জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

জাকির নায়েকের মিথ্যাচারঃ ইসলামিক জবাইতে পশু কষ্ট পায় না?

প্রকাশিত: আগস্ট 17, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 3 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামিক কোরবানির প্রথা অনুযায়ী, পশু জবাই করার সময় নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলা হয়, যা শরিয়াহ্‌ আইনে নির্ধারিত। এই প্রথায় পশুর গলার সামনের অংশ কেটে দেয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে রক্ত প্রবাহিত হতে দেয়া হয়, কিন্তু স্পাইনাল কর্ড অক্ষত রাখা হয়। এই পদ্ধতির যৌক্তিকতা ইসলামিক চিন্তাবিদরা ব্যাখ্যা করেন এভাবে—রক্ত নিষ্কাশন হলে মাংস ‘পবিত্র’ হয় এবং প্রাণী নাকি কম কষ্ট পায়। কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, বাস্তবে এটি একদম উল্টো ফল দেয়। স্পাইনাল কর্ড অক্ষত থাকার কারণে প্রাণীটি দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করে [1].

ড. জাকির নায়েকের কোরবানি বিষয়ক বক্তব্য

স্পাইনাল কর্ড এবং ব্যথা অনুভূতির সম্পর্ক

স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদণ্ডের স্নায়ুতন্ত্রী প্রাণীর কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। এটি মস্তিষ্কের সাথে শরীরের বাকি অংশগুলির সংযোগ স্থাপন করে এবং ব্যথা, চাপ, তাপমাত্রা ইত্যাদি সংবেদন প্রেরণ করে [2]. যখন স্পাইনাল কর্ড অক্ষত থাকে, তখন ব্যথার সংকেত মস্তিষ্কে অব্যাহতভাবে পৌঁছায়। তাই জবাইয়ের পর যদি স্পাইনাল কর্ড কাটা না হয়, প্রাণীটি সম্পূর্ণ চেতনার সঙ্গে মৃত্যু অবধি ব্যথা অনুভব করতে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যখন প্রাণী ধীরে ধীরে রক্তশূন্য হয়, তখন অক্সিজেনের ঘাটতি (hypoxia) দেখা দেয়, কিন্তু মস্তিষ্ক এখনো কার্যকর থাকে, ফলে ব্যথার সংকেত প্রবাহ বন্ধ হয় না [3]। ফলে “হালাল স্লটার” পদ্ধতিতে প্রাণীর মৃত্যুর প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ এবং কষ্টদায়ক।

জবাই

আধুনিক পশু অধিকারের দৃষ্টিকোণ

আধুনিক পশু কল্যাণ নীতিতে (Animal Welfare Standards) প্রাণীর কষ্ট কমানোকে প্রধান নৈতিক শর্ত হিসেবে দেখা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের 2009/1099/EC নির্দেশিকা অনুযায়ী, জবাইয়ের আগে প্রাণীকে সংজ্ঞাহীন করা (stunning) বাধ্যতামূলক, যাতে তারা ব্যথা অনুভব না করে [4]. বৈদ্যুতিক শক, captive bolt gun, বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস ব্যবহার করে প্রাণীকে অচেতন করা হয়, যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ মুহূর্তেই বন্ধ করে দেয় এবং ব্যথা অনুভূতি নষ্ট করে।

বিপরীতে, ধর্মীয় কোরবানির ক্ষেত্রে এই অচেতনকরণ অনুমোদিত নয়, কারণ এতে “আল্লাহর নামে রক্ত প্রবাহিত” হওয়ার শর্ত পূরণ হয় না। কিন্তু নৈতিকভাবে এটি একটি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে—ধর্মীয় বিধানকে অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে প্রাণীর অপ্রয়োজনীয় কষ্টকে অনুমোদন দেওয়া হয় [5].


ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন

ইসলামী ফিকহে বলা হয়েছে, “বিসমিল্লাহ” উচ্চারণ করে পশু জবাই করলে তা হালাল হয় এবং এর রক্ত নির্গমনই শুদ্ধতার প্রতীক। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মূলত আধ্যাত্মিক, শারীরবৃত্তীয় নয়। আধুনিক পশুচিকিৎসাবিদ্যা দেখায়, জবাইয়ের পর স্পাইনাল কর্ড অক্ষত থাকলে মস্তিষ্ক অন্তত ২০–৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, ফলে প্রাণী তীব্র ব্যথা অনুভব করে [6].

অনেক ইসলামী দেশে এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে—ধর্মীয় রীতি অপরিবর্তিত রেখে কি বৈজ্ঞানিকভাবে ‘হিউম্যান স্লটার’ পদ্ধতি সংযোজন সম্ভব? মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সৌদি আরবের কিছু আধুনিক স্লটারহাউসে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে ‘reversible stunning’ অনুমোদিত করা হয়েছে, যাতে পশু মারা না গিয়ে কেবল সংজ্ঞাহীন হয় [7].


উপসংহার

ইসলামিক কোরবানির প্রথা ধর্মীয় আচার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান ও নৈতিক দর্শনের আলোকে এটি একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রথা। স্পাইনাল কর্ড অক্ষত রেখে জবাই করা হলে প্রাণী তার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যথা অনুভব করে; অথচ সামান্য অচেতনকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সেই কষ্ট সহজেই কমানো সম্ভব। ফলে, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা অক্ষুণ্ণ রেখেও বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। একবিংশ শতাব্দীর মানবিক সমাজে কোনো ধর্মীয় আচারই প্রাণীর অযথা যন্ত্রণাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।


[ai_review]


তথ্যসূত্রঃ
  1. Gregory & Wotton, 1986, Meat Science ↩︎
  2. Kandel et al., 2021, Principles of Neural Science ↩︎
  3. Bager et al., 1992, Acta Veterinaria Scandinavica ↩︎
  4. European Food Safety Authority, 2013, EFSA ↩︎
  5. Singer, 1975, Animal Liberation ↩︎
  6. Grandin, 2010, Applied Animal Behaviour Science ↩︎
  7. Rahman et al., 2016, Journal of Animal Ethics ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.