠেলে দেওয়া যাবে না যাতে সে গর্তে পড়ে বা দেয়ালে আঘাত পায়; কিন্তু একইসঙ্গে তাকে রাস্তার প্রধান বা অগ্রাধিকারপূর্ণ অংশও ছেড়ে দেওয়া হবে না। [6]

لا يترك للذمي صدر الطريق، بل يضطر إلى أضيقه إذا كان المسلمون يطرقون، فإن خلت الطريق عن الزحمة فلا حرج. قالوا: وليكن التضييق بحيث لا يقع في وهدة، ولا يصدمه جدار ونحوه.

বাংলা অনুবাদ: জিম্মির জন্য রাস্তার প্রধান অংশ ছেড়ে দেওয়া হবে না; বরং মুসলমানেরা রাস্তা ব্যবহার করলে তাকে সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করা হবে। তবে রাস্তা ভিড়মুক্ত হলে কোনো অসুবিধা নেই। তারা বলেছেন, সংকীর্ণ করার পদ্ধতি এমন হতে হবে যাতে সে কোনো গর্তে পড়ে না যায় এবং দেয়াল বা অনুরূপ কিছুর সঙ্গে ধাক্কা না খায়।

নববীর বক্তব্য থেকে তাই “হাদিসটির অর্থ কাউকে দেয়ালে পিষে ফেলা নয়” বলা সঠিক; কিন্তু সেখান থেকে “হাদিসটিতে কোনো বৈষম্যমূলক সামাজিক অগ্রাধিকার নেই” বলা মিথ্যা। তাঁর ব্যাখ্যায় মুসলমান ও জিম্মির পথ ব্যবহারের অধিকার সমান নয়: সংঘাতের পরিস্থিতিতে প্রধান অংশ মুসলমানের, সংকীর্ণ অংশ জিম্মির। শারীরিক আঘাত নিষিদ্ধ হওয়া সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সমার্থক নয়।


আবু আল-আব্বাস আল-কুরতুবি: অমুসলিমকে ছোট করা, তুচ্ছ করা ও অস্তিত্বহীন হিসেবে উপেক্ষা করা

আবু আল-আব্বাস আল-কুরতুবি তাঁর আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিসি কিতাবি মুসলিম গ্রন্থে আগে সালাম না দেওয়া এবং রাস্তার সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করার নির্দেশকে একই সামাজিক নীতির দুটি প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর যুক্তির শুরুতেই রয়েছে একটি স্পষ্ট মূল্যায়ন: আগে সালাম দেওয়া সম্মান প্রদর্শন, আর কাফির সেই সম্মানের উপযুক্ত নয়। এরপর তিনি শুধু সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা বলেননি; অমুসলিমদের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা, তাদের প্রতি মনোযোগ না দেওয়া, তাদের ছোট করা এবং তাদের মর্যাদাকে তুচ্ছ করার কথা বলেছেন। তাঁর ব্যবহৃত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাক্যটি হলো, তাদের এমনভাবে উপেক্ষা করতে হবে, “যেন তারা অস্তিত্বহীন”। রাস্তার বিধানকেও তিনি এই একই উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন: সংকীর্ণ পথে অমুসলিমকে সম্মান দেখিয়ে মুসলমান নিজের জায়গা ছেড়ে দাঁড়াবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যাটি নিচে সম্পূর্ণ দেওয়া হলো [7]।

আরবি মূলপাঠ:
قوله – صلى الله عليه وسلم -: (لا تبدؤوا اليهود والنصارى بالسلام) إنما نهى عن ذلك لأن الابتداء بالسلام إكرام، والكافر ليس أهلا لذلك، فالذي يناسبهم الإعراض عنهم، وترك الالتفات إليهم؛ تصغيرا لهم، وتحقيرا لشأنهم، حتى كأنهم غير موجودين.
و(قوله: وإذا لقيتم أحدهم في طريق فاضطروه إلى أضيقه) أي: لا تتنحوا لهم عن الطريق الضيق؛ إكراما لهم واحتراما. وعلى هذا فتكون هذه الجملة مناسبة للجملة الأولى في المعنى والعطف، وليس معنى ذلك: أنا إذا لقيناهم في طريق واسع أننا نلجئهم إلى حرفه حتى نضيق عليهم؛ لأن ذلك أذى منا لهم من غير سبب، وقد نهينا عن أذاهم.

বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য—“তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আগে সালাম দিও না”—এই নিষেধের কারণ হলো, আগে সালাম দেওয়া সম্মান প্রদর্শন; আর কাফির সেই সম্মানের উপযুক্ত নয়। তাদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত আচরণ হলো তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা এবং তাদের প্রতি মনোযোগ না দেওয়া; তাদের ছোট করা ও তাদের মর্যাদাকে তুচ্ছ করার জন্য, যেন তারা অস্তিত্বহীন।
আর তাঁর বক্তব্য—“রাস্তায় তাদের কাউকে পেলে তাকে রাস্তার সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করো”—এর অর্থ হলো, তাদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য সংকীর্ণ পথে তাদের জায়গা ছেড়ে নিজেরা সরে দাঁড়াবে না। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অর্থ ও সংযোগের দিক থেকে এই বাক্যটি প্রথম বাক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে, প্রশস্ত রাস্তায় তাদের সঙ্গে দেখা হলে আমরা তাদের কিনারায় যেতে বাধ্য করে তাদের জন্য পথ সংকীর্ণ করে দেব; কারণ সেটি কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের পক্ষ থেকে তাদের কষ্ট দেওয়া হবে, আর তাদের কষ্ট দিতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে।

এই ব্যাখ্যায় অমুসলিমের প্রতি আচরণের উদ্দেশ্য আল-কুরতুবি নিজেই নির্ধারণ করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত তাসগীর অর্থ ছোট করা এবং তাহকীর অর্থ তুচ্ছ করা। এগুলো নিছক সালামের শব্দ নির্বাচন বা চলাচলের সুবিধা নির্ধারণের কথা নয়; অন্য ধর্মের মানুষকে সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে রাখার ঘোষণা। একজন মুসলমানের সঙ্গে দেখা হলে তাকে সম্মানসূচক অভিবাদন জানানো যাবে, কিন্তু একই জায়গায় একজন অমুসলিম দাঁড়িয়ে থাকলে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সে সেই সম্মানের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আবার সংকীর্ণ পথে দুইজন মুখোমুখি হলে কে আগে এসেছে, কার চলতে বেশি অসুবিধা হচ্ছে বা কার জায়গা ছেড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত—এসবের পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয় আচরণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে। আল-কুরতুবির ব্যাখ্যায় এই দুই নির্দেশের মধ্যে সংযোগও স্পষ্ট: সালাম ও পথ ছেড়ে দেওয়া উভয় ক্ষেত্রেই অমুসলিমকে সম্মান দেখানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রশস্ত রাস্তায় অকারণে কাউকে কিনারায় ঠেলে কষ্ট দেওয়ার বিরুদ্ধে তাঁর নিষেধটিও উদ্ধৃতির মধ্যে সম্পূর্ণ রাখা হয়েছে। সেই নিষেধ শারীরিক বা চলাচলগত কষ্ট দেওয়ার একটি সীমা নির্ধারণ করে; কিন্তু অমুসলিমকে সম্মানের অনুপযুক্ত বলা, ছোট করা এবং অস্তিত্বহীন হিসেবে উপেক্ষা করার নির্দেশ বহাল রাখে। বৈষম্য বুঝতে এই পার্থক্যটি জরুরি। একজন মানুষকে মারধর না করেও তার সামাজিক মর্যাদা অস্বীকার করা যায়; তাকে আঘাত না করেও জানিয়ে দেওয়া যায় যে, অন্যদের জন্য স্বীকৃত সম্মান তার প্রাপ্য নয়। আল-কুরতুবির বক্তব্যে ঠিক এই ধরনের ধর্মভিত্তিক সামাজিক বর্জনের নীতি প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পড়লে সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয়: এখানে অমুসলিমের অস্তিত্ব স্বীকার করা হচ্ছে, অথচ দৈনন্দিন সামাজিক আচরণে তাকে এমনভাবে উপেক্ষা করার কথা বলা হচ্ছে, যেন সেই অস্তিত্বের কোনো গুরুত্ব নেই।


মোল্লা আলী আল-কারী: লাঞ্ছনা, “অর্থগত হত্যা” ও দেওয়া সালাম ফিরিয়ে নেওয়া

হানাফি আলেম মোল্লা আলী আল-কারী মিরকাত আল-মাফাতিহ শরহ মিশকাত আল-মাসাবিহ-এ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় অমুসলিমকে সম্মান না দেওয়া এবং তাকে লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্য সরাসরি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ইহুদি ও খ্রিস্টান জিম্মিরাও এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। আগে সালাম দেওয়াকে তিনি মর্যাদা প্রদর্শন হিসেবে দেখেছেন এবং বলেছেন, তাদের মর্যাদা দেওয়া অনুমোদিত নয়। এরপর সূরা তাওবার “ওয়া হুম সাগিরুন” অংশের সঙ্গে যুক্ত করে লিখেছেন, “আমাদের তাদের লাঞ্ছিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” রাস্তার সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করার বিধানকে তিনি সেই লাঞ্ছনার সমর্থন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আরও রয়েছে জিজিয়ার কারণে হত্যার বিধান উঠে যাওয়ার কথা, সামাজিক লাঞ্ছনাকে “অর্থগত হত্যা” হিসেবে বর্ণনা করা এবং কাউকে মুসলমান মনে করে সালাম দেওয়ার পর সে জিম্মি বলে জানা গেলে তাকে তুচ্ছ করার জন্য সেই সালাম ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনা। নিচে হাদিসটির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো [8]।

আরবি মূলপাঠ:
4635 – (وعن أبي هريرة – رضي الله تعالى عنه – قال: قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم: (لا تبدءوا اليهود ولا النصارى) أي: ولو كانوا ذميين، فضلا عن غيرهما من الكفار (بالسلام): لأن الابتداء به إعزاز للمسلم عليه، ولا يجوز إعزازهم، وكذا لا يجوز تواددهم وتحاببهم بالسلام ونحوه، قال تعالى: لا تجد قوما يؤمنون بالله واليوم الآخر يوادون من حاد الله ورسوله الآية.
ولأنا مأمورون بإذلالهم، كما أشار إليه سبحانه بقوله: وهم صاغرون، ويؤيده قوله: (وإذا لقيتم أحدهم في طريق فاضطروه) أي: ألجئوا أحدهم (إلى أضيقه) أي: أضيق الطريق بحيث لو كان في الطريق جدار يلتصق بالجدار، وإلا فيأمره ليعدل عن وسط الطريق إلى أحد طرفيه جزاء وفاقا، لما عدلوا عن الصراط المستقيم؛ ولأن قتلهم واجب، لكن ارتفع بالجزية وما لا يدرك كله لا يترك كله، فهذا قتل معنوي والله أعلم.
وفي شرح مسلم للنووي، قال بعض أصحابنا يكره ابتداؤهم بالسلام ولا يحرم، وهذا ضعيف؛ لأن النهي للتحريم، فالصواب تحريم ابتدائهم، وحكى القاضي عياض عن جماعة: أنه يجوز ابتداؤهم للضرورة والحاجة، وهو قول علقمة والنخعي. وقال الأوزاعي: إن سلمت فقد سلم الصالحون، وإن تركت فقد ترك الصالحون.
قلت: الترك أصلح على ما هو الأصح. قال: وأما المبتدع فالمختار أنه لا يبدأ بالسلام إلا لعذر وخوف من مفسدة، ولو سلم على من لم يعرفه، فبان ذميا استحب أن يسترد سلامه بأن يقول: استرجعت سلامي تحقيرا له. قلت: ولا بأس بمثل هذا للمبتدع، أو للمباغض، أو المتكبر الذين لم يردوا عليه السلام.
قال، وقال أصحابنا: لا يترك للذمي صدر الطريق، بل يضطر إلى أضيقه، ولكن التضييق بحيث لا يقع في وهدة ونحوها، وإن خلت الطريق عن الزحمة فلا حرج. (رواه مسلم): وكذا أحمد، وأبو داود، والترمذي.

বাংলা অনুবাদ:
৪৬৩৫—আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুল বলেছেন, “তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আগে সালাম দিও না।” অর্থাৎ, তারা জিম্মি হলেও; অন্যান্য কাফিরের ক্ষেত্রে তো আরও বেশি প্রযোজ্য। আগে সালাম দেওয়া যাকে সালাম দেওয়া হয় তাকে মর্যাদা প্রদান করা, আর তাদের মর্যাদা প্রদান করা অনুমোদিত নয়। একইভাবে সালাম বা অনুরূপ আচরণের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে পারস্পরিক স্নেহ ও ভালোবাসা গড়ে তোলাও অনুমোদিত নয়। আল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো সম্প্রদায়কে তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধীদের ভালোবাসতে দেখবে না”—আয়াত।
আর আমাদের তাদের লাঞ্ছিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেমন আল্লাহ তাঁর বাণী “তারা অবনত অবস্থায় থাকবে” দ্বারা এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই অর্থকে সমর্থন করে তাঁর বক্তব্য: “রাস্তায় তাদের কাউকে পেলে তাকে বাধ্য করো”—অর্থাৎ তাকে যেতে বাধ্য করো—“রাস্তার সংকীর্ণতম অংশে”। অর্থাৎ, রাস্তায় দেয়াল থাকলে সে দেয়ালের গা ঘেঁষে থাকবে; অন্যথায় তাকে রাস্তার মাঝখান ছেড়ে যেকোনো এক পাশে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হবে। এটি উপযুক্ত প্রতিফল, যেহেতু তারা সরল পথ থেকে সরে গেছে। আর তাদের হত্যা করা অবশ্যকর্তব্য, কিন্তু জিজিয়ার কারণে তা উঠে গেছে। যা সম্পূর্ণ অর্জন করা যায় না, তা সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া হয় না। সুতরাং এটি এক ধরনের অর্থগত হত্যা। আল্লাহই ভালো জানেন।
নববীর শরহ মুসলিমে আছে: আমাদের কিছু আলেম বলেছেন, তাদের আগে সালাম দেওয়া মাকরুহ, হারাম নয়। কিন্তু এই মত দুর্বল; কারণ নিষেধটি হারাম বোঝায়। তাই সঠিক মত হলো, তাদের আগে সালাম দেওয়া হারাম। কাযী ইয়ায একদল আলেমের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, প্রয়োজন ও জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের আগে সালাম দেওয়া অনুমোদিত। এটি আলকামা ও নাখায়ীর মত। আওযায়ী বলেছেন: তুমি সালাম দিলে সৎ ব্যক্তিরাও সালাম দিয়েছেন; আর তুমি তা ছেড়ে দিলে সৎ ব্যক্তিরাও তা ছেড়েছেন।
আমি বলি: অধিকতর সঠিক মত অনুযায়ী তা ছেড়ে দেওয়াই বেশি উপযুক্ত। তিনি বলেছেন: বিদআতীর ক্ষেত্রে নির্বাচিত মত হলো, কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ বা অনিষ্টের আশঙ্কা ছাড়া তাকে আগে সালাম দেওয়া হবে না। আর কাউকে না চিনে সালাম দেওয়ার পর সে জিম্মি বলে জানা গেলে, তাকে তুচ্ছ করার জন্য “আমি আমার সালাম ফিরিয়ে নিলাম” বলে নিজের সালাম প্রত্যাহার করা মুস্তাহাব। আমি বলি: যে বিদআতী, বিদ্বেষ পোষণকারী বা অহংকারী ব্যক্তি সালামের উত্তর দেয়নি, তার ক্ষেত্রেও এমন আচরণে অসুবিধা নেই।
তিনি বলেছেন, আমাদের আলেমরা বলেছেন: জিম্মির জন্য রাস্তার প্রধান অংশ ছেড়ে দেওয়া হবে না; বরং তাকে সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করা হবে। তবে সংকীর্ণ করার পদ্ধতি এমন হতে হবে, যাতে সে কোনো গর্ত বা অনুরূপ স্থানে পড়ে না যায়। রাস্তা ভিড়মুক্ত হলে কোনো অসুবিধা নেই। “মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন”—একইভাবে আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিজীও বর্ণনা করেছেন।

এই ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বিশ্বাসকে জনপরিসরে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড বানানো হয়েছে। রাস্তার মাঝখান ছেড়ে অমুসলিমকে এক পাশে যেতে বলার কারণ হিসেবে আল-কারী তার চলাফেরার কোনো অসুবিধা, অন্য পথচারীর নিরাপত্তা বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন উল্লেখ করেননি; তিনি বলেছেন, অমুসলিম সরল পথ থেকে সরে গেছে, তাই রাস্তার মাঝখান থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া উপযুক্ত প্রতিফল। অর্থাৎ, মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য তাকে দৈনন্দিন জীবনে নিচু অবস্থানে রাখাকে ন্যায়সংগত প্রতিফল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এখানে “লাঞ্ছনা” শব্দটি সমালোচকের আরোপ নয়; আল-কারী নিজেই ইযলাল শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং সেটিকে ধর্মীয় নির্দেশ বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁর যুক্তিতে ধর্মতাত্ত্বিক অসম্মতি সরাসরি সামাজিক মর্যাদাহানির অনুমোদনে পরিণত হয়েছে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় তাঁর “অর্থগত হত্যা” কথাটি। এই শব্দবন্ধের আগে তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন, তা বাদ দিলে বক্তব্যটির কঠোরতা এবং উদ্দেশ্য দুটোই আড়াল হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, জিজিয়ার কারণে হত্যার বিধান উঠে গেলেও যা সম্পূর্ণ করা যাচ্ছে না, তা সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া হবে না; এরপর পথের সংকীর্ণ অংশে সরানোর আচরণকে অর্থগত হত্যা বলেছেন। তাঁর এই ব্যাখ্যায় অমুসলিমের জীবন রক্ষা পাওয়া এবং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা দুটি আলাদা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জিজিয়া তার জীবন রক্ষার কারণ হিসেবে উল্লেখিত হলেও, সামাজিক অপমানকে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত রেখে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জিম্মি ব্যবস্থায় অমুসলিমের প্রাণরক্ষার বিধান থাকলেই তার সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়—এই সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের ব্যাখ্যা থেকেই খণ্ডিত হয়। সুরক্ষিত জীবন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন এক নয়; জীবন রক্ষার শর্তের সঙ্গে অপমানের নির্দেশ জুড়ে দিলে সেই ব্যবস্থায় অধস্তনতা থেকেই যায়।

সালাম ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনাটিও এই সামাজিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে। একজন মানুষকে না চিনে সালাম দেওয়া হলো; তখন তার প্রতি সাধারণ সৌজন্য দেখাতে কোনো বাধা অনুভূত হয়নি। কিন্তু পরে সে জিম্মি অমুসলিম বলে জানা গেলে, আল-কারীর উদ্ধৃত আলোচনায় তাকে তুচ্ছ করার উদ্দেশ্যে সেই সালাম প্রত্যাহার করাকে মুস্তাহাব বলা হচ্ছে। আচরণ বদলানোর কারণ ওই ব্যক্তির কোনো অপরাধ, দুর্ব্যবহার বা সালামের প্রতি বিদ্রূপ নয়; নতুন করে জানা তার ধর্মীয় পরিচয়। এই নিয়ম অনুসরণ করলে মানুষের সঙ্গে প্রাথমিক সৌজন্যমূলক সম্পর্কও তার বিশ্বাস যাচাইয়ের অধীন হয়ে পড়ে। একই ব্যাখ্যায় প্রয়োজনের কারণে সালাম দেওয়ার মত এবং গর্তে পড়ে যাওয়ার মতো ক্ষতি এড়ানোর সীমা উল্লেখ আছে; কিন্তু লাঞ্ছনা, মর্যাদা না দেওয়া এবং ধর্মীয় পরিচয় জানার পর সৌজন্য প্রত্যাহারের বিধানও স্পষ্টভাবে উপস্থিত। পূর্ণ বক্তব্যটি পড়লে দেখা যায়, সামাজিক অসম্মান এখানে আকস্মিক কোনো রূঢ়তা নয়; তা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা এবং ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।


শুধু যুদ্ধকালীন ইহুদিদের জন্য? শামের খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ

এই বিধানকে কেবল মদিনার কোনো বিশেষ ইহুদি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতকালীন সাময়িক নির্দেশ হিসেবে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সুনান আবু দাউদের একটি বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ। সুহাইল ইবন আবি সালিহ বলেন, তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে শামে যাচ্ছিলেন। পথে লোকেরা খ্রিস্টানদের উপাসনালয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিচ্ছিল। তাঁর বাবা তখন আবু হুরায়রা থেকে এই একই হাদিস উদ্ধৃত করে তাদের আগে সালাম দিতে নিষেধ করেন। অর্থাৎ হাদিসটির প্রাথমিক transmission tradition-এই এটি মদিনার কোনো নির্দিষ্ট শত্রু গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ না রেখে শামের খ্রিস্টানদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। [9]

خرجت مع أبي إلى الشام فجعلوا يمرون بصوامع فيها نصارى فيسلمون عليهم، فقال أبي: لا تبدءوهم بالسلام، فإن أبا هريرة حدثنا عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لا تبدءوهم بالسلام، وإذا لقيتموهم في الطريق فاضطروهم إلى أضيق الطريق.
বাংলা অনুবাদ: আমি আমার বাবার সঙ্গে শামের দিকে বের হয়েছিলাম। তারা খ্রিস্টানদের উপাসনালয়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে তাদের সালাম দিচ্ছিল। তখন আমার বাবা বললেন: তোমরা তাদের আগে সালাম দিও না; কারণ আবু হুরায়রা আমাদের কাছে রাসুলের বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন: তোমরা তাদের আগে সালাম দিও না, আর রাস্তায় তাদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের রাস্তার সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করো।

এই বর্ণনা থেকে মুহাম্মদের মূল নির্দেশ দেওয়ার ঐতিহাসিক motive নির্ধারণ করা যায় না; কিন্তু একটি বিষয় নির্ধারণ করা যায়—প্রাথমিক মুসলিম transmission-এ বিধানটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মদিনাকেন্দ্রিক পরিস্থিতির মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়নি। শামের খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে পরবর্তী কোনো ব্যাখ্যাকার যদি একে সম্পূর্ণভাবে “শুধু তখনকার যুদ্ধকালীন নির্দেশ” বলে বাতিল করেন, সেই ব্যাখ্যা এই প্রাথমিক প্রয়োগের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।


একটি বিচ্ছিন্ন হাদিস নয়: নববীর ফিকহি বিধানে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস

ইমাম নববীর রওদাতুত তালিবীন-এ রাস্তার বিধানটি একটি বৃহত্তর ফিকহি কাঠামোর মধ্যে এসেছে। সেখানে জিম্মিকে রাস্তার প্রধান অংশ না দেওয়া, তাকে সম্মানের আসন না দেওয়া এবং মুসলমানদের উপস্থিতিতে তাকে সভায় অগ্রাধিকার না দেওয়ার বিধানের পাশাপাশি পোশাক ও বাহ্যিক পরিচয়ে মুসলিমদের থেকে আলাদা রাখার বিস্তারিত নিয়মও উল্লেখ করা হয়েছে। [10]

لا يترك لذمي صدر الطريق، بل يلجأ إلى أضيقه إذا كان المسلمون يطرقون … ولا يوقر، ولا يصدر في مجلس إذا كان فيه مسلمون … ويؤخذ أهل الذمة في دار الإسلام بالتميز في اللباس.
বাংলা অনুবাদ: জিম্মির জন্য রাস্তার প্রধান অংশ ছেড়ে দেওয়া হবে না; মুসলমানেরা রাস্তা ব্যবহার করলে তাকে সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করা হবে … তাকে সম্মান প্রদর্শন করা হবে না এবং মুসলমানরা উপস্থিত থাকলে তাকে সভায় অগ্রবর্তী আসন দেওয়া হবে না … ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মিদের পোশাকে পৃথক পরিচয় বহন করতে বাধ্য করা হবে।

একই আলোচনায় নববী জিম্মিদের আলাদা রঙ বা চিহ্নযুক্ত পোশাক, কোমরে বিশেষ বেল্ট, নির্দিষ্ট বাহন ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিমদের থেকে দৃশ্যমানভাবে আলাদা রাখার বিধানও উল্লেখ করেছেন। ফলে রাস্তার সংকীর্ণ অংশে যাওয়ার নির্দেশকে একটি বিচ্ছিন্ন “ট্রাফিক শিষ্টাচার” হিসেবে পড়া ঐতিহাসিক ফিকহি কাঠামোর সঙ্গে মেলে না। এটি এমন একটি status-system-এর অংশ যেখানে ধর্মীয় পরিচয় সামাজিক মর্যাদা, চলাচলের অগ্রাধিকার এবং বাহ্যিক পরিচয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।


ইবনুল কাইয়্যিমের আহকাম আহল আল-ধিম্মা: মুসলিমের জন্য আসন ছাড়তে হবে

ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর আহকাম আহল আল-ধিম্মা গ্রন্থে উমরের নামে প্রচলিত “শর্তে উমর” বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত করেছেন। এই শর্তগুলোর ঐতিহাসিক সনদ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ইবনুল কাইয়্যিম নিজেই বলেন যে ফকিহগণ এগুলো গ্রহণ করেছেন, নিজেদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত পাঠে অমুসলিমদের মুসলমানদের সভায় সম্মান করা, তাদের পথ দেখানো এবং মুসলমান বসতে চাইলে নিজেদের আসন ছেড়ে দেওয়ার শর্তও রয়েছে। [11]

وأن نوقر المسلمين في مجالسهم ونرشدهم الطريق ونقوم لهم عن المجالس إن أرادوا الجلوس … وشهرة هذه الشروط تغني عن إسنادها، فإن الأئمة تلقوها بالقبول وذكروها في كتبهم واحتجوا بها.
বাংলা অনুবাদ: আমরা মুসলমানদের তাদের সভায় সম্মান করব, তাদের পথ দেখাব এবং তারা বসতে চাইলে তাদের জন্য নিজেদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াব … এসব শর্তের প্রসিদ্ধিই এর সনদের প্রয়োজন পূরণ করে; কারণ ইমামগণ এগুলো গ্রহণ করেছেন, নিজেদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং এগুলো দিয়ে দলিল পেশ করেছেন।

এই দলিলটিকে উমরের নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ব্যক্তিগত ফরমান হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবনুল কাইয়্যিমের মতো প্রভাবশালী ফকিহ এটিকে জিম্মিদের বিধান ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং এর সামাজিক নীতিগুলোকে ফিকহি আলোচনার মধ্যে স্থান দিচ্ছেন। রাস্তার অগ্রাধিকার, আসন ছেড়ে দেওয়া, পৃথক পোশাক, প্রকাশ্য ধর্মীয় চিহ্ন সীমিত করা—সবগুলো মিলিয়ে এখানে সমমর্যাদার নাগরিকত্ব নয়, একটি প্রকাশ্য ধর্মভিত্তিক status hierarchy দেখা যায়।


আধুনিক যুগেও বিধানটি বিলুপ্ত নয়: ইবন উসাইমিন

আধুনিক সালাফি আলেম মুহাম্মদ ইবন সালিহ আল-উসাইমিনও হাদিসটিকে বাতিল বা কেবল অতীতের জন্য প্রযোজ্য ঘোষণা করেননি। তিনি শুধু দেয়ালে চেপে ধরার মতো শারীরিক ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় মুসলমান অমুসলিমের জন্য নিজের পথ ছেড়ে দেবে না; সংকীর্ণতা থাকলে সেটি অমুসলিমের ওপরই পড়বে। তিনি এই বিধানকে মুসলমানের মর্যাদা প্রকাশের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। [12]

لا تتوسعوا لهم إذا قابلوكم حتى يكون لهم السعة ويكون الضيق عليكم، بل استمروا في اتجاهكم وسيركم، واجعلوا الضيق إن كان هناك ضيق على هؤلاء … بل فيه إظهار لعزة المسلم.
বাংলা অনুবাদ: তারা তোমাদের মুখোমুখি হলে তাদের জন্য এমনভাবে জায়গা প্রশস্ত করো না যাতে প্রশস্ততা তাদের জন্য হয় আর সংকীর্ণতা তোমাদের ওপর পড়ে। বরং তোমরা নিজেদের দিক ও পথে চলতে থাকো, আর যদি সংকীর্ণতা থাকে তবে তা তাদের ওপর রাখো … বরং এর মধ্যে মুসলমানের মর্যাদা প্রকাশ রয়েছে।

এই আধুনিক ব্যাখ্যাটিও মূল বৈষম্য দূর করে না। “অমুসলিমকে দেয়ালে ধাক্কা দেওয়া হবে না”—এটি একটি physical limit; কিন্তু একইসঙ্গে ইবন উসাইমিন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পথ ব্যবহারের অগ্রাধিকার মুসলমানের জন্য সংরক্ষণ করছেন এবং সেটিকে মুসলিম মর্যাদার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কাজেই বিধানটির বৈষম্যমূলক চরিত্র কেবল কোনো মধ্যযুগীয় ভুল ব্যাখ্যার ফল—এ দাবি টেকে না।


উপসংহার

উপরের উৎসগুলো একত্রে পড়লে ধ্রুপদী ইসলামী আইনে মুসলিম ও জিম্মি অমুসলিমের সামাজিক অবস্থান সমমর্যাদাভিত্তিক ছিল—এ দাবি টেকে না। সহিহ হাদিসে ইহুদি ও খ্রিস্টানকে আগে সালাম না দেওয়া এবং রাস্তায় তাদের সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করার নির্দেশ এসেছে। নববী এই বিধানকে জিম্মির জন্য রাস্তার প্রধান অংশ ছেড়ে না দেওয়ার নিয়ম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবু আল-আব্বাস আল-কুরতুবি আগে সালাম দেওয়াকে সম্মান হিসেবে চিহ্নিত করে কাফিরকে সেই সম্মানের অনুপযুক্ত বলেছেন এবং সরাসরি তাকে ছোট ও তুচ্ছ করার ভাষা ব্যবহার করেছেন। মোল্লা আলী আল-কারী আরও সরাসরি অমুসলিমদের লাঞ্ছিত করার নির্দেশের কথা লিখেছেন। এগুলো সমালোচকের আরোপিত আধুনিক শব্দ নয়; ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকারদের নিজেদের ব্যবহৃত ধারণা।

এই কাঠামো কেবল সালাম বা পথ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ ছিল না। নববীর ফিকহি আলোচনায় জিম্মিকে সম্মানের আসনে অগ্রাধিকার না দেওয়া, মুসলমান থেকে দৃশ্যমানভাবে আলাদা পোশাক পরানো এবং বিভিন্ন সামাজিক চিহ্নের মাধ্যমে পৃথক রাখার বিধান এসেছে। ইবনুল কাইয়্যিমের উদ্ধৃত ‘শর্তে উমর’-এ মুসলমানের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া ও পথ দেখানোর মতো শর্ত সংরক্ষিত হয়েছে। ইবনে কাসীর জিজিয়া ও ‘সাগিরুন’-এর ব্যাখ্যায় অমুসলিমের অবনত ও লাঞ্ছিত অবস্থাকে ধর্মীয় বিধানের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ এখানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি রূঢ় আচরণের সমষ্টি নয়, বরং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মর্যাদা ও সামাজিক অগ্রাধিকারের একটি কাঠামোগত পার্থক্য দেখা যায়।

এই বিধানগুলোর সমালোচনার জবাবে প্রায়ই বলা হয়, অমুসলিমকে দেয়ালে আঘাত করতে বলা হয়নি বা অকারণে শারীরিক নির্যাতনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কথাটি সত্য হলেও তা মূল সমস্যার উত্তর নয়। কাউকে শারীরিকভাবে আহত না করা এবং তাকে সমান সামাজিক মর্যাদা দেওয়া একই বিষয় নয়। ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় অমুসলিমকে রাস্তার অগ্রাধিকার না দেওয়া, আগে সম্মানসূচক সালাম না দেওয়া, সভায় অগ্রাধিকার না দেওয়া এবং পৃথক সামাজিক চিহ্ন বহন করানো—এসব বিধান physical violence ছাড়াই ধর্মভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। আধুনিক মানবাধিকারের মৌলনীতি অনুযায়ী একজন নাগরিকের সামাজিক মর্যাদা, জনপরিসরে অধিকার বা সম্মানের মাত্রা তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এই কারণে ধ্রুপদী জিম্মি কাঠামোর এই বিধানগুলো আধুনিক সমমর্যাদা ও বৈষম্যহীন নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হুসাইন আল-মাদানী প্রকাশনী, হাদিসঃ ১৬০২ ↩︎
  2. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৬০৮ ↩︎
  3. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৮ ↩︎
  4. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৫-৫৬৬ ↩︎
  5. ইবনে কাসীর, তাফসীর আল-কুরআন আল-আজীম, সূরা তাওবা ৯:২৯ ↩︎
  6. ইমাম নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৩২৪ ↩︎
  7. আবু আল-আব্বাস আল-কুরতুবি, আল-মুফহিম, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৯০; আহলে ধিম্মাকে আগে সালাম না দেওয়া এবং তাদের সালামের উত্তর দেওয়ার পরিচ্ছেদ ↩︎
  8. মোল্লা আলী আল-কারী, মিরকাত আল-মাফাতিহ, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৯৩৯, হাদিস ৪৬৩৫-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  9. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫২০৫ ↩︎
  10. ইমাম নববী, রওদাতুত তালিবীন, জিম্মিদের বিধান ↩︎
  11. ইবনুল কাইয়্যিম, আহকাম আহল আল-ধিম্মা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৫৯-১১৬৫ ↩︎
  12. মুহাম্মদ ইবন সালিহ আল-উসাইমিন, মাজমু ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ৩/৩৮ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Historical, legal and philosophical criticism of religious discrimination in Islamic social regulations.

Epistemic Position: Secular rationalism, equal human dignity and freedom of belief. Religious prescriptions are examined through their stated purposes, practical implications and compatibility with equal rights.

This article examines the instruction to withhold the initiative in greeting Jews and Christians with salam and to force them into the narrowest part of the road. It traces the interpretation of this instruction through hadith collections, classical commentaries and jurisprudential works, showing how religious identity determines entitlement to respect and priority in public space.

The discussion draws on al-Nawawi, Abu al-‘Abbas al-Qurtubi, Mulla ‘Ali al-Qari, Ibn Kathir and Ibn al-Qayyim, alongside the modern explanation of Ibn ‘Uthaymin. Extended quotations document the language of humiliation, belittlement and contempt, as well as related rules concerning seating, distinctive clothing and the withdrawal of greetings. Arabic source passages and translations accompany the analysis.

The central argument concerns the distinction between protection from physical injury and recognition of equal social standing. Rules can prohibit bodily harm while preserving religious subordination through everyday conduct. The article examines how these prescriptions establish an inferior position for non-Muslims and conflict with equal citizenship and human dignity.

Leave a comment

Your email will not be published.